Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Galpe Ramakrishna Ed. 2nd

Mitra , Shishirkumar Ed · 2010/02/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

a, cry
শিশুতোষ মারজ
(৯শ্রীশিপির সি &ি2.বি.এ!
... রামকৃষ্ণ
%
%
শিশির পাবলিশিং হাউম

ব
ঐশিশিরকুমার মিত্র বি, এ
শিশির পাবলিশিং হাউস,
কলেজ স্ট্রীট মার্কেট,
দ্বিতীয় সংস্করণ।
লতা ৫ যি মুল্য ৪,
ষান্মাষিক মুলা ২
প্রতি সংখ্যা :
প্রি-আবদুল গফুর
নিউ ব্রিটেনিয়া প্রে,
২৪২-, অপার সারকিউলার রোড,
কলকাতা।

T কাত্তিক একেবারে অবাক হইয়া গেলেন।

No text on this page.

, রামকৃষ্ণ ! শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের নাম বােধ হয় তােমরা সকলেই শুনিয়াছ ; কিন্তু তিনি কেমন করিয়া “মাকে পাইয়াছিলেন,কেমন করিয়া “মাকে” দেখিয়াছিলেন সে কথা তােমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত জান না। এত বড় সাধুর জীবন- কথাটা সকলেরই জানা উচিত ;-তাই আজ তাহার জীবন কথা তােমাদের সংক্ষেপে বলিব। হুগলি জেলায় ‘কামারপুকুর’ নামে একখানি ক্ষুদ্র গ্রাম আছে। এখন এই গ্রামের অবস্থা নিতান্তই হীন হইয়া পড়িয়াছে, কিন্তু পূৰ্বে এই গ্রামে অনেক ধনী লােকের বাস ছিল,-কাজেই গ্রামখানির জাঁকজমকও বড় কম ছিল না। এই গ্রামে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় নামে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। ব্রাহ্মণ দরিদ্র হইলেও তঁাহার ন্যায় আচারবান ব্রাহ্মণ তখনকার দিনে অতি অল্প ছিল। রঘুবীর’ নামে তঁাহার হে

রামকৃষ্ণ
ছিল না।
একটী শালগ্রাম ছিল, তিনি তাহারই সেবায় দিন
রাত অতিবাহিত করিতেন। ক্ষুদিরামের পত্নীর
নাম ছিল চন্দ্রমণি দেবী। চন্দ্রমণির প্রকৃতিটা
এমনই সরল ছিল যে তাহার আপন পর ভেদ
কাহার দুঃখ দেখিলে তিনি আর স্থির
থাকিতে পারিতেন না। তাহার জীবনে এমন
দিন গিয়াছে,ক্ষুধার্ত প্রতিবেশীকে
নিজের অন্নগুলি প্রদান করিয়া নিজে প্রফুল্ল মনে
উপবাসে দিন কাটাইয়াছেন।
হুগলি জেলায় এই কামারপুকুর গ্রামে ১২৪২
সালের এই ফালুন বুধবার শুক্লপক্ষ দ্বিতীয়া তিথিতে
চন্দ্রমণি দেবীর গর্ভে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব
জন্মগ্রহণ করেন। চন্দ্রমণি দেবীর পূর্বে দুইটী
পুত্র ও একটী কন্যা হইয়াছিল,—শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ
পরমহংসদেব তাহার সর্ব কনিষ্ঠ সন্তান। ক্ষুদিরাম
তাহার এই কনিষ্ঠ পুত্র টীর নাম রাখিয়াছিলেন
গদাধর। কখন ও কেমন করিয়া তাহার নাম
রামকৃষ্ণ হইল তাহা তােমাদের পরে বলিব ।

রামকৃষ্ণ ন রামকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ দুই সহােদরের নাম ছিল, রামকুমার ও রামেশ্বর ও ভগ্নির নাম ছিল কাত্যা- য়নী। রামকৃষ্ণের বয়স যখন সাত বৎসর তখন তাঁহার পিতা ক্ষুদিরাম দেহত্যাগ করেন। ক্ষুদি- রামের দেহত্যাগের পর সংসারের ভার তঁাহার জ্যেষ্ঠ দুই পুত্র রামকুমার ও রামেশ্বরের উপর পড়িল। দুই ভাই তখন সংসার চালাইবার জন্য প্রাণপণে পরিশ্রম করিতে লাগিলেন, কিন্তু উপার্জন তেমন না হওয়ায় সংসারে বড়ই টানাটানি হইতে লাগিল। সংসার ঘাড়ে পড়ি- বার পর রামকুমারের কিছু ঋণও হইয়া পড়িল। কেমন করিয়া এই ঋণ শােধ করিবেন, কেমন করিয়া সংসারে আবার সচ্ছলতা আনিবেন রাম- কুমারের তখন তাহাই একমাত্র চিন্তা হইল। তিনি অনেক চিন্তার পর কলিকাতায় গিয়া অর্থ উপা- র্জনের চেষ্টা করিবেন স্থির করিলেন এবং একটা শুভদিন দেখিয়া জননীর পদধুলি লইয়া কলিকাতা রওনা হইলেন। {

রামকৃষ্ণ
কলিকাতায় উপস্থিত হইয়া রামকুমার ঝামা-
পুকুরে একটি টোল খুলিলেন। তখন রামকৃষ্ণের
বয়স চোদ্দ বৎসর। রামকুমার কলিকাতা আসি-
বার পর তাহাদের বাটীর গৃহ দেবতা রঘুবীরের
পূজা রামকৃষ্ণই করিতে লাগিলেন। রামকৃষ্ণ সে
সময়ে তাঁহাদের গ্রাম্য পাঠশালায় লেখা পড়া
শিখিতে ছিলেন বটে, কিন্তু লেখা পড়ায় তাহার
আদৌ ঝোঁক ছিল না। তাহার কণ্ঠটা ছিল অতি
সুমিষ্ট। অতি বাল্যকাল হইতেই তিনি গান
গাহিতে অত্যন্ত ভালবাসিতেন। কাহার মুখে
কোন গান একবার শুনিলেই তাহা তঁাহার কণ্ঠস্থ
হইয়া যাইত এবং সেই সকল গান অতি সুন্দর
ভঙ্গিমার সহিত গাহিতেন। কামারপুকুর গ্রামের
সকলেই রামকৃষ্ণকে বড় ভালবাসিত। স্ত্রী পুরুষ
সকলেই তাহাকে আদর করিয়া নিজের নিজে
বাড়ীতে লইয়া গিয়া তাঁহার মধুর কণ্ঠের গান
শুনিত। রামকৃষ্ণেরও কোন বাছ বিচার ছিল না,
আদর করিয়া তাঁহাকে যে ডাকি তাহাই বাড়ী

গিয়া তাহার মধুর গানে তাহাদের একেবারে
মােহিত করিয়া দিতেন।
রামকৃষ্ণের বয়স যখন সতের বৎসর তখন
রামকুমার ভ্রাতার গ্রামে লেখাপড়া কিছুই
হইতেছে না দেখিয়া রামকৃষ্ণকে সঙ্গে করিয়া
কলিকাতায় লইয়া আসিলেন। রামকুমার চেষ্টার
কোনই ত্রুটী করিলেন না, কিন্তু তাহা হইলে কি
হইবে, বাল্যকাল হইতেই রামকৃষ্ণের ধৰ্ম্ম বিষয়
ভিন্ন অপর কোন বিষয়েই মন বসিত না।
রামকৃষ্ণ কলিকাতায় আসিবার কিছুদিন পরে
কলিকাতা জানবাজার নিবাসী রায় রাজেন্দ্র
চন্দ্র দাসের বিধবা পত্নী রাণী রাসমণি কলকাতা
হইতে তিন মাইল দূরে দক্ষিণেশ্বর নামক স্থানে
গঙ্গাতীরে কয়েক বিঘা জমি কিনিয়া এক ঠাকুর
বাড়ী নিৰ্মাণ করিলেন ও তথায় কালী ও রাধা
গােবিন্দের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করিয়া যথাবিহিত
পূজার ব্যবস্থা দিবার জন্য যাবতীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত
দিগকে নিমন্ত্রণ করিলেন। পণ্ডিতগণ সমবেত

রামকৃষ্ণ হইয়া বলিলেন, “রাণী কৈবর্ত,-কাজেই কোন ব্রাহ্মণই তাহার প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহের পূজা করিতে পারে না।” ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের এই মত শুনিয়া রাণী সত্যই বড় মর্মাহত হইলেন। তিনি ব্রাহ্মণগণের মতে সন্তুষ্ট হইতে পারিলেন না। নিশ্চয়ই শাস্ত্রে ইহার কোন ব্যবস্থা আছে, ভাবিয়া রাসমণি দেশ বিদেশে পণ্ডিতদিগের গ্যবস্থা চাহিয়া পাঠাইতে লাগিলেন। ক্রমে এই কথা রামকুমারের কানে, আসিয়া উপস্থিত হইল। তিনি তখনই ব্যবস্থা দিয়া পাঠাইলেন, যে রাণী গুরুকে তাহার ঠাকুর- বাড়ী দান করুন, তাহা হইলে কালী ও রাধা- গগাবিন্দের পূজার কোন বাধাই থাকিবে না। রামকুমারের এই ব্যবস্থা পাইয়া রাণী রাসমণির আর আনন্দের সীমা রহিল না। অবিলম্বেই রাম- কুমারের ব্যবস্থা অনুসারে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার একটি দিন স্থির হইল, এবং রাণীর বিশেষ জেদাজেদিতে রামকুমারকেই সেই কাজের ভার লইতে হইল।

রামকৃষ্ণ ১৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৩২ সালে মহা ধুমধামের সহিত বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হইয়া গেল। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সহিত রামকৃষ্ণও দক্ষিণেশ্বরে মহােৎসব দেখিতে গিয়া- ছিলেন, কিন্তু কৈবর্তের প্রতিষ্ঠিত ঠাকুর বাড়ীতে অন্ন গ্রহণ করা ধৰ্ম্মসঙ্গত নহে ভাবিয়া তিনি সে দিন বাজারে গিয়া মুড়ি মুড়কি কিনিয়া খাইয়াছিলেন। ঠাকুর বাড়ীতে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করিয়াই রাম- কুমার অব্যাহতি পাইলেন না,রাণীর জেদা- জেদিতে পড়িয়া বিগ্রহের পূজার ভারও তাহাকেই গ্রহণ করিতে হইল। রামকৃষ্ণ কৈবর্ত প্রতিষ্ঠিত ঠাকুর বাড়ীতে প্রথম থাকিতে অস্বীকৃত হইয়া- ছিলেন,--কিন্তু রামকুমার যখন তাহাকে বুঝাইয়া দিলেন যে ইহা অন্যায় নহে তখন আর তিনি কোন আপত্তি করিলেন না। সেই হইতে রাম- কৃষ্ণও জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সহিত দক্ষিণেশ্বরে বাস করিতে লাগিলেন। রাণী তাহার জামাতা মধুর মােহন বিশ্বাসের উপর ঠাকুর বাড়ীর তত্ত্বাবধানের রামকৃষ্ণ ভার প্রদান করিয়াছিলেন। তিনি রামকৃষ্ণের সরল মুর্তিখানি দেখিয়াই একেবারে মুগ্ধ হইয়া পড়িলেন এবং ঠাকুর সেবার কোন একটা কাজে তাঁহাকে নিযুক্ত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। রামকৃষ্ণ প্রথমে ঠাকুর সেবার কোন কাজেই হাত দিতেন না। শেষে ভ্রাতার অনুরােধে ও মথুরবাবুর জেদাজেদিতে বাধ্য হইয়া ঠাকুরের বেশকারীর পদ গ্রহণ করিলেন। বেশকারীর পদগ্রহণ করিবার পর হইতেই রামকৃষ্ণের প্রাণের ভিতর কেমন যেন এলােমেলাে হইয়া যাইতে লাগিল। মাকে বেশ পরাইতে পরাইতে তিনি ভাবে বিভাের হইয়া পড়িতে লাগিলেন, মায়ের স্বরূপ মূর্তি দেখিবার জন্য দিন দিন তাহার প্রাণ ব্যাকুল হইয়া উঠিতে লাগিল। এই সময় সামান্য কয়েক দিনের পীড়ায় রাম- কুমার দেহত্যাগ করিলে,-রামকুমারের মৃত্যুর পর রামকৃষ্ণের উপরেই কালী পূজার ভার পড়িল। কয়েকদিন পূজা করিতে করিতেই রামকৃষ্ণের

রামকৃষ্ণ
কেমন যেন ভাবান্তর উপস্থিত হইল। তিনি ঠাকুর
বাড়ীর যেখানে সেখানে ধূলায় পড়িয়া ‘মা-মা”
বলিয়া গভীর আর্তনাদ করিতে লাগিলেন! পূজার
সময় পূজা করিতে মন্দিরে প্রবেশ করিয়া তিনি
নৈবেদ্য কাক বিড়ালকে খাওইয়া দেন, আর
কেবলই ‘মা-মা’ করিয়া দিতে থাকেন। ঠাকুর
বাড়ীর সকলে রামকৃষ্ণের এই অবস্থা দেখিয়া স্থির
করিলেন, রামকৃষ্ণ বদ্ধ পাগল হইয়াছেন।
সংবাদ মথুরবাবু ও রাণী রাসমণি অবিলম্বেই
পাইলেন। তঁাহারা দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া রামকৃষ্ণের
কাৰ্যকলাপ দেখিয়া স্পষ্টই বুঝিলেন,রামকৃষ্ণ
সাধারণ পাগল নহে, তাঁহার পাগলামীর ভিতর
এমন একটি জিনিষ আছে যাহা সাধারণ পাগলের
ভিতর নাই। তিনি যে একজন মহাপুরুষ, তিনি
যে সত্য সত্যই মায়ের সাক্ষাৎ পাইয়াছেন, এটুকু
বুঝিতেও রাণী রাসমণির বিলম্ব হইল না, তিনি
মনে মনে ভাবিলেন, এতদিনে তাহার মন্দির
প্রতিষ্ঠা সার্থক হইল।

রামকৃষ্ণ
দিন দিন রামকৃষ্ণের অবস্থা এমন হইল যে,
তাঁহার দ্বারা মায়ের পূজা হওয়া অসম্ভব হইয়া
দাড়াইল। তখন তাঁহাকে যে দেখিত সেই
ভাবিত তিনি একেবারে
বদ্ধ পাগল হইয়া
গিয়াছেন। চন্দ্রমণি দেবী পুত্রের এই অবস্থার
কথা শুনিয়া তাহাকে বাড়ীতে আনিবার জন্য ব্যস্ত
হইয়া পড়িলেন, -মথুরবাবুও রামকৃষ্ণের মাতার
ইচ্ছার কথা শ্রবণ করিয়া, সমস্ত বন্দোবস্ত ঠিক
করিয়া রামকৃষ্ণকে কামারপুকুরে পাঠাইয়া দিলেন।
কামারপুকুরে আসিয়া রামকৃষ্ণ কিছু প্রকৃতিস্থ
হইলেন। চন্দ্রমণি দেবী আত্মীয় স্বজনের সহিত
পরামর্শ করিয়া
পুত্রের
একটী বিবাহ দিবেন স্থির
করিলেন। কামারপুকুরের নিকটে জয়রামবাটী
গ্রামে রামকৃষ্ণের বিবাহ স্থির হইল। ঐ গ্রামে
রামচন্দ্র মুখােপাধ্যায় নামক একজন নিষ্ঠাবান
ব্রাহ্মণ বাস করিতেন, তাহার একটি পাঁচ বৎসরের
কন্যা ছিল, তাহারই সহিত রামকৃষ্ণের শুভ বিবাহ
সম্পন্ন হইয়া গেল।

রামকৃষ্ণ
বিবাহের কিছুদিন পরে রামকৃষ্ণ আবার
দক্ষিণেশ্বরে ফিরিয়া আসিলেন। দক্ষিণেশ্বরে
আসিয়া আবার তাঁহার ভাবান্তর হইল, আবার
তিনি “মা-মা’ বলিয়া পাগল হইলেন। এই সময়
একজন সন্ন্যাসিনী দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত
হন, ইনি তন্ত্র শাস্ত্রে অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন।
ইনি রামকৃষ্ণকে দেখিয়াই মহাপুরুষ বলিয়া চিনি-
লেন এবং তাঁহাকে তন্ত্র প্রণালীতে সাধনা শিক্ষা
দিতে আরম্ভ করিলেন। এই সন্ন্যাসিনীর নিকট
রামকৃষ্ণ তন্ত্র সাধনায় সিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন।
ইহার কিছুদিন পরে তােতাপুরী স্বামী
পরমহংস পরিব্রাজক দক্ষিণেশ্বরে আসিয়া উপস্থিত
হন এবং রামকৃষ্ণকে দেখিয়াই বেদান্ত সাধনার
শ্রেষ্ঠ অধিকারী বলিয়া চিনিতে পারেন। তােতা-
পুরীর নিকটেই রামকৃষ্ণ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং
সন্ন্যাস গ্রহণ কালে তিনিই তাহার নাম দেন
রামকৃষ্ণ। এইভাবে বার বৎসরের ভিতর রামকৃষ্ণ
পরমহংস দেব ভারতবর্ষে যত প্রকার ধর্ম মত

রামকৃষ্ণ
প্রচলিত আছে, তাহার সবগুলিতেই সিদ্ধি লাভ
করিয়াছিলেন। তিনি যখন যে সাধনা আরম্ভ
করিতেন একেবারে তখন সেই সাধনায় বিভাের
হইয়া পড়িতেন।
রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব যে একজন মহাপুরুষ,
অতি শীঘ্রই এ কথা চারিদিকে রাষ্ট্র হইয়া পড়িল।
লক্ষ লক্ষ লােক তাহাকে দেখিবার জন্য, তাহার
হিতােপদেশ শুনিবার জন্য দক্ষিণেশ্বরে জড় হইতে
লাগিল। ভাবের প্রাবল্যে মাঝে মাঝে তাহার
সমাধি হইত! ১২৯৩ সালের ৩১শে শ্রাবণ তিনি
মহা সমাধিতে নিমগ্ন হন। সে সমাধি আর তাহার
ভাঙ্গে নাই। মহাপুরুষ চলিয়া গিয়াছেন বটে,
কিন্তু আজও তাহার শত সহস্র ভক্ত শিষ্য তাহার
হিতােপদেশগুলি পৃথিবীতে প্রচার করিতেছেন।
উপদেশচ্ছলে তিনি যে সকল ভাবের গল্প তাহার
ও শিষ্যদিগকে বলিয়াছিলেন, তাহারই
কয়েকটি গল্প তােমাদের বলিব।

নাই।
নারদের অহঙ্কার।
নারদ ছিলেন একজন ভারিদরের ঋষি। দিন
রাত খালি তিনি হরিগুণ গান করিয়া বেড়াইতেন।
একবার নারদের মনে মনে ভারি অহঙ্কার হইল
যে তাহার মত হরিভক্ত বুঝি আর কেহ কোথাও
ভগবান সবই জানিতে পারেন,—তাহার
কাছে তাে আর কিছুই অজানা নাই। কাজে
নারদের এই অহঙ্কারের কথাটুকুও তিনি জানিতে
পারিলেন। তিনি নারদকে ডাকিয়া বলিলেন,-
“নারদ, পৃথিবীতে আমার একজন বড় ভক্ত আছে,
—তাহার চাইতে বড় ভক্ত আমার আর কেহ
নাই। তােমার একবার তাহাকে দেখিয়া আসা
উচিত।”
ভগবান হরির এই কথা শুনিয়া নারদের মনটা
বড়ই খারাপ হইয়া গেল। ভগবান একি বলিতে-
ছেন? আমি দিনরাত কেবল হরিগুণ গান করিয়া

নারদের অহঙ্কার
বেড়াই, আমার চেয়ে আর বড় ভক্ত কে থাকিতে
পারে? লােকটাকে দেখিয়া আসা উচিত।
নারদ ভগবানের কথার উত্তরে আর কিছু
বলিলেন না, সেই লােকটাকে দেখিবার জন্য
তখনই যাত্ৰা করিলেন । অনেক গ্রাম সহর পার
হইয়া শেষে নারদ সেই ভক্তের বাড়ীর সম্মুখে
উপস্থিত হইলেন। নারদ তথায় আসিয়া দেখি-
লেন, 'ভগবান যাহাকে দেখিবার জন্য তাহাকে
পাঠাইয়াছেন, সে একজন চাষা। সকালে একবার
শ্রীহরি বলিয়া হাল গরু লইয়া মাঠে চলিয়া যায়।
তাহার পর সারাদিন ক্ষেতের কাজ করিয়া সন্ধ্যার
পর বাড়ী আসিয়া, রাত্রে শয়ন করিবার পূর্বে
আবার একবার শ্রীহরি বলিয়া শুইয়া পড়ে।
নারদ তাে একেবারে তালা। আমি দিন রাত
হরিগুণ গান করিয়া বেড়াইতেছি আমি হইলাম
না ভগবানের যথার্থ ভক্ত,—আর এই চা কিনা
তাহার যথার্থ ভক্ত। ভগবানের উপর নারদের
বেশ একটু রাগ হইল । নারদ বৈকুণ্ঠে ফিরিয়া
}

No text on this page.

নারদ মহা সতর্কতার সহিত কৈলাশে যাত্ৰা করিল।

নারদের অহরি আসিয়া বলিলেন, “ষ্ঠাকুর, এ তােমার কেমন বিচার হইল? আমি দিন রাত তােমার নাম লইয়া বেড়াই, আমি তােমার যথার্থ ভক্ত হইলাম ,আর সেই চাষাটা, যে দিন রাতের ভিতর কেবলমাত্র দুইবার তােমার নাম স্মরণ করে, সেই হইল কিনা তােমার যথার্থ ভক্ত।” ভগবান হরি নারদের এ কথার কোন উত্তর দিলেন না, তিনি এক ভঁড় তৈল আনিয়া, নারদের হাতে দিয়া বলিলেন,-“এই তৈলের ভঁড়টা তুমি কৈলাশে দিয়া আইস। কিন্তু সাব- ধান, দেখিও যেন তৈল মাটীতে না পড়িয়া যায়।” নারদ ভগবান হরির নিকট হইতে তৈলের ভঁড়টা লইলেন। ভাড়টা একেবারে তৈলে পরিপূর্ণ ছিল। হাত একটু নড়িলেই তৈল মাটীতে পড়িয়া যাইবার সম্ভাবনা। কাজেই নারদকে মহা সতর্কতার সহিত তৈলের ভাড়টী লইয়া কৈলাশে যাত্রা করিতে হইল। পর দিন নারদ যখন তৈলের ভঁড়টা কৈলাশে দিয়া ফিরিয়া আসিলেন তখন

নারদের অহঙ্কার
ভগবান তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন,—“কিহে
নারদ, কাল তুমি কতবার আমার নাম স্মরণ
করিয়াছিলে?”
ভগবানের কথার উত্তরে নারদ মহা বিরক্তস্বরে
বলিয়া উঠিলেন,-“নাও ঠাকুর, কাল কি আর
তােমার নাম স্মরণ করিবার সময় পাইয়াছি! তুমি
যে তৈলের ভাড় দিয়াছিলে, তাই সাম্লাতেই
আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হইয়াছে।”
নারদের কথা শুনিয়া ভগবান মৃদু হাসিলেন,
বলিলেন,-নারদ, তুমি একটা তৈলের ভাড়
সামলাইতেই এমনি ব্যস্ত হইয়া পড়িলে যে
সমস্ত দিন রাতের ভিতর একটী বারের জন্যও
নামটা পৰ্যন্ত উচ্চারণ করিবার অবসর পাইলে
না। আর সেই চাষ দিন রাত সংসারের শত
যন্ত্রণার ভিতর থাকিয়াও অন্ততঃ দুইবার আমার
নাম স্মরণ করিতে একদিনের জন্যও ভুল করে
না,তবেই বলল দেখি, তাহার মত ভক্ত আমার
আর কে আছে?”

নারদের অহঙ্কার
ভগবান শ্রীহরির কথা শুনিয়া লজ্জায় নারদ
আর মাথা তুলিতে পারিলেন না। সঙ্গে সঙ্গে
তাহার অহঙ্কারটুকুও চিরজীবনের মত চলিয়া
গেল।
কে কতবার ভগবানকে ডাকে তাহাতে ভক্তির
পরিচয় হয় না। ভক্তির পরিচয় পাওয়া যায়
তখনই যখন বাধা বিঘ্ন আসিয়া উপস্থিত হয়, এবং
সেই বাধা বিঘ্নের মধ্যে,সংসারের শত প্রলােভনের
মধ্যেও যিনি ঈশ্বরকে ভুলিয়া যান না তিনিই
(খ)

বামুনের গো-হত্যা।
এক দেশে এক বামুন ছিলেন। তার বাগানে
বড় । বামুন নিজের হাতে এমন একটি
সুন্দর বাগান করিয়াছিলেন যে তেমন বাগান বড়
একটা দেখিতে পাওয়া যায় না। এমন কোন
ভাল ফলের গাছ ছিল না যা বামুন তাহার
বাগানে না পুতিয়াছিলেন।
একদিন একটা গরু সেই বাগানের ভিতর
প্রবেশ করিয়া বামুনের একটী বড় সখের কলমের
আম গাছ একেবারে মুড়াইয়া খাইয়া ফেলিল।
বামুন তখন একটু দূরে দাড়াইয়া অপর একটা
গাছের গুড়ি স্বহস্তেই পরিষ্কার করিতেছিলেন।
গরুটা তাহার সেই বড় সাধের কলমের চারাটা
খাইয়া ফেলায় বামুন আর রাগ কিছুতেই দমন
করিতে পারিলেন না,সম্মুখেই একটা শাবল
পড়িয়াছিল, তিনি সেইটী তুলিয়া সেই গরুটার
দিকে ছুটিলেন এবং এরূপ সজোরে সেই শাবলটার

বামুনের গাে-হত্যা দ্বারা গরুটাকে আঘাত করিলেন যে গরুটাকে আর এক পাও নড়িতে হইল না, এক আঘাতে সেইখানে পড়িয়াই গরুটা ছটফট করিয়া মরিয়া গেল। বামুন গরু মারিয়াছে এ-কথাটা শীঘ্রই গ্রামের ভিতর রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। একেই তাে গরু-মারা মহা পাপ,-তাহার উপর বামুন হইয়া গরু-মারা -সে পাপের ত আর প্রায়শ্চিত্ত নাই। গ্রামের লােক সকলে মিলিয়া বামুনকে একঘরে করিবার বন্দোবস্ত করিতে লাগিল। বামুন এই মহা বিপদে পড়িয়া অন্য উপায় না দেখিয়া বলিল, “গরু আমি মারিয়াছি কে বলিল,-গরু ত আমি মারি নাই ;-আমার এই হাত গরু মারিয়াছে। আর হাতেরও আমি অপরাধ দিতে পারি না কারণ হাতের কি ক্ষমতা ? এই হাত- খানি নাড়াইতেছেন, ফিরাইতেছেন যিনি, যাহার ক্ষমতায় এই হাত গরু মারিয়াছে যদি কোন অপরাধ হইয়া থাকে ত সে অপরাধ তঁাহার।

বামুনের গাে-হত্যা
অর্থাৎ এ অপরাধের জন্য দায়ী ভগবান। আমিও
নই, আমার হাতও নহে।”
বামুন ভগবানের উপরে সমস্ত অপরাধ
চাপাইয়া দিয়া বেশ নিশ্চিন্ত হইলেন। ভগবান
এই কথা জানিতে পারিয়া একদিন বুড়াে বামুনের
বেশ ধরিয়া সেই বামুনের নিকট আসিয়া
উপস্থিত। বামুন তখন বাগানের ভিতরেই
পায়চারী করিতেছিলেন, ভগবান তাহার সম্মুখে
আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,—“বাপু ও বাগানটী
বেশ সুন্দর !
বামুন তখনই উত্তর দিল,-“আমার।”
ভগবান বলিলেন,-“বাঃ, তােমার বাগনটি ত
কি
সুন্দর সারবন্দি করিয়া গাছগুলি
রােপণ করা হইয়াছে। তােমার মালি দেখিতেছি
বড় কাজের লােক।”
বামুন উত্তর দিল,-“মালি টালি আমার কেহ
নাই। আমি নিজেই এসব গাছ পুঁতিয়াছি
ভগবান বলিলেন,-“স্তাই নাকি! তাহা হইলে

বামুনের গাে-হত্যা
তুমি একজন কাজের লোেক।
এ রাস্তাটীও বড়
চমৎকার হইয়াছে,—এ রাস্তাটাও কি বাপু, তুমিই
করিয়াছ?”
ভগবানের কথায় বামুনের ভিতরটা ফুলিয়া
উঠিয়াছিল,—তিনি গম্ভীর স্বরে বলিলেন, - “এ
বাগানে যা কিছু দেখিতেছেন এ-সবই আমার
তৈয়ারী। এ রাস্তাও আমি নিজে করিয়াছি।
বামুনের কথায় ভগবান মনে মনে হাসিতে
ছিলেন, বামুনের কথাটা শেষ হইবামাত্র তিনি
বলিলেন, “ঠাকুর, সবই যখন তুমি করিয়াছ তখন
গরু মারিবার জন্যই কি ভগবান বেচারী দায়ী।”
বামুনের মুখ দিয়া আর কোন কথা বাহির
হইল না।
ভাল কাজগুলির বেলায় যখন নিজের বলিয়া
বাহাদুরী করিতে ছাড় না, তখন অন্যায় কাজ
করিলেই বা ভগবান দায়ী হইবেন কেন ?
- -

সাপ ও সন্ন্যাসী।
( ১ )
এম গ্রামের ধারে এক মাঠে এক প্রকাণ্ড
সাপ একটা গর্তের ভিতর বাসা করিয়াছিল।
সাপটা যেমন প্রকাণ্ড তেমনি ভয়ঙ্কর। সাপটার
ভয়ে গ্রামের লােক সেই মাঠের ত্রিসীমানায়
যাইতে সাহস করিত না। যদি কোন লােক না
জানিয়া সেই মাঠের নিকট যাইয়া পড়িত, তাহা
হইলে আর তাহার রক্ষা ছিল না, সাপটা অমনি
ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে কামড়াইত।
সেই মাঠের পাশের মাঠে রাখাল ছেলেরা
গরু চরাইত, আর যদি কাহাকেও সেই মাঠের
দিকে যাইতে দেখিত, তৎক্ষণাৎ তাহাকে সাপের
কথা বলিয়া সেদিকে যাইতে নিষেধ করিত।
একদিন রাখালেরা গরুর পাল লইয়া বাড়ী
ফিরিবার সময় দেখিল একজন সন্ন্যাসী সেই

সাপ ও সন্ন্যাসী
মাঠের দিকে যাইতেছেন। অমনি একজন ছুটিয়া
যাইয়া তাহাকে বলিল,
“ঠাকুর, ও দিকে যাইবেন না,ও দিকে যাইবেন
। ঐ মাঠে একটা প্রকাণ্ড সাপ আছে। সাপটা
বড় ভয়ঙ্কর—মানুষের শব্দ পাইলেই ছুটিয়া
আসিয়া কামড়ায়।”
রাখাল বালকের কথায় সন্ন্যাসী একটু স্তব্ধ
হইলেন, গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “বৎস! আমি
সন্ন্যাসী,আমি সাপের ভয় রাখি না। সাপের এমন
শক্তি নাই যে সন্ন্যাসীকে কামড়াইতে পারে।
সন্ন্যাসী আর বিশেষ কোন কথা কহিলেন না,
একটু মৃদু হাসিলেন, তাহার পর আবার সেই
মাঠের দিকেই অগ্রসর হইলেন। সন্ন্যাসী তাহা-
দের নিযেধ না মানিয়া চলিয়া গেলেন দেখিয়া
রাখাল ছেলেদের আর গ্রামে ফেরা হইল না,
সাপটা কি করে দেখিবার জন্য গরুর পাল লইয়া
তাহারা সেইখানেই দাড়াইয়া রহিল। সন্ন্যাসী
মাঠে যাইবামাত্র সাপটা ভয়ঙ্কর গর্জন করিয়া

সাপ ও সন্ন্যাসী
সন্ন্যাসীকে কামড়াইবার জন্য ছুটিয়া আসিল, কিন্তু
সন্ন্যাসী তাহার দিকে ফিরিবামাত্র তাহার গর্জন
বন্ধ হইয়া গেল, সে আর ফণা তুলিতে পারিল না,
মড়ার মত সন্ন্যাসীর পায়ের সম্মুখে পড়িয়া রহিল।
তখন সন্ন্যাসী গম্ভীর স্বরে সাপটাকে বলিলেন,-
“কি হে বন্ধু, আমাকে কি কামড়াইতে চাও।”
সাপটার তখন এমন অবস্থা হইয়াছিল যে সে
আর লজ্জায় কথা কহিতে পারিল না,—যেমন
ফণা নীচু করিয়াছিল তেমনই ফণা নীচু করিয়া
রহিল। সন্ন্যাসী আবার বলিলেন,-
“বন্ধু, তুমি যদি প্রতিজ্ঞা কর যে আর কখন
কাহাকেও কামড়াইবে না তাহা হইলে আমি
আবার তােমাকে তােমার পূর্ব শক্তি ফিরাইয়া
দিতে পারি।”
সাপ মশাই তখন করেন কি, অন্য উপায় ত
আর নাই। বাধ্য হইয়া সন্ন্যাসীর নিকট তাহাকে
প্রতিজ্ঞা করিতে হইল যে সে আর ভবিষ্যতে
কাহাকেও কামড়াইবে না! সন্ন্যাসী তাহার পূর্ব

সাপ ও সন্ন্যাসী
শক্তি তখন ফিরাইয়া দিয়া স্বস্থানে চলিয়া গেলেন,
আর সাপ মহাশয়ও সুড়সুড় করিয়া নিজের
গর্তের ভিতর গিয়া প্রবেশ করিল।
সন্ন্যাসীর নিকট প্রতিজ্ঞা করিয়াছে,-কাজেই
সাপ আর কেমন করিয়া মানুষকে কামড়াইবে।
সে অতি ভদ্রভাবে জীবন কাটাইতে লাগিল।
সাপটার এই ভাব দেখিয়া রাখাল ছেলেরা
ভাবিল, সাপটার নিশ্চয়ই বিষ দাত ভাঙ্গিয়া
গিয়াছে,—সাপটার আর কোন শক্তি নাই।
তাহার পর হইতে তাহারা সাপটাকে দেখিতে
পাইলেই ঢিল মারিতে আরম্ভ করে কিন্তু তবুও
সাপটাকে ফণা পৰ্যন্ত তুলিতে না দেখিয়া তাহা-
দের সাহস আরও বাড়িয়া গেল। তাহারা এক
দিন সাপটার লেজ ধরিয়া এমনি ঘুরান ঘুরাইল
যে সাপটার সর্বাঙ্গের হাড় ভাঙ্গিয়া চুরিয়া একশা
হইয়া গেল। কিন্তু তবুও সে কাহাকেও কিছু
বলিল না, কোনক্রমে প্রাণটুকু লইয়া গর্তে গিয়া
প্রবেশ করিল।

সাপ ও সন্ন্যাসী
সেই সময় সেই সন্ন্যাসী আবার একদিন সেই
মাঠে আসিয়া উপস্থিত হইলেন,—তিনি সাপটির
অবস্থা দেখিয়া বিচলিত স্বরে জিজ্ঞাসা করিলেন,
--“বন্ধু,তােমার এমন অস্থি চৰ্ম্ম সার অবস্থা কেমন
করিয়া হইল ? তােমার কি কোন অসুখ বিসুখ
করিয়াছে ?
সাপ মাথা নাড়িয়া বলিল,-“আমার অসুখ
বিসুখ কিছুই করে নাই। আপনার আদেশ মত
আমি আর মানুষকে কামড়াই না, - তাই মানুষে
আমার এই হাল করিয়াছে। সে দিন তাহারা
আমার লেজ ধরিয়া এমন ঘােরান ঘুরাইয়াছে যে
আমার সর্বাঙ্গের হাড় চুরমার হইয়া গিয়াছে।
সাপের এই কথা শুনিয়া সন্ন্যাসী প্রাণে বড়
বেদনা পাইলেন, গম্ভীর স্বরে বলিলেন, “ভাই,
আমি তােমাকে কামড়াইতে নিষেধ করিয়াছি,
কিন্তু ফোঁস করিতে তত নিষেধ করি নাই। তুমি
ফোঁস কর নাই কেন ? তাহা হইলে তো তােমার
এ দুর্দশা হইত না। লােকের অনিষ্ট করিও না,

সাপ ও সন্ন্যাসী
কিন্তু লােক তােমারও যাহাতে অনিষ্ট করিতে না
পারে, তাহার জন্য তােমারও সর্বদা প্রস্তুত থাকা
উচিত।
সন্ন্যাসী চলিয়া গেলেন। পরদিন রাখালের
ছেলেরা সেই মাঠে আসিবা মাত্র সাপ ভয়ঙ্কর
গজ্জন করিয়া উঠিল, তাহারা ভাবিল সাপটার
বুঝি আবার বিষ দাঁত গজাইয়াছে। তখন যে
যেদিকে পারিল ছুটিয়া পলাইল। সেই হইতেই
সাপটা আবার
বেশ নিশ্চিন্তে বাস করিতে
লাগিল।

ঘণ্টাকর্ণ । এক দেশে এক লােক ছিল সে দিন রাত কবল শিবেরই আরাধনা করিত। তাহার মত শিব ভক্ত লােক সচরাচর বড় একটা দেখিতে পাওয়া যাইত না। সে যথার্থ শিবকে প্রাণের সহিত ভক্তি করিত,কিন্তু তাহা হইলে কি হইবে । তাহার চরিত্রে একটা মহং দোষ ছিল যে সে পর কোন দেবতাকেই মানিত ন। ভক্তি করা তো দুরের কথা বরং তাহাদের মনে মনে ঘৃণা করিত। লােকটীর আরাধনায় সন্তুষ্ট হইয়া এক দিন শিব তাহাকে দেখা দিলেন, বলিলেন, “দেখ বাপু, সব দেবতাই এক, কাজেই একজনকে ঘৃণা করিলে সব দেবতাকেই ঘৃণা করা হয়। তুমি যত- দিন পর্যন্ত না অপরাপর দেবতাদিগকে ভক্তির চক্ষে দেখিবে ততদিন পর্যন্ত তুমি কিছুতেই আমাকে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট করিতে পারিবে না।”

ঘণ্টাকর্ণ
শিব লােকটিকে এই কয়টি কথা বলিয়া
অন্তর্ধান হইলেন। কিন্তু তবুও লােকটির চৈতন্য
হইল না। সে পূৰ্ব্বেও যেমন অপর দেবতাদিগকে
ঘৃণা করিত এখনও তেমনি ঘৃণা করিতে লাগিল।
শিবের কথাগুলির কোন ফল ত হইল ই না বরং
উল্টা ফল হইল। পূর্বে সে প্রকাশ্যভাবে কোন
দেবতারই নিন্দা করিত না কিন্তু শিবের আগমনের
পর হইতে সে প্রকাশ্যভাবেই তাহাদের নিন্দা
করিতে লাগিল। ইহার কিছুদিন পরে শিব
আবার একদিন হরিহর মূর্তিতে আসিয়া তাহাকে
দেখা দিলেন। লােকটা হরের পাশ্বে বসিয়া
হরির মূর্তি দেখিয়া ভিতরে মহা জ্বলিয়া গেল।
সে হরির মূর্তির দিকে একবার ফিরিয়াও চাহিল
না, কেবল হরেরই পূজা করিল। লােকটার
এই ব্যবহারে শিব মনে মনে মহা অসন্তুষ্ট হইলেন
এবং তখনই সেই লোেকটার সম্মুখ হইতে অন্তর্ধান
হইলেন। কিন্তু তাহা হইলে কি হইবে, ভবি
ভুলিবার নহে,সে তবুও অপর অপর দেবতাদিগকে

ঘণ্টাকর্ণ
*
ভক্তির চক্ষে দেখি না, তাঁহাদের যেমন অবজ্ঞা
করিয়া আসিতেছিল তেমনই অবজ্ঞা করিতে
লাগিল।
লােকটার এই গোঁড়ামীর কথা শীঘ্রই দেশময়
রাষ্ট্র হইয়া পড়িল। দেশের ছেলেরা তাহাকে
দেখিলেই ‘ঐবিষ্ণু ‘ঐবিষ্ণু চীৎকার করিয়া
লােকটাকে খেপাইতে আরম্ভ করিল। লােকটা
এমনই শিবের গােড়া হইয়া পড়িয়াছিল যে
ছেলেদের শ্রীবিষ্ণু চীৎকার তাহার একেবারে
অসহ্য হইল। বিষ্ণুর নামটা সে কাণে তুলিতেও
নারাজ। ছেলেদের ‘শ্রীবিষ্ণু চীৎকারের হাত
হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য সে এক মতলব
আঁটিল। তাহার দুই কাণে দুটা বড় বড় ঘণ্টা
ঝুলাইয়া দিল। যখনই ছেলের দল শ্রীবিষ্ণু
করিয়া চীৎকার করিত অমনি সে সবলে তাহার
মাথা নাড়িতে আরম্ভ করিত। অমনি ঘণ্টা
ঢনান্ শব্দে বাজিয়া উঠিত আর শ্রীবিষ্ণুর
নামটা তাহার কর্ণে প্রবেশ করিত না। লােকে

অমনি ঘণ্টা নাচ শব্দে বাজিয়া

No text on this page.

ঘণ্টাকর্ণ
তাহার পর হইতে তাহাকে ঘণ্টাকর্ণ বলিতে
আরম্ভ করিল।
তাহার গোঁড়ামীর জন্য সে আজও আমাদের
চক্ষে এমনি ঘৃণার পাত্র হইয়া রহিয়াছে, যে
আজও আমাদের দেশের ছেলেরা ফান মাসের
সংক্রান্তিতে এই ঘণ্টাকর্ণের মূর্তি প্রস্তুত করিয়া
লাঠি দিয়া ভাঙ্গিয়া ফেলে।
কোন বিষয়েই
গোঁড়ামী করা কাহারও উচিত নয়।

ব্রাহ্মণ ও ভাগবত।
এক রাজসভায় এক ব্রাহ্মণ উপস্থিত হইয়া
বলিলেন, “মহারাজ আমি ভাগবতে সুপণ্ডিত।
আমি আপনাকে কিছু ভাগবতের কথা শুনাইতে
ইচ্ছা করি।”
রাজা বেশ ভাল রকমই
জানিতেন, যে
যিনি ভাগবতে সুপণ্ডিত হইবেন, যিনি ভাগবত
বুঝিবেন, তাহার সমস্ত প্রাণ ভগবানকে চিনিবার
জন্যই ব্যাকুল হইয়া উঠিবে--তিনি সামান্য ধন
সম্মানের জন্য রাজসভায় কখনই আসিবেন না।
ব্রাহ্মণের কথার উত্তরে তাই রাজা বলিলেন,
“ব্রাহ্মণ, ভাগবত এখন আপনার সম্পূর্ণ আয়ত্ত
হয় নাই। বাড়ী যান,বাড়ী গিয়া অগ্ৰে ভাগৰত
সম্পূর্ণ আয়ত্ত করুন। আমি আপনাকে প্রতিশ্রুতি
দিতেছি ভাগবত যখন আপনি সম্পূর্ণ আয়ত্ত
করিবেন তখন আমি নিশ্চয়ই আপনার মুখে
ভাগবত শুনিব।”

আহ্মণ ও ভাগবত
রাজার এই উত্তরে ব্রাহ্মণ মনে মনে ভাবিলেন,
রাজাটা কি নির্বোধ, আমি আজ এত বৎসর
ধরিয়া ভাগবত পড়িলাম, আর রাজা কিনা অনা-
য়াসে বলিলেন,-আমার এখন ভাগবত সম্পূর্ণ
আয়ত্ত হয় নাই। ব্রাহ্মণ দুঃখিত মনে বাড়ী
ফিরিয়া আসিলেন ও অতি মনােযােগের সহিত
আর একবার ভাগবত অধ্যয়ন করিলেন এবং যথা
সময়ে আবার যাইয়া রাজসভায় উপস্থিত হইলেন।
ব্রাহ্মণকে আবার রাজসভায় উপস্থিত হইতে
দেখিয়া রাজা আবার সেই একই উত্তর দিলেন,
“ব্রাহ্মণ, আপনার এখনও ভাগৰত সম্পূর্ণ আয়ত্ত
হয় নাই।”
রাজার আচরণে ব্রাহ্মণ এবার বড়ই অসন্তুষ্ট
হইলেন এবং মনে মনে ভাবিতে লাগিলে, শী
হার সহিত এরূপ আচরণ করিতেছেন কেন,
নিশ্চয়ই ইহার ভিতরে কোন না কে। * অর্থ
আছেই। ব্রাহ্মণ বাড়ী ফিরিয়া গৃহের সমস্ত দরজা
জানালা বন্ধ করিয়া ভাগবত লইয়া বসিলেন এবং
(গ)

ব্রাহ্মণ ও ভাগবং
আহার নিদ্রা পরিত্যাগ করিয়া কেবলই ভাগবত
পাঠ করিতে লাগিলেন। এইভাবে একমনে কিছু
দিন ভাগবত পাঠ করিতে করিতেই ভাগবতের
গুপ্ততত্ব সকল তাহার প্রাণের ভিতর ফুটিয়া
উঠিতে আরম্ভ করিল,-সঙ্গে সঙ্গে তাহার ধন,
মান, কামনা, বাসনা সবই ধুইয়া মুছিয়া একেবারে
পরিষ্কার হইয়া গেল। রাজার নিকট যাইবার
কথা আর একবারের জন্যও তাহার প্রাণের ভিতর
উদয় ইল না। তখন হইতে তিনি নিজেকে
সম্পূর্ণ ভগবানের চরণে অৰ্পণ করিয়া দিনরাত
কেবল হারই আরাধনা করিতে লাগিলেন।
কাৰক বৎসর অতীত হইয়া গেল, কিন্তু ব্রাহ্মণ
আর ফিরলেন না দেখিয়া রাজা মনে মনে ভাবি-
সেন, ~~ ক্ষণে ব্রাহ্মণ কি করিতেছেন একবার
দেখিয় আসা উচিত। রাজা স্বয়ং একদিন
ব্রাহ্মণ কুটিরে যাইয়া উপস্থিত হইলেন। ব্রাহ্মণ
কখন ধ্যানে মগ্ন ছিলেন,—তাহার সর্বাঙ্গ দিয়া
স্বর্গের জ্যোতিঃ চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িতেছিল।

ত্রাণ ও ভাগবৎ
ব্রাহ্মণকে দেখিয়া রাজা আর স্থির থাকিতে
পারিলেন না, তখনই তাহার পদতলে পড়িয়া
বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, এতদিনে আপনার ভাগবত
সম্পূর্ণ আয়ত্ত হইয়াছে, এক্ষণে আপনি অনুগ্রহ
করিয়া আমাকে আপনার শিষ্য করুন।”
ব্রাহ্মণের তখন ধ্যান ভাঙ্গিল, কিন্তু রাজার
কথায় তিনি কোন উত্তর দিলেন না। বন, মান,
ঐশ্বৰ্য্য প্রভৃতির উপর তখন আর তাহার লােভ
ছিল না।
উপর উপর পাঠ করিলে কেবল পাঠ করাই
হয় তাহাতে মানুষ পণ্ডিত হইতে পারে না ।
পণ্ডিত হইতে হইলে মন প্রাণ এক করিয়া পাঠ
করা আবশ্যক।

চারি অন্ধ।
এক গ্রামে চারিটী অন্ধ বাস করিত। সেই
গ্রামের জমিদার একটী হাতী ক্রয় করিয়া আনি-
লেন। গ্রামের অনেকেই হাতী দেখে নাই,--
জমিদারের হাতী আসিবামাত্র দলে দলে লােক
হাতী দেখিতে যাইতে আরম্ভ করিল। গ্রামের
জমিদার যে একটী হাতী আনিয়াছেন, অন্ধ চারি
জনও সে কথা শুনিল। হাতীর মত জানােয়ার
পৃথিবীতে আর নাই,অন্ধ চারি জনেরও হাতী
দেখিবার বড় ইচ্ছা হইল। তাহারা চারিজনে
হাতী দেখিবার জন্য বাহির হইল। কিন্তু অন্ধ
তাহারা, কেমন করিয়া হাতী দেখিবে? হাতের
দ্বারা স্পর্শ করিয়া যতটুকু বােঝা সম্ভব তাহারা
কেবল ততটুকুই বুঝিল। বাড়ী আসিয়া যে
হাতীর পায়ে হাত দিয়াছিল সে বলিল,- “হাতীটা
ঠিক একটা থামের মত।”
দ্বিতীয় অন্ধ হাতীর শুড়টা স্পর্শ করিয়াছিল,

চারি অন্ধ -- সে বলিল,-“হাতী থামের মত কেন হইবে, ঠিক একটা গদার মত।” তৃতীয় অন্ধ হাতীর পেটে হাত দিয়াছিল, সে বলিল,-“হাতীটা থামের মতও নহে, গদার মতও নহে,-হাতীটা একটা মস্ত থলির মত।” চতুর্থ অন্ধ হাতীর কেবল কাণ দুইটা স্পর্শ করিতে পারিয়াছিল, সে বলিল,-“আমার তত মনে হয় হাতীটা একটা মস্ত বড় পাখার মত।” এই লইয়া চারি অন্ধ মহা তর্ক জুড়িয়া দিল, কেহই কাহার কথা মানিতে চাহে না, যে যেটুকু হাতীর স্পর্শ করিয়াছে সে সেইরূপই হাতীটার পরিচয় দিতে লাগিল। সেই সময় একটী ভদ্রলােক সেইখান দিয়া যাইতেছিলেন। চারিটী অন্ধ পর- স্পর কি জন্য এত তর্ক করিতেছে সেটুকু শুনিবার জন্য তিনি তথায় দাড়াইয়াছিলেন। তিনি তাহাদের তর্কের বিশেষ কিছু বুঝিতে না পারিয়া বলিলেন, “বাপু, তােমরা কিসের জন্য এত তর্ক করিতেছ?” ভদ্র লােকটীর প্রশ্নের উত্তরে চারিটী অন্ধ

চারি অন্ধ
আগাগােড়া সমস্ত কথা বলিয়া বলিল,-“মহাশয়,
আমরা আপনাকেই মধ্যস্থ মানিতেছি—বলুন তো
মহাশয় হাতীটা কিরূপ দেখিতে?
ভদ্রলােক বলিলেন, -“বাপু, তােমরা শুধু
শুধুই তর্ক করিতেছ। হাতী কিরূপ তােমরা
কেহই জান না। মােটের উপর হাতী থামের
মতও নহে, থলির মতও নহে, গদার মতও নহে,
পাখার মতও নহে। তবে হাতীর পাগুলা থামে
মত, শুড়টা গদার মত,পেটটা থলির মত আব
কাণ দুইটা পাখার মত। এই সবগুলাে এক করিলে
যেমন দেখিতে হয় হাতীও ঠিক তেমনি দেখিতে।”
পৃথিবীতে মানুষও ঠিক এই ভাবে ভগবান
সম্বন্ধে পরস্পর পরস্পরের সহিত তর্ক করে।
যে ভাবে ভগবানকে কল্পনা করে, ভগবান সেই
রূপই—সে বলিতে চায়।

কার্তিক।
একে কার্তিক ভগবতীর ছােট ছেলে,—তাহার
উপর তিনি ছিলেন আবার দেব সেনাপতি।
কাজেই স্বর্গে কার্তিকের পসার খুব বেশীই ছিল।
একদিন কার্ত্তিক দেব সভা হইতে বাড়ী ফিরিতে-
ছিলেন, পথে আসিতে আসিতে দেখিলেন, একটা
বিড়াল তাহার সম্মুখ দিয়া বাস্তাটা পার হইয়া
যাইবার চেষ্টা করিতেছে। কার্তিকের বয়স তখন
নিতান্তই অল্প,—ছেলেমানুষী তখনও তাহার যায়
নাই। বিড়ালটাকে দেখিয়া কার্তিকের কেমন মনে
হইল,বিড়ালটাকে রাস্তা পার হইয়া যাইতে দিবেন
। যেমন তাহার এই কথাটা মনে হইল অমনি
তিনি বল্লম দিয়া বিড়ালটাকে একটা খোঁচা
মারিলেন,—বিড়ালটা মিউ মিউ করিতে করিতে
যে দিক দিয়া আসিয়াছিল আবার সেই দিকেই
ফিরিয়া গেল। কার্ত্তিক যেমন প্রফুল্লমনে বাড়ী
ফিরিতেছিলেন তেমনি প্রফুল্লমনে বাড়ী ফিরিয়া
আসিলেন।

কার্তিক
কার্তিক বাড়ী আসিয়া মায়ের মুখের দিকে
চাহিয়া একেবারে অবাক হইয়া গেলেন,-তাহার
মায়ের মুখের খানিকটা যায়গা বিশ্রী রকম ছড়িয়া
গিয়াছে। ভগবতীর মুখের দিকে চাহিয়া কার্তিক
তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করিলেন,-“হ্যা মা,তােমার
মুখের উপরটা অমন ভাবে কেমন করিয়া ছড়িয়া
গেল?”
ভগবতী মৃদুস্বরে বলিলেন, -- “বাবা,
তােমারই বল্লমের আঘাত।”
মায়ের কথা শুনিয়া
কার্তিকের আর
আশ্চর্যের সীমা পরিসীমা রহিল না, তিনি আবার
বলিলেন,—“সে কি মা! আমি তােমায় কখন
আঘাত করিলাম ?”
ভগবতী বলিলেন,--“বাবা, তুমি আমায়
আঘাত কর নাই সত্য, কিন্তু তুমি আজ বাড়ী
ফিরিবার সময় একটা বিড়ালকে তােমার বল্লমের
দ্বারা খোঁচা দিয়াছিলে, না ?
বিড়ালের কথাটা কার্তিক ভুলিয়াই গিয়া-

কার্তিক
ছিলেন, মায়ের কথায় সে কথাটা আবার মনে
পড়িল, তিনি লজ্জিতভাবে বলিলেন,-“হ্যা মা,
আমি আসিরার সময় একটা বিড়ালকে বল্লমের
খোচা মারিয়াছিলাম বটে ;—তাহাতে তাহার
সহিত তােমার সম্বন্ধ কি ?—তাহাতে তােমার মুখ
এমনভাবে ছড়িয়া যাইবার কারণ কি ?”
ভগবতী স্নেহভরে বলিলেন,—“বাবা, সমস্ত
প্রাণীই আমার সন্তান। আমা হইতেই সমস্ত
প্রাণীর উৎপত্তি। তুমি যাহাকেই আঘাত কর,
সে আঘাত আমাকেই লাগিবে।”
মায়ের এই কথা শুনিয়া কার্তিকের জ্ঞান
হইল, সেই হইতে তিনি প্রতিজ্ঞা করিলেন আর
কখনও কাহাকে অনর্থক আঘাত করিবেন না।

অর্জন ও গ্রীকৃষ্ণ।
আমি কৃষ্ণকে সর্বাপেক্ষা অধিক ভালবাসি,
আমি শ্রীকৃষ্ণকে সর্বাপেক্ষা অধিক ভক্তি করি
এই কথা ভাবিতে ভাবিতে অর্জুনের মনে বেশ
একটু অহঙ্কর হইল। ভগবান অন্তর্যামী,
তিনি তখনই সেই কথাটা জানিতে পারিলেন।
অহঙ্করের চেয়ে বড় দোষ মানুষের আর কিছুই
নাই, তাই শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে একদিন ডাকিয়া
বলিলেন, “চল অর্জুন, একটু বেড়াইয়া আসি।”
দুই সভায় বেড়াইতে বাহির হইলেন।
কিছুদূর অগ্রসর হইবার পরই অর্জুন দেখিলেন
একটা ব্রাহ্মণ শুকনাে ঘাস খাইতেছে অথচ তাহার
কোমরে একখানা তরওয়াল ঝুলিতেছে। ব্রাহ্মণ
নাে ঘাস কেন খাইতেছে তাহা বুঝিতে
আনের বিলম্ব হইল না। . অলুন বুঝিলেন,
কিন্তু ব্রাহ্মণ ‘অহিংসা পরম ধর্ম গ্রহণ করি

কৃষ্ণ ও অর্জুন আসিয়া দেখিল ব্রাহ্মণের কোমরে তরল বাঁধা রহিয়াছে।

No text on this page.

রকম!
অর্জুন ও ঐকৃষ্ণ
য়াছে। তাজা ঘাসেরও প্রাণ আছে, তাই সে
শুনাে ঘাস খাইতেছে। কিন্তু ব্রাহ্মণের কোমরে
তরওয়াল বাঁধা রহিয়াছে কেন এটুকু আর বুঝিয়া
উঠিতে পারিলেন না। তিনি বেশ একটু আশ্চর্য
হইয়া শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘সখা, এ কি
পাছে প্রাণীর প্রাণ নষ্ট হয় সেইজন্য এই
ব্রাহ্মণ শুকনাে ঘাস খাইতেছে, অথচ ইহার
কোমরে তরওয়াল ঝুলিতেছে কেন?”
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের কথায় বলিলেন, “তাইতে।
সখা, চল ব্রাহ্মণকে জিজ্ঞাসা করিলেই সব জানিতে
পারা যাইবে !
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথায় অর্জুন ব্রাহ্মণের
নিকট উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “ব্রাহ্মণ,
পাছে প্রাণীর প্রাণে আঘাত লাগে এই আশঙ্কায়
তুমি শুননা ঘাস খাইতেছ, অথচ তােমার
কামরে তরওয়াল ঝুলিতেছে কেন?”
ব্রাহ্মণ অর্জুনের দিকে চাহিল, তাহার পর
দৃঢ়ম্বরে বলিল,-“আমি চারিটী লােককে সাজা

অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ
দিব বলিয়া এই তরওয়াল রাখিয়াছি। যদি
কখনও তাহাদের দেখিতে পাই, তাহা হইলে
তাহাদের আর কিছুতেই রক্ষা নাই।”
অর্জুন ব্রাহ্মণের কথায় অবাক হইয়া গিয়া-
ছিলেন, জিজ্ঞাসা করিলেন, “সে চারিজন
লােক কে?”
ব্রাহ্মণ উত্তর দিল, “প্রথম হইতেছে বদমাইস্
নারদ!”
“হার অপরাধ ?”
ব্রাহ্মণ রাগে চোখ দুইটা কটট করিয়া
বলিলেন, “স্তার অপরাধ? তার অপরাধ ভয়ঙ্কর।
সে আমার ভুর নিকট দিনরাত গান গাহিয়া
'তাহাকে আলাতন করিতেছে। তাহার জ্বলায়
ভগবান এক মুহুর্তের জন্যও স্থির থাকিতে
পারেন না।”
“দ্বিতীয় লোেকটী কে ?”
“দ্রোপদী ”
“তার অপরাধ ?”

শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন
“তার অপরাধও বড় কম নয়। দেখ, তাহার
আস্পর্ধা। প্রভু আমার আহারের জন্য যাইতে
ছিলেন সেই সময়ে কিনা সে তাহাকে ডাকিয়া
অস্থির করিয়া তুলিল। দুর্বাসার অভিশাপ
হইতে তাহাকে রক্ষা করিবার জন্য খাওয়া ফেলিয়া
তখনই তাহাকে কাম্যবনে ছুটিতে হইল। তাই
কি শুধু—তারপর সে কিনা আমার প্রভুকে
তাহার উচ্ছিষ্ট খাবার খাইতে দিল।
এত বড়
অপরাধের পর কি আমি তাহাকে সাজা না দিয়া
স্থির থাকিতে পারি।”
“তৃতীয়টী কে?”
“তৃতীয়টী হইতেছে, প্রহলাদ। সে ছোড়ারও
আস্পর্ধা বড় কম নয়। বালক তৈলের কড়ার
ভিতর যাইতে, হাতীর পায়ের নীচে পড়িতে,
এমন কি থানের ভিতর ঢুকিতে তাহাকে অনায়াসে
বলিল,-একটু বাধিল না।”
অর্জুন অবাক হইয়া গিয়াছিলেন, তাড়াতাড়ি
আবার জিজ্ঞাসা করিলেন,‘শেষটী কে ?”

অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণ
সে কিনা
“ব্রাহ্মণ রাগে লাল হইয়া উঠিয়াছিল কুদ্ধস্বরে
বলিল,-“নচ্ছার অর্জুন »
“তার অপরাধ?”
“তাহার অপরাধ সব চেয়ে বেশী ।
আমার ঠাকুরকে রথের সারথি করিল।”
ভগবানের প্রতি ব্রাহ্মণের ভক্তি দেখিয়া
আপনা হইতে অর্জুনের মাথা নত হইয়া পড়িল।
সেইদিন হইতে তাহার সমস্ত অহঙ্কার ধুইয়া
ছিয়া একেবারে পরিষ্কার হইয়া গেল।
অহ বড় পাপ।

No text on this page.

শিশির পাবলিশিং হাউসে শিশুতােষ সিরিজ সম্পাদক শ্রীশিশিরকুমার মিত্র বি,এ নৈতিক, পরমার্থিক ও জাতীয় শিক্ষার পক্ষে অপরিহার্য। প্রতিমাসে একখানি করিয়া প্রকাশিত হয়। আশ্বিন হইতে বর্ষ আরম্ভ। সডাক বার্ষিক মূল্য ৪, টাকা, প্রতিসংখ্যা • আনা। প্রকাশিত হইয়াছে। ১ম বর্ষ। ১। পৃথিবীর জন্ম ১৩। বাপ্পাবীর ২। প্রকৃতির পরাভব ১৪। পৌরাণিক, জন্মকথা ৩। কানুর কীৰ্ত্তি ১৫। মহম্মদ মহসীন ৪। আৰ্য্য ও অনাৰ্য্য ১৬। কৰ্ম্মদেবী ৫। আজগুবি জন্মকথা ৬। ছেলেদের বিষ্ণুপুরাণ ১৭। মজার গল্প ৭। গল্পে রামকৃষ্ণ ১৮। ভী ৮। সত্যযুগের কথা ১৯। রামকৃষ্ণের নূতন গল্প ৯। উদোলবুডাের সাঁওতালী গল্প ২০। জাতকের গল্প ১০। রামকৃষ্ণের আরাে গল্প ২১। রামকৃষ্ণের দেদার গল্প ২২। হামির ১২। উদোলবুডাের আরাে গল্প ২৩। ঠাকুরদের গল্প ১১। সতী

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Galpe Ramakrishna Ed. 2nd

Author
Mitra , Shishirkumar Ed
Title
Galpe Ramakrishna Ed. 2nd
File name
Galpe Ramakrishna Ed. 2nd
Text
OCR done
Citation
1922
Published
2010/02/13
Publisher
Sri Shishirkumar Mitra , Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
66
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Ramakrishna
DLI number
511053
Barcode
4990010018236.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Qacdytu0Ih5
Download PDF

Galpe Ramakrishna Ed. 2nd