Bally Sadharan Granthagar
Surjyamukhi Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সুৰ্য্যমুখী
উপন্যাস
বুদ্ধদেব বসু
গ্রণীত
প্রকাশক ; নলিনীকুমার মজুমদার
শ্রীগুরু লাইব্রেরী
২০৪, কর্নওয়ালিস ফ্রিট, কলিকাতা
442
মে, ১ ৯ ৩ ৪
দাম দেড় টাকা
সূৰ্য্যমুখী
বুদ্ধদেব বসু
প্রণীত
অন্যান্য উপন্যাস:
সানলা,
সাড়া, অকৰ্ম্মণ্য, -দেয়া-নেয়া, রডোডেনড়ন-গুচ্ছ,
যবনিক-পতন, যেদিন ফুটলে কমল,
আমার বন্ধু, ধূসর গােধূলি, হে বিজরী বীর,
অর্থম্পত্য
তাদের বিয়ে হলাে । শ্রাবণের এক হেঁড়া-মেঘ রাত্রে, অত্যন্ত শান্তভাবে, অনাড়ম্বন, প্রায় চুপে চুপে তাদের বিয়ে হলাে। কেউ জানলে না । মিহিরের সাহিত্যিক-বন্ধুদের মধ্যে কেউ নয় । যে জর্নালিষ্ট ছােকরা মাঝে-মাঝে তার বাড়িতে আসে তার সম্বন্ধে খবর সংগ্রহ করে’ সহরে প্রচার করবার জন্যে, সে-ও নয়। অনুষ্ঠানের কোনো আতিশয্য হলাে না। মেয়ের বাপের বাড়ির অবস্থাও তার অনুকূল নয়। তারা গরিব-দস্তুরমত গরিব, নিছক গরিব বলতে মা বােঝায়। গরিব ভদ্রলােক—সব চেয়ে ভয়াবহ গরিবত্ব। অবিশ্যি মিহিরও বড়লােক নয়। -বড়কে তাকে কোনােরকমেই বলা যায় না। কিন্তু তার জগতে, তার জীবনে, একজনের আয়ের অঙ্কে কিছু এসে যায় না। কেননা সে কবি। সে আর্টি। সে প্রতিভাবান—অনেক তা-ই মনে করে। তার গৌরব, তার মর্যাদা—সে সম্পূর্ণ অন্য জাতের। সেখানে তার ব্যাঙ্কের খাতা সম্পূর্ণ অবান্তর। অনেকের বিশ্বাস, বাঙলা কবিতাকে সম্পূর্ণ নতুন রাস্তায় সে নিয়ে গেছে-যদিও তার বয়েস মাত্র পঁচিশ। নিজেকে সে গরিব কি বড়লােক বলে ভাবতে শেখেনি : সে যে কখন, কোনাে-এক বিকেলে হঠাৎ আধ ঘণ্টার মধ্যে আশ্চৰ্য্য এবং অনিন্দ্য কয়েকটি লাইন লিখে ফেলতে
সূৰ্য্যমুখী
পেরেছে, সে-ই তাে তার পর ঐশ্বৰ্য্য। সেখানে অন্য কিছুরই কথা
ওঠে না। তার জীবনের সুরই বে আলাদা। তার ভাবনা, তার
মূল্যৰােধ, তার সন্ধান—সবই অন্য রকম। সে-সব বুঝবে না দু’
পায়ে পাড়ানাে ব্যাঙ্কের খাতা, পৃথিবীকে বারা ভরে রেখেছে।
তবু, কবিকেও খেতে হয়। মুদিখানার দেল মেটাতে হয়
তাকেও, বাড়িওয়ালা কবি বলে’ খাতির করে না ইত্যাদি,
ইত্যাদি। আজকালকার পৃথিবীতে পয়সা ছাড়া এক পা চলবার
উপায় নেই। আত্মার গভীর, গােপন তৃষ্ণা মেটাতেও পয়সার
দরকার। পয়সা ছাড়া বই কেনা যায় না। পয়সা না থাকলে
অলস অবসরে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু চুপ করে থেকেও
শান্তি নেই।
তার কপাল ভালাে, সেটুকু পয়সা ছিলাে এই কবির। বরং, তার
মা-র ছিলাে। এই এক ছেলে নিয়ে হৈমন্তী বিধবা হন। পরে
বছর আগে তার বয়েস যখন আটত্রিশ। অনেক দিন পর্যন্ত এমন
মনে হয়েছিলাে যে তার কোনাে সন্তান হবে না। সবাই আশা
ছেড়ে দিয়েছিলাে। এমন সময়, তিরিশের কাছাকাছি এসে,
আকস্মিক, আশাতীত, তার প্রথম মাতৃত্ব। এই প্রথম, এই শেষ।
মিহির! আর সেই সময় থেকে, তার জন্ম থেকে এই দুই জীবন
পুস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য জড়িত। এর মূল ওর মধ্যে, একর
প্রাণের উৎস অন্যের হৃৎকেন্দ্রে-চৈতন্যে, অন্ধকারে। বাবা
૨
সূৰ্য্যমুখী তার জীবনে একটা ব্যক্তিগত সত্য হয়ে উঠতে পারার আগেই তিনি মারা গেলেন। কেবল মা নিয়ে তার জীবন। নিঃশ্বাসের মত তা সহজ, চিরন্তন—তা টের পাওয়া যায় না। তা নিয়ে ভাবতে হয় না। হৈমন্তী তার ছেলের জীবনকে জড়িয়ে ধরেছেন, লালন করেছেন : পবিত, উন্মীলিত করে তুলেছেন তার সমস্ত প্রাণ দিয়ে, প্রতি মুহূর্তে, নিঃশেষে। স্বতঃস্ফুর্ত, নিরবচ্ছিন্ন শ্রোত, বাতাসের মত সহজতা টের পাওয়া যায় না। দু’জনার মধ্যে নিবিড় নিষ্ঠুর ভালােবাসা। মিহির পরিপূর্ণ তার মা-র মধ্যেই। যেন তার মা-র শরীর থেকে নিঃসৃত একটি আবহাওয়া তাকে ঘিরে রেখেছিলাে নিটোল সােনালি শান্তিতে। সেই শান্তিতে সে তৃপ্ত। হৈমন্তী তাকে দিয়েছেন অৱসয়--নিজের জীবন নিয়ে একা থাকতে। বিরল, অমূল্য উপহার। তাকে কিছু করতে হয় না। জীবনের যে-দিকটা ব্যবসাদারি, তার ভার হৈমন্তীর। তিনিই কথা বলেন বাড়িওয়ালা থেকে আরম্ভ করে’ জমাদার পর্যন্ত সকলের সঙ্গে। খরচ করেন, গুণে নেন ফেরত পয়সা, রাখেন হিসেব। হিসেব-মিহিরের জীবনের চরম বিতৃষ্ণ, যে-কোনােরকমের অঙ্ক দেখলেই সে ঈষৎ অসুস্থ বােধ করে। হৈমন্তীর প্রখর সাংসারিক জ্ঞান-পরিমিত আয় থেকে তিনি নিঙড়ে বার করেন যতটা আরাম সম্ভব, যতটা স্বাচ্ছন্দ্য। গিরি আরামের জীব। তার খাওয়া, তার দােয়া, তার পােষাক স্বাচ্ছন্দ্য। সূর্যমুখী কোথাও কোনাে-কিছুর এতটুকু ব্যতিক্রম ঘটলে সে অশান্তি বােধ করে। রায়া করতে হয় মৃগয়য়ীকে, ঘর-বাড়ি তকতকে ঝকঝকে রাখতে হয়, জামা-কাপড় কাচতে হয় দরকার হলে, যখন আর- কিছু নেই কোনাে-না-কোনাে সেলাই করবার থাকেই। সময়ের চাপ তাঁকে অনুভব করতে হতাে না-যথেষ্ট কাজ, দিন ভরে রাখবার পক্ষে, জীবন ভরে রাখবার পক্ষে যথেষ্ট কাজ। আর মিহির ভালােবাসতাে এই আরাম, শরীরের কোনােরকম শারীরিক অসুবিধে হলে সে বিরক্ত হতাে : একদিন হােরের উপকরণে একটু কমতি হলে, কোনাে বিকেলে চা খেতে একটু দেরি হলে সে মেজাজ ঠিক রাখতে পারতাে না। শরীরকে ভুলে থাকবার জন্যই তাকে সুখে রাখতে হয়। শরীর যেন বাধা দিতে না আসে তার আশ্চর্য সব চিন্তায়। তার কবিতা লেখায় । এমনি করে যদি সমস্ত জীবন কাটত! তা-ই কাটবে- অনেকদিন পর্যন্ত মিহির তা-ই জানত। কিছু সময় কাটে, মানুষের বয়েস বাড়ে। বয়েস বাড়ে, মানুষের শরীর ভেঙে পড়ে। কী ভয়ানক! কী অন্যায়, কী নিষ্ঠুর অন্যায়। অবিশ্যি তার মা-কে বুড়াে দেখায় না। মা-কে কখনাে সে বুড়ো বলে ভাবতে পারে না। মা যদি কখনাে বলেন, এই বুড়াে বয়েসে- কথাটা শুনে অসঙ্গ রাগ হয়। মুঢ়—নিজেকে বুড়ো বলে ভাবা। কী যেন-তার মনে হত, তার মা কখনাে ৪
সূৰ্য্যমুখী
বুড়াে হবেন না। ঘাড়ের কাছে ছাঁটা তাঁর ঘন ঝোঁকড়া চুল
সাদা হয়ে আসছে, তা সত্যি ; দুটো একটা দাত পড়েছে, চোখের
নিচের পাতা কুঁকড়ে আসছে। তা সত্যি। কিন্তু কী সুন্দর
এখনাে তিনি দেখতে। মঙ্গণ শুভ্র বাড়, শুভ্র নিটোল হাতের
কজি—যােললা বছরের মেয়ের মত। সাদায় আর কালােয় মেশানাে
চুলে আলাে আর ছায়া। সত্যি, যােলাে বছরের মেয়ের মতই
তাঁর মুখের লাবণ্য। কেন মিছিমিছি এ-কথা ভাবতে যাওয়া
যে বুড়াে হয়েছি? বুড়াে-কথাটা শুনলেই গা-টা ফাক
শিউরে ওঠে না! সেই বুড়াে তার মা কখনাে হবেন।
অসম্ভব।
তবু-ছােট্ট একটা কথা লুকোনাে দীর্ঘশ্বাসের মত মাঝে-
মাঝে শােনা যেতে লাগলো। আর পারিন, আর পারিনে।
আর মিহিরের রক্তের স্রোতে যেন তা বরফের কুচি ছিটিয়ে দিয়ে
গেলাে—সেই ছােট্ট সূক্ষ্ম দীর্ঘশ্বাস : আর পারিনে, আর পারিনে।
এক-একদিন হঠাৎ তার চোখে পড়ত লাল উনুনের ধারে বলে
তার মা বেঁধে যাচ্ছেন—কালাে হয়ে উঠেছে তাঁর মুখ। গায়
হঠাৎ তার সমস্ত রক্ত যেন জমে’ হিম হয়ে যেতাে। কোনাে-
কোনাে রাত্রে পাশের ঘর থেকে মা-র অক্ষুট গােঙানির শব্দ আসতো
তার কানে। আর বে-রাত্রিকে সে প্রিয়ার মত ভালােবাসে তা কি
হয়ে উঠতাে। নিজেকে তার মনে হতাে যেন অপরাধীর
৫
সূৰ্যমুখী সেই মনে হওয়াকে সে ঘৃণা করতাে। তার অপরাধ কোথায়? লে কি খাবে না? সে কি বাঁচবে না? কিন্তু সেই ছোট্ট চাপা আওয়াজ কিছুতেই মিলােচ্ছে না : আর পারিনে, আর পারিনে। তা তার শাস্তির সময়েও হানা দিতে আরম্ভ করলাে। কখনো-কখনাে তা তার সমস্ত খাওয়ার আনন্দ কেড়ে নিতাে—যখন সে দেখতে। তার মা-র আগুনের আঁচে শুকনাে একাগ্র মুখ। কুশ্রী সে সইতে পারে না; কেন তার মা সব সময় সুন্দর হতে পারেন না, আসলে তিনি যেমন ? যে-জিনিস খেতে ভালাে, তা তৈরি করতে এত কষ্ট কেন? কী অবিচার। নিজের দেশের উপর তার রাগ হত, এখানকার রান্নার যন্ত্রপাতি এমন বব্বর বলে। আধুনিক কল- কাওয়ালা রান্নাঘর হলে•••না, তাকে খামক এ-রকম অপরাধী করে তােলবার অধিকার কারাে নেই। যা-ই হােক, কথাটাকে সে মনের মধ্যে চাপা দেবার চেষ্টা করলাে। কাটলাে সময়। অন্যের সম্বন্ধে মিহিরের যতখানি বিবেচনা, এমন সাধারণত দেখা যায় না। বাড়ির চাকরকে কোনাে বাড়তি কাজের কথা বলতে সে কুষ্টিত হয়ে উঠতাে। কেবল তার মা-র পরিশ্রম সম্বন্ধেই যেন কোনাে দ্বিধা ছিলাে না তার মনে। মা-র কাজ করাটাই যেন স্বাভাবিক, সুন্দর। কেননা আমরা শুধু তার হাত থেকেই সেবা নিতে পারি, এবং নিতে চাই, যাকে । । ৬ সূর্যমুখী ভালােবাসি। এবং যে ভালােবাসে বলে জানি। মন যার প্রতি উদাসীন, তার সুবিধার লেশমাত্র হানিতে চঞ্চল হয়ে উঠি, কিন্তু ভালােবাসি যাকে, তাকে খাটিয়ে মারতে বাধে না। ভালােবাসার গতি বিচিত্র। কিন্তু হৈমন্তীর শরীর সত্যি বেন আর পেরে উঠছে না। প্রায়ই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তবু চা আসছে ঠিক সময়ে। মাছের রান্নার বৈচিত্র্য খর্ব হচ্ছে না। তবু এক-এক সকাল- বেলায়, বালতির পর বালতি জল ঢেলে ঘরের মেঝে তিনি ঝকঝকে করে তুলছেন। আর মিহিরের বুকের ভিতর দিয়ে যেন একটা ঠাণ্ডা, সাদা কাপুনি নেমে যায়—তাকে উব-হাঁটু হয়ে বসে ঘর সাফ করতে দেখে। কথাটা কী করে প্রথম ওঠে মিহিরের মনে নেই। কিন্তু একদিন সেটা উচ্চারিত হলাে। আর সেটা রয়ে গেলাে-বন্দুক ছোড়বার পর বাতাসে ধোয়ার গন্ধের মত। তা রয়ে গেলাে, বাতাসে একটা ভারি অনুভূতি, তা কিছুতেই সার’ যাবে না। মিহিরের মনে হতে লাগলাে যেন কোনাে শত্ৰু অন্যায় কৌশলে তাকে কোণঠাসা করেছে। বেরােবার পথ নেই। তার মনের মধ্যে একটা অন্ধ চাপা রাগ গুমরে মরতে লাগলাে। তার জীবনে স্ত্রীর কোনাে প্রয়ােজন নেই। পুরুষ যে-সব কারণে বিয়ে করে তার একটাও এখন তার পক্ষে খাটে না। এপর্যন্ত সে * সূৰ্য্যমুখী বিয়ের কথা কখনাে ভাবেই নি। তা মনে হয়েছে একেবারে অবান্তর, নিছক বাহুল্য। অথচ তার জীবনে স্ত্রীলােকের প্রয়ােজন মর্মান্তিক। তাকে ভালােবাসতে, তার সেবা করতে তার শরীরের সম্পূর্ণ আরাম সৃষ্টি করতে। মা-ই তাে আছে—আর এসব ব্যাপারে মার মত আর কে ? যে মা ভালােবাসে, তার মত অপরূপ স্ত্রীত্ব কোন্ স্ত্রীর? এমন কোমল, এমন নীরব, আত্ম- সমর্পণে এমন নিঃশেষিত ? ক্রীতদাসীর মত তার নীরব, অবিরল সেবা। ছেলের খাওয়ায় কাছে মা যেমন চুপ করে বসে থাকে, আত্মবিশ্বত, ভালােবাসায় মগ্ন, এমন পারবে কোন স্ত্রী ?(স্ত্রী অনেক কিছু চায়, মা কিছু চায় না। মা কিছু চায় না; কেবল হতে দেয়, কেবল ফুটিয়ে তােলে।) স্ত্রী ভালােবাসা চায়, ভালােবাসার ক্ষুধায় স্বামীকে সে ছিড়ে ফেলতে পারে ; মা-কে ভালােবাসবার পর্যন্ত দরকার করে না। স্ত্রীর কাছে অনেক দাবির, অনেক কথার, অনেক সংঘাতের ক্ষয় : মা-র কাছে শান্ত নীরব সম্পূর্ণ অখণ্ডতা। অথচ বিয়ে সম্বন্ধে তার মনে একটা স্বপ্নও আছে। সে কবি : সেলুন বােঝে, সে প্রেম চায়। সেই রহস্য আর আতঙ্ক আর উন্মাদনা! মেখে-ঢাকা জ্যোছনায় অস্পষ্ট উতরােল ভয়াল সমুদ্র। অনেক রাত্রে শূন্য মাঠের উপর দিয়ে ভেসে-আসা হঠাৎ দক্ষিণে হাওয়া—চোখে যাতে জল এসে পড়ে। অনেক ছবি সে দেখেছে
সূৰ্য্যমুখ
-চোখে দেখেছে মনের মধ্যে নতুন করে সৃষ্টি করে দেখেছে।
অনেক অনুভূতি এসেছে তার জীবনে প্রথমে তার শরীরের
জীবনে, তারপর তার ভাবনায় নতুন হয়ে, অপরূপ হয়ে। সেই
সব—সব জড়িয়ে মিশিয়ে, একত্র করে চরম করে সে চায়
সেই মেয়েতে, যাকে সে চাইবে, যাকে সে চাইবে রক্তের
সমুদ্রের সমস্ত উতরােল হিংস্র দিয়ে ।
আর তাকেই কি শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে হবে যেহেতু রান্না
করবার জন্যে একজন লােক দরকার? যেহেতু সকালে তার ঘুম
ভাঙবার আগে চা তৈরি করবার জন্যে কেউ না থাকলে চলে না?
ভাগ্যের বিদ্রুপ ! আর কী নিষ্ঠুর বিদ্রুপ। খুব রুচিসতও
নয়।
কিন্তু তা-ই যে। তার মা তা-ই চান। আর সত্যি কথাটা
যদি বলতেই হয়, সেও তা-ই চায়। তার পরিচর্যার জন্য একজন
স্ত্রীলােক দরকার। তা না হলে সে বাঁচবে না। স্ত্রীলােক ছাড়া
সে বাচতে পারে না—যা-ই বলল আর যা-ই করে। তার মাই
তাকে এ-অভােস করিয়েছেন। আর এখন তিনি বলছেন আর
পারিনে। আর পারিনে! আর পারিনে! কী অায়!
মিহিষের মনে হতে লাগলাে যেন কেউ তার সঙ্গে প্রবঞ্চনা
করেছে। কেউ যেন কথা দিয়ে কথা রাখেনি। এ রকম জে
কথা ছিলাে না-এ আবার কী? তার নিছক শারীরিক কয়েকটা
অপমান,
সূৰ্য্যমুখী
আমের জন্যেই কি এখন তাকে বিয়ে করতে হবে? কী
কী লজ্জা কিন্তু এ-কথা সে তাে জোর করে বলতে পারে
না-না, দুর হ! দূর হ! আমি আমার নিজের ব্যবস্থা নিজেই
করতে পারবে। কেননা সে তা পারে না। সেখানে তার চলে
না স্ত্রীলােক না হলে। ভাড়াটে চাকরের হাতে নিজেকে সমর্পণ
করবার কথা ভাবতে পারে না সে। এদিকে সময় কাটছে, মা-র
ৰয়েস বাড়ছে। এমনি চিরকাল চলতে পারে না। মিহির আর
ভাবতে পারে না; সে চোখ বুজে ফেলে, যেন কোনা অজ্ঞাত
আশঙ্কাকে এড়াবার জন্য। কী অন্যায়। কী নিষ্ঠুর, নিষ্ঠুর, নিষ্ঠুর
অন্যায় ! তার বুকের ভিতরে একটা অন্ধ নির্বোধ চাপা রাগ প্রতি
মুহূর্তে ফেটে পড়তে চাইছে।
আর মিহির নিজের মধ্যে ছটফট করতে লাগলাে-কোণঠাসা
কোনাে জন্ধুর মত। না—এ ভাবা যায় না, এ হতেই পারে না।
এ তার দুর্বলতার উপর অন্যায় সুযােগ নেয়নিছক অত্যাচার
তার উপর। আর তবু—মা-র সেই ছােট্ট, সূক্ষ্ম দীর্ঘশ্বাস-স্বর
তাকে হানা দিতে লাগলাে, আর মার চোখের নিচে গভীর হয়ে
পড়তে লাগলাে রেখা। আর প্রায়ই তাকে কেমন স্নান দেখাতাে--
যেন শরীরের রক্ত শুকিয়ে আসছে। আর ছেলের বুকের মধ্যে
হৃৎপিণ্ড হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথায় বিশ্বারিত হতাে, সেই মুখের দিকে
গকিয়ে।
সূর্যমুখী
শেষটায় একদিন সে বললে, আমি এখন বিয়ে করলে তুমি
সত্যি খুসি হও?
হৈমন্তী বললেন : সত্যি খুশি হই।
আর এমনি করেই বিয়ে হ’লল। উত্তাপহীন, আনন্দহীন।
নিয়তির মত অন্ধ, নিয়তির মত নিষ্ঠুর। কোনাে অদৃশ্য অন্ধ শক্তি
তাকে আঁকড়ে ধরেছে—তার সমস্ত মানুষ-শক্তি,পুরুষশক্তি সেখানে
ব্যর্থ। সে কিছু করতে পারে না। আচ্ছা, হােক তবে। হয়তাে
এতে সত্যি-সত্যি এতটা কিছু এসে যায় না, যতটা সে মনে
করছে। তার বুক একবারও একটু কেঁপে উঠলাে না—কোনাে
ভয়ে কি কোনাে সুখে কি কোনাে প্রত্যাশায়। মনকে সে পাথর
করে তুললে। শুধু পাথরের দেয়ালে অব সেই অন্ধ চাপা
রাগ।
যা-কিছু করবার হৈমন্তীই করলেন। মৃণাল তাঁর খোজেই
ছিলাে। তাদের পরিবারের সঙ্গে ছিলাে তাঁর জানাশােনা।
মেয়েটি কালাে, কিন্তু মুখ সুন্দর। লেখাপড়া শেখেনি, কিন্তু
গৃহকর্মে অসামান্য নৈপুণ্য। আঠারাে থেকে উনিশের মাঝামাঝি
বয়েস। ঠিক যে-রকম মেয়ে হৈমন্তী চান, যার হাতে তিনি
নিশ্চিন্ত হয়ে ছেলেকে দিয়ে যেতে পারবেন। অনেকদিন
থেকেই তার মন পড়েছিলো এ-মেয়ের উপর। তিনি দেরি
করলেন না।
সূৰ্য্যমুখী
‘মেয়েটিকে একবার গিয়ে দেখে আসবি, মিহির ?
‘কী হবে দেখে। ঢের তাে সময় পাবাে দেখবার।
তারপর, বিবাহ-লগ্নে যখন কন্যার মুখের দিকে তার তাকাবার
কথা, সে দৃষ্টিহীন চোখে সামনের শূন্যের মধ্যে তাকিয়ে রইলাে
-কিছু দেখলে না, কিছু বুঝলে না। আর হঠাৎ সেই অন্ধ চাপা
রাগ তার গলার কাছে উচ্ছ্বসিত হয়ে ফেটে পড়লাে—যেন গলা
টিপে তাকে মেরে ফেলবে।
• হৈমন্তী আর মৃণালে চমৎকার মিললাে-কবিতার দুই চরণের মত। বাড়ির মধ্যে প্রায়ই এরা দুজন একসঙ্গে। হৈমন্তী তৈরি করছেন তাঁর প্রতিনিধিকে। মিহিরের সমস্ত শারীরিক অভ্যাস তার জানা চাই, তার শরীরের অসংখ্য তুচ্ছ প্রয়ােজন-যে- সম্বন্ধে মিহির নিজে ভালাে করে সচেতনও নয়, তাদের পরিতৃপ্তি এমনই নিয়মিত, নির্ভুল, যন্ত্রের মত মণ। তার জন্যে কখনাে চেষ্টা করতে হয় না; যেন অভাবই 'তার তৃপ্তিকে সৃষ্টি করে, গর্ভলীন শিশুর নিশ্চেতন জীবনের মত। প্রতিদিনের জীবনে প্রতি মুহুর্তে কত জিনিস যে আমাদের শরীরের দরকার তা আমরা কপুনে বুঝতেও পারিনে—যতক্ষণ কাছে থাকে কোন স্ত্রীলােক, কোনো স্বেচ্ছা-ক্রীতদাসী, নিজেকে যে অবিশ্রান্ত ঝরিয়ে দেয়, নরম পশলার পর পশলায় ; নীরবে, গােপনে যে ঢেউ খেলিয়ে যায় প্রিয় পুরুষের জীবনের উপর দিয়ে, তার রক্তের ভিতর দিয়ে—অন্ধকার, উষ্ণ মােতে। হৈমন্তী মৃণালকে কাছে টেনে নিলেন, তাকে জড়িয়ে ধলেন নিজের জীবন দিয়ে। আর এই দুই স্ত্রীলােকের মধ্যে এক অদ্ভুত ভাষাহীন বাণী-বিনিময় ; তারা যেন অনেক আগেই পরস্পরকে বুঝে ফেলেছে। ডিমের খােলসের মধ্যে অজাত পাখির মত তারা আত্ম-সম্পূর্ণ—সেই তাদের মনােহীন, শারীর স্ত্রী-জগতে। কেননা ১৩ সূৰ্য্যমুখী মেয়েরা শুধু শরীরই বােঝে, শুধু শরীরকেই ভালোবাসে। তাদের সঙ্গে আমাদের শুধু শরীরের বিদ্যুৎ-সংস্পর্শ ; অন্য যেদিক দিয়েই আমরা তাদের সঙ্গে মিলতে যাই, সেটা খানিকটা গায়ে-পড়া, খানিকটা মনগড়া ব্যাপার। মিহিরের মনের জীবন-তার ভাবনার, কল্পনার, কবিতার জীবন—তার উপর হৈমন্তীর এতটুকু টান নেই, কোনাে কৌতুহল নেই তা নিয়ে। সেজীবন যদি মুল পর্যন্ত শুকিয়ে মরে যায়, তিনি তা জানবেন না; যদি পল্লবিত হয়ে ওঠে ইন্দ্রধনু-ঐশ্বর্যে তবু তিনি কিছু বুঝবেন না। তার ছেলে ভালাে কবিতা লিখতে পারছে কি না পারছে তা নিয়ে কোনো ভাবনা নেই তার। তার চোখে ছেলের কবিতার বদি কিছু অর্থ থাকে তা শুধু এই যে একটা কিছু নিয়ে সময় তাে কাটাতে হবে, আর এতে যদি ওর মন ভালাে থাকে এ-ই বা মন্দ কী? মিহিরে যেটা আসল জীবন, যেখানে সে কবি, সে শিল্পী, সে সীমাহীন- অনুভবে আন্দোলনে ব্যাকুলতায় সেই তার অস্পষ্ট ছায়াময় সমুদ্র- জীবন—সেখানে মায়ের হাত থেকে সে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ; সেখানে সে চিরন্তন নিঃসঙ্গ ; সেখানে কোনাে মাতৃমাংস থেকে তার সৃষ্টি হয়নি—সেখানে সে আত্মজ, আত্মসম্পূর্ণ, চরম। হৈমন্তীর এমন ক্ষমতা নেই সেখানে মুহূর্তের জন্য একটু উঁকি দেন। সে-ইচ্ছা নেই। শুধু ছেলের শরীরের জীবন নিয়েই তার ভাবনা-দিন থেকে দিন, প্রতি মুহুর্তে নিজের হাতে যে-জীবনকে তিনি সৃষ্টি ; ১৪ সূর্যমুখী করেছেন। সেখানেই তিনি ছেলেকে বােঝেন-নিজেকে দিয়ে ছেলেকে ভরে তুলতে পারেন সেখানেই। মৃণালকে তিনি দীক্ষিত করলেন সেই শারীর জীবনের রহস্যে। বেশি বলবার দরকার হলাে না, সে প্রস্তুত হয়েই ছিলো। সে-ও তাে মেয়ে। কী-রকম রান্না মিহিরের প্রিয়, মশারি কতটা উঁচু না হলে তার ঘুমের ব্যাঘাত হয়, চা সম্বন্ধে সে কী ভয়ানক খুঁতখুঁতে—ইত্যাদি, ইত্যাদি, আর তার সঙ্গে ব্যবহারের, ভঙ্গির অসংখ্য খুটিনাটি, যা বাদ দিলে সমস্তই অর্থহীন—একটু বিস্বাদ হয়ে ওঠে। শুধু করলেই চলে না; করবার রকমটা জানতে হয়—সেটাই আসল। সেখানে যদি কোনােরকমে একটু সুর কাটে, সব যায় নষ্ট হয়। আর মিহিরের কাছে অবিশ্যি তার মা-রই হচ্ছে মেয়েলিম মেয়েত্ব পৃথিবীর অন্য কোনাে মেয়ের সাধ্য নেই সেই তৃপ্তি, সেই শান্তি তাকে দিতে পারে। মৃণাল সেটা বুঝতে পারলে তার প্রবৃত্তি দিয়ে। তাই সে হৈমন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো সন্ত্ৰমের, পূজার দৃষ্টিতে। নিবিড়ভাবে সে আসক্ত হয়ে পড়লে তার প্রতিসারাদিন সে আছে তাঁর পিছনে, তার সঙ্গে-সঙ্গে। সব সময় যে কোনাে কথা হতাে তা নয়, দু'জনের মধ্যে নীরবতার পরিপূর্ণতা। আর কথা যখন হ’তে-সেই সব তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ জিনিস নিয়ে, যা নিয়ে মেয়েরাই কথা কইতে পারে। হৈমন্তীর জীবন সে নিজের করে ।
সূৰ্য্যমুখী নিলে। কিছুদিনের মধ্যেই মিহির টের পেলো যে তার জীবনের হাত বদলি হচ্ছে। তার প্রাত্যহিক জীবনের প্রতি মুহূর্তের নেপথ্যে রয়েছ মৃণাল। খেতে, বসতে, ঘুমাতে, কাপড় ছাড়তে সে হোঁচট খেয়ে পড়ছে মৃণালের উপর। মা যেন খানিকটা দূরে সরে গেছেন। মাকেও সে যেন দেখতে পাচ্ছে মৃণালের ভিতর দিয়ে। মা তাে সব সময় তাকে নিয়েই ব্যস্ত, মার জীবনের খানিকটা যেন মিশে গেছে, তার সঙ্গে। নিজেকে তিনি যেন দিতে চাচ্ছেন এই মেয়েরই ভিতর দিয়ে। কিন্তু এ তাে তিনি নন্। মিহির একে চায় না। তার রাগ হলো, অভিযােগ জমে উঠলাে মনে। তার মনে হলাে, মৃণাল যেন মা-কে কেড়ে নিচ্ছে তার কাছ থেকে নিজেকে সে কেবলই ছড়িয়ে দিচ্ছে তার স্ত্রীত্বের গর্বে, নিজেকে দিয়ে সব ভরে তুলছে—তারই জন্য যেন সে মা-কে হারাতে বসেছে। অসহ—এই আত্ম-প্ররােচিত উদ্ধত স্ত্রীত্ব । আসলে কিন্তু মৃণাল শান্ত, অত্যন্ত শান্ত, কানায় কানায় ভরা দীঘির কালাে জলের মত স্তব্ধ। কথা সে কম বলে; বাড়ির মধ্যে নানা কাজ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়-নীরব, ছায়াময় । বিড়ালের মত নিঃশব্দ তার চলাফেরা। হৈমন্তীর প্রতি তার আনুগত্য অনেকটা যেন পােষ বিড়ালের অস্ফুট, রেশমি আসক্তির মত । তার সমস্ত শরীরে পােষ-মানা পণ্ডর শান্ত, নরম হাব-ভাব। বড়-বড় উজ্জল তার চোখ-রাত্রির অন্ধকারে বিড়ালের চোখের মত। সব সূর্যমুখী সময় সে যেন সম্পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে। কেমন একটু অস্বস্তিকর—তার সেই স্তব্ধ, উজ্জ্বল দৃষ্টি। মিহির কখনাে ভালাে করে তার দিকে তাকালাে না। সে যখম ঘরে আসে মিহিরের চোখ বইয়ের উপর। সে যখন দরজার কাছে এসে আঁড়ায় মিহির চোখ না-তুলে বলে-“কী ? তার দিকে না-তাকাবার চেষ্টার মিহির নিজেকে প্রায় অসুস্থ করে তুললল। তবু এক-এক সময়, হঠাৎ তার চোখ মৃণালের চোখের উপর গিয়ে পড়তাে-বিক্ষারিভ, উন্মীলিত সেই চোখ। মৃণাল স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাে সেই নিতে চোখ নামিয়ে। আর তার স্ত্রীর শুধু এইটুকুই রইলাে তার মনে—উজ্জ্বল, স্তব্ধ চোখ, ত্রর অন্ধকারে বিড়ালের চোখের । ম'।
১ ; মৃণাল লেখাপড়া শেখেনি, ভালােবাসতে শিখেছিলাে। শান্ত, সুদুর, রেশমি ধরণে। বিড়াল যেমন করে পায়ের কাছে জুড়াে-সড় হয়ে বসে, যেমন করে রেশমি ভঙ্গিতে পায়ের নিচে ত'র উষ্ণ শরীর এলিয়ে দেয়। এর বেশি কি এর চাইতে অন্যরকম কোনাে ভালােবাসা সে ভাবতে পারতাে না। তার স্বামীর মনে প্রেমের যে-কল্পনা—পৃথিবী থেকে স্বর্গের সীমা পর্যন্ত রঙিন নদীর মত প্রবাহিত সেই বিরল ইন্দ্রধনু, তা সে বুঝতাে না। তার কথা কেউ তাকে বলেনি, সে জানতাে না ও-রকম কিছু মানুষের জীবনে আছে। সে বই পড়েনি, কবিতা পড়েনি; শিশুকাল থেকে সে শুধু জেনেছে বেঁচে থাকবার কঠিন, নিষ্ঠুর প্রয়ােজন। সে সময় পায়নি ভালােবাসা সম্বন্ধে মনের কোনাে ধারণা সংগ্রহ করবার, কোনাে কবির স্বপ্ন থেকে, শব্দের কোনাে সর্প-সূক্ষ্ম জাদু থেকে। তার মন নগ্ন, ধুন্য—কোনাে ভাবনার সূৰ্য্যাস্ত-মেঘে তা বিসিত নয়। সে শুধু জানতাে ভালােবাসার অপ্রতিরােধ্য, নিষ্ঠুর প্রয়ােজন- তার রক্তে, তার নিশ্চেতনতায়। বৰ্বর নারীর মত দৃষ্টিহীন, প্রশ্নহীন, উত্তপ্ত তার আত্মসমর্পণ। তার স্বামীর কবি-খ্যাতি সে শােনেনি। তার স্বামী কী আর কী নয়, সে ব্যাপারে তার প্রবৃত্তিগত উদাসীন। পুরুষ কিছু করবে, কিছু হবে এ তাে জানা কথা—কিন্তু সেখানে তাে, সেখানে তাে স্ত্রীর সঙ্গে তার ১৮ • সূৰ্যমুখী মিলন নয়। সে আসবে তার স্ত্রীর কাছে দিনের কাজের পরে- রাত্রির অন্ধকারে, রাত্রির নীরবতায় : সে তাকে খুঁজবে রাত্রির সেই সঙ্গোপন, উত্তপ্ত অন্তঃপুরে, তাকে নেবঅনির্বচনীয় নীরবতার সেই রাত্রিতে। সেই তার গহন, নির্জন রাত্রি-সত্তা—সেখানে সে তার স্ত্রীর। স্ত্রী সেখানে ফুটে উঠবে পাপড়ির পর পাপড়িতে আশ্চৰ্য্য নামহীন কোনো ফুলের মত, সেই বিশাল, নির্জন অন্ধকারে, প্রতিটি পাপড়ি প্রাণ-আত, শরীরের বিরলতম, নিভৃততম সুরার, সিঞ্চিত। তা-ই মৃণাল জানতাে। এত কথা অবিশ্যি তার মনে হতাে না, কিন্তু এ-ই সে অনুভব করতাে; এই জন্য নিজেরই অজ্ঞাতে, এই পরিপূর্ণতারই জন্য নিজের মধ্যে সে নিবিড় হয়ে উঠেছে। যে-সূৰ্য্য আঙুরকে ভরে তােলে, সে তাকে জানে না; মৃণালও জানতাে না কোন্ অদৃশ্য, ভীষণ শক্তি রয়েছে তার উষ্ণ-স্পন্দমান, সুরা-সঞ্চারমান বক্ষের নেপথ্যে। জাগ্রতভাবে সে তার শরীর সম্বন্ধে সচেতন ছিলাে না; কিন্তু, কী যেন, কোনাে অস্পষ্ট, অদ্ভুতভাবে সে যেন তাকে জানতাে। তার শরীরের সঙ্গে তার জীবনের এক ছন্দোময় প্রবাহ। অদৃশ্য, অন্ধকার স্রোতের মত তার শরীর-চেতনা। তার শরীর-তাই তার মহান উপহার, তার যজ্ঞের উৎসর্গ, তাই নিয়ে সে এসেছিলে : আর-কিছু তার ছিলাে না। আর আশ্চর্য সে-শরীর, বসন্তের লতার মত, সূৰ্যমুখী জ্বলন্ত দীপশিখার মত। অগ্নিময় তার শরীর, যৌবনময় ; কোননা গােপন, হিংস্র আগুনে আঙুলের ডগা পর্যন্ত উদ্ভাসিত। গােপন, বুকোনাে আগুন, তার রক্তের মধ্যে কোনাে অন্ধকার ঐশ্বর্য : তার চামড়ায় পড়েছে তারই ছায়া। সেই পেন আগুনই তাে তাকে কালাে করেছে, শুন্য দিগন্তে বিশাল রানির মত সেই রহস্য ; প্রাণের উত্তাপে সে কালাে, প্রাণের লাবণ্যে আভাময়। দীর্ঘ, সবল তার বাহ; তার নাসারন্ধ্রে প্রখর অনুভশীলতা : তার উৰ্দ্ধচুড় বক্ষের নির্ভীক বঙ্কিমা। কিন্তু এই সমস্ত শক্তি নেপথ্যে রয়েছে, নিহিত রয়েছে—সে ভালল তা জানে না। এই সমস্ত শক্তি অপেক্ষা করছে কোনাে পুরুষের, কোনাে স্বামীর। সেই স্বামীর রাত্রিতে তা ফুটে উঠবে, তারা হয়ে উঠবে। অলন্ত, চিরন্তন তারা। এখনাে মৃণাল রয়েছে শান্তিতে শিথিল, আচ্ছাদনে অস্পষ্ট, পােষ-মানা পশুর মত নরম। কিন্তু রাত্রি বন্ধ্যা, রাত্রি পাথরের মত বােবা। ফুল পড়ে রইলাে, সমস্ত রাত্রি ভরে’, ফুটে ওঠবার অপেক্ষায়। আশ্চৰ্য্য, নামহীন সেই স্কুল ! কিন্তু অন্ধকার ফেটে পড়লাে না গােপন সূৰ্য্যে, অন্ধকার কথা কয়ে উঠলাে না। পাথরের মত বােৰা অন্ধকার, পাথরের দেয়ালের গায়ে রাত্রি নিষ্পেষিত । মৃণাল চুপ করে রইলাে। কিছু করলে না, কিছু ভাবলে না। মনেমনে তর্ক করলে না, দীর্ঘশ্বাস ফেললে না, ভাগ্যকে একবার ২।
সূর্যমুখী
দোষ দিলে না। মেনে নিলে। স্বামীকে মেনে নিলে স্বামী
বলেই ; কোনাে অদ্ভুতভাবে তাকে বিশ্বাস করলে পৰ্য্যন্ত।
মেয়েমানুষের এক যখন বিয়ে হয়ে যায়, সমস্ত তর্কের
শেষ মীমাংসা হল সেখানেই। তার উপর আর কোন কথা চলে
না। তারপর কেবল মেনে নিতে হয়, কেবল বিশ্বাস করতে
কেননা মিহির তার সমস্ত মনকে পাথর করে তুলেছিলাে।
খানিকটা চেষ্টা করে, ইচ্ছার সাহায্যে। সে মনে-মনে তার
রাগকে পুষেছিলাে-যেন খানিকটা আদর করে’, ভালােবেসে।
সে-ই তাে তার ইচ্ছার নিশান, এই রাগ। তার নিজত্বের
খানিকটা ভাঙাচোরা, বিকৃত ব্যঞ্জনা। হঁ্যা, এই রাগকে সে
ভালােবাসতাে। কিন্তু তাকে সে গােপন করতে পরম চেষ্টায়,
প্রকাশ্যে কখনাে উড়তে দিতাে না সেই নিশানকে। মা-কে সে
কিছু বুঝতে দেবে না। এই তার প্রতিশোেধ মা-র উপর, পরম
প্রতিশােধ এইজন্যে যে তিনি তা জানবেন না। তিনি বা
চেয়েছিলেন, তা-ই হয়েছে। মাতৃ-ইচ্ছার অন্ধ্যায় আর কিছু
তিনি ভাবেন নি। বেশ, এইবার ছেলের পালা। এইবার সে
নিজের মনে উপভােগ করবে তার ছােটখাটো ঠাট্টা। সে
ঠকাবে, ঠকাবে—প্রতি দিন প্রতি মুহূর্তে ঠকাবে, তিনি তা
জানবেন না।
১
. ৬ সূৰ্য্যমুখী স্ত্রীর প্রতি তার প্রথম প্রতিক্রিয়া যেন খানিকটা শারীরিক বিকর্ষণ গেছে। যেমন কোনাে-কোনাে লােক দেখা হওয়া মাত্র কাছে টানে, ঠিক তেনি, মৃণাল যেন তাকে দুরে টানলে। তার একমাত্র ইচ্ছা হলে দূরে যেতে, দুরে সরে যেতে। আর এই ভাব কাটিয়ে ওঠবার কোনােরকম চেষ্ট সে করলে না ; কখনাে মৃণালের দিকে চেয়ে দেখলে না, তাকে দেখলে না। যেন খানিকটা এই রকমই ভেবে রেখেছিলাে, এটাই আশা করেছিলাে। সে দূরে সরে’ রইলাে-ঠাণ্ডা, সাদা বিচ্ছিন্নতায়। সত্যি, এ-মেয়ের সঙ্গে কোথায় তার এতটুকু মিল ? সে অন্য-এক জগতের, অন্য-এক গ্রহের। তার জীবনের আঁকাবাঁকা রাস্তা কোনাে-একটা মােড়েও এর জীবনকে কেটে যায়নি। সে কবি, সে স্বপ্নবিলাসী : তার মনের ভাবনার মেঘে মেঘে ছন্দের সােনার রঙ, ঘরে। সে বা ভাবে, সে যা অনুভব করে—আ, সেই সব ক্ষণিক, পলাতক আলাের টুকরাে—সে কথায় ধরে রাখতে পারে তার কতটুকুই বা। কল্পনার সেই রহস্যময়, অপরিসীম আকাশ- সেখানে তার মন পাখা মেলে দেয়, পাখা মেলে দেয়, চলে যায় দিগন্ত থেকে দিগন্তে,দুরাশা থেকে দুরাশায়। তার মধ্যে এই মেয়েকে সে দেখবে কেমন করে? কত বড় আলাে তার চোখের সামনে, অনেক কাছের জিনিস তার চোখে পড়ে না। দেখতে না-পাওয়াই হয়তাে দরকার। আর * २२
সূৰ্যমুখী
যদি সে-সব জিনিসের মধ্যে কোন স্ত্রী পড়ে যায় তা হলে
কী আর করা।
অর্থচ স্ত্রীলােকের মােহ সম্বন্ধে মিহিরের মন একটু বিশেষ রকম
দুর্বল—যেমন সব কবিরই হয়ে থাকে। আমার প্রাণের 'পরে
চলে গেলাে কে সন্তের বাতাসটুকুর মত? কে ? কী হবে
খোঁজ নিয়ে ? কী হবে জেনে? তুমি যে-ই হও, তুমি বয়ে যাও
আমার প্রাণের উপর দিয়ে বসন্তের বাতাসের মত। আর-কিছু
আমি চাইনে। চোখের চকিত আলাে কি ভুরুর একটু টান কি
বাহুর অলস কোনাে ভঙ্গি—কি দূর থেকে জানলায় দেখা ছবি কি
হঠাৎ হাতের উপর একটু রেশম-স্পর্শ—যে-কোনা, যে-কোনাে
জিনিস, যাকে ঘিরে আমার কথা বুনে যাবে তার রঙিন জাল।
হােক তা মুহূর্তের, আমার এই কথাও তত মুহুর্তের ফুল। তুমি
বয়ে যাও বসন্তের বাতাসের মত ফুল ফুটিয়ে দিয়ে, ফুল ছিটিয়ে
দিয়ে। আর-কিছু আমি চাইনে।
এই হচ্ছে সব কবির মনের কথা, চিরকালের কথা।
স্ত্রী-জাতির তারাই হচ্ছে সব চেয়ে বড় উপাসক; কিন্তু সেই
উপাসনায় কতখানি গর্ব, কতখানি স্বার্থপরতা তা বুঝতে পারলে
কোনা মেয়ে তার কবি-প্রেমিককে কাছে আসতে দিতাে না। কবির
হৃদয়ের মত এমন প্রবঞ্চনা আর-কিছুই করে না। সহজে সেখানে
রঙ ধরে, সহজে মুছে যায় : রেখে যায় সময়ের সমুদ্রে টলােমলাে
२७
সূৰ্য্যমুখী
একগুচ্ছ কণিকা। সেই রঙটাই তারা চায়, ভালােবাসতে
চায় না।
না-- এ-ও ঠিক বলা হলাে না : ভালােবাসতে চায় বইকি,
ভালােবাসতেও পারে। কিন্তু আগে রঙ, ধরা চাই। যে-বঙ,
ফলসে ওঠে কবিতা ফুলে-ফুলে, তাই জমে জমে' একদিন
হয়তাে গড়ে তােলে প্রেমের আশ্চর্য উজ্জ্বল মণি। কিন্তু যেখানে
পে-রঙ নেই, যেখানে হঠাৎ বসন্তের হাওয়া মনে এসে লাগে না,
সেখানে তাদের উদাসীনতার, অন্ধতার সীমা নেই। সেখানে
তারা দেখতে পায় না।
এমনি মিহিরের। তার মনের মধ্যে কোনােখানে ছিল
ভালােবাসার বিশাল, দুরন্ত বাসনা-হ্যা, ভালােবাসাই তাে-
তা ছাড়া আর কী নাম দেব ? এবং এটা সে জানতাে যে তা
সহজে হবার নয়। না, সহজ তা নয়। তাকে খুঁজে বেড়ানাে
যায় না, ইচ্ছার জোরে তাকে পাওয়া যায় না। তার জন্য অপেক্ষা
করতে হয়—আদিম, গম্ভীর ধৈর্য্যে। তার অঙ্গ প্রার্থনা করতে হয়
সুদূর দেবতার কাছে। আর মিহির প্রার্থনা করতাে-তার
জীবনের নির্জনতায়, তার কবিতার সেই রাত্রি-উৎসে। সে
বিশ্বাস করতো একদিন সে পরিপূর্ণ হবেই। সে তা অনুভব
করতে তার আত্মার গভীরতম স্তরে। সব সময় যেন তার মনে
হতােকানােখানে, কোনাে-এক মেয়ে অপেক্ষা করছে তারা।
.
২৪
;
সূৰ্যমুখী
তার নাম সে জানে না, কিন্তু তাকে দেখলেই চিনতে পারবে।
এখনাে মাঝখানে রয়েছে অদৃষ্টের আড়াল । একদিন ছিড়ে
বাবে সে-বাধা, মুহূর্তে জ্বলে উঠবে সমস্ত আকাশ, কোনা সংশয়
থাকবে না। এ না-হরেই পারে না : সে যদি এমন করে’ চাইতেই
পারে, তা হলে ওয়াটা এমন কী আশ্চৰ্য্য। না, সেটা তেমন
আশ্চৰ্য্য নয় ; সব চেয়ে আশ্চর্য এই যে সে এমন করে’ চাইতে
পারছে। কেননা এ-চাওয়াতে দুঃখ অনেক। কেবল চুপ করে
থাকতে হয়, নিজের নিভৃত আত্মায়। আর-কিছু করবার নেই।
অনেক ছেড়ে দিতে হয়, অনেক হারাতে হয়। বিশ্বাসের প্রচণ্ড
জীবনে ক্লান্তির, অবসাদের মুহূর্ত আছে—
সেগুলােকে কাটিয়ে উঠতে সত্যিকারের সাহস দরকার।
মুহূর্তও হয়তাে আসে যখন মনে হয় ও-সব ফাকি, ও-সব কিছু
ন—তাকে পরাস্ত করবার জন্য খানিকটা সঞ্চিত শক্তি না হলে
চলে না। আর সবার উপর, যা নিকট, যা প্রত্যক্ষ, যা
সহজ—তাকে প্রতি মুহূর্তে ছেড়ে যেতে হয়, ছাড়িয়ে যেতে হয়।
তবে যদি দেবতা দয়া করেন।
আর সেইজন্য মিহিরের কাছে মৃণাল নিতান্তই অবান্তর,
অর্থহীন। কোনােরকম আমলে আনবার মতই নয় সে। সে এত
বেশি প্রত্যক্ষ, এমন নিতান্তই কাছে। তার মধ্যে এতটুকু কোনাে
আড়াল নেই যার ফঁাকগুলাে যে তারা দিয়ে ভরিয়ে তুলতে
এমন
ন
সূর্যমুখী পারে। তার মশে নেই কোনাে দিগন্ত-ইঙ্গিত, কোনাে অদৃশ্য আকাশে বলাকা পাখা ঝাপটানির শব্দ। উন্মােচন করাে, আবরণ উন্মােচন করােতােমার মুখ দেখতে দাও। এ-ই হচ্ছে পুরুষের প্রার্থনা, প্রতি পুরুষের আত্মায় নিহিত করিব। তােমার মুখ দেখতে দাও, হে রহস্যময়ী, তােমার ঘােমা সরিয়ে নাও। সপ্ত-অবগুণ্ঠনবতী সেই দেবীর পূজায় পুরুষের আত্মা জ্বলে ওঠে লাল শিখার মত, বীরের হাতে খগের মত। কিন্তু মৃণালের মুখে যে কোনাে ঘােমটা নেই—নিজেকে সে যে নিঃশেষে প্রকাশ করে’ দেয় তার শরীর দিয়ে—যেটুকু তার দেখা যায়, সে তা-ই, তা ছাড়া কিছু নয়। প্রতিমার বিভূতি তার মধ্যে নেই : সে সীমাবদ্ধ পুতুল। চিরকাল ধরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না : প্রতি মুহূর্তের নতুন আলােয় সে অপরূপ নয়। তাকে নিয়ে মিহির কী করবে, কেমন করে দেখবে তাকে? মিহিরের মত স্বভাবের লােক হয় নিজেকে ভালােবাসায় উজাড় করে দেবে—তখন সাবধান, হে কুমারী, লজ্জাজড়িত, আরক্তকপােল,অকুটবাণী যুবতী, সাবধান!-না হয় থাকবে দূরে শরে’, নিজের গােপনতায় অবরুদ্ধ। সে কখনাে চেষ্টা করে’, জোর করে ভালােবাসবে না; কখনাে তাড়া করবে না, ফন্দি আঁটবে না, তৈরি করতে চাইবে না। সে বরং প্রেমহীন, দুঃখের জীবন কাটিয়ে যাবে; কিন্তু তৈরি-করা ভালােবাসা--না,না, মরে গেলেও
সূৰ্য্যমুখী
নয়। তা যেন ফুটে ওঠে নিজেরই ভিতর থেকে--আকলিক,
অকারণ, দুর্বোধ্য, যদি কখনাে হবার হয়। তাকে হতে যাও,
তাকে না-হ'তে দাও, জোর করে তাকে হওয়াতে যেয়াে না।
আর সেইজন্য স্ত্রীর প্রতি তার অনতিক্রম্য বিমুখতা, উদাসীনতা।
আমাকে একা প্লাকতে দাও, আমাকে স্পর্শ কোরাে না।
ফেনিয়ে ভােলা মনের ক্লেদাক্ত সংস্পর্শ থেকে আমায় রক্ষা করাে,
দেবতা। স্ত্রী, তার স্ত্রী—ভাবতে হাসি পায়। সে তার
সে তার স্ত্রী, সে তার। তার ! ঘৃণিত, বিষাক্ত কথা। একজন
মানুষ কেন আর-একজনের হবে? তােমরা বলতে পারাে,
তার কি কোনাে কারণ আছে? না, এ-মুঢ়তা তার কাছে চলবে
। কেননা মানুষ তার, এ-অপমান সে সহ করবে না। সে
মুক্ত থাকবে, সে থাকবে পবিত্র। যাকে সে নিজের করে নিতে
পারে না, সে তার-এ কেবল অপমান নয়, এ তাে নিছক যন্ত্রণা।
নীরবে, গােপনে মিহির যন্ত্রণা সহ্ করতে লাগলাে।
এমনি তাদের বিবাহিত জীবন। মিহির দুকিয়ে রাখলে
তার যন্ত্রণা, তা প্রকাশ করায় কোথায় যেন একটা স্কুলটিল।
সেটা তার লজ্জা, তা দেখাতে গেলে ল দ্বিগুণ হরে হবে।
যাকে সে ভালােবাসতে পারে না, তাকে আঘাত করতে গেলে
নিজেরই কাছে ছােট হয়ে যেতে হয়। সে তা পারে না। যাকে
ভালােবাসা যায় না তাকে দৰা, অন্তত, করতে হয় তা
সূৰ্য্যমুখী আত্ম-সম্মানে ঘা লাগে। তাই মৃণালের প্রতি তার বাইরের ব্যবহারে খানিকটা প্রশ্রয়, খানিকটা সহিষ্ণুতা—যেমন ব্যবহার আমরা করি শিশুর প্রতি, পােষা জানােয়ারের প্রতি, আর্থিক কারণে সম্পূর্ণ আমাদের অধীন কোনাে মানুষের প্রতি। বাইরের আবহাওয়া শান্ত, নিস্তরঙ্গ-হঠাৎ দেখলে সুখে বলে ভুল হতে পারে। কিন্তু ভিতরে সব ফাকা, শুন্যময়, পাথরের দেয়ালের মত বােবা রাত্রি। যে-কোনােরকমের দেখানােপনাকে মিহির ভয় কুরে। তার অবজ্ঞাকেও সে কোনাে কঠিন, নির্দিষ্ট রূপ দেবে না। তাকে ভাসতে দেবে হাওয়ায়, প্রেতের নিঃশ্বাসের মত, অনিশ্চিত, অথচ অনস্বীকার্য প্রেত-উপস্থিতির মত। ঠিক জায়গায় গিয়ে তা ঠিক ভাবে লাগে, কিন্তু বাইরে কিছু বোেঝা যায় না; বাইরে সব সমতল, মসৃণ। আর তার মা-কে মনে রাখতে হয় সব সময়েই। কোনাে প্রশ্ন তাকে যেন শুনতে না হয়, কোনাে জবাবদিহির দায় যেন তার উপর না পড়ে। তাই মাঝে-মাঝে, বিশেষ করে মা যখন কাছাকাছি থাকতেন, সে মৃণালের সঙ্গে একটু এটা-ওটা আলাপ করতাে, সাংসারিক কোনাে তুচ্ছতা। হয়তাে এমন কথাও জিজ্ঞেস করতে: ‘আজ তােমাকে এমন শুকনাে দেখাচ্ছে কেন ? কি চুলগুলাে শুকোতে পারে না ভালাে করে? না, কপটতা নয় ; দুর্বলতা—হয়তাে। অনুভূতিশীল মনে বিমুখতার ; ২t সূর্যমুখী অন্য লজ্জা। ভালােবাসবার অক্ষমতার উপর আচ্ছাদন। যার সঙ্গে এক বাড়িতে সব সময় বাস করতে হচ্ছে তার সঙ্গে কোনাে শষ্ট, রুঢ় ব্যবধানের মত অস্বস্তি আর-কিছু নেই : সেটাকে যথাসাধ্য কমিয়ে আনা। মৃণাল মানানসই জবাব দিতে—মৃদুস্বরে, সােজা তার স্বামীর মুখে তাকিয়ে। যেন হঠাৎ কিসের সুর লাগতাে তার কথায়। সে-ও কি বুঝতত এই খেলা, এই নাটক, তার নিজের ভূমিকা? যাই হােক, কোথাও আটকে যেতাে না, মসূণ সমতলতার কোণ বেরিয়ে পড়তোনা কোথাও। আর রাত্রে—মিহির অনেক রাত জেগে পড়াশুনাে করে। নীল ঢাকনা-দেয়া টেবুল্যাম্পের নরম আলাের সঙ্কীর্ণ চক্রের মধ্যে তার আনত মাথা। হাতের কাছে ছাইদানে আলানাে সিগ্রেট, তা থেকে ফিকে নীল ধোয়া পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠে উপরের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। ঘরের ভিতরের দিকে পাৎলা অন্ধকার, খাটের উপর মশারি ফেলা। সেখানে মৃণাল ঘুমিয়ে। ঘুমিয়ে ?-হা, তা-ই তাে, কারণ বিছানার দিক থেকে অক্ষুটতম কোনাে শব্দও কখনাে আসে না। সমস্ত দিনের কাজের পরে ক্লান্ত, বালিশে মাথা রাখা মাত্র মৃণাল ঘুমিয়ে পড়ে। কখনাে যদি তার তরে- শুয়ে ঘুম না আসে, কখনাে যদি সে খােল, কালাে চোখে কালাে অন্ধকারের ভিতরে তাকিয়ে থাকে, তা জানবার উপায় নেই। মিহি সূৰ্য্যমুখী যখন শুতে যায়, সে তাকে দেখে গভীরভাবে নিদ্রিত। সে-সময়ে তারও চোখ জড়িয়ে আসে ঘুমে, তার ভিতর দিয়ে মৃণালের অস্পষ্ট, আবছায়া মূর্তি সে দেখতে পায়—ঘুমে এলান, ঘুমে অন্ধকার। শুনতে পায় তার গভীর, নিয়মিত নিঃশ্বাস । খাটের এক প্রান্তে সে লীন, বিছানার প্রায় সমস্তটা মিহিরের দখলে। আর, একটু পরে সে-ও ঘুমিয়ে পড়ে, সেকেলে নক্সার সেই প্রকাণ্ড, ভারি খাটে, তার মা-বাবার বাসর-শয্যা, যার উপর ছেলেবেলায় সে গড়াতে ভালােবাসতাে, বড় হবার পর থেকে প্রত্যেক রাত্রি যার উপর সে ঘুমিয়েছে। সে উঠত দেরি করে’, মৃণাল উঠতে ভােরের প্রথম আলাের সঙ্গে। মৃণাল কখন উঠত, সে একদিনও গ টের পেতাে না। ছায়ার মত চুপচাপ, ছায়ার মত মৃদুসঞ্চারী, মৃণাল তার কাজ নিয়ে চলাফেরা করে সারাদিন ভরে। এক মুহূর্ত তাকে বিশ্রাম কমতে দেখা যায় । আর মিহিরের অসংখ্য নিশ্চেতন প্রয়ােজন একজন স্ত্রীলােকের সমস্ত সময় নিযুক্ত রাখবার পক্ষে যথেষ্ট। অভাব হলে সেসব চোখে পড়ে, মিটলে খেয়াল হয় না। মৃণালের সমস্ত প্রাণের ছন্দ যেন ঝরে’-ঝরে পড়তে লাগলাে সেই সব কাজে—তা-ই দিয়ে ভরে উঠতে লাগলাে তার ক্রীতদশীয় আত্মা, তার মায়ের-আত্মা নিজেকে সে ডুবিয়ে দিলে মিহিরের বষিজীবনে, গৃহ-জীবনে; সেই গৃহের সঙ্গে এক হয়ে উঠলাে সে।
; সূৰ্য্যমুখী মিহির তার মার হাতে যেমন ছিলাে, তেমনি রইলো কোনাে প্রভেদ লক্ষ্য করতে পারলে না। কোনাে অদৃশ্য হাত চাইবার আগেই তার সমস্ত অভাব মিটিয়ে যাচ্ছে—চিরকাল যেমন হচ্ছে। যে-সব জিনিস সে খেতে ভালােবাসে, তা-ই আসছে ঘুরে- ঘুরে, সূক্ষ্ম, প্রতিকর বৈচিত্র্যে ; যতই দেরি করে সে খেতে বসুক, ভাত যেন এই একটু আগে উনুন থেকে নামানাে হলাে। রােজ বিকেলে হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে সাফ জামা-কাপড়, আর জামার বােতামগুলো সব সময় ঠিক জায়গাতেই আছে। চায়ের জন্য একবারও ডাকতে হয় না, খাওয়া হয়ে গেলে বাসন- গুলাে এক মুহূর্ত পড়ে থাকে না টেবিলে; ছাইদানিতে এক ঘণ্টার ছাই জমে উঠতে পারছে না। মৃণাল ঝাড়ছে আর ঘুচ্ছে আর ঘষছে—ঘরের দেয়াল আর মেঝে, আসবাব আর আয়না, জানলার কাচ আর কাঠ ; বিছানা টেনে নিয়ে মেলে দিচ্ছে গােয়ে, আবার টেনে আনছে; বাথরুমে নিয়ে কাচছে ওয়াড়; কখনাে হয়-তত চাকরের মত জুতাে বুরুশ করছে—চাকরটা কাছে দাঁড়িয়ে হ করে’ দেখছে—তার দুই দীর্ঘ ঝহর ভঙ্গিতে যেন অজ, প্রবল প্রাণ উচ্ছলিত হয়ে পড়ছে। তার যেন যথেষ্ট করবার নেই- নিজেকে সে ছড়িয়ে দিতে চায়, আরাে, আরাে ; আয়াে নিবিড় করে এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে যেতে চায়। এই বাড়ির মুক আত্মার সঙ্গে তার মুৰু আত্মার নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। কোনাে অদ্ভুত, ; ৭ সা সূৰ্য্যমুখী অচেতন অধিকারে এই বাড়িকে সে নিয়েছে—সুহাত ভয়ে, জীবন ভরে নিয়েছে। এখানে সে পেয়েছে তার শাস্তি। এই বাড়ি আর এ-বাড়ির মধ্যে যা-কিছু আছে সব তার দখলে—তার শান্ত নীরবতার অন্তর্গত। এসব কাজেই তার সত্তার পরিপূর্ণতা, তার আনন্দ-যে-আনন্দ মিহিরের, চাদের দিকে তাকিয়ে। তার বাহুর সবল ভঙ্গিতে সেই আনন্দের স্রোত, সৃষ্টির স্রোত। সৃষ্টিশীল তােত—অন্ধকার উত্তাপে বয়ে যাচ্ছে সমস্ত বাড়ির ভিতর দিয়ে। ক্রীতদাসী-আত্মার উত্তপ্ত অন্ধকার স্রোত। আর কী ? যে-জন্য বিয়ে করা তা তো হলো; তে পরিপূর্ণ মাত্রাতেই হ’লল। হৈমন্তীর হাতে এখন এত কম কাজ যে মাঝে-মাঝে তিনি হাঁপিয়ে ওঠেন। সময় কাটাবার জন্য নিতান্ত নিয়ােজন জিনিস তাকে সেলাই করতে হয় বসে-বসে। মিহিরের বুকের মধ্যে আর ধাক্কা লাগে না—তার মা-র কালাে-হয়ে-আসা মুখের শীর্ণতা দেখে। নিজেকে আর অপরাধী মনে হয় না। এই স্ত্রীলােকের কাছে, যার প্রাণ-রস প্রতি মুহূর্তে শােষণ করে তার এই নবীন শরীর-তরু। —নিজেকে অপরাধী মনে হয় বই কি, কোনাে ভাবে, গন্ত স্ত্রীলােকের কাছে, মৃণালের কাছে। এ না হয়ে মা হলেই যেন ভালাে ছিলাে। পুরুষের জীবনে কোনাে দাসী যদি না থাকলেই ময়, সে-দাসী মা হ'লেই সব চেয়ে ভালাে। সেখানে কোনাে । ২
।
সূৰ্য্যমুখী
কৃতজ্ঞতায়, কোনাে ায়িত্বের বােষ নেই; সেখানে মুক্তি। যাকে
ভালােবাসি তার প্রতি নিষ্ঠুর হলেও মানায়, তার প্রতিই নিষ্ঠুর
হওয়া যায়। নিজের জন্য তার সমস্ত প্রাণ নিঃশেষে নিঙড়ে নেয়াও
ভালে; তা যদি অপরাধ হয় সে ভালােবাসারই অপরাধ, অপরাধ
করবার অধিকার ভালােবাসারই আছে। কিন্তু যাকে ভালােবালিনে,
সে যখন সমস্ত প্রণ শরীরের শিকড়ে-শিকড়ে সারিত করে
দেয়—তা প্রত্যাখ্যান করবার উপায় থাকে না-এমন ,
অনির্দিষ্ট তার গতি, এবং অনিবার্য তার প্রয়ােজন—এবং তা শয়
করাও সহজ নয়। সেটা মনের উপর একটা ভারত ।
মৃত স্তুপ।
সব চেয়ে বিঞ্জ এই কৃতজ্ঞতা কেন একজনকে বাধ্য
করা হবে আর-একজনকে মনে করে রাখতে। কিছু নিয়ে যদি
ভােলা না যায় তা হলে না-নেয়াই ভালাে—ষি সম্ভব হয়।
ভুলতে পারাই মুক্তি। আর তা না হলে, সেই ভার হালকা করবার
জন্ট ডেকে আনতে হয় শীর্ণ শ্বেত দয়াকে-মহীন প্রেত। কী
অত্যাচার আত্মার উপর-দয়া করবার এই নীরক্ত খেত প্রয়ােজন।
হয়তাে কোনাে বিকেলে, একটু-একটু করে চায়ে চুমুক দিতে
দিতে মিহির বই পড়ে, মৃণাল দাড়িয়ে থাকে পাশে, মীয়ব,
অপেক্ষমান, স্বামী খাওয়ার মধ্যে অদ্ভুতরকম আবিষ্ট। তাকে
টের পাওয়া যায় না, তাকে লক্ষ্য করবার দরকার করে না।
মিহিরের কোলের উপর বই : ডান হাত দিয়ে পাতা ওল্টাতে
৩৩
।
ब्यानको
ওটাতে হাতে সে ক্ষটিতে কামড় দেয়, সারা মুড়ে গুড়ো
ভেঙে পড়ে পাতার মাঝখানকার ফাকে—তা ঝাড়বার জন্যে আন্তে
সে একবার দেয়। আস্তে-আস্তে সে খায়, অর্ধ-চেতন, অঙ্কু-মনা,
যেন তার কোনাে তাড়া নেই—যেন শরীরের মধ্যে চায়ের উষ্ণ
সারের সঙ্গে-সঙ্গে কাব্যের উদ্দীপনা অনুভব করতে-করতে সে
কাটিয়ে দেবে চিরন্তন বিকেল। সেই তা মুক্তি, তার তন্ময়তা,
ভায় সত্তার পরিপূর্ণতা। দু’জনের পরিপূর্ণ চলতে থাকে
সমান্তরাল স্রোতে কেউ কাউকে ছোঁয় না।
তবু হঠাৎ হয়-ততা, টি-পটের ঢাকনা তুলে আরাে চা আছে
কিনা দেখতে গিয়ে কি সিগ্রেট ধরাতে গিয়ে হঠাৎ মিহিরের
খেয়াল হয় মৃণালকে।" মৃণালের স্তব্ধ, আত্ম-বিস্তৃত মুক্তির দিকে
তাকিয়ে তার খারাপ লাগে, কেমন একটু রাগ হয়। অন্যায়-
নিজেকে এমন করে’ অপসৃত করবার কী অধিকার তার আছে?
এই অপতিতেই তার নিহিত শক্তির বিস্তার। মিহিরের অস্বস্তি
লাগে। যদি সে দু’একটা কথা কইতাে, তা হলে ভিতরে ভিতরে
এই চাপা অস্বস্তি জমে উঠতাে না।
‘বােলাে না, তার মুখের দিকে না-তাকিয়ে মিহির বলে,
এতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে।
তােমার খাওয়া হােক, বাসনগুলাে নিয়ে যাই।
‘নিয়ে যাও।
সূৰ্য্যমুখী
‘চা তাে আরাে আছে।
‘নিচ্ছি ঢেলে। তুমি—তুমি তাে চা খাও না। একেবারেই
খাও ?
অভ্যেস নেই।
মিহির তার শেষ পেয়ালা ঢেলে নেয়। আলাপ এগােয় না।
সত্যি, বলবার জে কিছু নেই। হয়তাে মৃণাল তা আশাও করে
না। হয়তাে সত্যি তাকে দয়া করবার প্রয়ােজন নেই। শিরি
তাকে দেখছে তার নিজের আলােয়, নিজের ভিতর থেকে, সেই
তার সঙ্কোচ। নিজের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে
মৃণালের মতাে অন্যরূপ। সে-ও হয়তাে নিজের মধ্যে সম্পূর্ণ,
মিহিরের মত—অ-কোনাে শান্তিতে, অন্যকোনাে শক্তিতে।
মৃণাল তার স্বামীর তস্ময়তার দিকে তাকিয়ে থাকে-কেমন
একরকম গভীর, নিঃশৰ ধরণেনির্নিমেষ নিঃশে সেই সৃষ্টি।
যখন সে পড়ে, যখন সে লেখে, যখন সে চুপ করে বসে থাকে,
যখন হঠাৎ লেখা ছেড়ে উঠে ঘরের মধ্যে সে পায়চারি করে।
যে-অসহ অনুভূতিতে, যন্ত্রণার মত যে-আনলে যিহিরের আম্মা
আলােড়িত, তা সে জানে না। সে কিছু জানে না, কিছু বােঝে
: সে শুধু দেখতে পারে, শুধু ভাবে। এটাই যেন ঠিক,
মিহির যে তাকে দেখতে পাচ্ছে না, কিছুই যে দেখতে পাচ্ছে না ;
তার কাছে যে তার কোনাে অস্তিত্বই নেই, এটাই যেন ঠিক।
সূৰ্যমুখী এই বিলুপ্তিই যেন মৃণালকে কেমন করে ভরে তােলে। মিহিরের নিবিড় নিবদ্ধ কৃশ মুখ—যেন ভিতর থেকে কোন আলােয় উদ্ভাসিত—সুদূর, দুর্বোধ্য, স্পর্শাতীত, কোনাে সুদুর দেবতার মুখের মত। কোনাে সুদূর দেবতা—মৃণালের শরীরের ঘুপতি থেকে পূজায় ধোঁয়া উঠছে তার দিকে ; স্তবগানের মত গুঞ্জিত তার রক্তের সােত ; তার সমস্ত প্রাণ সে তুলে ধরছে, সে লুটিয়ে দিচ্ছে একটি সম্পূর্ণ অঞ্জলির মত। বলল, দেবতাকে কে স্পর্শ করবে—এই সুদূর, বিহ্বল, নিভৃত ঘেৰতা। শুধু নিঃশব্দ নির্নিমেষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, শুধু পূজায় ঝরে পড়া। কখনাে রাত্রে মৃণাল ঘরে এসে দেখে টেবু-ল্যাম্পের সঙ্কীর্ণ আলাের চক্রে মিহিরের আনত মাথা, তার মুখের খানিকটা ছায়ায়, সমস্ত আলােটা পড়েছে তার কালাে, কেঁকড়া চুলে। আলাের সেই সঙ্কীর্ণ চক্রে সে আবদ্ধ, সম্পূর্ণ—কোনােখানে আর-কিছু নেই। চারদিকে সে নিঃশব্দতা দিয়ে ঘেরা, নির্জন রাত্রি দিয়ে ঘেরা। সেই রাত্রির সীমানায় অন্য-কোনাে পৃথিবী-সেখানে চিরকালের রহ। আর সেই নিভৃত কৃশ মুখের দিকে তাকিয়ে, মৃণাল ভরে বায় রহস্যে আর আতঙ্কে সে জানে না, নির্জন রাত্রির সীমানায় কী আছে, তা সে জানে না। ভাবতে পারে না। শুধু তার মধ্যে ঐ বিশাল রহস্যের অন্ধকার। অন্ধকারের ভিতরে সে মিলিয়ে যায়, ছায়ার মত। ৩৬
T
সূৰ্য্যমুখী
স্বামীকে যে কখনাে মন দিয়ে জানতে চায় নি। তার মাকে
ল ফেলে রেখেছিলাে রহস্যের অন্ধকারে। সে জানতাে যে মিহির
সখে, কিন্তু যা লেখে তা উল্টিয়ে দেখবার ইচ্ছা তার কখনাে
য়নি। তা যেন বাহুল্য ; দুর থেকে চুপ করে যে তাকিয়ে থালা,
রই ভিতর দিয়ে তাে সে নিজেকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে আর
কছুর দরকার নেই। মিহিরের টেবিলের কাগজপত্র নিয়ে সে
খনাে নাড়াচাড়া করতাে না, দেরাজ খুলত না কখনাে।
কবার সে ভুল করেছিলাে, প্রথম দিকে, না জেনে। সমস্ত
রের শৃঙ্খলা সম্পাদন করে সে গুছিয়ে রেখেছিলাে মিহিরের
খার টেবিল, বইপত্র ইত্যাদি। কিন্তু, সে বুঝতে পারলে, মিহির
1 চায় না। স্পষ্ট করে সে কিছু বলেনি, কিন্তু মৃণাল তার চোখের
[কে তাকিয়েই বুঝতে পেরেছিলাে। সমস্ত বাড়ির মধ্যে এই
কটুখানি জায়গা মিহিরের, নিছক স্বত্বের চাইতে গভীরতময়,
য়িীতরাে কোনাে অর্থে তার। এখানে সে অন্য কাউকে হাত দিতে
বে না। সুতরাং এর পর থেকে সমস্ত ঘর ঝকঝক করবে,
কন্তু মিহিরের টেবিলে সেই চিরন্তন বিশৃঙ্খলা ।
কারণ সেই বিশৃঙ্খলা মিহির ভালােবালতাে। সেটা তার
জের হাতের কাজ, সেটা তাকে দিয়ে ভরা। সে-ই যেন
ছিয়ে আছে এলােমেলাে কাগজ-পত্রে,নানারকম বেকায়দায় ফেলে
খি বইয়ের তূপে। এর ম শে নষ্ট হতে দিতে পারে না।
;
মানের জীবনে কিছু থাকা দরকার, যা একমাত্র আয়, একান্তরূপে
তার। তার নিঃসঙ্গ, গােপন কোনাে সত; এমন একটা জায়গা
যেখানে সমস্ত পৃথিবীর মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়া যায়।
ভালােবাসার জোরেও কেউ সেখানে ঢুকতে পারে না, কেবল
ভালােবাসা যেখানে যথেষ্ট নয়। এমন কি, প্রচলিত অর্থের
ভালােবার দরকারও করে না। সেই নিঃসঙ্গতার দরজা কেবল
তার কাছেই খুলে দেয়া যায়, যার সঙ্গে আর দুয়ের মিল।
যার সঙ্গে এক ছলে আমার রক্তের প্রবাহ। সেকম মানুষ
জীবনে বেশি পাওয়া যায় না, দু'একজন পেলেই নিজেকে
ভাগ্যবান মনে করতে হয়। অত্যন্ত বিরল, মুক্তো-ছিটানাে
কয়েকটি মুহূর্ত বাদ দিয়ে, দরজা বন্ধই থাকেবন্ধ থাকাই
উচিত। মৃণাল সন্ত বাড়ি ভরে নিজেকে ছড়িয়ে দিক, কিন্তু
সেখানে দরজা বন্ধ। যিহির তায় নিঃসঙ্গতা নিয়ে যা করে,
লাল নিতান্ত বাইরে থেকেও তা ছুঁতে পারবে না। সে যে তার :
কাগজপত্র ইত্যাদি গুছিয়ে রাখবে এটুকু আক্রমণ, এটুকু
সংস্পর্শ পর্যন্ত মিহিরের কাছে অসহ।
কোনাে রাত্রে, বন্ধুদের কোনাে কাড়া থেকে ফিরতে শিবিরের
দেরি হতাে। এতে দেখতে মা-র ঘর অন্ধকার, মৃণাল একা
বলে’ আছে চুপচাপ, হয়তাে হাতে কোনাে সেলাই। তাকে
দেখে সে উঠে দাঁড়াতাে, আস্তে-আস্তে যেতে রানাথরের
দিকে। আর যিহিরের গলা পর্যন্ত যেন ঠাৎ আগ ঠেলে
উঠতাে--এই ধৈর্য্যের মূর্তি, এই জন্ম-দাসী, নির্বাক পােৰ-মানা
এই পশুকে দেখে।
‘তুমি এখনাে পাওনি?
মৃণাল চুপ।
তুমি এখনাে খাওনি ?
কেন খাওনি? এতক্ষণ না-খেয়ে তুমি বসে আছে কেন?
কে তােমায় বলে থাকতে বলেছে?
‘কেন? এতে দোষ কী?
‘আছে দোষ। আমার এসব ভালাে লাগে না।
‘আমার ভালো লাগে। মৃণালের কণ্ঠস্বর অত্যন্ত শান্ত,
তাতে এতটুকু প্রতিবাদের সুর নেই : যেটা সত্যি, তা-ই যেন
অত্যন্ত সহজভাবে বলছে। মুহূর্তের জন্য মিহিরের চমক লাগে ।
একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকায়। এ-কথার লে কী জবাব
দেবে? তবু, তার রাগের বাম্পগুলাে উঠছে ঠেলে, তারই বোকে
সে বলে ফেলে।
‘ভালাে লাগা উচিত নয়। এ-রকম তুমি য়তে
পারবে না।
তা হলে কী হবে?
৯
। गूगभूमी কী আবার হবে-ভাত চাপা দিয়ে রাখবেএঘরে। আর তাই তুমি খাবে? সােজা, সরল প্রশ্ন, কিন্তু মিহিরের মনের মধ্যে খোঁচা লাগে। তার মনে হয় মৃণাল যেন তার দুর্বলতার সুযােগ নিচ্ছে, তাকে আটকাতে চাইছে তার নিজেরই দুর্বলতার জালে। ও নারী, নারী! কল্যাণী, মুর্তিমতী করুণা, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমাদের খাওয়ার জন্য, ঘুমের জন্য, আরামের জন্ঠ,সুখের জন্য ভাবনার অন্ত নেই তােমার। কিন্তু সেই ছলনায়, তার সুযােগ নিয়ে তুমি আমাদের আটকাতে চাও; আমাদের দুর্ব করে দিয়ে সেই দুর্বলতাকে করে তােলল তােমার হাতের অস্ত্র। তুমিও আমাদের জড়াতে চাও, আমাদের আত্মাকে জড়াতে চাও। তুমিও রক্ত- শােক—যদিও তা টের পাওয়া যায় না, আর সেটাই সব চেয়ে ভয়ানক। অনেক, অনেক ভালাে মােহিনী, মায়াবিনী ইত্যাদি, বুকের উপর মুখ রেখে যে রক্ত-শােষণ করে--তার মধ্যে, আর যা-ই হােক, কোনাে কপটতা নেই। মায়াবিনীর ক্ষুধিত, লাল অথয় কোনাে মিথ্যে কথা বলে না। আর তুমি শু, তুমি পবিত্র, হে কল্যাণী, অলক্ষিতে, অজ্ঞাতে তুমি আমাদের জড়াও, তােমায় নেহে, তােমার করুণায় ; আমাদের আত্মাকে উপড়ে জানতে চাও তােমার করুণার, কল্যাণের সূক্ষ্ম, নরম হাতে। হে কল্যাণ, নিত্য আছে আপন গৃহকাজে। কিন্তু গৃহকাজ
সূৰ্য্যমুখী
নিয়েই তুমি থাকো, তার বাইরে আর এসাে না; তাের
গৃহকাজের সূক্ষ্ম তন্তু দিয়ে পদে-পদে আমাদের লিপ্ত কোরাে না,
আমাদের বাধিত কোরাে না—দূরে থাকো। তােমার বিশ
পুষ্পভবনে দূরে থাকো। তােমার আম্রশাখে কোকিলের ডাক
আর তােমার শিশুর কলধ্বনি—সব তুমি রাখাে;
কিন্তু আমার
আত্মাকে ছেড়ে দাও, আমার আত্মাকে ছুঁয়াে না।
একটু চুপ করে থেকে মিহির বলে : ‘নাও-রকম তুমি
কোরাে খামকা না-খেয়ে বসে থাকার কোনাে
দরকার নেই।
মৃণাল কিছু বলে না, তার মুখ দেখে মনে হর কথাটা সে মেনে
নিয়েছে। কিন্তু এর পরে যে-রাত্রে মিহিরের ফিরতে দেরি হয়,
মৃণাল তেমনি বসে আছে, চুপ করে, কোলের উপর দু'হাত জড়াে
করা, কি হাতে কোনাে সেলাই । রােজ এক কথা বলতে
মিহিরের ভালাে লাগে না ;
একটি কথা না-বলে’ সে খেয়ে
নেয়।
ক্রমে এমন হলাে যে তার আর রাগ হয় না। লক
করতেই সে ভুলে গেলাে। সে মেনে নিলে—মৃণালের অন্যান্য
কাজ, সমস্ত মৃণালকে সে যেমন মেনে নিয়েছে। মৃণাল সম্বন্ধে
তার মনের এমন আগ্রহও নেই যে বেশি রাগ করা যায়।
না।
8 এমন অনুমান করা যেতে পারে যে এই বিয়ে থেকে যা সুখ পাবার, তা পেয়েছিলেন হৈমন্তী। তিনি যা চেয়েছিলেন তা-ই হ’লল। আর মৃণালের নির্বাচন যে তাঁর কতটা ঠিক হয়েছিলো লে দু’দিনেই তার প্রমাণ দিয়েছে। মৃণালের মধ্যে হৈমন্তী মনের শাস্তি পেলেন। এ-মেয়েকে বিশ্বাস করা যায়, এর উপর নির্ভর করা যায়। তবু, কোথায় যেন একটা অতি সূক্ষ্ম চিড়। বাতালে যেন কী। আজকালকার ছেলেমেয়েদের এই কি প্রণয়ের ধরণ-তিনি অবলেন। দু’জনকে এক সঙ্গে তিনি মাঝে-মাঝে লক্ষ্য করতেন কি কি ধরা পড়তে, কিছু কি বােঝা যেতাে? না, আঙুল দিয়ে দেখানাে যায়, এমন কিছু নয়। শুধু, কোনাে হঠাৎ হাওয়ায়, অস্পষ্ট একটা পা ঝলসে উঠত চোখের সামনে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে হৈমন্তী ভাবতেন, সেই অস্পষ্ট পদাকে টুকরো-টুকরাে করে ছিড়তেন মনে-মনে। আর হঠাৎ একটা যাশ ভরে তার হৃৎপিণ্ড সঙ্কুচিত হয়ে যেতে-বুঝি তিনি ভুল কী ভয়ানক, অন্যের জীবন নিয়ে কোনাে ভুল করা! কেন আমরা অন্যের জীবন নিয়ে ভালাে-মন্দ কিছু করতে যাই ? যে যার জীবন নিয়ে যেমন খুসি করুক-সে-ই তাে সব চেয়ে ভালাে। ৪২
সূর্যমুখী
আর হৈমন্তীর মনে যন্ত্রণার মত একটা কথা মােচড় দিয়ে উঠতাে।
এ তাে ভয়ই জয়ে, তারই গরজে। নিজের আগ্রহে অ হয়ে
কি তিনি••তা-ই বা কেন, বিয়ে তাে সবাইকেই করতে আমার
কখনাে যদি কমেই, তাহলে এখন কেন নয়? তা ছাড়া, মিহির
কি বলতে পারতাে না—যদি ওর বাবার কিছু থাকতাে। মুক্তি
বিয়ে খুঁজে-খুজে তিনি কোনাে দোষ দেখতে পান না। তবু!
একদিন তিনি ছেলের কাছে গিয়ে বললেন : তুই যাঝে-মাঝে
বৌকে নিয়ে একটু বেড়াতে গেলেই পারিস?
উত্তর দেবার আগে মিহির মার চোখের দিকে একটু তাকিয়ে
রইলাে। বিয়ের পর থেকে মা-র সঙ্গে তার কেমন একটা ব্যবধান
গড়ে উঠছিলাে। মৃণাল চাপা দিয়েছে তার মাকে। প্রতিদিনের
নানা ছােটখাটো প্রয়ােজনের ভিতর দিয়ে তাকে আর পাওয়া
যায় না। দিনের বেলায় মা তার বাবার কাছে এনে ৰসেন;
সমস্ত দিনের মধ্যে সেই সময়টুকুতেই তার সঙ্গে তার যা কথাবার্তা।
তাও সে-রকম নয়, আগেকার দিনে যেমন হতাে। কোথায় যেন
বাধা। মৃণালের উপস্থিতি মাঝখানে।
বেশ, তা-ই হােক তবে। এ অবস্থা তােত মার নিজেরই হাতের
তৈরি। তিনিই এটা চেয়েছিলেন, তিনি এতে খুলি। এখন
আর কিছু বলবার নেই। নিজেকে সে আন্তে-আস্তে সরিয়ে
আনলে মার কাছ থেকে। তার মনের মধ্যে একটা বােব
সূৰ্যমুখী
আকেন সে তার মার মুখের কথা ভাবতে
গিয়েছিলাে? সুখ দিয়ে কী হয়? মা-কে সে খাটাতে-খাটাতে
মেয়ে ফেলতে পারলে না কেন?
তার মনে হলাে, যেন কতদিন পর আজ মা-কে ভালাে করে
দেখলল। আর হঠাৎ একটা বিদ্বেষের ধাক্কায় পাংশু হয়ে গেলে
তার মুখ। তাই! তার মা এখন এসেছেন তাকে দিয়ে মৃণালকে
ভালােবাসাতে। এতেও তার তৃপ্তি হয়নি। তার আত্মার উপর
তাঁর অপ্রতিরােধ্য অধিকার—এবং তিনি তা জানেন। সেই
অধিকার তিনি খাটাবেন তার মরজি-মত। তাকে তিনি
বাঁকাবেনই তাঁর অন্ধ ইচ্ছার চাপ দিয়ে দিয়ে। তার উপর তার
মা-র ইচ্ছার নিষ্ঠুর পাষা-নিষ্পেষণ--তা ছাড়া তার বিয়ে আর কী ?
অন্যায়, সব চেয়ে বেশি অন্যায় এই কারণে যে আঘাতটা
পড়েছিলাে তার হৃদয়বৃত্তিতে, যেখানে সে সব চেয়ে দুর্বল।
নিছক প্রবঞ্চনা—কিন্তু স্ত্রীলােক সব পারে। সম্পূর্ণ জেনে-শুনে
একটা বাদা-নাচ সে নেচেছে। তাতেও হবে না—আরাে একটা
বদরামাে তাকে করতে হবে। ভালােবাসতে হবে তার স্ত্রীকে।
সত্যি?
একটু চুপ করে থেকে সে বললে, 'কেন, ওর শরীর খারাপ
হচ্ছে নাকি?
শরীর খারাপ না-হলে বুঝি মানুষের বেড়াতে যেয়ােতে নেই?
৪
।
সূৰ্যমুখী
দিনের পর দিন বাড়ির মধ্যে বন্ধ হয়ে কাটাতে ভালাে লাগে
কারাে?
‘বন্ধ কেন বলছাে? এমন স্বাধীনতা আর কোথায়? তা
ছাড়া, ভালােও ওর লাগে। অন্য কোথাও গেলেই ভালাে লাগবে
।
“কী করে জানলি?
জানি । যার যা ভালাে লাগে তাকে তা করতে দেয়াই
হচ্ছে মনুষ্যধৰ্ম্ম। তুমি কেন জোর খাটাতে যাবে ?
হৈমন্তী ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন মুহূর্তকাল।
তাঁর দৃষ্টি জিজ্ঞাসায় সঙ্কুচিত। মিহিরের কথার সুর তার ভালাে
লাগলাে না। অনেক কথা একসঙ্গে তাঁর মনে হলাে; কিন্তু
তিনি চট করে কিছু বললেন না, পাছে ভুল কথা বলে ফেলেন।
অন্ধকার তিনি যেন হাতড়ে ফিরছেন, যেখােবার পথ খুঁজে খুজে।
মিহিরই আবার বললে : তা ছাড়া এতে এমন-কিছু এসেও
যায় না। তুমিও তাে বাড়ি বসেই দিন কাটাও।
‘আমার সঙ্গে ওর কী কথা?
নয়ই বা কেন? তুমি যা পারে, ও কি তা পারবে না।
-পারতে দেখিনে তাে।” বলেই, পাছে তার ভিতরের কোন
বিক্ষোভ, কোনাে বিদ্বেষ কথার সুরে বেরিয়ে পড়ে, সেই ভয়ে।
‘অবিশ্যি তুমি যদি বলে মুচকি হেসে হালকা সুৱে সে বলে
০৫
পূৰ্য্যমুখী
উঠলাে, ওকে নিয়েও যেতে পারি বেড়াতে। যেখানে খুলি।
যদি ভাগ্যক্রমে এমন হয় যে ও ভিক্টরিয়া মেমরিয়ল দেখেনি,
তা হলে আর কোনাে ভাবনা থাকে না। কেবল সব চাইতে
জমজমাট শাড়ি পরবার অপেক্ষা।
মিহির মৃদুস্বরে হেসে উঠলাে। সেই হাসির ভিতর দিয়ে
সে তার বিষকে ঢেলে দিচ্ছে রূপান্তরিত করে। অকপটকম
হালকা গােছের কথা—তার বিরুদ্ধে কী বলা যেতে পারে ?
হৈমন্তী যেন কোণঠাসা হয়ে পড়লেন। যদি হতাে প্রকাশ্য
বিরােধিতা তা হলে আলাদা কথা ছিলাে : তা হলে ইচ্ছার
সেই যুদ্ধে, আর যা-ই হােক, ছেলের মনের সমস্ত জড়ানাে
তােগুলাে খুলে খুলে যেতো, হয়তাে চলে আসতে তাঁর
হাতের মুঠিতে, তারপর তিনি সেগুলােকে যেমন-খুসি নল্লায়
ফেলতে পারতেন। কোনােভাবে, তাঁর অস্পষ্ট শ্রী-আত্মার
কোনোখানে তিনি জানতেন, ছেলের উপর তার ভয়ঙ্কর অধিকার।
একবার ভিতরে ঢুকতে পারলেই হয় কোনােরকম করে। কিন্তু
মিহির তুলে দিলে হাসির বেড়া, তাকে ফিরে আসতে হলাে।
সব চেয়ে বা খারাপ লাগে তা এই যে হাসির উপরে কোনাে
কলা চলে না। তা নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে হাস্যাস্পদ হতে
হয় নিজেরই কাছে। নিজেকে তার বিপৰ্য্যন্ত, ব্যর্থ মনে হলাে।
থেকে-থেকে তিনি আলেন ছেলের কাছে, মৃণালের প্রল
সূৰ্য্যমুখী
নিয়ে : নতুন রকমের যে গুজরাতি সাড়ি বেরিয়েছে, মৃণালের
জন্য তার একখানা কিনলে কেমন হয় ; বিয়েতে পাওয়া ছাইভ
দিশি প্রসাধনের জিনিস কি ব্যবহার করা ভালাে ; শােবার ঘরে
পরবার জন্য ওর মখমলের এক জোড়া চটি হলে বেশ হয় ;
ওর আঙুলে নীলা-বসান আংটি মানাবে বেশ। এমনি অনেক
গায়ে-পড়া, জোর-কয়ে-পড়া কথা। মিহির ধৈর্য্য ধরে শুনতে,
ক্ষীণ হাসি তার ঠোটে। রাখতে তার মায়ের কথা কিনে
আনতে সাড়ি আর এসেন্স, আর আংটি। অথচ, যে-কোনােরকম
বাজার করতে চিরকাল তার বিশ্রী লেগেছে। তার গায়ের জামা
হৈমন্তী বাড়িতে দরজি ডাকিয়ে পুরােনাে জামার মাপে তৈরি
করাতেন—সে টেরও পেতাে না। হৈমন্তী ঝড়ের জন্য প্রস্তুত
ছিলেন; হতাশ হলেন এমন প্রশান্ত বাধ্যতা দেখে। তিনি
কেবলই চেষ্টা
করতে লাগলেন ছেলের মনের মধ্যে উঁকি দিতে,
তার কাছে আসতে, তাকে মুঠোর মধ্যে পেতে। বিশেষ
সফল হলেন না, যদিও।
আর তিনি কেবলই খোঁচা দিতে লাগলেন—যদি একদিন
সে সত্যি চটে ওঠে, রাগের ঝোঁকে নিজেকে ধরা দিয়ে ফেলে।
তিনি ঠিক সেই সব প্রস্তাব নিয়েই ছেলের কাছে যেতোমার
সম্বন্ধে, তিনি জানেন, তার অনতিক্রম্য বিতৃষ্ণা। যেমন এক
বিকেলে তিনি হয়তাে বললেন :
;
৪৭
সূৰ্যমুখী
*
‘এই, বঙ্কিমবাবুর কী-একটা বই ফিলমে দেখাচ্ছে, ভালাে
দয়েছে নাকি খুব। মৃণাল দেখে আসুক না আজ।
‘নিশ্চয়ই। তুমিও যাও।
‘তা-ই ভাবছি। নিয়ে যাবে কে ?
নিয়ে আবার যাবে কে ? এখান থেকে এখানে যেতে পারবে
না? আমি না-হয় টিকিট এনে দিচ্ছি।
‘তুইও তাে যেতে পারি।
অসম্ভব।
‘অসম্ভব কেন? চল না। মৃণালকে কাপড় পরতে বলি।
‘তা কাপড় তাে পরতেই হবে।
“তুইও তৈরি হয়ে নে।
‘আমি যাবাে না। তুমি তো জানােই সিনেমা দেখতে আমি
ভালােবাসি নে।”
একদিন না-হয় গেলিই।
‘মরে গেলেও আমি বাঙলা ছবি দেখবে না।
‘তা হলে আর আমাদেরও যাওয়া হয় না।
না, থাক।
থাকবে কেন? যাও না তােমরা।
হৈমন্তীর প্রত্যেকটি কথায় হিসেবকয়া কু-পীড়ন। মিহিরের
.
সূৰ্য্যমুখী
দাঁতে দাঁত লেগে আছে, তবু তাকে শান্ত হয়ে থাকতে হবে।
ধৈর্য্যের পরীক্ষা, বলা যায়। দু’জনের প্রতিরােধশক্তির প্রম
যুদ্ধ। কিন্তু মিহিরও হার মানবে না। এমন সে হতে দেবে
না যে তার মা ফাকি দিয়ে তার উপর বাজি জিতে যাবেন। শেষ
পর্যন্ত সে ধরে থাকবে, নিজেকে টেনে রাখবে নিখুত মাত্রার
মধ্যে : শেষ পর্যন্ত জিৎ হবে তারই।
তাই সে একটু পরে বললে : আমার জন্যই তােমাদের যাওয়া
আটকে থাকবে কেন? চলল, আমিও না-হয় যাচ্ছি।
হৈমন্তী তখন উল্টোদিক দিয়ে আক্রমণ করলেন : “থাক,
ইচ্ছে না-থাকলে গিয়ে কাজ নেই।
একদিন না-হয় দেখলুমই একটা বাঙলা ছবি।
দয়া করে তােমায় যেতে হবে না।
স্বাভাবিক অবস্থায় হলে কথাবার্তা এতদূর এগােত না ;
মিহির অনেক আগেই মা-কে চুপ করিয়ে দিতে। আর এখন,
তার ইচ্ছে করছিলাে চীৎকার করে উঠতে, কিন্তু সে মৃদুস্বরে
শুধু বললে :
‘নিজের উপর দয়া করেই যেতে চাইনি।
হৈমন্তী আস্তে-আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন—ব্যর্থতার
ছবি। ছেলের বিরুদ্ধে তার মনের এই অস্পষ্ট, ব্যর্থ আক্রোশকে
তিনি কী করে সহ করবেন, কী করে গােপন করবেন? আর
৪৯
সূর্যমুখী
খানিক পরে, মিহির যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে,
হঠাৎ মৃণাল এসে বললে:
‘তুমি কি বেরুচ্ছে?
ভাবছিলুম একটু সিনেমায় যাবােতােমরা যদি যাও।
তা হলে না গেলে। আমরা কেউ যাচ্ছিনে।
যাচ্ছে না?
আজ তাে নয়।
আচ্ছা তা হলে’, মিহির আয়নার কাছ থেকে সরে এলাে।
‘যেদিন যাবে আমাকে বােলাে।
সন্ধেবেলায়, হৈমন্তীর ঘরের জানলার ফাকে ধুপকাঠি জ্বেলে
দিয়ে মৃণাল তাঁর কাছে এসে দাড়ালাে। বললে, মা, ওর যা
ভালাে লাগে না, কেন তুমি ওকে তা করতে বলে ?
‘ভালল না-লাগলে চলবে কেন ? ভালাে লাগাতে হবে।
‘আমার তাে কিছুরই দরকার নেই।
‘কেবল দরকার বলেই বুঝি ? পুরুষমানুষকে খামকা
মাঝে-মাঝে খাটিয়ে না নিলে ওদের মাথা ঠিক থাকবে কেন?
‘কিন্তু ওসব ঝটও তত ভালােবাসে না
‘ভালােবাসে না! ও কী ভালােবালে শুনি? যে-কাজ
ভালােবাসি, তা তাে নিজের গরজেই করতে পারি। সেটা আর
বেশি কথা কী? যা ভালােবাসি নে, তা কেবল তার জন্যেই
সূৰ্য্যমুখী
করতে পারি, যাকে ভালােবাসি। পুরুষমানুষ বৌয়ের জন্য এই
যাট সইবে না? তা কি হয়? না, হলেই ভালাে দেখার।
মৃণাল আর-কিছু বললে না, মুখ ফিরিয়ে নিলে। তার গলার
নীরব, নরম একটু রেখা হৈমন্তীর চোখে পড়লাে, আর হঠাৎ তাঁর
মনের মধ্যে একটা সন্দেহ, একটা আশঙ্কা, ভয়—বুঝি তিনি ভুল
করেছেন, বুঝি তিনি ভুল করেছেন। ভয়ে তার রক্ত যেন
শুকিয়ে গেলাে। আর সেই ভয় তাকে হানা দিতে লাগলাে, তার
বিশ্রামে, তাঁর আরামে, তার ঘুমে। তাঁর সমস্ত চিন্তায়, তাঁর
শান্তিতে, তাঁর নির্জনতায়। তিনি লক্ষ্য করলেন, তিনি লক্ষ্য
করা ছেড়ে দিলেন। তিনি মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন,
তিনি চোখ সরিয়ে নিলেন। তিনি ছােটখাটো কথা থেকে
গভীর ইঙ্গিত বার করবার চেষ্টা করলেন, চেষ্টা করলেন নীরবতায়
অন্তলীন সুরকে ধরতে। কিন্তু কিছুতেই কোনাে মীমাংসায়
পৌছতে পারলেন না।
ন * এমনি করে’ কাটলাে বাঙলাদেশের এলােমলো উতরােলউতি বর্ষা, বিরতিহীন,তৃপ্তিহীন; খেয়ালে ভরা, চঞ্চলতায় ভরা; বৃষ্টি ঝরিয়ে-দেয়া, রােদ ছড়িয়ে-দেয়া; আকাশ নীলের আর ধুসরের জোড়াতালি; আর্ত অন্ধকার আর কঠিন, শ্বেত দীপ্তির টানাপােড়েন; চাপা কান্নার মত রাত; রাত্রির মত রুদ্ধশ্বাস, মেঘের দুপুর; অজ, প্রগল্ভ, অশান্ত ; হঠাৎ লুটিয়ে- পড়া, সন্ধ্যার দিগন্তে রঙে-রঙে জ্বলে’-ওঠা; রাত্রির পথে-পথে নিঃসঙ্গ কুকুরের মত কঁকিয়ে-ওঠা হাওয়া ; মােহময়, বিরহময়, ক্লান্তিকর, অসহনীয়--আমাদের বাঙলাদেশের বর্ষা। আর সেবার তা আশ্বিনে ভেঙে পড়লাে, ঢেউ খেলিয়ে গেলে আশ্বিন ভরে, নষ্ট করে দিলে বাঙলার বিখ্যাত আশ্বিনকে। তা হাঁপিয়ে পড়লাে, খাবি খেতে লাগলাে, ফুরিয়ে এলাে, ফিকে হয়ে এলাে, তবু সে ছাড়বে না; তবু পূর্ণিমার জন্য ভরে’-ভরে’-ওঠা পুজোর চাদের মুখ সে শিঙ-তােলা মেঘের গুতােয় ভেঙে-ভেঙে দিতে লাগলাে। পুজোর দিনগুলো ভরে ছােট-ঘােট পশলা, রাত্রে জ্যোছনার বন্যা থেকে-থেকে কালাে হয়ে আসে, যেন একটা ঘােমটা পড়ে সৃষ্টির মুখের উপর : আর পূর্ণিমার পরে কৃষ্ণপক্ষ যখন এলাে, হঠাৎ আবার শ্রাবণ এলাে ঘনিয়ে-মনে হলাে এ-বৃষ্টি আয় কখনাে থামবে না।
সূর্যমুখী মাঝরাতে হঠাৎ নামলাে বৃষ্টি। তুমুল স্রোতে তা নেমে এলো, কেউ যেন কোনাে জিনিস ছুড়ে ফেললে স্বর্গ থেকে, যেন আকাশের একটা টুকরাে চৌচির হয়ে ফেটে গেলাে। রাত্রির সহরে যত অদ্ভুত মিশ্রিত শব্দ, জন্তুর আর যানের, কণ্ঠের আর ধাতু, সব যেন মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেলাে; রইলাে শুধু বৃষ্টির শব্দ, মসৃণ নিবিড় একটানা বৃষ্টি, রাত্রি ভরে’, আকাশ ভরে ; সমন্ত বিশ্ব, সমস্ত সময় ভরে। বৃষ্টির ছাট এসে লাগলাে মিহিরের আনত মুখে, অপরিসীম। সূক্ষ্ম কোনাে আঙুলের আদরের মত। যেখানে সে বলে’ ইলে টেবিলের উপর কনুয়ের ভর রেখে, সেখান থেকে হাত বাড়িয়ে সে সার্টি বন্ধ করে দিলে। কেউ যেন বৃষ্টির মুখ চেপে ধরলে। কিন্তু তা ছটফট করছে, কান্নাচ্ছে, গােঙাচ্ছে, কৌশলে কোণঠাসা কোন বন্য জন্তুর মত। তা পােষ মানবে না কিছুতেই। মিছিয়ের জানলার বাইরে তা মাথা কুটে মরছে। সমস্ত আকাশ কাঁপছে তার বিলাপে। নরম, নিরবচ্ছিন্ন এক শব্দ, কোণঠাসা জন্তুর প্রান্তিহীন দীর্ঘশ্বাসের মত, চেতনার খােলসকে যা দীর্ণ করে’ যায়, মস্তিষ্ককে যা আচ্ছন্ন করে অনির্ণেয়,অজ্ঞাত-উৎস কোনাে সুগন্ধের মত। জ বিষন্নতায় ভরা, নিঃসঙ্গতায় ভরা। মানুষকে তা নিয়ে যায় প্রতি অতীত সেই অন্ধকারে, যখন আমি অরণ্যের গুহায় বলে বিশাল পল্লবের ফাক দিয়ে মানুষ আকাশের তারা লক্ষ্য করেছে—আর রাত্রি ভরে গেছে গত বিশ্বের মধ্যে তার নিতার চেতনায়।
বিবি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। তার মন বলবে না
কিছুতে। হঠাৎ তার মনে সেই আদিম নিঃসঙ্গতা-বােধ। বৃষ্টি
স্পর্শ করেছে তার আত্মাকে, বৃষ্টি প্রবেশ করেছে তার আত্মার
বুয়ে। এই রাত্রির মত বিশাল অস্পষ্ট অন্ধকার বিষাদে সে আচ্ছন্ন।
কী যেন নেই, কী যেন নেই। কোনাে সময়ে, কোনাে রাত্রির
অৱশ্যে কে তারার দিকে তাকিয়েছিলাে—আজ তার মন ভরে
উঠেছে সেই তারাবিরহে। ঘরের চারদিকে সে তাকালাে।
আবাে-অন্ধকারে রেখামিত তার শয্যা, দেয়ালের উপর আড়-হ'য়ে-
পড়া ছায়ায় পরা—আর তার মনে যেন ভীষণ আদিম অরণ্য
যজিত হয়ে উঠলাে। সে যা অনুভব করলে তা অনেকটা
আজয়ের মত-নিঃসঙ্গ জন্তুর আতঙ্ক। তার যেন ভয় করতে
লাগলাে—মাত্রির এই অপহৃত, দীর্ঘনিঃশ্বসিত জগতকে ভয়।
ঠেফুল-ল্যাম্পের চাবিটা সে ঘুরিয়ে দিলে। ঘরের অন্ধকার ভরে
বৃষ্টির শব্দ, যেন এক প্রেত-পর কেবলই কী কইতে চাইছে=কইতে
পারছে না। কোনােখানে এক ফোঁটা আলো নেই। চোখে না-
দেখেও সে বুঝতে পারলে বাইরের ঠাসা কালাে আকাশ-জান্ত
একটা পাথরের মত। সে ভাবতে পারলে না রাস্তায় একটা
আলাে আছে, কোন বাড়ির কোনাে জানলায় একটু আলাের
যেখা। সমস্ত ডুবে গেছে, সাত হারিয়ে গেছে, শুধু এই অবিশ্রান্ত
নিয়ৰৰ শল। অন্ধকারের মধ্যে সুড়সুড় করে সে বিছানায় গিয়ে
।
সূৰ্য্যমুখী
শুলাে, গুহার মধ্যে কোনাে ক্লান্ত জর মত। বালিশের মধ্যে
মাথা ডুবিয়ে দিয়ে সে চোখ বুজলে। আর ঐ তোে-বৃষ্টি বাজছে
তার রক্তে দপদপ করে’, ধ্বনিত হচ্ছে তার হৃৎপিণ্ডে। বৃষ্টি, বৃষ্টি।
চিরন্তন অন্ধকারে চিরন্তন বৃষ্টি। সৃষ্টির শেষ দিনের মত, এলমের
মত। আর তার ভয় করছে, একা থাকতে চায় ভয় করছে।
একা থাকার মানে কী, এর আগে সে যেন কখনাে জানেনি।
যা-কিছু একদিন তাকে আশ্রয় দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে, বিশ্বাস
দিয়েছে—সব এই রাত্রির চাপে চূর্ণিত। তার নগ্ন নিঃসঙ্গ, মনােহীন
এই সত্তা—সে কাধনন নিজেকে এ-রকম করে ভাবতে পারেনি।
তার চামড়ার নিচে, তার মাংসের অভ্যন্তরে তা লুকিয়ে ছিলাে
এতদিন—এতদিন ধরে। দিন আর রাত্রির ক্ষেেত তার উপর
দিয়ে ভেসে গেছে, একে দিয়ে গেছে ছবি, ভাবনার গঙে আর
রেখায়—এতকাল, সেই ছবিটাই ছিলাে। হঠাৎ রাত্রির কোপের
আড়াল থেকে কী লাফিয়ে পড়লে তার উপর, কী নেমে এলাে তার
উপর—কিছু যেন ছিড়ে গেলাে,টুকরাে হয়ে গেলাে—আর এই তাে
সে জড়ােসড়াে হয়ে শুয়ে আছে ভীত পশুর মত, অন্তহীন
রাত্রি গড়িয়ে যাচ্ছে তার উপর দিয়ে।
মিহির বেশিক্ষণ চোখ বুজে থাকতে পারলে না। চোখ বুজে
থাকবার এই চেষ্টা, তা-ও যেন সহ হয় না। সে তাকিয়ে রইলাে
অন্ধকারের মধ্যে ; শুনতে লাগলাে বৃষ্টির অন্তহীন শব্দ। আশা
সূৰ্য্যমুখী কিছু নেই, সমস্ত পৃথিবীতে এছাড়া আর কিছু নেই। এখানে সময়ের সীমা। এর মধ্যে একা থাকা—এই রাত্রিতে, এই অন্ধকারে! যেন একটা ঠাণ্ডা তার মেরুদণ্ড বেয়ে বেয়ে উঠছে। সে কেঁপে উঠলাে। এই রাত্রি চেপে বসেছে সময়ের বুকের উপর সর্বব্যাপী দৈত্যের মত ; সময় থেকে সে স্বলিত হয়ে পড়ছে। এ-সময়ে কোনাে আশ্রয়, কোনাে সংস্পর্শ দিয়ে সে জানতে পারবে সে আছে। ঠাণ্ডায় তার শরীর যেন জল হয়ে আসছে ; তার কান, তার মন, তার সমস্ত সত্তা যেন বৃষ্টিময়। এই ঠাণ্ডা সে আর সইতে পারে না, এই ভয়। আর, '৫জন্তু উত্তাপ চায়, তার মত সে এগিয়ে গেলো সামনের দিয়ে, ওড়িমুড়ি হয়ে। সেই ঠাণ্ডা বিশাল শষ্যা নিয়তির প্রসারের মত তার শরীরের নিচে। সে তা পার হয়ে এলাে, সে হাত বাড়িয়ে দিলে অন্ধকারে। আর হঠাৎ এই সীমাহীন রাত্রির মধ্যে এ কী, এই উত্তাপের দ্বীপ! মিহিরের সমস্ত শরীর রােমাঞ্চে উন্মাদ হয়ে উঠলাে। মৃণাল কি ঘুমিয়ে ছিলাে? মৃণাল কি অপেক্ষা করে ছিলাে? কিন্তু সে-ও অন্ধকারের মধ্যে চোখ খুললাে; অন্ধকারের মধ্যে দু’জনের অন্ধ চোখ। আর মিহির মিশে গেলাে, মিলিয়ে গেলাে, মগ্ন হয়ে গেলে মৃণালের মধ্যে। নিজেকে সে ভরে তুললাে মূলকে দিয়ে। মৃণাল অমৃত, প্রগাঢ় শ্রোতে তার মধ্যে সঞ্চারিত, বালের উত্তাপ তার গােপন সূৰ্য্য, গােলাপের মধ্যে নিহিত সূৰ্য্যমুখী অন্ধকার, উজ্জ্বল সূৰ্য্য। আর সেই উষ্ণতা মিহিরের জঠরের মায়ুৰেত্রে, তার রক্তের মধ্যে কোনাে জলন্ত বিষের মত। প্রতিটি অঙ্গুলিপ্রান্তে সে বিষয়। অন্ধকার ভরে’ বিদ্যুৎস্রোতে, এক সম্পূর্ণ বিদ্যুত্বত্তে তাদের রক্ত প্রবাহিত। নিহির শশাষণ করে নিলে মৃণালকে, তাকে নিঃশেষে নিঙড়ে নিলে নিজের মধ্যে, যতক্ষণ না অন্ধকার সূৰ্য্য ঝরে ঝরে পড়লে পাপড়ির পর পাপড়িতে, রাত্রিকে জাগিয়ে তুলে; যতক্ষণ না সমস্ত রাত্রি মৰ্ম্মে-মৰ্ম্মে, তন্তুতে- তন্তুতে ঝঙ্কত হয়ে উঠলাে। আর পর দিন সকালে আকাশ রােদে-ঝলােমলে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মিহির দেখতে পেলাে সেই আশ্চৰ্য্য আকাশ। আর হঠাৎ কোথা থেকে একটা তিক্ততার ঢেউ তার গলা পর্যন্ত ঠেলে উঠলো। না, এ সে চায়নি, এর জন্য তার রাত্রি প্রস্তুত ছিলাে না। এ ফাকি, ফাকি। মৃণাল তাকে ফাকি দিয়েছে, নিজেকে সে কঁকি দিয়েছে। ঘৃণায় নিষ্ঠুর হয়ে উঠলাে তার মন। মৃণাল তাকে নিয়েছে কোন কৌশলে, কোনাে শঠতায়। সে কী বােকা—নিজেকে এমনি দীর্ণ করতে গেলােস্টটুকছে করতে গেলাে--তা শারীরিক অঙ্গচ্ছেদেরই মত; নিজেকে তার মনে হলাে বিকল, বিপৰ্যন্ত, অবমানিত। নিজেকে সে টুকরাে করে কেটেছে, যাতে একজন স্ত্রীলােক মনে-মনে বলতে পারে ‘সে আমার। তুমি আমার। তুমি আমার সব চেয়ে
ঋণিত কথা, কলুষিত, কলুর ; যা শুনলে প্রবল বিতৃষ্ণায় শরীর
শিশির ঝয়ে ওঠে। কী করে সে একজন লােকের হাতের
খেলায় ধরা পড়ে গেলাে! রাত্রির কিছুই তার ভালাে করে মনে
পড়ছিলাে না;
কিন্তু তার বিতৃষ্ণার নেশায় সে পরম অপরাধী
করে তুললাে মৃণালকে। তাকে ঘৃণা করে—যা একদিন সে
খনন করেনি-লে প্রতিশােধ নিলে নিজের আত্ম-বিভেদের,
নিজের পরাজয়ের। কেননা এতে কোনাে দীপ্তি নেই, কোন
ঐশৰ্য নেই। এর কোনাে মানে হয় না। এতে কেবলই ক্ষয়,
কেবলই বিকৃতি, নিজেকে দুটুকরাে করে ছিড়ে ফেলা। এর
কোনাে মানে হয় না। মিহিরের মনে হতে লাগলাে তার
আর একটা অংশ সে হারিয়ে ফেলেছে-বিকিয়ে দিয়েছে,
বলের কাছে।
সারাদিন সে মৃণালের মুখের দিকে তাকাতে পারলাে না।
সে ঘণা করলাে তার শান্ত, সমস্ত বাড়ি ভরে তার নিঃশব্দ
নৈপুণ্য। তার মধ্যে সে আজ একটা নতুন আত্মস্থতা দেখতে
পেলে : তার এই নীরব নিখুত নৈপুণ্য ; প্রশ্নহীন, নিঃসঙ্কোচ
বাধ্যতা—তা-ই যেন মিহিরকে সব চেয়ে বড় অপমান। সে বহন
করছে একটা গােপন, তার নিষ্ঠুর, অনস্বীকাৰ্য্য স্ত্রী। সেই ,
তার চরম শক্তি, রাত্রি যার উৎস। সারাদিন ভরে নিজেকে অপত
কয়ে রাখলেও তার কিছু এসে যায় না। রাত্রি আছে তার।
সূৰ্য্যমুখী
মিহিরের আত্মার একটা অংশ সে দখল করে নিয়েছে—আর
এদিকে দ্যাখাে, পােয্য বিড়ালের মত সে শান্ত, দ্যাখাে তার অদ্ভুত
নিখুত নৈপুণ্য!
তবু সেই রাত্রে মিহির তার প্রতিহিংসা নিলে। মৃণালকে
•অপমান করে, তার শরীরের ভিতর দিয়ে তার আত্মাকে অপমান
করে। ঘৃণার উল্লাসে সে তাকে স্পর্শ করলে। তাকে মুহমান
করে দিলে তার ঘৃণার উত্তাপে । সে উজাড় করে দিলে তার
জীবন্ত, জ্বলন্ত ঘৃণা--মৃণালকে তা পেঁচিয়ে ধরলাে চারদিক থেকে
কোনাে বিষাক্ত, সীল আগুনের মত। সে তাকে অপমান করলে,
ছারখার করে দিলে। নিজের স্বভাবের উপর এই ভয়াবহ
অত্যাচারে সে প্রায় মরে গেলাে : তবু, নিজেকেও সে দয়া করলে
না।
আর পরের দিন বিতৃষ্ণা, নিজের উপর প্রচণ্ড ঘৃণা। আর
যেহেতু সে-ঘণার কারণ মৃণাল, তার উপর তীব্রতটে ঘূণা। তার
ফলে আবার প্রতিহিংসা। এমনি করে চললল—বিষাক্ত,
অন্তহীন চকে। একটা ঘুণমান চাকা হঠাৎ তাকে ধরে ফেলেছে
কেবলই ঘুরে চলেছে, তাকে চূর্ণ করে’, নিষ্পেষিত করে। সুর,
অজ্ঞাত দেবতার কাছে মিহির প্রার্থনা করলে মুক্তির জন্য। কিন্তু
প্রার্থনার স্বর রাত্রির বুকের উপর মরে গেলাে। তার নিজের
মাংসই যে অবাধ্য, বিদ্রোহী। তার নিজের রক্ত ফেনিল হয়ে
সূৰ্যমুখী উঠলে তার বিরুদ্ধে। এই আত্মদ্রোহে ছিন্ন, দ্বিখণ্ডিত, সে মুখ থুবড়ে পড়লাে হতাশার চোরাবালিতে, স্পন্দমান, অসহায়, শক্তিহীন। নিজেকে সে ঘৃণা করতে লাগলাে-ওঃ, নিজের প্রতি ঘৃণায় সে পাগল হয়ে গেলাে। আর সেই ঘৃণার বিশুদ্ধতম নির্যাস তাকে ঢেলে দিতে হবে মৃণালের উপর—বিষের মত, সূক্ষ্ম মৃত্যুর মত-তা না হলে সে বাঁচবে না। ।
- যুদ্ধ চললাে। কিন্তু একপক্ষের যুদ্ধ ; একপক্ষের আক্রমণ ও পরাজয়। অন্য পক্ষ—তার কথা কিছু বলবার নেই। মৃণাল কি জানতে তার স্বামীর মন? সে কি বুঝতে মিহির তাকে অপমান করছে ?. অপমানে, প্রতিহিংসায় তাকে ছারখার করে দিচ্ছে? এটা কি সে ভাবতে পারতাে যে বিভিন্ন—এমন কি সম্পূর্ণ বিরােধী ভাব বাইরে ফলে ওঠে একই রূপ নিয়ে। নিবিড় শরীরকে ভেদ করে সে কি কখনাে ভিতরে উকি দিতে পারতাে ? কেমন করে পারবে ? তার শুধু শরীর ছিলাে, সে এসেছিলাে শুধু তার শরীর নিয়ে। তার শরীরের সংস্পর্শ আর অনুভূতি তা-ই তার কাছে চরম। তার জগতে এর বাইরে কোনাে অভিজ্ঞতা নেই। কেবল শারীরিক প্রতিক্রিয়া দিয়েই সে একটা জিনিস বুঝতে পারে। শরীর যেখানে জ্বলে ওঠে, ঝঙ্কত হয়ে ওঠে, সেখানে সে আর-কোনাে প্রশ্ন করে না। শরীর দিয়ে সে যেটুকু পায়, যা-কিছু পায়, তা-ই তার কাছে ঐশ্বৰ্য্য, সব তার কাছে একমুল্য। শরীরের সীমায় সে আবদ্ধ, শরীর ছাড়িয়ে সে দেখতে পারে না। না, মৃণাল কিছু দেখতে পেলে না। শুধু, তার অর্ধ-চেতন পশু-সত্তায় সে সুখে আপ্লুত হয়ে গেলাে। ঢেউয়ের মত সে ভেঙে পড়লাে, ঢেউয়ের মত সে লুটিয়ে পড়লাে। ফুটে উঠলাে তার সূৰ্য্যমুখী অন্ধকার সূয্য, রক্তের স্রোতে ছড়িয়ে পড়লে সূর্যের ঐশ্বৰ্য্য। সে নতুন হয়ে উঠলাে; অন্ধকারের দীপ্তিতে সে উদ্ভাসিত, রূপান্তরিত। সে সুখে ভরে উঠলােতার অর্ধচেতন পশু-মুখে। নিজের ভিতরে তার এক আশ্চৰ্য্য উন্মীলন-সৌন্দর্য্যে, উত্তাপে, আনন্দে। যীলােক এত সুন্দর হয়ে ওঠে কেবল এক কারণে কী তার নাম দেবব? ভালােবাসা? কিন্তু মিহিরের ভালােবাসা তাে নয়। তবু তা-ই তাকে বলতে হয়। কেননা কথা একটাই আছে, যদিও তাৰ অনেক। ভালােবাসা বলতে এক-একজন এক-একরকম বােঝে : কিন্তু প্রত্যেকেই ব্যবহার করে সেই এক কথা। পৃথিবীতে সৈন্তের ভালােবাসা আছে, আর ধনী বণিকের, - ক্লান্ত নাগরিকের আর কল্পনাবিলাসীর, ভীরু কুমারী, অভিজাত গণিকার, কবির, তরুণ ছাত্রের-সহজেই এ-তালিকা দীর্ঘ করা যায়। প্রত্যেকেই ভালােবাসে, ভালােবাসা চায় :.কিন্তু অভিজ্ঞতার সময় হিসেবে একটা আর-একটার অনেক দূরে; যত দূরে শেলির কবিতা পড়া আর জুয়া খেলায় জেতা; যত দূরে অজানা, বিশাল সমুদ্রে নৌকো নিয়ে ভেসে পড়া আর মধ্যাহ্ন ভােজনের পর ঘরের দরজা-জানলা বন্ধ করে মাসিকপত্রের পাতা ওল্টাতে-ওটাতে ঘুমিয়ে পড়া। বিভিন্ন বিপরীত, পরস্পরবিরােধী নানা জিনিসের জন্য আমাদের একই নাম। সেইজন্য এত কষ্ট দর কথা আর-একজনকে বােঝাতে। গলােবা গায়ে
সূর্যমুখী
আমাদের প্রত্যেকের মনেই একটা বিশেষ নক্সা আছে। সেখানে
ফর সঙ্গে মেলে না, তার কাছে আমরা বরফ। যিহিরের
যেনা, মৃণালের তা নয়। মৃণালের নিজের নার সঙ্গে যেটা
মিলেছে, সেটাতে সে সুখী। মিহির তা বুঝতে পারে না; কি
বুঝতে পারলেও মর্মমূলে আহত হবে।
কিন্তু মিহির বােঝে কি না-বােঝে, মৃণালের তাতে কিছু এসে
যায় না। সে নিজেই বােঝে না। সে জানে না তার নিজের
উন্মীলন। শুধু তার রক্তের মধ্যে একটা উজ্জীবন ; স
শরীরে বসন্তের শত নতুন হয়ে ওঠা-আর-কিছু নয়। আবার
জন্য মুহূর্তকাল সে থমকে দাড়াতাে না। একবার আয়নার সামনে
অকারণে এসে দাঁড়াতাে না—কী সুন্দর সে হয়ে উঠেছে, তা
দেখতে। শুধু সে নিজেকে ছেড়ে দিলে অন্ধকার, উষ্ণ সেই
রাত্রির স্রোতে। শুধু সে ভরে উঠলাে অন্ধকার, জলন্ত সূর্যে।
কিন্তু হৈমন্তী লক্ষ্য করলেন। তার চোখে ধরা পড়লাে
মৃণালের উন্মীলন। এসব জিনিস স্ত্রীলােকের দৃষ্টি কখনাে এড়াতে
পারে না। কোনাে নবীন স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়েই তারা
বলে দিতে পারে--বুঝতে পারে। মৃণালের দিকে আফিরে
হৈমন্তী শাস্তির নিঃশাস ছাড়লেন। আর ভয় নেই।
==
-
অান মাল পড়লাে। বাতাসে শীতের আমেজ। আকাশ নীল।
আলতে আয় উষ্ণতায় মধুর-হয়ে-ওঠা সকালবেলা। কলকাতায়
এরই মধ্যে ক্রিসমাসের উৎসব-গুঞ্জনের প্রথম সূচনা। কাজ
না-করবার সময়, অলস ভাবনার সময়, নিজের মনের মধ্যে
অকারণে খুশি হয়ে ওঠবার সময়।
এই সময়ে মিহিরের সঙ্গে তাপসী দেবীর আলাপ হলাে।
পলব বলে এক ছেলেদের কাগজে মিহির মাঝেমাঝে
লিখতাে, তাপসী দেবী তার সম্পাদক। তার লেখা পেয়ে
সম্পাদক খুসি হতেন, সে খুসি হ’ততা পল্লবে লিখে। কেননা
পল্লবের ছিলাে বিশেষ একটা সুর, একটু যেন স্বপ্নময়
পলাতক ছায়ার মত, মেয়ে-মনের সূক্ষ্ম-সঞ্চারী সুর। পল্লব পড়তে
মিহিরের ভালাে লাগত। অবিশ্যি ছেলেদের যে-কোনাে কাগজই
সে পেলেই পড়তাে-কেননা এ-বিষয়ে তার সন্দেহ ছিলাে না যে
বাঙলাদেশে তথাকথিত বয়স্ক লােকদের জন্য যেসব কাগজ
বেনােয় তার একটাও পড়বার মত নয়। অদ্ভুত বয়স্ক লােকের
পড়বার মত নয়।
তাপসী দেবী নিজেও কবিতা লিখতেন—ছােট-ঘােট ছবি, ।
একটু ঝাপসা, যেন পাৎলা কুয়াশার ভিতর দিয়ে দেখা। অলস
তার ছন্দ, নরম তার রঙ। মােমর আলাের মত নরম, চোখের
সূৰ্য্যমুখী
উপর জড়িয়ে-আসা ঘুমের মত। খানিকটা ক্রি িবসেটির
মত-যখন তাঁর মন ভালাে থাকতাে না। মিহিরের সেসব
কবিতা ভালাে লাগতাে। আর সে-ভাললাগা অবিশ্যি পারস্পরিক।
(এটা কেন হয় যে দু’জনের যখন পরস্পরের লেখা ভালাে লাগে
এবং সে-কথা তারা প্রকাশ করে, লােকে তাদের ঠাট্টা করে।
বলে—মিউচুয়াল অ্যাডমিরেশন সােসাইটি? তাতে ঠাট্টা করবার
কী আছে? তা হলেই ত সব চেয়ে ভালাে। অ্যাডমিনেশন
যদি মিউচুয়াল না হয়, সেটাই তাে ভয়ঙ্কর মারাত্মক।) পারস্পরিক
এবং উচ্চারিত। মাঝে-মাঝে তারা পত্রবিনিময় করতে-পল্লব
উপলক্ষ্য করে। তাপসী দেবীর হাতের লেখা ছােট-ছােট,
এক-একটা লাইন এক-একটা কশ, কালাে সাপের
মত। কোনাে চিঠিতে তিনি হয়তাে লিখতেন। একদিন আনুন
আমাদের এদিকেযদি সময় করতে পারেন। মিহির লিখতে
উত্তরে ; ‘চেষ্টা করবাে। কিন্তু যাওয়া তার কখনাে হয়নি, যেতে
তার ইচ্ছাই করেনি। হয়তাে তার তয় হয়েছে পাছে তাপসীকে
তার ভালাে না লাগে-পাছে বড় বেশি ভালাে লেগে যায়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত, প্রায় দু’বছরের কাগজের আলাপের পর
তাদের দেখা হলাে। তাপসীর সম্বন্ধে মিহির কিছুই জানতাে না।
সেই সন্ধ্যায়, নিজকে পার্ক সার্কাসের এক ছোট, একতলা বাড়ির
সামনে দেখতে পেয়ে সে হঠাৎ অবাক হয়ে গেলাে। পল্লব
লতাননা ;
:
ক
সূৰ্য্য
পিলের এই ঠিকানা। কিন্তু মােটও আপিলের মত দেখতে
নয়া লে নাই। এটা তাদের খাবার বাড়িতে এখানে
নিমন্ত্রিত। অৰিকি পরুষের উপলক্ষ্যেই নিয়ন্ত্রিত। পড়বে
পাঁচবছর পূর্ণ হলাে—সেইজন্য হােট একটা-কী বলে ওকে?-
এভিগলেন। কী কুৎসিত কথা, শোনামাত্র সমস্ত প্রতির
ভাৰ উবে যায়।
-তো সে না এলেই ভালাে করতে। ঘরে আলাে জ্বলছে,
শােনা যাচ্ছে কথা। হয়তো অনেক লােক এসেছে, হয়তাে
মিনিটেই সে হাঁপিয়ে উঠবে, তার ভালাে লাগবে না।
করে তার মাথায় এটা ঢুকলাে যে আসতে হবে। কিন্তু তাপসী
এত সুন্দর করে চিঠি লিখেছিলাে। সে-ও তাে পারতাে তার
চেয়েও সুন্দর করে লিখে জবাব দিতে। সত্যি বলতে,
এখানে তার উপস্থিতির চাইতে সেই চিঠি অনেক বেশি ভালাে
বেনাতো-ও দেখাতাে।
ফটকের গায়ে যেখানে বাড়ির নম্বর লেখা, সেদিকে বুকে সে
দাড়িয়ে আছে, এমন সময় তার পিছনে একটা কণ্ঠস্বর শুনলে :
‘া, এই বাড়ি। খুন।
ফিরে তাকিয়ে সে দেখলাে, কর আঠাঝাের একটি ছিপছিপে
ফর্সা ছেলে। সে তার চোখের দিকে তাকাতেই ছেলেটি বেলে
বললে; আখি আপনাকে চিনি। আসুন।
।
वागणी
আশীর ভাই—নিশ্চয়ই। এই জই আর মাকে নিলে
থাকে এই বাড়িতে। বাপ ছিলেন রানিগয়ে কালানি
ইঞ্জিনিয়ার। অল্প বয়েসে ভদ্রলােক মারা যায়। ভাগীর তখন
পনেরাে বছর। তারা চলে আসে কলকাতার ফোখ
যাদের থাকার জায়গা নেই, তাদের থাকার একমাত্র জায়গা
কিছু পয়সা ছিলাে : দুর্ভাবনার কোন কারণ ছিলাে না।
রানিগঞ্জে কোনাে সমাজ নেই : কোনাে সামাজিকতার যু
মধ্যে তার বাল্যের লালন হয়নি। শিশুকাল থেকে কলকাতার
আওতায় যেসব মেয়ে মানুষ, তাদের থেকে সে খানিকটা অন্যরকম
হতে বাধ্য। কে বলে কোণগুলাে ঘৰে সমান করে যে,
তার জীবনে তা ঘটতে পারেনি। ইস্কুলে না-গিয়ে, গান না-
শিখে, অটোগ্রাফ সংগ্রহ না-করে’, সিনেমালেকের দেবদেবীর
পূজো না-করে সে তার পনেরো বছর পূর্ণ করেছিলাে। কোনাে
গণ-মনােভাৰ ছেলেবেলা থেকে তার মনকে তৈরি করেনি।
পনেরাে বছরে, অনেক জায়গায় সে কাচা, অনেক জায়গায়
সে অস্বাভাবিকরকম গভীর। তার মধ্যে অনেক কোণ,
অনেক আঁকাবাঁকা। কিছু এলােমেলাে, অগােছাল তার
ভাব, বার হাওয়ার মত। বর্ষার মেঘের মত তার
মনের অসংলগ্ন রঙিন মুহূর্ত, পরম্পরাহীন।
সে হয়ে উঠেছে নিজের ভাবেই • গর, পশিচলের
সূৰ্যমুখী
বাঙা-আকাশের নিচে ধূসর, ঢেউখেলানাে প্রান্তরে
মাঝখানে।
বই সে ভালােবাসত। কলকাতা থেকে মাসিকপত্র আসবে
উন্মাদের মত সে তার প্রতীক্ষা করতাে। তার নামেই আসততা
সব কাগজ—প্রতিটি মােক তার নিজের হাতে খােলা চাই।।
প্রতিটি কাগজের বিশেষ একটা রূপ ছিলাে তার মনে, নিজস্ব
একটা গন্ধ—যা ভুল করা যায় না। সাহিত্য আর ভারতী,
সবুজপত্র আর নারায়ণের ভিতর দিয়ে সে বড় হয়ে উঠলো।
ও-গৰ কাগজ সে বুঝে পড়তো, না-বুঝে পড়তাে, মনে-মনে যা-
হােক একরকম ভেবে নিয়ে পড়তে-সে/ ভালােবাসতে
কথাগুলাে। তারপর এলাে বাঙলা মাসিক সাহিত্যের বাজারে যুগ
বিরাট বপু আর রঙিন ছবির, চারটে করে ধারাবাহিক উপন্যাস
আর দশটা করে ছােট গল্পের, সচিত্র ভ্রমণ-কাহিনী আর বিভিন্ন
ভাষায় বিস্তর উদ্ধৃতি-বহুল প্রবন্ধেয় যুগ। সে-সময়ে তাপসী
অনেকটা বুঝে পড়তে শিখলাে, কিন্তু তখন আর বাঙলা মাসিক
সাহিত্যে বুঝে পড়বার মত বিশেষ কিছু নেই।
এত পড়লে লেখবার জন্য হাত চুলকোবেই। রানিগঞ্জে
থাকতে তাপসী সমানে দেড় বছর হাতে লেখা এক কাগজ চালিয়ে-
ছিল--তার নাম কাজল। তার, মা নামকরণ করেছিলেন,
তার বাবা প্রথম সংখ্যায় কাজল ও কয়লা নামে প্রবন্ধ লিখে
সূৰ্যমুখী ছিলেন। একটা পারিবারিক পত্রিকা হয়ে উঠবে, এমন লক্ষণ দখা গিয়েছিলাে। সাত বছরের চারণ আঁকতাে ছবি। কিন্তু দু’ একমাস যেতেই দেখা গেলাে মা আর বাবা কাজলের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ একটি মানুষের হাতে ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত। এমন কি, চারণের ব্যবহার দেখেও মনে হয় না কাজলের পৃষ্ঠা অঞ্চত করাই তার জীবনের প্রধান আনন। কিন্তু কাজল চলতে লাগলাে প্রতি মাসের ঠিক পয়লা তারিখে একটি করে সংখ্যা বেলােয়- তাতে গল্প থাকে, কবিতা থাকে, ধারাবাহিক উপন্যাস থাকে, প্রবন্ধ থাকে, সুরেশ সমাজপতির ঢঙে মাসিক সাহিতােয় সমালােচনা থাকে, এমন কি, বিজ্ঞাপন থাকে। (তাপসীর জীবনের প্রথম মােহ-ভঙ্গ হয়, যখন সে জেনেছিলাে যে বিজ্ঞাপনগুলো কাগজওয়ালারা কাগজের সৌষ্ঠবের জন্য নিজেরা ভালাে করে লিখে ছেপে দেন না, বরং তা ছাপাবার অত ইঞ্চি মেপে পয়সা আদায় করেন। সে-সমস্ত লেখা তাপলীয় নিজের একঘেয়েমি এড়াবার জন্য তাকে আটটা ছদ্মনাম উদ্ভাবন করতে হয়েছিলাে। মাঝে-মাঝে যখন তার কোনাে বন্ধুর কোনাে লেখা বেরুতে, সেই বন্ধুর মা-বাবা তা বিশ্বাস করতে চাইতেন না: বলতেন, ‘তাপসীই তোদের নামে লিখে দিয়েছে। পাড়ার মধ্যে কয়েকটি বাড়ির মধ্যে কাগজের প্রচার। কোনাে মহিলা তাদের বাড়ি বেড়াতে এসে তপশীকে হয়তো জিজ্ঞেস করতেন।
গাে, তােমায় আবাঢ় সংখ্যার কয়?
আর ভাললী উত্তর দিতে :
এই তাে, মাসিক সাহিত্যটা শুধু বাকি, পয়লা তারিখেই
বেরিয়ে যাবে।
কি, তার বাবার কোনো বন্ধু তার কাছে এলে মুখ কাচুমাচু ·
করে বলতেন ;
আমায় একটা লেখা আছে—তােমায় কাগজে কি চলবে?
আয় সে, গম্ভীয়ভাবে :
‘রেখে যান। টিকিট দেয়া থাকলে ফেরৎ দেয়া হবে।
ভীষণ মজা-অনেক নাম দিয়ে অনেক জিলিল লেথা। এমন
উত্তেজনা আর কোন্ খেলায়? আর কোন্ খেলায় এমন
গাশ জুবে থাকা যায়। চারদিক থেকে আজ প্রায় পেয়ে
পেয়ে তার মনে অসংখ্য কুঁড়ি ধরতে লাগলাে। তার শিক্ষা
হয়ে পড়লাে একটু একপেশে, তার সহানুভূতি একমুখে: ভার
এতিতে একটুখানি সহজ বঙ্গভাব যেন লেগেই অইলাে।
এমনি, লে উঠতে লাগলাে বড় হয়ে। কাল বন্ধ হয়ে গেলাে,
ভায় দেখা হলাে না। সে ভালোবাসতাে কথা, শিখ বোন
# ভালােবাসে। কথার রঙ লাগলাে তার মনে : তার ভালাে
লাগতাে আঙিন কথাগুলোকে পা-পয় সাজাতে, বিশেষ একটা
হলে, কিভূ করে। আর যে আয়কানাে মানে আছে,
তখন পৰ্য্য তার কা মনে হতাে না। তার ভালাে লাগে,
তার মূলা লাগে—এই হচ্ছে প্রথম এবং শেষ ।
তারপর কলকাতা। সে কয়েকটা প ছাপালে খালিকপত্রে।
লােকজনের সঙ্গে চেনা হতে আরম্ভ করলাে। একটু পরিচয়
এলাে শহরের সাহিত্য-সমাজে—অন্তত তার একটা মে-
কারণ সে-সমাজ যে কোটা আর কোটা নয়, তার মধ্যে কে যে
আছে আর কে নেই, তা ঠিক করে বলা শক্ত। তার লেখা অনেক
কমে এলাে; বেশির ভাগ সময় কাটতে লাগলাে গল্প করে
আর বই পড়ে। তারপর, তার বয়েস যখন আঠাৱা নে হঠাৎ.
বার করে বসলাে এক কাগজ—এই পল্লব। ছেলেদের, কেননা
হঠাৎ সে আবিষ্কার করেছিলাে যে ছেলে ে লিখে সে যত
সুখ পায়, অমন আর কিছুতে নয়। কেমন করে সে যেন নিজেকে
পরে গেলাে। নিজেকে যেন চিনলে শিশুর জগতের জম্প
অর্থাললাকে। সেখানে অদ্ভুত খেয়াল, কল্পনার উন্দামতা মুক্তি,
সেখানে অসম্ভবতম স্বপ্ন। তারই টুকরাে-টুকরাে ছবি সে
'আঁকতােখন খেয়াল হতাে। যাকে খ্যাতি বলে তা তার
কিন্তু নিজের মধ্যে একরকমের পরিপূর্ণতা সে
;
সে-সব লেখা পড়ে মিহির তাকে না, ফয়েছিলাে
ক্রিসটিন গলেটির মত দেখতে। নো কিছু আশ্চর্য নয়। কিন্তু
r
সূৰ্যমুখী
সব চেয়ে বা আশ্চৰ্য্য তা এই যে সত্যিসত্যি তাপসীকে সে
সেইরকম দেখতে পেলাে, অনেকটা ক্রিসটিনা সেটির মত। ঠিক
এমনিই সে তাপলী দেবীকে মনে-মনে ভেবেছিলাে। রজনীগন্ধার
বৃত্তের মত শরীর। টানা চোখ, গায়ের রঙে ম্লান আতা,
স্নান, প্রি-য়্যাফেলাইট চুল। চোখের দৃষ্টি একটু যেন ক্লান্ত,
ঈষৎ বেরিয়ে-আসা গালের হাড়ে থেকে-থেকে গােলাপি আভা
ফুটে উঠেই মিলিয়ে যায়। তার পরনে ধবধবে সাদা সিক,
ইলেকটিক আলাের নিচে আলাের বুনােনাের মত। মিহির বিয়ে
শুব্ধ হয়ে গেলাে। তার যেন মনে হতে লাগলাে এই মেয়েকে
অনেক আগে থেকে সে চিনে আসছে। কবে যে তাকে প্রথম
দেখেছিলাে ঠিক মনে করতে পারছে না।
প্রথম পরিচয়ের পর তারা সাধারণ সভায় মিশে গেলাে।
হােট একটি সাহিত্যিক দল-দু'একজনের সঙ্গে মিহিরের আগেই
আলাপ ছিলাে। তারা সবাই সেই সুখী সম্প্রদায়ের যাদের
পয়সা আছে, প্রচুর অবসর আছে; বই পড়ে’, বই নিয়ে
আলােচনা কয়ে’ আর মাঝে-মাঝে দু’চার পাতা লিখে যাদের
'সময় কাটে। দু’জন এসেছিলেন স্ত্রী নিয়ে ; মাঝে-মাকে তারা
ত্রৈমাসিকের সংক্ষিপ্ত পুস্তক-পরিচয় লেখেন। লঘু, হাসিখুসি
আলাপের শ্রোত, মাঝে-মাঝে মােড় নেয়, কখনাে ফিরে আসে,
কখনাে কোণাকুনি গড়িয়ে চলে—সকলেরই জন্যে, সকলের মধ্যে
१२
সূৰ্য্যমুখী
সমান বিতরিত। ঘরের মধ্যে একটা উষ্ণতার অনুভব। নিজেরই
অজ্ঞাতে মিহিরকে টেনে নিলে সেই উষ্ণ আবহ। সে কথা
কইলাে, সে হাসলাে, অলক্ষিতে সে খুশি হয়ে উঠলো। আর
সমস্ত কিছুর আড়ালে, সমস্ত-কিছু সংযুক্ত করে, সম্পূর্ণ করে
তাপসীর গুদ্র উপস্থিতির অস্পষ্ট ঝিলিমিলি। সমস্ত কথার
আর হাসির সে হচ্ছে নেপথ্য-সুর। সাধারণ আলাপের মধ্যে
মিহির সােজাসুজি তার সঙ্গে বেশি কথা কইতে পারলে না
কিন্তু ঘরের মধ্যে এই উষ্ণ সঞ্চার যেন তার শরীর থেকেই নিত,
তাকে সে ভুলে থাকতে পারলে না, সব সময় সে তাকে অনুভ
করছে—কোনাে সুদূর, অবচেতনভাবে। আর মিহিরের যেন মনে
হ’লাে তাপসী তাকে টানছে—অদ্ভুত, মধুর আকর্ষণ। সে বাধা
দিলে না, রােধ করলে না; সে তা উপভােগ করলে সেই সুর
ঐশ্বৰ্য্যময় আকর্ষণ। তা ব্যাপ্ত হয়ে পড়ছে তার স্নায়ুমণ্ডলীতে
সূক্ষ্ম উষ্ণস্রোতে। তা অস্পষ্ট-মধুর -অনেকক্ষণ বন্ধ ঘরে থাকবার
পর রাস্তায় বেরুলে হঠাৎ গায়ে-এসে-লাগা রাত্রির হাওয়ার মত।
সাদা, কোণওয়ালা পেয়ালায় চা পরিবেষিত হলাে। চা
খেতে-খেতে একজন বললে;
‘আমি ভাবছি একটা চয়নিকা বার করবাে-মালিকপত্রে
প্রত্যাখাত কবিতার চয়নিকা। সঙ্গে-সঙ্গে সম্পাদকের মন্তব্য
‘চৎকাম। মহিলাদের একজন বললেন, ‘কবিতা যাই হােক,
অন্যগুলাের অই বইখানা পড়বার মত হবে।
কবিতাও কিছু পারাপ হবে না। প্রথমেই থাকবে শীতাঞ্জলি
থেকে কয়েকটা গান। ধরা যা শ্রবণ ঘন গহন মােহে”।
অখ্যাতনামা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এটি পাঠিয়েছেন কোনাে বিখ্যাত
শাসকের কাছে। সম্পাদক কী বলে তা ফেরৎ দেবেন বলতে
পারেন?
শখ সেন, যার প্রথম উপন্যাস অল্পদিন হলাে বেরিয়েছে,
উত্তর দিলে :
।
‘সহজেই বলা যায়। ভয়ঙ্কর বিৰেকওয়ালা সম্পাদক, প্রত্যেকটি
লেখা নিজে পড়েন, নিজের হাতে চিঠি লেখেন। নিজের মতামতের
উপর অসীম শ্রদ্ধা। তাঁর মন্তব্য অনেকটা এই গােছের হবে :
কবিতা দুই প্রকায়—ভালাে ও মন। আপনার কবিতা ভালাে
না, সুতরাং তা মল। মন্দ কবিতা লিখতে কোনাে বাধা
নাই, কিন্তু তার প্রকাশ নিয়ােজন। এতে হবে, নৃশে?
পেশ—প্রথমে যে কথাটা তুলেছিলাে-চকি হেসে বললে :
মন্দ নয়, কিন্তু এর চেয়েও ভালাে হতে পারে।
কি যদি ঠাট্টার দিকে যাও, সমাজপতি আর এভাত মুখুয্যের
বিলে চঙে, তা হলে এ-রকম হতে পারে। আপনার বন্ধু ও
প্রিয়তম কেন যে আপনাকে হেলায় ঠেলিয়া চলিয়া গেলে, এই
কবিতা পঢ়িয়াই তা বােঝা যায়। আপনারই লেয় এ-লেখা
আমরা ছাপিলাম না; কেন সামান্য একটা লেখার নােহে সমস্ত
বন্ধুদের বিসর্জন দিবেন?
না, এটা বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যায়।
• ‘সম্পাদকদের কথাই যখন উঠলাে, সুতা সরকার বললেন,
একটা সত্যি গল্প শুনুন। একটি ছেলে কতগুলাে কবিতা নিয়ে
যায় চিত্রাঙ্গদা অপিসে। প্রথমে সে জানায় বা পকেট থেকে
একতাড়তর্জমা বার করলে। সম্পাদক সেগুলাের দিকে একবার
তাকিয়েই বললেন : “তা আমরা ছাপিনে। এমনি লেখাও
আছে,” বলে ছেলেটি ডান পকেট থেকে অশ্য-এক তাড়া বার করে
টেবিলের উপর রাখলে। “এত বড় কবিতা গবে না, কাগজের
তাড়াটা হাতে নিয়েই সম্পাদক বললেন। “ছােট কবিতাও
আছে। পিছনে.দেখুন।” সম্পাদক পিছনে দেখলেন, গভীর
হয়ে গেলেন। ছ’ পাতাব্যাপী প্রেমের কবিতা থেকে দু'লাইনের
এপিগ্রাম পর্যন্ত সমস্ত রকম জিনিস এতে আছে।
‘তা সম্পায়কেরই বা এমন জো কেন? মালিকপত্রে
যেকোনাে পথই তাে ছাপা যায় এবং ছাপা হয়।
শুনে না। তখন সম্পাদক একবার তাদের দিকে,
এবার অন্য পালাের দিকে তাকাতে লাগলেন—আর খেয়ে
উঠতে লাগলেন। ছেলেটি চুপ করে বলে যা খেতে লাগলাে।
৪
f
সূৰ্য্যমুখী
খানিক পরে সম্পাদক হঠাৎ বলে উঠলেন; “হয়েছে। আপনার
এই লেখাটিই আমরা রাখতে পারি।” বলে’, মূল রচনার মধ্যে
সবার উপরে যেলম্বা পথ ছিলাে, সেটি দেখালেন।
“অত বড় কবিতা চলবে?”
“তা কোনােরকমে ঠেলে দিতে পারবে। লেখা ভালাে হলেই
লে—এই আমার প্রিন্সিপূ।”
“আচ্ছ, ধন্যবাদ
“পরের মাসের চিত্রাঙ্গদায় কবিতাটি বেরুলল। কবিতারউপরে
ব্র্যাকেটের মধ্যে লেখা,“রুপার্ট ব্রুক হইতে”। ছেলেটি মাথায় হাত
দিয়ে বসলো। হাঁপাতে-হাপাতে গেলে সম্পাদকের কাছে।
*এ কী হয়েছে?”
।
। “কী হয়েছে?
s
“এই যে রুপার্ট ঐক?”
“ও, ওটা আমিই বসিয়ে দিয়েছি। আপনার ভাে নাম নেই,
আপনার লেখা এত বড় কবিতা ছাপলে ভালাে দেখায় না।
আপনারও এতে ভালােই হবে—আপনার কবিতা কে পড়তাে,
বলুন-রুপার্ট ব্রুকের নাম দেখে তবু যদি একটু পড়ে। আপনি
কিছু ভাববেন না—কেউ তাে আর মিলিয়ে দেখতে যাবে না।”
সবাই হেসে উঠলাে। একজন বললে, সম্পাদকদের সম্বন্ধে
সব গল্প সংগ্রহ করে একটা বই করলেও হয়।
সূর্যমুখী
সম্পাদকদের নিয়ে আলােচনা চললাে। সবারই দু'একটা
গল্প জানা আছে বলবার মত। এই হচ্ছে সাহিত্যের
অলিগলি—নিরুদ্দেশ ঘুরে বেড়াবার এমন জায়গা আর নাই।
জীবনের সমস্ত কমেডি সেখানে ছড়ানাে। সুকুমার রায়ের ..
জগতের মত তা বিকৃত, অতিরঞ্জিত, আজগুবি, হাস্যকর,
অসম্ভব।
রাত বাড়লাে। কেউ একজন উল্লেখ করলে ওঠবার কথা।
তাপসী বললে, বােসল, এখনই কী? সবাই যেন একটু নড়ে-চড়ে
ভালো হয়ে বসলাে। আলাপ চলতে লাগলাে ক্ষীণস্রোতে,
থেমে-থেমে। হঠাৎ শশাঙ্ক সেন, মিহিরের দিকে তাকিয়ে :
‘মিহির, তােমার স্ত্রীকে নিয়ে এলেই পারতে?
মুহুর্তে মিহির গলা পর্যন্ত আর হয়ে উঠলাে। এবং সে
অনুভব করলে যে. সবাই তা লক্ষ্য করেছে। সে কোনদিকে
তাকাবে বুঝতে পারলে না।
তাপসী তাকে বাঁচিয়ে দিলে ।
‘আমারই দোষ। আমি জানতুম না •
শশাঙ্ক বললে : অনেকেই জানে না। মিহিরের স্ত্রীকে কেউ
কখনাে দ্যাখেনি।
মিহির চেষ্টা করে বললে : ‘তাকে এখানে আসতে বললেও
সে আসতে চাইতাে না’
সূৰ্যমুখী
‘কেন, তিনি কি তােমাকে দিয়ে আমাদের সবাইকে বিচার
কছেন নাকি?
সবাই হাসলো, মিহির সব চেয়ে বেশি। হাসতে পেয়ে সে
বাঁচলো। এই সুযােগে তাপসী প্রসঙ্গ-পরিবর্তন করলে;
‘আপনি অনেকদিন কিছু লিখছেন না, মিহিরবাবু।
সুভদ্র সরকার বলে উঠলেন, কেবল একজনের সঙ্গেই
লিখছেন?
‘সব সময়েই তাে আমি একজনের জন্যই লিখি।
সুভদ্রার চোখে কৌতুহলের ছটা।সব সময়?
সব সময়। একজনের জন্যেই আমার সব লেখা । সে আমি
নিজে।
সুভদ্রার মুখে একটু নিরাশার ছায়া পড়লাে। আর তাপসী
জিজ্ঞেস করলে, বাঁ দিকে চওড়া সিথি-করা তার মাথা ঈষৎ
মিহিরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ।
‘তা হলে অন্য লােকের জন্য আপনি মােটেও ভাবেন না?
তারা পড়লে কি না পড়লাে, তাদের ভালাে লাগলে কি লাগলাে
‘অতটা বলতে পারিনে। অঙ্গকে পড়াতে তাে চাই-ই; কে
চায় ?
৭৮
भूगम्भी
সেই তাে মুস্কিল। আর সেই তাে দুঃখ। আমার মনে আছে
একটা কথা, তা আমি বলতে চাই। অন্যদের বােঝাতে চাই।
কিন্তু আমার কাছে সে-কথার যা মানে, তা শুধু আমারই কাছে।
অন্তরা তা বােঝে না, বুঝতে পারে না। প্রত্যেকের মনের
আলাইচি, তারই সঙ্গে আমার লেখা তার মানিয়েছিয়ে
নেয়। তারা যা পড়ে, তা আমার লেখা নয় ; আমার লেখাকে তার
যেভাবে পেতে চায়, পেতে পারে--মানে, আমার কবিতায় তাদের
নিজস্ব পাঠ। অনেক রকম মানুষ, তাই শে-পাঠ অনেক রকম
হতে বাধ্য। তার মধ্যে কোথায় হারিয়ে যায়--ঠিক আমি .
যে-কথা বলতে চেয়েছিলুম। আমার কবিতায় অমি যা পড়ি,
অন্ত-কেউ তা পড়ে না, পড়তে পারে না। কেবল আমারই জন্য
আমার লেখা।
‘চিরন্তন আক্ষেপ! এ-কথা মেনে নিলে তাে লেখাই ছেড়ে
দিতে হয়।
মাঝে-মাঝে আমার তে ইচ্ছাই করে ছেড়ে দিতে। মানুষ
এত আয়ে-জান্তে বাড়ে আর আয়ু এত কম আর মানুষের ভাষা
এত দুর্বল বে লেখবার কোনাে মানে হয় না
মিহির আর তাপসী দল থেকে একটু পাশে সরে এসেছিলাে;
তাদের কথা আর-কেউ শুনছিলাে না। হােট-ঘােট দলে ভেঙে
গিয়ে বিক্ষিপ্ত, মৃদু আলাপ—কোনােলর শেষের দিকে যেমন হয়।
।
সূর্যমুখী এরা দুজন হঠাৎ নিজেদেয় দেখতে পেলাে মুখােমুখি, কথায় == আপনার কথা হয়তাে বুঝতে পারছি। যে-সব আশ্চৰ্য্য কবিতা জীবনে কখনাে লেখা হবে না, তার কথা ভেবে কোন্ কবির না মন-খারাপ হয়েছে ? হঠাৎ মনের মধ্যে সুর এসে গে— রঙিন, পলাতক একটা মুহূর্ত—সব সময় তাকে কথায় রে 'রায় যায় না। অনেক সময় তাকে ধরে রাখতে গিয়ে দেখা যায়, এরই মধ্যে রঙ এসেছে ফিকে হয়ে। কত যে কথা আমরা ভাবি- যদি সব ধরে রাখা সম্ভব হতাে, সময় নেই। সময় নেই; দিনগুলাে বড় ছােট, জীবনে নানারকম জিনিসের ভিড়। পৃথিবীর সব চেয়ে বড় কবিকেও যা হারাতে হয়, সে-তুলনায় তিনি যা দিয়ে যান তা অত্যন্ত তুচ্ছ। আর মানুষের পরিণতি এত মন্থর, কোনাে অনুভূতি আসতে-আসতেই হয়তাে জীবনের অর্ধেক কেটে গেলাে। যে- বয়েলে আমরা ভাবতে শিখি, যে-বয়েসে জীবনের ঘটনাগুলােকে মনের মধ্যে কিছু-একটা করে তােলবার ক্ষমতা আমাদের হয়, তা এত দেরিতে যে ভাবতে গেলে মন খারাপ হয়ে যায়। প্রতি বছরেই যেন আমার নতুন কোনাে সত্তা, প্রতি বছরই মনে হয়, “এতদিন আমি কোথায় ছিলুম?” কী যেন একটা মনের মধ্যে ক্রমাগতই ভেঙে যাচ্ছে, হয়ে উঠছে। দিগন্ত কেবলই যাচ্ছে দূরে সরে। নিজেকে দেখে-দেখে অবাক লাগে, হতাশ হতে হয়।
সূৰ্য্যমুখী যেটুকু আমার প্রকাশের ক্ষমতা, তাকে আমি কেবলই ছড়িয়ে যাব। মনে হয়, নিজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে কখনাে পারবাে না। মনের মধ্যে যেসব সূক্ষ্ম ছায়া ক্ষণিক রেখা একে যাচ্ছে, কোথায় পাবদা তার ভাষা? তখনই মনে হয়, হবে বলে ? ভাষা তত একটা রাধা : তা নষ্ট করে, বিকৃত করে, তার ভিতর দিয়ে ভাবনা.. ছড়িয়ে যায়, যায় হারিয়ে। ভাষার সীমা আছে, ভাবনার নেই। ভাবার কোনো বাধা নেই : তা সৰ্বব্যাপী ও চিরন্তন। তা সহজ, বিশুদ্ধ, সীমাহীন। তার উপর, তাতে শারীরিক কোনাে চেষ্টার দরকার করে না। ভাবতে এত ভালাে লাগে যে—যে বসে-বসে কেবল ভাবতেই ইচ্ছে করে। মনের ভিতরটা এমন নিবিড়, এমন সোনালি হয়ে ওঠে মে তখন আর কলম ছুঁতে ইচ্ছে করে না। তখনই লেখা ব্যাপরেটাকে মনে হয় অসহনীয় স্কুল। মনে হতেই পারে। কিন্তু তাই বলে”, হঠাৎ একটু থেমে তাপসী কথাটাকে ব্যক্তিগত স্তরে নামিয়ে আনলাে, একেবারে না-লেখবার কোনাে মানে হয় না, সে হেসে বললে। অনেকদিন কোনাে কাগজে আপনার কোন লেখা দেখিনি। কাগজে দিইনে অনেকদিন। ‘লিখেছেন, তা হলে? মিহির একটু হাসলাে‘মাসিকপত্রে কবিতা ছাপবার কথা ভাবতে মাঝে-মাঝে আমার অসহ বিতৃষ্ণা হয়। আমি যা লিখেছি
সূর্যমুখী
তার উপর কেউ ট্রামে যেতে-যেতে অলসভাবে একটু চোখ বুলিয়ে
গেলাে—এ আমি সইতে পারিনে। কি, কোনাে ডিপটি-গিন্নির
দিবা-নিদ্রার সহায়তা করতে
তাপসীর মৃদু তাকে বাধা দিলে। কিন্তু সবাই ও-রকম
''নয়, সে বললে।
‘প্রায় সবাই।
‘কিন্তু সবাই নয়। অন্য যে দু'চারজন, তাদের নিয়েই তাে
কথা। আর্ট জিনিসটাই সম্পূর্ণরূপে সাম্প্রদায়িক।
এ-কথা ভাবতে খুবই আরাম লাগে—যতক্ষণ ধরে নেয়া যায়
যে আপনি আর আমি দীক্ষিতের দলে।
তা কি নই?'
বাঁকা ভুরুর নিচে তাপসীর টানা চোখের দিকে তাকিয়ে
মিহির চুপ করে রইলাে। ‘সব সময়েই দু’চারজন থাকে,
তাপসী বলতে লাগলাে, এ-ই তাে সান্ত্বনা। কোনখানে, কেউ
হয়তাে আপনার মত করে ভাবছে। আপনার কথা যেই তার
মনকে ছুঁয়ে গেলে, জেগে উঠলাে প্রতিধ্বনি—যেন সে-কথা
তারই মধ্যে এতদিন ছিলাে চাপা হয়ে। হয়তাে সেই দু’চারজনের
জীবনে আপনি কয়েকটি সােনালি মুহূর্ত এনে দিলেন—সেটাই
কি কম? সেখানেই সার্থক হলাে আপনার লেখা। তারপর--
তা না-ই বা থাকলে, না-ই বা মনে রাখলে লােকে। এমন
সূৰ্যমুখী
ঐশ্বৰ্য্য পেয়ে ও দিতে পেরেও যে আরাে বেশি লােভ করে,
তাকে কী বলব?
তাপসীর কথা বলার ধরণে প্রবল আগ্রহ, আনন্দের ছন্দ।
নদীর মত তা তার ভিতর থেকে প্রবাহিত। হােট-ঘােট ঢেউ
তুলে যাচ্ছে চারদিকে। মিহির সেই উদ্দীপিত উষ্ণ কণ্ঠস্বর
শুনতে লাগলাে, মুগ্ধ। এক-এক সময় তাপসী একটু তাড়াতাড়ি
কথা বলে, একটু উচ্চস্বরে, নিজেই তা টের পায় না। আর সে
যখন হাসে, হঠাৎ তার সমস্ত মুখ যেন আলােয় জ্বলে ওঠে।
মিহির আর-কিছু বললে না। কিছু বলবার ছিল না বলে,
নয়, অনেক কিছু বলবার ছিলাে বলে। অদ্ভুতরকম চঞ্চল হয়ে
উঠছিলাে তার মন। তার ইচ্ছে করছিলাে কথ" বলতে, চুপ করে
থাকতে, তাপসীর শুভ্র সাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে।
একজন উঠে দাড়ালাে। ভাঙলাে সভা। সবাই উঠছে,
সবাই একসঙ্গে কথা বলছে। মিহিরকেও উঠতে হলাে। পুরো
দলটি একসঙ্গে বেরুলল, বারান্দা পার হয়ে রাস্তায়। কে যেন কী
একটা-কিছু বললে, একটা হাসির ঢেউ খেলে গেলাে। গঞ্জে
উঠলাে একটা মােটরের এঞ্জিন।
-তাপলী, ভুলাে না কিন্তু।
-নৃপেশ আমাদের গাড়িতে এসাে না।”
‘চলল হাঁটি। চমৎকার রাত।
সূর্যমুখী -“কারাে কাছে একটা সিগ্রেট আছে? -পড়ে দেখাে। সত্যিকারের ভালাে লেখা। -“আঃ, আমার ঘুম পেয়ে আসছে। কণ্ঠস্বরগুলো দুরে সরতে লাগলাে, ক্ষীণ হয়ে এলাে, মিলিয়ে গেলাে। আর হঠাৎ মিহির নিজেকে দেখতে পেলাে, রাত্রির রাস্তায় দাড়িয়ে, তাপসীর মুখখামুখি। তাপসী ক্ষীণ একটা ভঙ্গি করলে। সবাই চলে গেছে, অথচ সে এখনাে দাড়িয়ে কেন ? মিহির তেৰে অবাক হলাে। সে কি কিছুর জন্য অপেক্ষা করছিলাে? সে কি আমরা কোনাে কথা শুনতে চায়? তার যেন মনে হচ্ছে তাপসীর সঙ্গে অনেক কথাই তার বাকি রয়ে গেলো। দুজনের মধ্যে একটা সংস্পর্শের সূত্রপাত যে-মুহূর্তে হলাে, অমনি তা গেলাে ছিন্ন হয়ে। তাপসীকে সে বলতে শুনলাে : আপনার দেরি হয়ে গেলে : আর সঙ্গে-সঙ্গে তার মনে ফিরে এলাে তার বাড়ি । অভুক্ত, অপেক্ষমান, মৃণাল ; সমস্ত রাত্রি ভরে’ মৃণালের নিঃশব্দ সঞ্চার ; রাত্রি ভরে’ মৃণালের উষ্ণ স্রোত। আর তাপসীর অস্পষ্ট শুভ্র মূর্তির দিকে সে তাকালাে-চাদের মত স্নান, রাস্তার আবছায়ায় এক টুকরাে চাদের মত তার ঝিলিমিলি। আর হঠাৎ তার বুকের মধ্যে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাে অস্পষ্ট, উত্তপ্ত একটা ঢেউ। সে তার ঠোট কামড়ে ধরলাে, একবার আঙল চালিয়ে গেলে চুলের ৮
}
সূৰ্য্যমুখী
ভিতর দিল ; চলে যাবার আগে কী বলা যায়, খুঁজতে লাগলাে।
কিন্তু এবারেও তাপসীই বললে:
না কি ভিতরে এসে আর-একটু বলবেন? দুজন না হলে
সত্যি কোনাে কথা বলা যায় না।
মিহির বললে, না, যাই এবার।
‘আর-একদিন আসবেন?
সেই অর্ধ-আলােয় মিহিরের দৃষ্টি তাপসীর চোখ অন্বেষণ করে’
ফিলল। মিললাে তাদের দৃষ্টি, মুহূর্তকাল তারা রইলাে পরস্পরের
দিকে তাকিয়ে। সৃষ্টির ঘর্ষণে জ্বলে উঠলাে ছােট একটা শিখা;
সেই আলােয় পরস্পরকে তারা দেখে নিলে। তারপর মিহির।
বললে :
‘হ্যা, আসবে।
কিন্তু তাদের আবার দেখা হবার আগে পনেরো দিন কেটে
গেলাে। কী যেন, যাওয়া তার হয়ে উঠলাে না। তেমন-কোন
তাগিদ অনুভব করলে না মনের মধ্যে একদিন যে দেখা হয়েছে
তারই রেশ চলেছে তার মনে। তা থেকে সমটা রস সে নিঙড়ে
নিতে চায়। এমনি হয়—যারা বেশি ভাবে, তাদের। তাদের
প্রেম মন্থর। একটু আগুনের কণা থেকে সমস্ত মনের রঙিন হয়ে
ওঠবার সময় তারা দেয়। জীবনের অন্তরালে বেজে চলেছে
কোনাে সূক্ষ্ম সুর-না-ই বা বাইরে কোনাে প্রকাশ থাকলাে।
সূৰ্য্যমুখী
মাঝে-মাঝে কোনাে কাজের মধ্যে, কোনাে অলস মুহূর্তে মিহিরের
তাপসীকে মনে পড়তাে—যেমন হঠাৎ আমরা চাদের কথা
ভাৰি। আর তার মন ভরে যেত অদ্ভুত শাঝিতে। ভাবতে
ভালাে লাগতাে। ভাবতেই যখন এত ভালাে লাগছে কী হবে
গিরে ?
এতে করে একটা বিপদ এই যে অনেক সময় হয়তাে যা
হতে পারত, তা হয় না। শেষ পর্যন্ত ফসকে যায়, নিবে যায়।
পার হয়ে যায় সময় ভাবনা নিয়েই যার জীবন, সে থাকে
নিশ্চেষ্ট বলে।
সে-আশঙ্কা ছিলাে মিহিমের বেলায়। এখানে
যদি শেষ হতে, মিহির সেটাই মেনে নিতে স্বাভাবিক ও
অনিবাৰ্য বলে। কিন্তু এক বিকেলে হঠাৎ তাপসীর সঙ্গে তার
দেখা হয়ে গেলাে মিউনিসিপ্যাল মার্কেটে। সে লেখবার প্যাড
কিনছিলাে—পিছন থেকে অত্যন্ত মৃদুস্বরে কে বলে উঠলাে :
•
এই যে!
ফিরে তাকিয়ে সে দেখলাে, তাপসী।-বাঃ, আপনি!
‘গ্যিস আগে একদিন আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিলাে-
নয় তাে আপনাকে তাে চিনতেই পারতুম না। পাশ কাটিয়ে
চলে বেতুম।
কতনি হয়তাে গেছেন।
হতে গেছিও। তাপসী প্রতিধ্বনি করলে। হয়ত
সূৰ্য্যমুখী
একই ট্র্যামে আপনার সঙ্গে অনেকটা রাস্তা গেছি। ভাবতে
পারেন!
মিহির দোকানির হাত থেকে তার প্যাকেট নিলে। একটু
হেসে বললে, কত সময় যে আমাদের জীবনের নষ্ট হয়েছে তা
আমরা জানতে পারিনে বলেই রক্ষে। নয় তাে বাঁচতে পারতু
‘আর-একটু সময় নষ্ট করবেন ?
‘চলুন। দুজনে একসঙ্গে যেতে লাগলাে।-কোন্দিকে?
‘কোথায় গেলে কার্পেটের আসন পাওয়া যাবে বলতে পারেন?
.
জানেন না ?
“যেখা যাক খুজে।
মার্কেটের ঠাণ্ডা, আধাে-অন্ধকার অলি-গলি দিয়ে তারা ঘুরতে
লাগলাে। মিহির বললে, এই জিনিসপত্র কেনা আর-এক
‘কেন, আমার তাে বেশ ভালােই লাগে। বােধ হয় পয়লা
খরচ করতে পেরে আমার ভ্যানিটি খানিকটা খুশি হয়।
‘যদি সেটা বাজে খরচ হয়। নেহাৎই দরকারি জিনিসের
জন্য খরচ করতে হলে আমাদের কেমন যেন রাগ হয়।
“ তাে হবেই। আমাদের বেঁচে যে থাকতে হবে, এ তাে
৮
সূৰ্য্যমুখী
জানা কথা। সেটা আমরা একরকম ধরেই নিই। সে-জু যে-
খরচটা করতে হয়, সেটা, তাই, বড় বেশি গায়ে লাগে। মনে
হয়,পয়সাটা একেবারে জলে গেলাে। বদলে কিছুই পেলুম না।
যে-খরচ আমাদের না-করলেই নয়, তাতে কোনাে মজা নেই।
মুদি দোকান অত খারাপ লাগে তত সেই জন্যেই। মুদি
লােকটি যে পৃথিবীতে আত্মাহীনতার একটা প্রচলিত দৃষ্টান্ত তা
তার নিজের দোষে নয়, তার পণ্যের দোষে। সংসারে বাড়িওয়ালা
নামক জীব বােধ হয় সব চেয়ে বেশি বিদ্বেষের পাত্র। অথচ
তার কী দোষ? এদিকে এসেন্সের দোকানে গিয়ে অত্যন্ত
বেশি খরচ করতে শুধু যে আমাদের খারাপ লাগে না, তা নয়,
খরচ করতে পেয়ে আমরা খুশি হই। সেখানে, এমন কি, দোকানির
কাছে আমরা কৃতজ্ঞ বােধ করি। সে-লােকটিকে আমাদের ভালাে
লাগে, যদিও মুদি কি বাড়িওয়ালার সঙ্গে তার মূলগত কোনাে
পার্থক্য নেই।
পাওয়া গেলাে দোকান। তাপসী তার জিনিস কিনলে।
মিহির সেটা হাতে তুলে নিয়ে বললে : ‘এখন বাড়ি যাবেন তাে?
‘আপনি?'
‘আমি বাড়ি যাব। চলুন আপনাকে ট্রাম পর্যন্ত পৌছিয়ে
ফিরে আসি।
‘আপনিও চলুন না আমাদের ওখানে।
৫
সূৰ্যমুখী
।
‘দোষ কী?
এখন কী করে হয় ?
‘কিছুতেই হয় না?
মিহির দুপুরবেলায় সহরে গিয়েছিলাে কাজে, এই ফিরছে।
নিজেকে তার অপরিচ্ছন্ন, ধুলিময় মনে হচ্ছিলাে। ঠিক এইভাবে
তাপসীর সঙ্গে চলে যেতে খুঁতখুঁত করছিলাে তার মন। তাই
সে বললে;
‘বাড়ি হয়ে যেতে পারি--যদি বলেন।
‘আমি তাে অনেক আগেই বলেছিলুম।
মিহির ক্ষীণ হেসে বললে, 'না, আজকে ঠিক যাবে।
দু’জনে মার্কেট থেকে বেরুলাে । তাপসীর ট্রাম ধৰ্মতলায়
-বেশ খানিকটা হাঁটতে হবে। তাপসী মিহিরের নিযুক্ত হাতের
দিকে তাকিয়ে বললে : ‘আমাকে না-হয় একটা দিন—যদি
অসুবিধে হয়।
না-হয় অসুবিধে হ’লােই একটু।
একটু সময় তারা চুপচাপ হাঁটলে। এম্পায়ার থিয়েটারের
দেয়ালে সিনেমার জ্বলন্ত পােটর : এক অর্ধ-নগ্ন, অর্ধ-শায়িত
স্ত্রী-মূত্তি এক পা উপর দিকে তুলে দিয়ে হাসছে-সে-হাসিতে
সম্পূর্ণতম, বিশুদ্ধতম নির্বুদ্ধিতা।
সূৰ্য্যমুখী, ‘তবু আমরা গর্ব করে বলি’, মিহির বললে, “যে এটা হচ্ছে পৃথিবীর সভ্যতম যুগ। “কিন্তু সাধারণ লােকের জন্য কী ব্যবস্থা করবেন? সবাই তাে আর তারার গতিবিধি লক্ষ্য করে’ কি রবীন্দ্রনাথ পড়ে অবসর কাটাতে পারে না। ‘যা-ই বলুন না, মােজ এত লােক এই-সব জিনিস দেখছে, এবং দেখে উল্লসিত হচ্ছে, তা ভাবলে আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না। ‘একমাত্র সানা এই যে না-দেখেও পারা যায়। যার যেমন খুলি তেমনি জীবন কাটাতে পারে। ‘সবাই পারে? ‘কেউ-কেউ তাে পারে। যারা পারে না, তাদের নিজেদের কোনাে জীবন নেই। তারা প্রত্যেকে বিরাট গণ-মনের এক- একটা স্পন্দন। ‘তা হলে তাে সব ভাবনাই ঘুচলল। ‘আপনার নিজের যাতে কোনাে ভাবনা না থাকে, আজকালকার সভ্যতার সেটাই তাে উদ্দেশ্য। তারা সব ভেবে রেখেছে আপনার হয়ে। আপনি কী করবেন। কী পড়বেন, কেমন করে সন্ধ্যা কাটাবেন। ছুটিতে কোথায় যাবেন। এটা কি কম আরাম! আর আপনার হৃদয়ে কী প্রবল গণ-উচ্ছ্বাস এসে লাগে, যখন আপনি দেখেন অঙ্গ সবাই তা-ই করছে, তাই
সূৰ্য্যমুখী
পড়ছে, সেখানেই যাচ্ছে। অসংখ্যের একজন হবার মহৎ আনন্দ
প্রতি মুহূর্তে পাচ্ছেন আপনি।
মিহির বললে, নিঃশ্বাস ছেড়ে, ‘জনগণ-মন-অধিনায়ক
জয়ছে।
‘অবিশ্যি হতাশ হবার কিছু নেই। পৃথিবীর যা-ই হােক,
আমার কিছু এসে যায় না। আমি তাে আমি নিজের মনে।
তা কি পারেন-সব সময়? পৃথিবী আপনাকে কখনােই
একবারে একা থাকতে দেবে না।
‘তবু—যদি বুঝতে পারি, যদি ছটফট করতে পারি, তাহলেই
মনে করবাে বেঁচে গেলুম ।
তারা ধর্মতলায় এসে পড়লো। রাস্তা পার হয়ে তাপসী
বললে :
ক্লিান্ত লাগছে। সম্প্রতি এই বিষাক্ত সভ্যতায়
অস্থতম সৃষ্টি ট্রামগাড়ির জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।
সেই সন্ধ্যা মিহির কাটালাে তাপসীর সঙ্গে। সে তাকে পেলে
ছােট ঘরে, সামান্য তার আসবাব। সেখানে বসে সে পরবে
কাজকর্ম করে। নিচু একটা ক্যানভাসের ইজি-চেয়ারে বলে সে
একটা চিঠি পড়ছিলাে। তার পরনে সাদা তাঁতের শাড়ি, লাল
মখমলের চটিতে ঢােকানাে তার পা। মিহিরকে দরজার কাছে
দেখে চিঠিটা খামে ভরে রেখে সে উঠে দাড়ালাে।
—“যাক, আপনি সত্যি-সত্যিই তা হলে এলেন।
।
অনেকে
সূৰ্য্যমুখী
‘আপনার কাজে বাধা দিলুম ?
‘মােটও না। এখানেই বসবেন—না, পাশের ঘরে যাবেন ?
এখানেই তাে ভালাে। ছােট ঘরই আমার ভালাে লাগে।
ঘরে যে আর একটিমাত্র চেয়ার ছিলাে, মিহির তাতে বসলো।
তাপসী জিজ্ঞেস করলে।
‘এতদিন কী করলেন?
‘কী করলুম? কই, কিছুই তাে মনে পড়ছে না।
‘সেটা এমন-কিছু খারাপ নয়, ভেবে দেখতে গেলে।
‘না। জীবনের নিবিড়তম সুখের মুহূৰ্ত্ত, বরং।
বলবে আলস্য—কিন্তু সে-আলস্য শুধু শরীরের।
জানি। মনটা ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত আকাশ ভরে; নিজেরই
ভিতর থেকে উৎসারিত কোনাে স্রোত।
মাঝে-মাঝে এমন হয় যে যেদিকে তাকাই সেখানেই মনে
হয় কী রহস্য। নতুন কোনাে দৃষ্টিতে জীবনকে দেখবার মত।
একটা লাইন পড়লে পাঁচ মিনিট চুপ করে থাকতে ইচ্ছে করে।
এক সঙ্গে এত কথা মনে আসে যে কোনােটাই লেখা হয় না।
এক কথায়, কাজ যাকে বলে, তা হয় না কিছুই।
‘কেন যে মানুষকে কাজ করতেই হবে।
‘কেন যে সবাইকে কাজ করতে হয় তা তাে জানেন।
‘সে-কথা নয়। যদি নিছক জীবিকার জন্য কাজ হয়, তাতে
সূৰ্যমুখী
বোধ হয় বিশেষ কিছু এসে যায় না। সেটা নেহাৎই যান্ত্রিক,
মন সেখানে থাকে নিঃসাড় হয়ে।
না কি-মনকে তা নিঃসাড় করে তােলে?
‘জানিনে, তাপসী হেসে বললে, অভিজ্ঞতা নেই।
‘ছেলেবেলা থেকে আমাদের শেখানাে হয়েছে কাজের মাহাত্ম্য।
কোন্ বালক তার জন্মদিনে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের আত্মজীবনী
উপহার না পেয়েছে ? এত বলবার দরকার হয় কেন? মানুষের।
স্বভাবে নিশ্চয়ই কাজের প্রতি সহজ একটা বিমুখতা আছে।
‘যদি না সে-কাজে আনন্দ থাকে।
‘যদি না সে-কাজে আনন্দ থাকে, মিহির বললে, “যদি না
সে-কাজ খানিকটা খেলা হয়। কিন্তু আজকালকার সব কাজই
এমন ছাঁচে-ঢালা, ব্যক্তিকে তা কোনােখানে স্পর্শ করে না।
কিন্তু মানুষকে কােনো একটা অবলম্বন দিতে হয়—কোনােভাবে
তাকে জানানাে চাই যে সে সার্থক। সেইজন্য বেঞ্জামিন
ফ্র্যাঙ্কলিনের দরকার। কাজের জন্যই কাজ।
‘আরাে আছে। টাকার জন্য কাজ। যে-আনন্দ মানুষ
কাজের ভিতর দিয়েই পেতে চায়, তার বদলি হিসেবে তাকে দেয়া
লােভর উত্তেজনা। কেবল পয়সা করারই পরম মাহাত্ম্য, তাতে
বিশ্বাস না-করলে কি আপনি মনে করেন এত লােক দিনের পর
দিন এমন অনাপত্তিতে অবিশ্রান্ত কাজ করে যেতে পারতাে.
ত
সূর্যমুখী
‘কোনােখানে একটা বিশ্বাস থাকতে বাধ্য। যার যে-ধর্ম,
তার সমর্থন না পেলে মানুষ কিছু করতে পারে না। সমগ্র
জাতির একটা সম্মিলিত ধৰ্ম্ম থাকে। এক-এক যুগে তা এক-এক
রকম।
একটু ছেদ। মিহির তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাপসীর দিকে তাকালাে।
ঝকঝক করছে তার চোখ, তার লাল পাল ঠোটের প্রান্ত ক্ষীণতম
হাসিতে বাঁকানাে। একটা চাবুকের মত, তার শরীর। তার
সাদা শাড়ির উপর খয়েরি বুটি ভােলা, যেন ছােট-ঘােট কৌতূহলী
চোখ ফুটে রয়েছে। একটু সময় মিহির তার দিক থেকে চোখ
ফেরাতে পারলে না। তারপর সে বললে, নিজের কথার জের
টেনে।
সব সময় আমাদের আজকাল ভয়, পাছে সময় নষ্ট হয় ।
সময় নষ্ট না-করবার এই মর্মান্তিক চেষ্টায় বনকে আমরা নষ্ট,
করে ফেলেছি।
‘যদিও আমরা তা জানিনে। আর সেটাই সব চেয়ে খারাপ,
জীবনকে আমরা ইটের দেয়ালের মত নিরেট করে’ তুলি, আর
মনে-মনে বলি, খুব কষে’ খানিকটা বাচা গেলাে। চলতি ভাষায়
যাদের বলে কৃতীপুরুষ, তাদের যে-কোনাে একজনের জীবনের
কাহিনী যে-সুরে লেখা হয় তাইতেই বােঝা যায়।
‘আপনি যদি নাই জানতে পারেন, তা হলে, আর যা-ই হােক,
১৪
সূৰ্যমুখী
আপনাকে অসুখী হতে হয় না। বিপদ তাদেরই যারা এখনাে
সময়-ধর্মের প্রভাবে সম্পূর্ণরূপে মগ্ন হয়ে যায়নি। যারা এখন
বাঁচতে চায় ; মানুষের একা থাকবার পবিত্র অধিকারকে যারা
ছাড়তে চায় না।
‘তারা অসুখী হবে, তারা দুঃখ পাবে। কিন্তু তাদের কোনো
ভয় নেই। হয়তাে তাদের পক্ষে সুখী হবার প্রয়ােজন নেই।
হয়-তত অন্যকোনাে রকম সুখ তারা পেয়েছে, যাতে সমস্ত পুষিয়ে
যায়।
‘তা-ই আশা করা যাক।
‘কিন্তু তা-ই যে।
‘ঠিক জানেন?
‘আপনি কি জানেন না ?
তাপসীর উজ্জল, টানা চোখের পরিপূর্ণ দৃষ্টি মিহিরের মুখের
উপর এসে পড়লাে। সে-দৃষ্টি যেন বড় বেশি দেখছে, মিহির
চোখ নামিয়ে নিলে। প্রশ্নটা এড়িয়ে নিয়ে সে বললে :
‘আমি ভেবে দেখেছি আমাদের একমাত্র মুক্তি হচ্ছে আলখে।
‘কিন্তু সে-মুক্তি সহজ নয়। সত্যি বলতে, কিছু নাকরে
থাকার মত কঠিন আর-কিছু নয়। মানুষ নিজের নিঃসঙ্গতাকে
ভয় করে। আয়-কিছুর জ না হলেও, নিজের হাত থেকে
বাঁচবার জন্য মানুষকে কাজ করতে হতাে।
*
সূৰ্য্যমুখী
‘না, সহজ তাে নয়ই, মিহির একটু চুপ করে থেকে বললে,
‘মানুষের সব চেয়ে কঠিন সাধনা হচ্ছে আলস্য। আমরা যদি
মাঝে-মাঝে অলস হতে পারতুম, তা হলে বেঁচে যেতুম। শান্ত,
সােনালিকম অলস। যদি মাঝে-মাঝে ভুলতে পারতুম আমাদের
এই প্রাণঘাতী চেষ্টা! সুখী হবার চেষ্টায়, বুদ্ধিমান হবার চেষ্টায়,
ভালােবাসবার চেষ্টায় আমরা মরে যাচ্ছি। তারপর, তাপসীকে
নীরব দেখে :
‘আমাদের লেখাতেও সেই চেষ্টা। আমরা যেন এক মুহূর্ত
ভুলে থাকতে পারিনে যে আমাদের ভালাে লিখতে হবে।
আত্মপ্রকাশ করবার নিষ্ঠুর চেষ্টায় আমরা আত্মহত্যা করি। সব সময়
কি আত্মপ্রকাশ করতে হবে? কিছু ফেলে ছড়িয়ে দিতে হয়,
প্রকৃতিতে অজস্র অপব্যয়। যেখানে অপব্যয় নেই, সেখানে
লাবণ্য নেই। আর এই অপব্যয়কেই আজকাল আমরা সব চেয়ে
ভয় করি। সময়ের অপব্যয়কে ভয় করি, চিন্তার অপব্যয়কে ভয়
করি। আমাদের চিন্তার প্রত্যেকটি ছেড়া মুতােকে আমরা
লেখার মধ্যে গুজে দিতে চাই, জমিয়ে রাখি সেগুলাে মনের মধ্যে।
হারাতে পারিনে। সব সময় আমরা আত্ম-সচেতন, সতর্ক।
জীবন থেকে সব সময় কিছু-না-কিছু টেনে বার করতে আমরা
প্রত। আমাদের ফাকি দেবার উপায় নেই। কখননা আমরা
নিজেকে একটু ছেড়ে দিইনে, মিশে যাইনে আশে-পাশের
भूयायी
আবহাওয়ায়, কখনাে ভয়ে’ উঠিনে নিশ্চিন্ত শান্তিতে। কখনাে
জোর করে বলতে পারিনে-বয়ে গেলাে! সব সময় আমরা
ভাবি, ভাবি, ভাবি; যে-কোনাে জিনিস নিয়ে ভাবি, নিজেকে
নিয়ে সব চেয়ে বেশি ভাবি।
এমনি তারা কথা বললে, শীতের সন্ধ্যা ভরে’ ছােট সেই ঘরের
নিবিড় আবহাওয়ায়। বাইরে, রাস্তায় ধোয়া জমে উঠলাে, ধোয়া
কেটে গেলাে, কালাে আকাশে ঝকঝক করে উঠলাে তারা,
পূবের আকাশে দেখা দিলে কালপুরুষ। আর তারই কোণ
ঘেঁষে কখন উঠে এলাে কৃষ্ণপক্ষের কোণ-ভাঙা স্নান চাদ। তারা
দু’জন যখন একসঙ্গে বেরিয়ে এলাে বারান্দায়, হঠাৎ সেই চাদ
পড়লাে তাদের চোখে। দুজনে একসঙ্গে থমকে দাড়ালাে,
স্তব্ধ হয়ে গেলো। আর একটু পরে :
চাদ! রুদ্ধশ্বর তাপসী বলে উঠলাে।
‘আপনার কি মনে হয় চাদ জানে? মিহির জিজ্ঞেস করলে।
কী জানে?
‘এই—এতক্ষণ আমরা যা-কিছু বলছিলুম। চা কি মনে-
মনে হাসে ?
তাপসী কিছু বললে না। তারা আরাে কয়েক পা এগিয়ে
এলাে সিড়ির দিকে। মিহির আবার বললে, কেন আমরা এত
কথা বলি, আকাশে যখন চাদ রয়েছে ?
সূর্যমুখী বাইরের ঠাণ্ডায় তাপসী হঠাৎ একটু কেঁপে উঠলাে। খুব আস্তে-আস্তে সে বললে, ‘চাই জানে। ‘া—চাদ তাে সেই কথাই বলে যা আমরা সবাই বলতে চাই, কিছুতেই বলতে পারিনে।' বলে মিহির সিড়িতে নেমে এলাে। তারপর একবার মুখ ফিরিয়ে তাপসীর দিকে তাকালাে- আর হঠাৎ তাপসীর ঈষৎ-ক্লান্ত চোখের উপর থেকে কী যেন একটা আবরণ সরে গেলাে, উজ্জ্বল, উত্তপ্ত স্রোতে নেমে এলো তার দৃষ্টি, অন্ধকার বন্যার মত, তারাময় ঘূর্ণির মত। আর- কোনাে কথা হলাে না। রাস্তায় বেরিয়ে মিহির আবার শীতের শ্বেত চাদের দিকে তাকালাে। আর তার মনে ভরে গেলাে এক আশ্চর্য্য শান্তিতে। চাষ তাকে স্পর্শ করেছে, চাদ তার বুকের উপর লুটিয়ে পড়ে বলছে, ‘ভয় নেই। হঠাৎ তার বুকের মধ্যে নতুন এক শান্তির চেতনা। সে দ্রুতপদে কয়েক পা হাঁটলাে, তারপর তার মনে পড়লে মৃণালের কথা। আশ্চৰ্য্য-মৃণালের কথা আজ সে কী সহজে ভাবতে পারছে। সে আর অকে ভয় করে না—তার বুকের মধ্যে আজ চাঁদের আশ্চৰ্য শান্তি। আএইবার সে জয়ী হবে মৃণালের উপর। এতদিনে তার মুক্তি। কী দীর্ঘ, দীর্ঘ যন্ত্রণা সে পেয়েছে—মাত্রির সেই শৃঙ্খল, অন্ধকারের পাষাণ- নিষ্পেষণ। নিজের মধ্যে সে দীর্ণ হয়ে যাচ্ছিলাে। কিন্তু সে ৯৮
সূৰ্যমুখী
চাঁদকে ভুলে ছিলাে। সে জানতাে না নেপথ্যে অপেক্ষা করছে
চা—একদিন তা বেরিয়ে আসবে সময়ের ঘােমটা ছিড়ে।
আজ সেই উনােচন। আজ সে উঁদকে পেয়েছে—তার বুকের
মধ্যে, তার বুকের মধ্যে। তা তাকে সম্পূর্ণ করে তুলবে,
ফিরিয়ে আনবে তার অখণ্ডতা। এইবার তার মুক্তি।
১৯
} ৮ আর সেই চাদ মিহিরকে ভরে তুললাে। যে-চাদ আমাদের রক্তের সমুদ্রকে আকর্ষণ করে, যার সঙ্গে আমাদের রক্তের চিরকালের অতীন্দ্রিয় সংবেদন। সেই সুদূর, সেই মধুর, সেই নিষ্ঠুর চাদ! যা আমাদের উতলা করে, উদ্ভ্রান্ত করে ; ঘুমের মত যা নরম, হত্যার মত যা তীব্র; বিরহ-রাত্রির মত মদির, সমুদ্রের মত হিংস্র; যার স্পর্শে রক্তে বিষ জলে ওঠে, যার স্পর্শে অনির্বচনীয় শান্তি ; যার জন্য আমরা মরতে পারি, যার জন্য আমরা তারা হয়ে উঠতে পারি । যা আমাদের মধ্যে প্রেরণ করে অদ্ভুত খেয়াল, অসম্ভব কল্পনা ; যার জন্য আমরা দুঃসাহস করতে পারি, নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পারি, উপলব্ধি করতে পারি আমাদের চরম নিজত্ব। এবং যার জন্য, বিপর্যস্ত, উন্মথিত, উন্মত্ত, আমরা নিঃশেষ হয়ে যেতে পারি অপরূপ সর্বনাশে। আশ্চৰ্য্য, মিহির সহস্রবার নিজের মনে বললে, আশ্চৰ্য। হঠাৎ এ নেমে এসেছে প্রবল, অন্ধকার স্রোতে, ভেঙে পড়েছে তাদের উপর ক্ষুধিত সমুদ্রের মত। এখন আর-কিছু করবার নেই, কিছু ভাববার নেই। রক্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে চিরন্তন চাদের টানে, লুটিয়ে পড়ছে তার শরীর-প্রান্তে—আকাশের অস্পষ্ট- চাদের মত সেই তার শরীর। প্রায়ই সে যেতাে তাপসীর কাছে। কখনাে থাকতে দলের
*
:
কেউ-সাধারণ আজ্ঞা হতাে। কখনাে সেই ছােট ঘরে দু'জনে
বসে একটু-একটু করে চা খেতে খেতে আন্তে-আস্তে কথা বলা
এলােমেলাে, খেয়ালি, অলস কথা—যখন যেমন মনে আসে।
কোনােদিন তাপসীর কোনাে বন্ধু আসতাে গাড়ি নিয়ে : দল
বেঁধে তারা যেতে শহরের বাইরে, শীতের কলােমলাে সকালবেলায়,
রাস্তার উপর হালকা-নীল কুয়াশা, বাতাসে ধার। গাড়ি ছুটতে
ঘণ্টায় চল্লিশ মাইল যশাের রােড দিয়ে, বাতাস মুখে লাগতাে
চাবুকের মত, আঙুলের ডগাগুলাে অসাড় হয়ে উঠত : তাপসী
খোঁপা পড়তাে ভেঙে, বিশ্বায়িত হ’ততা চোখ, পিছন দিকে মাথা
হেলিয়ে হঠাৎ সে উচ্চস্বরে হেসে উঠতাে। আর তার পাশে
মিহির অনুভব করা যা এর আগে সে কখনাে অনুভব কয়েনি।
এই উজ্জ্বল আকাশের মধ্যে প্রসারিত হয়ে সে অস্পষ্ট দিগন্তে মিশে
গেছে—এই আকাশ তাে সে-ই, সে-ই এই বিশ্ব, বিশ্বের প্রাণকেন্দ্র
সূৰ্য্য। বাতাসে কী নেশা, এই আলাে-কে সে শশাষণ করছে
মদের মত। সে মাতাল হয়ে উঠতাে আপসীর চুলের গন্ধে, তার
মুখের কথা কবিতা হয়ে উঠতে চাইতাে। সে ঠাট্টা করতাে, সে
হেসে উঠতাে, সে কী বলতে জানতাে না। সে যেন চোখের
সামনে দেখতে পেত সমুজে-ফেরা সবুজ ঘণ; বিশাল, কালো
নবীর উপর দিয়ে আস্তে-আস্তে চলেছে মালচোনাে জাহাজ
অত সমুজের জীব, উদ্ভিদের মত দেখতে; সৌরভময়, তারাময়
। সূৰ্যমুখী আফ্রিকার অন্য রাত্রি। উদ্দাম হয়ে উঠতাে তার কানা , যা-কিছু সে পড়েছে আর ভেবেছে, যা-কিছু সে লােকের মুখে শুনেছে, যত ছবি ঘুমের আগেকার মুহূর্তে মনে-মনে সে তৈরি করেছে-সব যেন এক নিবিড় কেন্দ্রীভূত মুহূর্তে একসঙ্গে ভিড় করে আসতাে আর সেই আনন্দে মগ্ন, মুহূর্তের জন্য তাপসীকেও সে ভুলে যেতাে। কি কখনাে সমস্ত দিন তারা বাইরে থাকতাে, কোনাে রবিবার, ফল একটু বড় করে নিয়ে চন্দননগর কি ডায়মণ্ড হার্বর। একটা আগুনের রেখার মত কেটে যেতে ঘণ্টাগুলো। মিহিরের সমস্ত শরীর আনন্দে শিশির, শিশি করতাে। এত হাসি যে কোথা থেকে আসে! যখন সে খেতে, যখন সে ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসত, যখন সে তীরের মত ছুটে-যাওয়া কাঠবিড়ালির দিকে অকালে, যখন পায়ের নিচে শুকনাে পাতাগুলােকে গুড়ো করে দিতে দিতে হাঁটতে-সমস্তই যেন আশ্চৰ্য, বিশেষ-কিছু চোখে যেটুকু দেখা যাচ্ছে তা থেকে অন্যকিছু। তারপর বিকেলের দিকে ক্লান্ত, ধুলি-মলিন, চুলে শুষ্কমুখে বাড়ি ফিরে আসা—সূৰ্যময় হৃদয় নিয়ে। এত ভালাে লাগতাে যে শরীর-ভরা ক্লান্তি নিয়েও রাত্রে শুতে যেতে ইচ্ছে করতাে না, ঘুম আসতাে না বিছানায় শুয়ে। আর কখনাে-কখনো, আর কেউ না-থাকলে, দু’জনে তারা বেরুততা—কোথায়, তাতে কিছু এসে দায় না। যে-কোনো রা,
সূৰ্য্যমুখী
যে-কোনাে জায়গাযতক্ষণ তারা একসঙ্গে থাকে। তাপসী
ভালােবাসতে শীতের দুপুরে ঘুরে বেড়াতে—নিছক বেড়ানাে,
কোনাে উদ্দেশ্য না নিয়ে। ভালােবাসতে ট্রামের জানলা দিয়ে
ময়দানের দিকে তাকাতে, ভালােবাসতে চৌরঙ্গি। কখনাে তারা
মার্কেটে গিয়ে খামকা কোনাে জিনিস কিনতে, কখনাে যেতে
মিউজিয়মে,, মানুষের ক্রমবিবর্তনের বিভিন্ন স্তরের
দেখতে-ক্লান্ত বােধ করলে কোনাে দোকানে ঢুকে পড়তে চায়ের
কলকাতাকে তারা যেন নতুন করে আবিষ্কার
জন্য।
করলে।
এমন বিষয় নেই তারা যা আলাপ না করতাে। শুধু একটা
কথা তারা দু'জনেই এড়িয়ে চলত, মিহিরের বাড়ির কোনাে
প্রসঙ্গ কখনাে উঠতে না । তাপসী কোনাে প্রশ্ন করতে না,
মিহির দৈবক্রমেও কিছু বলতাে না। সেই একমাত্র নিষিদ্ধ ক্ষেত্র,
যেখানে তারা, কখনাে ঢুকতে পারবে না। সমস্ত কলকাতা
তাদের, কিন্তু ঐ ছােট একটুখানি জায়গা চিরকাল বাইরে থাকবে।
মিহির কখনো তাপসীকে তার বাড়িতে আসতে বলতো না;
এবং তার বিসদৃশতা তাপসীর যেন চোখেই ঠেকতাে না। সত্যি
সে কিছু ভাৰত না, অবাক হ'ত না ; সে ব্যাপারটাকে মেনে
নিয়েছিলাে। তাতে কী এসে যায় ? সে-ও কখনাে ভদ্রতার
হলেও মিহিরের কাছে তার স্ত্রীর উল্লেখ করতাে না। বুঝতে
;
সূৰ্যমুখী
পারতাে, সে তা চায় না। কেন চায় না? কী হবে ভেবে
আর ভাববার সময়ই বা কোথায়।
শুধু এই ব্যাপারে দু’জনের নিচ্ছিদ্র স্তব্ধতা—কোথাও তার
এতটুকু চিড় নেই। তাই বলে সেটা কোনােরকম ভার হয়ে
ছিলাে না তাদের মনে ; তারা তা একেবারে ভুলেই থাকতাে।
তাপসীর একথা কখনাে মনেই হয়নি যে সে অন্য কারাে
অধিকার লঙ্ঘন করছে। আর মিহির কখনাে ভাবতাে না তার
নিজের জীবনের উপর মৃণালের কোনাে দখল আছে। মৃণাল
তা চেয়েছিলাে, তার অন্ধ, নিষ্ঠুর স্ত্রীত্বে সে তাকে জড়াতে
চেয়েছিলাে। আর নয়—সেই খাসরােধকারী স্ত্রীত্ব আর নয়।
নিজেকে সে ছাড়িয়ে এনেছে—ঈশ্বরকে ধন্ধুবাদ, নিজেকে সে
ছাড়িয়ে আনতে পেরেছে।
অথচ মৃণালের উপর তার কোনাে বিতৃষ্ণা হলাে না। বরং,
মৃণালের উপর যে-কঠিন ঘৃণা নিয়ে সে উঠে এসেছিলাে রাত্রির
গহর থেকে, তা গলে গেলাে, মিলিয়ে গেলাে। নিজেকে সে আর
ঘৃণা করে না, তাই মৃণালকেও ঘৃণা করবার দরকার নেই। আর
তার কোনাে রাগ নেই কারাে উপর। স্ত্রীর সঙ্গে সে আজকাল
অনেক বেশি স্বচ্ছল; সহজে সে তার দিকে তাকাতে পারে,
সহজে কথা বলতে পারে। সে তাকে পরাস্ত করেছে; এখন,
আই, তাকে অনায়াসে দয়া করা যায়। সে আর আমলে
সূর্যমুখী
আনবার মতই নয়; তাই তাকে একটু স্নেহ করতে কোথাও
বাধে না। যেমন আমরা স্নেহ করি পােষা বিড়ালকে, মাঝে-মাঝে
তাকে নিয়ে একটু সময় নষ্ট করি। স্ত্রীর প্রতি মনের প্রবল
বিমুখতা যে সে কাটিয়ে উঠতে পারলে, তাতে তার উপর তার
জয় সম্পূর্ণ হলাে।
রাত্রে সে বাড়ি ফেরে, তাপসীতে আচ্ছন্ন হয়ে। মৃণাল অপেক্ষা
করে’ আছে চেয়ারে বসে’, বরাবর যেমন করেছে। মিহির
ঘরে ঢোকে, মুচকি হাসে। সে-হাসি মৃণালের জন্য নয় ; তবু,
মৃণালের দিকে তাকিয়েই হাসে।
তার শব্দ শুনে হৈমন্তী উঠে আসেন :
‘ক’টা বেজেছে রে?
মিহির ঘড়ির দিকে না-তাকিয়ে বলে, এই সাড়ে দশটা
হবে।
‘এত দেরি করিস কেন?
‘দেরি হয়ে যায়।
‘এই শীতের মধ্যে মৃণাল বলে থাকে।
থাকে কেন? আমি কি বলি? তারপর বলে হেলে :
“নাহয় কলােই। তুমি যা করতে পারতে, মৃণাল তা
পারবে না?
আর-একটু আগে ফিরলেই তাে হয়।
';
সূৰ্যমুখী
যতই দেরি করি, গরম ভাত তত নিশ্চিত।
খেতে বলে সে এমনি কয়েকটা কথা বলে। ভাসা-ভাসাভাবে,
প্রায় নিজেই না-বুঝে।
যে-সব কথা তার মনের নেহাৎই
উপকার স্তরের। নিজে বলে সে নিজেই শুনতে পায় না।
সারাক্ষণ তার মনের মধ্যে চলেছে অন্যকিছু। অ-কোনাে
সুর বেজে চলেছে তার গভীর চৈতন্যে, সারাক্ষণ।
খাওয়ার পর, অনেক রাত পর্যন্ত টেল্যাম্পের ধারে মাথা
নিচু করে সে বসে থাকে। বসে-বসে কবিতা লেখে। তাপসীকে
স্মরণ করে, তাপসীর উদ্দেশ্যে। ছোট-ছােট কথাগুলাে যেন
রাত্রির চিরে তাপসীর কাছে উড়ে চলে যায়, এক
ঝক কালাে পাখির মত-সেখানে, তাপী যেখানে শুয়ে
আছে, তার চুলের মত নরম অন্ধকার সমস্ত ঘর ভরে। তার
মনে হয়, তাপসী জানে। সে জানে যে রাত্রির এই স্তব্ধ মুহূর্তে
মিহির সমস্ত বিশ্বের মধ্যে একমাত্র তারই কথা ভাবছে। ঘুম
আসছে না তারও চোখে। অন্ধকারে, মিহিরের এই কথাগুলাের
পাখা-ঝাপটানি সে শুনতে পাচ্ছে। তার বিছানা ঘিরে তারা
ঘুরছে, উড়ছে—ছােট-ঘােট, কালাে পাখির ঝাঁক। লুটিয়ে পড়ছে
তার বুকের উপর। তাদের নরম উষ্ণতা তার শরীফে আর
মিহিরের মন অদ্ভুত এক পরিপূর্ণতায় উদ্বেল হয়ে ওঠে: তাপসীকে
সে অনুভব করে, তার কাছে, তার চারদিকে, এই তার সমস্ত
সূৰ্য্যমুখী রাত্রিতে। তাপসীর কাছ থেকে সে কখনাে দূরে যেতে পারে না। সে প্রবাহিত হচ্ছে তাপসীর দিকে অন্ধকার, উষ্ণ স্রোতে, এই অদৃশ্য, অন্ধকার রাত্রির ভিতর দিয়ে। সে ঝরে পড়ছে তাপসীর উপর, নীরব অজস্রতায়, এই অনির্বচনীয় অন্ধকারের আর ঘরের অন্যদিকে, অস্পষ্ট ছায়ারাশির মধ্যে, মৃণাল ঘুমিয়ে থাকে ? ঘুমিয়ে ? অন্ধকারের মধ্যে কালাে চোখ মেলে, সে কি ভেবেভেবে অবাক হতে থাকে ? সে কি সন্দেহ করে, সে কি বুঝতে পারে? সে কি প্রার্থনা করে? সঙ্কল্প করে ? সে কি মনেমনে। বলে, অন্ধকারের কানে-কানে কিছু বলে ? যা-ই হােক, তাকে দেখে কিছু বােঝা যায় না। সে ছায়াতে লীন। সে চির-অস্পষ্ট। আর দিনের বেলায় সে ঘুরে বেড়ায় সংসারের অসংখ্য কাজে, শান্ত, নিঃশব্দ, পােয্য বিড়ালের মত। যেমন বরাবর সে করেছে। নিজেকে সে ঢেলে দেয়, ঢেলে দেয়, তার স্বামীর পরিচৰ্য্যায়। তাই সে পারে, তা ছাড়া আর কিছুই সে পারে না। মিহিরের শারীরিক জীবনের তুচ্ছতম খুটিনাটির উপর তার হ্রাত। এমন কখনাে হয়নি যে সে গানের শেষে বাথরূমের রায় তার চটি না পেয়েছে, কি বিকেলে বেয়ােবাৰ সময় হাতের কাছে কুঁচোনন কাপড়। কিন্তু এতদিনে সে-সব * তার অভ্যেসে দাড়িয়ে গিয়েছিলাে; কিছু আর তার চোখে পড়ে ১৭
সূৰ্য্যমুখী
না, গায়ে লাগে না। এ-কথা মনে করতেই সে ভুলে গেলাে কে
মৃণাল রয়েছে এই-সমস্তর মুলে।
কিন্তু হৈমন্তী লক্ষ্য করছিলেন। মার চোখের মত ভয়ঙ্কর
চোখ পৃথিবীতে আর নেই। দুরে থেকে, নিঃশব্দে, তীব্র, হিংস্র
দৃষ্টিতে তিনি দেখছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন তাঁর ছেলের
অস্বাভাবিক উজ্জ্বল চোখ। আশঙ্কায় তার বুক কেঁপে উঠলাে।
তাঁকে জানতে হবে। মিহিরের চোখের সেই উজ্জ্বলতাকে ম্লান
করতেই হবে। অত সুখী হওয়া অন্যায়। এত সুখী হতে
তাকে দেয়া যায় না—তার কঠিন, একাগ্র মাতৃসত্তায় তিনি তাই
ঠিক করলেন।
তাই একদিন সন্ধের সময়, একটু আগে মিহির তাপসীর
কাছ থেকে ফিরেছে—দুপুরবেলায় তার সেখানে খাওয়ার নিমন্ত্রণ
ছিলাে-হৈমন্ত ছেলের কাছে এসে দাড়ালেন।
‘এতক্ষণে ফিরলি ! চা খাবিনে?
‘খেয়ে এসেছিল ?
‘আচ্ছা, যাও এক পেয়ালা।
‘চা খেয়েছি একবার ?
‘ও-সে কথন, এখন আর-একবার হলে খাওয়া যায়।
‘কোথায় খেলি চা?
তার মা-র,
সূর্যমুখী
--ওদের বাড়িতেই।
‘খানেই ছিলি এতক্ষণ?
মিহির তার মা-র মুখের দিকে একবার তাকিয়ে চুপ করে
রইলাে। বিশ্রী লাগছিলাে তার এসব প্রশ্ন।
দাড়াবার ভঙ্গিটাও তার ভালাে লাগলাে না। তিনি যেন কোনাে
উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছেন, মনের মধ্যে কোনাে স্থির সঙ্কল্প। কিন্তু
কেন? নিজের কঠিন ঠাণ্ডা ইচ্ছাকে প্রসারিত করবার কেন
এই চেষ্টাসব সময়, সব সময়?
হৈমন্তী আবার জিজ্ঞেস করলেন। ওখানেই ছিলি এতক্ষণ?
‘ওখানেই ছিলুম।
‘কাদের বাড়ি—যেখানে গিয়েছিলি?
‘এক বন্ধুর বাড়ি।
‘কে সে? :
এতদিনের মধ্যে মিহির কখনাে বাড়িতে তাপসীর নাম উচ্চারণ
করেনি। সম্পূর্ণই যে ইচ্ছে করে’ করেনি, তা নয় ; কোননা
দরকার হয়নি, কোনাে কারণ ঘটেনি। কারণ ঘটলে হয়তাে
করতাে। তবে এটা ঠিক যে তাপসীর সম্বন্ধে বাড়িতে যে কিছু
বলা হয়নি তাতে সে খুসিই হয়েছিলাে। সব কথাই বলতে
হবে, তারই বা কী মানে আছে ? কোনাে-কোনাে কথা হয়তাে
-বলাই ভালাে।
১০১
সূর্যমুখী
হৈমন্তী আবার জিজ্ঞেস করলেন, কে সে?
রাগে মিহির ম্লান হয়ে গেলাে। মা তার উপর আবার তাঁর
জোর খাটাতে চাচ্ছেন—তাঁর নির্মম ইচ্ছার জোর। তাকে
উন্মােচিত, উন্মুক্ত না-করে তিনি ছাড়বেন না। মা-র কাছে
সে কখনাে মিথ্যে বলতে পারে না, যেমন সে পারে না নিজের
মাংসের মধ্যে ঢুকি ঢুকিয়ে দিতে। শারীরিকভাবে তা অসম্ভব।
এবং হৈমন্তী তা জানেন। জেনে সেটা ব্যবহার করতে চান,
নিজের উদ্দেশ্যে, নিজের অধিকার-লােভের চরিতার্থতায় ।
আর, মিহির যতক্ষণ চুপ করে আছে :
তুই তাে আজকাল মােটে বাড়িতেই থাকিসনে’, হৈমন্তী
বললেন। মৃদুস্বরে, শান্তভাবে। তার কথার সুরে কোনাে
অভিযােগ নেই, আক্ষেপ নেই। তিনি কেবল একটা ঘটনার
উক্তি করছেন। শান্ত, নিশ্চল তিনি দাড়িয়ে, স্তম্ভের মত কঠিন।
কেন্দ্রীভূত ইচ্ছার শুম্ভ। আনত তিনি হবেন, না তিনি
বেকবেন না কিছুতেই। মিহির তার দিকে তাকালাে-আর
তার শরীরের গাঁইগুলাে যেন শিথিল হয়ে যেতে চাইলাে।
তবু সে নিজেকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলাে। সে-ও ছাড়বে
। স্থা, শীতকাল-বেড়াতে বেশ ভালাে লাগে; বেপরােয়া
হালকাঘরে সে বললে।
‘তাের এই বন্ধু যায় বুঝি সঙ্গে?
।
•
সূৰ্যমুখী
‘অনেকেই যায়।
কে এই বন্ধু? হৈমন্তীর মুখের একটি পেশী নড়ছে না।
তাঁর চোখ ছেলের মুখের উপর স্থির-নিবদ্ধ, উদাসীন।
মিহির একটু চুপ করে রইলাে ; তারপর আস্তে-আন্তে, স্পষ্ট
করে বললে, তার নাম তাপসী। সে একটা কাগজ চালায়--
আমি লিখি।
মিহির আবার বললে, সে নিজেও লেখে—জাখখানি-পল্লব
কাগজে? প্রায়ই সে এখানে-ওখানে বেড়াতে যায়-আমাকে
যেতে বলে সঙ্গে।
এইবার হৈমন্তী বললেন : ‘তা তুই তাকে মাঝে-মাঝে আসতে
বললেই পারি। সেটা তাে ভালাে দেখায়। না-বললেই
ভালাে দেখায় না।
এটা মিহির আশা করেনি। অবাক হয়ে সে তার মা-
মুখে তাকালাে। আ, তাঁকে হার মানানাে সহজ নয়। তিনি
গভীর। ফিরিয়ে দিতে তিনি জানেন। মিহির একটা সিগ্রেট
ধরালে, তারপর বললে :
বলব একদিন।
‘একদিন তাকে চা খেতে বল। মৃণালকে বলে রাখি
সব ব্যবস্থা করে রাখবে।
১১১
সূৰ্য্যমুখী
মিহির তার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলাে। আসে বােঝে,
না। প্রত্যেকটি কথার অন্তরালের তীক্ষ্ণ ইঙ্গিত সে বােঝে।
প্রত্যেকটি কথা বিষের কেঁাটার মত, তার রক্তে। রাগে ফেনিল
হয়ে উঠলাে তার রক্ত। কিন্তু কিছু বলবার উপায় নেই। সহ
করতে হবে চুপ করে। তার রাগ যে জ্বলে উঠবে তীব্র কথায়,
সে-সুযােগও মা তাকে দেবেন না। বিষের বুদ্বুদ গােপনে ফুটে
উঠবে—বিষ বার করে দেবার রাস্তাও থােলা নেই। বেশ, তা-ই
হােক্ তবে। সে-ও কিছু বলবে না। চুপ করে থাকবে।
চুপ করে’ সহ করবে। তার সহ করা দিয়ে মা-কে ব্যর্থ,
বিপৰ্য্যন্ত করে দেবে। দেখা যাক, কার জোর বেশি।
তার জীবন বয়ে চললাে উতরােল উজ্জ্বল স্রোতে, তাপসীকে
ঘিরে। কিছু সে ভাবলেন, এক মুহূর্ত থমকে দাড়ালাে না।
চাঁদ যদি আকাশ থেকে নেমে এলােই, এমন ভী: কে যে তাকে
সমস্ত জীবন দিয়ে জড়িয়ে ধরবে না, তাকে নেবে না দু’হাত ভরে,
বয়ের অন্ধকার ভরে, সময়ের চিরন্তনতা ভরে। তার জলন্ত
জ্যোতিতে অন্তরের নির্জনতম ঘর ভরে তুলবে না কে ?
কিন্তু বাড়ির মধ্যে তার মা-র নীরব নিস্পলক চোখ। সব
সময় সেই দৃষ্টি তার পিছনে, সব সময়। তার সামনে সে স্বচ্ছ হয়ে
যাচ্ছে, এ প্রবিষ্ট হচ্ছে তার হাড় পর্যন্ত। সব সময়, সব সময়।
মিহির যখন চুল আঁচড়ায়, যখন খেতে বসে; যখন সে জলের
১১২
সূৰ্য্যমুখী
গেলাস মুখে তােলে, যখন টেবিলের উপর আঙুল চেপে ধরে
নখ পালিশ করে—সেই স্তব্ধ অক্লান্ত দৃষ্টি সব সময় তার পিছনে।
তাপসীর উষ্ণ সৌগন্ধ্য থেকে সে যখন ফিরে থাকে, তার ভয় করে
মা-র কাছাকাছি যেতে—সে যেন বিকীর্ণ করছে সেই সৌরভ,
সে যেন বহন করে এনেছে তাপসীর সত্তার নির্যাস। সে তা
লুকোতে পারে না-লুকোতে সে চায়ও না। মা তার চোখের
দিকে তাকালেই বুঝতে পারবেন—বুঝলেনই বা। বুঝলেনই বা
নিজের মনে সে জোর করে বলতাে। আর তবু সে এড়াতে
চাইলে মা-র সেই প্রখর, নির্মম দৃষ্টি। কিন্তু সে ভয় করে না ;
তার বুদ্ধিতে, তার বুদ্ধির শক্তিতে, সে ভয় করে না। সে চাইতে
মা-র দৃষ্টিকে ভুলে থাকতে, অস্বীকার করতে। এবং অস্বীকার
করত, ভুলে থাকতাে।
কিন্তু সব সময় পারত না। যতক্ষণ সে তাপসীর সঙ্গে
থাকতাে, ততক্ষণ তার সম্পূর্ণ অখণ্ডতা। ততক্ষণ সে অনাক্রমণীয়,
কিছু তাকে স্পর্শ করতে পারে না। বাড়ি ফিরে এসে—সই
চোখ, সেই চোখ, সেই চোখ। তার বুদ্ধিবৃত্তির অতীত কোনাে
অন্ধকারে তা ফুটে রয়েছে। সে তাকে উপড়ে ফেলতে পারছে না,
তাকে অন্ধ করে দিতে পারছে না কোনাে চরম আঘাতে। তা
ফুটে রয়েছে—নির্নিমেষ, প্রশ্নহীন, চিরন্তন। তাকে ভুলে থাকতে
সে পারে না।
সূৰ্য্যমুখী
কিন্তু তাকে অস্বীকার তাকে করতেই হবে। আর, এক
তাপসীই তাকে বাঁচাতে পারে, তাকে মুক্তি দিতে পারে মা-র দৃষ্টির
সর্পিল সম্মোহন থেকে। সেখানেই—তাপসীর সেই উষ্ণ-সুরতি
পরিমণ্ডলে-শুধু সেখানেই সে মুক্ত, সে চরম। তাই সে প্রতিহত
তরঙ্গের মত ভেঙে পড়তে তাপসীর কূলে : যতক্ষণ পারত,
তারই সঙ্গে কাটাতে; বাঁচতে তারই মধ্যে ; যখন ছলে’ আসতাে,
তখনও নিয়ে আসতাে তার মধ্যে তাপসীর সূক্ষ্মতম সৌরভ।
১১৪
এমনি করে কাটলাে সেই শীত। মাঘ এসে পড়লাে। লাল
হয়ে উঠছে গাছের পাতা, আকাশ অবিশ্বাস্য নীল। হী-হী
করছে উত্তুরে হাওয়া; তবু হঠাৎ মাঝে-মাঝে বঙ্গোপসাগরে
কোনাে বিপ্লব ঘটে, আর শীতের মাঝখানে দক্ষিণে হাওয়া বয়,
দক্ষিণে হাওয়া বয়, মদির হয়ে ওঠে সন্ধ্যা, রাত্রি খুলে দেয় তার
চুল, ছায়ায় আর গুঞ্জনে, সৌরভে আর রহস্যে সমস্ত পৃথিবী ভরে
যায়। আর মানুষের রক্তের মধ্যে কিসের উষ্ণ উন্মীলন, সেখানে
কথা কয়ে’ ওঠে কোন্ অস্পষ্ট বাসনা।
একদিন তারা বেড়াতে গেলে চিড়িয়াখানায়। কথাটা
তাপসীরই মনে হলাে। মিহিরকে সে বললে ;
‘জু-তে যেতে তুমি ভালােবাসাে না?
‘খুব। আমার একমাত্র আপত্তি মানুষনামের জীবগুলােকে।
সংখ্যায় তারা বড় বেশি।
‘এতই বেশি যখন, আরাে দু’জন বাড়লে কিছু ক্ষতি হবে না।
চলল। মিসেস্ হিপ্পোর একটি খােকা হয়েছে শুনলুম।
সুতরাং তারা গেলাে। বিকেল দুটো প্রায়। বড় দরজা
দিয়ে ঢুকে তাপসী বললে, ‘কোন্ দিকে?
‘একদিকে গেলেই হয়। এখন আমাদের ডাইনে-বাঁয়ে
বিধাতার বিচিত্র সৃষ্টি ।
১১৫
T সূৰ্য্যমুখী ‘মায় মাড়ােয়ারি—এবং লাল মােজা পরা ভদ্রলােক, এদিক- ওদিক তাকিয়ে তাপসী বললে। প্রথমে তারা গেলে শিম্পাঞ্জিকে দেখতে। তারের জালে ঘেরা উঁচু খাঁচার মধ্যে নিঃসঙ্গ শিম্পাঞ্জি। কালাে, বেঁটে, বুড়াে- হয়ে আসা-কোনাে শিল্পীর উদ্দাম কল্পনা-প্রসূত মানুষের কাটুন। সে বসে আছে শরীরটাকে শিথিল করে দিয়ে, দু’পা সামনের দিকে ছড়িয়ে। তার ডান হাত ঝুলে আছে পাশে, বাঁ হাত সে তুলে দিয়েছে কপালের উপর, দেখা যাচ্ছে তার কালাে তেলাের গহ্বর, কানের উপর দিয়ে বেরিয়ে-পড়া লম্বা- লম্বা কালাে-নখ। তার মুখে অপরিসীম জীবন-ক্লান্তি। সে তার দর্শকদের দিকে তাকাচ্ছে না। তার কালাে মুখ গম্ভীর, আত্ম- বিস্তৃত। মিহির তিনবার হাততালি দিলে, কিন্তু তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে না। বুদ্ধের মত দেখতে। তাপসী বলে উঠলাে। ‘কবির মত দেখতে, মিহির বললে, যে-কবি চাদের দিকে তাকিয়ে আছে। যে-মেয়ে তার প্রেমিকের প্রতীক্ষা করছে, তার মত। সত্যি বলতে, আমার মত—এবং তােমার মত। দ্যাখাে, আমাদের মনের ভাব অনেক, কিন্তু মুখের ভাব ধরা- বাধ্য কয়েকটা। রাগে আমাদের মুখ যেমন লাল আর চোখ উল হয়ে ওঠে, আনন্দেও তেমনি। যে-লােক এইমাত্র কারাে সঙ্গে
সূর্যমুখী
তুমুল ঝগড়া করে এসেছে, তাকে দেখে তােমার মনে হবে সে
এইমাত্র তার প্রেমের স্বর্গ থেকে নেমে এলাে।—শিম্পাঞিা কী
ভাবছে, তােমার মনে হয়?
‘ভাবছে—এই কুৎসিত জীবগুলাে কার, অনেকটা
আমার মতই দেখতে, প্রাণপণে আমাকে নকল করবার চেষ্টা
করে ?
তাপসী হেসে উঠলাে।-সুইফট-এর এই শিম্পাঞ্জিকে দেখা
উচিত ছিলাে।
‘সুইফট্ হয়-ততা কল্পনা করতেন একটা চিড়িয়াখানা—সেখানে
মানুষ খাঁচার ভিতরে, আর পশুরা বাইরে। চিড়িয়াখানা বললুম
কিন্তু তাকে জেলখানা বললে ভালাে হয়, কি পাগলা গারদ, কি
দুটোই একসঙ্গে। পশুরা দেখতে যে মানুষ খিদে না-পেলেও
খায় ; বলপ্রয়ােগ করে স্ত্রীর উপর ; ক্ষুধা নিবৃত্তি ছাড়া অন্য
কারণে মারে ; হত্যা করে পরম্পরকে—এবং অনেক সময় সেই
হত্যাকারীদের স্মৃতিপুজা করে ; দেখতে, তারা নিজেদের কল্পনার
দাস, পাপের ভারে জর্জর ; ঈশ্বরকে তারা খােমােদ করে ও
উপঢৌকনে খুসি করতে চায় ; দুঃখ তাদের নিজস্ব ও বিশেষ সৃষ্টি।
আর তারা মাথা থেকে লেজের ডগা পর্যন্ত শিউরে উঠতে-বলতে
“কী ভয়ানক, কী ভয়ানক!”
‘এই—দ্যাখাে, তাপসী মিহিরের হাতে মৃদু ঠেলা দিলে, ও
,
;
সূৰ্য্যমুখী বােধ হয় বুঝতে পেরেছে যে আমরা ওর চেহারা নিয়ে আলােচনা করছিলুম। শিম্পাঞ্জিটা তার ভঙ্গি বদলেছিলাে। হাত থেকে মাথা নামিয়ে এনে দে ভাসা-ভাসা, তীক্ষ্ণ চোখে তার দর্শকদের দিকে তাকালো। তার পুরু ঠোটের কঁাক দিয়ে হঠাৎ ঝলসে উঠলাে বড়-বড় পাতের সাদা আভা। তা মনে হলাে অনেকটা ব্যঙ্গের হাসির মত। তার গােল ছােট কেশহীন মাথায় সে একবার হাত বুলােলে ; তারপর একটু সরে বসে’ অত্যন্ত ক্লান্তভাবে চুপ করে রইলাে। ও কী করবে ভেবে পাচ্ছে না, তাপসী বললে। ও জানে যে আমরা ওর খেলা দেখবার জন্য দাড়িয়ে আছি। ওর মেজাজটা একটু দার্শনিক-ঘেঁষা, এ-সব ওর ভালাে লাগে না। একজন দর্শক তারের জালে বাড়ি মেরে ডেকে উঠলাে, “হেই! শিম্পাঞ্জি মুখ ফিরিয়ে তাকালাে, চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখলাে। তারপর, তার ঘণ্টা বাজবার সঙ্গে-সঙ্গে আবির্ভূত সার্কাসের খেলেয়াড়ের মত, আত্ম-সচেতন,কর্তব্যপরায়ণ, উৎসাহহীন সে উঠে দাড়ালাে, দু’পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ অদ্ভুত একটা মুখভঙ্গি করলে। দর্শকরা হেসে উঠলাে। বেড়া বেঁষে পঁড়িয়ে করুণ, বিমর্ষ চোখে সে হাত পাতলাে। একটা ওল্টানােহঁড়ির মত তার পেট, তার হাত দুটো কুড়ােলের মত ঝুলে রয়েছে, তার বেঁটে পায়ের লম্বা-লম্বা আঙুল দিয়ে সে অদ্ভুত, অসমান পা ফেলছে। ১১৮ সূর্যমুখী অত্যন্ত হাস্যকর, কিন্তু সে এত বেশি মানুষের মত দেখতে যে হাসির মধ্যে হঠাৎ থেমে গিয়ে অবাক হতে হয়। মিহির একটা বৰ্মা-চুরুট ধরিয়ে তারের ফাক দিয়ে ভিতরে ফেলে দিলে। শিম্পাঞ্জি তৎক্ষণাৎ সেটা তুলে নিলে, মুখে দিয়ে প্রাণপণে টানতে লাগলাে। উঠলাে হাসির বােল। দুটি ছােট ছেলে আনান্দে চেঁচিয়ে উঠলাে। কয়েকটা টান দিয়েই সে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিলে। ‘বেচারা! মিহির বললে, ও যদি একবার নেশার স্বাদ পেতে, তা হলে মানুষের প্রতি ওর একটু অন্তত শ্রদ্ধা দু’চার মিনিট শিম্পাঞ্জি তার দর্শকদের আপ্যায়ন করলে। খাঁচার উপরকার দিকে আড়াআড়িভাবে লাগানাে কাঠ সে এক লাফে উঠে ধরে ফেললাে, ঝুলে রইলাে, ঝুপ করে পড়লাে, চিৎ হয়ে শুয়ে রইলাে তার উচু গােল পেট উপরদিকে তুলে দিয়ে, গড়াগড়ি গেলাে, খানিকক্ষণ ডিগবাজি খেলে, মাথার উপর আঁড়ালাে। ছােট ছেলে দুটি হাসতে-হাসতে যেন মরে যাবে। তারপর ততক্ষণে-নিবে-যাওয়া সেই চুরুটটা কুড়িয়ে নিয়ে চুপচপে বলে’ সেটা ছিড়তে লাগলাে, তার মুখে নিবিড় একাগ্রতা। যেন সার্কাসের খেলােয়াড় তার বাজি শেষ করে ফিরেছে, এখন নিজের আমােদর জন্য কিছু করতে যাচ্ছে।
সূৰ্যমুখী ‘চলাে’, মিহির বললে, ওকে এখন ওর বানরতকে ধ্যান করতে দাও। “ঘেন্না হয়”’ তাপসী বললে, “ও নিশ্চয়ই মনে-মনে বলছে, “ঘেন্না হয় এই মানুষগুলােকে দেখে। পরমবানরের কাছে সে প্রার্থনা করছে, “এই মূর্খদের হাত থেকে আমায় রক্ষা করাে।” লাল রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মিহির বললে; এক-এক সময় এ-কথা ভেবে সত্যি ভালাে লাগে যে পৃথিবীতে মানুষ ছাড়া অন্যান্য জন্তুও আছে। তারপর তারা গেলে পাখিদের ধরে। বাইরে থেকে তাদের কানে এসে লাগলাে একটা জড়ানন, মেশানন, বিশৃঙ্খল কিচির- মিচির। মেয়েদের সভায় মত’, মিহির বললে। সবাই বলবে, কেউ শুনবে না। এক আশ্চর্য জগৎ-এঙের আর শব্দের আর নরম পালকের। উলতম সব রঙের তীব্দ প্রতিঘাত। সাদা আর হলদে ফুটকিওয়ালা সাধারণ ছােট-ছােট পাখি থেকে দক্ষিণ আমেরিকার অন্তত প্রতিনিধিতাদের গায়ের রঙ চীৎকার করে উঠছে, তাদের দীর্ঘ পুচ্ছ কৃত্রিম বৃক্ষশাখা থেকে প্রায় মেঝেতে এলে ঠেকেছে, রামধনু-রঙের অগ্নিশিখার মত। সমস্তটা জায়গাটায় যেন রঙের লুঠ লেগে গেছে। ‘এত বড় পাখি আমার ভালাে লাগে না, তাপসী বললে।
সূৰ্য্যমুখী
বা যে-পাখি গান করে, তার অদৃশ্য হওয়া উচিত।
যে-পাখি সুন্দর, তার ছােট হওয়া উচিত। কিন্তু এই তাে
তােমার ছােট।
একটা ঘর ভরে অসংখ্য ছােট পাখি-তারা লাফাচ্ছে,
উড়ছে, পাখা ঝাপটাচ্ছে, তাদের ছােট শরীরের পক্ষে যতটা
সম্ভব চাচামেচি করছে। ছােট-ঘােট রঙের ঢেউ, সব জড়িয়ে
রঙের অবিশ্রান্ত একটা ফোয়ারা। তাপসী খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে
দেখলাে, তারপর বললে :
‘হাজার হক, শিম্পাঞ্জিটা খানিকটা মানুষ তাে। একটু
দার্শনিক গােছর না হয়ে সে যায় না। তার চোখের ভাষা,
তার ভঙ্গির অর্থ আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু এই পাখির জগত
একেবারে আলাদা। সত্যি তাদের কোনাে ভাবনা নেই। তারা
বিশেষ কিছু নয়। শুধু একমুঠো রঙিন, উক্ত প্রাণ। তারা
কেবল বাঁচে, সেইজন্য তারা এত সুন্দর। ঘরের মধ্যে একটা পাখি
টুকলে আমাদের ভালাে লাগে। কেন? হয়তাে একটু স্পর্শ
ভেসে আসে সেই নিবিড় উষ্ণতার। পাখি ভাবে না, আশা করে
না,ফন্দি আঁটে না। সে শুধু পালকে জড়ানাে একটু প্রাণ-স্পন্দন।
‘পাখিকে মনে হয় বিধাতার খেয়ালের সৃষ্টি।
আর আমরা তার সঙ্কল্পের—না, কী ? আমরা তার পরিপূর্ণতার
কাঠামাে। মাঝে-মাঝে পাখি হতে পারলে মন্দ হত না।
সূৰ্য্যমুখী
এক জায়গায় কয়েক জোড়া আশ্চৰ্য্য রঙিন লাভবার্ড, ফলে
বলে তারা অবিশ্রান্ত ঠোট দিয়ে ঠোকাঠুকি করছে। মাঝে-মাঝে
তারা জায়গা বদল করছে, সঙ্গী বদল করছে না কখনাে। মিহির
একটু তাকিয়ে থেকে বললে :
‘যদি এক ও অবিচ্ছেদ্য বিবাহে বিশ্বাস জন্মাতে হয়, তা হলে
এই পাখিদের লক্ষ্য করা সব চেয়ে ভালাে। আমাদের নীতি-
প্রচারের পদ্ধতি বদলানাে দরকার।
‘সারাদিন ধরে এরা প্রেম করছে। এদের ক্লান্ত লাগে না
কখনন?
‘তার চেয়েও আশ্চৰ্য্য, এরা যে পরস্পরকে মেরে ফেলে না।
কিন্তু আমাদের নিজেদের মানে এদের বিচার করতে গেলে চলবে
। তা ছাড়া, এ-জিনিস মানুষের মধ্যেও খানিকটা আছে বই
কি। শিম্পাঞ্জি এরকম প্রেম করতে পারে না, তবু মানুষ পারে।
মনে করতে হবে, পাখিদের কাছ থেকেই সে শিখেছে। জীবতত্বের
হিসেবে যা তার নিছক স্বভাব নয়, এমন অনেক জিনিস সে
নিয়েছে অন্যান্য প্রাণীদের থেকে। মানুষ এই পৃথিবীর মাইক্রোক।
সত্যি, মানুষের মত আশ্চর্য জীব আর নেই।
সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে মিহির আবার বলতে
লাগলাে :
‘মানুষ অরান্ত করেছিলাে অনুকরণ দিয়ে। সেটা বুদ্ধির প্রথম
১২২
সূর্যমুখী
স্তর অনুকরণ করবার ক্ষমতা মানুষ আর বানর ছাড়া অন্য
কোনাে প্রাণীর নেই। কোনাে নল্লার সঙ্গে অবিশ্রান্ত নিজেকে
মিলিয়ে নিতে নিতে একদিন সেটাই স্বভাবের অংশ হয়ে পড়ে।
সাপ আর কুমীর, হিপ্পো আর গণ্ডার শেষ করে তারা এলাে
বিরাট মাংসভুকদের কাছে। উৎকট গন্ধে বাতাস ভারি ?
ভিড় সেখানেই সব চেয়ে বেশি। দর্শকরা কেউ-কেউ নাকে
রুমাল চাপছে, কিন্তু তাদের মুগ্ধ চোখ সরিয়ে আনতে পারছে না।
‘জীবনের এটা একটা মস্ত আনন্দ’, মিহির মন্তব্য করলে,
কোনাে ভয়ঙ্কর বস্তুর এত কাছাকাছি থাকা, অথচ সত্যিকারের
কোনাে বিপদ নেই। অভিনয় দেকে কান্নার মত। দুঃখের
কষ্টটা না পেয়ে দুঃখের রােমাঞ্চটা পাওয়া। অত্যন্ত উঁচুদরের
থিল।
‘হয়-তাে’, তাপসী বললে, হয়তাে বন্দী বাঘ দেকে আমরা
পরােক্ষ খানিকটা তৃপ্তি পাই—যে এমন ভয়ঙ্কর, তার এই দুরবস্থা
দেখে নীচ গােছের উল্লাস। লােকগুলাের মুখের ভাব যেন এই
কেমন জব্দ? এইবার কেমন!
সে তাে স্বাভাকিক। স্বভাবতই যে জয়ী, সে তার জয়ের
কোনাে হিসেবই রাখে না। দুৰ্বল একবার কোনােরকমে
প্ৰবলকে পরাস্ত করতে পারলে তার আস্ফালন সমস্ত সীমা
ছাড়িয়ে যায়।'
১২৩
সূৰ্য্যমুখী
‘বাঘ মারবার জন্য মানুষের কী সাংঘাতিক তেড়বড়।
রাজা-মহারাজারা কাগজে চিঠি লেখেন, যাতে জঙ্গলের উপর কারাে
হাত না পড়ে। তাদের মারবার জন্য বাঘকে অক্ষয় ও নিরাপদ
রাখা চাই।
তারা একটা বাঘকে দেখছিলাে, সেটা নতুন এসেছে। খাচার
মধ্যে অবিশ্রান্ত কোণাকুণি পায়চারি করছে, উজ্জ্বল, জ্বলন্ত এক
জন্তু, প্রতিটি পেশী যেন ইস্পাতের তৈরি। বার্নিশ-করা সােনার
উপর ঘন কালাে ভােরা-কাটা তার শরীর। সুন্দর, যে-রকম
সুন্দর এক বণ্ঠ পশুই হতে পারে। দেখতে মনে হয় বিড়ালের
মত নরম, লীলায়িত ; কিন্তু তার আড়ালে রয়েছে প্রচণ্ড,
অপরিমেয় শক্তি।
‘আশ্চর্য, তাপসী মুগ্ধস্বরে বলে উঠলাে, ‘আশ্চৰ্য্য।
‘আশ্চৰ্য্য, মিহির পুনরাবৃত্তি করলে। যদি কখনাে রাত্রে
তােমার ঘুম না আসে, তাপসী, তুমি ভেড়ার পালের কথা ভেবে
না। সাদা মেঘের কথা ভেবাে না। কি ফুলের বাগানের, কি
বিকেলে নৌকোর গায়ে নদীর জলের ছলছলানির। বাঘের
কথা ভেবে, উজ্জল, নিঃসঙ্গ বাঘ। রাত্রির কালাে অরণ্যে আগুনের
মত বা অলছে। সে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ঘুরে বেড়াচ্ছে, সমস্ত রাত্রি
ভয়ে’, নিঃশব্দে। ভাবাে তার কথা! ভাবব তার প্রবল,
অন্ধকার জীবনের কথা। আপনাতে সে পরিপুর্ণ। সে মগ্ন
১২৪
সূৰ্য্যমুখী
তারপর জীবনের মধ্যে। তার জীবনের অন্ধকার স্রোত বয়ে
যাচ্ছে রাত্রির ভিতর দিয়ে, নিবিড় অরণ্যকে প্লাবিত করে।
সে লােভ করে না, যেটুকু তার দরকার তার বেশি নেয় না।
সে ভালােবাসে না, ভালােবাসার চেষ্টায় সে হাঁপিয়ে ওঠে না।
আর সে হিংসা করে না, মারতে যায় না। সে মারে, যখন
তার দরকার; কিন্তু মারতে সে চায় না, মনে মনে সে কখনন
বলে না, “আমি ওকে মারব, আমি ওকে মারব।”
আর সেই বাঘকে আমরা মারি, আশ্চর্য্য উজ্জ্বল সেই বাঘ,
হাতির পিঠে চড়ে, একশাে লােকজন নিয়ে, তীব্র হিংস্র আলাে
দিয়ে তাকে বিধে। বাঘের চোখের দিকে তাকিয়ে দ্যাখাে,
সবুজ মশালের মত চোখ। আর স্ত্রীলােকের চোখের সমােহন
সেই চোখে। তার দিকে তাকিয়ে থাকলে তুমি চোখ ফেরাতে
পারবে না। ইয়-ততা, যদি যথেষ্ট দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকতে
পায়রা, বাঘ তােমাকে চিনবে, এসে দাড়াবে তােমার কাছে
মাথা নিচু করে’, তুমি হাত দিয়ে ওর ঘাড়ের নরম উষ্ণতা
অনুভব করতে পারবে। কিন্তু তার সেই সমােহনকে আমরা
আমরা ভয় করি। এ থেকে চোখ ফেরাই, তাকে নষ্ট করে
দিতে চাই, উপড়ে ফেলতে চাই। আমরা জানি যে তার চোখের
সেই আগুনকে প্রথমে মারতে না পারলে তাকে আমরা মারতে
পারবাে না। আর সেইজন্যেই তাে তার মুখের উপর ফেলি
=
১২৫
সূর্যমুখী ইলেকট্রিক টর্চের তীব্র আলো। আর তারপর বন্দুড়ি। আমরা ভয় করি, তার চোখকে আমরা ভয় করি। কেননা আমাদের চোখে যে আলাে নেই। আমাদের চোখ মরা। বাঘ যে আমাদেরকে খেয়ে ফেলে, তাতে অবাক হবার কিছু নেই। ‘বাঘটা একবার তাকাচ্ছে না আমাদের দিকে’, তাপসী বললে, ‘আমাদেরকে লক্ষ্যই করছে না। ‘ভদ্রমহিলাকে অপমান! মিহির হেসে উঠলাে, এবারে সরি, চলল। বড় লােক জমছে। বাঘের দিকে শেষ দীর্ঘ দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে তাপসী সরে এলাে। ভিড় ঠেলে তারা আস্তে-আস্তে এগােলে। কয়েকটা দরজা পরে একটা সিংহ। দেখেই মনে হয় বয়েস হয়েছে। কেশর গেছে ঝরে। ফিকে হয়ে এসেছে গায়ের বাদামি-ধূসর রঙ। চলে বেড়াবার পর্যন্ত উৎসাহ নেই, আধ- শশায়া অবস্থায় আধ-বােজা চোখে ঝিমােচ্ছ। ‘দেখে কষ্ট হয়, তাপসী বললে। ‘সিংহকে যেন কিছুতেই চিড়িয়াখানার মধ্যে খাপ খাওয়ানাে যায় না। ‘তবু—ওর মাথাটা একবার দ্যাখাে, ওর পেট, ওর কোমর। এদের দেখলে মনে হয় মানুষই হচ্ছে সৃষ্টির কলঙ্ক। ‘সৌন্দর্যের প্রতিযােগিতায়, অন্তত, একেবারে শেষের বেঞ্চিতে তাতে সন্দেহ নেই। ১২৬
সূৰ্য্যমুখী
এক নড়ে চড়ে বসে’ সিংহ এক বিশাল হাই তুললাে। দেখা
গেলাে তার মুখের বিশাল গুহা। তার প্রকাণ্ড চওড়া জিহ্বা
সাদাটে, কর্কশ ; দু'পাশের কোণাচে কুকুর-দাত ছুরির ডগার মত
ধারালাে। প্রায় আধ মিনিট সে রইলাে মুখ খুলে ; তারপর মাথা
নামিয়ে নির্গত করলে অস্ফুট শব্দ।
‘কিছু ওর ভালাে লাগছে না, তাপসী বললে।
খানিক্ষণ তারা সিংহকে দেখলল। সে যেন মরে যাচ্ছে,
দেখে এমনি মনে হয়। একটা শিথিল চাবুকের মত পড়ে
আছে তার লেজ। মাঝে-মাকে লেজের প্রান্তদেশে খর্ব কেশগু
ক্ষীণতম আন্দোলন। তার কোনাে উৎসাহ নেই কোনাে দুঃখও
নেই। তার বন্দী অবস্থার বিরুদ্ধে সে বিদ্রোহ পর্যন্ত করে না।
তার প্রাণ-শক্তি চুইয়ে-টুইয়ে তার ভিতর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে,
প্রতি মুহূর্তে, একটু-একটু করে। সে যেন নিজেকে শান্তভাবে
গুছিয়ে নিয়েছে মরবার জন্য। চিরকালের মত বিশাল এক ক্লান্তি
তাকে আচ্ছন্ন করেছে। কোনাে রাগ তার নেই, কোনাে আশা,
কোনাে অনুশােচনা। তাকে ঘিরে রয়েছে নিঃসীম নিঃম্পদ শূন্যতা।
সি-সি মাছির কামড় যে খেয়েছে সেই অফ্রিকাবাসী যেমন
তার বাড়ির দোরগােড়ায় শুয়ে-শুয়ে মরে--মুহূর্তের পর মুহূর্ত,
দিনের পর দিন, অবিশ্রান্ত, মন্থর, একটু মধুরভাবে, এমন
কি-তেমনি মরছে এই সিংহ, বিনা কষ্টে, বিনা চেষ্টায়,
.
১২৭
সূৰ্য্যমুখী ইচ্ছা না-করে, প্রতিবােধ না-করে, নিজেকে সম্পূর্ণ-সমর্পণ তাপসী বললে, ‘মন-খারাপ হয়ে যায় বেশিক্ষণ দেখলে। ‘এসাে মন ভালাে করা যাক,' বলে মিহিয় তাকে সে-সব জায়গায় নিয়ে গেলে, যেখানে রয়েছে বিশুদ্ধ কমিক জীবেরা, যারা নিছক বাড়াবাড়ি, সুকুমার রায়ের ছবির মত। জিরাফ আর বাইসন, উটপাখি আর অতিকায় কচ্ছপ, ফ্লেমিংগাে আর ক্যাঙারু। তারপর ঘুরে-ঘুরে তারা এসে উপস্থিত হলাে যেখানে খালে-ঘেরা খােলা জায়গায় ওরাংওটাং দম্পতী সুখে বসবাস করছে, পৃথিবীর বৃহত্তম ইদুরের সঙ্গে নিবিড় বন্ধুতায় । যাক, তাপসী বললে আমাদের আত্মীয়দের কাছে ফিরে ‘যদিও শিম্পাঞ্জির মত অত নিকট নয় বােধ হয়। ‘দেখেই বুঝতে পারছি। শিম্পাঞ্জিটা দস্তুরমত অসুখী। অসুখী হবার ক্ষমতা ওর খুব বেশি পরিমানেই আছে, মনে হয়। আর এদের দ্যাখােকী-বকন ফুর্তিবাজ। সত্যি, ওদের দেখে মনে হয় সুখী কুকুরের মত স্ফুর্তিবাজ। প্রায় মানুষের সমান লম্বা, মানুষের দ্বিগুণ চওড়া, পাঁশুটে রঙ, মুখের ভাব হাসিখুসি, বেপয়ােয়া, এই বানর-মুগল অবিশ্রান্ত খেলা করছে, মুখ ভ্যাঙ চাচ্ছে, লাফাচ্ছে, গড়াচ্ছে, কৃত্রিম ডাল থেকে ২৮
সূৰ্য্যমুখী
ডালে, সমন্তটা ফাকা জায়গা ভরে। কখনাে দু’জনে জড়াজড়ি
করে’ গড়াতেগড়াতে খালের ধারে এসে ঠেকছে, কখনাে একজন
রাত্রিতে থাকবার ঘরের পিছনে লুকোচ্ছে, আর-একজন ফিরছে
তাকে খুঁজে—তারপর হঠাৎ পিছন থেকে মাথার উপর এক চাটি।
তাদের নড়াচড়ায় এমন ছন্দ, যেন স্প্রিং-এ চলছে তাদের
শরীর।
‘আস্ত দুটো ক্লাউন, তাপসী হাসতে-হাসতে বললে।
‘শিম্পাঞ্জিটাও মাঝে-মাঝে ভাড়ামি, করে, কিন্তু সে হয়তে
জানে যে সে ভাঁড়ামি করছে, হয়তাে খানিকটা ইচ্ছে করেই সঙ,
সাজে। কিন্তু ওরাংওটাং তা জানে না। এরা একেবারেই
জন্ম-সঙ।
‘উ', তাপসী বলে উঠলাে, কতরকম কসরতই ওরা জানে!
কিন্তু কী ওদের ভঙ্গিতে ত্র।
‘এমন অনুমান করলে ভুল হয় না বােধ হয় যে এদের দেখেই
মানুষ নাচতে শেখে। কীরকম মাপা চাল, দেখেছে, এতটুকু
খুঁত নেই। আর মানুষের চলাইফরা বেতালা, মানুষের দেহে এত
সহজ গতি নেই। কিন্তু সে সেটা পুষিয়ে নিলে। শিখলে নাচতে।
অসভ্যদের নাচ, নােটারকম হার্লেকুইন নাচ, আজকালকার
কাবারে নাচ তত এদেরই অঙ্গভঙ্গি অনুকরণ। তা-ই মনে হয়
তােমার?
১২
৯
সূৰ্য্যমুখী
‘কেবল একটা কথা মনে হয়। কাবারে এদেরকে হার
মানিয়েছে শতগুণে’, বলে তাপসী হেসে উঠলাে।
খানিকক্ষণ তারা দাড়িয়ে রইলাে সেখানে। বিকেল হয়ে
এলাে; শােনা যাচ্ছে মাংসতুকদের গর্জন। জন্তুদের খাবার
সময়। বাগানের লােক এলাে হাতে একটা বদনা, রুটি আর
কলা নিয়ে। তার সাঁকো পার হয়ে সে গেলাে ওরাংওটাং-
এর উপনিবেশে। রাখলে একটা কলাই-করা থালা খানিকটা
খরগােস খানিকটা ইদুরের মত দেখতে সেই অদ্ভুত, নামহীন
অকর সামনে। এতক্ষণ সে নিশ্চল হয়ে পড়ে ছিলাে,
বাদামি একটা পাথরের মত, তার বাঁকানো
মােটা-মােটা রোয়ায় আচ্ছন্ন। এত ছােট তার মাথা যে দেখা
যায় না; বােঝা যায় না চোখ আছে কি নেই। এইবার থালার
কাছে মাথা নিয়ে সে খেতে লাগলাে, কুটকুট করে, তার
হােট-ঘােট ধারালাে দাত দিয়ে আশ্চৰ্য্য দ্রুতবেগে। প্রায় অদৃশ্য
আযে সে খেলে, শুধু তার চলাে ঠোট সক্রিয়, বাকি সমস্ত
শরীরে একটুকু নড়াচড়া নেই। তার নিশ্চলতার সঙ্গে
ওরাংওটাংয়ের অক্লান্ত উচ্ছলতার প্রতিঘাত একটা দেখবার
জিনিস।
লােকটাকে দেখতে পেয়েই বানয়-দম্পতী ছুটে এলাে তার কাছে,
হাত থেকে কেড়ে নিতে চাইলে খাবার। লােকটা একটার
সূৰ্য্যমুখী
গালে মারলে এক চড়, তারপর খাদ্য বিতরণ করে দিলে সমান
করে। একটানে ছিড়লাে কলার খােসা, আন্ত রুটি আর কলা
চলে গেলে তাদের মুখে। লুব্ধ আনলে তারা চিবােতে লাগলাে
তাদের ফুলে-ওঠা গালের পেশীগুলাে দ্রুত ওঠা-পড়া করছে,
তাদের চোখের তারা প্রায় ভুরুতে এসে ঠেকেছে। তারপর
খাবার গেল হয়ে গেলে, তারা নিজে থেকেই লােকটির
সামনে এসে দাড়ালাে হাঁ করে’, পিছন দিকে মাথা হেলিয়ে,
আকাশে চোখ তুলে। লােকটি তাদের গলার মধ্যে ঢেলে দিলে
আফিম-মেশাননা পাৎলা চা; তারপর ‘ইদুরে’র সামনা থেকে
গলাটা কুড়িয়ে নিয়ে চলে আসতে লাগলাে। একটা
ওরাংওটাং এলাে তার পিছন-পিছন, কেবলই মুখ আর হাত
বাড়াতে লাগলাে। লােকটি মুখ ফিরিয়ে দিলে তাকে এক ধমক,
দ্রুতপদে সাঁকো পার হয়ে এসে একটানে তক্তাটা তুলে
নিলে।
তাপসী বললে, “দেখে মনে পড়লাে। চা না খেলে আর তাে
বচিনে।
‘চলাে যাই.”
পথের উপর গাছের ছায়া পড়েছে দীর্ঘ হয়ে, বিকেলের
হাওয়ায় কাপছে পাতাগুলাে। ঝকঝকে রােদে হেসে উঠেছে
সমস্ত বাগান। চায়ের দােকানের দিকে যেতে যেতে ।
সূৰ্য্যমুখী
‘চিড়িয়াখানা হচ্ছে পিউরিটানের ইস্কুল’, যিহিব বললে।
এখানে এলে একটা কথা অন্তত সে বুঝতে পারবে,
থাকতে চায়, ভুলে থাকবার প্রাণপণ চেষ্টা করে যে মানুষ
কাপড়-চোপড় নিয়েই জন্মায় না। এই সহজ কথাটা একবার
মেনে নিতে পারলে এত অসুখী সে হতাে না, অন্যের জীবনও
তুলতে না বিষময় করে। আর তাহলে সে তার নিজের শরীরকে
ভালােবাসতে পারতাে। তা পারে না বলেই সে এক মুহূর্তের
শান্তি পায় না জীবনে। তার যে একটা শরীর আছে, এ-কথা
ভাবতে তার অসহ্য লাগে। নিজেকে ঘৃণা করে সেজন্য ।
“কিন্তু সে এই পশুদের দেখতােনিজের শরীরের মধ্যে
তাদের কী নিবিড় সম্পূর্ণতা। দেখতে তাদের ঐ, তাদের
স্বাচ্ছন্দ্য, তাদের নির্লিপ্ততা। তারা প্রত্যেকে:এক-একটি অচেতন
প্রাণের দ্বীপ ; তারা যুক্ত; অন্ধকারে, তারা প্রত্যেকে পরিপূর্ণ
নিজের জীবনে। বনে-জঙ্গলে তারা থাকে, ঝােপে-ঝাড়ে, মাঠে
আর গাছে—তারা বিভিন্ন, তারা অসংখ্য। কিন্তু একজন
আর-একজনকে এড়িয়ে চলে, প্রত্যেকের জন্য তার নিজস্ব,
অতুলনীয়, অপরূপ জীবন। তারা কেউ কাউকে ঘাঁটাতে আসে
, ভাগ বসাতে চায় না অন্যের জীবনে, নিজের জীবনের ভাগ
দিতে যায় না অন্যকে। মানুষের পক্ষে এটা কী শিক্ষা,
ভাববা! জীবন থেকে চরমতম নিঙড়ে নেবার চেষ্টায় জীবনকে
;
১২
সূৰ্যমুখী
তারা নষ্ট করে না। তাদের মধ্যে শান্তি; আদিম বিশাল
ধৈৰ্য্য। বুঝি বা কিছু হারাম—এ-ভয়ে তারা কাতর নয়।
নিজের নিঃসঙ্গতাকে তারা ভয় করে না : নিজেকে তারা ভয়
করে না। তারা যা নয়, তা ছাড়িয়ে অন্য কিছু হয়ে উঠতে
গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে না। অত্যাচার করে না নিজের
উপর, নিজেকে হত্যা করতে চায় না। “They do not lie
awake at night and weep for their sins."
তারা যাচ্ছিলো আঁকাবাঁকা খালের পাশ দিয়ে। शी
তাপসী বললে ;
‘এসাে না এখানে একটু বসি। চা না-হয় একটু পরেই
খাবাে।
হয়তাে আর সময় থাকবে না।”
‘তা হলে বাড়ি গিয়েই খাবে। কিন্তু এখানে একটু বলি,
এসাে। কী যে ক্লান্ত লাগছে, তুমি ভাবতে পারবে না।
রাস্তা থেকে নেমে দু’জনে হাঁটতে লাগলাে ঘাসের উপর
দিয়ে। খালের একেবারে ধারে এসে তারা বলে, ঘাসের
উপর, তাদের একদিকে ঘন গাছের সারি সােনালি আলােয়
ঝলােমলে। বিকেল ঘনিয়ে আসছে, দীর্ঘতর হয়ে আসছে
ছায়া। খালের স্বচ্ছ, স্তব্ধ জলের মধ্যে গাছগুলাের নীলাভ ছায়ার
দিকে তাকিয়ে তারা খানিকক্ষণ চুপ করে রইলাে।
সূৰ্য্যমুখী
তাড়া করছে,
হঠাৎ উঠলাে হাওয়া, উতলা দক্ষিণে হাওয়া, বিকেলের
বুকের উপর একটুখানি বসন্ত লুটিয়ে পড়লাে। খালের স্নান জল
উঠলাে শিশি করে’, একটা অলস হাঁস ভেসে গেলাে, জলের
ভিতরে গাছের স্থির ছবি গেলাে ভেঙে। তারা দুজনে দু’দিকে
তাকিয়ে রইলাে, কেউ কিছু বললে না।
ঘােলাটে হয়ে এলাে আলল; ছায়াগুলাে যেন পরস্পরকে
ছটফট করছে রাত্রিতে মিশে যেতে। মৃদু ঢেউয়ের
মত হাওয়া এসে লাগলে তাদের বুকে। হাঁসটা পাড়ে উঠে
এসে পাখার জল ঝাড়ছে, মুক্তোর মত ঝরে পড়ছে জলের ফোঁটা।
গাছগুলাের মাথায় সােনার কুয়াশা লেগে রয়েছে যেন। আর
হাওয়া বইছে দক্ষিণ থেকে, হাওয়া বইছে, যে-হাওয়া ফুল ফোটায়,
যে-হাওয়ার রক্ত মাতাল হয়ে ওঠে।
হঠাৎ দুর থেকে ভেসে এলাে শিশুর আনন্দ-ধ্বনি। যেন
চমকে উঠে মিহির মুখ ফিরিয়ে তাপসীর দিকে তাকালো।
তাদের চোখােচাখি হলাে। এক দীর্ঘ নিবিড় মুহূর্ত তারা
পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইলা; তারপর মিহির আস্তে হাত
বাড়িয়ে তাপলীয় একখানা হাত তুলে নিলে। বললে, ‘আমাকে
ছেড়ে যেয়াে না।
দুৰ্বকাল তাপসী চুপ করে রইলাে, কেঁপে উঠলাে তার
চোখের পাতা। তারপর ?
}
১৩৪
সূৰ্যমুখী
‘এ-কথা কেন বলছে?
‘তুমি যদি জানতে। প্রায় অস্ফুটয়ে মিহির বলে উঠলাে।
জানি, জানি। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে
পারাে না ?
আর-একবার তাদের চোখ পরস্পরের মধ্যে মগ্ন হয়ে গেলাে।
একটা মুহূর্ত কাটলাে। তাপসীর কালাে চুলে ঝলসে উঠলাে
ঘােলা আলাে। মিহিরের হাতের উপর একটু চাপ দিয়ে সে বললে:
‘এত ভয় কেন তােমার?
‘আমাকে ছেড়ে যেয়াে না, মিহির সন্মােহিতের মত বললে,
‘আমাকে ছেড়ে যেয়াে না।
“কী ভাবছাে তুমি বলাে তাে?
‘আমি নিজেকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। আমি ভুল করেছি।
কিন্তু এখন তাে আর কিছুতে কিছু এসে যায় না।
‘আমার জানা উচিত ছিলাে । হয়তােবৰি অপেক্ষা
।
‘বােলাে না, তাপসী ব্যাকুলস্বরে বলে উঠলাে, “ওসব বােলদা
না। এতে কি তুমি খুসি নও?
মিহির মাথা নিচু করে চুপ করে রইলাে। তাপসী আবার
বললে, এ-ই কি যথেষ্ট নয়? সমস্ত পৃথিবীতে আর কী আছে,
বলাে?
১৩৫
সূৰ্যমুখী
মিহির চোখ তুলে এতক্ষণে প্রায় ঝাপসা হয়ে আসা গাছ
গুলাের দিকে তাকালাে।
‘না, আর-কিছু নেই। সে-ই তাে ভয়, তাপসী।
সেই তো সুখ। আর-কিছু তুমি কেন ভাবছছ? চেয়ে
দ্যাখাে, আমার দিকে চেয়ে দ্যাখাে। তুমি বুঝতে পারাে না?”
তাপসী, এ আমি সইতে পারছিনে।
তারপর দুজনেই চুপচাপ। এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেলে
তাদের মাথার উপর দিয়ে। খালের ঝিলিমিলি-জল থেকে-থেকে
কেঁপে উঠছে। ফিকে আকাশ ছড়িয়ে পড়ছে বনের সৌরভের
মত।
এমনি তারা বসে রইলাে অনেক্ষণ, হাতে হাত ধরে’, স্নান
জলের দিকে তাকিয়ে, সন্ধ্যায় আচ্ছন্ন। অনেক কথা বুদ্বুদের
মত ভেসে উঠলাে তাদের মনে, মিলিয়ে গেলাে। ভাষা নেই ;
কোন কথা বলা যায় না। চারদিক চুপচাপ হয়ে এলাে,
নামলাে ছায়া। গাছগুলাে সেং ছায়া-মানে অস্পষ্ট। দু’জনে
তাকিয়ে রইলাে সেইদিকে, জীবনের দিগন্তরেখার দিকে যেন।
হাওয়ায় একটা চুর্ণালক তাপসীর কপালের উপর এসে পড়লাে,
যেন কার নিঃশাস লাগলাে তার মুখে। হঠাৎ সে কেঁপে উঠলাে।
‘চলাে’, নিঃসের রে সে বললে।
সন্ধ্যার একটু পরেই যিহির বাড়ি ফিরলাে। তাপসীর সঙ্গে
১৬
শ
-
সূৰ্য্যমুখী
বেশিক্ষণ থাকতে সে সই করতে পারছিলাে না। চুপে-চুপে সে
তার ঘরে ঢুকলাে, যেন ভয়েভয়ে। তার মনে একটু ঘা সইবে
না এখন। এ সে কিছুতেই ভাঙতে দিতে পারে না,
তার মনের এই অপরূপ মুচ্ছা। সে বসে পড়লো একটা
ইজি-চেয়ারে, জামা-কাপড় বদলাবার কথা মনে হলাে
। তুলে নিলে একটা বই পড়বার জন্যে নয়, অভ্যাস থেকে।
খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলাে ছাপানাে পৃষ্ঠার দিকে, দৃষ্টিহীন চোখে।
তারপর তার খেয়াল হলাে তার চা খাওয়া হয়নি, আর তার
একটু মাথা ধরেছে।
হৈমন্তী এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘চা কি খেয়ে এসেছিল ?
না, দাও।
আর যখন সে তার বিলম্বিত চা খাচ্ছে, আর মৃণাল ব্যস্ত!
রান্নাঘরে, হৈমন্তী ছেলের খুব কাছে এনে দাঁড়ালেন। মিহিরের
সমস্ত শরীর সঙ্কুচিত হয়ে উঠলাে। আর তার নাড়িতে-বাড়িতে
মুহূর্তে বয়ে গেলে অজ্ঞাত, নাহীন একটা ভয়।
একটা কথা আছে তাের সঙ্গে।
অন্য-কোন দিন কি হতে পারে না? কাল? যে-কোনাে
দিন? কিন্তু আজ নয়, এখন নয়। এখন সে সইতে পারবে না।
কিন্তু সে কিছু বললে না, কিছু বলতে গেলেই তাে মনে আঁচড়
পড়বে।
১৩৭
।
সূর্যমুখী
‘মৃণালের সম্বন্ধে একটা কথা।
সাদা হয়ে গেলাে মিহিরের মুখ। অতি ক্ষীণশ্বরে সে
উচ্চারণ করলে, কী, বলাে ?
ওকে নিয়ে কাল একবার সেবা-সদনে যাবি ?
‘ওর অসুখ করেছে?
না। বােধ হয়—বােধ হয় ওর ছেলে হবে।
‘মা? মিহির অদ্ভুত, চাপা গলায় চীৎকার করে উঠলাে।
আয়-কিছু বললে না। হৈমন্তী আরাে অনেক কথা বলে গেলেন,
সে অস্পষ্ট চোখে তাকিয়ে রইলাে তার দিকে। কিছু শুনলে না,
কিছু বললে না। মা, তার মনের মধ্যে শুধু এই একটা কথার
ঢেউ উঠছিলাে। মা, শেষ পর্যন্ত তােমারই জয় হলাে।
১৮
১০ মা, তােমারই জয় হলাে। পৃথিবীতে আরাে একজন মা, ক্ষমতায় নিষ্ঠুর, সঙ্কল্পে অপরাজেয়। প্রাণের নাভি-উৎস থেকে উৎসারিত চিরন্তন বন্ধন। সেই অন্ধকারে আমাদের জীবনের মূল। অন্ধকার সেই নাভি-কৃপ, প্রাণকেন্দ্র, তার সঙ্গে আমাদের আত্মার সীমাহীন বৃত্ত-রচনা। তার মধ্যে আমরা বন্দী। নাড়ি কেটে ফেলা হয়, কিন্তু সংযােগ ছিন্ন হয় না : তা থেকে যায়, অবিচ্ছেদ্য, অনস্বীকাৰ্য, আমাদের সমস্ত জীবন ভরে’, আমাদের শৈশব কাটিয়ে ওঠবার অনেক পরে। মা যখন চিতায় ভস্ম হয়ে গেছেন, তারও পরে। মাতৃ-নাভির সঙ্গে সেই সংঘােগ-বৃত্তের মধ্যে চিরকাল আমাদের চলাফেরা ; চিরকাল তার সঙ্গে আত্মার তন্তুতে-তন্তুতে আমরা জড়িত। আর মিহির—লে আরাে একজন মা তৈরি করলাে। যে-মেয়ে তার আত্মার কোনােখানে নেই, তাকে সে মা করলে। তাকে দিলে ভীষণ মাতৃশক্তি। যাকে সে আর-কিছু দেয়নি, যাকে সে ভুলে থাকতে চেয়েছে, মুছে ফেলতে চেয়েছে, যার সঙ্গে কখনাে তার কোনাে প্রকৃত সংস্পর্শের আলাে জ্বলেনি, তাকে দিলে সেই ইচ্ছার নিষ্ঠুর শক্তি, যার কাছে তার নিজের জীবন পরাজিত, লাঞ্ছিত, বিখণ্ডিত। আর মৃণালের সেই ক্ষমতা যার উপর সে তত সে-ই, সে তাে তারই সত্তা নতুন করে জন্ম নিয়েছে। আর তার ভিতর দিয়ে সৃণালের ১৯ সূর্যমুখী অন্ধ ইচ্ছা তত জয়ী হচ্ছে তারই উপরে, মিহিরেরই জীবনের উপরে। আচ্ছা কিন্তু এই চরম নয় ; এ ছাড়াও আছে, এর বাইরেও আছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা কেবল আমাদের শরীরের মধ্যেই বাঁচি না। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, মানুষের এমন দুরবস্থা কখনাে হয় না যে সে তার জীবনকে অন্ধকারে পেতে না পারে। অন্তত মিহিরের মত মানুষের হয় না। সে তা হতে দেবে না কিছুতেই। তার জীবনের একটা নিভৃত অন্ধকার আছে যা তার নিজের। যা হয় হােক, তার উপর দখল সে ছাড়বে না। শরীরের জীবনে সে পরাস্ত ; কিন্তু তার সেই অন্ধকার জীবনের খোঁজ কেউ জানে না। কোনাে মা, কোনাে স্ত্রী সেখানে আসতে পারে না তাদের শরীর-শক্তি নিয়ে ; বাড়াতে পারে না তাদের নরম, নির্মম হাত। তাদের জন্য নিজেকে সে টুকরাে করে ফেলবে, যদি করতেই হয়, কিন্তু সেই অন্ধকার থাকবে সম্পূর্ণ, সঙ্গোপন, অব্যাহত। সুতরাং ব্যাপার যেমন ছিলাে তেমনি রইলাে। যে-স্ত্রী মা হতে চলেছে, তার প্রতি স্বামীর যা-কিছু কৰ্তব্য, মিহির সব করলে। তাকে নিয়ে যায় মাঝে-মাঝে সেবা-সদনে, তার সঙ্গে গল্প করে, তার অঙ্গ নিয়ে আসে ঘােট-খাটো উপহার। তার মা- সঙ্গে সে লড়বে শেষ পর্যন্ত; হেরে গিয়েও সে হার মানবে না। ১৪০
সূর্যমুখী
কিন্তু ভিতরে-ভিতরে সে রইলাে বিচ্ছিন্ন, নিঃসম্পর্ক। প্রথম
ধাক্কা যখন কেটে গেলাে, মিহির বললে নিজের মনে, ‘হােক না,
কী এসে যায়? তাপসীর কথা তার মনে পড়লাে : ‘এখন
আর কিছুতেই কিছু এসে যায় না। না, এখন আর কিছুই এনে
দাঁড়াতে পারে না তাদের মাঝখানে। যা হবার হােক। কিছুই
আর একে নষ্ট করে দিতে পারে না। অসময় বলে’ কি ঈশ্বরকে
দোষ দেবো ? মিহির মনে-মনে বললে, বলবাে কিহ’লল
যদি, দু'দিন আগে কেন হ’লল না? ওরে মূঢ় হৃদয়, চুপ কর,
চুপ কর, হ’তে যে পারলে, এ-ই কি কম আশ্চর্য! যা হয়েছে,
দু’হাত ভরে তাকে নে, জীবন ভরে তাকে নে।
১৪১
মাসগুলাে কেটে যেতে লাগলাে। আবার বর্ষা এলাে, বর্ষা ফুরিয়ে এলাে। মৃণালের শরীর উঠলাে ভারি হয়ে’, তার পদক্ষেপ ফরতরে। হঠাৎ কেঁপে-কেঁপে উঠছে তার এতদিনের স্তব্ধ দৃষ্টি। ম্লান হয়ে এসেছে তার মুখের অগ্নি-আভা। সেই পােকা, সেই ব্যাঙ, সেই মাছ—যা একটু-একটু করে মানুষ হয়ে উঠেছে, যা এতদিনে প্রায় মানুষ হয়ে উঠেছে, তা শােষণ করে নিচ্ছে তার সমস্ত যৌবন, যৌবনের জীবন্ত রক্ত। এক রাত্রে, সময় যখন আসন্ন, মৃণাল চুপ করে তার স্বামীর কাছে এসে দাড়ালাে। মিহির বই পড়ছিলাে, চোখ তুললাে না। কিন্তু মৃণাল সরে গেলাে না; অনেক, অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইলাে তার স্বামীর নিবিড়, নিবদ্ধ মুখের দিকে। তারপর আস্তে-আস্তে একখানা হাত এনে রাখলে স্বামীর হাতের উপর। এরকম সে কখনাে করে না। মিহির চমকে উঠলাে। বই- খানা কোলের উপর নামিয়ে রেখে চাইলে চোখ তুলে। মৃণালকে যেন বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বেচারা হয়তাে তার মনে ভয় হচ্ছে। হয়তাে সে কিছু বলতে চায় ; হয়তাে সে একটু আশ্বস চায়। মৃণালের হাতের উপর আস্তে একটু হাত বুলিয়ে সে বললে; কেমন আছে? খুব নরম সুরে বললে, যেমন করে আমরা শিশুর সঙ্গে কথা কই, কি রােগীর সঙ্গে। ১২
সূৰ্যমুখী
‘আমার তাে কিছু হয়নি।
‘কিন্তু তােমাকে আজ ভালাে দেখাচ্ছে না।
ও কিছুনয়। তারপর, একটু চুপ থেকে :
‘তাের একটু সময় হবে?
মিহির বইখানা বন্ধ করে টেবিলের উপর সরিয়ে রাখলো :
‘কিছু বলবে? বলল না।
মৃণালের আঙুলগুলাে মিহিরের আঙুলের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাে।
মিহির অনুভব করতে পারলে চামড়ার উপর তার নখের
ক্ষীণ স্পর্শ। হঠাৎ মৃণাল বললে :
‘আমার উপর তুমি রাগ কোরাে না।
মিহির অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকালো।-রাগ কেন
করবে ?
‘আমাকে দোষ দিয়াে না, মনে-মনে,• রুদ্ধস্বরে মৃণাল বলে
উঠলাে। আমাকে দোষ দিয় না।
মিহির তার হাত ছাড়িয়ে নিলে :
‘এ-সব কী তুমি বলছ?
‘এটা তুমি জেনাে, আমার কিছু দোষ নয়’,মৃণালৰলতে লাগলাে।
‘আমি কখনাে তােমার ভালােবাসা চাইনি। আমি কখনাে
মিহির তার একখানা হাত কজির কাছে ধরে তাকে বাধা
দিলে।
।
১৪
সূৰ্যমুখী
যাও, এখন শােও গে। তােমার শরীর ভালাে নেই।
‘আমাকে একটু বলতে দাও, তােমার পায়ে পড়ি।
যাও, শুয়ে থাকে। গে, মিহির আবার বললে।
কয়েক মুহুর্ত, মৃণাল স্তব্ধ হয়ে রইলাে। তার চোখ দিয়ে যেন
ঝরে পড়ছে তার প্রাণ-শ্রোত, মিহিরকে সর্বাঙ্গে জড়িয়ে ধরে।
তারপর যেন অসহ কষ্টে, অতি ক্ষীণস্বরে :
কেন তুমি আমাকে বিয়ে করেছিলে ?
মিহিরের উপর যেন একটা মােহ ছড়িয়ে পড়লাে। সে কিছু
বলতে পারলে না, কিছু ভাবতে পারলে না। আরাে শক্ত হলাে
তার মুঠি মৃণালের কজির উপর। আর মৃণাল বলতে লাগলাে,
অস্পষ্ট স্বরে, যেন নিজেরই মনে-মনে :
‘তবু ভালােই বলব। তবু যে তােমার দেখা পেয়েছিলুম
এই আমার সুখ । তুমি কি জান—তুমি কি কখনাে ভাবতে পারাে
আমি তােমাকে কত ভালােবেসেছিলুম?
যেন অন্য কেউ কথা বলছে , যেন মৃণালের অচৈতন্য থেকে
কোনাে প্রচণ্ড, অদম্য শক্তি ঠেলে বার করছে এই কথাগুলাে-
তাকে দীর্ণ করে, তাকে বিধ্বস্ত করে। নালাে নীরবতা, তার
কেন কথনাে শেষ হবে না। তারপর ;
‘তুমি কি কখনাে আমাকে এতটুকু ভালােবাসতে পারবে না?
মিহির মুঢ়ের মত তাকিয়ে রইলাে মৃণালের মুখে। যে-ঠো
১৪৪
সূর্যমুখী
দিয়ে সে তার কজি ধরে’ ছিলাে তা এলাে শিথিল হয়ে। আৰু
একটা দীর্থ, অসহ নীরবতার ছো।
মৃণাল আস্তে-আস্তে তার হাত ছাড়িয়ে নিলে :
‘বুঝলুম। খামকা ব্যথা দিলুম তােমার মনে—ক্ষমা কোনাে’,
বলে সে এক পা সরে গেলাে। তারপর হঠাৎ থমকে দাড়িয়ে;
অশরীরী প্রেত-স্বরে :
‘কিছুই কি তােমার বলবার নেই?
মিহিরের ঠোট নড়ে উঠলাে। সে যেন প্রাণপণ চেষ্টা করছে
কিছু বলতে, কিন্তু কোন কথা বেরুলাে না।
থা, মৃণাল বললে, “থাক্। নিজেকে তুমি আর কষ্ট দিয়ে
না, আমি যাচ্ছি। তারপর, টেল্যাম্পের তৈরি আবছায়ার
ভিতর দিয়ে যেতে যেতে :
‘তুমি মন-খারাপ কোরো না, আমার কোনাে নালিশ নেই।
আমি তত তােমাকে ভালােবেসেছিলুম। তােমাকে ভালােবেসেই
আমি সুখী হয়েছিলুম।
এর কয়েকদিন পরেই, সন্ধের একটু পরে মৃণাল তার সংসার
তার কাজ, সমস্ত ফেলে রেখে শুয়ে পড়লে বিছানায়, রুগ্ন
মত। হৈমন্তী তার কাছে গিয়ে তার কপালে হাত
রাখলেন।
.
১৪৫
১০
সূর্যমুখী
মৃণাল কিছু বললে না, শুধু তার বড়-বড় কালাে চোখ তুলে
তাকালাে।
হৈমন্তী খানিক্ষণ ধরে তার দিকে তাকিয়ে বললেন ; একটু
ওঠো। খেয়ে নাও ধা পারে।
না, খাবাে না।
‘খাবে বইকি। খেতেই হবে। ওঠো।
তাকে নিয়ে গেলেন খাবার ঘরে, বসলেন তার কাছে। বললেন, •
‘ভয় নেই, ভয় নেই কিছু।
মৃণাল কিছুই খেতে পারলে না, ফেলে-ছড়িয়ে উঠে এলাে।
‘বে, এতেই হবে, হৈমন্তী বললেন, ‘এসাে এবার।
তাদের শােবার ঘরের পাশে ছােট একটা ঘর প্রস্তুত ছিলাে,
সেখানে গিয়ে মৃণাল শুয়ে পড়লাে । হৈমন্তী লােক পাঠালেন সেবা-
সনে; একবার দেখে নিলেন সমস্ত ওষুধ-পত্র ঠিক আছে কিনা,
তারপর এসে বসলেন তার পাশে। ঘরের আলাে নেবানাে ;
অন্ধকারে শােনা যাচ্ছে মৃণালের ভারি, অসমান নিঃশ্বাস ।
‘কষ্ট হচ্ছে খুব ? হৈমন্তী জিজ্ঞেস করলেন।
‘মা।
‘ভন্ন কোরাে না, চুপ করে থাকো।
মৃণাল চুপ করে রইলাে। কিন্তু চুপ করে থাকা কঠিনতরাে
হয়ে উঠছিলাে প্রতি মুহূর্তেই তার মাংস কেউ যেন ছিড়ে
১৪৬
সূৰ্য্যমুখী
নিয়ে যাচ্ছে। এমন যন্ত্রণা যে পৃথিবীতে আছে, সে কখনন
ভাবেনি।” তে দাত চেপে, দু’হাতের মুঠি শক্ত করে আঁকড়ে
ধরে’ নিশ্চল, নিম্পন্দ, সে পড়ে রইলাে। চেষ্টা করলে অজ্ঞান
হয়ে যেতে।
কিন্তু তার ধৈৰ্য্যও ভাঙলাে। মিহির যখন বাড়ি ফিরে এলাে,
রাত দশটায়, সে শুনলাে সমস্ত বাড়ি ভরে’ মৃণালের গােঙনি।
নরম, দীর্ঘ আওয়াজ, আস্তে-আস্তে পরদা থেকে পরদায় উঠে
যাচ্ছে, যেন রাত্রির কোনাে অশুভ পাখি ডেকে উঠছে থেকে-থেকে।
ঘরের ভেজানাে দরজায় টোকা দিয়ে সে ডাকলে, ‘শা।
হৈমন্তী বেরিয়ে এলেন।
‘কখন আরম্ভ হয়েছে ?
‘সন্ধের পরেই।
‘আগে জানলে আমি আর আজ বেনােতা না।
‘তুই থেকেই বা কী করতিস?
‘নাস এসেছে?
হ্যা, এসেছে। তুই যা, কোনাে ভাবনা নেই।
‘সব ঠিক আছে তাে?
‘হা, হা, ঠিক আছে সব। তুই যা, খেয়ে নে গে। ভাত
চাপা দেয়া আছে—কিছু দরকার হলে দুর্গাকে ডেকে বলিস।
খেতে বসে মিহিরের বড় অবাক লাগলাে যে আজ তার
১৪৭
হয়নি।
সূৰ্য্যমুখী
খাবার কাছে মৃণাল নেই। এতখানি সময়ের মধ্যে এ-রকম কথন
একদিন মৃণালের একটু অসুখ করেনি—আশ্চৰ্য্য
ভালাে তার স্বাস্থ্য। কখনাে কোনাে রােগের কষ্ট সে পায়নি,
আর আজ, এখনকী ভয়ঙ্কর যন্ত্রণার ভিতর দিয়ে সে যাচ্ছে।
অন্যমনস্কভাবে মিহির খেয়ে উঠলাে। থেকে-থেকে তার কানে
এসে লাগছে গােঙানির আওয়াজ। তা যেন বাড়ছে। ভারি অস্বস্তি
লাগছিলাে তার-যে-কোনাে মানুষকে চোখের উপর এ-রকম যন্ত্রণা
পেতে কী করে দেখা যায় ? এবং কিছু করার নেই, কিছু যে
করবার নেই এটাই সব চেয়ে খারাপ।
দুর্গার সাজা একটা পান মুখে পুরে সে আবার সেই ঘরের
দরজার বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাে।
‘মা’ সে একটু চেঁচিয়ে ডাকলে।
হৈমন্তী বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘খেয়েছিস?”
‘কত দেরি আর?
‘দেরি আছে।
‘এখনাে দেরি?
অমন হয়ই।
মিহির একটু ইতস্তত করে বললে, ওকে একটু দেখা যায়
কী কৰি দেখে?
১৪৮
সূৰ্য্যমুখী
কেমন আছে ও?
ভালাে। ভালােই আছে।
মিহির আবার একটু চুপ করে রইলাে।
‘মা, খুব কি কষ্ট ?
কষ্ট তাে একটু হয়ই।
খন
হৈমন্তী হেসে ফেললেন। “তুই যা এখান থেকে। ঘুমােবাৰ
চেষ্টা ক।
মিহির তবু বাড়িয়ে রইলাে, যেন কী বলতে চায়।
হৈমন্তী বললেন, ‘আয়, ওকে একটু দেখেই যা।
মিহির দাঁড়ালাে চৌকাঠের ধারে। ঘরটি মেয়েতে ভর্তি
নার্স, মৃণালের মা আর পিসিমা, বােতল আর ফ্ল্যানেলের টুকরো
আর আগুনের হাঁড়ি নিয়ে সবাই ব্যস্ত। একটা উত্তপ্ত গন্ধ
ঘরের বাতাসে। নীল বালবে জ্বলছে আলাে। বিছানায় পড়ে
আছে মৃণাল, তার চোখ বােজা, ঠোট আটকানন। তাকে দেখে
বিশ্বাস করা শক্ত যে তারই ভিতর থেকে এই দীর্ঘ, অবিশ্রান্ত
গােঙানি বেরিয়ে আসছে। মিহির একটু আশ্বস্ত হলাে। যতটা
মনে হয়, হয়তাে সত্যি-সত্যি তেমন ভয়ানক কিছু ব্যাপার নয়।
হঠাৎ ভাবী মা একটু চুপ করলাে। আর সনেশদে
মিহিরের মুখের উপর এসে পড়লো মৃণালের বিশাল উজ্জ্বল
১৪১
সূর্যমুখী
চোখ, যন্ত্রণায় বিস্ফারিত, তার কালাে গভীরতায় কী কথা যেন
আলােড়িত হয়ে উঠছে। আর মিহিরের বুকের ভিতর দিয়ে
যেন একটা আগুনের স্রোত নেমে গেলাে, তাড়াতাড়ি সে সরে
গেলাে সেখান থেকে।
নিজের ঘরে এসে চেয়ারে বসে’ সে পড়বার চেষ্টা করলে। শুতে
যাবার কথা ভাবা অসম্ভব। প্রকাণ্ড, শক্ত খাটের উপর শুভ্র
মণ শষ্যার দিকে সে তাকালাে। মৃণালই পেতেছিলে নিজ
হাতে, সন্ধ্যার আগে। তার নিজের বালিস দুটো যেখানে
থাকবার কথা, সেখানেই রয়েছে ।
রাত বাড়লাে। চারদিক চুপচাপ হয়ে আসছে। কোথায়
ডেকে উঠছে অশান্ত, ক্ষুধিত কুকুর। পড়া অসম্ভব, বসে থাকা
অসম্ভব। মিহির উঠে পায়চারি করতে লাগলাে ঘরের মধ্যে।
আর হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ, তীব্র চীৎকার বাড়ির প্রান্ত থেকে প্রান্তে
বেজে উঠলাে। মিহির নিজেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠেছিলাে, তা
এমন ভয়ানক। সে থমকে দাঁড়ালাে। আর তা চলতে
লাগলাে, সেই নগ্ন নিষ্ঠুর চীৎকার। যে-মেয়ে কখনাে মৃদুস্বরে
ছাড়া কথা বলেনি, তার চীৎকারে সমস্ত রাত্রি খানখান হয়ে
ভেঙে পড়ছে।
বানােটার পর হৈমন্তী এসে বললেন, একজন ডাক্তার নিয়ে
আর বরুং।
সূৰ্য্যমুখী
খুব কি খারাপ, মা, খুব কি খারাপ?
‘ডাক্তার একজন থাকা ভালাে, তুই যা।
রাস্তায় বেরিয়ে মিহির যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলল। চীৎকার
ভেসে এলাে তার পিছন পিছন অনেকদূর পর্যন্ত। তারপর তা ,
আর শােনা গেলাে না। আর হঠাৎ মিহিরের মনে হলাে :
‘যদি ও মরে যায়, যদি ও মরে যায়।
বাকিটা রাত দুঃস্বপ্নের মত কাটলাে। মিহির ভালাে করে
কিছু টের পেলাে না। ঢেউয়ের পর ঢেউ, থেকে থেকে বেজে
উঠছে চীৎকার ; শুনতে-শুনতে সে প্রায় পাগল হয়ে গেলাে।
তারপর এক সময়ে তা থামলাে, মৃণাল মুচ্ছিত হয়ে পড়লাে।
হঠাৎ সমস্ত বাড়িতে অদ্ভুত অস্বাভাবিক স্তদ্ধতা।
ভােরের দিকে ডাক্তার বললে, বড় কঠিন প্রসব, একজনের
প্রাণের আশঙ্কা। জানা গেলাে, মৃণালের শরীরের গঠনে
কোথায় কী একটা দোষ আছে ; সত্যি বলতে, মাতৃত্বের সে ঠিক
উপযুক্ত নয়।
‘কোনাে উপায় কি নেই এখন?
‘চেষ্টা করবাে যথাসাধ্য। চেষ্টা করবাে দু’জনকেই বাঁচাতে।
বলা যায় না।'
‘শিশু না-হয় মরললাই।
‘দেখি ।
সূৰ্যমুখী ভােরের প্রথম আলাের সঙ্গে-সঙ্গে ফরসেপ দিয়ে টেনে বার করা হ’লাে লাল মাংসের একটা পিণ্ড। মাথাটা চেপ্টে গেলাে। সেটার নিঃশ্বাস পড়ে না, সেটা কাদে না। যাক, আপদ গেছে। কিন্তু নব-মাতার মুচ্ছা ভাঙলাে না। হৈমন্তী তার গালের উপর হাত রাখলেন, এখন তা উষ্ণ। ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘ভালাে করে একটু দেখুন ডাক্তারবাবু, আরাে ভালাে করে দেখুন। ‘এখন ছেলেটাকে দেখবার দরকার। কিন্তু ইতিমধ্যে মৃণালের মা সেই লাল মাংসপিণ্ডকে তুলে নিয়ে জোরে তার গা রগড়াছিলেন। হঠাৎ সে পরম উল্লাস কেঁদে উঠলাে, যেন ঘােষণা করলে, ‘আমি এসেছি। আলাে ফুটলাে আকাশে। ডাক্তার নিজেরই অসুস্থ চেহারা করে বাড়ি ফিরলো। মৃণালের মা শিশুকে কোলে করে বসে আছেন, তার চোখ দিয়ে যে জল পড়ছে তিনি নিজেই তা টের পাচ্ছেন না। হৈমন্তী মৃণালের শিয়রে বসে ফুপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। তা ছাড়া সমস্ত চুপচাপ ; ঝড়ের রাত্রির পর শান্তি। তখন মিহির গেলে সেই ঘরে, দাঁড়ালে মৃণালের পাশে। জানলা দিয়ে রােদ এসে পড়ছে তার বিছানায়। তার চোখ বােজা, দীর্ঘ, কালাে পলকগুলাে প্রায় গাল ছুঁয়েছে। তার হাত দুটি দু’পাশে এলিয়ে আছে, কয়েকটা চুল স্খলিত হয়ে পড়েছে
সূৰ্যমুখী
কপালে। যেন ঘুমিয়ে আছে। তার ঠোটের কোণে যেন হাসির
একটু আভাস। মিহির অনেকক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলাে,
দেখলাে। তার ইচ্ছে হলাে একটু স্পর্শ করে, সাহস হলো না।
অনেক, অনেকদুর, তাকে এখন আর ছোঁয়া যায় না। একটু
হাসির আভাস তার ঠোটে—সে যেন কী গােপন কথা জানে,
যেন তাকে নিয়ে গেছে সঙ্গে করে’, সে-কথা আর কেউ জানবে
না।—সে এখন একা।
কী ভয়ঙ্কর একা, মিহির ভাবলে।
মৃণালেয় মা শিশুকে নিয়ে চলে গেলেন, আবার বাড়িতে মা আর
ছেলে। কিন্তু সে-বাড়ি আর নয়। এখানে আর সহজে নিবাস
ফেলা যায় না। সারাক্ষণ কী যেন ফিফিস, ফিসফিস্ করছে।
সমস্ত বাড়ি ভরে’ ছড়িয়ে রয়েছে মৃণাল। চলতে ফিরতে তার
উপর হোঁচট খেয়ে পড়তে হয়। তাকে না-ছুঁয়ে একটা কাজ
করবার উপায় নেই। সমস্ত বাড়ি সে ভরে রয়েছে, আচ্ছন্ন করে
রয়েছে, সমস্ত বাড়ি সে চেপে ধরেছে তার অদৃশ্য সত্তা দিয়ে।
কে জানে মানুষের কোনাে প্রেত-সত্তা আছে কিনা, কিন্তু এই
তাে সব চেয়ে ভয়ঙ্কর, নিষ্ঠুর প্রেত-কথনাে তা ছাড়া দেয় না,
প্রতি মুহূর্তে তা হানা দিচ্ছে, প্রতি মুহূর্তে। সকালে ঘুম থেকে
উঠে চা খেতে বসে’ মিহিরের মনে পড়ে।
এই সময় সে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকত।
রাত্রিতে বিছানায় শুতে গিয়ে মনে পড়ে : ‘ঐখানটায় সে
ঘুমিয়ে থাকতো।
খেতে বসে ভালাে করে খেতে পারে না; মনে-মনে বলে,
ওখানে সে বসততা, সাড়ির কালাে পাড় তার পায়ে এসে
পড়েছে।
হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে হয়তাে দেখতে, নটা
বেজেছে, আর তার মনে হতাে : এই সময়ে বাথরুম থেকে তার
১৫৪
সূৰ্য্যমুখী
মানের ছলছলানি শুনতে পেতুম। আয়নার দিকে তাকিয়ে তার
বুকের ভিতরটা হঠাৎ মােচড় দিয়ে ওঠে।
‘এ-আয়নায় তার ছায়া আর পড়বে না।
আর সেই বাড়ি যেন মিহিরের মনে অদ্ভুত একটা মােহ বিস্তার ,
করলে, হয়ে উঠলাে তার আত্মার একটা অংশ। সেখানে
পাকতে তার অসহ্য লাগে, কিন্তু সেখান থেকে সে বেরােতেও পারে
না। সারাদিন সে বাড়ি বসে থাকে, কিছু করে না। শুধু
চুপ করে তাকিয়ে বসে থাকে। আর অনুভব করে,
বাড়িটা
তাকে জড়িয়ে ধরছে, তাকে ভরে তুলছে। মনেমনে
বােঝে যে এ অসম্ভব, এরকম করে বাঁচা যাবে না, কিন্তু
এড়াতে পারে না। বাড়িটার যেন আলাদা একটা সত্তা
ফুটে উঠছে—তা কথা কয়, তা কথা কয়। মিহির চুপ করে’
শােনে।
কাটলাে একমাস। কিছু বদলালো না। বাড়িটা কথা কয়।
ফিফি, ফিফি। রাত্রিতে ঘুম হয় না। হাওয়ার মধ্যে কী যেন
ভেসে বেড়ায়। আর তার শক্তি যেন ক্রমশই বাড়ছে, এই বাড়ির,
এই পরিপূর্ণ জীবন্ত শূন্যতার। না, সত্যি এ-বাড়িতে থাকা অসম্ভব
হয়ে উঠছে।
শেষটায় একদিন হৈমন্তী বললেন : অনেকদিন মনে-মনে
ভেবেছি তীর্থগুলাে ঘুরে আসবে। এতদিন কেবলই মনে হয়েছে
সূৰ্য্যমুখী
সময় নেই, এইবার দেবতা সময় করে দিয়েছেন। তুই আমাকে
নিয়ে চল।
মিহির বুঝলাে। বললে, চলল।
‘তা হলে খামকা দেরি করে লাভ নেই।
‘না, সব ব্যবস্থা করে ফেলে।
তাপসী একটা চিঠি লিখেছিলাে মিহিরের স্ত্রী-বিয়ােগের খবর
পেয়ে, তার উত্তর দেয়া হয়নি। যেদিন তাদের কলকাতা ছেড়ে
যাবার কথা, তার কয়েকদিন আগে মিহির ছােট একটা চিঠি
লিখলে :
‘মা-কে নিয়ে বাইরে যাচ্ছি শিগগিরই। কো-কোন্ জায়গায়
যাব এবং কবে ফিরব এখনাে কিছু ঠিক নেই। হয়তাে
শিগগির না-ও ফিরতে পারি। তােমার সঙ্গে দেখা করবার সময়
হলাে না। এমন যদি হয় যে তােমার সঙ্গে আর দেখা হলাে না,
একথা মনে কোনাে যে তােমাকে কখনাে ভুলবাে না।
আর পরের দিন বিকেলে মিহির যখন তার স্থানীয় সাহিত্যিক
বন্ধুদের কাছে চিঠি লিখছে, আর-কিছু করবার নেই বলে, সময়
কাটাতে হবে বলে’, ঘরের পরদা সরিয়ে এক স্ত্রী-মুক্তি দেখা দিলে।
লাফিয়ে উঠলাে মিহিরের হৎপিণ্ড, এমন প্রবলভাবে সে চমকে
উঠলাে যে কাগজের উপর গন্ত তার কলমের নিব নিচের দিকে
একটা আঁকাবাঁকা লাইন টেনে গেলাে। পরমুহূর্তে :
সূর্যমুখী
‘ও, তুমি, নিঃশ্বাস ছেড়ে মিহির বললে।
তাপসী তার দিকে এগিয়ে এলাে।-তােমাকে দেখতে এলুম।
তারপর, তার মুখের দিকে একটু তাকিয়ে থেকে :
“কী চেহারা হয়েছে তােমার!
মিহির কাগজ-কলম সরিয়ে রেখে উঠে দাড়ালাে।‘বােলাে।
না-ওখানে নয়, এসাে এদিকে।
জানলার নিচে একটা সেটি, সেখানে তাপসী বসলাে। মিহির
দাড়িয়ে রইলাে তার পাশে। একটু চুপচাপ। কিছুই যেন তাদের
বলবার নেই পরস্পরকে।
‘মা-কে ডেকে আনি, মিহির বললে।
‘আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে তাঁর। তিনিই তাে আমাকে
তােমার ঘর দেখিয়ে দিলেন।
‘তিনি তােমাকে কিছু বললেন ?
না। নিজের পরিচয় দিতে যাচ্ছিলুম, তিনি বললেন “বুঝতে
পেরেছি, তুমি তাপসী তাে ?
‘তুমি কোনাে আলাপ করলে না তাঁর সঙ্গে?
‘করবাে। কিন্তু তােমার সঙ্গে আগে আমার কথা বলা
দরকার। তুমি বসবে না ?
মিহির বসলে তাপসীর পাশে। তাপসী বললে ;
কতদিন তােমাকে দেখিনে।
১৫৭
সূর্যমুখী
‘তােমাকে প্রায়ই আমার মনে পড়েছে।
‘কেন যাওনি?
জোর করে যেতে চাইনি।
তাপসী চারদিকে একবার তাকালে—আর এই ঘরে তুমি
আবদ্ধ হয়ে আছে ?
মিহির মাথা নিচু করলে, যেন লজ্জায়।‘আমি দুর্বল, তাপসী,
আমি দুর্বল।
‘এ-ঘরের রুদ্ধ হাওয়ায় তুমি কেমন করে বাঁচবে?
‘সেইজন্যই তাে চলে যাচ্ছি।
‘চলে যাচ্ছে। কিন্তু সে তাে পালিয়ে যাওয়া। পালিয়ে
গিয়েই কি তুমি বাচবে?
মিহির তার চুলের মধ্যে গভীরভাবে হাত ঢুকিয়ে দিলে ।
‘দেখি চেষ্টা করে।
‘না, পালিয়ে যেয়াে না। যার কাছ থেকে আমরা পালাই সে
তাড়া করে আমাদের পিছন পিছন, তাকে আমরা ছাড়িয়ে যেতে
পারিনে কখনন, তার কাছে আমাদের হার। মিহির, তুমি হার
মেনন না।
মিহির স্থিরদৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে বললে, “তুমি কেন
এলে?
‘আমি বুঝতে পারছিলুম, বুঝতে পারছিলুম। তােমাকে
১৫৮
সূৰ্যমুখী
দেখতে পাচ্ছিলুম এই ঘরে, হাওয়া চেপে বসেছে তােমার বুকের
উপর ভারি হয়ে। মিহির, এ তুমি করছছ কী? এখানে যে
নিঃশ্বাস পড়ে না, ছাঁয়া থমথম করে দেয়ালের কোণে কোণে।
এ যে ভূতুড়ে বাড়ির মত মায়া দিয়ে ঘেরা। আর এই বাড়ির
কাছে নিজেকে তুমি সমর্পণ করেছে, ধরা দিয়েছে সেই
হাতে। নিজের তুমি কী করেছে বুঝতে পারে না?
মিহির, তার দৃষ্টি মেঝের উপর আবদ্ধ :
ক্ষমা করাে, আমাকে তুমি ক্ষমা করাে। তুমি যাও।
কিন্তু তাপসী তার একটু কাছে সরে এলাে :
‘কিন্তু কেন তুমি ভয় করছে ? কেন তুমি লুকিয়ে থাকছে?
আমার দিকে তাকাও, আমার দিকে তাকাও।
মিহির আস্তে-আস্তে চোখ তুললাে। তাপসী বললে, তােমার
চোখে ক্লান্তি। তােমার চোখে মৃত্যুর বাসনা। তুমি কি মরতে
চাও? তুমি কি নিজেকে দিয়ে দিতে চাও, হারিয়ে ফেলতে চাও?
বলল। কথা কও, মিহির, কথা কও।
কিন্তু মিহিরকে যেন ঘিরে রয়েছে একটা মুচ্ছা। মৃত্যুর
বাসনায় বিল চোখে তাপসীর দিকে তাকিয়ে সে বললে;
কী বলতে হবে আমি জানিনে।
তাপসী একটু ঘুরে বসে’ সােজা মিহিরের চোখে তাকালাে।
‘তােমার মুখে পড়েছে এই বাড়ির ছায়া। কতকাল, আর
•
১
সূৰ্যমুখী
কতকাল নিজেকে তুমি এমন করে নষ্ট হতে দেবে ? জানলা
খুলে দাও, জানলা খুলে দাও। ঘরে আলাে আসুক, বয়ে যা
বাইরের হাওয়া। মিহির, শুধু এই রূদ্ধশ্বাস অন্ধকারই একমাত্র
সত্য নয়, আকাশও আছে। সেই আকাশ তােমার—আর আমার ।
তাকে তুমি কেমন করে ভুললে ?
কিন্তু মিহির, মুচ্ছা-মগ্ন, নিশ্চেতন, মাথা নাড়লে :
‘এখন আর সময় নেই। আমি চলে যাচ্ছি। তােমাকে
মনে রাখবে। তাপসী, তােমাকে মনে রাখবে।
‘কেন তুমি যাবে ? কোথায় যাবে? কী হবে গিয়ে ?
যদি হাওয়া না বয়, যদি আলো না ফোটে, যদি এই মুচ্ছা না
ভাঙে—যেখানেই যাও, তুমি তাে মরতেই যাবে। মিহির, তুমি
কি মরবে বলে পণ করেছে ?
যেন কঠিন কষ্টে মিহির উচ্চারণ করলে : তুমি চুপ করে,
অপসী, তুমি চুপ করে।
‘না, না, তাপসী বলে উঠলাে। “ওঃ, মিহির, জানলা খুলে
ও। কথা কও। হাসে। হাসতে ভয় কারাে না। হাসি
দিয়ে ভাঙো এই মুচ্ছ—এই মায়া। কঠিন, নিশ্চল এই পাথর।
পাথর হয়ে উঠছে তুমিও যে। ভিতরে ভিতরে তুমি পচে
উঠছে। প্রার্থনা করাে সূর্যের কাছে, সূৰ্য্য তােমার মধ্যে জ্বলে
উঠুক। নতুন জন্ম হ তােমার প্রাণের। ওঃ, মিহির, আমাকে
;
সূৰ্য্যমুখী
এত করে বলতে হচ্ছে কেন? তুমি কি বুঝতে পারে না?
তুমি কি বুঝতে পারাে না?
মিহির কিছু বললে না। বসে রইলাে মাথা নিচু করে,
হাঁটুর উপর কনুই রেখে, চুলের মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে। তার
চোখ যেন কিছু দেখছে না; তার সমস্ত শরীর ঘিরে এক বিশাল
উদাসীনতা, অন্ধতা। কয়েক মিনিট নিঃশব্দে কাটলাে। তারপর
তাপসী আস্তে-আস্তে বললে ;
‘আমাকে এক গ্লাস জল দিতে পারে?
একটি কথা না-বলে মিহির উঠলাে, দিলে কুঁজো থেকে এক গ্লাস
জল গড়িয়ে এনে। তাপসী জল খেলাে,তারপর গ্লাসটা সরিয়ে রেখে
‘মনে কোরাে না তােমাকে আমি বুঝতে না পারি। কিন্তু
মিহির, ভালােবাসার চেয়ে ভালােবাসার দম্ভকে বড় করে তুলল।
। দুঃখের চেয়ে বড় কোরাে না শােককে। তােমার দুঃখকে
ভালােবেসাে না, দুঃখ ভালােবাসার জিনিস নয়। যদি মরে
গিয়ে থাকো সে তাে ভালােই ; মাঝে-মাঝে তাে মরতেই হয়--
বাঁচবারই জন্য, মিহির। মৃত্যু শেষ নয়, মৃত্যুতে তুমি থেমে
থেকো না—সেটাই যে পরম মৃত্যু। মৃত্যুকে ছাড়িয়ে যাও, মৃত্যু
পলু হয়ে নতুন জীবনে। মৃত্যুতে নতুন জীবনের উৎস, জীবন
নিজেকে নতুন করে সৃষ্টি করে মৃত্যুর ভিতর দিয়ে। সেই জীবনকে
তুমি নাও।
সূৰ্য্যমুখী
তবু মিহিরকে শুন্ধ, অবিচলিত দেখে তাপসী উঠে দাড়ালাে।
তার সামনে দাড়িয়ে নিবিড়, শান্তস্বরে বললে :
‘মিহির, তুমি কি মৃত্যুকে তােমার উপর জয়ী হতে দেবে?
আর হঠাৎ মিহিরের সমস্ত শরীর যেন কেঁপে উঠলাে। চোখ
তুলে সে তাকালাে তাপসীর দিকে, সে-চোখের গভীরতায় যেন
এখনাে অজ্ঞাত এক আলাের হয়ে-ওঠবার জন্য ছটফটানি।
তাপসী বলতে লাগলাে :
জীবনকে অস্বীকার কোরাে না। জীবনকে তুমি নাও,
তােমার জীবনকে তুমি নাও। তারপর, মিহিরের খুব কাছে
সরে এসে, উত্তপ্ত, ঈষৎ-কম্পিত স্বরে :
‘মিহির, কি তুমি ইচ্ছে করে মরবে, তুমি কি জীবনকে ভয়
করবে? তােমার কি সাহস হবে না নিজের জীবনকে নিতে ?
মিহির দু’হাতে মুখ ঢেকে ভাঙা-ভাঙা গলায় বলে উঠলাে :
‘তুমি কেন এলে? তুমি কেন এলে?
‘কষ্ট হচ্ছে তােমার ? হােতার মানে তাে এই যে
মুচ্ছ। ভাঙছে, পাথর ভেঙে যাচ্ছে। তােমার মুখ তােলে, আমার
দিকে তাকাও। আমি তােমার জন্য মুক্তি এনেছি, এনেছি
তোমার জীবন। তা তুমি জাননা, তা তুমি জাননা।
সেইজন্যই তােমার ভয়, তুমি মুখ ঢেকে আছে সেইজন্যেই।
তাপসী মেঝের উপর হাঁটু গেড়ে মিহিরের পাশে বসে পড়লাে,
সূর্যমুখী
দু’হাতে তার মাথা টেনে আনলো তার বুকের কাছে। মিহির
পাংশু মুখ তুলে তাকালাে, তার চোখ অশ্রুতে উজ্জ্বল।
তাপসী বললে : ‘আমার মধ্যে তােমার মুক্তি, আমার মধ্যে
তােমার জীবন। তুমি তা জানো, জানাে, জাননা। কেন তবে
নিজেকে কষ্ট দিচ্ছে। অমন করে? আমাকে তুমি নাও, আমাকে
তুমি নাও। বলতে-বলতে তাপসী মিহিরের ধন চুলের উপর তার
মুখ চেপে ধরলাে।
কয়েকটা মুহূর্ত নিঃশব্দে গড়িয়ে গেলো। তারপর দু’জনে উঠে
দাড়ালাে। তাপসী তাকালাে মিহিরের চোখের মধ্যে, অশ্রুতে
তার অন্ধতা ধুয়ে গেছে, তার মধ্যে সূর্যের ঝিলিমিলি। হাসবার
চেষ্টা করে’ তাপসী বললে, “চলো আমার সঙ্গে একটু বেরােবে ।
অনেকদিন তুমি বাড়ি থেকে বেরােও না’
মিহিব বললে, এখন আর না-বেরােলেও চলে।
‘না’ তবু, চলাে। চলো।
‘একটু বােসো’, বলে মিহির মুখ ধুতে চলে গেলো। সেই
কঁাকে তাপসী আয়নার কাছে দাঁড়িয়ে চুলটা একটু ঠিক করে নিলে।
দু’জনে একসঙ্গে ঘর থেকে বেরুলাে। সিড়ির কাছে এসে
হৈমন্তীর সঙ্গে দেখা।
‘আমি তাে তােমাদের জন্য চা করতে যাচ্ছি।
দরকার নেই, মা। আমরা বেরুচ্ছি।
সূর্যমুখী
‘বেরুচ্ছো? হৈমন্তী যেন কথাটা বুঝতে পারলেন না।
‘হ্যা, মা, বেরুচ্ছি।
দু’জনে সিড়ি দিয়ে নামতে লাগলো। হৈমন্থী ঠাণ্ডা, সাদা
ক্ষুধিত তাকিয়ে রইলেন তাদের পিছনে।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.