Bally Sadharan Granthagar
Sab - Harader Gaan Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সব-হাৱাদেৱ গান
বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
(পরিবর্ধিত ২য় সংস্করণ)
মাঘ ১৩৩৬
সরস্বতী লাইব্রেরী
৯নং রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলিকাতা।
মূল্য ১০ টাকা
প্রকাশক-ঐবিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
সরস্বতী লাইব্রেরী
৯নং রমানাথ মজুমদার থ্রট, কলিকাতা।
প্রিন্টার—শ্রীবিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়
শ্রীসরস্বতী প্রেস,
১নং রমানাথ মজুমদার ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
উপহার
* ==================
============
= = = = = = = = = = = = = = ====
No text on this page.
পরম শ্রদ্ধাস্পদ
অধ্যাপক শ্ৰীযুক্ত নৃপেন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
শ্রীচরণকমলেষু
প্রবীণ হয়েও তুমি অন্তরে নবীন,
গৃহস্থ হয়েও তুমি বন্ধন-বিহীন,
রসিক হয়েও তুমি পরম গম্ভীর,
ধীমান হয়েও তুমি মহাকৰ্ম্মবীর,
ক্ষাত্ৰ তেজে দীপ্ত তুমি নির্মল ব্রাহ্মণ
করেছ ভােগের সাথে ত্যাগের মিলন।
জীবনে ক'রেছ তুমি সবারে স্বীকার,
উন্মুক্ত করিয়া তব রেখেছ দুয়ার
সকলের তরে ; শুধু
মিথ্যার স্পর্ধারে
দাও নাই স্থান কভু। তাই নির্বিচারে
কাঞ্চন ছাড়িয়া নিলে সৈনিকের অসি,
স্বেচ্ছায় তাই ত তুমি কারাগারে পশি’
আৰু করিলে পান ব্যথার গরল ;
পরিলে নূপুর করি কারার শিকল ;
দারিদ্র্যে করিলে তুমি অঙ্গের ভূষণ,
দুঃখেরে মুকুট শিরে করিয়া ধারণ
দুখেরে দিলে গাে লজ্জা; মুক্তির বাঁশরী
বাজালে বন্ধন মাঝে ; দু’টি আঁখি ভরি
হেরিলে রুদ্রের শােভা ভীষণ মধুর ।
সাধিছ জীবনে তারই উন্মাদিনী সুর।
*
-
( ২ )
আমার এ গানে সেই রুদ্রের অর্চনা,
এচ-সুন্দর যিনি তাঁরই আরাধনা
করেছি সঙ্গীতে মাের। পদধ্বনি তার
জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে তনি অনিবার ;
তনি লক্ষ তরুণের রক্তের কল্লোলে,
শুনিতেছিমর্মে মাের ; দোলে, ওরে, দোলে
রক্তিম-কেতন তার বিদ্যুত-শিখায়,
কোদণ্ড-টঙ্কার তার ঐ শােনা যায়
সপ্তসিন্ধু-কলরােলে ঝন্ধার গর্জনে।
আসে আসে, ভয়ঙ্কর আসে প্রতিক্ষণে
বথ-চক্রে বিচূর্ণিয়া উদ্ধত প্রাসাদ,
অর্থগৃগ, ধনিকের অন্যায়ের বাঁধ।
তারই জয়ভেরী শুনি চাষীর হুঙ্কারে,
শ্রমিকের ধর্মঘটে। আজি কারাগারে
বন্দীরা জাগিছে রাতি তারই প্রতীক্ষায়
কারারুদ্ধ সন্তানের মুক্তি কামনায়
তারেই ডাকিছে মাতা বিনিদ্র নয়নে।
সে আসে, সে আসে ওগাে তাণ্ডব নর্তন
ভাঙ্গিয়া চুরিয়া সব করিয়া শ্মশান ;
আমার এ গানে তারই আগমনী গান।
শ্ৰদ্ধানত
বিজয়
সূচীপত্র ১ ৫ ১৩ ১. ২২ ৩৪ ১। সবহারাদের গান ২। রক্তজবা ৩। রক্ত-উষার যাত্রীদল ৪। মুক্তি-অভিযান ৫। আপনার পানে ফিরে তাকাও ৬। বিজিতের গান ৭। বুড়ীবালামের তারে ৮। বিপ্লবীর এতি ৯। বিদ্রোহী বীর ১০। কবির প্রতি ১১। অপরাধী ••• ১২। কামধেনু ১৩। কারার দুয়ারে ১৪। পথিকের গান ১৫। গুখ-শের ১৬. নারী স্বর্গের দ্বার ১৭। অর্ঘ্য ০ ০ ০ ৪০ ৪৩ ৪৯ ৫৫ ০০০ ৫৮ ৬০ ৬২
No text on this page.
সবু-হাৱাদেৱ গান
সর-হারাদের গান
গাহি জীবনের গান।
রাতের আঁধারে জাগিতেছে ধীরে মহামানবের প্রাণ।
ব্যথার শােণিতে রক্তিম হয়ে সহস্রদল ফোটে;
তাহারই বার্তা নিশার বক্ষে গগনে গগনে ছােটে।
পাঁপড়ির পর খুলিছে পাপড়ি রাতের অন্ধকারে
রক্তকমল ফোটে মানবের বেদনার পারাবারে।
পরম-শােভায় ফোটে কুবলয়—আমি কবি তার গান
গাহিতেছি আজি দুখের তিমিরে—আসিতেছে ভগবান।
আসিতেছে ভগবান
মহামানবের হৃদয়-পদ্মেগাহ কবি তার গান।
মানুষের ব্যথা সঞ্চিত হয়ে ছুঁয়েছে আকাশ-তল,-
যত দুরে চাই—তত দুরে হেরি সৃষ্টির চোখে জল,
সৰ-হারাদের গান
জঠরে জঠরে অলিছে বহ্নি, অয় নাহিক ঘরে-
কুকুরের সাথে লড়ছে মানুষ একটু রুটির তরে ;
কাকের মুখের আহার কাড়িয়া খেতেছে অন্ন খুটি-
কঁদে নয়নারী—চাহিনাকে কিছু-রুটি চাই, শুধু রুটি।
দাও রুটি”
“দাও,
ওগাে
ধনিকের দল যিরেও চাহে না,-কাঞ্চন মুঠি মুঠি
ছড়াইছে তারা বিলাস-ব্যসনে-বিলিয়ার্ড’ খেলে সুখে,
নাচে 'বলনাচ’, খায় শ্যাম্পেন’, ‘সিগার’ ফুকিছে মুখে,
বাজায় পিয়ানো, করে প্রেমালাপ, মােটরে চলেছে ছুটি
হাসিয়া হাসিয়া হােটলে বসিয়া কুকুরেরে দেয় রুটি ;
বাহিরে মানব ধুকিছে ক্ষুধার দুঃসহ বেদনায়
কুকুরের সাথে ভাগ্য বুঝি সে বদল করিতে চায়।
ভয় নাই, ভয় নাই;
তােমার লাগিয়া জাগে ভগবান। শােন রে মানুষ ভাই,
এই জগতের আড়ালে রয়েছে অদৃশ্য এক জন
ভয়ে যার তাপ দিতেছে অগ্নি, বহিতেছে সমীরণ,
চন্দ্র সূর্য ঘুরিয়া ঘুরিয়া ঢালিছে আলাের ধারা,
এই বিশ্বের আড়ালে সে জন জাগিছে তন্দ্রাহারা।
তােমাদের লাগি কত মহাপ্রাণ স’হেছে নির্বাসন,
কারার কক্ষে শৃঙ্খলভার বহিয়াছে আজীবন,
সৰ-হারদের গান
তােমাদের লাগি নয়নে তাদের ঝরেছে অশ্রুধারা-
সে সব বেদনা, সে সব সাধনা-ব্যর্থ হবে না তারা।
,
নিশার আকাশতলে
মহামানবের মৰ্ম্ম-কোরক ফোটে অগণ্য দলে।
যত তারে হানে তত ছুটে বাস-প্রাণে প্রাণ জাগে ঢেউ,
রবে না মানুষ মনুষের দাস—ক্ষুধিত রবে না কেউ।
দেহের রক্ত জল করে যারা যুগ-যুগান্ত ধরি
লাঙলের মুখে মরু-ধরণীরে তুলেছে শ্যামল করি,
পাহাড় কাটিয়া রচিয়াছে পথ, গড়েছে প্রাসাদ-মালা,
খুনির গর্ভে পশিয়া রত্নে ভৰিছে ধরার ডাল,-
আজ পৃথিবীতে জীবন তাহারা যাপিতেছে উপবাসে-
নিকটে লক্ষ প্রাসাদ থাকিতে ঘুমায় পথের পাশে।
শােভে চারিদিকে পণ্যবীথিকা-বসনের স্তুপে ভরা
তারই মাঝে শীতে কঁপে নরনারী ছিন্নবস্তু-পরা।
শােন ধনিকের দল,
কঁকির উপরে দাড়ায়ে রয়েছে তােমাদের ধনবল।
তােমাদের যত বিপুল প্রাসাদ, ফঁাকির উপরে গড়া
এই ফঁাকি আর কত কাল ধরে বহিবে বসুন্ধরা ?
উপবাসী যত গােলামের দল খেটে যাবে চিরকাল
তােমরা ঘুমাবে পালঙ্কে-আর চরাবে মানুষ লি।
মিথ্যা, এ সব মিথ্যা স্বপ্ন—তােমাদের জোর যত
ভাঙিয়া যেতেছে বাতাসের মুখে তাসের ঘরের মত ।
সবহারাদের গান ভাঙনের গান গাই । কঁকিতে কঁকিতে ভরিয়া উঠেছে সমাজ ; আজিকে তাই চক্র ধরিয়া আসে ভগবান চড়ি বিপ্লব-থে, দিগন্তে তার ডঙ্কা বাজিছে, নরনারী পথে পথে “রুটি দাও” বলি’ করে গর্জন, হাঁকে উচ্চৈঃস্বরে— “আমরা খাটিব কলে-প্রান্তরে, অল্প লুটিবে পরে। বহু শতাব্দী ধরিয়া নীরবে সহেছি এ অবিচার, আজ থেকে ভাই সহিব না আর ‘পরগাছা’দের মার।” সাম্যের যুগ এল ধরণীতে, এই যুগের নরনারী রহিবে না কেহ উপবাসী ঘরে, প্রাসাদ-তােরণে দ্বারী দিবে না তাড়ায়ে কাঙালের দলে, মূখ রবে না কেহ, নর বেচিবে না বাহুর শকতি, নারী বেচিবে না দেহ- সব-হারা যারা দুনিয়ায় তার সবের মালিক হবে- যুগের শঙ্খে এই মহাগান বাজে ভৈরব রবে। সময় হয়েছে নিকট বন্ধু, দুঃখ বেদনা ভােলল- ভগবান আসে,-আকাশে আকাশে আনন্দ-গান তােলো ব্যথার সাগরে নিশার আঁধারে রক্তিম শতদল করিছে রচনা তাহারই আসন,-মােছ মােছ আঁখিজল ।
রক্ত-জবা অমার এ মালা নহে যুথী-বেল-বকুলের মালা গাঁথে যাহা প্রণয়িনী তরুতলে বসিয়া নিরালা প্রেমিকে সাজাতে তার; এরে আমি গেঁথেছি নিশীথে আমার চোখের জলে । মরু-পথে চলিতে চলিতে আহত-হিয়ার তারে ব্যথা যত তুলেছে ঝঙ্কার- তাই দিয়ে গাঁথিয়াছি আমার এ রক্তজবাহার । শাণিত-চলনে লিপ্ত আমার এ মাল্যখানি দিয়ে পূজিনু চরণ তব । • এক দিন গ্রন্থরাশি নিয়ে অধ্যয়নে ছিনু মগ্ন সুখসুপ্ত নিরালা কুটিরে ; শরতের মেঘসম দিনগুলি ভেসে যেত ধীরে ; আপনার স্বপ্ন ল’য়ে থাকিতাম সেদিন বিভাের যৌবনের কুঞ্জবনে ; সহসা ভাঙিল ঘুম-ঘাের অতি ঘাের অট্টহাসে; চমকিয়া উঠি তরাসে। হােঃ হেঃ হেঃ হেঃ হিঃ হিঃ হিঃ হিঃ সেই হাসি ধ্বনিল বাতাসে ;
সবহারাদের গান
;
সে বিকট শব্দে মাের থেমে শেল হৃদয়স্পন্দন ;
শিহরিল প্রতি রােম; তারপর পূরিল গগন
সূচিভেদ্য অন্ধকারে ক্ষীণ হয়ে আসিল চেতনা;
সভয়ে চীৎকার করি কহিলাম—কে তুমি বল না,
হাসিছ বিকট হাসি? কিবা তব কুর অভিলাষ ?
আমারে লইয়া তব কেন এই ঘোর পরিহাস ?
আঁধারে উঠিল ধ্বনি-“আমি মৃত্যু ভাঙি ঘুমঘোর
এসেছি জাগাতে তােরে হানি তীব্ৰ কুলিশ কঠোর ;
মিলনের কুঞ্জবনে দুর্বাসার অভিশাপ,
ভাঙিয়া মঙ্গল-শঙ্খ শ্মশানের জাগাই বিলাপ,
ফুৎকারে নিয়ে দিই গৃহস্থের মঙ্গল-প্রদীপ,
লােল জিহবা দিয়া মুছি সধবার সিন্দুরের টিপ,
মাতৃবক্ষ শূন্য করি ছিড়ে আনি যুবক সন্তান,
গৃহে গৃহে রচি আমি বিচ্ছেদের ঘাের ব্যবধান,
দম্পতীর ফুলশয্যা পুড়াইয়া করি ছারখার,
শান্তিজল নাহি মাের,-আছে শুধু অগ্নি-তরবার ;
জাগাই ঘুমন্ত পুরী ঝটিকার উচ্চ অট্টহাসে,
উৎসবের ফুলমাল্য ম্লান করি বিষাক্ত নিঃশ্বাসে।
আমি কালী করালিনী, মৃত্যু আমি, আমি বানল,
আমি ঝঞ্চা, আমি শনি, আমি রাহু, আমি অমঙ্গল।
ওরে অন্ধ-রাখ স্বপ্ন, রাখ ধ্যান, রাখ অধ্যয়ন ;
যেতে হবে দুর পথে-কর ত্বরা”—থামিল গর্জন।
যেতে হবে দুর পথে। ডরে বক্ষ উঠিল কঁাপিয়া ;
কহিনু কম্পিত কণ্ঠে,—কিব হবে অক্ষমেরে দিয়া।
সবহারাদের গান ক্ষমা কর মােরে দেবী, পাবে তুমি বহু অনুচর- আমারে ছাড়িয়া দাও আমার এ আরামের ঘর। “ক্ষমা নাই মাের কাছে”--অন্ধকারে উঠিল হুঙ্কার ; “পাষাণী আমারে বলে—ঝা সম আমি দুর্নিবার ; আমার আহ্বান শুনি রাজপুত্র হয়েছে সন্ন্যাসী, তরুণ আমার ডাকে হাসিমুখে ধরিয়াছে ফঁসি, গােপার চুম্বন-মধু, শচী-মার অশ্রু-পারাবার সবার উপরে জয়ী প্রাণকাড়া আহ্বান আমার। দুৰ্বার, দুর্দম আমি—পারিবে না ঠেকাইতে মােরে।” বুঝিলাম—বৃথা চেষ্টা, বৃথা কান্না ; শত বাহু-ডােরে প্রিয়া যদি বাঁধে মােরে সুকোমল বক্ষ 'পরে তার, জননীর অশ্রুনদী রুদ্ধ করে নিষ্ক্রমণ-দ্বার, ভুলাইতে চাহে মন কুবেরের অগণিত ধন, তবু জানি ছিন্ন করি সংসারের সহস্র বন্ধন আমারে ছুটিতে হবে ভীষণ যে তারই অভিসারে ; বালুকার ক্ষুদ্র সেতু ভেসে যাবে সাগর-জোয়ারে। কহিনু কম্পিত কণ্ঠে-কোন্খানে যেতে হবে সাথে ? “দুঃখের শ্মশান-ক্ষেত্রে-অত্যাচার যেথায় দু’হাতে কাড়িছে অন্যের দেশ, দুর্বলেরে দলিছে দু’পায়ে।” থামিল গম্ভীর কণ্ঠ ; উচ্চ-হাস্য তরঙ্গের ঘায়ে কঁপায়ে আঁধার পুনঃ ক্ষণ পরে উঠিল ঝঙ্কার, “ওরে মুঢ়,-গাঁথিয়াছ অভ্রভেদী স্বার্থের প্রাকার আপনার চতুর্দিকে ;- তারই মাঝে কুসুম-শয়নে হেরিছ সােণার স্বপ্ন ছায়াময় শান্তিনিকেতনে। • , সব হারাদের গান সর্বনেশে এই শান্তি—ভিত্তি এর চৌর্যের উপরে ;- সত্য নাই, প্রেম নাই, বীৰ্য্য নাই ইহার অন্তরে। সুন্দরের ছদ্মবেশে এই শান্তি মরণের ছায়া, কবরের সুপ্তি ইহা, এর নাম সর্বনেশে মায়া। এ মায়া ছেদন কর,অগ্নি দাও আরাম-শয়নে, উলঙ্গ সত্যের সাথে শুভ দৃষ্টি হােক শুভ ক্ষণে। উন্মুক্ত আকাশ-তলে নিখিলের শােন হাহাকার অন্ন নাই, বস্তু নাই, রুগ্ন দেহ অস্থিচর্মসার- অন্তরে আনন্দ নাই, তবু কোটি নরনারী খাটিছে নীরবে নিত্য ; হৃৎপিণ্ড দু’হাতে নিঙাড়ি আপনার তপ্ত রক্তে মিটাইছে লােভীর পিপাসা ; আপনার গৃহ নাই—গড়িতেছে অপরের বাসা ; আপনার বস্ত্র নাই—বুনিতেছে অন্যের কাপড় ; আপনি অভুক্ত থাকি—ভরিতেছে ধনীর উদর। এদের দুঃখের ভাগ নিতে হবে; ইহাদের সাথে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইয়া নিদারুণ ঝটিকার রাতে ধরিতে হইবে উচ্চে বিপ্লবের উন্মাদিনী সুর, মিথ্যার আস্পর্ধা যত ভাঙিয়া করিতে হবে চূর। থামিল সে বজ্রকণ্ঠ শুধু এক মুহুর্তের তরে তার পর বাবা যথাহনে কুদ্ধ উন্মত্ত সাগরে তেমনি মথিয়া সেই সীমাহীন জমাট আঁধার উঠিল গম্ভীর নাদ,—“শুধু মিথ্যা, শুধু অহঙ্কার ; কোন দিকে নাহি প্রেম, নাহি মুক্তি, নাইকো বিচার । আইন চাহেনা ন্যায়, চাহে শুধু করিতে শাশ্বত
সহায়দের গান
;
;
•
অন্যায়ের অধিকার ;-দুর্বলের দীর্ঘশ্বাস যত
শূন্যে যায় মিলাইয়া ; কেহ যদি প্রতিবাদ কয়ে
কারাগার বিদ্রোহীরে করে গ্রাস আঁধার-বিরে ;
ফাসির কঠিন সি রুদ্ধ করে কণ্ঠশ্বাস তার,
প্রবল মিথ্যার হস্ত বন্ধ করে সত্যের দুয়ার।
শুধু কি রাষ্ট্রের মিথ্যা? হের ঐ সমাজ নিষ্ঠুর
মানুষে করিছে হেলা, যেন তারা শৃগাল কুময়।
পুরুষ নারীরে তার করিয়াছে কামনার দাসী,
বিলাসের ভোগ্য-বস্তু; পরিণয় হইয়াছে ফাসি ;
শক্তি অবরুদ্ধ আজ; প্রেমে নাই মুক্তির ঝঙ্কার ;
চারিদিকে শুধু মিথ্যা, শুধু দম্ভ, শুধু অত্যাচার।
আবার থামিল কণ্ঠ ; সভয়ে কহিনু আমি তারে—
একা আমি অসহায় ; ‘অসহায় ?—উঠিল আঁধারে
বিকট হাসির রােল। “ওরে মূঢ়, ছাড় অবিশ্বাস ;
কে বলিল একা তুই ?”
পূর্ণ হল সহসা আকাশ
আলােকের পারাবারে , হেরিলাম দেবীর মূরতি
মহাশূন্যে জ্যোতির্ময়ী ; শত সূৰ্য্য করিছে আরতি
ঘুরিয়া ঘুরিয়া তারে , এলােকেশ মেঘের বরণ
দিগন্তে লুটায়ে পড়ে, নিম্নে সিন্ধু করিছে ক্রন্দন
চুমিতে চরণধূলি ; করিতেছে ব্যজন ঝটিকা ;
লক্ ল লােল জিহ্বা, ভালে দীপ্ত শোনিতের টিকা
আরক্ত তপন সম; করে শােভে ভীম তরবার ;
ভীষণ দশনপাঁতি-বক্ষে দোলে নরমুণ্ড-হার;
;
;
সব-হারাদের গান চরণ-নখরে নাচে শত কোটি পূর্ণ শশধর ;- মুকুটে বিজলী ঝলে ; পরশিছে মহানীলাম্বর রক্ত-চুড়া কিরীটের হেরি সেই জ্যোতির প্রকাশ জাগিল সাগর-জলে জোয়ারের আনন্দ-উচ্ছাস ; শিহরিল তৃণদল, ফুলে ফুলে লাগিল কঁাপন তার পর মহাশূন্যে জিনি নব জলদ-গর্জন উঠিল গম্ভীর ধ্বনি ,—“ধ্বংসরূপে আমি চিরদিন , পুরাণ সৃষ্টিরে ভাঙি করি তারে চঞ্চল নবীন। শতাব্দীর পুঞ্জীভূত আবর্জনা ভাসাই বন্যায়, ভাঙিতে মিথ্যার বাঁধ, দাম্ভিকের প্রচণ্ড অন্যায় অমি ফিরি যুগে যুগে দেশে দেশে বিপ্লবের রূপে, সিন্ধুর জোয়ার আনি অন্ধকার অবরুদ্ধ কূপে জীর্ণ অবসন্ন বুকে ভাঙনের জাগাই উল্লাস খ-মুখে রক্তে লিখি মানুষের নব ইতিহাস। আমি ছিনু কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের গাণ্ডীবের ছায়ে, দুরন্ত-কৌরব-গৰ্ব ভাঙিলাম ত্রিশূলের ঘায়ে । ধনিকের অত্যাচারে জর্জরিত ফরাসী যে দিন মূৰ্ছিত শৃঙ্খলভারে, ‘গিলোটিন’ ধরিয়া সে দিন এসেছিনু উড়াইয়া দিগ্বিজয়ী ত্রিবর্ণ-নিশান, উন্মুক্ত কৃপাণ-মুখে ‘লুইসে’র কাটিনু গর্দান। উঠিল আবার যবে কঁদাইয়া রুষের গগন কোটিকণ্ঠে বুভুক্ষুর মর্মভেদী কাতর ক্রন্দন-
স-হারাদের গান
সে দিন আসিনু পুনঃ বিপ্লবের পরি রক্ত বেশ,
লেনিনের খঙ্গমুখে ‘জার’ বংশ করিলাম শেষ।
এমনি করিয়া আমি বারে বারে রক্তের বন্যায়
নিম্মন্স করিনু ধরা, ভাসাইনু কলুষ অন্যায়।
বিশ্বের শিয়রে আমি আজও জাগি—আমােঘ বিধান।
অত্যাচার যত কাল—তত কাল আমার কৃপাণ
মানুষের উষ্ণ-ক্তে বারে বারে উঠিবে রাঙিয়া।”
-নীরবিল কন্থকণ্ঠ ; জ্যোতি ক্রমে এল মিলাইয়া
অনন্ত-আকাশ-পটে; লুপ্ত হ’ল আগুনের ছবি ;
গগনে মিলল যেন মধ্যাহ্নের শত দীপ্ত রবি।
সূচিভেদ্য অন্ধকারে আবরিল আকাশ ধরণী ।
তখন সজল-নেত্রে উদ্ধে চাহি কহিনুজননী,
যে পথ দেখালে মােরে আজীবন চলিব সে পথে,
উড়িবে তােমার ধ্বজা আমার এ বিদ্রোহের রথে।
যে বাণী আমারে দিলে-তারে আমি বিলাব সবারে ;
যে আলো নয়নে দিলে—আমি সেই আলাের জোয়ারে
ভরিব আঁধার দেশ–নিরাশেরে দিব আমি আশা,
বিশ্বাসের অগ্নিতেজে পুড়াইব সন্দেহের বাসা।
তােমার চারণ-বেশে পথে পথে আমি গাব গান,
আমার সঙ্গীতে তব ফুকারিবে প্রলয় বিষাণ।
সাড়া নাহি দিল কেহ-অন্ধকার শুধু একবার
হাসিল বিজলী-তেজেতার পর নিশব্দ আঁধার।
১১
-হারামের গান সে দিন হইতে দেবী, ছুটিয়াছি তােমার আহবানে ; সে দিন হইতে মোর যত সুর বেজেছে পরাণে, যত আশা, যত স্বপ্ন মৰ্মে মাের দিয়েছে ঝঙ্কার- সব দিয়ে গান্ধিলাম আমার এ রক্ত জবা-হার।
রক্ত-উষার যাত্রীদল
ওরে আমার বাঁধন-হারা রক্ত-উষার যাত্রীদল,
চল ফুটিয়ে মরুর বুকে নব আশার লাল কমল ;
অন্ধকারের দুর্গশিরে রাঙা-রবির জয়-নিশান
উড়িয়ে দিয়ে, কণ্ঠে নিয়ে পাগলা-ঝোরার বিজয় গান
চল আগিয়ে
নতুন
দিনে তরুণ যত বন্ধুগণ,
অরুণ-রাঙা মেঘর রথে এল পথের নিমন্ত্রণ।
চোখে তােদের দূর আকাশের স্বপ্নমাখা নীল কাজল,
বুকের তলে গর্জি’ ফিরে সাত-সাগরের কুদ্ধ জল ;
বঘ্ৰে তোদের তৃৰ্য বাজে, ঝ। তােদের তুরঙ্গম,
রাজার মুকুট খেলনা তােদের, গলার মালা ভুজঙ্গম ;
করে তােদের বিজয়-ধনু-টঙ্কারে তার ভয়ঙ্কর
শঙ্কা লাগে, অশ্রুজলে অভয় মাগে নীল সাগর।
১৩
সব-হারাদের গান জীর্ণ বরষ ঐ মরে যায়, শিউরে উঠে অন্ধকার, ঐ খুলে যায় দিশ্ববলয়ের রক্ত-রাঙা তােরণ দ্বার, সপ্ত ঘােড়ার রথ হাঁকিয়ে চক্ৰবালে লাল ত্বপন বেরিয়ে আসে রক্ত বাসে, যাত্রা কর যাত্রিগণ। জানি মধুর বঁধুর দিঠি, মধু প্রিয়ার আলিঙ্গন, জানি মধুর মলয় বায়ে মুঞ্জরিত কুঞ্জবন, জানি মধুর গন্ধে বিভাের কোকিল-ডাকা:বকুল, জানি মধুর পঙ্গু-ফোটা মরাল-ডাকা দীঘির জল, জানি মধুর সখার হাসি, মধুর কচি শিশুর বােল, সবার চেয়ে জানি মধুর শীতল-করা মায়ের কোল। . তবু যে হায় সকল ছেড়ে চলতে হবে, নাই সময় ; ঘরের যত কান্নাহাসি রথের বুকে হােক তা লয় । নয়ন-কোণে জল জমেজে ? বিদায় নিতে চায় না মন ? ক্ষণিক যাহা তারেই চেয়ে ভুলবি যাহা চিরন্তন ? সাঁঝের দীপই সত্য হবে ? বিফল হবে চঁাদের কর ? নীল আকাশের চেয়েও তােদের আপন হবে বাসর-ঘর ? যাত্রী তােরা, পথিক তােরা, সঙ্গী তােদের সূৰ্য্য চাদ-- প্রাণের বেগে ভাসিয়ে চলিস্ যুগন্তেরই জীর্ণ, বাধা ; পথ-বিহীন সিন্ধু-বুকের যাত্রী তাের কলম্বাস- পাহার মরু লজিঘ চলিস্নাইকো বাধা, নাইকো ত্রাস তরু-বিহীন মরুর বুকে ছুটছে যেথা বালুর ঝড়, ক্ষুব্ধ সাগর পাষাণ-তটে ভাঙছে যেথা নিরন্তর,
সব-হারাদের গান
অভ্রভেদী গিরির শিরে বইছে যেথায় তুষার স্রোত,
তিমির রাতে গগন-পথে চলছে যেথা বিমান-পােত,
জন-বিহীন মেরুর দেশে নাই যেখানে সূর্যালোেক—
সেই ভীষণের বুকে তোদের এবার তবে যাত্রা হােক্।
কাগজ কলম আয় না ফেলে পুঁথি যেথায় সেথায় থাক্ ;-
বঁধুর গাঁথা বরণ-মালা বঁধুর হাতেই শুকিয়ে যাক্।
আছে যাদের অট্টালিকা, রেশমী কাপড় মােটর কার
সােণার খাটে দেখুক তার সেণার স্বপন চমৎকার।
শামলা-পরা উকিলগুলো মামলা নিয়ে থাক্ বিভাের,
রাত জেগে ছাত্রগুলাে কেতাব ল’য়ে পড়কে জোর,
কবি তাহার সেতার ল’য়ে চঁদনী রাতে করুক গান,
পুরুত মশাই ঘণ্টা নাড়ন, পাঁজি পুথির দিন বিধান,
নাকের ডগায় চশমা রেখে হিসাব লিখুক ব্যবসাদার,
খােশ মেজাজে গল্প করুক সিগার হাতে ব্যারিষ্টার ।
তােদের ত’ ভাই নাই ত’ কিছু, তােদের আছে নির্বাসন,
তােদর আছে ক্ষুধার জ্বালা তােদের আছে কঁাটার বন,
ততাদের আছে ফঁসির রসি, তােদের আছে শিকল-হার,
তােদের আছে আন্দামানের বন্দীশালার অন্ধকার,
তােদের আছে শূন্য ঝুলি মান্দালয়ের তপ্ত দিন,
তােদের আছে ‘রেগুলেশন’ লাঠির খোঁচা, অন্তরীণ।
পিছে তােদর শত্রুদলের বিদ্রুপেরই অট্টহাস
সামনে আসে ঘূর্ণীবায়ু ধূলায় ঢেকে নীল আকাশ।
.
শহারায়ে গান চলবি তােরা ভবের পথে আনন্দেরই ফুটিয়ে ফুল- মুখের পানে চেয়ে তােদর অবিশ্বাসীর ভবে ভুল। ডান হাতে যা করবি উপায় বাম হাত তাই বিলিয়ে দিক- কাল যা হবে তাহার বােঝা কালই তাহার স্কন্ধে নিক। সকল দেশই তােদর হবে, আপন হবে সকল ঘর, থাকবে নাকো বৰ্ণ-বিচার, থাকবে নাকো আপন পর। থাকবে শুধু একটা জাতি-সে জাত হবে মানুষ জাত- তার উপরে থাৰ না কো রাজা উজির কারো হাত। মানুষকে যে ক'রবে ছোট তোদের হয়ে শত্রু সেই ; ততাদের কাছে নাইকো গােলাম, তােদের কাছে মুনিব নেই, তােদের কাছে নাইকো আইন, নাইকো আচার, নাই বিধান-- যা কিছু ভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে কবি তােরা সব সমান। এই জগতের কারও কাছে মুইবে নাকো তােদের শিৰ- হােক না সে জন বুদ্ধ যীশু, হােক না সে জন খােদার পীর। বুকের ভিতর লুকিয়ে বসে আপন যে জন দেন আদেশ তাঁহার কাছে নাইকো রাজা, নাইকো সমাজ, নাইকো দেশ। চাইবি নাকো কারও দ্বারে, সখা তােদের সবল হাত, চোখের পানে চেয়ে সবার শুনিয়ে দিবি সাচ্চা বাত। কউ বা দেবে ধূলি তােদের, কেউ বা দেবে ফুলের হার, কেউ বা ডেকে কবে আদর, রুদ্ধ কেহ কবে দ্বার। যার যা খুশী করুক না সেতােরা পথের পথিক জন— বন্ধুজনে দিবি কেবল বিদায় বেলার আলিঙ্গন।
সঁ-হারুদের গান ঘরের কোণে ঘিতে তােদের চাইবে অনেক কোমল কর, সকল বাঁধন পেরিয়ে যাবি-মনকে তােরা শক্ত কর। তোদের শুধু আগিয়ে চলা, তােদর শুধু পথ আপন মুক্তি যাদের ডাক দিয়েছে বাঁধবে তাদের কোন্ বাঁধন? রুদ্ধ ঘরে আগল ভেঙে চল রে বা মুক্ত মাঠ, উচ্ছসিত হাসির রােলে পূর্ণ যেথা প্রেমের হাট, চিত্তে যেথা শঙ্কা নাহি, কেউ কাহারও নয়কো দাস, বুকের কথা মুখে যেথায় অসঙ্কোচে পায় প্রকাশ, পুরুষ নারী স্বাধীন যেথা, প্রেম যেখানে সমুজ্জ্বল, মুক্ত হিয়ার গানে যেথায় ঝঙ্কারিত আকাশতল- সেই খানেতে সেই খানেতে ওরে পথিক তােদের দেশ ;- সুন্দর সেই আলাের দেশে তােদের হবে পথের শেষ। ১১
মুক্তি-অভিযান
•
বাহিরিয়া এসাে বন্ধু, আসিয়াছে মুক্তির আহ্বান
সাগরের কূলে কূলে দুলে দুলে তরুণ নিশান
ডাকিছে তােমারে সখে ; দেশে দেশে সাজে বীরদল,
দিকে দিকে ধ্বনিতেছে তরুণের রণ-কোলাহল।
প্রশান্ত সাগরতটে নাচে আজি দুরন্ত ঈশান ;
শতাব্দীর অত্যাচারে ক্ষিপ্তপ্রায় চীনের পরাণ
বল-দৃপ্ত ধনিকের দম্ভ আজি চুর্ণিবারে চায়।
ভূমধ্যসাগর তীরে মিসর-মরক্কো-সিরীয়ায়
শােন গান-দেবতার পাঞ্চজন্য গর্জে ঘন ঘন ;
নিখিলের দত্য-দল, সাবধান, নিকট শমন।
১
সবহারাদের গান
ধন-দৃপ্ত, বলদৃপ্ত অত্যাচারী সভয়ে পলায়;
অবিচার জয়ী হবে। ধনলােভ জিনিবে ধরায় ?
ভগবান নাহি কি রে? নিভে গেছে রবি-তারা চঁাদ ?
প্রেম সত্য মিথ্যা সব ? বিশ্ব কি রে শয়তানের কঁাদ ।
;
হে তরুণ, তােল শির ; মুক্তিরে তাড়াবে সাধ্য কার ?
বিশ্ব-প্রাণ-শতদলে দেবী বসে আছে নির্বিকার।
দুনিয়ার ধনদৃপ্ত বলশালী রাজেন্দ্র মণ্ডলী
লক্ষ্য করি তারে সবে ছুড়িয়াছে নিৰ্মম দম্ভোগী
যুগে যুগে, দেশে দেশে; আজও তারা হানে তরবার
মুক্তিশির লক্ষ্য করি, দেবী হাসে হাসি অবজ্ঞার।
লজ্জা কেন হে তরুণ ? যত দিন রবে দুনিয়ায়
একটি বীরের স্মৃতি, যত দিন রহিবে ধরায়
আত্ম-ত্যাগী নির্ভীকের জয়-দীপ্ত বীরত্ব-কাহিনী
তত দিন ধরা হ’তে মুছিবে না মুক্তির বাহিনী।
যে দিন মুছিয়া যাবে বিশ্ব হ'তে ক্রুশের ছবিটি,
নিঃশেষে মিলায়ে যাবে নদীয়ার প্রেমের নদীটি,
শুখাইবে যেই দিন আরবের মরুভূমি-ফুল,
লুপ্ত হবে গ্যারিবল্ডি, ম্যাজিনীর বীরত্ব অতুল,
শিখেদের বলিদান, প্রতাপের বীরত্ব-মহিমা
শিবাজীর মহাবীৰ্য, লেনিনের আত্মার গরিমা,
১০
সবহারাদের গান জোয়ান-অফ-আর্কের অসামান্য বিশ্বাস বিক্রম সক্রেটিস, এব্রাহাম লিঙ্কনের স্মৃতি অনুপম যে দিন মুছিয়া যাবে, লুপ্ত হবে চারণের গান, মুক্তির হােমাগ্নি-শিখা সেই দিন হইবে নির্বাণ। তার আগে, তার আগে হে তরুণ, জেনে রেখ স্থির- তােমাদের জয়ধ্বজা উড়িবে উড়িবে উচ্চ-শির তােমাদেরই রক্তপূত জয়দীপ্ত ক্রুশের উপরে। তােমাদেরই বায়ুশূন্য আলােহীন কারার ভিতরে মুক্তির প্রদীপ-শিখা গর্বভরে জ্বলিবে নিশ্চিত। তােমরা মরিয়া যাবে—তােমাদের তরুণ শােণিত উর্বর করিবে দেশ, মুক্তি-বীজ পুষ্ট হবে তাহে; বীরের মৃত্যুর জয় কবি তাই যুগে যুগে গাহে। যুগ হতে যুগান্তরে চলিয়াছে মুক্তিসেনাদল, তুচ্ছ করি অগ্নিকুণ্ড, ভগ্ন করি কারার শৃঙ্খল, চরণে দলিত করি নৃপতির উদ্ধত কিরীট, মরণে সৃজন করি দেশে দেশে নব-শক্তি-পীঠ যায় যায় মুক্তিসেনা দলে দলে ঐ চলে যায়- কাননে, প্রান্তরে, পথে, গিরিশৃঙ্গে ঐ তারা ধায় উপত্যকা, অধিত্যকা, মরুভূমে সিন্ধুতটে তারা দ্বীপপুঞ্জে চলিয়াছে সারি সারি বাধাবন্ধহারা।
সব-হারামের গান
আমেরিকা-অষ্ট্রেলিয়া-য়ুরােপ-আফ্রিকায়
মুক্তিসেনা দলে দলে মেদিনী কঁপায়ে চলে যায়।
নবীন তুরস্ক চলে, আগে যায় দুর্জয় কামাল
আব্দুল করিম চলে—শয়তান, সামাল, সামাল ;
মিসরের জগলুল-সাথে যায় বীর ডি ভ্যালেরা-
সামিয়াৎ-সেন-মন্ত্রে চলে নব-দীক্ষিত চীনেরা—
সব আগে ঐ-চলে গুর্জরের তাপস নির্ভয়—
মৃদুতায় মেষ-শিশু-পরাক্রমে কেশরী দুর্জয় ;
সত্যাগ্রহ ধ্বজা করে পিছে চলে কোটি নর-নারী ;
জেগেছে—ভারতবর্ষ—সাবধান ওরে স্বেচ্ছাচারি।
একা নহ বন্ধু তুমি বিশ্ব আজি তব সহচর ;
তােমার যাত্রার সাথী চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্ৰ-নিকর।
সমস্ত পৃথিবীব্যাপী আজ ভাই মুক্তি-অভিযান
নূতন প্রভাতে সখে, দ্বার খােল, গাও জয়গান।
আপনার পানে ফিরে তাকাও
তােমার পিঠে যে হানে চাবুক
তার তরে কেন ধর লাঙল ?
যার লাথি তব ভাঙিছে বুক
তারই তরে কর রক্ত জল ।
st
বসনে ভূষণে সাজি যে জন
মাথায় তােমার ভাঙে কঁঠাল
তার তরে কেন বোন বসন ?
তার তরে কেন ধর কোদাল ?
খাটে না যেজন—খায় কেবল,
রক্তে তােমার খেলে সাঁতার,
তারে পুষে বল-কি হবে ফল ?
কি হবে বসন বুনিয়া তার?
রচি শৃঙ্খল, গড়ি কৃপাণ
হস্তে যাদের তুলিয়া দাও,
তাহারাই পিষে তােমার প্রাণ
আপনার পানে ফিরে তাকাও।
আছে অবসর ? আছে বিরাম ?
আছে কি শয্যা? ঘরে খাবার ?
আছে কি শান্তি ? আছে আরাম ?
মাছে কি তৃপ্তি ভালবাসার ?
তা যদি না থাকে কেন রে ভাই
আজীবন ফেল চোখের জল?
জুড়াবার যদি না মিলে ঠাই
মিছে কেন পান কর গরল ?
তুমি বােন ধান-অপরে হরে ;
তােমার স্বর্ণ অপরে লয় ;
তুমি রচ বাস—পরিছে পরে,
তুমি গড় অসি—অপরে বয়।
গুণ্ডারে দিতে বুনােনা ধান,
চোরেরে দিও না সােনার রাশ,
নিজেরে বাঁচাতে গড় কৃপাণ,
অলসের লাগি বুন না বাস।
१७
হারার গান
তুমি পড়ে আছ পথ-ধূলায় ;
তােমারই সাজানাে হৰ্ম্যে আজ
হাসিছে অপরে-দেখ না তায়?
আপনার শিরে হানিছ বাজ।
{
নিজ-হাতে গড়া লােহার ওসি
ছি ড়িতে এখন কেন প্রয়াস।
আপন করে যে গড়েছ অসি
তাই তােরে আজি করেছে দাস।
কোদাল লইয়া কাট ধরায়
আপনার গাের আপন হাতে
নিজের মৃত্যু-বসন হায়,
বুনিছ মুখ নিজের তঁাতে।
শলীর “Song to the men of England” হইতে
বিজিতের গান
কে তােমারে বলে পরাজিত হে নির্ভীক। নিৰ্জিত কেশরী ?
আমি জানি যুগে যুগে নব নব কবির বাঁশরী
তােমার গৌরব-গাঁথা ঝঙ্কারিবে নিত্যকাল ধরি ;
আমি জানি অনাগত নরনারী লবে চিত্ত ভরি’
শক্তির অমৃত-ধারা তব দীপ্ত প্রাণ-সিন্ধু হতে ;
যে আলাে জ্বালালে তুমি নিজে দহি, সে দীপ্ত আলােতে
অগণিত যাত্রীদল মুক্তি-পথ লইবে চিনিয়া ;
জয়-গর্বে স্ফীত হয়ে নাচে যারা তােমারে হানিয়া
মূঢ় তারা, নাহি জানে—পদতলে আগ্নেয়-পর্বত
ধুমাইছে প্রতি ক্ষণে ; তাহাদের বিনাশের পথ
তলে তলে পলে পলে গড়ে কাল আপনার করে ;
হাসিও না অবিশ্বাসি ! এ বিশ্বের রঙ্গমঞ্চোপরে
যুগে যুগে হয়ে গেছে ক্ষমতার বহু অভিনয় ;
উন্মুক্ত কৃপাণ করে কত রথী, সম্রাট নির্দয়
আসিয়াছে, খেলিয়াছে মানুষের মুণ্ড নিয়ে খেলা ;
তার পর একে একে এল যবে অপরাহ্ন-বেলা
সবহারাদের গান
;
চলে গেছে নামহীন বিস্মৃতির দুর-সিন্ধু-পারে ;-
তাদের স্মৃতির বােঝ পচে আজি পুথির মাঝারে।
অবিশ্বাসী বন্ধু মাের, বল আজি কোথায় নাদির ?
কোথা সে তৈমুর, নীরাে?কোথা গেছে দ্য গজনীর?
সিজার কোথায় আজি? কোথা গেছে কষিয়ার জার?
কোথা গেছে বােনাপার্ট ? বিশ্বজয়ী আলেকজাণ্ডার ?
মহাকালথচক্রে চূর্ণ হয়ে গেছে বন্ধু সবা-
কাঞ্চন মুকুট কত, সুবিপুল সাম্রাজ্য বৈভব।
হে দীপ্ত বিজয়ী, তুমি মনে মনে ভাবিয়াছ হায়।
বিজয় পতাকা তব চিরকাল উড়িবে ধরায়
অজেয় অমর রবে তব রক্ত-কলঙ্কিত অসি ;
দুর্বলের স্কন্ধে বুঝি নিত্যকাল রবে তুমি বসি।
বৃথা আশা! তব পাপ তব মৃত্যু করেছে রচনা
তােমার দস্যুতা মূঢ়। তােমারেই করেছে বঞ্চনা ;
যে শিকল পরায়েছ তৰ ক্রীতদাস গলদেশে
তাহারই অপর প্রান্ত তােমারেই ফাঁসী দেবে শেষে।
এ কথা ভুলিছ কেন?—তব সম মহাবলী কত
এসেছে, হেসেছে, পুনঃ কাল-চক্রে হইয়াছে হত।
মহাকাল চক্র ঘুরে—তারই সাথে ঘুরি তুমি আমি,
আজি সে কাঙ্গাল দীনকাল ছিল যে ভুবনস্বামী।
কুশ-কাষ্ঠে বিধে বিধে যারে আজ মারে অত্যাচারী-
অর্ধেক ধরণী কাল লুটাইছে পদতলে তারই।
আজি যে দুর্দান্ত রাজা, প্রজাপুঞ্জ শঙ্কিত অস্থির
বিপ্লবীর খড়ামুখে কাল তার বিলুষ্ঠিত শির।
।
;
সং-হারামের গান
এ নহে কবির স্বপ্ন—মহাকাল এই সত্য বহে;
এই সত্য দেশে দেশে ইতিহাস শতকঠে কহে।
হে বিজিত। নাহি ভয় ; আমি গাহি তব জয়-গান।
দুঃখের শর্বরী তব ঐ ধীরে লভিছে নির্বাণ।
ঐ আসে নব উষা রক্ত-রাগে রাঙিয়া আকাশ,
ঐ শােন প্রভাতের ফুল-গন্ধে মদির বাতাস
দিকে দিকে ছুটে ছুটে জয়-বাৰ্তা করিছে ঘােষণা ;
হে বনী। মস্তক তােল, বিশ্ব তােমা করিছে বন্দনা।
করেছ তপস্যা বহু দুর্যোগের প্রলয়-তিমিরে,
শত্রুরা করেছে ঘৃণা, বন্ধুগণ চাহে নাই ফিরে,
পাগল বলিয়া লােকে অঙ্গে তব ছুড়িয়াছে ধূলি,-
আসিয়াছে অবিশ্বাস, দু’টা নেত্ৰ উৰ্দ্ধপানে তুলি
ডাকিয়াছ বিধাতারে সন্দেহের রাত্রে বারে বারে
“হে পিত। হে পিত। আজি কেন তুমি ছেড়েছ আমারে ?”
পরায়ে দিয়েছে শিরে বৈরীদল কণ্টক মুকুট,
চেয়েছ তৃষ্ণার বারি, পাইয়াছ তীব্র কালকূট।
জীবন-সায়াহে তুমি খুঁজিয়াছ প্রিয় শিষ্যগণে,
আসে নাই পাশে কেহ। মৃত্যু-ভয়ে সবে প্রাণপণে
বারে বারে হায় বীর। করেছে তােমারে অস্বীকার ;
মৃত্যুদ্বারে সেই দৃশ্য হেরিয়াছ স্বচক্ষে তােমার ।
বেদনায় ঘর্ম তব রক্ত হয়ে ঝরেছে ভূতলে,
তবু বীর। নত-শির হও নাই মিথ্যা-পদতলে।
২
।
সৰ-হারাদের গান
হে বিজিত। আজি তব পরিপূর্ণ জীবন-সাধনা,
তপস্যার রাত্রি শেষ। শত্রু যত করেছে লাঞ্ছনা
জয়-মাল্য হয়ে তারা ফিরিয়াছে ললাটে তােমার
অগণিত যাত্রীদল ঘেরি তােমা করে নমস্কার।
.
রাত্রির পথিক দল আজও যারা রহিয়াছে পিছে,
ভয় নাই, কদিও না, স্বর্ণ-উষা সম্মুখে আসিছে।
বিশ্বাস আঁকড়ি থাক, কোন শঙ্কা করিও না মনে,
শত্রুরা করুক ঘৃণা, ছাড়ক না আত্মীয় স্বজনে,
তুমি চল একা একা। শেষ হয়ে আসে বিভাবরী,
প্রভাত-তােরণ-দ্বারে বাজে ঐ মঙ্গল-বাঁশরী
পরাজিত। সবহারা। আমি তব গাহি জয়গান।
সকলের নীচে যারা নতশিরে বহ অসম্মান,
মুখ-পানে যাহাদের চেয়ে সবে ফিরায় বদন,
লাঞ্ছনা-বিষাক্ত শরে যাহাদের জর্জরিত মন,
আত্মার মর্যাদা যারা ভুলিয়াছে ঘৃণা সহি সহি,
দুনিয়ার পথে পথে শীর্ণ হাতে ভিক্ষাপাত্র বহি
ফিরিতেছে যারা নিত্য কলঙ্কের শত দাগে দাগী,
অসহ ক্ষুধায় যারা স্ব-ইচ্ছায় লহ কারা মাগি,
মম কণ্ঠে তােমাদের জয়ধ্বনি উঠুক অম্বরে,
তােমরা পতিত নহ। তােমাদের অন্তরে অন্তরে
অলিতেছে দেবত্বের সুপবিত্র হােমাগ্নির শিখা।
বাহিরের ও কলঙ্ক, ও পশুত্ব, মিথ্যা-মরীচিকা
২৮
সব-হারাদের গান অস্তিত্ব-বিহীন ছায়া। বল সখে! বল একবার- “আমি জ্যোতির্ময় আত্মা, নারায়ণ অন্তরে আমার।” বহুকাল সহিয়াছ দানবের তীব্র কষাঘাত, এবার এসেছে দ্বারে মানবের মুক্তির প্রভাত। বিধাতার কাল-চক্র হের ঐ ঘুরিছে নীরবে । তােমাদের রক্ত শুষি মেতেছিল যাহার উৎসবে, তাদের মস্তকে নামে ঐ হের রুদ্রের অশনি, পিশাচের আর্তনাদে মুহুর্মুহু শিহরে ধরণী। জাগ বন্ধু। মেল চোখ ! মুক্তিউষা হাসে বাতায়নে ; আলােকে চঞ্চল ঐ গগনের সুনীল নয়নে মুক্তির আনন্দ আজি শুহাশ্যে উঠিয়াছে ফুটি, অমৃত-নিঝর-ধারা শত-ধারে পড়ে বিশ্বে লুটি মানস-নয়নে আজি একি দৃশ্য হেরি চারিধারে । এত দিন বন্দী হয়ে ছিল যারা দৈত্য কারাগারে, পতিত বলিয়া যারা লভিয়াছে কেবলই লাঞ্ছনা, যাহাদের চোখে মুখে লেখা শুধু দাসত্ব-বেদনা, রক্ত-শােষী পশ্চিমের সংখ্যাহীন বণিকের দল লক্ষহাতে যাহাদের কাড়িয়াছে ঐশ্বৰ্য সম্বল, আজি হেরি তাহাদের প্রভাতের সােণার আলােকে দলে দলে গান গেয়ে ধায় যেন কোন উদ্ধ-লােকে। সবার আননে হেরি আনন্দের কি অপূর্ব জ্যোতি। লক্ষ রবি শশি তারা যাত্রীগণে করিছে আরতি।
সব-হারার গান
দাস আর নহে দাস। মানুষ সে স্বাধীন সুন্দর,
পতিতের কণ্ঠে শুনি দেবতার মেঘমন্দ্র স্বর,
ভেঙে গেছে কারাগার, থেমে গেছে শৃঙ্খলের ধ্বনি,
ঘুচে গেছে গােলামের কাণাকাণি সন্ত্রস্ত চাহনী;
বাধামুক্ত নরনারী ঐ সবে দীপ্ত-নেত্রে হাসে,
মুক্তি। মুক্তি। মুক্তি। বােল শুনি আজি প্ৰাচীর বাতাসে;
বন্দী-শালে ছিল যারা হীনবীৰ্য্য, নিদ্রিত, নিশ্চল,
নবীন প্রভাতে তারা উল্লসিত জাগ্রত চঞ্চল।
আফ্রিকার কাফ্রী সেও চলিয়াছে ঐ উচ্চশিরে,
চীনের জাগ্রতসিংহ হুঙ্কারিছে পূর্বসিন্ধুতীরে,
তুরস্ক, তাতার চলে, চলে নিগ্রো, মূর, আফগান,
ভারত, কোরিয়া চলে, চলে শ্যাম, নবীন জাপান,
আরব, পারস্য চলে সারি সারি প্রচণ্ড দুর্জয়।
স্বাধীন সুন্দর সব—কারও চিত্তে নাহি কোনও ভয়!
আটল্যান্টিক তীর হতে সুদূর সে প্রশান্ত সাগর
সৰ্ব্ব ঠাই শুনি মুক্ত-মানবের কলকণ্ঠস্বর ।
প্রাচীর এ জাগরণ লক্ষ মুখে গাহ আজি কবি।
চিত্রকর। অক চিত্রে স্বরগের এ পবিত্র ছবি।
ইহারে বলিবে স্বপ্ন যাহা ইচ্ছা বল অবিশ্বাসি।
আজিকার স্বপ্ন কাল সত্য রপে উঠিবে প্রকাশি।
তােমার বুদ্ধির চেয়ে শক্তিমান বিশ্বের নিয়ম
তােমার বলের চেয়ে বলীয়ান সত্যের বিক্রম।
।
বুড়ী বালামের তীরে ‘বুড়ীবালামের’ তীরে বুকের শােণিতে যেদিন তােমরা রাঙালে ধরিত্রীরে, সম্মুখ-রণে যুঝি প্রাণপণে ঘুমালে বীরের দল মৃত্যু সেদিন জ্বালালাে শ্মশানে মুক্তির হােমানল। নিজেরে সেদিন নিঃশেষ করে বিয়ে গেলে যে আলাে সেই আলােকের রক্তশিখায় মিলায় রাতের কালাে সেদিনের সেই মৃত্যুর দান সকল দৈন্য হরি’ নব জীবনের গরিমায় মরু তুলিছে শ্যামল করি। । আজি তােমাদের স্মরি নবীন-আশার কণক-কিরণে উঠিছে চিত্ত ভরি। সারা-তনু-মন ঝঙ্কার দিয়া গাহিতেছে অনুখণ- ‘বাঘা যতীন্দ্র-ছিল সে বাঙালী,—ছিল ‘মনােরঞ্জন, ‘চিত্ত, ‘নীরেন’-বাঙালীর ছেলে। এই আকাশেরই তলে প্রাণ তাহাদের উঠিল বিকশি হাসি ও অশ্রুজলে। ৩১ সবহারাদের গান ? কে বলে এ দেশে মানুষ কেবল কল্প-কুঞ্জ-বাসী? ‘মােহন-লালের’ অসির সঙ্গে ‘চণ্ডীদাসের বাঁশী মিশেছে এ দেশে,খােলের সঙ্গে বাজে শাক্তের ঢাক- কোকিল-ডাকের সঙ্গে হেথায় গর্জে বাঘের ডাক, কপােতাক্ষী’র সঙ্গে ছুটেছে ভীষণ ‘পদ্মা’ নাচি ভােমরার সাথে বাঁধিয়াছে বাসা পাহাড়িয়া মৌমাছি, বেণু-রাগিনীর সঙ্গে নাগিনী ফণা নাচাইয়া খেলে, শ্যামলা ধরার বুক চিরে নীল পাহাড় উঠেছে ঠেলে, কোমলে কঠিনে মেশানাে এ মাটি,-তরুণেরা এই দেশে বটের ছায়ায় বাঁশরী বাজায়,-ফাঁসি কাঠে মরে হেসে। বিজয়ী বীরের দল মরিয়া তােমরা শিখাইয়া গেলে বাঁচিবার কৌশল। দেখালে—দেশের মুক্তির পথ মৃত্যুর বুক দিয়া; এর চেয়ে কোন সােজা পথ নাই,-লাটের সভায় গিয়া গরম গরম কথায় মূখ জনতা ভােলানাে যায়- মুক্তি—সে বড় নির্মম প্রাণ, সব কিছু সে যে চায় । অযুত বীরের রক্তে তাহার রঙীণ চরণতল,- পদযুগ ঘিরি অশ্রু-সাগর করিতেছে টলমল। তার দেখা মেলে ফাঁসীর মঞ্চে, নীর, কারাগারে,- আপন বলিতে কিছুই যখন থাকেনা তখন দ্বারে নীরব-চরণে সে আজি দাড়ায় ; মৃত্যুর সম্মুখে কোথা হতে এসে চুপে চুপে হেসে চুম্বন দেয় মুখে। २७ সৰ-হারাদের গান সে চায় প্রাণের সকল দরদ, সবটুকু ভালবাসা, তারে যে চেয়েছে প্রাণ মন দিয়ে ভেঙেছে তাহার বাসা। ঘরের প্রদীপনিভাইয়া দিয়া হয়েছে সে পথচারী, কুলে কালি দিয়ে অকুল সাগরে দিয়েছে সে জন পাড়ি। জ্বালালে যে হোেমানল- শত শিখা মেলি পরশিবে তাহা মহা-অম্বর-তল। কুটিরে কুটিরে ছড়াবে আগুন ;-সাজের আকাশ তলে তােমাদের কথা জননী শিশুরে কহিবে অশ্রুজলে । পিতা শুনাইবে পুত্রেরে তার,-ভ্রাতা ছােট ভগিনীরে- কেমন করিয়া মরিলে তােমর ‘বুড়ীবালামে’র তীরে। সেই মরণের অমর কাহিনী ছন্দে রচিবে কবি, শিল্পী ফুটাবে চিত্রে বীরের শেষ বিদায়ের ছবি, চারণ গাহিবে পথে পথে সেই মৃত্যুর জয়গান, সে গান শুনিয়া বক্ষে বক্ষে জাগিবে তরুণ প্রাণ। ‘প্রতাপ মােহন’ ‘সীতারাম’ আর ‘মীরমদনে’র পাশে রক্ত-আখরে তােদর কথা লেখা রবে ইতিহাসে।
বিপ্লবীর প্রতি
গলায় জড়ায়ে ফাঁসীর রশিটী, অধরে করুণ-হাসি,
‘তরুণ পথিক বলে যাও মােরে কারে এত ভালবাসি’
এমন করিয়া বিবাগী হইয়া ফসীরে বরিয়া নিলে,
যৌবন-তরী মরণ-সাগরে হেলায় ভাসায়ে দিলে ।
তরুণ বয়স, রূপ-রস-ভরা এই ধরণীর গেহ,
ধন জন মান, পরিচিত কত আপন-জনার স্নেহ,
তােমারে বধিতে পারিল না কেহ, বীর সন্ন্যাসী, তুমি
গাহিতে গাহিতে চলে গেলে “মাের জননী জন্মভূমী।
স্বরগের চেয়ে গরীয়সী তুমি, পরাণ-শীতল-করা,
সকল সুখের বড় সুখ মাগাে তােমার লাগিয়া মরা।”
ফসীর মঞ্চে আজিকে তােমারে হেরি অপরূপ বেশে;
বীর-বিদ্রোহী-সৈনিকরূপে বারে বারে তুমি হেসে
অত্যাচারীর খড়ঙ্গর তলে পাতিয়া দিয়াছ শির ;
আপন বুকের রুধিরে মুছালে কলঙ্ক জননীর।
৩৪
সবহারাদের গান
••
কেহ বা তােমারে কহিছে রক্ত-পিপাসু, কঠিন-প্রাণ,
কেহ কহে তােমা, উন্মাদ নাহি কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান
গম্ভীর-স্বরে কহে কেহ—ছিল ছোড়া নির্ভীক বটে,
কিন্তু হবে কি? গোয়ার ছোঁড়ার বুদ্ধি ছিল না ঘটে।
জানি না যে কাজ করে গেলে তুমি সত্য মিথ্যা তার
মানুষের গড়া মাপকাঠি দিয়ে তল পাওয়া তার ভার ।
আজিকে যাহারা আপনারগড়া আইন-নিগড়ে বাঁধি
কহিছে তােমারে খুনী, বিপ্লবী, নর-পশু, অপরাধী।
তাদের হস্তে ন্যায়ের দণ্ড! ভগবান তুমি নাই ?
পাপী করিতেছে পাপীর বিচার, তুমি দেখিতেছ তাই।
এমনি যাদের ন্যায়ের বিচার তারা হ’ল বিচারক।
ভাবি মনে মনে এ ধরার কিরে নাহি কেহ রক্ষক।
অসীম শূন্যে আঁধারে ছুটিছে বিশ্ব তুরঙ্গম
চালক তাহার বুঝি শয়তান নিষ্ঠুর নির্মম।
তােমার কাৰ্য ঠিক কি বেঠিক, সে বিচার হবে পরে,
কিন্তু যাহারা খুনী হয়ে আজি খুনের বিচার করে,
মিথ্যার ক্রীতদাস হয়ে যারা সত্যের গায় জয়,
স্ত হইয়া ধাম্মিক বলি দেয় যারা পরিচয়,
তাদের ধর্ম মুখােস খুলিয়া দেখাও বন্ধু সবে,
দেখাও, দানব দেবতার বেশে ফিরিছে কেমনে ভবে।
শান্তিবাদীরা ঘৃণা কর তারে? খুন তার অপরাধ?
এত ঘৃণা ছিল হত্যার প্রতি। থাক, শুভ-সংবাদ।
হাজার গান
তবে কিনা যবে আইনের নামে বর্বসর্দার
তােমার দেশের শত শত নরে পাঠাল যমের দ্বার ;
মার বুক হ’তে ছিনাইয়ে ল’য়ে নিরীহ দেশের ছেলে
পাঠায় সুদূর বনে জঙ্গলে, কয়েদীর বেশে জেলে,
তখন তােমরা চুপ করে থাক, ঘৃণা সে পােয় দূরে ;
মনে ভয়, পাছে সত্য কহিলে ঘানি গাছে দেয় জুড়ে।
পরম-ভক্ত সাজিয়া তখন তােমরা তরুণে কহ,
দোষীর দণ্ড দিবে ভগবান—তােমরা নীরবে রহ।
ভণ্ড-প্রেমিক! চুপ করে থাক, গেয়ােনা ক্ষমার গান ;
ক্ষমার মূল্য তােমরা বুঝিবে ? ভীরু যারা, অপমান
সহ পলে পলে মেষের মতন, আসিলে অত্যাচারী
মাতাভগিনীরে ফেলিয়া কুটীরে দৌড়াও তাড়াতাড়ি,
পুলিশের টিকি দেখিলে যাদের ভয়ে হয় বাক্রােধ
হায়রে কপাল। তারাই কহিছে, কোরােনা কারেও ক্রোধ।
পৈতৃক-প্রাণ বঁাচান যাহার সকলের বড় কাজ,
প্রেমের মহিমা উচ্চকণ্ঠে গায় সে ভণ্ড আজ।
ফাঁসির মঞ্চে দাড়ায়ে যে ঐ ছিল সে গাে অকপট,
যাই করে থাক—করেছে সে জন গড়িতে শক্তিমঠ,
কপট প্রেমের আবরণে সে ত ভীরুতারে ঢাকে নাই,
সত্য বলিয়া জানিয়াছে যাহা, কাজেও করেছে তাই।
ভুল করিয়াছ? পথে চলে যারা তাহারাই করে ভ্রম।
নির্ভুল শুধু জড়ের পিণ্ড, ভীরু যারা অক্ষম।
সব-হারাদের গান
গতিশীল নদী পথ ভুলে গিয়ে সাহারার বুকে মরে
বাঁশ-বনে-ঢাকা পান-ভরা ভােব বেঁচে রয় চিরতরে।
অসুর তােমরা বলিবে তাহারে ? দাও যত পার গালি ;
শুধু অনুরােধ—তােমরা তাহারে ক্লীব বলিও না খালি
তােমাদের যত ক্লীব সাধুতারে চরণের তলে দলি
মুক্তিপাগল কঁদিয়া গিয়াছে মুক্তি মুক্তি বলি।
পাপ-পুণ্যের ওজন মাপিয়া নিক্তি লইয়া হাতে
চলেনি সেজন; বার বার ফিরে চাহেনিকো পশ্চাতে।
তােমাদের মত বুদ্ধি তাহার পাকেনি সত্য বটে।
ভরা-যৌবনে নহিলে কি ছােটে মরণ-সাগরতটে।
উন্মাদ ছেলে বেসেছিল ভাল বন্দিনী জননীরে,
তাই সে গলায় ফঁসীর রসিটি তুলিয়া লইল ধীরে।
সত্য মিথ্যা ক্ষণেকের তরে ভােলরে বুদ্ধিমান।
বাহিরের কাজে খুজোনা সত্য—প্রাণ দেখে ভগবান।
বিদ্রোহী-বীর
ওরে অভিমানী ছেলে।
একবার শুধু একবার আজি চেয়ে দেখ আঁখি মেলে। এ
বন্দীর বেশে একদা যে পথে চলে গিয়েছিলে একা
অচেনা, অজানা যুবক-সেদিন দেয় নাই কেহ দেখা।
শুধু গিয়েছিলে একা একা চলে,সাথে ছিল নাকো কেউ।
হৃদয়ে হৃদয়ে ওঠেনি সে দিন আজিকার মত ঢেউ
কেহ গাহে নাই বন্দনা গান,কেহ দেয় নাই মালা,
নীরবে সে দিন গিয়েছিলে চলে নিয়ে বন্ধন জ্বালা।
আজ রাজা হয়ে ফিরিছ সে পথে ;
লাখাে-নরনারী এসে
চরণের তলে ঠেকাইছে মাথা, নয়নের জলে ভেসে।
বাতায়ন-পথে পুরনারী সবে করে লাজ বর্ষণ,
দ্বারে দ্বার শােভে বন্দন-মালা,উড়িছে জয়-কেতন
ভবনে ভবনে, গগনে গগনে উঠে তব জয় গান,
অগুরু গন্ধে সুরভি পবনে মেশে বাঁশরীর তান।
ফুলে ফুলে তব ছেয়ে গেছে তনু, ফুলে ছেয়ে গেছে বাট,
পুষ্পিত পথে চলিয়াছ যেন পৃথিবীর সম্রাট।
চির-বিদ্রোহী বীর।
আজ তুমি নহ বঙ্গের শুধু—আজ তুমি পৃথিবীর।
মহামানবের আহত, ব্যথিত, পীড়িত আত্মা তুমি,
যুগে যুগে তব হৃদয়-রক্তে রাঙিল বধ্যভূমি।
৩৮
সর্বহারাদের গান
যুগে যুগে তুমি পুড়েছ অনলে, দুলিয়াছ কঁসিকাঠে,
ব্যথার মানব | আজও তুমি কাঁদ হাটে মাঠে ঘাটে বাটে।
কণ্ঠে তােমার শৃঙ্খল বাঁধা, কঁাটার মুকুট মাথে,
নতমুখে তুমি কঁদিছ নীরবে-বিষের পাত্র হাতে।
সঙ্গীনে তব বিধিয়াছে বুক, পিঠে চাবুকের দাগ,
শত দিক হতে বেঁধেছে তােমারে শত আইনের নাগ।
কাদিতেছ তুমি ক্ষুধার জ্বালায়,—অঙ্গে বস্ত্র নাই,
বিপুল বিশ্বে মাথা গুজিবার নাই তব আজি ঠাঁই।
সকল কালের, সকল দেশের বেদনা তােমার মাঝে
মূরতি ধরিয়া দেখা দিল আজ নীল-কণ্ঠের সাজে।
নমাে, নমাে, নমাে নমঃ
ওগাে বিদ্রোহী মানব আত্মা দুৰ্বার দুর্দম।
মাটির আড়ালে মৃত্যু-বিহীন জ্বলিছে যে প্রাণখানি
আপনি মরিয়া জানাইয়া গেলে তারই ভাস্বর বাণী।
ইচ্ছা মৃত্যুপুথির পাতায় পড়েছি কাহিনী তার
দেখিনি জীবনে তুমি দেখাইলে, এই দেহ-কারাগার
কেমন করিয়া ভাঙ্গিয়া মানুষ চলে মুক্তির পানে
তুমি বলে গেলে, মানুষের সীমা নাহি, নাহি কোনখানে।
তুমি বিদ্রোহী, তুমি নির্ভীক, তুমি মৃত্যুঞ্জয়
তুমি জ্বলন্ত আগুনের শিখা অম্লান অক্ষয়।
কবির প্রতি
কবি আজি কোথা তুমি ? কোথা তব সে ভৈরব সুর
যে সুরে বাঁধিলে তুমি বীণা তব ভীষণ মধুর ?
কোথা তব কষুকণ্ঠে সেই মত্ত সিন্ধুর ঝঙ্কার ?
কোথায় লুকালে কবি, সেই দৃপ্ত কেশরী-হুঙ্কার ?
কোথা রেখে এলে কবি, সেই তব ঝঙ্কার নর্তন ?
উম্মত্ত, অশান্ত, ক্ষুব্ধ কোথায় সে দুরন্ত গর্জন
বন্ধন-যাতনা-ক্লিষ্ট শান্তি-হীন মুক্তি-পিপাসুর।
কোথায়, কোথায় কবি, সেই তব রণ-ভেরী-সুর
তরুণের মৰ্মে যাহা জেলে দিল প্রচণ্ড সাহারা ?
লক্ষ লক্ষ যুবকের করে দিল মত্ত, গৃহ-হারা?
মনে পড়ে সেই দিন—যেই দিন তুলি জয়-ভেরী
তরুণ জাতিরে তুমি ডাক দিলে, আর নয় দেরী
জাগাে, জাগাে, বন্ধু, জাগাে-কত কাল ঘুম-ঘােরে রবে ?
হৃদয় উপাড়ি আজি মাতৃপদে অর্ঘ্য দিতে হবে।
বিংশবর্ষ পূর্বে সেই দুর্যোগের তামসী-নিশায়
মুক্তির সমর-গীতি শুনাইলে তুমি বাঙলায়।
;
সব-হারাদের গান
আজি কবি, ফিরে এস সেই রুদ্র-রণ-তূর্য্য করে।
নিয়ে এস সেই ঝড়, সেই ঝঞ্চা, বক্ষের ভিতরে।
ছেড়ে এস মেঘ-লােক, এস কবি কল্পকুঞ্জ ছাড়ি ;
তােমার স্বদেশে আজি লুণ্ঠ্যমান লক্ষ নরনারী
কঁদিছে ধূলির পরে, হস্তপদ আবদ্ধ শৃঙ্খলে ;
নির্মম মনিবদল পৃষ্ঠে বুট হানিছে সবলে।
লেগেছে আগুন আজি ভারতের কুটিরে, কুটিরে ;
মনুষ্যত্ব দগ্ধ আজি; সিন্ধু-গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র তীরে,
গােদাবরী-মহানদী-তাপ্তি-কৃষ্ণা-নদীর ধারে
লজ্জানত নরনারী কঁাদে আজি শৃঙ্খলের ভারে।
তােমার বীণার তারে আজি কবি, উঠুক রণিয়া
তাদের ক্রন্দন-গীতি; রুদ্র-তালে উঠুক ধ্বনিয়া
তােমার বীণায় কবি মহেশের ডমরু-নিনাদ;
মূঢ় মূক প্রাণে প্রাণে জাগাইয়া দাও সিংহনাদ।
মলয়ের ঝিরিঝিরি শান্ত-স্নিগ্ধ-নিদাঘ-সন্ধ্যায়
ভাল আর নাহি লাগে, বসন্তের রক্তিম-উষায়
কোকিলের কলকণ্ঠ, ভ্রমরের মধুর-গুঞ্জন,
ফুলের সৌরভে ভরা স্নিগ্ধ-শ্যাম-ফুল্ল-উপবন
আজি নহে, আজি নহে মৃদুকণ্ঠে মিলনের গীত ;
আজি চাহি কণ্ঠে তব শুনিবারে ভৈরব সঙ্গীত ;
আজি চাহি শুনিবারে সেই রুদ্র শঙ্খের আহ্বান
কুরুক্ষেত্রে পার্থ-বুকে জাগাল যা উত্তাল-তুফান।
হে কবি, শুনাও আজি দৃপ্তকণ্ঠে বিচ্ছেদের ডাক,
সংগ্রামের নিমন্ত্রণ, তরুণের প্রাণকাড়া হক।
?
সবহারাদের গান যদি তাহা নাহি পার, কণ্ঠ যদি হয়ে থাকে ক্ষীণ, রক্তে যদি নাহি নাচে অগ্নিস্রোত দুরন্ত নবীন, চিত্তে যদি নাহি জ্বলে তরুণের হৃদয়ের জ্বালা, তবে কবি, চুপ কর ; গাঁথিও না মিলনের মালা তােমার গানের ছন্দে , ডাকিও না বিশ্বেরে হেথায় ; গােলামীর বিষবাষ্পে পরিপূর্ণ ভীষণ কারায় মিলনের যজ্ঞ-বেদী। নিমন্ত্রণ শ্মশানের বুকে ? দাম্ভিক পাশ্চাত্য জাতি হের ঐ হাসে সকৌতুকে দাসের আস্পর্ধা হেরি; নিজ ঘরে বন্দী যারা হায়! মরি, মরি,ঘরে তারা আহ্বান করেছে দুনিয়ায়! স্বদেশে ভিক্ষুক যারা, পথের কুকুর সম মরে তার ডাকিয়াছে ওরে, নিখিলেরে ঘরের ভিতরে। অপমান! অপমান! আজি যদি বিশ্ব আসে ঘরে- কি দিব আমরা তারে ? কি রেখেছি তাহাদের তরে? ম্যালেরিয়া ? ওলাউঠা ? দুর্ভিক্ষের রিক্ত-হাহাকার? দাসের শৃঙ্খল-ধ্বনি ? আর্তনাদ গােলাম খানার ? রক্ষা কর ওগাে কবি। যেই দিন ভাঙ্গিয়া শৃঙ্খল দুনিয়ার রাজপথে বাহিরিব স্বাধীন সবল, যেই দিন ত্রিশকোটি মানবের কলঙ্ক-কালিমা লুপ্ত করি দিবে দেখা মুক্তি-উষা-নবঅরুণিমা, সেই দিন, ওগে। কবি, গেও তুমি মিলনের গান- তার আগে প্রেম নহে, বিচ্ছেদের দুর্জয় আহ্বান। =
অপরাধী
;
সৈনিক আমি—সত্য চাহিমু, রাজার হুকুমে তাই
বধ্যমঞ্চে দাড়ায়েছি আজি ; মরণের আগে ভাই,
রেখে গেনু এই মরমের ব্যথা সিক্ত আঁখির জলে ;
বুকের জমাট রক্তের মালা হে ধরণী, তব গলে
দোলাইমু আজি জীবনের সাজে ; আমার বেদনা কবি,
আঁকিও তােমার করুণ তুলিতে; দেখায়ে নরের ছবি
অত্যাচারীর সঙ্গীনাহত
ক্রুশের
উপরে বুলে,
পায়ের তলায় অভাগিনী মাতা কঁাদে এলোথেলাে চুলে।
রাজার আইন-প্রেম সেথা নাই—নাহি সেথা ভগবান ;
তরবারি সেথা দিবানিশি করে মানব রুধিরে স্নান।
বুড়া পিতা মাতা—আমিই তাদের ছিনু অন্ধের আঁখি ;
সৈনিক দলে যােগ দিতে হ’ল,-রাজার হুকুম নাকি
৪৩
সব-হারামের গান
পল্লীর বুক ছেড়ে যেতে হ’লগ্রামের প্রান্তে আসি
লই বিদায় আখি-জলে ভাসি; ছিল যারা প্রতিবাসী
রহিল দাড়ায়ে অনিমেষ চোখে। স্নেহের জননী মাের
কম্পিত দেহে রহিল চাহিয়া, তপ্ত-অশ্রু-শাের
ঝরিল পিতার শীর্ণ গণ্ডে,-ক্রমে মিলাইল সব ,
দূর হ'তে শুধু বায়ুভরে আসে মা’র ক্রন্দন রব।
পিছনে কঁদিছে কত দিবসের কত স্মৃতিমাখা গৃেহ,
সুমুখে অজানা অকূল জগৎ—আপনার নাই কেহ।
অচেনা বিদেশে ধূ ধূ করে বালি, নাহি শ্যাম-তৃণ-তরু;
একদিকে কঁদে ক্ষুব্ধ সাগর—আর একদিকে মরু।
সাগরের তীরে শিবির মােদের-হাহাকার করে বায়ু;
দিঘলয়ের প্রান্তে ফুরায় ক্লান্ত রবির আয়ু;
আধার করিয়া আসে চারিধার—সৈনিক কঁাদি একা।
কোথায় আমার শ্যামল পল্লী! যায় না তাহারে দেখা ?
বুড়া পিতামাতা কোথায় আমার ? কে তাদের সেবা করে ?
একদিন রাধে-তিন দিন খায়, প্রদীপ জ্বলেনা ঘরে।
সৈনিক মােরা—মানুষ ত’ নই। বৃথা নয়নের জল ;
আমরা যে শুধু সচল যন্ত্র, লােক মারিবার কল।
{
:
হঠাৎ বাধিল বিপুল সমর-বিপ্লব এল দেশে ;
ছিল নির্জীব পরাধীন যারা—সাজিল বীরের বেশে,
কহিল ‘এ দেশ আমাদের ভাই, আমাদের এই ঘর ;
জনম হেথায়, লালিত হেথায়, মরিলে হেথা কবর।
ঃ
সব-হায়াদের গান তিল পরিমাণ জমি যতদিন রহিবে শত্ৰুকরে- ততদিন ভাই সঙ্গিনী আসি,-শয্যা তৃণের পরে। আমাদের রাজা হুকুম করিল—‘বিদ্রোহীদের মাথে হান জোর অসি, গৃহ তাহাদের লুটাও ধুলির সাথে। আমাদের শিরে বিধাতার দেওয়া সভ্য করার বােঝা এ কথা যাহারা বােঝেনা—তাদের তরােয়ালে কর সােজা। অস্ত্রে সস্ত্রে বাজিল বাজনা,কৃপাণ মুক্ত-কোষ ; ছুটিল ভীষণ অগ্নি-প্রবাহ,—বিষম যে রাজরােষ! আমরা রাজার শিকারী কুকুর—হুকুম মাত্ৰ ছুটি , শিকার পাইলে প্রভুর কথায় কামড়িয়া ধরি টুটি। সারা দুনিয়ার প্রভু আমাদের সাধের মৃগয়া করে; দুৰ্বল কোন শিকার পাইলে আমাদের ডাক পড়ে ; আমাদের ভাগে—যুদ্ধে মৃত্যু ;-বাঁচিলে—শুনাে হাড়- প্রভুর ভাগ্যে বিশাল রাজ্য, মণিমাণিক্য ভার। একথা আমরা সজোরে বলিলে পাঁজরে চাবুক মারে ; বলে—এ পাগল বিদ্রোহীটারে লয়ে যাও কারাগারে। সে দিন ডুবিছে সন্ধ্যার রবি ম্লান-প্রান্তর-শেষে শত্রু-পুরীতে নিশান উড়ায়ে ঢুকিছু বিজয়ী বেশে : পরিখার পারে তরুণ যুবক হেরিনু রক্তমাখা বিদ্রোহীদের রক্ত-পতাকা বৰ্ম্মে তাহার আঁকা। হাতছানি দিয়ে ডাকিল আমারে-গেনু আমি যেন চোর- অতি ক্ষীণস্বরে কহিল সে মােরে-বৃদ্ধা জননী মাের রয়েছে একেলা অদুর কুটীরে,-কহিও তাহারে তুমি- ঘুমায় তাহার বীর সন্তান শত্রুর গুলি চুমি। ৪৫
সবহারাদের গান
আঁধারে হঠাৎ আঁখির সামনে জাগিল মায়ের চোখ
অশ্রু-প্লাবিত জননীর মুখে উথলে পুত্রশােক।
মা যে সব দেশে একই জননী, মূৰ্ত্তি সে করুণার।
শত্রুর বুকে খোঁচা দিলে লাগে বুকে আপনার মার।
আমার জননী শুনে যদি আজি—পুত্রের দেহখানি
যে দেহ আপন বুকের শােনিতে গড়েছে নিজেরে হানি-
লুটায় তা আজি শত্রুগুলিতে কোন বিদেশের মাঠে
মরিবার কালে নাহি কেহ কাছে—তৃষ্ণায় ছাতি ফাটে ।
শিহরি উঠিল সারা দেহ-প্রাণ মার মুখখানি স্মরি
নিখিল-মায়ের বেদনায় মম বক্ষ উঠিল ভরি।
যামিনী আসিল নীরব চরণে, আঁধারে ভরিল দিশি,
মনে হ’ল মাের-নিখিলের দুখে কালাে হয়ে গেছে নিশি।
নিদ নাহি চোখে, হেরিনু সহসা আমার মুখের কাছে
অশ্রুসজল হাজার করুণ নয়ন চাহিয়া আছে।
যে দিকে তাকাই সেই দিকে জল-ভরা ছলছল আঁখি—
নীরব ভাষায় কহিল আমারে আমাদের চেন না কি ?
দর মত তােমরা যাদের মেরেছ, কেড়েছ দেশ
আমরা তাদের কন্যা জননী; অামাদেরও কর শেষ।
সভয়ে ঢাকি দুহাতে আনন, ভাকি—“হে ভগবান,
মৃত্যু-দূতেরে পাঠাইয়া তব লুকাও এ অপমান।
সকল ধরণী চীৎকার করি কহিল কানের কাছে,
‘প্রাণ নিতে পার ফিরায়ে দিবার শক্তি কি তব আছে
৪৬
সর্বহারাদের গান . আকাশের তারা ডাকিল আমায় ছাড় ঘাতকের কাজ- বাতাস মায়ের আহ্বান বহি আনিল মৰ্ম্মমাঝ। ঘৃণায় শিহরি উঠিল জীবন—তবু সেনাদল ছেড়ে চলে যেতে নারি–ছাড়িলে আইন তাজা প্রাণ নেবে কেড়ে। দেবতা আমার জয়ী হ’ল শেষে ;-পণ করিলাম আর মানব হইয়া মানব-অঙ্গে হানিব না তরবার। আকুল পরাণে নয়নের জলে কঁদিয়া ডাকিনু—স্বামি । ভীরু আমিটারে নাশিয়া আমার জাগাও সত্য-আমি। বিনিদ্র রাত হইল প্রভাত,ডাক দিল সেনাপতি ; হুকুম হইল ‘তােমাদের আছে কাজ গুরুতর অতি। বিদ্রোহী ঐ বন্দী সেনারা—পায়ে বেড়ী, হাতে কড়া, উহাদের প্রাণ নিতে হবে, যাও প্রস্তুত হও ত্বরা। আমি কহিলাম,‘আমা হতে কভু হবে নাক’ এই কাজ ; আমি আর নহি ঘাতক, গােলাম;—বিশ্বের মহারাজ আমার ভিতরে রয়েছে লুকায়ে, শুনেছি তাহার বাণী, জীবের অঙ্গে আঘাত করিলে শিবেরে আমরা হানি। ম’রেছে তােমার হুকুমের দাস,-জেগেছে অমর প্রণ; আজ আছে কাল নাই এ শরীর—অনন্ত ভগবান। গরজি উঠিল সেনাপতি রােষে,—“বাঁধ বিদ্রোহীটারে ; ভীরু কাপুরুষ, কাল প্রাতে তুমি যাবে শমনের দ্বারে। লৌহগুলির তপ্ত পরশে ঘুচায়ে নেশার ঘাের বােঝাব তােমায়—কোন্ দেবতার হুকুমের বেশী জোর। ৪৭ সর্বহারাদের গান জীবনের বেলা শেষ হয়ে আসে, ভগবান বিচারক ; কে ভীরু সাহসী সেই জানে শুধু, সেই জানে ঝুট, হক। মোর অপরাধ-ভায়ের বক্ষে হানিতে নারি ছুরি- মাের অপরাধ—সহি নাই আমি মানুষের জুয়াচুরী। তােমরা আমায় দেহ গাে বিদায়, সময় নাহি যে আর। আমার বেদনা, হে কবি, ছন্দে গাঁথিও যুক্ত-হার। প্রভাত এসেছে, উকি মেরে চায় লাজ-রক্তিম রবি ; অস্ত-অচলে পাণ্ডুর চাদ হেরি এ পাপের ছবি। অবাক হইয়া চেয়ে রয় নীচে আকাশের নীল আঁখি— মাক্ষুষ তাহার কামানের জোরে ভগবানে দেবে ফাঁকি। দূরে গীর্জায় বাজিছে ঘণ্টাও কাহার আহ্বান ? ভগবান ডাকে—আয় মাের বুকে, আয়রে বিজয়ী প্রাণ। মরণে জিনিলে যে জীবনখানি, অম্লান আলাে তার সকল রাজার মুকুটমণিরে দিবে চির ধিক্কার। আজিকে আমার কোন ভয় নাই—আমি যে মৃত্যু-হীন- মরণের বুকে দেবতা আমার বাজায় অমৃত-বীণ। ১৮
কামধেনু
দেশ যাহা ছিল
বড়দিদি, উঠে পড়, আর বেশী রাত নাই,
ছােট জা, গাে। জাগাে, জাগাে, ভাের হয়ে আসে ভাই।
পদি পিসি উঠেছিস। .বেশ বেশ তাড়াতাড়ি
ঘুটেগুলো ধরা দেখি—উহু, আজ শীত ভারি।
লাটাইটা খেদি দিদি চপট নিয়ে আয়,
চরকার সাথে ঐ সৈ মাের গান গায়।
বৌমার পাজগুলাে সত্যি কি সুন্দর।
বড় দি গাে। শুয়ে কেন ? সুরু কর ঘর্ঘর।
ঘর্ঘর ঘর্ঘর চরকায় গায় গান
রায়েদের বৌগুলাে এত ভােরে ভানে ধান।
পদি পিসি, কাল বুঝি ও বাড়ীতে বৌভাত।
বড় দিদি, তাের ভাই কতজোরে চলে হাত।
মাগাে। আর পারি নাকো,সূতাকাটা হল দায়,
মাসী দুটো ছুঁটে দেনা, আগুন যে নিভে যায়।
খেদি ভাই। তাের কাছে আর দুটো হবে পাঁজ?
শুক তারা ডুবে গেল, এখনও যে কত কাজ।
৪০
। সবহারাদের গান সুন্দর। ঘর্ঘর ঘর্ঘর চরকায় গান গায় রামুঘােষ গরু নিয়ে মই ঘাড়ে মাঠে যায়। রায়েদের মণ্ডপে ঐ বাজে নহবৎ- ছোড়াগুলাে এইবার জুড়ে দেবে কসরৎ। নাটাইটা দাও দিদি, সূতাগুলি তুলে রাখি, সব পাজ শেষ মাের, একটাও নাই বাকি। শীত এল, বিহারীর জামা দু’টো চাই মাসী ; সূতাগুলি দাও দেখি, তাঁতীবাড়ী দিয়ে আসি। প্রভাতে ওরে জগা, ওরে মাধা, শীগগির উঠে পড়- দেখে যারে মাঠ-ভরা কাপাস কি আয় হেলি ধামা নিয়ে, তুলোগুলাে তুলে আনি- পুরে গেল ধামা যে রে, ঝুড়ি দুটো আন টানি ঐ আসে জগা, মাধা—ডাল যেন ভাঙে নারে ; আয় আশা ঝুড়ি নিয়ে—যাই মােরা ঐ ধারে। একধামা, দুই ঝুড়ি-ভরে গেছে পুরাপুরি জগা মা চলে আয়-করিনে হুড়াহুড়ি। ওরে আশা, হেলি তােরা—উঠানের ঐ কোণে কেরকীতে বিচিগুলাে ছাড়া দেখি দুই বােনে। ক্যাচ কুচ, কঁাচ কুচ, কি মজার গান গায় বিচিগুলাে একদিকে, আর দিকে তুলা যায়। এইবার দুই বােনে বাছ দেখি তুলাগুলাে হয়ে গেছে ? দেখি—মােটে একধামা হ’ল তুলো। এইবার ঐগুলাে ােেদ্দরে দিয়ে আয়, তেল মেখে ঘাটে যাই—খেতে বােজ বেলা যায়। • সব-হারাদের গান দ্বিপ্রহরে ছােট বউ, ছােট বউ, তুললাগুলাে ধুনে নাও- পিঞ্জন ঐ ঘরে, চটপটু আন, যাও। ধুধু ধুধু কি মধুর আওয়াজ, মায়ে ঝিয়ে সূতা কাটি, নাতনীরা করে পাঁজ। ধুধু পিঞ্জর গাহে গান, ঘর্ঘর ঘর্ঘর চরকায় উঠে তান। বড়, ছােট, মেজ বউ কেউ কোথা ব’সে নাই- হেলি দিদি তােদের সে গানখানা গানা ভাই। আশা ও হেলির গান আমাদের ঘরে ঘরে কমলার মৃদু হাসি, আমাদের আঙিনায় ফোটে ফুল রাশি রাশি। আমাদের দীঘিভরা থৈ থৈ কালো জল, আমাদের গােশালায় দুধভরা গাভীদল ; আমাদের মাঠে মাঠে ফলে ধান, বাজে বাঁশী, আমাদের পথে পথে মেঠো সুরে গায় চাষী, আমাদের বারাে মাসে হয় তের পার্বণ, আমাদের মুখে হাসি লেগে থাকে অমুখণ। আমাদের বাপ ভাই মাঠে গিয়ে করে চাষ, ঘরে মােরা মায়ে ঝিয়ে সূতা কাটি বারমাস। পুরুষেরা মাঠে করে অন্নের আয়ােজন, ঘরে বসি মােরা রচি অঙ্গের আবরণ ; ঘর ও বাহিরে মােরা মিলেমিশে কাজ করি, ভিক্ষারে মােরা সবে ঘৃণা করি প্রাণ ভরি।
সাহারার গান আমাদের দেশে তাই অলসের নাই ঠাঁই সবে মিলে করি কাজ, খাই দাই গান গাই। দেশ যাহা হইয়াছে কোথা যাই, কি যে করি—চারিদিক দেখি ফাকা। কাপড়ের দাম হ’ল-জোড়া প্রতি দশটাকা। “বৌদিদি আছ নাকি?”—কার গলা শুনা যায় ? শীগগীর বল মনু-মা গিয়েছে ও পাড়ায়। লজ্জা সরম আর থাকেনাক নারায়ণ। এর চেয়ে মরা ভাল, ধিক ছার এ জীবন। ছেড়া কঁাথা পরে প'রে কাটায়েছি সাতমাস- এইবার তাও গেছে ; বাকি আছে গলে ফাস। { ; শুনিলাম ও পাড়ায়-কলুদের বউ কাল গলে দড়ি দিয়ে নাকি এড়ায়েছে ভব জাল! সংসারে কেউ তার ছিলনাক’ আপনার কাপড়-অভাবে শেষে ইজ্জৎ রাখা ভার; ভিক্ষা চলেনা আর -পথে চলা সুকঠিন !. ক্রমে ক্রমে কেটে গেল এক-দুই-তিন দিন । পরিশেষে ?.থাক থাক্মা ধরণী ! দ্বিধা হও; ক্লীবদের ভার আর মিছামিছি কেন বও ? ক্ষুধাতুর শিশুদের পাণ্ডুর মুখগুলি আর যে দেখিতে নারি! যবে কচি মুখ তুলি বলে তারা, খেতে দে মা, চোখ ফেটে আসে জল, বলি ‘বাছা—কিছু নাই! নূন ভাত সম্বল।
সব-হারাদের গান জোটে নাক’ তাও পূৰা, শীতে কপি সারারাত, তখন নয়ন-জলে ডাকি, প্রভু। প্রাণনাথ। আমাদের নাও, নাও তুলে নাও পদতলে- মরণ সহেনা আর তিলে তিলে পলে পলে। আঁখি জলে আজ শুধু সেই দিন পড়ে মনে যেই দিন চরকার সুমধুর গুঞ্জনে মুখরিত ছিল সদা বাংলার প্রতি ঘর, গ্রামে গ্রামে অফুরাণ ছিল প্রাণ নিঝর। এখন সকাল সাঁঝে চুপ করে বসে থাকি, নিঠুর গাে! আমাদের কাজ দিতে পারাে নাকি? দ্বাপরে শুনিয়াছিলে দ্রৌপদীর ক্রন্দন- আমাদের লজ্জা কি করিবে না নিবারণ ? দেশ যাহা হইতেছে 0 কে এসেছ দ্বারে বাবা! ক্ষুধায় যে প্রাণ যায়- কাজ কিছু দিতে পারে? ভিক্ষা যে মেলা দায়। কঁাধে ওটা চরকা না ? দেখি বাবা একবার। কোথা ছিলি হারানিধি ? আমাদের হাহাকার কাণে তার পশে নাই নিঠুররে এত কাল ? দেখ, দেখি একবার-হইয়াছে এ কি হাল। পরণের বস্ত্র সে ছিড়ে গেছে শতখানে, কত দুঃখ স’য়েছি যে-নারায়ণ শুধু জানে। বেঁচে গেছি, বেঁচে গেছি—আর কারে করি ভয়। চরকার সাথে আসে আনন্দ অক্ষয়- সবহারাদের গান ভিক্ষার পাটা দূর করে ফেলে দাও, কাজ কর হাতে আর আনন্দে গান গাও। চরকায় বস্তুরে, অন্ন সে চরকায় চরকার পরশনে অধীনতা দূরে যায়— ভেবেছিনু—কোন দিন মরে যাব অনাহারে- চক্র ধরিয়া করে নারায়ণ হাসে দ্বারে। দুখিনীরে। উঠে বস-কদনের অবসান । ঐ শােম্ দেশ জুড়ে চরকায় উঠে গান। অনাথিনি! ভাবনা কি? চরকারে চেপে ধর- দৈ-তিমিরে তাের চরকাই দিবাকর। পতিতারে। ফিরে আয় । আয় ঘরে, কথা শােন্, ঘরে বসে সূতা কাটি ভাত তুই পাবি বােন। ক্ষুধার অনলে জ্বলি কঁদিতেছে কে কোথায় ? চরকা ডাকিছে তারে—“আয় মাের কাছে আয়।” ‘‘আমা হতে হবে তাের দৈন্যের অবসান ; আমা হতে ফিরে তুই পাবি ধন সম্মান, আমি তাের ঘুচাইব জড়তার নাগপাশ, দাসত্ব কালিমা তাের আমিই করিব নাশ, পাণ্ডুর মুখে জ্যোতি আমিই করিব দান, নিরাশা-কাতর বুকে তুলিব আশার গান ! নীরব কুটীরে তাের আমিই বাজাব বেণু, আয় মাের কাছে আয়—হব তাের কামধেনু।” ৫৪
কারার দুয়ারে
;
কারার দুয়ারে বন্ধু, বিদায়ের লই সম্ভাষণ।
বেদনা-সিন্ধুর তীরে অামাদের আজিকে মিলন;
বিচ্ছেদের রাত্রি অসে, ছায়া তার পড়েছে অদুরে ;
আলো আঁধারের তীরে অাজি গান গাব কোন সুরে।
গাব না দুঃখের গান ; দুঃখ মিথ্যা, মিথ্যা অন্ধকার ;
সত্য শুধু মুক্তি-পথে মানুষের চির-অভিসার
অনন্ত আলাের পানে; কারাগার-ফঁাসি-নিৰ্বাসন
সেই অভিসার-পথে ক্ষণিকের ব্যথার বন্ধন।
বন্ধন ঘুচিয়া যায় রজনীর দুঃস্বপ্নের মত ;
চিরন্তন শুধু চলা; কে করিবে তারে প্রতিহত ?
আজিকে তােমার মাঝে নমি সেই পথিক-প্রাণেরে,
তুচ্ছ করি সৰ্ব্ব বিপ্ন, জয় করি সকল ভয়েরে
যে প্রাণ চলেছে নিত্য কূল হতে অকূলের টানে,
বাজায়ে ঝড়ের বাঁশি উদ্বেলিত দুরন্ত তুফানে,
যার কাছে নাহি রাজা, নাহি মৃত্যু, নাহি পরাজয়,
নাহি মাতা, নহি প্রিয়া, নাহি মােহ, যে চিরদুর্জয়,
তােমার ভিতরে আজি হেরি তারে জয়ী জ্যোতিষ্মন।
বন্ধু, এই গানে সেই পথিকের গাহি জয়গান ।
পথিকের গাম
নীল গগনের নীল পেয়ালায় ওরে পথিক, দাও চুমুক ;
আলাের সুরায় ভুলবরে আজ এ জীবনের সকল দুখ।
ভুলব আমার দুখের অতীত, ভুলব কালাে ভবিষ্যৎ ;
কূলের নােঙর তুলব এবার, ডাক দিয়েছে অসীম পথ।
নীল-আকাশের পথিক-মেঘের পাখায় চড়ে দিলাম পাড়ি
দিগ, বন্ধুদের বাজল যে শাখ, বাজায় বাঁশী দূরের গাড়ী ;
বন্ধু আমার ! পথ ছেড়ে দাও, রথ এল যে দূর-দেশের,
যাবার বেলায় রইল আমার বিদায়-চুমা রাত-শেষের।
শাস্ত্র-সমাজ ভুলব এবার, ভুলব জাতি সম্প্রদায়,
ভুলব কোরাণ, বেদ-বাইবেল কাজ কি নমি এদের পায় ?
দীন-দুনিয়ার আবর্জনার টানুন বােঝা জগন্নাথ ;
কাজ কি আমার ভু-ভারতের চিন্তা নিয়ে কাটিয়ে রাত
থাকুক আমার বাঁশের বাঁশীর সুরের মায়া চমৎকায়,
থাকুক আমার স্তব্ধ অতল নিশীথিনীর অন্ধকার ;
জড়িয়ে থাকুক মর্মে আমার রাঙা-ঊষার স্বপন খানি,
প্রাণের বীণায় বাজুক এবার বন-পথের গভীর বাণী।
সৰ-হারাদের গান
থাকুক এবার একলা আমার হাস্যভরা খেলার ঘর ;
আর যা কিছু নাই প্রয়ােজন , আসে আসুক, নাইক’ ডর,
নাই অনুরাগ, নাইক’ বিরাগ, নাইক’ মিতা, নাইক’ পর ;-
সকল দাবীর শেষ করে আজ ফিরে এলেম আপন ঘর।
এই ধরণীর অনেক দিনের ব’য়েছি ভাই অনেক ভার;
প্রাণের কঁাদ ঘুচল না হায়! কোথায় বল দুখের পার ;
তাইত এবার আপন-সীমায় ছিড়ে এলেম হাটের ডাের,
আনন্দ ভাই, বাইরে যে নাই, আনন্দ যে হিয়ায় মাের।
সেইখানে যার ফুটল না ফুল, সেখানে যার অন্ধকার
মিথ্যা তাহার তপস্যানল,-কাঁটায় ভরা জীবন তার।
এই ঘরে মাের দিবস-নিশায় আজ হতে যে বাজবে বাঁশী
সেই বাঁশরীর সুরের আলােয় তারার মুখে ফুটবে হাসি ;
আনন্দ-দীপ জ্বালব এবার নিরালা মাের প্রাণের ঘরে
এই দীপেরই সােনার আলােক ছড়াবে দিগ-দিগন্তরে।
পুণ্য-পাপের ধারব না ধার, পুথির বুলি ঢের শুনেছি,
নীতির কথায় যায় না আঁধার, আনন্দ তাই সার বুঝেছি।
প্রাণ খােল যার হাসির লহর, প্রণাম করি তাহার পায়-
এই দুনিয়ার চিতার উপর হাসতে পারে ক’জন হায় ?
দয়ার প্রকাশ নয় সুকঠিন, মিলে না হায় প্রেমিক প্রাণ,
হাতের সেবার চেয়েও কঠিন আনন্দে গো হৃদয় দান।
আনন্দ-দূত ! তাইত তােমার গলায় দিমু মিলন-মালা—
নীল-গগনের নীল পেয়ালার আলাের মদে ভুলাও জ্বালা।
গুর্খা-শের
ঘুমাও ঘুমাও:বন্ধু। রণ ক্লান্ত হে বীর সৈনিক।
মরণ-বঁধুর কোলে মাথা রাখি ঘুমাও খানিক।
বহুকাল পাও নাই সুনিবিড় নিশ্চিন্ত বিশ্রাম,
চতুর্দিক হ’তে মিথ্যা আঘাত হেনেছে অবিরাম।
তবু দীর্ঘ রাত্রি দিন যুঝিয়াছ শান্তিহীন একা।
সর্বাঙ্গে ঝরেছে রক্ত—কোন বন্ধু দেয় নাই দেখা।
অবসন্ন ক্রমে তনু-ক্ষীণ হয়ে এলো কোলাহল,
সম্মুখে মরণ-সিন্ধু এল ধেয়ে উন্মত্ত অতল ।
তবু সেই শেষ ক্ষণে হেরেছি তােমারে মহাবীর
নির্বিকার, অচঞ্চল, হিমাচল সম ঊর্ধ শির
মৃত্যুচ্ছায়া সমাচ্ছন্ন সেই আলো আঁধারের তীরে
হেরিলাম সে কি দৃশ্য। মানবের গর্বোন্নত শিরে
মহাকাল ধরিয়াছে রাজচ্ছত্র নক্ষত্র খচিত ;
অমৃত-নন্দন নর, পদতলে মরণ লুষ্ঠিত।
উন্নত ললাটে শােভে স্বরগের পারিজাত মালা;
সূর্যের মুকুট শিরে; নেত্রে তার বিদ্যুতের জ্বালা,
* খাবীর দল বাহাদুর গিরির স্মরণে।
সবহারাদের গান
ধরণী চরণে তার চালে শস্য রত্ন উপহার,
সমুদ্র শােনায় তারে অনন্তের সঙ্গীত উদার।
করিছে বন্দনা তারে জোড় করে দিগঙ্গনাগণ
দানব-বিজয়ী নর। জয় তব সুরেন্দ্র-নন্দন।
ত্রিভুবনজয়ী তব রথপরে সারথি কেশব ;
দেবতার সখা তুমি—করে শােভে গাণ্ডীব ভৈরব ।
অসীমের কুল হ’তে আসিল সে দুর্জয় নাবিক,
ধরণীর ঘাট তার বিশ্রামের আবাস ক্ষণিক,
বুকে তার জ্বলে হু হু সুদুরের দুরন্ত পিপাসা,
আকাশ ডাকিছে তারে—ওরে মুক্ত। ভেঙে ফেল বাসা,
বায়ু কহে—আয় মাের সাথে সাথে পাগল সােদর,
ফুল কহে—ফুটে ওঠ বিশ্বমাঝে সহজ সুন্দর।
গিরি কহে—উঠ বীর উৰ্দ্ধ-শির, নির্ভীক, স্বাধীন,
সিন্ধু কহে—মাের সাথে গান গাহ বন্ধন-বিহীন।
অনন্ত নিখিল সদা মুক্তিমন্ত্র ঢালে তার কাণে
তুমি তারে পঙ্গু করি দিবে মুখ, শস্ত্রের বিধানে ?
শিকল পরায়ে পায়ে প্রাণ তার বাঁধিবে শিকলে ?
মুক্তির অমর মন্ত্র ভােলাইবে তুচ্ছ অসি বলে ?
শক্তিমত্ত রে দাম্ভিক, পারিলে না জিনিতে তাহারে।
চিরমুক্ত আত্মা তার সগৌরবে গেল পরপারে।
পিছনে রয়েছে পড়ি দেহ শুধু আঘাতে বিকল,
স্বাধীন উন্মুক্ত প্রাণ নীলাকাশে হাসে খল খল।
নারী স্বর্গের দ্বার
নারী নরকের দ্বার
জানিনা এ কথা প্রথম ধ্বনিত হইল ক েকর।
সে কি কোন দিন জীবনে কখনাে পায়নি মায়ের কোল ?
কচি-তরু-খানি কোলে করে তার দেয় নাই কেহ দোল ?
কপালে তাহার টিপ দিবে বলে দেরে সাখেনি কেহ ?
চোখে তার কেহ দেয়নি কাজল ? বুকে বেঁধে তার দেহ
শােনায়নি তারে কোন নারী কি গাে ঘুমূ-পাড়ানীর গান ?
পড়ে গেলে তারে ‘যাট ‘যাট’ বলে করে নাই চুমা দান ।
‘হাঁটি হাঁটি’ বলে চলিতে তাহারে শেখায়নি শৈশবে
কোন নারী কি গাে? হয় ত’ সেজন এমনি অভাগা হবে!
হয় ত’ তাহার ছিলনা ভগিনী, হয় ত ছিলনা মাতা।
ঠাকুমার মুখে কল্পলােকের শশানেনি গল্প-গাথা।
অসুখের রাতে মায়ের হাতের পায়নি পরশ খানি,
পরম দুঃখে শােনননি নারীর মধুর কোমল বাণী,
হয়ত সে জন পায়নি জীবনে রমণীর ভালবাসা,
দ্বারে দ্বারে কেঁদে ফিরেছে হৃদয়, মেটেনি প্রাণের আশা;
এমনি করিয়া রমণীর প্রেমে বঞ্চিত হয়ে যার
কাটিল জীবন, সেই লিখিয়াছে—নারী নরকের দ্বার।
নারী স্বর্গের দ্বার
নূতন যুগের নূতন বীণায় তােল এই ঝঙ্কার।
-
সহানারে গান
এই জগতের যত মহারথী, যত বড় বড় কবি,
যত মহাজন, শিল্পীরা যারা এঁকেছে অমর ছবি,
নারী করিয়াছে সবারে সৃষ্টি। বাল্মীকি, কালিদাস,
বুদ্ধ, খৃষ্ট সবে করিয়াছে নারীর গর্ভে বাস।
অনাগত যুগে আসিছে যাহারা অতি-মানুষের দল
তারাও আসিছে মায়ের গর্ভে। তার প্রেম সুকোমল
এই জগতের যা কিছু কঠোর, যা কিছু অসুন্দর
সবারে তুলিছে সুন্দর করি। মরেছে লখীন্দর
হিংসার বিষে,বাঁচাবে তাহারে বেহুলা নূতন করি’
সত্য করে দিবে প্রাণ শােন, সাবিত্রী সুন্দরী।
অন্ধ হয়েছে কুরুরাজ আজ রাজ্যের লালসায়-
ঐ আসে তাই গান্ধারী সতী-অঞ্চল দেখা যায়।
হিংসা-দ্বেষের গরলে ফেনিল মানব-সাগর-তীরে
নারী গড়িতেছে মিলনের তাজ ব্যথার অনীরে।
নূতন যুগের কবি-
নূতন ছন্দে গাহ আরবার-নারী স্বর্গের ছবি।
পুরুষের মাঝে যাহা রমণীয়—সব রমণীর দান—
পুরুষ হয়েছে প্রেমিক নারীর প্রেম-নীরে করি স্নান ।
নিমায়ের প্রেম বিকসিত হ’ল শচীর হিয়ার তলে,
জননী সুনীতি ধ্রুবের হৃদয় ফুটাইল শতদলে,-
যুদ্ধ জয়ের মন্ত্র শিখিল অর্জুন-নন্দন
মাতার গর্ভে গােপনে ; নরের পিছনে নারীর মন।
পুরুষ প্রথম পাইয়াছে রূপ—নারীর রূপের মাঝে,
যা কিছু তাহার কাব্যের মাঝে নারীর ছন্দ বাজে।
অর্ঘ্য
যুগে যুগে দেশে দেশে আপনারে অর্ঘ্য দিল যারা
সত্য-শিব-সুন্দরের পদে ;-হল যারা সর্বহারা
আপনারে নিঃশেষিয়া তিলে তিলে মানবের লাগি,
সুখ-শয্যা পরিহরি তৃণশয্যা নিল যারা মাগি,
সিংহাসন ছাড়ি যারা দাড়াইল পথের ধুলায়,
স্বর্ণ-সৌধ তেয়াগিয়া যারা ধূলি-ধুসরিত পায়
মানবের দ্বারে দ্বারে বিলাইল অমৃতের ধারা,
দীর্ঘ-রাত্রি দীর্ঘদিন নিদ্রাহীন তপস্যার দ্বারা
অতিক্রমি অজ্ঞানের অমানিশা ঘাের অন্ধকার
জ্যোতির্ময় পুরুষেরে যাহারা করিল আবিস্কার,
রাজবেশ দুরে ফেলি, অঙ্গে বহি কঠিন বল্কল,
সত্যের চরণে যারা ডালি দিল জীবন-কমল,
গরল করিল পান, অগ্নিকুণ্ড মাঝে প্রবেশিল,
কণ্টক মুকুট মাথে ক্রশ-কাষ্ঠে জীবন সঁপিল,
যৌবনে সন্ন্যাসী সাজি এ ধরার বেদনার ভার
ৰুদ্ধে তুলি নিল যারা—তাহাদের করি নমস্কার।
সব-হরানে পার
স্বদেগের অপমানে যাহাদের দহিল অন্তর,
বন্ধন ছিড়িতে যারা মরণেরে করিয়া দোসর
বিদ্রোহের ধবজা বহি বাহিরিল রক্তসিক্ত পথে,
ঘুরিল প্রান্তরে, বনে, মরুভূমে, দুর্গম-পৰ্বতে
একা একা বন্ধুহীন—অনাহারে শীর্ণ কলেবর,-
সম্মুখে অজানা দেশ, পশ্চাতে ফিরিছে গুপ্তচর ;
মুক্তিরে বাসিয়া ভাল ফঁসি কাঠে দিল যারা প্রাণ,
কারা-কক্ষে বন্দী রহি পলে পলে করি আত্মদান
যাহারা গড়িল শুভ্র, অভ্রভেদী মুক্তির মন্দির,
তাদের চরণ প্রান্তে বার বার নত করি শির।
লক্ষ্মীর কমলবন ছাড়ি যারা জ্ঞানের সন্ধানে
বাহিরিল দিকে দিকে ; ছুটে গেল অজানার টানে
নূতন নূতন রাজ্যে, মানিল না শিলা-বজ্র-পাত,
অসভ্য বর্বর সাথে মহারণ্যে কাটাইল রাত,
সাহারার শুষ্ক বুকে তুচ্ছ করি মরু-বালু-ঝড়,
অচেনা হিংস্র-দেশে বহু দুঃখ সহি নিরন্তর
নূতন নূতন তথ্য যাহারা করিল আহরণ,
শিরে বহি সুদুর্গম শৈলশিরে তুষার-বর্ষণ
জানিতে ছুটিল যারা হিমাদ্রির রহস্য অপার,
উড়িল আকাশ মার্গে, উল্ললি পর্বত-প্রাকার,
প্রবেশিল সিন্ধু বুকে, ধরিত্রীর আঁধার বিবরে,
নির্ভয়ে ভাসিল যারা পথহীন দুস্তর সাগরে-
মানিলনা কোন বাধা, যারা শ্বেত ভল্লকের দেশে
তুষার-ঝঙ্কার সাথে নিশিদিন যুদ্ধ করি শেষে
সৰ-খরাদের গান
ঘুমায়ে পড়িল হায়। যাহাদের সাধনা দুর্বার
নব নব জ্ঞান-রত্নে সাজাইল বিশ্বের ভাণ্ডার,
বন্য-জন্তু-সমাকুল মরুভূমে করিল উদ্যান
সেই সব বীরদলে ভক্তি ভারে করি অর্ঘ্য দান
No text on this page.
No text on this page.