Makardah Saraswat Library, Howrah

Leniner Sahit

Monilal Srimani · 2009/07/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

লেনিনের সহিত
ম্যাক্সিম গর্কি
অনুবাদক--
মণিলাল শ্রীমানী
এম এ,
বি-এ
মূল্য এক টাকা

প্রকাশক
শ্ৰীকল্যাণময় এমাণী
২• নবীন সরকার লেন
কলিকাতা।
অগ্রহায়ণ ১৩৪২
প্রিন্টার
শ্রীশৌরীন্দ্রকুমার ,
‘পঞ্চপুষ্প প্রেস’
3 এ, রামরতন বসু।
কলিকাতা।

! লেনিনের সহিত ভুডিমির লেনিন মারা গিয়াছে। তাহাকে হারাইয়া জগৎ যে এক সৰ্ব্বাপেক্ষা অদ্ভুত প্রতিভা, তাহার সম- সাময়িক মহান ব্যক্তিগণের মধ্যে বিরাটতর পুরুষকে হারাইয়াছে, একথা তাহার শত্রুদের মধ্যে কাহারো কাহারো স্বীকার করিবার সাহস আছে। চেকোশ্লোভেকিয়া হইতে প্রকাশিত প্রাগের টাগো (Prager Tageblatt) নামক এক জার্মান “বুর্জোয়া সংবাদপত্রে “লেনিন” বিষয়ক এক প্রবন্ধের উপসংহারে এই কথা কয়টা লিখিত হইয়াছিল— “মরণেও মহান্ ও ভয়াবহ, আমাদের বােধশক্তির অতীত, ইহাই লেনিনের পরিচয়। এই প্রবন্ধের প্রধান সুর হইতেছে এই বিরাট মূর্তির প্রতি ভয় ও বিস্ময় মিশ্রিত শ্রদ্ধা। ইহা পরিষ্কার যে, এই প্রবন্ধের পশ্চাতে যে ভাব রহিয়াছে, তাহা কেবলমাত্র বিজয়ােল্লাস-ভাব নয়। “শত্রুর মৃতদেহ সুগন্ধ বিতরণ করে”এইরূপ উক্তির মধ্যে যে ভাব প্রকাশ পায়, বা বিরাট অথচ অস্থির আত্মার

২
লেনিনের সহিত
তিরােধানে যে স্বস্তির ভাব আসে, প্রবন্ধের পশ্চাতে ইহার কোনাে
ভাবই নাই। ইহা অভ্রান্ত যে, মহান পুরুষকে পাইয়া মনুষ্য
সমাজ যে গর্ব অনুভব করে, ইহা তাহারই অভিব্যক্তি।
যাহার জীবন নির্ভীক যুক্তির ও বাঁচিবার অদম্য ইচ্ছার
অন্যতম প্রধান নিদর্শন, যাহার ব্যক্তিত্ব স্বীকার করিয়া
‘বুর্জোয়া' পত্রিকাগুলি পৰ্যন্ত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিতে দ্বিধা-
বােধ করিল না, রুষ হইতে বিতাড়িত সংবাদ পত্রিকাদি লেনিনের
মৃত্যু উপলক্ষে তাহার প্রতি সে-সম্মান প্রদর্শন করিয়া নৈতিক
সাহস ও সুরুচির পরিচয় দিতে পারল না।
ভাডিমির ইলইচ লেনিনের চরিত্র অঙ্কন করা দুঃসাধ্য।
আস যেরূপ মৎস্যের অবয়বের অংশবিশেষ, লেনিনের কথাগুলি
তদ্রুপ তাহার বাহ্য রূপের অংশ বিশেষ। সরলতাও স্পষ্টবাদিতা
তাহার প্রকৃতির প্রধান অঙ্গ। তাহার বীরত্ব উজ্জ্বল দ্যুতিমণ্ডলে
তাহার ছিল সেই বীরত্ব যাহা একমাত্র রাশিয়াই
ভাল জানে। যে বিপ্লবী, বিশ্বে সামাজিক ন্যায়বিচার সম্ভাবনার
অকম্পিত বিশ্বাসে, মানবের কল্যাণের জন্য জীবনের সব সুখ
বিসর্জন দেয়, তাহার ছিল সেই প্রকৃত রুষ বিপ্লবীর নিরহঙ্কার
আত্মত্যাগের কঠোর জীবন।
লেনিনের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে, শশাকাকুল হৃদয়ে,
তাহার সম্বন্ধে আমি যাহা লিখিয়াছিলাম, তাহা তাড়াতাড়ি
লেখা হইয়া ছিল, সুতরাং , তাহা অপর্যাপ্ত। তৎকালীন
অবস্থানুযায়ী কি কারণবশতঃ আমি তখন অনেক কিছু
বেষ্টিত নয়।

লেনিনের সহিত..
লিখিতে পারি নাই, আশাকরি, তাহা সম্পূর্ণরূপে বােধগম্য।
লেনিনের দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণ ও মর্মভেদী এবং পাণ্ডিত্য ছিল
বিপুল। আর “অধিক পাণ্ডিত্যে অধিক দুঃখ”।
তাহার দৃষ্টি ছুটিত সম্মুখে—বহুদূর পর্যন্ত। ১৯১৯-২১ সালের
মধ্যে, তাহার সঙ্গে আমার যতো আলােচনা হইয়াছে, প্রায় সব
সময়েই, রুষবাসীর অবস্থা কয়েক বৎসরের কিরূপ
দাড়াইবে, সে তাহার সঠিক বিবরণ দিত। তাহার এই ভবিষ্যৎবাণী
অনেক সময়ে প্রীতিকর হইত না ও সেগুলি কেই সব সময়
বিশ্বাস করিতে চাহিত না। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, অধিকাংশক্ষেত্রেই
তাহার এই সন্দিগ্ধ মন্তব্যগুলি সত্যে পরিণত হইয়াছে।
মধ্যে
প্রথম সাক্ষাৎ
সন্দেহ,
বহু অন্যায় ফাক ও অসামঞ্জস্য থাকায় আমার পূর্ব
স্মারকলিপি আরও অসন্তোষজনক হইয়া উঠিয়াছিল। আমার
উচিত ছিল লণ্ডন কংগ্রেস হইতে আরম্ভ করা।
অবিশ্বাস, সম্মুখ বিরােধ, এমন কি ঘৃণার পটভূমি পিছনে রাখিয়া,
ভুডিমির ইলইচের সৌম্য মূৰ্ত্তি যখন সম্মুখে দাড়াইল, তখন
হইতেই আমার স্মারকলিপি আরম্ভ করা উচিত ছিল।
লণ্ডন সহরের উপকণ্ঠে কাঠের গীর্জার নগ্ন প্রাচীরগুলি,
ও ক্ষুদ্র অপরিসর হলের সূক্ষ্মাগ্র অপ্রশস্ত উচ্চ জানালাগুলি

লেনিনেয় সহিত এখনও আমি যেন সুস্পষ্টরূপে দেখিতে পাইতেছি। হল- ঘরটী কোন সঙ্গতিহীন বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষের উপযােগী। অট্টালিকার বহির্ভাগটিকেই কেবল গীর্জার সহিত তুলনা করা যাইতে পারে। ভিতরে ধর্মানুষ্ঠানের কোন চিহ্নই ছিল ; এমন কি বেদিটীও, অনুচ্চ হলঘরের শেষপ্রান্তে থাকার পরিবর্তে, দুই দরজার মধ্যে প্রবেশ পথে স্থাপিত ছিল। ইহার পূর্বে লৈনিনের সহিত আমার দেখাও হয় নাই, বা তাহার সম্বন্ধে যতখানি পড়া উচিত ছিল, তাহাও পড়ি নাই। কিন্তু আমার যাহা কিছু পড়া ছিল তাহা ও তাহাকে যাহারা ব্যক্তিগতভাবে জানিত, তাহাদের উৎসাহপূর্ণ বিবরণী, আমাকে প্রবলভাবে তাহার দিকে আকৃষ্ট করিয়াছিল। যখন আমাদের প্রথম পরিচয় হইল, অত্যন্ত সহৃদয়তার সহিত, সে আমার সহিত করমর্দন করিল। পরে তাহার সেই অন্তভেদী তীক্ষ্ণদৃষ্টি দিয়া, আমার ভিতরটা যেন বিশেষভাবে দেখিয়া লইয়া, নিতান্ত পরিচিতের ন্যায় কৌতুকের সহিত বলিল, “তুমি এসেছ দেখে ভারী খুসী হ'লুম। আমার বিশ্বাস তুমি বাগবিতণ্ডা দলাদলি ভালবাস,-তাই নয় কি? শিগগিরই এখানে পুরাননা ঝগড়া নিয়ে এক মজার অভিনয় আরম্ভ হবে।” আমি লেনিনকে এইরূপ আশা করি নাই। তাহার মধ্যে কিসের যেন একটা অভাব ছিল। সে ‘র’ অক্ষরটী একটু ঘুরাইয়া তালুর সাহায্যে উচ্চারণ করিত তাহার দাড়াইবার ভঙ্গি ছিল অদ্ভুত ও আড়ম্বরপূর্ণ ! যেন অতিরিক্ত মাত্রায় সাদাসিধা

লেনিনের সহিত...
তাহার ব্যবহার। এমন কোন ভাব প্রকাশ পায় নাই,
যাহাতে বুঝা যায় যে, সে একজন নেতা। সাহিত্যিক হিসাবে
' আমি এই সমস্ত খুঁটিনাটা ব্যাপার সূক্ষ্মরূপে পৰ্যবেক্ষণ করিতে
বাধ্য। আর এই আবশ্যকতা অভ্যাসে অনেক সময় বিরক্তিকর
অভ্যাসে দাড়াইয়াছে। কৰ্ম্মক্লান্ত শিক্ষকের নিকট অতিরিক্ত
ছাত্র যাইলে, তাহার মুখমণ্ডল যেরূপ ঈষৎ বিরক্ত ও কঠোর
দেখায়, (G. V. Plekhanov) জি, ভি, প্লেখানভের সহিত
যখন আমার প্রথম সাক্ষাৎ হইল, সে হাত দুইটী জোড় করিয়া,
সেইরূপ ঈষৎ বিরক্তিপূর্ণ কঠোর দৃষ্টিতে আমার দিকে
তাকাইল। “আমি তােমার পুস্তকের একজন ভক্ত পাঠক।”
প্লেখানভের এই সংক্ষিপ্ত মন্তব্যটী ছাড়া আর কোন কথাই
আমার স্মরণে আসে না। সারা কংগ্রেস-অধিবেশন কালের
মধ্যে আমরা কেহই পরস্পরের সহিত প্রাণখোলা আলাপ
করিবার আগ্রহ অনুভব করি নাই।
তারপর আমার সম্মুখে দাড়াইল এক বিরলকেশ, দৃঢ়-
প্রতিজ্ঞ, ঘনকায় পুরুষ।
এক হাতে সে আমার হাত ধরিল,
ও তাহার অদ্ভুত উজ্জ্বল চোখের স্নেহপূর্ণ দৃষ্টি আমার উপর নিবন্ধ
করিয়া, অপর হস্তে তাহার সক্রেটীসতুল্য কপােলটী মুছিল।
তারপরই সে আমার “মা” (Mother) বইখানির
ত্রুটী সম্বন্ধে আলােচনা করিতে লাগিল।
বুঝা গেল, এস,
পি, ল্যাদিজিনিকভ-এর (S. 'P. Ladyzhnikov) নিকট
রক্ষিত উক্ত পুস্তকের পাণ্ডুলিপিখানি,
ইতিমধ্যে
(म

লেনিনের সহিত পড়িয়া ফেলিয়াছে। আমি বলিলাম, “বইখানি তাড়াতাড়ি শেষ করছিলুম—তাই” কিন্তু কেন—সেকথা বলিয়া উঠিতে পারিলাম না। লেনিন সম্মতিসূচক মস্তক সঞ্চালন করিয়া, নিজেই কারণ নির্দেশ করিয়া বলিল-“হ্যা, বইখানা তাড়া তাড়ি শেষ হয়ে যাক, আমিও তাই চাই। এই রকম বইয়ের দরকার আছে, কারণ বিপ্লব আন্দোলনে যে সমস্ত কর্মী যােগ দিয়েছে, তারা পূর্বাপর না বুঝে, বিশৃঙ্খলার সঙ্গে কর্মে প্রবৃত্ত হয়। সুতরাং ‘মা’ বইখানা পড়লে, তাদের বিশেষ উপকার হবে। ঠিক কালােপযােগী বই।” আমার সম্বন্ধে তাহার এই একমাত্র প্রশংসাবাদ, কিন্তু আমার নিকট এই প্রশস্তি অত্যন্ত মূল্যবান। তারপর লেনিন বৈষয়িক লােকের মতাে নানারূপ প্রশ্ন করিতে লাগিল—বইখানি ভিন্ন ভাষায় অনূদিত হইয়াছে কি না, রুষ বা আমেরিকার মুদ্রণনিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠান (Censorship) ইহার কিছু অঙ্গহানি করিয়াছে কি না। আমি যখন তাহাকে বলিলাম যে, গ্রন্থকার দায়রা সােপ হইবে, প্রথমে সে কুটী করিল ; পরে পশ্চাদ্দিকে নিজ মস্তক সঞ্চালিত করিয়া চক্ষু নিমীলিত করিল। অবশেষে ‘ হােহাে’ করিয়া অস্বাভাবিক ভাবে হাসিয়া উঠিল। এই হাসি কর্মীদের আকৃষ্ট করিল, এবং বােধ হয় এফ, উরালকি (E, Uralsky) আরাে জন তিনেক লােক আগাইয়া আসিয়াছিল। সেদিন আমার মানসিক অবস্থা ছিল প্রফুল্ল। পার্টির বাছাই-

লেনিনের সহিত
করা তিনশত লােকের মধ্যে আমি ছিলাম দাঁড়াইয়া ; আর এই
সমস্ত লােককে এই কংগ্রেসে পাঠাইয়া ছিল একলক্ষ
পঞ্চাশ হাজার সুদক্ষ কর্মী। আমার চক্ষের সামনে দাঁড়াইয়া
ছিল—সর্বদলের নেতৃবৃন্দ, পুরাতন বিপ্লবী, প্লেখানভ, এক্সেল
(Axelrod ), দয়েচ, (Deutsch)। আমার প্রফুল্লতার
কারণ ছিল খুবই স্বাভাবিক এবং পাঠক সহজেই তাহা
বুঝিতে পারিবে, যদি এই প্রসঙ্গে আমি জানাইয়া দিই
যে, বিদেশে অবস্থানকালে দুই বৎসর কাল আমার অন্তর
অবসাদ ভারাক্রান্ত ছিল।
;
জাৰ্মান্ সােশ্যাল ডিমােক্রাটদিগের সহিত
আমার অবসাদ আরম্ভ হইয়াছিল বার্লিনে। সেখানে
প্রায় সমস্ত প্রধান সােশ্যাল ডিমােক্রাটের সহিত আমার
সাক্ষাৎ হইয়াছিল ; অগাষ্ট বেবেল ও অতি হৃষ্টপুষ্টকায়
সিঙ্গারের পার্শ্বে বসিয়া এবং অপরাপর গণ্যমান্য ব্যক্তি কর্তৃক
বেষ্টিত হইয়া আমি পানাহাদি করিয়াছিলাম।
এক বিস্তৃত আরামদায়ক কামরায় আমরা আহারাদি
করিলাম। রুচিপূর্ণ কারুকার্যখচিত বস্ত্রে ক্যানারী পাখীর
পিঞ্জরগুলি আবৃত ছিল, আরাম কেদারাগুলির পশ্চাদ্ভাগ
কারুকার্যখচিত অ্যান্টিমাকাসার দিয়া মােড়া ছিল, পাছে
উপবিষ্ট ব্যক্তির মস্তকের
সংস্পর্শে উপরের আবরণটী
মলিন হইয়া যায়।
প্রত্যেকটা দ্রব্য
দ্রব্য নিরেট এবং

৮
লেনিনের সহিত
সারবান্।
প্রত্যেকে ধীরভাবে পাহারাদি করিতে
করিতে পরস্পরের সহিত গম্ভীর কণ্ঠে বলিতেছিল
‘মালজাইট’ (Mahlzeit)। আমার নিকট কথাটী নূতন। কিন্তু
আমি জানিতাম ফরাসী ভাষায় ‘Mal' অর্থে খারাপ
ও জাৰ্মাণী ভাষায় ‘Zeit' অর্থে ‘সময়’—সুতরাং ‘Mal Zeit
অর্থে খারাপ সময়।
সিঙ্গার দুইবার কাউটস্কিকে
‘রােমান্টিসিষ্ট বলিয়া
সম্বােধন করিল।
বেবেলের নাসিকাটী ছিল শেনপক্ষীর
ন্যায় বক্র ও . কুঞ্চিত। • তাহাকে আত্মতৃপ্ত বলিয়া
মনে হয়। আমরা রাইনদেশীয় মদ ও বীয়ার পান
করিলাম। মদ্য ঈষদুষ্ণ ও অম্নস্বাদ ছিল, আর বীয়ার
ছিল বেশ সুস্বাদু। সােশ্যাল ডিমােক্রাটগণ রুষ বিপ্লব
ও পার্টির ( Russian. Revolution and Party) সম্বন্ধে
অপ্রসন্নতার সহিত বিষন্নভাবে আলােচনা করিতেছিল, কিন্তু
তাহাদের নিজেদের দুল অর্থাৎ জার্মান দলের
চমৎকার। চতুর্দিকে আত্মপরিতৃপ্তির এক আবহাওয়া বহিতেছিল।
কেদারাগুলিও যেন নেতৃবৃন্দের সম্মানিত নিতম্ব অঙ্গে ধারণ
করিয়া আনন্দিত হইয়াছিল ।
জার্মান পার্টির সহিত আমার কাজ ছিল একটু
কোমল ও সূক্ষ্মপ্রকৃতির। জাম্মান পার্টির একজন প্রধান
সত্য—পরে অখ্যাত পারভাস(Barvus) জানিয়ে (Znaniye)
নামক বলশেভিক আইনগ্রন্থ প্রকারাগার হইতে আমার Lower
সম্বন্ধে সবই

লেনিনের সহিত Depth নামক নাটকখানির অভিনয়ের দরুণ গ্রন্থকারের প্রাপ্য অর্থ : রঙ্গালয়গুলি হইতে সংগ্রহ করিবার অনুমতি ১৯০২ সালে সিস্তা- পুল ষ্টেশনে পাইয়াছিল -এখানে সে আসিয়াছিল এক আইন বিরুদ্ধ কারণে। কথা ছিল, সংগৃহীত অর্থ নিম্নলিখিত ভাবে বিভক্ত হইবে —শতকরা কুড়িগ সে নিজে লইবে, অবশিষ্ট অর্থের এক চতুর্থাংশ আমি গ্ৰহণ করিব, আর অপর তৃতীয় চতুর্থাংশ সােশ্যাল ডিমােক্রাটীক পার্টির অর্থকোষে যাইবে। পারভাস অবশ্য এ চুক্তির কথা জানিত, এমন কি এ ব্যবস্থায় খুসী হইয়াছিল। জাম্মানির সমস্ত রঙ্গালয়ে চার বৎসর ধরিয়া উক্ত নাটক অভিনীত হইল। এক বালিনেই উহা পাচশত বারের অধিক অভিনীত হইয়াছিল এবং পারভাস ইহা হইতে নিঃসন্দেহে এক লক্ষ মার্ক সংগ্রহ করিয়াছিল। কিন্তু সংগৃহীত অর্থের পরিবর্তে • জানিয়ে ( Znaniye ) নামক বলশেভিক আইনগ্রন্থ প্রচারাগারের কে, পি, পিয়ংনিৎস্কি রসিকতার সহিত এই মর্মে এক পত্রে আমায় জানাইল যে, পারভাস এক যুবতী মহিলার সহিত ইতালি ভ্রমণে বাহির হইয়াছে এবং তাহাতেই সে সমস্ত অর্থ খরচ করিয়া ফেলিয়াছে। ব্যক্তিগতভাবে তাহার সুখকর ভ্রমণের সহিত আমার সম্পর্ক ছিল সংগৃহীত অর্থের এক চতুর্থাংশটুকু লইয়া। অবশিষ্ট তৃতীয় চতুর্থাংশ অর্থ-সম্বন্ধে আমি জার্মান কেন্দ্রীয় কমিটিকে পত্র দ্বারা জানান সঙ্গত বােধ করিলাম। এস, পি, লাদিজিনিকভের মধ্যস্থতায় আমি তাহাদের সহিত পত্রালাপ করিলাম। পার- ।

লেনিনের সহিত
ভাসের ভ্রমণ কাহিনীর কথা শুনিয়াও কেন্দ্রীয় কমিটি সম্পূর্ণ
অবিচলিত রহিল। পরে আমি জানিতে পারিয়াছিলাম, পারভাস
দল হইতে বিতাড়িত হইয়াছে ; সত্য কথা বলিতে কি, তাহার
কান দুইটা মলিয়া দিলে ভারী খুসী হইতাম। কিছুকাল
পরে, আমার প্যারী অবস্থানকালে, কোনও এক ব্যক্তি আমাকে
এক অসামান্যা সুন্দরী যুবতীকে দেখাইয়াছিল। শুনিলাম সেই
পারভাসের ইতালি ভ্রমণের সঙ্গিনী। মনে হইল “যুবতী
সত্যই নয়নানন্দদায়িণী –অতীব সুন্দরী।”
বার্লিনে আমার অনেক লােকের সহিত সাক্ষাৎ হইয়া
ছিল—লেখক, শিল্পী, কলা ও সাহিত্যের পৃষ্টপােষক, এ ছাড়া
আরও অনেক লােক। তাহাদের নির্বিকারভাব ও আত্মপ্রীতি
পরিমাণে কম বেশী ছিল মাত্র।
হইল।
আমেরিকা যাত্রা
আমেরিকায় অসংখ্য মরিস হিলকুইটের সহিত সাক্ষাৎ
তাহাদের জীবনের একমাত্র আকাক্ষা নিউইয়র্কের
মেয়র বা শাসনকর্তা হওয়া। অনেক লােকের সঙ্গে
মিশিয়াছি, অনেক জিনিষ দেখিয়াছি, কিন্তু এমন একজন
লােক দেখিলাম না যে, রুষবিপ্লবের পূর্ণ অর্থ বুঝিতে
পারিয়াছে। বুঝিলাম, সর্বত্র সাধারণের ধারণা, রুষবিপ্লব
ইরােপবাসীর জীবনের একটা সামান্য ঘটনা মাত্র আর
সােশ্যালিজমের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্না এক সুন্দরী মহিলার
••

লেনিনের সহিত কথায়—যে দেশে সর্বদা কলেরা বা বিপ্লব লাগিয়া রহিয়াছে, সেই দেশে ইহা একটা অতি সাধারণ ঘটনা। বলশেভিক ধনভাণ্ডারের জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতে আমে- রিকা যাওয়ার মতলবটা এল, বি, ক্রাসিনের নিকট হইতে আসিল। স্থর হইল, ভি, ভি, ভরােভস্কি আমার সেক্রেটারী ও সভার পরিচালকরূপে আমার সঙ্গে যাইবে। ভরােভস্কি ভাল ইংরাজী জানিত, কিন্তু পার্টি তাহাকে অন্য কাজে নিযুক্ত করায়, এন, ই, বুরিণিন তাহার স্থান গ্রহণ করিল। বুরিণিন ইংরাজী জানিত না; পথে ও সে দেশে পৌছিয়া শিখিতে আরম্ভ করিল। আমার যাত্রার উদ্দেশ্য যখন জানিতে পারিল, সােশ্যালিষ্ট বিপ্লবীরা আমার ভ্রমণ বিষয়ে বালকের ন্যায় অতিশয় আগ্রহান্বিত হইয়া উঠিল। তখনও আমি ফিল্যাণ্ডে। চেকোভস্কি ও জি টলোভােস্কি আমার নিকট আসিয়া প্রস্তাব করিল যে অর্থ- সংগ্রহ কেবল মাত্র বলশেভিকদিগের জন্য না করিয়া সাধারণ বিপ্লবের জন্য করা হউক। ‘সাধারণ বিপ্লবের জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতে আমি অস্বীকৃত হইলাম। তখন তাহারা বাবুস্কাকে আমেরিকায় পাঠাইল। সুতরাং দুইজন লােক আমেরিকায় যাইয়া, স্বতন্ত্রভাবে, এমন কি পরস্পরের সহিত সাক্ষাৎ না করিয়া, বস্তুতঃ দুইটী বিভিন্ন বিপ্লবের জন্য অর্থ সংগ্রহ করিতে লাগিল। কে অপেক্ষাকৃত ভাল ও আসল, ইহা পরীক্ষা করিবার সময় ও প্রবৃত্তি অবশ্য আমেরিকাবাসীদের ছিল না। বাবুস্কা পূৰ্ব্ব হইতে তাহাদের পরিচিত ছিল। বহুপূর্বে

লেনিনের সহিত...
তাহার আমেরিকাবাসী বন্ধুগণ তাহার গুণগানে দেশ মুখরিত
করিয়া রাখিয়াছিল। জারের প্রতিনিধি আমার বিরুদ্ধে
অযথা কুৎসা রটনা করিতে লাগিল। আমেরিকার কমরেডগণ
রুষবিপ্লবকে স্থানীয় বিপ্লব ও অকালপ্রসূত ব্যাপার বলিয়া
সিদ্ধান্ত করিল। সভা সমিতিতে আমি যে অর্থ সংগ্রহ করিলাম,
তাহা তাহারা কতকটা ‘উদারভাবে ব্যবহার করিতে লাগিল।
মােটের উপর, আমি অত্যন্ত অল্প অর্থ ই সংগ্রহ করিতে পারিয়া-
ছিলাম—দশসহস্র ডলারেরও কম। স্থির করিলাম, সংবাদপত্রে
প্রবন্ধাদি লিখিয়া কিছু অর্থ সংগ্রহ করিব, কিন্তু আমেরিকাতেও
এক ‘পারভাস’ জুটিল। সুতরাং
আমার
আমেরিকা
ভ্রমণ, মােটের উপর ব্যর্থ হইল। যাহা হউক, সেখানে
আমি ‘মা’ লিখিলাম। ‘মা’র ভুল, ভ্রান্তি, ত্রুটি বিচ্যুতির
ইহাই কারণ।
তারপর আমি ইতালি ও কাপ্রি যাইলাম ও রুষ ভাষায়
লিখিত বই ও সংবাদ পত্রাদিতে ডুবিয়া রহিলাম—ইহাও আমার
অবসাদ ও নিরুৎসাহ বৃদ্ধি করিয়াছিল। আমি যেরূপ নিঃসঙ্গ
বােধ করিতেছিলাম, দাত উপড়াইয়া ফেলিবার পর, অনুভূতি
শক্তি থাকিলে, দাতটী, সম্ভবতঃ, সেইরূপ নিঃসঙ্গ বােধ করিবে।
সুপরিচিত ও বিশিষ্ট লােককে রাজনীতির
হইতে অপর মঞ্চে অ্যাক্রোব্যাটের ন্যায় ক্ষিপ্র চাতুর্য্য ও .
কৌশলের সহিত লম্ফ প্রদান করিতে দেখিয়া আমি বিস্ময়াবিষ্ট
হইয়াছিলাম।
মঞ্চ

লেনিনের সহিত...
“সব গেল।
তারা সবাইকে নিষ্পেষিত করেছে, ধ্বংস
করেছে, নির্বাসিত করেছে, বন্দীশালায় আবদ্ধ করে রেখেছে।”
তাহারা এই কথাই বলিত।
ইহার অধিকাংশই হাস্যোদ্দীপক, কিন্তু কোনরূপ প্রফুল্লতার
রেখাও ইহার মধ্যে ছিল না। রাশিয়া হইতে নবাগত এক
প্রতিভাশালী লেখক বলিল যে, আমি লােয়ার ডেপথস
নাটকের লিউক চরিত্রের ন্যায় অভিনয় করিতেছি-এখানে
আসিয়াছি, মিষ্ট কথায় যুবকবৃন্দাকে মুগ্ধ
করিয়াছি,
তাহারা আমায় বিশ্বাস করিয়াছে, মাথায় আঘাত
খাইয়াছে, আর আমি পলায়ন করিলাম। আর একজনের
মতে, 'প্রবণতা মােহই আমার সর্বনাশ করিয়াছে ; ‘আমার
খেলা ফুরাইয়াছে। আমার নাটকের যে, কোন গুঢ় অথ আছে,
তাহাও সে অস্বীকার করিল, আর তাহার একমাত্র কারণ
ইহা রাজসম্পর্কীয় ( Imperial )। বস্তুতঃ তাহারা মূখের
হাস্যকর অনেক কথাই বলিত। আমার প্রায়ই মনে হইত, বুঝি
মহামারীবাহী ধূলিকণা রাশিয়া হইতে উড়িয়া আসিতেছে।
তারপর সহসা
দেখি যেন রূপকথার নায়কের ন্যায়,
আমি রাশিয়ার সোশ্যাল ডিমোক্রাটীক পার্টির কংগ্রেসে আসিয়া
পড়িয়াছি। বাস্তবিক সেদিন আমার জীবনের এক মহানি।
লণ্ডন কংগ্রেস
কিন্তু আমার প্রফুল্লভাব স্থায়ী হইয়াছিল মাত্র প্রথম সভার
সময় পর্যন্ত
যখন তাহারা “সাময়িক ধারা”

১৪
লেনিনের সহিত
বাগবিতণ্ডা করিতে আরম্ভ করিল। এই সমস্ত বাগবিতণ্ডার
প্রচণ্ডতা এক মুহূর্তে আমার উৎসাহ শীতল করিয়া দিয়াছিল।
তাহার কারণ ইহা নয় যে, আমি অনুভব করিয়াছিলাম, পাটিটা
কিরূপ সংস্কারক ও বিপ্লবীদলে তীক্ষ্ণরূপে বিভক্ত-ইহা আমি
১৯০৩ সালেই জানিতাম। কারণ হইতেছে লেনিনের প্রতি
সংস্কারবাদীর বৈরীভাব। পুরাতন জলবাহী নলে চাপ দিলে
জল যেরূপ নির্গত হয়, সেইরূপ তাহাদের বক্তৃতার মধ্য দিয়া
লেনিন বিরুদ্ধতার প্রচণ্ডতা প্রকাশ পাইতেছিল।
যাহা বলা হয় তাহাই সব সময় প্রয়ােজনীয় নয়,
প্রয়ােজনীয় হইতেছে, কি ভাবে ইহা বলা হয়। ফ্রক কোট গায়ে
প্রােটেষ্টান্ট পাদরীর ন্যায় আট করিয়া জামার বােম
লাগাইয়া প্লেখানভ, যখন কংগ্রেস অধিবেশনের কাজ আরম্ভ
করিল, তখন সে পাদমীর ন্যায় এই আত্মবিশ্বাসে বক্তৃতা
দিতে লাগিল, যেন তাহার সমস্ত ভাবধারা অকাট্য, তাহার
প্রতি বাক্যটী, প্রতি বিরতিটী অত্যন্ত মূল্যবান্। সুকৌশলে
সুললিত বাক্যাবলী ওজন করিয়া সে সমবেত প্রতিনিধিগণের
মধ্যে বিতরণ করিতেছিল। আর বলশেভিক বেঞ্চ হইতে যখনই
কেহ কোন শব্দ করিতেছিল বা কোন ‘কমরেডকে ফিসফিস
করিয়া কিছু বলিতেছিল, তখনই শ্রদ্ধেয় বক্তা হঠাৎ থামিয়া গিয়া
সূচের স্যায় তীক্ষ্ণদৃষ্টি দিয়া তাহাকে বিদ্ধ করিতে ছিল।
কোটের একটা বােম প্লেখানভের অতি প্রিয় ছিল।
সব সময়েই বােতামটাকে বৈদ্যুতিক ঘণ্টার মত চাপিয়া

লেনিনের সহিত ধরিতেছিল, বােধ হয়, এই চাপই তাহার প্রবহমান বক্তৃতার স্রোতে বাধা দিতেছিল। একবার এক সভায় এক ব্যক্তির প্রশ্নের উত্তর দিতে উঠিয়া প্লেখানভ দুই বাহু একত্র করিয়া উচ্চকণ্ঠে ঘূণাব্যঞ্জক স্বরে “হা” করিয়া শব্দ করিল। ইহাতে বলশেভিক কমিগণের মধ্যে এক হাসির বােল পড়িয়া গিয়াছিল। প্লেখানভ কুটী করিয়া উঠিল তাহার গণ্ডদেশ বিবর্ণ হইয়া উঠিল। গণ্ডদেশ বলিতেছি- তাহার কারণ আমি মঞ্চের পাশে বসিয়াছিলাম এবং পাশ দিয়া বক্তার মুখের এক পাশ মাত্র দেখিতে পাইতেছিলাম। প্রথম সভাতে, প্লেখানভের বক্তৃতা দিবার সময়, বলশেভিক বেঞ্চের যে ব্যক্তিটী অতিমাত্রায় অধৈর্য্য ভাব প্রকাশ করিতেছিল, সে-ই লেনিন। একবার সে কুজাকার ধারণ করিল, যেন তাহার শীত পাইয়াছে, তাহার পরই সে অধীর ভাবে পাশ্ব ফিরিল, যেন গরম বােধ করিতেছে। জামার হাতার ছিদ্রে আঙ্গুল ঢুকাইল, চিবুক ঘষিল, মাথা নাড়িল এবং এম, পি টস্কিকে (M. I, Tomsky) ফিসফিস করিয়া কি বলিল। প্লেখানভ যখন বলিল যে, পার্টিতে কোন “মার্কসবাদ সংস্কারপন্থী” নাই। লেনিন মস্তক অবনত করিল, তার মাথার টাকটা তাল হইয়া উঠিল, আর তাহার স্কন্ধ নীরব হাস্যে কঁপিয়া উঠিল। তাহার পাত্র ও পশ্চাতে উপবিষ্ট কম্মিগণও হাসিয়া উঠিল এবং হলঘরের পিছন হইতে উচ্চকণ্ঠে ও বিষন্নভাবে কে একজন চীৎকার করিয়া বলিল “ওধারে যে লােক গুলাে বসে রয়েছে ওদের কি হবে?”

লেনিনের সহিত.. পিতাপুত্রীর সম্পর্কের ন্যায় খাঁটি সত্যের সহিত যাহার সম্পর্ক, খর্ব থিওডোর ডান (Little Theodore Dan) সেইরূপ লােকের মতাে কথা বলিত। সে সত্যের জন্ম দিয়াছে, সত্যকে পুষ্ট করিয়াছে এবং এখনও করিতেছে। সে কার্ল মার্ক-এর অবতার। তাহার মতে বলশেভিকরা অর্ধশিক্ষিত, আর ইহা মেনশেভিকদিগের সহিত তাহাদের সম্বন্ধ হইতে পরিষ্কার বুঝিতে পারা যায়। সে বলিত এই মেনশেভিকদের মধ্যেই সবচেয়ে বিখ্যাত মার্ক- বাদী চিন্তানায়ক দেখিতে পাওয়া যাইবে। “তােমরা মার্কসবাদী নও”, সে তাচ্ছিল্যের সহিত বলিল। না তােমরা মার্কসবাদী নও”, এই বলিয়া সে তাহার পীতবর্ণ মুষ্টি শূন্যে নিক্ষেপ করিল। কশ্মীদের মধ্যে একজন তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল “আবার কখন তুমি উদারপন্থীদের সঙ্গে চা খেতে যাচ্ছ?” প্রথম সভাতে মার্টভ বক্তৃতা দিয়াছিল কি না আমার স্মরণ নাই। এই অদ্ভুত চিত্তাকর্ষক পুরুষটী যুবকোচিত উৎসাহের সহিত বক্তৃতা দিয়াছিল। সহজেই বুঝা গেল, এই বিচ্ছেদ ও অনৈক্যরূপ বিয়ােগান্ত নাটক গভীরভাবে তাহার অন্তর স্পর্শ করিয়াছে। তাহার সারা অঙ্গ কঁপিয়া উঠিল। কড়া ইস্তিরী করা সার্টের কলার খুলিয়া ফেলিতে ফেলিতে, হাত দোলাইতে দোলাইতে, সে অধীরভাবে সম্মুখে পশ্চাতে পায়চারি করিতে লাগিল—কোর্টের জামার আস্তিনের নীচে তাহার কফটী ঝুলিয়া পড়িল। সে উচ্চে বাহু উত্তোলন করিল ও কফীকে যথাস্থানে প্রেরণ করিবার জন্য বাহু সঞ্চালন করিল।

;
লেনিনের সহিত...
মার্টভের বক্তৃতা শুনিয়া মনে হয় না যে,
জাল বুনিবার চেষ্টা করিতেছে, বরং মনে হয়, সে প্রাে-
সাহিত করিতেছে, অনুনয় মিনতি করিতেছে : বিচ্ছেদ,
অনৈক্য আমরা দূর করিবই, পাটি এত দুর্বল যে, বিভিয়দালে
বিভক্ত হইতে পারে না, সবার আগে কর্মীদের স্বাধীনতা
চাই-ই, আমরা কোনক্রমেই তাহাদের নিরুৎসাহ হইতে
দিব না। বক্তৃতার প্রথমাংশে, মধ্যে মধ্যে, সে প্রায় অনেকটা
বায়ুগ্রস্ত লােকের মতাে কথা বলিতেছিল; বাকোর প্রাচুর্য্যে।
তাহার আসল অর্থ প্রকাশ পাইতেছিল না, আর সে নিজে
শ্রোতৃবর্গের মনে এক ক্লেশদায়ক ছাপ মারিয়া দিতেছিল।
বক্তৃতার শেষের দিকে, বাহ্যতঃ বক্তৃতার সহিত কোন যােগ
রাখিয়া, সে সেই ‘যুদ্ধং দেহি' সুরে যুবকোচিত উৎসাহ ও
উদ্যমের সহিত সমরপিয়াসী বিরুদ্ধদলের ও সশস্ত্র বিপ্লবায়ােজনার্থ
সকল কাৰ্য্য ও প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে চীৎকার করিতে আরম্ভ
করিল। আমার স্পষ্ট স্মরণ হইতেছে, বলশেভিক বের হইতে
কে একজন চীৎকার করিয়া বলিয়াছিল, “হঁ্যা, ঠিক বলেছ।”
আর আমার মনে হয়, টমস্কি বলিয়াছিল, “কমরেড মার্টভের
মানসিক শান্তির জন্য আমাদের কি হাত দুটা কেটে বাদ
দিতে হবে ?”
ঠিক স্মরণ করিতে পারিতেছি না প্রথম দিনের অধিবেশনে
মার্টভ বক্তৃতা দিয়াছিল কি না। বক্তারা কে কিরূপভাবে
বক্তৃতা দিয়াছিল বর্ণনা করিবার জন্যই ইহার উল্লেখ করিলাম।

১৮
লেনিনের সহিত
তাহার বক্তৃতার পর, যে কামরা দিয়া সভাগৃহের হলঘরে
আসা যায়, সেই কামরায়, কর্মিগণের মধ্যে এক বিষাদময়
আলােচনা চলিতেছিল। “তােমাদের তাে মার্টভ রয়েছে,
আর সে Iskra দলের ( ‘অগ্নিস্ফুলিঙ্গ' নামক পত্রিকার
পরিচালকদের একজন।” “আমাদের বুদ্ধিজীবী বন্ধুগণ নিষ্প্রভ
হয়ে যাচ্ছে।”
রােস লাক্সেমবুর্গ ওজস্বিনী ভাষায়, আবেগে, তীব্র
শ্লেষব্যঞ্জকস্বরে বক্তৃতা দিয়াছিল।
বক্ত মঞ্চে লেনিন
এইবার ভাডিমির ইলইচ আসিল ; ক্ষিপ্রপদে মঞ্চের
উপর দাঁড়াইয়া উচ্চৈঃস্বরে তাহার স্বাভাবিক গম্ভীর কণ্ঠে
বলিল, “কমরেড !” প্রথমে তাহার বক্তৃতা আমার ভাল লাগে
নাই, কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আমি ও আর সকলে
তাহার বক্তৃতায় মুগ্ধ হইয়া গেলাম। এই প্রথম আমি
জটিল রাজনৈতিক প্রশ্ন সরলভাবে আলােচিত হইতে শুনিলাম।
তাহার মধ্যে, সুচারু ওজস্বিনী বাক্যপ্রয়ােগের কোনরূপ
প্রয়াস দেখিলাম না; কিন্তু প্রতি বাক্যটা সুস্পষ্টরূপে উচ্চারিত
হইতেছিল, আর তাহার অর্থ ছিল আশ্চর্যরকম সরল যে
অসাধারণ ছাপ, সে আমাদের অন্তরে আঁকিয়া দিয়াছিল,
পাঠকের মনে তাহা প্রতিফলিত করা অত্যন্ত দুরূহ।
তাহার বাহু প্রসারিত, হস্ত ঈষৎ উর্ধে উখিত; আর বােধ
;
;

লেনিনের সহিত
হইতেছিল, যেন সে ইহার দ্বারা প্রত্যেক বাকাটী ওজন করিয়া
দেখিতেছে, শত্রুপক্ষের মন্তব্যগুলি
সূক্ষমরূপে
তলাইয়া
দেখিতেছে, ও তাহার স্থানে, উদারপন্থী বুর্জোয়ার মতানুযায়ী
চলিয়া, বা ইহার পশ্চাদগামী না হইয়া, নিজপথ ধরিয়া
চলিয়া যাইবার শ্রমিকশ্রেণীর অধিকার ও কর্তব্যের সপক্ষে
গুরুত্ববিশিষ্ট যুক্তিতর্ক স্থাপন করিতেছে।
তাহার বক্তৃতায় ঐক্য, পূর্ণতা, সরলতা সতেজভাব, ও মাপের
উপর তাহার পূর্ণ অবয়ব--ক্লাসিক শিল্পের এক উৎকৃষ্ট শিল্পসৃষ্টির
রূপ ধারণ করিয়াছিল । সবই আছে, অথচ কিছুই অবান্তর নয়,
আর তাহার মধ্যে কোন অলঙ্কার থাকিলেও, তাহাও কাহারাে
নজরে পড়ে না, কারণ মুখমণ্ডলে দুইটা চক্ষু অথবা হাতের
আঙ্গুলের মত ইহা স্বাভাবিক ও অপরিহার্য।
পূৰ্ব্ববর্তী বাগীদের বক্তৃতা অপেক্ষা লেনিনের বক্তৃতা
অধিকতর সংক্ষিপ্ত, কিন্তু অন্য সকলের চেয়ে সেই আমাদের
মনে গভীরতর ছাপ মারিয়া দিয়াছিল।
ইহা কেবল
আমার নিজের ধারণা নয়। আমার পিছনে উৎসাহের
সহিত অনুচ্চস্বরে জল্পনা চলিতেছিল—“দেখ, এইবার সে কি
বলবে।” ঠিক তাই। তাহার সিদ্ধান্ত কাল্পনিক উপায়ে উপনীত
হইত না, পরন্তু স্বাভাবিক গতিতে, নিশ্চিতরূপে বিকশিত
হইত। মেনশেভিকরা তাহার বক্তৃতা শ্রবণে অসন্তোষ ও বিশেষ
করিয়া, লেনিনের প্রতি বিরকিব গােপন করিবার চেষ্টা করে
নাই। নীতির ব্যবহার যাহাতে পূর্ণরূপে নীতির আলােয়

লেনিনের সহিত...
নিরীক্ষণ করিতে পারা যায়, এই উদ্দেশ্যে যতই সে দৃঢ় অথচ
নিঃসংশয়ের সহিত পাটির বিপ্লবনীতির চরম বিকাশের
প্রয়ােজনীয়তা দেখাইতেছিল, ততই মেনশেভিকরা ক্রুদ্ধ হইয়া
তাহাকে বাধা দিতেছিল।
“কংগ্রেস দর্শনের বুলি আওড়াবার জায়গা নয়।” “গুরু-
গিরি করতে এসােনা, আমরা স্কুলের ছেলে নই।”
বিশেষরূপে, প্রথম আক্রমণ করিয়াছিল এক দীর্ঘকায়
শ্মশ্রুমণ্ডিত ব্যক্তি—দেখিতে দোকানদারের মত। আসন হইতে
লাফাইয়া উঠিয়া খলিত বাক্যে সে বলিল, “নী— নীচ --য—
যড়ষড়যন্ত্র।”
রােসা লাক্সেমবুর্গ মাথা নাড়িয়া লেনিনকে সমর্থন করিল।
পরবর্তী এক সভাতে সে বলশেভিকদের উদ্দেশ্যে এক সুন্দর
মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছিল। “তােমরা মার্কাদের উপর দাঁড়িয়ে
নয়, তােমরা এর ওপর চেপে বস, বরং শুয়ে পড়।
বিরক্তি, শ্লেষ, ঘৃণার একটা বিষাক্ত তপ্ত ঢেউ হলঘরখানা
ভাসাইয়া লইয়া গেল। লেনিনের মনোদর্পণ চক্ষু দুইটি শত
শত বিভিন্ন ভাবের অভিব্যক্তি প্রকাশ করিল।
সমস্ত মারমুখী আক্রমণ ব্যর্থ হইল—তাহার মনে কোন
দাগ টানিয়া দিতে পারিল না। আন্তরিক উৎসাহভরে, অথচ
ধ র ও শান্তভাবে সে বক্তৃতা দিয়া যাইতে লাগিল। বাহ্যিক
শান্তভাব ধারণ করার কি মূল্য কয়েকদিন পরে তাহাকে
দিতে হইয়াছিল, আমি জানিতে পারিয়াছিলাম । ইহা
শত্রুর এই

লেনিনের সহিত... ২১ অত্যন্ত আশ্চষ্য ও দুঃখের বিষয় যে, একমাত্র পূর্ণ বিকশিত মূল- নীতির সাহায্যে পাটির অনৈক্য ও আত্মকলহের কারণ নির্ণয় হওয়া সম্ভব, এই রকম স্বাভাবিক চিন্তাধারার জন্য তাহার বিরুদ্ধে এইরূপ বৈরীভাব উত্তেজিত হইতে পারে। পতাই এই ধারণা আমার মন অধিকার করিয়া বসিয়াছিল যে, কংগ্রেসের প্রতি অধিবেশনটা ভুড়িমির ইলইরে শক্তি উত্তরোত্তর বর্ধিত করিতেছে, তাহাকে পূৰ্ব্বাপেক্ষা সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী করিয়া তুলিতেছে । প্রতিদিন তার বক্তৃতা অটল হইতে অটলতর শুনাইতে ছিল, আর কংগ্রেসের ভিতর বলশেভিকদল উত্তরােত্তর দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ও অদম্য হইয়া উঠিতে ছি। লেনিনের পরই মেনশেভিকদের বিরুদ্ধে রােসা তাদেমবুর্গের ভাবোদ্দীপক সতেজ বক্তৃতা আমাকে সর্বাপেক্ষ। অধিক অভিভূত করিয়াছিল। লেনিন ও শ্রমিকদল শ্রমিকদের জীবনের সামান্য খু টিনাটার কথা তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া লেনিন তাহার অবসর সময় এমিকদের সাহচর্যে কাটাইত। ওদের মেয়েদের খবর কি? ঘর সংসারের কাজে গল। ডুবিয়ে বসে আছে ? কিছু শেখবার পড়বার সুবিধা করে উঠতে পারছে কি ?”

২২ লেনিনের সহিত... একবার হাইড পার্কে এক শ্রমিকদল - ইহারা কংগ্রেসেই সর্বপ্রথম লেনিনকে দেখিয়াছিল—কংগ্রেসে লেনিনের আচরণ সম্বন্ধে আলােচনা করিতেছিল। তাহাদের মধ্যে একজন এক চিত্তহারী মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছিল । “যতদূর আমি জানি, শ্রমিকদের মধ্যে তা'র মত চতুর ইও- রােপে বহুৎ থাকতে পারে, কিন্তু তােমাদের কর্মক্ষেত্রে টেনে আনতে পারে, তা'র মত এমন লােক তােমরা খুঁজে পাবে বলে আমার বিশ্বাস হয় না।” আর একজন হাসিতে হাসিতে বলিল, “ও ঠিক আমাদেরই একজন।” কে একজন উত্তর দিল, “প্লেখানভও ঠিক আমাদেরই একজন।” উত্তরটা ঠিক জায়গায় ঘা দিয়াছিল—“তােমরা মনে কর, প্লেখানভ সব সময় তোমাদের শেখাচ্ছে, তােমাদের উপর কর্তৃত্ব করছে, কিন্তু তা নয়, লেনিনই হচ্ছে একজন প্রকৃত নেতা ও কমরেড ।” একজন যুবক বিজ্ৰপচ্ছলে বলিল : “প্লেখানভের ফ্রক কোটটি তার পক্ষে অতান্ত অট।” একবার আমরা এক রেস্তোরাতে যাইতেছিলাম, এমন সময় মেনশেভিকদলভুক্ত এক শ্রমিক একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিবার জন্য লেনিনকে দাড় করাইল। লেনিন পিছনে পড়িয়া রহিল— আর এদিকে দলের আর সবাই চলিতে লাগিল। পাঁচ মিনিট পরে লেনিন রেস্তোরাতে প্রবেশ করিল। কুঞ্চিত। বলিল, 'আশ্চৰ্য্য যে এ রকম বােকা লােকও পাটি কংগ্রেসের

লেনিনের সহিত
ভ্য। সে আমায় জিজ্ঞাসা করল, আসলে ওসমস্ত আলােচনার
প্রকৃত কারণ কি। আমি বললুম, 'ব্যাপার হচ্ছে এই
তােমার বন্ধুরা পার্সিয়ামেন্টে প্রবেশ করতে চায়, আর আমাদের
বিশ্বাস, সংঘর্ষের জন্য শ্রমিক শ্রেণীকে প্রস্তুত হতে হবে।
আমার বিশ্বাস সে বুঝতে পেরেছে।”
আমরা কয়েকজন সর্বদা একত্রে এক সস্তার রেস্তোরাতে
আহারাদি করিতাম। আমি লক্ষ্য করিয়াছিলাম, ভুডিমির,
ইলইচ অত্যন্ত অল্প আহার করিত ; দুইটা বা তিনটা ভাজা
ডিম, এক টুকরা লবনাক্ত শুরু শূকর-জঙ, একপাত্র
ঘন কৃষ্ণবর্ণ বীয়ার—এই তাহার আহারের তালিকা। বেশ
বােঝা যাইত, নিজ সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে তাহার দৃষ্টি অত্যন্ত
অল্পই ছিল। শ্রমিকদের সুখস্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি তাহার অদ্ভুত
যত্ন ও দৃষ্টি সকলকে বিস্ময়াবিভূত করিত।
এম, এফ, অ্যাদ্রিয়েফ (গৰ্কির স্ত্রী) সেনানিবাসের মধ্যে
মদের দোকানের উপর নজর রাখিত। লেনিন তাহাকে
জিজ্ঞাসা করিত, “কি মনে হয়, শ্রমিকরা পেট ভরে খেতে
পাচ্ছে ? না? হু হু । আমরা বােধ হয় আরও অধিক সাঙুইচ
পেতে পারি ?”
একদিন দেখিলাম, আমি যে সরাইখানায় উঠিয়াছিলাম, সেই
খানে আসিয়া, লেনিন চিন্তামগ্নভাবে আমার বিছানাটা স্পর্শের
দ্বারা অনুভব করিতেছে ।
“কি করছো তুমি ?” আমি জিজ্ঞাসা করিলাম।

২৪
লেনিনের সহিত...
“দেখছি তােমার বিছানার চাদরগুলাে আলাে বাতাসের
স্পর্শ পায় কি না।”
প্রথমে আমি বুঝিতে পারি নাই, লণ্ডনে বিছানার চাদরাদি
কি রকম, তাহা সে জানিতে চায় কেন ? তারপর আমায় উদ্বিগ্ন
দেখিয়া সে স্পষ্ট করিয়া বলিল, ‘অতি অবশ্য নিজের সম্বন্ধে
যত্ন নিও।”
১৯১৮ সালের শরৎকালে দিমিত্রী পাভলভ নামক সরমােভাের
( Sormovo এক শ্রমিককে জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহার মতে
লেনিন-চরিত্রের বিশেষ উল্লেখযােগ্য বৈশিষ্ট্য কি। সে উত্তর
করিল, “সরল। লেনিন সত্যের ন্যায় সরল।” এমনভাবে
বলিল, যেন সে বহুপূৰ্বে ও বহুচিন্তার পর এই সিদ্ধান্তে
উপনীত হইয়াছে।
সবাই ভাল জানে, অধীনস্থ কর্মচারীই মনিবের কঠোর
সমালােচক। লেনিনের শকটচালক জিল একজন অভিজ্ঞ
ব্যক্তি, সে বলিয়াছিল, “লেনিন অনুপম। তাহার তুলনা
নাই। একদিন আমি Myasnitskaya রাস্তা দিয়া গাড়ী
চালাচ্ছিলুম। গাড়ী চলাচলিতে রাস্তা বন্ধ। একটুও সামনে
এগিয়ে যাইনি; ভয়, পাছে ধাক্কা লেগে গাড়ী চুরমার হয়ে যায়।
অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে হর্ণ বাজাচ্ছি। লেনিন গাড়ীর দরজা খুলে,
ধাক্কা খেয়ে প্রাণ হারাগাের বিপদের সামনে নিজেকে সম্মুখীন
করে, আমার পাশে পা-দানির ওপরে দাঁড়ালাে এবং আমায়
এগিয়ে যেতে বললে। চিন্তিত হয়ােনা জিল, আর সবার মতাে

লেনিনের সহিত...
এগিয়ে চল।' আমি একজন পুরাতন চালক। “আমি জানি, আর
কেউ এ রকম করতে সাহস করতো না।”
পাঠককে বোঝান শক্ত, কি সহজ ও স্বাভাবিক গতিতে
তাহার সমস্ত ভাবধারা একই স্রোতে প্রবাহিত হইত। কম্পাসের
কাটার অপরিবর্তনীয়তার ন্যায় তাহার চিন্তারশি শ্রমিকদের
শ্রেণী-স্বার্থে নিবদ্ধ ছিল।
লণ্ডনের এক সান্ধ্য অবসরে আমাদের ক্ষুদ্র দলটী এক
সঙ্গীতালয়ে প্রবেশ করিল।
ভি, ইলইচ বিদৃষক ও হাস্যরসিক নটের অভিনয়ে আনন্দে
সংক্রামকভাবে ‘হাে’ ‘হাে’ করিয়া হাসিয়া উঠিল,
অবশিষ্ট নটের প্রতি অন্যমনস্কভাবে তাকাইল। ব্রিটিশ কলাে-
ম্বিয়ার শ্রমিকদের গাছ কাটার দৃশ্যে সে বিশেষ মনঃসংযােগ
করিয়াছিল। পিছনের ক্ষুদ্র পটখানিতে বনমধ্যস্থ তঁাবুর দৃশ্য
দেখা যাইতেছে। সামনে দুইজন
সামনে দুইজন যুবক বৃক্ষছেদনে প্রবৃত্ত।
মুহূর্তে যুবকদ্বয় প্রায় এক মিটার স্থূল এক বৃক্ষের ও fড় ছেদন
করিয়া ফেলিল।
ইলইচ বলিল, 'সাধারণের চোখে তাই বটে। বাস্তব
জগতে এত তাড়াতাড়ি তারা কাজ করতে পারতো না। বস্তুতঃ
সেখানেও তারা কুঠার ব্যবহার করে, রাশি রাশি কাঠ কেটে
বাজে কাটি তৈরী করে। এই তােমাদের ইওরােপীয় সভ্যতা!”
ধনিকতন্ত্রের কঠোর পেষনে উৎপাদনে কি বিশৃঙ্খলা,
যথেচ্ছাচার উপস্থিত হইয়াছে, কি বিপুল কাঁচামাল নষ্ট হইতেছে,

লেনিনের সহিত এই সম্বন্ধে সে বলিতে আরম্ভ করিল। অবশেষে দুঃখ করিয়া বলিল, অথচ আজও এ সম্বন্ধে কেউ কোন বই লেখবার কথা চিন্তা করে নি। ভাবটা আমার নিকট সম্পূর্ণ পরিস্কার হইল না। কিন্তু ইলইচকে এ সম্বন্ধে কোন প্রশ্ন করিবার সুযােগ পাই নাই। মূকাভিনয় মঞ্চশিল্পের এক বিশেষ রূপ—এই সম্বন্ধে সে ইতিমধ্যে কতকগুলি চিত্তাকর্ষক মন্তব্য প্রকাশ করিতেছিল। “ইহা হইতেছে সাধারণভাবে অনুমােদিত ভাবধারার প্রতি এক বিশেষ বিদ্রুপাত্মক মনােভাবের অভিব্যক্তি ও এইসমস্ত ভাবধারা গুলিকে ওলটপালট করিবার, বিকৃত করিবার, স্বাভাবিকতার স্বেচ্ছাচারিতা দেখাইবার প্রচেষ্টা। ইহা একটু জটিল, কিন্তু আনন্দদায়ক। দুই বৎসর পরে ক্যাপ্রিতে এ, এ, বােগদানােভের সহিত ইউটোপিয়ান উপন্যাসের আলােচনা প্রসঙ্গে লেনিন বলিল, “সিনর ম্যাসিষ্ট (Signor Machist) কি করে ধনিক- তন্ত্র-হাঙ্গর পৃথিবীর রক্তশােষণ করছে তেল, লােহা, কাঠ, কয়লা গ্রাস করছে, এই সম্বন্ধে শ্রমিকদের জন্য যদি একখানা উপন্যাস তুমি লেখ, তাহলে ভাল হয়। বইখানি প্রয়ােজনীয় হয়ে উঠবে। প্যারিসে সাক্ষাৎ লণ্ডনে বিদায় সন্তাষণকালে সে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিল যে সে লেনিনের সহিত বশ্রামের জন্য ক্যাপিতে আসিবে। কিন্তু আসিবার জন্য মনস্থির করিবার পূর্বেই, আমি তাহাকে দেখিলাম পারিসের ছাত্রাবাসের একটা দুইখানা কামরাযুক্ত ফ্লাটে ( আকারে ছাত্রাবাসের ক্যাটের মত বটে, কিন্তু পরিচ্ছন্নতায় বা সুশৃঙ্খলতায় নয়)। ন্যাদে- জদা কনস্তান্তিনােভ না আমাদিগকে চা পরিবেশন করিয়া বাহিরে গিয়াছে। কামরায় কেবল আমরা দুইজন। জানিয়ে তখন ভাঙ্গিয়া চুরমার হইয়া গিয়াছে। যতদূর সম্ভব আমাদের সমস্ত সুশিক্ষিত ব্যক্তির জীবন বেষ্টন করে, এমন এক নূতন প্রকাশালয়ের গঠন সম্বন্ধে ইলইচের সহিত আলােচনা করিবার জন্য আমি আসিয়াছিলাম। আমি সম্পাদকীয় কাৰ্য্যস্থল রাশিয়ার বাহিরে লইয়া যাওয়ার প্রস্তাব করিলাম। বলিলাম,ভি, ভরােভস্কি.ও আর যে কেহ একজন উক্ত কর্মস্থলে থাকিবে, এবং রাশিয়ায়, ভি, এ, •দায়ানিৎস্কি তাহাদের প্রতিনিধিস্বরূপ থাকিবে। পাশ্চাত্য সাহিত্যের ইতিহাস, রুশ সাহিত্য ও সভ্যতার ইতিহাস সম্বন্ধে পুস্তকের সিরিজ প্রকাশ করা আমি সমীচীন বােধ করিয়াছিলাম, কারণ আমার মনে হইয়াছিল, এই সমস্ত পুস্তকজি আত্মশিক্ষা ও প্রচারকাৰ্য্য চালাইবার পক্ষে শ্রমিকদিগের নিকট সংবাদের খনি। কিন্তু ভডিমির ইলইচ মুননিয়ন্ত্রণ ও জনগঠনকার্যপরিচালনার বিম্বের উল্লেখ করিয়া মূলেই আমার মতলব ফাসাইয়া দিল । অধিকাংশ কমরেড পাটির ব্যবহারিক কাশ্যে লিপ্ত রহিয়াছে--- তাহাদের বই লিখিবার সময় নাই। তাহার প্রধান, ও ২৮ লেনিনের সহিত.. আমার নিকট সবচেয়ে অখণ্ড যুক্তি, অনেকটা এই রকম ছিল মােটা বই লিখিবার সময় নাই। যে সব বুদ্ধিজীবী স্পষ্ট সােসিয়ালিসম ত্যাগ করিয়া উদারপীদলে তিড়িতেছে, তাহা বাই মােটা বই পড়িবে, আর তাহারা যে পথ বাছিয়া লইয়া সেখান হইতে তাহাদের ফিরানাে অ'মাদের আমাদের যাহা, প্রয়ােজন, তাহা হইতেছে সংবাদপত্র ও ক্ষুদ্র পুস্তিকা। জানিয়ে প্রকাশালয় নূতন করিয়া চালাইতে পারিলে ভাল হয়, কিন্তু মুদ্রণনিয়ন্ত্রণের জন্য রাশিয়ায় ইহ অসম্ভব, আর এখানে (প্যারীতে) স্থানান্তরিত করার অসুবিধা জন্য অচল। লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র পুস্তিকা আপামর জনসাধারণের মধে ছড়াইয়া দিতে হইবে, আর এই সমস্ত স্তুপাকার পুস্তিকা আইনে চোখে ধূলি দিয়া স্থানান্তরিত করা অসম্ভব। প্রকাশালয় স্থাপনের জন্য আমাদিগকে সুদিনের অপেক্ষায় থাকিতে হইবে। তারপর তাহার সেই অপরিবর্তনীয় চিত্তহারী স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতা সহিত, সে দুমা (Duma) ও কাদেতের (Cadet) সভ্যবৃন্দের সম্বন্ধে বলিতে আরম্ভ করিল। প্রসঙ্গক্রমে বলিল, যে তাহার “Octobrist দলভুক্ত হইতে লজ্জনুভব করে” ; তাহাদের কেবলমাত্র একটা পথ খােলা আছে, আর সেই পথ হইতেছে ন্যায়ের পথ। যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী এবং সম্ভবতঃ একটী নয়, একটীর পর একটী করিয়া অনেকগুলি যুদ্ধ।” এই উক্তির স্বপক্ষে সে বহু যুক্তিতর্কের অবতারণা করিয়াছিল ; তাহার এই ভবিষ্যৎবাণী অচিরেই বানে ফলিয়া গিয়াছিল। তারপর সে দাড়াইয়া উঠিল দি লেনিনের সহিত... ও স্বকীয় বিশিষ্ট ভঙ্গীতে ওয়েষ্টকোটের হার ছিদ্রে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রবেশ করাইয়া, দীপ্ত চক্ষুদ্বয় ঘুরাইয়া, ধীরে ধীরে সেই ক্ষুদ্র গৃহমধ্যে পায়চারি করিতে করিতে বলিল “যুদ্ধ আসিতেছে। যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। ধনিক-জগৎ অন্ত দহন মবস্থায় এসে পৌঁছেছে। এর মধ্যেই লােকে চৌভ- ( Chauvinism) 3 জাতীয়তাবাদরূপ ঔষপানে নজেকে বিষাক্ত করতে আরম্ভ করেছে। মনে হয়, আমরা মার একটা সারা ইওরোেপব্যাপী মহাযুদ্ধের দৃশ্য দেখতে সাব।" “প্রলেটারিয়ে ? সেই ভীষণ সংহারলীলা প্রতিরোধ ফরবার শক্তি প্রলেটারিয়েটরা নিজেদের মধ্যে খুজে পাবে । কিরূপে প্রতিরোধ করবে ? সমগ্র ইওরােপের শ্রমিকগ। কক সাধারণ ধর্মঘট ? তারা এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বুচালিত হয়ে উঠতে পারেনি, বা তাদের মধ্যে শ্রেণী-বোধ ন্মায়নি। এরূপ ধর্মঘট ধৰ্ম্মঘট ঘরােয়া যুদ্ধের সূচনা করবে, কন্তু ব্যবহারিক রাজনীতিক হয়ে আমরা ইহার নির্ভর করতে পারি না।” ক্ষণেক সে চুপ করিল -ঘরের মেঝেতে জুতার তলাটা বষিতে লাগিল ; তারপর বিষন্ন ভাবে বলিল, “প্রােলেটারিয়েটদের ভয়ানক ভুগতে হবে, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কারও কিছুকাল তাদের কপালে যন্ত্রণা ভােগ আছে। কিন্তু এ -- 'ও . শ্চিত যে, এদের শত্রুরা পরস্পর পরস্পরকে দুর্বল করবে।” देशन ৩০ লেনিনের সহিত.. আমার নিকট পৰ্যন্ত আসিয়া, সতেজ কিন্তু অনুচ্চস্বরে, যেন বিস্মিত ভাবে, সে বলিল, “না, কিন্তু ভেবে দেখ। ভােজন- পরিতৃপ্ত ব্যক্তি অনাহারী ক্ষুধার্তকে পরস্পর পরস্পরের সহিত যুদ্ধ করতে বাধ্য করবে কেন? এর চেয়ে অধিক নির্বোধের কাজ, ও বীভৎসতর অপরাধ আর কি হতে পারে ? এর জন্য শ্রমিকদের যথেষ্ট মূল্য দিতে হবে, কিন্তু অবশেষে তারাই লাভবান হবে। এই হচ্ছে ইতিহাসের ইচ্ছা।” প্রায় সে ইতিহাসের উল্লেখ করিত, কিন্তু ইতিহাসের শক্তি বা ইচ্ছার প্রতি তাহার অকৃত্রিম বিশ্বাস সম্বন্ধে যাহা সে বলিত, তাহার কিছুই আমি অনুভব করিতে পারিতাম না। নিজের কথায় সে নিজেই বিচলিত হইল। পড়িল, কপাল হইতে ঘাম মুছিয়া, একটু ঠাণ্ডা চা পান করিল; তারপর অপ্রত্যাশিতভাবে জিজ্ঞাসা করিল, “আমেরিকার তােমার সেই ব্যাপারটা কি ? খবরের কাগজ থেকে জানলুম ব্যাপারটা কি সম্বন্ধ, কিন্তু এর শেষ হল কি করে ?” সংক্ষেপে আমি আমার য্যাডভেঞ্চার বিবৃত করিলাম। লেনিনের মত প্রাণখােলা হাসি হাসিতে পারে এমন দ্বিতীয় ব্যক্তি আমার দৃষ্টিপথে পড়ে নাই। আশ্চর্যের বিষয়, তাহার মত কঠোর প্রত্যক্ষবাদী, যে বিরাট উপবিপ্লবের অবশ্যম্ভাবিত মনশ্চক্ষে স্পষ্ট দেখিয়াছিল ও গভীরভাবে অনুভব করিয়াছিল, যাহার ধনিক জগতের প্রতি ঘৃণা ছিল অনড় ও নিম্মম, সেও শিশুর মত হাসিতে পারে—যতক্ষণ চোখে জল না আসে, যতক্ষণ সে বসিয়া

লেনিনের সহিত...
হাসিতে হাসিতে তাহার শ্বাসরুদ্ধ না হইয়া যায়, ততক্ষণ
হাসিতে পারে। ও রকম হাসিতে হইলে ঢাই সর্বাপেক্ষা
তাজা ও স্বাস্থ্যকর মন।
হাসির লহরের ভিতর দিয়া সে বলিল, “ও... তুমি একজন
রসিকপুরুষ (humourist)। ভাবতেও পারতুম না, এ রকম
মজার কিছু থাকতে পারে।”
চক্ষু মুছিয়া, তৎক্ষণাৎ সে গম্ভীর হইয়া উঠিল ও করুণ
কোমল হাসি হাসিতে হাসিতে বলিল, “ভারী সুন্দর
হাসি মুখে তুমি পরাজয় গ্রহণ করতে পার। কৌতুকপ্রিয়তা
(humour) এক চমৎকার সুন্দর, স্বাস্থ্যকর গুণ। আর
বাস্তবিক, জীবনটা যেমনি মজার, তেমনি দুঃখময়।”
আমরা একমত হইলাম যে, একদিনের মধ্যে আমি তাহার
সহিত দেখা করিব ; কিন্তু
জলহাওয়া ছিল খারাপ আর
সন্ধ্যাকালে আমার থুথুর সহিত অনেকখানি রক্ত উঠিতে আরম্ভ
সুতরাং পরদিবসই আমি সেই স্থান ত্যাগ করিলাম।
করিল।
ইতালিতে লেনিন
প্যারিসে সাক্ষাতের পর
আমাদের দেখা হইয়াছিল
ক্যাপ্রিতে।
সে সময় লেনিন সম্বন্ধে আমার ধারণা ছিল
অদ্ভুত, যেন ইলইচ দুইবার ক্যাপ্রিতে আসিয়াছিল, আর দুইটা
সম্পূর্ণ বিপরীত মনােভাব লইয়া। এক ইলইচ, যখন আমার
সহিত জেটাতে দেখা হইল, দৃঢ়স্বরে বলিল, “এ, এম (A. M).

৩২
লেনিনের সহিত...
আমি জানি, তুমি সব সময় আশা করছে,আমার সঙ্গে ম্যাসিষ্টদের
পুনর্মিলন সম্ভবপর। এ চেষ্টা যে বৃথা, আমাদের পুনর্মিলন
যে অসম্ভব, পত্রে আমি পূর্ব হ'তে তােমায় জানিয়ে
দিয়েছিলাম।”
বাসায় ফিরিবার পথে ও পরে আমি তাহাকে বুঝাইতে
চেষ্টা করিয়াছিলাম যে, তাহার মত সম্পূর্ণ ঠিক নয়। দুইটি
বিরুদ্ধ দর্শনের পুনর্মিলনের ইচ্ছা আমার কখনও ছিলনা, আর
বর্তমানেও নাই। প্রসঙ্গক্রমে একথা বলিলে অন্যায় হইবে
যে, আমি ভাল বুঝিও না। উপরন্তু আমার যৌবনাবস্থা
হইতে আমি সমস্ত দর্শনবাদ সম্বন্ধে সন্দিগ্ধ ছিলাম। সন্দেহের
কারণ, এক দর্শনবাদ অপরের বিরুদ্ধবাদী ও আমার ব্যক্তিগত
অভিজ্ঞতার বিরুদ্ধ।
মতে, পৃথিবীর সবেমাত্র
আরম্ভ হইয়াছে, পৃথিবী সবেমাত্র বিকাশ প্রাপ্ত হইতেছে ;
কিন্তু দর্শন ইহার মাথায় চটী মারিয়া ইহাকে সম্পূর্ণ এক
ভ্রান্তিমূলক অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করিয়া বসিল, “কোথায় যাচ্ছ
তুমি ? কেনই বা কেন তুমি ভাব ?।” কোন
কোন দার্শনিক কঠোর অথচ সরল আদেশ দিল “চুপ।” উপরন্তু
আমি জানিতাম, দর্শন স্ত্রীলােকের ন্যায় সাদাসিদে, এমন কি
ভীষণও হইতে পারে, কিন্তু এরূপ কৌশলের সহিত বেশ
বিন্যাস করিয়া থাকে যে তাহাকে সুন্দরী বলিয়া ভ্রম হয়।
ইহাতে ভি, ইলইচ হাসিয়া উঠিল। বলিল, “বেশ ঠাট্টা
হচ্ছে। পৃথিবী সবে আরম্ভ হয়েছে, বিকাশ প্রাপ্ত হচ্ছে—
আমার
যাচ্ছ ?

লেনিনের সহিত...
ওহে এটা বেশ গভীরভাবে চিন্তা করে দেখ। বহুপূর্বে যেখানে
তমার আসা উচিত ছিল, সেখানেই তুমি আসবে।”
তারপর আমি তাহাকে বলিলাম, আমার চোখে এ, এ,
বাগদানােত, এ, লুনাচারাস্কি ও ভি, এ, ব্যাজারভ মহৎ ব্যক্তি
দম্পূর্ণভাবে উচ্চশিক্ষিত, পাটীতে তাহাদের সমকক্ষ কেহ
নাই।
“ধরে নিলুম তাই। বেশ, তারপর ?"
“আমার বােধ হয়, তাদের সকলের শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য একই।
মার সম্যক্‌রূপে বােধগম্য ও অনুভূত হ'লে, তাদের উদ্দেশ্যের
কতা দার্শনিক-বিরুদ্ধতা মুছে ফেলবে—ধ্বংস করবে।"
“এর অর্থ কি এই দাঁড়ায় যে, এর পরও পুনর্মিলনের আশা
এখনও লােপ পায় নাই ? সম্পূর্ণ বৃথা আশা। বন্ধুভাবে বলছি,
মস্তিষ্ক থেকে, যতদূর সম্ভব সম্পূর্ণরূপে, এ ধারণা বিতাড়িত কর।
হামার মতে প্লেখানভর উদ্দেশ্যও এক। তােমাকে বলতে
ক, আমার ধারণা, তার লক্ষ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন, যদিও ইহা সত্য যে,
প্লখানভ বস্তুতান্ত্রিক, দার্শনিক নয়।”
এইখানে আমাদের কথােপকথন শেষ হইল। আমার মনে
য়, একথা বলা নিষ্প্রয়ােজন যে আমি তাহার মুখের কথাগুলি
প্রকাশ করিতে পারি নাই। কিন্তু আমি স্থির
গনি যে, তাহার ভাবধারা যথাযথরূপে লিপিবদ্ধ করিতে
সমর্থ হইয়াছি।
সুতরাং লণ্ডন কংগ্রেস অপেক্ষা লেনিন আমার সামনে দাড়া-

৩ঃ লেনিনের সহিত... ইয়াছিল আরাে দৃঢ়, আৱ অটলভাবে। কিন্তু তখন সে বিচলিত হইয়া উঠিত, এমন হইত যে পাটির মতো দলাদলি হইলে, তাহাকে যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্তের মধ্য দিয়া কিছু সময় কাটাইতে হইত। আর এখন সে শান্ত, বরং স্থির, উদাসীন ও বিদ্রুপাত্মক পরুষভাবে দর্শনতত্ত্বঘটিত ভাবরাশি মন হইতে দূর করিয়া দিতে উন্মুখ ও সদাই সতর্ক। এ, এ, বােগদানােত অতিরিক্তমাত্রায় চিত্তাকর্ষক, মধুর- প্রকৃতি ও লেনিনপ্রিয় ছিল। যদি নিজের সম্বন্ধে তাহার কতকটা উচ্চ ধারণা ছিল, তথাপি তাহাকে এই সমস্ত তীক্ষ্ণ, মর্মভেদী যন্ত্রণাদায়ক কথা শুনিতে হইতঃ “সােপেনহাওয়ার বলিত যে ‘পরিষ্কার চিন্তা মানে পরিষ্কার ভাষণ' । আমার মনে হয়, এর চেয়ে সত্য কথা সে আর কখনও বলেনি। কমরেড বােগদানােভ, তুমি নিজেকে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করতে পার না। অল্প কথায় আমায় বুঝিয়ে বল, তােমার পরিবর্তন ( Substitution) শ্রমিকদের কি উপকারে আসবে ও কেন মাসিস (Machism) মার্কসবাদ অপেক্ষা অধিক বিপ্লবকর ?" বােগদাননা ও ব্যাখ্যা করিবার চেষ্টা করিল কিন্তু বাস্তবিক সে যাহা বলিল তাহা দুর্বোধ্য---কথামাত্র সার। ইলই বলিল, “ও কথা ছেড়ে দাও। কে যেন বলেছিল, বােধ হয়, যয়েস (Juares ) ই হবে, পাদরী হওয়ার চেয়ে সত্য কথা বলা ভাল—আর আমি এর সঙ্গে জুড়ে দিই, ম্যাসিষ্ট হওয়ার চেয়ে। তারপর সে বােগদানােভের সহিত দাবা লেনিনের সহিত... খেলায় মগ্ন হইল । খেলায় হরিয়া গেলে সে ক্রুদ্ধ হইত ও শিশুর ন্যায় হতাশ হইয়া পড়িত। বিশেষ উল্লেখযোগ্য যে, তাহার চমক লাগিয়ে দেওয়া হাসির মত, শিশুর ন্যায় এই হতাশ- ভাব, তাহার চরিত্রের পূর্ণতা ও একতার কোন ক্ষতি করিতে পারিত না। ক্যাপ্রিতে দেখিলাম আর এক লেনিন---চমৎকার, অদ্ভুত কমরেড। সদাপ্রফুল্ল। বিচিত্র নয় তাহার ব্যবহার, পৃথিবীর সৰ্ববিষয়ে তাহার এক আন্তরিক অপরিসীম অনুরাগ। একদিনের কথা। সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। সবাই ভ্রমণে বাহির হইয়া গিয়াছে। আমাকে ও এম, এফ, আঁদিয়েফকে দুঃখিতভাবে ও গভীর আক্ষেপের সহিত সে বলিল : “কি পরিতাপের কথা ! এই সম চতুর প্রতিভাশালী পুরুষ, যারা পাটির জন্য অনেক কিছু করেছে, এবং দশগুণ বেশি করতে পারতাে—আর তারা আজ আমাদের সঙ্গে এক পথে চলবে না। তারা এ রকম করতে পারে না। আর এই রকম শত শত লোেক এই কঠিন নির্মম নিগ্রহে ধ্বংস প্রাপ্ত হচ্ছে---বীভৎসভাবে তাদের অঙ্গচ্ছেদ হ'চ্ছে।” আর এক সময় সে বলিল : “লুনাচারস্কি পার্টিতে ফিরে আসবে, আর দু'জনের চেয়ে সে অল্প স্বাতন্ত্রবাদী। তান প্রকৃতি উচ্চগুণসম্পন্ন—এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। তার সম্বন্ধে আমার একটা দুর্বলতা আছে।' কি মূখের নায় কথা—দুর্বলতা আছে। বাস্তবিক আমি তাকে

হইয়া
লেনিনের সহিত...
ভালবাসি, তুমি জান, ভারী সুন্দর কমরেড সে। তার মধ্যে
কিছু ফরাসীসুলভ দীপ্তি আছে। তার লঘুতা স্বকীয়
রুচিজ্ঞানের ফল।
ক্যাপ্রিদেশীয় জেলেদের জীবনের কথা, তাহাদের আয়ের
কথা, পুরােহিতের প্রভাব, তাহাদের বিদ্যালয়ের কথা-
সমস্ত বিষয়ে সে বিশদভাবে প্রশ্ন করিতে লাগিল।
তাহার অনুরাগের বিষয়বস্তুর পরিসর দেখিয়া, বিস্মিত
থাকিতে পারি নাই। যখন এক পুরােহিতকে তাহার
দৃষ্টিগােচর করান হইল -এক দরিদ্র কৃষকের সন্তান,তৎক্ষণাৎ
সে সংবাদ সংগ্রহের জন্য জিজ্ঞাসা করিল, কতবার চাষার।
তাহাদের ছেলেদের উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঠায়, আর ছেলেরা
পুরােহিত হইয়া গ্রামে ফিরে কি না।
“বুঝতে পেরেছ ? এটা যদি একটা স্বতন্ত্র ঘটনা না হয়--
তা হলে ব্যাপার দাঁড়াচ্ছে যে, এটা ভ্যাটিকানদের এক
মতলব—এক কৌশলপূর্ণ মতলব !”
সর্ব বিষয়ে সবার অগ্রগণ্য হইয়াও, অনুচ্চাভিলাষী, নিরহঙ্কার,
সাধারণ নরনারীর সরল জীবনে একান্ত অনুরাগী হইতে
পারে, এমন দ্বিতীয় পুরুষ আমি কল্পনা করিতে পারি না।
তাহার মধ্যে এমন এক আকর্ষণ-শক্তি ছিল, যাহা
শ্রমিকদের অন্তর
ও সহানুভূতি, তাহার দিকে আকৃষ্ট
সে ইতালী ভাষায় কথা বলি না। কিন্তু ক্যাপ্রি-
দেশীয় জেলেরা-ইহারা শ্যালিয়াপিন (Chiliapin) ও অপরাপর
করিত।

লেনিনের সহিত বিখ্যাত রুষবাসীকে দেখিয়াছিল—সহজাতবুদ্ধিবশতঃ তৎক্ষণাৎ লেনিনকে তাহাদের হৃদয়ের বিশেষ স্থানে আসন দিয়াছিল। তাহার হাসি ছিল মনমাতানাে--সেই রকম লােকের আন্তরিক হাসি, যে লােক, নরনারীর বীভৎস মূখত ও চতুর ব্যক্তির আক্রোব্যাটসুলভ চাতুর্যের সহিত সম্পূর্ণ পরিচয় থাকা সত্ত্বেও, “সরলচিত্ত নরনারীর” শিশুসুলভ অকৃত্রিম জীবনপ্রণালী দেখিয়া আনন্দিত হইত। জ্যভাণী দারাে (Giovanni+Spido) নামে এক বৃদ্ধ ধীবর তাহার সম্বন্ধে বলিয়াছিল ? “কেবল- মাত্র সরল অকপটচিত্ত ব্যক্তিই ও রকম হাসি হাসতে পারে।' কখনও কখনও স্বচ্ছ নীল আকাশের মত জলের উপর দিয়া আমরা দাঁড় বাহিয়া যাইতাম। আর লেনিন ‘আঙ্গুল দিয়া মাছ ধরিতে শিখিত—বিনা ছিপে, কেবলমাত্র সুতা দিয়া।' জেলেরা তাহাকে বুঝাইয়া দিয়াছিল, তাহার অঙ্গুলি যখন রঞ্জুর কম্পন অনুভব করিবে, তখনই মাছ বড়শবিদ্ধ হইবে। “কসি. দ্ৰিন, দ্ৰিন। Capisee ?” এক সেকেণ্ড পরে সে একটা মাছ বড়শবিদ্ধ করিল মাছটাকে জল হইতে টানিয়া তুলিয়া, শিশুর ন্যায় আনন্দে ও শিকারীর ন্যায় উৎসাহে, চীৎকার করিয়া বলিল, “দিন, দিন।” শিশুর ন্যায় উল্লাসে জেলেরা অট্টহাসি হাসিয়া উঠিল, এবং এই নৃহন জেলেটীর নামকরণ করিল, “সিনর দিন, দ্ৰিন।” সেইস্থান ত্যাগ করিয়া যাওয়ার পরও, তাহারা জিজ্ঞাসা করিত, “দিন, দিনের চলছে কেমন? এখনও তাকে জার গ্রেপ্তার করেনি ?”

লেনিনের সহিত... আমার স্মরণ নাই, লেনিনের পূর্বে কি পরে প্লেখানভ ক্যাপ্রিতে আসিয়াছিল। ক্যাপ্রি কলােনির কতকগুলি ঔপনিবেশিক, লেখক অলিগার,লরেন্দজ মেতনার (এই মেনার সােত জি নামক স্থানে বিপ্লব পরিচালনা করায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হইয়াছিল), পল ভিগদরচিক্ ও আমার বােধ হয় আরও দুইজন প্লেখানতের দর্শনপ্রার্থী হইয়াছিল। প্লেখানভ তাহাদের প্রার্থনা না-মঞ্জুর করিয়াছিল, আর না-মঞ্জুর করার তাহার অধিকারও ছিল। সে অসুস্থ হইয়া বিশ্রামের জন্য ক্যাপ্রিতে আসিয়াছিল। কিন্তু অলিগার ও লরেন্তজ, আমাকে বলিল যে, অতিশয় অভদ্রোচিতভাবে সে তাহাদের ফিরাইয়া অলিগরের মেজাজ ছিল অত্যন্ত চড়া পরদায় বাঁধা, সে পুনঃ পুনঃ বলিতে লাগিল যে, প্লেখানভ, এই ধরণের অনেক কিছু বলিয়াছে—“যে সব লোেক কিছু করতে পারে না, কেবল কথা বলতে চায়, তাদের উপর সে বিরক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের হাত থেকে সে মুক্তি চায়। আমার সঙ্গে সে যখন ছিল, বাস্তবিক স্থানীয় উপনিবেশস্থিত কোন লােকের সহিত দেখা করিতে চাহিত না। ইলইচ, তাহাদের সকলের সহিত সাক্ষাৎ করিত। প্লেখানভ কখনও কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিত না। সে পূৰ্ব্ব হইতেই এসব জানিত, ও নিজেই এ সম্বন্ধে সব বলিত। রুশীয় প্রথায় প্রতিভাদীপ্ত, ইওরােপীয় শিক্ষায় সুশিক্ষিত প্লেখানভ আপন পাণ্ডিত্য জাহির করিতে ভালবাসিত । বস্তুতঃ তীব্র বিদ্রুপ করিবার লােভে, বিদেশীয় বা রুশীয় কম- দিয়াছে ।

৩১
;
লেনিনের সহিত
রেরে দুর্বল স্থানে সজোরে নির্মম ভাবে আক্রমণ করিত।
আমার নিকট তাহার বিদ্রুপাত্মক রসিকতা অর্থহীন গেধ হইত।
কেবলমাত্র এই কয়টা কথা আমার স্মরণ আছে : “অপরিমিত ভাবে
পরিমিত ১lebring ; এনরিকো ফেরি (tiurict) erri) একজন
ঠক ; তার মধ্যে স্বর্ণও নাই, লোহও নাই।" ফেরি অর্থাৎ
লৌহ কথাটীর উপর এই হেঁয়ালীটা গড়িয়া উঠিয়াছিল।
সাধারণতঃ জনসাধারণের প্রতি তাহার ব্যবহার ছিল প্রসন্ন, যেন
সে এক দেবতা। অত্যন্ত প্রতিভাশালী লেখক ও পাটির
বাচনিক উৎসাহদাতা হিসাবে আমি তাহাকে গভীরভাবে
শ্রদ্ধা করিতাম ;
; কিন্তু তাহার প্রতি আমার কোন সহানুভূতি
তাহার মধ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় ‘আভিজাত্য-বােধ
আমার সিদ্ধান্ত হয়তাে ভুল হইতে পারে। আমি
ভুল করিতে ভালবাসি না। কিন্তু আর সকলের মত সব
সময় ভুল এড়াইয়া চলিতে পারি না।
কিন্তু এ কথা সত্য যে, জি, ভি, প্লেখানভ ও ভি, আই
লেনিন ব্যতীত, আর কোন দুইটা পুরুষ আমার জীবনপথে
আসে নাই, যাহাদের মধ্যে সাদৃশ্য এত অল্প,—আর ইহা
স্বাভাবিক। কারণ একজন পুরাতন জগতের সকাৰ্য
শেষ করিতেছে, অপরজন নবজগতের গঠনকার্য্যের পত্তন
করিতেছে।
জীবন আমাদের সহিত এরূপ বিদ্বেষপূর্ণ চাতুরী অভিনয়
কারে যে, যাহার। প্রকৃত ঘৃণা হইতে বঞ্চিত, তাদের অন্তর
তুল না।
ছল।

৪০ লেনিনের সহিত... প্রকৃত প্রেম হইতেও বঞ্চিত। এই সত্য মনুষ্য প্রকৃতির মূলে আঘাত করিয়া, মনুষ্য প্রকৃতিকে বিকৃত করিয়া ফেলিতেছে। আত্মার এই দুল্য বিভাগ, ঘৃণার ভিতর দিয়া প্রেমের বিকাশ ও অনুভূতি, আধুনিক জীবন ধারার বিনাশ ঘঘাষণা করিতেছে। যে • রাশিয়ায় অপরিহার্য দুঃখই মুক্তির সাধারণ সাধারণ পথ বলিয়া ঘােষিত হয়, সেখানে আমি এমন একজন লােক দেখি নাই বা জানিনা, যে লেনিনের ন্যায় সমস্ত অশান্তি, যন্ত্রণা ও দুঃখ গভীরভাবে, তীব্রভাবে ঘৃণা করিয়াছে, তাচ্ছিল্য করিয়াছে। তাহার এই মনােভাব, জীবন নাট্যের বিয়োগান্ত দৃশ্যের প্রতি তাহার এই তীব্র ঘৃণা, তাহাকে আমার চোখে আরও উন্নত করিয়া ধরিয়াছিল। কারণ লেনিন ছিল সেই দেশের লােক, যেখানকার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যসম্ভার দুঃখের গুণগরিমায় পরিপূর্ণ ও শশাকের অর্ঘ্য উপচারে সুসমৃদ্ধ। সে ছিল সেই দেশের লােক, যে দেশের যুবকের জীবন আরম্ভ হয়, সেই পুস্তকের প্রভাবে, যাহার সারাংশ হইতেছে, সামান্য অপরিবর্তনীয় জীবন- নাট্যের বৈচিত্র্যহীন বণনা। সমগ্র ইওরােপে রাশিয়ার সাহিত্যই সব চেয়ে নৈরাশাবাদী। আমাদের সব বইই লেখা একই বিষয় লইয়া, সবারই সুর এক। সব পুস্তকেই সেই এক কথা- কিরূপে যৌবনে কষ্টভােগ করি, নিৰ্ব দ্ধিতাবশতঃ মধ্যবয়সে যন্ত্রণা ভােগ করি, কিরূপে স্বৈরশাসকের উৎপীড়নে, স্ত্রীলােক- ঘটিত ব্যাপারে, প্রতিবেশী-প্রিয়তাবশতঃ, বিশ্বের অস্বাভাবিক গঠনকাৰ্য্যহেতু কষ্ট পাই, কিরূপে জীবনে কত ভুলের জন্য = ৪১ লেনিনের সহিত... বার্ধক্যে কষ্ট অনুভব করি, কিরূপে দন্তের অভাবে, বদহজমের দরুণ ও অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর ভয়ে অশেষ যন্ত্রণা পাই। বাসীদের মধ্যে যদি কেহ কোন রাজনৈতিক অপরাধে একমাস কারাগারে বাস করে ও এক বৎসর নির্বাসন দণ্ড ভােগ করে, তাহা হইলে তাহাদের মধ্যে প্রত্যেকেই তাহার দুঃখ যন্ত্রণার স্মৃতি পুস্তকাকারে প্রকাশ করা পবিত্র কর্তব্য বলিয়া বিবেচনা করে। কিন্তু সুখপূর্ণ জীবনের কাহিনী স্মারকলিপির আকারে প্রকাশ করিবার কথা কেহই চিন্তা করে না। রুষবাসীরা ভবিষ্যৎ জীবনপ্রণালীর চিন্তায় অভ্যস্ত ও চিন্তিত প্রণালীতে জীবন অতিবাহিত করিতে অসমর্থ। এক্ষেত্রে হয়তো এই রকম একখানা বই তাহাদিগকে শিখাইতে পারে কিভাবে সুখপূর্ণ জীবনের কনা করিতে পারা যায়। আমার মতে লেনিন এক অতুলনীয় বিরাট পুরুষ। মনুষ্য- সমাজের জ্বালা যন্ত্রণার বিরুদ্ধে তাহার বৈরাভাব ছিল অদম্য, আমােথ। তাহার জ্বলন্ত বিশ্বাস ছিল যে, দুঃখ জীবনের শ্রেষ্ঠ ও অপরিত্যজ্য অংশবিশেষ নয়, দুঃখ মানব জীবনের ঘৃণার বিষয় এবং প্রত্যেক মানুষের কর্তব্য হইতেছে, তাহাকে দূর করিয়া দেওয়া, আর প্রত্যেক মানুষ সেই ঘৃণ্য দুঃখকে দূরে ঠেলিয়া দিতে সম্পূর্ণ সমর্থ। লেনিনের এই সমস্ত ভাবধারা বিশেষ করিয়া আমার মনে এই বিশ্বাস উৎপাদন করিয়াছিল যে, সে এক অতুলনীয় বিরাটু পুরুষ।

৪২
লেনিনের সহিত...
লেনিনের সহিত মতভেদ (১৯১৭ খৃঃ)
।
১৯১৭-১৮ খৃষ্টাব্দে লেনিনের সহিত আমার এমন
সম্পর্ক দাড়াইয়াছিল যেমনটা আমি ইচ্ছা করি নাই। কিন্তু
তাহা ছাড়া অন্য উপায় ছিল না। লেনিন ছিল একজন
রাজনীতিক। কৃষকের মৃতচাপে গুরুভারাক্রান্ত রাশিয়ার
ন্যায় এরূপ বৃহৎ তরণীর কর্ণধারের মধ্যে যে শান্ত, স্থির,
পূর্ণ, সুস্পষ্ট অন্তর্দৃষ্টি একান্ত প্রয়ােজনীয়, তাহার মধ্যে সেই
পূণ, সুস্পষ্ট অন্তদৃষ্টি ছিল। রাজনীতির প্রতি আমার এক
সহজাত বিতৃষ্ণা আছে, আর জনসাধারণের, বিশেষ করিয়া,
কৃষাণদের বিবেচনা শক্তিতে অল্পই বিশ্বাস আছে। সৃজনী কৰ্ম্ম
শক্তিতে যে শক্তি (Force) বিরাজ করে, সুনিয়ন্ত্রিত ভাবধারা
ব্যতীত বিবেচনা শক্তি (Reason) সেই শক্তির অন্তর্ভুক্ত হইতে
পারে না। যতদিন না সমস্ত স্বতন্ত্রব্যক্তির স্বার্থ, সাধারণ স্বাথে
পরিণত হইতেছে, ততদিন জনসাধারণের মনে কোন ভাব
থাকিতে পারে না।
হাজার হাজার বৎসর ধরিয়া জনসাধারণ সহজ সুন্দর
জীবন লাভের চেষ্টা করিয়া আসিতেছে, আর এই প্রাণপাত
চেষ্টা জনসাধারণের রক্ত মাংস হইতে হিংস্র রক্তপিপাসু লােভী
পশুর সৃষ্টি করিতেছে। এই পশু, জনসাধারণকে দাসত্বশৃঙ্খলে
আবদ্ধ করিয়া, ইহারই রক্তে জীবন ধারণ করিতেছে ।
« চলিব, য
ধরণ ইহা উপ +

৪৩ লেনিনের সহিত... করে যে, কেবলমাত্র একটি শক্তি আছে, যাহা তাহাদিগকে এই সমস্ত পশুর দাসত্ব শৃঙ্খল হইতে মুক্তিদান করিতে পারে, যতদিন তাহারা লেনিন প্রচারিত সতর মন্ত্রশক্তি উপলব্ধি না করে। ১৯১৭ খৃষ্টাব্দে রাশিয়ায় পদার্পণ করিবার পর, লেনিন যখন তাহার প্রবন্ধ প্রকাশ করিল, আমি গৰিলাম যে, সে এই প্রবন্ধরাজির সাহায্যে অল্পসংখ্যক, কিন্তু রাজনীতি বিদ্যায় সুশিক্ষিত, সাহসী কর্মী ও সমগ্র রাশিয়ার শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে খাটি বিদ্রোহভাবাপন্ন বীর পুরুষের দলকে রাশিয়ার চাষার কবলে উৎসর্গ করিতেছে। ভাবিলাম রাশিয়ার একমাত্র সক্রিয় কর্মশক্তি গ্রাম্যজীবনের দুর্গম জলাভূমিতে এক মুষ্টি লবণের ন্যায় নিক্ষিপ্ত হইবে- নিক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হইলে, কোন চিঃ রাখিয়া যাইতে পারিবে না। কশবাসীর মনে, জীবনে বা ইতিহাসে কোন পরিবর্তন সংঘটন না করিয়া ডুবিয়া যাইবে, দুর্গন্ধ জলাভূমি তাহাদের শুষিয়। নইবে। আমার মতে, সাধারণভাবে পেশাদার বুদ্ধিজীবী, বৈনিক ও যন্ত্ৰকলাবিদ স্বভাবজাত বিদ্রোহী। আর এই ধনসাম্যবাদী বুদ্ধিজীবী ও কম্মিদল রাশিয়ার সঞ্চিত অন্য শক্তি। :৯১৭ খ্রষ্টাব্দে শক্তি-গ্রহণে সমর্থ, গ্রামসারন্যে উপযোগী স্যার কোন শক্তি দেখি নাই। কিন্তু এই শক্তি পরিমাণে অকিঞ্চিৎকর, ভাববৈপরীতে বৈধ হওয়া সত্ত্বেও, কেবলমাত্র আন্তরিক পূর্ণ ঐক্যবশতঃ নিজভূমিকা সকলের সহিত অভিনয় করিতে পারিত।

ওঃ
লেনিনের সহিত
তাহাদের সম্মুখে ছিল বিরাট কৰ্তব্য—বিশৃঙ্খল গ্রামের মধ্যে
শৃঙ্খলা স্থাপন করা, অসভ্য কৃষকের মনকে নিয়মাধীন করা,
তাহাদিগকে চিন্তা করিয়া কাজ করিতে শিক্ষা দেওয়া, গার্হস্থ্য
ব্যবস্থার সংস্কার করা ও এইভাবে দেশের উন্নতি স্থাপন
করা। আর এই সমস্ত বিষয়ে সাফললাভ করিতে পারা যাইবে
একমাত্র পল্লীর সহজাত বুদ্ধিকে সহরের বিচার বুদ্ধির অধীন
করিতে পারিলে।
আমার বিবেচনায়, বিদ্রোহের প্রথম স্তরের কাজ হইতেছে,
সেই অবস্থার সৃষ্টি করা, যে অবস্থা হইতে দেশের সংস্কৃতি-শক্তির
উৎকর্ষ সাধিত হইবে। এই উদ্দেশ্যে ক্যাপিতে কর্মীদের
জন্য এক বিদ্যালয় পরিচালনা করার কাজে নিজেকে উৎসর্গ
করিলাম। প্রতিক্রিয়ার বৎসরে, ১৯০ - হইতে ১৯১৩ খৃঃ পর্যন্ত,
সম্ভবমত নানা উপায়ে নিরুৎসাহ শ্ৰমিকদিগকে উৎসাহিত
করিতে সাধামত চেষ্টা করিয়াছিলাম। এই উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য
ফেব্রুয়ারী রেভােলিউসনের অব্যবহিত পরে (sitive Science
এর উৎকর্ষ ও সম্প্রসারণের জন্য Free Association গঠিত
হইয়াছিল। প্রতিষ্ঠানের এক
লক্ষ্য হইতেছে, রাশিয়ায়
বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণাগার গঠন, ও অপর লক্ষ্য হইতেছে,
শ্রমিকদিগের মধ্যে বিজ্ঞান ও যন্ত্রকলাজ্ঞানের ক্রমাগত প্রসার।
উক্ত Association পরিচালনার কার্যে নিযুক্ত ছিল—বিখ্যাত
বৈজ্ঞানিকের দল, Academy of Science এর সভ্যগণ, ভি,
এ ষ্টেকভ, এল, এ, চুগেয়েভ (L, A. Tchugavev), অ্যাকাডে

৪৫ হইল । লেনিনের সহিত... মিয়ান ফাসম্যান, এস, পি. কোষ্টিচেভ, এ, এ, পেট্রোভস্কি ও আরাে অনেকে। বহুচেষ্টায় অথ, উপকরণাদি সংগৃহীত এস. পি, কোষ্টিচেভ, ইহার পূর্ব হইতেই প্রাণীতত্ত্ব সম্বন্ধীয় ও উদ্ভিদতত্ত্ব-সম্বন্ধীয় গবেষণাগারের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচনে ব্যস্ত ছিল। আমার মনােভাব সম্পূর্ণরূপে স্পষ্ট করিয়া বলিতে হইলে, আমি আরাে বলিব যে, আমার সমগ্রজীবনে, সহরের উপর পল্লীর মূখতার বিষাদজনক প্রভাব, কৃষকসাধারণের ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রতি অনুরাগ ও তাহাদের মধ্যে সামাজিক ভাবা- বেগের (Social emotions) প্রায় সম্পূর্ণ অভাব, প্রবল •াবে আমার সমস্ত উৎসাহ দমাইয়া দিয়াছিল। গ্রামের চতুলিকে বিশৃঙ্খলা। যুদ্ধারম্ভে গ্রামের অবস্থা আরাে সঙ্গীন ও জাল হইয়া উঠিয়াছে। এইরূপ দুরূহ পরিস্থিতিতে আমার মত বৈজ্ঞানিক ও যন্ত্র-কলাবিদ বুদ্ধিজীবীর সহিত ঘনিষ্ঠভাবে যােগ রাখিয়া, রাজনৈতিক জ্ঞানের আলােয় প্রদীপ্ত কর্মিগণের নয় , কই একমাত্র সম্ভবপর সমাধান। রুষবিপ্লবে বুদ্ধিজীবীগণের অংশগ্রহণমূলাের প্রশ্ন সম্বন্ধে আমার সহিত বলশেভিকদের । মতভেদ হইয়াছিল। আর যে সমস্ত বাশেভিক শত শত অশিক্ষিত কর্মীকে সমষ্টিগত সাহসে (Social herois) উৎ- সাহিত করিয়াছিল ও প্রকৃত মানসিক উৎকর্ষে শিক্ষিত করিয়াছিল, সই সমস্ত বলশেভিক যে-বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ভুক্ত, সেই সম্প্রদায় কর্তৃকই এই বিপ্লবের আয়ােজন কাৰ্য্য আরব্ধ হইয়াছিল।

লেনিনের সহিত... আমার মনে হইয়াছিল, রুশীয় বুদ্ধিজীবী বৈজ্ঞানিক ও পেশাদার বুদ্ধিজীবী, রাশিয়ার তাৱী বােঝা বহন করিবার একমাত্র ভাররাহী পশু---অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ভারবাহী পশু। বহু ঘাত-প্রতিঘাত, উৎসাহ, আবেগ ও অনুপ্রেরণার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া গেলেও, জনসাধারণের মানসিক শক্তি তখনও তাহাদের বাহিরের লােকের নেতৃত্বের প্রয়ােজন বােধ করিত। ১৯১৭ খৃষ্টাব্দে আমি এই রকমই মনে করিতাম—আমি ভ্রান্তধারণার বশীভূত ছিলাম। আমার স্মারকলিপির এই পাতাখানি ছিড়িয়া ফেলা উচিত। কিন্তু ভুডিমির ইলইচ প্রায়ই বলিত, “কলমে যাহা লেখা হয়েছে, কুঠারে তা কেটে ফেলতে পারা যায় না”, আর “ভুল করেই আমরা শিখি।” পাঠক আমার ভুলের কথা জানিয়া রাখুক। যাহারা তাড়াতাড়ি কোন সিদ্ধান্তে আসিতে অভ্যস্ত, আমার ভুলের অভিজ্ঞতা তাহাদের যদি সতর্ক করিয়া দেয়, তাহা হইলে আমার ভুলের কাহিনীর কিছু সাথকতা আছে। কতকগুলি বিশেষজ্ঞ কর্তৃক অত্যন্ত হীনভাবে ক্রমান্বয়ে একটার পর একটা করিয়া অনেকগুলি হত্যাকাণ্ড-অভিনয়ের পর, বৈজ্ঞানিক ও পেশাদার যন্ত্রকলাবিদের সম্বন্ধে মত পরিবর্তন করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় রহিল না। এইরূপ পরিবর্তনের জনা কিছু মূল্য দিতে হয় বিশেষতঃ বার্ধক্যে। প্রকৃত জননায়কের কর্তব্য অতিমানবের পক্ষেও দুষ্কর। কিয়ৎ- পরিমাণে অত্যাচারী নয়, এমন নেতা দুলভ। টমাস মন্তসার ৪৭ লেনিনের সহিত... '1'); 11 12 অপেক্ষা লেনিনের নেতৃত্বাধীনে বােধ হয় অধিক লােক নিহত হইয়াছিল। লেনিনের মধ্যে নেতার অত্যাচার- গুণ না থাকিলে, লেনিন যে বিদ্রোহের নেতা ছিল, সেই বিদ্রোহ দমন ও প্রতিরােধ কাৰ্য্য আরও সুবিস্তৃত ও প্রবলভাবে পরি- চালিত হইত। অধিকন্তু আমরা যেন ইহাও অবশ্য বিবেচনা করি যে, সভ্যতার প্রসারের সহিত মানুষের জীবনের মূল্য স্পষ্টত হাসপ্রাপ্ত হইয়া আসিতেছে। বর্তমান ইরােপজগতে নব নব নরহত্যার উপায় উদ্ভাবন ও নরহত্যার প্রতি আসক্তি হইতেই, ইহা পরিষ্কাররূপে প্রমাণিত হইবে। যে নীতিবাগীশের দল, আজ রুষবিপ্লবের নৃশংসতার তীব্র সমালােচনা করিতেছে, অথচ গত চারি বৎসর কালব্যাপী, গ্লানিকর ইওরােপীয় যুদ্ধে নিহত মানবের প্রতি কোনরূপ করুণা প্রকাশ করে নাই, শুধু তাহাই নহে, অধিকন্তু সকলরূপ সম্ভবপর উপায়ে এই নারকীয় যুদ্ধের যাহাতে ‘বিজয় সমাপ্তি হয়, তাহার জন্য ইন্ধন জোগাইয়াছিল, আমি সকলকে আহ্বান করিতেছি, তাহারা আসিয়া সরল অকপটচিত্তে বলুক যে, এই সমস্ত নীতি- বাগীশের ভণ্ডামীর কতখানি তাহার অনুমোদন করে তাহাদের ভণ্ডামীর কথা শুনিয়া কতদূর বিদ্রোহভাবাপয় হইয়া পড়ে। আজ সুসভ্য রাষ্ট্র সকল ধ্বংসপ্রাপ্ত, হতশক্তি ও লুপ্তপ্রায়। আর হীন পেতি বুর্জোয়া ( Philistinism ) ফিলিষ্টাইনবাদ (ফিলিষ্টাইনবাদ সব জাতির মধ্যেই আছে) তাহার স্থানে বিজয় কেতন উড়াইতেছে। ইহার ফাস হইতে করে ৫. ।

৪৮ লেনিনের সহিত কাহারাে নিষ্কৃতি নাই, কণ্ঠরােধ করিয়া সকলকে বধ করা হইতেছে। লেনিনের নিষ্ঠুরতা সম্বন্ধে অনেক কিছু বলা হইয়াছে ও অনেক কিছু লেখা হইয়াছে। মিথ্যা ও অপবাদের হস্ত হইতে রক্ষা করার ন্যায় হাস্যোদ্দীপক, নির্বোধের মত, কিছু করিবার আমার অভিপ্রায় নাই। আমি জানি, পেতি বুর্জোয়া-রাজ- নীতিক্ষেত্রে মিথ্যারটনা ও কুৎসাপ্রচার এক বৈধ প্রণালী,শত্রুকে আক্ৰমণ কৰিবার এক স্বাভাবিক উপায়। পৃথিবীতে এমন মহান্ ব্যক্তি দুলভ, যাহার গাত্রে একটুও কর্দম নিক্ষিপ্ত হয় নাই। একথা সবাই জানে। ইহা ছাড়া মানুষের প্রবৃত্তি হইতেছে কেবল মাত্র অসাধারণ বিরাট পুরুষকে সাধারণের পর্যায়ে পর্যবসিত কর, তাহাই নয়, তাহার প্রবৃত্তি হইতেছে, তাহাকে মানুষের নিজ হাতে গড়া দৈনিক জীবনরূপ ঘৃণ্য পাকে ফেলিয়া পায়ের তলায় গড়াগড়ি করান। নিম্নলিখিত অপ্রিয় ঘটনাটা আমার নিকট চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে। ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে পেট্রোগ্রাডে ‘গ্রাম্যদরিদ্রের এক কংগ্রেসের সম্মেলন হইয়াছিল। রাশিয়ার উত্তরে, গ্রাম হইতে কয়েক হাজার কৃষক আসিয়াছিল। তাহার মধ্যে কয়েক শত রােমানভ, রাজবংশের শীত প্রাসাদে আশ্রয় পাইয়াছিল। কংগ্রেসের কাৰ্য্য হইলে সবাই নিজ নিজ স্থানে চলিয়া যাইবার পর, প্রকাশ পাইল, কেবলমাত্র উক্ত স্নানাগার নয়, সমূহই শেষ প্রাসাদের বহুসংখ্যক লেনিনের সহিত মহামূল্যবান্ সাক্সন ও প্রাচ্যদেশীয় বিচিত্র পাত্র মলমূত্র ত্যাগের জন্য ব্যবহৃত হইয়াছিল। এ রকম করিবার কোন প্রয়ােজন ছিল না, কারণ উক্ত প্রাসাদে মলমূত্র ত্যাগের স্থান ভাল অবস্থাতেই ছিল ও জল সরবরাহের সুব্যবস্থা ছিল। , কখনই তাহারা প্রয়ােজনের বশে এরূপ করে নাই। এই অসভ্যতা সুন্দরকে কলঙ্কিত ও বিকৃত করিবার অভিপ্রায়ের পরিচায়ক। সুন্দরকে চূর্ণবিচূর্ণ, বিকৃত, হাস্যাস্পদ ও হেয় প্রতিপন্ন করিবার যে কি হিংস্র প্রবৃত্তি মানুষের মনের মধ্যে উকি ঝুঁকি মারে তাহার শত শত প্রমাণ আমি পাইয়াছিলাম দুইটা বিপ্লবে ও একটা যুদ্ধে। কেহ যেন মনে না করে, কৃষক- দিগের প্রতি সন্দিগ্ধভাব থাকার দরুণ, আমি গ্রাম্য দরিদ্র ব্যক্তিগণের এই আচরণের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করিতেছি। বস্তুতঃ তা নয়। অতুলনীয় সুন্দর, পদার্থকে বিকৃত করিবার ঈর্ষাপরায়ণ আকাক্ষা ও এক অতুলনীয় বিরাট পুরুষের চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করিবার কুৎসিত ইচ্ছা মুখ্যতঃ একই। যাহা কিছু অসাধারণ, মানুষ যে ভাবে জীবন যাপন করিতে চায়, তাহা হইতে মানুষকে নিবৃত্ত করে। মানুষের যদি কোন আকাড়া থাকে, তাহাদের সামাজিক অভ্যাসের রকম মৌলিক পরিবর্তন নয়, তাহা হইতেছে অতিরিক্ত অভ্যাস অঞ্জন। অধিকাংশের বিলাপ ও অভিযােগের সারাংশ হইতেছে “আমাদের অভ্যস্ত জীবনপ্রণালীতে হস্তক্ষেপ করাে না।” মধ্যে ৪

লেনিনের সহিত
সবার চেয়ে লেনিনই জানিত কি ভাবে তাহাদিগকে তাহাদের
অভ্যস্ত প্রণালীতে জীবন অতিবাহিত করা হইতে নিবৃত্ত করিতে
হয়। তাহার প্রতি বুর্জোয়া জগতের ঘৃণা নগ্ন ও উন্মুক্ত
ভাবে চাহিয়া রহিয়াছে। যদিচ বিরক্তিকর, তথাপি এই ঘৃণা
আমাদিগকে জানাইতেছে প্রােলেটারিয়েটের উৎসাহদাতা ও নেতা
ভূডিমির লেনিন বিশ্বের বুর্জোয়াদের চক্ষে কিরূপ বিরাট ও
ভয়াবহ।
হ
কন্তু তাহা বা সব
দে অ
..
চালাহ
“সত্যের পূর্ণগঠিত-মূর্তি
তাহার মধ্যে বাঁচিবার সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত ইচ্ছা ও জীবনের ঘৃণ্য
পদার্থের প্রতি সকারী ঘৃণা আমাকে তাহার দিকে আকৃষ্ট
করিয়াছিল। সে যাহা কিছু করিত, সবের মধ্যে এক যৌবনাে-
চিত উৎসাহের সঞ্চার করিত। আর তাহার এই যৌবনােচিত

লেনিনের সহিত
উৎসাহ আমি ভালবাসিতাম। তাহার গতিবিধি ছিল
ধীর ও ক্ষীপ্র । তাহার দুর্লভ অথচ দৃঢ়তাব্যঞ্জক অঙ্গভঙ্গীর
সহিত তাহার বক্তৃতার সম্পূর্ণ মিল ছিল—আর তাহার
বক্তৃতায় কথা ছিল অল্প, কিন্তু ভাবপূর্ণ। তাহার ঈষৎ মঙ্গো-
ীয় মুখমণ্ডলে জীবনের মিথ্যা ও দুঃখের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত
অক্লান্ত • যােদ্ধার তীক্ষ্ণ চক্ষু জ্বল জ্বল করিত, দীপ্ত হইত
কখনাে জ্বল জ্বল করিত, প্রজ্জ্বলিত হইত, কখনাে শ্লেষব্যঞ্জক
হাসি হাসিত, আবার কখনাে ক্রোধে ধক ধক্ করিত। তাহার
চোখের প্রভা তাহার কথাকে আরাে উজ্জ্বল, আরাে দীপ্ত করিয়া
ধরিত। কখনাে কখনাে মনে হইত যেন, তাহার আত্মার
অদম্য শক্তি অগ্নিকণারূপে চোখের মধ্য দিয়া উড়িয়া আসি-
য়াছে, আর ইহার সহিত তাহার কথা শূন্যে প্রভা বিকীর্ণ করিতে
করিতে দোল খাইতেছে। তাহার কথায় লােকের মনে এই
ধারণা জন্মাইত যেন তাহার কথাগুলি এক দুর্নিবার সত্যের
দৈহিক বেগের অভিব্যক্তি।
দীর্ঘ এক টেবিল, টেবিলের একপ্রান্তে বসিয়া অভিজ্ঞ
ও নিপুণভাবে লেনিন কমরেডগণকে তাহাদের কাৰ্যে চালনা
চরিতেছে, কর্ণধারের ন্যায় তাহার সূক্ষ্ম সতর্ক চোখ দুইটা
হাসিতেছে, আনন্দে জ্বল জ্বল করিতেছে ; বা সত্যপিপাসু
উদ্গ্রীব জনতার সম্মুখে, এক
দাড়াইয়া
fথাটী পশ্চাদভাগে নিক্ষেপ করিয়া স্তব্ধ জনতার মধ্যে লেনিন
সুস্পষ্ট বাক্য বর্ষণ করিতেছে—এই সব ছবির সহিত আমা-
মঞ্চের উপর

লেনিনের সহিত••
দের এরূপ ঘনিষ্ট পরিচয় ছিল যে, গকি নামক গ্রামের পার্কে
লেনিনকে দেখিলে এক অস্বাভাবিক ও অদ্ভুত বিষয় বলিয়া
বােধ হইত।
তাহার কথাগুলি ইস্পাতের ক্ষুরের শীতল ঔজ্জ্বল্যের
ছবি আমার মনে জাগাইয়া দেয়। তাহার এই অদ্ভুত
সরলতাপূর্ণ কথা হইতে সত্যের পূর্ণগঠিত মূত্তির আবির্ভাব হইত।
লেনিন স্বভাবতঃ দুঃসাহসিক, কিন্তু তাহার দুঃসাহিসকতা
অর্থপিপাসু জুয়াড়ীর মত নহে।
লেনিনচরিত্রে সেই রকম
অসাধারণ নৈতিক সাহস প্রকাশ পাইত, যে রকমটী দেখিতে
পাওয়া যায়, সেই শ্রেণীর লােকের মধ্যে, আপনার বৃত্তির
উপর যাহার অকম্পিত বিশ্বাস, বহির্জগতের সহিত সম্বন্ধ
বিষয়ে যাহার দৃষ্টি গভীর ও পরিপূর্ণ, বিশ্বের শৃঙ্খলাহীন
রজগতের নাট্যাভিনয়ে অংশ গ্রহণে যাহার পূর্ণ অনুভূতি
আর সেই বিশৃঙ্খলার মধ্যে শত্রুর ভূমিকা গ্রহণে যাহার
ইচ্ছা আন্তরিক।
সে সমুৎসাহে দাবা খেলিত, পােষাকের ইতিহাস পড়িত,
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরিয়া কমরেডগণের সহিত তর্ক বিতর্ক করিত,
মাছ ধরিত, দক্ষিণ সূর্যের প্রখর উত্তাপে পুড়িতে পুড়িতে
ক্যাপ্রির পাথরাধানাে রাস্তার উপর দিয়া ভ্রমণে বাহির হইত,
কণ্টকারী গুলের সােণার বরণের দিকে, জেলেদের কালো
কালাে মােটা মােটা ছেলেমেয়েদের পানে তাকাইয়া নয়ন তৃপ্ত
করিত। সন্ধ্যাকালে রাশিয়া ও পল্লীর গল্প শুনিত। গল্পশে

লেনিনের সহিত ঈর্ষান্বিতভাবে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া সে বলিত “রাশিয়ার কি-ই বা জানি-সিমবারস্ক, ক্যাজান, পিটার্সবুর্গ, সাইবেরিয়ায় নিৰ্বাসন—এই পর্যন্ত।” সে কৌতুক ভালবাসিত। যখন হাসিত প্রাণ খুলিয়া সারা দেহ ও অন্তর দিয়া হাসিত। হাসিতে হাসিতে অভিভূত হইয়া পড়িত, অনেক সময় হাসিতে হাসিতে যতক্ষণ পর্যন্ত কঁদিয়া ফেলিত হাসিতে থাকিত। তাহার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ হু হু শব্দোচ্চারণটী অসংখ্য রূপে রূপায়িত হইত-তীক্ষ্ণ শ্লেষ হইতে আরম্ভ করিয়া অস্বীকারােক্তি সংশয় পর্যন্ত। জীবনের অজ্ঞতার মধ্য দিয়া যাহার দৃষ্টি যায় সুস্পষ্ট, সেইরূপ তীক্ষ দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের মধ্যে যে তীক্ষ্ণ কৌতুকপ্রিয়তা পরিলক্ষিত হয়, লেনিনের হু হু শব্দের মধ্যে সেই কৌতুকের সুর শােনা যাইত। লেনিন ছিল সুদৃঢ় ও বলিষ্ঠ। মাথাটা সক্রেটিসের মত, আর চোখ দুইটা ছিল তীক্ষ্ণ। সে প্রায় একটা অস্বাভাবিক, বরং হাস্যোদ্দীপক অঙ্গভঙ্গী করিত—মাথাটীকে পশ্চাদ্দিকে কোনরূপে কঁাধের উপর হেলাইয়া দিত, বাহুমূলের নীচে ওয়েষ্টকোটের হাতার ছিদ্রে আঙ্গুল ঢুকাইয়া দিত। এই ভঙ্গিমার মধ্যে একটা বেশ সুমিষ্ট মজার ভাব ছিল, যার কতকটা দেখিতে পাওয়া যায় লড়ায়ে বিজয়ী মােরগের মধ্যে। এই সময়ে এই অভিশপ্ত জগ- তের এই বয়ােপ্রাপ্ত শিশুটা, মনুষ্য সমাজের এই বিরাট, পুরুষটা, যাহাকে ভালবাসার উপলব্ধির জন্য শত্রুতা ও ঘৃণার

৫
লেনিমের সহিত...
বেদীতে আত্মবলি দিতে হইয়াছিল, আনন্দে উচ্ছসিত
হইয়া উঠিত।
বুদ্ধিজীবী ও বিশেষজ্ঞ সম্বন্ধে
[ ১৯১৮ খৃষ্টাব্দে লেনিন এক কারখানার শ্রমিক সভায়
বক্তৃতা দিয়া ফিরিতেছিল, এমন সময় ডােরা কাপলান নামক
সােসিয়ালিষ্ট বিপ্লবী লেনিনের জীবন গ্রহণ করিবার
জন্য লেনিনকে লক্ষ্য করিয়া গুলি ছুড়িল। ভাগ্যক্রমে
আততায়ীর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।]
১৯১৮ খৃষ্টাব্দে লেনিনের জীবন লক্ষ্য করিয়া আততায়ীর
এই শেষ হীন আক্রমণের পূৰ্ব্বে রাশিয়ায় আমার সহিত
লেনিনের সাক্ষাৎ হয় নাই, বা দূর থেকে আমি তাহাকে
দেখি নাই। বন্দুকের গুলি গ্রীবা ভেদ করিয়া ছুটিয়াছিল।
যখন আমি তাহার পাশে আসিয়া দাড়াইলাম, তখনও সে
তাহার হস্ত সঞ্চালন করিতে পারিত না, গ্রীবা নাড়িতে
পারিত না। আমি এই হীন আক্রমনের উল্লেখ করিয়া
রাগ প্রকাশ করিলে, ক্লান্তিকর বিষয়ের হাত হইতে উদ্ধার
লাভ করার স্যায়, সে উত্তর করিল, “কেবল মারামারি
ঝগড়াঝগড়ি। কিছু করা যাবে । যে যেমন বােঝে
তেমনি চলে।”
ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মত আমরা মিলিত হইলাম। কিন্তু একথা
ঠিক, প্রিয় ইলইচের তী অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে অনুকম্পা স্পষ্ট

লেনিনের সহিত...
ভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছিল। আর তাহার কারণ তাহার অতি
প্রিয় আমি, সেই আমিও, ভুল পথে চলিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম।
কয়েক মুহূর্তপরে উত্তেজিতভাবে সে বলিল, “যে আমাদের
দলছাড়া সে আমাদের বিরুদ্ধে। কালের যাত্রা সম্বন্ধে উদাসীন
মানুষও একটা খামখেয়ালী। ধরে নিলুম এ রকম লােক এক
সম্মু ছিল, কিন্তু এখন তা নেই, থাকতে পারে না। তারা
কারাে উপকারে আসে না। বাস্তব • আজ আরাে জটিল,
আরাে সমস্যায়। এই বাস্তবের ঘূর্ণীতে, সবাই—প্রথম থেকে
শেষ পর্যন্ত ঘুরপাক খাচ্ছে। তুমি বল না আমি অতিরিক্ত
মাত্রায় জীবনটাকে সরল করে তুলছি, আর এই সরলী-
করণ সংস্কৃতিকে ধ্বংসের ভয় দেখাচ্ছে?”
তারপর সেই শ্লেষব্যঞ্জক বিশেষত্বপূর্ণ “হু, হু।”
তাহার তীক্ষ্ণদৃষ্টি ঝলসিয়া উঠিল সে নিম্নস্বরে বলিতে
লাগিল, “আচ্ছা, রাইফেল হাতে লক্ষ লক্ষ চাষা তােমার
মতে কি সংস্কৃতির বিভীষিকা নয়? কি বল? তুমি মনে
করাে Constituent Assembly এই বিশৃঙ্খলতার সহিত যুদ্ধ
করতে পারতাে? দেশের বিশৃঙ্খলতা দেখে গােলমাল করছ যে
তােমরা, সেই তােমরাই সবার চেয়ে
ভাল করে বুঝতে
পারবে আমাদের সমস্যা কি? রাশিয়ার জনসাধারণ বুঝতে
পারে, এমন কিছু তাদের সামনে আমাদের ধরতে হবে।
সােভিয়েট ও কমুনিজম সােজা জিনিষ।”
“কি বললে? শ্রমিক ও বুদ্ধিজীবীর মিলন ? বেশ, সে মন্দ

লেনিনের সহিত
নয়। বুদ্ধিজীবীদের বলছে, তারা আমাদের দলে আসুক। তােমার
মতে তারা ন্যায়ের প্রকৃত দাস। তাহলে আর কি ? ভালই তাে,
আমাদের দলে তারা আসুক। দেশের লােককে নিজের
পায়ে দাঁড় করানাে, সমস্ত জগতকে জীবন সম্বন্ধে সত্য
কথা বলার বিরাট, কাযের ভার যারা গ্রহণ করেছে, সে তাে
আমরাই—আমরাই দেশের লােককে মনুষ্য জীবনের সােজা
পথ নির্দেশ করে দিচ্ছি,—দাসত্ব, ভিক্ষাবৃত্তি, হীনতার মধ্য
দিয়ে, দাসত্ব হীনতাকে পশ্চাতে রেখে, যে পথ সামনে চলে
গেছে, সেই পথ দেখিয়ে দিচ্ছি।”
সে উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া উঠিল। পরে বলিল, “এই জন্যই তো
বুদ্ধিজীবীর হাতে বুলেট (গুলি) উপহার পেয়েছি।” তাহার
কথার মধ্যে বিরক্তির কোন চিহ্ন ছিল না।
আমাদের কথােপকথনের উত্তাপ যখন কমবেশ স্বাভাবিক
অবস্থায় নামিল, বিরক্তি ও দুঃখের সহিত সে বলিল, “তুমি
কি মনে কর, বুদ্ধিজীবীদের আমাদের দরকার, এই নিয়ে
আমি ঝগড়া করি। কিন্তু তুমি তাে দেখতে পাচ্ছ, কি রকম
প্রতিকূল তাদের ভাব, কালের প্রয়ােজন সম্বন্ধে তার। কি রকম
ভুল বােঝে? আর তারা বুঝে দেখে না, আমরা না থাকলে
তারা কি রকম শক্তিহীন, জনসাধারণের নিকট পৌছিতে
কি রকম অক্ষম। আমরা যদি অনেকগুলি মাথা ভাঙ্গি তার
জন্য দোষী তারা।”
যখন আমরা মিলিত হইতাম, তখন প্রায় সব সময়ই

লেনিনের সহিত আমরা এই বিষয়ে আলােচনা করিতাম । যদি সে যাহা বলিত, তাহা বুদ্ধিজীবীর প্রতি তাহার মনােভাব, অবিশ্বাস ও প্রতিকূলতার পরিচয় দিত, প্রকৃতপক্ষে বিপ্লবী প্রক্রিয়ায় বুদ্ধিজীবীর কর্মশক্তির প্রয়ােজনীয়তা সম্বন্ধে সে সব সময় যথার্থ মূলা নিরূপণ করিত। আর বােধ হয়, সে এ বিষয়ে একমত যে, মূলতঃ বিপ্লব হইতেছে সেই শক্তির অকস্মাৎ বিস্ফোরণ, যে শক্তি স্বাভাবিক, সহজ, সরল অবস্থায় বিকাশ প্রাপ্ত হইতে পারে না, অধিকন্তু স্বাভাবিক অবস্থাকে অতিক্রম করিয়া যায়। একদিনের কথা স্মরণ হইতেছে। আমি ছিলাম আর লেনিন ও Academy of Science এর তিনজন সভা উপ- স্থিত ছিল। কথাবার্তা হইতেছিল পেট্রোগ্রডে অন্যতম সর্বোচ বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠাগার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজন সম্বন্ধে। তাহারা বিদায় লইলে লেনিন সন্তোষের সহিত বলিল, “এখন ভালই হ’ল। এরা চতুর লােক। সবই সোজা, সবই কঠোর নিয়মাবদ্ধ। এখুনি দেখলে তো, এসব লােক ঠিক কি চায় তা জানে। এদের সঙ্গে কাজ করাটাই এক আনন্দের বিষয়। বিশেষ করে, “আমি এস (S) কে পচ্ছন্দ করি”-এই বলিয়া সে রাশিয়ার বিজ্ঞান জগতের এক শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিকের নাম করিল। একদিন পরেই সে টেলিফোনে আমায় বলিল, “এস” কে (S) জিজ্ঞাসা কর, আমাদের দলে আসবে কি না ও আমাদের সঙ্গে এক এদের নিকট

৫৮
লেনিনের সহিত••
যােগে কাজ করবে কি না। এ যখন তাহার প্রস্তাবে
সম্মত হইল, সে আন্তরিক আনন্দানুভব করিয়াছিল। আনন্দে
হাতের মধ্যে হাত দিয়া ঘর্ষণ করিতে করিতে কৌতুকের
সহিত বলিল, “একে একে রাশিয়া ও ইউরােপের সমস্ত
আরকিমিডিসকে (অর্থাৎ বৈজ্ঞানিককে) আমাদের দলে টেনে
আনবাে। তারপর, তারপর প্রয়ােজন থাক, আর নাই, থাক,
জগতকে পরিবর্তিত হতে হবেই।”
পার্টির অষ্টম কংগ্রেস সম্মেলনে (১৯১৯ খৃষ্টাব্দে) এন,
আই, বুখারিণ অপরাপর বিষয়ের মধ্যে বলিয়াছিল । “বুর্জোয়া
ও প্রােজেটেরিয়াট এই দুই লইয়া রাষ্ট্ৰজাতি Nation)।
কতকগুলি ঘৃণ্য বুর্জোয়ার আত্ম-অভিনিবেশের অধিকার স্বীকার
করা সম্পূর্ণরূপে নিষ্প্রয়ােজন।”
প্রতিবাদ করিয়া লেনিন বলিয়াছিল, “ক্ষমা করাে, তা নয়।
নিশ্চয় ইহা অবান্তর ও নিরর্থক নয়। বুর্জোয়ার পক্ষ হইতে
তুমি প্রােলেটেরিয়েটের বৈষম্য প্রক্রিয়ার নিকট আবেদন
করছ। কিন্তু অপেক্ষা কর, দেখ ফল কি রকম দাড়ায়।
তারপর জাৰ্মাণীর উদাহরণ, বৈষম্য প্রক্রিয়া যে মন্দ গতিতে ও
দুরূহভাবে বিকশিত হয়, তাহা দেখাইয়া, বলপ্রয়ােগে যে তাহারা
কখনো কমুনিজমের বৃক্ষ রােপন করিতে কৃতকার্য হইবে
, এই ঘােষণা করিয়া, শিল্প বাণিজ্য ক্ষেত্রে, সেনা বিভাগে,
সমবায় আন্দোলনে, বুদ্ধিজীবীর প্রয়ােজনীয়তা সম্বন্ধে বিশদভাবে
আলােচনা করিতে লাগিল। সােভিয়েট গভর্ণমেন্টের সরকারী

লেনিনের সহিত মুখপত্র lzvestia হইতে, কংগ্রেসের আলােচ্য বিষয়ের এক অংশ উদ্ধত করিতেছি। “আগামী অধিবেশনে স্পষ্টরূপে এই প্রশ্নের চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত করিতে হইবে। বুর্জোয়া বিজ্ঞান ও টেকনিকের সাহায্যে যখন ইহা জনসাধারণের নিকট আরাে সুগম্য হইবে, তখনই কেবল আমরা কমুনিজ গড়িয়া তুলিতে পারি। এইজন্য প্রয়ােজন হইতেছে, বুর্জোয়াদের হাত হইতে যন্ত্র উপকরণাদি ছিনাইয়া লওয়া ও এই সম্পর্কে কাজ করাতে বিশে- যজ্ঞদিগকে আকৃষ্ট করা। বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞ ব্যতীত দেশের ফলােৎপাদন বাড়ান অসম্ভব। শ্রমিকনিয়ােগী ও কমুনিষ্ট কর্তৃক তাহাদের চারিদিকে এক বন্ধুসুলভ সহযােগিতার আবহাওয়া সৃষ্টি করিতে হইবে। এমন অবস্থার সৃষ্টি করিতে হইবে, যেন তাহারা ছাড়িয়া যাইতে না পারে। কিন্তু ধনিক তন্ত্রের শাসনাধীন অবস্থা অপেক্ষা আরাে সুন্দররূপে কাজ করিবার সুবিধা তাহাদিগকে দিতে হইবে। কারণ তাহা না হইলে বুর্জোয়ার নিকট হইতে শিক্ষা প্রাপ্ত এই স্তর কাজ করিবে না। কেবলমাত্র বলপ্রয়ােগের দ্বারা এই সমস্ত স্তরকে কাজ করানাে অসম্ভব। “বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞরা সংস্কৃতি-কাৰ্য্য করিতে অভ্যস্ত। বুর্জোয়া শাসনকালে এই কাজ তাহারা করিয়া আসিয়াছে, অর্থাৎ বিপুল প্রয়ােজনীয় কাজ ও গঠন কাৰ্যের দ্বারা তাহারা বুর্জোয়াকে অর্থশালী করিয়া তুলিয়াছে, আর এই অর্থের এক যৎসামান্য ৬০ লেনিনের সহিত••• অংশ প্রােলেটে রিয়াটকে দিয়াছে। এ সত্ত্বেও, তাহারা সংস্কৃতির কার্য্য আগাইয়া আনিয়াছে। এই তাহাদের পেশা। যতই তাহারা দেখিবে, কম্মিগণ যে কেবলমাত্র সংস্কৃতিকে মূল্যবান বলিয়া মনে করে তা নয়, উপরন্তু জনসাধারণের ভিতরে যাহাতে ইহার প্রসার হয়, তাহার সহায়তা করে, ততই আমাদের প্রতি তাহাদের মনােভাব তাহারা বদলাইবে। তারপর কেবলমাত্র রাজ- নীতির দিক হইতে বুর্জোয়া হইতে বিভক্ত হইবে যে, তা নয়, ব্যবহারের দ্বারা নৈতিকবলে তাহাদিগকে আমাদের দলে টানিয়া আনিতে হইবে। অমর। অবশ্য আমাদের যন্ত্র উপকরণাদির দ্বারা তাহাদিগকে আকৃষ্ট করিব এবং তাহার জন্য অবশ্য স্বার্থ বলি দিতে প্রস্তুত থাকিব। বিশেষজ্ঞের সহিত আচরণ সম্বন্ধে আমরা অবশ্য হীন বিরক্তিকর রীতির অনুসরণ করিব না। আমরা অবশ্য তাহাদিগকে যতদূর সম্ভব জীবনের শ্রেষ্ঠ অবস্থার উপায় করিয়া দিব। এই হইবে শ্রেষ্ঠ কর্মপদ্ধতি। গতকল্য যদি আমরা পেতি বুর্জোয়া দলগুলিকে আইনতঃ বৈধ করিবার কথা কহিয়া থাকি, আর আজ মেনশেভিকদিগকে ও লেফট সােসিয়ালিষ্ট বিপ্লবী দলভুক্ত সভ্যবৃন্দকে বন্দী করি, তাহা হইলে একটা সরলরেখা এই পরিবর্তনশীল পদ্ধতির বক্ষভেদ করিয়া চলিয়া যাইবে -আর এই পদ্ধতি হইতেছে বিরুদ্ধ-বিপ্লবের আমূল উৎপাটন ও বুর্জোয়াদর সংস্কৃতি সাধক যন্ত্রাদি প্রাপ্তি।” পেতি বুর্জোয়া “বিশ্বজনীনতার” হীন ভণ্ডামীর সমস্ত ক্রন্দনা- লেনিনের সহিত p নােল অপেক্ষা এক বৃহৎ নীতির এই সুন্দর অভিভাষনে অধিক বাবতা ও প্রাণ আছে। দুর্ভাগ্যক্রমে শ্রমিক শ্রেণীর সহযােগিতায় সাধুকার্যে প্রবৃত্ত হইবার আবেদনবাণী যাহাদের অনুধাবন করা ও সম্যক্ উপলব্ধি করা উচিত ছিল, তাহাদের অনেকে তাহা বুঝে নাই বা তাহার তারিফ করে নাই হীৰ বীভৎস হত্যাকাণ্ড ও বিশ্বাসঘাতকতার নীতি বাছিয়া লইয়াছে। দাসব্যবসায় উঠিয়া যাওয়ার পরও বহু অর্ধ গােলাম গৃহবাসী কৃষক, প্রকৃতিগত দাস, সেই আস্তাবলে তাহাদের প্রভুর ক্রীতদাস হইয়া রহিল, অথচ এইখানে তাহাদের প্রভু মহাশয়ের তাহাদের বেত্রাঘাত করিত। বিপ্লবী কৌশল বিপ্লবী জীবন ও বিপ্লবী কৌশলের নিষ্ঠুরতা সম্বন্ধে আমি প্রায় লেনিনের সহিত কথা কহিতাম। ক্রোধে ও বিস্ময়ে সে বলিত, “তুমি কি করতে বল? এ রকম অভূতপূর্ব নৃশংস জীবনমরণ সংঘষণে মনুষ্যোচিত কারুণ্য প্রদ- শন করা সম্ভব ? কোমলতা, বদান্যতা প্রকাশ করবার একটুও স্থান আছে কি? সমগ্র ইওরােপ আমাদের পথরােধ করে পঁড়িয়ে আছে, ইওরােপের প্রােলেটেরিয়াটের সাহায্য থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি, চারদিক থেকে ভাসুকের ন্যায় গুড়ি- মেরে বিরুদ্ধ-বিপ্লব আসছে। এ রকম অবস্থায় তুমি কি বলতে চাও? আমরা ঠিক করছি না? আমাদের সংঘর্ষণ করা,

দল নয়।
লেনিনের সহিত
প্রতিরােধ করা উচিত নয় ? মনে রেখে আমরা নির্বোধের
আমরা জানি, আমরা যা চাই, আমাদেরই নিজের
চেষ্টায় তা পেতে হবে। তুমি কি মনে কর, এ ছাড়া অন্য উপায়
আছে, এ বিশ্বাস আমার মনে কেউ উৎপাদন করতে পারলে,
আমি এখানে চুপ করে বসে থাকি ?”
উত্তেজিত আলােচনার পর, সে একবার জিজ্ঞাসা করিয়াছিল,
“যুদ্ধে কোন আঘাতটী প্রয়ােজনীয়, কোনটী অতিরিক্ত নিপ্রয়ােজন,
বিচার করবার তোমার মানদণ্ড কি ?” এই সকল প্রশ্নের কেবল
এক অস্পষ্ট কবিত্বপূর্ণ উত্তর দিতে পারিয়াছিলাম। আমার মনে
হয়, ইহা ব্যতীত অন্য উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব।
আমি প্রায় লেনিনকে নানারূপ অনুরােধে অভিভূত করিতাম
ও আমি প্রায় অনুভব করিতাম, বহুলােকের কাজে ব্যাগার খাটিয়া
মরিতাম বলিয়া, লেনিন আমার পানে করুণাদৃষ্টিতে তাকাইত।
সে বলিত, “তােমার কি মনে হয় না, কতকগুলাে বাজে কাজে
তুমি তােমার কর্মশক্তির অপচয় করছাে?”
কিন্তু যাহা করা উচিত বলিয়া মনে করিতাম, আমি করিয়া
যাইতাম। প্রােলেটেরিয়াটের শদিগকে যে জানিত, সে যখন
ক্রুদ্ধজিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমার পানে তাকাইত, আমি আমার অভীষ্ট
কর্তব্য সম্পাদনে বিরত হইতাম না। অভিভূতের ন্যায় সে মস্তক
সঞ্চালন করিত ও বলিত, “কমরেড ও শ্রমিকদের চক্ষে তুমি
নিজেকে ভুল বােঝচ্ছ।”
আমি বলিলাম, প্রায় অধিকাংশ সময় কমরেড ও শ্রমিকগণ

০ লেনিনের সহিত... কুদ্ধ ও বিরক্ত হইলে মূল্যবান্ ব্যক্তির জীবন ও স্বাধীনতা অকিঞ্চিৎ- কর বলিয়া মনে করে। আর আমার মতে, ইহা যে কেবল মাত্র এই পৰ্বত প্রমাণ, নিরর্থক নিষ্ঠুরতার দ্বারা বিপ্লবের সৎ ও কঠোর কাৰ্য্যকে বিপদগ্রস্ত করিতেছে তা নয়, পরন্তু এই নিষ্ঠর কার্য নির্মম ও কার্যপ্রণালী হিসাবে অন্যায়, কারণ ইহা বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিকে বিপ্লবে অংশ গ্রহণ হইতে নিবৃত্ত করিয়াছে। অবিশ্বাসের সহিত লেনিন ‘হুহু করিল। তারপর বুদ্ধিজীবীরা। শ্রমিক স্বার্থে বিশ্বাসঘাতকতা করিয়াছে, এই রকম অনেক উদা- হরণ আমায় দেখাইল । সে বলিল, “আমাদের মধ্যে অনেকে দলত্যাগ করে, শত্রুপক্ষে যােগদান করে, বিশ্বাসঘাতকতা করে-ভীরুতাবশতঃ নয়, আত্ম- শ্রদ্ধা বশতঃ। শত্রুপক্ষে যােগদান করে-কারণ তারা ভয় পায়, যদি কোন বিরক্তিকর বিপজ্জনক অবস্থায় পড়ে। তাদের ভয়, বাস্তবের সহিত সংঘর্ষণে তাদের প্রিয় মতবাদ বুঝি মান হয়ে যাবে। আমাদের সে রকম কোন ভয় নাই। আমাদের নিকট কোন মতবাদ প্রিয় ও পবিত্র নয়, আমাদের নিকট সবই কাৰ্যসাধক নিমিত্ত মাত্র। এমন কোন সময় আমার মনে পড়ে না যখন আমার কোন অনুরােধ লেনিন রাখে নাই। যদি আমার সমস্ত অনুরােধ সব সময় পূর্ণ না হইয়া থাকে, তাহা হইলে সে দোষ তাহার নয় ; দোষ সেই শাসন যন্ত্রের, যে কদাকার দানব রাশিয়ার শাসন যন্ত্রের মধ্যে বিরাজ করিত। আর যদি আমরা ধরিয়া লই, তাহা হইলে ৩ লেনিনের সহিত... দোষ হইতেছে মূল্যবান্ জীবনের দুঃখ লাঘব করিবার বা মৃত্যুর করাল গ্রাস হইতে রক্ষা করিবার এক হিংস্র অনিচ্ছা। স্বেচ্ছাকৃত অপকার শবিশেষ, বৈরাগ্যযুক্ত হইলেও ধূর্ততাপূর্ণ, ধূর্ততাপূর্ণ,-সম্ভবতঃ এরূপ বহুস্থানেই আছে। প্রতিহিংসা ও ঈৰ্য্যা প্রায়ই নিশ্চেষ্টতার বলে বলীয়ান্ হইয়া কাৰ্যকরী হয়, এবং বাস্তবিকই রুগ্ন- মনবিশিষ্ট বহু ক্ষুদ্র মানুষ আছে, যাহারা প্রতিবেশীদের দুঃখ কষ্টের চিন্তায় আনন্দ উপভােগ করে ও সেই আনন্দের জন্য রােগীর স্যায় তৃষ্ণার্ত হয়। একদিন সে হাসিতে হাসিতে আমাকে একখানি তার দেখা- ইল। “ওরা আবার আমায় বন্দী করেছে। ওদের বল আমায় ছেড়ে দিতে।” সাক্ষর—আইভান ভলনি। “আমি তার বই পড়েছি। আমার খুব ভাল লাগতাে তার বই। প্রথম পাঁচটা কথা পড়েই আমি বুঝেছিলুম-হা, এই একজন মানুষ যে বােঝে ভ্রান্তি অবশ্যম্ভাবী, যে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত পেলে ক্রুদ্ধ হয় না, রােষ প্রকাশ করে না। বােধ হয়, এই বার নিয়ে তিনবার হ’ল সে বন্দী হয়েছে। তুমি বরং তাকে বুঝিয়ে বল, সে গ্রাম ছেড়ে যাক, তা না হলে, তারা তাকে হত্যা করতে পারে। বােঝা যাচ্ছে, তারা তাকে খুব ভালবাসে না। তাকে ‘তারে এই সংবাদটী জানিও।” যাহাদিগকে সে শত্রু বলিয়া বিবেচনা করিত, তাহাদিগকে তাহার সাহায্য করিবার তৎপরতা দেখিয়া আমি প্রায় বিস্ময়া- ভিভূত হইতাম। আর এই তৎপরতা কেবলমাত্র বর্তমানে

লেনিনের সহিত...
সাহায্য করা নয়। তাহাদের ভবিষ্যৎ জীবন কল্পনা করিয়া
সে চিন্তিত হইত। উদাহরণ স্বরূপ—এক সেনাপতি বৈজ্ঞানিক
রাসায়নিককে মৃত্যুভয় দেখান হইয়াছিল। মনােযােগ সহকারে
আমার কাহিনী শ্রবণ করিয়া লেনিন হু হু’ শব্দ করিল।
তারপর বলিল, “তাহলে তুমি মনে কর, সে জানতাে না, তার
ছেলেরা রসায়নাগারে আগ্নেয়াস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে ? কতকট।
অস্বাভাবিক ঠেছে। এই রহস্য উদঘাটন করবার জন্য
আমরা অবশ্য জাজ্জিস্কির উপর ভার দিব। তার এক
সত্যানুসন্ধানী সহজাত শক্তি আছে।”
কয়েকদিন পরে প্রেট্রোগ্রডে সে অনায় টেলিফোন-যোগে
বলিল, “আমরা তােমার সেনাপতি মহাশয়কে ছেড়ে দিচ্ছি
আমার বােধ হয়, এর আগেই তাকে কারামুক্ত করা হয়েছে ।
এখন তােমার সেনাপতি মহাশয় কি করতে চায়?”
“হােমােইমালসান” (Homoemulsion)
“হ্যা, হঁ্যাকার্বলিক অ্যাসিড। আচ্ছা, সে তার কার্বলিক
ফোটাক। তার যদি কোন প্রয়ােজন থাকে, আমায় জানিও।”
লেনিন মানুষের প্রাণরক্ষা করিয়া আনন্দ প্রকাশ করিতে
ভালবাসিত না; সেইজন্য সেই আনন্দ গােপন করিবার জন্য, সে
শ্লেষবিজড়িতস্বরে কথা বলিয়াছিল। কয়েকদিন পরে পুনরায়
সে আমায় বলিয়াছিল, “ওহে, সেনাপতি মহাশয়ের চলছে
কেমন ? সব ঠিক-ঠাক ত?”
১৯১৯ খৃষ্টাব্দে পেট্রোগ্রাডের রন্ধনাগারে এক পরমাসুন্দরী

লেনিনের সহিহ.. রমনীর আবির্ভাব হইয়াছিল। সে আসিয়া কঠোরস্বরে বলিল, “আমি রাজকুমারী ‘টী”। আমার কুকুরের জন্য একটা হাড় দাও।” একটা গল্প প্রচলিত আছে যে, রাজকুমারী ‘টী' অবনতি ও ক্ষুধা সহ্য নিতে না পারিয়া নেভার জলে ডুবিয়া মরিবার সঙ্কল্প করিয়াছিল। কিন্তু কথিত আছে, তাহার চারিটী কুকুর আপনা হইতে রাজকুমারীর কষ্টদায়ক সঙ্কল্প বুঝিতে পারিয়া তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিত হইয়াছিল, চীৎকার ও মানসিক দুঃখ প্রকাশের দ্বারা তাহাকে আত্মহত্যার সঙ্কল্প হইতে বিরত করিয়াছিল। আমি এই গল্পটা লেনিনের নিকট বিবৃত করিলাম। বক্রদৃষ্টিতে আমার আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করিয়া, পরে চক্ষু দুইটি আবৃত করিয়া, বিষন্নস্বরে লেনিন বলিল, ‘গল্পটা বানানো হলেও ভাবটা মন্দ নয়। বিপ্লবের এক ব্যঙ্গচিত্র।” কিয়ৎক্ষণ সে চুপ করিয়া রহিল। তারপর সােজা হইয়া দাড়াইয়া, টেবিলের উপর কাগজপত্রাদি পর পর সাজাইয়া রাখিয়া. চিন্তিতভাবে বলিল, “হঁ্যা, এই সব লােক আজ মহা- বিপদাপন্ন। ইতিহাস নিষ্ঠুর বিমাতা। প্রতিশােধ নিতে আরম্ভ করলে, আর থামে না। এর আর কি বলবার আছে ? এই সমস্ত লোকের পক্ষেই খারাপ। তাদের মধ্যে যারা চতুর, বেশ বুঝতে পেরেছে, শিকড়শুদ্ধ তাদের টান পড়েছে। ছিন্ন হয়েছে, বাড়বার আর কোন উপায় নাই। পুনরায় ইওরােপে বীজ ছড়ালেও তারা সন্তুষ্ট হবে না। তােমার কি মনে হয় না, তারাও এর মূলচ্ছেদ করবে ? কি বল ?” । তাদের মূল লেনিনের সহিত.. ৬৭ "আমার মনে হয় না, তারা করবে। “তার অর্থ এই যে, হয় তারা আমাদের পথে চলবে, আর না হয় আমাদের পথে বিঘ্নস্বরূপ দাঁড়াবার চেষ্টা করবে।” আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, “এই সমস্ত লোকের প্রতি তুমি করুণাপরবশ, এ কি কেবল আমার ধারণা-না সত্য প্রত্যুত্তরে সে বলিল, “চতুর বুদ্ধিমান লােকদের জন্য আমি দুঃখিত। আমাদের মধ্যে বুদ্ধিমান লোকের সংখ্যা অধিক নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা মেধাবী, কিন্তু মনের দিক থেকে অলস।” যে সমস্ত কমরেড, শ্রেণীদর্শনবাদ অতিক্রম করিয়া বলশেভিক- দিগের সহিত একযোগে কাজ করিতেছিল, তাহাদের কথা শুণ করিয়া, সে তাহাদের সম্বন্ধে অত্যন্ত আশ্চৰ্যজনক আগ্রহর সহিত কথা বলিতে লাগিল। লেনিনের গুণাবলী অদ্ভুত ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন লেনিন উচ্চতম পরিমাণে বিপ্লবী বুদ্ধিজীবীর শ্রেষ্ঠ গুণাবলী ও শক্তির অধিকারী ছিল। আত্মসংযম প্রায়শঃ আত্মনিগ্রহ ও আত্মচ্ছেদের চরম আকব প্রাপ্ত হইয়া লিওনেদ, আঁান্দ্রিয়েভ বর্ণিত এক নায়কের, সুকে বিসর্জন দিয়া, যুক্তির আশ্রয় গ্রহণের ন্যায় পঁাড়াইত “আর আর সবাই কঠোর জীবন যাপন করছে, সুতরাং আমাকেও ই করতে হবে।” ১৯১৯ খৃষ্টাকে কঠোর দুর্ভিক্ষের বংসরে, প্রদেশ হইতে

লেনিনের সহিত..
কমরেড সৈনিক ও কৃষকগণ যে খাদ্য পাঠাইত, তাহা আহার
করিতে লেনিন লজ্জাদুভব করিত। যখন তাহার নিরানন্দময়
ফ্লাটে খাদ্যের মােড়ক আসিত, সে ভ্রকুটী করিত, অস্বস্তি
বােধ করি তাড়াতাড়ি পীড়িত কমরেডকে বা যাহারা
খাদ্যাভাবে দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল, তাহাদিগকে ময়দা, চিনি,
মাখন দিতে অগ্রসর হইত।
একবার, যখন সে আমায় তাহার সহিত আহার করিবার
নিমন্ত্রণ করিয়াছিল, বলিয়াছিল, “আজ আমি তােমায় শুটকী
মাছ খেতে দিব—অ্যাকান থেকে আমায় পাঠিয়ে দিয়েছে।”
সােক্রেটীসতুল্য কপােলটী কুঞ্চিত করিয়া, তাহার তীক্ষ্ণদৃষ্টি
আমার দিক হইতে অপসারিত করিয়া, সে বলিতে লাগিল,
“আমি যেন এক
বড় লােক, তারা এমনি জিনিষ
পাঠায়। কি করে নিষেধ করি বলােতাে? যদি তুমি ফিরিয়ে
দাও, গ্রহণ না কর, অন্তরে আঘাত পাবে। আর আমার
চারদিকে সবাই ক্ষুধার্ত।”
সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত খেয়ালবিহীন, তামাক ও মদের
সহিত সম্পূর্ণ অপরিচিত, সকাল হইতে রাত্রি পর্যন্ত জটিল
ও গুরুতর কার্যে ব্যাপৃত-নিজের পানে তাকাইবার কথা
তাহার মনে হইত না, কিন্তু কমরেডদের স্বাস্থ্যের দিকে তাহার
দৃষ্টি থাকিত সজাগ।
পাঠাগারের লম্বা টেবিলের নিকট বসিয়া, খাতা হইতে
কলম না তুলিয়া, লিখিতে লিখিতে, তাড়াতাড়ি বলিতে

লেনিনের সহিত থাকিত, “সুপ্রভাত। কেমন আছ ? এক্ষুনি শেষ করছি। গ্রামে একজন কমরেড আছে, সে বড় নিঃসঙ্গ বােধ করছে। তাকে অবশ্য উৎসাহিত করতে হবে। মানসিক অবস্থা কম প্রয়ােজনীয় নয়।” একবার আমি মস্কেীতে তাহার নিকট গিয়াছিলাম । বলিল,,খাওয়া দাওয়া হয়েছে ?” “হঁা”। “মিথ্যা বলছে না ?” ‘সাক্ষী আছে। ক্রেমলিনে খাবার কামরায় খেয়ে এসেছি।” “শুনেছি সেখানকার খাবারদাবার ভাল নয়।” “মন্দ নয়, কিন্তু আরো ভাল হতে পারে।” তৎক্ষণাৎ সে বিশদভাবে সব জানিতে চাহিল। “ভাল নয় কেন ? কি করে ভাল হতে পারে ?” সে ক্রুদ্ধস্বরে অনুচ্চ- কণ্ঠে বলিতে আরম্ভ করিল, “কেন, একজন সুদক্ষ পাচক তারা রাখতে পারে না? কাৰ্যতঃ সেখানকার লোক খাতে খাটতে মূচ্ছিত না হওয়া পর্যন্ত খেটে যায়, ভাল খাদ্য তাদের খেতে দিতেই হবে, যাতে তারা বেশী খেতে পারে। আমি জানি, সেখানে অল্প পরিমাণ খাদ্য পাওয়া যায়, আর তা-ও খারাপ ; সেখানে একজন ভাল পাচক তাদের যােগাড় করতেই হবে। তারপর সে রন্ধনের সহিত আহার ও হজমের ক্রিয়ার সম্বন্ধে কতকগুলি স্বাস্থ্যতত্ত্ববিদের মত- মত উল্লেখ করিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ সব ভাববার

৫
লেনিনের সহিত...
সময় পাও কি করে ?” প্রত্যুত্তরে সে আর একটা প্রশ্ন করিল,
‘যুক্তিযুক্ত আহার সম্বন্ধে ?” তাহার কণ্ঠস্বরে বুঝিলাম, আমার
প্রশ্নটী কালােপযােগী হয় নাই।
পি, এ স্কোয়ােকোদভ-আমার একজন পুরাতন আলাপী,
সরমােভর আর এক কর্মী, কোমল প্রকৃতি-আমার নিকট
অভিযােগ করিল যে চেক্কায় কাজের অত্যন্ত কষ্ট। আমি
তাহাকে বলিলাম, “আমার মনে হয় তোমার উপযুক্ত কাজ
এ নয়।” দুঃখের সহিত সে বলিল, “হ্যা ঠিক তাই। সম্পূর্ণভাবে
স্বভাববিরুদ্ধ, অপ্রিয়।” কিন্তু কিয়ংগণ চিন্তা করিয়া বলিল,
“কিন্তু তুমি ভান ইলইচকেও তার ভাবাবেগের টু’টি টিপে মেরে
ফেলতে হয়। ভারী লজ্জিত যে আমি এত দুৰ্ব্বল।
এমন অনেক কর্মীকে আমি জানিতাম । এখনও জানি,
যাহারা সহজাত সামাজিক আদর্শবাদকে দমন করিতে, আপনাদের
ভাবাবেগকে সবলে রােধ করিত ও এখনও করে, শুধু তাহাদের
অবলম্বিত ব্রতের সাফল্যের জন্য। লেনিনকেও কি ভাবাবেগ।
চাপিয়া রাখিতে হইয়াছিল ? আদৌ সে নিজের কথা অপরাকে
বলিতে চাহিত না।
চেয়ে, আত্মার গােপন
সংক্ষুব্ধতা সম্বন্ধে, সে অধিক নিৰ্বাক্ থাকিতে পারিত।
যাহা হউক এক সময় গর্কি নামক পার্কে কতকগুলি ছােট
ছােট ছেলে মেয়েদের আদর করিতে করিতে সে বলিল,
“আমাদের চেয়ে এদের জীবন আরাে সুখের হবে। আমরা
যতোখানি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন কাটালুম, এরা ততােখানি
আর সবার

লেনিনের সহিত
অভিজ্ঞতা লাভ করবে না। এদের জীবনে এত বেশী নিষ্ঠুরত'র
ছা প থাকবে না।”
তারপর দূরে যেখানে পাহাড়ের কোলে গ্রামটী রহিয়াছে,
সেই দিকে দৃষ্টি মেলিয়া বিষন্নভাবে সে বলিল, “আর ত? আমি
এদের হিংসা করি না। ইতিহাসে আমাদের যুগের লােক এক
অদ্ভুত অর্থপূর্ণ কীর্তি রেখে গেল। আমাদের জীবন-অবস্থায় যে
নৃশংসতার প্রয়ােজন হয়ে ছিল, এরা তা বুঝতে পারবে এ
সমর্থন করবে। সব—সব বুঝতে পারবে। তারপর কোমল
ও মধুর স্পর্শে, অতি সযতনে ছােট ছােট ছেলেমেয়েদের গায়ে
হাত বুলাইয়া আদর করিল।
একদিন তাহার নিকট আসিয়া দেখি, টেবিলের উপর “যুদ্ধ
ও শান্তি” পড়িয়া রহিয়াছে।
“হ্যা টলষ্টয়। শীকারের দৃশ্যটা পড়বার ইচ্ছা হয়েছিল ।
তারপর মনে পড়ে গেল একজন কমরেডকে চিঠি লিখতে হবে ।
পড়বার একেবারে সময় নাই। কেবলমাত্র কাল রাত্রে টলষ্টয়
সম্বন্ধে তােমার বইখানি পড়ে উঠেছিলুম।”
হাসিয়া চোখ ঘুরাইয়া, আরানের সহিত আরাম কেদারায়
দেহ এলাইয়া দিয়া, নিম্নম্বরে দ্রুত গতিতে বলিতে লাগিল,
“কি বিরাট ব্যাপার বলােতো ?. কি অদ্ভুত মাথা! এই হচ্ছে
মশাই তােমাদের একজন শিল্পী। আর এর চেয়ে অধিক বিস্ময়-
কর কিছু জানাে কি ? সাহিত্যক্ষেত্রে কাউন্ট লিও টলষ্টয়ের
আগমনের পূর্বে সাহিত্য জগতে খাটি মুক্তিকের দেখা তুমি পাওনি?”

१२ লেনিনের সহিত তারপর চোখ ঘুরাইয়া, আমার পানে দৃষ্টিপাত করিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ইওরােপের কোন লােককে তার পাশে বসাতে পার কি?” পরমূহুর্তে নিজেই উত্তর দিল না—একজনকেও নয়।” আর সন্তোষের সহিত হাসিতে হাসিতে হস্তদ্বয় ঘর্ষণ করিল। একাধিকবার আমি তাহার চরিত্রে এই বিশেষত্ব লক্ষ্য করিয়াছিলাম—রুষসাহিত্যে এই গর্ব। কখনাে কখনাে এই বিশে- যত্ব লেনিন প্রকৃতির সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ বলিয়া আমার মনে হইত, আবার কখনাে, এমন কি স্বাভাবিক বলিয়া বােধ হইত। কিন্তু ইহার মধ্যে আমি দেখিতে শিখিয়াছিলাম, পিতৃভূমির প্রতি গভীর- ভাবে নিহিত তাহার আনন্দপূর্ণ প্রেমের প্রতিধ্বনি। ক্যাপ্রিতে জেলেরা কি রকম সযতনে হাঙ্গর কর্তৃক ছিন্ন, জড়ানাে জালের ‘জট ছাড়াইতেছে, নিরীক্ষণ করিতে করিতে সে বলিল, “আমাদের লােকেরা এর চেয়ে তাড়াতাড়ি কাজ করে।” তাহার মন্তব্যে আমি যখন সন্দেহ প্রকাশ করিলাম, সে ঈষৎ বিরক্তির সহিত ‘হু হু করিয়া বলিল, “এই সব কোলাহলময় স্থানে বাস করে, তােমার কি মনে হয় না, তুমি রাশিয়াকে ভুলে যাচ্ছ ?” ভি, এ, সায়ানিংস্কি ষ্টোয়েভ আমাকে বলিয়াছিল যে, একবার সে লেনিনের সহিত এক ট্রেনে সুইডেনের মধ্য দিয়া ভ্রমণ করিতেছিল ও ডুরারের সম্বন্ধে একটী জাৰ্মাণ প্রবন্ধের পানে তাকা- ইতেছিল। সেই গাড়ীতে কতকগুলি জাৰ্মাণ যাইতেছিল। তাহারা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “বইখানা কি?” পরে প্রকাশ লেনিনের সহিত পাইয়াছিল যে, তাহারা কখনও তাহাদের শিল্পীর নাম শ্রবণ করে নাই। ইহা প্রায় লেনিনকে উৎসাহিত করিয়া তুলিয়া- ছিল, আর দুইবার সে দায়ানিৎস্কিকে গর্বের সহিত বলিয়া- ছিল, “এরা এদের নিজেদের শিল্পীদের চেনে না, কিন্তু আমরা চিনি।” মস্কৌ-এর এক সন্ধ্যায়, ই, পি, পিয়েসকোভস্কির ফ্লাটে ইসায়া দবরােউহণ বীথােভেনের এক সুর বাজাইতেছিল। একাগ্রমনে শ্রবণ করিয়া লেনিন বলিল,“জানি না এপাসিওনেতার- এর চেয়ে অধিক সুন্দর, বৃহৎ কি হতে পারে ! রােজ শুনতে ইচ্ছা করে। অদ্ভুত অলৌকিক সঙ্গীত। গর্বের সহিত সর্বদ চিন্তা করি —বােধ হয় এ আমার স্বভাব মানুষ কি অদ্ভুত জিনিষই না করতে পারে !” তারপর চোখ ঘুরাইয়া, মৃদু হাসিয়া, বিষন্নভাবে সে বলিল, “কিন্তু আমি তাে সব সময় গান শুনতে পারি না। গীতবাদ্য তােমার স্নায়ুকে মন্ত্রমুগ্ধ করে, তােমাকে অর্থহীন সুন্দর কথা বলাতে চায়, আর এই হীন নরকে বাস করে, যারা এই রকম অদ্ভুত সৌন্দৰ্য্য সৃষ্টি করতে পারে, তাদের মাথায় টোকা মারতে শেখায়। আর এখন অবশ্য তুমি কারাে মাথায় টোকা মেরাে না—কামড় দিয়ে, তােমার হাত সরিয়ে দেবে। যদিও আমাদের আদর্শ নয় কারাে উপর বল প্রয়ােগ করা, তবুও তােমাকে তাদের মাথায় নির্মমভাবে আঘাত করতে হবে। হু, হু, আমাদের কর্তব্য নারকীয়ভাবে কঠিন।”

৭৪
লেনিনের সহিত
সন ১৯২১ সালে,
৯ই অগাষ্ট, যখন নিজেই প্রায়
পীড়িত ও সম্পূর্ণ পরিশ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল, সে আমাকে এক
পত্র লিখিয়াছিল।
“এ, এম (A. M )
এ, বি, ক্যামেনেভের মারফৎ তােমায় চিঠি পাঠিয়েছিলুম।
এত ক্লান্ত যে অত্যন্ত সামান্য কাজ করতেও অক্ষম ; আর
তােমার থুথুর সঙ্গে রক্ত উঠছে, আর এখনো তুমি বাইরে
বেরিয়ে পড়নি? বাস্তবিক, এটা লজ্জাকর অবিবেচকের পরিচয়
দিচ্ছে।
ইওরােপে ভাল স্বাস্থ্যনিবাসে থাকলে সেরে উঠবে
ও আরাে কত কিছু উল্লেখযােগ্য কাজ করতে পারবে। বাস্তবিক,
বাস্তবিক। কিন্তু এখানে তুমি সেরে উঠতেও পারবে না,
আর কিছু করতেও পারবে না। এখানে কেবল নিরর্থক কাজ
ছাড়া তােমার কিছু করবার নাই। বেরিয়ে পড়, সেরে ওঠো।
একগুয়েমী ক'রােনা—আমার একান্ত অনুরােধ।”
“তােমার লেনিন।”
যাহাতে আমি রাশিয়া ত্যাগ করি, তাহার জন্য, অদ্ভুত ধৈর্য্যের
সহিত, সে বৎসরাধিক আমায় পীড়াপীড়ি করিয়াছিল। আশ্চর্য্য,
নিজ কাজে মগ্ন থাকিয়াও, সে মনে রাখিত যে, এমন একজন
লােক আছে, যাহার বিশ্রাম প্রয়ােজন। এই রকম ভিন্ন ভিন্ন
অনেক লােককে সে পত্র লিখিত—সম্ভবতঃ অনেক কুড়ি।

সং লেনিনের সহিত কমরেডদের প্রতি মনােভাব কমরেডদের প্রতি তাহার সম্পূর্ণরূপে অতুলনীয় মনোভাব, এমন কি তাহাদের জীবনের ক্ষুদ্রতম সূক্ষ্মাংশেও পরিব্যাপ্ত তাহার অন্তর্ভেদী মনােযােগের কথা আমি পূৰ্বেই বর্ণনা করিয়াছি। ও কর্মকুশল কর্মচারীর প্রতি চতুর মনিবের যেমন কখনো কখনো স্বার্থপূর্ণ যত্ন থাকে, লেনিনের এই অবয়বে কখনাে আমি সেইরূপ স্বার্থপূর্ণ দৃষ্টি দেখি নাই। লেনিনের দলায় এরূপ কিছু হয় নাই। প্রকৃত কমরেডের প্রতি যে আন্তরিক য; জন্মে, সমানে সমানে যে ভালবাসা হয়, তাহার মধ্যে ছিল সেরূপ যত্ন ও ভালবাসা। আমি জানি, তাহার পার্টির মধ্যে, এমন কি সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকেও, লেনিনের সমকক্ষ বলিয়া মনে করা সম্ভব, কিন্তু লেনিন নিজে ইহা উপলব্ধি করিতে চাহিত না। কখনো কখনো সে লােকের সহিত কঠোর ব্যবহার করিত, তর্কে প্রবৃত্ত হইলে তাহাদের রক্ষা ছিল না। নির্মমভাবে তাহাদিগকে হাস্যাস্পদ করিত, বিষাক্ত সাপের বিষােদগারের ন্যায় অট্টহাস্যে তাহাদিগকে জর্জরিত করিয়া দিত। এই সবই সে করিত। কিন্তু গতকল্য যাহাদের সে ভৎসনা করিয়াছে, যাহাদের কার্যের কঠোর সমালােচনা করিয়াছে, কতবার তাহাদের প্রতিভা ও নৈতিক দাতা দর্শনে তাহার মধ্যে প্রকৃত বিস্ময়ের সুর স্পষ্টভাবে ফুটিয়া উঠিত। ১৯১৮ হইতে ১৯২১ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত জঘন্য অবস্থার মধ্যে তাহাদের অদম্য, অক্লান্ত কর্মদক্ষতা, সর্বদেশের ও পাটীর চরের মধ্যে, যুদ্ধক্লান্ত দেশের সর্বাঙ্গে সয ক্ষতের মত পরিব্যাপ্ত লেনিনের সহিত ষড়যন্ত্রের মধ্যে, তাহাদের অবস্থার কথা স্মরণ করিয়া, সে স্তব্ধ ও স্তম্ভিত হইয়া যাইত। তাহারা অবিশ্রাম কাজ করিত। আহার পাইত অতি অল্প ও আহাৰ্য্য অতি জঘন্য। অনন্ত বিপদ ও ভয়ের মধ্যে তাহারা বাস করিত।, কিন্তু লেনিন নিজে এই সব অবস্থার কঠোরত ও যে সমাজের ভিত্তি অন্তবিপ্লবরূপ হিংস্র ঝটিকাপাতে কম্পিত হইয়াছে, সেই সমাজের অকস্মাৎ বিপদের কথা অনুভব করিত বলিয়া বােধ হইত না। কেবল একবার অভিযােগের মত একটা কথা তাহার মুখ হইতে বাহির হইয়া পড়িয়াছিল, আর তাহাও নিজ কামরায়, এম, এফ, অ্যাড্রিয়েফের সহিত কথােপ- কথনকালে। “ভদ্রে, এম, এফ, আর কি আমরা করতে পারি ? যুদ্ধ ছাড়া অন্য উপায় নাই। কঠিন বােধ করছ কি? নিশ্চয়, অতিশয় কঠিন দেখছি। তুমি ভাব আমার পক্ষে কঠিন ও কষ্টকর নয় ? কঠিন, অতি কঠিন। কিন্তু জার্জিস্কির পানে তাকাও। কিছুই নয়, এ রকম তাকে দেখাতে আরম্ভ করেছে। এ-র কিছুই করা যাবে না। অকৃতকার্য হওয়ার চেয়ে দুঃখ পাওয়া ঢের ভাল।” • আমার সম্মুখে যে, সে একমাত্র দুঃখ প্রকাশ করিয়াছিল, তাহা এই, “দুঃখিত, গভীরভাবে দুঃখিত যে, মাৰ্টভ আমাদের সঙ্গে নেই। কি অদ্ভুত কমরেড ছিল সে, কি প্রাণখােলা খাটী মানুষ ছিল সে।”

MAKAROMAH – FAH
Ed:-188,
লেনিনের সহিত
মনে পড়ে, মাটভের মন্তব্য কি রকম অনেকক্ষণ
প্রাণখােলা হাসি হাসিয়াছিল।
“রাশিয়ায় মাত্র দু’জন কমু-
নিষ্ট আছে-লেনিন ও কলােনতাই।" তারপর উচ্চকণ্ঠে হাসিয়া,
দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, “কি চতুর। নারী সে!”
পাঠাগার হইতে একজন কমরেড রাজকার্যপরিচালককে
বিদায় দিয়া, আন্তরিক সম্রম ও বিস্ময়ের সহিত বলিল, “একে
তুমি বহুদিন থেকে জান? ইওরােপের যে কোন দেশের মন্ত্রী
সভার প্রধান মন্ত্রীর স্থান গ্রহণ করবার এ সম্পূর্ণ উপযুক্ত।”
তারপর হস্ত ঘর্ষণ করিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল, “প্রতিভায়
ইওরােপ আমাদের চেয়েও দরিদ্র।”
একবার আমি প্রস্তাব করিলাম, বিমান ধ্বংস করিবার জন্য
বৃদ্ধ বলশেভিক গােলন্দাজ কর্তৃক আবিষ্কৃত আগ্নেয় অস্ত্রটী দেখিতে
প্রধান গােলন্দাজ বিভাগে আমরা একত্রে যাইব।
সে বলিল,
“আমি ও-সম্বন্ধে কি বুঝি ?” কিন্তু সে আমার সঙ্গে
গিয়াছিল।
এক অন্ধকার কামরায়, এক টেবিলের চারিদিকে সমবেত
হইয়াছিল সাতজন সৈন্যাধ্যক্ষ-বৃদ্ধ, শ্মশ্রুমণ্ডিত, সবাই বৈজ্ঞানিক।
টেবিলের উপর যন্ত্রটী রক্ষিত ছিল। সৈন্যাধ্যক্ষদের মধ্যে দু-
বেশী লেনিনের মূর্তি স্নান ও অকিঞ্চিৎকর হইয়া গিয়াছিল।
আবিষ্কারক যন্ত্রের গঠনাবলী ব্যাখ্যা করিতে লাগিল। দুই
তিন মিনিট লেনিন মনঃসংযােগ সহকারে তাহার কথা শ্রবণ
করিল, পরে সম্মতিসূচক ভাবে ‘হু', হু,' শব্দ করিয়া সেইরূপ

৭৮ লেনিনের সহিত স্বাচ্ছন্দের সহিত তাহাকে প্রশ্ন করিতে লাগিল, যেন সে তাহাকে কোন রাজনৈতিক তথ্য সম্বন্ধে প্রশ্ন করিতেছে। ...আবিষ্কারক ও সৈন্যাধ্যক্ষগণ বিশদভাবে আগ্রহের সহিত ব্যাখ্যা করিতে লাগিল। পরদিন উক্ত আবিষ্কারক আমাকে বলিল ও ? “আমি আমার সৈন্যাধ্যক্ষদের বলেছিলুম, তােমার সঙ্গে এক- জন কমরেড আসকে, কিন্তু কমরেডটা যে কে, তা আমি বলিনি। ইলইচকে তারা চিনতে পারেনি। সে যে বিনা আড়ম্বরে, বিনা দেহরক্ষীতে আসতে পারে, বোধ হয়, এ তারা কখন কল্পনাও করতে পারেনি। তারা আমায় বললে “এ কি কোন যন্ত্রকলা- ভিজ্ঞ, না অধ্যক্ষ ? কি ? লেনিন কি আশ্চর্য! এ-ও কি সম্ভব ? আমাদের যেসব জিনিষ নিয়ে সম্পর্ক, এ-সব সে এত জানলে কি করে ? যন্ত্রকলাবিদের মত সে সব প্রশ্ন করছিলো। কি রহস্য !” বােধ হইল তাহার প্রকৃতপক্ষে বিশ্বাস করে নাই যে, এই লােকই লেনিন। প্রধান গোলন্দাজ বিভাগ হইতে ফিরিবার পথে লেনিন চাপা হাসি হাসিতে লাগিল ও আবিষ্কারকের সম্বন্ধে কথা বলিতে লাগিল। “দেখলে' কত সহজে মানুষ সম্বন্ধে তােমার ভুল ধারণা হতে পারে। আমি জানতুম, ও একজন বৃদ্ধ, সৎ কমরেড। আগ্নেয়াস্ত্র আবিষ্কারের সঙ্গে কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু বােধ হয়, এই তার ঠিক পথ। বেশ ভাল লােক। আমি যখন যন্ত্রটীর ব্যবহারিক মূল্য সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করছিলুম,

৭১
লেনিনের সহিত
সৈন্যাধ্যক্ষেরা কি আমায় সমর্থন করে নাই ? আর সন্দেহ প্রকাশ
করেছিলুম এক উদ্দেশ্যে—জানতে চেয়েছিলুম, এই অদ্ভুত যন্ত্র
সম্বন্ধে তাদের কি মত।”
উচ্চহাস্যে তাহার সর্বাঙ্গ কঁপিয়া উঠিল, পরে জ্ঞািসা
করিল, “বলােতাে ‘আই (I) আর কিছু আবিষ্কার করেছে ? তার
আর অন্য কিছু করা উচিত নয়! হায়! যদি আমরা আমাদের যন্ত্রা-
ধ্যক্ষদিগের জন্য ভালভাবে কাজ করবার আদর্শ-অবস্থার সৃষ্টি
করতে পারতাম ! পঁচিশ বৎসর পরে রাশিয়া হবে পৃথিবীর
মধ্যে সর্বপ্রধান দেশ।”
হা, সে আমার সম্মুখেই কমরেডদের সুখ্যাতি করিত।
এমন কি যাহাদের প্রতি তাহার কোন সহানুভূতি ছিল না,
তাহাদেরও সে আমার সম্মুখে প্রশংসা করিত। লেনিন জানিত
কি ভাবে তাহাদের কর্মশক্তির প্রশংসা করিতে হয়।
টটস্কির { L. D. 'I'votsky) গঠন কাৰ্যদক্ষতার উচ্চ প্রশংসা
শ্রবণে আমি অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিলাম। ভি, ইলইচ
আমর বিস্ময়ভাব লক্ষ্য করিয়াছিল।
“হ্যা, আমি জানি ট্রটস্কির প্রতি আমার মনােভাব কি, এই
নিয়ে এক মিথ্যা জনরব আছে। কিন্তু আমি এও জানি—-
যা আছে তা আছে, যা নাই তা নাই। সেনাবিভাগ সুনিয়ন্ত্রিত
ও পরিচালনা করতে সে সম্পূর্ণ উপযুক্ত ছিল।”
কিয়ৎক্ষণ নীরব থাকিয়া, নিম্নস্বরে বরং বিষন্নভাবে বলিল,
“আর তবুও সে আমাদের একজন নয়। আমাদের অথচ আমাদের
এল, ডি,

৮০
লেনিনের সহিত
নয়। টুটস্কি উচ্চাভিলাষী। তার মধ্যে লাসেলের (Lassale)
কিছু আছে, এমন কিছু যা ভাল নয়।”
“আমাদের অথচ আমাদের নয়”—এই কথা কয়টা দুইবার
আমার সম্মুখে উচ্চারিত হইয়াছিল। দ্বিতীয়বার উচ্চারিত
হইয়াছিল আর একটা বিখ্যাত ব্যক্তির সম্পর্কে—এই লােকটী
ভ্রাডিমির ইলইচের
মৃত্যুর
অব্যবহিত পরে মারা গিয়াছিল।
খুবই স্বাভাবিক যে লেনিন লােকচরিত্র বুঝিতে পারিত
একবার আমি তাহার পাঠাগারে প্রবেশ করিয়া দেখি, একজন
লােক লেনিনকে অভিবাদন করিতে করিতে দরজার দিকে
হাঁটিয়া আসিতেছে। চোখ না তুলিয়া লেনিন লিখিয়া যাইতেছিল।
দ্বারের দিকে নির্দেশ করিয়া সে জিজ্ঞাসা করিল, “লােকটাকে
চেন ?” আমি বলিলাম, “সার্বজনীন সাহিত্য ব্যবসা সম্পর্কে
লােকটার সহিত দু’বার দেখা হয়েছিল।”
“তারপর ?”
“লােকটা মূখ-অশিক্ষিত।”
“হু হু এক রকম সাপ, আর সম্ভবতঃ পাজী বদমাস। কিন্তু
এই প্রথম আমার সঙ্গে দেখা, আমার ভুলও হতে পারে।”
লেনিনের ভুল হয় নাই। কয়েক মাস পরে, লেনিনের
অবধারণা যে সত্য, বর্ণে বর্ণে মিলিয়া গিয়াছিল ।
সে সকলের জন্য কত রকম চিন্তা করিত, কারণ সে বলিত
“আমাদের যন্ত্রাদি পরিবর্তনশীল। অক্টোবর বিপ্লবের পর থেকে
ভিন্ন প্রকৃতির বহু লােক ধীরে ধীরে জুটেছে। আর তার জন্য

লেনিনের সহিত... ৮১ দোষী তােমার সাধু প্রকৃতি প্রিয় বুদ্ধিজীবী। এ তাদেরই হীন হত্যাকাণ্ডের ফল।” আমরা যখন গর্কি নামক পার্কে বেড়াইতেছিলাম, লেনিন আমায় এই কথা বলিয়াছিল। অ্যানেজিনস্কির সম্বন্ধে আমি কথা বলিতে আরম্ভ করিলাম। কেন, তা অামা স্মরণ হইতেছে না ; বােধ হয়, সে তখন তার নাচ ৮: বীর চাল চালিতেছিল বলিয়া । “মানসচক্ষে দেখতে পার। আমাদের যখন প্রথম সাক্ষাৎ হয়, তার প্রতি কেমন একটা শারীরিক ঘৃণার ভাব আমার মন অধিকার করে বসেছিল। এভাব আমি জয় করতে পারিনি। আর কাহাকে দেখে আমার মনে এমন ভাব উদয় হয়নি। এক সময় আমাদের উভয়কে একত্রে কোন কাজ করতে হয়েছিল। আদমন করবার জন্য আমাকে সব রকম উপায় উদ্ভাবন করতে হয়েছিল—ভারী বিঞ্জ। আমার বেশ মনে পড়ছে, কোনক্রমে এই অপদার্থ হীন ব্যক্তিকে সহা করতে পারিনি।” তারপর বিস্ময়ে স্কন্ধ ঝাঁকানি দিয়া বলিল, “কিন্তু পাজী ম্যালিনােভােস্কির মতলব আমি বুঝতে পারিনি। ভারী রহস্যময় বাপ? নলিনােভল্কি।” আমার নিকট লেনিন ছিল কঠোর শিক্ষক, অনুরক্ত বন্ধু । কৌতুকের সহিত সে আমায় বলিল, “তুমি এক প্রহেলিকা। সাহিত্যক্ষেত্রে বােধ হয় তুমি একজন প্রত্যক্ষবা, আর অন- সাধারণের প্রতি তােমার মনােভাবের দিক থেকে, তুমি একজন

০২
লেনিনের সহিত...
l'anticist, cutata fapt a catos f# ( Victim of
listory) ইতিহাসের বলি ? আমরা ইতিহাস জানি. আর আমর
বলিকে (victin) বলি--বেদী উল্টে দাও! মন্দির ভেঙ্গে
ফেল! দেবতার ধ্বংস হউক! আর তুমি আমার মনে এই
বিশ্বাস উৎপাদন করাতে চাও যে, শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামশীল দল
সৰ্বপ্ৰথমে বুদ্ধিজীবীদের সন্তুষ্ট করতে বাধ্য।
আমার ভুল হইতে পারে; কিন্তু আমার মনে হয় লেনি
আমার সহিত কথা কহিতে ভালবাসিত। সে প্রায় সব সময়
বলিত, “এখানে এসে আমার সঙ্গে দেখা করাে—তার যােত
জানিও, আমরা একত্র মিলিত হব।
একবার সে বলিয়াছিল, “তােমার সঙ্গে আলাপ করা তৃপ্তি-
কর। তোমার জ্ঞানচক্রের পরিধি পরিবর্তনশীল ও বিরাটু।" লেনি
বুদ্ধিজীবীদের মনােভাবের কথা জিজ্ঞাসা করিত। বৈজ্ঞানিকদের
সম্বন্ধে আলাপ করিতে সে বিশেষ আগ্রহান্বিত হইত।
সময় বৈজ্ঞানিকদিগের অবস্থা উন্নত করিবার জন্য আমি এন,
বি, খালটভের ( N. B. Khaltov) সহিত একযােগে কমিটিতে
কাজ করিতেছিলাম।
প্রােলেটেরীয় সাহিত্য
প্রােলেটেরীয় সাহিত্যে তাহার অনুরাগ ছিল
ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তােমার মত কি ?" আমি বলিলাম যে, আমি

লেনিনের সহিত
অনেকখানি আশা করি, কিন্তু Lity/2। সাহিত্য-পাঠ প্রতিষ্ঠান।
গঠন করার প্রয়ােজন বােধ করি, আর ইহার সঙ্গে ভাষাত,
বিদেশীভাষা—পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য-পল্লীগাথা, (folk lot
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস ও স্বতন্ত্রভাবে রুষসাহিত্যের অধ্যাপনা
বন্দোবস্তের প্রয়ােজন বােধ করি।
চোখ দুইটী ঘুরাইয়া, চাপা হাসি হাসিয়া, সে হু হু করি।
অত্যন্ত বিস্তৃত আর অত্যন্ত চোখ ঝলসানাে - এই যা । এই
সমস্ত বিষয় পড়াবার জন্য আমাদের নিজেদের অধ্যাপক নাই,
অধিকন্তু বুর্জোয়া অধ্যাপকেরা এক ভিন্ন রকমের ইতিহাস
শেখাবে। না, আমার মতে কোনক্রমেই আমরা এখন এক
কিছু করতে যাব না।
তিন বৎসর কি পাঁচ বৎসর আমাদের
অপেক্ষা করতেই হবে।”
তারপর সে অভিযােগ করিত, "পড়বার আদৌ সমৰ
নাই।” সে প্রায় জোরের সহিত প্রচারকার্য চালাইবা
জন্য দেমিয়ান বেদনির (Dlly Bolly । পুন্তাকে
মূল্যের উল্লেখ করিত; কিন্তু ইহাও বলিত, “ইহা কতকটা জটিল।
কোথায় সে পাঠককে ছাড়িয়ে, এগিয়ে এগিয়ে যাবে, তা-
সে নিজেই পাঠকের পিছু পিছু চলেছে।”
সে মেয়াকোভস্কিকে ( Jayakoi-hy) অবিশ্বাস করিত;
রং সে তাহার উপর বিরক্তই ছিল। “সে চীৎকার করে কি এক
বকৃত কথা আবিষ্কার করে, কোথাও অানার মতের সঙ্গে
মেলে না—আর তাছাড়া দুর্বোধ্য, ইহার সবটাই অসংবদ্ধ, পড়।
;

লেনিমের সহিত
দুরূহ। মেয়াকোভস্কি প্রতিভাশালী ? অত্যন্ত প্রতিভাশালী ।
দেখাই যাবে। কিন্তু তোমার কি মনে হয় না,
আজকাল লোক রাশি রাশি কবিতা লিখছে? সংবাদপত্রের
সমস্ত, পাতা ভর্তি কবিতা, আর প্রচুর কবিতার বই রােজ
বেরুচ্ছে।”
আমি বলিলাম, এ রকম সময়ে কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া
মুবকের পক্ষে স্বাভাবিক। আমার মতে ভাল গদ্য অপেক্ষ
মাঝারি ধরণের পদ্য লেখা অপেক্ষাকৃত সহজ, আর কবিতা লিখিতে
অল্প সময় লাগে। উপরন্তু পদ্যরচনা শিক্ষা দিবার আমাদের
অনেক ভাল ভাল শিক্ষক আছে।
“গদ্য লেখার চেয়ে পদ্য লেখা সহজ, একথা আমি বিশ্বাস
করি না। আমি কল্পনাই করতে পারি না। তুমি যদি জীয়ন্ত
আমার গায়ের ছাল ছাড়াতে, তা হলেও আমি দু লাইন
কবিতা লিখতে পারতুম না।” তারপর সে কুটী করিল
“আমরা অবশ্য আপামর জনসাধারণের মধ্যে সম সাহিত
ছড়িয়ে দিব—এখানে, ইওরােপে, যেখানে যা আছে, সব।”
সে ছিল রাশিয়ার এক অধিবাসী যে, বহুদিন নিজদেশ হইতে
বহুদূরে বাস করিয়াছিল ও মনোযােগের সহিত নিজদেশের সমস্ত
ব্যাপার পর্যবেক্ষণ করিয়াছিল—আর দূর হইতে ইহা আরও
উল, আরও সুন্দর দেখায়। শের
যে প্রধান শক্তি,
দেশবাসীর যে অতুলনীয় প্রতিভা এতদিন অস্পষ্টরূপে প্রকাশিত
ছিল, বৈচিত্রহীন ও অত্যাচারী ইতিহাসের প্রতাপে সুপ্ত ছিল

লেনিনের সহিত অথচ রাশিয়ার অদ্ভুত জীবনপটের পশ্চাতে উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির মত সর্বদা জ্বল জ্বল করিত, লেনিন সেখান থেকে, সেই প্রবলশক্তি ও অতুলনীয় প্রতিভা যথাযথভাবে পরীক্ষ। করিয়াছিল। ভুডিমির লেনিন মারা গিয়াছে। কিন্তু তাহার নাম- শক্তির উত্তরাধিকারীরা জীবিত আছে। তাহারা বাঁচিয়া থাকিয়া এরূপ কার্য চালাইবে যাহা মানব ইতিহাসে অপরাপয় কাৰ্যা- পেক্ষা অধিকতর জয়যুক্ত হইয়া থাকিবে।

প্রধান
পরিচয় লিপি
ক্তি, এ, আলেজিংস্কি(জন্ম ১৮৭৯-১৯০৫ সাল হইতে
Russian Social Democratic Part'র কার্যকরী সমিতি ও
দ্বিতীয় Duma৪ সভ্য ছিল। বলশেভিক বিপ্লবের পর হইতে White
Gard General Wrangel এর প্রচার বিভাগের প্রধান কর্মচারী।
এ, এফ, অঁােিয়ভ-গাঁর স্ত্রী।
প, বি, এক্সেদ ( ১৮৫ ••১৯২৮—মার্কসী দলের অন্যতম
প্রতিষ্ঠাতা। পরে মেনশেভিক দলের
নেতা। Soviet
Govt-এর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী।
ভি, এ, ব্যাজারভ জন্ম ১৮৭৪) - অর্থনৈতিক ও
দশনতত্ত্ব বিষয়ক প্রবন্ধ লেখক। ১৯০৭ সান্তে বলশেভিক পার্টির
সভ্য ছিল। পরে Machist দলভুক্ত হয় । .:. S. S. R. এর
S:ate Planning Commission এর কার্যে ব্যাপৃত।
অগষ্ট বেবে—(১৮৪০-১৯১৩),--অৰ্মাণ সংগল ডিমােজাটাক
পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও উক্ত দলের একজন নেতা।
দেমিয়া ৰেনি-( জন্ম ১৮৮৩)-বিদ্রুপাত্মক কবি, রাশিয়ার
অতি জনপ্রিয় কমুনিষ্ট লেখক।
এ, এ, বােগদানভ,-(জন্ম ১৮৭৩)-বিখ্যাত বলশেভিক লেখক।
১৯০৮ সালে Machist দলে যােগদান করে।
নিকোলাই বুখারি-(জন্ম ১৮৮৯)—বিখ্যাত বলশেভিক্।
ফিনােভাের শ্যালিয়াপি-(জন্ম ১৮৭৩) -রাশিয়ার
বিখ্যাত গায়ক।

লেনিনের সহিত.. থিয়ােতাের ডান্ জন্ম ১৮৭১ । --মেনশেভিক বলে এক নেতা। এফ, গেনিয়া-(১৮৫৫-১৯২১)—বিপ্লব ট্রেড ইউনিয়নের স. সােস্যালিজম প্রচারে উদ্যোগ, আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সসি .. পাটীর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। বলশেভিক্‌ বিদাহে। পক্ষ লিও, জি, দয়েচ, -- জন্ম ১৮৫৫।–১৮৮৩ থাকে বাদ Emancipation of Lab:21. GOt1px পার্টির অঞ্চম প্রতিষ্ঠা .. যুদ্ধের সময় উগ্র চোভনদী ও ১৯১৭ সালে প্লেখানার সহকর্মী। আলবাট ডুরা-১৪৭১-১৫১৮। জাস্মাণ দেশীয় শিল্প লেখক ফেলিস্ক জাজ্জিনস্কি- ১৮৭৭-১৯২৬। Polis Democra' Partyর অতি পুরাতন স । ১৯১৭ সাল হইতে মৃত্যুকাল পাশ বলশেভিক কেন্দ্রিয় কমিটির সভা। এনরিকো ফেরি। ১৮৮৬ ১৯১৯)—ইতলায় সোস্যালি, বিদ্যালয়ের লেকচারার, আইন-ব্যবসা। মরিস হিলকুইট- জন্ম ১৮৭০।-সােসিয়ালি পাটির প্রতিষ্ঠাত ও নেতা, ধনী, আইন-ব্যবসায়ী, সােতিয়েট ও কমুনিষ্টর ভীষণ এল, জ। যময়- ১৮৫৯-১৯১৪।-বিখ্যাত ফরাসী সােসিয়াল নেই। গত মহাযুদ্ধের সময় আততায়ী হতে নিহত হয়। বি, কামেনেভ,—জন্ম ১৮৮৩)-পুরাতন বলশেৰি নেতা, বিপ্লবের পর বড় বড় উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিল, সেলিমেট গণ- মেন্টের বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য Communis পাটী হইতে বিতাড়িত হয় ও পরে বির-মত পরিবর্তন করিলে পাটিতে ফিরিয়া আছে ৮৮ লেনিনের সহিত কাল কাউটস্কি-(জন্ম ১৮৫৪ )---যুদ্ধের পূবে মার্কসপন্থা চিন্তাশীল ব্যক্তি। পরে সােভিয়েট ও কম্যুনিজম বিদ্বেষ। এ, বি, খালট–পূর্বে • সােভিয়েট ইউনিয়নের রাষ্ট্র প্রচার বিভাগের সর্বময় কর্তা। এলেকজান্দ্রা, এম, কলােনই- জন্ম ১৮৭২)—প্রথমে মেনশেভিকদলের মহাকম্মি ও মহিলা আন্দোলনে তৎপর, যুদ্ধের সময় বলশেভিক দলে যােগদান করে। এখন সেভিয়েটের বাহিরে সােভিয়েটের দৌত্য-কার্যে নিযুক্ত। এল, বি, ক্র্যাসি(১৮৭০-১৯২৮)-পুরাতন বলশেভিক নেতা, অক্টোবর বিদ্রোহের পর বহু দায়িত্বপূর্ণ সরকারী পদে অধি- ঠত ছিল। পরে ইংলণ্ডে ও ফ্রান্সে সােভিয়েট গভর্ণমেন্টের দূত ছিল। এ পি ল্যাখিজিনিকভ–১৯১৭ সালের পুস্তক প্রচারাগার প্রতিষ্ঠানের প্রধান কম্মকর্তা। আনাতােল লুনাচা—িজন্ম ১৮৭৫ ) জনৈক ভাষাবিদ, নাট্যকার এবং সাহিত্য সমালােচক। বােস লুক্সেমবুগ-(১৮৭১-১৯১৯) জাৰ্ম্মাণী, পােল্যাণ্ড ও রাশিয়ার শ্রমিক আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করিয়াছিল। টাকাস লীগের ( ভবিষ্যতে জৰ্মানীতে কমুনিষ্ট পাটী' নামে পরিচিত। প্রতি যাহা Karl Liebknechtএর সহিত জাৰ্ম্মাণ রাজপুরুষগণ কর্তৃক নিহত হয়। এ, ম্যালিনাভক্তি-১৯১১ সাল হইতে বলশেভিক আলো- লনে তৎপর ছিল। চতুর্থ ডুমা ও দলের কেন্দ্রীয় সমিতির নির্বা- চিত সত্য। ফেব্রুয়ারী বিপ্লবের পর হইতে জানিতে পারা যায় যে, সে জার এর (Czar) গুপ্ত পলীশ বাহিনীর সভ্য। সােভিয়েট, বিপ্লবের পূর্বে লেনিনের সহিত.. পরে গভর্ণমেন্টের প্রতিষ্ঠার পর স্বেচ্ছায় রাশিয়ায় ফিরিয়া আসে। বিচারে স্বদেশদ্রোহী ও গুপ্তচর প্রতিপন্ন হওয়ায় প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়। এ মাটভ,—(১৮৭৩-১৯২৩)--মেনশেভিক দলের নেতা। সােভিরেট, গভর্ণমেন্টের শত্রুদলভুক্ত হইয়াছিল। ভি, মেয়াকভস্কি- ১৮৯৪-১৯৩০ )-রাশিয়ার কবি ও Futuris ফ্রাজ মেরিং- ১৮৪৮-১৯১৯) বিখ্যাত মার্কসমতবাদী ঐতিষ্ঠাসিক ও সাংবাদিক। স্পটকা লীগের অন্যতম নেতা। টমাস মুন্তসার,(১৪৯৮r১৫২৬)-জাম্মাণির ১৫২৫ সালের ষক বিপ্লবের নেতা। পারভাস-(১৮৯৬-১৯২৪)--বিখ্যাত মাকসমতবাদী জাৰ্মাণ সােখাশ ডিমােক্রটিক পাটির সারী সভ্য। জর্জ, ভি, প্লেখানভ-( ১৮৪০-১৯১৮)-মার্কসবাদী, ॥ রাশিয়ার মার্কসপন্থী সােখালিজমের প্রতিষ্ঠাতা। প্রথমে লেনিনের সহকর্মী, পরে মেনশেভিক দলের নেতা। বিগত মহাযুদ্ধের সময় রুধিয় রাজকীয় উদ্দেশ্যের সমর্থক ও অক্টোবর বিপ্লবের পর সােতিটে গণমেন্টের তীব্র প্রতিদ্বন্দ। পল্ সিঙ্গার-(১৮৪৪-১৯১১) জাম্মাণ সােশ্যাল্ ডিমােক্রটিক দলে অন্যতম নেতা। এচেকোভস্কি- ১৮৬০•১৯২৬)-সসাশ্যাল বিপ্লবীলের নেতা। এম পি, টমস্কি- - জন্ম ১৮৮•--যৌবন কাল হইতে বলশেভিক মতবাদী। ও ১৯১৭ সালের বিপ্লবে কার্যকরী হন গ্রহণ করে। ইউ, এস, এস আর (U. S. S. B) Labour Union এর Central Council এর ও ১৯১৯ সাল হইতে Central Commi ttee of Partyর সভাপতি ছিল। বিরুদ্ধ-দল সংগঠনকরার জন্য দায়িত্ব ০ ఎం

লেনিমে
পূর্ণ পদ হইলে চুত করা হয়। অধুনা State Publi
এর কর্মকর্তা।
এ, ভি, ঐইস্কি- জন্ম ১৮৭৯)—১৯০৩ সালে রাশি
Democratic Party বিভক্ত হওয়ার পর Menshevik.
মহাযুদ্ধের সময় কাউটস্কি দলভুক্ত আন্তজাতিক ছিল।
বিপ্লবের পর বলশেভিক দলে যােগ দেয়। Central Cor
সভ্য ও গভর্ণমেন্টের দায়িত্বপূর্ণ পদের অধিকাৰ্থী ছিল
সালে পার্টির কাৰ্য্যতালিকা ও মতবাদের প্রতিদ্বন্দিতা করা
হইতে বিতাড়িত হয় এবং সমস্ত পদ হইতে চ্যুত হয়।
গুপ্তভাবে সােভিয়েট গভর্ণমেন্টের প্রতিদন্দিতা করার জন্য সে
রাজ্য-হইতে বিতাড়িত হয়।
ভ, ভি,ভনভস্কি ( ১৮৭১-১৯২৩। বলশেভিকদলের
সত্য ও Soviet union ভুক্ত Communist Partyএর অন্যতম
সভ্য। ১৯২৩ সালে যখন লুসেন বৈঠকে Soviet গত
প্রতিনিধির কাৰ্য্য করিতেছিল তখন নিহত হয়।
স, জিটলােভল্কি-কর্ষীয় বক্তা ও লেখক। সামাজিক

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Leniner Sahit

Author
Monilal Srimani
Title
Leniner Sahit
File name
Leniner Sahit
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2009/07/15
Publisher
Sri Sourindrakumar Ghosh,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
98
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Forms Of Political Organization. States As Political Power
Keywords
Essays about politics
DLI number
551041
Barcode
4990010021100.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
QDg4T6AOJhe
Download PDF

Leniner Sahit