Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kabbya-renu

Dutta,pulinbihari · 2009/12/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কাৰৰেণু
শ্রীপুলিনবিহারী দত্ত বিরচিত
অনিত্যতা, অনুতাপ, আত্ম-নিবেদন,
ভীমরথি-ধরা প্রাণে উঠে অনুক্ষণ,
সুখদুঃখ শােক-তাপ,
যা করেছি পুণ্য-পাপ,
তােমারই চরণে দেব! করিনু অর্পণ।
কলিকাতা
বঙ্গাব্দ ১৩৩৭

শ্রীহরিদাস দত্ত
প্রকাশক ।
১নং শিকদার পাড়া লেন,
কলিকাতা
কলিকাতা, ১৬৬ নং বহুবার ফ্রীট
বসুমতী-বৈদ্যুতিক রােটারী মেসিনে
শ্রীপূর্ণচন্দ্র মুখােপাধ্যায় মুদ্রিত

উৎসর্গপত্র
পরলােকগত বাল্য-সখাগণ
স্মৃতি-তর্পণ
গােকুল বলাই, নিতাই, নিমাই,
গােরা, ঠাকুরদাস, মহেন্দ্র, নবাই,
আর যারা ছিলে, চলে গেছ ভাই,
একা পড়ে আছি, এ ঘাের সংসারে।
বেঁধেছিনু হিয়া তােমাদের সনে,
সরল-পবিত্র প্রেমের বাঁধনে,
মধুময় স্মৃতি সদা জাগে মনে,
যদিও তােমরা গেছ পরপারে।
তােমাদের সেই ‘গুরুপ-ফটোখানি,
টাঙায়ে রেখেছি শয্যা-গৃহে আনি,
নিত্য তাহা দেখি, কি হেতু না জানি,
গণ্ড বহি ঝরে তপ্ত অশ্রুকণা ।

{
মনে পড়ে কত কথা ছেলেবেলা
ক্ষণে আড়ি-ভাব, হুটোপাটি খেলা,
পাঠে অবহেলা, বাগানেতে মেলা,
চড়িতি আর গহনা-
বাজনা।
পিতা-মাতা স্বর্গে, হারায়েছি স্নেহ,
পত্নী পরলােকে, বন্ধু নাই কেহ,
রােগ-শােকে ভগ্ন, জরা-জীর্ণ দেহ,
বুদ্ধি-স্মৃতি লুপ্ত, দৃষ্টিশক্তিহীন।
কেনা-বেচা শেষ এ ভবের হাটে,
একা আছি বসে বৈতরণী ঘাটে,
এ তিক্ত জীবন সপি চিতা-কাঠে,
(কবে) তােমাদের দলে হইব বিলীন ?
তােমাদেরই
পুলিন।

কাব্য-ণে
পৌরাণিক
আমি কবে যাবাে হরি-দরশনে ?
সুমতি তিতিক্ষা দুই সহচরী সনে।
বিবেক মুরলী-নাদে, আকুল পরাণ কাঁদে,
তেয়াগিয়া ভােগ-সুখ মায়ার বন্ধনে।
ছাড়ি গৃহধন-জন,
বিশুদ্ধ হইবে মন,
এ জীবন সমর্পণ কান্তের চরণে।
শ্রদ্ধার যমুন-জলে
ডুবে রব কুতূহলে,
পরিহরি কুলমান, লজ্জার বসনে
আমার প্রাণের বঁধু, কুসুমে ঢেলেছে মধু,
গগনে অনন্ত জ্যোতি, সুগন্ধ চন্দনে।
কলকণ্ঠে বিহঙ্গিনী, তারি গুণ গায় শুনি,
স্নিগ্ধ সুকোমল স্পর্শ মলয়-পবনে।
প্রেম নাই যার প্রাণে, এ রস সে কি বা জানে ?
ভক্তি-পুস্পাঞ্জলি দিয়া ভজিব গােপনে।
আমি রাধা সেবাদাসী, প্রাণনাথে ভালবাসি,
সে চরণ গতি মুক্তি, জীবনে মরণে। ১

২
কাব্য-রেণু
আমি ধেয়ে মরি বনে বনে
বিরহবিধুরা গােপিকার মত,
হরিপদ অন্বেষণে।
মায়ার আঁধার এ ঘাের সংসার,
পাপের কণ্টক ফুটে অনিবার,
গৃহকৰ্ম্ম শুধু সুখ আপনার,
ভুলিয়াছিলাম দারা-সুতধনে।
মধুর মুরলী কে শুনালে কানে,
ভক্তির অমৃত ঢালিল এ প্রাণে ;
বিহবল করিল তাহার সন্ধানে,
যিনি প্রাণসখা জীবনে মরণে।
৫
কাছে আছেন তিনি দেখিতে না পাই,
অন্ধের সমান ঘুরিয়া বেড়াই,
কে জানিস্ তােরা ব’লে দে না ভাই,
সপিব সর্বস্ব তঁাহার চরণে।
এ কামনা মাের হবে কি সফল,
বিষয়বাসনা ঘুচিবে সকল,
হরি হরি বলে হইব পাগল,
কায়মনােবাক্যে ভজিব সে জনে। ২

কাব্য-রেণু
ত
[ কবিবর নবীনচন্দ্র সেনের অনুসরণে ।
মা. গাে ! এসাে একবার,
পাপেতে মলিন বড় হৃদয় আমার।
নিবৃত্তি, প্রবৃত্তি সনে,
পরাজিত প্রায় রণে,
তুমি বিনা জননী গাে কে করে উদ্ধার !
যখনি ধৰ্ম্মের গ্লানি, পাপেতে কাতর প্রাণী
অধৰ্ম্মের অভ্যুত্থানে ইও অবতার ।
একদিন অযােধ্যায়
দেখাইলে রঘুরায়,
পিতৃভক্তি, সত্যব্রত, পালন প্রজার।
নৃশংস রাক্ষস-বংশ, স্বহস্তে করিলে ধ্বংস,
বীরবেশে ঘুচাইলে ধরণীর ভার।
একদা যমুনা-কূলে,
মুরলী-নিনাদ তুলে
প্রেমভক্তি শিখাইলে ব্রজগােপিকায়।
কুরুক্ষেত্র-রণ-মাঝে,
পার্থের সারথি সাজে,
পাষণ্ডমণ্ডল দ’লে ধর্মের প্রচার।
ভীম হিমাচল-তলে, জন্মি রাজপুত্র ছলে
ত্রিতাপের ঘাের জ্বালা, করিতে নিবার।
অহিংসা পরম ধৰ্ম্ম, শিখালে নিষ্কাম কৰ্ম্ম
ইন্দ্রিয় সংযম ব্ৰত, কামনা সংহার।

৪
কাব্য-রেণু
জেরুজিলমেতে পুন, গাহিলে শান্তির গুণ
স্বার্থত্যাগ, সখ্য, সাম্য, দীনল বিস্তার।
আপন শােণিত দিলে, সহিষ্ণুতা শিখাইলে,
ঘাতুকেরে ক্ষমা দেখে মােহিত সংসার।
আরবের মরুভূমে,
পাপ-কদাচার-ধূমে
উপালকের বেশে আসিয়া আবার ।
ভাগবত রূপ ধরি,
কোরাণ রচনা করি,
অধৰ্ম্মের ভ্রান্ত ভাব করিলে সংস্কার।
মা গাে। তুমি পুনরায়,
দেখা দিলে নদীয়ায়
দীন ব্রাহ্মণের গৃহে মূৰ্ত করুণার।
জীবে দয়া নামে রুচি, অচণ্ডালে কৈলে শুচি,
কান্তভাবে শান্ত প্রাণে জীবের নিস্তার ।
মা গাে! তুমি কত স্থানে, বিকাশ মানব-প্রাণে
শঙ্কর, নানক, মীরা, কবীর, লুপার।
পাপ করি নিবারণ,
ধৰ্ম্মরাজ্য সংস্থাপন
অই যাচি পাপধ্বংসী চরণ তােমার।
এসাে মা রণরঙ্গিণী, চিত্তক্ষেত্র রণস্থলে,
দুৰ্ম্মতি দুর্নীতি-দৈত্য দম্ভ করে মহাবলে ।
ছটা অস্ত্র লয়ে সঙ্গে যুঝিতেছে নানা রঙ্গে
আকুল অস্থির প্রাণ বিলুষ্ঠিত ধরাতলে।

কাব্য-রেণু
সভয়ে তাই
ভেদিয়া ধৈর্য্যের বৰ্ম্মে, বেঁধেছে সেনানী ধৰ্ম্মে
বুদ্ধি বিদ্যা গজ বাজী পরাস্ত হলাে সদলে।
মহিষাসুর অহংকার, ছাড়িতেছে হুহুঙ্কার
মায়ার কারায় পেপারে বাঁধিয়া পাপ-শৃঙ্খলে।
আর যে উপায় নাই, অভয়ে।
কাতর সন্তান ডাকে, ভাসিয়া নয়নজলে
দানবদলনী বেশে
নিস্তারিণী তুমি এসে
জ্ঞান-খঙ্গ হান তারে, বিবেকচরণে দলে।
শক্তি-নাগপাশে বেঁধে,
অনুতাপ-শেল বিধে
মহিষমর্দিনীরূপে বিহর হৃদকমলে।
বৈরাগ্যের দীপ জ্বালি,
সংযম-কুসুমাঞ্জলি
শ্রদ্ধা-বিশ্বদল দিয়া পৃজি ভক্তি-গঙ্গাজলে।
মােহ-ছাগ বলিদান,
চণ্ডীপাঠ স্তোত্র গান
শান্তি হােম ফোটা যেন, শিরে ধরি কুতূহলে। ৪
মাতৃভক্তি—শ্ৰীমন্ত
কৰ্ত্তব্য-পালনে পিতৃ-অন্বেষণে
চলেছি সিংহলে জননী-আজ্ঞায়।
আসি কালিদহে এ কি ব্যাত্যা বহে।
জানি কি করি না দেখি উপায়।

কাব্য-রেণু
শিরে ঘনঘটা ঘাের অন্ধকার,
ভীম প্রভঞ্জন ছাড়ে হুহুঙ্কার
উত্তাল তরঙ্গ অকূল অপার,
জল-স্থল কিছু দেখা নাহি যায়।
ভাঙ্গিয়া মাস্তুল উড়ে গেছে পাল,
শিথিলবন্ধন ছুটে যায় হাল,
হাঁকিছে কাণ্ডারী সামাল সামাল,
মাঝি-মাল্লাগণ কম্পিত শঙ্কায়।
সংক্ষুব্ধ জলধি ডােবাে ডােবাে পােত
পাটাতন ভাসে বহে জলস্রোত
অশনি ঝনা বিজলী বিদ্যোত
সবে মিলে বুঝি প্রলয় ঘটায়।
আজি বুঝি আর নাহি পরিত্রাণ,
কৈশােরে জীবন হবে অবসান,
জন্মিলে মরণ (বিধির বিধান )
এক দিন হবে, খেদ কিবা হয় ?
তবে কেন এত হতেছি কাতর ?
মনশ্চক্ষে আসে, উজানি নগর,
প্রিয় জন্মভূমি আবাস-ভিতর
কাঁদিছেন মাতা লুটায়ে ধূলায়।

৭
কাব্য-রেণু
ওই যে জননি পতি-বিরহিতা
সপত্নী-তাড়িতা, স্বজন-লাঞ্ছিতা
বিনা অপরাধে হিংসা-কলঙ্কিত
মলিনবসনা জীর্ণ-শীর্ণ কায় ।
আমি মাত্র তার ভরসা কেবল,
জীবনে বন্ধন, সংসারে সম্বল,
মার উষ্ণ শ্বাস, তার অশ্রু-জল
আমি বিনা হায় কে আর মুছায়।
আহা! ভাল কথা পড়ে গেল মনে,
বিদায় যখন লইনু চরণে,
বলেছিলেন তিনি সস্নেহ-বচনে,
বিপদসময়ে ডাকিতে দুর্গায় ।
হা ধিক্ ! ভুলিয়া মাতৃ-উপদেশ
ঘটেছে বিপদ, তাই এত ক্লেশ
আর ভাবি কেন দুঃখ হবে শেষ,
সপি মন-প্রাণ তারিণীর পায়।
এসাে মা অভয়ে,
ডাকি গাে সভয়ে,
বিপদসময়ে দয়াবতী হয়ে,
কাতর তনয়ে ত্রাহি পদাশ্রয়ে,
অতি দীন-হীন আমি অসহায়।

৮
কাব্য-রেণু
জল, স্থল, ব্যোম, বিশ্বচরাচর,
তােমারি সৃজিত, তােমারি কিঙ্কর,
উন্মাদ সংগ্রাম, সম্বর, সংহর,
ভেসেছি অকূলে তব ভরসায় ।
জননীর আজ্ঞা এ কি চমৎকার।
থেমেছে ঝটিকা, দিক পরিষ্কার
বাহ বাহ তরী, ওহে কর্ণধার,
ঘুচেছে সঙ্কট শঙ্করী-কৃপায়।
খুজিব সিংহলে, জনক কোথায় ?
গৃহে লয়ে যাব ধরি তার পায়—
আশা-পথ চেয়ে জননী যথায়
উজলিবে সেথা হাসির ছটায়।
শুন হে শ্ৰীমন্ত ! তােমারি মতন
আমরাও যেন জননী-বচন
বিপদে সম্পদে করিয়া পালন
নিশিদিন ডাকি সর্বমঙ্গলায়। ৫

কাব্য-রেণু ধ্রুব ( সকাম-সাধনা ) কোন্ দিকে যাই ? ভাবিয়া না পাই, এ যে ঘাের বন, নিশি অন্ধকার। শীতে কঁপে কায়, কঁাটা ফুটে পায়, দুরু দুরু হিয়া, পথে চলা ভার। চারিদিকে দেখি বন্য পশুগণ- বিশাল শরীর, করাল বদন, বিকট গর্জনে করে আস্ফালন, এ উহারে ধরে করিছে আহার । কেন জীবে জীবে এত হিংসা-দ্বেষ ? কেন বলবান ক্ষীণে দেয় ক্লেশ ? নাহি কি মম ? নাহি দয়া-লেশ ? কঠোর সংসারে এ কি অত্যাচার। আজিকে প্রভাতে গেলেম যখন পিতার চরণ করিতে বন্দন কোলে ল’তে তিনি বাহু প্রসারণ খুলিলেন যেন স্নেহের দুয়ার।

১০ কাব্য-রেণু হেন কালে সেথা আসি সুয়ারাণী তাড়াইল মােরে বলি কটু বাণী কি যে অপরাধ করেছি না জানি ? পিতৃক্রোড়ে যেতে নাহি অধিকার। হায় ! এ সংসারে আমার মতন, জনকের স্নেহে বঞ্চিত ক’জন । বিমাতার শেল পরুষ বচন- মরমে বিধিয়া করে হাহাকার। কহিনু সে দুঃখ মার কাছে গিয়া, মধুর বচনে মােরে প্রবােধিয়া নীরবে উত্তপ্ত অশ্রু উথলিয়া জানাইল তার বেদনা অপার । ‘ওরে বাছা ধ্রুব’ ( বলিলেন তিনি। নাহি পুণ্যবল আমি অভাগিনী, তাই দুঃখ পাই দিবস-যামিনী, নাহি পূর্বজন্মে সুকৃতি আমার । ভাবি নাই বুঝি হরির চরণ, ডাকি নাই পদ্মপলাশলােচন তাই মােরে বাম শ্রীমধুসূদন অভাগা সন্তান অভাগী মাতার।

কাব্য-রেণু
১১
দোলাইয়া মােরে স্নেহময় কোলে,
ভুলালেন তিনি সুমধুর বলে,
ঘুমালে জননী আসিলাম চলে,
হরির সন্ধানে খুজিব সংসার।
কোথা থাকেন হরি, শ্রীমধুসূদন,
দয়াময় পদ্মপলাশলােচন ?
জান যদি বল ওহে তরুগণ,
কোথা গেলে দেখা পাই তাহার।
জান যদি বল ওহে সমীরণ,
ওগাে বিভাবরি । পশু-পক্ষিগণ।
চেন কি তাহারে ? কোথায় আগার ?
বড় আশা হলাে মায়ের কথায়,
খুঁজিয়া দেখিব সে হরি কোথায় ?
দেখাব হরিরে কত যাতনায়-
এ পােড়া পরাণ জ্বলে অনিবার।
হরিরে ভজিলে পায় ধন-জন,
ছত্র-দণ্ড আর রাজ-সিংহাসন,
হয় শত্ৰুজয়, বাসনা-পূরণ,
রােগ-শােক ক্ষয় বিপদে উদ্ধার।

কাব্য-রেণু
হরিরে ডাকিব করি প্রাণপণ,
একাগ্র-হৃদয়ে মন্ত্রের সাধন,
হয় হবে তায় শরীর-পতন
অবসান হবে তীব্র যাতনার।
আপনি হাসিব, মায়েরে হাসাব,
হরির প্রসাদে রাজ্য-ধন পাব,
সগৌরবে আমি পিতৃক্রোড়ে যাব,
থেতা মুখ ভোঁতা হবে বিমাতার।
প্রহলাদ
( নিষ্কাম-সাধনা )
হরি দয়াময় মঙ্গল-নিলয়
বুঝেও বােঝে না কেন জীবগণ ?
ভুলিয়া মায়ায় আহার-নিদ্রায়
অহংজ্ঞানে মত্ত থাকে অনুক্ষণ!
যাহার ইচ্ছায়—এ বিশ্ব-সংসার
হয়েছে, রয়েছে, হইবে সংহার,
ববাঝে না খোঁজে না শ্রীচরণ তার
ভজে না, মজে না, নির্বোধ এমন।

কাব্য-রেণু
দুদিনের তরে হেথা আসে যায়
পবন-হিল্লোলে তরঙ্গ খেলায়
তবু দম্ভ করে, এ যে বড় দায় ।
বিষয়-সম্ভোগে রহে অচেতন।
হায় রাজ্যমদে জনক আমার
কত শাস্তি মােরে দেয় বারে বার,
হরির কৃপায় পেয়েছি নিস্তার,
তাই তারে বলে বিপদভঞ্জন।
উত্তপ্ত তানল হইল শীতল,
অমৃতের কাজ করিল গরল,
পাষাণ ভাসিল, ছিড়িল শৃঙ্খল,
বশীভূত হােলাে প্রমত্ত বারণ ।
করি হরিনাম এই অপরাধ ?
পিতা হয়ে পুত্রে ঘটান প্রমাদ,
যত ক্লেশ পাই হরি-প্রেমাস্বাদ,
ততই মধুর জুড়ায় জীবন।
যে যেখানে আছ পশু-পক্ষী নর,
রবি, শশী, তারা, বিশ্ব-চরাচর,
হরি হরি বলে ডাক নিরন্তর
হরি-প্রেমে মজ সপ কায়মন

১৪
কাব্য-রেণু
অনিত্য অলীক ঐহিক কামনা,
হরির চরণে কোরাে না প্রার্থনা,
হরি-প্রীতি তরে হরি-উপাসনা,
হরি-প্রেমানন্দে পাক রে মগন।
আমি কেহ নই হরি কর্ণধার,
তাহারি ইচ্ছায় চলে এ সংসার,
সুখে দুঃখে সদা তারে দিয়া ভার,
নিষ্কাম-হৃদয়ে কর রে সাধন।
তবু কেন লােকে ‘আমি আমি করে ?
সে আমিত্ব থাকে কতক্ষণ তরে ?
আঁখি পালটিতে আমি-গর্ব হরে,
নিভে যায় অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মতন।
হরিপদে যদি রাখ দৃঢ় মন,
বিপদে সম্পদ হবে সংঘটন,
বুনিবে তখন নিগূঢ় কারণ
উন্মীলিত হবে ভক্তির নয়ন।
আজি বিপরীত যাহা জ্ঞান হয়,
পরিণামে তাহা মঙ্গল নিশ্চয়,
হরির এ খেলা, হরি লীলাময়,
সুখ দুঃখ শুধু শিক্ষার কারণ।

কাব্য-রেণু
জলের বুদবুদ মিশাইবে জলে,
পঞ্চভূতে সত্য দেহ যাবে চলে,
আত্মা অবিনাশী, নিজ কৰ্ম্মফলে,
সুকৃতি দুষ্কৃতি ভুগিবে আপন।
হরি সর্বব্যাপী, যেতে হয় না বন,
ঘরে বসে চলে ভজন-সাধন,
বিদ্যা-বুদ্ধি-জ্ঞান নাহি প্রয়ােজন,
তারে কর মাত্র আত্মসমর্পণ। ৬
পারমার্থিক
কোথা স্বর্গ, নরক কোথায় ?
এ লােকে কি লােকান্তরে বােঝা বড় দায়।
যে মানব ইহলােকে,
সমভাব হর্মে শােকে,
ঈশ্বরে নিবিষ্ট চিত্ত, সদা সুস্থকায়।
সন্তোষ-অমৃত পানে,
পরিতােষ যার প্রাণে,
তাহারি স্বরগ-ভােগ থাকিয়া ধরায়।
যে জন রিপুর দাস,
রুগ্ন দেহ বার মাস,
পাপের পিচ্ছল পথে নিরন্তর ধায়।
শান্তি-গরল ঢালা,
হৃদয়ে কঠোর জ্বালা,
তাহারি নরক-ভােগ থাকিয়া হেথায়।

১৬
কাব্য-রেণু
আমি কোথা যেতে কোথা এলাম গাে ?
গহনে ঘুরিয়া কিবা ফল পেলাম গাে।
জানি কি ঘুম-ঘােরে, বাঁধি কি
কুহক-ডােরে,
প্রবল প্রবৃত্তিস্রোতে ভেসে গেলাম গাে।
মিটিল কোন আশা,
না ছুটিল এ পিপাসা,
ভােগের দহনে শুধু জু’লে মলাম গাে। ৭
মসীবিন্দু প্রায়,
দেখি পাখী উড়ে যায়,
অগাধ অসীম, নিবিড় নীলিম অনন্ত গগন-গায়।
কভু দেখি তার পাখা,
সােনার কিরণ ঢাকা
কভু বা কালিমা-মাখা মেঘের ছায়ায়।
আমরাও সেই মত,
ঘুরি ফিরি অবিরত
কখন আমােদে হাসি (কভু ) কাঁদি যাতনায়।
হিংসা, দ্বেষ, দয়া, মায়া, অলীক আলােক, ছায়
কেবলি দেহীর ধৰ্ম্ম স্পর্শে না আত্মায়। ৮
(আমি) ডাকবাে না আর মা বােলে।
(এত) লুটিয়ে মাটী কাদি-কাটি
তবু তত তুই নিস্ নে কোলে।
ছটা শত্রু দিয়ে পিছে,
অভয়া নাম ধরি মিছে,
মায়ার শেকল বেঁধে কেবল
ফেলেছিস্ তুই যত গােলে।

কাব্য-রেণু
১৭
আমার যদি কৰ্ম্মফল,
তােরে কেন ডাকি বল ?
যা হবার তাই হবে তখন
অহংজ্ঞানে যাই চোলে। ৯
তুমি যা গড়েছ আমায় আমি তাে হয়েছি তাই,
পাপী হই, সাধু হই, তােমা ছাড়া গতি নাই,
তুমিই তত কারিগর, এ দেহ কি এ অন্তর,
সদসদ বৃত্তিগুলি পেয়েছি তােমার ঠাই।
সুমতি কুমতি যাহা, তুমিই তাে দিতেছ তাহা,
অদল বদল করি হেন শক্তি কোথা পাই।
অহং বুদ্ধি তােরি মায়া, আলােকের তলে ছায়া,
লীলাময়ি। তেরি খেলা অহংজ্ঞানে খেলে যাই।১০
দিন চলে যায়, পলে পলে আয়ু ক্ষয় পায়।
সে তাে দাড়ায় নাকো কারাে অপেক্ষায়।
দুৰ্য্যোধন সিংহাসনে, যুধিষ্ঠির বঞ্চে বনে,
কেহ হাসিমুখে, কেহ নয়নধারায়,
কাহারাে বদনে সুধা, কাহারাে জঠরে ক্ষুধা,
কেহ বলদৃপ্ত, কেহ ব্যাধিতে লুটায়।

১৮
কাব্য-রেণু
যাহার যেমন ভাগ্য, ভােগে মতি কি বৈরাগ্য,
অবিরাম গতি, কালস্রোতে ভেসে যায় ।
যখন যে ভাবে থাকি, এক ভাবে যেন ডাকি,
দুলভ মানবজন্ম যাহার কৃপায়। ১১
( আমার ) আঁধার হৃদিকরে, আয় গাে মা আলো ক'রে,
(তােমার) পতিত-পাবন, অভয় চরণ, দেখি যেন প্রাণ ভরে
জপ তপ পূজা ধ্যান, নাহি মাের কোন জ্ঞান,
কিসে পাব পরিত্রাণ ? কঁদি তাই সকাতরে ।
পাপেতে মলিন মতি, সতত কুপথে গতি,
না হলে মা? দয়াবতী, কে তরাবে এ পামরে ? ১
জীবন-তরণী ভাসে অদৃষ্ট-সাগরে
মানুষের সাধ্য কিবা ব্যতিক্রম করে ?
গ্রহ সুপ্রসন্ন যার, ধূলা-মুঠা সােনা তার,
সুবাতাসে লয়ে যায়, সৌভাগ্য-বন্দরে।
বিধি যার প্রতি বাম, ঝড় তুফান অবিশ্রাম,
ঘূর্ণ বায়ু , চোরাবালি, চক্রদহে মরে।
বিদ্যা-বুদ্ধি লােপ পায়, পােড় সােল পালিয়ে যায়
মাতৃক্রোড়ে বাঁধি বৎসে, অন্যে দুগ্ধ হরে।১

কাব্য-রেণু
৯
।
কত কাল দোলাবি মা সংশয়-দোলায় ?
আশা-ভয় দুই দিকে টানে দুজনায়।
কত না মধুর ভাষা, শুনায় কুহকী-আশা,
রূঢ় ভয় পাড়ে গালি কটু রসনায়।
অবােধ হৃদয় হায় ! এ দিকে ও দিকে চায়
কোন্ দিকে যাই মা গাে ! না বুঝি উপায়।
প্রবৃত্তি নিবৃত্তি দুটো, কোষ্টা সাচ্চা কোটা ঝুটো?
সত্যপথে—নিয়ে যা মা, আমি অসহায়। ১৪
মা গাে ! তােমারি ইচ্ছায়
সুখ দুঃখ নিরবধি ঘুরে এ ধরায়।
কখন উপরে উঠি, কভু নীচে পড়ি লুটি,
একভাবে চিরদিন কাহারাে না যায়।
কেহ রােগী, কেহ সুস্থ, কেহ ধনী, কেহ দুস্থ,
অদৃষ্টের ঘােরচক্রে মানবে ঘুরায়।
যে ভাবে থাকি না কেন, তােমারে ভুলি না যেন
ও চরণে চিরদিন রেখাে মা আমায় । ১৫
কেন দোষ গাে আমায় ?
ভেসেছি প্রবৃত্তিস্রোতে ঘটনা-বাত্যায়।
উপরে অদৃষ্ট-মেঘ, কুসঙ্গ পবন-বেগ,
বাসনা-ভাটার টানে টেনে নিয়ে যায়।

কাব্য-রেণু
মায়ানদী সুগভীর, মন-তরী নহে স্থির,
ধৈৰ্য-পাল, ধৰ্ম্ম-হাল, ছিন্নভিন্নপ্রায়।
বিষয়ের ঘূর্ণাপাকে, প্রাণ পরিত্রাহি ডাকে,
ভবের কাণ্ডারী বিনা নাহিক উপায়। ১৬
জীবনের শেষ দিন আজ।
ফুরায়ে এসেছে বেলা,
সাঙ্গ এ ভবের খেলা,
কর্মক্ষেত্রে অবসান হুটোপাটি কাজ,
ডাক্তার টিপিয়া নাড়ী, চলে গেল মাথা নাড়ি,
অশ্রুপ্লত দারা-সুত আত্মীয়-সমাজ।
অবশ হতেছে অঙ্গ,
দৃষ্টি-তিস্বরভঙ্গ
নাভিশ্বাস, স্পন্দহীনপ্রায় হৃদিমাঝ ।
দণ্ড দুই আছে বাকি, উড়ে যাবে প্রাণপাখী,
পাঁচেতে মিশাবে দেহ ধরি পঞ্চ সাজ।
অন্তিমের এ সময়,
দেখা দাও দয়াময়,
পতিতপাবনরূপে হও হে বিরাজ।
তোমারি মায়ায় মেতে,
ঘুরিয়াছি দিনে রেতে,
বুঝি নাই ধৰ্ম্মাধৰ্ম্ম, ভাবি নাই লাজ।
সদসৎ এ জীবনে,
করেছি যা, ও চরণে,
অপিয়া নির্বাণ যাচি ওহে বিশ্বরাজ! ১৭

কাব্য-রেণু
২
যত দিন যায় ভোেগ-লালসায়,
ধেয়ে মরি শুধু আকুল প্রাণে।
ছুটে না দুরাশা, মিটে না পিপাসা,
ভেসে যাই যেন লােভেরি টানে ।
অবােধ শৈশব কাটিল খেলায়,
গোয়ানু যৌবন মাতি প্রমদায়,
ধন-মান লাগি এ বৃদ্ধ দশায়,
লালায়িত চিত বিষয় পানে।
কতবার ভাবি বসিয়া বিজনে,
একাগ্র হৃদয়ে মুদিত নয়নে
অন্য চিন্তা ছাড়ি মুক্ত-সঙ্গ মনে
যে কদিন বাঁচি তাহারি ধ্যানে।
এ কি হতভাগ্য অদৃষ্ট আমার,
বিষয়-বাসনা এ কি রে দুর্বার
ভােগের শৃঙ্খল ভাঙা বড় ভার,
ফিরে ঘুরে কেন বাসনা আনে ?
কত দিনে মা গাে ! করিবি নিষ্কাম,
নিশিদিন যেন জপি তাের নাম,
সর্বভূতে তােরে হেরি অবিরাম,
বিভাের হইব মহিমা-গানে। ১৮

২
কাব্য-রেণু
বড় খটকা লেগেছে মা গাে! মনেতে আমার,
কোন্ পথে যাওয়া শ্রেয় ঠাউরে উঠা ভার।
রাজনীতি শাস্ত্র বলে,
কৌশলে কি ছলে বলে,
‘আত্মানং সততং রক্ষেৎ স্বকাৰ্য উদ্ধার।
স্বার্থ লয়ে নাড়াচাড়া,
ঐহিকের তােল-পাড়া,
আত্ম তুষ্টে জগৎ তুষ্ট ঘাের অহংকার।
ধর্মশাস্ত্র পুনঃ কয়,
ইহলােক কিছু নয়,
দুদিনের ধন মান, অস্থায়ী অসার।
সম দুঃখ, স্বার্থ, ত্যাগ,
বিশ্বপ্রেমে অনুরাগ,
আত্মবিসর্জনে কর পর-উপকার।
মা গাে ! কোন্ পথে যাই, ওলােট পালট খাই,
প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি-দহে ঘুরি চক্রাকার।
যখন যে ভাব উঠে, সেই স্রোতে পড়ি লুটে,
জোয়ার ভাটার টানে ভাসি অনিবার।
নাহি জ্ঞান, নাহি শক্তি,
হৃদয়ে দেহি মা ভক্তি
সংশয় ঘুচায়ে কর পামরে উদ্ধার। ১৯
হৃদয় চঞ্চল ইন্দ্রিয় প্রবল
মন স্থির কভু হােলাে না হেলাে না,
আমি অসহায়, না দেখি উপায়
কি করে তােমায় ডাকি, মা বলল না

কাব্য-রেণু একান্তে নির্জনে বসিলে পূজায়, বিষয়-বাসনা জঞ্জাল ঘটায়, কোথা যেতে মা গাে! কোথা লয়ে যায়, জ্বালাতন করে, ঐহিক কামনা। তুমি যদি মা গাে ! নাহি দাও বল, এ জীবন তবে যাইবে বিফল, কার কাছে আর কাঁদিব তা বল ? কার পদ আর করিব সাধনা ? তুমি ছাড়া আর অন্য গতি নাই, তুমি ছাড়া আর কিছুই না চাই সকাতরে তােরে ডাকি মা গাে! তাই অধমতারিণি ! কোরো না ছলনা মায়ার বন্ধন করাে মা! ছেদন, সুখ দুঃখ সব দিয়া বিসর্জন- ও চরণে প্রাণ করি সমর্পণ, ঘুচে যাক যত অলস বাসনা। ২০ ছি! ছি! এ কি রে বালাই। অহংকারে আপনারে কেন ভুলে যাই ? নিজে থাকি কাচ-ঘরে, ঢেলা মারি অন্য পরে, সমবেদনায় কেন প্রাণ মজে নাই ?

২৪
কাব্য-রেণু
কণ্টক ফুটিলে পায়,
নিজে ব্যথা পাই তায়,
অপরের বেদনায় ফিরে নাহি চাই।
করে ধরি ধনুর্বাণ,
লম্ব অসি খরশাণ,
হরিতে পরের প্রাণ উদ্যত সদাই।
নিজের পােষণ তরে,
অপরে শােষণ করে,
হাসিমুখে আত্মসুখে কামনা মিটাই।
পেয়েছি মানব-কায়,
বিদ্যা বুদ্ধি ভরি তায়
কি জ্ঞান লভিনু হায় ! শিখিনু কি ছাই।
এ কি লজ্জা! এ কি ঘৃণা । বুঝি না সমবেদনা,
এই কি রে মনুষ্যত্ব ? এই কি ভাই ভাই ? ২১
জীবনের পরিণাম,
ভেবে দেখ রে মন,
যৌবনের লম্ফ-ঝম্প থাকে কতক্ষণ?
রাম লক্ষ্মণ যুধিষ্ঠির,
কৃষ্ণাঙ্গুন মহাবীর,
জীবনের শেষ দিনে কি হলাে তখন ?
জগজ্জয়ী সেকেন্দর,
নীয়রা কি জুলিয় সীজর,
ধাতুকের ঘাের চক্রে ত্যজিল জীবন ।
চঙ্গিস খ। ভারতে আসি, কাটি নর-মুরাশি,
গড়েছিল পিরামিড, কোথায় সে এখন ?
তৈমুর, মামুদ, গিজনী, নাদীর, আমেদ দুর্ণি,
শােণিতের হ্রদমাঝে হােল নিমগন।

কাব্য-রেণু
দিগ্বিজয়ী সে সম্রাট,
নেপােলিয়ন বােনাপার্ট
হেলেনার কারাগারে মুদিল নয়ন।
সিরাজোদ্দৌলা, বক্তিয়ার, মিরন্ কোথা গেল আর,
রণ-রাহু কৈশােরের চির নির্বাসন।
শাণিত অসির দ্বারা,
উচ্চপদে ওঠে যারা,
হায় রে অসির ঘায় তাদের পতন।
মন রে ।
তাই গর্বমদ,
সতত সন্তোষ-রসে থাক রে মগন। ২২
ত্যজ তুচ্ছ
উচ্চ পদ,
তােমারি মায়াতে মােহিত হইয়া,
জননি! তােমারে ভুলিয়া থাকি।
অপার বাসনা, সকাম সাধনা,
বিপদে পড়িলে তখনি ডাকি।
সম্পদ-সময়ে ঘাের অহংজ্ঞান,
আমি দাতা, কৰ্তা, কৃতী, বুদ্ধিমান,
ত্রিভুবনে কেবা আমার সমান,
অহংকারভরে লােহিত আঁখি।
বিপদ-সময়ে না পাই উপায়,
অহংকার টুটে করি হায়! হায় !
তােমারি কৃপায় পড়ি তাের পায়,
তােমারে চিনিতে থাকে না বাকি।
৩

N কাব্য-রেণু আর সব ছার, তুমি মাত্র সার, প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি, সৃজন, সংহার, যত ঘটনার তুমি মূলাধার, চিরদিন যেন হৃদয়ে রাখি। ই ডাকি মা গাে ! মায়ার বন্ধন- ঘুচাইয়া, দাসে কর সচেতন, সুখে দুখে যেন দেখি ও চরণ, অধম সন্তানে দিও না ফাকি। ২৩ হেন ভাঙ্গা ঠাট মা গােয় রাখিয়াছ কি কারণ? অকর্মণ্য বুড়াদের জগতে কি প্রয়ােজন ? দেহখানা জরা-জীর্ণ, মন-বুদ্ধি ভ্ৰমাকীর্ণ, জড়ােয় মাংসপিণ্ড, শিথিল ইন্দ্রিয়গণ। নাহি হয় জীববৃদ্ধি, কিবা ইষ্ট হয় সিদ্ধি ? শুধু করে অন্নধ্বংস বেঁচে থাকে যতক্ষণ । শক্তিহীন পরবশ, প্রাণে মাখা তিক্ত রস, নগণ্য, জঘন্য, ঘৃণ্য, নিজে নিজে জ্বালাতন । আর নাহি সহ যায়, টেনে নে মা তাের পায়, অনন্ত শান্তির ঘুমে মুদি এবে দুনয়ন। ২৪ কাব্য-রেণু ২ ধনি ! তুমি ভাব কি কখ, দরিদ্রেরা হাহাকার করে কি কারণ? জীর্ণবাস, শীর্ণকায়, উদরান্ন মেলা দায়, সমাজের নিম্নতলে পশুর মতন। তোমার ভােজন তরে, উপাদেয় থরে থরে, চ, চুষ, লেহ, পেয়, নানা আয়ােজন। কিছু খাও, কিছু গেল, কত না ছড়ায়ে ফেল, ভরাপেটে নাহি লাগে সুখাদ্য রন্ধন। ও দিকে দেখ না চেয়ে, ছাতু, পান্তা ভাত খেয়ে- অর্ধাশনে কত লােক কাটায় জীবন । হিম বৰ্মা গ্রীষ্ম শীতে, তব তনু আচ্ছাদিতে, চারুশিল্পে বহুমূল্য বসন-ভূষণ। অঙ্গে বিনা আচ্ছাদন, রােগে মরে কত জন, শুনেছ কি ? নিজ চক্ষে করেছ দর্শন ? কুসুম-উদ্যান-মাঝে, উজ্জ্বল বিজলী-সাজে, মর্মরে নির্মিত তব হৰ্ম্ম সুশােভন। অভাগার ক্ষুদ্র কুঁড়ে, বায়ু বহে খড় উড়ে, রৌদ্র শীত বৃষ্টি তায় না যায় বারণ। মণি-মুক্তা রত্নভারে, সাজাইছ প্রমদারে, বিলাস-ব্যসনে কত ব্যয় অগণন ২৮ কাব্য-রেণু ভেবেছ কি ক্ষণ তরে, কত হতভাগ্য নরে, তাশন বসন বিনা হারায় জীবন। তুমি রাজা, জমিদার, এ কেমন ব্যবহার, ভিক্ষুকের কপর্দক করিছ শোষণ। সমবেদনায় প্রাণে, কেন না করুণ আনে, তবু তুমি ক্ষান্ত নও করিতে পীড়ন। বােঝ না কি একি মতে, আসিয়াছ এ জগতে একি রূপে হেথা হতে করিবে গমন। সে যে তাের ভাই ভাই, তুমি কি তা শিখ নাই, রােগে শােকে সুখে-দুখে তােমারি মতন। বিভব পেয়েছ বলে, যেও না দরিদ্রে দলে, বিষয়ের বিষপানে নেশায় মগন । যাদের কঠোর শ্রমে, ফলপুষ্প-ধান্য-গমে, ধরণীর বক্ষঃস্থল হয় সুশােভন চারু শিল্পকলা কাজে, প্রাসাদ মন্দির সাজে, তাহারা ত হেয ঘৃণ্য নহে কদাচন। পেয়েছিলে যে সম্পৎ, দিতে হবে কৈফিয়ৎ সে কথাটা মনে যেন থাকে গাে স্মরণ। অন্ন দাও ক্ষুধাতুরে, স্নিগ্ধ জল পিপাসুরে, রােগীরে ঔষধ-পথ্য, উলঙ্গে বসন। তবে বুঝি সদাশয়, আত্মত্যাগ মহাপুণ্য, সাধুর লক্ষণ। ২৫ মহত্বের পরিচয় কাব্য-রেণু ২৯ অনন্তের কোলে যেতে চাই চলে, জ্বালাতন বড় করেছে সংসার। মিটিয়াছে সাধ, বিষয়ের ফাঁদ- ভুগে ভুগে প্রাণ হলাে ছারখার। শিশুকাল হতে আশার নেশায়, ছুটিতেছি সদা সুখ-পিপাসায়, ধরি ধরি করি, কোথায় পলায়! সুখ লােভে দুঃখ পাই অনিবার। শৈশবে করিনু বিদ্যা আহরণ, যৌবনে বিবাহ ধন উপার্জন, বার্ধক্যে এখনাে যশ অন্বেষণ, পাছু পাছু ছুটে মরি দুরাশার। ২৬ যদি মা ! দিবে না দেখা, আশা দাও কি কারণ? এ আকাঙ্ক্ষা কেন প্রাণে, কেন মন উচাটন ? তােমারে পাইবার তরে, কত দেশে কত নরে, জপ, তপ, যাগ-যজ্ঞ, করে তীর্থ পৰ্যটন। কত ব্ৰত উপবাস, পাবে তােরে অভিলাষ, যে যা বুঝে, সাধ্যমত করে সবে আচরণ। ভােগ-ভাগ্য-কামনায়, কেহ বা ঐহিক চায়, কারাে বাঞ্ছা তব পদে সর্বকৰ্ম্ম সমর্পণ।

৩০
কাব্য-রেণু
সতত সর্বত্র রও,
ইন্দ্রিয়ে গােচর নও,
মানুষের জ্ঞানাতীত, নাহি পায় বাক্য-মন।
বিজ্ঞান দর্শন অন্ধ,
শাস্ত্র মূক সীমাবন্ধ,
অনন্ত অচিন্ত্য ভাব নাহি হয় নিরূপণ ।
লােক-জ্ঞান-গম্য নয়,
তবু কেন এ হৃদয়-
পাবাে পাবাে পাবাে বলে সদা করে অন্বেষণ ?
পাবে না তা জানি ভাল,
সুখে দুঃখে চিরকাল,
সদা যেন থাকে প্রাণ তব পদে নিমগন। ২৭
ভাবিলে বিধাতা তব সৃষ্টির কৌশল,
ভক্তিতে বিভাের হই, বিস্ময়ে বিহ্বল।
মজিয়া প্রেমের টানে,
মাতিয়া কামের বাণে,
প্রবেশে জরায়ুমাঝে জীবাণু সকল।
জননী-শােণিত ল'য়ে,
তিলে তিলে পুষ্ট হয়ে,
দিনে দিনে বাড়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সকল।
কোথা হতে আসে প্রাণ, নাহি শক্তি নাহি জ্ঞান,
মাংসপিণ্ডাকার ভ্রণে চৈতন্য কেবল।
ভবিষ্য পােষণ তরে,
রক্ত দুগ্ধ-রূপ ধরে,
প্রয়ােজনমত হয় প্রত্যহ প্রবল।
সে দুধেতে তা আর,
নাহি কারাে উপকার,
শিশুর পুষ্টির তাহা অনন্য সম্বল।

কাব্য-রেণু কাল পূর্ণ হলে পরে, থাকে না তাে সে জঠরে, বাহিরে আসিয়া দেখে এই ভূমণ্ডল। সেই মাতৃস্তন্য তার, কেবলি হয় আহার, ক্রমে ক্রমে বাড়ে যত খায় অন্ন-জল। যত জন্মে শক্তি জ্ঞান, অহংকারে মাতে প্রাণ, সদসৎ বৃত্তি সঙ্গে পায় তার ফল। তুমি আমি সবে হায় ! আসি ভবে এ প্রথায়, অনন্ত পৰ্য্যায় গাঁথা সৃষ্টির শৃঙ্খলে। আপন সন্ততি রেখে, চলে যায় হেথা থেকে, জীব হতে জীব-স্রোত বহে অনর্গল। যে করেছে হেন সৃষ্টি, তার পদে রেখাে দৃষ্টি, কায় মনে ভক্তিভরে থাকিও নিশ্চল। ২৮ লীলামরি জননি! আমার, লীলায় সৃজন তাের মা, লীলায় সংহার। মানুষের তুচ্ছ জ্ঞান, কি করিবে পরিমাণ, যেটা দেখি, সেটা বুঝি অতি চমৎকার। কাননে কুসুম ফুটে, পবনে সৌরভ ছুটে, বিচিত্র পতঙ্গ কত, লােভে ধায় তার। এক ফুলে মধু খায়, পরাগ মাখিয়া গায়, অন্য ফুলে গিয়া করে গর্ভের সঞ্চার।

৩২
কাব্য-রেণু
পাপড়িগুলি পড়ে ঝরে,
ফুল হতে ফল ধরে,
ফলমাঝে জন্মে বীজ বংশের বিস্তার।
পশু পক্ষী নর যত,
নিজ প্রয়ােজনমত,
দেশ-দেশান্তরে লয়ে করে ব্যবহার। ২৯
অনন্ত নিদ্রায়, শ্মশান-শয্যায়,
কত দিনে মা গাে মুদিব নয়ন ?
এ ঘাের মায়ার, কঠোর সংসার,
করিতেছে মােরে মহা জ্বালাতন।
যাহাদের লাগি, খাটি দিন-রাত,
শ্রমজলে ভাসি, করি প্রাণপাত,
তারই মরমে, করে মা আঘাত,
ভুগে জরজর, হােলাে এ জীবন।
আপনার ক্ষতি করিয়া স্বীকার,
করেছি যাদের শত উপকার,
শত্রুতা সাধিয়া, প্রতিশােধ তার,
প্রেমের বন্ধন করিছে ছেদন।
স্বার্থ-লালসায়, সুখ-পিপাসায়,
আত্মম্ভরী জীব, ধায় অন্ধপ্রায়,
প্রেম প্রীতি নাই, ভাতায় ভ্ৰাতায়
জীবনসংঘর্ষ এ কি রে ভীষণ।

কাব্য-রেণু
তাই ডাকি মা গাে ! দীনে দয়া করে,
শান্তিময় কোলে নে গাে মা সত্বরে,
খেলা সাঙ্গ করে, ফিরে যাই ঘরে,
বিস্মৃতির গর্ভে দিয়া বিসর্জন। ৩০
বেচা-কেনা সাঙ্গ করে, এ ঘাের ভবের হাটে,
সাঁজের বেলা ছেড়ে খেলা, বসে আছি খেয়া-ঘাটে।
ঘুরে ঘুরে সারাদিন,
দেহখানা হােলাে ক্ষীণ,
পাপে প্রাণ জরজর, পরিতাপে বুক ফাটে।
কাঞ্চনের বিনিময়ে,
ঠকিলাম কাচ লয়ে,
সোলা লােভে ভােলা হয়ে, বেচি চন্দনকাঠে।
রিপুবশে মত্ত মন,
হারাইয়ে নিত্যধন,
সুনীতির পথ ছেড়ে, ঘুরিনু মরুর মাঠে।
পারের সম্বল নাই,
খেদে কেঁদে মরি তাই,
তােমার করুণা বিনা কিসে তরি এ বিভ্রাটে ? ৩১
তােরি মায়া-বশে, এ বৃদ্ধ বয়সে,
খেটে মরি মা গাে! প্রাণান্ত করিয়া।
রক্ত
উঠে মুখে, ব্যথা ধরে বুকে,
ধনাশায় তবু ধাই গাে ছুটিয়া।

৩৪
কাব্য-রেণু
নিশিদিন আর কোন চিন্তা নাই,
টাকা কিসে পাই, খুঁজে মরি তাই,
সদসৎ পথ দেখিতে না চাই,
বিষয়-নেশায় বিভাের হইয়া ।
এত কষ্টে যাহা করেছি
পরিণাম তার ভেবে ভয় হয়,
সুরা কি বেশ্যায় কোর্বেব অপচয়,
পুত্র কিম্বা পৌত্রে বিলাসে মজিয়া।
হয় তো পরেতে এ ধনের লাগি,
ভায়ে ভয়ে কতাে কর্বে রাগারাগি,
উকিল কৌনসে হবে অংশভাগী,
দালতে শ্রাদ্ধ যাবে গড়াইয়া।
পুত্র-পৌত্রদের মঙ্গল কারণ,
কত ভ্রান্ত পিতা রেখে যায় ধন,
বিগর্হিত পথে কুলাঙ্গারগণ
ছিনিমিনি খেলে দেয় উড়াইয়া।
শীল, সিংহ, কিম্বা বিশ্বাস, সরকার,
অর্জন করিল যে ধনভাণ্ডার,
ভেবে যবে দেখি পরিণাম তার,
ধন-মুদ মা গাে দেয় ঘুচাইয়া।

কাব্য-রেণু
৩৫
ধন বিনিময়ে মিলে পুণ্য পাপ,
কেহ আশীর্বাদ, কেহ অভিশাপ,
কারাে সুখ শান্তি, কারাে অনুতাপ,
সুপথে কিম্বা বিপথে চলিয়া।
সকল সময় টাকা বন্ধু নয়,
অহংকার দম্ভ মােহের আলয়,
তথাপি বােঝে না এ পােড় হৃদয়,
মায়া-মৃগ লােভে অশান্তি আনিয়া।
স্বদেশ স্বজাতি দরিদ্রের হিতে,
হাত তুলে তবু পারি না ত দিতে,
এ কি ঘের মায়া, দিয়াছ মা চিতে,
বিবেক তিতিক্ষা গিয়াছি ভুলিয়া।
দাও নিভাইয়া ঘাের দাবানল,
ঢেলে দে মা প্রাণে সুধা-শান্তিজল,
গােলােকধাঁধায় হয়েছি বিহ্বল,
কোলে তুলে নে মা মলা মুছাইয়া । ৩২
আয় মৃত্যু! করি আলিঙ্গন,
এ বয়সে বন্ধু নাই তমার মতন।
দীর্ঘ পথে পরিশ্রান্ত,
জীবনসমরে ক্লান্ত,
জরা-জীর্ণ দেহখানা তিক্ত এ জীবন।

৩৬ কাব্য-রেণু শিথিল ইন্দ্রিয়চয়, কেহ কাৰ্যক্ষম নয়, জঠর, চরণ, কর, শ্রবণ, নয়ন। স্তিমিত প্রদীপপ্রায়, দশা বসা নাহি তায়, স্মৃতি, বুদ্ধি, শক্তিহারা, বিলুপ্ত কিরণ। ভাগবত-শ্রীচরণ, অনুরক্ত নহে মন, বিকৃত বিষয়-বিষে বিফলে মগন । থাকিয়া ধরার মাঝ, সাধিব বা কোন কাজ ? মিছে মাংসপিণ্ড কেন করিব বহন। আয় মৃত্যু ডাকি তাই, এখন ঘুমাতে চাই, অনন্ত বিস্মৃতি-কোলে করিয়া শয়ন। ৩৩ প্ৰেম-গীতি জানি আমি পাব নাকো তায়, তবু কেন মিছে মন তারি পানে ধায় ? সেই মুখ, সেই হাসি, সে অতুল রূপরাশি, জড়ায়ে রেখেছে যেন প্রেমের লতায় । এতে যদি দুখ পাই, তবু কি ভুলিতে চাই ? ভুলব বলে মনে হলে, উঠে হায়! হায়! তার স্মৃতিটুকু লয়ে, সুখ-দুঃখে এক হয়ে, হৃদয়ের মৰ্ম্মে মৰ্ম্মে নিয়ত খেলায়। যদি আমি নাহি পাই, তবু আমি সদা চাই, সে যেন সুখেতে থাকে, থাকুক যথায়। ৩৪

কাব্য-রেণু
৩৭
(ওই) মন-চোরা, মাথা-ঘােরা, হাসি কোথা পেলে ?
নেশায় করেছ তাের ও মদিরা ঢেলে।
যত পাই তত খাই,
যত খাই তত চাই,
আগুন দ্বিগুণ জ্বলে দিলে ঘৃত ফেলে ।
বিলােল কটাক্ষ তায়,
করেছে উন্মাদপ্রায়,
যেও না লাে রসবতি। দাসে পায়ে ঠেলে। ৩৫
আমার সদাই জাগে মনে ( জীবনসঙ্গিনী লাে !)
যে নিশিতে প্রাণে প্রাণে গাঁথিনু দুজনে।
সুমঙ্গল ছাঁদনাতলায়, প্রথম দেখা তােমায় আমায়,
একটুখানি টুকটুকে মুখ, সলাজ লােচনে।
রাঙা অঙ্গে রাঙা চেলি, যত সব এয়াে মেলি,
হুলু দিয়ে শিখাইল, বর বড় না কনে।
সময় পেয়ে নাপ তে বেটা, যুড়ে দিলে গালির ঘটা,
মালাবদল, ছাউনি-নাড়া, গােপনে গােপনে।
সভা-মাঝে ধরি হাতে,
সিন্দুর পরাণু মাথে,
মন্ত্রপাঠ, অগ্নি সাক্ষী, ঘােটা চাদবদনে।
কড়ি খেতে গেছি হেরে, কানমলা কোমল করে,
কত হাসি, কত ঠাট্টা, বসিয়া ভােজনে।

৩৮ কাব্য-রেণু বাসর-ঘরের কথা, শালীদের রসিকতা, সে যামিনী গেল যেন, অপসরা-কাননে। কত কথা গেছি ভুলে, যতনে রেখেছি তুলে, স্মৃতির সােনার কৌটা কিশাের জীবনে। ৩৬ চাচর চিকুর, অধর মধুর, নিটোল ললাটখানি। নীলাভ চঞ্চল, লােচন-যুগল, লােহিত কপোেল পাণি। আকর্ণসংগতা, বিলােল জ্বলতা, মদন-কেতনখানি। শিখর-দশনা, চকিত হসনা, অমিয় ঝরণা বাণী। কমল-চরণ, বিমল-বরণ, চাদের কিরণ ছানি এ প্রাণ, এ কায়, সপেছি তােমায়, প্রেমের প্রতিমা জানি। পরম যতনে, হৃদি-সিংহাসনে, সাজায়ে রেখেছি রাণি। যেও না নিয়ে । দাসের হৃদয়ে কঠোর কুলিশ হানি ॥ ৩৭

কাব্য-রেণু
---
চারুশীলে । তােমায় আমায়-
সংসারের রঙ্গভূমে ক্রীড়া সাঙ্গপ্রায়।
কীটদষ্ট বৃক্ষ মত,
তিন কুড়ি বর্ষ গত,
ওলােট পালােট কত
সহিয়াছি, অবিরত বিনীত মাথায়।
সুখ-দুঃখে রাশি রাশি, কত কান্না কত হাসি,
স্মৃতি সদা সে কাহিনী হৃদয়ে জাগায়।
কত ছাত্র বাল্যকালে,
পড়িতাম পাঠশালে,
কয়জন তাহাদের আছে এ ধরায় ?
যৌবনের সঙ্গী যত,
অকালে মিলায়ে গেছে, কালের বাত্যায়।
বৃন্তচ্যুত পুষ্পপ্রায়
তনয়-তনয়া হয়।
ক্রোড়শূন্য কোরে মরি! লুকাল কোথায় ?
জনক-জননীদ্বয়,
গিয়াছেন স্বর্গালয়,
বহে ঘটনার স্রোত, অনন্ত ধারায়।
বাকিমাত্র তুমি আমি,
কে হইবে অগ্রগামী,
নিশিদিন ভাসি, দোহে সেই ভাবনায়।
নারীধৰ্ম্ম অনুরাগে,
তুমি যেতে চাও আগে,
এবার আমার পালা, বর্ষ গণনায়।
যা আছে বিধির মনে,
ঘটিবে অচির দিনে,
কি সাধ্য মানবশক্তি, লঙ্ঘিব তাহায়।

৪০
কাব্য-রেণু
4
।
তুমি যাই অর্ধ অঙ্গ,
দুর্ভাগ্যের ভ্রুকুটিভঙ্গ,
সংসারের ঘাের তরঙ্গ এড়াই হেলায়।
কত উগ্র উৎশৃঙ্খল,
প্রবৃত্তির তীব্ৰানল,
তব কোমলতা ঢালে অমৃতধারায়।
তােমারে বাসিয়া ভালাে, হৃদয়ে জ্বেলেছি আলাে,
উজলিত এ সংসার প্রেমের প্রভায়।
সহিষ্ণুতা স্বার্থত্যাগ,
পরহিতে অনুরাগ,
পাপে ঘৃণা, পুণ্যে মতি, তােমারি শিক্ষায়।
গৃহধৰ্ম্মে সদাসক্তি,
হরিপদে দৃঢ়
ভক্তি
চিরদিন তুমি মাের ধৰ্ম্মের সহায়। ৩৮
হাসি হাসি মুখে,
কারে লয়ে বুকে,
দোলাইছ প্রিয়ে ! বল না ?
ও চাদ বদনে,
সােহাগ চুম্বনে,
তিরপিত প্রাণ হ’ল না।
ওটি আমাদের গৃহ-কাননের,
নবীন মুকুল প্রেম-পাদপের,
বিধাতার দান, পুতলি স্নেহের,
সংসারের সার খেলনা ।

কাব্য-রেণু
৪১
ওরে লয়ে কোলে পুলকিত কায়,
বর্ষে যেন প্রাণে অমৃতধারায়,
আত্মহারা হই, স্বার্থ ঘুচে যায়,
ওরি সুখ সদা কামনা।
সত্য যুগ সম পবিত্র জীবন,
ভরা পেটে হাসি, ক্ষুধায় রােদন,
বিষয়ের বিষ ভােগেনি কখন,
শিখে নাই কোন ছলনা।
টেপাে টেপাে রাঙা গাল দুটি ফুলে,
খুদে খুদে ওই হাত দুটি তুলে,
ফোটা ফোটা কুঁড়ি ঠোট দুটি খুলে,
নীরবে কি বলে বােঝ না।
“তােমরা সবাই মম সম হায় !
মাংসপিণ্ডাকারে এস এ ধরায়,
আপন রক্ষণে নিজে অসহায়,
দেহে মাত্র ছিল চেতনা।
পরম পিতার চরণ-দয়ায়,
আসি যাই সবে মায়ার খেলায়,
বিষয়ের মােহে মজিয়ে হেলায়,
তার পদ কভু ভুলাে না।

৪২ কাব্য-রেণু সুখ দুঃখে তােরা, আমারি মতন, তাহারি চরণে করিও যােদন, শান্তির স্তন্তেতে জুড়াবে জীবন, করুণার নাই তুলনা।” ৩৯ ওই সরােবরে বিকচ নলিনী, মনােলােভ নিজ শােভা, হেরে হাসে পাগলিনী। কালাে অঙ্গ ভূঙ্গ কাছে, কভু গায়, কভু নাচে, গুণ গুণ মধু যাচে, মাথা নাড়ে গরবিণী। তাের প্রতি যার টান, কেন তার অপমান ? দিবা হলে অবসান, কান্তি যাবে কমলিনী ৪০ জীবনের দুই দিকে, দুই মহাস্থান- একটি সূতিকাগার, অন্যটি শ্মশান। মাঝে সুখদুঃখময়, জীবনের রঙ্গালয়, প্রবেশ প্রথম পথে দ্বিতীয়ে প্রস্থান। অঙ্ক ও গর্ভাঙ্ক কত, দৃশ্য তার নানামত, প্রাসাদ, পর্বত, নদী, মন্দির, উদ্যান। কোন দৃশ্যে ভাঙা কুঁড়ে, বাতাসেতে খড় উড়ে, কোথাও নির্জন মাঠ মরুর সমান।

কাব্য-রেণু ৪৩ কোনটায় উচ্চ হাসি, আনন্দ-সাগরে ভাসি, কোনটায় অশ্রুরাশি, শােক-দুঃখে ম্লান। জীবনযাপন তরে, কত দ্বন্দ্ব ঘরে পরে, কত ধৰ্ম্ম কত কৰ্ম্ম, কত অনুষ্ঠান। যে জন পরের তরে, আত্মবিসর্জন করে, সেই শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, সেই মহাপ্রাণ। অভিনয় শেষ হলে, সে জন চলিয়া গেলে, ধন্য ধন্য করে লােক, গায় কীর্তিগান। ৪১ বিবিধ দেখ ভাই। এ বড় কৌতুক, মেষ-চৰ্ম্মে সমাবৃত কপট জম্মুক। নানা শাস্ত্র-বিশারদ, রাজদ্বারে উচ্চপদ, পেটেতে জিলাপির পেঁচ, মধুমাখা মুখ। কৌটিল্যের অবতার, আসলখানা বােঝা ভার, বচনে উদার বড়, স্বার্থে ভরা বুক। মাথায় জড়ান সাল্লা, কৌশলে বাধান মামলা, ধরি মাছ না ছুঁই পানি, পরদুঃখে সুখ। লােক-দেখানে অবিরল, কুম্ভীরের অশ্রুজল, অন্তরেতে দয়া-ধৰ্ম্ম নাহি একটুক। সভ্যতার সুচিক্কণ, পরিচ্ছদ আবরণ, সদরে তিলক মালা অন্দরে ঢু ঢু।

১৪ কাব্য-রেণু হিপক্রিসি, ডুপ্লিমেসি, বুঝি তার মাসি পিসি, বদমায়েসির লিষ্টি গাঁথা, যেন ব্ল্যাক বুক। হারামের ছুরি পেটে, ফেরেব-ফন্দি গেঁটে গেঁটে, পুকুর পাচার করেন দিয়ে দুটো ফুক। ৪২ অলক্ত-রঞ্জিত, নুপুর গুঞ্জিত, রুণু রুণু নাদে, বাজে গােল মল । অনন্ত সন্তাপভরা, এটা যে দুখের ধরা, সাররত্ন প্রমদার চরণ-যুগল। ভঙি, খেয়ে ভােলানাথ, ও চরণে কুঁপােকাত, বিলুষ্ঠিত নীলকণ্ঠ, পাতি বক্ষঃস্থল। সুচারু চন্দ্রিকা আঁকা, লুটায়ে ময়ূর পাখা, শিরে ধরি শ্যামাদ হলেন বিহ্বল। কত শত মুনিবর, বিশ্বামিত্র পরাশর, কঠোর তপস্যা করে লভিল এ ফল। পাইয়া অন্য পথ, কত অজ দশরথ, ধন, প্রাণ, রাজ্যসনে হয়েছে টম। এন্টনি উন্মাদ প্রাণ, জাহাঙ্গির সাজিহান, হাবুডুবু খেয়ে কাবু গেল রসাতল। আমি নর ক্ষুদ্র জ্ঞান, কিবা জানি স্তুতি-গান, শাস্ত্র ইতিহাসে গাঁথা আছে সে সকল। ৪৩

কাব্য-রেণু
৪৫
গৃহিণীর চঞ্চল অঞ্চল,
বাক্যবীর বাঙ্গালীর সহায় সম্বল।
যখন আঁধার রেতে,
বাহিরেতে হয় যেতে,
দুরু দুরু করে হিয়া, আতঙ্ক প্রবল।
ভূত প্রেত জুজু ভয়ে,
সটান আড়ষ্ট হয়ে,
মুখেতে সরে না কথা, ধমনী শীতল ।
বিছানা কি ঘর দ্বার,
কৰ্ত্তে হয় পরিষ্কার,
তখন ও আঁচলখানি ভরসা কেবল।
সভায় বক্তৃতা দিয়ে,
যখন ছেলের বিয়ে,
ঘটকের সঙ্গে বাধে মহা কোলাহল।
কপাটের আড়ে থেকে, মাথা নেড়ে কিম্বা হেঁকে,
তখন ও আঁচলখানি ভরসা কেবল।
পাইতে যাহার সাড়া,
প্রতিবাসী ছাড়ে পাড়া,
হাত মুখ নথ নাড়া, ধরা রসাতল।
কত গুণ নাহি জানি, তার সে আঁচলখানি,
চির-জয়যুক্ত হােক, সাধুক মঙ্গল। ৪৪
কিছুই ঠিক পাইনে দাদা!
ভােলা-পাড়া যতই করি, ততই বাড়ে ধাঁধা
যে সৃজিল এ সংসার,
সাকার কি নিরাকার ?
কোথা আছেন ? কোথা নাই ? কালাে কিম্বা সাদা ?

৪৬
কাব্য-রেণু
চৈতন্য কি
জড়
শক্তি,
রচিল সৃষ্টির পংক্তি ?
ভক্তি, জ্ঞান, কিম্বা কৰ্ম্ম, কিসে যায় সাধা?
আগে আমি কোথা ছিলাম ? কোথা যাবো? কেন এলাম ?
আত্মা দেহে কি সম্বন্ধ ? কেন মায়ায় বাধা ?
আমি কি পরম হংস ? * অমর কি হবে ধ্বংস ?
স্বর্গ নরক কোন্ লােকে ? কাদায় যায় কি কাদা ? :
অদৃষ্ট কি কৰ্ম্মফলে,
কার বশে জীব চলে ?
সুখ লােভে দুখ মেলে, চোখ থাকতে আঁধা।
শাস্ত্রে শাস্ত্রে মহাদ্বন্দ্ব,
এ উহারে ভাবে অন্ধ,
যত মুনি তত মত, প্রভেদ গাদা গাদা। ৪৫
( চার্লস ম্যাকে লিখিত টিউবাকেন নামক কবিতার
ছায়া অবলম্বনে)
ধরণীর বাল্যকালে,
ছিল এক জন,
সুদৃঢ়-শরীর, বীর, নাম সুদর্শন।
ব্যবসায় কর্মকার,
মুদগর আঘাতে তার
ছুটিত ফুলিঙ্গ-মালা লােহিতবরণ।
রবির উদয় অস্ত,
জাত সুৰ্ম্মি লয়ে ব্যস্ত
বাজিত উত্তপ্ত লৌহ, করি ঠন্ ঠন্।
* পরং অহং স,=আমি সেই পরম পুরুষ বা সােহহং ।
| Dust to dust

কাব্য-রেণু ৪৭ ( ২ ) পরশু বল্লম আর, তীর তরবার, অনলে তাতায়ে গড়ে, অতি তীক্ষ্ণ ধার, আনলে সে গায় গান, “সাবাস্ সে বলবান, আমার এ অস্ত্রগুলা হাতে যাবে যার। এ মেদিনী, ধন, ধান্য, বীরকীৰ্ত্তি মহামান্য, সিংহাসন, রাজদণ্ড, পাবে অধিকার।” ( ৩ ) গর্জিত অনল-পাশে বসিয়া যখন- শাণিত ইস্পাতে অস্ত্র করিত গঠন, কত লােক সেথা আসি, দেখিত আনন্দে ভাসি, তাহার হাতের কাজ অতি সুচিক্কণ । ধনুক সায়ক-যত, শূল, শেল, নানামত, বাখানিত বলি কত উৎসাহ-বচন। --- ( ৪ ) “সাবাস তােমারে বলি ওহে সুদর্শন ! বাহবা এ অস্ত্রগুলা, সুদৃঢ় কেমন। এ তােমার কি কৌশল, পাইলাম নব বল, এখন আমারে আর আঁটে কোন্ জন ?” দলে দলে লােক আসি, লয়ে গেল অস্ত্ররাশি, বিনিময়ে ধন রত্ন দিল অগণন

88
কাব্য-রেণু
(৫)
কিন্তু হায়! দিবা নাহি হতে অবসান,
ব্যথিল তাহার চিত্ত, পৰ্যাকুল প্রাণ।
দেখিল সে সবিস্ময়ে,
তাহারি আয়ুধ ল’য়ে
বেধে গেছে মারামারি দম্ভ অভিমান।
পরিহরি দয়া-ধৰ্ম্ম,
বাধিল নিৰ্ম্মম কৰ্ম্ম,
রুধিরে পঙ্কিলপ্রায় হােলাে ধরাশান।
( ৬ )
তপ্ত রক্তে সিক্ত কর কত ভাই ভাই,
কাটা মুণ্ড উড়াছড়ি, সংখ্যা তার নাই।
মিয়মাণ শিল্পী তায়, “এ কি! পরিণাম হায়!
কি গঠি! কি সাজানু ! কি শিখানু ছাই !
আমারি প্রমাদ তরে,
এ বিবাদ ঘরে ঘরে,
জগতের পাপ-স্রোত বেড়ে গেল তাই”।
( ৭ )
সে অবধি কত দিন.একা সুদর্শন,
গালে হাত দিয়া ব'সে ভাবে মনে মন।
অনুতপ্ত চিত্ত তার,
ছোঁয় না হাতুড়ি আর
হাপােরে অনল-শিখা করে না জ্বালন।
কাজকর্মে নাহি মন,
সদা থাকে উচাট
মরিচা ধরিছে লৌহে নাহিক যতন।

কাব্য-রেণু
৪৯
।
(৮)
*
ভেবে ভেবে অবশেষে কিছুদিন পরে,
প্রফুল্ল বদন তার কহে হর্ষতরে।
“এ কি মাের ভ্রান্ত দৃষ্টি ? ইস্পাত হয়নি সৃষ্টি,
শুধু মাত্র অস্ত্রপুঞ্জ গঠনের তরে।”
কৃষি-শিল্প যন্ত্র কত,
বিরচিল নানামত,
সৃজিল লাঙ্গল ফল। সুনিপুণ করে।
(৯)
এ দিকে লােকেরা দেখে বিষময় ফল,
গলে গলে আলিঙ্গন ছাড়িয়া কোন্দল ।
অসি বৰ্ম্ম দিল খুলে,
নাগদন্তে রাখে তুলে,
সানন্দ অন্তরে আসি ধরিল লাঙ্গল।
জীবের মঙ্গল তরে,
নানাবিধ শ্রম করে,
ফলে ফুলে সুশােভিত হ’লাে ধরাতল।
(১০)
হরিষে গাহিল পুনঃ যত লােজন,
“ধন্য তাের গুণপণা, ধন্য সুদর্শন।
তাের গুণে বসুমতী,
হইয়াছে ফলবতী,
মানব-সমাজ আজ শান্তিনিকেতন।
দুৰ্জ্জনের উৎপীড়নে,
রক্ষিতে দুর্বল জনে,
কাজে লাগিবেক অস্ত্র বিপদ যখন।”

৫৪ কাব্য-রেণু - --- L স্মৃতির ছিন্ন পৃষ্ঠা লেখকের বিবাহে একটি হর্ষ-বিষাদ-বিজড়িত ঘটনা-বৈচিত্র্য আছে, সেটি এই ঃ- [ কলিকাতা হইতে ৭ মাইল উত্তরে কামারহাটী গ্রামে দুর্গাচরণ পিতুড়ির ঘাটের পার্শ্বে আমাদের একখানি ছােট-খাট পৈতৃক উদ্যান ছিল। তথায় ইষ্টকে গাঁথা বেদীর উপর প্রপিতা- মহীর প্রতিষ্ঠিত বিশালকায় অশ্বথ ও বটগাছ আছে ও একটি ছােট-খাট রাসমঞ্চ ছিল। আমার পূর্বপুরুষগণের আমলে কুল- দেবতা রাধাকান্ত জিউকে কলিকাতা হইতে তথায় লইয়া যাইয়া সমারােহে রাসযাত্রা উৎসব হইত, লােকে সেই জন্য ইহাকে ‘কলা- বাগানের রাস’ বলিত। আমরা বাল্যকালে সময়ে সময়ে তথায় যাইয়া বাস করিতাম। আমার যখন বয়স ২০ বৎসর, তখন আমার পরম স্নেহময়ী পিতামহী ভীষণ গ্রহণী-রােগে আক্রান্ত হন। স্বর্গীয় খ্যাতনামা কবিরাজ রমানাথ সেন মহাশয়ের উপদেশে সেই বাগানে লইয়া গিয়া তাহাকে বায়ু ও স্থান-পরিবর্তনের জন্য রাখা হয়। গঙ্গাতীরে থাকিয়া তাহার বিশেষ উপকার হইয়াছিল। বৈশাখ মাস হইতে কার্তিক মাস পর্যন্ত তথায় থাকিয়া তিনি প্রায় নীবােগ হইয়াছিলেন। আমি তাহার অতিপ্রিয় জ্যেষ্ঠ পােল, তিনি আমার বিবাহের জন্য পূৰ্ব্বে একটি পাত্রী স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন। অগ্রহায়ণ মাস পড়িলে পর তিনি আমার পিতা ও কাকা মহাশয়দিগকে আমার বিবাহ দিবার জন্য অতিশয় জেদ করিতে লাগিলেন। পুত্রদ্বয় মাতৃ-আজ্ঞা লঙ্ঘন করিতে পারিলেন না, তাহাকে কলিকাতায় আনিয়া বিবাহের আয়ােজন কাব্য-রেণ ৫১ করিতে লাগিলেন; কিন্তু দুর্দৈবের কথা বলিব কি, কলিকাতায় আসিয়া তাহার বােগ পুনরায় প্রবল হইতে লাগিল, অবিবা- হিতান্নের দিন ব্যাধিটা সাতিশয় ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিল, ও বিবাহের দিন নাড়ী ছাড়িয়া গেল। কিন্তু তথাপি তার জ্ঞানের বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম হয় নাই, অথবা বাশক্তি বিলুপ্ত হয় নাই। তিনি সাহস দিয়া আমার পিতা ও কাকা মহাশয়কে বলিলেন, “যাও বাছা, আজ রাত্রে বিবাহ দিয়া বর-বধূ লইয়া আসিয়া আমাকে দেখাও।” তাহার আদেশমত সেই রাত্রেই আমি বিবাহ করিয়া বধু সমেত বাটী আসিয়া তাহার চরণধূলি লইলাম ; তিনি আমাদের উভয়কে আশীৰ্বাদ করিয়া আমাকে বলিলেন, “দেখ, ভাই, তুই আর কাদছিস কেন? আমি ত আমার বদল দিয়া গেলাম এবং নব বধূকে বলিলেন, “দেখ দিদি, আমার এই ছােট ভাইটি একটু খ্যাপা পারা, যদি তােমার সহিত ঝগড়া করে ত রাগ করিও ” এবং আমার পিতা ও কাকা মহাশয়দিগকে বলিলেন, “তােমাদিগকে এই নূতন মা দিয়া গেলাম। আমি জানি, ইহার স্বভাব অতি শান্ত-শিষ্ট, ইহার গুণে তােমরা আমার অভাব অনুভব করিবে না,” ইহা বলিয়া তিনি আমার নূতন বধুর যৌতুক- স্বরূপ যে পৈতৃক অলঙ্কার রাখিয়াছিলেন, তাহা কাকা মহাশয়কে পরাইয়া দিতে বলিলেন, তঁাহর আদেশ পালিত হইল। তখন তিনি সকলকে বলিলেন, “আর কেন, আমার মনের সাধ পূর্ণ হইয়াছে, এইবার আমায় গঙ্গায় লইয়া চল।” তখন রাত্রি ২টা। তাহাকে নীচে নামান হইলে, তিনি আকাশের তারা দেখিয়া আবার বলিলেন, “না না, এখনও রাত্রি আছে, শীতে ছেলেদের ব্যামাে হইতে পারে, আমাকে ঠাকুর-দালানে রাখিয়া তােমরা

কাব্য-রেণু
বাসি বিবাহের উদ্যোগ কর, অশৌচ হইলে এক মাস মাছ
খাইতে পারিবে না, ভাল করিয়া সকলকে কল্য মাছ-ভাত
খাওয়াও, আর কুলদেবতা রাধাকান্ত ও পাড়ার তারাসুন্দরী
দেবীর ভােগ দিয়া আমাকে প্রসাদ আনিয়া দাও। তাহার
পর, আমাকে তীরস্থ করিও।”
পরদিন তাহার আদেশমত সকল কাৰ্য অনুষ্ঠিত হইলে,
বেলা তিনটার সময় তাহাকে তীরস্থ করা হয়, সমস্ত রাত তিনি
সংকীৰ্ত্তন শুনিয়া ও নিজে নাম জপ করিতে করিতে সূর্যোদয়কালে
অর্ধগঙ্গাজলে শয়ন করিয়া অনন্ত ধামে চলিয়া গেলেন।
সাধারণ লােকে মৃত্যুর নামে ভীত ও বিচলিত হইয়া পড়ে,
কিন্তু সেই পুণ্যবতী কৰ্ম্মযােগিনী পিতামহী আমার, যেন এ
বাড়ী হইতে ও বাড়ী যাইতেছেন, এইরূপ নিঃশঙ্কচিত্তে সংসারের
সমস্ত সুবন্দোবস্ত করিয়া পরপারে চলিয়া গিয়াছেন। এই
শােকানন-বিজড়িত ঘটনাটি লেখকের মনে এত গভীর অঙ্কপাত
করিয়াছে যে, সে ঘটনা স্মরণ করিয়া নিম্নলিখিত কবিতাটি
লিখিত হইয়াছে।
{
(১)
।
।
এই সেই প্রাচীন উদ্যান,
শৈশবের ক্রীড়াক্ষেত্র পবিত্র স্থান।
অতীত স্মৃতির সনে,
কত কথা পড়ে মনে,
পিতুড়ী ঘাটের পার্শ্বে সংকীর্ণ শ্মশান।
f,
++

কাব্য-রেণু ৫৩ T . (২) ভাগীরথী পশ্চিমে বহিছে। আজও যেন কলনাদে কত কি কহিছে। আচ্ছাদি উহার তট, যুগল অশ্বত্থ বট, বড়মার * প্রতিষ্ঠিত বেদীতে শােভিছে। (৩) আজিও সেই আগেকার মত, ফলপুষ্পে ভরা তরু রহেছে উন্নত ; নারিকেল বেল আম, পেয়ারা গুবাক জাম, যােপণ করিল যারা কালনিদ্রাগত। * । ( ৪ ) আজও যেন জাগিছে হৃদয়ে, কলা-বাগানের রাস’ ক্ষীণ রেখা হয়ে ; কান্তসহ রাধারাণী । কুল-দেবতায় আনি, আনন্দ উৎসব হােত শুৎসময়ে। * ( ৫ ) সমুজ্জ্বল আলােকমালায়, শােভিত প্রাচীরকক্ষ পুষ্প-পতাকায় । দিবাভাগে অন্নদান, নিশাকালে যাত্রাগান, দেখিবারে কত লােক আসিত নৌকায়। * প্রপিতামহীর। ক রাধাকান্ত ঠাকুর।

৫৪
কাব্য-রেণু
( ৬ )
রাসমঞ্চ গিয়াছে ভাঙ্গিয়া,
কালের করাল দন্তে চর্বিত হইয়া
বট-অশ্বথের গাছে,
বেদী আজও গাঁথা আছে,
অতীত গৌরব সাক্ষী সম দাড়াইয়া।
(৭)
ওই বট অশ্বথের মূলে,
বাল্যজীবনের দিনে নানা ফুল তুলে ;
দীর্ঘ গ্রীষ্ম অবকাশে,
বসি পিতামহীপাশে,
খেলিতাম কত সুখে ভয় চিন্তা ভুলে।
(৮)
কলকণ্ঠে কোকিল পাপিয়া,
দিগন্ত প্লাবিত করি বেড়াত উড়িয়া,
তাহাদের ভঙ্গি ধরে,
ডাকিতাম উচ্চ স্বরে,
সাধিতম খাইবারে মিষ্টান্ন ভাঙ্গিয়া ।
(৯)
কত তরী গঙ্গার উপরে,
কেহ দড় টেনে যায়, কেহ পালভরে ;
নাবিকেরা বসি তায়,
ফুল্লমনে গীত গায়,
আফিস-ফেরত কত বাবু যান ঘরে।

কাব্য-রেণু
৫৫
(১০)
জেলে মালা ক্ষুদ্র ডিঙ্গি লয়ে
গঙ্গায় ধরিত মাছ রৌদ্র-বৃষ্টি সয়ে,
বংস সহ গাভী-দল,
পান করি গঙ্গা জল,
শ্যামল পুলিনে তৃণ খায় হৃষ্ট হয়ে।
(১১)
বসে ওই ঘাটের সােপানে,
শুদ্ধ চিত্ত দ্বিজগণ মগ্ন বিভু-ধ্যানে ;
যজ্ঞসূত্র ধরি করে,
সন্ধ্যার বন্দনা করে,
কেহ করে দেবাচ্চনা শাস্ত্রের বিধানে।
(১২)
.
=
সদ্যস্নাতা পল্লীবধূদল,
মুক্তকেশ সিক্তবেশ লয়ে যায় জল ;
হাসি ভরে মৃদু স্বরে,
কথা কয় পরস্পরে,
ঘােমটায় ঢাকা মুখ, লােচন চঞ্চল।
(১৩)
কোথাও বা মুখরা প্রাচীনা,
কলহে নিপুণা নাহি লজ্জা ভয় ঘৃণা ;
সঘনে পায়ে পাড়া,
দিয়া যায় হাত নাড়া,
পরিপাক অয় নাহি হয় দ্বন্দ্ব বিনা।

কাব্য-রেণু
(১৪)
সত্য যুগ ধস্থ শিশুকাল,
জাতিধৰ্ম্ম ভেদাভেদ নাহিক জঞ্জাল।
নানা জাতি শিশু মেলি,
একত্রে করিছে কেলি,
এক ঠাই ভাই ভাই ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল।
(১৫)
সুরধুনী-বক্ষেতে সাঁতার,
আপনারা দাড় টেনে নৌকায় বিহার ;
গাছে চড়ে গেছি পড়ে, হাত পা গিয়াছে ছ'ড়ে,
কঁচা পাকা ফল পেড়ে একত্রে আহার ।
{
ঘােড়া ঘােড়া কপাটি কপাটি,
কত মত খেলিতাম, গুলি-ডাণ্ডা-লাঠি ;
লাঠিম, লাটাই, ঘুড়ি, ব্যাট ধরি, বল ছুড়ি,
করিতাম কভু কুস্তি, অঙ্গে মাখি মাটি।
(১৭)
প্রভাতে পাখীর গানে উঠি,
দেখি নানা বর্ণ কত ফুল আছে ফুটি
বিচিত্র পতঙ্গগণ,
করে তায় বিচরণ,
সকৌতুকে তাহাদের পাছু পাছু ছুটি।

কাব্য-রেণু
৫৭
( ১৮ )
বরিষায় কাল কাদম্বিনী,
ঘাের ঘটা অন্ধকারে ঢাকিত মেদিনী;
ছুটিত উন্মত্ত ঝড়,
বজ দন্তে কড় মড়,
মুসলের ধারে বৃষ্টি হাসিত দামিনী।
(১৯)
নিদাঘ-সন্তপ্ত তরুগণ,
কোমল শ্যামল শােভা প্রাবৃটে কেমন ;
নবীন পল্লব-ভরে,
লতা আলিঙ্গন করে
লম্ফ ঝম্প ভেককুলে তর্জন গর্জন।
( ২০ )
অমাবস্যা আঁধার নিশায়,
ধীর শান্ত ভীমকান্ত মরি সুষমায়।
উদ্ধভাগে সমুজ্জ্বল,
অগণিত তারাদল,
পরপারে ক্ষীণ রশ্মি, আলােক নৌকায়।
t
(২১),
দীর্ঘদেহ দৈত্যের মতন,
তাল নারিকেলশ্রেণী অস্পষ্ট দর্শন;
কোথাও বা সুচঞ্চল,
অযুত জোনাকিদল,
জুলে, নিভে, বিটপীরে করি আচ্ছাদন।

প্রকৃতির যাদুমন্ত্র করিত বিকাশ।
৫৮
কাব্য-রেণু
(২২)
পূর্ণিমায় উজ্জ্বল যামিনী,
কৌমুদী মাখিয়া গায় বিভােরা মেদিনী ;
হীরকখচিত কায়,
জানুবী-লহর ধায়,
শােভে যেন মূর্তিমতী শান্তি বিনােদিনী।
(২৩)
কখন বা শারদ সন্ধ্যায়,
দীপমালা সাজাইয়া কদলী-ভেলায় ;
ভাসায়ে দিতাম নীরে,
করতালি দিয়া তীরে,
দেখিতাম খদ্যোতিকাশ্রেণী ভেসে যায়।
( ২৪ )
কিবা নীল নিৰ্ম্মল আকাশ,
কি সুবাস পুষ্পশ্বাস, বিমুক্ত বাতাস ;
শাখা-পত্রে মরমর,
ভাগীরথী তরতর,
(২৫)
সন্ধ্যা নাহি হইতে বিগত,
করাল বিকট রবে ডাকে শিবা যত,
শুয়ে পিতামহী-কোলে, স্নেহমাখা মধু বােলে,
চোখ বুজে শুনিতাম উপকথা কত।

কাব্য-রেণু
--------
( ২৬ }
শুনিতাম.শাস্ত্রের বারতা,
সুভদ্রা, সাবিত্রী, সীতা, দময়ন্তী কথা;
রাম, লক্ষ্মণ আর
দুৰ্য্যোধন দুরাচার,
অন্ধকের পুত্রশােক, চিন্তা পতিব্রতা।
(২৭)
শুনিতাম তীর্থের কাহিনী
মথুরা, শ্ৰীবৃন্দাবন, বিন্ধ্য-নিবাসিনী ;
গয়া, জগন্নাথ-মঠ,
প্রয়াগে অক্ষয় বট,
কাশীধামে আসি, গঙ্গা উত্তরবাহিনী।
( ২৮ )
ক্রীড়াশীল চঞ্চল জীবন,
পিতামহী-স্নেহ-অঙ্কে লালন-পালন।
সতত দুরন্ত অতি,
বাণী-পদে নাহি মতি,
গুরুজন করিতেন কতই শাসন।
(২৯)
আধ নিদ্রা আধ জাগরণে,
শৈশব যাপিত, যেন সুখের স্বপনে ;
শুভ্র স্বচ্ছ লঘুকায়,
শরতের মেঘপ্রায়,
চিন্তাহীন শ্রমহীন, তরুণ কিরণে।

৬০
কাব্য-রেণু
(৩০)
কালস্রোতে আসিল যৌবন,
শৈশব চাঞ্চল্য ঘুচে, বিলাসে মগন ;
নব ভাবে নবনাট্য
বেশভূষা পারিপাট্য,
জীবনের প্রথমাঙ্ক হােলাে সমাপন।
(৩১)
হেনকালে বিধির লাঞ্ছনা,
কেমনে সে শােকগাথা করিব বর্ণনা,
মৰ্ম্ম বিদলিত করে,
গণ্ড বহি অশ্রু ঝরে,
যখনি মনেতে পড়ে সে ঘাের ঘটনা।
(৩২)
বােগাক্রান্তা ঠাকুমা আমার,
এ দেহ লালিত হােলাে স্নেহ-অঙ্কে যার ;
জনম অবধি তার,
অহােরাত্র কণ্ঠহার,
জননী অধিক স্নেহে সহিত আব্দার।
?
t
(৩০)
প্রতিবাসী আত্মীয় স্বজন,
যার গুণ ব্যাখ্যা-কালে সজল নয়ন ;
মধুভাষী মৃদু হাসি,
হরিপদে চিরদাসী,
আত্মপর, ভেদজ্ঞান, ছিল না কখন।

কাব্য-রেণু
৬১
A
(৩৪)
কলিকাতা সহরে নিবাস,
বিজ্ঞ চিকিৎসকগণ হইয়া হতাশ;
এ কাননে আনি তারে, আদেশিল রাখিবারে,
উপকারে যদি আসে জাহ্নবী-নিশ্বাস।
নৌকা-যােগে আনিয়া হেথায়,
বাবা কাকা রাখিলেন পীড়িত মাতায় ।
থাকিতাম কাছে কাছে,
ক্রটি কিছু হয় পাছে,
প্রাণপণে সেবিতাম প্রভাত-সন্ধ্যায়।
(৩৬)
মালাজপ, তুলসী-অর্চনা,
নিত্যকৃত্য, নাম-গান, দেব-আরাধনা ;
করিবারে অন্যমন,
পড়িতাম রামায়ণ,
পুণ্য ভাগবত-কথা ঢালিত সান্ত্বনা।
-
(৩৭)
বসাইয়া চৌকির উপরে--
কভু কক্ষে বারান্দায় ধরাধরি করে ;
প্রভাতে নদীর কূলে,
মধ্যাহ্নে অশ্বথ-মূলে,
নৌকায় শায়িতা কভু অস্তরবিকরে।

৬২
কাব্য-রৈণু
( ৩৮ )
রমানাথ ভিষ-সত্তম,
বার্ধক্যে গ্রহণী-রােগ ভীষণ বিক্রম ;
ছয় মাস চিকিৎসায়,
নীরােগ করিল প্রায়,
শ্বেথ, জ্বর, উপসর্গ কিছু উপশম।
( ৩৯ )
দুর্গোৎসব গিয়াছে চলিয়া,
কার্তিকের হিমকণা পড়িছে ঝরিয়া ;
মন নাহি টিকে আর, আজ্ঞা হলাে ঠাকুরমার,
আর কেন চল যাই বাটীতে ফিরিয়া ।
খ
( ৪০ )
পুত্রদ্বয় মাতৃ-আজ্ঞাকারী,
কোনমতে পারিল না রাখিতে নিবারি ;
কার্তিক হইলে শেষ,
ফিরিয়া এলাম দেশ,
বৃদ্ধার মনের কথা বুঝিতে না পারি
(৪১)
আজ্ঞা দিল ডাকিয়া পিতায়,
: “এ জীবন অবসান হইবে ত্বরায়
ভেবে চিন্তে চারিদিক, পালী রাখিয়াছি ঠিক
পৌত্র-বধূ আনি ঘরে দেখাও আমায়।”

কাব্য-রেণু
১৩
" ৪২)
নিনাদিল মঙ্গল-বাজনা,
গাত্রেতে হরিদ্রা দিল, পিঁড়িতে আলপনা ;
পরায়ে শ্রীখণ্ড বাস,
হাতে সূতা অধিবাস,
আচম্বিতে সর্বনাশ! বিধি-বিড়ম্বনা।
( s৩)
পূর্বব-রাত্রে হইয়া প্রবল,
দ্বিগুণ ব্যাধির স্রোত বহে অনর্গল ;
মণি-বন্ধে নাহি নাড়ী,
শ্বাস বুঝি যায় ছাড়ি,
বক্ষের স্পন্দন যেন হতেছে নিশ্চল।
( ৪s )
নাহি কিন্তু জ্ঞানের ব্যত্যয়,
পিতারে সাহস দিয়া পিতামহী কয়,
“যাও বাবা বিভা দিয়া,
ততক্ষণ রবে প্রাণ কোরাে নাক ভয়।”
নববধূ আন গিয়া,
( ৪৫ )
F
চলে বর বিষাদে মগন,
চক্ষে ধারা চিত্তহারা কলের মতন
প্রত্যেক মুহূর্তে তার,
চিরারাধ্য দেবতার,
জনম মন বুঝি হয় বিসর্জন।

কাব্য-রেণু
৪৬)
অদৃষ্টে এ কি পরিহাস ।
একের উদয়ে কেন অন্যের বিনাশ ?
এক গ্রন্থি করি ছিন্ন,
হৃদিমৰ্ম্ম ক্ষত খি,
অন্য সূত্রে বাঁধি তায় আনন্দ উল্লাস।
( ৪৭ )
কিছু ভাল লাগে কি তখন ?
অর্ধেক জীবন যার হতেছে পেষণ
মনে নাই কি প্রকারে, কোন্ মন্ত্রে কি আচারে,
নব বালিকার পাণি করিনু গ্রহণ।
(৪৮)
এই মাত্র আছে যে স্মরণ,
সেই রাত্রে বধূ সনে ফিরিনু ভবন ;
রাঙা চেলি ঢাকা কায়,
হাত ধরে লয়ে তায়,
মুমুযুর পদপ্রান্তে করিনু লুণ্ঠন।
(৪৯)
কহিলেন করি আশীৰ্বাদ,
“ঘর আলাে, দেখ, নাতি! যেন সােনার মিদ;
রাখিয়া যাই,
আর কেন কাঁদ ভাই!
চিরজীবী হয়ে থাক, পূর্ণ মাের সাধ।”

কাব্য-রেণু
(৫০)
“খ্যাপা পারা ভাইটি আমার,
যদি বােন! কোনমত করে দুষ্টাচার ;
কখনাে কোরাে না রােষ, ধােরাে না উহার দোষ,
আমার প্রতিভূ হয়ে চালাও সংসার।
(৫১)
“বর-কনে শয্যায় শােয়াও,
রাখিয়াছি অলঙ্কার পরাইয়া দাও ;
সাধ ছিল পূর্ণ হ’ল,
গঙ্গায় লইয়া চল,
এনে দাও জপমালা, হরিনাম গাও।”
(৫২)
“না, না, না, এখনাে রাতি আছে,
হিম পড়ে ছেলেদের ব্যামাে হয় পাছে,
বাসিবের আয়ােজন,
কর ডাকি লােকজন,
খাওয়াও কুটুম্বগণে আজ ভাত-মাছে।”
(৫৩)
সে রজনী প্রভাত হইল,
যথারীতি বাসি-বিভা আদি সমাপিল ;
ভােগ দিয়া রাধাকান্তে,
প্রণমি চরণ-প্রান্তে,
সজ্ঞানে সায়াহ্নে তাঁরে ভীরস্থ করিল।

কাব্য-রেণু
(৫৪)
নাসিকায় তিলক শশাভিত,
বাহুতে ললাটে কণ্ঠে হরিনামাঙ্কিত
মুখে মৃদু হরি নাম,
বাহিরায় অবিরাম,
যােগমগ্না প্রায় নেত্র অর্ধনিমীলিত।
(৫৫)
নির্বিকার বদনমণ্ডল,
এত যে ব্যাধির ক্লেশ তথাপি অটল ;
ভবলীলা সাঙ্গ করি,
মায়া-মােহ পরিহরি,
ছাড়িয়া যাবেন আজ পাপ-ধরাতল।
(৫৬)
হায় বিধি কি খেলা তােমার ?
অমৃতে গরল ঢাল, আলােকে আঁধার ;
হরিষে বিষাদ হেন,
সংঘটন হয় কেন ?
দুর্বোধ তােমার লীলা বুঝে
ওঠা ভার।
(৫৭)
কোথা আজ বিবাহ-মঙ্গলে,
মুখরিত হবে গৃহ আনন্দ-কল্লোলে ;
তা না হয়ে আর্তনাদে, আকুল সগােষ্ঠী কাঁদে,
চিতাধূমে সমাচ্ছন্ন দগ্ধ শােকানলে।

কাব্য-রেণু
৬৭
(৫৮)
সঙ্গে চলে আত্মীয় স্বজন,
চৌদিক বেষ্টিয়া গায় বৈষ্ণবের গণ
বাজে করতাল খােল,
উচ্চনাদে হরিবােল,
দশমী-দিবসে যেন দেবী বিসর্জন।
(৫৯)
এক নিশা করি গঙ্গাবাস,
ব্রহ্মার মুহূর্তে যবে অরুণপ্রকাশ;
শুদ্ধ গঙ্গাজল পান,
কঁপে ওষ্ঠ নাম-গান,
স্পন্দহীন কলেবর কণ্ঠাগত শ্বাস।
(৬০)
অর্ধ-দেহ নিমগ্ন গঙ্গায়
পুণ্যবতীর প্রাণবায়ু অনন্তে মিশায়,
অগুরু চন্দন আনি,
সে দেবী-প্রতিমাখানি,
সর্বশুচি বৈশ্বানর দহিল চিতায়।
(৬১)
শােকাকুল তনয়-যুগল,
দাস-দাসী বধূ পৌত্র কঁদিয়া বিহ্বল ;
কুটুম্ব বান্ধবগণ,
সবে বিষাদিত মন,
পরিচিত জন মাত্রে আঁখি ছল ছল।

৬
কাব্য-রেণু
(৬২)
মৃত্যু নামে লােকে করে ভয়,
তােমার জীবনে যেন সেটা কিছু নয় ;
ভবলীলা সাঙ্গ করে, চলে গেলে লােকান্তরে,
নির্লিপ্ত প্রশান্ত চিত্তে স্থান-বিনিময়।
(৬৩)
সদানন্দ পর-উপকারে,
কৰ্ম্মযােগিনীর মত ছিলে এ সংসারে ;
বিগলিত স্নেহরসে,
রােগশয্যা-পার্শ্বে ব'সে,
কত লােকে সিঞ্চিয়াছ অমৃতের ধারে।
১৮।
(৬৪)
তব করে সুস্বাদু রন্ধন,
একবার যে খেয়েছে ভােলেনি কখন ;
পায়সাদি দূরে থাক, ভাজা, পােড়া, তুচ্ছ শাক,
রসনায় কত তৃপ্তি করিত বর্ষণ।
(৬৫)
গৃহকর্মে কত গুণপনা,
রােগে শােকে সুখে দুঃখে নিষ্কাম সাধনা
কাব্দরিদ্র প্রতি,
দেক-দ্ধিজে ভক্তিমতী,
দত্ত-কুললক্ষী ব’লে করিত ঘােষণা।

কাব্য-রেণু
৬৯
(৬৬)
যাও দিদি বৈকুণ্ঠ-ভবন,
যথা তব চিরারাধ্য লক্ষ্মীনারায়ণ ;
রােগ নাই শােক নাই, চির-শান্তিময় ঠাঁই,
দ্বেষ-হিংসা-বিবর্জিত আনন্দ-সদন।
(৬৭)
সেই ধাম নিত্য বৃন্দাবন,
নিত্য রাসলীলা করে প্রাণকৃষ্ণধন।
অদ্বৈত পতির সনে,
মিল গিয়া সে ভবনে,
তব অপেক্ষায় আছে যাদবনন্দন।
(৬৮)
যত দিন রবে এ জীবন,
শ্রদ্ধা-পুষ্পদামে ঢালি ভক্তির চন্দন ;
যখন যে ভাবে থাকি,
হৃদি-সিংহাসনে রাখি,
স্মৃতির মন্দিরে তব পূজিব চরণ।
(৬৯)
আজি আমি নিজে পিতামহ,
পৌত্র-পৌত্রীগণ প্রতি কত হয় স্নেহ।
সে পবিত্র স্নেহ তব,
করি প্রাণে অনুভব,
স্বগীয় অমিয়ধারা ঢালে অহরহ।

নাতি-নাতনী-ভুলান ছড়া
(১)
ঝ-ঝমাঝম্ বাদ্যি বাজে।
* বর এসেছে সভার মাঝে ।
ছালা-তলায় দাড়িয়ে বর ;
আই মঙলী তুই বরণ কর।
গলায় মালা, মাথায় টোপর।
হাতে যতি, চেলির কাপড়।
বরকে মারে গুড় চাল।
নাপতে বেটা পাড়ে গাল ॥
বরণডালা জলের ঝারা।
মালা-বদল, ছাউনি নাড়া
কত এয়াে হােলাে জড়।
বর বড় না ক’নে বড় ।
হুলুর ধ্বনি শখের সনে।
চার-চোখে চায় বর-কনে।
সভায় ব'সে কন্যা-দান।
সীথায় সিদূর ঘােমটা টান ।
পুরুত করে মন্ত্র পাঠ।
আশীর্বাদ করছে ভাট।

৭১
n
হাত ধুয়ে পান খাই।
কাব্য-রেণু
বরকে নিয়ে বাসর-ঘরে।
শালী-শালাজ ঠাট্টা করে।
কুটুম্বেরা ছাতে বসে।
লুচি-মণ্ডা খাচ্ছে ক’সে।
(২)
পুটির মানুষ পীড়ে পাত।
বামুন ঠাকুর দেবে ভাত।
শাক, মুক্তা, ভাজা, বড়ি।
ডাল, ঝোল, চচ্চড়ি ।
পােলাও কালিয়া অম্বল পায়েস।
দই মােণ্ডা সন্দেশ।
রাঁধুনীর গুণ গাই ।
(৩)
চাপা ফুলে খোঁপা-চুলে, হীরার প্রজাপতি,
কানেতে পান্নার দুল, নাকে গজমতি।
সেলি গুদ চাপকলি, গলায় সাতনড়ি।
বিজ বাজু তাগা আর, হাতে বালা চুড়ি।

१२
কাৰ্য-রেণু
}
কোমরেতে চন্দ্রহার করে ঝর্মল।
বডি আর শাড়ী গায়, পায়ে রূপার মল।
আতর-গােলাপ গায়ে মেখে, অন্য দিয়ে পায়।
নাতনী আমার সােহাগ করে শ্বশুরবাড় যায়।
প্রমসংশােধন
লেখকের দৃষ্টিশক্তি বিলুপ্তপ্রায়। কাণে শুনিয়া অপরের সাহায্য
প্রুফ সংশােধন করিতে ১১ পৃষ্ঠায় ১০ লাইনের পরে ‘গগনের তারা,
চন্দ্রমা, তপন, লাইনটি বসিবে।

1972-afsef শ্রীপুলিনবিহারী দত্ত বিরচিত 4913 Ho ento, atat উক্ত কাব্য সম্বন্ধে শ্রদ্ধাস্পদ নাট্যাচাৰ্য্য স্বর্গীয় গিরিশচন্দ্র ঘােষ মহাশয়ের অনুগ্রহলিপি- 13, Bose para Lane. Calcutta, 27th February, 1890. My dear Poolin Babu Myself and our mutual friend Babu Debendra Nath Mazumder, read together your Hridai Pratidhani, and spent a couple of pleasant hours over it. It is not a "School boy freak" as you modestly call it. The book is a book with something solid in it. I found in it much to "praise. Our friend Debendra Babu. I mean the brother of Late lamented Surendranath, the poet was also very deeply impressed as myself, with Hines. They were all spontaneous flow of a poetic 'heart, and not couplets of syallable counting Rhymers. Within the compass of a letter I can not fully dilate on its merits although it would be a very agreeable task to do it. I could say a great deal. There is much to say on the chastity of the style and thought the soberness of molaricholy pervading the work, the adoration of Nature, the rapture of Love, the Religious ecstasy and the your fluent p, grateful tribute of respect to the departed Soul who watched on your tender years. All these I could dwell with pleasure but my space forbids and reluctantly close with a hearty thanks for your valuable present and your kindness towards me throughout, Yours very sincerely Girish Chandra Ghose. কাব্যকণা সম্বন্ধে সমালােচনা। কাব্যকণা (খণ্ডকাব্য)। শ্রীপুলিনবিহারী দত্ত কর্তৃক বিরচিত, আট আনা। ইহাতে পৌরাণিক, পারমার্থিক, বৃহস্য, প্রেম- গতি ও নানা বিষয়ক দুই শত একত্রিশটি কবিতা ও গান আছে। পুলিন বাৰু সাহিত্য-সমাজে নিতান্ত অপরিচিত নহেন। ইতি পূর্বে তাহার “হৃদয়-প্রতিধ্বনি বঙ্গসাহিত্যে প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছে। আলােচ্য গ্রন্থখানিতে ভাবের মাধুৰ্য্য ও ভাষার চাতুর্য যথেষ্ট পরিমাণে পরিলক্ষিত হয়। —সাপ্তাহিক বসুমতী, বৈশাখ, ১৩১৬। কাব্যকণা। কয়েকটি কবিতায় এ গ্রন্থ রচিত। শ্ৰীযুক্ত পুলিনবিহারী দত্ত কর্তৃক বিরচিত ও প্রকাশিত। মূল্য আট আনা। এক একটি কবিতা এক একটি গান। সুর-স্বর দেওয়া নাই, তবে গায়ক মাত্রেই মনােনীত সুর-স্বরে গাহিতে পারেন। গাহিলেও কবিতার মাধুর্যে মনমুগ্ধ হয়। অধিকাংশ গান কাব্যরসপূৰ্য্যে মনােরম। ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ভাবের গান। হাস্যরসােদ্রেকেও গ্রন্থকারের শক্তি আছে। -বঙ্গবাসী, ৭ই ফান, ১৩১৬।

v/e কাব্যকণা—শ্ৰীযুত পুলিনবিহারী দত্ত বিরচিত। মূল্য • আনা, ১২২ পৃষ্ঠায় সম্পূর্ণ। সুন্দর কাগজ, সুন্দর ছাপা। এই কবিতা-পুস্তকখানি প্রধানতঃ পাঁচ বিভাগে বিভক্ত—পৌরা- নিক, পারমার্থিক, রহস্য, প্রেমগীতি, নানা বিষয়ক। পুস্তকখানি আগাগােড়া পাঠ করিয়া পরিতৃপ্ত হইয়াছি। ইহাতে অন্ধ অনুকরণ- দোষ নাই। সরল স্বচ্ছন্দ গতিবিশিষ্ট ছন্দ। একটি কবিতা পাঠ করিতে আরম্ভ করিলে শেষ না করিয়া ছাড়া যায় না। —অর্চনা, চৈত্র, ১৩১৭। কাব্য-কণা। পুলিনবিহারী দত্ত কর্তৃক বিরচিত ও প্রকাশিত, মূল্য ১০। নানা বিষয়ক কবিতা-পুস্তক। সকলগুলি সুন্দর হইলেও এ কথা নিঃসন্দেহে বলিতে পারি, মধ্যে মধ্যে এক একটি কবিতা অতি সুন্দর হইয়াছে। -নব্যভারত, পৌষ, ১৩১৬। * Kabya Kana." This is a collection of verses in Bengali composed by Babu Pulin Behary Dutt. The subjects are varied, and the poet seems to have a peculiar knack of dealing with abstruse matter of Hindu religion and philosophy as gracefully as with the most frivolous topics. Altogether we are delighted with the little book. The Bengalee Io, 3• I9ro • বৃন্দাবন-কথা A Guide to Brindaban পুলিনবিহারী দত্ত-বিরচিত, মূল্য ২০ টাকা মাত্র। এই পুস্তকে বৃন্দাবনের প্রসিদ্ধ দেবতা, সুরম্য মন্দির এবং তানসেনের গুরু হরিদাস স্বামী, বল্লভাচাৰ্য, মানসিংহ, জয়সিংহ, মীরাবাঈ, অহল্যাবাঈ প্রভৃতি ৪৬ খানি চিত্র ও মানচিত্র আছে। প্রিয়জনকে উপহার দিবার মত উৎকৃষ্ট আইভরি ফিনিস কাগজে পরি- কার ছাপা, সুন্দর কাপড়ে বাঁধাই, সোনার জলে নাম লেখা। এখনি ৩ধু বৃন্দাবনের নহে—স্বদেশ ও স্বজাতির ইতিহাস। চারি শত বৎসর পূর্বে মুষ্টিমেয় কয়েকজন কৌপীনমাত্র সম্বল বাঙ্গালী যাইয়া পাঠানগণ- বিধ্বস্ত প্রধান বৈষ্ণবতীর্থকে বিনা অস্ত্র-প্রমােগে কেবলমাত্র ধর্ম, ভক্তি ও চরিত্রবলে উদ্ধার করিয়াছিলেন—এখানি বাঙ্গালীর সেই অপূৰ্ব্ব গৌরব-কাহিনী—পবিত্ৰচেতা ভক্তগণের সুমধুর চরিতখ্যানে পূর্ণ। মাথুর কথা (বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষ-গ্রন্থাবলীভুক্ত) পুলিনবিহারী দত্ত বিরচিত প্রকাশক শ্রীরামকমল সিংহ, বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষৎ মন্দির, ২৪৩১ নং অপার সারকুলার রােড, কলিকাতা। মূল্য সদস্য পক্ষে দুই টাকা, সাধারণ পক্ষে ২০ টাকা শ্ৰীযুক্ত অমুল্যচরণ বিদ্যাভূষণ মহাশয় লিখিত ভূমিকা-সমেত। এই পুস্তকে বৈদিক যুগ হইতে আরম্ভ করিয়া রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণাদিতে, মথুরার যেরূপ বিবরণ পাওয়া যায়, তাহা বর্ণিত H হইয়াছে। তৎপরে জৈন মহাবীর ও নেমিনাথ, বুদ্ধ, অশােক, উপগুপ্ত, মিলিন্দ ও পুস্পমিত্র প্রভৃতির জীবনী ; কণিষ্ক, বশিক, হবিষ্ক ও বাসুদেব প্রভৃতি শক বা কুষাণ রাজগণের, চৈনিক পরিব্রাজক ফাহিয়া, হিয়ান্থ সাঙ, ও অন্যান্য চৈনিক পরিব্রাজক গণের বর্ণিত বিবরণ; চন্দ্র গুপ্ত, সমুদ্রগুপ্ত, বিক্রমাদিত্য প্রভৃতি গুপ্ত সম্রাটগণের, শ্রীহ, মিহিরভােজ রাজগণের ও মুসলমান যুগের বিবরণ ; পরিশেষে বর্তমান যুগের দেব-মন্দির, টিলা, ঘাট ইত্যাদির বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। । 1 সমালােচনা মাথুরকা-মথুরা একাধারে ঐশ্বর্য ও মাধুৰ্য্য-স্মৃতি- বিমণ্ডিত প্রাচীন নগরী। মথুরার ইতিহাস জানিলে ভারতবর্ষের রাষ্ট্রীয় ও ধৰ্ম্মজীবনীর একটা প্রয়ােজনীয় অধ্যায়ের সহিত পরিচয় হয়। বেদে “মথুরা” নামটির স্পষ্ট উল্লেখ না থাকিলেও যমুনার ও তাহার তীরবর্তী জনপদের উল্লেখ আছে। রামায়ণের ইঙ্গিত স্পষ্টতর, মহাভারত ও নানাবিধ পুরাণের মধ্য দিয়া মথুরার চিত্রটি বেশ উজ্জ্বল বর্ণেই ফুটিয়া উঠিয়াছে। এই মথুরা নগরে স্থাপত্য-শিল্পের অত্যুৎকৃষ্ট নিদর্শন অপরূপ সৌধরাজি ও দেব-মনির-শ্রেণী একাধিক বার চূড়া উত্তোলন করে এবং প্রতিবারেই অত্যাচারীর হস্তে কলুষিত ও বিধস্ত হয়। ভারতবাসীর গৌরবের তিলক ও কলঙ্কের ছাপ যেমন মথুরার ভালে অঙ্কিত, অন্যত্র সেরূপ নয়। শ্রদ্ধেয় গ্রন্থকার প্রাচীন বয়সে এই প্রয়ােজনীয় ও দুরূহ কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিয়া আমাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হইয়াছেন। বিস্তর পরিশ্রম, গবেষণা ও বিচার করিয়া তিনি এই পুস্তকখানি প্রণয়ন করিয়াছেন।

ঋগ্বেদ হইতে আরম্ভ করিয়া নানা পুরাণ, প্রাচীন বিদেশী পর্যটক গণের ভ্রমণকাহিনী, প্রাচীন ও আধুনিক ইতিহাসের মধ্য দিয়া অতি দুর্গম ও জটিল পথ অতিক্রম করিয়া তিনি এই তীর্থ-পরিক্রমা শেষ করিয়াছেন। এই যে অপরূপ মাল্য-চনা, ইহাও কম কৃতিত্বের পরিচায়ক নয়। বঙ্গবাণীর কণ্ঠে এ বক্কহার অকলঙ্ক প্রভায় চিরদিন দোদুল্যমান থাকিবে। গ্রহের শেষাংশে যে চিত্রাবলী দেওয়া হইয়াছে, তাহাতে গ্রন্থের বর্ণিত বিষয়সমূহ বুঝিবার সুবিধা বৃদ্ধি পাইয়াছে। ভাষা সরল ও স্বচ্ছ।—বঙ্গবাণী, জৈষ্ঠ, ১৩৩৪। এই পুস্তকখানিতে গ্রন্থকারের প্রচুর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, পাণ্ডিত্য, গবেষণা ও বিশ্বাস-কৌশলের যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। কয়েকখানি চিত্রযুক্ত হওয়ায় পুস্তকটির গৌরব বাড়িয়াছে। আমরা ইহার বহুল প্রচার কামনা করি।-“প্রবাসী, ফান, ১৩৩৩। গ্রন্থকার এই পুস্তক দুইখানি আমাদিগকে দিয়াছেন পুস্তক বিক্রয়লব্ধ অর্থ 'আমাদিগের বঙ্গীয়-সাহিত্য পরিষদের দুস্থ- সাহিত্যিকগণের সাহায্য ভাণ্ডারের তহবিলে জমা হইবে। যাহার এ পুস্তক ক্রয় করিবেন, তাহারা তাে ঘরে বসিয়া বৃন্দাবন ও মথুরার প্রাচীন সময় হইতে বর্তমান সময় পর্যন্ত সচিত্র সমস্ত বিবরণ জানিতে পারিবেন এবং সঙ্গে সঙ্গে দুঃস্থ-সাহিত্যিক ভাণ্ডারের পুষ্টি সাধন করিবেন। প্তস্থান-বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ-মন্দির। ২৪৩১ অপার সাকুলার রােড, কলিকাতা।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kabbya-renu

Author
Dutta,pulinbihari
Title
Kabbya-renu
File name
Kabbya-renu
Text
OCR done
Citation
1930
Published
2009/12/13
Publisher
Haridas Dutta,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
88
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Dutta,Pulinbihari
DLI number
512755
Barcode
4990010019799.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Q7bWyE06KAh
Download PDF

Kabbya-renu