Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Nakur Babu
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
নকুতুবু
(নুতন না
‘ভজহরি-সর্দার প্রণেতা’
শ্রীহরিমােহন মুখােপাধ্যায় প্রণীত
কলিকাতা
৮১নং কলেজ স্ট্রীট, পশুপতি প্রেসে
শ্রী অবিনাশচন্দ্র বসু দ্বারা মুদ্রি,
কলিকাতা-বহুবাজার ৭নং পঞ্চাননতলা লেন হইতে
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।
মূল্য আট আনা।
No text on this page.
ভূমিকা।
আমি সখ করিয়া আমােদের জন্য এই বহি লিখি নাই ; বড়ই
মনঃকষ্টে লিখিয়াছি। কেন মনঃকষ্ট,—ভাবুক পাঠক বহি পড়িলেই
বুঝিতে পারিবেন। বলিয়া রাখি, এ বহি নাটক নহে, নক্সা মাত্র।
সুতরাং নাটকের চরিত্র-চিত্রণ-গুণ এ নক্সায় পূর্ণাংশে সম্ভবিতে
পারে না। পাঠক এই বহি পড়িবার কালে এইটুকু মনে রাখি-
বেন, ইহাই আমার বিনীত অনুরােধ। আমার অকৃত্রিম সুহৃৎ
দাতাকর্ণ, হরিবাসর, দীনবন্ধু প্রভৃতি বিবিধ সুপ্রসিদ্ধ গীতাভিনয়-
গ্রন্থ-প্রণেতা শ্ৰীযুক্ত হরিপদ চট্টোপাধ্যায় মহাশয় এই গ্রন্থ-প্রকাশে
বিশেষ আগ্রহাতিশয্য দেখাইয়াছেন। এ পক্ষে পাপতি প্রেসের
মান মাখমলাল রায় এবং মান সুদর্শন চট্টোপাধ্যায়ের যত্নও
আমি ভুলিতে পারিব । জ দুম্বা ইহাদের মঙ্গল করুন।
ইতি সন ১৩১৬ সাল। ১০ই মাঘ ।
গ্রাম সেনেট।
পােঃ সেনেট।
জেলা হুগলী ।
হরিমােহন দেবশর্মা
মুখােপাধ্যায়।
No text on this page.
THE ABSENTEE KANDLORDS. ': : ৩ $ 3' ! There is little sympathy between the tenunts and their landlords as the latter do not live on their estutes and take no interest in works of public utility or improvement." An extract from the report of the commi ssioner of the Presidency Division for the past oficial yea.!' 1909. পল্লীবাসী জমিদার মাত্রেই যে সহরবাসী এবং প্রজাগণের প্রতি সম্যকরূপ সহানুভূতিশূন্য, এমন কথা প্রকৃত নহে; আমি এমন কথা বলি না। খাস্ পল্লীবাসী প্রজাবৎসল জমিদারও অনেক আছেন। ইহাদের সংখ্যা যতই বাড়িবে, পল্লীগ্রাম- সমূহের পক্ষে ততই মঙ্গল। গ্রন্থকার।
No text on this page.
#seleasesales at assesselease
আশীৰ্ব্বাদী।
dega999999999
পরম-কল্যাণ-ভাজন বহু গুণাস্পদ
শ্রীমান বরদা প্রসাদ বসু।
পরম ক্ষেমাস্পদে।
নিত্যমঙ্গল-কামী
শ্রীহরিমােহন দেবশর্মা
মুখােপাধ্যায়।
শ্ৰীমান বরদা-বাবু !
আপনি “বঙ্গবাসীর প্রতিষ্ঠাতা যােগেন্দ্রচন্দ্র
বসু মহাশয়ের জ্যেষ্ঠপুত্র। তিনি আমার প্রতিপালক
ছিলেন ; আপনি ও আমার প্রতিপালক। পরন্তু
আপনি আমার বড়ই ভক্তি করিয়া থাকেন। আমি
আপনার বহু গুণে মুগ্ধ ; কিন্তু দরিদ্র। দরিদ্র
ব্রাহ্মণের আশীৰ্বাদই সম্বল। আপনার সর্বাঙ্গীণ
মঙ্গল কামনা করিয়া, আশীৰ্ব্বাদী-স্বরূপ এই গ্রন্থ আমি
আপনার করে অর্পণ করিলাম। আমি জানি, হিন্দুর
দেশে হিন্দুধৰ্ম্মের শ্রীবৃদ্ধি হউক, বিলাস-স্রোত
মন্দীভূত হউক, ইহা আপনার আন্তরিক ইচ্ছা।
তাই, পল্লী গ্রামের আধুনিক অবস্থার দর্পণ-স্বরূপ এই
গ্রন্থ আপনার করে অর্পণ করিয়া, আজ আমি অতি-
মাত্র তৃপ্ত এবং কৃতার্থ ।
৭নং পঞ্চাননতলার গলি,
বহুবাজার - কলিকাতা।
সন ১৩১৬ সাল । তারিখ ১০ ই মাৰ ।
Assssssssssssssssssssssssssssssssssssssssssssssssss
===
No text on this page.
প্রস্তাবনা।
একজন প্রবীণ-গ্রাম-মণ্ডলের গাইতে গাই,
প্রবেশ
শুধু পা, জোলাধুতি পরা, কঁাধে এক গামছা ।
( বাউলের সুর।)
এ যে ঘাের দিশে লাগা।
এ যে ঘোর দিশে লাগা।
{ গাছের গোড়া কেটে, ঠাণ্ডা জলে
জাগিয়ে রাখা আগা
দেশের মণি, পাড়াগাঁয়ে শুনি হাহাকার,
সুখ-বিলাসী গেঁয়ো বাবু, নজর নাইক তার,
(ওরে) বাস্তু-ভিটেয় চরিয়ে ঘুঘু সহরেতে ভাগা।
পাড়া-গাঁয়ের পুকুর চটান ঘর-ভিটে শ্মশান,
সহরবাসী গায়ের মালিক, সে দিকে না চান,
( বরং) সহর থেকে থেকে থেকে
চাদা-মাথট মাগা।
লক্ষনী-গােল গাঁয়ের গায়ে ধরূলাে ধ্বস-পচা,
সভা করে বাবুর কেবল বােতিতা রচ,
(ওরে) ব্ৰহ্ম-তেলােয় কেউটে-কামড়,
হাতে বাঁধা তাগা।
No text on this page.
নকুড় বাবু?
প্রথম দৃশ্য।
[ গ্রাম্য পথ ]
গােপী-যন্ত্র-হাতে আউলে ক্ষেপা,পরাণ ঘোষ,ঠান্দিদি।
আউলে ঝিঙ্গে ফুল কঁকুড় কঁকুড়,
নকুড় বাবুর নেজ দেখেছ।
ফজলী-ডালে, আমড়া দোলে
আঙোর হড়ীর রব শুনেছ।
পরাণ। চুপ, চুপ চুপ আউলে ! কচ্ছিস কি ? কোন নকুড়ের
নাম কচ্ছিস, !
আইলে। জমিদার ! তালাক-দার ! হাবিলদার ! খেতাব-দার
দর-দার-দেদার দর।
( ২ ) ও যার বাস্তবাটী, ঘুঘুর বাসা, ভিটেয় ফোটে সরষে ফুল। ধা-কিড়ি-কিড়ি ধাক্কিড়ি-কিড়ি। ও যার, মা-জননী, ভিখারিণী, পেটের পুতের চক্ষুশূল। ধা-কিড়ি-কিড়ি ধাক্কিড়ি-কিড়ি। পরাণ। আউলে ! কঁাধের উপর তাের একটা মাথা ! কথাটা যদি নকুড় বাবুর কাণে উঠে, তা হলেই বুঝেছিস্ ত, এক কোপেই কন্ধ-কাটা রে কন্ধ-কাটা ! অাউলে । ও যার বাপ-পিতেমাে পায়না পিণ্ডি, হদা বেটার হাব বুঝেছ ! পরাণ। আউলে ! নকুড় বাবু গাঁয়ের জমিদার ! গাঁয়ে অত বড় মস্ত বাড়ী ; তুই বলছি, বাস্তুবাড়ীতে ঘুঘুর বাসা, ভিটেয় ফোটে সরূষে ফুল ! আর অমন ক্ষেপামি করিসনি—করিস নি ! আউলে । তাই বটেরে পরাণ ঘােষ ! বড় ভিটা, বড় কোটা বড় ঘরে লিংপােষ ! গাঁয়ের মুনিষ, পায়না হদিস খাজনা-আদায়ে এই- ও-ঠ, বােস, ওঠ বােস ! ও যার বৈঠকখানায় গামােফোন বাজে, প্যাক প্যাক ছােটে হাওয়া-জুড়ী।
( ৩ )
পােড়ার মুখে বিয়ার গাঁজে,
কেঁপে ওঠে তাকিয়া-ভুড়ি ।
ঠান্দিদির প্রবেশ ।
বাণ। এ ! আউলে বেটার আজ নেহাৎ মরণ ঘুনিয়েছে !
ঠান্দি ! এয়েছ ! আজ পাগলটার রকম দেখ । গান্টা আষ্টা
করে এত দিন গাঁয়ে থেকেই কোন রকমে পেটে দুটো ভাত
দিচ্ছিল ; এইবার বেটা জাহান্নমে যায় গো-জাহান্নমে যায় ।
আউলে।
ঠান্দি আমার ঠাউরে দেখনা,
আউলে বলে কি আঙ্গ বাত।
ঘরের খুটি ঘুণে মাটী,
বিগড়ে গেছে পৈতৃক ধাও।
ঠানদি। আউটে। নকুড় বাবু হাজার যােক বড় মানুষ লােক ;
গায়ের জমিদার। তাকে অমন করে কি বলতে আছে
বাছা! দুবো ঘাসও মানুষের শত্রু। কথাটা তার কাণে গেলে,
একটা বিপজ্জি কাণ্ড ঘটবে !
আউলে ।
আউলে ক্ষেপা জলের শেওলা,
ভেসে চলে জলের গায়।
হুরাে হনুর হুঙ্কার শুনে,
আউলে ক্ষেপা ভয় কি পাও
পরাণ। ঠাদি! এক কাজ করা যাক ! কেন অকারণ ক্ষেপাট।
মারা পড়বে ; আউলে বড় ফুলুরি ভালবাসে ; ওকে ফুলু-
( ৪ )
রির লােভ দেখিরে, তােমার বাড়ীই না হয় নিয়ে যাও।
পথের মাঝে দাঁড়িয়ে এমন অবােল-তাবােল কাটা ডাল
হচ্ছে না।
গাউলে।
ঠানদির আমার টেকসই কড়,
পাকা ঘানির হাঁকা তেল।
খাসা জাতার পেশা বেশম,
নাইক ময়লা নাইক ভেল।
ঠাদি ! আমি ফুলুরি খাবাে।
যাদি। দূর হতচ্ছাড়া মিসে! আমি যেন তাের জন্যে ঘিয়ে-
ভাজা ফুলুরি তৈরি করে রেখে, তােকে আদর করে
ডাকতে এয়েছি! আম-মর !
আউলে ।
কেন ঠাদি গর-গর রাগে,
জর-জর হিয়া যাই-যাই-যাই।
নকুড়-বিরহে বড় ব্যথা বুকে,
দুটো ফুলুরি দাও না খাই ।
পরাণ। এই ক্ষেপা ! হট, হিঁয়াসে ! যত বলি চলে যা, বেটার
ততই ক্ষেপামী। ন্যাকামি জুড়ে দিয়েছে ! মার না দিলে
সিধে হবে না বুঝি ?
আউলে।
নড়ে মারে ছড়ে মারে।
ধরে মারে ঘােষের পাে।
মায়ের ছেলে যাই মা কোথা ।
নে } তুলে কোলে থাে৷
( ৫ )
ঠাদি। কেষ্টার কাছে আমি আনা চারেক পয়সা পাব ; খুঁজতে
গেছলুম। সে আজ যে সেই নাবার বেলা বেরিয়েছে, আর
তার দেখা নেই। পথে বেরিয়ে একি কাণ্ড বাপু! তুই ঘরে
যা ! কেন ও-পােটার সঙ্গে ব’কে ব’কে মাথা খারাপ
করছিস !
উলে।
এদিন পরে ঘরের কদর,
আগা ভিতে পল্কা চাল।
পরাণ গয়লা ডুকরে কাঁদে,
আউলে ছেলের হাড়ীর হাল।
এই আগে-ভাগে আমি যাই ।
আর, গড়ে বসে পা ছড়িয়ে-
নড়ে বাবুর মাথা খাই ।
[ আউলের প্রস্থান।
পরাণ। বেটার পাগলামী আজ কদিন বড়ড বেড়ে উঠেছে
ওকে আর পথে ঘাটে অমন করে যেখানে-সেখানে
বেরুতে দেওয়া হবে না। কিন্তু আউলে নকুড় বাবুর কথা
গুলা ঠিক ঠিক বলে না? খাজনার জন্যে কি অত্যাচার।
ঠাদি। তা—ত বলে ! কিন্তু নকুড় বাবুর হাড়কাটে
কোন্ দিন পড়ে আর কি ? বনে বাস করে বাঘের সঙ্গে
ঝগড়া করাটা কি ভাল? তবে সময় সময় অসহিও হ’
পড়ে ; চুপ করে থাকা যায় না। নকুড় বাবু আর তা
পরিবার যেন বাদসা-বাদসী! কি দেমাক্! কদিন
( ৬ )
;
গাঁয়ে এসেছেন ; গা খান যেন টলমল। কাল একবার
রাণীকে দেখতে যাব। পাড়ার
পাড়ার লােকের এত কষ্ট ; ওঁরা
কি গায়ের কেউ নন্। ধন-দৌলৎ কিসের জন্যে ? এখন
কেষ্টা কোথায় গেল দেখি। পরাণ! তুমি তােমাদের পাড়াটা
একবার খুঁজে দেখবে? পয়সা ক গঙার জন্যে আমার
বড় আটকাচ্ছে।
পরাণ। দেখি।
[ উভয়ের প্রস্থান ।
oE
( ৭ )
পট-পরিবর্তন।
বাক-কঁাধে কতিপয় গয়লা-যুবকের প্রবেশ ।
এক-পে দুধে
তিন-গে জল,
সহরে চালান।
পাড়ার লােকে
পায় না যােগান,
কেঁদে লবেজান ।
সহরে বেচে আসি,
টাকা-সের ছানা,
গায়ের লোকে খুঁড়লে মাথা,
এক ছটাকও পায় না,-
( অমর) নগদ অয়ে নবাব-বাবু,
কার আছে আর এত মান ।
( ৮ )
দ্বিতীয় দৃশ্য।
{ নকুড় বাবুর গ্রামস্থ বাটি ।
নডগৃহিণী শশিমুখী, প্রতিবেশী-রমণী মাতঙ্গিনী,
ফিরিওয়ালী, ঠান্দিদি, আউলে ক্ষেপা ও ঝি।
মাতঙ্গিনী। কি গাে শশিমুখী রাণী ! দিবা ত্রিপ্রহরে নীল
আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে কেবলই পূর্ণশশী খুঁজছ, নাকি ?
“রহু-হু সজনী, আসিবে যামিনী,
ফুটিবে শশাঙ্ক-ফুল !”
পশিমুখী। সংস্কৃত ভাষায় তােমার মত স্ত্রীলােককে প্রগলভা
বলিয়া থাকে। ধীর সমাজে প্রভা কামিনী নিন্দিত।
হাতঙ্গিনী। হে শিক্ষিতা সজনী দিদি ! যে সব পাড়াগেঁয়ে বড়
মানুষদের মেয়ে পাড়া-গাঁ ছেড়ে সহরের তেতালায় বসে
ব’সে অষ্ট প্রহর কেবল বড় বড় আংরেজী কেতাব পড়ে,
তাদিগে কি স্ত্রীলােক বলে ?
“শিহরিয়ে উঠ প্রাণপতি যার,
চখের চাহুনি দেখে।
নফরের মত, তুলে দেয় পতি,
পান খিলি প্রিয়া-মুখে।
যে বর-যুবতী আপন পতিরে,
ভেবা-গঙ্গারাম কয়ে।
( ৯ )
জৰ্ম্মণ পণ্ডিত বিলাতী পণ্ডিত
কি বলিয়া ডাকে তারে।
শশিমুখী। দেখিতেছি, তােমার কবিতা-অভ্যাস আছে, কিন্তু
যখন তখন কবিত্বের অপপ্রয়ােগ শিষ্টজন-সঙ্গত নহে।
আমার সম্মুখেই প্রকারান্তরে কবিতায় আমার নিন্দা করা কি
তােমার উচিত হইতেছে ?
মাতঙ্গিনী। সজনি! ঐটাই আমার দোষ। আমি যখন শ্বাশু -
ডীর কাছে ধীর হয়ে বসে মহাভারতের কথা শুনি, তখন
আমার আদৌ কবিত্ব পায় না ; আর যেমন আমি এই
তােমার কাছে আসি, অমনি সজনি ! কোথা হতে প্রাণের
ভিতর যেন কবিত্বের নায়েরা হাজার মুখে ফুটে উঠে,
কবিত্বের বিলে বড় বড় ঢেউ খেলতে থাকে ;-
“শশিমুখী মত সুখী আর বা কে আছে!
নকুড় নফর যর ফেরে পাছে-পাছে ।
বাস্তবাস বিষাবাস মনে হয় যার।
সহরে নফরে ঘেরা সুখের সাতার।
কলে স্নান, কলে গান, কলে বাতি জ্বলে।
কলে কেতা–কল্-কেতা তাই লােকে বলে।
ও সজনি! মুখখানি এত কাছে মারছে কেন ধনি! রাগ
ক’ছ কি? আমায় একবার তােমাদের কলকেতা-পুরে নিয়ে
যাবে ?
শশিমুখী। তােমার রঙ-বিদ্রুপ ক্রমেই আমার অসহ্য হয়ে উঠছে।
( ১০ ) মাতঙ্গিনী। তা হবে বই কি দিদি ! আমরা পাড়াগেঁয়ে ; আম- দের গেঁয়াে রসিকতা কি সই! তােমায় সয় ? “সহরের সুখ-পােরা ফুর্তি-ভরা প্রাণ। গাঁয়ের কৌতুকে বটে করে আচান্ ॥ সয় কিগো—গাঁয়ে-বসা কাঙ্গালিনী-কথা । মােহ-খনি মেম-ধনি হেথা আছে কোথা ? একজন ফিরিওয়ালীর প্রবেশ। ফিরিওয়ালী। গত। এনেছি চমৎকার চিজ বাজর। ভ’রে থরে থরে । সাবান্ ফিতে, নানা কিতে, আরসির বাহার আসল হীরে । খাসা সীসার রেকাব বাটী, গিষ্ঠীর কাজে পরিপাটী, রকম রকম রুজ পমেটম, তাসের ফোটায় তারা হারে। মা-ঠাকরুণ ! কিছু নেবেন কি ? শশিমুখী। রাবিস মাল আমার অগ্রাহ্য। কলিকাতার একাধিক সাহেব কোম্পানি আমাদের আবশ্যক দ্রব্যের সরবরাহ করিয় থাকে ।
( ১১ )
মাতঙ্গিনী। শিক্ষিত। শশিমুখি ! ইহারা গরিব ; ফেরি করিয়াই
দিন গুজরাণ করিয়া থাকে। দেশে এয়েছ ; এদের কাছে দু-
চারি আনার জিনিস কেন না? এরা কত উৎসাহ পাবে ।
শশিমুখী। আমার নিকট অর্থনীতির ব্যবহার অন্যরূপ।
মাতঙ্গিনী। একি বলো সই! শুনে অবাক্ হই ।
কথাগুলো কটমট, চাহনি সেরূপ।
নাচনি বিবির ঢঙ্গে এদেশী-বিরূপ ।
থাকে। শশি ! একা বসি, আমি যাই চলে।
আবার আসিব-শশী অস্তাচলে গেলে ।
[ প্রস্থান।
ফিরিওয়ালী। কিছু নিলেন না মা !–বড় আশা করে
এসেছিনু মা !
শশিমুখী। বৃথা বাক্য-ব্যয় অনাবশ্যক।
[ ফিরিওয়ালীর প্রস্থান ।
ঠান্দিদির প্রবেশ ।
ঠানদি। বউ-রাণি ! অনেক দিনের পর তুমি বাড়ী এরেছ ; তাই
আমি গাঁয়ের লােকের দুটো কষ্টের কথা তােমায় বলতে
এয়েছি। তােমরা না শুনলে কে শুনবে বাছা ?
শশিমূখী। কষ্ট,-ভগবৎ-সৃষ্টির অমৃত ফল। আমাকে আবার
সে কথা কি শুনাবে ?
ঠানদি। অবাক করলে গো অবাক করলে ! তা বাছা! যাদের
( ১২ )
কাছ থেকে তােমরা কিস্তি-কিস্তি খাজনা আদায় ক’ছ,
তাদের কষ্ট তােমরা দেখবে না ? যাদের খাজনার টাকায়
তােমাদের বড় মাষী, তারা খেতে না পেয়ে মারা গেলে,
তােমাদের খাজনা দিবে কে ?
শশিমুখী। ইহা প্রত্যক্ষ অনধিকার চর্চা ; জেনানা-বাটীর সম্পূর্ণ
অযােগ্য। নায়েব-গােমস্তার পক্ষেই এ সব বিষয় সঙ্গতরূপে
আলােচ্য।
ঠাদি। বাছা! তােমার বাড়ীরই পিছনে ভবার মা আজ এক
মাসকাল রােগে শয্যাগত ; ঘরে কিছু সম্বল নেই ; তার জন্যে
কিছু কিছু মাসােহার বরাদ্দ করে দেবে মা?
শশিমুখী। মিতব্যয়িতা মনুষ্য-মাত্রেরই অবশ্য-পাল্য। অমিতব্যয়ীর
সাহায্য-ব্যবস্থা করিয়া, আমি এ মহানীতির উল্লম্বন করিতে
;
;
একান্ত অসম্মত।
আউলের প্রবেশ ।
আউলে ।
ওরে, ঠাকুর-ঘরে ঠাকরুণ কই।
পেতনি বসে আছে।
কাড়ে দেবে ঠান্দিদি গো !
যেওনা ওর কাছে।
কে তুমি এখানে ?
ভিয়ান-খােলার তাড়, আমি,
খিচ মারিবার যম।
শশিমূখী।
আউলে ।
( ১৩ ) আমি, ভেজাল মাটী, করি খাটি, ঝাজ কি আমার কম ? শশিমুখীর দিকে চাহিয়া ) সারিকা ! একবার রাধাকৃষ্ণ বলে ? শিমুখী। ঝি! দরােয়ানকো বােলাও! কেন সে পাগলটাকে বাড়ীর ভিতর আতে দিয়েছে ? বােলাও-বােলাও ? আউলে । ওরে, মােগলাই পােলাও, একে গেছে, গন্ধে বমি উঠে। একি ঘেন্না, কমল-বনে, গুয়ের গন্ধ ছুটে । (শশিমুখীর দিকে চাহিয়া)—ব্রজেশ্বরি ! এ বৃন্দাবনে কত দিন? ঠানদি। আউলে ! এখানে এসেও আবার ক্ষেপামি ? পালা পালা ! এখনি দরােয়ান এসে তােকে গারদে পুরবে। শশিমুখী। প্রবীণা ! আমি উপলব্ধ করিতেছি, এ কৌতুক আপ- আপনি অহেতুক আমায় অপমানিত করবার জন্যেই এই পাগলটাকে পশ্চাৎ পশ্চাৎ লয়ে এসেছেন। উহার সঙ্গে সঙ্গে আপনার ও বিচার আবশ্যক। জামি নিশ্চিতই তার বিহিত ব্যবস্থা করবাে। ওরে, ছিড়ে গেছে, সােনার তার, তুবড়ে গেছে খামি। গলার গয়না গড়াগড়ি, ডুকরে কাঁদি আমি । ( কান্না ) পিয়ারি। কি হলি গাে ! নারই। আউলে।
( ১৪ )
দরোয়ানের প্রবেশ।
শশিমুখী। (দােয়ানের প্রতি) এ-ই! এখনি এই পাগলটাকে
ধরে, দু হাতে বেঁধে, ঘরের ভিতর আটক রাখবি। হুকুম
বুঝিয়াছিস?
দরােয়ান। আজ্ঞে ! (আউলের দিকে চাহিয়া ) হাই !
আউলে ।
ছইও না ছুইও না-আমি-
লজ্জাবতী লতা।
তােমার সঙ্গে আছে আমার
বহু পীরিতের কথা।
ঠানদি। এই বার আউলে গেল রে গেল,—পাল-পালা !
আউল।
ওরে, সেকুল পালায় আটকে গেছি,
কজে ফাটে দুখে।
আয় ছুটে আয় বেহ্মা-ঠাকুর,
আগুন দে ওর মুখে।
হুমকি দিয়ে পালাই আমি,
ধবে আমায় কে ।
ধূ ধূ-ধূ পেতনি পােড়ে,
বাঁশের খোঁচা দে।
[ দ্রুত প্রস্থান।
শশিমুখী। ( দরােয়ানের প্রতি) ড্যাম্!—তােমার হাত হইতে
একটা পাগল পলাইল ?
( ১৫ )
;
দরােয়ান। পালাল,-তা করবে কি?
শশিমুখী। ইহারও বিচার হইবে ।
পরােয়ান। যাে মজি।
[ দরােয়ানের প্রস্থান।
ঠাদি। আমি যা বলতে এসেছিলুম, তাত শুলে না বাছা !
ভগবান্ তােমাদিগে বড় মানুষ করেছেন ; তােমরা না শুনলে
কে শুনবে বাছা ? তােমরা যদি না শুন, তা হলে ভগবান
তােমাদের উপর রুষ্ট হবেন ! চিরদিন কি সমান যায় বাছা !
শশিমুখী। কে আপনার উপদেশ শুনিতে চাহিতেছে ?
ঠানদি। তােমাদের সন্নিপাতবিকার ; উপদেশ শুনতে যাবে
কেন বাছা ? এখন কি ওমুদ ভাল লাগে ? লাগবে – সবুর
কর ; আমরাই দেখবাে।
শশিমুখী। বৃথা বাক্য-ব্যয়ে আপনি আর আমার সময় নষ্ট
করবেন না। আপনি এই মুহূর্তেই আমার বাড়ী ত্যাগ
করুন।
ঠানদি। ভগবান্ যদি থাকেন, আবার এই ঠান্দিদিকে আদর
করে আর এক দিন ডাকতে হবে-হবে--হবে।
ঐ
যে বলে,-
“আজ দেমাকে দরিয়া সরা।
কাল সকালে বাসি মড়া ।”
[ প্রস্থান।
( ১৬ )
শশিমুখী। কি ! এ মাগটাক্ষে আর বাড়ীতে সহজে আসতে
দিবি না; আমাদের বিনা হুকুমে ত নয়ই। আমি
গােছলখানায় যাচ্ছি। টার্কি সোপ আর ভােয়ালে খান।
নিয়ে চল্। আসুক আগে,--আজ পিগি চটকাবা ।
[ ঝি ও শশিমুখীর প্রস্থান ।
( ১৭ )
পট-পরিবৰ্ত্তন।
কাস্তে-কাটারি-হাতে কতিপয় মজুর-যুবকের প্রবেশ ।
গীত।
যা-যা—মানিনা তাের ভদ্দর-গিরি আর ।
( মােরা) জোরে করি, মজুরগিরি, নগদা রােজগার ।
ভট-চট্ট সাপুই সা,
সবারই ত দু হাত পা,
যেমনি মােরা, তেমনি তােরা,
তােয়াক্কা আর রাখি কার ।
একটা ববি, দশটা শুনবি,
দরকার হলে দশ বার আবি,
( মােরা)রােজ-মজুরী, দয়ায় করি,
চোখ রাঙ্গালে নইকো তার ।
এক ইস্কুলে সবার পড়া,
এক রেলগাড়ী সবার চড়া,
এক কাছারী,—মামলা করি,
বামুন-শূদ্র একাকার।
।
( ১৮ )
তৃতীর দৃশ্য।
| নকুড় বাবুর অন্দর-বাটী)
এর বিচার
নকুড়বাবু, শশিমুখী, ঝি, আউলে ক্ষেপা,
ঠানদিদি, দরােয়ান।
পশিমুখী। মূঢ়! তুমি কি আমায় এবার অপমানিত করবার
জন্যেই সঙ্কল্প করে বাড়ী এনেছ ?
নকুড়। কি হয়েছে—কি ?
শকিমুখী। পাড়ার ঐ ধুমসি বানি—যাকে গা-শুদ্ধ লােক
ঠান্দি বলে ডাকে—সেই বানি একটা উন্মাদকে সঙ্গে করে,
এনে আমার যৎপরােনাস্তি অপমান করিয়াছে।
কি তুমি করতে পারবে? যদি না পারে--যদি না করাে,
তা হলে তােমার সঙ্গে আমার সম্বন্ধ, লােপ-লােপ--লােপ !
মাগাে! তুমি এমন হাড়হাবাতে কাপুরুষের হাতে আমায়
দিয়েছিলে গো ! ( কান্না )
নকুড়। কেঁদেই খুন ; কথাটা ভাল করে না বলে আমি বুঝবে।
কেমন করে ?
শিমুখী। ঘট যে সৰ্ব্বদাই খালি ; বুদ্ধি কি আছে বশ্বের ?
বুদ্ধি থাকলে কি আর এই মেলেরিয়া মরশুমে এদো ডােবার
পাড়ে আমায় নিয়ে এস ? আমি নিশ্চিন্ত হয়ে কোথায়
ব্যাকটি লিয়জি বিষয়ে চিন্তা করবে; নুতন থিয়রি উদ্ভাবনে
;
( ১৯ )
ব্যাপৃত থাকবে, তা না হয়ে বানি এসে বলে কিনা,
অমুকের কষ্ট, খেতে পায় না, খেতে দাও ; অমুক শয্যাগত,
উঠতে পারে না, সাহায্য করে। একটা পাগলা সে আবার
আমার মুখের সম্মুখে ছড়া কাটে, বিদ্রুপ করে, ব্রজেশ্বরী
বলে ! আবার দরােয়ানটাও কি তেমনি ? পাগলটাকে ধরে
আটকে রাখতে বল্লাম, ভেবা-গঙ্গারাম হয়ে দাড়িয়ে রইলো ।
পােড়ার-মুখ! দরােয়ানের ডাল রুটি আজই কমিয়ে দাও; না
শােনে—জবাব ! বানিটার ত কঠিন শাস্তি আবশ্যক।
পাগলাটাকে ধরে তার পাগলামী সম্পূর্ণরূপে ছাড়িয়ে
দিতে পারবে না? এ-জমিদার বাবু ? যদি এই দণ্ডে এই
সব পারে,--ত আমার সম্মুখে দাড়াও,-নচেৎ আমার
সম্মুখ হতে এই মহুর্তেই তাপসৃত হও। বুঝেছ ?
নকুড়। নিশ্চিত। তােমার কথা বুঝবাে না ত বুঝবাে কি ?
নাচিতে নাচিতে আউলের প্রবেশ ।
পশিমুখী। ঐ গো - ঐ।
আউলে । তাই বটে সই
ভূত-পেত্নী ঠিক যুটেছ ;
যেমন হাঁড়- তেমনি সরা।
!
সােনার গাঁরে শাশান করে
আর কেন ধন নৃত্য করা।
ঝাড় না রোজা, সরূষে পড়া,
( ২০ ) মার ঝাড়, আগা গােড়া, শিরে শিরে বহুক জোরে,- কজে-চেরা রক্ত-ধারা । নকুড়। খবরদার । আউলে । যে আজ্ঞা প্রভাে! নকুড়। তামাসা ? আউলে। হরেকৃষ্ণ। সে হাটের সংবাদ কি প্রভাে ? নকুড়। দরােয়ান ? আউলে। আজ্ঞে,-নরক-হাটের সংবাদটা দিয়ে দরােয়ানকে ডাকলে ভাল হয় না ? শশিমুখী। তুমি নিজেই ওটাকে ধরে একটা ঝাঁকুনি দিতে পাচ্ছ না ? আউলে । অন্দরে বন্দর-মেলা বাঁদরী নাচে পিছু-পিছু। সুদরী চেলা নিয়ে আয় ঠানদি! বকসিস দে—না কিছু-কিছু । শশিমুখী। ছি ছি কাপুরুষ ! ওটাকে পাড়ে উত্তম করে জল- বিছুটী লাগাবার ব্যবস্থা করাে না ? আউলে । আয় ঠাদিদি ! আয় ঠান্দিদি ! আয় ঠানদিদি ! দেখবি আয়। পেতনির ঠাটে ভূতের ঠমক্! ধমক খেয়ে পরাণ যায় ।
( ২১ )
জল-বিছুটি জল-বিছুটি জল-বিছুটি জ্বলে।
আয় পেনির নাড়ী ছিড়ে আমি পরাই ভূতের গলে ।
ঠাদি গাে !
ঠানদিদির প্রবেশ ।
ঠান্দি। বাবু! আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন?
নকুড়। তােমার এত স্পর্ধা ?-তুমি অপমান করে ?
ঠানদি। কবে ?—কোথা ?—কার ?
আউলে ।
ভূত-পেতনির মান-অপমান!
হায় হায় হায় ! বলবাে কি ?
বিনি-দত্যি খাবে এবার,-
খুলে তােদের খুলির ঘি।
নকুড়। দরােয়ান?—এ দরােয়ান ? (ঠাদির প্রতি ) তুমি এই
পাগলাটাকে সঙ্গে নিয়ে আমার অন্দরমহলে এসে ভারি
অপমান করে গেছ। জানােই—আমি তােমার এ অপমান
করার শােধ নিতে পারি ?
আউলে । পেত নির রােষে ভূতের রােখ।
তিড়িং-বিড়িং নাচে।
সামনে দাড়িয়ে যমের দূত,
কামড়েছে কাল্-সাপে।
দারােয়ানের প্রবেশ।
নকুড়। এই পাগলাটাকে পাড়ো,-না ভাগে ! খুব হুসিয়ার !!
( ২২ )
( ঠাদির প্রতি ) তুমি জানাে,-তুমি যে বাস্তু বাড়ীতে বসত
করে, সে বাড়ী আমার ;-সে বাড়ীর জমি আমার। আমার
হুকুমে তুমি আর সে বাড়ী ঢুকিতে
পাইবে না; ঢুকিলেই
দরােয়ান তােমায় গলা ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেবে ! তুমি
আমার এলেকায় বাস করিতে পাইবে না।
ঠানদি। কই ! আমি ত ওঁকে কিছুই বলিনি। পাড়ার লােকে-
দের ভারি কষ্ট
তাই দুই এক জনের জন্যে কিছু মাসােহারার
কথা বলেছিলুম। এতে কি অপরাধ বাবু ?
নকুড়। গুরুতর অপরাধ ?—গুরুতর অপমান! এখনি তুমি
তােমার ঘরের চাবি দিয়ে যাও ; নচেৎ ঘাের শাস্তি,-ঘাের
;
শাস্তি !!
আউলে ।
শশিমুখী। আমার কৰ্ম্মে ব্যাঘাত,—পাঠে ব্যাঘাত,-চিন্তায়
ব্যাঘাত! তুমি সে দিন আমার বহু ব্যাঘাত উপস্থিত করিয়াছ ;
তাহার উপর যাইবার কালে শাসাইয়া গিয়াছ ;-সে গুরুতর
অপরাধের হিসাবে এ দণ্ড অতি লঘু -
অতি
লঘু !!
পেতনির মাথায় ঘুঘু চরে,
কাণে ঝোলে কেঁচো।
বিনির কোপে রেহাই নাই,
এই কথাটী এচো।
( নাচিতে নাচিতে) পেত নি! এই কথাটি এচো !
নকুড়। চুপ রও! ( ঠাদির প্রতি )- চাবি-কাটি দিলে ?
( ২৩ )
=
দয়ােয়ান। ওর আঁচল থেকে চাবি-কাটিটা খুলে নাও,
আবি খুলে নাও।
ঠানদি। না গো ! এই দিচ্ছি নাও গাে ! ও মা! বাবু আমার
কি সর্বনাশ করলে গো ! ওগাে ! আমি কোথা যাব গাে !
ওগাে আমি কোথা থাকবাে গাে !
শশিমুখী। যাদের জন্য তুমি সেদিন আমার নিকট ঘােরর মায়া-
কান্না কাদিতে আসিয়াছিলে, তাদের বাড়ীই থাকবে। ভাগে।
হিয়াসে! দরােয়ান! ইকো ভাগায়া দেও!
নকুড়। আবি ভাগে-নচেৎ সমাধাক্কা ।
আউলে,। বানির মাংস ভাগা-ভাগা,
পেতনি বসে খাচ্ছে অই ।
পেয়ারের ভূত পেয়ালা ধ'রে,
ঢাছে তাতে রক্ত-দই !!
নকুড় । ( ঠান্দির প্রতি) এখনও আমার সম্মুখে দাড়িয়ে ?
অাবার নেক্র করে কঁাদা হচ্ছে ? দরােয়ান! ইসকো সমা
ধাক্কা দেকে ভাগাও ।
ঠানদি। ওগাে আমি কোথা যাব গাে ! ওগো! বাবু কি করলে
গো! ওগাে আমার কি সর্বনাশ হলাে গে।।
[ কঁদিতে কাদিতে প্রস্থান ।
শশিমুখী। বানিটার কতকটা হয়েছে । আর একটু বাড়াবাড়ি
করলেই জল-বিছুটি খেত আরকি ! এইবার এই পাগলাটা
( ২৪ )
নকুড়। দরােয়ান! ইকো আচ্ছা তরফসে পাড় কে গারদ
ঘরমে লে চলো !
আউলে । ওরে, পাঁকাল মাছ কি মুঠোয় থাকে,
পিছলে পালায় ধরূতে গেলে।
ধূ-ধূ আগুন উঠবে জ্বলে,
দিন ফুরুলে--আঁধার এলে।
[ প্রস্থান।
শশিমুখী। এ-হে-হে! পালালাে ? ময়দপুরুষ ! কাঁচা খুলে
ঘােমটা দাও না? ছিঃ ছিঃ ছিঃ ! ঝি? নীলাম্বরী শাড়ী-
খানা নিয়ে আয় ত ! বাবু-পুরুষকে পরিয়ে দি।
নকুড়। তামাসা রাখাে; ওর ব্যবস্থা করা যাবে। গায়ের চাল
বড় বিগড়ে গেছে ; দোরস্ত করতে হবে ; কাছারী-বাড়ী
চলুম ; খাজনা বাকী অনেক টাকা ; আদায়ের ব্যবস্থা আজই
করা আবশ্যক।
শশিমুখী।—নিশ্চিত-নিশ্চিত। কতকগুলো মিথ্যাবাদী প্রবঞ্চক
প্রজা দারিদ্র্যের ভাণ করে, আমাদের খাজনা দেওয়া বন্ধ
রেখেছে। তাদের সকলেরই উচিত শাস্তি দেওয়া অতি শীঘ্র
;
অত্যাবশ্যক।
[ উভয়ের প্রস্থান
( ২৫ )
পট-পরিবর্তন।
এক ক্রুদ্ধমূৰ্ত্তি যুবকের প্রবেশ ।
গীত।
দাদা-টাদা আর মানি না
আলাদা হবে।
চালা ভেঙ্গে,
চুলাে ভেঙ্গে,
চুল চিরে ভাগ ল’বো।
বােক ছিলুম এত দিন,
শুধলুম দাদা-বৌয়ের ঋণ,
আমার টাকায় নবাব-গিরি,
আর কি করূতে দোবো ।
দাদা-ভেয়ে আর কি বন্ধ ;
টাকার সঙ্গেই সব সম্বন্ধ,
শুকিয়ে মরুক,—ওদের পানে
আর কি আমি চাবো ।
( ২৬ )
চতুর্থ দৃশ্য ।
[ নকুড় বাবুর কাছারী বাটী।
নকুড় বাবু, পরাণ ঘােষ, আউলে ক্ষেপা, নিধি-
রাম সাপুই, ভূতে সর্দার পাইক,
চারিজন বৈরাগী ।
পরাণ। বাবু। বহুদিন পরে আপনাকে দেখতে পেয়েছি।
আপনার কাছে এক দরখাস্ত আছে।
নকুড়। কি দরখাস্ত ?
পরাণ। নিমে ত খাজনা কিছুতেই দিতে পারবে না; সে বাতে
পঙ্গু ; উঠতে পারে না।
নকুড়। উঠতে পারে না? পেগের হাতে কি লাঠি ছিল না ?
লাঠির চোটে উঠবে।
পরাণ। সে কি বাবু-মােশাই ? আজ পনর দিন তার পেটে ভাত
নেই। উঠবার বল কোথা ?
নকুড়। পাগটা কি অপদার্থ ? নিমের গায়ে বল জমিয়ে দিতে
পালে না? কলুডােবার ঠাণ্ডা জল কলসী কতক নিমের
গায়ে ঢেলে দিলে না ? কঁপুনির চোটে বল আপনি গজিয়ে
উঠবে ! গােমস্তা বেটার কি বাগ্রােধ হয়েছে ?
পরাণ। রামঃ রাম! অমন কথা ববেন না মােশাই ? আমরা
মনে করেছি, গা-শুদ্ধ লােক জুটে এবার নিমের খাজনা বেহ!-
( ২৭ )
ইয়ের জন্যে আপনার কাছে দরাস্ত করবে। আপনি যদি
আমাদের ছেড়ে—গাঁ ছেড়ে-জমিদারী ছেড়ে—সহরে বাস
না করতেন, তাহলে কি গরিব প্রজা আমাদের এত দুর্দশা
নকুড় । ও সব ন্যাকামে রেখে দে ! নিমেকে বুঝিয়ে বল, খাজন।
তাকে দিতেই হবে। আমি কি অষ্টমের টাকা পরিবারের গয়না
বাধা দিয়ে সাৎ করবো ? ওঃ ! বেটারা যেন আমার সােয়াগের
পুং-রে ।
পরাণ। না হয়, কিস্তি-খেলাপের সুদ ধরে নেবেন ; আশীৰ্বাদ
করো মশাই! নিমে বেঁচে উঠক ; অনেক গুলি কাচ্চা-বাচ্চা,
আর কেউ নেই।
নকুড় । কোন কথা শুনতে চাহি না। সুদ কি ? খাজনা আজই
আদায় করবাে। দরখাস্ত কিরে বেটা ? তুই এখনি নিমের
বাড়ী যা। আমি পাগও পাঠাচ্ছি। খাজনা এখনি আমার
চাই। না পাই, গােমস্তাকে বলে রাখছি, তােরও তামাম
সম্পত্তি ক্রোক করবে। বুঝলি !
পরাণ। বুঝবো আর কি মাথা-মুণ্ডু মােশাই? মাপ করবেন,
বড়
কষ্টেই বতে হচ্ছে, এমন জমিদারী করা আর আমরা
কখন দেখিনি। গাঁয়ে অনেক জমিদার হয়েছে-গেছে ।
ছেলেবেলা দেখেছি, জমিদারেরা গরিব প্রজার উপর কত
রকমে দয়া করতাে, দায়ে পড়ে খাজনা দিতে না পারলে,
কিস্তি-খেলাপের সুদ পৰ্য্যন্ত নিত না; সময়ে সময়ে প্রজা
২৮. )
লােককে তারা ছেলের মত পেট পূরে ভাল ভাল সামিগ্রী
খাওয়াত ! এখন তােমাদের কি একটু দয়া-মায়া হয় না বাবু?
একটা কথা আমার রাখােনা মােশাই? নিমের খাজনার
জন্যে পীড়াপীড়ি না করে, তার রােগ সাবার জন্যে কিছু
ওযুদের ব্যবস্থা করে দাওনা বাবু! ভগবান তােমার ভাল!
করবেন।
নকুড়। যা-যা ! মিছে ফ্যাচফ্যাচ, করিনি। খাজনা আদায়
এখনি চাই-ই চাই ।
আউলে ক্ষেপার প্রবেশ।
আউলে । ওরে, কটাস্ কটা ডাসের কামড়,
ধড়ফড়ানি জলা।
শঙ্কর নেজের চাবুক চালাও,
ঘুচুক ভূতের মেলা।
নিধিরাম সর্দারকে লইয়া পাইক ভূতত
সর্দারের প্রবেশ।
নকুড়। (নিধিরামের প্রতি) বেটা চাষা! তুই নাতে-বউয়ের
জমিতে বেড়া দিয়েছিস, কোন্ বাবার হুকুমে ?
আউলে।
ওরে, গেছােবাবা হুমকি মারে,
মরণ-ক্ষিদের জোরে ।
বাবার বাবা, মারবে চাবুক,
বৈতরিণী-পারে ।
( ২৯ ) নিধিরাম। আজ্ঞে, আমিত আপনার সমস্তাকে বলে কয়ে, আপ- নার গনস্তার সঙ্গে পরামর্শ করে তবে এ কাজ করেছি। সেলামীর টাকা-ও ত আপনাকে কিছু দিয়েছি। নকুড়। পরামর্শ! সেলা-মীর টাকা ! গমস্তার মুখে শুনেছি, তুই টাকা দিস নি ! আবার যদি ও জমির উপর তুই পা দিবি, ত তাের পা ভাঙ্গবে, গা থেকে তাের বাস, উঠব ; গমস্তাকে আমি কড়া হুকুম এখনি দিয়ে রাখছি। নিধিরাম। সে কি মশাই ? আমি যে সেদিন হেলেগরুটা বেচে সেলামী বাবদে আপনার গমস্তাকে দশটা টাকা দিয়ে গেলুম। নকুড়। ভূতো ! নিধে বেটাকে ঘা কতক জল খাইয়ে দেত । বেটা মিথ্যেবাদী! সেলামীর টাকা দিয়ে গেছিস, আউলে । ওরে, দত্যি হলাে যুধিষ্টির, সত্যিবাদী খাঁটী। রাং-পিতলের জলুস, বাড়ে, খাটী সােণা মাটী । নকুড়। ভূতো ! পাগলাটাকে গলাধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দে-ত । বেটা বড় বাড়াবাড়ি করে তুলেছে ! (নিধির প্রতি) দেখ, নিধে। তােকে ঐ জমিতে বেড়া দেওয়া বাবদ আরও পঞ্চাশ- টাকা সেলামী দিতে হবে। পারি, জমিতে যাবি। না পারি, জমির কাছে যাবি-কি-মবি। ওরে, ধৰ্ম্ম-ছাড়া, লক্ষ্মীছাড়া, যত ভূতের পুৎ। ? আউলে ।
( ৩০ )
নযাব হবে মনে-মনে,
এই করেছে কুৎ।
মাঝ-দরিয়ায় ডুববে না,
দুঃখীর চোখের জলে।
হাত-পা ছুড়ে খাবি খাবে,
ইন্দুর-ধরা কলে।
নকুড়। পাগলাটা অস্থির করে তুলে। রাে’! তােকে টের
পাওয়াচ্ছি। নিধে! ভাল চা ত আজই টাকার ব্যবস্থা
কবি !
আউলে। খবরদারি ফুরিয়ে এল,
সূর্য্যি বলো পাটে।
বাজরা ভুলে দুটো যাদু ।
আর কেন এ হাটে ।
নিধিরাম। দোহাই মশাই! আর আমার কিছু নেই। দশটী টাকা
যা দিয়েছি, তাই নিয়ে আমায় মা করবেন। আর আমি
কিছু দিতে পারবাে না মােশাই !
নকুড়। আবাৎ পাবি।
পরাণ। বাবু-মােশাই ! গরীব দুঃখীকে আপনারা দেখবেন না—
ত কে দেখবে?
নকুড়। চুপ রও! তােমাকে মধ্যস্থ মানা হইতেছে না। নিধে।
সেলামীর টাকা আজ কখন দিচ্ছি?
( ৩১ )
নিধিরাম। কেমন করে দেব বাবু? কেবল শুকনো হাড়ে কি
টাকা বেরােয় বাবু ?
নকুড়। ভূতো, লাগা নিধেকে জুতো। ( জুতো মারা)
নিধিরাম। বাবু আমায় মেরে ফেল্লো ! বাবু আমায় মেরে ফেলে ।
[ দৌড়িয়া প্রস্থান ।
নকুড়। নিধে পালালো ; আচ্ছা, ওর বিহিত করছি। পরাণে !
এখনও এখানে দাড়িয়ে ? নিধের খাজনা এখনি আদায় চাই ।
ব্যবস্থা করতে পারিস বাঁচবি, না পারি, তুইও যাবি।
পরাণ । দয়া-মায়া কি একটু নেই ? নারায়ণ ! নারায়ণ !!
নকু । আবার নারায়ণ নারায়ন ? ভূতাে ! দে বেটাকে গলা -
দে বেটার ট টি টিপে। { নিধিরামের মুখে পিঠে
প্রহর।
বেগে চারিজন বৈরাগীর প্রবেশ ।
গীত।
বৈরাগীগণ।
ও ! শয়তান করিস্ কি।
অত্যাচারে বিষম ডরে কেঁদে সারা গ্রামবাসী।
তক্মা ছাড়ো, তপি তােলে, তপন-তনয় ডাকে,
বিকট বদন, কঁাপায় বিষম হঁাকে।
গাঁয়ের লোকে, গায়ের শত্রু,
বলবে কি আর ছি ছি ছি !!
নিকট শমন,
( ৩২ )
তে-রে-রে-রে! ওরে, ছেড় দাড়ী, মার চাপড় !
ধর ধর ! নিধি ! তুই পালা-পা-লা।
[ দ্রুতবেগে নিধিরামের প্রস্থান।
নকুড়। আঁ-আঁ আঁ ।-(বেগে চম্পট )।
আইলে।
গীত।
সে জনের এমনি সুবিচার।
চিরদিন কি সমান ভাবে,
চলতে পারে অত্যাচার।
আয়না রে ভাই বৈরাগী সব !
বুক-জুড়ান ধন !
ফুলের মালা পরিয়ে গলে,
খাওয়াব মাখন !
আউলে চলে, ড্যাং-ড্যাং-ড্যাং
তােয়াক্কা আর রাখি কার !!
| বৈরাগীগণ সহ আউলের প্রস্থান।
(
৩৩ )
পট-পরিবর্তন।
একজন কিশােরী কুমারীর প্রবেশ ।
গীত।
এন ক'রে বঁধবো খোপা,
কুঁচকে ক'লাে চুল।
এ‘ন করে কইবো কথা,
দুলিয়ে কানের দুল।
এনি করে বাইজী-সাঁটে,
উড়িয়ে ওড়না, বডিস, এটে,
এম্নি বাগিয়ে
বাড়িয়ে দেব স্বামীর ভুল।
এই বয়সে সব বুঝেছি,
কামরূপের ঢং সব শিখেছি,
এক অপাঙ্গে,
প্রেমের রঙ্গে,
ভেঙ্গে দেব শ্বশুর-কুল।
উঠিয়ে বসিয়ে,
( ৩৪ )
৭ঞ্চম দশ্য ।
[ নকুড় বাবুর বাটী
শশিমুখী, নকুড় বাবু, ঝি, ঠান্দিদি, আউলে,
দরােয়ান, নকুড় বাবুর চাকর।
শশিমুখী। বাড়ী সারানো আর ক দিন চলবে? এ আঁস্তাকুড়ে
মার বেশী দিন থাকা যে অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠছে। শীঘ্রই
আমাদের কলকেতা যা ওয়া আবশ্যক।
নকুড়। বাড়ী আর তাই বাকী ।
শশিমুখী। পূজোর দান করে খানিকটা জায়গা বাজে ফেলে
রাখা হয়েছিল। এবার সে জায়গায় আমার কথামত,
আমার ইচ্ছামত, 'আমার পছন্দমত ড্রেয়িং রুম তৈয়ারি হচ্ছে ত ?
নকুড়। নিশ্চিত-- নিশ্চিত।
শশি খী
। আর, খিড়কীর বাহিরে ও পুকুরটার কি ব্যবস্থা
করূছো ?
নকুড়। পুকুরটোচষ্টান হয়েই এয়েছিল জল সামান্যই
থাকতে ; পাড়ার লােকগুলো জ্বালাতন করে তুলেছিল।
ও পুকুরের জল না হলে তাদের খাওয়াই হত না। এবার
পুকুরটা না বুজিয়ে আর বাড়ী থেকে বেরুচ্ছি না! ওখানটাতে
ভাল ভাল কতকগুলাে বিলিতি ফুলের গাছ দিব মনে করেছি।
( ৩৫ )
শশিমুখী। উত্তম ব্যবস্থা ! পুকুর বােজানাের খরচাটা ঐ পাড়ার
লােকগুলাের কাছে আদায় করতে পারলে না? এতদিন যারা
বেপরােয়ায় ঐ পুকুরের জল খেয়ে আসছে, পুকুর বােজানাের
খরচা তাদেরই দেওয়া কৰ্ত্তব্য। ইহাই ত ধর্মসঙ্গত, ন্যায়সঙ্গত
এবং যুক্তিসঙ্গত।
নকুড়। সেই ব্যবস্থাই করেছি। গমস্তাকে কড়া হুকুম দিয়ে
রেখেছি। পনর দিনের ভিতর ঐ পুকুর বুজানাের আড়াই
শত টাকা পাড়ার বিশ ঘর লােকের কাছ থেকে আদায় কতে
হবেই হবে।
শশিমুখী। উত্তম ব্যবস্থা হইয়াছে। তোমাকে কি আর কোন
যুক্তি দিবার আবশ্যক করে ? প্রজারা সব আদায় দিতে না
পারে, সেই ধুসি বামনীর ভিটে বেচে অনাদায় টাকাটা সংগ্রহ
করে নেবে।
নকুড়। তাই ভেবে রেখেছি।
বেগে ঝির প্রবেশ।
ঝি। বেশ হয়েছে ! বেশ হয়েছে ! বেশ হয়েছে !
শশিমুখী। কি হইয়াছে কি ?
ঝি। পরাণে গয়লা জন কয়েক ছোঁড়াকে নিয়ে পাতেদের পড়ায়
বানি মাগীর জন্যে একখানা কুঁড়েঘর বেঁধে দিয়েছিল। ও
বাবু! শুম, কাল রাতদুপুরে সে ঘর ধূ-ধূ। গিয়ে দেখি,
ঘর নেই ; ছেয়ের গাদা! আহা-হা! ভগবান আছেন
( ৩৬ )
বা! ভগবান আছেন! আমি জমিদার বাবুর পাট ঝি, রাণী
মার দুলালী; বানি আমাকেও কি কম অপমান করেছে ?
মাগী যেন ফুলে ফুলে বেড়াচ্ছিল ? কাল রাত্তিরে তেমনি
হয়েছে ! ছেয়ের গাদায় ত কই একখানা হাড়ও খুজে পেলুম
না ! বেঁচে আছে!-বেঁচে আছে। পাপের ভোগ সা না
ভুগলে
কি মরবে ?
কঁাদিতে কঁাদিতে অব-পে ভু! কাপড়-পর।
চুল-পােড়। ঠান্দদির প্রবেশ ।
দি। বাবু! তুমি আমায় বিনি দোযে ভিটে-ছাড়া করেছ।
পরাণ পাতেদের পড়ায় পাতলতা দিয়ে আমার জন্যে এক
খানা কঁড়ে বেঁধে দিয়েছিল । কাল রাত-দুপুরে তােমার
লােকে তাতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সব পুড়ে গেছে,
আমি পুড়ে মরতে মরতে বেঁচে গেছি। এই দেখ, আমার
কাপড় পােড়া, চুী পােভা। বু! তােমার গমস্তা, তােমার
দয়ােখান এই কাজ করেছে। বিনি অপরাধে আমার এত
অপমান,-~-এত লাঞ্ছনা,—এত শাস্তি।
নকুড়। নিকালে হিয়াসে ! হারামজাদি! আমার গমস্তা দরো-
যান তোর ঘর পুড়িয়েছে ? যত বড় মুখ,-তত বড় কথা ?
শশিমুখী। উসকো গলাধাক্কা দেকে হিয়াসে আবি ভাগাও--আবি
ভাগাও--আবি ভাগাও।
।
( ৩৭ )
ঠান্দি। ষােল পােয়া পূর্ণ,--যােল পােয় পূর্ণ!--এর কি হলাে
গগা !
আউলে ক্ষেপার প্রবেশ।
আউলে ।
ওরে, ভূতের ঘাড়ে ভূত চেপেছে,
ওঝা (মলে কই।
ওরে, ভূত-পেতনি মিলে গাকে,
করূবে জল-সই
ওরে, ঠান্দিদির
ওই চখের জল,
কুল-কাঠের আগুন।
ওরে ভূত-পেতনি
ছেচকি-পােড়া,
দগ্ধে হবে খুন ॥
ঝি। এটা ত বড় বাড়াবাড়ি করে তুলেছে ? জানিস্-আমি
কে ? তােকে পজ্যন্ত গাঁ থেকে ওঠাবাে -ওঠাবাে -
ওঠাবাে !
ওরে, উঠতি ধানের পথ্যি চাহি,
সন্নিপাতের রােগী।
ওরে, বিষ্ঠার কৃমি
হতে চাহে,
তপােবনের যযাগী ।
ওরে হাড়ি-ঘরের
ছুড়ি হ’ল,
শুড়ি-বাড়ীর রাণী।
আউলে ।
( ৩৮ )
{
ওরে, ঠুলি-বাঁধা,
জোয়াল কঁাধে,
নড়ে টানে ঘানি।
তেরে কেটে তাং-তেরে কেটে --তাং!
( ঝির প্রতি) বৃনে! বদসি-যদি কিঞ্চিদপি, দন্ত-রুচি-কৌমুদী
হরতি-দর তিমির-মতি ঘাের ।
(কীৰ্ত্তনের সুর ) রাগ ত্যজ রাগিনি লো !
বাঘিনী পালাবে বনে !
ঝি। আমার এত গঞ্জনা ? এত লাঞ্ছনা ? বাবুর সুমুখে-দশজনের
সুমুখে—আমার এত অপমান? আজই আমি যদি এর বিহিত
কতে পারি, ত, বাবুর বাড়ী জল গ্রহণ করূবে !
আউলে । (কীৰ্ত্তনে) চাকরিণি-চর! কেন গরগর রাগে।
যাবে কোথা গরবিনি। বৈতরণী আগে ।
রক্ত-জলে ভেসে চলে পচা পশু পাখী।
" (নাচিতে নাচিতে ) নকুড় খাবে, ঝি খাবে খাবে শশিমুখী।
; ঝি-মণি! আর কেন ? মথুরা ত্যজিয়ে চলো।
কুবুজা রাণী, লুটায় অবনী,
দিন ত ঘুনায়ে এলাে।
নকুড়। চই-ও।
আউলে চই-চই চই কি খাবি হাঁস।
কঁড়ের ভাঁড় যে খালি।
ওরে, হালি-পােনা, জালে গাঁথা,
বঙ্গ দেখেন কালি ।
( শশিমুখীর প্রতি) আর নেচন, শশিমুখি ?
হাসি হাসি মুখে ।
সামনে শ্মশান, শিয়াল কুকুর,
কঁদছে তােমার দুখে।
ওরে, নরক-ৰ্ত্ত মলের কুড়,
তােমার খাবার তাই।
যমের বঁটা পড়লো মুখে,
আর বিলম্ব নাই ।
( চীৎকার ভাগাে -ভাগে-ভালাে।
শশিমুখী। দােরায়ান! ইকো পঁচিশ জুতি লাগাও।
আউলে । ওরে, জুতি রূবে, ভূতির পুত,
থুতি কঁপে রাগে।
ওরে, গাঙ, ফড়িঙের খেলা দেখ,
ঝাড় প্র?ীপের আগে
আর কেন আউলে এ ভূতের হাটে ? আমার সঙ্গে
একবার অসবি ? একবার থানায় যাবি ?
নকুড় । ( ঠানদিকে ভেঙ্গাইয়া) থানা -য় যা -বি? বাওয়াচ্ছি।
দরােয়ান! আচ্ছা রকমের একটা ঝাকুনি দে -ত।
শশিমুখী! দরােয়ানের দেওয়া সুবিধে হবে না; আমি দিচ্ছি।
ঠাদিকে গলা ধাক্কা দেওয়া )
ঠাদি। ওগো ! এরা কে গাে ? ওগাে ! আমায় মেরে ফেলে
গো! ( প্রস্থানােত)।
ঠানটি।
( ৪০ ) দ্রুতবেগে গাহিতে গাহিতে দুইজন বালকের প্রবেশ। গীত। এ যে বেজায় দাপ। এ যে বেজায় দাপ! বাতির ঘরে, বসত করে, কাল-নাগিনী সাপ। চল চল ঠান্দিদিগো ! আর কেন ছেথায় ! পেতনি-জলায় তােমার থাকা আর কি শােভা পায় ? এইবার চাবুক-চোটে ঘুচিয়ে দেবে। ভূত-পেতনির কারচুপি-কাপ । [ ঠান্দিকে লইয়া প্রস্থান। নকুড়। এ অকাল-কুয়া গুলো ত বড় জ্বালিয়ে তুলে ! দাড়া, দাড়া! পুলিশে চিঠি লিখে এখনই তােদর শ্রাদ্ধ করছি। মশিমুখী। না,-এখানে আর থাকা চল না। গাটা এক- বারে নরক-কুণ্ড হয়ে গেছে ! স্বর্গ ত কল্কাতা। উচিতমত শিক্ষে দিয়ে তবে আমি কল্কাতা গিয়ে চির-বাস করূবাে ? আউলে । ওগাে, নরক হ’ল স্বর্গভূমি, পেতনির সুখ ত তায়। স্বর্গ ছেড়ে ভূত-পেতনি এদের নরক দেখতে চায়।
( ৪১ )
ভূত-পেতনির বিষম দাপে,
স্বর্ণ-ভূমি টলে ।
চুবিয়ে মারূবে যমের দূত
অতল রসাতলে ॥
নকুড়। মা বেটাকে। (পদাঘাত করিতে উদ্যত )।
ওরে, কানায় কানায়, উপছে উঠে,
ডুবলাে ভরা না ।
নড়ে বাবু, হাবুডুবু
অউলে সরে যা।
[ প্রস্থান।
আউলে ।
চাকরের প্রবেশ ।
চাকর। বাবুর নামে এই টেলি গ্রাম।
নকুড়। ( আস্তে ব্যস্তে খুলিয়ে পাঠ) “(ffice failed; come
sharp* আফিস ফেল --শী আসিবেন।
ফে-শীঘ্ৰ আসিবেন। অ্যা। - অ্যা -
শশিমুখী ! আমায় এখনি কল্কাতা যেতে হচ্ছে ! যদি বে-
গতিক বুঝি, ফিরিতে বিলম্ব বুঝি, তােমায় টেলিগ্রাম করবাে :
তুমি নিশ্চিত যাবে।
শশিমুখী। বাইজীর নিমন্ত্রণেই এত তাড়া নাকি ?
নকুড়।
এ সংবাদেও রঙ্গ ?
শশিমুখী। রঙ্গ-রাজ-মহিষীর ঐ ত ঢঙ্গ?
নকুড়। আমি চলুম ; গাড়ী ঠিক করতে বলিগে।
( ৪২ )
শশিমুখী। আমিও চলুম, এবণ্ট আমােদ করিগে। ইহাই ত আমাে-
দের উপযুক্ত অবসর ! কি ফুৰ্ত্তি ! একটা গান করবে ?
আমি গাউন পরিয়ে, টাউনে ফিরি,
ব্রাউন ব্রুমে চড়ি ।
আমি ভিলেজ ছাড়িয়ে, নলেজ করি,
কলেজে কেমেথ্রি পড়ি।
আমি ম্যাডেম লইয়ে, মানেজ করি,
কারেজ আমার কত।
আমার দুচোখের বালি, নেটিব পল্লী,
নে টিব নিগার যত ।
[ মরাল-গমনে প্রস্থান ।
( ৪৩ )
পট-পরিবর্তন।
গামছা-কঁাধে ঐ দ্বভাবে এক সৎ-গােপ
যুবকের প্রবেশ।
গীত ।
দেখি, একবার বামুন্ বেটা ! আয় দেখি হেথায় ।
তাের পাঠশালে ক-খ পড়া, তা বলে কি চড়বি মাথায়।
এত টাকা তাের ঘরে, আমায় ডাকি নাম ধ'রে,
চিনিস্নাকে আমি কেটা,দুনিয়া নাচে আমার কথায় ।
আমিই গাঁয়ে পুরুষ একা, ছি-নি-নি-নি খোল টাকা,--
ধােপা-নাপিত করবো বন্ধ, আগুন দেব ছেড়া কঁথায়।
গুরু-পুরুত বন্ধ করে, আমায় জব্দ করবি কিরে,
অমন লাখো বামুন ঝোলে আমার,
এই জোলা-ধুতির ঝোল। কেঁচায় ।
( ৪৪ )
ষষ্ঠ দৃশ্য।
[ নকুড় বাবুর কলিকাতাস্থ বাটীর বৈঠকখানা ]
নকুড়বাবু, নবীন-গােবিন, মােসাহেব, বাইজী,
মােটর-গাড়ী-চালক, এক বৈরাগী, আম্মাণী
অংশীদারের চাকর।
নবীন। ( এক হাত কপালে আর এক হাত কোমরে রাখিয়া
কোমর দুলাইয়া নাচিতে নাচিতে কীৰ্ত্তন।)
ওরে নবীন সরসে
নকুড়-কমল,
কনক-করণে হাসে।
ওরে, পরাণ ভুলল,
ভুবন মাতল,
মােহনিয়া মধু-বাসে ।
ওরে, নকুড় আমার,
নকুড় নয়ন-মণি।
নকুড়-নকুড়
নকুড়-নকুড়
নকুড় রতন খ ন ।
নকুড়। কেয়া – বাৎ! মজাদার! থি চিয়াস ফর ন–ভী-না
ব্যাব্ব! এন্টিডােট টু ক্যালামিটি! আফিস-ফেলের মহৌষধ,
জীবনের সার,
•••
( ৪৫
)
এই ত আমােদ-রঙ্গের মহৌগধি ;-ক ধার ন-ভী-না
বাব্ব, !
গােবিন। (নাচিতে নাচিতে )
নকুড় বলিয়া
তিনটি তাখর
অাসা ছানিয়া মাথা।
চাদ নিঙাড়িয়া
সে সুধা ঢালিয়া,
হিয়ায় জড়ায়ে রাখা !
নকুড় আর
আলিস-তাকিয়া,
নকুছ দুনিয়া ভরা !
( আমার নকু দুনিয়া ভরা )
নকুড় তাণ,
ভাত-পানি-পান,
নকুড় বিহনে মরা ॥
( ওগাে আমি ) নকুড়
বিহনে মরা।
নবীন-গবিন। (উভয় )
ওগো, আমরা নকুড় বিহনে মরা।
ওগো, নকুড় হাঁড়ি, মােরা সরা।
ওগো, নকুড় নােদের সোর স্যাম্পিন,
নকুছ কাফি চা।
ওগো, নকুড় মােদের মাথার মাণিক,
নকুড় পিয়ার রাঃ ।
নকুড় । বাঃ বাঃ বাঃ! তবে একটুখানি খা; খেয়ে নেচে নেচে
যা ! ( স্যাম্পেন প্রদান ) আমােদ—আমােদ! আমাে-
৪৬ ) দের ক্রিম অফিস-ফেল,অফিস-ফেলের প্রতিক্রি আমােদ। আচ্ছা, -প্রিয়-সখা যুগল ! বল দেখি, তােমর। আছ আমার তরে, কি আমি আছি তোমাদের তরে? নবীন-গগাবিন। ( মােরা) আর কিছু জানিনা যাদু! ভুবন-ভিতরে। শুধু নকুড়-মরাল চরে হিয়া-সবেরে । যতনে খাওয়াই তারে ক্ষীর ছানা-ননি । গােঠে পাঠাইয়া ঝুরি দিবস-রজী। নকুড়। ঠিক বলেছ ! ঠিক বলেছ ধনেরা! তােমাদের জন্যই এই দেখ আমার বাড়ি খানি ডি চুরি রসে ডগ ; আফিস- খানি ফেলপঙ্কে ডুবু ডু বু!! আমি ত আর কিছু জানিনি এখন-আর কিছু জানি - নি ! নবীন-গগাবিন। ওরে, এমন গুণের মণি আর কোথা পাব । তমালে বাঁধিয়ে তােরে শুধু নেহাবিব। তােমায় মুরলী ধ্বনি কিবা গুণ জানে। বিবাদী ননদী-জলা নাহি মনে মানে। ঘরে আর রতে নারি । (আমরা) ঘরে আর রইতে নারি। (নকুড় কানাই বিনে) ঘরে আর রইতে নারি। কুড়। আমি কি ছাড় তে পারি ? তােমাদের তরে আর সব { ছেড়েছি ; জন্মভূমি বাস্তু সব--ছেড়েছি ; তােমরা যা বলেছ,
( ৪৭ )
তাই করেছি ;-খচে পুরুষের অদ্ভুত কীর্তি দেখিয়েছি ,
হরদম খরচ করেছি ; দেনার মোচাক - *য়ে বাবা ! দেনার
মৌচাক ! তবু তােমরা
বলে,- এই সে দিন কিনেছি
গ্রামগাফোন্ কোন্ ফোন ! এই সে দিন কিনেছি মােটর,-
টর টর! বাবা ! এইবার মহাজনেরা সব গ গ !!
নবীন-গােবিন। সরু সরু-সহ্
তর ভর--তর,
নকুড় আসে ঘর।
(ওরে) এ ধন যার ঘরে নেই, সে কেমনে ঘর করে :
নকুড়। ওরে ভাই ! এবার এ ঘর সাবাড় ! এটা তব, সাত
পারি ! দেশে গিয়ে রে ভাই এবার ভারি জ্বালাতন।
কতকগুলো বিকুটে বেঙ্গে পাঙ্গড় এসে বলে কিনা, -
খাজনা মকুপ করো ! তমুক কা; তু করাে; পুকুর
কাটো, জলছ এ দাও !
নবীন-গােবিন। কি জবাব দিলে বাপপন!
নকুড়। খাপ সুরৎ ! দেল খােস! কাটা-কাটা ! ছাঁটা ছাটা।
“নেহি হােগা !” বাজে খরচ নেহি গাে! ককেত্তামে
হ মাহিন হামর দো-হাঙ্গার রূপয়া খরচা কোন্ দেগা ?
নবীন-গগাবিন। ওরে, সাগর-ছে চ।
স্বাতি তারার জল।
ওরে, এমন নকুড়
না পাইলে,
কিসে বঁচি বল ।
গালভরা জবাব দিয়েছ বাপধন! আমাদের বসিটা?
মণি » নকুড়,
( ৪৮ )
নকুড়। এক এক শ’ রূপেয়া।
নবীন-গােবিন। ওরে জড়োয়া নেকুলেশ,
সন্নিপাতের পানি।
নকুড় আমার,
ধরিয়া যতনে,
ওরে, এমন সুখে
নকুড় বার,
কোথ। বাইজী মণি।
গাইতে গাইতে বাইজীর প্রবেশ।
বাইজী। { কীৰ্ত্তন --
চল্ চল্ চল্
মধুর মলয়
মালতী-সুবাস মাখি।
নকুড় রতনে
হিয়ায় পূরিয়ে রাখি।
ললিত-লবঙ্গ-লতা-পরিশীলন কোমল-মলয়-সমীরে
বিহরতি নকুড় মম হৃদয়-হেম-পিঞ্জরে ;
নবীন-গগাবিন। হুহূরে - হুরূরে !
নকুড়। আয়র! দেখরে ! খেল্ শেষরে ! আফিস্ ফেরে।
এন্টিডোট টু আফিস-ফেল্-এক গেলাস বাইজী-মণি, এক
চুমুক !
বাইজী। (গান)-
সারা সুনীল
গগনের গায়,
এক চাদ শুধু হাসে।
।
( ৪৯ )
এক অলি শুধু * সারা ফুল-বনে
পিয়ে ফুল-মধু-বাসে |
কে,-- ?
শ্রিত-কমলা-কুচ-মণ্ডলম্ ধৃত-কুণ্ডল -
কলিত-ললিত-বনমালে ।
বিরাজে নয়ন-মণি
নকুড় রতন-খনি
ভুবন-মোহন মৃণাল-নালে ।
( কীৰ্ত্তনে ।
মরি-মরি ! কিবা সে ভঙ্গি বাঁকা গো !
নবীন-গােবিন। (নাচিতে নাচিতে) ও হাে হো হো ।
যেন কঁঠাল-কাঠের পুরাণে পিঁড়ায়,
বাঁকা আপােনা আঁকা গাে !
নকুড়। বাইজী ! প্রাণ তর-- জী! দূর তাের দেনা,দুর তাের
আফিস, ! বেটা পরাণ ! তুই বলিস্, খাজনা মকুপ ! বেটা !
খাজনা মকুপ দিলে এমন খাপ-সুরৎ এসরাজ শুনাবে কেরে
বেটা! আর একখানি বাইজী-মণি। আর একখানি।
(কীৰ্ত্তনে
আমার কলিজা-কলসে
উছলি-উছলি উঠে।
বাইজী।
নকুড় অমিয়
( ৫০ )
৫
অঞ্জলি অঞ্জলি
এত খাই তবু
পিয়াস নাহিক মিটে ।
তুমসি মম বসন
ত্বমসি মম ভূষণম্ !
ত্বমসি মম হৃদি-কণ্ঠ-হারম!—নকুড় হে !
নবীন-গোবিন।
নকুড় নিপটম
নধর কপট
প্ৰেম-বালাখানা-দ্বার।
বাইজী।
নিজ্জিত-স্বজন
মদ্দি-প্রজান,
শ: সিত-সহর-স'র।
নকুড়।
লহ লহ নি ।
চাক-চন্দ্রাননি।
বসিস এহি হেম হার।
( আর কি আমার মজতে বাকি
বসিস এহি হেম হারম।
নবীন-গােবিন।
এমনম, উদারম,
এমন দাতারম,
ভুবনম, ভিতরম, আছে কেবা আরম, ।
নকুড়-গুণে ঝুরে মরি গো !
( আমর) নকুড়-গুণে ঝুরে মা গো !
( ৫১ )
এক বৈরাগীর মৃদু’পদে প্রবেশ ।
বৈরাগী। মুকুন্দ মধুসূদন !
বলে মুকুন্দ মধুসূদ-নম্ !
নবীন-গগাবিন। কে - অম্ ।
বৈরাগী। ( গলা খাঁকার দিয়া – গান )
মন! তাের ভাঙ্গবে ভুল আর কবে ! ·
এই সুখ-রাশি, অই কুসুম-ব'স !
আর ক মাস বা রবে ।
বাইজী। বাবু – সা-ব! আজ তবে আমি আসি ?
নকুড়। (বৈরাগীকে) এই বেটা ধাঙ্গড় চুপ! (বাইজীর প্রতি
যেও না বাইজী ! গলায় দিয়ে ফাঁসি !
আজ থাকে না হেথা বসি ।
নবীন-গােবিন। ( গান )
এখনো চঁাদিনী আছে, যামিনী হয়নি তাের ।
কোথা যাবে বাইজী-মণি ! বাঁধিয়ে বিরহ-ডাের।
বাইজী। জরুরি কাম বাবু-সা-ব। আজ বিদায়।
[ বাইজীর প্রস্থান।
নকুড়। অস্তাচলে গেল শশী,-অস্তাচলে গেল রে।
কি হ’লল হে প্রিয়-সখা -কি হলো কি হলাে রে ।
=
( ৫২ )
নবীন-গগাবিন। ওরে, এই যে ছিল, কোথা গেল,
কাল-দল বাসিনী
ওরে, বিহনে পিয়ার ভুবন আঁধার,
জল-ছাড়া মীন আর বাঁচিনি।
আমরা তবে যাই এখনি ।
( কীৰ্ত্তনে )
আনতে ও সেই বাইজী ধনি।
দুরে, নকুড় বাবুর রতন-খানি !!
( ছুটিয়া প্রস্থান
বৈরাগী।
রাধে গাে -বি–ন। এরা কে গো ?
গীত।
এই উঠছে সুখের নিশান,
ব’স আছ তাকিয়া ঠেশান,
বলে হ করে বিষাণ,
অানি যেতে হবে।
এই ধন-দৌলৎ
কোথায় পড়ে রবে।
মন্ ! তাের ভাঙ্গবে ঘুম আর কবে।
পুৎ-ঔরৎ
( ৫৩ ) বাবু-মশাই! আজ আমায় আপমার দেউড়ীতে একটু আশ্রয় দিবেন ? নকুড় । ইস! বেটা যেন আমার অন্ধের নড়ি ! ছাড়, বেটা এখনি আমার বাড়ী। নৈলে, ছিড়ে দেবাে তাের-ঐ লম্বা দাড়ি । বৈরাগী। রাধে মাধব ! রাধে মাধব । বাবু আমায় চিনতে পাচ্ছেন ? আমি যে আপনারই প্রজা;-আপনার তালুকে আমার বাস ! নকুট। এঃ! আমার প্রজা! নিকালে আবি হিঁয়া—সে ! তালুক --টালুক আমি মানি না। না বেরােও--ত—এই ধরূবােগর- দান! ছাড়িয়ে দিব বৈরাগী জান ! এখনও দাড়িয়ে ? বৈরাগী। হুজুর ! একটা কাজের জন্যে ককেতা এসেছিলুম। বেলা শেষ হয়ে গেল ; আজ আর যেতে পারলুম না। কেবল একটু শােবার যায়গা ; এক গণ্ডুষ জল'ও চাহি না। ব্রজ - মাধব ! ব্রজ –মা - ধব । নকুড়। আমার সঙ্গে চোপ্রা! ন্যাক্রা তার ভাঙ্গ ছি দাড়া? নিয়ে আয় ত রে হুড়কো ! ( নেশার ঝোঁকে ) “খাপ-তরিবং বাইজী আমার হৃদয়-দাড়ের ময়না। লক্ষ টাকা খরচ করে,- দিব তােরে, জড়ােয়া হীরের গয়না। আয়না বাইজি !–বুক-জোড়া ধন। আয়না - এক বার 'আয়-না !!
( ৫৪ )
( বৈরাগীর প্রতি) এখনও বখদ মুরোদটা আমার সামনে
খাড়া ?
বৈরাগী। হরে গোবিন্দ । এই কি আমাদের জমিদার নকুড়বাবু ?
[ প্রস্থান।
মােটর-গাড়ী-চালকের প্রবেশ ।
মােগাঃ-চাঃ। বাবু! গাড়ীত মেরামত হােগিয়া ; লেকি আপ
রূপেয় না দিয়া ; ইসি ওয়াস্তে গাড়ী আজ নাহি মিলা।
নকৃড়। আচ্ছা হুয়া । রূপেয়া নাহি মিলেগা ! ভাগে হিয়াসে
ভাগে !
মােঃ-গাঃ-চাঃ। বাবুকে। নেশা হুয়া।
[ প্রস্থান।
অৰ্ম্মণী অংশীদারে চাকরের প্রবেশ।
অ-অং-চাঃ। আমার মনিব জরুর করে আমাকে আপনার
কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। হিসেব নিকেশ আবশ্যক। টাকা
চাই।
নকুড় । কিসের টাকা রে বেটা ?
( নেশায় ) ও তার, চরণ-পূর, বাজে কি মধুর,
দুরু দুরু কাপে হিয়া।
আমার দুর দুর কঁাপে হিয়া।
আ:---চ্যঃ। আপনি বেটা বেটা করূবেন না ! মুখ সামূলে কথা
কবেন। আপনি আফিস ফেল করেছেন। হিসাব চাই
টাকা চাই।
নকুড়। নেহি মিলে – গা; যা—'ও; হ–টো ।
( নেশায় ) তুমি আমার রসগােল্লা, আমি তােমার রস,।
তােমার গুণে বাইজি-মণি ! দুনিয়া আমার বশ ।
আঃ-অং-চাঃ। আচ্ছা, আজ আমি চল্লম। টের পাবে কাল
সকালে।
যাঃ- যাঃ-বেটা যা ।
( নেশায় ) নিকুঞ্জ-কুটীরে সুখ - অভিসায়ে,
রহু রহু চন্দ্রাবলী যাই
( মুর্ভূিত হইয়া ভূপতিত )
নকুড়।
!
( ৫৬ )
পট-পরিবর্তন।
একটী টাকা-হাতে এক শীর্ণকায় প্রবীণ
ব্যক্তির প্রবেশ ।
( গায়ে ছেড়া চাদর, পায়ে ছেড়া চটি, হাতে
ছেড়া ছাতা, কপালে তিলক )
গীত।
আমি সার ভেবেছি টাকা।
টাকার তরেই
এ সংসারে
আমার বেঁচে থাকা।
হ’ক না কেন বেটা-বেটি আত্ম-পরিবার,
টাকার তরে রেয়াৎ আমি রাখি নাক কার,
টাকাই আমার প্রাণের দোসর,-
টাকা বিনে সব ফাকা !!
লোক-লোক তা সরম-ভরম কিছুই আমার নাই,
দীন-ভিখারী এলে দ্বারে তখনি তাড়াই,
( অমার ) টাকার তরে (এই) আঁতি-পাকানো,
( দেহ ) দড়ি করে রাখা।
দিন-দরিয়া যা না ডুবে আমার তাতে কি ?
পাপ-পুণ্যের মাথায় আমি কুড়ল মেরে দি,
( আমার } টাকাই ধরম,
টাকাই করম,-
টাকা আমার প্রাণ-সখা ।
( ৫৭ ) সপ্তম দৃশ্য। [ নকুড় বাবুর কলিকাতাস্থ বাটী । নকুড়বাবু, আৰ্ম্মাণী অংশিদার, মিউনিসিপাল ওভারশিয়ার, শশিমুখী, ঝি, ডাক্তার বাবু, মেথর-দম্পতি। আঃ-অং। নকুড়বাবু ! কাল আমি আপনার নিকট লােক পাঠিয়ে ছিলাম। আপনি তার অপমান করেছেন। জানেন, আপনারই দোষে আফিস্ ফেল হয়েছে। সুতরাং আমার অংশ, আমার প্রাপ্য, আমি এক পয়সাও ছাড়ব না। বুঝ- লেন ? কুড়। আমার দোষে কিরূপ? আমি কি আফিসের টাকা হা করে গিলে গিলে খেয়ে ফেলেছি ? আঃ-অং। আপনি টাকা গিলে গিলে খান নাই ; বিয়ার ব্র্যাঙি কিনে কিনে খেয়েছেন। আমার প্রাপ্য টাকা আপনি চুকা- ইয়া দিবেন ? না, আমি আপনার বাড়ী এখনই নীলনে চড়াবাে ? নকুড়। বাড়ী নীলাম ? অত্যন্ত স্পর্ধার কথা। আমি আপনার টাকা ধারি না। আঃ-অং। বেইমান ! টাকা ধারাে না ? এখনই আমি তােমার
( ৫৮ )
;
নিকট টাকা আদায় করবাে । না ব’বে,-ত অপমান
ক’রবাে ; জেলে পাঠাবো ।
নকুড়। উভয়ের টাকায় আফিস্ চছিল ; আফিস্ ফেল হয়েছে,
উভয়েরই টাকা গিয়েছে ; আমি আবার কার টাকা ধারি ?
আঃ-অং। তুমি তােমার অংশিদারকে ফাঁকি দিবার জন্যই ইচ্ছা-
পূৰ্ব্বক আফিস্ ফেল করিয়াছ ; আমি আর কোন কথা শুনিতে
চাহি না ; ইতিমধ্যেই আমি বাড়ী ডিক্রী করে রেখেছি।
বাড়ী এখন আমার দখলে।
নকুড়। মুখ সামলে কথা কবে।
আঃ-অং। কি ? মুখ সামলে কথা ক'ব ? জোচ্চোর ! দোসর।
কথা কৰি ত, চোয়াল ভেঙ্গে রক্ত বার করবাে !
নকুড়। দরােয়ান ?
আঃ-অং। আবার দরােয়ান?--এই মালুম ঘুষি! দেখি তাের
কোন্ দরােয়ান-বাবা রাখে ?
( উভয়ে ঘুষাঘুষি ; নকুড় ধরা-পতিত )
বস্ আজ এই পর্যন্ত ; কাল সকালে ডিগ্রীজারী করবো ;
টাকা আমার গেছে, কোথা ?
[ প্রস্থান।
নকুড় । ( উঠিয়া ) গেছে বেটা! উঃ! অকারণ দাড়িয়ে এত
অপমান ? কে আছ ওখানে, ঝি!
( ৫৯ )
ঝির প্রবেশ ।
ঝি। বাবু ডাকছেন ?
নকুড়। (ভেঙ্গাইয়া) বাবু ডাকছেন ? কোথা ছিলি মাগী এতক্ষণ?
আমি যে মরে গেছলুম ! দেখ দেখি, গালে পিঠে কাশিটে ।
ঝি। (স্বগত) বাবু কি পাগল হ’ল গা ? (প্রকাশ্যে ) বাবু।
আপনার তার পেয়েই রাণী-মা তাড়াতাড়ি কলকেত এলেন ;
তার গায়ে পিঠে বড়ই ব্যথা হয়েছে। তেল দিচ্ছিলুম।
মারলে বাবু আপনাকে ?
নকুড়। কে মারলে ?-ভগবান রে বেটি ভগবান! নেকি মাগী ।
একটু জল আন্ ।
ঝি। (একান্তে ) বাবুর কি মাথা বিগড়ে গেল ? তা হতে
পারে। আফিস ফেল হয়েছে ; দেনদারের তাগাদা লাগি-
য়েছে! যাই, জল আনি।
[ প্রস্থান।
মিউনিসিপাল ট্যাক্স-কলেকারের প্রবেশ।
মিঃ-ক। নকুড়বাব ! আমরা তার কোন কথা শুনব না ; বাড়ী
আপনার ডিক্রী হয়েছে ; টেক্সের তামাম টাকা এখনই চুকা-
ইয়া চাই।
নকুড়। (বড় কষ্টে কেঁাতাইয়া ) আজ টাকার বড় টানাটানি ;
কাল আসবেন ; চুকিয়ে দেব।
( ৬০ )
;
মিঃ-ক। তা হবে না; ও জোচ্চোরী আর চলবে না ; গলায়
গামছা দিয়ে আদায় করবো।
নকুড়। দরােয়ান ?
মিঃ-ক। দপােয়ান কি কবে ? আমায় ধরে রাখবে না কি ?
জাননা নকুড় ! আমরা মিউনিসিপালিটির লােক। দেউলে
নকুড় বাবুর দয়ােয়ানকে আমরা ভয় রাখি না।
নকুড়। যে-সে এসে অপমান কবে ? দেখ, বক্-বক, করাে
না; আজ পলাও,-কাল এসাে।
মি:-ক। রসো,--আঙ্গুল না-বাকালে চলছে না; সােজা আঙ্গুলে
কি ঘি বেরবে ?
নকুড়। কি ?-বেঙ্গেও লাথি মারবে ? বেরােও হারামজাদ !
মিঃ-ক। বটে রাস্কেল ! জোচ্চোরী কবি ; আবার তার সঙ্গে
দাত-খামুটী ? গালি-গালাজ ? (আস্তেন গুটাইয়া অগ্রসর )
নকুড়। ( আগাইয়া আসিয়া ওভারসিয়ারের গলা ধরা ) এখনও
মুখ সামলে !
মিঃ-ক। এখনও গা সামলে! ( গালে চড় মারা ; উভয়ে মারা-
মারি)।
জলের গ্লাস হাতে ঝির প্রবেশ ।
ঝি।
ওগাে-ওকি-lেi ! কি হলো গাে ! ওগাে বাবু " মেরে ফেলে
গো! 'ও দরােয়ান! দরােয়ান! রাণী মাকে বলি গিয়ে গো!
[ গ্লাস রাখিয়া প্রস্থান ।
{ ৬১ )
দরােয়ানের প্রবেশ ।
দূরােয়ান। ক্যা হুয়া বাবু !- ক্যা হুয়া !
মিঃ-ক। হেক্ক – হুয়া ! কাল সকালে বাবুর বাড়ী-জুড়ী নীলাম
কবে ; আজ বস।
[ দ্রুত প্রস্থান।
কুড়। দরােয়ান! জলের গেলাস সরিয়ে দাও। দরােয়ান ।
আমার বড় অপমান! এখনি আমায় পাল্কী করে দেশে নিয়ে
চল। যাক—আমার কল্কাতার আফিস-বাড়ী-জুড়ী-
গাড়ী—সব যাক্। বড় লাঞ্ছনা! বড় গঞ্জনা ! বড় জালা !
গাঁয়ের বানি-গিনি কি আমায় ডাকছে ?
দৌড়িয়া ঝির প্রবেশ ।
ঝি। ওগো বাবু গাে ! ওগো দরােয়ান গো! রাণী মা নেই গাে ।
নকুড়। আঁ! কি হয়েছে ?
ঝি। ওগাে বাবু গো ! রাণী-মার কি হলো গো! কেন আমি
আপনার তার পেয়ে তাড়াতাড়ি তাকে ককেতা নিয়ে এলুম
গাে! রাণী-মা ছাদের উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন ; দাড়িয়ে দাড়িয়ে
কি দেখছিলেন ; আমি তখন আপনার জন্যে জল নিয়ে আস্
ছিলুম। গিয়ে দেখলুম, রাণী-মা নীচে পড়ে গেছেন। দাত
ভেঙ্গে গেছে। ঠোট কেটে গেছে। মাথা ফেটে গেছে।
;
( ৬২ ) ঝর ঝর রক্ত! যাই,-মুখে জল ঝর ঝর রক্তবাবু গাে ! দি’ইগে গো ! ; নকুড়। দরােয়ান! চাকরকে ডাক্তার ডাকতে বলে; ধরে নিয়ে চল ত ; আমি দেখি গে ! (উত্থান-চেষ্টা) না ; উঠতে পর- লুম না ; মাথা ঘুরছে ; চোখ বুজে আছে ; পৃথিবী অন্ধকার ঠেছে। ডাক্তার আছে? দরােয়ান! জলের গলাসটা এগিয়ে দাও ত ; বানিকে আমার চোখের সামনে থেকে সরে ; •• যেতে বল ত ? দয়ােয়ান। বানি ? উ ও কঁহা হ্যায়? নকুড়। অন্ধ ! দেখতে পাচ্ছাে না? ঐ যে দাড়িয়ে খিল্ খিল হাসছে ? ডাক্তারেরর প্রবেশ। ভাক্তার। কি খবর নকুড় বাবু? নকুড়। বিষম দুর্ঘটনা ; ভিতরে গিয়ে দেখে আসুন ; আমারও বড় অসুখ ; উঠতে পাচ্ছি না। | ডাক্তারের প্রস্থান। দয়ােয়ান। আমিও যাবাে নাকি ? নকুড়। যাও; খুব যাও; একে একে সব, যাও। । [ দরােয়ানের প্রস্থান।
( ৬৩ )
মেথর-দম্পতির প্রবেশ ।
মথর-দম্পতি।
( গান )
ঝাড়, মারে। এমন বাবুর মাথায়।
ঝাড়, মীরে এমন বাবুর মাথায়।
নকুড়। দগদগে ঘায়ে নুনের ছিটে! তােরা আবার কেন ?
মেথর-দম্পতি।
( গান )
ঝাড়, মারে। এমন বাবুর মাথায়।
ঝাড়, মারে। এমন বাবুর মাথায় ॥
দরােয়ান-সহ ডাক্তারের প্রবেশ ।
মশায় -নকুড় বাবু ! দুর্ঘটনা বড় গুরুতর ; মাথায়
বিষম আঘাত ; আয়ােগ্য কিছু সময়সাপেক্ষ।
নকুড়। ককেত থাকা আমার পক্ষে এখন একান্ত অসম্ভব হয়ে
উঠছে। কাল সকালেই আমি দেশে যাবার ইচ্ছা করছি।
কি বলেন?
ডাক্তার। একান্ত অনুচিত।
নকুড়। এখানে থাকাও আর আমার পক্ষে একান্ত অনুচিত।
তবে যা আপনার ইচ্ছা। কিন্তু সুচিকিৎসা বিশেষ
আবশ্যক। আমি আসি।
[ ডাক্তারের প্রস্থান।
( ৬৪
মেথর-দম্পতি।
গত ।
ডিক্রী-জারি,
নীল বাতী জ্বলে।
অজি-কাল
করে বাবু
বাবুর বাড়ী
.
তলব না দিলে ।
চাইতে গেলে গুষ্ঠি মিলে, ভাগিয়ে দেয় --
কড়া কথায়।
ঝড়ি, মারাে এমন বাবুর মাথায় ।
ঝাড়, মারে। এমন বাবুর মাথায়।
নকুড়। যাঃ-য ! আজ যাঃ কাল সকালে তলব চুকিয়ে নিয়ে
যা। দরােয়ান! আমরা কাল সকালেই দেশে চলে যাবো ।
তার ব্যবস্থা কবে। এই বার আমায় ধর ত। আমি বােধ
হয়, ভিতরে যেতে পাবো।
[ নকুড় বাবুকে লইয়া দরােয়ানের প্রস্থান।
মে থর-দম্পতি।
গীত।
দিন দুই তিন
জারি-জুরি,
সহরে এসে।
( ৬৫ )
ছি-নি-নি-নি খেলে টাকা,
নবাবী বেশে।
গরব-ভরে থুথু ফেলে ধৰ্ম্মের মাথায়।
ঝাড়, মারাে এমন বাবুর মাথায়।
ঝাড়, মারাে এমন বাবুর মাথায়।
[ গাহিতে গাহিতে প্রস্থান
( ৬৬ )
পট-পরিবর্তন।
বর-সজ্জার ফর্দ-হাতে বরের বাপের প্রবেশ ।
গীত।
ও মায়াকান্না কালে কি হবে !
একটি পয়সা আর কমে না,
যদি আমার ছেলে চাবে।
দয়া দয়া করে। বা কি,
দয়ার বা কি আছে বাকী,
মাইনর ফেলে হাজার টাকা,
আর কি,—এমন সস্তা পাবে।
রূপাের দান আর চুড়ি -সুটে,
এত কি তায় খরচ বটে,
এক-শ খানা নমস্কারী,
নইলে, দোসরা জায়গা যাবে ।
তােমার অাকায় মাকড়সা-জাল,
আমার কি দোষ,—তােমার কপাল !
অপরের ভোগ, -ও মেয়ের বাপ!-
ভােগে কে আর কবে ৷
---
( ৬৭ )
অষ্টম
দৃশ্য
| নকুড় বাবুর দেশস্থ বাটী
নকুড়বাবু, শশিমুখী, ঝি, বৈষ্ণবী, ডাক্তার বাবু,
আউলে ক্ষেপা।
নকুড়। কি হলাে !—সব গেলো। কলকাতা - আফিস—পসার
প্রতিপত্তি সব গেলো! শশিমুখি ! এখানে আছ ?
শশিমুখী। আছি। এখনও আমার গায়ে-মাথায়-দাতে-চোয়ালে
বড় ব্যথা। কথা কইতে বড় কষ্ট। সব গেছে,--গেছে ;
আবার হবে। ডাক্তারকে আতে বলেছ ?
নকুড়। বলেছি বই কি ? ঝি কি এখনও ফেরে নি?
ঝির প্রবেশ ।
ঝি। ডাক্তার বাবু আছেন।
ডাক্তারের প্রবেশ।
নকুড়। ডাক্তার বাবু! আমার স্ত্রীর মাথাটা দেখুন দেখি ! যাতে
শীঘ্র সেরে উঠে, সেইরূপ ঔষধ দিবেন। আপনাকে আর
কি বলবাে, আমাদের শনির দশা পড়েছে। বড় বিপদই
যাচ্ছে।
ডাক্তার। (শশিমুখীর মাথা দেখিয়া ) সারবে বই কি সাবে
( ৬৮ )
লােক পাঠিয়ে
তবে নির্দোষ সাব্যুতে কিছু সময় লাগবে।
দেবেন,-'ওষুদ দেবাে।
[ ডাক্তারের প্রস্থান।
নকুড়। (শশিমুখীর প্রতি। বামুন-গিন্নির কিছু খবর পেয়েছ ?
কিছু খোঁজ নিয়েছ ? এক একবার মনে হচ্ছে, বামুন-গিন্নির
বড় অপমান করেছি, দুঃখী ও জাগুলােকে বড় কষ্ট দিয়েছি,
তাই কি এমন হলাে ?
শিমুখী। আমারও মনটা এক একবার যেন চমকে চমকে
উঠছে ; কি জানি, কিসে কি হলাে ? যা-যা হবার, তা
হয়ে গেছে ; বেশী ভালে অসুখ বাড় বে; যা রয়—সয়, তাই
ভাল।
এক বৈষ্ণবীর প্রবেশ ।
বৈষ্ণবী।
গীত।
শ্যামশুক পাখী, সুন্দর নিরখি,
রেখেছিনু হৃদি-মাঝে।
এখন, নখর-প্রহরে, হু হু হু ঝরে,
বাজ যেন বুকে বাজে।
(নকুড় বাবুর প্রতি) বাবু সাহেব! ( শশিমুখীর প্রতি) রাণী
মা! আমার অপরাধ নেবেন না; গায়ে গায়ে রব উঠেছে-
আপনার প্রজারা বড় কষ্ট পাচ্ছে ; একজন বামুন-বিধবা
বাস্তু-ছাড়া হয়েছে ; শুনে বড় কষ্ট হলো। তার পর শুনলুম,
আপনাদের ভারি বিপদ হয়েছে ; আপনারা আমাদের জমি-
দার ; তাই একবার দেখতে এলুম। ভিক্ষে দেন—দেবেন ;
দেন, অমনি দেখে চলে যাব।
(গান)
এক যে বাবু, ছিল তাজা,
হীরে-সােণার দেশে।
নেশার ঝোকে, মনের পাকে,
মজলে বাবু শেষে।
নকুড়। মজেছিলুম বটে; কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, মজেছিলুম।
শশিমুখি ? তুমিও বুঝতে পাচ্ছাে না ?
আউলে ক্ষে পার প্রবেশ।
ওরে
আউলে। ওরে, অবুঝ ছেলে সুবুঝ হলাে,
হাল্কা হল বােঝ।
ঘাের বিকারে,
ওষুদ করে,
বামুন-গিন্নি রােঝ।
নকুড়। বুঝেছি, বামুন-গিন্নিই রােঝা বটে! এইবার হুস হচ্ছে।
শশিমুখি ! হুস হচ্ছে ?
শশিমুখী। বৈষ্ণবি! তােমার নাম অনেক দিন শুনেছি বটে! ।
( ৭০ )
তােমার কি এমনি ভিক্ষে করেই দিন চলে ? আর কি কেউ
নেই ?
বৈষ্ণবী। না মা! কেউ নেই ; তবু ভাল,তুমি জিজ্ঞাসা
করলে ! শুনেছিলুম, তােমার বাড়ী কেউ এলে, তুমি মুখ
তুলে কথাই কইতে না।
সে ভাব বদল হয়েছ--'ভাল।
(গান)
ভালবাসিবে ব'লে, ভালবাসি-নে।
আমার স্বভাব এই, আমি তােমা বই আর জানি-নে।
বিধুমুখে মধুর হাসি, দেখতে বড় ভালবাসি,
তাই তােমারে দেখতে আসি, দেখা দিতে আসি-নে।
আজ আসি তবে বাবু ! আসি তবে রাণি !
শশিমুখী। আজ বড় অসুখ ; ভিক্ষে দিতে পারলুম না ; আর
একদিন আসি—বেশী করে ভিক্ষে দেব।
নকুড়। আর একদিন আসি—আসি, তাের কষ্টের কথা
শুনবাে ।
(গান)
ওরে, চকোর-চকোরী, গলা ধরাধরি,
প্রাণ ভরি খায় চঁাদ-সুধা।
ওরে, এতদিন পরে,
যায় বুঝি দূরে,
বিয়াড়া বিষম সহুরে ক্ষুধা ।
[ প্রস্থান।
;
বৈষ্ণবী।
( ৭১ ) ,
দৌড়ে এমু,
*
নকুড়। শশিমুখি ! সহরের গান-জল ভাল ? না, পাড়াগাঁয়ের
কাদা-পাক ভাল ? সহরের ভুড়ে বাবু ভাল? না, পাড়া-
গাঁয়ের গরিব প্রজা ভাল ?
আউলে । ওরে,পা পিছলে পড়েছি,
সহরের শাণ-বাঁধা ঘাটে।
ওরে, ব্যথা পেয়ে
পাড়াগাঁয়ের হাটে।
ওগাে! আর কি সেথা যাব গো !
নকুড়। আউলে ! তােকে এ সব ছড়া শিখায় কে? তার বাড়ী
কোন্ দেশে? কি করে সে ?
আউলে। ওগাে, ভাব-সাগরের মাঝি তিনি,
সালে ধরেন হাল।
তুফান দেখে,
সাম্লৈ থেকে,
চালান্ বাদাম-পাল।
শশিমুখী। আউলের ছড়াগুলা শুবার মত বটে,-ভাববার মতও।
আমি এতদিন কোথায় ছিলুম।
আউলে ।
ওগাে ! মগজে যার মগজ থাকে,
সেই ত ভাবতে পারে।
ওগে! ইলি-বাঁধা, কলুর বলদ
ঘুরে ঘুরে মরে।
ওগাে ! ভূতের নাচন এলাে কমে,
পেতনির বদল রং।
( ৭২ )
ওগাে ! এদো-ডােবায় পদ্ম-কলি,
ধৰ্ম্মের এমনি ঢঙ,।
ওগো ! রাত পােহল, ফরসা হলো,
ভরসা হ’ল কিছু।
আর কেন তুই আউলে হেথা,
সরে পড় রে পিছু!
[ প্রস্থান।
নকুড়। শশিমুখি ! তুমি এত দিন ব্যাকটি চলজি পড়লে ;
আমি বাইলজি পড়লুম ; এইবার ফিলজফি ভাববার সম
হয়েছে । আমি চলুম।
[ প্রস্থান।
শশিমুখী। আমার মাথাটা যেন কেমন-কেমন ; সবই যেন
কেমন-কেমন! মাথায় ওষুদটা একবার দিই গে। তাইত,
আমি এতদিন কাউকে গ্রাহ করতুম না ; সাধু ভাষায় কথা
কইতুম ; দুঃখীর দিকে চাইতুম না। মনে মনে করতুম,
দুনিয়ায় আমিই কেবল মস্ত বড় ; সেই জন্যেই কি এমন
হলো? ককেতায় মনে হলো, বামুন-গিন্নিই যেন
আমাকে ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল ; প্রজাগুলো
পিছুতে দাড়িয়ে খিল্ খিল হাছিল ! কেন আমার এমন
ভুল হয়েছিল ?
;
( ৭৩ )
পট-পরিবর্তন।
কতিপয় হােমরা-চোমরা হিন্দুর প্রবেশ।
গীত।
(আমরা) সাবেক হিন্দু রাখব নাক’ আর ।
কয় সাঙ্গাৎ মিলে, হুজুক তুলে,
কবাে তােদের পগারপার ।
উড়িয়ে নতুন ঢঙ্গের নিশান,
ভাঙ্গবো তােদের ধম্মের গুমান,
মনু তােদের কি মুরুব্বি,
দেখবাে এইবার ।
সমাজ-সমাজ করিস্ রে কি,
এ সমাজে কি আছে বাকি,
মােদের আঁখির ঠারে, সমাজ ফেরে,
( আমরা নতুন সমাজ-অবতার ।
চালিয়ে নতুন কলমের খো,
ঘুচিয়ে দেব সেকালের পোচ,
এখন, নতুন চলন, নতুন ধরণ,
নতুন সংস্কার ।
( ৭৪
নবম দৃশ্য ।
[ নকু বাবুর দেশস্থ বাটী ]
নকুড় বাবু, শশিমুখী, দরােয়ান, গমস্তা, ঝি,
পরাণ, ঠান্দিদি, আউলে, বৈরাগীদল ।
নকুড়। আজ যেন মাথাটা একটু খােলদা খােল মনে হচ্ছে।
দরােয়ানের প্রবেশ।
রােমান। গমস্তা আপকা-ওয়াতে না হয়।
নকু।
বােলাও।
গমস্তার প্রবেশ।
গমস্তা। বাবু! সৰ্ব্বনাশ! কতকগুলা প্রজা এককাট্টা হয়ে খাজনা
বন্ধ করেছে। অষ্টমের টাকা যােগাড় করতে পারিনি। কাল
কালেক্টারীর টাকা দাখিলের দিন। এবার আর বুঝি রাখতে
পারলুম না।
নকুড়। আঁা!
গমস্তা। নিমে বেটা ইচ্ছে করে খাজনা দিতে দেরী করেছিল ;
সে ত আপনি সবই জানেন। আপনারই আদেশ-মত
তাকে একটু ধমক দিয়েছিলুম। তাই কতক প্রজা ধর্মঘট
করেছে।
নকুড়। আমিও একখানা দরখাস্ত পেয়েছিলুম বটে। এইবার
;
( ৭৫ ) ; ঠিক হয়েছে। প্রজাদের সঙ্গে আমি যেমন ব্যবহার করে- ছিলুম, এইবার তার ফল ফলেছে। পিতৃপুরুষের বাস্তু ছেড়ে, পুত্রবৎ : প্রজাগণকে ছেড়ে,–এতদিন আমি সহরের সুখ- সাগরে সাঁতার দিচ্ছিলুম ; এইবার হাত পায়ে ঘন ঘন খিল ধরূছে ; ডুবলুমডুবলুম ! অকুল পাথারে ডুবলুম। (রাগের সহিত ) গমস্তা !তুমি অত্যন্ত স্বার্থপর ; অত্যন্ত বদমায়েস। আমি এক গুণ করতে বলেছি ; তুমি দশগুণ করেছ ; আমি ধরে আনতে বলেছি, তুমি বেঁধে এনেছ! তােমারই দোষে আমার জমিদারী যেতে বসেছে। তুমি বাস্তু-ঘুঘু ! গমস্তা। এখন বলবেন বইকি! বুকের রক্ত দিয়ে এতদিন আপ- নার কাজে খাটুলুম ; এখন আমি বাস্তু-ঘুঘু হ’ব বইকি! আপনি কাগজ-পত্র সব বুঝে নিন্। আমি আর একদণ্ডও আপনার বাড়ী থাকবে না। নকুড়। তােমার ফন্দী আমি বুঝেছি! তুমি আমায় বিপদে ফেলে নিজনামে জমিদারী কিবার যােগাড় করেছ ! তুমি কি অমনি- অমনি রেহাই পাবে ? তােমার স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি আমি আটক করুবাে ! গমস্তা। সে পরের কথা। এই আপনার কাগজ-দপ্তর রইলো, আমি বিদায়। আর কি এখানে থাকা পােষায় ? [ প্রস্থান। নকুড়। বুঝেছি- বুঝেছি ! আমি বড় নেশায় ভাের হয়েছিলুম ;
; ( ৭৬ ) তাই এতদিন বুঝতে পারিনি ; এখন সব বুঝেছি, সব বুঝেছি! আমি মহাদম্ভে বামুন-গিন্নির আপমান করেছিলুম ; প্রজাদের উপর অব্যবহার করেছিলুম, সহরের সুখ-বিলাসে বিভাের হয়েছিলুম, এসব বিপদ তারই ফলে। দরােয়ান! বামুন- গিন্নির খবর নিয়েছ ? পরাণকে ডেকেছ ? পরাণ ঘােষের প্রবেশ। পরাণ। বাবু মশাই! ডেকেছেন ? আপনি আমাদের বড় অপ- মান করেছেন ! মার পর্যন্ত খেয়েছি ; সব সয়েছি ; সব ভুলেছি ; আপনি জমিদার,-ডেকেছেন। আবার এয়েছি। কিন্তু বামুন-গিন্নির অপমান, বামুন-গিন্নির কষ্ট আমাদের বুকে বড় বাজছে ; বামুন-গিন্নি কেঁদে কেঁদে বড় কাতর। নকুড়। যা হবার, তা হয়ে গেছে। যা করবার, তা করে ফেলেছি। এইবার আমি তঁার পায়ের ধূলা নিয়ে সর্বাঙ্গে মাখবাে। আমার জননীর মত তাকে ভক্তি কবে। তিনি এখন আছেন কোথা? পরাণ। পাতেদের পড়ায় আমরা তার জন্যে কুঁড়ে বেঁধে দিয়ে ছিলুম ; সে কুঁড়ে ঘরে কে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল ; পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন তিনি সাঁপুইদের দরজায় আছেন। বড় কষ্ট তঁার-বাবু মশাই। নকুড়। তাঁর বড় কষ্ট, আমার নরকের জ্বালা। আমার সব গেছে ; কল্কাতা গেছে ; কারবার গেছে ; জমিদারী-ও যায়- , যায় !
( ৭৭ ) পরাণ। বাবু-মশাই! গমস্তার জ্বালায় জ্বালাতন হয়ে প্রজারা খাজনা দেওয়া বন্ধ করেছে। আপনি জমিদার , আপনি ত একদিনও প্রজাদের মুখের দিকে তাকানি। আপনি জমি- দার বলে আমরা সব সয়ে আছি। এখনও কি আপনি মুখ তুলে চাবেন না ? নকুড়। ভুল হয়েছিল, অত্যন্ত ভুল হয়েছিল। সে গমস্তার কৰ্ম্ম- গিয়েছে। তুমি এখনি যাও। বড় বড় মাতব্বর প্রজাগণকে আমার কথা বুঝিয়ে বলােগে ; আজ বৈকালে যেন তার আমার সঙ্গে দেখা করে ; আমি যত্ন করে সকলকার কষ্টের কথা শুনবো ; উচিতমত ব্যবস্থা করবো; আর কাউকে কোন রকমে কষ্ট পেতে দেবাে না। নিমের এ বছরের খাজনা রেহাই দেবে, তার ওষুদের ব্যবস্থা করবো ! বুঝলে পরাণ? পরাণ। সব বুঝেছি, বাবুমশাই! সব বুঝেছি। এতদিন যদি আপনি এমন কতেন, সহরে গিয়ে আমাদের ভুলে না থাক তেন, তা হলে কি আজ এমন হত ! আমাদের এত কষ্ট হত ; অাপনার এত বিপদ ঘটত ! তবে চলুম বাবু! নকুড়। আচ্ছা—এস ! বেশ ঠাণ্ডা করে, বেশ ঠাণ্ডা হয়ে সকলকে বুঝিয়ে বগে, আমি তাদের সকল কষ্ট দূর করূবে । ; পরাণ। যে-আজ্ঞে ! পরণাম। [ প্রস্থান।
( ৭৮ )
আউলে ক্ষেপার প্রবেশ
আউলে। ওরে, এত দিনে ভুল ভেঙ্গেছে,
কুল দিয়েছেন কালী ।
ওরে, বৃন্দাবনে ফিরে এলো,
ব্রজের বনমালী ।
ওরে, ঘরের ছেলে, ঘরে খেলে,
ঘরের সাথী নিয়ে ।
ওরে, বাস্তু ঘুঘু ফাদে সাবাড়,
ধৰ্ম্মে - ফাকি দিয়ে।
ওরে, কুমড়ো-ফাটা পেতনি উবুড়,
ভূতের খোলস খােলা।
ওরে, আঁধার ঘরে, চাদের আলো,
ধৰ্ম্মদেবের মেলা।
‘ধীরপদে ঠান্দিদির প্রবেশ।
ওরে, নকুড় বাবুর চোখ ফুটেছে,
ঠান্দিদির আজ পূজো।
আউলে ক্ষেপা,
পেট ভরে তুই,
খাবি ভাজা-ভুজো।
নকুড়। ( ঠান্দিদিকে দেখাইয়া তাহার পায়ে ধরিয়া)-ঠানদি
বড় অপরাধ করেছি , বড় কষ্ট পাচ্ছি ; কলকেতায় আমার
সৰ্ব্বনাশ হয়ে গেছে , তােমার অপমান করেছিলুম, তেমনি
( ৭৯ )
.
হাজার অপমানে আমার মাথা কাটা গেছে , তােমার শাপে
জমিদারী আমার যায়-যায় হয়েছে। তুমি বলাে,-তুমি
আমার সব অপরাধ ক্ষমা কবে ?
আউলে । ( নাচিতে নাচিতে )
ঠান্দিদি হে!
মুঞ্চ ময়িমানমনিদানম্ ।
নকুড়। ঠানদি! এতদিন পরে বুঝেছি, আমি বাস্তু ছেড়ে, গাঁ
ছেড়ে, প্রজা ছেড়ে, তােমাদের সকলকে ছেড়ে, সহরের
বিলাসে মেতে, গুরুতর অপরাধ করেছি। প্রাণের তুল্য প্রজা-
গণের—প্রাণের তুল্য গ্রামবাসিগণের অনেককে একে একে
চক্ষের সমক্ষে যমের মুখে তুলে দিয়েছি। আমার কত কাঙ্গাল
প্রজা আজ একমুষ্টি অন্নের জন্য লালায়িত, এক ঘটী জলের জন্য
কাতর। আমি চোখ থাকতে এতদিন তা দেখেও দেখিনি।
কাণ থাকতে এতদিন তা শুনেও শুনিনি ! টাকা থাকতে তার
কোন ব্যবস্থাই করিনি। তারপর, চরম অপরাধ,তােমার
অপমান করা !
আউলে
(কীৰ্ত্তনে)
সহর-পিরিতী সায়রে ডুবি,
খাইনু আপন-মাথা !
ঠান্দিদি হে! কি কব মরম-ব্যথা !!
নকুড়। সহরে থেকে থেকে,-সহরের সুখ-মােহে ডবে,
( ৮০ )
-
নেশায় বুদ হয়ে,-সব জলাঞ্জলি দিয়েছি। বলতেও বুক
ফেটে যায়,-সহধৰ্ম্মিণীকেও সাক্ষাৎ প্রেতিনী করে তুলেছি
বড় জ্বালা,-ঠাদিদি ! বড় জ্বালা ;
আইলে।
ওরে, কাহিল নাড়ী, -- সালাে এবার,
পটল-সত্বর জলে।
ওরে, রােঝর ফয়ে, পড়লাে ভূত,
ঠাদির পদ-তলে ।
নকুণ্ড। বলো ঠান্দি ! আমায় ক্ষমা করলে! আর আমি কারও
অপমান করবাে না ; কাকে কোন জ্বালা দেব না;
তুমি এখনি তোমার ঘরে যাও। দরোয়ান সঙ্গে গিয়ে তােমার
ঘরের চাবি খুলে দিয়ে আসুক। আজ হতে তুমি আমার
মা ; মাসে-মাসে আমি তােমার মাসােহরার ব্যবস্থা করে
ঠাদি। বাবু! তুমি আমার পেটের ছেলের তুল্য। তােমাৰ
উপর দুঃখ হয়েছিল বটে, কিন্তু ছেলের উপর দুঃখ কি বেশী
দিন থাকে বাছা! দুঃখে যদি দুটো একটা কঠিন কথা বলে
থাকি, মনে কিছু করােনা বাবু! আশীৰ্বাদ করি, তােমার
সুবুদ্ধি বজায় থাক্ ; তােমার মঙ্গল হােক। হেঁ বাবু! শুন্-
লুম, বউ-মা নাকি কলকেতায় পড়ে গিয়ে বড় কষ্ট পাচ্ছেন।
তাকে একবার দেখে যাবাে না ?
নকুড়। দেখবেন বই কি! আপনাকে দেখা তার পক্ষেই যে
এখন অত্যন্ত আবশ্যক। ঐ যে ঝিয়ের সঙ্গে আসছে।
( ৮১ ) হাঁ-করা ঝিয়ের সঙ্গে কাতরভাবে শশিমুখীর প্রবেশ। ঠাদি। ইঃহিঃহিঃ! এ কি হয়েছে! আহা ---হা! সে রূপের একি দুর্দশা ! একটা চোখ বেরিয়ে গেছে ; নীচে পাটীর দাত গুলো খসে গেছে! আহা-হা! কেমন করে পড় লােগ। ! নকুড়। কল্কাতার বাড়ীতে ছাদের উপর ছিল ; হঠাৎ মাথা ঘুরে উঠে; পড়ে যায় ; তাতেই এমন হয়েছে। !ি বলে, এখনি ঠাদির দুই পায়ে মাথা লুটাইয়া ক্ষমা চাহুক। ঠান্ দির পায়ের ধূল লইয়া সৰ্ব্বাঙ্গে মাখুক। ঠান্দির আশীর্বাদে তাহলে শীঘ্রই সেরে উঠবে। শশিমুখী। (ক্ষীণস্বয়ে) ঠান্দি ! আমি আপনার কাছে বড় অপ- রাধিনী। আমি আপনার বড়ই অপমান করেছি; আপ- নাকে বড় কষ্ট দিয়েছি। তার ফলে আজ আমার এই দুর্দশা ! ক্ষা করুন। আর আমি আপনাদের অপমান করবাে না; আর আমি আপনাদের ছেড়ে যাবে। না ; আর আনি বিদ্যের দেমাকে আত্মহারা হ’বাে না ! আর আমি আপ- নাদের কষ্ট দেখে চুপ করে থাকবে না। ক্ষমা করুন, ঠাদি! আমার বড় কষ্ট ঠাদি। আশীর্বাদ করি, নীরােগ হও !—সুস্থ হও মা ! হাতের নােয়। অক্ষয় হােক মা! তােমরাই ত আমাদের ভরসা মা
( ৮২ )
ক
;
নকুড় বাবু! ঝি অমন হা করেই রইলো কেন? ওকি মুখ
বুজতে পারে না ?
আউলে । ওরে, ভূত পেতনির সাজ খসেছে,
গেঁয়ো হাওয়ার গুণে।
ওরে, বুননা শালিক, পােষ মেনে আজ,
ব’লে ঘরের কোণে ॥
ওরে, ঝিয়ের চোয়াল, আটকে গেছে,
মুখ বুজে না আর।
ওরে, ধৰ্ম্মদেবের সূক্ষ্ম বিচার,
রেহাই আছে কার৷
নকুড়। ঝিটেরও বড় গরব হয়েছিল ; ভগবান ওকেও শাস্তি
দিয়েছে। আজ কয়দিন ধরে ও আর চোয়াল ব জ তে পাচ্ছে
! একদিন হাই তুলতে গিয়ে ঐ দশা হয়েছে ! ডাক্তার
দেখান হয়েছিল ; চুয়াল আর জুড়বে না! বড় কষ্ট ।
ঝি। ( ঠান্দিদির পায়ে পড়িয়া –গোগাইয়া) আ-কে ক্ষ—য়া !
ঠাদি। ভাল হয়ে উঠো মা ! ভাল হয়ে উঠো ! বাবু, ! এখন
আসি ।
[ প্রস্থান।
নকুড়। ঝি! ওটাকে (শশীমুখীকে দেখাইয়া) এখান থেকে
নিয়ে যা !
ঝি। আ-ছা।
শশীমুখীকে লইয়া ঝির প্রস্থান।
( ৮০ )
গাহিতে গাহিতে একদল বাউলের প্রবেশ ।
বাউল দল।
গাঁয়ের বাবুর
ঢঙ ফিরেছে,
রঙ খুলেছে ভাল।
আউলে। (নাচিতে নাচিতে)
আউলে ক্ষেপা,
খেলার রাজা,
সামূলে গুটী চালাে ।
ৰাউল দল।
নতুন সাজে,
গা সেজেছে,
ঘুচলাে আঁধার রাশি।
আউলে। (নাচিতে নাচিতে )
নকুড় বাবু,
গাঁয়ের বাবু,
আউলে ক্ষেপার হাসি।
ওরে, কাপুরুষের,
তুফান গেলাে ঘুচে।
ওরে, মনের মানুষ, ঘরে পেয়ে,
আউলে ক্ষেপ নাচে ;-
আরে হে—আউলে ক্ষেপা নাচে।
সূক্ষম বিচার,
( ৮৪. )
বাউলদলের চক্রাকারে নকুড়বাবুকে বেষ্টন
করিয়া নাচিতে নাচিতে গীত।
বাউলের সুর।)
সহরের মায়া ছাড়াে ভাই।
সহরের মায়া ছাড়ো ভাই !
সাধ করে ভাই ! হাপর-কলে,
কেন পুড়ে হবি ছাই ।
কেঁদে বলেন গ্রাম-জননী,
‘জল দে আমার মুখে !’-
এত ছেলে না শুনিস্ তা,
বিভাের সহর-সুখে,
ওরে, অন্তকালে ঐ মা ছাড়া,
আর যে গতি নাই।
বেছে বেছে রতন এনে,
গায়েরে সাজাও,
তড়াগ কেটে,লহরে তার,
পিয়াস মিটাও।
পথের কাদা দে ভাই মুছে,
ছেলের কাজ ত তাই
( ৮৫ )
আউলে।
নেচে নেচে আউলে বলে,
(ওরে) মায়ের দুধে মানুষ হওয়া,
ছেলের কাজ ত তাই।
যবনিকা পতন।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.