Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Maharam-chittra
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মহৰম- চিত্র। ফজলুর রহীম চৌধুরী এম, এ, প্রণীত। * सूना १० बजि साना गांव।
প্রকাশিকা
মিসেস এফ রহীম চৌধুরী
উলানিয়া, বরিশাল।
-
প্রাপ্তিস্থান ঃ-
মোহাম্মদী বুক এজেন্সী
২৯নং আপার সারকুলার রােড,
কলিকাতা।
প্রিন্টার
মােহাম্মদ খায়রুল আনাম খা
মােহাম্মদী প্রেস
২৯, আপার সারকুলার রােড, কলিকাতা
অজজ
*-'৫। • •", , , , ,
2s
নূরনবী হজরত মােহাম্মদের
উদ্দেশ্যে
কি চাহনি আছে দেব, নয়নে তােমার ?
বিমলিন যার কাছে মৃগ-আঁখি-ঠার ;
সরমে চপলা হের লুকায় গগনে,
দেব, তব আঁখি দুটী অতুল ভুবনে।
জানিনাক আছে কি না রবির কিরণে,
অথবা চাঁদিমা গায়ে তব আঁখি-ভাষ,
পুণ্য এ চিত্র কিন্তু পেয়ে সাড়া কার,
দিকে দিকে দিছে ঢেলে অফুরন্ত হাস।
তােমারি আলোেক পেয়ে আশায় মাতিয়া,
কোরক পাপড়ীগুলি গিয়েছে খুলিয়া ;
কৈশােরের স্মৃতি মম ছিল সুপ্ত প্রায়,
আজ সে গগন পানে গরবে তাকায়।
বাণী পুত্ৰ-অরি সমালােচনার ধার,
করে যদি ছিন্ন ভিন্ন পুস্তিকা আমার,
সমাজ কুপুত্র-দোষে যদি বা কখন,
‘চিত্রের হয় গো মম অকাল মরণ,
তোমারি মহিমা ধারা হৃদয়ে ধরিয়া,
উঠিবে পুস্তিকা মম গরবে ভরিয়া ;
এ হতে গৌরব আর কি আছে আমার?
শােক করেতে তব ক্ষুদ্র উপহার।
===
২eases
No text on this page.
নিবেদন আমি যে কখন কাব্য লিখিব এমন মনে করিয়া এই পুস্তক প্রণয়ন আরম্ভ করি নাই। আমি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করিয়াই পুস্তকখানা লেখা আরম্ভ করি এবং যখন ঢাকা কলেজে আই-এ পড়িতাম তখন সখ করিয়া মাঝে মাঝে কারবালা-সম্বলিত ঘটনার দু একখানা চিত্র উক্ত কলেজ-ম্যাগাজীনে প্রেরণ করিতাম । আমার প্রােফেসার ও সমপাঠিগণ সকলেই আমাকে উৎসাহ প্রদান করিতেন। তাঁহাদের উৎসাহে প্রণো- দিত হইয়াই আমার হৃদয়ে মাতৃভাষা চৰ্চ্চার একটা আকাঙ্ক্ষা জন্মে এবং তাহাদের উৎসাহে উৎসাহিত হইয়া আজ সেই কবিতাগুলি একত্র করিয়া জনসাধারণের সম্মুখে উপস্থিত করিতে সাহসী হইয়াছি। আমি ত বলিয়াছি, গ্রন্থখানি আমি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার পরই আরম্ভ করিয়াছিলাম ; তখন আমার বিবেচনা শক্তি তত পরিণত হয় নাই, কাজেই ঘটনা সন্নিবেশ সম্বন্ধে অনেক দোষ রহিয়া গিয়াছে এবং অনেক স্থানে ইতিহাসের ব্যতিক্রম হইয়াছে বলিয়া বােধ হইবে। ঘটনা সন্নিবেশ পরিবর্তন করিতে গেলে পুস্তকখানার আমূল পরিবর্তন করিতে হইবে, কিন্তু সাত নকলে আসল খান্ত হয় এবং লেখার জীবনীশক্তি বিনষ্ট হইয়া যায়, তাই তাহা করিতে বিরত রহিলাম। ইতিহাসের ব্যতিক্রম সম্বন্ধে আমার এই বলিবার আছে যে কাব্য হিসাবে হা ধর্তব্য নহে। অনেক সময়ে আসল ঘটনার চারিদিকে কল্পিত ঘটনার সমাবেশ করিয়া আসলকে ফুটাইয়া তুলিতে হয় ; তাহাতে আসলের কোন মানহানি হয় না।
ভাদ্র, ১৩২৪ সাল ?
পুস্তকখানার প্রুফ ও অন্যান্য নানারূপ ভুল সংশােধন সম্বন্ধে আমি
জাতীয়-মঙ্গলের কবি বন্ধুবর মােজাম্মেল হক বি, এ, সাহেব এবং উলানিয়া
করােনেশন হাই স্কুলের এসিষ্ট্যান্ট মাষ্টার শ্রীযুক্ত বাবু বিপিনবিহারী
চক্রবর্তী মহাশয়ের নিকট কৃতজ্ঞ। আমার যে সকল অকৃত্রিম বন্ধু এই
পুস্তক প্রণয়ন সম্বন্ধে আমাকে উৎসাহ প্রদান করিয়াছেন তাহাদিগকে
আমি আমার অকপট ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি।
পুর্বেই উল্লেখ করিয়াছি তাহাদের উৎসাহে প্রণােদিত হইয়াই আজ
ক্ষুদ্র গ্রন্থখানি জনসাধারণের সম্মুখে উপস্থিত করিতে সাহসী হইয়াছি।
এখন জনসাধারণের আদর এবং উৎসাহই গ্রন্থখানির জীবনস্বরূপ হইবে।
এসহাক-মঞ্জিল।
বিনীত
উলানিয়া, বরিশাল।
ফজলুর রহীম চৌধুরী।
দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞাপন।
বহুকাল পরে খােদার ফজলে মহরম-চিত্রের দ্বিতীয় সংস্করণ বাহির
হইল। এই সংস্করণের জন্য মােহাম্মদীর ম্যানেজার মৌলবী খায়রুল
আনাম খাঁ সাহেবকে আমার অশেষ ধন্যবাদ।
চট্টগ্রাম
বিনীত
ডিসেম্বর ১৯২৭ সাল।
ফজলুর রহীম চৌধুরী।
সূচী পত্র বিষয় পৃষ্ঠা ০০০ | ০ ০ কল্পনার আশিস কাসেদ এজিদের পত্র হাসান ও হােসেন ০০ ০ ১০-১১ ••• ১২-১ s ০০০ যুদ্ধসংবাদ ০০০ হাসানের মৃত্যু এজিদের মন্ত্রণা ••• ২৮-৩১ ৮০ ০ ৩২-৩৩ D জোয়াদের স্বপ্ন মদিনার সভা ৩৪-৩৬ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৪৩৪৪ কারবালা ওহাব শহীদ কাসেন শহীদ হােসেন শহীদ ৪৫-৫২ ০ ০ ৫৩৬৪ ৪৮০ মহাকাল ৬৭৭০ ৫০০ মারওয়ান ও জয়নাল এজিদ ও জয়নাব হানিফার যুদ্ধযাত্রা ফাতেমা ৭৪-৭৫ . ৭৬৭৮
•
বিষয়
পৃষ্ঠা
৭৯-৮২
app
বন্দী
সীমার বধ
৮৩৮৫
০ ০
৮৬৮৯
পাপের শাস্তি
পরিণাম
জয়নাল অভিষেক
০ ০ ০
.
বন্দনা।
দয়াময় গর্বহারী হে বিশ্ব পালক,
বিপদ বারণ তুমি, ধরণী চালক।
অনাদি, অনন্ত তুমি প্রেমপারাবার,
মহিমার সিন্ধু তুমি অতীত চিন্তার।
পাঠালে করুণা করি শেষ পয়গম্বার,
জগতে এলাম সত্য করিতে প্রচার।
একেশ্বরবাদে পূর্ণ হইল জগত ;
( ধন্য তুমি শেষ নবি, ধন্য মােহাম্মদ! )
তিমির নাশিয়া ধীরে উঠিল তপন,
কোরানের গানে, প্রভে, মাতিল ভুবন।
দাও প্রাণে, দয়াময়, কবিত্ব উচ্ছ্বাস,
হয় যেন হৃদে মাের ভাবের বিকাশ,
গাহিতে কারবালা-কথা এসলামের জয়,
পাপের পতন আর ধর্মের বিজয়।
দশদিশি গানে তব উঠুক মাতিয়া,
উজলি জ্ঞানের ধারে হৃদি আললাকিয়া।
No text on this page.
কস্পনার-আশিস।
তুষারশুভ্র, বিশদবরণ,
পঙ্কজবদনী হরিণীনয়না,
বীণা করে ধরি কল্পনা বালা ;
ঢল ঢল ঢল অাখি উৎপল,
অমল আভায় বদন উজল,
উছলি উঠিছে বিমল আলা।
আননের র্গর শান্ত করুণা
বিতরে চৌদিকে স্বর্ণ জোছনা,
বিজলি খেলে গাে নয়নে,
পদতলে কত ফুটছে তারকা
শিশিরসিক্ত, হীরক রাকা,
অঞ্চলউড়িছে গগনে।
৩
কল্পনার-আশি
হাসিতে তার জগত টলে,
পাষাণ শিলা যায়গাে গলে,
বিদ্যুৎ উঠে বিকাশি;
আবার কখনাে হৃভঙ্গে তাঁর
খসিয়া পড়ে তারকা-হার,
নিবিয়া যায় তঁাদের হাসি।
ক্রোধেতে তার অশনী ছুটে,
মেঘের কোলে বজ্র ফুটে,
উঠে সাগর কল্লোলি ;
পর্বতের দৃঢ় বক্ষ হানি
লেগে যায় হানাহানি,
সানুদেশ বেগে উঠেগাে টলি।
হাসিছে বালা মধুরতাময়
ভাসিছে অদূরে মূরতিনিচয়,
বাণী-বীণা-সুরে মাতিয়া
দেহ থরথর, ভাবে ঢলঢল,
আঁখি ঢুলু ঢুলু, প্রেমে টলমল,
উঠিল সকলে নাচিয়া।
কল্পনার-আশিস
শিহরি উঠিল অনন্ত গগন,
বিস্ময়ে চাহিয়া রহিল ভুবন,
উথলি ছুটে মধুর গান ;
ধীরে ধীরে স্বর নামিয়া এল,
রাগিনী শুধু
জাগিয়া র’ল ;
কাপায়ে বিমান ছুটীছে তান।
মূরতি সব সে তানে মাতি,
রাগ রাগিনী মালিকা গাঁথি,
মাতায়ে তুলিল আবার গান ;
গলাতে দোলায়ে মণির মালা,
কল্পনার সেই অমিয় বালা,
করিল সবারে আশিস দান।
“তােমাদের গানে,
তােমাদের তানে,
সকলে দুঃখ ভুলিবে ;
তােমাদের হাসে,
তােমাদের ভাষে,
স্বরগ-উৎসখুলিবে।”
কল্পনার-আশিস
বীরত্বের কথা,
করুণা মমতা,
গাহিবে হর্ষে ধরণী ;
মানব প্রাণে
পিরীতি বহিবে
স্মৃতির নিঝর,
উথলি উঠিবে,
স্বর্ণ উজল বরণী।
বলিয়া বালা বদন ঘুরায়ে,
বাতাসের গায়ে
দীপ্তি ছড়ায়ে,
মিশিয়া গেল গগনে ;
সান্ত্বনা পূর্ণ আশিস রাশি,
কবির মুখে
শান্ত হাসি,
জাগাল শুভ লগণে।
মহম-ভিন্ন
<<
কাসেদ।
আরবের মরুপ্রান্তে তিমির নাশিয়া,
উদিতেছে ধীরে ধীরে বিমল তপন ;
বালুকণা সৌরকরে হয়ে প্রতিভাত
ধরিয়াছে দেহ পরে রজত কিরণ।
সুন্দর বেশেতে মরু হয়েছে শােভিত,
অনন্ত বালুর রাশি অপূর্ব বরণ।
ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি করিছে সাহারা,
দূরে দূরে মরীচিকা ধাঁধিছে নয়ন ;
বিদেশী বণিকগণ আল্লা নাম স্মরি
নিজ নিজ উপাসনা করি সমাপন,
চলিয়াছে উটপৃষ্ঠে প্রফুল্ল অন্তরে,
চলিছে উটের সারি মন্থর গুমন।
মহরম-চিত্র
বালুর সাগর ভেদি অসংখ্য বিপদ
আসিছে গ্রাসিতে যেন মুখ বিস্তারিয়া,
মরুপুত্র বেদুইন, সর্দার নিজাম,
বণিক-আতঙ্ক তারা, সশস্ত্র আসিয়া
চোখের পলকে হের লটি পণ্যরাজি,
মরুর প্রান্তরে পুনঃ যাইছে মিশিয়া।
মধ্যাহ্ন তপন যবে শিরের উপরে,
অজস্র অনলরাশি করে বরিষণ,
বিষাক্ত সিরাকো যবে হয়ে প্রবাহিত
বণিকের প্রাণ করে আতঙ্কে পূরণ,
পূণ্য তীর্থ কাযাত্রী নির্ভীক সন্তান,
অকম্পিত পদে কিন্তু করয়ে গমন।
ধীরে ধীরে পড়ে যবে নৈশ যবনিকা,
পথহারা দিশাহারা পথিক যখন
নিশার আঁধার ঠেলি পাগলের প্রায়
অনন্ত মরুর মাঝে করে বিচরণ
শৃঙ্গে শৃঙ্গে সঙ্কেতাগ্নি জানায় তাদেখে
সেথায় মিলিবে চারু প্রাণ আবাহন
ܗ ܕ
মহরম-চিত্র
অসভ্য বেদুইনদের অতিথির সেবা
লজ্জায় আবরে হায় সুসভ্য সমাজ !
অতিথি শত্রুর প্রতি মহত্ব তাদের
জাগায় সুসভ্য প্রাণে ঘােরতর লাজ,
যুদ্ধক্ষেত্রে তাহাদের কৌশল অশেষ
পরায় সাদরে শিরে বীরত্বের তাজ।
বিপদসঙ্কুল হেন মরু অতিক্রমি,
চলিছে কাসেদ এক মদিনা নগরে,
( রাজার কাসেদ বলি হেন মনে হয়)
দামাস্কের পাঞ্জা হের শােভিতেছে করে,
সঙ্গেতে মােহরাঙ্কিত রাজার লিপিকা,
কল্পনে! চলগাে হেরি কি লেখা ভিতরে।
মহরম-চিত্র
এজিদের পত্র।
“জয়নাব, তব আশে কিনা করিয়াছি ?
শত শত বাধা বিঘ্ন বিফল করিয়া
ধাই তােমার পানে; তার প্রতিদান
হাসানে লইলে তুমি হৃদয়ে বরিয়া।
;
ধনে রূপে সমকক্ষ কে আছে আমার?
এজিদ হাসান হ’তে কত উচ্চতর ।
তুমি কিনা তারে ওগাে অবাধে ঠেলিয়া
ফকির হাসান-করে দিলে নিজ কর।
কিন্তু এ সাধের ঘর ভাঙ্গিব তােমার,
জ্বালাব ও সুখগৃহে শশাকের আগুন,
সে অনলে জ্বলি হায় ও সােণার হৃদি
হইবে হইবে ভস্ম পুড়িয়া দারুণ।
হাসান,
এজিদের মুখগ্রাস লইছ কাড়িয়া,
আহুতি হইবে এর জীবন হননে
আরবে জ্বালায়ে দিব সমর অনল,
জ্বলিরে ভীষণ অগ্নি সুখের কাননে।
মহরম-চিত্র
লভিব জয়নাবে আমি, লভিব নিশ্চয় ;
শত শত বাধাবিঘ্ন তৃণজ্ঞান করে
ফেলিব সরায়ে ; হাসানের প্রাণনাশ
নিশ্চিত নিশ্চিত বলি জানিও সমরে।
যেই অগ্নি জ্বালায়েছ হৃদয়ে আমার,
হাসানের বংশলােপে নির্বাণ তাহার,
জ্বলিবে সমর বহ্নি জ্বলিবে আরব
অচিরে মদিনা ভূমি হইবে কান্তার।
ভারবাহী পশু সব দ্বিখণ্ডিত হয়ে
এজিদের প্রতিহিংসা জানাবে জগতে,
সতীর সতীত্ব নাশ, প্রাণীর সংহার,
জালাবে নরকবহ্নি সুখের মরতে।
সাধের বিটপিশ্রেণী লুটিবে ধূলিতে
জাগাবে আরববক্ষে শােক হাহাকার ;
নরকের প্রেতমূৰ্ত্তি ভ্রমিবে জগতে,
পিশাচের লােল জিহ্বা করিয়া বিস্তার।*
১১
মহরম-চিত্র
হাসান ও হােসেন।
ভূতলে স্বরগ সম মদিনা নগরী
জগত-কীরিট-মণি কিবা মনােহর।
মাঝে মাঝে গিরিশিরে তারকার সাথে
শােভিতেছে অর্ধচন্দ্র পতাকা সুন্দর।
রাজপথে জনগণ চলে অবিরাম,
উঠিতেছে হর্ষধ্বনি মুখরি নগরী ;
ঢালিছে জীবের প্রাণে সুখ শান্তি বারি
বাসন্তী পবন ধীরে সুবাস সঞ্চরি।
অদূরে শােভিছে হের সমাধি সুন্দর ।
(জগতের জনমান্য নবির সমাধি,)
অঙ্গনে নামাজে রত ভকতের দল,
স্মরিতেছে বিধায় বক্ষে হস্ত বাঁধি।
মর্মরে গ্রথিত অই জীবন্ত চিত্রিকা
মােসেম গৌরব গাঁথা করিছে প্রচার ;
সত্য-সনাতন ধর্ম এসলাম জগতে,
উদার মহান্ ও গাে চিত্র মহিমার।
মহরম-চিত্র মসজিদ সােপানে হের দাড়ায়ে হােসেন দামাস্ক-কাসেদ লিপি ধরিয়া করেতে, ভ্রাতৃবর হাসানের বদন নিরখি, এজিদের লিপিকথা বর্ণিছে ক্রোধেতে। “ভ্রাতঃ, হের এই এজিদের সাদর আহ্বান। পিশাচের কুমন্ত্রণে হইয়া চালিত অগণিত সেনা সহ করিয়াছে রণ, করিতে পবিত্র ভূমি কালিমা আবৃত। ভাবে নাই ক্ষণতরে কি মহা প্রলয় করিবে আকুল এই আরব পরাণ শােষিবে কাফের রক্ত প্রতিশােধ ল’তে বুকেতে বিঁধিয়া তীক্ষ্ণ শাণিত কৃপাণ। আরবের প্রাণে পাপী অম্লান বদনে, চাহিছে ভীষণ ব্যথা করিতে প্রদান, কি যে প্রতিহিংসা তার, কি যে প্রতিশােধ সুপ্তোখিত আরবের ধর্মগত প্রাণ-
মহরম-চিত্র
দিবে পরিচয় যবে অসিতে অসিতে
দিবে পরিচয় তারা তীক্ষ্ণ ভল্ল, শালে ;
অসির ঝনে যবে কাঁপিবে মেদিনী,
কি যে লেখা আঁকা আছে এজিদের ভালে।
ভ্রাতঃ,
দোষ তব, প্রদিয়াছ আশ্রিতাকে ছায়া,
পীড়িতাকে করিয়াছ অভয় প্রদান;
করিয়াছ কর্ণপাত লাঞ্ছিত-ক্রন্দনে,
মানিনীর হস্তে হস্ত করিয়াছ দান।
এজিদের কূটমন্ত্রে হইয়া জড়িত
যবে পতি ভাৰ্য্যা তার দিল বিসর্জন,
স্নেহ মমতায় তুমি কোলে তুলে নিলে,
দিয়া তারে স্বরগের প্রেম আলিঙ্গন।
ভ্রাতৃসম যেই ছিল বাল্যকাল হতে,
আজ কি না তােষামদে হইয়া চালিত
দামাস্ক স্বাধীন বলে করিছে ঘােষণা,
করিতে মকার শৌর্য চির আবরিত।
১৪
মহরম-চিত্র
লভেছিল যার পিতা পিতৃদেব হতে
প্রভু পুরস্কার-রূপে ক্ষুদ্র দামাস্কস,
আজ কি না তার পুত্র অহঙ্কার ভরে
কহিছে মােদের হ’তে দামাস্কের বশ।
অহঙ্কারে সেনা তাই করিছে প্রেরণ
মক্কার স্বাধীন ধ্বজা কাড়িয়া লইতে,
কাটিয়া লইতে ভ্রাতঃ, আমাদের শির,
জয়নাবে তার হস্তে প্রদান করিতে।
মােরা কি এতই হীন করিতে বহন,
মােরা কি নির্জীব এত পিঠ পেতে লব,
এজিদের অপমান,-পিশাচের লাথি ?
মক্কার স্বাধীনসূৰ্য অতলে ডুবাব !
যাহাদের প্রিয়খেলা অসিতে অসিতে,
স্বাধীনতা ধৰ্ম্মজ্ঞানে পুজে যারা হায়!
তাহাদের সাথে বাদ। এর প্রতিদান
কি যে এক মহা যােগ বলা নাহি যায়।
মহরম-চিত্র
মক্কার প্রান্তরে যবে ছুটিবে শােণিত,
বহিবে লহরে যবে রক্ত-তরঙ্গিণী, ;
পৈশাচিক রবে হবে পূর্ণ চরাচর,
নাচিবে উল্লাসে যবে শকুনি গৃধিনী ;
রবিকরে ঝকমক-করি বারবার,
হােসেনের তরবারি তীক্ষ্ণ খরতর,
নাশিবে অরাতি যবে, দেখিবে তখন
হােসেনের পরিচয় পাইবে পামর
কাশেদ,
যাও চলে, বল গিয়ে প্রভুকে তােমার,
এর প্রত্যুত্তর হবে অসিতে অসিতে,
ধরি অস্ত্র দৃঢ়করে শত্রু বিনাশিয়া
দিব পরিচয় মােরা অকম্পিত চিতে।
বলিতে বলিতে প্রভু জানূপরে বসি,
দুই হস্ত যােড় করি ভক্তিপূর্ণ সুরে,
দুই গণ্ডে অশ্রুবারি হইছে পতিত,
বলিতে লাগিল বীর করুণ অন্তরে
১৬
মহরম-চিত্র
“জগতের অধিপতি প্রভু পরমেশ,
শকতি নাহিক মাের করিতে প্রার্থনা,
নাই যে তােমার ঐ করুণার শেষ,
কি দিয়া তােমায় খােদ, করিব অর্চনা।
কিছু নাহি প্রিয়বস্তু ধরণী-উপর,
অর্ঘ্য দিতে পারি যাহা সুবিমল পদে ;
উচ্চচিন্তা কিছু নাহি ধরণী-ঈশ্বর,
মম এই পাপপূর্ণ ক্ষুদ্রতম হৃদে।
দাও হে শকতি ঈশ, করিতে প্রার্থনা,
কর মাের ক্ষুদ্র হৃদি প্রেমের নিলয়,
দাও তৰ মহিমার ক্ষুদ্র এক কণা,
সুখে দুখে লই যেন তােমারি আশ্রয়।
সময়েতে পারি যেন জনগণে দিতে,
তােমাদত্ত এই ক্ষুদ্র প্রেম ভালবাসা ;
মহিমার অণুকণা দিবে না কি চিতে?
করুণা-ঈশ্বর তুমি দিওনা দুরাশা।
১৭
মহরম-চিত্র
চির-দুখ-শােক-দৈন্য দলিত যে জন
সেও কি প্রাণের মাঝে গড়ে না কল্পনা ?
কত কি আশায় মেতে তারাে ক্ষুদ্ৰপ্ৰাণ
ভরে সুখে, মুছে যায় অসার ভাবনা।”
মহরম-চিত্র
যুদ্ধ-সংবাদ।
চল গাে কল্পনে সখি, হৃদয়মােহিনি,
এজিদের রাজধানী দামাস্ক নগরে,
শােভিতেছে হৰ্ম্মরাজি কিবা মনােহর !
গর্বভরে উদ্ধশিরে চাহিয়া অম্বরে,
সঙ্গীত তরঙ্গে যেন ভাসিছে নগরী,
অমল জোছন রাশি ধরি দেহ পরে।
উঠিছে দুর্গের চূড়া ভেদিয়া গগন,
সুরক্ষিত দামাস্কস অত্যুচ্চ প্রাচীরে,
তােরণে প্রহরীদল ভীম দরশন,
মুক্ত অসি করে লয়ে বিচরিছে ধীরে,
প্রহরী বেষ্টিত হের এজিদ-প্রাসাদ,
ভূতলে স্বরগ সম স্রোতস্বিণী তীরে।
অযুত কিশােরী-কণ্ঠ হুর-স্বর জিনি,
রবাবের তানে তানে ধরিয়াছে গান,
নাচিতেছে বামাদল রাগিণী তরঙ্গে,
স্খলিত বসন খানি, অপাঙ্গ নয়ান,
লালসা জড়িত চোখে চাহিছে এজিদ,
শিরাজী নেশার ঘােরে হয়ে লবেজান।
১১
মহরম-চিত্র
নিবেদিল হেন কালে উজির মারােয়া,
“বদেগি জাহাপান, আরব-ঈশ্বর,
যুদ্ধের সংবাদ লয়ে আসিয়াছে দূত,
পরাজিত মদিনায় অলিদ প্রবর।”
ছুটিল মদের নেশা, চাহিল এজিদ,
হইয়াছে আঁখিতার রক্তজবা ঘাের,
ক্রোধেতে বদন তুলি জিজ্ঞাসিল
কপিল সভয়ে সবে সভার ভিতর।
“কেন হে নীরব মুখে কাসেদ প্রবর!
কেন হে মলিন মুখে ভূমিতে চাহিয়া ?
বলহে যুদ্ধের বার্তা নির্ভয় অন্তরে,
শুনিতে উৎসুক অতি এ চঞ্চল হিয়া।”
“পরাক্রান্ত মহারাজ দামাস্ক-সম্রাট,”
বলিতে লাগিল
দূত মস্তক তুলিয়া।
“কেমনে বর্ণিব আমি সে যুদ্ধ কাহিনী।
স্মরণে এখনাে মাের কেঁপে উঠে হিয়া,
আল্লাহ আল্লাহহা রবে কাঁপায়ে ভুবন,
আরবেরা যুদ্ধক্ষেত্রে বেগে প্রবেশিয়া,
ঝুলে ঢাল পৃষ্ঠে পরে, হস্তে তরবার,
রঞ্জিছে ধরণী বক্ষ অরাতি নাশিয়া।
মহরম-চিত্র
দেখিনু অশ্বিনীপৃষ্ঠে হােসেন প্রবর
বসন লােহিত বর্ণে হয়েছে শােভিত ;
কাটিয়া চলিছে সৈন্য অক্লান্ত বদনে,
অস্ত্র তার শত্রুপরে হইছে ঘূর্ণিত,
অশ্বের দাপটে ধরা করে টলমল,
মুহূর্তে মুহূর্তে শত্রু হইছে পতিত।
অদূরে দাড়ায়ে এক পুরুষপুঙ্গব
হেরিতেছে আহবের মূরতি ভীষণ,
ক্ষণে ক্ষণে আক্ষেপিছে জীবহত্যা তরে,
বেদনায় পরিব্যাপ্ত কোমল আনন;
অবশেষে আদেশিল যুদ্ধ ক্ষান্ত তরে,
করুণার মূর্তি তিনি এমাম হাস।
উড়িল বিজয়ধ্বজা রণাঙ্গণ পরে,
গাহিল সকলে হর্ষে এমামের জয়,
পড়িল দরুদ সবে প্রান্তরে প্রান্তরে,
গাহিছে আরব জয় রমণীনিচয় ;
হইতেছে পুষ্পবৃষ্টি যােদ্ধগণ-শিরে
মদিনা নগরী-যেন আনন্দ-অলয়।
মহরচিত্র
আরবের জয়গাঁথা শুনিতে শুনিতে
মুহূর্তে সকল জ্ঞান হারাল পামর,
পলকে উন্মুক্ত করি শাণিত কৃপাণ,
আমূল বসায়ে দিল বক্ষের ভিতর,
তা’সহ হইল শেষ কাসেদের খেলা
বহিল পিশাচ-মুখে হাসির লহর।
২২
মহরম-চিত্র
হাসানের মৃত্যু।
কে তুমি রমণি অয়ি, নিশার আঁধারে
অগ্রসিছ ধীরে ধীরে হাসানের ঘরে ?
কেন বা কাঁপিছে দেহ থর থর করে,
কি বাসনা লুক্কায়িত কোমল অন্তরে ?
নিস্তব্ধতা বিরাজিছে ধরণীর বুকে,
নীরব সুপ্তিতে ধরা সুখ-আচ্ছাদিত ;
এহেন সময়ে ওপাে কোন অভিনয়ে
ধরার সুন্দর বক্ষ হবে কলুষিত ?
জলাধার-মুখবস্ত্র করি উন্মােচন,
সঙ্গোপনে কি ঢালিছু নির্বোধ রমণি ?
মামুনার কুটমন্ত্রে হইয়ে দীক্ষিত,
কালিমা আবৃত হায় করিলে ধরণী।
সুখের আশায় মাতি করিলে যে কাজ,
চিরদিন অপযশ ঘুষিবে জগত ;
ঈর্ষাবশে যেই পাপ করিলে অর্জন,
সে পাপের ফলে হায় জ্বলিবে সতত।
মহরম-চিত্র
জয়নাব-সুখ দেখি সহিল না প্রাণে,
তাই বুঝি প্রয়ােগিছ তীব্র হলাহল ?
করিতে স্বামীর প্রাণ সমূলে বিনাশ,
সুতীব্র গরল দানে কি সান্ত্বনা বল ?
পিশাচের মন্ত্রণায় হয়ে প্রতারিত,
স্বামিহন্ত্রী হলে হায় জাএদা সুন্দরি।
কিন্তু এ মােহের ঘাের কাটিবে যখন,
ও দেহ হইবে কালী অনুতাপে পুড়ি।
হাসান স্বপ্নের ঘােরে উঠিল বলিয়া,
“দিওনা, দিওনা তারে ও অনলে ডালি,
সহসা জাএদা-প্রাণ উঠিল কাঁপিয়া,
হায়রে এজিদ আজ কি পাপ ঘটালি ।
খেলিতেছে সুধাকর জোছনা মাখিয়া
তারারাজি মিটিমিটি করিছে আকাশে;
এহেন সময়ে যদি উঠে কাল মেঘ,
চঞ্চলা চপলা যদি গগনে বিকাশে,
মহরম-চিত্র
মানব পরাণ ক্ষোভে উঠে গুমরিয়া,
মথিত করিয়া তার বিষাদ হৃদয়
উঠে অভিশাপ ; পারে কি রােষের ভরে
প্রকৃতির ভাগ্যসূত্র করিতে বিলয় ?
ঐ যে মদিনা-রবি অস্তমিত হায় !
বিষাদে আবরি কত মানব হৃদয় ;
পারে কি ভাঙ্গিতে কেহ মরণের ফঁাদ,
জীবনের কালরাহু করিবারে জয় ?
হাসানের কণ্ঠভেদি উঠিছে যে স্বর
পাপীর অভয় তাহ, অনন্তের দান।
ক্ষমার অপূৰ্ব্ব মূৰ্ত্তি এমাম হাসান,
হৃদয়ের স্তরে বাঁধা কি সুন্দর তান ।
“সর্ব অঙ্গ জ্বলিতেছে বিষের দহনে,
উঃ কি আলা! যাই আমি, বিদায় হােসেন।
জানি আমি যে অভাগী বিষের প্রয়ােগ
করিয়াছে, প্রাণ মাের করিতে হরণ।
মহরম-চিত্র
ভাই, ভব পাশে মাের এই আকিঞ্চন,
সখিনা, কাসেমে করাে বিবাহ বন্ধন,
বহুদিন এই আশা জেগেছিল মনে,
সময় অভাবে কিন্তু হল না পূরণ।
যে দিয়াছে বিষ তার করােনা সন্ধান,
করিও না কোনরূপ শাস্তির বিধান ;
পিশাচের অপরূপ মােহের ছলনা,
রােধিবারে পারে নাই দুৰ্বল পরাণ ।
ক্ষমা করিলাম তারে, প্রাণের হােসেন,
স্বরগেও নিয়ে যাব মাের এই পণ।”
দেখিতে দেখিতে তার মুদিল নয়ন,
স্বর্গপুরে চলে গেল এমাম হাসন্।
এজিদ হাসান বধে ধনের ভাণ্ডার,
খুলিয়া দিয়াছে তার উৎফুল্ল অন্তর ;
সিরাজী পরাণ ভরে করিতেছে পান,
জমিয়া উঠিছে তার মদিরা-আসর,
শাদিয়ানা বাজিতেছে প্রাসাদে প্রাসাদে,
গাইছে"নর্তকীবৃন্দ জয় এজিদের।
মহরম-চিত্র
ঘােষিতেছে রাজদূত দামাস্ক নগরে
হাসান-নিধন-বার্তা। করিছে প্রচার
জয়নাদে এজিদের প্রমত্ত আদেশ,
“কর ফুর্তি, গাও জয় নব বাদসার,
ধন নিতে পার তব যত ইচ্ছা হয়,
খুলিয়া দিয়াছে ভূপ ধনের ভাণ্ডার।
রাজ কাৰ্য্য বন্ধ র’ল সাত দিন তরে,
করিবে না শােকচিহ্ন শরীরে ধারণ ;
একবিন্দু অশ্রুজল ফেলে যদি কেহ,
সহস্র শােণিত-বিন্দু করি নির্গমন
লইব রে প্রতিশােধ—এই রাজাদেশ,
মাত হে উৎসবে সবে হসিত আনন।
পাঠক, প্রবেশি এবে মন্ত্রণা আগারে,
দেখে আসি এজিদের করাল তর্পণ।
२१
মহাশচিত্র
এজিদের মন্ত্রণা।
প্রকোষ্ঠ কাপায়ে রােষে কহিল এজিদ,
“এখনও বিষ দাত ভাঙ্গিল না তার ?
এখনাে সে অধীন করে অস্বীকার,
দেখিব কেমনে বাঁচে জীবন তাহার ?
সে দিন সমরাঙ্গনে কোন ভাগ্যফলে,
লভিয়াছে জয় পাপী, তাই অবিরাম
গর্বভরে ধরাখানা করে সরা জ্ঞান ;
এবার নিজেই আমি করিব সংগ্রাম।”
কহিল মারোয়া মন্ত্রী দাঁড়ায়ে তখন
“প্রভাে, এ অধীন দাস এখনাে জীবিত,
এখনাে এ ধমণীতে বহে রক্তধার,
এখনাে যৌবন মাের দেহে বিরাজিত।
দেখিয়াছি রণে আমি বীৰ্য হােসেনের,
কাসেমের অস্ত্ৰখেলা মরণ জড়িত ;
আরবের প্রতিহিংসা দেখিয়াছি প্রভাে,
এ আইবে পরাজয় নিশ্চিত নিশ্চিত।
২৮
মহররুচি
জেয়াদ হােসেন-বন্ধু কুফার অধিপ,
জানে না করুণা কভু, কঠিন হৃদয়,
পাঠান কাসেদ এক মণিমুক্তাসহ ;
কৌশলে অরাতি নাশ সঠিক নিশ্চয়
ছলেতে হােসেনে তথা লয়ে যায় যেন,
মুখেতে বন্ধু অতি দেখায়ে তাহায়
ঘাতকের হস্তে যেন করেন নিহত;
এর চেয়ে শ্রেষ্ঠতম না দেখি উপায়।”
দাড়াল হামান মন্ত্রী মনস্বী সুজন,
বলিতে লাগিল বৃদ্ধ নির্ভীক অন্তরে,
“মহারাজ, কেন এত রােষ আপনার,
কেন এ প্রবেশ প্রভাে সিংহের বিবরে :
পৃথিবীতে কোন স্বার্থ নাই যাহাদের,
মানবের উপকার করেন সাধনা,
তাহাদের প্রতি বৃথা কেন এত রােষ?
কেন প্রভাে, তাহাদের হনন-কামনা।
২৯
মহরম-চিত্র
আরবের এক প্রান্তে বসতি যাদের,
একবৃন্তে দুটী ফুল সম ছিল যারা,
ছিড়িয়া অকালে প্রভাে কি পাইলে ফল ?
জাগালে হােসেন-প্রাণে ভীষণ সাহারা ।
আর না, আর না প্রভাে, হইয়াছে ঢের,
মৃতােপরি এ আঘাত কেন গাে আবার ?
প্রভাতেই হােসেনেরে ঢেকেছে আঁধার,
আর না হইবে উষা জীবনে তাহার।”
মায়ােয় কহিল রােষে, “বিজ্ঞ মন্ত্রিবর,
বৃদ্ধ হ'লে মানবের বুদ্ধিদোষ হয় ;
নতুবা তােমাতে কেন এত অবনতি ?
এত অবসাদ কেন সারা দেহময় ?
ভূপতি নিজের বলে হইবে সম্রাট,
হইবেন ছত্রপতি পৃথিবী ভিতরে ;
তােমার হাতে কেন মাথাব্যাথা এত?
কেন তব মায়া এত হােসেনের তরে?
মহরম-চিত্র
পৃথিবী গাইবে হর্ষে এজিদের জয়,
মুখে মুখে গীত হবে এজিদের গান ;
তােমার হাতে মন্ত্রী জ্বালা কেন এত ?
কেন সম্রাটের তুমি কর অপমান ?”
গর্জিল এজিদ রােষে আবার তখন,
“সেনাপতি, সত্যবটে তুমি যা বলিলে,
বৃদ্ধ হলে মানবের বুদ্ধি লােপ পায়,
পামরে করহ বন্দী লৌহের শৃঙ্খলে।
আজন্ম আমার অম্নে বর্ধিত শরীর,
ভক্তির চূড়ান্ত আজ দেখা’ল আমায়।
শত্রুকে প্রশ্রয় দিতে বলিতেছে পাপী,
এমন কৃতঘ্ন আর কোথা আছে হায় ।
সেনাপতি,
পাঠাও কাসেদ এক কুফা নগরীতে,
সাথে তার দাও বহু ভেট মূল্যবান ;
উপযুক্ত রক্ষী দাও সঙ্গেতে তাহার,
গােপনেতে যায় যেন, খুব সাবধান।”
মহরম-চিত্র
জেয়াদের স্বপ্ন।
পাপের অপূৰ্ব্ব শক্তি কুহক অশেষ।
কল্পনা করে না তাহা সরল হৃদয় ;
মােহের ছলনে সদা থাকে আবরিত,
হয়না প্রাণেতে তাহা কভুও উদয়।
ক্ষীরের ভিতরে ঢাকা বিষের ছুরিকা,
জানিতে পারে কি তাহা নির্দোষ হৃদয় ?
কিরূপে জানিবে লােকে জেয়াদের প্রাণ
মুদ্রালােভে হইয়াছে বিষের নিলয়।
জেয়াদ গড়িল এক অপূৰ্ব স্বপন,
“স্বর্গীয় মূরতি এক দেখেছি শিয়রে,
হাতে শােভে আষা, গায়ে সাদা পিরূহান,
উজ্জ্বল মুকুট তার রমনীয় শিরে।
বলিতেছে “প্রিয় বৎস, হােসেন আমার
ভ্রাতৃহীন, সঙ্গিহীণ, কাঁদে দিনরাত,
নির্দয় এজিদ
পুনঃ
করিতেছে রণ,
ভেঙ্গে দাও অবিলম্বে তার বিষদাত।”
মহরম-চিত্র
দেখিতে দেখিতে মূৰ্ত্তি হইল বিলীন,
চিনিলাম তিনি হজরত মােহাম্মদ ;
আবেগে বিভাের হয়ে করিলাম আমি
মমানাজাত, ভক্তিভরে হয়ে গগ।
আজ হতে কুফা রাজ্যে করহ প্রচার
হােসেনের সেবা তরে করিলাম পণ,
এজিদ-বিপক্ষে আমি ধরিলাম অসি
হােসেনের তরে আমি করিব রে রণ।
এখনি পাঠাও
দূত
মদিনা নগরে,
হােসেন মদিনা হতে কুফা আসে যেন,
দেখিব এজিদ দেহে ধরে কত বল ?
মরণের সাধ এত হইয়াছে কেন?”
মহরমচিত্র
মদিনায় সভা।
পাইয়া জেয়াদ-লিপি হােসেন সুমতি
করিলেন মহা সভা মদিনা শহরে,
“ভ্রাতৃগণ, শুন তবে, কর অবধান,”
বলিতে লাগিলা বীর শােকাকুলস্বরে।
“একে ত ভ্রাতার শােকে আছি বিচলিত,
চিতায় জ্বলিতেছে হৃদি অনিবার ;
ও দিকে অলিদ পাপী লক্ষ সৈন্য সহ,
আক্ৰমিতে দেশ মাের আসিছে আবার।
যুদ্ধই ধরম জ্ঞানে সেবিতাম আমি,
আজ কাঁপিতেছে হিয়া এজিদের ভয়ে,
দেহ অবসন্ন যেন, বল নাই হাতে,
কণামাত্র তেজ নাই এ বীর-হৃদয়ে।
শত বিভীষিকা আসি স্বপনের ঘরে
দেয় দেখা, আর আসে হাসানের ছায়া।
ইসারায় ডাকে মােরে বলে “আয় আয়,
করিসনে ভাই আর পৃথিবীর মায়া।”
৩৪
মহামটি।
জেয়াদ আমার বন্ধু ধীমান্, সুজন,
কপটতা লেশ নাই হৃদয়ে তাহার ;
ডেকেছে আমায় যেতে কুফা নগরীতে,
স্বার্থশূন্য বীর সে যে গৌরব ধরার।”
বলিল প্রাচীন এক উঠিয়া তখন,
“বন্ধুও সময় পেলে ফিরিয়া দাড়ায় ;
কিরূপে জানিব প্রভাে, জেয়াদের হাত
হয় নাই কলঙ্কিত এজিদ-মুদ্রায় ?
কিরূপে জানিব প্রভাে, মিথ্যা এ স্বপন,
এজিদ কুহক-জাল করিয়া বিস্তার,
রয়েছে প্রস্তুত সদা আপনার তরে,
পড়িলে উদ্ধার কিবা পাবেন আবার!”
“না বৃদ্ধ, তেমন কথা বলােনা কখন,
জেয়াদ কখনাে নহে নির্দয় তেমন,”
কহিল হােসেন সাহ অবিশ্বাস ভরে,
“কুফাতে যাওয়াই মাের সুস্থির এখন।”
মহরম-চিত্র
বলিল আবার বৃদ্ধ অনুনয় করি,
“কুফা যেতে তব যদি এত অভিলাষ,
কিছু সেনাসহ আগে পাঠায়ে মেশ্লেমে,
জেনে নেওয়া শ্রেয়কর মনের আভাষ।”
৩
স্বীকৃত হলেন প্রভু বৃদ্ধের কথায়,
হাজার সিপাই গেল মােশ্লেমের সাথে
সজল নয়নে প্রভু দিলেন বিদায়,
আশীৰ্বাদ করিলেন হাত দিয়া মাথে।
মােশ্লেমের আগমন জানিয়া জেয়াদ
কুফাতে লইল তাকে সাদরে বরিয়া,
নানারূপে মনস্তুষ্টি করিল তাহার,
ছলনার কুম্ভ পাপী হৃদয়ে ভরিয়া।
জেয়াদের ব্যবহারে হ’য়ে তুষ্ট অতি
মােশ্লেম পাঠাল দূত হােসেনের তরে,
এদিকে এজিদ-সৈন্য ঘিরিল তাহায়,
বাধিল ভীষণ রণ কুফার প্রান্তরে।
মহরম-চিত্র
কারবালা।
এই কি সে কারবালা স্মরণে যাহার
শত শত ভকতের ভেদিয়া হৃদয়,
উঠে শুধু হাহাকার, অশ্রু অবিরল
বুক ফাটা কান্না ধ্বনি, বিলাপ নিচয়।
শহীদের রক্তমাখা ফোরাতের তীর,
মহা মরুভূমি এযে লহুর দরিয়া,
বুক ফাটা রােদনের চির তীর্থস্থান,
বীরত্বের কীর্তি ধ্বজা হৃদয়ে ধরিয়া।
জেয়াদের ছলনায় এমাম হােসেন
উপনীত
হল
এই
মরুভূ প্রান্তরে,
চৌদিকে
বালুর
রাশি ভীষণ কান্তার,
জাগিল ভীতির ছায়া তাহার অন্তরে।
সপ্তাহ হইল গত তবুও হােসেন
পাইল না কোন পথ কুফা যাইবার,
চলিয়াছে অবিরত, কিন্তু সে পথের
নাহি শেষ, মরু শুধু চৌদিকে তাহার ।
মহরম-চিত্র
শ্রবণে পশিল রব হায়! হায় !! হায় !!
আসিল সে স্বর যেন দূর শূন্য হতে,
আবার উঠিল রব হায়! হায় !! হায় !!
আবার উদিল ভীতি হােসেনের হৃদে।
বলিলেন “বন্ধুগণ, বিপথে চলিয়া
ভাগ্যের তাড়নে মােরা আসিয়াছি হেথা ;
এখানে মরিতে হবে তােমাদের সহ,
এখানেই শেষ হবে জীবনের গাঁথা।
কারবালা ভূমি এ যে জগত বিদিত,
সম্মুখে বালুর রাশি পাইছ দেখিতে;
দক্ষিণে ফোরাত নদী চলিছে বহিয়া।
দেখিছ বিজন বন আছে বাম ভিতে।
খাটাও শিবির হেথা যা থাকে কপালে,
যা হবার পারিব না করিতে বারণ,
বিধির অপূর্ব বিধি! কি সাধ্য মানব
ক্ষুদ্র বলে করে তার গতি নিবারণ ?”
:
৩
মহরম-চিত্র
উঠিয়াছে হাহাকার হােসেন শিবিরে
পিপাসায় শুকণ্ঠ সকলেরি প্রাণ ;
হয়েছে ফোরাত-তট শত্রুবর্গে ঘেরা,
জলের বিহনে প্রাণ হবে অবসান ।
হােসেন কাসেদ-মুখে পাইল শুনিতে
সসৈন্য মােমে হত কুফা নগরীতে,
জেয়াদ—অলিদ-সৈন্য ঘিরিয়া তাহায়
করিয়াছে অস্ত্রাঘাত নির্দোষ বুকেতে।
জেয়াদের নির্দয় করিয়া স্মরণ,
কাঁদিয়া উঠিল তার কোমল হৃদয় ;
মােমে বিদায় কালে বলেছিল যাহা,
মনেতে আসিয়া সব হইল উদয়।
আসিবে অধীন দাস শুভবার্তা লয়ে,
অথবা শুনিবে প্রভাে, বিশ্বাসী হৃদয়
অসিতে অসির ঘাত করিয়া নির্ভয়ে,
জীবনের সুখ খেলা করিয়াছে লয়।”
৩৯
মহরম-চিত্র
হােসেন ভাবিল মনে “তুমি ত মােশ্লেম,
জীবনের সুখ আশা দিয়া বিসর্জন,
পালিলে প্রতিজ্ঞা তব অক্ষরে অক্ষরে,
জগতের অক্ষয় যশ করিলে অর্জন।
কে দেখিবে এ হৃদের দারুণ যন্ত্রণা ?
উঠিয়াছে আৰ্তনাদ শিবির ভিতরে,
যুদ্ধ বিনা বিন্দুমাত্র জল-আশা নাই,
শিশুগণ শুষ্ককণ্ঠ জল জল করে।
দেখিতেছি কোন চ’খে এ দৃশ্য ভীষণ ?
নরকের পট যেন গিয়াছে খুলিয়া,
নিবার নিবার প্রভাে, ভীষণ যাতনা,
একেবারে শান্তি দাও পরাণে মারিয়া।”
একে একে শিবিরের বালক বালিকা
চাহিতে লাগিল জল হােসেনের, পাশে,
চাহিল হােসেনবানু বিন্দুমাত্র জল,
শিশুর কোমল প্রাণ রক্ষিবার আশে।
৪
মহরম-চিত্র
ব্যথিত হােসেন বীর অশ্ব পরে উঠি,
শিশুটীকে ক্ষিপ্রহস্তে বুকে তুলে নিল,
শত্রুদল মাঝে প্রভু উপস্থিত হয়ে
করিল মিনতি শুধু এক ফোটা জল।
বলিল “আমার পিতা শেরেখােদা আলী,
নানা নূর নবী হজরত মােহাম্মদ,
হাসান ছিলেন মাের প্রিয় সহােদর,
ফাতেমা খাতুন মা জোহরা-জোেত।
স্মরিয়া তঁাদের ভ্রাতঃ, শুধু একবার
এক বিন্দু জল দাও শিশুটীর তরে,
জলের বিহনে এর কণ্ঠাগত প্রাণ,
এখনাে জল হলে বাঁচিতেও পারে।”
“চিনিহে হােসেন তোমা—এজিদের অরি”
বলিল সৈনিকগণ একতান স্বরে,
“বধিব তােমায় মােরা এই তীর ঘায়ে,
কাঁদহে একটিবার জীবনের তুরে।”
৪১
মহরনচিত্র
নিমেষে একটি শর অলক্ষ্যে আসিয়া,
শিশুর নির্দোষ বক্ষ করিল বিদার,
জল তরে আর্ত হায় শিশুর নয়ন,
মেলিল না আঁখি-তারা এ জনমে আর
বলিল হােসেন সাহ, “পাষণ্ড পিশাচ,
কিরূপে নির্দোষ এই শিশুর পরাণ
লইলি তীরের ঘায়ে ? এর প্রতিশোেধ
লইবে লইবে মাের শাণিত কৃপাণ !
শিশুর জানাজা তরে যাইতেছি আমি,
আলাব সমর-বহ্নি ফিরিয়া আবার ;
বলিয়া ফিরিল
প্রভু মৃত
শিশু
বুকে,
শিবিরে পড়িয়া গেল মহা হাহাকার।
६२
মহরম-চিত্র
ওহাব-শহীদ।
কহিল ওহাব-মাতা প্রিয় পুত্রে তার,
এখনও তরবারি রাখিয়াছ কোষে।
আরবের প্রতিহিংসা গিয়াছ ভুলিয়া !
আমিও যে নারী হয়ে কঁপিতেছি রােষে।
শিশুর কোমল বুকে তীরের আঘাত,
এও কি পুরুষ হয়ে দেখিতেছ বসে।
ছি ছি ছি ঘৃণার কথা, ধিক্ শত ধিক্!
হইবে আরব পূর্ণ তব অপযশে।
এখনি কৃপাণ করে যাও রণভূমে,
জল বিনে শিশুগণ কণ্ঠাগত প্রাণ ;
উদ্ধার ফোরাত-তীর শত্রুকুল হতে,
জল এনে পিপাসার কর শান্তিদান।”
ওহাব পলকে অশ্বে করি আরােহণ,
শত্রু বিনাশিতে গেল রণক্ষেত্র মাঝে,
রমণীর দেহ পরে ভুষণ যেমন,
বীরের অপার শােভা রণসাজে রাজে।
৪৩
মহরমচিত্র
অসংখ্য সৈনিক বীর করিয়া বিনাশ
বিন্দু মাত্র জল তরে হইল কাতর,
ঘিরিল এজিদ-সৈন্য চারি দিক্ হতে,
ত হইল দেহ ভূমির উপর।
ওহাব-পতন হেরি শােকার্তা জননী
উদিল শত্রুর মাঝে রণাঙ্গনা বেশে,
পুত্র-শােকে দিশাহারা পাগলিনী হায়!
অবেণী কেশের রাশি উড়িছে আকাশে
নারকী সৈনিক দল রমণীর দেহে,
পিশাচের হৃদি লয়ে করিল আঘাত,
এজিদ। দেখরে দুষ্ট কি মহা প্রলয়,
রমণী-শােণিতে আজ রঞ্জিত ফোরাত!
দেড় লক্ষ শত্রু-সৈন্য করিয়া বিনাশ,
সহিদ হইল যত আরবের বীর,
তবুও বিপক্ষ সৈন্য টলিল না হায়!
উদ্ধার হ’ল না তবু ফোরাতের তীর !
মহরম-চিত্র
কাসেম-শহীদ।
পাঠক,
হেরেছ অনেক দৃশ্য, অনেক বিষাদ,
দেখ চেয়ে আজ এক নূতন অধ্যায়
হইতেছে অভিনীত হােসেন-শিবিরে,
সখিনা কাসেমে আজ শুভ পরিণয়।
কাসেম যাইবে রণে, চাহিল বিদায়
পিতৃব্যের পাশে ; বলিল হােসেন সাহ,
“ভ্রাতৃ-আজ্ঞাতব সাথে সখিনা-মিলন”
বিষাদের মাঝে তাই আনন্দ-প্রবাহ।
রণসাজে কাসেমের হইল বিবাহ,
বিদায় লইল বীর পরিজন হতে,
সখিনার করে কর লয়ে বীরবর
তেজ-পূর্ণ দৃপ্ত স্বরে লাগিল কহিতে-
মহরমটি
“তুমি গাে বীরের কন্যা, আমি বীর-সূত,
প্রণয়-অঙ্কুর আজি প্রেমে পরিণত ;
প্রণয়-পয়ােধি হ’ল পূর্ণ কূলে কূলে,
আমাদের প্রেম দেখে শিখুক জগত।
মিলন হ’ল না বুঝি এজগতে আর,
শত্রুর দামামা শুন ডাকিতেছে রণে,
মিলন হইবে পুন পরমেশ-দ্বারে,
রণভেরী ওই শুন বাজিছে সঘনে।”
বলিল সখিনা-“প্রাণেশ্বর, প্রিয়তম,
শরক্তে পিপাসার কর শান্তিদান,
উদ্ধার ফোরাত-তীর শত্রুগণ হতে,
সকলেই জলবিনে কণ্ঠাগত প্রাণ।
দেখুক এজিদ আজ কাসেমের বল;
হউক জগৎ পূর্ণ তব জয় গানে;
সখিনার স্বামী নহে ভীরু কাপুরুষ !
প্রাণেশ্বর, প্রিয়তম, যাও তবে রণে।”
মহাকচিত্র
সকলের কাছে বীর লইয়া বিদায়,
পলকে অশ্বের পরে করি আরােহণ
উপস্থিত হ’ল আসি রণক্ষেত্র মাঝে,
ডাকিল অরাতি-সৈন্যে করিবারে রণ।
কাসেমের আগমনে সভয় অন্তরে,
চাহিছে সকলে ত্রাসে এ উহার পানে,
শার্দুলের আগমনে শিবকুল প্রায়,
বলশূন্য দেহ যেন, নির্জীবতা প্রাণে।
“এ নহে সামান্য বীর, বীরকুল সেরা”
বর্জখেরে লক্ষ্য করি কহিল ওমর,
“সমকক্ষ নাহি কেহ মম সৈন্ত মাঝে
দ্বন্দ্বযুদ্ধে বধ একে তুমি বীরবর।
দেখাও বীরত্ব আজি বধিয়া সমরে,
চিরকাল ধরাধাম গাবে তব জয়,
উপযুক্ত শত্ৰু তব তুচ্ছ নাহি কর,
কাসেম ইহার নাম হাসান-তনয়।”
৪৭
মহরম-চিত্র।
“কি কহিছ সেনাপতি ? বর্জখেব নামে
সভয়ে কম্পিত হয় সমস্ত ভূবন,
ছি ছি! ছি ছি। লাজে মবি।” কহিল বজ্রখ
“আজ কিনা শিশু সহ দিতে বল রণ।
একান্তই বীর বলি মনে কর যদি,
সৈন্যমধ্যে চারি পুত্র আছে বিদ্যমান,
পাঠাও তাদের আগে, দেখিবে সত্বর
বালকের সমরাশা হইবে নিৰ্বাণ।”
বর্জখের চারি পুত্র একে একে সবে
কাসেমের অসিঘাতে হইল পতিত,
পুত্রশােকে দিশাহারা বর্জখ দুৰ্ম্মতি
ছুটিল কাসেম পানে ক্রোধেতে পীড়িত।
“নির্বোধ বালক অরে, দুঃখ এই মাের,
অকালে আসিলি আজ এ কাল সমরে,
দেখিবি না পুনঃ ওরে পরিজন তাের,
খণ্ডিত হইবে দেহ রণভূমি পরে।
৪৮
মহরম-চিত্র
তৃষ্ণার্ত বালক হত বর্জখের করে,
এই অপবাদ লােকে করিবে রটনা,
কিন্তু পুত্রইন্তা তুই, নাহি রক্ষা তাের,
স্যায় কি অন্যায় আজ না করি ভাবনা
এই যে সুতীক্ষ্ণ অসি বসি তাের বুকে
রক্তিম রুধির-ধারা করিবেক পান
নতুবা জনম মম বৃথা এ ধরায়,
তাের রক্তে অসি মাের করিব ক্ষালন।
“কি কহিব যােদ্ধ বর” কহিল কাসেম,
“একে ত পুত্রের শােকে আছ বিচলিত,
তব সনে আজ আর কি করিব রণ ?
অচিরে তােমার মৃত্যু জানিও নিশ্চিত।
এই যে সুতীক্ষ্ণ অসি মম করে আজ,
চারি পুত্র একে একে করিয়া নিপাত
হয় নি পিপাসাপূর্ণ, নাচি তব বুকে
ডুবাবে জীবন-তরি করিয়া আঘাত।”
১৯
মহরম-চিত্র
মাতিল উভয় বীর ভীষণ সমরে,
দেখিছে সৈনিক দল যুদ্ধের কৌশল;
বর্জ্যখ করিল লক্ষ্য কাসেমের শিরে,
ঢাল পরে লক্ষ্য তার হইল বিফল।
চঞ্চল চপলা প্রায় অসি কাসেমের
উঠিল আকাশে, পুন নামিল যখন,
সভয়ে দেখিল সবে ভীষণ কৃপাণ
বর্জখের শির ভেদি করেছে গমন !
একে একে বহু সৈন্য করিয়া বিনাশ
জল তরে আর্ত হ’ল কাসেম সুধীর
আক্রমিল রােষ ভরে নদী-রক্ষী সেনা,
অশ্ব বা ওষ্ঠে লয়ে আরবের বীর।
৬
দুল দুল চলিতেছে পুচ্ছ প্রসারিয়া,
কাসেমের অসি বেগে ঘুরিছে আকাশে
অসংখ্য অরাতি দেহ করিয়া নিপাত,
শশাভিত হয়েছে অসি রুধিরাক্ত বেশে।
৪
মহরম-চিত্র
সহসা বিষাক্ত এক তীর অসি হায়,
কাসেমের বক্ষ পরে পড়িল সজোরে
বেদনায় সর্ব দেহ হইল কাতর,
লুটায়ে পড়িল বীর অশ্বের উপরে।
অশ্ব বন্ধ হস্ত হ’তে ছুটে গেল ধীরে ;
শিক্ষিত, আহত অশ্ব শত্রু ভেদ করি,
শিবিরের পানে দ্রুত চলিল ছুটিয়া ;
প্রভুর মূৰ্ছিত দেহ পৃষ্ঠ পরে ধরি।
;
কাসেম-মস্তক ক্রোড়ে লয়ে বীরজায়
দেখিছে করাল মৃত্যু—সর্বনাশী ছায়া,
কিরূপে গ্রাসিছে ধীরে জীবন-শকতি,
সংসার অমূল্যধন
লইছে কাড়িয়া।
সতী কি থাকিতে পারে পতিকে ছাড়িয়া ?
সখিনা কিরূপে রবে কাসেম বিহনে ?
লুটায়ে পড়িল দেহ স্বামি-দেহ পাশে,
লভিল অপূৰ্ব শান্তি স্বর্গগত প্রাণ।
মহরম-চিত্র
গলাগলি করে দেখ সখিনা, কাসেম
রুধিরে রঞ্জিত লাল বিবাহ-বসন,
বিমল স্বর্গীয় সুখ লভিছে হৃদেতে,
অপূর্ব সাহানা বেশ করিয়া ধারণ।
এজিদ, কামুক দেখ, কি অপূর্ব দৃশ্য।
গভীর প্রেমের চিত্র এ হ’তে মােহন
আছে কি জগতে? পিশাচ প্রলুব্ধ হয়ে
কোথা হতে কোথা হায় করেছ গমন।
মহরম-চিত্র
হােসেন-শহিদ।
কপােল দক্ষিণ কর রাখিয়া বিষাদে,
ঐ যে একটি বীর বসিয়া শিবিরে
ধরাতল পানে দৃষ্টি, দাড়াল সরােষে,
কাসেম-নিধন-বার্তা শুনিয়া সমরে।
সজ্জিত হইল বীর যুদ্ধ করিবারে,
মহামূল্য বস্তু সব করি পরিধান,
জয়নাল কনিষ্ঠ পুঙ্খ কহিল আসিয়া,
“পিতা গাে, এখন আমি আছি বর্তমান।
যুদ্ধেতে বিরত হও, দেখিবে জয়নাল
বিতাড়িয়া শত্রু সব রণক্ষেত্র হতে,
কিরূপে ফোরাত-জল করিবে উদ্ধার,
সুতীক্ষ্ণ শাণিত অসি লয়ে ক্ষুদ্র হস্তে।”
বলিল হােসেন বীর “তুমি জয়নাল
প্রাণের প্রতিম পুত্র কর অবধান,
এমাম বংশের চিহ্ন রহিবে না আর,
যদি তুমি যুদ্ধক্ষেত্রে কর প্রাণদান।
মহরমচিত্র
শুনিবে হানিফা যবে আম্বাজ-ঈশ্বর,
এ দুঃখ কাহিনী তব হবে অবসান,
সহস্র এজিদ হায় লুটাবে ধুলিতে,
হানিফার ক্রোধ-বহ্নি করিতে নির্বাণ।
সকলের কাছে বীর লইয়া বিদায়,
মহামূল্য বস্ত্রে দেহ করি আচ্ছাদিত,
মােহাম্মদ-শিরস্ত্রাণ নিজ শিরে পরি’
সাহাবের মােজা দ্বারা হইয়া সজ্জিত ;
দাউদের কটিবন্ধে কটিদেশ এটে,
আলীর কবজখানা ধরি বাহু পরে,
বেগবান্ অশ্বে প্রভু আরূঢ় হইয়া,
উপজিল আসি সেই ভীষণ সমরে।
এজিদের সেনাগণ উঠিল কাঁপিয়া ;
হােসেনের অস্ত্র যেন লয়ে অগ্নিরাশি,
চপলার প্রায় দ্রুত চমকি আসিছে,
প্রলয় ঘটাতে আজ সকলে বিনাশি।
মহরমচিত্র
হােসেনের রক্তমুখ, আরক্ত নয়ন,
করেতে সুদীর্ঘ-বর্শা, শাণিত কৃপাণ,
মুখেতে দৃঢ়তাপূর্ণ অবজ্ঞার রাশি,
করিছে তাদের যেন মরণ আহ্বান।
হােসেনের অস্ত্রাঘাতে হইয়া পীড়িত,
এজিদের সেনাগণ প্রাণরক্ষা তরে,
বনে আসি সকলেই লইল আশ্রয় ;
এমাম চালাল অস্ত্র ফোরাত উদ্ধারে।
;
ফোরাতের জলস্রোত করিয়া রঞ্জিত,
এমাম ফোরাত-তট করিল উদ্ধার
শত শত দেহখণ্ড রহিছে পড়িয়া,
চারিদিকে ভীতিরাশি করিয়া বিস্তার।
জলেতে নামিয়া যেই অঞ্জলি পুরিয়া,
লইলা সলিল পান করিবার তরে,
মনেতে আসিয়া শােক হইল উদয়,
ফেলে দিল জল প্রভু অবজ্ঞার ভরে।
মহরনচিত্র
ফোরাত উদ্ধারকল্পে বীরগণ যত,
একে একে দিয়া সবে দেহ বলিদান,
কারবালা মরুভূমি করিয়া রঞ্জিত,
সকলেই স্বর্গধামে করেছে প্রস্থান!
কাসেম কিরূপে হায় বিবাহের দিনে,
প্রিয়তমা পাশে বীর বিদায় লইয়া,
কিরূপে নিজের দেহ করিল নিপাত,
বিন্দুমাত্র জল তরে কাতর হইয়া ।
অশ্রু-জলে সিক্ত হ’ল হােসেনের চোখ,
কিরূপে প্রাণের প্রিয় আলী আক্বার,
পিতার রসনা নিজে করি আস্বাদন,
ভীষণ তৃষ্ণার কষ্ট করিলা নিবার।
বিষাদিত স্মৃতি সব জাগিয়া মরমে,
কাতর করিল তার কোমল হৃদয় ;
হাত হতে জল প্রভু ফেলে
দিল
দূরে,
প্রাণেতে অপূর্ব ভাব হইল উদয়।
৫৬
মহরম-চিত্র
দেহ-বস্ত্র একে একে ফেলে দিল দূরে,
নগ্ন পদে, নগ্ন দেহে এমাম হােসেন
প্রাণের কামনাগুলি সরায়ে ফেলিয়ে,
লভিতে চলেছে আজ আত্মার নির্বাণ।
হৃদয়ের বৃত্তি যার ছাড়ি কোমলতা,
মলিনতা-মসী-বেশ করেছে ধারণ,
কিরূপে জানিবে সেই অভাগা মানব,
শুভ্রবেশ পবিত্রতা সুন্দর কেমন ?
অনন্তের পাখী ঐ উড়িছে আকাশে,
শূন্য পরে ঢালে যেই হৃদয়ের গান,
জগতের কুটিলতা না পারে পৌঁছিতে,
স্তরে স্তরে জাগে তার স্বরগ-আহ্বান।
ভ্রমিতে লাগিল প্রভু ফোরাতের কূলে,
চারিদিকে শত্রুগণ চলিছে ঘিরিয়া,
বায়ু বিদারণ করি শন্ শন্ রবে,
অসংখ্য কলম্বকুল চলিছে ছুটিয়া ।
মহরম-চিত্র
সীমারের তীক্ষ্মতীর হেনকালে এসে,
হােসেনের পার্শ্বদেশে করিল আঘাত;
বিষাদে প্রকৃতি-দেবী উঠিল কাঁদিয়া,
নীরবে শােকের ভরে দাঁড়াল ফোরাত !
বহিল ভীষণ শব্দে ভীম প্রভঞ্জন,
চারিদিক অন্ধকারি’ ঘিরিল আবর,
আসিছে গ্রাসিতে যেন প্রলয়ের ঘটা,
শশাকেতে মলিন যেন জগত-অম্বর।
বিষের দহন আর না পারি সহিতে,
হােসেন পড়িল ভূমে হয়ে অচেতন,
হৃদয়ের বৃত্তি যেন আসিছে নিবিয়া,
আসিছে মুদিয়া ধীরে সুচারু নয়ন।
পাঠক,
বর্ণিতে সে কথা মাের বিদরে হৃদয় ;
লােভপরবশে হের সীমার পামর,
হােসেনের পূত বক্ষে পাতিয়া আসন,
লক্ষমুদ্রা-আশে পাপী, চালাল খঞ্জর।
মহরম-টি
অনাদি অনন্তলীলা, বুঝে শক্তি কার?
কি সাধ্য বুঝিবে তাহা নশ্বর মানব?
হােসেন মেলিল ধীরে শান্ত আঁখি-তারা,
নীরবে হেরিল তার সর্ব অবয়ব।
পশিল না গলচর্মে সুতীক্ষ ছুরিকা,
তিল পরিমাণ স্থান হ’ল না আহত ;
আবার সীমার ছােরা চালাল গলেতে,
স্কন্ধ হ’তে ছােরা পুন হল প্রতিহত ।
আশ্চর্যে চাহিল পাপী হােসেন-বদনে,
শান্ত, সৌম্য মূর্তি তার আকাশে চাহিয়া,
আত্মসমর্পিয়া যেন পরমেশ-পায়,
লভিছে অতুল শান্তি হৃদয় ভরিয়া!
ক্ষণতরে পাপ-হৃদি উঠিল কঁপিয়া,
পরক্ষণে অর্থলােভ হৃদয়ে আসিয়া
ভাসাল পাপের কথা, গলেতে আবার
চালাল সুতীক্ষ্ণ ছােরা করেতে তুলিয়া।
৯
মহরম-চিত্র
বেদনায় ক্লিষ্ট হ’ল এমাম হােসেন,
চাহিয়া পাপীর পানে সস্নেহ দৃষ্টিতে,
বলিতে লাগিল প্রভু “বৃথা চেষ্টা তব,
কাটিবে না গলচৰ্ম্ম ছােরার আঘাতে।
খােল দেখি আগে তব বক্ষের বসন,
প্রকৃত কাতেল’ যদি তুমিই সীমার,
লেশমাত্র লােম তব থাকিবে না বুকে,
নতুবা বিফল হবে ছুরিকা তােমার।
অস্ত ভাবে বক্ষবস্ত্র খুলিল সীমার,
মুহূর্তে হােসেন-হৃদি উঠিল কঁপিয়া,
নিষ্ঠুর, নির্দয় এ যে কাতেল তাহার !
সীমার খঞ্জর পুনঃ ধরিল চাপিয়া।
সীমারের ছােরা পুনঃ হইল বিফল,
হােসেন বলিল ধীষ্ট্রেবৃথা চেষ্টা তব,
কণ্ঠের পশ্চাতে মোর বিঁধিয়াছে তীর,
সেখানে চালাও ছােরা প্রলুব্ধ মানব!
মহরটিজ
বাল্যকালে মাতামহ মেহ পরবশে,
গলদেশে করিয়াছে চুম্বন প্রদান,
পারে কি লৌহের ঐ সামান্য ছুরিকা,
বিখণ্ড করিতে কভু সেই সব স্থান ?”
“রেখে দাও উপকথা” বলিল সীমার
এই ভাবে কেটে নিব মস্তক তােমার”
আবার চালাল পাপী তীক্ষ্ণধার ছােরা,
আবার হইল চেষ্টা বিফল তাহার।
বলিল হােসেন পুন “শুন মহাপাপী,
তুমি যে লােভের দাস, অতি দুরবল,
কিরূপে ‘নাজাত পাবে বিধাতার কাছে
নাই যে সীমার তব সহায় সম্বল!
হেরিয়া পাপের ভরা কাঁদিছে পরাণ,
স্বরগেতে তােমা বিনে কভু নাহি যাব,
সুযােগ তােমাকে এই করিতেছি দান,
হবে না প্রতিজ্ঞা মাের কভু-অপলাপ।
৬১
মহরম-চিত্র
এমামের কথামত তীরবিদ্ধ স্থানে,
সুতীক্ষ ছুরিকা হায় চালাল সীমার
মস্তক বিভিন্ন হয়ে পড়িল খসিয়া,
উঠিল ত্রিদিব ভেদি রব হাহাকার !
হােসেন, হােসেন রবে কাদিল গগন ;
দুকুল প্লাবিয়ে হয় বহিল ফোরাত,
কি যেন অব্যক্ত শােক চলিছে বহিয়া,
মর্মভেদী হাহারবে পূরিল জগত।
কারবালা মরুভূমি করিয়া কম্পিত,
সহস্ৰ মুখেতে যেন চলিছে বহিয়া,
হা হােসেন, হায় হােসেন, অপার্থিব স্বর,
ভয়েতে পাপীর হৃদি উঠিল কাপিয়া।
সাহারার মরুময় হৃদয় আকুলি,
মরমে বেদনা ভার উঠিল জাগিয়া ;
প্রকৃতি হইয়ে হের শির-মণি হারা,
আকুল আবেগ ভরে উঠিল কাদিয়া
মহরম-চিত্র
“জীবনের প্রহেলিকা,
ছেদি ভব-কুহেলিকা,
ওহে মহামতি, এবে চলিলে কোথায় ?
বিসর্জিয়ে মায়া, আশা,
বলি দিয়ে ভালবাসা,
সাধিয়ে আপন কাজ বিপুল ধরায়,
চলিলে কোথায় দেব, চলিলে কোথায় ?
উল্কাসম জনমিয়ে,
দশ দিশি উজলিয়ে,
কোথায় চলিছ এবে মহান্ পরাণ?
প্রখর মার্তণ্ডপ্রায়,
আলাে দিয়ে এ ধরায়,
কোথায় গরবে প্রভাে, করিছ প্রয়াণ ?
এ দেশ পাপেতে ভরা,
জীব হেথা সুখহারা,
চলিয়াছ তাই বুঝি অমরের বেশে !
বলি দিয়ে সব সুখ,
ভুলে যত শ্রম, দুখ,
ভুঞ্জিতে অতুল সুখ স্বরগের দেশে?
মহরম-f
ধরাতল পরিহরি,
কোন দেশ লক্ষ্য করি,
চলিলে কোথায় দেব, কোথা আলােকিতে
অন্ধকার করি হেথা,
বিতরিয়ে মাদকতা,
কোথায় চলিলে দেব, অলাে বিতরিতে ।
তথায় আছেগাে বুঝি প্রীতির বন্ধন,
বিরহ নাহিক তথা,
নাহি তথা শােক কথা,
অতুল প্রেমেতে গড়া বুঝি সে ভুবন।
আর কেন বিলম্বিছ যাও দেব, যাও
সেবিবে দেবতাচয়,
উজল স্বরগময়,
অপ্সরার বরমাল্য তব গলে দাও,
স্বরগের জ্যোতিকণা স্বরগেতে যাও।”
৬s
মহাকাল।
;
আমি মহাকাল, দলি আমি পদতলে
শত শত শির, পদাঘাতে চূর্ণ করি,
দীর্ণ করি দেহ খণ্ডগুলি, চলি আমি
মহাবেগে, নাহি দৃষ্টি সম্মুখে পশ্চাতে।
অক্ষয়, অনন্ত আমি ; তড়িতের ন্যায়
গতি মাের, জলি আমি উল্কাখণ্ড প্রায়
আমার আবৰ্ত্ত ঘঘারে হাসান নিহত,
হােসেন হয়েছে হত কারবালা ভূমে,
বিবাহ-দিবসে হের সমরে পতিত,
আরবের বীরশ্রেষ্ঠ হাসান-নন্দন,
অপূৰ্ব সাহানা বেশ করিয়া ধারণ!
ওহাব-পতন হেরি শােকার্তা জননী,
উদিল শত্রুর মাঝে রণাঙ্গনা-বেশে,
রমণী-শােণিতে হ’ল রঞ্জিত ফোরাত ।
করি ছিন্ন দশনেতে শত শত শির,
আবৰ্ত্তে সাধন করি প্রলয় সংসারে,
জাগায়েছি আরবেতে রব হাহাকার।
ক্ষুন্নিবৃত্তি এখনও হয়নি নীরব,
দামাস্কে জাগাব পুনঃ সমর-অনল ।
No text on this page.
দ্বিতীয় খণ্ড।
মারওয়ান ও জয়নাল।
জয়নাল,
মদিনা-গৌরব-রবি অস্তমিত আজ,
দামাস্ক-সম্রাট হের প্রভু মদিনার,
হাসানের পাপে হায় আরব শশ্মান,
মক্কায় উঠেছে আজ খােল হাহাকার।
রক্ষিতে বাসনা যদি অমূল্য জীবন,
লভিতে অতুল সুখ পৃথিবী ভিতরে,
দামাস্কের অধীনত করহে স্বীকার,
হইবে শৃঙ্খলমুক্ত চিরকাল তরে।”
নীরবিল মহা ধূর্ত মারােয়া পামর,
সগর্বে মস্তক তুলি কহিল জয়নাল,
“করিব কি এজিদের প্রভুত্ব স্বীকার ।
পরিব কি গলে সাধে দাসত্ব-শৃঙ্খল!
মহরম-চিত্র
এজিদ মাবিয়া-পুত্র, এমামের দাস,
কি সাধে করিব তার দাসত্ব স্বীকার
পতঙ্গের পক্ষ হয় মরণের তরে,
এজিদের খর্ব হবে গর্ব অহঙ্কার।”
আবার কহিল ধূর্ত “শুন জয়নাল,
অদৃষ্ট-লিখন ইহা, বিধির বিধান,
দামাস্ক-সম্রাট হবে পৃথিবী-ঈশ্বর,
মুখে মুখে
গীত হবে এজিদের গান।
বৃথা অহঙ্গারে হের হাসান নিহত,
হােসেন সবংশে হত কাৰ্বালা-প্রান্তরে
এখন উদ্ধার-আশা মরীচিকা প্রায়,
কে বল আসিবে পুনঃ এ কাল সমরে ?
তাই বলি কর ওগগা প্রভুত্ব স্বীকার,
জয়নাবে এজিদ-করে করগে-প্রদান,
ভুঞ্জিবে অতুল সুখ, অক্ষয় গৌরব,
লভিবে জীবনরত্ন এজিদের দান।
মহামচি
নতুবা লুষ্ঠিত হবে মস্তক তােমার,
এজিদের প্রতিহিংসা করিতে নির্বাণ,
শাণিত শূলেতে তব হবে প্রাণ নাশ,
সংসারের খেলা তব হবে অবসান।”
উত্তরিল জয়নাল “শুন হে মায়ােয়া,
জগতের হিত যিনি করেন সাধন,
রক্ষিবেন তিনি মােরে ভীষণ বিপদে ;
বিপদ-বারণ বিভু পতিত-পাবন।
প্রমত্ত বারণ সম পিতৃব্য হানিফা
শুনিবেন যবে এই কাহিনী ভীষণ,
সহস্র এজিদ হায় লুটাবে ধূলিতে,
হানিফার ক্রোধ-বহ্নি করিতে বারণ ।
এখনাে সময় আছে, এখনাে মারোয়া
মাগাে ক্ষমা একবার অপরাধ তরে,
করুণা-ঈশ্বর তিনি দয়ার সাগর
উজ্জ্বল প্রদীপ প্রভু আলােকে আধারে।”
মহরম-চিত্র
নীরবিল জয়নাল এ কথা বলিয়া,
ভাবনা-সাগরে মগ্ন হইল মারােয়া,
প্রমত্ত কুঞ্জর সম বীর বর্তমান ;
ভয়েতে শরীর তার উঠিল কঁপিয়া।
••
সৈন্যহীন, অর্থহীন দামাস্ক এখন,
সংখ্যাতীত সেনা হায় হয়েছে নিহত ;
কিরূপে সে আক্রমণ করিব বারণ?
কেমনে হানিফা-শক্তি হবে প্রতিহত ?
কেমনে যাইব ফিরি তীরেতে আবার ?
ডুবিয়াছি হায় মােরা অতল সলিলে।
পরাহত হেরি আজ দামাস্ক-মঙ্গল,
জ্বলিবে দামাস্ক দেশ ভীষণ অনলে।
প্রকাশ্যে কহিল ধূর্ত আবার তখন,
“জয়নাবে এজিদ-হস্তে করগে প্রদান,
ভুঞ্জিবে অতুল সুখ অক্ষয় গৌরব,
লভিবে জীবনরত্ন এজিদের দান।”
এজিদ
ও জয়নাব।
“জয়নাব, কুরঙ্গিণি, হৃদয়-রঞ্জিনি,
লওহে বরিয়া আজি এজিদে তােমার।
যে দিন প্রথম হায় নেহারি তােমায়,
হৃদয় বিকায়ে দিনু চরণকমলে ;
বিসর্জিয়া আত্মজ্ঞান ধাইনু পশ্চাতে,
পদতলে দলি হায় ধর্মচিন্তা সব।
ভিক্ষুক হাসান হের উন্মত্তের মত
দাড়াল বিপক্ষে মাের ; মুহূর্তের মাঝে
হয়ে গেল ভস্মীভূত তীব্র রােষানলে,
হােসেন সবংশে হত। অয়ি বরাননে,
লও আজি বুকে তুলে এজিদে তােমার
রিপুদল দলি পদে জয়মাল্য গলে,
এ দাস এসেছে আজ তােমার সমীপে।
তৃষিত চাতক প্রায় দুরাত্মা এজিদ
চাহিল জয়নাব পানে বরিষণ-আশে ;
তুলিয়া মরাল-গ্রীবা বলিল জয়নাব,
“এজিদ, ধিক্ রে দুষ্ট পাষণ্ড পামর,
নরকুল-গ্লানি তুই।
পাপের ছলনে
অহঙ্কারমদে মুদি আঁখি অন্ধপ্রায়
মহরম-চিত্র
চলেছিস ধেয়ে। ওরে মূঢ়, নাহি দৃষ্টি,
কোথা হতে কোথা হায় করেছ গমন।
খােল আঁখি একবার, দেখ চেয়ে পাপী,
আরবের ঘরে ঘরে মহা হাহাকার।
প্রতিশােধতরে শত শত অভিশাপ
উঠিছে আকাশে। দুই হস্ত উদ্ধে তুলে
মাগ পাপী একবার বিধাতার ক্ষমা।”
লালসাজড়িত আঁখি তুলিয়া এজিদ
লাগিল বলিতে তব তরে জয়নাব,
শুধু তব তরে, এখনাে দেহেতে প্রাণ,
হৃদয়েতে আশা ভুঞ্জিতে অতুল সুখ।
অক্ষয় অনন্ত ওগগা রূপরাশি তব
রাজভােগতরে শুধু। নির্মিত হয়নি
অতুল এ রূপরাশি হাসানের তরে।”
বলিয়া ধাইল পাপী আলিঙ্গন আশে।
দলিতা-ফণিনী-সম গর্জিলা জয়নাব,
“সাবধান নরাধম, এ তীক্ষ ছুরিকা
রাখিয়াছি তব তরে ; পাষণ্ড, পিশাচ
আলায়েছ গৃহে মম শােকের আগুন।
লােভের ছলনে পাপী চলেছ জব্বরে ;
মহরম-চিত্র
দাম্পত্য প্রণয়ে কপােত কপােতী সম
ছিনু মােরা সুখে। ভাঙ্গিয়া সে ঘর মাের
ফেলে দিলে হায় মােরে অকূল পাথারে।
শান্তিতরে শুধু হাসানের পূত পদে
লই আশ্রয়। পাপিষ্ঠ, কৌশলে তব
হােসেন সবংশে হত, হাসান নিহত।
শােনূরে এজিদ, ফের যদি একপদ
হবি অগ্রসর, শাণিত ছুরিকা মম
তাের পাপ-রক্তে আজি করিব ক্ষালন।
শােন্ মহাপাপী, প্রতিফল-দিন তাের
সমাগত প্রায়। উদিবে যে ঘনঘটা ;
ঘিরিবে রে তােরে শীঘ্র চির-অন্ধকার।”
বলিতে বলিতে সতী গর্বপদভরে
পরিজনপাশে ত্বরা করিল গমন।
হানিফার যুদ্ধ-যাত্রা।
“মন্ত্রিবর, একি কথা শুনিতেছি আজ।
হাসান কৌশলে হত এজিদ-করেতে,
হােসেন শিবিরে বন্দী, সসাগরা ধরা
হ’ত প্রকম্পিত হায় যাদের বীরত্বে,
তারাই লাঞ্ছিত কিনা শৃগালের করে !
লিখে দাও রাজলিপি বিভিন্ন দেশেতে
সমরে নিরত যেন হয় নৃপকুল ;
আলাব দামাস্ক দেশ জ্বলন্ত বহ্নিতে।”
এতেক বলিল ক্রোধে হানিফা প্রবর,
ছুটিল ফুলিঙ্গ যেন জ্বলন্ত আঁখিতে।
তারপর বীরবর চাহি সৈন্য পানে,
বিবরিল এজিদের পাপের কাহিনী ;
“জলাভাবে শিশুগণ করে হাহাকার,
ঘিরিয়াছে নদীকূল এজিদ-বাহিনী
ঝলসি উঠিল ক্রোধে সহস্র কৃপাণ
যেরূপ মেঘের কোলে চমকেদামিনী ;
ক্রোধেতে আষাজীগণ চীৎকারি উঠিল,
কঁপিয়া উঠিল ভয়ে আবব-মেদিনী।
স
s
মহরম-চিত্র
জেয়াদের মােহমন্ত্রে হয়ে প্রতারিত,
কিরূপে মােশ্লেম হত কুফা নগরীতে,
শুনিয়া সৈনিকবৃন্দ কহিল কাতরে,
“এমামের পরিবারে রাখহে শান্তিতে,
ওহে প্রভাে দয়াময় করুণা-আধার,
পাই যেন এমামেরে জীবন্ত হেরিতে”
বলিতে বলিতে ক্রোধে অগ্রসিল সবে,
কারবালা অভিমুখে তড়িত-গতিতে।
পথিমধ্যে দূতমুখে শুনিল হানিফা
হােসেন সসৈন্য হত কাৰ্বালা-প্রান্তরে,
জয়নাল জীবিত শুধু এমামের কুলে,
হােসেনের পরিবার এজিদের করে ;
হানিফা ক্রোধের বশে কহিল গর্জিয়া
“এজিদ, ইহার শাস্তি হানিফার করে
ভুগিবি, ভুগিবি ত্বরা ; তাের ছিন্ন শির
জাগাবে অপূৰ্ব্ব শান্তি হানিফা-অন্তরে।”
ফাতেমা।
“মাতঃ,
মিটি মিটি করিতেছে তারকা গগনে,
অমল বিমল জ্যোতি করিয়া ধারণ,
নিবসে কি পিতা মাের তারকার মাঝে
ভুলিয়া মােদেরে মাগাে সুখেতে মগন ।
নিশাতে যখন মাগাে, শয্যাপরে শুয়ে,
চেয়ে থাকি একমনে সুনীল গগনে,
জ্যোতির্ময় ক্ষুদ্র তারা হস্ত বিস্তারিয়া
ডাকে যেন মােরে মাগাে, প্রফুল্ল আননে।
ঘুমঘােরে অচেতন মুদিত নয়ন
যখন নীশীথ কালে যায়গাে খুলিয়া
দেখি মাতঃ তারা খানি শুভ্র আবরণে
রেখেছে ঘিরিয়া মােরে আলাে বিস্তারিয়া
আকুল হয়েছে মাতঃ, হৃদয় আমার
যাইতে পিতার কাছে, পথ বলে দাও;
কিরূপে যাইব ওগাে, কোথা তুমি পিত
ফাতেমা নন্দিনী তব কোলে তুলে লও।
মহরম-চিত্র
কহিল হােসেন-জায়া নির্বোধ বালিকা,
চলে গেছে পিতা তব দূর স্বর্গ পুরে ;
জীবিত মানব তথা না পারে পশিতে,
মন হতে বৃথা চিন্তা ফেলে দাও দূরে।
নেহার, এজিদ পাপী আসিছে এদিকে,
হেথা হতে শীঘ্রগতি যাই আমি চলে,”
বলিয়া হােসেন-জায়া ত্বরিত গতিতে
নিমিষেতে চলে গেল চোখের আড়ালে।
বলিল এজিদ আসি, “বালিকে ফাতেমা,
শুনেছি খেজুর খেতে তােমার বাসনা,
সুপক্ক খেজুর পাত্রে আনিয়াছি তাই,
মিটাইতে সাধ তব মনের বেদনা।”
‘নাচিল উল্লাসে হায় বালিকা হৃদয়
হউক তােমার পাপী সুখের জীবন।”
বলিয়া ধাইল বালা পাত্রের দিকেতে,
সুকোমল ভুজদ্বয় করি প্রসারণ
৭
ইরাও
এজিদের পাপ-চিত্র হেরিতে হেরিতে
অচল হয়েছে এই লেখনী আমার ;
যেই পাত্রে রেখেছিল হােসেনের শির,
অঙ্গুলি নির্দেশে তাহা দেখাল পামর।
উন্মােচিল স্তহস্তে বালিকা ফাতেমা
পাত্রের উপরে ঢাকা ক্ষুদ্র আবরণ
সত্রাসে বালিকা দ্রুত ধাইল পশ্চাতে,
ভয়েতে শুকাল তার কোমল আনন।
পিতার বিখণ্ড শির হেরিয়া বালিকা
হৃদয়ে পাইল হায় অশেষ যাতন,
বাত্যাহত ছিন্ন ভিন্ন লতিকার মত
ভূমিতে পড়িল বালা হয়ে অচেতন।
ফাতেমার নিমীলিত ক্ষুদ্র আঁখিতারা
আর না হেরিল কভু এ পাপ ভুবন,
নির্দোষ, নিস্পাপ আত্মা প্রতিশােধ তরে
বিধির সকাশে ত্বরা করিল গমন।
৭৫
বন্দী।
রক্তবর্ণে আলােকিয়ে পূরব গগন,
উদিত হইল ভানু আরব-প্রান্তরে ;
সুচিকণ বালুকণা হয়ে প্রতিভাত,
ক্ষণে ক্ষণে ধরিতেছে নব নব বেশ,
সৌরকরে চমক্ করে অনিবার।
সীমার কৌশল বলে অর্থদান দ্বারা
তােগান-তুরকী-রাজে করিয়া বন্ধন
চলিয়াছে দামাস্কসে ; মনে কত আশা,
অর্থলাভ, পদবৃদ্ধি, শত শত আশা
উথলি উঠিছে প্রাণে ফুৰ্ত্তি সঞ্চারিয়া।
ধূ ধূ ধূ জ্বলিছে ঐ এখনাে শিবির,
ভারবাহী পশু সব ছুটিছে চৌদিকে,
পরাজিত সৈন্য সব গুহাতে যাইয়া
লইছে আশ্রয় ; সীমার প্রফুল্ল মনে
চলিল দামাস্ক পানে, আনন্দ বাজনা
বাজিতেছে মরুভূমি করে প্রকম্পিত।
হেন কালে পূর্বদিকে চক্রবাল ভেদি
উদিল সৈন্যের রেখা, ভাবিল সীমার
;
মহরম-চিত্র
;
আসিছে মারােয়া মন্ত্রী। আনন্দ আবেশে
অগ্রসিল কিছুদূর; নিশানে খচিত
অর্ধচন্দ্ৰ-পূৰ্ণ তারা, ফুকিছে নকিব
মসহাব, কাক্কা যিনি এরাক-ভূপতি
যাইতেছে মদিনায় হানিফা সকাশে,
যদি কারাে থাকে শক্তি দাও বাধা দান।”
পরাজিত সেনা সব সেই রব শুনে
আসিয়া কাক্কার পাশে লাগিল বলিতে,
“তােগান তুরকী-রাজ সৈন্যগণ সহ
যেতেছিল মদিনায় হানিফা উদ্দেশে;
পথি মধ্যে নিশাকালে শিবির খাটায়ে ;
ছিল নিদ্রা-নিমগন। সীমার পামর
আক্রমিল হেনকালে, কিন্তু শরাঘাতে
হয়ে জর্জরিত ছাড়িল সম্মুখ রণ।
ষড়যন্ত্র করি পাপী নিশীথ সময়ে,
সৈন্যাধ্যক্ষে বশীভূত করি অর্থদানে,
শিবিরে দিয়াছে অগ্নি ; বহ্নিমুখে হায়
কত শত হতভাগ্য হইয়াছে লয়।”
পলকে সমর ডঙ্কা উঠিল বাজিয়া,
কৃপাণ-ফলক-রাশি কোষমুক্ত হয়ে
মহরম-চিক
চঞ্চলা চপলা প্রায় উঠিল চমকি।
এরাকী-সৈনিকগণ কাক্কার আদেশে
সীমারের সেনাগণে ফেলিল ঘিরিয়া,
বাঁধিল তুমুল রণ; কাক্কায় সে বেগ
না পারি সহিতে আশ্রয় লইল পাপী
শিবির ভিতরে। প্রাণরক্ষা তরে ত্বরা
ছেড়ে দিল রাজদ্বয়ে ; কাকার হৃদয়
টলিল তাতে ; কহিলেন “বন্ধুগণ,
দামাস্কের সৈরাশি করহ নিপাত ;
পারে যাইতে যেন আজ এক প্রাণী
ভেদি এ দুর্ভেদ্যশ্রেণী। এই সে সীমার
এমামের কণ্ঠদেশে করি অস্ত্রাঘাত
;
করিয়াছে শিরচ্ছেদ, দেখিব পাপীরে
আজ দেখি কোন ছলে পায় পরিত্রাণ।”
সীমারের ব্যবহারে হয়ে ক্রোধান্বিত
বলিছে সৈনিকবৃন্দ, “একি ব্যবহার।
-যার পরে প্রাণ মােরা সমর্পণ করে
আসিয়াছি রণক্ষেত্রে, তিনি কিনা ভয়ে
আশ্রয় লয়েছে যেয়ে শিবির মাঝারে
শত্রু-করে সমৰ্পণ করিয়া মােদেরে।
মহরম-চিত্র
ধিক্ সে সীমার নামে! এস মােরা সবে
পাপিষ্ঠে বন্ধন করি কাক্কার করেতে
করিগে প্রদান; কেন পুতলের মত
শক্তহস্তে শুধু শুধু করি প্রাণদান?”
দামাস্ক-সৈনিকগণ সীমার পামরে
লৌহের শৃঙ্খল দ্বারা করিয়া বন্ধন
উপস্থিত হ’ল আসি কাক্কার সকাশে;
সকলে বন্ধন করি বীর মহাব
প্রদীপ্ত তপন সম উৎফুল্ল অন্তরে,
চলিল গরব ভরে হানিফা উদ্দেশে।
৮২
সীমার-বধ ।
কেন হে সীমার আজ শৃঙ্খলিত হয়ে
হানিফা-শিবিরে আজি? কেন অবিরত
জ্বলিতেছে অনুতাপে, কেন শ্লথ দেহ
হানিফার পদতলে হইছে পতিত ?
তুমি না সীমার সেই লক্ষ মুদ্রা-আশে
হােসেনের গলদেশে ছুরিকা বসায়ে
কাটিয়া লয়েছ শির? কেন আজ ওহে
গর্বিত ও দেহখান ধূলায় লুটায়ে !
ধৰ্ম্মজ্ঞান বিসর্জিলে স্বর্ণমুদ্রা-আশে,
ওরে রে মুদ্রার গুণ বলিহারি যাই।
চ’খের পলকে কর প্রলয় সংসারে,
তােমা হেন মােহমদ অদ্বিতীয় নাই।
.
হানিকার শির-আশে চলেছিলে পুনঃ
কিন্তু কি বিধির বিধি । হ’ল অঘটন
এ জনমে আর তব পূরিল না আশা,
চিরতরে মুখ হায় মুদিবে নয়ন!
মহরম-চিত্র
কোথা সেই পদবৃদ্ধি, কোথা অর্থলাভ
মনে যেই উচ্চ আশা করিতে পােষণ ?
সকলি ও প্রাণ সহ হইবে বিলয়,
দুরাকাভক্ষা তব আর হ’ল না পূরণ।
পিপাসায় শুকণ্ঠ হােসেনের প্রাণ
কঠিন ছুরিকাঘাতে করিলে হরণ,
কিন্তু তব দণ্ড আজ প্রতিফল তার
সুতী বাণের ঘায়ে হইবে মরণ।
সঙ্কেত হইল যেই কল অশেষ,
সুতীক্ষ্ণ ধারাল প্রান্ত, লাগিল বিধিতে
পাপীর কঠিন দেহে, জর্জরিত
হয়ে
পড়িল সীমার হায় লুটায়ে ভূমিতে!
“ওহে হে হােসেন প্রভাে, কিবা লােভে হায়,
লক্ষ মুদ্রা আসে তােমা বধিনু কুক্ষণে,
ওই যে নরক-অগ্নি লােলজিহ্বা লয়ে
আসিতেছে গরাসিতে, দাও ছায়া বুকে।
মহরম-চিত্র
;
ওই যে বিশাল বক্ষ পাপীর আশ্রয়
বিস্তারি দাও হে ছায়া করুণা-নিদান;
পারি না, পারি না আর সহিতে এ জ্বালা,
দেখাও পাপীরে প্রভাে মহিমার দান।
সুনির্মল পুণ্যতলে দাও শান্তিছায়া,
করুণার সিন্ধু তুমি, এমাম হােস,
তুমি বিনে প্রভাে মাের রক্ষা আর নাই,”
বলিতে বলিতে পাপী মুদিল নয়ন।
পাপের শান্তি।
মানবের ভাগ্য-সূত্র অনন্তের টানে
নিয়ে যায় মানবেরে কোন দূর দেশে,
ধীরে ধীরে কাটি তার জীবনের তার
ফেলে যায় তাবশেষে সাহারার দেশে।
পিশাচ মানব-বুকে পাতিয়া আসন
দেখায় তাহারে কত মুরতি মােহন :
বিষযুক্ত করে তার নির্মল শােণিত,
অবশেষে দেয় তারে অশেষ যাতন।
নেমে আসে হায় যবে নৈশ-যবনিকা,
আঁধার আঁধার ঘাের আবরে নয়ন,
গতস্মৃতি একে একে জাগিয়া মরমে,
সম্মুখেতে টেনে আনে শ্মশান ভীষণ।
এজিদ শিবিরে বসি ভাবিতেছে মনে
'হানিফা-প্রতাপ আর সহ্য করা দায়,
দিন দিন সৈন্যনাশ, ধন বল হীন,
হানিফার জয় আশা অনিশ্চিত নয়।
মহরম-চিত্র
তােগান-তুরকী-রাজে করিয়া বন্ধন
সীমার আসিতেছিল দামাস্ক নগরে,
কিন্তু কি বিধির বিধি! হ’ল অঘটন
ভুগিল পাপের শাস্তি হানিফার করে।
অলিদ হানিফা-হস্তে পরাজিত হয়।
লক্ষ লক্ষ সেনা তা হইয়াছে হত ;
কি দোর্দণ্ড মহাশক্তি হানিফা পামর !
মারওয়া তার হস্তে হয়েছে নিহত।
কি কুক্ষণে মােহমদে মজেছিনু আমি ।
হাতে হাতে প্রতিফল পাইতেছি তার ;
দামাস্কের সিংহাসন হইবে বিলয়,
উদিবে মদিনা-রবি, তীব্র সৌর-কর।
সহস্র কিরণ-রশি হানিফা-শিবিরে
নিশার তমসা নাশি জ্বল জ্বল করে ;
ভাবিছে এজিদ ভয়ে সহস্র ফুণিনী
আসিছে গ্রাসিতে যেন বিষণা ধরে।
৮
মহাকচিত্র
“লও হে পেয়ালা ভরে সুতীব্র সুরায়”
বলিল এজিদ জোরে সাকীকে তাহার;
সুগন্ধি সুরায় যেন শান্তি আর নাই;
“আন সুরা তীব্রতর” বলিল আবার।
জেয়াদের প্রতিশােধ হইয়াছে বেশ
নরকের বহ্নিমুখে জ্বলিছে পামর ;
‘অর্থলােভে প্রভুহত্যা’ নিষ্ঠুর পিশাচ
উপযুক্ত প্রতিফল হাতে হাতে তার।
কল্য যুদ্ধে দামেস্কের পতন নিশ্চিত,
এজিদ দামাস্ক ছাড়ি করি পলায়ন
করিবে যে প্রাণরক্ষা” বলিতে বলিতে
এজিদ পড়িল ভূমে হয়ে অচেতন।
“অরে রে দুর্মতি, তুই বিবের প্রয়ােগে
করেছিস, বধ মােরে, প্রতিশােধর
কল্যকার রণে পাবি হানিফার করে,
সহিবি সুহিবি জ্বালা, পুড়ি নিরন্তর।
৮৮
মহরম-চিত্র
কৃতঘ্ন পামর তুই মাবিয়ার সুত,
প্রভুহত্যা করেছিস, সেই পাপে হায়
দামাস্কেব অধিবাসী জ্বলিবে নিরত,
অধীনতা-দৃঢ়-পাশ পরিয়া গলায়।
;
ধিক্ রে এজিদ তুই রমণীর দেহে
করেছিস, অস্ত্রাঘাত নিঠুর পরাণে ;
উপযুক্ত প্রতিফল পাইবি তাহার,
হইবে রে প্রতিশােধ কল্যকার রণে।
জলাভাবে বধেছিস, কাৰ্বালা-প্রান্তরে
তিল তিল করি জ্বলে মরেছি অকালে,
তার প্রতিশােধ হবে হানিফার করে,
হারাবি, হারাবি প্রাণ তার প্রতিফলে।”
উঠিয়া বসিল পাপী সভয় অন্তরে,
শত শত বিভীষিকা চারিদিকে তার
আসিছে গ্রাসিতে যেন, ত্রাসেতে এজিদ
অচেতন হয়ে ভূমে পড়িল আবার।
পরিণাম !
প্রভাত হইল নিশা, ঊষার কিরণ
দামাস্ক-আকাশপ্রান্তে দিল দরশন,
নাচিল পুলকে যত আম্বাজী সেনানী
এসামের শত্রুরাশি করিতে হনন।
নিরখিল ক্ষণতরে এজিদ-সেনায়,
যেমতি ক্ষুধিত ব্যাঘ্র নিরখে হরিণী
শােণিত-পিপাসু হয়ে, অথবা যেমতি
ঘুরিয়া বেড়ায় রােষে মণিহারা-ফণী
মত্ত মাতঙ্গের মত ছুটিল আম্বাজী
কক্ষচ্যুত তারা প্রায় ধাঁধিয়া নয়ন,
কোষমুক্ত অসি সব উঠিল বালসি
শােণিত-পিয়াসা যেন করিতে বারণ।
রক্তিম তপন ধীরে দিল দরশন,
এজিদের সুখনিশা হ’ল অবসান;
মাতিল উভয় সেনা ভীষণ সমরে,
ছুটিল কলম্বকুল, বাজিল বিষান।
মহরফচিত্র
বায়ু বিদারণ করি ছুটিছে বল্লম,
ঝম করিতেছে তীক্ষ্ণ তরবার,
লইছে শত্রুর প্রাণ নিপুণ আঘাতে
সৌরকরে প্রতিভাত হয়ে বারবার।
আম্বাজী-সৈনিকগণ প্রভুনাম লয়ে
দামাস্কের সৈন্যরাজি করিছে হনন,
পাপ অনুচর যত এজিদের সেনা
হেরিছে সম্মুখে শত ভীষণ শমন।
অশ্বের দাপটে কত দামাস্কের সেনা
প্রাণশূন্য দেহ লয়ে রয়েছে পড়িয়া ;
ক্ষতমুখে রক্তধার হইয়া বাহির
আম্বাজী-সৈনিক সবে দিতেছে রঞ্জিয়া।
হানিফার দীর্ঘ বর্শা, তীক্ষ্ণ তরবার
শত্রুর ললাহিত রক্তে হয়েছে রঞ্জিত,
সফেন, সুঠাম গ্রীব শুভ্র দুলদুল
শত শত অরি দেহ করিছে হত।
মহচি
এজিদের সেনাগণ প্রাণভয়ে সবে
পালাতে লাগিল ভয়ে রণক্ষেত্র ছাড়ি
দিশাহারা অশ্বগণ চলিল ছুটিয়া
পদাঘাতে করি চুর্ণ কত শত অরি।
হানিফার রক্তমুখ এজিদের চোখে
হইল পতিত, পাপী দেখিল সভয়ে,
হানিফার বীর দেহ ধরি পৃষ্ঠ পরে
আসিতেছে দুলদুল, মেদিনী কঁপায়ে।
দামাস্কের অধিপতি ভীরু কাপুরুষ
নিজ অশ্ব পরে জোরে করিল আঘাত,
রণক্ষেত্র ছড়ি অশ্ব চলিল ছুটিয়া
পারি সহিতে সেই তীব্র কষাঘাত।
এজিদের বাজী পাছে শুভ্র দুল, দুল,
চলিয়াছে পূর্ণবেগে, এই ধরে ধরে,
আবার পড়িছে পাছে, উভয় তুরঙ্গ
সমভাবে দৌড়িতেছে জঙ্গম পাহাড়ে।
মহর-টিল
পদাঘাতে শিলাখণ্ড পড়িছে ছুটিয়া,
এজিদ দৌড়িছে নিজ প্রাণরক্ষা তরে,
হানিফার মনােবাঞ্ছা এজিদের প্রাণ
লইবে কৃপাণ ঘায়ে সম্মুখ সমরে।
•
এজিদ অশ্বের বা দিয়াছে ছাড়িয়া,
রাজধানী পানে অশ্ব চলিল ছুটিয়া
লম্ফদানে পার হয়ে নগরের দ্বার,
সবেগে ছুটিল অশ্ব তােরণ লঙ্ঘিয়া।
সহস্র আজী-হস্ত এজিদের আশে
হইল বিস্তৃত, হানিফা গর্জিল রাগে
“এজিদ আমার বধ্য” সভয়ে সকলে
দাড়াল সরিয়া ; অশ্ব ছুটিল সবেগে।
উদ্যানের মাঝখানে কুঞ্জ মনােহর,
লতাপাতা আবরিত সজ্জিত সুন্দর ;
গুপ্তপুরী, রুদ্ধদ্বার, এজিদ লক্ষেতে
প্রবেশিল কুমাঝে, বদ্ধ হল দ্বার।
মহরম-চিত্র
হানিফাও অশ্ব হতে নামিল সবেগে,
সহসা উজ্জ্বল এক সুতীব্র আলােক
নির্ঘোষিয়া চারিদিক্ ভাতিল আকাশে,
কম্পিত হইল ভয়ে ভূলােক দ্যুলােক ।
“হানিফার বধ্য নহে এজিদ পামর,
অনন্ত অনলে পাপী পুড়িবে হেথায়”
কম্পিত করিয়া শব্দে ভীষণ অনল
প্রবেশিল দ্বারপথে এজিদ গুহায় ।
ভীষণ চীৎকার শব্দে পূরিল গগন,
পূতিময় ধূমরাশি উঠিল আকাশে ;
হানিফার ক্রোধবহ্নি হ’ল না নিৰ্ব্বাণ,
চালাল কৃপাণ বীর ক্রোধের আবেশে।
আম্মাজী-সৈনিকগণ গণিল প্রমাদ,
এজিদের সেনাগণ দ্বিখণ্ডিত হয়ে
পড়িতেছে হানিফার ক্রোধবহ্নি-মুখে,
আবার উঠিল স্বর ত্রিদিব কাপায়ে-
১৪
মহর-চিত্র
“হানিফা, জান কি তুমি কত যত্নে হায় !
নরগণে নিজ হস্তে করেছি সৃজন,
আজ কিনা সেই সৃষ্টি করিয়া বিনাশ
জ্বালাময় ক্রোধবহ্নি করিছ বারণ !
অই যে পৰ্বত দেখ প্রাচীরের মত,
আ-জনম রবে বন্দী উহার তলায় ;”
দেখিতে দেখিতে শৈল ঘিরিল তাহায়,
হানিফা প্রােথিত হল পৰ্বত-গুহায়।
আম্বাজী-সৈনিকগণ শুনিল সভয়ে,
পর্বতের মধ্যে যেন অশ্বপদধ্বনি,
দুল দুল হ্রেষা রবে থাকিয়া থাকিয়া
দামাস্কের শৈল যেন উঠিতেছে স্বনি।
লইয়া শশাকের ভার তীব্র দিবাকর
ঢলিয়া পড়িল দুঃখে পশ্চিম আকাশে,
ভীষণ তিমিরে হ’ল আবৃত ধরণী,
জাগিয়া রহিল পূণ্য সততার পাশে
জয়নাল-অভিষেক।
নূহের প্লাবন যেন গিয়াছে বহিয়া,
পাতিয়া বিশাল বিশ্বে পুণ্যের আসন ;
হাসিতেছে দামাস্ক অপরূপ বেশে,
এসলামের কমজা করিয়া ধারণ।
বহিতেছে দামাস্কসে উৎসবের রােল,
নগরী পুণ্যের স্রোতে উঠিছে হাসিয়া,
ভাসিয়া উঠিছে যেন বিশাল গরিমা,
পাপের করাল ছায়া গিয়াছে চলিয়া।
ধরিয়াছে সৌধাবলী কি শোভা সুন্দর!
স্বরগের শােভা যেন করেছে ধারণ
মনােরম বেশ ভূষা পরিয়া হরফে
চলিয়াছে রাজপথে নাগরিকগণ।
;
প্রাসাদে প্রাসাদে আজ উড়িছে নিশান
মদিনার জয়গাঁথা করি পরকাশ,
হেলে দুলে গর্বভরে দুলিছে কভু বা,
রামধনু-শােভারাশি করিয়া বিকাশ।
মহরম-চিত্র
কলধ্বনি, হর্ষোল্লাস উঠিছে নগরে,
ফুর্তির ঝলকরাশি বহিছে কেবল ;
নাচায়ে মানব-প্রাণ আনন্দ-আবেশে
গৃহে গৃহে উঠিয়াছে আনন্দের বােল।
ভীষণ ঝটিকাপূর্ণ প্রলয়ের পরে
উদিল আকাশে পুনঃ বিমল তপন ;
বিমল কিরণে বিশ্ব উঠিল হাসিয়া,
চাহিল মধুর হাসে সুনীল গগন।
•
এজিদের পাপাচার উৎপীড়ন ভারে
উঠেছিল ঘরে ঘরে মহা হাহাকার
নাশিয়া পাপের সেই ভয়াল মুরতি
উদিল পুণ্যের ছবি দামাস্কে আবার।
বিচরিছে সিংহদ্বারে দৌবারিক দল
তীক্ষ্ণধার মুক্ত অসি শােভিছে করেতে;
চলগাে কল্পনে অয়ি! হেরি রাজসভা
অপূর্ব সুখের ধারা লভিতে হৃদতে।
মহরম-চিত্র
মসলিন্যবনিকা ঝুলিতেছে দ্বারে,
মন্দ সমীরণভরে উঠিছে দুলিয়া ;
গােলাব-ঝরণাগুলি উৎসারিত হয়ে
বহিছে সৌরভে সভা মােহিত করিয়া ।
থরে থরে পুষ্পরাজি রয়েছে সজ্জিত,
আকুল করিছে প্রাণ সুগন্ধি আতর ;
লতা পাতা আবরিত শ্বেত শুম্ভাবলী
বিশাল বিরাট দেহে শােভিছে সুন্দর।
রথিবৃন্দে পরিবেষ্ট জয়নাল আবদীন
বসিয়াছে সিংহাসনে প্রফুল্ল আননে,
অযুত তারার মাঝে সুধাংশু যেমন
উছলি প্রতিভা যেন উঠিছে বদনে।
রিপুদল দলি পদে মহারথীগণ
গর্বিত আননে সবে রয়েছে বসিয়া ;
মন্দ সমীরণভরে পতাকানিচয়
পতপত উড়িতেছে থাকিয়া থাকিয়া।
মহরম-টি।
পায়ে সে সভাতল গভীর স্বননে,
কহিল হানিফা মন্ত্রী গাজী রহমান,
“পাপের পতন আর ধর্মের বিজয়
বিধির অপূর্ব সৃষ্টি অপূৰ্ব বিধান !
সমরে দুদ্ধর্ষ যােদ্ধা অরিকুল-ত্রাস
হে বীরেন্দ্র মহারথী এরাক-ঈশ্বর,
দেখালে বীরত্ব তব, কৌশল অশেষ
জিনি বাহুবলে তব দামাস্ক-সমর।
তােগান-তুরকী-রাজ, তােমাদের পাশে
অচ্ছেদ্য-নিগড়ে বাঁধা এসলাম-গৌরব
দামাস্ক অধীন আজ তােমাদের বলে”
এতেক বলিয়া মন্ত্রী হইল নীরব।
অধীনস্থ রাজগণ একে একে আসি
চুমিল সম্মানে সবে এমামের কর,
নিস্তব্ধ, নীরব সেই রাজ-সভাতল
এমামের জয়কারে হইল মুখর।
মহরম-চিত্র
আরম্ভিল পুনঃ মন্ত্রী গাজী রহমান,
“হে মক্কা-মদিনাবাসী মােসলেমনিচয়,
যে শকতি দেখায়েছ করাল সমরে,
করেছ যে মহাবলে দামাস্ক বিজয়,
পৃথিবীর ইতিহাসে উজ্জ্বল অক্ষরে
রহিবে অঙ্কিত তাহা, হবে না বিলয় ;
তােমাদের অস্ত্র-বলে, সমর-কৌশলে
বসিয়াছে সিংহাসনে হােসেন-তনয়।
আম্বাজের মহারথী বীর যােদ্ধগণ,
অরিকুল-ত্রাস রণে, দুদ্ধর্ষ সমরে,-
এসলাম-গৌরব পুনঃ করিতে উদ্ধার
করেছ যে মহারণ দামাস্ক-প্রান্তরে,
যত দিন রবি শশী উদিবে গগণে-
এ মহান্ মহিমা গাথা হবে না নীরব,
অযুত মােসলেম-কণ্ঠে হইবে ধ্বনিত,
বিলীন হবে না কভু এ মহা গৌরব।
মহরম-চিত্র
দামাস্কের অধিবাসি, জানহে তােমরা
মাবিয়ার ব্যবহারে হয়ে তুষ্ট অতি-
দামাস্কের সিংহাসন পুরস্কার রূপে
দিয়েছিল যােদ্ধশ্রেষ্ঠ আলী মহামতি।
মাবিয়ার ষড়যন্ত্রে গুপ্ত অরি-করে
হইল নিহত আলী প্রার্থনা-মন্দিরে ;
করিল অশেষ চেষ্টা দুৰ্ম্মতি নারকী,
মক্কার পবিত্র ধ্বজা অধিকার তরে ।
মাবিয়া তনয় পুনঃ পাপাত্মা এজিদ
জয়নাব-রূপ-মােহে হইয়া পতিত,
দামাস্ক স্বাধীন বলে করিল ঘােষণা
করিতে মক্কার শৌর্য চির-আবরিত।
অপূৰ্ব্ব কৌশলভরে বিষের প্রয়ােগে,
করিল নিহত পাপী এমাম হাসানে,
জ্বলিয়া উঠিল তা’তে ভীষণ সমর,
বাধিল তুমুল রণ মদিনার সনে
মহরম-চিত্র
কিন্তু কি ভীষণ ধূর্ত মাবিয়া-তনয়!
জেয়াদে ছলিয়া পাপী
মুদ্রা-প্রলােভনে,
কারবালা হত্যাকাণ্ড করি উদ্যাপন
বহাল শােকের ধারা মােসলেমনয়নে।
স্বাধীনতা-উপাসক মােসলেমের করে
পাপের কালিমা ছায়া গিয়াছে মুছিয়া ;
ভাতিছে গগনে পুনঃ এসলাম-তপন
বিমল কিরণে বিশ্ব উঠিছে হাসিয়া।”
কঁপায়ে সে সভাতল গভীর স্বননে,
উঠিল অযুতকণ্ঠে “এসলামের জয় ;
পাপের পতন আর ধর্মের বিজয়,
জয় জয় জয় ওগগা এমামের জয়।”
বিধির অপূর্ব বিধি, অপূৰ্ব্ব বিধান
হেরিল তপন আজি হসিত-আনন।
দামাঙ্কের সিংহাসনে ফুল্ল পদ্ম সম
বসিয়াছে জয়নাল হােসেন-নন্দন।
সমাপ্ত
-
৩য় সংস্করণ মৌলবী ফজলুর রহীম চৌধুরী এম, এ, সাহেবের গ্রন্থাবলী। ডিরেক্টর কর্তৃক প্রাইজ ও লাইব্রেরীর জন্য মনােনীত। ১। পয়গম্বর-কাহিনী। জগতের আদি মানব হজরত আদম হইতে আরম্ভ করিয়া হজরত এসহাক পৰ্যন্ত নবীগণের জীবনী সম্বলিত গবেষণাপূর্ণ অতি মনােরম ও প্রাঞ্জল ইতিহাস। মনােরম পড়ের বঁধাই মূল্য ১০। (২) সােহরাব-রুস্তাম । সওগাত ও সাধনা প্রভৃতি মাসিক পত্রিকা কর্তৃক প্রশংসিত। সেই সােহরাব-রুস্তমের প্রাণস্পর্শী মৰ্ম্মবিদারক কাহিনী আপনি কি এখনাে পড়েন নাই ? বীরপূত্র চলিয়াছে বীর পিতার সহিত সাক্ষাৎ করিতে। সম্মুখে বাধা বিঘ্ন বালুকণার ন্যায় উড়িয়া যাইতেছে। ভবিষ্যতের বিধান চমৎকার। পিতা-পুত্র যুদ্ধ, ভীষণ যুদ্ধ। অন্যায় যুদ্ধে পিতা কর্তৃক পুত্র নিহত। ঐ যে অকসা তীর! সব নীরব! এমন মর্মভেদী কাহিনী একবার পড়িয়া দেখুন। মূল্য মাত্র বারো আনা। ৩। Anglo Arabic Word Book. আরবী শিক্ষার্থিগণের জন্য অপুৰ্ব্ব পুস্তক। ব্যাকরণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখিয়া পুস্তকখানি নিপুণতার সহিত বিরচিত হইয়াছে। শিক্ষকগণ এই পুস্তকের সাহায্যে সুন্দররূপে ছাত্রদিগকে শিক্ষা দিতে পারিবেন। মূল্য আট আনা মাত্র। ৪। এসরাইল বংশীয় নবীগণ “এই পুস্তকখানি পয়গম্বর কাহিনীর দ্বিতীয় খণ্ড। ইহাতে হজরত মুছ। হইতে হজরত ইছা পর্যন্ত নবীদের জীবনী ও কার্যাবলী দক্ষতার সহিত সহজ সরল ও হৃদয় গ্রাহী ভাষায় লিখিত হইয়াছে। মূল্য মাত্র পাঁচ সিকা।
৫। কোরআনের সুবর্ণকুঞ্জিকা ইহা পয়গম্বর কাহিনীর শেষ খণ্ড,ইহাতে সভ্যতার ইতিহাস, আরবদের প্রাচীন ইতিহাস, বিশ্বজনীন সভ্যতা বিস্তারে এছলামের স্থান, এছলামের ভাববাদী তদীয় সংক্ষিপ্ত জীবনে কি আশ্চর্যভাবে বিশ্ব মানব- তাকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছেন তাহা অতি সুন্দর ভাবে আলােচিত হইয়াছে। ইহা এছলামের মূল নীতি সমন্বিত কোরআনের কুঞ্জিকা। মনােরম বাঁধাই এবং সুন্দর কাগজ ও ছাপা। মূল্য এক টাকা। ৬। মেশকাত শরীফ (বাঙ্গালা ) মােছলমানের পথ প্রদর্শক হজরত মােহাম্মদ এর অমর বাণী মেশকাত শরীফ হাদিছ। দিনদারী ও দুনিয়াদারী সকল কাজেই প্রত্যেক মােছল- মানের হাদীছ জানা দরকার। এই জন্য ধর্মের নিগূঢ় রহস্য প্রত্যেক মােছলমান ভাইকে জানাইবার জন্য উহার সঠিক অনুবাদ বাংলা ভাষায় বাহির করা হইল। হাদিছ খানি প্রায় সাত শত পৃষ্ঠায়সম্পূর্ণ কাপড়ের বাঁধাই। মূল্য মাত্র সাড়ে তিন টাকা। ৭। আরবী সহচর (যন্ত্রন্থ) আরবী শিক্ষায় অপুৰ্ব্ব পুস্তক। ইহাতে ব্যাকরণ ছাত্রদের বুঝিবার জন্য বিশেষ সরল ভাষায় লিখিত হইয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রম, অনুবাদ প্রভৃতি ও উহার কায়দা প্রদত্ত হইয়াছে। পুস্তকের বিশেষ বিশেষত্ব এই যে ইহাতে ye Jai ইত্যাদি কঠিন ও দুরূহ বিষয় সমূহ সহজ কবিতা আকারে দেওয়া হইয়াছে। প্রাপ্তিস্থান মােহাম্মাদী বুক এজেন্সী ২৯ অপার সার্কুলার রােড কলিকাতা
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.