Makardah Saraswat Library, Howrah

Dipali Ed. 2nd

2009/08/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মাশী

No text on this page.

ভয়-১৩০৬
–১৩৩৫
kয়ােগার
প্রতিষ্ঠাতা
“দেব-সাহিত্য-কুটির
* * * * ' ,
গিয়েও তুমি যাওনি চলে, আছ মােদের কাছে,
তােমার স্মৃতি ফুলের মত ছড়িয়ে নিতি আছে।
কাৰ্য্য তােমার করব মােরা সমস্ত প্রাণ দিয়ে
দেশাহিত্যের উন্নতি হােক তােমার আশীষ নিয়ে।

No text on this page.

-সচিত্র
মূতন সংস্করণ
==
দীপালী
শ্ৰীমতী আশালতা দেবী রত্নপ্রভা,
সাহিত্য-ভারতী
এক টাকা

প্রকাশক-অমুল্যাতন বন্দোপাধ্যায়,
পরিচালক—“দেব-সাহিত্য-কুটীর
৫৪৭ নং কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা।
দ্বিতীয় সংস্করণ
১৩৪২
প্রিন্টার-একালীপদ নাথ
নাথ ব্রাদার্স প্রিন্টিং ওয়ার্কস
৬, চালতাবাগান লেন, কলিকাতা।

দীপালী পরিত্যক্ত ফাউন্টেন পেনটাতে পুনরায় কালী ভরিতে ভরিতে আপন মনেই নীতিশ বলিতেছিলনাঃ, ভজুয়াটাকে নিয়ে আর পারা গেলনা..বয়স যত বাড়ছে ততই যেন ভীমরতি ধরছে•••কথায় কথায় সমানে জবাব•••ভাবে যেন এখনাে আমি সেই ছােট্ট খােকাটিই আছি••• এই প্রচণ্ড গরম একগ্লাস বরফজল চাইলুম-বল্লে কিনা, বরফ জল খেলে সর্দিগৰ্ম্মি লাগবে...। বাহিরের দালানে মৃদু পদশব্দ হইতেই নীতিশ দরজার পর্দাটা তুলিয়া ঈষৎ মুখ বাড়াইয়া কহিল—কে? ভজুয়া এলি বুঝি? সহসভজুয়ার শুকুনাে হাড়গিলার মত অভব্য মূর্তিখানির পরিবর্তে নীতিশ যাহা দেখিল—সত্যই তাহা সম্পূর্ণরূপেই অভাবনীয়।••• দুইটি চোখের বিস্ময়ের জড়িমা তখনও মুছিয়া যায় নাই, এমন সময় নীতিশের কাণের কাছে ক্লান্ত কোমল সুর বাজিয়া উঠিল—“নিখিল বঙ্গীয় সেবাসদনের ম্যানেজার কি এইখানে থাকেন, দয়া করে বলবেন আমায় ?•••আমার বিশেষ দরকার। এতক্ষণে নীতিশ আপনাকে সম্বণ করিয়া লইয়া চোখের ক্ষিপ্ত দৃষ্টিটা বারেকের তরে সুমুখের ওই শ্যামলা তরুণীটির উপর বুলাইয়া লইয়াছিল।

দীপালী বর্ণ স্নিগ্ধ শ্যামল মােটেই নাই। বর্ষা-ধােয়া ফুলের মতই কোমল বাহুদুটা, হাতকাটা খদ্দরের ব্লাউজের ভিতর দিয়া অনাবৃত অংশ- টুকু দেখা যাইতেছিল••ফস। নয় কিন্তু সুন্দর চোখে মুখে একটা অচপল দৃঢ়তা যেন ছবির মতই ফুটিয়া রহিয়াছে।... দারুণ গ্রীষ্মের তাপে, পথশ্রমের ক্লান্তিতে তার সর্বাঙ্গ দিয়া টপ, টপ, করিয়া ঘাম ঝরিতেছে-কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘামের বিন্দুগুলি যেন চন্দন-লেখার মতই সাজানাে মুখখানি রােদের-আঁচে ফুলের মতই শুকনাে ম্লান...সকালে-বাধা এলাে খােপাটা বােধহয় খসিয়া পড়িয়াছে.. দু’চার গাছি চুর্ণকুন্তল গালের পাশে—কপালে ভিজিয়া জড়াইয়া গিয়াছে। পায়ের নাগরা জোড়াটায় রাজ্যের ধূলা••• বােধ হয় মেয়েটিকে অনেকখানি পথই পায়ে হাটিয়া আসিতে হইয়াছে। আহা••• নীতিশের বড় মমতা জাগিল। তার মন মেয়েদের মতই অত্যন্ত কোমল। একটু খানি দম লইয়া তরুণীটী বলিতে লাগিল—“আনন্দ বাজার পত্রিকায় দেখলুম ঠিকানা রয়েছে সাতশের বি, কৈলাস বােসের স্ত্রী, সেখানে গেলুম, কিন্তু কোন হদিশ পেলুমনা, রাজ্যের অভদ্র লােকগুলাে জড় হয়ে নানা রকম প্রশ্নে আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললে শেষে একটী ভদ্রলােক বল্লেন এই ঠিকানায় আসতে এখানে কি বাধা দিয়া নীতিশ ব্যগ্র কণ্ঠে কহিল—হ্যা—এই খানেই আগে-“নিখিল বঙ্গীয় সেবাসদন'—ম্যানেজার আমিই, —আপনিই ?...

দীপালী
একটা আরামের নিঃশ্বাস ফেলিয়া তরুণীটি কহিল—বচলুম !
অন্ততঃ ঘােরা ঘুরির দায় থেকে। আচ্ছা আপনি
কথা কহিতে কহিতে দুজনে ঘরের ভিতরে আসিয়া দাড়াইয়াছিল,
তরুণীর কথায় বাধা দিয়া নীতিশ তাড়াতাড়ি একখানি চেয়ার আগাইয়া
দিয়া বিনয়-নম্বরে বলিল—প্রশ্ন এর পরে করবেন, অন্ততঃ তার আগে
একটু জিরিয়ে নিন্•একগ্লাস শরবত আনতে বলবাে...?একটু বরফ
মিশিয়ে
মুহূর্তে তরুণীর মুখভাব কঠিন হইয়া উঠিল, পরক্ষণেই মৃদু হাসিয়া
বলিল—মাপ করবেন, এখানে এসেছি আমি কাজের সন্ধানে, অতিথি
হয়ে আপনাকে অনর্থক বিব্রত কত্তে নয় ।
একটু খানি কাসিয়া, গলাটা সাফ করিয়া লইয়া মেয়েটি পুনরায়
বলিল—‘সেবা সদনের’ কাৰ্য-বিবরণীটা আমাকে দেখাতে পারেন ?
অবশ্য যদি কিছু মনে না করেন।
নীতিশ উঠিয়া সম্মুখের টেবিল হইতে একখানি কঁনােমােটা খাতা
লইয়া মেয়েটার হাতে নিয়া বলিল—এই নিন—
‘ধন্যবাদ’ বলিয়া মেয়েটা খাতাখানি কোলের উপর রাখিয়া নিবিষ্ট
মনে দেখিতে লাগিল।
দেখিতে দেখিতেই কহিল—এই খানেই আগে ছিল বল্লেন না?
এখন তাহলে সেবাসদনটা উঠে কোথায় গেছে ?
নীতিশ মুখ তুলিয়া কহিল—বেশী দিনের কথা নয়, সম্প্রতি উঠে
গেছে ঢাকায়।
দুই চারি পৃষ্ঠা উলটাইয়া মেয়েটা মুখ তুলিয়া কতকটা আপন মনেই
কহিল—ঠিক, এই তাে আমি খুঁজছিলুম। এই কাজই আমার পক্ষে
না

দীপালী
শুভ•••আচ্ছা আপনাদের সেবাসদনের জন্যে নারী-কৰ্মী তাে বিস্তর
আছে দেখছি কিন্তু এদের নেওয়া, মানে ভর্তির বন্দোবস্ত করার ভারও
কি আপনার ওপর ?
শেষের কথা কয়টা সে নীতিশকে লক্ষ্য করিয়াই বলিল।
নীতিশ স্নিগ্ধস্বরে বলিল—কতকটা বটে, তবে আমার মা-ও কিছু
কিছু ভার নিয়েছেন। কিন্তু সে কথা যাক—আপনি আপনার
-আমার পরিচয়?
মেয়েটা অকুণ্ঠ স্বরে বলিল—আমার পরিচয়ের জন্যে আপনি ব্যস্ত
হয়ে পড়েছেন !..না-না—এটা হওয়াই স্বাভাবিক...আচ্ছা আপনি
আলােক নাথ বােস...হাইকোর্টের ব্যারিষ্টার...তাকে চেনেন?
নীতিশ একটুখানি ভাবিয়া বলিল—চোখে দেখবার সৌভাগ্য হয়নি
কখনাে, তবে নাম শুনেছি..তিনি কি
তিনি আমার দাদা...আমার নাম দীপালী বােস, হ্যা,
এইবার কাজের কথা হােক, তাহলে এই সেবাসদনের আপনিই তো
ম্যানেজার? না আর কেউ আপনার ওপরওলা আছেন ?
নীতিশ স্বল্প হাসিয়া কহিল—দেখুন, সেবাসদনের ম্যানেজার আমি
এইটুকুই যা সত্য—তা’বাদে কাৰ্যতঃ আমি কোন কিছুই করতে
পারিনা, আমি একটা অকর্মণ্য। মেয়েদের দেখাশােনার ভার
নিয়েছিলেন আমার মা, কিন্তু মার শরীর এখন খারাপ হওয়াতে
তিনি আর বেশী খাটতে পারেন না, মার দু’টা মহিলা-বন্ধুই সে
সমস্ত করে থাকেন, তবে হ্যা, যার ইচ্ছা এবং উৎসাহতেই এই
সেদাসদনটুকু গড়ে উঠেছে।
তরুণীর মুখের উপর হতাশার একটা ম্লান ছায়া ফুটিয়া উঠিল।
ক

দীপালী কহিল--আপনার কথাগুলো যেন হেঁয়ালীর মত শােনাচ্ছে মিষ্টার মুখার্জী, সেবাসদনের ম্যানেজার আপনি, অথচ দেখা শুনা, কাজ কর্মের ভার অন্যের ওপর...মাপ কৰ্বেন.••একটা কথা, এসমস্ত কি আপনার ভাল লাগেনা? নীতিশের প্রশস্ত ললাট ঈষং কুঞ্চিত হইয়া উঠিল। কহিল—না,, ভাল না লাগবার কোন কারণ-ই নেই...তা নয়, আমার সময় যে ভারী অল্প কি করি বলুন? বলিয়া নীতিশ মেয়েটার মুখের পানে বড় করুণ ভাবেই তাকাইল। এতক্ষণে মেয়েটীর মনে পড়িল—সত্য, ডক এন, মুখার্জী কলিকাতার একজন নামকরা ফিজিসিয়ান, তার চিকিৎসা-পদ্ধতিও সুন্দর, শুধু ধনী- গৃহেই নহে, সাধারণ গরীব গৃহস্থের নিকট হইতে ডাক আসিলে স্নানাহার ফেলিয়া তিনি বিনা দর্শনীতেই চিকিৎসা করিতে ছুটেন। তার মিষ্ট মধুর ব্যবহারেই রােগীর রােগ যেন অর্ধেক উপশম হইয়া যায়। মেয়েটা একটু লজ্জিত কণ্ঠেই রুহিল,—ও•••তা বটে ! নীতিশ একটু সরিয়া আসিয়া স্নিগ্ধ কণ্ঠে কহিল—কই, কি দরকারে যে এসেছিলেন তা তত বলেন না? অকর্মণ্য শুনে ভাবছেন এতখানি পথ আসাই মিথ্যে হয়ে গেল, না ? মেয়েটা স্মিতমুখে উত্তর দিল—না মিষ্টার মুখার্জী—আপনি তা ভাববেন না...আমি তা মােটেই মনে করিনি। আপনার মার এ কাজে উৎসাহ আছে জেনে আমার এত সুন্দর লাগছে...সত্যিই মেয়েদের দেখাশুনাব ভার মেয়েরা নিজের হাতে নিলে যতটা সুষ্ট হয়ে ওঠে, পুরুষের হাতে বােধহয় ততটা আশা করা যায় না।

দীপালী নীতিশ স্মিতমুখে বলিল-আমার তাে তাই বিশ্বাস। কিন্তু আপনি বারিষ্টার আলােক বােসের ভগ্নী,•••তবে- দীপালী হাসিয়া কহিল--বারিষ্টারের একমাত্র বােন হয়ে পথে পথে কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছি—এটা সত্যই একটু আশ্চৰ্য্য লাগছে আপনার !...কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, আমি ঠিক আর পাঁচজন মেয়ে- ছেলেরা যে ভাবে জীবন কাটায়—অর্থাং পরের গলগ্রহ হয়ে,—আমি সে জীবন চাই না...পুরুষের সঙ্গে সমানে পালা দিয়ে লেখাপড়া শিখেছি-- সকল বিষয়ে পুরুষের ন্যায় সমান অধিকার চাইছি অথচ দিন কাটাচ্ছি সেই বাবা কিম্বা দাদার অন্নের ভরসায়। নিজে যদি নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাড়াবার শক্তি না-ই পেলুম, তাহ েইউনিভারসিটীর ডিগ্রী গুলাে গলায় ঝুলিয়ে লাভ কি বলুন? আমি কাজ চাই, নিজে খেটে খেতে চাই। কিন্তু আমার কথাগুলাে ভারী বক্তৃতার মত শােনাচ্ছে-নয় ? বলিয়া শ্যামা মেয়েটা অপরূপ হাসি হাসিল।•••নীতিশ তাহার কথার উত্তরে ব্যগ্র কণ্ঠে বলিল—না দীপালী দেবী, মােটেই তা নয়। আপনার কথা শুনে আমার ভারী শ্রদ্ধা হচ্ছে-আপনার ওপর এবং আপনাদের মতই সাহসিকা মেয়েদের ওপর। সাধারণের চোখে হয়ত আপনারা বিদ্রোহী, কিন্তু যথার্থ কথা বলতে গেলে দে। ঠিক আপনাদের মতই বিদ্রোহী মেয়েদের দরকার হয়ে পড়েছে। বাইরে কাজ বিস্তর—আর সে কাজ একা পুরুষের সাধ্য নয় সামলে ভােলা। দীপালী বলিল--কিন্তু তাই বলে সব পুরুষকেই অকর্মণ্য বলে গাল দেবেন না, তাদের মধ্যে আপনাদে মতও মানুষ আছেন•••আচ্ছা আপনাদের সমিতিতে মহিলাদের থাকবার কোন ব্যবস্থা আছে কি ? মানে-শুধু দু’চার দিনের জন্যে নয়—চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত...

দীপালী নীতিশ বলিল—হ্যা—তা নিশ্চয়ই আছে,কিন্তু সেটাও তাে এখানে নয় দীপালী দেবী, সে হচ্ছে ঢাকায়, আপনি যদি ইচ্ছে করেন- দীপালী বলিল—ইচ্ছে করা করি কি, আমাকে সেই খানেই যেতে হবে—নইলে এখানে দাদা এখন উপস্থিত না থাকলেও আরও দু'চারটা শুভাকাঙ্ক্ষী আত্মীয়দের পাল্লায় পড়লে নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাড়ানাের ইচ্ছেটা মনের মাঝেই আকাশ-কুসুমের মত মিলিয়ে যাবে। বাবা-মা বেঁচে নাই অবশ্য,—কিন্তু অন্য আত্মীয়েরা ভাল করতে না পারলেও ভাল কাজে বাধা দিতে পিছপা হন না।...আচ্ছা উঠি এখন,—কিন্তু কই আপনার মা’র সঙ্গে তো দেখা করা হল না? কোথায় তিনি বলুন না ? মেয়েটা যেন যাদু জানে ! শুধু কয়টা মুহুর্তেই নীতিশকে যেন কত- কালের চেনা বলিয়া মানিয়া লইয়াছে। নীতিশ বলিল—তিনি তো এখানে নেই দীপালী দেবী, ঢাকা থেকে আসবেন কাল ভােরে...তিনিও আপনাকে দেখলে ভারী সন্তুষ্ট হবেন দেখবেন। মেয়েটী চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া দাড়াইয়া বলিল—ও,-আচ্ছা, তাহলে আমি কাল সকাল আটটা সাড়ে আটটার সময় এখানে আসছি- একেবারে তল্পী-তল্পা নিয়ে। মার সঙ্গে পরামর্শ করে আমি কালই রওনা হতে চাই। এই সময় দরজার ভারী পর্দাটা ঠেলিয়া একটি যুবক প্রবেশ করিল, বাঁহাতে তার একতাড়া কাগজপত্র, ডান হাতে একখানি পােষ্টকার্ড। যুবকটী নমস্কার করিয়া বলিল—পাবনা থেকে অনন্তবাবু চিঠি দিয়েছেন নীতিশবাবু। তাদের কিছু টাকা না পাঠালে চলছে না। চঁদার টাকা যা উঠেছিলােতা তত কাপড় আর চাল ডাল কিনতেই ফুরিয়ে গেল, এখনও ওষুধ পত্রের জন্যে

দীপালী
—চাদা—? কিসের চাঁদা প্রকাশ? চঁাদা করে টাকা তুলতে অনন্ত
বাবুকে কে পরামর্শ দিয়েছিল?—আমার ব্যাঙ্কের টাকা কি ফুরিয়ে
গেছে ভেবেছ ?
প্রকাশ নীতিশের উত্তেজিত মুখের পানে চাহিয়া ভাষার খেই
হারাইয়া ফেলিয়াছিল, সে কি জবাব দিবে, অতঃপর তিন চার বার
মাথার চুলের মধ্যে আঙুল চালাইয়াও খুঁজিয়া পাইল না। নতমুখে হাতের
কাগজ পত্রগুলি রাখিতে টেবিলের ধারে অগ্রসর হইল ।
নীতিশ মুখ ফিরাইয়া বিরক্তি ভরে কহিল—যত সব ইডিয়ট !
আচ্ছা, ওসব পরে হবে..হ্যা, দীপালী দেবী, মাপ কৰ্বেন, তখন
আপনার কথার জবাব দিতে পারিনি তা আপনি কি বলছিলেন,
কাল আটটা সাড়ে আটটার সময় আসবেন?•••বেশত...যখন খুশী
আপনার এখানে চলে আসবেন...আমার তাতে আনন্দ বাড়বে বই
কমবে না, কারণ আপনাদের মত কর্মী পাওয়া,–এ আমাদের মস্তবড়
সৌভাগ্য।
দীপালী চেয়ার ছাড়িয়া উঠিয়া গঁড়াইয়া, ধীরে ধীরে মাথাটি নাড়িয়া
কহিল-কৰ্ম্মী হতে না হতেই আমাকে এতবড় আখ্যাটা দিচ্ছেন কেন
নীতিশ বাবু? কোন কাজ হাতে কলমে না করেই তার আগে নিজের
নামটা জাহির করা—আমি মােটেই পছন্দ করিনি। আচ্ছা—কথা
রইল কাল সকালে আসব আমি,নমস্কার ।
যুক্ত হাত দুখানি ললাটে ঠেকাইয়া তরুণী বাহির হইয়া গেল।
দরজার ভারী পর্দাটায় সামান্য একটু দোলা লাগিল মাত্র
দৃপ্ত অথচ শান্ত সুন্দর তাহার গতি-ভঙ্গীর পানে ক্ষণেক চাহিয়া
নীতিশ ফিরিয়া দাড়াইল।

দুই খালি একখানা চেয়ার টানিয়া বসিয়া পড়িয়া নীতিশ কহিল ;-কই হে প্রকাশ, তােমার অনন্তবাবুটী কি লিখেছেন দেখি? প্রকাশ নীতিশের প্রসারিত হাতের উপর সসঙ্কোচে একখানি পােষ্টকার্ড রাখিয়া কহিল—ওই মহিলাটী কে এসেছিলেন, নীতিশ বাবু? দৃষ্টি রহিল পােষ্টকার্ডের উপরেই, একটু অন্যমনস্কর ভাবে নীতিশ উত্তর দিল—কে? ও-উনি তােমাদের সেবাসদনের কাজে যােগ দেবেন বলে এসেছিলেন।•••প্রকাশ, ভাই, এই তােমার চিঠি নাও... আমি আর এ সমস্ত পেরে উঠছিনা...আমাকে এক্ষুণি একটা জরুরী ডাকে বেরুতে হবে। বলিয়াই নীতিশ পােষ্টকাৰ্ডখানি ফেলিয়া উঠিয়া দাড়াইল। প্রকাশ নীতিশের পানে চাহিয়া বিস্মিত কণ্ঠে কহিল—অনন্তবাবুকে টাকা পাঠাবার ব্যবস্থা কৰ্ব্বেন না ? নীতিশ টেবিলের ড্রয়ার টানিয়া এক গােছ চাবি বাহির করিয়া প্রকাশের সম্মুখে রাখিয়া কহিল—এই নাও চাবী, পাঠাবার তুমিই পাঠিয়ে দাও প্রকাশ, তােমায় তাে কতবার বলেছি ভাই, এ সমস্ত হাঙ্গামা আমার মত লােকের পােষায় না, তবু তােমরা শুনবেনা? সত্যি এ রকম দায়ে-ঠেলা ম্যানেজারী কোরে কোন লাভ নেই, কাজ তাে ছাই করি: শুধু লােক হাসানাে•• প্রকাশ আশ্চৰ্য্য হইল। কহিল-তবে এত বড় কাজের ভার আপনি ।

দীপালী কাকে দেবেন নীতিশ দা?...আমরা যে আপনার ওপরেই ভরসা কোরে কাজে নেমেছি ? নীতিশ হাসিয়া উঠিল। কহিল—খুব মস্ত লােক আমাকে ঠাউরে- ছিলে, নয় প্রকাশ ? কাজের লােকের ভাবনা কি ভাই, তুমি আছ, অনন্তবাবু আছেন, অনন্ত বাবুর সেই বন্ধু দু’জন•••ারা তাে সুযােগ্য কর্মী...আমার বােধ হয় ম্যানেজারী পদটা অনন্তবাবুকে দিলেই ভাল হয়। ভদ্রলােক খুব খাটতে পারেন। প্রকাশ অবজ্ঞা মিশ্রিত কণ্ঠে কহিল–ছাই পারেন। পারেন কেবল বাজে কথায় সময় কাটাতে। অনন্ত বাবুর সঙ্গে আমার মােটে বনে না। প্রকাশের রাগ দেখিয়া নীতিশ মনে মনে হাসিল...ছেলেমানুষ !••• পরে কহিল—আচ্ছা, দাও খাতাখানা, আজকের মত দেখি। কষ্ট করে এনেছ যখন—বলিয়া নীতিশ আয়-ব্যয়ের খাতাখানি কোলের উপর মেলিয়া ধরিল কিছুক্ষণ এমনি নীরবেই কাটিল। নিস্তব্ধ ঘরের দেওয়ালে টাঙাননা বড় ঘড়ীটায় শুধু একটানা টিক্ টিক্ সু একঘেয়ে হইয়া বাজিতেছিল।••• মিনিট পনেরাে পরে নীতিশ খাতাখানা বন্ধ করিয়া টেবিলের এক- ধারে রাখিয়া বলিল—ই, আজ রইল এই পৰ্য্যন্ত, রাত্রে সব ঠিক ঠাক কল্লেই চলবে। হঁ্যা, রােগী দেখে ফিরবার মুখে আমাকে একবার মার্কেটের ওদিকে যেতে হবে প্রকাশ। মা আসছেন কাল...কিছু তাজা ফলমূল আর গােটা কয়েক ডাব এনে রাখবে। নিজে না কিনলে ভজুয়ার হাতে পয়সা দিলে সে যা আনবে—মা তা মুখে করতেই পারবেন না..ভাল কথা প্রকাশ আজ শনিবার না ? প্রকাশ নীরবে শুধু মাথা নাড়িল ।

দীপালী নীতিশ একটু ব্যস্ততার সহিত কহিল-বেলা তত বােধ হয় পাঁচটা বাজে বাঃ তুমি এখনও দাড়িয়ে আছ—বাসায় যাবে না?—তােমার শ্বশুর-বাড়ীতে যে নেমন্তন্ন সেটা বুঝি ভুলেই গেছ ?... প্রকাশ উঠিয়া একবার মৃদু আপত্তি তুলিল—আমিও আপনার সঙ্গে মু’মার্কেটে যাইনা নীতিশ দা, ফল টল গুলাে- নীতিশ প্রবল বেগে মাথা নাড়িল—তা হতেই পারেনা,•••আজ যাও তুমি, কাল বাদে পরশু এসে একেবারে সােজা পাবনায় চলে যেও••• পাঁচটা বাজতে এখনাে উনিশ-কুড়ী মিনিট দেরী আছে,...দেখি পােষ্টাফিসটা যদি খােলা থাকে তাে অনন্তবাবুকে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিই,পরশু তােমার হাতে দেশী করে কিছু দেব। সঙ্গে কিছু খুচরা টাকা ও পাঁচটাকার পাঁচখানি এবং দশটাকার দুই খানি নােট বাহির করিয়া পাঞ্জাবীর পকেটে পুরিয়া লইয়া নীতিশ বাহিরে আসিয়া দেখিল, নীচে রান্নাঘরের দালানে দাড়াইয়া ভজুয়াটা ঠাকুরের সঙ্গে রীতিমত ঝগড়া বাধাইয়া তুলিয়াছে। ঠাকুরের অপরাধ... সে না হয় একটু ঘুমাইয়াই পড়িয়াছিল, কিন্তু ওই নিষ্কর্মা ঠাকুরট। তাকে জাগাইয়া দেয় নাই কি আক্কেল ? শুধু তাহাই নয়, কলতায় বসিয়া বাসন মাজিতে মাজিতে বামা বুড়ীও সপ্তমে গলা চড়াইয়া চেঁচাইতেছিল—অত বড় খােট্টা জোয়ান মরদ, দিন দুপুরে পহ্নে পড়ে আয়েস করে ঘুমুবে-তাকে আবার জাগিয়ে দেবার নােকর চাই.••ওরে আমার আবদেরে থােকা রে— প্রকাশ হাসিতে হাসিতে বলিল-নীতিশদা, আপনার ঘরে বাঙ্গল- বিহার-উড়িষ্যার অপরূপ সমন্বয় দেখে এক পাও নড়তে ইচ্ছে করে না। মাসীমা না থাকলে এরা তিনটীতে এ বাড়ীর ত্রিসীমানায় কাক-চিল দীপালী বসতে দেবেনা—চোর ডাকাত তত দূরের কথা।•••ওহে ঠাকুর! উনুন দু’টো যে বৃথাই জ্বলে যাচ্ছে, ঝগড়া ঝাটি থামিয়ে সেটার দিকে একটু নজর দাওনা বাপু। তাতে কাজ দেখবে । —“যত সব ঝঞ্চাট! তুমি এস প্রকাশ বেলা যায়” বলিয়া নীতিশ প্রকাশের হাত ধরিয়া টানিয়া মােটরে উঠাইল এবং প্রকাশকে তাহার মেসের বাসায় মােটর হইতে নামাইয়া দিয়া আপন গন্তব্যস্থানে গাড়ী ছুটাইয়া দিল। মন তাহার আজ ক্ষণে ক্ষণে উন্মনা হইয়া যাইতেছিল। ভাবনা- চিন্তার সকল বাধা অতিক্রম করিয়া বারে বারে একখানি শান্ত স্নিগ্ধ শ্যামল মুখ তাহার মনের দুয়ারে নিঃশব্দ চরণে আসিয়া দাড়াইতেছিল। নীতিশ শিহরিয়া উঠিল।•••••সে মুখ আর কাহারও নহেসে মুখের অধিকারিণী মাত্র কয়েক ঘণ্টা পূর্বের দেখা সেই শ্যামা মেয়েটী।••• তাপদগ্ধ ধরণীর সকল আলা জুড়াইবার জন্য যেন একখণ্ড জল-ভরা মেঘ মৃদু সঞ্চারে নামিয়া আসিয়াছিল।... পরিপূর্ণ যৌবনের স্বাস্থ্য-সম্পদে অতুলনীয়, তার সর্বাঙ্গ ঘিরিয়া তেমনিই যেন স্নিগ্ধ শীতলতা। নিমেষে নীতিশ আপনার মনের রশ্মি টানিয়া ধরিল।••এ সব সে কী যা-তা ভাবিয়া মরিতেছে। দেশের এই দারুণ অবস্থা,-বন্যা, দুর্ভিক্ষ, দেশ জুড়িয়। হাহাকার...সে না জীবন পণ করিয়া দেশের সেবায় আত্মনিয়ােগ করিয়াছে। আজন্মের শিক্ষা-সংস্কার ভুলিয়া আজ সে তুচ্ছ একটা নারীর সৌন্দর্য্যের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করিতে বসিল ! পথহারা বুঝি এমনি করিয়াই হয়। ১৪ দীপালী নীতিশ ভাবিল, বড় বাচিয়া গিয়াছি।•••অন্যান্য কাজ সারিয়া নিশ্চিন্ত মনে সে এবার মার্কেটের ভিতর ঢুকিয়া পড়িল। অজস্র নর-নারীর মেলা। ইউরােপীয়ানই বেশী...এ ধারটায় আসিলে মনে হয়না যে, বাংলা দেশের প্রতি ঘরে ঘরে অর্থের দারুণ অভাব ঘটিয়াছে—বাঙালী আজ নিরন্ন, বস্ত্রহীন। মিলিত করে বিচিত্র কোলাহলে—অভাবের সে ক্ষীণ করুণ আর্তনাদ আসিয়াই পৌছায়না।... ওধারে গ্লোবে ‘মেরী পিকফোর্ডের’ চিত্রাভিনয় চলিতেছে। কি একখানা নৃতন ফিল্ম। টিকিট-ঘরের সুমুখে লােক ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে। •••এই তাে সংখ্যাতীত লােক ছবি দেখিয়া আনন্দ করিতে আসিয়াছে, কে বলিবে যে উহাদের ঘরে শর্থাভাব ! স্ত্রী-পুত্রেরা পেট ভরিয়া দুই মুটো খাইতে পায় না ! নীতিশ ভাবিয়াই পাইল না—মাথার ঘাম পায়ে ফেলিয়া যে সামান্য বােজগার...দুই হাতে বিলাইয়া যায় ইহারা কি করিয়া নিত্যই! দূর হউক-বাজে ভাবনা যত এক সঙ্গে যেন তাহাকে আজ পাইয়া বসিয়াছে।•••একটা ছাড়ে তাে আর একটা••• দোকানে দোকানে ঘুরিয়া নীতিশ বাছিয়া বাছিয়া তাজা টাটকা যাহা পছন্দ হইল ফল কিনিল। মায়ের আদেশ মত দুই একটা টুকি টাকী জিনিস পত্রও কিনিল-খান দুই গামছা, গােটা চারেক পাথরের বাটী, একটা পিতলের ধুনচি। বাকী রহিল মার ফর্দে লেখা কাপড় কেনা।•••বাহির যখন হইয়াছে তখন যাহা কিনিবার সারিয়াই ঘরে ফেরা ভাল, নহিলে জিনিস না পাইলে মা হয়ত বকুনী সুরু করিবেন।••• কাপড় কিনিতে গিয়া নীতিশ দু’খানি খদ্দরের চওড়া লালপাড় সাড়ী দীপালী বেশীই কিনিল। যদি মা’র দরকারে লাগে, নহিলে প্রয়ােজন বিশেষ ছিল না। জিনিসপত্র কিনিয়া সে যখন বাসায় ফিরিল, রাত তখন সওয়া দশটা... ভজুয়া বাহিরের বােয়াকটায় বসিয়া রাস্তার গ্যাসের আলােয় ঝুকিয়া পড়িয়া তুলসীদাসের দোহাবলী পড়িতেছিল, পাশে বসিয়া ঠাকুর। দেখিয়া বােধ হয় দুইজনের সন্ধি হইয়া গিয়াছে। উড়িয়া ঠাকুরটী ভজুয়ার মুখের দিকে তাকাইয়া কি যে রস গ্রহণ করিতেছিল, তাহা সে-ই জানে। নীতিশ খােলা দরজার চৌকাঠে পা রাখিয়া ডাকিল-ঠাকুর, ভাত দিয়ে যাও.•• ; রাত্রে শয্যায় শুইয়া অনেকক্ষণ চক্ষু মুদিয়া পড়িয়া থাকিয়াও নীতিশের চোখে এক ফোটাও ঘুম আসিল না। তেমনি প্রচণ্ড গরম। মাথার উপরে বৈদ্যুতিক পাখাটা পুরা পয়েন্টে ঘুরিয়া ঘুরিয়াও নীতিশের মগজটাকে শীতল করিতে পারিতেছিল না, নিদ্রাহীন চোখে খানিকটা এপাশ-ওপাশ করিয়া উঠিয়া আলােটা জ্বালিল ; পরে জানালার ধারে চেয়ারখানাকে টানিয়া লইয়া কয়েকখানা ভন মাসিক ও সাপ্তাহিক কাগজ লইয়া বসিল। এসব কাগজ কোন দিন সে ছুইয়াছে বলিয়া তাে মনে পড়ে না। মার জন্যে নেওয়া হয়, প্রতি মাসে ও সপ্তাহে আসিয়া অনাদৃত ভাবে টেবিলের এক কোণেই পড়িয়া পড়িয়া জমা হয়—হয়ত তাহাদের প্যাকেট পৰ্য্যন্ত খােলাই হয় না। মা যখন কলিকাতায় থাকেন, তখন অবসর কালে পড়েন।

দীপালী আজ ইহাদের লইয়া বসিল নিতান্ত দায়ে পড়িয়া যেন•••ঘুম আসে না:••তার জন্য ইহার মত এত বড় সুহৃদ সে আর এত রাত্রে কোথায় পাইবে ? কিন্তু তাহাও ভাল লাগিল ন। অস্থির ভাবে নীতিশ উঠিয়া বড় আলমারীটা খুলিয়া তাহার থাকে থাকে সাজানো সুদৃশ্য ইংরাজী বই- গুলির দিকে চাহিল কিন্তু কোন পানিই তাহার মনঃপুত হইল না::: আলমারীর কবাট দুইটা সজোরে বন্ধ করিয়া বিরক্তিভরে সুইচট অফ করিয়া দিয়া বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দাড়াইল । আঃ । এতগণে তাহার প্রান্ত দেহ যেন জুড়াইয়া গেল।•••রাত, শেষের স্নিগ্ধ ঝিরঝিরে বাতালে গভীর আরামে চোখ দুইটি মুদিয়া আসিল। দিবসের সেই ক্লান্ত রগ কোথায় যেন মিলাইয়া গেছে । রাত্রির শীতল আলিঙ্গনের মাঝে নিজেকে সে নিঃশেষে বিলাইয়া দেছে।•••নীতিশ বারান্দায় ভর দিয়া দাড়াইয়া সুমুখে যতদূর দৃষ্টি চলে দেখিতে লাগিল... প্রকৃতির অপরূপ শােভা। ঘুমন্ত নগরীর বুকের পরে নিশান্তের স্নান জ্যোৎস্না যেন মায়ালােক রচিয়াছে•••চারি দিকেই গভীৰ স্তব্ধতা।••• ঘর হইতে একটা মাদুর আর একটা বালিশ লইয়া আসিয়া নীতিশ বারান্দায় বিছাইল। ঋরে বালিশে মাথা রাখিয়া চোখের উপর হাত দুইটা চাপা দিয়া শুইয়া পড়িল। ঘুম তাহার এতক্ষণে সত্যই পাইয়াছিল। দিনের প্রকাশ্য আলােয় যাহাকে দূরে সরাইয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছিল, নশীথের অস্পষ্ট ছায়ায় সে গােপন সঞ্চারিণী পায়ে পায়ে আসিয়া ১৭

দীপালী
নীতিশের সারা মনখানি জুড়িয়া বসিল—কখন তাহা সে নিজেই জানে
।
স্বপ্নের মাঝেও সেই অকুণ্ঠিতার
সুন্দর মনােরম মূর্তিখানি ক্ষণে
ক্ষণে অন্তরের অন্তঃপুরে ভাসিয়া বেড়াইতেছিল।...
নিদ্রিত নীতিশের ওষ্ঠে তৃপ্তির হাসি !...
১৮

মায়া বৌদির কথাটা দীপালীর অন্তরে বড় গভীর ভাবে বাজিয়া ছিল। বাজিবার কথাই... আজই যেন তাহারা বালীগঞ্জের আরিষ্টক্র্যাট সমাজের মাথার মণি হইয়াছে, কিন্তু অতীতের সেই দুঃখময় জীবনের ইতিহাস—সে তাে ভুলিবার নয় ! গরীবের ঘরে,তাহাও পাকা কোঠায় নয়—অপরিচ্ছন্ন নােংরা, একটা সরু গলির ছােট্ট একটা খােলর ঘরের স্যাঁতসেঁতে দালানে তাহাদের জন্ম হইয়াছিল। তাহার দাদার জন্মের মুহুর্তে বােধ হয় শাখটা কেহ বাজাইয়াছিল কিন্তু তাহার জন্ম-মুহর্তে যে বাজে নাই এটা ঠিক কেননা মা-বাপের কাছে মেয়ে বলিয়া সে চিরটা দিনই অবহেলা পাইয়া আসিত !••• কেরাণী বাপ, আর রুগ্না মা, ঘরে দরিদ্রের করাল মূর্তির প্রচণ্ড তাড়নায় ভালমন্দ খাওয়া দূরের কথা, দুইবেলা পেট ভরিয়া অন্ন জুটিত না। ক্ষুধার জ্বালায় দীপালী চীৎকার করিয়া দিলে অভাগিনী মাতা তার মাথাটা বুকে চাপিয়া শুনাে স্তনের বোঁটাটা মুখে ঢুকাইয়া দিতেন •••পাঁচ বছরের মেয়ে-বুকের দু’চার ফোটা জলাে দুধে তার কি হইবে ? দীপালী হাত পা ছাড়িয়া কাদিত, তখন তাহার ছােট্ট দাদাটী হাত ধরিয়া টানিয়া বাহিরে আসিয়া সান্ত্বনা দিবার চেষ্টা করিত—বৃথাই... দুটী ভাই বােন—এক ছাঁচে ঢালা, রূপে ও গুণে সমান । বাপ-মা কখনাে তাদের পেট ভরিয়া খাওয়াইতে পারেন নাই...দুঃখও দীপালী তাদের কম ছিল না '...কিন্তু এক দিন ছেলেমেয়েকে ভবিষ্যতের অতল কালো অন্ধকারের মাঝে ফেলিয়া তাঁহারা মাত্র পাঁচদিনের আড়াআড়ি পৃথিবীর বুক হইতে বিদায় নিলেন !••• গরীবের ঘরের টাইফয়েড...ওনুপই বা কোথায়...আর ডাক্তারই বা কে দেখায় ?...মরিয়া তাহারা বাচিলেন, অন্ততঃ জীবনব্যাপী অনন্ত দুঃখের হাত এড়াইলেন। জীবন-রথের চাকা ঘুরিয়া গেল। ফুলের মত কোমল দুটি কচি-প্রাণ শিশুকে পথে দাড়াইয়া ভিক্ষ করিতে দেখিয়া ওই মায়ারই বাবা অপরেশ বাবু বুকে তুলিয়া তাহাদের নিজের গৃহে পরম সমাদরে স্থান দেন। মায়াকে বিবাহ করিয়া আলােক চলিয়া গেল বিলাতে। দীপালী তখন বি, এ দিবার জন্য প্রস্তুত হইতেছে।•••বিলাত হইতে ফিরিয়া আলােক দেখিল, এইবারই তাহারা যথার্থ পিতৃহীন হইল। অপরেশ বাবু কাজের জন্য মফঃস্বলে গিয়াছিলেন.••সেইখানেই তিনি বসন্ত রােগে মারা যান। সে আজ বছর চারেকের কথা—বেশী দিন নয়। গত জীবনের এই ঘটনাগুলি তাদের স্মৃতির কোঠায় সঞ্চিত অছে ভুলিবার উপায় কি ? যাত্রার অতিপূৰ্বে সুটকেশটী গুছাইতে গুছাইতে দীপালীর বার বার মনে পড়িতে লাগিল সে যাইলে তাহার দাদার কি করিয়া চলিবে। বয়সে বড় হইলেও তাহার যে ‘দীপা না হইলে এক দণ্ড চলে না। দাদা যখন শুনিবেন—তঁাহার ‘দীপা তাহাকে একটা খপর দীপালী পৰ্য্যন্ত না দিয়াই ঘর ছাড়িয়া অজানা পথের সন্ধানে পাড়ি দিয়াছে, বেনায় ক্ষোভে তার মুখখানি কি করণই ন হইয়া উঠিবে। চোখের সুমুখে দীপালী যেন আলেকের সেই শুষ্ক করুণ মৃত্তি- খানি দেখিতে পাইল !...টপ, টপ, করিয়া তার গালের উপর দিয়া অশ্রু ঝরিল। মায়া কি জানি কেন দীপালীকে সহিতে পারিত না—অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাড়াইয়া ওই মেয়েটী তার মুখের উপরেই কিনা দশ কথা শুনাইয়া দিল !...সে কাহার খাইয়া মানুষ জানে না কি? সে আর কি এমন বলিয়াছিল ? খাবার ঘরের টেবিলটা না হয় একটু সাফ করিতেই বলা হইয়াছিল। সে না ডাকিলে তখন মায়া কাহাকেই বা ডাকে...সুকুয়াটার জর, বুদ্ধ, খানসামাটা মার্কেটে গেছে ফুল কিনিতে, বিন্দী দাসীকে ডাকিয়া ডাকিয়া গলা ফাটাইলেও উত্তর দিবে না, মায়া তো নিজে কাজ কর্ম কিছু করিতে জানে না, অতএব••• কিন্তু দীপালী যখন স্পষ্ট গলায় কহিল—পারিবেনা সে, এ কাজ তাহার নয়, তখন মায়ার সমস্ত রক্ত তাতিয়া আগুন হইয়া উঠিল.••সেও রুষ্ট হইয়া শুনাইয়া দিল—পরের ঘরে পরের ভাত খাইয়া যাহারা মানুষ তাহাদের অত নবাবীয়ানা পােয় না পরের দোরে থাকিতে হইলে সময় অসময়ে দুইটা কাজ করিয়া উপকার করিতে হয়। খানিকটা বিষ উগরাইয়া মায়া কক্ষান্তরে চলিয়া গিয়াছিল, কিন্তু সে বিষের বাষ্পে দীপালীর মনে হইল অকস্মাৎ সমস্ত শরীর যেন তার হিম হইয়া আসিতেছে, নিঃশ্বাস পর্যন্ত টানিয়া নিবার ক্ষমতা নাই। সে আর দ্বিতীয় বাক্যটি উচ্চারণ করে নাই; আস্তে আস্তে দীপালা বাড়ীর বাহির হইয়া সারাটা দিন পথে পথে ঘুরিয়া কাজের সন্ধান করিয়াছিল। অবশেষে গতি তার শেষ হইল নীতিশের বাড়ীতে গিয়া । আজ তার অনির্দিষ্ট পথে যাত্রা শুরু... ভিজা গামছা দিয়া দীপালী চোখ-মুখ মুছিয়া রুক্ষ চুলের রাশিটা দুই হাতে জড়াইয়া একটা যেমন তেমন এলাে খোপা বাঁধিয়া লইয়া, আয়নার সুমুখে দাড়াইয়া কঁাধের কাপড়ের পিনটা খুলিয়া গিয়াছিল পুনরায় আঁটিতে আঁটিতে যেন শুনিল—তাহার দাদা ডাকিতেছেন— দীপা ! দীপা! দীপালী চমকিয়া চাহিয়া দেখিল-সুমুখে কেহই নাই। কিন্তু নীচে অত গােলমাল কিসের ? ওই না তাহাদের ড্রাইভার মতিবাবুর গলা !•••তবে কি সত্যই দাদা ফিরিয়া আসিলেন ;-তাহা হইলেই তাে প্রমাদ••• দীপালীর ঘর হইতে বারান্দায় আসিতে যে সময়টুকু লাগিল, সেই অবসরে টপ, টপ, করিয়া সিড়ি' ভাঙ্গিয়া আলােক একেবারে বারান্দায় আসিয়া উদ্বেগ ব্যাকুল স্বরে ডাকিল-দীপা-মায়া ?•••কোথায় রে তােরা:বা: • •! দীপালী বাহিরে আসিয়া ত্রস্তভাবে কহিল-দাদা, তুমি এমন হঠাৎ? আলােক বারান্দায় রেলিংয়ে পিঠ দিয়া কহিল—এমনিই,•••আসতে নেই বুঝিরে—তােদের নেমন্তন্নের কার্ড না পেলে? দীপালী মুখটা ফিরাইয়া কহিল—বারে! আমি বুঝি তাই বলছি? তবে তােমার আসবার দিন ছিল— -মে মাসের শেষ উইকে’ তাে? কিন্তু অতদিন আর থাকতে হ’ল ! ২২ দীপালী ; । যে কেস্টার জন্যে গিয়েছিলুম ; সেটা মিটমাট হয়ে গেল। তাই ভাবলুম—জলাভূয়ে পড়ে পড়ে ম্যালেরিয়াকে না ডেকে কোলকাতাতেই ফিরে যাই... কিন্তু এসেই দেখছি অন্যায় হয়ে গেছে,-য তােদের অভ্যর্থনার বহর দেখছি.. দীপালী শুস্বরে কহিল—সে আবার কী ?—কেন? আলােক চকিতে মায়ার কক্ষ-পানে একটা চোরা কটাক্ষ হানিয়া কহিল—এসে দেখছি যে, খবর না দিয়ে আসাটাই প্রকাণ্ড অপরাধ- নইলে তােরা কোথায় আগ-বাড়িয়ে আমাকে আদর-অভ্যর্থনা করবিনা যে যার সব ঘরেই রইলি বন্ধ। আমি তবে ফিরে চলি ভাই- দীপালী ব্যস্ত হইয়া কহি—বেশ যা হােক, এই তাে আমি রয়েছি, এস-ঘরে এসে বােস। দীপালীর ঘরে পা দিয়াই খােল সুটকেশটার পানে আলােকের নজর পড়িতেই সে বিস্মিত দৃষ্টি তুলিয়া দীপালীর মুখের পানে চাহিল। দীপালীর মুখ কিন্তু স্পষ্ট দেখা গেলনা, সে তখন একমনে টেবল-ক্লথটার সূক্ষ্ম সূচি- শিল্পের উপর একান্ত মনােনিবেশ করিয়াছে। কি যেন একটা গােলমাল বাধিয়াছে...আলােক দীপালীর মুখটা ধরিয়া ফিরাইয়া কহিল—ওটা কি দীপা? কোথায় যাওয়া হচ্ছে তােমার ? দীপালীর মাথাটা অসম্ভব রকমে বুকের কাছে ঝুকিয়া পড়িল। আলােক একটা কাউচের উপর ধপ করিয়া বসিয়া পড়িয়া কহিল— দীপু, খােলা সুটকেশটার রহস্য আর ঘন করে রাখিসনে দিদি ! চটু করে বলে ফেল, আমি পােষাক টোষাক ছাড়ি উকি ভয়ঙ্কর গরম••• পাখার মাত্রাটা বাড়াইয়া দিয়া দীপালী কহিল-পরে বােলব খ’ন দাদা, তুমি ততক্ষণ পােষাক ছাড়, আমি দেখি চার বন্দোবস্ত দীপালী উহু ;-দীপালীর দিকে সােজা হইয়া ফিরিয়া বসিয়া আলােক কহিল —তােমার ওই সুটকেটীর সকল রহস্য না জেনে আমি এখান থেকে পাদমেকং ন গচ্ছামি ! দীপালীর কপাল ঘামিয়া উঠিল। কি বলিবে সে...? সে কি ইহাই বলিবে—তােমার বধূকে আমি সহিতে পারিলাম না বলিয়া ঘর ছাড়িলাম ! না—না সে ভারী বিশ্রী শােনায়•••তবে সে কী উত্তর দিবে ? কিছুক্ষণ নীরবে চিন্তা করিয়া দীপালী কহিল—এমন কিছুই নয়, ঘরে বসে বসে ভাল লাগে না, তাই একটা কাজ পেয়ে—নিয়েছি, আজকে সেখানে যাবার কথা- দীপালীর দৃষ্টি চকিতে তাহার বাম হস্তের মনিবন্ধের উপর পড়িল, -সােনার ছছাট্ট ঘড়িটীর কঁাটা তখন সওয়া আটটা সময়-নির্দেশ করিতে- ছিল। দীপালীর বুক ঠেলিয়া একটা চাপা নিঃশ্বাস বাহির হইবার জন্য ছটফ করিতেছিল। সমস্ত সঙ্কল্প বুঝিবা ব্যর্থ হইয়া যায়... আলােক বােনটীকে কাছে টানিয়া পাশে বসাইয়া জিজ্ঞাসা করিল— দীপু, তােমার গলার স্বর, তােমার শুনাে মুখ,চোখের ছলছলে দৃষ্টিটা কিন্তু আমায় বলছে যেন—এটা সামান্য নয়..বলতে যদি তােমার আপত্তি কিছু থাকে—তাহলে থাক আমি শুনতে চাইনি। কিন্তু একটু আভাষও কি আমি পেতে পারিনি ? কেননা, তােমাকে তত আমি চিনি। তাহার দাদার ধারণা যে কোন্‌পথে যাইতেছে তাহা ভাবিয়া লজ্জায় দীপালী মাথা হেঁট করিল। পরক্ষণে মুখ তুলিয়া অকম্পিত স্বরে কহিল -না দাদা, তুমি যা ভাবছ তা নয়, তবে আমি বলছিলুম কি, মানে ২৪

দীপালী
মেয়েরা স্বভাবতঃই পরের গলগ্রহ...এ বন্দী-জীবন ছাড়া বাইরের মুক্ত
আলাে-বাতাসে গিয়ে নিজে নিজের সামান্য ভারটা বহন করলে কি
দোষের কাজ হয় ? এ শিক্ষা তাে তুমি আমাকে বরাবরই দিয়ে এসেছ
দাদা !
আলােক কহিল—তা তাে দিয়ে এসেছি...কিন্তু হঠাৎ তােমার
মাথায় এ খেয়াল চাপলো কেন দীপু, সেইটা আমায় বুঝিয়ে বলল।
আমি মফঃস্বলে বেরুবার আগেতো তােমার এ বিদ্রোহিনী মূর্তি দেখে
যাইনি। নিশ্চয় এই ক’দিনের মধ্যে এমন কিছু একটা কাণ্ড ঘটেছে, যে,
যার জন্যে তুমি আর এ বাড়াটায় থাকতে রাজী হচ্ছ না। ঠিক তাে?
মাথা নামাও কেন দীপু,••••••আমার কি মনে হচ্ছে
জানো?
দীপালী আলেকের পানে চকিতে চাহিল। আলােক টেবিলের
উপর দুই কনুই রাখিয়া কহিল—আমার স্থির বিশ্বাস—মায়া...
ওকি !
আম্বরে দীপালী ‘দাদা’ বলিয়াই থামিয়া গেল। আলােকের
ধারণা-শক্তি কি এত প্রখর•••না ভগিনীর প্রতি অত্যধিক মেহের
প্রাবল্য এ ?
এইবার আলােক ব্যাপারটা কতক বুঝিল। মায়াকে সে চিনিত
ভাল করিয়াই, ভগিনীকেও জানিত, আরও বুঝিল যে, দীপালী মায়া-
ঘটিত কোন কথা আলােকের কাছে প্রকাশ করিবে না।
নিরুপায় আলােক ডাকিল—মায়া ! মায়া ! শুনে যাও
অকস্মাৎ দীপালী তীরের মত সােজা হইয়া বলিল—দাদা, এ কি
কর তুমি, সত্যিই কি তুমি আমাকে ঘর ছাড়া কৰ্বে...? মায়া বৌদিকে

দীপালী যদি তুমি এখানে ডাক,-তাহলে এক্ষুণি—এই মুহূর্তে আমি বাড়ী ছেড়ে দিয়ে চলে যাব.. তুমি ভারি অন্যায় কচ্ছ... দীপালীর গলার স্বর ভারী হইয়া আসিতেছিল, উত্তেজনায় তার সারা দেহটা থর থর করিয়া কাপিয়া উঠিল। দীপালীর একখানি হাত সস্নেহে টানিয়া ধরিয়া আলােক কহিল- দীপু অস্থির হােনে, আমি তােদের কি হয়েছে না হয়েছে জানতে চাইনে আর। পাগলী...একটু কিছু হলে তুই অত ভয়ঙ্কর রাগ করিস কেন বল তাে? ঠিক যেন সেই ছােট্ট বেলাটীর মত ।••ভাল কথা, কোথায় তাের যাবার কথা বল্লি-না:••সে কোন্ জায়গা...কি কাজ বেছে নিয়েছিস রে? দীপালী মুখ নীচু করিয়াই কহিল—ঢাকায় যাব, ‘বঙ্গীয় সেবাসদনের’ নাম শােননি দাদা, আমি তারই নারী-কর্মী হব, ভেবেছিলুম বেশ চুপিসাড়ে পালাবাে, কিন্তু তুমি এসে পড়ে সব গণ্ডগােল করে দিলে নইলে এতক্ষণ শেষের কথা কয়টায় অবরুদ্ধ অভিমানের স্পন্দন••• আলােক এইবারে হাসিয়া উঠিল। কহিল—ভেতরে ভেতরে এত বড় কাণ্ডটি তুমি বাধিয়ে বসে আছ দুষ্ট মেয়ে, বটে, কিন্তু এইখানেই মায়ার আর তােমার মধ্যে প্রভেদ দেখতে পাই আকাশপাতাল । মায়া আর তুমি দু’জনেই নব্য শিক্ষিতা, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য মায়া তার শিক্ষার অপব্যয় করছে বসে বসে। মানে পরচর্চা হিংসা দ্বেষ যা কিছু আর পাঁচটা সাধারণ মেয়েরই নিতান্ত একচেটে, মায়া তার প্রভাব এড়িয়ে যেতে পারছে না, কিন্তু তুমি আলােক তার মাথার রুক্ষ চুলগুলি টানিয়া টানিয়া সােজা করিতে দীপালী করিতে পুনরায় বলিল—আসল জায়গায়ই গলদ হয়েছে দীপু, মায়াকে আমার মত গৃহ-হারা হতভাগা লােকের হাতে দেওয়াটা জ্যাঠামশায়ের ভয়ঙ্কর ভুল হয়েছিল। কি কথায় কি কথা আসিয়া পড়িতেছে দেখিয়া দীপালী সহসা স্বাভাবিক স্নিগ্ধ স্বরে কহিল,—থাকগে ও সব বাজে কথা দাদা, তুমি • ওঠ, এর পর খেয়ে দেয়ে সুস্থ মনে যাবার বিষয়ে বন্দোবস্ত কোরাে অখন,•••ওঠো দেখি— আলােক কাউচ হইতে উঠিয়া সহসা দীপালীর পানে ফিরিয়া পঁাড়াইয়া কহিল—দীপু, তাের এই সঙ্কল্পে আমি বাধা দিতে চাইনে ভাই, কাজ করতে চাস কর, কিন্তু লক্ষ্মীটি দিদি, আমার একটা কথা রাখবি বল্ ? আলােকের কথাগুলির মধ্যে কেমন যেন করুণ একটা সুরের মায়া দীপালীর অন্তর ছুইয়া গেল। দীপালী আলােকের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল—তােমার কোন্ কথাটা আমি রাগিনে দাদা? যে তাই আজ অমন করে বলছ ? কি কথা বল ? দীপালীর এলাে খোঁপাটীতে আদর করিয়া হাত বুলাতে বুলাইতে আলােক মেহসিক্ত কণ্ঠে কহিল—তা জানিরে, তাই বলছি—যেখানে ইচ্ছে তুই গিয়ে কাজ কর দীপু, কিন্তু দেশছাড়া হােসনে...অন্ততঃ আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন তুই আমার কাছে কাছেই থাক। ঢাকায় যাওয়া তাের কোনমতেই হতে পারে না ভাই! তােকে অন্যত্র পাঠিয়ে আমি থাকতে পারবােনা—কিছুতেই পারবােনা। বলিতে বলিতে আলােকের চক্ষু অশ্রুসজল হইয়া উঠিল । দীপালী ব্যথিত কণ্ঠে কহিল—বাবনা আমি ঢাকায়, তুমি ভেবােন। দাদা,কিন্তু তাদের যে কথা দিয়ে এসেছি २१ দীপালী আলােকের মুখে এতক্ষণে হাসির রেখা ফুটিল। কহিল—বেশ তাে, সেই ভদ্রলােককে আজ বিকেলে তুমি নিজে গিয়ে ধরে নিয়ে এস। তারপর দেখা যাবে।•••ভালাে কথা দীপু, গােটা কতক ঘুঘু এনেছি শিকার করে, তুমি নেমে এসে•••দ্যাখাে কি কি মাল মশলা লাগবে বাবুর্চীকে একটু দেখিয়ে দাওগে, আমি একবার মায়াকে দেখিগে... সহসা তাহাদের ‘লনে’ একখানি ট্যাক্সি থামিবার শব্দ হইতেই উভয়ে চমকিয়া চাহিল । ট্যাক্সি হইতে একটি সুবেশা তরুণীকে নামিতে দেখিয়া আলােক উল্লাসের ভঙ্গীতে কহিল—দেখো দীপু, এইবার ভাল করে ঢাকায় যাও••• ওই তােমার বন্ধু ইর। সেন•••আরে বিমুও যৈ এসেছে ব্যাপার কী ?••• এসে তত দেখি... আলােক দীপালীকে টানিতে টানিতে অতিথি-সম্বর্ধনায় ছুটিল। খােলা সুটকেশ হইতে দীপালীর নিয়ােগ-পত্ৰটা ফ্যানের হাওয়ায় তখন সমস্ত ঘরখানায় উড়িয়া বেড়াইতেছিল। ২৮ চার দক্ষিণের খােল বারান্দার একধারে একটা বড় ধামার ভরা গাছপাকা আম..মা মাঝখানে বসিয়া বঁটি দিয়া নিপুণভাবে কাটিয়া কাটিয়া নীতিশের রেকাবীতে দিতেছিলেন, গল্প শুনিতে শুনিতে নীতিশ একমনে তাহারই রস গ্রহণ করিতেছিল।••• জলের গামলাটায় হাতটা ধুইয়া মা কহিলেন—নিবারণ চক্কোত্তীর সে কী দগ্ধ ! বলে কুসুম-ডিঙে নাই বা হলো, হাতে যখন সূতাে বেঁধেছে, ও বিয়ে তখন ধরে নাও হয়েই গেছে:••মেয়ে পালিয়ে এসেছে, ও যাবে কোথায়, ওর মাথা ভেঙ্গে আজ রক্ত দেখবে।•••বলে বাছা, মেয়েটাকে সত্যি সত্যিই দুই খুড়ো-খুড়ীতে মিলে চেলা কাঠের বাড়ি, সে কী মার ! নীতিশ একখানি আম তুলিয়া মুখে দিতে যাইতেছিল, মার কথা শুনিয়া তার হাত হইতে আমের টুকরাটা মাটীতে পড়িয়া গেল । বিস্মিত কণ্ঠে কহিল—তুমি দাড়িয়ে দেখলে মা, তখনই কেন প্রতিকার করলে না? মা কহিলেন—সে কিরে দাড়িয়ে দেখবো কি? আমি কি ছিলুম নাকি ? গােপাল জ্যাঠা এই বিশু, মাখন ওরা সবাই এসে বল্লে- নীতিশ কহিল—আচ্ছা খুড়ে-খুড়ী তাে! পাত্তরটী কে ? মা মুখভঙ্গী করিয়া কহিলেন,-কে আবার, ওই অলপ্লেয়ে খুড়াে নিবারণ চকোত্তীর দ্বিতীয় পক্ষের হাবা-কালা শালা, গুণের আর শেষ নেই তার। তা, মেয়েরই বা দোষ দেব কি বাবা, অমন সােনার দীপালী প্রতিমে মেয়ে...কি দুঃখে সে হাবা-কালার গলায় মালা দিতে যাবে?••• তা মেরে ধরে খুড়ো-খুড়ী তাে ওকে একটা ঘরে চাবী দিয়ে রাখে, মেয়েটার এদিকে বুদ্ধি শুদ্ধি নেই, কিন্তু বিপদের দিনে যাহােক সাহস দেখিয়েচে ! জানালার ভাঙ্গা গরাদে খুলে রাত্তিরে চুপি চুপি পালিয়ে এসে রূপগঞ্জের পচা পুকুরধারে দাড়িয়ে ছিল, বােক। মেয়ে বােধ করি জলেই ঝাঁপ দিত। ভগবান রক্ষা করলেন। আমি তখন বরাজের মত পাড়ায় ওষুধ বিলি করে ফিরছি--ভিখনের হাতের লণ্ঠনটার আলাে পড়তেই ও তখন সরে গিয়ে একটা ঝােপের ভেতর ঢুকে পড়ে, শেষে ভিখুতে আমাতে খুজে ওকে বার করি। ওর মুখ থেকে ব্যাপার শুনে, বাছা হাত-পা, আমার পেটের ভেতর সেধিয়ে গেল••ওকে ওর খুড়াে-খুড়ীর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার মানে যমের মুখে তুলে দেওয়া ! আমি তাে তখনই বাড়ী ফিরে রাতারাতি গুছিয়ে গাছিয়ে ট্রেনে চাপলুম। আহা, বাপ-মা নেই..তাই বাছার এত শাস্তি। আমি বল্লুম তুই আজ থেকে আমারই মেয়ে হলি মা, আমার ঘরেই চল্।••• নীতিশ জলের গ্লাসটা টার্নিয়া লইয়া হাত ধুইয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া কহিল—কাজটা কিন্তু ভাল হলেও আইনের চোখে এটা দোষণীয়। ধরে ওর কাকা যদি ক্রিমিন্যাল সুট ফাইল করে—মেয়ে চুরির অপবাদ দিয়ে ? মা গালের উপর হাত রাখিয়া ব্যঙ্গ ভরে কহিলেন,—ওর কাকা কে কৰ্বে ? পােড়া কপাল আমার•••সে হল মহা কঞ্জুস, পিপড়ের মুখ থেকে চিনি কেড়ে খায়, সে কৰ্ব্বে টাকা খরচ ? ওরে তাকে আমি চিনি ••তুই মিথ্যে ভাবিসনে,যদিই সে রকম কিছু হয়, তাকে কিছু টাকা ধরে দিলেই সে চুপ করে যাবে।•••হারে, আর আম খেলিনে?•••খা- দীপালী খা, আর দু’টো পাকা দেখে কেটে দি? তাের তরু মাসীমাদের সেই বৌ-ভুলুনি গাছের আম রে..খুব মিষ্টি না ? নীতিশ মাথা নাড়িয়া কহিল—মিষ্টিই বল, আর টই বল, আর একটা আমও আমি খাচ্ছিনে । নীতিশ ঘরের মধ্যে চলিয়া গেল। মা আমের ঝুড়িটা এক পাশে ঠেলিয়া রাখিয়া উঠিয়া দাড়াইয়া কহিলেন—পদ্মা, তােমার খাওয়া শেষ হলে একবার ওপরে এসাে তাে মা, এই আম কটা আর খানিকটা দুধ নিয়ে ঠাকুর আর বামাকে ভাতের ওপর দিয়ে। •••মার আহ্বানে ত্রস্ত হইয়া একটা গৌরী মেয়ে কুণ্ঠা-জড়িত পদে বারান্দায় আসিয়া দাড়াইল।. ‘পদ্মা’ নামে মেয়েটাকে মানাইয়াছে ভাল। চমৎকার শ্রী !••• সকালের স্নানসিক্ত প্রভাত-পদ্মের মতই স্নিগ্ধ মুখখানি দু’পহরের মলিনতায় ঈষৎ স্নান, তা ছাড়া তার দেহের কোনখানে অসুন্দরতার লেশমাত্রও নাই। যৌবনের অটুট স্বাস্থ্যে ঢল ঢল মুখখানির চারিধারে কেঁকড়া কোকড়া কালাে চুলগুলি হাওয়ার ঝাপটায় উড়িয়া বেড়াইতেছিল, পরণে সদ্যপােয়া লাল পেড়ে সাড়ী, ছােট ঘােট পা দুখানিতে কবে বােধহয় আলতা পরিয়াছিল,আঙুলের ডগায়, নখের কোণে কোণে তারি অস্পষ্ট চিহ্ন। মেয়েটার চোখের দৃষ্টি বড় ভীরু, গলার স্বরেও তারি অল্প আভাষ। পদ্মার হাতে আম কয়টা ও দুধের বড় কঁাসার বাটীটা তুলিয়া দিয়া বা কহিলেন—এগুলাে ওদের দিয়ে তুমি ওপরে উঠে এসে মা,"বুঝলে? মাথা নাড়িয়া পদ্ম আস্তে আস্তে নামিয়া গেল, একটু পরে যখন সে দীপালী উঠিয়া আসিল—তখন দেখিল দরজার দিকে পিছন ফিরিয়া বসিয়া মা নীতিশকে বলিতেছেন—কইরে,—তাের সেই দীপালী বলে মেয়েটা তােত এখনাে এলােনা । ঘরের দরজার পানে চাহিতেই নীতিশের চোখ পড়িল পদ্মার দুটী ভীরু চোখের অসহায় দৃষ্টির উপর।•••মুহূর্তে চোখ নামাইয়া কহিল— ওই নাও মা, তােমার মেয়ে এসেছে। তুমি বাপু তােমার মেয়ের সঙ্গে গল্প টল্প করাে-আমার অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। একবার প্রকাশের মেসের দিকে যেতে হবে, সে এলে তাকে পাবনায় পাঠাতে হবে।••• নীতিশের কথায় মা বাহিরের দিকে চাহিয়া পদ্মাকে কহিলেন— ভেতরে এসােনা মা, নীতিকে লজ্জা করলে চলবেনা, ওকে তুমি ‘দাদা বলে ডাকবে,•••হা-বসাে••• পদ্মা সঙ্কুচিত হইয়া মা’র পাশ ঘেসিয়া বসিয়া পড়িল। মা সস্নেহে তার খােলা চুলগুলি নাড়িতে নাড়িতে কহিলেন—একরাশ চুল ! মেয়ে তত কোলে পাইনি, তাই মেয়ের অপূর্ণ সাধটা ভগবান তােমাকে দিয়ে মেটাবেন বলেই নীতি আমার এত দিন বিয়ে করেনি:••বউ নিয়ে সাধ- আহাদ যে কবে কৰ্বো"চুলগুলাে যে একেবারে ভিজে রয়েছে পদ্মা, ওই বারান্দার কোণে বােদ পড়েছে:..যাও মা, নেড়ে চেড়ে শুকিয়ে এসে •••নীতি বেরুচ্ছিস ? আসবার সময় দুটো ক্লিপ নিয়ে আসিস তাে।... নীতিশের বড় হাসি পাইল, মা ওই পাড়াগাঁয়ের ভীরু মেয়েটাকে একদিনেই কায়দা-দুরস্ত করিয়া তুলিতে চান। চুলে ক্লিপ, আঁটিয়া পায়ে শ্লিপার পরিয়া ও যদি দীপালীদের মত মেয়েদের সুমুখে দাড়ায়, তাহলে ওর দাঁড়ানাের ভঙ্গী দেখিয়া তাহারা হাসি লুকাইবে কোথায়...

দীপালী- -

No text on this page.

দীপালী
•••তার চেয়ে ও যদি লালপেড়ে শাড়ীর আঁচলটুকু গলায় জড়াইয়া
সন্ধ্যাপ্রদীপ হাতে লইয়া তুলসীর মূলে ভক্তিভরে প্রণাম করে, তখন
নীতিশ চাই কি একখানা ছবিও আঁকিয়া লইতে পারে।•••
কিন্তু মা'র সাধ—ওই ভীরু মেয়েটীকে সং সাজানাে-ধেং•••!
নীতিশ কহিল—আচ্ছা মনে থাকে তাে আনব। বলিয়া ফট ফট
করিয়া জুতার শব্দে বারান্দা কাপাইয়া নামিয়া গেল।

আঁচ রাস্তায় দাড়াইয়া নীতিশ খানিকক্ষণ এধার ওধার অনাবশ্যক ভাবেই ঘুরিল। তার উদ্বেগ-ব্যাকুল দুটী চোখের দৃষ্টি পথের পথচলা পথিকের ভীড়ের মাঝে কী যেন কি খুজিয়া বেড়াইতেছিল। নিতান্ত অন্যমনস্কর মত সে অবশেষে চলা সুরু করিতেই, দূর হইতে কাহার মিষ্ট অথচ শিশুর কচি গলার তীক্ষ্ণ কোমল আওয়াজের মত সুর ভাসিয়া আসিল-নীতিশ বাবু, এই রােদ্দ রে কোথায় চলেছেন ? একটা ছাতা পৰ্যন্ত সঙ্গে নেননি’ বাঃ••• গলার স্বরে চমকিয়া নীতিশ অদূরে চাহিয়া দেখিল—সুমুখের থামিয়া-পড়া ট্রাম হইতে দীপালী নামিতেছে। এত কাছে•••আর নীতিশ চারিদিকে খুজিয়া মরিতেছে! নীতিশ আগাইয়া আসিয়া হাত তুলিয়া নমস্কার করিয়া কহিল—দীপালী দেবী, বেশ—এতক্ষণ পরে বুঝি এখানে আসার কথা মনে হল ?•••সকালে মা••• দীপালী বাধা দিয়া প্ৰতিনমস্কার করিয়া ক্ষুর স্বরে কহিল,দাড়ান নীতিশ বাবু, আগে আমায় কথাটা শেষ করতে দিন, আপনি এর জন্যে অনুযােগ করতে পারেন, কিন্তু নীতিশ বাবু, চুক্তিভঙ্গের অপরাধের জন্যে অপরাধী ক্ষমা প্রার্থনা করছে, ক্ষমার যােগ্য কিনা সে বিচার আপনি করুন। ৩৪ দীপালী দীপালী সরিয়া নীতিশের সুমুখে আসিয়া দাঁড়াইল। —চুক্তি ভঙ্গের অপরাধ—সে আবার কী দীপালী দেবী? কথাটা খুলে বলুন দয়া করে,—কিছু বুঝলাম না তাে — নীতিশ বিস্মিত দৃষ্টিতে চাহিল। দীপালী নতনেত্রে কহিল..সমস্ত সঙ্কল্প আমার পণ্ড হয়ে গেল নীতিশ বাবু, আমি যদি কালই ঢাকায় চলে যেতুম: নীতিশ কহিল, “চলে যেতুম' বলছেন কেন দীপালী দেবী, আপনি কি তাহলে আমাদের সেবাসদনে যােগ দেবেন না? দীপালী মাথাটা হেলাইয়া ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কহিল,-না নীতিশ বাবু, ভালবাসার বাঁধনটা এত শক্ত যে, টেনেও ছিড়িতে পারলুম না...চলতে না পারার যা কষ্ট, সে তাে আপনি বুঝতে পারছেন না নীতিশবাবু, সে শুধু...যাক্, কিন্তু, কথা দিয়ে কথার মর্যাদা রাখতে পারলুম না, এত বড় অপরাধটা ভুলি কি করে ! নীতিশের অন্তরটা যেন সহসা অতর্কিত বেদনার ঘায়ে টনটন করিয়া উঠিল সে অর্থহীন উদাস দৃষ্টি মেলিয়া দীপালীর মুখের পানে চাহিল । দীপালীর কথায় সে কি জবাব দিবে ?...দীপালীর সহিত পরিচয় তােত তার মাত্র কয়েক ঘণ্টার। সেই পরিচয়ের দাবীতে সে তত দীপালীকে জোর করিয়া কহিতে পারে না যে, তুমি এমন করিয়া সরিয়া যাইও না আমার তাতে বড় কষ্ট হইবে ! দীপালীর উপর তাহার অধিকার কিসের? খানিকটা চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকিয়া শুষ্ককণ্ঠে নীতিশ কহিল- অপরাধ কিসের দীপালী দেবী, আমাদেরই দুর্ভাগ্য যে, আপনার মত कची পেলুম না••••••আপনি বাড়ীর ভেতর আসুন, এখানে রােদের ।

দীপালী তাতে দাড়িয়ে থেকে কোন লাভই নেই। মা এসেছেন, দেখা করবেন না? দীপালী আগ্রহের সহিত কহিল—নিশ্চয়ই। মার সঙ্গে দেখা করব বলেই তাে এই দুপুরে ছুটে এলুম। চলুন::আমার যাওয়া যে কেন হল না সব বলছি। তারপর মৃদু হাসিয়া পুনরায় দীপালী কহিল—আর একটা কথা নীতিশ বাবু, আমার দাদা এসেছেন, তিনি আমাকে ভার দিয়াছেন - আপনাকে আজ আমাদের ওখানে ধরে নিয়ে যেতে যেমন করেই হােক। নীতিশও হাসিল। কহিল—অর্থাৎ ? —অর্থাৎ বিকেলে গিয়ে একটু চা’টা খাবেন, আর দাদার সঙ্গে আলাপ করে তার অনিবাৰ্য কৌতূহলটা মিটিয়ে দিয়ে আসবেন, যাবেন ? নীতিশ স্মিত মুখে বলিল—বেশ তাে, যেতে আমার একটুও আপত্তি নেই, কিন্তু অনিবাৰ্য কৌতুহলটা কি দীপালী দেবী?...আমার মত মানুষকে তিনি দেখবার জন্যে এতটা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, এ কথাটা শুনেও আমার সুখ আছে, কি বলেন ? সিড়ির ধাপে পা রাখিয়া দীপালী ঘাড় বাঁকাইয়া কহিল–আছে বৈ কি—আপনাদের মত দেশপ্রেমিক লােক দেখবার জিনিষ—মানে ভক্তি করবার জিনিষ...। আপনারা শুভক্ষণে জন্ম নেন নীতিশ বাবু। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য দেখুন না, আমরা নারী, সেবাপরায়ণা, দয়া মায়া মমতা এতগুলি গুণের আধার, অথচ আমাদের দেখবার জন্যে কেউ প্রত্যাশা করে বসে থাকে না, এটা কি কম আপশােষ !••• নীতিশ উঠিতে উঠিতে আপন মনেই সহসা কহিয়া উঠিলনা, দীপালী আপনি ভারী জানেন—আপনার জন্যে কেউ প্রত্যাশা করে বসে ছিল কি-না। মুখ হইতে কথাটা বাহির হইতেই নীতিশ লজ্জায় আড়ষ্ট হইয়া গেল। তাহার হইল কি? এমন অসংযত মন তাে তার আগে ছিল ..! দীপালী দেবী না জানি তাহাকে কী অভব্যই না ভাবিলেন। দীপালীর কানেও কথাটা গিয়াছিল—কিন্তু সে তাহার উত্তরে স্বভাবসিদ্ধ হাসি হাসিয়া কহিল--মা, তাহলে আমার অন্তত আপশােষের কারণ নেই...আজ তাহলে তােত আপনাকে খুব জব্দ করেছি:••? বারান্দায় যখন উভয়ে উঠিল, তখন নীতিশের শােবার ঘরের খােলা জানালাটায় দাড়াইয়া মা যেন কাহার উদ্দেশে কহিতেছিলেন-তা বলে তত মা হয়ে ফেলে আসতে পারি নে। দেখা যাক-ভাল ঘর বর পাই তত বিয়ে দোব, নইলে আমার এই লক্ষ্মীপ্রতিমা আমারই ঘরের লক্ষ্মী হয়ে ঘর আলাে করে থাকবে। এমন পদ্মফুলের মত সুন্দর মুখ আমার নীতিশের সঙ্গে কথা বলিতে বলিতে মাতা সুমুখেই নীতিশকে দেখিয়া একটু অপ্রতিভ হইয়া বাহিরে আসিয়া দীপালীর চিবুকে হাত দিয়া কহিলেন —এস মা, সেই সকালে এসে অবধি আমি নীতিকে হাজার বার জিজ্ঞেস করছি যে তুমি কখন আসবে।••• কথা ত নয় যেন আগুনের ফুলকী... ঘরে ঢুকিবার মুখে নীতিশ মা’র কথাগুলি শুনিতে পাইয়াছিল। তার দুইটা কান যেন পুড়িয়া খাক হইয়া গেল। বিরক্ত ভাবে পর্দাটা তুলিয়া কহিল-ঘরে আসুন দীপালী দেবী !

দীপালী । দীপালীর কানেও মার কথা কয়টী পশিয়াছিল, সে বেশ একটু বিস্ময়ের সহিত ঘরের ভিতর দৃষ্টি মেলিয়া দিয়া দেখিল, সুন্দর সুশ্রী একটী অল্পবয়সী মেয়ে ঘরের বড় আলমারীটার গা ঘেসিয়া দাড়াইয়া আছে। দুটী গালে তার লজ্জার লালিমা। দীপালী হাসিমুখে ঘরে ঢুকিল। সারা দেহে একরাশি লজ্জা মাখিয়া খােল। দরজা দিয়া পদ্মা সেই মুহূর্তে বাহিরে ছুটিয়া পলাইল। কত বড় অপরাধ যেন সে ইহাদের কাছে করিয়া ফেলিয়াছে! মা হাসিলেন, কহিলেন—পাগলী কোথাকার.••এতাে লাজুক !••• নিরালা বারান্দার এক কোণে আসিয়া পদ্ম যেন হাঁফ ছাড়িল। বনের ছাড়া পাখীটি সেখানকার হাজার অসুবিধার মাঝেও, আপন মনে শীষ দিয়া উড়িয়া বেড়াইতেছিল...কলিকাতার এই বদ্ধ ঘরের ভিতরে আসিয়া এই সারা বেলাটুকুতেই সে যেন হাঁফাইয়া পড়িয়াছে। আছে সেই মুক্ত আকাশ, না আছে সেই পাড়াগায়ের শ্যামল বনের অপরূপ স্নিগ্ধ শােভা-সরসতা। পদ্মা বারান্দায় ঝুকিয়া পড়িয়া উপরের দিকে চাহিল ! মাথার উপর চারকোণা ছােট্ট আকাশখানি•••চারিদিক ঘিরিয়া পাঁচিলের পর পাঁচিল, বাড়ীর পাশে বাড়ী:.মাগাে ! কলিকাতার লােকগুলা এই খাঁচার মধ্যে থাকে কি করিয়া—দম বন্ধ হইয়া যায় না। পদ্মার চোখের সামনের ছােট্ট আকাশখানি সহসা দেখিতে দেখিতে বহুদূরের ফেলিয়া-আসা প্রান্তর-বুকের সেই অবাধ-মুক্ত অসীম আকাশ- খানির মত বড় হইয়া উঠে...সে যেন ইসারায় হাতছানি দিয়া পদ্মাকে ভাকে—ফিরিয়া আয়...

দাপালী খাচার পাখীর বুকে রুদ্ধ একটা মূক বেদনা বাহির হইবার জন্য আঁকুপাঁকু করে রৌদ্রতপ্ত নীলাকাশের দিকে চাহিয়া চাহিয়া দুটী চোখ যখন জলে ভরিয়া আসে, ঘর হইতে তার কানে মা'র স্নেহ আহ্বান আসিয়া পৌছায় —পদ্মা, কোথায় গেলে মা, ঘরে এস। পদ্মা চমকিত হইয়া উঠে। মা যদি সে সময় না থাকিতেন তাহ হইলে এতক্ষণে পদ্মা কোন রাজ্যে থাকিত কে জানে ? পচা পুকুরের জলে মরিয়া যখন সারা অঙ্গ তার ফুলিয়া ভাসিয়া উঠিত, রাজ্যের ললাকের নগ্ন দৃষ্টির সামনে তার বীভৎস বিকৃত দেহখানির না জানি কী অবস্থা ঘটিত ! নিজের সুন্দর তনুলতার পানে চাহিয়া পদ্মা আপন মনে শিহরিয়া উঠিল । পদ্মা ঘরে ঢুকিতেই মা বলিলেন-এই যে মা-পদ্মা, বামুন ঠাকুর এখনাে আসেনি বুঝি ? ••আসেনি? আচ্ছা তুমি ওই বারান্দার কোণ হ’তে ষ্টোভটা এনে ধরাও তাে, আমি নীচে থেকে ঘী-ময়দাটা বের করে আনি। এদের জন্য খান কত লুচি আর দু’চার খানা ভাজি আর একটু চা করে দাও। দীপালী মাথা নাড়িয়া আপত্তির সুরে কহিল—আমি যে এক্ষুণি খেয়ে আসছি মা, আবার কেন ওসব হাঙ্গামা- মা হাসিলেন, কহিলেন—পাগল মেয়ে! তােমার সে ‘এক্ষুণি যে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে মা, তা হােক—বেশী না একটুখানি মিষ্টিমুখ না করে গেলে আমি মনে বড় কষ্ট পাব, ব’স মা, আমি আসচি- মা চলিয়া গেলেন। এদিকে পদ্মা তখন ষ্টোভটা লইয়া বিষম মুস্কিলে পড়িয়াছে। আসলে সে রূপগঞ্জের ষ্টেশনমাষ্টারের ঘরে এই . ১া দুদহ :৪৯ সং সন ১৩৪ নীতিশকে লইয়া দীপালী যখন ফিরিল, তখন টেনিস-কোর্টে ইরা, ইরার দাদা বিমান আর আলােকের খেলা খুব জমিয়া উঠিয়াছে। দীপালীকে দেখিয়া ইরা ব্যাট হাতে করিয়াই চঞ্চল-চরণে ছুটিয়া আসিল। দীপালীর কাধের উপর বাঁ হাত খানি রাখিয়া অভিমানের সুরে কহিল- বেশ মেয়ে ভাই তুমি, এই আসছি বলে একেবারে সারা বেলাটা কাটিয়ে,•••একটা সুখবর আছে, এদিকে আয় বলছি- দীপালী ইরার হাত ছাড়াইয়া বলিল—একটু দাড়া ভাই, নীতিশ বাবুকে দাদার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়ে আসি তারপর তাের যত সুখবর আছে শুনবাে। নীতিশকে ইরা এতক্ষণ লক্ষ্য করে নাই, এতক্ষণে চোখ তুলিয়া দেখিতেই ইরার দুই গালে লজ্জার লাল আভা ফুটিয়া উঠিল। দীপালী নীতিশের দিকে তাকাইয়া হাসিমুখে কহিলনীতিশবাবু, ইনি আমার বন্ধু ইরা সেন, ভারী বকূতে পারে, আপনার সঙ্গে আলাপ হলে দেখবেন ওর কথার সঙ্গে কথা জুগিয়ে আপনি পেরে উঠবেন না, আসুন, দাদা এখনাে খেলাতেই মত্ত রয়েছেন দেখছি। নীতিশ হাসিয়া ইরাকে নমস্কার করিয়া দীপালীর সঙ্গ লইল। নীতিশকে দাদার দলে ভিড়াইয়া দীপালী ফিরিয়া আসিয়া ইরার দিকে চাহিয়া কহিল-এবার তােমার ‘ সুকু’ কি সংবাদ আছে নিশ্চিন্তে বলতে পারাে,আমি বসি...

দীপালী শান্তিতে ইরার কপালে—নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমিয়া উঠিয়াছে...সুগন্ধি রেশমী রুমালে কপালটা মুছিয়া কহিল–দাড়া ভাই বলছি,-বডড তেষ্টা পেয়েছে। লনের ভিতরে ছােট্ট ছােট্ট বেতের টেবিলে পরিশ্রান্ত অভ্যাগতদের জন্য মিষ্টান্নভরা প্লেট সাজানােই ছিল, ইরা একটা প্লেট হইতে একটা সন্দেশ লইয়া মুখে ফেলিতেই একটা কঁচের গ্লাসে বরফ মিশানাে লেমনেড লইয়া বেহারা আসিয়া দাঁড়াইল। লেমনেডটা খাইয়া ইরা আসিয়া সখীর পাশে বসিয়া টিপিয়া টিপিয়া কহিল—দীপা, লক্ষ্মী মেয়েটী, তবে না জানতুম তুমি কারুর ভালবাসায় পড়নি !•••আমাদের কাছে লুকিয়ে রেখে লাভটা কি তােমার ভাই? শওর তত নই, যে হিংসেয় জলে উঠবে! দীপালী অবাক হইয়া ইরার মুখের পানে চাহিয়া কহিল-বারে মেয়ে •••দোষ দিলেই হল? ভালবাসায় পড়লুম কার—আর কবে-সে তাে দেখছি আমার চেয়ে তুই-ই বেশী জানিস ! সত্যি ইরা, বলনা ভাই- আমি কার ভালবাসায় পড়েছি ? ইরা রাগিয়া কহিল-- আহা ন্যাকা মেয়ে ! কিছুটা জানেন না ! তােমার নীতিশ বাবুটী কে মশাই ? নীতিশবাবু ?, ও—তাের ধারণাশক্তি যে এত প্রখর, এ্যাদ্দিন তাে তা জানতুম না ইরা? দূর পাগলী,-নীতিশ বাবুর সঙ্গে মােটে আমার দু’তিন দিনের আলাপ.••তা এরই মধ্যে ভালবাসব কিরে ? ইরা দুই চোখ নাচাইয়া মুখ ঘুরাইয়া কহিল—হয়গাে মশাই হয়, ভালবাসা এক নজর দেখতেই হয়,বল্লেই হ’ল কি-না !–অমন সুন্দর দেখতে...আচ্ছা না হয় নাই বল্লিটের তত পাবােই একদিন, তারপর ৪৩ দীপালী আমার বিয়েতে তুই যাচ্ছিস কি না তা বল? আমি তােকে নেমন্তন্ন করতে এসেছি। দীপালী যেন আকাশ হইতে পড়িল! বিস্ময়ভরা কণ্ঠে কহিল— বিয়ে ! তাের? ইরা তুই বিয়ে কচ্ছিস? ইরা দীপালীর কাধে একটা মৃদু ঠেলা দিয়া কহিল—এতে অবাক হবার কিছু কারণ নেই দীপ। কারণ, এমন দিন একদিন তােমারও আসবে,•••আসবে কি, হয়ত এগিয়েই এসেছে। নীতিশবাবু তাের বর হলে বেশ হয় ভাই- দীপালী আরক্ত হইয়া ইরাকে একটা ধমক দিয়া কহিল—কি সব যা তা বকছিস ইরা?•••আচ্ছা, কলেজে থাকতে আমরা কি প্রতিজ্ঞা করেছিলুম-মনে আছে ইরা? ইরা মাথাটা কাত করিয়া কহিলা—খু-উ-ব ! তা আবার মনে নেই? আমি, তুই, মনিকা, রেবা সব্বাই মিলে প্রতিজ্ঞা করেছিলুম-যে, বিয়ে আমরা মােটেই করবােনা। কিন্তু সত্যি কথা বল দেখি দীপ- কলেজের ছাত্রীটির মত এখনাে কি সেই ভীমের প্রতিজ্ঞা বজায় রাখলে চলে? একদিন না একদিন বিয়ে তাে করতেই হবে—না হয় শগগীরই করলুম। দীপালীর বুকে একরাশ চোখা চোখা কথা ঠেলিয়া উঠিল,–এই সব, লঘু-প্রকৃতির মেয়েদের কাছে ইহা ভিন্ন আর পরিণামের কত প্রত্যাশা করা যাইবে ? সে কহিল-তা জানি, সলিল রায়ের হাত এড়াতে কি তুমি পারবে? •••আচ্ছা ইরা, বিয়ে করে তুই কি করবি? ইরা খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। কহিল—বেবি! বিয়ে করে ৪ঃ দীপালী আর সব মেয়েদের মত ‘স্ত্রী’ হব, ‘মা’ হব-অপরিপূর্ণ জীবনকে পূর্ণতার আনন্দে ভরিয়ে তুলব, আবার কি করবাে? কিন্তু সত্যি কথা দীপ, বল দেখি, তুই কি ভেবেছিস জীবনে মােটেই বিয়ে করবি ? দীপালী সজোরে মাথা নাড়িয়া কহিল—কোন কালেই নয়। বিয়ের নামে জীবনজোড়া বন্ধনকে সাধ করে ফাসির মত গলায় পরবাে আমি? তুই দেখে নিস ইরা, যদি সে রকম দিন কোন দিন আমার আসে, তাহলে আমি এই ভারতবর্ষ ছেড়েই পালাবাে। আমি চাই মুক্ত স্বাধীন--অবাধ আনন্দভরা জীবন•• ঘরের কোণে খাচায়-পােরা পাখীর মত বাইরের প্রচুর আলাে-বাতাস উদার আকাশের পানে তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলব, সংসারের নানা ঝঞ্চাট পায়ে পায়ে দেবে শিলি এটে••• সে রকম জীবন আমি কামনা করি না ভাই।•••আমি যেন আমার স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন রেখেই চলতে পারি। ইরা এবার হাসিল না, দীপালীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ চাহিয়া থাকিয়া কহিল,-বুঝলুম, কিন্তু এ নিয়ে কাব্যি করা পােয়। কিন্তু রক্তমাংসে গড়া মানুষ ওই নীরস শুকুনন বৈচিত্র্যহীন জীবন নিয়ে বাঁচবে কি করে ভাই? দীপালী সহাস্যে কহিল আমি তো তাই চাই ইরা, আমার বাঁচার আয়ু ওরই মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে যে ! -তা থাক, অত বড় বড় কথা আমার ভাল লাগে না, মােটেই না। মেয়ে হয়ে জন্মেছি ‘স্ত্রী’ হব না ‘মা’ হব না, তবে আর জীবনের সার্থকতা কিসে? তুমি ভাই সৃষ্টিছাড়া মেয়ে, নিজের চারিদিকে রহস্যের জাল বুনে তার মাঝে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাও! তুমি ৪৫ দীপালী কি বলতে চাও-এ পণ তােমার আজীবন টিকবে? জীবনে কাউে তুমি ভালবাসবে না ? ইরা রাগ করিয়া অদূরে চাহিয়া দেখিল-তাহার দাদা আলােক ও নীতিশ খেলা শেষ করিয়া গল্প করিতে করিতে এই দিকেই আসিতেছে। ইরা লক্ষ্য করিল, নীতিশ কথা কহিতে কহিতে সকলের অলক্ষ্যে দীপালীর মুখের উপর তাহার সলজ্জ-চকিত দৃষ্টিটা বুলাইয়া লইতেছে। ইরা চাহিতেই নীতিশ ধরা পড়িয়া লজ্জায় মাথা নামাইল । ইরা হাসি চাপিয়া ফিরিয়া বসিতেই দীপালী কহিল-জীবনে কাউকে ভালবাসব না বলে এমন প্রতিজ্ঞা তাে কোনদিন করিনি ইরা, হয়ত ভালবাসার মত মানুষটী পেলে ভালও বাসব, কিন্তু তার সঙ্গে বিয়ের কোন সম্পর্ক থাকবে না। সে কথা যাক, তাের সলিল রায় এখানে পৌছুবেন কোন তারিখে রে ? ইরা মৃদুকণ্ঠে কহিল বােঙ্গে থেকে টেলি করেছেন, ফাষ্ট জুন এ; -“সেকেণ্ড জুনে আমাদের বিয়ে নিজে বিয়ে না কর্তে চাও: করাে না —কিন্তু আশা করি আমার বিয়েতে যােগ দেবে”... দীপালী ইরার গালটা একটু টিপিয়া কহিল—দেব গাে দেব। বাবা, বিয়ের নামে আনন্দ যে ধরছেনা তাের ইরা!••• ইরা চেয়ার ঠেলিয়া উঠিয়া পড়িয়া কহিল—না—সব্বাই তাে তােমার মত বিয়ের নামে ‘রণং দেহি’ মূর্তি ধরে’ নেই...আমরা এই পৃথিবীরই মানুষ,...ওই দেখ দাদা এসেছেন, আমরা ভাই এবার চলি; কারণ এখান থেকে যেতে হবে সিপ্রা দি’র বাড়ী, সেখান থেকে মার্কেট। তারপর এধার ওধার একটু আধটু ঘুরতেই রাত হয়ে যাবে,তাের কিন্তু যাওয়া চাই-ই দীপা, নইলে আমার বিয়ের সব আনন্দই মাটী, বুঝলি ?

দীপালী দীপালীর হাতখানা ধরিয়া একটু কোমলভাবে চাপ দিয়া ইরা বিদায় লইল। অনেকক্ষণ তার গমনপথের দিকে অন্যমনস্কর মত চাহিয়া থাকিয়া দীপালী উঠিয়া যেখানে আলােক ও নীতিশ বসিয়া গল্প করিতেছিল সেইখানে আসিয়া একখানা বেতের চেয়ার টানিয়া বসিয়া পড়িল । কথায় কথায় রাত যে কতখানি পায়ে পায়ে আগাইয়া গিয়াছিল, নীতিশের তাহা খেয়ালই ছিল না। আজ তার জীবন যেন নৃতন পথে যাত্রা শুরু করিয়া দিল। বালীগঞ্জ সােসাইটীতে সে বড় একটা মিশিত —পারত পক্ষে সে ইহাদের প্রাণপণে এড়াইয়াই চলিত। আজ সে ইহাদের সমাজে প্রাণ খুলিয়া মিশিবার সুযােগ পাইয়া মনে মনে প্রচুর আনন্দ উপলব্ধি করিল। সে ভাবিল, বাহির হইতে ইহাদের দেখিয়া আগে সে কত কি না ভাবিত। আজ দেখিল, ইহারা ‘পর’কে ‘আপন’ করিয়া লইতে জানে, ইহাদের সহিত মিশিয়া, দুইটা কথা কহিয়া আরাম আছে। আরও কিছুক্ষণ বসিয়া থাকিয়া নীতিশ বিদায় লইয়া উঠিল। দীপালী খানিকটা পথ আগাইয়া আসিয়া কোমল সুরে কহিল,-কাল আবার এখানে আসছেন তো নীতিশ বাবু? নীতিশ চলিতে চলিতে থমকিয়া দাড়াইয়া দীপালীর পানে ক্ষণেক চাহিয়া কহিল–আসব’ বলে যাচ্ছি দীপালী দেবী, কিন্তু ডাক্তার মানুষের বিপদ ওইখানে, কথা দিয়ে কথা রাখাটা সব সময় হয়ে ওঠে না, -কালকে আসবার জন্যে চেষ্টা যে করবে না তা নয়, কিন্তু বাইরে থেকে ডাক এলে বােধ হয়:••আচ্ছা নমস্কার•• নীতিশ কয়েক পা আগাইয়া পুনরায় ফিরিয়া আসিয়া দেখিল, দীপালী ৪৭ দীপালী তখনাে সেই একই ভাবে দাড়াইয়া আছে। নীতিশকে ফিরিতে দেখিয়া চীপালীর চমক ভাঙ্গিল। মিথুকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল—“ফিরে এলেন যে নীতিশ বাবু, কিছু কি ভুলে গেছেন?” নীতিশ কহিল—না, ভুলে যাবার মত সঙ্গে কিছুই তাে আনিনি।••• দীপালী দেবী, একটা কথা বলবাে, যদি অভয় দেন দীপালী একটু ইতস্ততঃ করিয়া কহিল–বলুন না কি বলবেন। এর জন্যে অত কুষ্ঠিত হচ্ছেন কেন নীতিশ বাবু ? নীতিশ গলার স্বরটা খুব কোমল করিয়া কহিল-আমার এখানে আসার ব্যাপারটা তাে শুনলেন, আমি বলছিলুম, কাল আপনি যদি আমার ওখানে দয়া করে আসেন, তাহলে বুক হইতে ভারী একখানা পাথর নামিয়া গেল। নীতিশের কথা বলিবার প্রারম্ভে আড়ম্বর দেখিয়া দীপালী মনের যে ক্ষীণ শঙ্কাটুকু জাগিয়াছিল, কথা শুনিয়া তাহা নিমেষেই উড়িয়া গেল । সে মাথা নাড়িয়া মিষ্টি গলায় কহিল—যাব,—নিশ্চয়ই। সেখানে আমি মার স্নেহ পেয়েছি যে নীতিশ বাবু, আপনি অত করে না বল্লেও আমি ঠিক কাল গিয়ে হাজির হতুম । -“আচ্ছা”...বলিয়া নীতিশ প্রফুল্ল মনে চলিয়া গেল। নীতিশ বলিয়া গেল যে বটে ভুলিয়া যাইবার মত জিনিষ সে সঙ্গে কিছুই আনে নাই, কিন্তু ওখানেই তার এতটুকু ভুল রহিয়া গেল দীপালীর কাছে বিদায় লইয়া সে যখন পথে আসিয়া দাড়াইল, তখন তাহার ভােলা-মনের সবখানিই যে বালীগঞ্জেই ভুলিয়া রাখিয়া আসিল -সে খেয়ালতখন তাহার হইল না—হইল কিছু পরে। ৪৮ দীপালী ••পদ্মার সেদিন তিলমাত্র বিশ্রামের অবসর ছিল না, নীতিশ দীপালীকে লইয়া বাহির হইয়া যাইতেই সে উপরে উঠিয়া আসিল। ঘরের এটো বাসনগুলি নিজেই সরাইয়া কলতলায় গিয়া সেগুলি মাজিয়া ধুইয়া রান্নাঘরে রাখিয়া নীতিশের ঘরে আসিয়া দাঁড়াইল।... সারা ঘরখানি অগােছাল, টেবিলের উপর রাশীকৃত বই শুপাকারে ঢালা, যখন ইচ্ছা হইয়াছে সেই বইখানিই ব্ল্যাক হইতে টানিয়া টেবিলে ফেলিয়াছে। পরে তাহা গুছাইয়া রাখিবার অবসর হয় নাই, দেওয়ালের গায়ে বড় আয়নাখানার উপরে একপুরু ময়লা, ফটোগুলির পিছনে পিছনে আশেপাশে ঝুল জমিয়াছে। পদ্মার বড় হাসি পাইল, ঘরে এত মূল্যবান সাজসজ্জা, কিন্তু কী অযত্নেই না পড়িয়া রহিয়াছে ! পদ্মা তাহার খুড়ার সেই মাটীলেপা ঘরখানিই না কি পরিচ্ছন্ন রাখিত। পদ্মা আঁচলটা কোমরে জড়াইয়া ঝাটা হাতে গৃহ সংস্কারে মন দিল।... সারা গায়ে ধূলা মাখিয়া সে যখন গা ধুইবার জন্য কলতলায় নামিল, তখন বেলা প্রায় পড়িয়া আসিতেছে। সাবান মাখিয়া গা ধুইয়া একখান পােয়া লালপাড় সাড়ী পরিয়া সে মা’র অগােচরে পা টিপিয়া টিপিয়া নীতিশের ঘরে আসিয়া বড় আয়না- খানার সম্মুখে দাড়াইল। সম-মােছ নিৰ্ম্মল আয়নার বুকে তার সুগঠিত সুকুমার তনুলতাখানি ফুটিয়া উঠিল। আপনার সৌন্দর্য্যে আপনিই মুগ্ধ হইয়া পদ্মা মুখ টিপিয়া একটু হাসিল । তাহার এই অফুরন্ত অপরিসীম সৌন্দর্যের কাছে দীপালীর শ্যামরূপ কি অতি তুচ্ছ নহে? মায়ের সেই অর্ধসমাপ্ত কথাটুকু তাহারও কাণে গিয়াছিল, শুধু কাণে নয় মরমেও পশিয়াছিল..হয়ত তাহা সম্ভবপর নহে, স্বপ্নই... ৪১ দীপালী কিন্তু সে স্বপ্ন বড় মধুর, পদ্মা সেই স্বপ্নের ঘােরেই আচ্ছন্ন থাকিতে চাহে, তাই অবসন্ন-দিবালােকে নিজ ঘরে একাকী দাঁড়াইয়া থাকিয়াও অকস্মাৎ পুলকের অপূৰ্ব্ব শিহরণে পদ্মার সর্ব অঙ্গ শিরশিরকরিয়া উঠিল। যে কথাটুকু শুনিয়া পদ্মার এত আনন্দ, সেই কথাটুকু পদ্মাকে কল্পনার মায়াময় রথে তুলিয়া লইয়া অনেক অনেক দূরে চলিল••• পথ যেন অফুরন্ত :: হৃদয়ের শূন্য শুভ্র পটখানিতে তুলির কয়েকটা আঁচড় পড়িল...কাহার সুন্দর সহাস-আনন স্পষ্ট বুঝা যায় না...পদ্মা ডুবিয়া গেল। ৫০ রাত সওয়া নয়টা বাজিয়া গেল, নীতিশের দেখা নাই, দশটাও বাজিয়া ", পদ্মাকে ডাকিয়া কহিলেন,—খাইয়া যাও। পদ্মা খাইনা, কহিল—কাল সারারাত আপনি জেগে এসেছেন শা, আপনি একটু ফলমূল যা হােক কিছু মুখে দিয়ে শুয়ে পড়ুন, উনি এলে হামি খাবার বেড়ে দেব’খন—আর আমার খিদে পেলেই খাব, একটু সরে- ‘উনি’ কথাটা বলিবার সময় পদ্মার গলার স্বর সহসা কেন যে বাপিয়া পিয়া গেল, ম! অতটা লক্ষ্য করিলেন না, পথশ্রমের কষ্টে যে ক্লান্তি ঠার জাগেনি তা নয়, তবু স্নেহাধিক্য বশতঃ মা দু'চার বার আপত্তি করিয়া শেষে পদ্মার কথাই রাখিলেন । মার খাটে মশারীটা ফেলিয়া দিয়া পদ্ম। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া গড়াইল,—অনেকক্ষণ পথের পানে চাহিয়া চাহিয়া তাহার মনে হইল মে যেন তাহার দুই চোখ জড়াইয়া আসিতেছে, সারারাত সেও তত কাল দুটি চোখের পাতা এক করে নাই। নীতিশের খাবারটা সযত্নে ঘরের মেঝেয় ঢাকা দিয়া রাখিয়া, একখানি হাসন বিছাইয়া খালি মেঝতেই পা হাতের উপর মাথা রাখিয়া শুইয়া পড়িল।—কী আরাম ! দুই চোখ মুদিয়া সে যেন ক্রমশঃ পাতালপুরীর ভতর নামিয়া যাইতেছে—আস্তে-আস্তে—আরও নীচে..পদ্মা কি তলাইয়া যাইবে ! -না ঘুমাইয়া একটু আরাম করিবার জো কি তাহার আছে, ওই দীপালী স্বপ্ন-ভীতিটা তাহার যেন দূর আর হইতেছিল না। তাহার পরে নিজেকে সম্বরণ করিয়া নীতিশকে সম্বােধন করিয়া সে কহিল—আপনি খেতে বসুন আগে। নীতিশ পাঞ্জাবীটা খুলিয়া র্যাকে রাখিতে রাখিতে কহিল—আমি যে খেয়েই আসছি পদ্মা, আর খেতে পারবােনা। ও সব অমনিই ঢাকা থা। পদ্মার মুখখানি সহসা বিমর্ষ হইয়া গেল। হেঁট হইয়া সে খাবারের থালাটা উঠাইয়া লইতে লইতে আপন মনেই কহিল—একেবারে কিছু না খেলে যা হয়ত রাগ করবেন । নীতিশ হাসিয়া কহিল—না পদ্মা, মা কখনাে আমার ওপর রাগ করেন না, তবে আর কেউ যদি করে•••কি বল ? ভাল কথা, রাত তে। প্রায় এগারটা বাজে, তােমার খাওয়া হয়েছে ? পদ্মা নীরবে নতমুখে দাড়াইয়া রহিল। নীতিশ ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল—তুমি এত রাত পর্যন্ত খাওনি কেন পদ্মা? ও হাে, ঠিক, ঠিক..আমি খাইনি বলে—না? বাড়ীর পুরুষদের খাওয়া না হলে তােমরা খেতে পাও না...এ বড় অন্যায় কোরেছ পদ্মা, আমার খাওয়া এই রকমই...ঠিক থাকে না। আজ যা কোরেছ, কোন দিন আর এমন কোরে শুকিয়ে থেক না...আচ্ছা পাগল তাে ! থালাটা সরিয়ে আন ত’ পদ্মা,দেখি ? নীতিশের কাছে পদ্মা থালাটা সরাইয়া আনিতেই সে বিস্ময়ের সঙ্গে বলিল—এত রান্না হয়েছে ! এটা কি, মাংস..ঠাকুর আজ কোরেছে কি ? নীতিশ একখণ্ড মাংস মুখে ফেলিয়া চিবাইতে চিবাইতে কহিল- ৫৪ দীপালী উহু, রান্নাটা তাে ঠাকুরের শ্রীহস্তের মত লাগছে না ঠিক, পদ্মা, আজকের রান্না তুমি নিশ্চয় বেঁধেছ, নয় ? পদ্মা মাথা নাড়িয়া কহিল, হঁা, ভাল হয়েছে ? আমি ভাল রাঁধতে জানি না, মা আমাকে দেখিয়ে দিয়েছেন। নীতিশ একটু গম্ভীর হইবার চেষ্টা করিতে করিতে কহিল—পদ্ম', বিনয়ে দেখছি তুমিও কারুর চেয়ে কম নও,‘মা দেখিয়ে দিয়েছে’ দেখিয়ে দিলেও ভাল রাঁধুনী না হলে রান্না এত সুস্বাদু হয় না••এই দেখ, খাব না খাব না করেও মাংস তােমার আধ-বাটীর ওপর খেয়ে ফেল্লুম...এইবার তুমি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়গে, কেমন? কৃতজ্ঞতায়, রান্নার প্রশংসার আনন্দে পদ্মার বুক ভরিয়া উঠিল এমন মিষ্টি কথা সে জীবনে আর কোন দিনই শুনিতে পায় নাই... সমবেদনা...স্নেহ ভালবাসার অভাবে যে জীবন তাহার এতদিন শুষ্ক--- দুঃসহ বলিয়া বােধ হইত, আজ যেন পদ্মার মনে হইল সহসা তাহা সার্থকতার মধুর রসে কানায় কানায় ভরিয়া উঠিতেছে !... পদ্মা থালা-গ্লাস পাশের ঘরে রাখিয়া আসিয়া ছােট্ট একখানি ফুলকাটা কঁচের পিরিচে করিয়া দুটী বড় এলাচ, গােটা কতক লবঙ্গ ও পানের মসলা নীতিশের টেবিলে রাখিয়া দিয়া মৃদুকণ্ঠে কহিল—আর আপনার কিছু দরকার আছে কি ? নীতিশ একমনে কি যেন ভাবিতে ছিল, পদ্মার কথায় চমকিয়া উঠিয়া কহিল-না না, আর কিছু দরকার নাই আমার, এবার তুমি খেয়ে নাওগে, রাত কত হ’ল সে খেয়াল আছে ? পদ্মা মৃদু হাসিয়া অন্তর্হিত হইল। সকালে উঠিয়া নীতিশ মুখ ধুইয়া দাড়ী কামাইবার উদ্যোগ করিতেছে, দীপালী পদ্মা আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল—আপনার চা এখন করে আনব ?-মা বলেন- নীতিশ পদ্মার দিকে হাসিমুখে ফিরিয়া চাহিয়া কহিল—ইস, এরই মধ্যে তােমার দেখছি স্নানটান সারা—একেবারে কমপ্লিট ! চা আনবে ! আচ্ছা এইখানেই আনন, খেয়েই আমি বেরুব একবার। পদ্মা চলিয়া গেল। -নীতিশ দা—আছেন নাকি ? ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিল একটি বাইশ তেইশ বছরের ছেলে। চোখে রিমলেশ চশমা, পায়ে স্যাণ্ডাল, মাথার বড় বড় চুলগুলি টানিয়া পিছনে আঁচড়াননা, গায় একটা খন্দরের ঢিলা পাঞ্জাবী, পরণে খদ্দরের ধূতি, এক কথায় অতি-আধুনিক সাজ-সজ্জায় সজ্জিত। নীতিশ গালের উপর সাবান বুলাইতেছিল, ছেলেটিকে দেখিয়া আনন্দোৎফুল্ল কণ্ঠে কহিল—আরে অনন্ত যে, পাবনা থেকে ফিরছ নাকি? খবর কি সেখানকার ? বসাে বসাে, মাকে ডাকি... নীতিশ বারান্দায় আসিয়া চীৎকার করিয়া ডাকিল-মা, ও মা! অনন্ত এসেছে। পদ্মা ! এক পেয়ালা চা’য়ে হবে না, দু’পেয়ালা নিয়ে পদ্ম নীচের দালান হইতে মুখ বাড়াইয়া মৃদুস্বরে কহিল—মা স্নানের ঘরে, চা নিয়ে যাচ্ছি। খাবার কিছু চাই কি—আনব ? নীতিশ মাথা নাড়িয়া কহিল--পারবে তৈরী করতে, লক্ষ্মীটি, তাহলে নিয়ে এস। নীতিশ ঘরে আসিয়া আয়নার সুমুখে দাড়াইয়া অনন্তকে কহিল- তারপর, অনন্ত, পাবনার খবর কি?

দীপালী অনন্ত হাসিয়া কহিল-পাবনার খবর আর কি দোব, ছিদ্র হয়েছে হাজারটা কোটা বন্ধ করবেন বলুন! যত সব চাষাভূষাে গুলো তাদের খাই যেন আর মেটেনা, একটা গ্রামের লােকগুলােকে জড়ো করে চাল ডাল, কাপড় সব বিলি করে দিলুম, দিয়ে অন্য একটা গ্রামে যাবার বন্দোবস্ত করছি—ব্যস্! ঠিক তার দিন দুয়েক পরেই তারা এসে হাজির, সেই নাকিসুরের কান্না।...এদের আবার ঘটাতে আছে, আপনার যেমন খেয়ে দেয়ে কাজ নেই নীতিশ দা, কতকগুলো টাকা অনর্থক খরচা কেবল, তার চেয়ে বলেছিলুম আপনাকে নীতিশ দা, ওই টাকাটায় একটা বায়ােস্কোপ ফিল্ম কোম্পানী খুলুন, ও ব্যবসাটা আজকাল কি রকম ফেঁপে উঠেছে দেখছেন তাে, আমি তো যােগাড় যন্ত্রের সব ভার নিচ্ছিলুম- নীতিশ একটু অসহিষ্ণু হইয়া কহিল-বাস, বাস! অনন্ত থামাে । টাকা আমার যা আছে, সংপথে থাকলে দিন নেহাৎ মন্দ চলবে না । দান কোরলে আমার ক্ষয় হবে না, যা দেব,ভগবান তার দুননা দেবেন আমায়, তা যাক, তুমি যে সব ফেলে হঠাৎ এখানে চলে এলে? অনন্ত কহিল—আমার ছােট বােনের বিয়ে, কাজেই...আমি সেখানকার সব ব্যবস্থা করে এসেছি। প্রকাশের হাতেই সমস্ত চার্জ বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। সহসা অনন্তের দৃষ্টি দরজার উপর পড়িল। পর্দার আবরণটা কোন মতে ঠেলিয়া পদ্মা ঘরের ভিতরে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে••তার দুইহাতে দুই পেয়ালা গরম চা, ধোঁয়া উঠিতেছে। অপরিচিত এক যুবকের ক্ষুধিত তীব্র দৃষ্টির সম্মুখে পদ্মা সরমে এতটুকু হইয়া গেল। লােকটার তাকাইবার ভঙ্গীটা ভ—রি বিশ্রী...

দীপালী = রক্ত লােলুপ পশুর মতই তার দুই চোখের দৃষ্টি যেন জ্বল জ্বল করিতেছে, •••পদ্মার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠে । একটু পরে পদ্মা কুষ্ঠিতপদে আগাইয়া আসিয়া টেবিলের উপর পেয়ালা দুইটা নামাইয়া চলিয়া যাইতেছিল, নীতিশ ডাকিয়া কহিল—খাবার কই পদ্মা, শুধু চা•••অনন্তর জন্যে —আনছি খাবার, বলিয়াই মুহূর্তে পদ্মা বাহির হইয়া গেল। বহুকাল হইতে অনন্ত নীতিশকে ভাল করিয়াই জানে, নীতিশ যে মা’র একমাত্র সন্তান, অনন্ত সে খবরও রাখে, সহসা নীতিশের ঘরে অসম্ভাবিত অনূঢ়া এক রূপসী মেয়ের আবির্ভাবে সে আশ্চৰ্য্য হইয়া গিয়াছিল। তার দেহের সমস্ত রক্তের কণাগুলি তাতিয়া উঠিল। এত রূপ । অনন্ত আরও কিছুদিন আগে আসিলে ভাল করিত। নিতান্ত ভাল মানুষটীর মত অনন্ত কহিল,উনি কি আপনার বােন নাকি নীতিশ দা—? দেখিনি তাে আগে। নীতিশ এক পেয়ালা চা অনন্তর সুমুখে ঠেলিয়া দিয়া নিজের পেয়ালাটা টানিয়া লইয়া কহিল,কে, পদ্মা, না, বােন যদিও নয়, তবে•••ওর হিষ্ট্রি মস্ত অনন্ত, বলছি...এই যে পদ্মা, বাঃ, লুচি, হালুয়া ওটা কি বেগুণ ভাজা? বাঃ, একেবারে সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা:খাও অনন্ত••• পদ্মা টেবিলের উপর থালা নামাইয়া সােরাই হইতে জল গড়াইতেছিল, পিছন ফিরিয়া না তাকাইয়াও সে বুঝিতে পারিল "অনন্তর দুইচোখের লােভাতুর দৃষ্টি তার প্রতি অঙ্গকে যেনাে গ্রাস করিতেছে। অত্যন্ত অস্বস্তি বােধ করিলেও মানুষকে খাইতে দিয়া সে এখন কোন্ ছুতায় ঘর হইতে বাহির হইয়া যায় ! সে বাহিরের জানালাটার দিকে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়াইয়া রহিল !

দীপালী জলের গ্লাসটা এক নিঃশেষে শেষ করিয়া অনন্ত বিনীত কণ্ঠে কহিল উঃ যা পিপাসা পেয়েছিল—আর একটু জল আমায় দিন তো পদ্মা একটু সরিয়া আসিয়া অনন্তর গ্লাসে জল ঢালিয়া দিল, তার চোখের দৃষ্টি ভূমিসংলগ্ন, নীতিশ ও একমনে খাইতেছে—অনন্ত এই অবসরে পদ্মার রক্তিম মুখখানি তন্ন তন্ন করিয়া দেখিয়া লইল ... মনের মাঝে অতৃপ্ত কামনা যেন বিরাট একটা দানবের রূপ ধরিয়া ক্ষেপিয়া উঠিল, পদ্মা চোখ তুলিতেই অনন্তর দৃষ্টির সাথে নয়ন মিলিল। পদ্ম শিহরিয়া উঠিল বাহিরে আসিয়া ভাবি-মানুষে মানুষকে এমন করিয়া দেখে কেন ?•••এই দৃষ্টি সে রূপগঞ্জে হাবার নয়নে দেখিয়াছিল, আজ অনন্তর চোখেও সেই লােলুপ দৃষ্টি দেখিল, কিন্তু নীতিশ তো তাহার দিকে অমন করিয়া ক্ষুধিতের মত তাকায় না, তার দুইটা চোখের তারা কেমন সুন্দর শান্ত, সর্বদাই যেন হাসির রসে ভরা। এই ছেলেটী নীতিশের চেয়ে সুন্দর হইলে কি হইবে, নীতিশকেই পদ্মার যেন বেশী করিয়া ভাল লাগে: নীতিশ নামটাও তাহার কাছে কত মিষ্টি। ইহাদের কাছে সেই হাবা, মাগো.••ভাগ্যিস পদ্মা পচা পুকুরের জলে ডুবিতে গিয়াছিল, নহিলে এতদিনে হয়ত তাহার সেই খুড়া জোর করিয়া সেই হাবটার বাড়ীতেই পাঠাইয়া দিত।

আট বিকাল বেলায় মা পদ্মাকে খুজিতে খুজিতে ছাদে আসিয়া দেখেন-- আলিসার উপর মুখ রাখিয়া পদ্ম পিছন ফিরিয়া দাড়াইয়া আছে। মা কোমল কণ্ঠে ডাকিলেন—পদ্মা, একলাটী চুপ করে এখানে দাড়িয়ে কেন মা, নীচে আয়, দীপালী তােকে খুজচে। পদ্মা কোন জবাব দিল না, মা জোর করিয়া তার মুখটা ধরিয়া সুমুখে ফিরাইয়া দেখিলেন, পদ্মার পদ্ম আঁখিদুইটী অশ্রুতে টল টল করিতেছে। মা সস্নেহে পর অশ্রুসজল মুখখানি বুকের ভিতর চাপিয়া স্নিগ্ধস্বরে কহিলেন—কঁদছিস কেন মা? এখানে কি তাের মন টিকছে ? তবে কি আমি তােক ভুল বুঝে তাের মনে শুধু শুধুই কষ্ট দেবার জন্যে এতখানি পথ টেনে আনলুম? পদ্মা মায়ের বুকের ভিতর ছােট্ট মেয়েটীর মতই মুখ গুজিয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছিল। দুঃখের দিনে সে অনেক সময় চোখের জল ফেলিয়াছে, একা নির্জন গৃহতলে শূন্য শয্যায় শুইয়া সে কত রাত শুধু কাদিয়াই কাটাইয়াছে। অন্ধকারে গা ঢাকিয়া ঘরের দেওয়াল গুলা ভূতের মত দাড়াইয়া তাহার কান্না বুঝি কান পাতিয়া শুনিয়াছে, বাতাস আসিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলিয়া চলিয়া গিয়াছে, কিন্তু এম করিয়া বুকের ভিতর টানিয়া সান্ত্বনা তত তাহাকে কেহ দেয় নাই... মৌন মূক রুদ্ধ গৃহ চাপা কান্নার গােমরানী শুনিয়া কঁপিয়াছে শুধুই, ভাষা দিয়া সহানুভূতি জানাইবার ক্ষমতা তাে তাহাদের ছিল না।

দীপালী আজ পদ্মা এত সুখেও কাদে কেন...? পদ্মা নিজেই এ প্রশ্নের জবাব পায় না••• মা পরম স্নেহে পদ্মার মাথাটীতে হাত বুলাইতে বুলাইতে কহিলেন— পদ্মা, কেন কাদছিস মা, আমাকে বল ? ওরে, অতটুকু ছোট্ট বুকে এত- খানি পাষাণ ভার চাপিয়ে রাখিসনে মা, একজনের কাছে নামিয়ে হাল্কা কর, আমি শুধু নীতিশের মা নই—আমি যে তােরও মা পা, আমার কাছে লুকোসনে পদ্মার চোখের জল বাধা মানিতেছিল না। রুদ্ধকণ্ঠে সে কহিল- আমাকে কেন মা এত আদর কচ্ছেন••সেই জন্যেই তো••• মা হাসিয়া পদ্মার ছােট্ট মাথাটীর উপর মুখ রাখিয়া কহিলেন- পাগলী মেয়ে, মেয়েকে আদর করবাে না তো কাকে করবাে বল ?••• ওরে, তাের বুকেও যেমন মা-হারানাের ব্যথা সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে, আমিও তেমনি বছর তিন চার হােল একটা মেয়ে জন্মের মত হারিয়ে বসে আছি, অবকিল তার মুখের ছাচ ঠিক তােরই মত, অমনি সেও তােরই মত বড্ড ভীরু ছিল, লাজুকও। পদ্মা, নীতিশ আমার বুক জুড়ে ছেলেমেয়ের সব স্থানটুকুই পূর্ণ করে আছে সত্যি—কিন্তু মা হ'য়ে, পেয়ে হারানাের ব্যথাটা যে কত বড়, তা যদি জানতিস মা... পদ্মা সচকিত হইয়া মাথাটা তুলিয়া সিক্তকণ্ঠে কহিল—আপনার মেয়ে ছিল মা? কতবড় হয়েছিল ? মা ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে কহিলেন—আমাকে তুই ‘আপনি’ বলে কথা বলিসনে পদ্মা, আমার বুকের ভাঙা জায়গাটায় গিয়ে ওটা বড় বিশ্রীভাবে ঘা দেয়।-আমার মেয়ে—সে কি আমায় ‘আপনি ডাকত ?

দীপালী পদ্মা উঠিয়া চোখ মুছিয়া সলজ্জ কণ্ঠে কহিল—আর বলব না মা, তুমি ও-রকম করে কথা কমােনা, আমার বড় কষ্ট হয়। মা পদ্মার মুখখানি আর একবার বুকে চাপিয়া চুম্বন করিয়া কহিলেন তবে চ মা নীচে যাই, দীপালী এসে অনেকক্ষণ একলা বসে আছে, •••ওই একটী খাসা মেয়ে, যেমন কথাবার্তা, তেমনি চালচলন, আমার মেয়েভাগ্যি ভাল বলতে হয়, কি বলিস মা ?••• পদ্মা নীরবে কিছুক্ষণ থাকিয়া কহিল—আমি গিয়ে কি করব মা, আমি তােমার মুখ মেয়ে, না জানি কাজ-কর্ম, না জানি একটা কিছু গুছিয়ে বলতেওঁরা হয়ত আমায় দেখে কত হাসেন মা কহিলেন—ইস ! হাসবে বই কি! এমন একটা মুখ্য মেয়ে কার ঘরে আছে—বার করুক দেখি। তুই নেবে আয় তত বাপু, বেশী বকিসনে। মা পদ্মার হাত ধরিয়া টানিয়া দ্বিতলে নামিয়া আসিলেন। কহিলেন —চট করে গা ধুয়ে কাপড় চোপড় বদলে আয়, আমার মেয়ে অমন করে থাকলে লােকে কি ভাববে?—লােকে বলবে ডাইনী মা। মা একটু হাসিয়া নীচে নামিয়া রান্নাঘরে গিয়া দেখেন, দিব্যি জুতা- টুতা ছাড়িয়া দীপালী রান্নাঘরের এক পাশে বসিয়া ঠাকুরকে উপদেশ দিতেছে—মাছের কালিয়াটা তুমি রেখে দাও ঠাকুর, ওটা আজ আমি রাঁধব,•••আর বিন্দী, দমের আলু ও-রকম ছােট্ট ছােট্ট করে কুটছ কেন বল ত? ওযে গলে পায়েস হয়ে যাবে—ছাড় বঁটিখানা, আমি কুটে নিচ্ছি-- ঘন ঘন যাতায়াতে দীপালী এ-বাড়ীর সকলকার কাছেই অত্যন্ত প্রিয় এবং পরিচিত হইয়া পড়িয়াছে—মা তত তাহাকে পদ্মারই পাশা- দাপালী পাশি ঠাই দিতে একটুও দ্বিধা করেন না, প্রশস্ত স্নেহ ক্রোড়,এক ধারে পদ্মা অপর ধারে দীপালী । মা হাসিয়া কহিলেন—কি হচ্ছে দীপুমা । রান্নাঘরে আজ অন্নপূর্ণার অধিষ্ঠান হয়েছে যে দেখছি ! মার বড় ভাল লাগিতেছিল—দীপালীর এই কর্মপটুতা দেখিয়া । নারী-জীবনের সকল ধর্মের মাঝে এই গৃহ-ধৰ্ম্মটিই বড় সুন্দর ভাবে দেখা যায়...যখন সে বহির্বিশ্বের সহিত সকল দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করিয়া আপনার মহিমায় আপনি ফুটিয়া উঠে..যখন সে শুধু বিদ্রোহিনী নারী নহে—ধাত্রী.কল্যাণী... তখন তাহাদের দুই নয়নের প্রান্তে বিদ্রোহের প্রলয় বহ্নি নিভিয়া গিয়া স্নেহ-প্রেমের অমিয়ধারা ঝরিয়া পড়ে •• এমনি একটিী কল্যাণী বধু আসিয়া যদি মা’র শূন্য গৃহ আলােকিত করিত। মা’র মুগ্ধ ভাব বেশীক্ষণ রহিল না। দীপালী মাকে দেখিয়াই ছুটিয়া আসিয়া বাম হাত দিয়া মা’র কটী বেষ্টন করিয়া আবদারের সুরে কহিল -তুমি ঠাকুরকে একটু বলে দাওনা মা, আমি তাহলে তরকারী গুলাে রেধে ফেলি•••। আচ্ছা, না, আমি রাঁধলে নীতিশ বাবু খাবেন?••• আমরা যে কায়স্থ••• মা দীপালীর মুখখানি দুই হাতে উচু করিয়া তুলিয়া ধরিয়া কহিলেন হায় হায়—সে আবার ছোয়াছুয়ি আচার-বিচার মেনে চলবে, রাজ্যের মুচী-মেথর ছুয়ে এসে আমার কোলে শুয়ে পড়ে। বলে, মানুষ মানুষই, জাতের গণ্ডী দিয়ে তাকে দূরে রাখা কেন মা? আমরা কিন্তু অত বিচার করতে পারবােনা...সেই জন্যে আমাকেও ওর মতে মত দিতে হয়।

দীপালী দীপালী একদৃষ্টে মার মুখের পানে তাকাইয়া কি ভাবিতেছিল কে জানে! কিন্তু পদ্মার মত সেও তাে মাতৃহারা...মাতৃস্নেহের সম্পূর্ণ স্বাদ সে পায় নাই বললেই চলে, নীতিশের মাকে যখনই সে দেখে, তখনই তাহার প্রাণ ভরিয়া ‘মা’ ‘না’ ‘মা’ বলিয়া আত্মার অতৃপ্ত ক্ষুধা মিটাইবার জন্য সমস্ত প্রাণটা ব্যাকুলিয়া উঠে !... নীতিশকে সে ভাল বাসিয়াছে, প্রাণ ভরিয়া ভাল বাসিয়াছে, কিন্তু সে ভালবাসা তার মর্মকোষে আবদ্ধ পুষ্প পরাগের মতই আজিও আত্ম- গােপন করিয়া আছে। দীপালীর ভয় হইত, পাছে তাহার মনের নীরব প্রেম নীতিশের চোখে ধরা পড়িয়া যায় । নীতিশ ও তাহার মাঝে যে ব্যবধানটা হিমালয়ের মতই মাথা উচু করিয়া দাড়াইয়া আছে—সে বাধা ভাঙিয়া কোনও দিনই তাহারা সহজ ভাবে মিলিত হইতে পারিবে না•••তাহাদের মিলন-পথটি পুষ্পবীথির মত সহজ সুন্দর মধুর নহে, কঁাটায় ভরা, চলিতে গেলে পায়ে বিধিবে।••• কিন্তু দীপালী তাহাকেও তুচ্ছ করিত—যদি সে মিলনের ক্ষণিক আনন্দকেই উপভােগ করিতে চাহিত।••• দীপালী চাহে নীরব প্রেম-বিরহের অবিচ্ছিন্ন বিপুল বেদনার মাঝে সে তাহাকে প্রাণ ভরিয়া অনুভব করিবে। সে প্রেমের অন্ত নাই —মরণ নাই। একদিন সে ইরার সহিত তর্কের খাতিরে বড় গলায় বলিয়াছিল যে, সে বন্ধন চাহে না, চাহে মুক্তির আনন্দ—প্রচুর স্বাধীনতা।••• কিন্তু সে সঙ্কল্পের গােড়ায় বুঝি ঘুণ ধরিয়াছে।•••সময় সময় সে ভাবে মন্দ কি, ছােট্ট একটি সংসার...স্বামী ও সে...আর—আর অন্য কেহ নয়— ৬৪ দীপালী স্বামী, সে নীতিশই, যে তার অস্ফুট নারীত্বকে তিলে তিলে নীরব প্রেমের ধারায় অভিষিক্ত করিয়া জাগাইয়া তুলিতেছে। যাহাকে ভাল বাসিয়া দীপালী রুক্ষ ধরার বুকে হারানাে মায়ের স্নেহ খুঁজিয়া পাইয়াছে —সেই নীতিশ...দীপালীর বড় প্রিয় নীতিশের মা’র বুকের তলায় আজ নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে ছাড়িয়া দিয়া নিস্তব্ধ রাত্রির আরামে ঢলিয়া পড়িতে ইচ্ছা হইতেছিল। দীপালীর দুটী চোখ সহসা জালা করিয়া যেন জল আসিল।••• মানুষের সব আশা, সব কামনাই কি পূর্ণ হয় ? দীপালী মা’র সঙ্গে উপরে আসিল। মন তাহার সহসা এই মুহূর্তে যে কোন নির্জন নিভৃত গৃহকোণ খুজিয়া মরিতেছিল। মনে হইতে- ছিল তার হৃদয়ের এই স্পন্দনটুকু হয়ত মা'র চোখে ধরা পড়িয়া যাইবে । হয়ত বা নীতিশের চোখেও। তাহার মানসিক পরিবর্তনের জন্য দায়ী তাে শুধু সেই-ই। নীতিশ কি দীপালীর বিধাতা ? দীপালী একটা সােফার উপর অবসন্ন ভাবে বসিয়া পড়িতেই মা ব্যস্ত ভাবে বলিয়া উঠিলেন—দীপু, তােমার কি কোন অসুখ করছে মা? মুখটা অমন শুকিয়ে গেছে কেন ? আহা আগুনতাতে এতক্ষণ ছিলে•• অভ্যেস তাে নেই। মাথাটা একটু গােলাপ জল দিয়ে ধুয়ে ফেলবে ? বলিয়া তিনি পাখার গতিটা একটু বাড়াইয়া দিয়া কহিলেন—পদ্মাকে ডেকে দি, একটু মাথাটাতে হাত বুলিয়ে দিক। বলিয়া মা পা বাড়াইতেই দীপালী চঞ্চল স্বরে বলিয়া উঠিল—না মা, লক্ষ্মীটি, ব্যস্ত হ’য়ােনা,মাথাটা চট করে ধরে উঠেছে—তাই...এই একটুখানি শুয়ে থাকলেই সেরে যাবে।

দীপালী দীপালী দুইটি চোখ মুদিয়া সােফার উপর হেলিয়া পড়িল। মার আর নীচে যাওয়া হইল না, দীপালীর মাথাটী অতি যত্নে কোলের উপর টানিয়া তার ঘনকৃষ্ণ চুলের রাশির ভিতর আঙুল বুলাইয়া দিয়া তাহাকে ঘুম পাড়াইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু স্নেহময়ী মা কি দীপালীর অন্তর্যাতনা বুঝিতে পারিয়াছিলেন ?

পৃথিবীর সকল দেনা-পাওনা চুকিল কি না সে কথা ভাগ্যনিয়ন্তই লিতে পারেন, মা কিন্তু সহসা নীতিশের ঘাড়ে সকল ভাবনা চির বােঝা ফেলিয়া দিয়া অকস্মাৎ একদিন অজানা লােকের উদ্দেশে পাড়ি দিলেন ব্যাপারটা যেমন আকস্মিক, তেমনই দুর্ঘটনায় ভরা। সুস্থমানুষ, কথা কহিতে কহিতে সহসা দুইহাতে মাথা চাপিয়া সেই যে শয্যার উপর ঢলিয়া পড়িলেন, সেই শয্যাই তাহার শেষশষ্য। নীতিশ নিজে ডাক্তার হইলেও সহরের বড় বড় নামজাদা ডাক্তার- রে সেই মুহূর্তেই আনিয়া জড়াে করিল। পৃথিবীর মধ্যে সে মাকেই চিনিত, মা যে এমন করিয়া তাহাকে সংসারের মাঝে একলা ফেলিয়া চলিয়া যাইতে পারেন—সে ভাবনা সে ভাবিতেও পারিতেছিল না। কিন্তু ডাক্তারদের সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হইয়া গেল।•••অ্যাপােপ্লেক্সি... নীতিশের হাতে পদ্মার হাত দুইখানি সঁপিয়া দিয়া মা বিদায় লইলেন, কি যেন বলিবার চেষ্টা করিলেন কিন্তু বাণী তার অকথিতই রহিয়া গেল। ঠোট দুইটি বার কয়েক নড়িয়া একেবারে জন্মের মতই স্থির হইয়া গেল। নীতিশ মাকে হারাইয়া একেবারে পাগলের মত হইল। দীপালী বর পাইয়া ছুটিয়া আসিল। শুধু আসিল না-ছায়ার মত নীতিশের দীপালী সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়া তার মনের দারুণ ব্যথার বােঝাকে সমবেদনার স্নিগ্ধ- স্পর্শে হালকা করিয়া তুলিতে লাগিল। সবচেয়ে ক্ষতি হইল বেচারী পদ্মার।... জন্ম যাহার দুভাগের মধ্যে, বিধাতা বুঝি সুখ বলিয়া জিনিষটী তাহার ভাগ্যে লিখিতে ভুল করিয়া বসেন।•••আজন্ম দুঃখ বেদনার ঝড়- ঝাপটা সহ্য করিয়া সে মার অসীম স্নেহ-ভরা বুকখানির আশ্রয়ে আসিয়া বাঁচিয়া গিয়াছিল। সময় সময় তাহার মনে হইত, অদূর ভবিষ্যতে সুখের যেন ক্ষীণ আলােটুকু মা স্বহস্তে জালিয়া তাহার সম্মুখে ধরিয়াছেন —হয়ত তাহাই মেঘের কুয়াশা ঠেলিয়া দীপ্ত সূর্যের মতই একদিন সহস্র তেজে জ্বলিয়া উঠিবে ।... কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর দেবতা তাহার অদৃশ্য হস্তে মােড় ঘুরাইয়া দিলেন, পদ্মার ভবিষ্যতের সেই ক্ষীণ আলােটুকু কঁপিতে কাপিতে অন্ধকারের কোলে আত্মসমর্পন করিল।•••পদ্মা চাহিয়া দেখিল সমস্ত পৃথিবীটা হইতে যত আলাের রেখাগুলি একে একে নিশ্চিহ্ন হইয়াই সব মুছিয়া গিয়াছে••• সব অন্ধকার:: এত কালী পৃথিবীর বুকে লেপিয়া দিল—কে ? মায়ের শেষ কাজ সারিয়া নীতিশের মাথায় এক দুর্ভাবনা জাকিয়া বসিল, সে ভাবনার মূল পদ্মাকে লইয়া। মা’ততা নিশ্চিন্তে পদ্মাকে নীতিশের হাতে সমর্পণ করিয়া বিদায় নিলেন। কিন্তু পদ্মার মত একটা অতি সাধারণ মেয়েকে লইয়া নীতিশ সারাজীবনের মত দুর্ভাগ্যকে বরণ করিয়া লইতে প্রস্তুত হইতে পারিতে- ছিল না। অথচ এই স্বজনহীনা নিঃসহায়া মেয়েটিকে সহসা না জানিয়া শুনিয়া কাহার হাতেই বা তুলিয়া দেয়? মা'র কথা-টুকুর উপর অচঞ্চল দীপালী বিশ্বাস রাখিয়া ওই মেয়েটি যে নিঃস্বার্থ ভাবে তাহার ক্ষুদ্র সংসারটিকে সাজাইয়া গুছাইয়া স্বচ্ছলতার একটা নূতন শ্ৰ ফুটাইয়া তুলিতেছে মায়ের মত, বােনের মত, দরদী স্ত্রীর মত ওই যে মেয়েটির নির্বাক স্নেহ- মমতা প্রতিপদে নীতিশকে এক অপূর্ব বাঁধনে তিলে তিলে বাধিয়া ফেলিতেছে, নীতিশের শিক্ষিত উদার মন সে বাঁধন ছিন্ন করিয়া ফেলিবার মত শক্তি খুঁজিয়া পায় না, ভাবিয়া মরে—ভারাক্রান্ত হৃদয়ের মধ্যে অন্ধের মত হাতড়ায় শুধু। তার তরুণ মন যখন দীপালীকে ঘিরিয়া স্বপ্নরাজ্যের মায়াময় সৃষ্টি রচিয়া তুলিতেছিল, অকস্মাৎ এই দারুণ দুর্ঘটনা কঠিন বাজের মতই তীব্র আর্তনাদ করিয়া নীতিশের অতি-যত্নে গড়া স্বপ্নরাজ্য ভাঙিয়া চুরিয়া তছ, নছ, করিয়া দিয়া গেল।••• নীতিশ ক্ষ্যাপার মত রাস্তায় রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল ৷••• নীতিশের মন যখন সমস্যার দোলায় ঘুরপাক খাইয়া মরিতেছে, সেই সময় একদিন দীপালী আসিয়া নীতিশকে ধরিয়া বসিল-কাল তাহার জন্মদিনের উৎসব, এ উৎসবে তাহারও পদ্মার যােগ দেওয়া চাই-ই।••• নীতিশকে রাজী করিতে বিশেষ বেগ পাইতে হইল না, পদ্মও দীপালীর আন্তরিক নিমন্ত্রণ নীরবেই গ্রহণ করিল। কিন্তু গােল বাধিল যাইবার সময়। চাদরটার পাক খুলিয়া এলাে মেলাে ভাবে গায়ে ফেলিয়া নীতিশ আসিয়া পদ্মার ঘরের সুমুখে দাড়াইয়া সবিস্ময়ে কহিল—একি পদ্মা, তােমার যে এখনও কিছু হয়নি! নাও নাও শীগগীর তৈরী হয়ে নাও, পাঁচটা কখন বেজে গেছে, এক্ষুণি হয়ত দেরী দেখে দীপালী আবার পাঠিয়ে বসবে।

দীপালী নীতিশকে অকস্মাৎ স্তম্ভিত করিয়া দিয়া পদ্মা অন্যদিকে মুখ ফিরাইয় কহিল—আপনিই যান, আমি আর যাবনা। এতটা দিন পর্যন্ত পদ্মাকে কোন বিষয়ে ‘না’ করিতে দেখে নাই... আজ নীতিশ পদ্মার ব্যবহারে বড় আশ্চর্য্য হইয়া গেল। সে কহিল—সে কি পদ্মা ! তুমি যাবেনা কেন ? দীপালী অত করে বলে গেছে, না গেলে সে সত্যিই বড় দুঃখ পাবে, ছিঃ ‘না’ করে লক্ষ্মীটি, চুলটুল বেঁধে তৈরী হয়ে নাও—আমি তােমাকে আরও আধঘণ্টা সময় দিচ্ছি— পদ্মা খাটের বাজুটা বাম হাতে দৃঢ়ভাবে চাপিয়া তেমনিই অচপল কণ্ঠে কহিল-না না আমি যাবনা, কেন আমাকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছেন বলুন তাে? আমি তাদের সমাজে মেশবার মত কিছুই যােগ্যতা লাভ করিনি:••তাদের মাঝে গিয়ে বােকার মত সং সেজে দাড়িয়ে থাকলেই কি আপনি বেশী সুখী হবেন? তা হলে বলুন আমি এক্ষুণি যাচ্ছি। অভিমানের রুদ্ধ উচ্ছ্বাসে তার কণ্ঠস্বর কঁপিয়া ভাঙিয়া গেল। নীতিশ পদ্মার অভিমান-স্ফীত সুন্দর মুখখানার পানে মিনিট কয়েক চাহিয়া থাকিয়া খাটের এক পাশে চাপিয়া বসিয়া কহিল—পদ্ম, তােমাকে আমি বুঝলাম না, বাইরের সমাজকে তুমি কেন যে এমন করে এড়িয়ে চল,•••এ আমার ভারি আশ্চৰ্য্য লাগে। এইত সময়—জীবনটাকে পরিপূর্ণ ভাবে দেখে নেবার, শিখে নেবার, উপভােগ করে নেবার। অথচ আমি দেখি, তুমি সব সময়ই ইচ্ছা করে সংসারের এই ছােট্ট আবেষ্টনটুকুর মধ্যেই আত্মগােপন করে থাকতে চাও।...নিজেকে সব সময় অত ছােট করে ভেব না পদ্ম, তাতে নিজেই নিজের অনন্ত দুঃখকে বরণ করে নেবে। বেশ আপত্তি হয়, আর যেওনা, কিন্তু আজকের দীপালী দিনটীতে তুমি আমার অনুরােধটুকু রেখে চল সেখানে, নইলে ভদ্রতা থাকবে না। পদ্মার মুখখানা নীতিশের কথা শুনিতে শুনিতে কঠিন হইয়া উঠিতে- ছিল। সে গলার স্বরে জোর দিয়া কহিল-কেন ভদ্রতা থাকবে না আপনার ? আমি আপনার কে ? পথে-পাওয়া একটা ভাগ্যহীন। মেয়ে, জোয়ারের জলে ভেসে-আসা তুচ্ছ একটা কুটোর মতই ভাসতে ভাসতে আপনার দোরগােড়ায় এসে লেগেছি ।•••ভবিষ্যতে হয়ত ভেসে ভেসে আবার কোথায় চলে যাব আমার ভাগ্য তাে বিধাতা নিজের হাতেই বেঁধে দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন...আমার নিমন্ত্রণে যাওয়া না যাওয়াতে আপনার কি আসে যায়? তুচ্ছ অতি হীন একটা জীবন, তার আবার ভদ্রতা অভদ্রতা, তার আবার লােকলৌকিকতা,-সব বাজে।••আমার জন্য আপনি অনর্থক চিন্তা করবেন না, আমি যেমন আছি মেনি থাকি। পদ্মার কণ্ঠ শেষের দিকটায় বড় সজল হইয়া আসিল। নীতিশ আর কিছু বুঝুক আর নাই বুঝুক এইটুকু বুঝিতে তার বিলম্ব হইল না যে, কোন একটা কারণে পদ্মার মনে দারুণ অভিমান জাগিয়াছে।•••অথচ এমনিধারা অভিমানের রুদ্র সাড়া পদ্মার তরফ হইতে কোন দিন পাওয়া যায় নাই। সত্যই নিজের দুর্ভাবনায় অস্থির হইয়া নিজেই সে ঘুরিয়া মরিয়াছে, পদ্মার সুখ দুঃখের প্রতি এতটা উদাসীন হওয়া তাহার উচিত হয় নাই। কিন্তু কেন ? এ অভিমানের হেতু কোথায় ? নীতিশ খাট হইতে নামিয়া পদ্মর মুখখানা জোর করিয়া সুমুখে ফিরাইতেই দেখিতে পাইল, তার দু’টি ডাগর আঁখির কূলে কূলে অশ্রুর জোয়ার ফাপিয়া ফুলিয়া উঠিতেছে। ব্যথিত হইয়া নীতিশ কহিল,-ছিঃ ৭১ দীপালী পদ্মা, তুমি আমাকে এতটা পর ভাব ! দেখ দেখি ছেলেমানুষের মত আজ আমাকে কতকগুলাে যা তা কথা শুনিয়ে দিলে ! আচ্ছা পদ্মা, এতে কি আমার কষ্ট হচ্ছে না—বলতো? সত্যিই তুমি আমার মার পেটের জন্মাননা বােন নও, তাই তােমার ওপর দাবী-দাওয়া হয়ত আমার খাটে না, কিন্তু কে বলতে পারে যে, পূর্বজন্মে আমরা একান্ত আপন জন ছিলাম কি-না? নইলে কোথা ছিলে তুমি কোথায় ছিলাম আমি—কেউ কারুকে চিনতাম জানতাম না, অথচ আজ একেবারে তুমি আমার সংসারের সর্বময়ী কর্তী হয়ে বসেচ !•••মানুষকে এত আঘাত দিয়ে কথা বলতে তুমি কোথা থেকে শিখলে পদ্মা ? নীতিশ উল্টা পথ ধরিয়া তাহাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়া উণ্টা ফলই পাইল। পদ্মা রাগে জ্বলিয়া উঠিয়া কহিল—আপনার সংসারে সর্বময়ী কী হতে আমি গেলাম কেন? আমার কিসের দায় এত, নিন না আপনি সমস্ত বুঝে পড়ে•••আমিও তাহলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি..পরের ঝক্কি বইতে বইতে আমার জীবন গেল, আমি আর পারি না.••তা ছাড়া আপনিই বা আমাকে এতখানি কর্তৃত্ব দিলেন কেন?-আপনার সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কি ? নীতিশ এবারও ভুল করিল, কথাটার গতি হাল্কা পথে লইয়া যাইবার অভিপ্রায়ে সে হাসিয়া কহিল-ও, তাই বল, অভিমানের কারণটা এতক্ষণে বুঝতে পারলাম, তােমার নিজের সংসার নেই বলে রাগ কর না পদ্ম, শিগগীরই নিজের সংসারের ঝক্কি পােয়াতে হবে এবার, আমি একটুও নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে নেই, চান্দিকে তােমার উপযুক্ত পাত্র খুঁজে বেড়াচ্ছি। আমার এমন সুলক্ষণা বােষ্টীকে তাে আর যার-তার হাতে তুলে দেওয়া যায় না।••• ৭২ দীপালী বারুদের স্তুপে যেন আগুন পড়িল ! এতদিনকার পুঞ্জীভূত অভিমান, যাহা পদ্মার মনের গােপন কোণে তিল্ তি করিয়া জমিয়া উঠিতেছিল, আজ নীতিশের কথায় তাহা অকস্মাৎ ফাটিয়া বাহির হইল। পদ্মা নীতিশের হাত দুখানা জোর করিয়া সরাইয়া দিয়া কম্পিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল—চাইনা—চাইনা আমি আপনার এত অনুগ্রহ, কে আপনাকে মাথার দিব্যি দিয়ে আমার ভবিষ্যত ভাবতে বলেছে? কেন আপনি এমন করে আমাকে অপমান করতে এসেছেন ? নীরিহ পশুর গলায় ছুরি চালানােই যাদের ব্যবসা, তাদেরও যেটুকু হৃদয় বলে পদার্থ আছে— আপনার দেখছি তা-ও নেই..মাগাে••• বলিতে বলিতে দুটী চোখের পড়-পড় অশ্রুধারা পাছে নীতিশের চোখে ধরা পড়িয়া যায় সেই ভয়ে, পদ্মা ঘর হইতে একরকম ছুটিয়াই বাহিরে পালাইল। নির্দোষ নীতিশের বিবর্ণ মুখখানা তাহার দেওয়া এই মিথ্যা অপবাদে যে কতদূর মলিন হইয়া উঠিয়াছে, সেটুকু পদ্মার তখন দেখিবারও অবসর ছিল না ! বাহিরে আসিয়া পদ্মা দুই হাতে বুক চাপিয়া স্বল্পান্ধকার বারান্দার এক কোণে গিয়া ঝর ঝর করিয়া দিয়া ফেলিল। অকারণে কেন যে তাহার চোখে এত জল সহসা উৎসরিত হইয়া উঠিল, পদ্মা নিজেই তাহা ভাবিয়া পাইল না। আঘাত খাইয়া সে-ত তার দ্বিগুণ আঘাত নীশিকে এইমাত্র দিয়া আসিল,•••তাহাতে তো আনন্দ হইবারই কথা! কিন্তু নীতিশের ম্লানমুখ স্মরণ করিয়া তাহার সারা অন্তরখানি এমন বেদনায় ভাঙিয়া পড়িতে চায় কেন? একজনকে কসাই বলিয়া গালি দিয়া আসিয়া এতক্ষণে সে ভাবিয়া দেখিল সে নিজেই কত বড় নির্মম ! নীতিশের কথায় তার অন্তর জ্বালা ৭৩ দীপালী করিয়া উঠিয়াছিল বলিয়া, সে কি বলিয়া আজ নীতিশকে অতখানি বেদনা দিয়া আসিল। এ বেদনা যাহাকে দিয়া আসিয়াছে তাহার কত- খানি লাগিল কি না সেই বলিতে পারে, কিন্তু পদ্মা ব্যথা দিতে গিয় নিজেই ব্যথার বাণে আহত হইয়া ছট ফট করিতে লাগিল। খানিক পরে পদ্মা দূর হইতে উকি মারিয়া দেখিল স্তব্ধপ্রায় নীতি বিছানার পরে’ একইভাবে বসিয়া আছে। দেখিয়া পদ্মার অন্তর যেন আকুলি-বিকুলি করিয়া উঠিল, ইচ্ছা হইল ছুটিয়া গিয়া নীতিশের পা দুইখানি বুকের ভিতর চাপিয়া ধরিয়া কহে—ক্ষমা করাে, ওগাে—তােম ছাড়া এত বড় দুনিয়াতে আমার আর আছে কে ? কিন্তু হায়রে কিসের অধিকারে সে নীতিশের চরণ দুইখানি বক্ষে চাপিয়া অতৃপ্ত হৃদয়ের সমস্ত জ্বলা জুড়াইবে? সে পরের মেয়ে..নীতিশ শুধু তাকে ভায়ের মত ভক্তি করিতে অধিকার দিয়াছে, কিন্তু কী উচ্চ আশা !—সেইটুকুই যে তাহার মত নিঃসহায় অনাত্মীয়া তরুণীর পক্ষে সৌভাগ্যের অতীত,ইহার বেশী চাহিবার অধিকার, ভালবাসিবার মত স্পর্ধা তাহার আসে কেন?... দোষ তাে নীতিশের নহে, দোষ তাহার মর্মান্তিক ভাগ্যলিপির। পদ্মা সহসা ঝড়ের মত ঘরে ঢুকিয়া সুইচটা টানিয়া দিয়া নীতিশের নিকটে সরিয়া আসিয়া অনুতপ্ত কণ্ঠে কহিল—রাগের সময় আমার জ্ঞান থাকেনা, আপনাকে সত্যিই আজ আমি যা-তা বলে গেছি। এতগুলাে রূঢ় কথা কি করে যে আমি বল্লাম তা ভেবে পাচ্ছিনা, কিন্তু তার জন্যে আমি মাপ চাইচি,বলুন আমায় মাপ করেছেন? দুই করতলের মধ্যে মাথা চাপিয়া নীতিশ বসিয়া ছিল, পদ্মার গলার সাড়া পাইয়া সে সহসা মুখ তুলিয়া পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে পদ্মর মুখের প্রতি চাহিল। ৭৪ দীপালী পদ্মা সবিস্ময়ে দেখিল-নীতিশের মুখ কাগজের মত-ই সাদা। নীতিশ পদ্মার দিকে মুখ ফিরাইয়া ব্যথিত স্বরে কহি—সত্যি, সত্যিই পন্যা আমি কসাই...কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমার শত্রু নই। নিজের মার পেটের বােন থাকলে তােমার চেয়ে তাকে বেশী ভালবাসতুম না পদ্ম, আমার সে অভাব তুমি নিঃশেষেই মিটিয়ে দিয়েছ। তােমাকে সুখী করাই আজ থেকে আমার জীবনের ব্রত হল, বল পদ্ম। কি করলে নীতিশের আবেগােচ্ছাসে বাধা দিয়া পদ্মা একটু ব্যস্ত হইয়া বলিল— কিছুনা, কিছু করতে হবেনা আমার জন্যে ও সমস্ত পাগলামী ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ুন দেখি, এতখানি বেলা দেখে তারা হয়ত কত কি ভাবছেন,•••মাগাে আমি যেন কী, মিথ্যে এতখানি সময় আপনার নষ্ট করে দিলুম-উঠুন না, একি !--হাতে দেখি ঘড়িটাও পরেন নি... কি ভুলাে মন আপনার বুঝে দেখুন•••একটু দাড়ান, ঘড়িটা আমি নিয়ে, আচি। বেশ পরিষ্কার সহজ সুরে কথা কয়টি বলিয়া পদ্মা চলিয়া গেল... পরমুহূর্তেই নীতিশের রিষ্ট-ওয়াচটী হাতে করিয়া ফিরিয়া আসিয়া মৃদু অনুযােগের সুর তুলিয়া কহিল—কই, আপনি যে উঠলেন না বড় ? ও,, আমার ওপর রাগ তা হলে এখনাে আপনার যায় নি দেখ চি—বলুন না, কি বলে ক্ষমা চাইলে আপনি সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে মাপ করতে পারবেন ? নীতিশের শিথিল-প্রায় ডান হাতখানি নিজের কোমল করতলে চাপিয়া অতি যত্নে ঘড়িটী বাঁধিয়া দিয়া পদ্মা জিজ্ঞাসু নয়নে চাহিল। পদ্মাকে সহজ ভাবে কথা বলিতে দেখিয়া নীতিশের বেদনামথিত অন্তর অনেকখানি সান্ত্বনা লাভ করিল।

দীপালী শুধু নীতিশ বুঝিয়া পাইল না, সেদিনের সেই পাড়াগাঁয়ের ভীরু, অতি মাত্রায় লজ্জাশীলা মেয়েটী সহসা বাকপটুতায় এতটা পারদর্শিনী হইল কি করিয়া !•••আজ তাহার কথার ধার এত বেশী যে, ধারালাে ছুরীর মত মানুষের চামড়া কাটিয়াই শুধু ক্ষান্ত হয় না, অন্তরটাকেও ক্ষত বিক্ষত করিয়া ছাড়িয়া দেয় ! নীতিশ উঠিয়া দাঁড়াইয়া হাসিয়া কহিলনা পদ্মা, ক্ষমা চাইবার অনেক আগেই আমি তােমাকে ক্ষমা করে ফেলেছি। সে কথা যাক, দীপালীর জন্মােৎসব, তাকে কি উপহার দেওয়া যায় বল দেখি? মেয়েরা তােমরা, মেয়েদের পছন্দ ভাল করেই বুঝবে। আবার সেই দীপালী:পদ্মার মনটা আবার দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। সমস্ত জগতটার মাঝে নীতিশ শুধু দীপালীকেই চিনিয়াছে••• তাহার অন্তর দীপালীময়, পদ্মার সেখানে প্রবেশাধিকার কি এতটুকুও নাই! তাই নীতিশ পদ্মার অন্ত বেদনা বুঝিয়াও বুঝেনা, অথবা বুঝিবার চেষ্টা করেনা উপরন্তু পলে পলে প্রতি কথায় সে পদ্মাকে নির্মম ভাবে আঘাত করিয়া বসে ! বিকৃত মুখখানায় জোর করিয়া খানিকটা হাসি টানিয়া আনিয়া পদ্মা কহিল-ওঃ, খুব জহুরী আপনি চিনেছেন দেখছি! গয়নাগাটির বালাই আমার কোনকালেই ছিল না, তা ছাড়া সাজ-সজ্জার আমি সত্যিই কিছু জানি না•••আর পাড়াগাঁর মেয়ের পছন্দ মত জিনিস কিনে সহুরে মেয়েকে দিতে গিয়ে হাস্যাস্পদ না হয়ে নিজেই নিজের মনের মত মানে যা আপনার ভাল লাগে, তাই কিনে দিন, তা হলেই তিনি খুসী হবেন। কথাটার সত্যতা নীতিশ নিজেও মানিল। বাহিরে আসিয়া পদ্মার ৭৬ দীপালী দিকে চাহিয়া একবার মৃদুকণ্ঠে কহিল—কিন্তু পদ্মা, তােমাকে একল: রেখে যেতে আমার ইচ্ছে কচ্ছেনা, ফিরতে আমার রাত হয় ত একটু বেশীই হবে...কি করে ছেলেমানুষ একলাটী থাকবে বলতাে?থাকগে যাক, আমার গিয়ে দরকার নেই পদ্ম.. পদ্মা এই কথায় সসা খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। শুভ্র গ্রীব বাকাইয়া ভ্রভঙ্গী করিয়া সে কহিল—আপনার কোন কিছু ভয় নেই.. আপনি আসুন, ভূতের ভয়ে ডরিয়ে ওঠবার মত বয়স আর আমার নেই, •••সে বয়স অনেক দিন আগে পেছনে ফেলে এসেচি••• বাইরে ভাজু থাকবে, নীচে বামাবুড়ী শােয়, ভয় যদি পাই-ই, তা হলে তাকে ডেকে এনে চৌকি দেওয়াব খন•••নিন, আপনি চলুন, আমিও গা ধু, মাই, বেলা একেবারেই গেছে।

पतन ঠেলিয়া ঠুলিয়া জোর করিয়া নীতিশকে পাঠাইয়া দিয়া পদ্মা গা ধুইবার জন্য নীচে নামিবার কোন চেষ্টাই করিল না.••••একেবারে সে নীতিশের ঘরের ভিতরে গিয়া নীতিশের পরিত্যক্ত বিছানাটার উপর লুটাইয়া পড়িল। অবরুদ্ধ বেদনা—যাহা এতক্ষণ পদ্মার বুকের ভিতর সাগরের অশান্তি অশ্রান্ত বারিধারার মত তােলপাড় করিয়া মরিতেছিল, এতক্ষণে জনশূন্য গৃহে একাকী শয্যায় অবলুষ্ঠিতা পদ্মার দুইচোখ দিয়া অশ্রু হইয়া ঝরিয়া পড়িল। কতবড় বেদনার আঘাত যে বুক পাতিয়া গ্রহণ করিয়া সে নীতিশকে তাহারই প্রিয়তমার কাছে পাঠাইয়া দিল..সে খবর তাে আর নীতিশ জানে না. দীপালীর প্রেমের বর্ম ভেদ করিয়া তুচ্ছ পদ্মার প্রাণভরা ভালবাসার অর্ঘ্য কোনদিনই নীতিশের কাছে পৌছাইবে না, পদ্মা পদ্মাই থাকিবে, পদ্মা দীপালী নয় । কতক্ষণ এমনি চেতনাহারার মত পদ্মা নীতিশের বালিশের উপর মুখ গুজিয়া পড়িয়াছিল কে জানে, খােলা জাল্লা দিয়া অতিমাত্রায় বৃষ্টির ছাট আসিয়া পদ্মার সারা মাথাটা ভিজাইয়া দিতেই সম্বিত পাইয়া সে উঠিয়া বসিল। জানালা দিয়া সে তাহার অশ্রুসজল দৃষ্টি বাহিরের পানে মেলিয়া দিতেই দেখিল, বাহিরের ওই আকাশখানিও বেদনায় আতুর হইয়া ঝর ঝর করিয়া অবিশ্রান্ত অঞ বর্ষণ করিতেছে। ঝােড়াে হাওয়া থাকিয়া থাকিয়া রুদ্ধ জানালা-দুয়ারের কপাটে কপাটে যেন পথভ্রান্ত পথিকের ৭৮ দীপালী তই কর হানিয়া ফিরিতেছিল। জানালাটা বন্ধ করিয়া দিয়া পদ্মা একখানা সােফার উপরে অবসন্ন ভাবে ধপ করিয়া বসিয়া পড়িল । তার সমস্ত অঙ্গ ঘিরিয়া হতাশ বেদনার একটা করুণ রূপ যেনাে মূর্তি শরিয়া ফুটিয়া উঠিল। এমনি ভাবে একলা থাকাটা মা’র মৃত্যুর পর হইতেই পদ্মার অভ্যাস হইয়া গিয়াছিল। নীতিশ ‘কল’ হইতে আসিয়া প্রথমেই দীপালীদের স্বপ্ন-সৌধে’ গিয়া হাজির হইত, সেখান হইতে দীপালীর অভিমান-স্ফুরিত অধরের অভিমান-ভরা মৃদু অনুযােগ এড়াইতে না পারিয়া প্রায়ই রাত্রির আহার পর্যন্ত শেষ করিয়া গৃহে ফিরিতে তার এগারােটা বাজি। যাইত। বাড়ী আসিয়াই পদ্মার সহিত আবশ্যকীয় দুই একটা কথা বলিয়াই শান্ত দেহে সে শয্যা গ্রহণ করিত। পদ্মা তাহাতে কোনদিনই আপত্তি তুলিত না, যেখানে তাহার কোনও অধিকার নাই—সেখানে অনুযােগ অভিমান প্রকাশ করিতে যাওয়া বােকামী ভাবিয়া সে নীতিশকে একটি দিনের তরেও তার নিঃসঙ্গতার বিপুল বেদনা জানাইতে চায় নাই। অনেক সময় এতটুকু সকাল করিয়া গৃহে ফিরিবার জন্য অনুরােধ করিতে গিয়া নিজেই লজ্জা পাইয়া নীরবে ফিরিয়া আসিয়াছে, বুকের ভিতর কত কথা, কত ব্যথা মৌন-বেদনায় গুমরিয়া উঠিয়াছে, পদ্মা নীতিশকে তাহার এতটুকুও আভাষ দেয় নাই। নীতিশের যদি চোখ থাকিত, তাহা হইলে পদ্মার ম্লান মুখ, অশ্রুসজল দুই নয়নের নীরব ভাষাতেই তার অনন্ত দুঃখ বুঝিতে পারি, কিন্তু নীতিশের মন দীপালীর প্রেমে আচ্ছন্ন...পদ্মার বেদনা বুঝিয়া দেখিবার বুঝি এতটুকুও অবসর তাহার নাই। না-ই থাকুক, পদ্মা তার ক্ষুদ্র জীবন-তরীখানি তাে নিরাশা-স্রোতের দীপালী পরেই ভাসাইয়া দিয়াছে—কোনদিন কূল যদি পায়, তবেই কিনারায় লাগিবে..নহিলে বাচ্চাল হইয়া একদিন অতল সাগরের গভীর জলে তলাইয়া যাইবে। পৃথিবীর তাহাতে কতটুকু ক্ষতি হইবে...বিন্দুমাত্রও নয়... ঢল যখন নামে, তখন বাঁধ দিয়া জলের গতি ঠেকাইয়া রাখা দায় হইয়া উঠে, পদ্মার নিঃসঙ্গ জীবন আজিকার এই ঝােড়াে হাওয়ার সাথে সাথে যেন উদ্দাম-চঞ্চল হইয়া উঠিল। একটি মানুষের এতটুকু স্নেহ- প্রেমের অভাবে তার সমস্ত প্রাণটা ডুকরাইয়া কঁদিয়া উঠিল...কেহ নাই তার, এতবড় বিরাট বিশ্বের মাঝে আপনার বলিতে পার কেহই নাই, থাকিলে আজিকার এই মহা দুর্যোগের রাত্রিতে দুইটি বলিষ্ঠ সবল বাহুর তপ্ত আলিঙ্গনে নিজেকে নিঃশেষে ছাড়িয়া দিয়া পদ্মা আরামে দুইচোখ মুদিয়া পড়িয়া থাকিত। বাড়ীর সে আবর্জনা ফেলিবার ফুটা-ভাঙা পাত্রের মত অযত্নে একটি পাশে পড়িয়া আছে, কাজের জন্যই তাহার সঙ্গে যত সম্পর্ক, নহিলে এ বাড়ীর সে—কে? কাহার সঙ্গে তার কতটুকু সম্পর্ক ? পাের চোখের জল আজ কোন মতেই বাধা মানিল না। অনেকক্ষণ সােফার উপরে মুখ লুকাইয়া কঁদিয়া কঁদিয়া সে উঠিয়া বসিল। পাগল ঝড়ের মাতুনী তখনও পৃথিবীর বুকের উপরে প্রলয় নর্তন করিয়া চলিয়াছে। পদ্মা দ্বার খুলিয়া বাহিরে আসিল। দক্ষিণ দিকের বারান্দা ঘুরিয়া ছাদে উঠিবার ঘুরানাে লােহার সিড়ির পাঁচীলটার গায়ে গােটা কতক ঘুলঘুলী ছিল, পদ্ম আসিয়া তাহারই একটাতে মুখ বাড়াইয়া দেখিল, মুমূখের বাড়ীর ছােট্ট রান্নাঘরটাতে একটি অল্প বয়সী বউ আপনমনে হেঁট দীপালী হইয়া রুটি বেলিতেছে। বউটীর সহিত পদ্মার সম্প্রতি আলাপ হইয়াছে। পদ্মা যখন তখন এই ঘুলঘুলীটার ফাকে আসিয়া তার অতৃপ্ত দৃষ্টি মেলিয়া ছােট্ট সংসারটীর নিত্য নিয়মিত কাজগুলি দেখে। বাড়ীতে বউটি আর তার স্বামী:••তাদের দু'জনার প্রেম-প্রীতি অচ্ছেদ্য বঁধনে বাঁধিয়াছে একটি মাস ছয়েকের শিল্প। সংসারে বউটীর সাহায্য করিবার দ্বিতীয় লােক বলিয়া নাই, অথচ সে বেশ হাসিমুখে শিশুটীকে বুকে লইয়াই যাবতীয় কাজকৰ্ম্ম আনন্দের সঙ্গে করিয়া চলে। এই কাজ করাটুকুর পিছনে রহিয়াছে তার অগাধ স্বামীপ্রেম, আর অবিচলিত নিষ্ঠা, পৃথিবীর অন্য কোন খবরের সঙ্গে সে সম্পর্ক রাখেনা, রাখিতে চায় না। সে জানে শুধু তার স্বামী-আর ফুলের মত কোমল কচি সন্তানটীকে। দেখিয়া দেখিয়া পদ্মার আশা মিটেনা...সে ভাবে অমনি একটী ক্ষু সংসার সে যদি পাইত... অমনি স্বামী, অমনিই শিশু বুকের ভিতর হু হু করিয়া আগুণ জ্বলিয়া উঠিল... পদ্মা দেওয়ালে হেলান দিয়া দাত দিয়া সজোরে নিজের ঠোটটাকে চাপিয়া ধরিল, জীবনে-সে-ও তাে ওই মধুর স্বপ্ন দেখিত। খুড়ীমার সাজসজ্জা দেখিয়া সেও ভাবিত, তার যখন বিবাহ হইবে, তখন সেও সারাদিনের কাজকর্মের স্বল্প অবসরে কাঠের একখানি হাত-আয়না পাতিয়া চুল বাঁধিতে, বসিবে...পাশে থাকিবে সিদুর-কৌটা, ভিজা গামছা, হয়ত বা একটী শিশু, সাজ-সজ্জা সারিয়া সুন্দর একখানি সাড়ী পরিয়া সে একটা বিশেষ ব্যক্তির অপেক্ষায় অধীর-প্রতীক্ষা করিবে । তারপর ?•••কে আসিয়া তাহাকে বুকের ভিতর জড়াইয়া তার দুইটা சம் চুম্বনের স্নিগ্ধ-প্রলেপ... ৮১ দীপালী হু হু করিয়া খানিকটা জলাে-হাওয়া সহসা পদ্মার মুখে চোখে আসিয়া লাগিল। সৰ্ব্ব শরীর তার কেমন যেন শির শির করিয়া উঠিল । অন্ধকার, পুঞ্জীভূত অন্ধকারের ভিতর পদ্মা সেইখানেই নিশ্চল স্থানুর মত বসিয়া রহিল। হাত বাড়াইয়া সুইচটা টানিয়া সে যে বাতিটা জ্বালাইবে সে ইচ্ছাটুকুও তাহার ছিল না: কতক্ষণ কাটিল। অকস্মাৎ তীরের মত কাহার সুতীক্ষ কণ্ঠস্বর তাহার কানে আসিতেই সে নড়িয়া সােজা হইয়া বসিল। কান পাতিয়া গলাটা শুনিয়া সে চকিতে গায়ের উপর আঁচলটা টানিতে টানিতে সেই অন্ধকারেই দ্রুতপদে সিড়ি বাহিয়া নীচে নামিল। নিশ্চয়ই নীতিশ আসিয়াছে! ছি-ছি! পদ্মা এতক্ষণ নিজের ভাবেই মসগুল হইয়াছিল— এই অশ্রান্ত বারিধারা-মাথায় করিয়া যে ডাকিয়া ডাকিয়া সারা হইতেছে, তাহার কথা একটিবারও ভাবে নাই। এক ঝলক বৃষ্টির ঝাপটার সঙ্গে সঙ্গে অনন্ত ভিতরে ঢুকিয়া পদ্মকে কহিল—তুমি...পদ্মা,::নীতিশদা নেই?...বিশেষ দরকারে এসেছিলুম, প্রকাশের মেসটা ছাড়িয়ে দু’পা আসতে না আসতেই এমন ঝড়-বিষ্টি চেপে এলাে যে, কি করি তাই ভেবে পেলুম না, বাড়ীও তত আমার সামান্য পথ নয়, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট ছাড়িয়ে সেই বেলগেছের কাছাকাছি, •••তা হলে আমি চলি ! নীতিশদা নেই যখন... পদ্মা অনন্তর মুখের পানে চাহিয়া কহিলনা-ই বা তিনি রইলেন, তা বলে এই বিষ্টিজলে ভিজে সপসপে হয়ে কোথায় যাবেন আপনি? ওপরে আসুন, কাপড় জামা ছেড়ে চা টা খেয়ে শরীরটা একটু গরম করে নিন, নইলে সদ্য নিউমােনিয়া ধরবে। অনন্ত যেন কৃতার্থ হইয়া গেল। পদ্মার সঙ্গে আলাপ জমাইবার ৮২ দীপালী সে অনেক দিন আগে হইতেই সুরু করিয়াছিল, বাকপটু অনন্ত কন্তু এইখানে পরাজিত হইয়াছিল। পদ্মা তাহার অসংখ্য প্রশ্নের উত্তরে তুই একটী অতি প্রয়ােজনীয় কথা ছাড়া জবাব বড় একটা দিত না। অনন্তকে রীতিমত উপেক্ষা করিয়াই চলিত।•••আজ পদ্মার আগ্রহ দেখিয়া সে বেশ একটু বিস্মিতও হইয়াছিল, তবু সে সুযােগ ছাড়িল না—পদ্মার পছনে পিছনে চলিতে চলিতে কহিল—কিন্তু, এই একলা বাড়ীতে তুমি কোন্ ভরসায় আমাকে ওপরে যেতে বলছ পদ্মা? নীতিশদা যদি এসে পড়েন, তা হলে কি ভাববেন বল ত?... পদ্মা অনন্তর দিকে মুখ ফিরাইয়া সুবস্কিম জ্বযুগল আর ও বাঁকাইয়া কহিল-এলেনই বা তিনি, আমার চেয়ে আপনি কি তাকে কম চেনেন? আজ যদি আপনাকে এই অবস্থায় ফিরিয়ে দিই,--তহলে তার কাছেও কি আমার অপরাধ হবে না?... আপনি কুষ্ঠিত হচ্ছেন কেন? অন্যের চোখে আমি গলগ্রহ হয়ে থাকলেও, যার গলগ্রহ, তার কাছে আমি না চাইতেই পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে গেছি। দুনিয়ার সাধারণ মানুষের চেয়ে তিনি অনেক উচুতে। তা ছাড়া, এ বাড়ীতে তার চেয়ে আমার অধিকার একচুলও কম নয়। আপনি আসুন—রাত হয়েছে, হয় তো- কথাটা অসম্পূর্ণ রাখিয়াই পদ্মা হন্ করিয়া দুই চারিটা সিড়ি পার হইয়া উপরে উঠিতে লাগিল। অনন্ত মনে মনে একটু হাসিয়া, উঠিতে উঠিতে কহিল—সুন্দর মানুষের সবই সুন্দর। কিন্তু তােমার ধারণা নতান্ত অমূলক পদ্ম। লজ্জা কুণ্ঠা-ব'লে জিনিষগুলাে আমার কোষ্ঠিতেই লেখা নেই...বেশ তাে,—চল একটু তােমার হাতের গরম চা খেয়ে শরীরটাকে তাজা করে নিই।

দীপালী ঘরে ঢুকিয়া পদ্মা কহিল—একটু দাড়ান, এক মিনিট, আমি । থেকে আপনার জন্যে ধুতি আর একটা শার্ট খুজে আনি। আনা হইতে নীতিশের ব্যবহৃত একটা হাতে কেঁাচানন ধুতি, আর একটা খদ্দরের পাঞ্জাবী টানিয়া লইয়া পদ্মা আসিয়া অনন্তর হাতে ধুতি দিয়া কহিল—আপনি কাপড় ছাড়ুন, মামি ততক্ষণ ততক্ষণ গ্লোভ, ধরাই। পদ্মা ষ্টোভ, টানিয়া লইয়া জ্বালাইতে বসিল। স্মৃতি তার অন্তরকে আর একবার তীব্র দংশন করিল—এই ষ্টোভ, পরাগাের তুচ্ছ ব্যাপারটু। আজিও সে ভুলে নাই, দাত দিয়া সজোরে ঠোট কামড়াইয়া পদ্মা চ তৈরী করিতে লাগিল। এক পেয়ালা চা খাইয়া অনন্ত সােফাটার উপরে চাপিয়া বসিয়া কহি --নীতিশদা কোথা গেছেন, পদ্মা ? পদ্মা অন্যমনস্ক হইয়া উত্তর দিল-মিস্ বােসের জন্মদিনের নেমন্তন্ন রাখতে গেছেন। অনন্ত হাসিয়া কহিল—মানুষের কী মন! মিস বােস, মানে সেই দীপালী বলে মেয়েটা তাে ? দেখেছি তাকে...সে তো কালাে-“তারই এত শক্তি যে নীতিশ দা তােমার মত পদ্মা অধীর কণ্ঠে বাধা দিয়া কহিল—ও সব কথা নাই বা তুললেন অনন্ত বাবু!••আপনার আর কিছুর দরকার থাকে তাে বলুন...কিছু খাবার টাবার- অনন্ত পদ্মার দিকে ফিরিয়া বসিল। পদ্মার যৌবনদৃপ্ত সুকোমল দেহলতার পানে লালসা-ভরা দৃষ্টি মেলিয়া কহিল—খাবার ?—নাঃ- মিথ্যে আর তােমাকে কষ্ট দেব না পদ্মা, ওতে আমার কষ্ট হবে। ৮৪ দীপালী কন্তু আমি ভাবছি তােমার মত সুন্দর মেয়েকেও নীতিশা উপেক্ষ। করে ? রাগ করােনা পদ্মা, সত্যিই তুমি বড় সুন্দর...সত্যি তােমাকে খেতে আমার বড় ভাল লাগে, সাহস করে এতদিন নােকে কোন খ। বলিনি, বলতে ভয় করত, তাছাড়া বলবার মত এমন দীর্ঘ অবসর কোনদিন অদৃষ্টে জোটেনি। কিন্তু আজ সত্যই বলছি পদ্মা, তেত্রিশ কোটী দেবতার শপথ নিয়ে বলছি,--আমার কথায় রাগ করেনা, নো—তােমাকে যদি আমার সারা জীবনের সঙ্গিনী রূপে পেতুম— সহসা পদ্ম অস্ফুট একটা আর্তনাদ করিয়াই, পিছু হটিয়া সতেজ অথচ কম্পিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল—এসব কী বলছেন অনবার ?--আপনি কি আজ আমাকে অপমান করতে এসেছেন? অনন্ত তখন পদ্মার পদ্মমুখের অধর-সুধা পানেচ্ছায় উন্মত্ত হইয়া উঠিয়াছে। বিনাইয়া বিনাইয়া অভিনয়ের ভঙ্গীতে বলিতে লাগিল-- প, শুনতে পাচ্ছনা কি, পৃথিবীর আজ কী দারুণ মন্ততা, সমস্ত ধরণীর কেও আজ বুঝি এমনিই ব্যর্থ কামনার বেদনার রােল সহসা আকাশে- বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। ঝােড়ো হাওয়াও তারই ক্ষুব্ধ শ্বাস...এমনি ঝড়ের রাতে এক গাছের লতা ছিটকে যদি আর এক গাছের লতার সঙ্গেই জড়িয়ে যায়, তাহলে সে অঘটন ঘটাবার জন্যে দায়ী প্রলয় রাতের খাতুনী, তুমি আমি নই, এমন দিনে আমায় তুমি বঞ্চিত করােনা পদ্মা- পদ্মা ফিরিয়া দাড়াইয়া উত্তেজিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল—আজ স্বয়ং ভগবানও যদি এসে আপনাকে আশ্রয় দিতে বলেন, আমি তার আদেশ অমান্য করবে!—আপনি এই মুহূর্তে চলে যান। এক অসহায় স্ত্রীলােক পেয়ে আপনি আমাকে অপমান করবার সাহস পেয়েছেন বটে, কিন্তু মনে ৮৫ দীপালী রাখবেন—একদিন নারীত্বের মর্যাদা রাখতে আমি কোনাে বাধাকেই বাধা বলে স্বীকার করিনি। অতিথি হয়ে এসে ছিলেন,—সংকারের টী রাখিনি, কিন্তু অতিথির অপমানের অপরাধ থেকে আজ আপনি আমায় অব্যাহতি দিয়ে যান !—উঠুন- অনন্ত সহজে দমিবার ছেলে নয়। কণ্ঠস্বর যথাশক্তি মােলায়েম করিয়া বলিল—অপমান-ভৎসনা-লাঞ্ছনা—সব তােমার ফুলের মাল হয়ে আমার কণ্ঠের ভূষণ হােক পদ্মা ! তুমি আমায় চরণে ঠেলােনা। পদ্মা আর কোনপ্রকারেই ধৈৰ্য্য রক্ষা করিতে পারে না যেন। একবার ইচ্ছা হইল—চায়ের ডিস-কাপগুলা ছুড়িয়া ঐ কুকুরের মত ঘৃণ্য পশুটার আস্তাকুঁড়ের মত মুখখানা কাটিয়া ছিড়িয়া দেয়, কিন্তু এই নিশীথরাত্রে নিভৃত রক্ষীহীন জনশূন্য কক্ষে আপনার অসহায়তা অনুমান করিয়া দে এতখানি অগ্রসর হইতে পারিল না। বাহিরে তখন প্রকৃতির তাণ্ডবলীল। সমানে চলিয়াছে ; পৃথিবীর মর্মকথা-ঝড়ের বেগে উধাও হইয়া সীম- হীন কোন্ দূর দিগন্তে গুমরিয়া আৰ্তনাদ করিতেছে, বাদল-রাতের বেদনা বহিয়া দাদুরীর কণ্ঠে উচ্ছাস ধ্বনিয়া উঠিয়াছে ! কিন্তু সবই হয়তাে পদ্মার কল্পনা ! লৌহনিগড়বদ্ধ কলিকাতার বুকে কোথায় কি ? —কেবল বৈদ্যুতিক তীব্র আলােটার প্রখর ঔজ্জ্বল্যে শয়তানের মূর্তিটাই আজ ভয়াল হইয়া তাহাকে ভয় দেখাইতে চায় । সুনিপুণ নটের মত অনন্ত কাপিয়া কঁপিয়া মধুর স্বরে পুনরায় কহিল—পদ্ম, কিসের অভাব তােমার ? তুমি আমার হও, আমি তােমাকে বুকের রাণী, মাথার মণি করে রেখে দেব। তােমার এমন বয়স, এমন যৌবন, কার জন্যে পদ্মা তুমি নিজেকে সন্ন্যাসিনী করে তুলছিলে ? নীতিশ দা কি মানুষ? ভােগের সময় যদি পরিপূর্ণভাবে জীবনটাকে দীপালী ভাৈগই না করে নিলে, তাহ'লে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিলে কিসের জন্যে? এই রূপ, এই যৌবন কি শুকিয়ে মরে যাবে তবে? পদ্মা, একটা অনুরােধ আমার রাখবে ? পদ্মা সহসা তীব্রকণ্ঠে চীংকার করিয়া উঠিল—ভজুয়া—বামা!- অনন্তর কাণে এই চীৎকার বজ্রের শব্দ অপেক্ষাও ভীষণ শােনাইল। উঠিয়া পদ্মার পায়ে ধরিয়া মার্জনা চাহিবে, না ঐ ফুলের মত কোমল -মাধবীলতার মত মৃদু-বাতকম্পিত তনুলত বুকে জড়াইয়া, স্থলপদ্মের পাপড়ীর মত চারু-ওষ্ঠে চুম্বন-রেখা আঁকিয়া দিবে—ভাবিয়াই সে ঠিক করিতে পারিল না। অবাক হতভম্বের মত একান্ত অপ্রতিভভাবে পদ্মার বিদ্যুৎ-শিখার ন্যায় জ্বলন্ত চাহনির দিকে চোখ রাখিতে গিয়াই সে দৃষ্টি নত করিয়া ফেলিল। কিন্তু পুনরায় মুখ তুলিতেই দেখিতে পাইল, থরথর-কম্পিত পদ্মার ক্ষীণদেহ ভূমে লুটাইতেছে! মূচ্ছিতা সে। চোর চুরি করিতে আসিয়া ধরা পড়িবার আভাষ পাইয়াই যেমন চোরাই মাল পরিত্যাগ করিয়া প্রাণভুয়ে দূরে পলাইতে চায়—অনন্ত ঠিক সেইরূপই ভীতভাবে ঘর ছাড়িয়া দ্রুত নীচের দিকে নামিয়া গেল। মূচ্ছিতা পদ্মার পরিণাম ভাবিয়া দেখিবার মত সংসাহস তাহার একেবারেই ছিল না তখন। ক্ষ ঝড় ওঠে ঝড় থামিয়াও যায়, কিন্তু প্রকৃতির শােভন অঙ্গে তার মাতামাতির যে কালাে কালাে দাগগুলি ফুটিয়া উঠে—সে চিহ্ন তাে সহজে মুছে না: শেষ রাত্রি। ঝড়ের সে কলরােল থামিয়া গিয়াছে। পদ্মা মাটীতে ৮৭ দীপালী মুখ গুজিয়া সারারাত্রি একই ভাবে কাটাইয়াছে। নীতিশের মােটমের হর্ণের শব্দে সচকিত হইয়া সে যখন মাথা তুলিল তখন দিবসের আলাে রাত্রির সকল মলিনতা মুছিয়া দেবতার আশীর্বাদের মতই ঘরে আসিয়া লুটাইয়া পড়িয়াছে। কালরাত্রির অবসান হইয়াছে, প্রভাত তাহার বিচিত্র আনন্দসম্ভারে পরিপূর্ণ ডালিখানি লইয়া নিত্যকারের মতই হাসিমুখে বিশ্বের অঙ্গনে আসিয়া দাড়াইয়াছে, পদ্মা আজ কি বলিয়া তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া লইবে...? ঝড় তো শুধু প্রকৃতির সকল সুষমা হরণ করিয়া ক্ষান্ত হয় নাই— একটা রাত্রির কালবৈশাখীর ঝড়—ওই সহায়-সম্বলহীন মেয়েটীর মাথার উপর দিয়া বহিয়া গিয়াছে যে... ৮৮ বালীগঞ্জের পথে নীতিশ

No text on this page.

এরো বালীগঞ্জে সেদিন উৎসব তেমনি জমিল না। আম ৪ধারার চনা দেখিয়া অধিকাংশ নিমন্ত্রিতেরাই সন্ধ্যার আগেই বিয়ে হইল। কেবল যাই যাই করিয়া রহিয়া গেল নীতিশ, ইরা, ইরার স্বামী সলিল রায়, আর বিমান। পিয়ানাের মৃদু-গম্ভীর আওয়াজের সাথে আপনার কোমল কণ্ঠ মিশাইয়া দীপালী দুই একখানা ফরমাস মত গান গাহিয়া ইরাকে ইসারায় ডাকিয়া সকলের অলক্ষ্যে চুপি চুপি কহিল—তুমি এবার রেহাই দাও ভাই আমায়, আমি এত বাঁধাধরার মধ্যে থাকতে পারিনি, ওদিকে কি হচ্ছে না হচ্ছে সমস্ত দেখাশুনো না করলে মায়া বৌদি একা পেরে উঠবে না। লক্ষ্মীটি, তুমি এই মিউজিক-টুলটায় চেপে বসো..হা এবার গান ধরাে, আমি যাই...| দীপালীর আঁচলটায় টান দিয়া ইরা মুখ টিপিয়া হাসিয়া কহিল—অত কৈফিয়তে দরকার কি ভাই, বল না কেন, নীতিশবাবুর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলা হয় নি বলে বুকের ভেতর ছটফটিয়ে উঠেছে !..বাঃ কী মুখ- টেপা মেয়ে ভাই তুমি, এত ভালবাসা হয় নীতিশবাবুকে, অথচ কেউ জিগ্যেস করতে গেলেই ভুরু-কুঁচকে বলা হবে—‘ভালবাসা-টাস। আমার আসে না- দীপালী ইরার মুখে নরম হাতখানি চাপা দিয়া মৃদু হাসিয়া কহিল- ভারী ভালবাসার কদর শিখেচিস যে ইরা, দু’দিন বিয়ে করতে না করতেই সবার মনের খবর আঁচে বুঝে নিতে শিখেচিস? ভাল যদি বাসতে হয়, ৮১ দীপালী তাহলে নীতিশকেই বাসব তাতে তাের সঙ্গে লুকোচুরি করবাে কেন? ছাড় ভাই, রান্নাঘরের দিকে একবার না গেলে পুডিং ফুডিং সব মাটী করবে ওরা। ইরা হাসিয়া দীপালীর আঁচলটা ছাড়িয়া দিল। পিয়ানাের রীডগুলিতে চাপার কলির মত আঙুল দিয়া আপন মনে একটা ইংরাজী গানের সুর বাজাইয়া ইরা মধুর সুরে গান ধরিল “তুমি সন্ধ্যার মেঘ শান্ত সুর আমারি সাধের সাধনা... দূরে একটা টেবিলের উপর শ্রান্ত ভাবে মাথা রাখিয়া নীতিশ চক্ষু মুদিয়া পড়িয়া ছিল, অকস্মাৎ পিঠের উপর একখানি কোমল করতলের মৃদু-স্পর্শ অনুভব করিয়া চমকিয়া ফিরিয়া দেখিল...দীপালী...তাহার কামনার ধন দীপালী অতি সন্নিকটে দাড়াইয়া.. ইরা তখন গানের দ্বিতীয় চরণ ধরিয়াছে- “আমি আপন মনের মাধুরী মিশায়ে তােমারে করেছি রচনা:••| নীতিশ দীপালীর প্রশান্ত মুখের পানে তাকাইয়া ছােট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া কহিল—ব’সাে। দীপালী বসিল। নীতিশের ডান হাতখানি আস্তে আস্তে নাড়িতে নাড়িতে স্নিগ্ধ কণ্ঠে কহিল-নীতিশ, তােমার শরীর বােধহয় আজ ভাল বােধ হচ্ছে না? মুখ চোখ যেন অতিরিক্ত শুক্ননা দেখাচ্ছে, তােমার কি অসুখ কচ্ছে ? দীপালীর দুই চোখে ব্যাকুলতা...স্বরে তারই মৃদু আভাষ।••• নীতিশ ম্লান হাসি হাসিয়া কহিলনা দীপা, অসুখ নয়, তবে দীপালী . . শরীর যে খুব ভাল ঠেকছে তা নয়, মাথাটা সামান্য ধরেচে যেন। কিন্তু তুমি তাে বেশ গাচ্ছিলে দীপা, তুমি উঠে এলে কেন? দীপালী নীতিশের পানে পূর্ণদৃষ্টি মেলিয়া কহিল—কেন ইরা তাে সুর গাচ্ছে। ওর গলা বােধ হয় আমার থেকে আরও মিষ্টি, তােমার ভাল লাগছে না ওর গান ?...না নীতিশ তােমাকে আজ বডড বেশী শ্রান্ত দেখাচ্ছে•••এত আলো, লােকনের গণ্ডগােলে তােমার মাথাধরা হয়ত আরও বাড়তে পারে—তুমি একটু ফঁাকায় চল, কেমন ? দীপালী নীতিশের হাত দুইখানি ধরিয়া মৃদু অনুযােগের সহিত কহিল। নীতিশ সে অনুযােগ এড়াইতে পারিল না। দুজনে উঠিয়া বাহিরের ঘেরা বারান্দায় দুইখান। বেতের চেয়ার টানিয়া মুখােমুখি হইয়া বসিল। দু’জনের বুকের ভিতরে কথার সাগর কেনাইয়া উঠিতেছিল, কিন্তু বাহিরে দু’জনেই নীরব। সুমুখের বাগানে অজস্র ফুল ফুটিয়াছে, তাহার-ই ঘন-সৌরভ বাদল-বাতাসে ভাসিয়; বেছাইতেছিল। ইরার গান তখনও কানে আসিতেছে— “তুমি আমারি, তুমি আমারি, মম শূন্য হৃদয় বিহারী...” পরিপূর্ণ নীরবতায় দু’জনার হৃদয় পরস্পরকে যেন বড় কাছাকাছি পাইয়াছিল। অন্তরের ভাব যখন ঘন হইয়া উঠে, বাহিরে তখন বাণী ফোটে না। ইরার সুর মৃদু হইয়া ক্রমশঃ যখন থামিয়া আসিতেছে, দীপালী তখন কহিল—আচ্ছা নীতিশ, মনীশ গুপ্তকে তুমি দেখেছ..সেই যে বিমানদার পাশে বসে ছিল, চোখে চশমালদা মত...বেশ স্মার্ট ? বেচারী:..

দীপালী সে আজ আমাকে এক গােছ রাঙা গােলাপের তােড় উপহার দিয়ে বললে—“আমার অনুরাগের রঙে রাঙা এ গােলাপ তােমায় উপহার দিয়ে ধন্য হলুম...আমার দান গ্রহণ কোরে কৃতার্থ করে দেবী...” আমার তখন এত হাসি পেয়েছিল নীতিশ, আর একটু হলেই আমি হেসে ফেলতুম, আর বেচারী অপ্রতিভের শেষ হতে.••ভাগ্যিস দাদা এসে তাকে টেনিস্ খেলতে ডাকলেন ...আচ্ছা নীতিশ, মন তাে ভগবান একটা মাত্রই দিয়েছেন, স্তাবকের দল তাে দেখি অসংখ্য, সবাই তত আজ উপহার দেবার সময় বিনীত ভাষায় নিজের মনােভাব জানিয়ে গেলেন•••এখন কার ওপর প্রসন্ন হব বল তো? তুমি তো আমার বন্ধু, তােমার কাছে পরামর্শ চাই... দীপালী হাসিয়া নীতিশের কাধের উপর হাত রাখিল। শুধু বন্ধু আর বন্ধু, দীপালী চাহে নীতিরে বন্ধুত্ব।••••••তুচ্ছ- শুনাে বন্ধুত্বের প্রীতির বিনিময়ে সে তার হৃদয়ের কোন মহামূল্য রত্ন যে অপহরণ করিয়া নিয়াছে—সে খবর কি দীপালী রাখে? বন্ধুত্ব ততা সবার কাছেই পাওয়া যায়, দীপালীর বন্ধু ইরা, সেও তত তাহার বন্ধু: নীতিশ তত দীপালীর বন্ধুত্ব কামনা করে-না, তার চেয়ে আরও, আরও বেশী কিছু চায়, তার তৃষ্ণাতুর প্রাণ দীপালীর প্রেমের অভিলাষী, কিন্তু ওই রহস্যময়ী নারী নীতিশের অন্তরকে যখন তখন বেদনার আঘাতে জর্জরিত করিয়া চাহে বন্ধুত্ব! মানুষের প্রাণ কি চায় -কিসের কামনায় ব্যাকুল হইয়া উঠে ও তাহা বুঝিতে চেষ্টা করে না, হাসিয়া উড়াইয়া দেয়—ভাবে সে বিজয়িনী...কিন্তু দিন কি উহার একদিন আসিবে না: নীতিশের এই মর্মবেদনা ও কি একদিনও আপনার অন্তর দিয়া গ্রহণ করিবে না..?••• ৩ দীপালী ব্যর্থ-নিরাশ প্রহরগুলি প্রতি মুহূর্তের পদধ্বনি শুনিয়াই অবসান হইয়া যাইবে ?••••প্রথম যৌবনে সকল মানুষের চিত্তই এক অনাগত অপূর্ব সুখ-কল্পনায় বিভোর হইয়া থাকে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রের একটানা ভীড়ের মাঝে নীতিশের তরুণ মন কোথায় হারাইয়া গিয়াছিল, প্রথম যখন নয়ন মেলিল, তখন দীপাণীর শ্যামস্নিগ্ধ মনােহর কাঙি তার অবসন্ন প্রাণ-মনে যেন সোনার কাঠির পরশ বুলাইয়া দিল-মানসীর মােহন স্পর্শে তার ক্ষীণ-মৰ্ম্মসায়রে প্রেমের শতদল অকস্মাৎ রঙীন পাপড় মেলিয়া বিকশিত হইয়া উঠিল। শয়নে-জাগরণে সে তার মৃর্তি ধ্যান করিয়া কাটাইত, তার তরুণ মন তাহাকে ঘিরিয়া নব নব স্বপ্ন রচনা করিয়া কিরিত...সমস্ত বিশ্বের মাঝে সে একমাত্র প্রাণ ভরিয়া ভালবাসিয়াছিল দীপালীকে কিন্তু দীপালী: তাহাকে সে তো আজিও বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছে : ধরা দিয়াও সে ধরা দেয় না.••এ কী রহস্য তার, এ কী হেঁয়ালী ? আপনা হইতে সে আপনার চারিধারে এক মায়াজাল রচনা করিয়া, আপনাকে আপনি সৃষ্টি করিয়া বসিয়া আছে, তাহাকে তাে আয়ত্ব কর। যায় না শুধু চোখের দেখা... শুধু চোখের দেখায় কি প্রাণের ক্ষুধা মিটে... নীতিশ আজ মরীয়া হইয়াছিল । দীপালীর কথার উত্তরে সে সহসা বলিয়া ফেলিল-দীপা, শুধু বন্ধুত্বের আদান প্রদান ছাড়া তােমার কাছে আমি কি আর কিছুই দাবী করতে পারি না? মানুষের প্রাণ নিয়ে এমন রহস্য কর কেন তুমি ? কেন তুমি আমাকে এমন করে দূরে সরিয়ে রেখেচ•••আমি তােমার বন্ধুত্ব চাই না—তুমি ফিরিয়ে নাও •••আমাকে তুমি মুক্তি দাও.•• দীপালী দীপালী বিস্মিত হইল। নীতিশকে সে বরাবর সংযমী স্বল্পভাষী, বলিয়াই জানিত, নীতিশকে সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করিত, আজ সেই নীতিশের মুখে অসংলগ্ন কথা শুনিয়া সে চিন্তিত হইল, সে শুধু ভাবিল —মানুষ মানুষই—মানুষ দেবতা নয়।... দীপালী নীতিশের পানে সংশয়পূর্ণ দৃষ্টিতে চাহিয়া কহিলনীতিশ তােমার কি হয়েছে? কেন তুমি এমনতর অসংযত হয়ে পড়ছে ? তােমার মাথায় এরকম উদ্ভট কল্পনা কে ঢুকিয়ে দিলে বল তাে? তুমি আমার বন্ধুত্ব চাও না তুমি আমার কাছ হতে মুক্তি পেতে চাও... কিন্তু কেন সে কথা কি জিগ্যেস করতে পারি ? এমন কি অপরাধ করেছি আমি নীতিশ, যে, যার জন্যে তুমি আজকের দিনে আমাবে এমন কোরে- দীপালীর কণ্ঠস্বর ক্ষোভে বেদনায় রুদ্ধ হইয়া আসিল। গলাটা ঝাড়িয়া সে নীতিশের হাতখানি কোলের উপর রাখিয়া কোমল মধুর কণ্ঠে কহিল—কি তুমি চাও নীতিশ, আমি তােমায় কতটুকু দিতে পারি ...কিসের যােগ্যতা আমার আছে বল ? নীতিশ দীপালীর করুণস্বরে অপ্রস্তুত হইয়া পড়িয়াছিল।•••ক্ষুব্ধ স্বরে সে কহিল—তুমি এমন কষ্ট পাবে জালে আমি কোন কথাই তুলতাম না দীপা, কিন্তু মনকে নিয়ে আমি আর পেরে উঠছিনা, আমাকে মাপ কোনাে তুমি।যােগ্যতা তােমার কতটুকু আছে নেই সে খপর আমি জানতে চাই না:••আমি যা চাই তুমি কি সেটুকু আমাকে দিতে পার না দীপ,? দীপালী অচঞ্চল স্বরে কহিল—বল, নীতিশ, আমার কাছে তুমি কি চাও'•••••? সত্যিই আমার বড় আশ্চৰ্য্য ঠেছে। তােমাকে ১৪

দীপালী
দেবার মত আমার কী আছে, তাই আমি জানিনা তবু বল তুমি
একবার
নীতিশ আবেগভরে কহিল—তুমি নিজে না জানতে পারাে, ফুল
যখন ফোটে—সে খবর তখন সে জানতে পারে না—যতক্ষণ না তার
মৃদু সৌরভ বাতাস এনে কানে কানে জানিয়ে দেয় দাপা,"এততেও তুমি
আমার মনের কথা বুঝতে পাচ্চোনা? আমি যে তােমাকেই চাই।
একেবারে আমার আপন কোরে একান্ত আপনার হতেও আপনার
কোরে নিতে চাই !..তুমি শুধু ইচ্ছে করলে আমাকে যে অমৃতের
অধিকারী করতে পারে কি জানাে না?
দীপালীর অন্তর যেন অবরুদ্ধ বেদনায় ভাঙ্গিয়া পড়িল । ঠিক
এমনিই যে হইবে, এই ধারণা সে আজ নীতিশের শুনে। মুখ, উদাস
দৃষ্টি দেখিয়াই ধরিতে পারিয়াছিল, পাছে সবার মুখেই তার মনের
চাঞ্চল্যটুকু ধরা পড়িয়া যায়, এই ভয়ে সে নীতিশকে টানিয়া আনিয়া
বাহিরে বসাইয়াছিল ।
দীপালীর নারী চিত্ত মমতার রসে সিক্ত হইয়া উঠিল। স্নিগ্ধ কয়ে
কহিল-নীতিশ, নিজেকে তুমি আর পাচজনের মতই শেষে এত সাধারণ
কোরে তুললে ! আমি যে তােমাকে আমারই মনের অনুরূপ ভেবে
বড় শান্তি পেতুম ! শেষে তুমিও, তুমিও নীতিশ তুচ্ছ একটা নারীকে
দেখে মনের গতিকে সংযত করে রাখতে পাল্লে না•••আমার এই
বন্ধুত্ব কি তােমার মােটেই বাঞ্ছনীয় নয় ?
নীতিশ বড় অধৈৰ্য্য ভাবেই কহিল-বলেছি তাে দীপা, শুধু তােমার
মামুলী বন্ধুত্বকে নিয়ে আর আমি থাকতে পারিনি•••এমন ভাবে কত
দিন নিজেকে সজাগ প্রহরী দিয়ে ঘিরে রাখব? এত জানাে দীপা, আর

দীপালী এটুকু বােঝবার ক্ষমতা নেই তােমার ! দুইটী পুরুষ, বা দুটী সমবয়সী নারীতে যে প্রীতির বাঁধন গড়ে তুলতে পারে, দু’টা তরুণ-তরুণীতে তা পারে না,•••একদিন না একদিন তাদের মনের সুপ্ত কামনা সকল দ্বিধা- দ্বন্দ্ব ঠেলে মাথা তুলে জেগে ওঠে। মানুষ ছাড়া আমরা তাে আর কিছু নই দীপা। দীপালী মাথা নাড়িয়া অধীর-চঞ্চল সুরে কহিল—তুমি বড় ভুল করছাে নীতিশ, মানুষ বলেই আমরা আরও বড় হতে চাই...তরুণ আর তরুণের বন্ধুত্বের মাঝে কামনা বা প্রেম আসে কেন?•••সে তো তুচ্ছ এই দেহটার জন্যেই.••এই দেহের আকর্ষণই তাদের বন্ধুত্বের প্রসারতার পক্ষে বিরাট বাধা হয়ে দাড়ায়।•••তখন ক্ষণিকের মােহ তাদের এত বেশী প্রবল হয়ে ওঠে যে, অনেক সময় তারা নামতে নামতে পা ফস্কে, একেবারে অতলে তলিয়ে যায়।•••পশু যারা তাদেরও একটা বাঁধাধরা নিয়ম আছে, কিন্তু মানুষ এত বেশী চঞ্চল যে, সময় সময় তারা স্থান-কাল-পাত্র সব ভুলে গিয়ে বােধ হয় পশু বৃত্তিকে ও ছাপিয়ে ওঠে•••কিন্তু যাক ওসব মানব-মনের আলােচনা অন্যদিনের জন্যে ভােলা থাক, নীতি, আজ তুমি আমার কাছে কেন এমন প্রার্থনা জানালে? তুমি কি জানােনা—আমি কি প্রতিজ্ঞায় বদ্ধ ? নীতিশ দীপালীর হাত দুইখানা সবলে চাপিয়া কহিল—প্রতিজ্ঞা কার কাছে তুমি পণে বদ্ধ দীপা? কি এমন কঠিন পণ নিজে নিজে বেছে নিয়েছ—এই বয়সে ? দীপালী মুখটা অন্যদিকে ঘুরাইয়া মৃদু স্বরে কহি-কারাে কাছে নয় নীতিশ, আমি নিজের কাছেই পণে বদ্ধ। দেশের এই দারুণ *:

দীপালী দুর্দিনে বিয়ে করে আর অযথা কাঙালের সংখ্যা বাড়াতে চাই না নীতিশ, সত্যিই আমি ভেবে রেখেচি, বিয়ে আমি কোনও দিনই কৰ্বোনা, আমি এমনি মুক্ত স্বাধীন থেকে যতটুকু পারি দেশের উপকার কোরে বেড়াব।••• নীতিশ কহিল—বিয়ের পরেও যে তুমি এমনি মুক্ত স্বাধীন থাকবে , এমন কথা তােমাকে কে বললে দীপা, তােমার স্বাধীনতায় আমি কোনদিনই হাত দিতে যাব না, বিয়ের পরেও তুমি এমনি স্বাধীন থেকেই দেশের কাজে নিজেকে সপে দিও, আমি বাধা দেব না। শুধু আমাকে অধিকার দাও—তােমাকে আপন করে নিতে।••• দীপালী খুব মিষ্টি গলায় কহিল—এখনও কি তুমি আপন বলে আমাকে পাওনি নীতি, এত কাছে তােমার রয়েচি, এমন অকুণ্ঠ ভাবে তােমার সঙ্গে মিশচি, তবু তােমার তৃপ্তি হচ্ছে না? রাগ করােনা নীতিশ, তাহলে আমাকে বাধ্য হয়েই বলতে হয় যে, তুমি আমার মনের খোজ রাখতে চাওনা, তুমি চাও আমার এই পরিপূর্ণ রক্তমাংসে গড়া—তুচ্ছ-অতি তুচ্ছ-দেহটাকে। কিন্তু তাহলে আমার মনে কি হবে জানাে? আমি ভাববাে যে, তুমি আমার মন যে কি আদর্শ বেছে নিয়েছে সে খপর নিলেনা, শুধু ডাকাতের মত আমার দেহের সৌন্দর্য্যে লুব্ধ হয়ে সর্বস্ব লুটে নিলে। তােমার আমার মনের মাঝে যদি এতবড় একটা ব্যবধান গড়ে ওঠে, তাহলে সমস্ত জীবনটা যে আমাদের বিশ্বদ হয়ে যাবে নীতিশ, কি নিয়ে আমরা সােণার সংসার গড়ে তুলব ? দীপালী নীতিশের মুখের পানে এমন ভাবে চাহিয়া রহিল যে, নীতিশ সে তীব্র অথচ আকুল দৃষ্টি সহিতে পারিল না—মাথাটা নত করিয়া সে বড় ব্যথিত সুরেই বলিয়া উঠিল—এতখানি অবিচার তুমি আমার ১৭ দীপালী ওপর করছ দীপা, তুমি কি আমায় এতদিনেও চিনতে পারােনি?.. তােমার অন্তরের সৌন্দৰ্য-ভিখারী আমি, তােমায় ভালবেসে আমি রিক্ত, দেহের ক্ষুধাই যদি আমার প্রবল হয়ে উঠতাে, তার পিপাসা তাে আমি অনেক দিন আগেই মেটাতে পারতুম। দীপা, আমি পশু নই যে তঙ্করের মত তােমার অনিচ্ছায় তােমার সর্বস্ব অপহরণ করে নেব, আমি তােমায় সত্যিই বড় ভালবাসি, ভালবাসি বলেই ভেবেছিলুম- আমার এই প্রেম একদিন না একদিন তােমার বিমুখ অন্তরকে আমার কাছে টেনে আনবে। কিন্তু বাতাসের গায়ে আমি ব্যর্থ প্রাসাদ রচনা করতে চেয়েছিলুম, তাই এতটুকু ভর সইলাে না-কল্পনার সৌধশীর্ষ আবার মাটীর ওপর ভেঙ্গে গুড়িয়ে পড়ে গেল।...ভেবেছিলুম-তুমি আমায় ভালবাস, কিন্তু•••••• নীতিশ অতি কষ্টে আপনাকে সংযত করিয়া নীরব হইল।•• নীতিশের প্রাণের বেদনা দীপালীর মর্মবীণার প্রতি তন্ত্রীতে মৃদুভাবে আঘাত করিয়া ঝ ঝন করিয়া বাজিয়া উঠিল। চকিতে দীপালী দুইহাতে মুখ ঢাকিয়া আৰ্ত্ত করুণ সুরে কহিয়া উঠিলনীতিশ, নীতি, কেন তুমি এমন সুরে কথা কইছ, কেন তুমি আমাকে এতটা হৃদয়হীনা ভাবছ? ছিলুম আমার মনের এ গুঢ় বেদনা কাউকে--না তােমাকেও জানাবােনা, কিন্তু তুমি আমায় আজ পাগল করে দিচ্ছ...তুমি তাে জানােনা—তােমায় আমি কত•••তােমার প্রেম আমাকে প্রতিনিয়ত কী প্রবল ভাবেই না আকর্ষণ করছে, তােমার জন্যে প্রতি মুহুর্তে আমি আমার সঙ্কল্পচ্যুত হয়ে পড়ছি: •••আমার আদর্শ আমার মন ভােমার মাঝে নিঃস্ব হয়ে মিলিয়ে যেতে চাইছে••তবু তুমি••• দীপালীর মত সংযত মেয়েরও দুটী চোখ আজ মনের-মানা ১৮ দীপালী মানিলনা, বাঁধ-ভাঙ্গা অশ্রু তার দুই কপােল ভাসাইয়া ঝরিতে লাগিল।••• নীতিশ অবাক হইয়া তার অশ্রুসিক্ত মুখের পানে চাহিয়া রহিল। দীপালীর চোখে জল ! কতবড় বেদনায় আৰ্ত্ত হইয়া সে যে লােক- চক্ষুর সুমুখে ধরা দিয়াছে নীতিশের বুঝিতে তাহা অনুমাত্রও বিলম্ব হইল না। সে সহসা আত্মবিস্মৃত হইল।••জগৎ, সংসার—সব ভুলিল, দুইহাতে সে দীপালীর অশ্রু-ভেজা মুখখানি চাপিয়া ধরিয়া আকুল হইয়া কহিল—কেন এত কষ্ট পাচ্ছ দীপ, এত যদি ভালবাস, তবে কেন নিজেকে এমন করে সর্বনেশে পূণের ফাসীতে বেঁধে মারতে চাচ্ছ ?..কাজ কি তােমার দেশের জন্যে মাথা ঘামিয়ে ! কাঙাল দেশের বিরাট ক্ষুধার অন্ন তুমি কতটুকু যােগাতে পাৰ্বে ? জীবনের এই প্রভাত- বেলায় তুমি যেন সৰ্বস্বহারা বিধবার মত ঘাটের কিনারায় তরী সাজিয়ে বসে আছ! তিলে তিলে এই মানসিক যন্ত্রনায় নিজের প্রাণটাকে দগ্ধে মারলেই কি তােমার অভীষ্ট পূর্ণ হবে ?•••তােমার বিধাতা কি তােমার বুকের রাঙা রক্তের অর্ঘ্য নেবার তরেই তােমাকে এই আলাে- হাসি-ভরা পৃথিবীতে নারীজন্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন? দীপালী ক্ষণিকের তরে নীতিশের বুকের পরে মাথাটা রাখিল, তারপর মুখ তুলিয়া আঁচল দিয়া চোখের জল মুছিয়া কম্পিত কণ্ঠে কহিলনা নীতিশ, আর বেশী আমার কাছে তুমি চেয়ােনা, আজ ততামাকে এত কথা বললুম শুধু অসংযত মনকে দাবিয়ে রাখতে না • পেরেই, আমাকে তুমি মাপ করাে, আমি আমার মনকে বড় বেশী উচু সুরে বেঁধেচি•••আমার আশা বড্ড বেশী, একবার বিয়ে করে তােমার পাশে গেলে আর আমি ফিরে আসতে পারবাে না,•••তােমার দীপালী সর্বজয়ী প্রেমই আমাকে তােমার মাঝে নিঃশেষ করে দেবে।••“আমি তােমায় ভালবাসি, এত ভাল পৃথিবীতে আর কেউ কাউকে বেসেচে কি-না জানিনা...কিন্তু আমায় তুমি এমন সুরে আর ডেকোনা নীতি, তােমার ডাকে আমি পাগল হয়ে যাই•••তুমি আজও যেমন আছ, এমনি বরাবর আমার পাশটীতে চির জীবনের সুখ-দুঃখের সমভাগী বন্ধু হয়ে থাক। আমাকে যুক্তি দিও, কিন্তু পথহারা করােনা...সমস্ত বিশ্বের ডাক আমায় ঘরে টিকতে দেবেনা, নীতিশ আমাকে মুক্তি দাও। দীপালীর চোখ দিয়া টস টস করিয়া আবার অশ্রু ঝরিল। নীতিশ দীপালীকে কোমল কণ্ঠে সান্ত্বনা দিয়া কহিল—তাই হবে দীপালী, এজন্যে আমি তােমার চলার পথের বন্ধু হয়েই থাকব, কিন্তু একটা ভিক্ষা আমার পূর্ণ করবে দীপা•••? জীবনের প্রথম ও শেষ একটা অনুরােধ শুধু এক কণা পাথেয় আমায় দীপালী নীতিশের বুকের কাছে সরিয়া আসিল, নীতিশ তার মানস-প্রতিমার অজ্ঞাত বৃষ্টি-জলে-ভিজা শ্বেত পদ্মের মত মুখখানি বারেকের তরে আপনার তৃষাতুর বুকে চাপিয়া ধীরে ধীরে মাথা নত করিয়া তার সিক্ত অধর পুটে একবার অতি সযতনে আপন তপ্ত ওষ্ঠ রাখিল। সাগরের প্রশান্ত নীলিমার বুকে উদার আকাশ-তল যেন নিঃশপে আসিয়া মিশিল । কালবৈশাখীর উন্মত্ত ঝা যখন প্রলয়ােচ্ছাসে পৃথিবীর বুকের উপর ঝাপাইয়া পড়িয়া সমস্ত প্রকৃতিকে লইয়া ছিনিমিনি খেলিতে দীপালী লাগিল,—বালীগঞ্জের নিমন্ত্রিতেরা তখন বাড়ী ফিরিবার আশায় জলাঞ্জলী দিয়া সে রাত্রির মত স্বপ্ন-সৌধেই ঘুমাইয়া কাটাইল।শুধু নীতিশ একা শুভ্র-কোমল বিছানার পরে অঙ্গ ঢালিয়া দিয়া বাতাসের আর্তনাদ শুনিতে শুনিতে শেষ কয়েকটা প্রহর জাগিয়া কাটাইয়া দিল।••• ঘড়িতে যখন চারিটা বাজিল, তখন ফোটা ফোটা বৃষ্টি পড়িলেও ঝড়ের মাতুনী থামিয়া আসিয়াছে...নীতিশ ছােট্ট একখানি শ্লিপ লিখিয়া টেবিলের পরে পেপার-ওয়েট চাপা দিয়া রাখিয়া বাহিরে আসিয়া ভিজিতে ভিজিতেই পথ চলিল:.....কতটা পথ এমনিই চলিয়া নীতিশ একখানা ট্যাক্সি দেখিয়া চাপিয়া বসিল।••• ১০১ বারাে বাড়ী ফিরিল যখন-তখন ভােরের আলাে দেখা দিয়াছে। মনিবকে দেখিয়া দাসদাসীরা কাজে লাগিল, চাকর আসিয়া কি চাই না চাই জানিয়া গেল—আসিল না শুধু পদ্মা। নীতিশ ভাবিল পদ্মার অভিমান হইয়াছে। মন তার পদ্মার প্রতি করুণ মমতায় ভরিয়া উঠিল। আহা বেচারী:..কাল সে তাহাকে একা ফেলিয়া চলিয়া গিয়াছিল, রাত্রির ঝঙ্কায় আসিতে পারে নাই...ছেলে- মানুষ, দারুণ অভিমানে সে বুঝি পণ করিয়াছে নীতিশের সঙ্গে আর কোনও দিন কথাই কহিবে না। নীতিশ মনে মনে হাসিয়া স্নান করিতে নামিয়া গেল। মন তার আজ বড় অন্যমনস্ক, নীতিশ থাকিয়া থাকিয়া কী যেন ভাবিতে লাগিল..কী যে তাহার অন্তগূঢ় মর্মবেদনা:দরদী প্রাণ নহিলে কে বুঝিবে..-নীতিশ তাই পদ্মার নারী-চিত্তের এতটুকু সমবেদনার শীতল- স্পর্শ খুঁজিয়া বেড়াইতেছিল...কিন্তু পদ্ম কই! বামা ঝী আসিয়া ঠাই করিয়া গেল, নীতিশ আসনে বসিয়া ভাবিল এইবার পদ্মা যেখানেই থাকুক না কেন আসিবেই, আহারের সময় পদ্ম তদারক না করিলে সেদিন তাহার খাওয়াই হইয়া উঠেনা। পদ্মা বলে, “ঠাকুরের যা রান্না, আর দেবার যা ছিরি, ওতে কি মানুষে খেয়ে পেট ভরে ? কিন্তু অবশেষে অন্নের থালা হাতে করিয়া মূৰ্ত্তিমান দ্রৌপদীর মত ঠাকুরই আসিয়া দর্শন দিল। নীতিশ ঠাকুরকে কহিল—দিদিমণি কোথায়?

দীপালী ঠাকুর একগাল হাসিয়া থালাটা নীতিশের সম্মুখে রাখিয়া কহিল- এজ্ঞে স্নানের ঘরে। নীতিশ আধ-সিদ্ধ ডালটা পাতে ঢলিয়া কহিল-এ ডাল খাওয়া যাবে না ঠাকুর, তুমি নিয়ে যাও,•••আজ বুঝি পদ্মদিদি তােমায় রান্না দেখিয়ে দেন নি-না? ঠাকুর মাথাটা চুলকাইতে চুলকাইতে কহিল—আজ্ঞে না, তিনি তাে এই উঠলেন। পদ্মা ঘর হইতে সমস্তই বুঝিতে পারিল, কান পাতিয়া শুনিল নীতিশ ঠাকুরকে তাহারই অনুপস্থিতির কারণ জিজ্ঞাসা করিতেছে। একবার পদ্মা ভাবিল, সে গিয়া আহারের স্থানে দাড়ায়, কিন্তু দারুণ অভিমানে তার বুক তখন কানায় কানায় ভরিয়া উঠিয়াছে !-কাল রাত্রে যদি নীতিশ অনুপস্থিত না থাকিত—তাহা হইলে সাধ্য কি সেই ঘেয়াে কুকুরটার••• দারুণ অভিমান-বেদনায় সহসা যেন তার সমস্ত অঙ্গ ব্যথিয়া উঠিল। -সে যাইবে না—এই তুচ্ছ জীবনটার জন্য অন্যের অনুকম্পা সে আর মাগিবে না। আজ সব চেয়ে বেশী অভিমান হইল—নীতিশের মায়ের উপর। কেন তিনি পদ্মকে এমন আশ্রয়ে রাখিয়া গেলেন। একটা নির্মম দয়ামায়াহীন—রূঢ় মানবের চরণাশ্রয়ের আশ্রিতা করিয়া । মানসিক যন্ত্রণায়' পদ্মা নিজের গলাটা দুইহাতে সবলে চাপিয়া নিপীড়ন করিতে লাগিল। কিন্তু মৃত্যু কি এত সহজে আসে ? যন্ত্রণা—সে যত বড় নিদারুণই হউক না কেন, আপনার কণ্ঠ রােধ a দীপালী করিয়া কেহ কখন মৃত্যু-দেবতাকে ডাকিয়া আনিতে পারে নাই। পদ্মাও পারিল না। দাতে দাত দিয়া পদ্মা বসিয়া বসিয়া গভীর চিন্তার মাঝে ডুবিয়া গেল।••• নিঃশব্দে অতি ধীরে ধীরে পদ্মা ঘরের খিল খুলিয়া স্নানের ঘরে গিয়া ঢুকিল।•••মাথার ভিতরটাতে যেনাে কে অনবরত লােহার হাতুড়ী দিয়া পিটিতেছে•••এত দারুণ যন্ত্রণা... ঘটি-ঘটি জল চৌবাচ্ছা হইতে তুলিয়া সে ক্রমান্বয়ে মাথাটার উপরে ঢালিতে লাগিল।..স্নান করিয়া সে যখন বাহির হইল, তখন পদ্মা যাহা ভয় করিয়াছিল তাহাই ঘটিল, সুমুখের উঠানে নীতিশ দাড়াইয়া মুখ ধুইতেছে। কী প্রশান্ত সহাস সুন্দর মুখশ্রী...! অথচ ওই..ওই...সুন্দর মুখই তাে পদ্মার জীবনে এত বড় অবিচারের তীক্ষ শেল হানিয়া দিয়াছে। ওই মােহন মুখের মধুর হাসিটুকুর তলাতেই তােল পদ্মা নিঃশেষে নিজেকে বিকাইয়া ফেলিয়াছে! পদ্মার বুকের প্রত্যেক খাঁজে খাঁজে নীতিশের ওই মনােহর কান্তি যে আজিও—এখনও কাটিয়া বসিয়া গিয়াছে।...কিন্তু ওই দেহ-মন•••ওই হাসি সে তত তার মত অভাগিনী সৌভাগ্য-বঞ্চিত নারীর জন্য বিধাতা সৃষ্টি করেন নাই।•••ও দেহ-মন যে দী-পা-লী-র। আজ তাহার এই বীভৎস অপমানের জন্য দায়ী ওই নির্মম, নিষ্ঠুর পুরুষ...যে অক্লেশে এক কাঙ্গালী তরুণীর অন্তরের স্বচ্ছ অনাবিল প্রেমের অর্ঘ্য অবহেলে প্রত্যাখ্যান করিয়া মুখ ফিরাইয়া চলিয়া গেছে। পদ্মার বুকে আরাে তীব্র অভিমানের জ্বালা মাথা তুলিয়া জাগিয়া উঠিল।••• ১০৪ দীপালী ঐ সুঠাম সুন্দর পুরুষটি, যাকে পদ্মা এ জীবনের ধ্রুবতারা ভাবিয়া রাখিয়াছে, সে তাে ইচ্ছা করিলেই এককণা—একবিন্দু প্রেম দিয়া পদ্মার বুভুক্ষু অন্তরের সমস্ত তৃষা মিটাইতে পারি..উহারই ইচ্ছায় তেল পদ্ম তাহার জীবনের গতিটাকে সুনিয়ন্ত্রিত করিয়া সুন্দর সহজ সত্যের পথে চালাইয়া লইয়া যাইতে পারিত। পাশের বাড়ীর ওই বউটির মতই তো সে আজ একখানি গৃহের সমুদয় ভার হাসিমুখে আপনার হাতে তুলিয়া লইয়া কল্যাণমন্ত্রী বধূ... হয়ত বা সন্তানের জননী হইতে পারিত। কিন্তু একজন পুরুষের এতটুকু কৃপাদৃষ্টির অভাবে বুঝি এমনি করিয়াই নারী-হৃদয়ের সমস্ত স্নেহ-প্রেম-মায়া-মমতা শুকাইয়া সীমাহারা মরুভূমি হইয়া যায়•••| না ফোটে ফুল,না ফলে ফল ! শুধু হাহা করিয়া অনন্ত-অনন্ত কাল ধরিয়া ঝড় তুলে•••নারী বুকের তপ্ত দীর্ঘশ্বাস...... পদ্ম সেখান হইতে আর এক-পা-ও নড়িতে পারিল না••••••পা দুইখানা সহসা যেন জমিয়া পাথর হইয়া উঠিয়াছে••• পদ্মাকে সহসা দেখিয়া নীতিশ কোমল কণ্ঠে কহিল—এতবেলা অবধি কি ঘুমুচ্ছিলে পদ্মা ? না শরীর খারাপ হয়েছে ? মুখ চোখ যে শুকিয়ে চুপসে গেছে...দেখি সরে এসে তাে তােমার হাতটা একবার দেখি। পদ্মা চাবুক খাইয়া যেন ছিটকাইয়া উঠিল। সনিঃশ্বাসে কহিল- আপনি কি আমাকে কুকুর পেয়েছেন নাকি?•••সারা রাতটা যে মানুষ কী করে কাটায় তার খোঁজ নেওয়া আবশ্যক মনে করেন নি...এখন সকালে এসে এ অনুগ্রহটুকু না-ই বা দেখালেন ! আপনার আশ্রিতা দীপালী বলে খুব সয়ে যাচ্ছি নীতিশ বাবু, কিন্তু মানুষের যে সইবার সীমা আছে, সব মানুষেরই তা বােঝা উচিত। পদ্ম আর উত্তরের অপেক্ষা করিল না, পাশ কাটাইয়া দালানে উঠিয়া দ্রুতপদে একেবারে আপনার শােবার ঘরে গিয়া দড়াম্ করিয়া দরজার খিলটা তুলিয়া দিল। নির্জন কক্ষতলে পড়িয়া পড়িয়া পদ্মা বুঝিল—তার চারিদিকে নামিয়া আসিতেছে এক নিচ্ছিদ্র অন্ধকার, সেই অন্ধকারের বিস্তীর্ণয় পদ্মা যেন ক্রমে ক্রমে উন্মত্ত সাগরের ঘুণীর মাঝে ছােট্ট একখানি হাল্কা নৌকার মত কেবলি পা খাইয়া মরিতেছে...হয়ত ডুবিবে...কিন্তু ডুবিয়া মরিবার ভয় এখন তাহার আর নাই...পৃথিবীর মানুষদের সে দেখিয়া লইয়াছে—এইবার অতল সাগরে তলাইয়া গিয়া দেখিবে—জগৎ বলিয়া যদি সেখানে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকে, তাহা হইলে সেখানকার মানব-মনের অনুভূতি কী? সারাটা দিন তার এমনি রুদ্ধ ঘরে নিরাহারেই কাটিয়া গেল। বিকালে নীতিশ আসিয়া অনুনয় করিয়া বাহির হইতেই কহিয়াছিল— পদ্ম, সমস্ত দিন অন্ন-জল স্পর্শ করলে না, কী যে তােমার মনে হয়েছে তাও কিছু বলে না..বড্ড জরুরী ডাক এসেছে- আমি বেরুচ্ছি পদ্মা, আমার ওপর রাগ-অভিমান করলেও মা’র কথাটা স্মরণ কোরে কিছু মুখে দিও.নইলে তাঁর আত্মা বড় ক্ষুব্ধ হবেন।••• নীতিশের ভারি জুতার শব্দটা ক্রমশঃ দূর হইতে যেনাে দূরান্তরে মিলাইয়া গেল। পদ্মার চোখে এবার সাত সাগরের জোয়ার যেন কুল ভাঙ্গিয়া হু-হু করিয়া ছুটিয়া আসিল। ১০৬ দীপালী . মামা-মা..মাতৃহারা সে, মা পাইয়াছিল...স্নেহবঞ্চিত নারী মাতৃস্নেহের বিমল ধারায় পরিতৃপ্ত হইয়া গিয়াছিল। অধিকার যার উপর যত বেশী অভিমান তার উপর তত বেশী কর। চলে—এ তথ্য পদ্মা জানিত না, তবু সে এটুকু সারা অন্তর দিয়াই বিশ্বাস করিত যে, পৃথিবীর মাঝে—এই আশ্রয়হীন নিৰ্বান্ধব পুরীর মাঝে—যার উপর সে অভিমান ভরা অবজ্ঞার ভাব দেখাইতে চলিয়াছে- সে-ই তাহার আপনার একান্তই অন্তরের। হয়তাে সে চাহিয়াছিল-নীতিশ কাছে বসিয়া দু’হাতে তার মলিন মুখখানি তুলিয়া জলভরা চোখদুটীর যাতনার বাণী পাঠ করিবে,—নিকটে —অতি নিকটে টানিয়া হয়তো বা–মুহুর্তে মুহূর্তে পদ্মা যার বিরাট প্রত্যাশা করে সেইটুকু প্ৰদান করিয়াই পদ্মকে পূর্ণ পরিতৃপ্তির মদির-রসে মাতাইয়া দিবে !...কিন্তু—কী—নিষ্ঠুর—কতবড় নির্মম অই নীতিশ ! নারীর অন্তর-ব্যথাকে রােগীর দেহের মতই নিষ্ঠুরভাবে অপােপচারের সীমায় টানিয়া আনে—এত তার সাহস-এতই অবহেলা । পদ্মা আর সহিতে পারিল না। জীবন সে ত্যাগ করিবে না, কিন্তু জীবন বাঁচাইবার জন্য এই নিছক লােক-দেখানাে দয়ালের ভয়াল আশ্রয় আর দু'হাত বাড়াইয়া যাজ্ঞা করিবে না—কিছুতেই ।••• নীতিশ চলিয়া যাইতেই পদ্ম৷ বাহিরে আসিয়া দাড়াইল !-পায়ের নীচে সমস্ত পৃথিবীটা তখন যেন দুলিতেছে ! সারাদিন অভুক্ত থাকিয়া, তাহার উপর মানসিক যন্ত্রণায় তার সমস্ত দেহ টলমল করিতেছিল, নির্ভর সে কাহার উপর করিবে? কে তাহার নির্ভরতার মূল্য রাখিবে—কেহই নাই...। ১০৭ দীপালী তার সব শূন্য: জগৎ শূন্য•••বিশ্ব শূন্য•••লক্ষ্যহারা পাখীটীর মতই, মন তাহার আর্তস্বরে কঁদিয়া কাঁদিয়া উঠিতেছিল। মা, বাপ, ভাই-বােন কেহ নাই তার,••এই বয়স তাহার, এই বয়সে কি সবই হারাইয়া যায়, এমন একজন তার আপন বলিতে কেহ থাকিল না...যে পদ্মাকে তার স্নেহপক্ষ-পুটের অন্তরালে ডাকিয়া লইবে? সমস্ত বিশ্বের মাঝে পদ্মার ঠাই এতটুকুও নাই...! কিন্তু এই ঘর, এই নিরাপদ আশ্রয় ত্যজিয়া সে থাকিবেই বা কোথায় ? এতক্ষণে আবার সে ভাবিল-নীতিশকে সে যে এখনও প্রাণ ভরিয়া ভালবাসের ছােট্ট বুকখানি ভরিয়া উঠিয়াছে নীতিশকে ভালবাসিয়া •••সে যে তার স্বর্বস্ব ধন••সে যে তার আরাধনার দেবতা এক কথায় তার সব—সবটুকুই যে ওই নীতিশ...। কিন্তু সে তার অগাধ প্রেমের অমর্যাদা করিয়াছে, অশিক্ষিতা গ্রাম্য বালিকার প্রেম সে একটা মুহূর্তের তরেও আদর করিয়া গ্রহণ করে নাই, সে ভালবাসে দীপালীকে—সে চাহে দীপালীর প্রেম না— —এই দীনতা আর সে সহিবে না!—অদৃষ্ট ছাড়া পথ নাই, আজ অদৃষ্টান্বেষনেই পদ্মা অচিন্ পথের যাত্রী সাজিবে !—কাজ নাই এখান- কার সােনার খাচা! পদ্ম আর ভাবিতে পারিল না। এত ভাবনা, এত ভার বহন করিবার শক্তি নাই—শক্তি নাই তার•• এই সুসজ্জিত গৃহতল, ওই শয্যা, নীতিশের কোমল অঙ্গের স্পর্শ- সুরভি যাহার প্রতি পরতে পরতে জড়ান, পদ্মা আর দেখিতে পাইবে •••এই ঘর, এই নিশ্চিন্ত আশ্রয় ছাড়িয়া পদ্মা আজ কোন্ লক্ষ্যহীন পথের উদ্দেশে পাড়ি দিবে যেখানে ভালবাসার অপমান, সেখানে পদ্মার ১০৮ দীপালী প্রাণ আর এক দণ্ডও টিকিতে পারিতেছে না..তাহাকে যে যেতেই হইবে। পথ অচেনা হউক । কিন্তু কোথায়? কোথায় সে যাইতেছে তাহা নিজেই জানেনা••• দুর্নিবার স্রোতের মাঝে তার জীবন-তরীখানি এতদিনে বুঝি অতলতলে ডুবিয়া মরিল ••ওই, ওইতো কে যেন বহুদূর হইতে হাতছানী দিয়া তাহাকে ডাকিতেছে—আয়...আ...আয়...! পদ্মার দুই চোখ ঝাপসা হইয়া উঠিল---সে মুচ্ছিত হইয়া শূন্য মেঝেটার কঠিন বুকেতেই লুটাইয়া পড়িল।

ভেৱ হঠাৎ কয়েকটা জরুরী কেস হাতে আসিয়া পড়াতে আলােক সেদিন পাটনায় চলিয়া গেল। দীপালীর শরীরটা সেদিন ভালো ছিল না বলিয়া সে বিকালে নিত্যকারের মত ইরাদের বাড়ী বেড়াইতে না গিয়া নিজের ঘরটিতে আসিয়া বসিয়া ছিল। জানালার নীচেই বাগানে কয়েকটা রজনীগন্ধার ঝড়...মৃদু মৃদু গন্ধ আসিয়া দীপালীর মনটাকে যেন ভারী করিয়া তুলিতেছিল কোলের উপর একখানি বই তার খােলাই পড়িয়া রহিয়াছে, পড়িতেও ভাল লাগে না.গত কয়েকটা মাস আগেকার কথা মনে করিতেও আজ তাহার ভারী লজ্জা করিতেছিল। যে মায়ার আচরণে ব্যথা পাইয়া সে একদিন গৃহত্যাগ করিবার সঙ্কল্প রাখিয়াছিল, আজ সেই মায়াই তার সুখ-দুঃখের একমাত্র সহচরী। মায়ার কাছে মনের কথা খুলিয়া না বলিলে তার সে রাত্রে চোখে যেন ঘুমই আসে না•••মায়া যেন নূতন রূপে দীপালীর চোখে ধরা দিয়াছে... সেদিনের সেই রূঢ় কথা কয়টা বলিয়া অবধি মায়ার মন অনুতাপে ভরিয়া গিয়াছিল। সে একটু অভিমানী, একটু মুখরা হইলেও স্বামীকে সে মনে মনে ভালই বাসিত। গত দিনের ব্যবহারে তার সদাপ্রফুল্ল স্বামীর মনে ও মুখে যে বেদনার ছাপ পড়িয়াছিল, মায়া তাহা আঁচ করিয়া অনুতপ্ত চিত্তে দীপালীর কাছে ক্ষমা চাহিয়াছিল। সেইদিন হইতেই মায়ার চরিত্র যেন মায়া বলেই দ্রুত পরিবর্তন হইয়া গেল। যেন আজনমের চিরসাথী-মায়া আর দীপালী:•• দীপালী সন্ধ্যার মৃদু অন্ধকার তখন রাত্রির তিমিরে ডুবিয়া গিয়াছিল। দীপালীকে তখনও পর্যন্ত এক ভাবে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া মায়া আসিয়া কহিল—আজ তাের কী হােল, দীপা•••••ঘর ছেড়ে যে একটীবারও বেরুলিন!..নীতিশ বাবুও তাে আজ এখনও এলেন না- কেন ভাই ? মায়া দীপালীর পাশের চেয়ার খানায় বসিয়া পড়িয়া দীপালীর গলাটা জড়াইয়া ধরিল। দীপালী বইখানি মুড়িয়া টেবিলে ফেলিয়া আলস্য-জড়িত কণ্ঠে কহিল —কি জানি, হয়ত কোথাও আটকে পড়েছেন...। শরীরটা বড় খারাপ ঠেচে মায়াদি,...পাখাটা ভাই বন্ধ করে দে— মায়া উঠিয়া পাখাটা বন্ধ করিয়া দীপালীর কাছে বসিয়া কহিল— দেখ ভাই, ননদকে তাে শুনি ‘রায়-বাঘিনী’ বলে, কিন্তু তুই ভাই মােটেই রায়-বাঘিনী নােস্, তুই বরং আমার মত বনের বাঘিনীকে বশ করে ফেলেছিস।•••••কিন্তু তাের মুখটা আজ অত শুকনাে দেখাচ্ছে কেন বল ত ? সত্যি কথা বলবি—একেবারে নিছক খাটি কথা শুনতে চাই। দীপালী হাসিয়া ফেলিল। কহিল—খাটি সত্যি কথাই তােকে বলব মায়াদি, কিন্তু তার আগে একটা কথা তােকে জিগ্যেস কৰ্ব্ব...আচ্ছা বল দেখি, পুরুষরা একটা সাধারণ মেয়ের জন্যে এত মাথা ধুড়ে মরে কেন? অবিশ্যি যাদের বিয়ে হয়ে গেছে তাদের কথা ধরছিনা•••যেমন ইরা—যেমন তুই...কিন্তু••• মায়া দীপালীকে বাধা দিয়া কহিল—সে সাধারণ মেয়েটা কে তা আমি বুঝতে পেরেছি দীপা,—কিন্তু পুরুষদের মধ্যে-কে-কে তার জন্যে দীপালী মাথা খুঁড়ে মরল...আগে বল শীগগীরনইলে আমার হাতে আজ তুই নিস্তার পাবিনে বলে দিলুম। দীপালী মুখটা ঘুরাইয়া কহিল-বলে যাচ্ছি শুনে নে—তারপরে কি কোরব তাের কাছে পরামর্শ নেব ।কাল ইরার বাড়ীর পার্টিতে গেছলুম জানিস তো? সেখানে ক্রমান্বয়ে চারটি ছেলে আমার কাছে ‘প্রপােজ, করে•••প্রথম, ইরার দাদা...দ্বিতীয় মিস্টার বাকচী...তৃতীয় সেই রবীন বাবু যিনি আমাদের দার্জিলিং যাবার সময়—পথের বন্ধু, চতুর্থ সেই চশমা-পরা ছেলেটী—আমার জন্মদিনের উৎসবের কথা স্মরণ কর,•••ভাই মায়াদি, এই সব ছেলেগুলাের জন্যে কি ব্যবস্থা করা যায় বল দেখি...? রূপকথার সেই ঘুমন্তপুরীর রাজকন্যা এক একটা—কি বল ? দীপালী খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। মায়া অতি কষ্টে হাসি চাপিয়া গম্ভীর হইবার বৃথা চেষ্টা করিতে করিতে বলিল—থা বাপু•••বেচারীদের কথাগুলাে আগে শুনতেই দে, পরে দাওয়াই বালাস, •••তাদের নিশ্চয়ই তুই প্রত্যাখ্যান করেছিস...! —নিশ্চয়ই। শেষের সেই বাবুটাকে বল্লাম—দেখুন, আপনার মনের ব্যথা আমি সমস্ত অন্তর দিয়েই গ্রহণ কোরলুম সত্য...কিন্তু শুধু বন্ধুত্ব টুকু ছাড়া আর আমি আপনাকে বেশী কিছু দিতে পারলুম না। জানেন তত আমার কি কঠিন পণ..? বেচারীর মুখ দেখলে তখন সত্যি সত্যিই কষ্ট হয় মায়াদি, এরা না জেনে শুনে কেন এমন কাজ করে বসে বল তাে? মায়া উদাস-কণ্ঠে কহিল-মন্দ কাজই বা তারা কোখানটায় করে শুনি ? ভালবাসা কি আর জেনে শুনে বাছবিচার কোরে হয়? যে যখন ভালবাসে এমনি করেই বেসে থাকে, তুই কি আর তা জানি না দীপালী রাক্ষুসা; আর যা করিস কর, কিন্তু আমার কাছে আর সত্যকে হাত- চাপা দিয়ে লুকিয়ে রাখিসনে,:--নীতিশ— দীপালী অসহিষ্ণুভাবে বলিল—নীতিশের নাম কচ্ছিস মায়াদি, কিন্তু নীতিশ তাদের চেয়েও কত উচুতে তা যদি জানতিস, আমার শুধু মুখের কথায় সে আমার বন্ধুত্বটুকুই শ্রেয় বলে মেনে নিয়েছে—কিন্তু এরা, তুই কি মনে কচ্ছিস, ওই চারটা একই সঙ্গে সমানভাবে প্রাণ ভরে ভালবাসে? মায় উত্তেজিত-কণ্ঠে কহিল—তােনার যে ঐ এক বেয়াড়া প্রতিজ্ঞা বাপু--:বিয়ে কোরবনা:-কেন, ওদের কথা না হয় ছেড়েই দিলুম,- নীতিশবাবুকেই বা তুই ওকথা বলতে গেলি কেন তাের জন্যে কি সব্বাই জ্বলেপুড়ে মরবে দীপ,? মানুষের জীবন, ঘরকন্না করবার তাে সাধ আহ্লাদ সকলেরই হয় ? দীপালী আরক্ত মুখে কহিল—হয় তত হােক না কেন, আমি কি তাদের ধরে রেখেছি? বল দেখি মায়ানি, এক দিন এক সঙ্গেই যদি চারটী ছেলে ছিনে জোকের মত একটা মেয়েকে প্রলুব্ধ করে বসে, তাহলে সে বেচারীর প্রাণ কণ্ঠাগত হয় কি না? বিয়ে করতে চায় তারা করুক না কেন, দেশে মেয়ের অভাব তত পড়েনি...আমার চেয়ে ঢের ভাল মেয়ে তারা ইচ্ছে করলেই পেতে পারে। আসল কথা কি জানিস মায়াদি, এই সব দেখে দেখেই বিয়েতে আমার বিতৃষ্ণা জেগেছে •• বিয়ে তাে সব্বাই কোরে থাকে, আমি না হয় নাই করলুম: সৃষ্টিছাড়া জগতছাড়া জীব আমি,•••কিন্তু এতগুলাে লােকের দীর্ঘশ্বাস আমি যেন আর সইতে পাচ্ছিনি••• আমাকে এবার কোলকাতা ছাড়তে হােল।••• মায়া এইবার রাগিয়া উঠিয়া কহিল—কোলকাতা ছাড়তে হােল, কোলকাতা ছেড়ে কোন্ লঙ্কায় যাবে শুনি? ১১৩ দীপালী দীপালী চেয়ারটায় হেলিয়া পড়িয়া কহিল—সত্যি ভাই, এ সব আমার মােটেই ভাল লাগে না:••মেয়েমানুষ বলে আমাদের যেন একটা স্বতন্ত্র ইচ্ছে থাকতে নেই..একধার থেকে ছেলেরা এসে ‘ভালবাসি’ ‘ভালবাসি বলে ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে, একবারও তারা ভেবে দেখবে আমরা তাদের ভালবাসা নিতে প্রস্তুত আছি কি না! দেখ, মায়াদি, —ভেবেছিলুম কাউকে এখন বলব না, কিন্তু না—তােকেই বলি, বােম্বতে একটা ভাল চাকরী খালি পেয়েছি—মনে কচ্ছি বােম্বেতেই আপাততঃ যাই—কি বলিস? মায়ার দুই চোখ বিস্ফারিত হইয়া উঠিল। অবাক হইয়া দীপালীর স্মিত মুখের পানে ক্ষণকাল চাহিয়া থাকিয়া উত্তর করিল, সত্যিই তুই কল্কাতা ছেড়ে চলে যাবি দীপা? কিন্তু নীতিশকে ছেড়ে তুই থাকতে পারবি?... দীপালী মায়ার বুকে মাথাটা রাখিয়া কহিল— মাথাটা রাখিয়া কহিল—ভালবাসা কি কপূরের মত খােলা জায়গায় রাখলে উপে যায় মায়াদি?•••দাদার যদি ফিরতে কিছুদিন দেরী হয়, তাহলে তুই তাকে ভুলে যাবি ?...মায়াদি, মনটাকে আমার খু-উ-ব শক্ত কোরে বেঁধে নিয়েছি বলেই, কালকে সেই একের পর একে চারটা ছেলের দীর্ঘশ্বাস আঁচলে করে কুড়িয়ে নিয়ে এসেছি। তােদের মত ভীরু মেয়ে হলে এ-বাড়ীতে আমার মাল্যদান উপলক্ষে আজ এতক্ষণ উৎসবের ফর্দ লিখতে বসে যেতিস.•• নীতিশকে আমি জানিরে—সে আমার একটা মুখের কথায় যুগ যুগান্ত প্রতীক্ষা করে বসে থাক পারে। একটা জীবন না হয় আমাদের এমনি প্রতীক্ষাতেই কেটে যাক না ভাই..বেশ একটু নতুন কিছু হবে। দীপালীর কণ্ঠ যেন ধরিয়া আসিতেছিল। গলা ঝাড়িয়া সে পুনরায় কহিল—যাদের মুখে ভগবান বলবার প্রচুর ক্ষমতা দেননি, অন্তরে ? ১১৪ দীপালী তাদের প্রেমের অনির্বাণ শিখা আজীবন জ্বলতে থাকে। নীতিশকে দেখেছিস কখনন—বাকচাতুরীতে আমাকে মুগ্ধ কোরতে? দীপালী থামিল। বাহিরে জুতার পদধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে নাতিশের পরিচিত কোমল কণ্ঠ বাজিয়া উঠিল—আসতে পারি দীপ,? নীতিশের কণ্ঠস্বরে চমকিয়া উভয়ে সংযত হইয়া বসিয়া একসঙ্গে উৎফুল্লস্বরে বলিয়া উঠিল—আসুন নীতিশ বাবু পর্দা সরাইয়া নীতিশ ঘরে ঢুকিয়া মায়াকে যুক্তকরে নমস্কার করিয়া কহিল—আজ আমি একটু বিশেষ কাজে আটকে পড়েছিলুম মিসেস বােস, আশা করি তার জন্য মাপ কোর্বেন। মায়া মৃদু হাসিয়া কহিল—বসুন নাতিশ বাবু, মাপ চাইছেন আমার কাছে, না আমার এই দজ্জাল ননদটীর কাছে বলুন তো? দীপালী মায়াকে গােপনে একটা চিমটী কাটিয়া কহিল—দ ডালপনা আবার তােমার সঙ্গে কখন করলুম বল ত?—দেখছ নীতিশ, মায়াদি খালি আমাকে চটিয়ে দিয়ে মজা দেখে..আচ্ছ! আমি কি খুব লক্ষ্মী মেয়ে না ? মায়া উঠিয়া দাড়াইয়া হাসিতে হাসিতে কহিল-হা তুমি ভারি লক্ষ্মী মেয়ে, তাই আমাদের ফেলে রেখে কোলকাতার বাইরে পালাবার জন্য মতলব আঁটছ। নীতিশ সাশ্চর্য্যে বলিয়া উঠিল—সত্যি নাকি মিসেস্ বােস—দীপু, কি কোলকাতা ছাড়ছে নাকি—কোথায়—কবে যাবে ?••• নীতিশের প্রফুল্ল মুখখানিতে বেদনার কালাে ছায়া মা যেন ঘনাইয়া আসিল। মায়া চলিতে চলিতে কহিল—শুনুন না ওরই মুখে, আমি দেখি...চা’র জলটা নিয়ে আসি ততক্ষণ। মায়া চকিতে অন্তর্হিত হইল। দীপালীর একখানি হাত কোলের দীপালী উপর তুলিয়া লইয়া নীতিশ ধীরে ধীরে ব্যথিত কণ্ঠে কহিল-দীপু, কেন তুমি এমন কোরে আমায় ফেলে পালাচ্ছ বলত? কোথায় যাওয়া ঠিক কোরেছ আমাকে বলবে না?••• দীপালী মৃদুকণ্ঠে কহিল—এখনও তত ঠিক হয়নি নীতিশ, তবে শীগগীরই যেখানে হােক যাব, যাবার আগে তােমাকে নিশ্চয়ই জানাব... তােমাকে না জানিয়ে কি আমি কখনাে কোন কাজ কোরেছি-তা বল ? নীতিশ ব্যাকুলস্বরে কহিলনা তা করনি বলেই তােমাকে জিগ্যেস কচ্ছি, আচ্ছা দীপ, এ জন্ম-ততা আমাদের এমনি ব্যর্থতায়ই কেটে গেল•••পরজন্মেও কি তােমাকে আমি আমার অতি নিকটে আমার পাশে পাশে পাব না:••এ জন্মের শেষ হবে কবে...? দীপা, যেখানেই যাও, যাওয়ার আগে আমাকে খপর দিতে ভুলবে না, এটুকু আশা দাও আমায়। দীপালী নীতিশের কাধের উপর হাত দুইখানি রাখিয়া আবেগভরে কহিলনা নীতিশ, না, তােমাকে আমি খপর দেবােই। তারপর সামান্যক্ষণ চিন্তা করিয়া জিজ্ঞাসা করিল—আচ্ছা আসচে শনিবার দিন বাগবাজারের ঘাটের ধারে সন্ধ্যের সময় তােমার দেখা পাব কি ? নীতিশ জ কুঞ্চিত করিয়া স্বল্পকাল ভাবিয়া উত্তর করিল—তা পাবে ...কিন্তু এত জায়গা থাকতে সেদিন ওখানে যেতে বলছ কেন দীপা সেদিন কি আমাকে তুমি কিছু বলবে? দীপালী রুদ্ধস্বরে কহিল..বলব—তুমি ঠিক যেও কিন্তু, ভুলােনা, অনেক কথাই আছে তােমাকে বলবার-বলব সেদিন তুমি আজ বড় আন্ত, চল খাবার-ঘরে চল, মায়াদি বােধ হয় এতক্ষণ চা-খাবার নিয়ে অপেক্ষা কোরছে: একটা ভারী নিঃশাস ফেলিয়া নীতিশ দীপালীর সঙ্গে বাহির হইয়া গেল।

চৌদ্দ শনিবারের বিকাল ।•••রােগী দেখিয়া নীতিশ তার ড্রাইভারকে বলিল —মােতন, তুমি গাড়ী নিয়ে বাড়ী ফিরে যাও, এই পথে আমার একটু কাজ আছে-সেরে যাব। মােতান্দ্রের নমস্কারের প্রত্যুত্তরে মাথাটা ঈষৎ হেলাইয়া একটু হাসিয়া নীতিশ আনমনে পথ চলিতে লাগিল। বাগবাজারের ঘাটের কাছে সে যখন পৌছাইল –তখন বেলাশেষের রক্ত-রবি সারা আকাশটার গায়ে মুঠ। মুঠা আবার ছড়াইয়া আস্তে আস্তে দিগন্তের বুকে হেলিয়া পড়িতেছে... দৃশ্যটা ভারি সুন্দর...উপভােগ্য।• নীতিশের চঞ্চল চিত্ত আলো- ছায়ার এই মােহন খেলায় আকৃষ্ট হইয়া পড়িল, সে ধীরে ধীরে সুখের রেল-লাইনটা পার হইয়া ঘাটের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিল। বাঁধানাে ঘাটের সিড়ি দিয়া নামিতে নামিতে সে দেখিল, জলের দিকে মুখ করিয়া একটী মহিলা বসিয়া আছে, এইখানে বসাটা সুশােভন হইবে কি না ভাবিয়া নীতিশ একধাপ সিড়ি বাহিয়া উপরে উঠিতেই মেয়েটি পিছন পানে ফিরিয়া কোমল-মধুর -কণ্ঠে কহিল-নীতিশ! সহসা নীতিশ পরিচিত মধুর সুর শুনিয়া বিস্ময়ে ফিরিয়া তাকাইয়া দেখিল দীপালী।••• নীতিশ ত্বরিতে নামিয়া আসিয়া দীপালীর একখানি হাত নিজের হাতের মধ্যে বন্দী করিয়া কহিল—দীপা। দীপালী নীতিশের পানে চাহিয়া হাসিল। বড় মধুর হাসি-কহিল ১১৭ দীপালী -তুমি এসেছ নীতিশ, তােমার সঙ্গে দেখা হল ভালই হল, নইলে আবার আমায় দোয়াত-কলমের সাহায্য নিতে হ'তাে•••বসােনা নীতিশ একটু দীপালী তার রুমালখানি সিড়ির উপর পাতিয়া কহিল—এইখানে ব’স নীতিশ, নইলে যে ধূলাে••• নীতিশ আঙুল দিয়া রুমালটাকে দেখাইয়া স্মিতমুখে কহিলরুমালটা কি অপরাধ করেছে, ওকে এমন নির্মম ভাবে ধূলাের উপর পেতে দিলে দীপা? তুমি তােল ওটা, আমি অমনিই বসছি। দীপালী মাথা নাড়িয়া কহিলনা নীতিশ, ব’স, এমন কিছু মহামূল্য জিনিষ নয়, ভয় নেই.•• নীতিশ অগত্যা বসিল। দীপালী তার পাশে বসিয়া সহসা নীতিশের দুইখানি হাত সবলে চাপিয়া ধরিয়া মৃদুস্বরে ডাকিল-নীতিশ, আমার কালকের চিঠিখানা পেয়েছিলে তাে ? দীপালীর স্পর্শে কী আরাম..হাত দুইখানি যেন টাটকা ফুলের মতই নরম, নীতিশ চোখ মুদিল।নীতিশ বিকলচিত্তে জড়িত-স্বরে কহিল পেয়েছি দীপ, কিন্তু তার অর্থ বুঝতে পারিনি পৃথিবী যেন ক্রমশঃ লুপ্ত হইয়া যাইতেছে:পরপার যেন তারই রঙের আভাস লাগিয়া রঙীন হইয়া উঠিয়াছে। নীতিশ বিহ্বল-সুরে ডাক দিল-দীপা ! দীপা মাথাটা নীচু করিয়া ভারি গলায় কহিল-কোলকাতা ছেড়ে কালই বম্বে যেতে হচ্ছে নীতিশ...কালকের মেলেই... নীতিশের চোখের সুমুখ হইতে সমস্ত আলাে যেন দপদপ করিয়া সহসা নিভিয়া গেল চারিদিকে গাঢ় অন্ধকার। ১১৮ দীপালী নীতিশ বাম্পার্জ-কণ্ঠে কহিল--এ দণ্ড কেন দীপা, আমি কি কোন অপরাধ কোরে ফেলেছি ? তাই কি—এই কথাটুকু জানাবার জন্যেই কি সেদিন আমায় ডেকে পাঠিয়েছিলে ? দীপালী অতিমাত্রায় ব্যগ্র হইয়া কহিল—না না নীতিশ, তুমি কেন অপরাধ কোরবে..তা নয়,তবে, জানােই তাে তুমি, যে কাজ আমি স্বেচ্ছায় বরণ কোরে নিয়েছি, সে কাজ সম্পূর্ণ কোরতে গেলে বালীগঞ্জের স্বপ্ন-সৌধে প্রচুর আরামের মধ্যে গা ভাসিয়ে থাকলে সফল হয় না। মানব-মনের বিচিত্র সুখ-দুঃখের অনুভূতির সঙ্গে যদি পরিচিত হতেই না পারলুম, তাহলে তাদের অভাব-অভিযােগ মেটাব কী দিয়ে? শুধু বম্বে নয়, আমাকে আরও অনেক জায়গায় ঘুরতে হবে নীতিশ•••ঘরের মায়া কেটে একবার বেরুতে পারলে হয়...তারপর.•• দীপালীর কথায় নীতিশের মুখ একেবারে শাদা হইয়া গেল। যেন নির্মম হস্তে তার মুখের সমস্ত রক্তটুকু নিঃশেষেই নিংড়াইয়া বাহির করিয়া লইয়াছে•••প্রকৃতির এই বর্ণ-সুষমার কোন সৌন্দৰ্যই আর নীতিশের নয়ন-মনকে লুব্ধ করিতে পারিল না—সে পাংশুমুখে দীপালীর পানে চাহিয়া আপনার দুরন্ত মনের আবেগকে অতিকষ্টে সংযত করিয়া ক্ষুব্ধ-কণ্ঠে শুধু কহিল-বেশ, তােমার মনের ইচ্ছাই পূর্ণ হােক দীপা। দীপালী কারতম্বরে কহিল—শুধু এই—এই কথাটুকু নীতিশ, আর আর কিছু বলবে না? আর কিছু বলবার নেই তােমার ? তোমার আমার এই মিলন, জীবনের এই শুভ মুহূৰ্ত্ত হয়ত আর না-ও আসতে পারে..হয়ত এই বাণীই আমার বিদায়-বাণী বন্ধু !-কথা কও দীপালীর দুইটী গালে জলের ধারা••আসন্ন সন্ধ্যার মান আলাে হাজার টুকরা হইয়া তখন গঙ্গার মৃদু জোয়ারে কঁপিয়া-উঠা ঝিকিমিকি ১১১ দীপালী ঢেউগুলির উপর পড়িয়া অপরূপ হইয়া উঠিয়াছিল। দীপালী জলভরা • দৃষ্টি তুলিয়া নীতিশের পানে চাহিল। নীতিশ অকস্মাৎ উচ্ছসিত হইয়া বলিয়া উঠিল—কী কথা কইব দীপ, মনের ভেতর কত কথা•••ওই জোয়ারের জলের মতই আজ এত চঞ্চল হয়ে উঠেছে যে, মুখের ভাষা দিয়ে তাকে কী ভাবে প্রকাশ কোরব ভেবে পাচ্ছি না দীপা, আজ তুমি যত সহজে আমাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে পাচ্ছ, আমি ত অত সহজ হ'তে পাচ্ছিনা:••আমার মনে হচ্ছে তােমার যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার সব-কিছু শূন্য হয়ে মহাশূন্যে মিশে যাবে।তােমায় আমি ভালবেসেও কাছে পাইনিবিদ্যুৎশিখার মতই তুমি আমার জীবনের সব আঁধার- রাশিকে ঘুচিয়ে দিয়ে ক্ষণে ক্ষণে নিত্য নূতন রূপে প্রকাশিত হয়েছ, কিন্তু আজও আমি তােমার আসল মূৰ্ত্তিটুকুর পরিচয় পেলুম না.. দূরের মায়া তুমি, দুদিনের জন্য আমাকে সহস্র পাকে বেঁধে আবার দূরেই সরে যাচ্ছ কিন্তু আমি কী নিয়ে থাকব-তা একবার ভেবে দেখেছ কী দীপা ?••• দুইখানি কোমল করপুটের মধ্যে অতি যত্নে নীতিশের ডানহাতখানি ধরিয়া দীপালী ভারী-সুরে কহিল—নিজের দুঃখটাকে অত বড় করে দেখতে যেওনা নীতিশ, তাতে ঠকবে তুমিই...নিজে হতে নিজের চা দুঃখের জালে জড়িয়ে পড়লে দুনিয়ার কোন জায়গায় ঠাঁই পাবে না,••• তােমার মত সর্বস্ব হারিয়েও পৃথিবীতে অনেক জনই বেঁচে আছে, বুকের ভেতর তুষের আগুন নিশিদিন গােপনে পুষে রেখেও বাইরের ধারকা হাসির জোরে তারা জীবনের গতিকে নতুন খাতে বইয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে, আর তুমি পুরুষ হয়ে এতটুকু দুঃখের টাল সামলাতে পাচ্ছ ? এত দুর্বল—এত অসংযত তুমি !••• নীতিশ আৰ্ত্তকঠে বলিয়া উঠিল—দীপা, দীপা, বকছ তুমি আমায় ? . ১২০ দীপালী আমায় দুর্বল বলছ, অসংযত বলছ, কিন্তু ভুল বলছ দীপা, কত বড় সংযমের বাঁধ দিয়ে নিজের দুৰ্ব্বার মনটাকে সবলে বেঁধে রেখেছি তা কি তুমি জাননা? জানাে না। তাই আজ তুমি এমন কোরে আমাকে তিরস্কার কোরছ। কাকে তুমি এত কথা শােনাচ্ছ দীপ, যে তােমাকে মন-প্রাণ ঢেলে ভালসে কাঙাল হয়ে গেছে—যার জীবনের অসংখ্য মুহুর্তের মধ্যে একটা মুহূর্তকেও তুমি তােমার সরস স্পর্শ দিয়ে মূল্যবান কোরে তােল-নি, স্মৃতির ভাণ্ডারে জমিয়ে রাখবার মত যাকে তুমি তুচ্ছ একটা কাণা কড়িও উপহার দাও-নি, চোরের মত দর মত যার যথাসর্বস্ব লুণ্ঠন কোরে পথের ভিখারীর মত ফেলে রেখে অনিৰ্দেশ্য পথে যাত্রা শুরু কোরেছ ! তুমি না নারী, তােমাদের চিত্ত না ফুলের মতই কোমল-নমনীয় ! তাকে তিরস্কার করতে তােমার নারী-হৃদয় কি একবারের তরেও সমবেদনায় ভরে উঠলাে না...? ফোটার সার্থকতা নিয়েই ফুলের বিকাশ হয়। ভালবাসার জন্যে, ভালবাসা বিলােবার জন্যেই তােমাদের সৃষ্টি...কিন্তু কোন্ বিধাতা তােমাকে সৃষ্টি করেছেন দীপা? ..আজ যদি কোন উপায়ে তােমার সৃজন-বিধাতার দেখা পেতুম: তা হলে তার টু টি টিপে একবার জিগ্যেস কোরে নিতুম:::যে নির্মম এই নারী সৃষ্টি করার অর্থ কি ?..না না•••আমি আজ পাগল হয়ে গেছি দীপা, আমি আজ উন্মাদ,বুভুক্ষু মনটা আজ পিপাসায় আকুল হয়ে উঠেছে••• আমাকে মাপ করাে তুমি !... নীতিশ তার আবেগভরা বাণী শেষ করিয়া অর্থহীন উদাস দৃষ্টি মেলিয়া দূর দিগন্তের দিকে চাহিয়া রহিল।••• কূলহারা সীমাহীন সাগরের অশান্ত ঢেউগুলি যেন দুর্ণিবার ক্ষোভে নীরস তপ্ত বালুবেলার উপরে আসিয়া আছড়া-আছড়ি করিতেছিল। ১২১ দীপালী ০ ০ ০ ! দীপালী যেন মর্মে মরিয়া গেল। এতগুলি কথার উত্তর তার শুষ্ক কণ্ঠ একটী সহানুভূতির বাণীও উচ্চারণ করিতে পারিল না। নীতিশের এই বুকের-রক্তে-রাঙা প্রেমের অর্ঘ্য-যাহা দীপালী দুই হাতে আঁকড়াইয়া ধরিলেও উপচাইয়া পড়িয়া যায়, যে প্রেমের পরিবর্তন নাই...সীমা নাই •আকাশের মতই অনন্ত উদার, সাগরের মতই যার কূল-কিনারা নাই... দীপালী নারী, কেমন করিয়া সে তার প্রেমাস্পদকে ফিরাইয়া দিয়া কর্মের স্রোতে আপনাকে ভাসাইয়া দিবে জলের বুকে রক্ত-রাঙা আকাশের লালচে ছায়া আসিয়া পড়িয়াছে, আসন্ন সন্ধ্যার একটা অপরিস্ফুট স্তব্ধতা যেন সমস্ত পৃথিবীকে একটা বিচিত্র রূপ দিয়া স্তব্ধ করিয়া দিয়াছে...বােবা পৃথিবীটাও যেন মাথা নীচু করিয়া নিজের বুকের স্পন্দন গােন...! পরিপূর্ণ নিস্তব্ধতার মাঝে ক্ষণিকের তরে দীপালী যেন আত্মহারা হইয়া পড়িল। অলস ক্লান্ত সন্ধ্যার এমনি একটা মুহূর্তেই বুঝি চুপি চুপি কাণাকাণি করিয়া কথা বলিবার সুযােগ, প্রাণে প্রাণে এক হইয়া মিশিয়া লীন হইয়া যাইবার এই-ই বুঝি যথার্থ সময় ! একটা কথা—একটা কথা যদি দীপালী শুধু নীতিশকে জানায়•••একটীবার যদি সে উচ্ছসিত হইয়া বলিয়া ফেলে যে “হৃদয়হীনা,অকরুণা নারী নই বন্ধু কর্তব্যের শক্ত দড়ীর বাঁধনে এমনি বাঁধা পড়িয়া গিয়াছি যে, প্রাণ আজ সে বন্ধন মুক্ত হইবার জন্য ব্যাকুল হইয়া মরিলেও উপায় নাই.••উপায় নাই।•••নহিলে নীতিশ,আমি তােমায় ভালবাসি বােধ হয় তার কণামাত্রও ভালবাসা তুমি আমাকে দিতে পারনি...দীপালীর পাষাণ-প্রায় হৃদয়-পটে নিপুণ শিল্পীর মত তুমিই প্রথম প্রেমের তুলিকা-পাত করিয়াছ•••এতদিন দীপালীর অসংখ্য উপাসকের একজনও সে অসাধ্য সাধন করিতে সক্ষম হয় নাই। ১২২ দীপালী দীপালীর চোখ ভরিয়া জল আসিল..তার এত সংযমতা কেন? নীতিশ যে ব্রাহ্মণ •সে কায়স্থ ! এক মুহূর্ত পরে সে কতকটা সংযত হইয়া মুখ ফিরাইয়া কহিল- অতটা নিষ্ঠুর আমাকে কেবনা নীতিশ, আমি অত নিষ্ঠুর নই...আমিও তােমায় ভালবাসি। তােমায় ভালবাসি—এ কথা তােমাকে সেদিনও জানিয়েছি—আজও মা জাহ্নবীর কূলে বসে প্রতারণার আশ্রয় নেবনা- যথার্থই তােনাকে ভালবাসি...আমাদের বিবাহ না হলেও আমার জীবন- মরণের দেবতা একমাত্র তুমিই...তুমিই আমার প্রাণে প্রেমের প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছ। এই যে আমার কাজের প্রেরণা, এত শক্তি আমায় কে দিয়েছে ?—এতটা সংযমী—এত দরদী আমায় কে করেছে নীতিশ? সে তােমার ওই অপূৰ্ব চিরসুন্দর বিশ্বজয়ী প্রেম। তােমার প্রেমই আমাকে তুচ্ছ ভােগ-বাসনার গণ্ডী ছাড়িয়ে সুদূর-অনেক দূরে নিয়ে গেছে। দুনিয়ার ছােট বড় কাঙাল দুঃখীদের ভালবাসতে শিখিয়েছে। তাই আজ আমি তােমাকে ছেড়ে এত দূরে চলে যেতে পাচ্ছি। বলিয়া দীপালী নীতিশের পাশে সরিয়া বসিয়া তার কাধের উপর একখানি হাত রাখিয়া কহিল-নীতিশ,তুমি কি শুধু আমার চোখের ওপরে দাড়িয়ে আছ, তােমার ওই মুখখানি যে আমার দেহের প্রতি অনু- পরমাণুতে, প্রতি রক্ত-কণার সঙ্গে মিশিয়ে রয়েছে দূর-নিকট আমার কাছে যে সবই সমান নীতিশ, চোখ দুটো বুজলেই যে আমি তোমাকে বুকের অতি-কাছে দেখতে পাই। আমার অন্তর জুড়ে তুমি বস আছ••• তাই তাে আমি তােমার বিরহ অনুভব করতে পারিনি। আমি যখন কাজ করি নীতিশ, তখন মনে হয় কে যেন আমার রাত্রি-দিনের সঙ্গীর ১২৩ দীপালী মত পাশে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে...অবসাদ এলে উৎসাহ যােগাচ্ছে...ক্লান্তি এলে অমৃত পান করাচ্ছে ! সে কে জানাে বন্ধু ? সে তােমার চিরসুন্দর অজেয় প্রেম ! নীতিশ, কেন আমার জন্যে শােক করছ, কেন আমাকে বেঁধে রাখছ? আমায় তুমি যেতে দাও নীতিশ মুগ্ধ হইল, বিস্মিত হইল। মুহূর্তেরঅসংযম—উন্মত্ততা স্মরণ করিয়া লজ্জিত অপরাধীর মত কহিল—দীপ, সত্যিই তােমার প্রেমের কাছে আমার প্রেম আজ হার মেনেছে, তােমার ভালবাসার তুলনা হয়না, •••সামান্য মানুষ আমি, তাই ভােগের দ্বারায় তােমার দেহটাকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিলুম। আর চাইব না। তুমি দেবী, তাই তুমি বুঝতে পেরেছ যে, প্রলােভনকে চোখের সামনে রেখে আমার পক্ষে চিত্ত জয় করা হয়ত কঠিন হয়ে উঠবে,তাই তুমি আমার কাছ থেকে বহুদূরে সরে যাচ্ছি। তাই যাও•••দীপা, তাই তুমি যাও, বলতে আমার বুক যেন ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাচ্ছে তবু বলছি তুমি যাও। তােমার কাজ সফলতায় ভরে উঠুক, শুধু ভগবানের কাছে এতটুকু প্রার্থনা কোরাে—যেনাে আমার এ জন্মের সাধনা পরজন্মে সফল হয়, এ জন্মের তপে পরজন্মে যেন আমার সাধনার দেবী তুষ্ট হয়। নীতিশের বুকখানা ভারী নিঃশ্বাসের চাপে ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতেছিল। খানিকটা পরে সে যেন কতকটা আত্মগত ভাবেই কহিল—বােম্বেতে কোথায় থাকবে তুমি দীপা?•••তােমার দাদা তােমাকে যেতে দিলেন••• আপত্তি করলেন না ? দীপালী গাঢ়স্বরে কহিল—কোথায় থাকবাে—সে খবর আমি তােমায় দেব না, আর দাদার অনুমতি আমি আদায় কোরে নিয়েছি। দাদা আমাকে ভাল কোরেই চেনেন..শুধু নীতিশ তােমার ভালবাসার দোহাই, ১২৪ দীপালী তুমি আমাকে ভুলে যেও, আমি যে কখন ছিলুম, তাও তুমি ভুলে যেও আমাকে যে তুমি হারিয়েছ তা-ও তুমি ভুলে যেও! মনে কোরাে, দীপালী বলে কেউ ছিল না: কাউকেই তুমি হারাওনি, ক্ষোভ কোরনা নীতিশ, তাহলেই তুমি অসীম শান্তি পাবে। নীতিশ অধীর হইয়া কহিল--এ আবার কী তােমার অসঙ্গত অনুরােধ দীপা! তােমায় আমি ভুলে যাব ? তােমার স্মৃতিটুকু পৰ্য্যন্ত আমার মন থেকে মুছে ফেলে দেব? তুমি যে কী দাপা, তােমার যাবার আগেও আমি তােমাকে এতটুকু বুঝতে পারলুম না ! তুমি বড় দুর্বোধ্য বড় জটিল ! যত চেষ্টা করি এর জট ছাড়াতে, ততই যেন আমাকে উপহাস কোরে গিট পড়ে যায়, •••আমার জীবনের ধ্রুবতারা তুমি, আমাকে অন্ধকারের অতল হ্রদে ডুবিয়ে রেখে সরে যাচ্ছ...জীবনের দীপশিখা আমার জ্বলতে জ্বলতে নিবে যাচ্ছে, আর তুমি বলছ কি-না এই মুহূর্তগুলি আমার স্মৃতির মালা থেকে খসিয়ে ফেলে সাগর-জলে ভাসিয়ে দেব ? দীপালী অচঞ্চল সুরে কহিল—হ্যা, তাই দেবে তুমি। তুমি যদি সত্যই আমাকে ভালবেসে থাক, তাহলে তুমিই পাৰ্বে...বিস্মৃত প্রায় হারানাে দিনগুলির করুণ মুহূর্তের স্মৃতি যদি কোনদিন তােমার জীবনে এসে ছায়াপাত করে, তাহলে কঠিন হয়ে তাকে মুছে ফেলে কর্মসাগরে ঝাপিয়ে পড়বে—আমাদের ভালবাসার এই হল সাধনা...কিন্তু সময় তাে আর নেই নীতিশ, এইবার আমাকে বিদায় দাও । দীপালীর মাথাটা নীতিশের কাধের উপর হেলিয়া পড়িল। আত্ম- বিশ্বতের মত নীতিশ পলকহারা দৃষ্টিতে দীপালীর মুখের পানে চাহিয়া রহিল। চাহিয়া চাহিয়া...দৈখিয়া দেখিয়াও বুঝি তার তৃপ্তি হইতে- ছিল না, নীতিশের কাণে যেন হাজার হাজার দৈত্য আসিয়া গর্জন দীপালী করিতেছিল—সময় নাই—সময় নাই—দীপালী শুধু তাহার একার নহে... দীপালী বহুর...দীপালী সমস্ত বিশ্বের..তাহাকে ধরিয়া রাখিবার ক্ষমতা তাহার নাই নাই। নীতিশ তার কাণের কাছে মুখ নামাইয়া ধীরে ধীরে কহিল—দীপা, তােমাকে আমি ষ্টেশন পর্যন্ত পৌছে দিয়ে আসব, অনুমতি দাও আমায়। দীপালী নীতিশের বুকে মুখ লুকাইয়া সজল কণ্ঠে কহিল—নানীতিশ, , রক্তমাংসের দেহ আমারও.••সমারােহ করে সে বিদায়-দৃশ্যটা তুমি আমি কেউ-ই হয় তাে সইতে পারবাে না। তার চেয়ে এইখানে তােমার বুকে এমনি কোরে মাথা রেখেই দীপালীর আজ মৃত্যু হােক...! তােমার প্রেমের অনির্বাণ আলােক-শিখায় তার দেহ পুড়ে ছাই হয়ে, রেণু রেণু হয়ে ওই গঙ্গার জলেই মিশিয়ে যাক...এ কাল রাত্রির অবসানের সঙ্গে সঙ্গে কর্মের কঠোরতার মাঝে সে এক দীপালীর নবজন্ম সুরু হবে..যার ফেলে-আসা জীবনের ওপর এতটুকু মমতা নেই...আকর্ষণ নেই..পৃথিবীর হাজার হাজার কাজের মানেই যে নিজের বন্ধনমুক্ত জীবনের আয়ু খুজে নিতে চায়। দীপালীর সেই শান্ত সুন্দর চোখ দুটীতে প্রভাত-শিশিরের মতই দুই ফোটা শুভ্র অঞ সায়াহ্নের রক্ত রশ্মির মৃদু আলােকে ঝলমল করিয়া উঠিল ! বিদায়ের পূর্বমুহূর্তে নীতিশ একবার পরিপূর্ণ আবেগে দীপালীকে সাদরে বুকের ভিতর জড়াইয়া ধরিয়া অশ্রুসিক্ত-কণ্ঠে অতি ধীরে কহিল- তবে তাই হােক, তাই হােক—দীপা, তুমি দীপ জ্বেলে দিয়ে আগে আগে পথ দেখিয়ে চলে যাও•••আমি:তােমার দেওয়া আলােটুকু লক্ষ্য করে দীপালী পথ চলতে চেষ্টা করি...আমারও নবজন্ম সুরু হােক, মাঝখানে থাক আমাদের প্রেম—দু-ধারে তুমি আর আমি...এ প্রেমের বিচ্ছেদ নেই.. শেষও নেই। দীপালী মুখ তুলিয়া সজল-সুরে কহিল-তবে আমায় ছেড়ে দাও নীতিশ, তােমার বুকে মাথা রেখে আমি যে এই মুহূর্তে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলছি। আমার সমস্ত সঙ্কল্প জোয়ারের জলে ভেসে যেতে চাচ্ছে••• আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলছি নীতিশ.••ছেড়ে দাও আমায়, যেতে দাও।••• নীতিশ কোন উত্তর করিল না, দীপালীর মুখখানা দুই হাতে অতি যত্নে উচু করিয়া তুলিয়া ধরিয়া ধীরে ধীরে তাহার 'পরে নত হইয়া পড়িল। আকাশ আর সাগর, পরস্পর যেন পরস্পরকে দুবাহু মেলিয়া আঁকড়াইয়া ধরিল । ••••••একটী মৃদু ভীরু সব-হারাণে। চুম্বন পৃথিবীতে যার কোন মূল্যই খুঁজিয়া পাওয়া যায় না, অমৃতের সাগর মন্থন করিয়া যাহার সৃষ্টি ••• এ জীবনে শুধু উহাই হইল ওই দুইটী চিরবিচ্ছিন্ন নর ও নারীর সম্বল -চলার পথের পাথেয়। সে রাতটার অধিকাংশ সময়ই পথে পথে ঘরছাড়া উদাসীর মত নীতিশ ঘুরিয়া ঘুরিয়া কাটাইয়া প্রত্যুষে যখন সে আপনার বাড়ীর দরজার সুমুখে আসিয়া দাঁড়াইল,—তখন অকস্মাৎ অনন্ত তার সদর দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিয়া নীতিশকে দেখিতেই সবলে তার হাত দুইখানি চাপিয়া ধরিয়া উৎকণ্ঠিত স্বরে কহিল-নীতিশ দা, পদ্ম? পদ্মকে তত বাড়ীতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! ১২৭

দীপালী
এই পৰ্যন্ত বলিয়া অনন্ত তার হাতখানা ছাড়িয়া দিয়া আপন মনেই
বুকিতে সুরু করিল—
ও মেয়েকে দেখেই আমি আগেই টের পেয়েছিলুম যে,ও কখনাে ভাল
মেয়ে । জংলা পাখী কি পােষ মানে নীতিশ দা...
শিল কাটাই
হােল ওদের ব্যবসা, তুমি যে বড় সরল মানুষ কি-না, তাই বুঝতে পারাে
নি, মেয়ে জাতৃটার ধর্ম কি ছাই আছে ?
কথাগুলাে নীতিশের কাণে এক বর্ণও পৌছিল কি না সন্দেহ,
বিস্ময়-বিমূঢ়ের মত অনন্তর মুখের পানে তাকাইয়া রহিল।•••
দীপালী:নাই-পদ্মাও নই!
নীতিশে রাকাশের দুইটা বিরােধী তারা•••জলিতে জলিতে কি
একই সময়ে খনি পড়ে?
কাহার অভিশাপে সে কোন বিধাতার?••••••
বুকের ভিতর কোটী কোটী মানবের আর্ত-হৃদয়ের বহ্নিজালা সহসা
যেন ধূ ধূ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল।
জগতে সানা বলিয়া তাহার কোন বস্তু আর অবশিষ্ট রহিল না।•••

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Dipali Ed. 2nd

Author
Not Available
Title
Dipali Ed. 2nd
File name
Dipali Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2009/08/12
Publisher
Dev Sahitya Kutir,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
139
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Dipali- Story
DLI number
512611
Barcode
4990010019669.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Q43SuvXyDd8
Download PDF

Dipali Ed. 2nd