Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Ramabati

Chakraborty,mahimaniranjan · 2009/10/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মাবত
বিয়ােগান্ত নাটক
শ্রীমহিমানিরঞ্জন চক্রবর্তী প্রণীত
হেমপুর রাজবাটী
বীরভূম।
১৩১৬ সাল
মুল্য দশ আনা মাত্র।

প্রকাশক- শ্রীচারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বি, এ ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস্-২২নং কর্ণওয়ালিসষ্ট্রীট, কলিকাতা। কান্তিক প্রেস কলিকাতা, ২০, কর্ণওয়ালিস স্ক্রট, শাহরিচরণ মান্নাদ্বারা মুদ্রিত।

মাবতী
বিয়ােগান্ত নাটক
শ্রীমহিমানিরঞ্জন চক্রবর্তী প্রণীত
হেতুমপুর রাজবাটী
বীরভূম।
।
১৩১৬ সাল
মূল্য দশ আনা মাত্র।

প্রকাশক- শ্ৰীচারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বি, এ ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস্-২২নং কর্ণওয়ালিসষ্ট্রীট, কলিকাতা। কান্তিক প্রেস কলিকাতা, ২০, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্র, হরিচরণ মান্নাদ্বারা মুদ্রিত।

উৎসর্গ। পরম পূজ্যপাদ পিতৃদেব, নাটক নভেল প্রভৃতি লঘু-সাহিত্য আপনার প্রিয় নয়, ইহা স্থির জানিয়াও ‘রমাবতী’কে আপনার শ্রীচরণে অৰ্পণ করিলাম। নগণ্যা ‘মা’র, অপরের নিকট স্নেহ-সমাদর প্রাপ্ত না হইবারই কথা। কিন্তু, আপনার নিকট ত সে আশঙ্কা নাই—পিতার চরণে পুত্রের ভক্তি-উপহার যতই কেন তুচ্ছ হউক না, কখনই ত উপেক্ষিত হয় না। প্রত্যক্ষ দেব। আমি আপনার অযােগ্য সন্তান- আপনার শ্রীচরণে অৰ্পণ করিবার মত আমার কিছুই নাই। তবে, ভগবান যাহা দিয়াছেন, তাহাই আপনার শ্রীচরণে অৰ্পণ করিলাম— অকৃতি সন্তানের অকিঞ্চিৎকর সস্নেহ ভক্তি-উপহার গ্রহণ করিয়া চিরকৃতার্থ করুন। ইতি। হেতমপুর রাজবাটী । অাপনার অযােগ্য সন্তান শ্ৰীমহিম ৩১ শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৬'

No text on this page.

উৎসর্গ। পরম পূজ্যপাদ পিতৃদেব, নাটক নভেল প্রভৃতি লঘু-সাহিত্য আপনার প্রিয় নয়, ইহা স্থির জানিয়াও ‘রমাবতী’কে আপনার শ্রীচরণে অৰ্পণ করিলাম। নগণ্যা ‘মা’র, অপরের নিকট স্নেহ-সমাদর প্রাপ্ত না হইবারই কথা। কিন্তু, আপনার নিকট ত সে আশঙ্কা নাই-পিতার চরণে পুত্রের ভক্তি-উপহার যতই কেন তুচ্ছ হউক না, কখনই ত উপেক্ষিত হয় না। প্রত্যক্ষ দেব! আমি আপনার অযােগ্য সন্তান- আপনার শ্রীচরণে অৰ্পণ করিবার মত আমার কিছুই নাই। তবে, ভগবান যাহা দিয়াছেন, তাহাই আপনার চরণে অৰ্পণ করিলাম— অকৃতি সন্তানের অকিঞ্চিৎকর সস্নেহ ভক্তি-উপহার গ্রহণ করিয়া চিরকৃতার্থ করুন। ইতি। হেতমপুর রাজবাটী অাপনার অযােগ্য সন্তান শ্ৰীমহিম ৩১ শে জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৬

No text on this page.

নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষগণ . . . রণজিৎ সিংহ ... মােহনপুরের বৃদ্ধরাজা মানসিংহ রাজা ( যুবরাজ) দর্পনারায়ণ দেওয়ান ও রঘু রায়ের আত্মীয় (ভ্রাতুষ্পত্র) বিধুর (স্ত্রী-প্রমদা) ফটিক ও ফকির রাজভৃত্য ও দেওয়ানের অনুচর শান্তশীল রাজ সংসারের বিশ্বাসী ব্রাহ্মণ-ভৃত্য। দী পাগল। সেনানায়ক, দ্বারপাল, সাধু, নিধু ও কৃষকগণ। স্ত্রীগণ রমাবতী রাণী (মানসিংহের), অবন্তীপুরের রাজা রঘুরায়ের কন্যা। জাহ্নবী রমাবতীর সখী। প্রসন্ন ( কুটিনী ) নর্তকীগণ , গঙ্গাবাল, বনবালা। গ্রাম্য স্ত্রীগণ চিত্রা, চাপা, মােহিনী, স্বর্ণ ও সুদি। দরে রক্ষিতা হতভাগিনী কুলটাগণ। ০ ০ ০ ০ ০ ০

No text on this page.

নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ। পুরুষগণ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ০ রণজিৎ সিংহ মােহনপুরের বৃদ্ধরাজা মানসিংহ রাজা ( যুবরাজ ) দর্পনারায়ণ দেওয়ান ও রঘু রায়ের আত্মীয় (ভ্রাতুস্পুত্র ) বিধুর (স্ত্রী-প্রমদা) ফটিক ও ফকির রাজভৃত্য ও দেওয়ানের অনুচর শান্তশীল রাজ সংসারের বিশ্বাসী ব্রাহ্মণ-ভৃত্য। পাগল। সেনানায়ক, দ্বারপাল, সাধু, নিধু ও কৃষকগণ। দীয় স্ত্রীগণ ০ ০ ০ রমাবতী রাণী ( মানসিংহের), অবন্তীপুরের রাজা রঘুরায়ের কন্যা। জাহ্নবী রমাবতীর সখী। প্রসন্ন ( কুটিনী ) নর্তকীগণ গঙ্গাবালা, বনবালা। গ্রাম্য স্ত্রীগণ চিত্রা, চাপ, মােহিনী, স্বর্ণ ও সুদি। দৰ্পের রক্ষিতা হতভাগিনী কুলটাগণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

মাবত প্রথম অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। মন্ত্রণা গৃহ দর্পনারায়ণ,-(আসীন ) দর্প। আর কিসের ভয়? ফটিক, ফকিররে বশ করেছি, আর কি চাই? দেখতে দেখতে, পাঁচজন, দশজন—শতজন- সহস্ৰজন ; তারপর গ্রাম, নগর, দেশ; ক্রমে সমস্ত রাজ্য অধিকার। আমিই হ’ব দেশের রাজা। মানসিংহ ? সেত দুর্বল চিত্ত যন্ত্র পুত্তলিকা। যেদিকে চালার সেই দিকে চলবে ; যেমনভাবে রাখব তেমনিভাবে থাকবে। তাকে ভয় করি না, করি, তার সে ব্যাটা বড় পাকা। ওই যে ফটিক, ফকির আসছে।

রমাবতী।
(ফটিক ও ফকিরের প্রবেশ)
এস, ভাই ; তােমাদের মঙ্গলের জন্য দিবারাত্রি চিন্তা করে
আমার মস্তিষ্ক খারাপ হয়ে গেছে, কিন্তু ধন্য তােমাদের ধৈৰ্য্যগুণ ;
তােমরা বেতনভােগী ভৃত্য বলে রাজা যখন যা’ অনুমতি করেছেন
তখনই তাই করেছ। তথাপি সময়ে সময়ে যে অপমান ও নিগ্রহ
সহ করেছ, তা দেখলে মনে হয়, তােমরা অতি কাপুরুষ, ধমণী
প্রবাহিত রক্তে কিছুমাত্র উষ্ণতা নাই। প্রচণ্ড শীতােৎপন্ন তুষার
খণ্ডের ন্যায় চিরশীতল। পদদলিত পিপীলিকার যে বৈরনিৰ্যাতন
তেজ আছে, তােমাদের হৃদয়ে তাও নাই। ধিক্‌ তােমাদের
মনুষ্য জন্ম, ধিক্ তােমাদের পুরুষ নামে, শততধিক্ তােমাদের
জীবনে।
ফটিক। আমাদের আর জীবন। খানিকটা জমাট রক্তমাংস
নিয়ে বেড়াচ্চি বৈত নয়।
দর্প। সকল কাজের সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রান্ত হলে
প্রতিবিধান করা মনুষ্য মাত্রেরই কর্তব্য। সেদিনের নির্যাতন
মনে হলে উদ্বন্ধনে, আত্মনাশ ইচ্ছা করে। সময়ে আজ্ঞা পালিত
হয় নাই বলে পদচ্যুতি, অপমান, লাঞ্ছনা; বাকি রইল কি?
এতে কার না ক্রোধ হয় ? প্রভুই হােক, আর দেবতাই
হােক, এতে কার না ঘৃণা জন্মে ? তােমাদের নিগ্রহ
দেখে নিৰ্যাতন পিপাসায় আমার হৃদয় অহরহঃ জ্বলছে, প্রতিশােধ
বাসনা, কালভুজঙ্গ হয়ে আমার বক্ষে দিবারাত্রি দংশন করছে।
;
২

রমাবতী।
ফটিক। দেওয়ান মশায়, কি বলব ? একএকবার প্রাণের
তার খুব কড়া করে বাঁধি ; কিন্তু ভয় হয়, পাছে সুর চড়তে চড়তে
শেষে তার ছিড়ে যায়। তবে, আপনার মতন ওস্তাদ যদি পাই
তাহলে একহাত বাজিয়ে নি। আপনি সহায় থাকলে আমরা কি
করূতে পারি না পারি, তা একবার দেখিয়ে দি।
দর্প। ভাই, আমার এজীবন তােমাদেরই জন্য। তােমরা
কিসে সুখী হও আমার কেবল সেই চিন্তা। তােমাদের
হাতে একবার রাজ্যটা তুলে দিতে পারলেই, আমি নিশ্চিন্ত মনে
সংসার থেকে অবসর গ্রহণ কতে পারি।
ওই শান্তশীল আছে
তোমরা এখন সরে পড়।
;
(শান্তশীলের প্রবেশ)
এস, ভাই শান্তশীল, তােমাকে যা বলেছি তা ভেবে দেখেছ
কি ? কিছু স্থির কতে পেরেছ কি ?
শান্ত। দেওয়ান মশায়, আমি অতি তুচ্ছ ব্যক্তি ; আমার
সাহায্যে যে আপনার বিশেষ উপকার হবে তা বােধ হয় না।
অধিকন্তু, বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আমার পরকালের পথ রােধ হবে।
ইহজন্মে শান্তিহারা উন্মাদের মত সংসার আশ্রমে ঘুরে মর’ব ;
পরকালে ঘৃণিত জন্ম লয়ে বিশ্বময় হাহাকার রবে ছুটে বেড়াব।
আমায় ক্ষমা করুন, প্রাণ থাকতে হস্তোত্তোলন করতে পারব না।
দর্প। তবে ঘৃণিত, অপমানিত জীবন বহন করা শ্লাঘনীয় বলে
স্থির ককূলে ?
তােমার প্রাণ এত নিস্তেজ ? মনুষ্যজীবনের

রমাবতী। ; অলঙ্কার,মান, সম, বংশগৌরব সমস্ত জলাঞ্জলি দিয়ে, প্রতি পদে অপমানিত হয়ে নির্লজ্জের ন্যায় প্রভুর পদলেহন করূবে সেও ভাল, তবু আত্মােন্নতির চেষ্টা করবে না? এমন ঘৃণিত জীবন কি মনুষ্যের ঈঙ্গিত? তাতে ক্ষতি কি ? লজ্জা কি ? সন্তান, পিতার দ্বারা প্রহৃত হলে আবার পিতারই অঙ্কে আশ্রয় লয়। স্নেহময় পিতা পুত্রকে কোলে তুলে আবার সােহাগ করেন, আদর করেন। যিনি প্রভু, তিনি আমাদের পিতা ; অপরাধ দেখলে অবশ্য দণ্ড- বিধান করবেন, তাতে লজ্জা কি, দুঃখ কি ? দর্প। দেখ, শান্তশীল, যুবরাজ মানসিংহের অত্যাচারে সকলেই মর্মপীড়িত। কর্মচারী, প্রজা সকলেই তার প্রতিবিধানে কৃতসংকল্প। শীঘ্রই যে রাজ্যে বিপ্লব উপস্থিত হবে তার সন্দেহ নাই। সেইজন্য বলছি, কেন রাজ্যটা পরহস্তগত হয় ? আমাদের মধ্যে কিছুদিনের জন্য রাজ্যটা রাখা উচিত। যুবরাজের চৈতন্য হলে আবার তার রাজ্য তাকে ফিরিয়ে দিলেই হবে ; কেবল তাকে একটু শিক্ষা দেওয়া বৈ ত নয় ? এ আপনি কি বলছেন ? যুবরাজ অত্যাচারী ? প্রজা, ভৃত্য, সকলেই তার বিপক্ষ? এ সব কথা ত স্বপ্নেও শুনিনি, নশায়! তবে এইমাত্র জানি যে, ফটিক ফকির এই গুপ্ত মন্ত্রণায় , আপনার সাহায্যকারী। তাদের কি স্মরণ হয় না যে, ভদ্র সন্তান হয়ে একদিন পেটের দায়ে রন্ধন কাৰ্য্য স্বীকার করে দ্বারে দ্বারে ঘুরে দিনপাত করতে হয়েছিল। তখন তাদের কি দুর্দশা ছিল, ৪ রমাবতী। এখন কি তা স্মরণ হয় না ? যখন তাদের পরিবারবর্গ অনাহারে অশ্রুসিক্তলােচনে দিনপাত করত—যখন তাহার প্রাণের ধিক্কারে আত্মনাশে প্রয়াস পেয়ে দেশময় ঘুরে বেড়াত, তখন তাদের কে রক্ষা করেছিল ? যুবরাজ মানসিংহ দয়া পরবশ হয়ে, দারিদ্রের করাল কবল হতে তাদের রক্ষা না করলে আজ তারা কোথায় থাকতো ? সেদিন কি মনে নাই? সে দুঃখের দিন কি এখন স্মরণ হয় না? কৃতম্নের স্মৃতি কি এত সহজেই ধুয়ে যায় ? তাই সে সব ভুলে গিয়ে জীবনদাতার অনিষ্টসাধনে এক্ষণে কৃতসংকল্প ! ওঃ কি ভয়ঙ্কর ! দর্প। এ কথা অবশ্য স্বীকার করি যে, যুবরাজ সময়ে সময়ে আমাদের অনেক উপকার করেছিলেন। এরূপ উপকার অনেক দয়াবানই করে থাকেন। তাই বলে কি সেই উপকার রজুতে এক ব্যক্তিকে চিরকাল বন্ধন করে তাকে আজীবন লাঞ্ছিত বা অপ- মানিত করা উচিত? জীব-জগতের মহামূল্য স্বাধীনতা জীবমাত্রেরই আকাঙ্ক্ষিত ; তার মূলে কুঠারাঘাত করা কি উপকারী ব্যক্তির হােক না সে উপকারী, হােক না সে জীবনদাতা, তাই বলে অপমান করবার পদদলিত করবার তার কি অধিকার ; কর্তব্য ? আছে ? - শান্ত। কাৰ্য্যকুশলী ব্যক্তির যুক্তি তর্কের অভাব হয় না, ঘড়যন্ত্রকারীর ছলনার অভাব হয় না। দেশের আপামর সাধারণ সকলেই জানে, যুবরাজ বিচক্ষণ, প্ৰজারঞ্জক ; উচ্চ নীচ সকলের প্রতি তাহার সদ্ব্যবহার। এমন দেবতাকে অত্যাচারী বলে সাধারণে বিশ্বাস করবে কেন ?

রমাবতী। ; দর্প। দেছি তুমি তার অতি পক্ষপাতী, আচ্ছা, ভাই, এখন এস। কিন্তু ভগবানের দিব্য, একথা কারও কাছে প্রকাশ করেন। ( শান্তশীলের প্রস্থান) ওঃ, কি গৰ্ব ! কি অহঙ্কার! বৃদ্ধ মহারাজ নরাধমকে ভালবাসেন বলে অহঙ্কারে জগতকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। কিন্তু জান নাকি শান্তশীল, বৃদ্ধ রাজা-যুবরাজের হাতে রাজ্যভার দিয়ে অবসর গ্রহণ করেছেন। আর সেই যুবরাজ আমার হন্তে ক্রীড়া পুত্তলিকা মাত্র। তােমায় অনেক উপদেশ দিলুম, শান্তশীল, কিন্তু দেখছি তাতে তোমার চৈত্য হ’লােনা, বরং গৰ্ব আরও বেড়ে উঠছে। আগে তােমায় প্রতিফল দিব তারপর অন্য কাজ। ( চিন্তা ) যে আশা হৃদয়ে জাগছে তা’কি নিষ্ফল হবে? না, কিছুতেই না। গিরি নদী বন পরিশােভিত এই বিশাল রাজ্য, লােক ললাম- ভূতা আনন্দময়ী রমাবতী, কখন কি আমার হবে না? রাণী, রাণী, রমাবতি! আহা, কি মধুমাখা নাম! মরি! মরি! কি রূপ ! মহা প্রলােভন! মহা প্রলােভন! এর তুলনায় প্রাণ অতি তুচ্ছ। রাজ্য—ঐশ্চৰ্য্য-রম। (প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য।
কক্ষ
মানসিংহ ও রণজিৎ সিংহ।
;
মান। বাবা, দেওয়ান দর্পনারায়ণ অতি দক্ষতার সহিত কাৰ্য্য
করছেন। তার বিরুদ্ধে আপনার বিশ্বাস বদ্ধমূল, কিন্তু তার কাৰ্য্য
নৈপুন্য দেখলে, আপনার সে ভ্রম দূর হবে। বাবা, আমার ইচ্ছা
আপনি তার কাৰ্য একবার পরিদর্শন করুণ।
রণজিৎ। দয়াময়, দয়া কর। মানসিংহ, তুমি যদিও বয়সে
বালক নও, তথাপি কাৰ্যে বালক ; কারণ, আমরা জগতের ঘাত
প্রতিঘাত সহ করেছি, বিভিন্ন-স্বভাব মানবের সহিত ব্যবহার
করেছি, তােমার এখন সেরূপ সুযােগ ঘটে নাই ; বয়সের সঙ্গে সঙ্গে
যখন সংসার পথে অগ্রসর হবে তখন বুঝবে, তােমার বৃদ্ধ পিতার
কথা যথার্থ কি না। দর্পনারায়ণ আমার একজন পরম আত্মীয়,
অকারণ তার উপর আমার মমতা হ্রাস হবে কেন? নারায়ণের
কৃপায় এত লােক প্রতিপালিত হচ্ছে, আর সেই বা এখানে
স্থান পায়না কেন? মানসিংহ, আমি বৃদ্ধ—তােমার পিতা, আমার
কথা শশান-দর্প যতই কাৰ্য কুশলী হােক না কেন, তার হৃদয়
কাল কুটিলতার আধার। তাকে দেওয়ান পদে নিযুক্ত করে ভাল
কর নাই। হরি হে, তােমারই ভরসা।

রমাবতী। মান। বাবা, হতে পারে কোন সময়ে সে আপনার বিরাগ- ভাজন হয়েছিল, সে ক্রোধ চিরকাল পােষণ করেন কেন? রণজিৎ। কেবল আত্মরক্ষার জন্য, দয়াময়, দয়াময়, আমি জানি সে কাল ভুজঙ্গ, সুযােগ পেলেই কখন দংশন করতে পরাজুখ হবে না। ক্রোধ নয় বাপ, আত্মরক্ষা। যাই, বা সন্ধ্যাহিকের সময় হােল, রাধা বল্লভ, কৃপা কর। ( প্রস্থান।) মান। পিতার কি ভ্রম! ( দর্পনারায়ণের প্রবেশ ) ; এস ভাই, দর্পনারায়ণ এস, এসময়ে এলে যে? দর্প। যুবরাজ, আপনাকে যে কি চক্ষে দেখছি তা আর বলতে পারি না, স্বয়ং জগদীশ্বরই জানেন, আপনাকে একদণ্ড না দেখলে শান্তিহার পাগলের মত হয়ে পড়ি ; তাই সময়ে, অসময়ে দেখতে আসি। বােধ হয় বিরক্ত হন না ? মান। না, না,সে সব কিছু মনে করনা। এখনই মহারাজের কাছে তােমার কথাই হচ্ছিল। কিন্তু, তােমার প্রতি তার কেন এত ক্রোধ বুঝতে পারি না। দর্প। কেন যে ক্রোধ সে কথা কাউকে বলব না মনে করেছিলাম ; কিন্তু দেখছি এক্ষণে বলাই ভাল। কি বলব যুবরাজ, বলতেও রসনা জড়িত হয়—যদিও মহারাজ সম্পর্কে আমার খুড়া, তথাপি কোন লােক দিয়ে তিনি আমার বিধবা ভগ্নীকে রাজ ৮

রমাবতী।
বাড়ীতে পাঠায়ে দিতে আদেশ করেন, আর তাহার ভরণপােষণের
ভার গ্রহণ করূতে সমুৎসুক, তাহাও জানান। খুড়ার এরূপ
ব্যবহারে মর্মাহত ও ক্রোধান্ধ হয়ে বলে পাঠালুম যে, মহারাজের
এরূপ বরহবৃত্তি কতদিন থেকে জন্মেছে। তার উত্তরে তিনি
বল্লেন যে, যতদিন তিনি এই কটুক্তির প্রতিফল না দিবেন
ততদিন তিনি আমার মুখদর্শন করবেন না।
মান। কি সর্বনাশ! সত্য ?
দর্প। পাছে আপনি মিথ্যা মনে করেন সেই জন্য একথা
এতদিন প্রকাশ করিনি; কিন্তু যুবরাজ, এখন আপনার প্রতি
আমার এত ভালবাসা জন্মেছে যে, আপনি কোন কথা জিজ্ঞাসা
করুলে গােপন করতে পারি না।
মান। ছি, ছি, পিতার এই ব্যবহার! যিনি আমার গুরু,
উপাস্য দেবতা, তার এই ঘৃণিত প্রবৃত্তি ! জগতে তবে কাকে ভক্তি
করব ?
দর্প। যুবরাজ, তা হলে অনুমতি করেন ত এখন আসি,
কাছারির বেলা হল।
(প্রস্থান।)
মান। পিতা, বৃদ্ধপিতা, হরিপরায়ণ হয়ে পরকালের পথ উন্মুক্ত
না করে তােমার একি ব্যবহার ? শুভ্রকেশমণ্ডিত, বার্ধক্য কবলিত,
বির পিতা, এ সংসারে আর তােমার কদিন? মুহুর্তের মধ্যে
তােমার জীবন আয়ু অনন্তের কোলে বিলীন প্রায়, এবয়সে
তােমার একি ব্যবহার ? কিন্তু, কি বলছি ? কাকে বলছি ?

রমাবতী।
পিতাকে? পিতা আমার দেবতুল্য, সদা দেবার্চনারত, হরিনামে
পূতপিতা-তাকে? না, না, তবে একি ?
, না, তবে একি ? কি শুলেম ?
দেওয়ানের মুখে এ কি শুনলে ?
(ফকিরের প্রবেশ)
ফকির। (স্বগতঃ ) হরি, মুখরেখাে, সােনার চাদ গাছে
তুলে মই কেড়ে নিওন, বাব। ( প্রকাশ্যে ) এই যে যুবরাজ!
যুবরাজ, অভিবাদন করি।
মান। এস ফকির, কিছু সংবাদ আছে কি?
ফকির। (স্বগতঃ ) কি করি—বলব ? না না, কাজ নেই,
জোলা তাঁতির মখমলে হাত কেন বাবা? পেন্নাম করে পালাই,
কি কলুম, সাত পাঁচ না ভেবে একেবারে বাঘের মুখে এসে পড়লুম।
এলেই ছিল ভাল।
মান। ফকির-কেন এমন করছো ?
ফকির। আজ্ঞে—জ্ঞে—জ্ঞে—জ্ঞে, হুজুজুজুর,
মান। কি হয়েছে ? কেন এত সঙ্কুচিত হচ্ছ ? কিছু কথা
থাকে, বল।
ফকির।
আজ্ঞে-আজ্ঞেযুবরাজ-আজ্ঞেমহারাজ
আজ্ঞে-হুজুরআজ্ঞে।
মান। কি বলছ, ফকির ?
ফকির। (স্বগতঃ ) যা থাকে কপালে, বলে ফেলি।
মান। ভয় পাবার কোন কারণ নাই, বল।
১০

রমাবতী।
ফকির। মহারাজের হুকুম হয়েছে, দেওয়ান মহাশয়কে গ্রাম
থেকে অতি গােপনে বার করে দিতে। আপনি জানলেই গর্দান
যাবে, তাই হুজুর আপনি যেন জেনেন না, তা হলে আমার প্রাণ
যাবে।
মান। কি বল্লে ?
ফকির। আজ্ঞে আমি বলিনি হুজুর।
মান। সে কি, এই যে, তুমি বলে।
ফকির। এই যা, করলুম কি? গরিবের কথা ভুলে যান
হুজুর।
মান। আরে না, না, তােমায় এ কথা বল্লে কে ?
ফকির। আজ্ঞে, দেওয়ান মহাশয় বলে পাঠালেন, তবে আসি
মান। কারণ কি ?
ফকির। আজ্ঞে, দেওয়ানের ভগ্নী-ভগ্নী-হুজুরহুজুর।
মান। ছি, ছি, বাবার এ বড় অন্যায়।
ফকির। বড় অন্যায়,-দেওয়ানের দোষ কি ?
মান। কিন্তু, বাবা কি এমন কাজটা করবেন ?
ফকির। তাইত—তাইত—তাঁহার এমন কাজটা করা সম্ভব
হয় না।
মান। তার কি বুদ্ধি ভ্রংশ ঘটল ?
ফকির। তা ঘটতে পারে, মহারাজের অনেক বয়স হলে
আপনি ঠিক ঠাওরেছেন।
•

রমাবতী।
মান। কিন্তু, বাবা-
ফকির। কিন্তু, বাবা! সেইজন্য ভীমরতী ঘটতেই পারে না;
হুজুর, অনুমতি হয় ত আসি—বড় তৃষ্ণা পেয়েছে।
মান। কেন ?
ফকির। হুজুর, হুজুর, এই বহুমুত্রের ব্যায়াম আছে কিনা,
তাতেই ঘন ঘন তো পায়। ফটিককে জিজ্ঞাসা করলে সব বুঝতে
পারবেন। তা হলে হুজুর, যাই।
(দৌড়িয়া প্রস্থান)।
মান। একি, ক্রমশই যে আমার হৃদয় ঘাের তমসাচ্ছন্ন হতে
লাগল? একি হলো? পিতার বৃদ্ধ বয়সে এমন দুৰ্ম্মতি কেন
হ’ল ? আমাকে গােপন করে দর্পনারায়ণের প্রতি তার অত্যা-
চার ? কেন এমন দুষ্কৰ্য্য করে পিতা এ বয়েসে কলঙ্কের ডালি
মাথায় নিচ্ছেন ? এ কথা কি পিতাকে জিজ্ঞাসা করব ? আর
জিজ্ঞাসা করেই বা ফল কি? যখন তিনি গােপন করে এ কাৰ্য্য
করেছেন, তখন কি আমার কাছে এ সব স্বীকার করবেন ? এখন
করি কি? যদি তাকে বােঝাবার কেউ না থাকে, তা হলে দিন
দিন তার এ প্রবৃত্তি বৃদ্ধি হবে; এখন করি কি ?
(ফটিকের প্রবেশ )
ফটিক। মহারাজ, আমায় স্মরণ করেছেন?
মান। হাঁ, তুমি দেওয়ানের প্রতি পিতার অত্যাচারের
কথা কিছু জান ?
১২

রমাবতী।
ফটিক। মহারাজ, কি করে বলি ?
মান। কেন?
ফটিক। আপনাকে কোন কথা প্রকাশ করতে মহারাজের
নিষেধ,—কি করে বলি ?
মান। আমার আদেশ, সকল কথা খুলে বল। দোষ হয়
আমার হবে ?
ফটিক। দোহাই যুবরাজ, এ কথা যেন মহারাজ ঘুণাক্ষরেও
জানতে পারেন। মহারাজ অামার প্রতি হুকুম করেছেন যে,
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়ানকে নগর থেকে দূর করে দিতে। হুজুর,
কি করি? যখন আপনাদের নিমক খেয়েছি তখন ভালমন্দ যা
বলেন, তাই করতে হবে। এখন, দেওয়ান মহাশয়ের উপায় কি
হবে, হুজুর? আঃ বেচারা আপনার সঙ্গে দেখা করবার জন্য
ছটফট কছে। যে যাই বলুক, হুজুর, লােকটা কিন্তু খুব হুসিয়ার
ছিল ; আর তার আপনাঅন্ত প্রাণ, আপনাকে ত্যাগ করলে
বেচারা নিশ্চয় ওলাউঠা হয়ে মারা যাবে, হুজুর, আঃ আপনার জন্য
তার মায়া কি ? দরদ কি ? যে অবধি শুনেছে, আপনাকে ছাড়তে
হবে, সে অবধি কেবল আপনার জন্যই-এই ডুকরে ডুকরে কাঁদছে,
হুজুর।
মান। সে কোথায় আছে।
ফটিক। হয়ত সে এতক্ষণ বেরুবার বন্দোবস্ত করছে।
মান। কি অন্যায়, তুমি যাও, তাকে একটু অপেক্ষা করতে
বলগে-আমি যাচ্ছি।
(ফটিকের প্রস্থান)

মণাবতী
দীনু।
( দীনু পাগলের প্রবেশ )
ফুস মন্তর দিলে কানে, মন টলে তারই পানে।
দীনে পাগল বলছে তায়, দেখে শুনে চল ভাই।
(গীত)
সামলে সবে চল না, ভবের পথ পিছল বড়,
খাবে আছাড়—জান না।
কলিকাল গিলটি করা, বাছা সােনা যায় না ধরা,
নকলের জমক ভারি, তাই দেখে কেউ ভুলনা ।
মান। কি মনে করে এলে, দীনু ?
দীনু। প্রাণটা আমার খারাপ ভারি, তাইতে এলেম তাড়াতাড়ি,
মানসিংহ, চল মানে,
নইলে মজবে ধনে প্রাণে।
মান। দীনু এখন যাও।
( মানসিংহের প্রস্থান)
দী। মানসিংহ, আজ চল মানে,
বলে গেল পাগল দীনে।
( প্রস্থান)
১৪

তৃতীয় দৃশ্য।
রাজ-উদ্যান
( রণজিৎ ও শান্তশীলের প্রবেশ )
রণজিৎ। রাধাবল্লভ! হরি হে ! শান্তশীল! দেখছি রাজ্যের
আর মঙ্গল নাই। পুত্রের মতিচ্ছন্ন ঘটেছে। পাপিষ্ঠ দর্প তার
ঘাড়ে চড়েছে, মানকে বুঝালাম, অনেক উপদেশ দিলাম, কিন্তু
যখন যা’র মতিচ্ছন্ন হয় তখন সে কি আর হিত-কথা শােনে।
রাধাবল্লভ! তােমারই পদ ভরসা !
শান্ত। মহারাজ! আমি এর আর কি উত্তর দিব, আমি
একজন অতি তুচ্ছ ভৃত্য আমার কোনও কথা বলা ধৃষ্টতা ; তবে
আমি, মহারাজ, বহুকাল থেকে আপনার অন্নে প্রতিপালিত, প্রাণ
থাতে আপনাদের অনিষ্ট দেখতে পারব না। মহারাজ, যুবরাজকে
সতর্ক করুন, সাবধানতায় মঙ্গল বই অনিষ্ট নাই।
রণজিৎ। রাধাবল্লভ, রাধাবল্লভ, আর কি করে সতর্ক করব?
ছােট ছেলেত নয় যে শাসন করব। নানা উপদেশ দিলাম, কত
বুঝলাম, না শুনলে কি করব ? হরি হে চরণ দেও, আর আমার
বৃদ্ধ বয়স, এ সময় বৃন্দাবন বাস করাই কর্তব্য। যা তার কপালে
আছে হবেই, কি কব বল, রাধাবল্লভ!
শান্ত। মহারাজ, তা’ বেন না, সময় অতি খারাপ, এ সময়

রমাবতী।
বৃন্দাবন বাসের সঙ্কল্প ত্যাগ করুন। যুবরাজ সবেমাত্র সংসারে
প্রবেশ করেছেন, এখন তাকে অসহায় করবেন না।
রণজিৎ। এত কষ্টে প্রাণ পাত করে পিতৃদত্ত সম্পত্তি রক্ষা
করলাম—এই শেষ বয়সে তার কি ধ্বংস দেখতে বল ? তা
পারব না, আমার কর্তব্য আমি করলুম, তারপর মানের অদৃষ্টে যা
আছে, হবে।
শান্ত। মহারাজ, এত অমঙ্গল চিন্তা করছেন কেন ?
রণজিৎ। কেন ক’চ্ছি তা যদি বেঁচে থাক, দেখতে পাবে,
কুলাঙ্গার দর্প, নরপিশাচ দর্প, তারে আমি বিলক্ষণ চিনি, তার
অন্তরে গরল, মুখে অমৃত। সে যখন এ সংসারে প্রবেশ করেছে
তখন অধঃপতন অবশ্যম্ভাবী। বিপদভঞ্জন মধুসূদন, তােমার
ইচ্ছা!
শান্ত। মহারাজ, আপনার রাজবুদ্ধি, আপনার দূরদর্শিতা,
সাধারণের সঙ্গে তুলনা হতেই পারেন, কিন্তু এসময় যুবরাজকে
অসহায় করবেন না।
( উভয়ের প্রস্থান।)
(একদিক দিয়া মানসিংহ ও অপর দিক্ দিয়া দীনুর প্রবেশ।)
দীনু। পথে চলা শক্তবড় সাপ বিছে আছে,
চোর ডাকাত দিবা রাতি ফিরছে পাছে পাছে
মানসিংহ বাড়াও পা চেয়ে রাস্তা পানে,
নইলে, পড়বে বিষম ফেরে পাগলা দীনে ভনে।

রমাবতী।
মান। দীনু, তুমি ক’দিন থেকে আমার কাছে ঘন ঘন আসছ
কেন বল দেখি?
দী। বক বকানি বম বম বুঝ দেখি ভাই,
ঘুম ভাঙ্গবে দেখতে পাবে সাপে তুলছে হাই।
(দীনুর প্রস্থান)
মান। কি করি বিষম সমস্যা, দরিদ্র আত্মীয়, তার উপর অত্যা-
চার, নির্বাসনের ব্যবস্থা, কি করে কি করি? আত্মীয়ের নয়ন
বিগলিত অশ্রুধারায় পিতার শান্তিশশী চিরকালের জন্য অস্তমিত
হবে। নির্দোষী আত্মীয়ের অশ্রুসস্পাত, অভিসম্পাতে পরিণত
হলে বংশ নাশ হবে। কি হবে, কি করি? যেমন পুত্রের দোষ
পিতা দ্বারা লক্ষিত, সেইরূপ পিতার দোষও পুত্রের দ্বারা দৃষ্ট হয়।
আমি ভিন্ন পিতাকে এ সকল কথা কে বলবে ? আমি ভিন্ন
পিতাকে পাপ কাৰ্য হতে কে নিরস্ত করূবে? মা বৈকুণ্ঠবাসিণী,
আপদে বিপদে পিতা পুত্রে পরস্পর পরস্পরের মন্ত্রণাদাতা। সুতরাং
পিতাকে এ কাৰ্য্য হতে নিরস্ত করা আমারই উচিত। ঐ যে বাবা
আসছেন, বলব তাতে দোষ কি?
( রণজিৎসিংহের প্রবেশ)
রণজিৎ। হরি বল মন, হরি বল, মান এখানে এমন সময়ে
বিষন্ন ভাবে দাড়িয়ে আছ কেন?
মান। বাবা, কেন আপনিদর্পরায়ণের প্রতি এরূপ ব্যবহার
করছেন ? তাকে ক্ষমা করুন।
রণজিৎ। সে যেরূপ এত দিন গ্রামবাসী প্রজা হয়ে ছিল
৮

রমাবতী।
তাকে সেইরূপভাবে দূরে রাখ, বেশী ঘনিষ্ঠত করবার প্রয়ােজন
নাই।
?
মান। যদি কোনও ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ হয়ে থাকে সে আমাকর্তৃক,
সে জন্য তার দণ্ড কেন ?
রণজিৎ। কি দণ্ড ?
মান। বাবা, আমায় বলতে হবে না, আপনি স্মরণ করে
দেখুন।
রণজিৎ। এ সব কি ? কে তােমায় এ সব কথা বলে ?
মান। যেই বলুক, তাকে ক্ষমা করুন।
রণজিৎ। ক্ষমা আর কি ? বিশ্বাস ঘাতকের সংস্পর্শে অনিষ্ট
ভিন্ন ইষ্টের সম্ভাবনা নাই।
মান। তাহলে এ জীবনে তার আর ক্ষমা নাই
রণজিৎ। না।
মান। এতদিন আপনার আজ্ঞা বেদানুশাসনের ন্যায় অক্ষরে
অক্ষরে পালন করেছি। ন্যায় অধ্যায়ের দিকে কখনও দৃষ্টিপাত
করি নাই, তার ফল কি এই ? এ রাজ্যের সৌভাগ্য-সূৰ্য্য
অস্তমিত হবার এই পূৰ্ব্ব সূচনা, কিন্তু পিতা ক্ষমা করবেন, যখন
নিরপরাধী দর্পনারায়ণকে আশ্রয় দিয়েছি, তখন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত
রক্ষা আমার ধ্রুব সংকল্প ; তাই বলি, আপনি এ দারুণ প্রতিশােধ
বাসনার সাধ ত্যাগ করুন।
রণজিৎ। মান, এসব কি বলছিস্? প্রতিশােধ! কিসের
প্রতিশোধ ?
১৮

রমাবতী।
এ
মান। বাবা, আমার সঙ্গে এরূপ ব্যবহার কেন ? আপনি
প্রকাশ করুন, আর নাই করুন, আমি সবই জানতে পেরেছি।
আপনার এ বয়সে পাপের সেবা করা কি উচিত? ভগবৎ চরণে
আত্মসমর্পণে পরকালের কাৰ্য্য করুন।
রণজিৎ। কি কুলাঙ্গার সন্তান, পিতার চরিত্রে সন্দিহান ?
মান। পিতা কোন্ তুচ্ছ-পিতার পিতা পরমপিতার চরিত্রে
বদি দোষ দৃষ্ট হয়, তা হলে সেও তুচ্ছ মানবেরও সমালােচ্য।
বয়সে বানপ্রস্থ অবলম্বন করে নারায়ণ অর্চনায় নিযুক্ত হয়ে
পরকালের পথ মুক্ত করুন।
রণজিৎ। কুলাঙ্গার সন্তান, তাের মুখ দেখলেও পাপ।
যেখানে অধৰ্ম্মের প্রভাব, পুত্র পিতৃদ্বেষী, সে গৃহে মুহূর্তকালও বাস
করা উচিত নয়। বুঝেছি, দুর্মতি দর্পনারায়ণ তাের মন্ত্রণাগুরু
হয়েছে। তার হস্তে তুই যন্ত্রপরিচালিত পুত্তলিকা। এ রাজ্যের
আর মঙ্গল নাই, ভগবান বিমুখ, সৰ্ব্বনাশ অবশ্যম্ভাবী।
যে রাজ্যে রাজ্যেশ্বরের এমন প্রবৃত্তি, তার রক্ষায়
ভগবান অশক্ত।
( প্রস্থান)

চতুর্থ দৃশ্য।
দর্পনারায়ণের কক্ষে
দর্প ও ফটিক।
দর্প। কামনা সফল, কিন্তু সাবধান ভাই সব, খুব হুসিয়ার,
আমাদের এই গুপ্তমন্ত্রণা যেন কেউ ঘুণাক্ষরেও জান্তে না পারে।
ফটিক। ঠিক হয়েছে, বেটা রেগেছে—বাপকে তিরস্কার
করেছে, বাপও মুখ বিষকরে দুকথা শুনিয়ে দিয়েছে। আর চাই
কি ? নারদ-নারদ-খের কাঠি, লেগে যা ঝটাপটি।
দর্প। এখনও অনেক চাই। বাপকে এখান হতে তাড়ান
চাই, সে থাকতে বুদ্ধি বড় খাটবে না। বুড়ো বড় ঝানু। তাকে
দেশান্তরিত করাই চাই। আর, ঐ বেটা বিটলে বামুন শান্তশীল,
বেটার বড় অহঙ্কার, তাকে এ মােহনপুর থেকে তাড়ান চাই।
বাস-তা হলেই কাম ফতে।
ফটিক। শান্তশীলের উপরেও যুবরাজের কোপদৃষ্টি ফেলেছি।
আর ক’ দিন? দেখুন ত, সে বেটাও শীগগির তলপিতলপা বাঁধে।
দর্প। বেশ করেছ। আমিও ইত্যবসরে একটা বুদ্ধি ভেবে
ঠিক করি।
সে জন্য বড় ভাবতে হবে না, মহারাজা হচ্ছে মনসা

রমাবতী।
বঁটা।
সে ব্যাটাকে সরাতে পারলে সামান্য কুলকাটার জন্য ভাবি
না।
এক মােচড়েই ফরসা হয়ে যাবে।
1
(ফকিরের প্রবে।)
ফকির। মনসা কাটা সরেছে আর ভয় নাই, মহারাজ ছেলের
উপর রাগ করে বৃন্দাবন চল্লো।
দর্প। সত্য ! সত্য ! কে বলে ?
ফকির। বলবে আবার কে; আমি এই চাক্ষুস দেখে এলেম্ ;
শান্তশীল তাকে অনেক বুঝুলে, কিন্তু রাজার মন একবারে তেওড়ে
গেছে, সে কিছুতেই মালে না।
ওঃ! শান্তশীল বেটা কি পারি ।
দর্প। ও ব্যাটাকে না তাড়ালে কোন কাজই হবে না।
ফকির। তার জন্য ভাবনা কি ? আপনি আমাদের সহায়
থাকলে হল।
দর্প। ভাই, তােমাদের জন্যেই আমার এত উদ্যোগ, এত
পরিশ্রম।
ফটিক।
(দীর প্রবেশ )
দী। বসে বসে কছে বাঘ শিকার সন্ধান।
মুখটী টিপে, ঘাড়টী গুজে, ছাড়ছে বিষের বাণ ।
দর্প। বাবা দীননাথ, এশ্লোকটী শিখলে কোথায় ?
দীমু। শিখব না ত মনে করি কিন্তু ছাড়ে না।
বলে, না শিখলে দীনু তোমার আক্কেল হবে না।
২১

বমাবতী।
দর্প। দীনু বলতে পার মহারাজ কোথায় ?
দী। চিতিসাপের বিষ লেগেছে রাজার নরম গায়।
তাই, মােজার তরে মহারাজা বৃন্দাবনে যায়।
দর্প। (স্বগতঃ) আঃ ঘামদিয়ে জ্বর ছাড়লাে। (প্রকাশ্যে )
আচ্ছা, তােমরা মহারাজের সংবাদটা সঠিক জেনে এসাে।
(ফটিক ও ফকিরের প্রস্থান)
দী। জ্বর আসে যায় পত্তি করে, আবার ঘুরে ঘুরে জ্বরে ধরে।
হতে হতেই যকৃৎপিলে, তারপরেতেই পটল তােলে,
পাপের বােঝা হলে ভারী, মাঝ দরিয়ায় ডুববে তরি।
( প্রস্থান)
দর্প। মরি, মরি! কি নন্দনকাননের অগ্রাঞ্ছিত রূপ।
অরুণকিরণ প্রতিভাষিত কোমল কান্তি ।
কোমল কান্তি ! কি পূর্ণবিকশিত
বিস্ফারিত পদ্মপলাশলােচন! অবগুণ্ঠনে রূপবতী মেধাবৃত শশাঙ্কের
ন্যায় কি রমণীয় সৌন্দৰ্য্য বিস্তার করেছে ; একবার দেখেছি,
দেখে পাগল হয়েছি ; আর কি সেরূপ দেখতে পাব ? দেখ বার
কামনায় আকুল হৃদয়ে পাগলের মত ঘুরছি, আর কি দেখতে
পাব না? রমাবতী! রাণী রমাবতী! কেন মানসিংহের দ্বারা
পদে পদে লাঞ্ছিত, পদে পদে অপমানিত হচ্ছ ? এস, অভাগী
তােমায় হৃদয়মন্দিরে স্থাপন করে চিরজীবন তােমার দাসত্ব কবে।
( প্রসন্নর প্রবেশ।)
প্রসন্ন। ওই কি বলে, কার দাসত্ব করূবে গো?
দর্প। প্রসন্ন এলে ? সংবাদ কি ?
২২

রমাবতী।
প্রসন্ন। ওই কি বলে, আগে আমায় বসি দাও, তারপর
বলবো।
দর্প। প্রসন্ন যার প্রতি প্রসন্ন কুলােস্তস্য পরাভব। এখন
প্রসন্ন হয়ে বল প্রসন্ন, কতদূর কি হল?
প্রসন্ন। ওই কি বলে—তবে আমার দূতিগিরির দক্ষিণে ?
দর্প। হবে-হবে।
প্রসন্ন। বটে ? তবে, আমারও হবে হবে।
দর্প। না প্রসন্ন রাগ করােনা, চল দিচ্ছি।
( উভয়ের প্রস্থান)
( দীনুর পুনঃপ্রবেশ )
দী। তাতা ধিনা নাচরে দীনে ; সাপের হাঁচি বেদেয় চিনে।
( প্রস্থান)
পঞ্চম দৃশ্য
অন্তঃপুর কক্ষে
রাণী ও মানসিংহ।
০
রাণী। কি করূলে ? শুলম পিতাকে বাক্যযন্ত্রণায় দেশত্যাগী
কৰলে ?
করলে কি ? পিতা গুরু, পরম গুরু—তার প্রাণে
ব্যথা দিলে?
২৩

রমাবতী।
মান। সে ভাবনা তােমার নয়। তুমি স্ত্রীলােক, তােমার যা
কৰ্তব্য, তাই কর।
রাণী। স্বামীর মঙ্গলকামনাই স্ত্রীজাতির একমাত্র কর্তব্য।
পাছে তােমার অমঙ্গল হয়, তাই চিন্তা। রাজ্যের জন্য কি আমার
জন্য চিন্তা করি না; কি কারণে পিতার সঙ্গে বিবাদ, তাও জান্তে
চাই না।
বৃদ্ধ পিতার মনােকষ্টে পাছে তােমার অকল্যাণ হয়
তাই বড় ভয়।
এখনও বাবাকে ফিরিয়ে আন। নইলে, নিশ্চয়
অনর্থ হবে।
মান।
সেজন্য তােমাকে ভাবতে হবে না। স্ত্রীলােকের মুখে
অনধিকার চর্চা ভাল দেখায় না।
রাণী। তােমার এমন দুর্মতি কেন ঘটলো! তুমি ত আগে
এমন ছিলে না, তােমার পায়ে পড়ি, বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে এস।
তিনি এখনও বেশীদূর যান নাই। তাকে নিয়ে এসে পায়ে ধর,
ক্ষমাভিক্ষা কর। নইলে, নিশ্চয় তােমার অমঙ্গল হবে।
মান। আমার জন্য তোমায় ভাবতে হবে না। আমরা
ক্ষত্রিয়, ভবিতব্যের আশঙ্কা করি না। এখন তোমায় যা বলতে
এসেছি শােন; আমি মৃগয়ায় যাব,সাবধানে থেকে।
রাণী। না, এখন তােমার যাওয়া হবে না। এখন তোমায়
ছেড়ে দিব না। যদি বাবাকে না আন, তাহলে তােমাকে
কিছুতেই ছেড়ে দিব না; আমি স্ত্রী, পায়ে পড়ি কথা রাখ।
মান। কেন মা, এত অধীর হচ্ছ ? কেন এত আশঙ্কা
চিন্তা কছ ?
কোন ভয় নাই। নানাপ্রকারে আমার মন
২৪

রমাবতী।
খারাপ হয়েছে, সেইজন্য মৃগয়ায় গিয়ে মনটা স্থির করবো মনে
করেছি।
রাণী। নাথ ! দাসী কখনও তােমার কাছে ভিক্ষা চায় নাই
এখন মৃগয়ায় যেও না, এইটাই প্রার্থনা। এই ভিক্ষাটি আমায়
দাও; কি জানি, মন বলছে তােমার অমঙ্গল হবে। প্রভু, তুমি
দাসীর এ কথাটি রক্ষা কর। তুমি ভিন্ন আমার এ সংসারে আর
কেউ নাই। তাই বড় ভয়, পাছে তেমমর অমঙ্গল হয়।
মান। রমা ! আমার জন্য তােমার এত চিন্তা কেন? অমঙ্গল
যখন হবে তখন নিশ্চয় হবে। কার সাধ্য তার গতি প্রতিরােধ
করে? তবে তুমি কেন অনর্থক ভেবে দেহ পাত করূছো ? কিছু
ভেবাে না, আমি মৃগয়া থেকে শীঘ্রই ফিরবো।
রাণী। যখন তােমায় নিষেধ করছি তখন একটা কথাই রাখ।
মান। রাবার হলে নিশ্চয়ই রাখতে, তােমার আবদার
উতে গেলে আর আমার কোন কাজকর্ম চলে না !
রাণী । তােমার পায়ে ধরি আজ তুমি যেও না। আগে বাবাকে
ফিরিয়ে আন, তারপর যেখানে ইচ্ছা যেও।
মান। রমণীর কাৰ্যে রত রহ রমাবতী ;
পুরুষের কাৰ্যভার পুরুষ উপর।
( প্রস্থান)
রাণী। জগদীশ্বর। আমার স্বামীর কি হবে? আমার প্রাণ
কাদছে, আমার মন বলছে, স্বামীর আর মঙ্গল নাই ; দয়াময়
কি হবে? বাবা!
আমি তােমার পুত্রবধু, আমি ক্ষমাভিক্ষা
২৫

রমাবতী। তবু ভাসে আঁখি, করছি, তোমার পুত্রকে ক্ষমা কর। জগবন্ধু । আমার স্বামীকে ক্ষমা কর। মানুষ মাত্রেই ভ্রমপূর্ণ। আমার স্বামীর প্রতি রােষ করাে না ; দয়াময়, নাথ ! ফিরে এস, ফিরে এস, আমার কথা রাখ, ফিরে এস। (গীত ) দাসীর মিনতি রাখ, প্রাণনাথ যেও নাক, এ সংসাৰ বিপদময়। চখে চখে রাখি, কি জানি কখন কি হয় । তুমি মম ভবে তরি, তুমি ভবে কাণ্ডারী, ভেঙ্গ না সে সুখ আশ্রয় । বিপাকে পড়িলে, আপন প্রাণ ঢেলে, কে রাখিবে নাথ সেথা হৃদয়ে তুলে ; তাই করি মানা, যেওনা যেওনা, অভাগীর মিনতি রাখ হয়ে সদয় । (জাহ্নবীর প্রবেশ ) জাহ্নবী। সই, সই! তুমি এমন করে রয়েছ কেন? একি ? তুমি কাঁদছ ? (গীত) রাণী। তুহিন ধারা ঝরে নলিনী বুকে। কাঁদিতে করােনা মানা আছিলাে সুখে। জনম কাদিতে, শেল বুকে নিতে কাদি কাটাব কাল নীরব দুঃখে । জাহ্নবী। কেন প্রাণ ঢালি দিবি স্রোতেরই মুখে। .

রমাবতী। রাণী। কাঁদব না? আমি না কঁদলে কাদবে কে ? সােনার সংসার কি ছিল, কি হতে বসেছে। পিতার কোলে মাথা রেখে স্বামীর সােহগে বর্ধিত হয়ে বনহরিণীর ন্যায় এতদিন সংসারে সুখে বিচরণ করেছি, আজ পিতা গেছেন। স্বামী ব্যথিত হৃদয়ে মৃগয়ায় গেলেন ; আজ সবই শূন্য—গৃহশূন্য, প্রাণশূন্য, যে দিকে চাই সেই দিক শূন্য। কি হবে সই! সই, কি করূলে স্বামীর অমঙ্গল হয় না ? জাহ্নবী। সতি রাণী ! তুমি কায়মনে যার মঙ্গল কামনা কর তার কি কখন অমঙ্গল হয় ? রাণী। সই! আশীৰ্বাদ কর তাই যেন হয়। জাহ্নবী। তুমি নিশ্চিন্ত থাক, কেঁদনা। (সহসা মেঘগর্জন ও বজ্রপাত) এ কি! কোথা হতে ভীষণ গর্জন উচ্চরবে বধির শ্রবণ, তমােময় এ সংসাব, দৃষ্টিরােধ সবাকার, আচম্বিতে কেন সই, হেন ভাবান্তর ? ও কি! ও! চপল হাসে, ঝলসিয় দশদিশা, ঝলসিয়া অন্তর আমার, ঢাকিতে আঁধার বিশ্ব তম আবরণে। ভীম কর্কশরবে ধায় প্রভঞ্জন- মর্মরিয়া তরুকাণ্ড, নিষ্পেষিয়া তুঙ্গশৃঙ্গ, জভঙ্গে পবন মত্ত তাণ্ডবনৰ্ত্তনে। রাণী। २१

রমাবতী।
অমঙ্গল পূর্বাভাস, করিতে প্রকাশ
ভাবান্তর হেন বিশ্বে লয় মাের মনে।
কি হ’ল সই! কি হ’ল আমার।
জানিনা, জানিনা-পরাণ বােঝে না,
কঁদিয়া কাঁদিয়া প্রাণ উঠে আনিবার।
জাহ্নবী। কেন সই বৃথা অমঙ্গল চিন্তা করছো? কোন
চিন্তা নাই।
রাণী। নারায়ণ ! দেবদামােদর ক্ষমা কর পতিরে আমার,
পতিবিনিময়ে দেহ দণ্ড অবতারে,
প্রাণদণ্ড কিম্বা তব যেবা রুচি হয়,
হাসি মুখে করিব গ্রহণ।
কিন্তু বিপদভঞ্জন! যাচিহে কাতরে
বিপদে ফেল না হরি, পতুিরে আমার।
(পটক্ষেপন )
২৮

দ্বিতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
বহির্বাটীস্থ কক্ষ
(দীননাথের গান গাহিতে গাহিতে প্রবেশ)
দীন। (গীত)
তুম্-তা-না-না-না-
পাঁচটা লােকের কারসাজিতে বােক বলাে না।
এ সংসার চিড়িয়াখানা ভেল আছে নানা,
দেখতে উপর চিকন চাকন গরল-পােরা পেট খানা।
মাসি, পিসি, বােপাে, ভাসুর, কারুর কেউত করে না :
(তারা) গুলুক বুঝে মারে মুলুক দুনিয়ার এই ত কারখানা
দীননাথের সাচ্চা কথায় কেউ ভাই তােমরা চটো না।
( প্রস্থান)
( দর্পের প্রবেশ)
দর্প। এমন সুযােগ আর হবে না। রাজা মৃগয়ায় গেছে,
রাণী একা আছে, আমার উপর গৃহ রক্ষার ভার। দর্প, তবে কেন
নিশ্চিন্ত থাক? রমা ! রমা ! কি অমিয় মাখা নাম! ক্ষীরােল

রমাবতী।
সাগরের অমৃত ভাণ্ডারেও বুঝি এত সুমিষ্ট সুধা নাই। আবার
দেখতে পাব ? আবার কি দেখে নয়ন সফল করুবাে? যদি
রাণী রমাবতীকে পাই তা হলে, নারায়ণ, রাজ্যৈশ্বৰ্য্য কিছুই চাই না।
মরি! মরি, মরি, কি কমনীয় কান্তি ! কি ভ্রমরকৃষ্ণ আকর্ণ
– যুগল, কি দোদুল্যমান কৃষ্ণকুঞ্চিত কেশদাম, পিয়াসা
পিয়াসা–দারুণ পিয়াসা। রমাকে পেতে যদি সর্বস্বান্ত হতে
হয়—এমন কি ধৰ্ম্মে জলাঞ্জলি দিয়ে আজীবন নরকে থাকতে হয়,
সেও স্বীকার, তবু তাকে ছাড়বে না। আজ রাত্রেই তার উপায়
করবাে। যেমন করে পারি, এমন কি প্রাণ পণেও রমার লাভ
করবে। কেও ?
(প্রসন্নর প্রবেশ )
প্রসন্ন। আ পােড়া কপাল আর কি-চিন্তে পারছো না ?
দর্প। প্রসন্ন, কি কলে প্রসন্ন? শীঘ্র বল। শীঘ্র বল; বড়
পিপাসা। সতৃষ্ণ নয়নে তােমার প্রতীক্ষায় পথ পানে চেয়ে
আছি। বল প্রসন্ন, কি হল?
প্রসন্ন। ঐ কি বলে, আমার বক্সিস্ ?
দর্প। তুই যা চাইবি তাই দিব। এমন কি, এই বিশাল রাজ্য
তাের পায়ে সমর্পণ করবাে। বল প্রসন্ন, কি হল ?
প্রসন্ন। ঐ কি বলে, তুমি যে কাটা পাঁঠার মত ধড়ফড় কচ্ছ।
ঐ কি বলে, তার জন্য এত ব্যস্ত কেন গাে? ঐ কি বলে, আমার
বক্সিস্?

রমাবতী। দর্প। প্রসন্ন, আজ যে সুযােগ পেয়েছি, এমন সুযােগ আর পাব না। যে সময় বয়ে যাচ্ছে, সে সময় আর ফিরবে না। প্রসন্ন, আর আমার সন্দেহে রেখাে না। প্রসন্ন। আর ছটফট করো না। তোমায়, ঐ কি বলে, নিতে এসেছি, চল। দর্প। প্রসন্ন, প্রসন্ন ! তােমার পায়ে পড়ি, সত্য বল । প্রসন্ন। হ্যা গাে আমি রাণীমাকে, ঐকি বলে, বলুম যে মহারাজা দেওয়ান মহাশয়ের বড় বশ ; তাকে বুঝিয়ে পড়িয়ে, ঐ কি বলে, পাঠিয়ে দেও, এখনই ধরে আনবে। তাই রাণী মা তােমায় ডেকেছেন। ঐ কি বলে, আমার বক্সিস্? দর্প। চল প্রসন্ন চল, আজ তােমায় আশাতীত পুরস্কার দিব। পুরস্কার দিয়েও তােমার ঋণ পরিশােধ করতে পারব না। ( উভয়ের প্রস্থান) (দীনু ও শান্তশীলের প্রবেশ ) শান্ত। উঃ কি ঘােতর ষড়যন্ত্র ! ভগবান, তােমার বজ্র কোথায় ? হায়, হায়, এখন উপায় কি করি ? দীনু তাের এত জ্ঞান, তােকে পাগল কে বলে ? যে বলে সে নিজে পাগল। আমাকে এখানে এনে কি কাজই করেছিস, দীনু, নচেৎ- অসূৰ্য্যম্পরূপা মহারাণীকে একটা বিশ্বাসঘাতক ভৃত্যের • দ্বারা কি অপমানিতই হতে হতো। ও কি ভয়ানক। কি ঘৃণিত ব্যাপার! যার অন্নে প্রতিপালিত, যার অন্নদাস

রমাবতী।
তারই সর্বনাশে কৃতসংকল্প। সংসার কি ভয়ানক স্থান! এ
সংসারে যেন আর কেউ কাকেও বিশ্বাস না করে। ধৰ্ম্ম, তুমি
কোথায়? এই নর পিশাচের লােমহর্ষণ ব্যাপারে কি তুমি, অন্তহিত
হয়েছ ? হে মধুসূদন ! তুমিই একদিন জগৎ সংসারে প্রকাশ
করেছ ;-
“পরিত্রাণায় সাধুনা বিনাশায় চ দুস্কৃতাম্
ধৰ্ম্ম সংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে
কোথা আছ দয়াময়! একবার অবতীর্ণ হও। একবার এসে
বিশ্বাসঘাতক নরপিশাচের দারুণ কবল হতে আমার সতী জননীর
মৰ্য্যাদা রক্ষা কর। নচেৎ, তােমার বেদ বিধি অতল জলে ডুবে
যাবে। তােমার নামে কলঙ্ক স্পর্শ করবে। হরি হে ! তােমার
যে কর-কমলবরে নখােদ্ভুত শৃঙ্গ দ্বারা হিরণ্যকশিপুর বক্ষ বিদীর্ণ
করে রুধির পান করেছিলে, যে ক্ষত্রিয় রুধির প্লাবনে সংসার হতে
পাপ তাপ বিদূরিত করেছিলে, সেই মূৰ্ত্তি ধরে একবার এস মধু-
সূদন! এসে এ নারকীয় কীট দর্পনারায়ণের দর্প চূর্ণ কর। দী
বল, বল, একবার জয় জগদীশ হরে !!!
(প্রস্থান)
৩২

দ্বিতীয় দৃশ্য।
•
অন্তঃপুর
রাণী-( উপবেশনে)
ভগবান, দাও মতি পতিরে আমার,
যাহে গৃহে আসি পিতার চরণে মাগি ক্ষমা,
সুখে রহে শান্তির আশ্রয়ে।
কি আছে অসাধ্য তব ? কেন তবে দাসীরে কঁদাও ?
জীবের উদ্ধার হেতু গৌরাঙ্গের বেশে
দেশে দেশে হরিনাম ঢালি,
পতিতে করিলে তুমি দয়াতে উদ্ধার
শিষ্যরূপে যােদার পদপ্রান্ত করিয়া ধারণ
শিখায়েছ ভক্তি কোমলতা ;
গুরু মুৰ্ত্তে, রত্নাকরে পাপ পথ হতে,
উপদেশ মন্ত্র প্রাণে ঢালি
জ্ঞান মার্গে করিলে প্রেরণ।
তােমার কৃপায় বিশ্বরূপ,
চোর রত্নাকর আজি ধাৰ্মিক প্রধান ;
ব্যোম ব্যাপি তার যশােগনি,
গীত হয় ভারতের প্রতি ঘরে ঘরে ।
বায়ু-লগ্ন জলকণা সম,
গ ।
.

রমাবতী
অনন্ত বিশ্বের পটে অনন্তে মিশিয়া সৰ্বময়,
তুমি হরি করিছ বিরাজ।
শ্যামল বিটপি কুঞ্জে, অগাধ সাগরে
অথবা ভূধর শৃঙ্গে, চির মরুমাঝে,
খেলিতেছ তুমি দেব, রঙ্গে অবিরাম,
অলক্ষে ভবের খেলা, দেখ দিবারাতি ;
শক্তিধর অসাধ্য কি আছে চরাচরে ?
জগবন্ধু, জগন্নাথ, হে রাধাবল্লভ,
কোটী কোটী নমস্কার চরণে তোমার,
প্রণাধারে দাও দেব, সুমতি ভকতি---
পথ প্রদর্শক হও জটিল সংসারে।
( প্রসন্নর প্রবেশ )
প্রসন্ন। ও রাণী ঠাকরুণ, আর কাঁদছ কেন, ঐ কি বলে,
দেওয়ানজি এসেছেন। তাকে বুঝিয়ে পড়িয়ে পাঠিয়ে দেও, এখনই
রাজাকে ধরে আন্‌বে। ঐ কি বলে, তাকে ডাক্বব ?
রাণী। আচ্ছা ডাক।
(প্রসন্নর প্রস্থান।)
দয়াময়, বড়দায়ে ঠেকেছি, তাই লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে
দর্পনারায়ণের সম্মুখে বাহির হতে বাধ্য হলেম। যুবরাজ দেওয়া-
নকে ভালবাসেন, বিশ্বাস করেন, তার কথা ঠেলতে পারবেন না
তাই দেওয়ানকে ডাকিয়েছি, আমার স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে তার
-
৩৪

রমাবর্তী।
হাতে ধরে বিনয় করে বলব। রাধাবল্লভ, এতে যেন আমার কোন
দোষ স্পর্শ না করে।
(দর্শ ও প্রসন্নর প্রবেশ।)
প্রসন্ন। এই নিন্ রাণী মা–ওই কি বলে, দেওয়ানকে নিন্।
( প্রস্থান।)
রাণী। আপনি আমার স্বামীর বন্ধু, সুতরাং আমার পূজনীয় ;
আজ সেই সাহসেই আপনার সঙ্গে লজ্জা বিসর্জন দিয়ে কথা
কইছি ; তাতে অপরাধ গ্রহণ করবেন না। আজ আমার একটি
প্রার্থনা রক্ষা করুন ; আমার স্বামী যে অবধি মৃগয়ায় গেছেন, সে
অবধি প্রাণ বড়ই ব্যাকুল। আপনি আমার স্বামীকে এনে দিন।
এই উপকার করে আমার মৃতদেহে প্রাণদান করুন।
দর্প। তুমি তার জন্য ব্যাকুল, কিন্তু সে তােমায় চায় না।
তুমি তার দু’ চক্ষুর বিষ। তবে কেন তার জন্য ব্যাকুল হচ্ছ ?
রাণী। এ পােড় অদৃষ্টের দোষে যদি তিনি আমায় বিষ নয়নে
দেখেন, তা বলে আমি কেন আমার কর্তব্য কর্মে ত্রুটি করবাে?
আপনি আমার স্বামীকে এনে দিন।
দর্প।
সে আসবে না। সে আবার বিবাহ করবে বলেছে ;
তখন কেন তার জন্য ভেবে দেহপাত কবৃছ ?
রাণী। যদি তিনি পুনরায় বিবাহ করে সুখী হন, তাতে
আমার অনন্দ বই দুঃখ নাই, কারণ তার সুখেই আমার সুখ।
নববধু আমার ভগ্নীর স্বরূপ হবে, তাকে আদর করূবে, সােহাগ
কবো, তাতেই আমার অপার আনন্দ।
.

রমাবতী।
;
দর্প। তােমর স্ত্রীজাতি, স্বভাবতই দুর্বল। আমার কথা শুন,
তার চিন্তা ছেড়ে দাও।
রাণী। আপনি এসব কি বলছেন?
দর্প। আমি যা বছি স্থিরভাবে চিন্তা কর, তাহলে বুঝতে
পারবে।
রাণী। কি, স্পষ্ট করে বলুন।
দর্প। রমা, রমা (হস্তধারণ )
রাণী। দূর হ’ নরাধম ! (হস্ত ছাড়াইয়া লওন )
দর্প। রমা, যে তােমায় চায় না তার সাধনা কেন? আমায়
ভালবাস, তাহলে আদর, সােহাগ, এমন কি এ অমূল্য প্রাণ পৰ্য্যন্ত
তােমার পায়ে সমর্পণ করবে ! বল রমা ! হৃদয়েশ্বরি, বল তুমি
আমার হবে ?
রাণী। এত স্পর্ধা! সামান্য ভৃত্য হয়ে এত স্পর্ধা বাক্য।
যে দূর থেকে অবনত মস্তকে আজ্ঞা প্রতিপালন করে, তার পদতলে
মােহনপুর রাজরাণী সৰ্বস্ব সমর্পণ করে কুল, মান, ধৰ্ম্ম খােয়াবে,
এই আত্মধ্বংসকারী বাসনা কে তাের মনে জাগাইল নরাধম ?
স্বামীর বন্ধু হয়ে, বিশ্বাসী ভৃত্য হয়ে, তাের এ কি ব্যবহার? তুই
আমার সম্মুখ হতে এখনি দূর হ’।
দর্প। তবে শােন রমা। তুমি যার জন্য এত ব্যাকুল, তাকে
আর ইহজগতে দেখতে পাবে না। তার সঙ্গে ইহ জীবনে মিলন
আশা আজ হ’তে জলাঞ্জলি দাও। তবে কেন এত গর্ব ? অহঙ্কার
ত্যাগ
নররাজ মহারাজ দর্পনারায়ণের প্রণয়পাত্রী

রমাবতী। হও, পরম সুখে বাস করবে, নচেৎ তােমার দুর্গতির সীমা থাকবে না। রাণী। যে মন্দিরে বহুআরাধনা করে, বহুতপস্যা করে, দেবমূর্তি স্থাপন করেছি, সেই পবিত্র মন্দিরে, হেয় পদলেহী কুকুর মুর্তির প্রতিষ্ঠা করূবাে? নিজের ধ্বংসের জন্য এ স্বপ্ন কোথায় দেখলি নরাধম ? আমার জীবন-সৰ্বস্ব মানসিংহ আমার হৃদয় মধ্যে প্রতিষ্ঠিত দেবমুর্তি। অকৃতজ্ঞ ভৃত্য, তুই কোন তুচ্ছ ! যদি ভগবান স্বয়ং উপযাচক হন, তবু তিনি এ হৃদয়ে মানসিংহের স্থান অধিকার করতে পারবেন না। যদি প্রাণেশ্বরের দেখা ইহজীবনে না পাই,তথাপি দেখবি নরাধম, যতদিন দেহেপ্রাণ থাকবে ততদিন সেই প্রতিষ্ঠিত মুৰ্ত্তির অর্চনা করে জীবন সার্থক করবো। যদি আমার স্বামী দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করেন, আমাকে গৃহ হতে দূর করে দেন, আমার নামে ধিক্কার দেন, তবু যতদিন জীবিত থাকবে, ততদিন সেই মুক্তি ভিন্ন অন্য মুৰ্ত্তি এ হৃদয়ে স্থান পাবে না, সেই চরণ ভিন্ন অন্য চরণ সেবা কবে না। দর্প। এখনও বলছি সম্মত হও, নচেৎ অপমানিত হয়ে সম্মত হতে হবে। রাণী। সাবধান নরাধম! যদি আমি সতী হই, স্বামীপদে যদি আমার ঐকান্তিক ভক্তি থাকে, সংসারে ধৰ্ম্ম থাকে, তাহলে কার সাধ্য আমার ধৰ্ম্মনষ্ট করে ? পাপিষ্ঠ ! তাের নয়কের ভয় নাই ? ধর্মাধর্ম জ্ঞান নাই ? প্রভু-পত্নীর উপর অত্যাচার। পাপপুণ্য ধৰ্ম্মাধর্ম সকলি বিসর্জন দিয়েছিস? ৩৭ রমাবতী দর্প। পাপপুণ্য, ধর্মাধর্ম তােমার জন্য সব বিসর্জন দিয়েছি। জন্মজন্মান্তর নরকের কীট হয়ে অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করবে, তথাপি যে উপায়ে পারি, আমার অভিলাষ পূর্ণ করূতে সঙ্কুচিত হব না। স্বয়ং ভগবান এলেও আমায় নিরস্ত করতে পারবেন না। যদি সহজে সম্মত না হও, বলপ্রয়ােগ করুবাে। এত স্পর্ধা! আমার গৃহে আমার অপমান। সাবধান। নতুবা রাজদণ্ডে প্রাণ হারাবি। দর্প। গর্বিত রমণী, এত অহঙ্কার ? রাণী। (রাণীর অঞ্চল ধারণ ও বলপ্রয়োগ।) রাণী। নরাধম । বিশ্বাসঘাতক। ভৃত্য হয়ে আমার অঙ্গ- স্পর্শের আকাঙ্ক্ষা ! স্বর্গে কি ভগবান, নেই ? দণ্ডের কি ভয় নেই ? দর্প। দেখি আজ তােকে কে রক্ষা করে ? দেখি তোর সতীত্বের অহঙ্কার কোথায় থাকে ? ( বল প্রয়ােগ।) রাণী। জনার্দন! কৃপাময়! রক্ষা কর। আর আমার কেউ নাই। দয়াময়! তুমি দুঃশাসনের হাত থেকে দ্রৌপদীর মান রক্ষা করেছিলে, দশাননের অত্যাচার থেকে জানকীর সতীত্ব রক্ষা করেছিলে ; তুমি অনাথার নাথ, অসহায়ের সহায়, অনাথবন্ধু, রাধাবল্লভ, এই পিশাচের করাল কবল হতে তােমার অধম 'কন্যার মর্যাদা রক্ষা কর। গােবিন্দ হে! কোথায় তুমি ? করুণাময় ! রক্ষা কররক্ষা কর।

রমাবতী।
( শান্তশীল ও দীনুর প্রবেশ।)
শান্ত ও দী। মা, মা! স্থির হও; মা-মার-কুলাঙ্গারকে
মার—বিশ্বাসঘাতক নরপিশাচকে মার। (দর্পকে প্রহার।)
শান্ত। এই কি রে কলির বিচার? এই কিরে যুগ-ধৰ্ম্ম ?
দেবােপম যেই প্রভু,
পিতার আদেশ ঠেলি করিলরে কত উপকার,
অনন্ত বিশ্বাস ঢালি যে করিল বিশ্বাস স্থাপন,
তার কিরে এই পুরস্কার ?
যার অন্নে গঠিত শরীর,
ধমনীতে প্রবাহিত শােণিতের কণা
সাক্ষ্য দেয় প্রভুর করুণা ;
তার অগােচরে, প্রভুপত্নী অসহায় দেখি,
পশিয়া রাক্ষসরূপে অন্তঃপুরে তার,
নিরমল কুলে, মাখাতে কলঙ্ক কালি পিশাচ প্রয়াস ।
দূর হ’রে নরাধম, পশুর অধম,
বিশ্বাসঘাতক, চোর, লম্পট-অগ্রণী।
( দৰ্পের প্রস্থান)
রাণী। বাবা, বৃক্ষা কর, রক্ষা কর।
শান্ত। আর ভয় কি মা! তােমার সন্তান থাকতে তােমার
ভয় কি মা ! যতদিন তােমার অন্নগঠিত শরীরে এক বিন্দু রক্ত
থাকবে, ততদিন প্রাণপণে তােমদের হিত কামনা কবাে, মা
শান্ত হন।

রমাবতী।
রাণী। শান্ত, দী! তােমাদের কৃপায় আজ আমার মান
রক্ষা হ’ল। আজ অবধি জালেম, বাছা, তােমরাই রাজার যথার্থ
হিতাকাঙ্ক্ষী।
শান্ত। কৃপা কি না? এ যে আমাদের কর্তব্য। দীনু! রাণী
মাকে তুমি সুরক্ষিত স্থানে নিয়ে যাও। দর্পনারায়ণকে, কে কে
সহায়তা করেছে তা দেখতে হবে।
( দীনুসহ রাণীর প্রস্থান)
কি অদ্ভুত ব্যাপার ! যার অন্নে প্রতিপালিত, যার কৃপায় রক্ষিত
তারই সর্বনাশ! ভগবান! এর কি প্রায়শ্চিত্ত নাই ?
( প্রসন্নর চুলের মুঠি ধরিয়া টানিতে টানিতে দীনুর প্রবেশ)
একি! এও ষড়যন্ত্রের মধ্যে আছে নাকি ?
দীমু। লম্বা ডুরি ছেড়ে দিয়ে—দ্যাথে কারখানা।
মেঘের পাশে মুচকি হাসে তাও কি জান না?
প্রসন্ন। দোহাই বাবা! আমি কিছু জানি না। দোহাই
বাবা, আমার নামে রাজার কানে, ঐ কি বলে, কিছু লাগিও না।
তােমাদের, বাবাঠাকুর, ভাল করে মিষ্টি খাওয়াব।
শান্ত। বেটি ! তুমিও এর মধ্যে আছ—তাত জাতেম না।
প্রসন্ন। দোহাই বাবাঠাকুর ! আমার চৌদ্দপুরুষ, ঐ ফি বলে,
এর কিছু জানে না। কোন্ চোক্‌-খাকী, কোন্ গতর-খাকী,
এর কিছু জানে বাবা! তােমায়, ঐ কি বলে, বড় বড় রসগােল্লা
খাওয়াব।
৪০
.

রমাবতী।
শান্ত।
দে বেটিনাকে খং দে।
প্রসন্ন। এই দিচ্ছি বাবাঠাকুর। এই দিচ্ছি। ওমা, কি
হবে গাে! পােড়ারমুখে দেওয়ানের পেটে এত ছিলো? তা
কে জানে মা ?
( নাকে খৎ দেওয়ন)
শান্ত। যা বেটি রাজবাড়ী থেকে এখনই দূর হয়ে যা, ফের
যদি তােরে দেখতে পাই, তা হলে কুকুর দিয়ে খাওয়াব।
প্রসন্ন। না বাবা, এই চলুম ! আর আমায় ত আমায়,
আমার গােবরে তােলা ছাঁচটি পর্যন্ত দেখতে পাবে না।
( প্রস্থাননাদ্যত ও উহাকে ধৃত করিয়া দী)
দী। মিষ্টি দেবার লােভ দেখিয়ে পালাও কেন ধন?
জল পড়ার ভূত নইক আমি ও কাল-বদন।
চল দীনু।
( প্রসন্নর ঘাড়ে ধরিয়া দীনু ও শান্তর প্রস্থান)
৪১

তৃতীয় দৃশ্য। বন-প্রান্ত শিবির (রাগের গীত) সবার চেয়ে ভালবাসি কান্না অভিমান। দিনের হাসি, জ্যোৎস্নারাশি হানে হৃদে বাণ। নীল আকাশে কাদম্বরী, তুষার ঘেরা নত গিরি, নােনা ধরা কোটাবাড়ী, দেখলে ঠাণ্ডা প্রাণ। ভরা নদীর হৃদয় তুফান, কুলবতীর আবেশ মাখা গান ; রােমে রােমে লাগছে যেন দোমে দোমে টান ; জলকণা আঁখির কোণে, গজমুক্তা হয়লাে মনে, (তার) নলিন আঁখির মলিন রেখা ঠাণ্ডা করে প্রাণ ; ওলে। ঠাণ্ডা করে প্রাণ। (অন্তর্ধান ) ( মানসিংহ ও দৰ্পের প্রবেশ ) ! মান- মান। কি। এত বড় স্পর্ধা? স্ত্রী অবিশ্বাসিনী সিংহের স্ত্রী অবিশ্বাসিনী। কখনও চক্ষে দেখিনি, স্বপ্নেও সন্দেহ করিনি। বিশ্বাস হয় না দর্প, বিশ্বাস হয় না। ৪২

রমাবতী।
দর্প। মহারাজ আমি আপনাকে যা বলছি তাতে বিন্দুমাত্র
সন্দেহ করবেন না। অন্য কেউ আপনার কাছে এ কথা বলতে
সাহসী হত না। কিন্তু মহারাজ! যখন আমায় বিশ্বাস করে
সমস্ত আমার হাতে নির্ভর করে গেছেন, তখন আমি এ সক
ব্যাপার কেমন করে গােপন করি ?
মান। তুমি স্বচক্ষে দেখেছ, না জনশ্রুতি ?
দর্প। মহারাজ, স্বচক্ষে দেখেছি। কি বলবাে? বলতে
রসনা জড়িত হয়। রাত্রি দুই প্রহরের সময় প্রসন্ন এসে সংবাদ
দিলে, আমি ব্র্যস্ত হয়ে বাতায়নের পার্শ্বে যেয়ে দেখলু, শান্তশীল
মান। দর্প! আর শুনতে চাই না। কিন্তু তােমায় দেখাতে
হবে; যদি না পার সমুচিত দণ্ড পাবে।
দর্প। মহারাজ! তার জন্য চিন্তা কি? আমার সঙ্গে
গােপনে আসুন, আমি সমস্ত দেখিয়ে দিব।
মান। আচ্ছা, তুমি এখন বিশ্রাম করগে। আজ রাত্রিতেই
আমি গােপনে যাত্রা কবাে।
( দৰ্পের প্রস্থান)
আজ বুঝলাম রমণীহৃদয় কুটিলতাময়। অধরে হাসিমাখা
সরলতা, অন্তরে হলাহল। পাপীয়সী রমা ! তাের বাচাতুৰ্য্যে
এতকাল মুগ্ধ হয়ে বিশ্বাস করেছিলুম্, তুই আমা ভিন্ন কিছুই
জানিস না ? এ সংসারে আমি তাের একমাত্র উপাস্য দেবতা।
ভ্রমেও বিশ্বাস করিনি, যে সৰ্ব্বদা স্বামীর মঙ্গলকামনায় নিরত,
৪৩

রমাবতী।
মুহুৰ্ত্ত বিচ্ছেদে দুঃখচিন্তায় অভিভূত, সে কখন পর-প্রেমে মুগ্ধ হয়ে
যথেচ্ছাচারিণী হতে পারে ? মূৰ্ত্তি ! কার মূৰ্ত্তি ? তুচ্ছ ভৃত্যের
ভৃত্য, পরান্নভােজী, দণ্ডে দণ্ডে পদ-তাড়িত, পর্ণকুটীরবাসী
নিঃসহায়, নিঃসম্বল, পাপাত্মা শান্তশীলের মূর্তি! ধিক্‌ রমা, তােরে
শতধিক্‌! আর যে এমন উচ্ছল পাপীয়সীর পাণিগ্রহণ করে,
প্রভাকর করােজ্জ্বল পবিত্রতাময় কুলে কলঙ্ক অর্পণ করেছে, তারও
জীবনে ধিক! শান্তশীল! আরে আরে শান্তশীল ! মানসিংহের
কুলে কালি দিয়ে তুই জীবিত থাকৃবি? এ মনের কোণেও স্থান
দিস্ না। রমা, হতভাগিনী-অবিশ্বাসিনী রমা ! তাের পতিকে
প্রতারণা করে তার চক্ষুশূল হয়ে কখনও জীবিত থাবিনি। ঘৃণা !
ঘৃণা! প্রতি নিশ্বাসে ঘৃণা! প্রতিপদক্ষেপে ঘৃণা ! এ ক্ষত্রিয়
জীবনে ঘৃণা! রাজবংশে ঘৃণা, রমণীকুলে, ঘৃণা, ঘৃণা-ঘৃণা-
অসহ্য ঘৃণা।
( দীর প্রবেশ)
দী। রাজা, করছ কি মন্ত্রণা,
পরের কথায় মেরে বউ, পাবে যাতনা।
এমন কাজও করাে না।
মান। দীনু সত্য বল, জান কি, রমা সতী রমণী ? না, কুলটা
ঘৃণা, যথেচ্ছাচারিণী ? জান যদি সত্য বল।
দী। সীতার মত রাণী তােমার ভাসিও না জলে
শুনকথা, যাবে ব্যথা, দীননাথ যা বলে।
৪৪

রমাবতী। মান। উন্মাদের কথার কি মূল্য! নিশ্চয় অবিশ্বাসিনী। দর্প যা বলছে কখন সে কথা মিথ্যা নয়। দীমু। দেখে শুনে কর কাজ। হার জিত নাহি লাজ । এ কথা যদি মিথ্যা হয়। দীননাথ তার বাপের নয় । মান। ভাল, সেই ভাল। স্বচক্ষে দেখবাে, তার চরিত্র স্বচক্ষে পরীক্ষা করবো, মনের সমস্ত সন্দেহ ঘুচাবো, তার পর প্রতিকার ; তারপর প্রায়শ্চিত্ত। যাব, এখনি যাব—যাতন- মৰ্ম্মভেদী যাতনা । ( প্রস্থান) (দীনুর গীত) দম দাদে ,-না-না। ভবে সবে বুঝে চল না। কোথাও লতাপাতা ফুল পরিপাটী, তার তলাতে কেউটে সাপ চায় মিটিমিটি, শােভায় ভুলে সেথায় গেলে তুলবে পটল জান না। কোথাও বালির ঘর, উপরটি তার চিকন চাকন, মরি কি সুন্দর। যােকাচ্ছলে সেথায় গেলে, চটকে দিবে প্রাণখানা। ( প্রস্থান) ৪৫

চতুর্থ দৃশ্য।
রাজবাটী সংলগ্ন রাজপথ
( গ্রাম্য বালিকাগণ)
বিদু। আর শুনেচি বােন্?
মধু। কি হয়েছে লাে?
সরসী। চুড়ীর কি বুকের পাটা, আমরা গেরস্ত ঘরের মেয়ে
আমাদের অত সাহস নাই।
মধু। বলনা সরসী দিদি, কি হয়েছে ?
মতি। আর কি হয়েছে। কার পেটে যে কি আছে বােন
কিছু বােঝা যায় না। গেরস্ত ঘরে হলে কি আর কিছু বাকী
থাকত ? পােড়ারমুখীকে বঁটায় বিষ ঝেড়ে দিব।
মধু। আরে মলাে, আগে কি হয়েছে বল না, তারপর বেঁটায়
বিষ ঝাড়ি।
সরসী। রাজরাণী—রাজার বউ, পোড়া কপাল আর কি, দুধ
ক্ষীরে অরুচি হয়ে পচা ঘােলে সাধ ! গলায় দড়ি ।
মধু। মর পোড়াকপালী, কি হল জিজ্ঞাসা করে করে গলা
ভেঙ্গে গেল তবু কথাটা কি, বলিনি
সরসী। তুই শুনিনেই ? আ কপাল!
৪৬
?

রমাবতী।
মতি। তুই ছিলি কোথায় চুড়ি ? সহর শুদ্ধ গােল-আর
তুই জানিসনি?
বিদু। বাঘের ঘরে ঘােঘের বাসা, মা!—রাজা টের পেলে
সব ফরসা করে দেবে।
মধু। আরে মলো! বা ছাই।
সরসী। আর শুতে বাকী থাকবে কি না? কুলটার ঢাক
বেজে গেছে, তখন আর কতক্ষণ?
মধু। তাের পায়ে পড়ি দিদি, বল কি হয়েছে ?
সরসী। ওলল পশু রাণীর বিদ্যে বেরিয়ে গেছে।
মতি। রাণীর নয় লো—দেওয়ানের।
বিদু। না, লো না, রাণীতে আর দেওয়ানে-
মধু। কি করে এমনটা হলাে ?
বিদু। শুনি নেই? রাণী নাকি তাকে দিন দিন আনতে,
এনে চোরকুঠুরিতে লুকিয়ে রাখতো।
সরসী। তবে সবই জানিস্ আর কি। আমি নাজিরের
মেয়ের কাছে এখনি শুনে আচি। শান্তশীলের সঙ্গে তার ঘটনা
হয়েছে।
মতি। থা—থা! কিছু জানিনি? রাণী শুয়েছিল, আর
দেওয়ান সেই সময় তার ঘরে ঢুকেছিল।
মধু। বেশ তাই হ’ল। নে আর পথের মাঝখানে ঝগড়া
করিনে। কে কোথায় শুবে। রাজার কাণে যাবে, বড় ঘরের
বড় কথা—তাের আমার দরকার কি? আয় একটা গান গাই
৪৭

মাতা।
গীত
বয়লাে সুখে মলয় বায়।
তালে তালে কোকিল বধু লতার আড়ে গায়,
কাল জল নাচে ধীরে, রবি ছবি সােহাগ করে,
যেন মণি মালা গলে পরে, প্রণয় বিলায়।
( প্রস্থান)
পঞ্চম দৃশ্য।
অন্তঃপুর সংলগ্ন রাজোদ্যান
(দর্প, ফকির ও ফটিকের প্রবেশ)
দর্প। ভাই! মহারাজ গােপনে আমার বাড়ীতে আছেন।
তাকে বলেছি, শান্তশীলের সহিত রাণীর অবৈধ সম্বন্ধ স্থাপিত হয়েছে,
মহারাজও বিশ্বাস করেছেন। তবে তিনি এ ব্যাপার চাক্ষুষ
দেখতে চান।
তা হলেই ত ঘােল খাওয়ালে ?
দর্প। তার ভাবনা কি ? তুমি এক কাজ কর—শান্তশীলকে
মহারাজের নাম করে উদ্যানে ডেকে আন।
দর্প। আমি এদিকে ঠিক করেছি, শান্তশীল এখানে উপস্থিত
হলে পরিচারিকা রাজার নাম করে রাণীকে বাতায়নে ডেকে দেবে ;
ফটিক।
৪৮

রমাবতী।
শান্তশীল উদ্যানে, আর রাণী বাতায়নে থাকবে। সেই মিলন
একবার মহারাজকে দেখাতে পারলে আর কিছুই চাই না।
ফকির। উহু, হুহু, (কম্প।)
দর্প। ও কি হল ?
ফকির। দেওয়ান মশায়। আমার কম্প এল।
দর্প। সে কি ? হঠাৎ ?
ফকির।
হঠাৎ নয়, হৃৎকম্প আজ কদিন থেকে হচ্ছে।
আজ দেখছি গা-কম্প। মশায়, আমার শরীর খারাপ।
দর্প। বুঝেছি, কিন্তু ফকির এ কাৰ্য্য না করলে রাজ্য লাভের
পথ নিষ্কণ্টক হবে না। রাণী থাকতে, রাণীর আত্মীয়-স্বজন, সহায়
থাকতে, আমাদের সমস্ত চেষ্টা, সমস্ত উদ্যম পণ্ড হবে। ভাই।
এতদূর অগ্রসর হয়ে আর পশ্চাৎপদ হয়ােনা। রাজ্য তােমার
করায়ত্ত—মঙ্গলঘট পদাঘাতে ভেঙ্গ না।
ফকির। আপনার কথা বুঝেছি, কিন্তু বুঝেও ত কম্প
আটকাতে পারছিনা? দোহাই দেওয়ান মশাই! ঐ কাজটী
আমি করতে পারব না। আমায় পক্ষাঘাতে ধরূবে।
দর্প। তা না করলে ত আমাদের কামনা সফল হবে না ? যেমন
করে হ’ক মানসিংকে সহায়হীন করা চাই। যদি কখনও সে
আমাদের গুপ্ত মন্ত্রণ জানতে পেরে আমাদের বিপক্ষ হয়, তখন
যাতে সে স্বপক্ষে শ্বশুরের নিকট কিংবা অন্য কোনও স্থান থেকে
সাহায্য না পায় তার পথ আগে বন্ধ করতে হবে। ভাই, রাজ্য
চাও ত হিতাহিত, ন্যায় অন্যায় বিচারে জলাঞ্জলি দাও। সংসারে
৪৯

রমাবতী।
কারও চক্ষুর জলে ভুলনা; মায়া মমতা যেন হৃদয়ে স্থান পায়
। যদি ধনধান্যপূর্ণ এ বিশাল রাজ্যের অধীশ্বর হতে চাও,
যদি মানসিংহের অত্যাচারের প্রতিশােধ নিতে চাও—তাহলে ভাই
আমার কথা শােন। আমার উপদেশ অনুসারে কাৰ্য কর, অচিরে
রাজ্যলাভ হবে। রাজ্য। রাজ্য—বিশাল রাজ্য!'
ফটিক। বলেন কি, রাজ্য। রাজ্য—বিশাল রাজ্য। পান্তুয়ার
মত তাকিয়া, মােহনভােগের মত বিছানা, তাও কি ছাড়া যায়?
ঠিক বলেছেন দেওয়ান মশায়। রাজ্য চাই।
আগে রাজ্য।
তারপর জান্। আমি প্রস্তুত আছি, দেওয়ান মশাই।
ফকির। (স্বগতঃ ) আমলে শালা বলে কি? রাজ্যটা একা
ভােগা দেবে নাকি ? এত করে শেষে রাজ্যটা হাত ফসকে যাবে?
শালা বড় কথাই বলেছে, পান্তুয়ার তাকিয়া, মােহনভােগের বিছনা!
আহা! ও শালা রাজা হবে আর আমি যেমন ফকির তেমনই
থাকবাে। বাবা তা হচ্ছে না, দুধসাগরে ক্ষীরের ঢেউ
( প্রকাশ্যে ) আমার কম্প সেরে গ্যাছে দেওয়ান মশাই। এই দেখুন
আপনার কাজ করবার জন্য ছট ফট্ করছি
দর্প। তবে ফকির আর ক্ষণকাল বিলম্ব করােনা ; যাও শীঘ্র
যাও, শান্তশীলকে নিয়ে এস।
ফকির। নিশ্চয় খাজা, গজা, মতিচুর,
যেন দুধসাগরে
ক্ষীরের ঢেউ।
(প্রস্থান)
দর্প। যাও ফটিক, তুমি সতর্ক হয়ে রাজপথ রক্ষা কর,
যেন কেউ এখানে দাঁড়াতে না পায়। (ফটিকের প্রস্থান)
?
6

রমাবতী দর্প। রমা তাের এত অহঙ্কার! এত গর্ব। ঘৃণায় দর্প- নারায়ণকে পদাঘাত করতে উদ্যত হয়ে যে বিষের আগুন জেলে দিয়েছি সেই প্রদীপ্ত হতাশনে দগ্ধ হয়ে ভস্মীভূত হবি। আমি পুরুষ, দুৰ্বলাবালার তেজ, গর্ব, তার নিকটে বালুকার প্রাচীর মাত্র। রমা, গর্বিত রমা, দ্যাখ তাের কি দুর্দশা করি। যার সহায় বলে উত্তেজিত হয়ে ধরা শরা জ্ঞান কতিস, যে গরিমায় আমার আশা নিৰ্ম্মল করে অবমাননা করেছি, আজ তাের সে তেজ, সে সহায় হরণ করে, :ঘাের বিপদ সাগরে তােকে নিমগ্ন করুবাে। রমা । পুড়ে মরু, পুড়ে ম। নচেৎ দর্পনারায়ণের শান্তি নাই। (প্রস্থান) (শক্তির প্রবেশ) শান্ত। মহারাজ কখন্ এলেন; কেন এস্থানে আসতে আদেশ দিলেন, কিছুই বুঝতে পারছি না। সেই রাত্রি অবধি দর্পনারায়ণও নিরুদ্দেশ। সে যেরূপ ভয়ঙ্কর ব্যক্তি, তাতে তার অসাধ্য কিছুই নাই। তারই কি কোন কারসাজি ? আর এতেই তার কারসাজি কি খাবে? এখানে এলুম, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি, তারপর যদি মহারাজের দেখা না পাই, চলে যাব। (রাণীর বাতায়ন সম্মুখে দণ্ডায়মান ) শাশীল। মা, শুছি রাজা এসেছেন। দেখা হয় কিনা মা? রাণী। না, বাবা, কোথায় তিনি? একবার ডেকে দাও। (বাতায়ন হতে রাণীর প্রস্থান)

রমাবতী।
( মানসিংহ, দর্প, ফটিক ও ফকিরের প্রবেশ।)
মান। তবে রে বিশ্বাসঘাতক নরপিশাচ! আমার অম্নে
প্রতিপালিত হয়ে আমারি সর্বনাশ!
শান্ত। মহারাজ । একি! বিনা অপরাধে আমার প্রতি
এরূপ ব্যবহার কেন ?
দর্প। মহারাজ, ওর কোন কথা শুনবেন না। ও বড়
শয়তান। কুলাঙ্গারের প্রাণ বধ করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করুন।
মান। নির্লজ্জ, এখনও তাের মুখে বাক্য স্ফুরণ হচ্ছে ?
এখনও বলছিস্ নিরপরাধী? স্বচক্ষে যে কাৰ্য্য দেখলুম তারও
প্রতিবাদ করূতে সাহসী হচ্চি। বিশ্বাসঘাতক! তুই কি মনে
করি যে তাের মত আমার চক্ষুও বিশ্বাসঘাতকের কাৰ্য্য করূবে?
শান্ত। মহারাজ! বুঝেছি দুরাত্মা দেওয়ানের কৌশলে
আজ আমার এই দুর্গতি।
দর্প। কি পাষণ্ড, নিজের দোষস্থালনের জন্য আমার উপর
দোষারোপ ? মহারাজ! পাপাত্মার সহিত অধিক বাক্যব্যয়ে
আপনার পবিত্র রসনা কলুষিত করবেন না। বধ করুন।
মান। শান্তশীল। আর কেন আত্মগােপন ? যদি নিজের
প্রাণ চাও, যদি নিষ্কৃতি চাও, তা হলে সমস্ত কুথা প্রকাশ করে বল।
ফটিক ও ফকির। মহারাজ! আর কেন ? কাজ শেষ করে
ফেলুন।
দর্প। সেই কথা ভাল। ও মাথামুণ্ড কত কি বলবে,
অপরাধীর কথা কবে বিশ্বাসযােগ্য ?

রমাবতী।
শান্ত। প্রাণ যায় ক্ষতি নাই। মানের কাছে প্রাণ অতি
তুচ্ছ! মহারাজ! সেই মান যখন গেল, তখন এ জীবনে আর
ফল কি? জীবীত থেকে চিরদিন পুড়ে মরা অপেক্ষা এখনই প্রাণ
বধ করুন। আত্মার শান্তি হউক। কিন্তু ধরণীশ্বর ! বিশ্বাস
করুণ আর নাই করুন, চন্দ্র সূৰ্য্যকে সাক্ষি করে বলছি, ধর্মকে
প্রত্যক্ষ করে বলছি, শালগ্রাম হাতে দিন, স্পর্শ করে বলছি।
ফটিক। যা বলবি ব্যাটা বলে ফে। তাের আর ভাড়া-
মিতে কাজ নাই। কি সত্যবাদীরে ? তাের স্পর্শে শালগ্রামও
শিউরে উঠে।
শান্ত। ভগবানকে এই ধন্যবাদ দি যে, কখনও রাজপরি-
বারের অমঙ্গল চিন্তা মনােমধ্যে তিলার্ধের জন্যও স্থান পায় নাই।
আর নারায়ণের কাছে এই প্রার্থনা করি, যতক্ষণ দেহে প্রাণ
থাকে তিলেকের জন্য যেন সেই পিশাচভাবের উদয় না হয়।
মহারাজ! প্রাণ রক্ষার জন্য প্রাণের মমতায় বলি নাই; দোষ
হ’তে নিষ্কৃতি পাবার জন্য বলি নাই। বিশ্বাস করুন, আর
নাই করুন, এই মােহনপুরের রাজলক্ষ্মী আপনার পাট মহিষী
সতীশিরােমণি সাবিত্রীরূপিনী!
সাবিত্রীরূপিনী! চন্দ্রের কলঙ্ক আছে,
চরিত্রেরও কলঙ্কের কথা শ্রুত হয়, কিন্তু মহারাজ, পূৰ্ব জন্মার্জিত
বহু তপস্যার ফলে যে স্ত্রীর লাভ করেছেন, যার শান্তিছায়াস্পর্শে,
আপনি এতকাল সৰ্বমুখের অধিকারী, সেই মহাপুণ্যময়ী রমণীর
চরিত্র অতুলনীয়। সেই সতী রাণী আমার মা, আমি তাঁর
অধম পুত্র।

রমাবতী।
দর্প। ওঃ কি ভণ্ড! শুনে আমার আপাদমস্তক বলে
উঠলো। বেটা চোখে চোখে ধরা পড়লো—আর এখন ভণিতা
ফটিক। চোখ বলে চোখ ফুটি কানা নয়, রাত কানা নয়,
সূৰ্য্যিকানা নয় ।
ফকির। দিন কানা নয়, টেরা নয়, মান্ত্যাপড়া নয়,
ছানি পড়া নয়, টলে ঢলে অজ্বলে, ফ্যালফেলে এমন এমন
পেঁচার মত রাজার চোখ।
ফটিক। চোখ বলে চোখ,?
দর্প। বেটা কি মিথুক হে! ঝর ঝর করে মিথ্যা কথা
গুলো ঝরিয়ে দিলে, একটা ঢােক গিলে না।
মান। আচ্ছা, শান্তশীল, বল দেখি তুমি কি জন্য এমন সময়
এখানে এসেছিলে ? এখানে তােমার কি কাজ ছিল ?
ফটিক। মহারাজ! আর কেন ? কচক’রে গলাটা কেটে
দিন্ , টক্ করে মুণ্ডটা পড়ে যাক, চট করে কাজ শেষ হয়ে যাবে।
মান। আমার প্রশ্নের কি কোন উত্তর আছে ?
শান্ত। আছে, মহারাজ! আর বলবাে না। এ সময় বলে
আপনি বিশ্বাসও করবেন না। তা ছাড়া, অপরের নামে গ্লানি
কৰূতেও প্রবৃত্তি নাই। তবে এই পর্যন্ত বলতে পারি, আমি
বইচ্ছায় এখানে আসি নাই, আপনার নাম করে কারও দ্বারায়
আনিত হয়ে ছিলাম, এবং মহারাণীও বােধ হয় সেই কৌশলে
ঐ বাতায়ন সম্মুখে প্রেরিত হয়েছিলেন। মহারাজ! চক্র, ভয়ঙ্কর
৫৪

রমাবতী।
;
চক্র। আর আমায় প্রশ্ন করবেন না।
করলে উত্তর দিতে
পাবে না। মহারাজের বিচারে যথার্থই যদি আমি অপরাধী হই,
আমায় শাস্তি দিন, তাতে আমার কিছুমাত্র দুঃখ নাই।
দর্প। বেটা মিথ্যাবাদী! নরপিশাচ! নরপাংশুল !
শান্ত। ভগবান তােমায় সকল পাপ থেকে রক্ষা করুণ।
মান। তােমাদের অন্তরের ভাব তােমরাই যান, আর
জগদীশ্বরই জানেন; কিন্তু আমার চক্ষুকে অবিশ্বাস করুতে পারি
। এক্ষণে তােমার প্রতি এই আদেশ, অনতিবিলম্বে তুমি নগর
ত্যাগ কর। নচেৎ তােমার অমঙ্গল ঘটবে।
সে কি মহারাজ! গুরুতর অপরাধের এই কি
শাস্তি ? যদি আমাকে অপরাধী সাব্যস্ত করে থাকেন তা হলে
আমার প্রাণবধাজ্ঞা দিন—গুরুতর অপরাধের কি এই দণ্ড ?
মহারাজ! আমায় শাস্তি দিন, দণ্ড দিন। এই ধর্মের সংসারে যদি
আমি মহাপাপে লিপ্ত হয়ে থাকি তা হলে নারায়ণ! তুমি আমার
উপযুক্ত দণ্ড বিধান কর। আর এই দরিদ্র ব্রাহ্মণের সর্বান্তঃকরণ
নিঃসৃত আশীর্বাদে যেন মহারাজের চিরলক্ষ্মী চির অচল হয়ে সর্বদা
মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হিন্। মহারাজ। আমি আপনার অন্নদাস, এই
অন্নগঠিত শরীরে যতদিন প্রাণ থাকবে, ততদিন কায়মনােবাক্যে
মহারাজের মঙ্গল কামনা কবে। অধীন ভূতত্যর এই শেষ,
নিবেদন, কুচক্রীর কুচক্রে পড়ে আমার সতী জননীর অমৰ্য্যাদা
করূবেন না; তার মনঃপীড়ায় আপনার অমঙ্গল হবে। চাটুকারের
চাটুবাক্যে মােহিত হবেন না, দুৰ্বল মন সবল করুণ।
৫৫

রমাবতী।
মান। আমার সুমুখ থেকে চলে যাও। ভগবান এর বিচার
(প্রস্থান)
(দর্পনারায়ণ কর্তৃক শান্তশীলের গলায় হাত দিয়া দূরীকরণ )
সকলে। কাম ফতে! শান্তশীলের বিসর্জন, কাম ফতে।
ফটিক ও ফকির। খুব বুদ্ধির খেল যা হক, এর কাছে
টাকু মােড়ল, আত্মারাম সরকার কোথায় লাগে।
দর্প। হা হে! দর্প করতে নেই—দৰ্প করূতে নেই। আমার
এতে কি-তােমাদের পাঁচজনের আশীৰ্বাদ। আর এখানে থাকবার
প্রয়ােজন নাই, চল।
ফটিক ও ফকির। ব্যস্ বাবা! কাম ফতে! ক্যামজা, কাম
ফতে !
(প্রস্থান)
ষষ্ঠ দৃশ্য
অপুর
মান। শান্তশীলের কথা শুনে পৰ্য্যন্ত আমার হৃদয় ঘাের
সন্দেহে আচ্ছন্ন। নির্ভীক হৃদয়ে সে যা বলে, পাপীর মুখ হতে
এ সকল বাক্য কখন নিঃসৃত হয় না। তবে কি রমা অসতী
নয় ? তবে কি সে দ্বিচারিণী নয় ? তবে আজ একি দেখলেম ।

রমাবতী। রমা বাতায়নে, শান্ত উদ্যানে। কেন? কি জন্য ? কি অবােধ্য কারণ সমবায়ে উভয়ের সম্মিলন ? চক্র। শান্ত বল্লে চক্র! তবে তাই কি? সম্ভব। সে যে ভগবানের চেয়ে পবিত্র, সে কি কখন বিশ্বাসঘাতিনী হতে পারে? আমি যে তার সংসার, সম্পদ, ঐশ্বৰ্য্য, ঈশ্বর—আমি যে তার সুখে দুঃখে আশ্রয়-সে কি কথন আমায় ভুলে, আমার ভালবাসা পদদলিত করে, পরপুরুষ আসক্ত হতে পারে ? রমা কলঙ্কিনী ? অসম্ভব। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, এমন কি দেবতাদের মধ্যেও কলঙ্ক থাকতে পারে কিন্তু মা, কলঙ্কিনী নয়। রমা বিশ্বাসঘাতিনী নয় ; রমা ধৰ্ম্মরাজ্যের ঈশ্বরী রমা সতীশিরােমণি, রমা আমার হৃদয়মন্দিরের রাজরাজেশ্বরী। কে বলে দিবে, কে বুঝিয়ে দিবে, নারায়ণ বলে দাও, আমার রমা, যাকে প্রাণে প্রাণে হৃদয় বিনিময়ে ভাল বেসেছি, আমার যথাসর্বস্ব দিয়ে যার ছবি বুকে ধরেছি, একবার বলে দাও দয়াময়—সেই রমা কি দুশ্চারিণী কলঙ্কিনী ?—না আর্যাবর্তের উজ্জ্বলতম রত্ন সতীশিরােমণি ? ( রমার প্রবেশ) রমা। একি, মহারাজ, এ কি শুনলেম্ ? শান্তশীল নাকি নিৰ্বাসিত ? তােমর একমাত্র বন্ধু ; রাজ্যের একমাত্র হিতৈষী, সে নাকি রাজ্য হতে দূরীভূত? একথা কি সত্য? মান। (স্বগতঃ ) উঃ দুশ্চারিণী, শান্তশীলের জন্য উন্মত্ত । প্রকাশ্যে ) সম্পূর্ণ সত্য। ৫৭

রমাবতী।
রমা। কেন মহারাজ, তার অপরাধ কি ?
মান। তার যা অপরাধ—তােমারও সেই অপরাধ।
রমা। আমি তােমার কথা বুঝতে পারছি না। এ সব
কথা কি ? তােমারই বা এ ভাব কেন ?
মান। রমা, এখনও কি মায়ায় মুগ্ধ করতে চাও? যে
কুহক জাল বিস্তার করে এতদিন আমায় আচ্ছন্ন রেখেছিলে
তা’ ছিন্ন হয়েছে। আর প্রতারণা কেন ? যার প্রতিমা দেবীভ্রমে
এতদিন হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করে পূজা করেছিলাম আজ তাকে চিনেছি,
আজ সে প্রতিমা বিসর্জন দিয়েছি।
এ কি বলছ? আমি কুহকী ? প্রতারক? যে
তোমায় পেয়েছে সে কি কথনও প্রতারক হতে পারে ? তােমার
সংস্পর্শে যে পিশাচও দেবতা হয়।
মান। আর কেন রমা ? মায়াতে ভুলাতে আর পাবে না।
এতদিন রাক্ষসীর মায়াজালে আমার দৃষ্টি আবদ্ধ ছিল, এখন
আমার সে মােহন্ধকার ঘুচে গেছে।
রমা। তােমাকে ভালবাসা ভিন্ন অন্য মায়া শিখিনিতােমার
ধ্যান, তোমার চিন্তা, তােমার পূজা ভিন্ন অন্য ব্রত কখনও গ্রহণ
করিনি। দেবতা সাক্ষী—আজীবন কখন মিথ্যা কথা বলিনি, কখন
অসত্য ব্যবহার করিনি।
মান। তবে সত্য বল-বাতায়নে দাঁড়িয়ে শান্তশীলের সঙ্গে
কি কথা হচ্ছিল ?
রমা। ধৰ্ম্ম সাক্ষী, তােমার কথা ছাড়া আর কোন কথা
৫৮

হয়নি। তুমি আমায় ডেকেছিলে তাই সেখানে গিয়েছিলুম্। সে আমার পেটের সন্তান, তােমার যথার্থ বন্ধু। মহারাজ, তােমার পায়ে ধরি, তাকে নির্বাসন করো না। মান। (স্বগতঃ ) এত স্পর্ধা ; এখনও তার নাম। ( প্রকাশ্যে ) এতক্ষণে স্থির জানলুম, রমা তুমি পাপে ডুবেছ, পবিত্র কুলে কালি দিয়েছ, তােমার প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা ভগবান করবেন। আমি দণ্ডের ব্যবস্থা করে, জগৎময় কলঙ্কের ধ্বজা উড়িয়ে, পবিত্র মােহনপুরের ক্ষত্রিয়কুল অনপনেয় কালিমায় কলঙ্কিত করূতে ইচ্ছা করি না। ভগবান দণ্ডপ্রদাতা ; আমি নিমিত্ত মাত্র। কিন্তু যে কলঙ্কিনী , তার এ গৃহে স্থান হতে পারে না। রমা। আমি কলঙ্কিনী ? কারে কথা বলছ, মহারাজ ? মান। শুধু কলঙ্কিনী কেন ; তুমি বিশ্বাসঘাতিনী, দ্বিচারিণী। রমা। আমি বিশ্বাসঘাতিনী? আমি দ্বিচারিণী ? ব্ৰহ্মাণ্ড অবিশ্বাস করে, হৃদয়ের সমস্ত বিশ্বাস তােমার হৃদয়ে স্থাপন করুলে যদি আমি অবিশ্বাসিনী হই তা হলে আমি শতবার অবিশ্বাসিনী। পুণ্য, ধৰ্ম্ম, সুখ, শান্তি, স্বর্ণ, ঈশ্বর, পিতা, মাতা, সকল ত্যাগ করে একমাত্র তােমাতে অনুরক্ত হলে যদি দ্বিচারিণী হই তা হলে আমি সহস্রবার দ্বিচারিণী। মান। আমিও বলি, যে নারী আত্মমর্যাদা, মান সম্রম, ধর্ম, স্বামী ভুলে পরপুরুষানুরক্ত হয়, সে সহস্রবার কেন সক্ষবার দ্বিচারিণী। তুমি রমণী, তােমার প্রতি পরুষ ব্যবহার অনুচিত, তাই বলি, আমার বন্ধয়মান ক্রোধ বহ্নিতে ঘৃতাহুতি ঢেলে না।

রমাবতী। রমা। মহারাজ, তুমি যখন আমায় কলঙ্কিনী বলেছ তখন আমার যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে। দুঃখ পেলে যার বুকে মাথা রেখে প্রাণের ব্যথা জুড়াব, সেই যখন আমায় কলঙ্কিনী বলেছে তখন আমার যন্ত্রণার মােলকলা পূর্ণ হয়েছে। তােমার রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য, ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম, সংসার, পৃথিবী সকলই আছে, কিন্তু তুমি ছাড়া আমার কিছুই নাই। তুমি আমার সুখ, স্বর্গ, তুমি আমার একমাত্র কাম্য, একমাত্র ধর্ম। তােমার সম্মুখে বিশ্ব, চরাচর, তেত্রিশকোটি দেবতাকে সাক্ষী রেখে বলছি, যদি আমি কখনও পরপুরুষের উপচিকা হয়ে থাকি, যদি কখনও ভ্রমে কিম্বা স্বপ্নে, জ্ঞানে কিম্বা অজ্ঞানে, মােহনপুরাধিপতি মহারাজ মানসিংহ ব্যতীত অপরের মুৰ্ত্তি হৃদয়ে ধ্যান করে থাকি, তা হলে যেন অন্তিমকালে তােমার চরণদর্শন আমার অদৃষ্টে না ঘটে। যেন জন্মজন্মান্তরে পতিপুত্রে বঞ্চিত হই। ( জাহ্নবীর প্রবেশ) জাহ্নবী। কাকে কলঙ্কিনী বছ, মহারাজ ? যে সাবিত্রীর চেয়ে সতী, লক্ষ্মীর চেয়ে পবিত্র, তাকে কলঙ্কিনী বছ, মহারাজ তােমার বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছে। যার কথা তােমার নিকট বেদমন্ত্র সে যখন আমার সইকে দ্বিচারিণী বলেছে, তখন তুমি আমার কথায় যে প্রত্যয় কবে না তা জানি। কিন্তু মহারাজ, বলতে রসনা জড়িত হয়, কি বলব? যে পাপিষ্ঠের কুহক মন্ত্রে ভুলে দেবতুল্য পিতাকে দেশত্যাগী করেছ, সেই মহাপাপিষ্ঠ কীটাণুকীট, তােমার কুল কলঙ্কিত করূতে নিশীথে অপাপবিদ্ধা সতীরাণীর কক্ষে প্রবেশ রমাবতী। করেছিল। ধাৰ্মিক চূড়ামণি শান্তশীল সে বিপদ হতে সইকে রক্ষা করূলে, আজ তােমার বংশের মান কোথায় থাকত ? পুরস্কার স্বরূপ ধৰ্ম্মকে নির্বাসিত করূলে, অধৰ্ম্মকে প্রশ্রয় দিলে। তাতেও ক্ষান্ত না হয়ে, রাজকুলবধূকে কলঙ্কিনী বলে বিদূরিত করেছ ? বিনা দোষে সতীর অপমান করে স্বইচ্ছায় মহাবিপদ আহ্বান করাে না, মহারাজ। ভূতভাবন ভবানীপতি সতী পূতদেহ স্কন্ধে ধরে ত্রিভুবন পর্যটন করেছিলেন, তা কি ভুলে গেছ, মহারাজ ? বৃন্দাবনবিহারী শ্রীহরি যে সতীর মর্যাদা রক্ষার জন্য তার চরণ- যুগল ধারণ করেছিলেন, ঐশ্বৰ্য্য বিলাসােন্মত্ত পাষাণহৃদয় মানসিংহ, তুমি সেই সতীর অপমান করে কেন রাজকুল ধ্বংশের অঙ্কুর রােপিত করছ ? মান। তুমি পাপিষ্ঠার সহচরী—তােমার কথায় প্রত্যয় করি না। যে মায়ায় মুগ্ধ হয়ে এতদিন মায়াবিনীকে সতী ভ্রমে গলায় পরেছিলাম, আজ সে মায়াজাল ছিন্ন হয়েছে, যে কলঙ্কিনী সে পরিত্যাজ্য ; এ গৃহে তার স্থান হতে পারে না, যাও জাহ্নবী, বিশ্বাসঘাতিনীকে আমার গৃহ হতে লয়ে যাও। (প্রস্থান) রম। মহারাজ, চলুম-জন্মের মত চলুম-আমার সর্বস্ব এখানে রেখে চলুম। আর আসব না—আর তােমায় জ্বালাব না। কিন্তু মহারাজ, মনে রেখাে তুমি নিরপরাধিনীকে, কুলবধূকে অকারণ কলঙ্ক অপবাদ দিয়ে গৃহ হতে বহিস্কৃত কলে। যদি সত্য ধর্মের উপর এ সংসার প্রতিষ্ঠিত হয়, যদি স্বর্গে দেবতা থাকে, যদি

রমাবতী।
পাতিব্ৰত্যে ধৰ্ম্ম থাকে, তা হলে মােহনপুররাজ, স্মরণ রেখাে
একদিন অশান্ত প্রাণে আবার আমায় খুজে বেড়াবে, আবার
আমায় দেখা দেবে, আবার আমায় আদর করে ডাকবে।
( প্রস্থান)
(গৃহলক্ষ্মীর অবির্ভাব ও গীত)
কেন মিছে বল চঞ্চলা।
থাকিব কেমনে, অধীর পরাণে, কত বা সহিৰ জ্বালা
স্নেহ ভরে যারে, করিৰে কোলে, হতাদরে মােরে চরণে ঠেলে,
ব্যথিত হৃদয়ে, কত থাকি সয়ে, চলে যাই হয়ে ব্যাকুলা।
(পটক্ষেপন)
৬২

তৃতীয় অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
মন্ত্রণা গৃহ
(নর্তকীগণের গীত)
ঐ ভাসে দিনমনি সুনীল গগনে।
হাসে তকশির, সমীরণ ধীর, ঝরে সুধাধার বিহগ কূজনে ।
ধায় তটিনী, মৃদুগামিনী, ফলফুলহারে শশাভিতা ধরণী ;
মােহনমালা, প্রেমের খেলা, প্রাণে প্রাণে বাধা মােহন মিলনের
( প্রস্থান)
দর্প। এইবার অনেকটা নিষ্কণ্টক! অনেকটা নির্ভয়। বৃদ্ধ
নিৰ্বাসিত, শান্তশীল বিতাড়িত, রাণী, বিদূরীত! আপদ গ্যাছে।
ফটিক। বেটি দুপুর রােদে হেঁটে গেল।
দর্প। যাবে না? গাড়ী, পাল্কী, মুটে সব বন্ধ করে দিছ।

রমাবতী।
ফকির। বেটির কি রূপ। দশদিক আলো করে যাচ্ছিল।
দর্প। আর ওসব কথা তুলাে না। তাকে মনে পড়লে
তার কথা উঠলে, আমি সব ভুলে যাই। যাক, কোন রকম করে
বেটাকে দিন কয়েকের জন্য দেশান্তরিত কতে পারলে আর
আমাদের কে পায়।
ফকির। তা হলে কি হবে ?
দর্প। আবার কি হবে ? তােমাই রাজা হবে।
ফটিক ও ফকির। আঁ! রাজা হব ? বলেন কি ?
ফটিক । আমি রাজা হলে দিনকতক পােলাও কালিয়া খেয়ে
নিব। শাক-চড়চড়ি আর ভাল লাগে না।
ফকির। আরে, ও ত আছেই; আমি রাজা হলে পায়ে চলে
গা--এ সাই, বাৎ কহেগা-হু, হু! গোঁফমে তাও দেগাইয়্যাঃ।
দর্প। চুপ করো, মহারাজ আসছেন।
(রাজা মানসিংহের প্রবেশ ও সকলের অভিবাদন )
মান। দেওয়ান! আমার চিত্তের স্থিরতা নাই। রাজকাৰ্য্য
তুমিই পৰ্যালােচনা কর, তােমারই উপর সব নির্ভর করুলেম।
দর্প। যে আজ্ঞা মহারাজ! তার জন্য চিন্তা কি ? আপনাকে
কোনও কষ্ট পেতে হবে না। কিন্তু মহারাজ, যে রকম সব রাজ
সরকারে কর্মচারী, তাতে সহজে কেউ কথা শুনবে না। সেই
জন্য মহারাজ, আমায় একটি হুকুমনামা দিন।
মান। আচ্ছা একটা লিখে আন ; আমি স্বাক্ষর করে দিচ্ছি।
দর্প। যে আজ্ঞে মহারাজ!
৬৪

রমাবতী। (জনৈক দ্বারপালের প্রবেশ) রাজার হস্তে পত্র দান। মান। (পত্র পাঠ করিয়া) পিতার আসকাল উপস্থিত। তিনি আমাকে দেখতে চেয়েছেন। অথই রওনা হব। কাল- বিলম্ব কবে না। আমার যান বাহনাদি প্রস্তুত করতে শী পদেশ দাও। দর্প। যে আজ্ঞে মহারাজ। তা হলে হুকুমনামাটা সহি করে দিন। মান। (তথাকরণ) আমি যাবার জন্য প্রস্তুত হইগে। ( প্রস্থান) ফটিক। (স্বগতঃ ) হা হওগে। যমের বাড়ী যাবার জন্য প্রস্তুত হওগে। দর্প। ভাই, ভগবান সময় দিয়েছেন, এ সুযােগ ছাড়লে আর পাবে না। ফটিক। গােলাম হাজির, কি কতে হবে আদেশ দিন্। ফকির। আর বেশী দেরী সইছে না। শিগগির একটা রাজা বনিয়ে দিন। রাজা হবার জন্য গা-টা মাটি মাটি করছে। দর্প। তার জষ্ঠ ভাবনা কি ? রাজা হয়েছই ধর। এখন মানসিংহ নামে রাজা, কাৰ্যতঃ তােমরাই রাজা। আর এখানে দাড়িয়ে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। চল, মান বিসর্জনের ব্যবস্থা করিগে। ( সকলের প্রস্থান)

রমাবতী।
(দীননাথের প্রবেশ)
(গীত )
।
দৃম্ তাম্ তাদৃতা, না-না।
শনির প্রেমে গলাগলি আর যাদু টে কেনা।
জন্মদাতার হ’ল মরণ ঘরের লক্ষ্মী বিসর্জন,
শনির খেলায় ভেস্কি লাগায় নলের কি বিড়ম্বনা।
বােকা রাজা আঁখি মেল, দেখে শুনে পথটা চল,
নইলে, সাপের ছােবল খেয়ে শেষে উড়ে যাবে প্রাণখানা।
( প্রস্থান)
দ্বিতীয় দৃশ্য!
অলিন্দ
(দর্পনারায়ণের প্রবেশ)
দর্প। আর কি! কারেও ভয় করি না। নায়েব, গােমস্তা,
কারন, জমাদার, বলে, কৌশলে, প্রলােভনে, হস্তগত করেছি ।
আর কারেও ভয় করি না। তবে ফটিক ফকিরের বড় আশা-
তারা রাজ গদিতে বসবেন! কিন্তু নির্বোধ! এটা বুঝতে পার
, দর্পনারায়ণ কি পরের জন্যই এ রাজ্য-পথ নিষ্কণ্টক করেছে ?

রমাবতী।
সংসারে এত সার্থশূন্য কে আছে ? মুর্থ! যতই আকাশকুসুম দেখ
, এ রাজসিংহাসন দর্পনারায়ণের জন্য। নারায়ণ এলেও, আমায়
বিফলমনােরথ করূতে পারবেন না। তা তােমরা কোন্ তুচ্ছ।
তবে এখন নিরাশ কবো না, আগে সমস্ত আপদ বিপদ দূর করি,
রাজ্যের ভিত্তি অধিকতর দৃঢ় করি, তারপর অপমানিত করে
তােমাদের বহিস্কৃত করূবাে। যদি তাতেও প্রতিবন্ধক হও, তা
হলে তােমাদের প্রাণবধেও কুণ্ঠিত হবে না। ঐ যে মুখের
আনন্দ করতে করতে আসছে।
(ফটিক ও ফকিরের প্রবেশ)
ফটিক। আমি রাজা হব।
ফকির। কি চেহারা রে, যেন অমাবস্যার রাত্রি! তােকে
রাজা সাজবে কেন ? আমি রাজা হব।
ফটিক। মরি মরি ! প্রাণ ঠাণ্ডা হয়ে গেল আর কি ?
নিজের মুখখানি কখনও আর্শিতে দেখ নি ? কিষ্কিন্ধারাজ,
কিষ্কিন্ধাধামে যাও। সেইখানে বেশ রাজা সাজবে। নল, নীল,
হয়গ্রীব প্রভৃতি মন্ত্রী স্ব স্ব লাঙ্গুল বিস্তার করে চারিধারে ঘিরে
ববে, একবারে ইন্দ্রের সভা বনে যাবে আর কি! মােহনপুরের
' রাজা আমি হব।
ফকির। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ! আর যে হাঁসি রাতে পারিনি ?
দেওয়ান মশাই! একবার শুনুন শুনুন। কথা শুনুন।
দর্প। কেন তােমরা ঝগড়া করছ ?

রমাবতী। ফকির। বেশ কথা দেওয়ান মশাই, বলুন ত, রাজা কাকে সাজে? দর্প। তার জন্য ঝগড়া কেন? দুজনেই রাজা হবে। দুই জনেই রাজ্য ভাগ করে নেবে। ফটিক ও ফকির। সেই বেশ কথা। তা হলেই বিবাদ মিটে যাবে। অর্প। এখন এক কাজ কর, তােমরা সপরিবারে রাজবাড়ীতে বাস কর। রাজার মত আদব কায়দা শিখলে তােমাদিগে সিংহা- সনে বসিয়ে আমি নিশ্চিন্ত মনে বনে তপস্যা করতে যাব। ফটিক। না, না, দেওয়ান মশাই, তা হবে না। আপনি এত ক্লেশ করূছেন, আমরা আপনাকে ছাড়ব না। আপনি যেমন দেওয়ান আছেন তেমনি থাকবেন। দর্প। আচ্ছা, সে পরে চিন্তা করা যাবে। এই হচ্ছে মাহেন্দ্র- ক্ষণ, আর কালবিলম্ব করে না। এখনই রাজবাড়ীতে যাত্রা কর। ফকির। আজ ফরের মায়ের ফরের কি অনন্দ রে । ফটিক। আজ ফটিকের বেটা ফটিকের কি আনন্দ রে ! ( উভয়ের প্রস্থান) ( দ্বারপালের প্রবেশ, পত্রদান ও প্রস্থান) দর্প। এ যে দেখছি মানসিংহের পত্র! (পত্র পাঠ) অন্যই ত সে প্রত্যাগমন করছে! কই যায় ? ( দ্বারপালের প্রবেশ) তুমি শীঘ্র সেনানায়ককে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।

রমাবতী। বারপাল। মহারাজ! তিনি দরবার গৃহে আপনার জন্য প্রতীক্ষা করছেন। দর্প। ডাক (দ্বারপালের প্রস্থান) ( দপের পত্র লিখন) ( সেনানায়কের প্রবেশ ) দর্প। সেনানায়ক! তুমি এক সহস্র সৈন্য নিয়ে শীঘ্র সিংহ- দ্বারে সজ্জিত থাক, আর মুহুর্মুহু তােপধ্বনি করূতে থাক। যখন মানসিংহ আসবে, তাকে এই পত্র দিয়ে মানে মানে নগর ত্যাগ কতে বলবে। যদি সহজে স্বীকৃত না হয়, বলপ্রয়ােগে দূর করে দেবে। যেমন ঘটনা হবে, দূতদ্বারা তৎক্ষণাৎ আমায় সংবাদ পাঠাবে। সেনানায়ক। যথা আজ। ( প্রস্থান ) দর্প। আর ভয় কি! এমন শাসন করেছি যে, একটী বপক্ষীও মানসিংহের সাহায্য করতে যাবে না। এখন মােহনপুর রাজ্যের আমিই যথার্থ প্রভু। সকলে আমার ভয়ে অ্যাস্ত, কেউ আর দেওয়ান বলতে সাহস করে না। সকলেই মহারাজ বলে সম্বোধন করে। ( দূতের প্রবেশ) দূত। মহারাজ! মহারাজ মানসিংহ সিংহদরজায় এসে উপ- স্থিত হয়েছেন। দর্প। কি দূত! যদি তােমার মুখে পুনরায় ‘মহারাজ মানসিংহ উচ্চারিত হয়, তাহলে এখনই তােমার জিহ্বা দ্বিখণ্ড করবাে। ৬১

রমাবতী।
দর্প।
আমি ব্যতীত এ রাজ্যের রাজা আর কেউ নাই। সেনাপতি
'কোথায় ?
দূত। আজ্ঞে মহারাজ! তিনি সিংহদরজায় উপস্থিত
আছেন।
দর্প। যাও, মানসিংহকে শীঘ্র দূর করে দিতে বল।
যে আজ্ঞা।
( প্রস্থান)
(নেপথ্যে তােপধ্বনি)
ঐ যে—ঐ যে—কামান গর্জন! দর্পনারাণ, আজ
তাের কি আনন্দ! এমন দিন যে কথন হবে, স্বপ্নেও ভাবি নাই।
(তােপধ্বনি) ঐ যে ফের কামান নিনাদ। দর্পনারাণ, আজ
মােহনপুরে তােরই আধিপত্য। তুই আজ শত শত প্রজার রক্ষক,
তােরই হাতে শত শত প্রাণীর জীবন, মরণ। কি আনন্দ।
কি সুখ ! (পুনরায় তােপধ্বনি) ফের! ফের! সেই চরাচর
ভীতিবিধায়ক গগনভেদী তােপধ্বনি ! আহ! বড় দুঃখ,
প্রাণেশ্বরী প্রমদাকে রাজরাণী করূতে পারলেম না ।
প্রমদা, কেন অকালে সংসার ছাড়লে ! দেখ তােমার স্বামী
আজ মােহনপুরের অধীশ্বর। অদৃষ্টদোষে একটীও সন্তান হয়
নাই। আমার অন্তে এ বিশাল রাজ্য কে ভােগ কবে ? তার
ভাবনা কি? যখন রাজ্য হয়েছে তখন সবই হবে। হাজার
হাজার প্রাণেশ্বরী আসবে, কত পুষ্যিপুত্রের উমেদার হবে। তার
ভাবনা কি
টাকাতেই সব হবে।
প্রম,
?
৭৩
d

রমাবতী।
(দূতের প্রবেশ)
দূত। মহারাজ, অভিবাদন করি।
দর্প। কি সংবাদ ?
দূত। মহারাজ, মহারাজমানসিংহ না, না, হুজুর, মানসিংহ
আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার প্রস্তাব করলেন। সেনাপতি সে
আবেদন মঞ্জুর করলেন না। তার পর তার সৈন্যের যুদ্ধ করূতে
চাইলে, তাতেও তিনি বাধা দিলেন। বল্লেন; ভগবানের ইচ্ছা,
পূর্ণ হােক। আমার প্রায়শ্চিত্ত হােক। এই বলে তিনি কোথায়
চলে গেলেন। সেনাপতি বলে পাঠালেন, আর কোন আশঙ্কা
নাই।
দর্প। দূত ! কল্য তােমায় পুরস্কৃত করব, যাও, শীঘ্র সেনা-
পতিকে সসৈন্যে পাঠিয়ে দাও।
(দূতের প্রস্থান)
আর আমায় কে পায় ? শান্তবেটা আমায় ধর্ম শিক্ষা দিতে
এসেছিল ; তাই তার ধৰ্ম্ম ফল কপাল ফলে গেছে। ধৰ্ম্ম ! ধৰ্ম্ম
কি? মানুষের ইচ্ছাই ধৰ্ম্ম-অনিচ্ছাই অধৰ্ম্ম। যদি আমি ধৰ্ম্ম ধৰ্ম্ম
করে চিরকাল আকাশপানে তাকিয়ে থাকতেন, তা হলে কে আমার
রাজ্য হাতে তুলে দিতে আসতাে ? এ সংসারে কাপুরুষেরাই
ধর্মের দোহাই দেয়। নির্ভীকপুরুষ কখনও ধৰ্ম্মের মুখাবলােন
করে না। এইবার ফটিক ফকিরের প্রাণসংহার করতে হবে,
নচেৎ ভবিষ্যৎ পথ নিষ্কণ্টক হবে না। মানসিংহের সহিত যােগনান
করতে পারে।

রমাবতী।
(সৈন্যসহ সেনাপতির প্রবেশ )
সকলে। জয়! জয় ! মহারাজ দর্পনারায়ণের জয়।
দর্প। তােমরা আমার প্রাণ হতে প্রিয়তম। কারণ তােমাদের
কৃপায় আমি রাজ্য লাভে সমর্থ হয়েছি, তােমাদের সকলকে কাল
যথাযােগ্য পুরস্কৃত করবাে।
সকলে। জয়! জয়! মহারাজের জয়।
(ফটিক ও ফকিরের প্রবেশ )
ফকির। আমি নিব আলােয়ার।
ফটিক। আমি নিব রামপুর।
ফকির। দেওয়ান মশায়। আমি নিব আললায়ার।
ফটিক। দেওয়ান মশায়! আমি নিব রামপুর।
দর্প। যাও সবে যমপুর।
ফটিক ও ফকির। দেওয়ান মশায় ! সে কোথা?
দর্প। এই যে বুঝিয়ে দিচ্ছি। সেনাপতি, এই পামর দুটাকে
গ্রেপ্তার কর।
(তথাকরন)
ফটিক ও ফকির। একি! একি! দেওয়ান মশায়! একি
দর্প। তােমাদের যমের বাড়ী যেতে হবে। যাও বধ্যকাষ্ঠে
এদের বধ কগে।
ফটিক। ওগো, সটিকের বেটা
ফটিকের কি হলো রে ?
কোথায় আলােয়র, কোথায় রামপুর!
৭২

রমাবতী।
ফকির। দেওয়ান মশায়। আর কোথায় যমপুর। ফয়ের
মায়ের ফরে ভিন্ন যে আর কেউ নাই গাে ।
সেনাপতি। এই, মুখ সামলে কথা বল। দেওয়ান কি?
মহারাজ বল।
ফটিক। কই বাবা! মহারাজকে ত দেখতে পাচ্ছিনে।
যে দেওয়ানজী।
সেনাপতি। তােম্ কোন হায় ?
ফটিক। আমি বাবা ফ, ফ, টিক টিক টিক্ টিক্ টিক
সেনা। তুমি তাে ভারি বেকুব। যখন দেওয়ান ছিলেন,
তখন দেওয়ান বলেছিলে, এখন ইনি হচ্ছেন মােহনপুরের মহারাজ
দর্পনারায়ণ।
তা বেকুব না হলে বা গুটি পােকার মত আপনার
জালে আপনি জড়াই? দোহাই মহারাজ! হুজুর ধীরাজ ! এই
নাকে খৎ, এই কানে খৎ, বাবা প্রাণে মারবেন না। রাজ্য চাই না,
কানাকড়িটী পৰ্যন্ত চাই না, প্রাণে মারবেন না।
দর্প। লে যাও-কোতল কর।
( প্রস্থান)
ফকির। বাবা সেনাপতি, আর যাই করবি তাই কর, প্রাণে
মারিসন বাপ! না বুঝেই কচু পােড়া খেয়েছি। দোহাই বাপ,
প্রাণবধ করিসনি। বাবা, বুঝলুম, ধর্মের কাঠি আপনি নড়ে।
ফটিক। বাবা, আমার বহুপরিবার। আমিই তাদের একমাত্র
অন্নদাতা ; আমি গেলে তাদের কি হবে বাপ? সেনাপতি ছেড়ে
৭৩
ফকির।

রমাবতী।
দাও ; তােমার পায়ে পড়ি। দয়াময়! প্রাণ বাঁচাও, আর কখনও
এমন কাজ হতে দিব না।
সেনা। এখন কঁদলে কি হবে ? এমন অন্যায় কাজ করতে
গিয়েছিলে কেন?
নির্বোধ, জান না, এ সংসার, আর্শিতে মুখ
দেখা, যেমন কাজ করবে তার তেমন ফল পাবে। চল, যমপুরের
রাজগদিতে বসাইগে।
ফকির। আমরা যে পথের পথিক, তুমি ও তো তাই বাবা?
সেনাপতি। কে বলে ?
ফকির। আমি বাবা। ফ, ফ, কিরি, বি, সি, বি, সি,।
সেনা। (দীর্ঘনিশ্বাসত্যাগ করতঃ ) যা বলেছ, সত্য। কিন্তু
সৈনিক জাতি হুকুমের দাস; হুকুম পালন করতেই তাদের
জন্ম। তারা হিতাহিত লক্ষ্য করে না, ন্যায় অন্যায় বিচার করে না।
মহারাজ মানসিংহ দর্পনারাণের আদেশ পালন করতে হুকুম
দিয়েছেন, তাই করছি। এতে পাপপুন্য জানি না। আর কেন বিলম্ব
করছে। এখন এই রাজ-পরিচ্ছদ পরে চল। (শৃঙ্খলবদ্ধ করন )
ফটিক। হায়, হায়, এতদিনে আমার চোখ ফুটলো; ধর্ম আছে
এতদিনে জানলে। ভগবান, তােমার পানে কখন চাইনি।
নিঃশঙ্কচিত্তে এতদিন পাপাচরণ করে এসেছি। তাই আজ আমার
এই দশা। প্রভু, দয়াময়, যে পাপের তুল্য পাপ নাই, সে পাপ
অবাধে করেছি। যে ভালবাসত, যে বিশ্বাস করত, তার সর্বনাশ
করেছি। বধ্যকাষ্ঠে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত কতে চলুম।
ফকির। মহাপাপের প্রায়শ্চিত্ত আজকে হল; এমন দিন এক
র
৭৪

রমাবতী। দিন আসবে যে দিন দর্পনারাণকে আমাদের মত পাপাচরণের ফল- ভােগ করতে হবে। আজ আমাদের প্রায়শ্চিত্ত। (শৃঙ্খলাবদ্ধ ফটিক ফকিরকে লইয়া সকলের প্রস্থান) তৃতীয় দৃশ্য। জাহ্নবী পুলিন। মানসিংহ। মান। দয়াময়! আমায় মৃত্যু দাও। মর্মান্তিক যাতনা দিয়ে পিতাকে হত্যা করেছি, পতিপরায়ণা পত্নী, পাষণ্ড অত্যাচারে শেলবিদ্ধ হৃদয়ে মৃত্যুশয্যায় শায়িত—তুহিন নিষিক্ত পদ্মিনীর ন্যায় দণ্ডে দণ্ডে নিষ্প্রভ স্বামীগত প্ৰাণা অভাগীর প্রাণ বধ করলুম। ধর্ম শাস্ত্রে যে সকল মহাপাপ বর্ণিত আছে, যার প্রায়শ্চিত্ত বিধানে শাস্ত্ৰকৰ্তাও অক্ষম, সেই মহাপাপের স্রোতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত এ মহাপাপের শেষ থাকে কেন? তাই আজ আত্মহত্যা কতে চলেছি। ভগবান, মৃত্যু দাও। আমি রাজ্য হারা হয়েছি বলে দুঃখ নাই। উত্তম হয়েছে। যে মহামুখ ধর্মপ্রাণ পিতার চরিত্রে অবিশ্বাস করে—চাটুকারের বাক্ চাতুর্যে মুগ্ধ হয়ে কলঙ্কের ডালি মাথায় দিয়ে সােনার প্রতিমা বিসর্জন দেয়—ষে ৭৫ হয়েছি।

রমাবতী।
নরাধম পিতার চরণে আত্মসমর্পণ না করে পত্নীর হৃদয়ে আত্মদান
করে, বিশ্বাসঘাতক ভূতত্যর পদে আত্মসমর্পণ করে, সেই
পাষণ্ডের এই হচ্ছে উপযুক্ত প্রায়শ্চিত্ত। কৃপাময়! কৃপা করে
এ অভাগাকে মৃত্যু দাও। যে মৃত্যু কামনা করে, সে মৃত্যু পায় না
কেন?
যে মায়াস্বপ্নে মুগ্ধ হয়ে আশার চক্ষে সংসার সুখধাম
জ্ঞান করে, পুত্র কন্যা পরিবেষ্টিত হয়ে সংসারে স্বর্গসুখ উপভােগ
করে, ভব কামনায় অন্ধ হয়ে যে সংসারে অনন্ত জৗবনের আকাঙ্ক্ষা
করে, অচিরে মৃত্যু তার সে সাধ ভেঙ্গে দেয়। কিন্তু যে মৃত্যু চায়
সে মৃত্যু পায়না কেন? আহা! ঐ যে হরিপদবিহারিণী ত্রিতাপ
হারিণী সুরধনী তরঙ্গে তরঙ্গে পাপতপ্ত জীবের তাপহরণ সংকল্পে
শুভ্রবসনে দ্রুতগামিনী, মাগো ! এ অভাগা ভীষণ পাপে লিপ্ত।
সর্বপাপহরা জননী, এ পাপাত্মা সন্তানের সে মহাপাপ হরণ করুতে
পাবে কি ? কেন পাবি না মা? কলুষদগ্ধ কলির জীবকে
উদ্ধার করতে পাপভারাবনত ধরার বক্ষে মন্দাকিনী ধারায়
অহর্নিশি প্রবাহিতা। তবে এ পাপীর পাপভার অপনয়ন করতে
কেন পারবিনি মা? আজীবন সংসারে দুষ্কৰ্ম্ম করেছি, কখনও
ভগবানের নাম গ্রহণ করি নাই, তার ফলে অনন্ত যাতনায় পুড়ে
মরছি। কোল দে মা, কোল দে না।
(গঙ্গাবালার'উথান ও গীত)
এক মনে চলে যাও—ফিরে চেও না।
আসুক উষা, কুসুম ভূষ। তিমির বসনা।
৭৬

রমাবতী। হােক সুখ দু:খ হাসি অধোমুখ, তার উজল আলাে, আঁধার কালাে, ফিরে দেখ না। ওগাে বিধির লেখা আঁখির আড়ালে, দেখাবাে সাধে উঠবে গরল, নিরাশা সাগরে ডুব না। মান। কে গাে ? কে গান কলে ? অনিন্দিত, সুকোমল কণ্ঠনিঃসৃত আশাপূর্ণ ঝঙ্কারে কে আমার মেঘাবৃত হৃদাকাশে আশা-শশধরের স্নিগ্ধালােক ঢেলে দিলে। কে না বলে, মরে না । আত্মহত্যায় মহাপাপ। কে না বলে গেল, পিতার চরণে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি পুত্রের সকল দোষ মার্জনা করবেন। তবে কি আবার ফিবাে? কই কই, আমার হৃদয়াধিষ্ঠাত্রী দেবমূর্তি কৈ? তার কাছেও কি ক্ষমা পাব? সেখানে যে নিষ্ঠুরতা নাই, পাপ নাই। আমি কেমন করে আমার পাপরাশি ল’য়ে তার সামনে দাঁড়াব? সাধ হয় একবার সতী রাণীর পদপ্রান্তে পড়ে ক্ষমা চাই, একবার সেই স্বৰ্গজ্যোতিঃ প্রতিভাত করুণা মাখা মুখ- খানি পানে চেয়ে তেমনি করে “মা”, “মা” বলে ডাকি। কিন্তু কিন্তু, কোন্ মুখে সেখানে আর দাঁড়াব? না, না, আর আশায় মুগ্ধ হব না—কুহকীর ছলনায় ভুলে আর আত্মহারা হব না! •এ বিশ্বরাজ্যে আমার সব ফুরায়েছে; সংসারে আর সুখ কি? সবই গ্যাছে, শ্মশান, শ্মশান, আর পারি না মা-এ যন্ত্রণাময় অনুতাপদগ্ধ জীবন আর বইতে পারি না, মা! ত্ৰিতাপহরা জাহ্নবী, কোল দে মা কোল দে ! ৭৭

রূমাবতী।
মাতঃ শৈলসুতা সপত্নী বসুধা শৃঙ্গার হারাবলিং
স্বর্গারোহণ বৈজয়ন্তী ভবর্তীং ভাগীরথীং প্রার্থয়ে।
গাঙ্গং বারি মনােহারি মুরারি চরণচ্চতম্।
ত্রিপুরারি শিরারি পাপহারি পুতুমাম্।
পাপাপহারি দুরিরি তরঙ্গধারি
শৈল প্রচারি গিরিরাজগুহা বিদারি
ঝঙ্কারকারি হরিপদ রসসাবিহারি
গাঙ্গং পুনাতু সততং শুভকারি বারি।
(ঝম্পােদ্যত)
উদাসীন বেশে শান্তশীলের প্রবেশ)
শান্ত। কর কি ?কর কি ?
মান। কে তুমি?
কে তুমি! কেন আমার গন্তব্যপথে বাধা দিলে ?
শান্ত। এ নবীন বয়সে কেন আত্মবিসর্জনে প্রয়াস ?
মান। মহাপুরুষ, আর প্রশ্ন কর না, হৃদয় পাপদাহে দগ্ধ,
এ সংসারে আর আমার সুখ হবে না। সব গ্যাছে, কেবল
আঁখিজল মাত্র সার হয়েছে, তাই মায়ের কোলে আশ্রয় নিতে
সন্তান বিপদে পড়লে মা ভিন্ন আর কার কোলে
স্মরণ নিবে?
শান্ত। সে ত ঠিক কথা, কিন্তু আত্মবিসর্জন করতে কে
মায়ের কোলে আশ্রয় নিতে যায় ? আর এমন কঠোর হৃদয়
জননীই বা কে আছেন, যিনি পুত্রকে আত্মনাশে সহায়তা করেন ?
আত্মহত্যায় মহাপাপ! কদাচ আত্মবিসর্জন করাে না।
চলেছি।
৭৮

রমাবতী। মান। পাপ ? আমায় পাপের ভয় দেখাচ্ছ ? আর পাপের ভয় করি না। জগতে যত কিছু পাপ আছে সমস্তই করেছি গুরুহত্যা করেছি, স্ত্রীহত্যা করেছি, এ অপেক্ষা গুরুতর পাপ আর কি আছে, সন্ন্যাসী ? পাপ-জর্জরিত হৃদয়ে পাগলের মত দিবারাত্র ঘুছি। বুঝলুম, এ ঘাের নরকের কলুষ ভার ধারণ করতে বসুন্ধরাও অশক্ত। তাই, সর্বপাপহারিণী সূধনী জলে আত্মবিসৰ্জন কৰূতে এসেছি। শান্ত। আত্মহত্যায় শান্তি পাবে না। শান্তি পাবার অন্য পথ, সে পথ সুখ, দুঃখ, জন্ম, মৃত্যু বর্জিত। সেই পথে অগ্রসর হও, অনন্ত সুখের অধিকারী হয়ে অনন্ত প্রাণে চির শান্তিধামে বাস কবে। যুবক! বােধ হয় সংসারসুথে মত্ত হয়ে দয়ামকে বিস্মৃত হয়েছিলে, তাই তােমার এত যাতনা। কিন্তু যাই হক, করুণাময় কখনও করুণাদানে কাতর নন্। সেই জগবন্ধুর চরণে মনােবদনা জ্ঞাত কর, কায়মনােবাক্যে দীনবন্ধু রাধাবল্লভের নিকটে ক্ষমাভিক্ষা কর, দয়াময় তােমায় নিশ্চয় ক্ষমা করূবেন। তিনি জগতপিতা। আমরা তাঁর স্নেহপালিত আদরের ধন। পুত্র যদি শত অপরাধ করে, অনুতপ্ত হৃদয়ে পিতার চরণে ক্ষমা প্রার্থনা করে, পিতা কি তার প্রতি দয়া করবেন না ? অবশ্য করূবেন। ঐকান্তিক প্রাণে করযােড়ে রাধাবল্লভকে ডাক, দীনবন্ধু তােমার শত অপরাধ ক্ষমা করে তােমার হৃদয়ে শান্তিবারি সিঞ্চন করূবেন। মান। দয়াময় কি আমায় ক্ষমা করিবেন ? শাত্ত। অবশ্য করূবেন। বৎস, দ্বিধা করে না। দ্বিধাই ৭৯

রমাবতী।
হচ্ছে ধৰ্ম্মনাশের মূল। দেখছি, তুমি অনাহারী, আমার আশ্রমে
এস, সুস্থ হলে তােমার সঙ্গে এ বিষয় আলাপ করবো।
( উভয়ের প্রস্থান)
চতুর্থ দৃশ্য।
গ্রাম্য পথ।
( সাধু, নিধু ও স্ত্রীদ্বয়ের প্রবেশ)
(গীত )
কাঁদে রূপভানু-ওরে আমার কপালে বিধি হই
এত দুষ্টু লিখেছিল—হারে ওরে বলবো ও কার কাছে।
এত ছােট ছাতির ভিতর, মস্তবড় দু-হারে ওরে বলবাে কার কাছে ।
সাধু। ওরে নিধে! খুব কপালের জুন মাইরি। তাই
পালায়ে আসতে পেরেছি।
নিধু। হাঁ খুড়ো! তা লইলে ইজ্জৎ মেরেছিল আর কি ?
সাধু। নিধে, আর শুনেছিস্, লবদ্বীপের নতুন পরিজনটাকে
কাল শালা ধরায়ে এনে ইজ্জৎ মেরেছে।
নিধু। বলিস্ কি খুড়াে, সত্যি নাকি?
সাধু। দূর শালা চাষারডি, খুড়ো হয়ে তুর সত্যে লসা
কছি নাকি।
৮০

রমাবতী। নিধু। বলিস্ কি ? প্রথমা স্ত্রী। আর বলিস্ কি? যখন ধরে নিয়ে যায় তখন আমি গাে’নে দাড়াইয়ে দেখেছি। বউটো পুকুরে গিয়েছিল সেই সময়ে দুটো যমদূতের মতন সিপেই এসে, ঘুড়িটেকে লুফে নিয়ে গেল। বউটো কেঁদে খুন হলাে। তাকে নিয়ে কুনবাগে ঢুকলে আর লজর হলাে না। দ্বিতীয় স্ত্রী। আহা! আমাদের সাবেক রাজা বেশ লুক ছিল। আমরা রামরাজত্তিতে বসত কছিলুম। ইঃ, আঁটকুড়ের বেটাকে কে রাজা ককূলে ? রাজা হলো যদি, তবে মরেনা কেন? মরুক, মরুক, মলে আপদ যায়। নিধু। দূর শালি, এত কারখানা ছুঁয়ে গেল, কিছুই কি শুনিসনি? দেওয়ান গুখুকোরবেটা বুড়ো রাজাকে, রাণীকে, শেষে ছুট রাজাকে তেড়ে দিয়ে রাজা হইছে। ছুট রাজা নাকি ধিৎ- কারে গাঙ্গে ঝাঁপ দিয়ে মরেছে। সাধু। রাজা গেল গেল, রাণীর কপালে তেঁতােল গুলে গেল আর কি ? (শান্তশীলের প্রবেশ) শান্ত। হ্যা বাপ, এদিকে কারেও যেতে দেখেছ ? সাধু। এ বাবা ! একি রে নিধে ; ডর লাগছে যে। নিধু। কিছু ভয় নাই খুড়ো, এত তরাস কিসের? শান্ত। বলনা বাপু, কেউ এদিকে গেছে। ৮১

রমাবতী।
সাধু। কেনে বাবা ডর দেখাচ্ছ ? আমরা ছুট লুক ! আমাদের
কি চো আছে যে দেখবে?
শান্ত। কোন ভয় নাই। আমি সন্ন্যাসী, আমাহ’তে তােমা-
দের কোন অনিষ্ট হবে না।
নিধু। হা পিভু দেখেছি, একপাল কেয়াে (কাক) উড়ে
গেল। একপাল রাম ভেড়া মেমাতে মেমাতে গেল, তার পেছাতে
একটা হুড়কোদামড়া নেজুড় তুলে ছুটলো।
১মা স্ত্রী। মর পোড়াকপালে ; আর তার পেছনে যে একটা
ধলা বেঁড়ে কুকুর গেল তা বল্লিন ?
নিধু। ঐ দেখ ঠাকুর ! অত কি ঠাওর থাকে ? একটা
বেঁড়ে কুকুরও গেইছিল।
শান্ত। আঁ! তােমরা পাগল নাকি?
২য় স্ত্রী। না ঠাকুর, উওরা পাগল নয় ; পাগল উওর
পিশেষেরলাতজামাইএরশাড়ভাই।
শান্ত। কি আপদ ! কোন লােককে যেতে দেখেছ ?
সাধু। তাই বল ঠাকুর, তা’ত দেখেছি।
শান্ত। কই, কোন দিকে গেল ?
নিধু। আমাদের
সাথে তামাসা কছে। কেনে
ঠাকুর ?
শান্ত। না–বাবা—তােমাদের সঙ্গে তামাসা করি নাই।
নিধু। কেনে ঠাকুর, এই তো তােমাকেই দেখছি, আর
বলছো কোন বাগে গেল ?
৮২

রমাবতী।
সাধু। পিভু ; কাল থেকে পেটে ভাত নাই। জিউয়ের
বিকুলিতে ছুটে ছুটে পালায়ে আচ্ছি।
ছুটে পালায়ে আচ্ছি। এখন কি লা করুবার
সময় ?
শান্ত। কেন বাপ; তোমরা কার
পালায়ে
এসেছ ?
নিধু। আর ঠাকুর বলাে না। মােহনপুরের দপা বলে এক
ছাওয়ান ছিল, সেই গুহােটা এখন রাজা হয়ে ভারি জালাইছে।
নিধনের ধন হলে দিনে দেখে তারা। পিভুগো, আর বউ বিটির
ইজ্জৎ রাখলে না।
শান্ত। এ্যা, বল কি ?
সাধু। আর বল কি ? সুমন্ত বউ বিটি দেখছে, আর ধরে
ধরে ইজ্জৎ মারছে। কি করি ঠাকুর, ছুট লুক বলে কি আমাদের
মান ইজ্জৎ নাই ? তাই গা ছেড়ে পালাইছি। আর সে রাম
রাজত্তি নাই। আগে পুণ্যি করেছিলুম, তারই জোরে এমন রাম
রাজা পেয়েছিলুম। কপাল ভেঙ্গেছে, তাই ছিরামাদও বনে
গেইছে। যেমন সুখ করেছিলুম তেমনি দুঃখু হইছে।
শান্ত। কোথা যাবে ?
নিধু। আর কোন বাগে যাব, রাণীমায়ের গায়ে যাই। শুনেছি,
তিনি শ্বশুরঘরের লােককে খুব চেঁহ করেন।
২য় স্ত্রী। ও হতভাগা, ও চোখাগির পুত, হাঁ-করে ভাবছি
কি? ঐ দ্যাখ, সেই দীনে খ্যাপা ।
সকলে। ধল্লে-ধলে, পাল-পালা ! ( সকলের প্রস্থান)

রমাবতী।
( দীনুর প্রবেশ )
দীনু। একি বাবা! একি তােমার বেশ ?
কাপড় ছেড়ে, খিকে ধরে, সেজেছে যে বেশ ।
শান্ত। দীনু, অনেক দিন পরে দেখা হ’লভাল আছতো ?
দী। আছি পড়ে ভবের বাজারে
ভাল কি মন্দ বাবা, কে বলতে পারে ?
শান্ত। রাণীমার খবর কিছু রাখ কি ?
দী। রাজার শােকে রাণীর দেহ দিন রাতি জ্বলে-
যম মাসে টানাটানি পাঁচজনাতে বলে।
শান্ত। হা ভগবান! রাণীর কপালে এত দুঃখ লিখেছিলে?
দীনু, এখন রাজ্যের অবস্থা কিরূপ?
দীনু। রাজ্য এখন খাবি খাচ্ছেন।
সেপাই শান্ত্রী পালিয়ে গেছেন।
শান্ত। বল কি ? তাহলে এই সুযােগে মহারাজকে রাজ্যে
পুনঃ প্রতিষ্ঠিত কলে হয় না?
দী। গেলেই রাজ্য হাতে পাবে।
দর্প দেশান্তরিত হবে।
পাপের সরা চৌদ্দ পওয়া।
ফটীক ফকির কোতল হয়।
পাপের ফল পাবে যবে।
দৰ্পের দর্প চূর্ণ হবে।
শান্ত। বল কি ? তাহলে আর কালবিলম্ব নয়। মহারাজে
৫
.
t
৮৪

রমাবতী।
কষ্ট আর দেখা যায় না কিন্তু, মহারাজ কোথা গেলেন, খুঁজে
পাচ্ছি না।
দী। নিমক হালাল এরেই বলি
চল তবে বেলাবেলি ।
তাতা ধিনা নাচরে দীনে,
সাপের হাঁচি বেদেয় চিনে।
( উভয়ের প্রস্থান)
পঞ্চম দৃশ্য।
বন
(বনবালাগণের গীত)
আধ সুধা আধ, বিষমাখা প্রাণ, ঢলিয়া ঢলিয়া বহিয়া যায়।
আধ মধুর কুঞ্জ, আধ কুসুমপুঞ্জ, মলয়হিল্লোলে খেলে সদাই।
আধ শ্মশান, আধ মরুময় স্থান, হলাহল বাণ ছটে কোথায়।
কোথাও হাসি, দিবসনিশি, কোথাও রােদন ভাসে নিরাশায়।
মান। কেউ চারিটি অন্ন দাও।' ক্ষুধায় প্রাণ যায়। এ বিশ্বে
অনেক দয়াবান আছ ; দয়াকরে এই বুভুক্ষুকে
চারিটি অন্ন দাও।
মনে করেছিলুম, আমার রক্ষাকর্তা মহাপুরুষ ভিক্ষাদ্বারা প্রাণধারণ
৮৫

রমাবতী।
করেন, তার গলগ্রহ হব না; তাঁর সঙ্গ ছেড়ে চলে এসেছি।
কিন্তু দেখছি, এ কাজ ভাল করি নাই। পেটে অন্ন নাই, হৃদয়ে
শান্তি নাইপৰ্বতে, জঙ্গলে, অহর্নিশি ঘুরছি।
জঠর জ্বালায়
প্রাণ ওষ্ঠাগত। কিন্তু কার কাছে ভিক্ষা করবাে ? কারও সহিত
দেখা হচ্ছে না। এস্থান অপরিচিত ; কোথায় যাব? মাগাে
অন্নপূর্ণা ! অনুদানে তুমি জগতের জীবকে পালন করছে ;
দয়াময়ী! তবে কেন, অভাগার প্রতি বাম ? বুঝেছি মা! যে
অভাগা, নরাধম, তার দৃষ্টিতে শস্যশ্যামলা ধরণী মরুভূমি হয়,
অনন্ত পারাবারও সলিলশূন্য হয়। আমিই সেই ঘৃণিত নরাধম।
আমার আগমনে এ পথ পথিকশূন্য। কোথা যাই? আমার
সুখের আশ্রয়, স্ব ইচ্ছায় শ্মশান করেছি। সব ছিল, সব গেছে।
কেবল স্মৃতি মাত্র পড়ে আছে। আর পারি না, দুৰ্বল দেহে আর
দাড়িয়ে থাকতে পারি না।
(শয়ন )
স্বর্গবাসি পিতা! আমায় ক্ষমা কর। রমা, হৃদয়েশ্বরী রম!
তুমি স্বর্গের পারিজাত কুসুম, আমি পাপানলদগ্ধ পুরীষকীট।
ই আমায় ক্ষমা কর। তােমরা না প্রসন্ন হলে কৃপাময়ের কৃপালাভ
অসম্ভব।
( শান্তশীলের প্রবেশ )
ভগবন! এ অভাগার আবেদন কি গ্রহণ করলে ? তাই
সাহায্যার্থ এই পথিককে পাঠিয়ে দিলে ? কে ভাই ! আহার
দিয়ে অভাগার প্রাণ বাঁচাও।

রমাবতী। শান্ত। (চতুর্দিক অবলােকন করিয়া) কাহার কাতরকণ্ঠ শুছি না? বড় অন্ধকার, কোলের মানুষ দেখা যায় না। কে গা? বােধ হচ্ছে ক্ষুধার্ত পথিক। ( অগ্রসর হইয়া) এই যে! তুমি- এখানে ? তােমার সন্ধানে কাল রাত্রি থেকে ঘুছি—আমার কাছ থেকে কেন পালিয়ে এলে বাপ ? মান। মনে করেছিলুম তােমার গলগ্রহ হব না। তাই পালিয়ে এসেছিলুম ; কিন্তু কাজ ভাল করি নাই। আর কথা কইতে পাছি না। ক্ষুধায় প্রাণ যায়-কৃপা করে কিছু খেতে দাও। শান্ত। তােমার ভার ভগবান আমার হাতে অর্পণ করেছেন, তুমি পালিয়ে এলে হবে কি ? এই নাও বাপ, খাও। ; (খাদ্যদান ও মানসিংহের ভক্ষণ) মান। আঃ! মহাপুরুষের কৃপায় আবার জীবন পেলাম। নবশক্তি সঞ্চারে প্রাণ শীতল হলো। কিন্তু আমার এই অকিঞ্চিৎ- কর জীবনে লাভ কি? আমি পুষ্টিকর আহারে উদর পূর্ণ করছি, আর আমার মা, ভগ্ন হৃদয়ে রােগ শয্যায় শায়িতা, সর্বপ্রকার সুখে, তৃপ্তিকর আহারে বঞ্চিত। ধিক আমার প্রবৃত্তি! ধিক আমার দগ্ধোর, আর কি আমার প্রাণ ধারণ করা উচিত? না, আর আহারে প্রয়োজন নাই। ( আহারপত্র দূরে নিক্ষেপ ) রাণী ! রাণী ! রমা ! হৃদয়েশ্বরী। কোথা তুমি ? কোথা তুমি ? ( প্রস্থানােত) ৮৭

রমাবতী।
শান্ত। যুবক শান্ত হও। সমস্ত বুঝেছি বাপ। কেন এত
আত্মগ্লানি ? তুমি কি করতে পার ? যা অদৃষ্টে ছিল তাই ঘটেছে।
কর্মের স্রোত কেউ রােধ করতে পারে না। ভগবান নিয়ন্তা,
তুমি উপলক্ষ মাত্র।
মান। মন বুঝেও বােঝে না। পিত্নহত্যা করলুম, অবলা
বালা, যে আমা বই জানে না, মিথ্যা কলঙ্ক ডালি, তার মাথায়
দিয়ে গৃহ হতে দূর করলুম। আহা! তাই সেই নয়ন বিগলিত
অশ্রুধারা, সেই ভয়ব্যাকুল-বিবশা করুণ-প্রতিমা, সেই বিপন্নাবেশে
পদধারণ, প্রভু! সব একে একে স্মৃতিপথে উদিত হচ্ছে।
হায় রম! তাের কি করলুম? পিতা, তোমায় হত্যা করলুম,
কি কলুম, কি করলুম! আমি কি করলুম !
বাছা, সংসারশ্রম, মহাযােগস্থান। এ অপেক্ষা
অধিকতর কঠোর সংযম শিক্ষার স্থান আর নাই। প্রতি পদে
পরীক্ষা-প্রতি পদে লাঞ্ছনা! শােক দুঃখনলের দাহিকা যন্ত্রণা,
অচ্ছেদ্য প্রলােভনের মায়াজাল। যে মহাপুরুষ এই সকল পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হতে পারেন, বনচারী ফলমূলাহারী তাপসাপেক্ষা তিনি
শতগুণে শ্রেষ্ঠ। তুমিও আজ সেই পরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত। উতলা
হয়াে না। ধৈৰ্য্যাবলম্বন করে রাধাবল্লভকে ডাক, ঐ চরণ সার কর,
দুঃখের দিন অবসান হবে।
মান। পৰ্বত প্রমাণ যাতনা কি ক্ষয় আছে ? এ জীবনে কি
আর দুঃখ যাবে ?
শান্ত। যাবে কি? গ্যাছে। তােমার কাতরকণ্ঠ নারায়ণের

রমাবতী।
কোমল হৃদয়ে শেল বিদ্ধ করেছে। দয়াময় তােমার সকল অপরাধ
মার্জনা করেছেন, আপন রাজ্যে চল। তােমার অভাবে সিংহাসন
শূন্য, প্রজাগণের আর্তনাদে গগনতল প্রতিধ্বনিত। দর্পনারায়ণের
অত্যাচারে দেশবাসী মৰ্ম্মপীড়িত। চল মহারাজ! রাজ্যে চল।
তােমায় রাজ্যে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করে, সতী জননীকে তােমার হাতে
সমর্পণ করে, প্রাণের সকল আলা শান্ত করূবাে।
মান।
সে কি । রাজ্য !-রম—আমি ? একি স্বপ্ন না
দৈববাণী ? নরদেহধারী, কে তুমি করুণা মূর্তিতে আমার সম্মুখে
বিরাজিত।
সে কথা পরে হবে; এখন চলুন মহারাজ, রাজ্যে
চলুন।
মান।
রাজ্য চাই না- রমা চাই। সেই আমার রাজ্য, সেই
আমার ঐশ্বৰ্য্য। তা’রে পেলে আমার নরকেও স্বর্গ সুখ। রমা।
রমা ! কোথা গেলে তােমায় পাব? কোথা তুমি ?
শান্ত। ভগবান, একি হল? রাজা কি অবশেষে উন্মায়
হলেন?
( প্রস্থান)
৮৯

ষষ্ঠ দৃশ্য।
অবন্তিপুর
রমার পিতৃগৃহ
(রাণী রমাবতী ও জাহ্নবী পালঙ্কোপরি উপবিষ্টা )
(রমার গীত)
ছিড়ে গেছে হৃদি-তার, বীণাত বাজেনা আর।
সকলি ফুরায়েছে, নাহি সে ঝঙ্কার।
সে বীণা পঞ্চম সুরে, গাহিত প্রেমের গান,
এখন বাজে তায়, নিরাশার ভাঙ্গা তান।
ভাঙ্গা বুকের ভাঙ্গা গান, পােরা আছে সে বীণায়
একদিন সুধাধারা, ঝরিত গাে অনিবার।
জাহ্নবী। সই রে, আর কঁদিনে, কেঁদে কোন ফল নাই।
রমা। ভগবান যখন অভাগিনীকে সংসারে কাঁদতে পাঠিয়ে
ছেন, তখন কাঁদা ভিন্ন উপায় কি সই ? কাদি, যতদিন পােড়
দেহে প্রাণ থাকে, ততদিন কাদি। সই! কাদতে নিষেধ করােনা।
জাহ্নবী। কেঁদে কেঁদে তােমার দেহ দুর্বল—পীড়াগ্রস্ত। বৃথা
অবর্ষণে ফল নাই। দেখ সই, এই দগ্ধ জীবনে কখন পতির

রমাবতী। সোহাগ, স্বামীর আস্বাদ পাই নাই। কেবল নারায়ণে আত্মসমর্পণ করে, সে দারুণ যন্ত্রণা ভুলেছি। এ সংসারে কে কার ? সবই ক্ষণস্থায়ী। জলকোলে বায়ু সঞ্চারিত জলবিষ মত সবই অনিত্য। তাই বলি সই, বৃথা সন্তাপ পরিত্যাগ করে আত্মসমর্পণ কর, এ জীবনে অনন্ত সুখের অধিকারিণী হবে। রমা। স্বামী পূজা ভিন্ন এ জীবনে যে অন্য পূজা জানিনা। সই, তিনিই আমার সংসার, তিনিই আমার ভগবান। জাহ্নবী। কেন অসত্যে প্রাণ সমর্পণ করে আত্মনাশে প্রয়াস পাচ্ছ ? রমা। যদি পতি আমার অনিত্য হন, জগতে নিত্য কি? সত্য কোথায় ? যদি জগতে দেবতা থাকেন, স্বামীই আমার দেবতা। যদি ধৰ্ম্ম থাকেন, স্বামীর চরণযুগল পূজাই আমার ধর্ম। আমি ভগবান জানিনা, ধৰ্ম্ম পুণ্য জানিনা, কেবল পতির চরণই জানি। জাহ্নবী। যদি জাননা, যদি শিখ নাই সই, এখন জান-সেই জগতস্বামীর অর্চনা ভিন্ন, এ দুঃখময় জীবনে শান্তি নাই। রমা। যদি স্বামীপূজায় অনন্ত নিরগামী হই, যদি স্বামী অর্চনায় দুঃখ সন্তাপ আমার চির সঙ্গী হয়, তাতেও আমার যে আনন্দ, বৈকুণ্ঠেও সে সুখের তুলনা নাই। আমি ঈশ্বর চাইনা, মুক্তি চাইনা, শান্তি চাইনা। স্বামীর উদ্দেশে উদ্বেলিত প্রাণে, দরবিগলিত বারি-সিঞ্চনে, আমার যে আনন্দ, ভগবৎ লাভেও আমার সে আনন্দ, সে সুখ হবে না। স্বামী দর্শন যদি এ পােড়। অদৃষ্টে না ঘটে, যতদিন বাঁচব, মানসে সেই দেবতামূৰ্ত্তি হৃদয়ে স্থাপন

রমাবতী।
করে চন্দন নিষিক্ত পুষ্পেপহারে তার চরণযুগল ধ্যান করে
জাহ্নবী। সই, ধন্য তােমার অচল পতিভক্তি।
রম। কি বলব সই, প্রাণের আবেগে যখনি কেঁদে ভগবানের
চরণ প্রান্তে মনের দুঃখ জানাতে যাই, ঠাকুর আমার কি করূলে বলে
যখনই নতমস্তকে ভূমি স্পর্শ করি, তখনই শিরােপরি আমার স্বামীর
চরণযুগল দেখতে পাই। জাহ্নবী, যে পূজা শিখেছি, তা কি আর
এজীবনে ত্যাগ করতে পাবো ?
( রঘুরায়ের প্রবেশ)
রঘু। মা, কেমন আছি এখন ?
রমা। বেশ আছি বাবা; তুমি আমার জন্য ভেবোনা।
রঘু। মা, আমার এ সংসারে কেউ নাই। স্ত্রী পুত্র সকল
ধনে বঞ্চিত। তুমিই আমার জননী, তুমিই আমার কন্যা। তােমারই
আশায় সংসারে বাস। তােমায় সুস্থ দেখলেই আমার আনন্দ।
কিন্তু মা, তােমার অবস্থা ত ভাল দেখছি না। হা’ ভগবান,
কি কলে ? কোমল কলিকায় বজ্রাঘাত ? দয়াময় ! তােমার
রাজ্যে অবিচার কেন ?
জাহ্নবী। বাবা, চিন্তা করবেন না। ভগবান নিষ্ঠুর নন,
সই, দিবারাত্রি কেঁদনা। বাবা, ভাল চিকিৎসকের ব্যবস্থা কর।
রঘু। বেশ কথা বলেছ জাহ্নবী! তাই করি। মা, তুমি
চিন্তা পরিত্যাগ করে ভগবানকে ধ্যান কর—এ কুদিন আর

রমাবতী।
থাকবে না। জাহ্নবী, রমার মন যাতে ভাল থাকে তাই কর।
আমি চিকিৎসক আনবার ব্যবস্থা করিগে।
( প্রস্থান )
জাহ্নবী। সই, একটা গান শোন, মন প্রফুল্ল হবে।
(গীত )
এ ভব সাগরে, কেন মরি ঘুরে,
হৃদি ধনে কেন দেখি না।
কায়াটা গড়িয়ে পরাণ অর্পিল,
খেলিতে খেলা ভবে পাঠাইল ;
কাঁদালে কাঁদি হাসালে হাসি
কেন ভেবে পাই যাতনা।
হৃদয়ে সাহস নাহিক লেশ,
আঁখিজল শুধু অবশেষ,
আমি কি করি, কি করিতে পারি
তবু আমি আমি কথা ছাড়ি না।
১৩

সপ্তম দৃশ্য
গ্রাম্যপথ
( মানসিংহ ও শান্তশীল )
মান।
মহাপুরুষ, তােমার কৃপায় আমি জীবন পেয়েছি,
আশ্রয় পেয়েছি। জানিনা তুমি কে ?
শান্ত। মহারাজ! আমি দেবতাও নই, মহাপুরুষও নই,
আমি আপনার ভৃত্য মাত্র। মহারাজের সেবা আমার ব্রত ;
সেই ব্রতপালন করতে আজীবন চেষ্টা পেয়েছি, আপনার নিকট
যে উপকার লাভ করেছি, আজীবন সেবাতেও তাহা পরিশােধ
হবায় নয়। আমি আপনার অন্নদাস শান্তশীল।
মান। শান্তশীল। শান্তশীল—তুমি ? (আলিঙ্গন।) প্রভুগতপ্রাণ
শান্তশীল! তােমাকে অশেষ যাতনা দিয়েছি, তথাপি নরাধমের
প্রতি এত ভক্তি—এত অনুরাগ ! দেবচরিত্র শান্তশীল! নিষ্ঠুর
প্রভুর প্রতি তােমার এত দয়া ! আজ হ’তে তুমি
আজ হতে তুমি ভৃত্য নও,
আমার পিতা। আমি তােমার অকৃতজ্ঞ সন্তান। তুমি ব্রাহ্মণ
আমি ক্ষত্রিয়। তুমি দয়ার আধার, আমি মূর্তিমান অধর্মাবতার।
পায়ে ধরি পিতা, আমার সকল দোষ মার্জনা কর।
৯৪

রমাবতী।
শান্ত। মহারাজ! করেন কি ? করেন কি ? আপনি
অন্নদাতা পিতা, আমি আশ্রিত সন্তান। আপনার দোষ কি
আমি গ্রহণ করূতে পারি ? . কায়মনে আশীৰ্বাদ করি, মহারাজ
রাজ ঐশ্বৰ্য্য ভােগ করে চিরশান্তি লাভ করুন। চলুন মহারাজ,
গৃহে চলুন।
মান। আমার আবার গৃহ কোথায় ?-তরুতল ?
শান্ত। না মহারাজ। দর্পকে দুরীভূত করে রাজ্যোদ্ধার করুন।
মান। আর না, শান্তশীল, বাসনানল হৃদয়ে জ্বালাবার আর
চেষ্টা ক’র না। রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য কিছুই আর চাই না। সকল
বাসনা ত্যাগ করছি।
শান্ত। সে কি মহারাজ! বিশ্বাসঘাতকের হাতে রাজ্য তুলে
দিয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকবেন? একবার ফিরে দেখবেন না,
সে পাষণ্ড কি ভয়ানক অত্যাচারে আপনার প্রিয়তম প্রজাদের
প্রপীড়িত করছে ?
মান। কৰ্ম্মফলের হাত হতে কেহই নিষ্কৃতি পাবে না।
নিয়তির গতিরােধ করে এমন শক্তিধর কে আছে ?
শান্ত। আপনিই তাদের নিয়তি, রাজার ইঙ্গিতে প্রজার
ভাগ্য পরিবর্তন।
মান। রাজা কে? দর্পনারায়ণ এখন রাজা।
শান্ত। সে প্রভুদ্বেষী ভৃত্য ; রাজা আপনি।
মান। রাজা আমি ? ভুল বুঝেছ, শান্তশীল। মানসিংহ
মরে গেছে-আমি ভিখারী।

রমাবতী। শান্ত। যতদিন চন্দ্রসূৰ্য্য থাকবে ততদিন আপনি রাজা। মান। ক্ষুধায় যার জঠর জ্বলছে, কৌপিন মাত্র যার অবলম্বন হয়েছে, বৃক্ষতল যার একমাত্র আশ্রয়, সে যদি রাজা হয় তবে আমি নিশ্চয় রাজা। ধন, প্রাণ, পিতা বিসর্জন দিলে সংসারে যদি নিয়তি বলে খ্যাতি লাভ হয়, তবে আমি নিঃসন্দেহ ভাগ্যবিধাতু বলে জনসমাজে পরিচিত হতে পারি। আর আমায় বুঝাতে চেষ্টা করে না, শান্তশীল, আমাকে আমি বেশ বুঝেছি। (কয়েকজন প্রজার প্রবেশ) ১ম প্রজা। মহারাজ, রক্ষা কর—দেশ ছারখার হ’ল- এতদিন কোথায় ছিলে, মহারাজ ? মান। কাকে মহারাজ বছো, বাবা ? ১ম প্রজা। আমার কাছে লুকুতে পারবে না-আমি তােমায় অনেক বার দেখেছি। মহারাজ ছদ্মবেশ ছাড়, সিংহাসনে এসে বসাে। দপা বেটা রাজ্যটা যে ছারখারে দিলে, মহারাজ! ২য় প্রজা। এই দেখ, মহারাজ পাবেটা আমার ঘর জালিয়ে দিয়েছে। ৩য় প্রজা। আমার যুবতী স্ত্রীকে ধরে নিয়ে গেছে, মহারাজ। ৪র্থ প্রজা। দপাবেটা আমার ঘর লুট করে সব নিয়ে গেছে মহারাজ। ৫ম প্রজা। রক্ষা কর, রক্ষা কর, মহারাজ, আমরা ধনে প্রাণে মলুম, তুমি আসবে বলে পথ পানে চেয়ে আছি—তাই

রমাবতী।
আজও দেশ ছাড়িনি। তুমি সিংহাসনে বসাে, দেওয়ানকে
তাড়িয়ে দাও।
মান। একি, শান্তশীল, মনােমধ্যে আবার ক্রোধ জাগছে
কেন? যা’ নিবে গেছে, তার আবার শিখা কেন? রাধাবল্লভ,
প্রবৃত্তি নিবাইয়া দাও; সংসারে আর আমায় লিপ্ত করে না।
(স্ত্রীগণের ভেট লইয়া প্রবেশ ও গীত)
আজি, আকুলিত ভীতচিত, হরষিত।
দুঃখ নিশাগত, চন্দ্রমা উদিত, মধুপবনে সুধা ক্ষরিত।
ধর ধরণীধর, আদর উপহার, নয়ন সিঞ্চিত, ভকতি হার;
ধন জন জীবন, পালন কারণ, (করি) দরশন চিত উল্লসিত।
মান। হা ভগবান, আমার মত অভাগাকে, লোকে আজও
ভালবাসে ?
তােমরা জাননা আমি কে, তাই তােমার।
আমায় ভালবাস। যারা আমায় ভাল বেসেছিল তাদের আমি
নিৰ্যাতন করেছি, যারা আমার মঙ্গল খুজেছিল, তাদের দূর করে
দিয়েছি। তােমরা দূরে থাক , কাছে এসনা, ভাল বেস না ;
এ অভাগাকে ভাল বাসলে কাদতে হবে, একদিন আমারই
হাতে লাঞ্ছিত হতে হবে।
১ম এজা। মহারাজ, আমাদের কান্না দেখে কি তােমার দয়া
হয় না? তুমি ত এমন ছিলে না, মহারাজ? প্রজার কান্না
দেখলে তুমি ত কখন স্থির থাকতে পারূতে না? চল, মহারাজ,
৯৭

রমাবতী।
রাজধানীতে চল, দেওয়নাকে মেরে আমরা তােমায় সিংহাসনে
বসাব।
(জনৈক স্ত্রীলােকের প্রবেশ।)
স্ত্রী। (চরণে পড়িয়া) রক্ষা কর, রক্ষা কর, মহারাজ,
আমার জাতি, কুল, মান সব যায়।
মান। তােমার কি হয়েছে ?
স্ত্রী। আমার একমাত্র পুত্রবধূকে পাপিষ্ঠ দপ হরণ করে নিয়ে
গেছে। কি হবে মহারাজ, আমার কি হবে? (ক্রন্দন )
মান। কোথায় কোন পথে গেছে ? শীঘ্র বল।
স্ত্রী। চলাে, মহারাজ, রাজধানীর দিকে চল।
সকলে। মার, মার, দপা বেটাকে মার।
( প্রস্থান)
৯৮

চতুর্থ অঙ্ক। e প্রথম দৃশ্য। -do- প্রমােদ ভবন ( চিত্রা, চাপা, মােহিনী, স্বর্ণ ও সুদি—সকলের গীত) মােরা বিকচ কমল, তপন সম্বল, হাসি ভাসি ল’য়ে সরসীর জল। থাকি সরম আবেশে, সদা কাঁপি তরাসে, ব্যথা দিলে কে কঠিন পরশে, কেবা সাধিল বাদ, ওহাে ঢালিল গরল । হাসি হাসি অনল ঢেলে দিলি, মরম দাহে অঙ্গ হ'লাে কালি, উহু জীবন ক্ষার, ওগাে চিত চঞ্চল । চিত্রা। আমাদের কি কষ্টের জীবন! হৃদয় আলাময়, মুখে হাসি। প্রাণে হা হুতাশ, অধরে গীত। কি ছিলে, কি হলে। কোথায় স্বামীর গৃহস্থ বধু, আর কোথায় চিরকলঙ্কিতা রক্ষিত। বো। চাপ। ভগবান কি বিচার করবেন না? এ অত্যাচারের কি প্রতিকার করূবেন না? যে পাপিষ্ঠ আমাদের সর্বনাশ করেছে--সে ভগবানের বিচার হ’তে কখন নিষ্কৃতি পাবে না। ৯৯

রমাবতী।
মােহিনী। ভগবান! আর কেন বিলম্ব করছ ? পাপের
ফল শীঘ্র দাও ?
স্বর্ণ। যেমন সাধ্বী সতীর সতীত্ব হরণ করে পােড়র মুখে
মা বাপকে কাদায়েছে, তেমনি যেন হতভাগা আজীবন কেঁদে
কেঁদে মরে।
সুদি। ভগবান। পূর্ব জন্মে অনেক পাপ করেছি। তার
ফলে অসহ যন্ত্রণা ভােগ করছি। দয়াময় মুক্তি দাও। পিশাচকে
নিপাত কর।
( দর্পের প্রবেশ)
দর্প। তােফা! তােফা! অগ্রীগণ চুপ করে কেন? গান
লাগাও, গান লাগাও।
( স্ত্রীলােকগণের গীত)
শশী উদিল সুনীল ভালে।
হেলে দোলে কত মানিনীকুল সােহাগ হিল্লোলে ।
রজত কিরণ ঢলে, দলে দলে চকোর করে সুধাচুরি, বিভােরা কুমুদি জলে।
যমুনা পুলিনে বাঁশরি গান, দূরে ঝরে কত অমিয় তান,
শত চাদ মাখা কালিন্দির জল, হীরক ঝকি জ্বলে।
দর্প। আমি কি সুখী ? আমার মত সুখী দুনিয়াতে
কে আছে ? অতুল ঐশ্বর্যের অধীশ্বর, ইন্দ্রভবন রাজপ্রাসাদ,
প্রাণােন্মাদক উদ্যান, সহস্র সহস্র আজ্ঞাবহ ভৃত্য, লক্ষ প্রাণী
আমার কৃপালাভ আশায় প্রতিদী, অপ্সরী বিনিন্দিত নর্তকীদল।
মরি, মরি! সংসারে যা কিছু সুন্দর সব আমারি জন্য।

রমাবতী।
( প্রসন্নের প্রবেশ )
প্রসন্ন। মহারাজ, মহারাজ, এই যে মহারাজ! হাঃ হাঃ
হাঃ হাঃ। (হাস্য )
দর্প। কি হ’ল প্রসন্ন?
প্রসন্ন। মহারাজ, হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ (হাস্য ) ছাড়বার মেয়ে ?
প্রিথমে, ঐ কি বলে, মস্করি করেছিল—(হাস্য) কিন্তু যাবে কোথা ?
যেমন, ঐ কি বলে, পুকুরে এসেছে, আর অনি ইসার। আর
যেমন ইসার, অনি কি বলে, পাঁচফোন সিং, তেজপাত সিং
একেবারে লুফে—মহারাজ (হাস্য )—আমার বক্‌সিস্?
দর্প। তবে তারা এখন এলনা কেন ?
প্রসন্ন। আছে মহারাজ, আছে। তবে সােজা রাস্তায়
না এসে, ঐ কি বলে, একটু ঘুর পথে আছে। কি জানি যদি
কেউ ছিনিয়ে নেয় ? মহারাজ, বসি।
দর্প। কার এত আস্পর্ধা যে রাজভােগের সামগ্রীতে হাত
দেয়? যা হাে’ক প্রসন্ন, তােমার বাহাদুরী আছে। তোমায় আজ
ভাল করে পুরস্কৃত করবাে।
(জনৈক স্ত্রীলােকসহ প্রহরিগণের প্রবেশ)
প্রসন্ন। ঐ যে মহারাজ। (হাস্য )
দর্প। তােমরা রাজসরকারের উপযুক্ত ভৃত্য। কল্য যথাযােগ্য
পুরস্কৃত করবে।
(প্রহরিগণের প্রস্থান)
প্রসন্ন। ও রাঙা বােড়, আর কারে লাজ ?
ঐ কি বলে,
১০১

রমাবতী
ঘােটা খােল, তাের বড় পুণ্যি বউ, তাের বড় পুণ্যি, তাই আজ
রাণী হলি। এখন রাজবাড়ীতে থাক; ফুরফুরে বাতস খ-আর
চাদের আলােতে—ঐ কি বলে-পাইচারি কর।
বউ। না, আমি এখানে থাকবে না। আমায় ছেড়ে দাও।
দর্প। সে কি ধনমণি? এমন রাজ্য ঐশ্বৰ্য্য তুচ্ছ করে তুমি
যাবে কোথায় ? পর্ণকুটির কি তােমার যােগ্য স্থান ? আমি
তােমার দাস হ’ব, তােমার পায়ে যথাসর্বস্ব সমর্পণ করবো, তুমি
আমায় ছেড়ে যাবে কোথায় ?
প্রসন্ন। ও বউ, আর কি চাস্? মহারাজ তাের নকর
হলো, ঘুমটা খুলে,-ঐ কি বলে-দুটো আলাপচারি কর।
বউ। আমি রাজঐশ্বৰ্য্য চাই না। ভগবান আমায় যা
দিয়েছেন, আমি তাতেই সুখী। আমায় ছেড়ে দাও।
প্রসন্ন। মর ছুড়ি।
মর চুড়ি! সুখে খেতে ভূতে কিলােয় বুঝি ?
মরছিলি জল বয়ে—ভাত বেঁধে ;-একবেলা অন্ন জুটতাে—এক
বেলা জুটতাে না—এখন ঐ কি বলে-রাজরাণী হ’লি, ভাল খাবি,
ভাল পরবি, তা নয়, চুড়ির গরব দেখ ?
দর্প। আহা! ওকে কটু কথা বলােনা। যার এত রূপ,
তা’র প্রাণে ব্যথা দিও না। তােমাকে আমি আদরে রাখবে,
যত্ন করবে, কোন অভাব থাকবে না।
বউ। আমার যা অভয, এরাজ্য কোন্ ছার, সমস্ত পৃথিবীর
রাণী হলেও সে অভাব দূর হবে না। মহারাজ, আপনার পায়ে
ধরি, আমায় ছেড়ে দি।

রমাবতী।
দর্প। তােমার যা অভাব আছে বল, সমস্তই দূর করুবো।
তার জন্যে ভাবনা কি?
প্রসন্ন। ওরে বেটি ? তাের পেটে এত বুদ্ধি ? কিছু বিষয়
নেবার মতলব কেঁদেছ ?
বউ। মহারাজ! যদি অবলার প্রতি এত দয়া, তবে সতীত্বে
কালি দিবেন না। ভগবানের ইচ্ছায় আমি যাকে স্বামিত্বে বরণ
করেছি, তার কাছে আমায় পাঠিয়ে দিন। আমি রাজ্য ঐশ্বৰ্য্য
কামনা করি না। আমার এই অভাবটি মােচন করুন। আমি
অতি দীন গৃহস্থবন্ধু, মহারাজের যােগ্য নই।
প্রসন্ন। ওমা! কোথা যাব মা! চুড়ির অহঙ্কার দেখে
আর বাচিনে। মহারাজ! ও মিষ্টি কথার কেউ নয়। এত বড়
লােকটা কাকুতি মিনতি করছে—ঐ কি বলে—একটু গেরাহি
নাই ? আমরা তু করে ডাকলেই ছুটে যাই। তবে পােড়াকপালী
এখন কি আর সে দিন আছে ?
দর্প। তুমি সে আশা ত্যাগ কর, তােমার স্বামীকে ভুলে
যাও। তুমি যদিও দীনদরিদ্র, তথাপি রূপে অতুলনীয়া ; রাজ্যের
উৎকৃষ্ট সামগ্রীতে আমার অধিকার।
প্রসন্ন। তার আর বলতে মহারাজ ? ওলো ছুড়ি, তুই কি
করে জাবি। তুই সেদিনকার মেয়ে বইত নয়? রাজা হওয়া
কত মজা তুই কি করে বুঝবি? একটি ভাল ফলের গাছ আজ্জালুম
ভােগে এল রাজার। খরচ করে—পুকুর কাটিয়ে,-মাছ ফেলুম
ভােগ করবে রাজা। ওলাে মিষ্টির ভাণ্ডার থেকে পায়খানা পর্যন্ত
?

রমাবতী।
যেখানে যা কিছু ভাল মাল আছে, সব রাজার। তাই বলি, তাের
স্বামীর মুখে মুড়াে জ্বেলে রাজরাণী হ’, গৃহস্থ ঘরের কথা ভুলে যা।
বউ। ভুলবে? কখন ভুলবাে না। তুচ্ছ জীবন বলি দিব।
তথাপি যাকে বরণ করেছি, সে দ্বীন, দরিদ্র, পথের ভিখারী হােক,
অন্ধ হ’ক, খঞ্জ হক এ জন্মে তাকে ভুলতে পারব না।
দর্প। অবশ্য পাবে। জান না, তুমি কার সঙ্গে কথা কচ্ছ ?
বউ। জানি, একটা ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে, সত্য কথা
বলতে ভয় কি? আমার পর্ণকুটিরবাসী দরিদ্র স্বামীই আমার
ঐশ্বৰ্য্য। আমি ধন সম্পদের ভিখারী নই। মহারাজ এখনও
বলছি, আমার সর্বনাশে উদ্যত হবেন না।
প্রসন্ন। ও মাগাে! ছুড়ির যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা।
ওমা কি হবে !
(জনৈক প্রহরীর বেগে প্রবেশ)
প্রহরী। মহারাজ সর্বনাশ হয়েছে। প্রজারা বিদ্রোহী হয়ে
নগর আক্রমণ করেছে।
দর্প। তাদের তাড়িয়ে দিতে বলগে।
প্রহরী। কাকে বলব মহারাজ ? সকলেই যে মাইনে না
পেয়ে পালিয়েছে। দু’দশজন যারা নেমকের চাকর, তারাই আমার
মত আজও আছে।
দর্প। তােমরাই তাদের তাড়িয়ে দাওগে।
প্রহরী। আমরা পাবো কেন মহারাজ—তারা যে অনেক।
১০৪.

রমাবতী।
দর্প। না পায়, কয়েদ যাবে—যাও এখনি যাও।
( প্রহরীর প্রস্থান)
এখন সুলােচনে, কাছে এস দেখি।
বউ। দূর হও পাপিষ্ঠ।
দর্প। তুমি অবলা--তাই এ সকল কথা বলতে অবকাশ
পাচ্ছ। নচেৎ এখনি তােমার মস্তক স্কন্ধ হতে বিচ্যুত হত।
। মরণের ভয় কারে দেখাও? জান না কি মহারাজ ?
আৰ্যকন্যা জীবন্তে জ্বলন্ত চিতায় হাস্যমুখে আরােহণ করে।
আমিও সেই আৰ্য্যদুহিতা। মৃত্যুর ভয় যদি থাকতাে, তাহলে
হৃদয়ের সর্বস্ব ঢেলে পতি সার করূতে পাতাম না।
প্রসন্ন। ও বেটি ছােট লােক। আর ঐ কি বলে, কথায়
কাজ নাই।
দর্প। গৰ্বিতা অবলা, তােমায় অনেক ক্ষমা করলুম। আর
বাক্যব্যয়ে প্রয়ােজন নাই। ঐ গুপ্তমন্দিরে চল।
বউ। যাব না—কিছুতেই না।
দর্প। নিশ্চয় যেতে হবে।
বউ। কার সাধ্য আমায় নিয়ে যায় ?
(প্রহরীর প্রবেশ)
প্রহরী। মহারাজ, বিদ্রোহীরা নগর ও দুর্গ অধিকার
করেছে।
দর্প। বেশ করেছে। তােকেকে এখানে আতে বল্লে ?
(প্রহরীর প্রস্থান)

রমাবতী।
প্রসন্ন, দুষ্টাকে ধর। সয়তানি, তুই কি জানিনে,আমার
নামে যম পৰ্য্যন্ত কম্পিত ?
প্রসন্ন। এই যে মহারাজ। (বধূর হস্তধারণ)
বউ। তবে রে পােড়ারমুখী, সতীর অঙ্গে হাত ?
(প্রসন্নর কেশধারণ)
প্রসন্ন। ওহহাঃ হােঃ হােঃ। গেলু, গেলু,ছাড়-
ছাড়—ছাড়। উহুঃ হুঃ হুঃ হুঃ ঐ কি বলে—গেছি—গেছি-
ছাড়ছাড়।
দর্প। (বধূর হস্ত হইতে প্রসন্নকে মুক্ত করণ )
প্রসন্ন। ও মাগাে! ফটাশ, ফটাশ-ঝন্ ঝ। ওমা চিড়িক
চিড়ি—টন্ট।
দর্প। কি স্পর্ধা! একটা তুচ্ছ রমণীর দ্বারা অপমান?
তবে রে পাপীয়সি-(হস্তধারনােত ও বধূর ইতস্ততঃ পলায়ন)
বউ। দীনবন্ধু, রাধাবল্লভ! রক্ষা কর, রক্ষা কর। কোথা
আছ, দয়াময় রক্ষা কর—রক্ষা কর ।
দর্প। দুষ্টা, কতক্ষণ পালিয়ে বেড়াবি? যখন আনার
ক্রোধানল জ্বেলেছিস, তখন তাের নিস্তার নেই।
বউ। দয়াময়, আর বুঝি পারুলেম্ না। দুষ্ট দর হস্ত
থেকে, আর বুঝি সতীত্বর রাতে পারলেন না। কোথা আছ
রক্ষাকর্তা। মান রাখ।
(শান্ত ও মনসিংহের প্রবেশ )
মান। কেন পারবে না মা? অবশ্যই পাবে। এক প্রাণে

রমাবতী।
নারায়ণকে ডেকেছ, তিনি তােমায় রক্ষা করেছেন। যিনি পঙ্গুকে
গিরিল্যন করাচ্ছেন, বামনকে চন্দ্র স্পর্শ করাচ্ছেন,তিনি
তােমার সতীত্ব রক্ষা করতে পাবেন না? মা, কোন ভয়
নাই
বউ। বাবা রক্ষা কর, রক্ষা কর।
মান। ভয় নাই মা, গৃহে যাও।
বউ। বাবা, ভগবান তােমার মঙ্গল করুন।
( প্রস্থান)
মান। চিনিতে কি পারহে দেওয়ান ?
দর্প। কোই হায় ?
শান্ত। দর্পনারায়ণ, ঘাের অত্যাচারে রাজ্য উৎসয়ে দিয়ে
মরুভূমি করেছ। দেশবাসী, কৰ্ম্মচারী, ভৃত্য সকলে তােমার
অত্যাচারে প্রপীড়িত হয়ে পালিয়ে গেছে। আর কারে খুজছো ?
এ মরুভূমির মধ্যে কাকে পাবে ?
দর্প। তােমরা কে ? (মানের প্রতি) তুমি ! তুমি কে?
মান। আমি ? চেন না কি আমায় দেওয়ান ?
পিতার আদেশ ঠেলি যে জন গৃহেতে
দিয়েছিল তােমারে আশ্রয়,
প্রেমপ্রীতি দিয়ে রেখেছিল হৃদয়মন্দিরে,
ভ্রাতৃস্নেহ আবরণে ;
আত্মপ্রাণ ঢালি তাের কথায়
যে জন করিল তার পিতারে নিধন ;
তব বাক্য করি যেই বেদবাক্য জ্ঞান,
১০৭

রমাবতী। সতীরে করিল দূর পদাঘাত করি মন্ত্রমুগ্ধ নির্বোধ অধম ; যেই ভিক্ষুকের বেশে, দেশে দেশে অনাহারে করিল ভ্রমণ, সেই, সেই আমি মানসিংহ নরাধম। কিন্তু তব কাল পূর্ণ এবে, প্রজার জীবন, খেলারপুতুলীসম- অকাতর প্রাণে, কেড়ে নেছ পাষাণ হৃদয়ে। মর্মভেদী করুণ রােদনে, ব্যোমল ধ্বনিত সতত। শান্তি বিলাইতে নারী এসেছে জগতে, পারিজাত সম আহা সতীত্ব রতন, ছিড়ি সে সুন্দর ফুল, বন্যশূকরের প্রায়, ডুবায়েছ অকাতরে পঙ্কিল পাথারে। চিত্র। মহারাজ, আমরাই সেই হতভাগিনী। এই নরপিশাচ আমাদের সর্বনাশ করে সতীত্ব নষ্ট করেছে। আমাদের জনসমাজে ঘৃণিতা, অস্পৃশ্যা করেছে। মহারাজ, অনুমতি করুন-নখাঘাতে পাষণ্ডের বক্ষবিদীর্ণ করে রক্ত পান করি। আর সহ্য হয় না। মান। শুন দর্প, মর্মভেদী গাথা, কাদেনা কি পরাণ তােমার ? সতীর আঁখির জল অনাথ রােদন, পীড়িতের আর্তনাদ, মুমুর্মু হুতাশ, উঠেছে আকাশ পথে ঈশ্বর উদ্দেশে, ধর্মের তুলাদণ্ড নত তব ভরে অশক্ত ধরিত্রী এবে ধরিতে সে ভার। ১০৮

রমাবত।
বন্ধুভাবে আজীবন করিনু পালন
ফল তার অনন্ত যাতনা ।
যাও রাজ্য ত্যজি গহন কাননে
দেহে থাকে যদি বল, চ’খে থাকে যদি জল
প্রায়শ্চিত্ত কর তার আজন্ম ক্রন্দনে,
দগ্ধমুখ লােকালয়ে না দেখাও আর।
শান্ত। ধন্য মহারাজ আপনার ক্ষমাশীলতা।
রমণীগণ।
দুরাচার, যেমন আমাদের সতীত্ব হরণ
সমাজের হেয় করেছিস, এই পদাঘাত (পদাঘাত করণ) তাহার
সামান্য প্রতিফলস্বরূপ গ্রহণ কর।
( দর্পের প্রস্থান)
চিত্র। মহারাজ নিরাশ্রয়া অবলাদের গতি কি হবে ?
মান। শান্তশীল এদের জন্য এক পৃথক বাড়ী নির্দিষ্ট করে দাও।
তারা যেন তথায় আজীবন উত্তমরূপ ভরণপােষণ প্রাপ্ত হয়।
রমণীগণ। ভগবান তোমার মঙ্গল করুন। (প্রস্থান)
১০৯

দ্বিতীয় দৃশ্য। প্রান্তর দর্প। হায় আমি কি কলুম-আমি কি করসুম। এ্যা কি বলছ ? মহাপাপ-নিশ্চয় তাত করেছি, তবে আর কেন তিরস্কার- কেন ভয় দেখাও ? একি! একি! কেও ? জটাজুট সমাচ্ছন্ন কুটী কুটিল বদন রােষকষায়িত লােচনে আমার দিকে ছুটে আসছে ? এলে যে ? এসে পড়লাে যে ? কোথা পালাবদা, কোথা রক্ষা পাবো ? বিশ্বাসঘাতককে আশ্রয় দিবে কে? কে আছ রক্ষা কর, রক্ষা কর। (বেগে অগ্রসর) ও কি ? কি কর্কশ স্বর-জলদগম্ভীরস্বরে বলছে, দর্প গুরুহত্যা, স্ত্রীহত্যা, প্রভুহত্যা তাের পাপের প্রায়শ্চিত্ত--ওরে ওরে গেল—গেল—বজ্রাঘাত বজ্রাঘাত, ব্রহ্মাণ্ড মস্তকে ভেঙ্গে পড়লাে। যাই যাই-কোথা যাব- আমি প্রতারক—আমি বিশ্বাসঘাতককে আশ্রয় দিবে—আমার কি হলো—আমি কি করলুম-মলুম-মলুম—ঐ ঐ ঘেরে ফেল্লে- পুড়িয়ে ফেল্লে-অগ্নি, অগ্নি—চতুর্দিকে অগ্নি। কে আমায় রক্ষা কবে? বিশ্বাসঘাতককে কে আশ্রয় দিবে ? কে আছ গাে' রক্ষা কর রক্ষা কর। আর আমি বিগঘাতকের কাজ করবে না, প্রতারণা প্রবঞ্চনা জন্মের মত জলাঞ্জলি দিলুম। উপকারী ব্যক্তির চিরকাল • ১১০ ।

রমাবতী।
দাসত্ব করূদে। ওহহ হহ! বুক ভেঙ্গে গেল। কি বিকট হাস্য,
শ্রবণ বধির হলাে। কি বলছো? আমি বিশ্বাসঘাতক? আমার
কথায় কেউ বিশ্বাস করবে না? তবে কি আর আমার স্থান নাই।
ইহকালেও নাই, পরকালেও নাই ? জীবনে নাই, মরণেও নাই ?
হায় আমার কি হলো? হায় আমি কি কলুম ?
( কতিপয় কৃষকের প্রবেশ)
সকলে। ওরে ! ওরে! দেখ, দেখ, সেই গুখেকোর বেটা
দপা। মার শালাকে-গাে-বেড়েন কর।
দর্প। কে তােমরা গাে ? কে তােমরা? আমায় আশ্রয়
দাও।
১ম কৃষক। এই যে শালা! তােমায় আছরা ভাল করে
দিচ্ছি। একবার মহারাজের ঘরে আছরা নিয়ে তার সর্বনাশ করেছ,
রাজ্যের বউ বিটির ইজ্জৎ মেরেছ, এবার আমরা নিয়ে কি করবি
রে, শালা? মার শালাকে, জিউ রেখে মার। (প্রহার )
দর্প। মারিনে ভাই, মারিসনে। আর কিছু করূবে না।
যে আমায় আশ্রয় দিবে তার চিরকাল মঙ্গল কামনা করবো।
২য় কৃষক। শালার ধর্মের কথা শোরে ! ওরে শালা !
রাজার মতন কি তুই আমাদিগকে বােকা পেয়েছিস! মার, মার,
শালাকে। (পুনঃ প্রহার )
৩য় কৃষক। বিশ্বাসঘাতুকইঃ ভিড়, ড্যাম, শালে! তােম
কেঁউটে সাপের জাত বেটিস, হাম কি পারত নাইরে বেটা ?
খুন কর—শালাকে খুন কর। (প্রহার )

রমাবতী।
দর্প। আর মারিস না ভাই—আর মারিস না।
১ম কৃষক। হাঃ হ, করছিস কিরে মুখর ডিম? মানুষটা
যে মরে যাবে? তখন কি খুনের দায়ে পড়বি ?
২ কৃষক।
কি করলি রে শালা ? আর যে মানুষটা
লড়ে নামলো নাকি ? চল, চল পালাই চল।
৩য় কৃষক। ইষ্টভিড, ড্যাম্ শালে? ( সকলের প্রস্থান)
( শান্তশীল ও দীনু পাগলের প্রবেশ )
শান্ত। দীনু, শীঘ্র চল, মহারাজ জলস্পর্শ করেন নাই। এত
বুঝলে কিছুতে শুলেন না। উন্মাদের মত রাণীমাকে আনুতে
ছুটেছেন। শীঘ্র চল।
দী। পাপের তরী, হলো ভারি।
দর্প হেথায় গােঙ্গায় ভারি ॥
শান্ত। (চকিত হইয়া) সত্যিই তাে! দর্পনারায়ণের একি
দশা ? জ্ঞানশূন্য ? দীনু, শিগগির জল আন।
দীনু। জল দিলে কি হবে ভাই।
দর্প এখন খাবি খায় ।
( প্রস্থান)
শান্ত। দপ, দর্প।
দর্প। জল, জল! বড় তৃষ্ণা। কে ভাই-বড় তৃষ্ণা।
(জল লইয়া দীনুর প্রবেশ
( জলদান) দুপ,
উঠ, কোন লােকালয়ে যাও।
অনাহারে কয়দিন বাঁচবে ?
১১২

রমাবতা দর্প। লােকালয় ? কোথা লােকালয় ? আর লােকালয় কেন, যমালয়ে পাঠিয়ে দাও। শান্ত। আহা! দর্প তােমার কষ্ট দেখে বাস্তবিকই দুঃখ হচ্ছে। দর্প। আমার কষ্ট দেখে তােমার দুঃখ হচ্ছে ভাই ? কোন উপকরণে তােমার হৃদয় গঠিত? কোন গুণে তুমি বিশ্বাসঘাতকের প্রতি দয়া করূছো? তুমি কে ভাই ? শান্ত। আমি শান্তশীল, আমায় চিতে পাছছা না ? দর্প। তুমি শান্তশীল। বিনা অপরাধে যার সর্বনাশ করে- ছিলুম, তুমি কি সেই শান্তশীল? আমার প্রতি তােমার এত দয়া ? তুমি মানব না দেবতা? তুমি স্বার্থপর সংসারের-না স্বর্গের ? শান্ত। আর সে কথা কেন তােল ভাই? যা হবার হয়ে গেছে। এস আমার সঙ্গে এস, তােমায় কোন লােকালয়ে রেখে যাই। দর্প। আর সে কথা তুলবােনা। তােমার শ্রীপদের ধূলি দাও। তুমি ভগবান, লােকালয়ে আর যাব না। আমি বিশ্বাস- ঘাতক আমায় ত্যাগ কর। শান্ত। ভাই, দুঃখ করো না—সবই ভগবানের ইচ্ছা। তুমি কি করতে পার। দর্প। আমি কি করতে পারি ? প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, লােকের সর্বনাশ করতে পারি। আমি বিশ্বাসঘাতক। (বেগে প্রস্থান) শান্ত। আহা! দর্প বেচারা উন্মাদ হয়ে গেছে। কোথায় গেল ? অনাহারে কি প্রাণ ত্যাগ করবে? ১১৩ 1 ১১৩

ম
দী। পাপের মজা দুদিন ভাল, শেষে দুঃখ চিরকাল।
ভেবে আর কি করবে বল, চল আমরা যাই চল।
শান্ত। তবে যাই চল।
( উভয়ের প্রস্থান)
তৃতীয় দৃশ্য।
প্রসন্ন।
প্রসন্ন।
ওগাে আমার সর্বনাশ হয়েছে গাে। ওগো
কে কোথায় আছ আমায় রক্ষা কর-ডাকাতে আমার সর্বস্ব
কেড়ে নিয়ে গেছে গো। এতদিন গতর খাটিয়ে যা কিছু করে
ছিলুম, সব নিয়ে গেছে গাে। আমার হাত মুচড়ে,তাগা
বালা—আর, নাক কান ছিড়ে নথ, মাকড়ি নিয়ে গেছে গাে।
ওগাে কোথায় কে আছ গাে, আমায় বাঁচাও গাে ।
(দীনুর প্রবেশ )
দীনু। একি, এখনাে থামেনি হাঁক ?
পাড়ছে যেন যাঁড়ের ডাক,
তাের দুপা বেটা মরে থাক,
এখনো তবু বাজছে শাক ?
১১৪

রমাবতী দর্প। লােকালয় ? কোথা লােকালয় ? আর লােকালয় কেন, যমালয়ে পাঠিয়ে দাও। শান্ত। আহা! দর্প তােমার কষ্ট দেখে বাস্তবিকই দুঃখ হচ্ছে। দর্প। আমার কষ্ট দেখে তােমার দুঃখ হচ্ছে ভাই ? কোন উপকরণে তােমার হৃদয় গঠিত ? কোন গুণে তুমি বিশ্বাসঘাতকের প্রতি দয়া করূছছ ? তুমি কে ভাই ? শান্ত। আমি শান্তশীল, আমায় চিন্তে পাছো না ? দর্প। তুমি শান্তশীল। বিনা অপরাধে যার সর্বনাশ করে- ছিলুম, তুমি কি সেই শান্তশীল? আমার প্রতি তােমার এত দয়া ? তুমি মানব না দেবতা? তুমি স্বার্থপর সংসারের-না স্বর্গের ? শান্ত। আর সে কথা কেন তােল তাই ? যা হবার হয়ে গেছে। এস আমার সঙ্গে এস, তােমায় কোন লােকালয়ে রেখে যাই। দর্প। আর সে কথা তুলবােনা। তােমার শ্রীপদের ধুলি দাও। তুমি ভগবান, লােকালয়ে আর যাব না। আমি বিশ্বাস- ঘাতক আমায় ত্যাগ কর। শান্ত। ভাই, দুঃখ করো না—সবই ভগবানের ইচ্ছা। তুমি কি করতে পার। আমি কি করতে পারি ? প্রতারণা, প্রবঞ্চনা, লােকের সর্বনাশ করতে পারি। আমি বিশ্বাসঘাতক। (বেগে প্রস্থান) শাস্ত। আহা! দর্প বেচারু, উন্মাদ হয়ে গেছে। কোথায় গেল ? অনাহারে কি প্রাণ ত্যাগ কবে ? ১১৩ দর্প। জ

রমাবতী।
শান্তি কোথাও মিলবে নাক,
মরবি শুধুই মাথা খুড়ে ।
( প্রসন্নের পুনঃ প্রবেশ)
প্রসন্ন।
(গীত)
তােরা দেখে যা, তােরা দেখে যা কেমন মজা মেরেছি,
পয়সার পাছু ছুটে ছুটে, কেমন দাগা পেয়েছি।
আর ছুটবো নাক বাপ,
আর করবাে নাক পাপ,
হা, হা হা হা, হি হি হি হি, বড় হাসা-হেসেছি,
হা, হা, হা হা, হাে হাে, হাে হাে, ভূতের বােঝ ফেলছি।
( শান্তর প্রবেশ )
শান্ত। দীনু সব শেষ হয়েছে,-মা, আমাদের ত্যাগ করে
চলে যেতে বসেছেন—জীবনের আর কোন আশা নাই। এতদিন
পরে মােহনপুর রাজবংশ লক্ষ্মীভ্রষ্ট হ’ল-রাজ্য ধর্মহীন হ’ল ।
দী। এখানে যে বড় তাপ, ফুটতে পারে কি পারিজাত,
ফুটলে পরে শুকিয়ে মারবে করে পদাঘাত।
আকাশের ফুল হেথা শিউরে মলল। পাপে,
আমিও এবার দেশ ছাড়লুম তােমাদেরই দাপে।
( প্রস্থান)
শান্ত। হায়, হায় একি হল! সকলি ফুল।
তম কাদম্বিনী ঘেরা আঁধার গগনে।
ছিল মাত্র একটি তারকা।
4

রমাবতী।
প্রসন্ন। না গো, তা নয়। কে, দীনু ঠাকুর ? তােমার
পায়ে পড়ি, আমায় রক্ষা কর। আমি যা কিছু এতকাল ধরে
করেছিলুম তা পুটুলি বেধে নিয়ে পালাচ্ছিলুম—রাস্তায় ডাকাতে
কেড়ে নিয়ে গেছে গাে। ওগো আমার সব নিয়ে গেছে গো,
কেবল পরণের কাপড় না রেখে গেছে গো। হায় হায় আমার
কি হবে গাে?
তুই হয়েছিলি বড় ভারি।
তাই খসে গেল পয়সা কড়ি।
যদি হতে পারিস হালকা ভারি,
তবে পারবি দিতে ভব পাড়ি ।
দী।
প্রসন্ন। ওমা পাগলের সঙ্গে কথা কইতে কইতে আমিও
পাগল হব নাকি? আমার মাথার ভিতর কেমন কচ্ছে ; আমার
সৰ্বস্ব গেছে তবুও আমি দাড়িয়ে কথা কচ্ছি ? আমার কি হবে
গাে? আমায় কে খেতে দেবে গো ?
(বেগে প্রস্থান)
দী।
পাপেডুবলে প্রথম মজা,
শেষকালেতে বিষম সাজা।
দপা বেটার গতি' দেখে
আপন মনকে আপনি বােঝা।
পাপের বােঝা মাথায় করে
ফিবি দেশে ঘুরে ঘুরে।

রমাবতী।
শান্তি কোথাও মিলবে নাক,
মরবি শুধুই মাথা খুঁড়ে ।
( প্রসন্নের পুনঃ প্রবেশ)
প্রসন্ন।
(গীত)
তােরা দেখে যা, তােরা দেখে যা’ কেমন মজা মেরেছি,
পয়সার পাছু ছুটে ছুটে, কেমন দাগা পেয়েছি।
আর ছুটবাে নাক বাপ,
আর করবাে নাক পাপ,
হা, হা হা হা, হি হি হি হি, বড় হাসা-হেসেছি,
হা, হা, হা হা, হাে হাে, হাে হাে, ভূতের বােঝ ফেলছি।
( শান্তর প্রবেশ)
শান্ত। দীনু সব শেষ হয়েছে,-মা আমাদের ত্যাগ করে
চলে যেতে বসেছেন—জীবনের আর কোন আশা নাই। এতদিন
পরে মােহনপুর রাজবংশ লক্ষ্মীভ্রষ্ট হ’ল-রাজ্য ধর্মহীন হ’ল।
দী। এখানে যে বড় তাপ, ফুটতে পারে কি পারিজাত,
ফুটলে পরে শুকিয়ে মারবে করে পদাঘাত।
আকাশের ফুল হেথা শিউরে মলো পাপে,
আমিও এবার দেশ ছাড়লুম তােমাদেরই দাপে।
( প্রস্থান)
শান্ত। হায়, হায় একি হল! সকলি ফুরাল।
তম কাদম্বিনী ঘেরা আঁধার গগনে।
ছিল মাত্র একটি তারকা।

রমাবতী। কেবল একমাত্র স্বামীকে দেখতে চাই। একবার তাকে দেখাও দয়াময়! যিনি তােমার মত সুন্দর, বিশ্বের ন্যায় অসীম, বারিধি তুল্য গম্ভীর, একবার তাকে দেখাও দীননাথ। ( যুক্তকরে কঁদিতে কাদিতে) স্বামি, প্রভু কোথা তুমি ? একবার দেখা দাও। যেখানে থাক একবার এস। যদি তুমি আমার একমাত্র উপাস্য হও, যদি কায়মনােবাক্যে তোমার আজীবন পূজা করে থাকি, তাহলে তুমি যেখানেই থাক প্রভু, আমার অন্তিম সময়ে দেখা দাও। ( মানসিংহের প্রবেশ ) এসেছ। কাছে বসাে ; আরও কাছে বসাে। একবার তােমায় স্পর্শ করি-একবার তােমায় ভাল করে দেখি। অনেকদিন তােমায় দেখি নাই। অনেকদিন তােমায় স্পর্শ করি নাই ? ঐখানে বসে অমি করে ঐভাবে আমার পানে তাকিয়ে থাক, অমনি করে তােমার গও বক্ষ প্লাবিত করে চক্ষের জল ছুটুক—আমি একবার নয়ন ভরে দেখি। মান।রমা ! রমা ! আমি পাষণ্ড নরাধম—আমার এ অপ- রাধের কি প্রায়শ্চিত্ত নাই ? জাহ্নবী।-সতীর চরণ স্পর্শ কর—সর্তীর নিকট ক্ষমা চাও সকল পাপ হতে মুক্ত হবে। রমা।-ছি, ছি, করাে কি ? পায়ে হাত দিও না। জাহ্নবী, আমাকে ও আমার স্বামীকে কেন পাপে নিমজ্জিত কর। জাহ্নবী। পাপে নিমজ্জিত করলুম ? তােমার পায়ের ধূলা রমাবতী। নিলে পাপ হয়? জানি না, জগতে এতদপেক্ষা পুণ্যময় কিছু আছে কিনা! দ্বাদশ বৎসর তােমার পাশে পাশে, ছায়ার ন্যায় ফিছি, তােমার হৃদয়ের প্রত্যেক ভাব, প্রত্যেক চিন্তা, আমি অবগত আছি। জানি না, তােমার হৃদয়খানি অপেক্ষা জগতে কিছু পবিত্র আছে কিনা—জানি না, তােমার ঐ চরণ অপেক্ষা কোন তীত্ৰক্ষেত্ৰ পুণ্যময় আছে কিনা? ভারতে যত পুণ্যতােয় নদী, যত পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, এমন কি স্বয়ং ভগবান-মহারাজ মান- সিংহের পাপ ধৌত করূতে পারেন কিনা সন্দেহ স্থল। কিন্তু তােমার ঐ পবিত্র চরণ—যাহা নারায়ণের অসাধ্য তাহাও সংঘটিত করতে পারে। রমা। ছি, ছি, ছি, জাহ্নবী, কেন এমন সময় আমার মনঃ- পীড়া দাও ? বালিকা বয়সে স্বামী হারাইয়ে স্বামী কেমন দেখ নাই ? যদি দেখতে তা হলে এমন কথা বলতে পারুতে না। স্বামী সরে এস, পা এগিয়ে দাও, তােমার ঐ পায়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি। মান। রমা, রমা, তুমি আমায় একি দেখাচ্ছ ? ধর্ম পাপের নিকট পদানত! কেন রমা, তুমি আমার পদতলে ? এ দৃশ্য যে আর সহ্য হয় না, আমার বুক যে ফেটে যায়, রমা। তুনি আমায় তিরস্কার কর, তাতে শান্তি পাব, কিন্তু এ আদর, এ সম্ভাষণ আমার বুকের ভিতর যে দাবানল জ্বেলে দিচ্ছে, রমা। রমা। স্বামী আজ আমার সুখের মৃত্যু—কেঁদে আমার এ সুখ নষ্ট করো না, প্রভু, দুদিন পরে আবার সেই অনস্থ ধামে রমাবতী। কেবল একমাত্র স্বামীকে দেখতে চাই। একবার তাকে দেখাও দয়াময়! যিনি তােমার মত সুন্দর, বিশ্বের ন্যায় অসীম, বারিধি তুল্য গম্ভীর, একবার তাকে দেখাও দীননাথ। (যুক্তকরে কাদিতে কাদিতে) স্বামি, প্রভু কোথা তুমি ? একবার দেখা দাও। যেখানে থাক একবার এস। যদি তুমি আমার একমাত্র উপাস্ত হও, যদি কায়মনােবাক্যে তােমার আজীবন পূজা করে থাকি, তাহলে তুমি যেখানেই থাক প্রভু, আমার অন্তিম সময়ে দেখা দাও। মানসিংহের প্রবেশ ) এসেছ! কাছে বসে ; আরও কাছে বসো। একবার তােমায় স্পর্শ করি--একবার তােমায় ভাল করে দেখি। অনেকদিন তােমায় দেখি নাই। অনেকদিন তােমায় স্পর্শ করি নাই? ঐখানে ব’সে অমি করে ঐভাবে আমার পানে তাকিয়ে থাক, অম্‌নি করে তােমার গণ্ড বক্ষ প্লাবিত করে চক্ষের জল ছুটুক—আমি একবার নয়ন ভরে দেখি। মান।রমা ! মা! আমি পাষণ্ড নরাধম--আমার এ অপ- রাধের কি প্রায়শ্চিত্ত নাই ? জাহ্নবী।-সতীর চরণ স্পর্শ কর—সতীর নিকট ক্ষমা চাও সকল পাপ হতে মুক্ত হবে। রমা।-ছি, ছি, করো কি ? পায়ে হাত দিও না। জাহ্নবী, আমাকে ও আমার স্বামীকে কেন পাপে নিমজ্জিত কর। : জাহবী। পাপে নিমজ্জিত করলুম? তােমার পায়ের ধূলা বমাবতী। নিলে পাপ হয়? জানি না, জগতে এতদপেক্ষা পুণ্যময় কিছু আছে কিনা! দশ বৎসর তােমার পাশে পাশে, ছায়ার ন্যায় ফিছি, তােমার হৃদয়ের প্রত্যেক ভাব, প্রত্যেক চিন্তা, আমি অবগত আছি। জানি না, তােমার হৃদয়খানি অপেক্ষা জগতে কিছু পবিত্র আছে কিনা জানি না, তােমার ঐ চরণ অপেক্ষা কোন তীত্ৰক্ষেত্ৰ পুণ্যময় আছে কিনা? ভারতে যত পুণ্যতােয় নদী, যত পবিত্র তীর্থক্ষেত্র, এমন কি স্বয়ং ভগবান—মহারাজ মান- সিংহের পাপ ধৌত করতে পারেন কিনা সন্দেহ হল। কিন্তু তােমার ঐ পবিত্র চরণ—যাহা নারায়ণের অসাধ্য তাহাও সংঘটিত করতে পারে। রমা। ছি, ছি, ছি, জাহ্নবী, কেন এমন সময় আমার মন:- পীড়া দাও ? বালিকা বয়সে স্বামী হারাইয়ে স্বামী কেমন দেখ নাই ? যদি দেখতে তা হলে এমন কথা বলতে পারতে না। স্বামী সরে এস, পা এগিয়ে দাও, তােমার ঐ পায়ে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ি। মান। রমা, রমা, তুমি আমায় একি দেখাচ্ছ ? ধর্ম পাপের নিকট পদানত! কেন মা, তুমি আমার পদতলে ? এ দৃশ্য যে আর সহ্য হয় না, আমার বুক যে ফেটে যায়, রমা। তুনি আমায় তিরস্কার কর, তাতে শান্তি পাব, কিন্তু এ আদর, এ সম্ভাষণ আমার বুকের ভিতর যে দাবানল জ্বেলে দিচ্ছে, রমা। রমা। স্বামী আজ আমার সুখের মৃত্যু কেঁদে আমার এ সুখ নষ্ট করো না, প্রভু, দুদিন পরে আবার সেই অনন্তবামে

ঈশ্বর-প্রভু।
দেখা হবে। সেখানে বিচ্ছেদ নাই, কান্না নাই—অনন্ত কাল
ভরে তােমায় নিয়ে থাকব।
মান। রমা, রমা, কি করলে আবার সে সব ফিরে পাওয়া
যায়—কি করলে আবার তেমনিটি হয় ?
রমা। স্বামী-চলিলাম—বিদায়-মনে রেখাে-স্বামী-
(মৃত্যু)
জাহ্নবী। একি হল—আমায় ছেড়ে কোথা গেলে বােন্?
(পতন ও মূচ্ছ।)
মান। রমা, রমা, চলে গেলে, স্বর্গের পারিজাত এ পাপিষ্ঠের
সংস্পর্শে শুকিয়ে গেলে ? জন্মজন্মান্তরের পুণ্যফলে যে মহারত্ন
লাভ করেছিলুম আবার–পুঞ্জীকৃত পাপের ফলে সেই অমূল্য
ধন হারালাম। যাও দেবী অনন্তধামে, যেখানে পাপ নাই,
অত্যাচার নাই, সেই পুণ্য-রাজ্যে গিয়ে পতিব্রতা ধৰ্ম্ম শিক্ষা দেও।
আর কার জন্য এ আলাময় জীবনভার বহন ক’ব, কার আশায়
শেলবিদ্ধ প্রাণে সংসারকাননে ছুটে বেড়াব—যাব যাব—যে
পথে পুণ্য বিস্তার করে হৃদয়লক্ষ্মী চলে যায়, তার অনুসরণ
কব-মা, রমা—আমায় সঙ্গে নাও।
( যবনিকা পতন )
৫
১২৩

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

台

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Ramabati

Author
Chakraborty,mahimaniranjan
Title
Biyogasta Natak
File name
Ramabati
Text
OCR done
Citation
1909
Published
2009/10/8
Publisher
Indian Publishing,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
152
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengalidrama
Keywords
Chitra
DLI number
513143
Barcode
4990010020149.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
QUAoyMFxI07
Download PDF

Ramabati