Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Uttara Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
छेउता
सारिका
हवन-भिनय
FITHOR
ape me sunn:
me
MEENA
HatyaKerrupturdan
--------
ALLAHBE
aamaARALIAAPL-content wwwma
MartunusammanamaasummaNMOHAMNNY
*!হেন্দ্রনাথ গুপ্ত
MARANAMAHARAN
DANAawantPARD
LM.Mya
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
7. Biswas Nursery
উত্তৱা
ক্যালকাটা থিয়েটারে অভিনীত
প্রথম অভিনয় রজনী—রবিবার, ৭ই আগষ্ট, ১৯৩৮
স্টার থিয়েটারে অভিনীত
প্রথম অভিনয় রজনী—শনিবার, ১৮ই মে, ১৯৪০
শ্রীমহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, এম. এ.
GHOSH, C.
K,
C{ "'T
.
শ্রীগুরু লাইভে
২০ ৪নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
এক টাকা চারি আনা
প্রকাশক- শ্রীসুখেন্দুবিকাশ মজুমদার ৯নং দয়াল সােম লেন, কলিকাতা। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রিন্টার- পঞ্চানন দাস সত্যনারায়ণ প্রেস ২৮৪এ বিডন রাে, কলিকাতা।
যদি তােমার মনে হয়—চোখের জলে লেখা
এই নাট্য-কাহিনীর আড়ালে এমন কিছু
আছে••• তােমার জীবনের কোনাে একটি
বেদনা-পরিম্লান মুহূর্তকেও মধু-রসে সিঞ্চিত
করতে পারে ••হে অপরিচিত বন্ধু'এ
নাটকখানি তা হলে তােমার
: তাতি নইব্রেরী
*
৪।
:::
:- * - সিহাট।
( :'ও।
== উত্তরা নাটকের রচনাকাল ইংরাজী ১৯৩১ সাল ; তখন আমি বি-এ ক্লাশের ছাত্র। পাঠ্যজীবনের ভাবপ্রবণ-মনের কল্পনা নাটকের গতিকে কাব্যের আতিশয্যে মন্থর করেছিল। পরে কাব্যাংশ যথাসম্ভব বর্জন করে একে বর্তমান আকারে গ্রথিত করা হয়েছে। সাতবৎসর আগে এই উত্তরা-ই একদিন নাট্য-শিল্পী শ্ৰীযুক্ত নির্মলেন্দু লাহিড়ীর সঙ্গে আমার পরিচয় স্থাপন করিয়ে দেয়। নির্মল বাবুর নিকট থেকে পাওয়া সেদিনকার সেই মধুক্ষরা-প্রীতি সেই হ’তে অলক্ষ্য-সঞ্চারে আমার জীবনের কল্প-লতাকে অভিসিঞ্চিত করে আসছে। এজন্যে আমার মানসী-সৃষ্টির মধ্যে এই উত্তরার প্রতি আমার স্নেহের পক্ষপাতিত্ব আছে। ক্যালকাটা থিয়েটারের স্বত্বাধিকারী, শ্রদ্ধেয় বন্ধুবর শ্রীযুক্ত যশােদা নারায়ণ ঘােষ উত্তরার মঞ্চরূপদানে যেরূপ সূক্ষ্ম বসবােধের পরিচয় দিয়েছেন কোনাে পেশাদার রঙ্গালয়ের কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে তা সহসা আশা করা চলেনা! নাটকের গানগুলি শ্রদ্ধেয় কবি শ্ৰীযুক্ত হেমেন্দ্রকুমার রায়ের রচনা। প্রচ্ছদপটখানি এঁকেছেন প্রসিদ্ধ চিত্রশিল্পী শ্ৰীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্তী। ক্যালকাটা থিয়েটারে অভিনয়ের পর ষ্টার থিয়েটারের কর্তৃপক্ষ এই নাটকখানির পুনরভিনয়ের ব্যবস্থা করে বিশেষ ধন্যবাদ ভাজন হয়েছেন।
ক্যালকাটা থিয়েটারের সংগঠনকারিগণ ক্যালকাটা থিয়েটার হেমেন রায় ০ ০ ০ প্রযােজনা গীতরচনা নৃত্যপরিকল্পনা সুরশিল্পী নৃত্যশিক্ষক রূপ সজ্জাকর অমর বসু বিভাের বসু ৮। • স্মারক মঞ্চাধ্যক্ষ যন্ত্ৰীসঘ গােকুল বাবু মণি মুখার্জি ভুপেন দত্ত কুমুদ ভট্টঃ [ বাচ্চ] ক্ষীবােদ গাঙ্গুলী, সন্তোষ দাস [ ভুলুবাবু ], মন্মথ বসু, কুশশা বাবু A শ্রীকৃষ্ণ ভীষ্ম দ্রোণ ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠির ভীম অর্জুন ঘটোৎকচ ভুমিকা লিপি সিদ্ধেশ্বর গাঙ্গুলী [ এঃ ] জীবন চ্যাটার্জি অমিয় গােস্বামী মাণিক দত্ত রজনী ভট্টাচার্য্য পশুপতি সামন্ত অমল বন্দ্যো গণেশ গােস্বামী ly দেবীদাস বন্দ্যোঃ ০ ০ ০ ••• সন্তোষ দাস ০ ০ ০ পান্নালাল মুখখাঃ ••• অমূল্য হালদার অভিমন্যু দুৰ্য্যোধন দুঃশাসন শকুনি জয়দ্রথ কপিল বিরাট উত্তর ০ ০ ০ বিমল ঘােষ জীবন মুখােঃ ধ্রুব মুখােঃ ব্ৰজেন দত্ত ••• লম্বােদর ঘণ্টাকর্ণ অবশিষ্ট ভূমিকায় খগেন দাস জীবন মুখখাঃ আদ্যনাথ, বিভাের, কালী, বিমল ইত্যাদি ০ ০ ০ দ্রৌপদী সুভদ্র ০ ০ , রােহিণী ধরিত্রী মীরা অবশিষ্ট ভূমিকায় আসমানতারা শেফালিকা [ পুতুল। লক্ষ্মী দুর্গারাণী বিদ্যুৎ সুবাসিণী, প্রমিলা, আঙুর, প্রতিভা, ফিরােজা, আশা, মহামায়া ইত্যাদি স্টার থিয়েটারের সত্ত্বাধিকারী অধ্যক্ষ প্রয়ােগশিল্পী মঞ্চশিল্পী নৃত্যশিল্পী মঞ্চতত্ত্বাবধায়ক রূপ সজ্জাকর যন্ত্ৰীসঘ সংগঠনকারিগণ সলিলকুমার মিত্র বি-কম্ জ্ঞানেন্দ্রকুমার মিত্র কালিপ্রসাদ ঘােষ বি-এস-সি পরেশ বসু সাতকড়ি গাঙ্গুলী যতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী নন্দলাল গাঙ্গুলী বিদ্যাভূষণ পাল, কালিদাস ভট্ট, মথুরামােহন শেঠ, ললিতমােহন বসাক, বনবিহারী পান, বসন্তকুমার মুখােঃ ভুমিকা লিপি ভূপেন চক্রবর্তী পঞ্চানন চট্টোপাধ্যায় অমূল্য মুখার্জি শ্রীকৃষ্ণ গােছ ঘােষাল ভীষ্ম দ্রোণ ধৃতরাষ্ট্র যুধিষ্ঠির ভীম অর্জুন ঘটোৎকচ অভিমন্যু দুৰ্য্যোধন ০ ০ ০ সনৎ মুখার্জি গােপাল ভট্টাচাৰ্য্য অমল বন্দ্যোঃ জীবন গাঙ্গুলী দেবীদাস (পরে মঙ্গল চক্রবর্তী) জয়নারায়ণ মুখার্জি ০ ০ ০ ••• উমাপদ বসু দুঃশাসন শকুনি . স সব কপিল বিরাট মুরারী বিমল ঘােষ জয়নারায়ণ মুখার্জি রবি রায় চৌধুরী মঙ্গল চক্রবর্তী (পরে মণি sn. চ্যাটার্জি ) ঘণ্টাকর্ণ ০ ০ ০ লবােদর অবশিষ্ট ভূমিকায় রণজিৎ রায় বিষ্ণু সেন রতন সেন, ভােলানাথ চৌধুরী, নলিন বাগ, কৃষ্ণ বন্দ্যোঃ, প্রসাদ বিশ্বাস, অনিল রায় ইত্যাদি। ০ দ্রৌপদী সুভদ্রা উত্তরা নােহিণী ধরিত্রী মীরা অবশিষ্ট ভূমিকায় মিস লাইট সত্যবালা শেফালিকা (পুতুল) রাজলক্ষ্মী দুর্গারাণী লীলাবতী দুনিয়াবালা, সরসী, তারকবালা, রবি, বীণা (৩ জনা), শেফালি (বােদা), আশা, হাসি, লীলা, ইরা,পারুল,শান্তি,কমলা ইত্যাদি। ০ ০ ০ SIK. GHOST, CALCULA
No text on this page.
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
উত্তরা পাষাণবেদীতে
পুষ্পিত বনভুমি ; দূরে জাহ্নবীর জলধারা।
বসিয়া মালা গাঁথিতেছিল।
উত্তরার সখীদের গীত
ওলো ফুল ফুটেছে বনে বনে
ভুল জুটেছে মনে মনে,
এলো চুল লুটেছে কুঞ্জপথে
ফুল-বাতাসে খণে খণে।
বালা গাঁথছে মালা ফুলে ফুলে
কালা পাষাণ থাকে ভুলে ভুলে
সখি দেবতা যদি মানুষ হত
জাগত দয়া প্রাণের কোণে।
বধুর যৌবন হয় জাগল নাক
মধুর প্রেমের কোকিল ডাকল নাক
রঙ দিয়ে কেউ আঁকল নাক
অশোক পলাশ মুরণে।
২
উত্তরা
উত্তরা। মীরা,
মীরা। মালা গাঁথা শেষ হ’ল সখি?
উত্তরা। হ’ল শেষ ; এইবারে আয় তােরা -
জাহ্নবীর পুণ্য-নীরে স্নান সমাপিয়া
মহেশ্বরে করিব অর্চনা।
মীরা। আমি কিন্তু সখি, ভাবিয়া অবাক হই
স্বপ্নে কেন ইষ্টদেব করিলা নির্দেশ
এই বনে পতি লাভ হইবে তােমার।
রাজ্যে নহে•••নহে লােকালয়ে
শ্বাপদসঙ্কুল এই নিবিড় কানন
মানুষের নাহি হেথা কভু সমাগম ;
তাই শঙ্কা হয় প্রাণে -
উত্তরা। কিসের আশঙ্কা সখি?
হিংস্ৰজন্তু ? দানব ? রাক্ষস ?
মনে নাই, ক্ষণ পূৰ্ব্বে আসি হেথা
বন-অধিষ্ঠাতা সেই শালপ্রাংশু বিরাটপুরুষ
মােদের রক্ষণভার স্ব-ইচ্ছায় করেছে গ্রহণ।
আর তবে কারে ভর ?
আয় সখি, নিঃশঙ্ক হৃদয়ে
( সকলের প্রস্থান; অপরদিক হইতে
অভিমন্যু ও ঘটোৎকচের প্রবেশ)
অভি। কহ সত্য, কেবা তুমি ?
ঘটো। বলেছি তাে, বনচারী অনাৰ্য্য রাক্ষস --
অভি। না, না, কভু নহে ।
দেব-রে-সুদুর্লভ হেন শক্তি কভু
.
উত্তরা অনার্যের করায়ত্ব নহে। দ্বারাবতী তেয়াগিয়া রথ আরােহণে-- চলেছিনু বিরাট নগরে। বনপথে অকস্মাৎ কেশবের রথ অলক্ষ্য হইতে তুমি অন্তরাল করি’ দাড়াইলে সম্মুখে আমার ! “ছাড় পথ, পথ ছাড়” বারম্বার কহিনু ডাকিয়া••• শুনিলে না কোনাে কথা ! শুধু হেরিলাম— স্ফুরিত অধরে আর নয়নে তােমার অই • অই মত রহস্যের হাসি । বীরত্বে, পৌরুষে দিলে প্রচণ্ড আঘাত ক্রুদ্ধসিংহ সম তাই রথ হতে ঝম্প দিয়া পরিলাম ভূমে দ্বন্দ্বযুদ্ধে ভেটিতে তােমারে। কিন্তু কী আশ্চর্য ! কেশব-প্রদত্ত-শিক্ষা, মল্লবিদ্যা শিক্ষা যত বলভদ্র পাশে সকল স্তম্ভিত করি আঁখির নিমেষে অবহেলে তুমি মােরে বক্ষে তুলে নিলে ! হাঃ হাঃ হাঃ না•••মানিব না পরাজয় ; শক্তি নহে, নহেক পৌরুষ- রাক্ষসী-মায়ায় মােরে করেছ স্তম্ভিত ! ঘটো। অভি।
৪ উত্তর হে রাক্ষস, বীরত্বের গর্ব থাকে যদি সর্ব মায়া পরিহরি দ্বন্দ্বযুদ্ধ দেহ তবে অর্জুন-নন্দনে। ঘটো। অর্জুন-নন্দন তুমি ! অভি। হঁ্যা, চমৎকৃত কেন বীর ? কালান্তক রূপে তব সম্মুখে দাড়ায়ে রণ মাগে অভিমন্যু-অর্জুন-নন্দন! ঘটে। অভিমন্যু ! অৰ্জ্জুন-নন্দন! অনুমান মিথ্যা নহে মাের । হাঃ হাঃ হাঃ। ওরে ভাই, রণ চাস? রণ চা তুই ? দিব রণ•••দিব প্রাণ চাহি যদ্যপি। কিন্তু তার আগে আয় একবার কঁাধে তুলে নিয়ে তােরে মহােল্লাসে নেচে আসি বন-বনান্তরে। আয়.•• আয় ভাই- অভি। ভাই। তব মুখে ভ্রাতৃ-সম্বােধন! কেন, বিস্ময় কি আছে ইথে ? ওরে অভি, আমি তাের.আমি তাের ( উচ্ছাস দমন করিয়া) পাণ্ডবেরে ভালবাসি কিনা উল্লাসে পাগল হয়ে তাই তােরে ভাই বলে ডাকি। অভিমন্যু, রাগ করিয়াে না তুমি, লজ্জা করিয়াে না, চারিদিকে ঘাের বন••• অনাৰ্য রাক্ষস মুখে ভ্রাতৃ সম্বােধন দুটো।
কেহ শুনে নাই হেথা,
শুধু তুমি, আমি,
আর শুনেছেন সেই কৃষ্ণ অন্তর্যামী।
অভি। কী আশ্চর্য্য । অন্তর কহিছে যেন
এ অনাৰ্য আৰ্য্যোত্তর, পূজনীয় মম !
নাহি জানি
অজ্ঞাতে বলিনু কারে বহু কটুবাণী ।
ঘটো। কী ভাবিছ অভিমন্যু ?
চলে এসাে ত্বরা ; এ বনের আমি রাজা-
সিংহ, ব্যাঘ্র, ভল্লুকেরা
সবে মাের প্রজা;
এসস, পরিচয় দিব করাইয়া তাহাদের সাথে।
( চলিতে চলিতে নেপথ্যে চাহিয়া )
ভাল কথা•••অভিমৃত্যু,
দেখ, দেখ, দেখ, অই—
অভি। একি! মূর্তিমতী উষা যেন দিল দেখা
উদয় অচলে !
চন্দন-চশ্চিত ভালে, রক্ত পট্টাম্বরে,
ললিত ঝঙ্কার তুলি’ চরণ-মঞ্জীরে-
কে আসিছে সদ্য-স্নাত লাবণ্য-প্রতিমা।
কহ ভদ্র, জানাে যদি, কে ঐ কিশােরী ?
ঘটো। পরিচয় নাহি জানি;
আমি শুধু জানি-
অই মালা নিয়ে যেতে আসিতেছে বালা-
-
উত্তরা ( উত্তরা বেদী’পরে পুষ্পমাল্য রাখিয়া গিয়াছিল, তাহা দেখাইয়া দিতে অভিম মালা তুলিয়া গলায় পরিল) অভি। মালা! বাঃ, যত শােভ- গন্ধ তার আরও বহুগুণ- দুটো। ( ছুটিয়া উত্তরার প্রবেশ ) উত্তরা। কি করিলে•••কি করিলে অবােধ পথিক। শিব-পূজা তরে আমি গেঁথেছিনু মালা— সে মালা পরিলে গলে এত দুঃসাহস ! (ঘটোৎকচকে) তুমিই না বন-অধিষ্ঠাতা! বলেছিলে, রক্ষক হইয়া তুমি রহিবে হেথায় ; তােমারি সাক্ষাতে মাের মালা হ’ল চুরি ! ও, সত্য বটে, হয়েছে অন্যায়... ভীষণ অন্যায়। কিন্তু মাগাে- আমারে দুষিছ তুমি শুধু অকারণ ; শোনা যায়, শিব নাকি এক কালে ঋক্ ধ্বক কপাল আগুনে মদনেরে ভস্ম করেছিল। তাই আমি মনে ভাবিলাম-- শিবে তুষ্ট করি, তুমি তারে পুনরায় দিয়েছ বাঁচায়ে। দেহধারী সে মদন মালা তুলে নিল, তাহে দোষ কিবা ? উত্তরা। চমৎকার ! পূজা নাহি শেষ হতে শিব তুষ্ট হল!
উত্তরা
দুটো।
হয়•••হয়...মাগাে, তাও হয়।
থাকিলে মনের ভক্তি-
পূজার আগেই এসে ঠাকুর আপনি
নৈবেদ্যের চাল কলা সব খেয়ে যায়।
ও, প্রত্যয় হল না বুঝি ?
দেখ, দেখ তবে প্রত্যক্ষ প্রমাণ,
ডেকেছ কি ডাক নাই—
তামনি আসেন কৃষ্ণ এইদিক পানে !
ভাই,
কদৰ্য্য অনাৰ্য্য এবে লুকাইল বনে ;
যথাকালে আবার মিলিব।
অভিমন্যু,
[ প্রস্থান
উত্তরা।
অভি।
উত্তরা।
অভিমন্যু। ! অৰ্জ্জুন-নন্দন তুমি !
অনুমান সত্য দেবী; তুমি ?
চিনিবে না মােরে,
আমি কিন্তু চিনেছি তােমারে।
বহুদিন শুনিয়াছি তােমার কাহিনী
আর্য্য বৃহন্নলা মুখে !
কতদিন শুনিতে শুনিতে
আকুল অন্তর মাের
অলক্ষ্যে চলিয়া গেছে দ্বারাবতী পানে
হে কুমার, তােমারি সন্ধানে।
হয়তাে ভেবেছি কভু—এমনি বিজনে
চকিতে হইবে দেখা দেহে সঙ্গোপনে।
উত্তরা তুমি চাবে চলে যেতে, মৌন-আঁখি মাের- তােমার নয়নে চাহি কঁদিয়া কহিবে— “হে পান্থ বিদেশী, ক্ষণিক বিশ্রাম করাে তরুতলে বসি,”. উত্তরার সে মিনতি এতদিনে শুনিলে কুমার ? অভি। উত্তরা ! তবে তুমি বিরাট নন্দিনী। কি আশ্চর্য্য। হে কিশােরী, নহ তুমি অচেনা আমার ! যেদিন প্রথম মাতুল গােবিন্দ মুখে- ( শ্রীকৃষ্ণের প্রবেশ ) রক্ষা কর গুণধর ভাগিনেয় মাের, যা করিবে কর নিজে মাতুল গােবিন্দ-মুখে করিতে চেয়ােনা আর কলঙ্ক লেপন । হায় হায়••• আমি ভেবে মরি-বনপথে অকস্মাৎ কি কারণে ভাগিনেয় হল অন্তর্ধান । কিন্তু হেথা এসে দেখি বলি, শুন সুবদনি, নিতান্ত সুবােধ শিশু ভাগিনেয় মাের— এরে ছেড়ে দাও! উত্তরা। কিন্তু ও যে চোর- অভি। না:•••••মিথ্যা কথা- শ্রীকৃষ্ণ। আহা, লজ্জা কিবা তাহে ? .
উত্তরা চৌর্য-বিদ্যা-সেততা শ্রেষ্ঠ বিদ্যা বিশেষতঃ রমণী হরণ। শুন ধনি, - ঘােড়শ শতেক নারী করিয়া হরণ- অর্জুনেরে শিক্ষা দিমু চৌর্য্যের কৌশল ; তারপর একদিন আমারি উপরে সখা বিদ্যার পরীক্ষা দিল আমারি ভগিনী সুভদ্রা হরিয়া। সেই চৌর-শ্রেষ্ঠ, পুণ্যকীৰ্ত্তি সখা ধনঞ্জয় ইনি তার সুযােগ্য সন্তান ; চৌর্যের অপূৰ্ব শিক্ষা বহে এঁর শিরায় শিরায় ! অভি। মাতুল- তবে থাকুক সে সব কথা জানি ভাল, মাের যুক্তি কারাে নাহি হবে মনােমত। এসাে দোহে সঙ্গে মাের- বিরাট সভায় হবে দুজনার চৌর্যের বিচার। শ্রীকৃষ্ণ। ( উত্তরা অভিমন্যুকে লইয়া শ্রীকৃষ্ণের প্রস্থান ; পশ্চাতে মহানন্দে হাসিতে হাসিতে ঘটোৎকচ তাহাদের অনুসরণ করিল) দ্বিতীয় দৃশ্য উত্তর। বিরাট নগর, প্রাসাদ অলিন্দ। বিরাট ও উত্তর বিরাট। নিশা শেষে গেল কন্যা মহেশে পূজিতে, বেলা দ্বিপ্রহর প্রায় ; এখনাে এল না ! রে উত্তর,—একি বিপরীত বুদ্ধি তাের ? কোন্ প্রাণে ঘাের বনে উত্তরে একাকী ফেলিয়া- গৃহে ফিরে এলি তুই? শুন তাহ, কহি সবিশেষ ; বনপথে দেখা হল মহাবীৰ্য্যবান এক রাক্ষসের সাথে । অনার্যের বেশ তার, কিন্তু জ্ঞান হয় । ছদ্মবেশী দেবতা নিশ্চয়। সুমিষ্ট মধুর ভাষে সম্বােধিয়া মােরে কহিলেন মহাত্ম- “ভগিনীর তরে তব কোনাে চিন্তা নাই ; আপন জননী সম রক্ষিব তাহারে।” তাই আমি বিরাট। ধিক্ তােরে বুদ্ধিহীন সন্তান আমার । মায়াবী রাক্ষস তােরে করেছে ছলনা! নাহি জানি এতক্ষণে ঘটিল কি মহা সর্বনাশ! রে উত্তর, দ্রুতগামী বায়ুরথে বনদেশে করহ গমন, সঙ্গে লও তীক্ষ্ণধার আয়ুধ কৃপাণ,- উত্তরা ১১ ভীম। যাও শীঘ্র যাও, রাক্ষস-কবলমুক্ত কর ভগিনীরে। ( উত্তরের প্রস্থান ; অপর দিক হইতে যুধিষ্ঠির, ভীম ও রে প্রবেশ ) যুধি। কি কারণ চিন্তান্বিত বিরাট নৃপতি। পুত্রে তব কোথায় প্রেরিলে ? বিরাট। ধৰ্ম্মরাজ, উপস্থিত বুঝি মাের মহা সর্বনাশ ! নিশা শেষে গেল কন্যা শঙ্করে পূজিতে, এখনাে এল না ফিরে। ভয় হয়- জানি কি বিপদ ঘটিল। কিসের বিপদ তব বিরাট রাজন্ ? সুমঙ্গল সৌম্যমূৰ্ত্তি ধৰ্ম্মরাজ রহেন যেথায়, অমঙ্গল তথা হতে বহুদূরে পলাইয়া যায়। একান্ত আকুল যদি তুমি- কি করিবে ফুল-তনু কুমার উত্তর ? বৃকোদরে করহ আদেশ, গদা স্কন্ধে তুলে নিয়ে দেখে আসি ত্বর কালহত কে দুৰ্ম্মতি বিরাটের ঘটায় বিপাক । বিরাট। না, না, ক্ষমা করো ভীমসেন, তােমারে না’রিব আমি কাননে প্রেরিতে। এই দীর্ঘ বর্ষকাল- সয়েছ অনেক দুঃখ আমার লাগিয়া । জ্ঞানে বা অজ্ঞানে
১২
করিয়াছি বহু অপরাধ, হে পাণ্ডব,
তােমাদের সবার নিকটে
যুধি । একি কহ বিরাট রাজন্ !
অপরাধী নহ তুমি, সাধিয়াছ পাণ্ডবের
মহা উপকার। তােমার করুণা বলে,
তােমারি আশ্রয়ে
অজ্ঞাত বাসের কাল পরিপূর্ণ হ’ল ;
তােমারি সহায়ে সখা,
পণ-মুক্ত হইল পাণ্ডব।
সত্য পালনের বন্ধু, দুর্দিন-বান্ধব, নাহি জানি
কোন্ বাক্যে কৃতজ্ঞতা জানাবাে তােমারে !
বিরাট। ধর্মরাজ,ধৰ্ম্মরাজ,
( উত্তরের পুনঃ প্রবেশ)
উত্তর। পিতা, আনিয়াছি, শুভ সমাচার,
পাণ্ডব-মিলন হেতু বিরাট নগরে
আসিছেন শ্রীগােবিন্দ দ্বারাবতী হতে!
কী আশ্চৰ্য্য পিতা,
দূর হতে হেরিলাম কেশবের রথে
উত্তরা ভগিনী মাের হাস্য মুখে রয়েছে বসিয়া!
বিরাট। শ্রীগােবিন্দ আসিছেন বিরাট নগরে ।
শীঘ্র যাও হে কুমার,
পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া কৃষ্ণে কর অভ্যর্থনা।
( উত্তরের এল)
অর্জুন। কেশব আসিছে।
উত্তরা ধনসঙ্গী, যেন মনে হয়, পাণ্ডবের দুঃখ-নিশা-শেষে হ’ল পুনঃ অরুণ উদয় ! বিরাট। হ’ল ভাল, কৃষ্ণসনে আসিছে উত্তরা । *ী, মম অনুরােধ মাের উত্তরারে তুমি করহ গ্রহণ। অর্জনক উত্তরা। বৃহন্নলা বেশ ধরি’ আশৈশব পালিয়াছি স্নেহছায়াতলে ; নৃত্যে-লাস্যে, সঙ্গীত-কলায় ভূষিত করেছি তারে রূপ-মুগ্ধ-ভক্ত যথা মায়ের প্রতিমা-সজ্জা, করে অলঙ্কারে। হে রাজ, মাতৃসমা মানি আমি কন্যারে তােমার ; দেহ আজ্ঞা, মাতৃরূপে করিব গ্রহণ। বিরাট। কিন্তু বড় আশা ছিল প্রাণে - ( অভিমন্যু উত্তয়া সহ শ্রীকৃষ্ণের প্রবেশ ) শ্রীকৃষ্ণ। আশায় সাধিল বাদ নিতান্ত দুর্জনে । সকলে। কেশব, কেশব! শ্রীকৃষ্ণ। আর কেশব! কেশব অবাক হয়ে হ’ল প্রায় শব । মনে মনে ছিল আশা অর্জুন-নন্দন আর বিরাট-নন্দিনী দুজনেই হবে ঠিক চৌৰ্য্য অপরাধে হাতে হাতে বন্দী করি আনিয়াছি দোহে ; সাধু শিরােমণি। কিন্তু হের,
১৪
উত্তরা
বিচারিয়া দেহ দণ্ড যে হয় সে হয়-
( দ্রৌপদীর প্রবেশ)
দ্রৌপদী। কে গাে শঠ শিরােমণি,
মাতার অজ্ঞাতে চাহ সন্তানের করিতে বিচার ?
আয় পুত্র, আয় কন্যা, আয় মাের বুকে।
শ্রীকৃষ্ণ। কৃষ্ণা, সখি,
এরা কিন্তু মহা অপরাধী।
দ্রৌপদী। জানি কৃষ্ণ, বুঝেছি সকল !
গুরুতর অপরাধে
অপরাধী সন্তান আমার!
বিচার তাহার
করিবেন নিজে প্রজাপতি।
দ্বারকায় রথ আমি করেছি প্রেরণ
সুভদ্রা ভগ্নীরে মাের আনিতে হেথায়,
বার্তাবহ দিকে দিকে চলে যাক ত্বরা
আমন্ত্রণ করিবারে ধরণীর রাজন্য-মণ্ডলে।
তারপর সাক্ষী রাখি ধৰ্ম্মরাজে,
সাক্ষী রাখি দেহধারী নর নারায়ণে
উত্তরা অভিরে মাের পুষ্পডােরে করিব বন্ধন।
(নেপথ্যে শধ্বনি)
= তৃতীয় দৃশ্য বিরাটপুর সান্নিধ্যের বনপথ । লম্বোদর ও ঘটোৎকচের অপরাপর অনুচর লম্বাে। এই দেখ, তােরা সবাই চলে এসেছিস, তবু সেই কুঁড়ে ঘণ্টাকর্ণের দেখা নেই! বলি, ও ঘণ্টাকর্ণ, ঘণ্টাকর্ণ - ( নেপথ্যে ঘণ্টাকর্ণ-“যাচ্ছি...ই...ই...) লম্বো। “যাচ্ছি”—আমাদের মাথা কিনেছেন আর কি! ওদিকে বিরাটরাজার মেয়ের বিয়ে যে শেষ হয়ে গেল (ঘণ্টাকর্ণের প্রবেশ) ঘণ্টা। বিয়ে শেষ হয়ে গেল । আমরা না যেতেই। লম্বাে। কেন, তুই বরের মাসী না কণের পিশি যে তাের জন্যে বিয়ে আটকে থাকবে? বিয়ে তাে বিয়ে বর-কণে এতক্ষণে বাসরঘরে চলে গেল ঘণ্টা। বাসরঘরে চলে গেল! হিঃ হিঃ হিঃ—আমার একটা গল্প-কথা মনে পড়ে গেল- লম্বাে। রাখ, তাের গল্প-কথা! বুদ্ধির টেকি, পা চালিয়ে আয় ঘণ্টা। বুদ্ধির চেঁকি! , তাহলে গল্পটা না বললেই নয়! প্রমাণ করে দিচ্ছি আমার বুদ্ধির কতখানি দৌড়।•••বাসরঘরের কথা বলছিলি না? আমার বাসরের কথা শােন্। বিয়ে হয়ে গেল, তবু দেখি বউ বাসরঘরে আসতে দেরী কচ্ছে! চারদিকে শ্বশুর- শাশুড়ি, আত্মীয় কুটুম-বউকে ডাকতেও লজ্জা করে—আবার না এলেও বুকের ভেতর হুহু করে ওঠে। দুকুল রক্ষা করে তাই ছাড়লাম এক ভেঁকুর—“ব্বউ” ; সবাই ভালে যে নিছক টেকুর ;
উত্তরা
তখন বউ
কিন্তু বউ বুঝল যে আমি তাকেই ডাকছি—“বউ”।
কি করলে জানিস ? সে দিল এক হাঁচি ; সবাই ভাবল নিছক
হাঁচি; কিন্তু আমি বুঝলাম যে বউ আমাকে বলছে “যাচ্ছি”“যাচ্ছি”-
( সকলে হাসিয়া উঠিল ; শুধু লম্বোদর বিরক্তভাবে এক পার্শ্বে দাড়াইয়া রহিল।
ঘণ্টা। কি ! গােমড়ামুখাে হয়ে রইলি যে? আমার বউএর বুদ্ধির কথা
শুনে হিংসে হচ্ছে বুঝি ?
লদাে। বয়ে গেছে হিংসে হতে ; তাের বউএর বুদ্ধির গল্প শুনলেই পেট
ভরবে! ওদিকে ভীমের সাঙ্গপাঙ্গরা যে সব ভাল ভাল খাবার
জিনিস উড়িয়ে দিল।
ঘণ্টা। তা না হয় দিলই বা, আমাদের রাজা ঘটোৎকচ তা বলে আমাদের
বাসী পেটে রাখবে না। আয় না, একটু নেচে-কুঁদে নিই—ক্ষিধের
ওষুধ হবে’খন•••ধর না একখানা গান—
ঘটোৎকচের অনুচরদের গীত
বন মানুষ নইত মাের। বনের মানুষ দাদা,
মনের মানুষ আজকে হয়ে বধৰ কেবল ছাদা।
ঢের খেয়েছি মহিষ হরিণ শুয়াের শ্রীরাম পক্ষী
রসগােল্লার গামলাতে আজ ঝাঁপিয়ে হক মক্ষি
নাগর সেজে নগর পানে ছুটব কে দেয় বাধা ?
ভুড়ির বহর দেখে ভীষণ যেয়ােনা কেউ ভড়কে
ভয়ের ব্যাপার নেইক ভায়া নই যদিও খড়কে।
এক একজনে একশ হাড়ির বেশী খেলেই তা ॥
( ঘটোৎকচের প্রবেশ)
ঘটো। বেঁচে থাকবেঁচে থাকু••
ভাল নাচ নেচেছিস্ তােরা-
উত্তরা ১৭ জনে জনে খুসী করে দিব পুরস্কার। শােন্ ভাইসব, “হাতীমারা” বনে তােরা আজ রাত্রে করূগে বিহার। গণ্ডার, ভল্লুক, মােষ, যা পাস্5 ভাঙ্গিয়া গলার হাড় তাজা রক্ত খাস্। যা যা যা•••খুসী হয়ে দিলাম আদেশ। সকলে। বহবা•••বহাে•••চল্ চল্ সবে- ষাে। সে তো যাবাে•••কিন্তু যে জন্যে আমাদের নাচোন কেঁাদন- সেই বিয়ে দেখা হল না তাে রাজা। হা রাজা,—বিয়ে হয়ে গেছে তবু এখনাে তাে আমাদের ডাকিল না তারা। দূর বেটা হাঁদারাম সেথা যাব কি রে ? দেখিলে মােদের ছিরি-- করি দন্ত কিড়িমিড়ি— ভয়ে বর মুচ্ছা যাবে- আর চাদ উঠিবে না ফিরে। ঘটো। সাবধান-অমঙ্গুলে কথা যদি বলিস্ আবার এক চড়ে ভাবি চোয়াল। বর মূৰ্ছা যাবে কি রে ? ঘণ্টা।
১৮ ঘটো। জানিস্ জানি, যার বিয়ে হল- সেই অভিমন্যু কেবা? শ্রীকৃষ্ণ তাহার মামা, শিবজয়ী ধনঞ্জয় বাবা, ভীমসেন জ্যাঠা, আর ঘটোৎকচ দাদা- লম্বাে। এত কুটুম্বিতা! তুমি দাদা! তবু তারা নেমন্তন্ন করিল না তােমা! নেমন্তন্ন ? তাইতাে । কেন ডাকিল না মােরে । কেন ডাকিল না!••• আরে দূর, আমি তার ভাই একেবারে আপনার জন- আমারে কিসের নেমন্তন? অর্জুনের আছে নেমন্তন ? আছে কি ভীমের ? তবে ? হাঃ হাঃ হাঃ ঘণ্টা। কিন্তু অর্জুনের লােক যারা তারা তো পেয়েছে নেমন্তন্ন ! ভীমের বন্ধুরা যত—তারাও গিলিছে সবে মাংস, পরমান্ন, মণ্ডা পাহাড় পাহাড়। শুধু ঘটোৎকচ-অনুচর অভাগা আমরা আমরাই পড়িলাম বাদ! ঘটো। ওরে, না • না•••তােদের বলার ভার, রে অবােধ,রে অশান্ত বন্ধুরা আমার, - উত্তর। - = ততাদের সকল ভার ধর্মরাজ মনে মনে দেছেন আমারে। চল চল্ তােরা, আমিও তােদের সাথে যাই, নিজ হাতে বন্যপশু মারিয়া এখনি তোদের বিয়ের ভােজ দিয়ে আসি চ- ( প্রস্থানেত ; শ্রীকৃষ্ণ সম্মুখে আসিয়া পঁাড়াইলেন) শ্রীকৃষ্ণ। কোথা যাও ঘটোৎকচ ? অভিমন্যু-পরিণয়ে সবার অধিক প্রিয়, আনন্দ তােমার। সেই তুমি- কি কারণে কহ প্রিয়বর,- কোন্ গুরু অভিমানে, কোন্ বেদনায় অপরাধী প্রায় হেন রহ লুকাইয়া ? চল প্রিয়বর,- আমি আমন্ত্রণ করি তােমা সঙ্গীগণ সহ, চল ত্বরা বিরাট-ভবনে। তােমার মিলন লাগি’ উৎসুক দ্রৌপদী, সুভদ্রা জননী তব আছে প্রতীক্ষায়। অভিমন্যু-জ্যেষ্ঠ-ভ্রাতা তুমি, বর-বধূ আশীৰ্ব্বাদ করিবে না প্রিয় ? ঘটো। আশীৰ্বাদ ! নিশ্চয় করিব আশীৰ্বাদ । অভিমন্যু ভাই মাের, আমি তার দাদা, আশীর্বাদ করিব না তারে। কেমন, বলি নি আমি ? ডাকিবে না মােরে !
২০
উত্তরা
দেখু: দেখু•••চেয়ে দেখু••'হতভাগা সব,
কৃষ্ণ নিজে এসেছেন তােদের ডাকিতে।
ওরে, প্রণাম কর, প্রণাম কর
(সকলে প্রণাম করিল ; ঘটোৎকচ শ্রীকৃষ্ণের পশ্চাতে যাইতে
যাইতে সহসা থমকিয়া দাড়াইল)
শ্রীকৃষ্ণ। নীরবে দাড়ালে কেন প্রিয় ?
ঘটো।
কৃষ্ণ, হ’ল না যাওয়া, ক্ষমা কর মােরে ;
শ্রীকৃষ্ণ। প্রিয়বর,
ঘটো। কেমনে যাইব কৃষ্ণ,
আমি যে অনাৰ্য্য!
শ্রীকৃষ্ণ। কী দুঃখ তাহাতে প্রিয় ?
অনাৰ্য যদ্যপি তাহে কিবা অপরাধ?
বর্ণ তব ঘনশ্যাম ?
এই হের আমিও শ্যামল ।
বনচারী তুমি যদি
মাের বাস সেও বৃন্দাবন।
অপরাধু যদি তার
অনাৰ্যা রাক্ষসী যার মাতা-
আমারও জননী তবে
অনাৰ্য্যা গােপের নারী ব্ৰজের যশােদা ।
ঘটো।
কৃষ্ণ, কৃষ্ণ,
চোখ ফেটে জল আসে-
বলিও না আর।
জানি, তুমি ভালবাস আমারে কেশব,
উত্তরা ২১ বুদ্ধিহীন কর্ণার - কর্পর আধার বলি ভালবাসে সকল পাণ্ডব। তবু•••তবু কৃষ্ণ, পারিব না যেতে। আসিয়াছে পৃথিবীর নানা দেশ হতে নিমন্ত্রিত রাজগণ সেথা ; নিতান্ত কুৎসিত আমি, অসভ্য বর্বর, নাহি জানি সাধু আচরণ, আমারে দেখিয়া যদি হাসেন তাহারা••• লজ্জা পাবে পিতা তাহে, পাণ্ডবের হেঁট হবে মাথা। কাজ নাই•••কাজ নাই গিয়ে, ফিরে চলিলাম কৃষ্ণ। প্রাণের অভিরে মাের জানাইও ভালবাসা অনাৰ্য ভাইয়ের- যদি অভি ঘৃণা করি মুখ না ফিরায় (সানুচর ঘটোৎকচের প্রস্থান) শ্রীকৃষ্ণ। হায়•••হায়- কী দারুণ অভিমান শেলসম বিঁধে আছে ঘটোৎকচ বুকে ! পাণ্ডব-মিলন হেতু সতত আকুল- অপরাধী প্রায় তবু ফিরে দূরে দূরে ! নাহি জানি, আৰ্য অনার্যের এই ভেদ কবে বা ঘুচিবে ! এ মহাভারত-তীর্থে এক ঠাই সকল মানব এক মহ। জাতি রূপে কবে বা মিলিবে ।
২২
উত্তরা
( দ্রৌপদী ও সুভদ্রার প্রবেশ)
দ্রৌপদী। কেশব,
শ্রীকৃষ্ণ। একি! কৃষ্ণা,-সখি,
তুমি হেথা অকস্মাৎ!
দ্রৌপদী। জাহ্নবী-অৰ্চনা করি সুভদ্রার সনে
এই পথে চলেছিনু গৃহে !
লােকমুখে করিনু শ্রবণ
তুমি নাকি যাইবে কেশব,
পাণ্ডবের দূত হয়ে হস্তিনা নগরে !
কিসের এ দৌত্য কৃষ্ণ ?
ঐকৃষ্ণ। ধৰ্ম্মরাজ, ভীমার্জুন সবার বাসনা সখি,-
ভ্রাতৃদ্বন্দ্ব পরিহরি—
কৌরবের সনে হােক সৌহার্দ্য স্থাপন।
সন্ধির প্রস্তাব লয়ে তাই চলিয়াছি।
দ্রৌপদী। সন্ধির প্রস্তাব ! ধৰ্ম্মরাজ ভীমার্জুন:
সবার বাসনা !
কিন্তু, জানিতে কি পারি কৃষ্ণ,
দ্রৌপদীর মুখ পানে চাহি
একবার স্পষ্ট ভাষে কহ তাে কেশব,-
কী ইচ্ছা তােমার ?
শ্রীকৃষ্ণ! সখি:• সখি •
দ্রৌপদী। বল কৃষ্ণ,
মেদিনী-নিবদ্ধ-দৃষ্টি, কম্পিত অধর,
কি কারণ মৌন হয়ে রহিলে কেশব ?
-
উত্তরা সুভদ্রা। কি কবেন আৰ্য তােমা? তুমি ভাল জান- অগ্নিগর্ভ গিরি সম দুইপক্ষ কৌরব পাণ্ডব বিশ্বব্যাপী প্রলয়ের আছে প্রতীক্ষায়। যেইদিন হবে অগ্নদগার লক্ষ-কোটী সুখের সংসার আঁখির নিমেষ মাঝে ভস্ম হয়ে বাতাসে মিলাবে ; শ্মশান-চিতায় তুলি’ অযুত সন্তানে- কাঁদিবে ভারত-লক্ষ্মী দীর্ণ হাহাকারে ! দ্রৌপদী। কাঁদিবে ভারত-লক্ষ্মী দীর্ণ হাহাকারে ! আজ কাঁদিছে না? আজ বুঝি মহােৎসব তা’র ? বসিয়া ভারত-লক্ষ্মী গৌরবের স্বর্ণ সিংহাসনে বিতরিছে বুঝি আজ আশীৰ্বাদ-অমৃত বচন চরণে লুষ্ঠিত-তনু প্ৰণত বিশ্বেরে। সুভদ্রা। দিদি,—দিদি, দ্রৌপদী। ভেবে দেখ, •••ভেবে দেখরে সুভদ্রা, সে দিনের কথা। একবস্ত্র রজস্বলা রমণীর কেশ আকর্ষিয়া কৌরবের সভাতলে আনিল যেদিন নির্লজ্জ পশুর সম দেখাইল উরু পঞ্চ-পাণ্ডবের বধু দ্রুপদ বালারে ! সমবেত ভীষ্ম দ্রোণ কৃপাচাৰ্য আদি-- হেঁটমুণ্ডে সমাসীন ধৰ্ম্মরাজ পার্থ বৃকোদর- ২৪ উত্তরা শ্রীকৃষ্ণ। সবার সমক্ষে যবে কামাচারী দুঃশাসন বসন অঞ্চল ধরি- পবলে বার বার করে আকর্ষণ কৃষ্ণা•••কৃষ্ণা • • সুভদ্রা। পায়ে ধরি.••পায়ে ধরি তাের— ভৈরবী মুরতি হেরি কাঁপিছে অন্তর ; অভিশাপে সারা বিশ্বে এনাে না প্রলয় । দ্রৌপদী। প্রলয়! কোথায় প্রলয়! নিপীড়িতা সতীনারী হাহাকারে করিছে ক্রন্দন- সে ক্রন্দন চরণে দলিয়া- কৃষ্ণ যায় হাস্য মুখে, বাহু প্রসারিয়া কৌরবেরে বক্ষ মাঝে দিতে আলিঙ্গন তবু বিশ্বে আসে না তাে অনন্ত প্রলয় । যাও•••যাও কৃষ্ণ কৌরব সভায়- পাঞ্চালী দিবে না বাধা। নির্যাতিতা দ্রুপদ-নন্দিনী পদাহ কালভুজঙ্গিনী-- উদগার করিল তার কুণ্ডলিত বিষ-বাষ্প নীলহলাহল—J.- দেখিব•••দেখিব কৃষ্ণ, পূর্ণব্রহ্ম সনাতন যে হও সে হও কৌরব সভায় তুমি কত শান্তি পাও, কোন্ মধু আনন্দের হিল্লোল জাগাও! --- = + = = চতুর্থ দৃশ্য হস্তিনার রাজসভা। সিংহাসনে রাজা ধৃতরাষ্ট্র। ভীষ্ম, দ্রোণ, দুৰ্যোধনাদি যথাযােগ্য আসনে সমাসীন। ক দূত। দেব, পাণ্ডবের দূতরূপে- সমাগত দ্বারে জনার্দন- ধৃতরাষ্ট্র। জনার্দন! জনার্দন! যাও সুযােধন, সম্বৰ্ধনা কর জনার্দনে- দুৰ্য্যো। সম্বর্ধনা কারে পিতা ? কুরু-রাজসভাতলে আমন্ত্রিত নহে ত কেশব । নিজ প্রয়ােজন হেতু ভিক্ষুকের সম যেবা দ্বারে উপনীত প্রার্থনা শ্রবণ শুধু করিব তাহার ; সম্বৰ্ধনা—ভিক্ষুকের প্রাপ্য নহে কভু। শকুনি। অতি ন্যায্য কথা ইহা । ভিক্ষুকেরে অত বেশী আদর দেখালে আহলাদে উঠিবে শেষে মাথার উপরে, কি বলেন ভীমদেব ? ভীষ্ম। ধিক্ ধিক্ তােরে দুর্যোধন, হীনবৃত্তি অনুচর প্ররােচনা শুনি ঘটিল কি এত মতিভ্রম ! যাহার চরণ রেণু পরশ কারণ
উত্তরা
যােগীগণ যুগ যুগ তপস্যা করিছে
সেই কৃষ্ণ গােকুল-আনন্দ
দ্বারে উপনীত তাের—
সন্ধিতে দ্বিধা কর তরে!
বৰ্ব্বরের ন্যায় হেন আচরণ
কোথায় শিখিলি তুই অধম সন্তান!
দুৰ্যো। পিতা, রুষ্টভাষ শুনিবারে
ডেকেছ কি দুৰ্যোধনে রাজ সভাতলে ?
দেহ আজ্ঞা, সভা ত্যাগ করিব এখনি
কটু তিরস্কার কারাে সহিতে না’রিব।
সঞ্জয়, সঞ্জয়,
অভিমানী সুযােধনে শান্ত করা ত্বরা !
সুযােধন,
দুৰ্যো। শুন পিতামহ,—
গােকুল-আনন্দ তব ভগবান কেশবের শুন আচরণ।
যথাযােগ্য বিধানে তাহার
করেছিনু পূজা আয়ােজন ।
4 মণি-দীপ-দীপ্ত-কক্ষ, পুষ্পিত উদ্যান,
রাজভােগ্য ভােজ্য পেয়, নানা উপহার
জিজ্ঞাসহ দুসন?
এখনাে নির্দিষ্ট আছে কেশবের তরে।
কিন্তু, নীতিজ্ঞানহীন সেই গােপের নন্দন
অবহেলা করি মাের সর্ব আয়ােজন
ভিখারী বিদুর গৃহে
উত্তরা
२१
মহানন্দে ক্ষুদ্র-অন্ন করিল ভক্ষণ ।
শকুনি। অই . অই ..
বিদুরের ক্ষুদে তুষ্ট গােয়ালার পুত
টেকুর তুলিয়া অই আসে এইদিকে
(শ্রীকৃষ্ণের প্রবেশ)
শ্ৰীকৃষ্ণ। দ্রোণকৃপ আদি দ্বিজ, ভীষ্ম পিতামহ,
আৰ্য্য ধৃতরাষ্ট্র আদি প্রণম্য জনেরে
কেশব করিছে প্রণিপাত ;
দুৰ্য্যোধন দুঃশাসন আদি প্রিয় বান্ধবেরা সবে
লহ মাের প্রতি সম্ভাষণ, .
ভীষ্মদি। জনার্দন, জনার্দন,
আসন গ্রহণ কর করুণা করিয়া।
(শ্রীকৃষ্ণের উপবেশন )
শ্রীকৃষ্ণ। ভাই দুৰ্য্যোধন,
অনুমানে জ্ঞান হয় মনঃক্ষুঃ তুমি
তােমার আতিথ্য আমি করিনি গ্রহণ।
গােপের নন্দন কৃষ্ণ দরিদ্র রাখাল,
বহু মুল্য রাজভােগ জঠরে না সয় ।
তাই দায়ে পড়ে করিলাম লোভের দমন ;
ক্ষুধা শান্তি হেতু
বিদুরের ক্ষুদকণা সুধা বলি করিনু গ্রহণ।
কষ্ট হইওনা তাহে
২
উত্তরা
•
শকুনি। না, ইথে রােষ কিবা ?
শাস্ত্রে আছে, স্বর্গে গিয়ে টেকি ভানে ধান
তাই, রাজভােগ হাতে পেয়ে
ক্ষুদ খাবে গােয়ালার পুত,
এ তাে জানা কথা !
সৌবল, সৌবল !
বল কৃষ্ণ, বল তুমি-
প্রাণাধিক পাণ্ডবের, কুশল সংবাদ---
শ্রীকৃষ্ণ। কুশল তাদের আর্য,
তােমারি করুণা পরে করিছে নির্ভর
হৃতরাজ্য, বৈভব বিহীন তব ভ্রাতুস্পুত্রগণে
পুনঃ যদি বেঁধে লও স্নেহের বন্ধনে
তবেই কুশল তাত।
বৎস ধৃতরাষ্ট্র,
মেঘমুক্ত রবি সম পণমুক্ত পুনৰ্ব্বার
উদিল পাণ্ডব।
পিতৃরাজ্যে তাহাদের ন্যায্য অধিকার
অবিলম্বে কর দান ;
সমুজ্জ্বল হবে তাহে কৌরব গৌরব।
শকুনি। শােনাে ােেনাে•••দুৰ্য্যোধন,
“পিতৃরাজ্য!”..আরে বাপু,
পিতৃরাজ্য কার ?
পাপমতি রে সৌবল,
সে বিচার ন্যস্ত নহে তােমার উপরে।
ভীষ্ম।
ভীষ্ম।
শ্রীকৃষ্ণ। হস্তিনার সিংহাসনে কৌরব পাণ্ডব দোহাকার সম অধিকার অর্ধরাজ্য পাণ্ডবের, অর্ধ কৌরবের দুৰ্য্যো। কভু নহে; একই গগনের তলে চন্দ্ৰসূৰ্য্য সমকালে না করে বিরাজ। কৌরব-গৌরব-রবি যতদিন উদয় অচলে ততদিন অনন্ত আঁধারে রবে পাণ্ডু সুধাকর। শুন দুৰ্য্যোধন, রাজ্য-লিপ্সা নাহি ভাই, পাণ্ডবের মনে ; বিস্তীর্ণ ভারত রাজ্য থাকুক তােমার, রাজ সিংহাসনে বসি— একচ্ছত্র আধিপত্য কর তুমি সমগ্র ভারতে ; পাণ্ডব চাহেনা অংশ সাম্রাজ্য শাসনে। দুৰ্য্যো। তবে কি চাহে তাহারা ? শ্রীকৃষ্ণ। নিৰ্বিবাদী পঞ্চভাই তােমার নিকটে পঞ্চখানি গ্রাম শুধু ভিক্ষা চাহিতেছে । একান্ত মিনতি মাের—হে কৌরব, এই ভিক্ষা কোরাে না নিষ্ফল। ধৃতরাষ্ট্র। সুযােধন • সুযােধন, কেশবের অনুরােধ-মাত্র পঞ্চগ্রাম। দুৰ্য্যো। পঞ্চগ্রাম...পঞ্চগ্রাম। পাণ্ডব যেখানে যাবে সাম্রাজ্য সেখানে। হােক তাহা ক্ষুদ্র গ্রাম- কি হােক, অতি ক্ষুদ্র পাতার কুটীর !
৩০ উত্তরা . ভীস্মাদি। দুৰ্যো। পাণ্ডবের স্তুতিবাদ দূর গ্রাম হতে নিয়ত ধ্বনিত হবে পল্লব মর্মরে, সমুদ্র কল্লোলে ; বিষ-জ্বালা সম মাের হৃদয় বিঁধিবে । মরণের নামান্তর হবে তাহে জীবন আমার ! না : না হবে না•••হবে না কভু - এ প্রার্থনা হবে না পূরণ দুৰ্য্যোধন: দুর্যোধন রণ রণ••• পাণ্ডবের সহ রণ-পাণ্ডব নিধন জীবনের ব্রতসম মানে দুর্যোধন। শুন সবে প্রতিজ্ঞা আমার, পঞ্চগ্রাম দূরে থা—বিনা রণে সূচ্যগ্র মেদিনী আমি দিব না পাণ্ডবে। সুবােধন•••সুযােধন,••• হে সঞ্জয়, কি করি উপায় ! শান্তির প্রয়াস ! শান্তির প্রয়াস। মুক্তকেশী দ্রৌপদীর তপ্ত দীর্ঘশ্বাস নাগমন্ত্র সমতেজে আকর্ষে কৌরবে তরঙ্গিত কাল-সিন্ধু পানে ; শান্তির প্রয়াসে তাহে কি ফল ফলিবে চলিলাম তবে দুৰ্য্যোধন, জানাইব বাঞ্ছা তব পাণ্ডব প্রধানে। ধৃত। শ্রীকৃষ্ণ।
উত্তরা ৩১ ৭ । আসি এবে,কুরুক্ষেত্রে পুনঃ দেখা হবে বিজয়-গাণ্ডীব-ধারী ফাল্গুনীর রথে। (ধীরে ধীরে অগ্রসর হইলেন) শকুনি। চলে গেল, চলে গেল • বৎস দুর্যোধন, কর্ণের সে কর্ণে কর্ণে সাধু উপদেশ- দুৰ্যো। দাড়াও কেশব,- মহামানী দুর্যোধনে করি অপমান কোথা তুমি ফিরে যাবে অনাৰ্য লম্পট । ফান্ধনীর কপিধ্বজে অশ্ববল্প ধরিবারে হইয়াছ বুঝি কৃষ্ণ বড়ই চঞ্চল? সৰ্ব্ব চক্রান্তের চক্ৰী, লজ্জাহীন শঠ, নব অশ্ববন্ধু তােম। দিব এইবার। দুঃশাসন, যাও বন্ধন•••বন্ধন- ভীদি। একি সর্বনাশ.••একি সর্বনাশ! দুর্যোধন। বন্ধনবন্ধন- শ্রীকৃষ্ণ। হাঃ হাঃ হাঃ- আমারে বাঁধিবে দুর্যোধন ? জান না কি ওরে মূঢ়, হলে প্রয়ােজন, সারা বিশ্ব বিদলি চরণে, বিদলিয়া চন্দ্র সূর্য গ্রহ উল্কায় ব্রজের গােপাল কৃষ্ণ নৃত্য করে মৃত্যু-রঙ্গে মহাকাল রূপে!
৩২ উত্তরা দেখিতে বাসনা যদি মহাকালরূপ, কাল-নৃত্য দেখিতে কামনা বাক্: বাঁধূ তবে রে কোরব, বাধরে গােপালে: হাঃ হাঃ হাঃ- (রঙ্গমঞ্চ অন্ধকার হইয়া গেল...পৃথিবী কাপিতে লাগিল ; উল্কা বৃষ্টি বজ্রের গর্জন যেন প্রলয় সূচনা করিল ) দুর্যো। একি! প্রলয় আঁধার কেন আসিল নামিয়া। পদতলে থর থর কঁপে বসুন্ধরা, রক্তবৃষ্টি.. উল্কাপাত•••লক্ষ কোটী জ্বালামুখী বজের গর্জন। ( ফিরিয়া দেখিল সম্মুখে এক বিরাট মূৰ্ত্তি) একি • একি, সংহার-ত্রিশূল করে রক্তনেত্রে মুক্ত জটাজালে কে নাচে•••কে নাচে অই কালান্তক দুরন্ত ভৈরব । কালমুৰ্ত্তি । মহাকাল ..মহাকাল আমি। কৌরব ভবনে কৃষ্ণ- মহাকাল • মহাকাল আজি - হাঃ - হাঃহাঃ- 7. Giswas fursery পাতা মোস্তানি CALCUTTA. দ্বিতীয় প্রথম দৃশ্য পাণ্ডব শিবির ; গ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন SC শ্রীকৃষ্ণ। হে ফান্ধুনী, কহি পুনৰ্ব্বার সৰ্ব্ব চঞ্চলতা তব কর পরিহার। অধৰ্ম্ম বিনাশ হেতু পাণ্ডবের দেহ পরিগ্রহ, অধৰ্ম্ম করিতে নাশ কুরুক্ষেত্রে রণ আয়ােজন, পিতামহ ভীষ্মের পতন- ১ তাও জেনাে ঘটিয়াছে ধৰ্ম্মরাজ্য স্থাপন কারণ। অর্জুন। ধৰ্ম্মরাজ্য ! ধৰ্ম্মরাজ্য। সেই তব ধর্মরাজ্যে পাণ্ডবের অভিষেক লাগি আত্মীয়-বান্ধব-রক্ত এত যদি হয় প্রয়ােজন ক্ষমা কর তবে জনার্দন, রাজ্য ধনে নাহি আকিঞ্চন পঞ্চ ভাই পুনঃ মােরা পশিব কাননে। শ্রীকৃষ্ণ। অর্জুন। হায়, হায়, ভাবিতেও বিদরে হৃদয়- জাহ্নবীর বর-লব্ধ ভীষ্ম পিতামহ জাহ্নবী সলিল সম স্নেহধারা যার কুরুপা দুইকূলে সমভাবে হত প্রবাহিত পার্থ !
৩৪ উত্তরা সেই সত্যব্রত, নরশ্রেষ্ঠ পিতামহে মাের বধিলাম অন্যায় সমরে শিখণ্ডীরে রাখিয়া সম্মুখে ! হে কেশব, আর নয়•••আর নয়- করযােড়ে করিহে মিনতি এইবারে অর্জুনেরে মুক্তি দেহ তুমি ! শ্রীকৃষ্ণ। মুক্তি! মুক্তিদাতা নহি আমি, শুন সব্যসাচী, কুরুকূল বক্ষ-রক্ত লাগি মুক্তবেণী প্রতীক্ষিছে দ্রুপদনন্দিনী, তার কথা নাহি হও বিস্মরণ ( দ্রৌপদীর প্রবেশ) দ্রৌপদী কি কারণ দ্রৌপদীরে করিলে স্মরণ ! দুঃশাসন বক্ষ-রক্ত আনিল কি পণমুক্ত বিজয়ী পাণ্ডব- দ্রৌপদীর মুক্তবেণী বাধিবে বলিয়া ? অর্জুন। পাঞ্চালীপাঞ্চালী, পিতামহে বধিয়াছি আজি রণস্থলে ! দ্রৌপদী। জানি • জানি আমি পিতামহ হত। সেই বৃদ্ধ পিতামহ হত- জীর্ণপত্র সম যেবা আপনি খসিয়া যেত, কুরুকূল মহীরুহ হতে আজি কিম্বা কালি দিবা গতে। পিতামহ হত রণে,- ।
৩৫ হয়েছে কি হতদ্রোণ কর্ণ অশ্বত্থামা কৃপ শাৰ ভগদত্তসহ নীচবৃত্তি গান্ধার শকুনি ? নিহত কি করেছ সমরে সেই পাপ জয়দ্রথে দ্রৌপদী হরণে যেবা করিল প্রয়াস? গেছে কি শমনপুরে দুষ্ট দুঃশাসন— সঙ্গে তার ক্র রমতি রাজা দুর্যোধন পাঞ্চালীর কেশ বাস- সভাস্থলে যে দুৰ্ম্মতি বলে আকৰ্ষিল পঞ্চ কেশরীর সম বীৰ্য্যবান পঞ্চপতি থাকিতে সম্মুখে ? অর্জুন। যাজ্ঞসেনী:••যাজ্ঞসেনী,- উত্তেজিত কোরাে না আমারে। দ্রৌপদী। করিব না: করিব না উত্তেজিত তােমা। যাও হে কেশব, শােকার্ত স্থলিতবাক্য সখারে তােমার নিয়ে যাও সযতনে বিশ্রাম মন্দিরে, অথবা লইয়া যাও কৌরব ভবনে আলিঙ্গিয়া দুর্যোধনে, মিত্র দুঃশাসনে তপ্ত প্রাণ করুক শীতল। পাণ্ডবের সত্য পণ সে যদি কেবল হয় বৃথা আস্ফালন, বৃথায় দোলামু যদি বিগলিতা বেণী দুঃশাসন বক্ষরক্তে বাঁধিব বলিয়া, বৃথায় সহিষ্ণু যদি তীব্র অপমান
উত্তর
পঞ্চস্বামি-ভুজবলে বিশ্বাস করিয়া,
কি কাজ জীবনে তবে বল তাে কেশব ?
না••••••যাই আমি,
ঘৃণিত কৌরব-স্পর্শে অপবিত্র দেহ
প্রজ্জ্বলিত বহ্নিকুণ্ডে দিব বিসর্জন
( প্রস্থানেষ্ঠতা )
অৰ্জ্জুন। কৃষ্ণা, কৃষ্ণা,--
হে কেশব, কর রথ প্রস্তুত সত্বর ;
ধরিনু গাণ্ডীব পুনঃ লৌহমুষ্টি মাঝে
তৃপ্তি দিতে বুভুক্ষিতা রণ-চামুণ্ডারে।
(অৰ্জ্জুন ও কৃষ্ণের প্রস্থান)
দ্রৌপদী। তৃপ্তি ! তৃপ্তি নাই রণ চামুণ্ডার
যত দিনে শত ভাই দুৰ্য্যোধন সহ
নিকৌরবা না হবে মেদিনী,---
কৌরব স্বপক্ষ মাঝে প্রাণীমাত্র যতদিন
রহিবে জীবিত-নিৰ্বাপিত নাহি হবে
সর্বনাশা ক্ষুধাবহ্নি শ্মশান কালীর।
(সুভদ্রার প্রবেশ)
সুভদ্রা। নিষ্কৌরবা করিয়া মেদিনী
রণ-উন্মাদিনী শ্মশান কালিকা
পরিপূর্ণ তৃপ্তি লাভ করিবে কি তাহে?
ক্ষুধাবহ্নি শান্ত হবে তার ?
কৌরব পাণ্ডবে মিলি
আলিয়াছে বিশ্বগ্রাসী প্রলয় অনল
সে কি হবে নির্বাপিত
একমাত্র কৌরবে দহিয়া ?
দ্রৌপদী। ভদ্রা,
সুভদ্রা। স্বচক্ষে নেহারি নিত্য
কুরুক্ষেত্র রণাঙ্গনে
কত চিত্র সকরুণ•••কত মূৰ্ত্তি বেদনা-
বিল !
চারিদিকে নিপতিত—হতগজ, রথা সারথি-
মধ্যে বহে রক্তসিন্ধু প্রলয় প্লাবনে,
তরঙ্গে তরঙ্গে তার ভেসে যায় স্রোতে
ছিন্নদেহ, ছিন্নপদ, লক্ষকোটী মানবের বিচ্ছিন্ন মস্তক
কোথা অস্ত্ৰাহত রথী পড়ি ভূমিতলে
যন্ত্রণা-বিকৃতস্বরে বারম্বার করিছে চীৎকার
“কড়জালা:::বড়জ্বালা জল জল জল দে জননী ;
কোথা জল ? কে দানিবে জল তারে ?
শিয়রে মূচ্ছিতা মাতা•••পদতলে মুচ্ছিতা প্রেয়সী।
যখন জাগিল তারা জল দিবে বলি’
পিপাসিত ওষ্ঠদুটি আর না নড়িল !
হায় ভগ্নি, সে দৃশ্য দেখিতে যদি বারেক নয়নে-
তখনি বুঝিতে মনে
জননী
বধূর
এই তীব্র শােকাঘাত
একদিন প্রতিঘাত দানিবে নিশ্চয় !
দ্রৌপদী। প্রতিঘাত !
সুভদ্রা। ভেবে দেখ, ভেবে দেখ,বােন,
পুত্রহারা জননীর সেই শােকাতুর
উত্তরা
-
লৌপদী
ব্যথাদীর্ণ করুণ মূরতি !
তােরও বুকে আছে ত সন্তান
আছে তাের অভিমন্যু পরাণ-পুতলী ;
পুত্রহারা জননীর পাশে
আয় একবার
প্রাণপ্রিয় অভিমন্তে লয়ে।
দ্রৌপদী। চুপ...চুপ.. মাতা হয়ে হেন কথা
বলিস্ পাষাণী !
অভিমন্যু:..অভিমন্যু•••কোথা পুত্র মাের
( বেগে স্থান
ভদ্রা মাতা আমি•••মাতা আমি,•••
তাই বুঝি
শােকাতুরা বিশ্বমাতা বুকে
সমপ্রিয় সকল সন্তান
দ্বিতীয় দৃশ্য
জ্যোৎস্নালােকিত বনভূমি। নীহারিকাদের মায়ানৃত্য। নৃত্য শেষে তাহারা
বন অন্তরালে অদৃশ্য হইল। একটু পরে লম্বােরের প্রবেশ
লম্বােদর। বাবারে বাবা, একি যাদুর খেলারে বাবা! রাজার আদেশ,
খুব সাবধান হয়ে বন পাহারা দিতে হবে। কিন্তু বনের চারদিকেই
যে আজ মেয়েছেলের হুল্লোড় দেখছি! আকাশ ‘াদা করে একধার
থেকে যেন নক্ষত্র বৃষ্টি হচ্ছে ! যতক্ষণ শূন্যে থাকে দেখি নক্ষত্র ; কিন্তু
উত্তরা পৃথিবীর মাটী ছুঁতে না ছুতেই দেখি তার টপাটপ মেয়েছেলে বনে গেছে ! রক্ত বৃষ্টির কথা শুনেছি•••আগুন বৃষ্টির কথা শুনেছি • কিন্তু এমন রাশি রাশি মেয়েছেলে বৃষ্টির কথা তাে কখনও শুনিনি রে বাবা! ব্যাপার তাে সুবিধের মনে হচ্ছেনা! একটাকে যদি ধরতে পারতাম তাহলে ওদের মতলবখানা কি বার করে নেওয়া যেত। রােসো, এক কাজ করা যাক না কেন! এমনি তাে ধরা দিচ্ছে না! মেয়েছেলে সেজে এখানে বসে পড়া যাক। একটা না একটা এ পথ দিয়ে যাবেই, •••তখন ঝােপ বুঝে কোপ দেওয়া যাবে। (চাদর দিয়া ঘােমটা টানিয়া বসিল...একটু পরে অপর দিক হইতে ঘণ্টাকর্ণের প্রবেশ) ঘণ্টা। ব্যাপারখানা কি রকম হল ! স্পষ্ট দেখলাম তেঁতুলতলায় দাড়িয়ে এক পরমা সুন্দরী রাজকন্যা আমায় “প্রাণনাথ” বলে ডাকছে। এগিয়ে গিয়ে হাত ধরতে দেখি—কোথায় রাজকন্যা ! এক আঁশস্যাওড়ার ঝােপ জড়িয়ে ধরেছি যে! মাথার ওপরে শুধু এক কাঠ বেড়ালী ন্যাজ দোলাচ্ছে—আর আমায় “প্রাণনাথ” বলে ভেঙচি কাটছে! তাইতো, শেষে কিনা কাঠবেড়ালী ••(সহসা অবগুণ্ঠিত লম্বােদরকে দেখিয়া ) ওমা, এই যে,•••প্রাণেশ্বরী আমার এখানে বসে আছেন! রােসাে, এবার তাহলে আর ছাড়ছি নে।" ( অগ্রসর হইয়া লম্বােদরকে ধরিল )- লম্বােদর। ওরে, ছাড়•••ছাড়, ঘণ্টা। উহু, তা কি হয় প্রিয়ে ? এবার আর কাঠ বিড়ালী নয়•••এবার জাতবেড়ালের ছানা! লম্বাে। ছানা নই দাদা...আমি রাম বেড়াল ( ঘােমটা ফেলিয়া দিল) ঘণ্টা। আঁ! লম্বােদর! তবে-
৪০
উত্তরা
লম্বাে। আর তবে দিয়ে কাজ নেই, একটী দেখেই পাগল হয়ে গেছ•••
আর ঐ তাকিয়ে দেখ
( নেপথ্যে দেখাইল)
ঘণ্টা। আঁ, এযে একেবারে এক ঝাঁক !
লম্বাে। পালিয়ে আয়...পালিয়ে আয়, রাজাকে খবর দিই চল। হাতী
হত, গণ্ডার হত বুক ফুলিয়ে লড়তুম•••কিন্তু মেয়েছেলের সঙ্গে লড়াই
করা•••ও বিদ্যে তাে আমাদের জানা নেই। আয়•••আয়-
( উভয়ের প্রস্থান)
(অপরদিক হইতে নীহারিকাদের পুনঃ প্রবেশ)
১মা। কে•••কে ও সখি ?
২য়া। আসিছে নক্ষত্ররাণী•••আপনি রােহিণী—
(রােহিণীর প্রবেশ)
রােহিণী। রাণী ! না..না.. নহি রাণী ;
দীনা রিক্তা সর্বহারা আমি ভিখারিণী
২য়া।
দেবি,
রােহিণী। সত্য বটে, একদিন রাণী আখ্যা
আছিল আমার।
সেদিন সে চন্দ্রলােকে লাবণ্য-উচ্ছল
শশাঙ্কের বাম অঙ্কে:
বসিতাম সগৌরবে মহিষীর মত।
কিন্তু হায়, কুক্ষণে সে চন্দ্রলােকে
গর্গ ঋষি হল আবির্ভূত ;
পূজা আয়ােজনে তার বিচ্যুতি ঘটিতে
কুদ্ধ ঋষি দিল অভিশাপ।
উত্তরা
৪১
চন্দ্রলােকহারা হয়ে দেব শশধর
ধরা মাঝে নর রূপে লভিল জনম।
সেই হতে•সেই হতে পতিভাগ্য গরবিনী
নক্ষত্র রােহিণী -
ভিখারিণী সাজিল কেবল,
অশ্রু তার জীবন-সম্বল।
২য়া। দেবি : দেবি,—গর্গঋষি অভিশাপ
কতদিনে হইবে খণ্ডন ?
কবে মােরা ফিরে পাব দেব শশধরে ?
রােহিণী। পরিপূর্ণ অভিশাপ কাল।
কিন্তু হায়, তবু নাহি শেষ হ’ল চক্রান্ত দৈবের ।
ক্ষীণপ্রাণা রমণীর প্রেমে
মােহাচ্ছন্ন হইয়াছে দেব শশধর ;
পূৰ্বজন্ম স্মৃতি তার
আবৃত করিয়া আছে কুহকিনী মৰ্ত্তনিবাসিনী।
এ কুহক অবিলম্বে ভাঙ্গিতে হইবে।
“অই অই দেখু•••
প্রণয়-বিহ্বল চন্দ্র প্রেমিকারে লয়ে
গুঞ্জরি ফিরিছে অই যৌবন প্রলাপ !
শােন্ সহচরী সবে,
মায়ার সঙ্গী তানে রমণীরে বিমুগ্ধ করিয়া
অন্য কোথা মিয়ে যা সত্বর,
তারপর একাকী ভেটিব আমি চন্দ্রে নিরজনে।
(রােহিণীর প্রস্থান...নীহারিকাদের মায়া গীত)
=
82
গীত
নীল সায়রের চাঁদ গেছে সই,
রূপ-সায়রে সইতে জল ।
ছায়াপথে মায়ারথে প্রাণের কথা কইতে চল।
লক্ষতার দৃষ্টিপাতে
মনে মেলে কার মনের সাথে
হাত মিলিয়ে নরম হাতে
জাগায় হৃদয়-শতদল।
হৃদয় কমল কে ফোটালে
বুকের আঁচল কে লোটালে—
কে ভাঙ্গালে কুসুমি-ঘুম
জুগিয়ে কুড়ির পরিমল।
( উত্তরা, অভিমন্যুর প্রবেশ)
কে তােমরা গাহ গান বিজন কাননে ?
এমন মাধবী রাতে গৃহবাস ত্যজি-
ধরার চঞ্চল দুটি কিশাের কিশােরী
বিহরিছে বনপথে প্রণয় পুলকে,
তাই কি এসেছ আজি তাদের ভুলাতে
স্বর্গ হতে দেব-কন্যা মর্ত্যের মাটীতে ?
( নীহারিকাগণ গমনােতা)
-কোথা যাও•• কোথা যাও দেবকন্যাগণ ?
মা।শুনিয়াছি, পৃথিবীর নীলদে
ফুটিয়াছে সুরভি কমল ;
তেমন মধুর ফুল স্বর্গপুরে নাই ;
গন্ধে তা’র ম্লান হয় স্বর্গ-পারিজাত।
উত্তরা উত্তরা। উত্তরা। উত্তরা। সেই ফুল তুলিবারে যাই হ্রদতীরে— কোথায় কোথায় সে অপরূপ ফুল ? ২য়া। দূরে নয়,•••একান্ত নিকটে-- মােরে নিয়ে চল তবে, আমিও তুলিব সেই সুরভি কমল। প্রিয়তম,—দেহ অনুমতি অভি। প্রিয়া ...না..বাধা নাহি দাও মােরে, বড় সাধ জাগিয়াছে চিতে-- গাঁথিয়া কমলমালা সাজাব তােমারে, পদ্মপর্ণে বনতলে রচিব শয়ন । চিন্তা করিও না প্রিয়, এখনি ফিরিব।) এসাে দেবকন্যাগণ ( নীহারিকাদের সহিত উত্তরার প্রস্থান-অপরদিক হইতে ঘটোৎকচের প্রবেশ) ঘটো। তাইতাে ! রমণী যদ্যপি হয়, একজোড়া আঁকা বাঁকা শিঙ, কেন রয়েছে মাথায় ! অভি। কি আশ্চর্য! তুমি হেথা পুনৰ্বার ! পরিচয় নাহি দাও...জিজ্ঞাসিলে নাম- বেদনা-বিহ্বল নেত্রে রহ তাকাইয়া ! ছায়ার সমান শুধু ফির পিছে পিছে। ভদ্র, কী বার্তা তােমার ? অভিমন্যু অভিমন্যু, - ঘটো।
৪৪ উত্তরা আমি তােমারেই খুজিতেছি ভাই। শােন•••শােন•• বড়ই আশ্চর্য কথা- শিঙওলা নারী এক দেখিয়াছি বনে, সাবধান থেকে: গুতাে দিতে পারে কিন্তু অভি। শৃঙ্গধারী নারী ! ঘটো। হু..হু...ছােট নয়—এই এতবড় একজোড়া আঁকা বাঁকা শিঙ। শােনাে, খুলে বলি ; দূর হতে দেখি-কে এক রমণী যেন আড়ালে লুকায়ে ফেরে তােমাদের পিছে ! মনে বড় সন্দ হল, আগুসরি জিজ্ঞাসিমু-কে তুমি রমণী ? আরে বাবা। কোথায় রমণী ! আঁখির পলকে দেখি মাথায় তাহার- কী সুন্দর একজোড়া শিঙের বাহ শিঙ, নেড়ে বোত্ করে এক ওঁ তত দিয়ে চার পা বাড়ায়ে নারী ছুট দিল বনে মিলিল না অভি। কী আশ্চর্য ! সে কি কথা! ঘটো। ভেল্কি •••ভেল্কি ভাই, সন্দ হয়- এই বনে হইয়াছে মায়ার উদয় । ভাল কথা, উত্তরা জননী কোথা? তারে তাে দেখি না! অভি। উত্তরা ! উত্তরা গিয়াছে হ্রদে ৪৫ ঘটো। দেবকন্যা সহ- কমল তুলিবে বলে। সে আবার কি রকম কথা ! এ বনের পথঘাট.••সকল সন্ধান এই মাের নখের ডগায় ; হেথা হ্রদ কোথা, পদ্ম কোথা, দেবকন্যা--তাই বা কোথায়। অবশ্য, কন্যা এক আসিয়াছে 4 কিন্তু তার তাে মাথায় দুটো শিঙ তাই তাে ! হ্রদ•••পদ্ম•••দেবকন্যা। উহু, এ যে তেরস্পর্শ হল! ব্যাপার তাে সুবিধের নয় । অভিমন্যু,—যাই আমি, লয়ে আসি মায়ের সন্ধান। তুমি কিন্তু থেকো সাবধান ; সেই শিঙলা হরিণীরে ধরিতে যেয়াে না। কিদাকার বনের রাক্ষস আমি--আমারে দেখিয়া নারী হয়তাে বা ভয় পেয়ে সাজিল হরিণী ; তুমি কিন্তু সাবধান, তােমারে দেখিলে হরিণী আবার হবে যুবতী রমণী ( এস্থান) একি। আশঙ্কায় কেন কাঁপে প্রাণ -- চিরস্থির বক্ষে কেন দুরন্ত স্পন্দন ! কিসের আশঙ্কা মাের !
উত্তরা - - অভি। ••••••যাই আমি-বাহুর বন্ধনে ফিরাইয়া আনি মাের পরাণ-পুতলী- ( প্রস্থানােত—সম্মুখে রােহিণী আসিয়া দাড়াইল) অভি। কে তুমি রমণী, আগুলিয়া পথে মাের-মৰ্ম্মর-মূরতি সম আছ দাঁড়াইয়া ! মানবী দানবী যে হও সে হও—ছাড় পথ- যাব আমি উত্তরার পাশে। রােহিণী। কেন যাবে উত্তরার পাশে ? তব প্রতীক্ষায়—অনন্ত সম্পদ সুখ রেখেছি সঞ্চিত ; এসো, দিব তােমা- ক্ষমা কর হে অপরিচিত, অনন্ত সম্পদ সুখে নাহি আকিঞ্চন। ক্ষত্রিয়-নন্দন আমি,—হলে প্রয়ােজন বাহুবলে তিনলােক করিয়া বিজয়- সপ্ত-সাগরের যত মাণিক্য প্রবালে স্বহস্তে সাজাব আমি উত্তরার সােণার প্রতিমা। ছাড় পথ ত্বরা রােহিণী। বাখানি বীরত্ব তব বীরচূড়ামণি ! কিন্তু পার কি বলিতে মােরে, বীরত্বের এত দম্ভ যদি— কি কারণ কুরুক্ষেত্র রণ পরিহরি কাননে কাননে ফির-অস্ত্রপরিবর্তে ধরি নারীর অঞ্চল ?
৪৭ রমণীপ্রণয় রণে হতে পার বীর- কিন্তু শিখ নাই ক্ষত্রিয় আচার ! অভি। প্রগল্ভা রমণী,- নাহি জান কারে কর সম্ভাষণ ! অর্জুন-নন্দন আমি—বীর-ধৰ্ম্ম শিখাও আমারে। যবে হবে প্রয়ােজন- মদনের ফুলধনু অভিমন্যু করে দ্বিতীয়-গাণ্ডীব-রূপে করিবে গর্জন। রােহিণী। কবে...কবে হবে সেই প্রয়ােজন ? অভি। কুরুক্ষেত্র রণে-একরথে কেশব অর্জুনে কে আঁটিবে কৌরব বাহিনী মাঝে ? শুনিয়াছি জনকের মুখে, নারায়ণ সম বলী নারায়ণী সেনা কৌরবের আজ্ঞাধীন এবে ; তাহাদের সনে ফাঙ্কনীর যবে হবে রণ- সেইদিন হয়তাে বা হবে প্রয়ােজন অস্ত্রধারণের মম কুরুক্ষেত্র রণে। (নেপথ্যে ঘটোৎকচ-“অভিমন্যু-অভিমন্যু-) রােহিণী। অই•••কে ডাকে তােমারে ! নারায়ণী সেনা..নারায়ণী সেনা ( ছুটিয়া প্রস্থান-নেপথ্যে ঘটোৎকচ ) “অভিমন্যু ...অভিমন্যু, হ’ল সৰ্ব্বনাশ,-মাতারে দংশিল বুঝি কাল-ভুজঙ্গিনী ৪ উত্তরা ( উত্তরার ছুটিয়া প্রবেশ) উত্তরা। ওগো, রক্ষা কর••রক্ষা কর, মায়া-সরােবর মাঝে মায়া-পদ্ম ফুটে যেমনি তুলিতে যাব- অমনি সে কাল-ভুজঙ্গিনী আমারে দংশিতে এল । অই...অই বুঝি ছুটে আসে•• রক্ষা কর মােরে- ( অভিমনুর বক্ষলগ্ন হইল) অভি। ভয় নাই...ভয় নাই প্রেয়সী আমার। মাের বক্ষলগ্ন প্রিয়া, তোমারে হেরিয়া- অই...অই দেখ— নাগিনী ফিরিয়া যায় শির নােয়াইয়া- তৃতীয় দৃশ্য কৌরব শিবির দুৰ্যো। দ্রোণ, দুর্যোধন, শকুনি। ভীষ্ম পিতামহ গত। কিন্তু আছে দ্রোণ সেনাপতি—যার পদতলে বসি শস্ত্রবিদ্যা শিখিয়াছে কৌরব পাণ্ডব।
উত্তরা
৪৯
কহ গুরু, তুমি বর্তমানে, অর্জুনের বাণে কেন
বিপর্যস্ত কৌরব বাহিনী ?
তুমি যেথা যুদ্ধের নায়ক
কোন শক্তি বলে সেথা
মহামার করে পার্থ কৌরবের মাঝে ?
দ্রোণ। শুন রাজা দুর্যোধন,
শক্তি তার—বিজয় গাণ্ডীবে,
শক্তি তার—ধৰ্ম্মের আশ্রয়ে,
শক্তি তার-ভগবান কেশব সহায়ে।
শকুনি। আর শক্তি তার—গুরুদ্ৰোণ মেহবশে
ধনুকে জোড়েন বাণ ভাতা দেখে দেখে,
পাছে তার প্রাণের অর্জুন যাদুমণি
ব্যথা পান গায়ে।
দ্রোণ। আরে আরে নীচাত্মা সৌবল,-
কোনােদিন হস্ নাই রণে আগুয়ান
শ্রীকৃষ্ণ চালিত রথে
বিজয়-গাণ্ডীবধারী ফাল্গুনীর আগে,
তাই তাের হেন দুঃসাহস,
হেন বাণী কহিস্ দুৰ্ম্মতি!
দুৰ্য্যো। ক্রুদ্ধ হইয়াে না গুরু,-অকারণ তিরস্কার
কোরােনা মাতুলে।
তােমার রক্ষিত সেনা
হেনরূপে প্রতিদিন নাশিছে ফাল্গুনী-
সমরে শৈথিল্য তব একমাত্র কারণ ইহার,
৫০
মাতুল একাকী নহে, এ সন্দেহ বদ্ধমূল
সবার অন্তরে।
দ্রোণ। সবার অন্তরে। সকলে ভাবিছে মনে
অর্জুনের প্রতি মােৰ পুত্ৰাধিক স্নেহ,-
সেই
হেতু
শৈথিল্য করেছি আমি
রক্ষিতে কৌরবে
শকুনি। অই কথা, গুরুদেব, ঠিক অই কথা,
দুষ্ট লােকে নানাভাবে
নানা বর্ণ বিন্যাসিয়া-
অই এক কথা, রাত্রিদিন করে আলােচনা।
দ্রোণ। বেশ, শােন তবে রাজা দুৰ্য্যোধন,
এ সন্দেহ থাকে যদি মনে
পার্থ সনে করিতে সমর
অন্য কোনাে মহারথী করহ নিয়ােগ।
আর চারি পাণ্ডবের ভার থাকুক আমার পরে ;
তিন দিনে•••তিনদিনে শুধু
পাণ্ডুপক্ষ করিব নিৰ্ম্মল।
পার্থ কেশবের ভার দেহ অন্যজনে।
শকুনি। অর্থাৎ, পাণ্ডবে করিয়া বধ
দেহ মাের হাতে;
আমি তার শবদেহ দ্বিখণ্ড করিব
ভয়ানক বিপুল বিক্রমে।
আরে বাপু, পার্থ আর কেষ্টসখা
ও দুটাই বাঁধায়েছে যত গণ্ডগােল ;
উত্তর।
তারা বিনা চারিটী পাণ্ডব
সে তাে একেবারে গােবেচারী,
অবিশ্যি অই গদাধর ভীম-ষণ্ডা বাদে।
বৎস দুৰ্য্যোধন,
পার্থ কেশবের ভার কে লবে তা হলে?
দুৰ্যো। পার্থ কেশবের ভার!
পার্থ ও কেশব !
কারে নিয়ােজিত করি।
( রােহিণীর প্রবেশ)
রােহিণী। হে কৌরব,
নিয়ােজিত কর তব নারায়ণী সেনা।
দুৰ্য্যো।
কে ! কে তুমি !
রােহিণী। নিয়তি••নিয়তি আমি শুনহে কৌরব,
মম উপদেশ মত কাৰ্য কর যদি
সুনিশ্চিত লভিবে বিজয়।
নারায়ণ সম বলি নারায়ণী সেনা
আছে তব আজ্ঞা অপেক্ষায়।
সে দুর্ধর্ষ সেনাদলে সত্বর প্রেরণ কর
অৰ্জ্জুনে ভেটিতে।
ফানী নিযুক্ত র’বে সংশপ্তক রণে
সেই অবসরে তুমি
শত্রুপক্ষে মহামার করিয়াে কৌরব
পূর্ণ হবে সাধ তব•••পূর্ণ হবে
অভীষ্ট আমার।
হাঃ হাঃ হাঃ
पर
(এন)
উত্তরা দুৰ্য্যো। সত্য • সত্য কথা বলিয়াছে নিয়তি-রূপিণী । শ্রীকৃষ্ণে সারথ্য হেতু বরণ কারণ পার্থ আমি দুইজনে গিয়াছিনু দ্বারকা নগরে; পার্থ পেল কেশবেরে, আমি লভিলাম কেশবের বিশ্বজয়ী নারায়ণী সেনা। কি আশ্চৰ্য। এতদিন তাহাদের একেবারে ছিনু বিস্মরিয়া একবারও পড়ে নাই মনে । চল চল গুরু, চলহে মাতুল, কৃষ্ণার্জুনে ভেটিবারে নারায়ণী সেনাদলে করিগে প্রেরণ— ( প্রস্থান) চতুর্থ দৃশ্য পর্বতের সানুদেশ : রাত্রিকাল : রােহিণী পর্বতের উপর দিয়া নামিয়া আসিল। রােহিণী। কোথা যাও হে ভ্রান্ত পথিক ? সম্মুখে দুর্বার গিরি, পথ নাহি হােথা; এইদিকে এসাে, আমি দেখাইব পথ- ( জয়দ্রথের প্রবে।) জয়। কে তুমি রমণী, বিজন অরণ্যমাঝে ভ্রম একাকিনী পথহারা পান্থজনে দেখাইতে পথ ?
রােহিণী। মাের পরিচয়ে পান্থ নাহি প্রয়ােজন ;
শুধু জেনাে হিতার্থী তােমার।
সুবিশাল বীরবপু, স্কন্ধদেশে কিণাঙ্কলেখন,
নেহারিয়া হয় অনুমান, ক্ষত্রিয় সন্তান তুমি।
কহ বীর, কী কারণ—
কাননে পশেছ আসি তপস্বীর বেশে ?
জয়।
শুন সুবদনি,-
সিন্ধু-অধিশ্বর আমি, জয়দ্রথ নাম।
দৈব বিড়ম্বনা হেতু ভীমার্জুন করে
সয়েছিনু তীব্র অপমান।
তারই প্রতিশােধ লাগি’ শক্তি লাভ তরে
দীর্ঘকাল মহেশ্বরে করেছি অৰ্চ্চনা ;
ইষ্ট মাের পরিতুষ্ট আজি।
লভেছি শিবের বর-অর্জুন ব্যতীত
আর চারি পাণ্ডবেরে
পরাজিত করিব সমরে।
শিব বরে শক্তি লভি’
মহােল্লাসে চলিয়াছি কুরুক্ষেত্র রণে
বৈরি-নির্যাতন হেতু।
রােহিণী। আনন্দিত • আনন্দিত বচনে তােমার।
কিন্তু বীর, শুন তবে, কহি সমাচার,
পাণ্ডবের রক্ষণ কারণে
ধর্মরাজে দেব-অস্ত্র প্রদানিতে বাসনা করিয়া
নিশাযােগে পার্থ যায় রণস্থল ত্যজি’
৫৪ উত্তরা পাণ্ডব শিবির পানে। সে অস্ত্র লভিলে-অর্জুন সমান বলী হবে তার চারি সহােদর, পাণ্ডবেরে পরাজিতে কেহ না পারিবে, শিব-বর হইবে বিফল । জয়। তবে ? রােহিণী। উপায় করেছি স্থির, শুন, কহি তােমা,-- সংশপ্তক রণ অবসানে মায়াবলে অর্জুনেরে পথহারা করি আনিয়াছি এ দুর্গম বনে। পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ•••ঙ্খলিত চরণ... রজনীর অন্ধকারে একা ফেরে সলিল সন্ধানে। এইখানে • এইখানে মনােরথ পূরিবে মােদের। ওই.• ওই, বুঝি আসে সব্যসাচী ; যাও বীর••যাও অন্তরালে সাধিয়া আপন কাৰ্য--- কী কৰ্ত্তব্য জানাব তােমারে (গরথের প্রস্থান । রােহিণী। ওগাে মায়া নিঝরিণী, সুরা হতে তীব্রতর মাদক সলিলে তােমারে করেছি পূর্ণ। বিন্দুমাত্র করে যদি পান—মানব তােত ছার- আঁখির নিমেষ মাঝে দিগহস্তীচয়- তাঘােরে লুটাবে ধুলায়।
উত্তরা ৫৫ /তথাপি•••তথাপি কহি, শুন নিঝরিণী, যতক্ষণ ফানীর কাল-তৃষ্ণা সৰ্ব্ব অঙ্গ না করে অবশ- লুপ্ত রহ অন্ধকার তলে। সাবধান...সাবধান—অতি সঙ্গোপন, আসিতেছে সব্যসাচী, রহি অন্তরালে। ( রােহিণীর প্রস্থান ; মায়ানিঝর অদৃশ্য হইল।••• একটু পরে অর্জুনের প্রবেশ । অর্জুন। কী আশ্চৰ্য্য এত অন্বেষণ করি বিন্দুমাত্র জলচিহ্ন নাই পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ, জড়িত চরণ, অগ্রসর হই হেন শক্তি নাহি আর। জল জল কোথা পাই ? এই ক্লান্ত পদে যাবাে পাণ্ডব শিবিরে, বহ্নি তেজে সমুজ্জল দেবদত্ত অস্ত্ররাশি মাের— ধৰ্ম্মরাজে করিব প্রদান। কোনােমতে• ••কোনােমতে কালি যদি কুলরক্ষা পায়-- সংশপ্তকে বধি পুনঃ কৌরব সমরে সৈনাপত্য করিব গ্রহণ। কিন্তু তার আগে : ওঃ, আর তাে পারিনা। একি কাল-কৃষ্ণা !.."জলজল • কোথা পাব পিপাসার জল। (শিলাখণ্ডে ক্লান্ত মস্তক রাখিলেন : উজ্জ্বল আলোকে নিরিণী, লাগিল সেই আলােক চোখে লাগিল) ৪০ উত্তরা অর্জুন। অকস্মাৎ নক্ষত্রের অজস্র আলোক । ওকি•••ওকি ওকি ও রজতধারা ! আঁখির বিভ্রম মাের। না: না••• অই...অই জল পিপাসার জল••• নিরের জল! (জলপান) আঃ, শান্তি শান্তি সৰ্ব্ব জ্বালা পলকে নিভিল। সম্মুখে ঘুমন্ত রাত্রি • আকাশ নিৰ্বাক... স্পন্দহীন•••গতিহীন অনন্ত বিরাম। বুঝিতে না পারি কেন অকস্মাৎ শিরায় শিরায় মাের পশিল এ তন্দ্রার জড়িমা । যেন কত যুগ'কত যুগান্তর শুধু জাগরণে গিয়াছে কাটিয়া তাই আজ বিশ্বের নিদ্রার ভার আঁখি পাতে মাের।••• ওরে ও উপল-শয্যা, তুই মােরে অঙ্কে দিলি স্থান- (শমন) ( গিরিশৃঙ্গ হইতে নীহারিকাপুঃ নামিয়া আসিয়া ঘুম পাড়ানী গান গাহিল) নীহারিকাদের গীত যােটা পর ঘুমতী নদীর যুম ডাকে আয় আয়রে । স্বপ্ন-রাণীর নিমহলার ঘর খুলে যায় যায়রে।
উত্তরা ৫৭ বকুল তলায় দোলনা কারুর দুলবে না, ঘুমকাতুরে-কোকিল গলা খুলবে না, কবির বাণী নীরব-শ্বাসে করবে যে হায় হায়রে। চুল-চুল-টুল চালােকের তন্দ্রাগাে, ঘুম-ঘুম-ঘুম আজ রজনীগন্ধা গো, প্রাণের পীতম্ বুক-বিছানায় ঘুম-চোখে চায় চায়রে। ( গীতান্তে রােহিণীর প্রবেশ•••তাহার ইঙ্গিতে নীহারিকাগণ প্রস্থান করিল। রােহিণী। হে শ্রেষ্ঠ পাণ্ডব,- মায়া-নিদ্রা মাঝে হােক স্বপ্ন-জাগরণ! যে প্রশ্ন করিব তােম এইক্ষণে তার স্বপ্নবেশে প্রদান উত্তর- অর্জুন। কি প্রশ্ন ? রােহিণী। রণবিদ্যা এমন কি কিছু নাই কৌরব আয়ত্বে, পাণ্ডব জানে না যাহা ? অৰ্জ্জুন। দেবতার কৃপা আর গুরু আশীর্বাদে সর্ব বিদ্যা করায়ত্ব মাের। রােহিণী। তুমি নহ, তুমি ভিন্ন অপর পাণ্ডব। তারা কি সকল জানে ? সর্ব অস্ত্রে জানে কি সন্ধান ? রণক্ষেত্রে সর্ব বৃহ- অজুন। বৃহ! রােহিণী। হ্যা, বৃহ? বলাে• ব্যুহের সন্ধান••• ভেদিতে পারে কি তারা সব ? অর্জুন। এক বৃহ আমি আর দ্রোণগুরু ছাড়।
৫৮
উত্তরা
-
ত্রিজগতে আর কেহ না জানে সন্ধান।
রােহিণী। কোন্ কোন্ বৃহ ?
অর্জুন। চক্রব্যুহ।
রােহিণী। চক্রব্যুহ কি বলিলে চক্রব্যুহ !
কেহ তার জানে না সন্ধান ?
পাণ্ডবের কোন রথী ?
অর্জুন। একজন শুধু হয়তাে পারিত,
কিন্তু সে যে নিতান্ত বালক!
রােহিণী। ভাল ভাল কি বলেছ নাম ?
চক্রব্যুহ চক্ৰবৃহি-
( রােহিণীর প্রস্থান•••নিঝরিণী আঁধারে মিলাইল—একটু
পরে দেখা গেল নীল স্তিমিত আলােকে শ্রীকৃষ্ণ
অর্জুনকে খুজিতে খুজিতে পর্বত
শিখর হইতে নামিয়া
আসিতেছে)
শ্রীকৃষ্ণ। সখা,•••সখা••• ফাল্গুনী,-
( অঙ্গুন চোখ মেলিলেন)
শ্রীকৃষ্ণ।
এত তন্দ্রা উপল-শয্যায় ?
সুদুর্গম পৰ্বত-অরণ্য, চারিভিতে
করি অন্বেষণ, সখা-সখা” বলি
বারম্বার কত যে ডাকি।
কেন, কিসের লাগিয়া সখা
এসেছ হেথায় ? কি ভাবিছ•••
মনে নাহি পড়ে ?
(অর্জুন ঘাড় দোলাইয়া বলিলেন-‘না’)
উত্তর শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণ। না! সংশপ্তক রণ অবসানে তােমারে রাখিয়া একা অশ্ব লয়ে গিয়েছিনু হিরন্বতী জলে, সেই অবসরে—বলল, সেই অবসরে। অর্জুন। সেই অবসরে আমি বাত্রা করিলাম— রুধিরাক্ত শবদেহ, মৃতের কঙ্কালপূর্ণ রণস্থল রাখিয়া পশ্চাতে--- সেইক্ষণে যাত্রা করিলাম রজনীর ঘন অন্ধকারে। কেন: কেন গেলে? অর্জুন। নাহিক স্মরণ তাহা, শুধু মনে পড়ে একাকী চলিনু ছুটে। রণস্থল••প্রান্তর.• কানন- বহুদূর পশ্চাতে রহিল ; চির-রাত্রি অন্ধকার যেন আপনি খুলিল তার রহস্য দুয়ার-সেই পথে চলিলাম একা। চলিতে চলিতে-পিপাসা জাগিল মাের— প্রবল পিপাসা । ও... জি.কণ্ঠ.••শুষ্ক হল মরুভূমি সম ; বিন্দু বারি মিলিল না কোথা? অতি কষ্টে বহি দেহভার:: এই শিলাখণ্ড শেষে করি আশ্রয় । শ্রীকৃষ্ণ। তারপর ? তবু মিলিল না জল ? অৰ্জ্জুন। জল ! হামিলেছিল...এইখানে মিলেছিল জল।
৬০ উত্তরা স্বপ্ন। অনন্ত পিপাসা মাের দিয়াছে মিটায়ে গিরি-গাত্র-বাহী অই স্নিগ্ধ নিঝরিণী ( চাহিয়া দেখিলেন নিঝরিণী অন্তর্হিত) শ্রীকৃষ্ণ। নিঝরিণী! কোথা নিঝরিণী । অর্জুন। তবে, কোথা গেল নিঝরিণী । শ্রীকৃষ্ণ। আবার সে নিঝরিণী ! পার্থ, তুমি কি দেখেছ স্বপ্ন ? অৰ্জ্জুন। : না:••একে একে পড়িছে স্মরণে! জনার্দন,-কে যেন আসিয়াছিল— কে যেন শ্রীকৃষ্ণ। অর্জুন। নারীমূৰ্ত্তি এক। চিনি না দেখিনি আগে, কোন্ এক অসতর্ক মুহূর্তে আমার সেই মায়াবিনী যেন...কি এক গােপন কথা, গােপন সন্ধান•••ছলনায় নিয়েছে জানিয়া! শ্রীকৃষ্ণ। কি কথা ? সে তাে নাহি আসে স্মরণে আমার ; বিস্মৃতির ধূমজালে আচ্ছাদিত মস্তিষ্ক আমার! কোনােমতে নাহি পড়ে মনে আমারে আয়ত্বে পেয়ে—কী কথা সুধাল, কী জানিল মায়াবিনী নারী- ( অকস্মাৎ দুর আকাশপটে রোহিণীকে দেখিলেন) অর্জন। অই•••অই হের বহুদূর আকাশের পারে, অর্জন। A
উত্তরা
৬১
অর্জন।
মেঘস্তর ভাঙ্গি পদতলে...
গ্রহ উপগ্রহ লােক পশ্চাতে ফেলিয়া-
অই ছুটে মায়াবিনী নারী।
ওরে, রুদ্ধ করুদ্ধ ক গতি-
নহে ব্ৰহ্ম অস্ত্রে করিয়া সন্ধান
(ধনুকে বাণ যোজনা : শ্রীকৃষ্ণ সম্মুখে পঁাড়াইলেন)
শ্রীকৃষ্ণ।
বন্ধ কর তুণীরে শায়ক ;
স্বপ্নবেশে ব্ৰহ্ম অস্ত্র কাহারে হানিছ ?
স্বপ্ন নহে নহে স্বপ্ন: • •
অই দেখ পালায় মায়াবী
শ্রীকৃষ্ণ। স্বপ্ন যদি নাহি হয়—যদি সত্য হয় --
ও তাে তবে নির্মম নিয়তি।
বাণে চাহ নিয়তির পথ বােধিবারে ?
ছিঃ, এখনাে কি ঘুচিল না তার জড়িমা।
চলে এসাে -নিশা অবসান প্রায়
চলে এসো সংশপ্তক সমর অঙ্গনে।
অর্জুন। বেশ! তােমারি বাসনা তবে হউক পূরণ,
চলাে কৃষ্ণ রণাঙ্গণে যাই।
নিয়তি! সত্যই কি এসেছিল নিয়তি আমার ।
নহে অসম্ভব পার্থ।
নহে, কোথা গেল নিঝরিণী ?
অৰ্জ্জুন। সত্য যদি এসেছিল নিয়তিরূপিণী,
হে মাধব, নিশ্চিত জানিও
এই রঙ্গমঞ্চে তবে আরম্ভ হইল এক
-
৬২ উত্তরা অভিনব অপূর্ব নাটক- তিনলােক দর্শক তাহার। এতদিনে ফাল্গুনীর প্রতিদ্বন্দ্বী যােগ্য মিলিয়াছে। একদিকে দুর্নিবার প্রবল নিয়তি অন্যদিকে একা রথী, সহায় কেবল একটী সারথীর কাপট্য-চঞ্চল। তবু • তবু একবার যেতে যেতে বলে যাই তােরে, শােনাে ওগাে নিয়তিরূপিণী, যদি জয়ী হই—পুরস্কার বাঞ্ছা নাহি করি- জয়লক্ষ্মী বরমাল্য ক্ষত্রিয়ের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ; আর•••আর যদি মাের হয় পরাজয় যদি তুই হােস জয়ী শােনূরে নিয়তি,-চাহিস যদ্যপি - জীবনের শ্রেষ্ঠ-রত্ন- শ্রীকৃষ্ণ। ফানী, ফাঙ্গনী, করি পণ- জীবনের শ্রেষ্ঠ-রত্ন দিব উপহার।
তৃতীয় অফ
প্রথম দৃশ্য
;
উত্তরার শয়ন কক্ষ। পালঙ্কে নিদ্রিতা উত্তরা ; প্রতিষধের রক্তাভ বাতায়ন
পথে ঘরের মধ্যে লুটাইয়া পড়িয়াছে। সখীরা জাগরণী গান গাহিল।
গীত
স্বপনেতে তপনেতে গােপনেতে দেখা নিতি
ধরণীর সরণীতে নেই চদিমার স্মৃতি।
জাগো, সখি জাগাে, সখি জাগাে,
আঁখি-চাপাকলি ঢেক না গাে ;
জাগে ফুল—জাগে অলি,
জাগে প্রভাতের গীতি।
উত্তরা। (স্বপ্নজড়িত কণ্ঠে ) না : না কোথা যাও প্রিয়তম,
আমারে ফেলিয়া! পায়ে ধরি.. পায়ে ধরি
যেয়াে না চলিয়া ।
মীরা। সখি•••সখি,-
উত্তরা। (জাগরিত হইয়া) একি! মীরা!
সে তবে কোথায়?
কে কোথায় ? মনচোর তব ?
ভয় নাই সখি,-যে বাঁধনে বেঁধেছ তাহারে
সাধ্য কি তাহার
ছিন্ন করি সে বন্ধন যাবে পালাইয়া ।
মীরা।
৬৪ উত্তরা উত্তরা মীরা নিকটেই আছে কোথা; মনে লয়- এখনি ফিরিবে। কিন্তু, আমি যে দেখেছি সখি’ নিশাশেষে ঘাের দুঃস্বপন ! দুঃস্বপন ! দেখিলাম যেন—আমি আর প্রিয়তম দুইজনে গেছি কোন্ সাগরের কূলে। নীরব নিশুতিরাত ; জন প্রাণী নাহিক কোথাও ! দিগন্ত মেখলাসিন্ধু আবর্ত-ফেনিল সম্মুখে বহিয়া যায়। তার পরপারে দূরে বহুদূরে নির্জন ভবনচূড়ে একটী সােনার আলাে বার বার কেঁপে কেঁপে ওঠে চঞ্চল বাতাসে। কী আছে হােথায় প্রিয় কাহার প্রতীক্ষা লাগি কে জালায় আলাে ?” প্রিয়তম কথা কহিল না। চলো, মােরা যাব ঐ পারে।” তবু প্রিয় দিল না উত্তর উতল। নিঃশ্বাস ফেলি বারেক চাহিল শুধু মাের মুখপানে! (আচম্বিতে হেরিলাম সিন্ধু জলে ভাসে অপরূপ চঁাদের তরণী ; হাল ধরে বসে এক রূপসী তরুণী ধীরে ধীরে সেই তরী একূলে ভিড়িল । • !
উত্তরা
৬৫
-
প্রিয়তম উঠিল তাহাতে।
তারপর আমারে তুলিতে
দুইবাহু সম্মুখেতে যেমনি বাড়াবে-
অমনি সে মায়াবিনী দিল তরী খুলে !
আর্তস্বরে উঠি কঁদিয়া-
“কোথা যাও•••কোথা যাও, নিয়ে যাও মােরে-
তাহার উত্তরে-
কাল-নাগিনীর সম সহস্র-ফণায়
প্রিয়তমে আবেষ্টিয়া, সৰ্ব্ব অঙ্গ
নিষ্পেষিয়া তার--
তরঙ্গ গর্জন সনে “হা হা” রবে সর্বনাশী
উঠিল হাসিয়া! ঘুম ভেঙ্গে গেল।
সখি•••সখি,-
নিশশেষে হেন অমঙ্গল স্বপ্ন
কী হেতু দেখিলে?
অমঙ্গল ! না না কোথা অমঙ্গল ।
কি সাহস অমঙ্গল স্পর্শিবে আমারে।
কেন ভুলে যাস্ সই,-
ধনঞ্জয় কেশবের আমি যে রে
স্নেহের দুলালী! সুভদ্রা জননী মাের।
অভিমনু স্বামী-
( অভিমন্যর প্রবেশ)
অভি। সেই স্বামী-
আজ্ঞাবহ ভৃত্য সম দ্বারে উপনীত ;
মীরা।
উত্তরা।
উত্তরা উত্তরা। অভি। দাসে আজ্ঞা দেহ মহারাণী ! (হাসিয়া সখীদের প্রস্থান) কোথা গিয়াছিলে প্রিয় ? শুন প্রিয়া, কহি এক আশ্চর্য্য সংবাদ কিন্তু কই, কোথা গেল ! এসো•••এসাে•••এসাে এই দিকে— ( ঘটোৎকচের প্রবেশ ) অভি। উত্তরা, ইহারে চিনিতে পার ? উত্তরা। একি! এযে সেই বনচারী- অভি। চুপ•••ইনি অগ্রজ আমার ; তাত-বৃকোদর-পুত্র বীর ঘটোৎকচ। সত্বর প্রণাম কর লুটায়ে চরণে ( উত্তর প্রণাম করিতে গেলে ঘটোৎকচ লজ্জায় যেন মরিয়া গেল) ঘটে। একি কর•••একি কর মাতা। আমি আশীৰ্বাদ করিয়াছিছিছি••• অনার্যের চুয়ােনা চরণ- অভি। বাধা নাহি দাও তাত। তােমার কনিষ্ঠ ভ্রাতা, ভ্রাতৃবধু পাশে চির পূজনীয় তুমি•••তুমি আৰ্য্যোত্তম। নাহি জানি, কোন অভিমানে সত্য পরিচয় তব এতদিন রাখিলে গােপনে। ভাগ্যে আজ মাতা তােমা দেখিলেন শিবিরের পাশে ; হাতে ধরি নিয়ে এসে দিলেন চিনামে।
উত্তরা
ঘটো।
উত্তরা। প্রিয়তম, এতদিন মােদের নিকটে
পরিচয় লুকাইয়া--
আৰ্য কিন্তু করেছেন মহা অপরাধ!
তার শাস্তি দান হেতু
চলাে মােরা যাব তার গৃহে ;
লুটিয়া খাইব যত ভােজ্য বস্তু আছে।
যাবে:• 'যাবে মাতা! সত্য যাবে তুমি !
না না • মাথা মাের কি রকম
ঘােলাইয়া যায় ? মনে হয়
স্বপ্ন দেখিতেছি! অভিমন্যু,
কি কহিব ভাই ; হিড়িম্বা জননী মাের
জনম দুঃখিনী:কত যে হবেন খুসী
তােমাদের পেলে। নিজ হাতে মা আমার
করিয়া রন্ধন•••না : না•••পালাই•••
পালাই আমি-
অভি। (হাত ধরিয়া) কোথা যাও অগ্রজ আমার ?
ক্ষুধার্ত কনিষ্ঠ হের, ক্ষুধাতুরা ভ্রাতৃবধূ তব।
সুভদ্রা দ্রৌপদী মাতা
আশৈশব অন্নে জলে করিলা পালন ;
হিড়িম্বা জননী মাের এত কি নিষ্ঠুরা
একটি দিনের তরে মিটাবে না ক্ষুধা
বঞ্চিত কি করিবে সন্তানে ?
কে বলেছে কে বলেছে বঞ্চিবেন মাতা!
কার সাধ্য বঞ্চিবে রে তােরে !
ঘটে।।
উত্তরা অভি। চর্চ••শীঘ্র চল্ মাের সনে কী আনন্দ! কী আনন্দ!“অভিমন্যু, আমি কিন্তু ভাইবনে গিয়ে সর্ব অগ্রে নৃত্য করি দেখাব তােদর। ভাল নৃত্য করিবারে জানি—এই দেখ, (নৃত্য আরম্ভ করিল ; সহসা উত্তরার প্রতি চোখ পড়িতে অপ্রস্তুতের মত থামিল) থাক্ • মাতা বুঝি লজ্জা পেল ক্ষণেক অপেক্ষ আৰ্য্য, জ্যেষ্ঠতাত ধৰ্ম্মরাজ অনুজ্ঞা লইয়া- এখনি আসিব মােরা ঘটো তবে, আগে আমি যাই- ছুটে গিয়ে সঙ্গীদলে দিই সমাচার ; বলে আসি-আমার ভবনে আসিছে অামার ভাই.. অভিমন্যু নিজে, সঙ্গে তার উত্তরা জননী । হতভাগাগুলাে অবাক হইয়া যাবে- কী যে মজা হবে...নাচিতে নাচিতে একেবারে.. যাই ভাই, তুমি কিন্তু দেরী করিওনা ( প্রস্থান) রাক্ষসী মাতার গর্ভে ঘটোৎকচ অগ্রজ মােদের অনাৰ্য জনমহেতু যে গ্লানি পুঞ্জীত তার রয়েছে অন্তরে অভি।
উত্তরা লাে কল্যাণী, মােরা কোহে সেই গ্লানি মুছাব যতনে। তারপর দিনশেষে সুদূর কদম্ববনে রাত্রি যবে আসিবে নামিয়া দূর বনান্তরে যাবাে তুমি আর আমি। উত্তরা। শুধু তুমি আর আমি সারা অঙ্গ কাপে মোর অসহ উল্লাসে প্রিয়তম, প্রস্তুত হইয়া আসি, তুমি যাও জ্যেষ্ঠতাত আদেশ লইতে। ( উত্তরার প্রস্থান ; অপর দিক হইতে যুধিষ্ঠির ও ভীমের প্রবেশ) যুধি। বৎস অভিমন্যু, অভি। প্রণাম চরণে আৰ্য•••প্রণাম মধ্যম, আমি যে চলিয়াছিনু তােমাদেরই পাশে। যুধি। পুত্র, অভি। একি••ঘূরিত অধর তব, নতনেত্রে চাহিতেছে মেদিনীর পানে । কিসের সঙ্কোচ আৰ্য্য। যুধি। সমূহ বিপদ পুত্র, ঘটিল সমরে। কেশব অর্জুন দেহে গেছে চলি সংশপ্তক সমর অঙ্গনে। সেই অবসরে চক্রব্যুহ বিরচিয়া শস্ত্রগুরু দ্রোণ মহামার করিতেছে পাণ্ডবের মাঝে। দুর্ভেদ্য•••অটল ব্যহ- একমাত্র পার্থ বিনা কেহ মােরা নাহি জানি প্রবেশ সন্ধান। } ৭০ উত্তরা তবু রহিয়াছে আমি ব্যর্থকাম•••ভগ্নোদ্যম বীর বৃকোদর। অই•••অই শােন হাহাকার পাণ্ডব সেনার ; সৰ্ব্বনাশ হ’ল বুঝি অর্জুন বিহনে ! অভি। চিন্তা ত্যজ তাত, অর্জুন নাহিক যদি, রয়েছে আৰ্জ্জুনী। দেহ আজ্ঞা দাসে ত্বরা যাব রণস্থলে চক্রব্যুহ বিচূর্ণিয়া জানাব কৌরবে— কেশব ফাল্গুনী নাই, সিংহ-শিশু অভিম—এক দেহে কেশব ফাল্গুনী । ভীম। আমি র’ব দেহরক্ষী সম সদা গদা স্কন্ধে লয়ে পুত্র তােমার পশ্চাতে। একবার শুধু একবার কোনােরূপে পারি যদ্যপি ভাঙ্গিতে সে বৃহদ্বার- সাগর প্লাবন সম ব্যুহে প্রবেশিয়া ভাসাইব কুরুদলে আঁখির নিমেষে। অই অই পুনঃ পাণ্ডুপক্ষে জাগে হাহাকার ; একবার•••ওরে অভিমন্যু, শুধু একবার বৃহদ্বার খুলে দে আমারে। অভি। যাও•••যাওহে মধ্যমত উৎসাহিত কর সেনাদলে ; অস্ত্রসজ্জা করি আমি এখনি যাইব। ( ভীমের স্থান)
উত্তরা
৭১
অভি।
যুধি। পুত্র, পুত্র, পার্থের গচ্ছিত ধন,
তুই মাের দারিদ্রের অন্তিম-সম্বল।
আশীর্বাদ কর আর্য্য,
পার্থের অম্লান-কীৰ্ত্তি অভিমনু হতে
স্নান নাহি হয় যেন কৌরব-আহবে।
যুধি । সৰ্ব্ব অন্তরের মাের লহ আশীৰ্বাদ।
কুরুক্ষেত্র মহারণে -
সেনাপতি পদে আজি বরিনু তােমারে।
এ বিপুল-কুল-মান রক্ষিও কুমার।
নারায়ণ• নারায়ণ, দেখিও অভিরে।
( যুধিষ্ঠিরের প্রস্থান; অভিমন্যু অস্ত্রসজ্জা করিতে আরম্ভ করিল।
একটু পরে গান গাহিতে গাহিতে উত্তরার প্রবেশ)
গীত
বুকের কোকিল গাইছে বঙীন গীতি
তোমার গীতি আমার গীতি
নতুন প্রেমের প্রতি।
নদীর মতন হয়ে সাগরগামা
বাচব তােমার প্রেম-সায়রে আমি,
আপনাকে যে হারিয়ে ফেলাই
আমার সুখের নীতি।
(অভিমন্যুকে অসজ্জা করিতে দেখিয়া উত্তরা সহসা নির্বাক
হইয়া গেল।
অভি। কেন প্রিয়ে, থেমে গেলে ।
গাহিলে না গান?
কী দেখিছ চাহি মাের পানে।
१२ উত্তরা এসসা, বসাে এইখানে। শুনিও উত্তরা, কী সঙ্গীত তােলে আজ ধনুক-টঙ্কারে-তােমার প্রাণের অভি। শরমুখে বীণার ঝঙ্কার... গদার ঘূর্ণনে গুরুগুরু দামামা গর্জন! দেখিও কৌতুক তুমি, রথ রথী গজ বাজী লক্ষকোটি সেনানী দুর্জয় কেমনে নাচাব আজ জ্বালামুখী পৰ্বতের বহিস্রাব সম! জলে স্থলে পবন-মণ্ডলে রন্ধ্রে রন্ধ্রে গগনের জাগিবে আমার প্রদীপ্ত দীপক রাগ। ভাল কথা, উত্তরা, বলিতে ভুলিয়া গেছি, আজিকার রণে জ্যেষ্ঠতাত বরণ করিলা মােরে সেনাপতি পদে। (সচকিত। উত্তরা আসন ছাড়িয়া উঠিল) উত্তরা। সেনাপতি! তুমি! এত বড় কৌরব সমর...রথরথী সেনাগজ- উঃ-যেন শেষ নাহি ! সাগরের জলােচ্ছ্বাস যেন! না•••তােমারে দিব না যেতে অভি। ছিঃ উত্তরা, এমন অবুঝ তুমি! ক্ষণেক অপেক্ষা কর।
৭৩
পিতা রত সংশপ্তক রণে
সুযােগ বুঝিয়া আস্ফালন করে কুরুদল।
ভাবে মনে অৰ্জ্জুন বিহনে
বীরহীন পাণ্ডব-শিবির।
এই অপমান মােরে তুমি শিরে নিতে কহ ?
অর্জুন-নন্দন আমি !
শােনাে প্রিয়া, ঘটোৎকচ অগ্রজেরে
মাের লাগি অপেক্ষিতে বােলো ;
অরি দলি’ এখনি ফিরিব।
উত্তরা। যাহা তব মনে লয় কর,-
মােরে সুধায়াে না কিছু।
ভীরু হিয়া কেঁপে ওঠে—
রােধিতে পারিনা আঁখিজল
একি বিপরীত কথা,
শুনিনি কোথাও, শৈশবে সমর সাধ !
কেমনে শুনিবে কই ?
গােবিন্দ মাতুল আর ভদ্রার্জুন জনকজননী-
অন্যজনে সম্ভব না হয় !
যাদব-সমরে অগণন সেনার মাঝারে
পতিপার্শ্বে রথরশ্মি ধরি
যেই নারী চালাইল হয়-
যার সনে একা পার্থ পরাজিল
লক্ষ যদুসেনা—সেই ভদ্রাদেবী জননী আমার ।
পিতা মাের গাণ্ডীবী অর্জুন
অভি।
৭৪ উত্তরা সুরাসুর নাগনর জয়ী। মনের নয়নে হেরি সংশপ্তক রণ-- বিশাল প্রান্তর•••আকাশে উঠেছে দীপ্ত-রবি ! কেশবের রথে বসি’ বিশ্বজয়ী জনক আমার- শ্রাবণের ধারা সম ঝলকে ঝলকে বরষিছে মৃত্যুসম বান! অরাতি পলক হারা: নাহি অবসর মুছিতে ললাট-স্বেদ•••শােনিত-নিস্রাব। একা রণ : একা রণ করে পিতা বহুজন মাঝে । বীর-হৃদি মাের উল্লাসে অধীর-- উত্তরা, হাসিমুখে দাও লাে বিদায়। কী তােমার মনসাধ তুমি ভাল জান ; বীর-ধৰ্ম্ম চাহিনা বুঝিতে। তুমি যাবে রণে—হেথা আমি একা বসে র’ব ; ফুরাতে চা’বে না দিন • ঝরে যাবে কুসুমের মালা •• বীণা পড়ে রবে..সাঙ্গ হবে কানন বিহার। হয়তাে ভুলেছ তুমি- অভি। ভুলি নি উত্তরা, ভুলিব না সে সুখ-স্বপন। আজিকার রণ গত হাে- তােরে নিয়ে যাব পুনঃ কানন বিহারে। দুরে•••বহুদূরে কাজল গ্রামের শেষে দিগন্তের পারে। উত্তর।। • ও = উত্তরা ৭৫ উত্তরা। কোনাে এক বনানীর প্রচ্ছন্ন ছায়ায় ••• সঙ্গিহীন অসীম নিরালা মিলাবে একান্ত দুটি প্রাণ। ( উৎফুল্ল হইয়া) কেহ রহিবেনা কাছে। মাথার উপরে শুধু অতন্দ্র-আকাশ.. পাহাড়ের বন হতে হিল্লোল বহিয়া যাবে মহুয়া সুবাস : দূরে গাবে নামহারা পাখী কেবল দু’টিতে মােরা : আর কেহ নয় ! তােমারে এমন পেলে • কী যে ভাল লাগে বলিতে পারিনা। আমরা দুটি তাে শুধু ? অভি। হা হা,–রে আমার বনের হরিণী, ভীরু ও সজল দিঠি আলাে ভরে দাও হাসি আনাে মুখে ; আমারে এবার বিদায় যে দিতে হবে। ( বাহিরে সেনাদের জয়ধ্বনি ও রণদামামার ধ্বনি) অই, মহােল্লাসে মাতি সেনাদল আমারে আদান করে। প্রিয়া,—আসি তবে- উত্তরা । আমি কিন্তু সারা দিন পথ চেয়ে রব- বিলম্ব কোরাে না প্রিয় - অভি। না- দাড়াও- উত্তরা অভি। কি উত্তরা ? উত্তরা। যাইবার আগে এঁকে দাও ললাটে আমার নারায়ণী সিদুরের রেখা। ( অভিমন্যু কৌটা খুলিতে গেল...অকস্মাৎ কৌটা হাত হইতে পড়িয়া গেল ••রক্তিম সিদুর চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িল • নেপথ্যে মৃদু যন্ত্রধ্বনি উঠিতেছিল ; তাহাও সেই সঙ্গে আর্তনাদ করিয়া স্তব্ধ হইয়া গেল...উত্তরা, অভিমন্য বিদ্যুৎপৃষ্টের ন্যায় চমকিয়া উঠিল। অভি। উত্তরা ; উত্তরা। অভি! ; অর্জন। দ্বিতীয় দৃশ্য প্রাক্তন; শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন হে কেশব, বাক্য তব করি প্রণিধান। সত্যরক্ষা হেতু জ্বলিয়াছে কুরুক্ষেত্রে সমর অনল ; সত্য মােরে কর্মক্ষেত্রে করে আবাহন। আজিকার ধ্বংসলীলা, জ্বালামুখী বাণে মম সংশপ্তক বধ, করে নাই চিত্ত মম ব্যাকুল চঞ্চল ; কি কারণে জান কি কেশব ? শিবিরে ফিরিয়া পাবাে সত্য, শান্ত, স্নিগ্ধ-পরশন, প্রিয়জন মাঝে এই ভরসায়- সত্য-সন্ধ রাজা যুধিষ্ঠির ; অনুচর, সহচর সবে তার সত্যের সেবক- শ্রীকৃষ্ণ।
৭৭
A
অর্জন। সর্ব অগ্রে দ্বিজদল “স্বস্তি, স্বস্তি” রবে উচ্চারিবে
আশিস বচন।
রণ প্রত্যাগত আমা দোহে
ঘিরি কুতূহলে, বৈতালিক তুলিবে সঙ্গীত...
হৃষ্ট মম স্বপক্ষ স্বজন-জনার্দন, ভেবে দেখ
একবার, সত্যের সে অপূর্ব-মুরতি।
জ্যেষ্ঠ ধৰ্ম্মরাজ, স্নেহ আশীৰ্বাদ ভরা
বক্ষমাঝে তার লভিব আশ্রয়। সম্ভাষিবে
মধ্যম পাণ্ডব। পুত্র মম অভিমন্যু
সম্মুখে দাড়াবে আসি দৃপ্ত-তেজ-কিশাের-কেশরী!
সীমন্তিনী বধূ মাতা কল্যাণী আমার
প্রশান্ত মধুর হাসি--
(সহসা শ্রীকৃষ্ণের সর্ব অঙ্গ কাপিয়া উঠিল )
জনার্দন,---জনার্দন,---
এ কী অকস্মাৎ!
শ্রীকৃষ্ণ। কী সখা,-
অর্জন। আচম্বিতে যেন শিহরিল শ্যাম-তনু তব ?
শ্রীকৃষ্ণ। পুরাতন কথা এক জাগিল স্মরণে
তাই মন হ’ল উচাটন।)
ত্যজি’ লীলা-বৃন্দাবন-কৈশাের স্বপন
যবে আমি আসি মথুরায়-
ব্যাকুল গােপিকাকুল
om
কাঁদিয়া পাগল-পারা-
অশ্রুবানে মগ্ন ব্রজধাম।
*হা কৃষ্ণ, হা কৃষ্ণ” রব তরঙ্গিয়া ওঠে
৭৮ উত্তরা সারা বৃন্দাবনে। ব্রজাঙ্গনা আঁখিজল ধরি’ হিয়া পরে- যমুনা গুমরি কঁাদে,- অন্ধকার বনচ্ছায়া থমকি চমকে অন্তৰ্ঘন বাষ্পের আবেগে।••• তারা তাে বােবে না হায়- আঁখির বাহির বলে কভু নহি মনের বাহির। রহি যত দূর দূরান্তরে মুগ্ধ প্রাণ বাঁধা থাকে প্রিয়জন পাশে নিবিড়-গহন-শ্যাম-করুণ-বাঁধনে ! অর্জন। কিন্তু সেকথা এখন কেন ? শ্রীকৃষ্ণ। কেমনে কহিব ? অকস্মাৎ হইল স্মরণ, তাই বলিতেছি। আঁখির বাহির নহে মনের বাহির, দেহের অদেখা হ'লে—ধরা দেন দেহের অতীত। অর্জন। হে মুরারি-বাক্য তব বুঝিতে না পারি । দোলে মন সন্দেহ দোলায়। রহস্য-রহস্যজালে ঘিরিয়াছ যেন .. কী এক কঠোর সত্য- (নেপথ্যে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কপিল) কপিল। দেবদত্ত, দেবদ, কোথা তুই ?—ফিরে আয়—দেবদত্ত, অর্জন। কে? কণ্ঠভরা হেন আকুলতা নিয়ে কে ডাকে কাহারে ? কে তুমি?
উত্তরা
৭৯
(কপিলের প্রবেশ)
কপিল। আমি ? মাের কোনো পরিচয় নাই।
আগে বলােদেখিয়াছ তারে ?
অর্জন।
কে সে ? কী সম্বন্ধ তােমার সহিত ?
কপিল। কী সম্বন্ধ আমার সহিত।
সে যে এই
দু’টী অন্ধ নয়নের আলাে,
এই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের অন্তিমের ধন।
শোেননা-শােনাে, বলি পরিচয়,
যােড়শবর্ষীয় শিশু-ছিন্নবাস পরিধানে
তবুও অপূৰ্ব্ব কান্তি
দিব্যজ্যোতি খেলে কলেবরে।
আমার সন্তান ;—সেই মাের দেবদত্ত
কুরুক্ষেত্র রণে গেল। দেখিয়াছ তারে ?
অর্জন। তােমার সন্তান?
যােড়শবর্ষীয় এক বিপ্ৰশিশু সমর অঙ্গণে !
কপিল। শুনিল না বারণ আমার।
আজি কুরুক্ষেত্র রণে-
কে এক কিশাের বীর-যুদ্ধ করে দেব-নর-ত্রাস---
অর্জন। কিশাের বীর।
কপিল। হা হঁা-পাণ্ডুবংশধর-সপ্তরথী রণ !
মাের পুত্র দূর হতে সমর দেখিল ।
কৌতূহল দমিতে নারিয়া, কহিল আমারে,
“পিতা, এই শাল্মলী তরুর তলে
করহ বিশ্রাম ; সমর দেখিয়া আসি।”
উত্তরা অর্জন। কপিল। অর্জন। ছুটে গেল ; কত যে ডাকিনু পিছে- কেহ শুনিল না। তারপর-কী প্রলয় হয়ে গেল আজ। তার মাঝে কোথা খুঁজে পাবাে- আমার হারানাে নিধি। বলবল, কে তুমি ? দেখিয়াছ তারে ? শান্ত•••শান্ত হে ব্রাহ্মণ কেমনে হইব শান্ত তরে নাহি পেলে ? ওগো, অন্ধ আমি- সে আমার নয়নের আলাে। খুজে আনাে খুঁজে আনাে কোথায় খুজিব তারে? ভীষণ সমর- লক্ষ কোটী সেনাগজ হত তুরঙ্গম পড়িয়াছে কুরুক্ষেত্রে দিচয় ঘেরি। মানব-অগম্য নিশীথ শ্মশান সম রুধির-পঙ্কিল রণস্থল। তার মাঝে কোথায় খুজিব রে উন্মাদ, সন্তানে তােমার ? তবে—তবে কি উপায় হবে ? না না•••পিতা আমি- আমি তারে খুজিতে পারিব । আমার অগম্য নাই ত্রিজগতে কোনাে স্থান আজ। কপিল।
উত্তরা ছেড়ে দাও•••ছেড়ে দাও, দেবদত্ত-দেবদত্ত, অর্জুন। কোথা যাও ? শােনাে হে ব্রাহ্মণ, বৃথা তারে কেন অন্বেষণ ? কেন এ কাকুতি তব ? ধরণীর সকল কিশােরে তব দেবদত্ত ভাবি মনেরে সান্ত্বনা দাও। শােননা-শােনাে- আমারও রয়েছে এক কিশাের সন্তান তা’রও রূপে ত্রিজগৎ আলাে, তা’রও গুণ তারও শৌর্য নহে সাধারণ । তারে তুমি বুকে টেনে নাও। ওরে, ওরে, বক্ষমণি-হারা ব্যথাতুর পিতা, মাের অভিমন্যু আজ হতে তােমার সন্তান। কপিল। কী—কী বলিলে নাম! অর্জুন। অভিমন্যু কপিল। অভিমন্যু। অভিমন্যু! তবে-তবে তুমি- অর্জুন। আমি তৃতীয়-পাণ্ডব। চমৎকৃত কি হেতু ব্রাহ্মণ ? হা হা, ভুবন বিখ্যাত সেই ভাগ্যবান আমি যার রথে বসেছেন নিজে নারায়ণ, অগ্রজ যাহার ধর্মরাজ, পুত্ৰ অভিম- কপিল। থাক থাক আর বলিও না।
৮২ উত্তরা ছেড়ে দাও ছেড়ে দাও এইবার মােরে। এখনাে শােনননি বুঝি- অৰ্জ্জুন। কী? কী শুনিব ? কপিল। কিছু নয়, ছেড়ে দাও•••ছেড়ে দাও, দেবদত্তে খুজে আসি- অর্জুন। বলব- কোথা যাস রে উন্মাদ ? করি পণ- ঐশ্বৰ্য্য সম্পদ যা কিছু আমার আছে সমভাগী করিব তােমারে- কপিল। সমভাগী। ! সমভাগী । ওরে রিক্ত, ওরে নিঃস্ব, ওরে সর্বহারা, তুমি মােরে করিবে করুণা! ছেড়ে দাও, দেবদত্তে খুঁজে আসি••• দেবদত্ত-দেবদত্ত- (বেগে প্রস্থান) অর্জুন। ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণ, কোথা যাও সব্যসাচী ? উন্মাদ ব্রাহ্মণপুত্রশােকে ছন্নমতি, তা’র পিছে কি হেতু ছুটিবে ? অর্জন। উন্মাদ! উন্মাদ বিপ্র ! তাই হবে। এ কি বুক কঁপে কেন ? ওষ্ঠ জিহ্বা শুষ্ক হয়ে আসে ! এ কি অকস্মাৎ কোন ব্যাধি আক্রমণ করিল আমারে। শ্রীকৃষ্ণ। ব্যাধি।
উত্তরা
চোখ কেন জলে ভরে আসে।
চোখে জল! হে কেশব, দেখ চমৎকার
রণবেশধারী সব্যসাচী,
তার দুই চোখ জলে ভরে গেছে!
[ ধরণীর মর্মস্থল ভেদ করিয়া ধীরে ধীরে
এক করুণ সঙ্গীত উথিত হইল ]
গীত
ন
যায় নিভে যায় চোখের জলে
চোখের আলাে, দিনের আলাে,
সুৰ্য্য-চিতার রক্ত-শিখা
চিত্তে আমার কে হালাল !
অর্জুন। কেশব, কেশব,
সত্য করি কহ মােরে-
এ গান কাহার ?
শ্রীকৃষ্ণ। বিশ্ব প্রকৃতির! ধরণীর বুক হতে
হেন গাথা জাগে নিরন্তর
মত্ত মােরা রহি কোলাহলে
তাই সদা শ্রবণে না পশে।
অর্জুন। কিন্তু
এত সকরুণ বেদনার গান।
শ্রীকৃষ্ণ। পলকে পলকে ঝরে নিখিল কাননে
নাম-হারা বৃন্ত-হারা কতো ফুল কলি,
শুকায় শ্যামলীলতা,
তপ্ত আঁখি জলে-ম্লান হয়
৪
উত্তরা
বকুলের বাসক শয়ন কতাে মধুরাতে
কে রাখে সন্ধান তা’র ?
মৌনা এই বসুধা জননী
সৰ্বস্মৃতি হৃৎপিণ্ড তলে তার
লেখা হয় শােনিত অক্ষরে।
তাই মাতা রহি’ রহি’ ফুকারিয়া কাঁদে
দুঃসহ বেদনা ভরে ।
পার্থ—
অর্জন। ( শ্রীকৃষ্ণের হাত বুকে টানিয়া লইলেন)
এইখানে রাখাে হাত।
বলল কিসের আভাস পাও?
তনু মন সৰ্বস্ব আমার
ডালি দিছি রাঙা পায় ;
নিঠুর কেশব, তবু বুঝিবে না ব্যথা।
পাণ্ডব জীবন ধন, পাণ্ডবের প্রাণ মন,
তুমি বিনা পাণ্ডবের কে আছে কোথায় ?
বলাে, কুশল সবার ?
শ্রীকৃষ্ণ।
অমঙ্গল কোথা পাণ্ডবের ?
অর্জুন। তবু মন যে চাহেনা মোের
মানিতে প্রবােধ।
সংশপ্তক রণজয়ী চলেছি শিবিরে,
রণ বার্তা সুধাইতে কেহ তাে আসে না!
চির-পূজ্য ধর্মরাজ, ভ্রাতা বৃকোদর,
সহদেব, অমুজ নকুল-কোথায় তাহারা?
উত্তরা ৮৫ কোথা•••কোথা মাের সৰ্ব্ব গৰ্ব্ব, নয়নের আলাে- অভি-অভি-অভিমন্যু মাের ? (নেপথ্যে আবার যেন কোন অশরীরি বাণী সঙ্গীতের মীড়ে মীড়ে কাঁদিয়া উঠিল) গীত | ০ ০ ০০০০ ; ঝরা-ফুলের আত্মা কেঁদে খুজছে হারা-গন্ধ খুজছে অামাৰ মৰ্ম্ম-মরু কোথায় সবুজ-ছন্দ। শ্মশান ধোয়ায় আকাশ বাতাস কেমন করে বাসব ভাল ! যায় নিভে যায়.. [ ধীরে ধীরে রক্ত-রবি ডুবিয়া গেল ; সব অন্ধকার একটু পরে স্নান চন্দ্রালােক দেখা দিল। অর্জুনের সারা দেহ চঞ্চল হইল; মুগ্ধের মত তিনি সেই অদৃশ্য সঙ্গীতকে যেন অনুসরণ করিতেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বাধা দিলেন•••] শ্রীকৃষ্ণ। ফানি, অর্জুন। পার যদি অই কণ্ঠ রুদ্ধ করে দাও, সঙ্গীত-রূপিণী অই অলক্ষ্যচারিণী উন্মাদ করিল মােরে। রুদ্ধ করাে—ক্ষান্ত করাে ওরে- শ্রীকৃষ্ণ। শান্ত হও প্রিয়, অর্জুন। সারা বিশ্ব মথিত বেদনা, তপ্ত অশ্রু উপহার তুমি কি বােঝ নি কৃষ্ণ, শােনন নি এখনাে –
উত্তরা
শ্রীকৃষ্ণ।
ছন্দে গানে উচ্ছসিয়া বার বার কহিছে আমারে
“রে অর্জুন—রে অর্জুন,
পুঞ্জীভূত এ ক্রন্দন তােরি লাগি শুধু”
হে ফাণি, এইবার তবে
কালি রজনীর কথা করহ স্মরণ—
সত্য যদি নিয়তির সনে
হয়ে থাকে সমর আরম্ভ,
দুঃখের মুরতি ধরি’---সত্য যদি এসে থাকে
জীবনে তােমার
সুমহান্ পরীক্ষা সময়
তােমার কি চঞ্চলতা সাজিবে অর্জুন ?
সত্য.. সত্য কথা বলেছ মাধব,
নিয়তিরে লভিয়াছি প্রতিদ্বন্দ্বী মম ;
নিয়তির সনে রণ মাের।
হে মাধব,আর আমি কিছুমাত্র না হ’ব চঞ্চল
অর্জুন।
তৃতীয় দৃশ্য
পাণ্ডর শিবিরের একাংশ
ভদ্রা ও দ্রৌপদী
সুভদ্রা।
পায়ে ধরি তব
এ চাঞ্চল্য কর পরিহার।
ধর্খরাজ মুহমান•••ক্ষীপ্ত ভীমসেন...
উত্তরা
৮৭
শােকমগ্ন সহদেব • •অনুজ নকুল।
তুমি দিদি, পাণ্ডবের কল্যাণী-প্রতিমা,
ধ্রুবতারা সম রাজো সংসার শিয়রে ;
সর্বংসহা কুললক্ষ্মী ওগাে,
তুমি যদি ফেল অশ্রুজল
কে তবে করিবে শান্ত অশান্ত পাবে।
দ্রৌপদী। নহি কুললক্ষ্মী আর,
কুলগ্রাসী রাক্ষসী দ্রৌপদী।
মেলিয়া করাল জিহ্বা ছিন্নমস্তা সম
আপন বৃক্ষের ধনে করিলাম গ্রাস।
স্বর্ণলতা বধূ কাঁদে লুটায়ে ধূলায় ;
হায় হায়•••মাতা হয়ে
স্বহস্তে মুছিনু তার সিথির সিঁদুর!
মহা সর্বনাশী আমি
কেন আলিলাম এই সৰ্ব্বনাশা সমর অনল ।
কেন পাঠালেম রণে প্রাণপ্রিয় অভিমধ্যে মাের।
ভদ্রা,ভদ্রা,
নিবারিতে পারিলি না মােরে ?
কেন বলিলি না বােন্-
“অভিমন্যু আমার সন্তান::
আমি তারে দিব না যাইতে।”
সুভদ্রা। কেন নিবারিব দিদি ?
বুঝিয়াছি স্থির
অভিমনু নহে মাের, তােমারও সে নহে।
।
-
৮৮ উত্তর ০ সে যে ছিল গােবিন্দের ধন- গােবিন্দ আপনি তারে করেছে গ্রহণ। অশান্ত নয়নে যদি আসে অশ্রুজল পুঞ্জীত করিয়া তারে রাখাে মৰ্ম্মতলে- তারপর নিভৃত নির্জনে•••লুকাইয়া সারা বিশ্বজনে- নীরবে ঢালিও অশ্রু ব্যথাহারী গােবিন্দের রাতুল চরণে। দ্রৌপদী। ভদ্রা,—ভদ্রা, সুভদ্রা। যাও দিদি,-শােকমগ্ন পৌরজনে প্রকৃতিস্থ করমূচ্ছগতা উত্তরে প্রদান চেতনা। আমি যাই মহাকাল শিবের মন্দিরে... ভক্তিভরে পূজিব তাহারে (সুভদ্রা দ্রৌপদীর প্রস্থান...অপর দিক হইতে অর্জুন ও কৃষ্ণের প্রবেশ) অৰ্জ্জুন। কে•••কে হােথায়! মধ্যম। এশাে• 'রণবার্তা দাও। একি! লুকাও কি হেতু! ( ভীমের প্রবেশ) ভীম। লুকাবাে! লুকাবাে কি হেতু! আমি লুকাইলে—লজ্জাহীন শৃগাল-তাড়িত কলঙ্কী জীবন লয়ে কে বাঁচিবে আর ! আমি কোথা লুকাইব? লুকায়েছে শুধু ভূকম্প, অনলস্রাব, ঝঞ্চা, ঘূর্ণীবায়, উত্তরা ৮৯ - প্রলয়ের জলােচ্ছাস, বজ্র-হুহুঙ্কার- আমারে বাঁচায়ে রেখে যুগান্তের তরে। অৰ্জ্জুন। ক্ষত্রিয়-গৌরব তুমি হে অগ্রজ, তােমার কি সাজে কভু হেন চঞ্চলতা ! রণবার্তা কহ। শ্রীকৃষ্ণ। আৰ্য ভীমসেন,- কী বলিব আমি আপনারে ! অই দেহ...অই বক্ষ সুবিশাল হিমাদ্রির স্থৈর্য সেথা যােগ্য চিরদিন ! অচঞ্চল হের সখা মাের, আর অচঞ্চল: হ্যা•••অচঞ্চল চিত্ত আমি। ভীম। আমিও চঞ্চল নহি ; পাষাণে বেঁধেছি বুক। নহে- শত্ৰুৰূহে কিশাের বালক - “কোথা তাত, কোথা তাত বৃকোদর” বলি পুনঃ পুনঃ করিল আহ্বান বাহিরে দাঁড়ায়ে আমি স্বকর্ণে শুনিনু ! শ্বাস মাের রুদ্ধ হইল না, বক্ষের স্পন্দন মাের লভিল না অনন্ত-বিরাম অর্জুন। বাহিরে দাড়ায়ে ! ভীম। বাহিরে দাড়ায়ে। দ্রোণগুরু করে মহামার দুর্ভেদ্য সে কাল-ব্যুহ রচি। ভেদিবার পথ নাহি ৯০ উত্তরা ০ ভীম। জয়ােল্লাসে মাতে বৈরী দল। আহত তক্ষক সম রুষিল বালক- “রহ•••রহ, আমি অগ্রে করি বৃহভেদ •• তুমি তাত, আসিও পশ্চাতে।” অৰ্জ্জুন। পারিল ! পারিল সে ব্যুহ ভেদিবারে ! পারিল না ! চক্ষের পলকে ইরম্মদ সমবেগে ছুটিল বালক চূর্ণ করি বহদ্বার। অস্ত্রের ঘূর্ণনে তার ঝলসি বিজলী ছটা বঁধিল নয়ন; আচম্বিতে চমকি দাড়া- অর্জন। তারপর তারপর ? নয়ন না পালটিতে হেরি— রুদ্ধ ৰূহ ! পাণ্ডবের সর্বশক্তি প্রতিহত হল গিরি মুলে সাগরােৰ্ম্মি যথা! অর্জন। কে । কে তােমারে বাধা দিল বৃহ প্রবেশিতে । জয়দ্রথ- অর্জুন। জয়দ্রথ । সিন্ধুরাজ ? ভীম। সিন্ধুরাজ জয়দ্রথ ! বনবাসে শূন্য গৃহে পাঞ্চালীরে করিয়া হরণ একদিন যে দুৰ্ম্মতি পলাইতেছিল••• কেশে আকর্ষিয়া যারে ফেলিলাম পাঞ্চালীর পায়••• ভীম।
আছাড়ি মারিতে সাধ, ক্ষমিলাম যারে শুধু জ্যেষ্ঠের বচনে সেই আজ নিবারিল মােরে ব্যুহে প্রবেশিতে ! ওঃ, মৃত্যু••কোথা মৃত্যু••• বৃকোদর নাম লুপ্ত হাে- চিহ্ন তার ডুবে যা চির-ঘন-বিস্মৃতির তলে। অর্জন। জয়দ্রথ । জয়দ্রথ ! শ্রীকৃষ্ণ। ক্ষুদ্রশক্তি জয়দ্রথ ; সাধ্য কি তাহার-- নিবারে সমরে তােমা? শুন কহি গুপ্তকথা, তব করে লাঞ্ছিত হইয়া গহন কাননে পশি দীর্ঘকাল করিল সে শঙ্করে সাধনা। তপস্যায় তুষ্ট হয়ে শূলী-শম্ভু বর দিল তারে ; সেই বরে আজিকার রণে সে অজেয়। ভীম। সহস্র প্রণাম মাের সে দেবের পায় যার বরে লভিল সে এ হেন বিজয় । বহ মাঝে একা শিশু যুঝে সঙ্গীহারা সপ্তরথী মিলি তারে এককালে একসাথে করে অস্ত্রাঘাত- অর্জন। সপ্তরথী ! এককালে ! একসাথে ! ভীম। ভাবি নাই, হেন নিষ্ঠুরতা ক্ষত্ররণে সম্ভবে কখনাে !
৯২ উত্তরা দ্রোণ, কর্ণ, দুৰ্য্যোধন, দুঃশাসন আদি বারবার পরাজিত অভিমন্যু করে ফেরুপাল সম- পুনঃ পুনঃ পলাইয়া বাঁচে। সম্মুখ-সংগ্রামে আর রক্ষা নাহি হেরি বালকেরে ঘেরি সপ্তজনে বাণ জোড়ে সপ্ত শরাসনে। কেহ কাটে ধনুগুণ.••কেহ অশ্বরথ••• কেহ খঙ্গ চর্মকেহ বা তুণীর — অর্জুন। ও•••সম্বর • •সম্বর আৰ্য্য, মিনতি চরণে- ভীম। দুই বাহু•••দুই বাহু উর্দ্ধে তুলি কিশাের বালক উচ্চকণ্ঠে ফুকারি উঠিল— *পিতা-পিতা, কোথা তুমি, কোথায় মাতুল কৃষ্ণ, দেখে যাও ক্ষত্রিয়ের রণ আচরণ— অর্জুন। ক্ষত্রিয়ের রণ আচরণ! অই•••অই•••আবার সে আহ্বান তাহার ! সংখ্যাতীত সেনানীর সমর কল্লোল নির্বাপিত করি ওই ডাকে শিশু মােরে রক্ত-সিন্ধুমাৰে । সপ্তরথী নির্লজ্জ নিষ্ঠুর তার মাঝে অই অভি একা যুঝিতেছে ভগ্ন অসি রথচক্র কোদণ্ড লইয়া ।
অই ক্ষতদেহে রুধির নিস্রাব ।
অই মাের বংশের তিলক।
দাড়া•••াড়া অভি, পিতা তাের
গাণ্ডীব টঙ্কারি চলে
হীন-বীর্য ক্ষত্রিয়েরে শিখাতে, সমর -
ঐকৃষ্ণ। পার্থ, উন্মাদ হইলে তুমি !
পার্থ...পার্থ...
অর্জুন।
কে! জনার্দন ।
কি বলিতে চাও?
শ্রীকৃষ্ণ। স্থির হও•••শান্ত সমাহিত চিত্তে
কাৰ্য কর প্রিয় ;
ক্ষত্রিয়ের আদর্শ যে তুমি !
অর্জুন। ভাল, বলে দাও তবে,
ক্ষত্রিয়ত্ব কি চাহিছে আমার নিকটে ?
প্রশান্ত বিরাম ?
শ্ৰীকৃষ্ণ।
•••••ক্ষত্রিয়ত্ব চাহে প্রতিশোধ!
অর্জুন। চাহে প্রতিশােধ! বিন্দু বিন্দু করি
নিঃশেষে ঝরিল তার বক্ষ-রক্ত যত
ভাসাইয়া কুরুক্ষেত্র:••রাঙা করি
হিন্বতী জল
কী কথা বলিছে তারা?
ভীম। প্রতিশােধ•••রে ক্ষত্রিয়, লহ প্রতিশােধ -
অর্জুন।
রে ক্ষত্রিয়, লহ প্রতিশােধ
( দৃঢ়পদে অগ্রসর হইলেন)
৯৪
উত্তরা
শ্রীকৃষ্ণ। একি! এখনি কোথায় যাও?
অৰ্জ্জুন। অনির্দিষ্ট গতি মাের ;
নাহি জানি কোথা!
কুরুক্ষেত্ৰ•••প্রান্তর•••কানন•••
গিরিশৃঙ্গ•• উল্কালােক•••গ্রহ উপগ্রহ
যেথা নি দস্যুদল গােপন আশ্রয়,
হােক স্বর্গ...হােক ম.••হােক রসাতল—
আকর্ষিয়া জ্বালামুখী বাণের সন্ধানে
বাহিরে আনিব একবার ; তারপর,
বাদী হয় ত্রিজগৎ বাসী: বাদী হন
দেবেন্দ্রবাসব.••কিম্বা নিজে রুদ্রমহাকাল
দেখিব•••দেখিব একবার,
পুত্রহারা ফাল্গুনীর রােষ-বহ্নি হতে
কার সাধ্য বাঁচায় তক্ষরে-
(পুনঃ গমনােগত; এমন সময় উত্তরা সম্মুখে
আসিয়া দাঁড়াইল, পশ্চাতে দ্রৌপদী )
উত্তরা। কৈ•••কৈ মাের অভি ?
অর্জন। ছাড়;••ছাড়,
মায়াবিনী-
আগে বল—অভি : অভি কোথা গেছে ?
অর্জন। উত্তরা !••••••এইবারে সব ভেসে গেল
উত্তরা। (সম্মুখে আসিয়া সকলের মুখের পানে তাকাইল)
এই যে, যুদ্ধ জয় করে
সকলে এসেছ ফিরে ; তবে,
তবে সে আমার কোথা?
উত্তরা।
উত্তরা
সেই কোন্ ভোরবেলা গেল,
কয়ে গেল অরি দলি এখনি ফিরিব।
সারাদিন বসি বাতায়নে
তারি লাগি গাঁথিয়াছি মালা...
সে মালা শুকায়ে গেছে, ঝরে গেছে ফুল,
তবু, অভি তে এল না !
দিন চলে গেছে -
ওপারের তালীবনে নেমেছে আঁধার,
মাঠে আর নদী জলে
কালাে চুল এলাইয়া কে যেন গােঙায় !
বড় ভয় বাসি মাগাে, অভি একা কোথা ?
দ্রৌপদী। উত্তরা, আবার এ পাগলের মত
কী সুরু করিলি ? ছিঃ মা,
এতক্ষণ কি বােঝানু তবে ?
সে যে চলে গেছে•••আর ফিরিবে না।
কেন•••কেন ফিরবে না ?
কেন চলে যায় ? মাগাে,
কহি তাের চরণ পরশি’
আমি তারে কিছু বলি নাই...
কোনাে ব্যথা দিই নি পরাণে•••
বল্ মাগাে, এত তার কেন অভিমান ?
দ্রৌপদী। উত্তরা, মা আমার,
উত্তরা। যুদ্ধ সাঙ্গ হবে-
তারপর, দুটীতে মিলিয়া
উত্তরা।
উত্তরা
দূরে যাব নদ-নদীপারে।
যেখানে মহুয়া বনে ফুটে রাঙা ফুল •
নামহারা পাখী গাহে গান ।
পিতা, পিতা,
একবারও আসিবে না অভি ?
কত কথা অ-কওয়া রয়েছে-
ওমা, মাের কত গান এখনাে গাহিনি।
দ্রৌপদী। মুছে ফে••মুছে ফেস্ আঁখি...
নিজে কেঁদে অভাগিনী,
জননীরে কাদাস্ নে আর
উত্তর। এই আমি মুছিনু নয়ন।
বলাে পিতা,—সে আসিবে ফিরে ?
কাঁদিব না:কাঁদাব না কারে••দেখ তুমি
বলাে•••বলাে-
(অর্জনের কণ্ঠলগ্ন হইল )
অর্জুন। আকাশের সুখ-সুপ্ত যতেক দেবতা,
একবার নেমে এসে
মানব পিতার বক্ষ মাঝে।
স্বর্ণলতা•••স্নেহের দুলালী মাের:
এ আমারে কী কথা সুধায় ?
তাহারে প্রবােধ দিতে
ভাষা দাও•••ভাষা দাও ওষ্ঠপুটে মাের!
উত্তরা।
পিতা...পিতা-
অর্জুন। হে বসব,নিত কবচ বধি
.
উত্তরা ০ ০ ০ স্বর্ণলক্ষ্মী যেই জন সগৌরবে আনিল ফিরায়ে সেই সব্যসাচী আপন পুত্রেরে আজ কোথা রেখে এল পুত্রবধূ সুধায় কাতরে ! কী তারে প্রবােধ দিব। শ্রীকৃষ্ণ। মাগাে—অসীম বিশ্বাসে চিরদিন ভালবাস মােরে। তাই বলি-- স্থিরচিত্তে শুন মাের কথা আঁখিজল মুছে ফেল ধীরে। অধৰ্ম্ম করিতে নাশ••• অভিমন্যু রণাঙ্গণে লভিল শয়ন! উত্তরা। সত্য। সত্য! রণাঙ্গণে পড়িয়াছে অভি। কিন্তু এ যে অসম্ভব ! হেন অসম্ভবকেমনে বিশ্বাস করি। কে তাহারে বিনাশিল? কী বুঝাও মােরে ? জ্যেষ্ঠতাত গদাধর ভীম••• শিবজয়ী ধনঞ্জয় পিতা••• মাতুল গােবিন্দ নিজে... এত যার সহায় রয়েছে, সেই বীৰ্যদীপ্ত মহাবীর- তিনলােকে শত্রু কে তাহার? কে সাহসী কেশাগ্র ছুইতে? শ্রীকৃষ্ণ। অন্যায় সমর মাতা-নীতিহীন রণ,- ৯৮ উত্তরা উত্তরা। নহে কে বধিবে তারে ? শক্রব্যুহে একা অভি করে মহামার- হাহাকারে পলায় অরাতি। শেষে কৌরবের গুরু দ্রোণ, কর্ণ, দুঃশাসন সপ্তরথী একত্র হইয়া একসাথে হানিল শায়ক ; সপ্তরথী একসাথে একক শিশুরে- উত্তরা। উঃ, মা,•••মাগাে, দ্রৌপদী। উত্তরা,—উত্তরা,—একি হল! , কিছু নয়। সাতজনে:••সাতজনে মিলে। পিতা,—কোথায় আছিলে তবে সারাদিন তুমি ? পাও নাই যুদ্ধের সংবাদ ? শােনো নাই বুঝি সাত ব্যাধে তারে ধরি হত্যা করিয়াছে। সারা অঙ্গে রক্তধারা ঝরে একহাতে তরবারি—অন্যহাতে মুছিয়া ললাট, সে কতাে ডাকিল “পিতা, পিতা, কোথায় মাতুল কৃষ্ণ”- কিছু শােনন নাই? পিতা ? (অৰ্জ্জুন অব্যক্ত অার্তনাদ করিয়া একপার্শ্বে সরিয়া গেলেন ; উত্তরা এইবার ভীমের পানে তাকাইল) নানা•••মােরে নয়•••মােরে নয়- উত্তরা। হে পিতৃব্য,শুনিয়াছি ভীম।
উত্তরা ৯৯ ভীম। = উত্তরা। অভি’র রক্ষক হয়ে তুমি গিয়েছিলে, তুমিও কি শােন নাই আহ্বান তাহার ? আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়, কক্ষচ্যুত হও গ্রহতারা••• জীবধ্বংসী অন্ধকার, এখনি লুকায়ে ফেল কলঙ্কী এ নিঠুর পাষাণে । আর কত • • •আর কত- দ্রৌপদী । শান্ত হও মহাভাগ, শান্ত হও স্বামী, শ্ৰীকৃষ্ণ। শান্ত হও প্রিয়, পুরুষ হইলে বিচলিত—নারী কি করিবে ? কেন বিচলিত হবে। কেন অশ্রুজল । এই দেখ, নারী আমি,••• মাের চোখে নাহি আর এক ফোটা জল। মুছ অ•••মুছ অশ্রু সবে। ভীম। উত্তরা, মা আমার, আমি ছিনু রণাঙ্গণে, তবু পারি নাই আমি অভি’রে রাখিতে । হন্তারক তার স্বর্ণখাটে মুখে নিদ্রা যায়- আর আমি আর আমি উত্তরা। তাই যদি হয়—অশ্রুজলে•••দীর্ঘশ্বাসে সে নিদ্রা কি রুদ্ধ হবে তার ? ওঠো পিতা...ওঠো তবে কাৰ্ম্ম ক লইয়া- গদা ধরে গদাধর ভীম,••• হে কেশব,—রথরশ্মী করিয়া ধারণ পার্শ্বে বস বিজয় গৌরবে । স্থাবর জঙ্গমময় প্রতি জীবলােকে ১০০ উত্তরা উত্তরা। বহিস্রাবী বাণ মুখে করহ ঘােষণা পাণ্ডব অক্ষম নহে, নহে শক্তিহীন- শাস্তি দিতে বর্বর অরিরে। দ্রৌপদী। উত্তরা ! উত্তরা ! আর নয়•••ডেকোনা আমারে। আঁখিজল,-বাষ্প হয়ে যাও••• দীর্ঘশ্বাস,-ঘনাও প্রবল মেঘে। স্বামীহা জীবিত যদ্যপি:ক্ষত্ৰনারী: বীর জায়া- কেন তার শােকের কাকুতি আজ হতে—জীবনের সব কাজ সাঙ্গ করে দিনু ; বেঁচে রব শুধু এক প্রতিশােধ তরে । অর্জুন। প্রতিশােধ তরে । একথা তােমার মুখে। শােনাে জনার্দন,উত্তরা চাহিছে প্রতিশােধ। এই মুর্তি...এই মূৰ্ত্তি মম উত্তরার * শােন পিতা, মুখ হতে অন্নজল'নয়নের ঘুম আজি হতে দিলাম বিদায়। শােন:••শােন পিতা,- স্বামীহস্তা সুতপ্ত শােণিতে পতির চরণ মাের যতক্ষণ স্নান নাহি করে- শবদেহ আঁকড়িয়া রব ; উত্তরার স্বামীদেহ ততক্ষণ হবে না সৎকার। মহাশক্তি জননীগাে,- শ্রীকৃষ্ণ।
উত্তরা
তাের পণ কে করে বিফল ?
( অৰ্জ্জুনকে) আর কেন ? এইবার
জাগাে অরিন্দম
অর্জুন। জাগাে অরিন্দম
তােমারও মুখে এই কথা !
তুমিও বলিছ জনার্দন!
শােন•••শােন তবে••হে মাধব,-
শৌর্য বীৰ্য ফাল্গুনীর
স্তব্ধীভূত ছিল এতক্ষণ
এই মূৰ্ত্তি...এই মূর্তি দেখিব বলিয়া!
আঁখি-বিচ্ছুরিত এই রুদ্র-কালানলে
পূর্ণ করি নিতে শুধু অক্ষয়-কুণীর
এতক্ষণ ছিনু প্রতীক্ষায়। এইবারে-
“জাগাে অরিন্দম.. জাগাে অরিন্দম”-
জয়দ্রথ । জয়দ্রথ । জলিল অনল ।
তীব্র অপমান•••তীব্র শােকজ্বালা:••
এইবারে হবে প্রতিশােধ
অর্জুন। জয়দ্রথ ! জয়দ্রথ । হে মধ্যম,
ভাল কথা করালে স্মরণ !
শােননা ওগাে শােকাতুরা বুভুক্ষিতা মাতা,
তব মৰ্ম্মজ্বালা-
অরাতির বক্ষরক্তে ধৌত করি দিব।
আকাশের সূৰ্য্যচন্দ্র বসুন্ধরা সমুদ্র মেখলা•••
সম্মুখে অগ্রজ ভীম...শ্রীগুরু গােবিন্দ•••
ཁྱེན །
১০২ সাক্ষী রাখি ক্ষত্রিয়ের চিরসাথী শর শরাসন- করিলাম পণ- কালি কুরুক্ষেত্র রণে অস্তাচলে দিবাকর না হতে বিলীন নিৰ্ম্মম ধরণী বুকে বাণে বাণে রচিব নিশ্চয় জয়দ্রথ-অন্তিম-শয়ন ; এই পণ ব্যর্থ যদি হয়- সত্য-ভ্রষ্ট বিফল জীবন ডালি দিব জ্বলন্ত অনলে। চতুর্থ অঙ্ক প্রথম দৃশ্য বন মধ্যে মহাকাল মন্দির। দুর্যোধন, দুঃশাসন, শকুনি। দুর্যো। জয়দ্ৰথ, জয়দ্ৰথ,কোথা জয়দ্রথ ? হয়। ক্ষণকাল পূর্বে তারে আসিতে দেখেছি এই বনভূমে। শিব বরে আজি রণে বিমুখিল সিন্ধুরাজ সকল পাণ্ডবে। পুনরায় শিবতুষ্টিহেতু তাই পশিল কাননে। শকুনি। শিবতুষ্টি? ভাগিনেয়, শিব তারে কৃপাবলে
উত্তরা
১০৩
সশরীরে করেছে গ্রহণ। পার্থ রােষ হতে
রক্ষিতে সে ভক্ত পুঙ্গবেরে, আপন উদর মাঝে
নিলেন টানিয়া। দেখিছ না
ক্ষুধাবহ্নি ঠাকুরের তাহাতেও নহে প্রশমিত,
ঘুরিছে সধূম-অগ্নি মন্দির বেষ্টিয়া
চক্রধারী নাগসম লক্লক্ জিহ্বা প্রসারিয়া!
উঃ আগুনের তাপে যেন গাত্র-চৰ্ম্ম পুড়ে
পশিছে বিকট গন্ধ নাশার বিবরে।
ভাগিনেয়, ব্যাপারটা সুবিধার নহে;
এসাে মােরা এখান হতেই
সিন্ধুরাজে স্বস্তিবাক্য বলি’-উদ্দেশে প্রণাম করি
বৃষভবাহনে, বস্ত্রাবাসে ফিরে গিয়ে হই নিরাপদ।
দুৰ্যো। সত্য ••সত্য•••দেখিয়াছ দুঃশাসন---: •r
মন্দির ভেদিয়া যেন উঠিতেছে ঘননীল তীব্র হলাহল।
ক্রোধভরে নীলকণ্ঠ বিশ্বধ্বংস হেতু
সমুদ্রমন্থন জাত মহাবিষ করে কি উদাের ?
মহাপাপ.. মহাপাপ করিয়াছি আজি রণস্থলে
সপ্তরথী অভিমধ্যে একসাথে বধি ;
তারই প্রায়শ্চিত্ত বুঝি হইল সূচনা।
দু কিন্তু হে উজ, ভুলিয়াে না যেন
অভিমন্যু বধিয়াছে তােমার আত্মজে ;
প্রাণপ্রিয় পুত্র তব কুমার লক্ষ্মণে-
দুৰ্য্যো। বলিয়াে না বলিয়াে না দুঃশাসন,
আমারে ভুলিতে দাও লক্ষ্মণের শােক।
১০৪ উত্তরা এসো এসাে ত্বরা, খুজে দেখি কোথা জয়দ্রথ— শকুনি। বৎস দুৰ্য্যোধন,- দুৰ্য্যো। স্বেচ্ছায় জ্বালানু এই সমর অনল পঞ্চগ্রাম ভিক্ষাপ্রার্থি পাণ্ডবেরে বিমুখ করিয়া ; কেন তবে শোক মাের? জ্বলুক•••জ্বলুক অগ্নি বাধা নাহি দিব ; উঠুক গর্জিয়া তবে প্রলয় অনল জতুগৃহ বহ্নিসম মহারােষে ব্যাপিয়া গগন যায় যাক তন্ম হয়ে আত্মবন্ধু পরিবৃত শত সহােদর সনে নিজে দুৰ্য্যোধন- তবু মাের একপণ- যা প্রাণ মান না ছাড়িব। ( সকলের প্রস্থান ; অপরদিক হইতে জয়দ্রথকে ধরিয়া ঘটোৎকচের প্রবেশ) হে রাক্ষস-একি অত্যাচার। মুক্তি দে মুক্তি দে মােরে— ঘটো। হাঃ হাঃ হাঃ। চিরমুক্তি দিব তােমা শুন সিন্ধুরাজ ; তাই আনিয়াছি মহাকাল শিবের মন্দিরে, তাজারক্ত••াজারক্ত. • হাঃ হাঃ হাঃ কেন চা মাের রক্ত••• কী করেছি: কী করেছি আমি ? ঘটো। কি করেছ? এইখানে•••এইখানে রাখাে হাত, দেখাে একবার, বুকের পাঁজর ভেঙ্গে গুড়া করে দিয়ে, স্নেহ মায়া ভালবাসা সব শুষে নিয়ে মরুভুমি করিয়াছ কিছু করাে নাই।
উত্তরা ঘটো। * এ জয়। রাক্ষস•••রাক্ষস- বড় তৃষ্ণা•••বড় তৃষ্ণা !•••আমার রাক্ষসী-তৃষ্ণা মিটাইব আজ তাজারক্তে তাের। পশুর অধম তুমি, রাক্ষসেরও ঘৃণা জাগে রক্তপান করিতে তােমার। তাই আনিয়াছি মহাকাল শিবের মন্দিরে বলি দিয়ে দেবতার প্রসাদ খাইব। হাঃ হাঃ হাঃ জয়। ক্ষমা•••ক্ষমা•• ঘটো। ইষ্টদেবে চাহে ক্ষমা—ডাকো ইষ্টদেবে- ব্যোম শঙ্কর•••ব্যোম শঙ্কর! [ খড়গ তুলিল। সুভদ্রা পশ্চাৎ হইতে আসিয়া অঙ্গ ধরিলেন । সুভদ্রা। কি কর•••কি কর পুত্র,- কে ? মাতামাতা! বাধা নাহি দাও মােরে ; জান কি জননী,—কেবা এই নর-পশু বলি দিতে এনেছি যাহারে ? সুভদ্রা। জানি পুত্র, আমার সন্তান। ••••••জানাে না মাতা, এই সেই বর্বর পামর, চক্রব্যুহ দ্বারে ছিল এই কুলাঙ্গার এই সেই জয়দ্রথ•••পাপ সিন্ধুরাজ- সুভদ্রা। জানি পুত্র,জয়দ্রথ সন্তান আমার। ক্রোধ পরিহর তুমি- হিংসা দিয়ে হিংসা নাশ হয় না কখন ; মাের মুখ পানে চাহি ক্ষমা করাে এরে। ঘটো। ঘটো।
উত্তরা
ঘটো। মাতা! মাতা! না না•••তুমি মাের মাতা নহ ;
মাতা বলে ডাকিব না তােমা।
নিষ্ঠুরা পাষাণী তুমি : কিম্বা তুমি জগত-জননী
(ঘটোৎকচের প্রস্থান)
জয়। সত্য, সত্য দেবী, বুঝিতে না পারি
অকস্মাৎ বনে কি গাে জগন্মাতা হলে আবিভূতা?
তােমার নয়নে চাহি বনচারী দুরন্ত রাক্ষস
ফেলিয়া উদ্যত-খা গেল পলাইয়া ।
কহ দেবি, কিবা পরিচয় ?
সুভদ্রা। পরিচয়ে কি হবে আমার ?
উন্মাদিনী সম ফিরি কাননে প্রান্তরে।
জয়। নাহি জানি, দেবী কি মানবী তুমি !
যে হও সে হও-রাক্ষস কবল হতে রক্ষেছ আমারে ;
এইবার রক্ষা করে রােষ-ক্ষুব্ধ ফাল্গুনীর করে ।
সুভদ্রা। পুত্র,
জয়। শিববরে বলীয়ান হয়ে পরাজিত করিয়াছি
চারি পাণ্ডবেরে! কিন্তু মাতা,
পার্থ হেতু যত ভয় মাের ;
বধিয়াছি রণস্থলে এক মাত্র সন্তানে তাহার ।
এসেছিনু শিব-তুষ্টি লাগি হেথা
পুনৰ্বার অচিঁতে তাহারে; কিন্তু দেবি,
সাধ্য নাই পশিব মন্দিরে।
অই হের•••অই হের, ঘূর্ণমান অগ্নিরাশি বেষ্টিয়া মন্দির
করাল নয়নে যেন ভৎসিছে আমারে।
উত্তরা
১০৭
.
কেমনে যাইব হােথা অর্চিব মহেশে ?
তুমি যদি পার দেবি, শিবের অর্চনা
করে আমার হইয়া! পার্থ পরাজয় হেতু
পূজ মহেশ্বরে—
সুভদ্রা। পুত্র,-পুত্র,
জয় । মাতা-মাতা,চরণে ধরিয়া তাের
করিছি মিনতি, ভয়াতুর সন্তানেরে
রক্ষিবি না মাতা! মাগিবি না। শিবপদে পুত্রের কল্যাণ ?
সুভদ্রা পুত্রের কল্যাণ ! পুত্রের কল্যাণ !
হায়রে গর্বিতা নারী, মনে মনে ছিল অভিমান
বিশ্বের সকল জীব তােমার সন্তান,
জগন্মাতা রূপে তুমি সৰ্ব্বজীবে করুণা করিবে;
দর্পহারী নারায়ণ তাই বুঝি করিলা প্রেরণ
পুত্র-হন্তা ঘাতকেরে তােমার নিকটে
মাতৃ-স্নেহ-পিপাসিত সন্তানের বেশে।
“মা” বলিয়া ডাকে সে যে কাঙালের প্রায়
চাহে তাের পতি পরাজয়
প্রার্থনা পূরণ তার করিবি না মাতা!
জয়। মাতা••••••
সুভদ্রা। আবার•••আবার ডাক্ হে মাের সন্তান,
সুমধুর মাতৃ নামে ব্যাপ্ত করি দে রে তুই নিখিল ভুবন।
শােন পুত্র—প্রতিহিংসা••• প্রতিহিংসা-দাবানল
দাউ দাউ করে, ধেয়ে আসে মাতৃত্বেরে এসিতে আমার ;
তুই পুত্র, তুই পুত্র, ‘মা’ বলিয়ে ডারে আবার -
om
১০৮
উত্তরা
(মাতৃ-মন্ত্ৰ-উদাত্ত-সঙ্গীতে, ডুবাইয়া দে রে ত্বরা সব কোলাহল
জয়। মাতা•••মাতা,••মাতা-
সুভদ্রা। মাতা আমি:মাতা আমি-
যুগে যুগে নিপীড়িত সৰ্বংসহা জগত-জননী।
দেবনর যক্ষর গন্ধৰ্ব দানব
লক্ষকোটি সন্তানেরে ধরিয়াছি বুকে।
বাৎসল্য-গলিত-ধারা-বক্ষক্ষীরে মাের
লক্ষকোটি সন্তানেরে যুগে যুগে করেছি পালন।
কেন এ ক্রন্দন•••কেন এ ক্রন্দন তবে অবােধ সন্তান!
যে বুকে আঘাত দিলি, আয় পুত্র, সেই বুকে দিব তােরে স্থান;
চলে আয় নিঃশঙ্ক হৃদয়ে
কল্যাণ চাহিয়া তাের বিদ্বদলে পূজিব মহেশে।
( জয়দ্রথকে লইয়া মন্দির প্রবেশ ; প্রাঙ্গণে
শ্রীকৃষ্ণ ও ঘটোৎকচের প্রবেশ)
ঐ...ঐ শােনাে ঘটোৎকচ,
শিবস্তব করে ভদ্রা জয়দ্রথ কল্যাণ চাহিয়া।
অৰ্জন করেছে পণ, কালি রণে জয়দ্রথে করিবে নিধন ;
অন্যথায় প্রবেশিবে জ্বলন্ত অনলে।
মাতৃমন্ত্রে উজ্জীবিতা সুভদ্রা ভগিনী
জয়দ্রথে বসাইল পুত্রের আসনে ;
তাহার প্রার্থনা বাণী,
বায়ুস্তর ভেদ করি ধেয়ে যায় কৈলাস ভবনে-
ধ্যানমগ্ন ধূর্জটির চরণ কমলে।
টলিবে মহেশ ভােলা, হবে সৰ্ব্বনাশ,
পার্থের প্রতিজ্ঞা আর রক্ষিতে না’রিব।
শ্রীকৃষ্ণ
উত্তর
১০৯
ঘটো। কি করিব...কি করিব আমি জনার্দন ?
আমারে আদেশ দাও
মহাকাল শিবলিঙ্গ করিয়া হরণ
ডুবাইয়া দিয়া আসি সাগরের জলে।
তার হেতু যত পাপ লাগু আমার
শিবশাপে ধ্বংস হই আমি
তবু পূজা হইতে দিব না।
শ্রীকৃষ্ণ। চুপ...চুপ...কৌশলে লভিব সিদ্ধি
শুন ঘটোৎকচ ; এক কাৰ্য্য কর বৎস,
হেথায় দাঁড়ায়ে “সুভদ্রা জননী” বলি
বার বার ডাক উচ্চতরালে...ডাক ত্বরা,
রহিলাম আমি অন্তরালে -
( প্রস্থাননাদ্য)
ঘটো। কিন্তু জননী যে ধ্যানে বসিয়াছে ;
সে ডাক কি শুনিবে জননী ?-
শ্রীকৃষ্ণ। না শুনুক, কিন্তু শুনিবে তো জয়দ্রথ ?
আমিও তাহাই চাই।
“সুভদ্রা জননী” নাম বার বার কর উচ্চারণ,
হীন মতি জয়দ্রথ জানুক অন্তরে-
কে বসেছে মন্দিরেতে শিবপূজা তরে!
(কৃষ্ণের প্রস্থান)
ঘটো। সুভদ্রা জননী—সুভদ্রা জননী
জননী সুভদ্রা-
(জয়দ্রথ মন্দির হইতে ছুটিয়া আসিল )
জয়। কে ? সুভদ্রা ! কোথায় সুভদ্রা !
=
১১০
উত্তরা
ঘটো। নীচ পশু, নাহি জান সুভদ্রা মায়েরে ?
যে মায়ের বুকজোড়া নিধি
সাত ব্যাধে একসাথে করেছ হরণ
সেই সে সুভদ্রা মাতা বিদ্বদলে শিবপূজা করে
জয়। কি...কি বলিলে ! সেই সে সুভদ্রাদেবী।
রণে মৃত অভি’র জননী
জয়দ্রথ বধহেতু পণবদ্ধ পার্থের ঘরণী !
একি সর্বনাশ! কারে নিয়ােজিনু আমি শিবপূজা তরে
প্রতিহিংসা পরায়ণা শােকার্তা জননী
কি প্রার্থনা করিতেছে শিবের চরণে!
সন্তান কল্যাণ !•••সন্তান তাহার মহাশূণ্যে অপেক্ষিছে
অতৃপ্ত হৃদয়ে•••জয়দ্রথ শােনিত তর্পণে ।
তবে কি তবে কি ভদ্রা আমারে ছলিয়া
আমারই মরণ লাগি.••
ওঃ • ওঃ•••ছলনা•••ছলনা••
সুভদ্রা। (ধ্যানাবেশে) সন্তান কল্যাণ !•••সন্তান কল্যাণ !
হে আরাধ্য আদিদেব, হে শিব শঙ্কর,-
সাধিষ্টান হও তুমি আমার সম্মুখে ;
সন্তান-মঙ্গলহেতু ব্যাকুলা জননী,
লহ তার বিদল চরণে অঞ্জলী:••
জয়। না••••••
( ছুটিয়া মন্দিরে প্রবেশ )
সুভদ্রা। ধ্যানসিদ্ধা সেবিকার শেষ নিবেদন,
কালি কুরুক্ষেত্র রণে সিন্ধুরাজ জয়দ্রথে
উত্তর। জয়। না : না হবে না হবে না তাহা, পূজাসিদ্ধি অঞ্জলী তােমার শিবপদে অর্পিতে দিবনা (পুষ্পপত্তি ভূমিতে নিক্ষেপ) সুভদ্রা। কি করিলি কি করিলি অবােধ সন্তান, নিজদোষে নিজমৃত্যু আনিলি ডাকিয়া- জয়। আগুন•••আগুন গ্রাসিল বুঝি ••• কে রক্ষিবে•••কে রক্ষিবে মােরে ! ঘটো। রক্ষা! রক্ষা ! হাঃ হাঃ হাঃ। শিবিরে জাগিছে পার্থ তােমারে রক্ষিতে • হাঃ হাঃ হাঃ জয়। পার্থ•••পার্থ- ( উন্মাদের ন্যায় ছুটিয়া প্রস্থান) সুভদ্রা। কোথা যাস্ কোথা যাস্ কালহত অভাগ্য সন্তান, তিনলােকে কেহ নাই রক্ষিবে যে তােরে ফিরে আয়•••ফিরে মৃত্যুভীত, ফিরে আয় জননীর অভয় অঞ্চলে | /দ্বিতীয় দ্বিতীয় দৃশ্য রণক্ষেত্রের একাংশ উত্তরা, মীরা,সুভদ্র। মীরা। যাহা ছিল সর্বশেষ সেনাদল পাণ্ডব শিবিরে তাও চলে গেল ! বস্ত্রাবাস যােদ্ধাহীন ;
১১২
উত্তরা
আর তবে কার প্রতিক্ষায় ? সব গেছে।
উত্তরা।
সব গেছে ? সব ?
( বিহ্বলের মত ক্ষণেক দাঁড়াইয়া রহিল)
আমারও সকল কাজ শেষ•••
সবার বাহিরে আমি। তবে এখন ?
মা, মাগাে, বলে দাও, কি করিব আমি ?
কী কাজ রয়েছে মাের তবে ?
সুভদ্রা। কেন মা, সমর দেখ।
ধৰ্ম্মক্ষেত্রে সমাগত মহাযােদ্ধা যত
উত্তরা। সমর! সমর! হাহা•••
প্রতিশােধ •••প্রতিশােধ রহিয়াছে বাকী ।
অরাতির কুল ধ্বংস, রক্ত ধারে স্নান!
রণ রণ মহারণ করাে-
( উত্তরা ছুটিয়া একপাশে দাঁড়াইয়া যুদ্ধ দেখিতে লাগিল )
সুভদ্রা। কুসুম-কোমল বুকে নিদারুণ শােক
শেল সম বিধিয়াছে হায় !
কে জানে, কখন এ জ্বালার হবে নিৰ্বাণ ।
ধ্বংস ! ধ্বংস! নিরন্তর ভেসে আসে
প্রলয়ের সাগর কল্লোল ! আচ্ছন্ন আকাশ ধরা,
বাণ বৃষ্টি বিজলী ঝলকে। পিতা কোথা? পিতা ?
কে-কেও সখি?
কভু ভূমেকভু নভে অপূৰ্ব সন্ধান
উত্তরা। কপিধ্বজ• কপিধ্বজ ! শ্রীকৃষ্ণ চালিত
অই কপিধ্বজ রথে
উত্তরা।
মীরা।
উত্তরা
!
বিজয় গাণ্ডীবধারী আপনি ফাল্গুনী !
পিতা,পিতা,-ধ্বংস করাে, ধ্বংস করে অরি।
মীরা। হাহাকার জাগিতেছে কৌরবের দলে
মর্মভেদী ওঠে আর্তনাদ!
উত্তরা। (করতালি দিয়া) হাঃ হাঃ হাঃ-
উঠিবে না? মনে নাই, কালিকার কথা?
আর্তনাদ--আৰ্তনাদ! অরিকুল নিৰ্ম্মল হইল।
অস্তগামী সূৰ্য্য অই আকাশের পটে
জয়দ্ৰথ-বঙ্গ-রক্তে রক্তবর্ণ করিল ধারণ!
অস্তসূ ! অস্তসূৰ্য্য স্নান করে
শােণিত সাগরে! অস্তমুখী-উত্তরাও
এবার নাহিবে তপ্ত-রক্ত সিন্ধুর প্লাবনে ;
আনন। পিতা...রক্ত আনাে•••আরাে রক্ত•••উঃ-
( উত্তেজনা অসহ্য হইল, দুই হাতে মুখ ঢাকিল)
উঃ-অৰ্তনাদ,একি আৰ্তনাদ !
শ্বস ঘাের রুদ্ধ হয়ে আসে
সুভদ্রা। হৃদয়ের বৃত্তি মাঝে লেগেছে সংঘাত ;
নারী-আত্মা উঠিছে জাগিয়া।
হে চির-কল্যাণময় দেব,
জলা-বহ্নি নিভাইয়া দাও দয়াময়,
শান্ত করে এইবার যত উত্তেজনা,
নহে উন্মাদিনী হইবে অভাগী !
উত্তরা। [ স্বগত প্রলয়! প্রলয়! কী ফল এ প্রলয় করিয়া ।
অনর্থক কেন আর জীব-রক্তপাত ?
উত্তরা।
১১৪
উত্তরা
==
[ উত্তেজনায় ] না, না, ধ্বংস-ধ্বংস !
প্রতিশােধ চাই আমি।
অগ্নিবাণে ভস্ম হােক ধরা
আজ আর রবে না সৃষ্টি ; সত্য আজ
ভস্ম হবে ধরা। সব্যসাচী ধরিয়াছে মহারুদ্র-রূপ।
উত্তরা। রুদ্ররূপ!••••••ও অবসাদ
সারা অঙ্গে অবসাদ ঘিরিল আমার ;
আর যে পারি না আমি-
( টলিতে টলিতে সম্মুখে আসিল)
উত্তরা। মা-মা,-
সুভদ্রা। উত্তরা, দেখিলে না রণ?
উত্তরা। শােন গাে জননী,লব আমি প্রতিশােধ,
শত্রু-রক্তে করিব তর্পণ।
তবু মাগাে,চোখে আর পারি না দেখিতে ।
হৃদয়ের উত্তেজনা চেয়েছিল শােণিত তর্পণ।
কিন্তু কিন্তু•••ওই আর্তনাদ কোটি মানবের
ওর সাথে থেকে থেকে যেন ভেসে আসে
কার কণ্ঠস্বর-“হেথা নয়, হেথা নয়, এই পথে নয়—
সুভদ্রা। উত্তরা, উত্তরা,
উত্তরা। “হেথা নয়—হেথা নয়”-বুঝি মাের
এই বুকে মাগাে-
(সুভদ্রার বুকে মুখ লইয়া কাদিতে লাগিল।
ক
তৃতীয় দৃশ্য
রণক্ষেত্র
==
শ্রীকৃষ্ণ।
শ্রীকৃষ্ণ ও ভীম
ভীম। জনার্দন-জনার্দন,-
শ্রীকৃষ্ণ। প্রিয়বর,-
ভীম। অই হের•••অই হের জনার্দন,
দিবাকর অস্তাচল পাটে।
স্মরণে আকুল হই পার্থের প্রতিজ্ঞা।
রবি অস্তপূৰ্ব্বে যদি জয়দ্রথ হত নাহি হয়
ফাল্গুনী করিল পণ—
চিতানলে নিজদেহ করিবে অর্পণ।
সে পণ কেমনে রহে সে দেখিব আমি।
বড়ই সঙ্কট কাল বিলম্ব করােনা ভাই--
ছুটে যাও সমর-উল্লাসে।
[ ভীমের প্রধান ]
শ্রীকৃষ্ণ। বিভাব-চলিয়াছ অস্তাচল পাটে।
যাও দেব,—স্মরণ রাখিয়াে শুধু,
যার রথরশ্মি আমি নিজ হাতে করেছি ধারণ
হিত তার আমিও দেখিব।
(প্রস্থান...অপর দিক হইতে দুৰ্য্যোধন, দুঃশাসন,
শকুনি প্রভৃতির প্রবেশ)
দুঃশ। হের হের•••অই হের দিবাকর যায় অস্তাচলে-
দুৰ্য্যো। হয় অনুমান, অর্ধদণ্ড বেলা আর
১১৬ উত্তর নাহি অবশেষ। অর্থদণ্ড গত হলে আর সত্য-ভ্রষ্ট হইবে ফাল্গুনী। কৌরবের শ্রেষ্ঠ বৈরী ভস্ম হবে জ্বলন্ত চিতায়- শকুনি। আর কেন ? জয়দ্রথে এইবার নিয়ে এস ব্যুহের বাহিরে । দুৰ্য্যো। না না•••যতক্ষণ সূর্য অস্ত পূর্ণ নাহি হয়, যতক্ষণে শেষ-রশ্মি অস্ত-তপনের পশ্চিম দিগন্ত কোণে না হয় বিলীন ততক্ষণ রবে জয়দ্রথ সুরক্ষিত ব্যুহের আড়ালে ; মায়াধর গােপের নন্দন কৃষ্ণে করি না বিশ্বাস। উল্লাসে উন্মত্ত হয়ে আনিব না জয়দ্রথে ব্যুহের বাহিরে ; সূৰ্য্য আগে অস্ত হয়ে যাক্। ( সকলের প্রস্থান) ( পর্বত চূড়ায় শ্রীকৃষ্ণ ) সূর্য অস্ত ! ৰ্য্য অস্ত নাহি হতে আসিবে না জয়দ্রথ ব্যুহের বাহিরে । হে তপন, নিয়মতান্ত্রিক তুমি প্রকৃতির দাস যােগবলে করি তব রথ-চক্রগ্রাস কর্তব্য বিচ্যুতি তব ঘটাতে চাহি না। কিন্তু তবু শুন দিবাকর,- অধৰ্ম্ম করিতে নাশ কুরুক্ষেত্রে অশ্ব-বল্পা করেছি ধারণ- অধৰ্ম্ম করিতে নাশ তােমার রক্তিম ঠাম মায়া-মুগ্ধ-বিশ্ব হতে করি আচ্ছাদন। অপরাধ লয়াে না তপন ; সুদর্শন-সুদর্শন (সূৰ্য্য কালাে ছায়ায় ঢাকিয়া গেল ) শ্রীকৃষ্ণ।
উত্তরা
১১৭
!
(শ্রীকৃষ্ণের প্রস্থান ; অপর দিক হইতে দুর্যোধনাদির পুনঃ প্রবেশ)
দুৰ্য্যো। একি! কী হেতু এ অন্ধকার ?
•ঃশ। সূর্য অস্ত ! সূর্য অস্ত ! হাঃ হাঃ হাঃ
শকুনি। সূর্য অস্ত ! তাই তাে !
কিন্তু মনে হয়, বড় অকস্মাৎ !
কোন ফাকে ধাক্ করে ডুবিল তপন !
দুৰ্য্যো। যাও যাও দুঃশাসন, এইবারে
সিন্ধুরাজে নিয়ে এস ব্যুহের বাহিরে।
স্বচক্ষে দেখুক আসি পার্থের মরণ—
( দুঃশাসনের প্রস্থান)
শকুনি। পার্থের মরণ! পার্থের মরণ ! হাঃ হাঃ হাঃ
( জয়দ্রথকে লইয়া দুঃশাসনের প্রবেশ)
দুৰ্য্যো। এসে••এসাে সিন্ধুরাজ ••চলে এসো নিঃশঙ্ক হৃদয়ে।
এইবার অর্জুনের বহ্নি মাঝে আত্ম-বিসর্জন।
জয়। কোথায় অর্জুন ? কোথায় সে দাম্ভিক পাণ্ডব,
করিল যে আস্ফালন জয়দ্রথে বধিবে বলিয়া ?
কোথায় সে কৃষ্ণ-সখা পরম মায়াবী ?
মহারাজ, প্রাণ ভয়ে পলায়ন করিল কি তারা।
( শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন পর্বত চূড়ায় আসিয়া দাঁড়াইলেন)
শ্রীকৃষ্ণ। জয়দ্ৰথ,–একান্ত অধীর প্রাণে
স্মরিলে মােদের ; দেখ তবে মৃত্যুকালে
একসাথে কেশব অর্জুনে।
সখা, বিলম্ব কি হেতু আর ?
গাণ্ডীবে আরােপ করাে ত্বরা মৃত্যুবাণ
১১৮ উত্তরা দুৰ্য্যো। আরে আরে নীচাত্মা যাদব,- নির্লজ্জ ভীরুর সম যুদ্ধ-নীতি দিবি বিসর্জন । অস্তগত দিবাকরপণ-ভ্রষ্ট হয়েছে অর্জুন শ্রীকৃষ্ণ। কে বলে রে অস্তগত দেব দিবাকর ? মৃত্যুগামী পতঙ্গের হেরিয়া উল্লাস কৃষ্ণ-মেঘ-আবরণে লুকায়ে বদন জয়দ্রথ-ভাগ্য-রবি ক্ষণিক হাসিল শুধু বিদ্রুপের হাসি। অই অই হের পুনৰ্ব্বার রক্তরবি অস্তাচল চুড়ে- [ কৃষ্ণ-আবরণ অপসারিত হইল ] জয়। একি সর্বনাশ! রবি নহে অস্তগত ! কি করি উপায়। - হা। পালাও-পালাও- (জয়দ্রথের প্রস্থান) অর্জুন। কোথা যাবি রে তস্কর,-ফাল্গুনীর কবল হইতে ? অভিমনু-আত্মা অই মহাশূন্যে অপেক্ষিছে আকুল তৃষায়- তর্পণ করাবাে তারে ওরে সিন্ধুসুত, তাের বক্ষ-রক্ত দিয়া অজস্র ধারায়-- ও (বাণক্ষেপ ; সঙ্গে সঙ্গে সূৰ্য্য অস্তপাটে বিলীন হইল। স্তিমিত আলােকে দেখা গেল ঘটোৎকচ দুই হাতে রক্ত মাখিয়া অট্টহাস্য করিতেছে। ঘটো। হাঃ হাঃ হাঃ—প্রতিশােধ•••প্রতিশোেধ । তাজা রক্ত পান করি তাথৈ তাথৈ নাচি রাক্ষসী নাচন। নিয়ে যাই...নিয়ে যাই তাজারক্ত গঙুষে পূরিয়া ; উত্তরা মায়ের আজ রাঙা হােলী খেলা।
উত্তরা
১১৯
রাঙা রক্ত মায়ের ললাটে কী সুন্দর মানাইবে ।
ঠিক যেন সিন্দুরের
(সহসা মনে পড়িল উত্তরা ললাটে আর সিন্দুর পরিবে না।
ঘটোৎকচ আর্তনাদ করিয়া উঠিল )
ওঃ, কৃষ্ণ•••কৃষ্ণ•••
চতুর্থ দৃশ্য
বনপথ
ধরিত্রীর গীত
ভ্রিমি দ্রিমি জিমি মেঘ-মৃঙ্গ
ঝর্কর ঝর ধারার ঝরণা
ভিজিছে মাতিয়া রাতি-উলঙ্গ।
চকিতে চপলা অতি চমকি চমকি ওঠে
রনন ঝনন বােলে গহন কানন লেঠে,
প্রলয় খেলিছে ভুবনে ভুবনে
গগন হারাল অলােক সঙ্গ।
হাহা করে হাহাকারে হঁাকে ক্ষ্যাপা বায়ু
থর থর কাপে ধরা নাহি যেন আয়ু!
কে পথিক, কোথা যাও, গেল জীবনের বেলা-
দিকে দিকে কায়াহীন কালো ছায়া করে খেলা।
কাঁদিছে সৃষ্টি হাসে অদৃষ্ট
মরণ-কুহকে ছােটে তুরঙ্গ।
(প্রস্থান)
১২০
উত্তরা
শ্রীকৃষ্ণ।
ঘটো।
(অপর দিক হইতে শ্রীকৃষ্ণ ও ঘটোৎকচের প্রবেশ)
বৎস ঘটোৎকচ,
হে-কৃষ্ণ,তােমারে ত্রিলােকে কহে
ব্যথাহারী শ্রীমধুসূদন।
সবার বেদনা যদি নাশিতে সক্ষম
তুমি ক্রুি জান না তবে ঘটোৎকচ অন্তর-বেদন!
অনায় বলিয়া মােরে তুমিও কি উপেক্ষায়
ফিরালে নয়ন! ডাকিলে না কুরুক্ষেত্রে-
অভিমধ্যে রক্ষা করি, দিতে বিসর্জন
•••কীৰ্ত্তিহীন•••অভিশপ্ত জীবন আমার। )
কৃষ্ণ। প্রিয়বর,-
ঘটো। তাজা রক্ত...ভাজা রক্ত অরাতির
এই হের এনেছি গঙুষে । কিন্তু কৃষ্ণ,
মায়ের ললাটে আর পরিবে না রক্তিম সিন্দুর ;
মুছে গেছে•••মূছে গেছে••
চির তরে মুছেছে সিন্দুর !
এ রাঙা শােণিতে আর কী করিব তবে ?
মৃত্যু দাও• • মৃত্যু দাও হতভাগা বনের রাক্ষসে—
( অদম্য বেদনায় ও অভিমানে কঁদিতে কালিতে
চলিয়া গেল...শ্রীকৃষ্ণ ধ্যানন্তিমিত নেত্রে সেইপথে
চাহিলেন ; তঁাহার কণ্ঠেও অশ্রুর কম্পন)
শ্রীকৃষ্ণ। মৃত্যু চাও! মৃত্যু চাও তুমি ঘটোৎকচ ?
যাও বীর,-মহামৃত্যু তব তরে আছে প্রতীক্ষায়।
কর্ণের আয়ত্বাধীন একাগ্নী শায়ক হতে রক্ষিয়া অৰ্জ্জুনে-
বীরের বাঞ্ছিত-মৃত্য যথাকালে করিও গ্রহণ।
;
ক
পঞ্চম দৃশ্য
নীপুলিন ; শীতের কুয়াশার মত অস্পষ্ট জ্যোৎস্যালােকে চারিদিক রহস্যময় বলিয়া
বোধ হয় ; বহুদুর হইতে একটী করুণ রাগিণী ভাসিয়া আসিতেছে ।•••
অর্জুন, দ্রৌপদী, সুভদ্রা ও শ্রীকৃষ্ণের প্রবেশ
অর্জুন। কী আশ্চৰ্য্য,এখানেও নাহিত উত্তরা !
কোথায় সে গেল তবে?
দ্রৌপদী। কোথা গেল ! কোথা গেল উত্তরা আমার!
(ফুলসাজে সজ্জিত। উত্তরার প্রবেশ)
উত্তরা। এই যে এসেছি মাগাে,-কেন আকুলতা?
কেন চোখে নামে জলধারা ?
আজ যে আমার বড় আনন্দের দিন,
চির-আকাঙ্খিত! হাসাে, হাসে,
অই দুটি ওষ্ঠ কোণে মাগাে, ঝরুক প্রসন্ন হাসি।
অশ্রুজলে এ দিনের কোরাে না মলিন।
( দ্রৌপদী কিছু বুঝিতে পারিলেন না ; কেবল নীরবে
সুভদ্রার পানে চাহিলেন)
দ্রৌপদী। ভদ্রা ;
( উত্তর সুভদ্রার নিকটে গেল )
উত্তরা। মাগাে,-দেখ আমি কেমন সেজেছি !
ফুল হার, ফুল আভরণ,
ফুল-রেণু মাখা সারা গার।
কী আশ্চৰ্য্য মাগাে! কাননে নাহিক আর ফুল,
সব তুলে সাজিয়াছি;
তবু কেন সৰ্ব্ব অঙ্গ সঙ্কোচে মরিছে ।
যেন কত লজ্জা, কত ভয়! বারম্বার কানে কানে কয়,
।
১২২
উত্তরা
উত্তরা।
• “ওরে, তার যােগ্য হয় নাই মােটে,
ছিঃ ছিঃ, কত ত্রুটি, কত অপরাধ!”
কী করি বল তাে মােরে ?
সুভদ্রা। কী বলিস্? কী বলি তুই? উত্তরা,
এখনো বলিতে হবে? বােঝ নাই তুমি-
আশ্চৰ্য্য কেহ নয় ? শােন তবে,
তােনারে বলিব সঙ্গোপনে।
আজ আসিয়াছে দেবি,
প্রিয়-মিলনের শুভলগ্ন মাের !
ডাকিছেন প্রিয়তম ; দুয়ারে দাঁড়ায়ে তার রথ !
না:••ফিরায়াে না মুখ,
সত্য বলি আসিয়াছে রথ।
ওই—ওই শােনাে•••ডাকেন আমারে।
মাগাে,-এবার চলিনু তবে--
(উত্তরা অৰ্জ্জুনের কাছে গেল)
পিতা, তুমি কেন অমন বসিয়া ?
কথা কও•••কথা কও...পিতা,
অর্জুন। কতত রিক্ত, কতাে দীন,—ওরে,
আজ আমি কতো অসহায়
সে কি তাের রয়েছে অজ্ঞাত ?
কেনকেন যাবি ?কোথা যাবি মােদের ছাড়িয়া ?
উত্তরা। কেঁদো না:• কেঁদো না আর ।
এই দেখ, আমারও এসেছে চোখে জল !
এই ধরণীরে আমি বাসিতাম ভালাে,
উত্তরা এর ফুল, এর পাতা, এর নদী জল, পশু, পাখী, নর, নারী, যত কিছু এর সব ভালাে•••সব ভালাে লাগিত আমার অৰ্জ্জুন। তবে ? তবে কেন যাবি ? উত্তরা। কী করিব ? সে চলিয়া গেছে, আর তাে এখানে থাকা চলে না আমার। মুছে ফেল আঁখিজল। যাবাে বলে ভুলিতে কি পারি ? এই হারাবার ব্যথা নিশিথ রাতের ঘুম যদি ভেঙ্গে দেয় - বাতায়ন খুলে দিও ; দেখিও চাহিয়া দূর ছায়াপথে বসি তােমার স্মরণে কতাে অশ্রু ঢালিতেছি তারায় তারায় । চলিনু এবার ;—বিদায়•••বিদায়, ( শ্রীকৃষ্ণকে) তােমার আশিস দাও- অৰ্জন। শান্তি রাজ্য-শান্তি রাজ্য করিব স্থাপন। বংশের প্রথম পুত্র সমর-নিহত, পুত্রবধু পশিছে চিতায়, একা র’ব শ্মশান-ভারতে শান্তিরাজ্য করিতে স্থাপন ! হে কেশব,দেখ মাের শান্তিরাজ্য হয়েছে সুচনা । শ্রীকৃষ্ণ। স্থির হও হে ফানি,সৰ্ব্ব শঙ্কা ত্যজ। কৃষ্ণা, সখি,—নীরব কি হেতু ? কি বলিবে বল উত্তরারে- দ্রৌপদী। উত্তরা, এ যে অসম্ভব !
১২৪ উত্তরা ; উত্তরা। অসম্ভব! কী ? দ্রৌপদী। ভদ্রা, সুভদ্রা। চিতানলে কেমনে উত্তরা, প্রবেশ করিবে তুমি ? উত্তরা। এই কথা? দেখিও জননী, যেরূপ শঙ্কিত-পদে নব-পরিণীতা বাসক-শয়নে যায়। ওষ্ঠে মৃদু হাসির কম্পন যেরূপ শুনেছ- সুভদ্রা। ওরে-পাগলিনী,-সেকথা বলিনি আমি- উত্তরা। তবে? মুদ্রা। আজ আর তনুত্যাগ ইচ্ছাধীন নহেক তােমার-- উত্তরা। ইচ্ছাধীন নহেক আমার! সুভদ্রা। এ তনু একার নহে উত্তরা। একার নহে ! সুভদ্রা। ভুলিয়াছ উন্মাদিনী,—এই বুকে তাের - উত্তরা। এই বুকে মাের— সুভদ্রা। সন্তান! পাণ্ডুবংশধর! তাহার পালনে অবশ্য করিতে হবে দেহ রক্ষা মাতা- অর্জুন। সত্য। সত্য ! সন্তান। সন্তান! তার ছায়া•••তারই প্রতিকৃতি। আমার অভির শিশু! (উত্তরা অভিভূতের ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিল••সমস্ত চেতনা তাহার কোন দূর দুরান্তরে যেন ছুটিয়া গিয়াছে।) দ্রৌপদী। উত্তরা! উত্তরা!- একি! ভদ্রা, কি করিবি ক বােন- কেমন চাহিয়া আছে মাতা! উত্তরা, উত্তরা, =
উত্তরা
১২৫
উত্তরা। উঃ মাগাে -
সুভদ্রা। শােনাে শােনাে মা আমার,
শুধু নারী নহ, আজ যে জননী তুমি।
এই বুকে সৃজন-আকুল
জাগে এক মাতৃ-আত্মা!
অর্জুন। সন্তান! সন্তান। তারই ছবিরই নবরূপ।
সেই শ্যাম অভিরাম তনু,
নিখিলের মায়া-ভরা নীলা সে যুগল নয়ন!
আমার অভি’র শিশু।
বহুদূরে অন্ধকার গভীর গহ্বরে
জ্বলিয়া উঠিল ও কি আশার আলােক ।
অনাগত ভারতের মানচিত্র খানি
সহসা উজ্জ্বল করি•••কে আসেরে তরুণ নায়ক।
অভি’র নন্দন! ওরে, শান্তি-রাজ্যে রাজা
মোর অভি’র নন্দন! উত্তরা, উত্তরা,
রে জননী,-আমার মিনতি রাখ, !
সমস্ত জীবন ব্যাপী যতেক সাধনা
নিমেষে বিফল করি অন্তর্ধান হয়ে যাবি তুই।
-না,-দিব না•••দিব না তােরে যেতে !
দ্রৌপদী। উত্তরা উত্তরা।
উত্তধা। মা, মাগাে, তুচ্ছ আমি, অতি ক্ষুদ্র শকতি আমার,
আমি যে পারিনা মাগাে,-এত আমি পারিনা জননী-
শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু মাগাে, নব যুগ চাহিছে তােমারে ;
তাহার আহ্বান উপেক্ষা করিবে তুমি ?
উত্তরা
উত্তরা। ( অদম্য উচ্ছাসে ]
নব যুগ ! হে নিষ্ঠুর, আবার বলিছ নবযুগ !
যুগান্তর রথ-চক্র তব,
আমার এ নারী-বক্ষ নিষ্পেষিত বিদলিত করি
চালায়েছ ঘর্ঘর আরাবে ;
আনিয়াছ ভারতের শুভ যুগান্তর
কোন্ মূল্য—কোন্ মুল্য বিনিময়ে বলাে তাে গােবিন্দ ?
নবযুগ! নবযুগ !
জীবন নিয়েছ কেড়ে, মরণেরে করেছি সম্বল,
সে মরণে বাধা দাও কোন্ অধিকারে ?
( হঠাৎ কাঁদিয়া ] হে দয়াল, হে মধুর-নিখিল-বল্লভ,
আমারে করিলে তুমি কাঙালিনী
শ্রীকৃষ্ণ। মাতা,-মাতা,আর অশ্রু ফেলিও না!
যত জ্বালা-তাের কণ্ঠে হােক পুষ্পমালা !
উত্তরা। [ আত্ম সম্বরণ করিয়া ] না, না,আমি যাব ।
পারিব না হেথা আর মুহুর্ত তিষ্ঠিতে।
(সম্মুখে অগ্রসর হইল)
কোথা যা—কোথা যাস্ তুই ?
উত্তরা। [ চলিতে চলিতে লােকান্তরে•••অভি’র মিলনে
লােকান্তরে !••••••ওরে পাগলিনী,
যে সন্তান তাের বুকে ধ্যান-নিদ্রাগত
বাহিরে প্রকাশ লাগি
এই ধরণীতে রহি, তারই মাঝে দেখিবি অভি’রে।
উত্তরা। অভি’র স্বপন কায়া।
শ্রীকৃষ্ণ।
উত্তরা
১২৭
কে সে অনাগত শিশু চির-ঘনাে-রহস্য-আবৃত--
যার মাঝে জাগিবে আমার সাধনার দেব-মূর্তিখানি !
,-না,-চিনিনা, জানিনা আমি তারে
(পুনঃ অগ্রসর হইল)
অৰ্জ্জুন। ওই-ধরােধরা,
আমার সর্বস্ব নিয়ে গেল পলাতক।
ওরে, ফিরে আয়-ফিরে আয়,
উত্তরা। বিদায়-বিদায়
( উত্তরা ধীরে ধীরে দূর রহস্য-লােকের পানে অগ্রসর
হইতেছিল। পশ্চাতে অন্ধকারের বুক ভাঙিয়া
কোন অনাগত শিশু যেন কাঁদিয়া উঠিল। তাহার
ক্রন্দন সুরের কম্পনে উদ্বেল হইল।
অনাগতের গীত
আলোর ছেলে একলা শুনি
কালো রাতের চরণ-ধ্বনি,
চল্ ফিরে চল্ আলাের দেশে
মা জননী•••মা জননী।
( উত্তরা সেই গান শুনিয়া মুহূর্তকাল দাড়াইল ;
পুনঃ অগ্রসর হইলে গীত জাগিল)
গীত
অন্ধকারে দাও ছুটিয়ে মা-
প্রভাত-কমল দাও ফুটিয়ে মা।
দাওগো ভালােবাসার আলাে
দাও হৃদয়ে পরশমণি-
চল্ ফিরে চল্ আলাের দেশে
মা জননী, মা জননী।
১২৮
উত্তরা। একি! একি হল! মুক্ত বিহঙ্গিনী আমি-
কে আমারে বাধিলি মায়াবী !
••••••••
গীত
দাওগো ভালবাসার আলো
দাও হৃদয়ে পরশমণি,
মা জননী, মা জননী, মা জননী, মা জননী।
(কুয়াস কাটিয়া স্বচ্ছ আলোকবা উত্তরার চোখে
মুখে আসিয়া পড়িল ; অপরূপ মাতৃত্বের আভাস
তাহার মূৰ্ত্তিকে মহিমাময়ী করিয়া তুলিল)
;
উত্তর।
অজস্র আলােক বন্যা ;
তার মাঝে একি কণ্ঠস্বর !
কে বাড়াল অই দুখানি মৃণাল বাহু!
যে সেই ওষ্ঠ•••সে কালাে নয়ন দুটি !
চিনেছি:•• চিনেছি তােরে
সন্তান। সন্তান।
ওরে শিশু•••ওরে মাের স্বপন-দুলাল,
কোলে আয়•••বুকে আয়-
(স্বপ্ন-শিশুকে আলিঙ্গন করিয়া আনন্দ-উন্মাদনায়
উত্তরা মুচ্ছিতা হইয়া পড়িতেছিল ; সুভদ্রা দ্রৌপদী
তাহাকে ধরিলেন)
,
.CK T"..
নবনিকা-
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.