Makardah Saraswat Library, Howrah
Sonar Bandhan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
| MAKARD। -:). "
সােনার বাঁধন
SWE
Estd:-1919
৮ ০৩৪
সাহিত্য
নির্মল
পীঠ
রেলওয়ে
সিরিঞ্জ
E
প্রথম মুদ্রণ
মুনীন্দ্রপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী
১। এক টাকা
hচিত্রাভিনয় স্বত্ব প্রকাশকের।
--ও প্রকাশক :- শ্রীগােষ্ঠবিহারী দত্ত শ্ৰীশরৎচন্দ্র পাল কমলিনী-সাহিত্য-দর পরিচালিত নিম্মল- সত্য-পীঠ ৯, কর্ণওয়ালিস , কলিকাতা। -রেলওয়ে সিরিজে আ দেশহিতে আত্মনিবেদিতপ্রাণ অদ্বিতীয় সজ-সংস্কারক “মালঞ্চ”-সম্পাদক সেই কালীপ্রসন্ন দাশগুপ্ত এম-এ প্রণীত পুরাঙ্গনা শুদ্ধাস্তচারিণী মা-লক্ষমীদের সংসার সাহারার মরিচীকান্তি দূর করিবার জন্য প্রকাশিত হইয়াছে সম পুস্তক.এ তাগিদ আরম্ভ করুন | ==== আনন্দময়ী-প্রিন্টিং-ওয়ার্কস কলিকাতা-২৫ নং নিমতলা ঘাট ব্রীট হয় الهلال المعتل
=
তমসাচ্ছন্ন উপন্যাস-সাহিত্যাকাশে
বিদ্যুৎ বিকাশ ।
?
• নবাব আলীবর্দীর স্নেহ-পলি -
বাংল-মসনদের সৌখীন-আলাল:-
বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার-নবাব-দুলাল
নবাব-তকের বুনিয়াদি নবাব
- সেই
নবাব সিরাজউদ্দৌলা ।
কমলিনীর'- ‘রাজপুতের মেয়ে প্রণেতা
শ্ৰীযুক্ত প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সাধের রচনা
চিত্ৰবহুল নবাবী-উপাখ্যান
নবাব
সিরাজউদ্দৌল৷
বি-বিশ্রুত-চিত্রশিল্পীগণের
বিশ্ববিমােন চিত্রাবলী ভূষিত হইয়া
শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে।
B
No text on this page.
و مو با A1، a1 ۱۶:(: , , , সােনার বাঁধন প্রথম পরিচ্ছেদ “ফুটবল ম্যাচ খেলিতে যাইয়া নিরাপদ যখন গুরুতর চোট খাইল, তাহার জ্ঞান চৈতন্য তখন কিছুই ছিল না। খেলােয়াড়ের দল এবং দর্শকমণ্ডলীর মধ্যে অনেকেই তাহার সংজ্ঞারহিত দেহ- বেষ্টন করিয়া তখন সেবা করিতে লাগিল। কেহ পথ করি- তেছে, কেহ মাথায় বরফ দিতেছে, কেহ তাহার দক্ষিণ হস্তখানা ধীরে ধীরে টানিয়া-টানিয়া সােজা করিবার চেষ্টা করিতেছে, কেহ আহত হাতখানির উপর বরফ লাগাইতেছে, কেহ মুখে চখে জলধারা দিতেছে আর কেহ কেহ বা অলস্যের হাই তুলিয়া মজ। দেখিতেছে। সংসারে কত প্রকারের লােকই আছে। সে যাহাহউক, এত সেবা ও যত্নেও নিরাপদর কিন্তু জ্ঞান হইল না। কাজেই গাড়ী ডাকাইয়া তাহাকে হাসপাতালে পাঠাইতে হইল। খেলা অবশ্য তাহাতে বন্ধ হইল না ; নিরাপদ স্থানান্তরিত হইবামাত্র খেলা যেমন চলিতেছিল, তেমনই চলিতে লাগিল।
সোনার বঁধন নিরাপদর পিতা বমপদ অত্যন্ত দরি “ব্যক্তি। বামপদ যখন শুনিলেন, তার পুত্র খেলায় চোট ইয়া অচৈতন্য অবস্থায় পড়িয়া আছে, তখন তঁাহার মিনার তব অববি রহিল না। নিরাপদর সামান্য চাকুরীর আগেই তার সংসার চলে। বামপদ পূর্বে চাকরী করিতেন। ব্যবসায় বৃত্তিও তাহার কিছু কিছু ছিল। কিন্তু গ্রহ ফেরে এখন হর চাকরীও গিয়াছে, আর ব্যবসায় ও নষ্ট হইয়াছে। সংসারটী ও তার নিতান্ত ছােট নহে। চারিটি পুত্র, তিনটি কন্য, তিনি স্বয়ং এবং তাহার পত্নীকে লইয়া সসরে খাইতে নয়টি প্রাণী ! কন্যা তিনটীর মধ্যে দুইটীর বিবাহ হইয়া গিয়াছে--তাহার মধ্যে একটি বাল বিধবা, আর একটি দরিদ্র স্বামীর পত্নী। কাজেই অক্ষমতা সত্ত্বেও বৃদ্ধ বামাপদকেই তাহাদের ভরণ পােষণের ভার গ্রহণ করিতে হইয়াছে। পুত্রগণের মধ্যে নিরাপদই বড়- অন্যান্য পুত্র গুলি অল্পবয়স্ক । এক সওদাগরি আনিসে নিরাপদ করী করে—পঞ্চান্নটী টাকা বেতন পায়—তাহাতেই কায়ক্লেশে তাহাদের সংসার এক প্রকারে চলে। আর গুটি পঞ্চাশেক টা হইলেই বামাপদর সংসারটি বেশ সুচারুরূপেই চলিত। কিন্তু সে টাক আসে কোথা হইতে ? বানাপদ আশা করিতেছিলেন, তাঁহার অন্যান্য পুত্র গুলি একটু মানুষের মত হইলেই তাহাদের চাকরীর চেষ্টা করিবেন। তাহারা কিছু কিছু আনিতে শিখিলেই সংসারের আর দুঃখ কষ্ট থাকিবে না এমন সময়ে এই বিপদ। বামাপদ তাহার গৃহিণী মাতঙ্গিনীকে ডাকিয়া বলিলেন- “এখন করি কি বল দেখি? আমার ত অন্নাভাবে, চিন্তাভারে এই ভগ্ন শরীর। একটি পাও চলবার শক্তি নেই। এখন হাঁস-
সােনার বঁধন
ওরে ও
मन
?
পাতালেই বা যাই কেমন করে আর খরচ এই ব! 5ংলই
.কোথা
থেকে ? হতভাগা ছেলেকে কতদিন এfx
ছোড়া, ও সব অসুরের খেলা খেলিসনে রে গেল ।
খেলা কি গরীবের ছেলের সাজেরে ?
সখ করতে গিয়ে সর্বনাশ করলে আমার।
এন কবি
কি বল দেখি?”
বামাপদ যাহার নিকট পরামর্শ চাহিলেন, ই:1 পরামশ
দিবার শক্তি যে কতটুক, তা বােপর অনিকি ? ছিল না ।
কিন্তু মজ্জমান ব্যক্তি প্রাণ পাইবার আশায় যেমন পড কটা ও
ধরিয়া থাকে, বামাপদ সেইরূপ মাতঙ্গিনীর বেশ চাহিতে
লাগিলেন। পীড়িত পুত্রের অবস্থার বিষয় অবগত হইয়া জননী
তখন সাতিশয় উদ্বিগ্না হইয়া পড়িয়াছেন । অন্য স: ইলেও এ
তিনি একটু আধটু পরামর্শ দিতে পারিতেন।
তিনি আর কোনও কথাই কহিতে পারিলেন ন'...করিত
লাগিলেন কেবল অ শ সির্জন।
কিন্তু কাদিলেই ত আর বিপদমুক্ত হইতে প র যায় না।
বামাপদ তখন গাড়ী ডাকাইয়া হাসপাতালে যাইবার বাবা করিতে
লােগিলেন। বিপদে পড়িয়া তিনি কিছু বল সঞ্চয় করিয়াছেন ।
যিনি সে বল সঞ্চয় করিতে পারেন, বিপদ হইতে উদ্ধার ল"
করা তঁাহার পক্ষে অসম্ভব নহে।
নিরাপদর মধ্যম সহােদর তারাপদ গাড়ী ঢাকিয়া আনিয়া
যখন বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল, তখন আর একখানা গাড়ীও
সেই বাটীর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল। সে গাড়ীর অ'রােহী--
মপ্লিনাথ-নিরাপদর একজন বন্ধু—ফুটবল খেলার একজন সহচর।
সােনার বাঁধন মল্পিনাথ হাসপাতাল হইতে ফিরিয়া আসিয়া সংবাদ দিল যে নিরাপদর জ্ঞান হইয়াছে, আর ডাক্তার বলিয়াছেন, হাতখানা যদিও ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, নিরাপদর জীবনের কিন্তু আশঙ্কা নাই। মাযার চেষ্টা খুব সাঘাতিক নহে, তবে হাসপাতালে নিরাপদকে এখন দশ পনের দিন থাকিতে হইবে। না থাকিলে রােগী সম্পূর্ণ- রূপে নীরােগ হইতে পারিবে না। সংবাদটা শুনিয়া বামাপদ কতকটা সুস্থির হইলেন বটে, কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিন্ত হইতে তিনি কিছুতেই পারিলেন না। হাস- পাতালে যাইবার জন্য বিশেষ ব্যস্ত হইয়া পলিন। মাতঙ্গিনীরই সে বিষয়ে বিশেষ জিদ। বৃদ্ধের শারীরিক অবস্থা দেখিয়া মল্লিনাথ কহিল--- “আপনারা অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? আমি বছি, সেখানে যাবার আপনাদের কোনাে দরকার নেই। আমাদের বাড়ীতে যা চিকিৎসা হয়, হাসপাতালের চিকিৎসার ব্যবস্থা তার চেয়ে ঢের ভাল। অমন ডাক্তার, অমন ওযুধ, 'অমন পথ্য আর অন সেবা গৃহহ লােকের বাড়ীতে হবার উপায় আছে কি? আমি নিজের চঃখে সব দেখে এসেছি। তাই এ কথা বলতে পাচ্ছি। সে যা হক, নিরাপদ আমার সঙ্গে কথাবার্তা কয়েছে—সে এখন অনেকটা ভাল আছে। কেন আপনারা ব্যস্ত হচ্ছেন ? আর আপনি গেলেই কি এখন তাকে দেখতে পাবেন ? হাসপাতালে রােগী দেখা শুনা করবার একটা সময় আছে। সে সময় এখন উত্তীর্ণ হয়েছে। রাত, এখন প্রায় দশটা—এখন কি আর আপনি সেখানে যেতে পাবেন ? তা'রা ত ঢুকতে দেবে না।” কথাগুলা বামাপদ বুঝিলেন-বুঝিয়া নীরব হইয়া রহিলেন।
সােনার বাঁধন
মল্লিনাথ কহিতে লাগিল—“দেখুন, নিরাপদ বছিল, তার আসি
বড় খারাপ। কামাই বেশী হ'লে হয়ত তার চাকরীটুকুও যেতে
পারে। তা আমি অবশ্য তার অেিস খবর দিব। কিন্তু ইতি-
মধ্যে যদি আপনাদের কোনাে কিছুর দরকার হয়, তা
তা'হলে আমাকে এই—এই—আমাকে না
হয় বলবেন। আমি
চেষ্টা
কবুব-যাতে আপনাদের কেনাে কষ্ট না হয়।”
অপরিচিত যৌবননান্মুখ বালকের অযাচিত সাহায্যদানের কথা
শুনিয়া বামাপদ বিস্ময়-মুগ্ধ না হইয়? আর থাকিতে পারি
। কৃতজ্ঞতার অশ্রু বিসর্জন করিতে করিতে বামাপদ জিজ্ঞস
করিলেন—
“তুমি থাক কোথা বাবা?”
“এই আপনার বাড়ীর খান কয়েক বছর পরে।”
"কৈ, তােমার ত কখনাে নিরাপদর কছে দেখিনে বাবা ।”
“আজ্ঞে না, আবশ্যক না হলে আমি কোথাও বড় একটি
যাই না। নিরাপদর সঙ্গে খেলাধূলা করি—তাতেই তার সঙ্গে
আমার সামান্য আলাপ পরিচয় ছিল। আজ 'র ভারী বিপদ,
তাই আলাপটাও খুব বেশী হয়ে গেল।”
অদ্ভুত বালকের অদ্ভুত কথা শুনিয়া বামাপদ বিস্ময়ব্ধ হইয়া
রহিলেন। কিছুক্ষণ পরে মল্লিনাথকে তিনি আবার জিজ্ঞাসা
করিলেন--
“তুমি কি কর বাবা?”
“আজ্ঞে, পড়ি।”
“তা আমাদের সাহায্য করতে তুমি টাকা পাবে কোথায়?”
“সে কথা, জিজ্ঞাসা করবার কারাে অধিকার আছে কিনা,
সােনার বঁধম
যদি তা করতে
সেট ঠিক আমি জানি না। যাইহক, আমি আপনাদের কিছু
কতে পারি ব'লে আমার বিশ্বাস আছে।
অনুমতি দেন, তা হলে আমি আপনাকে আপনি ধন্য মনে
করব। এখন আসি তবে-দরকার '।
ডেকে পাঠাবেন।
কাকতুয়া ওলা বাড়ীতে আমরা থাকি।”
মল্লিনগি আর কোনও কথা না বলিয়া চলিয়া গেল। বানাপদ
ভবতে লাগিলেন—অপরিচিত বালকটি শকি-ন! সারল্য ও
করুণার প্রতিমূর্তি।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
নিরাপদকে হাসপাতালে পড়িয়া থাকিতে হইয়াছিল অনেকদিন।
তার ভাঙ্গা হাতখানা জোড়া লাগিল বটে, কিন্তু কাৰ্য্য করিবার
শকি হইতে সে হাত চিরকালের জন্য বঞ্চিত হইল। মাথায় চোট
লগ।। জন্য ও তাহার বুদ্ধি বিবেচনা একটু কমিয়া গিয়াছিল।
নো; কও----হাসপাতাল হইতে যখন সে বাহির হইয়া আসিল,
নিরাপদ তখন দুৰ্বল, স্বাস্থ্যহীন, সহায় সম্পদহীন—চাকুরীটি পর্যন্ত
তাই । নষ্ট হইয়া গিয়াছে। ডাক্তারেরা বলিয়া দিয়াছেন—এখন
কিছুকাল তাহাকে চুপ করিয়া বসিয়া থাকিতে হইবে ; পরিশ্রমের
কাশ্য এখন সে কিছুই করিতে পারিবে না।
আদেশ ত ডাক্তারেরা করিয়া বসিলেন—কিন্তু বামাপর সংসার
চলে কিরূপে? সংসারটাকে মাথায় করিয়া যে এতদিন রাখিয়াছিল,
সেই যদি অকর্মণ্য হইয়া পড়িল, তবে সংসার চালায় কে? তারাপদর
সােনার বাঁধন ; বয়স হইলেও চাকুরী করিবার বয়স অবশ্য তাহার এখনও হয় নাই। আর চাকুরীই বা তাহার করিয়া দেয় কে ? চাকী মিলিলেই বা সে তাহা রক্ষা করে কেমন করিয়া? যে বিদ্য! • 'কিলে চাকরী করা সম্ভবপর হয়, সে বিদ্যা তাহার একটুও নাই ?ম:পদর তৃতীয় ও চতুর্থ পুত্র উমাপদ ও শ্যামাপদ এখনও অপ্রপ বরঙ্গ-তাহাদের ত কথাই নাই। সুতরাং সংসার লইয়া বামাপদ বিপন্ন হইয়া পড়িলেন । সকল জ্বালা মানুষ সহ্য করিতে পারে, কিন্তু উদরে জ্বালা কেই সহ্য করিতে পারে না। উদর পূর্ণ থাকিলে মানুষ দেবতা হইলেও হইতে পারে; কিন্তু উদর খালি থাকিলে সেই মানুষ পশুর ও অপম হয়। সংসারে এত যে উদর-আলা বাড়িয়াছে, সে জ না যে হওয়াই সম্ভব, নিরাপদ সে কথা মনে মনে জানিত। তবে কোনও কথ; এ পর্যন্ত কেহ তাহাকে শুনায় নাই। তাহার শরীর অসুস্থ --তাহাকে এ সকল কথা শুনাইয়া লাভই বা কি ? কিন্তু অল্প কষ্টের যন্ত্রণা আর কতদিন লুকাইয়া রাখিতে পারা যায়? কাজেই রুগ্ন নিরাপদ শয্যায় পড়িয়া-পড়িয়া অন্ন কষ্ট পীড়িত পিতা, মাতা, লতা, ভগিনীর অবস্থা অচিরেই স্বচক্ষে দেখিল এবং অনন্যোপায় হইয়া অশ্রু বিসজ্জন করিতে লাগিল। এতদিন চক্ষের জল না ফেলিয়া যে সে কতকটা স্থির থাকিতে পারিয়াছিল, তাহার কারণ—তাহার বিশ্বাস ছিল, হয়ত ঋণ করিয়া তাহাদের সংসার চলিতেছে। কিন্তু ঋণ তাহাদের দিবে কে? দরিদ্রকে কি কেহ ঋণ দেয় ? ঋণ দান ও ঋণ গ্রহণ! যাহাদের মধ্যে চলে, বামাপদ সে সম্প্রদায়ভুক্ত নহেন, সুতরাং অন্নাভাব ও বস্ত্রাভাবের যন্ত্রণা অনুভব করা তাহার পক্ষে অনিবার্য।
সােনার বাঁধন নিরাপদ অনেক কাদিয়া, অনেক ভাবিয়া একটা উপায় স্থির করিল। মলিনাথকে পত্র লিখিয়া ডাকাইয়া আনিয়া সে কহিল- “হাঁ ভাই, তুমি শুলেম্ বাবাকে বলে গিছলে, আমাদের সংসারে অভাব দুঃখ হ'লে, তােমাকে জানালে তুমি তার প্রতিকার করবে” একটা দেশলায়ের বাক্স, এক গােছ চাবির হােড়া ও মুখবন্ধ করা একখানা ছুরী বাজীকরের মত দুই হস্তে লুফিতে লুফিতে নিরাপদর কথায় বাধা দিয়া মল্লিনাথ কহিল- “তা' নয়—ও সব কথা আমি বুঝি না। কোনাে কথা আমাকে জানান হয়েছিল কি?” “নাই যদি জানান হয়-তােমারও কি খোজ নিতে নেই?” “কেন তা’ নেব? একটা কথা উপযাচক হ'য়ে বলেছিলেম ব'লে অপমানিত হয়েছিলেম ; খোজ খবর নিলে আরাে বেশী অপমানিত হবার সম্ভাবনা মনে করে আর কোনো খবরই রাখিনে।” “কি বলছ তুমি?” “ঠিক বলছি - সত্যের মত সত্য সত্য বলছি। ইচ্ছা করলে তুমি কর্তাকে জিজ্ঞাসা করতে পার।” "তুমিই বলনা ভাই, কি হয়েছে।” “বলব? বলছি--তবে শােন। সেদিন আমি কাকে বলেছিলেন, যদি কিছুর আবশ্যক হয়, তা হলে আমাকে বলবেন ! তার উত্তরে কর্তা কি বললেন জান? বলা হ'ল–সাহায্য করতে তুমি টাকা পাবে কোথা ? এমন সব কথা যেখানে হয়, সেখানে মল্লিনাথ আসে না-বুঝেছ হে নিরাপদ? পাব কোথা?চুরী ক'রে, ডাকাতী ক'রে—তা’ •• সােনার বাঁধন পারি ত ভিক্ষে করে ! কিন্তু সে সব কথা তার জিজ্ঞাসা কবার দরকার ছিল কি ?” মল্লিনাথের স্বভাবই ঐরূপ। তাহার আত্মমর্যাদা-জ্ঞান অদ্ভুত প্রকারের। নিরাপদ সে সম্বন্ধে কতকটা কয়েকজন বন্ধু বান্ধবের নিকটে পূৰ্বেই শুনিয়াছিল, আর কতকটা আজ স্বচক্ষে দেখিল । সে যাহাহউক, নিরাপদর অনুনয়, বিনয়ে সে সম্বন্ধে একটা মীমাংসা সহজেই হইয়া গেল। সেইদিন হইতে নিরাপদদের সংসারে অন্নকষ্টটা আর রহিল না। তৃতীয় পরিচ্ছেদ মাতঙ্গিনী তাহার কনিষ্ঠা কন্যা সরযূকে ভৎসনা করিয়া কহিলেন-- “হরে, তাের দিদিরা থাকতে তুই মাছ কুটতে গেলি কেন বল দেখি ? যা’ পারি না, তা'তে হাত দিস্ কেন? কই মাছ সে বড় ভালবাসে ব'লেই বাজার থেকে অমন বড় মাছ দুটো আনান গেল। আর তুই কেটে-কুটে অমন বড় মাছ দুটোকে যাচ্ছেতাই ক'রে দিলি । ধন্যি মেয়ে যা হক । সরযু দোষ করিয়াছিল-সে আর কথা কহিল না। চুপ করিয়া সে দাড়াইয়া রহিল। তাহার বড়দিদি বিভাবতী জননীকে বুঝাইয়া কহিতে লাগিল “ছেলে মানুষ, করে ফেলেছে এক কাজ--ব’কলে আর কি হ'বে বল মা ? তারুকে তুমি আর একবার বাজারে পাঠাও- আর দুটো মাছ দেখে শুনে আসুক।”
১৪
সােনার বাঁধন
তপ্ত কড়ায় মসলা-মাখান মাছ দুইটা মুখ লুঙ্গী সহকারে ফেলিয়া
দিয়া মাতঙ্গিনী কহিলেন--
“এই রাত্রে বাজার তােমাদের জন্য খােলা আছে, আর মছও
জিয়ন অাছে ! য' দেখতে পারিনা দুচক্ষে, ঠিক সেই কাজ গুলােই
তাের ক'রে বসবি।”
সরযূ অপ্রতিভ হইয়াছিল। তবে তাহার বড়দিদির মধ্যস্থতায়
লজ্জার হাত হইতে কোনও প্রকারে সে রক্ষা পাইল।
সরযূর
মেজদিদি সরমা তখন রন্ধনশালার একটা কোণে বসিয়া দুলিয়া
দুলিয়া ময়দা মাখিতেছিল। এতক্ষণ পর্যন্ত কোনও কথাই সে কহে
নাই। সরযুর উদ্দেশ্যে এইবার সে কথা কহিল । সরমা বলিল --
মেয়ে মানুষের কাজকর্ম অত নােংরা হওয়া ভাল নয়—বুঝলি
সরযু। না তাের ভালর জন্যই তােকে অত কথা বলছেন। মল্লিদা’
যখন খেতে বসবে, তখন ম' কেমন করে ও মাছ পাতে দেবেন
বল দেখি?
বিভারতী কহিল--
“তা'র আর কি-মা না দিতে পারেন, সরই না হয় দিয়ে
আসবে।
মল্লিনা সেই সময়ে রন্ধনশালার দাওয়ায় আসিয়া “চ্যাপটালি”
খাইয়া বসিয়া জিজ্ঞাসা করিল -
কি রাধছ মা ?”
মাতঙ্গিনী শশব্যস্ত হইয়া কহিলেন--
“এস বাবা এস। এই তােমার তরে কই নাছ দুটো রব ছি
২ ব'। তা' পােড় মেয়ে সরযু মাই দুটো কুটতে গিয়ে সব নষ্ট
করে ফেলেছে। তাই আমিও বছিলুম আর সরমাও বছিল।”
সােনার বাঁধন মল্লিনাথ হাততালি দিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল- “বেশ করেছে, বেশ হয়েছে—আবার মাছ কিনে , ত ? রাঁধ, তবে আমি খাব। ভাঙ্গা গুড়ো মাছ, অমিত ক ছুতেই খাবনা। কেমন সরযূ, কোন জব্দ ? আমার পাশে চু দিয়ে আমার মুখ পুড়িয়ে দেবে কি আর? ক্ষমা চাও, ন'কে : নও, তবে মাপ করব—আর ঐ ভাঙ্গা মাছ খেতে রাজা : ; কিছুতেই আজ তােমাদের বাড়ী খাচ্ছিনা। চাও মাপ-দ। ও ২ । সরযূ অন্যায় করিয়াছিল—কাজেই ভয়ে ভয়ে সে কম হয় ফেলিল। তখন মলিনাথ হাসির রােলে চতুর্দিক নিনদিক বাহিরে ছুটিয়া চলিয়া গেল। বিভাবতী, সরমা প্রভৃতি ও তার হাসিয়া থাকিতে পারিল না। মাতঙ্গিনী হাসিয়া বলিলেন- “ভারী আমুদে ছেলে।” বিভাবতী কহিল-- “আর রাগও তেমনি। পাণ থেকে চুণ খণে আর ক্ষ। থাকে না। তবে মিষ্টি কথার গােলাম—চ'খ রাঙ্গালেই মুস্কিল মাতঙ্গিনী। বড় মানুষের ছেলে—চ’খ রাঙ্গানির ধর ধরে ও কার ?” বিভাবতী। ধারধারির কথা হচ্ছে না--ওর স্বভাবই এ রকম । সরমা। অত বড়লােকের ছেলে, কিন্তু চাল-চলন্ ট স ম লােকের মত। ছেড়া কাপড়, কাল জামা, চটি জুতাে এই ত মলির সাজ। মাতঙ্গিনী। কিন্তু মনটা ভারী উচু ওর। এই দুঃসময়ে কি নাথকে না পেলে আমাদের না খেয়েই মারা যেতে হত।
সােনার বাধন মাতঙ্গিনী অনেক চেষ্টা করিযাও মরিনাথ কিছুতেই বলিতে পারেন না। মল্লিনাথকে তিনি মল্লিকৃনথি বলিয়া থাকেন। সেই কারণে তাহার পুত্র কন্যারা কথাটা লই একটু রঙ্গ করে। বিভাবতী হাসিতে হাসিতে বলিল-- “তুমি কোন মল্লিকের কথা বলছ মা, বসু মল্লিক না শুধু মল্লিক?” } বিভাবতীর মনের কথাটা কি, মাতঙ্গিনী তাহা বুঝিতে পারিলেন। মৃদু হাসিয়া তিনি কহিলেন— “আর বুড়াে মানুষ না, অত শত নামের মানে জানিনা। যাই হক, কর্তা বলেন, মল্লিকনাথ আর জন্মে আমাদের কেউ না কেউ ছিল। তা না হলে এত করাটাও করে গা ! লােকের আপনার জনও এত করেও নকআর করতে জানেও না।” ছুটিতে ছুটিতে হাসিতে হাসিতে মপ্লিনাথ আবার আসিয়া উপস্থিত হইল। সে কি হাসি, আর কি নৃত্য! মল্লিনাথের কাণ্ড দেখিয়া সরযূর জর আসিবার উপক্রম হইল। মল্লিনাথ সরযুর হাত পরিয়া কহিল- “চল, এখন কর্তার কাছে। সব কথা আমি তাঁকে ব'লে দিয়েছি।” কোনও সমালােচক সে স্থানে উপস্থিত থাকিলে নিশ্চয়ই বলিত,—এ কাজটা মল্লিনাথের ভাল হয় নাই। ভয় পাইয়া যে একবার ক্ষমা চাহিয়াছে, মল্লিনাথ তাহার নামে আবার স্থানান্তরে অভিযােগ করিতে যাইল কেন? মল্লিনাথের সৌভাগ্যক্রমে সেরূপ শ্রেণীর কোনও সমালােচক সে স্থানে উপস্থিত ছিল না। সুতরাং মল্লিনাথ আসিল আর সােনার বাঁধন অবলীলাক্রমে সরযুকে “পাকড়াও” করিয়া কর্তার নিকট হাজির করিল। সরযু ও মল্লিনাথ চলিয়া যাইবার পর মল্লিনাথদের পুরাতন ভৃত্য রন্ধনশালার দাওয়ায় আসিয়া উপস্থিত হইল। মল্লিনাথের জননী , গঙ্গাদেবী পুত্রের আহাৰ্য্য পাঠাইয়া দিয়াছেন। এমন আহাৰ্য্য পুরাতন ভৃত্যটি প্রতিরাত্রেই আনিয়া থাকে। মল্লিনাথের সঙ্গে নিরাপদদের এখন খুবই আত্মীয়তা। অতি সামান্য দিনের ভিতরই এইরূপ আত্মীয়তার বন্ধন ঘটিয়া গিয়াছে। নিরাপদদের সংসারের সমস্ত খরচ এখন মল্লিনাথকেই বহন করিতে হয়। কুড়ী বৎসরের যুবক সে ভার অনায়াসে বহন করিতেছে। মল্লিনাথ টাকাটা যােগাড় করে—জননীর বাক্স হইতে। সে তাহার পিতামাতার অত্যন্ত স্নেহের পাত্র। জনক জননী তাহাদের পুত্রের স্বভাবের কথা অবগত ছিলেন বলিয়াই তাহর হস্তে টাকা কড়ি দিতে একটুও দ্বিধা বােধ করিতেন না। মল্লিনাথ অনেক সময়েই এখন নিরাপদদের বাড়ীতে কাটায়। তবে রাত্রিকালে বাহিরে থাকিবার তাহার হুকুম নাই। মল্লিনাথের রাত্রের আহারটা হয় নিরাপদদের বাটীতে। তবে ভােজ্য সামগ্রী আসে মল্লিনাথদের বাটী হইতে। মন্বিনাথ, নিরাপদ প্রভৃতির সহিত আহার করিয়া বাড়ী চলিয়া যায়। এইরূপে তাহাদের কিছুদিন কাটিয়া গেল । তাহাতে নিরাপদদের সংসারের অনেক সুবিধা হইল বটে, কিন্তু মল্লিনাথের পড়াশুনার বিশেষ ক্ষতি হইতে লাগিল। মল্লিনাথের পিতৃদেব হরসুন্দর রায় যখন সমস্ত কথা শুনিলেন, তখন তাঁহার একটু চিন্তার উদ্রেক হইল। পুত্রকে শক্তকথা সােনার বাঁধন তিনি কোনও দিনই বলেন নাই—আজও বলিতে পারিলেন না। তবে মল্লিনাথের জননী মল্লিনাথকে আচ্ছা করিয়া ভৎসনা করিয়া কহিলেন— “দেখ বাবু, পড়াশুনায় অমনােযােগী হলে একটি পয়সাও তােমাকে দিব না। তখন টেটা পাবে।” মল্লিনাথ সতর্ক হইবার অনেক চেষ্টা করি। কিন্তু অভ্যাস- দোষ ঘটিলে আর কি সতর্ক হওয়া যায় । চতুর্থ পরিচ্ছেদ নিরাপদ সুস্থ হইয়াছে--কিন্তু বিশেষ চেষ্টা করিয়াও চাকুরী তাহার মিলিতেছে না। চাকুরীর বাজার বড় মন্দ। বিশেষ কেরাণর চাকুরী। ভাল বেতন ও খােরা পােষাক দিয়াও একটা ভাল দাস কিম্বা দাসী পাওয়া কঠিন ব্যাপার, কিন্তু পাশ-করা কেরাণী একজন চাহিলে, দশজন আসিয়া উপস্থিত হয়। এরূপ ক্ষেত্রে চাকুরীর বাজারে আগুন লাগা বিচিত্র নহে। দেশের লােক ব্যবসায় বাণিজ্যে যতদিন মনােযোগী না হইবে, চাকুরীর মায়া যতদিন ত্যাগ না করিতে পারিবে, ততদিন দেশবাসীর অন্নকষ্ট, বস্ত্ৰকষ্ট, কিছুতেই দূর হইবে না—দেশের লােক এ কথা কতদিনে বুঝিবে ? নিরাপদ, মল্লিনাথকে পাখা করিতে করিতে বলিল— “মল্লিদা, এত চেষ্টা করেও ত চাকরী একটা মিল না। তুমি দিচ্ছ, তাই সংসার চলছে। কিন্তু কতদিন আর তুমি চালাবে?”
সােনার বাঁধন মল্লিনাথ বসিয়াছিল—শুইয়া পড়িয়া কহিল- “যতদিন পারা যাবে—কিন্তু সে কৈফিয়ৎ কি তােমাকে দিতে হবে? তা বল, তা হলে স'রে পড়ি।” “সে কি ভাই, তুমি কৈফিয়ৎ দিবে কি? তােমার জন্যই এতগুলি , প্রাণী বেঁচে আছে। তুমি না এলে কি হ'ত বল দেখি?” মল্লিনাথ উঠিয়া বসিয়া চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া কহিল— “চোপ, রও, তােমার স্তাবকতা শােনবার জন্য তােমাদের বাড়ীতে পড়ে থাকি না। যা’ কর্তব্য, তাই করা হয়েছে, আর ভবিষ্যতেও তাই করা হবে। তােমার চাকুরী কবুতে হয়, তুমি • খুঁজে পেতে নাও। আমার তাতে কোনাে ওজর নাই। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তুমি চাকরী পাবে না। তা'র প্রথম কারণ-চাকুরী একবার গেলে সহজে আর পাওয়া যায় না; দ্বিতীয় কারণ—তােমার ডান্ হাতখানা জখম্ হবার পর থেকে তুমি কেরাণীর কাজে একেবারে অকর্মণ্য না হলেও, খুব কৰ্ম্মী নও। এমন স্থলে তােমাকে চাকুরী দেবে কে বল দেখি? চাকরী কি মুখের কথা না গাছের ফল যে পেলেই হ'ল ?” তিরস্কৃত নিরাপদ এ সকল প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে না পারিয়া অথবা ভয়ে না দিয়া চুপ করিয়া রহিল। মপ্লিনাথ তখনও বলিতেছে— “দেখ হে, ওসব মৎলব ছাড়। ভিক্ষায়াং নৈব চ। ভিক্ষায় কিছু হবে না। তােমার বাপের ব্যবসায় বাণিজ্য কিছু ছিল ত ? বে-তদ্বিরে সেগুলাে নষ্ট হয়ে গেছে। আমি বলি কি, সেই সব কাজ কৰ্ম্মই কর না কেন?” বামাপদ ও মাতঙ্গিনী সেই সময়ে সেই গৃহে প্রবেশ করিলেন। নিরাপদর অন্যান্য ভ্রাতা ও ভগিনীগণও তাহাদের পশ্চাতে প্রবেশ সােনার বাঁধন করিয়া যে যাহার আসন গ্রহণ করিল। মলিনাথের ইচ্ছায় বৃদ্ধ বামাপদ হইতে আরম্ভ করিয়া অন্যান্য সকলকেই সন্ধ্যার পর মল্লিনাথের নিকটে বসিয়া গল্পগুজব করিতে হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে নিরাপদদের বাড়ীতে এইরূপ গল্পের বৈঠক বসিয়া থাকে। সে বৈঠকে ধর্মতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব প্রভৃতি অনেক জিনিসেরই আলােচনা হইয়া থাকে। কোনও দিন মল্লিনাথ, নিরাপদ তারাপদ প্রভৃতিকে কিছু কিছু ইংরাজী ও বাংলা পড়াইয়া থাকে। মল্লিনাথের বয়স অল্প হইলে কি হয়—তাহার বুদ্ধি অত্যন্ত তীক্ষ। অল্প বয়সে মুরুব্বীয়ানা করিবার সুযােগ ও অবসর পাইয়া তাহার বুদ্ধি তীক্ষ্ণতর হইয়া উঠিয়াছে। তাহার উপর নিজের ইচ্ছামত সৎকার্যে অর্থব্যয় করিবার তাহার শক্তি ও সুযােগ আছে। স্বাধীন মতাবলম্বী, চরিত্রবান মল্লিনাথ বামাপদর সংসারে কর্তৃত্বের পূর অধিকার পাইয়া যে পূরাদস্তুর কর্তা সাজিবে, কর্তৃত্ব দণ্ড পরিচালন করিবে, তাহার আর আশ্চৰ্য্য কি ? তাহার চরিত্রের সেইটাই বিশেষত্ব। সে বৈশিষ্ট্য যাহার আছে, সে শিশুই হউক, যুবকই হউক আর বৃদ্ধই হউক, তাহার সম্মুখে অনেককেই মস্তক অবনত করিতে হয়। এ ক্ষেত্রে তাহাই হইয়াছিল। গল্প-গুজবের বৈঠকে সেদিন স্থির হইয়া গেল, নিরাপদ, ভ্রাতাগণের সাহচর্যে ব্যবসায় বাণিজ্যই করিবে। ব্যবসায় বাণিজ্য করিতে যে অর্থের আবশ্যক, সে অর্থ মল্লিনাথ যােগাইবে। মল্লিনাথকে ত অর্থ উপার্জন করিতে হয় না--অর্থ আসে তাহার স্নেহময়ী জননীর ভাণ্ডার হইতে। ইচ্ছায় হউক, অনিচ্ছায় হউক, গঙ্গা--পুত্রকে অর্থ দিয়া থাকেন। এরূপ স্থলে টাকা খরচ করিবার মল্লিনাথের আর ভাবনা কি? সৎকার্য্যে, বিপন্নের উদ্ধারে টাকা খরচ করিতে পাইলে ?
সােনার বাঁধন
মল্লিনাথ অনির্বচনীয় আনন্দলাভ করে—টাকা জমাইবার দিকে তাহার
আদৌ দৃষ্টি নাই। টাকা জমাইয়া তাহার তেমন সুখও হয় না।
প্রকৃতি হিসাবে রুচির বিশেষত্ব।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
“ততার সঙ্গে আর পারলুম না মল্লি, তােকে নিয়ে কি করব বল
দেখি ?”
“কেন মা, করেছি কি?”
“কি করেছিস্? তাের গায়ের কাপড় কোথায় ? এই সেদিন
গায়ের কাপড় কিনে এল, আর আজ তুই খালি গায়ে বেড়াচ্ছিস্?
ব, গায়ের কাপড় কি করলি ?”
“গায়ের কাপড় ! এঁা গায়ের কাপড় কিনে এসেছিল নাকি ?
সেখানা আমার গায়ে ছিল নাকি।”
“আবার দুষ্টামী ! আচ্ছা থাক্ তুই, আজ থেকে এক
পয়সা তােকে দিব না। দেখি তাের দান ধ্যান চলে কোথা
থেকে।”
“সে কি মা, আমার উপর রাগ করে তুমি বিপন্নদের বঞ্চিত
করবে?” ।
“তবে বল, গায়ের কাপড় গেল কোথা ?”
“নিজের মুখে নিজের কথা বলতে কি আছে মা? ভেবে নাও,
গায়ের কাপড়খানা কাকে ঠোটে করে নিয়ে গেছে, কি হারিয়ে
সােনার বাঁধন বাস, গেছে, কি বাতাসে উড়ে গেছে—এই রকম যা হয় একটা কিছু। লেঠা চুকে গেল!” কথা হইতেছিল মাতাপুত্রে। সেই সময়ে মল্লিনাথের পিতা হরসুন্দর সেইস্থানে আসিয়া পড়িলেন। পিতৃদেবকে দেখিয়াই মল্লিনাথ উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটিয়া পলাইল। হরসুন্দর, গঙ্গাদেবীকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “মলি পালাল যে?” “গায়ের কাপড়খানা হারিয়েছে, তাই তোমাকে দেখে পালাল।” “হু-হারিয়েছে। সে সন্ধান আমি পেয়ে গেছি। শীতবস্ত্রখানা মল্লি দিয়ে এসেছে কা'কে জান?—এক ভিখারীকে। এ কাণ্ড হয়েছিল শ্যামবাজারের চৌমাথায়। যারা সেখানে উপস্থিত ছিল, তাদের মধ্যে একজনের সঙ্গে আমার আলাপ পরিচয় আছে। তারই মুখে খবরটা আমি পেয়ে গেছি।” “কি করব ও ছেলেকে নিয়ে বল দেখি? পরবার কাপড়, গায়ের জামা, শশাবার বিছানা পৰ্যন্ত যে ও বিলিয়ে দিতে আরম্ভ করেছে, তার কি করি বল দেখি? ও যে আমাকে ভাবিয়ে তুলে। “কোনাে ভাবনা নাই গিন্নি। ওকে আমি আর কোনাে কথা বলি না। তুমিও ওকে আর কিছু বল না। গুরুদেবের মুখে উপদেশ শুনতে শুনতে ক্রমেই আমি ভিন্ন মানুষ হয়ে পড়ছি। তারই ফলে হয়ত আমার মনে হচ্ছে, অমন ছেলে অনেক তপস্যার ফলে মিলে গাে, অনেক তপস্যার ফলে মিলে।—হাউস্ওলার বাড়ীতে মুচ্ছ দিগিরি করে ত অনেক পয়সা রে আনি। ছেলের হাত দিয়ে না হয় কিছু দান খয়রাত, করাই গেল। তার জন্য আর ভাবনার কথা কি আছে?”
সােনার ধন
“ভাবনার কথা আছে বৈকি গাে। অমন উড়ন্ চণ্ডে হলে
এর পরে যে মল্লি ভারী কষ্ট পাবে—সেটা বুঝছ না। চিরদিন ত
আর আমরা থাকব না।”
“মল্লিকে কষ্ট দেয় কে ? দাতার দান তােলাই থাকে। ওর’ যা’
ইচ্ছে, ও তাই করু—ওকে আর কিছু ব’ল না।”
“তােমার আদরেই ছেলেটা মাটি হ'তে বসেছে। লেখা পড়া
পৰ্য্যন্ত ওর কিছু হচ্ছে না।”
“ঐ একটা কথা বটে! কিন্তু লেখা পড়া যে ও কিছু করছে
—তা নয়। মল্লির শিক্ষকদের মুখে শুনেছি, অন্য ছেলে যা’ এক
মাসে করে, মল্পি তা একদিনে সারে। সে অদ্ভুত মেধাবী।—এই
সব কথা শুনে আর ওর কাণ্ড দেখেই ত আর ওকে কিছু বলতে
চাচ্ছ না। না হলে আমিও কি আর ওকে ভৎসনা করতে না?”
“কিন্তু ছেলেকে যে তুমি ভারী আদর দাও—সেটা আর অস্বীকার
কতে পার না।”
“কে জানে কার কথা কতটা সত্য। ছেলেটা ত আমার কাছে
একবার আসে না পৰ্যন্ত--আবদার করা ত দূরের কথা। আমার
বােধ হয়, আদরটা পায় তােমার কাছ থেকেই বেশী। সে কথাটী
কিন্তু একবারও বলছ না। মানুষের নিজের দোষ লুকানও
একটা স্বভাব।সেই কারণে তােমাকেও আর দোষ দেওয়া
চলে না—কি বল গিন্নি?”
“ভালং এখন থেকে তা হলে আমিই মল্লিকে শাসন করব।
—ওর হাতে আর একটী পয়সাও দিচ্ছি না—তা হ'লেই ও দুরন্ত
হয়ে যাবে।”
“ও কাজটা কর না গিন্নি, ও কাজটী কর না। তা হলে
সােমার বঁাধন
ছেলেটা একেবারে বিগড়ে যাবে। যে যার কাজ নিয়ে সংসারে
এসেছে। সে কাজে বাধা দেওয়া চ'লে কিগা? বাধা টিকবে
কেন? বাধা পেলে অনেক সময়ে মানুষটা ঠিক উল্টো হয়ে যায়।
আমার বয়স হয়েছে অনেক-অনেক দেখেছি—অনেক শুনেছি--
তাই তোমাকে এসব কথা বলতে পারছি। মানিয়ে শাসন করতে
পার, কর—তাতে আমার কোনও আপত্তি নাই। কিন্তু সীমার
বাইরে যেও না—তা হ'লেই মুস্কিল হয়ে যাবে।”
“তুমি কি বল, আমি তার কিছুই বুঝতে পারি না। তােমার
ভয়েই মল্লিকে আমার আর শাসন করা হল না। কে জানে তার
ফল কি হবে।“
“মল্লি শাসনের ছেলে নয় গাে। গুরুবাক্যে বিশ্বাস কর—সব
ঠিক হয়ে যাবে। মল্লি এসেছে, একটা ভারী কাজ ঘাড়ে করে।
জীব ও জগতের মঙ্গল সাধন করা—একটা খুব বড় কথা। সে
কথাটা ছেড়ে দিলেও মনে করতে পারি—খুব একটা ভারী
কাজ মল্লির হাতে আছে।
সেই কাজের কাজী হবার জন্যে
সে এখন থেকে প্রস্তুত হচ্ছে। আমাদের বেহুদা শাসন ও মানবে
কেন? ওর দূর ভবিষ্যৎ আমি যেন খানিকটা দেখতে পাচ্ছি।
তা দেখে আমার যেন গৌরব হচ্ছে, স্পর্ধা বাড়ছে।”
“কি বলছ তুমি?”
“কিছু না, কিছু না। পাচটা নয়, সাতটা নয়—একটা ছেলে।
তা'কে অত শাসন করবার আমার সাধ্যও নাই, আর ইচ্ছাও
নাই। তবে শাসন করবার চেষ্টা করতেন, ছেলে যদি বদ হত।
কিন্তু ভাল ছেলেকে শাসন করে মন্দ করি কেন? কথাটা বুঝলে
গিৰি ?”
সােনার বাধন “না—একটুও না।” “তবে বুঝতে আর পারবে না—বুঝেও আর কাজ নাই। চলছে, তেমনি চলুক। কৰ্ম্মফল ভগবানের চরণে সমর্পণ ক'রে আমরা নিশ্চিন্ত হই এস।” অনেক তর্ক বিতর্কের পর স্বামীর কথাতেই পত্নীকে সম্মত হইতে হরসুন্দর বহিৰ্বাটীতে চলিয়া গেলেন—গঙ্গাদেবী বসিয়া ভাবিতে লাগিলেন—শাসন ভাল, না ভগবানের উপর নির্ভর করা ভাল । ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ সরমা, সরকে এতদিন যে চক্ষে দেখিত, এখন আর ঠিক সে চক্ষে দেখিতে পারিতেছে না। এরূপ ব্যাপারটা যে কেন ঘটল, সরমা, সরযুকে যে কেন লাঞ্ছিত করে—গঞ্জনা দেয়, তাহা মাতঙ্গিনী ও বিভাবতীর পক্ষে বুঝিয়া উঠা কঠিন হইয়া দাঁড়াইল। সরযূর চলা, বলা, বসা, দাড়ান, কাজ কর্ম কিছুই সরমার পছন্দ হয় না। ঘােট ব’ন বলিয়া সরযূর উপর সরমার এতটুকুও টান নাই ! নিদাঘ- মধ্যাহ্নের আতপ-তাপ যেরূপ জ্বালাদ, সরমার বাক্য-যন্ত্রণাও- সরযুর পক্ষে সেইরূপ লাপ্রদ হইয়া উঠিতে লাগিল। অথচ কেহই বুঝিতে পারিল না—ইহার হেতু কি—সরযুর উপর সরমার এত রাগ কিসের জন্য। বিভাবতী সরমাকে জিজ্ঞাসা করিল- সােনার ধন “হ্যা সরমা, সরযু তাের দুটি চক্ষের বালাই হয়েছে, কেন বল দেখি? ছােট ব'ন, আজ বাদে কাল পরের ঘরে চলে যাবে। তার সঙ্গে কি অমন করতে আছে ভাই?” চ’খ, মুখ রক্তবর্ণ করিয়া সরমা কহিল- “কি করব আবার? আমার দোষ কি বল ? অত বড় বুড়াে হাতী মেয়ে—একটা কাজ জানে না, কৰ্ম্ম জানে না; যাতে হাত দেবে, তাই নষ্ট করবে, আর নেচে নেচে হেসে হেসে বেড়িয়ে বেড়াবে-তা’ দেখে আমি কি চুপ করে থাকব? তােমরা সহ্য করতে পার, আমি কিন্তু তা পেরে উঠিনা ।” বিভাবতী হাসিয়া বলিল - “তাহলে এখন থেকে আমাদের বুঝতে হবে যে সংসারের সকলকে শাসন কবুবার ভারতের হাতে–কি বল?” “তা কেন? আমি কি তাই বলছি ? তবে এটা তবে এটা বলতে পারি যে সরযূ এখন ভারী বেয়াড়া হয়েছে। আইবুড়াে মেয়ের এমন বেয়াড়াপণা ত ভাল নয়।” "কিসে বেয়াড়াপণাটা দেখলি তার?” “কিসে নয় তাই তুমি বল দেখি?” “আমি ত কিছুই দেখতে পাইনা। তবে তুই বলিস্ বটে। কিন্তু বেয়াড়াপণটা যে সে কি করে, তা' তুই বলতে পারি না। ছি সরমা, বনে বনে এমন ঝগড়া বিবাদ কি করতে আছে ? তা' করলে আমাদের দুঃখের সংসারে দুঃখ আরও বাড়বে ভিন্ন কমবে না।” “আমাদের সংসারে এখন দুঃখ কষ্ট কিসের ? সে বটে এক দিন ছিল-যখন দাদার রােজগারে আমাদের খেতে হত। এখন মল্লিদা’ আমাদের অন্নদাতা—আর আমাদের ভাবনা কি?”
সােনার বাঁধন একটু চখ তুলিয়া, একটু কুঞ্চিত করিয়া—একটু নাসিকা ফুলাইয়া বিভাবতী কহিল- “কি বলছিরে তুই! মল্লিনাথের উপরেও তাের রাগ আছে -"নাকি? কি সর্বনাশ! মল্লিনাথ না থাকলে যে এতদিন আমাদের সকলকে অনাহারে মরতে হত। হারে সরমা, এ তাের কেমন বুদ্ধি ? মা, বাবা, নীরু এরা এ কথা যখন শুনবেন, তখন তারা কতটা বিরক্ত হবেন বল্ দেখি ? আর মল্লিনাথের কাণে এ কথা উঠলে সেই কি তোদের বাড়ীতে আর মাথা গলাবে রে?” মল্লিদার কথা আমি কিছু বলছি নাকি?” “নাকি সুরে অমন ‘নাকি নাকি করিসূনে বছি। শােন্“আমি যা' বলি। আমি তােদর বড় বন। কপাল পুড়িয়ে বাপের বাড়ীতে প'ড়ে আছি তাহার কথায় বাধা দিয়া সরমা কহিল--- “মাথার সিদুর মাথায় নিয়ে আমিই বুঝি বাপের বাড়ীর ভাত খাচ্ছি, না?” “সেই কথাই ত আমি বলতে যাচ্ছিলুম রে। আমাদের আর এ সংসারে আগুন জ্বালান উচিত নয়। বাপ মা'র যা'তে শান্তি থাকে, ভাইগুলি যাতে বজায় হয়, কয়-মন-বাক্যে ভগবানের কাছে আমাদের সেই প্রার্থনা করাই উচিত। হ্যা সরমা, পরের ছেলে মল্লিনাথ—সে আমাদের সংসারে এতটা করে, আর আমরা সেই উপকারের যদি এমন প্রতিদান দিই, তা' হ'লে সেটা কি আমাদের পক্ষে দেখতে ভাল হবে, না ধৰ্ম্ম থাক্বে? কথাগুলাে বােঝ, সরমা।” “ওর আর বােঝাবুঝি কি আছে দিদি? মল্লিদা আমাদের শশান্ বলি-
সােনার বাধন
উপকারী লােক। তার উপর আমাদের আর রাগ গোসা কি ?
তিনি যা করবেন, তা’ই চলবে। ওর আবার কথা কি?”
“ও কথাটাও ভাল বল্লিনি সরমা।”
“আমার সবই মন্দ দিদি। কপাল মন্দ না হলে
সরমা আর কথা কহিল না—গর্জনের পর বর্ষণ আরম্ভ হইল।
বিনা কারণে সে গর্জন ও সে বর্ষণ দেখিয়া বিভাবতী একটু আশ্চৰ্য্যা-
ম্বিত হইল। তবে ভগিনীর চক্ষে জলধারা দেখিয়া বিভাবতী স্থির
থাকিতে পারিল না। সামাকে সে অনেক মিষ্ট কথা বলিল, অনেক
সান্ত্বনা দিল, অনেক প্রকারে অনেক কথা বুঝাইবার চেষ্টা করিল।
সরনা সে সকল কথা বুঝিল কিনা, তাহার স্নেহাদরে সরমার দুঃখ দূর
হইল কিনা, তাহা বুঝিবার আর বিভাবতীর অবসর রহিল না।
মল্লিনাথ তখন বাটীতে প্রবেশ করিয়াই চীৎকার করিতেছে-
‘দিদি-দিদি।”
বিভাবতীকে চলিয়া যাইতে হইল-ডাকিয়া কাহারও দেখা
না পাইলে মল্লিনাথ ভারী রাগ করে। মল্লিনাথের রাগ হইলে
সকলের সহিত কথা বন্ধ করিয়া দিয়া গভীর ভাবে সে বসিয়া
থাকে অথবা বিবাদীগণকে অত্যন্ত দূরে দূরে রাখিবার চেষ্টা
করে। এই সকল কারণে মল্লিনাথকে ক্রুদ্ধভাবাপন্ন করিতে কেহই
বড় একটা সাহস করে না।
বিভাবতী চলিয়া গেল-সরমা একাকিনী বসিয়া আপনার কথা
আপন মনে আপনার মনের মত করিয়া ভাবিতে লাগিল। কুমতি
তখন সরমার ঘাড়ে চাপিয়াছে। কুমতির ভয়ে সুমতি সরমাকে
ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল।
সােনার বাঁধন = শ , ( 4 / A + সপ্তম পরিচ্ছেদ মলিনাথের জামার পকেট হইতে “ব্যাগ” বাহির করিয়া লইয়া সরযূ বলিল— “পাচটা টাকা আমি নি?” রুমাল দিয়া চশমা মুছিতে মুছিতে মল্লিনাথ কহিল— “না বলে কা'রও কোনাে জিনিস নিলে তাকে কি বলে সরযূ ?” প্রশ্নটা শুনিয়া কিংকর্তব্য বিমুঢ়ার ন্যায় সরযূ স্থির হইয়া দাড়াইয়া রহিল । তাহার মুখ দিয়া আর কোনও কথা বাহির হইল না। বেতসলতার মত সে কঁপিতেছিল--তাহার হস্ত হইতে “ব্যাগ টী” মাটীতে পড়িয়া গেল। “ব্যাগে” যে টাকা ও “নােট” গুলি ছিল, “ব্যাগের” মুখ খুলিয়া যাইতে তাহা মেঝ্যার উপর ছড়াইয়া পড়িল । তখন মল্লিনাথের মুখে হাসি আর ধরে না। হাসিতে হাসিতে কাশিতে কাশিতে হাঁপাইতে হাঁপাইতে মলিনাথ কহিল-- “কেমন ভয় দেখিয়েছি । আমাকে না বলে না করে আর আমার ব্যাগে হাত দেবে ?” লজ্জায় সরযুর মুখ আরক্তিম হইয়া উঠিয়াছিল। কোনও কথা না কহিয়া পলাইয়া যাইয়া লজ্জার হাত হইতে রক্ষা পাইবার চেষ্টা সে করিতেছিল। কিন্তু মল্লিনাথ তাহার পথরােধ করিয়া দাড়াইয়া কহিল- “চলে যাচ্ছ যে। রাগ হয়েছে বুঝি? পাশ কাটাইয়া পলাইবার চেষ্টা করিয়া সরযু কহিল- সােনার বাঁধন “আমায় যেতে দাও মল্লিদা’ ?” “কেন টাকা চাই না?” “না।” “কেন-রাগ হয়েছে ?” “না।” “অভিমান হয়েছে?” “না।” “ক্ষিদে পেয়েছে ?” সরযু এবার হাসিয়া ফেলিল। তবে সে হাসি খুব চাপা—অধর কোণে ও নয়ন কোণে সে হাসির রেখাটুকু ফুটিয়া উঠিয়াছিল মাত্র। সরযূর সে হাসি দেখিয়া মল্লিনাথ হাসিয়াই কহিল- “রাগটা পড়েছে দেখছি। তা’ বেশ হয়েছে। এখন ক টাকা চাই বল। খোঁপাটা একটু কসিয়া বাধিতে বাঁধিতে সরযু বলিল— “চাই না।” “ই—এখনাে রাগ রয়েছে দেখছি দাড়াও, মাকে আর নিরুকে তােমার রাগের কথা বলে দিচ্ছে। তা হলেই টেটা পাবে এখন।” এ কথায় সরযূ অত্যন্ত ভয় পাইল। সে জানিত, মল্লিদা’ যদি মাকে কিম্বা কাহাকেও কোনও কথা বলিয়া দেয়, তাহা হইলে তাহাকে বিশেষরূপে তিরস্কৃত হইতে হইবে। সরযু হাত মােচড়াইতে মােচড়াইতে কহিল- “না মল্লিদা’, তুমি কা'কেও কিছু ব’ল না। তােমার পায়ে পড়ি মল্লিদা।”
সােনার বাঁধন হাসির উপদ্রবে পেট ফুলিয়া উঠিলে, চেষ্টা করিয়া যতটুকু গাম্ভীর্য রক্ষা করিতে পারা যায়, সেই গম্ভীৰ্যটুকু রক্ষা করিয়া মল্লিনাথ কহিল- “হু-তবে টাকা নেবে?” "৪+C: * { 4.0. “ক টাকা।” “এক টাকা।” “এই যে বছিলে পাঁচ টাকা ?” “আচ্ছা পাঁচ টাকাই দাও।” “তাহলে-ভয়ে বা উপরোধে টাকা নিচ্ছ ; বা উপরোধে টাকা নিচ্ছ ; টাকার দরকার তােমার নেই ? এ কথার উপরে কি কথা বলিতে হইবে, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়াও সরযু তাহা স্থির করিতে পারিল না। কাজেই তাহাকে চুপ করিয়া থাকিতে হইল। মল্লিনাথ জিজ্ঞাসা করিল-- “চুপ করে রইলে যে?” “কি বলব বল!” “ক টাকা চাই ?” “পাঁচ টাকা। “টাকা কি হবে ?” “পশম কি'নব-মা বলছিলেন, তোমার জন্য একখানা ছাটা ফুলের আসন বুনে দিতে হবে।” “কি হবে আসনে ?” “তুমি বসবে।” “আর সকলে বসবে কিসে-মটাতে, নয় !”
সােনার বাঁধন T সরষুকে আবার কথা বন্ধ করিতে হইল। মল্লিনাথ কহিতে লাগিল- “তােমার আসন তৈরী করবার সখ হয়েছে, তা না হয় কর। কিন্তু সে আসনে আমি বলছি না। মাটীই আমার আসন—মাটীর চেয়ে পবিত্র আসন আর কি আছে?” “আসনে তুমি যদি না ব’স, তা হ'লে—আসন আর বুনবও । কাজেই টাকারও আর দরকার হবে না।” “আবার রাগ—আবার অভিমান?” “কৈ, না?” “বেশ, টাকা পাচটা তা' হ'লে নিয়ে যাও। বাকী টাকাগুলাে মাটী থেকে তুলে ব্যাগে পুরে যেখানে ছিল, সেইখানে রেখে দাও। বাস, তা হলেই তােমার ছুটি। সরযূ সেই কাৰ্যেই ব্যাপৃত হইল। বামাপদ সেই সময়ে সেই গৃহে প্রবেশ করিয়া মেঝ্যার উপরে টাকা ছড়ান দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন- “আজ কাল টাকা কি তােমার এত সস্তা হয়েছে বাবা?” মল্লিনাথ কহিল- দেখুন না, সরযু রাগ ক'রে সব টাকাগুলাে মাটীতে ফেলে দিয়েছিল। আবার ভয় পেয়ে নিজেই সেগুলাে কুড়ােচ্ছ।” "সরযুর বাবা যা করতে পারে না, সরযু যদি তা করতে পারে, তা হলে তার বাহাদুরী আছে। যাক গে সে নিরু, তারাকে ত ব্যবসায় বাণিজ্য ধরা'লে। কিন্তু ওরা প’রবে কি?” “সে অঙ্গীকার ত’ আমি করতে পারি না। তবে এইটুকু কথা।
সােনার বাধন
বলতে পারি যে চেষ্টা করলে চেষ্টার ফর এক দিনে না হক,
দশ দিনেও ফলে।”
“তােমার মুখে ফুলচন্নন পড়ক বাবা। তুমিই এখন আমার
সৰ্বস্ব—তুমিই আমার ভগবান। তুমি যেমনটা বলবে, তেমনিট ।
আমাদের করতে হবে।”
“সে কথা আপনি বলেন, মা বলেন, অন্যান্য সকলেও বলে
থাকে বটে। কিন্তু সরযু তা মানতে চায় না। কি সরযু, সব কথা
বলে দেব না কি?”
সরযুর মুখে কাতরতার চিহু দেখিয়া মল্পিনাথ কাতর হইয়া
পড়িল। সে সম্বন্ধে কোনও প্রসঙ্গ মক্কিনাথ আর উত্থাপিত করিল
। ব্যবসায় বাণিজ্যের কথাই চলিতে লাগিল। নিরাপদ ও
তারাপদ আসিয়া সেই সকল কথাবার্তায় যােগাদান করিল। সেই
অবসরে ব্যাগটা মল্লিনাথের পার্শ্বে আস্তে আস্তে রাখিয়া সরযু
নিঃশব্দে ছুটিয়া পলাইল।
অষ্টম পরিচ্ছেদ
সরযুর
উপর সরমার ভারী হিংসা। মনে মনে সে কোন্ কথা
কেমন রঙ্গে রাঙ্গাইয়া ভাবিত, মুখে তাহা কোনও দিনই সে
প্রকাশ করে নাই। তবে লক্ষণ দেখিয়া বলিতে হইলে বলিতে
পারা যায় যে সরষুকে মল্লিনাথের এতটা ভালবাসাটাই সরমার রাগ
ও হিংসার বিশেষ কারণ।
সরষু, কুমারী। মল্লিনাথের সহিত যেরূপ ঘনিষ্ঠতা-সুত্রে তাহারা
৩৪
সােনার বাঁধন
আবদ্ধ হইতেছে, সরমার বিশ্বাস—একদিন হয়ত মল্লিনাথ ও সরযূ
বিবাহ-পাশে আবদ্ধ হইতে পারে। সরমা স্বয়ং দরিদ্র স্বামীর পত্নী।
জীবনে সে অনেক কষ্টই পাইয়াছে আর এখনও পাইতেছে।
সেই কারণেই সে কাহারও ভাল, বড় একটা দেখিতে পারে না।
সুতরাং তাহার ভগিনী সরষু যদি এমন “ঘর বর” পায়,
তাহা হইলে সরমার তাহাতে সুখ হইবে কেন? সরমা 'চাহে
—তাহার যেমন হইয়াছে, শুধু সরষুর কেন, পৃথিবী শুদ্ধ লােকেরই
সেইরূপ হউক। তাহা হইলে কাহারও সহিত বিবাদ বিসম্বাদ
বা কাহারও প্রতি সরমার হিংসাদ্বেষের আর কারণই থাকে না।
কিন্তু সরযূ যদি মল্লিনাথের বাম পার্শ্বে স্থান পায়, তাহা হইলে
সরমার বাঁচা কঠিন হইবে। হিংসার বড় জ্বালা।
কিন্তু এ বিবাহ যে সিদ্ধ হইবে, তাহারই বা প্রমাণ কি ?
সরষুকে
কি সত্য সত্যই ভাল বাসে? বাসে বৈ কি।
ভাল না বাসিলে, সরযুর এত উৎপাত, এত উপদ্রব মল্লিনাথ সহ
করিবে কেন? আর সর--সে ত মল্লিনাথের নামে একপ্রকার
পাগলিনী। অতএব বুঝা গেল—ইহাদের মধ্যে প্রেম-সঞ্চার
হইয়াছে।
সরমার মনে একথা উদয় হইতেই তাহার বুক ভাঙ্গিয়া গেল,
মাথায় হাত দিয়া সে বসিয়া পড়িল।
কিন্তু একটা কথা—মনািথ ও তাহারা ত এক জাতি নহে।
এক জাতি না হইলে হিন্দু শাস্ত্রানুসারে বিবাহ হইতে পারে না।
সরমার মনে একটু আশার সঞ্চার হইল। কিন্তু পরক্ষণেই আবার
তাহার মনে হইতে লাগিল--প্রেমের আবার জাতি বিচার কি ?
মল্পিনাথ যেরূপ একগুঁয়ে প্রকৃতির যুবক, সে হয়ত সরযূকে বিবাহ
মল্লিনাথ,
সােনার বাঁধন করিবার জন্য হিন্দুধর্ম ত্যাগ করিলেও করিতে পারে। পুষ্প-ধনুর উপদ্রবে অনেকেই ধৰ্ম্মের গণ্ডী কাটিয়া বাহির হইয়া গিয়াছে। মল্লিনাথই বা তাহা না করিবে কেন? তবে এ প্রথার বিবাহে কি মলিনাথের পিতামাতা অনুমতি দিবেন? কিন্তু অনুমতি পাইবার অপেক্ষা করে কে? নায়ক নায়িকার মতের উপর—চ'খের নেশার উপরই ত এরূপ বিবাহ নির্ভর করে। পিতামাতার মতামতের মূল্য সেরূপ স্থলে আর কতটুকু? সরমা বিষম চিন্তায় পড়িয়া গেল। সে ভাবিতে লাগিল---এ এ বিবাহ কেমন করিয়া বন্ধ করা যায়। এ সম্বন্ধে কাহারও সহিত পরামর্শও ত সে করিতে পারে না। মল্লিনাথের বিরুদ্ধে যাহার নিকট সে কোনও কথা উত্থাপন করিবে, তাহার নিকটই সে লাঞ্ছিত হইবে। এরূপ : কাহার সহিত সে কি কথা কহিতে পারে। অনেক ভাবিয়া চিস্তিয়া সরমা এক উপায় স্থির করিল। দুই দশ দিন গত হইলে এ কথা ও কথা কহিতে কহিতে জননীর নিকট সরম প্রস্তাব করিল “মা, সরযু ত কলাগাছের মত বেড়ে উঠছে। এই বেলা ওর বিয়ে দাও। বেশী বেড়ে উঠলে ওর বর মেলা মুস্কিল হবে।” সরমার কথা শুনিয়া মাতঙ্গিনী বিশেষ প্রীত হইলেন। তাহার ধারণা ছিল—সরমা তাহার কনিষ্ঠা ভগিনীকে দুইটী চক্ষে দেখিতে পারে না। আজ সেই সরমার মুখে সরযুর ভাবী মঙ্গলামঙ্গল সম্বন্ধে এতগুলি কথা শুনিয়া তাহার আনন্দের আর সীমা রহিল না। তিনি বিভাবতীকে ডাকিয়া বলিলেন- শুছিস বিভা, সরমা কি বলছে, শুনছিস্?”
সােনার বাধন যে কথাগুলি সরমা তাহার নিকট বলিয়াছিল, সেই কথাগুলি বিভাবতীর নিকট বিবৃত করিয়া মাতঙ্গিনী কহিলেন— “হাজার হক, মা’র পেটের ব’ন—ঝগড়া ঋটিই করুক, আর যাই করুক, সরযুর অমঙ্গল সরমা কি কখনাে মনের কোনে ঠাই দিতে পারে ?” জননীর মতেই বিভাবতী মত প্রকাশ করিল। তখন কথা হইল, সরযুর বিবাহ সম্বন্ধে মল্লিনাথের সহিত কথা-বার্তা কহিতে হইবে। মল্লিনাথের মত ভিন্ন ত আজকাল তাহাদের সংসারে কোনও কাজ হইবার উপায় নাই। এখন কর্তাকে কোনও কথা না বলিলে, তাহার সহিত কোনও বিষয়ের পরামর্শ না করিলে বরং চলে, কিন্তু মল্লিনাথের সহিত কথা না কহিলে, পরামর্শ না করিলে কোনও কাৰ্যই হইবার উপায় নাই সরমা বলিল— “মল্লিদাকে এখন অত কথা বদ্বার দরকারটা কি হচ্ছে ? মল্লিদার কাজ ত সতের রকমের—পাত্তর খোঁজ বার ভারটাও ত’র ঘাড়ে চাপালে চলবে কেন? দাদা, বাবা, আগে পাত্তর ঠিক করুন, তা’র পর মল্লিদার সঙ্গে কথা কওয়া যাবে—কি বল দিদি ?” ঘাড় নাড়িয়া বিভাবতী বলিল- “তা’ কি হয়—মল্লিনাথ কিছু জানবে না, অথচ ভিতরে ভিতরে একটা এত বড় কাজ হবে, সেটা কি ভাল কথা? মল্লিনাথ পরে সকল কথাই শুনবে—তখন সে ভারী রাগ করবে।” পা ছড়াইয়া বসিয়া মাতঙ্গিনী সুপারি কাটিতেছিলেন। সুপারি কাটা বন্ধ করিয়া যাতিখানা মাচার উপরে রাখিয়া বিভাবতীর পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাইতে বুলাইতে তিনি কহিলেন—
সােনার বাঁধন
ঠিক বলেছিস্ বিভা। তাের ভারী বুদ্ধি মা। মল্লিনাথকে না
বলে এখন কি কোনাে কাজ করা যেতে পারে । পরের
আপনার হয়েছে। তাকে চটালে, আবার পর হ'তে তা'র
কতক্ষণ? তার জন্যই আমরা সকলে দুবেলা আঁচাতে পাবছি,
লজ্জা রাখবার বস্তর পাচ্ছি—ছেলেদের একটা কাকারবারও
চলছে। ওরে বাপরে, তাকে না ব'লে কি কোনাে কাজ হতে
পারে ? কর্তার কাণে কি নিরু তারার কাণে এ কথা উঠলে
তারা আর রক্ষে রাখবে না।”
সেই পরামর্শই অবশেষে সুপরামর্শ বলিয়া স্থির হইল। সরমা
অবশ্য সে পরামর্শটাকে সুপরামর্শ বলিয়া গ্রহণ করিতে পারিল না।
তবে সে কথাটা তাহার মনে মনেই রহিল। প্রকাশ্যে তাহাকে অবশ্য
বিপরীত ভাবটাই প্রকাশ করিতে স্বার্থবুদ্ধি যাহাদের
পাপ করিতে শিখায়, এরূপ করা ভিন্ন তাহাদের আর কিছু
উপায় আছে কি?
হইল ।
নবম পরিচ্ছেদ
খুব মেঘাড়ম্বর, বিদ্যুৎ, বজ্রাঘাত ও অতিবৃষ্টির পর সূৰ্য্যালােক
দেখিলে জীবের যেরূপ আনন্দ হয়, খুব দুঃখ কষ্টের পর সুখের
ক্ষীণালােক দেখিয়া বামাপদ এবং মাতঙ্গিনী প্রভৃতির সেইরূপই
আনন্দ হইল। মল্লিনাথের অর্থসাহায্য, বুদ্ধি ও পরিশ্রমের ফলে
সােনার বাঁধন নিরাপদদের ব্যবসায় বাণিজ্য বেশ উন্নতির পথে অগ্রসর হইতেছে। ব্যবসায়-কাটা কাপড়ের--তাহাতে বেশ দুই পয়সা মুনাফা আছে। যখন ব্যবসায় চলিল, দুই পয়সা আসিতে লাগিল, তখন নিরাপদ ও তারাপদ প্রভৃতির বিবাহের জন্য ঘটক ঘটকীর যাতায়াতও সে বাড়ীতে বাড়িয়া উঠিল। একদিন যাহারা সে সংসারের খোঁজ, খবর রাখে নাই, দরিদ্রের সংসার বলিয়া যাহারা সে সংসারকে বরং ঘৃণার চক্ষে দেখিত, সময় বিশেষে হয়ত লাঞ্ছিতও করিত, তাহারাও এখন অযাচিত ভাবে বামাপদর নিকট উপস্থিত হইয়া বন্ধুভাবে বসে দাড়ায়, গল্প গুজব করে, তামাক খায় এবং বলিয়া থাকে—তাহার যেমন সােণার সংসার, এমন সংসার আজকালের দিনে বড় বেশী দেখিতে পাওয়া যায় না। ছেলেদের অবিবাহিত অবস্থায় আর বেশীদিন রাখিলে তাহাদের যে বিশেষ ক্ষতি হইবে, এমন উপদেশও অনাহুত বন্ধুবর্গ এখন অযাচিত ভাবে দিয়া থাকে। সরলস্বভাব বৃদ্ধ বামাপদর মনটাও যে তাহাতে গলিয়া না যায়, এমন নহে। তাহার উপর মাতঙ্গিনীর অনুনয়, অনুরােধও যে নাই, এমন কথাও বলা চলে না। কিন্তু বামাপদ কি করিতে পারেন—মল্লিনাথের মত, না হইলে ত তিনি কিছুই করিতে পারেন না। মল্লিনাথের কথা-সংসার আর একটু সচ্ছল না হইলে, সরকে উপযুক্ত পাত্রে দান করিতে না পারিলে নিরাপদ ও তারাপদর বিবাহ দেওয়া উচিত নহে। . মল্লিনাথের মতেই সকলের মত। তাহার অমতে কাৰ্য্য করিবার শক্তি সে সংসারে কাহারও নাই। মল্লিনাথ হইতেই তাহাদের সুখ সমৃদ্ধি; মল্লিনাথের চেষ্টা যত্নেই তাহাদের খ্যাতি সম্মান। সুতরাং মল্লিনাথের অমতে তাহারা কাৰ্য করে কোন্ সাহসে?
সােনার বাঁধন
মল্লিনাথের কথাগুলি কিন্তু অনাহুত হিতৈষী বন্ধুগণের আদৌ
ভাল লাগে না। বামাপদকে ঘেরিয়া বসিয়া তাম্রকূট সেবন করিতে
করিতে বামাপদকে তাহারা বুঝাইতে লাগিল—“ও সকল কথা
কোনও কাজের কথা নহে। মল্লিনাথের বয়সই বা কি আর বুদ্ধিই :
বা কি? ছেলে মানুষের কথা তিনি অতটা কাণেই বা তুলিবেন
কেন?”
বামাপদ, তাহাদের বুঝাইয়া দিলেন, মল্লিনাথ সে সংসারের কে
এবং তাহার সংসার মল্লিনাথের নিকট কতটা ঋণী। বামাপদ,
উপকারীর উপকার অস্বীকার করিতে জানেন না। সেই কারণেই
মলিনাথের কথা তিনি গােপন করিলেন না—গােপন করিবার
আবশ্যকও বুঝিলেন না। উপকার পাইয়া যাহারা সে উপকারের
কথা গােপন করে, বামাপদের মতে তাহারা ঘটা চোর। বামাপদ
ঘটীচোর হইতে রাজী নহেন।
বাহিরের গােমালটা বামাপদ কোনও প্রকারে মিটাইলেন বটে,
কিন্তু বাড়ীর ভিতরে যে গােলমালটা চলিয়াছিল, তাহা মিটাইয়া দেওয়া
তার পক্ষে খুব কঠিন হইয়া পড়িল। সরমার বুদ্ধিতে পডিয়া
মাতঙ্গিনীকে এখন বুঝিতে হইয়াছে যে কোনও বিশেষ কারণে
সরযুর বিবাহ দেওয়া মলিনাথের আপাততঃ অভিপ্রেত নহে। নিরাপদ
ও তারাপদর বিবাহ দিলে পাছে সেই সঙ্গে সরযূর বিবাহও দিতে হয়,
সেই কারণে মল্লিনাথ, তাহাদের বিবাহে আপত্তি করিতেছে।
মাতঙ্গিনী স্বয়ং যেমন বুঝিয়াছিলেন, বামাপদকেও তিনি সেইরূপ
বুঝাইতে চেষ্টা করিতে লাগিলেন। অনেক কথা কাটাকাটির পর
বামাপদকেও বুঝিতে হইল যে, মাতঙ্গিনী যাহা বলিতেছেন, তাহাতে
কিছু সত্য নিহিত থাকিলেও থাকিতে পারে।
৪০ সােনার বাঁধন কিন্তু সে কথা বুঝিয়াই বা তিনি করিবেন কি? মল্লিনাথের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনও কাৰ্য্য করা তাহার সাধ্য নহে। তবে অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া বামাপদ এক উপায় স্থির করিলেন। মল্লিনাথকে নির্জনে পাইয়া বামাপদ একদিন বলিলেন- “তুমি যদি একটা কথা রাখ, তা হলে তােমায় একটা অনুরােধ করি বাবা।” বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে মল্লিনাথ কহিল-- “আপনার অনুরােধ ! আচ্ছা, কি বলুন।” “এই—এই বছিলুম কি—এই সরযূর বিয়েটা এখন না হয় থাক্। একটা ভাল ঘর বর দেখে ওর যা হয় একটা করা যাবে। সে বিষয় তুমি যেমন বুঝবে, তেমনি করবে। কিন্তু নিরু, তারার বিয়ের জন্যে পাঁচজনে আমাকে ভারী ধরাধরি করছে। তুমি রাজী হলেই, আমি রাজী হই।” “এ বুদ্ধি আপনাকে কে দিল? মেয়ের বিয়ে না দিয়ে ছেলেদের বিয়ে দিতে হবে—সেটা কেমন কথা বলুন দেখি ?” “আমি তা ৰছি না বাবা। তবে বলছি কি--ছেলেদের বিয়ে দিচ্ছি না বলে পাচজনে পাঁচ কথা বলছে।” “সে পাঁচজন কে ?--খুব বুদ্ধি তাদের। তবে বিয়ে দিবার ইচ্ছা যখন অতটাই হয়েছে, তখন একসঙ্গে ছেলে মেয়ের পাত্রী ও পাত্র খুঁজুন। তাতে আমার আপত্তি নাই। আমার ইচ্ছা ছিল, ওদের কা-কারবার আর একটু ভাল হলে, তার পর বিয়ে থা দেওয়া যাবে। কিন্তু তা’ যখন আপনাদের পছন্দ হচ্ছে না, তখন আপনা- দের মতেই আমার মত।” “বেঁচে থাক বাবা-চিরজীবি হও। আমাদের সংসারের জন্য সােনার বাঁধন ৪১ ভেবে ভেবেই তােমার শরীর নষ্ট হ’ল বাবা। যা’ হক, তােমার কল্যাণে যখন ছেলে গুলাের নূন ভাতের যােগাড় হয়েছে, তখন ওদের বিয়ে থা দিয়ে, সংসারে স্থিতি করে মরতে পারলেই আমার সুখ হয়। তুমি যে আমাদের আর জন্মে কে ছিলে বাবা, তা বলতে পারি না। তবে এ জন্মে তােমাকে বাবা বলেছি—আর বাপের কাজও তুমি করতেছ। এখন এই কাজটুকু করে দাও বাবা। ঐটুকু হলেই নিশ্চিন্ত হয়ে আমি তােমাদের কোলে মাথা রেখে মরি, আর তােমাদের কাধে বৃদ্ধের চক্ষু অশ্রুভারাক্রান্ত হইল। তিনি আর কথা কহিতে পারিলেন না। মল্লিনাথ, বৃদ্ধের হস্ত দুইধানি ধরিয়া কহিল- “আপনি কাদেন কেন—কান্নাকে আমি বড় ভয় করি। চক্ষের জল মুছুন্ আপনি। তারপর কথা ক'ব।” বামাপদর অশ্রুজল মল্লিনাথই মুছাইয়া দিল। তৎপরে বিবাহের কথাবার্তা চলিতে লাগিল। বামাপদ বুঝিলেন—বিবাহ ব্যাপারে— মল্লিনাথের প্রাণখােলা মত নাই; তবে একান্তই যদি সে কাৰ্য্য সম্পন্ন হয় তাহাতেও তাহার আপত্তি নাই দশম পরিচ্ছেদ সরযু এখন আর বড় একটা মল্লিনাথের সম্মুখে আসিতে চাহে না। তাহার কেমন যেন একটা লজ্জার ভাব আসিয়াছে। যৌবননান্মুখী বালিকা এখন “মল্লিদার” কণ্ঠস্বর শুনিতে ভালবাসে, “মল্লিদার গল্প শুনিতে ভালবাসে, “মল্লিদাকে” লুকাইয়া দেখিতে ভালবাসে-কিন্তু ১২ সােনার বাঁধন “মল্লিদার” সম্মুখে আসিতে হইলেই তাহার যত বিপদ উপস্থিত হয় । মল্লিনাথ তাহাকে দশবার ডাকাডাকি করিয়াও এখন একবার দেখিতে পার না। মল্লিনাথ ভাবিতে লাগিল—যাহাকে না ডাকিতে দশবার - আসিত, একটা কথা জিজ্ঞাসা করিলে দশটা কথা কহিয়া ফেলিত, যার আদর আব্দার শ্রাবণের ধারার মত অবিরল-বর্ষী ছিল, আজ তাহাকে ডাকিয়াও তাহার দেখা পাওয়া যায় না কেন? অত্যন্ত বিরক্ত হইয়া বিভাবতীকে একদিন সে জিজ্ঞাসা করিল- “দিদি, সরযূকে ডাক্লেও আর আসেনা কেন?” কি বলিবে স্থির করিতে না পারিয়া-বিভাবতী বলিয়া ফেলিল- “তা’র ভারী লজ্জা হয়েছে—তা’র বিয়ের কথা হচ্ছে কিনা।” “কি মুস্কিল। আমি তার দাদ:-আমার কাছেও তা’র লজ্জা! উক তাকে।” বিভাবতী, সরযূকে ডাকিতে গেল—কিন্তু সব কিছুতেই “মল্লিদার” নিকট আসিতে চাহে না। সরযূর বিশ্বাস--মল্লিদার সহিতই তাহার বিবাহ হইবে। মল্লিদ। ভিন্ন আর কে তাহার বর হইতে পারে ? বালিকার এমন ধারণা যে কেন হইল, সে কথা কেবল প্রণয়ের দেবহাটীই বলিতে পারেন। মল্লিনাপকে জিজ্ঞাসা করিলে, কোনও কথারই সে সদুত্তর দিতে পারে না। মল্লিনাথের স্বভাব---সকলের সহিতই সে আমােদ আহলাদ করে, সকলকেই সে মিষ্ট কথা বলে, আবার রাগ কি অভিমান হইলে সকলকেই সে দশ কথা শুনাইয়া দেয় --প্রহার পর্যন্ত করিতে উদ্যত হয়। সেই স্বভাব বশেই সরযুর সহিত সে এতটা ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করিয়াছিল। সরষু দেখিতে ভাল, সরষুর অভাব ভাল, সরযুর কথা মিষ্ট, সরষু সেবামুরাগিণী—এই সকল পাতা মুড়ি. সােনার বাঁধন ৪৩ কারণেই মল্লিনাথ তাত্মাকে অত্যন্ত ভালবাসিয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু সে ভালবাসায় প্রণয়ের এতটুকুও গন্ধ নাই। প্রণয় কাহাকে বলে, এতটা বয়স হইলেও মল্লিনাথ তাহা বুঝিতে বা শিখিতে পারে নাই । শিখিয়াছে দরিদ্রের সেবা করিতে, আর্তকে রক্ষা করিতে, বিপন্তের : বিপদে মাথা দিতে, স্বার্থ ভুলিয়া পরার্থে আত্ম বিসৰ্জন করিতে। ইহা ভিন্ন তাহার ধর্ম নাই, কর্ম নাই, চিন্তা নাই, ধারণা নাই। মল্লিনাথ প্রেমিক বটে, কিন্তু তাহার প্রেম সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ নহে। তাহার প্রেমাস্পদ, সংসার-সংগ্রামে বিপন্ন জীব—তাহার প্রেম, দরিদ্র নারায়ণের সেবা। যাহার প্রেম, কুলুনাদিনী স্রোতস্বিনীর মত সাগর সঙ্গমে ছুটিয়াছে, সে কেমন করিয়া জানিবে, রমণীর প্রেম কোন্ পথে কেমন করিয়া চলিয়া থাকে। সে প্রেমের সম্মান কেমন করিয়া সে রক্ষা করিবে-কেমন করিয়া সে প্রেমের সে প্রতিদান দিবে? হায় সরষু, তুমি কি বুঝিয়া কি করিয়াছ? মলিনাথের অনন্ত ভালবাসার তরঙ্গে পড়িয়া তুমি তাহার পদে আত্মসমর্পণ করিলে ; কিন্তু সে পদে তোমার স্থান মিলিবে কি? রত্নলাভের আশায় তুমি সাগরে ঝাঁপ দিয়াছ---সে কারণে তােমাকে দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু কে জানে—তুমি ডুবিবে কি উঠিবে। বিভাবতী ফিরিয়া আসিয়া বলিল- “সে আবে না।” একটু আশ্চর্য হইয়া মল্লিনাথ কহিল— “আসবে না! কেন আসবে না—রাগ হয়েছে ?” “কি জানি—আজকাল সে ভারী দুষ্ট হয়েছে।” “চল, তা'র দুষ্টামী বন্ধ করে দিচ্ছি।” কথাটা বলিয়াই পাকশালার দিকে মল্লিনাথ অগ্রসর হইল ।
ওঃ
সােনার ধাধন
সরযূ সেইখানে চুপটি কারয়া বসিয়া কি ভাবিতেছিল। মল্লিনাথ
তাহার মাথাটা ধরিয়া নাড়িয়া দিয়া জিজ্ঞাসা করিল -
“রাগ হয়েছে ? কেন, বােন্ধার পশম ফুরিয়েছে নাকি? তা'ত
বলেই হত। অত রাগারাগির দরকারটা হয়েছে কি? এখানে
না হয় রাগারাগি চছে, বিয়ের পর শশুর বাড়ী গেলে আমাকেই বা
সেখানে পাবে কোথা’ আর রাগই বা করবে কা'র উপরে?”
“এতগুলি কথার একটী উত্তরও সরযু দিতে পারিল না।
সে মরিয়া যাইতেছিল।
সে যেমন চুপ করিয়া বসিয়াছিল, তেমনই
করিয়া বসিয়া রহিল। মল্লিনাথ তাহার দক্ষিণ হস্তখানি ধরিয়া
টানিয়া বলিল—
“চল মার কাছে। তােমার রাগের বিচার আজ সেইখানেই হবে।
মল্লিনাথের করম্পর্শে বালিকার সমস্ত শরীরে যে কি একটা
বৈদ্যুতিক প্রবাহ প্রবাহিত হইল, কিরূপ যে একটা বিপুল পুলকের
সৃষ্টি হইল, তাহা সরযু অনুভব করিল মাত্র। তাহা প্রকাশের ভাষা
নাই, আর প্রকাশ করিবেই বা সে কাহার কাছে ? সে যে কুমারী !
তখন ও মল্লিনাথের হস্তে সরযুর মৃণাল করপল্লব রহিয়াছে। মলিনাথ
তখনও জিজ্ঞাসা করিতেছে---
“যাবে না ?”
নিদ্রোখিতের মত সরযু কহিল--
“কোথায়?”
মল্লিনাথ হাসিয়া বলিল—
“শ্বশুর বাড়ী।”
হাত ছিনাইয়া লইয়া সরযু দ্রুতবেগে পলায়ন করিল। মল্লিনাথ
শসিতে হাসিতে চীৎকার করিতে করিতে বলিল--
সােনার বাঁধন ৪৫ “দুয়াে, হেরে গেল। দিদি, ধর ধর, সরষু আমাদের না ব'লে করে শশুর বাড়ী পালাচ্ছে।” চীৎকার ও লম্ফে বাড়ী সরগরম্ করিয়া মল্লিনাথ বাহিরের ঘরে চলিয়া গেল। আজ তাহাকে নিরাপদদের বাটীতেই রাত্রি যাপন করিতে হইবে। বামাপদ আজ তিনদিন হইল তাহার শ্যালক গৃহে গিয়াছেন। নিরাপদ ও তারাপদও পিতার অন্বেষণে গিয়াছে। তাহাদেরও এ পর্যন্ত দেখা নাই । বাটীতে পুরুষ অভিভাবক কেহ নাই বলিয়া মল্লিনাথকেই আজ বাটী রক্ষার ভার গ্রহণ করিতে হইবে। মল্লিনাথ চলিয়া গেল—সরমা তাহার মাতার গা ঠেলিয়া বলিল- “দেখছ সব মা! অত বড় আই বুড়াে মেয়ের সঙ্গে মল্লিদার ঐ সব ন্যাকামী করা ভাল দেখায় কি?” মাতঙ্গিনী কোনও কথা কহিলেন না। বিভাবতী বলিল-- “সরযু তুই হচ্ছিস্ কি? কাকে কি বলতে হয়, তা' তুই শিখ লিনি এখনও ! মল্লিনাথ তােদের সংসারের কে, তা কি তুই জানিনে ?” -কুঞ্চিত করিয়া সরমা কহিল- “তাই বলে উনি যা ইচ্ছে তাই কবুবেন বুঝি ?” বিশেষ বিরক্তির সহিত বিভাবতী কহিল- “চুপ,—কোনাে কথা বলিস্ নে-সৰ্ব্বনাশ হয়ে যাবে।” সর্বনাশের কথা শুনিয়া-মাতঙ্গিনী কি ভাবিলেন--বলিতে পারা যায় না। তবে তিনিও সরমাকে কিছু তিরস্কার করিলেন। সরমাকে আবার অপ্রতিভ হইতে হইল।
ভ সােনার ধন একাদশ পরিচ্ছেদ বামাপদ আজ তিন দিন বাড়ী ছাড়া। পিতার সংবাদ আনিবার জন্য নিরাপদ ও তারাপদ দুইজনেই মাতুলালয়ে গিয়াছে। কিন্তু তাহাদেরও কোনও সংবাদ নাই। এইরূপ কাণ্ড দেখিয়া মলিনা কখনও বামাপদ, নিরাপদ ও তারাপদর উপর দ হইল, কখনও বা তাহারা কোনও কারণে বিপন্ন হইয়াছে মনে করিয়া তাহাদের জন্য অতি মাত্রায় চিন্তিত হইয়া পড়িল। মল্লিনাথের স্বভাবই এইরূপ । যখন যে ভাব, তাহার মনে উদয় হয়, একাগ্রতা গুণে সে ভাবটাকে মল্লিনাথ খুব বড় করিয়া লয় এবং সেই ভাবে সেইরূপ কাৰ্য্য করিবারও চেষ্টা করে। মল্লিনাথ-চরিত্রের সেইটাই একটা বিশেষত্ব। মল্লিনাথের যখন মনে হইল যে বৃদ্ধ বামাপদ কোনও না কোনও বিপদে পড়িয়াছেন, তখন করুণা ও সহানুভূতিতে তাহার হৃদয় ভরিয়া গেল। তখনই মল্লিনাথ, নিরাপদর মাতুলালয়ে যাইবার জন্ধ প্রস্তুত হইল। মাতঙ্গিনী জিজ্ঞাসা করিলেন- “কোথায় যাবে বাবা?” “চুলােয় যাব—যেখানে সকলে গিয়ে বসে তাল পাকাচ্ছে। একবার আক্কেলটা দেখ দেখি -কা আজ তিন দিন বাড়ী ছাড়া, ছেলে দুটোকে পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছেন, আর একটা খোঁজখবর পর্যন্ত দিবার সময় হ’ল না! আচ্ছ—দেখা হ'? আগে, তারপর এর বিচার হবে।”
সােনার বাঁধন ৪৭ আর কোনও কথা না বলিয়া মল্লিনাথ বাটীর বাহিরে চলিয়া গেল। খুব রাগ, খুব অভিমান, অথবা খুব করুণা হইলে মল্লিনাথ এইরূপ কথাই বলিয়া থাকে এবং এইরূপ আচরণ করিয়া বসে। মল্লিনাথ যখন নিরাপদর মাতুলালয়ে উপস্থিত হইল, বামাপ, নিরাপদ, তারাপদ এবং নিরাপদর মাতুল গােবন দাস একটা ক্ষুদ্র অন্ধকার ঘরে বসিয়া কি একটা বিষয়ে পরামর্শ করিতেছিল। মস্লিনাগের আগমন-বার্তা শুনিয়া তাহাদের সকলেরই ভয় হইল। মল্লিনাথের স্বভাবের বিষয় তাহারা সকলেই ত অবগত আছে। সুতরাং ভয় ত তাহাদের হইবারই কথা। মল্লিনাথের ক্রোধ হইলে সে কাহারও বড় একটা পাতির রাখে না। মল্লিনাথ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়াছিল। গৃহে প্রবেশ করিতে না করিতেই তাহার মুখে যাহা আসিল, বামাপদ ও নিরাপদ প্রভৃতির উদ্দেশে তাহাই সে বলিয়া ফেলিল। মাতুল গােবর্ধনও সে ভং সনা হইতে পরিত্রাণ পাইল না। কিন্তু পেটে খাইলেই পিঠে সহিতে হয়। মল্লিনাথের কুবাক্যগুলি তাহাদের সকলকেই হজম করিতে হইল। মল্লিনাথের ভৎসনা সহ্য করা ভিন্ন তাহাদের আর উপায় কি? যে অন্নদাতা-শুভানুধ্যায়ী, তাহার মুখের উপর সহজে আর কে কথা কহিতে পারে? বয়সের অম্লাধিক্য এস্থলে আদৌ বিচাৰ্য্য নহে। চুপ করিয়া থাকিলে কোনও বালাই নাই। বামাপদ প্রভৃতি চুপ করিয়া থাকায় মল্লিনাথকে অচিরে চুপ, করিতে হইল। তখন মাতুল গােবর্ধন একটু চক্ষের জল ফেলিয়া, একটু নাকি সুর তুলিয়া মল্লিনাথকে বুঝাইতে লাগিল যে দোষ বামাপদ বা নিরাপদর কিছুই নাই। দোষ যদি কাহারও থাকে, তবে তাহা গােবর্ধন দাসের। গােবৰ্ধনই বামাপদ ও নিরাপদদের আটকাইয়া রাখিয়াছে ৩ সােনার বাধন এবং নিরাপদ ও তারাপদর বিবাহের সম্বন্ধ ঠিক করিয়া ফেলিয়াছে। কিন্তু মল্লিনাথের সম্মতি ভিন্ন ত বিবাহ হইতে পারে না। তাই তাহারা পরামর্শ করিয়া স্থির করিতেছিল যে কেমন করিয়া মল্লিনাথ বাবা- জীবনের সম্মতি পাওয়া যাইতে পারে। এমন সময়ে ভগবানের দয়ায় মল্লিনাথ স্বয়ং আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। মিষ্ট কথায় মল্লিনাথ অনেকটা নরম হইয়া গিয়াছিল। মৃদু ' হাস্য করিয়া সে কহিল— “আর সম্মতি যদি না দিই ?” বামাপদ তাড়াতাড়ি কহিলেন- “তা’ হলে বিয়ে হবে না। তুমিই ত আমার সর্বস্ব, বাবা। তােমার অমতে কোনাে কাজ করতে পারি কি?” “ই-তাই বুঝি লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলেদের বিয়ে দিবার ব্যবস্থা করা হচ্ছিল ?” “সে কি বাবা, তাও কি কখনাে হয়। বিয়ের কথা আমি কিছুই জাতে না। গােবন আমাকে আনিয়েছিল—কি বলে গে--- কি বলে গে” মল্লিনাথের অধরে আবার হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিল । (म বলিল- “সন্দেশ খাওয়াতে-বটে? তারপর ছেলেদের বিয়েটাও অনি হয়ে গেল--কেমন?” “না বাবা, তাও কি কখনাে হয় ! তুমি জালে না, তুমি শুলে —বিয়ে কি অমনি হ'লেই হ'ল ?” মিষ্ট কথা শুনিলে ও চক্ষের জল দেখিলে মল্লিনাথ কেমন একপ্রকার হইয়া পড়ে। এই দুই মহাত্মই বামাপদ, মল্লিনাথের উপর নিক্ষেপ সােনার বাঁধন ৪১ শুক করিতে ছাড়েন নাই। তাহাতে মল্লিনাথের পরাজয় হইল। পরাজি সঙ্গিনাথ তখন বলিল- “দূর হ’ গে ছাই—কি করতে হবে, তাই বলুন।” কি করিতে হইবে, বামাপদ ও গােবর্ধন তথন যুক্তি করিয়া মলিনাথকে বলিয়া ফেলিলেন। মল্লিনাথ আঁহাদের আদেশ শিরােধার্য্য করিয়া গােবর্ধনের পাশের বাটীতে নিরাপদ ও তারাপদর জন্য পাত্রী দেখিতে চলিল। নিরাপদর জন্য যে পাত্রীটি স্থির হইয়াছিল, তাহার বয়স কিছু বেশী হইয়াছে বলিয়া মল্লিনাথ সে বিবাহে সম্মতি দিতে একটু ইতস্তত করিতে লাগিল। তবে গােবর্ধনের মুন্সীয়ানায় তাহার সে ইতস্তত ভাবটা শীঘ্রই অপনােদিত হইল। পাত্রী দুইটা সহােদরা,—তাহাদের আশীৰ্ব্বাদ করা হইয়া গেল। টাকা দিয়া আশীৰ্বাদ করিল, মল্লিনাথ । এখানেও বয়সের অল্পতায় ক্ষতি হইল না। গরজ বড় বালাই। সেই বালায়ের জন্যই মল্লিনাথ অপরের সংসারের কর্তা ; আর বামাপদ সেই কর্তৃত্ব অবাধে সহ করিয়া থাকেন। দ্বাদশ পরিচ্ছেদ নিরাপদ ও তারাপদর বিবাহ হইয়া গেল, কিন্তু সরযুর বিবাহ হইল না। ইহাতে পাঁচ জনে পাঁচ কথা বলিতে লাগিল। সে কারণে বামাপদকে অনেকের কাছেই অনেক প্রকার কৈফিয়ৎ দিতে ইহল । কিন্তু কৈফিয়ৎ দিলেই কি মানুষ কৈফিয়ৎ বুঝিতে চায় ।
সােনার বাঁধন সরযুর বিবাহটা “যাহার তাহার” সঙ্গে না হওয়ায় সরযূ আনন্দিতাই হইল। মল্লিনাথকে সে ভালবাসিয়া ফেলিয়াছে, মল্লিনাথ তাহার হৃদয়- মন্দিরের দেবতা বলিয়া সে স্থির করিয়া লইয়াছে। সেরূপ স্থলে অন্যের সহিত তাহার বিবাহ হইলে সে কি কখনাে সুখী হইতে পারে ? অপরের সহিত তাহার বিবাহের কথাবার্তা চলিতেছিল বলিয়া সে মরমে মরিয়া গিয়াছিল । সে সম্বন্ধ কোনাে কারণে ভাঙ্গিয়া যাইলে তাহার আনন্দের আর সীমা রহিল না। সরযূর মনে মনে এমন সাধ, এমন বাসনা, এমন আকাঙ্ক্ষা যে জাগিয়া উঠিয়াছিল, মল্লিনাথ তাহার বিন্দু বিসও অবগত ছিল না। 'আনন্দময় যুবক মল্লিনাথ-আপনার আনন্দে সে আপনি ভরপুর। প্রণয়ীর আকাঙ্খ, বিরহীর হা-হুতাশ, নিরাশিতের ব্যথা বেদনা তাহাকে স্পর্শ করিতেও পারে নাই। সেই কারণে সরযূর সহিত কথাবার্তা চিরদিন যেমন সে কহিয়া আসিয়াছে, যেমন ব্যবহার করিয়া আসিতেছে, এখনো ঠিক সেইরূপই করিয়া থাকে। কিন্তু সরযুর কথাবার্তা, সরযুর ব্যবহার, ঠিক এখন আর তেমনটা নাই । গকারণে সরযূর এরূপ লজা ও অস্বাভাবিক গাম্ভীৰ্য দেখিয়া মলিন সময়ে সময়ে আশ্চর্য্যান্বিত হয়-- সময়ে সময়ে বিরক্তও হয়— আবার সময়ে সময়ে রাগও করিয়া থাকে। তাহাতে সরযুও ব্যথিত হয়, আর মলিনাথের ও মনােকষ্টের সীমা থাকে । কিন্তু তাহাতেও সরযূর লজ্জা, গাম্ভীর্য টুটে কৈ ? সরযূর এখন একটা সুখ-সরমা আর তাহাকে তেমন জ্বালাতন করিবার অবসর পায় না। সেই কারণে নির্জনে বসিয়া এখন তাহার হৃদয়-দেবতাকে প্রাণ ভরিয়া ভাবিবার, প্রতি প্রেম শ্রদ্ধার অঞ্জলি দিবার সে সুযােগ পাইয়াছে। সরমার এখন অনেক কাজ। সে এখন ননদিনী—“কালসাপিনী”। জাতৃজায়। দুইটার কলঙ্ক-গাথা সােনার বাধন প্রচার করিবার জন্য তাহার আহার নিদ্রার সময় পর্যন্ত এখন নাই। সরমার স্বভাব---কলঙ্ক-সাগর সৃষ্টি করা, আর সেই সাগরে প্রিয়- জনকে নিমজ্জিত করা। যাহার স্বভাব এমন কুৎসিত, মরিলেও কি তাহার স্বভাবের পরিবর্তন হয় ? সরমাকে ডাকিয়া বিভাবতী একদিন কহিল- “ই। রে, তুই যে সকলকে মন কষ্ট দিস্, কেন বল্ দেখি ?” হাত মুখ ঘুরাইয়া সরমা কহিল—“কষ্ট আবার দিলুম কাকে ?” “সকলকে।” “সকলটা কে-শুনি তবু !” “এই বউ দুটোকেই ত আপাতত: দিচ্ছিস।” সিংহিনীর মত গর্জন করিয়া উঠিয়া সরমা কহিল--- "দিবনা—দুশােবার দিব, হাজার বার দিব! ৫ে দুটোর বাপ জোচ্চোর। সোনার গয়না দেবে ব'লে জোচ্চোরটা পিতলের গয়না দিয়েছে, ফুলশয্যা দিবার কথা ছিল---’র কিছুই করেনি। তার পর, কাপড় চোপড় যা দিয়েছে, তা বােধ হয় হাড়ী মেথরেও দিতে পারে না। বলব না, বলবার কাজ করে কেন?” “তাতে তার মেয়ের অপরাধটা কি? আর অপরাধ থাকলেও তুই তাদের শাসন করবার কে? তাের এই সব ব্যভারের কথা যদি নিরু কি তারু শােনে, তারা তােকে কি বলবে বল দেখি? অধিকতর চীৎকার করিয়া সরমা তখন বলিতে লাগিল— “ওঃ- মাথা কেটে ফেলবে আর কি! বাবুদের শ্বশুর হবেন । জোচ্চোর—তার কিছু করতে পারবেন না; আর শাসন করবেন- মা বনকে-কেন বল দেখি?” সরমার চীৎকার শুনিয়া মাতঙ্গিনী সে স্থানে আসিয়া পড়িলেন।
সােনার বাঁধন ৰামাপদকেও সে স্থানে আসিতে হইল। • চীৎকারের মাত্রাটা বেশী হইয়া পড়িয়াছিল। বাটীর কর্তা ও গৃহিণীর সে স্থানে উপস্থিত হওয়ার কারণ তাহাই। কৰ্ত্তা ও গৃহিণী যখন সরমার চীৎকারের কারণ গুনিলেন, তখন তাহারা সরমার পক্ষই অবলম্বন করিলেন। এ পক্ষাবলম্বনের একটু কারণ ছিল। কারণটা, নিরাপদ ও তারাপদর শশুরের উপর রাগ। সুতরাং সে ক্ষেত্রে সরমার জয় হইল। বিভাবতী তাহার পিতৃদেবকে তথাপি জিজ্ঞাসা করিতে ছাড়িল না যে নিরাপদ ও তারাপদর বিবাহে তিনি কিছু পাওনার আশা করিয়া- ছিলেন কি না। বামাপদ কহিলেন-- “তা’ একটু ক'রেছিলেম্ বৈ কি। সে আশা না থাকলে মেয়ের বিয়ে স্থগিত করে তাড়াতাড়ি ছেলেদের বিয়ে দিবার আবশ্যকই বা ছিল কি আর তােমার মামার বাসায় তে-রাত্তির কাটাবারই বা দরকারটা ছিল কি ? বৈবাহিক মহাশয় বলেছিলেন, অনেক অর্থ ও অনেক অলঙ্কারপত্ৰই তিনি দান করবেন। একেবারে বঞ্চিত না করে তিনি যদি কিঞ্চিৎও দিতেন, তাহলে আমার দুঃখ ক্ষোভ থাকত না। কিন্তু শেষে কবলে কি না আমার সঙ্গে প্রতারণা—ছি।” পিতার কথা শুনিয়া বিভাবতী আর কোনাে কথা জিজ্ঞাসা করিতে সাহস করিল না। পিতা মাতার উৎসাহ পাইয়া সরমা তখন আরও . চীৎকার করিতে লাগিল এবং ভাতৃজায়াদিগের উপর আরও বাক্যবাণ চালাইতে লাগিল। সে বাক্য-বর্ষণ আর কিছুতেই বন্ধ হয় না। তখন নিরাপদ ও তারাপদ আপনাদের ব্যবসায়-স্থলে বসিয়া দেনা পাওনার হিসাব করিতেছিল। গৃহে তাহারা উপস্থিত থাকিলে, সরমা এতটা কাণ্ড করিতে সাহস করিত কি না সন্দেহ। আর বাপদ সােনার বাঁধন মাতঙ্গিনীও তাহার পক্ষ সমর্থন করিতেন কিনা—সে বিষয়েও সন্দেহ আছে। পুত্রেরা এখন উপায়ক্ষম—তাহাদের একটু ভয় করিয়া ও বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাকে চলিতে হয়। কলির প্রভাব। কিন্তু ভাগ্যক্রমে মল্লিনাথ সেই সময়ে সেই স্থানে আসিয়া পড়িল তাহাকে দেখিয়াই সকলের তর্জন গর্জন থামিয়া গেল। মল্লিনাথ সকলের দিকে একবার চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল— “বাড়ীর মধ্যে এমন ডাকাত, পড়া চীৎকার হচ্ছিল কেন ? ভর লােকের বাড়ীতে এমন ধারাটা হওয়া ত উচিত নয়।” মল্লিনাথের কথার উপরে কেহই আর কোনাে কথা কহিল না। বখন বারম্বার মল্লিনাথ প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করিতে লাগিল, তখন বামাপদ ও মাতঙ্গিনীকে সকল কথাই মল্লিনাথের কাছে স্বীকার করিতে হইল। পীরতার সহিত সকল কথা শ্রবণ করিয়া মল্লিনাথ কহিল- “ঠিক হয়েছে—উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত হয়েছে। লােভে পড়ে তাড়া- তাড়ি ছেলেদের বিয়ে দিতে গিছ লেন--একটু ঠকবেন বৈ কি! যে কন্যাদায়গ্রস্ত, তার দোষ আমি বিশেষ ধরি না। কিন্তু লােভে পড়ে আপনি যদি ছেলে বিক্রয় করেন, পণ প্রথায় আপনার যদি আস্থা থাকে, দেশের দারিদ্র্য যদি আপনি বুঝেও না বুঝতে পারেন, তাহলে তা'র প্রায়শ্চিত্ত আপনাকে করতে হবে বৈ কি। কিন্তু সে যাই হক, মেয়ে-কৰ্ত্তা আপনার বাড়ীতে কবে থেকে হ'ল ?” অপ্রতিভ বামাপদ তাড়াতাড়ি কহিলেন— “সে কি বাপ-মেয়ে-কৰ্ত্তা কি রকম? হতা’ হয়েছে বৈকি। এই যে তাদের গলা শুনছিলে—বৌ দুটীর উপর অমৃতবর্ষণ হচ্ছিল। সরমার মুখ শুকাইয়া গেল। বামাপদ ও মাতঙ্গিনীর মুখও খুব উজল রহিল না। মল্লিনাথ কহিতে লাগিল— ৫৪ সােনার বাঁধন “মানা করে দিচ্ছি আমি—এমন সব কাণ্ড বাজতে আর না হয় । পরের মেয়ে বাড়ীতে এনে নিরপরাধে তাদের এমন কষ্ট দেওয়া কি কথা শুনান ভদ্রতার পরিচায়ক নয় একেবারেই। দোষ করে থাকে, তাদের বাপ করেছে—তাদের অপরাধ কি? এমন করে বৌ গুলােকে কষ্ট দেওয়া ভাল নয় ত !” মাতঙ্গিনী কহিলেন- “না বাবা---আমার ঘরের লক্ষী তা'রা ; তাদের কি আমি কষ্ট দিতে পারি।” মল্লিনাথ কহিল- “আপনারা না দেন—আপনাদের মধ্যমা কন্যা হয়ত দিয়ে থাকেন। সেটা একেবারেই বাঞ্চনীয় নয়। কৈ, দিদি কি সরযূ ত এ সব কথায় একেবারেই থাকে না। সরমা এ কথা বলে কেন—এত কাণ্ড করে কেন?” বামাপদ ও মাতঙ্গিনী তখন সরমাকে তিরস্কার করিতে লাগিলেন। সরমা অবশ্য মনে মনে বিলক্ষণ গন করিতে লাগিল--সে গর্জনের শব্দ কিন্তু তাহার মুখ দিয়া একটুও বাহির হই না। মল্লিনাথ ভারী শক্ত লােক--তাহার সম্মুখে গৰ্জন করিলে কাহারও পরিত্রাণ নাই। বিবাদ বিসম্বাদের একটা মিটমাট করিয়া দিয়া মল্লিনাথ সরযূর সন্ধানে এ ঘর ও ঘর করিতে লাগিল। মল্লিনাথ জানিতে চাহে--- গতকল্য সে যে পশম কিনিয়া পাঠাইয়া দিয়াছে, সে পশম লইয়া সরযু কি বুনিতেছে। “পশম বোনার” সরষুর আজ কাল তেমন আর উৎসাহ নাই বলিয়াই মল্লিনাথের এত তত্ত্ব, এত অনুসন্ধান লইবার আবশ্যক। এরূপ তত্ত্ব লওয়া মল্লিনাথের একটা স্বভাব ।
সােনার বাঁধন L QARASWAT Etd:-1919. MAK: PC!! ত্রয়ােদশ পরিচ্ছেদ হরসুন্দর যে আফিসের মুৎসুদ্দি ছিলেন, কি জানি, কি একটা কারণে সে আফিসটা হঠাৎ বন্ধ হইয়া গেল। হরসুন্দরের অনেকটা টাকা সে আফিসে গচ্ছিত ছিল। টাকাটার কিনারা হরসুন্দর কিছুই করিতে পারিলেন না। আফিসের কর্তারা বললেন—টাকা উড়িয়া যাইলে তাহ! কি আর খুঁজিয়া পাওয়া যায়। আফিস হইতে বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া হরসুন্দর গঙ্গাদেবীকে কহিলেন--- “শুনেছ গিন্নি, আজ থেকে আমার ছুটী।” সে কথার অর্থ কিছুই বুঝিতে না পারিয়া গঙ্গাদেবী জিজ্ঞাস? করিলেন—“কিসের ছুটী গা? এখন তো কোনাে পাল পাৰ্বন নেই... আর রবিবারের ও ত এখনাে তিন দিন দেরী আছে।” “এ ছুটী, সে ছুটী নয় গো, সে ছুটী নয়। এ ছুটীতে আফিস একে- বারেই বন্ধ হয়ে গেছে—ছুটোছুটি আর করতে হবে না। টাকাকড়ি আফিসে যা’ জমা ছিল, তাও আর ফিরে পাওয়া যাবে না।” গঙ্গাদেবী সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিলেন—“বলি, হয়েছে কি ?” চক্ষু বিস্তার করিয়া হরসুন্দর উত্তর দিলেন—“সােজা কথায় যাকে বলে সর্বনাশ। আফিস উঠে গেছে-বন্ধ হয়ে গেছে। টাকাকড়ি আমার যা কিছু ছিল, সব ডুবে গেছে। সে আর ফিরে পাওয়া যাচ্ছে না -বুঝেছ ? বাঁচা গেছে-ভাবনার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া গেল। ০ সােনার বাঁধন চল এখন কোনাে তীর্থস্থানে গিয়ে বাস করিগে-ভগবানের নাম নিয়ে কোনো মতে শেষ জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া যাবে। “তুমি কি বলছ গাে?” “ঠিক বলছি। টাকা টাকা করে এতদিন জালে পড়েছিলাম। টাকা গেছে, এখন জালমুক্ত হ’ব । চল এইবার দিই ছুট-পরকালের কাজ হয়ে যাবে। ভগবান যা’ করেন, তা মঙ্গলের জন্য।” “মল্লিনাথ” “কে মল্লিনাথ, কে তুমি? কেউ কারাে নয়। মায়া-মায়া-সৰ মায়া। যে যার কৰ্ম্ম ক'রে, যেখানকার লােক সেইখানে চলে যায়।” “স্থির হও তুমি। এতক্ষণে বুঝতে পাবছি, সৰ্ব্বস্ব হারিয়ে টাকার শােকে তুমি পাগল হ'তে বসেছ। আফিস বন্ধ হয়ে থাকে-- হ'গে’ ; টাকা গিয়ে থাকে—যাগে চুলাের দুয়ারে ! তুমি স্থির হও, তুমি শান্ত হও--আবার আমাদের সব হবে।” “আমি স্থিরই হয়েছি-- শান্তিতেই আছি গো। সেই জন্যই ত জীবনের বাকী কাজ গুলাে চটপট, সেরে ফেলতে চাচ্ছি। তুমি ভাবছ কি টাকা খুইয়ে আমি পাগল হ’তে বসেছি ? আরে ছোঃ- আরে ছাে।” “স্থির হও তুমি—মুখে হাতে জল দাও—তারপর যা বলবার তাই বল।” মুখে হাতে জল দিয়া গামছায় মুখ মুছিতে মুছিতে হরসুন্দর বলিলেন- “আমি ভাবছি গিন্নি, টাকার শােকে পাগল তুমি না হও। ছেলে- টার জন্য আমি তত ভাবছি না, যত তােমার জন্য ভাবতে হচ্ছে। টাকা মল্লিনাথের কাছে খােলকুচির মত। যে পথে সে এখন ছুটেছে, তার * * সােনার বাধপাতা মুড়িবেন • ৫৭ গতিবােধ কেউ করতে পারবে না। কিন্তু তােমার কি গতি হবে, তাই আমি ভাবছি গিন্নি।” “তােমারও যা’ গতি, আমারও তাই গতি। তুমি কি ভাব, আমি, তুমি ছাড়া ?” এ প্রশ্নটায় একটু থতমত খাইয়া হরসুন্দর চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। দুর্বিপাকের সংবাদ পাইয়া হরসুন্দরের বাটীতে তখন অনেক আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব সমবেত হইয়াছে। আত্মীয়তার ছলে প্রশ্ন করিয়া তাহারা হরসুন্দরকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিতে লাগিল। ধীর প্রশান্ত ভাবে হরসুন্দর তাহাদের সকলকে বুঝাইয়া দিলেন—টাকা নষ্ট হওয়ার কোনাে ক্ষতিই হয় নাই। বরং তাহাতে তাহাদের মঙ্গলই হইয়াছে। যতদিন টাকা ছিল, টাকার গর্ব ছিল, ততদিন ভান করিয়াও তিনি ভগবানকে ডাকিবার অবসর পান নাই। এখন টাকা গিয়াছে, অভি মান গিয়াছে,এইবার ভগবানের পদে আত্মসমর্পণ করিবার তাহাব বিশেষ সুবিধা হইবে। হরসুন্দরের স্থৈর্য ও ধৈৰ্য্য দেখিয়া অনেকেই চমৎকৃত হইল। কে কেহ বা বলিতে লাগিল—লােকটা টাকার শােকে এমন উদাস হইয়া পড়িয়াছে। আপনাপন বুদ্ধি ও জ্ঞান মত সকলেই স্ব স্ব অভিমত প্রকাশ করিতে লাগিলেন। হরসুন্দরের নিকট সে সকল অভিমতের কোনই মূল্য নাই দেখিয়া জ্ঞানী আত্মীয়স্বজনের দল অচিরে সেস্থান ‘পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইল। হরসুন্দর তখন গঙ্গাদেবীকে আবার নিকটে ডাকাইয়া দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন-“বাঁচা গেল।” টাকার কথা সংসারের কথা আমার কাছে লােক এখন যত অল্প বলে, আমার পক্ষে ততই মঙ্গল। লােকগুলাে আমাকে চিনেও না, বুঝেও না। ওরা ভাবছে—ওরা পণ্ডিত, আমি পাগল,-হইবেও বা।
সােনার বাঁধন গৃহিণী, কর্তাকে সেদিন সে সময়ে আর কোনাে কথাই কহিতে দিলেন না। পতিকে আহারাদি করাইয়া পত্নী হার সেবা করিতে লাগিলেন। হরসুন্দর ঘুমাইয়া পড়িলেন- কিন্তু গঙ্গাদেবীর সে রাত্রিতে আর নিদ্রা হইল না। মল্লিনাথ সে রাত্রিতে বাটিতে ছিল না। একজন দরিদ্র প্রতিবাসীর শব দেহ বহন করিয়া কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে শ্মশান-শাটে সে গিয়াছিল। গঙ্গাদেবী ভাবিতে লাগিলেন---মল্পি এ কাছে থাকিলে ভাল হইত। সম চতুর্দশ পরিচ্ছেদ হইল না জ্ঞানহীন শিশু অথবা জ্ঞানান সাধু বহুমূল্যবান রত্নাভরণ টান মারিয়া ফেলিয়া দিয়া দুঃখ কষ্ট যেমন কিছুই অনুভব করে না, হর- সুন্দরের টাকা কড়ি নষ্ট হইয়া যাইলে ও তঁাহার সেরূপ দুঃখ কষ্ট কিছুই হরসুন্দর কিরূপ প্রকতির লােক, তার দুর্দিন উপস্থিত হওয়ায় সকলে তাহাকে বুঝিতে পারিল- চিনিতে পারিল। সামান্য স্বার্থহানি, সম্পতি হানি হইলে লােক পাগল হইয়া যায়। আর এতটা টাকা লােক্সান্ হইয়া যাওয়াতেও যে হরসুন্দর একটীবার তাহার জন্য হা-হুতাশ করিলেন না, স্ত্রীপুরুষে ভবিষ্যৎ ভাবিয়া শােকে দুঃখে মুহমান হইলেন না—সেটা কি একটা সামায় কথা ! হরসুন্দর প্রকৃতির ব্যক্তি যাহারা স্বচক্ষে দেখেন নাই, তাঁহারা ভাবিতে পারেন- ইহা গল্প-কথা। কিন্তু সেরূপ আদর্শ পুরুষ দেখিবার এবং তাহাদের সান্নিধ্যে যাইবার সােনার বাঁধন যাহাদের সৌভাগ্য ঘটিয়াছে, তাহারাই বুঝিবেন যে হরসুন্দর-চিত্র অপ্রাকৃত বা অতিরঞ্জিত নহে। কাহারও নিকট মাটীও টাকা, আবার কাহারও কাহারও ধারনা ও বিশ্বাস যে টাকা কড়ি ধন সম্পত্তি মাটা ভিন্ন আর কিছুই নহে। হরসুন্দর সংসারী হইলে কি হয়, সংসারে থাকিয়াও তিনি যােগী-ত্যাগী-ঈশ্বরানুরাগী। সুতরা টাকা তঁাহার নিকট মাটা ভিন্ন আর কি হইতে পারে ? সে “টাকা মাটা" যতক্ষণ তাহার নিকট ছিল, ততক্ষণ সে মাটী লইয়া। তিনি খেলা করি- তেন। সে মাটী যাহাদের আবশ্যক, তিনি তাহাদের তাহা দান করিতেন। কিন্তু সে মাটী যখন তাহার হাতছাড়া হইল, তখন তিনি ভাবিলেন—সে মাটির ভাণ্ডারী হওয়া, সে মাটী লইয়া নাড়া চাড়। করিবার তাহার অধিকার আর ঈশ্বরাভিপ্রেত নহে। ভাণ্ডারীর দায়িত্ব হইতে মুক্তিলাভের বাসনা সকল সাধু-ভাণ্ডারীই করিয়া থাকেন। সে মুক্তি যখন হরসুন্দর মনের গুণে লাভ করিলেন, মুক্তির আনন্দ হইতে তিনি আপনাকে বঞ্চিত করিবেন কেন? এ আনন্দে যে নির- নন্দ হয়, সে ভাগ্যবান নহে। মাটির চিন্তায় যে জীপন যাপন করিতে চায় করিয়া আনন্দ পায়, সে তাহাই করিতে থাকুক। তবে তাহাতে ভগবানের সান্নিধ্যে সে যাইতে পারিবে না- -ভগবান লাভ তাহার ভাগ্যে ঘটিবে না—একথ। খুব সাহস করিয়া বলা যাইতে পারে। মানুষের ভাবনা যেরূপ, মানুষের সিদ্ধিও সেইরূপ। ভগবানের চিন্তায় মানুষ আত্মহারা না হইলে, মানুষ, ভগবান পাইবে কেমন করিয়া? ০ কিন্তু এত কথা, এত তত্ত্ব কয়জনই বা বুঝিতে চাহে, আর কয়জনই ' বা বুঝিতে পারে? মুখে যাহাই বলুন, এত তত্ত্ব গঙ্গাদেবী সহজে বুঝিতে চাহিলেন না। টাকায় তাহার খুব দরদ না থাকিলেও টাকা সােনার বাঁধন থাকিলে যে সংসারে কেহ কাহাকেও বড় একটা মানিতে চাহে না, এমন ধারণা এমন বিশ্বাস তাহার খুবই ছিল—আর থাকাও অন্যায় নহে। সেই বিশ্বাস থাকায় টাকা হারাইয়া পতি পুত্রের জন্য তিনি চিন্তিত হইয়া পড়িলেন। মল্লিনাথ যখন তাহার মাতাকে বুঝাইয়া দিল যে পিতার মত অভ্রান্ত, তপন গঙ্গাদেবীর দুঃখ, কষ্ট, ভাবনা, চিন্তা অনেকটা দূর হইল। এই সুযোগে হরসুন্দর তীর্থযাত্রার সকল উদ্যোগই করিয়া ফেলিলেন। হরিদ্বারে হরসুন্দরের গুরুদেবের আশ্রম। তিনি আপাততঃ সেইখানে যাওয়াই স্থির করিলেন। মল্লিনাথ, পিতার সঙ্গে যাইতেও চাহিল না, আর হরসুন্দর তাহাকে সঙ্গেও লইলেন না। কথা রহিল- গুরুদেবের আদেশ হইলে হরসুন্দর আবার সংসারে ফিরিয়া আসিবেন । একজন দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ের উপর মলিনাথের ভাৱাৰ্পণ করিয়া হরসুন্দর হরিদ্বারে যাত্রা করিলেন। যাত্রাকালে গঙ্গাদেবী অনেক কাদিলেন, অনেক যন্ত্রণা অনুভব করিলেন। একমাত্র পুত্রকে একা রাখিয়া কাহার আর দূর দূরান্তরে যাইতে ইচ্ছা হয় । তবে হরসুন্দরের সংসারের সকল বিধি নিয়মই বিপরীত। সাধারণ সংসারের সহিত তাহার সংসারের অনেক বিষয়েই ঐক্য নাই। যাত্রাকালে হরসুন্দর, মল্লিনাথকে ডাকিয়া বলিলেন- “তােমার ভাগ্যে যা আছে, তা অবশ্যই তােমাকে ভােগ করতে হবে। তার অন্যথা হ’বার উপায় নাই ; ভগবানের ইচ্ছাই সকল সময়ে পূর্ণ হয়। যাতে ভগবান তুষ্ট হন, তাই কর বাবা।” আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধবগণের মধ্যে দুই একজন মল্লিনাথের সম্বন্ধে দুই একটা উপদেশ অযাচিতভাবে হরসুন্দরকে দিতে গিয়াছিল। হরসুন্দর বলিয়া গেলেন—মল্লিনাথের ভােগী হইবার কথা নয়, যােগ সােনার বাঁধন হইবারই কথা। সেইরূপ লক্ষণই ত মল্লিনাথে দেখতে পাওয়া যায়। তবে তার বিপরীত যদি ঘটে, সেটা ভগবানের ইচ্ছা। সে কথা শুনিয়া হরসুন্দরের বিরুদ্ধে অনেকে অনেক কথাই কহিতে লাগিল। কাহারও মত--হরসুন্দর নির্মম পিতা ; কেহবা ভাবিল- টাকার শােকে লােকটার মস্তিষ্ক বিকৃত হইয়া গিয়াছে। সে যাহা হউক, তাহাতে হরসুন্দরের যাত্রা বন্ধ হইল না। হরসুন্দর মল্লিনাথকে বেশ ভালই জানিতেন। তাই তাহাকে একা রাখিয়! যাইতে হরসুন্দরের মনে কোনাে দ্বিধাই হইল না। পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ ধর্মপরায়ণ হরসুন্দর, পুত্রকে সংসারের ঘাত প্রতিঘাত সহ্য করিবার শক্তি ও শিক্ষালাভের জন্য সংসারে একা রাখিয়া চলিয়া যাইবাব পর পিতামাতার অদর্শনে মল্লিনাথের অত্যন্ত কষ্ট হইতে লাগিল। এমন কষ্ট ইতঃপূৰ্বে তাহাকে আর কখনো পাইতে হয় নাই। আনন্দময় যুবক পিতামাতার অদর্শনজনিত ব্যথা বেদনায় নিতান্ত নিরানন্দ হইয়া পড়িল। তাহার সর্বদাই মনে হইতে লাগিল—সে বুঝি আর বাঁচিবে না, ইহজন্মের মত সে বুঝি আর তাহার জনক জননীকে দেখিতে পাইবে না। তাহার আরও মনে হইতে লাগিল-একটা বাহাদুরী দেখাইবার অভিপ্রায়ে, ধৰ্ম্ম এবং কর্তব্য পালনের অজুহাতে পিতামাতাকে দূরে যাইতে দিয়া সে আদৌ ভাল কাজ করে নাই। মল্লিনাথকে একা ফেলিয়া রাখিয়া যাইয়া হরসুন্দরেরও ঠিক সেই কথাই মনে হইতেছিল। প্রিয়জন অদর্শনের ব্যথা বেদনায় ঋষি, সােনার বাঁধন তাপস-দেবতাও আত্মহারা হইয়া পড়েন—মানুষ ত দূরের কথা। সে কথা হরসুন্দর এতদিন বুঝিতে পারেন নাই। তাহার ধারণা ছিল, তাঁহার যখন যেমন ইচ্ছা, তখন তেমনই বুঝি করিতে পারেন। কিন্তু পুত্রের অদর্শনজনিত কাতরতায় তাঁহার সে মতের—সে ধারণার পরিবর্তন হইয়া গেল। পুত্রের পিতা হওয়া কি সহজ ব্যাপার । মল্লিনাথের জননী গঙ্গাদেবীর ত আর কথাই নাই। মল্লিনাথের কথা—মল্লিনাথের মুখ মনে পড়িলেই তাহার দুই চক্ষু দিয়া প্রবল বেগে অশ্রু-ধারা বহিতে থাকিত। অনেক বুঝাইয়া—অনেক–প্রবােৰ দিয়াও হরসুন্দর সে ধারা রুদ্ধ করিতে সমর্থ হইতেন না। বৈরাগ্য ও প্রবৃত্তি- কেমন করিয়া যে কোন্ দুৰ্বল মুহুর্তে লােকের মনে জাগিয়া উঠে এবং কখন তাহা মিলাইয়া যায়—তাহা ধরিবার ও বুঝিবার বােধ হয় কোনাে উপায়ই নাই। তবে চেষ্টার ফলে, শিক্ষার ফলে, সাধনার ফলে সকল জিনিসই সাধ্য হয়--সকল সাধনাই সিদ্ধ হয়। কিন্তু সে সিদ্ধি কি সহজ, না সে সিদ্ধি একদিনে হয় । কালের শিক্ষা ও উপদেশ, আদরের প্রলেপ দুই তরফকেই কিন্তু অচিরে শান্ত করিয়া ফেলিল। হরসুন্দরের গুরুদেব মাধধানন্দ সরস্বতী উপদেশ বাক্যে শিষ্য ও শিষ্যাকে সাধন-পথ দেখাইয়া দিয়া তাহাদের সকল চিন্তা ভুলাইয়া দিলেন। আর ওদিকে বামাপদ, নিরাপদ, মাতঙ্গিনী প্রভৃতির মিষ্টবাক্যে তুষ্ট হইয়া এবং দরিদ্র-নারায়ণের সেবায় আত্ম নিয়ােষিত করিয়া মঙ্গিনাথ সকল দুঃখ কষ্ট ভুলিয়া গেল। কৰ্ম্ম ও সাধনা চলিল দুই তরফেই। ইহাই সংসারের শিক্ষা—এই শিক্ষাই মানুষকে উন্নত করে, মানুষকে উদার করে, মানুষকে দেবতা করে। কিন্তু সে শিক্ষা হয় কয়জনের—সে শিক্ষার সুযােগ পায় কয়জন ভাগ্যবান !
সােনার বাঁধন হরসুন্দরের প্রায় সমস্ত সম্পত্তিই আফিসওয়ালার কৃপায় নষ্ট হইয়া গিয়াছিল। যাহা অবশিষ্ট ছিল, তাহা অতি সামান্য। সেই সামান্য সম্পত্তির আয়েই মল্লিনাথের জীবন-যাত্রা এক প্রকার সুচারুরূপে চলিতে পারিত। কিন্তু যে একদিন এতটা টাকা পরার্থে খরচ করিয়াছে, এত অল্প টাকায় তাহার আর কি হইবে? মল্লিনাথের আত্মীয়- যাহার উপর হরসুন্দর মল্লিনাথের ভারাৰ্পণ করিয়া গিয়াছিলেন—মল্লি- নাথকে সাবধান করিয়া দিবার অনেক চেষ্টা করিল। কিন্তু সে কথা তখন শুনে কে? দরিদ্র-নারায়ণের সেবাপরায়ণ মল্লিনাথের আয়ের দিকে লক্ষ্য কখনই ছিল না—আজ থাকিবে কেমন করিয়া চিরদিন সে খরচ করিয়া আসিয়াছে—আজও খরচ করিতে লাগিল । আর্তের সেবায় ঋণ করিয়া, ভিক্ষা করিয়াও সে অর্থ সংগ্রহ করে। অর্থাভাবে দরিদ্র-সেবা তাহার একদিনও বন্ধ হইল না। সেই সানন্দেই তাহার পিতামাতাকে পৰ্যন্ত সে ভুলিতে পারিয়াছে। যাহার মনে এরূপ শক্তি, এরূপ একাগ্রতা, অর্থাভাবে কি তাহার সেবা-ধৰ্ম্ম বন্ধ হয় ? মল্লিনাথ বলিত-যেদিন তাহা বন্ধ হইবে, সেদিন বুঝিব–সংসার মিথ্যা, ধর্ম মিথ্যা, ভগবান মিথ্যা। কে জানে—ইহা কিরূপ দার্শনিক বিচার আর কিরূপ মীমাংসা । তবে, একটা কথা—পৃথিবীতে অনেক জিনিস আছে, যাহা বুঝিবার একটুও উপায় নাই। সেই অনেক জিনিসের মধ্যে ইহাও না হয় একটা জিনিস। মস্লিনাথের টাকা কড়ি এখন আর তেমন নাই; কিন্তু সেবার কাৰ্য্য তাহার অনেক বাড়িয়া গিয়াছে। কৰ্ম্মীর কৰ্ম্ম তাহাতেও বন্ধ হইল না। প্রবল ইচ্ছা শক্তি সম্পন্ন কর্মীর কর্ম-পথ কে রুদ্ধ করে ?
MAKERDAH-HOWRAH!. ভs 'সােনার ধন •• ••••• Estd:-199, যােড়শ পরিচ্ছেদ এক মল্লিনাথ এখন শত মল্লিনাথ হইয়া দাড়াইয়াছে। দারিদ্র-ভারে যাহারা অবসন্ন ; দুঃখ, কষ্ট, শােকে যাহারা মুহমান ; যাহাদের গৃহ নাই, বন্ধু নাই, বান্ধব নাই,—মল্লিনাথ তাহাদের ; মল্লিনাথের যাতা- যাত, মল্লিনাথের আত্মীয়তা সেইখানে। ভগবান কি পদার্থ দিয়া যে মল্লিনাথকে গড়িয়াছিলেন, তাহা ভগবানই জানেন। মল্লিনাথকে সাধারণ লােকের বুঝিবার কিছুই উপায় নাই। মল্লিনাথ এইমাত্র যাহাকে গালি দেয়, যাহাকে মারিতে উদ্যত হয়, পরমুহুর্তে হয়ত তাহারই জন্য আপনাকে আপনি আহুতি দিবার সঙ্কল্প করে। দরিদ্র- মাত্রেই তাহার বন্ধু, দরিদ্রমাত্রেই তাহার জীবন। ধনীর দ্বারে সে যাইতে চাহে না—ধনীর ছায়া সে স্পর্শও করে না। তবে বিপন্ন হইয়া যদি কোনো ধনী তাহার শরণাপন্ন হয়, তখন মস্লিনাথ শরণা- পরে কার্যোদ্ধারের নিমিত্ত প্রাণ পর্যন্ত পণ করে-কাৰ্য্যেদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত সে কখনই তাহাকে পরিত্যাগ করে না। কিন্তু সে-স্কৃত দমন। আনন্দময় যুবক হইলেও দুষ্কৃতদমনে তাহার অত্যন্ত উৎসাহ এবং প্রবল প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তির জন্যই তাহার শত্রু সংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়াছিল ; কিন্তু জগতকে যে গ্রাহ্য করে না, এরূপ হীন শত্রুকে সে কি গ্রাহ্য করিবে—আর কেনই বা করিবে ? মল্লিনাথ কি সামা যুবক না সে সামান্য প্রাণ? শক্তি সামর্থ্যে সে ভীম, শাসনে সে অসুর, ক্ষমায় সে ঋষি। তাহার সহিত তুলনা কাহার? নিরাপদদের বহুভাগ্য যে এমন “অসুর-ঋষিকে তাহারা বন্ধুত্বের হেম-শৃঙ্খলে বাঁধিতে পারিয়াছে। বামাপদ সে কথা বুঝিতেন বলিয়াই সােনার ধন মল্লিনাথকে তিনি এতটা খাতির করিতেন এবং সেইরূপ খাতির তাঁহার পুত্রকন্যাগণকে করিতে বলিতেন। কিন্তু তাঁহার সে কথা তখন বুঝে কে আর বুঝিবার চেষ্টাই বা করে কে? বুঝিবার মত বুদ্ধি না থাকিলে মল্লিনাথকে ত এতটুকুও বুঝিতে পারা যায় না। ভবিষ্যতে যে আদর্শ পুরুষ হইবে, সে কি সামান্য মানুষ ? কিন্তু মল্লিনাথ যে কত বড়—আরও কত বড় হইবার সম্ভাবনা আছে, সে তাহার কিছুই জানিত না বুঝিত না—জানিতে বুঝিতে চাহিত না। তাহার কাষ সে হাসিয়া খেলিয়া করিয়া যায় ; আর সহস্র বিস্মিত চক্ষু তাহার কাৰ্য্যাবলী দেখিয়া কেবল তাহারই পানে মন্ত্র মুগ্ধবৎ চাহিয়া থাকে। মল্লিনাথের বয়সও অল্প আর শক্তিও সামান্য। লােকে ভাবিতে লাগিল-এই অল্প বয়সে, এত সামান্য শক্তিতে মল্লিনাথ এমন সব মহৎ কাৰ্য্য কিরূপে করিয়া থাকে। মূর্খের দল বুঝিতে পারে না, পিতৃপুরু- ষের পুণ্য না থাকিলে, মহাবংশের সন্তান না হইলে, সাধনার পথে না চলিলে এমন সুনাম অর্জন করা কাহারও ভাগ্যেই ঘটিয়া উঠে না। জীবের মঙ্গল যাহারা অহােরহ চিন্তা করে, সেই হিত-চিন্তায় যাহারা আত্মােৎসর্গ করিয়া থাকে, তাহাদের পুণ্য কি সামান্য, না শক্তি সাধারণ ? ছুছুন্দর চন্দন-বিলাস সাজিলে, সমাজে তাহা চলিবে কেন? সেই অলৌকিক পুণ্য-প্রতিভাসম্পন্ন মল্লিনাথ যখন হাসিয়া হাসিয়া রঙ্গ করিয়া বামাপদর সংসারের সকলের সহিত আনন্দ কৌতুক হৰিত, তখন জালা, ব্যথা, বেদনা, যন্ত্রণা সে সংসারে আর কিছুই থাকিতনা। অমন যে হিংসাপরায়ণ সরমা, সেও মল্লিনাথের শাসন- নীতিতে অনেকটা দুরস্ত হইয়াছিল। কিন্তু আর একস্থানে সে শাসনের বিপরীত ফল ফলিল। সেই কথাই এখন আলােচনার বিষয়।
সােনার বাঁধন । মল্লিনাথ দেখিতেও সুরূপ, সুকান্ত ছিল ; আর তাহার হাস্য পরিহাস, শক্তি, প্রতিভা, আশ্রিতরক্ষণ-প্রবৃত্তি, স্নেহ, প্রীতি, করুণা, আত্মীয়তাও অসামান্য ছিল। সেই রূপ, সেই গুণ প্রতিদিন দেখিতে কণ্ঠস্বর প্রতিদিন শুনিতে শুনি সেই। সেই আদর প্রতিদিন পাইতে পাইতে, সেই স্নেহের শাসনে প্রতিদিন শাসিত হইতে হইতে, বামাপদর সংসারের আর একটা প্রাণী মশ্বিনাথকে আত্ম সমর্পণ করিল। সরযূ না বুঝিয়া, না জানিয়া যে মন্ত্রে মল্লিনাথকে ভাল বাসিয়াছে, এ রমণী জানিয়া শুনিয়া সেই মন্ত্রে মল্লিনপিকে প্রণয়াস্পদ বলিয়া স্থির করিয়া লইল-গরলকে অমৃত বলিয়া প্ৰহণ করিল। এ রমণী বামাপদর জ্যেষ্ঠ পুত্রবধু--নিরাপদর ভাৰ্য্যা। পিত্রালয়ের যথেচ্ছাচারে শশুরালয়ে লাঞ্ছিতা, অবমানি ও সকলের পরিত্যক্তা হইয়া মল্লিনাথকে সহকার তরুর মত সে আশ্রয় করিবার মানস করিল। কিন্তু মনািথ যে সহকার নহে, এ কথা প্রণয়ােন্মাদিনী একবারও মনে করিতে পারিল না। কুলবালার কুলক্ষয়ের ইহাই ত প্রথম লক্ষণ। সপ্তদশ পরিচ্ছেদ নিরাপদর পত্নী উষাসুন্দরী কখন যে কোন্ অবসরে মল্লিনাথকে ভালবাসিয়া ফেলিয়া ছিল, সে তাহা নিজেই জানিতে পারে নাই। মল্লিনাথ তাহার স্বামীর অন্তরঙ্গ বন্ধু-তাহাদের সংসারের অশেষ হিতৈষী—সে তাহাদের বাড়ীতে আসে, সকলের সহিত গল্প গুজব সােনার বাধন রঙ্গ কৌতুক করে—সকলেই তাহাকে মান্য করিয়া থাকে--সেই সুত্রে উষাসুন্দরীও একের অধিকবার মল্লিনাথের সহিত দেখা করিবার ও কথা কহিবার সুযােগ পাইয়াছে। কিন্তু সে সুযােগ হইতে ত তাহার সহােদর। সরস্বতীও বঞ্চিতা হয় নাই। সরস্বতী তারাপদর স্ত্রী। কৈ, সরস্বতীর ত উষার মত মতিগতি হয় নাই ! সুতরাং কিছুতেই বলিতে পারা যায় না যে এই সাক্ষাৎ ও গল্প গুজব রঙ্গ কৌতুকই যত অনিষ্টের মূল। যাহা ঘটিয়াছিল তাহা উষাসুন্দরীর প্রবৃত্তির দোষে—সে প্রবৃত্তি সে কপালদোষ সকলের হয় না। অনেকে হয়ত আবার উষাসুন্দরীরও প্রবৃত্তির দোষ দিতে চাহিবে না। তাহাদের হয়ত কথা হইবে—ঘটনা স্রোতে পড়িয়া উয মল্লিনাথকে ভালবাসিয়া ফেলিয়াছিল। উষার পিত। উষার বিবাহকালে--- বৈবাহিককে ফাকি দেয়। কিন্তু তাহার জন্য নিরপরাধিনী উষ। শশুর গৃহে উপেক্ষিত হয় কেন ? অনাদরের মাঝখানে যে বাহার নিকট অদর পায়, সে কি আর তাহাকে ভাল না বসিয়া থাকিতে পারে ? আর একটা কথা—একটু বেশী বয়সেই উষার বিবাহ হইয়াছিল । সরস্বতীর অপেক্ষা অনেক জিনিসই সে অনেক ভাল বুঝিত। শশুর গৃহে আসিয়া তাহার প্রথম চেষ্টা হইল, যাতে শশুর শাশুড়ী, স্বামী দেবর প্রভৃতিকে সে সুখী করিতে পারে, কটুম কুটুম্বিতায় যাহাতে কলহ বিবাদের ছায়া না পড়ে। কিন্তু ননদিনী সরমার দোষে সব নষ্ট হইয়া গেল। গােলটা মিটাইবার জন্য বিভাবতী অনেক চেষ্টা করিয়াছিল বটে; কিন্তু সরমার কূট মন্ত্রণায় তাহার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হইয়া গেল। মুখরা উষাসুন্দরীরও মুখ সেই সময়ে বেশ ফুটিয়া উঠিল। কাজেই নিরাপদও তাহাকে উপেক্ষা না করিয়া থাকিতে সােনার বাঁধন পারিল না। আদর পাইত উষা কেবল মল্লিনাথের নিকট—মল্লিনাথের প্রকৃতিই সকলকে আদর স্নেহ করা। সে আদর উষার চক্ষে প্রণয়ীর মোেদর স্বরূপ প্রতীয়মান হইল। অনাদরে যাহার হৃদয় মরুভূতুল্য হইয়াছিল, আদরের ধারা পাইয়া সে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। কিন্তু সেই উৎফুল্লতাই ঊষার সর্বনাশের কারণ হইল। সে কথা উষা বুঝিয়াও বুঝিতে পারিল না অথবা বুঝিতে চাহিল না। এ সম্বন্ধে তাহার হৃদয় মধ্যে সুমতি কুমতির তর্ক বিবাদ বাধিয়া গেল। সুমতি, কমতির নিকট তর্ক যুক্তিতে পরাজিতা হইয়া কোথায় যে পলায়ন করিল, তাহার সংবাদ, উষাসুন্দরী কিছুই রাখিতে পারিল না । উষা যখন বেশ স্পষ্ট বুঝিল, মল্লিনাথকে সে ভালবাসিয়া ফেলিয়াছে, তখন সে কোটা উচিত, কোটা অনুচিত, কোন্টা ধৰ্ম্ম, কোষ্টা অধর্ম, কোন্ পথ সুপথ, কোন্ পথ কপথ, সে দিকে তাহার আর বড় দৃষ্টি থাকিল না। সে তত্ত্ব তাহাকে তখন বুঝাইয়াই বা দেয় কে ? মল্লিনাথ সম্বন্ধে কোনাে কথাই ত সে কাহারও নিকট প্রকাশ করে নাই —আর প্রকাশ করেই বা কোন্ মুখে? বুক তাহার ফাটিয়া যাইতেছিল, কিন্তু মুখ ভাহার কিছুতেই ফুটিল না। ধীলােকের দশাই ত ঐ। ভালবাসার আবর্তে পড়িয়া উষ। সরযুর উপর বিশেষ ঈর্ষান্বিতা হইয়া পড়িল। সরমার মত উষাও ভাৰনা হইল—মল্লিনাথ যদি সরযূকে বিবাহ করিয়া ফেলে, তাহা হইলে ত তাহার সমস্ত আশা নিৰ্ম্মল হইবে। কিন্তু সে ব্যাপারের উপর উষার ত কোনাে হাতই, নাই। মনের হিংসা-বিষ তাহার মনেই রহিল। সে বিষ কাহার উপর আর সে প্রয়ােগ করিবে ? তবে বিষ যাহার আছে, সে একে- বারে স্থির হইয়া থাকিতে পারে না। বিষের জ্বালা, বড় জাল-- “রিষ বিষ” বড় ভয়ঙ্কর।
সােনার বাঁধন • ** ***** ** ০ নিরাপদদের সংসারে তাহাকে লইয়া যে এতটা কাণ্ড চলিতেছিল, সে কথা মল্লিনাথ কিন্তু বিন্দু বিসর্গও জানিত না-জানিতে পারিলে ও বিশ্বাস করি না। তবে একটা ব্যাপার দেখিয়া-মলিনাথ এখন যেন কেমন এক প্রকার হইয়া পড়িয়াছে। উষা এখন প্রায়ই লুকাইয়া মল্লিনাথকে পান দিয়া যায়, হাসি, চাহনি ও স্পর্শে কেমন যেন একটা বৈদ্যুতিক প্রবাহ মিশাইয়া দেয়,আর সেই শক্তির বলে মল্পিনাথ কেমন যেন এক প্রকার হইয়া পড়ে। তবে প্রণয় সম্বন্ধে তাহার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া মল্লিনাথ স্থির করিল—উষার এটা একটা পাগলামীরই অঙ্গ হইবে। ঊষাকে পাগলিনী বলিয়া মল্লিনাথের ধারণা ছিল। কারণ----ঊষা অত্যন্ত বুকিত, অত্যন্ত ঝগড়া করিত, সময়ে সময়ে অত্যন্ত নির্লজ্জার মত ব্যবহার করিত—আবার সে অত্যন্ত সেবা-পরায়ণা ছিল। সংসারে উপেক্ষিত। হইলেও সেবা কাৰ্যে তাহার উৎসাহ আদৌ কমে নাই। উষার আর একটা রােগ ছিল—জাগিয়া প্রলাপ বকা। লােকে বলিত—সেটা প্রলাপ নহে—“ঠাকুরের ভর।” ভূত, প্রেত, ঠাকুরেরই ভর হউক, অথবা রােগ বা অন্য কিছুরই ভর হউক, সে সময়ে কিন্তু সে ভীষণ প্রকৃতি হইয়া দাড়াইত। মল্লিনাথ ভাবিল—এ পান দানের ব্যাপারটা—সেই বুঝি ভরেরই একটা ডাল পালা। কিন্তু মল্লিনাথের আর একটা ভাবনা হইল-উষার করস্পর্শে তাহার একটা আচ্ছন্ন ভাব, এক উমভাব তাহাকে ব্যাকুল করিয়া তুলে কেন ? এরূপ ভাব ত পূর্বে তাহার কখনও হয় নাই। ০ ৭০ সােনার ধন অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ নিরাপদর সংসার এখন খুবই সুখের। সে সংসারে । এখন কিছুরই অভাব নাই। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও বৃদ্ধ বামাপদ ও মাতঙ্গিনী বেশ সুখী হইতে পারিতেছেন না। সে সংসারে এখন ঝগড়া বিবাদ বাড়িয়াছে, হিংসা দ্বেষ বাড়িয়াছে,মনের মিল, প্রণের হাসি সে সংসারে কাহারও বড় একটা নাই ; সমবেদনা, সহানুভূতি সে সংসার হইতে একেবারেই অন্তর্হিত হইয়াছে। তাহার স্থান অধিকার করিয়াছে, ভ্রাতৃবিরােধ, পরস্পরের নিন্দা, গ্লানি, অসূয়া । তাহা দেখিয়া বামাপদ কাতর হইয়া পড়িলেন। তিনি ভাবিলেন-- দুঃখের দিন ছিল ভাল। দুঃখের দিনে তাহার পুত্রেরা তাহার বাধ্য ছিল-পিতা মাতাকে তাহারা সম্মান করিত— তাহাদের ভক্তি ছিল—তাহাদের পরস্পরের মধ্যে স্নেহ, প্রীতি, মমতা ছিল। কিন্তু সুখের দিন আসিতেই সে সংসারে এ কি অভাবনীয় পরিবর্তন যটিয়া গেল। নিধনের ধন হইলে কি এমনই হয় ? মল্লিনাথের শাসনে সে মননামালিন্ত খুব বাড়িয়া উঠিতে পারিতে ছিল না বটে, কিন্তু তাহা বস্তু মধ্যস্থ ক্ষীণ অগ্নির মত ধীরে ধীরে, প্রসারিত হইতে লাগিল। তাহার ফল ভবিষ্যতে যে কিরূপ দাড়াইবে, তাহা বুঝিতে বামাপদর আর বাকী রহিল না। মল্লিনাথকে তাহারা সকলে ভয় করে, ভক্তি করে; সুতরাং তাহাদের ঝগড়া, বিবাদ মিটাইয়া দেওয়া,-তাহাদের শাসন করা- মল্লিনাথের পক্ষে খুব কঠিন ব্যাপার নহে। তবে সে মিটমাট, t
সােনার বাঁধন
৭১
সে শাসন কতক্ষণ চলে ? স্বার্থবশে যাহাদের মনের মিল নষ্ট
হইয়াছে, শাসনের শক্তিতে তাহাদের কি আর মিলিত করা যাইতে
পারে ? শাসনের সম্মুখে তাহারা ঠিক থাকিত, কিন্তু তাহার পশ্চাতে
তাহারা যথেচ্ছাচারী হইয়া পড়িত। স্বার্থচালিত লােকের পক্ষে এরূপ
হওয়া খুব অস্বাভাবিক নহে।
এই সকল কাণ্ড দেখিয়া মল্লিনাথ ক্রমেই বিরক্ত হইয়া পড়িতে
লাগিল। তাহার বিরক্তিতে নিরাপদ, তারাপদ প্রভৃতির এখন বিশেষ
কিছু আসিয়া যায় না। তাহারা এখন উপার্জনক্ষম—তাহাদের হাতে
এখন টাকা আছে—তাহারা কিছু সম্পত্তি করিয়াছে—এখন তাহারা
মল্লিনাথকে আর তেমন ভয় করিবে কেন ? যাহারা তা করে,
তাহারা উত্তম, যাহারা না করে-তাহার অধম। নিরাপদ ও তাহার
ভ্রাতাগণ এখন অধমের অধম হইয়া পড়িয়াছে। যাহারা অকৃতজ্ঞ,
তাহারা অধম নহে ত কি ?
অধম সহােদরদিগের অধন ব্যবহার দেখিয়া---বিভাবতী দারুণ
চটিয়া গিয়াছিল। নিরাপদ প্রভৃতিকে পিতা মাতার সম্মুখে পাইয়া
তর্কচ্ছলে সে একদিন বলিল—
“হরে নিরু, তারু, তােরা যে আজকাল কা'কেও বড় একটা
মাতে চাস্ না, তার কারণ কি বল্ দেখি ? গর্ব করিস ত
কিছু পয়সার—সে পয়সা এল কোথা থেকে বল দেখি?”
নিরাপদ, তারাপদ সে কথার উত্তরে কোনাে কথা বলিল না।
কিন্তু তাহাদের অপর ভ্রাতা দুইটী সমস্বরে কহিল—
“কেন, আমরা রােজগার করি, আমাদের দোকান পাট
আছে, ব্যবসা
বাণিজ্য
আছে-আমাদের
টাকার আবার,
ভাবনা কি?”
৭২ সােনার বাঁধন সে কথা শুনিয়া সকলেই অবাক হইয়া গেল। তেমন কথা শুনিবার জন্য কেহই প্রস্তুত ছিল না। সে কথা শুনিয়া বিভাবতী অত্যন্ত রাগিয়া উঠিয়াছিল। পিতার মুখের দিকে চাহিয়া সে কহিল- “এরা এত শীগগির যে মল্লিনাথের মহত্ত্ব ভুলে যাবে—অকৃতজ্ঞ হবে, তা কি স্বপ্নেও কখনো ভেবেছিলে কি সেই দিন-যে দিন পেটের জ্বালায় অপরের ফেলে দেওয়া তরকারির খােসাগুলাে পর্যন্ত রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে সিদ্ধ করে পেটের জালা থামিয়েছি; মনে পড়ে কি সেই দিন—যে দিন অন্নকষ্ট, বস্তুক, রােগ, শােক, ব্যথা, বেদনা, অপমান, লাঞ্ছনা, উপদ্রব অত্যাচার আমাদের সকলকেই প্রায় মৃত্যুর দ্বার অবধি টেনে নিয়ে গিয়েছিল । মনে পড়ে কি সেই দিন—যেদিন আমাদের দারিদ্র্যের কথা নিয়ে, 'আমাদের অসহায় অবস্থা দেখে আমাদের প্রতিবাসী, আমাদের আত্মীয় স্বজন আমাদের কত বিদ্রুপ না করত? কিন্তু মল্লিনাথ এসে আমাদের পেটের জ্বালা থামিয়েছে; টাকা কড়ির কিছু সংস্থান করে দিয়েছে, যশ মান, খ্যাতি, প্রতিপত্তি এখন আমাদের যা কিছু, তা’ সেই মল্লিনাথেরই কৃপায়। আজ দিন পেয়ে যদি সে দিন ভুলে যাই, তাহ'লে ক্ষতি তা'তে কার? ক্ষতি আমাদের। কারণ, ভগবান যে তা’তে বিরূপ হবেন। তখন আমাদের হবে কি?” বিভাবতীর কথায় ও প্রশ্নে বৈদ্যুতিক প্রবাহ ছিল। সে প্রবাহে সকলেরই হৃদয় কাপিয়া উঠিল। পূর্বের দিনগুলি—অতীতের স্মৃতি তাহাদের মনে পড়িয়া গেল। তখনকার মত তাহারা মলিনাথকে আবার দেবতা বলিয়া স্বীকার করিতে স্বীকার করিতে বাধ্য হইল। সেই অবসরে-বামাপদ ও মাতঙ্গিনী সেই প্রবাহে আপন আপন শক্তি পাতা মুটিনে না সােনার বাঁধন মিশাইয়া দিয়া-পুত্র, কন্যা ও বধূমাতাদিগকে সংসারের সুখ শান্তি সম্বন্ধে অনেক উপদেশ দিলেন। কিন্তু দারুণ দুর্যোগের পর সূর্যোদয় হইলে লােকের যেমন সেই দুর্যোগের কথা মনে থাকে না, দুঃখের পর সুখের মুখ দেখিয়া নিরাপদাদের এত কথা মনে থাকিবে কি ? তাহা থাকিলে সে সংসারের অশেষ মঙ্গল হইত, অশেষ উন্নতি হইত। উৎস মার্গের যাহারা পথিক হইতে উদ্যত হইয়াছে, তাহার কি অার উপদেশ বাক্য মানিয়া চলে ? উপদেশ মানিলে, কর্তব্য পরায়ণ ইলে, কতজ্ঞতা থাকিলে, ধর্মভীরু হইলে সংসারে কি এত দুঃখ কষ্ট থাকে, না সংসারে কাহারও সহিত কাহারও মুখ বাঁক বাকি ২য়? যাহারা সমস্ত জিনিষ বুঝে বলিয়া গর্ব করে, তাহারা এই সামান্য কথাটা বুঝিতে পারে না কেন? তবু তাহারা বলে—তাহারা বজ্ঞ। হারা যদি বিজ্ঞ হয়,-তবে মূখ কে ? উনবিংশ পরিচ্ছেদ নলিনাথ তাহার পিতার নিকট হইতে প্রায়ই পত্র পায় এবং প্রায়ই সে সকল পত্রের উত্তর দেয়। কিন্তু এবার যেরূপ পত্র তাহার পিতৃদেবের নিকট হইতে সে পাইল, সেরূপ পত্র ইতঃপূৰ্বে মল্লিনাথ আর কখনাে পায় নাই। পত্রে লেখা ছিল- . বাবা মল্লিনাথ, তােমায় অনেক দিন দেখি নাই এখন মাঝে মাঝে তােমায় দেখিতে ইচ্ছা করে। তােমার গর্ভধারিণীরও সেই ইচ্ছা বিশেষ বলবতী ৭৪ সােনার বাঁধন --- হইয়াছে। তােমার হাতে যদি বিশেষ কোনাে কাজ না থাকে, তাহা হইলে তুমি একবার হরিদ্বারে আসিতে পার। পড়া শুনা তুমি কি কর, না কর, তাহার সংবাদ কখনও লই নাই-আজও লইব না। কারণ-এখনকার কালের পড়াশুনার যেরূপ রীতি প্রবর্তিত হইয়াছে, তাহার সহিত আমার সহানুভূতি নাই। আমার বিশ্বাস—লেখা পড়া শিখিয়া এখনকার কালের অনেকেই গণ্ডমূখ হয়, ধৰ্মকৰ্ম ভুলিয়া যায়, ধর্মদ্রোহী হয়, সমাজদ্রোহী হয়, নীতিদ্রোহী হয়—পিতা মাতাকে মানিয়া চলে না, শাসন মানিতে চাহে না, শৃঙ্খলার দিক দিয়াও যাইতে চায় না। তাহাতে হয় কি—তাহারা উৎসন্ন মার্গের পথিক হয়---ভগবানক ভুলিয়া যার ভােগবিলাসী হইয়া ইহকাল ও পরকাল সমস্ত নষ্ট করে। আমি লক্ষ্য করিয়াছি, ধৰ্ম্মে তােমার মতি আছে, ভগবানে তােমার বিশ্বাস আছে, সেবা ধৰ্ম্মে তুমি আস্থাবান। তাহা লক্ষ্য করিয়াই অধিক বিদ্যা তােমায় শিখাইবার যত্ন করি নাই। সে কারণে তােমার গর্ভধারিণী ও অন্যান্য অনেকেই আমার বুদ্ধির নিন্দা করিয়াছে এবং ভবিষ্যতে করিবেও। কিন্তু তাহাতেও আমি বিচলিত হইবার লােক নহি। সে প্রকৃতির লােক হইলে আমার একমাত্র বংশধরকে একা ফেলিয়া আমি কি হরিদ্বারে থাকিতে পারি ? ভগবান আমাকে যাহা করাইয়াছেন, তাহাই আমি করিয়াছি। নিজের বুদ্ধিতে আমি যে কখনও কিছুই করি না—সেইটুকুই আমার সান্ত্বনা। যাউক সে কথা। গুরুদেব বলেন, তােমার অদৃষ্ট লিপিতে লেখা আছে—কিছু কালের জন্য তােমায় সংসার ত্যাগ করিতে হইবে। অন্য পিতা হইলে, কথাটা শুনিয়াই হয়ত ব্যাকুল হইয়া পড়িত।
সােনার বাঁধন কিন্তু গুরুদেবের কৃপায় আমি তাহা হই নাই। গুরুদেবকে প্রত্যক্ষ ভগবান বলিয়া আমি মনে করি। আমি যখন ভগবানের সান্নিধ্যে আছি, তখন আর আমার ব্যাকুলতা আসিবে কিসের জন্য ? কিন্তু তােমার গর্ভধারিণীর সে বিশ্বাস এখনও হয় ত আসে নাই। সেই কারণেই তিনি একটু অস্থির হইয়া পড়িয়াছেন। তুমি এখানে আসিয়া তাহার ব্যবস্থা করিও। গুরুদেব তােমায় আশীৰ্বাদ করিয়াছেন। আমার এবং তোমাৰ গর্ভধারিণীর আশীৰ্বাদও তুমি জানিও। ইতি- আশীৰ্বাদক তোমার পিতা। এমন পত্র কোনাে পিতাই বােধ হয় কোনাে পুত্রকে লিখেন । পিতা, পুত্রকে লালন পালন করেন, পুত্রের ভবিষ্যৎ উন্নতির জন্য পুত্রকে লেখা পড়া শিখাইয়া থাকেন এবং পুত্র যাহাতে সৰ্বতে'- ভাবে সুখী হয়, সংসারে যাহাতে তাহার শ্রীবৃদ্ধি হয়, যশ মান যাহাতে তাহার বাড়িতে পারে তাহারই চেষ্টা তিনি করিয়া থাকেন। কিন্তু হরসুন্দরের প্রকৃতি স্বতন্ত্র। এরূপ স্বাস্থ্য ভাল কি মন্দ—তাহ বিচার করিবার যাহাদের অধিকার আছে, তাহারাই তাহা বিচার করিবেন। তবে সে স্বাতন্ত্র্য যে সংসারীর পক্ষে খুব মঙ্গলজনক নহে, এই অবধি ভয়ে ভয়ে বলিতে পারা যায়। সংসারে সকলেই সন্ন্যাসী হইলে সংসার চলিবে কেমন করিয়া—সংসার করিবে কে ? পিতার পত্র পাইয়া পুত্র খুব আনন্দিতই হইল। সংসারের সেবা করিতে মল্লিনাথ ভালবাসে বটে, কিন্তু সংসার তাহার একটুও ভাল লাগে না। অদ্ভুত পিতার অদ্ভুত পুত্র। সে যখন শুনিল; সংসার ত্যাগ তাহার ভাগ্যে আছে, তখন সােনার বাঁধন আনন্দ ত তাহার হইবারই কথা। শৈশব হইতে যাহার কোনাে বন্ধনই নাই, যৌবনের ভােগ বাসনা যাহার হৃদয় অধিকার করিতে অসমর্থ হইয়াছে, সংসার ত্যাগ তাহার পক্ষে সুখের সংবাদ। বিশেষ সে আদেশ-সে সংবাদ যখন তাহার পিতার নিকট হইতে আসিয়াছে। হরিদ্বারে জনক-জননীর নিকট যাইবার জন্য মল্লিনাথ উদ্যোগ করিতে লাগিল। সে সংবাদ শুনিয়া—মল্লিনাথের যাহারা আশ্রিত, মল্লিনাথ না থাকিলে যাহাদের মধ্যে অনেকেই বাঁচিতে পারে না, তাহারা বজ্রাহত হইল। তাহার! বলিতে লাগিল—মল্লিনাথ যদি তাহাদের ছাড়িয়া চলিয়া যায়,-তাহা হইলে তাহাদের দিন চলিবে কিসে! সুতরাং মল্লিনাথ হরিদ্বারে যাইলে, তাহাদের ও মল্লিনাথের সঙ্গে যাইতে হইবে। মল্লিনাথ ভাবিতে লাগিল –এ আবার কি উৎপাত। বিংশ পরিচ্ছেদ নানা কারণে মল্লিনাথের হরিদ্বারে যাইতে দুই দশ দিন বিলম্ব ঘটিতে লাগিল। সেবক, সেবা-ক্ষেত্র ছাড়িয়া সহজে কি যাইতে পারে ? মল্লিনাথের কাজ কত ! যাইব বলিলেই কি মল্লিনাথের যাওয়া হয় । হরিদ্বারে যাইতে তাহার যতই বিলম্ব ঘটিতে লাগিল, সরম গােপনে গােপনে মল্লিনাথের ততই কুৎসা রটনা করিতে আরম্ভ করিল। সরমার আন্তরিক ইচ্ছা—মল্লিনাথ সেই মূহুর্তেই হরিদ্বারে চলিয়া যায়। কিন্তু আজ-কাল করিয়া মল্লিনাথের ত কিছুতেই যাওয়াই ইতেছে না।
সােনার বাঁধন ৭৭ সরমা তখন উমাপদ ও শ্যামাপদকে মুরুব্বী ধরিয়া তাহাদের বুঝাইতে লাগিল-মল্লিদা যে কলিকাতা ছাড়িয়া স্থানান্তরে যাইতে চাহিতেছে না, তাহার একটা গূঢ় রহস্য আছে। গৃঢ় রহস্যের উল্লেখ করিতে যাইয়া সরমা, সরযূ ও মল্লিনাথের নাম একাধিকবার উল্লেখ করিয়া ফেলিল। দুঃখের পর সুখের মুখ দেখিয়া অপদার্থ যুবক দুইটা ইতিমধ্যেই গর্কিত হইয়া উঠিয়াছিল। মল্লিনাথের সাহায্যে ও দয়ায় তাহাদের গােষ্ঠী যে অনাহার বশতঃ মৃত্যুর কবল হইতে বাঁচিয়াছে, সে কথা একেবারেই তাহারা ভুলিয়া গিয়াছিল। তাহাদের ধারণা ও বিশ্বাস যে বাণিজ্য ব্যাপারেই তাহাদের ধনাগম হইয়াছে। সুতরাং মল্লিনাথের কাছে খামকা-খামকা তাহারা এতটা হীন হইয়া থাকিবে কেন—এতটা মাথা হেঁট করিবে কেন? শ্যামাপদ, উমাপদকে কহিল- “সেজদা’, বাবার কি বুদ্ধি দেখেছ? খেটে খুটে রােজার কছি আমরা, আর নাম হচ্ছে মল্লিদা'র। আচ্ছা, তাও না হয় বাবার খাতিরে সহ্য করা গেল। কিন্তু সরযূকে নিয়ে এ কি ঢলাঢলি ?” একখানা জলচৌকির উপর বসিয়া পড়িয়া—উমাপদ বলিল— “আমিও তাই ভাবি। কিন্তু বাবা, মা, দাদারা কিছু না বললে আমরা কি করতে পারি ?” “আচ্ছা, মল্লিদা’ কি ভাল লােক?” “যা শুনছি, তা'তে ত একটুও ভাল লােক বলে মনে হয় না। “তা হলে উপায়?” “হরিদ্বারে চলে গেলে, সব লেঠাই ত চুকে যায়। কিন্তু যাচ্ছে কৈ ?” “কেন যে যাচ্ছেন, তার কারণও ত শােনা গেল। তাইত ৭৮ সােনার বাধন • ভাবছি—উপায়। এখন আমাদের কিছু মান সম্রম হয়েছে, কিছু টাকা কড়িও হয়েছে। এখন ত আমাদের আর মল্লিদা’র নামে বিকোন উচিত নয়। তার উপর আবার এই অত্যাচার ! “বাবার যেমন কাণ্ড-ই।” “এক কথায় আমি সব ঠাণ্ডা করে দিতে পারি। কিন্তু কি ব—মল্লিদার সামনে কোনো কথা বতে কেমন যেন আমার বাধ- বাধ ঠেকে। তা না হ'লে মজাটা একবার দেখাতেম।” “আরে আমরও ত ঐ অবস্থা । না হলে আমিই কি ছেড়ে কথা কইতেম?” তারাপদ আসিয়া ও সে পরামর্শে যােগদান করিল। তারাপদর সম্প্রতি মনের ভাব-মলিনাথ, তাহাদের সহিত আর কোনো সম্পর্ক রাখে। ভ্রাতাগণের মধ্যে তারাপদ বেশ একটু কূটবুদ্ধিসম্পন্ন। তাহার মনের ইচ্ছ!--সকল তাকে ঠকাইয়া তাহাদের বিষয় ও ব্যবসায় সে একা একাই ভােগ করে। কেবল মল্লিনাথের ভয়ে তারাপদর কল্পনা কৰ্যে পরিণত হয় নাই। এখন উপযুক্ত অবসর বুঝিয়া কনিষ্ঠ সহোদরগণের পরামর্শে সে যোগদান করিল এবং জ্যেষ্ঠ নিরাপদ ও যাহাতে তাহাদের মতাবলম্বী হয়, সে বিষয়েও যথাবিহিত চেষ্টা করিবে বলিয়া উমাপদ ও শ্যামাপদকে উৎসাহ প্রদান করিল। এ সকল কাণ্ড তাহাদের গােপনে গােপনেই চলিয়াছে। বামাপদ বা মাতঙ্গিনী এ সকল কীর্তির কথা এতটুকুও জানিতে পারেন নাই সড়যন্ত্রের ফলে নিরাপদকে ও ভ্রাতাদিগের মতে মত দিতে হইল। তখন ষড়যন্ত্রের সভায় স্থির হইয়া গেল--মল্লিনাথের মত কুৎসিত জীব পৃথিবীতে আর জন্ম গ্রহণ করিয়াছে কিনা সন্দেহ। মল্লিনাথ তখনও দেবতা আছে-বামপদ, মাতঙ্গিনী, বিভাবতী ও সােনার বাঁধন সরযুর চক্ষে। *, উষার নয়নে মল্লিনাথ অনুরূপে প্রতিভাত। অভাগিনী, বিবাহিতা হইয়াও মল্লিনাথের প্রতি অনুরক্ত। একবিংশ পরিচ্ছেদ এত কাণ্ড, এত পরামর্শ, এত সডসন্ত্র যে ভিতরে ভিতরে : গেল, তাহার সংবাদ মল্লিনাথ কিছুই রাখে নাই—তাহার বিন্দু বিসর্গ ও সে জানিতে পারি না। তাহা শুনিলে মন্নিনাথ হয় ত কি এক অলৌকিক শক্তিবলে এক কথায় ত বড় কাণ্ডট! মিটাইয়া দিত। কিন্তু সে যাহাতে এ ব্যাপরের বিন্দু বিসর্গও জানিতে না পারে, তারাপদ সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করিয়াছিল। সে অবশ্য তারাপদর সয়তানী বুদ্ধি। দুই এক দিনের মধ্যেই এই ক। ওটা একটা প্রকণ্ডে পরিণত হইল । বামাপদ ও মাতঙ্গিনী অবশ্য এ কাণ্ডের কিঞ্চিৎ আভাস পাইয়াছিলেন। মল্লিন।পের সহিত তঁাহার পুত্রগণের মনোমালিন্ধু অবশ্যম্ভাবী বুঝিয়। তেঁাহার। মরমে মরমে মরিয়া গেলেন। মল্লিনথ সে সংসারে জন্ম সহ করিয়াছে, তাহা কে করিতে পারিবে আর কেনই বা করিবে ? সেই মলিনাথের বিরুদ্ধে বামাপদর পুত্রগণ এইরূপে ভীষণ ষড়ষধ করিতেছে। মানুষ এতই স্বার্থপর, এতই অকৃতজ্ঞ, এমনিই "নিক হারাম ! বামাপদ সে বিষয়ে যতই চিন্তা করিতে লাগিলেন, ততই তিনি অস্থির হইয়া পড়িলেন—অবশেষে নিজেকে অত্যন্ত অসহায়, নিরুপায় ভাবিয়া তিনি কাদিয়া ফেলিলেন।
সােনার বাঁধন কলম্নের নিকট পুত্রগণের অভদ্র হীন আচরণ দেখিয়া বামাপদ ও তঙ্গিনীর অশ্রু- পাত করা ভিন্ন আর কিছু উপায় ছিল না। নিরাপদ প্রভৃতি এখন উপায়ক্ষমতাহাদের হাতে টাকা আছে—নি, অক্ষম, গৌরবহীন জন্মদাতার কথা অথবা গর্ভধারিণীর উপদেশ তাহারা কি আর শুনিবে, না তাহাদের আদেশ হতভাগ্য দাম্ভিক সন্তানগণ মাথা পাতিয়া লইবে । কথা যাহারা শুনে, শাসন যাহারা মানে, তাহারা ত কুলতিলক। কিন্তু বামাপদর পুত্রগণকে সে শ্রেণীর মধ্যে গণ্য করা যায় না। স্বার্থের দায়ে, বুদ্ধির দোষে তাহারা পাপ-পঙ্কে নিমগ্ন হইয়াছে। তাহারা কৃতঘ্ন, তাহারা বন্ধুদ্রোহী। সুতরাং তাহার • কুলঘ্ন । আর কি আশা করিতে পারা যায় ? তথাপি তাহাদের ডাকাইয়া বামাপদ অনেক কথা বুঝাইলেন- তাহাদের আঁটীয়া উঠিতে না পারিয়া বৃদ্ধ অনেক কটু কথা কহিলেন— ইহকালের ও পরকালের ভয় দেখাইয়া অনেক উপদেশই তিনি তাহা দের দিতে লাগিলেন। কিন্তু তারাপদ সে সকল কথা তাহার সহােদর- বর্গের কাণে পৌছাইতেই দিল না। তর্ক করিয়া বিবাদ করিয়া, তাচ্ছিল্য করিয়া পুত্র পিতার কথা নাকোচ করিয়া দিল--পিতাকে হারাইয়া দিল। পুত্ৰ ভাবিল—তাহার বুন্ধি ক্ষুরধার-বিলাতে জন্ম- ইলে সে হয়ত একদিন রাজ-মন্ত্রী হইলেও হইতে পারিত। অার পিতা ভাবিলেন--পুত্ররত্নটী মুখ, বৰ্ব্বর, হীন, কাপুরুষ, অকৃতজ্ঞ। বামাপদ তখন চিন্তা করিতে লাগিলেন–এরূপ ক্ষেত্রে কি করা উচিত-কোন্ পথ গ্রহণীয়। পুত্রগণের উপর যথেষ্ট ক্রোধ এমন কি মুণারও উদ্রেক হইয়াছিল বটে; কিন্তু তবুও তিনি পুত্রগণের বিরূদ্ধা- চরণ করিতে পারেন না। কু-পুত্র অনেক দেখিতে পাওয়া যায়—কিন্তু কু-পিতা বা কু-মাতা করন ?
No text on this page.
No text on this page.
পাতা দিবেন না ৮১ সােনার বাঁধন | ' . . যখন কোনো উপই আর রহিল না, যখন বামাপদ তাহার পুত্র- গণকে কিছুতেই শাসনের গণ্ডীর মধ্যে আনিতে পানি না, তখন বিভাবতী তাহার পিতাকে কহিলেন—“বাবা, এ সব কথা মল্লিনাথকে কি আপনার বলা উচিত নয়? চিন্তাক্লিষ্ট মুখে বামাপদ বলিলেন-“তাতে লাভ?” “লাত আর কি। তবে কথা গুলাে তা'র কাণে যাওয়া উচিত—তা'তে সে সাবধান হতে পারে।” “কোন্ মুখে তা'কে এ সব বলব আমি?” “সেই যা কথা। কিন্তু আমরা পাপ করছি যে দেবতার বিরুদ্ধে !” “দেবতার ত’তে আর ক্ষতি কি, ব মা? ক্ষতি আমাদের। আমি ভাবছি-এই পাপে আমার বংশ নির্ধ্বংশ না হয় !” কথাটা শুনিয়া মাতঙ্গিনী চমকিয়া উঠিলেন। কথাটা উচ্চারণ করিয়া বামাপদও যে স্থির ছিলেন—এমন নহে। কিন্তু যে কথা মুখ দিয়া বাহির হইয়া গিয়াছে, তাহা ফিরাইয়া আনিবার উপায় কি ? নিরাপদ, তারাপদ, উমাপদ ও শ্যামাপদ সকলেই পিতার অভিশাপের কথা শুনিল। কিন্তু কথাটা তাহারা গায়েই মাথিল না। তাহারা এখন মল্লিনাথের সহিত সকল সম্পর্ক ছিন্ন হইবার উপায় উদ্ভাবনে ব্যস্ত হইয়াছে ; কোনাে কথা—কোনাে হিতবাণী তাহাদের কাণে আর পৌছায় কি? মার মল্লিনাথ তখন কি করিতেছিল? হরিদ্বারে সে চলিয়া যাইলেও নিরাপদদের সংবর যাহাতে সুশৃঙ্খলে চলে, যাহাতে তাহাদের ব্যবসায় বাণিজ্যের কোনাে ক্ষতি না হয়, অর্থাগমের পথ যাহাতে বেশ সুগম হয়—যাহাতে তাহাদের মান সম্রম বজায় থাকে, মান সন্ত্রম উত্তরােত্তর বৃদ্ধি পায়—তাহারই উপায় সে কল্পনা করিতেছিল—তাহারই ব্যবস্থা ;
৮২ সােনার বাঁধন করিবার জন্য তাহার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবগণের দ্বাবস্থ হইতেছিল। কিন্তু বিধির বিধানচক্র সকল ব্যবস্থাই উল্টাইয়া দিল। কৰ্ম্মফল-অদৃষ্ট! ইহার উপর আর কি কথা আছে ! মানুষ গড়ে-ভগবান ভাঙ্গেন। কর্মফল--অদৃষ্ট। দ্বাবিংশ পরিচ্ছেদ মল্লিনাথ তাহার পিতার নিকট হইতে আবার" একখানি পত্র পাইল। কলিকাতা ছাড়িয়া হরিদ্বারে যাইবার জন্য সে পত্রে তাহাকে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হইয়াছে। সুতরাং এবার আর সে চুপ, করিয়া থাকিতে পারিল না। নিরাপদদের ভবিষ্যৎ মঙ্গলের ব্যবস্থা করিতে তবু তাহার দুই একদিন বিলম্ব হইয়া গেল। মলিনাথ ভাবিলকি করা যায়, হাতের কাজ ফেলিয়া যাই বলিলেই ত আর যাওয়া চলে না। নিরাপদের মনের ভাব এখন কিন্তু অন্যরূপ। তাহারা ভাবিতে লাগিল--ও সব কাজের কথা নহে। মল্লিনপি যে বাম্বার পত্র পাইয়াও কলিকাতা ছাড়িয়া অন্যত্র যাইতে চাহিতেছে না, তাহার ভিতর একটা বিশেষ কথা আছে। পরের ছেলের এমন কি দায় যে পরের মঙ্গলের জন্য পিতার আদেশ ঠেলিয়া রাখে। নিরাপদদের মনে এখন পাপ চিন্তা প্রবেশ করিয়াছে। তাহারা 'অনেক পাপ কথা ভাবিতে লাগিল। মল্লিনাথ যাহাতে শীঘ্ৰ কলিকাতা ছাড়িয়া চলিয়া যায়, তারাপদর প্ররোচনায় নিরাপদ সে বিষয়ে বিশেষ চেষ্টা করিতে লাগিল। মল্লিনাথ কিন্তু সে কথার কিছুই বুঝিয়া সােনার বাঁধন উঠিতে পারে নাই। তাহার ধারণা—নিরাপদ প্রভৃতি যে হরিদ্বারে যাইবার জন্য তাহাকে এতটা জি করিতেছে, সেটা তাহারই মঙ্গলােদ্দেশ্যে । সেরূপ ভাবা ভিন্ন মল্লিনাথ আর কি ভাবিতে পারে ? জীবনে সে কখনাে পাপ করে নাই ; মঙ্গল ভিন্ন সে কখনও অপরের অমঙ্গল চিন্তা করে নাই ; পরার্থ, 'পরসেবা যাহার জীবনের ব্রত, লােকের ছক্কা পাঞ্জা” সে কেমন করিয়া বুঝিবে আর কেনই বা তাহা বুঝিতে যাইবে তাহার কাজের জমা খরচ নাই—হিসাব নিকাস খতিয়ান নাই। জীব ও জগতের কাৰ্য্য করিয়াই সে সুখী—জীব ও জগতকে ভালবাসিয়াই তাহার আনন্দ। অত হিসাব নিকাস সে কেন করিবে—অত ছোেট মন তাহার কেন হইবে ? হিসাবী হইলে অবশ্য তাহাকে বুঝিতে হইত যে অযাচিত ভাবে কাহাকেও ভালবাসিতে নাই, অযাচিত ভাবে কাহারও কোনো উপকার করিতে নাই। তাহা করিলে উপকারির মান থাকে না সম্ভম থাকে না---মৰ্যাদা থাকে না। বেশী মেলামেশা করিলে ক্ষুদ্র- চেতা হীন প্রাণ অন্ত্যজের নিকট মহৎকে উপেক্ষিতই হইতে হয় । কিন্তু সে শিক্ষা ত মল্লিনাথের হয় নাই। সুতরাং যে কুটীল পথ নিরাপদরা ধরিয়াছিল, মল্লিনাথ কিছুতেই তাহার সন্ধান রাখিতে পারিল না। নিরাপদর বারম্বার অনুরোধের উত্তরে-মল্লিনাথ কহিল, “তােমরা দেখছি নিরু, যথার্থই মহং। তােমাদের নিজেদের মঙ্গলমঙ্গলের দিকে না চেয়ে—যখন তােমরা এক রকম জোর করেই আমাকে এখান থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছ, তখন আমাকে বুঝতে হচ্ছে যে আমার মঙ্গলটাই তােমাদের কাম্য। বাবা যখন তােমাদের কথা শুনবেন, তখন তিনি ভারী খুশী হবেন।”
সােনার বাঁধন ima মুখখানা কাদ কাদ করিয়া নিরাপদ কহিল- “তােমাকে ছেড়ে মল্লিদা’ আমাদের যে জীবন্ত হয়ে থাকতে হবে, সে কথা তােমাকে না বললেও তুমি বুঝতে পার। কিন্তু বাবা যখন বার বার চিঠি লিখছেন, তখন ত’ তােমার আর এক মুহুৰ্ত্তও দেরী করা উচিত হচ্ছে না। তারাপদ আমাকে বলছিল- মল্লিদা’ যদি আর কোনাে রকমে একটুও দেরী করেন, তাহলে আমরা জোর করে তাকে ধরে রেলগাড়ীতে তুলে দিয়ে আসব। আর সকলেরও প্রায় ঐ কথা।” “খুব ভালবাসার কথা বটে ! যাক, কালই আমি রওনা হচ্ছি। সকলকে যা’ বার আমি সব বলে দিয়ে গেলে। তােমরা খুব সাবধানে থেক—খুব সাবধানে কাজ কর্ম ক’র। বুঝেছ ত, পয়সা থাকলে কত কষ্টই পেতে হয় । সে পয়সা যখন হাতে পেয়েছ, নির্বোধের মত সেটা আর হাতছাড়া কর না। ভয়ে ভয়ে সদ্ভাবে থেক, কার সঙ্গে প্রতারণা প্রবঞ্চনা ক’র না, ভগবানে মতি রেখ, বাপ, মাকে সুখী করতে চেষ্টা কর--তাহলেই সব ঠিক চ'লে যাবে। বদিয়াতী কর না—তাহলেই দুঃখ পাবে-বরবাদ হবে। কথা গুলাে মন দিয়ে শুলে ত হে?” নিরাপদের বুকের ভিতরটা বাতাসে কবাটপড়ার মত ঝণাৎ করিয়া উঠিল। চেষ্টা করিয়া ধাক্কাটা অতিকষ্টে সান্দাইয়া নিরাপদ কহিল— “তােমার কথা আর বুঝব না মলিদা’? তা—তা, নিরাপদর মুখ দিয়া আর কথা বাহির হল না। তাহার ভাগ্যবলে তারাপদ সেই সময়ে সেই স্থানে আসিয়া পড়িল । তারাপদ ভারী খেলােয়াড়। খেলােয়াড়ী করিয়া সমস্ত জিনিষটা সােনার বাঁধন সে সালাইয়া লইল। তারাপদ না আসিলে নিরাপদ নিশ্চয়ই একটা গােল বাধাইয়া বসিয়া থাকিত। সেই কারণেই ত তারাপদ যখন তখন বলিয়া থাকে- “দাদা ভারী বােক|--হস্তী-মূখের উপর—মনুমেন্টমূখ।” সে যাহা হউক, স্থির হইয়া গেল --“মল্লিদা” তারপর দিনই হরিদ্বার যাত্রা করিবে । অদ্য রাত্রিতে তাহাদের বাটীতে মল্লিদা’র ভােজনের নিমন্ত্রণ। ভােজট। বিদায়ী ভােজ । যােবিংশ পরিচ্ছেদ নিরাপদদের বাড়ীতে মল্লিনাথের আজ রাত্রিতে ভােজের নিমন্ত্রণ। এ ভােজটা বিদায়ী ভেজ। এ ভােজে বক্তৃতাও ছিল, আর চখের জলও যথেষ্ট ছিল। এ ব্যাপারে বক্তৃতা যাহারা করিয়াছিল, তাহারা প্রাণহীন—নির্মম। বক্তৃগণের মধ্যে তারাপদই অবশ্য অগ্রণী। বক্তৃতা সে জমাইয়াছিল ভাল। নিরাপদর সুর একটু বেসুরা হইতে আরম্ভ হইয়াছিল, কিন্তু তারাপদ বুদ্ধি করিয়া সেটা খুব সালাইয়া লইল। তারাপদ উপস্থিত না থাকিলে হয় ত চালটা ধরা পড়িত। তবে চ'খের জলটা যাহাদের পড়িয়াছিল, তাহাদের সে জল কর্দমাক্ত নহে। গিরি-সম্ভতা নিঝরিণী যেমন আপন ইচ্ছাবলে পাহাড় ভেদ করিয়া আপনিই বাহির হয়—সে জলে যেমন মলা মাটা থাকে না, মল্লিনাথের জন্য যাহারা কাদিয়াছিল, অশ্রুধারা তেমনই মর্মভেদী, তেমনই অনাবিল ।
সােনার বাঁধন • ১, ২, ৩, চক্ষের। জল পড়িয়াছে—বামাপদ, মাতঙ্গিনী ও বিভাবতীর। সরযু ও ঊষাও বুঝি লুকাইয়া লুকাইয়া অনেক কঁদিয়াছে। কে জানে, কাহারও সম্মুখে মল্লিনাথের কথা কহিতে কিম্বা তাহার জন্য চ’খের জল ফেলিতে--কেন উষা লজ্জা করে-কেমন যেন সে হইয়া পড়ে। নিরাপদও একটু কাদিয়াছিল । মল্লিনাথকে বিদায় দান করিতে অতীতের অনেক কথাই তাহার মনে পড়িতেছিল। মল্লিনাথ না থাকিলে যে তাহারা বাঁচিতে পারিত না, আজ যাহা হইয়াছে, তাহা যে হইতে পারিত না, সে কথা নিরাপদ বার বার মনে হইতে লাগিল। কিন্তু চ'খের জলের তােড়ে পাছে—“দাদা গলিয়া যায়, সে দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে তারাপদর একটুও ঔদাসীন্য ছিল না। কড়া পাহারায় নজরবন্দী হইয়া নিরাপদর অন্তরের অশ্রু অন্তরেই শুকাইয়া গেল। নিরাপদর অশ্রুজল বাহিরে যতটা গড়া- ইয়া পড়িতেছিল, ভণ্ডামী-বিষ তাহাতে মিলাইয়া দিয়া তারাপদ সে জলটাকে অব্যবহাৰ্য্য করিয়া তুলিল। তারাপদ, উমাপদ, শ্যামাপদ ও সরমাও বড় অল্প কদিল না ; কিন্তু লােকলজ্জায় অথবা সয়তানী- বুদ্ধিতে চখের জল ফেলিয়া নদী নালাকেও যাহারা হার মানাইয়া দেয়, তাহাদের সে জলে কি হলাহল আছে, মল্লিনাথ-চরিত্রের লােক তাহা কখনাে বুঝিতে পারে কি ? সে কথা না বুঝাই ভাল—তাহা বুঝিলে জগতে মলিনাথ-চরিত্র সুদুল্লভ হইবে। সয়তানী ধরিতে শিখিলে ভাল লােকও ক্রমে সয়তান হইয়া পড়ে। ভােজনাদি শেষ হইতে রাত্রি অনেক হইয়া গিয়াছিল। সুতরাং সে রাত্রিতে মল্লিনাথের বাসায় ফিরিয়া যাওয়া আর কোনাে মতেই ঘটিয়া উঠিল না। বামাপদ ও মাতঙ্গিনী কহিলেন- সােনার বাঁধন “তাও কি হয়—এত রাত্রে কি আর মল্লিনাথের বাসায় যাওয়া হ'তে পারে!” কথাটা-তারাপদ ও সরমার একটুও ভাল লাগিল না। তাই : ব মনের কথা—এই সহানুভূতির ঘটায় মল্লিনথি যদি আর ও কিছু দিন কলিকাতায় থাকে এবং থাকিতে থাকিতে যদি তাহার হরিদ্বারে যাওয়াটাই আর ঘটিয়া না উঠে, তাহা হইলে ত ভারী বিপদের কথা । কিন্তু মল্লিনাথের কথায় ত তাহাদের কাহারও কথাটা কহিবার যাে-র নাই। সুতরাং বিরক্ত হইয়াও তাহাদের চুপ করিয়াই থাকিতে হইল। মল্লিনাথ ধীর পদে বহিৰ্বাটীর একটা ঘরে শয়ন করিতে চলিয়া গেল । • মল্লিনাথ একাকীই শয়ন করিয়াছিল। কাহাকেও কাছে লইয়া সে শয়ন করিতে পারে না। মল্লিনাথের আর একটা স্বভাব- অন্ধকারে কিছুতেই তাহার নিদ্রা হয় না। তাহার শয়ন-মন্দিরের বহিভাগে একটা আলাে থাকা চাই ই চাই। এ রাত্রিতেও সে নিয়ম রক্ষিত হইয়াছিল। খােলা দ্বারের মধ্য দিয়া • আলােক-রশ্মি গৃহে প্রবেশ করিতেছিল। সুতরাং খুব বেশী আলাে গৃহমধ্যে প্রবেশ না করিলেও-গৃহট অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল না। সেই মালােকে গৃহ প্রাচীরস্থ দুই একখানা অস্পষ্ট চিত্র দেখিয়া কি একটা পুরাতন কথা ভাবিতে ভাবিতে মল্লিনাথ ঘুমাইয়া পড়িল। কি এক দুঃস্বপ্ন দেখিয়া শেষ রাত্রিতে যখন তাহার ঘুমটা ভাঙ্গিয়া গেল তখন মলিনাথ চোখ মেলিতেই দেখিল-ঘরটা অন্ধকার। সে ভাবিল-হয় তৈলাভাবে না হয় কটকা বাতাসে প্রদীপটা নিবিয়া গিয়া থাকিবে। দীপ-শলাকা বাহির করিবার জব্দ - সােনার বাঁধন মল্লিনাথ আপন উপাধান-তল অন্বেষণ করিতে লাগিল। কিন্তু দীপ শলাকা ত সে স্থানে নাই। মল্লিনাথের মনে পড়িল—উপাধান তলেই দীপ-শলাক। সে রাখিয়াছিল ! তাহা গেল কোথায়----আশ্চৰ্য্য । ইতিমধ্যে কাহারও নিশ্বাসের শব্দ যেন মল্লিনাথের কাণে আসিতে- ছিল। মল্লিনাথ একটু ভয় পাইল, একটু কৌতুহলীও হইয়া পড়িল। বিজড়িত স্বরে মল্লিনাথ জিজ্ঞাসা করিল-"কে?” উত্তর হইল"পেত্নী।” সত্য সত্য পেত্নীর কথা শুনিলে অথবা তাহার দর্শন পাইলে মল্লিনাথ হয় ত ততটা বিস্মিত হইত না—আর ততটা ভয়ও পাইত না। কিন্তু কণ্ঠস্বর শুনিয়া মল্লিনাথ যখন বুঝিল, সে কণ্ঠস্বর উষার, তখন তাহার কেমন একটা ভয়, কেমন একটা বিস্ময় আসিল। যাহা পূৰ্বে সে কখনও অনুভব করে নাই। রাস্তার দিকের জানালাটা তাড়াতাড়ি খুলিয়া দিয়া--এক দৃষ্টিতে “প্ৰেতিনীর মুখের দিকে চাহিয়া মল্লিনাথ কহিল- “সত্যই ত উষা! এত রাত্রিতে অন্ধকারে এ ঘরে তােমার এমন অবস্থায় দেখলেম কেন উষা?” একটুও সঙ্কোচের ভাব প্রকাশ না করিয়া—ধীর, স্থির, অবিকম্পিত কণ্ঠে উষা বলিল—“কাজ ছিল।” অধিকতর বিস্ময় সহকারে মলিনাথ জিজ্ঞাসা করিল— “এমন সময়ে আমার কাছে তােমার কিসের কাজ? প্রগলভার মত উষা সে প্রশ্নের কি একটা উত্তর দিতে যাইতে- ছিল। কিন্তু তাহা সাইয়া লইয়া সে কহিল— “তুমি আমায় হরিদ্বারে নিয়ে চল। আমি এখানে আর থাবও , আর থাকতে পারবও না।”
সােনার বাঁধন
০
* 1/1/
* *
“তুমি কি বলছ ?”
“কিছু না। কেবল এই বছি—আমি তােমার
পদয়ে
থাকতে চাই।”
এ কথার অর্থ মল্লিনাথ কিছুই বুঝিতে পারিল না।
একটা নিদারুণ ভয় ও লজ্জায় সে অভিভূত হইয়া পড়িল । কেমন
একটা অশান্তি যেন তাহাকে ঘেরিয়া ফেলিল—কেমন একটা জাল",
কেমন একটা যন্ত্রণা তাহার মর্মস্থল যেন ছিড়িয়া ফেলিতে লাগিল।
গৃহে আর সে তিষ্ঠিতে পারিল না। গৃহ হইতে বেগে নিষ্ফা
হইয়া বামাপদর গৃহ সম্মুখে উপস্থিত হইয়া দ্বারে সজোরে আঘাত
করিয়া সে ডাকিল--
“মা-মা।”
সে আহ্বান শব্দে—বাটীর সকলেই প্রায় উঠিয়া পড়িয়াছিল ।
মাতঙ্গিনী সভয়ে জিজ্ঞাসা করিল—
“কি হয়েছে বাবা? কঁপছ যে ! ভয় পেয়েছ কি বাবা?”
মল্লিনাথ সে সকল প্রশ্নের কোনাে উত্তরই করিতে পারিল না।
তাহার প্রাণে তখন কি একটা হাহাকার উঠিয়াছে—কেমন একটা
ঝড় বহিতেছে।
মল্লিনাথ একবার ভাবিল—সকল কথাই সে মাতঙ্গিনী
বামাপদর নিকট বলিয়া ফেলে। তাহাতে কিন্তু উষার সমূহ
বিপদপাতের সম্ভাবনা আছে বুঝিয়া--সে আর কোনাে কথাই
কহিল না।
মল্লিনাথ কোনাে কথা না বলিলেও-সরমা, তারাপদ প্রভৃতিকে
গােপনে ডাকিয়া লইয়া যাইয়া সকল কথাই বলিয়া দিল। কথা-
গুলা অবশ্য অতিরঞ্জিত। সরমা সে রাত্রিতে জাগিয়া ছিল—অলক্ষ্যে
৪
সােনার বাঁধন
থাকিয়া মল্লিনাথ ও উষার কথােপকথন সে শুনিয়াছিল। তাহার
স্বভাবই ঐরূপ ।
সরমা যাহা শুনিয়াছিল—তাহার দশগুণ গল্প করিয়া সকলের
নিকট সে একটা বিশেষ বাহাদুরী লইবার চেষ্টা করিল। সে সকল
কথা শ্রবণান্তর তারাপদ তাহার পিতৃদেব ও মাতা ঠাকুরাণীকে বেশ
দশ কথা শুনাইয়া দিল। কথা গুল। অবশ্য মল্লিনাথেরই বিরুদ্ধে।
তবে তাহাতে কিস্তুত কিমাকারের আবরণ ছিল। তাহার কারণ—
মল্লিনাথকে স্পষ্ট কোনো কথা বলিতে এখনও তাহাদের সাহস হয় না।
মলিনাথ সকল কথা কাণে তুলিয়াছিল কি না—তাহা বলিতে
পারা যায় না। সে যাহা হউক, কোনো কথারই মল্লিনাথ
প্রত্যুত্তর করিল না। কাহাকেও কিছু না বলিয়া ৰাটী হইতে সে
বাহির হইয়া গেল। বামাপদ ও মাতঙ্গিনীর সহস্র আহ্বানেও আর
মল্লিনাথ ফিরিয়া আসিল না।
তারাপদ ও সরমা ভাবিল--আপদ এতদিনে বিদায় হইল ।
বামাপদ কিন্তু মাতঙ্গিনীকে ডাকিয়া বলিলেন—
“গিরি, আমার সংসারের লক্ষ্মী-শ্ৰ বুঝি ঐ মল্লিনাথের সঙ্গেই
গেল গাে।”
?
সােনার বাঁধন চতুর্বিংশ পরিচ্ছেদ মল্লিনাথ ত চলিয়া গেল—কিন্তু তাহাতে ঊষার নির্যাতন . বাড়িল যে! তাহাত বাড়িবারই কথা। হিন্দুর ঘরে এমন প্রবৃত্তি লইয়া যে স্ত্রীলােক জন্মগ্রহণ করে, তাহাকে এমন নির্যাতন সহ্য করিতে হইবে বৈকি? কথাটা—নিষ্ঠুরতার ; কিন্তু কুলটা প্রবৃত্তিটাই কোন্ কৰুণ স্নিগ্ধ । যে স্ত্রীলোেক কুলধৰ্ম্ম গ্রাহ্য করে না, স্বামীর গৌরব মৰ্য্যাদ রক্ষা করে না, মানবতার যে অপমান করে, তাহাকে সহানুভূতি করিবে কে? শয্যা কলুষিত করিলেই যে স্ত্রীলােক অসতী হয়—এমন নহে ; মন কলুষিত করিলেও তাহাকে সে পাপে পাপিনী হইতে হয় । যে কারণেই হউক, উষা সেই পাপই করিয়াছিল। পাপের ফল তাহাকে ভােগ করিতে হইল। তবে মাত্রাটা কিছু বেশী হইয়া পড়িয়াছিল। মাত্রা বৃদ্ধির জন্য সরমাকে সম্পূর্ণরূপে দায়ী করা নীতি- বিরুদ্ধ হয়ত হইবে না। ঈর্ষা তাহাকে পশু করিয়াছিল স্ত্রীর প্রতি এত অত্যচার—রূপমুগ্ধ নিরাপদ কিন্তু আর নীরবে সহ্ন করিতে পারিতেছিল না। পত্নীর পক্ষ অবলম্বন করিয়া এখন 'সকলকেই বেশ দুই কথা সে শুনাইয়া দিতে লাগিল। কাজেই তাহাতে ঝগড়া বিবাদের বেশ সুত্রপাত হইয়া উঠিল—সংসারটা তাহাতে উৎস যাইবার পথে দাঁড়াইল। বামাপদ ও মাতঙ্গিনী বহু চেষ্টা করিয়াও তাহ,আর বন্ধ করিতে পারিলেন না। বামাপদর সুখের সংসার ভাঙ্গিবার বিশেষ একটু কারণ আছে « * A. A ১%As/ সােনার বাঁধন তারাপদ যত্ন করিয়া প্রতিদিন বিষবৃক্ষমূলে জলসেচন করিত। সুতরাং দিনে দিনে সে বৃক্ষ বেশ পুষ্টই হইতে লাগিল। সংসারে বিবাদ বাধিলে—সংসারটা ভাঙ্গিয়া যাইলে তারাপদরই সমধিক লাভবান হইবার সম্ভাবনা। কারণ সে কৌশলী। তাহার কৌশলেই ত বামা- পদর সংসারে এমন ভাঙ্গাভাঙ্গি-এমন ঝগড়া বিবাদ। যতদিন মল্লিনাথ ছিল, ততদিন এ ঝগড়া বিবাদ কেহই করিতে সাহস করে নাই। কিন্তু আজ সাহস বাড়িয়াছে সকলেরই। মল্লিনাথ আর সে সংসারের কর্তা নাই বলিয়া—সেখানে এমন বিশৃঙ্খলা ঘটিতে আরম্ভ হইয়াছে। বামাপদ, মাতঙ্গিনী, বিভাবতী ও নিরাপদর প্রতিপদে সে কথা মনে হইতে লাগিল-'প্রতি কথায় মল্লিনাথকে মনে পড়িতে লাগিল। কিন্তু সে এখন কোথায় ? যাহার জন্য বামাপদর দুঃখের সংসার সুখের হইয়াছে, যাহার চেষ্টায় নগণ্য নিরাপদ ও তাহার ভ্রাতারা সমাজে সম্মান পাইয়াছে, যাহার আত্ম- বলিতে সে সংসারের প্রতিষ্ঠা, সে যে অভিমানভরে চলিয়া গিয়াছে, সে কথা কেমন করিয়া তাহারা ভুলিতে পারে? মল্লিনাথের কথা মনে পড়িলেই বামাপদ ও মাতঙ্গিনী প্রভৃতির নয়নে জলধারা বহিতে থাকে —প্রাণ যেন ফাটিয়া বাহির হইবার উপক্রম হয়। কিন্তু তাহাতে কি আর মল্লিনাথ ফিরিয়া আসিবে। বামাপদর সংসারে ঝগড়া বিবাদ খুবই চলিতেছিল। সহােদরে সহােদরে বাক্যালাপ বন্ধ হইয়া গিয়াছে,-সহােদর সহােদরাগণের মধ্যে একটা বিশেষ অপ্রীতি ঘটিয়াছে-পিতা-মাতাকেও পুত্রেরা এখন আর তেমন মানিয়া চলে না—আর পিতামাতাও বুঝি আর •• তাহাদের স্নেহের চক্ষে দেখিতে পারেন না। সে সংসারে কেমন একটা বিশ্রী ওলট পালট হইয়া গেল। তাহার ফলে তাহাদের তেমন k.::[ - 0; সােনার বাধন কার কারবার নষ্ট হইল—মান সম্রম ইজ্জৎ সমাই ঘুচিয়া গেল— পড়িয়া রহিল কেবল দুঃখ, কলঙ্ক, অনুতাপ ! এ দুঃখ, এ অনুতাপ তারাপদর অবশ্য কিছুই হয় নাই। কারণ, বিবাদ বিসম্বাদকে নিমন্ত্রণ করিয়াই তাহাদের সংসারে ডাকিয়া আনিয়া বেশ দুই পয়সার সে সংস্থান করিয়াছে। কার কারবার তারাপদই চালাইত। বিবাদ বাধাইয়া দিয়া—টাকা-কড়ি আত্মসাৎ করিবার সে বেশ সুবিধা পাইয়াছে। বিবাদীগণ এখন কি তাহাদের ব্যবসায় বাণিজ্য দেখিবার অবসর পায় ? সংসারের জালা ব্যথায় বামাপদ ও মাতঙ্গিনী ক্রমেই অস্থির হইয়া পড়িতে লাগিলেন। তাহারা স্থির করিলেন—কোনাে তীর্থ স্থানে তাহাদের শেষ জীবনটা কাটাইয়া দিবেন। কিন্তু তাহারা ত “যাইব” বলিলেই যাইতে পারেন না। সরযুর বিবাহ না দিয়া তাঁহারা তীর্থ যাত্রা করেন কেমন করিয়া ? 4std:-19ic নহে। বামাপদর সংসারে যে এরূপ বিপ্লব উপস্থিত হইয়াছে, তাহা কেবলই সরমা বা তারাপদর জন্য তারাপদর পত্নী সরস্বতীকেও ইহার জন্য কতকটা দায়ী করা চলিতে পারে। সংসারে যখন সে প্রথম আসিয়াছিল, তখন ছিল সে এক প্রকার। কিন্তু সরমার সহিত মিলিয়া শেষে দে আর একপ্রকার হইয়া পড়িয়াছে। এখন সরস্বতী-- তাহার দিদি উবাকেও ঘৃণার চক্ষে দেখে- তাহার সহিত বাক্যালাপ ১ সােনার ধন । পৰ্যন্ত সে বন্ধ করিয়া দিয়াছে। সংসারটা যাহাতে হাঙ্গিয়া যায়, সরস্বতী এখন সে বিষয়ে চেষ্টা করে এবং তাহার স্বামীকেও সেইমত উপদেশ দিয়া থাকে। তারাপদ একাই একসহ। তাহার উপর পত্নীর উৎসাহে উৎসাহিত হইয়া এবং পত্নীর সহানুভূতি পাইয়া-সংসারে আগুণ জ্বলাইয়া দিবার সে বিশেষ চেষ্টা করিতে লাগিল। চেষ্টার ফলও ফলিল। বামাপদর সংসারে কলহ বিবাদ এখন দিবারাত্রি চলিতেছে। এখন মল্লিনাথ নাই-কে তাহা বন্ধ করে ! বিবাদ যখন চরমে উঠিল, পিতামাত। বর্তমানেও স্ত্রী লইয়া তারাপদ তখন ভিন্ন সংসার পাতিল। পৈত্রিক কারবারটা এখন নষ্ট হইয়া গিয়াছে। তারাপদ এখন একটা নূতন কাবুরার খুলিয়াছে—তাহার কোন পাঠ অবশ্য ভালই চলিতেছে। দুষ্টলােকে বলিতে লাগিল--তারাপদ সকলকে ফাকি দিয়া বাবসা- যের সমস্ত টাকা আত্মসাৎ করিয়া নিজ নামে এখন কারবার চালাইতেছে। সুতরাং আইন আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করিয়া জিসিষটা উদ্ধার করিবার চেষ্টা করা নিরাপদ প্রভৃতির খুবই উচিত। সেই উপায়ই নিরাপদ প্রশস্ত উপায় মনে করিল। দাদার মতে মত দেওয়া ভিন্ন উমাপদ এবং শ্যামাপদও আর কোনও উপায় স্থির করিতে পারিল না। পিতার নিষেধ, মাতার আদেশ কেহই আর এখন মানিতে চাহে না। নিরাপদ কহিল-- “বাবার হুকুম শুতে গেলে, মায়ের উপদেশ মানুতে গেলে, ''আমাদের সুখ সােয়াস্তি থাকে না।” কথাটা শুনিয়া বামাপদ ও মাতঙ্গিনী ক্ষুন্ন হইলেন। কিন্তু কেবল ক্ষুন্ন হইয়াই বা লাভ কি? মনের কথা মনে চাপিয়া রাখিয়া সােনার ধন পারে, তারাপদকে ডাকাইয়া বামাপদ তাহাকে অনেক সদুপদেশ দান করিলেন—অনেক ভাল কথা বুঝাইবার চেষ্টা করিলেন। তাতে কিন্তু তারাপদর নিকট হইতে টাকা বাহির হইল না। তারাপদ বলিল—তাহার সহােদরেরা যাহা করিতে তাহাতে তাহার কোনাে আপত্তি নাই। তারাপদ আরও বলিল- দাদার মত পরের দয়ার উপর ' কখনই সে নির্ভর করে নাই। যাহা কিছু সে সঞ্চয় করিয়াছে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়াই তাকে করিতে হইয়াছে। এরূপ ক্ষেত্রে যাহারা তাহাকে চোর বলে, তাহারই সেই নামের যােগ্য—সেই পদবাচ্য। ভ্ৰাতায় প্রায় বাকবিতণ্ডা তখন খুব চলিল। সে তর্ক বিবাদ অক্ষম বামাপদ কোনাে মতেই মিটাইতে পারিলেন না। মাতঙ্গিনী সন্তান-বাৎসল্যবশত: সে বিবাদের মাঝখানে আসিয়া ছাইতে রক্তারক্তি কাণ্ডটা বন্ধ হইল বটে, কিন্তু ব্যাপারটা আদালতে গড়াইল । কোনও পক্ষই যখন “আপােষ” মানে না, তখন বিচার- লয়ের শাসন ভিন্ন তাহা আর কিরূপে মিটিতে পারে? বামাপদ বই- মানেও বামাপদর পুত্রগণের ভাগ্যে তাহাই ঘটিল। সকলই কর্মফল । মােকদ্দমা রীতিমতই চলিতে লাগিল। বামাপদের সমাজে মুখ দেখাইবার আর উপায় রহিল না। অনন্যোপায় হইয়া মাতঙ্গিনী, বিভাবতী, সরমা ও সরযূকে সঙ্গে লইয়া তিনি হরিদ্বারে চলিয়া গেলেন। তাহার বিশ্বাস ছিল—মল্লিনাথ যত বিরক্তই হউক না কেন, মল্লিনাথের নিকট উপস্থিত হইলে সে আর তাহাদের ফেলিয়া দিতে পারিবে না। যাইবার সল্প পুত্রগণকে ডাকাইয়া তিনি বলিয়া গেলেন—এক ঘরের দুই কন্স আনিয়াই তাহার যত সর্বনাশ হইয়াছে, যত বিপদকে সােনার বাঁধন তিনি ডাকিয়া আনিয়াছেন। বাহিরের আপদ না আনিলে এমন বিপদে তাহাকে হয় ত কখনই পড়িতে হইত না। তারাপদ তখন সরমার বিরুদ্ধে নানা অভিযােগ করিতে পশ্চাৎ- পদ হইল না। সে বলিতে লাগিল--সরমাও সে সংসারের অল্প ক্ষতি করে নাই। কিন্তু বামাপদ সে সকল কথা বড় একটা কাণে তুলিল না। বামাপদ হরিদ্বারে চলিয়া গেলেন। তাঁহার পুত্রেরা সেই সুযােগে আদালতের উকীল মােক্তারগণের দ্বারস্থ হইল এবং পরের হাতে তুলিয়া দিয়া পথের ভিখারী হইবার পথ প্রশস্ত করিল। আদালতগৃহে এবং আদালতের অলিন্দে ব্যবহারাজীবগণের পশ্চাতে পশ্চাতে বামাপদের পুত্রগণ এখন ক্রীতদাসের মত ঘুরিয়া বেড়ায়। মামলা মােকদ্দমা করার বিপদ কত !–মানুষ তবু ত বুঝিয়াও বুঝিবে না ! ঘরের টাকা ষষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ যে আশায় বুক বাঁধিয়া বৃদ্ধ বামাপদ হরিদ্বারে যাইয়া উপস্থিত হইলেন, সে আশায় তাহাকে বঞ্চিত হইতে হইল। এতটা পথ এত কষ্ট করিয়া যাইয়াওবামাপদ মল্লিনাথের সাক্ষাৎলাভ করিতে ' পারিলেন না। মল্লিনাথ হরিদ্বারে আসিয়াছে বটে, কিন্তু তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার বামাপদের কোনও উপায় নাই। যে মল্লিনাথ জীব ও জগতকে ভালবাসিয়া আত্মহারা হইয়া পড়িত, সেবাধৰ্ম্মে সােনার বাঁধন ১৭ যে মল্লিনাথ আনন্দ ও গৌরব অনুভব করিত, মানুষকে ভালবাসিয়া, মানুষের সেবা করিয়া যে মল্লিনাথ ভগবৎপ্রেমে অধিকারী হইবার আশা করিতেছিল, সেই মল্লিনাথ এখন সেবাধৰ্ম্মে বীতশ্রদ্ধ, নিৰ্মম, নির্দয়, নর-বিদ্বেষী। মানুষের নাম শুনিলে, মানুষের ছায়া দেখিলে সে এখন চমকিত হয়। মানুষের নিকট সে এখন থাকেও না-- মানুষের সন্নিধানে সে আর যাইতেও চাহে না। মানুষ এখন মল্লিনাথের চক্ষে অতি ঘৃণ্য-পশুর অধম ; মানুষ দেখিলে মল্লিনাথ এখন ক্ষেপিয়া উঠে। মানুষ তাহার কাছে যাইলে, মানুষকে মারিতে সে তাড়া করে। মল্লিনাথ থাকে এখন নীরব কুটীরে—নির্জনে! তাহার পিতা- মাতার সহিতও মলিনাথের বড় একটা দেখা হয় না। মল্লিনাথের সহিত কাহারও দেখা করিতে—কথাবার্তা কহিতে আপাতত নিষেধ আছে। নিষেধ কর্তা—হরসুন্দরের গুরুদেব-মাধবানন্দস্বামী। সাধু যতি বলিয়া মাধবানন্দস্বামীর প্রসিদ্ধি আছে। মাধবানন্দ নিষেধ-বাক্যে কৃহিয়াছেন—মপ্লিনাথের নিকট আপাতত যেন কেহ না যায়। সে বড় ঘা পাইয়াছে—তাহাতেই সে নর-বিদ্বেষী হইয়া উঠিয়াছে। মানুষের এমনটাই হইয়া থাকে—এরূপ হওয়াই স্বাভাবিক। সে যাহা হউক, যতদিন পর্যন্ত তাহার হৃদয়ের ক্ষত ভাল হয়, যতদিন তাহার মানসিক ব্যাধি না সারে, ততদিন তাহার সহিত কাহারও সাক্ষাৎ করিবার আবশ্যক নাই। মল্লিনাথের গােগ যদিও দুশ্চিকিৎস্য, তথাপি তাহার চিকিৎসার ভার লইয়াছেন মাধবানন্দস্বামী স্বয়ং। তিনি ভিন্ন রােগীর কাছে আর কেহ যাইতেও পায় নামার যাইতেও চাহে না। সে স্থানে আছেই বা কত লােক—আর না-বিদ্বেষীর কাছে সহজে যাইতেই বা চাহে কে?
সােনার বাঁধন মল্লিনাথের দর্শনলাভে বঞ্চিত হইয়া ভগ্ন-মনােরথ বামাপদ হরসুন্দরকে জিজ্ঞাসা করিলেন- “বাবার সঙ্গে দেখা কবুবার তাহ'লে এখন আর উপায় নেই ?” সদানন্দ প্রকৃতি হরসুন্দর হাস্যমুখে কহিলেন- “গুরুদেবের নিষেধে আপাতত সে উপায় নাই বটে, কিন্তু পরে যে হবে না, তাই বা আপনাকে কে বলেছে ?” “তাহলে এখন আমি কি করব?” “ইচ্ছা হয়, এখানে থাকবেন, খাবেন-দাবেন, আনন্দ করে বেড়াবেন।” “আমার স্ত্রী, কন্যা--এই এত গুলিকে নিয়ে।” “ইচ্ছা হয়, আরাে দু-দশ জনকে ডেকে আন্তে পারেন। দেবের আশ্রমে কিছুরই অভাব হবে না।” অপ্রতিভ বামাপদ তাড়াতাড়ি কহিলেন— “আমি তা’ বলছিনা—শুধু এই বলছি যে সংসার-প্রপাড়িত জীব আমরা,আমাদের বসবাসে আশ্রম কলুষিত না হয়।” “সে বিচারের ভার গুরুদেব আমার উপর দেন নাই। অতিথি আপনারা, অতিথি সৎকারের ভার আমি গ্রহণ করতে পারি। তার- পর গুরুদেব এসে যথােচিত ব্যবস্থা করবেন।” গুরুদেব এখন কোথায়-কবে তার দর্শন পাওয়া যেতে পারে ?” “সাধু-সন্ন্যাসী কখন কোথায় অবস্থান করেন, কেমন করে তা স্বরূপ বলা যেতে পারে? তবে কাৰ্যান্তে তিনি যে আশ্রমেই ফিরবেন, এইটুকুমাত্র তিনি বলে গেছেন।” বামাপদ আর কোনাে প্রশ্ন করিলেন না। হরসুন্দরের অনুমতি লইয়া তিনি সপরিবারে সেই আশ্রমেই বাস করিতে লাগিলেন।
সােনার বাঁধন E মলিনাথ সম্বন্ধে এবং তাহার আপনার সংসারের সম্পর্কে হরসুন্দরের সহিত বামাপদ অনেকবারই অনেক কথা কহিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু হরসুন্দরের সে বিষয়ে সম্পূর্ণ ঔদাসীন্য দেখিয়া-সে সকল কথা কহিতে বামাপদের আর সাহসে কুলায় নাই। হরসুন্দর এখন সংসারত্যাগী। সংসারের তত কথা তিনি শুনিবেনই কেন আর ? .কিন্তু তাহাতে তিনি কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। সংসারত্যাগী হরসুন্দর অতিথি সেবাই করিতে লাগিলেন—সংসারের কথা তিনি আর কহিতে চাহিলেন না। সপ্তবিংশ পরিচ্ছেদ সহােদরে সহােদরে মামলা মােকদ্দমা চলিতে লাগিল খুব। “যভাষাঁড়ি-বাণ” ডাকিলে নদীর জল যেমন ফুলিয়া উঠে, গর্জিতে থাকে, সহোদরের সহিত সহােদরের বিবাদ বিসম্বাদে দ্বেষ, হিংসা পরস্পরের মনের ভিতর তেমনই ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতে লাগিল-- নিন্দা, গ্লানি, কুৎসা তেমনই চলিতে লাগিল। বাণ ডাকিলে দুল ভাসিয়া যায়, ঝগড়া বিবাদে প্রিয়জনের প্রিয় সম্বন্ধ নষ্ট হইল - আত্মীয়তা ঘুচিয়া গেল। তখন বাহিরের লােক ভিতরের অনেক কথা শুনিয়া ফেলিল। তাহাতে বামাপদর পুত্রগণের মুখ পুড়িল ভিন্ন উজ্জ্বল হইল না। যাহাদের ঘরের কথা বাহিরে আসে, তাহা- দের মুখ এমন করিয়াই পুড়িয়া যায় । মামলা মােকদ্দমায় সর্বস্বান্ত হয় সকলেই। বামাপদর পুত্রগণের ১০০ সােনার বাঁধন । । । । । । ভাগ্যেও তাহার ব্যতিক্রম হইল না। তাহাদের ব্যবসায় বাণিজ্য পূৰ্বেই নষ্ট হইয়া গিয়াছিল—নগদ টাকা কড়ি অলঙ্কার পত্র যাহা কিছু ছিল, এইবার তাহা সমস্তই নষ্ট হইল। মামলায় জয় পরাজয় কোনাে পক্ষে স্থির হইবার পূর্বেই তাহারা সকলেই পথের ভিখারী হইয়া পড়িল। উপরন্তু লাভ হইল—কলঙ্ক। অনধিকারী বাহিরের লােক এখন বিচার করিতে বসিয়াছে, বামাপদর জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূকে সমাজে স্থান দিতে পারা যায় কি না। স্ত্রী লইয়া নিরাপদ বিষম সমস্যায় পড়িয়া গেল। সমালােচকের সমালােচনা তখন এমনই প্রখর হইয়া দাড়াইয়াছে যে তাহার ঝাঁঝে সমাজে নিরাপদর মুখ দেখান ভার হইয়া পড়িল। সে ঝাঁঝ প্রথম বাহির হইয়াছিল তারাপদর মুখ হইতে। সমালােচকবৃন্দের মুখে এখন তাহা সহস্রগুণ বদ্ধিত হইয়াছে। নিরুপায় নিরাপদ সে ঝঝি হইতে বাঁচিবার আশায় ভ্রাতৃবধূর নামে কলঙ্ক ঘােষণা করিতেও পশ্চাৎপদ হইল না। সমালােচক- গণের উৎসাহ তখন আরও বাড়িয়া গেল। তাহারা গল্প গুজব করিয়া চারিদিকে ঘােষণা করিতে লাগিল যে বামাপদর বংশের মত এমন কলঙ্ক-কালিমা মাখা বংশ বাংলা দেশে বােধ হয় আর একটাও নাই। সুতরাং তাহাদের সমাজচ্যুত করাই উচিত। সমালােচকগণের চেষ্টার ফলে নিরাপদ ও তারাপদ সমাজচ্যুত হইয়া গেল। এখন তাহাৱা বুঝিতে লাগিল, যে আপনার নাক কাটিয়া পরের যাত্রাভঙ্গ করিবার চেষ্টা করিলে দুর্দশাটা- এমনই হয়। মল্লিনাথকে তখন পদে পদে তাহাদের মনে হইতে লাগিল। মল্লিনাথ সহায় থাকিলে তাহাদের এমন হীনাবস্থা হয়ত হইত না। কিন্তু সে অনুতাপ এখন বৃথা।
সােনার বাঁধন ১০১ শ্যামাপদ ও উমাপদ দেখিল-অগ্রজদ্বয়ের আওতায় পড়িয়া তাহারাও মারা যাইতে বসিয়াছে। তখন তাহারা বুদ্ধি করিয়া স্থির করিল--অগ্রজাদের সম্পর্কে না থাকাই সৰ্বাংশে শ্রেয়। অবিবাহিত যুবক তাহারা। সঙ্কল্প কার্যে পরিণত করিতে তাহাদের আদৌ বিলম্ব ঘটিল না। সামান্য বেতনে থিয়েটারের দলে তাহারা ভর্তি হইয়া গেল। সে দলে যােগদান করিয়া কিছুদিনের জন্য তাহাদের জঠরা- নল শান্ত হইল বটে, কিন্তু আর একটা অনল যথন জ্বলিয়া উঠিল, তখন তাহাদের নরক যন্ত্রণার আর সীমা রহিল না। সঙ্গদোষে এমনই হয়। সমালােচকগণের কশাঘাত নিরাপদ যখন আর কিছুতেই সহ্য করিতে পারি না, তখন সে একটা স্বাধীন সমাজে নাম লিখাইয়া ফেলিল। সেই সমাজভুক্ত একজন ডাক্তার কি জানি কিসের লােভে এখন নিরাপদর বিশেষ বন্ধু । ডাক্তারের সহিত বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ হওয়া অবধি নিরাপর বাটীতে রােগের আর বিরাম নাই। ডাক্তারকে অবশ্য টাকা দিতে হয় না—ডাক্তার আপনিই মাসে, আপনিই রােগী দেখিয়া চলিয়া যায়—কখনন কখনাে বা সেবা সুশ্রষাও করিতে হয় । সুতরাং ডাক্তারের নিকট নিরাপদকে তজ্ঞ থাকিতে হইয়াছে। কিন্তু মাঝে মাঝে নিরাপদর প্রাণে কেমন যেন একটা “চিড়িক” মারে-মল্লিনাথের কাছে ত নিরাপদ তজ্ঞ থাকিতে পারে নাই। সে কথা যখন তাহার মনে হইত; নরাপদর বুকটাথন হুহু করিয়া জ্বলিয়া উঠিত। তেমন উপকারী, তেমন নিঃস্বার্থ বন্ধু কি এখনকার দিনে সহজে পাওয়া যায় । কাঞ্চন ফেলিয়া নিরাপদ কাচখণ্ড ঘরে তুলিয়াছিল। এ মৰ্ম্ম-বেদনা অনুতাপ-নিরাপদর সেই মহাপাপেরই প্রায়শ্চিত্ত।
১০২ সােনার বাঁধন উষাসুন্দরীর কথার উপর নিরাপদর কথা কহিবার কখনই সাহস ছিল না—এখনও নাই। তবে নিরাপদকে এখন যেন আরও একটু বেশী রকমের কাপুরুষ হইতে হইয়াছে। স্বাধীন সমাজের অভিনব অভিমতে উষাসুন্দরী এখন অনুপ্রাণিত। নিরাপদ এখন কি তাহার উপর কথা কহিতে পারে না তাহাকে শাসন করিতে পারে ? তাহা পারে না বলিয়াই তাহার প্রাণের জাল 'এখন বদ্র বেশী হইয়া পড়িয়াছে। কিন্তু প্রাণের আলা তাহাকে প্রাণেই চাপিতে হইল। প্রাণের দায়ে, মনুষ্যত্নের অভাবে সে আপন সমাজ ছাড়িয়াছে, ধৰ্ম্ম ছাড়িয়াছে, আপন জন ছাড়িয়াছে,তবে প্রাণের দায়ে স্ত্রীর শাসন, স্ত্রীর অত্যাচার সহ্য করতে না পারিবেই বা কেন ? হীন প্রাণ হইলে পরিণামে এমনই হীনের হীন হইতে হয়—এমনই লাঞ্ছনা সহ্য করিতে হয়—পােকা মাকড়ের মত এমনই পদদলিত হইতে হয়। আর তারাপদ !–সরস্বতীকে লইয়াই বা এখন সে কি অবস্থার আছে? রােগের ঝুড়ী স্কন্ধে করিয়া প্রবল প্রতাপ তারাপদ এখন হাঁস- পাতালের দুগ্ধ-ফেণনিভ শয্যা দখল করিয়া রহিয়াছে। রােগ-শয্যায় পড়িয়া পড়িয়া তারাপদ ভাবে--মল্লিনাথকে লাঞ্ছিত করিয়াই কি তাহাদের এমন অধঃপতন হইল । সুমতি' নিপুণা সেবিকার বেশে অচৈতন্য তারাপদর কাণে-কাণে মাঝে-মাঝে বলিয়া যাইত---“তাহাই ত বটে।” সে কথা শুনিয়া তারাপদ শিহরিয়া উঠিত—ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া চীৎকার করিত—আর ভয়ে ও নৈরাশ্যে তাহার সমস্ত দেহটা কাপিতে থাকিত। তখন হাসপাতালের লােকেরা আসিয়া রােগীর মাথায় পর্বত প্রমাণ বরফ চাপাইয়া দিত। তাহাদের মতে রােগীর এটা “প্রলাপ বকা”। কিন্তু রােগী স্বয়ং তাহা স্বীকার করিত না।
সােনার বাধন
= "+ এ = * * * * * * *
হাসপাতালের লােজন বলিত—বিকারের সেটাও একটা অবস্থ;
বিশেষ।
অভাগিনী সরস্বতী এখন পরগৃহে দাসীবৃত্তি করিয়া উদরা সংগ্রহ
করিতেছে। তাহা ভিন্ন আপাততঃ তাহার আর উপায় কি ? তবে
যে গৃহস্থের ঘরে সরস্বতী আশ্রয় পাইয়াছে, সে গৃহস্থটা অত্যন্ত সৎ।
তাহাতেই তাহার যেটুক সুখ। ' কিন্তু প্রণের জালায় যে সৰ্ব্বদ।
লিতেছে, স্বামী যাহার অসহায় অবস্থায় হাস্পাতালে পড়িয়া আছে,
তাহার মনের সুখ আর থাকে কেমন করিয়া ?
বিপদে পড়িয়া সরস্বতী বিপদবারণকে স্মরণ করিতে লাগিল।
হিসাবে সরস্বতীকে কতকট। ভাগ্যবতী বলা যাইতে পারে। কারণ,
বিপদে পড়িয়াও ত অনেকে ভগবানের নাম গ্রহণ করিতে পারে না।
সরস্বতীর সে নাম মনে পড়িয়াছে-ভগবানের নাম
স্মরণ করিয়া
নির্জনে সে ভগবানকে ডাকে-উদ্দেশে তাহার নিক সে তাহার
প্রাণের বেদনা জানায়--বিপদ হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য তাঁহার
চরণে সে নিবেদন করে। কে জানে—এ ব্যাকুল নিবেদন তাহার
চরণে পৌছাইবে কি না।
০
অষ্টবিংশ পরিচ্ছেদ
হরসুন্দর, ও গঙ্গাদেবী যদিও তখন সংসারাম ত্যাগ করিয়াছেন,
তথাপি বামাপদ ও তাহার পত্নী, কন্যাগণকে আদর আপ্যায়ণ করিতে
তাহারা কুট করিলেন না। অতিথি সৎকার—গৃহস্থেরও ধৰ্ম্ম বটে
আর সাধু ; যতি, সন্ন্যাসীরও ধর্ম বটে!
১০৪
সােনার বাঁধন
বামাপদ, সাধুর আশ্রমে খুব আদর যত্নেই থাকিলেন। তবে একটা
বিষয়ে বামাপদ ও অন্যান্য সকলের উপর একটা নিষেধ ছিল।
নিষেধটা—আশ্রম-বনস্থালীর যে ভাগে মল্লিনাথ এক্ষণে অবস্থান করে,
সেদিকে কেহ না যায়।
সে নিষেধ মানিয়া সকলকেই চলিতে হইতেছিল। নিষেধটা
মানিয়া চলিবার ইচ্ছা ছিল না কেবল—সরমার। স্ত্রী সুলভ চাঞ্চল্য ও
ঔৎসুক্যবশে মল্লিনাথের নির্জনবাসটা দেখিবার জন্য সরমা অস্থির হইয়া
পড়িয়াছিল। সে কথা বুঝিতে পারিয়া সরযূ সরমাকে কহিল--
“অমন কাজ করনা মেজদি'! যেটায় নিষেধ আছে, সেটা করবার
দরকার কি?”
বিরক্তির সহিত সরমা কহিল,
“কেন, কলে কি হয়?”
“পাপ হয়-অপরাধ হয়।”
“কি অপরাধটা হয়—শুনি ?”
“তা জানি না—কেবল অপরাধ হয়, তাই জানি।”
“যা জানি না—বুঝিস না, তা'তে কথা ক’স কেন, সেইটে
আমায় বুঝিয়ে বলতে পারি? তা বােঝাবার ত শক্তি নেই—কেবল
জানিস, ন্যাকা-কা কথা কইতে। শােন, বলি—কি করব। লুকিয়ে
লুকিয়ে মল্লিদা’ কি করে, কি খায়, তাই দেখব। বল দেখি—তা'তে
মহাভারত অশুদ্ধ হবে কি ?”
“মহাভারত, রামায়ণ কারাে হাতে পড়ে কখনাে অশুদ্ধ হয় কিনা
সে জ্ঞান আমার নেই। তবে এটা জানি, এটা বুঝি যে তুমি সেখানে
গেলে যােগীর হয় ত যােগ ভঙ্গ হবে। সেটা একটা পাপ-তা’তে
অপরাধ হয়।”
সােনার বাঁধন “ইস্! মল্লিদা’ যোগী হয়েছে নাকি ?---কবে থেকে? ভাল --- ভাল। তা তুই এক কৰ্ম্ম করি—তুই তার সঙ্গে যােগিনী হ’স—ত' হ'লেই সকল’গােল মিটে যাবে।” সরমার এ বিদ্রুপে যে বিষ ছিল, সে বিষের প্রভাবে সরযুর কথা বন্ধ হইয়া গেল। সে আর সে স্থানে দাড়াইল না। সরমা তাহাতে কৌতুকানুভব করিতে লাগিল। কি আশ্চর্য্য তাহার মনের গঠন । হিতাকাঙ্ক্ষীর অহিতাকাঙ্ক্ষা করিতে সে একটুও পশ্চাৎপদ হয় না। তাহারই কুবুদ্ধির ফলে তাহাদের সংসারে এমন আগুন জ্বলিয়া উঠিয়াছে —তাহার ফলে তাহাদের সকলকেই গৃহহীন হইতে হইয়াছে—বিপন্ন হইয়া তাহাদের পিতৃদেবকে হরিদ্বারে আসিতে হইয়াছে—তথাপি সরমার মতি গতির পরিবর্তন হইল না। ইহার অপেক্ষা আশ্চর্যের বিষয় আর কি আছে। সৃষ্টির বিধান বিচিত্র । কথাটা ক্রমে বিভাবতী, মাতঙ্গিনী, এমন কি বামাপদেরও কাণে উঠিল। সে কারণে সরম। সকলের নিকট ভংসিত হইল। কিন্তু তাহাতে সরমার কি যায় আসে। প্রবৃত্তির দেষে তাহার ঔৎসুক কিছুতেই নিবৃত্তি লাভ করিল না---বরং তাহা উত্তরােত্তর বাড়িয়ই উঠিতে লাগিল। অবশেযে গোপনে একদিন মল্লিনাথের আশ্রম-কুটীর দেখিতে সে চলিয়া গেল। নিবিড় বনস্থলী তখন ঘনান্ধকারে সমাচ্ছন্ন হইয়া গিয়াছে । আকাশ-পথে ক্ষপাকরের ক্ষীণ রজতধারা ফুটিয়া উঠিয়াছিল বটে, কিন্তু বনান্ধকার তাহাতে দূরীভূত হয় নাই। তখন আশ্রমের ওঙ্কারধ্বনি বায়ুতরঙ্গে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ধনস্থলী ঝঞ্ছত করিয়া মহাব্যোমে ছড়াইয়া পড়িতেছিল। সেই ছন্দোবন্ধময় ওঙ্কারধ্বনি শুনিতে শুনিতে সরমা মল্লিনাথের আশ্রমের দিকে ধীর পদ-বিক্ষেপে অগ্রসর হইতে লাগিল।
১০৬ সােনার বাঁধন মাঝে মাঝে তাহার বুকের ভিতরটা কাপিয়া উঠিতেছিল। পাপী . পাপাচরণ করিতে অগ্রসর হইলে পাপীর হৃদয়ে যেরূপ আতঙ্ক জাগিয়া উঠে, সরমারও সেইরূপ আতঙ্ক হইতেছিল--কিন্তু দুর্বুদ্ধিশে যে পথে সে চলিয়াছিল, সে পথ হইতে পাপিনী কোনও মতেই প্রতিনিবৃত্ত হইতে পারিল না। বিবেকের তাড়না উপেক্ষা করিয়া—বিচারের অবসর না রাখিয়া--প্রবৃত্তির উদ্দীপনায় গন্তব্য স্থানাভিমুখে উদ্দামবেগে সে এখন চলিতে লাগিল। চরণ তাহার পথরােধ করিতেও মন তাহার সে পথ মুক্ত করিয়া দিল । কিন্তু অভিলষিত স্থানে পৌছাইয়া সরমা দেখিল কি ? অন্ধকার। অন্ধকার । চারিদিকে অন্ধকার। বনপ্লাবী জমাট অন্ধকারের ভীষণতা সরম আর সহ্য করিতে পারিল ন! এইবার তাহার দারুণ ভয় হইল—ভয়ে সে চীৎকার করিয়া উঠিল। সে চীৎকারে অন্ধকারাচ্ছাদিত কীরবাসীর শান্তি ভঙ্গ হইয়া গেল। কুটীরাভ্যন্তর হইতে প্রশ্ন হইল—“কে ?” প্রশ্নকর্তা—মল্লিনাথ ! প্রশ্নের উত্তর না পাইয়া-মল্লিনাথ আবার জিজ্ঞাসা করিল—“কে, গুরুদেব ?” সে বারেও প্রশ্নের উত্তর নাই। প্রশ্নকর্তা দীপ-শলাকার সাহায্যে অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া—সেই আলােকে চারিদিক দেখিতে লাগিল। কিন্তু কেহই তাহার দৃষ্টিপথে পতিত হইল না। সরমা একটা বৃক্ষের আড়ালে দাড়াইয়াছিল। তাহাকে মল্লিনাথ দেখিতে না পাইলেও সে মল্লিনাথকে স্পষ্ট দেখিতে পাইতেছিল। মস্লিনাথ আগে যেমনটা ছিল, এখন আর তেমনটা নাই। তাহার আকৃতির এখন অনেক পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। বস্ত্রাদি পরিধানেরও তাহার অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। অশ্লিনাথ এখন গৈরিকধারী।
সােনার বাঁধন ১০৭ কাহারও উত্তর না পাইয়া মল্লিনাথ স্থির হইয়া আপনার আসনে বসিয়া পড়িল। অগ্নি যেমন জ্বলিয়াছিল, তেমনই জ্বলিতে লাগিল। ততটুকু সময়ের মধ্যে সরমা কতকটা বল সঞ্চয় করিতে পারিয়া ছিল। সে ভাবিল-মল্লিদা’র চেহারার যদিও অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে, কিন্তু মল্লিদা’ত প্রায় সেই মল্লিদাই আছে। অতএব তাহাকে আর ভয়টা কিসের?' মলিনাথের সম্মুখে যাইতে যদিও সরমার প্রথমে খানিকটা লজ্জা, খানিকটা সঙ্কোচ আসিল বটে, কিন্তু পরক্ষণেই চেষ্টা করিয়া সে ভাবটাকে সরমা সরাইয়া দিতে সমর্থ হইল। সে ভাবিল—এতটা পথ যখন এত কষ্ট করিয়া আসা গিয়াছে তখন মল্লিদার সঙ্গে দুইটা কথা কহিতে ক্ষতি কি? মল্লিদাত আর রাক্ষস নহে যে তাহাকে ধরিয়া সে গিলিয়া ফেলিবে? সরমা আরও ভাবিল-- মল্লিদার নিকটে যাইলে–ফিরিবার পথে আলােকের সাহায্য সে পাইতে পারে। তাহাতে 'অন্ধকারের ভয় তাহার আর কিছুই থাকিবে না। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া,--অনেকবার অগ্রসর হইয়া তনেব- বার পশ্চাৎপদ হইয়া—সরমা সাহসে ভর করিয়া অবশেষে মল্লিনাথের সম্মুখে উপস্থিত হইয়া ডাকিল-“মল্লিদা !” মল্লিনাথ বিস্মিত চক্ষে সরমার দিকে চাহিয়া-বিদ্যুৎগতিতে উঠিয়া দাড়াইল। তাহার পর সে জিজ্ঞাসা করিল-- কে তুমি?” বিজড়িত কণ্ঠে সরমা কহিল- “আমি-আমি মল্লিদা!” “আমি—কোন্ আমি? পেত্নী আমি,-মানুষ আমিনা দেবাঝা ৫ ।
Sob সােনার বাঁধন আমি? ব শীগগির তুই কে—কোথায় তাের বাসা? অন্ধকারে একলা থাকি--এখানেও আমির উৎপাত । “তুমি চিতে পারছনা, মল্লিদা? এ আমি যে ! “দুর্ভোর আমির নিকিচি করেছে। আমি, আমি মুছে ফেলেছি। তুই বল, তুই কোন্ আমি?” আলাে ও ছায়ায় মলিনাথ ঠিক সরমাকে চিনিতে পারে নাই। মল্লিনাথ অন্যমনস্কভাবে আবার জিজ্ঞাসা করিল— “তুই থাকিস কোন্ গাছে ! বল, গুরুদেব এলে সব কথা তাকে বতে হবে। তুই যদি পরিচয় না িত ব এই স্বলন্ত আরা তাের গায়ে দিই ফেলে।” সরমা দেখিল-সমূহ বিপদ। সে জ্বলন্ত অঙ্গার তাহার শরীরের উপর পড়িলে আর রক্ষা নাই। নিদারুণ ভয়ে চীৎকার করিয়া সরমা বলিল-- “আমি সরমা-মল্লিদা।” নামটা শুনিয়া মপ্লিনাথ চমকিত হইয়া উঠিল। তাহার পর একটা অস্বাভাবিক শব্দ করিয়া সে কহিল- “মানুষ ! দূর হ, দূর ই। মানুষের মুখ আর দেখব না আমি—মানুষ যেখানে থাকে, সেখানে যাই না আমি—মানুষের সঙ্গে আর কোনাে সম্পর্ক রাখি না আমি। কোন্ সাহসে তুই আমার সামনে এসেছিস বল ত? জানিস্ নে—এখানে খুন করে ফেলব?” জ্বলন্ত অঙ্গার তুলিয়া মল্লিনাথ চারিদিকে ছুড়িতে লাগিল। সরমা ভয়ে বৃক্ষান্তরালে আশ্রয় গ্রহণ না করিয়া আর থাকিতে 'পারিল না। তখন মল্লিনাথের মূর্তি ভীষণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে।
সােনার বাঁধন ১০৯ জলন্ত কাষ্ঠখণ্ড ঘুরাইতে ঘুরাইতে বনভাগে সে ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতে লাগিল। বনস্থলী তখন আলােড়িত হইয়া উঠিল। হরসুন্দর তখন আর স্থির হইয়া বসিয়া থাকিতে পারিল না—পুত্র সন্নিধানে তাঁহাকে ছুটিয়া আসিতে হইল। মলিনাথ ক্ষেপিয়া উঠিয়াছে সরমা মূচ্ছিতা হইয়া বৃক্ষতলে পড়িয়া আছে। ঊনত্রিংশ পরিচ্ছেদ । অনেক বুঝাইয়া, অনেক মিষ্ট কথা বলিয়া মল্লিনাথকে হরসুন্দর শান্ত করিলেন বটে, কিন্তু তাহা অল্পকালের জন্য। গঙ্গাদেবীও অনেক মিষ্টকথা বলিয়া মল্লিনাথকে শান্ত করিতে চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু তাহাকে শান্ত করা কি এখন সহজ ব্যাপার? এখনকার নরবিদ্বেষী মল্লিনাথ কি আর তখনকার সে মল্লিনাথ আছে ? তবে মল্লিনাথকে শান্ত করিবার একটা বিশেষ সুযােগ তৎপর- দিবস ঘটিয়া গেল। হরসুন্দরের গুরুদেব মাধবানন্দস্বামী–সেই দিন আসিয়া পড়িলেন। মল্লিনাথও স্বামীজির মন্ত্রশিষ্য। মল্লিনাথকে নির্জনে লইয়া যাইয়া গুরুদেব কহিলেন- “তােমার চাঞ্চল্য ঘটেছে বৎস! সে চাঞ্চল্য থাকলে সাধনার পথে অনেক বাধা পাবে।” গুরুদেবকে দেখিয়া অবধি মল্লিনাথ একেবারে ভিন্ন মানুষ হইয়া গিয়াছিল। শান্ত ভাবে এখন সে কহিল-- “আপনাকে ত আমি বলেছিলে যে মানুষের মুখ আর আমি
১১০
সােনার বাঁধন
দেখব না। কিন্তু সেই মানুষ যখন আবার আমায় বিরক্ত করতে
এসেছে, তখন আমি স্থির থাকি কেমন করে বলুন?”
গুরুদেব ঈষৎ হাস্য করিয়া কহিলেন-“অভিমানের বন্যায় পড়ে
তুমি আপনাকে আপনি ভুলে গেছ বল। তােমার নিন-বাসের
যে আমি ব্যবস্থা করেছিলেম, তার গৃঢ় কারণ ছিল। সে কারণ
আর কিছুই নয়—কেবল তােমার মনস্থির করবার জন্য। কিন্তু
আমি দেখছি,- আমার ব্যবস্থার সুফল চলে নাই। তাতে আমি
দুঃখিত হ'লেম।”
গুরুদেব দুঃখিত হইয়াছেন শুনিয়া---মল্লিনাথ অপরাধ ভয়ে ভীত
হইয়া পড়িল। অপরাধীর মত বিশুদ্ধ বদনে সে কহিল---
“আমি আপনার একান্ত আশ্রিত--সেবক, শিষ্য। আমার প্রতি
আপনি বিরূপ হ'লে আমার কি উপায় হবে, গুরুদেব ?”
মাধবানন্দস্বামী এবারও হাসিলেন। সে হাসিতে শিষ্যের প্রতি
গুরুদেবের অভয় সঙ্কেত ছিল। আনন্দাশ্রু বিসর্জন করিয়া আশীষ
বচনে স্বামীজি কহিলেন—
“তােমার বয়সে তােমার মত ভক্ত শিষ্য খুব অল্পই দেখা যায়।
তােমার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল হক বৎস! কিন্তু নরবিদ্বেষী হ'লে তােমার
ত চলবে না। তুমি যে কু-পথগামীর উপায়-নিরাশ্রয়ের আশ্রয়।”
করযোড়ে মপ্লিনাথ বলিল—
“দয়া করে ঐ আদেশটুক ফিরিয়ে নিন, গুরুদেব। মানুষের
মুখ আর আমি দেখতে পারবনা। তারা এত স্বার্থপর, এত হীন,
এত কৃতঘ্ন, এমন কদাচারী।”
কৌতুকানন্দে মাধবানন্দস্বামী কহিলেন—
“তুমিও ত মানুষ, বৎস! মানুষ হ'য়ে মানুষকে তবে ঘৃণা করবে
সােনার বাঁধন ১১১ কেন? মানুষ ত আর দেবতা নয়, তবে তার দোষশূন্য হবে কেমন ক'রে? সকল মানুষেরই কিছু না কিছু গুণ আছে। সেই গুণের ভাগ যখন খুব বেশী হয়, তখন মানুষ আপনা আপনি দেবতা হ'য়ে যায়। এমন যে মানুষ, তাকে কি ঘৃণা কবুতে আছে, বাবা?” "কিন্তু আমার প্রতি যে তারা ভীষণ অত্যাচার করেছে । তাদের সেবা করতে গিয়ে, তাদের সুখ শাস্তির বিধান কতে গিয়ে আমি যে দারুণ মর্মব্যথা পেয়েছি।” “তা’ত হয়েই থাকে—যে যত সহ্য করে, তার উপর তত অত্যাচারই হয়ে থাকে। কিন্তু তাই বলে কি ঘরে আগুণ ধরাতে হবে? একজন অত্যাচার করেছে বলে সকলকে ঘৃণার চক্ষে—অবহেলার চক্ষে দেখতে থাক্বে? তুমি যে মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছ, সে মন্ত্রের সার হচ্ছে—জীবে দয়া। সেই জীবকে যদি তুমি প্রীতির চক্ষে না দেখতে পার, তবে তােমার মন্ত্র সিদ্ধ হবে কেমন ক'রে? অভিমান ভরে, অহমিকা জ্ঞানে, ধৰ্ম্মের শাসন অগ্রাহ্য কর না বৎস। ' করলে ঠিক ধর্মদ্রোহী না হও, ঠিক গুরুদ্ৰোহী না হও, একটা কিছুর যে দ্রোহী হবে, সেটা নিশ্চয়। ভালবাসার চেয়ে বড় ধৰ্ম্ম আর কিছু আছে কি না, সেটা আমার এখনও ঠিক জানা নাই। তােমার পিতৃদেব, তােমার মাতৃদেবী-সেই ধর্মের প্রভাবে জগৎ সংসারকে ভালবাসতে শিখছেন। আমার অনুবােধ বৎস, তুমিও সেই পথের পথিক হও। তাতে তােমারও মঙ্গল, আর জগৎ সংসারের মঙ্গল।” করতলে কপােল বিন্যস্ত করিয়া মল্লিনাথ গুরুদেবের কথা শুনিতে- ছিল, অর আকাশের দিকে চাহিয়া চাহিয়া কি একটা ভাবিতেছিল মাধবানন্দস্বামী তখনও কহিতেছেন- সােনার বাঁধন * * * * “সকলই অসার—সার বস্তু কেবল ভগবৎ প্রেম। সেই প্রেমে প্রেমিক হ'তে হ'লে লজ্জা, মান, ভয় সকলই ত্যাগ করতে হয় জীব ও জগৎকে ভালবাসতে হয়—বিশ্বের সেবক হতে হয়, দরিদ্র- নারায়ণের অনুরাগী হতে হয়। তবে ত জন্ম সার্থক হবে, তবে ত জীবন ধন্য হবে। জীবের কল্যাণ সাধন করতে হলে, জীব-বিদ্বেষী হলে চলবে কেন বৎস? হিংসা করবার, বিদ্বেষ করবার ভণ্ড ত জগতে অনেকই আছে। সেটা করবার জন্য জগতে তোমার আবার আবশ্যক ছিল কি?” মল্লিনাথ চুপ করিয়া বসিয়াছিল—সেইভাবেই সে বসিয়া রহিল। আচাৰ্য বলিয়া যাইতে লাগিলেন— “দেখ বৎস, গৰ্ব তাভিমান কিছুই করবার নাই এখানে। গর্ব অভিমান, স্বার্থ, সংশয় সব ভুলে গিয়ে তন্ময় হয়ে একবার তােমার অতীত ইতিহাস, ভবিষ্যতের করণীয়ের প্রতি দিব্য দৃষ্টি দাও দেখি, ধ্যান-পরায়ণ হয়ে একটু চিন্তা কর দেখি, সব ওলট পালট হয়ে যাবে—মাটির মানুষ হয়ে পড়বে--দেবতার মত উদার হবে। তখন হিংসা, দ্বেষ, জ্বালা যন্ত্রণা, দর্প অভিমান, ব্যথা বেদনা আর কিছুই থাকবে না; তখন মনে হবে—তুমিই বুঝি সৰ্বনিয়স্তার সৰ্বশ্রেষ্ঠ দান আর বিশ্ব সংসার বুঝি তােমাকে পাবার জন্য সর্বদা লালায়িত। সঙ্কীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে তখন আর তুমি আবদ্ধ থাকবেনা, তখন সেধে-সেধে যেচে-যেচে আপনাকে আপনি বিলিয়ে দিবে তুমি—তখন বুঝবে, তুমি আদিতে ছিলে, মধ্যে আছ, অন্তেও থাকবে। মহা প্রলয়েও তােমার বিনাশ নাই—তুমি বীজ, তুমিই সৃষ্টির এক মহা উপাদান। তখন তুমিই এক-তুমিই বহু। তখন। হিংসা, দ্বেষ, অভিমান কা'র উপর আর করতে পারবে, বৎস?”
সােনার বাঁধন ১১৩ ভাবের কথা শুনিতে শুনতে মল্লিনাথ ভাব-সাগরে ডুবিয়া যাইতে ছিল। শিষ্যের ভাব-সমাধি গুৰু আর ভঙ্গ করিলেন না। মাধবা- নন্দস্বামী নিঃশষে সে স্থান ত্যাগ করিয়া কাৰ্যান্তরে চলিয়া গেলেন। ভাবমগ্ন মল্লিনাথ তখন ‘ভাবের ভাব” হইয়া জীব ও শিবের কথা ভাবিতে লাগিল। মল্লিনাথের সমাধি যখন ভঙ্গ হইল, তাহার অভিমানের দাহিকা শক্তি তখন নষ্ট হইয়া গিয়াছে। সে তখন আকাশের মত উদার, বসন্তানিলের মত মধুর, জাহুবী সলিলের মত পবিত্র, তাপসের মত সৰ্ব্বত্যাগী, ব্রজকিশােরের মত প্রেমােন্মত্ত। গুরুদেবের আদেশ ও উপদেশ সে তখন মাথায় করিয়া লইল, দীনাতিদীন বিশ্বসেবক হইবার যে ব্যাকুলতা, সেই ব্যাকুলতা তাহাকে আকুল করিয়া তুলিল। সে আর কিছুতেই স্থির থাকিতে পারিল না ; গুরুর সন্ধানে মল্পিনাথ তখন ছুটিয়া চলিল । গুরু নহিলে পথের সন্ধান বলিয়া দিবে কে? গুরু সন্নিধানে আসিয়া মল্লিনাথ কি দেখিল? যাহা দেখিল, মল্লিনাথ জীবনে আর ভুলিতে পারিবে না। সরমা তখন শয্যায় পড়িয়া আছে। অভাগিনীর তথন আর চৈতন্য নাই। প্রলাপ- বচনে সে যে তখন কত পাপ, কত অত্যাচার, কত হিংসা, কত পর-পীড়নের কথা আপন মুখে ব্যক্ত করিতেছে, তাহা বর্ণনাতীত । তাহার নাসিকার দিয়া তখন শােণিত ধারা বহিতেছিল, যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া ভূমিতলে সে মুখ ঘসিতেছিল। সে কি করুণ দৃশ্য। সে দৃশ্য দেখিয়া মল্লিনাথ কাঁদিয়া ফেলিল। মানুষের দুঃখে মল্লিনাথ কঁদিতেছে দেখিয়া হরসুন্দর ও গঙ্গাদেবী উভয়েই একটু আশ্চৰ্য্য হইলেন। কারণ—এই মল্লিনাথই না নরবিদ্বেষী ছিল ?
১১৪ সােনার বাঁধন সে যাহা হউক, গুরুদেবের ঈঙ্গিতে মল্লিনাথ অন্যান্য সকলের সঙ্গে সরমার সেবা করিতে লাগিল। নর-বিদ্বেষ পাপ হইতে মুক্ত হইয়া মল্লিনাথের সেই প্রথম সেবা। গুরুর কৃপা হইলে সব হয়—গুরু যে প্রত্যক্ষ ভগবান । FRIEHAT LILI, Est:1910. MAKARDAH –HOW RAH. ত্রিংশ পরিচ্ছেদ মেঘাড়ম্বর ও ধারাশ্রাবণের পর আকাশ যেমন নিৰ্ম্মল হয়, কুঞ্জ-কানন যেরূপ শ্যামল-শ্র ধারণ করে, জগৎ সংসারে যেরূপ একটা কমনীয়তা ফুটিয়া উঠে, অভিমান-মেঘ কাটিয়া যাইতেই মল্লিনাথের প্রফুল্ল- সেইরূপ প্রস্ফুট হইয়া উঠিল। মানুষ স্বার্থ ভুলিয়া-- পরার্থে আত্ম নিয়ােগ করিলে, ভগবানের ভক্ত হইলে মানুষের এমনই দিব্য- কান্তি ফুটিয়া উঠে। মল্লিনাথের সে শ্ৰী দেখিয়া মাধবানন্দস্বামী কহিলেন- “যিনি অনভিমানী, যিনি অহিংস, যিনি সেবক, করণ। যাঁ'র মন্ত্র, ত্যাগ স্বা’র ধৰ্ম্ম, ভূমা য’র লক্ষ্য, ত’র মুখশ্রীতে যে দিবালােক ফুটে উঠে, তােমার মুখেও সেই আলােকের প্রথম রশ্মি ফুটে উঠেছে। এখন স্বকার্যে প্রবৃত্ত হও, আর্তের উদ্ধারকল্পে, পাপীর সােনার বাঁধন ১১৫ ৭ ; e পাপ মােচনাৰ্থে-ভগবানের নাম স্মরণ করে—তা’র মহিমা কীর্তন করতে থাক। বনজঙ্গলে বসে থাকলে আর ত তােমার চলবে না!” মল্লিনাথ উদাসভাবে কহিল— “তা হ'লে আবার সংসারে ফিরে যেতে হ'ল, গুরুদেব।” “নিশ্চয়। সেখানে তাপ-দগ্ধ অসহায় জীব তােমার প্রতীক্ষায় বসে আছে। মন্ত্র তােমার সফল হয়েছে, সাধনায় তুমি সিদ্ধি লাভ করেছ, পরীক্ষা-সাগর তুমি উত্তীর্ণ হয়েছ ; এখন যাও বৎস, জীবন্মুক্ত পুরুষ তুমি-সংসারের হিত সাধন করতে।” গুরুর আশীৰ্বাদ মাথায় লইয়া ভক্ত-শিষ্য কর্মের সংসারে ফিরিষা যাইবার জন্য প্রস্তুত হইল। তবে তখনাে, সরমা সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয় নাই, সেই কারণে গুরুর আশ্রম ত্যাগ করিতে মল্লিনাথের তুই চারি দিন বিলম্ব ঘটিতে লাগিল। সেবা, সুশ্রষা ও গুরুর কৃপায় সরমা যখন স্বাস্থ্য ফিরিয়া পাইল, তখন মল্লিনাথ নবজীবন লইয়া নবােদ্যমে নৃতন পথের পথিক হইতে চলিল। সে পথ-ভগবানের নাম গান-সেবা ধৰ্ম্ম পালন—-জগতে ধৰ্ম্মভাব প্রচার করণ। পুত্রের মহৎকার্যে সাহায্য করিবার জন্য হরসুন্দর ও গঙ্গা- দেবী সাধু পুত্রের সঙ্গে চলিলেন। বামাপদ, মাতঙ্গিনী, বিভাবতী, সরমা, সরযু সকলেই তখন নবধৰ্ম্মের নব পুরােহিতের অনুসরণ করিতে বাধ্য হইয়া পড়িল। ভক্তির আকর্ষণে—ভাবের বন্যায় পড়ি। -মাধবানন্দস্বামীকেও শিষ্যের পাছে পাছে ছুটিতে হইল। নামের এমনই গুণ—নাম শুনিলে প্রাণ আকুল হইয়া পড়ে। নিরাপদ, তারাপদ, উমাপদ, শ্যামাপদ, উষাসুন্দরী ও সরস্বতী মরু-পথে পড়িয়া—এতদিন বড় কষ্টই পাইতেছিল, বড় যন্ত্রণাই ভােগ , করিতেছিল, বড় লাঞ্ছনাই সহ্য করিতেছিল। প্রেম-যজ্ঞের ঋত্বিক ১১৬ সােনার বাঁধন স। মল্পিনাথকে ফিরিয়া পাইয়া—মল্লিনাথের ক্ষমা-তরুর সুশীতল ছায়ায় স্নিগ্ধ শান্ত হইয়া আবার তাহারা ধৰ্ম্ম-জীবন লাভ করিল—আবার তাহারা মল্লিনাথের প্রিয়জন হইল। মল্লিনাথ প্রেমানন্দে এখন আত্মহারা ! ভগবানের নাম কীৰ্ত্তনে সে এখন পাগল হইয়া উঠিয়াছে। সকলের দ্বারে দ্বারে যাইয়া— সকলকে ডাকিয়া ডাকিয়া সে বলিতে লাগিল- “তােমার পাপ আমায় দাও ভাই, সে পাপ আমি বহন করব। তুমি সুখী হও, তুমি শান্তিতে থাক, তােমার মঙ্গল সাধিত হক।” কেহবা ব্যঙ্গ করিয়া-কেহবা সহানুভূতিতে বলিল-- “আমাদের পাপ তুমি ত ঘাড়ে নিতে চাচ্ছ। তােমার সে পাপ কাটবে কেমন করে? মল্লিনাথ মধুর হাসি হাসিয়া কহিল- “ভগবানের নামের গুণে আর গুরুর কৃপায় । ভয় কি-ভাবনা কি? কলুষ-তারণ যে আমায় বুকের ভিতরেই বিরাজ করছেন। আমার সর্বস্ব তিনি—তিনিই আমাকে ত্রাণ করবেন—তা'র অভয় চরণতলেই আমি আশ্রয় পাব।” কথাটা খুব জোরের। সে কথায় অনেকেই মস্লিনাথের মতাবলম্বী হইয়া পড়িল। তখন কৰ্ম্ম, জ্ঞান ও ভক্তিপথের নির্ভীক পথিক, সেবা-তীর্থের পরিব্রাজক মল্লিনাথ ভক্তমণ্ডলী পরিবেষ্টিত হইয়া সেবাধর্ম পালন করিতে লাগিল আর লােকের দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া গাহিতে লাগিল— এ সংসার কার, তুমি বা কাহার একবার ভেবে দেখ রে জীব ;
সােনার বাঁধন
১১৭
তুমি, আমি সব হ'য়ে যাব শৰ
শব না হইতে খােজ রে শিব ।
তুমি না ডাকিতে আসে যেবা কাছে,
তব তরে যেব ঘুরে পাছে পাছে,
কেন তারে ভুলে, ভাস রে অকুলে
কুলহারা হ'লে হ'বে কি পার ;
শুন সে আদান- বশরীর তান
একটা কেই
পথ ভুল যেন বে ওন অর !
সে কথা শুনিয়া কেহবা বিদ্ধ প করিত আর কেহ কেহ বা
প্রেমা বিসর্জন করিত। কিন্তু দিন যত যাইতে লাগিল, মল্লিনাথের
ভক্তসংখ্যা তত অধিক বাড়িতে লাগিল। মল্লিনাথকে আর বড়
জিজ্ঞাসা করে না—ত অল্প বয়সে বৈরাগ্যের পথ
সে অবলম্বন করিল কেন ? কারণ সকলেই এখন বুঝিয়াছে,
মল্লিনাথ তাহার সর্বস্ব ভগবানের পাদে অৰ্পণ করিয়াছে।
সরযুর
সম্বন্ধেও সেই একই কথা। বিশ্বপ্রেমে যাহারা ডুবিয়াছে, তাহাদের
ধারাই ঐরূপ। মেদ, মাংস, পুরীষ, শােণিতে নির্মিত দেহের সুখের
জন্য তাহার একটুও লালায়িত নহে, অসার সম্মান, সন্ত্রম, সঙ্কোচের
দামে তাহারা আত্মবিস্মৃত হয় না ; স্বার্থরক্ষার প্রলােভনে, দ্বেষ হিংসার
তাড়নায় মনুষ্যত্ব তাহার
হারাইতে চাহে
না-কব্য-পথে
তাহাদের পদস্খলন হয় না। তাহাতেই তাহারা জগতের আশ
হইয়া থাকে।
সে যাহা হউক, যাহারা দুষ্ট, যাহারা ঘৃণ্য, যাহাদের জীবন
কলঙ্কিত, মল্লিনাথের সঙ্গ লাভ করিয়া সঙ্গগুণে তাহারা সৎ হইল ।
নিরাপদ, তারাপদ প্রভৃতি সকলেই এখন মল্লিনাথের আশ্রিত শিষ্য।
১১ সােনার বাধন উষা এখন আর সে উষা নাই। বাসন্তী-উষার মত সে এখন, অতি সুন্দর, অতি মধুর —অতি নিৰ্ম্মল। সরস্বতীর প্রায়শ্চিত্ত হইয়া গিয়াছে। রুগ্ন স্বামীকে মৃত্যুর দ্বার হইতে ফিরিয়া পাইয়া—তাহারও অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটিয়া গিয়াছে। অগ্নিদগ্ধ না হইলে কি স্বর্ণের উজ্জলতা বাড়ে ? প্রেমিক সাধক মল্লিনাথের তখন কি আনন্দ! দীনের দীন, • হীনের হীনকে যে উদ্ধার করিতে পারে, ইহকাল ও পরকালের কথা যে বুঝিতে পারে ও বুঝাইতে পারে, পবিত্রতার পথে-- উন্নতির পথে মানুষকে যে লইয়া যাইতে পারে, তাহার এমন আনন্দই হইয়া থাকে। এ আনন্দ বুঝাইবার জিনিষ নহে—বুঝিবার জিনিব ; দেখাইবার জিনিষ নহে—ভাবিবার জিনিষ ; ব্যক্ত করিবার জিনিষ নহে--ধ্যান ধারণার জিনিষ। পুত্রের সম্বন্ধে হরসুন্দরের ভবিষ্যদ্বাণী সফল হইল । মলিনাথ এ সংসারের মহৎকাৰ্য্য করিতে আসিয়াছিল—সে মহৎ কাৰ্য্যই করিতে লাগিল। বিশ্বপ্রেমিক মল্লিনাথের তখন গুরুদত্ত নাম হইল—প্রেমানন্দ। প্রেমানন্দের প্রেমানন্দে ভক্ত-মণ্ডলী আনন্দের ত্রিধারায় স্নান করিয়া পূতপুণ্য হইল। ভগবান কাহাকে দিয়া কথ কি কাৰ্য্য করান, কোন্ সূত্রে কোন্ কার্যের সূচনা হয়, ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে কেমন করিয়া তাহা সিদ্ধ হয়, কে সে কথা বলিতে পারে ? মল্লিনাথ আশৈশব ছিল সেবা-ধর্মপরায়ণ। কিন্তু সে সেবা ছিল অহংবুদ্ধির প্রভাবে। তাহার ফল-লােহার বাধন। সেই বাধনে মল্লিনাথ নর-বিদ্বেষীও হইয়াছিল। স্পর্শমণি গুরুদেবের কৃপায় সে বাঁধন এখন সােনার বাঁধন। সকল বাধন যেদিন খসিবে, তীব্র
সােনার বাঁধন
১১৯
*
বৈরাগ্যে ভগবানের জন্য ব্যাকুলতা যেদিন আসিবে, সাধক সেইদিন
হইবে বাঁধনহারা; সেইদিনই সাধকের সিদ্ধি। প্রেমানন্দ সিদ্ধি পথই
খুঁজিতে লাগিল। মাধবানন্দ আশীৰ্বাদ করিয়া কহিলেন—“বা'রা নিতা
সিদ্ধের থাক, সোনার বঁধনও তাদের আবদ্ধ করতে পারে না।
কি বৎস, তােমার সিদ্ধি অবশ্যম্ভাবী। সােনার বাঁধনে তুমি জনকঋষি
হও ; '' বাধনহারা হয়ে ভগবানের দর্শন পাবে।”
স্বস্তিবাচন প্রেমানন্দ মাথা পাতিয়া লইয়া ধন্য হইল ।
সমা1919
MAKARDAH
-HOWRAH.
শুধু সুলভ বলিয়া নহে; ; প্রথিতযশা গ্রন্থকার—সর্বোচ্চ মূল্যের কাগজ—মুক্তাক্ষরে ছাপা ও সর্বোপরি সহরের শ্রেষ্ঠ শিল্পীবৃন্দের তুলিকাঙ্কিত জীবন্ত চিত্রের সমাবেশে নির্মল-সাহিত্য-পীঠের -রেলওয়ে সিরিজ- অসমর্থদিগের পক্ষে অনুকরণ করিবার উপযুক্ত উপকরণ সমগ্র ভারতবর্পে—অনুপম ! অতুলন!! ১। হিন্দুনারী—শ্রীমতী চারুশীলা মিত্র ২। রাজপুতবালা-শা প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায় ৩। চোরাবালি---হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘােষ ৪। মিলন-রাত্রি-শ্ৰীমতী কমলাবালা দেবী পল্লী-লক্ষী-রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ৬। পুরাঙ্গনা-শ্ৰীকালীপ্রসন্ন দাশ গুপ্ত এম-এ ৭। সিরাজদ্দৌলা—প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায় ৮। চাদমালা-সৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায় বি-এল, ৯। সােনার বাঁধন-মুনীপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী ১০। নবীনসাথী-নারায়ণচন্দ্র ভট্টাচার্য। (কমলিনীর ) . ৯ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, (ঠঠনে কালীতলা) কলিকাতা।
মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া ;-উপন্যাসের ভিতর দিয়া "স্তায় সৎসাহিত্য
প্রচারের জন্য যে সকল প্রকাশকবৃন্দ বদ্ধপরিকর হইয়াছেন,
সর্বাগ্রে তাহাদিগকে আমরা অভিবাদন করিতেছি।
আমাদের নূতন সাহিত্য-তীর্থের নাম
নিৰ্ম্মল সাহিত্য পীঠ
৯নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
আমরা ১২ একটাকা সংস্করণ উপন্যাস
নিয়মিত প্রকাশ করিব।
আমরা দীপক’-রাগিণী গাহিয়া আগুণ আলাইবার প্রয়াসী নহি।
‘মেঘমল্লারের' 'আলাপ করিয়া শুরু, দগ্ধ, নীরস সাহিত্য-ক্ষে
শ্রাবণের ধারায় সরস করিয়া তুলিবার সঙ্কল্প করিয়াছি।
অতএব, হে সাহিত্যামােদী সজ্জন সূধাবৃন্দ
আপনারা জনে জনে আমাদের সাহায্যের জন্য হস্ত উত্তোলন করুন।
আপনাদের নিকট অভয় পাইলেই আমরা আমাদের বাণী-পূজার প্রথম উপচার
বঙ্গীয় নাট্য-পরিষৎ সম্পাদক-জগদ্ধাত্রী'-প্রণেতা
রাসবিহারী মুখখাপাধ্যায় প্রণীত
সতীর জ্যোতি
নামক সচিত্র উপন্যাসখানি আপনাদের কম-করে তুলিয়া দিয়া ধন্য হইব।
গত শ্রবণ-গগাধূলির নগ্ন-সন্ধ্যায় মেঘের কোলে সৌদামিনী
হাস্যের ন্যায় নির্মল-সাহিত্য-পীঠ’ হইতে সতীর জ্যোতি লহরে হরে
ফুটিয়া উঠিয়াছে।
মূল্য-রেশমী বাধাই সচিত্র ১, ডাকে ১০।
প্রেম-রঙ্গ-তরঙ্গায়িত উপন্যাস-প্লাবিত বঙ্গে
ধর্মসঙ্গত—পরিপূর্ণাঙ্গ-সংসাহিত্য আজ
উপন্যাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সু-প্রচারিত!
পরিব্রাজক-অকিঞ্চন দাসের
প্রাণপাত পরিশ্রমে প্রস্তুত সংসাহিত্য-রসকরা—
বাথাদিনী বীণাপানির প্রসাদি সাহিত্য-পায়সান্ন
--আজ:-
সৎ-সাহিত্যামােদা ভক্তবৃন্দের পংক্তিতে পক্তিতে
অপরিষ্যাপ্ত পরিবেশিত!
সে আবার কি ?
স্বামী-তীর্থ
যত ইচ্ছা এ সাহিত্য-মহামৃত
পান করিয়া যুগে যুগে অমর হইয়া থাকুন, কিন্তু সাবধান,
এ অমৃত যেন মাটিতে না পড়ে।
-কারণ -
সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র ও দার্শনিক পণ্ডিত সুরেন্দ্রমােহন
ভট্টাচার্য্যের পর—উপন্যাস-সাহিত্য-ক্ষেত্রে স্বামীতীর্থের উপমা
‘গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার মত কেবল স্বামীতীর্থ” উপন্যাস পাঠেই হইবে,
নচেৎ, কথার শকতি নাই বুঝাতে ইহায়!
হিন্দু মাত্রেরই “স্বামীতীর্থ পাঠের একান্ত প্রয়ােজন হইলেও
পয়সা খরচ করিতে নারাজ—অথচ পাঠেচ্ছা-প্রবল সাহিত্যামােদীগণ,
স্থানীয় লাইব্রেরী হইতে চাহিয়া লইয়াও একবার পড়িবেন
ইহাই প্রকাশকের বিনীত অনুবােধ। ভারতের সমস্ত পুস্তকালয়ে
প্রাপ্তব্য। রেশমী কিংখাব মণ্ডিত ১ ডাকে ১০।
৯ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, (ঠঠনে কালীতলা) কলিকাতা
- প্রেয়সী!
মিষ্টি উপন্যাসের সৃষ্টিকর্তা সৌরীন্দ্রমােহন বাবুর—প্রেয়সী
‘প্রিয়ে, চারুশীলে ! মুঞ্চময়ী মানমণিদানম্
সাহিত্য-সব্যসাচী—বাংলার মােপাসা-ভারতী-সম্পাদক
শ্ৰীযুক্ত সৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায় বি-এল প্রণীত
বুকভরা আশ-মুখভরা হাসি
প্রেয়স
মকবন্ধ-গন্ধ-মদির উপন্যাস সাহিত্যোদ্যানে সৌরীনবাবুর মানস-কম
প্রেয়সী
এ প্রেয়সীফুলশয্যায় নবদম্পতীর প্রথম মিলন রাত্রির প্রেয়সী।
চিরনির্জন-শয্যায় তুমি নবাগতা,-এ যে নৃতন সােনালী স্বপ্ন,
তবে জাগ লাে রূপসী, বহিয়া যায় যে গােলাপজাগানাে লগ্ন
প্রিয়তমে, জাগাে জাগো !
গভীর রাত্রি, নিঝুম স্তব্ধ, কোথাও একটু নাহিকো শব্দ,
এ ফুল্ল-বাসর-শুভ মুহুর্ত, এ যদি বিফলে যায় গাে ;--
দিবসের আলাে ধাধিবে নয়ন, পরিচয় নেওয়া হয় কি তখন ?
নৃতন জীবন-নব দরশন---এই শুভক্ষণ, জাগো! প্রিয়ে জাগো ।
প্রাণময়ী--প্রেমময়ৗ---রসময়ীরঙ্গময়ী 'প্রেয়সী’
নানা চিত্রালঙ্কার ভূষিত হইয়া ৪র্থ সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে ।
নগদ মূল্য ১, এক টাকা, ডাকে ১•।
কমলিনীসাহিত্য-মন্দির
একমাত্র সত্বাধিকারী-শ্রীগােষ্ঠবিহারী দত্ত, শরৎচন্দ্র পাল।
সাহিত্য-সংসারে যত রকম ‘বৌ, আছে, তাহার মধ্যে বন্ধুর বৌ-টি কি সুন্দর। ইহার চাল-চলন গড়ন-পটন, হাব-ভাব, কাৰ্য-কলাপ- সবেরই যেন কেমন একটা নৃতন বাহার ! দেখুন দেখি, মুখখানি কি চমৎকার ! নববিবাহিতদিগের মধ্যে যিনি যত রূপসী বধুই গৃহে আনিয়া থাকুন না কেন, তুলনায়, এ বিয়ের বাজারে বন্ধুর বৌটিই সবার উপর টেকা । এমন রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী বৌ ;-ওঃ, বন্ধুর কি জোর বরাত ভাই এবার ‘বন্ধুর বৌ'র সমালোচনার বাবঠলে একা অনাবিল আনন্দ-প্রবাহ ঘটিবে । ‘কমলিনী’র বিজয়-বৈজয়ী এ বৎসবের উপরের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস উপন্যাস-সম্রাটের প্রধান সদস্য–প্রথম শ্রেণীর ঔপন্যাসিক- শ্ৰীযুক্ত ফণীন্দ্রনাথ পাল বি-এ প্রণীত বন্ধুর বে নব চিত্ৰমণ্ডিত হইয়া ষষ্ঠ সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে আপনাদের বৌ দেখিবার নিমন্ত্রণ রহিল,, লৌকিকতা গ্রহণে সক্ষম জানিবেন। কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির একমাত্র সত্ত্বাধিকারী—এগােষ্ঠবিহারী দত্ত, শরৎচন্দ্র পাল।
“যার যত পরাক্রম সে জানে আপন!”
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দিরের
চিরন্তন উপন্যাস—‘কালােমেয়ে’র
উপহার হইতে উপসংহার পর্যন্ত—প্রচ্ছদপট হইতে পুস্তনী পর্যন্ত
আগাগােড়া নৃতন--আমূল পরিবর্তন।
দাড়িয়ে আছে বলির বালা, সিদূর নিয়ে পথ চেয়ে
গ্রাম-মাতব্বর-মনােরঞ্জন-কলির মহা বলিদান।
• যুপকাষ্ঠে নারী-বলি !-মূর্তিমান নরসিংহ অবতার!—চতুর্দিকেই
লেলিহান অগ্নি-শিখা। ভােগের বস্তু ভস্ম করিয়া ভক্ষণাস্তে
কৃষ্ণ চর্মে জয়ঢাক প্রস্তুত ! সাবাস বাঙ্গালী ।
বাংলার বালীর “চামের দামের চেয়ে প্রাণের মূল্য কত অল্প ,
তাহারই জাজ্বল্যমান উদাহরণ :-
উপন্যাসাচাৰ্য্য-পণ্ডিত
নারায়ণচন্দ্র ভট্টাচাৰ্য বিদ্যাভূষণ প্রণীত
কালােমেয়ে
৮ খানি নব চিত্র-সংঘােজিত ২০ আড়াই টাকা মূল্যের উপযুক্ত
: উপন্যাস “কালেমেয়ের নাম মাত্র মূল্য ১ ডাকে ১০।
কমলিনী-সাহিত্য-মন্দির
একমাত্র সত্বাধিকারী-এগােষ্ঠবিহারী দত্ত, শরৎচন্দ্র পাল।
যার কটাক্ষ-ইক্ষণে দিল্লী-সিংহাসন, প্রলয়ের ভূফ
যে বঙ্গ-রমণীর বাহুবলে দুর্ধর্ষপ্রতাপ অমিত
অপমানিত—পৰ্যদন্ত—পলায়ন-পর
লুষ্ঠিত পতাকাধারিণী ষড়ৈশ্বৰ্যময়ী শ্রীপুরের কাজ ।
সাহিত্য-সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের ভ্রাতুষ্পেত্রি—‘জপুতে
শ্ৰীযুক্ত প্রমথনাথ চট্টোপাধ্য
অভিনব ঐতিহাসিক নাট্যোৎ
* * * * * * * * * * * * *
রাজরাণী
নব-প্রণালীতে প্রস্তুত অসংখ্য রঙিনচিত্র মণ্ডিত হইয়া
স্বর্গ-মর্ত দৈত্যপুর, ত্রিভুবন ভরপুর-অন্দ মন্দ
লুষ্ঠিত পতাকা হাতে কে যায় কে যায় । যশের
এই বিজয় যশেহারভূষিত। রাজার মূরণী না
এমন মহিয়সী বঙ্গ-মহিলার বিশ্ব-বিমেহন কার্যা
এতদিন অন্ধকার-গহবরে লুক্কায়িত ছিল কেন ?
একবার ভাবিতেই হই
তার উপর চিত্র :--‘রাজরাণী’র রঙিণ :
অদ্বিতীয় আলেখ্য-বিদ্যা পারদর্শী শ্ৰীযুক্ত
যে এক নপন্থা অবলম্বন করিয়াছেন, তাহা দেখি
হইবে, এ ছবি নয় ;--সজীব-চলন্ত বায়স্কোপের দৃ
মূল্য
রেশমী বাধাই
১১ ডাকে ১০
কমলিনীসাহিত্যমনি
একমাত্র সত্ত্বাধিকারী-গােষ্ঠবিহারী , শ্ৰীশর
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.