Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sita-nirbbashon

Chaki,benimadhab · 2009/09/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সী-নিৰ্বাসন।
শ্রীবেণীমাধব চাকী বি, এল,
প্রণীত।
প্রকাশক-সিদ্ধেশ্বর পান,
৬৬ নং কলেজ ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
সন ১৩২০।

CALCUTTA :
PRINTED BY ABINASH CHANDRA MANDAL,
“SIDDHESWAR MACHINE PRESS,"
73, Shibnarayan Das's Lane.
1913

উৎসর্গপত্র।
আত্ম-ত্যাগ-পরায়ণা
বঙ্গ-কুল-ললনাগণের
করকমলে
এই গ্রন্থ
সাদরে
সমর্পিত হইল।

No text on this page.

ভ্রম-সংশোধন পত্র। পৃষ্ঠা পংক্তি অশুদ্ধ ৮ ২৩ জোছনা কামাচারী দ্বিজোত্তমােৎসি জ্যোছনা কামচারী দ্বিজোত্তমােহস্তি ২৮ ১ 'গুমুর 'গুমর ৪২ লগ্ন নগ্ন ৯ ২ ভাগীরথী ! রাজকার্যে ৪৫ ৮০ কেন ৮১ ১১ ভাগিরথী ? রাজকার্ষে কেহ দুর্যোগে দুর্যোগেব শার্দল ভুয়ে দুর্যোগে দুর্যোগের ৮৬ ১০১ ৭ শার্দল ১০২ ভূয়ে যে যেন ১১৯ प সােণার সােনার ১৩৫ ২২ য ১৪৬ বেশ ১৪৭ ২ বেস অপ্সসর সজনি অপ্সরা স্বজনি ৬ শুন

No text on this page.

আমার নিবেদন কবিবর কৃত্তিবাসের রামায়ণে লবকুশের সহিত সসৈন্য রামচন্দ্রের যুদ্ধ প্রভৃতি যে সকল বিবরণ বর্ণিত হইয়াছে, এ গ্রন্থে আমি সে সমস্ত একেবারে পরিত্যাগ করিয়াছি। প্রকৃত পক্ষে আদিকবি বাল্মীকির রামায়ণে লব কুশ কর্তৃক রামচন্দ্রের যজ্ঞশ্ব ধৃত, এবং তাহা লইয়া লবকুশের সহিত রঘুসৈন্যের যুদ্ধ ' হওয়ার কোন উল্লেখ নাই। উত্তরচরিতপ্রণেতা ভবভূতি, পদ্মপুরাণ হইতে ঐ উপাখ্যানভাগ গ্রহণ করিয়া তাহার নাটকে সন্নিবিষ্ট করিয়াছেন, অনুমিত হয়। কবিবর কৃত্তিবাস কোথা হইতে এই অংশ গ্রহণ করিয়াছেন জানি না; সম্ভবতঃ ঐ পুরাণ হইতেই গ্রহণ করিয়া থাকিবেন। যাহা হউক, আমি এ সম্বন্ধে আদিকবির পদানুসরণ করাই সঙ্গত মনে করিয়াছি। আর একটী কথা। দুর্মুখের মুখে সীতার লােকাপবাদ বৃত্তান্ত শুনিয়া রামচন্দ্র সীতাদেবীর বনবাস দিয়াছিলেন, এ কথা আদিকবির রামায়ণে নাই। মহর্ষি অন্যভাবে এ বিষয় বর্ণনা করিয়াছেন। ভবভূতি ভঁহার উত্তরচরিতে দুর্মুখ- কাহিনী সন্নিবিষ্ট করিয়াছেন। আমার এ গ্রন্থ নাটকাকারে যে ভাবে লিখিত হইয়াছে, তাহাতে আমি এ সম্বন্ধে মহাকবি ভবভূতির অনুসরণ করা ভাল বােধ করিয়াছি। স্থানে স্থানে কাহারও অনুসরণ না করিয়া কল্পনার সাহায্য লইয়াছি।

০ ঋণী। কবিগুরু বাল্মীকির অপূৰ্ব্বসৃষ্টি আদর্শ-সতী সীতাদেবীর বনবাস-বৃত্তান্ত লইয়া এ পর্যন্ত নানা আকারে নানা ভাবে অনেক গ্রন্থ রচিত হইয়াছে। সুতরাং এ গ্রন্থ প্রণয়নে আমার পূর্ববর্তী লেখকগণের নিকট-ইচ্ছায় হউক অনিচ্ছায় হউক, জ্ঞাতসারে হউক অজ্ঞাতসারে হউক,—আমি অনেক পরিমাণে সে ঋণ এইখানে স্বীকার করিয়া আমার কর্তব্য পালন করিলাম। বঙ্গ-সাহিত্য-সেবী বন্ধুগণমধ্যে অনেকে এই গ্রন্থ প্রণয়ন- সম্বন্ধে আমাকে সাহায্য ও উৎসাহিত করিয়াছেন। আমি তাঁহাদিগের নিকট বিশেষ কৃতজ্ঞ। আর আমার পরম স্নেহাস্পদ শ্ৰীমান্ ফণীন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় এই গ্রন্থের মুদ্রাঙ্কন ও প্রফ সংশােধনাদি সকল বিষয়ে যে পরিশ্রম করিয়া- ছেন, তাহার জন্য আমি তাহাকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিতেছি। গ্রন্থের অনেক স্থানে ভ্রমপ্রমাদ রহিয়া গিয়াছে। পাঠক- পাঠিকাগণ সেগুলি সংশােধন করিয়া লইবেন, ইহাই প্রার্থনা। বগুড়া। সন ১৩২০ সাল, ১০ই জ্যৈষ্ঠ। গ্রন্থকার।

নাট্যোলিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষগণ। রামচন্দ্র, লক্ষ্মণ, ভরত, শত্রু, নারদ, বাল্মীকি, বশিষ্ঠ, সুমন্ত্র, দুর্মুখ, লব, কুশ, সুগ্রীব, বিভীষণ, বিপ্ৰবন্ধু ও রত্নদাস ( নাগরিকদ্বয়), মন্ত্রী, প্রতিহারী, দুত, বাহক, সৈনিক, অন্ধ, খঞ্জ, রাজকর্মচারী, কখুকী, নাগরিকগণ, ঋষি- বালকগণ, ঋষিশিষ্য- গণ ইত্যাদি। স্ত্রীগণ। সীত, উর্মিলা, পৃথ্বীদেবী, স্বর্গবিদ্যাধরীগণ, সহচরীগণ, জনৈক স্ত্রীলােক, বনদেবীগণ, তাপসীদ্বয়, সুরবালাগণ।

No text on this page.

সীনিবাসন।
প্রস্তাবনা।
সুরলােক।
{ স্বর্গ-বিদ্যাধরীগণের সঙ্গীত।)
আজি হরষ-ভরে, এসাে বহুদিন পরে,
নাচিব গাহিব মিলি সবে অমরায়।
আয় লাে প্রমােদে মাতি, গেছে চলি দুখ-রাতি,
সুখ-অরুণ-ভাতি ফুটেছে লো পুনরায় ।
মন্দার ফুলে করি কেশ-রচনা,
অঙ্গ সাজাই ভুলি মনােবেদনা,
আয় আয় সহচরি, খেলা করি লুকোচুরি,
শূন্যে মিশায়ে যাই জোছনা মাখিয়া গায় ।
ত্রিলােকে রাবণ-বধে সবে নাচিছে,
উল্লাসে ঋষি যত সাম গাইছে,
এ সুখ-সময়ে সই, কেন লো নীরবে রই,
প্রাণ ভরি রামনাম গাই সবে আয় আয়।
১ম বিদ্যাধরী। অমরী:-মরণ নাই—তাই রক্ষোগৃহে
এত কষ্টে অপমানে রহিয়াছে প্রাণ।
(নেপথ্যে বীধ্বনি।

সীতা নির্বাসন
২য় বিদ্যাধরী। ওই ওই, আসিছেন এই দিক পানে
সতত কলহ-প্রিয় দেবর্ষি নারদ ;
চল মােরা হেথা হ’তে যাই অন্য স্থানে।
[ বিদ্যাধরীগণের প্রস্থান
[ নারদের প্রবেশ।
নারদ। কই কই-কোথা গেল ? এই না শুনি
সুমধুর-কণ্ঠে মধুমাখা রামনাম
এই দিক্ পানে? ঢালিয়া সুধার ধারা
ভক্তের পরাণে, কে গাইছে সুরলােকে
পবিত্র সে নাম? গাও ত্রিজগহাসি,
সে নাম তারকব্রহ্ম অন্তের সম্বল ;
তুমিও নারদ, সপ্তমে তুলিয়া সুর
বীণার ঝঙ্কারে, জীবের উদ্ধার তরে
গাও সেই নাম।
( সঙ্গীত।)
ভুলােনা ভুলােনা সুধামাখা রামনাম রে,
সুধামাখা রামনাম রে।
জপ নাম নিরবধি, পাবে যদি
অন্তে সেই সারাৎসারে।
সদা ভক্তিভরে গাও রামলীলা,
যে নামের গুণে জলে ভাসে শিলা
অনিত্য বিষয় ভুলি, প্রাণ খুলি
ডাক ভব-কর্ণধারে।

প্রস্তাবনা।
৩
vin .
জীব-কল্যাণ-সাধনে আত্মহারা,
দিলে চণ্ডালে কোল প্রেমে মাতােয়ারা ;
কে বােঝে তোমার মায়া, পদছায়া
দিও সদা এ কিঙ্করে।
লীলাময়, কে বুঝিবে লীলা তব ?
কেন সৃষ্টি, কেন স্থিতি, কেন বা প্রলয়
তােমার ইচ্ছায় হরি হয় বার বার
কে বুঝিবে ? কে বুঝিবে কেন জীবগণ
আসে ক্ষণেকের তরে, কি কাৰ্য্য সাধিতে,
কোথায় কেন বা চলি যায় পুনরায় ।
কি দুর্ভেদ্য যবনিকা অন্তরালে প্রভে,
সৃষ্টির রহস্য গাঢ় লুকায়ে রেখেছ।
তুমি, তুমিই তা জান।
( পরিক্রমণ।)
প্রলয়-পয়ােধি-জলে ধরিত্রী যখন
নিমগন, তুমি হরি মীন দেহ ধরি,
উদ্ধার করিলা বেদ, নাশি শঙ্খসুরে।
কূৰ্ম্মরূপ ধরি মন্দর ধরিয়া পৃষ্ঠে
সমুদ্র-মন্থনে পুনঃ রক্ষিলা ধরণী।
পরে মহাপরাক্রম দিতির নন্দন
হিরণ্যাক্ষ, ধরি যবে ধরা সুন্দরীরে
গেল লয়ে পাতালপুরীতে, তুমি নাথ,
ভীষণ বরাহরূপে পশি রসাতলে
দৈত্য নাশি উদ্ধারিলা বসুন্ধরা সতী।

৪
সীতা-নিবাসন।
তার পর যবে বর-দৃপ্ত স্বেচ্ছাচারী
হিরণ্যকশিপু, আরম্ভিল অত্যাচার,
মহা হাহাকার উঠিল ত্রিলােক জুড়ি,
হৃদয়বিদারী সে রােদন-ধ্বনি নাথ,
পশিল তােমার কাণে, দয়াময় তুমি,
ধরি নরসিংহরূপ ভৈরব-মূরতি
করিলা অসুর নাশ, রক্ষিলা ত্রিলােক,
হরিনাম ত্রিভুবনে হইল প্রচার।
পরে যবে ধনমদে মত্ত বলিরাজ,
ধরিলা বামনরূপ শিক্ষা দিলা রে।
তারপর মহাদম্ভী ক্ষত্রিয়ের দল,
রাজশক্তি পশুবলে করি পরিণত,
বিসর্জিয়া ন্যায়ধৰ্ম্ম, আত্মসুখতরে
শাসিতে লাগিল ধরাতল, তীক্ষ্ণধার
কুঠার ধরিয়া করে, সিংহনাদ করি
তুমি হরি, “সংহার” “সংহার” ভীমরবে
কপায়ে মেদিনী, বহালে রুধির-নদী
ক্ষত্রিয়-শােণিতে, শান্তিময় ধরাতল
হইল আবার। পুনঃ ত্রেতাযুগে যবে,
সৰ্বলােক ভয়ঙ্কর দুর্ধর্ষ দুর্বার
সদা স্বেচ্ছাচার-রত দুষ্ট দশানন
আরম্ভিল ঘাের অত্যাচার, তুমি দেব
পূর্ণব্রহ্ম অবতীর্ণ হইয়া ধরায়
বধিলা সবংশে তারে রামরূপ ধরি,
L

প্রস্তাবনা।
নিঃশঙ্কিলা দেবনর—এ তিন ভুবন ;
স্থাপিলা ধৰ্ম্মের রাজ্য, রামরাজ্যনামে
হইবে কীৰ্ত্তিত যাহা যুগযুগান্তরে।
হরিতে দুষ্কৃতিকার, রক্ষিতে ধাৰ্ম্মিকে,
আরাে কতবার হরি ধরণীমণ্ডলে
কতরূপে কতভাবে অবতীর্ণ হবে
কত দেশে, কে পারে কহিতে তাহা। কিন্তু,
এখনাে ত্রেতার লীলা হয় নাই শেষ ;
রক্ষোনাশ মহাকাৰ্য হয়েছে সাধিত,
আরাে কাৰ্য নরলােকে আছে করিবার।
তাই লক্ষ্মীনারায়ণ, আরাে কিছুদিন
রহিবেন মর্ত্যলােকে, আরাে কিছুদিন
রামরূপী জনার্দনে হেরিবে মানব।
কি হবে থাকিয়া হেথা ? যাই ধরাধামে
রাম-অবতার-লীলা স্বচক্ষে দেখিতে।
কত আত্মসুখত্যাগ, স্বার্থবিসর্জন
করিবেন রাজগণ করিতে পালন
রাজধৰ্ম্ম, রামভদ্র শিখাবেন তাহা,
প্রজারঞ্জনের তরে দিয়া বিসর্জন
সতী-সাধ্বী ধৰ্ম্মপত্নী জনক-কন্যায় ;
আর সেই মহাসতী পতি-পরায়ণ
পতিভক্তি-পরাকাষ্ঠা দেখাবে কেমনে,
বিস্মিত স্তম্ভিত করি ত্ৰিজগদ্বাসী,
দেখে আসি নিজ চক্ষে, কি কাজ হেথায় ?

৬
সীতা-নিবাসন।
কি মহতী আশার বারতা মানবের!
‘রাজধর্ম শিখিবে মানব,
নারীধৰ্ম্ম শিখিবে রমণী।
যাই চলি ধরাতলে দেখিতে সে লীলা
অদ্ভুত অশ্রুতপূৰ্ব্ব, এ তিন ভুবনে।
[ নারদের প্রস্থান
প্রস্তাবনা সমাপ্ত।

প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
অযােধ্যা-রাজসভা। ।
( রাম, লক্ষ্মণ, বশিষ্ঠ, মন্ত্রী ও সভাসদগণ আসীন।)
রাম।
কুলগুরাে,
বিপুল সাম্রাজ্যভার করেছি গ্রহণ।
কর দেব আশীৰ্বাদ, নিরাপদে যেন
রক্ষিতে শাসিতে পারি সন্তানের মত
প্রজাবৃন্দে। শিখি নাই রাজকাৰ্য কভু,
ধনুর্বাণকরে কাটায়েছি শিশুকাল,
তার পর চতুর্দশবর্ষ বনে বনে
পৰ্বতে পৰ্বতে ভ্রমিয়াছি, করিয়াছি
রণক্রীড়া রাক্ষসের সনে।
হয় নাই
অবসর কভু রাজনীতিক্ষেত্রে মাের
কাৰ্য্য করিবার, তাই দেব নিবেদন,
ভ্রান্তি যদি হয় কোনাে স্থলে, লইবেন
সংশােধিয়া উপদেশ দানে।
বশিষ্ঠ।
সাধু তুমি,
জিতেন্দ্রিয় সত্যনিষ্ঠ তােমার সমান
ত্রিভুবনে নাহি আর, কি ভয় তােমার ?

৭ সীতা-নির্বাসন। । ন্যায়-তুলাদণ্ড ধরি ধৰ্ম্মাসন হতে আদেশ করিবে দান, করি আশীর্বাদ নির্বিঘ্নে রাজ্যের কাৰ্য চলিবে সতত, ব্রাহ্মণের আশীর্বাদ না হবে অন্যথা। লক্ষণ। রাম। মহাবাহু তুমি আৰ্য ভুবনবিজয়ী, সমদর্শী, ন্যায়পর, দয়ার সাগর, সিংহাসনে বসি কর আদেশ প্রচার ; আছে দাস, মহাবল শত্রুঘ্ন ভরত, ভ্ৰমিব সাম্রাজ্যে মােরা, দেখিব সতত কোথায় কি প্রয়ােজন অভাব কাহার ; নির্বিঘ্নে শাসিব রাজ্য মথি শত্রুকুল। জানি আমি হে ভ্রাতৃরতন, জানি আমি ভুজবীৰ্য তব, জানি তব ভ্রাতৃপ্রেম, জানি কত বল ধরে শত্রুঘ্ন ভরত ; কিন্তু ভাই, শুধু শক্রবধে রাজকাৰ্য নাহি হয় শেষ। রাজধৰ্ম্ম মহাব্রত, শুনিয়াছি চারিমতে উদ্যাপন তার। বিশেষতঃ কোথা আর শত্রু হে রাজন্ ? মহারাজ্যে সুখশান্তি করিছে বিরাজ। নিৰ্ম্মল রাক্ষসকুল, নির্ভয়-হৃদয়ে দ্বিজগণ নিয়ােজিত জ্ঞান-অন্বেষণে, ঘুচাইতে ধরাতলে দুঃখ মানবের। শস্যপূর্ণ। বসুন্ধরা সদা হাস্যময়ী মন্ত্রী। - •

প্রথম অঙ্ক।
৯
জলাশয় দেবালয় আদি, প্রয়ােজন
যেখানে যেমন দেব, হ’তেছে সকলি।
রাম। নাহি রক্তপাতে আর বাসনা আমার।
ইচ্ছা মাের প্রেমভােরে জগৎ-সংসার
রাখি বাঁধি। সাধ হয়, নিজ প্রাণ দিয়া
পারি যদি দুঃখ কারে করিতে মােচন,
অকাতরে দিই প্রাণ। মহারাজ্য মাের
আসিন্ধু হিমাদ্রি সুবিস্তৃত, দেখাে সবে,
দুঃখ যেন প্রজা মাের নাহি জানে কেহ।
রঘুকুলরাজধৰ্ম প্ৰজার রঞ্জন,
দেখিও সকলে, কুলধৰ্ম্ম রক্ষা যেন
হয় বিধিমতে ;-
লক্ষ্মণ। শিরােধার্য আজ্ঞা তব রঘুচুড়ামণি,
প্রজারঞ্জনের তরে পালিব সতত
তব আজ্ঞা ভাল মন্দ না ভাবিয়া কিছু।
রাম। মন্ত্রিবর, গুপ্তচর করহ প্রেরণ
সৰ্ব্বস্থানে, দেখুক গােপনে তারা সবে,
কি আছে অভাব কার, কে কি বলে
দোষগুণ মম।
মন্ত্রী।
হইয়াছে নিয়ােজিত
বিশ্বস্ত অমাত্য বহু এ কার্যের তরে।
বল মন্ত্রিবর, এই গুরুতর কাজে,
নিয়ােগ করেছ কারে রাজধানী মাঝে ?
রাম।
।

সীতা-নির্বাসন
মন্ত্রী। দুমুখ তাহার নাম সদা সত্যবাদী
অকপট। কুমার লক্ষ্মণ নিজে দেখি
নিয়ােজিত করেছেন তায়।
রাম।
কি বলিলে,
দুর্মুখ তাহার নাম ?
লক্ষ্মণ।
আছে তার অন্য নাম, কিন্তু
অনায়াসে দেয় সত্য অপ্রিয় সংবাদ,
তাই সবে নাম তার দিয়াছে দুর্মূখ।
রাম। এ কাৰ্য্যের উপযুক্ত সেই। মন্ত্রিবর,
কহিও দুম্মুখে, প্রতিদিন নিশাকালে
সুষুপ্ত নগরবাসী হইবে যখন
যায় যেন মাের কাছে, থাকে যদি কিছু
জানাতে আমায় তার রাজ্যের সংবাদ।
দিও সাবধান করি, অপরের কাছে
করে প্রকাশ যেন গুপ্ত সমাচার।
মন্ত্রী। যথা অভিপ্রায় দেব।
রাম।
সভাভঙ্গ এবে।
পূৰ্বাহ্ন অতীতপ্রায়, নিজ নিজ স্থানে
যাও এবে বিশ্রামের তরে। অপরাহ্নে,
যথাকালে সভাস্থলে আসিও সকলে,
আবেদন অভিযােগ শুনিব সবার।
( সকলের প্রস্থান।

প্রথম অঙ্ক।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
অযযাধ্যার রাজান্তঃপুরস্থ প্রমােদ-কানন।
[ সহচরীগণের প্রবেশ।]
সঙ্গীত।
হের ললা হের লাে সই,
সরােজিনী কাছে ওই,
দিনমণি মাগিছে বিদায় ;
সন্ধ্যা আসিছে হেরি,
আঁখি মেলি ধরি ধরি,
কুমুদিনী চাদ পানে চায়।
কমল মুদিছে আঁখি বিরসবদন,
গুঞ্জরি কাঁদে অলি বিষাদিত মন,
তা’ নেহারি কুতূহলে,
যেন পরিহাস ছলে,
অনিল করিছে হায় হায়।
;
১ম সহচরী। আহা কিবা সাজিয়াছে উপবন আজি
মনােহর সাজে সখি, মধুর প্রদোষে !
সরষু-সলিল-কণা পরশি শীতল,
হরি পরিমল ধন কুসুমে কুসুমে,
দোলাইয়া মৃদু মৃদু তরু-লতিকায়
বহিছে মলয়ানিল যেন ভয়ে ভয়ে।
ঢালিছে নিকুঞ্জ হ’তে থাকিয়া থাকিয়া
6

সীতা-নির্বাচন। সঙ্গীত-অমৃতধারা সুকণ্ঠ বিহগ। দূরে ক্রীড়াশৈল পাশে চকিত-নয়ন খেলিছে কুরঙ্গ-শিশু আনন্দ-অন্তরে, জননীর চারিদিকে করি ছুটাছুটি। নিরানন্দ চক্রবাক হের লাে চাহিয়া, চক্রবাকী কাছে ওই মাগিছে বিদায় সরযুর উপকূলে ব্যথিত-হৃদয়। তপােবন প্রায় উপবন, পূরাইতে অভিলাষ জনক-সুতার, নিৰ্মাইলা রামভদ্র অতি যত্ন করি অযযাধ্যায়। ২য় সহচরী। হের সহচরি, বুঝি প্রকৃতিসুন্দরী করিতে দোহদ পূর্ণ রাজ-মহিষীর সাজায়েছে এত সাজে রম্য উপবন- ভূতলে স্বর্গের শােভা নন্দন-কানন। ১ম সহচরী। কিন্তু কোথা সীতাদেবী ? সুরভি কুসুমে সযতনে সুচিকণ গেঁথেছি মালিকা, সাজাইব মােহিনী কবরী, দোলাইব কম্বুকণ্ঠে তাঁর, হেরি হাসি রঘুবীর সম্ভাষিবে সকৌতুকে বনদেবী বলি মহিষীরে, সলাজহরষে আরক্তিম গণ্ডস্থল হবে মহিষীর। ২য় সহচরী। আর আমি,- কাঁপায়ে সরসীনীর সন্ধ্যা-সমীরণ গাইব মিলনগীতি সাধ মিটাইয়া । ***

দ্বিতীয় অঙ্ক।
১৩
১ম সহচরী। ওই হের, আসিছেন জনকনন্দিনী
উৰ্মিলা ভগিনীসহ মৃদুমন্দগতি।
{ সীতা ও উর্মিলার প্রবেশ।]
সীতা।
সীতা।
এসাে সবে বসি এই লতাকুঞ্জ পাশে।
( সকলের উপবেশন।
উৰ্মিলা। রাজকাৰ্য্য হয় নাই শেষ, তাই আৰ্য্য
বিলম্বেন আজ আসিতে বিশ্রাম তরে
অন্তঃপুরমাঝে। রাজকাৰ্য ভগিনি গাে,
এত কি কঠিন ?
বড়ই কঠিন কাজ।
ভেবে দেখ মনে কত পিতৃ-মাতৃহীন,
কত অভাগিনী পতিহীন, কত বৃদ্ধ,
জরাগ্রস্ত কত আছে মহারাজ্যে র ;
পূরাবেন অভাব সবার সমভাবে,
সযতনে মুছাবেন অশ্রু কাতরের,
তবেই ত রাজনামযােগ্য রাজা তিনি,
নহে শুধু রাজনামধারী ক্ষুদ্র নর।
ঊর্মিলা। ( সহাস্যে) পতিহীনা রমণী সবার তিনি যদি
হন পতি, তবে দিদি, বিপদ তােমার,
সপত্নীর সংখ্যা করা ভার।
সীতা। ( সহাস্যে )
রাম-ঘরণীর
নাইলাে সপত্নী-ভয় ; আর তাই যদি
বিধাতা লিখিয়া থাকে কপালে আমার,

১৪
সীতা-নির্বাসন।
তাই যদি ইচ্ছা হয় তার, কহিতেছি
অকপট বাণী সুবদনি, হাসিমুখে
কিঙ্করীর মত, সেবিব সপত্নীপদ
তুষিতে তাহারে।
১ম সহচরী।
সীতা।
ধন্যা নারীকুলে তুমি,
পতিকুল পিতৃকুল ধন্য তােমা হতে,
পবিত্রা বসুধা সতী তােমার জনমে ।
বল এবে বল দেবি,-বড় ভালবাসি
শুনিতে তােমার মুখে, মধুরভাষিণি,-
বনবাস বিবরণ ; কেমনে যাপিতে
নিশিদিন, সেই ঘাের অরণ্যের মাঝে,
পরিপূর্ণ নিশাচরগণে ?
সত্য বটে,
ভীষণ দণ্ডকবন পূর্ণ নিশাচরে,
পূর্ণ হিংস্ৰজন্তুগণে ; কিন্তু সে সকলে
মাহি ছিল ভয় মাের তিলেকের তরে।
মহাবীর পতি যার, মহাধনুর্ধর
দেবর রক্ষক যার, কি ভয় তাহার
সামান্য রাক্ষস হ’তে ? হিংস্ৰজন্তু ছার।
পঞ্চবটী বনমাঝে গােদাবরীতীরে
ছিল ক্ষুদ্র কুটির মােদের, সযতলে
রােপণ করিয়াছিনু চারিদিকে তার
কত তরু কত লতা নয়নরঞ্জন,
;
-

দ্বিতীয় অঙ্ক।
১৫
নাহি জানি নাম সব,-বিতরি সুবাস
কত যে ফুটিত ফুল,--
উর্মিলা।
কি হত সে ফুলে ?
সীতা। অবচয়ি পুঞ্জে পুঞ্জে ফুল নানাজাতি,
অঞ্জলি পূরিয়া অর্ঘ্য দিয়া, পূজিতাম
আমার বাঞ্ছিত সেই চরণ-যুগল ;
কভু বা গাঁথিয়া মালা ফুল্লফুলদলে
তুলিয়া দিতাম সখি, গলায় তাহার ।
কুতুহলে ক্রীড়াছলে কভু ফুলবাণে
লক্ষ্য করিতাম র বিশাল উরস,
হাসি কহিতেন প্রভু জুড়ি দুই কর,
‘কেন বরাননি, কোন রাজ্যলােভে কহ
‘এ মহাযুদ্ধের আয়ােজন, রাজ্যহীন
‘বনবাসী আমি, মাের সনে ? তবে যদি
‘শুধু বিজয়-কামনা পুরাইতে দেবি,
‘হয়ে থাকে অভিলাষ, বিফল প্রয়াস ;-
‘বহুদিন দাশরথি তােমার নিকটে
‘করিয়াছে বিনাপণে আত্মসমর্পণ,
‘মিথিলায় হরধনু ভেঙ্গেছে যেদিন।
১ম সহচরী। ইন্দ্রাণী হইতে কোন্ নারী করে সাধ,
পায় যদি প্রাণ ভরি সেবিতে সতত
এ হেন পতির পদ ঘাের বনমাঝে।
সী।
আর পায় যদি,
এ হেন দেবর-সেবা অতুল জগতে।

১৬
সীতা-নিৰ্বাসন।
সহচরি, কুমারী যদ্যপি কোন দিন
কেহ, বর আসি যাচে মাের কাছে, এই
আশীৰ্বাদ করি তায় কায়মনে আমি,
করে যেন আৰ্যপুত্রসম পতিলাভ,
দেবর পায় গাে যেন লক্ষ্মণের মত।
উৰ্মিলা। কিসের প্রশংসা তুমি কর দেবরের
এত করি, আমি কিছু না পাই ভাবিয়া।
কর্তব্য তাহার করিয়াছে, তার তরে
কিসের ব্যাখ্যান তার এত ?
সীতা। ( সহাস্যে : তবে তেয়াগিয়া বােন্ দেবরের কথা
পঞ্চবটী-বিবরণ শুনাই তােমায়।
উৰ্মিলা।
কে করিল মানা ? যাহা ইচ্ছা বল তাহা,
কহিব না কথা।
সীতা।
শুন তবে সুবদনি,
সহসা পড়িল মনে যে কথা আমার
আজ তােমার কথায় ;-গভীরা যামিনী,
চন্দ্রমা হাসিতেছিল সুনীল গগনে,
থাকি থাকি পাপিয়ার সুমধুর ধ্বনি
কাপাইয়া বনস্থলী দিগ্‌দিগন্তর,
বরষি সুধার ধারা শ্রবণ-যুগলে
মিশিয়া যাইতেছিল সুদূর অম্বরে।
সহসা ভাঙ্গিল ঘুম, মনে হােলো দেখি
কি করে লক্ষ্মণ শূর উর্মিলা-বিরহী ;
মনে হােললা, এ মধুর রজনীতে বুঝি,

• প্রথম অঙ্ক।
১৭
ঘুমধােরে স্বপ্নাবেশে দেবর আমার
উৰ্মিলা উৰ্মিলা বলি ডাকিছে তােমায়।
উর্মিলা। ঊর্মিলার ভাবনায় ছিল না নয়নে
নিদ্রা তার ;
সীতা।
শয্যা ত্যজি, অতি ধীরে ধীরে,
আইনু কুটীরদ্বারে, হেরিনু বিস্ময়ে,
কষিত-কাঞ্চন-কায় কাৰ্ত্তিকেয়রূপী
দেবর দাঁড়ায়ে মম,-স্কন্ধে শরাসন,
করে নিষ্কোষিত অসি, ফলক তাহার
চমকিছে সুবিমল চঁাদের কিরণে ;-
কোথা নিদ্রা ? কোথা স্বপ্ন ?—কি যে ভাব মনে
হইল আমার সখি না পারি কহিতে,
ঝরিল নয়নে অশ্রু,
২য় সহচরী ।
।
একি মহাদেবি,
একি গাে লক্ষ্মণ-প্রিয়া উৰ্মিলা-সুন্দরি,
কেন হােলা আঁখি ছলছল উভয়ের,
কহিতে শুনিতে এ কাহিনী ?
সী। আনন্দাশ্রু সহচরি, সম্বরিতে নারি
সে সব দিনের কথা স্মরিয়া এখন ?
বুঝিলে কি প্রাণসমা ভগিনি আমার,
কিসের ব্যাখ্যান এত করি দেবরের ?
প্রভাত-অরুণ-ছটা পূরব-গগনে
প্রকাশিলে, করি স্নান গােদাবরী-নীরে,
একাকী পশিত বনে ফল আহরণে ;

১৮
সীতা-নির্বাসন।
নাহি শ্রান্তি নাহি ক্লান্তি সেবিতে ভ্ৰাতায়,
ভ্রাতৃবধূ পরিচর্যা করিতে সতত।
১ম সহচরী। আর দেবি কি করিতে তুমি ততক্ষণ?
সী। হাত ধরাধরি করি প্রাণনাথ সনে
ভ্ৰমিতাম কুতুহলে কাননে কাননে,
কত কথা কিছু ছাই অর্থ নাই যার,
কহিতাম তাঁর কাছে; শুনিতাম তার
কত কথা, মনে নাই বুঝি নাই যাহা।
কভু অন্যমনা হেরি রাঘবে বীরে,
যাইতাম লুকাইয়া বনের আড়ালে,
সহসা আমায় তিনি না হেরি নিকটে
চাহিতেন চারিভিতে দুৰ্মনায়মান,
যেন ফণী মণিহারা,
সীতা। ( সহাস্যে )
তা হতে অধিক ;
দেখিয়া তাহার দশা অন্তরাল হতে,
হাসি করতালি দিয়া আসিতাম ছুটি
কাছে তঁার ; হাসিরাশি ফুটিত অধরে,
সৌদামিনী যেন সখি, খেলিত জলদে।
কভু গােদাবরী-তীরে বসিয়া দুজনে,
বিচিত্র লহরীলীলা হেরিম সুখে ;
প্লাবিয়া উভয় কূল ব্যাকুল আবেগে,
উছলি উছলি যবে বরষায় সখি,
ছুটিত তটিনী রঙ্গে সাগর-সঙ্গমে,

প্রথম অঙ্ক।
১৯
হইতাম আত্মহারা বিবশা বিলা,
স্কন্ধে তাঁর রাখি মাথা, নিরখি সে শােভা
উৰ্মিলা। শুনিয়াছি মহাবনে গােদাবরী-তীরে
মদমত্ত করী সদা ফেরে দলে দলে।
দিত কভু
সীতা। পুষিয়াছিলাম এক করিণী-শাবক ;
ছুটোছুটি শিশু-করী মনের উল্লাসে
বেড়াইত মাের সাথে কাননে কাননে।
তুলিয়া মৃণালসহ কমলের দল,
উপহার কুটীরে আমার ;
সাজিতাম কমল-মালায় মনসাধে।
তা দেখিয়া কহিতেন হাসি রঘুমণি,
‘সাজিয়াছ ভাল রঘুকুল-কমলিনি ।
‘কমল মালায়, কিন্তু হের লজ্জা পায়,
‘সবােবর-সােহাগিনী শ্ৰীঅঙ্গে তােমার।
১ম সহচরী। কি কাজ ভূষণে তার এত রূপ যার !
সীতা। তার পর একদিন ভ্রমিতে কাননে,
দুর্জয় কেশরী এক গর্জি ঘােরনাদে
আক্রমিল করভকে ; আতঙ্কে কপিল
প্রাণ মাের, মুদি আঁখি উঠি কাঁদিয়া।
সহসা পশিল কানে কোদণ্ড টংকার,
শুনিলাম ‘নাহি ভয়’ কহিছে রাঘব।
হেরিলাম আঁখি মেলি ; সম্মুখে আমার
নব-জলধর-কান্তি গম্ভীর সুন্দর

t
সীতা-নিৰ্বাসন।
ধনু-করে রাঘবেন্দ্ৰ ; করী-শিশু মাের,
জানাইছে কৃতজ্ঞতা শুণ্ড বুলাইয়া
অঙ্গে তাঁর ; মাের পানে চাহিয়া চাহিয়া,
পশুরাজ পলাইয়া গেছে দূরবনে।
নবজলধর যবে ঢাকিত গগন,
কাপাইয়া বনস্থলী গর্জিত গম্ভীর
শৈলে শৈলে শৃঙ্গে শৃঙ্গে হােতাে প্রতিধ্বনি,
মাতি সেই রবে সখি দুয়ারে আমার
ময়ূরী-ময়ুর কত পেখম তুলিয়া,
নাচিত হরষভরে কেকা-রব করি।
এইরূপে মনসুখে দিবসরজনী
মাস ষড়ঋতু বর্ষ দেখিতে দেখিতে
কালের অনন্ত গর্ভে হইত বিলীন।
কিন্তু,
পড়িত যখন মনে শৈশব-সঙ্গিনী
তােমা সবে, হােতাে মনে মিথিলা কোশল,
জনকের ভালবাসা, শ্বশুর-আদর,
ছুটিত নয়নে জল অবাধ গতিতে,
ছােটে যথা নিঝরিণী বরষা-আগমে
অতিক্রমি বেগভরে গিরিবর বাধা।
-
২, সহচরী। মানবের সমাগম ছিল না কি সেথা
একেবারে ?
পথহারা পথিক কখনাে

প্রথম অঙ্ক।
হােতো উপস্থিত ; সমাদরে পরিচর্যা
করিতাম সবে, সুখসেব্য ফল-মূলে
সুশীতল জলে ; করিলে বিশ্রাম লাভ,
দেবর লক্ষ্মণ পথ দেখাইয়া সবে
দিতেন বিদায়। তাপস তাপসী কভু
আসিতেন পঞ্চবটী-বন দরশনে ;
হােতাে দেখা তাহাদের সনে, শুনিতাম
কত কথা, কিন্তু মিথিলা-কোশলবার্তা
কেহ নাহি পারিত কহিতে-সুধাইলে,
দীর্ঘশ্বাস পড়িত নীরবে অশ্রুসহ।
বহুদিন গেলে এই ভাবে,-একদিন,
কি যে সে কুদিন সখি সীতার জীবনে,-
কুটীরদুয়ারে আসি দিল দরশন,
মােহিনীর বেশে এক অপূৰ্বরমণী
রূপে তার ঝলসে নয়ন, দরশনে
ভয় হােলাে মনে ;-
উৰ্মিলা।
বুঝি সেই শূর্পণখা ?
সীতা।
সেই কলঙ্কিনী
কালভুজঙ্গিনী শূর্পণখা, জানকীর
সুপ্রসন্ন অদৃষ্ট-আকাশে, ধূমকেতু-
রূপে.আসি হইল উদয়। অকস্মাৎ
নাচিল দক্ষিণ চক্ষু, কাপিল হৃদয়
মহাভয়ে, আশুগতি পশিং কুটীরে।

সীতা-নিৰ্বাসন।।
সীতা।
দ্বারদেশে আৰ্যপুত্র ছিলেন বসিয়া,
কিছু দূরে অসিকরে দেবর লক্ষ্মণ ।
উর্মিলা। কি হইল তারপর ?
হাসি হাসি সে রূপসী
আসি কাছে তাঁর, নিরখি নিরখি
মুখ পানে ক্ষণকাল, কহিল সুস্বরে,
কে তুমি কাননবাসী দেবাকৃতি নর?
‘কেন বল বর বপু বকলে আবৃত,
‘রাজআভরণ-রাজবেশ, উপযুক্ত
‘যে অঙ্গের প্রসাধন তরে-বল শুনি
‘বনবাসী কোন দুখে ? এসাে মাের সাথে
‘নিত্য নব সুখভােগ করাব তােমায়,
‘কায়মনে তুষিব, সেবিব তােমা ধনে।
‘এসাে উপযাচিকায় কোরাে না বঞ্চিতা,
‘পূরাও বাসনা মাের পুরুষ-রতন।
১ম সহচরী। কি ভাবিলে কি করিলে তুমি পতিপ্রিয়া ?
কি কহিল জিতেন্দ্রিয় রাঘবেন্দ্ৰ বীর
রাক্ষসীর শুনি অভিলাষ ?
রােষে ভয়ে
কেমন যে হােললা মাের মন, সহচরি,
নাহি পারি কহিতে এখন। চাহিলাম
কাতর-নয়নে মুখপানে, দেখিলাম,
সবিস্ময়ে, হসিত-বদন রঘুবীর।
সকৌতুকে সম্ভাষিয়া ছদ্মবেশিনীরে
সীতা।

প্রথম অঙ্ক।
কহিলেন ধীরে ধীরে, শুন লাে সুন্দরি,
ওই হের পত্নী মম, অভিলাষ তব,
পূর্ণ হয় আমা হতে এ নহে সম্ভব ।
সপত্নীর জ্বালা ধনি সহিবে কেমনে ?
১ম সহচরী। কি কহিল কি করিল রাক্ষসী তখন ?
সীতা। হেরি মােরে নিশাচরী কি যেন ভাবিল
মনে মনে, চারিদিকে চাহিয়া চাহিয়া
দেখিল লক্ষ্মণ শূরে ; অপাঙ্গে তাহার
জ্বলিল বানানল, উন্মত্তার প্রায়
ছুটি গেল পাশে তার কহিল কাতরে ;-
‘আহা মরি কেগাে তুমি এ বিজন বনে ?
‘দেখিয়াছি নন্দন-কাননে রতিপতি,
‘দেখিয়াছি সুরপুরে পাৰ্ব্বতী-নন্দনে,
‘দেখিয়াছি কত রূপ ত্রিলােক ভ্ৰমিয়া,
‘কিন্তু, দেখি নাই হেন কমনীয় কান্তি
‘কভু এ জীবনে।
কেন কেন গাে নীরব .
‘গুণমণি, কেন নাহি চাহ মাের পানে ?
‘কটাক্ষে সম্মতি তব জানাও দাসীরে,
‘এ হৃদয়-সিংহাসনে বসাই তােমায়
‘রাজা করি। কামাচারী আমি বীরবর,
‘স্বর্গে মর্ত্যে রসাতলে যথা ইচ্ছা তব,
‘বিহরিব মনসাধে লইয়া তােমায়,
“রহিব সতত তব আজ্ঞাবহ দাসী।

২৪
সীতা-নির্বাসন।
১ম সহচরী। কি করিল, কি কহিল, ঊর্মিলাবিলাসী,
শুনি রাক্ষসীর মুখে বাসনা তাহার ?
সীতা। কহিল দেবর তারে রুক্ষ্ম তীব্ৰস্বরে,
‘নাহি জানি কে যে তুমি নিলাজ রমণী,
‘কেমনে আনিলে মুখে এ কুৎসিত কথা ?
‘দূর হও হেথা হ’তে, নতুবা এখনি
‘পাবে শাস্তি সমুচিত লক্ষণের হাতে।
ভগ্ন-মনােরথ সখি রাক্ষসী তখন,
ধাইল কুটীরপানে লক্ষ্য করি মােরে ;
চক্ষুর নিমিষে বীর নিষ্কোষিয়া অসি,
নাসাকর্ণ রাক্ষসীর ফেলিল ছেদিয়া;
ছুটিল শােণিতধারা, তিতিল মেদিনী।
বিকট চীৎকারি নিশাচরী, নিজ মূৰ্ত্তি
ধরিল তখন ; ভয়ে শিহরিয়া আমি
পশিলাম মুদি আঁখি আৰ্যপুত্র-ক্রোড়ে ।
শুনিলাম গর্জিছে রাক্ষসী, ‘পাবি শীঘ্র
প্রতিফল এ অপমানের, ক্ষুদ্র নর,
রাবণ-ভগিনী আমি নিকষা-নন্দিনী,
করিলি আমায় বিরূপাঙ্গ, করিলি রে
ব্যর্থ-মনােরথ, পাবি শাস্তি যথােচিত
ইহার লাগিয়া। পরিপূর্ণ পঞ্চবটী
হইল সে রবে ; মূর্হিতা হই আমি
আৰ্যপুত্র-ক্রোড়ে।
১ম সহচরী।
তার পর ?

প্রথম অঙ্ক
সীতা।
তার পর শুনেছ সকলি,
ঘটিয়াছে যাহা সখি, সীতার ললাটে।
( নেপথ্যে রাজসভাভঙ্গসূচক তুৰ্য্যধ্বনি।)
ভঙ্গ রাজ-সভা ওই চল অন্তঃপুরে।
উর্মিলা।
( সকলের প্রস্থান।

প্রথম অঙ্ক।
তৃতীয় দৃশ্য।
অযােধ্যার রাজপথ।
( বিপ্ৰবন্ধু এবং রত্নদাসের ভিন্ন ভিন্ন দিক্‌
হইতে প্রবেশ।
;
রত্ন। প্রণাম ঠাকুর-দা, এতদিন ছিলেন ' কোথা ? এই এত বড়
ধূমধাম হয়ে গেল, কত মিষ্টান্নের গড়াগড়ি, কত পুষ্পসবের
ছড়াছড়ি, কত দানধ্যান তার সীমা সংখ্যা নাই। এমন
রাজ্যাভিষেক কখনাে হয় নাই, হবেও না। তা, এমন সময়ে কি
বিদেশে থাকতে হয় ?
বি। কি জান ভায়া, সবই অদৃষ্ট; পেছনে শনি লেগেই আছে,
সদাই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্চে। বাড়ীতে যে দশদিন ঠিক
হয়ে থাকবে, তা ঘটে কই।
তবে এখন যাওয়া হচ্ছে কোথা ?
বি। এই,-একবার রাজসভায় যাবাে মনে করেই বেরিয়েছিলুম,
তা বড় দেরী হয়ে গেল, আজ আর হােললা না।
রত্ন। কেন? রাজসভায় কোনাে অভিযােগ আছে না কি ?
বি। এ-এই—ব্রাহ্মণী
রত্ন। এ-ব্রাহ্মণীর বিরুদ্ধে রাজদ্বারে অভিযােগ! কথাটা ত বড়
ভাল বােধ হচ্ছে না।

প্রথম অঙ্ক।
২৭
বি। আরে না হে না।—তার নামে অভিযােগ হ’তে যাবে কেন ?
কথাটা হচ্চে এই, ব্রাহ্মণী বল্লেন, কোথায় দিনরাত বাঁদরের
মত ছুটোছুটি করে বেড়াও, বুড়াে হতে চল্লে, সময় অসময়
কাণ্ডাকাণ্ড জ্ঞান তােমার কিছুমাত্র হােলল না। ।
এই
তর্কালঙ্কার, বিদ্যালঙ্কার, ন্যায়ালঙ্কার প্রভৃতি সবাই মহারাজের
অভিষেক উপলক্ষে কত বিদায় পেলে ; রূপাের ঘড়া, সােণার
থালা পট্টবস্ত্রাদিতে সকলের গৃহ পরিপূর্ণ, আর তুমি একটা
দেশ-বিখ্যাত দিগ্‌গজ পণ্ডিত, তুমি কি না,-বলেই অমনি
নাকি-সুরে কেঁদে কেঁদে বল্লেন ‘তােমার হাতে পড়ে আমার
এক দিনের তরেও • সুখ হােলা না ইত্যাদি ইত্যাদি, সে
ভায়া আর ব’লবাে কত। ব্রাহ্মণীর চোখে জল দেখে, পৃথিবীটা
আমার চোখে অন্ধকার হয়ে এলাে।
রত্ন। আহা হা, সে ত হবেই, সে ত হবেই। তার পর ?
বি। তার পর, ব্রাহ্মণী আমার প্রখরবুদ্ধিশালিনী কি না,
বল্লেন, “যা হবার হয়েছে, এখন এক কাজ কর, একটী শ্লোক
রচনা করে, একবার রাজসভায় গিয়ে মহারাজকে আশীর্বাদ
কর, অবশ্যই মনস্কামনা সিদ্ধ হবে। তাই ভায়া,-একটী
শ্লোক রচনা করে রাজসভার দিকে যাবার মতলব এটেছি,
বামুনে কপাল, দেখি কি হয়
রত্ন। তা ব্রাহ্মণীর কথাটা শ্লোকে উল্লেখ করা হয়েছে কি ?
হা, হা, হা, ভায়া,-সকল অস্ত্র একবারে ছাড়তে নেই।
সেটা পরে হবে। এখন, এই শােনাে দেখি, শ্লোকটা কেমন
হয়েছে। ও—একটু বিবেচনা করে দেখ দেখি ।
যে আজ্ঞা, আবৃত্তি করুন।
বি।

২৮
সীতা-নিৰ্বাসন।
\/\n\ ।
বিপ্ন।
দ্বিজোত্তমােৎস্মি ঋণদায়গ্রস্তঃ
সমাগতস্তেন ভবৎ-সকাশং
গৃহাণাশীষং শুভমস্তু সৰ্ব্বং
প্রসীদ রাজন্ কপিরাজবন্ধো।
কেমন হয়েছে বল দেখি ?
রত্ন। আহা হা, অতি চমৎকার, অতি চমৎকার। যেমন ভাবের
গভীরতা, তেমনি অনুস্বরের ঘটা, আর ততধিক পদলালিত্য।
বিশেষতঃ এই সম্বােধনপদটী অতি সদৃবিবেচনার সহিত
প্রয়ােগ করা হয়েছে ;-“কপিরাজ বন্ধো”,আপনার মত
পণ্ডিতেরই উপযুক্ত সােধনপদ।
বি। হাঃ হাঃ, হাঃ-বল্লে কি হয় ভায়া, অনেক ব্যাকরণ অলঙ্কার
শাস্ত্রাদি মন্থন করে, শব্দগুলি বিন্যাস করা হয়েছে ;-তা
মহারাজ বিশেষ তৃপ্তিলাভ ক’বুবেন বােধ হয় ? •
আঃ—সে বিষয়ে অণুমাত্র সন্দেহ নাই।
বিপ্র। এখন রাজসভায় উপযুক্ত রসগ্রাহী ভাবগ্ৰাহী পণ্ডিত উপস্থিত
থাকলে হয়।-তা যাক ভায়া, বলি আজকালকার কোন
নূতন সংবাদ কিছু রাখ কি ?
আজ্ঞে না, নূতন সংবাদের ধার বড় একটা পারি না।
বােব হচ্ছে, আপনার যেন কিছু সংগ্রহ আছে।
বি। হা,–না,তা, এমন কিছু নয়, চারিদিকে চাহিয়া -
তা যা’, যেতে দাও।
( স্বগত) ঠাকুর ত এসেছে একটা কিছু বলতেই,তা
আবার প্রমুর ক’চ্ছে কত ? ( প্রকাশ্যে )আরে বলুন না,
t

প্রথম অঙ্ক। ২৯ বলুন না, বলতে গিয়ে আবার চেপে যাচ্ছেন কেন? আমি ত আর অন্য কেউ নই। বি। বলি তা—এমন কিছু নয়। তবে কথা কি জান, আমি ত বরাবর প্রায় বিদেশেই থাকি। ব্রাহ্মণীকে সে সময়টা শর পিতৃগৃহেই রেখে দি, সুতরাং সে দিকটাও সে সময়ে পরস্মৈপদেই চলে যায়। বুঝলে ভায়া ? আজ্ঞে, বুঝতে বিলক্ষণ পাচ্ছি। এখন আপনি ভূমিকাটা সংক্ষেপে সেরে আসল কথাটা বলে ফেলুন দেখি। বিপ্র। আহা হা, অতটা অধীর হলে চলবে কেন? এই শােনাে না,- আবার, চারিদিকে দেখিয়া ) কেউ কোনাে দিক থেকে = শুনবে না কি ? কৈ, কে আর আছে এখানে, আপনি নির্ভয়ে ব’লে যান। কথাটা যেন কিছু গুরুতর বলেই বােধ হচ্চে। বি। না,–গুরুতর বিশেষ কিছু নয়। তবে কি না,যা শুনলেই বুঝতে পারবে।-এবার বাড়ী এলেই ব্রাহ্মণী আমায় চোখ মুখ রাঙ্গিয়ে বল্লেন আর আমি এ সব পারূবাে না। তুমি চিরকাল বিদেশ ঘুরে বেড়াবে,—আর আমি এ বয়সে বাপের বাড়ী এ একলা থাকবে, সে হবে না। আচ্ছা ঠাকুর-দা, ঠানদিদির বয়সটা কত হবে বলুন দেখি ? বি। ,বয়সটা আর এমন বেশী কি ? এই ধর—এ',-এই- কিছু কম পঞ্চাশ ষাট হতে পারে। ,তবে আর এমন বেশী কি ? বি। আমি ব’লুম, তাতে কি? ব্রাহ্মণী তখন অগ্নিশর্মা হয়ে বল্লেন, ?

সীতা-নিৰ্বাসন।
বিপ্ন।
‘এতে দশ জনে দশ রকম কুৎসা করতে পারে। আমরা ত
আর রাজরাণী নই, যে নামে সব কেটে যাবে।
সে কি রকম, সে কি রকম ?
এ আর শােনন নি ? ( চারিদিকে চাহিয়া ) আমাদের
রাজমহিষীর কথা নিয়ে লােকে যে কত কি কানাকানি
ক’চ্ছে।
সে কি ? আমরা ত কিছু শুনতে পাইনি!
বি। শুনবে ভায়া, ক্রমে শুনবে সব। কানাকানিটা জমে বেড়ে
যাচ্ছে। কত লােক কত কি ব’লছে। কেউ বলছে, এত
দীর্ঘকাল,—আর কারাে ঘরে নয় রাক্ষসের ঘরে,আবার যে
সে রাক্ষস নয়, স্বয়ং রাক্ষসরাজ রাবণের ঘরে,—তা ভায়া
আমি কিছু বিশ্বাস করি নে।
দুম্মুখের প্রবেশ ]
দুষ্মথ। বলি কি গাে ঠাকুর মশাই,
বি। এই যে দুর্থ মহাশয়,
বিপ্র ও রত্ন ( উভয়ে)। আসতে আজ্ঞা হয়, আসতে আজ্ঞা হয়।
দুমুখ। প্রণাম ঠাকুর-মশাই, এখানে কতক্ষণ?
বি। এই সবে আসছি, এ,এই মাত্তর। অনেক দিন পরে ভায়ার
সঙ্গে হঠাৎ দেখা হােলল কি না, তাই দুটো কথা বােলবাে
মনে করে এখানে দাঁড়িয়েছি।
দুম্মুখ। কি কথা বলছিলেন না?
বি। কৈ না,আমরা ত কেউ কোনাে কথা বলি নি।
দুষ্মথ। (স্বগতঃ ) কি ভয়ানক! এই সব অপদার্থ লােকের কথায়

প্রথম অঙ্ক।
বিশ্বাস স্থাপনা করে লােকে কত কি করে বসে।
( প্রকাশ্যে ) তা এখন যাওয়া হচ্ছে কোথা ?
বি। যাই দেখি, আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করিগে
( বিপ্ৰবন্ধু ও রত্নদাসের প্রস্থান।
দুর্থ। কি পরিতাপ ! যার জন্মে বসুন্ধরা পবিত্র, একবার যার নাম
কল্পে সকল পাপ-ক্ষয় হয়, সেই পুণ্যময়ীর চরিত্রে কলঙ্ক
আরােপ করতেও লােকে দ্বিধা করে না। কিন্তু দেথতে
হচ্চে, অপবাদটা কতদূর ছড়িয়ে পড়েছে। ওই, এই দিক
পানে কতকগুলাে লােক আসছে না? একটু আড়ালে
দাড়াই, দেখি এরা আবার কি নিয়ে আছে ? এই কদিন
যেখানে যাচ্ছি, সেইখানেই ত এই কথাই শুনতে পাচ্ছি।
[ দুর্মুখের অন্তরালে প্রস্থান।
[ দুইজন নাগরিক ও একজন স্ত্রীলােকের প্রবেশ ]
১ম পু। সে হবে না, হবে না, হবে না।
স্ত্রী। বাবা তাের পায়ে পড়ি বাবা, আমার দুটো কথা শােন।
আমি তাের শাশুড়ী,-দেখ, মা যা, শাশুড়ীও তাই,
একটু স্থির হয়ে শােন। তারপর যা হয় ক’রি, লক্ষ্মী বাপ
আমার।
১ম পু। কি শুনবাে আর ? শুনে শুনে যে কান ঝালাপালা হয়ে
গেছে। আরও শুনতে বাকী আছে না কি ?
স্ত্রী। আচ্ছা, মেয়েটা এমন কি অপরাধ করেছে যে, তাকে পরি-
ত্যাগ ক’বছো?
১ম পু। অপরাধ বলে অপরাধ? এ যদি অপরাধ না হয়, তবে মেয়ে

সীতা-নিবাসন।
দুটো
ছেলের পক্ষে আর কি অপরাধ হতে পারে ? তােমার
মেয়ে নিয়ে তুমি থাক বাছা, আমার অমন মেয়েয় কাজ নাই।
স্ত্রী। ওমা! এ বলে কি গাে ! নিজের বােনের স্বামী, তার সঙ্গে
টো কথা ক’য়েছে, তাতেই সব অশুদ্ধ হয়ে গেল? আর
তােমরা বাছা যে দিনরাত কত কি কর, তাতে বুঝি আর
কোন দোষ হয় না? না,তােমর পুরুষ সবই ক’র্তে
পার, আর মেয়ে-ছেলের বেলা, একটু কথা কইলেই সব
অশুদ্ধ হয়ে যায় ।
১ম পু। দেখ, আর কথা বাড়িও না ব’লছি, শেষটা অপমান হতে
হবে।
২য় পু। তবে রে বেটা বেল্লিক, যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা।
লঘুগুরু জ্ঞান নেই। দাড়া, এখুনি গিয়ে রাজদ্বারে অভি-
যােগ করছি। দেখি, এর একটা প্রতীকার হয় কি না ?
১ম পু। ওগাে, জানি গাে জানি; তােমাদের এ রাজার কাছে এ
ব্যাপারে বিলক্ষণ প্রতীকার পাবে, তা জানি।
স্ত্রী। ওগাে, তুমি থামাে গাে থামাে। মেয়েটার গতি কি হবে
একটু ভাবব, ওকে আর রাগিও না।
২য় পু। না, কিছুতেই না। রাজদ্বারে যাবে, যাবে, যাবাে।
১ম পু। তা যাও, যাও, যাও। যা পার করগে। উচিত কাজ
কোবােই কোবাে, কিছুতেই ছাড়বে না। তিনি যেন
রাজা, সব পারেন, আমরা অতটা পারিনে। যা হয় হবে।
২য় পু। কি রে পাষণ্ড, রাজা সব পারেন? তুই বেটা বলিস কি ?
১ম পু। বােল্বাে আর কি ?—রাজার দোষেই ত দেশটা অধঃপাতে
যেতে বসেছে। যে স্ত্রীলােকের অঙ্গ পরপুরুষে স্পর্শ করেছে,

প্রথম অঙ্ক রাক্ষস-গৃহে যে দীর্ঘকাল বাস করেছে, তাকে কি না তিনি অমনি নিয়ে বসলেন। আমরা জন্মে মুখ দেখতেম না। ২য় পু। বেটা, রাজমহিষীর যে অগ্নি-পরীক্ষা হয়েছে। ১ম পু। আরে রেখে দাও তােমার অগ্নিপরীক্ষা। আগুনে পুড়লে আবার মানুষ বাঁচে? ও একটা কথার কথা। গিয়ে দেখেছ তুমি ?—বলতে পার ? ২য় পু। কেন? সুগ্রীব অঙ্গদ হনুমান প্রভৃতি কপিরাজগণ সকলেই ত বলেছে। ১ম পু। হাঁ—এইবার ঠিক হয়েছে। যা কোনাে কালে কেউ দেখে নি, শশানে নি, এপ্লন বানরের কথায় তাই বিশ্বাস ক’বুতে হবে। ২য় পু। আরে বেটা, মহারাজ যে নিজেই বলেছেন। ১৭ পু। আরে সেই ত হচ্চে বােগের ঘর। তিনি এখন মহিষীর প্রতি বিশেষ অনুরক্ত,-সুন্দরী কি না,—কিছুতেই ছাড়তে পারেন না। তাই মনগড়া একটা অগ্নিপরীক্ষার কথা রটিয়ে দিয়েছেন। ফল দাঁড়িয়েছে এই,-মেয়েরা এখন যা ইচ্ছা তাই ক’বতে লেগেছে। কিছু বল্লেই বলে বসে, ‘রাজরাণী যদি অতটাই পারেন, আমরা কি আর এতটুকুও পারি না। রঘুবংশে এমনটা ঘটবে, কেষ্ট স্বপ্নেও ভাবে নি। রাজপাপে রাজ্যটা উচ্ছন্ন যাবে আর কি ? স্ত্রী। তা বাবা, মেয়েটার যা ঘাট হয়েছে নিও না, লক্ষ্মী বাপ আমার ; সে ত আর রাজমহিষীর মত কোন গুরুতর অপ- রাধ করেনি, দোহাই তােমার বাবা। ১ম পু। ওগাে, দশবার বলেছি সে হবে না, হবে না, হবে না। $

সীতা-নিৰ্বাসন
।
অন্তরাল হইতে দুর্মুখের আগমন।
দুষ্মথ। (১ম পুরুষের প্রতি) বলি কিহে ? এত গােযােগ কোচ্ছাে
কেন এখানে? ব’লছে কি ?
শ্রী। (স্বগতঃ ) না জনি কি সর্বনাশ করে বসে। কি না জানি
বলে ফেলে!
১ম পু। ব’লছি কি ? এই যা সবাই বলছে, তাই বলছি।
২য় পু। (প্রথম পুরুষের মুখে হাত দিয়া) আরে চুপ চুপ। (দুমুখের
প্রতি) আজ্ঞে, দেখুন দুখ মহাশয়, ছেলেটা আমার
জামাতা, কেমন একটু মতিচ্ছন্ন মত হয়েছে; কি বলে কি
করে, তার ঠিকানা নাই।
ও সব কথা শুনবেন না । চল
বাপু, এখন বাড়ী যাই।
[ প্রথম পুরুষকে বলপূর্বক ধরিয়া লইয়া দ্বিতীয়
পুরুষ ও স্ত্রীর প্রস্থান।
হায় হায়,
মূর্তিমতী পবিত্রতা জনক-নন্দিনী,
তার নামে কলঙ্ক রটনা। কে বুঝিবে
রহস্য ইহার? ক্ষুদ্র আমি,-মূৰ্থ আমি,
বুঝিব এ প্রহেলিকা কি সাধ্য আমার ?
সার্থক দুখ নাম হইল আমার
এতদিনে! হায় হায় কেমনে জানাব
নিদারুণ এ সংবাদ রঘুরাজপকে!
( চিন্তা)

প্রথম অঞ্চ।
৩৫
কি ফল ভাবিয়া ; শুনিয়াছি ঋষিমুখে
মহাজনমুখে, সার-ধৰ্ম্ম মানবের
কৰ্তব্য-পালন। করিব কর্তব্য মাের,
হবে বা হবার।
[ প্রস্থান।

প্রথম অঙ্ক।
চতুর্থ দৃশ্য।
অযযাধ্যার রাজান্তঃপুরস্থ কক্ষ।
[ সীতা ও সহচরী।]
সহচরী। বিমনা তােমায় কেন হেরি রাজেন্দ্রাণি ?
কি যেন ভাবিছ মনে মনে, ক্ষণে ক্ষণে
পড়িছে নিশ্বাস, চাহিতেছ মুখপানে
বারবার, কিন্তু লক্ষ্যশূন্য দৃষ্টি তব
না দেখিছ মােরে। শুনিতে কি পায় দাসী,
কি চিন্তায় আজি তব মলিন শ্রীমুখ ?
শুনিতে কি পায়, পূর্ণশশধর কেন
জলদে আবৃত ?
বুঝি না কেন যে মন
হইল এমন। কঁপিছে হৃদয় মাের
থাকিয়া থাকিয়া, কারণ বিশেষ কিছু
পারি বুঝিতে। বড় ভয় মনে সখি,
কি যেন বিপদ মাের ঘটিবে অচিরে।
সহচরী। কেন দেবি, করিতেছ হৃদয় গােপন ?
বিস্ফারিত নেত্র তব সভয় সজল,
ক্ষণে ক্ষণে চিন্তা-রেখা পড়িছে ললাটে,
বক্ষঃস্থল ঘন ঘন হ’তেছে কম্পিত,
বল মােরে কি হয়েছে বল মহাদেবি ?
সীতা।

প্রথম অঙ্ক
৩৭
সীতা। অস্থির হয়েছে মন দুঃস্বপ্ন দেখিয়া।
সহচরী। কি স্বপ্ন দেখিয়া ব্যাকুল হয়েছ এত
পাই কি শুনিতে ? দূর হয় অমঙ্গল,
শুনিয়াছি প্রকাশিলে স্বপন-কাহিনী।
সীতা। অতি ভয়ঙ্কর স্বপ্ন! শিহরে পরাণ,
সরে বচন মুখে কহিতে সে কথা।
জনহীন যেন এক ভীষণ প্রান্তর
নাহি তথা বৃক্ষলতা, নাহি আছে প্রাণী,
নাহি শব্দ, নাহি আলল, নাহি অন্ধকার,
ভয়াবহ ছায়া এক দিগন্ত ব্যাপিয়া
বিরাজিছে অবিচ্ছেদে, দিগন্তবিস্তৃত
ধূ ধূ করে বালিরাশি, সে প্রান্তরে সখি,
একাকিনী অসহায় পড়ে আছি আমি।
ঘিরি চারিদিক তার অনন্ত জলধি,
পরশিয়া নভস্তল উঠিতেছে তাহে
উৰ্ম্মিমালা। সহসা সজনি, ভাঙ্গা ভাঙ্গা
রক্তবর্ণ জলদের জাল আবরিল
নভােদেশ, রক্তবর্ণ হইল প্রান্তর ।
সহচরী। তার পর ?
বিকট চীৎকার সখি,
উঠিল সহসা মাের চারিদিক হতে;
উঠিল অসংখ্য দেহ,-কেমনে না জানি,
হস্তহীন পদহীন মুণ্ডহীন কেহ
তাধেই ধেই নাচিতে লাগিল সবে
সীতা।

এ
সীতা-নির্বাসন।
ঘিরিয়া আমারে। মহাভয়ে সহচরি,
আবরিনু কযুগে নয়নযুগল।
শুনিনু তখন, কহিতেছে একজন,
‘এই সেই, এই সেই, ইহারি কারণে
‘অসময়ে ছাড়িয়াছি সুখের সংসার,
‘বুকে করি কত আশা অতৃপ্ত-বাসনা ;
‘দারা পুত্র প্রেমের পুতলী নিঃসহায়
‘কত দুঃখে যাপিতেছে দিন। অন্য জন
কহিছে গরজি, ‘সর্বনাশি, সর্বনাশি,
তুই নারীকুলে, তাের তরে ভঁঙ্গোকুল
নিৰ্ম্মল সমূলে ;-কত পত্নী পতিহারা,
পুত্রহারা মাতা, বিলাপিছে দিবানিশি
বক্ষে হানি কর'। মেলি নয়ন সখি,
হেরিনু সভয়ে, ছুটিছে আমার পানে
রক্ষোরাণী মন্দোদরী, রুক্ষ্ম আলুথালু
কেশরাশি উড়িছে অম্বরে, ভীমা মূৰ্ত্তি,
ঘুরায়ে আরক্ত নেত্র, দন্ত কড়মড়ি।
দেখিনু ছুটিছে তারা উন্মাদিনীবেশে
জ্ঞানহারা, উগ্রচণ্ডা যেন রণভূমে
করিতে অনুরনাশ।
কহিল দুজনে
মােরে চাহি, ভেবেছিস মনে সৰ্ব্বনাশি,
‘সুখে তাের যাবে দিন? ঘটিবে না কভু
‘বিচ্ছেদ স্বামীর সনে ? শােন্ শােন তবে,
‘ভুঞ্জিবি বৈধব্য-জ্বালা স্বামী বর্তমানে

।
প্রথম অস্ক।
‘চিরদিন, ঝরিৰে নয়নে অশ্রুধারা
‘অবিরল তিতিয়া মেদিনী, না ঘটিবে
‘পতিসেবা অদৃষ্টে লাে তাের, না পাইবি
‘পতির সােহাগ, পতিহারা রমণীর
‘শােন অভিশাপ। শিহরিল অঙ্গ মাের,
কপিল পরাণ, উঠি কাঁদিয়া সখি,
নিদ্রা গেল দুরে।
সহচরী।
স্বপ্ন কিছু নয় দেবি।
পূৰ্ব্ব-কথা আজ করিয়াছ আলােচনা,
তাই এ দুঃস্বপ্ন দেবি, করেছ দর্শন।
সীতা। হবে তাহা; কিন্তু তবু বড় ভয় মনে,
যেন কি অমূল্য-নিধি হারাই হারাই।
সহচরী। কুমার তােমার গর্ভে রঘুবংশধর,
এ সময় নহে ভাল দুশ্চিন্তা তােমার।
দেখিলে এ ভাব তব, রঘুকুলমণি
ব্যাকুল হবেন অতি জান ত সকলি।
সীতা। কি করি—কি করি সখি, আসিছেন তিনি,
কেমনে করিব তাঁর চিত্তবিনােদন ?
সহচরী।
কেন অকারণ চিন্তা পুষিছ হৃদয়ে ?
সব চিন্তা হবে দূর ভাব তাঁর কথা।
সীতা। সেই ভাল সেই ভাল সখি, ভাবি তারে ;
হরিবেন চিন্তা মাের চিন্তামণি মম।
সহচরী। ভাব তারে, বিম্বাধরে ফুটিবে এখনি

৪০
সীতা-নিৰ্বাসন।
হাসিরাশি। বল দেবি, কেমনে করিব
চিন্তা-নিপীড়িত মন প্রফুল্ল তােমার ?
সীতা। গাও.সখি,—সুকণ্ঠ তােমার সুললিত,
গাও শুনি, দূরে যা মনের আঁধার ।
সহচরী। কি গাহিব ?
সীতা।
যাহা ইচ্ছা, ভাল হয় যাহা।
সহচরী।
(গীত।)
( তুমি ) কোথা এ আঁধারে ।
বড় আঁধার এ আঁধার এ।
দিশেহারা আমি সংসার-পাথারে,
তুমি না তারিলে সখা বল কে তারে।
কূল নাহি হেরি ভব-পারাবারে,
তুমি মম ধ্রুবতারা লও হে পারে।
সীতা।
কি সুন্দর কি সুন্দর সখি, বুঝিয়াছ
কি বেদনা হৃদয়ে আমার, তাই তুমি
জুড়ালে পরাণ এ সঙ্গীতে।
[ রামচন্দ্রের প্রবেশ ও উভয়ের উত্থান ]
রাম। বােসাে দেবি, বােসস সহচরি ;-গতপ্রায়
রজনীর দ্বিতীয় প্রহর,—নিদ্রার সময়,
এখনাে মহিষি, বল কেন জাগরিত ?
সীতা। নাথ, পােড়া আঁখি দুটী না চাহে মুদিতে,
না হেরি দিনান্তে ওই চরণযুগল
একবার, তাই সখি সহ বসে আছি
তব প্রতীক্ষায়।
4

প্রথম মঞ্চ।
৪১
রাম।
যাও সখি, বিশ্রামের তরে
(সখীর প্রস্থান এবং রামচন্দ্র ও সীতার উপবেশন।)
সীতা। নাথ, জাগরণে ক্লেশ কি আমার ?
অশােককাননে চেড়ী-দল-পরিবৃত
ছিলাম যখন, সুদীর্ঘ যামিনী কত
যাপিয়াছি আমি অনিদ্রায়, মনে হলে,
ভেসে যায় বুক আঁখি জলে।
রাম।
কেন দেবি,
স্মরিয়া সে কথা আর ব্যথা পাও মনে ?
বিধিলিপি, ঘটিয়াছে ছিল যা কপালে।
কেন আর সে সকল মনে কর এবে ?
সীতা। নাথ,
রাম। একি ? একি আজ মহাদেবি ? কেন
সঙ্কুচিত এত কহিতে মনের কথা ?
সীতা। উর্মিলা ভগিনী সহ গিয়াছিনু মােরা
প্রমােদকাননমাঝে ভ্রমিবার তরে।
কথায় কথায় পঞ্চবটী-বন-কথা
উঠিল সেখানে ; কহিলাম তার কাছে
কেমনে দেবর করিত মােদের সেবা,
আরাে কত কথা। বুঝিলাম মনে মনে,
ভগিনীর যেন বড় সাধ স্বামীসহ
কাননভ্রমণ। তাই ইচ্ছা,
রাম। কি ইচ্ছা বল না দেবি, অবশ্য পূরাব।

৪২
সীতা-নিৰ্বালন।
সীতা। বড় সাধ হয় না কানন-ভ্রমণে,
নিম্মুক্ত গগনতলে ঋষি-তপােবনে,
দেবর লক্ষ্মণ আর উর্মিলার সহ।
দেখাইব ভগিনীরে ঋষিপত্নীগণ
কেমন সরলপ্রাণ কোমলপ্রকৃতি,
পুণ্যময় পবিত্ৰাত্মা ঋষিগণ কিবা।
গলাগলি করি তথা ভগিনীর সনে,
বড় সাধ বেড়াইতে, দেখাইতে রে
লগ্ন প্রকৃতির শােভা কত যে সুন্দর।
রাম। এ সামান্য অভিলাষ জানাতে আমায়
এতই আশঙ্কা তব ? তব তৃপ্তিতরে
কি না পারে করিবারে অযযাধ্যার পতি ?
সীতা। তুমিও যাইবে সাথে, নতুবা আমার
মনােরথ পূর্ণ নাহি হইবে সকল।
রাম। এও কি বলিতে হয় ? পাগলিনী তুমি,
দেহ ছায়া কভু কি গাে থাকে দুরে দুরে ?
সীতা। বড়ই আনন্দ মনে হইবে আমার,
কোলাহলময় এই রাজধানী ছাড়ি,
ভ্ৰমিব যখন দূরে
নির্জন-কাননে,
নাহি যথা হিংসা দ্বেষ নিন্দা কপটতা।
দেবৰ লক্ষ্মণ আহরিবে ফল নাথ,
আমাদের তরে, লইয়া সে ফল আমি,
দিব তুলি সমাদরে ভগিনীর মুখে ;
বনফুলে সাজাব তাহায়।

প্রথম অঙ্ক
সীতা।
রান। বল শুনি, কোন্ বনে যেতে অভিলাষ?
সীতা। আমি কি বলিব তাহা যথা ইচ্ছা তব।
রাম। শুনেছি জাহ্নবী-তীরে, নহে বহুদুর,
মহাঋষি বাল্মীকির আছে তপােবন;
চল তথা বাই, করি ঋষি-দরশন।
দেখে আসি কেমনে এখন ঋষিগণ
যাপিছন দিন, রক্ষোভয় হ’তে সতি,
হইয়া উদ্ধার।
ভাগিরথী? পবিত্ৰাতটিনী,
তব পূর্বপুরুষের কীৰ্ত্তি মহীতলে।
জুড়াইব মনপ্রাণ, চক্ষু জুড়াইব
দরশন করি রে, পবিত্র করিব
অঙ্গ পরশি সলিল। মনে পড়ে নাথ,
যবে বনবাসে যেতে নৌকা আবােহণে
হইনু জাহ্নবী পার, মিতিনীর সহ
আইল গুহকমিতা সম্ভাষিতে সবে ;-
এমন সরলপ্রাণ, এত ভালবাসা
দেখি নাই পাই নাই কভু এ জীবনে।
কত দুর সেথা হ’তে মিতার সে দেশ
আমরা থাকিব যথা? মিতিনীর সহ
হবে কি গাে দেখা পুনঃ সেই তপােবনে?
রাম। আছে গাে পুষ্পকথ, চির-সহচর
আছে গাে লক্ষ্মণ ভাই, কি চিন্তা তােমার ?

৪৪
সীতা-নির্বাসন
সীতা।
দেখাইব মিতাসহ মিতিনীরে পুনঃ,
ইচ্ছা যদি হয় তব।
ইচ্ছা হয় মনে,
উপহার দিতে ঋষি, ঋষি-পত্নীগণে,
সাজাইতে বালকবালিকা তাঁহাদের।
রাম। কুবের-ভাণ্ডার উন্মুক্ত তােমার তরে।
যত ইচ্ছা যাহা ইচ্ছা লও সঙ্গে করি,
অকাতরে বিলাও সবায়। কিন্তু দেবি,
কি আছে এমন ধন রামের ভাণ্ডারে,
যা দিয়া তুষিতে পার তপস্বীর মন ?
যে অনিত্য সুখভােগে মত্ত গৃহিগণ,
ঋষিগণ তুচ্ছ করে তাহা। নির্বিকার
চিত্ত তাহাদের ; ভাবেন একাগ্রমনে
দিবসমিনী, নিরাকার নিরঞ্জন
পুরুষপ্রধানে, বাসনা কামনা সেই
এক নিত্যধনে সঁহাদের।
সী। জানি আমি নরনাথ মতি তাঁহাদের।
কিন্তু শােভা নাহি পায় দেব, রিক্তহস্তে
প্রণাম করিতে ঋষিগণে ; আছে রীতি,
যাব কিছু সঙ্গে করি, করিব প্রণাম,
মাগিব আশীষ হাদের।
রাম। কি আশীষ মাগিবে বৈদেহি ?
সীতা। পবিত্র চরণ-ধূলি লয়ে তাহাদের

প্রথম অঙ্ক। ৪৫ মাগিব আশীষ এই, ‘পাই যেন কোলে রঘুবংশ-অলঙ্কার সুন্দর কুমার। রাম। পূর্ণ মনােরথ যেন হয় দেবি তব- কিন্তু যাইবার আগে নিও অনুমতি গুরুজন সকলের, নিও আশীর্বাদ নির্বিঘ্নে আনন্দে শীঘ্র ফিরিবার তরে। [ সহচরীর প্রবেশ।] ০ সহ। ক্ষম মােরে নরদেব, আসি নাই আমি স্বইচ্ছায়।' কহিল কধুকী, রাজপদে দিতে সমাচার, ‘রাজকর্মচারী এক, দরশন রাজেন্দ্রের করিছে প্রার্থনা, আসিয়াছে রাজকার্ষে রাজার আদেশে। রাম। যাও দেবি, যাও এবে শয়ন-মন্দিরে ; এখনি ফিরিয়া আমি আসিব তথায়। [ সীতার প্রস্থান। যাও সখি, বল তারে, অপেক্ষা করিতে মাের মন্ত্রণা-ভবনে। এখনি যাইব, শুনিতে তাহার মুখে সমাচার তার। সহ। যে আজ্ঞা রাজন! [ সহচরীর প্রস্থান রাম। কে জানিত এত সুখ লিখিয়াছিলেন বিধি রামের ললাটে।

৪৬
সীতা-নিৰ্বাসন।
বিরাজিছে সুখ-শান্তি মহারাজ্যে মোের,
নাহি কোন শক-ভয়, অকাল-মরণ ;
ভ্রাতৃগণ আমা বই কিছু নাহি জানে।
কুলগুরু বশিষ্ঠ প্রবীণ ভাবিছেন
রাজ্যের মঙ্গল। প্রজাগণ হৃষ্টমন,
অবাধ বাণিজ্যে ধনরত্নে পরিপূর্ণ
গৃহ সকলের, শস্যপূর্ণ। বসুন্ধরা।
এ সময়ে মহিষীর পূরাতে বাসনা
নাহি হেরি বাধা কিছু। ভরতের করে
অর্পি রাজকাৰ্যভার, যাই পােবন
বৈদেহীর সহ তার পূরাতে বাসনা।
হায়, অবােধিনি, তপােবন দরশনে
হয়েহে বাসনা; সামান্য এ অভিলাষ
জানাতে আমায় কতই কুণ্ঠিতা তুমি
হলে মাের কাছে। কত ক্লেশ সহিয়াছ
আমার লাগিয়া এ জীবনে, রামচন্দ্র
পারে কি ভুলিতে? পিতৃ-সত্য-রক্ষাহেতু,
তেয়াগিয়া রাজ্য যবে চলিলাম বনে,
ছাড়ি গৃহ রাজ্যভােগ জনকনন্দিনী
ছিন্ন করি সকল বন্ধন, তেয়াগিয়া
সকলের মায়া, ছুটিল আমার সাথে
সন্ন্যাসিনীবেশে ঘাের বনে।
সেই মাের প্রেমের প্রতিমা হৃদয়ের।
যবে বনবাসে ব্যাকুল হইত মন
।
সেই তুমি

প্রথম গ।
৪৭
স্বদেশের তরে, চাহি তব সদানন্দ
প্রণয়বিহ্বল মুখ-পানে, ভুলিতাম
সকল যন্ত্রণা।-তপােবন গমনের
আয়ােজন তরে দিব আজ্ঞা নিশ-অস্তে
কুমার লক্ষ্মণে।—যাই এবে শুনে আসি,
এ নিশীথে কি সম্বাদ এনেছে দুর্থ।
[ রামচন্দ্রের প্রান।
.

প্রথম অঙ্ক।
পঞ্চম দৃশ্য।
রাজপুরীর—মন্ত্রণা-ভবন ।
{ দুমুখের প্রবেশ।]
-
দুর্থ। বাঁধিয়াছি পাষাণে পরাণ, করিয়াছি
মনঃ স্থির। কিন্তু হায়! অবশ রসনা ;
ফোটে না বচন মুখে কহিতে সে কথা।
জানি আমি নিষ্কলঙ্ক-চরিত্র বৈদেহী,
জানেন রাজেন্দ্র নিজে, জানেন লক্ষ্মণ ;
কিন্তু হায়! নাহি জানি পুরবাসিগণ
কি কারণে সে কথায় না করে প্রত্যয়।
ধিক্ ধিক্ প্রজাবৃন্দে, না জানিয়া কিছু
নিষ্কলঙ্ক রমণীর কলঙ্ক রটায়।
শত ধিক্ জীবনে আমার, কেন আমি
সইলাম এ কাৰ্যের ভার? ওই ওই,
আসিছেন বুঝি রামভদ্র। কি করিব ?
কেমনে বলিব নিদারুণ এ সংবাদ
তাহার নিকটে ?
[ রামচন্দ্রের প্রবেশ ও দুর্মুখের অভিবাদন।]
রাম। দুম্মুখ, কুশল তব ? কি সংবাদ দিতে,
আসিয়াছ মাের কাছে এ ঘাের নিশীথে ?

প্রথম অঙ্ক।
৪৯
দুমুখ। ক্ষমা কর দাসে ঘুমণি ;-
রাম। কি ভয় তােমার ভদ্র ? বল অকপটে
বলিবার আছে যাহা, জানিয়াছ যাহা।
দুষ্মথ। দাও মােরে বিদায় রাজ, এ কাৰ্য্যের
নাহি প্রয়ােজন দুর্মুখের।
রাম। কেন ভদ্ৰ হ’তেছ কাতর? বুঝিয়াছি,
আছে কিছু অপ্রিয়-সম্বাদ মাের তরে।
কিন্তু তার লাগি বল তােমার কি দোষ?
কহ তুমি নিঃসঙ্কোচে রামের নিকটে,-
সত্যবাদী জ্ঞানি তুমি,-শুনিয়াছ যাহা,
জানিয়াছ যাহা কিছু প্রকাশ্যে গােপনে।
দুর্মুখ। আসিয়াছি বলিবারে, বলিব এখনি ;
কিন্তু নরনাথ, প্রার্থনা দাসের এক
করিবে পূরণ দেব, কর অঙ্গীকার।
রাম। অবশ্য প্রার্থনা তব করিব পূরণ,
ন্যায়-ধৰ্ম্ম-মতে যদি নাহি হয় বাধা।
দুমুখ। আন দেব তীক্ষ্ণধার অসি ; যে কাহিনী
জিহ্বা মাের করিবে প্রকাশ, তার তরে
উপযুক্ত দণ্ড তার সমূলে ছেদন।
রাম। শুনি তব কথা হে ধীমান্, কাঁপিতেছে
পরাণ আমার ; কেন আর রাখিতেছ
বিষম উদ্বেগে ? বল শীঘ্র।
দুর্মুখ। শুন দেব, কর্ণমূলে কহিব সে কথা।
(রামচন্দ্রের কর্ণে কথন)

সীতা-নির্বাসন।
এই শেষ ।
রাম।
দুধ। এই কাহিনীর শেষ, শেষ দুখের।
(রামচন্দ্রের পদপ্রান্তে পতন )
রাম। উঠ ভদ্র, কি দোষ তােমার ?
(দুধের উত্থান)
করিয়াছ কর্তব্য পালন; উপযুক্ত
পুরস্কার পাবে তার তরে, যাও এবে।
দুর্মুথ। নমি পদে নরদেব!
| দুম্মুখের অভিবাদন ও প্রস্থান।
রাম।
হায়, একি শুনি।
দুমুখ-দুখ ; কোথা গেল ? সত্যই কি
পুরবাসিগণ বঁটায় কলঙ্ক হেন
রঘুরাজকুলে ? কি করিব ? কি হইবে ?
পারি বুঝিতে ইহা স্বপন কি মায়া।
ঘুরিতেছে ধরাতল, ঘুরিছে আকাশ,
ছুটিছে উদভ্রান্তগতি নক্ষত্রনিকর,
কক্ষচ্যুত, লক্ষ্যহীন, উন্মাদের প্রায়
শূন্যপথে। একি ? একি ? ঘােররবে যেন
প্রলয়ের মেঘমালা গর্জিছে ভীষণ
মহারােষে ;-কিছুই যে না পারি বুঝিতে।
, না, এই ত রয়েছি আমি, এই এই
মাের মন্ত্রণা-ভবন, অপবাদ-কথা
সত্যই কহিয়া গেল দুধ আমায়।
হায়, হায়, দুঃখিনী জানকী; ততধিক
৫

প্রথম অঙ্ক।
দুঃখী হায়, হতভাগ্য রাম। হায় প্রিয়ে,
ত্রিলােকসম্মুখে করিলা পরীক্ষাদান,
পুরবাসী না করে বিশ্বাস। তবে দেব
নিশাপতি, উঠিও না তারাদলসহ
নভস্তলে পুনঃ আর শীতলিতে নরে।
কুলপতি দিনপতি, আর যেন পুনঃ
উঠিও না নিশা-অন্তে অযযাধ্যা-গগনে ;
চির-অন্ধকারে থাকুক জগৎ-বাসী।
হায়, হায়,
সতীর পবিত্ৰ-নামে কলঙ্ক রটনা!
কেন ফিরি আইলাম রাজ্যভােগ-আশে ?
ছিল ভাল দণ্ডক-কাননে চিরবাস।
তাপস-তাপসী পশুপক্ষী নাহি জানে
সংসারের ছলনা চাতুরী কপটতা,
নাহি জানে পরনিন্দা, পরশ্রীকাতর
নহে তারা। কেন আমি আইলাম
লােকালয়ে ফিরি? কি করি, কি করি?-
উপায় না হেরি কিছু।
কেমনে যাইব
ফিরি এবে অন্তঃপুরে ; থাকিব হেথায়,
যতক্ষণ অন্তরাত্মা নাহি হয় স্থির।
[ পটক্ষেপণ।]
প্রথম অঙ্ক সমাপ্ত।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
উর্মিলার কক্ষ।
[ উর্মিলা আসীনা।]
উর্মিলা। সােনার পিঞ্জরে বদ্ধ পক্ষিণীর মত
গেল মাের সারাটা জীবন একভাবে।
দেখিলাম শুধু সৌধমালা, দাসদাসী,
শুনিলাম শুধু নগরের কোলাহল,
বুঝিলাম শুধু দ্বেষ হিংসা স্বার্থ আদি
মানব-হৃদয়ে কি বিপ্লব ঘটাইছে
দিবসরজনী এ সংসারে। কেন আজি
পুরাতন কথা যত পড়িতেছে মনে,
পারি বুঝিতে কিছু। প্রথমযৌবনে
দিনকত গেল মহাসুখে। তারপর,
বিমাতার ছলনায় রাঘবেন্দ্ৰ বীর
রাজ্য ত্যজি বনবাসে চলিলেন যবে,
হইলেন অনুগামী অনুজ তাহার ;
কত যে কদিনু পায়ে ধরি, বনে যেতে
সাথে তার,-কাঁদিলেন তিনি,—বলিলেন,

অশ্রু-বিজড়িত-কণ্ঠে হাত দুটী ধরি,
‘সঙ্গে তুমি গেলে প্রিয়তমে, বল শুনি
‘কে সেবিবে জনকজননী,—কে মুছাবে
‘অশ্রু তাঁহাদের ? র ইচ্ছা,-রহিলাম
গৃহে আমি, সহিলাম নীরবে নির্জনে
চতুর্দশবর্ষব্যাপী বিরহ-যন্ত্রণা।
তারপর সুপ্রসন্ন হলেন বিধাতা,
পাইলাম তরে পুনরায়। কিন্তু মাের
পূরিল মনের বাসনা। ইচ্ছা হয়,
হাত ধরাধরি করি ছাড়িয়া সংসার,
ভ্রমি সুখে তার সনে কাননে কাননে,
শৈলে শৃঙ্গে শান্তিময় ঋষি-তপােবনে,
দেখি সাধ পূর্ণ করি আছে কত শােভা
শােভাময়ী প্রকৃতির অনন্ত-ভাণ্ডারে।
আমার মনের সাধ মনেই রহিল।
[ লক্ষণের প্রবেশ।
লক্ষ্মণ। কি সাধ অপূর্ণ আছে, পায় কি শুনিতে
আজ্ঞাধীন? থাকে সাধ্য অবশ্য পূরাবে
রামানুজ, কর মাত্র আদেশ প্রচার।
উৰ্মিলা। কথার ছলনে ভাল শিখেছ ভুলাতে
উৰ্মিলায়। সেও ভাল, এসেছ যে তার
কাছে রাজকাজ ছাড়ি, শুনাতে তাহারে
দুটী ছলনার কথা। কি সৌভাগ্য আজি,

সীতা-নিৰ্বাসন।
রজনীর প্রথম প্রহরে দরশন
মিলিল তােমার।
গণ।
এ অভিমানের কথা,
কেন আজি সুবদনি শুনি তব মুখে ?
উর্মিলা। জলাঞ্জলি অভিমানে দিয়াছে উর্মিলা।
মনে করি কতদিন ‘করি অভিমান,
মনে মনে কত কথা রাখি যােগাইয়া,
আগমন-প্রতীক্ষায় তব; কিন্তু হায়,
যেই সে মুহূর্ত আসি হয় উপস্থিত,
যেই তব পদ-শব্দ পরশে শ্রবণ,
পাশরি সকল কথা, পাশরি আপনা,
চেয়ে থাকি ওই মুখপানে।
নমণ।
বল শুনি,
কোন্ সাধ হয় নাই পূর্ণ উৰ্মিলার ?
উৰ্মিলা। শুনিবে কি ?
প্রমােদ-কাননে কালি প্রদোষসময়
ভ্রমিতে ভ্রমিতে সুখে মহিষীর সনে,
শুনিলাম পঞ্চবটী-বন-বিবরণ
তাঁর মুখে; ইচ্ছা হােললা,—কিন্তু বৃথা ইচ্ছা,
লক্ষণ। কি ইচ্ছা বল না শুনি,
উর্মিলা।
ইচ্ছা হােলদা,
কোলাহলময় এই সংসার ছাড়িয়া,
থাকি কিছুদিন কোন শান্তিময় স্থানে ।
তােমার সহিত সদা,
•

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৫৫
*** AL ne,
( সীতার প্রবেশ।
সীতা।
?
শুভ সমাচার,
আনিয়াছি আমি বােন তােমার লাগিয়া ।
লক্ষ্মণ। নমে পদে মহাদেবি, লক্ষ্মণ দেবর,
যাচে আশীৰ্বাদ তব।
সীতা।
হও চিরজয়ী,
পালহ নির্বিঘ্নে প্রজাপুঞ্জে, মহাবীর,
নাশি শক্র তীক্ষ্ণ-অস্ত্রে সম্মুখসমরে।
উর্মিলা। আর ছেদি নাসাকর্ণ নিরস্ত্র। নারীর
যথা পাও কাননে করে।
সীতা। কি উত্তর হে দেবর, কি বলে উৰ্মিলা ?
লক্ষ্মণ। পাপের উচিত শাস্তি দিয়াছি পাপীর,
উত্তর কি প্রয়ােজন তাহার আবার ?
উৰ্মিলা। কি যে মহাপাপ করেছিল শূর্পণখা,
যার লাগি নাসাকর্ণ চিরদিন তরে
গেল তার, আমি কিন্তু না পারি বুঝিতে।
লঙ্কার সমরজয়ী তুমি মহাবীর
বল মােরে বুঝাইয়া, দেখি বুঝি যদি।
লক্ষ্মণ। কুলটা যে নিল্ল জ্জা রমণী, সংসারের
ঘাের অমঙ্গল ঘটে সদা তাহা হতে;
অবশ্য কর্তব্য তার শাস্তির বিধান
সমুচিত।

সীতা-নিৰ্বাসন।
ঊর্মিলা।
বল হে চরিত্রবান্,
বল দেখি শুনি, জিতেন্দ্রিয় ধৰ্ম্মনিষ্ঠ
পুরুষ যে জন, কি করিতে পারে তারে,
সহস্র কুলটানারী সহস্র বৎসর
যায় যদি গড়াগড়ি চরণে তাহার !
সীতা। কি বল দেবর ?
উর্মিলা।
আরাে বলি, নহে আৰ্যনারী শূর্পণখা,
সে ত নিশাচরী,—মনােভাব, সমাজবন্ধন,
ভিন্ন তার, ভিন্ন তার আশা রুচি, ভিন্ন
. তার প্রাণ ; তমাদের চক্ষে যাহা ঘৃণ্য
নিন্দনীয়, নহে তাহা নিন্দনীয় ঘৃণ্য
তাহাদের ; তাই যদি হয়, বল তবে,
বল মােরে বুঝাইয়া হে বীরপ্রধান,
কোন্ অধিকারবলে, নাসাকর্ণ তার
তুমি করিলে ছেদন ?
সী।
হে দেবর,
শুনিলে ত বলে যাহা উৰ্মিলাসুন্দরী ?
আমি বলি, যুক্তিময় কথাগুলি তার।
উর্মিলা। শুধু তাই ?
উপায় কি নাহি ছিল অন্য কোন মত,
দূর করি দিতে তারে পঞ্চবটী হ’তে ?
কিন্তু মহাবীর, ধন্য বীরপণা তব,
হানিলে স্ত্রী-অঙ্গে অস্ত্র সামান্য কারণে।
সীতা।
গুরুতর অভিযােগ বিরুদ্ধে তােমার

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৫৭
করিয়াছে উপস্থিত উৰ্মিলা রূপসী।
কি বল দেবর এ কথার ?
মণ।
কি বলিব ?
পরাভব করিনু স্বীকার।
সীতা। ( সহাস্যে )
ইন্দ্রজিৎ-জিৎ
পরাজিত রণে আজ উৰ্মিলার সহ।
নহে বিস্ময়ের কথা রঘুকুল-রাণি,
হেন পরাভবে সতত অভ্যস্ত এই
দেবর তােমার ; সতত আনন্দ তার
হেন পরাভবে। পায় যেন চিরদিন
হেন পরাভব সজ্জা, দেবর তােমার
দেবি, কর আশীর্বাদ।—কিন্তু বল শুনি,
কি শুভ-বার, আনিয়াছ লক্ষ্মণের
উৰ্মিলার তরে।
সীতা।
তপােবন-গমনের
অভিলাষ মাের জানাইলে আৰ্যপুত্রে,
দিয়াছেন অভিপ্রায় সুপ্রসন্ন-মনে।
হে দেবর সবে মিলি, লইয়া তােমায়
যাব মােরা সুপবিত্রা জাহ্নবীর তীরে,
বাল্মীকির তপােবন দরশন তরে।
বড় সাধ ছিল মনে বহুদিন হ’তে,
ভগিনীর সহ সুখে ভ্রমিতে কাননে ;
পুরিবে সে সাধ মাের, সাধ উর্মিলার
মিটাইব সযতনে, এই সুসম্বাদ।

সীতা-নির্বাসন।
উৰ্মিলা। শূর্পণখা মত নারী আছে কি তথায় ?
বীরত্বের পরিচয় দেবরের তব,
কেমনে পাইব বল নাহি থাকে যদি ?
সীতা। দেখা যাবে তপােবনে যাইব যখন।
কিন্তু কোথা মহারাজ ? দেখি নাই তারে
সারাদিন।
লক্ষণ।
রঘুবীর মন্ত্রণা-ভবনে,
একাকী যেন কি কার্যে ব্যস্ত সারাদিন।
নিষেধ তাঁহার কাছে যাইতে সবার।
অনুমানি, না থাকিলে তিনি, রাজকাৰ্য্য
কি ভাবে চলিবে তাহা করিছেন স্থির।
বল আৰ্য্যে, ভগিনীরে তব, তপােবন
দান বিতরণ করিতে হইবে বহু,
আয়ােজন তার যেন থাকে যথােচিত।
উৰ্মিলা। কি আছে সে বিলাইবে, দরিদ্রা উর্মিলা।
তুমি তার একমাত্র সর্বস্ব সংসারে,
বিলাইব অকাতরে, তুমি যদি বল।
[ কধুকীর প্রবেশ ]
কঞ্চুকী। রঘুবীর করেছেন স্মরণ কুমারে,
আছেন অপেক্ষা করি মন্ত্রণা-ভবনে।
লক্ষণ। তপােবনে যাইবার আয়ােজন তরে
আদেশ দিবেন বুঝি, যাই তার কাছে।
[ কধুকী ও লক্ষ্মণের প্রস্থান।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
কত যে আনন্দ আজ অন্তরে আমার
ভগিনি লল, নাহি পারি কহিতে তােমায়।
চল বােন, আয়ােজন করিগে সত্বর।
তাপসীর বেশে মােরা যাব পােবনে।
[ উভয়ের প্রস্থান।
২০i

দ্বিতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
রাজপুরীর মন্ত্রণা-ভবন।
[ ধরাসনে রামচন্দ্র উপবিষ্ট।]
হা বৈদেহি, এই ছিল অদৃষ্টে তােমার ?
আছ তুমি মনের উল্লাসে অন্তঃপুরে,
ভাবিতেছ মনে, বেড়াইবে মহাসুখে
ভগিনীর সহ পােবনে, বিতেছ
কেমনে তুষিবে ঋষি ঋষি-পত্নীগণে,
দেখিতেছ সুখের স্বপন কত মত ;
কিন্তু হেথা মন্ত্রণা-ভবনে, সর্বনাশ
সাধিছে তােমার সতি, প্রাণাধিক পতি।
কি করিব, অন্যগতি নাহি যে রামের।
পিশাচ, রাক্ষস রাম অবােধ্যার পতি
-না,-পিশাচ রাক্ষস করিতে অক্ষম
যাহ, বসেছি করিতে।
করিলাম মনে
কতবার, ছাড়ি রাজ্য ছাড়িয়া সংসার,
যাই চলি সীতাসহ পুনঃ বনবাসে,
থাকি দোহে অনন্ত-মিলনে।
কিন্তু তাহে
গুরুতর কলঙ্ক টিবে রঘুকুলে।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৬১
*
=
নিরুপায়, নিরুপায়, অযযাধ্যার পতি।
রঘুকুলরাজধৰ্ম প্ৰজার রঞ্জন,
কুলধৰ্ম্ম ত্যজিব কেমনে? কি কহিবে
জানি লক্ষ্মণ, আদেশিব যবে তারে
জানকীরে দিতে বনবাস। পালিবে কি
আদেশ আমার ? প্রেরিয়াছি প্রতিহারী
লক্ষ্মণের তরে, কিন্তু কেন বিলম্বিছে
এত সুমিত্রা-নন্দন ?
(অবােবদনে চিন্তা )
লক্ষণের প্রবেশ।
শক্ষণ।
নমে তব পদে,-
(স্বগতঃ) একি হেরি! ধরাসনে অযােধ্যার পতি।
পড়ে পলক, নেত্রে নিশ্চল তারকা,
বিষাদমলিনমুখ নিস্পন্দ গম্ভীর,
যেন পাষাণের গড়া রামের মুরতি,
নহে রাম! নাহি বুঝি কারণ ইহার,
ভয় হয় জিজ্ঞাসিতে, অবশ্য হয়েছে
কোন ঘাের দুর্ঘটনা।
( প্রকাশ্যে )
রাজ রাজেশ্বর,
কেন স্মরিয়াছ দাসে পাই কি শুনিতে ?
পাই কি শুনিতে, কেন বা এ ভাবান্তর
হেরি অকস্মাৎ ?
রাম। আসিয়াছ ?—আসিয়াছ প্রাণাধিক
D

৬২
সীতা-নিৰ্বাসন।
অনুজ আমার ? এসাে, হতভাগ্য রাম
ডেকেছে তােমায় ভাই যে কাৰ্য্যের তরে,
তাহা শুনিবে এখনি। বল প্রিয়তম,
ক্ষমিবে আমায় তুমি সরল-অন্তরে ?
লক্ষ্মণ। একি রঘুমণি ? কি দোষ করেছে দাস,
তাই হেন পরুষ-বচন কহ তারে ?
আজ্ঞাধীন আমি ভ্রাতা তব।
রাম।
শুন ভাই,
জ্বলিতেছে যে ভীষণ অনলের শিখা,
চিতা-বহ্নি-সম এই হৃদয়ের মাঝে,
কহিব কাহার কাছে, কে আছে রামের
তােমা বিনা।লােকে বলে ‘কলঙ্কিনী সীতা
লক্ষ্মণ। কে বলে কে বলে হেন কথা ? কহ দেব,
তীক্ষ্ণ খড়গে ছিন্ন করি রসনা তাহার,
দিব ডালি শৃগাল-কুকুরে।
রাম।
শুন আগে বৃত্তান্ত সকল। নহে ভাই
একজন, নহে দুইজন, দেশময়
গৃহে গৃহে সবে করিতেছে বলাবলি
‘কলঙ্কিনী সীতা, কলঙ্কিত রঘুবংশ
রামের লাগিয়া।
লক্ষ্মণ।
ঘাের মিথ্যা অপবাদ ।
প্রজাগণে জনে জনে বুঝাইব আমি
সাধ্বী সতী সীতাদেবী রঘুকুলবধূ।
স্থির হও,

দ্বিতীয় অঙ্ক। রাম। অসাধ্য অসাধ্য ভাই, বৃথা আশা তব। বিষে যার জর্জরিত সমস্ত শরীর, কোন্ স্থানে হবে তার ঔষধ প্রয়োেগ ? নাহি দেখি এ রােগের প্রতীকার কিছু, দেখেছি অনেক চিন্তা করি। লক্ষ্মণ। কি করিবে তবে রঘুমণি ? কি উপায় করিব এখন ? রাম। নিরুপায়, নিরুপায় ;- আছে মাত্র একটী উপায়। শুন ভাই- লক্ষ্মণ। কি উপায় ? দেহ আজ্ঞা করিব এখনি। রাম। করেছি সংকল্প স্থির, শুন প্রাণাধিক, তুষিব প্রজায় আমি ত্যজি বৈদেহীরে। লক্ষ্মণ। বৈদেহীরে পরিত্যাগ! অভিপ্রায় তব নারিনু বুঝিতে কিছু রঘুকুলমণি ! রাম। নাহি অন্য গতি আর, জনমের মত হবে সীতা নির্বাসিত রাজ্য হতে মােয়। লক্ষ্মণ। নির্বাসিত হবে সীতা, এ সংকল্প দেব, করিয়াছ স্থির মনে? পাই কি শুনিতে কোন অপরাধে নিৰ্বাসনদণ্ড গর করিছ বিধান ? সন্দেহ কি কর দেব, রাম। না না ভাই, জানি আমি পরম পবিত্র পত্নী মম - লক্ষণ। জান দেব, তবু বিনা দোষে গর্ভবতী বনিতায় দিবে বনবাস ?

৬৪
সীতা-নিৰ্বাসন।
রাম। কি আর করিতে পারি বলহ আমায় ?
রঘুকুলসারধর্ম প্রজার রঞ্জন ;
তুষিব প্রজার মন বনে দিয়া সীতা।
প্রতিপাল্য প্রজাগণ মম।
পণ। কে করে বারণ রঘুবীর, প্রজাগণে
করিতে পালন ? কিন্তু বিচারক তুমি,
ন্যায়পরায়ণ সদা, বল দাসে শুনি,
কোন্ ধৰ্ম্ম, কোন ন্যায়মতে, নির্দোষের
দণ্ড তুমি করিছ বিধান ?
রাম। পত্নীত্যাগে সদা মাের আছে অধিকার।
লক্ষণ। পত্নীত্যাগে থাকে যদি অধিকার তব,
প্রজাত্যাগে বল শুনি হে প্রজারঞ্জক,
বিন্দুমাত্র অধিকার আছে কি তােমার ?
নহে কি জানকী প্রজা তব, প্রতিপাল্য
বৃক্ষণীয় অন্য প্রজামত? বিশেষতঃ,
জান তুমি নরনাথ, পরমপৰিত্ৰা
নারীকুল-শিরােমণি জনকনন্দিনী
মিথ্যা অপবাদ তার শুনি লােকমুখে,
দিতেছ তাহারে বনবাস; এই কি হে
রাজধৰ্ম্ম ? এই কি হে বিচার তােমার ?
রাম। কি করিব ? কি করিব বল প্রাণাধিক ?
রঘুকুলরাজধৰ্ম প্ৰজার রঞ্জন।
লক্ষ্মণ। তাই যদি হয় নরনাথ, পার তুমি
ত্যজিতে সীতায়, তুষিতে লােকের মন।
|
•

দ্বিতীয় অঙ্ক।
কিন্তু দেখেছ কি ভাবি, আছে গর্ভে তার
কুমার তােমাৰ আৰ্য, রঘুবংশধর ;
কোন রাজধৰ্ম্মবলে বুঝাও আমায়,
বংশধরে দিবে তুলি পদের মুখে ?
লক্ষ্মণ বিচারপ্রার্থী তােমার নিকটে,
করহ বিচার করি যা ইচ্ছা তােমার।
রাম। এ ইচ্ছা প্রজার ভাই, নহে ইচ্ছা মাের।
প্রজার ইচ্ছার দাস কি করিব আমি ?
লক্ষ্মণ। কর যাহা ইচ্ছা তব, কি বলিব অমি ?
রাজেশ্বর তুমি দেব, বিদায় আমায়
দাও চিরদিন তরে, রাখ এ মিনতি।
নাম। প্রার্থনা রামের আগে শুনহ ধীমা,
এ বিপদে রক্ষিবারে এ তিন ভুবনে
তােমা বিনা রাঘবের কে আছে অপর ?
রক্ষিয়াছ রক্ষোযুদ্ধে লঙ্কার সমরে,
রক্ষা কর এ বিপদে চির-সহচর।
ল’য়ে যাও জানকীরে রথে আরােহিয়া,
দিয়ে তারে এস বনবাস।
ক্ষম দাসে,
কি দোষে লক্ষ্মণ আজ দোষী তব পদে,
তাই হেন আজ্ঞা তারে দিতেছ নৃমণি?
হায় আৰ্য, হায় দেব, ছায়ার মতন
ফিরিয়াছি বনে বনে বর্ষচতুর্দশ,
যাপিয়াছি দিবসমিনী অনাহারে

সী-নির্বাসন।
অনিদ্রায়, সহিয়াছি অম্লানবদলে
রাক্ষসের শত শত তী-অত্রাঘাত ;
এই কি অযােধ্যানাথ পুরস্কার তার।
উদ্ধারিতে যে সতীরতনে, বধিলাম
ইন্দ্রজিতে যতজ করি, তার ফলে
পুত্রশােকাকুল ত্রিলােকবিজয়ী বীর
নিকষা-নন্দন, পশিল আহবে যবে
ৰবিতে আমায়, মনে কি পড়ে গাে দে,
মহাত্রাসে পিল নিলােক থরথরি,
হংকার করি নিক্ষেপিল শক্তিশেল,
উজলিয়া নভল, গর্জি ঘােররবে,
ছুটিল সে অস্ত্রবর উদ্দেশে আমার,
হাহাকার করিল গগনে দেবগণ ;
কাপে নাই বারেক হৃদয়, পড়ে নাই
বারেক পলক, ধরিলাম বুক পাতি
মহা-শক্তিশেল,-এই হের চিহ্ন তার
পড়িলাম রণভূমে ঘাের যাতনায় ;
না গেল পরাণ তাহে এই কি কারণে?
হয় বিধি, নাহি জানি কত মহাপাপ
করেছি পুর্বজন্মে, যার লাগি আজ
নিতে হইল হেন নিদারুণ বাণী,
শক্তি-শেলাধিক ভীষণ আঘাতে যাহা
বিধিতেছে হৃদয়ে আমার।
যত পায়

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৬৭
করহ ভৎসনা, ভৎসনার উপযুক্ত
আমি ভ্রাতা তব; কিন্তু বল প্রাণাধিক,
রাম যে অনন্যগতি কি উপায় তার?
কেমনে কলঙ্ক দূর হইবে কুলের ?
লক্ষ্মণ। রাখিতে কুলের মান নাশিবে রমণী
বিনাদোষে ?
দেখ ভাবি, দেশময় যত
নরনারী, ভাবে যদি কলঙ্কিনী সীতা,
আর আমি তারে যদি রাখি নিজগৃহে,
ঘরে ঘরে ঘটিবে অনিষ্ট শত শত,
ঘাের অশান্তিতে পূর্ণ হবে রাজ্য মাের,
অতি বিষময় ফল ফলিবে সত্বর।
ভেবেছি অনেক,
ভেবেছ অনেক,
ভেবেছ কি মনে, বিনাদোষে দিলে ব্যথা
সতীর পরাণে, কি ফল ফলিবে পরে ?
রক্ষোবংশধ্বংস-কথা কর দেব মনে।
ঝরে যদি আঁখি হতে অশ্রু এক ফোঁটা,
পড়ে যদি একটী নিশ্বাস, সর্বনাশ
ঘটিবে অচিরে। উঠিবে প্রলয় ঝড়
সতীর নিশ্বাসে, ছুটিবে কালাগ্নি তাহে
বিশ্ব-নাশ-ক্ষম, সে অনলে ছারখার
হবে এ সংসার ; কোথা রবে রাজপাট
কোথা প্রজাপণ ?

সীত-নির্বাসন
রাম। সামান্যা নারীর মত ভাবিয়াছ মনে
জানকীরে? সে যে সাধ্বী সতী-শিরােমণি,
সে যে বিধাতার সৃষ্টি আদর্শ-ললনা,
ধরাতলে নারী-ধৰ্ম্ম করিতে প্রচার
জন্ম তার। ভয় নাই ভাইরে লক্ষ্মণ,
নাহি অভিশাপ-ভয় সীতাদেবী হতে।
মূর্তিমতী সহিষ্ণুতা জনক-নন্দিনী
সহিবে নীরবে ভাই সকল যন্ত্রণা।
পতির আদেশ, শিরােধার্য্য করিবে সে
পতিপরায়ণা।
আছে আৰ্য তব রাজ্যে
বহু কর্মচারী, আত্মীয়স্বজন বহু
আছে আজ্ঞাধীন ; এ কাৰ্যের তরে দে,
যাহে ইচ্ছা কর আজ্ঞা, ক্ষমা কর দাসে।
রা।
এ কাৰ্যের উপযুক্ত নাহি অন্য কেহ,
তাই ডাকিয়াছি আমি লক্ষ্মণ তােমায়।
নাহি জানে সংকল্প আমার পুরবাসী
অন্য কেহ। তপােবন দরশনতরে
করিয়াছে অভিলাষ জনক-দুহিতা ;
লহ তারে রথে করি জাহ্নবীর পারে
সেই ছলে, এসাে রেখে অরণ্যের মাঝে।
বাল্মীকির পােবন নহে বহুদূর
তথা হ’তে।ধীরে ধীরে অতি সাবধানে
জানাইও তারে তাই, আদেশ আমার।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
লক্ষ্মণ। তারপর কি ঘটিবে অদৃষ্টে তাহার,
দেখেছ কি একবার ভাবি সীতানাথ ?
রাম। অন্ধকার ভবিষ্যৎ কে জানে কি হবে।
বিধাতার ইচ্ছা এই লয় মাের মনে,
নহে কেন এ কলঙ্ক রটিবে সীতার ?
বিচারি দোষগুণ পালহ আদেশ,
হবে যা হবার ভাই, কি হবে ভাবিয়া।
[ উভয়ের প্রস্থান

দ্বিতীয় অঙ্ক।
তৃতীয় দৃশ্য।
জাহ্নবী-তীরবনপথ।
| সীতা ও লক্ষণের প্রবেশ।
সীতা।
মণ।
সীতা।
হে দেবর, কহিয়াছ জাহ্নবীর তীরে
মহাঋষি বাল্মীকির পুণ্য-তপােবন,
এ যে দেখি অরণ্য ভীষণ পুরােভাগে ?
বাল্মীকির তপােবন নহে বহুদুর
হেথা হতে।
কিন্তু রথ ছাড়ি কেন মােৰে
আনিলে হেথায় পদব্রজে ? কেন নাহি
আইলেন আৰ্যপুত্র সাথে ? কোথায় বা
প্রাণ-সমা ভগিনী উর্মিলা? কিছু আমি
পারি বুঝিতে। আছেন ত আৰ্যপুত্র
কুশলে আমার ?
শারীরিক কুশল হার।
কাজ নাই তপােবন দরশনে আর
হে দেবর, চল ফিরি যাই অযােধ্যায়।
অস্থির হ’তেছে মন কেন যে না জানি।
দেখি গে চরণ তার চল যাই ফিরি।
লণ।
সীতা।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৭১
সীতা।
সীতা।
লক্ষণ। (স্বগতঃ) হায়, হায়, কি বলিব, কি দিৰ উতর।
হে দেবর, কেন নাহি দিতেছ উত্তর ?
দেখিয়াছি অমঙ্গল প্রভাত-স্বপনে,
দেখিয়াছি অমঙ্গল আসিবার কালে,
মহাভয় চিতে সেই হ’তে হে দেবর,
বল বল কি হয়েছে রাখ এ মিনতি।
মলিন বদন তব সজল নয়ন,
দেখি নাই হেন মূৰ্ত্তি কখনাে তােমার ।
কি যেন বলিতে চাও, কিন্তু রুদ্ধকঠে
সরে বচন তব একি ভাবান্তর ?
রুম দেবি,
করেছি কি বল অপরাধ,
ৰাৱ তরে আজ হেন নিষ্ঠুরের মত
করিতেছ আচরণ আমার সহিত ?
বার লাগি প্রাণ দিতে লঙ্কার সমরে
ভাব নাই এক তিল, আজ কেন বল,
এ হেন যন্ত্রণা তারে দিতেছ দেবর ?
লগণ। (স্বগতঃ ) হায়, হায়,
কেন নাহি গেল প্রাণ শক্তিশেলাঘাতে ?
কেন নিরুত্তর বীরমণি? চল ফিরি
অযযাধ্যা-নগরে। ওই হের অস্তাচলে
দিনমণি, সন্ধ্যার আঁধার আবরিছে
বন-স্থলী, হুঙ্কারি ভীষণ ওই শুন
নিবিড় জলদ-জাল উঠিছে আকাশে
সী।
০

१२
সীতা-নিৰ্বাসন।
যেন বিনাশিতে সৃষ্টি, নিবিছে তারকা,
ভয়াকুল জীবকুল ছুটিছে চৌদিকে
প্রাণভয়ে, চল ফিরি অযােধ্যানগরে।
মণ। ক্ষম মােরে মহাদেবি, নাহি স্থান তব
অযযাধ্যায় ;-
সী। নাহি স্থান অযােধ্যায় ? কি অর্থ ইহার।
বল মােরে বুঝাইয়া দেবর লক্ষ্মণ।
কেন এত হ’তেছ কাতর? বল মােরে,
বল মােরে কি বেদনা অন্তরে তােমার ?
সহিতে সকলি পারি, সহিব সকলি,
অসহ আমার প্রাণে যন্ত্রণা তােমার।
ঘটিবে ললাটে মাের যা আছে লিখন,
তুমি কেন ক্লেশ পাও তাহার লাগিয়া ?
প্রাণাধিক, কি ঘটেছে বল বিবরিয়া।
এ
লক্ষ্মণ। দাও ধূলি চরণের জনক-নন্দিনি,
মাতৃসম দেখিয়াছি চিরদিন আমি,
সেবিয়াছি তােমায় সতত, কিন্তু দেবি,
ফুরাইল আজ হ’তে লক্ষ্মণের সেবা।
রাজার আদেশে, এনেছি তােমায় হেথা
দিতে বনবাস।
সীতা। কি চিন্তা তাহার তরে, স্থির হও বীর,-
রাজাদেশ অবশ্য পালিব। কিন্তু ভাই,
শুনিতে কি পাই, কোন দোষে দোষী আমি

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৭
~~
চরণে তাঁহার, যার লাগি এ দারুণ
দণ্ড তিনি দিলেন আমায় ?
লক্ষ্মণ। দীর্ঘকাল রক্ষোগৃহে যাপিয়াছ দেবি,
তাই লােক রটায়েছে কলঙ্ক তােমার।
তুষিতে লােকের মন অযােধ্যার পতি,
দিলেন তােমায় বনবাস। রাখিলেন
কুলধৰ্ম্ম তেয়াগি তােমায় ।
সীতা। বুঝিলাম ভাঙ্গিয়াছে কপাল আমার।
কেন তুমি তার তরে করিছ নােদন
প্রাণাধিক ? রাজাদেশ পালনীয় সদা ;
তুমি পালিয়াছ বীর, আমিও পালিব।
যাও ফিরি অযােধ্যানগরে।
লক্ষণ! কোন্ মুখে ফিরি আমি যাইব তথায় ?
জিজ্ঞাসিবে যবে মােরে কৌশল্যা-জননী,
কোথা পুত্রবধূ মাের জনক-দুহিতা,
কি উত্তর দিব তারে আমি ? কি বলিব
কুলবধূগণে? উর্মিলা ভগিনী তব
সুধাইবে যবে বক্ষে করাঘাত করি,
‘কোথা বল ফেলে এলে ভগিনী আমার,
‘ল’য়ে চল লয়ে চল মােরে তার কাছে;
কি বলে বুঝাব আমি, কি দিব উত্তর ?
শ্মশান অযােধ্যাপুরী, অন্ধকারময়
তােমা বিনা, ফিরি আর যাব না তথায়।
তার চেয়ে চিরদিন লােকালয় ছাড়ি,

৭৪
সীতা-নিৰ্বাসন।
কাটাই এ জীবন কাননে কাননে ;
অথবা বহিছে ওই পবিত্ৰা তটিনী
ভাগীরথী, জুড়াইব হৃদয়ের আল
সুশীতল সলিলে তাহার।
সীতা।
ওকি কথা?
হে দেবর, যাও ফিরি গৃহে। যুছ অশ্রু,
ধৈৰ্য্য ধর বীর তুমি, বীরের মতন।
বুঝিয়াছি আৰ্যপুত্র ত্যজিলেন মােরে
লােক-রঞ্জনের তরে, নাহি অন্য হেতু ;-
সীতার অদৃষ্ট-দোষ নহে দোষ তার,
নহে কেন এ কলঙ্ক বৃটিবে সীতার ?
ওই শুন ভীমনাদে গর্জে কাদম্বিনী ;
আসিছে তুমুল ঝড়, যাও পরপারে,
আবরাহিয়া রথে শীঘ্র যাও দেশে ফিরি ;
রাধ কথা শেষ-কথা জনমের মত।
লণ। কোন প্রাণে যাব ফিরি ফেলিয়া তােমায়
এ সঙ্কটে ? কে রক্ষিবে তােমায় এখানে ?
সীগ।
আছে কি আদেশ তার রক্ষিতে আমায়
বনবাসে ? নাহি থাকে যদি, কেন তবে
থাকিবে হেথায় ? থাকিলে হেথায় তুমি,
বনবাস কিসে বল হইল সীতার ?
করিও না চিন্তা কিছু আমার লাগিয়া,
যাও ফিরি বীরবর অযােধ্যানগরে।
কহিও অযােধ্যানাথে, ধরণী-নন্দিনী
•,
t

{
দ্বিতীয় অঙ্ক।
শিৱ পাতি লইয়াছে আদেশ তাহার।
জানাইও প্রণাম আমার গুরুজনে।
কাঁদিয়া আকুল হবে উৰ্মিলা ভগিনী
জানি আমি ; বুঝাইও তারে ভাল করি,
সীতার ললাট-লিপি ছিল এই মত ;
নহে কেন ত্যজিবেন রাম হেন স্বামী।
বিও না আমার লাগিয়া, হে দেবর,
যদি সতী হই আমি, কায়মনে যদি
করে থাকি চিরদিন পতি-পদ-সেবা,
রক্ষিবেন ধৰ্ম্ম মােরে এ ঘাের সঙ্কটে।
গৃহে ফিরি যাও হে সুধীর।
লণ।
হায়, হায়,
কে বুঝিবে নিয়তির খেলা এ জগতে,
কে বােধিতে পারে তার অব্যাহত-গতি ?
পাসিয়াছি ভ্রাতৃ-আজ্ঞা পালিব তােমার।
দাও দেবি, বিদায় এখন, যাব আমি;
কিন্তু কর এই আশীৰ্বাদ, যেন সতি,
কোলে করি কুমার তােমার, পারি আমি
তােমার সম্মুখে, বসাইতে সিংহাসন
রাধবের কোলে।
সী।
পূর্ণ মনােরথ যেন
হয় বীর তব ।
অণ। সতীর আশীষ দেবি, অবশ্য ফলিবে ;
সে আশায় রাখিব পরাণ। নমি পদে।

৭৬
সীতা-নিৰ্বাসন।
সীতা। চিরজয়ী চিরজীবী হও বীরবর।
[ অপােবদনে লক্ষ্মণের প্রস্থান।
(স্বগতঃ) এই বুঝি শেষ-দেখা দেবরের সনে,
আর একবার দেখি তবে।
(প্রকাশ্যে) হায়, হায়, অদৃশ্য দেবর।
কোথা মাতঃ বসুন্ধরে, তনয়া তােমার
একাকিনী অসহায়া ঘাের বনমাঝে
ডাকিছে তােমায় মা গাে, লও কোলে করি।
জন-দুখিনী আমি, না আছে সংসারে
কেহ মাের মুছাইতে অশ্রু নয়নের,
কহিতে মা, সান্ত্বনার কথা দুটী মােরে।
ভাবি না মা আমার কারণ, ছার প্রাণ
দিতে পারি বিসর্জন জাহ্নবী-সলিলে
এই দণ্ডে, সব জ্বালা পারি জুড়াইতে।
কিন্তু হায়, গর্ভে মাের রঘুবংশধর।
নাহি এবে অধিকার আত্ম-বিসর্জনে।
আসিতেছে ঘনাইয়া চারিদিক হতে
মেঘমালা, ভীষণ নিবিড় অন্ধকার
আবরিছে ক্ৰমে বনস্থলী, পরিপূর্ণ
পাদপে কন্টকে ; কোথায় আশ্রয় এবে
পাইব হেথায় ?—কোথা অগতির গতি
ত্রিলােকপালিনি, নিস্তারিণি, তার মা গাে,
এ ধাের সঙ্কটে তনয়ায়। রক্ষো নাশি

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৭৭
বুলি রাঘব দেবগণে, রক্ষ মা গাে,
রাঘবের বংশধর এ বিপত্তিকালে।
পারি না সহিতে আর শক্তিহীনা আমি।
( মুর্জিত হইয়া পতন )
Tv

দ্বিতীয় অঙ্ক।
চতুর্থ দৃশ্য।
জাহ্নবী-তীর।
[ বিদ্যুৎ, বজ্রধ্বনি ও ঝড় বৃষ্টির মধ্যে
সুমন্ত্রের প্রবেশ।
সু। কেন না আইল ফিরি কুমার লক্ষণ
এতক্ষণ? না জানি কি অনর্থ ঘটিল।
কি করি, কোথায় যাই, কোথায় বা কৰি
অন্বেষণ, কেহ নাই কারে বা সুধাই।
জননীর সম ভক্তি করেন লক্ষ্মণ
জানকীরে, ফেলি রে এ ঘাের সঙ্কট
কি ভাবে যে ফিরিবেন, না পারি বুঝিতে।
উঠেছে করাল-মমঘ দিগন্ত আবরি,
নিবিড় আঁধার চাকিয়াছে জল,
খেলিছে চপলা মুহম্মুহুঃ, কড়কড়
গর্জিছে কুলিশ পাইয়া জীবপােক।
যাের দুর্যোগে কোথায় রহিল ৷
সুমিত্রা-নন্দন, কোথা বা রহিল সতী
জনক-নন্দিনী,-কে বলিবে কি দুটি
অদৃষ্টে তাহার? এত ৰে দেখিতে ৰে

দ্বিতীয় অঙ্গ।
এ -বয়সে মুমন্ত্রের, বি নাই
মনে কোন দিন।
[ বিদ্যুৎ ও বজ্রধ্বনির মধ্যে উন্মত্তপ্রায়
লক্ষণের প্রবেশ।
যা সৃষ্টি যা রসাতলে ;
কি কাজ থাকিয়া বিশ্ব যাক ধ্বংসপুরে,
জীব জন্তু নর নারী যে আছে যেখানে।
হান বস্ত্র অবিচ্ছেদে দেব সুরপতি,
নাহি কর ক্ষমা নরলােকে, চুর্ণ কর
রেণু রেণু করি দেব এ মহীমঙ্গল ;
উড়াও সে রেণু গুলি দেব প্রভঞ্জন,
বহি প্রলয়ের বেগে উড়াও আকাশে।
জানি কি হােলাে হায় সে ঘাের কাননে,
নিঃসহায় নিরাশ্রয়া অবলাবাসার
এতক্ষণ ; যাই আমি যাই আমি পুনঃ
পরপারে, দেখে আসি কি হােলল তাহার।
(লক্ষ্মণের যাইবার উপক্রম ও সুময়কর্তৃক ধাৰণ )
কোথা যাও হে সুধীর, শাহবীৰ ৰক্ষে
নেহার উঠিছে ওই তর ভীষণ।
বরষিছে বারিধারা মুষলধারায়
লধর, দুটিতেছে অসংখ্যকরকা,
কোথা যাও এ সময় স্থির হও বীর।
লক্ষণ। হির হব ? স্থির হ'তে বলিছ আমায়?

সীতা-নিৰ্বাসন।
হের ওই অস্থিরা প্রকৃতি; নাহি আছে
চেতনা যাহার, মমতা না আছে যার,
হের, সেও শােকাবেগে ঘাের উন্মাদিনী ;
আর আমি, রক্ত-মাংসময় দেহধারী
চেতন পরাণী,কেমনে হইব স্থির
বলহ আমায় ?
সুম। সকলিমঙ্গলময় বিধির বিধান।
লক্ষণ। সকলি মঙ্গলময় বিধির বিধান ?
বল তবে হে সুম, কত বিলাসিনী,
কত মহাপাপী, ভুঞ্জিতেছে কত সুখ
সুসজ্জিত সুরক্ষিত অট্টালিকা-মাঝে
আনন্দ-উচ্ছাসে এ সময়ে, আর কেন,
সংসার-ললাম সেই পবিত্র রমণী
ঘােরবনে একাকিনী আশ্রয়-বিহীন,
পাতার কুটার নাই লুকাইতে শির ?
পার কি বুঝাতে মােরে রহস্য ইহার?
নারীহত্যা হােলদা আজ লক্ষ্মণের হাতে ;
কেমনে ধৈর্য ধরি বুঝাও আমায়।
কেহ নাহি যায় প্রাণ, কি কাজ জীবনে।
হান বজ্র হে সুরেন্দ্র, লক্ষ্মণের শিরে।
সুম। জানি না বুঝি না নিজে কেমনে বুঝাৰ
হে সুধী, তােমায় আমি রহস্য ইহার ;
ক্ষুদ্ৰবুদ্ধি জীব মােরা, দৃষ্টি আমাদের
সীমাবদ্ধ, বিধাতার গুঢ় অভিপ্রায়

দ্বিতীয় অঙ্ক।
কেমনে বুঝিব বল? তবে শুনিয়াছি
ঋষিগণ-মুখে, ঘটে যাহা ঘটে সব
মঙ্গলের তরে জগতের।
লক্ষ্মণ। নির্বাসনে জানকীর বিনা অপরাধে
বল শুনি কি মঙ্গল হইবে সাধিত
জগতের ? কি ফল হইবে নারীবধে ?
বিধিলিপি,-কর্মফল,-বিধির বিধান,
অর্থহীন কথা এ সকল ; নাহি মানি,
নাহি মানি কিছু।
সুমন্ত্র।
হের কে আসিছে ওই
এই দিক পানে এ দুর্যোগে।
ক
;
[ প্রতিহারীর প্রবেশ।
প্রতিহারী। প্রমাদ পড়েছে অযযাধ্যায় হে কুমার।
সীতা-নিৰ্বাসন-বার্তা হয়েছে প্রচার
অন্তঃপুরে ; করাঘাত করি বক্ষঃস্থলে,
কঁদিছে কৌশল্যাদেবী সুমিত্রা কৈকেয়ী
হা-হারবে। শ্রুতকীৰ্ত্তি মাগুবী উর্মিলা,
শােকে অচেতন সবে জানকীবিহনে।
যে আলােকে উদ্ভাসিত ছিল রাজপুরী,
বিহনে তাহার হে কুমার, অন্ধকার
আজ তাহা, শ্মশান-সমান। শিশু-মুখে
না ফোটে বচন, পিঞ্জরের পাখী সব
নিস্পন্দ নীরব, না করে আহার তার,

৮২
সীতা-নিৰ্বাসন।
ঝরে অবিরল ধারে নয়নের জল।
সুমন্ত্র। কি ভাবে আছেন রঘুপতি ?
প্রতিহারী।
হে সুমন্ত্র,
কেমনে বলিব বল কি যে দশা তাঁর।
আবােহিলা সীতাদেবী লক্ষ্মণের সহ
বিমানে তােমার যবে, রঘুকুলমণি
উঠিলেন অভ্রভেদী প্রাসাদ-চূড়ায়,
রহিলেন একদৃষ্টে চাহি রথপানে,
গর্ভাগ্নি-ভূধর-প্রায় স্থির অচঞ্চল।
যে মুহূর্তে রথধ্বজ অদৃশ্য হইল
বনরাজি অন্তরালে সুদূর দক্ষিণে,
‘দেবি, হা দেবি, বলি আৰ্তনাদ করি
পড়িলেন ধরাতলে চেতনা-বিহীন।
লক্ষণ। কে দেখিল কে সেবিল ভঁরে প্রতিহারি,
বল বল কি হােলাে াহার রপর ?
প্রতিহারী। বহু যত্নে হােলাে াঁর চেতনা সঞ্চার ;
কিন্তু দেব, নাহি আর অন্য কথা তাঁর,
মুখে শুধু ‘হা বৈদেহি হা বৈদেহি’ রব
ক্ষণে ক্ষণে, কভু বা নিৰ্বা নিরুত্তর
ললাকের কথায়, কভু উন্মাদের প্রায়
চারিদিকে চায়, কভু কহে উচ্চকণ্ঠে
সম্বােধি তােমায়, ‘হা লক্ষ্মণ, এনে দাও
‘বৈদেহী আমার, কোথা নিয়ে গেলে তারে,
‘কোথায় রাখিলে রামের অমূল্যনিধি

দ্বিতীয় অঙ্ক
‘কণ্ঠের ভূষণ। চল দেব চল শীঘ্র
অযােধ্যানগরে। তমা বিনা প্রবােধিতে
নাহি কেহ আর, এ বিপত্তিকালে বীর
অগ্রজে তােমার। চল শীঘ্র, বিলম্বিলে
ঘটিবে বিপদ।
প্রাণের অধিক তুমি
অনুজ তাঁহার, চল শীঘ্র উঠ রথে,
চল তার কাছে।
সুমন্ত্র
{ সকলের প্রস্থান।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
পঞ্চম দৃশ্য।
নিবিড় অরণ্য।
{ গাহিতে গাহিতে বনদেবীত্রয়ের প্রবেশ।]
( সঙ্গীত।)
থেমে গেছে ঝড়,
তারকানিকর
ফুটেছে গগন-গায় ;
ভ্রান্ত মানব
ভেবেছিল সব
বুঝি নাশ হয়ে যায়।
হায় রে তাহারা
জানে না বুঝে না
বিধাতার কি বিধান ;
মানবের মত
মমতাবিহীন
নহে যে তাহার প্রাণ।
কি মােহের ঘােরে ঘােরে রাতিদিন,
কেন যে সতত ধায়
নিত্য ভুলিয়া
অনিত্যের আশে,
কি হবে তাদের হায়!
। চতুর্থ বনদেবীর প্রবেশ।
কোথা ছিলে এতক্ষণ এ ঘাের দুর্যোগে ?
অলক্ষ্যে থাকিয়া রক্ষিলাম এতক্ষণ
১ম, বন।
৪র্থ, বন।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৮৫
০
বিপদপতিতা সতী ধরিত্রা-সুতায়।
ছিল পড়ি বনমাঝে মুর্দি হইয়া,
তুলি কোলে সাবধানে রক্ষিলাম তারে,
ঝটিকাপ্রবাহে ছিন্ন ভিন্ন বনস্থলী
হইল যখন।
১ম, বন। রঘুকুলরাণী ভীষণ অরণ্যমাঝে
ঘাের নিশাকালে ! জান কি, কি হেতু
জানকীর হেন দশা ঘটিল কপালে ?
৪র্থ, বন। করেছে প্রচার লােক মিথ্যা অপবাদ,
তাই রাম দিয়াছেন বনবাস তারে।
১ম, বন। লােক-অপবাদ ?—জানি আমি জানি বােন,
চরিত্র নরের ; ঘাের অপদার্থ তারা
জানি ভালমতে । সতত স্বার্থের দাস,
প্রবৃত্তির দাস সংসারী মানব যত ;
ভাবে জনে জনে ‘সুচতুর বুদ্ধিমান
আমার সমান নাহি কেহ এ সংসারে’,
দেখিলে অন্যের ভাল বুকে বাজে শেল ;
কেহ মত্ত ধনমদে কেহ রূপমদে,
অহমিকা কপটতা নিত্য-সহচর
তাহাদের,ক্ষুদ্র কীট ভাবে না কখনন,
আছে একজন সর্বদশী বিচারক
সবার উপরে ; কভু রে নাহি ভাবে
মনে'।
মানব মরণশীল অতিক্ষুদ্র প্রাণী,
৪র্থ, বন।

৮৬
সীতা-নির্বাসন।
কিন্তু বিধাতার সৃষ্টি, আছে প্রয়ােজন
তাহাদের। নহে সৃষ্ট কিছু এ জগতে
সচেতন অচেতন বিনা প্রয়ােজনে।
ক্ষুদ্র-দৃষ্টি ক্ষুদ্র-বুদ্ধি ক্ষুদ্র-জীব নর
সতত কৃপার পাত্র ;-
১ম, বন। যাক্ ও সকল কথা, বল শুনি এবে
কি হইল তারপর জনক সুতার ?
৪র্থ, বন। হােলো ক্রমে যতনে আমার, দেহে তার
চেতনা সঞ্চার ; আখাসিয়া কর্ণমুলে,
অদৃশ্য হইয়া আমি রহিনু নিকটে।
১ম, বন। কি হইবে দশা তার এ ঘাের বিজনে ?
৪র্থ, বন। সতত দয়ার্দ্রচিত্ত মহর্ষি বাল্মীকি,
হেন দুর্যোগের পর প্রতি নিশিদিন
আসেন অরণ্যমাঝে লইতে সন্ধান,
আছে কি বিপন্ন কেহ আশ্রয়বিহীন।
আসিবেন তিনি হেথা নাহিক সংশয় ;
ততক্ষণ বােন্, রক্ষিব সতীরে আমি
অলক্ষ্যে থাকিয়া। হের ওই বনপথে
এই দিক্ পানে করুণার প্রতিমূর্তি
জনক-নন্দিনী আসিছেন ধীরে ধীরে ;
চল সাথে সাথে। (বনদেবীগণের অন্তরালে গমন)
( সীতার প্রবেশ ।।
মূচ্ছিতা যখন আমি,
সীতা।
•

দ্বিতীয় অঙ্ক।
৮৭,
কে যেন কহিল কানে মাের, ‘ভয় নাই,
‘ভয় নাই জনক-নন্দিনি, উঠ বৎসে,
‘হও ধীরে অগ্রসর বনপথ ধরি,
‘শীঘ্র কার মিলিবে আশ্রয়, নাহি ভয়,
‘কেশাগ্ৰ তােমার সতি না স্পর্শিবে কেহ।
কিন্তু কই ? আইলাম এত পথ, তবু
দেখি ঘাের অরণ্যানী ; যাইব কোথায়
নাহি জানি, কোথায় বা পাইব আশ্রয়।
কি আশ্চৰ্য, পূর্ণ বন হিংস্র-জন্তুগণে,
গর্জিছে চৌদিকে সবে ভীষণ-নিনাদে ;
কিন্তু কই কেহ নাহি আসিছে নিকটে ।
পতি-পরিত্যক্তা যে রমণী, বুঝি হায়,
বনের শ্বাপদ যত ভয় করে তারে।
( দীর্ঘনিশ্বাস ও চিন্তা )
মানুষের কণ্ঠস্বর যেন শােনা যায় ;
কে আসিছে ? নহে দস্যু, নহে ত তস্কর ?
( নেপথ্যে সঙ্গীত ধ্বনি
না, এ যে,--
ঋষিকণ্ঠসমুর্থিত সঙ্গীত সুন্দর ;
অকূলে দিলেন কূল বুঝি বিধি মােরে।
গাহিতে গাহিতে সশিষ্য বাল্মীকির প্রবেশ।
( সঙ্গীত।)
জয়, দেব-দেব অসুরারি।
জয়, ত্রিলোেক-পালন অনাদিকারণ
শঙ্খ-চক্র-গদা ধারী ;

اط সীতা-নিৰ্বাসন। জয়, সত্য-সনাতন নিত্য-নিরঞ্জন পাপ-তাপ-দুখ-হারী। তুমি সজ্জন-রক্ষণ, দৈত্য-নিসূদন, জয় জয় গোলােক-বিহারী ; হে করুণাময় দেহি পদায়, যাচে ভকত কৃপাবারি। ; বাল্মীকি। কে তুমি মা, এ ঘাের কাননে একাকিনী ? মনে হয় যেন কোন রাজকুলবধূ ; কিন্তু হেরি তপস্বিনী-বেশ, দাও মােরে পরিচয়, ইচ্ছা যদি হয় মা তােমার, বল কি করিতে পারি উপকার তব ? সীতা। জানি কে তুমি দেব, আমি অভাগিনী। বাল্মীকি। বুঝিয়াছি না পাইলে পরিচয় মাের, নিজ পরিচয় দিতে অনিচ্ছুক তুমি। বুদ্ধিমতী তুমি মাতা নাহিক সংশয়। বাল্মীকি আমার নাম, আশ্রম আমার নহে দুর হেথা হ’তে, চল মোর সাথে। ঘাের অন্ধকারে মহাঝড়ে পাইয়াছ বড় ক্লেশ, চল মাের সাথে, তার পর শুনিব মা পরিচয় তব। পিতা, পিতা, নমে পদে অভাগিনী তনয়া তােমার। লজ্জা হয় তব কাছে দিতে পরিচয়, রুঘুকুলবধু আমি জনক-দুহিতা। সীতা।

দ্বিতীয় অঙ্ক।
বাল্মীকি। রঘুকুলবধু তুমি জনক-দুহিতা।
কোথা সঙ্গিগণ তব অনুচর যত ?
দেখিব কি তাহাদের করি অন্বেষণ ?
সীতা। নাহি দেব অনুচর কেহ মাের সাথে।
বনে আমি নির্বাসিত রাজার আদেশে।
বাল্মীকি। নির্বাসিত হেথা তুমি রাজার আদেশে !
পারি কি শুনিতে মাগো কারণ ইহার ?
সীতা। ক্ষম দেব, না পারিব কহিতে সে কথা।
বাল্মীকি। (স্বগতঃ ) দেখি যােগবলে, কি কারণে নির্বাসন
হইল ইহার।
(ধ্যানস্থ হইয়া অবস্থিতি।
হায় লােক-অপবাদ,
নাহি কিছু ধরাতলে অসাধ্য তােমার।
( প্রকাশ্যে ) বুঝিলাম যে কারণে এ দশা তােমার।
হায় মাতঃ, নাহি জানি কি হবে ইহার
প্রতিকার। চল সতি আশ্রমে আমার।
পালিব যতনে তনয়ার মত মেহে
থাক যত দিন।
বৃক্ষ তাত, গর্ভে মাের
রঘুবংশধর। না আছে প্রার্থনা অন্য,
নাহি আছে আর কোন সাধ এ জীবনে।
বাল্মীকি। কেন মা নিরাশ হও? ঋষি-পত্নীগণ
তনয়ার মত স্নেহ করিবে তােমায়,
পালিবে সন্তান তব বহু সমাদরে।
সীতা।

সীতা-নির্বাসন।
আসিবে সময় যবে বিধির বিধানে,
লইবেন রামভদ্র অপত্য তাহার।
কর শােক পরিহার চিন্তা অকারণ,
এসাে মা, পবিত্র কর আশ্রম আমার
| সকলের প্রস্থান
[ পটক্ষেপণ! ]
দ্বিতীয় অঞ্চ সমাপ্ত

তৃতীয় অঙ্ক
।
প্রথম দৃশ্য।
অযযাধ্যার মন্ত্রণা-ভবন।
রামচন্দ্র আসীন।
রাম। গগছে চলি তার পর কত সম্বৎসর,
যে দিন তেয়াগি হায়, অযযাধ্যাভবন
গেছে চলি কুললক্ষ্মী চিরদিনতরে।
শ্মশান অযােধ্যাপুরী রামের নয়নে
সেই দিন হ’তে সদা; যত মনে করি
ভুলে থাকি, কে যেন রে স্মৃতির দুয়ারে
সবলে আঘাত করে তত ; নবীভূত
হয় শােক, মনে জাগে সেই মুখখানি।
যত দিন দেহ নাহি হইবে অঙ্গার,
তত দিন স্মৃতি তার দহিবে হৃদয় ;
নীরবে সহিতে হবে সকল যন্ত্রণা।
কিন্তু হায়, কার দোষ ? রাজ্য-অধিপতি
রামের অদৃষ্ট-দোষ, কার দোষ দিব ?-
জানি অনাথা সেই অসহায় বালা,

সীতা-নির্বাসন।
কেঁদেছিল বক্ষে কত করাঘাত করি
‘হা নাথ হা নাথ’ বলি ঘাের বনমাঝে,
লক্ষ্মণ তেয়াগি যবে আইল চলিয়া।
কে জানে কি ঘটিয়াছে অদৃষ্টে তাহার ?
বুঝি সে সােনার কান্তি হিংস্র শ্বাপদের
নখাঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়েছে তখনি।
| প্রতিহারীর প্রবেশ।
প্রতিহারী । কুলগুরু বশিষ্ঠের সহ মন্ত্রিবর,
শত্রুঘ্ন লবণজয়ী, কুমার লক্ষ্মণ,
অপেক্ষা করিছে দ্বারে দর্শনের তরে।
রাম। আন শীঘ্র করি ।
[ প্রতিহারীর প্রস্থান।
( বশিষ্ঠ, শক্ৰ'গ্ন, লক্ষণ এবং মন্ত্রীর প্রবেশ।
শক্রয়। নমে পদে রাঘবেন্দ্র শত্রু তােমার।
ও পদ-প্রসাদে সবংশে করেছি নাশ
লবণ রাক্ষসে ; মথুরায় চিরশান্তি
করিছে বিরাজ।
বশিষ্ঠ।
নহে শুধু মথুরায় ;
আসমুদ্র গিরি, সর্বত্র সমানভাবে
শান্তি বিরাজিত। মহাসুখী প্রজাগণ।
রাম। আশীৰ্বাদ তব দেব।
লক্ষ্মণ। অধীন করদ রাজগণ, সকলের

তৃতীয় অঙ্ক।
A ran,
আকিঞ্চন, অশ্বমেধ-যজ্ঞ এবে হয়
অনুষ্ঠান ; আমাদেরাে বাসনা সবার।
রাম। তােমাদেরাে বাসনা সবার অশ্বমেধে ?
করিতে বাসনা পূর্ণতােমা সবাকার
সতত প্রস্তুত রাম, কর অনুষ্ঠান।
কিন্তু ভাই,
লক্ষণ।
কেন নীরবিলে, রঘুমণি ?
রাম। অশ্বমেধে বুঝি মাের নাই অধিকার।
শত্রু। রাজচক্রবর্তী তুমি ধরণীমণ্ডলে,
অশ্বমেধ-যজ্ঞে তব নাই অধিকার,
একি কথা?
রাম।
সস্ত্রীক হইয়া রাজগণ
করিবেন যজ্ঞ-অনুষ্ঠান, এ বিধান
শাস্ত্রের বিখ্যাত। কোথা ভাই পত্নী মম ?
লক্ষ্মণ। (স্বগতঃ) কি দারুণ সীতা-শােক দহিছে সতত
সীতানাথে, কে বুঝিবে বিনা সীতানাথ ?
মন্ত্রী। ক্ষম মােরে মহারাজ, বাসনা সবার
সস্ত্রীক হইয়া যজ্ঞ-অনুষ্ঠানে ব্রতী
হউন রাজন।
রাম। পুনঃ দারপরিগ্রহ ?
কি দোষ তাহায় ?
বিশেষতঃ পুত্রলাভ বংশরক্ষা তরে
বহু দারপরিগ্রহ শাস্ত্রের বিধান।
রাম। বংশরক্ষা? পুত্রলাভ? আছে ভ্রাতা মাের
মন্ত্রী।

৪
সীতা-নির্বাসন।
তিন জন, পুত্রলাভ করিয়াছে তারা,
পিতৃলােক জলপিণ্ড পাইবে সকলে,
বংশরক্ষা রাজ্যরক্ষা হইবে সকলি ।
আত্ম-সুখ রামচন্দ্র করে না কামনা,
ইন্দ্রিয়তৃপ্তির তরে দারান্তর কভু
গ্রহণ না করিবে সে এ জীবনে আর।
এ জীবনে আর কোন নারী, না হইবে
রাঘবের অর্ধাঙ্গভাগিনী।
লক্ষণ। (স্বগতঃ) হায় হায়, কোথা তুমি জনকনন্দিনি,
দেখে যাও তােমা বিনা কি দশা রামের।
(প্রকাশ্যে ) তবে দেব, রহিবে কি অপূর্ণ বাসনা
সকলের ?
রাম।
অন্য কোন উপায় ইহার
থাকে যদি কর তবে, কি বলিব আমি।
লােকরঞ্জনের তরে ধর্মপত্নী মাের
করিয়াছি পরিত্যাগ, হৃদয়ের আলাে
নিয়েছি চিরদিনতরে; কিন্তু ভাই,
রাখিতে লােকের কথা পুনরায় আমি
করিব না দারান্তরগ্রহণ জীবনে।
লক্ষ্মণ। কুলগুরাে, হয় না কি উপায় ইহার
আর কোন ? সর্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত তুমি,
দেখ ভাবি কিসে হয় যজ্ঞ-অনুষ্ঠান।
বশিষ্ঠ। নাই বৎস উপায় ইহার আর কোন।

তৃতীয় অঙ্ক।
ধৰ্ম্মপত্নী-সহ ধৰ্ম্ম আচরিবে লােক
শাস্ত্রের বিধান।
বৃথা কেন চিন্তা তবে,
অশ্বমেধ-যজ্ঞ-আশা কর পরিত্যাগ
ভাই লবণ-বিজয়ী।
শক্র। বিশ্রাম করুন আৰ্য্য, যাই মােরা এবে ;
স্মরিলে আসিব পুনঃ বিবরিতে পদে
লবণ-নিধনবাৰ্তা, মথুরা-কাহিনী।
{ রামচন্দ্র ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
রাম। রাজচক্রবর্তী আমি সবার উপর,
নাহি কেহ ধরাতলে আমার সমান
কহে সবে, ভাবে সবে এ জগতীতলে
নাহি আছে সুখী কেহ আমার মতন।
কিন্তু হায়, আমি দেখি দুঃখী মাের সম
বিধাতার সৃষ্টিমাঝে নাহি কেহ আর।
মুকুটমণ্ডিত শিরে কি দারুণ ব্যথা,
কে বুঝিবে মুকুট যে না ধরেছে শিরে।
দিবানিশি ভাবিতেছি পরের কারণ,
নাহি নিদ্রা নাহি শান্তি তিলেকের তরে ;
এই কি রাজত্ব ? এ যে দাসত্ব দুঃসহ।
কতকাল এ দাসত্ব করিব যে আর
নাহি জানি। উপযুক্ত হইলে কুমার,
সূৰ্য্যবংশনরপতি দিয়া রাজ্যভার
তার করে, ছিন্ন করি সংসার-বন্ধন,

৯৬
সীতা-নির্বাসন।
যায় চলি গৃহ ছাড়ি নির্জন কাননে,
পরমার্থ চিন্তাতরে, চিরন্তন প্রথা।
কিন্তু হায়, আমি বনে দিয়া গর্ভবতী
ধৰ্ম্মপত্নী মাের, স্বহস্তে সে আশাদীপ
করেছি নির্বাণ ।
( চিন্তা )
অশ্বমেধ ? হয় না কি যজ্ঞ-অনুষ্ঠান
স্থাপি যদি স্বর্ণময়ী সীতা-প্রতিকৃতি ?
জিজ্ঞাসি সবায়, হয় যদি আদেশিব
করিতে উদ্যোগ। প্রতিহারি,
; প্রতিহারীর প্রবেশ।
প্রতিহারী। কি আদেশ পালিব রাজন!
রাম।
ডাক পুনঃ
গুরুদেব আদি সবে, কুমার লক্ষ্মণে।
প্রতিহারী। যথা আজ্জা রাজরাজেশ্বর। | প্রতিহারীর প্রস্থান ।
রাম। ভ্রান্তি, ভ্রান্তি,-অমৃতের তৃষ্ণা, চাই আমি
মিটাইতে জলের ছায়ায়।
[ লক্ষণ প্রভৃতির পুনঃপ্রবেশ।]
লক্ষ্মণ। কি আদেশ পালিব এখন নরনাথ ?
রাম। গুরুদেব,
মাটীর প্রতিমা গড়ি, দেবত্ব আরােপি
পূজা তাহে করি নর লভে যদি ফল,
যজ্ঞাগারে স্বর্ণময়ী সীত-প্রতিকৃতি
স্থাপিলে কি নাহি হয় যজ্ঞ-অনুষ্ঠান ?

তৃতীয় অঙ্ক।
৯৭
রক্তমাংসময় দেহ কলঙ্কিত হয়
দেব, লােকের কথায় ; সুবর্ণ প্রতিমা,
কলঙ্ক না অর্শিবে তাহায়, মনে হয়।
বশিষ্ঠ। জানি মােরা নরনাথ, পরম পবিত্র
সীতাদেবী ; প্রতিমূর্তি স্থাপিয়া তাঁহার
নাহি হবে অশাস্ত্রীয় যজ্ঞ-অনুষ্ঠান।
রাম। তবে ভাই শত্রুঘ্ন লক্ষ্মণ, আয়ােজন
কর সবে মিলি।
দেশদেশান্তরে
করহ ঘােষণা এই, পারিবে যে শিল্পী
গড়িতে সীতার মূৰ্ত্তি অবিকল করি,
পুরস্কৃত করিব তাহায় যথােচিত।
যাব আমি অন্তঃপুরে লতিতে বিশ্রাম,
তােমরাও যাও সবে নিজ নিজ স্থানে।
[ রামচন্দ্র ব্যতীত সকলের প্রস্থান ।
হবে যজ্ঞ অনুষ্ঠান, আসিবে সকলে ;
আসিবে কিষ্কিন্ধ্যাপতি সুহৃদপ্রধান,
আসিবেন লঙ্কেশ্বর মিত্র বিভীষণ,
‘কোথায় জানকীদেবী’ জিজ্ঞাসিবে যবে,
কি দিব উত্তর আমি ? অঞ্জনানন্দন
সুধাইবে যবে মােরে সজলনয়নে
‘কোথায় জননী মাের জনক-নন্দিনী,
কি বলিয়া বুঝাইব তারে। যাই আজ,
সীতাশূন্য অন্তঃপুরে বহুদিন পরে।
[ প্রস্থান।
৭

তৃতীয় অঙ্ক।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
বাল্মীকির পােবন।
( গাহিতে গাহিতে লবকুশ ও ঋষি-
বালকগণের প্রবেশ।।
(গীত।)
ফুটেছে কাননে কত থরে থরে ফুল,
সাদা রাঙ্গা নীল পীত কি শোভা অতুল।
লতিকা প্রভাত-বায় হের দুলিছে,
আধফোটা কলিগুলি ধীরে ফুটিছে,
ফোটা ফুল তুলি আয় ছোঁবােনা মুকুল।
হাসি হাসি উষারাণী হের আসিছে,
সাড়া পেয়ে ডানা নেড়ে পাখী জাগিছে,
ঝােপের ভিতরে শীস দেয় বুলবুল।
১ম বালক। আয় কুশীলব তাড়াতাড়ি
ফুল তােলাটা সেরে,
পড়তে বসি
নৈলে ঋষি
গুড়ো করবেন মেরে।
লব। মারবেন কেন
পড়া যদি
দিতে পারি ভালাে,
পােড় বাে তখন ভাল করে
ফুটুকই ত আসল।

তৃতীয় অঙ্ক।
৯৯
খেলা করি
কুশ। আয় ততক্ষণ
ভাগীরথীর ধারে,
ছুটি আমি
দেখি আমায়
ধ’বৃতে কেবা পারে।
২য় বালক। এক দণ্ডে তােমরা দুই
শিখে ফেল যা,
মাথা ভেঙ্গে
সারাদিনে
পারি না যে তা।
ছুটতে যেয়ে হোঁচো খেয়ে
পড়ে যদি যাই,
হাত পা ভেঙ্গে
বুই পড়ে
আমি ওতে নাই।
কুশ। যেতেই হবে নৈলে তােকে
নিয়ে যাব টেনে,
জানিস সে দিন
কত শাস্তি
কথা না মাের মেনে।
(২য় বালকের হস্তধারণ }
২য় বালক। মলুম মলুম, গেলুম গেলুম,
ও কুশী-দা ছাড়।
পায় পড়ি তাের মাথার দিরি
ভেঙ্গে যে যায় হাড়।
কুশ। (হাত ছাড়িয়া) দিলুম ছেড়ে, আয় সকলে
আমার সাথে চলে,

সীতা-নিৰ্বাসন। ১ম বালক। হাত পা ধরে নৈলে ছুড়ে ফেবাে গাঙ্গের জলে। কুমীর মামা আছে সেথা ছেলে খাবার তরে, মাঝগঙ্গায় যাবে নিয়ে লেজের বাড়ি মেরে। অমন করে সদাই যদি লাগিস মােদের পিছে বলে দেব সকল কথা মা-জানকীর কাছে। না ভাই না ভাই, শুলে পরে এ সমস্ত কথা, চোখের জলে ভাসবেন তিনি মনে পাবেন ব্যথা। কাঁদতে তারে দেলে আমার কেমন করে প্রাণ, এই নে এগাে আচ্ছা করে, ম’লে দে মাের কাণ। আয় ভাই কুশী যাক ওরা সবে কুসুম চয়ন তরে, আমরা দুজন আয় ততক্ষণ খেলি ধনুঃশর করে। পাই যদি ভাই দেখিতে কাননে শাবকের সহ করী, নব।

তৃতীয় অঙ্ক।
ভল্লক বরাহ
বধিয়া মাতঙ্গ তীক্ষ্ণ শরাঘাতে
আনিব শাবক ধরি।
কেশরী শাৰ্দল
দেখিবারে যদি পাই,
বাণে কাটি পাড়ি ফেলিব দুজনে
আয় ভাই আয় যাই।
কুশ। কোথা ভাই আর কেশরী শাৰ্দল
আছে এই তপােবনে,
হের ওই সব
কুরঙ্গ-শাবক
ভ্ৰমিছে নির্ভয়মনে।
হিংস্র পশু হতে ঋষিবালকের
নাহি আর ভয় হেতু,
চল আজ যাই বাঁধি শরে শরে
গঙ্গার উপর সেতু।
লব। বেশ কথা ভাই চল গঙ্গাতীরে
করিব নুতন খেলা,
চল তাড়াগড়ি ফিরিতে হইবে
হ’তে অধিক বেলা।
[ উভয়ের প্রস্থান।
২য় বালক। দেখিনি ভাই বাপ জন্মে
এমন ষণ্ডা ছেলে,
ভেঙ্গেছিল
হাতখানা মাের
আর একটু হলে।

সীতা-নির্বাসন। ১ম বালক। সেদিন ভাই লবা ছেড়া বললে মােদের কাছে, ধর আমায় সব দেখি তােদের গায় কত বল আছে। দশ বার জন আমরা তখন ধলুম ভুয়ে পেড়ে, এক ঝাকানি দিয়ে সবা উঠে পােড় লাে তেড়ে। দাড়িয়ে উঠে বিষম জোরে দিলে একটা পাক, প’ড় লুম ছুটে এই দেখ ভাই বেঁকে গেছে নাক। তাও বলি ভাই ওরা যদি থাকে কাছে ভিতে, কারুর তরে বিন্দুমাত্র ভয় থাকে না চিতে। এই সেদিন ভাই বনে থেকে আতে ময়ূর-ছা, পাহাড় থেকে পিছলে পড়ে ভাঙ্গলো আমার পা। দৌড়ে দুভাই এসে কাছে তুলে নিলাে কোলে ; কত যত্ন কল্লে যে ভাই ভুবাে না তা মলে। ২য় বালক।

তৃতীয় অঙ্ক।
(নেপথ্যে সঙ্গীত।)
রামনাম গাও রে রসনা ;
ভক্তিভরে জলে সে নাম
শমনভয় আর থাকবে না।
১ম বালক। ওই শােন ভাই
আসছে ঋষি
প্রাতঃস্নানের তরে,
চল এখন সব ফুল কুড়িয়ে
স’রে পড়ি ঘরে।
[ ঋষিবালকগণের প্রস্থান।
( নেপথ্যে) হরে রাম, হরে রাম, হরে রাম।
[ বাল্মীকির প্রবেশ।
বাল্মীকি। এতদিনে সার্থক হইল পরিশ্রম ;
কত দীর্ঘ দিন ধরি রামের চরিত
পুণ্যময়, রচিয়াছি করিয়া যতন ;
কিন্তু এত দিন গায় নাই কেহ তাহা,
শুনি নাই পরাণ ভরিয়া। কি সুকণ্ঠ,
কি মেধাবী, কি সুন্দর নয়নরঞ্জন
শিশু দুটী ; বীণার ঝঙ্কারে গায় যবে
রামের চরিত সুললিত, স্তব্ধ হয়
কাননের পশুপক্ষিগণ, স্থির হয়
জাহ্নবীর লহরী চঞ্চল, বরষণ
করে পুষ্প গগন হইতে দেবগণ।
কিন্তু কত দিন আমি রাখি বা এ ভাবে

১০৪
সীতা-নির্বাসন।
আর কুমার দু’টীরে। জানেনা ইহারা
কার পুত্র, কোন বংশে জন্ম ইহাদের।
বার বার জিজ্ঞাসে আমায় কত ভাবে,
পারি উত্তর দিতে, কত মত ছলে
রাখি ভুলাইয়া, কিন্তু পারি না ত আর ।
কত দিন থাকে বহ্নি ভস্মে লুকাইয়া ?
কি করি উপায় কিছু ভাবিয়া না পাই।
কভু মনে করি, ল’য়ে যাই অযযাধ্যায়,
দেই পরিচয় করি পিতার সহিত।
কিন্তু ভয় হয়, কি জানি যদ্যপি রাম
করে প্রত্যাখ্যান, কি হবে কি হবে তবে ?
শুনিলে সে কথা হায় মায়ের পরাণে
বাজিবে বিষম শেল ; সে দারুণ ব্যথা
নারিবে সহিতে কভু জনক-নন্দিনী,
ভাঙ্গিবে হৃদয় তার, ঘটিবে বিপদ।
কাজ নাই, থাকিব নীরবে কিছুদিন ;
অবশ্য সুযােগ বিধি দিবেন করিয়া
যথাকালে। যা’ দিন এই ভাবে এবে।
[ প্রস্থান ।

তৃতীয় অঙ্ক।
তৃতীয় দৃশ্য।
অযােধ্যার রাজসভা।
জনৈক কর্মচারীর প্রবেশ।
‘কারী। ন্য শিল্পী গড়িয়াছে সীতার মুরতি,
সেই মুখ, সেই চক্ষু, সেই অবয়ব,
সেই স্নেহময় ভাব বদনমণ্ডলে।
না জানি কি হবে মনে অযােধ্যাপতির
হেরিবেন যবে তিনি সে স্বর্ণ-প্রতিমা।
হায় রে, থাকিত যদি শকতি আমার
সঞ্চারিতে ধাতুময় মূর্তিতে চেতনা,
এখনি জীবন্ত করি সে স্বর্ণ-প্রতিমা
দিতাম অযােধ্যানাথে, সুমিত্রানন্দনে।
[ রাম, লক্ষণ, বশিষ্ঠ প্রভৃতির প্রবেশ।
রাম। বল ভদ্র, কি সংবাদ আনিয়াছ তুমি ?
কর্মচারী। আনিয়াছি স্বর্ণময়ী সীতাপ্রতিকৃতি,
অপেক্ষা করিছে শিল্পী রাজার আদেশ ;
কোথায় রাখিব দেব চাই অনুমতি।
রাম। যাও ভাই লক্ষ্মণ সুমতি, রাখ যত্নে
সে প্রতিমা অন্তঃপুরমাঝে সাবধানে,
যতদিন যজ্ঞাগার না হয় নির্মাণ।

সীতা-নিৰ্বাসন।
রাম।
যাও ভদ্র, কহ শিল্পীবরে, পুরস্কৃত
করিব তাহারে যথাকালে।
যথা অনুমতি।
(লক্ষ্মণ ও কর্মচারীর প্রস্থান
প্রেরিয়াছিলাম লােক
দেশদেশান্তরে গুরুদেব, বলে সবে
গােমতীনদীর তীরে নৈমিষকানন
এ মহাযজ্ঞের তরে উপযুক্ত স্থান।
তাই দেব দিয়াছি আদেশ, আয়ােজন
করিতে তথায় ; ভরত শত্রুঘ্ন দেহে
গিয়াছে সেখানে, যজ্ঞশালা পান্থশালা
করিতে নির্মাণ। আসিবে ত্রিলােকবাসী
যজ্ঞ দরশনে , যথাযােগ্য বাসস্থান
সকলের তরে নিৰ্মাইতে হবে শীঘ্র
দিয়াছি আদেশ। অট্টালিকা পট্টাবা
যাহা কিছু প্রয়ােজন সকলি হইবে।
মন্ত্রিবর, জানাইও কর্মচারিগণে
জনে জনে, রাজার ভাণ্ডার মুক্ত সদা
তাহাদের করে, অভাব কাহারাে যে-
নাহি হয় কিছু।
কাহারে প্রেরিব দেব
নিমন্ত্রণ তরে ?
যাইবে কুমারগণ,
প্রতিনিধিরূপে মাের নিমন্ত্রণ তরে।
মন্ত্রী।
রাম।

তৃতীয় অঙ্ক।
vann.
আমিও সত্বর যাব পরিজনসহ
নৈমিষকাননে।
[ জনৈক প্রতিহারীর প্রবেশ।]
প্রতিহারী। নমি পদে রাঘবেন্দ্র, সৈনিক জনেক
নিয়ােজিত যজ্ঞ-অশ্ব রক্ষণের তরে
অনুমতি মাগিতেছে রাজ-দরশন।
রাম। আন তারে প্রতিহারি, যাও ত্বরা করি।
[ প্রতিহারীর প্রস্থান।
(স্বগতঃ) ঘটিল কি বিরোেধ কাহারাে সনে?
[ প্রতিহারী ও সৈনিকের প্রবেশ।]
কি সংবাদ হে সৈনিক, বল শীঘ্র করি,
কি কারণ বল শুনি আইলে ফিরিয়া ?
সৈনিক। কুমার-আদেশে আসিয়াছি আমি দেব,
জানাইতে রাজপদে অশ্ব-সমাচার।
বিপ্ন বাধা কিছু নাই সকলি কুশল ;
ছুটিছে তুরঙ্গবর গ্রীবা বক্র করি
তুষারধবল-কান্তি জয়-পত্ৰ শিরে,
পিছে পিছে রঘুসৈন্য অমিতবিক্রম
চন্দ্রকেতুসহ রঙ্গে চতুরঙ্গদলে।
রাম। ধরিবে কি অশ্ব কেহ, হবে কি সমর
কারাে সনে? বল যদি থাকে সম্ভাবনা,
করিব উপায় তার এখন হইতে।

১০৮
সীতা-নির্বাসন
সৈনিক। কার সাধ্য রােধে তারে এ তিন ভুবনে ?
রঘুসৈন্য রক্ষিত সে ছুটিছে অবাধে।
রাম। শান্ত তুমি যাও এবে লভ গে বিশ্রাম।
[ সৈনিকের প্রস্থান।
গুরুদেব, করিয়াছি আয়ােজন যাহা
এ যজ্ঞের তরে সব, দেখুন বিচারি
হবে কি না যথােচিত ; থাকে যদি দেব,
আরাে কিছু করিবার, করুন আদেশ।
আসিছেন মিত্রবর কিষ্কিন্ধ্যার পতি,
আসিছেন রক্ষঃশ্রেষ্ঠ লঙ্কার ঈশ্বর
বিভীষণ সৈন্যসহ। করিয়াছি মনে,
দিব ভার সুগ্রীব মিতায় পরিচর্যা
করিবার ব্রাহ্মণসকলে, ঋষিগণে
সেবিবেন মিত্র বিভীষণ ; সমাগত
রাজগণে করিবেন সেবা, ভ্রাতুস্পুত্র
ভাতৃগণ মিলিয়া সকলে। নৃত্যগীত
আমােদআদ যাহা কিছু প্রয়ােজন
সকলি হইবে
বশিষ্ঠ। অরুন্ধতী পরিচৰ্য্যা ঋষিপত্নীগণে
করিবেন হে রাজন, দেবর্ষি মহর্ষি
আসিবেন যত, সেবিব সকলে আমি
শিষ্যগণসহ। নির্বিঘ্নে নির্বাহ হবে
মহাযজ্ঞ তব।
রান। কৃতার্থ হইনু দেব, কি আর বলিব

তৃতীয় অঙ্ক।
১০৯
রঘুবংশ চিরদিন তােমার আশ্রিত,
নাহি চিন্তা থাকে যদি আশীর্বাদ তব।
বশিষ্ঠ। সত্যপথে ধৰ্ম্মপথে ন্যায়পথে তুমি
চলিতেছ চিরদিন, পালিছ প্রজায়
অপত্যের মত মেহে, না ঘটিবে কিছু
বিঘ্ন-বাধা তব যজ্ঞে জানিও নিশ্চয়।
যাই আমি আয়ােজন তরে।
[ বশিষ্ঠের প্রস্থান।
রাম। যাই অন্তঃপুরে, দেখিগে নয়ন ভরি
সীতার মূরতি আজ বহুদিন পরে,
যে মূৰ্ত্তি হৃদয়-মাঝে দিবস-রজনী
জাগিতেছে নিরন্তর। হতভাগ্য আমি,
তা না হলে আজ জনকনন্দিনীসহ
যজ্ঞ-অশ্বমেধে, মহােৎসবে মহােল্লাসে
হইতাম ব্ৰতী, যজ্ঞ-অশ্ব পুত্র মাের
যাইত রক্ষিতে ;—কিন্তু হায় নহে তাহা
ইচ্ছা বিধাতার।
(চিত্তা)
পুরস্কৃত করিব শিল্পীরে, হয়ে থাকে
মূৰ্ত্তি যদি সে মূর্তির মত।
[ প্রস্থান।

সীতা।
তৃতীয় অঙ্ক।
চতুর্থ দৃশ্য ।
বাল্মীকির আশ্রম।
[ একাকিনী সীতা উপবিষ্টা।]
প্রখর তপন-তাপে তপ্তা বসুমতী,
বহিতেছে সমীরণ রহিয়া রহিয়া
অগ্নিময় ; গগনবিহারী পক্ষিগণ
শিয়াছে নীড়ে সবে শাবকের সহ ।
গাভীগুলি বৎসসহ পাদপ-ছায়ায়
করিতেছে রােমন্থন নয়ন মুদিয়া ;
বরাহ মহিষদল পম্বল-মাঝারে
অবগাহি সবে ঘন ছাড়িয়ে নিশ্বাস ;
স্তব্ধীভূত জীব-জন্তু করিছে বিশ্রাম
এতক্ষণ লবকুশ রহিল কোথায় ?
যে দুরন্ত শিশুদুটী, সদা ভয় মনে
কবে কি বিপদে পড়ে অনর্থ ঘটায়।
হায় রে, বুঝিতে যদি পারিত সন্তান,
কি করে মায়ের প্রাণ সন্তানের তরে,
যতক্ষণ চাদমুখ না হেরে নয়নে,
[ লবকুশের প্রবেশ।
কোথা মা কোথা মা তুমি এসেছি আমরা।
চল মা কুটীরমাঝে করিব বিশ্রাম।

তৃতীয় অঙ্ক।
১১১
সীতা। কোথা ছিলে এত ক্ষণ প্রাণের দুলাল ?
মলিন সােনার কান্তি, বিশুষ্ক বদন,
স্বেদজলে ভাসিতেছে প্রসন্ন ললাট,
বহিছে নিশ্বাস ঘন ঘন, বক্ষঃস্থল
হ’তেছে কম্পিত। কোথা ছিলে এত বেলা
ছাড়িয়া মায়েরে ? এসাে বােসস। দুই ভাই
নিকটে আমার, অঞ্চলে বীজন করি
স্নিগ্ধ করি দেহে। ( অঞ্চলদ্বারা বীজন।)
ক্রীড়াছলে গিয়েছিলে আজি বহুদূরে,
তাই বুঝি মায়ে ভুলে ছিলে এত বেলা ?
লব। জাহ্নবীর পরপারে গিয়াছিনু মােরা।
। তা। কোন্ প্রয়ােজন ছিল পরপারে যেতে ?
তােমাদের প্রয়ােজন যাহা, সকলি ত
আছে এই পারে ।
শুনিলাম জননি গাে,
আসিয়াছে পরপারে অশ্ব মনােহর ।
দেখি নাই তপােবনে অশ্ব কোনাে দিন,
ঋষি-বিরচিত গ্রন্থে পড়িয়াছি শুধু,
গিয়াছিনু তাই মােরা তুরঙ্গ দেখিতে।
সীতা। (স্বগতঃ) রাজপুত্র দেখে নাই অশ্ব কোনাে দিন।
(প্রকাশ্যে) কেমন দেখিলে অশ্ব বল দেখি শুনি?
শব। দেখিলাম বহু অশ্ব বহু সৈন্যসহ,-
সীতা। কিসের কারণে বহু অশ্ব বহু সৈন্য
এলাে এই দেশে, কিছু পার কি কহিতে ?

১১২
সীতা-নির্বাসন।
লব। এসেছি জানিয়া সব কথা; শােনাে বলি।
শ্বেতবর্ণ অশ্ব এক অতি মনােহর
ছুটিতেছে বায়ুবেগে ; ললাটে তাহার
বাঁধা আছে জয়পত্র, না আছে আরােহী,
ধনুর্ধারী অশ্বারােহী পশ্চাতে তাহার
কত যে আসিছে মাগাে না পারি কহিতে,
শুনিলাম অশ্ববর রক্ষণের তরে।
সীতা। বুঝি কোন নরপতি হয়েছেন ব্রতী
অশ্বমেধ-যজ্ঞতরে, তাহারি তুরঙ্গ।
শ। হাঁ মা, তাই, শুনিলাম সেনাদল কাছে,
অশ্বমেধ-যজ্ঞে ব্ৰতী অযযাধ্যার পতি।
সীতা। (অন্যমনস্কভাবে স্বগতঃ )
অশ্বমেধ-যজ্ঞে ব্ৰতী অযযাধ্যার পতি?
লব। অশ্বভালে জয়পত্র পড়িনু যখন,
বড় রােষ উপজিল হৃদয়ে জননি,
ইচ্ছা হােলাে রঘুসৈন্য ভস্মীভূত করি
শানলে, তুরঙ্গম আনি তপােবনে।
এত স্পর্ধা এত দম্ভ অসহ পরাণে।
কিন্তু মা নিষেধ তব করিতে বিরােধ
কারাে সনে, তাই ফিরি আইলাম মাের।
সী। (স্বগতঃ ) হায় হায়, পিতাপুত্রে বাধিত সমর,
সব কুশ যদি আজ তুরঙ্গ ধরিত;
কি হােত তাহলে আমি না পারি ভাবিতে।
কেন মা বিমনা তুমি হও বার বার ;

তৃতীয় অঙ্ক।
করেছি কি আমরা মা হেন অপরাধ,
যার লাগি হইয়াছ বিষাদিত এত ?
কৌতুহলবশে গিয়াছিনু বহুদূরে
তুরঙ্গ দেখিতে, আসিতে হয়েছে বেলা,
ক্ষম তার তরে ; আর কভু নাহি যাব
বলি তােমায় কোন স্থানে।
সীগ। সেই ভাল, শ্রান্ত এবে লভহ বিশ্রাম।
{ উভয়কে বীজন ও অলক্ষ্যে বাল্মীকির প্রবেশ।
বাল্মীকি। (স্বগতঃ )
মরি কি অপূৰ্ব্ব শােভা, হের রে নয়ন!
স্নেহময়ী মূর্তিমতী বিশ্বমাতা যেন
আবিভূত তপােবনে হয়েছে আমার।
সংসার-সম্বন্ধশূন্য আমি যে তপস্বী,
আমারে নয়নে যদি উঠে উছলিয়া
এ দৃশ্য নেহারি অশ্রু, কি আশ্চর্য্য তবে
মায়ার বন্ধনে বদ্ধ সংসারী-মানব
এ মােহের ঘােরে ঘােরে দিবসমিনী।
কিন্তু,
কেন এত বিষাদিতা ধরিত্রী-সুতায়
হেরি আজ, যাই দেখি জিজ্ঞাসি কারণ।
( প্রকাশ্যে ) বসিয়াছ লবকুশ অধিকার করি
মাতৃক্রোড়, নাহি স্থান আমার লাগিয়া ?

১১২
সীতা-নিৰ্বাসন।
এ কেমন জননি গাে, ভালবাসা তব ?
আমি কি সন্তান নই ? আমার লাগিয়া
নাই কি ও ক্রোড়ে তব এতটুকু স্থান?
ছােট বড় সকল সন্তান জননীর
ভালবাসা জননীর স্নেহ, সমভাবে
পাইবার আশা করে সদা, কিন্তু মা গাে,
হেরি সদা কনিষ্ঠ উপরে সমধিক
স্নেহ যেন হয় জননীর। যাই আমি,
লব। যাও চলি যথা ইচ্ছা, দিব না হেথায়
মােরা বসিতে তােমায়।
সীতা। বড়ই অশিষ্ট হইতেছে দিন দিন
লবকুশ মাের। জাহ্নবীর পরপারে
গিয়াছিল আজি অশ্ব দেখিবার তরে
না বলিয়া মােরে, এখনি আইল ফিরি।
বাল্মীকি। (স্বগতঃ) তবে বুঝি শুনিয়াছে জনক-নন্দিনী
অশ্বমেধ-যজ্ঞবার্তা অযােধ্যাপতির।
দেখি অন্য কথা তুলি রাখি ভুলাইয়া।
( প্রকাশ্যে ) গাইয়াছ শবকুশ জননীর কাছে
অশােক-কানন-গাথা শিখিয়াছ যাহা ।
লব। শুনিবে কি জননি গাে, শুন যদি গাই,
অতি সুমধুর গীত শিখিয়াছি মােরা।

তৃতীয় অঙ্ক। ১১৫ সীতা। গাও শুনি। (লবকুশের গীত।) গাও গাও বীণে ললিত কণে জানকীর দশা অশােকবনে ও। দারুণ হিমঋতু তুষার বরষে যবে অর্ধ অনাবৃত দেহ ও ; কাঁপে থরথরি হাসে চেড়ীদল, করে সন্তাষা কেহ ও। নিদাঘ-তপন-তাপে তপ্ত সমীরণ আগুন বহি যবে যায় ও ; দগ্ধ অঙ্গলতা জনক-রাজসুতা মুচ্ছিতা ভূতলে লােটায় ও। বরষগমে যবে শাওন ঢালে ধারা নাহি বিরাম দিনরাতি ও, সে ধারা সহমিশি সতীর নয়নধারা বহি যায় প্লাবিয়া ক্ষিতি ও। সীতা। যাও বৎস, যাও এবে লভগে বিশ্রাম। [ লবকুশের প্রস্থান। শুনিলাম আজ তাত, লবকুশ মুখে, অশ্বমেধ-যজ্ঞে ব্ৰতী অযযাধ্যার পতি ? বাল্মীকি। হাঁ বৎসে, প্রকৃত যাহা শুনিয়াছ তুমি। সীতা। শাস্ত্রের বিধান দেব, শুনিয়াছি আমি পত্নী বিনা নাহি হয় যজ্ঞ-অনুষ্ঠান? বাল্মীকি। (স্বগতঃ) হায়, পতিগতপ্রাণা, বুঝিলাম আমি যে কারণে বিষাদিতা জনক-দুহিতা।

১১৬
সীতা-নিৰ্বাসন।
(প্রকাশ্যে ) তাই বৎসে, শাস্ত্রের বিধান, পত্নীবিনা
নাহি হয় যজ্ঞ-অনুষ্ঠান।
সীতা।
তবে কি ?
বাল্মীকি। সুবর্ণে নিৰ্মাণ করি মূরতি তােমার,
যজ্ঞাগারে রঘুনাথ স্থাপিয়াছে তাহা ;
বামে রাখি স্বর্ণ-সীতা সস্ত্রীক হইয়া
যজ্ঞ করিবেন রাম হইয়াছে স্থির।
বিস্তীর্ণ নৈমিষারণ্য যােজন যােজন,
এ যজ্ঞের আয়ােজন হইয়াছে সেথা।
অট্টালিকা পটাবাসে পূর্ণ বনস্থলী ;
শত শত তড়াগ, দীর্ঘিকা, রঙ্গভূমি
ক্রীড়াভূমি হয়েছে নির্মিত। ত্রিভুবনে
নিমন্ত্রণ হয়েছে সবার ; শিষ্যসহ
হইয়াছে আমারাে আহ্বান যজ্ঞস্থলে।
সীতা। যাইবেন শিষ্যসহ আপনিও তবে ?
বাল্মীকি। হাঁ বৎসে, যাইব আমি করিয়াছি মনে।
সীতা। লবকুশ কি করিবে, যাবে কি তাহারা ?
বামীকি। দেখ ভাবি; অভিপ্রায় হয় যদি তব,
লবকুশে লব সঙ্গে করি। জিজ্ঞাসিও
লবকুশে কি বলে তাহারা। যাই আমি
দেখা পুনঃ করিব সত্বর।
[ বাল্মীকির প্রস্থান
সীতা। কে বলে অভাগী সীতা, ধন্যা নারীকুলে।

১১৭
তৃতীয় অঙ্ক
হেন স্বামী এ সংসারে কোন রমণীর ?
হায় নাথ, গড়িয়াছ প্রতিমূৰ্ত্তি মাের
স্বর্ণ দিয়া, মহাযজ্ঞ নির্বাহের তরে।
সীতার মূরতি নাথ, অন্তরে তােমার
জাগিতেছে দিবানিশি, দহিছে তােমায়
দিবানিশি সীতা-স্মৃতি সীতার বিরহ।
কি করিবে তুমি নাথ, কি করিব আমি ?
তােমার যন্ত্রণাতরে জনম সীর।
হে বিধাতঃ, পুনঃ যদি নারীজন্ম হয়,
পাই যেন স্বামী তারে জন্ম-জন্মান্তরে,
আছে প্রার্থনা অন্য না আছে কামনা।
( চিন্তা।)
কিন্তু লবকুশ,-কি করিবে লবকুশ ?
দিব ভার ঋষির উপর ; যাহা ইচ্ছা
করিবেন তিনি।
[ প্রস্থান।

তৃতীয় অঙ্ক। পঞ্চম দৃশ্য। নৈমিষকাননাভিমুখী পথ। { বিপ্ৰবন্ধু, রত্নদাস ও বাহকের প্রবেশ।] বিপ্ৰ। আহা হা ভায়া, স্থানটী অতি রমণীয়; এসাে, এই খানে উপ- বেশন করে কিঞ্চিৎকাল বিশ্রাম করা যাক। রত্ন। হাঁ,—কিছু পরিশ্রান্ত হওয়া গেছে বটে। স্থানটীও জলে স্থলে সকল বিষয়ে ভাল, আসুন বসা যাক। ( সকলের উপবেশন।) বি। আচ্ছ৷ ভায়া, নৈমিষারণ্যের যজ্ঞ-স্থানটা আর কতদূর হবে, বলতে পার কি ? রত্ন। কি করে বােল্বাে? আমি ত জীবনে কখনাে বিদেশে যাইনি, সেটা বরং ঠাকুরদা আপনার বিলক্ষণ অভ্যাস আছে। বি। আরে ভায়া, আমি কি আর বনে জঙ্গলে গিয়ে থাকি ? বাব- ভালুকে কি আর ব্রাহ্মণ-ভােজনের দক্ষিণা দেয় ? আমি যাই লােকালয়ে, যেখানে কিঞ্চিৎ প্রাপ্তির আশা আছে। রত্ন। এই না শুনতে পাই, আপনি তীর্থদর্শনের জন্য দেশপৰ্যটন করেন। নৈমিষারণ্যও ত একটা পবিত্র তীর্থস্থান। বি। তুমি ও যেমন ভায়া, ওটা একটা কথার কথা। লােকের কাছে ব’লে যাই বটে যে তীর্থদর্শনে যাচ্ছি, ভিক্ষাবৃত্তি যে ভাল, তা ত নয় ;-কাজেই বার বার ঐ কথাটা বলে

তৃতীয় অঙ্ক।
বেরিয়ে পড়তে একটু লজ্জাও বােধ হয়। তাই বলে যাই,
তীর্থদর্শনে যাচ্ছি, কিন্তু আসলটা যাই—অর্থান্বেষণে।
রত্ন। ।
তা যা’ এখন ওসব কথা বলি ঠাকুরদা, এই যে মহারাজ
যে ভাবে যজ্ঞ করবার ব্যবস্থাটা করেছেন, এটা কি ঠিক
শাস্ত্রসঙ্গত হচ্ছে ?
বি। কি ভাবটা, এ
এ—একটু বুঝিয়ে, এ–একটু পরিষ্কার করে
বল দেখি।
রত্ন। এ-এই যে সস্ত্রীক হবার জন্যে সােণার সীতা গড়িয়েছেন,
এটা কি ঠিক হয়েছে ?
বি। অপেক্ষা কর, একটু চিন্তা করে দেখি।
রত্ন। এর আর চিন্তা করবেন কি ? এ তাে চিন্তার বিষয় কিছু নয়।
শাস্ত্রে এরূপ বিধান আছে কি না, তাই জিজ্ঞাসা কচ্ছি।
বি। শাস্ত্র বিষয়টা,-বুঝলে ভায়া, অর্থাৎ-অতি কঠিন ; আর
যেমন কঠিন তেমনি ব্যাপক। চিন্তার প্রয়ােজন আছে বৈ
কি ভায়া, চিন্তার প্রয়ােজন আছে বৈ কি।
(স্বগতঃ) শাস্ত্রে অধিকার ত আমার যথেষ্ট,—এখন বলি কি ?
রত্ন। আজ্ঞে, তা বিবেচনা করেই বলুন।
বি। এটা ভায়া, আমার ঠিক্ শাস্ত্র-সঙ্গত বলে মনে হচ্ছে না।
রত্ন। আজ্ঞে, হেতুটা শুনতে পাই কি ?
বি। আরে, এত অতি সহজেই বুঝতে পার। মনে করে দেখ,
যে স্ত্রীকে একবার দুশ্চরিত্রা-জ্ঞানে পরিত্যাগ করা হােসল,
আবার তারই প্রতিমূর্তি গড়িয়ে তাকে ধৰ্ম্মপত্নীস্থলে স্থাপনা
করে নেওয়াটা কি সঙ্গত হচ্চে?
;

সৗ-নির্বাসন।
রত্ন। আজ্ঞে, মহারাজ ত তাকে দুশ্চরিত্রা বলেন না, তিনি জানেন
সীতাদেবীর চরিত্র নিষ্কলঙ্ক। তবে দশজনে বলে, তাই
তিনি লােক-রঞ্জনের জন্যই তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন।
লােক-রঞ্জনটা রঘুকুলের চিরন্তন রাজধৰ্ম্ম কি না ?
বি। আরে রেখে দাও ভায়া, ওটা একটা কথাই নয়। কথায়
বলে ‘যা রটে, তা বটে'। কথাটা যদি একেবারেই মিথ্যা
হােততা, তা হলে তিনি হচ্চেন দেশের রাজা, সবাইকে
একটু শাসন করে দিলেই ত পারতেন! তা না করে
নিজের স্ত্রীকে একেবারে কি না বনবাসে দিয়ে ফেলেন।
ভিতরে একটা কিছু না থাকলে কি আর অতটাই করে
বসেন ভায়া ?
রত্ন। ত হলে ঠাকুরদা, এই এতদিন হ’ল সীতাদেবীকে বনবাসে
দিয়েছেন, আর ত মহারাজ দারান্তর গ্রহণ কল্লেন না।
বড় রাজ্যের অধীশ্বর, এত ঐশ্বৰ্য্য, এত বৈভব, বয়সটাও
আপনার মত এত অধিক হয় নি?
বি। আঁ, কি বােলছাে, আ-আমি বুড়াে?
রত্ন। আজ্ঞে না, বুড়াে আপনাকে কে বলছে ; বলি আপনার চেয়ে
বােধ হয় তিনি বয়সে কিছু ছােট,
বি। হা,–তা—কিছু ছােট হতে পারেন। কি জান ভায়া,
মােহ,মােহ। কি একটা মােহ মহারাজকে ঘিরে রয়েছে,
সেটাকে এতদিন কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পাচ্ছেন না, তাই
একটা কিছু মনে করে বসে আছেন। রাজ-রাজড়ার কাণ্ড,
কি করে বলি বল ?
রত্ন। আচ্ছা, ধরুন ঠাকুরদা, সত্যি সত্যি যদি সীতাদেবী নিস্পাপ
•
ন

তৃতীয় অঙ্ক।
নিষ্কলঙ্ক হন, তবে কি তাকে বনবাসে দেওয়াটা ভাল
হয়েছে ?
বি। হাঁ—তা-ভাল হয়েছে কি না কথাটা বলা বড় শক্ত।
আর,-মন্দই বা কি করে বলি ; কথাটা যখন র’টেছে,
রত্ন। আরে কথাটা একটু নিজের উপরে নিয়েই বুঝুন না। এই
মনে করুন, যদি আপনার প্রতিবাসী দশজন ঠান্‌দিদি সম্বন্ধে
একটা মিথ্যা কলঙ্ক রটনা করে,
বি। কি,-কি বল্লি, বেটা বেল্লিক, বেটা মুখ, অৰ্বাচীন, বেটা
অধম, অপকৃষ্ট, জঘন্য,
রঙ্গ। আজ্ঞে, ক্ষমা করুন, বলি কথার কথা, সত্যি সত্যি নয়, ধরুন
যদি এই রকম,
ফের, ঐ কথা বলবি ?-বেটা নীচ, ইতর, পামর ; বেটা
পাষণ্ড, নরাধম, হেয়; বেটা দুরাচার, দুষ্ট, দুঃশীল ;-এদের
জিব, কেটে ফেলা উচিত, তুষানল ব্যবস্থা, তুষানল ব্যবস্থা।
রত্ন। আজ্ঞে আমিও ত তাই বলছি, যারা এরকম অনর্থক লােকের
কুৎসা করে বেড়ায়, জিব কেটে ফেলাই তাদের উচিত
শাস্তি।
এত বড় আস্পর্ধা, যা মুখে আসছে তাই বলছ! ব্রাহ্মণের
প্রতি এমন কটুবাক্য, ব্রাহ্মণের অপমান!
রত্ন। ঠাকুরদা চটলেন না কি? তবে আমি এইখান হতেই বিদায়
হই। আপনি আপনার পথ দেখুন।
=
বি।
বি।
[ জনৈক পথিকের প্রবেশ।]
কি হে বাপু, তুমি কোথেকে আসছ ?
বিঞ্জ।

১২২
সীতা-নিৰ্বাসন।
বি।
পথ। আজ্ঞে, এই নৈমিষারণ্য হ’তে আসছি।
রত্ন। ফিরে এলে যে, বড় সুবিধা বােধ হচ্চে না বুঝি ?
পথি। বলেন কি মশাই ? এমন কোন দিন হয় নি, হবেও না।
বি। কি রকম, কি রকম, এ-একটু বলে ফেল দেখি।
পথি। কি বলব ঠাকুর মশাই, সে বলবার যাে নেই। যা আয়ােজন
উদ্যোগ হয়েছে, এ ত্রিসংসারের লােক চৌদ্দপুরুষ বসে
খেলেও ফুরুতে পারবে না।
দধির সরােবর, ক্ষীরের
দীৰ্ষিকা, নবনীতের পাহাড়,
আহা-হা, বাপু, আর বােলােনা—আর বােলােনা; রসনায়
সলিল-সঞ্চার হচ্চে। (স্বগতঃ ) ব্রাহ্মণীকে না এনে বড়
অন্যায় করা হয়েছে, কি করা যায় ?
রত্ন। আচ্ছা বাপু, ব্রাহ্মণভােজনের দক্ষিণাদির ব্যবস্থা কি রকম
হবে, কিছু বুঝতে পারূলে ?
পথি। যার যেমন ইচ্ছা, মহারাজ মুক্তহস্ত। আর শুনলুম ঠাকুর
মশাই, আপনাদের আহারাদির ও বিদায়ের ভার কিষ্কিন্ধ্যা-
পতি সুগ্রীব আর তার অনুচরগণের উপর। আর তারাও
সব এসে পৌঁছেছেন।
বিপ্র। এ-এ-এ তবেই হয়েছে,—সব মাটীরে সব মাটী।
পথি। আজ্ঞে, না ঠাকুর মশাই, কিছুই মাটী নয়। অতি সুব্যবস্থা
হয়েছে ; কোন একটা দ্রব্যের প্রয়ােজন হলে, তিন
লক্ষ্যে তা’ এনে উপস্থিত করে দিচ্ছে। এমন ক্ষিপ্রহস্ত,
ক্ষিপ্রপদ,-
র। লাঙ্গুলের ক্ষিপ্রতাটা কিরূপ উপলব্ধি কল্লে ?

তৃতীয় অঙ্ক।
}
?
পথি। সেটার ব্যবহার এ পর্যন্ত হয় নাই, আপনারা সকলে গিয়ে
উপস্থিত হলে কি হবে বলতে পারি না।
বি। বলি বাপু, ঋষিগণ ব্রাহ্মণগণ সব এসে পৌঁছেচেন কি
পথি। আজ্ঞে, কেবল আসতে আরম্ভ করেছেন মাত্র। স্থানের
অভাব নাই, অভাব হবার কোন সম্ভাবনাও নাই।
বি। আরে না হে না, সে কথা নয়।
বলি স্বর্ণসীতা-সম্বন্ধে
কোন কথা শুনতে পেলে কি ?
পথি। স্বর্ণ-সীগ সযত্নে যজ্ঞাগারে রক্ষিত হয়েছে। এখন সাধারণকে
দেখান হচ্ছে না।
বি। কি জ্বালা, তা নয় তা নয়। বলি সে সম্বন্ধে,—তা যাক,
আমাদের তাতে কি এসে যায়।
সে ত আর সত্যি সত্যি
মানুষ নয়, ধাতুমূৰ্ত্তিমাত্র, তাতে আর কি দোষ হতে পারে?
আর হ'লেও, যিনি যজ্ঞ করছেন তারই পক্ষে প্রত্যবায়,
আমাদের কি ? বিদায়টা বিবেচনামত হলেই হলাে। তবে
সেটার সম্বন্ধে যদি অবিবেচনার কোন সম্ভাবনা দেখি,
আমরাও এটা নিয়ে একটা গােযােগ বাধিয়ে তুলবে।
রত্ন। (স্বগতঃ) আহা, ঠাকুরদার কি মহান্ নিঃস্বার্থ ভাব।
( প্রকাশ্যে পথিকের প্রতি) বলি বাপু, আমােদপ্রমােদের
কিরূপ ব্যবস্থা হয়েছে কিছু বলতে পার ?
পথি। যথেষ্ট, যথেষ্ট ; নৃত্যগীতাদির প্রচুর আয়ােজন হয়েছে। তা
ছাড়া ক্রীড়াকৌতুক যত রকম আছে, যা হতে পারে,
সমস্তেরই ব্যবস্থা হয়েছে। সময় নষ্ট করবেন না, যত শীঘ্র
পারেন চলে যান।
রত্ন। আর কতটা পথ যেতে হবে বল ত ?
;

১২৪ সীতা-নিৰ্বাসন। আমি চলুম পথি। আর দুদিনের মধ্যেই পৌছে যাবেন। আমি এখন আসি। [ পথিকের প্রস্থান। বাহ। আর আমি তােমার মােট বইতে পাব না ঠাকুর। এই সদাই বল কাছে কাছে, এখন শুনছি আরও দুদিনের পথ। এই রইল তােমার মােট, আমি আর পারবাে না। বি। কেন পাবি না, পারতেই হবে তােক। আগে ব’তে পেরেছিলি না ? নে বেটা নে, তােল;-ব্রাহ্মণের সঙ্গে এমন ব্যবহার। (তুলিয়া দিতে চেষ্টা ও অকৃতকার্য হওয়া। বাহ। পারুবাে না ঠাকুর ; তােমার যা ইচ্ছা কর। এখন। ধার করে খেয়েছি, না বিদায়ের ভাগ দিবে ? দিন- রাত্রি এত বকুনি সইতে পাবাে না। [ বাহকের প্রস্থান। বি। দেখ ত ভায়া, বেটা বুঝি সত্যি সত্যি চলে গেল। তুমি দু’কথা বলে লােকটাকে ফেরাও। রাগের মাথায় তােমায় যা বলেছি ভায়া, ভুলে যাও, ওসব মনে কিছু কোরাে না। হঠাৎ আমার কেমন একটা ক্রোধের উদ্রেক হয়, সামলাতে পারি না। রত্ন। ওহে, ফের ফের, হাজার হাে’ ব্রাহ্মণ, রাগ কোরাে না। আশীৰ্বাদ ক’বৃবেন হে, আশীৰ্বাদ করবেন; তােমার ভাল হবে। ওঁকে এ ভাবে ফেলে যাওয়াটা ভাল হয় না। { বাহকের পুনঃপ্রবেশ। বাহ। শুধু আশীর্বাদে পেট ভরে না মশাই।

তৃতীয় অঙ্ক। ১২৫ রত্ন। আরে চল হে চল, শুনলে ত সেখানকার আহারাদির ব্যবস্থা। বাহ। সে ত ঠাকুরের মােট না বইলেও পাবাে। বি। আরে চল্ চল, সন্তোষ ক’বাে তােকে, সন্তোষ ক’বাে ; তা হলেই ত হ’ল। আর কি চাস বল। [ একজন অন্ধের প্রবেশ। অন্ধ। বাবা, তােমরা কোথা যাচ্ছে বাবা? রত্ন। আমরা যজ্ঞ দেখতে নৈমিষারণ্যে যাচ্ছি। অন্ধ। বাবা, যদি দয়া করে আমায় সঙ্গে করে নাও, আমি সঙ্গী হারিয়েছি, অন্ধ-মানুষ কি করে যাব বল। বি। বেটা তুই অন্ধ, কি দেথতে যাচ্ছিস? যা যা বেটা, ফিরে যা। কে তােকে নিয়ে যাবে ? অন্ধ। মশাই, যদি একলা ফিরতেই পারি, তবে একলা সেখানে যেতেও ত পারি ; দোহাই বাবা, তােমাদের পায়ে পড়ি, আমায় সঙ্গে নাও। ঘুমিয়েছিলাম, কে যেন বললে, যজ্ঞ- স্থলে যা, বড় অদ্ভুত ঘটনা হবে, তাের চো সেরে যাবে, সব দেখতে পাবি, তাই যাচ্ছি। • [ একজন খঞ্জের প্রবেশ।] খঞ্জ। নৈমিষারণ্য আর কতদূর বাবা? ৰিপ্ৰ। (স্বগতঃ) এ বেটা আবার কে? এ যে দেখছি ত্রিভুবনের লােক যে যেখানে ছিল, সমস্ত সেইখানে চলেছে। অকা- তরে দান বিতরণ হবে শুনতে পেয়েছে, আর যত বেটা

১২৬
সীতা-নির্বাসন
হতভাগা ছুটেছে।—সব ছােট লােক কি না। (প্রকাশ্যে )
চল চল, আর বিলম্ব করা হচ্ছে না।
বাহ। থাম ঠাকুর, আগে এদের একটা উপায় করি, তারপর
যাচ্ছি। দেখ ভাই খঞ্জ, তুমি এই অন্ধের কাঁধে চড়ে
বােসাে, আর পথ বলে দাও; ও তােমায় কাঁধে করে নিয়ে
চলে যা’। দুজনেরই কাজ হবে।
বি। (স্বগতঃ ) বেটা ত ভারি বুদ্ধিমান! যদি কারুর কাছে
অধ্যয়ন ক’বৃতাে, তবে একটা বশিষ্ঠ বিশ্বামিত্র হতে
পারতাে। তা ভালই হয়েছে, এই ঘােট লােকগুলাে
লেখাপড়া শিখলে কি আর রক্ষা ছিলাে ? ( প্রকাশ্যে )
এখন চল চল।
[ খঞ্জকে লইয়া অন্ধ এবং অন্য সকলের প্রস্থান।
-

তৃতীয় অঙ্ক। '
ষষ্ঠ দৃশ্য।
সীতা।
বাল্মীকির আশ্রম।
{ সীতা উপবিষ্টা। ]
হেরিলে এক তিল যে চঁাদ-বদন
বিশ্ব আমি হেরি অন্ধকার, কেমনে যে
ধরিব পরাণ, না হেরি সে মুখ আমি
ভাবিয়া না পাই। কিন্তু কি করিব আর ?-
‘যজ্ঞস্থলে’ বলিলেন ঋষি আজ মােরে,
‘রামের চরিত গা’বে মিলি দুই ভাই।
ইচ্ছা ার কোন মতে পিতাপুত্রে যদি
হয়ে যায় পরিচয়, হয় সম্মিলন।
আসিবে কি হেন দিন ? হবে কি এমন ?
আর যদি পেয়ে পরিচয়, রঘুপতি
গ্রহণ না করেন সন্তান, কি হইবে,
কি হইবে তবে ? কাজ নাই, কাজ নাই
গিয়ে, থাকুক আমার কাছে, যা হবার
হবে। কিন্তু কতদিন আর নাহি দিয়া
পরিচয় রাখিব বা আমি। হায় বিধি,
কত দুঃখ আছে আরাে কপালে আমার।
চপল বালক, উৎসাহে হৃদয়পূর্ণ,
কেমনে নিষেধ করি যেতে যজ্ঞস্থলে।

সীতা-নির্বাসন।
{ লবকুশের প্রবেশ। ?
লব। জননি গাে, হইয়াছে আয়ােজন সব,
যাইব এখন মােরা যজ্ঞ-দরশনে।
দাও চরণের ধূলি, দাও মা বিদায়।
কেন মা কাদিছ তুমি? ঋষির সহিত
যাব যজ্ঞ-দরশনে, কি চিন্তা তােমার ?
আবার আসিব ফিরি যজ্ঞ শেষ হলে,
দাও মা প্রসন্নমনে বিদায় এখন।
সীতা। কোথায় মহর্ষি এবে শিষ্যগণ তার ?
লব। আসিছেন ঋষিবর শিষ্যগণসহ
বিদায় লইতে মা গাে তােমার নিকটে।
কুশ। কেঁদো না মা করাে না মা নিষেধ যাইতে,
শুনিয়াছি ঋষিমুখে ত্রিজগৎ-বাসী
সমবেত হবে যজ্ঞে, আশ্চর্য ঘটনা
হবে কত, দেখিব আমরা। তুমি যদি
কাঁদ মা গাে কেমনে যাইব?--
সব। দেখিব মা বড় সাধ নয়ন ভরিয়া
রাবণনিধনকারী রাম রঘুনাথে,
ইন্দ্রজিৎ-জয়ী বীর দেখিব লক্ষণে,
হনুমন্তে, সুগ্রীবে, অঙ্গদে দেখিব মা,
দেখিব ধার্শ্বিক বিভীষণে সৈন্যসহ,
করােনা মা করােনা বারণ।

তৃতীয় অঙ্ক ।
সীতা।
(স্বগতঃ )
হা অদৃষ্ট !
নাহি জান কে তােমরা কাহার তনয়।
কুশ। কেন মা নীরব তুমি, কেন বিষাদিতা ?
জননি, কর কি মনে অনিষ্ট মােদের
সাধ্য আছে এ সংসারে করিতে কাহারাে ?
[ বাল্মীকির প্রবেশ।]
বাল্মীকি। ভয় নাই বৎসে, আমি কহিনু নিশ্চয়,
তপস্যার ফল যদি থাকে বাল্মীকির,
শুভ হবে শুভ হবে এ যাত্রার ফল।
সুপ্রসন্ন চারিদিক হের মা চাহিয়া,
স্নিগ্ধ নিরমল বায়ু বহিতেছে ধীরে,
বিহঙ্গ ললিতকণ্ঠে গাহিছে সঙ্গীত,
আনন্দে পড়িছে ঢলি প্রকৃতিসুন্দরী।
আশীৰ্ব্বাদ কর মাগাে সন্তানে তােমার।
{ লবকুশের প্রতি)
লবকুশ, জননীর লও পদধূলি।
(লবকুশকর্তৃক সীতার পদধূলিগ্ৰহণ)
সীতা। কি করিব আশীৰ্বাদ, না সরে বচন;
হউক তােদের তাই ইচ্ছা যা আমার।
বাল্মীকি। পরম পদার্থ হায় জগৎ-সংসারে
মাতৃস্নেহ !
সীতা। (বকুশের হাত বাল্মীকির হাতে দিয়া)
এই লও ধর পিতঃ, জীবন-সর্বস্ব
অভাগীর, দিলাম সঁপিয়া তব করে।

সীতা-নির্বাসন।
ওই মুখপানে চাহি রাখিয়াছি আমি
এ পােড়া পরাণ তাত, এতদিন ধরি।
কত কথা, কত কথা পিতঃ পড়িতেছে
মনে আজি, কত কত অতৃপ্ত-বাসনা
এ ভাঙ্গা বুকের মাঝে উঠিছে যে জাগি,
কে জানিবে কে বুঝিবে বিনা অন্তর্যামী।
বাল্মীকি। (চক্ষু মুছিয়া) কেন মা কাদাও তুমি এ বৃদ্ধ-বয়সে ?
ওই হের লবকুশ আকুল কাদিয়া,
মুছ অশ্রুজল এবে দাও মা বিদায়,
শুভলগ্ন যাইছে বহিয়া।
সীতা। এসসা বাপ লবকুশ, কি আর বলিব ;
এসাে চুমি চঁদমুখ যাত্রার সময়।
(লবকুশকে চুম্বন করিয়া সৱােদনে বাল্মীকির প্রতি)
দাও চরণের ধূলি অভাগী কন্যায় ;
যেন পিতঃ, মনে থাকে কাঙ্গালিনী আমি,
ওই দুটী রত্ন বই নাহি কিছু আর।
[ সীতা ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
রক্ষিও মা আদ্যাশক্তি দুর্গতিনাশিনি,
দাসীর নয়নমণি রক্ষিও বিপদে।
আর যদি ঘটে মা বিপদ, না শুনিতে
সে বারতা, দিও স্থান শান্তিময়-ক্রোড়ে
অভাগীরে।
[ পটক্ষেপণ।]
তৃতীয় অঙ্ক সমাপ্ত।

চতুর্থ অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
নৈমিষ-কাননাভিমুখী পথ।
[ বাল্মীকি ও লবকুশের প্রবেশ
বাল্মীকি। এইখানে লবকুশ করহ বিশ্রাম
ক্ষণকাল। নদীকূলে যাই আমি এবে,
সন্ধ্যা-বন্দনাদি শেষ আসিগে করিয়া ।
[ বাল্মীকির প্রস্থান
লব হের ভাই দূরে ওই নিঝর ধারায়
অস্তগামী তপনের রক্তিম-কিরণ
শােভিছে সুন্দর কিবা,—সুবর্ণের ধারা
পড়িছে ছড়ায়ে যেন ধরণীর গায়।
বৃক্ষশাখা হ’তে শাখী বিচিত্রবরণ
ছুটিয়া আসিছে কভু, তখনি আবার
পরশি সে জলধারা যাইছে ফিরিয়া,
কি জানি কি মনে করি নীড়ে আপনার।

১৩২
সীতা নির্বাসন।
কুশ। হের ভাই এই দিকে মৃগশিশুকুল,
শশক বিচিত্রবর্ণ দলে দলে কত
ছুটিতেছে যে যাহার বিশ্রামের স্থানে।
লব। সুনীল-গগনে হের নেপক্ষী এক
ছুটিছে কপােত পিছে উল্কাসম বেগে ;
কুশ। ছাড় অস্ত্র কর রক্ষা বিপন্না কপােতী।
(লবকর্তৃক অস্ত্ৰত্যাগ।)
পড়িয়াছে নেপক্ষী, বাঁচিল কপােত।
ধন্য ভাই লক্ষ্যভেদে ক্ষমতা তােমার।
রাখ এবে ধনুঃশর, প্রকৃতির শােভা
দেখি এইখানে বসি, সুন্দর এ স্থান।
(নেপথ্যে তুৰ্য্যধ্বনি।
নেপথ্যে। পথিকগণ, পথ পরিষ্কার কর, পথ পরিষ্কার কর। কুমার
লক্ষ্মণ রথারােহণে এই পথে যজ্ঞস্থলে যাচ্ছেন। আগতপ্রায় ;
স’রে যাও, সব স’রে যাও, পথ পরিষ্কার কর।
( পুনরায় নেপথ্যে তুর্ষধ্বনি।)
লব। তাই কুশ, এ আবার কেমন ভাই ? কুমার লক্ষ্মণ রথারােহণে
এ পথে যাবেন বলে আর কেউ কি পথে চলতে পাবে না ?
এ কেমন রীতি ভাই ? তবে কি রাজপুরুষেরা যে পথে
চ’লবেন, সে পথে দীনদুঃখী কেউ চলতে পাবে না ?
আমাদের তপােবনে ত ভাই, এমন নয়।
কুশ। শুনেছিলাম, যজ্ঞে গেলে অনেক আশ্চৰ্য্য দেখতে পাবাে,
এই বুঝি তার প্রথম নিদর্শন পথে?

চতুর্থ অঙ্ক।
লব। মহর্ষি বইলেন নদীতীরে, এখন স’রেই,বা যাই কোথা?
কুশ। কেন সরে যাব, দাড়া না দেখি কে কি করে। হাতে ধনুর্বাণ
আছে ত ?
[ একজন দূতের প্রবেশ।]
দূত। কে তােমরা ? এখানে দাড়িয়ে কি কোচ্ছাে? আঁ?
লব। দেখতে পাচ্ছে না, আমরা ঋষিবালক।
দূত। ঋষিবালক ত হাতে তীরধনু কেন ?
ও আমাদের হাতে থাকে।
দূত। কেড়ে নি যদি।
কুশ। ক্ষমতা থাকে নাও।
দূত। হু, তবে ত ঋষিবালক খাঁটী। কোন ঋষির শিষ্য তােমরা ?
কুশ। মহর্ষি বাল্মীকির।
দূত। কোথায় তিনি ?
লব। সন্ধ্যাদির জন্য নদীতীরে গিয়েছেন, এখনি আসবেন।
দূত। (স্বগতঃ ) তবে ত কুমারকে সংবাদ দিতে হচ্চে। মহর্ষি
এই পথে পদব্রজে যাচ্ছেন, এ অবস্থায় তিনি কিছুতেই রথা-
রােহণে এ পথে যাবেন না। (প্রকাশ্যে ) আচ্ছা, থাকতে
পার তােমরা এখানে।
( দূতের প্রস্থান।
কুশ। বেটা কি গোঁয়ার ভাই।
লব। আর কথাই বা কি মিষ্টি।
কুশ। বড়লােকের ভৃত্য বুঝি ভাই সব এমন ধারাই। আদেশ
যদি হয় ভাই এতটুকু, ওরা করে তােল তাকে এত বড়।

১৩৪
সীতা-নিবাসন।
লব। ঐ দেখ ভাই, কে যেন একজন বিচিত্ৰবেশধারী দিব্যকান্তি
পুরুষ এই দিকে আসছেন। মহর্ষি এখনও এলেন না।
চল, আমরা ঐ খানে বসে তার জন্য অপেক্ষা করি।
ও এখন কত দেখবাে; কত রাজা, কত রাজপ্রতিনিধি, কত
সেনাপতি যজ্ঞদর্শনে যাচ্ছেন, কি করে বােলবাে কে উনি।
লব। আহা ভাই, বড় সুন্দর গম্ভীর মূর্তি, দেখলে ভক্তি হয়।
( উভয়ের দূরে উপবেশন।)
[ ধীরে ধীরে লক্ষণের প্রবেশ।
লক্ষ্মণ। (স্বগতঃ) মরি মরি কে রে এ বালক দুটী ? দেহ
সুকুমার, আবরিত গৈরিক বসনে
ঋষি-তনয়ের মত, কিন্তু নহে কভু
ঋষির তনয় ; বীরগর্বে অবয়ব
মণ্ডিত সুন্দর, যেন শিশু রাম দু’টী
চুরি করি জানকীর নয়ন-মাধুরী
বাড়ায়েছে শ্রীমুখের শােভা মনােহর,
ইচ্ছা হয় নিতে কোলে চুমিতে বদন।
(প্রকাশ্যে) কে তােমরা শিশুদুটী দাও পরিচয়,
কোথায় কেন বা বল যাইতেছ এবে ?
লব। ঋষি-শিষ, লবকুশ আমাদের নাম,
যাইতেছি অশ্বমেধ-যজ্ঞ দরশনে।
লক্ষ্মণ। জনকের নাম কিবা কোথা বা বসতি,
কি জাতি তোমরা বৎস বল বিবরিয়া।
কুশ। নাহি জানি মহাভাগ, অন্য পরিচয়,
বলিয়াছি জানি যাহা, কি বলিব আর।

চতুর্থ অঙ্ক।
১৩৫
কেন শিশু করিতেছ আত্ম-সংগােপন ?
পিতৃ-নাম ধরাতলে নাহি জানে কেবা।
এসাে কাছে বল শুনি, করেছ তােমরা
কোন্ বংশ অলঙ্কৃত লভিয়া জনম ?
লক্ষ্মণ আমার নাম দশরথ-সুত,
নিঃসঙ্কোচে পরিচয় দাও মাের কাছে।
নব। লক্ষ্মণ তােমার নাম দশরথ-সুত,
সুমিত্রা-নন্দন বীর রামের অনুজ ?
লক্ষ্মণ। সেই আমি। কেমনে জানিলে এ সকল
কথা, বালক তােমরা দুটী, কে কহিল
এ সকল বিবরণ তােমাদের কাছে ?
কুশ। রচিয়াছে রামের চরিত মহাঋষি,
পড়িয়াছি গ্রন্থে তাঁর, শুনিয়াছি মুখে।
ভাই লব, এই সেই ভ্রাতৃগতপ্রাণ
মহাবীর লক্ষ্মণ সুমতি।
(ঔৎসুক্যের সহিত উভয়ের দর্শন।)
লব। সেই মহাবাহু তুমি রামের অনুজ,
অনাহারে অনিদ্রায় বর্ষচতুর্দশ
কাটাইলে স্ব-ইচ্ছায় ছাড়ি রাজ্যভােগ
বনে বনে, ভ্রাতৃপ্রেমে ভ্রাতার সহিত ?
লক্ষ্মণ। সেই আমি।
লব। সেই তুমি? নিকুম্ভিলা-যজ্ঞভঙ্গ করি,
বধিয়াছ লঙ্কাপুরে ভীম-শরাঘাতে

সীতা নির্বাসন।
রাক্ষসকুলের রবি, ইন্দ্রজিৎ শূরে,
সেই তুমি মহাবীর সুবাহু লক্ষণ?
লক্ষ্মণ। ( ঈষৎ হাসিয়া )
সেই আমি।
কুশ। সেই তুমি ? লঙ্কার সাগরকূলে
বক্ষ অনীকিনী পড়িল সমরে যবে
লঙ্কাপতি সহ, পৰ্বতপ্রমাণ বহ্নি
উঠিল জ্বলিয়া, শিখা তার পরশিল
গগনমণ্ডল ; ধরিত্রী-নন্দিনী সতী
জানকী যখন প্রবেশিল সে অনলে
ত্রিলােকসম্মুখে, তুমি হাহাকাররবে
পূর্ণ করি দশদিক্‌ করিলা যােদন,
সেই তুমি প্রাণাধিক দেবর সীতার ?
লণ। কেন শিশু পূৰ্ব্বস্মৃতি দাও জাগাইয়া ?
যা হবার হইয়াছে, দাও পরিচয়।
লব। সেই তুমি ? হে ধীমান্ ভাতার আদেশে,
পূর্ণগর্ভা সাধ্বী সতী জনক-কন্যায়
ফেলে এলে বনবাসে বিনা অপরাধে,
হিংস্র শ্বাপদের মুখে, ঘাের অন্ধকারে
মূর্হিতা হইয়া সতী রহিল কাননে ;
সেই তুমি ভ্ৰাতৃভক্ত দেবর সীতার ?
নমণ। ( স্বগতঃ ) শেলসম বিধিতেছে বালকের বাণী
হৃদয়ের মাঝে মাের; কিন্তু ইচ্ছা হয়
শুনি কথা ইহাদের জনম ভরিয়া।

চতুর্থ অঙ্ক।
১৩৭
( প্রকাশ্যে ) কোন্ ঋষি রচিয়াছে, রামের চরিত?
কাহার বা শিষ বল তােমরা দুজন ?
কুশ। বাল্মীকির শিষ্য মােরা, তাহারি রচিত
শিখিয়াছি গরি কাছে রামায়ণ-গান।
লক্ষ্মণ। (স্বগতঃ ) বুঝিবা সীতার পুত্র এ দুটী বালক,
তপােবন-সন্নিধানে বাল্মীকি ঋষির,
করেছি পরিত্যাগ জনক-কন্যায়।
( প্রকাশ্যে ) কোথায় মহর্ষি এবে সঙ্গিগণ তর ?
লব। সঙ্গিগণ গেছে আগে ; আমরা দুজন
মহর্ষির সঙ্গে আছি নাহি অন্য কেহ।
গিয়াছেন ঋষিবর গােমতীর তীরে
সন্ধ্যাহেতু ; আসিবেন এখনি ফিরিয়া ।
লক্ষ্মণ। জান যদি বল বৎস, কি হইল পরে
জানকীর দশা সেই ঘাের বনমাঝে।
কুশ। নাহি জানি, অপ্রকাশ সে অংশ গ্রন্থের।
[ দূরে বাল্মীকের প্রবেশ।
বাল্মীকি। (স্বগতঃ ) ভ্রাতৃপুত্র পিতৃব্যের অপূৰ্ব্ব মিলন!
নাহি জানে নবকুশ সম্মুখে তাদের
দাঁড়ায়ে পিতৃব্য বীর সুমিত্রানন্দন ;
নাহি জানে লক্ষ্মণসুমতি, উপস্থিত
রামের তনয় দুটিী সম্মুখে তাহার।
( প্রকাশ্যে ) জয়ােহন্তু লক্ষ্মণবীর রঘুকুলমণি।
( প্রণাম করিয়া )
তপােবনে কুশল সকল মহাঋষি ?
',

সীতা-নির্বাসন
৩
যাগযজ্ঞে বাধাবিঘ্ন উপদ্রব আর
হয় কি এখন দেব পূর্বের মতন ?
বাল্মীকি। শান্তিপূর্ণ রামরাজ্যে কোথায় সম্ভব
বাধাবিঘ্ন ধৰ্ম্মকাৰ্যে, সকলি কুশল।
লক্ষণ। পারি কি জানিতে দেব, এই শিষ্য দুটী
পাইলেন মহাঋষি কোথায় কেমনে ?
কে ইহারা পাইতে কি পারি পরিচয় ?
বাল্মীকি । তপােবনে জন্ম ইহাদের ; শিষ্য মাের।
রচিয়াছি রামায়ণ বহুদিন ধরি ;
বড় সুমধুর-কণ্ঠ এ দুটী বালক,
শিখিয়াছে রামায়ণ গান যত্ন করি।
শুনাইতে সে সঙ্গীত অভিলাষ মাের
ত্রিলােকনিবাসী সবে, তাই সন্ধে করি
যাইতেছি যজ্ঞস্থলে বালক দুটীরে ।
পণ। এ তাে নহে পরিচয়, ক্ষম এ দাসেরে
মহাঋষি ; কে জনক, জননী কে, বল
ইহাদের, প্রাণ মাের বড়ই ব্যাকুল
নেহারি এ শিশুদুটী দা ও পরিচয়।
বাল্মীকি। কেন বৃথা ব্যাকুলতা, স্থির কর মন,
জানিবে সময়ে সব, চল যজ্ঞস্থলে।
লক্ষ্মণ। আছে রথ প্রস্তুত এখানে, চল দেব,
শিষ্যসহ আরােহিয়া রথে।
বামীকি।
লব কুশ,
যাইবে কি যজ্ঞস্থলে রথ আরােহণে?

চতুর্থ অঙ্ক।
৩
লব। যথা ইচ্ছা, যথা দেব তব অভিপ্রায়।
বাল্মীকি। চল তবে যাই সবে আরােহিয়া রথে ।
[ সকলের প্রস্থান।

।
চতুর্থ অঙ্ক।
দ্বিতীয় দৃশ্য।
নৈমিষারণ্যস্থ যজ্ঞস্থলের এক অংশ।
( বিপ্ৰবন্ধু, রত্নদাস ও বাহক সমবেত।]
বি। দেখতে ভায়া, হবিঃ টা—কিছু কটু,এ-দুর্গন্ধযুক্ত বােধ
হচ্চে না ? আর পরিমাণেও বড় কম কম বােধ হচ্চে।
বাঁদুরে কাণ্ড কি না,সুব্যবস্থার সম্পূর্ণ অভাব।
রঙ্গ। আজ্ঞে, আমি ত ঘৃতে কোন দোষ দেখি না।
বি। বাড়ীতে ব্রাহ্মণী যে ঘৃত ব্যবহার করে থাকেন, তার যে
সৌরভ, সে আর কি বােলবাে ভায়া ; এ যেন তেমনতর
নয়।
বাহ। (স্বগতঃ ) ঠাকুরের বাড়ীতে এ জন্মে কেউ কখনাে ঘি চোখে
দেখে না, আর বলছে কি না, এ ঘি টা দুর্গন্ধ। (প্রকাশ্যে )
তবে না হয় এ কলসীটা বলে আর একটা নিয়ে আসি।
বি। বলে কেন রে বেটা, বদলে কেন? যা বরং যেয়ে বল, আর
এক কলসী ভাল ঘৃতের প্রয়ােজন।
বাহ। যাই, তাই বলিগে।
( প্রস্থানের উপক্রম।)
সুগ্রীবের প্রবেশ।]
বি। এই যে কিষ্কিন্ধ্যাধিপতি উপস্থিত। জয়ােহস্তু, জয়ােহস্তু ;
আসতে আজ্ঞা হাে’, আসতে আজ্ঞা থােক।

৩
?
চতুর্থ অঙ্ক।
৪১
সুগ্রী। প্রণাম ঠাকুর মশাই ; ঘৃতটা কি কটুবােধ হচ্চে? দেখি
কেমন ?
বি। আজ্ঞে না, কটু কে বলে ? অতি উৎকৃষ্ট, অতি উপাদেয় ঘৃত।
সুগ্রী। যখন যা প্রয়ােজন হবে, অনুগ্রহ করে জানালেই তৎক্ষণাৎ
সাধ্যমত প্রেরণ কোবাে। আর আমিও সৰ্ব্বদা সম্বাদ
নিচ্ছি। তবে আসি এখন, প্রণাম ; অনেক স্থান দেখতে
হবে।
[ সুগ্রীবের প্রস্থান।
বি। বাপ, কখন যে হুট মুটু করে এসে পড়ে, তার ঠিকানাই
নেই। শুনতে টুনতে পেয়েছে না কি?
বাহ। তবে আর এখন আন্‌তে যাব না?
বি। না, না, এখন না; যখন যেতে হয় আমি বলবাে।
বাহ। (রত্নদাসের প্রতি) আচ্ছা কৰ্ত্তা, এই যে অশ্বমেধ যজ্ঞটা, একি
সব রাজাই ক'ৰ্ত্তে পারে ?
রত্ন। দূ, তা পাবে কেন ? যিনি রাজাধিরাজ, সসাগরা সপ্তদ্বীপ
পৃথিবীর অধীশ্বর, কেবল তিনিই পারেন, আর কেউ নয়।
বাহ। সে আবার কেমন কৰ্ত্তা, বুঝলেম না ।
রত্ন। এই যিনি এ যজ্ঞ সম্পন্ন ক’রুতে পালেন, তিনি পৃথিবীর
সকল রাজার উপর রাজচক্রবর্তী হলেন; অর্থাৎ পৃথিবীর
পতি হলেন।
বাহ। তবে যজ্ঞ শেষ হলে, মহারাজ আমাদের পৃথিবীর পতি
হবেন, এই ত ?
রত্ন। হ, তাই।
বাহ। তবে এ কি রকম হােললা ?

১৪২
সীতা-নির্বাসন
রত্ন। এর আর রকম কি ?
বাহ। আজ্ঞে শুনতে পাই কর্তা, আমাদের রাজরাণী যিনি ছিলেন,
তিনি বসুন্ধরা দেবীর কন্যা।
বি। যা যা, থাম, বেটার যত উভট্টি কথা। তাের সে বিচারে
কাজ কি রে বেটা ?
বাহ। আজ্ঞে না, তাই বলছি।
বিপ্র। বেটার জালায় অস্থির।
বাহ। (রত্নদাসের প্রতি) আজ্ঞে কৰ্ত্তা, আর একটা নিবেদন পাই।
রত্ন। আবার কি ববি ? বল বল।
বাহ। ঐ যে ঘােড়াটা, ও দিয়ে কি হবে ?
ও ঘােড়াটা বধ করে ওর মেদ দ্বারা যজ্ঞ-কাৰ্য্য সম্পন্ন হবে।
বাহ। তা এতে মন্তর পড়তে হবে ?
রত্ন। হবে বৈ কি।
বাহ।
কে পড়বে কর্তা?
রত্ন। মহারাজ স্বয়ং পড়বেন।
বাহ। মহারাজ স্বয়ং পড়বেন, তা-ও সােনার সীতা এনেছেন
কেন ?
বি। ঐ,—ঐ তাে রে,ঐ কথাটাই বােঝা ভার। সােনার সীতা
নিয়ে সস্ত্রীক হয়ে মন্ত্র পড়বেন। তা,ভারি ভারি পণ্ডিত,
বড় বড় ঋষিরা ব্যবস্থা দিয়েছেন, আমরা কি কোরুবাে? তা
যা হয় হােক, আমাদের বিদায়টা ভালাে মত হলেই
হােলাে।
বাহ। আহা হা, অমন সুন্দর ঘােড়াটা মেরে ফেলবে। তার চাইতে
একটা ঘােড় গড়িয়ে বলি দিলে হয় না? সােনার মানুষ

চতুর্থ অঙ্ক।
১৪৩
দিয়ে যদি আসল মানুষের কাজ চলে ত; একটা গড়া ঘােড়া
দিয়ে কি আর জ্যান্ত ঘােড়ার কাজ চলে না?
বি। তা হবে কি করে রে বেটা? গড়া ঘােড়ার কি আর মেদ হয় ?
রত্ন। তােমরা ঠাকুর একটা ব্যবস্থা করে দিলেই ত হয়। খানিকটা
বি টি ঢেলে দিলেই হল।
বি। যা যা তুই বেটা যখন পণ্ডিত হবি, তখন সেই ব্যবস্থা দিস।
( নেপথ্যে তুৰ্য্যধ্বনি।)
রত্ন। কিসের ঘােষণা দিচ্ছে,—না ?
বি। (বাহকের প্রতি) যা যা, জেনে আয় ত, জেনে আয় ত,
কিসের ঘােষণা দিচ্ছে।
বাহ। আজ্ঞে এই যাচ্ছি। (স্বগতঃ ) এই ছুটুলুম, এই যে যাব,
এদিটা সব দেখবাে তবে ফিরুবাে। বাবা রে বাবা,
একদও কোথাও যাবার যাে নেই।
[ বাহকের প্রস্থান।
বি। ও ভায়া ওর কৰ্ম্ম নয়, তুমি বরং যেয়ে জেনে এসাে।
রত্ব। ঐ যে এই দিকেই আসছে, আর যেতে হবে না।
[ পুনরায় নেপথ্যে তুৰ্য্যধ্বনি।
[ একজন দূতের প্রবেশ।]
বিখ। বলি কি হে বাপু,-এ কিসের ঘােষণা দিচ্ছ ?
দূত। মহারাজের অভিপ্রায়, সমাগত ব্রাহ্মণমণ্ডলী ও তাদের সঙ্গী,
ভৃত্য, শিষ্য প্রভৃতির সংখ্যা নির্ধারণ করেন। তাই ঘােষণা
দিচ্ছি, ব্রাহ্মণগণ অনুগ্রহপূর্বক তৎসম্বন্ধে তালিকা দিলে,
তিনি বিদায়সম্বন্ধে শৃঙ্খলা স্থাপন করেন।

১৪৪
সীতা-নিৰ্বাসন।
বি। ওহে বাপু, কৃথাটা ঠিক্ পরিষ্কার হােলো না। বলি, কেবল
সংখ্যাটা দিলেই চলবে, না নাম-ধামাদিও দিতে হবে ?
দূত। আজ্ঞে, নাম-ধামাদির বিশেষ প্রয়ােজন নাই; সংখ্যাটাই
আবশ্যক।
বি। কথাটা তবু ঠিক পরিস্কার হােলল না।
দূত। কি জাতে চান অনুমতি করুন।
বি। তুমি বাপু রাজদূত, কিন্তু বুদ্ধিটা তত সূক্ষ্ম বলে বােধ হচ্চে
। যদি প্রশ্নোত্তর দ্বারাই সমস্তটা পরিষ্কার ক’বুতে হােললা,
তবে আর সাধারণ লােকের সঙ্গে তােমাদের পার্থক্য রইল
কোথায় ? কথাটা হচ্ছে এই--(গলা পরিষ্কার করিয়া)
অর্থাৎ-এ-বুঝলে কি না,
দূত। আজ্ঞে না, এ পর্যন্ত উপলব্ধি ক’তে সমর্থ হই নাই।
বিপ্র। অ—অর্থাৎ এই যে ভৃত্য আর শিষ্যদের কথা বল্লে, তা কি-
কেবল যারা উপস্থিত তারাই, না উপস্থিত অনুপস্থিত সমস্ত ?
দূত। ( সহাস্যে) আপনাদের যেমন ইচ্ছা; সে সম্বন্ধে কোন
বিধিনিষেধ নাই।
বিপ্র। আহা হা, না হবে কেন, না হবে কেন? এমন রাজা ত আর
কখনাে হয় নাই, হবেও না। আশীৰ্বাদ করি, চিরজীবী
হও। তা—বাপু, এ লিখে কখন কার কাছে দিতে হবে ?
দুত। যখন ইচ্ছা;—কিষ্কিন্ধ্যাধিপতির নিকট দিলেই হবে।
তবে এখন আসি। প্রণাম।
[ দূতের প্রস্থান।
বিপ্র। ভায়া, তবে এখন বিবেচনা করে একটা তালিকা প্রস্তুত
করে ফেল দেখি।

চতুর্থ অঙ্ক।
• __
এতে আর বিবেচনার বিষয় কি আছে ?
বি। আছে বৈ কি ভায়া, আছে বৈ কি।
রত্ন। আপনার সঙ্গে একটী বাহক ভিন্ন ত আর কেউ নাই।
আর বাড়ীতেও ত আর কোন ভৃত্য কি শিষ্যাদি নাই।
বি। ঐটে তােমার ভুল ভায়া, প্রকাও ভুল।
রত্ন। কি রকম ?
বিপ্র। ভৃত্য সময় সময় নিয়ােগ করা হয়ে থাকে বৈ কি, তাদেরও
ত কিছু পেতে হবে ; আর দেখ, এই যে শিষ্যের কথা
ব’ছ,-শিষ্য অনেক প্রকার। আমাদের কাছে অনেক
লােক অনেক সময় নানা বিষয়ে বিধিব্যবস্থা উপদেশাদির
জন্য এসে থাকে, তারাও ত শিষ্যমধ্যে গণ্য, তাদেরই বা
অন্যায় করা হবে কেন ?
রত্ন। (স্বগতঃ) আহা হা ঠাকুরদার কি উদার ভাব! (প্রকাশ্যে)
তা, আপনার যেমন অভিপ্রায় হয়, বল্লেই লিখে দেবো।
বি। হাঁ—তা আমিও একটু ভেবে দেখি। মহারাজ যেন কল্পতরু
হয়ে বসেছেন,—আমাদের তাই বলে ত যা ইচ্ছা তাই
করে বসা ভাল হয় না। সঙ্গত অসঙ্গত একটা বিবেচনা
করে দেখা উচিত।
যত্ন। তা কি করতে চান ?
বি। ওহে সেই জন্যই ত ব’লছি। এ—একটা বিবেচনামত
তালিকা দিতে হবে।
রত্ন। আজ্ঞে, তা বটেই ত।
বি। আর দেখ, একটা বিষয়ে তােমায় সতর্ক করে দি। এ কথা
গুলাে ও বাহকবেটাকে বােলােনা, বুঝেছ ?

১৪৬
সীতা-নিৰ্বাসন।
রত্ন। আজ্ঞে, বেস বুঝতে পারছি।
বি। তা ভায়া তুমি একটু বােসস, আমি একবার আহ্নিকটা সেরে
আসি। আর দেখি ও বেটা কোথা গেল।
{ বিপ্ৰবন্ধুর প্রস্থান।
র। আচ্ছা লােক যা হাে’ক। এ রকম যে আর কত এসে পড়েছে,
কে জানে? আর এই যে নানারূপ দ্রব্যসামগ্রী ক্রমাগত
সংগ্রহ ক’চ্ছে, এ নেবেই বা কেমন করে? লােক ত ঐ
একটীমাত্র। আর তার সঙ্গে যা করে, দিনের মধ্যে সে
সাতবার বিগড়ে যায়।
[ বাহকের প্রবেশ।]
বাহক। কৰ্ত্তা, কৰ্ত্তা, বড় গােল বেধেছে।
রত্ন। আরে, হয়েছে কি ?
বাহক। আজ্ঞে, এসে পৌঁছেছেন।
রত্ন। আরে কে ?—কে এসে পৌঁছেছেন ?
বাহক। আর কে, স্বয়ং দেবর্ষি নারদ। যার নামে গণ্ডগােল বেধে
ওঠে, তিনি স্বয়ং উপস্থিত।
রত্ন। তা তাের ভয় কি?
বাহক। আজ্ঞে না, আমার বড় ভয় নেই। ভয় আমার ঠাকুর মশা-
ইকে নিয়ে। সবাই বলছে, যখন দেবর্ষি এসেছেন, তখন
একটা কিছু বিভ্রাট ঘটবেই ঘটবে।
রত্ন। আর কি দেখে এলি, বল দেখি?
বাহক। আচ্ছা কর্তা, ও গুলাে কি কর্তা?
রত্ন। কোন্ গুলাে ? আগে বলু, কি রকম শুনি।

6
চতুর্থ অঙ্ক।
~~~
বাহক। আজ্ঞে, এই মানুষের মত হাত পা, আর ঘােড়ার মত মুখ ;,
সঙ্গে অনেক বাদ্যযন্ত্র।
রত্ন। ওরা সব কিন্নর।
বাহক। কিন্নর আবার কি কৰ্ত্তা ?
রত্ন। কিন্নর কি জানিস নে ?
বাহক। আজ্ঞে না।
রত্ন। ওরা সব দেব-গায়ক। দেবতাদের সভায় ওরা গান গেয়ে
থাকে। এখানে গাইতে এসেছে।
বাহক। আচ্ছা, ওদের ত সব ঘােড়ার মত মুখ, তা ওরা গায় কি
করে ? ঘােড়ার মত চিঁহিহি করে গায় না কি?
রত্ন। দূর বেটা, ওরা গায় খুব ভাল।
বাহক। তা, গাইবার জন্য ত স্বৰ্গবিদ্যাধরীরা সব এসেছে দেখে
এলেম। আর তাদের যে রূপ, তা আর কি বােলবাে কর্তা।
উর্বশী, মেনকা, রম্ভা,
.
( বিপ্ৰবন্ধুর প্রবেশ।
বি। কিরে বেটা রম্ভা এনেছিস ?
বাহক। আজ্ঞে, তা আবাে কি করে ?
ব। তাও ঠিক। যত বদর যুটেছে, তাের আর রম্ভা পাবার
সম্ভাবনা কি?
বাহক। আজ্ঞে, এ সে রম্ভা নয়, এ রম্ভার হাত পা আছে।
বি। সে আবার কিরে বেটা ?
র। ও অপ্সসরা গুলাে দেখে এসেছে, তাই ব’ছে।
বি। এ-বেটা আবার অষ্পরা দেখতে গেছিলাে?

১৪৮ সীতা-নিৰ্বাসন। বাহক। বড় সুন্দর ঠাকুর মশাই, বড় সুন্দর, তুমি যদি দেখতে, বি। থাম্ বেটা থাম্ ; আর কি দেখুলি বল দেখি। বাহক। আর দেখলেম দুটো ছেড়া। রত্ন। হাঁ হাঁ, আমিও দেখেছি বটে। বাল্মীকিমুনির দুটী শিষ্য না ? বাহক। আজ্ঞে হাঁ, তারই শিষ্য। তারা যে গেয়ে বেড়াচ্ছে, তা আর কি বােলবাে। বি। কি গাচ্ছে ? বাহক। রামায়ণ। এমন গান জন্মে কোনাে দিন শােনন নি। শুন- লেম, কাল রাজসভায় তাদের গান হবে। বি। গিয়ে কাল শুনতে হবে, কি বল ভায়া? রত্ন। আজ্ঞে, যেতে হবে বৈ কি। [ অন্ধ ও খঞ্জের প্রবেশ।] বি। আঃ,-আবার এ দুটো উৎপাত এসে উপস্থিত। রত্ন। কি হে সংবাদ কি? ভাল আছ ত ? বিপ্র। (অন্ধের প্রতি) কিরে বেটা, তাের চো ভাল হয়েছে ? অন্ধ। আজ্ঞে দেবর্ষি নারদ বলেছেন, শীগগীর ভাল হয়ে যাবে। বি। তিনি কি ঔষধ দিয়েছেন না কি ? অন্ধ। না মশাই, ঔষধ দেন নাই। বলেছেন, যজ্ঞস্থলে প্রতিদিন যা, একদিন ভাল হয়ে যাবি। রত্ন। তা বেস বেস, যাস। বি। ওটা আবার একটা কথা। ঔষধ পত্র কিছুই নেই, যজ্ঞস্থলে গেল, আর চোক অমনি ভাল হয়ে গেল। খঞ্জ। দেবর্ষির কথা কখনই মিধ্যা হবে না। আমায় বলেছিলেন, চতুর্থ অঙ্ক। ১৪৯ তাের পা ভাল হয়ে যাবে, তা আমার পা ভাল হয়ে গেছে। এই দেখুন। (পরিক্রমণ।) বি। আরে পা আর চোক, অনেক কমবেশ। অন্ধ। দেবর্ষির কথা কখনই নিস্ফল হবে না, দেখবেন। বিপ্র। আচ্ছা সব দেখা যাবে, দেখা যাবে। এখন চল ভায়া, এক- বার ঘুরে ফিরে সব দেখে আসা যাক। রত্ন। চলুন। ( সকলের প্রস্থান।

চতুর্থ অঙ্ক।
তৃতীয় দৃশ্য।
বাল্মীকির আশ্রম।
সীতার প্রবেশ । ]
গেল এই কয়দিন নাহহরি নয়নে
চঁদমুখ দুইখানি, গেল কয়দিন
না শুনিয়া মধুমাখা মাতৃ-সম্ভাষণ ;
আর যে থাকে না স্থির পরাণ আমার।
কি করি কাহার কাছে লই বা সম্বাদ ;
জানি নৈমিষারণ্য কতদূর পথ,
কে আছে আমার আমি পাঠাই বা কারে।
১ম পসী।
| তাপসীদ্বয়ের প্রবেশ। ]
যে দিন হইতে দেবি, বৎস লবকুশ
গেছে যজ্ঞ দরশনে মহর্ষির সহ,
সেই দিন হ’তে তুমি হয়েছ কেমন
অনাহারে অনিদ্রায়, দিবসমিনী।
কি বলিবে বকুশ, বলিবেন ঋষি,
দেখিলে এ দশা তব আসিলে ফিরিয়া ?

চতুর্থ অঙ্ক।
১৫১
সীতা। ভাবিও না আমার লাগিয়া প্রাণসখি,
সহােদরাধিক স্নেহে তােমরা সকলে
পালিতেছ অভাগীরে সন্তানের সহ,
এ স্নেহের প্রতিদান শকতি আমার
নাহি দিতে,—অভাগিনী জনক-তনয়া।
২য় তাপসী। নহ অভাগিনী, সাধ্বী সতী-শিরােমণি
রাজেন্দ্রাণী তুমি, পবিত্র এ তপােবন
তব আগমনে, কৃতার্থ আমরা সবে
তব সহবাসে, কি চিন্তা তােমার সতি?
বীরজায়া বীরমাতা তুমি এ জগতে ;
বিধি-বিড়ম্বনে শুধু কদিনের তরে
ভুঞ্জিলা অশেষ দুঃখ স্বামীর বিরহে ;
কিন্তু দুঃখনিশা তব অবসানপ্রায়।
সী। না না সখি, শুনিয়াছ জীবন-কাহিনী
অভাগীর ;-আজন্ম-দুঃখিনী আমি সখি,
হলে দেহান্ত দুঃখ যাবে না আমার।
তাই সদা বড় ভয় মনে, প্রত্যাখ্যান
যদি তিনি করেন আমার সবকুশে,
কি উপায় হইবে আমার ?
১ম তাপসী। কেন তিনি করিবেন নিজের তনয়ে
প্রত্যাখ্যান ? দেখিলে তােমার সব কুশে,
স্নেহরসে গলিবে পরাণ, লইবেন
কোলে তুলি আদর করিয়া, চুম্বিবেন
বদনকমল। বৃথা অমঙ্গল ভয়

সীতা-নির্বাসন।
সীতা।
কেন কর সতি ? শুভ সমাচার দেবি,
আসিবে অচিরে।
আরাধনা ইষ্টদেবে
কর ভক্তিভরে।
অন্য ইষ্টদেব আমি জানিনা জীবনে,
পূজিতেছি তাহারি চরণ চিরদিন ;
আমরণ পূজিব সজনি ভক্তিভরে।
কিন্তু বিধি প্রতিকূল মম, শঙ্কা তাই
সদা মনে, না জানি কি হয় যজ্ঞস্থলে।
২য় তাপসী । কি হইবে? পরিচয় দিবেন করিয়া
ঋষিবর। বলিবেন ত্রিলােকবাসীকে,
মহাসতীগর্ভে জন্ম তনয় দুটিীর।
অবিশ্বাস র কথা বল কে করিবে ?
সীতা। জাননা জাননা সখি তােমরা সকলে
সংসারের রীতিনীতি চরিত্র নরের।
সরলা তােমরা সবে, থাক তপােবনে ;
সংসার পবিত্র নহে তপােবনমত।
ভাল হয় মন্দ সখি, মন্দ ভাল হয়,
লােকের কথায় সেথা দিবসরজনী।
কি জানি যদ্যপি লােক না করে প্রত্যয়
ঋষির কথায় সখি, কি হবে তা হলে ?
১ম তাপসী। তাইত, কি হবে তবে না পারি বুঝিতে।
সীতা। ঘটিবে অনর্থ ঘাের। শিহরে পরাণ
মনে যদি করি আমি সে দারুণ কথা।
মহাধনুর্দ্ধর সখি, পুত্র দুটি মাের,

চতুর্থ অঙ্ক।
জানে জননী বই কিছু এ জগতে।
সহিবে লবকুশ অপমান মাের
নীরবে ;-ত্রিশােক যদি হয় প্রতিবাদী,
প্রতিশােধ নিতে অস্ত্র ধরিবে তাহারা।
২য় তাপসী। কি হবে তাহলে ওগগা জনক-দুহিতা ?
সীতা। আকুল পরাণ সখি, হয়েছে আমার
সেই ভয়ে; পতি মম রাবণ-বিজয়ী
মহাবীর, তিনি যদি রক্ষিতে আশ্রিতে
ধনুর্বাণ করেন ধারণ, ত্রিজগৎ
হইবে সহায় তাঁর ; ভীষণ সমর
হইবে নৈমিষবনে জনকে তনয়ে ;
বহিবে শােণিত-স্রোত গােমতী-গরভে।
কি ফল যে হবে পরে কে পারে কহিতে ?
১ম তাপসী। না না, অসম্ভব কথা ভাবিতেছ তুমি।
স্নেহময় প্রাণ তব তাই শঙ্কা এত ।
পতিভক্তি মাতৃস্নেহ হৃদয়ে তােমার
তুেিতছে জাগাইয়া আশঙ্কা এ সব
অমূলক। যজ্ঞস্থলে আছে উপস্থিত
দেবগণ, ঋষিগণ, সাধু মহাজন
লক্ষ লক্ষ, অন্যায় তথায় না ঘটিবে
কভু, তুমি ভাবিও না সতি।
সীতা। সীতার অদৃষ্ট মন্দ ; সীতার লাগিয়া
কত যে রুধিরপাত হইয়াছে সখি,
তাহা শুনেছ সকলি ; তাই ভয় মনে,

১৫৪
সাতা-নির্বাসন।
বুঝি পুনঃ রক্তস্রোতে ভাসে বসুন্ধরা।
২য় তাপসী। বহিবে শান্তির ধারা, দেব-আশীর্বাদে
হবে বিপদ কোন স্থির জেনাে মনে।
যন্ত্রণার অবসান হইবে তােমার
অতি শীঘ্র, কহিনু নিশ্চয়।
সীতা। সফল কামনা যেন হয় তােমাদের
অভাগিনী সীতার প্রার্থনা।
১ম তাপসী। চল এবে যাই সবে লভিগে বিশ্রাম।
[ সকলের প্রস্থান।

চতুর্থ অঙ্ক।
চতুর্থ দৃশ্য।
নৈমিষারণ্য—যজ্ঞস্থল।
। রাম, লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন, নারদ, বশিষ্ঠ, বিভীষণ,
সুগ্রীব, সুমন্ত্র, বিপ্ৰবন্ধু, রত্নদাস,
সভাসদৃগণ প্রভৃতি আসীন।
রাম। নমি পদে দেবর্ষি নারদ, চরিতার্থ
দাশরথি তব আগমনে যজ্ঞস্থলে ;
কর দেব আশীষ রাঘবে, শুভ-জ্ঞ
সুসম্পন্ন হয় যেন তার নিরাপদে।
নারদ। ত্রিলােকপূজিত তুমি শত্রু-নিসূদন,
জিতেন্দ্রিয় সত্যনিষ্ঠ ধরণী-ঈশ্বর,
তব যজ্ঞে বাধাবিঘ্ন সম্ভব কোথায় ?
কি ছার নারদ ঋষি, দেবলােক হতে
সমাগত ব্ৰহ্মা আদি দেবগণ যত,
কল্যাণ সাধিতে তব গুণ রাবণারি।
অদ্ভুত ঘটনা হবে এই অশ্বমেধে,
ত্রিদিবনিবাসী সবে উৎসুকনয়নে
অন্তরীক্ষে আছে সবে দর্শনের তরে।
রাম। নমি পদে উদ্দেশে সকল দেবতায়,

১৫৬
সীতা-নিৰ্বাসন।
চর্মচক্ষে না পাই দেখিতে, নর মােরা
হে দেবর্ষি, হরিভক্ত তােমার সমান
নাহি আছে নাহি হবে কেহ এ জগতে ;
তুমি দেব থাক যদি যজ্ঞস্থলে মাের,
কোন বিবাধা নাহি হইবে সম্ভব।
নারদ। শুনিলাম লােকমুখে, চরিত তােমার
নবর, রচিয়াছে মহর্ষি বাল্মীকি,
শিষ্য দুটী আছে তাঁর লবকুশ নাম,
গায় তারা সে চরিত অতি সুমধুর।
লক্ষ্মণ। শুনেছি কিন্নর-গাথা হৃদয়-উন্মাদী,
শুনেছি অপ্সরাকণ্ঠে মােহময় গীত,
শুনিয়াছি সামগান ঋষিগণমুখে,
কিন্তু দেব, শুনি নাই কভু এ জীবনে
এ হেন অমৃতবর্ষী সঙ্গীত সুতান।
রাম। গাবে আজ লবকুশ এই সভাস্থলে
রামায়ণ, মহাঋষি সমাগতপ্রায়।
(লক্ষ্মণের প্রতি)
যাও ভাই, এসাে দেখে কেন বিলম্বিছে
মহর্ষি বাল্মীকি আর শিষ্যগণ তাঁর।
শমণ। যে আজ্ঞা রাজন।
[ লক্ষ্মণের প্রস্থান।
রাম। (স্বগতঃ ) কি অদ্ভুত ঘটনা যে হবে যজ্ঞস্থলে
আমি কিছু না পাই ভাবিয়া।
(প্রকাশ্যে) ওই যে বাল্মীকি ঋষি শিষ্য সঙ্গে করি
আসিছেন যজ্ঞস্থলে লক্ষ্মণের সহ।

চতুর্থ অঙ্ক।
১৫৭
{ বাল্মীকি, লক্ষণ ও লবকুশের প্রবেশ।
প্রণাম চরণে তব মহর্ষি আমার,
কৃতার্থ করুন করি আসন গ্রহণ।
(নারদকে প্রণামান্তে বাল্মীকি ও লবকুশের উপবেশন । )
বাল্মীকি। জয় জয় রাঘবেন্দ্র ধরণী-ঈশ্বর,
রাবণ-নিধনকারী দেবগণপ্রিয়,
অঙ্গহীন যজ্ঞ যেন নাহি হয় তব,
কি আর আশীষ আমি করিব তােমায়।
রাম। ( লবকুশকে দেখিয়া স্বগতঃ )
কেন কেন মন মাের হইল এমন,
ইচ্ছা হয় শিশু দুটী বক্ষে লই তুলি।
( প্রকাশ্যে ) মহাঋষি এই কি সে বালক দুজন,
তােমার রচিত গীত গাহিয়া যাহারা
মুগ্ধ করিয়াছে শুনি ত্রিলােকবাসীকে ?
বাল্মীকি। হাঁ নরেন্দ্র, এই সেই শিষ্যদুটী মাের।
বৎস লব, বৎস কুশ, হের সিংহাসনে
পুরােভাগে, ওই সেই অযযাধ্যার পতি,
চরিত যাহার দেবােপম, শিখিয়াছ
এতদিন করিয়া যতন। নরপতি,
অনুমতি হয় যদি তব, লবকুশ
সভাস্থলে ত্রিলােকসম্মুখে, গায় আজি
সুললিত চরিত তােমার।
রাম। অনুমতি যাচে রাম, দেবর্ষি নারদ

১৫৮ সীতা-নির্বাসন। তােমার চরণে, আর সবার নিকটে, দেহ আজ্ঞা, ঋষিবর-রচিত সঙ্গীত শুনি এই দিব্যকান্তি শিশুদের মুখে। নারদ। গাও বৎস লবকুশ, শিখিয়াছ যাহা ; উৎসুক সকলে হের ত্রিজগৎবাসী শুনিতে বিচিত্র গাথা ঋষি-বিরচিত। বাল্মীকি। গাও বৎস, রামায়ণ রামের সম্মুখে। বি। (স্বগতঃ ) ওঃ-খুব বড় একটা বিদায়ের কঁাদ পেতেছে ( প্রণামান্তে লবকুশ কর্তৃক গীত।) বীণে, রামরচিত গীত গাও রে। যবে দশরথবাসে বসন্তে মধুমাসে জনম লভিল হরি আসি, জয় জয় জয় রবে সুরপুরবাসী সবে পূর্ণ করিল দশদিশি। নবীন-দূর্বাদল শ্যামল সুবিমল রূপ অতুল মনলােভা, বাড়িল দিনে দিনে চন্দ্রকলা সম মুগ্ধ জগৎ হেরি শােভা। রাক্ষসী তাড়কায় সংহারি অবহেলে গেল চলি মিথিলাপুরে, ভাঙ্গিয়া হরধনু জনকরাজপুরে সভিল জনক-তনয়ারে। সত্যপালনহেতু মেহময় জনকের তেয়াগি রাজ্য ভােগ-আশে, চতুর্থ অঙ্ক। ««• • • • • • ভ্রাতা দয়িতাসনে বল্কল পরিধানে গেল চলি ঘাের বনবাসে। দগুক মহাবনে রক্ষঃ বধিল বই শান্তি স্থাপিল জনস্থানে, শঙ্কা হইল দূর উলসিত তিনপুর ভুবন ভরিল জয়গানে। বিনাশি দুষণ-খরে পঞ্চবটীবনে নির্ভয় করিল সবারে ; হলিল লঙ্কাপতি ক্রোধে অনলসম হরিল জনক-তনয়ারে। সুগ্রীব সহ মিলি শিলায় সিন্ধু বাঁধি উতরিল রাক্ষসপুরে, ঘাের সমরে তথা রক্তে বহিল নদী নাশিল লঙ্কেশ শুরে। সাগর উপকূলে পরখিয়া আগুনে গ্রহণ করিল বনিতারে ; রাজ্য লইল আসি নিনাদ জয় জয় ঘঘাষিল কোশলপুরে। লােকনিন্দা শুনি রঞ্জিতে প্রজাগণে বর্জিল সেই দয়িতারে, গর্ভবতী সতী কাদিল একাকিনী পূর্ণ কানন হাহাকারে। ( কথুকীর প্রবেশ। কধুকী। মহারাজ অনুমতি করুন প্রদ ক্ষান্ত হাে’ক এ সঙ্গীত নাহি প্রয়ােজন। কাঁদিয়া আকুল সবে অন্তঃপুর মাঝে

১৬০
সীতা নির্বাসন
মহাদেবীগণ সহ বধুগণ যত,
চাহিতেছে দেখিতে সকলে শিশু দুটী।
লক্ষ্মণ। ( করযােড়ে বাল্মীকির প্রতি)
বল মহাঋষি বল কে এ শিশু দুটিী ?
অস্থির পরাণ মাের, করহ করুণা,
দাও পরিচয় দেব, রাখহ মিনতি।
বাল্মীকি। প্রতিশ্রুত আছি আমি তােমার নিকট
পরিচয় দিতে ইহাদের, কিন্তু বীর,
করিবে কি কথা মাের প্রত্যয় সকলে ?
নারদ।
লােকের কথায়, মহাঋষি,
কিবা ক্ষতি কিবা লাভ তব ? দাও তুমি
পরিচয় বালক দুটীর; হের ওই
অধীর লক্ষ্মণবীর, শত্রুঘ্ন, ভরত,
অধীর অযােধ্যাপতি ব্যাকুল-অন্তর ;
করহ উৎকণ্ঠা দূৰ দিয়া পরিচয়।
বাল্মীকি। শুন তবে শুন কহি ত্রিজগৎবাসী,
শুন সবে অপূৰ্ব্ব-বারতা, স্থির-মনে।
একদিন,—স্মৃতিমাঝে জাগিছে সে দিন
নবভাবে,—দিনমণি গেলে অস্তাচলে,
অকস্মাৎ নভেদেশ আবরিল মেঘে,
শিহরিল বনরাজি অস্থির ব্যাকুল,
বহিল তুমুল ঝড় যেন সৃষ্টিনাশে,
বজ্ৰনাদে কাপিল ত্ৰিলােক মুহুর্মুহুঃ,
কাপিলা বসুধাসতী ভীম ভূকম্পনে।

চতুর্থ অঙ্ক।
১৬১
সহসা পূরিল বন স্বর্গীয় সৌরভে,,
প্রকৃতির ভীমরব ডুব’য়ে গম্ভীর
দৈববাণী এক মাের পশিল শ্রবণে,
‘উঠ উঠ রত্নাকর বহু পুণ্য তব,
মহাসতী আবিভূত কাননে তােমার,
যাও শীঘ্র বনমাঝে, আইস লইয়া।
বাহিরিনু শিষ্যগণসহ ঘাের বনে,
থামিল সে মহা ঝড় হাসিল কানন,
সাক্ষাৎ পাইনু র অরণ্যের মাঝে।
নারদ। বড় পুণ্যবান তুমি এ মহীমণ্ডলে
হে বাল্মীকি, পুণ্যময় আশ্রম তােমার।
কি হইল তার পর বলহ সবায়।
বাল্মীকি। পিতৃ-সােধনে তৃপ্ত করি মাের প্রাণ,
নিজ পরিচয় তিনি দিলেন আমায়,
জননী বলিয়া আমি ডাকিলাম তারে,
লইলাম আশ্রমে আমার। দেখিলাম
পূর্ণগর্ভা নারী-শিরোমণি ;-
লক্ষ্মণ। কহ দেব, কহ দেব, কেবা সে রমণী ?
বাল্মীকি। শুনিবে সকলি, কেন হও ধৈৰ্য্যহারা।
প্রসবিল যমজ কুমার অচিরাৎ
আশ্রমে আমার সে রমণী, লবকুশ
নাম আমি দিলাম তাদের ; এই সেই
লবকুশ সম্মুখে সবার হের সবে,
মহাসতী-গর্ভে জন্ম হয়েছে এদের।

১৬২
সীতা-নির্বাসন।
নহে শুধু সুপণ্ডিত রামায়ণ-গানে
শিশু দুটী, সর্বশাস্ত্রে সুপণ্ডিত এরা
এ বয়সে, মহাধনুর্ধারী বীৰ্য্যবান,
সমকক্ষ দিপালগণ সহ রণে।
রাম। কোন্ পুণ্যবতী গর্ভে জন্ম ইহাদের
কহ ঋষি কহ শীঘ্র, ব্যাকুল অন্তর।
বাল্মীকি। বসুধা জননী ঘর, জনমে যাহার
পবিত্রা এ বসুন্ধরা, অযযানিসম্ভবা
জনক-নন্দিনী সীতা মাতা ইহাদের।
হে রাজেন্দ্র, লবকুশ তনয় তােমার।
( বিপ্ৰবন্ধু কর্তৃক রত্নদাসকে ইঙ্গিত।)
লবকুশ, পিতৃপদে করহ প্রণাম।
(লবকুশ কর্তৃক প্রণাম।)
বহুদিন চাহিয়াছ পিতৃপরিচয়
মাের কাছে, দিই নাই, ছিল বাধা দিতে,
আজ শুভদিনে, ত্রিশােকসম্মুখে বৎস,
পিতা পুত্রে পরিচয় দিলাম করিয়া।
হের ওই, তােমাদের পিতৃব্য লক্ষ্মণ,
চরিত যাহার গাইতে গাইতে বৎস,
ভাসিয়াছ অশ্রুজলে কত কতবার।
করহ প্রণাম মেঘনাদবধকারী
পিতৃব্য-চরণে।
লবকুশকর্তৃক প্রণাম ও লক্ষ্মণকর্তৃক উভয়কে ক্রোড়ে গ্রহণ )
শ

চতুর্থ অঙ্ক।
১৬৩
আর দুই খুল্লতাত ওই তােমাদের
শ, ভরতবীর, ওই বামভাগে
হের সুমন্ত্র সারথি।
লক্ষণ। হে ঋষি, যে রত্ন আজ দিলে মাের কোলে,
নাহি কিছু এ সংসারে দিতে পারি আমি
এ রত্নের বিনিময়ে চরণে তােমার।
কিন্তু দেব, বল শুনি, কোথায় এখন
রঘুকুল-কমলিনী মহাদেবী সীতা?
আছেন কি ইহলােকে ভ্রাতৃজায়া মাের ?
বাল্মীকি। আলাে করি আছে সতী আশ্রম আমার
নিরাপদে, নাহি চিন্তা কিছু র তরে।
সতীর রক্ষক ধর্ম রক্ষিছে সতীরে।
নারদ। কি কাজ হে নৃপবর, সােনার সীতায়,
আছে যদি সীতা সতী এ মহীমণ্ডলে ?
আন তারে, পূর্ণ কর মহা-যজ্ঞ এবে,
বামে রাখি সুপবিত্রা অর্ধাঙ্গিনী তব।
বাল্মীকি। গচ্ছিত ধনের মত শুনহে রাজন,
এ দুটী রতন আমি এত দিন ধরি
রক্ষিয়াছি সযতনে ; কৰ্ত্তব্য আমার
করিয়াছি যথাসাধ্য পালন সতত ;
গ্রহণ করহ এবে তনয় তোমার
নববর, মুক্ত আমি এত দিন পরে ;
বনবাসী বনে যাই, করি আশীর্বাদ।
রাম। হে মহর্ষি, নাহি জানি কি বলিয়া আমি

১৬৪
সীতা-নিৰ্বাসন।
জানাইব কৃতজ্ঞতা তােমার নিকটে ;
চিরদাস রঘুবংশ চরণে তােমার।
নারদ। ধন্য তুমি আদিকবি, পুণ্যবান তুমি,
শিষ্য এবে করহ প্রেরণ তপােবন,
দিতে বাৰ্তা শীঘ্র করি জনক-সুতায়।
বিপ্র। (জনান্তিকে রত্নদাসের প্রতি) তাই ত হে ভায়া, এ সব
আবার কি হতে চোলো ?
রত্ন। (জনান্তিকে) থামুন না, দেখা যাক কি হয়।
লক্ষ্মণ। কি বলে দেবর্ষি, শুন ত্রিলােকনিবাসী।
নারদ। কি বলিবে ? বলিবার নাহি কথা কিছু ;-
প্রেরহ সত্বর রথ তপােবন মাঝে,
আন গৃহে গৃহলক্ষ্মী সতী-শিয়ােমণি;
পূর্ণ হােতূ অশ্বমেধ, পূর্ণ মনস্কাম
হউক সবার এই করি আশীর্বাদ।
রাম। হে দেবর্ষি, জানি আমি তব আগমনে
সুফল ফলিবে রাজ্যে, রামের ললাটে।
যথা অভিপ্রায় তব, প্রেরিব এখনি
বিমান, আনিতে হেথা জনক-সুতায়।
হে সুমন্ত্র, যাও ত্বরা দেবর্ষি আদেশ,
এস ল’য়ে মৈথিলীরে পােবন হ’তে।
সুমন্ত্র। এই আমি চলি তথায়, নরবর ।
নমি পদে প্রণম্য সবার।
[ সুমন্ত্রের প্রান।
৪

চতুর্থ অঙ্ক।
১৬৫
লক্ষ্মণ। এস বৎস লবকুশ, চল অন্তঃপুরে,,
পিতামহীগণ তব ব্যাকুল-অন্তর,
এস, স্নিগ্ধ কর আসি পিত পরাণ
হাদের, এস সাথে বংশের দুলাল।
[ লব কুশ ও লক্ষ্মণের প্রস্থান।
নারদ। যাও সবে যাও আজ নিজ নিজ স্থানে ;
আসিলে জনকসুতা পােবন হ’তে,
যজ্ঞপূর্ণ হইবে এখানে। সবে মিলি
আসিও তখন ; যাও এবে।
রাম। যাও মিত্র বিভীষণ লঙ্কার সহায়,
যাও হে কিষ্কিন্ধ্যাপতি সুহৃদ প্রধান,
যাও এবে লভগে বিশ্রাম। ক্ষুন্নমনা
ছিলে সবে কৃত কাৰ্যে মাের; কিন্তু বুঝি
দেব-আশীর্বাদে আশা পূর্ণ তােমাদের
হয় সকলের ; দেখিবে সকলে হেথা
জনক-সুতায় যজ্ঞস্থলে।
সকলে।
জয়, দেবর্ষির জয়, মহর্ষির জয়।
নারদ। জয় জয়, কবিগুরু বাল্মীকির জয়।
। বিপ্ৰবন্ধু ও রত্নাস ব্যতীত সকলের স্থান।
বি। ভায়া, রকমটা ত বড় ভাল বােধ হচ্ছে না।
রত্ন। কেন, মন্দই বা কি ?
বি। মন্দ নয়! বল কি ? এ যে দেখতে পাচ্ছি, মহারাজ যেন
আবার মহিষীকে নিয়ে বসলেন আর কি ? কি করা যায়
বল দেখি, আঁ ?-

সীতা-নিৰ্বাসন।
• রত্ন। কেন, নিলে আপনার আমার ক্ষতিটাই বা কি ?
বি। তুমি ত ভায়া সােজাসুজি বলে ফেল্লে ক্ষতিটাই বা কি ?
কিন্তু একটু তলিরে কথাটা বুঝে দেখ ত। এ হলে কি
আর সৃষ্টি থাকবে না কি?
রঙ্গ। কেন ? থাকবে না ত কি রসাতলে যাবে ?
বি। তা রসাতলে যাওয়াটা বিচিত্ৰই বা কি ?
[ নারদের প্রবেশ।
নারদ। কি ঠাকুর, কাকে রসাতলে পাঠাচ্চ ?
সে স্থানটা কি
নিতান্তই মন্দ না কি ? দেখে এসেছ ঠাকুর ?
বি। আজ্ঞে, আজ্ঞে, বলি না,-,-কে রসাতলে যাবে, আমি
তার কি জানি।
নারদ। আচ্ছা ঠাকুর, এস সেই দিন—সীতাদেবী এলে, দেখা
যাবে কে রসাতলে যায়।
[ নারদের প্রস্থান।
রত্ন। তা ঠাকুরদা, কি করতে চান এখন?
বি। দেখি ভেবে, কি করতে পারি। আগেই জানি, যখন
দেবর্ষি নারদ এসে পৌচেছেন, একটা কিছু বিভ্রাট না হয়ে
যায় না। শেষটা বিদায়সম্বন্ধেই একটা ব্যাঘাত ঘটবে
আর কি।
রত্ন। চলুন, আজকার মত ত যাওয়া যাক।
[ উভয়ের প্রস্থান।

চতুর্থ অঙ্ক।
পঞ্চম দৃশ্য।
বাল্মীকির আশ্রম।
{ সীতার প্রবেশ।
সীতা।
ওকি শুনা যায় দূরে ? ভ্ৰম কি আমার ?
বৃথচক্র-সমুথিত গভীর নির্ঘোষ
মনে হয় আসিতেছে রহিয়া রহিয়া
দূর হ’তে। আইল কি ফিরিয়া আমার
লবকুশ রথে চড়ি? না না—ভ্রান্তি মাের ;
বুঝি বা এ দূরাগত মেঘের গর্জন।
কোথা পাবে লবকুশ স্পন্দন আমার,
কেন বা আসিবে ফিরি আবােহিয়া রথে ?
কি হইল যজ্ঞস্থলে, না পাই ভাবিয়া,
কেন ঋষি নাহি দেন সংবাদ এখানে ?
[ তাপসীদ্বয়ের প্রবেশ। ।]
১ম তাপসী। সুসম্বাদ, সুসম্বাদ অযযাধ্যার রাণি,
আসিয়াছে শিষ এক যজ্ঞস্থল হতে।
পিতাপুত্রে পরিচয় গিয়াছে হইয়া ;
মহা আনন্দিত সবে পুরবাসী যত,
কৌশল্যা সুমিত্রা আদি মহাদেবীগণ

১৬
সীতা-নিৰ্বাসন।
০
সীতা।
যতনে লইয়া কোলে তনয় দুটীরে,
আনন্দাশ্রু অবিরল করিছে বর্ষণ।
শুনি রামায়ণ-গান বকুশমুখে,
মুগ্ধ ত্রিজগৎ-বাসী হইয়াছে সবে।
২য় তাপসী। কেন অশ্রু উথলির এ শুভ ংবাদে
চক্ষে তব, বল শুনি জনক-তনয়া ?
মুছ নয়নের জল, শুভদিন তব
আসিয়াছে, গেছে চলি দুখের বৃজনী ।
এতদিনে আশা পূর্ণ হইল প্রাণের ;
সন্তান তাঁহার ল’য়েছেন তিনি, আর
চিন্তা কি আমার। কিন্তু এই খেদ মনে
রহিল আমার, না হেরিনু নিজ চক্ষে,
শােভিয়াছে লরকুশ কেমন সুন্দর
অঙ্কে র।
১ম তাপসী।
সব আশা পূর্ণ হবে তব,
হবে পুনঃ রাজরাণী স্বামী-সােহাগিনী।
মনে কি পড়িবে দিনান্তে রারেক এই
তপােবন কথা ?
[ সুমন্ত্রের প্রবেশ।।
সুমন্ত্র। জননি গাে, নমে পদে সন্তান তােমার
অপরাধী। ছিল না ও আশা কভু মনে,
পাইব আবার আমি দরশন তর।
সীতা। ওকি কথা হে সুম, শ্বশুরের মৃত

চতুর্থ অঙ্ক।
১৬৯
কত মেহে পালিয়াছ শৈশৰ হইতে
তােমরা, শ্রদ্ধার পাত্র জনক-সুতার,
শােতে এ হেন বাণী মুখে তােমাদের।
রাজ-আজ্ঞা পালিয়াছ,প্রশংসার কথা,
করিলে অপরাধ হইত তােমার ।
যা’ ও সকল কথা, বলই এখন,
কুশলে আছে ত সবে অযােধ্যানিবাসী ?
কেন আগমন হেথা পাই কি শুনিতে ?
সুমন্ত্র। আনিয়াছি রথ দেবি, লইতে তােমায়।
করেছেন অভিপ্রায় দেবর্ষি নারদ,
তােমা সনে যজ্ঞশেষ করিতে রাঘবে।
সীতা। রাজেন্দ্রের অভিপ্রায় আছে কি ইহাতে ?
সুম। আসিয়াছি আমি হেথা তাহারি আদেশে।
কি কাজ বিলম্বে আর, যাই আমি ত্বরা,
স্তন প্রস্তুত করি আশ্রমের দ্বারে ;
বিদায় লইয়া হেথা সকলের কাছে
চল দেবি, উৎকণ্ঠিত ত্রিজগৎ-বাসী
যজ্ঞস্থলে।
{ সুমন্ত্রের প্রস্থান।
সীতা।
কেন মন হইল এমন ?
রাখিয়াছি পরাণ আমার এ আশায়,
লকুগে অঙ্কে তাঁর দেখিয়া নয়নে
যেতে যদি পারি আমি সংসার হইতে,
সীতা-জন্ম-লাভ মাের হইবে সার্থক।

১৭০ সীতা-নিবাসন। সেই শুভদিন বুঝি উপস্থিত এবে ; কিন্তু কেন যেন কপিছে পরাণ, সখি, পারি বুঝিতে। ১ম তাপসী। চিরদিন তুমি সহিয়াছ নানা ক্লেশ । আশা-ভকে পাইয়াছ ব্যথা কতবার কোমল হৃদয়ে তব, তাই এ আশঙ্কা ব্যাকুল করিছে আজ হৃদয় তােমার। যাও এবে মহাযজ্ঞ কর সমাপন স্বামীসহ, সুখে থাক চিরদিন করি আশীর্বাদ। ২য় তাপসী। কোন প্রাণে দিব গাে বিদায়, মহীশুতে, না পারি কহিতে কি যে ব্যথা ছিড়িছে হৃদয়-গ্রন্থি ছাড়িতে মােরে। নাহি জানি কি বলিয়া করি আশীর্বাদ। আর কি পাইব পুনঃ দেখা এ জনমে, আর কি শুনিব মােরা ও মুখের বাণী ? যাবে স্বামী-দরশনে,তপস্বিনী মােরা, নাহি জানি সাজাইতে রাজরাণীবেশে কেমনে যাইবে বল- সখি, আমার কিছু নাহি প্রয়ােজন অন্য বেশে। যাহা কিছু সুখ শান্তি আমি লভিয়াছি এ জীবনে, সৰ এই বেশে। এই বেশে প্রাণেশের সনে বনে বনে ভ্রমিয়াছি কত বৰ্ষ মনের উল্লাসে। সীতা।

চতুর্থ অঙ্ক।
১৭
কাঁদিতেছে প্রাণ মাের ছাড়িতে ভগিনি,
পুণ্যময় পােবন, সরলা-প্রকৃতি
পুণ্যবতী তােমা সবে; কি আর কহিল,
রেখাে মনে অভাগিনী জনক-কন্যায়।
১ম তাপসী। শুন শুন কাননের পশু-পক্ষিগণ,
শুন তরু-লতা-গুল্ম বনস্পতিচয়,
শুন শৈলরাজি, শুন গিরি-নিঝরিণি,
বিদায় মাগিছে আজ তােমাদের কাছে,
রঘু-কুল-রাজলক্ষ্মী জনক-দুহিতা ;
দাও সবে হৃষ্টমনে বিদায় তাহারে।
(তাপসীদ্বয়ের রােদন।)
সী। ওই যে তরুণ দুটী বকুলপাদপ,
মনে পড়ে, লবকুশ লভিল জনম
যেই দিন, সেই দিন রােপিয়াছি আমি।
সেই দিন হতে কত যত্ন করিয়াছি
ও দুটী তরুরে। নবীন পল্লবে আজ
শােভিছে সুন্দর তরু দুটী ; দেখাে সখি,
অযতন নাহি যেন হয় উহাদের।
অচিরে ফুটিবে ফুল, সৌরভে তাহার
পূর্ণ হবে তপােবন, কর আশীর্বাদ
সখি, জনক-সুতায়, পূর্ণ যেন হয়,
লবকুশ উভয়ের যশের সৌরভে
বসুন্ধরা সেই মত। না আছে সীতার
এ জীবনে আর কোন প্রার্থনা কামনা।

১৭২
সীতা-নির্বাসন।
চল এবে লইগে বিদায়, প্রাণ-সখি,
তপােবনবাসী যত ঋষিগণ কাছে,
প্রণমি সবার পদে লই আশীৰ্বাদ।
{ চক্ষু মুছিতে মুছিতে সকলের প্রস্থান।
[ পটক্ষেপণ।]
চতুর্থ অঙ্ক সমাপ্ত।

পঞ্চম অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। নৈমিষরণ্য-যজ্ঞস্থল। [ রাম, লক্ষণ, ভরত, শত্রু, লব, কুশ, নারদ, বাল্মীকি, সুগ্রীব, বিভীষণ, সুমন্ত্র, বিপ্র- বন্ধু, রত্নদাস, সভাসদৃগণ, প্রজাগণ, অন্ধ, খঞ্জ, সীতা।] লক্ষ্মণ। এস বৎস লবকুশ, পূর্ণ কর সাধ পিতৃব্যের, এস ব’স জনকের কোলে সিংহাসনে, হেরি আমি জুড়াই নয়ন। (লবকুশকে লইয়া রামের ক্রোড়ে সিংহাসনে স্থাপন।) এতদিনে সফল সতীর আশীর্বাদ ; পূর্ণ মাের মনস্কাম এতদিন পরে। হের মহাদেবি, কিবা শােভিছে সুন্দর, নব জলধর কোলে নব জলধর। ( সীতাকর্তৃক সানন্দে দর্শন।)

১৭৪
সীতা-নিৰ্বাসন।
নারদ। হে রাজেন্দ্র, কেন আর বিলম্ব এখন ;
করহ গ্রহণ তব সহধর্মিণীরে,
রাখি তারে বামভাগে, সস্ত্রীক হইয়া
পূর্ণ কর মহাযজ্ঞ দেখুক সকলে।
রাম। শুনিলে ত প্রজাগণ, ত্ৰিলােকনিবাসী,
কি বলেন দেব-ঋষি শুনিলে সকলে ?
দাও এবে অনুমতি সুপ্রসন্নমনে,
ধর্মপত্নী বৈদেহীরে করিয়া গ্রহণ
যজ্ঞপূর্ণ করি আমি শাস্ত্রের বিধানে।
লক্ষ্মণ। (স্বগতঃ) একি? একি ? কেহ নাহি দিতেছে উত্তর।
নিঃসন্দেহ এখনও নহে কি সকলে ?
রাম। কেন নাহি দিতেছ উত্তর প্রজাবৃন্দ ?
অভিমত নহে কি সবার, সীতাদেবী
সহ আমি যজ্ঞ সাঙ্গ করি ?
লক্ষ্মণ। (স্বগতঃ ) হায় হায়, মহাসভা তবু নিরুত্তর।
রাম। বুঝিব কি তবে আমি, অভিপ্রায় নাই
সকলের, সীতাদেবী গ্রহণে আমার ?
বি। আজ্ঞে, মহারাজ পুনরায় মহিষীর সঙ্গে সম্মিলিত হন,
এ ত আমাদের-এ-বড় আনন্দেরই কথা। কিন্তু,
আপাততঃ—সকলের যেন সেটা অভিপ্রায় নয় বলেই,
অর্থাৎ-বােধ হচ্চে।
.সুগ্রীব। আমি কিষ্কিন্ধ্যার পতি, শুনহ সকলে,
বৈদেহীরে দশানন হরিল যখন,
করিল সন্ধান াঁর মাের অনুচর,

পঞ্চম অঙ্ক।
১৭৫
আমারি সহায়ে উদ্ধারিল রামভদ্র
মহাদেবী সীতা। আমি জানি সুপবিত্র
জনক-দুহিতা চিরদিন। শুন সবে
হলে শেষ লঙ্কার সমর, মহাসতী
দিলেন পরীক্ষা প্রবেশিয়া অগ্নিকুণ্ডে
ত্রিলােকসম্মুখে ; কেশাগ্র অনল তার
স্পর্শেনি তখন। মাের কথা প্রজাবৃন্দ
করহ বিশ্বাস। অভিপ্রায় কর সবে
গ্রহণে সীতার। মহােৎসবে মহাযজ্ঞ
হউক নিৰ্বাহ।
বি। আজ্ঞে, তা মহাশয় যখন বলছেন, তখন তাতে অবিশ্বাসের
কোন কথা হতেই পারে না। এ-তবে কি না,—অর্থাৎ
আসল কথাটা কি, এরা বলছেন—অশােকবনের অবস্থা
ত—এ'—কিষ্কিন্ধ্যাপতি দিনরাত বসে স্বচক্ষে দেখেন নি।
বিভীষণ।
শুন সবে ত্রিলােকনিবাসী মাের কথা ;
আমি ভ্রাতা রাবণের শঙ্কা-অধিপতি ;
লঙ্কাপুরে যাহা কিছু ঘটিয়াছে সদা
অগােচর নহে কিছু মম; আমি বলি
মহাসতী জনকনন্দিনী, সুপবিত্র,
চরিত্র হার। অশােক-কানন-মাঝে
চেড়ী-পরিবৃতা, যে ভাবে ছিলেন তিনি
সব জানি আমি।
বি। (জনান্তিকে রত্নদাসের প্রতি) বানররাজ গেলেন, এখন
আবার এলেন রাক্ষসরাজ,—তবেই—হয়েছে।

১৭৬ সীতা-নিৰ্বাসন। { বিভীষণ। সরমা বনিতা মম অশােক-কাননে রক্ষিয়াছে নিরন্তর জনক-সুতায় ; নিস্পাপ শরীর তার স্পর্শেনি অনল, যবে রামভদ্রাদেশে সাগরের কূলে পশিল অনলমাঝে জনক-তনয়া, দেব দৈত্য যক্ষ রক্ষঃ হেরিল সকলে সবিস্ময়ে ; ঘাের রবে ঘােষিল জগৎ ‘মহাসতী মহাসতী জনক-নন্দিনী। সতী-শিরে দেবগণ করিল বর্ষণ পুষ্পসার। করহ বিশ্বাস কথা মাের, অনুমতি দেহ সবে সুপ্রসন্ন মনে। বিপ্ৰ। ( জনান্তিকে রত্নদাসের প্রতি) শুলে ভায়া কথার বাঁধুনি। হু—আমরা যেন এতই বােকা। বিভীষণ। কেন নাহি দিতেছ উত্তর প্রজাবৃন্দ ? হের, রাজা তােমাদের বিষগ্ন বদন সিংহাসনে, করিছে অপেক্ষা অভিপ্রায় তােমাদের উদ্বিগ্নহৃদয়ে। বি। আজ্ঞে, রাক্ষসরাজ, এরা বলছেন কি—অর্থাৎ-এ-যে সেখানে ত এদেশের কেউ ছিলেন না। আপনারা দেখেছেন, আপনাদের মনে কোনরূপ সংশয় না থাকবারই কথা। আমারও নাই। তবে কি না—অর্থাৎ-এদের ভাবে বােধ হচ্চে, এ-যেন বিদেশী লােকের কথায় এরা সম্পূর্ণ নিঃস- ন্দেহ নন্। এ-বড় অন্যায়, বড় অন্যায় যা হাে’। আপ- নাদের কথাতেও অবিশ্বাস।

পঞ্চম অঙ্ক।
১৭৭
বাল্মীকি।
শুনহ অঘােধ্যাবাসী, ত্ৰিজগৎ-বাসী,
বাল্মীকি আমার নাম, পরিচয় মোর
নাহি কিছু প্রয়ােজন জানহ সকলে।
আমি বলি মহাসতী ধরিত্রী-নন্দিনী।
কেন যে সন্দেহ হয় তােমাদের মনে
নিষ্কলঙ্ক চরিতে সীতার, আমি কিছু
না পারি বুঝিতে। জন্মে যার বসুন্ধরা
পবিত্র হইল, নরনারী যুগে যুগে
পবিত্র হইবে স্মরিয়া যাহার নাম,
সে মহাসতীর নামে কলঙ্ক রটনা
কেন যে করে গাে লােক, আশ্চৰ্য্য এ কথা !
হের সভাস্থলে এই উপস্থিত হেথা
ত্রিকালজ্ঞ অন্তর্যামী দেবর্ষি নারদ,
জিজ্ঞাস উহারে যদি হয় প্রয়ােজন,
পবিত্রা কি কলঙ্কিতা জনক-দুহিতা।
অভিপ্রায় দিয়াছেন তিনি সভাস্থলে,
সীতাসহ সীতাপতি যজ্ঞ-অনুষ্ঠান
করিবেন যথাশাস্ত্র, শুনিয়াছ সবে।
তবে কেন এই দ্বিধা মনে তােমাদের ?
কেন না বলিছ সবে সুপ্রসন্নমনে
গৃহীত হউন সীতা রাজ-সিংহাসনে ;
মহানন্দে মহাযজ্ঞ হউক নির্বাহ।
থাকে যদি জিজ্ঞাসিতে কিছু তােমাদের,
করহ জিজ্ঞাসা মােরে নিঃসঙ্কোচমনে,
এই দণ্ডে নিঃসন্দেহ করিব সবায়।

১৭৮ সীতা-নির্বাসন লক্ষ্মণ। (স্বগতঃ) তবু নিরুত্তর মহাসভা! তবু নাহি দেয় অভিপ্রায় ? ঋষির কথায় লােক না করে প্রত্যয় ? কত আর, কত আর থাকিব সহিয়া। বাল্মীকি। কি বলিছ প্রজাবৃন্দ ? লক্ষ্মণ। শুনেছ কি প্রজাগণ, শুনেছ কি সবে কি বলিল তােমা সবে মহর্ষি বাল্মীকি ? অবিশ্বাস হয় কি হে তাহারও কথায় ? বিপ্র। আজ্ঞে, অবিশ্বাসের কথা ত কিছু হচ্ছে না। তবে কি না, অনেকে বলছেন কি,—অর্থাৎ—এই একবার যদি পরীক্ষা দিয়েছেন, তবে দ্বিতীয়বার,-এ-একটা পরীক্ষা দিলেই ত আর.কোনাে গোল থাকে না। লােকের মন, এলােকের ভাব বুঝে ওঠা ভার। এ—আমাদের মনে কোনাে গােলই নাই। তবে কি না,—অর্থাৎ সকলের মন ত আর সমান হয় না। রাম। (স্বগতঃ) আবার পরীক্ষা! হায় কোন্ মুখে আমি বলিব সীতায় হেন কথা ? কি করিব কি করিব উপায় এখন ? বি। অর্থাৎ-কথাটা পরিষ্কার করে বলাই ভাল। সবাই বল- ছেন,-এ-যে নিষ্কলঙ্ক রঘুবংশ সম্বন্ধে কেউ কোনাে দিন কোনাে কথা বলতে না পারে, সেই মত করাই—এ'—ভাল। অর্থাৎ—এই যে লবকুশ, যখন এরা সিংহাসনে বসবেন, তখন যদি—এ'-এই-মহিষীসম্বন্ধে কেউ কোনাে কথা আলাে- চনা করে, সেটা—এভাল হবে কি?—অর্থাৎ রঘুবংশের

পঞ্চম অঙ্ক।
১৭৯
সীতা।
মৰ্য্যাদাটা যাতে যথাযথ রক্ষা হয়,–এ–সেটাও ত দেখা
কৰ্ত্তব্য।
রাম। বৈদেহি, কেমনে আমি বলিব তােমায়,
আবার পরীক্ষা দিয়া বুঝাইতে সবে
চরিত্র তােমার সতি, কলঙ্কবিহীন।
কিন্তু শুনিলে ত তুমি, প্রজাগণ সবে
স্বচক্ষে দেখিতে চায় প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
হে রাজ, অভাগিনী আজ্ঞাধিনী তব
চিরদিন ; জানি আমি হৃদয় তােমার,
জানি আমি সহিয়াছ সহিতেছ কত
আমার লাগিয়া দেব জনম ভরিয়া।
তােমা বিনা কারাে চিন্তা করিনি জীবনে,
তুমি মাের একমাত্র সাধনার ধন,
লঙ্ঘিতে আদেশ তব কি সাধ্য আমার ;
আদেশ তােমার প্রভু অবশ্য পালিব।
রাম।
হে লক্ষ্মণ, অভিপ্রায় হয়েছে সতীর,
আবার পরীক্ষা তরে কর আয়ােজন
জানকীর ; দেখুক সকলে নরনারী,
দেখুক ত্রিলােকবাসী নয়ন মেলিয়া,
মূর্তিমতী পবিত্রতা জনক-দুহিতা।
আনহ ইন্ধন ভারে ভারে,
সীতা।
হে দেবর,
ইন্ধনের নাহি প্রয়ােজন, বারে বারে
বৈশ্বানরে না পশিৰ আমি।

১৮০
সীতা-নিৰ্বাসন।
বি। (জনান্তিকে 'রত্নদাসের প্রতি) দেখলে ভায়া সম্মত নয় ।
আমি ত আগেই বলেছি, ও অগ্নি পরীক্ষা টরীক্ষা কিছু নয়।
হুঃ—আগুনে পুড়লে আবার মানুষ বাঁচে।
রত্ন। ( জনান্তিকে) থামুন না ঠাকুরদা, দেখাই যাক কি দাড়ায়।
বি। (জনান্তিকে) আমার ঢের দেখা আছে, তােমরা দেখ।
নারদ। দাও তবে দাও দেবি, যেমন বাসনা
সতীত্বের পরিচয় সবার সম্মুখে।
অন্তরীক্ষে অমরমণ্ডলী আছে চাহি
পলক-বিহীন-নেত্রে দেখিবার তরে ;
হেথা যজ্ঞস্থলে কৌতুহলপূর্ণ হের
ত্রিজগৎ-বাসী। কেন আর বিলম্বি
জনক-দুহিতা? হয়েছে সময়পূর্ণ,
বিলম্বে কি কাজ।
সীতা। দেব, নাথ, প্রাণেশ্বর, আরাধ্য-দেবতা
হৃদয়ের, কি বলিব-কি বলিব আর ;
করহ গ্রহণ শেষ পরীক্ষা আমার।
মিটিয়াছে জীবনের ছিল সাধ যত ;
দেখেছি নয়ন ভরি সিংহাসনে আজ
অঙ্কে তব লবকুশে, নয়নের মণি
অভাগীর; সন্তান তােমার লইয়াছ
কোলে তুমি, চিন্তাহীন আমি এত দিনে।
অপূর্ণ বাসনা আর নাহি আছে কিছু
জানকীর, দাও প্রভু বিদায় এখন।
লক্ষ্মণ। এক্ িমহাদেবি, একি নিদারুণ কথা ?

পঞ্চম অঙ্ক।
১৮১
সীতা।
হে দেবর, ভ্রাতৃবধূ মাগিছে বিদায়,
পরীক্ষার কাল তার উপস্থিত এবে।
নমি যত গুরুজনে, স্বামীর চরণে
কোটি কোটি প্রণিপাত পরীক্ষা সময়।
সাক্ষী দশদিকে দশদিকপাল,
সাক্ষী দিগঙ্গনা চিত্ত নিরমল,
সাক্ষী অন্তরীক্ষে গ্রহতারাগণ,
সাক্ষী দেবলােকে দেবতাসকল।
সাক্ষী রসাতলে নাগেন্দ্র বাসুকী,
সাক্ষী সাক্ষী সবে গন্ধৰ্ব্ব কিন্নর,
সাক্ষী মর্ত্যভূমে যােগীঋষিগণ,
সাক্ষী ধৰ্ম তুমি সবার উপর।
যদি সতী হই আমি, কায়মনে যদি
করে থাকি একমাত্র পতি-পদ-সেবা,
নারীধৰ্ম্ম যদি পালন করিয়া থাকি
জীবনে সতত, সত্যপথে ধর্মপথে
যদি চলে থাকি চিরদিন, হে বসুখে,
জননি আমার, উঠ তবে উঠ দেবি,
তনয়া তােমার লও মাতঃ কোলে করি,
দাও তারে স্থান তব শান্তিময় ক্রোড়ে।
( ভূগর্ভ হইতে ভীষণ শব্দ। ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করিয়া
সিংহাসনােপবিষ্টা পৃথ্বী-দেবীর উত্থান।
বিবন্ধুর দ্রুত প্রস্থান।)

১৮৮২
সীতা-নিবাসন।
। এস কোলে, এস মাের দুখিনী তনয়া।
সীতা। বিদায় বিদায় প্রভাে, জনমের মত,
লবকুশ রহিল আমার।
(সীতাদেবীকে লইয়া পৃথীদেবীর পাতালপ্রবেশ।
আকাশ হইতে পুষ্পবৃষ্টি। লবকুশ,
লক্ষ্মণ প্রভৃতির রােদন।)
নারদ ও বাল্মীকি। জয় জয় মহাসতী ধরিত্রী-নন্দিনী।
রাম। কোথা গেল—কোথা গেল ভাই রে লক্ষ্মণ,
কোথা মিলাইল নয়নের আলাে মাের
প্রাণের প্রতিমা ? বসুন্ধরে, বসুন্ধরে,
কোথা নিয়ে গেলে তুমি হৃদয়-সৰ্ব্বস্ব
রাঘবের ? দাও—ফিরে দাও আনি মােরে
রঘুকুল-রাজলক্ষ্মী, গৃহ-লক্ষ্মী মাের।
লক্ষ্মণ।
কোথা বসুন্ধরা আৰ্য, কোথা মা জানকী ?
রাম। না দিল উত্তর বসুন্ধরা, নাহি দিল
ফিরায়ে আমার জানকীরে? হে লক্ষ্মণ,
আন শরাসন, আন শীঘ্র, অস্ত্রানলে
দহিব মেদিনী, ছারখার করি আজ
দিব রসাতলে এ সংসার, সাধ্য কার
কে পারে রক্ষিতে, দেবাসুর নাগ নর
আসুক সকলে ;
(গণ কর্তৃক শর-শরাসন প্রদান এবং রামচন্দ্র
কর্তৃক শর সংযােগকরণ।)
দাও ফিরে বসুন্ধরে জানকী আমার,

পঞ্চম অঙ্ক।
১৮৩
নারদ। ( করযােড়ে) কর রােষ পরিহার কমললােচন,
ভুলিয়াছ কেবা তুমি, কিসের কারণে
জন্ম তব। ভূভার হরিতে দয়াময়,
ছাড়িয়া গােলােকধাম দশরথগৃহে
অবতীর্ণ রামরূপে রাক্ষস নিধনে ;
আত্ম-বিস্মৃতিতে ভ্রান্ত আছ নররূপে,
কেন দেব অকারণ করিতেছ রােষ ?
মহালক্ষ্মী আবিভূতা জানকীর রূপে
এ সংসারে, দেবকাৰ্য্য সাধনের তরে,
শিখাইতে আর নারীকুলে নারীধৰ্ম্ম
নিগুঢ় এ কথা। সাধি মরতের কাৰ্য্য,
গেলেন কমলা চলি চিরশান্তিময়
নিত্যধামে নিত্যানন্দে করিতে বিরাজ
তােমাসনে, হে গােলােকপতি নারায়ণ,
পূর্ণজ্ঞানময় তুমি, আমি কি বুঝাব ?
( রামচন্দ্র কর্তৃক ধনুঃশর পরিত্যাগ।)
হে লক্ষ্মণ, বৃথা শােক কর পরিহার।
হের ওই লবকুশ অধীর কাদিয়া;
লহ দোহে অন্তঃপুরে, করহ সান্ত্বনা।
অবিশ্বাসী ব্রিলােক-নিবাসী আছ যারা,
করিলাম দিব্য চক্ষু প্রদান সকলে,
হের ওই অন্তরীক্ষে কমল আসনে,
বিরাজিছে মহাসতী অতুল গৌরবে।
পটাপসারণ।
;

১৮৪
সীতা-নিৰ্বাসন।
সুরবালাপরিবৃতা কমলারূপিণী সীতার অন্তরীক্ষে আবির্ভাব
অন্ধের চক্ষুলাভ। সকলের দর্শন।)
সুরবালাগণের সঙ্গীত।
হের রে ত্রিলােকবাসী
সতীধামে সতী ওই ;
অতুল গৌরবে শােভে
অনন্ত করুণাময়ী।
জয় সীতাসতী জয়,
জয় শ্রীরামের জয়,
কি আছে জীবের গতি
@পতি চরণ বই।
যবনিকা পতন।

No text on this page.

No text on this page.

Sita-nirbbashon

Author
Chaki,benimadhab
Title
Sita-nirbbashon
File name
Sita-nirbbashon
Text
OCR done
Citation
1913
Published
2009/09/13
Publisher
Sidhyeswar Pan,calcutta
Language
Sanskrit
Pages
199
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Drama
Keywords
Sita
DLI number
513304
Barcode
4990010020294.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
QKZPy4tjqk0
Download PDF

Sita-nirbbashon