Makardah Saraswat Library, Howrah

Khana Ed. 2nd

Roy, Manmatha · 2009/07/31

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

খনা
পঞ্চাঙ্ক নাটক
মন্মথ রায়, এম-এ
নাট্যনিকেতনে শুভ উদ্বোধন
বৃহস্পতিবার, ২৬শে আষাঢ় ১৩৪২
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, কলিকাতা

একটাকা চারি আনা
দ্বিতীয় সংস্করণ
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সের পক্ষে ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস্ হইতে
গােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

অখিল নিয়ােগী
বন্ধুবরেষু—
মন্মথ রায়

No text on this page.

লেখকের কথা খনা লিখিয়াছিলাম নিজের প্রেরণায়, ১৯৩২ সালে, পূজার ছুটিতে। খনার মতই এ নাটকখানির ভাগ্য বিচিত্র। আর্টথিয়েটার লিমিটেড, পরিচালিত ষ্টার থিয়েটারে ইহা প্রথম পঠিত ও গৃহীত হয়, দিনাজপুর নাট্যসমিতি কর্তৃক ইহা প্রথম অভিনীত হয়, অধুনালুপ্ত “নাট্যকুঞ্জ” ( কলিকাতা) কর্তৃক ইহা প্রথম বিজ্ঞাপিত হয়, “বাঙলার বাণী” সাপ্তাহিকপত্রে ইহা প্রথম প্রকাশিত হয়, অবশেষে বৰ্ত্তমানরূপে রূপান্তরিত হইয়া রাজধানীর নাট্যশালায় প্রথম অভিনীত হয় “নাট্যনিকেতনে”--- গত ১১ই জুলাই (১৯৩৫) সাড়ে সাতটায়। “মেগাফোন” নামক সুপরিচিত গ্রামােফোন কোম্পানীর প্রথম নাট্যার্ঘ্য “খনা” আমার এই নাটকেরই সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। খনার কোন ইতিহাস পাই নাই। এই নাটকের বার আনা আমার কল্পনা এবং চারি আনা কিংবদন্তী। “খনার জন্য আমি অনেকের নিকটই ঋণী। প্রাথমিক উপদেশ দিয়াছিলেন পরম বান্ধব শ্রদ্ধেয় শ্ৰীযুক্ত হরিদাস চট্টোপাধ্যায়। উৎসাহ দিয়াছিলেন নাট্যকার-বন্ধু শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত শিবপ্রসাদ কর । সঙ্গীত-রচনা করিয়াছেন কবি-শিল্পী বন্ধুবর শ্রীঅখিল নিয়ােগী। তাহাতে সুর সৎযােগ করিয়াছেন সুবিখ্যাত সঙ্গীতাচাৰ্য সুর-সুন্দর বন্ধু শ্রীযুক্ত ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়। নৃত্য পরিকল্পনা করিয়াছেন কলা-লোকের লক্ষ্মী- কল্পাদ্ধেয়া শ্ৰীযুক্ত নীহারবালা। দৃশ্যপটের চারুকল্পনা এবং গ্রন্থের প্রচ্ছদপট অঙ্কন করিয়াছেন শিল্পীবর বন্ধু শ্রীনরেন দত্ত। নাটকের প্রুফ, দেখিয়া দিয়াছেন বন্ধু-বৎসল শ্রীযুক্ত কৃষ্ণশঙ্কর নিয়োেগী। নাটক

প্রযােজনার কষ্টকর প্রাথমিক আয়ােজন করিয়া দিয়াছেন নট-তিলক
শ্ৰীযুক্ত মণী ধােষ। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাহাদিগকে আমার আন্তরিক
কৃতজ্ঞতা নিবেদন করিতেছি।
সর্বশেষে স্মরণ করিতেছি তাহাদিগকে...যাহারা পরমাত্মীয়ের মত
আমার খনাকে নাট্যনিকেতনােপযােগী রূপসজ্জায় ঐশ্বৰ্য্যময়ী করিয়াছেন।
তঁাহারা নাট্য-নায়ক পরম শ্রদ্ধেয় শ্রীযুক্ত প্রবােধচন্দ্র গুহ এবং বাঙলার
নটসূৰ্য্য শ্ৰীযুক্ত অহীন্দ্র চৌধুরী। সর্বশেষে শেষ নিশ্বাসে লােকে
কাহাকে স্মরণ করে তাহারা তাহা জানেন।
“বরদা ভবন”,
বালুর ঘাট
মন্মথ রায়
দিনাজপুর
১৮ই জুলাই, ১৯৩৫।
দ্বিতীয় সংস্করণে
লেখকের কথা
মেট্রোপলিটান পিকচার্সএর মিঃ বি. এল. খেমকার প্রযােজনায় শ্রীযুক্ত
জ্যোতিশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় এই “খনা” বাণীচিত্রে
রূপান্তরিত হইয়া গত ১২ই নভেম্বর (১৯৩৮) কলিকাতার “উত্তরা”
চিত্ৰগৃহে মুক্তিলাভ করিয়াছে। উহাতে শ্ৰীযুক্ত অহীন্দ্র চৌধুরী বরাহ
এবং শ্ৰফুক্তা ছায়া দেবী খনার ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছেন।
মথ রায়
৩০ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট,
১লাগ্রহায়ণ
কলিকাতা
১৩৪৯

প্রথম অভিনয় রজনী
১১ই জুলাই বৃহস্পতিবার, ১৯৩৫
সংগঠনকারিগণ
সঙ্গীত-রচনা
সুর-সংযােজনা
দৃশ্য-পরিকল্পনা
নৃত্য-পরিকল্পনা
রঙ্গপীঠাধ্যক্ষ
হারমােনিয়ম বাদক
সঙ্গতি
শ্ৰীঅহীন্দ্র চৌধুরী
শ্ৰীঅখিল নিয়ােগী
শ্ৰীভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়
শ্রীনরেন্দ্র দত্ত
শ্ৰীমতী নীহারবালা
শ্রীভূপেন্দ্রনাথ দত্ত
শ্ৰীচারুচন্দ্র শীল
শ্ৰীবনবিহারী পান
কনকনারায়ণ ভূপ
শ্ৰীআশুতােষ ভট্টাচাৰ্য্য ও
বেহালা-বাদক
স্মারক
আলােক সম্পাত
শ্ৰীশচীন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য্য
শ্রীসুধীরকুমার সুর ও
শৈলেন্দ্রনাথ দত্ত
শ্রীকুঞ্জলাল রায়
বেশকাৰ্য্য

অভিনেতৃগণ বিক্রমাদিত্য বিভাবসু ধৰ্ম্মাধিকার বরাহ মিহির কামন্দক ভৈরব মহাকাল বিশালাক্ষ রাহুল। তিলক , রক্ষসৈন্যগণ পুরুষ শিবকালী চট্টোপাধ্যায় শ্ৰীব্রজেন্দ্র সরকার শ্ৰীআশুতােষ ভট্টাচাৰ্য্য শ্ৰীঅহীন্দ্র চৌধুরী জীবন গাঙ্গুলী শ্ৰীমনােরঞ্জন ভট্টাচাৰ্য্য শ্ৰীমণি ঘােষ (এমেচার ) শ্রীননীগােপাল মল্লিক শ্ৰীখগেন্দ্রনাথ দাস শ্ৰীআদিত্য ঘােষ শ্ৰীবেচু সিংহ শ্রীভবানী ভট্টাচাৰ্য, ঐগিরিজা মিত্র, শ্ৰীসুধাংশু গুহ, শ্ৰীকালীকুমার বসু শ্রীভবানী ভট্টাচাৰ্য, শগিরিজা মিত্র, ঐবিমল ভট্টাচাৰ্য্য জীবনকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়, শ্রীজিতেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়, শ্রীসুধীর বসু, শ্ৰীকালীকুমার বসু, শ্ৰীগিরিজা মিত্র, শ্রীসুধাংশু গুহ, শীবিমল ভট্টাচাৰ্য ইত্যাদি শ্ৰীসন্তোষ দাস (ভুলাে ) শ্ৰীঅমূল্য হালদার শ্রীগােকুলচন্দ্র মুখােপাধ্যায় সিংহলের মন্ত্রীত্রয় চাষা জনৈক লােক পথিক

স্ত্রী
শ্ৰীমতী সরযূবালা
খনা
ধরণী
মদনিক
তরলিকা
উন্মাদিনী নারী
চাষা-স্ত্রী
ছাত্র-ছাত্রীগণ
শ্ৰীমতী চারুশীলা
শ্ৰীমর্তী নিরুপম
শ্ৰীমতী তারকবাল (লাইট)
শ্ৰীমতী হেনাবালা
শ্ৰীমতী কোহিনুরবালা
শ্ৰীমতী পুষ্পরাণী, শ্রীমতী মুকুলমালা,
শ্ৰীমতী সুবাসিনী, শ্ৰীমতী রাধারাণী,
শ্ৰীমতী তারকবাল, শ্ৰীমতী হেনাবালা,
শ্ৰীমতী রাণীবালা, শ্ৰীমতী লীলাবতী,
শ্ৰীমতী আশালতা
পুরনারীগণ

চরিত্র ••• ••• বিক্রমাদিত্য ভারত সম্রাট বিভাবসু বরাহ ঐ জ্যোতিষার্ণব মিহির ••• বরাহের পুত্র কামক ঐ শিষ্য ঐ ক্রীতদাস মহাকাল লঙ্কার জ্যোতিষী রাহুল ঐ শেষ রক্ষ-রাজবংশধর বিশালাক্ষ ••• ঐ রক্ষ-সেনাপতি তিলক খনার দেহরক্ষী জনৈক চাষা, ছাত্রগণ, ধৰ্ম্মাধিকার, জনৈক লোেক, রক্ষ-সৈন্যগণ, সিংহল-মন্ত্রীগণ ইত্যাদি ••• : ধরণী মনিকা তরলিকা লঙ্কার সিংহরাজকন্যা বরাহের স্ত্রী ঐ কন্যা মনিকার সহচরী ছাত্রীগণ, জনৈক চাষা-স্ত্রী, উন্মাদিনী নারী, পুরনারীগণ ইত্যাদি

খনা
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
সিংহল
মহাকালের চতুষ্পঠী--অদূরে সমুদ্র
ছাত্র-ছাত্রীগণ, খনা ও এক চাষা-দম্পতি
ছাত্র-ছাত্রীগণের গান
দাগ কেটে আর আঁক কষে ভাই হস্তরেখা করবে। বিচার
মােদের কথার ভুল ধরিলে, বিধাতাকেও বলবাে কি ছার!
কবে তােমার জনম হ’লল? কখন যাবে যমের বাড়ী ?
মাের মগজে জমা আছে—সকল রকম কথার সারি।
সাচ্চা কথা বলবো সােজাই--ধার ধারিনা নিছক মিছার ।
আপনি বুঝি হাত দেখাবেন ? কিসের খবর জানতে চান ?
মােদের কাছে বাঁধা আছেন—ভূত-ভবিষ্যৎ-বৰ্তমান।
ফঁাড়া আছে ?—চান তাড়াতে ?
চান কি কোন রােগ সারাতে ?
ফস্ করে সব ফর্দ করুন--ইচ্ছে আছে জানতে কি আর !

মিহিরের প্রবেশ চাষা। আমরা আর কতক্ষণ বসে থাকবাে ! মহাকাল মশায় সেই কথন গেছেন, এখনাে ফিরলেন না—এদিকে বেলাও পড়ে গেল। মিহির। রাজবাড়ীতে গেছেন, কেন গেছেন জানিনে । ( খনাকে } রাজকন্যা কি জানেন ? ধনা। যে জন্যই গিয়ে থাকেন তা জেনে এদের কি লাভ। আপনাদের কি দরকার ওঁকে ( মিহিরকে দেখাইয়া) বলুন--- গুরুদেবের প্রধান শিকাই উনি। চাষা। এসেছিলাম গণতে। খনা। ওঁকে বলুন-উনি গণে দেবেন। চাষা। তবে মশায় আপনিই কথাটা একটু গুরুতরই...( স্ত্রীকে দেখাইয়া ) উনি আমার পরিবার। আজ সকাল.বলা ঘুম থেকে উঠেই...কথাটা একটু গুরুতরই... মিহির। বলুন- চাষা। বলছেন “দিব্যি কর আমি মরলে আর বিয়ে করবে না।” আমি বলছি...এমনটী কি হবে? উনি বলছেন “হােক না হােক কর দিব্যি।” আমি বলছি, তাহলে মহাকাল মশাইকে দিয়ে গুণিয়ে, দেখতে হয়। তাই এখন বলুন এমনটী কি হবে ? মিহির। • কেননটী ? চাষা।---এই যে উনি কি সত্য সত্যই স্বর্গারােহণ করছেন—অবিশ্যি আমার পূর্বে ?

প্রথম অব মিহির। কথাটা গুরুতরই বটে! আমাকে ক্ষমা করুন, আপনি বরং কাল আসবেন—গুরুদেব থাকবেন তিনিই- খনা। এ কথা বললে, কার বেশী অপমান হচ্ছে বুঝছি না! শিষ্যের ন শুরুর—যে গুরুর এমন শিষ্য ? চাষা। (স্ত্রীকে) কি গাে, একটা দিন সবুর করতে পারবে? চাষা-স্ত্রী। একটা-দিন! একটা মুহূর্তও আমার সইছে না। যে স্বপ্ন আমি দেখেছি—না, আর আমার তর সইছে না---দিব্যিটা করে ফেল–ফেল বলছি—ভাল চাও তাে•• চাষা। (মিহিরের প্রতি ) দেখলেন—দেখলেন তো? মিহির। আমার যা বলবার আমি বলেছি- খনা। অর্থাৎ উনি এত সামান্য গণনা করেন না। চাষা। তা মা—আপনার নাম ডাকও খুব শুনেছি। শুনেছি মেয়ে মানুষ আর রাজার মেয়ে না হলে মহাকাল মশাই আপনাকেই নাকি তার গদী দিতেন। তা মা, দেখছেন তাে•••যদি দয়া করে আপনিই-- খনা। তা উনি যখন এত তুচ্ছ গণনা করবেন না, তখন ওঁর অনুমতি হলে-- মিহির। কারও অক্ষমতা নিয়ে এত বড় রহস্য করা রাজকন্যার পক্ষেই শােভা পায়। আমি তা ধরছি না। বরং গুরুর সম্মানটা রক্ষা পাশি এই কথাই বলছে... খনা।' আসুন আপনি-আপনিও মা আসুন, এগিয়ে আসুন। অক্ষরে দ্বিগুণ, চৌগুণ মাত্রা নামে নামে করি সমতা

তিন দিয়া রে আন
তাহে মরা বাঁচা জান।
এক শূন্যে মরে পতি
দুই রহিলে মরে যুবতী ।
( চাষাকে) মহাশয়ের নাম?
চাষা। উদ্ভট।
না। উদ্ভট...অক্ষর সংখ্যা হ’ল তিন। ( স্ত্রীকে) আপনার নাম ?
চাষা-স্ত্রী। বলনা গাে কি-
চাষা। আমি বলব কি গাে?
খনা। (স্ত্রীকে) আপনিই বলুন না-
চাষা-স্ত্রী। নামের কি ঠিক আছে, মিন্সে ঘড়িতে ঘড়িতে নতুন নতুন
নামে ডাকে--
খনা। বাপ-মায়ের দেওয়া নামটা বলুন।
চাষা-স্ত্রী। মক্ষিকা।
খনা। মক্ষিকা:::তাহলে অক্ষর সংখ্যা হ’ল ছয়। তাকে কর দুই দিয়ে
গুণ, হ’ল বার। এইবার মাত্রা। উদ্ভটের মাত্রা “উ” আর মক্ষিকার
মাত্ৰা হ'ল “ই” আর “আ”। উভয় নামের মাত্রার সংখ্যা হল “উ”
“ই” “আ” কিনা তিন। কর তাকে চার দিয়ে গুণ। হ’ল বার।
অক্ষরের বার, আর মাত্রার বার, যোগ দাও—হ’ল চব্বিশ। কর
তাকে তিন দিয়ে ভাগ। ভাগ শেষ রইল শূন্য। অতএব...
চাষা। অতএব
স্ত্রী। ত–
২

প্রথম অঙ্ক,
খনা।
এক শূন্যে মরে পতি।
দুই রহিলে মরে যুবতী।
চাষা। অর্থাৎ----?
খনা। অর্থাৎ ভাগশেষ যখন শূন্য, সুতরাং স্বর্গারােহণ করছেন আপনিই
আগে।
চাষ। বটে! ( স্ত্রীকে ) দিব্যিটা ত তাহলে তােনাকেই করতে হচ্ছে
নক্ষিরাণী—জানতে যখন পারলামই তখন তাে আর ছাড়তে পারি
। যে দিনকাল পড়েছে বাবা, এক সঙ্গে বিশ বৎসর ঘরকন্না
করেও স্বামী জীবিত থাকতেই মাগ বলে ও আমার স্বামী নয়-
শ্রদ্ধ হতে না হতেই যে তুমি আর এক শালার গলায় মালা দেবে,
আর সেই শালা পরমানন্দে আমার যথা সৰ্বস্ব করবে ভােগ,
স্বর্গ থেকে তাই আমি ফ্যাল ফ্যাল করে দেখবাে.. আর করতে
পারবাে না কিছুই—তাতে হতে পারেনা মক্ষিরাণী ! দিব্যিটা
এখনই কোরে ফেল দেখি---আমিটি স্বর্গে গেলে বিয়েটি আর
কোরবেনা---
স্ত্রী। ভালাে বিপদ! তাই কি আমি পারি ?
চাষ। খুব পায়রা বাপ-মা জ্ঞানী লােক-সাধে কি আর নাম
রেখেছিলেন মক্ষিরাণী—তাই ত আমি বলি---
মিহির। থাক্ থাক্‌ ওসব ঘরের কথা..ওসব ঘরে গিয়েই...
চাষ। ঘরের কথা! কে না জানে মশাই! আচ্ছা বেশ, চলােত ঘরে
-তারপর সে আমি দেখে নিচ্ছি—( খনাকে) যে উপকারটা আঙ্গ
করলে মা—( স্ত্রীকে) দিব্যি কর---দিব্যি কর-কর এখনও দিব্যি-

n - থাক না এখন। আসুন-আপনারা এখন আসুন।
;
কোলাহল করিয়া
করিল
মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে তাে খনা দেবী ?
খনা। অর্থ?
মিহির। কিন্তু আমি বলি লােক-সমক্ষে আমাকে এত হেয় করবার এই
চেষ্টার কি কোন প্রয়ােজন ছিল ? শৈশবে সাগর-জলে ভেসে এসে
আমি এই সিংহলে কূল পেয়েছিলুম ; তােমার পিতা-মাতা দয়া করে
আমাকে লালন-পালন করলেও আমি কুলহীন, গােত্রহীন—এই
অখ্যাতি এই অমৰ্যাদাই কি যথেষ্ট নয় রাজকন্যা?
খনা। যে আমাকে রাজকন্যা বলে সম্বােধন করে তার কথার উত্তর
দেওয়া না দেওয়া আমার ইচ্ছাধীন।
মিহির। তার পূর্বে জানা আবশ্যক অন্য কোন নামে অভিনন্দন করবার
অধিকার আমার আজ আছে কিনা! বিশেষ গুরুদেবকে রাজপুরীতে
যে উদ্দেশ্যে ডেকে নেওয়া হয়েছে--তা জানবার পরও?
খনা। সেই অধিকারই সত্যিকার অধিকার— কোনক্রমেই কেউ
কোনদিনই ত্যাগ করবে না ! না—আজও না। যে কোন
নামে, যে কোনরূপে অভিনন্দন করবার অধিকার আমি
দিতে পারি—হয়ত বা দিয়েছিলাম, কিন্তু সে অধিকার যদি
কেউ ত্যাগ করে-ইচ্ছাতেই হােক আর অনিচ্ছাতেই হােক
--আমি ‘ববাে সে আমাকে কোনদিনই গ্রহণ করে নি
অন্তরের সঙ্গে।

প্রথম অঙ্ক *শব্যস্তে মহাকালের প্র মহাকাল। এই যে! তােমরা! শুনেছ খনা মার বিয়ে (কোন উত্তর না পাই শুনেছ-আমি বরং শুনলুম অনেক পরে। তা হােল্ক আর সময় নেই.. মহারাজ বলেছেন আজই ঘােটক বিচার করে দিতে হবে। মিহির, এসােত বাবা আমাকে একটু সাহায্য কর। খনা মা! বিয়ে হলেও জ্যোতিষ চর্চাটা ছেড়না—তুমি মা সাক্ষাৎ সরস্বতী এস মিহির-এই হচ্ছে খনার জন্মপত্রিকা—আর এই হচ্ছে রাহুলের খনা। মাকে আমি বলেছি গুরুদেব, রাহুলের সঙ্গে আমার বিবাহ মহাকাল। সে কি না! সব যে ঠিক্ ! অবশ্য মােটক বিচারাদি এখনও হয়নি। কিন্তু তা--- খুন। যোটক বিচার করতে হয় করুন। কিন্তু আমি আমার ভাগ্য- রেখা বিচার করেছি। অন্য কোন বিচার না হয় থাক। আমি বলছি বাহুলের সঙ্গে আমার বিবাহ হবে না। মহাকাল। বড়াে গােলমেলে কথা! কিন্তু মা, আমি ত যােটক বিচার না করে পারি না। মহারাজ আমায় ডেকে বললেন--কালই আছে লগ্ন--কালই হবে বিয়ে। আমি বরং বলেছিলাম এত তাড়া কেন? তিনি বলেন, বিশেষ কারণ আছে। গােপনে আমায় বললেন- তা তােমাদের বলতে বাধা নেই, কারণটা বিশেষই বটে। মহারাজ হয়েছেন বৃদ্ধ-জরা-জীর্ণ। সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, নঙ্কার রক্ষবংশ বিদ্রোহ ঘােষণা করতে বদ্ধপরিকর হয়েছে। তারা বলছে বাঙলার ৭ 4 गाया 4 হির বিজয়সিংহ প্রটিষ্ঠিত সিংহ-বংশের শাসন আর আমরা সইবাে না— মধ্যেই তার দাবী জানিয়েছে-শঙ্কার কথাটা তত অন্যায় নয় মা। মহারাজ vছু স্থির করেন নি—কিন্তু রাহুলের সঙ্গে তােমার বিবাহ স্থির করে ফেলেছেন। রাহুল হচ্ছে বিজিত রক্ষ রাজবংশের শেষ বংশধর। তার সঙ্গে সিংহ-বংশের একমাত্র উত্তরাধি- কারিণী তােমার বিয়ে হলে লঙ্কার রক্ষ-রাজবংশের সঙ্গে বাঙলার সিংহ-বংশের যে মিলন সংস্থাপিত হবে তাতে সম্ভাবিত রক্ষ-বিদ্রোহ অসম্ভব হবে—দেশের শান্তি অক্ষুন্ন থাকবে। তা রাহুল ও মা তােমার অনুরাগী এবং বংশমর্যাদায় ও গুণ-গরিমায় তােমার সৰ্ব্বাংশে উপযুক্ত নয় মা? কি বল মিহির ? মিহির। দেশের শান্তি রক্ষার্থে।-- খনা। (দপ, করিয়া জ্বলিয়া উঠিয়া ) দেশের শান্তি অশান্তি বিচার না করে গুরুদেবের আদেশ প্রতিপালন কৰ্তে ৰােটক বিচার করাই বরং ভালাে ( ইহাতেও তৃপ্ত না হইয়া) গুরুদেব! গুরুদেব ! স্বামী স্ত্রীর অগ্র-পশ্চাৎ মৃত্যু গণনা বে করতে পারেনা তাকে আপনি আপনার সাহায্যের জন্য ডাকছেন তাও বা সহ্য হয়—কিন্তু এ আমি সহ করতে পারিনা যে ••এত আঘাতেও আপনার ঐ শিয়াের চৈতন্য হয় না। কাপুরুষ আর কাকে বলে আমি ত জানিনা গুরুদেব ! মহাকাল। ব্যাপার কি মিহির ? তােমাদের উভয়ের মধ্যে কি কোন কলহ হয়েছে ?

থ অদূরে রাইলের প্রবেশ --না কলহ করবে কেন ! ছিঃ তােমরা দুজ প্রতিপালিত হয়েছ ঠিক যেন সহােদর ভ একসঙ্গে খেলা ধূলা করেছ, আমার এখানে বিদ্যাভ্যাস করেছ, তােমাদের মধ্যে যে কলহ বড়ই অশােভন—বিশেম খনার এই শুভ পরিণয়ের প্রাক্কালে। খনার বিবাহের অনেকখানি ভাৱই যে তােমাকে নিতে হবে মিহির। উৎসবের ব্যবস্থা, বিবাহের আয়ােজন, সবই নে তােমাকে দেখতে হবে। না—মিহির, খুব উৎসাহ নিয়ে আমার সঙ্গে এসে দেখি•••চুল আমার নিভৃত-কক্ষে, যেটক বিচারটা খুব ভালাে করে করতে হবে। খনা মা হচ্ছে খেয়ালী মেয়ে ! বলে কিনা রাহুলের সঙ্গে আমার বিয়ে হবে না। মেয়েরা অমন বলেই থাকে। এ ত ঐ বলছে অন্য মেয়ে হলে বলতো- রাহুল। বলতাে...“সে কি মা বিয়ে! আনি কৰ্ক না”। মহাকাল। এই যে রাহুল! এসে পড়েছ বাবা! ভালই হয়েছে। শুনলে ত সব। দু ভাই বোনের এই ঝগড়া মেটাতেই বিলম্ব হয়ে গেল। তা তুমি খনা নার সঙ্গে একটু গল্প কর আমি আর মিহির একটু ঘােটক বিচার করছি।-~- মিহিরকে লইয়া অন্যত্র প্রস্থান রাহুল। খনা দেবী ! আমার সঙ্গে তােমার বিবাহ হবে না একথাটা তােমার নিজের মুখে শুলে বলার ভঙ্গি দেখে বুঝতে পাৰ্ত্তাম ওটা বিরাগ সূচক কি অনুরাগ সূচক। (খনা উত্তর দিল না ) “মৌন ‘সম্মতি লক্ষণ” শাস্ত্র বাক্য। অতএব ধরে নিচ্ছি— খনা। বেশ তে ধরুন না, আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে হ’ল। তারপর ? .j|পর ? রাহুল। জীবনের স্বপ্ন। স্বপ্নের জীবন! খনা। বেশ বেশ! তারপর? রাহুল। তারপর, "তুমি বল খনা, আমিই কি আজ সব কথা কইব ? ভুমি কি কিছুই বলবে না? বনা। বলার জন্য আমি ছট-ফটু কচ্ছি। বলি? বাহুল। বলল- খনা। বৃদ্ধ পিতা আর কয়দিন! যেই চোখ বুজেছেন অনি—আকাশ- বাতাস প্রকম্পিত করে মহা-মহাসমারােহে হবে অভিষেক উৎসব। কি উজ্জল দৃশ্য ! স্বর্ণ-সিংহাসনে রাজ-ত্রতলে রক্ষকুল বন্দিতা বালার সিংহ-কন্যা আমি। আর পদতলে তুমি কি উচ্চপদ চাও রাহুল? —মন্ত্রীত্ব ? মন্ত্রীত্ব চাওনা?.•সেনাপতিত্ব তোমায় দিতে পারব না: বেশ তবে.••কৃষিবিভাগ ? বাহুল। ধনা! খনা। পনা। কৃষিবিভাগ যদি অভিলাষ নয়,কলাবিভাগ ? বাহুল। খনা! আমি তােমার স্বামী। পনা। ( সহজভাবে ) তুমি ভুলে যাচ্ছ ঘােটক বিচারও বাকী-- বাহল। ঘােটক বিচারের আবশ্যকতা যার আছে তার থাক্। অন্য কোনরূপ বিবাহে আমার অরুচি নেই, তবে আমি নিজে বিশ্বাস করি বাক্ষস বিবাহ। রাক্ষস বিবাহ কি জানাে? ১০

প্রথম অক্ষ
খনা। নিশ্চয়ই জানি। হই না কেন ।
করছি রাক্ষসের দেশে। রাক্ষস কি ?
জানি। কিন্তু তুমি অনর্থক উত্তেজিত
বিবাহই হােক উত্তরাধিকারীত্বের বিধান বদলাবে না! রাজকুমার
যেখানে নেই, সেখানে সিংহাসন হচ্ছে রাজকন্যার, রাজ-জামাতার
নয়। না---না রাহুল, রাক্ষসের রক্তচক্ষুতে কিংবা তার পশু-
শক্তিতেও এ বিধান বদলায় না..•বদলাবে না।
রাহুল। যদি তােমাকে হত্যা করি?
অনা। তবে আমাকে বিয়ে করা হয় না।
রাহুল। আমি তােমাকে--আমি তােমাকে ভালবাসি না-...
না। কিন্তু খনা কাকে ভালবাসে তা তুমি জানাে না।
রাহুল। সে আমি অনুমান কৰ্তে পারি খন-তবু আমাকে দয়া কর্তেই
বলছি না। সত্যই আমি তােমাকে ভালবাসি। রাক্ষসের
ক্ষুধার মতাে সুতীব্র অত্যুগ্র আমার প্রেম তুমি উপেক্ষা করাে,
করােনা খনা তুমি আমায় দয়া কর, দয়া কর•• 'খনা !
না। দয়া করে প্রেম হয় না রাহুল। তুমি কিছু জানাে না—কিচ্ছ
জানাে না রাহুল
বাহুল। যদি বলি সিংহাসনে তুমিই উপবেশন করে পদতলেই
আমি বসবাে-
না। বলােনা, বলােনা রাহুল ও কথা বলােনা। এতগণ যদিও
কথা কইছি—চেয়ে দেখছি—এ কথা বললে এইখানেই নিবেদন
ইতি-এবং যবনিকা পতন!

খনা তােমার বলবার আছে এবং আমার শােনবার ।। বরং তুমি শুনতে পার - রাহুল। কি ? খনা। একটা গান -গান- চাঁদ ওঠে উজলিয়া গগনে কতজনে মুঠি ভরি ধরে তার স্বপনে ! তারে কিবা কব আর যেবা জেগে অনিবার চায় সুদূরের শশী--তার নিজ ভবনে । মহাকাল ও মিহিরের প্রবেশ। হাতে জন্ম পত্রিকা মহাকাল। এই যে ! বেশ ! বেশ !..কিন্তু একটু গােলমাল হয়ে যাচ্ছে যে : ক্ষত্র বিট শূদ্র বিপ্রাঃ । ক্রমানন্মষাদি রাশয়ঃ । পুংসাং বর্ণাধিকা কন্যা নৈবােদ্বাহা কদাচন। বরের বর্ণাপেক্ষা কন্যার বর্ণ শ্রেষ্ঠ হইলে সেই কন্যাকে কদাচ বিবাহ করিবে না। এখানে ঠিক তাই হচ্ছে -চিন্তনীয় বটে। ১২ প্রথম অব মিহির। চিন্তনীয় কি বলছেন প্রভু! এ বিবাহ কখনও হতে পারে । অষ্টমে পাপগ্ৰহঘদি জ্যোতিষ সত্য হয়, এ বিবাহে ল কন্যার মৃত্যু! হাকাল। মহারাজ এদিকে সব আয়ােজন প্রস্তুত করে ফেলেছেন- অথচ এই বিচারের পর আমিই বা তাকে কি করে বলি এ বিবাহ গ্রে---তিনিই বা কি করে জেনে শুনে এ বিবাহ দেন ? না। তাইতাে! কি হবে গুরুদেব । ল। বুঝলাম। উত্তম ! আমার পথ আমিই দেখছি। উত্তম ।...এখনি যদি বিবাহের বাদ্য বেজে ওঠে..চমকে উঠানা রাজকন্যা না। বিবাহের বাদ্য শােনবার জন্য কুমারীরা উন্মুখ হয়েই থাকে না ! 5মকা না ! হলের প্রধান উত্তম ! কাল । না- না-এ সব কি কথা ! মিহির.এস ---গার একবার বরং ভাল করে-- না। ঐ অন্যমনস্ক শিষ্য নিয়ে ? তবেই হয়েছে। যদিও কিছু আশা ভরসা ছিল..তাও গেল। মহাকাল। না--না,-তা হলেনিহির তুমি বরং...। আজ তোমাকে একটু অন্যমনস্কই দেখছি বটে। আচ্ছা, মা, তুমি নিজেই এসে ন? 1 আমি ত দেখেছি এ বিয়ে হবে না। বর আপনি আনার

খনা
মহাকাল। হ্যা মা...কিন্তু বিয়েটা হলেই বড় ভাল তো আমাদের
রক্ষ কুলের বন্ধু যদি তুমি হও মা, আমাদের কুল হবে উজ্জ্বল, আনন্দ
হবে আমার সব চেয়ে বেশী—কারণ আমি জানি তুমি কি ! না--মা,
আর দেরী করব না-রাহুলের গতিকটা ভাল দেখলাম না, কখন
কি করে বসে কে জানে। আমি বরং মহারাজের কাছে গিয়েই
সব বলে আসছি--
খনা। না, তা হলে তাে আপনার আর কিছুতেই দেরী করা চলে না।
মহাকালকে রওনা করিয়া দিলেন
সত্যই আর দেরী করা চলে না। কখন কি হয় কে জানে (ভূমিতে
রেখাপাত করিয়া কি দেখিয়া ) শনিবার-বার-দোষ নেই, তিথি
নিষেধ নেই—প্রশস্ত নক্ষত্র—অতএব গােধূলি লগ্নেই আজ আমার
বিয়ে। মিহির !
মিহির নীরব রহিলেন
খনা। কি কথা কইছ না যে? দেশের শান্তি ?
মিহির। রাহুলের সঙ্গে তােমার বিবাহ হতে পারে না। কখনাে না-
এ বিবাহ হ'লে তােমার নিশ্চিত অকাল মৃত্যু
খনা। দেশের শান্তি অশান্তি যে বিচার কৰ্ত্তে যায় তার মুখে একথা!
কিন্তু একথা শশানে কে! দলবল নিয়ে রাহুল এখুনি আছে...
আজই হবে আমার বিয়ে ।
মিহির। অসম্ভব ! রাহুলের সঙ্গে তােমার বিবাহ--আমি জীবিত
থাকতে নয়।
১৪

প্রথম অংক A খনা। আমার জীবনের জন্য তােমার এ দরদ বিচিত্ৰই বােধ হচ্ছে মিহির। মিহির। বিচিত্র বােধ হবে বৈকি! ভূমিকম্প যেদিন হয় সেদিন বিচিত্রই বােধ হয়...কিন্তু সে কি একদিনের রচনা ?,একদিনের রচনা খনা? দিনের পর দিন-রাতের পর রাত-বর্ষের পর বর্ষ, তােমার চোখের আড়ালে তােমার জ্ঞানের অন্তরালে তোমার মনের অজ্ঞাতে: তিলে তিলে..ধীরে ধীরে চুপি চুপি সে হয়েছে রচিত। আজ••আজ হয়ত সেই ভূমিকম্প-খনা ! যে বিবাহে তােমার জীবনহানি অবধারিত, আমার জীবন থাকতে সে বিবাহ আমি হ'তে দেব না-দেব না খনা ! খনা। যদি আমার পিতামাতা এ বিবাহ চান ? মিহির। আমি তা মান্বাে না। অনুভব কর্তে পারি---অনুভব কত্তে পাচ্ছি আমি..জীবনে এমন মুহূর্তও আসে যখন মনে হয় এবং তা মিথ্যা নয় যে, তােমার পিতামাতার চেয়েও আমি বড় • আমার জীবনে সেই মুহূর্তই হয়তাে এসেছে। তাই আজ আমি সকল বাধা সকল বিঘ্ন তুচ্ছ করতে পারব তােমার জন্য। না। হঁ্যা ভূমিকম্পই মনে হচ্ছে বটে। কিন্তু আনার কি গতি হব বলত? রাহুলকে না হয় তাড়ালে, কিন্তু তারপর? সে আমি জানিনা খনা। খনা। তবে কি জানব আমি! একি সেই মুহূর্ত নয় মিহির যে মুহূর্তে তােমার মনে হচ্ছে তুমি আমার আত্মীয় স্বজন পরিজন সবার চেয়ে বড় ? তা যদি হয় আমার মনের দিকে..মুখের দিকে তুমি চাইতে বাধ্য-বাধ্য- মিহির।

খণ
মিহির। আমি কি বুঝছি না খনা..বুঝছি না খনা তুমি কি
বলছ? কিন্তু তুমি হয়তাে ভুলে গেছ,- ভূলেই গেছ খনা,
আমি গােলহীন, গৃহহীন অজ্ঞাতকুলশীল নিঃস্ব মুবক। এই
রূঢ় সত্যিটি স্মরণ করেও কি আমার সঙ্গে এমনি খেলা
খেলবে তুমি?
খনা। খেলা ! যা হ’ল জীবন-মরণের কথা--মান-সম্মানের কথা
তাই হ’ল পেলা! বাঙলার সিংহ-বংশের এক কন্যাকে ভয়ে
আত্মদান করতে বাধ্য করবার জন্য আছে লঙ্কার অনাৰ্য রাক্ষস
তার নাম খেলা! ভারতীয় আর্য-বক্তকে কলঙ্কিত, লাঞ্ছিত করবার
জন্য উন্মুক্ত তরবারী হাতে ছুটে আসছে অনাৰ্য রাক্ষস পার্শে
দণ্ডায়মান তুমি..এক ভারত সন্তান
মিহির। ভারত সন্তান!
খনা। হ্যা তুমি ভারত সন্তান নির্বিকার চিত্তে
...বলছ কিছু
নয়, খেলা !
মিহির। আমি ভারত সন্তান ?
খনা। হঁ্যা, তুমি ভারত সন্তান?
মিহির। কি বলছ খনা? তুমি কি বলছ না ?
খনা। জ্যোতিব যা ঘােষণা করেছে তাই বলছি মিহির।
মিহির। আমি ভারত সন্তান !
খনা। তুমি ভারত সন্তান!
মিহির। কে বলে?
না। আমি। বহু বর্ষের সাধনায় আমি স্বয়ং রচনা করেছি

প্রথম অক তােমার জন্ম-পত্রিকা। যদি জ্যোতিষশাস্ত্র সত্য হয়, আমি ঘােষণা কচ্ছি তুমি ভারত সন্তান, ভারতবর্ষের পরম পবিত্ৰ আৰ্য-বংশ জাত। পিতা তােমার বিশ্ববিখ্যাত মণীষী, মাতা সাক্ষাৎ ভগবতী। মিহির। সত্য ! সত্য ? খনা। অক্ষরে অক্ষরে সত্য। মিহির। খনা! খনা! তুমি যখন বলছ•••তবে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নেই। নব-জন্ম—আজ আমার নব-জন্ম। কোথায়••• কোথায় আমার সেই জন্ম-পত্রিকা? কে কে আমার পিতাকে আমার মাতা ? খনা। পিতৃ-পরিচয় লাভ করবার সে শুভক্ষণ তােমার জীবনে এখনও আসে নি মিহির। যখন আসবে...তােমার প্রশ্নের অপেক্ষা কৰ্ব্বনা। •••সেই হবে আমার জীবনের সর্বাপেক্ষা গৌরবময় মুহূর্ত..কিন্তু তা আজ নয়। মিহির। কিন্তু খনা—কিন্তু খনা- খনা। বৃথা তুমি ব্যাকুল হ’চ্ছ মিহির ! পিতৃ-পরিচয়ের জন্য শুভ মুহূর্তের যে অপেক্ষা যে অপেক্ষা করতে হয়। জ্যোতিষের এ জ্ঞান- টুকুও কি তুমি হারালে? ( হঠাৎ কি দেখিয়া চীৎকার করিয়া উঠিলেন) এ কি! তিলক। এমন কেন ? কি সর্বনাশ! মিণির। তিলক! তাইতাে! উন্মুক্ত রক্তাপ্লুত অসি হস্তে ছুটে আসছে-- ১৭ २

কৈশাের যৌবনের সন্ধিক্ষণে অবস্থিত তিলক উন্মুক্ত
রক্তাল্পত অসি হস্তে ছুটিয়া আসিল
{
খনা। এ কি তিলক! এ ভাবে তুমি-
তিলক নীরব রহিল
কি করেছি! তুই কি করেছিস?
তিলক। রাহুলকে আমি বধ করে এলাম দেবী
খনা। উঃ..কেন--কেন তিলক ?
তিলক। তুমি তাকে কি বলেছ জানিনা। সে এখান থেকে গিয়ে
একদল রাক্ষসকে ধর্মের দোহাই দিয়ে উত্তেজিত করে—অস্ত্র-শস্ত্র
নিয়ে এখানে আসছিল, আর ঘােষণা কচ্ছিল “সিংহ-বংশের সিংহিনী
আজ রক্ষ-বংশের দাসী হবে-কে দেখবে এস।” আমি তােমাকে
রাজপুরীতে নিয়ে যেতে আসছিলাম। পারলাম না আমি তােমার
সে লাঞ্ছনা সইতে। সােজা গিয়ে রাহুলকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করলুম
সে আমাকে কশাঘাত করে হেসে উঠলাে। অশ্লীল অভদ্র ভাষায়
সে পুনরায় তােমায় লাঞ্ছিত করল। সহ্য করতে পারলাম না, আমি
ছুটে গিয়ে তার বুকে তােমার দেহরক্ষার এই অসি আমূল বিদ্ধ করে
তার রসনা দিলাম চিরতরে স্তব্ধ করে।
খন। তিলক ! তিলক! তুমি আজ আমার জয় তিলক ! তারপর
--তারপর তিলক ?
তিলক। কথার সময় নেই দেবী ! উত্তেজিত রক্ষগণ তােমায় বন্দিনী
করতে ছুটে আসছে। এই নাও আমার অস্ত্র, রাহুলের রক্ত রঞ্জিত
১৮

প্রথম অs
এই বিজয়-অস্ত্র •••আমি রক্ষ-বিদ্রোহের সংবাদ মহারাজকে জ্ঞাপন
করতে চললাম—যতক্ষণ না রাজসৈন্য এসে উপস্থিত হয়, যে প্রকারে
পার আত্মরক্ষা কর।
খনাকে অসি দিয়া ছুটিয়া চলিয়া গেল
মিহির। এখুনি তারা আসবে। তােমার ঐ অলি আমায় দাও খনা-~-
খন। জীবন-মৃত্যুর এই সন্ধিক্ষণে এই পুণ্য-পুত অসি আমি শুধু তারই
হাতে তুলে দিতে পারি মিহির-যে ধৰ্ম্মসাক্ষী করে আমায় বুকে
টেনে নিয়ে বলবে, আমি তােমার ইহকালে---পরকালে---
মিহির। খনা!--খনা !
খনা। হঁ্যা, তারই হাতে,—শুধু তারই হাতে আমি দিতে পারি
এই অসি.••তা যদি না দিতে পারি...এ অসি নারীর দুৰ্বল
হস্তেই শােভা পাবে-বলিষ্ঠ সবল পুরুষ তুমি দাড়িয়ে তাই
দেখবে।
মিহির। খনা! ধৰ্ম্মসাক্ষী করেই বছি খনা, দাও তােমার অসি:
আমার ভীরু প্রেমকে তুমি-তুমিই যখন দিলে সাহস, আর আমি
ভয় করি না খনা। ঊর্ধের আকাশ-অন্তরের অন্তর্যামী—তিলকের
অসি এবং রাহুলের রক্ত সাক্ষ্য রেখে আজ এই গােধূলি লগ্নে আমি
তােমার পাণিগ্রহণ করলাম খনা !
তরবারি হইতে রক্ত লইয়া দ্বারা খনার সীমান্তে
সির রেখা টানিয়া দিলেন, খনা তাহাকে
প্রণাম করিয়া উঠিয়া ‘ড়াইলেন

খনা খনা। মিহির! প্রিয়তম! আর দেরী নয় এইবার তবে ছুটে চল- মিহির। কোথায়? কোথায় ? খনা। সমুদ্রের বুকে মিহির। কেন—কেন খনা? খনা। পিত্রালয়ের খেলা ভাঙলাে। বধূ চলাে স্বামীর হাত ধরে’- শ্বশুরালয়ে—সমুদ্রের ওপারে.. ভারতবর্ষে ! মিহিরকে টানিয়া লইয়া খনা সমুদ্রের দিকে অগ্রসর হইল সানুচর রক্ষনায়ক বিশালাক্ষের প্রবেশ বিশালাক্ষ। ঐ যে খনা.. পালাচ্ছে, সাবধান ! রক্ষগণ তাহাদের লক্ষ্য করিয়া তীরক্ষেপে উদ্যত হইল। খনা নৌকায় উঠিতেছিলেন ফিরিয়া আসিলেন। পশ্চাতে আসিলেন মিহির। বিশালাক্ষের সম্মুখে গিয়া খনা। কি চাও? বিশালাক্ষ। প্রতিশােধ-রাহুলের মৃত্যুর প্রতিশােধ। খনা। অর্থাৎ আমার মৃত্যু চাও ? বিশালাক্ষ। না। যত অসভ্যই তােমরা আমাদের মনে কর না কেন, স্ত্রী-হত্যা আমরা করি না। খনা। তবে ? বিশালাক্ষ। রাহুলের অন্তিম-বাসনা আমরা করব চরিতার্থ।' সিংহ- বংশের সিংহিনী! দর্প আমরা তােমার ক’রব চূর্ণ। রাৰ্থলের শবদেহের সঙ্গেই হবে তােমার বিবাহ - ক প্রথম অক, খনা। শবদেহের সঙ্গে বিবাহ ! চমৎকার ! কিন্তু একটু বিলম্ব হয়ে গেছে সেনাপতি। বেশী নয়, সামান্য, বিবাহ আমার হয়ে গেছে। বিশালাক্ষ। বটে! কার সঙ্গে বিবাহ হ’ল শুনি? খনা। কুলত্যাগ করে যার সঙ্গে অকূলে ভাতে যাচ্ছি—দেখছো না ? বিশালাক্ষ প্রভৃতি। মিহির খনা। মিহির। বিশালাক্ষ। হাঃ হাঃ হাঃ ওসব আমরা মানি না। ( অনুচরদের প্রতি) বন্দী কর। খনা। বন্দী কর ! বটে! উত্তম ফিরে চল মিহির—প্রাসাদে। মিহির। সে কি খনা খনা। হা ফিরে চল প্রাসাদে। মূর্থের দল।•••ওরা এসেছে আমাকে বন্দী করতে। ভুলে গেছে যে আমি রাজকন্যা, সিংহল-সিংহাসনের ভাবী উত্তরাধিকারিণী। না তবে আর দ্বিধা নয় মিহির। ফিরে চল,—ফিরে চল প্রাসাদে। মিহির। কিন্তু খনা। কিন্তু নয়। ফিরে আমাকে যেতেই হবে। কেননা, ওরা স্বাধীনতা চায় । ওরা—ওরা চায় চির-অধীনতা। ওরা চায়—আমি ফিরে গিয়ে ওদের শাসন করি, পেষণ করি, ধীড়ন করি। শুধু আজ নয়-বংশ-পরানুক্রমে, চিরদিন চিরকাল- রক্ষগণ। না, কখনাে না- ২১

=
খনা। হাঁ তাই। তা না হলে আমার অভাবে--সিংহ-বংশের উত্তরাধি-
কারীত্বের অভাবে-লঙ্কায় রাক্ষস-রাজত্বের হবে পুনঃ প্রতিষ্ঠা
এ কথা জেনেও কেন-কেন বাঙলার সিংহ-কন্যাকে বন্দনা
কার জন্য 'বন্দী করে ঘরে নিয়ে যেতে চায় ? কেন ?
কেন ?
রক্ষগণ। না না, চাই না।
খনা। সেনাপতি।
বিশালাক্ষ। না, চাই না।
খনা। তবে বিদায়।
মিহিরের হাত ধরিয়া সমুদ্রের দিকে যাইতেছিলেন। এমন সময়
অদূরে সামরিক বাদ্যসহ রাজ-সৈন্যগণের ধ্বনি শােনা গেল---
ক্রমে ক্রমে সেই ধ্বনি নিকটতর হইতে লাগিল
সিংহলেশ্বর জয়তু !
সিংহলেশ্বর জুয়তু!
সিংহলেশ্বর জয়তু!
বিশালাক্ষ। ( সাতঙ্কে ) রাজসৈন্য ।
রক্ষসৈন্যগণের মধ্যে বিষম চাঞ্চল্য—তাহারা পালাইতে চাহিবে এমন সময়ে
খনা। রক্ষদল! বন্ধুদল ! যদি দেশের স্বাধীনতা চাও, পালিয়ে না-
পালাতে দাও আমাকে। রাজসৈন্য এসে যদি দেখে তাদের
রাজকন্যা রাজ্য ছেড়ে-সিংহাসনের অধিকার ছেড়ে স্বামীর হাত
ধরে’--স্বামীর ঘর ক’তে চললাে চিরতরে—তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ছুটে
২২

প্রথম অক. এসে আমায় ধরে রাখবে।"বধূ হারাবে স্বামীর ভিটা-তােমর হারাবে স্বাধিকার, বুঝেছ-বুঝেছ কি বন্ধুদল? যদি বুঝে থাক- জীবন পণ করে স্বাধীনতার এই অপূৰ্ব সংগ্রামে ক্ষণেক দাড়াও শুধু ততক্ষণ যতক্ষণ না আমরা সমুদ্রের ঐ দিক্‌চক্ৰবালে মিশে যাই চিরতরে বন্ধু—চিরতরে । বিশালাক্ষ। দেবী ! দেবী! আজ তােমার এ কি রূপ দেখলাম দেবী! নির্যাতিত-উৎপীড়িত-রক্ষকুলের মহিমময়ী মা ! তােমার সৈন্য আজ আমরা। (জানু পাতিয়া) আশীৰ্বাদ কর । খনা। নির্ভয় হও। লঙ্কা স্বাধীন হােক। বিশালাক্ষ ও সৈন্যগণ নতজানু হইয়া আশীর্বাদ গ্রহণ করিল-খন। মিহিরের হাত ধরিয়া সমুদ্রপথে ছুটিলেন

দ্বিতীয় অঙ্ক
বরাহের পাঠগৃহ
সন্ধ্যা-রাত্রি
গান গাহিতে গাহিতে মনিকা ও তরলিকা ধূপের ধোয়া দিয়া
সন্ধ্যা-রাত্রিকে অভ্যর্থনা করিয়া লইল
উভয়ের গীত
তরলিকা।
মনিকা।
তরলিকা।
সন্ধ্যায় অলকে
নীপ বাঁধি বল কে
বাতায়নে বসে একা নীরবে,
ধূপ-ধোয়া-গন্ধে
মন নাচে ছন্দে
জোছনায় একা ঘরে কি রবে ।
আজি এই সন্ধ্যায়
কার পানে মন ধায়
বল দেখি মুখ খুলে বালিকা
যেবা আসে স্বপনে
তারি গলে গােপনে
দেব কবে তুলে মম মালিকা!
২৪
মনিকা।

দ্বিতীয় অঙ্ক
নয়।
তর। কি সুন্দর জ্যোৎস্না, পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে।
মদ। (দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া) বিভাবরী বিষধরি ভােগস্য ভিমােমনি
তর। সে আবার কি ?
মদ। ওকি চাদ না সূৰ্য্য ?
তর। সন্ধ্যারাতে সূৰ্য্য ?
মদ। তাইত, তবে চাদই। না, তাও নয়। চন্দ্রের কিরণ ত এত প্রখর
ও দাবানল সখি, দাবানল ।
তর। দাবানল আকাশে? সে কি সখি ?
মদ। তবে বর্জ।
তর। কিন্তু আকাশে মেঘই বা কই ?
মদ। হয়েছে সখি হয়েছে। রাত এলেই বিরহিণীদের কি মনে হয়
জান? মনে হয় এ ত রাত নয়, যেন সাপ, আকাশের ঐ যে চাদ
সে ঐ সাপেরই মণি !
এ কবিত্বের কাছে কালিদাসও পরাজয় স্বীকার করবেন সখি ।
মদ। ছিঃ সখি, (কালিদাসের উদ্দেশে নমস্কার) ও কথা মুখে আলেও
পাপ হয়। এ যে তারই শ্লোক।
তর। মাভৈঃ! মাভৈঃ ।
যদ। কাকে বলছ সখি?
তর। তােমাকেও...আর ঐ যে লােকটি হন্তদন্ত হয়ে এদিকে ছুটে
আছে•••ওকেও।
মদ।' (তাহাকে দেখিয়া সােল্লাসে) সখি ! সে আছে..ছুটে আছে-
তর। মাভৈঃ! মাভৈঃ!
২৫
তর।
!
ক

ছুটিয়া পুথিহন্তে কামন্দকের প্রবেশ
কামক। রক্ষ মাং-রক্ষ মাং-
তর। মাভৈঃ•••মাভৈঃ•••ব্যাপার কি? ব্যাপার কি ?
কাম। (পশ্চাতে অবলােকন করিতে করিতে) বিষম ! ভীষণ ! ভয়ানক!
পুথিগুলি ধর তরলিকা!
তর। (পুথি লইয়া ) মনিকা!
ব্যজন করিতে ইঙ্গিত
মদ। ( ব্যজন করিতে করিতে) ভয় পেয়েছেন?
কাম। আমি পুথিগুলি নিয়ে শাস্ত্রালােচনার জন্য তােমাদের এখানে
আছিলাম—হঠাৎ ঐ বাড়ীর সম্মুখে এক হস্তিনী
তর। হস্তিনী ?
কাম। মাভৈঃ—স্ত্রীলােক। গুড় নয়, হাত দিয়ে ইসারায় আমায়
ডাকলাে। কাছে গিয়ে দেখি-কঁছে। জিজ্ঞেস করলাম
এ ব্যাপার কি ?
তর। কি বলে?
কাম। “হে পান্থ পুস্তককর ক্ষণমাত্র তিষ্ঠ
বৈদ্যোৎসি কিং গণিতশাস্ত্রবিশারদোহসি।
কেনৌষধেন বদ, পশ্যতি ভৰ্ত্তর
কোৰ্যাগমিতি পতিঃ সুচির প্রবাসী।
আমার হাতে পুথি দেখেই ধরে নিয়েছে আমি হয় বৈদ্য না হয় জ্যোতি-
ৰ্বিদ এবং তাই সকাতরে তার অনুনয়, যদি বৈদ্য হও, তবে বল, কোন্
ঔষধি দ্বারা আমার ভর্তর কিনা আমার শাশুড়ীর কাণা চোখ
?
২৬

দ্বিতীন্ন অঙ্ক
ভাল হয়। আর যদি জ্যোতির্বিদ হও তবে গণনা করে বল, আমার
দীর্ঘকাল প্রবাসী পতি কতদিনে গৃহে আগমন করবেন। অর্থাৎ
মদ। অর্থাৎ?
কাম। আমার শাশুড়ী কাণা, চোখে দেখতে পাননাপতিও প্রবাসে।
অতএব
তর। অতএব ?--
কাম। বলেই হাত ধরে টানাটানি। একটি ফুৎকারে তার হাতের
প্রদীপটা নিভিয়ে দিয়ে ছুটতে ছুটতে
তর। এখানে এলেন? এসে ভালই করেছেন। সখীও এখানে বড়ই
বিপন্না।
এ গৃহে আর কেউ নেই, মাত্র আমরা দু’টি অবলা।
একটি মাত্র ভৃত্য। সে কাণা নয়, বােবা।
কাম। কেন, আচাৰ্য ? আচাৰ্যাণী ?
মদ। বাবা আর মা উভয়েই রাজপুরীতে আরতি দর্শন করতে গেছেন ;
শুধু আছে ঐ ভৈরব।
কাম প্রহরী তবে রয়েছে ?
শদ। ওর ভয়েই তাে মরি।
কাম।
কেন ? কেন ?
মদ। ও যেন একটা মূকদৈত্য: ক্রীতদাস বটে, কিন্তু কি জানি কেন,
ওকে দেখলেই আমার গা শিউরে ওঠে
কাম। • আমারও। ও রকম কুৎসিত বীভৎস ক্রীতদাস, তােমাদের মত
সুন্দরীর পাশ্বে যখন এসে দাড়ায়•••চন্দ্রগ্রহণ লেগে যায়। ও বৃদ্ধ
হয়েছে•••আচাৰ্য্যদেব ওকে মুক্তি দেন না কেন?
২৭

মদ। ও মুক্তি চায় না।
তর। ঐ যে দূরে ওর ছায়া দেখলাম।
মদ। প্রভুর অনুপস্থিতিতে প্রভু-কন্যার রক্ষণাবেক্ষণ করছে, কিন্তু ওর
কাণ্ড দেখলে বােঝা শক্ত, ও আমাকে রক্ষণ করবে না ভক্ষণ করবে!
কাম। তবু ভাল ও বােবা! নইলে ওর অভিযােগ আর অভিশাপে
অন্ততঃ আমি ভস্ম হয়ে যেতাম !
তর। আকারে-ইঙ্গিতে ও বাচালের চেয়েও বাকপটু।
মদ। হ্যা সখি! আমার ভয়ই হচ্ছে। ও হয়ত পিতার নিকট
অভিযােগ কবে আমরা বিশ্রম্ভালাপ করছি।
তর। অর্থাৎ সখি বলছে, বিশ্রম্ভালাপের চেয়ে কোন গুরুতর কার্যে
ব্রতী হবার ব্যবস্থা করুন।
কাম। না, না, না,এসাে আমরা শাস্ত্রালােচনা করি। আচাৰ্য্যদেব
এসে তা দেখলে প্রীত হবেন।
মদ। আমাকে কবিতা রচনা শিক্ষা দি।
কাম। কবিতা ? আচ্ছা, তবে শােন
“কবিতা বণিতা চৈব সুখদা স্বয়মাগতা
বলাদামানাচেৎ সরসা বিরসায়তে।”
কবিতা এবং বণিতা ইহারা উভয়েই স্বেচ্ছায় আগমন করলেই সুখপ্রদ
হয়। বলাৎকারে ইহাদের মাধুৰ্য্য নষ্ট হয়। শুধু তাই নয়—
“কবিতা কোমল বণিতা রসেন রসিতা
রসয়তি রসিকং যদি স পততি কঠিন হৃদয়ে
ভবত্যলগ্না প্রতিপদ ভগ্না।”
২৮

দ্বিতীয় অঞ্চ কবিতা এবং কোমল-বণিতা উভয়েই রসবতী, উভয়েই রসিক ব্যক্তিকে পরম প্রতিদান করে। কিন্তু অরসিকের হস্তে পতিত হলে প্রতি পদে দুরবস্থাপন্ন হয়। বুঝলে ? তর। সখীর পরম সৌভাগ্য যে আপনার ন্যায় রসিকের হস্তেই- কাম। বল কি তরলিকা, বল কি ? তর। সখীর কবিতা শিক্ষা হচ্ছে। মদ। (তরলিকার প্রতি কৃত্রিম কোপে ) যাঃ!-( বলিয়াই মুখ ঢাকিল ) কাম। কালিদাস বলেন— “অচুচুরচ্চারু চকোর লােচনা শিয়ং কিমিনোরথবাধু জন্মনঃ যতােজনঃ কশ্চনবীক্ষতে যুদা। পিধায় গােপয়তি চাননং তথা।” তর। অর্থাৎ ? কাম। ঐ যুবতী বােধ হয় চন্দ্রমার জ্যোতি অথবা নলিনীর শােভ অপহরণ করেছে। নতুবা মুখ ঢাকে কেন? মদনিক অধিকতর লজ্জায় মস্তক আবৃত করিয়া বসিল কালিদাস বলেন- “মধ্যং হরিণাং নয়নং মৃগীনা জহার সা চারুরুতং পিকীনা নচেদমীষাং কথ মায়তাক্ষী সদৈব সঙ্কোচন মাতনােতি।”

খনা বােধ হয় সুন্দরীগণ সিংহের কটিদেশ, হরিণের নয়ন এবং কোকিলের স্বর অপহরণ করেছে। নতুবা-(মনিকাকে দেখাইয়া) ওরূপ কেন ? তর। সখী রাগ করেছে। কাম। তবে আমি নই--কালিদাস কি বলেন শােন- “কোপয়া যদি কৃতাে ময়ি পঙ্কজাক্ষী সােহস্তু প্রিয়স্তব কিমত্র বিধেয়মন্যৎ। আশ্লেষমৰ্পয় মদর্পিত পূৰ্বমুচ্চৈ- দক্ষতং মম সমৰ্পয় চুম্বনঞ্চ।” হে পঙ্কজাক্ষী! তােমার মনে যদি আমার প্রতি ক্রোধ হয়ে থাকে তবে আমি তােমায় যা দিয়েছি, তুমি আমায় তা ফিরিয়ে দাও ফিরিয়ে দাও আমার আলিঙ্গন-আমার চুম্বন। ভৈরবের প্রবেশ ও সকলকে অবলোকন করিয়া প্রস্থান কাম। (ভৈরবকে দেখিয়াই ) এরূপ কলহ হবেই কিনা ? “মঙ্গলস্থ দশয়ান্তু কলহে বন্ধুভিঃ সহ।” আর এই যে অকস্মাৎ ভয়, এই যে ননস্তাপ তার কারণ বৃহস্পতি দশায় রাহুর অন্তর্দশা, কিনা— তর। নি, আর কথায় কাজ নেই। ঠাকুর ঠাকুরাণীর আবা সময় হয়েছে। কাম। এরূপ জ্যোতিষ-চর্চা হচ্ছে দেখলে আচাৰ্য্যদেব সুখীই হবেন- সুখীই হবেন। ৩০

দ্বিতীয় অঙ্ক
নেপথ্যে বরাহ। ভৈরব ! ভৈরব !
তর। ঐ আচাৰ্য্যদেব ।
মনিকা সভয়ে উঠিয়া দূরে সরিয়া গেল
আমার বড় জল পিপাসা পেয়েছে--আসছি (পলায়ন)
কাম। তাই ত আমারও যে কি একটাও ভাল কথা মনে পড়েছে।
আমি জ্যোতিষ-গ্রন্থই ভুলে’ ফেলে এসেছি। সেগুলি বাড়ী থেকে
নিয়ে আসছি।
বাতায়ন-পথে পলায়ন
মদ। তা হলে আমিও বরং-
পলায়নে উদ্যত এমন সময় নেপথ্যে বরাহ ডাকিল--“মদনিক!”
মনিকা শয্যায় পড়িয়া ঘুমের ভান করিল
বরাহের প্রবেশ।
পরে ধরণী ও ভৈরবের প্রবেশ
বরাহ। মনিকা এইখানে নিদ্রাভিভূতা?
ভৈরব ইঙ্গিতে জানাইল তাহা নহে
বরাহ। হাঁ, ঐ যে-~-
ভৈরব শব্যাপাধে গিয়া নতজানু হইয়া মদনিকাকে পরীক্ষা করিতে লাগিল
ধরণী। ভৈরব !
ভৈরব ছুটিয়া তাহার সম্মুখে আসিয়া করযােড়ে দাড়াইল
বরণী। ' তুমি আমার মেয়ের পাশে গিয়ে দাড়িওনা।
বরাই। কেন ? কেন ?

ধরণী। মেয়ে 'ওকে ভয় পায়। ওর চেহারার দিকে চাইলে তার মাথা
ঘরে। একদিন মুচ্ছাও গিয়েছিল। ভৈরব ! তােমাকে পূর্বেও
কতদিন বলেছি—আজও বলছি-তুমি ওর সম্মুখে যেয়াে না।
তােমার ছায়া যেন ওর গায়ে না লাগে। বুঝলে?
না
ভৈরব মনে ব্যথা পাইল কিন্তু আদেশ পালন করিবে সম্মতি জানাইল
বরাহ। তরলিকা—সে কোথায়? ভৈরব, তরলিকাকে ডাক।
ভৈরবের প্রস্থান
-
ধরণী। আমি বলি আর কেন ? ভৈরব বৃদ্ধ হয়েছে ওকে এখন মুক্তি
দাও।
বরাহ। ও মুক্তি চায় না।
ধরণী। ক্রীতদাস মুক্তি চায় না অদ্ভুত কথা। ওর হয়ত কোন দুরভিসন্ধি
আছে। সেই জন্যই তাকে বিতাড়ন করা আরাে বেশী প্রয়ােজন
হয়ে দাড়িয়েছে প্রভু!
বরাহ। দুরভিসন্ধি ! ভৈরবের দুরভিসন্ধি! হাঁ-না-তা (সহসা )
এতকাল আমাদের সেবা করেছে, মায়ায় বদ্ধ হয়েছে, তাই ও
মুক্তি চায় না।
বেদীর উপর রক্ষিত পুস্তকগুলি দেখিতেছিলেন হঠাৎ চমকিয়া
এ কি! শৃঙ্গার-তিলক! এ গ্রন্থ কে পড়ছিল ! মদনিক!
গ্রন্থ এখানে এলই বা কি করে?
ও সব প্রশ্নের চেয়ে আমার একটা গুরুতর প্রশ্নের উত্তর দাও
ধরুণী।

দ্বিতীয় অঙ্ক
বরাহ। কি ?
ধরণী। কন্যার বয়স কত হ’ল স্মরণ হয় ?
বরাহ। যতই হােক; কিন্তু তাই বলে এই শৃঙ্গার-তিলক! এ গ্রন্থ
এখানে এলো কি করে ?
ধরণী।
ও গ্রন্থটা নিয়েই বা তােমার এত মাথা ব্যথা কেন ? ওতে
কি আছে ?
বরাহ। তােমারই বা সে প্রশ্ন কেন? কন্যার বিবাহের কথা বছিলে,
তাই বল
ধরণী। তা শুছ কই ? কন্যার কৈশাের তাে গেছেই-যৌবনও
যে যায়-~
বরাহ। হাঁ, আমি পাত্র দেখবাে।
ধরণী। পাত্র ত চোখের ওপরেই রয়েছে।
বরাহ। কে ?
ধরণী। ঐ কামক।
বরাহ। কামক ব্রাহ্মণ ?
ধরণী। তােমার কন্যা বুঝি চণ্ডাল ?
বরাহ। ও হাে হােতাইত! এই গ্রন্থখানা আমার বুদ্ধি বিলােপ
করেছে, এ গ্রন্থ এখানে কেমন করে এল ?
তরলিকা ও পশ্চাতে ভৈরবের প্রবেশ
( তলিকাকে ) এ গ্রন্থ এখানে কেমন করে এল?
তর। কি গ্রন্থ পিতা?

বরাহ। নাম না হয় নাই শুলে। এইখানা—এইখানা-
তর। দেখি...
বরাহ। দেখছ না? এইখানা
তর। নাম না জেনে, পুথি না দেখে কি করে ব’লবাে পিতা ?
বাহ। (ধরণীকে) পুস্তকখানা অগ্নিদগ্ধ করবে, আজই এখনই--
ধরণী। (পুথিখানা লইয়া) ওগাে মেয়ে কি তােমার শক্ত হয়ে দাড়াল?
মেয়ে যা চাইবে, তুমি তা দেবেনা; যা চাইবে না, তুমি তাই দেবে।
বরাহ। দাও, আমাকেই দাও! (পুথিখানা লইয়া ভৈরবকে। এটা
অগ্নিদগ্ধ করবে: নাও।
ভৈরবের দিকে ছুড়িয়া দিলেন। ভৈরব লইয়া প্রস্থানােত
মদ। (কৃত্রিম নিদ্রা হইতে উঠিয়া) মা! মা! কী ভীষণ এক দুঃস্বপ্ন
দেথলাম মা!
ধরণী। কি স্বপ্ন মা ?
মদ। দেখলাম কি একখানা গ্রন্থ আগুনে পুড়ছে—সেই সঙ্গে আমিও
-আমিও-( ক্রন্দন)।
ধরণী। (মদনিকাকে বুকে লইয়া) ওরে ওরে কি সর্বনাশ!
ভৈরব মনিকার ক্রন্দনে বিচলিত হইয়া উঠিল । কপিতে কাপিতে বরাহের
সম্মুখে আসিয়া নতজানু হইয়া পুথিখানি যাহাতে না পােড়ন
হয় তাহার জন্য কাকুতি মিনতি করিতে লাগিল
৩৪

দ্বিতীয় অঙ্ক
বরাহ। (ভৈরবকে) আচ্ছা দাও।
ভৈরব মহাখুসি হইয়া বরাহের পদতলে পুথি রাখিল। চোখে
মুখে কৃতজ্ঞতা ফুটিয়া উঠিল
বরাহ। এ গ্রন্থ আজ রক্ষা পেল, তােমাদের ক্রন্দনে নয়। ভৈরবের
প্রার্থনায়।
পুথি লইয়া প্রস্থান
ধরণী। এতদূর ! তােমার কাছে আমাদের মূল্য এইটুকু ? :( মদনিকাকে
বুকে লইয়া) আয় মা,-( তলিকাকে) আয়-
তর। কোথায় মা ?
ধরণী। আমার পিত্রালয়ে যেখানে কন্যার আদর আছে' 'ভূত
যেখানে সর্বস্ব নয়।
সঁদ। চল মা—
ভৈরব তাহাদের সম্মুখে গিয়া নতজানু হইয়া
করজোড়ে যাইতে নিষেধ করিল
ধরণী । (ভৈরবকে) তুমি থাকতে আমরা আর এখানে ফিছি না।
ভৈরব ইঙ্গিতে জানাইল সে-ই যাইতেছে। কাদিতে লাগিল। মনিকাকে
শেষ দেখা দেখিয়া কাদিতে কাদিতে বাহির হইয়া গেল
ধরণী। আমাদের কথায় যে গেল তা যেন উনি না জানেন। ক্রীতদাস
পালিয়েও ত যেতে পারে!
৩৫

নেপথ্যে বরাহ। ভৈরব ! ভৈরব । ধরণী। আমি গিয়ে শেষ রক্ষা করছি প্রস্থান মদ। আপদ দূর হ’ল। তর। আহা বেচারা চোখের জল ফেল্‌তে ফেলতে গেল ! মদ। কষ্ট যে না হচ্ছে তা নয় তালিকা। ভৈরব আমার সেবা করবার জন্যে উন্মুখ হয়ে ফিরত—কিন্তু—যাক্.. তর। চল সখি মার কাছে চল। মদ। না সখি সে আবার আসতে পারে। তর। এত রাত্রে ? মদ। তাকে সাবধান করবার জন্যই আমাকে এখানে থাকতে হবে। তর। শুধু শুধু বসে থাকবি? মদ। ঐ পুথিখানা পেলে হত। তরলিকা, যদি কোনমতে পারি-- ঐ পুথিখানা--বুঝলি। ( ইঙ্গিত) তর। দেখছি মদ। এই পথে সে পালিয়েছে, হয়ত এই পথেই সে ফিরবে। বড় ঘুম পাচ্ছে- তর। তবে শশাবে চল- মদ। তুই গিয়ে শাে–আমি আজ সারারাত জেগে শাস্ত্র পড়বে। তর। হাঁ শাস্ত্রই পড়-কিন্তু প্রেমে পড়ােনা সখি-- হাসিতে হাসিতে প্রস্থান।

দ্বিতীয় অন্ধ
মনিকা ধীরে ধীরে শয্যায় শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িল। চোরের মত ভৈরব প্রবেশ
করিয়া অতি সন্তর্পণে চারিদিকে তাকাইয়া দেখিয়া লইল । পরে শয্যার
কিছু দূরে বসিয়া মনিকাকে ব্যজন করিতে লাগিল। বরাহ
প্রবেশ করিয়াই এই দৃশ্য মুগ্ধভাবে কিয়ৎক্ষণ তাকাইয়া
দেখিলেন। পরে ভৈরবের অলক্ষ্যে ধীরে ধীরে
তাহার পশ্চাতে দাড়াইয়া মৃদুস্বরে ডাকিলেন
বরাহ। ভৈরব ।
ভৈরব চমকিয়া উঠিয়া ব্যজনি রাখিয়া তাহার
পদ প্রান্তে লুটাইয়া কাঁদিতে লাগিল
বরাহ। ওঠ ভৈরব, তুমি মদনিকাকে নিয়ে আজই এদেশ থেকে পালিয়ে
যাও দূরে দূরে বহুদূরে, তােমার এ কষ্ট আমি আর সইতে
পারিনা-ভৈরব ।
ভৈরব অস্বীকার করিল। জানাইলনা-
বরাহ। হা ভৈরব, আমি মনিকাকে জাগরিত করে আর আমার স্ত্রীকে
ডেকে এনে...উভয়ের নিকট এই মিথ্যাচার প্রকাশ করি। ভৈরব ।
ভৈরব ! এ মিথ্যাচার যে তােমাকেই শুধু বেদনা দেয়—তা নয়—
আমাকেও—আমাকেও
ধরণীর পুনঃ প্রবেশ
ধরুণী। একি? ভৈরব! আবার !
ভৈরব চমকিয়া উঠিয়া কাপিতে কাপিতে বাহিরে চলিয়া গেল

ধরণী। ও নিশ্চয়ই আমাদের কোন সৰ্ব্বনাশ করবে ! ওর লক্ষণ ভাল নয়। বরাহ। ভুল-ভুল ধরণী ! ক্রীতদাসেরা প্রভুর জন্য অমানুষিক আত্ম- ত্যাগ করে। ব’স ধরণী, ওদের আত্মত্যাগ যে কতদূর ভয়ঙ্কর হতে পারে, আমি বলছি শােন— ধরণী। গল্প শাের কি এই সময় ? প্রস্থানােচ্ছতা বরাহ। তােমার সঙ্গে আমি পণ রাখলাম ধরণী, এ গল্প শুনে তুমি আতঙ্কে কেঁপে উঠবে। ধরণী। গল্প শুনেই আতঙ্কে কাপবে ? বরাহ। পরিহাস নয়—হয়ত পরে মূৰ্ছাও যেতে পার, অথবা অথবা তার চেয়ে আরও কিছু ভীষণ ধরণী । (হাসিয়া) বল। না দাড়াও, কি পণ? বরাহ। সাধ্য মত যে কোন পণ—যে কোন পণ ধরণী। বেশী কিছু নয়, আমি যদি হাসি-মুখেই এ গল্প শুনে যেতে পারি, তাহলে সাতদিন তুমি জ্যোতিষ-চর্চা বন্ধ করে ঘরে বন্দী হয়ে থাকবে। বরাহ। সাতদিন কেন ? চিরজীবন জ্যোতিষ-চর্চা ছেড়ে দেব। তুমি ধরণী। বলবল- বরাহ। এই ধর, কোন রাজার আমারই মত এক বৃদ্ধ সপণ্ডিত ছিল। ৩৮

দ্বিতীয় অঞ্চ
ধরণী। কিন্তু সেই পণ্ডিতের আমার মত কোন স্ত্রী ছিল না নিশ্চয়।
বরাহ। হাঁ, স্ত্রী ছিল এবং তারা আমাদেরই মত প্রথম-জীবনে নিঃসন্তান
ছিলেন।
ধরণী। পরেও কোন সন্তান হ’ল না?
বরাহ। হ’ল-সেই কথাই বলছি। যেদিন হ’ল সেইদিনই সেই পণ্ডিত
ঐ ভৈরবের মত এক ক্রীতদাস দম্পতী ক্রয় করেন।
ধরণী । মিছে! ভৈরবের মতই সে ক্রীতদাসের স্ত্রী মারা গেল নাকি?
বরাহ। হাঁ, মারা যায়-সন্তান প্রসবকালে।
ধরণী। সন্তান প্রসবকালে ! কিন্তু ভৈরবের তাে তা নয়। শুনেছি-
বরাহ। শােন বলছি। ক্রীতদাস তখন সেই সদ্যজাত কন্যা নিয়ে মহা
বিব্রত হয়ে পড়ে। পূৰ্বেই বলেছি সেইদিনই সেই সভাপণ্ডিতের
অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীও এক পুত্র প্রসব করে।
ধরণী। মিলাে না। আমি প্রসব করলাম, এক কন্যা !
বরাহ। শােন বছি। সভা পণ্ডিত জ্যোতিষ চর্চা করতেন। তার
পুত্র ভূমিষ্ঠ হলেই তিনি জাতকের আয়ু গণনা করে দেখেন, জাতকের
আয়ু মাত্র এক বৎসর।
ধরণী। তুমিও কি তােনার সন্তানের আয়ু সেই রাত্রেই গণনা
করেছিলে ?
বরাহ। করেছিলাম। আমিও করেছিলাম। তারপর পণ্ডিত কি
ভাবলেন জান ?
ধরণী। কি?
বরাহ। তাঁর পুত্রের আয়ু যখন মাত্র এক বৎসর, তখন আর ঐ

বৎসরায়ু সন্তানকে লালন পালন করে মায়াবদ্ধ হওয়া কেন? তিনি
সেই সদ্যজাত শিশুকে তার প্রস্থতির অজ্ঞানাবস্থাতেই এক তাম্র পাত্রে
রক্ষা করে জলে ভাসিয়ে দিলেন।
ধরণী। উঃ, কি নিষ্ঠুর ! পিতা হয়ে কি করে তা পারলে?
বরাহ। তুমি এখনই বিচলিত হ’চ্ছ ধরণী !
ধরণী। না না, কিন্তু সেই শিশুর মাতা? জ্ঞান ফিরে পেয়ে যখন তার
স্বামীর এই নিষ্ঠুরতা জানতে পারল তখন ?
বরাহ। তিনি তাে জানতে পারলেন না।
ধরণী। জাতে পারলেন না? তার অর্থ ?
বরাহ। পত্নীকে প্রবােধ দেওয়া যাবে না ভেবে সেই পণ্ডিত বিষম ব্যাকুল
হয়ে পড়লেন। তিনি ছুটে গেলেন তার সেই ক্রীতদাসের গৃহে।
ধরণী। কেন ?
বরাহ। গিয়ে ক্রীতদাসের বুক থেকে কেড়ে আলেন ক্রীতদাসের
সেই কন্যা-
ধরণী। তারপর বুঝি ক্রীতদাসের সেই কন্যাকে তার স্ত্রীর বুকে
বরাহ। রাখলেন।
ধরণী। তুমি ব’ছ কি স্বামী ?
বরাহ। স্ত্রীর যখন জ্ঞান হ’ল, তখন তিনি জানলেন, তার পুত্র হয়নি।
হয়েছে ঐ কন্যা।
ধরণী। কি সর্বনাশ—আর সেই ক্রীতদাস ?
বরাহ। ক্রীতদাস প্রথমটায় খুবই দুঃখিত হয়েছিল, কিন্তু প্রভুর আজ্ঞায়
সে তার চোখের জল মুছে ফেলাে। শুধু তাই নয়। পণ্ডিত সেই
৪০

দ্বিতীয় অঙ্ক ক্রীতদাসকে দিয়ে শপথ করিয়ে নিলেন, সে এ ঘটনা জীবনে কারো নিকট প্রকাশ করবে না। এমন কি ঐ কন্যার নিকটও না। ধরণী। তার ফলে ? তার ফলে ? বরাহ। তার ফলে সেই ক্রীতদাসের কন্যা পণ্ডিতের কন্যারূপেই মানুষ হ’ল। প্রকৃত ঘটনা জানলেন পৃথিবীতে মাত্র দুইটী প্রাণী। আমি আর তিনি । ধরণী । ( বিষম চাঞ্চল্যে চীৎকার করিয়া উঠিলেন) তুমি? তুমি? বরাহ। ( সামলাইয়া লইয়া) আমি আর সেই পণ্ডিত। ধরণী । ( সন্দিগ্ধচিত্তে ) আর সেই ক্রীতদাস? বরাহ। হুঁ, আর সেই ক্রীতদাস। ধরণী। তােমাকে তারা একথা বলাে কেন ? বরাহ। (নীরব রহিলেন। কিন্তু এ নিস্তব্ধতা তাহার অসহ্য হইল ) তবে সত্য কথা শুবে ধরণী ? এ মিথ্যা আমি আর সইতে পারিনা সইতে পারিনা-- ধরণী। কি মিথ্যা? কি মিথ্যা স্বামী? ববাহ । ( বিষম অন্তদ্বন্দ্বে বক্তব্য বলিবেন কি বলিবেন না ঠিক করিতে পারিলেন না ) ঐ যে মদ- নিকা-- ধরণী । বল, ওগাে••বল ! আমার সর্বশরীর আতঙ্কে কাঁপছে। ঐ যে মদ-- নিকা--- বাহ। ' চীৎকার কোরনাও জেগে উঠবে। ধরণী। তুমি বল-তুমি বল ! ঐ মদনিকা বরাহ। (নীরব ) ৪১ ধরণী। ওকি আমার নয়? যে আমার ছিল তাকে কি তুমি- বরাহ। ( কি বলিবেন বুঝিলেন না। একটা আর্তনাদের মধ্য দিয়া) ধরণী। ধরণী ! ধরণী । ( সক্রন্দনে) বল-বল-যে আমার ছিল তাকেই কি তুমি স্বহস্তে নদীর জলে --ওহহহােবল- বরাহ। (বুঝিলেন ধরণী মূচ্ছিতা হইতে পারেন, চেষ্টা করিয়া হাসিয়া ) হা-হা-হা মিথ্যা—মিথ্যা ! আমি এতক্ষণ যা বল্লাম, তার প্রত্যেকটী অক্ষর মিথ্যা। আমি ছল ক'রে পণে জিতলাম। ধরণী। সত্য ? এই কথাই সত্য? বরাহ। এই কথাই সত্য। (হাসিতে লাগিলেন। ক্ষণেক নিস্তব্ধতা ) ধরণী । ( বিশেষ চেষ্টা করিয়া ইহা বিশ্বাস করিল ) তাই বল। কিন্তু এ রকম প্রাণান্তকর ছলনা কি মানুষে করে ? এখনও আমার বুক কাপছে—ছিঃ ! ছিঃ !—আমি এখনই ঠাকুর প্রণাম করে আসছি। প্রস্থান বরাহ। (বাতায়ন পার্শ্বে গিয়া চাপা গলায়) ভৈরব ! ভৈরবের প্রবেশ। সে বরহের দিকে চাহিয়া রহিল আমি পারলাম না ভৈরব ! বতে আমি চেয়েছিলাম, কিন্তু আমার কণ্ঠ বােধ হয়ে এল। ভাবাবেগ লুকাইবার জন্য বাহিরে পালাইলেন ভৈরব মনিকাকে দেখিতে লাগিল। তাহার বেদীপ্রান্তে সস্নেহে অঙ্গুলী, চালনা করিতে লাগিল-পিতা যেমন সন্তানের দেহে হাত বুলায় ৪২

দ্বিতীয় দৃশ্য
উজ্জয়িনী পথ
পথিক আপন মনে গাহিয়া চলিয়াছে
-গান--
সমুখ পানে চলরে ভােলা-
মনের-মাণিক খুঁজতে হলে সইতে হবে ঝড়ের দোলা
খেলুক তড়িৎ, আসুক না ঝড়
চলার পথে করিসূনে ডর
হয়ত পথের শেষে পথিক, রতন দিয়ে ভরবি ঝােল
প্রস্থান
মিহির ও খনার প্রবেশ
মিহির। নিষ্ঠুরা নারী! আর কত দিন এ খেলা আমার সঙ্গে খেলবে?
আর যে আমি ধৈৰ্য্য ধরতে পারছি না খনা! দেশের পর দেশ,
পৰ্ব্বতের পর পৰ্বত, নদীর পর নদী পার হয়ে এলাম, কিন্তু কোথায়
কোথায় আমার জন্মভূমি ?
খনা। তােমার কষ্ট হচ্ছে মিহির ?
মিহির ভারতবর্ষের কি শেষ নাই খনা?
না। তাতে কি তােমার দুঃখ হচ্ছে মিহির ? আমার হচ্ছে গৰ্ব্ব ।

মিহির। গৰ্ব ?
খনা। হাঁ গর্ব। আমাদের দেশ.••সে কত বড় দেশ। দিনের পর দিন,
রাতের পর রাত...পথ চলেছি, দেহ অবসন্ন হয়ে পড়ছে...তবু কি এই
ভেবে আনন্দ হচ্ছে না যে আমরা আমাদের দেশের একাংশও অতিক্রম
করি নি ?
মিহির। আনন্দই হয়েছে খনা। দুস্তর সাগর দেখে দুঃখিত হই নি।
মনে করেছি আমার জন্মভূমির সাগর-সাগরই, এতটুকু নদী নয়।
দুর্লঙ্ঘ্য পৰ্বত লঙ্ঘন করবার সকল কষ্ট আমরা হাসিমুখে বরণ করেছি।
মনে করেছি—আমার জন্মভূমির পৰ্বত, মাটীর স্তুপ নয়। আমার
দেশের যা কিছু আছে, সবই শ্রেষ্ঠ। কিন্তু তার মাঝেও আমার
সূতিকাগার আমার স্বর্গ! কোথায় আমার সেই স্বর্গ ?
উদ্ভ্রান্ত এক নারীর প্রবেশ
নারী। স্বর্গ ! স্বর্গ ছিল আমার বুকে ••এখন সে আমার বুকে ঘুমিয়ে
পড়ত। স্বর্গ ছিল আমার ঘরে.••যখন সে আমার ঘরে খেলা করত।
স্বর্গ ছিল আমার মুখে যখন সে আমার মুখে চুমাে খেত।
খনা। কে মা, কে ?
নারী। শােন নি তার কথা? সে যখন হাত, তখন মাণিক ঝরত।
যখন হাঁটুত মনে হ’ত মাটীর বুকে পদ্ম ফুটেছে•••শােন নি তার কথা?
মিহির। আমরা বিদেশ থেকে এসেছি। কে মা? সে কে ?
নারী। সে ছিল আমার ভাঙা ঘরের চাদের আলাে ! কখনও কি
তা দেখ নি ?
৪৪

দ্বিতীয় অঙ্ক
মিহির। তােমার পুত্র !
নারী। লােকে বলে পুত্র, কিন্তু পুত্র ব’ললেই কি সব বলা হ’ল ? সে যে
ছিল আমার চোখের মণি, বুকের মাণিক।
খনা। কোথায় সে ?
নারী। খেতে খেতে পালিয়ে গেল। লােকে বলে চোরে চুরি
করেছে। আমারও তাই মনে হয় মা ! আমারই মনে হত তাকে
চুরি করে ধরে রাখি। আর খুঁজে পেলাম না। কি করেই বা
খুজবাে? চোখে আলাে নেই—বুকে আশা নেই—মনে ভরসা নেই
--কি করে খুজবাে ?
খনা। রাজদ্বারে সংবাদ দিয়েছ মা?
নারী। সে কি মা?
না। রাজাকে জানিয়েছ?
নারী। রাজা আমি চিনি না মা !
খনা। তবে এস মা আমাদের সঙ্গে এস-উজ্জয়িনী চল--
নারী। হাঁ মা, চল। দাড়িয়ে থাকলে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।
চল মা চল--
মিহির। ( খনাকে ) কোথায় ?
না। তােমার সূতিকাগারে—তােমার স্বর্গে।
মিহির। উজ্জয়িনী ?
খনা। হা উজ্জয়িনী।
মিহির। তবে এস মা--তুমি হারিয়েছ পুত্র--আমি হারিয়েছি---
পিতা-মাতা! চলে এস রাজদ্বারে—আমি গণনা করে ব’লৰ
৪৫

কোথায় তােমার সন্তান! এই গণনাতেই—এই গণনাতেই আমি
বিশ্ব-বিশ্রুত বিক্রমাদিত্যের সভায় আত্ম-প্রতিষ্ঠ হয়ে খুঁজে বের
ক’রবকে আমার পিতা! হাঁ খনা, সন্ধান যখন পেয়েছি—এই
উজ্জয়িনী আমার জন্মভূমি-সহস্র লােকের মধ্যেও আমি তাকে
চিব-আর তিনি—তিনিও কি আমায় চিনবেন না খনা?
সকলের এস্থাৰ
৪৬

তৃতীয় দৃশ্য
বিক্রমাদিত্যের বিশ্রামাগার
মহারাজ বিক্রমাদিত্য বিশ্রাম করিতেছিলেন ; নর্তকীগণ
লাস্যমৃত্যেসম্রাটের চিত্তবিনােদন
করিতেছিল
নৃত্যান্তে বরাহের প্রবেশ
বরাহ। সম্রাট !
বিক্র। জ্যোতিষার্ণব !
বরাহ। হাঁ আমি! অনধিকার প্রবেশের মার্জনা ভিক্ষা করি—কিন্তু
এসে আমার উপায় ছিল না। সম্রাট ! এক মহা সমস্যা
উপস্থিত।
বিক্র। সমস্যা ! কি সমস্যা জ্যোতিষার্ণব
বরাহ। ধর্মাধিকরণে বিচার হচ্ছিল। বিচারপ্রার্থী ছিল উন্মাদিনী প্রায়
এক নারী। সঙ্গে তার এক বিদেশী দম্পতি-পরিচয়ে প্রকাশ সিংহল
হ’তে তারা সদ্য-আগত-ব্যবসা জ্যোতিষ-চর্চা। উন্মাদিনী এসে
অভিযােগ করল—উজ্জয়িনীর কালী মন্দিরের পুরােহিত তার একমাত্র
শিশু সন্তানকে নরবলিদানার্থে অপহরণ করেছে। এই অভিযােগের
প্রমাণ দানে আদিষ্টা হ'লে--সে বলল, অন্য কোন প্রমাণ নাই,
সিংহলাগত জ্যোতিষী-দম্পতির গণনাতেই সে পুরােহিতের বিরুদ্ধে
এই গুরুতর অভিযােগ আরােপ করেছে। সম্রাট! জ্যোতিষ
৪৭

গণনায় যদি অপরাধীর নির্দেশ হয়, তবে শাসন সংরক্ষণের জন্য আমিই কি যথেষ্ট নই ? সহস্র সহস্র মহামাত্য, গুপ্তচর, চৌরদ্ধরণিক, নগরপাল, শান্তি রক্ষকের তবে কি আবশ্যক। বিক্র। অবশ্য। বরাহ। কিন্তু কি বলব সম্রাট, ঐ অপরিচিত জ্যোতিষী-দম্পতির গণনার উপর নির্ভর করে পুরােহিতকে বন্দী করা সম্বন্ধে আমার অভিমত প্রার্থনা করায় আমি বললাম, পুরােহিতকে বন্দী না করে বন্দী কর সেই উন্মাদ জ্যোতিষীকে--যে জ্যোতিষের নামে এক মহা সম্রান্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিক্র। নিশ্চয় নিশ্চয় তারা বন্দী ? বরাহ। না সম্রাট! বন্দী নয় বরং—এই যে ওরাও এসেছেন—শুনুন- ওদের কাছেই শুনুন। ধৰ্ম্মাধিকার ও বিভাবসুর প্রবেশ ধৰ্ম্মা। জ্যোতির্ণব বিচারের অপমান করেছেন সম্রাট। বি। আমি শুনেছি। সিংহলাগত সেই দম্পতীকে এখনও বন্দী করা হয় নি কেন মন্ত্রীবর ? বিভা। আমাকে বলতে দিন ধৰ্ম্মাধিকার। বিভা। ধর্মাধিকার তাদের বন্দী করতে আদেশ দেবেন--ঠিক সেই সময় রােমাঞ্চকর এক ঘটনা ঘটল। ভীত, এস্তা হয়ে ছুটে এলেন, স্বয়ং পুরােহিতের পত্নী-বুকে তার এক শিশুসন্তান-মমতাময়ী সেই নারী ধৰ্ম্মাধিকারের পদতলে রাখল সেই শিশু—এবং কি বলব সম্রাট ৪৮

দ্বিতীয় অফ
সত্য সত্যই দেখা গেল—ঐ শিশুই বিচারপ্রার্থিনী সেই উন্মাদিনীর
অপহৃত সন্তান! “মা” বলে তার বুকে গিয়ে পড়ল ঝাঁপিয়ে।
বিক্র। কি আশ্চর্য-তারপর? তারপর মন্ত্রী ?
বিভা। বিচার-সভায় উপস্থিত জনমণ্ডলী সিংহলাগত জ্যোতিষী-দম্পতির
জয়ধ্বনি করে উঠল-এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা ক্রোধে অন্ধ হয়ে চীৎকার
ক’রছে—পুরােহিতকে বন্দী কর—বিচার কর--বিচার কর--ঐ
পুরােহিতের বিচার কর।
বিক্র। তারপর। তারপর ? পুরােহিত ?
ধৰ্ম্মা। আমি পুরােহিতকে বন্দী ক’বার আদেশ দিলাম কিন্তু কিন্তু
সম্রাট—ঐ জ্যোতির্ণব-অনধিকার হলেও তারস্বরে সভামধ্যে
ঘােষণা করলেন, সিংহলাগত ঐ দম্পতি জ্যোতিষীই নয় । 'ওদের
গণনা জ্যোতিষীগণনা নয়--যাদুকর যাদুকরীর ইন্দ্রজাল।
বরাহ। সহস্রবার এবং যে সিদ্ধান্তের ভিত্তি শাস্ত্রসম্মত নয়,
ভােজবিদ্যা, সে সিদ্ধান্ত সত্য হলেও অশাস্ত্রীয় বলে প্রামাণ্য নয়---
গ্রাহ্য নয়। সেই জন্যই শুধু গণনার উপর নির্ভর করে পুরােহিত
দণ্ডা নন।
বিক্র। সমস্যাই বটে। তারপর
বিভা। বিষম দ্বন্দ্ব উপস্থিত হল—তুমুল কোলাহল হতে লাগল। শান্তি-
ভঙ্গের আশঙ্কা করে বিচারসভা ভঙ্গ করে আমি এদের নিয়ে
এসেছি--
বিক্র। সিংহলাগত সেই দম্পতী?
বিভা। আপনার দ্বারে।--আসুন। সম্মুখে সম্রাট।

মিহির ও খনার প্রবেশ মিহির। সম্রাট জয়তু। আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন সম্রাট। বিক্র। আপনারা জ্যোতিষী ? বরাহ। (উত্তেজিতভাবে ) সম্রাট-সম্রাট–শুনুন সম্রাট! আমি ঘােষণা করছি—ওরা জ্যোতিষী নয়—ওরা রাক্ষস-লঙ্কার মায়াবী রাক্ষস মিহির। সম্রাট। সম্রাট ! এ কথা মিথ্যা। আমরা ভারত-সন্তান। বরাহ। ভারত-সন্তান! ভারত-সন্তান! বিক্র। ভারত-সন্তান পরিচয় যথেষ্ট নয় যুবক, ভারতের কোন্ বিখ্যাত পণ্ডিত তােমার পিতা ? বরাহ। বল-বল-কে তােমার পিতা ? মিহির। খনা-খনা, এখনও—এখনও কি তুমি নীরব থাকবে ? খনা। এর অতিরিক্ত পরিচয় দিতে বর্তমানে আমরা অক্ষম। বরাহ। অক্ষম ! পিতৃ-পরিচয় দিতে অক্ষম! হাঃ হাঃ হাঃ সম্রাট। শুনলেন? মিহির। খনা-খনা-- খনা। ছিঃ মিহির! বরাহ। অথচ এদের গণনার উপর নির্ভর করেই—পুরােহিতের ন্যায় মহা সম্রান্ত ব্যক্তিকে-ঐ ধৰ্ম্মাধিকার- ধৰ্ম্মা। হাঁ সম্রাট, আমি সত্য ঘটনাকে উপেক্ষা করতে পারি না আমার বিচার যদি বিচার বলে গ্রাহ হয় তবে আমার বিচারে পারিপার্শ্বিক ঘটনামুলে পুরােহিতই অপরাধী—এবং বিরুদ্ধরূপ - দ্বিতীয় অঙ্ক প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত শাস্তি তার আজীবন কারাবাস। এই নবাগত যুবকের অদ্ভুত গণনা সাহায্যে সন্তান-হারা এক নারী ফিরে পেয়েছে এক সন্তানকে হারিয়ে সে হয়েছিল উন্মাদিনী। বিদ্যোৎসাহী মহারাজ বিক্রমাদিত্যের ধর্মাধিকার আমি-আমি সম্রাট-সম্মুখে সানন্দে তােমাকে দিচ্ছি এই জয়-পত্র-- বরাহ। সম্রাট। সম্রাট। বিক্র। দাড়ান ধর্মাধিকার। আপনার বিচার অবশ্যই গ্রাহ। কিন্তু আপনার বিচারের বিরুদ্ধে-উৰ্দ্ধতন ধর্মাধিকরণ, সম্রাটের সমীপে প্রতিবাদ হওয়ায় বিচার করছি আমি। বিচারে গণনার স্থান নাই —বিচার প্রমাণ-সাপেক্ষ। সত্য বটে পুরােহিতের গৃহে পাওয়া গেছে সেই অপহৃত শিশু---কিন্তু শুধু তাতেই প্রমাণ হয় না—যে ঐ শিশু অপহরণ করেছিল পুরােহিত। বিশেষ জ্যোতির্ণব বরাহের মতে যখন এই গণনা অশাস্ত্রীয়—তখন এই গণনাকে আমরা ভােজবিদ্যা বা রাক্ষসীর ইন্দ্রজাল ভিন্ন আর কোন আখ্যা দিতে পারি না। আমার বিধানে ঐ জয়-পত্ৰ জ্যোতিষার্ণব বরাহের। শােন সিংহলাগত দম্পতি! তােমাদের গণনার ফল জয়যুক্ত হলেও যেহেতু তােমরা সিংহলাগত, যেহেতু তােমরা পিতৃ-পরিচয় দিতে অস্বীকৃত—তজ্জন্য- তজ্জন্য বিপরীতরূপ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত আমার বিধানে তােমরা লঙ্কাবাসী মায়াবী রাক্ষস। খনা। কিন্তু সম্রাট-- বিক্র. না মা, সম্রাটের বিধান প্রতিবাদের নয়। আমার রাজ্যে মায়াবীর স্থান নেই। স্থান হতে পারে—যদি কেউ দয়াপরবশ হয়ে তােমাদের পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে। কে গ্রহণ করবে, তােমাদের পূর্ণ দায়িত্ব? খনা। (বরাহের প্রতি) প্রভু!' প্রভু! দয়া করে অবহিত হন প্রভু! আপনার পদতলে বসে ভারতীয় জ্যোতিষ শিক্ষা করব এই অদম্য কামনা নিয়েই আমরা এসেছি—সুদূর এই ভারতে! আমাদের আশ্রয় দিন--আপনার পদতলে আমাদের আশ্রয় দিন বরাহ। এ কি বলছ! এ কি বলছ মা? খনা। যা বলছি অক্ষরে অক্ষরে সত্য। দয়া করুন—দয়া করুন প্রভু। বরাহ। তাইত । বিক্র। মায়াজাল প্রসারিত ! সাবধান জ্যোতির্ণব ! বরাহ। সত্য—সত্য—অতি সত্য। মায়াজাল! মায়াজাল ! না মা-- আমি পারব না। তােমাদের কামনা পূর্ণ করতে আমি পারব না। -না-না- খনা। আপনার পায়ে পড়ছি—আপনার পায়ে পড়ছি- বিক্র। হাঃ হাঃ হাঃ বরাহ। ( ক্রুদ্ধ হইয়া) সাবধান। খনা। বটে! উত্তম। স্বামী- মিহির। মহারাজ বিক্রমাদিত্যের সুবিশাল রাজ্যে বিদ্যার্থী এই দুইটি প্রাণীর স্থান নেই। সত্য সত্যই কি তুমি বিশ্ববিশ্রুত বিদ্যোৎসাহী বিক্রমাদিত্য- বিক্র। ক্রন্দনে অথবা ভৎসনায় বিক্রমাদিত্য তার কর্তব্য পথ হতে বিচলিত হয় না।

দ্বিতীয় অক
খনা। সম্রাটের আদেশ শিরােধার্য। কিন্তু ক্ষুদ্র—অতি ক্ষুদ্র একটি
নিবেদন আছে। অতি ক্ষুদ্র নিবেদন
বিক্র। বল মা-
খনা। জ্যোতিষার্ণব বরাহের নিকট আমার একটি কথা বলবার
আছে—একটি মাত্র কথা—কিন্তু বলব আমি তা—গােপনে।
বরাহ। না-
খনা। মাত্র একটি কথা—একটি কথা
বরাহ। না-না—আমি গােপনে কোন কথা শুনতে অসম্মত--
বিক্র। হাঃ হাঃ হাঃ.••জ্যোতিষার্ণবের রাক্ষস-ভীতি উপভােগ্য সন্দেহ
নাই।
খনা। উত্তম। তবে আমি প্রকাশ্যেই বলছি। জ্যোতিষার্ণব
মিহিরকে তাহার সম্মুখে লইয়া গিয়া
ইনি আমার স্বামী। সত্য সত্যই কি একে সিংহলবাসী মায়াবী
বলে মনে হয় ? দেখুন দেখি এর মুখের দিকে চেয়ে !
বরাহ তাহাকে নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন
খনা।
এস স্বামী চলে এস। (গমনােদ্যত )
বরাহ। দাড়াও—শােন--
খনা। একটি কথাই বলব বলেছিলুম, বলা তাে তা হয়েছে।
বরাহ। নানা—( মিহিরকে ধরিয়া) তােমার বয়স ?
খন্ম। যাদের একটি কথা শুনতেই আপত্তি—দ্বিতীয়বার কথা কইবার
তাদের সাহস নাই জ্যোতিষার্ণব !

বরূহ। তুমি বল-তুমি বল—তােমার বয়স ?
মিহির। বিশ বৎসর।
বরাহ। বিশ বৎসর! বিশ বৎসর।
বি। কি হ’ল জ্যোতিষার্ণব ?
বরাহ। এা—না ভাবছিলুম.. হা ভাবছিলুম—ভাবছিলুম—এই যে
এরা নিতান্ত বালক বালিকা নিতান্ত অসহায়—এদের নির্বাসিত
করলে–বিদেশে অপরিচিত দেশে-নিৰ্বাসিত হলে এদের
দুঃখের সীমা থাকবে না—এটা বিবেচনার কথা বটে সম্রাট।
বিক্র। বুঝলুম বুঝলুম জ্যোতিষার্ণব
বরাহ। ( বিরক্ত হইয়া) কি বুঝলেন সম্রাট ? যাই বুঝুন--এটা স্বীকার
করতেই হবে—যে রাক্ষসীয় জ্যোতিষ অশাস্ত্রীয় অশাস্ত্রীয় সন্দেহ
নাই, কিন্তু, সেটাও জ্যোতিষ-—সেটাকে আলােচনা করে দেখতে
দোষ কি? আপনারা হাসছেন, হাসুন-কিন্তু আমি হাসতে পারছি
আমি হাসতে পারছি না। তােমরা থাকবে। সম্রাট, আমি
এদের বুঝতে চাই, জানতে চাই, এরা কে? কে এরা ! কেউ
যদি তােমাদের আশ্রয় না দেয় আমি আশ্রয় দিলুম। এস—তােমরা
আমার অতিথি। এবং-এবং সত্যই যদি তােমরা আমার শিষ্যত্ব
চাও--জানি না তাতে কার দর্পচূর্ণ হচ্ছে কিন্তু সে প্রস্তাবে আমি
সম্মত হলাম সানন্দে-সানন্দে।
মিহির ও খনা বাহ চরণে প্রণত হইল। বরাহ তাহাদিগকে
আশীর্বাদ করিলেন।
৫৪

তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য বরাহের বাসভবন অন্তঃপুরের একাংশ। এক পার্শ্বে একখানি ক্ষুদ্র গৃহ। অন্য পার্শ্বে সুবিস্তৃত অলিন্দ। সন্ধ্যা। একটি চ্যুত-লতিকা বসন্ত সমাগমে নব পুষ্পরাগে রঞ্জিত হইয়া মলয় পবন-সংযােগে মৃদু মৃদু কম্পিত হইতেছে। প্রসাধন-রতা মদনিক।। মনিকার সখিগণ তার জন্মােৎসব উপলক্ষে প্রাঙ্গণটিকে নৃত্যে ও সঙ্গীতে মুখরিত করিয়া তুলিয়াছে -গান- দেবাশীষে আজ বেঁধেছে কবরী, ঘিয়ের প্রদীপে নয়ন কালো-- জনম তিথিরে সফল করিতে--ঐ চোখে শুভ প্রদীপ জ্বালাে। অগুরু গন্ধে শুভ্র এ মন- শঙ্খ করিছে শুভ আলাপন শুভ্র ললাটে চন্দন-রেখা--এ নব তিথিতে সাজিবে ভালো। --- খনা নিপুণিকা। নাও, এইবার জন্মদিনের শেষ উৎসবটি হােক। শােন সখি, তােমার এই জন্মদিনে তােমার মনের কথাটি আমাদের বল-শুনে খুসী হয়ে ঘরে যাই মনিকা। ব’লব ভাই, কিন্তু আমি মুখে বলতে পারব না— সখিগণ। তবে নদনিক। আমি লিখে দিচ্ছি পদ্মের চারটি পাপড়ি ছিড়িয়া তাহাতে একে একে কাজল-লতা সহকারে চন্দন যােগে কি লিখিয়া তরলিকার হাতে দিল-তরলিকা তাহা একে একে চারি সখির হাতে দিয়া আসিল- মনিকা। এইবার পড়- নিপুণিকা। “কা” চতুরিকা। “ম” মালবিকা। “” বাসন্তিকা নিপুণিকা কি না—“কামন্দক” ! তােমার পেটে এত । গিয়ে বলছি ঠাকুরকে—মনের ঠাকুরটিকে গিয়ে বলছি-আয়রে আয় ঠাকুরের সন্দেশ নিবি তত আয় । মনিকা ও তরলিকা ব্যতীত সকলের প্রস্থান তর। ধন্য তাের জন্মদিন। বসন্তের কি সুন্দর সন্ধ্যা ! মানিনী, ঐ চ্যুত-লতিকার দিকে চেয়ে দেখ । বসন্ত-সমাগমে নব-কুসুমিতা, ঐ মানিনীকে মলয়ানিল দোলা দিচ্ছে। মানিনী সােহগে কাঁপছে।

তৃতীয় অঞ্চ -গান- আসিল মলয়-অনিল, দিল সে কুঞ্জে হানা- হব তাের রাতের সাথী, লতা, না কর মানা! সম্মুখে আঁধার নিশ হে সখি, হারাই দিশা তােমারি বুকের মাঝে সুখনীড় আছে জানা। বহু পথ একা চলে আজিকে আমি অবশ আমি দেখিব সুখের স্বপন, কাটাবাে মধুর যামি সরমে নরম লতা কহে না মরম কথা- তনুতে কঁপন লাগে মুখে কয় না-না-না- গানের ভিতরেই পুথির বােঝা হস্তে কামক প্রবেশ করিল কাম। কাম। কালিদাস-কালিদাস তর। অর্থাৎ ? “ইয়ং সন্ধ্যা দুরাদহমুপগতাে হমলয়াৎ তদেকাং তৎগেহে বিনয়রতি নেস্যামি রজনী। সমীরেণেত্যুক্তা নব কুসুমিতা চ্যুত-লতিকা ধুনানা মূৰ্দনি নহি নহি নহীত্বেব কুরুতে।” অর্থাৎ•••সন্ধ্যা সমাগত, বহুদূর মলয় পৰ্বত হ’তে আমি এসেছি ওগাে বিনয়বতী, আজ একটি রাত্রি তােমার গৃহে যাপন করুতে ক

খনা
৫
অভিলাষ করছি-সমীরণের এই বাক্যে নব-মুকুলিত, কিনা—নব
পুষ্পিতা চ্যুত-লতিকা মাথা নেড়ে বলছে, না, না, না! তিনবার কেন
বছে জান কি ?
তর। আমি কি জানি। কিন্তু কেন বলুন ত ?
কাম। আজ না, কাল না, পরশু না, এই তিন দিন না • এ কালিদাসের
কবিতা—এ কবিতাও যদি না জান--তবে তুমি জান কি ?
মদ। ও যা জানে•••তা আর কেউ জানে না।
কাম। অর্থাৎ ?
তর। অর্থাৎ•••অর্থাৎ•••অর্থাৎ চুল বাঁধতে জান?
কাম। বাঁধতে জানি না কিন্তু কেন বাধ তা জানি।
মদ। অর্থাৎ ?
কাম।
যাতে মন্মথসমরে রণকৃতাং সৎকার মাতম্বৰ্তী
বাসেদাজঘনে সুপীন কুচয়ে হারং কটো কিঙ্কিণী
তাম্বুলস্য চ বীটিকাং মুখবিধৌ হস্তেরণৎ কঙ্কণং।
পশ্চাদবর্তিনী কেশপাশ নিচয়ে যুক্তংহি বন্ধক্ৰম !
মদ। অর্থাৎ ?
কাম। অর্থাৎ আমি না: কবি কালিদাস বলেন--সুন্দরী মন্মথ-সমরে
জয়লাভ করে স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সকলকে যুদ্ধ-সময়ে যে যেরূপ সাহায্য
দান করেছিল, তাদের তদুপযুক্ত উপহার দান করলেন—কটিকে
দিলেন কিঙ্কিণী, শুনে দিলেন হার, নিতম্বকে দিলেন মেখুলা, বদনে
দিলেন তাম্বুল, হস্তে দিলেন বলয়•••শুধু কেশপাশ কোন উপহার
পাবে না। কেন না যুদ্ধের সময় সে পশ্চাৎবর্তী হয়ে ছিল। অতএব--
৫৮

তৃতীয় অঙ্ক
তর। অতএব ?
কাম। (তরলিকাকে) বাঁধ এই চুল। আমরা কিছু বুঝি না ?
মদ। ভারি তাে বুঝেছেন !
কাম। তবে হাঁ, আবার এমন সব ব্যাপারও আছে যা একেবারে
বুঝি না।
তর। সত্যি না কি ?
কাম। যেমন “কুসুমে কুসুমােৎপত্তিঃ শুয়তে ন চ দৃশ্যতে।”
তর। অর্থাৎ ?
কাম। অর্থাৎ হে সুন্দরী! পুষ্পের উপর পুষ্পের উৎপত্তি হয় কোন
দিন দেখি নি, শুনিও নি। কিন্তু
মদ। কিন্তু
“বালে! তব মুখাম্বুজে কথমিলিবরদ্বয়ং |
-হে বালা! তােমার বদন-রূপ কমলের উপর নয়ন-রূপ দুই দুইটি
নীল-পদ্ম। বােকার মত শুধু চেয়েই দেখি। কিন্তু অর্থ যে ওর
কি...কিছুই বুঝি না।
ধরণীর প্রবেশ
ধরণী। কি বােঝ না কাম-ক?
কাম। কালিদাসের কবিতা।
ধরণী। কিন্তু উনি বলেন, তুমি কালিদাস নিয়েই অস্থির। জ্যোতিষে
তােমর মনােযােগ নেই।
কাম। গুরুর কৃপায় জ্যোতিষ আমার করকবলিত। দুঃখ এই যে কেউ
কাম।
আমায় প্রশ্ন করে না।

তর। (হাত মুঠা করিয়া সম্মুখে আসিয়া) বলুন ; আমার হাতে কি ?
ধরণী। নাও এবার তােমার দুঃখ দূর হ’ল কামক!
কাম। (মনে মনে বিড় বিড় করিতে লাগিল। আকাশের দিকে
তাকাইল। ভূমিতে রেখা টানিল। পরে বলিল) প্রাণী ! জীবিত !
তর। তারপর ?
কাম। (পূৰ্ব্ববৎ ) চতুষ্পদ।
তর। চতুষ্পদ। তারপর?
কাম। (পূৰ্ব্ববৎ ) শুড় আছে।
তর। হাঁ আছে। নাম বলুন।
কাম। হাতী, হাতী! হাতী না হয়েই যায় না। চতুষ্পদ এবং শুড়
আছে। খােল হাত।
তর। সাবধান! হাতীটা যদি উড়ে পালায় ?
কাম। সে কি! হাতী উড়বে ?
তর। যে হাতী হাতের মুঠোয় ধরে রাখা যায়, সে হাতী বন্ বন্
করে ওড়ে।
কাম। কই দেখি! ( তলিকা মুঠা খুলিয়া কামন্দকের নাকের কাছে
ছাড়িয়া দিল—কাম-ক তৎক্ষণাৎ তাহা ধরিয়া ফেলিয়া) এ কি!
মশা ? কিন্তু তা হলেও চতুষ্পদ...শুড় আছে ! ছােট হাতী,
ছােট হাতী...বলেছি কিনা-
ধরণী। বেঁচে থাক বাবা! মনিকার জন্মদিনে মিহির ও খনাকে নিমন্ত্রণ
করেছি। তারা আছে। এই সময়টায় তুমি
তর। না..বরং উনি থাকলে আমাদের সময়টা কাটবে ভাল।

তৃতীয় অঞ্চ
কাম। তাদের নিমন্ত্রণ হয়েছে ? কে নিমন্ত্রণ করেছে ?
বরণী। প্রভু স্বয়ং। ওদের ব্যবহারে তিনি ভারী প্রীত হয়েছেন।
ওদের দেখে যত মুগ্ধ হচ্ছেন, ততই বিরক্ত হচ্ছেন তােমার ওপর।
তুলনায় তুমি বড়ই নীচে নেমে যাচ্ছ কান্দক!
কাম। মায়া ! মায়া !-রাক্ষসী মায়া ! গেল, সব গেল ! হয়ত এখনও
সময় আছে। কোথায় প্রভু ?
ধরণী। প্রভু যথাস্থানেই আছেন। সেজন্য তােমাকে ভাবতে হবে না।
তুমি বরং
তর। আঃ ছােট হাতীগুলাের কি অত্যাচার! ওদের তাড়াবার একটা
ব্যবস্থা করতে পারেন ?
কাম। ক’রছি। মারণ-যজ্ঞ। দেখ—
প্রস্থান
ওরলিকা মনিকার গায়ে হাসিয়া ঢলিয়া পড়িল
নদ। গণনায় না হয় একটু ভুলই হয়েছে, তাই বলে ওকে অতটা অপদস্থ
করা আমাদের উচিত হয় নি তলিকা---
ধরণী। হাতের মুঠোয় হাতী আছে যে ভাবতে পারে, তাকে অপদস্থ
করার ক্ষমতা কারও নেই মা! আমি শুধু ভাবি ঐ খনার কপাল।
কি বরই পেয়েছে !
মদ। খনার কপাল তোমার না ভাবলেও চলবে না !
ধরণী। তাের কপালের কথা ভাবতে গিয়েই তাে তার কপালের কথা
মনে জাগে। যাই বল মা, মিহিরের কথা যতই শুনছি, ঐ
কামনককে

•। মদ। জ্যোতিষ আমি ঘৃণা করি মা, ঘৃণা করি। আসুন মিহির, কাব্য আর কবিতা নিয়ে দু-চারটা প্রশ্ন কি আমিই করব না। তর। সখি, তিনি এলেই সেই প্রশ্ন: চুল বাঁধি কেন? ধরণী। চুল বাঁধি কেন এও আবার একটা প্রশ্ন নাকি? হাঁ ভাল কথা-সম্রাট তাের জন্মদিনে ময়ূরকন্ঠি শাড়ী উপহার পাঠিয়েছেন সেই শাড়ী পরবি আয়। সকলের প্রস্থানােদ্যোগ। এমন সময় একগুচ্ছ ফুল হস্তে ভৈরবের প্রবেশ ভৈরব অতি যত্নে মনিকার সম্মুখে ফুলগুচ্ছ ধরিল মদ। আচ্ছা, একে কে ফুল আতে বলেছে ? জন্মদিনে একটা শুভকাৰ্যে যাচ্ছি•••সম্মুখেই এই অত্রা! ধরণী। ফুলগুলি ত বেশ! নে মনিকা। ঘরের লােক কি অযাত্রা মদ। তুমি জান না মা, ওকে দেখলেই আমার গা শিউরে ওঠে। তখনি একটা না একটা কিছু অনর্থ ঘটে। ভৈরবকে এড়াইয়া সকলের প্রস্থান। ভৈরব ভাঙিয়া পড়িল। তাহার হাত হইতে ফুলগুচ্ছ পড়িয়া গেল। স্বপ্নাবিষ্টের মত বরহের প্রবেশ, ভৈরবের কাছে গিয়া- বরাহ। ( চাপা গলায়) আমি পরাজয় স্বীকার করছি। আমি—আমি বিশ্ববিখ্যাত নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন আমি—ঐ সিংহলাগত যুবক- যুবতীর কাছে পরাজয় স্বীকার করছি। আমি স্বীকার করি, আমার চেয়ে ওদের জ্যোতিষের জ্ঞান লক্ষগুণে বেশী। ওদের যা শক্তি••• ৬২ তৃতীয় অঙ্ক তা, আমার কল্পনাতীত। আমার ইচ্ছা হয়, আমার কেবলই ইচ্ছা হচ্ছে—নবরত্ন সভাতেও নয়, বিশ্বসভায় আমি এ কথা ঘােষণা করি। জগতের সকল জ্যোতিষী মিলে ঐ দেব-দম্পতীকে পূজা করি- দৃপ্তকণ্ঠে ঘােষণা করি—কে কোথায় অবিশ্বাসী আছ, এইবার এস--- আমরা মূর্খতােমাদের সংশয় দূর ক’তে পারি নি কিন্তু এইবার এস দেখি ! আমার ইচ্ছা হয় ভৈরব, আমি ওদের পায়ে লুটিয়ে পড়ে’ বলি, আমি কিছু জানি না কিছু না। যেটুকু শিখেছিলাম, এতকাল তারই দর্পে আর এক পদ অগ্রসর হই নি! তােরা আমায় দয়া কর দয়া করে আমায় শিক্ষা দে-- শিক্ষা দে- ক্ষণকাল কি ভাবিয়া শিহরিয়া উঠিলেন, কিন্তু পরক্ষণেই হাসিয়া উঠিয়া কহিলেন এই কথা আমি বলতে পারি? আমি বিশ্ববিখ্যাত নবরত্ন সভার অন্যতম রত্ন। জগদ্বিখ্যাত জ্যোতিষী-শ্রেষ্ঠ বরাহ----আমি—আমি এই কথা বলতে পারি ? (হাসিয়া উঠিলেন—হঠাৎ যেন ভৈরবকে দেখিয়া তাহার প্রতি বজ্রনির্ঘোষে ) আমি তােমাকে কি বলেছি ? বল-বল- ভৈরব কিছুই বলিতে পারিল না বরাহ.। ( হাসিয়া উঠিলেন) ভৈরব ! প্রভুভক্ত মূক ভৃত্য আমার! যা বলেছি...সাক্ষ্য নেই—কেউ তার সাক্ষ্য নেই। ভৈরব ! ভৈরব ! !

খনা
আমার ইচ্ছা হয়, ওরা যখন ঘুমিয়ে থাকে, তখন একখানা ছুরি
ওদের বুকে-
কল্পনায় তাহাদিগকে ছুরিকাঘাত করিতে গিয়া ভৈরবকে দেখিয়া চমকিত
হইয়া তাহার নিকট পরম অপরাধীর মত
, না, না আমি না।
ভৈরব সান্ত্বনা দিবার জন্য পদসেবা করিতে লাগিল, যখন বুঝিলেন তাহার
সম্মুখে ভৈরবই আর কেহ নহে তখন বরাহের স্বপ্নভঙ্গ হইল
ও তুই ? ভৈরব ? সংবাদ কি? তাের মা কোথায়? মদনিক।
কই ? তরলিকা ? তােমরা কোথায় ?
ভৈরবের প্রস্থান
মিহির আর খনা কিন্তু রওনা হয়েছে। তােমাদের আয়ােজন সব
ধরণী, মদনিক এবং তরলিকার প্রবেশ
নদনিক বিচিত্র সাজে সজ্জিত।
ধরণী। সব প্রস্তুত। কিন্তু কই, তারা কই ?
বরাহ। তারা রওনা হয়েছে-
ধরণী। তােমার সঙ্গে তারা এল না কেন ?
বরাহ। এক সঙ্গেই রওনা হয়েছিলাম, কিন্তু পথে—
ধরণী। পথে কি হল ?
বরাহ। অজস্র লােক জমে গেল। যত সব অসভ্যের দল ।
৬৪

তৃতীয় অঙ্ক
ধরণী। পথেও লােক ভাগ্যগণনার জন্য ধ’বে ? পথেও কি তােমার
মুক্তি নেই ?
বরাহ জোর করিয়া কথাটা শেষ করিবার অভিপ্রায়ে
বরাহ। তাতে তােমার কি ?
ধরণী। আমার আর কি? আমার তাতে বরং গর্ব, কিন্তু
মদ। লােকেরা কি তাঁদের পথরােধ করেছে ? তারা কোথায় ?
তাঁদের এত দেরী কেন ?
বরাহ। আমি জানি না।
ধরণী। তারা হয়ত প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না, তাই বিলম্ব হচ্ছে।
তা, তুমি গিয়ে না হয় তাদের উদ্ধার করে আন! রাত্রি যে মেই
গভীর হয়ে আছে!
বরাহ। প্রয়ােজন থাকে তুমি যাও, আমি পারব না।
নিস্তব্ধতা
ধরণী। এই ঘরে তাদের শােবার ব্যবস্থা করেছি। আমি নিজেই এ ঘর
আজ সাজিয়েছি। আজ ওরা আসবে শুনে শুধু মনে হচ্ছে এ যেন
আমারই ছেলে...বিয়ে করে ঘরে বউ আছে। কেন যেন শুধু মনে
হচ্ছে-ঐ মিহিরও কেন আমার গর্ভে জন্ম নিল না?
মদ। (ধরণীকে জড়াইয়া ধরিয়া সাভিমানে) মা!
ধরণী। কি মা? ও কথা শুনে তাের বুঝি অভিমান হ’ল ?

খনা
ছি মা, তুই—তুই-ই যে আমার সাত রাজার ধন এক
মাণিক! (বরাহকে) আজ ওর জন্মদিনে তুমি ওকে আশীর্বাদ
মদ। বাবা!
বহকে প্রণাম করিল
বরাহ। ওঃ!
একটা অস্ফুট আর্তনাদ কণ্ঠ হইতে বাহির হইল
ধরণী। তুমি পিতা,
আজ
ওর জন্মদিনে
আশীৰ্বাদ
বরাহ। ভৈরব । ভৈরব !-
ধরণী। ভৈরবকে আবার এখন কি প্রয়ােজন ? এই শুভ মুহূর্তে
ছুটিয়া ভৈরবের প্রবেশ
মদ। (ভৈরবকে) আমার সম্মুখ থেকে দূর হও।
ভৈরব পিছাইয়া গেল
বরাহ। (মনিকাকে ) কেন ?
মদ। ( প্রায় কঁদিয়া) আমি জানি না—আমি জানি না।
ধরণী। পিতা যখন কন্যাকে আশীৰ্বাদ করবে তখন ও কেন? কতবারই
ত তােমাকে বলেছি—মনিকা ওর চেহারা দেখেই শিউরে ওঠে।
ওকে দেখলেই

তৃতীয় অঙ্ক
মদ। আমার ভয় হয়। মনে হয় ও একটা দৈত্য। (বরাহকে)
ওর আচরণ ত জান না তুমি, পারে ত আমায় গ্রাস
করে।
বরাহ। ভৈরব !
নিকটে আসিবার জন্য ইঙ্গিত
মদ। মা ।--
ধরণীর প্রতি অভিযােগসূচক দৃষ্টিতে
ধরণী। (বরাহের প্রতি) তবু? তবু ?
বরাহ। ভৈরব ।
ভৈরব নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল, মনিকাকে
আজ তােমার এই জন্মদিনে ওকে প্রণাম কর মনিকা।
মদ। প্রণাম !! ওকে ?
ঘৃণায় মুখ ফিরাইল
বরাহ। ও তােমার যেমন হিতাকাঙ্ক্ষী, তেমন তােমার আর কেউ নাই,
আমিও না-তােমার এই মাতাও নয়।
ভৈর ইঙ্গিতে জানাইল প্রণামের প্রয়ােজন নাই প্রণাম সে চায় না।
এক হাতে চোখের জল ঢাকিয়া অন্য হাতে মনিকাকে আশীর্বাদ
করিতে করিতে চলিয়া গেল

ধরণী। (বরাহকে) তুমি ওকে আশীর্বাদ করুলে না?
বরাহ। জগতের শ্রেষ্ঠ আশীৰ্বাদ ও লাভ করেছে। মা!
মদনিক প্রণাম করিল
দীর্ঘ জীবন লাভ কর, পিতাকে সুখী কর।
ধরণী। মাতার কথাটা বাদ গেল কেন? (হাসিয়া) কি স্বার্থপর
তুমি !
নেপথ্যে কোলাহল
ও কিসের কোলাহল ?
বরাহ। তারা আছে।
ধরণী। আমি আহারের আয়ােজন
আয়ােজন ক’ছি। তােমরা ওদের নিয়ে
এস।
ধরণীর প্রস্থান। বরাহ ও মদনিক বাহিরে চলিয়া গেলেন।
বাহিরে কোলাহল
নেপথ্যে।
“আমার কি হবে দেবী ?”
“সমুদ্র যাত্রা তবে আমার হবেই?”
“আমার বৌ মরবে, সে কি ?”
“কলার চাষ এই মাসে ?”
“আমার সন্তান হবে একুশটি ? আরে সর্বনাশ !”
“গুপ্ত ধনটা কোথায়? বল দেবী ?”
“কখন যাত্রা কলে শুত হয়?”
বহুকণ্ঠে।
৬৮

তৃতীয় অঙ্ক
নেপথ্যে খনা। মঙ্গলের ঊষা বুধে পা
যথা ইচ্ছা তথা যা
রবি গুরু মঙ্গলে উষা
আর সব ফাস ফুস
বহুকণ্ঠে উহার পুনরাবৃত্তি হইল
উত্তেজিতভাবে বরাহের প্রবেশ
বরাহ। অশাস্ত্রীয়—নিতান্ত অশাস্ত্রীয় ।
পশ্চাতে পশ্চাতে মিহিরের প্রবেশ
মিহির। কি অশাস্ত্রীয় আচাৰ্য ?
বরাহ। খনা দেবী যেরূপ যাত্রার শুভলগ্ন নিরূপণ করছেন—“মঙ্গলে
উষা, বুধে পা,—যথা ইচ্ছা তথা যা।” যদি তখন মঘা, কিম্বা অশ্লেষ্ম—
কিম্বা ত্র্যহস্পর্শ হয়—তবু ?
মিহির। হাঁ, তবু মঙ্গলবারের নিশাবসানে উষাকালে, বুধবারের প্রারম্ভে,
যদি যাত্রা করা যায়, সে যাত্রা পরম শুভ।
বরাহ। আৰ্য ঋষিগণ কি মূখ ছিলেন ? অথবা ঘুম ভাঙতো মধ্যাহ্নে,
উষার সন্ধানই তারা পান নি ?
মিহির। তখাপি উষার মাহাত্ম লােপ হবে বলে মনে হচ্ছে
। বাইরের ঐ যত
যত লােক এসেছে, সবাই খনা দেবীর
বচন অনুযায়ী যাত্রা করে সফল মনােরথ হয়েই, ওই বচন
লিখে নিচ্ছে।

মনিকার প্রবেশ
মদ। (বরাহকে) দিদিকে বাঁচাও বাবা ! (মিহিরকে) না হয়
আপনিই যান। এ কি অত্যাচার! এক মুহূর্তের অবসরও কি
ওঁর মিলবে না?
বরাহ। কি হয়েছে মা?
মদ। তা কি দেখছ না বাবা? রাজ্য শুদ্ধ নােক এসে যে খনা-
দিদিকে পাগল করে তুল! কারও প্রশ্ন, পেটে কি আছে?
ছেলে না মেয়ে? কলার চাষ কোন্ মাসে ? গুপ্ত ধনটা কোথায়?
এমনি সব কত প্রশ্ন? রক্ষা কর বাবা, তুমি গিয়ে দিদিকে রক্ষা কর !
বরাহ। আচ্ছা মা, আমি যাচ্ছি—
হাসিমুখে বরাহের প্রস্থান
মদ। আমি শুধু ভাবছি, দিদি কি করে হাসিমুখে এই অত্যাচার
সহ করে ?
মিহির। হ, ও পারে। কিন্তু আমি পারি না।
মনিকা ও মিহিরের বাহিরে প্রস্থান
নেপথ্যে বরাহ। কার কি গণনা আছে বল ?
নেপথ্যে জনতা উচ্চহাস্থ করিয়া উঠিল
নেপথ্যে বরাহ। মা-লক্ষ্মী আমার গৃহে অতিথি। তাকে অন্তঃপুরে যেতে
দাও। কার কি গণনা আছে আমায় বল ?
নেপথ্যে জনতা। আমরা আর ঠকছি না। বরং কাল এসে মা-লক্ষ্মীর পায়ে
পড়ব।
চল হে চল
৭০

তৃতীয় অঙ্ক
নেপথ্যে বরাহ। আমি কি তােমাদের ঠকিয়েছি ?
নেপথ্যে জনতা। মা-লক্ষ্মীর গণনা দেখে এখন তাই মনে হচ্ছে ঠাকুর।
নেপথ্যে বরাহ। বটে! বটে।
নেপথ্যে খনা। তােমরা অবােধ, তাই ঐ মহাপুরুষের মর্যাদা জান না।
ঐ মহাপুরুষের চরণতলে শিক্ষালাভের আমরা যােগ্য নই।
নেপথ্যে জনতা। তােমার মা এ অনর্থক বিনয়! শােন মা
নেপথ্যে খনা। তােমাদের কথা শুলেও পাপ হয়।
বরাহ, খনা, মিহির ও মনিকার প্রবেশ-পশ্চাৎ পশ্চাৎ জনতা
ভিড় করিয়া আসিয়া দাড়াইল
খনা। (বরাহের নিকটে গিয়া) দেব! ওরা অবােধ, ওদের ক্ষমা
করুন! আমায়ও ক্ষমা করুন।
ইহাতে জনতার মধ্যে কেহ বলিয়া উঠিল
“আহা মা’র কি বিনয়।”
ধনার মুখখানা সহসা ছাইয়ের মত শাদা হইয়া গেল। একটা অব্যক্ত
যাতনায় দুই হাতে মুখখানা চাপিয়া ধরিল
খনা। ওঃ !
মিহির। কি বিড়ম্বনা! কে জান্ত এমন হবে! মহাপুরুষের এই
অসম্মান আর ত দাড়িয়ে দেখতে পারি না খনা।
খনা। চল, চল, আমায় এখান হ’তে নিয়ে চল--
জনতার মধ্যে কেহ। আমরাও তবে নিশ্চিন্ত হই। মহাপুরুষের মতিভ্রম
৭১

হ’তে কতক্ষণ? এস মা শীগগীর এস—এই রাত্রিযােগে এই
নেমন্তন্নের কথাটাই আমাদের ভাল লাগছে না।
মদ। (মহা ক্রোধে ) ভৈরব ! ভৈরব !
ছুটিয়া ভৈরবের প্রবেশ
বাহিরের ঐ লােকগুলােকে
বরাহ। (ভৈরবকে) না-
ভৈরব মনিকার ইঙ্গিত মাত্র জনতার উদ্দেশে ছুটিতেছিল।
বরাহরের আদেশে ক্ষান্ত হইল বটে কিন্তু জনতা
ভয়ে ছুটিয়া পালাইল
( খনাকে) যাও, মা, ওদের নিরাশ করাে না, ওদের কাছে যাও।
খনা। বাহিরের ঐ নরকে আমাদের তাড়াবেন না! আপনার চরণে
আমাদের আশ্রয় দিন্ দেব !
ধরণীর প্রবেশ
ধরণী। তােমাদের গল্প কি ফুরুবে না ? খাবার যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল ।
খনা। মা !
কাদিতে কঁদিতে ধরণীকে জড়াইয়া ধরিল
ধরণী। এ কি মা, কাদছ নাকি?
খনা। না মা, মা ক্ষিদে পেয়েছে, কঁদব না? শিগগীর চল,
খেতে দাও।
মদ। পন্যি মেয়ে! (মিহিরকে) আসুন।
৭২

তৃতীয় অঙ্ক মিহির। (বরাহকে) চলুন! ধরণী। ওঁর খাবার সময় এখনও হয় নি। সে সেই দুপুর রাতে। তােমরা এস। বরহ। নানা—চল আমি যাচ্ছি। তােমাদের আহার দেখব। ধরণী। নানা—তুমি গণনাই কর। নইলে কাল সকালে লােক এসে তােমার মাথা খাবে। (মিহির ও খনার প্রতি একটুও সময় যদি পান! বড় হওয়ার এ যে কি বিপদ, যখন হবে বুঝবে। বরাহ ব্যতীত সকলের প্রস্থান অন্যদিক হইতে একজন লােককে ধরিয়া লইয়া কামন্দকের প্রবেশ দাম। পালাবে কেন ? ভয় কি ? কি গুণতে হবে বল। দেখছ না সম্মুখে সাক্ষাৎ শুক্রাচার্য। লােক। আমি অনেক দূর দেশ হ'তে এসেছি মশাই! শুাম, এখানে এলেই মনস্কামনা পূর্ণ হবে। সেই আশায় কষ্টকে কষ্ট মনে করি নি, অর্থ ব্যয় সার্থক মনে করেছি। কিন্তু এখানে পৌঁছেই দেখলাম, বহু লােক প্রাণভয়ে পালাচ্ছে- কাম। ওদের ফঁাড়া আছে কিনা! প্রভুর গণনা শুনেই সবাই দৌড়ে পালাল -- লােক। তবে ত আরও বিপদ। শুনেছি সর্পদংশনে আমার মৃত্যুযােগ আছে। ফঁাড়া যদি সত্য হয়, কি হবে? আমার যে বাতব্যাধি। পালাতে ত পারব না। কাম। পালাবে কেন ? গ্রহশান্তি-অব্যর্থ ! অব্যর্থ! দক্ষিণা তিন রজতমুদ্রা। সদ্য ফলপ্রদ বিশেষ গ্রহশান্তি-দক্ষিণা নব সংখ্যক রজত- খনা মুদ্রা। এবং•••বা-রা-হী কবচ :সৰ্ববিঘ্নবিনাশন•••সৰ্বভয় প্রশমন •••সর্বসিদ্ধিসংঘটন—দক্ষিণা অষ্টদশ রজতমুদ্রা। যজ্ঞও করতে পার। সর্পজ্ঞ ! জন্মেজয় করেছিল, শােনন ? লােক। না শুনি নি। কিন্তু শুনেছি ঐ প্রভুর অদ্ভুত গণনা। তাই কোন্ দিন, কোথায়, কি অবস্থায়, কোন্ দণ্ডে, কোন্ পলে, কোন্ অনুপলে, সেই কালসর্প— চমকিয়া সভয়ে চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত কাম। এত ভয় কেন? সম্মুখে দেবতা। লােক। দেবতা জেনেই জাতে এসেছি--কবে, কোথায়, কখন, কোন্ দণ্ডে, কোন্ পলে, কোন্ বিপলে, সর্প আমায় দংশন করবে ? ফঁাড়াটা বহু জ্যোতিষীকে দিয়ে গুণিয়েছি:। কারও সঙ্গে কারও গণনা মেলে না। কেউ বলে আজ কাল, কেউ বলে বিশ বৎসর পর, কেউ বলে এখনও ত্রিশ বৎসর বাকী। কেউ বলে আমার ম’রবার পর সেই ফাটা ! অবশেষে শুনলাম বিক্রমাদিত্য রাজসভায় অপহৃত শিশুর উদ্ধারের সেই অলৌকিক কাহিনী। নবরত্নের অন্যতম রত্নরূপে পরিচিত বরাহকে মূখ প্রতিপন্ন করে ( বরাহকে দেখাইয়া) ঐ সিংহল দেবতার অত্যাশ্চর্য গণনা! ( হঠাৎ ) আমার মা কোথায় ? খনা মা ? কাম! আছেন, আছেন, ভাত রান্না করছেন। সাবধান, কোন বাজে কথা নয়। দেখছ না প্রভু ধ্যানমগ্ন ! দর্শনী আমার হাতে দিয়ে তুমি গিয়ে শুধু বল—প্রভু! সাপে আমাকে কবে খাবে? ব্যস্ আর কোন কথা নয় দর্শনী ? ৭৪

তৃতীয় অঙ্ক
লােক। (দর্শনী দিবার ভান করিয়া হঠাৎ ছুটিয়া গিয়া বরাহের চরণ
ধরিয়া) প্রভু! আমি আপনার চরণপ্রান্তে উপনীত হবার পূর্বেই
কপর্দকহীন হয়ে পড়েছি। সূৰ্য্যদেবনিতান্ত যে গরীব তাকেও আলাে
দিতে কার্পণ্য করেন না। আমাকেও আপনি তেমনি দয়া করুন•••
দয়া করে আপনার মিহির নাম সার্থক করুন।
বরাহ। আমার নাম মিহির!
লােক। আপনার নাম আজ কে না জানে? সিংহল হতে যে দিন
বরাহ। তুমি ভুল করেছ--আমি বরাহ।
লােক। বরা-হ? আপনাকে ত আমি চাই নি ! আমি যে সেই
সিংহল-দেবতা মিহিরকে চাই। সাক্ষাৎ সরস্বতী খনা মাকে চাই।
বরাহ। কি প্রয়ােজন তােমার ?
কাম। সর্প দংশনে ওর মৃত্যু-যােগ আছে। সেই ফঁড়াটা কবে, কোথায়,
কখন
বরাহ। বেশ, আমিই গণনা করছি। এ ত অতি সহজ গণনা।
লােক। না, না মশাই, আপনার কথা আমার জানা আছে। আমি
চাই সেই সিংহল দেব-দেবীকে। শুলাম, তারা এখানে, এই গৃহেই—
কাম। ( রাগিয়া তাহাকে তাড়াইবার মানসে চীৎকার করিয়া ) সাপ।
সাপ! সাপ !
লােক। বাপ! বাপ! বাপ, !
দৌড়িয়া পলায়ন
বরাহ। এর চেয়ে আমার মৃত্যু ভাল কামক মৃত্যু ভাল।
কাম । আমিও তাই ভাবছি, মৃত্যু ভাল, কিন্তু আপনার নয় ।

ভৈরব ছুটিয়া প্রবেশ করিল বরাহ। জীবনে এত অপমান কখনও সইনি। অথচ এও বুঝছি-এর জন্য ওরা এতটুকু দায়ী নয় ! কাম। এ সব ষড়যন্ত্র প্রভু, ষড়যন্ত্র ! আপনি বুঝছেন না—তাই ওদের নেমন্তন্ন করে ঘরে ডেকে এনেছেন। শুধু কি তাই? ওদের জন্য ফুলশয্যা রচনা হচ্ছে! দুধ দিয়ে মানুষ কাল সাপ পােষে—আমি এই প্রথম দেখছি। শােন তৈরব— ভৈরবকে কি বলিতে লাগিল বরাহ। না, না, ওদের কি দোষ? আমি দেখেছি, ওদের গণনা অব্যর্থ। আমি বুঝেছি, ওদের বিদ্যা অলৌকিক বিদ্যা। ওদের প্রতিভাও অস্বীকার করবার উপায় নেই। কিন্তু এ কথাও ঠিক কামক, ওদের বিদ্যা রাক্ষসী-বিদ্যা-সনাতন শাস্ত্রসম্মত নয়। কিন্তু কি ক’ব, আজ আমি বৃদ্ধ, আমার সে নব নব উন্মেষশালিনী প্রতিভা নেই—তর্ক-যুদ্ধের শক্তি নেই, সাহসের অভাব হয়েছে, অধ্যবসায় হারিয়েছি। আজ আমি আমার যৌবনের জীর্ণ কঙ্কাল—আজ আমার বুকে শুধু এক হাহাকার—কি জান কামক ? কাম। কি প্রভু ? বরাহ। আমার পুত্র নাই, পুত্র নাই--আজ যদি আমার পুত্র থাকৃত, রূপে সে কারও কাছে ম্লান হত না। শিক্ষায় সে কারও কাছে মাথা নত করত না। বিদ্যায়, প্রতিভায়, হয়ত বিশ্বের বিস্ময় হত। আজ আমার পুত্র নাই-তাই আজ এই বার্ধক্যে অসহায়ভাবে দেখতে ৭৬ তৃতীয় অঙ্ক হচ্ছে রাক্ষসী-মায়ায় কিরূপে দেশ ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন হচ্ছে সনাতন জ্যোতিষ কিরূপে ক্রমে ক্রমে রাহুগ্রস্ত হচ্ছে। থাকৃত যদি আমার সে এ অপমান কিছুতেই সহ্য ক’ত না•••এর প্রতিকার করুত। সে নেই--কিন্তু আমরা ত আছি:••এস ভৈরব,-- ভৈরবকে লইয়া কামন্দকের প্রস্থান বরাহ। বৃথা—বৃথা—বৃথা, আমার জীবনই ব্যর্থ হ’ল—শুধু এক পুত্রের অভাবে- প্রস্থান ধরণী, মনিকা, মিহির ও খনার প্রবেশ ধরণী। আর রাত করােনা বাবা! মা মনিকা, এবার ওরা বিশ্রাম করবে। প্রভু কোথায়? তবে কি আবার পাঠাগারে গেলেন ? আয় মনিকা, খনা ও মিহিরকে) আসি বাবা–আসি মা ! আর রাত করাে না—ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। আয় মনিকা। ধরণীর প্রস্থান মদ। যাই মা ! খনা। (মদনিকাকে) একটা গান মদ। (খনাকে ) একটা গান- খনা। তুমি মদ। না ভাই তুমি-- মিহির। কলহ কেন? না হয় আমিই ৭৭

খনা
খনা। না, না, রক্ষে কর! এত রাত্রে শান্তিভঙ্গ সুবিধার কথা নয়।
তুমি গাও ভাই ।
—মদানকার গান
এল,
সখি,
জীবন-মাঝে আজি পরম-রাতি
কনক-দীপে আলাে উজল-বাতি।
এল দখিন হাওয়া,
কার পরশ পাওয়া-
রঙিন হয়ে এল নেশায় মাতি।
।
এল,
আছি,
দুয়ার খানি মাের আধেক খুলে
কদম-কেশর সই, খোপার চুলে
মিছা মেঘের শাড়ী,
মােছ নয়ন-বারি-
জীবন-সাথী মাের মলিন ভাতি।
বিনা,
ধরণীর প্রবেশ
ধরণী। এখনও শুতে যাও নি বাবা ! আয় মনিকা।
ধরণী ও মনিকার প্রস্থান
খনা।
এ জম্মদিনেও ও সুখী নয় ।
মিহির। এ বয়সে বিয়ে না হলে অ-সুখ হবারই কথা খনা।
খনা। আজ তােমারও জন্মদিন মিহির।
মিহির। আমারও জন্মদিন আজ! বল কি না?
৭৮

তৃতীয় অরু
খনা। গণনা করেই বলছি মিহির। বিশ বৎসর পূর্বে এই উজ্জয়িনীতে
ঠিক এই দিনটিতেই তুমি প্রথম ধরণীর আলাে দেখেছিলে!
মিহির। কার ঔরসে ? কার গর্ভে ? কোথায়? কোন্ গৃহে ?
খনা। উতলা হয় না মিহির! উপযুক্ত দিন-ক্ষণ হলেই আমি বন্ধ।
মিহির। তার আর কত বিলম্ব ?
খনা। তুমি নিশ্চিন্ত থাক মিহির ! তুমি যত অধীরই হও না কেন,
অসময়ে আমি কোন কথাই বলব না। ব’লবার হলে বহু পূৰ্ব্বে-সেই
সিংহলেই আমি বলতাম। ( নিস্তব্ধতা )
মিহির উঠিয়া ঘরের দিকে চলিল
যাচ্ছ যে ?-
মিহির। যে অক্ষম, ঘুমিয়ে থাকাই তার পক্ষে শান্তি।
ঘরে গিয়া শয়ন
খনা। বটে, যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর।
ঘরে গিয়া দুয়াৰ দিয়া শয়ন
দেহ আবৃত করিয়া চোরের মত কামনক ও তৎপশ্চাতে ভৈরবের প্রবেশ। ভৈরবের
হাতে মশাল। কামক ভৈরবকে ইঙ্গিতে বুঝাইতেছিল--
ঐ ঘরে আগুন দিতে হইবে। ভৈরব চকমকি দ্বারা
মশাল জ্বালিবার উপক্রম করিতেই
নেপথ্য হইতে
বরাহ। কে ? কে ওখানে? পালিও না, দাড়াও।
বরাহের কণ্ঠ শুনিয়াই উভয়ের পলায়ন। বরাহ তাহাদের
ধরিবার জন্য সেই দিকেই গেলেন

খনা দুয়ার খুলিয়া বাহিরে আসিয়া দাড়াইল
খনা। কেউ ত নেই। তবে কি শুনতে ভুল করলাম ! ভারতবর্ষে কি
সবই সুন্দর ! কি সুন্দর চাদনী রাত ! মিহির ঘুমিয়েছে। এই
চাঁদের আলাে ছেড়ে ঘরে যেতে মন চায় না! (সােপানে.উপবেশন )
মন ভুলে অবহেলে—
সােনার-কমলে পাষাণ-পরাণে দিয়েছিলে জলে ফেলে ।
স্রোতের সে ফুল উতলা হাওয়ায়
কত গাঙ, ভেসে ফিরে এল হায়--
ও ভােলা, তাহারে বুকে তুলে নাও--দিয়াে নাক দূরে ঠেলে।
বরাহের প্রবেশ
বরাহ। খনা !
খনা। আপনি? এ সময় ? খানিক
সময় ? খানিক পূৰ্ব্বে-সে কি তা হলে
আপনারই কষ্ট
বরাহ। হাঁ মা। কিন্তু, আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে মা?
খনা। কি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করুন পিতা।
বরাহ। তুমি কি আমাকে উদ্দেশ্য করেই ও গান গাইছিলে?
খনা নিরুত্তর
বরাহ। বল মা, চুপ করে রইলে কেন? বুঝেছি, আমাকে ব্যঙ্গ করাই
তােমাদের উদ্দেশ্য।

তৃতীয় অঙ্ক খনা। সে কি পিতা ? বরাহ। এই জন্যই তােমরা সুদূর সিংহল হ’তে এখানে এসেছ? খনা। এ ভ্রান্ত ধারণা কি করে আপনার মনে উদয় হ’ল ? বরাহ। না আমার ধারণা ভ্রান্ত নয়। যদি তাই হয় তা হলে বল- তােমাদের এখানে আসার প্রকৃত কারণ? এখন ব’তে পারব না। সময়ে জাতে পারবেন। বরাহ। তা হলে আমার অনুমানই সত্য ? খনা নিরুত্তর বরাহ। বয়সে আমার অপমৃত্যুর আয়ােজন না করে আর কিছুকাল অপেক্ষা করলে কি তােমাদের বিশেষ ক্ষতি খনা। সে কি পিতা ? ধরাহ। জীবনের চেয়ে যশ বড়। তােমরা আমার সেই যশ-.. খনা একবার কিছু বলিবার উপক্ৰম করিল, কিন্তু পরক্ষণেই চুপ করিল বরাই। আমি বৃদ্ধ। আর সে শক্তি নাই যে, তােমাদের উদীয়মান প্রতিভার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাড়াই। কিন্তু মা, এ শক্তিও নাই, যে এই অপমান, এই লাঞ্ছনা সহ করি। ঘরে লাঞ্ছনা, বাইরে লাঞ্ছনা-বল মা, তােমরা কি আমার মৃত্যু চাও? খনা। দুর্ভাগ্য যে আপনি আমাদের এতখানি ভুল বুঝেছেন! সুদূর সিংহল হ’তে কেন এখানে এসেছি ? ৮১ বরাহ। কেন তা মৰ্ম্মে মর্মে বুঝতে পারছি। ওঃ! আজ যদি আমার পুত্র থাক্ত! খনা। মনে করুন না কেন যে আমরা আপনারই সন্তান•••মনে করুন কেন আমরা আপনারই পুত্র-পুত্রবধূ! বরাহ। তা যদি হতে—তা যদি হ’তে মা, না যাক- খনা। দীর্ঘনিশ্বাস কেন ? মনে করা কি একেবারেই অসম্ভব ? বরাহ। আমি তা মনে করলেও লােকে তা মনে করবে কেন ? খনা। লােকে কি আজ এই কথাই মনে করতে পারে যে আপনি অপুত্রক ন, পুত্র আপনার হয়েছিল ? বরাহ। খনা! খনা ! খনা। যে—-আপনি, আপনার আপনার সেই পুত্রকে তার জন্মদিনেই, বিশ বৎসর পূৰ্ব্বে ঠিক এই দিনে স্বহস্তে জলে নিক্ষেপ করেছিলেন ? বরাহ। তাম্রপাত্রে—এই তাপ্তির জলে-তুমি-তুমি-তুমি এ কথা কি করে জানলে? খনা। যেমন করেই হােক আমি জেনেছি। বরাহ। গণনায়? গণনায় ? খনা। হঁ গণনায়। কিন্তু গণনায় ত এ কথা জানতে পারলাম না যে পিতা হয়ে কেন আপনি স্বয়ং সেই সন্তানকে বরাহ। গণনা-গণনা করে দেখলাম, মাত্র এক বৎসর তার আয়ু খনা। এক বৎসরনা একশত বৎসর ? ৮২ তৃতীয় অঙ্ক বরাহ। এক বৎসর। খনা। না, একশত বৎসর ? বরাহ। হতে পার তােমরা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্যোতিষী--কিন্তু জাতকের আয়ু গণনার সামান্য জ্ঞানটুকু আমার আছে। খনা। কিন্তু মানবমাত্রেরই ত ভুল হয়--আপনারও-- বরাহ। সাবধান! খনা। আপনি ক্রুদ্ধ হতে পারেন কিন্তু এ কথা যদি আজ জানেন যে আপনার পুত্র আজও বর্তমান, তথাপি কি আপনি ক্রুদ্ধই হবেন ? বরাহ। সাবধান! সাবধান! খনা বক্ষাবরণ হইতে একখানি গণনাপত্র বাহির করিয়া বরাহের সম্মুখে ধরিয়া খনা। তবে দেখুন, আমি আপনার সেই পুত্রের জন্ম-পএিকা রচনা করেছি। এই দেখুন, আয়ু ছিল তার একশত বৎসর—অথচ আপনি তার পিতা, গণনায় দু’টি শূন্য ভুল করে বরাহ। তাহার হাত হইতে গণনা পত্র কাড়িয়া লইয়া ছুড়িয়া দিয়া সাবধান! সকল অপমান আমি সইতে পারি, কিন্তু এ অপমান- খনা। অপমান ? না আনন্দ ? বরাহ। (সেই জন্ম-পত্রিকা কুড়াইয়া লইয়া) এই পত্র তােমার ভ্রান্ত গণনার সাক্ষী হয়ে রইল রাক্ষসী! আমি বিশ্বসমক্ষে প্রকাশ ক’ব পত্রে দৃষ্টিপাত করিয়া) দাড়াও, দেখছি, কোথায় তােমার ভুল-( মনােনিবেশ সহকারে দেখিয়া চীৎকার করিয়া) এ কি ? ( পুনরায়) এ কি? সত্যই ত—সত্যই ত— আবার গণনা পৰ্যবেক্ষণ) তাই ত— বসিয়া উন্মাদের মত পুনরায় গণনা) কি করেছি! এ আমি কি করেছি। খনা। আপনি শান্ত হন। আপনার পুত্র জীবিত আছে। বরাহ। কে সে? কোথায় সে? খনা। কিন্তু ব’বার সে শুভ মুহূর্ত যে এখনও আসেনি পিতা! ইতিমধ্যে কমন্দক ইহাদের অলক্ষ্যে মিহিরের ঘরের শিকল টানিয়া দিয়াছে। ভৈরব ঘরে আগুন দিয়াছে। আগুন জ্বলিয়া উঠিয়াছে বরাহ। তা হাে, তবু তুমি বল কে আমার পুত্র- মিহির। ( ভিতর হইতে) আগুন! আগুন! খনা। ও কি! সৰ্ব্বনাশ- বরাহ। বল মা ! কে আমার পুত্র ! মিহির। খনা—খনাঘর থেকে আমি বেরুতে পারছি না, আমি পুড়ে মরলুম-- খনা। হাত ছাড়-হাত ছাড়---আমার স্বামী—আমার স্বামী- বরাহ। আমার পুত্র-আমার পুত্র মিহির। খনা, এই মৃত্যু মুহূর্তেও কি তুমি ববে না—কে আমার পিতা? ৮৪ বরাহ। বল কে আমার পুত্র? বল কে আমার পুত্র ? খনা। তােমার পুত্র—তােমার পুত্র- হাত ছিনাইয়া লইয়া ছুটিয়া গিয়া ঘরের শিকল খুলিয়া দিয়া আমার স্বামীই তােমার পুত্র। মিহির ছুটিয়া বাহিরে আসিল মিহির। তুমি ! তুমি! পিতা ? বরাহ। আমি-আমি- মিহিরকে বক্ষে জড়াইয়া ধরিলেন ৮৫ চতুর্থ অঙ্ক প্রথম দৃশ্য অগ্নিদগ্ধ গৃহ প্রাঙ্গণ। গভীর রাত্রি। বরাহ প্রেতের মত পদচারণা করিতেছিলেন। পুথি হন্তে কামন্দক মনিকার খােজে যাইতেছিল হঠাৎ বরাহ তাহাকে পশ্চাৎ হইতে ডাকিলেন। কাম-ক চমকিয়া উঠিল বরাহ। কামক! কাম। প্রভু ! বরাহ। তুমিই ঘরে আগুন দিয়েছিলে ? কাম। সে কথা ত কেউ ব’ছে না—সে কথা কেউ তুলছেই না। সবাই ব’ছে-কি আশ্চৰ্য্য প্রভু—এ কথা এরই মধ্যে সারা উজ্জয়িনীতে রাষ্ট্র হয়ে গেছে—সম্রাটের কানে পৌঁছেছে—আপনার বহিপ্রাঙ্গণে জনতারও অন্ত নাই এবং সে কি ব্যঙ্গ বিদ্রুপ! আপনি নাকি লাঞ্ছনার হাত এড়াবার জন্য জোর করেই বলছেন ঐ মিহির নাকি আপনার পুত্র এবং ওকে জলে ভাসিয়ে দিয়ে বিশ বছর পরে ফিরে পাওয়ার যে গল্প রচনা করেছেন, সবাই সে গল্প শুনে ব’ছে, কল্পনায় আপনি কালিদাসকেও পরাজিত করেছেন। বরাহ। হু তুমি যাও। আমাকে একাকী থাকতে দাও। 'বাও- যাও কামনক। কামন্দকের প্রস্থান

চতুর্থ অঙ্ক
ধরণীর প্রবেশ
ধরণী। প্রভু!
বরাহ। বল।
ধরণী। এতদিন আমার কাছে এ সংবাদ গােপন রেখেছিলে কেন?
বরাহ। বলতে চেয়েছিলাম ধরণী—কিন্তু কিন্তু নিজের দুর্বলতার
জন্য তা পারি নি।
ধরণী। তা হলে--মদনিক আমার কন্যা নয়—কন্যা সেই ক্রীতদাসের
অর্থাৎ ঐ ভৈরবের? সেদিনকার সেই গল্প তবে অক্ষরে অক্ষরে
সত্য ?
বরাহ। অক্ষরে অক্ষরে সত্য।
ধরণী। মনিকা-মদনিক আমার কন্যা নয় ? যাকে আজ বিশ বৎসর
দেহের রক্ত জল করে লালন করলাম, পালন করলাম-সে আমার
কন্যা নয় ? পুত্ৰ হ’ল ঐ মিহির—যে আমার এক বিন্দু স্তন্য পর্যন্ত
পান করে নি! প্রভু ! প্রভু ! মিহিরকে আমি ফিরে পেয়েছি
এ আনন্দ আমি সইতে পারছি—কিন্তু মনিকাকে হারাবার দুঃখ
আমি সইতে পারব না। না—না-পারব না।
নেপথ্যে মদ। মা! মা!
ধরণী। মনিকা! কি বলব প্রভু! আমি তাকে কি বলব?
মনিকার প্রবেশ
মদ। মা ! মা ! যা শুনলাম তা কি সত্য?
ধরণী। (নীরব রহিলেন)
৮৭

মদ। তুমি কথা কইছ না কেন মা? তােমরা কি মানুষ মা? এত সব ঘটনা যে ঘটেছিল, কই একটিবারও ত আমায় বল নি ? ধরণী। তবে শােন মা—আজ তােমায় বলছি কত বড় অবিচার যে আমরা তােমার ওপর করেছি- মদ। একশবার করেছ। এত বড় একটা ঘটনা সবার কাছে লুকিয়েছ- লুকোও, কিন্তু তাই বলে আমার কাছেও লুকোবে ? ধরণী। কিন্তু আজ আর না বলে পারছি না—আমি সব বলছি- মদ। থাক আর বলতে হবে না। যেন আমি কিছুই শুনি নি। ধরণী। শুনেছিস্? মদ। না শুনেই বুঝি লাফাচ্ছি? ধরণী। কি শুনেছিস্ বল্ দেখি- মদ। ঐ মিহির আমার দাদা। বাবা ওকে জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন আয়ু গুণতে ভুল করে। শিশু-হত্যার অপরাধ হয়েছে বুঝতে পেরে কথাটা গােপন রেখেছিলে তােমরা। ভারী দুঃখে ছিলে তােমরা- যদ্দিন না আমি হলুম। মিহির আমার ক’ বছরের বড় মা? বরাহ। ( ছুটিয়া আসিয়া ) না না, তুমি ভুল শুনেছ মদনিক! প্রকৃত কাহিনীর অনেকখানিই তুমি শােননি। ধরণী। (বরাহকে বাধা দিয়া) ও ঠিক শুনেছে, তুমি থাম। বরাহ। না, না ধরণী ! ধরণী। তাের পিতা আনন্দে উন্মাদ। চলে ' আয় মনিকা, আমি ব’ছি। মনিকাকে টানিয়া লইয়া প্রস্থান ৮৮

চতুর্থ অঙ্ক
ছুটিয়া কামনকের প্রবেশ
কাম। প্রভু! সর্বনাশ !
অদূরে খনা ও মিহিরের প্রবেশ
বরাহ। কি কাম-ক?
কান। সম্রাট এই অভাবনীয় ঘটনার কথা শােনা মাত্র তার প্রধান
অমাত্য বিভাবসুকে আপনার গৃহে প্রেরণ করেন। আমাকে দেখেই সে
প্রকৃত ঘটনা কি জানতে চাইলে। আমি বল্লাম, আমি এখনও সব
শুনিনি। সে বল্ল সম্রাট বলছেন, যদি বরাহদেব নিজের পুত্রের
আয়ু গণনা করতেই ভুল করেন, তাঁর গণনার ওপর লােকের কোন
আস্থা থাকতে পারে না। তাকে জ্যোতিষীই বলা চলে না। সে
আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। এই যে খনা দেবী, আর কেন ?
যা হবার হয়েছে, মিহির ঠাকুর সুস্থ হয়েছেন। সত্য হােক, মিথ্যা
হােক, দয়া করে আমার বৃদ্ধ প্রভুটীর স্কন্ধ ত্যাগ করে অন্য একটি
শ্বশুরের সন্ধান দেখুন। অমাত্যবর একলা বসে আছেন, আমি
দেখছি।
প্রস্থান
খনা ও মিহির সম্মুখে আসিয়া দাড়াইল
মিহির। পিতৃ সম্বােধনের সৌভাগ্যের বিনিময়ে আমি আপনার
শিরে এত বড় অসম্মানের ডালি তুলে দিতে পারি না, পারি
পিতা।

খনা। তাই স্থির করেছি আমরা চলে যাব। দূরে দূরে বহু দূরে-- কেউ আমাদের সন্ধান পাবে না। আপনি ভাববেন না পিতা। মিহির। আপনি এখনই ঘােষণা করে দিন—আমরা রাক্ষসের দেশ হতে এসেছিলাম, মায়াবী আর মায়াবিনী। দুদিন মায়ার খেলা খেলে আবার চলে যাচ্ছি। কিন্তু কিন্তু পিতা, এই দুদিনের খেলাই আমাদের বাকী জীবনের পাথেয় হয়ে রইল। (পায়ের ধূলি লইয়া) বিলম্ব নয়—আর বিলম্ব নয় খনা!- বিভাবসুর প্রবেশ বিভা। এই যে আপনারা সবাই এখানে। আমি বিভাবসু। সম্রাট আমার প্রত্যাবৰ্ত্তন প্রতীক্ষায় বিনিদ্র-চক্ষে বসে আছেন বলে আমি আর বিলম্ব করতে পারলাম না। আপনাদের সম্বন্ধে প্রচারিত কাহিনী সম্রাট বিশ্বাস করেন নি। তিনি বলছেন, বরাহদেব যদি নিজের পুত্রের আয়ু গণনায় ভুল করে থাকেন, তবে কে আর তার গণনায় আস্থা স্থাপন করবে? কে তবে তাকে জ্যোতিষী ব’বে ? তাই তিনি সত্য-মিথ্যা অবগত হবার জন্য আমাকে এই রাত্রেই প্রেরণ করেছেন। আমি আশা করি প্রচারিত পল্লবিত এই কাহিনী সম্পূর্ণ মিথ্যা। কি বলেন জ্যোতিষার্ণব ? বরাহ। না, এ কাহিনী সম্পূর্ণ সত্য। এই আমার সেই হারানিধি পুত্র। বিভা। জ্যোতিষার্ণব। আপনি কি বলছেন? মিহির। ( বিভাবসুকে) না, না, শুনুন

চতুর্থ অঙ্ক
বরাহ। যা শােনবার উনি তা শুনেছেন। অথবা আবার শুনুন ভুল
আমি করেছিলাম। সােনার-কমল জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলাম।
লােকে যদি তাতে বলে জ্যোতিষ আমি জানি না, বলুক। রাজা যদি
বলেন –আমি জ্যোতিষীই নই—বলুন। কিন্তু দ্বিতীয়বার আর আমি
সে ভুল করব না। পারব না আজ আমি একে পুনরায় ভাসিয়ে
দিতে--আমার জীবন নদীর-ওপারে ।
মিহির ও খনাকে লইয়া প্রস্থান
পুথির বোঝা স্কন্ধে কামলকের প্রবেশ। কাম-ক আসিয়া দেখিল কেহ কোথায়ও
নাই। পুথির বোঝা নামাইয়া রাখিয়া সে অন্দরের দিকে উকি
মারিয়া যেই দেখিল তথায় মনিকা রহিয়াছে, ছুটিয়া আসিয়া
পুথির স্তুপ সম্মুখে রাখিয়া অধ্যয়নের ভান
কাম।
“অসারভূতে সংসারে সারভূতা নিতম্বিনী ইতি
সঞ্চিত্যবৈ শম্ভুদ্ধাঙ্গে পাৰ্বতীং দধৌ ॥”
অত্যার্থ-অসার সংসার। এই অসার সংসারে রমণী একমাত্র সার
পদার্থ। দেবাদিদেব মহাদের এই জন্যই পার্বতীকে অর্ধাঙ্গে ধারণ
করিয়াছেন।
মনিকার প্রবেশ। তাহার হস্তেও পুথির বােঝা
কাম। (তাহাকে আড়চোখে চাহিয়া দেখিয়াই অধিকতর মনঃসংযােগ
করিল ১)।
“রমণী মধুরাধর মধুমধুরিমা পরিমাণজগাসিৎ।
হরিরেব যৎ সুরেভ্য দত্তামৃতমিন্দিরাং বাম ।”

খনা কিনা—রমণী মধুরাধরের আস্বাদ স্বয়ং হরিই জানেন। নতুবা সমুদ্র মন্থনকালে অন্যান্য দেবতাকে অমৃত দান করে স্বয়ং লক্ষ্মী দেবীকে গ্রহণ করলেন কেন? ( চীৎকার করিয়া) অতএব মনিকা পুথি খুলিয়া পাঠ করিল “নিৰ্বানদীপে কিমু তৈল দান, চৌরে গতে বা কিমু সাবধান। বয়ােগতে কিং বণি বিলাস পয়ােগতে কিং খলু সেতবন্ধ। কিনা!—দীপ নিৰ্বাপিত হলে তাতে আর তৈল প্রদান করে লাভ কি? চোর চুরি করে চলে গেলে সাবধান হয়ে কি ফল? যৌবন অতীত হ'লে বণিতা-বিলাসে কি প্রয়ােজন ? জল নির্গত হ'লে সেতুবন্ধের কি আবশ্যক? অতএব কাম। অতএব উঠিয়া মনিকার গলায় মাল্যদান করিতে গেল এমন সময় ছুটিয়া তালিকার প্রবেশ তর। অতএব—( নেপথ্যে দেখাইয়া )—কিন্তু বরাহের প্রবেশ বরাহ। (কামল্ক পালাইতে উদ্যত হইয়াছিল) কাম-ক! দাড়াও- কাম। কি গুরুদেব ? ৯২ চতুর্থ অঙ্ক বরাহ। কালিদাস-কাব্যকুঞ্জের কোকিল তুমি, তােমাকে আমি মুক্তি দিচ্ছি। কাম। সে কি প্রভু ? বরাহ। হাঁ আমি পরিহাস জানি না। তুমি আমার শিষ্যত্ব হতে মুক্ত। এখন হ’তে স্বচ্ছন্দে তুমি কালিদাসের কবিতা-নিকুঞ্জে বিহার করতে পার। কাম। 'আমি একা? বরহ। আবার কে ? কাম। ক্রুদ্ধ হবেন না প্রভু! বরাহ। বল! কাম। মদনিকা কালিদাসের কাব্য ওর কণ্ঠস্থ। অবশ্য জ্যোতিষ শাস্ত্রেও ওর পাণ্ডিত্য কম নয়। হাঁ, আমা অপেক্ষা অধিক। কিন্তু কালিদাস:••• বরাহ। তুমি বলতে চাও মদনিক আমার আশ্রয় ত্যাগ করে কালিদাসের আশ্রয় গ্রহণ করবে ? কাম। না প্রভু! বরাহ। তবে ? কাম। আমাদের উভয়ের মন- - থামিয়া গেল বরাহ। বল- কাম। অভয় দিন্ ত বলি-

বরাহ। বল!
কাম। আমাদের উভয়ের মন, উভয়ের প্রাণ কাব্যাকাশে বিচরণ করতে
করতে একত্রীভূত হয়ে
বরাহ। তুমি ওকে বিবাহ করবে ?
কাম। প্রভুর অনুমতি অপেক্ষা
বরাহ। যদি জান ও আমার কন্যা নয়?
কাম। অধমের সঙ্গে পরিহাস কেন প্রভু ?
বরাহ। আমাকে পরিহাস করতে কখনও দেখেছ কামক?
কাম। না প্রভু।
বরাহ। যদি এই কথাই সত্য হয় যে ও এক ক্রীতদাসের কন্যা! আমি
এবং আমার স্ত্রী পালন করেছি মাত্র ?
কাম। দাসের সঙ্গে ছলনা করবেন না প্রভু!
মদ। বাবা তুমি কি বলছ ?
বরাহ। ঠিক ব’ছি। মনিকা! মনিকা ! ঐ ভৈরবই তােমার পিতা।
তুমি মাতৃহীনা। আমরা তােমাকে লালন পালন করেছি মাত্র।
মদ। বাবা!
!
ধরণীর প্রবেশ
মা! মা !
ধরণী। কি না ?
মদ। বাবা আমাকে বাবা আমাকে--( ক্রন্দন )
ধরণী। কি হ’ল ? তুমি কি বলেছ ?
৯৪

চতুর্থ অঙ্ক
বরাহ। যা সত্য—আমি আর তা গােপন করতে পারছি না। আমি
মনিকাকে তার পিতৃ-পরিচয় দিয়েছি।
কাম। কি যে বলেন প্রভু! এতে আপনার বিশেষ ( ধরণীকে দেখাইয়া )
ঐ মা জননীর যে কতখানি অসম্মান হচ্ছে তা কি আপনি বিবেচনা
ক’চ্ছেন না ?
বরাহ। (ক্রোধে ) রহস্য আমি জানি না কামক! আমি ঘােষণা
করছি-ঐ ক্রীতদাসের কন্যা ঐ মদনিক।। ভৈরব ! ভৈরব ।
মদ। তুমি—তুমি বল মা—এ কথা সত্য ?
ধরণী নীরব রহিলেন
মদ। কথা কইছ না যে মা? বল মা, বল—এ কথা সত্য ?
ধরণী। সত্য।
।
কাম। ঐ ক্রীতদাস মদনিকার পিতা ?
শশব্যস্ত ভৈরবের প্রবেশ
মদ। ভৈরব ! ভৈরব ! তুমি বল, তুমি বল—তুমি আমার পিতা?
ভৈরব কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িল
নদ। বল ভৈরব—বল~--
ভৈরব মনিকাকে বিচলিত দেখিয়া সেও
মহা বিচলিত হইয়া উঠিল
বরাহ। বল ভৈরব, আজ এই মহা সন্ধিক্ষণে আমি আদেশ করছি,
আর তুমি নীরব থেক’ না ভৈরব ! ভৈরব ! প্রভুভক্ত ভৃত্য আমার,

কথা কও কথা কও আজ। আমার মিথ্যাচারকে সুরক্ষিত রাখতে
স্বেচ্ছায় এই বিশ বৎসর ধরে’ মূক হয়ে আছ তুমি---ওরে ভৃত্য-ওরে
বন্ধু—আমি আজ যখন নিজে সেই মিথ্যার গ্রন্থি করছি উন্মােচন
তাের আত্মত্যাগের অবসান কি আজও হবে না? ওরে আজও
হবে না ভৈরব ? ওরে তুই কথা বল্-কথা বল্ আজ। সম্মুখে
তাের মাতৃহারা একমাত্র সন্তান—ওকে বুকে নে--বুকে নিয়ে ব--
এই সুদীর্ঘ বিশটী বৎসর---ওঃ-হােহাে---
বিশ বৎসর কথা না বলিবার অনভ্যাসে
জড়তা জনিত কণ্ঠে বহুকষ্টে
ভৈরব। মা ! মা আমার!
মদ। তুমি? তুমি আমার পিতা?
ভৈরব। আমি--আমি--আমি !
মদ। বাবা!— তাহার বুকে পড়িতে গেল )
ভৈরব। ( শিহরিয়া সরিয়া গিয়া) না-মা আমাকে তুমি,-আমাকে
তুমি-
মদ। ঘৃণা করতুম। কিন্তু কিন্তু--আজ-আজ যে তুমিই আমার
সব বাবা!
ভৈরব। মা ! মা আমার ।
বুকে লইয়া আনন্দাশ্রু বর্ষণ করিতে লাগিল
বরাহ। আঃ-আঃ-
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিলেন

চতুর্থ অঙ্ক কাম-ক ধীরে ধীরে বরাহের নিকট গেল কাম। প্রভু! বরাহ! কি কামক। কাম। মনিকা বরাহ। এখনও তুমি মদনিকার পাণিপ্রার্থী ? কাশ। প্রভু অপরাধ গ্রহণ করবেন না। আপনার কাছে জ্যোতিষ- চর্চা করলেও মূলতঃ আমি মহাকবি কালিদাসেরই শিষ্য । তাই বিচার করে দেখলাম, স্ত্রীরত্নং দুঙ্কুলাদপি—অতএব ভৈরবের পদতলে মদনিকাকে লইয়া নতজানু হইয়া কামন্দক বলিল আমাদের আশীর্বাদ কর ভৈরব। সর্বাগ্রে প্রভুর আশীৰ্বাদ আবশ্যক বিবেচনায় ভৈরব মনিকা ? কামন্দককে হাত ধরিয়া বরাহের সম্মুখে লইয়া গেল এবং এই মিলনকে আশীর্বাদ করুন, এই প্রার্থনা সকাতরে জানাইল বরহ। তােমাদের প্রেম অসাধারণ। জাতি-ধম্মের গণ্ডী তােমরা অতিক্রম করেছ। এ বিবাহে আমি সানন্দে সম্মতি দিচ্ছি। আশীৰ্বাদ করছি। ধরণী। আশীর্বাদ করছি সুখী হও। ৯৭ তৃতীয় দৃশ্য পুরনারীগণ বরণডালা লইয়া মঙ্গল-গীতে বধূবেশে মনিকাকে বরণ করিয়া লইল —গান- মঙ্গল-শঙ্খে-মঙ্গল-কণ্ঠে মঙ্গল-সুরে শােনাবাে গান- সিন্দুর ভালে—মঙ্গলময়ী, শুকতারা সম জাগাও প্রাণ! পারুল-চাপায় গাঁথিব নূতন মালা-- শত উপচারে সাজাবাে বরণডালা— তব তরে হ’ল পঞ্চ-প্রদীপ জ্বালা নে সাজাবাে বদনখানি— র শােনাবাে মধুর বাণী- দিয়ে নব-রূপ তারে করিব দান। - অলক্ষ্যে আসিয়া দাঁড়াইল। মুগ্ধচিত্তে সে ব নিরীক্ষণ করিল এবং বাদ্যের তালে ত্য করিতে করিতে উহাদিগের পশ্চাৎ অনুসরণ করিল Sbor

চতুর্থদৃশ্য
বরাহের বাসভবন
বিভাবসু ও বাহ
বিভা। মহাকবি যথার্থ বলেছেন :-
“শৰ্বরী দীপকচন্দ্র প্রভাতে দীপকো রবিঃ।
ত্রৈলােক্য দীপকো ধৰ্ম্ম সৎপুত্র কুলদীপক ॥”
অভাবিতরূপে সেই সৎপুত্র লাভ করে আপনি ধন্য হয়েছেন। ভুলের
ফলে যে এত বড় লাভ হয়—এ আমরা এই প্রথম দেখলাম।
বরাহ। শুধু পুত্র? পুত্রবধূ ?
বিভা। পুত্রবধূর ত আপনার তুলনাই নাই। রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী।
আপনার পুত্রবধূ সম্বন্ধে সম্রাটের ধারণা—তিনি মানবী নন্-দেবী।
বিশেষ জ্যোতিষশাস্ত্রে তিনি যে অলৌকিক প্রতিভা প্রদর্শন
করেছেন, তাতে এই কথাই মনে হয়—আমরা এতকাল জ্যোতিষ
নিয়ে শুধু অসার থেলাই খেলেছি। মনে হয় শুধু মরীচিকার পেছনে
পেছনে উদ্ভ্রান্তের মত ছুটোছুটীই করেছি, প্রকৃত জ্যোতিষের
অস্তিত্বই অবগত ছিলাম না। কি বলেন জ্যোতিষার্ণব ?
বরূহ। ঠিক তা নয়, তবে কিনা—প্রকৃত বিষয় হচ্ছে এই যে, অর্থাৎ ..
এই কথাটাই আমি বলতে চাই যে-

বিভা। যে কথাই বলুন, এ কথা কিছুতেই অস্বীকার ক’ঝতে পারবেন না
যে সেই দেবীর সহজ স্বাভাবিক, অথচ অভ্রান্ত অব্যর্থ গণনা আপনার।
কিছুই অবগত নন্। আপনার পুত্রও না। আপনারা যা জানেন
তাতে অন্ধকারেই ঢিল ছোড়া হয়, লক্ষ্য-স্থলে কোনটা লাগে, কোনটা
লাগে না।
বরাহ। এ কথা আমি স্বীকার করতে পারি না মন্ত্রিবর ।
বিভা। আপনি স্বীকার করুন আর নাই করুন, যা সে কথা, শুনুন
জ্যোতিষার্ণব ! আমি আজ শুধু আপনাকে অভিনন্দিত করতে
আসি নি। আমি রাজাদেশে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।
সম্রাট অধীর হয়ে উঠেছেন—তিনি আর কিছুমাত্র বিলম্ব করতে
স্বীকৃত নন্।
বরাহ। কেন, তিনি কি চান ?
বিভা। তিনি বলছেন, বিশ্বের শ্রেষ্ঠ-মনিষা, শ্রেষ্ঠ-প্রতিভার একত্র
সমাবেশের জন্যই নবরত্ন সভার প্রতিষ্ঠা। সত্য কিনা আপনিই
বলুন!
বরাহ নিরুত্তর
বিতা। সে সভায় শুধু তারই স্থান হওয়া আবশ্যক যিনি বিদ্যায়, বুদ্ধিতে
জ্ঞানে, প্রতিভায়—বিশ্বজয়ী। সে ক্ষেত্রে-~-
বক্তব্য বলিতে ইতস্ততঃ করিতে লাগিলেন
বরাহ। ( উত্তেজিত হইয়া) আপনি কি বলতে চান বলুন!
বিভা। আপনিই কি এ কথা বলতে চান, নবরত্ন সভায় মােগ্যতম
১০ ০

চতুর্থ অক্ষ
লােকের স্থান না হয়ে—অযােগ্য, অকর্মণ্য লােকের ক্রীড়াভূমি হয়ে
থাকবে ?
বরাহ। আমি কিছুই বলতে চাই না। আমি আপনাকে কোন কথাই
বলতে চাই না।
বিভা। আপনি ওরূপ বিচলিত হচ্ছেন কেন? সম্রাট কখনই অবিচার
করবেন না।
বরাহ। ( বিড় বিড় করিয়া) বিচার ! বিচার ! সম্রাটের বিচার।
বিভা। এ ক্ষেত্রেও বিচার করবার জন্য সম্রাট অস্থির হয়ে উঠেছেন।
তিনি আজই-সন্ধ্যার পূর্বে
বরাহ। বােধ হয় নবরত্ন সভা হতে আমাকে বহিস্কৃত করতে
চান ?
বিভা। আপনি ভুল বুঝেছেন। তিনি চান নবরত্ন সভায়--আপনি
আপনার আসন সুদৃঢ় করুন। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি
বরাহ। তিনি ।
বিভা। এক বিচারের আয়ােজন করেছেন।
বরাহ। কিরূপ?
বিভা। আজ সন্ধ্যার পূর্বেই তিনি আপনার নিকট একটি প্রশ্নের
উত্তর চান।
বরাহ। কি প্রশ্ন ?
বিভা। আকাশে কয়টী” তারা? আপনি উত্তর দিতে পারলে নবরত্ন
সভায় আপনার আসন ধ্রুবতারার মতই স্থির। অন্যথায়--
বরাহ। অন্যথায় ?
১০১

বিভা। নবরত্ন সভায় আপনার পরিবর্তে তিনিই প্রতিষ্ঠিত হবেন—যিনি
এই উত্তর দেবেন। নমস্কার। (প্রস্থানােত)
বরাহ। আকাশে কয়টা তারা ?
বিভা। হাঁ, আকাশে কয়টা তারা।
প্রস্থান
বরাহ। আমার তারা অস্ত গেছে বলেই না--বৃদ্ধ আমি, জীর্ণ আমি,
আমাকে আজ এই প্রশ্ন ?—আকাশে কয়টা তারা।
প্রস্থান
খনা ও মনিকার প্রবেশ
খনা। মনিকা! মনিকা। এখানে আমি স্বামীর সংসারে শৃঙ্খলিতা-
আর লক্ষ যােজন দূরে-সাগর পারে রয়েছে স্নেহান্ধ এক বৃদ্ধ,
শােকার্তা এক বৃদ্ধা! এপারে ওপারে শুধু এক আৰ্তনাদ উঠছে--
আয় আয়—যাই-যাই। কিন্তু যাবার উপায় নাই। আসবার
উপায় নাই। মনিকা—এ যে কি ব্যথা তুমি বুঝবে না, কেউ
বুঝবে না।
মিহিরের প্রবেশ
মিহির। কি বুঝবে না খনা?
খনা। না, কিছু না।
মদ। ঐ মা আসছেন
১০২

চতুর্থ অঙ্ক
ধরণীর প্রবেশ
মা! বাপ-মার জন্য বৌদির মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে।
রিণী। স্বামীর ঘর করতে এসে বাপ-মার জন্য কালে ত চলবে
মা! বিয়ের পর বৌকে ভুলেই যেতে হয় যে তার বাপ-মা
আছে।
খনা। ( মনিকাকে) তুমি যদি পার ভুলাে । কিন্তু (ধরণীকে )
কোন মেয়ে কি তা পারে মা?
ধরণী। রাজকন্যারা হয় ত পারে না, কিন্তু
মিহির। না মা রাজকন্যা বলে ওকে অপমান করাে না।
মদ। রাজকন্যা বলে যে কারও অপমান করা হয়--তা ত জানা ছিল
মা।
মিহির।
যদি তা না জেনে থাক, তবে আজ জান, রাজকন্যা হয়েও যখন
ঐ নারী স্বেচ্ছায় বরণ করল অজ্ঞাতকুলশীল, দীনহীন এই অনাথকে,
তখনও কি ওকে ব’লবে রাজকন্যা ? সাম্রাজ্যের সম্পদ তুচ্ছ করে,
পিতা-মাতার অগাধ স্নেহ উপেক্ষা করে, আমার হাত দুখানি ধরে ও
যখন ঝটিকা-বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে ঝাঁপ দিল তখনও কি বলবে ও আর
কিছু নয়, শুধুই রাজকন্যা ?
মদ। অপরাধ হয়েছে দাদা! চল মা বাবার কাছে যাই। বাবাকে
ভারী বিষন্ন দেখলাম, কেন মা ?
ধরণী । ( খনার দিকে বক্রদৃষ্টিপাত করিয়া) প্রসন্ন থাকবার
উপায় কই মা?

খনা মদ। তােমার জামাইয়ের মুখে আমিও কথাটা শুনেছি মা। হ বৌদি ! রাণী না হয়ে বধূপনা করতেই যখন এসেছ তখন আর জ্যোতিষ-চর্চাটা কেন ? ধরণী। ঘর কন্না করতে হলে ঘরকন্নাই করতে হয় না ! জ্যোতিষ- চর্চাটা যাদের কাজ তারাই করুন। মদ। এই বা কি কথা বুঝি না বৌদি—যে রাজ্য শুদ্ধ লােক এসে বরের বউয়ের কাছে ধন্না দেবে, কপালের লিখনটী পড়ে দাও। দেশের শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ বাবা যেখানে বর্তমান সেখানে তুমিই বা কোন সাহসে তাদের ভাগ্য-বিচার করতে বসে বলতাে ? ধরণী। কথাটা ভালও ত নয় মা । মদ। নবরত্নের পণ্ডিত যেখানে বর্তমান সেখানে তাকে দিয়ে গণনা ন করিয়ে তােমাকে দিয়ে গণনা করানাের অর্থ এই ত—যে তােমা মুখখানি সুন্দর! ধরণী। যে দিক দিয়েই দেখ, এতে যে কর্তার মাথা হেঁট হচ্ছে, এ কথাট আমি তােমাকে কি করে বােঝাব মা? আয় মনিকা। মদ। চল মা! বৌদি না বুঝলেও দাদা যে একথাটা কেন বােঝে না তা আমি বুঝি না। মনিকা ও ধরণীর প্রস্থান খনা। আমাকে নিয়ে চল। এই যদি সংসার হয় তবে আমায় এখা থেকে উদ্ধার কর--রক্ষা কর- মিহিরের বুকে পড়িয়া কাঁদিতে লাগিল CAO

চতুর্থ তা
মিহির। যদি তুমি আমায় ভালবাস খনা, তবে আমার মুখ চেয়ে এ
নির্যাতন সহ্য করা কি একান্তই অসম্ভব ?
খনা নীরব রহিল
মিহির। রামের মুখ চেয়ে সীতা যে লাঞ্ছনা সানন্দে সহ্য করেছিলেন,
তারই নাম রামায়ণ। পঞ্চপাণ্ডবের মুখ চেয়ে দ্রৌপদী যে নির্যাতন
হাসিমুখে সহ্য করেছিলেন তারই নাম মহাভারত। সেই রামায়ণ...
সেই মহাভারত তােমাকে কি শান্ত করতে পারবে না খনা ?
খনা নীরব রহিল
নেপথ্যে বরাহ। মা !
মিহির। পিতা!
পরস্পর আলিঙ্গন-মুক্ত হইল
বরাহের প্রবেশ
বরাহ। মিহির! তুমি এখানে? আচ্ছা তুমি খনা চলিয়া
যাইতেছিল) না মা তুমি দাঁড়াও! (মিহিরকে) তুমিই বরং--
মিহিরের প্রস্থান
খগাে তুমি জান মা?
খনা । জানি।
বরাহ। একটা গণনা করাে ত মা !

খনা। গণনা আর আমি করব না পিতা !
বরাহ। কেন?
ধন নীরব
বরাহ। কেন গণনা করবে না মা?
খনা। আমি আজ হতে জ্যোতিষ-চর্চা ত্যাগ করলাম দেব ।
বরাহ। সে কি মা? জ্যোতিষের সৰ্বোচ্চ যশােশিখর যখন তােমার
আয়ত্তাধীন, তখন তুমি এ কথা কেন বল ?
খনা। হাঁ দেব যে কথা বলেছি, সেই কথাই সত্য।
বরাহ। হঠাৎ তােমার এ সিদ্ধান্তের কারণ কি মা?
খনা। আমাকে ক্ষমা করুন দেব!
বরাহ। তােমাকে কেউ ক্ষমা করবে না মা! মূর্তিমতী সরস্বতীর মত
তুমি জ্যোতিষে নব নব আবিষ্কার করেছ। সনাতন শাস্ত্রের সঙ্গে
তার বিরােধ হয় বলেই আমি তা গ্রহণ করতে পারি না--আজন্মের
সংস্কার এসে বাধা দেয়। কিন্তু শাস্ত্রবিরুদ্ধ হলেও, তােমার গণনা,
তােমার বচন যে অভ্রান্ত তা ত স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি। বিশ্বের
এত বড় কল্যাণ আয়ােজন করে মধ্য পথে তুমি নিবৃত্ত হলে আমিই
যে তাতে বাধা দেব মা ।
খনা। তাই কি !
বরাহ। তুমি হয় ত শুনেছ,আমিতােমায় হিংসা করি-শুনেছ আমি তােমায়
ঘৃণা করি--ভেবেছ তােমার জয়ে আমি ক্ষুব্ধ—কিন্তু যদি জানতে মা-
খনা নিরুত্তর
১০৬

চতুর্থ অধ্য
বরাহ। যদি জাতে মা, নিশীথ রাত্রে-~-
বরাহ। নিশীথরাত্রে পৃথিবী যখন ঘুমিয়ে পড়ে, সারা বিশ্বে একটা
প্রাণীও জেগে থাকে না, তখন, তখন আমার এই দেহ-পিঞ্জর হ'তে
বের হয়ে আসে আমার অনাবিল অকলঙ্ক আমি--হিংসা জানে না--
দ্বেষ জানে না—তােমার জয়ে ক্ষুব্ধ হয় না—ধীরে ধীরে সেই আমি
তােমার যশ-মন্দিরের সােপান শ্রেণীতে গিয়ে দাড়াই-তােমার যশের
আলােকে উদ্ভাসিত হয়ে তােমাকে—অতটুকু শিশু তুমি--তােমাকে
আমি ভক্তিভরে মুগ্ধচিত্তে প্রণাম করি--প্রণাম করি।
খনা। পিতা! প্রভু!
অদূরে সন্ধ্যার শঙ্খধ্বনি ও আরতি বাদ্য শশানা গেল
বরাহ। সন্ধ্যার আরতি। সন্ধ্যা !
যেন তাহার মৃত্যুকাল উপস্থিত
ঐ আকাশে কয়টী তারা খনা ?
খনা। কে বলতে পারে ঐ অকাশে কয়টী তারা?
বরাহ। আমি পারি নি-আমি পারি নি, কিন্তু উত্তর আমার চাই-ই
চাই। বল ।
না। গণনা না করে কি করে বলা যায় ?
বরাহ। গণনা কর---গণনা কর---
ধনা গণনা আমি আর করব না পিতা।
বরাহ। ( খনার হাত চাপিয়া ধরিয়া) গণনা তােমাকে করতেই হবে
১০৭

খনা খনা। শোন মা। সম্রাটের প্রশ্ন আকাশে কয়টি তারা ! এই সন্ধ্যায় যদি আমি তার উত্তর দিতে পারি, নবরত্ন সভায় স্থান হবে, দিতে পারলে নবরত্ন সভা হ'তে বহিষ্কৃত হব। আমি মৃত্যু বাণ করতে পারি কিন্তু পরাজয়ের অপবশ কিছুতেই—কিছুতেই সহ্ন করতে পারব না আমি। সন্ধ্যা আগত ! আমি অপরাগ! তুমি আমাকে উত্তর বলে দেবে—সেই উত্তর আমি সম্রাট সকাশে নিজ উত্তর বলে প্রচার করে আমার আসনে, আমার প্রতিষ্ঠা অক্ষুঃ রাখব। উপায় নাই মা! এ ভিন্ন আমার আর উপায় নাই। কি তুমি এখনও নীরব ? আমার অপমান, আমার অসম্মানই কি তবে তুমি কামনা করছ খনা? খনা। না, না, আমি গণনা করব, আমি গণনা করব । বরাহ। তুমি আমায় বাঁচালে মা, বাঁচালে । উভয়ের প্রস্থান বিক্রমাদিত্য ও বিভাবসুর প্রবেশ বিভা। সম্রাট দেখলেন ত, শুনলেন ত সব ? বিক্র। আর আমার দ্বিধা নাই মন্ত্রী। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রতিভার সমাবেশ- কল্পেই আমার নবরত্ন সভা। সেই সভায় আজ থেকে সরে এস, ঐ ওঁরা আসছেন। উভয়ের প্রস্থানােত ছুটিয়া বরাহের প্রবেশ, পশ্চাতে খনা বরাহ। কে শুতে চাও আকাশে কয়টা তারা। একি! সম্রাট। শুনতে চান আকাশে কয়টা তারা? soba

চতুর্থ অঙ্ক
বিক্র। শুনতে চাই কিন্তু খনা দেবীর মুখে।
বহ। কেন! সম্রাট, আমি এখনও বর্তমান, নবরত্নের জ্যেতিষ-রত্ন
আমি, আপনার নিজ হস্তে দত্ত এই সম্মানের অসম্মান করতেই কি
আপনি আজ বদ্ধপরিকর ?
বিক্র। হ-সম্মানের প্রকৃত অধিকারীকে ভূষিত করবার জন্য আমি
বদ্ধপরিকর। প্রকৃত ঘটনা আমরা অবগত। আপনি পদচ্যুত।
আপনি নবরত্নের অলঙ্কার উন্মােচন করে খনা দেবীকে ভূষিত করুন ।
দেবী! আসুন
খনা। কোথায় ?
বিক্র। নবরত্ন সভায়-
খুন। বধূর স্থান সভায় নয়, স্বামীর ঘরে, শ্বশুরের ভিটায়।
বরাহ। নাও মা-এ রাজার দান।
খনা! রাজার দান আমি, উপেক্ষা করতে পেরেছি--কিন্তু দেবতার
দান—আপনার দান আমি উপেক্ষা করতে পারি না—আমি মিনতি
করছি পিতা ও অলঙ্কার আপনি আমায় পরতে আদেশ করবেন
না--আপনার আশীর্বাদে যে অলঙ্কার আমি পরেছি—হাতের
এই শাঁখা-সীথের এই সিন্দুর যেন এই অলঙ্কার আমার
==
অক্ষয় হয়।
বাহ-চরণে প্রণত হইল

পঞ্চম অঙ্ক প্রথম দৃশ্য বরাহের বাসভবন বহিঃপ্রাঙ্গণ বরাহ ও মিহির বরাহ। বিবেচনা করে দেখ মিহির, বার্ধক্যের একমাত্র অবলম্বন পুত্র- পুত্র-বধূ। পুত্রের সেবা এবং পুত্র-বধূর শুশ্রুষা পাচ্ছি এবং পাব আশা করেই এ ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়েও বাঁচতে লােভ হয়। পরম জ্ঞানবতী বধূমাতা এ কথা বুঝেও আমাদের পরিত্যাগ করে পিত্রালয়ে সিংহলে যেতে চান কোন্ প্রাণে ? মিহির। পিতামাতাকে দেখেই আবার সে ফিরে আসবে। পিতামাতার সে একমাত্র সন্তান। আমার কথাও বিবেচনা করুন। পুত্র না হলেও আমি তাদের পুত্ৰাধিক ছিলাম। আমাদের উভয়কেই একসঙ্গে হারিয়ে তাদের মনের অবস্থা আপনার কল্পনা করা কঠিন নয় পিতা। বরাহ। হাঁ, কিন্তু তবু মিহির। পিতামাতার বিরহে আপনার বন্ধুমাতার কি অবস্থা হয়েছে স্বচক্ষে দেখেছেন পিতা? আপনি অনুমতি করুন আমরা সিংহলে গিয়ে তাদের একটিবার দেখে আসি।

পঞ্চম অব
বরাহ। আমরা ?
মিহির। আমি এবং খনা।
বরাহ। তুমি?
মিহির। হাঁ, আমি আর খনা।
বরাহ। অসম্ভব-অসম্ভব। তােমাকে স্বহস্তে নদীর জলে ভাসিয়ে
দিয়েছিলাম। বহু পুণ্যে তােমাকে ফিরে পেয়েছি। যে ভুল
একবার করেছিলাম, দ্বিতীয়বার সে ভুল করতে সাহস নাই।
মিহির, আমি তােমাকে যেতে দিতে পাব না।
মিহির। শুনুন পিতা-
বাহ। না, না, আমাকে বিরক্ত করে না মিহির। সম্রাট আমাকে
স্মরণ করেছেন। আমার মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। আমাকে আর
বিরক্ত করাে না। আমি রাজসভায় চললাম।
মিহির। কিন্তু খনা-
বরাহ। ( ফিরিয়া) তবে শােন মিহির, তােমার বিচ্ছেদ যদি বা সইতে
পারি, তার বিচ্ছেদ আমার পক্ষে দুঃসহ। তুমি আমার পুত্র কিন্তু
সে আমার মা লক্ষ্মী।
মিহির। আপনি শুধু নিজের দুঃসহ অবস্থাই কল্পনা করছেন। কিন্তু
তার দুঃসহ ব্যথা স্বচক্ষে দেখেও আপনার মনে কিছুমাত্র দয়ার
উদ্রেক হচ্ছে না। স্বার্থপরতায় আপনি হৃদয়হীন নিষ্ঠুর হবেন না।
আমি আপনাকে মিনতি করছি পিতা--
বহ। ( ভাবাবেগ দমন করিয়া) বেশ, তােমরা যেতে পার।
(ক্ষণিক নিস্তব্ধতা) যাও– রুদ্ধ আবেগ দমনে অক্ষম হইলেন)
১১১

এস, আর দাড়িয়ে কেন ? যাও। সে-তুমি--তােমরা দুজনেই, দু’জনেই-- চলিয়া গেলেন অন্তপুর হইতে বিরহ-ব্যাকুল। খনার প্রবেশ খনা। পিতা কি বলে গেলেন, মিহির ? মিহির। ( নীরব) খনা। অনুমতি দিয়েছেন ? মিহির। (নীরব ) খনা। দেন নি ? মিহির। দিয়েছেন। খনা। তবে এস, আজই আমরা যাত্রা করি। কাল রাত্রে সেই দুঃস্বপ্ন দেখা অবধি আমি আর কিছুতেই ধৈৰ্য্য ধরতে পারছি না। আমরা প্রস্তুত হই- মিহির। আমি যেতে পারব না খনা, খনা। তার অর্থ ? মিহির। অর্থ অতি সহজ। তুমি বাবে—সঙ্গে উপযুক্ত রক্ষী, অভিভাবক দেব। খনা। তুমি যাবে না? মিহির। না-~- খনা। পিতা অনুমতি দেন নি ? মিহির। দিয়েছেন। ১১২

পঞ্চম অs
খনা। তবে ?
মিহির। দিয়েছেন বলেই যেতে পারব না। না দিলে হয়ত অবাধ্য
হয়েই যেতাম।
খনা। অনুমতি পেয়েও তুমি যাবে না?
মিহির। তুমি যাও।
থনা। আমি যাব? একা? তােমাকে রেখে?
মিহির। আমি নিরুপায়। আমি যেতে পারব না। তুমি যেতে পার।
যদি যাও, বল, আমি তার আয়ােজন করি।
খনা। ( নীরব রহিল )।
মিহির! তুমি যাবে না?
খনা। ( নীরবে অন্তঃপুরাভিমুখে চলিল)
মিহির। তুমি যাবে না?
খনা। না।
দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া উদগত-অশ্রু রােধ করিয়া দাড়াইল
মিহির। আমি নিরুপায়। আমি নিরুপায় ! পিতা যদি অনুমতি না
দিতেন, আমি অবাধ্য হয়েই যেতাম--কি, না,আমি নিরুপায় ।
আমি নিরুপায় !
খনা। নিরুপায় নয়, নিষ্ঠুর। নইলে পিতার অনুমতি পেয়েও--
মিহির।
সে অনুমতির অর্থ পুত্রবধূ বােঝে না, বােঝে পুত্র !
প্রস্থান
খনা এই বাক্যবাণে আহত হইল এবং শুদ্ধ হইয়া সঁড়াইয়া রহিল
খনা। ও কে? কে আসছে? তিলক ?
নেপথ্যে তিলক। ওহে, এই কি জ্যোতিষার্ণব বরাহের গৃহ ?
৮

ধনা।। (চরম ব্যাকুলতায়) তিলক! তিলক!
নেপথ্যে তিলক। দেবী।
তিলকের প্রবেশ
খনা। তিলক!
তিলক। দেবী! দেবী!
খনা। কিন্তু তুমি এখানে তিলক!
তিলক। যদি বলতে পারুম তুমিই বা কেন এখানে দেবী? বলতাম।
কিন্তু চিরকালের ভৃত্য আমি, আমি তা বলব না। বরং ব’ছি,
যেখানে তুমি, সেইখানেই আমার স্থান।
সামরিক প্রথায় খনাকে অভিবাদন করিয়া ঈড়াইল
খনা। (আপন মনে) না-না-কি মনে করবেন তারানা-না—তুমি
ভুলে যাচ্ছ তিলক! তােমাদের সে রাজকন্যা মরে গেছে। আজ আমি
সংসারের বধূ—অমন ভাবে আমার সম্মুখে দাড়িয়ে আমায় লজ্জা
দিও না—তুমি বরং
তিলক। কিন্তু দেবী, আমি ত একা নই, সমগ্ৰ সিংহল ছুটে আসছে।
এখনি এসে পড়ল বলে ! কী সমারােহে তারা আসছে!
খনা। আসছে--সমগ্ৰ সিংহল,•••আমার বাবা ? না—না, এ সব কি ?
এ কি অন্যায়? আমি বধূ। আমার স্বামী, আমার শ্বশুর একমুষ্টি
আতপ তণ্ডুলে ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন। এ কি, অত্যাচার! না তিলক,
তুমি-তুমি-তুমি এখান থেকে বরং চলেই যাও তােমাকে ও
ভাবে আমি সইতে পারছি না। আমার স্বামী, আমার শ্বশুর
১১৪

পঞ্চম অফ
এখানে এসে তােমাকে এ ভাবে দেখেন, এ আমি ইচ্ছা করি না
ইচ্ছা করিনা তিলক! ফিরে যাও তুমি ফিরে গিয়ে যারা আসছে,
তাদের বল, তারা ও ভাবে আমার এখানে এলে আমি আত্মহত্যা
হ, আমি আত্মহত্যা করব।
তিলক। দেবী—তিনি-
খনা। ছুটে যাও•••ছুটে গিয়ে আমার বাবাকে বল, তিনি আসুন—-
তিলক। দেবী—তিনি
খনা। হাঁ, হাঁ তিনি আসুন। শশাভাযাত্রা করে নয়, গরীব-মেয়ের
পর্ণকুটীরে যেমন আসে
তিলক। কিন্তু
খনা। আমার অবাধ্য হ’চ্ছ তিলক-যাও।
তিলকের প্রস্থান
অন্য দিক দিয়া মিহিরের প্রবেশ
খনা। (তাহাকে দেখিয়াই আনন্দে ) সিংহলে আর বােধ হয় না গেলেও
চলবে মিহির !
মিহির। হাঁ, সবই শুনেছি রাজকন্যা! সবই শুনলাম—গরীবদের মৰ্ম্মে
আঘাত না লাগে সেজন্য তােমার মহানুভবতার যে অন্ত নাই—তা
দেখে শুধু এই কথাই আজ আবার আমার মনে হচ্ছে যে আমাকে
পতিত্বে বরণ করে তােমার কি ক্ষতিই না হয়েছে !
খনা। মিহির ! মিহির।
মিহির। আজ বােধ হয় মৰ্ম্মে-মৰ্মে বুঝছ খনা, মহাকালের চতুপাঠীতে

সেই গােধূলি লগ্নে কি ভুলই তুমি করেছিলে যে আজ তােমাৰ সংসারে দেহরক্ষীর ঠাই নাই—একটা শােভা যাত্রার ঠাই নাই। খনা। মিহির ! মিহির ! ক্ষান্ত হও—ক্ষান্ত হও। অনর্থক—অনর্থক তুমি আমায় আঘাত করছ ! তুমি কি জান না—জান না আমায়? আমি সব সইতে পারি-শুধু সইতে পারি না—তােমার অনাদর--তােমার উপেক্ষা—মোর তিরস্কার—তােমার আঘাত। | ছুটিয়া কামন্দকের প্রবেশ কামন্দ। সৰ্ব্বনাশ—সৰ্ব্বনাশ—মহা সৰ্ব্বনাশ ! মিহির। কি সৰ্ব্বনাশ ? কামনক। সম্রাট প্রভুকে প্রকাশ্য-রাজসভায় বিষম অপমান করেছেন। খনা। সে কি ? কামক। কারণ আপনি খনা দেবী। মিহির। সে কি ? কামন্দক। ঔর গণনা--ওঁর বচন। আপনারা কি আর আছেন ? খনার বচনে যে দেশ ছেয়ে গেছে! মা সরস্বতী আর আপনাদের জ্যোতিষ-গ্রন্থের পাতায় বাস ক’ছেন না। আশ্রয় নিয়েছেন ওঁর ঐ জিহবায়-- মিহির। তুমি বল—তুমি বল কামক—পিতার সংবাদ বল- কামক। পিতার কথাই বলছি। নবরত্ন সভায় সম্রাট প্রভুর আসনে ওঁর স্বর্ণমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে প্রভুকে ঐ সভায় নিমন্ত্রণ করে সাধারণ আসনে তার স্থান নির্দেশ করেছেন। ১১৩

পঞ্চম অফ
মিহির। কামক!--
কামলক। প্রভুর এই অপমান সভাশুদ্ধ লােক পরমানন্দে উপভােগ
করছে। কি সে ব্যঙ্গ-কি সে বিদ্রুপ ।
খনা। সম্রাটের এ কি আচরণ ?
কামক। আপনার মনস্কামনা পূর্ণ হয়েছে খনা দেবী—সম্রাট শুধু
আপনার স্বর্ণ-মূর্তি নবরত্ন আসনে প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হন নি। প্রভুকে
বৃত্তি-চ্যুত করে আপনার বৃত্তি ধার্য করেছেন। অর্থাৎ দু’ মুষ্টি
অন্নের জন্য প্রভুকে আপনার মুখের পানেই
মিহির। কামক-না-খনা--
খনা। বল---
মিহির। তুমি আমাদের কুগ্রহ---তােমারই জন্য তােমারই জন্য পিতার
এই অপমান—পুনঃ পুনঃ এই অমৰ্যাদা-অবশেষে চরম এই লাঞ্ছনা!
খনা। মিহির--
মিহির। কুক্ষণে ভেলায় ভেসে সিংহলে কূল পেয়েছিলুম, কুক্ষণে তােমার
পিতামাতা আমাকে লালন-পালন করেছিলেন, কুক্ষণে তােমায়-আমায়
জ্যোতিষ শিক্ষা করেছিলাম, কে জানত, কে জানত তখন, যে তুমিই
হবে আমার জীবনের একমাত্র কুগ্রহ।
না। মিহির-মিহির---
মিহির। হাঁ হাঁ শুধু আমার কুগ্রহ নও--আমার কুগ্রহ, পিতার কুগ্রহ
আমাদের সংসারের কুগ্রহ—কিন্তু কাকে তিরস্কার করব খনা---এ
‘আমার নিয়তি-তােমার নিয়তি—কোথায় পিতা! এস কাম-ক--
প্রস্থান
১১৭

কাম। কি করে যে ঐ মুখ আপনি এখনও দেখাচ্ছেন, ভেবে পাই না-
বাপ-মুখের কি কাল-বচন—আমি হলে অমন জিভ কেটে
ফেলতুম।
প্রস্থান
খনা। ( মরণাহতে আহত হইয়া) ওঃ আমার বচন—আমার জিহ্বা
তাই হােক—তাই হােক
দু হাতে মুখ ঢাকিয়া অন্তঃপুরে প্রস্থান
শশব্যস্তে বরাহ তৎপশ্চাৎ মিহির প্রবেশ করিলেন
বরাহ। কোথায় খনা? খনা কোথায় ?
মিহির। তােমায় তারা অপমান করেছে পিতা! আমি জানতে চাই
কি অপমান করেছে-
বরাহ। অপমান! অপমান! মূর্থ তারা—আমায় অপমান করতে
চেয়েছিল ! ওদের আমি ব’লে এলাম—আজ এই স্বর্ণমূৰ্ত্তি প্রতিষ্ঠায়
যুগে যুগে এই অপূৰ্ব্ব-কাহিনীই বিশ্বময় বিঘােষিত হবে যে, বিশ্ববিখ্যাত
নবরত্ন-সভায় বরাহ পণ্ডিতের আসন পূর্ণ করবার সাধ্য অপর কোন
দ্বিতীয় ব্যক্তির হয় নি সে আসন পূর্ণ করেছিল বরাহ পণ্ডিতেরই
কুললক্ষ্মী প্রাতঃস্মরণীয়া খনা দেবী! শুধু কি তাই বলেছি! মিহির
গর্বভরে বলে এলাম, সম্রাট! স্বর্ণমূৰ্ত্তি কেন? মা যখন স্বয়ং বর্তমান
মাকে আন-আমার আসনে মহাসমারােহে তাকে বরণ কর।
তাতে শুধু নবরত্ন ধন্য হবে না-সমগ্র ভারতবর্ষ ধন্য হবে—জগতের
ইতিহাসে আৰ্য-নারীর এই গৌরব-গাথা স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হবে।
১১৮

পঞ্চম অঞ্চ
ঋন মা’র অমরত্বের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও অমর হয়ে থাকব - মিহির
...আমি•••এবং বিদ্যোৎসাহী সম্রাট তুমি ! স্বয়ং সম্রাট শনা মার
জয়ধ্বনি করে উঠলেন—সভা ভঙ্গ করে শােভাযাত্রা করে তারা
আসছেন. মা’কে আমার নবরত্ন সভায় বরণ করে নিতে ! না ! না !
কোথায় তুমি—আমি স্বহস্তে আজ তােমায় সাজিয়ে দেব-মিহির !
তুমি খনা মা’কে নিয়ে এস।
মিহির। আমি আনছি--আমি আনছি।
ছুটিয়া অন্তঃপুরে গেলেন
বরাহ। একি! আপনারা?
মিহিরের প্রস্থান
লিকের সহিত সিংহল রাজ্যের মঞ্জিয়ের নগ্নপদে প্রবেশ
স্বর্ণখালায় রাজমুকুট
প্রধান মন্ত্রী। আমরা সিংহলের মন্ত্রীত্রয়। আমাদের অভিবাদন গুহ
করুন জ্যোতিষার্ণব।
বরাহ। সিংহলরাজের কুশল ?
প্রধান মন্ত্রী। তিনি স্বর্গারােহণ করেছেন। সম্রাজ্ঞীও সহ-মৃত হয়েছেন।
সিংহলের সিংহাসনের একমাত্র উত্তরাধিকারিণী আপনার বধূমাতা
খনা দেবী--- সম্রাটের শেষ কামনায়ী...আমরা তঁাকে বরণ
করে সিংহলে নিয়ে যেতে এসেছি....এই তার রামকুট।
বরাহ। কিন্তু-কিন্তু..ঐ মুকুট অপেক্ষা তাঁকে অধিকতর মাঘ মুকুটে
সম্মানিত করবার জন্য আসছেন বিশ্ববিশ্রুত সম্রাট বিক্রমাদিত্য।
ঐ
দেখুন

জয়বাদ্য। স-সভাসদ বিক্রমাদিত্যের প্রবেশ। সঙ্গে স্বর্ণধালে জয়মুকুট বরাহ। সম্রাট জয়তু! বিক্রমাদিত্য। মা কই ? মা ? বরাহ। আজ আমার কি সৌভাগ্য! মা, মা একাকী মিহিরের প্রবেশ বরাহ। মা কই ? মা কই ? মিহির। সে আর আসবে না- বরাহ। আসবে না ! সে কি! আমি যাই- মিহির। (তাহাকে বাধা দিয়া) না ---- বরাহ। কেন? মিহির। সে আমায় বলেছিল, আমি সব সইতে পারি- শুধু সইতে পারি যে তুমি আমায় ভালবাসবে না। সব সইতে পারি—সইতে পারি না-তােমার অনাদর-তােমার উপেক্ষা--তােমার তিরস্কার---- বরাহ। তুমি তাকে তিরস্কার-~- মিহির। হাঁ আমি করেছিলাম--তবু--তবু—আজ আমি তাকে তিরস্কার করেছিলাম । বরাহ। মা বুঝি তাই অভিমান করে বসে আছে! হাঃ হাঃ হাঃ আমি গিয়ে নিয়ে আসচি- মিহির। (হাকে বাধা দিয়া) দাড়ান। কাম-ক এসে বললে, সম্রাট কর্তৃক তােমার লাঞ্ছনা-ক্রোধে আমি জ্ঞান হারালাম-জ্ঞান হারিয়ে তাকে আমি---- ১২ পঞ্চম অক বরাহ। তাকে তুমি? তাকে তুম মিহির। নিরুত্তর)। ববাহ। (চরম আশঙ্কায় ) খনা ! খনা। মিহির। কি ব’ পিতা! ( হঠাৎ কাদিয়া) সে নেই ! সে নেই । বরাহ। নেই! তুমি ব’ছ কি মিহির ? খনা!—খনা ! মিহির। কাকে ডাক ? কেন ডাক ? তাকে আমি--তাকে আমি হত্যা করেছি—অস্ত্র দিয়ে নয়—শুধু কথায়—শুধু ভৎসনায় ! বাহ। আঁ! ছুটিয়া অন্তঃপুরে গেলেন মিহির। ঐ দেখ পিতা! অভিমানিনী আমার কর্তিত জিহ্বার রক্ত- সাগরে ছিন্নকমলের মতো- === খনার মৃতদেহ বুকে তুলিয়া লইয়া বরাহ ফিরিয়া আসিলেন বরাহ। মা-মা, দীনের কুটীরে লক্ষ্মীপূজার আয়ােজন করেছে সিংহল । সরস্বতী পূজার আয়ােজন করেছে ভারত। মামা-ভক্ত এসেছে দ্বারে, তুই কথা ক’-কথা ক’ -- সিংহল ও ভারতমুকুট দুইটি শ্রদ্ধাভরে সােপান প্রান্তে অর্ধ দিল যবনিকা

বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল
সুপ্রসিদ্ধ সাহিত্যিক শ্ৰীযুক্ত
প্রমথ চৌধুরী এম-এ,
ইসলাম -
বার-এট-ল :-
“-বাঙলার সাহিত্যে নাটক
একরকম নেই বলেই হয়।
আশা করি আপনি আমাদের
সাহিত্যের এ
অভাব পূর্ণ
করবেন।”
—এক বুক কাদা ভেঙে
পথ চলে এক দীঘি পদ্ম
দেখলে দু'চোখে আনন্দ যেমন
ধরে না, তেমনি আনন্দ দু’চোখ
পূরে পান করেছি আপনার
লেখায়। আমায় আর কারুর
কোন লেখা এত বিচলিত
করে নি।”
নব যুগের নাট্য-সাহিত্য
তরুণ বাঙলার কীর্তিমান নাট্যকার
মন্মথ রায় এম-এ প্রণীত
কারাগার-পঞ্চাঙ্ক নাটক। মননমােহন থিয়েটারে অভিনীত হইয়া
জাতির মর্মস্পর্শ করিয়াছে। বার্ণাড-সর সেন্ট জোয়ানের সহিত
একাসনে স্থান পাইয়াছে।-“বিজলি”...১০
মুক্তির ডাক—একাঙ্ক নাটক। ষ্টার থিয়েটার। মেটারলিঙ্কের
“মনাভনা’র সহিত একাসনে স্থান পাইয়াছে।- “প্ৰবৰ্ত্তক”••••
সেমিৱেমিস ও নাটমঞ্চ—লেখকের সুপ্রসিদ্ধ কথা-নাট্য
সংগ্রহ। যন্ত্র।

[ ২ ] দেবাসুর—পঞ্চাঙ্ক বৈদিক নাটক। ষ্টার থিয়েটার। জাতির মুক্তি- যজ্ঞে দধিচীর আত্মাহুতি। ফ্লোরা এনাইন ষ্টীলের কৃতিত্বের সহিত লেখকের কৃতিত্ব একাসনে স্থান পাইয়াছে।– ডাঃ নরেশচন্দ্র সেন- গুপ্ত এম-এ, ডি-এ-১, চঁদ সদাগৱ-পঞ্চাঙ্ক নাটক। মনোেমােহন ও ষ্টার থিয়েটার। শত শত রাত্রি অভিনীত হইয়াও পুরাতন হয় নাই। নাটকখানি শুধু মনােমােহনেই নতুন নয়, নাট্য-সাহিত্যেও নতুন। পঞ্চাঙ্ক নাটক রচনায় তাঁর এই প্রথম চেষ্টাই এতটা জয়যুক্ত ও সাফল্যমণ্ডিত হয়েছে দেখে আশা হচ্ছে যে, বাঙ্গলাদেশে অন্ততঃ একজন এমন নাট্যকার জন্মেছেন যিনি ভবিষ্যতের রঙ্গমঞ্চকে কু-নাটক অভিনয়ের দায় হতে রক্ষা করতে পারবেন।”--“নাচঘর”, ••১, শ্রীবৎস—পঞ্চাঙ্ক নাটক। ষ্টার থিয়েটার। এমনি নাটকের অভিনয়েই রঙ্গমঞ্চের লােকশিক্ষক নাম সার্থক।--“নবশক্তিতে “চন্দ্রশেখর” •••১১ সাবিত্রী-নাট্য-নিকেতন। “সাবিত্রী”র পুরাতন পরিচিত কাহিনীর মৰ্ম্মগত সত্য অক্ষুন্ন রাখিয়া, নাট্যকার উহাকে এমন এক চিত্তহারী মধুর রূপ দিয়াছেন, যাহার স্নিগ্ধ সৌন্দর্য্য প্রত্যেক দৃশ্যে কৌতূহল ও কারুণ্যের মধ্য দিয়া অনাড়ম্বরে স্যার বিকশিত হইয়া এক আনন্দাশ্রু পরিপ্লুত তৃপ্তিময় পরিণতি লাভ করিয়াছে। ইহা পুরাতনকে নূতন করিয়াছে—আধুনিককে সনাতন সত্যের অচলপ্রতিষ্ঠ বেদী দেখাইয়াছে।” -“আনন্দবাজার”: ১০ [ ৩ ] মহুয়া—পঞ্চা, নাটক। মনােমােহন থিয়েটার। ও দেশের জগৎ- প্রসিদ্ধ কারমেনের সঙ্গে তুলনা করতে কিছুমাত্র কুণ্ঠাবােধ হয় না। --“নবশক্তিতে (“চন্দ্রশেখর” )...১১ সতী-পঞ্চাঙ্ক নাটক। নাট্য-নিকেতন। দক্ষযজ্ঞের পুরাতন কাহিনীর অভিনব অপরূপ রূপ। “হাসি এবং অশ্রু সমুজ্জ্বল” “আনন্দবাজার”:১০ অশােক—পঞ্চাঙ্ক ঐতিহাসিক নাটক ; ঐতিহাসিক নাটক ; রঙমহলে অভিনীত। মূল্য ১০ “অশােকই যে মন্মথবাবুর সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক, তাতে সন্দেহ নাই। -“ভগ্নদূত” মন্মথবাবুর ভাষা আছে, ঘটনা সৃষ্টির শক্তি আছে, গল্প বলবার কায়দাও জানা আছে।-“নাচঘর” গতানুগতিক পন্থাকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে এই শক্তিশালী নাট্যকার —নিজের নিজস্ব ধারায় কি সুন্দর ভাবেই না চরিত্র সৃষ্টি করে তােলেন ! অলৌকিক বিষয়-বস্তুকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করে নাট্যকার সুকৌশলে অশােকের অন্তদ্বন্দ্ব যে ভাবে নিপুণ তুলিকায় ফুটিয়ে তুলেছেন—তাতে তাকে প্রথমশ্রেণীর সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পী বলে অভিনন্দিত করতে আমাদের সঙ্কোচ নেই।—“শিশির” সুনিপুণ লেখকের হাতে নাটকখানি মনােরম হইয়া উঠিয়াছে। ----“বন্দেমাতরম্” [ ৪ ] ...তার ( নাট্যকারের) মুন্সিয়ানা দেখে মুগ্ধ না হয়ে থাকা যায় না। নাট্যকার যে ভাবে কুনালের প্রতি তিষ্যরক্ষিতার প্রেমের পরিচয় ফুটিয়ে তুলেছেন তা একমাত্র প্রথম শ্রেণীর আটিষ্টের তুলির কাজের সঙ্গে তুলনীয়।-“দীপালী” এমনিধারা finished production ইদানীন্তনকালে আর কোন অভিনয়-আসরে দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না।-“আজকাল” Sj. Manmatha Ray is one of those authors who have fortunately their own monopolised styles. He can always beat a nav tract. He can give a new colouring to an old picture and infusc new life into it. Asoke has satisfied most sanguine expectations. Asoke is much more an ordinary dramatic production. Asuke has come to stay with us.--Advance. Though the story of the drama is as old as near about two thosand years, the skilful dealing of the dramatist has endowed it with an epic grandeur. The drama in this respect can well be called as representing the strife and struggle of the age in which we live and so appeals to our heart all the more readily.-- Amrita Bazar Patrika. . We commend to all lovers of histrionic art to make it a point to visit this play from the pen of Mr. Manthatha Ray:-Forward.

মন্মথ রায় রচিত পঞ্চাঙ্ক নাটক খনা —প্রথম রজনীর অভিনয় দর্শনে--- আনন্দ বাজাৱ-১৩-৭-৩৫- গত বৃহস্পতিবার নাট্যনিকেতনে সুপ্রসিদ্ধ নাট্যকার যুক্ত মন্মথ রায় প্রণীত পঞ্চাঙ্ক পৌরাণিক নাটক “খনার” উদ্বোধন হইয়াছে। নাট্যকার হিসাবে মন্মথবাবুর সুনাম অনেকদিন হইতেই আছে এবং এই নাটকে তিনি তাহার কৃতিত্বের চরম উৎকর্ষতা প্রদর্শন করিয়াছেন। বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার অন্যতম সভ্য জ্যোতির্ণব বরাহের ভূমিকায় শ্রীযুক্ত অহীন্দ্র চৌধুরী অতি সুন্দর অভিনয় করিয়াছেন। অভিনয় দেখিলে মনে হয়, এইরূপ অভিনয় কেবল তাতেই সম্ভব । খনার ভূমিকায় শ্রীমতী সরযূবালা অতি চমৎকার অভিনয় করিয়াছেন। তাহার অভিনয় প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত দর্শকের চিত্ত আকৃষ্ট করিয়া রাখে। ভৈরবের ভূমিকায়—মণি ঘােষের অভিনয় বিশেষ উল্লেখযােগ্য। • তাহার রূপসজ্জা এবং অভিনয়ভঙ্গী আমাদের খুব ভাল লাগিয়াছে। বরাহের শিষ্য—কিন্তু কালিদাস-ভক্ত প্রেমিক-কামকের ভূমিকায় মনােরঞ্জন ভট্টাচাৰ্য সুঅভিনয় করিয়াছেন এবং তাহার অভিনয় আমরা বিশেষভাবে উপভােগ করিয়াছি। মিহিরের ভূমিকায় জীবন গাঙ্গুলীর অভিনয় ভালই হইয়াছে। বরাহের স্ত্রী ধরণীর ভূমিকায় শ্রীমতী চারুশীল [ ৬ ] অতি চমৎকার অভিনয় করিয়াছেন। নাটকের মধ্যে, নয়খানি গান আছে এবং শ্রীযুক্ত অখিল নিয়ােগী সমস্ত সঙ্গীত রচনা করিয়াছেন এবং ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় সুর দিয়াছেন। প্রত্যেক গান সুগীত হইয়াছে। মােটের উপর নাট্যনিকেতনের “খ” বেশ সাফল্যমণ্ডিত হইয়াছে এবং প্রত্যেকেই ইহা দেখিয়া তৃপ্তিলাভ করিবেন। দেশ-~-২ ০.৭-৩৫- সুপ্রসিদ্ধ নাট্যকার শ্রীযুক্ত মন্মথ রায়ের নূতন পঞ্চাঙ্ক নাটক ‘না’ নাট্যনিকেতনে দেখান হইতেছে। প্রাতঃস্মরণীয়। খনাদেবীর বচন কাহিনী বাঙ্গালী মাত্রই বিশেষভাবে জানেন। নন্মথবাবু অতি দক্ষতার সহিত এই খনা চরিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন এবং শ্রীযুক্ত অহীন্দ্র চৌধুরীর পরিচালনায় ক্যালকাটা থিয়েটার্স ইহার রূপ দিয়াছেন। গত শনিবার নাট্যনিকেতনে আমরা খনার অভিনয় দেখিয়া আসিয়াছি। অভিনয় দেখিয়া আমরা বিশেষ তৃপ্তিলাভ করিয়াছি। বঙ্গবঙ্গমঞ্চে এই নাটক যে একটী বিশিষ্ট স্থান অধিকার করিয়াছে—তাহা আমরা নিঃসন্দেহে বলিতে পারি। ভারতসম্রাট বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার অন্যতম ব; জ্যোতিমান বরাহের ভূমিকায় অহীন্দ্র চৌধুরী অভিনয় করিয়াছেন।--তাহার অভিনয় প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত যেমন আন্তরিকতার ভরা তেমনি প্রাণস্পর্শী। পুত্রের সহিত মিলনের দৃশ্যটী অতি চমৎকার হইয়াছে। খনার ভূমিকায় শ্ৰীমতী সরযূবালার অভিনয়, আমাদিগকে মুগ্ধ করিয়াছে। এই মহীয়া মহিলার ভূমিকায় তিনি বিশেষ কৃতিত্বের সহিত অভিনয় করিয়াছেন। একটী সংযম ও নিষ্ঠার ভাব তাহার অভিনয়ের মধ্যে দেখিতে পাওয়া যায়। ইহার পরই কামনকের ভূমিকায় যুক্ত মনােরঞ্জন ভট্টাচার্যের [ ] অভিনয় উল্লেখযােগ্য। মনােরঞ্জনবাবু সেই শ্রেণীর নট যিনি সর্বপ্রকার ভূমিকাতেই কৃতিত্বের সহিত অভিনয় করিতে পারেন--বিশেষ করিয়া হাস্যপূর্ণ ভূমিকায়। কাম-ক ছিল বরাহের শিষ্য, কিন্তু সে জ্যোতিষ চর্চার ধার ধারিত না। সে ছিল কালিদাস ভক্ত এবং প্রেমচর্চাকে তাহার জীবনের শ্রেষ্ঠ কৰ্তব্য বলিয়া মনে করিত। দীর্ঘ চারিঘণ্টা ধরিয়া এইরূপ বিয়ােগান্ত নাটকের অভিনয়ে, দর্শক-চিত্ত যাহাতে ভারাক্রান্ত হইয়া উঠে তজ্জন্য লেখক অতি নিপুণতার সহিত এই কান্দক চরিত্রের সৃষ্টি করিয়াছেন এবং এই চরিত্রে মনােরঞ্জনবাবুর অভিনয়—আমরা বিশেষভাবে উপভােগ করিয়াছি। মিহিরের ভূমিকায় জীবন গাঙ্গুলীর অভিনয় ভালই, কিন্তু তিনি বিশেষ কিছু কৃতিত্ব দেখাইতে পারেন নাই। ক্রীতদাস চরিত্র মন্মথবাবুর আর একটী সৃষ্টি। এই চরিত্রে মণি ঘােবের অভিনয় ও রূপসজ্জা অপূৰ্ব্ব হইয়াছে। তাহার অভিনয় এরূপ করুণ ও মৰ্ম্মস্পর্শী যে তাহাতে সময় সময় দর্শকচিত্ত ব্যথিত হইয়া উঠে। বিক্রমাদিত্যের মন্ত্রী বিভাবসুর ভূমিকার অভিনয় মন্দ হয় নাই ; তরলিকার অভিনয় এবং গান আমাদের ভাল লাগিয়াছে। মদনিকার ভূমিকায় নিরুপমা এবং তরণিকার ভূমিকায় তারকবালা ( লাইট। অভিনয় করিয়াছেন। নাটকে নয়খানি গান আছে এব” শ্রীযুক্ত অখিল নিয়োেগী সমস্ত গান লিখিয়াছেন। লেখা খুব ভাল এবং সবগুলিই সুগীত হইয়াছে। দৃশ্যপট এবং সাজসজ্জা প্রশংসনীয়। নবশক্তি-১০ই শ্রাবণ, ১৩৪২- নাট্য নিকেতনে খনালব্ধপ্রতিষ্ঠ নাট্যকার মন্মথ রায়ের ‘খনা'। নাটকখানি ব্যবসদারদের অনেক ফিকিরফর হাত এড়িয়ে [ ৮ ] দীর্ঘকাল পরে রঙ্গমঞ্চে আত্মপ্রকাশের সুযােগ লাভ করেছে। যার জন্য ব্যবসায়ীদের এত কাড়াকাড়ি সে জিনিষ যে ভাল হবে তা অনুমান করা শক্ত নয়, কিন্তু উপযুক্ত হতে না পড়লে কোন জিনিস যে কি হয়ে দাড়ার সেইটেই ছিল ভাবনার কথা। গত শনিবার ‘নাট্য নিকেতনে’ ‘খ’ দেখে এসে আমাদের সে আশঙ্কা দূর হয়েছে। প্রতিভাবান শিল্পীর অভিনয়ে নাটকের চরিত্র যে কত অপূৰ্ব হয়ে উঠতে পারে শ্ৰীযুক্ত অহীল চৌধুরী তা দেখিয়েছেন তার ধরাহের অভিনয়ে। এক সঙ্গে স্নে, পরাজয়ের গ্লানি ও ঈর্ষার জালা তিনি যে অপরূপ রূপে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, । তার ন্যায় শিল্পীর পক্ষেই সম্ভবপর। শ্ৰীযুক্ত মনােরঞ্জন ভট্টাচার্যের কামকের ভূমিকাও হাস্যরসে অপূৰ্ব। তার চিরকুমার সভায় সিক ও ফুল্লরার ‘ভাড় দত্তে’র পরে খনার এই ‘কামকের ভূমিকাও স্মরণীয় । খনার ভূমিকায় সরযূবালার অভিনয় চমৎকার হয়েছে। ভৈরবের ভূমিকাটিও চমৎকার হয়েছে। নাচের পরিকল্পনা নূতন এবং প্রশংসনীয় । আমরা খনা নাটকখানি দেখে খুশী হয়েছি, আশাকরি যারা দেখবেন তারাও খুশী হবেন। DIPALI. Vol. Vil. No. 29 July, 19, 1935 "KHANA", from the pen of Manmatha Ray,isprahaps God's answer to the theatre-owner's prayer for a play hat will please ali classes of audiences without calling orth the best in the artistes. And that is where the dramatist truimphs bver the players as a whole , Marmatha Ray needs no introduction to the Bengali hcatre-goers and “KHANA” furnishes an excellent -xample of this noted author's rate knack of turning [ o ] legends of yore into engrossing plays to the liking of modern audiences. Ray wields a facile pen and is a past master in giving such twists to a story that go a long way in creating dramatic situations and climaxes, In "KHANA” both these qualities have admirablycombined o effect popular entertainment, with a capital 'P' and 'F' The life-story of Khana has taken the form legends in many part of this country. She is known to posterity as one of the greatest astrological geniuses that ever lived in the world. But her life-story contains a universal appeal, inasmuch as, shc being heiress ti a throne, embraced poverty for the love she bore to her husband who however did not hesitate to trifle with that love. The author has closed the play with Khana': supreme sacrifice with her life at the altar of this divine love. Much of the play however is occupied with incidents in the life of Baraha, one of the nine luminaric in King Bikramaditya's world-famous Court, as he wa the prime cause of all that happened in the drama. Th author has blended the different episodes in an admit able manner, and the result has been the creation of strong story-interest that never lets the attention of th audience flag till the very final curtain. -TEESPIS কাজল রেখা-অপূৰ্ব শিশুপাঠ্য। স্কুল কলেজে অভিনীত চার আনা।

[ 30 ] VIDYUTPARNA Amrita Bazar patrika. Sunday~4th. Sept. 1934, Mr. Manmatha Roy, who with his remarkable literary gift has won his way to the fore-front of the drainatists of the day has given us this new play which was originally published in that much famed collection playlets by the writer, termed “Ikankika', and an enthusiastic appreciation of which, in the literary circle, inspired its publication in an carly issue of "Bharatbarsha” in the year, 1344. To suit the altered atomsphere of the stage on its restricted lines on the occasion of its performance by "C. A. l.” the playlet underwent varied changes to come to the present lorin. The huge success enjoyed by the play, as playeri by that respected band of artists, "C. A. D.," woull be some thing of a superfluity to mention here. Coming to the work itself. “VIDYUTPARNA" would be csteemed by many keen lovers of Irama having bronght a whiff of fresh breeze in Bengal's jaded arena of dramus. This one-art geil, complete in four compactly knitted out ches, is a pleasant revelation of further developments of Mr. Rey's sitt of the dramatic pen, calling forth the best in him. With his cnchanting story-weaving kuach, one lines it immensely pleasurable to be deeply engrossed in the destiny of the 'Devadasi,' "VIDYUTPARNA", the thrilling recounting ul the pomantic throbs of her life and of the divine mission she was called upon to fulfil in the climatic deal. The main thread of the story is perfectly well preserved, linking on to it the engaging by.plays with consummato craftsinarship. The writer's deep insight into and understanding nf human characters and lijs grasp of the art of creating Find then ably tackling dramatic situations, all imbued as [»] with the touch of his literary distinction, all go to make his work ingeniously bright. "VIDYUTPARNA,' is a legend of yore 'which while thoroughly ingratiating in its foldings of legendary grandeur, is not bcrcft of a shrewd touch of modernism. The characters from his pen have just that artful hue of over-colour which makes them memorable. The dialogue is penetratingly live to let the reader share as it were the thrill of the actual contact with the characters. The note of humour is well inscribed. This lively intelligent, refreshing drama should find many readers of taste....... Price As-12. RAJNATI Hindustan Standard. Mar.13, 1938. Cal. Edition. At a time when modern Bengali literature was really in need of a good dramatist, Sj. Manmatha Ray appeared in this sphere with his keen insight into human nature and his extraordinary talent in creating a truly dramatic situation in his characters. In his book RAJNATI Sj. Roy has once again exhibited his originality in this art. To those who complain of a dearth of suitable Bengali dramas for amateurs we are glad to recommend this book with this hope that it will be received with the same kind of appreciation as it was the case in Calcutta when it was staged by the C. A.P. The ideology behind the book is purely Indian. We would like also to mention about the well-composed songs and its nice get-up....Price As. 12. রাজনটী মধুচ্ছার প্রেমের অন্য মণিপুরের যুবরাজ চন্দ্রকীর্তি রাজ্যতাগ করিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু প্রভুপাদ কাশীশ্বর গােস্বামীর অনুনয়ে বৈষ্ণবধৰ্ম্মেয় ভবিষ্যতের দিকে চাহিয়া মধুচ্ছা চন্দ্রকীৰ্ত্তিকে প্রত্যাখ্যান [ ১২ ] করিলেন। সেই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়া মধুচ্ছন্দা লাভ করিলেন--- শ্রীচৈতন্যের পুণ্য পদধূলি এবং রাজ্যাভিষেকের পর চন্দ্রকীৰ্ত্তি হইলেন সন্ন্যাসী। এই সুন্দর কাহিনীটি লইয়া খ্যাতনামা নাট্যকার শ্রীযুক্ত মন্মথ রায় ‘রাজনটী' রচনা করিয়াছেন। সুন্দর দৃশ্যপট ও সুললিত নৃত্য-গীতের মধ্য দিয়া এই সুন্দর গল্পের স্রোত বহিয়া গিয়াছে। এই দিক দিয়া বিচার করিলে, নাটকখানিকে অপেরায় শ্রেণীতে ফেলা যায়। অথচ ইহা পূর্ণাঙ্গ অপেরা নহে; চারিটি মাত্র দৃশ্যে সমাপ্ত একাঙ্ক নাটক। নাটক রচনায় শাযুক্ত মন্মথ রায় মহাশয়ের খ্যাতি বহু পূৰ্ব্বেই প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। বাঙলার দর্শকমহলে তাহার জনপ্রিয়তাও প্রভূত। একাঙ্ক নাটকেও যে তিনি কিরূপ শক্তির পরিচয় দিয়াছেন তাহা তাঁহার মুক্তির ডাক,” “একাঙ্কিকা”র পাঠকমাত্রেই অবগত আছেন। বর্তমান নাটকে তাহার পূৰ্ব্বখ্যাতি অক্ষুন্ন আছে। প্রচ্ছদের চিত্রখানির জন্য শিল্পী নরেন্দ্র দত্ত মহাশয় প্রশংসার অধিকারী।--“দেশ”..মূল্য বার আনা। রাজনীফাষ্ট এম্পায়ার। শ্ৰীযুক্ত মন্মথ রায় যশস্বী নাট্যকার। বিদ্যুৎপর্ণা নাটকের রচনা- বিন্যাসে তিনি যে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়াছিলেন ‘রাজটী’ নাটকের মধ্যেও তাহার অভাব নাই, এই নাটকের মধ্যে তিনি যে সূক্ষ্ম অন্তদৃষ্টি ও মনস্তত্ত্বের পরিচয় দিয়াছেন তজ্জন্য আমরা তঁাহার প্রতিভার যােগান করিতেছি।-“আনন্দবাজার পত্রিকা”। বারাে আনা

বিশেষ বিজ্ঞপ্তি
বাঙলা সাহিত্যে
একাঙ্ক নাটক প্রবক
মন্মথ রায়ের
সুপ্রসিদ্ধ একাঙ্ক নাটক সংগ্রহ।
-একাঙ্কিকা—
নাট্যসাহিত্যে সত্য সত্যই নব রসধারার মন্দাকিনী
অভিজাত সমাজে সাদরে অভিনীত
মূল্য |• মাত্র
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০ ৩১১, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Khana Ed. 2nd

Author
Roy, Manmatha
Title
Khana Ed. 2nd
File name
Khana Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1935
Published
2009/07/31
Publisher
Gurudas Chatterjee And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
154
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Drama Plays
Keywords
Historical Drama
DLI number
550986
Barcode
4990010021095.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
QIF8hUCbR0Y
Download PDF

Khana Ed. 2nd