Bally Sadharan Granthagar

Patheo

Bandyopadhyay, Sri Kedarnath · 2009/08/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পাথেয়
কেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
ইণ্ডিয়া প্রেস লিমিটেড
এলাহাবাদ।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত ]
[ মূল্য ১• দেড় টাকা

প্রকাশক :-
শ্ৰীকালীকিঙ্কর মিত্র
ইণ্ডিয়া প্রেস লিমিটেড
এলাহাবাদ।
এিটা :-
শ্ৰীঅপূৰ্ব্বকৃষ্ণ বসু
ইণ্ডিয়া প্রেস লিমিটেড
বেনারস-ব্রাঞ্চ।

উৎসর্গ তামাকে তুমি জান- আমার অন্য কিছু নাই। আমিও জানি- তােমার নিকট ঋণী থাকতেই আমার সুখ। একেদারনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

No text on this page.

ভূমিকা
সত্য ঘটনা অবলম্বনে
গল্প কয়টির গড়ন।
গ্রন্থকার

No text on this page.

পাথেয় দূরের আলাে অপূৰ্ব্ববাবু সাত বছরের ডিপুটি । আমাদের গ্রামেই বিবাহ করেছেন। কচিৎ কখনাে তার আবির্ভাব হত ; ম্যালেরিয়ার ভয়ে তিন দিন কখনাে কাটাতেননা। মাথার অসুখ হওয়ায় কবিরাজের শরণ নেন। তিনি বলেছেন—এই সময় দিনকতক নথি-পত্র থেকে মাথাটা নড়িয়ে, সহরের ধূলি-ঘন বায়ুর বাইরে গঙ্গাকূলে-কোন বৃক্ষলতা-বহুল শীতল পল্লীতে থাকা, আর প্রাতে নিয়মিত গঙ্গা- স্নান। আড্ডা দিতে পারলে আশু ফল পাবে,অবশ্য দাবা পাশা বাদ, সেরেফ গান গল্প গুড়ুক, হাসি-তামাসা ; তাস খেলে ত’ এক ঘণ্টা,—বাস, তার বেশী নয়। এই হ'লেই সেরে যাবে ; ঔষধের আবশ্যক নেই। তাই এক মাসের ছুটি নিয়ে শ্বশুরবাড়ী আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন, যেহেতু আমাদের গ্রামখানি গঙ্গার ওপরেই, -আর বৃক্ষলতা-বহুল ত’ বটেই।

পাথেয় আমাদের বৈঠকের আড়াটা ছিল বিশুদ্ধ। তিনি খোজ নিয়ে তাইতেই ভর্তি হয়ে পড়লেন। বেশ মিশুক লােক, দু’তিন দিনেই বেমালুম আপনার লােক বনে গেলেন। আমার “অমৃতবাজার পত্রিকা” আসত,-একদিনের পুরাতন সংখ্যাখানা—দুপুর বেলাটা কাটাবার জন্যে নিয়ে যেতেন। সেদিন ইংরিজি ১৯২২ সনের ২রা জুলায়ের কাগজখানা ফিরিয়ে দেবার সময় বললেন-“কতবড় জাত দেখুন-ওরা বড় হবেনা ত’ হবে কে ! আকাশে ওড়া, জলের মধ্যে থাকা, হাজার হাজার মাইলে বেতার- বার্তার আদান-প্রদান, বৃদ্ধকে যৌবন দান, ইত্যাদি ইত্যাদি অল্পদিনের মধ্যে সেরে ফেললে। এবার দেখছি পরপারের পাত্তাও লাগিয়েছে। দেখবেন, সপ্তলোক ভেদ করতে ওদের সাতটা বছরও লাগবেনা—আয়না বানিয়ে ফেলবে,—ডাক বসিয়ে দেবে।” -বলেন কি ? পরলােকের সাড়া কিছু পেলেন নাকি ? —আপনি বুঝি কাগজখানা কেবল নিয়েই থাকেন-দেখেন- ! Sir Conan Doyle-এর (সার কোনান্ দয়াল-এর নাম শুনেছেন ত’। তিনি যে-সে লােক নন—তিনি একজন বড় বৈজ্ঞানিক—এডিনবরার LL. D., লণ্ডনের নামজাদা ডাক্তার, অসাধারণ বক্তা—আবার সাহিত্য-জগতে দশ জনের একজন। যেমনি হাতে-বহরে, তেমনি স্বাস্থ্য, তেমনি মাথা। তিনি বিনা প্রমাণে বা চক্ষে না দেখে একটি কথাও বিশ্বাস করবার

দূরের আলাে
৩
লােক নন । আজ ১৫২০ বৎসর তিনি অলৌকিক বা
পারলৌকিক রহস্যের পেছনে পড়েছিলেন।
এখন প্রমাণ সংগ্রহ
করে অর্থাৎ ভূতের বা সূক্ষ্মদেহের ফোটো নিয়ে আর
পারলৌকিক স্ত্রী-পুরুষ তলব করে’-তাদের কথা শুনে, জগতে
সেই বাণী প্রচার করতে দেশবিদেশে বেরিয়েছেন। অনেক
ঘুরে সম্প্রতি আমেরিকায় লেকচার দিচ্ছেন। সর্বত্রই লােকারণ্য
--স্থানাভাব-চড়াদরে টিকিট কিনেও লােক দাড়াতে স্থান
পায় না। তিনি এক পয়সাও ছোঁননা,-সব টাকাটা Psychic
( আধ্যাত্মিক) গবেষণার জন্যে দেন।
তার হচ্ছে—মৃত্যুর পর মানুষের জীবন নিয়ে কথা, অর্থাৎ
ভৌতিক জীবন এবং তাহাদের সুখ বা দুঃখানুভূতি সম্বন্ধে ।
আর তার প্রধান বাণী হচ্ছে “এ জীবনে যে-কোন বীজ ছড়াবে
বা যা বুনবে, পরলােকে তার কড়ায় গণ্ডায় আদায় পাবে বা
আদায় নিতে হবে।” “
তিনি বলছেন—“যে বাণী ( message) তিনি শােনাচ্ছেন
—হয় তার মত মহত্তম বাণী মানুষকে কখন দেওয়া হয়নি, না হয়
-এটা একটা ভয়ঙ্কর ভ্রান্তি,মায়া।” তার পরই তিনি বলছেন
Life in the spirit world and the
realization of happiness or woe.
| Whatever is sown in this life will be reaped
to the uttermost limit on the other."

৪ পাথেয় -“আমি যা দেখেছি, আমি যা শুনেছি, আর আমি যা সত্য বলে জেনেছি, সেইটাই শপথ করে জানালুম।” —শুনলেন ? কত বড় ব্যাপারটা বলুন দিকি,ওদের অসাধ্য কিছুই নেই। বললুম,-“ওঁর যা বর্ণনা শশানালেন, তাতে মহাপুরুষ বলেই মনে হয়। মানবের এতটা উপকার করছেন—একটি পয়সা নেন- না! ওঁর Sherlock Holmes পড়ে’ ভারি আকৃষ্ট হয়েছিলুম বটে। যাহােক—উনি যে-কথা শুনিয়ে দিয়েছেন—অর্থাৎ এর চেয়ে মহত্তম বাণী মানুষকে কেউ কখনাে দেয়নি, তাতেই বােঝ যায়, বিশ্বের সব দেশ সম্বন্ধে ঘোটা-অভিজ্ঞতা না থাকলে, এতবড় কথা উচ্চারণ করতে পারতেননা। আনন্দের কথা এই—আমরা সব হারালেও—‘দয়াল আমাদের জোটেই, দয়ালের কমতি কখনাে হয়নি।” ডিপুটিবাবু একটু অবাক হয়ে আমার মুখের ওপর সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে বললেন—“আপনার ভাবটা বুঝতে পারলুমনা।” —কেন—সত্য কথা নয় কি ? বরং কবে যে ওঁরা দয়া করে বলে’ দেবেন-“মৃত মা-বাপের শ্রাদ্ধ করা অবশ্য-কৰ্তব্য,” সেই *** He says himself—The message he is delivering is either the greatest ever transmitted to mankind, or it is the most appalling delusion. I testify to that which I have seen and heard and know to be true.

দূরের আলাে
সাইন্টিফি বাণী শােনবার অপেক্ষায় উৎকর্ণ হয়ে আছি। যখন
অতদূর পৌছেছেন—দেবেনই একদিন। ওঁরা না বলে বিশ্বাস
করতে পারিনা যে !
তিনি একটু হেসে বােধ হয় মেনে নিলেন। আমিও আর
কথা বাড়ালুমনা ।
ডিপুটিবাবুর ঝোঁক ছিল গল্প শােনবার। পল্লীর প্রাচীন
কথা শুনতে তিনি ভালবাসতেন। একদিন একটা বলেছিলুম,
সেইদিন থেকে নিত্যই তার অনুরােধ পেতুম ।
বললেন—“নিৰ্ম্মলবাবু, আজ আপনাকে এত বড় জিনিষটে
শােনালুম—আপনার ত দৃষ্টি এড়িয়েই গিয়েছিলো, তার বদলে
এমন একটি গল্প শােনাতে হবে—যাতে আপনাদের গ্রামের
পূর্বেকার ইতর-ভদ্র, ছেলে-বুড়াে দেখতে পাই।”
বললুম—“সেটা তাহলে গল্পের আইন-কানুন ছাড়িয়ে, পূর্বের
পল্লী-পরিচয়ে দাড়াবে—আর তার মধ্যে অনেককিছু ঢুকে
পড়বে। সেটা ঠিক গল্প হবেনা।”
তিনি হেসে বল্লেন—“আপনার বলবার ধরণে সেটা যে গল্প
হয়ে দাড়াবেই, সে ধারণা আমার হয়ে গেছে। তা ছাড়া আমি
ততা নিছক মিছে-গল্প শুনতে চাচ্ছিনা।”
বললুম,-“বেশ, তবে তামাকটা সেজে বসি।”
(১)
সেদিন ছিল শনিবার।
সকাল আন্দাজ ছ-টা হবে। বাড়ীর সামনে ছােট বাগানটাতে

পাথেয়
;
পাইচারি করতে করতে দাতন করচি। পাড়ার একজন প্রৌঢ়া
কলসী-কাখে গঙ্গাস্নানে যাচ্ছিলেন ; দেখি, একটি ছােট মেয়ে
তাকে কি জিজ্ঞাসা করায়, তিনি আমার দিকে দেখিয়ে দিয়ে
চলে গেলেন।
মেয়েটি কে? কই কখনাে ত’ দেখিনি! শ্যাম বর্ণ, একখানি
ডুরে কাপড় পরা, কোকড়া কোকড়া রুক্ষকেশ কপালের ওপর
দুলচে, বয়স হবে আট কি নয়, কিন্তু সঙ্কোচমাখা সুন্দর চোখ
দুটির বিনম্রভাব বয়সটাকে যেন অনেকখানি এগিয়ে গিয়েছে,
চোখে চাঞ্চল্যের চিহ্ন মাত্র নাই। অবাক হয়ে চেয়ে আছি,
মেয়েটি বেড়ার ধারে এসে বললে-“আমি যে আপনার কাছে
যাব।”
-এসনা,—ওই ওখান-দে এস।
মেয়েটি ধীরে ধীরে এসে ভূমিষ্ঠ হয়ে আমার পদদ্বয় স্পর্শ
করে মাথায় দিয়ে, উঠে বললে—“আমি বিন্দুবাসিনীতলার
মাধব ঘােষের মেয়ে ; আপনিই ত’ আমার বাবার দাদাঠাকুর !”
হাসিমুখে বললুম, “হা,–আমি তােমার বাবার দাদাঠাকুর,
আবার দাদা-বাবুও। তােমার বাবা কেমন আছেন?”
মেয়েটির মুখ ম্লান হয়ে গেল ; সে বললে-“আমার বাবার
বড় অসুখ জ্যাঠামশাই, কাল ডাক্তারবাবু এসেছিলেন, আজ
আবার দীনেশ-কাকা ডাকতে গেছেন। বাবা আপনার পায়ের -
ধূলাে চেয়েছেন।”
শুনেই প্রাণটা দমে গেল। মুখে বললুম-“ভয় কি, সেরে

দূরের আলাে
যাবেন ; চল, তােমার সঙ্গেই আমি যাচ্চি,-চাদর খানা নিয়ে
আসি।”
আমার স্ত্রী শুনে বললেন-“মেয়েটিকে বাড়ীর ভেতর
আনলেনা কেন? হাতে কিছু দিতুম।”
-এর পর দিও বলে’ই চাদর নিয়ে বেরিয়ে এসে বললুম,
“চল—তােমার নামটি কি মা?”
-আমার নাম গৌরী।
আজ প্রায় বিশ বৎসর মাধবের সঙ্গে কোন সংস্রব না
থাকলে ও আমি কোন দিনই তাকে ভুলতে পারিনি। তার
নামটি আজ আমার প্রাণে এই প্রভাতের পবিত্রতার মতই
পরশ দিলে। প্রাণ যে তার কোন্ অদৃশ্য কক্ষে দুর্লভ স্মৃতিগুলিকে
তাদের সত্যরূপ দিয়ে সসম্মানে অথচ গােপনে রাখে, তা বলতে
পারিনা। আজ নাম মাত্রই মাধবকে যেন সর্বাঙ্গে—শুধু অনুভব
নয়,—উপভােগ করলুম।
( ২ )
মাধব ছিল গয়লার ছেলে। তার বাপের ছিল পাঁচ সাতটি গরু,
আর নয়-দশ বিঘে ধান-জমি। তাইতেই তাদের বেশ চলে যেত।
ঐ একমাত্র ছেলেটিকে হীরু-ঘােষ পাঠশালে লেখা-পড়া শিখতে
দেয়। মাধব পাঠশালের পড়া শেষ করলে ; কিন্তু তার পড়বার
ইচ্ছা শেষ হলনা। হীরু নিজের জাতের অনেক কথা অনেক
বিদ্রুপ স’য়ে তাদের কাছে বিনীত ভাবে মঞ্জুরী আদায় করে আর
বাবুদের অনুমতি নিয়ে, মাধবকে ইংরিজি ইস্কুলে পাঠায়।

৮
পাথেয়
মাধব আমাদের ক্লাসে ভর্তি হয়। সে এল যেন ভদ্রলােকের
ছেলেদের ভৃত্য, তাদের হুকুম তামিল করাই তার কাজ। কারুর
পেসিল কি বই পড়ে গেলে মাধব তা কুড়িয়ে দেয়, কারুর
মাৰ্বল হারিয়ে গেলে কি দূরে গিয়ে পড়লে, মাধব তা খুঁজে
আনে। কেউ তারে কিছু হুকুম করলে মাধব সেটা সৌভাগ্য
বলে’ নেয়। রােজ সকলের প্লেট ধুয়ে দেওয়াই ছিল তার
কাজ। আমি জানি-মাৰ্বল-খেলায় মাধবের টিপ, ছিল খুব
সুন্দর। পাঠশালে কোন ছেলে তাকে কোনদিন খাটাতে
পারেনি; কিন্তু ইস্কুলে এসে পৰ্য্যন্ত যদি কেউ দয়া করে তাকে
নিয়ে খেত-হেরে খাটাটাই ছিল তার কাজ ! আমি খুব
লক্ষ্য করে দেখেছি বাবুদের ছেলেদের সন্তুষ্ট রাখবার জন্যে ইচ্ছে
করেই সে হারতাে--সব খেলাতেই।
ইস্কুলে প্রথম বছরটা তার কি নির্যাতনের মধ্যেই কেটেছিল ।
বােধ হয় কোন ছেলেই সে-অবস্থায় এতটা দিন টেকে থাকতে
পারতােনা। একটা ভাল কথা, কি হুকুম পাবার জন্যে কিরূপ
লালায়িত হত, কি সঙ্কোচেই সে আড়ষ্ট থাকত,ভয়ে ভয়ে
সরে সরে থাকতে পাছে কারুর গায়ে গা ঠ্যাকে, কি কাপড়ে
কাপড় ঠ্যাকে! অজাতে সামান্য স্পর্শে ই তাকে শুনতে হত
-“এই বেটা গয়লার ছেলে-দেখতে পানা!”
আবার দয়াল পণ্ডিতমশাই তার সম্বন্ধে নিজের নামের
বিপরীত অর্থটাই বরাবর বাহাল রেখেছিলেন। তার বিরুদ্ধে
যে যা অভিযােগ করতে তিনি নির্বিচারে তাকে শক্ত সাজা

দূরের আলাে মুক্ত-হস্তেই দিতেন। আমি তার হয়ে কিছু বলতে গিয়ে তার মুক্ত-হস্তের দান প্রায়ই পেতুম। তাতে মাধব যে কতটা কুণ্ঠা বােধ করত, আর আড়ালে আমাকে কাতর ভাবে বলত- “দাদাবাবু আপনার পায়ে পড়ি, আমার হ'য়ে কিছু বলবেননা, আপনাকে মারটাই আমাকে বড় বেশী লাগে।” তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল—সে কখনাে মিথ্যে কথা কইতে পারতনা। এ সাহস ও-বয়সের ছেলেদের মধ্যে খুবই বিরল ছিল। বরং মিছে কথা ক'য়ে মাষ্টারদের ঠকাতে পারলে ভারী একটা আনন্দ আর বাহাদুরী ছিল। একটা দিনের একটা কথা আজও ভুলতে পারিনি।” নটবর খবর দিলে বসাকের-বাগানে গােলাপজাম পেকেছে। যারা বাগান জমা নিয়েছে, দু-এক দিনের মধ্যে পেড়ে হগসাহেবের বাজারে পাঠাবে। আমাদের গ্রামের জিনিষ আমাদের চোখের সামনেদে বেরিয়ে যাবে আর আমরা হাঁ করে চেয়ে থাকবাে- এমনি আমরা অপদার্থ ! আমরা কি কেবল গরুর মত গাছে ফুলধরা থেকে ফল পাকা পর্যন্ত দেখতেই আছি! ইত্যাদি নটবরের উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা শুনে বন্ধুবরেরা একবাক্যে রায় দিলে—তা হতেই পারেনা, তাতে গ্রামের বনাম আছে, শুনেছি, কর্তারা ঐ বাগানেই মালিদের ছেকল দিয়ে–সাত-সাতটা নীচু গাছ নেড়া করে বেড়া ডিঙিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। -এক-একজনের জোর ছিল কত ! শ্যাম জ্যাঠামশাই পাকা দু-কাদি মৰ্তমান কলা দুহাতে ঝুলিয়ে নিতে থেকে এই চার

১০
পাথেয়
মাইল ছুটে এসেছিলেন—কোনাে বেটা ধরতে পারেনি
ইত্যাদি, ইত্যাদি।
পশ্চাতে এত বড় সব tradition থাকায় তখনি পরামর্শ স্থির
হয়ে গেল—সেইদিন সন্ধ্যার সময় গােলাপজাম পেড়ে আন্‌তেই
হবে, তাতে আমরা অপদার্থ—আমাদের মুখ দেখানো উচিত
নয়।
একজন এ সংবাদও দিলে-বাগানের লােকেরা সন্ধ্যার সময়
গঙ্গা দর্শনে যায়।
কথা হ’ল-কেহ দূরে, কেহ নিকটে পাহারায় থাকবে, আর
মাধব বেশ নিশ্চিন্তে গাছে উঠে ডাল-সমেত গােলাপজামের
তােড়া ছুরি-দে কেটে কেটে তলায় ফেলবে; নটবর আর
কার্তিক কুড়িয়ে হাতে হাতে চালান দেবে।
শুনে মাধব যেন নিমেষে শুকিয়ে গেল । সে কাতর চোখে
চেয়ে বলে,-“আপনারা আমাকে মাপ করুন, এ কাজটি আমি
পারবনা, আমি গরীব ছােট-লােক, বাবুদের বাগানে ঢুকতেই
আমার পা ওঠেনা। আবার বাবার জ্বর দেখে এসেছি, সন্ধ্যের
সময় আমাকেই আজ বাড়ী-বাড়ী দুধ দিতে যেতে হবে।”
সাহস করে’ সে ‘চুরি করতে পারবােনা
আনতে পারলেনা,—সেইটাই ছিল তার প্রাণের কথা।
—পারবিনি! আচ্ছা বেটা! ছােটলােকেই ভাল পারে,
ঐ করে খায়, -তাই বলা।
তারা আবার কিনে খায় কবে?
ভাল চা ত’ এখনাে বছি !
কথাটা মুখে

দূরের আলাে
মাধব কম্পিতকণ্ঠে বলে,-“আপনারা যখন যা বলেন তখুনি
করি, কখনাে কি না বলিচি! এ কাজটি আমি পারবনা
আমাকে মাপ করুন।”
“থাক থাকু, দেখচনা বেটা ধৰ্ম্ম-পুর! ছােট-লােকের
বাড়, দেখেচ। সেক্রেটারী অতুলবাবুই ত এইটি করলেন, দয়াল
পণ্ডিত মশাই ঢের বারণ করেছিলেন।
-যা না বেটা কানা-গরু, এখানে আর কেন, দূর হ—
মাধব মাথা নীচু করে দাড়িয়ে ছিল, একবার কেবল অন্যের
অলক্ষ্যে আধ-চাওয়া-গােছ আমার দিকে চাইতেই আমি
ইসারায় যেতে বললুম।
সে যেন ফাঁসির হুকুম পেয়ে ধীরে
ধীরে বাড়ী চলে গেল। সে কি করুণ দৃশ্য ! তার সেই অবস্থাটা
আমাকে ভারি আঘাত করতে লাগলাে। কিন্তু তার হয়ে
একটি কথাও কইতে পারিনি।
অভিযান বন্ধ রইলনা, কিন্তু সেটা সফলও হ’লনা-
সুফলও দিলেন।
গােলাপজামগুলি বৃক্ষচ্যুত হয়ে ধরাশায়ী
হ’ল বটে, কিন্তু বাগানের লােকেরা এসে পড়ায় একটিও হাতে
এলনা। আমাদের ছত্রভঙ্গ অবস্থায় যত্র-তত্র পথ দেখতে হল।
পর দিন বেলা ১১ টার সময় ঝুড়ি ঝুড়ি গােলাপজাম ইস্কুলে
এসে উপস্থিত হল। যারা এনেছিল তারা কেঁদে জানালে,
তাদের চাকুরী ত’ যাবেই, মাইনেও পাবেন। দু-তিন জনকে

১২
পাথেয়
সনাক্তও করলে। হেডমাষ্টার, দয়াল পণ্ডিত মশায়ের উপর
বিচারের ভার দিয়ে গেলেন।
রাতের-দেখা সনাক্ত মঞ্জুর হলনা। ক্লাসের সব ছেলেদের
এক এক করে জিজ্ঞাসা করা হল, এ কাজ কে করেছে ? সবাই
একবাক্যে বলেকরেছে মাধব। সে-ই গাছে উঠে কেটে
কেটে ফ্যালে, আমরা তার পরামর্শ-মত রাস্তায় ছিলুম, ইত্যাদি।
কেবল হরিবিহারী আর আমি বলি—মাধব সে-দলেই ছিলনা;
তার বাপের অসুখ বলে বাড়ী চলে গিছলাে।
সওয়াল-জবাবের উল্লেখ অনাবশ্যক। মাধব নীরবে যে-মারটা
খেলে, একটা জানােয়ারেও তা পারতাে বলে মনে হয়না।
স্কুলেই তার জ্বর এলো। মিথ্যা কথা ক’বার অজুহাতে
হরিবিহারী আর আমি যা পেলুম তাতে জ্বরটা শুধু আসেনি।
এক-কুড়ি সেরা-সেরা ফল পণ্ডিত মশায় স্বহস্তে বেছে নিয়ে,
বাগানের লােকদের বিদায় দিলেন। আশ্বাস দিয়ে বলেন,
তােমাদের কোনাে ভয় নেই, বাবুদের কাছে ইস্কুল থেকে চিঠি
পাঠাচ্ছি,আর ফলের এই নমুনাে রাখলুম,—দর জেনে ফাইনের
ব্যবস্থা করাব।
তারা ফলের ঝুড়ি নিয়ে চলে গেল। আর সেই বাছা বাছা
উৎকৃষ্ট ‘এককুড়িটা’ দর-যাচাইয়ের জন্যে নটবরের-মারফত, পণ্ডিত
মশায় বাড়ী প্রস্থান করলে। সেদিন তার ছুটি হয়ে গেল।
ঘণ্টা শেষ হয়ে গেল। পণ্ডিত মশাই অন্য ক্লাশে চলে
গেলেন।

দূরের আলাে ; আঘাতগুলাের জ্বালা তখনাে জীর্ণ হয় নি। কানে পৌছুতে লাগলাে, পণ্ডিত মশাই ছােট ছেলেদের জোর-গলায় পড়াচ্ছেন সদা সত্য কথা কহিবে ; প্রবঞ্চনা করিয়া পরের দ্রব্য লইবেনা । অবিচার করা মহাপাপ। ইত্যাদি হরিবিহারীর চোখের জল তখনাে হু-হু করে পড়ছে, সে পিঠে হাত বুলাচ্ছিল—খি খিল করে হেসে উঠল ! সবাই তার দিকে চেয়ে যােগ দিলে। আবার ভাব হয়ে গেল। মাধব আরাে দু’বছর ইস্কুলে পড়ে। তখন আর ভদ্র ছেলেদের তার উপর সে পূৰ্বভাব ছিলনা। সে ব্যবহারে আর চরিত্র-গুণে সকলকে জয় করেছিল। বয়সের সঙ্গে বােধ হয় অনেকে তাকে চিনেছিল। সকলে যে চিনেছিল এমন কথা বলতে পারিনা। তার বিনীত আনুগত্য আর সুমধুর ব্যবহারকে কেহ কেহ অবশ্য- প্রাপ্য বলেই ভাবতো। বাপ মারা যাওয়ায় সংসার, দু’টি অবিবাহিতা ভগ্নী একেবারে তার মাথার ওপর এসে পড়ায়, সে ইস্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। এই ছড়াটা তাকে যে কতখানি বেদনা দিয়েছিল, সে যে-দিন সকলের কাছে বিদায় নেয়, সেই দিন সবাই তা অনুভব করেছিল। সে যখন হাত জোড় করে’ অবনত শিরে-অজ্ঞানে যে-সব অপরাধ হয়ে থাকবে তার জন্যে সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে চোখের জল সামলাতে সামলাতে দীনহীনের মত চলে গেল, সেই দিন আমরা-ভদ্রলােকের ছেলেরা, ক্লাসে বসে

১৪
পাথেয়
স্পষ্ট অনুভব করেছিলুম—ক্লাসটা যেন নিষ্প্রভ হয়ে গেল। তার
চরিত্র-মাধুৰ্য্যই আমাদের অনেককেই চরিত্র জিনিষটির মূল্য
বুঝিয়ে দিয়েছিল ।
;
তার পর দীর্ঘ দিন চলে গেছে—বােধ হয় বিশ বাইশ
বছর। সে বাপের কাজগুলি—চাষ-বাস, গরু-বাছুর দেখা, দুধ
জোগাননা প্রভৃতি মাথা পেতে নিয়ে সংসারে প্রবেশ করেছে,
ভগ্নী দু’টির বিবাহ দিয়েছে, নিজেও সংসারী হয়েছে। সংসারও
বেড়েছে।—তার শ্রমের বিরাম নেই, ছুটি নেই; বােধ হয় সে-
বেশে সে দেখা করতে লজ্জাও বােধ করে, তাই বড় একটা
দেখাও হয়না। সে সকাল-সন্ধ্যা কাজে ব্যস্ত,আমরা উদয়াস্ত
চাকরির পশ্চাতে ! দু’তিন মাসে একবার দেখা হলে, সেও
পূর্বের মত অবাধে কথা কইতে পারেনা।
ভগ্নী দু’টির বিবাহে সে দীনের মত এসে দাড়িয়েছিল ।
আমরা গিয়ে বন্ধুর মত সব কাজের ভার নি। তাতে সে কি
উৎসাহই পেয়েছিল ! সে-যে আমাদের নিয়ে কি করবে তা
ভেবেই পায়না। কি অমায়িক কুণ্ঠামিশ্রিত হাসি ?
মধ্যে মধ্যে বাংলা কি ইংরাজী বই চাইতে আসতো। তাকে
পেলে ছাড়তে ইচ্ছা হতনা কিন্তু তার কাজে ফুরশৎ কোথায় ?
‘নরােত্তম চরিত’ আর ‘The Imitation of Christ' বই
দু’খানার সুখ্যাতি তার মুখে ধরতনা। তাই ও-দুখানা আমি
তাকে দিয়ে দিয়েছিলুম-সে কণ্ঠস্থ করেছিল। দেখা-শােনার

দূরের আলো
দূরত্ব তাকে কি দূরে ফেলতে পারে ! সে-যে আদর্শের মত হয়ে
হৃদয় অধিকার করে ছিল ! তার পর ত অনেক বড়বাবু, বড়
ধনী, বড় বিদ্বান, বড় গুণী দেখেছি—অনেক বড় কথা শুনেছি,
কিন্তু তথাকথিত এই ছােট লােকটির সেই ছােট ছােট বিনীত
ব্যবহার গুলির দুর্লভ দীনতার পশ্চাতে কি-যে একটা পবিত্র
মাধুৰ্য্য ছিল—যার শীতল-সৌন্দর্য্য বড়-বড়র মধ্যে মেলেনি।
( ৩ )
মাধব মুখে একটু হাসি এনে বললে—“আমি জানি, দাদাবাবু
আমাকে পায়ের ধূলাে দেবেনই।”
বললুম-“ব্যাপার কি মাধব, কি হয়েছে, অসুখটা কি ?”
সেই ভাবেই হাসিমুখে, খুব নীচু গলায় মাধব বললে-
“এবার বিদেয় নেবার অসুখ দাদাবাবু, তাই আপনাকে কষ্ট
দিয়েছি। জীবনের আরম্ভকালে অনেক কষ্ট দিয়েছি, আমার
জন্যে অনেক নির্যাতন স্ব-ইচ্ছায় সয়েছিলেন, এখন বিদায়-বেলায়
আপনি বই আর কে সইবে দাদাবাবু !”
সেই মধুর কণ্ঠ, সেই সুমধুর কথা ! কিন্তু আজ তা শুনে
আগের মত উপভােগ করতে পারলুমনা,-প্রাণটা সহসা ব্যথায়
ভরে উঠলাে। বললুম-“এ-সব তুমি কেন বলচে। মাধব,
তুমি নিজে ত আমাকে কখনাে ব্যথা দাওনি ভাই,
এইবার মাধবের দুই চক্ষু জলে ভরে এলাে,সে সামলে
নিয়ে বললে—“সে যে অনেক কথা দাদাবাবু, আপনার আপিসের
বেলা হয়ে যাবে।” পরে নিমেষ মাত্র নীরব থেকে বলে-

পাথেয়
“কিন্তু এরপরের জন্যে রাখলে, আমার বেলাও যে ফুরিয়ে যাবে ।
আচ্ছা আমার কথা থাক, দীনেশের কথাটা আপনাকে না।
বললে ত' নয় দাদাবাবু !”
—কে দীনেশ ?
—আমাদের লক্ষ্মীদিদির ছেলে বললে বুঝতে পারবেন কি?
ও পাড়ার হরলাল চাটুযয্য মশায়ের বিধবা পত্নী-লক্ষ্মীদিদি।
আমাদের বড়য্যে মশাইদের বাড়ীর মেয়ে। বিধবা হয়ে
অসহায় হয়ে পড়েছেন, বড় কষ্ট। ঐ দীনেশ ছেলেটিই তার
আশা-ভরসা। ছেলেটি বড় ভাল ।
-এইবার সে এন্টেন্স, দেবে। পূর্ণবাবু বলেছেন, পাস
হলেই তিনি পােষ্ট আপিসে ৩০ টাকায় নিয়ে নেবেন ! দিদি
বড় দুঃখ-কষ্টে মানুষ করছেন—পাস্ সে হবেই দাদাবাবু।
একটু থেমে মাধব বললে,-“এইবার আর একটু কষ্ট দেব,
আমার শক্তি নেই। দোরের মাথায় ঐ যে হাঁড়ি ক’টা আছে
তার বাঁ দিকের নীচের হাঁড়িটা পাড়তে হবে দাদাবাবু,-একটু
ভারি ঠেকবে।”
একটু নয়—বেশ ভারি ; পেড়ে দেখি—টাকা, আধুলি,
সিকি, দোয়ানি, পয়সা আর আধূলায় আধাঁড়ি হবে।
আমি অবাক হয়ে মাধবের মুখের দিকে চাইলুম। সে তার
সেই পাণ্ডুর মুখে একটু হাসি ছড়িয়ে বললে, “অনটনের সংসার,
কিছু রাখা ত’ সম্ভবই নয়, এটা না রাখলে নয়—তাই যখন
যা পেরেছি চোখ-কান বুজে ঐতে ফেলেছি,ওতে আধলাও

দূরের আলে। -- পাবেন। ঐ আমার আট নয় মাসের সঞ্চয় ! কত হয়েছে তাও জানিনা, আমার চাই অন্ততঃ কুড়িটি টাকা।” আমি গুণতে আরম্ভ করে দিয়েছিলুম। শেষ হলে বললুম- “প্রায় ২৩, টাকা হয়েছে।” উত্তেজিত আগ্রহে প্রায় ২৩ টাকা হয়েছে বলবার সঙ্গে সঙ্গে কি-যে একটা আনন্দপ্রবাহ তার চোখে-মুখে তরঙ্গিত হয়ে গেল, তা প্রকাশ করা যায়না। তার পরেই সে চোখ বুজলে,- দুটি চোখের বাইরের কোণ দিয়ে দুটি ধারা গড়িয়ে পড়লো। তার পর শীর্ণ মুখখানি হাসিতে উজ্জ্বল করে’ বললে—“পায়ের ধূলাের পরেই—এই হাঁড়িটির ভার দেবার জন্যেই আপনাকে কষ্ট দিয়েছি। ঐ যা আছে ওরি মধ্যে দীনেশের এন্টে ন্স দেবার ফি আর পরীক্ষার ক’দিন তার কলকেতায় থাকবার ব্যবস্থাদি আপনাকে করে দিতে হবে। কম পড়ে তো-আপনাকে আর কি বলব দাদাবাবু,-আমার আর তাে কিছু নেই।” আমার কথা সরছিলনা,চেষ্টা করে বললুম-“কম ত’ পড়বেইনা ভাই, বরং কিছু বাঁচবে ! কিন্তু আমি বলি কি পরীক্ষার এখনো দু-তিন মাস বিলম্ব আছে—সম্প্রতি ” মাধব কাতরভাবে বাধা দিয়ে বললে—“না দাদাবাবু, ও-আজ্ঞে করবেননা ! আমাদের বাক্স-প্যাটরা, লােহার সিন্দুক—সবই ওই হাঁড়ি। যে টানাটানির সংসার—আজই এক সময় সব হাঁড়িকুঁড়ি ওটুকাবে। আজ আট নয় মাস সংসারকে বঞ্চিত করে অনেক চেষ্টায় ওই যা হয়েছে, ও-থেকে 2 ১৮ পাথেয় ওষুধে ডাক্তারে দিলে—আমি তাে মরবই দাদাবাবু, কিন্তু বড় অশান্তিতে ছটফট করে’ মরবাে !” --না মাধবও আমি নিয়ে যাচ্ছি ভাই, তােমার ইচ্ছামতই খরচ হবে! -আঃ, ও-সম্বন্ধে আমি এখন সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত হলুম। ও-কাজটি আপনার মত আর কে পারত। আপনাকে দেবতা বলে জানি, আর একটি কথা যদি দয়া করে বলে দেন, আমি বল পাই, সম্পূর্ণ শান্তিতে মরতে পারি। আমি মুখ খু গয়লা, এ-জন্মে কিছু দেখা-শােনার সুযােগ হ’লনা। ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম, ধ্যান- ধারণা শােনাই রইল, কি করে সকলে দুবেলা দুমুঠো খেতে পাবে এই ধান্ধায় শয্যা ত্যাগ থেকে শয্যা গ্রহণ পর্যন্ত চিন্তা আর পরিশ্রমে জীবনটা কেটেছে। শ্রান্ত শরীর শয্যায় পড়লেই রাতটা নিদ্রায় কেটে যেতাে।-তােমার সংসারে তুমি আমাকে চাকর রেখেছ, তােমার ইচ্ছামত তুমি আমাকে চালিয়ে নিয়ে, -শক্তি দিয়াে। অপরাধ থেকে রক্ষা করে। এইরূপ একটা মুখের মনগড়া প্রার্থনা নিয়ে যাত্রা আরম্ভ করেছিলুম! আজ যাত্রা শেষে তার সংসার তাঁর হাতে দেবার সময় মনটা এক- একবার নড়ে উঠছে—দুৰ্বল হয়ে পড়ছে--কষ্ট দিচ্ছে। হ দাদাবাবু, চাকর থাকলে, মনিব একটু নিশ্চিন্ত থাকেন। গেলে তিনি নিজে না দেখে কি থাকতে পারেন :--সব ত তাঁর ? চাকরের দেখার চেয়ে ঢের বেশী দেখবেন। তিনি ত’ শুধু মালিক নন-তিনি অনাথনাথ,নয় কি দাদাবাবু?

দূরের আলো
তার পরই ম্লান হাসির সঙ্গে একটা নিশ্বাস ফেলে বললে-
“ভেবে আর কি করব।”
মনটা দমে ত’ গিছলই,বুঝলুম, মাধব মস্ত একটা অশান্তি
ভােগ করছে,—প্রাণটাও বেদনা-চঞ্চল হয়ে উঠলো। জোর
করে বললুম,—“যে আজীবন সত্যকে ধরে চলেছে-তিনি
নিজে তাকে ধরে থাকেন, তার ধারণা কখন মিথ্যা হয়না ভাই।
তুমি যা ঠাউরেহ, তার চেয়ে সত্য আর নেই, এই আমার বিশ্বাস।
এর বেশী আমি বুঝিনা-তােমার ভাবনা আসছে কেন?”
মাধব কেঁদে ফেললে ! বললে-“বড় অপরাধ হয়ে গেছে
দাদাবাবু! আমার মাথা ঠিক থাকচেন, সেই আমাকে
ডােবাচ্ছিল। আর নয়—আর হবেনা” বলেই সে তার শীর্ণ
হাত দুটি একত্র করে কপালে ঠেকিয়ে চোখ বুজলে। দুই চক্ষে
জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। তিন মিনিট শ্বাস নেই। আমি
চঞ্চল হয়ে উঠলুম।
সেই একটি নমস্কারে বােধ হয় সে সৰ্বস্ব সমর্পণ শেষ করলে,
আর একটা ঝড়ের মত নিশ্বাসে বাইরের সব-কিছু হটিয়ে দিলে,
-তারপর আঃ-বলে চোখ খুলে আমার দিকে হাসি মুখে চেয়ে
বললে—“এইবার মন খুলে পায়ের ধূলােটা দিয়ে যান, আফিসের
বেলা হল।”
সে কি প্রফুল্ল মুখ! চোখের সামনে যেন পদ্মের বিকাশ
দেখলুম। আমি কথা খুঁজে পাচ্ছিলুমনা। মিনিট দুই কেটে
গেল। সে-ই কথা কইলে,-কাল রবিবার, না,—পারেন ত’

২০
পাথেয়
এদের একবার এই পর্যন্ত বলেই হাসিমুখে বললে,-“ছিঃ,
অভ্যাস কি মলেও যাবেনা দাদাবাবু ! তা আপনাদের হাত
দিয়েই ত’ তঁার দেখা দেখি।”
বললুম-“মাধব, এ-সব তুমি কি বােকচো, তােমার এমন
কি হয়েছে? সে তাে একদিন সকলেরই আছে, তােমার ত’
ভাই ৯ বিঘে ধান জমি রয়েছে,-ভাতের ভাবনা নেই।"
আমার কথা অসমাপ্ত রইল ।
“সে আর নেই দাদাবাবু” বলে আমার মুখের ওপর
চেয়ে একটু জোরে হাসতে গিয়ে তার কাশি এল, ঘুরে
ওপাশ ফিরলে,-কি খানিকটে মুখ থেকে বেরিয়ে গেল।
বিছানাতেই ফর্শা ন্যাড়া ছিল, তাইতে মুখ মুছে, সেটা চাপা
দিলে ।
একটু আগে দীনেশ ওষুধ খাওয়াতে আসে, মাধব তাকে
বলেছিল--‘বাবা-ওষুধ আর আমাকে দিনি,–গঙ্গাজল দিলেই
বেশী উপকার হবে।' সে ক্ষুন্ন হচ্চে দেখে বলে,-“আচ্ছা দাও।
আর দেখাে বাবা-বাড়ীতে খোজটা নাও, চাটুয্যে মশায়ের
ছেলের দুধটা গেছে কি না। খােকার দুধটা যেন সকাল সকাল
যায়ভুল না হয়।
ভাবলুম, ওষুধটা উঠে গেল,-আমি বসে রয়েছি-তাই
কু-দৃশ্যটা চাপা দিলে।
একটু পরে বললুম-“সে আর নেই কি রকম?”
-সেই জমিটে ?

দূরের আলাে
দেখি, মাধব চোখ বুজে সামলাচ্ছে, সেই অবস্থাতেই বললে
-~~-“পরে শুনবেন দাদাবাবু !”
ঝলুম সে কষ্ট বােধ করচে-এখন তাকে প্রশ্ন করাটা ভাল
হয়নি। মনে মনে অপ্রতিভ হয়ে বললুম-“আমি এখন চললুম
মাধব, তুমি একটু স্থির হয়ে শােও ভাই, বড় বেশী কথা কওয়ানাে
হয়েচে-কাজটা ভাল হয়নি। আমি সন্ধ্যার সময় না-হয় কাল
সকালেই আসবাে’খন।”
মাধব ক্ষীণ স্বরে বলে—সে যা হয় করবেন—এখন ত’ পায়ের
ধূলো আমার মাথায় দিয়ে যান, আমি যে নিতে পাচ্ছিনা
দাদাবাবু !”
তার ওই শেষের কাতর কথা কয়টি আমার হৃদয়ে যেন
আসন্ন বিপদের ছায়ার মত এসে পড়লো।
এতক্ষণ আমি
তার কথা গুলির মধ্যে অবসাদ-মাখা নৈরাশ্যের সান্ধ্য-সুর
পেয়ে ব্যথা বােধই করছিলুম, তার পশ্চাতে যে বিদায়ের
আয়ােজন বিপুল হয়ে উঠেছে-সেটা একবারও মনে উদয়
হয়নি।
আমি উঠে দাড়িয়েছিলুম। তার দিকে চেয়ে দাড়িয়েই রইলুম,
সে চোখ বুজেই বললে—“কই দাদাবাবু !”
আমি যন্ত্রের মত “এই যে ভাই” বলে’ ভগবানকে স্মরণ
করে তাড়াতাড়ি তার মাথায় পায়ের ধুলাে দিলুম। আমার
রুদ্ধশ্বাসটা পােড়লল, সে বােধ করি জানতে পারলে, তার
মুখে একটু হাসির আভাস দেখলুম, কিন্তু আর সে কথা কইলে-

২২ পাথেয় না ! আমারাে কিছু জোগালােনা। ব্যথাভরা বুকে ধীরে ধীরে দাওয়ায় পা দিতেই বিপদশঙ্কিতা কম্পিহৃদয়-সমগ্র বিশ্বের মূর্তিমতী দীনতার মত মলিনাঞ্চলখানি গলায় দিয়ে গৌরীর মা আমার পদপ্রান্তে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করতে গিয়ে প্রায় লুটিয়েই পিেড়লো,-দেহ তার হতাশ-শিথিল হয়ে গেছে ! ( ৪ ) রাস্তায় হরিবিহারীর সঙ্গে দেখা। হরিবিহারী আমাদের সহপাঠী ছিল। সেও মাধবদের জাত, বােধ হয় দূরসম্পর্কও আছে। তারা ২৩ পুরুষ জমিদার, তাই গ্রামের সকলের সঙ্গে তাদের মেলামেশা সহজ ভাবেই চলে। হরিবিহারীর স্বভাব বরাবরই নিরীহ আর পরােপকার- পরায়ণ। “হাতে হাঁড়ি যে,—বিদেয় নাকি!” বলে সে হাসলে। আমার হাসবার মত মনের অবস্থা ছিলনা, বললুম-“বিদেয় বটে,মাধব দিলে।” “মাধবকে দেখতে গিছলে নাকি,-কেমন দেখলে,-সে আছে কেমন ?” -অসুখ ত’ বটেই, কিন্তু তার অতটা হতাশ হবার মত কিছু তাে দেখলুমনা। তবে বােধ হ’ল যেন তার ভেতরে কি

দূরের আলাে
একটা কঠিন অসুখ আছে,
যার ব্যথা তার মৰ্ম্মে পৌছে
গেছে—তার উদ্যম উৎসাহ, আশা ভরসা একেবারে মুছে
দিয়েছে।
—তােমাকে কিছু বলে ?
-না।
-তুমি কিছু শােননি?
-না ।
সে অনেক কথা। তার পরিবার কামিনী-আমাদের
আপনা-আপনির মধ্যে, আমার সঙ্গে কথা কয়,—সে-ই আমাকে
ডেকে পাঠায়, তা না ত’ তার অসুখের খবরও পেতুমনা।
যা—গুপী-দত্তকে চেন ত’—যিনি আজ তিন বছর হল
আমাদের গ্রামে এসে বাস করেচেন ? ওঁর জন্ম কেটেচে জমিদারী
সেরেস্তায়। সেরেস্তার একটি দক্ষ দানব। মজিলপুর মজিয়ে
আমাদের গ্রামে এসে নতুন করে গজিয়ে উঠেচেন। এই তিন
বছরের মধ্যেই মামলা-মকদ্দমা শতকরা ষাটে পৌছে দেছেন।
আমাদের ৭৮ জন প্রজার ১৭ বিঘে ধান-জমি সাফ উড়িয়ে
নেছেন। তারা নাকি টাকা ধার নিলাে। তারা বলে, ওঁকে
চিনিইনা ! আমাদের সেরেস্তার রামহরি সরকার বলে—এখনও
ওঁর পরিচয় পান-নি-সবুর করুন ! ঐ দত্তটি ব্ৰজপুরের বাবুদের
সত্ত্বকত্ব রেখে আসেননি। জালে অমন সিদ্ধহস্ত কাল কলিতে
জন্মায়নি । কোথাও আবির্ভাবের এক সপ্তাহ মধ্যে উনি
লােক চেনাটা সেরে ফেলেন। দেখেন উনি দুটি জিনিষ, -

২৪
পাথেয়
কারা ভাল মানুষ, তাদের উনি কোন একটি স্বনামখ্যাত পশু
বলেই জানেন। আর দেখেন-সঙ্গান্ত ও সম্মানিত বংশের
কে কে খুব কষ্টে দিনপাত করচে ; তাদের উনি সহানুভূতি
দেখিয়ে আপনার-জন করে নেন—কখন কিছু সাহায্যও করেন।
অর্থাৎ মুঠোর মধ্যে করেন। তারাই ওঁর কার্যাদির সাফাই
গান, সাক্ষী হন,-অপরের সাক্ষী দিইয়ে তাদের কিছু কিছু
পাইয়েও দেন।
-সকালে গুপী দত্তর কথা কেন ?
—বলছি। মাধকে আর মারলে কে ? আজ দশ
দিনের কথা—মাধব একখানা রেজেষ্ট্রি-করা চিঠি পায়। খুলে
দেখে গুপী দত্তর উকীল উমেশ বাবু লিখেছেন, আমার মক্কেল
শ্ৰীযুক্ত গুপীনাথ দত্তের নিকট তুমি হণ্ড-নােটে যে ৩৫১
দু' বছর সাত মাস পূর্বে কৰ্জ নিয়েছিলে, সে টাকা মায় সুদ
যেন আজ হইতে সপ্তাহের মধ্যে পরিশােধ করা হয়।
আজ হইতে এক সপ্তাহ অন্তে তােমার নামে আদালতে নালিশ
রুজু করিয়া উক্ত টাকা আদায় করিতে আমার মক্কেল বাধ্য
হইবে। ইত্যাদি
মাধব ভেবেছিল—চিঠিখানা ভুলক্রমে তার কাছে এসেছে,
এ-মাধব আর কেউ হবে। দু-দিন আগে তার জ্বর হয়েছিল।
জরুরী জিনিষ ভেবে সেই রাতেই জ্বর-গায়ে সে উমেশ বাবুর
সঙ্গে দেখা করে বলে -এ পত্ৰখানা বােধ হয় ভুলে তার কাছে
গিয়ে পড়েছে, তাই সে দিতে এসেছে । গুপী বাবুকে সে এক
নচেং

দূরের আলো
বার মাত্র দেখেছে, তখন সে তার নামও জানতনা। তিনি
তার লক্ষ্মী বলে’ যে গাইটি ৬০ সের দুধ দেয়, সেইটি কিছু দিয়ে
নিতে চান। তাতে সে হাত জোড় করে বলে,-“আমি অতি
গরীব গয়লা, ঐটির কায় কোন প্রকারে চলে যায় আমাকে
ক্ষমা করুন বাবু!
তিনি তাতে “বেশ বেশ লক্ষ্মীকে রাখাই তাে পুরুষার্থ
হে।” এই বলে চলে যান। অনি ভদ্র লোকের কথা রাখতে
না পেরে আর তার কথার ভাব বুঝতে না পেরে মনটায় বড়
অস্বস্তি বােধ করেছিলুম। তারপর তার সঙ্গে আর কখনো কথা
হয়নি,-দূরে দূরেই তাকে দেখেছি।
উমেশ উকীল মাধবকে জানতেন। তিনি বলেন –
-“তুমি
দেখছি আর সে-মাধব নেই। তােমার সঙ্গে গুপীনাথ দত্ত
মশায়ের যদি আর দেখাই না হয়ে থাকে ত’ তােমার এই
হ্যা নােটখানা তাকে দিয়েছিলো কে, আর টাকাটাই বা তুমি
কার হাত থেকে নিয়েছিলে।” এই বলে তিনি মাধবের
হাণ্ডনােটখানা দেরাজ থেকে বার করে মাধবকে দেখতে দিয়ে
বললেন-“এ লেখা কার,সইটে কার ?”
মাধব সাগ্রহে দেখতে গিয়ে সহসা যেন ধাক্কা খায়।
সাক্ষীরূপে ভগবতী চাটুয্যে মশাই সই করেছেন দেখে চমকে
ওঠে। তার মুখের বর্ণটা মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তার পর
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে উমেশ বাবুর হাতে কাগজখানা দিয়ে
বিমূঢ়ের মত মাথা নীচু করে থাকে। উমেশ বাবু বলেন-“এখন

২৬ পাথেয় কি বল ? এ হাওনাের্ট কি তােমার নয়?” মাধব কাতরত- মিশ্রিত বিনীত কণ্ঠে বলে—“না বলবার তাে যাে নেই উকীল বাবু!” --তবে কি এ হ্যাণ্ড নােট, তােমার নয় ? -নয় ত’ নিশ্চয়ই, কিন্তু সে-কথা ত’ আপনিও বিশ্বাস করতে পারবেননা, উকীল বাবু। এইবার তিনি সুর বদলে বললেন-“এ কুবুদ্ধি তােমায় কে দিলে ? ও-সব ফন্দি ছাড়-বিপদে পড়বে, বুঝলে -যে আজ্ঞে, ছাড়লুম। -হ্যা, আদালতে ও-সব টাকেনা, বুঝলে। ধর্মের চোখে ধূলো দেওয়া যায়না। তা যদি হত ত’ ধৰ্ম্ম এতদিন ধৃতরাষ্ট্র হয়ে যেত। তােমার মত অনেকে অনেক চেষ্টা করেছে আর করেও, তাতে বাধা দিয়ে ধৰ্ম্মকে রক্ষা করবার তরেই আদালত আছে, আর আমরা আছি,বুঝলে। মাধবের ও-সব কোন কথাতেই কান ছিলনা। উমেশ বাবু বলে চললেন,-তুমি গ্রামের লােক, ভাল লােক বলেও জানতুম -কারুর কুপরামর্শে পড়েছ দেখছি। যাকু,—টাকা যােগাড় করতে যদি না পার ত’ যা বলি তাই করগে, সুবিধে হ'লেও হ'তে পারে। গুপী বাবু মহাশয় লােক—তার কাছে গিয়ে দুখ, জানালেই কাজ হবে বলে আমার বিশ্বাস। কিছু ধান জমি আছে না? -আজ্ঞে বিঘে।

দূরের আলো
-তাতে তাে অর্ধেকও হয়না হে। আচ্ছা যাও দিকি একবার,
তিনি তেমন লােক নন, হাতে-পায়ে ধরলে,-বুঝলে ? যাও
গ্রামের লােক তুমি—না হয় আধঘণ্টার মধ্যে আমিও উপস্থিত
হচ্ছি, দেখি সুদটে। যাতে-বুঝলে ? যাও,—হরে গয়লা-বেটা
নিছক খাটি জল খাওয়াচ্ছে হে! মােটা হচ্ছি কি ড্রপ সি
দাড়ালো, ঝতে পারছিনা। তােমাদের জাতের উপকার করাই
ভুল, তবে শুনেছি তুমি ভাল লােক,দেখি।-আচ্ছা, আগে
গুপী বাবুর কাছে যাও ত’, সংসারে নিজের কাজ আগে-শুভস
শীঘ্রং-বুঝলে,-
মাধব অতিষ্ঠ হয়ে শুছিল, জ্বরটাও যাতনা দিচ্ছিল, সে
প্রণাম করে, টলতে টলতে বেরিয়ে বাঁচে।
হরিবিহারী বলে’ চললো-
আমাদের বাল্যবন্ধু রামরায়-উমেশ উকীলের ক্লার্ক (মুন্সি)
কি না,সে তখন উপস্থিত ছিল। জানই ত’ সে নকুলে লোেক
আমাকে “শােন শােন, বিদুর-দুৰ্য্যোধন সংবাদটা শুনে যাও” বলে
ডেকে সমস্ত কথা-বার্তা যেমন যেমন হয়েছিল, অভিনয়ের মত
করে’ শুনিয়ে শেষ বলে মাধবের ও ন-বিঘে ত’ গেছেই
আবার সুদের বদলে দুধ চাই, ওর লক্ষ্মী বলে গরুটাও গিবে
আমার হাতে ভাই অনেক কাগজ আসে, কিন্তু অন্যের লেখার

২৮
পাথেয়
এমন নিখুৎ নমুনাে কখনাে নজরে পড়েনি। তায় গুপীর
দৌলতে উকীল বাবুর এখন যথেষ্ট ‘রূপী’ আসছে, দু'জনে
হরিহরায়া। কোন উপায়ই ত’ দেখিনা ভাই।”
—যাকু, রামরায় যা যা বলেছিল ঠিক্ তার কথাগুলিই
তােমাকে বলেছি। বাদ গেছে কেবল তার ভাবভঙ্গী আর
কণ্ঠস্বর ।
বললাম—“মাধব উমেশ বাবুর পরামর্শ-মত গুপীদত্তর কাছে
গিয়েছিল ?”
“তুমি কি মাধবের প্রকৃতি জাননা ! সে ওই কদৰ্য্য প্রস্তাব
শুনে, অতবড় মিথ্যাটা মাথা পেতে নিতে যেতে পারে?
চেয়ে সে মরণটাই বরণ করে নিলে দেখছি।”
এই বলে
হরিবিহারী উদাস ভাবে একট। নিশ্বাস ফেলে ।
বলে-“জ্বর নিয়ে বেরিয়েছিল রাত ৮টা আন্দাজ, যখন
উমেশ বাবুর বাড়ী থেকে ফেরে, তখন জ্বর অনেক বেড়ে গেছে ।
চৌধুরীপাড়া পেরুতে পারেনি, পোলটার উপর শুয়ে পড়ে ।
সন্ধ্যের আগে ঝড়-বৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল, সব ভিজে ছিল,
জোলাে-হাওয়া ও দিচ্ছিল। রাত হওয়ায় দীনেশকে বলে?
পাঠানয় সে খুঁজতে যায়। যখন বাড়ী আনলে, তখন ১২ট।
বেজে গেছে। মাধবের ভাল সংজ্ঞা ছিলনা, দৃষ্টি লক্ষ্যহীন,-
কথার মধ্যে-না না’ ‘চাটুয্যে মশাই—তা হতেই পারেনা
কখনাে--‘ব্রাহ্মণ—অত বড় পবিত্র বংশ’ ;-কখনাে-‘আহা,
বড় কষ্টই পড়ে থাকবেন’; কখনো বা বড় অভাবেই করে’

দূরের আলো থাকবেন; কখনাে তাতে কি হয়েছে, ব্রাহ্মণ দেবতা-অভাব যে বুঝি গাে, সেই তত মানুষকে ভুল করায়।’-কামিনি, খবরদার ভার ছেলের দুধ না বন্ধ হয়, সকাল সকাল পাঠিয়ে দিও। ওটা অ ভাবেতে করিয়েছে—অভাবেতে। ওঁর দোষ নেই। উনি করতেই পারেননা--ব্রাহ্মণ যে ;-সারারাত এই সব অসংলগ্ন কথাই বার বার ক’য়েছিল। সকালে ঘুমিয়ে পড়ে, জ্বর কমে যায়। সাত দিনের দিন ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন,-“বল- নিউমােনিয়া। কাল থেকে রক্তও দেখা দিয়েছে।” শুনে চমকে উঠলুম, প্রাণটা অবলম্বন খুঁজে পেলেন। হায় হায় করে উঠলো। বুঝলুম-সে “কু-দৃশ্য” চাপা দেয়নি ; —আমি না বেদনা-বিচলিত হই, তাই কালের জরুরি ডাকের রক্ত-লিপিখানা ঢাকা দিয়েছিল । বললুম-“হরিবিহারী তুমি ভাই মাধবের কাছ থেকে আর ননাড়ােনা, আমি এলে তােমার ছুটি। আমার দুর্ভাগ্য, এমন একটা কাজ ফেলে এসেছি আমাকে আপিসে যেতেই হবে, ভাই। তা ছাড়া চাবিও আমার হাতে ;-তুমি গিয়েই মহেন্দ্র ডাক্তার মশাইকে আনতে দীনেশকে পাঠিয়ে দেবে, রাজকুমার বাবুরও থাকা চাই, খরচ সব আমার। বেশ—তাই হবে। কেবল বলে যাও হাড়িটাতে কি ? বলুম। শুনে মান-হাসির সঙ্গে একটা নিশ্বাস ফেলে সে বললে-“জানাে ওর জন্যে সে কি কাণ্ড করেছে ! কাপড়, ৩০ পাথেয় কপি, কড়াইশু টি, আঁব, পান, ইলিসমাছ এ-সব থেকে ও-বাড়ী আজ প্রায় এক-বৎসর বঞ্চিত। গয়লায় বাড়ীর ছেলে-মেয়েরা দুধ খায়নি,—ওই দীনেশ ছেলেটির এন্টেস দেবার খরচ সঞ্চয়ের জন্যে,—ওর লক্ষ্মী-দিদির দুঃখ দূর হবার আশায় !” পাঁচ দিন আগেও জানতে পেলুমনা ! অসহায় বালকের মত হাত-পা আছড়ে কঁদতে ইচ্ছা হচ্ছিল, বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। তাড়াতাড়ি বললুম—“হরিবিহারী, আর শােনানি ভাই, মাধব যাতে বাঁচে, তাই কর। মহেন্দ্র ডাক্তার যা বলবেন— ঠিক ঠিক তাই করা চাই-খরচ যতই হােক। আমার ফিরতে সন্ধ্যে” ( ৫ ) তখন কুটীর-পানসীর চলন কমে গেছে। আমাদের গঙ্গা পার হয়ে, বালী থেকে ট্রেণে কলকাতায় যাতায়াত করতে হয়। মেঘনাদ-মাঝি আমাদের পারাপার করে। খালের একটা মেটে ঘাটে আমরা উঠতুম নাবতুম। ট্রেণের টাইম বুঝে দুবেলাই নৌকো ছাড়া হত,-এমন দু’তিন বার। আমরা ছিলুম মাসিক বন্দোবস্তের যাত্রী,অপর কারুর কাজ পড়লে, তারাও আসতেন- যেতেন—মানা ছিলনা। কোন কোন দিন বাধাব্যবস্থার বাবুরা তাতে বিরক্ত হতেন, বিশেষ করে আপিস যাবার সময়,-বেশী বােঝাই হ'লে পাছে বেলা হয়, ট্রেণ মিস হয়। মেঘনাদ তখন

দূরের আলো
হাত জোড় করে ধীরে ধীরে বলতে—“কোথায় এখন ঘুরে
বেড়াবেন, কষ্টে পড়বেন, কাজের ক্ষেতি হয়ে যাবে,আতে
দিন বাবু, আমি খেটে পৌছে দেব’খন।” পয়সার লােভে নয়,
-পয়সা সে কারুর কাছেই চাইতে পাতােনা,-আসল কথা
সে কারেও ক্ষুন্ন করতে পারতােনা। “না” বলতে পারতাে-
।
মেঘনাদ জাতে মালা হলে ও মালাদের মত তার কোন
খানটাই ছিলনা। তার স্বভাব-চরিত্র কথা-বাত্রা ব্যবহার-বিনয়
লক্ষ্য করলে আশ্চর্য্য হ'তে হ'ত। কোন নেশাই তার ছিলনা।
গভীর-রাত্রে বা যে-কোন সময় তাকে ডাকলে সে বিরক্ত হতনা
পার করে দিত, কখনো বােতেনা-কি দেবেন?
কথা, সেই নিরক্ষর মালার মধ্যে যে-সব সদ্গুণ লক্ষ্য করেছি,
শিক্ষিত ভদ্রের মধ্যে তা বিরল। তাই সে-সম্বন্ধে মেঘনাদের
সঙ্গে কথা ক'য়ে দেখবার আমার একটা ভারি কৌতুহল ছিল,
এতটা বৈশিষ্ট্য তাতে কোথা হতে এলো,-নিশ্চয় সে কোন
শক্তিমান গুরু পেয়ে থাকবে।
কিন্তু কথাটা পাড়বার আর
আমার সুযােগ ঘটনা, ইচ্ছাটাই থেকে যেত।
আজ শনিবার, অফিস থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে কিছু
বেদানা, আঙ্গুর আর আপেল নিয়ে, ৪|| •টের ট্রেণ ধরলুম।
মহেন্দ্র বাবু নিশ্চয়ই আশা দিয়ে গেছেন-এতক্ষণ তঁার ওষুধ বােধ
হয় তিন-দাগ পড়ে গেছে।
খালধারে পৌছে দেখি, মেঘনাদ নৌকা নিয়ে হাজির আছে।

পাথেয়
আমার আগেই কে-দু’জন নৌকোয় উঠে বাইরে গলুয়ের দিকে
বসেছে।
নৌকোয় পা দিয়েই চমকে গেলুম !
ভগবতী চাটুয্যে মশাই বলেন—“এই যে নিৰ্ম্মল-ভাল আছ
বাবা, বাড়ীর সব ভাল ?”
সেই চিরপরিচিত সদ্বংশসুলভ সরল অমায়িক সহজ সুর ।
কেবল চক্ষু দুটি বােধ হ’ল কলুষত। ঘৃণা আমার ভেতর থেকে
বুলিয়ে উঠেছিল, সেটা মুখে-চোখে পৌছবার পূৰ্বেই—“আজ্ঞে
ভালই আছি, বাড়ীর সব ভাল ;-ভেতরে এসে বসুন না,” বলতে
বতে হালের দিকে নৌকার ছইয়ের উপরে গিয়ে বসলুম ।
“না—এইখানেই আমরা বেশ আছি বাবা, দেরী ত’ হবেই,
সন্ধ্যাহিক সেরে নিতে পারবাে।”
আমার শনিবার-সসামবার ছিলনা, স-ছটার ট্রেণেই
আসতুম! মেঘনাদের দিকে চাইতে সে বললে-“আজ পাঁচট
বিশ মিনিটের গাড়ীতেই বাবুরা সব আসেন, সেইটাই শনিবারের
বড়-পাড়ি। ভেটেল ঠেলে গিয়ে সময়ে এসে জুটতে পারবাে
কি! তাড়া আছে কি বাবু?”
বাবুদের মেজাজ আমার জানা ছিল, পাঁচ মিনিট দাড়াতে
হলে মেঘনাদকে অনেক কথা শুনতে হবে। সারাদিন খাটুনির
পর ক্লান্ত ক্ষুধিত বাড়ীমুখখা বাঙ্গালীর মেজাজ ঠিক রাখার আশা
করাও অন্যায়। বললুম-“তাড়া ত’ খুবই ছিল মেঘনাদ, কিন্তু
উপায় কি,থা।”

দূরের আলো মেঘনাদ বড় কুণ্ঠায় পড়ে’ বললে—“বলেন তাে—” বললুম—“না-থাক মেঘনাদ, বিশ পচিশ জনকে দাড় করিয়ে রাখা হবে।” মেঘনাদ ভারি কিন্তু হয়ে বললে-“একখানা নৌকো দেখবো। কি বাবু ?” আমি তাকে শান্ত করবার জন্যে বললুম-“না, মেঘনা, আমি ওই পাড়িতেই যাব । অনেক দিন থেকে তােমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা কোরব-কোরব করে’ করা হয়নি, আজ এই ফাকে সেইটাই শুনি। মাধবই মাথার মধ্যে ঘুরছিল। হঠাৎ মেঘনাদের মধ্যে তার ছায়া যেন দেখতে পেলুম। তাই কথাটা মনে পড়ে গেল ' ভালই হল, তা না হলে মেঘনাদ সারাক্ষণটা ক্ষুন্ন মনেই ছটফট করতাে। গুপী-দত্ত চাটুয্যে মশায়ের গা ঠেলে, ঠোট উলটে, ভুরু তুলে বিদ্রুপের হাসি ফুলিয়ে বললে-“আজ-কালের উদারতা। চুলােয় যাক্, আটটার পরই উমেশ আসবে, আজ তো তােমার পেটের চিন্তা নেই—ঠোঙ্গা পােরা খাবার, আর-এই দুটে। রাখাে।” এই বলে’ চাটুয্যে মহাশয়ের হাতে কি দিয়ে বগল থেকে নথিপত্রের বাণ্ডিল বার করে’—চাটুয্যে মশাইকে কি-সব বােঝাতে লাগলেন। সেটা আর শােনা গেলনা । বেশ বােধ হ’ল চাটুয্যে মশাই অনিচ্ছায় একটু ঝুকলেন মাত্ৰ-কাণ আমাদের দিকেই ইল- তিনি আমার কাছ থেকে হাত চার-পাচ মাত্র তফাতে 3

৩৪
পাথেয়
ছিলেন। মেঘনাদের কাছে আমি যা শুতে চেয়েছিলুম, সেটা
নিশ্চয়ই তার কানে গিয়ে থাকবে।
দুচার-বার ইতস্ততঃ করে’ মেঘনাদ সহাস্য বিনয়ে বললে,
“সে শুনলে আপনি হাসবেন বাবু,-বিশ্বাস করবেননা।”
“বললুম,-তুমি মিছে কথা কইবেন, এ বিশ্বাস আমার
আছে মেঘনাদ, তানাত শুনতে চাইতুমনা।”
"তবে শুনুন,—সে অনেক দিনের কথা বাবু-তখন আমার
বয়স ১৫|১৬, এখন দুকুড়ি চোদ চলছে। ঐ বয়সেই আমি
"লম্বা-চওড়া জোয়ান হয়ে পড়েছিলুম। মালা-পাড়ায় কেউ
আমার সঙ্গে পারতােনা, সবাই ভয় করত। সাতার কেটে
দু’বেলা ও-পারে গাঁজা খেতে যেতুম,ছােটলােকের আরো যে-
সব আয়েব তা ধরতে আরম্ভ করেছিল। এ-পারে ও-পারে
সঙ্গীও জুটেছিল তেমনি। এমন সময় আমার কলেরা হ’ল ।
মধু-ডাক্তার মশাই দেখলেন, বাঁচাতে পারলেননা। সন্ধ্যে
থেকে ঘরের মধ্যে বড় বড় অচেনা চেহারা আর কুকুর দেখতে
লাগলুম। ভয়ে আর কথা কইতে পারলুমনা। তাদের একজন
বললে—“৯টা হয়েছে, আর নয়, এইবার চলে আয়।”
আমাকে যেন যাদু করলে,না বলতে পারলুমনা, কেবল
বললুম-কি করে যাব ? আর একজন ধমকে বললে-দেরি
হয়ে যাচ্চে-হা-করে বেরিয়ে আয়! হাঁ করতেই দেখি আমি
বাইরে-দেহটা মাদুরে পড়ে। মা-বােনের। চীৎকার করে
কদচে, পাড়ার সবাই ছুটে আসছে, কেউ বলচে অসুর-পাত হ'য়ে

দূরের আলাে
গেল, অত বড় জোয়ান আর দেখবােনা। দূরে কেউ কেউ
বলাবলি করছে-যে বাড় বেড়েছিল—ও-কি থাকে-
আমি তখনো আমার ঘরে আর বাড়ীর চারদিকে ঘুরচি,
দেহটাকে ছেড়ে যেতে পারচিনা। কোথায় যাব? ঐ তাে
আমার ঘর। দেহ ছেড়ে থাকবে। কোথায় ? এমন সময় তারা
ধমকে বললে-আয় আমাদের সঙ্গে-রে থাকবার জায়গায়
চল ;-একজন বললে,—এখানেও আসতে পাবি এখন আয় ।
এই বলতেই কুকুর গুলো এগুলাে তার পরই তাদের সঙ্গে
আমরাও শূন্যে চললুম। খানিকক্ষণ কিছুই বুঝলুমনা।
পর-সে যে কি, তা বােঝাতে পারবােনা বাবু,-ভিজে ভিজে
কালো স্যাৎস্যে তে জমাট বাধা অন্ধকার,-তা থেকে আবার
কোয়াসার মত পে উঠছে—দম আটকে যেতে লাগলাে। লক্ষ
লক্ষ দুঃখী অসহায় স্ত্রাপুরুষের হাহাকার এক সঙ্গে কাণে ঢুকে
মাথা বো বো করতে লাগল। ছটফট করতে লাগলুম। একজন
বললে-“দুধার বেশ করে দেখতে দেখতে চল। কোন দিকেই
দৃষ্টি ছিলনা,-ভাল করে দেখবার চেষ্টা করতে গিয়ে শিউরে
উঠলুম-ওরে বাপরে-এ কি! আমাদের দুধারে মিশমিশে
কালাে–দয়ের মত ঘন নদী চলেছে,—কি দুর্গন্ধ !
-কি দুর্গন্ধ ! তাতে সব
মানুষ ! মাছের মত গিশ গিশ করছে ! কেউ ভাসছে, কেউ
এক কোমর, কেউ গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দাড়িয়ে আছে, কেউ ডুব
দিচ্ছে, কেউ কিনারায়। স্থান নেই।
স্থান নেই। তাদেরি চীৎকারে যেন
হাজারটা পাটের-কল চলছে! তাদের অবস্থা আর কষ্টের কথা

পাথেয়
বলতে পারবােনা বাবু, মাপ করবেন। পাঁচ ছয় জন চেনা
লােকও দেখলুম,—উঃ ও-পাড়ার দাদাঠাকুরের কান্না দেখে কেঁদে
উঠেছিলুম,—তিনি চিনতে পেরে বললেন—‘মেঘা, এলি নাকি,
আহা! এই পথ দিয়ে, আহা! তা তােদের এতটা নয় বাবা,
আমি যে ব্রাহ্মণ ছিলুম ! আমার কোনটারই মাপ নেই।
এই দু-বচর তাে এসেছি, কি করেছিলুম জানি তো সব।
চৌধুরী মশাই দেশান্তরী হলেন, তারি ফল। একটু এগিয়ে...
কেও দেখতে পাবি। অন্তরে আঘাত–উঃ ! তােকে এখন
বলে’ আর লাভ কি ?” তার পরই তাঁর, না বাবু, তা মুখে
আনতে পারবােনা, উঃ, কি কষ্ট—কি ভােগ ! আর’, এই
বলে’ মেঘনাদ তার উদ্দেশে প্রণাম জানিয়ে মাপ চাইলে ।
বললেন—“আরও ছ-মাস, তারপর আবার ফিরতে হবে।”
-আমি আর দেখতে পারলুমনা বাবু। সঙ্গীরা বিদ্রুপ
করে’ বললে—“তুই এর চেয়েও বড় জায়গা পাবি !” তারা মজা
দেখে আনন্দ পায়। তারাও আগে ভুগেছে কিনা, এখন এই
কাজ নিয়েছে, যেমন জেলের কয়েদীরা কেউ কেউ খালাস
পেলে জেলেই কাজ করে—জমাদার হয়। তারাই বেশী নিষ্ঠুর
হয়--কষ্ট দেয়।
—সবই কষ্টের কথা, মন্দ কথা, সে আর কি শুনবেন ;
আরাে টের আছে-ঢের রকম; সে-সব আপনার শুনে কাজ
নেই। আপনার সামনে বলতে পারবােনা। বিশ্বাস করেন
ততা শুনেই হৃদকম্প হবে। সরল-বিশ্বাসীদের সংসার ছেড়ে-

দূরের আলাে যায়,সে এমনি বাবু। কেবল যাতনা, কেবই কষ্ট ; আর সকলেই নিজের নিজের অপরাধ নতুন লােক পেলেইজকার করে বলে । -রকন রকমের পাচ-থাক পেরিয়ে—বাড়ী-ঘর দেখা দিলে,-ইট-কুণের নয়, কিসের তা, তখন ঠাওরায় কে ! প্রকাণ্ড একটা কালো রংয়ের ফটক—তার দুদিকে হাতীর মত দুটো মােষ বাঁধা, দুই চুড়োয় দুটো কাগ, তার মধ্যে আমাকে ঢোকালে। দুধারে দুধারে বাড়ী,অনেকটা গিয়ে -সানের বড় বাড়ীর ঘণ্টায় তারা ঘা দিলে। শব্দে প্রাণ চমকে উঠলো- কাপতে লাগলুম। তারা হেসে বললে—“আর-কি, পৌছে গিছি তো, এইবার আরাম পাবি। -দেখি—দুজন ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন—আমাদের- চেয়ে দেখতে কিছু বড়,–একজন কালে।—দেখলে ভয় হয়, একজন গৌরবর্ণ, বেশ ঠাণ্ডা মূর্তি। কালাে লােকটি আমার বাপের নাম জিজ্ঞাসা করলেন। আমি কাপতে কাঁপতে বলতেই তিনি—এ কি করলি’ বলে’ সঙ্গীদের এমন ধমক দিলেন যে, তার ধাক্কায় আমি পড়ে গেলুম। এ তাে পে-র ছেলে নয় ! কখন বেরিয়েছে ?” —টা রাতে। —শীগগীর নে-যা,এখন ১২টা বাজে, দেহ থাকলে হয়— ঠাণ্ডা মূর্তিটি বল্লেন-সােজা দেব-পথে যাবি, তা না ত সময়ে পৌছুতে পারবিনি,-লােকটির অদেষ্ট ভাল- ৩৮ পাথেয় ৩) -এই জানােয়ারদের দোষে, আসুক ফিরে! জান্ নিয়ে খেলা! তারা কাপতে কঁপতে বলে—“ওরই সঙ্কট অবস্থা ছিল -তাই— আবার সেই ধমক। তেষ্টায় আমার সব শুকিয়ে গিছলো, -ভাল লােকটির দিকে চেয়ে একটু জলের প্রার্থনা করলুম। তিনি কালােটির দিকে চাইলেন। ১ঙ্গীদের ওপর হুকুম হল- “দক্ষিণ খাড়ী।” তারা আমাকে নিয়ে ছুটলো,-ফটক পার হবার পরই “শীগগীর জল খেয়ে নে” বলে একটা খাড়ী দেখিয়ে দিলে । আমি ফিরে এসে বললুম “ও-যে আর-কিসের মত” -তাের আর ওর বেশী পাবার নেই ;-তেষ্টা নেই বল! এখানে থাকলে ওই ত’ খেতে হবে । আমার দেহটা কেঁপে উঠলো। “ওই ত’ পাবি। সে দিনও আসবে, চল্ এখন”-- তার পর কি সুন্দর পথ, কি উজ্জ্বল ঠাণ্ডা আলাে, সেখানে রাত নেই। কি বাতাস, কি সুগন্ধ, দুধারে কি ফুল-ফল, কি সব পাখী, কি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সব লােক! দুধারে যাকে দেখি, সবার মুখেই হাসি আর আনন্দ-চিন্তার দাগ একটাও তারা চাইলেই মনে হয়, যেন মা-বাপের চাউনি, নেই।

দূরের আলো
ভাই-বােনের চাউনি। যেন ভালবাসা আর স্নেহ উপচে পড়ছে।
কি নদীই দেখলুম ! দুধারে চন্দনের গাছ-হাওয়ায় যেন চন্দন
মাখিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে ! জলে কেউ স্নান করছেন, কূলে কত
স্তব পাঠ চলেছে, পদ্মের বন, হাঁসের খেলা, পাখীর গান, সে কি
আমি বলে উঠতে পারি, আপনারা দেখলে বলতে পারতেন।
আমার সে তেষ্টা, জাল, ভয় সব জুড়িয়ে গেল। একটা কেমন
আরামে-আনন্দে অামার সবটা যেন নতুন হয়ে গেল। আর
ফিরতে ইচ্ছা হলনা, কিন্তু থাকতে দেবে কে ! বললে -
“তাের বড় ভাগ্যি, দু'দিক দেখে যাচ্ছি।”
সেই আলো পার হতেই আমাকে এক ধাক্কায় এনে
ফেললে। তখন আমাদের উঠোনে লাশ নে-যাবার জন্যে সব
তয়ের। চালি বাধা হয়ে গেছে, লােকেরা কোমর বেঁধে হাজির ;
কেবল মার জন্যে দেরি হচ্ছিল, তিনি আমার ওপর পড়ে
চীৎকার করছিলেন, ছাড় ছিলেন না। আমি ঘরে ঢুকতেই
তারা বলে—“নে,—শীগগীর দেহের মধ্যে ঢুকে পড়।
-কোখেকে আমারও তখন দেহের মােহ এসে গেল,
বলুম—কি করে’ ঢুকি? একজন বলে,-“মুখদে ঢুকে পড়
—মুখ বন্ধ থাকে ত’ কাণ-দে। আমি মুখ-দে ঢুকে পড়েই,
“মা” বলে ডালুম।
-তার পর যা হয়, সকলে ঘরে ঢুকলাে, কেউ ভয় পেলে ।
কথা কইলুম, তবু তাদের বিশ্বাস হ’তে আধ ঘণ্টা সময়
লেগেছিল। ইন্দির, ভুলু, গােপাল, প্রেমাদ, এই সব বড় বড়

৪
পাথেয়
মােড়ল মালার মত, দেওয়ায়, তবে আমার বাঁচা ঠিক হয়, বাবু।
এত সহজে হতনা, যদি না আধঘণ্টা পরেই প্রেমাদের বাড়ী
জোর-কান্না উঠতে। ; পঞ্চায়েৎ সেই দিকেই সব ছুটলাে।
গিয়ে দেখে, প্রেমচাদের ছেলে, মদ খেয়ে এসে দাওয়ায় শুয়েছিল,
হঠাৎ বুকে ব্যথা ধরে সেইমাত্র মােলো,-তার নামও ছিল—
মেঘনাদ।”
চাটুয্যে মশাই অসীম বিস্ময়ে বলে উঠলেন,—“আঁ--
সেই রাত্রেই!”
—আজ্ঞে হা,–তখুনি।
'গুপী-দত্ত রুষ্ট হয়ে, তাড়নাস্বরে চাটুয্যে মশাইকে বলে
উঠলাে—“আমি কি তােমার চাকর যে সেই পৰ্য্যন্ত ব’কে
যাচ্চি, আর তুমি শুচো মালার মুখে ঐ গাঁজাখুরি গল্প।”
একে ত গুপী-দত্তের ওপর ঘৃণায় রাগে, আমাকে আগে
থেকেই বিষাক্ত করে রেখেছিল, তায় মেঘনাদের উপর তার
ঐরূপ ইতর ইঙ্গিতে আমাকে জ্বালিয়ে দিলে। মেঘনাদ সেটা
বুঝতে পেরে, আমার পা'দুটো চেপে ধরে নিম্নস্বরে বলে,
“আমাকে মাপ করুন বাবু, উনি আমার নৌকোয় এসেছেন।”
আমি তার কথাটা বুঝে, আর তার কাতর ভাব দেখে, অতি
কষ্টে সামলে উঠেই বললুম—“হা,–তার পর?”
—তার পর সেরে উঠলুম। কিন্তু আগের মেঘনাদ আর
রইলনা। যেন বােবা হয়ে গেলুম। মা অনেক করে চারটি
খাওয়াতেন। ঘাটের ওপরেই ঘর, ঘাটেই বসে দিন-রাত

দূরের আলাে
০১
কাটতত, রাতে নৌকোতেই পড়ে থাকতুম। সকলে তামাসা
করে’-“জড়ভরত” ব’তে শুরু করেছিল।
যাবার সময় যা দেখেছিলুম, তা-তো আর আপনাকে
সব খুঁটিয়ে বলতে পারিনি, সেই সব চোখের সামনে থাকতো,
আর-কি বাবু কথা কইতে পারি, না কাজ-কর্ম করতে পারি ?
ভয় হতো যদি মিথ্যে বেরিয়ে যায়—কি কারুর প্রাণে বাজে!
তিন-কোশের মধ্যে সংকীর্তন কি কথা হচ্ছে শুনতে পেলেই
যেতুম। লুকিয়ে গুরু করলুম, কন্ঠি নিলুম। তখন
। তখন সকলে
জোর করে বে দিলে ।
এত পায়ে ধরলুম-কত কাদলুম, কেউ
শুনলেনা। তার পর সংসার ঘাড়ে পড়লো। তখন থেকে
আপনাদের কাজ নিয়ে, আপনাদের আর মা গঙ্গার চরণে পড়ে
আছি। যতটুকু পারি—করতে চেষ্টা পাই। ভগবানকে
কেবল জানাই-কারুর প্রাণে যেন আঘাত না দিয়ে ফেলি।
ওইটিই সৰ্বনেশে জিনিষ, বাবু!
-আমি মুখখু ছােটলোেক, কিছুই জানিনা, আপনাদের
চরণে থাকার জন্যে এত কথা কইতে পারলুম। সব সত্যি
বলে জানবেন বাবু—এই চোখে দেখা। তার পর কি আর বাবু
লােক মন্দ কাজ করতে পারে ! কিন্তু পারলুম কই—কত হয়ে
যাচ্চে, হবে।” এই বলে’ মেঘনাদ বিমর্ষ মুখে একটা দীর্ঘশ্বাস
ফেললে। পরে বললে—আহা দাওয়ানজি-বাড়ীর সেই বুড়ো
ঠাকুর-দা মশাইকে মনে পড়ে ত বাবু,এখানেও যেমন সদানন্দ
পুরুষ ছিলেন, সেখানেও তেমনি দেখলুম। সেই নদীর ধারে

82 পাথেয় একটা কাঞ্চন গাছের তলায় স্ত্রী-পুরুষে বসে’ জপ করছেন-এক গাছ ফুলের নীচে যেন দেবদেবী দেখলুম। সেই হাসি ! বললেন- মেঘনাদের আর বলা হ’লনা,–এই সময় পেরে-বাবুরা সব এসে গেলেন। মেঘনাদ নৌকো খুললে, খাল পেরিয়ে গঙ্গায় পড়তেই বড়বাজারের ‘গােল-গজার’ ঠোঙ্গাটা টেনে নিয়ে গুপী-দত্ত একমুটো মুখে ফেলে দিয়ে ঠোঙ্গাটা এগিয়ে ধরে চাটুয্যে মহাশয়কে বললে-খাওনা। তিনি অন্যমনস্ক বললেন। – কি ?- আমি ধরে থাকবাে নাকি-নাও ধর” এই বলে আর এক-মুটো তুলে গালে দিয়ে, ঠোঙ্গাটা চাটুয্যে মশায়ের শিথিল-হস্তে ঠেকিয়ে ছেড়ে দিতেই তিনি ধরতে না ধরতেই সেটা গঙ্গার জলে পড়ে গেল। দু তিন জন “আহা আহা” করে’ উঠতেই, দত্ত বলে উঠলাে—“অদেষ্টে থাকলে তাে,”- ভেতর থেকে কে একজন বললেন-“তা বটে—প্রসাদটা- মেঘনাদ অবস্থাটা বুঝতে পেরে আর তার শেষটা ভেবে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়ে—দু তিনটে জোর ঝিকি মেরে নৌকা ঘাটে ভিড়িয়ে দিলে । চাটুযয্য মশাই বহুক্ষণ থেকেই অন্যমনস্ক ছিলেন, তার মন বােধ হয় মেঘনাদের সেই কাহিনীর মধ্যে ঘুরছিল । কথায় তার কাণই ছিলনা। নৌকা জোরে ডাঙ্গায় লাগতে তার হুস হ’ল। দত্ত “এস” বলায় তিনি বললেন-“আমার একটু দেরি আছে।” ও-সব দূরের আলো ৪৩ “আটটার মধ্যে কিন্তু আসা চাই-উমেশ আমার চাকর নয়,-বসে থাকবেনা” বলে’ দত্ত এগিয়ে পড়লাে।-চাটয্যে মশাই বিমর্ষভাবে কেবল বললেন-“দেখি।” ঘাটে ওঠবার সময় দত্ত আপনা-আপনি বলতে বলতে চলাে—'টাকা দুটো আগে দিয়ে কি কু-কাজই করেছি,-সঙ্গ- সে আমারও বামুনে-বুদ্ধি দাড়াচ্ছে দেখছি।” বলে চলে গেল, আমি শেষে ছিলুম, বাপ, করে একটা শব্দ য়ে ফিরে দেখি—চাটুয্যে মশাই জামা, চটি, চাদর সব যি ডুব দিলেন। এক ধারে দাড়ালুন। দেখি—মোনাকে বলব-ন- “নেনাদ, বাবা এখন আমি ব্রাহ্মণ, মা গঙ্গার কোলে তুমি-আমি দু'জনেই, বাবা ঠিক বলিস—নিৰ্ম্মলকে যা বলছিলি তা সব সত্যি কথা ?” মেঘনাদ হাত জোড় করে বললে-“কমই বলেছি ঠাকুর- শাই, সব কি আমি বলতে পারি, তবে যা বলেছি—তা আমার নিজের চোখে দেখা, তার একটুও আমার কাছে মিথ্যে নয়।” “হয়েছে বাবা,” বলে’ ওঠবার আগে, টাক থেকে টাকা দুটো বার করে’ গঙ্গায় ছুড়ে ফেলতে গিয়ে, আবার হাত গুটিয়ে ঘাটে উঠতে লাগলেন। ঘাটে একটি অসহায় গরীব রােগী থাকতাে-তার হাতে টাকা দুটি দিয়ে মুক্ত-পুরুষের মত দ্রুত স্বচ্ছন্দ গতিতে বাড়ী চললেন।

৪৪
পাথেয়
( ৬ )
পরে শুনেছি
-চাটুয্যে মশাই শুনেই বেরিয়েছিলেন—রাত্রের কোন
উপায় নেই। বাড়ী ঢোকবার আগে সে-কথাটা বােধ হয় স্মরণ
হওয়ায়, মাথাটা সজোরে নেড়ে বলে উঠলেন—“তা হােক,
ব্রাহ্মণদের নারায়ণ আছেন, ভিক্ষা আছে, উপবাস , না
হয় মৃত্যু ত আছে, তা বলে” উঃ, নারায়ণ রক্ষা করছেন
দালানে পা দিয়েই দেখেন—কা’রা বােশেখ-চাপার একালী
পাঠিয়েছে। বিবিধ ফল মূল মিষ্টান্ন—দালানে ধারনা! (ইলেটি
আনন্দে হাসিমুখে খবর দিতে ছুটে আসছে।
“হা ভগবান অমি পেটের জন্যে কি করছিলুম” বলেই তিনি
ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেন। ছেলেটি হকচকিয়ে বাবার কাপড়
চাটুয্যে মশায়ের বড় বউঠাকরুণ সেকেলে মাটির মানুষ। সংসার ভিন্ন
হয়ে গেলেও নিত্য খােজ-খবর নিতেন,—যতটুকু সম্ভব সাহায্যও করতেন।
তিনি জেনেছিলেন—সেদিন রাত্রের কোন ব্যবস্থাই নেই। তাই আঁচল
ঢাকা দিয়ে একসরা মুড়ি ও গােটা ছয়েক নারকোল-নাড় নিয়ে আসছিলেন।
চাটুয্যে মশাইকে বাড়ীর পথে দেখে পেছিয়ে গা-ঢাকা হয়ে দাড়ান।
ছােট দেবরের কাছে লজ্জার কোনই কারণ ছিলনা , কিন্তু দুঃখের অবস্থায়
সাহায্য হিসাবে কিছু দিতে যাবারও মস্ত বড় একটা সঙ্কোচ আছে।
তিনি তার পেছনে পেছনে বাড়ী ঢােকেন এবং অন্তরালেই হােট-জার জন্য
অপেক্ষা করে থাকেন। পরদিন তিনিই কাঁদতে কাঁদতে এই সব কথা বলেন।

দূরের আলাে
৪৫
টেনে বারবার বলতে লাগলো—“বাবা তুমি কেঁদনা, দেখনা
তুমি—আমাদের কত খাবার !”
ব্রাহ্মণী অন্যত্রে ব্যস্ত ছিলেন। চাটুয্যে ছেলেকে কোলে করে
ঘরে ঢুকতেই, মাথার কাপড় টেনে ব্রাহ্মণী বলে উঠলেন-“ওগাে
তুমি একি করলে, বামন হয়ে দেবতা চিনলেন,—মাধবকে
মেরে ফেললে ! সে যে আমাদের দুখখু দেখে আজ তিন বছর
দুবেলা দুধ খাইয়ে মন্টকে বাঁচিয়ে রেখেছে, বাছা এ-বেলাও
যে দুধ পাঠিয়েছে ! নারায়ণ আমার পেরমাই নিয়ে তাকে রক্ষা
কর, আমাদের এমন করে' মেরন ঠাকুর!” এই বলে তিনি
কঁাদতে লাগলেন।
চাটুয্যে মশাই সহসা এই আঘাতে কাঠ হয়ে গেলেন।
অপরাধীর মত জড়িত কণ্ঠে বললেন-“মাধবের অখ-সে
বাচবেন ! কে বললেন-না” বলতে বলতে ছেলেকে কোল
থেকে নাবিয়ে দিয়ে “আমি আসছি” বলেই তিনি বেরিয়ে
পড়েন।
আমি ঘাট থেকে সােজা মাধবের বাড়ী ছুটেছিলুম ;-পাড়ায়
ঢুকতেই দ্বিধায় বুকটা সহসা বিষম দুলে উঠলাে! সামনের সব
জিনিষ—ঘর-বাড়ী গাছ-পালা আকাশ-বাতাস সব যেন থম্‌থমে,
নিষ্প্রভ, ঠিক গেরােণ লাগার অবস্থা। দুটি ছেলে ছুটে এসে

৪৬
পাথেয়
বললে-শীগগীর আসুন, হরিবিহারী-দ। আপনাকে এগিয়ে দেখতে
বললেন, মাধব-কাকা আপনাকে কেবল খুঁজছেন।
বাড়ীর মধ্যে তখন যে বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের অপসানির হাহাকার
উঠছে, সে-সব আমার কানে যায়নি; আমি যেন যন্ত্রের মত
হয়ে গেলাম,-এক দৌড়ে একেবারে উঠানে উপস্থিত।
সেই খানেই তুলসী-তলায় শুয়ে মাধব তখন প্রাণটা নিবেদন
করছে!
হরিবিহারী চেঁচিয়ে বললে –“মাধব, তোমার দাদাবাবু
এসেছেন।”
তখনাে সে ছিল—বােধ হয় আমার অপেক্ষায়। ধীরে ধীরে
চাইলে। মুখখানা তার হাসি মাখা হয়ে গেল। মুখের কাছে
বসে’ বললুম-“নিশ্চিন্ত হও ভাই, ভগবান তােমার সব ভার
আমাদের দিলেন, গৌরীর বে আমার” মাধব আমার চোখে
চোখ রেখে চলে গেল ।
ঠিক সেই মুহূর্তে “সর সর, মাধব-মাধব যাসনি বাবা,
শুনে যা —” বলতে বলতে ভিড় ঠেলে ঝড়ের মত চাটুয্যে মশাই
এসে পড়লেন।
মাধবকে দেখতে পেয়ে—“আঁ,—না, শুনতে হবে বাবা”
বলেই হাঁটু-গেড়ে বসে তার কানে মুখ দিয়ে চীৎকার করে’
বলতে লাগলেন-“অভাবে স্বভাব নষ্ট হচ্ছিল বাবা, নারায়ণ
হতে দেননি—আমি সেই ব্রাহ্মণই আছি। বিশ্বাস কর বাবা-
আমি ও-কাজ হতে দেবনা মাধব, প্রাণ থাকতে না। সংসার
।

দূরের আলাে ৪৭ দেখার ভার আমার—আমি ভিক্ষা করে পালবো,যতদিন থাকবাে-এই তাের দাওয়ায় এসে পড়ে থাকবো।” সকলের দিকে চেয়ে প্রচুল মুখে মাথা নেড়ে বললেন- ‘শুনেছে। বল হরি হরি বােল ! চল -” * পাগলের মত হয়ে গেলেও তিনি তার কথা বরাবর রক্ষা করে গেছেন, আমরা কিছুতেই তাকে নিরস্ত করতে পারিনি। তিনি যা আনতেন গৌরীর না কিছু রেখে বাকি সমস্তই গােপনে তার বাড়ী দিয়ে আসতো। শুনলুম-গুপী-দত্ত উমেশ উকীলের কাছে বলেছে—“বেটা বেইমান বামুনশিন্নিও খেলে, ভরাও ডােবালে,-এই ছ-মাসের মধ্যে খুব কম হবে তো ১২১৩ টাকা খাইয়েছি হে ?” ডিপুটি বাবু নির্বাক হয়ে শুনছিলেন। আমার বলা শেষ হলে দুতিন মিনিট মাটির দিকে পলকহীন চেয়ে থেকে, রুমাল- খানা বার করে মুখটা মুছলেন। তার পর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, লাঠিগাছটি নিয়ে ধীরে ধীরে অন্যমনস্কর মত বেরিয়ে গেলেন, একটি কথাও কইলেননা। আমারাে কোন কথা এল- ,-আস্তে আস্তে উঠে তামাক সাজতে বসলুম।

৪৮
পাথেয়
---
সহসা ক্ষেত্তোর নাপিতের গলা শুনতে পেয়ে চেয়ে দেখি--
ডিপুটি বাবু গলিটার মােড়ে দাড়িয়ে একাগ্র হয়ে শুনছেন।
সে গাইছিল
“মন তুমি কৃষি কাজ জাননা,
এমন মানব জমিন্ রইল পড়ে,
আবাদ করলে ফোতাে সােণা।”

ধম্মা
১
।
কাজলা এলাটি একটি মিটমিটে প্রদীপের সামনে বসে পাট
কাটছিল আর টুলছিল। রাত তখন দেড়টা হবে।
জানালায় খুটখুট ক'রে মুশব্দ হওয়ায় মুখ তুলে বললে,
-কে ?
“আমি।"
“ কি ভাগ্যি! আর যে বড় সকাল সকাল ?”
“নের খােন্।”
প্রদীপটা উসকে—হাতে ক'রে দে : খুলতে গেল।
বাড়া ঢুকেই ধম্মা নিজের হাতে দোর! বন্ধ করলে। উঠানের
চার-দিক ঘুরে দেখে বললে,-“অ'লে। উ, ক'রে ধর—আমড়া-
গাছটা দেখে নি।”
এরপর নেবু গাছটার : মধ্যে হাতের বষাটার
দু'চার খোঁচা দিয়ে ঘরে গিয়ে ঢুকলাে।
কাজল। মুখ-টিপে হেসে বললে,-“মদ্দোর মদ্দামিও আছে-
বুও আছে।”
“ভয় আবার নেই কাতাের নেই?”
কাজল জোরে মাথা নেড়ে বললে,-“না—ভয় নেই,
ভাবনা আছে।”

০
পরে হাসি মুখে বললে,-“ভীতু লােকের সঙ্গে থাকলে একটু
হয় বই কি।”
ধম্মা তার মাথার কাপড় টেনে-খােপাট। নেড়ে দিয়ে
বললে -- “আরে ধ্ব-সদ্দারনী বটে । তা তাের আবার
ভাবনাটা কি,—এই তাে পাট-কাটতে শিখেছিস দেখছি !”
“না সদ্দার,-তামাসা রাখ ! তাের দুটি পায়ে পড়ি,
ও-কাজ আর করিসনি। কোন্ দিন কি ঘটবে—জম্বটা মিছে
হয়ে যাবে,-আমিও জ্যান্ত ম'রে থাকবাে।”
“আমি কি করি রে কাজলি—আমাকে যে করায়,—এখন
নেশায় পেয়ে বসেছে ! জম্মটা তো সেই দিনই গেছে—যেদিন
গদিতে ডেকে নে’গে ভাইটেকে ছ'টা টাকার জন্থে বুকে বশ
ড'লে মারলে,-“উঃ! তখন তো এমন ছিলুম না,-কে হাত
জোড় করে ছিলুম-পায়ে ধরেছিলুম। কি ভুলই করেছিলুম
—মরে ছিলুম রে!
ধম্মার কোকড়া ঝাঁকড়া চুল ফুলে উঠলাে,-রক্ত-চক্ষু যুবতে
লাগলাে।-কুপিত সিংহের প্রতিচ্ছবি।
কাজলা তাড়াতাড়ি তার চোখে-মুখে ভিজে গামছ; চেপে
ধরলে।
একটু পরে মুখ সরিয়ে নিয়ে একটা গভীর দীঘশ্বাস ফেলে
বললে,-“সেই-তত খুন চাপলল ! তার ভাইকে তাবি সামনে
মেরে তবে মনে হ’ল-“আমি আছি । বাঁশ ডলতেকিন্তু হাত
সরলাে না! তার পরেই তাে এখানে চলে আসি।”

মুহূর্তকাল নীরব থেকে ধম্মা বললে,-“এখন গদির-টাকা
নদীতে লুটি।
ছ'টাকার তরে ভাই গেছে, তাই টাকার
দাওর খুলেছি- ছড়াই !”
এই ব'লে গমিশ্রিত আত্মপ্রসাদের একটা বিকট হাসি
হেসে উঠলো। পরক্ষণেই ব্য:থত ১:৪ বলে, ---“কিন্তু এই
তাে ফিরে পেলুম না !”
দীঘশ্বাস আপনিই ব’য়ে গেল।
কাজলা অবসর বুঝে কেবল বললে,-“তবে?”
“ভাবিনা তা নয় কাজলি,-পারিনা ভাই। বলেছি তে।
-নেশা ধরে গেছে,-রাত এগাৱােটা হ'লেই ছটফটানি ধরে
ছুটে বেরুই! আর কি জানিস ? দলের লােকেই বা কি
বলবে । দিনু, দেব, রতনা-না-মর বলবে।”
“তারা বলে তাে ব’য়ে গেল,-স্বস্তি তো থাকবে।”
ধম্মা হাসলে, বললে,-“তুই মেয়ে-মানুষ-বুঝবিনি।
পারে সে নামটাই রেখে যায়।” দু’বার বুকটা চাপড়ে—“এ-সব
তাে পুড়ে যায় রে,-নামটাই তো সব—সেইটাই থাকে, তাের
গুরুঠাকুর বলেনা-নামের চেয়ে বড় কিছু নেই ?”
“সে তাে ভগবানের নাম।”
“সবারই তাইরে—সবারই তাই।”
থানার ঘড়িতে ঢং ঢং করে দুটো বাজলাে। কাজল। ব্যস্ত
হয়ে বললে,-“ইস করছি কি!-নে, হাত-মুখ ধদ, আমি
ভাত বেড়ে আনি।”

পাথেয়
কাজলার রূপ ছিল-রং ছিলনা। চোখ দুটি ছিল করুণা-
মাখানো-তুলি দিয়ে টানা । কণ্ঠ ছিল শ্রবণ-মধুর, চুল ছিল
অসামান্য। এলানাে অবস্থায় নজরে পড়লে ভদ্রলােকেরও ভুল
হ'ত, না চেয়ে কেউ চলে যেতে পারতনা। তার ব্যবহারে
আর সেবায় পাড়ার মেয়েরা মুগ্ধ ছিল। সকলেই তাকে
ভালােবাসতে চাইতো।
ধম্ম ছিল ছেয়ালে বলিষ্ঠ-গঠনের শ্যামবর্ণ দীর্ঘাকৃতি পুরুষ,
বিনম্র। একশো জোয়ানের মাঝ থেকে তাকে সর্দার বলে
বেছে নেওয়া শক্ত ছিলনা।
প্রকৃতিতে পৰিচয় পাওয়া যেতনা যে, সে-জলদ।
দিনে মজুরি করে-ঘর ছায়, বেড়া বাঁধে, মাটি কোপায়, কাট
চেলায়।
কাজলা সামনে বসে খাওয়াচ্ছিলাে। খাওয়া প্রায় শেষ হলে
ধম্মা বললে,-“কই তুই খাবিনি ?”
“না।”
*কেননা ?”
“এমনি।”
“তবু শুনি?”
“খিদে নেই,—আবার কি?”
“আগে বলিসনি কেনাে?”
“বললে কি হত?”

“খেতুমনা!”
“ই—ভারি যে! তুই খাবিনি কেননা, তুই তাে আর কারুর
খোজ রাখতে যাসনা !”
ধম্মা অবাক হয়ে চেয়ে রইল,-“বুঝলুমনা!”
“আজ গিয়ে দেখি কাকিমা তিনপাের-বেলায় মায়ে-ঝিয়ে
মুড়ি আর কলমি শাক-সিদ্ধ খেতে বসেছে ! আমাকে দেখে
হাসতে হাসতে বললেন,-“এ বেশ লাগে রে কাজল, আমরা
মাঝে মাঝে খাই।”
বললুম,-“তা তত দেখতে পাচ্ছি,-তুমিও যত খেলে
দিদিমণিও তত খেলে !”
কাকিমা বললেন-“ওর না-খাওয়াই ভালো, যে-রকম বাড়ছে
-উপােস করাই উচিত । বাড়, আছে-বের উপায় নেই।
আমার দিন-রাত সমান করলে !”
“-মথুরাদিদি পাতে হাত-দে’ মুখ গুজে বসে রইল ।
কাকিমা তাড়াতাড়ি পাথরখানি নিয়ে পুকুরে চলে গেল। দেখি
—তার চোখ ফেটে জল গড়াচ্ছে।”
কাজলার গলা ধরে এসেছিল, চোখ মুছে বলে,-“দিদি-
মণিকে যে ডেকে এনে কিছু খাওয়াব, কি কিছু দিয়ে আসবে,
তার উপায় নেই। আমাদের কোনাে জিনিষ কাকিমা ছুতে
দেবেনা! মথুরাকে মানুষ করেছি-একি সওয়া যায়, না-
দেখা যায়।”
কাজলা ঢেক্‌-গিলে চোখ মুছলে।

পাথেয়
ধম্মা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললে,—“কাজল কাদিসনি, মা-কালী
ছাড়া মানুষে কিছু করতে পারবেনা। কত উপায়ে কত
লােকের দায় ঘােচালুম, ওখানে যে কোনো উপায়ই কাজ
কয়েনা কাজলি ।
এমন
বামুনের-মেয়ে আমি
কোথাও দেখিনি। সেদিন বললেন,-ধম্মদাস—আমাদের এই
ভিটেটুকু বেচে দে বাবা,-তােদের মথুরার বিয়েটা দিয়ে
জুড়ুই ? আর আমি দেখতে পারছিনা, লােকের কথা ও
শুনতে পারছিনা।
“বললুম,তারপর জুডুবার জায়গাটা থাকবে কোথায়
কাকিমা !
“হাসতে হাসতে বললেন,—যাদের মা-গঙ্গার কোলে বাস,
তারে জুড়ােবার জায়গার অভাব নেই রে—তুই আমার
জন্যে ভাবিসনি বাবা। কেবল ওই তো আমার পথের বাধা
হয়ে রয়েছে।
“যে ধম্মা মোদর-বনেও বাস করে আসে, কতবার
বাঘের সঙ্গে সামনা-সামনি হয়েছে-গায়ের একটা রে। খাড়া
হয়নি, কাকিমার কথা শুনে সেই ধম্মা শিউরে উঠেছিল।
দুনিয়ার মধ্যে ঐ বামুনের মেয়েটিকেই ভয় করি ভাই,
ইস্পাতের-খড়া বলে মনে হয়। ওঁর সামনে কথা বেরোয়-
।"
কাজলার চোখের জল শুকিয়ে এসেছিল। সে একদৃষ্টে ধম্মার
দিকে চেয়ে তার কথা শুনছিল। বললে, “আবার অমন সচ্চা

ধম্ম। মেয়েমানুষ ও দেশে নেই,দয়া-ধৰ্ম্মও তেমনি ! কোথাকার একটা কুকুর মরমর হয়ে গঙ্গার ঘাটে এসে পড়েছিল,-তাকে রােজ নিজের ভাতের আদ্দেক খাইয়ে আসতেন। ছিল—পাঁচবার তাকে জল খাওয়াতে যেতেন,-এ আমি চোখে দেখেছি।” গরমের দিন ধম্ম; চুপ করে কি ভাবছিল, দু-একটা কথা কানে গিয়েছিল মাত্র। বলে, “ভয় তাে খাটিকেই-গােখরো সাপের বিষ যে ! আচ্ছ। এই পূজোট। বাদ—” “তার মানে ?” “বিন্দুবাসিনী-তলার একশো বচরের পূজো-এবার বুঝি পড়ে যায়,—চণ্ডীমণ্ডপের চালও গেছে। রায় মশাই মা মা করছেন আর ছেলের মত কাদছেন,-ব্রাহ্মণের কোন উপায় নেই। মার হুকুমটা সেরে তারপর ?” “তারপর দিদিমণির বিয়ের তরে মার কাছে-ভালাে-জাতের টাকার উপায় চাইবাে-” বলে হাসলে। “এই কথা !” “হাঁ, দেখে নিস।” “যে-টাকা কাকিমা ছোয়না—তা আর আনবিনি ?” “তাই তো ভাবছি। টাকারও যে জাত আছে তা জানতুম- না!-খা এইবার— পাথেয় ধম্মা দাওয়ায় আঁচাতে গেল। খানিক-পরে কাজল এঁটো নিয়ে, পাথর হাতে করে এসে দেখে,—ধম্মা আকাশের দিকে চেয়ে ডান হাত উচু ক’রে পাথরের মূর্তির মত নিঃস্পন্দ দাড়িয়ে আছে,-আঁচায়নি! কাজলাকে দেখে সে চমকে কেঁপে উঠলো। -“উঃ-ভয় পেয়েছিলুম রে ! দেখলি,মনে মনে ভালো হবার ইচ্ছেয় লড়াই লেগেছিল,-তাইতেই এই! ভালো হওয়া মানেই না-মরদ হওয়া রে,ছিঃ ! কেবল ভয়ের পূজো করতে বেঁচে ম'রে থাকা !” “তাই নাকি! কাকিমা?” ধম্মা আর কথা কইলেনা, হাত মুখ ধুয়ে ধীরে ধীরে ঘরে গিয়ে ঢুকলাে। শিবানী-দেবী ছিলেন চাটুয্যেদের ছােট বােড়। আট- মাসের মেয়ে কোলে-ক'রে বিধবা হবার পর সনাতন প্রথা অনুসারে দু’বেলা সংসারের রাধা-বাড়া-যার যেমন ফরমাজ, ছেলে-মেয়েদের দেখা-শােনা, খাওয়ানাে-ধােয়ানাে প্রভৃতি অবশ্য- কর্তব্যরূপে তার ওপরেই চাপে,কারণ কাজকর্শে থাকলে শােকতাপ ভুলে থাকতে পারবেন । একাদশীতেও ব্যবস্থা বদলায়না! কাজকর্মে থাকলে উপবাস নাকি গায়ে লাগেনা। বিধবাদের শুভকামী বিচক্ষণ লােকদের বহু বিবেচনার ফল এই-সব বিধি-ব্যবস্থার কোনােটি হ’তে তিনি বঞ্চিত হননি।

সে-বাড়ীর মেয়েপুরুষের বুদ্ধি ও বিচারশক্তিটা কিছু অসাধারণ
বলে প্রসিদ্ধও ছিল।
বড় ঠাকুরঝির মাথাঘােরা রােগ,—সুতরাং সকালে মিছরির
সরবৎ খান। ছােট বউকে তা ঠিক করে রাখতে হয়।
ছােট বউকে আহ্নিক সেরে নিতে দেখে তিনি বললেন
—“দেখ ছােট-বউ-ইহকাল তাে পুড়েইছে-পরকাল।
পােড়ানাে কেননা! তুমি এখন কালাশৌচের সর্বশ্রেষ্ঠ (অথাৎ
অদ্বিতীয় ) অধিকারী, এখন একবছর তােমার এ-সবে অধিকারই
নেই , পাপ আর বাড়িওনা।”
শিবানী পূজো-পাঠ বন্ধ করে কালাশৌচের বাধামুক্ত হাড়ি
আর অপােগণ্ড পালনের অধিকারই স্বীকার করলেন,—সবই
মুখ বুজে।
মুস্কিল হল—সকলকে খাইয়ে শেষে নিজের প্রায়ই কিছু
থাকেনা। সেদিন একগাল মুড়ি, না হয় একটু গুড় আর
জল। অনাহারে অনাহারে স্তনদুগ্ধ শুকিয়ে গেল। মেয়েটা
কারাে কোল তাে পায়না-দাওয়ায় পড়ে খিদেয় চেঁচায়
-কেউ চেয়েও দেখেনা,তােলেওনা,কারণ বাপ-খেগো
অলুক্ষুণে মেয়ে, আপদ! সবাই ধমকায় আর থামাতে বলে।
বলে,-“প্রাতঃবাক্যে বাড়ীতে আরও তো ছেলে মেয়ে
রয়েছে-কারুর অমন রাক্ষুসে-গলা শুনেছ?শুনলে বুক কেঁপে
ওঠে গাে ! আবার কাকে খাবে” ইত্যাদি।

৫৮
পাথেয়
কাজলার আসা-যাওয়া সব বাড়ীতেই,—এ বাড়ীতেও
ছিল। নিকট প্রতিবেশী,কান্না কানে যায় আর ছটফট
ক'রে ছুটে আসে। ছােট-কাকিমার অবস্থা চোখে দ্যাখে-
সবই বােঝে। ভাবে,-জ্যান্ত-মানুষ কি করে মুখ-বুজে এতো
সয়! মেয়েটা গেলে ওঁর আর থাকবে কে !
-
বুকটা কেমন করে ওঠে, তাড়াতাড়ি কোলে তুলে নিয়ে
বেরিয়ে যায়। দুধ খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে আনে।
এটা-বাড়ীর কেউ চায় না—কারুর ভালােও লাগে না,
কিন্তু কাজলা ধম্মার বউ,
কাজেই ঠাকুরঝি হেসে বলেন-“ভাগ্যিস তুই ছিলি,
ও-মেয়ের গায়ে কারুর হাত দেবার জো নেই–ককিয়েই আছে,
কিছুতে বগ, মানে না,-বংশ ছাড়া ! মেয়েটাকে দেখা—তাও
উনি পরেনা !
কে বলবে বলে !”
ইত্যাদি।
শিবানী শােনে,-পাথরের শােন।
তখনাে বাপ-মা বেঁচে ! গরীব হলেও মানুষ তাে ! এই
সাংঘাতিক আঘাতের পর মেয়েকে একবার নিয়ে যাবার জন্যে
তারা অনেক লেখালেখি, অনুনয় বিনয় করলেন। এ অবস্থায়
অভাগীরা স্বভাবতই বাপ-মা খোজে। জগতের আলাে তাে
তার নিবেই গেছে।
জবাব পান,-“যাবার কোনাে দরকার দেখছিনা, ছােট-বউ
ভালই আছেন, তার কোনরূপ চিন্তা চাঞ্চল্যের লক্ষণ নেই,

ধম্মা। একটু ও অধীর হন নি। মেয়েকে যদি দেখতে ইচ্ছা হয়—এসে দেখে যেতে পারেন।”—ইত্যাদি। তারা যেন মেয়ের নিরাভরণ ঐশ্বৰ্যটা দেখবার জন্যে লালায়িত হয়ে প্রস্তাবটা করেছিলেন দিন যায়—মাস কাটে। বুদ্ধিমানেরা ভগবানকেও ভাবিয়ে তােলেন,—ইচ্ছা সত্ত্বেও তিনি উপায় খুঁজে পাননা। শেষে শিবানীর শরীরে বসন্ত দেখা দিলে। এতদিনে “মার অনুগ্রহ” বলে কথাটা বুঝি সার্থক হয় ! কি শুনতে হ’ল—“সকল রকমে জালালে গা ! এখন এ-আপদ ফেলি কোথায়। বাপ-মার দরদ যে বড় ! নিয়ে- যান। ছােট-লােক মিসে খবরটা পর্যন্ত নেয়না!" পাশের দু’কাঠা জমিতে জঙ্গলের মাঝে দু'খানা চালা ছিল। একখানাতে গরু-বাছুর থাকতো, একখানায় কেওড়া কাঠের তক্তপােষ পাতা—ছেলেদের পড়বার ঘর। কেউ এলে সেই- খানেই বসে । —অমন ঘরখানা ওঁর কপালেই নাচছিল । ছোঁয়াচে-বােগ,গরু বাছুর বাড়ীর লক্ষ্মীমা ভগবতী। পাশের ঘরে রাখতে ভরসা হ’লনা,দুধ দিচ্চেন-সবাই খায় । বড়ঠাকুরঝির আবার মূচ্ছাগত বাই, ছােট্‌ঠাকুরঝির ওপর- হাত তত কড়ির-আনলা,-হাত-পােরা মাদুলি,-ও-রুগীর ঘরে তার ঢােকবার জো নেই, মাদুলি মাটি হয়ে যাবে,—নিষেধ আছে। বউয়েরা সব সন্তান-সম্ভবা।

পাথেয়
এ সবই “মার অনুগ্রহ”।
শিবানী অনেকদিন পরে আরামের নিশ্বাস ফেলে ছেড়া
মাদুরে এসে শুলেন। এক কলসী গঙ্গা-জল আর একটা
কান ভাঙা পেতলের ঘটিও পেলেন।
পাড়ার মুখখু সধবা বিধবারা থাকতে পারলেন না, তাঁরা এসে
দেখতে শুনতে লাগলেন।
*—সব বাহাদুরি !”
কাজল-মেয়েটিকে নিজের ঘরে নিয়ে রাখলে ।
“এদ্দিন সব ছিলেন কোথায়! এদ্দিন করেছিল ৰুৱা।
করতে পারেন নি।”
ছােট-বউ কিন্তু সেরে উঠলেন।
“সাচা কেবল আালাতে! গেলে জালাবে কে!”
জগতে অনেক ঘটনা ঘটে যা ভালাে হলেও ভােগায়।
ছােট বাবু দেবসুন্দর সওদাগরী আপিসে কাজ করতেন।
সে-আপিসে দশ বছর চাকরি করে ম’লে স্ত্রীকে কিছু মাসােহারা
দেওয়ার নিয়ম ছিল।
শিবানীর নামে মাসে মাসে দশটাকা করে আসতো, অবশ্য
শিবানী সে-কথা জানতেন না।
কেন—তা ভগবানই জানেন, সে-মাসে আপিসের লােক
এসে শিবানীর সই নিয়ে টাকা তার হাতেই দিয়ে যায়, আর
মাসে মাসে দিয়ে যাবে বলে যায়।

'।
স্বামীর টাকা বিধবার যে কি বস্তু, বিশেষ এ অবস্থায়
এ ভাবে পাওয়া, তা বলাই নিষ্প্রয়ােজন। কেবল সেই দিন
তার চোখ-ফেটে জল গড়াতে পাঁচজনে দেখেছিল। চোখ মুছে,
টাক কয়টি মাথায় ঠেকিয়ে আঁচলে বাঁধেন। সারাদিন দোরে
খিল দে পড়ে ছিলেন।-বুঝি দুঃখ উপভােগ ।
বৈকালে বড়ঠাকুরঝি দু’থানা পুরানাে থালা কয়েকটা ঘটি-
বাটি এনে দাওয়ায় রেখে ব'লে গেলেন-“এই তােমার-ভাগের
বাসন-কোসন নাও। তুমি যাই কর না, ভাইয়েরা আমার
শিবতুল্য,—একটা ঘড়াও দিতে বলেছে। মঙ্গলার খােজছে
-এর পর দিয়ে যাবাে’খন। যা হােক, ভালো কীর্তি রাখাল
ছােটকি!” সবটা কানে এলােনা—প্রাণে অবশ্য এলো।
ছােট-বউ নিৰ্বাকু। বিধবা হওয়া ছাড়া আবার কি নূতন
অপরাধ হলাে।
ছােট-বউ বিবাহিত জীবনের শুভপ্রারম্ভ থেকেই বুঝেছিলেন,
—সত্যটা বললেই ‘সত্য' সম্মান পায়না--সত্যের প্রতিষ্ঠা হয়না,
বক্তাও রেহাই পায়না। তাই নীরবতা বরণ করে নিয়ে-
ছিলেন; তারি দৃঢ়তাটা ‘তে’ আখ্য পেয়েছিল ।
তিনি নীরবেই নিৰ্বাসন নিলেন। উপায় কি ? বহু
দুশ্চিন্তার মধ্যে তাতে একটুও যে স্বস্তির স্বাদ ছিল না এবং
এটাও যে “মার অনুগ্রহ” নয়, এমন কথা বলা কঠিন।
{

পাথেয়
তারপর দুঃখ কষ্ট নিয্যাতনের মধ্যে তার এক-যুগ কেটে
গেছে-সহিষ্ণুতা আর দৃঢ়তা মাত্র সম্বলে।
ইতিমধ্যে তিনি সেবায় শুশ্রুষায় অনেকেরই, বিশেষত
ইতর সাধারণের মা হয়ে পড়েছেন।
কিন্তু মথুরা তেরো উত্তীর্ণ হয়, তার বিবাহের চিন্তা সম্প্রতি
তাকে অহরহ বিধতে আরম্ভ করেছে।–“ ভগবান লজ্জা রাখো,
তােমার মুখ চেয়েই পড়ে আছি!”
পরমাত্মীয়েরা প্রচার করে রেখেছেন--“দেবসুন্দর তা
উপরি কম পেতো না, সে সব টাকা গেলাে কোথায়,-শোনো
কেনাে-সব আছে,-সব আছে। কোথায় আছে তা ও আমরা
তেজ আর কিসের।”
কাজলার কাকিমার পরিচয় সংক্ষেপত এই।
জানি।
এ কয়-দিন ধম্মা দিন রাত খাটছে। সকালে তাড়াতাড়ি
নারকোল আর মুড়িগুড় খেয়ে গ্রামের পূজা-বাড়ীগুলি ঘুরে
আসে। সেখানে যা কাজ থাকে সত্বর কিছু কিছু সেরে ও-পাড়ার
রায়েদের বাড়ী গিয়ে দম নেয়। সেখানকার খাটুনির সব কাজই
ভার। তারা নিতান্ত গরীব, লােক-বলও নেই! শেষ চৌধুরী-
বাড়ী ছােটে-এরা জমিদার, পূজাও খুব ঘটার, লােকেরও
অভাব নেই। তবু যায়,শরীর আর কিসের জন্য, শক্তিই বা
কেন, যদি মায়ের সেবায় না লাগে।

আজ তাদের সতেরােটা নারকোল-গাছে উঠ দেড়শাে
নারকোল পেড়ে-বুক ছ’ড়ে এসেছে।
বাড়ী ফিরেই বললে—“কাজলি এক-কোষ, তেঘসেদিক
নারকোল পাড়তে উঠে বুকটা বড় ছ’ড়ে গেছে,—জলছে।
কাজলা তাড়াতাড়ি তেল এনে নিজেই বুকে মালিস ক'রে
দিতে দিতে বললে—“কই, নারকেল গাছে উঠতে তো কখনো
দেখিনি।"
“দরকার পড়লে শক্তটা আর কি-পূরুষ মানুষ সব পারে।”
“আজ আর কাজে যাওয়া হবে না কিন্তু, নেয়ে খেয়ে ঘুমো।”
“মথুরাদিদির কাপড় চাইনা? আজ গেলেই আমার
বারােটাকার কাজ পুরাে হবে। শরীর আমার ভালই আছে।”
মথুরার কাপড়ের কথায় কাজল আনন্দে সব ভুলে গেল,
বললে-“সে কাপড়ের এমন ছিরি, মথুরা পরলে ঠিক মা-লক্ষ্মীটির
মত দেখাবে। জোলা-মিসে কাল নিয়ে আসবে বলেছে।”
“টাকাটা বলাইদা'র কাছ থেকে তুই এনে রাখিস হবে।
কাকিমাকে জানিয়ে যা—তিনি না সােবে করেন।”
“সে ভয় নেই,-কাকিমা ও-ঘাটে নাইতে গিয়ে দেখে
এসেছেন—তুই বলাইদা’র কাটের-টালে কাট চেলাচ্ছিস।
আমাকে হেসে বললেন-ছেলের আবার একি সখ
চাপলাে !
—সব শুনে, জলে তার চোখ টন্ করতে লাগলাে।
বললেন-গেল পূজোর কাপড় মথুরাকে আমি পরতে দিইনি,

৬৪ পাথেয় সে ঠাকুর দেখতে পৰ্য্যন্ত যায়নি, তাতে কি আমার ছেলেকে কম কষ্ট দিয়েছি, তাই না বাছার এই খাটুনি ! -কাকিমার চোখ দে, ট ট করে জল পড়লাে। মুছলেও কমে না ! বললেন—আমিও তাতে কম কষ্ট পাইনি মা, সেই পৰ্য্যন্ত ছেলের সঙ্গে মুখ তুলে কথা কইতে পারিনা!” “আর শােনাসনি কাজলি।” ধম্মা মুখ ফিরে ঢােক গিললে, -“তার দোষ কি, কিন্তু কত-বড় ঘা-মেরে মানুষ আমাকে এমন বানিয়েছে তা যে ভুলতে পারিনা। ছ’-টাকায় ভাই বেচেই না—* বুক ঠেলে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। “যা হবার ছিল হয়ে গেছে” এই বলেই কাজলার মুখ থেকে হঠাৎ বেরিয়ে গেল—“এখন ভাই তো দেখছিস।” সিংহকে যেন সজোরে খোঁচা দেওয়া হ’ল-ধম্মার মাথায় আগুন লেগে গেল। সে গর্জে উঠলো—“কি বলি ! খবরদার,ফের শুনলে জিভ টেনে ছিড়ে ফেলবাে! ভদ্দোর ললাকের কথা ভদ্দোর লােকে বুঝবে, সে কি আমার ভব্দোর- লােকের ভাই ছিলো !”...... সে-গর্জন কাকিমার চালায় পৌছে প্রতিধ্বনি তুলেছিল, তিনি রাধতে রাধতে ছুটে এলেন— “কি রে কাজলি—ছেলেকে কি বলেছিস!” কাজলা অপরাধীর মত জড়সড় হয়ে গিয়েছিল, কথাটা যে কোথায় গিয়ে কতটা আঘাত করতে পারে, সে অতশত ভাবেনি।

ধম্মা
সে কেঁদে ফেললে-“আমি বুঝতে পারিনি কাকিমা, জেনে-
শুনে আমি কি ওকে কষ্ট দিতে পারি ?—ওর তা বিশ্বাস হয় ?”
কাকিমার সামনে ধম্মার এ মূৰ্ত্তি কোনদিন প্রকাশ পায়নি।
সে সেইখানেই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুজে বসে পড়লাে,-রাগ,
লজ্জা, ক্ষোভ, বেদনা একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে দুধারের পাঁজরা
হাপরের মত ফুলে ফুলে উঠতে লাগলাে, সে কাদছে ।
কাকিমা দ্রুত গিয়ে তার মাথায়, পিঠে হাত বুলুতে বুলুতে
বললেন,—“তুইও আমাকে কাদাবি ধম্মদাস !—ছি বাবা ওঠ ,
নেয়ে আয়। দ্যাখ দিকি চেয়ে-মেয়ে আমার কতটুকু হয়ে,
গেছে !-ও কি বুঝে বলেছে কিছু!”
কাকিমা আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিলেন।
অভিমান এসে ভাষা জোগালে ! “তুমি নাকি আমার সঙ্গে
মুখ তুলে কথা কইতে পারনা।
তবে আর আমি এখানে পড়ে
আছি কেন!
এখানে আমার কে আছে, কি ঐশ্বয্যি আছে
কাকিমা
এ আবার কি কথা !
সব তার মনে পড়ে গেল। বললেন,-“কিন্তু আমার ঐশ্বয্যি
যে তােরা,-তােরা যে আমার ভগবানের দেওয়া সামগ্রী, আমি
কার ভরসায় তেরাে বছর কাটালুম ধম্মদাস ! পাছে কোন্‌দিন
কি ঘটে—তাের কিছু দেখতে হয়, তােকে খােয়াতে হয়, তাই না
তাের ওপর এমনি পাষাণীর মত কঠিন ব্যবহার করে এসেছি।
এই ভাবনা এই তেরাে বছর ব’য়ে আসছি! রাতে কারুর সাড়া
5

পাথেয়
পেলে, কি একটু শব্দ হ'লে বুকটা ধড়াস্ করে ওঠে, সমস্ত শরীর
হিম হয়ে যায় ! আমার সব পুজো-আহ্নিকই মিছে রে ধম্মদাস,
তাের সুমতি তাের মঙ্গলই চেয়ে এসেছি। কেবল তাের
পয়সাটি ছুইনি,—পুণ্যির জন্যে নয় ধম্মদাস ! যদি তাতে তাের
মনে লাগে—তুই ও-কাজটি ছাড়িস।
-যে মথুরা তােদেরই, কেবল বিইয়েছিলুম আমি, তাের
দেওয়া কাপড় তাকে পরতে দিইনি। এত বড় শক্ত সাজ।
অতি-বড় শত্তরেও দিতে পারতেন। আমি কিন্তু সেই সাজাই
তােকে দিয়েছি, আর নিজে তা নিয়েছি—দিনরাত। মেয়ে-
মানুষ, ও-ছাড়া আমার আর উপায়ও ছিলনা, ভেবেও কিছু
পাইনি।”
সকলে নীরব । সহসা
“আচ্ছা—পায়ের ধূলাে দাওতো মা, গঙ্গাস্নান করে আসি।
কাজলি ! এসেই ভাত চাই, খিদে লেগেছে!”
যেন সে-মানুষ নয় !
কাজলার সঙ্গে চোখােচাখি হতেই দুজনের চোখেই নির্মল
হাস্যের উজ্জ্বল রেখাপাত ।
ধম্মা গামছাখানা টেনে নিয়ে নাইতে চলে গেল।
।
“তুমি না এলে আজ কি হ'ত কাকিমা !”
“কি আবার হত-ও তেমন ছেলে নয়। ওকে পাগল করে

কাটায়।
দিয়েছে। ও কি কিছু করে তুলে থাকবার তরে সময়
কিছু রেখেছে কি,-কারুর দুঃখকষ্ট সইতে
পারে কি!”
“এখন ছাড়লে যে বাঁচি—আর যে ভাবতে পারিনা।”
“ছেড়েছে।”
“আমার তাে বিশ্বাস হয়না মা।”
“তুই দেখি।”
“তােমার কথা মিথ্যে হয়না—তা জানি।”
তারপর হাসতে হাসতে বলে—“তুমি আজ কি করলে বল
দিকি কাকিমা ! রাঁধতে রাধতে এটো হাতে এসে সব ছুঁয়ে লেপে
এক করলে যে। এখন আবার নাইতে হবে,বিধবা
মানুষ—”
“কেননা, তাতে কি হয়েছে, ছেলেকে ছুঁলে কি দোষ আছে
রে পাগলি। যাদের আছে তাদের আছে, আমার নেই, নাইবাে
কেননা ?”
“তবে আমিও পায়ের ধূলােটা নি।”
“তােদের এ আবার কি হ’ল।”
কাজলা তাঁর পায়ে মাথা ঠেকালে
মথুরার হাঁ কানে এলােচচ্চড়ি যে চুয়ে পুড়ে আগুন ধরে
।
শিবানী ছুটে বেরিয়ে গেলেন।
কথায় কথায় সামান্য কারণে কি যেন একটা ওলট-পালট

৬৮
পাথেয়
ঘটে গেল। একটা দমকা ঝাপটায় সকলের মনের সব ময়লা
মুহূর্তে উড়িয়ে দিয়ে স্নিগ্ধ-স্বচ্ছতা এনে দিলে।
পঞ্চমীর পূজো-মাখানাে জ্যোৎস্নাটুকু দেখতে দেখতে ডুবে
গেল।
এতক্ষণ মথুরার বিবাহের উপায় চিন্তা চলছিল।
বললে,-“কাকিমার কি একখানি গয়নাও আর নেই!
“তুই যে আজ নতুন লােক হলি ! সে বছর মথুরার যখন
বিকার হয়—যাতে একচল্লিশ দিন মেয়ে এই যায় এই যায়,-মনে
নেই ?—মতিবাবু বলায় ভাসুর যাতে বলেছিলেন—“টাকা না
বার করেন—গয়না তাে আছে!”—কাকিমার মাকড়ি, বালা,
কণ্ঠমালা বেচেই তো মজুমদারকে দেখানাে হয়।”
ধম্মদাস উদাস ভাবে বললে,-“এদ্দিন যদি কাট চেলাতুম,
রােজ দুটাকার কাজ করতে পারতুম রে । আচ্ছা ভাবিসনি,
মা আছেন।
“কাকিমাকে দেখে যে ভাবতে হয়—ইস্পাতে যেন ঘুণ ধরতে
সুরু হয়েছে।”
ধম্মা অন্যমনস্কভাবে—“হু” “আচ্ছা”—ব’লেই উঠে দাড়ালো।
*দোরটায় খিল দিয়ে নে।”
“আবার কি?”
“এমনি একটু ঘুরে আসি।”

ধম্মা
“তবে কাকিমাকে মিথ্যেবাদী বানাবি।”
“কেননা ?”
“কাকিমা যে আমাকে বলে—ছেড়েছে তুই দেখিস !”
“বলেছেন নাকি।”
তারপর হেসে বললে-“কাকিমা অন্তর্যামী
আজ অন্য কাজ আছে রে, সে-সব নয়। রতনা খবর
দিলে একজন আড়কাটি সেথাে সেজে চার পাঁচটি মেয়েকে
কালীঘাট দেখাবার ছলে, বর্ধমান থেকে এনে বালীর খালের
মধ্যে নৌকোয় রেখেছে। আজ রাতে মেটেবুরুজের
কুলি-ডিপােয় চালান দেবে,—মরিনসে না ডেমেরায় পাঠাবে।
একটি বউ কোলের-ছেলে ফেলে এসেছে—বড় কঁদছে। দেখে
আসি তাদের যদি উপায় করতে পারি।”
মুহূৰ্ত্ত নীরব থেকে, উদাস ভাবে বললে,-“কাকিমা
বলেছেন,—সত্যি ?—ঠিক বলেছেন রে ! আচ্ছা
জ্যোৎস্না ডুবেছে, এইবার তারা বেরুবে, আর আমি
দাড়াবােনা।”
নিমিষে বেরিয়ে গেল
এ আবার কি! কাজলা কথা কবার সময় পেলেনা; তার
অন্তরটা কেবল “দুর্গা দুর্গা” করে উঠলাে।
৪
ভবানী চৌধুরীমশাই গ্রামের জমিদার, সে-কালের বাবুদের

৭০ পাথেয় নমুনার শেষ চিহ্নের মতই ছিলেন। দুধের সঙ্গে আফিন্ জাল দিয়ে সরখানি খেতেন। দুহাতে তিনটে হীরের আংটি,-নধর শরীর, বাবরি চুল, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। নিতান্ত আবশ্যক হলে গ্রামের বাইরে পা বাড়াতেননা। মাত্র পূজায় পঞ্চমীর দিনটি প্রতি বৎসরই নিজে কলকাতায় যেতেন—কারেন্সিতে নােট ভাঙাতে, আর বস্ত্রাদি কিনতে-পূজার বাজার করতে। এবারও গিয়েছিলেন। সুখের শরীর, তার ওপর আজ ঘােরাঘুরিটে অত্যধিক হওয়ায় বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সন্ধ্যাও হ’ল—এখনাে বাজারের অনেক বাকি সুতরাং আমলাদের উপর সে-সব ভার দিয়ে নৌকোয় বসে গঙ্গার হাওয়ায় শান্তিমুক্ত হবার তরে একখানা গাড়ী ভাড়া করে জগন্নাথ ঘাটে চলে আসেন। বলে ? আসেন,-“আমি নৌকোয় থাকবে, তােমরা সত্বর বাজার-সেরে চলে এসাে।” নিজের সঙ্গে ছিল মাত্র টাকা শশা ছয়কের কাপড়, আতর, গােলাপ, বড়বাজারের সের পাঁচেক রাতাবি সন্দেশ আর নােটে নগদে খুজরায় হাজার দুই টাকা। ছিরু-খানসামা সঙ্গে এসে নৌকো ভাড়া করে তাতে জিনিষ- পত্র তুলে দিয়, সুজুনী বিছিয়ে, ফুশিতে এক ছিলিম তাওয়াদার তামাক সেজে দিয়ে, তাকে বিশ্রাম করতে বলে চলে গেল। চৌধুরী মশাই বলে দিলেন,-“শীগগির আসবি। ফোজদুরী- বালাখানার সের-দশেক তামাক নিতে যেন ভুল না হয়।”

ধম্মা
পিরান খুলে মুখ-হাত-পা ধুয়ে, গা মুছে স্নিগ্ধ হয়ে, সন্ধ্যাক্কি
সেরে চৌধুরীমশাই এ-বেলা কঁচা-আফিই খেতে বাধ্য হলেন।
শরীর শ্রান্ত থাকায় একটু বেশীই খেলেন। পরে খানকতক
সন্দেশ মুখে দিয়ে জল খেয়ে চক্ষু বুজে আরামে তামাক টানতে
টানতে ক্লান্ত শরীর সহজেই শয্যা নিলে।
নাসিকাধ্বনি শুনে দাড়িমাঝিরা মুখ চাওয়া-চাউই করে”
হাসলে। একজন এসে তাওয়াদার ছিলিমটি তুলে নিয়ে গিয়ে
টানতে আরম্ভ করে দিলে।
রাত তখন বারােটা। পঞ্চমীর পালা জ্যোৎস্নাটুকু ডুবে
গেছে। অতবড় কলকাতা সহরের সােরগােত্ সারাদিনের অসীম
চাঞ্চল্যের পর এড়িয়ে পড়ে একটু ফুরশৎ পেয়ে যেন ঝিমুচ্ছে।
কেবল আকাশের তারা আর জাহাজের আলােগুলি এই ফাকে
নিঃশব্দে গঙ্গাবক্ষে নেবে পড়েছে। তাদের আনন্দ-স্নান আর মৃদু
জলকল্লোল নিশীথিনীর শূন্যবক্ষে-নিস্তব্ধতার নিকষে একটা
নিবিড় সুর একটানা টেনে চলেছে, যাতে মাধুৰ্যও আছে, আবার
যার একান্ততায় গা-ও ছমছম করে! তার মাঝে বেসুরাে শব্দ
কানে এলেই চমকে উঠতে হয়।
আড়কাটির কবল থেকে মেয়েগুলিকে মুক্ত করে’-রতনার
সঙ্গে আর তিনজন সঙ্গীর মাফৎ তাদের রওনা করে দিয়ে ধম্মা
বড়গঙ্গার মুখে একটা বয়ায় ছিপখানা বেঁধে আড়কাটির

৭ পাথেয় লােকদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিল। ছিপখানার জলের-রং, সহজে কারাে চোখে পড়েনা। খাটুনি আজ অতিরিক্ত হয়েছে, জোয়ার এলেই ফিরবে- দক্ষিণ-হাওয়াও দিয়েছে। সহসা নিস্তব্ধ রজনীর বুকখানা চিরে বলির-জীবের কণ্ঠ- নিঃসৃত কাতর ধ্বনির মত কোন্ অসহায়ের একটা হৃদয়ভেদী অন্তিম আবেদন দক্ষিণে-হাওয়ায় ভর করে ধম্মার কানে ঢুকে প্রাণের মধ্যে লুটিয়ে পড়ে থর থর করে কাঁপতে লাগলাে ! সে তড়াক-করে দাড়িয়ে ওঠবার সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠলো—“রশি খাে।” হুকুমটা যেন ধৰ্ম্মরাজের কাছ থেকে এল !–“আওয়াজটা দখিন্ থেকে এলাে না ? উঃ, চার চারটে দাড় খালি ! পুষিয়ে নিতে হবে-প্রাণ-পণ ভাই । এখনি ব্রহ্মহত্যা হয়ে যাবে, গায়ে আর মুখ দেখাতে পারবােনা!” *কেননা সদ্দার ?—কে সদ্দার ?” “গলাটা যেন চৌধুরী মশায়ের, আজ পঞ্চুমী না? তাকে আজ বেরুতেও দেখেছি। —সর্বনাশ হয়ে যাবে রে! রাজগঞ্জের দল—ওরা জলেই ফেলে দেয়! নে জোয়ানরা—দু-ঘা মেরে নে ভাই।” ভেটেল পেয়ে ছিপ ক্ষিপ্ত সর্পের মত ছুটলাে ! তিন রশি তফাৎ থেকেই ধম্মা সঙ্গীদের হুকুম করলে—“দাড় ভােল,-সড়কি।”

ধম্ম
१७
পরেই “খবরদার”—কথাটা এমন বজ্রনির্ঘোষে তার মুখ
থেকে বেরুলল, বােধ হ’ল যেন আকাশের সব তারাগুলো
ঝর ঝর করে ঝরে পড়লো।
‘জয় কালী ।
নিমেষে ছিপও নৌকা স্পর্শ করলে। সঙ্গে সঙ্গে এক জনের
পায়ে সড়কি গিয়ে লাগলাে।
সে-নৌকোর দাড়ি-মাঝিরা তখন ছইয়ের ভিতর ঢুকেছিল।
ঘটনাটা এত ক্ষিপ্রগতিতে ঘটে গেল যে, সহসা বহু লােক দেখে
বা পুলিশের ছিপ ভেবে তারা ভীত-বিমূঢ়ের মত ঝুপ ঝাপ
করে’ গঙ্গায় লাফ মারলে।
“মারিনি—যেতে দে,” বলেই ধূম্মা নৌকোয় উঠে পড়লাে।
“ওরে, চৌধুরী মশাই-ই তােত, হাত-পা বাঁধা,শীগগির
একখানা--উঃ, বড় সময়ে মা পৌছে দেছেন ?
চৌধুরী মশাই অজ্ঞান অবস্থায়।
“নৌকোর গলুই ছিপে বেঁধে ঘুরিয়ে নে। শালকে পর্যন্ত
এমনি যাক্, জিরিয়ে নে জোয়ান। মা কালী মুখ রক্ষে
করেছেন।”
চৌধুরী মশার মাথায় মুখে জল দিয়ে হাওয়া করতে করতে
সংজ্ঞা আসে,-চোখ চান না !
বলেন—“সব নে বাবা, আরাে পাঁচহাজার বাড়ী পৌছেই
দেবাে-ব্রাহ্মণকে প্রাণে মারি নি বাবা।” ইত্যাদি।
বহু আশ্বাস ও অভয় দেবার পর চৌধুরী মশাই চোখ

৭৪
পাথেয়
খােলেন। তবুও মাঝে মাঝে আসন্ন অপঘাত আর মৃত্যু-দূতের
ছায়া চোখ থেকে মােছেনা-কেঁপে ওঠেন। এই ভাবে ঘণ্টা
খানেক কাটবার পর ধীরে ধীরে তার বিশ্বাস আসে, কতকট।
প্রকৃতিস্থ হন।
ঘাটে তাঁর ছেলে শৈলেন লােকজন নিয়ে চিন্তাকুলচিত্তে
অপেক্ষা করছিল। নিজের গ্রাম আর আপনজনদের দেখে
তার পূর্ব-শক্তি অনেকটা ফিরে এল !
“এই ধৰ্মদাসের জন্যে আজ”-বলেই ছেলের গলা জড়িয়ে
কেঁদে উঠলেন।
ধম্মদাসকে বললেন-“দরকার আছে, তাই শুধু এই
কাপড়ের গাঁটগুলি আর আমার গুড়গুড়িটা নামিয়ে দে বাবা।
আর যা সব তাের রইল, তুই আমার জীবনদাতা-কাল একবার
দেখা করিস্ বাবা।”
“ওকি বলছেন হুজুর, আমি কি এ গাঁয়ের কেউ নই ।
আপনাকে যে মা-কালী ফিরিয়ে আনতে দিয়েছেন এর চেয়ে
বেশী কিছু চাইনা। কাল কি আর গাঁয়ে মুখ দেখাতে পারতুম
বাবু!
—যারা কুঁড়েয় পড়ে থাকে, খায় কি না খায়, কেউ খোঁজ
রাখেনা, আপনারা তাদের বুঝতে পারবেননা, চলুন পৌছে
দিয়ে আসি।”
চৌধুরী মশাই একটিও কথা কইতে পারলেন না, কেবল
বললেন,-“চল বাবা।”

৭৫
যেতে যেতে চৌধুরী মশাই বললেন,—“বাবা, তুই আমার
প্রাণ দিয়েছিস-জীবনদাতা,-তােকে আমার অদেয় কিছু নেই,
এ-কথাটি মনে রাখি। তােকে তাের ইচ্ছামত কিছু না দিলে
আমি যে কোন কাজে শান্তি পাবনা ধম্মদাস,-না পূজায়, না
মাকে ডেকে।—অন্তর সাড়া দেবেনা, মায়ের নামও গলায়
বাধবে।”
“কি চাইব,-দুঃখকষ্ট আমাদের যে-কোনাে সাধই রাখতে
দেয়নি হুজুর! আচ্ছা এখন মার পূজা তাে আগে সারুন গে,
তারপর
“কবে দেখতে পাবে।”
“দেখলেই দেখতে পাবেন হুজুর ! ফি বছরই ত' পূজা
বাড়ীতে ধম্মার কাজ-পাতফেলা আর এটো নেওয়া।”
চৌধুরী মশাই লজ্জায় কথা কইতে পারলেননা, শেষে
বললেন,—“ধর্মদাস আমাদের অবস্থাই আমাদের অপরাধে অভ্যন্ত
করে রেখেছে।”
ধম্মা আর শুনলেনা। “বড় কষ্ট গেছে, আরাম করুনগে
হুজুর ।” বলেই দ্রুত চলে গেল ।
আজ এয়ােদশী। চৌধুরীমশাই ধম্মাকে আটকেছেন।
-তাকে কিছু নিতেই হবে।
অনেক কথা হ’ল। জীবনে কাকিমার চেয়ে বড় কিছু আর

পাথেয়
আপনার ব’লে গর্ব করবার তার কাছে ছিলনা। যারা শক্তি
ধরে তারা শক্তিরই পূজা করে।
“কাকিমা আমার টাকা ছছাবেননা,তার মেয়ের বিয়ের
উপায় নেই, তবু না। মথুরা কিন্তু তেরাে পেরুলাে। এখন
মজুরি করে’ এ কাজ করতে দু’বছর লাগে। তা ছাড়া
উপায়ও দেখছিনা। তা আমি যদি কিছু না নিলে দুঃখিত হন
তাে এই অসহায়ার ওই মেয়েটির বিয়েটা দিয়ে দিন্। এটা
ঐ বাঁচা-বাঁচির কথা নয় বাবু,সে মা কালী জানেন,এটা
ভিক্ষে করছি হুজুর।”
একটু নীরব থেকে-“কাকিমা না হেসে ছেলের সঙ্গে কথা
কইতেননা,এখন স'রে স'রে থাকেন, পাছে তাঁর মলিন মুখ
দেখলে আমার লাগে।” বলতে বলতে ধম্মার গলা ভার হয়ে
চোখে জল বেরিয়ে এল।
সব শুনে চৌধুরী মশাই কিছুক্ষণ অবাক হয়ে ধম্মার দিকে
চেয়ে থেকে বললেন-“তাতে তােকে আমার কি দেওয়া হল,
তাের লাভ ?”
“সব লাভ কি চোখে দেখা যায় হুজুর?-এই যে এত খরচ
করে মার পূজো করলেন, আপনার লাভটা কি দেখাতে পারেন
হুজুর ?—সেই আর কি।”
চৌধুরী মশাই মনে মনে লজ্জিত হ'লেন, বললেন,-“তাই
হবে ধম্মদাস।”
“কিন্তু সব ভার আপনাকে নিয়ে এ কাজটি করে দিতে

ধম্মা হবে, মেয়েটি যাতে সুখে থাকে। তা হলেই আমি লাখ টাকা পাবে।” “আচ্ছা তাই হবে বাবা। আর এই অঘ্রানেই যাতে দিতে পারি তার চেষ্টাও পাবে।” ধম্মা তার পায়ের ধূলো নিয়ে বিদায় হ’ল। চৌধুরীমশায়ের একটি দীর্ঘশ্বাস পড়লাে, তিনি উদাস ভাবে বিমৰ্য মুখে ভাবতে লাগলেন-“জীবনে অনেক কাজই করেছি— তার মধ্যে এমন কাজ একটিও নেই। -তাইতেমেয়েটি যাতে সুখে থাকে—সে কি আমার হাত! ভাবতে লাগলেন। সতেরােই অঘ্রান মথুরার বিবাহ হয়ে গেছে। দেখে সকলেই অবাকৃ—পাত্র চৌধুরীমশায়ের একমাত্র পুত্র শৈলেন্দ্র ! “জমিদার মশাইকে সকলে ধন্য ধন্য করছে। কেবল বড়ঠাকুরঝি বলছেন—“আমার ভাইঝি কুমু থাকতে কি না—” ইত্যাদি। “তা আমাদের বাড়ীতে ও-বর মানাতে নামােটে একটি পাস্!—ভায়েরা আমার—হুঃ। বলিনি সেজবউ, টাকার ছালার ওপর বসে আছে। কি চাপা মেয়ে বাবা ! কবে মােরবাে কেবল জানিনা লাে।” সেজভাজঠাকরুণ “পাসের” কথায় জ্বলে যান, বলেন-“ছাই- পাস, বুদ্ধির চাপেই সব গেলেন, কোথাও যেতে জানেন,না ৭৮ পাথেয় কথা কইতে জানেন? মেয়েটার যেমন অদেষ্ট। শেষ একটা বাইসম্যান্ জুটবে!” ভাসুর দুদিন আগে থেকে বাড়ী আসেননি। “লাটসায়েবের মেমের নাকি কি কাজ পড়েছে যা আর- কারুর সাদ্দি নেই করে। চাকরি তাে আর ছেড়ে দিতে পারে- না। লাট নীর আবার আর কারুর কাজ পছন্দ হয়না।”- ইত্যাদি—বড়ঠাকুরঝির উক্তি। . ধম্মা একদিন হাসতে হাসতে বললে,-“মা-গঙ্গার কোলে জ্বালা জুড়ােবার জায়গা খোজবার জন্যে আর তাড়াতাড়ি করবে- ত কাকিমা।” “বােস বাবা, মথুরার একটি ছেলে দেখে যাবনা রে!” “ বই কি কাকিমা” বলেই কাজলা ছুটে গিয়ে তার পায়ে মাথা রেখে হেসে লুটিয়ে পােড়ললা!”

তখন দক্ষিণেশ্বর গ্রামের অবস্থা খুবই ভাল ; অনেকেই
রেড়ির তেলের কারখানা খুলিয়া, রেড়ির তেল ও খােলের
কারবারে বেশ দু’টাকা রােজগার করিতেছেন। ঐ সকল
কারখানায় কাজ করিবার জন্য মুটে, মজুর, প্রেসম্যান্
প্রভৃতি শ্রমজীবীরা হুগলী ও বর্ধমান অঞ্চল হইতে ক্রমশ:
দক্ষিণেশ্বরে উপস্থিত হইয়াছে এবং কেহ কেহ স্থায়ী রকমে
বাসও করিতে আরম্ভ করিয়াছে। তাহাদের মধ্যে জাহানাবাদ
অঞ্চলের হারান বাগদিও একজন। দক্ষিণেশ্বরে সে হারু মুটে
বলিয়াই পরিচিত
হারু দিননাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের বহিৰ্বাটিতেই
আশ্রয় লইয়াছিল এবং হরনাথ রায়ের রেড়ির কলে মূটের
কাজ করিত। হারুর বয়স আন্দাজ পঁয়ত্রিশ, সে বেশ

৮০
পাথেয়
বলিষ্ঠকায় ও কৰ্ম্মনিষ্ঠ। তাহার মুখে সৰ্ব্বদাই একটা আনন্দভাব
দৃষ্ট হইত, এবং তাহার বিনীত ব্যবহার সকলের নিকটেই মধুর
ও প্রিয় ছিল। সে মাসে ৩০/৩৫ টাকা উপার্জন করিত
এবং প্রতিবৎসর চাষবাসের সময় দুই মাসের জন্য বাড়ী
হরনাথ রায় মহাশয়ের রেড়ির কলে রামহরি ভট্টাচার্য
সরকারের কাজ করিতেন।
নিজের আবশ্যকমত চার পাঁচ টাকা বাদে, উপার্জনের
বাকি টাকাটা হারু সরকার মহাশয়ের কাছে জমা
রাখিত এবং বাড়ী যাইবার সময় বীজ খরিদ ও চাষ-বাসের
জন্য তাহা লইয়া যাইত।
ভট্টাচাৰ্য মহাশয় যখন বুঝিলেন, হারু নিতান্ত ভাল
মানুষ, তাহার চক্ষুলজ্জা খুবই বেশী এবং
বেশী এবং হাতে টাকা
থাকিতে ‘নাই বলিয়া কাহাকেও ক্ষুন্ন করিবার শক্তি তাহার
নাই,তখন তাহার নিকট আবশ্যকমত দশ বিশ টাকা
কর্জ লইতে তাঁহার আর সঙ্কোচ রহিলনা। হারু
বলিত—“এ ত’ আপনাদেরই টাকা, আমাকে কেবল বাড়ী
যাবার সময় সাহায্য করলেই
করলেই হবে।”
অবধি
ভট্টাচাৰ্য মহাশয় মধ্যে মধ্যে কর্জ লইতেন এবং তদুপযুক্ত

হারু
আশীৰ্বাদ করিতে ভুলিতেন না; তাহার প্রধান কারণ,
হারু সুদ লইত না, সুদের পীড়া সে পূৰ্বে পাইয়াছিল।
এই ভাবে ৬৭ বৎসর গত হইবার পর রামহরি
ভট্টাচার্যের কন্যার বিবাহ উপস্থিত হইল। হরনাথ রায়
মহাশয়ের নিকট তিনি পিতৃশ্রাদ্ধ উপলক্ষে যে ঋণ
করিয়াছিলেন, তাহা আজিও পরিশােধ
করেন নাই,
সুতরাং তাহার নিকট পুনৰ্বার ঋণের প্রস্তাব কি করিয়াই
বা করেন! পুত্রের বিবাহে বৈবাহিকের নিকট
নগদ চারিশত টাকা গােপনে আদায় করিয়াছিলেন,
ঋণ পরিশােধ না করিয়া তাহা চোটা সুদে ধার দিয়া
থাকেন। সেরূপ লক্ষ্মীমন্ত টাকায় হাত দেওয়াও তাহার
পক্ষে সম্ভব নহে। সুতরাং হারুর জমা-খরচের হিসাব
দেখিবার জন্য খাতার উপর একবার ললালুপ দৃষ্টি করিলেন,-
দেখিলেন, হারুর নামে ৩৬০ টাকা জমা রহিয়াছে। কিন্তু এত
টাকা সে ধার দিতে রাজী হইবে কি?
সাত-পাঁচ ভাবিয়া পরদিন তিনি দীর্ঘ ফোটা কাটিয়া
নামাবলী দ্বারা সৰ্বাঙ্গ আচ্ছাদন করিয়া কৰ্ম্মস্থানে আসিলেন।
টিকিতে এমন একটি বড়গােছর বিল্বপত্র সংলগ্ন করিলেন,
যেন তাহা সহজেই
লােকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে
পারে।
হারু নিত্য সন্ধ্যার সময় তাহার দৈনিক পারিশ্রমিক লইতে
সরকার মহাশয়ের নিকট আসিত ;সে-দিনও
আসিল।
6

২
পাথেয়
প্রণামান্তে সে বলিল—“সরকার মশাই, আজ আপনাকে এমন
আমনা দেখছি কেন?”
রামহরি ভট্টাচাৰ্য্য এই প্রশ্নেরই অপেক্ষা করিতেছিলেন ;
-তাহার অভিনয় নিস্ফল হয় নাই। তিনি বলিলেন,-“কি
আর বােল্বব হারু, বড়ই বিপদে পড়েছি বাবা,মেয়েটার
বে’ না দিলে জাত যায় । অনেক চেষ্টায় ভগবান্ একটি পাত্র
জুটিয়ে দিলেন বটে, কিন্তু আজ দশদিন হ’লহাতে যা ছিল
জমান দিয়ে ছেলেটার একটা চাকরী করে দিয়েছি,দেখলুম
কাজটায় বেশ দু’টাকা রােজগার আছে ;-হাত একেবারেই
খালি করে বসেছি হারু। কি করেই বা জানবাে বল
যে, দশ দিন পরেই মেয়েটার ভাগ্যে এমন সুপাত্র এসে
জুটবে!
-এখন কি করি, কোথায় যাই, কার কাছে যাই—ভেবে
কূল-কিনারা পাচ্ছি না! কন্যাদায়ের চেয়ে আর দায় নেই
বাবা,-এ বিপদে কে আমাকে উদ্ধার করে আমার জাতরক্ষা
করবে, সেই চিন্তাতে আজ আর অন্ন পেটে দিতে পারিনি,
হারু-তােমাকে ছেলের মত দেখি,-বলেও একটু স্বস্তি
পাই। অত বড় প্রাতস্মরণীয় বাপ-পিতামাের বংশে জন্মে আজ
কি না এই সামান্য,–থাক, তােমার মনটাও আবার খারাপ করি
কেন। নাও—আজকের এই...
পর দুঃখে হারুর প্রাণ স্বভাবতই কঁাদিত,—পরােপকারের
সাধ্যমত চেষ্টা বা যত্নের কোন দিনই তাহার ত্রুটি ছিলনা।

হারু
সে তৎক্ষণাৎ বলিল—“আপনি ভাববেননা,-যে টাকাটা
আমার নামে জমা আছে, তাই নিয়ে এখন মেয়ের বিয়েট।
শীগগির শীগগির দিয়ে ফেলুন। অমন সুপাত্তোর ছাড়বেননা।
অনেকদিন হল আমার বাবা একজনের জামী হয়েছিলেন,
কিন্তু সে লােকটা ফেরার হওয়ায় আমাদের জমি-জমা বসতবাটী
সবই বন্দক প'ড়ে আছে—সে প্রায় সুদে আসলে চারশো টাকায়
দাড়ালাে। সেইটে শোধ ক'রে ভিটেটা খালা কোরবে। বােলে
ঐ টাকাটা রাখচি।
আমার তাড়া নেই, এখনও এক বছর
সময় আছে,-তারির মধ্যে আমাকে কৃপা করলেই হবে।
যান, এখন আগে আহার করুনগে।”
রামহরি ভট্টাচাৰ্য মহাশয় অবাক করুণ দৃষ্টিতে চাহিয়া-
“আমার যে ভাগ্য-স্বপ্ন নয় তাে বাবা।” বলিতে বলিতে
উঠিয়া দাড়াইয়া হারুকে জড়াইয়া ধরিলেন এবং পৈতা শুদ্ধ
হাত তাহার মস্তকে রাখিয়া বলিলেন,-“বাবা, তুমি আমার
বড় ছেলে !
এ উপকার আমার বংশের কেউ কখনও ভুলবে-
।
তুমি আমাদের জাত রাখলে, তুমি আমাকে বাঁচালে ।
তােমার কল্যাণে এখন আর আমি ঋণ পরিশােধের জন্যে ভাবি
;—দেবেন আমার মাসে কমসেকম্ ৬০/৭০ টাকা উপরী
রােজগার করবেই করবে,—মায় সুদ তিনশাে ষাট টাকা শােধ
দিতে ছ'মাসও লাগবেনা। আমি আর তােমাকে কি
আশীৰ্বাদ ক’রবাে-তুমি লক্ষপতি হও।” এই বলিয়া টিকি-
সংলগ্ন বিল্বপত্রটি সযত্নে খুলিয়া তাহার হস্তে দিলেন।

৮৪ পাথেয় হারু প্রণাম করিয়া বলিল,-“সুদের কথা তুলবেননা ; টাকাটা বিশেষ দরকার, তাই সময়ের কথাটা জানিয়ে রাখতে হলাে।” তিন বৎসর হইল রামহরি ভট্টাচার্যের কন্যার বিবাহ হইয়া গিয়াছে। শ্বশুরের চেষ্টায়-শ্বশুরের অফিসে সত্য- সত্যই দেবেন কুড়ি টাকা বেতনে একটি কেরাণীগিরি কাজ পাইয়াছে, কিন্তু সে-টাকা তাহার পােষাক-পরিচ্ছদেই ব্যয় হারুর টাকার জন্য কাহারও কাহারও কোনদিন কিছুমাত্র চেষ্টা বা চিন্তার ভাব দেখা যায় নাই। দেবেন কেবল একদিন বাপকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল—“ কোন লেখাপড়া নেই ত’!” হারু যে বাসায় থাকিত, তাহার পার্শ্বেই দেবকালী ঘােষালের বাড়ী। দেবকালী বাবু একটু মােটামাইনের চাকুরী করেন, মেজাজটা একটু নিম-সাহেবী গােছের। বেতনের ওজনে, তিনি তাহার লেখাপড়া ও জ্ঞানবুদ্ধির ওজনও একটু ভারি করিয়াই ভাবেন। গ্রামের কেহ কখনও তাহাকে অমিশ্র বাংলা কথা brt কহিতে শুনে নাই,এমন কি স্ত্রীলােকেরাও নহে। তাহার অবস্থা-হীনা বিধবা পিসির একটি পুত্র লেখাপড়ার জন্য আসিয়া তাহার বাটীতে বাস করিতেছিল। তাহার বয়ঃক্রম ব্রয়ােদশ হইবে, -নাম বিনােদ। লেখাপড়া অপেক্ষা বাজার-হাট করাই ছিল বিনােদের বড় কাজ। উপযুপরি দুই বৎসরই বিনােদ পরীক্ষায় সুখ্যাতির সহিত উত্তীর্ণ হইয়া প্রাইজ পাওয়ায় এবং দেবকালী বাবুর পুত্র বিজয়ের পরাজয়ের সংবাদ প্রচার হওয়ায় ও গ্রাম মধ্যে তাহা লইয়া একটা অনুচ্চারিত ভাব বিজয়ের মাতা সুস্পষ্ট অনুভব করায় বিনােদ বাড়ীর চক্ষুশূল হইয়া পড়িয়াছিল। একদিন হঠাৎ তাহার কলেরার লক্ষণ দেখা দেওয়ায়, দেবকালী বাবু রােগটিকে খুবই bad type-এর ও real Asiatic স্থির করিয়া সেই দিনই স্ত্রী-পুত্ৰাদিকে নিজের শ্বশুরালয়ে স্থানান্তরিত করিলেন এবং স্বয়ং অন্যত্র আহারের ব্যবস্থা করিলেন বিনােদকে দেখা-শুনার ভার ঝির উপরেই ন্যস্ত হইল। দেবকালী বাবু আপিস যাইবার সময় ভরাপেটে রুবিণীর- ক্যাম্ফর-সিক্ত রুমালখানা নাকে চাপিয়া ধরিয়া একবার বহিৰ্বাটী হইতে বিনােদের সংবাদ লইয়া গেলেন। ঝি নাক-মুখ আঁকাইয়া আপনা-আপনি বলিল—“ভদ্দর লােক যেন দুনিয়ায় কেউ না হয় !” ঝির কাচ্চাবাচ্চা আছে,-সন্ধ্যার পরই সে বাড়ী চলিয়া যাইবে,—এদিকে রােগের প্রকোপ ও বিনােদের যাতনা বাড়িতে পাথেয় লাগিল। বিনােদ কাতর হইয়া ঝিকে বলিল,-“দিদি, আমি বােধ হয় আর বঁচিবােনা, মাথা জ্বলে যাচ্ছে। মা কাছে থাকলে-” বলতেই, দুই চক্ষে জল গড়াইয়া পড়িল। একটু সামলাইয়া বলিল,-“দিদি, মাকে আমার প্রণাম জানিও, আর আজ আমাকে রাত্তিরে একলা ফেলে যেও না। না হয় হারু দাদাকে ডেকে দিও, আমার ত’ জল-গড়িয়ে খাবার আর বল নেই।” ঝি চক্ষু মুছিয়া বলিল, “ভয় কি দাদা, তুমি সেরে উঠবে। এই আমি তােমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। বুলিয়ে দিচ্চি। হারুকে না ডেকে দিয়ে কি আমি যাব !” হারু আজ তিন দিন তিন রাত বিনােদের মাতার-স্থান অধিকার করিয়াছে,-তাহার শয্যা-ত্যাগ করে নাই। কেবল ডাক্তার ডাকা ও ঔষধ-আনার সময় মাত্র বহিবায়ুর সংস্পর্শে আসিত। চতুর্থ দিনে ডাক্তার বাবু বলিলেন,-“আর কোন ভয় নাই।” তখন ঝির হাতে দুটি টাকা ও পথ্যের ভার দিয়া হারু বাসায় আসিল। আজ তিন দিন পরে ভাত রাঁধিয়া দু’চার গ্রাস খাইবার পর হারুর বমন ও ভেদ আরম্ভ হইল। দ্রুত বলহীন হইয়া পড়ায় সে বুঝিল-এ-যাত্ৰা আর তার রক্ষা নাই। ভাবিল—এ- সংক্রামক রােগ লইয়া আশ্রয়দাতাকে বিপন্ন করিবনা,এখনও শক্তি আছে—মা-গঙ্গার কোলেই স্থান লইগে। পরে, বহু বষ্টে হারু ৮৭ ধীরে ধীরে দাতারাম মণ্ডলের ঘাটে আসিয়া শয়ন করিল এবং একজন সহকর্মীকে দেখিতে পাইয়া বলিল,-“ভাই দয়া করে দাদাঠাকুরকে কি রায় মশাইকে যদি একবার ডেকে দিস!” দেখিতে দেখিতে ভদ্র ও ইতর স্ত্রী-পুরুষে দাতারাম মণ্ডলের ঘাট ভরিয়া গেল। হারুর গুণে ও ব্যবহারে সকলেই তাহাকে আপনার জন বলিয়া ভাবিত ও ভালবাসিত। তাই সকলেই যেন আজ একটা আসন্ন ক্ষতির আশঙ্কায় বিচলিত । তারাচরণ বাবু ডাক্তারের জন্য ছুটাছুটি করিতেছেন। কেবল রামহরি ভট্টাচাৰ্য ওরফে সরকার মহাশয়, এই সংবাদ পাইয়াই, একটা জরুরী কাজে বরাহনগরের পথ দিয়া কলিকাতায় রওনা হইয়া পড়িলেন,-ঘাটের সােজা-পথটা আজ আর মাড়াইলেননা। দিনবাবু, রায় মহাশয়, কানাইবাবু প্রভৃতি গ্রামের বিশিষ্ট ভদ্রলােকেরা সকলেই উপস্থিত হইয়াছিলেন। তারাচরণ বাবু উৎকণ্ঠার সহিত ডাক্তারের আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। মুহূৰ্ত্তগুলা যেন যুগ বলিয়া তাঁহার বােধ হইতেছিল। হারু জোড়হাত করিয়া বলিল,-“আমার আর বেশী দেরি নেই ; ডাক্তারের তরে চেষ্টা পাবেননা, আমার দু’-একটা কথা বলবার আছে, এখনও বােধ হয় বলতে পারব।” কানাইবাবু বলিলেন,—“বল, আমরা শুনছি।” হারু বলিল,-আমার গেজেতে বারােটি টাকা আছে। শ্যাম- দোকানী চালের দরুণ ৪||• টাকা পাবে; সৰ্বানন্দ কাপড়ের দাম ৩ পায়; কেষ্টপালের কাছে এক নাগরী গুড় নিয়েছি,

৮৮
পাথেয়
সে ॥১০ পায়। হরিহর বাবুর কাজ করেছিলুম, • পাওনা
হয়েছিল, তিনি ১৯ টাকা দিয়েছিলেন, বাকিটা ফেরৎ দেওয়া
হয়নি। কত হ’ল দাদা মশাই ?”
কানাইবাবু। আট টাকা সাড়ে পনর আনা।
হারু। তা হলে ১২ টাকার মধ্যে কি রইল ?
কানাইবাবু। তিন টাকা এক-আনা।
হারু অতি কাতরভাবে বলিল,-“তাতে ত ঘাট-খরচ হয়না।
আমার আর ত কিছু নেই, একটা ঘটি আর একখানা পেতলের
থালা আছে কেবল। যা কিছু কম পড়ে, আপনারা কেউ দয়া
করে আমাকে ভিক্ষে দেবেন,আপনাদের গ্রামে ছেলের মত
ছিলুম-” হারুর স্বরভঙ্গ হইয়া আসিল।
রায় মহাশয় বলিলেন,-“সে কি হারু! আমরা জানি, তুমি
রামহরি ভট্টাচার্যের কাছে সাড়ে তিনশত টাকার উপর পাও।
আরও কয়জনের কাছে কিছু কিছু পাও। তাছাড়া এ মাসে
যা কাজ করেছ,—আমার কাছেই তার জন্যে তােমার অন্ততঃ
পঁচিশ টাকা পাওনা হবে। সব আদায় হলে পাঁচশাে টাকার
কম হবেনা। তােমার ছেলে আছে শুনেছি। তুমি কেবল
দেনার কথাই কইলে,—সে ত’ কিছুই নয়। এখন একবার
সকলের সামনে তােমার পাওনাটার কথা খুলে বল।”
হারুর বক্তব্য শেষ হইয়াছিল। কিন্তু সকলে বার বার
বলায় সে অবশিষ্ট বলটুকু সংগ্রহ করিয়া ক্ষীণ কণ্ঠে বলিল,-
*এতদিন যে গ্রামের অন্নজল খেলুম, আপনাদের পায়ের
दाल

হারু
পেলুম,—যাবার সময় সে-গ্রামের লােককে টাকার জন্যে বিপদে
ফেলে যাব। হাতে থাকলে কি কেউ দিতেননা। ছেলেটা
এসে নানা রকমে পীড়ন করতে পারে। সে-সব আমার পাওয়া
হয়েছে। সে ঘােটলােকের ঘরের ছেলে,-আশীৰ্বাদ করুন
যেন খেটে খেতে পারে !”
কানাইবাবু উদাস ভাবে গঙ্গার দিকে চাহিলেন। ঠার
অজ্ঞাতেই ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘনিশ্বাস বহিয়া গেল।
তারাচরণ বাবু সন্তপ্ত হৃদয়ে বলিলেন,-“হারু, ভগবানের
দূতের মত তুমি একদিন নিজে এসে স্ব-ইচ্ছায় আমার বিপদের
সময় ৪০ টাকা সাহায্য না করলে, রমেশকে আমি মৃত্যুমুখ
থেকে বাঁচাতে পারতুমনা। কিন্তু এখনও যে বাবা আমি সেই
মােহর গুলির অর্ধেকও শশাধ করতে পারিনি।”
হারু বিদায় মুহূর্তের সমগ্র শক্তিতে বলিয়া উঠিল,-“সে টাকা
আমি রমেশ দাদাকে দিয়েছি।”
পরেই ক্ষীণ স্বরে বলিল,-“একটু গঙ্গাজল আর পায়ের
ধূলাে দি।”
জল খাইয়া হারু অস্পষ্ট কণ্ঠে বলিল,-“দেহটা শ্যাল-কুকুরে”
আর তার কথা সরিলনা, দুই চক্ষে জল গড়াইয়া পড়িল ।
তারাচরণ বাবু বেদনা-বিহ্বল-কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন,—“আমার
পুত্ৰ-বিয়ােগ হচ্ছে, সে ভার আমার।”
হারু কষ্টে হাত তুলিয়া প্রণাম করিবার চেষ্টা করিল, হাত
দটি অবশ হইয়া দুই পার্শ্বে পড়িয়া গেল।

পাথেয়
তারাচরণ বাবু বালকের মত কঁদিয়া উঠিলেন। সকলেই
গভীর বেদনাপ্ত শ্বাস ফেলিয়া চক্ষু মুছিলেন। জোয়ারের
জল “সর সর” শব্দে দাতারাম মণ্ডলের ঘাটের সােপান-শ্রেণী
উত্তীর্ণ হইয়া হারুকে অঙ্কে লইতে যেন ছুটিয়া আসিল !
সশব্দে ডাক্তার বাবুর গাড়ীও ঘাটে আসিয়া দাঁড়াইল।
ডাক্তার বাবু তাড়াতাড়ি নামিলেন। তারাচরণ বাবু তাহাকে
দেখিয়া কাদিতে কঁদিতে দারুণ ক্ষোভের সহিত বলিলেন,--
“হারু চলে গেল—তার পর এলেন ডাক্তার বাবু ! গরীবকে
বাঁচাতে একটু চেষ্টাও করলেননা।”
ডাক্তার বাবু হারুকে খুবই জানিতেন। তিনি বড়ই দুঃখিত
ও লজ্জিত হইয়া বলিলেন,—“দশটার সময় রামহরি ভট্টাচার্যের
ছেলে দেবেন, আমায় জেদাজেদি করে তার পিসিকে দেখতে
কেদিটিতে নিয়ে গিছলাে। সেইখানেই খাওয়ার হাঙ্গামা করে
মিছিমিছি ৪৫ ঘণ্টা দেরি করালে ! এইমাত্র বাড়ীতে
পা দিয়েই খবর পেলুম,—গাড়ি না ছেড়ে তাতেই চলে
এসেছি।”
একটু বিমর্ষ থাকিয়া পুনরায় বলিলেন,—“বিশেষ কিছুই না!
গিয়ে শুনলুম,—পুরােনাে কলিক্‌-ব্যথা,অমন হামেসা হয়।
হায় হায় ! তার তরে হারুর জন্যে একবার চেষ্টা করেও দেখা
হ’ল না!” এই বলিয়া ব্যথিত অন্তরে মাথা হেঁট করিলেন।
কানাই বাবু, রায় মহাশয় প্রভৃতি সকলেই ক্ষণেক পরস্পরের
মুখ-চাওয়া-চাওই করিয়া নীরব রহিলেন।

হারু
১১
কেবল রামহরি ভট্টাচাৰ্য রজনীর অন্ধকারে দুর্গানাম জপ
করিতে করিতে কলিকাতা হইতে গ্রামে ফিরিলেন এবং হারু
ইহধাম ত্যাগ করিয়াছে শুনিয়া একটা আরামের নিঃশ্বাস
ফেলিলেন। *
সেই
* এই গল্পটি আমার বহুদিন পূর্বের লেখা—প্রথম রচনা।
মােহেই ইহা পুস্তক মধ্যে রক্ষিত হইল।—লেখক

অন্নপূর্ণা
অচলেশ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ী যশােহরে। বি-এ পড়িবার
সময় তাহার পিতৃবিয়ােগ হওয়ায় এবং অন্য কোন অভিভাবক
থাকায়, তাহাকে লেখাপড়া ছাড়িয়া সংসারনির্বাহের উপায়-
চিন্তায় মন দিতে হইল। কলেজে ইংরাজী ও সংস্কৃতের জন্য তাহার
যশ ও প্রতিষ্ঠা ছিল, তাই লেখা-পড়া ছাড়িতে তাহার মনঃকষ্টের
অবধি রহিলনা। সে যখন দেখিল, সামান্য পৈতৃক জমিজমা
যাহা আছে তাহাতে মােটা ভাত-কাপড় একপ্রকার চলিয়া
যাইতে পারে, তখন নিৰ্মাও না থাকিতে হয়, অথচ স্বাধীন
ভাবে বিদ্যাচর্চাও চলে, এমন একটা কিছু ভাবিতে লাগিল।
দিন-কতক পরেই সে সাত আট বৎসরের দশ বারােটি
বালিকা লইয়া নিজের বহির্বাটীতে একটি বালিকা বিদ্যালয় খুলিল
ও স্বয়ংই তাহাদের পড়াইতে লাগিল।
জগতের কোথাও বুদ্ধিমান্ বা বিজ্ঞ লােকের অভাব নাই।
ভগবান্ বােধ হয় সর্বাগ্রে তাহাদের সৃষ্টি করিয়া, পরে জগৎ
সৃষ্টি করিতে সাহস পাইয়াছিলেন, নচেৎ মাটীর জগৎ সত্যই
মাটী হইয়া যাইত।
বিজ্ঞেরা বলিলেন,-“যদিও অচলেশ ভাল ছেলে, তাহার
বিদ্যাবুদ্ধি ও স্বভাবচরিত্র সম্বন্ধে গ্রামে সুযশই আছে, কিন্তু

অন্নপূর্ণা
আমরা এত-লােক থাকিতে মেয়ে ইস্কুলের
খেয়ালটা তাহার
মাথাতেই আসিল কেন ?
যাহা হউক, সে বিবাহ না-করা
পর্যন্ত কোন বুদ্ধিমান্ লােকেরই ও স্কুলে মেয়ে পাঠান উচিত
নয়,” ইত্যাদি।
এই মন্তব্যটা প্রকাশ পাইবার পর কেহ কেহ বুদ্ধিমান্
হইবার লােভ সংবরণ করিতে পারিলেননা,-মেয়েদের স্কুলে
যাওয়া বন্ধ করিলেন।
অচলেশ বুঝিল,গ্রামের হরিশ রায় মহাশয়ের কন্যার
বিবাহের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করাটা ভাল হয় নাই। তাহার
ইচ্ছা ছিল,-যদি বিবাহই করিতে হয় ত কোন গরীব-ব্রাহ্মণের
কন্যাকেই গ্রহণ করিবে। হরিশ রায় সঙ্গতিপন্ন লােক, তিনি
অনায়াসেই অন্যত্র কন্যার বিবাহ দিতে পারিবেন এবং এই
কথাই সে হরিশ রায়কে বলিয়াছিল।
হঠাৎ চারি পাঁচটি মেয়ে স্কুল পরিত্যাগ করায় অচলশ
চিন্তিত হইয়া পড়িল। সে ইতিকৰ্তব্য স্থির করিতে পারিতে-
ছিলনা। এমন সময় এক দিন একটি পরিচিত সদাচারী গৃহী-
সাধু আসিয়া তাহার কন্যাটিকে গ্রহণ করিতে অনুরােধ করায়
অচলেশ আর দ্বিরুক্তি করিলনা। সেই মাসেই শুভকাৰ্য্য সমাধা
হইয়া গেল। অচলেশ, সাধুকন্যা ও সাধুর আশীৰ্বাদমাত্র লইয়া
ঘরে ফিরিল।
সাধু শ্যামাচরণ চক্রবর্তী অতি সাত্ত্বিক প্রকৃতির লােক
ছিলেন। তাহাকে সে-অঞ্চলের সকলেই শ্রদ্ধাভক্তি করিত;

পাথেয়
সুতরাং হরিশ রায়ের মাথায় যে-সব পাকা পাকা চালগুলি
দশমহাবিদ্যার মত উদয় হইয়াছিল, অচলেশের বিপক্ষে তাহার
একটিও প্রয়ােগ করিতে না পারিয়া তিনি নিদারুণ মর্মপীড়া
ভােগ করিতে লাগিলেন ও নিজের কাছে যেন জীবন্ম ত হইয়া
রহিলেন।
অচলেশের মেয়ে-স্কুলটি
মেয়ে-স্কুলটি দিন দিন উন্নতি লাভ করিতে
লাগিল। তাহার দিনগুলিও বেশ কাটিতে লাগিল। কিন্তু বেশী
দিন বেশ-কাটা জগতের নিয়ম নহে,-তাহাতে তাহার চলে
। তিন বৎসর না যাইতেই একটি কন্যা রাখিয়া ও কন্যার
নাম অন্নপূর্ণা রাখিয়া অচলেশের পত্নী ইহধাম ত্যাগ করিলেন।
অন্নপূর্ণা তাহার দিদিমার নিকট মানুষ হইতে লাগিল।
২
সেই অন্নপূর্ণা এখন চৌদ্দ বৎসরের মেয়ে। বাপের কাছে
পুত্রনিৰ্বিশেষে লেখাপড়া ও দিদিমার কাছে গৃহকর্মাদি শিখে।
এক বৎসর হইল, তাহার দাদামহাশয়-সাধু শ্যামাচরণ দেহ
রাখিয়াছেন। তাঁহার নিকট ধৰ্ম্ম ও পৌরাণিক কথাদি শুনিয়া
অন্নপূর্ণার জ্ঞানটা তাহার বয়সকে ছাপাইয়া যেমন অনেকখানি
বাড়িয়া গিয়াছিল, তেমনই তাহার স্বভাবটাও বয়সকে তাহার
প্রাপ্য মর্যাদা না দিয়া, প্রায় অজ্ঞান বালিকাদের কোটায় নামিয়া
আসিতেছিল। ফলে, তাহার বয়সটা কোন দিকেই সামঞ্জস্য পায়
নাই।

অন্নপূর্ণা
কন্যাকে লেখাপড়া শিখাইবার এতটা পরিশ্রম পণ্ড হইল
দেখিয়া, অচলেশ বড়ই মর্মাহত হইল এবং আর ও-সম্বন্ধে সময়
নষ্ট করা বৃথা ভাবিয়া তাহার বিবাহের জন্য একটি সৎপাত্র
অনুসন্ধান করিতে লাগিল; কিন্তু বহু চেষ্টা করিয়াও কোন
সুবিধা করিতে পারিনা। কেহ একটু আশ্বাসও দিলনা,
ভাল করিয়া কথাও কহিলনা, ছেলের দামটাও বলিলনা।
হঠাৎ একদিন হরিশ রায় আসিয়া বলিল,-“কি গো অলেশ
বাবু, মেয়ের বে’র কিছু স্থির হ’ল ?”
অচলেশ। আজ্ঞে না, কিছুই ত করতে পারিনি।
হরিশ। বল কি! জাত-জম্ম যে থাকবেনা হে,সমাজ
এখনাে মরেনি:..
অচলেশ। আপনারা অনেককেই জানেন,একটু দয়া করে
যদি-
কথা শেষ করিতে না দিয়াই হরিশ রায় বলিল,-“তােমার
বলার অপেক্ষায় বসে আছি কি, বলিনি কি আর ! কিন্তু যে
মেয়ে বানিয়েছ, মেয়ের গুণ ত আর চাপা নেই! নাম করতেই
দেখলাম, সাতখানা গাঁয়ের লােক শিউরে উঠল।”
তিনি যে বলিবার অপেক্ষা না রাখিয়াই সব বলিয়াছেন,
হরিশ রায়ের এত বড় সত্য কথাটা বিশ্বাস করিতে অচলেশের
দ্বিধামাত্র হয় নাই।

পাথেয়
এত দিন সে চিন্তিতই ছিল, এইবার সে সত্যই ভীত হইল।
কারণ, অন্নপূর্ণার প্রকৃতি স্বাধীন, তাহার সাহস পুরুষােচিত।
গ্রামের স্ত্রী-পুরুষ সবাই তাহার আত্মীয়, সকলের কাছেই তাহার
অবাধগতি। এই সব কারণে, গ্রামে তাহার “নিল জ্জা, মর্দা-
মেয়ে” বলিয়া নিন্দা ছিল।
গৃহস্থ-কন্যার বিবাহ সম্বন্ধে এ-সব কথা যে অনুকূল নহে,
তাহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। তাহার উপর হরিশ রায়ের
অযাচিত অনুগ্রহ।
হস্তস্থিত খােলা-পঞ্চদশীখানা অচলেশের চক্ষুতে কেবল
মসীলেপনই করিতে লাগিল। এমন সময় কোথা হইতে হঠাৎ
অন্নপূর্ণা আসিয়া বলিল,-“বাবা, দিদিমার শরীর আর ভাল
থাকছেনা, তিনি শীগগিরই কাশীবাস করতে যাবেন।”
অচলেশ অন্যমনস্কভাবেই বলিল,-কার সঙ্গে, দেখবে
শুনবে কে ?”
অন্নপূর্ণা বলিল,-“আমি সঙ্গে যাব, আমিই দেখবাে
নবাে।”
শুনিয়া অচলেশের অন্যমনস্কভাবটা ছুটিয়া গেল, সে হাসিয়া
ফেলিল।
অন্নপূর্ণা গম্ভীরভাবে বলিল,-“কেন ! তিনি আমাকে
লালন পালন করেছেন, এখন তার সেবা-শুশ্রুষা আমি করব না
ত করবে কে? তার আর কেই-বা আছে!”
অন্নপূর্ণার কথাগুলির মধ্যে এমন একটা সত্য ও দৃঢ়তার সুর

অন্নপূর্ণ।
ছিল যে, অচলেশ আর সে-কথার উত্তর দিতে না পারিয়া বলিল,
-“খরচ যােগাবে কে ?”
অন্নপূর্ণা বলিল,-“দাদামশায়ের দুচার জন শিষ্য দেবেন।”
অচলেশ জানিত, অন্নপূর্ণা যতই উন্মাদ-প্রকৃতির হউক, সে
মিথ্যা কথা কহিবেনা; আর যেটাকে সে উচিত বলিয়া ভাবে,
তাহাতে বাধা দেওয়াও কঠিন। তাই ধীরভাবেই সে বলিল,--
“অনু, তাের বিবাহের জন্যে আমি ব্যস্ত হয়ে রয়েছি, কেউ যদি
দেখতে আসে ! এ-সময়ে কি অত দূর যায় মা!”
অন্নপূর্ণা বলিল,-“যিনি আমাকে মানুষ করেছিলেন, তার
অসময়ে আমি তাকে দেখবনা ! তার স্বামি-পুত্র থাকলেও
বা কথা ছিল। বেটে এখন থাক বাবা, আমি তাকে ছেড়ে
কোথাও থাকতে পারবনা। আর তুমি অত ভাব কেন বল
দিকি ?
মানুষের ইচ্ছায় কিছুই হয়না, যখন যা হবার
আপনি হবে, তুমি ভগবানের উপর ভর দিয়ে বই নিয়ে বসে
থাক।যাই, বাঁড়ুয্যেদের উপেনের পইতে, অনেক খুঁটিনাটি
আছে, ওরা অত পেরে উঠবে কেন?”
ব্যস্তভাবে চলিয়া গেল।
অচলেশ হাসিতে গিয়া কঁদিয়া ফেলিল।
এই বলিয়া অন্নপূর্ণা
অন্নপূর্ণার প্রকৃতিটা যে অদ্ভুত রকমের ছিল, সে-সম্বন্ধে
অচলেশেরও সন্দেহ ছিলনা;-স্নেহাধিক্যও সেটাকে এড়াইতে
পারে নাই। তাই স্নেহ ও সত্যের মধ্যে কর্তব্যকে স্থান দিতেই
7

১৮ পাথেয় হইল। অচলেশ ভাবিল, গ্রামের লােকের ধারণা ও হরিশ রায়ের সহানুভূতির বাহিরে অন্নপূর্ণাকে দিনকতক রাখাই ভাল, তাহাতে উভয় ক্ষেত্রেই পরিবর্তন সম্ভব। কাশীযাত্রার দিন অন্নপূর্ণা গ্রামের সকল বাড়ীতেই বিদায় লইতে গেল এবং সকলকে প্রণামে কঁাদাইয়া ও উপদেশে হাসাইয়া ফিরিল। কিন্তু সে হাসি তাহাদের এক বিন্দু অশ্রুকেও শুষ্ক করিতে পারিলনা। এই অদ্ভুত মেয়েটি চলিয়া যাইবার প্রতি পদক্ষেপ যেন তাহাদের অন্তরকে জানাইয়া দিল,—অন্নপূর্ণার চলিয়া যাইবার সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের কতটা চলিয়া যাইতেছে । এই মেয়েটি যে গ্রামের কতখানি ছিল ও সকলের মধ্যে তাহার সত্যকার স্থান কতটা ছিল, আজ তাহা অনেকেই অনুভব করিল। সে-দিনকার উজ্জ্বল দ্বিতীয় প্রহরটা অপরাহের উদাস অবসন্নতায় যেন পার হইয়া দেখা দিল। মেয়েটি যেমন অদ্ভুত, এতটা নিন্দার অন্তরালে তাহার এতখানি প্রভাব প্রচ্ছন্ন থাকাটাও তেমনই অদ্ভুত বােধ হইতে লাগিল। কাশীধামে আসিয়া দেবনাথপুরায় একটি বড় ত্রিতল বাড়ীর দ্বিতলের একটি ঘর ভাড়া লইয়া অন্নপূর্ণা তাহার দিদিমার সহিত রহিল। বাড়ীখানি পাবনার এক জন জমিদারের। দ্বিতল ও নীচের-তলা ভাড়া দেওয়া হয় ; ত্রিতলটি সম্পূর্ণ খালি থাকে।

অন্নপূর্ণা বাবুর প্রতি বৎসর একবার করিয়া আসেন ও ২৩ মাস ঐ ত্রিতলে বাস করিয়া থাকেন, বাকী কয়-মাস তালা দেওয়াই থাকে। দিদিমা দুৰ্বল, মধ্যে মধ্যে অসুস্থও হইয়া থাকেন, তাই অন্নপূর্ণা তাহাকে কিছু করিতে দেয় না; বাজার হাট, গঙ্গাজল আনা, রন্ধন, ডাক্তার-বৈদ্য ডাকা, পর্ধাদি দিনে তাহাকে গঙ্গাস্নান ও বিশ্বনাথ-অন্নপূর্ণাদি দেব-দেবী দর্শন করানাে,-সকল ভারই সে নিজের উপর লইয়াছে। তদ্ভিন্ন তাহার নিয়মিত সেবা-শুশ্রুষা ত আছেই। এসব সম্বন্ধে সে দিদিমার কোন মানাই শুনেনা। আবার অন্নপূর্ণার প্রকৃতিগত অপর সকল বাতিকও ছিল,- কাশী আসিয়া সে-সব যেন বাড়িয়া গেল। পরের কোন কায করিতে পাইলে সে-দিন তাহার স্বস্তি থাকেনা। সে সম্বন্ধে তাহার জাতিবিচার ছিলনা। পরিচিত অপরিচিত ছিলনা। বৃদ্ধাদের জল তুলিয়া দেওয়া, অন্ধকে হাত ধরিয়া তাহার গন্তব্য স্থানে দিয়া আসা, রােগী বা আতুর দেখিলে-রাস্তার লােক ধরিয়া তাহাদের উপায় করিয়া দেওয়া, মণিকর্ণিকা হইতে চৌষট্টি যােগিনী পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে সাধু-ফকিরদের খোজ লওয়া, তাহা ছাড়া দুঃস্থের সেবা, ঔষধ আনিয়া দেওয়া, ছেলে-লওয়া, বাজার করিয়া দেওয়া প্রভৃতি তাহার নিত্যকর্ম হইয়া পড়িল। এ-সব সে এতই নিঃসঙ্কোচে ছেলেখেলার মত হাসিমুখে করিত যে, বৎসর না ঘুরিতেই কাশীর মহাজন, পাণ্ডা, দোকানী, ১০০ পাথেয় মেয়ে ডাক্তার-বৈদ্য, এমন কি সিভিল সার্জনের পর্যন্ত সবিস্ময় ও সশ্রদ্ধ দৃষ্টি তাহার উপর পড়িল। তাহার সরল, নির্ভয়, সুমধুর আবেদন অগ্রাহ্য করিবার বা তাহাকে ক্ষুন্ন করিবার সামর্থ্য কাহারও রহিলনা। কেহ তাহাকে ক্ষ্যাপা বলে, কেহ শ্রদ্ধা করে, কেহ দেবী বলিয়া ভাবে। মহাজনরা,—এমন কি, সাধু-ফকিররা এই মেয়েটিকে একদিন না দেখিলে উৎকণ্ঠার সহিত খোজ লয় । মােটা, মলিন, কখনও বা ছিন্ন বস্তুই অন্নপূর্ণার আবরণ ছিল। তাহার নিজের জন্য কেহ কখন কিছু দিবার প্রস্তাব করিতে সাহস করিনা , তবে ভাল ফুল বা ফুলের মালা দেখিলে সে স্বয়ংই হাত পাতিয়া লইত ও মহানন্দে বিশ্বনাথ বা অন্নপূর্ণাকে অর্পণ করিতে ছুটিত। দেশে তাহার রূপটা তাহার অদ্ভুত প্রকৃতির আওতায় পড়িয়াই ছিল। কাশীতে সেইটাই তাহার কাজে লাগিল,- তাহার রক্ষক হইল । তাহার চক্ষু দুইটিতে এমন কিছু ছিল, যাহা দেখিলে লােকের প্রাণে প্রগাঢ় শ্রদ্ধারই উদয় হইত,-মন অপরাধের অবকাশমাত্র পাইতনা। কিন্তু তাহার এই অসামান্য রূপ, অনন্যসাধারণ প্রকৃতি, সহাস শিশু-সারল্য, অথচ সঙ্কোচহীন নির্ভীক দৃষ্টি, কাশীতে সকলের নিকট সম্মান আকর্ষণ করিলেও এবং অতি-বড় মন্দপ্রকৃতির লােকও সে-দৃষ্টির সম্মুখে লজ্জিত ও অবনত হইলেও,-দেশে অচলেশ ও কাশীতে দিদিমা তাহার বিবাহের জন্য ভাবনায় দিন দিন শীর্ণ ও জীর্ণ হইতে লাগিলেন। = অন্নপূর্ণা ১০১ ৪ মাঘ মাসের মাঝামাঝি জমিদার বাবু আসিয়া তাহার দেবনাথপুরার বাড়ীর ত্রিতলটি অধিকার করিয়াছেন। সঙ্গে পত্নী-ব্ৰহ্মাণী দেবী, বড় পুত্রবধূ চপলা ও তাহার একটি পাঁচ বৎসরের ছেলে ননীগোপাল, আর বাবুর ছােট ছেলে বিশ্বনাথ, ঝি ও উড়ে চাকরও আসিয়াছে। রাধিবার জন্য কাশীতে ব্রাহ্মণ- কন্যার অভাব নাই। বিশ্বনাথ বি, এ, পাস করিয়া বিলাতে ব্যারিষ্টারী পড়িতে যাইবার সঙ্কল্প করিয়াছিল, কিন্তু ম্যালেরিয়া আর অজীর্ণরােগ তাহাতে বাধা দিয়াছে। বায়ুপরিবর্তনের আশায় তাহার কাশীতে আসা। বড় ভাই ধর্মদাস—এটর্ণী, তিনি আসিতে পারেন নাই। অন্নপূর্ণার সৰ্ব্বত্রই অবাধ-গতি। জমিদার বাবুরা আসিবার পরই সে নিত্য তাহাদের খোঁজ লয় ; বড়-বৌয়ের ছেলেটির সঙ্গে খেলা করে। আবার বিশ্বনাথ বিলাতে ব্যারিষ্টার হইতে যাইবে, এই লইয়া তাহার সহিত তর্ক করে ব্যারিষ্টার হবে কেন? তােমাদের কিসের অভাব? বেড়াতে যাও–যাও ; ব্যারিষ্টার হয়াে না। বিশ্বনাথ যদি বলে-দোষ কি? তাহাতে অন্নপূর্ণা বলে, “শুনেছি নাকি তাতে কথার ধাঁধায় ফেলে লােককে ঠকিয়ে জেতবার ঝোক বাড়ে, তা হলে পাপও ত বাড়ে! পয়সা খরচ করে এমন বিদ্যে শিখতে আছে কি!”

পাথেয়
বড়বৌ চপলা জুতা-মােজা পরেন, কাজেই তার গঙ্গাস্নান
বা দেব-দেবীদর্শন ঘটা সম্ভব নহে। এ দিকে তার মাথার
অসুখ-মাথা জ্বলে। অন্নপূর্ণা তাহাকে জুতা মােজা খুলিতে
বলে, গঙ্গাস্নান করিতে বলে-“তা না ত রােগ যাবে কেন ?
আর দেব-দেবী দর্শন করবেনা ত কাশীতে আসাই বা কেন ?
আগ্রায় গেলেই ত ছিল ভাল,তাজমহল দেখা হত ; লক্ষে
গেলে গােরস্থান দেখে খুসি হ’তে!”
শুনিয়া চপলা বিরক্ত হইতেন, কথা কহিতেননা।
চপলার ছেলে ননীগােপালের আমাশয় হওয়ায় অন্নপূর্ণা এক
দিন জিজ্ঞাসা করিল,-“হ্যা গা, তােমাদের জাত না যায় ত বাবা
বিশ্বনাথের একটু চন্নামৃত এনে খাইয়ে দি, এক দিনেই ভাল হয়ে
যাবে।”
শুনিয়া চপলা অনিচ্ছায় একটু হাসির ভাব আনিলেন ; আর
আর সকলে হাসিয়া খুন।
চা-পানান্তে চপলা একদিন বেড়াইয়া আসিয়া হাসিতে
হাসিতে বিশ্বনাথকে বলিলেন,—“ঠাকুরপাে, কাশীবাস করতে এসে
মাগীরা ধৰ্ম্ম-কর্মের যে নমুনাে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে, তা দেখে
এলুম ;-তার মাথা নেই, মুণ্ডু নেই, একটা যেন পুতুলনাচ!
দেখলে লজ্জায় মাথা হেঁট করতে হয়। তাতে প্রাণ নেই, তার
সার্থকতা ত খুজেই পাইনা। কঁাচ্চাখানেক চালের খুদ, আর
পােটাক গঙ্গাজল নিয়ে বিশ্বনাথ থেকে শুরু করে দুধারি
মুড়িনাড়া যা দেখছে, তাকেই গােণ দু’টি ক'রে চাল আর দু’

অন্নপূর্ণা
ফোটা জল ছুড়ে মাতে মারতে চলেছে। তার মধ্যে কথাবার্তাও
আছে, ঝগড়াও আছে, সিম-বেগুনের দর করাও আছে। মুক্তি
পাবার টোপটা মন্দ নয় !”
বিশ্বনাথ হাসিয়া বলিল,-“বৌদিদি, তুমিও একদিন সস্তায়
কাজ সেরে রাখনা ।”
বড়বৌ বলিলেন,—“রক্ষা কর,অত সস্তার মুক্তি ট্যাকসই
হবেনা।”
বিশ্বনাথ তখন অন্নপূর্ণার দিকে চাহিয়া বলিল,-“তুমি কি
বল ?”
অন্নপূর্ণা বলিল,-“আমি ত ভাবি-সকল পূজোই পূজো,
পাঁচ শ টাকার দুর্গোৎসবও দুর্গোৎসব, পাঁচ টাকার দুর্গোৎসবও
দুর্গোৎসব ; পঞ্চাশ টাকার বে’ও বে, পাচশ টাকার বে’ও
বে;—কেবল ঘটার তফাৎ। ভগবানের কিছুরই অভাব নেই,
ভাব আর ভক্তি নিয়েই কথা। যার যেমন পুজি। বউদি
যাঁদের দেখে এসেছেন, তাদের-ওজনে তাদের বিচার করতে
পারলেই বােধ হয় ঠিক হয়। নিজের ওজনে পরকে দেখলে
বােঝা যায়না।”
চপলা। আমি ত বুঝিও সব কেবল ভণ্ডামী আর পণ্ডশ্রম।
অন্নপূর্ণা। ও-কথা বলতে নেই বউদি, ওতে অপরাধ হয়।
কাজ কি?
চপলা। ভগবাকে নিয়ে ওরূপ তামাসা আমার ভাল
লাগেনা।

১০৪ পাথেয় অন্নপূর্ণা। ভগবানকে নিয়ে তামাসা করবার মত বুকের- পাটা বােধ হয় মানুষের নেই,-মেয়েদের ত নেই-ই। মানুষে তার উদ্দেশে যা করে, সেটা প্রাণের হুকুমেই করে। বউদি, তুমি বুঝি কখনও কাশীতে গ্রহণ দেখনি! লক্ষ লক্ষ লােক, খোড়া, অন্ধ, রুগীরা পর্যন্ত বিশ-কোশ হেঁটে গ্রহণে নাইতে আসে। কার হুকুমে ? এ কাজ আইন করে হয়না বউদি। ভেতরের তাড়া চাই। আবার বিশ্বাস না থাকলে কি তাড়া জাগে ? চপলা। সেটা ভুল বিশ্বাস । অন্নপূর্ণা। কিন্তু তার আনন্দটা ত ভুল নয় বউদি ! সেইটেই যে সকলে খােজে ; বিশ্বাসীও খোজে, অবিশ্বাসীও খোঁজে। বিশ্বনাথ অন্নপূর্ণার কথায় আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল,- *অন্নপূর্ণা, তুমি এ-সব পেলে কোথায় ?” অন্নপূর্ণা হাসিয়া বলিল,-“তােমাদের কাছেই শুনি। ভুল হলেই শুধরে দিও।ও মা ! কাকগুলাের জলটা যে বলে দেওয়া হয় নি।” বলিতে বলিতে অন্নপূর্ণা ছুটিয়া চলিয়া গেল। চপলা বলিলেন,-মেয়েটা পাগল ।” বিশ্বনাথ অন্যমনস্কভাবে বলিল,-“তা হবে।” চপলা পড়িবার জন্য অন্নপূর্ণার কাছে পুস্তক চাহেন। অন্নপূর্ণা তাই দুইখানি বই আনিয়া তাহার হাতে দিয়া বলিয়া যায়—“বেশ ভাল করে দেখাে।”

।
অন্নপূর্ণা
আজ অন্নপূর্ণা আসিতেই চপলা নাক-সিটুকাইয়া বলিলেন,-
*এই নাও তােমার বই,খুব লােককে বইয়ের কথা
বলেছিলুম!”
অন্নপূর্ণা বলিল,-“কেন বউদি ?”
চপলা বলিলেন,—“যত আজগুবী আর অসম্ভব মিথ্যে কথার
কাড়ি! ও গেলা মানুষের কাজ নয়।”
অন্নপূর্ণা। সে কি বউদি ! তবে একটা কথা আছে, ও ত
শুধু বই নয়, ওষুধ।
নয়, ওষুধ। অনেক ওষুধ মধুর সঙ্গে গিলতে হয়।
এর অনুপান—বিশ্বাস।
এই বলিয়া বই দুইখানি ভক্তিপূৰ্ব্বক মাথায় ঠেকাইয়া
অঞ্চলের মধ্যে রাখিল।
চপলা হাসিয়া বলিলেন,-“তােমার বিশ্বাস তােমারই থাক।”
অন্নপূর্ণা। ও মা, ভুলে গেছি—আমি যে ননীগােপালের
সঙ্গে খেলব বলে এলুম, সে কোথা ?
চপলা। ঝির সঙ্গে বেড়াতে গেছে ।
অন্নপূর্ণা। ননীকে অমন পথে-ঘাটে পাঠিয়ােনা। আমি
এখন চলুম ;—কোন কাজ নেই ত ?
চপলা হাসিয়া বলিলেন,-“কি কাজ ?”
অন্নপূর্ণা বলিল,-“না—তাই বলছি,”—বলিতে বলিতে সে
চলিয়া গেল।
বিশ্বনাথের ঘরের সম্মুখ দিয়া যাইবার সময় অন্নপূর্ণা ব্ৰহ্মাণী

১০৬
পাথেয়
দেবীকে সেই ঘরের দরজার কাছে দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া
বলিল—“ননীকে দেখতে পেলুমনা, খেলা হ’লনা,চলুম।”
ব্ৰহ্মাণী দেবী বিমর্ষভাবে বলিলেন,-“বিশ্বনাথের জ্বর হয়েছে,
বিদেশ, তাই বড় ভাবনা হয়, মা।”
অন্নপূর্ণা। জ্বর হয়েছে ! কবে থেকে? খবর দেন নি
কেন ?
ব্ৰহ্মাণী দেবী চিন্তার মধ্যেও হাসিয়া বলিলেন,-“তুমি কি
ডাক্তার যে খবর দেবাে ?”
বিশ্বনাথও হাসিল।
অন্নপূর্ণা বলিল,-“ও মা, জ্বর-টর হলে ডাক্তারেরই বুঝি সব
ভার!
তিনি ত ওষুধ লিখে আর টাকা নিয়েই খালাস। আর
বুঝি কোন কাজ নেই ? দেখি”—বলিয়া সরাসরি বিশ্বনাথের
খাটের কাছে গিয়া অসঙ্কোচে বিশ্বনাথের কপালে, গালে, বুকে ও
হাতের মধ্যে হাত দিয়া বলিল,-“তাই ত, জ্বরই ত; কি কষ্ট
হচ্ছে বল ত গা ?”
বিশ্বনাথ বালকের মত হাসিতে হাসিতে বলিল,-“হাত, পা,
কোমর কামড়াচ্ছে।”
অন্নপূর্ণা সাহস দিবার সুরে বলিল,-“ভয় নেই, মা ভাল
করে দেবেন। আমি দু’তিন বাড়ী সেরেই আসছি। তাড়াতাড়ি
যেন ওষুধ-টষুধ খাওয়া না হয়।” বলিতে বলিতে অন্নপূর্ণা দ্রুত
চলিয়া গেল ; একবারমাত্র পশ্চাৎ ফিরিয়া বিশ্বনাথকে বলিল,-
“ও কিছু নয়।”
••
ক

অন্নপূর্ণা
১০৭
অঞ্চলাবৃত বই দুইখানি খাটের একপার্শ্বে রাখিয়াছিল,
অন্যমনস্ক তাহা বিশ্বনাথের শয্যাতেই রহিয়া গেল।
ইতিমধ্যে চপলাও আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। তিনি
বিশ্বনাথের অসুখের কথাটা অন্নপূর্ণাকে বলা অনাবশ্যক ভাবিয়া-
ছিলেন।
এইবার রােগ ভুলিয়া, তিন জনেই হাে হাে করিয়া হাসিয়া
উঠিলেন। ব্রহ্মাণী দেবী বলিলেন,-“আহা—অমন সুন্দরী
মেয়ে, কিন্তু একেবারেই পাগল।”
চপলা বলিলেন,—“এসেছিল ননীর সঙ্গে খেলতে,—যাবার
সময় দেখি—পেলায়-ডাক্তার ! পাগল নয় ত কি! ছুড়ীর বে
হওয়াই মুস্কিল।”
ব্ৰহ্মাণী দেবী বলিলেন,-ঠিক বলেছ বউমা, তা না ত আর
এত দিন হয় নি! জেনে শুনে কে দেবে বল। আহা, অমন
মেয়েটার কি অভাগ্যি।”
বিশ্বনাথ সকলের সঙ্গে হাসিল, সকলের কথা শুনিল ; কিন্তু
এ-কথা কোন মতেই ভাবিতে পারিল না যে-অন্নপূর্ণা পাগল।
৬
আজ তিন দিন বিশ্বনাথের জ্বর। জ্বরটা খুব বেশী, চোখ-মুখ
লাল, গাত্রদাহ রহিয়াছে। বাড়ী শুদ্ধ লােক বিচলিত। কাল
টেলিগ্রাম গিয়াছিল। এইমাত্ৰ কৰ্ত্তার বড় ছেলে ধর্মদাসবাবু
আসিয়াছেন। রােগীর ঘরে ডাক্তার বিনয় বাবু, কৰ্ত্তা, ধর্মদাস
বাবু, ব্ৰহ্মাণী দেবী প্রভৃতি উপস্থিত।

১৮
পাথেয়
অন্নপূর্ণা তাড়াতাড়ি আসিয়া চপলার ঘরে ঢুকিল ও ননীকে
কোলে লইয়া তাহার সঙ্গে কথা কহিতে কহিতে তাহার হাতে
একটি হরীতকী ও একটি রুদ্রাক্ষ বাঁধিয়া দিল।
বড়বৌয়ের ইচ্ছা নয় যে, অন্নপূর্ণা ননীকে ছোয়। সে-কথাটা
বলিতে না পারিয়া বলিলেন,-“ও আবার কি পাগলামী !
ও গুলাে আবার কি ?”
অন্নপূর্ণা বলিল,-“থাক্‌-না, যেন খুলো না বউদি ; ও থাক।
;
এই বলিয়া দ্রুত গিয়া বিশ্বনাথের কক্ষে প্রবেশ করিল ও
বিশ্বনাথের ডান হাতটি তুলিয়া লইয়া তাহাতেও হরীতকী ও
রুদ্রাক্ষ বাঁধিয়া দিল। পরে সকলের দিকে চাহিয়া বলিল,-
“হ্যাগা, রুগীর ঘরে জটলা করে ও-সব কথা কেন ?”
ডাক্তার বাবু বলিলেন,-ঠিক বলেছ মা ;-এ কি, অন্নপূর্ণা
যে! তাই ত বলি, এ-কথা আর কে বলবে ! এস গাে,
আমরা বারান্দায় যাই।”
অন্নপূর্ণার ব্যবহারে ও কথায় ধর্মদাস বিরক্ত হইয়াছিলেন।
বারান্দায় যাইবার সময় মা’কে জিজ্ঞাসা করিলেন,-“ও মেয়েটা
ব্ৰহ্মাণী দেবী বলিলেন,-ও একটা আধপাগলা মেয়ে
আপনি এসে জুটেছে, মাঝের-তলায় থাকে।”
ধর্মদাস রাগতভাবে বলিলেন,-“পাগলকে রােগীর কাছে
আসতে দেওয়া কেন ? আর বিশুর হাতে যা-তা কি-সব বেঁধে

অন্নপূর্ণ।
দিলে,-তােমরা চেনে, কিছু বললেন ! ও-সব আমি করতে
দেবনা।” পরে ডাক্তার বাবুর দিকে অগ্রসর হইয়া গম্ভীভাবে
কহিলেন,—“যদি স্মলপক্স হয় ত খুবই সিরিয়াস কথা।আমার
৫ বছরের ছেলে এখানে রয়েছে, আপনি কি অ্যাড ভাই দেন?”
ডাক্তার বাবু বলিলেন,-“অবস্থাবিশেষে অ্যাড় ভাই,
সুবিধা থাকলে স্থানান্তরিত করা মন্দ নয়।”
ধর্মদাস। দ্বিতীয় কথা, বিশ্বনাথকে অ্যাটেণ্ড করবে কে ?
এখানে ভাল না পাওয়া যাবে ?
ডাক্তার। আপনারা যদি কেহ না পারেন ত যেমনই হক,
ভাড়াটে-নাস খুঁজতেই হবে। তবে মা যদি রাজি হন ত কথাই
নেই।
ধর্মদাস। আপনি বলেন কি! ওঁর এই বৃদ্ধ বয়েস, তার
উপর রাত্রিজাগরণ। তায় এক-আধ দিনের কথা নয়—
ডাক্তার। ওঁর কথা নয়,
আমি অন্নপূর্ণামার কথা
বলছি।
ধর্মদাস। তিনি কে ?
ডাক্তার। যিনি এখন রােগীর ঘরে রয়েছেন।
ধর্মদাস। ঐ-মেয়েটি, ও ত’ পাগল ; ওর উপর রােগীর
ভার!
ডাক্তার। কে বল্লে পাগল। যদি ওঁকে পান ত..
ধর্মদাস। চার্জ কি রকম?
ডাক্তার। চার্জ আবার কি ?
০ ০ ০

১১০
পাথেয়
গ
ধর্মদাস। পরে বসিসে সেরে নেয় বুঝি? আমি সে-রকম
লােকের উপর নির্ভর করতে পারিনা।
ডাক্তার ঘৃণাটা গােপন করিয়া বলিলেন,-“দরকার কি?”
ধর্মদাস মা’র দিকে ফিরিয়া বলিলেন—“মা, কি বল ?”
ব্ৰহ্মাণী দেবী বলিলেন,-“আমি কি বুঝি বাবা, যাতে ভাল
হয় কর। সােমােত্ত মেয়ে--
ডাক্তার বাবু আর দাড়াইলেননা। তাঁহার পায়ের শব্দ
পাইয়া অন্নপূর্ণা ছুটিয়া আসিয়া বলিল,-“কাল বেলা ৯টার মধ্যে
সিভিল সার্জেকে নিয়ে একবার আসতেই হলে ডাক্তার বাবু,
তা না ত রুগী ফেলে আমাকেই সেথায় ছুটা ত হবে। পরশু
থেকে তাদের এ-ঘরে ঢােকা বােধ হয় হবেনা, জুতােটুততা
চলবেনা।”
ডাক্তার বাবু ঢোক গিলিয়া, “আচ্ছা মা, তাই হবে” বলিতে
বলিতে একবার সকলের দিকে চাহিলেন। কৰ্ত্তা ও ধর্মদাস
যন্ত্রবৎ “নিয়ে আসবেন” বলিয়া সম্মতি দিলেন। ডাক্তার বাবু
চলিয়া গেলেন।
অন্নপূর্ণার এই অযাচিত কর্তৃত্বভার গ্রহণ ও আদেশ কেহই
অমান্য করিতে পারিনা।
ধর্মদাস নিজের নির্দিষ্ট কক্ষে ঢুকিয়াই ননীগােপালের হাতে
হরীতকী ও রুদ্রাক্ষ বাঁধা দেখিয়া বিরক্তির সহিত চপলাকে তাহা
খুলিয়া ফেলিয়া দিতে বলিলেন।

১১১
অন্নপূর্ণা
চপলা। একটা পাগলী-ছুড়ী ননীর সঙ্গে খেলা করতে
আসে, সে-ই আজ বেঁধে দিয়ে গেছে।খুলতে বারণ করেও
গেছে।
ধর্মদাস। কাশী এসে তােমাকেও ভুতে পেলে না কি! ও
সব নন্‌সে-আমি মানিনা। সে-ছুড়ী কি করে?
চপলা খাসিয়া বলিলেন,-মেয়েমানুষে আবার কি করবে !
চাবও করে, ওকালতীও করেনা, বােধ হয়, মুন্সেফও নয়।
এখন কি বল খুলে ফেলে দি?”
ধর্মদাস। এক্ষুনি,-ও আবার জিজ্ঞেস্ করছ কি ! তবে
চপলা। ২মিও তাই বলি, ওতে ননীর ত আর কষ্ট
হচ্ছেনা।
ধর্মদাস। তা তুমি জানলে কি করে ? কচি ছেলেকে
মিছে বােঝা বওয়ানই বা কেন ?
চপলা। তবে খুলেই দি,-কি বল ?
ধর্মদাস। ননীকে একবার ত তােমার জিজ্ঞেস করতেও
হয়। হাঁ রে ননী, তাের হাতে ওগুলাে খুব লাগছে না ত ?
ননীগােপাল আনন্দে বলিল,-“অনুদি দিয়েছে।”
ধর্মদাস বলিলেন,-“ওরে পাজি, লাগছে কি না বল। লাগছে
বই কি, তুমি খুলে দাও,খুলে দা । ইডিসেন্ট দুলেদের
ছেলের মত
চপলা। তবে দি ? :
ধর্মদাস। তমার ইচ্ছে নেই দেখছি ; এ-সব বুদ্ধি ভাল নয়।

১১২
পাথেয়
চপলা । আমার আর কি। ই-ছুড়ী যে—গেরাে
দিয়েছে। দেখি আবার কচিখানা কোথায়। তােমার পকেটে
চুরী নেই, কেটেই দাওনা।
ধর্মদাস “তাই দি” বলিয়া, পাঁচটা পকেট সাতবার খুজিতে
লাগিলেন।
তখন বড়বউ হাসিয়া বলিলেন,-“তাড়াতাড়ি করে ছেলেটার
হাতটা কেটে বােসবে ; নাওয়া-খাওয়া সেরে ধীরে-সুস্থিরে
ওগুলাে কেটে দিলেই হবে’খন। কি বল ?”
ধর্মদাস। তবে তাই করা যাবে; কিন্তু খবরদ র, ভুলে যেও
না যেন। দেখলে লোেক আমায় কি বলবে।
ফল কথা—উভয়ের কাহারও সে-গুলি ননীগে পালের হস্তচ্যুত
করিতে সাহস হইলনা।
ধর্মদাস সেই দিনই বেলা ৩টার ট্রেণে পত্নী-পুত্র লইয়া
কলিকাতায় রওনা হইলেন।
যাইবার সময় বাপকে বলিলেন,-“খুব সাবধানে থাকবেন ।
টিটমেণ্ট, আর নার্সিং সম্বন্ধে কোন ত্রুটি না হয়। বিশ্বনাথের
অবস্থা সম্বন্ধে আমি যে নিত্য টেলিগ্রাম পাই। দুটি নাস
নিযুক্ত করা চাই-ই,—ও মেয়েটার উপর যেন নির্ভর করা না হয় ;
ওকে অতটা আস্কারা দেওয়াই অনুচি5 হয়েছে। ওর সম্বন্ধে
৫৭ জন বিশ্বস্ত লােকের সাক্ষ্য লওয়াই উত ছিল। ডাক্তার

অন্নপূর্ণা
ওকে ভাল বল্লেই বিশ্বাস করা যায়না। আমার ও-সব খুব জানা
আছে। একই প্রােফেসনে পরস্পরের মধ্যে বিলক্ষণ টাউটিং
চলে। ডাক্তারের কথাগুলা মার্ক করলেননা!” ইত্যাদি, ইত্যাদি।
এই বিপদের সময় বড় ছেলের ভাব দেখিয়া কৰ্ত্তার তাহাকে
ঝঞ্চাট বলিয়াই বােধ হইতেছিল। তিনি বলিলেন, “সকল
ভার গুলাে আমারই রইল, এখন তুমি আর অপেক্ষা করনা,
টেণের টাইম হয়ে আসছে।
ধর্মদাস রােগটা যেমনই কটেজিয়স্ তেমনই ডেন্জারাস,
আমি ও-সম্বর বড়ই নার্ভাস; তাই
কৰ্ত্ত।। -তে আর কি হয়েছে; পৌছেই খবরটা দিও।
ধর্মদাস। রকার হয় ত টেলিগ্রাম পেলেই আমি চলে
আসতে পারি
কর্তা। সে দরকার আর যেন না হয়। তােমার আর বিলম্ব
করে কাজ নেই।
ধর্মদাস স্ত্রী পুত্র লইয়া রওনা হইলেন। মা ব্ৰহ্মাণী দেবী
অঞ্চলে চক্ষু মুছিলেন। কর্তা একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিলেন।
এতক্ষণ সকলে নীরব থাকিবার পর যখন মােগলসরাই
হইতে ট্রেণখানা সত্যই কাশীর সংস্রব ত্যাগ করিল, তখন ধর্মদাস
বলিলেন,-“মামলার নথি ঘেটে ঘেটে বিলক্ষণই বুঝেছি, জগতের
পনের-আনা লােক ৫ ফু চক্ষুলজ্জাতেই মরেছে!”
৪

১১৪
পাথেয়
চপলা। কিন্তু
ধর্মদাস। ওতে আর ‘কিন্তু’ নেই। ঐ ‘কিন্তু’টাই মানুষের
দুৰ্বলতা আর নিৰ্ব দ্ধিতা।
পরে চা, রুটী, বাবু-সন্দেশ আর সােডা খাইয়া সেকেণ্ড-ক্লাশ,
‘বার্থে সকলে শয়ন করিলেন।
ধর্মদাস এক দুই করিয়া থ্রি-ক্যাসেল সিগারেট ভ করিতে
করিতে অযাচিতভাবে মনে মনে অকাট্য প্রমাণ কল সঞ্চয়
করিয়া আত্ম-কর্ম সমর্থন করিতে লাগিলেন। বােধূ হয়, জুরীর।
একবাক্যে বলিল, “নটগিন্টি,” জজও রায় দিলেন 'নটুগিন্টি,”
তবু কিন্তু এটর্ণী ধর্মদাসবাবু মানসিক স্বাচ্ছন লাভ করিতে
পারিলেননা।
হঠাৎ শয্যা হইতে উঠিয়া কুঁজো হইতে এক গ্লাস জল
গড়াইয়া চোখে-মুখে দিলেন ও পান করিলেন এবং কিছুক্ষণ
বাহিরে মাথা বাড়াইয়া থাকিবার পর সজোরে –“ঠিক করেছি”
বলিয়া পুনরায় শয়ন করিলেন।
প্রভাত হইতেই ননীগােপালকে লইয়া চপলা উঠিয়া বসিয়া-
ছেন। তারের উপর নীলকণ্ঠ আর ফিরে আসিয়া বসিয়াছে,
ননী তাহাদের ধরিবার জন্য হাত বাড়াইতেছে, কিন্তু গাছপালা-
গুলি তাহার দিকে সবেগে ছুটিয়া আসায়, সভয়ে হাত গুটাইয়া
লইতেছে।
গাড়ী একটা ষ্টেশনে আসিয়া থামিল। ষ্টেশনটিতে বিশেষ
ভিড় বা গােলমাল নাই; কেবল একটি সীন বালকের কাতর

অন্নপূর্ণা
১১৫
কণ্ঠ বলিতেছে—“আপনারা কেউ দয়া করে আমায় চারটি পয়সা
দিন, আমার ছােট ভাই আজ ১৪ দিন পরে পথ্য করবে,
আমাদের দু’টি পয়সা বই সম্বল নেই।”
বালকটির এই প্রার্থনা কে কি ভাবে লইল, তাহা অন্তর্যামীই
বলিতে ‘রেন।
ধৰ্ম্মদ সর অজ্ঞাতে একটি বিষধর সর্প তাহার বক্ষের উপর
শুইয়াছিল সহসা সে যেন প্রবল বেগে মাথা তুলিয়া তাঁহার
মৰ্ম্মে দংশা করিল। তিনি তীর-বেগে উঠিয়া গাড়ীর দরজা
খুলিতে খুলি ত বালকটিকে ডাকিলেন। গাড়ী ছাড়িবার ঘণ্টার
সঙ্গে সঙ্গেই ব ক ছুটিয়া আসিল। ধর্মদাস তাড়াতাড়ি তাহাকে
একখানা পাঁচ কার নােট দিলেন।
বালক ভদ্র স্তান, সে অবাক হইয়া কঁদিয়া ফেলিল ও রুদ্ধ
কণ্ঠে বলিল, “আমার ভাইটিকে বাঁচাতে ভগবাই আপনাকে
পাঠিয়েছেন।”
গাড়ী তখন চলিতে আরম্ভ করিয়াছে।
ধর্মদাস আবার কম্পিত-হস্তে ব্যাগ খুলিয়া আর একখানি
দশ টাকার নােট তাহার দিকে ছুঁড়িয়া দিলেন ও চীৎকার করিয়া
তাহার ঠিকানা জিজ্ঞাসা করিলেন। সে শব্দ গাড়ীর শব্দে
ডুবিয়া গেল, বালক বুঝিতে পারিল না। ধর্মদাস সেই ভাবেই
গাড়ীর দরজা ধরিয়া বাহিরে মুখ বাড়াইয়া রহিলেন। গাড়ী
দুইটি ষ্টেশন পার হ ৷ গেল।
চপলা কোন কষ্ট কহিতে সাহস করিলেননা। কেবলমাত্র

পাথর
বলিলেন, “হাওড়া পৌছিতে এখনও ঘণ্টাখানেক আছে, ততক্ষণ
একটু শােওনা।”
ধর্মদাস কেবল একটি “” বলিয়া, অন্যমনস্কভাবে বিছানায়
আসিয়া শুইয়া পড়িলেন।
গাড়ী হাওড়া ষ্টেশনে পৌছিতেই ব্যারিষ্টা নাগ
ও উকীল মিষ্টার মাইতি সস্ত্রীক ধৰ্ম্মদাসকে দেখিবে পাইয়া
হা খুলিলেন। পরে কুলি ডাকিয়া জিনিষপত্র মাের লইয়া
যাইতে হুকুম করিলেন।
ধৰ্ম্মদাসের চেহারা দেখিয়া তাহারা কিছু জিজ্ঞসা করিতে
ইতস্ততঃ করিতেছেন বুঝিয়া তিনি সংক্ষেপে অব টা জানাইয়া
দিলেন। তখন উভয়েই প্যান্টের উভয় পকের হস্ত প্রবেশ
করাইয়া চেত্তা-খাইয়া উৎসাহের সহিত তাহার করে অনুমােদন
ও তাহার “কম-সেন্স” ও “মরেল কারেজের” ভূয়ী প্রশংসা করিয়া
বলিলেন, “কোন্ বুদ্ধিমান স্ত্রী-পুত্রকে যমের মুখে রেখে এই
বিংশ শতাব্দীতে একটা অর্থহীন প্রাচীন প্রথার দোহাই দিয়ে
নিশ্চিন্ত থাকতে পারে !” ইত্যাদি, ইত্যাদি।
ব্যারিষ্টার ও উকীল-বন্ধুর রায় পাইয়া এতক্ষণে এটর্নি
ধৰ্মদাসের ধোকা মিটিল ও বদনমণ্ডল প্রফুজ হইল। চপলারও
আড়ষ্টভাবটা কেটে গেল। তখন তিনজনে সিগারেট ধরাইয়া,
সকলে মােটরে গিয়া উঠিলেন।
বােধ হয়, ধর্মদাস পথের-ধূলা পথেই ঝায়ো ফেলিয়া প্রসন্ন
চিত্তে তাহার চৌরঙ্গী-হাউসে পৌছিতে পারছিলেন।

অন্নপূর্ণা ১১৭ ৮ বসন্তের গুটি গুলি যখন বিশ্বনাথের গৌর-কান্তিতে মসীলিপ্ত করিয়া ভীষণতর হইয়া উঠিল এবং সকলের মনে আতঙ্কের ছায়াপাত করিয়া ভাবী-বিপদকে আসন্ন করিয়া তুলিল, ডাক্তার- বৈদ্য তান বদনে চিন্তা ও গাম্ভীর্যের দৃশ্য প্রকট করিলেন। সে দিন রাত্রি হইতে ঝি, চাকর ও রাঁধুনীকে আর দেখা গেল না। বাড়ীতে যে দুই তিন ঘর ভাড়াটিয়া ছিল, তাহারাও সকাল হই হই অন্যত্র সরিয়া গেল। বেলা আটটার মধ্যে অতবড় বাড়ীটি যে জনশূন্য ও তাহার নিস্তব্ধতা যেন ভীতিপ্রদ হইয়া উঠিল। রাত্রিটা খই দুশ্চিন্তায় ও অনিদ্রায় কাটায় কর্তা ভােরবেলা ঘুমাইয়া পড়ি ছিলেন। প্রাতে উঠিয়া আফিং ১ চা খাওয়া তাহার অভ্যাস। আজ বেলা আটটায় উঠিয়া কোন ব্যবস্থা দেখিয়া, ঝি-চাকরকে ডাকিলেন। কোন উত্তর না আসায় একেবারে সরােষে সপ্তমে হাঁক দিলেন। ব্ৰহ্মাণী:দেবী ছুটিয়া আসিয়া অবস্থাটা জানাইয়া দিলেন। ভৈরব রায়চৌধুরী বেজায় রাশভারী জমিদার, তাহার দাপটে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়। অন্যান্য সাতখানা গ্রামের জমিদাররা তাহার কাছে প্রজা-উচ্ছেদের পরামর্শ লইতে আসেন। আজ বিদেশে ওপদে তাহার এই অবস্থা! ধর্মদাস দুইখানা টেলিগ্রাফ করিয়া কু, তাহার উত্তর পর্যন্ত দেন নাই। সকালে পাথেয় লাকটা কে ! তিন-পপ মাছ ও রাত্রিতে পাঁচ-পাে মাংস না হইলে তাহার আহারই হয় না। কিন্তু অন্নপূর্ণা এ বাড়ীতে সে সকলের প্রবেশ আজ প্রায় অষ্টাহ বন্ধ করিয়া দিয়াছে,-কেহ একটি কথা কহিতে সাহস পান নাই। কাজেই, কৰ্ত্তার এক প্রকার অনাহারই যাইতেছে। তাহার উপর ঝি, চাকর ও রাঁধুনীর একযােগে এই মন্তান- বার্তা তাহাকে যেন ক্ষিপ্ত করিয়া দিল। তিনি আর-লােচনে চীৎকার করিয়া উঠিলেন, “কি, এতবড় স্পর্ধা, কেউ!র ল্যাজে পা! যে ভৈরব-রায়কে সকলে কালভৈরব বলে, যেমজ পর্যন্ত একটি মামলা হারেনি, তার সঙ্গে বদমায়েসি ! আগুনের সঙ্গে খেলা ! এখানেও দেখিয়ে যাব-ভৈরব-রায় একযােগে এগারশাে টাকা ভেঙ্গে সরে পড়ার বীতে পিনাল কোডের ধারায় হাতে হাতকড়ি-দে ধরি, না আনতে পারি ত-” গৃহিণী তাড়াতাড়ি বাধা দিয়া বলিলেন, “এ বিপদের সময় কাশীতে আর- কৰ্ত্তা উচ্চকণ্ঠেই বলিলেন, “কাশী ফাসী আমি মানিনা, এ-রকম না করলে তােমার ঐ অন্নপূর্ণাও য স’রে যাবেনা, তার প্রমাণ কি ?” কথাটা একেবারে অসঙ্গত নয় ভাবিয়া গৃহিণী শিহরিয়া উঠিলেন, তাহার বুকটা ধড়াস করিয়া উঠিল। তিনি ধীরে ধীরে বলিলেন, “যে এতটা কচ্ছে, যাকে আট দিয়ে ভেতর থেতে-

অন্নপূর্ণা
১১৯
শুতে দেখলুমনা, সে কি”—তিনি আর বলিতে পারিলেননা,
সেরূপ অসহায় অবস্থার কথাটা মুখে আনাও তাহার সামর্থ্যে
কুলাইলনা।
তিনি বলিলেন, “একটু আগে বিশু তােমাকে বলবার জন্যে
আমায় বলছিল, একটি সুপাত্রে যেন অন্নপূর্ণার বিবাহ নিজের
খরচায় দিয় দেন।” বলিতে বলিতে ব্রহ্মাণী দেবী দুই তিনবার
অঞ্চলে চ মুছিলেন।
কথাটা শুনিয়া কৰ্ত্তার একটু পরিবর্তন দেখা দিল, চোখে-মুখে
যেন ঈষৎ গবালাসের আভাস ফুটিয়া উঠিল। তিনি বলিলেন,
“আমার ছেলে নইলে এ বুদ্ধি ক’জনের আসে ! ঐ মেয়েটাকে
আটকাবার ঐই একমাত্র উপায়"
এই সময় fলশ্বনাথের ক্ষীণ কস্বর কাণে আসায় ব্রহ্মাণী দেবী
দ্রুত চলিয়া গেলেন।
সাড়ে আটটা হইয়া গেল, এখনও সম্মুখে চায়ের পেয়ালা
দেখিতে না পাইয়া রায়-মহাশয়ের পূর্ব-প্রকৃতি তখনই ফিরিয়া
আসিল। পুত্রকে দেখার পূৰ্বেই তিনি একখানা চাদর টানিয়া
লইয়া সৰ্ব্বাগ্রে পুলিস ডায়েরী করাইতে অর্থাৎ গােড়া বাঁধিয়া
রাখিতে ছুটিলেন।
অন্নপূর্ণা বাড়ী অবস্থা বুঝিয়া, গৃহিণীর উপর বিশ্বনাথের
ভার দিয়া আজ প্র তুই স্নানে গিয়াছিল। আনন্তে বিশ্বনাথ,
অন্নপূর্ণা ও মা শীত চরণামৃত লইয়া ও বাজার সারিয়া দ্রুত

১২০
পাথেয়
ফিরিতেছিল। কর্তাকে গলির মধ্যে দেখিয়া বলিল, “কোথায়
যাচ্ছেন? আপনার চা না-খেয়ে কোথাও যাওয়া হবেনা,
আসুন।”
কর্তা কি বলিতে যাইতেছিলেন, অন্নপূর্ণ। কিন্তু শুনিবার
অপেক্ষা না করিয়া অগ্রসর হইল,-কৰ্ত্তাও ধীরে ধীরে, অন্নপূর্ণার
অনুসরণ করিলেন।
অন্নপূর্ণা রােগীর কক্ষে প্রবেশ করিয়া যত্নে তার মস্তকে,
কপালে, কণ্ঠে ও বুকে মায়ের-ফুল বুলাইয়া দিয়েই বিশ্বনাথ
“আঃ”—বলিয়া একবার চাহিল।
অন্নপূর্ণা ধীর সস্নেহ স্বরে বলিল—“এই চরণতটুকু খেয়ে-
ফেল ত ভাই।”
রােগী নীরবে তাহাই করিল।
অন্নপূর্ণা রন্ধনশালায় প্রবেশ করিয়া মি!ি পনেরর মধ্যে
সুমার্জিত রেকাবী করিয়া হালুয়া আর কার বিশেষ অর্ডারে
তৈয়ারী রজতনির্মিত একটি তিন-পাে কাছের এক কাপ চাপা-
রঙ্গের সধূম চা আনিয়া ভৈরব রায়ের সম্মুর রাখিয়া বলিল—
“খান, কি রকম হয়েছে জানিনা ; কাল থেকে আপনাকে চা
খাইয়ে নাইতে যাচ্ছিনা। বাড়ীতে কে পুরুষ নেই, বাইরে
যেন বেরুবেননা।” এই বলিয়া অন্নপূর্ণ; রন্ধনশালায় দিকে
দ্রুত চলিয়া গেল।
রায় মহাশয়ের প্রাণের মধ্যে সহস্র বিষয় বিক্ষিপ্তভাবে
উচু-নীচু পর্দায় যাতায়াত করিতেছিল ; মাসে মুহূৰ্ত্তমাত্র বিশ্রাম
;

অন্নপূর্ণ ১২১ ছিলনা। কিন্তু চায়ের পেয়ালায় দৃষ্টি পড়ায় ও তাহার সুগন্ধ নাসারন্ধে, প্রবেশ করায় তদ্দণ্ডেই সকল চিন্তাকে সেই ধূমায়িত চায়ের মধ্যে বিসর্জন দিয়া চা-মুখাে হইয়া পড়িলেন। চায়ের গৌর-কান্তি দেখিয়া চিন্তার দুর্বহ ভার সরিয়া দাঁড়াইল। কাশীতে আসিয়া চায়ের এমন রং ও এরূপ সুঘ্রাণ তিনি একটি বিও উপভােগ করেন নাই। তাহার স্বাদ গ্রহণের জন্য ব্যগ্র হইয়দেড়-পাে হালুয়া নিঃশেষ করিতে তাহার নিমেষমাত্রও লাগিলনা। এক চুমুক চা খাইয়াই “আঃ! বাঁচলুম” বলিয়া আরামে চক্ষু মুদ্রিত করিলেন ও আপনা-আপনিই বলিলেন,- “বেটীর সব পণই আছে, হরে-খানসামাও এমন চা খাওয়াতে পারেনি।” তিনি এত মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে, ধীরে ধীরে স্বাদ গ্রহণ করিতে করিতেশ মিনিটে সবটুকু শেষ করিলেন এবং নিতাই- স্যার চায়ের ক্লাপটা ছােট করিয়া দিয়াছে বলিয়া তাহার উপর রুষ্ট হইলেও বলিলেন, “বেটা বে-ওজর ভরি-পাঁচেক রূপপ সরিয়েছে।” যাহা হউক, চায়। সেই বিপুল বাটিটির মধ্যে তাহার পুলিস- ডায়েরীর সঙ্কল্প ও ডুবিয়া গেল ; মনটাও সঙ্গে সঙ্গে হালকা হইল। বােধ হয় রাধুনী ও চাকর-দাসীর প্রত্যাবর্তনের সহিত পূর্বের সেই ধূসর বর্ণের চায়ের পুনরভিনয় আর ডাকিয়া আনাটা তিনি বুদ্ধিমানের যে বলিয়া মনে করিলেননা। তখন কর্তা। এই উঠিয়া তাওয়া দিয়া তামাক সাজিলেন ও ১২২ পাথেয় আগুন আনিতে রন্ধনশালায় প্রবেশ করিলেন। দেখেন- অন্নপূর্ণা ভাতের ফেন গালিতেছে ও দুইটি উনানে দাল ও তরকারি ফুটিতেছে । তিনি অবাক হইয়। অন্নপূর্ণার মুখের দিকে চাহিয়া ভাবিতে লাগিলেন, “এ অনিন্দ্যসুন্দরী অসীম-কর্মদক্ষা মেয়েটি কে !” অন্নপূর্ণা তাহার দিকে না তাকাইয়াই বলিল-“ছেলেকে দেখে এসেছেন?” ভৈরব-রায় থতমত খাইয়া একটু অপ্রতিভভাবে লিলেন,- “এই তামাকটা খেয়েই যাব ভাবছিলুম মা।” অন্নপূর্ণা পূৰ্ব্বমতই বলিল, “সে কি! সানটা বেজে গেছে, এখনও ছেলেকে দেখেননি! যান নি, কোকে এখানেই থাকু, আমি আগুন তুলে দিয়ে আসব।” কর্তা ধীরে ধীরে কলিকাটি রাখিয়া ফিরলেন, দ্বিরুক্তি করিবার সাহস হইলনা। কারণ, এতক্ষণ শুকে না দেখাটা যে গর্হিত কাজ হইয়াছে, তাহা তিনি বুটি,তছিলেননা এমন নহে; কিন্তু পাকা অহিফেনসেবীরা, সকল প্রকার নড়াচড়ার কাজকে বিষম ঝঞ্চাট বলিয়াই ভাবেন এবং যতটা সম্ভব তাহা এড়াইবার চেষ্টাই পান। এরূপ বাৎসল্যেেত্র তাহা প্রযােজ্য হইলেও অভ্যাসের জড়তা হার মানসি উদ্যমকে বিপুল দেহসঞ্চালনে বাধাই দিতেছিল। তাহার উ র-গিয়া কিরূপ দেখিব”, এ আশঙ্কটাও কম প্রতিবন্ধক করিতেছিলনা। তাই তিনি এই যাই, এইবার যাব’ করিতেলেন। অন্নপূর্ণার অন্নপূর্ণ। কথায় তাহা যেন বাহির হইতে ধাক্কা খাইয়া গতিলাভ করিল। তিনি একেবারে বিশ্বনাথের শয্যাপাশ্বে আসিয়া থামিলেন ও এক টানেই জিজ্ঞাসা করিলেন, “বিশু, আজ কেমন আছ বাবা?” বিশ্বনাথ ধীরে ধীরে চাহিয়া ক্ষীণ কণ্ঠে বলিল, “ভাল আছি।” কিন্তু সে স্বরে পিতার প্রাণ একটুও আশ্বাস পাইল না। সুর তাহারার্মে বিষম একটা মােচড় দিল । নিজেকে সামলাইবার আর পুত্রকে একটু স্বাচ্ছন্দ্য দিবার মত কিছু • পাইয়া বলিলেন, “বাবা বিশু, আমি তােমার ইচ্ছামত পাই অন্নপূর্ণার বিয়ে দিয়ে দেব।” তাঁহার মব ছিল, এই অত্যাবশ্যক কথাটা অন্নপূর্ণার সাক্ষাতে অর্থাৎ হার শ্রুতিগােচরে বলিবেন; কিন্তু এখন আর তাহার সে পাটোরী-বুদ্ধি ছিলনা। পুত্রের অবস্থা ও গৃহিণীর উদাস দৃষ্টি দেখিয়া তিনি বিচলিত হইয়া পড়িয়াছিলেন । অন্নপূর্ণার উৰে হইতেই ব্রহ্মাণী দেবী বলিলেন, “সে কোথায়? সে-ও বু । সরূলো! কি কুক্ষণেই যাত্রা করেছিলুম!” এই বলিয়া একটি গভর নিশ্বাস ফেলিলেন। কর্তা কিছু বলির পূর্বেই অন্নপূর্ণা এক-বাটি সাবু লইয়া সেই কক্ষে প্রবেশ ক ল ও কৰ্ত্তার দিকে চাহিয়া বলিল, “যান, -তামাকটা পুড়ে যাও।” পরে ব্রহ্মাণী দেবীর দিকে ফিরিয়া বলিল, “যান, এইবা সব নাওয়া-খাওয়া করে নিন গে, এখানে আমি আছি। দিদি আজ একাদশী, আমি আর এখন নড়চি- । যান, আর দে করবেননা।”

১২৪
পাথেয়
if
জলমগ্ন ব্যক্তি হঠাৎ যেন অবলম্বন পাইল। চক্ষু দুইটি
অশ্রুসিক্ত হইয়া ব্ৰহ্মাণী দেবীর উদাস ভাবটা ধুইয়া গেল। তিনি
সস্নেহে অন্নপূর্ণাকে বলিলেন,-“তুমি খাবেনা, মা?”
অন্নপূর্ণ। বিশ্বনাথের দিকে অগ্রসর হইতে হইতে বলিল,
“আমি সব সেরে এসেছি, আপনারা যান, অনেক বেলা হয়েছে,
—অমনি একটু গড়িয়ে নেবেন।”
কক্ষের বাহিরে আসিয়া ব্ৰহ্মাণী বলিলেন, “ মেয়েটা মারা
গেল!”
কৰ্ত্তা কাতর কণ্ঠে বলিলেন, “ওকে একটু বিশ্রাম দেবার
মত লােক আমার আর কে আছে!” বলিরে বলিতে তাহার
মরুশুষ্ক রক্তচক্ষুর বহ্নিজ্যোতিঃ সহসা অশ্রুধারায়নবিয়া গেল।
উভয়ে রন্ধনশালার দ্বারে আসিয়া দেখি নি,-যেন লক্ষ্মী-
পূজার ঘর-ঝরঝর তকৃত করিতেছে ; সেনগুলি ঝক্ঝক্‌
করিতেছে। অন্নপূর্ণা রন্ধন সমাপ্ত করিয়া অসন পাতিয়া জলের
গ্লাস্ ঢাকিয়া সবই পরিপাটিভাবে রাখিয়া আছে। দুগ্ধ নিবন্ত
উনানে বসানাে আছে ; ঘৃত, লবণ, দধি, lি ন আসনের সন্নিকটেই
A
রক্ষিত।
এতটা বিপদ ও বিপন্নতার মধ্যে এই শৃঙ্খল পারিপাট্য ও
পবিত্রতাব্যঞ্জক পরিচ্ছন্নতা দেখিয়া ব্রহ্মা দেবী উচ্ছ্বাস দমন
পূৰ্ব্বক কেবলমাত্র বলিলেন, “অনেক পপ না থাকলে আর
বড়লােকেরা রাঁধুনী আর ঝি-চাকরের মুখয়ে সেই পাপিষ্ঠিদের
হাতে জ্বলে পুড়ে সারা-জীবন অশান্তিতে টায়না।”

অন্নপূর্ণা পরে স্বামীকে চা খাওয়াইবার জন্য ব্যস্ত হওয়ায়, কর্তার নিকট চায়ের বিবরণ ও প্রশংসা শুনিয়া ব্ৰহ্মণী দেবী নিশ্চিন্ত হইলেন এবং এই দুদ্দিনেও একটু আনন্দের হাসি তাহার মুখে যেন দেখা দিয়া গেল। কি একটা কথাও তাঁহার মুখে অনুচ্চারিতই রহিয়া গেল, এইটুকুমাত্র বাহির হইল—“গরীবের মেয়ে না হ'ল—” ভব আরও তিন দিন কাটিয়া গিয়াছে। রাধুনী বা চাকর-দাসীর অভাব কেহই অনুভব করেন নাই, রােগীর সেবারও কোন ত্রুটি হয় নাই। কিন্তু রােগীর অবস্থা উত্তরােত্তর শঙ্কাজনক হইয়া উঠিয়াছে। গত ত্রিতে রােগী মাঝে মাঝে প্রলাপ বকিয়াছে ; কেবলই মাকে ডাকিয়াছে, অন্নপূর্ণাকে খুঁজিয়াছে। প্রলাপের মধ্যে অন্নপূর্ণার সহিত কথাই অধিক ; কিন্তু তাহা এতই অসংবদ্ধ অস্পষ্ট যে অর্থোপলব্ধি হয় না। মা’র নিকট তাহা সঙ্কটজ্ঞাপক ; অন্নপূর্ণ র মনের কাছে তাহার সবটাই জটিল । কিন্তু তাহার প্রাণের কাছে কি এক নব অনুভূতি যেন শিশির- সিক্ত শিরীষ-কুসুমে তুলি দিয়া তাহার মনের পশ্চাতে অর্থ লিখিতেছে । মা নিৰ্বাক্‌ নি লিভাবে শূন্যে চাহিয়া পুত্রের শয্যাপার্শ্বে বসিয়াছিলেন। উর অরুণাভা দেখা দিতেই তিনি অবনত করিয়া পুত্রেমুখের উপর নিবদ্ধ করিলেন ও দুই তিন পাথেয় মিনিট পরে একটি নাড়ী-ছেড়া নিশ্বাস ফেলিয়া ধীরে ধীরে উঠিয়া দাড়াইলেন। বিশ্বনাথের তৎপূৰ্বেই একটু নিদ্রাকর্ষণ হইয়াছিল। অন্নপূর্ণার দিকে হতাশ-কাতর দৃষ্টিতে ফিরিয়া কম্পিত হস্তে সহসা তাহার হাত দুখানি ধরিয়া বাষ্পরুদ্ধ কঠে ব্ৰহ্মাণী দেবী বলিলেন, “মা, আমি আর দেখতে পারচিনা, আমার বিশ্বকে তোমার হাতে দিলুম, তুমিই ওকে দেখে, ওর সব ভারই তােমর,” বলিতে বলিতে তিনি দ্রুত ঘরের বাহিরে দালানে (সিয়াই যেন ভাঙ্গিয়া পড়িলেন ও ভূমে লুটাইয়া রুদ্ধ ও মৰ্ম্মস্পর্শী কণ্ঠে কঁদিতে লাগিলেন। অন্নপূর্ণা আজ অপেক্ষাকৃত সকাল সকাল 'কল কাজ সারিয়া কৰ্ত্তা-গৃহিণীকে যথাসম্ভব সুস্থ ও আশ্বস্ত রিয়া, দেবদেবীর চরণামৃত আনিয়া রােগীকে খাওয়াইয়াছে ও হার প্রকৃত অবস্থা জানিবার জন্য বেলা ১০টার মধ্যে চার-বৈদ্য ডাকিয়া, তাহাদের অভিমত লইয়াছে। কিন্তু কাহাও কাছে আশ্বাসের কিছু পায় নাই। বিচক্ষণ অভয় কবিরাজও অভয়বাণী শুনাইতে পারেন নাই, কেবলমাত্র বলিয়াছেন, “আজরা-অমাবস্যা, দিনটা বড়ই বিরুদ্ধ। রাত্রির কোন সময় এ বিকা কেটে গিয়ে জ্ঞান আসবে, কিন্তু গুটিগুলির ব’সে যাবার মত লুণ রয়েছে, তা হলে গাত্রদাহ উপস্থিত হবে, সেটা সকাল ৫টা ৬ সম্ভব। ঐ সময়টা উত্তীর্ণ হয়ে গেলে যেন খবর পাই। ভো, তুমি ত সব বােঝ ১২৭ অন্নপূর্ণা -মা’র কৃপায় কিছুই অসম্ভব নয়। শেষ রাত্রিটা খুব সাবধানে থেক না।” অন্নপূর্ণা অভিমত মাত্ৰই লইতেছিল ; ঔষধের মধ্যে দেব- দেবীর চরণামৃতই ব্যবহার করিতেছিল। তাহার দৃঢ় বিশ্বাস, রােগী যদি তাহাতে না পারে, অন্তত তাহার পরকালের কিঞ্চিৎ সাহায্য হইবে, কিন্তু ডাক্তার-বৈদ্যের ঔষধ এ রােগ আরােগ্য করিতে সমর্থ নহে। তবে, আজ একটা অজানা কিছু মাঝে মাঝে অন্নপূর্ণার মৰ্ম্মস্থানটাকে নাড়া দিয়া তাহাকে চঞ্চল করিয়া তুলিয়াছে। কেন যে এমন হইতেছে, তাহাও সে বুঝিতে পারিতেছেনা; অথচ সারাদিন এই গবে চরণামৃত ও ঔষধের সঙ্গে যুঝিয়া সে অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে অপরাহু ৫টা সময় আর সে স্থির থাকিতে পারিলনা; তাড়াতাড়ি চা আর রােগীর কক্ষসম্মুখে একখানি চেয়ার দিয়া ধীরস্বরে কর্তাকে দল, “আপনি এইখানে বসে চা খান, আমি একবার মন্দিরে যাচ্ছি, আমার ফিরতে দেরী হবেনা।” কর্তা যন্ত্রচালিত তাহাই করিলেন । তিনি আজ কয়দিন বিমূঢ়ভাবেই কাটাইলেছিলেন। কাটাই ছিলেন। আছেন কি নাই, তাহা নিজেই বুঝা কঠিন হইত, দি মধ্যে মধ্যে বড়-ছেলে ধৰ্মদাসের উপর ক্রোধ ও অভিমান তসিয়া তাহা জানাইয়া না দিত। ব্ৰহ্মাণী দেবী জজ আর পুত্রের ঘরের দিকে পা বাড়াইতে পারেন নাই। কখন অন্নপূর্ণার দিদিমার কাছে, কখন কর্তার ১২৮ পাথেয় কাছে, কখন একান্তে ফিরিতেছেন, কখনও বা শুইয়া পড়িতেছেন, কোথাও স্থির থাকিতে পারিতেছেননা। ছিন্ন নাড়ীর অছিন্ন প্রাণসূত্র তাঁহাকে অধীর করিয়া তুলিয়াছে, “কি জানি--কি দেখিব”, এই শঙ্কাই তাহাকে দূরে দূরে রাখিয়াছে। অথচ সেই পরিমাণে অন্নপূর্ণাকে দেখিবার, তাহাকে নিকটে পাইবার ইচ্ছা প্রবলভাবে উপস্থিত হইতেছে। কিন্তু সে-ই ত আজ বাড়ীর প্রাণশক্তি, তাহার অপেক্ষা আপনার কে আছে। বিশুর ভার যে তাহারই,তাই তাহাকে ডাকিতে পারিতেছেননা, ছটফট করিতেছেন। বিশ্বনাথ, অন্নপূর্ণা ও শীতলার মন্দিরে গিয়া ত্বপূর্ণা সাননে পরম অপরাধীর মত নিজের দুর্বলতার জন্য ক্ষমা চাহিয়া সন্দেহান্দোলিত অবসন্ন প্রাণে বলসঞ্চয় করিয়া পুনরায় চরণামৃত ও নিৰ্ম্মাল্য লইয়া ফিরিয়াছে। প্রাণে প্রবল উচ্ছা-মণিকর্ণিকায় গিয়া ভৈরবী-মায়ের আশীষ লইয়া আইনে কিন্তু গঙ্গাতীরস্থ শীতল-মন্দির হইতে মণিকর্ণিকার দিকে হিতেই—প্রজ্বলিত চিতা দেখিয়া তাহার আপাদমস্তক শিা:রিয়া উঠিল, বদন নিমেষে পাংশুবর্ণ হইয়া গেল ! অন্নপূর্ণাক্ষু মুদ্রিত করিল ও উদ্দেশে তাহার ভৈরবী-মা’কে প্রণাম করিয় ধীরে ধীরে বাড়ী ফিরিল। যে মণিকর্ণিকা তাহার নিত্যকার বিচরণক্ষত্র, যে মহাশ্মশানে অসহায়ের সঙ্গিরূপে সে কতবার গিয়াছে যে-চিতার নিকট সে

অন্নপূর্ণা
১২
ইহ-পরকালের ইঙ্গিত পাইয়া এই বয়সেই জীবনের ধারা নির্ণয়
করিয়াছে, আজ সেই চিত। দর্শনে সে ভয় পায় কেন?
এই সব তােলাপাড়া করিতে করিতে সে বাড়ী আসিল ;
আসিয়াই মায়ের চরণ হইতে গৃহীত মাল্য রােগীকে পরাইয়া
দিয়া তাহার সর্বাঙ্গে চরণামৃত ছড়াইয়া দিল এবং চক্ষুতে ও মুখে
স্পর্শ করাইল। পরে কর্তা ও গৃহিণীকে আশাব্যঞ্জক বাক্যে
কিছু জলযােগ করাইয়া শয়ন করিতে বলিল ও স্বয়ং আসিয়া
রােগীর শয্যাপাশ্বে বসিল। মুহূর্তেই তাহাকে যেন ধ্যানমগ্না
দেবী-প্রতিমার মত দেখাইল, তাহাতে যেন ভয়-ভাবনার ছায়া-
মাত্র নাই। আমরা পূর্বে যে স্বভাব-চঞ্চল শিশু-সরল মেয়েটিকে
দেখিয়াছিলাম, এ যেন সে-অন্নপূর্ণা নহে !
রাত্রি ১১টা সময় রােগী সহসা “মা” বলিয়া ডাকিল।
অন্নপূর্ণা শাম্বরে লিল—তাকে ও-ঘরে একটু শুতে বলেছি,
ডাকবাে?”
বিশ্ব। না, তা থাক। একটু জল
অন্নপূর্ণা একটু ষদুষ্ণ দুধ আর জল আনিয়া বলিল—
“দু-ঢােক দুধ খেয়ে জল খান” ; এই বলিয়া দুগ্ধ ও জল পান
করাইল।
বিশ্ব। আমি স্বপ্ন দেখছিলুম? তুমি কি স্বপ্ন বিশ্বাস
কর?
অন্ন। (সভয়ে }ক স্বপ্ন।
বিশ্ব। আমাকে যেন মালা পরিয়ে দিলে।
9

পাথেয়
শুনেছি,
অন্ন।
বিশ্ব। বল দিকি কে ?
অন্নপূর্ণার দুই গণ্ড রক্তবর্ণ হইয়া উঠিল ; সে তাড়াতাড়ি
বলিল,-“আপনার বেশী কথা কবার মত শরীর নয় ।
দুর্বল হলে ও-রকম দেখে।”
বিশ্ব। আমাকে পাঁচটা মিনিট কথা কইতে দাও অনু।
আমি তােমার নিষেধ অমান্য করতে পারবনা।
অন্ন। বলুন।
বিশ্ব। তােমার বই দুখানা আমি পড়েছি।
অন্ন। কি বই ?
বিশ্ব। “কাশীখণ্ড” আর “বেহুলা”,-তুমি যা আমার
বিছানায় ফেলে গিয়েছিলে।
সহসা রােগীর এতটা জ্ঞান আর সাৰ্থ ফিরিয়া আসায়
অন্নপূর্ণা বড়ই ভয় পাইল।
সে বলিল-“সে কথা আমার মনে
নেই।”
বিশ্ব।
তােমার কথায় আমার বিশ্বাস আছে, তুমি
ঠিক করে বল—কাশীতে যার মৃত্যু হয়, সে নির্বাণমুক্তি
লাভ করে, তার আর জন্ম হয়না ;- কথা তুমি
কথা তুমি বিশ্বাস
কর?
শুনিয়া অন্নপূর্ণা চমকিয়া উঠিল এ : সবলে নিজেকে দমন
করিয়া বলিল,-“ও-সব কঠিন কথা ভাবার মত অবস্থা এখন
আপনার নয় ; নিষেধও আছে।”
;

অন্নপূর্ণ। ১৩১ অন্ন। বিশ্ব। আমি কেবল শুনব। অন্ন। শুনলেই ভাবতে হয়। বিশ্ব। আমি তােমার কথায় বিশ্বাস করব । তবে শিব-বাক্যে অবিশ্বাস করবেন না । বিশ্ব। যদি অন্যের কথা হয় - অন্ন। মুনি-ঋষির কথা হলেও তারাই বা মিছে কথা লিখবেন কেন ? ওটাকে মিথ্যা ভাবাটাই আমি অপরাধ বলে মনে করি। বিশ্ব। তবে আমি কাশীতে মরতে পারবনা। ( একটু নীরব থাকিয়া) আমাকে কেউ বাঁচাতে পারেনা ? বেহুলা তার স্বামীকে বাঁচিয়েছিল- একটা বুকভাঙ্গা বেদনা অন্নপূর্ণাকে অধীর করিয়া তুলিল। সে মনে মনে বলি র—“আমি বেহুলার চরণ-রেণুর তুল্যা নই, তার চরণে সহস্রবার প্রণাম করি, তিনি কৃপা করে আমায় সেই শক্তি দিন।” পরে নিজেকে দৃঢ়বলে সংযত করিয়া বলিল—“কি হয়েছে যে আপনি ওসব কথা ভাবছেন? দেবতায় অবিশ্বাস করতে নেই। পাঁচ মিনিট অনেকক্ষণ হয়ে গেছে।” রােগী একটু ধান-হাসির রেখা টানিয়া, একটি গভীর নিশ্বাসের সহিত কষ্টে পাশ ফিরিল ও নীরব হইল। সেই সঙ্গে অন্নপূর্ণার হৃদয় যেন বল বাতাবিক্ষুব্ধ তরঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাতে অস্থির হইয়া উঠিল। প্রকাশ্যে সে প্রস্তরপ্রতিমার মত বসিয়া ১৩২ পাথেয় যেন যন্ত্রচালিত হন্তে রােগীকে ধীরে ধীরে বাতাস করিতে লাগিল; কিন্তু রুদ্ধমুখ আগ্নেয়গিরি তাহার ভিতরটায় বিষম উৎপাত আরম্ভ করিয়া দিল। রাত্রি দুইটার পর যেন স্বপ্নবিলভাবে রােগী হঠাৎ বলিয়া উঠিল, “কেবল তুমিই পারতে অনু।” অন্নপূর্ণার সংযমের বাঁধ শতধা ভগ্ন হইয়া গেল, সে রােগীর শয্যায় মুখ জিয়া, আকুল রুদ্ধ কণ্ঠে বলিল, “ওগাে, আমি কি করে পারি, তা বলে দাও!” অভয় ঘণ্টাখানেক পরে রােগীর গাত্রদাহ আরম্ভ হইয়াছে। কবিরাজের কথা স্মরণ করিয়া অন্নপূর্ণার সমস্ত রক্ত জল হইয়া গিয়ছে, সমগ্র শক্তি লােপ পাইয়াছে, বুদ্ধিও আর স্থির থাকিতেছেনা। যেন অবনতমুখী শুধু শ্বেতপদ্ম জ্যোতিহীন- পাণ্ডুর। সে বিচলিত চাঞ্চল্যে চরণামৃতসিক্ত করবীর পূষ্পগুচ্ছ রােগীর সঙ্গে কম্পিত হস্তে সঞ্চালন কতিছে,-আর প্রাণ তাহার আকুল প্রার্থনা বিদ্যুদবেগে অন্তৰ্য্যামার চরণে বহন করিয়া চলিয়াছে। রােগী গাত্রদাহে অস্থির হইয়া অন্নপূর্ণা দেবতার চরণপৃক্ত মাল্য সহসা আচম্বিতে কণ্ঠ হইতে খুলিয়া ছুডয়া ফেলিয়া দিল। দেবতার নিষ্ঠুর পরিহাসের মত তাহা অন্নপূর্ণার কণ্ঠ জড়াইয়া সে চমকিয়া শিহরিয়া উঠিল ; তাহার হস্ত স্থির হইয়া গেল। ব্রহ্মাণ্ড যেন তাহার চক্ষুর সম্মুখে ওলট-পালট হইয়া ধরিল। ;

অন্নপূর্ণা গেল। সে সবলে উঠিয়া দাড়াইল ও ধীর স্পষ্ট কণ্ঠে রােগীকে বলিল, “তুমি অধীর হয়ােনা, একটু সহ্য করে থাক, আমি এখনই আসব। মা’কে ডেকে দি, ততক্ষণ তিনি এখানে একটু বসুন। তােমার কষ্ট দেখলে কিন্তু তিনি বসতে পারবেননা।” উদ্বিগ্ন কাতরতার সহিত রােগী বলিল, “না অনু, তা হবেনা, এখন আর কোথাও যেওনা, এখন আর আমাকে ছেড়ে যেও । পরজন্মেও আমি বঞ্চিত। এ জন্মের শেষ মুহূর্তটি আমার সার্থক কর।” বলিতে বলিতে বিশ্বনাথের কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়া আসিল, তাহার দুই চক্ষু অনর্গল অশ্রুপ্রবাহে ভাসিয়া গেল। অন্নপূর্ণা আর পারিলনা, আজ সে প্রথম কাদিল—“ওগাে, তােমার দুটি পায়ে পড়ি, আমায় বারণ করােনা, একবারটি আমায় যেতে অনুমতি দাও।-মা কখনই এমন হতে দেবেন- !” রােগী নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “তবে যাও, আমি তােমার অপেক্ষা করব।” বলিয়া ওপাশ ফিরিল । অন্নপূর্ণা সত্বর নিজের অঞ্চলে রােগীর অশ্রুপ্লাবিত চক্ষু মুছিয়া দিল, পরে তাহার অংক্ষ্যে অঞ্চলটি গলায় দিয়া ধীর শান্তভাবে প্রণাম করিয়া তাহার পদধূলি মাথায় লইল ও মনে মনে বলিল, “মা আমার করুণাময়ী, বাবা আমার মঙ্গলময়, এ-কথায় যদি আমার কখনও না অবিশ্বাস এসে থাকে, ত তারা আমায় ভিক্ষা দিতে বিমুখ হবেননা।” অন্নপূর্ণা কক্ষান্তরে গিয়া কর্তা ও গৃহিণীকে রােগীর নিকট ১৩৪ পাথেয় কিছুক্ষণের জন্য বসিতে বলিল এবং স্বয়ং গাত্রদাহের প্রতীকারের জন্য যাইতেছে বলিয়া দ্রুত বাটী হইতে বাহির হইয়া গেল। সন্তানের নিকট মা থাকিলে কোনরূপ অনিষ্টের আশঙ্কা থাকে- না, কাহারাে তাহার উপর অধিকার থাকেনা। এই কথায় ব্ৰহ্মাণী দেবীকে প্রবুদ্ধ করিতে পারিয়াছিল। বিশ্বাসের দৃঢ়তা ও আশা অন্নপূর্ণাকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল, কিন্তু অনাহার, জাগরণ ও দুর্ভাবনা তাহার দেহকে একেবারেই দুৰ্বল করিয়া দিয়াছিল। চৌষট্টি-যােগিনী ঘাটের সংখ্যাধিক অসম-সােপানগুলি কোন প্রকারে নামিয়া তাহার চরণদ্বয় অবশ হইয়া গেল, মাথা ঘুরিতে লাগিল, চক্ষু অন্ধকার দেখিল, সে বসিয়া পড়িল। যে উদ্দাম আবেগ তাহাকে অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার ভেদ করিয়া এই গভীর নিশীথে এত দুর টানিয়া আনিয়াছিল, তাহা যেন সহসা অন্তর্হিত হইল। অন্নপূর্ণা নিবলম্ব-নিমজ্জিতের ন্যায় একেবারে অন্তিম হতাশায় কঁদিয়া উঠিল, “মা , আমি যে তােমার কাছে যেতে পারলুমনা; ওগাে, আমি যে তাকে বলে এসেছি।” সেই আর্তস্বর ভাগীরথীর আর্দ্র বক্ষে লুটাপুটি খাইতে লাগিল। “কে গা–কি হয়েছে” বলিতে বলিতে একটি রমণী দ্রুত সেইখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। অন্নপূর্ণা । আমি যে আর উঠতে পারছিনা। আমি কি করলুম-

অন্নপূর্ণা
১৩৫
সে তাহার
“কে—অনু-মা নাকি! কি হয়েছে মা, পড়ে গেলি নাকি?”
এই বলিয়া সেই রমণী অন্নপূর্ণার পৃষ্ঠে সস্নেহে হস্ত স্পর্শ করিলেন.
ভৈরবী-মার স্নেহ-স্পর্শে অন্নপূর্ণার রুদ্ধ হৃদয়াবেগউইলিয়া
উঠিল, কিন্তু প্রকাশের ভাষা সে খুঁজিয়া পাইলনা।
চরণে নিজের শীর্ণ দেহখানি ঢালিয়া দিয়া কেবল ফুলিয়া ফুলিয়া
কঁদিতে লাগিল।
এই অদ্ভুত মেয়েটিকে কেহ কখনও কাদিতে দেখে নাই,
চির-হাস্যময়ীই দেখিয়াছে। তাই ভৈরবী-মাও আশ্চর্য্য হইলেন
এবং সস্নেহে তাহার গায়ে হাত বুলাইতে লাগিলেন ।
আবেগটা একটু কমিলে তিনি অন্নপূর্ণার কাছে সংক্ষেপে
সকল কথাই শুনিয়া লইলেন ও বলিলেন, “এত বড় বিপদের
মধ্যে মাথা গলালি, একবার জানতেও দিলিনি! ভাগ্যি একবার
হরিশ্চন্দ্র-শ্মশানে যাবার ইচ্ছে হ’ল, তাই না দেখা হল।”
অন্নপূর্ণা ধীরে মুখ তুলিয়া কাতর কণ্ঠে বলিল, “মা, আমি
যাবার জন্যে ছট করছিলুম, সময় পাচ্ছিলুমনা। সে-দিন
যাব ব'লে ও-দিন চাইতেই জলন্ত চিতা দেখে কেমন হয়ে
গেলুম,”—বলিতে বলিতে তাহার আপাদমস্তক সজোরে শিহরিয়া
নড়িয়া উঠিল ;
ভৈরবী-মা সেই সঙ্গেই বলিয়া উঠিলেন, “ও কি অনু, তাের
ত কখন ভয় দেখিনি।”
অন্নপূর্ণা উপুড় লইয়া অরুদ্ধ কণ্ঠে বলিল, “জানিনা মা,
এ আমার কেন হ’ল, আমি ত কখন এ-সব ভাবিনি। তবে

পাথেয় কেন তিনি আমার অজানার মধ্যে দিয়ে এ সঙ্কট রচনা করলেন । মা, তুমি আমায় রক্ষা কর, আর যে আমি পারছিনা ।” ভৈরবী। ওতে আর নূতন কি হয়েছে মা! তুই যে মা হয়ে জন্মেছি। চল একবার দেখে আসি, ওঠ। এই বলিয়া অন্নপূর্ণাকে তুলিয়া বক্ষসংলগ্ন করিয়া ভৈরবী চুম্বন করিলেন ও তাহাকে লইয়া অগ্রসর হইলেন । সিড়িতে উঠিতে উঠিতে অন্নপূর্ণা শুনিল, রুদ্ধ গম্ভীর রোদনের স্বরে কর্তা বলিতেছেন, “আমি সেই ভৈরব-রায়,আজ আমার কেউ নেই।” রাত্রির নিস্তব্ধতার মধ্যে সে স্বর যেন পাষাণ ভেদ করিয়া বাহির হইল। অন্নপূর্ণার বুক কঁপিয়া উঠিল। ভৈরবী-মা তাহা বুঝিতে পারিয়া বলিলেন, “ভয় কি !” সা পাইয়া দালান হইতেই সে অপরাধীর মত কক্ষে প্রবেশ করিতে করিতে বলিল, *কেন বাবা, আমার কি বড় বেশী দেরী হয়ে গেছে ? আমি-” অন্নপূর্ণার কথা সমাপ্ত না হইতেই কর্তা ও গৃহিণী রােদন- কাতর কণ্ঠে কি বলিতে গিয়া তাহা অৰ্দ্ধোচ্চারিত রাখিয়াই সহসা নিৰ্বাক হইলেন। দ্বারদেশে দৃষ্টি পড়িতেই গৈরিকধারিণী গৌরবর্ণা উন্নত শান্তমূর্তি দেখিয়া উভয়েই স্তব্ধ হইয়া গেলেন। ভৈরবী-মা কোনো দিকে না চাহিয়া রােগীর শয্যা পার্শ্বে গিয়া অন্নপূর্ণা ভৈরবী-মা স্নেহমধুর দাড়াইলেন, অনুপূর্ণা তাহার পশ্চাতে রহিল । রােগী তখন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে যুঝিয়া অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে । ভৈরবী-মা শয্যাপাশ্বে বসিয়া রােগীর মাথায় হাত বুলাইতেই রােগী স্বস্তি বােধ করিয়া “আ” বলিয়া ধীরে ধীরে চাহিয়াই শিহরিয়া চক্ষু বুজিল। কণ্ঠে বলিলেন, “ভয় কি বাবা, যাতনা কি খুব বেশী বােধ কচ্ছ ?” শীতল স্নেহ-বাক্যে রােগী পুনরায় চাহিল ; একটা ব্যর্থ চেষ্টা পাইয়া ক্ষীণ কণ্ঠে বলিল, “হাত তুলতে পারছিনা মা।” তাহার মনােগত ভাব বুঝিতে পারিয়া ভৈরবী-মা বলিলেন, “আমি অমনিই আশীৰ্বাদ করছি, তুমি ভাল হও।” বিশ্বনাথ ক্ষীণ নিশ্বাসের সহিত বলিল, “মৃত্যু আমার সর্ব- শরীরে উপস্থিত হয়েছে মা,” পরে অস্ফুট হতাশ স্বরে “ভয় কেবল মুক্তির” বলিতে বলিতে অন্নপূর্ণার দিকে দৃষ্টি পড়িল ; মুখে একটু ম্লান হাসি আবার প্রয়াসেই চক্ষু আর্দ্র হইয়া গেল। ভৈরবী-মা সস্নেহে বলিলেন, “পাগল ছেলে, কিছুরই ভয় নেই বাবা, ভয় কেবল জন্মের।” পরে নিজের কণ্ঠ হইতে একগাছি মালা খুলিয়া, তন্মধ্যস্থ বিশেষ একটি ফল অন্নপূর্ণাকে দেখাইয়া বলিলেন, “এই ফলটি গঙ্গাজল দিয়ে পাথরবাটিতে একটু ঘষে নিয়ে এস ত মা। দু’মিনিটের বেশী ঘষােনা, পরে জল একটু বেশী মিশিয়ে এনাে।”

১৩
পাথেয়
•
অন্নপূর্ণা কম্পিত হস্তে মালাগাছটি লইয়া যন্ত্রের মত চলিয়া
গেল। সে ফিরিলে ভৈরবী-মা স্বয়ং সেই জল রােগীকে খাওয়াইয়া
দিলেন ; অবশিষ্ট জলটুকু দিয়া অন্নপূর্ণাকে রােগীর সৰ্বাঙ্গ সিক্ত
করিয়া দিতে বলিলেন।
মিনিট পাঁচেক পরে ভৈরবী-মা রােগীকে জিজ্ঞাসা করিলেন,
“এখন কেমন বোধ কচ্চ বাবা ?”
বিশ্বনাথ বলিল, “গায়ের আল আর টের পাচ্ছিনা মা,
কেবল ঘুম পাচ্ছে।”
ভৈরবী-মা হাসিতে হাসিতে বলিলেন,-সেই বেলা ১০টার
পর ঘুম ভাঙ্গবে।”
পরে কৰ্ত্তা-গৃহিণীর দিকে চাহিয়া বলিলেন, “ভয়ের কিছু
নেই, তােমর শােও গে। অনু, এই ঘরের মেজেয় একটু গড়া।
তিন দিন পরে মা’র পূজা দিয়ে নাইয়ে দিও; আমিও সে দিন
আসব, বাকি ওষুধটা দিয়ে যাব।” এই বলিয়া হাসিতে হাসিতে
দ্রুত চলিয়া গেলেন। নীচে তাহার কণ্ঠস্বর, “না গেল, “দোরটা
দিয়ে নে অনু।”
বােগান্তে বিশ্বনাথ আজ স্নান করিয়াছে; কিন্তু বাপ-মা’র
মন এখনও চিন্তামুক্ত নহে, কারণ, ভৈরবী-মা অপর একটি ঔষধের
কথা বলিয়াছিলেন, এখনও তঁহার দেখা নাই।
অন্নপূর্ণা সম্পূর্ণ আশ্বস্ত থাকিলেও মাঝে মাঝে তাহাকেও

অন্নপূর্ণ।
অভাবটা যেন স্পর্শ করিয়া যাইতেছে। বিশ্বনাথও কয়েকবার
তাহার খােজ করিয়াছে।
সন্ধ্যা যতই সনিকট হইতে লাগিল, অন্নপূর্ণা ততই চঞ্চল
হইতে লাগিল। নিজে না ভাবিলেও আপনা-আপনি তাহার
মনে হইতেছিল, সন্ধ্যাদীপ জালিয়া একবার ভৈরবী-মা’র কাছে
যায় ; সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু একটা অজ্ঞাত কারণ—লজ্জা, সে
ইচ্ছাটাকে বাধাও দিতেছিল। এইরূপ ইতস্ততঃ করিয়া তাহার
বৈকালবেলাটা কাটিতেছে।
সন্ধ্যার অল্পক্ষণ পরেই—“কোথা গাে, বাবা কেমন ?” বলিয়া
হাস্যমুখে ভৈরবী-মা আসিয়া একেবারে বিশ্বনাথের ঘরে উপস্থিত
হইলেন।
কর্তা-গৃহিণী সত্বর উঠিয়া অবনত হইয়া প্রণাম করিলেন,
বিশ্বনাথ শয্যায় উঠিয়া বসিয়া প্রণাম করিল। ব্ৰহ্মাণী দেবী
তাহার পদধূলি লইয়া পুত্রের মাথায় ও সর্বাঙ্গে দিলেন। উভয়েই
তাহার কৃপা সম্ব। যথােচিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশে উদ্যম করিতেই
ভৈরবী-মা সহাস্যে বলিলেন, “ও-জিনিষটার সবটাই অনুমা’র
প্রাপ্য।”
মা, আমি ত অন্নপূর্ণার হাতেই আমার বিশুকে
দিয়ে রেখেছি ; আমি নিজে
বাধা দিয়া ভৈরবী-মা বলিলেন, “এখন আমি কিন্তু তার ঠিক
উলটোটাই বলি,-বিশ্বনাথের হাতে অন্নপূর্ণাকে দেওয়াটাই
স্বাভাবিক, আর সেইটিই নিয়ম, না?”
ব্ৰহ্মাণী ।

১৪০
পাথেয়
ভৈরব-রায় অগ্রসর হইয়া বলিলেন, “মা, তার চেয়ে আমাদের
বড় সৌভাগ্য এখন আমি আর কল্পনাও করতে পারিনা।”
অন্নপূর্ণার মুখমণ্ডল যেন বিদ্যুগতিতে আকর্ণ রক্ত-রাঙা
হইয়া উঠিল। সে ঘরের বাহিরে যাইবার উপক্রম করিতেই
ভৈরবী-মা ডাকিলেন, “অনু, ওষুধটা নিয়ে যা।” অন্নপূর্ণা
নিকটে আসিয়া আনতবদনে দাড়াইল।
ভৈরবী-মা নিজ হস্তের শাখাগুলির মধ্য হইতে দুইগাছি
খুলিয়া স্বয়ং অন্নপূর্ণার কম্পিত করে পরাইতে পরাইতে সহাস্যে
বলিলেন, “এ ওষুধ তােমাকেই ধারণ করতে হয়। পরে গম্ভীর
ভাবে কহিলেন, “এই সাবিত্রী-শাঁখা তােমার আয়তি-চিহ্ন, আর
তােমার স্বামীর রক্ষাকবচ, আজ আমি তােমাকে পরিয়ে দিলুম।
পরে তােমার বাবা এসে শাস্ত্রীয় কাজ শেষ করবেন।”
অন্নপূর্ণা সকলকে আহারাদি করাইয়া, রােগীর পথ্যাদি ঠিক
করিয়া রাখিয়া, ব্রহ্মাণী দেবীকে বলিল, “আ” আপনার। ঐ ঘরে
থাকুন, দিদিমার শরীরটে ভাল নেই, আমি—”
তাহার কথা শেষ করিতে না দিয়া ব্ৰহ্মাণী দেবী বলিলেন,
“আচ্ছা মা, আজ তাই হবে, ১০/১২ দিন ঘুমােওনি, একটু
ঘুমােও গে। কিন্তু কাল থেকে, বিশু আমার ভাল করে সেরে
-ওঠা পর্যন্ত, তােমাতে আমাতে ঐ ঘরেই শােব।”
কতক-বা আনন্দে, কতক-বা অন্নপূর্ণার রূপ-গুণের প্রশংসায়
ও তাহার সেবা-যত্বের আলােচনায়, কতকবা ভৈরবী-মা’র প্রশান্ত

১৪১ অন্নপূর্ণা প্রকৃতি ও তাহার হাস্তবিজড়িত সস্নেহ ব্যবহার বর্ণনায়, আর কতক-বা অন্নপূর্ণার অভাবে পাছে পুত্রের সেবার ত্রুটি ঘটে এই আশঙ্কায় কৰ্ত্তা-গৃহিণী সারারাত এক প্রকার জাগিয়াই কাটাইলেন—কোন কষ্টই অনুভব করিলেননা। প্রভাত হইতে তখনও একটু বিলম্ব আছে। কাশীবাসী কেহ কেহ—“জয় কাশী বিশ্বনাথ”—“জয় বিশ্বনাথ অন্নপূর্ণে” বলিতে বলিতে গঙ্গাস্নানে চলিয়াছে। দেবালয়ে প্রভাত আরতির শঙ্ঘণ্টাধ্বনি শুনা যাইতেছে। স্থানে স্থানে মঠে-মন্দিরে সুললিত সানাই, সুমধুর ভােরাই-রাগিণীর আলাপ তুলিয়া সারা আকাশে-বাতাসে একটা পবিত্র হিল্লোল তুলিয়াছে। প্রভাত-বায়ু যেন শান্তি বর্ষণ করিয়া বেড়াইতেছে। কাশীতে আসিয়া পৰ্যন্ত ভৈরব-রায় এই নির্মল সুপবিত্র ভাবটি এক দিনও লক্ষ্য বা অনুভব করেন নাই। তাহার নিতান্ত গদ্যময়-গঠন হইলেও আজ তিনি অভিভূতের মত তাহা উপভােগ করিতে লাগিলেন। যদিও রাত্রিজাগরণের অবসন্নতায় তিনি ঘন ঘন হাই তুলিভেছলেন এবং ব্রহ্মাণী দেবী তাহ'কে একটু নিদ্রা যাইবার জন্য বার বার অনুরােধ করিতেছিলেন, তিনি কিন্তু অকস্মালব্ধ এই দুর্লভ প্রশান্তি-উপভােগ হইতে নিজেকে বঞ্চিত করিতে পারিতেছিলেননা। অন্নপূর্ণা শেষ রাত্রেই উঠিয়া আসিয়া সকলের অজ্ঞাতেই রায়-মহাশয়ের অবস্থাটা অনুমান করিয়া লইয়াছিল। সে সহসা আমাদের সেই পরিচিত তিন-পাে বাটিটি পূর্ণ করিয়া এক বাটি 982 পাথেয় । সধূম বাদামী-চা, দেবতার দানের মত কৰ্ত্তার সম্মুখে রাখিয়া বলিল,-“রাত্রিতে আপনার বড় কষ্ট গেছে, আজ এক বাটি বেশী খাওয়াই ভাল।” বিস্ময়ে মুহূর্তকাল নিৰ্বাক্ থাকার পর কর্তা-গৃহিণী উভয়ের মুখেই হাসি ফুটিয়া উঠিল। বিশ্বনাথ জাগিয়াছিল, সে-ও হাসিয়া পাশ ফিরিয়া শুইল। কৰ্ত্তা প্রীতিপূর্ণ হাস্যে বলিয়া উঠিলেন, “আঃ, বঁাচালি না। বেটীর যেন সকলের প্রাণের মধ্যে বাসা !” বিশ্বনাথ মনে মনে আবৃত্তি করিল, “ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে।” অন্নপূর্ণা দ্রুত কৰ্ম্মান্তরে চলিয়া গেল। সুরে, ছন্দে, সৌন্দর্য্যে ও চায়ের সুগন্ধে ভৈরব-রায়ের কাছে বিশ্বটা আজ যেন তাহার সুষমার দ্বার খুলিয়া দিল। তিনি চা খাইতে খাইতে ব্রহ্মাণী দেবীকে বলিলেন,-“আশ্চৰ্য্য দেখ, যখন নসিবন-বিবির নাবালক ছেলেদের সেই অত-বড় সাত- হাজার টাকা আয়ের হাটটা কেবল ৭• টাকা কর্জের দায়ে তিন-চালে নিজের করে নিয়েছিলুম, তার ও ত এত বড় লাভ বলে মনে হয়নি, যেমনটি অন্নপূর্ণাকে পেয়ে আজ বােধ করছি।”

দুর্ভিক্ষের দান
১
প্রশান্ত আমার বাল্যবন্ধু।
ব্যারিষ্টার হয়ে বাড়ী ফিরে-
সস্ত্রীক বেড়াতে বেরিয়েছে। কাল আমার বাসায় এসে
পৌঁছেছে। বহুদিন পরে দেখা হওয়ায় উভয়েই যেন সেই
তরুণের কোটায় ফিরে এসেছি। সেই-বয়সের সেই-সব কথা
উল্লেখ করে পােয়ানাে-দিনের স্বাদ উপভােগ করা চলেছে ।
ইতিমধ্যে জীবন-পথে যে-সব কটা দেখা দিয়েছে, তাদের
কথা তাদের ব্যথা কোথায় সরে গেছে ! আনন্দের আর
আয়ােজনের ঘটা পড়ে গেছে—কি বাইরে কি অন্দরে। কথা
আর ফুরায়না।
এখানে অল্প
সকলেই উপস্থিত হয়েছেন—দেবেনবাবু, নীরদবাবু, নৃত্যবাবু
ও শরৎবাবু।
হরকিষণবাবু এই স্থানেরই বাসিন্দা। আমার বাসার
সামনেই পথের ও-পারে তার বাড়ী ও বাগান। বাঙ্গালীর
মতই বাঙ্গলা বলেন, বাঙ্গলা উপন্যাস পড়েন, বাঙ্গালীদের
সঙ্গেই তার ব-দাড়ানাে। খুব মিশুক আর মজলিসী
লােক। চা-বাগানের ম্যানেজার ছিলেন,-শরীর আর
পৃঙ্গালীই থাকেন। আজ রবিবার, প্রায়

১৪৪
পাথেয়
অর্থ দুই বাড়িয়ে বাড়ী এসে বিশ্রামের কাজ নিয়েছেন। ইংরাজী-
কেতাদুরস্ত ভদ্রলােক।
তিনিও উপস্থিত হয়েছেন। বিলাতের কথা পড়েছে।
—প্রশান্ত বক্তা।
বৈঠকে বেশ উৎসাহ উত্তেজনা দেখা
দিয়েছে।
হতভাগ্য আমি,-আমাকে আজও ঘণ্টা দুয়েকের জন্যে
এমন মজলিস ছেড়ে আপিসে যেতে হবে। আপিস নিকটেই
সকলের চা খাওয়া হলে, আমি আপিসের জন্য প্রস্তুত হতে
গেলুম।
মিনিট পনেরাে পরে বাইরে এসে দেখি—তর্কের তুমুল
সংগ্রাম শুরু হয়ে গেছে। প্রশান্ত, হরকিষণবাবু, শরৎবাবু
আর নীরদবাবু,—অপর পক্ষে দেবেনবাবু আর নৃত্যবাবু।
দ্বিতীয় দল যুক্তিতে পেছিয়ে পড়েছেন বটে, কিন্তু দেবেনবাবুর
হাফ-আকড়ায়ের গলা—উচু সুরে সকলকে দাবিয়ে চলেছে।
তার কণ্ঠস্বর সকলেরই সুপরিচিত; তিনি যখন গভীর রাত্রে
পত্নীর সহিত সুমিষ্টালাপ করেন,পথের হােরাওয়ালা হেঁকে
প্রশ্ন করে—“রামে কেয়া ঝামেলা হয়, বাবুজী !”
তর্কের বিষয়টা খুবই গুরু—সাংঘাতিক বলাও চলে,
আমরা সতী বা সতীত্ব বলতে যা বুঝি, সেটা একটা মনগড়া
কখা মাত্র। তার প্রমাণের কোনও রাজপথ নেই।
বস্তুর সঙ্গে কেবল দেহেরই সম্পর্ক, তাকে ধর্মের কোটায়
তুলে ধরে নারীদের লােকলজ্জায় ফেলে নিৰ্মম লােকরা
যে

১৪৫
দুর্ভিক্ষের দান
তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করতাে। আর নারীধম্মের নিসেন
তুলে নিজের জাতের গৌরব গেয়ে বেড়াত। গোড়াদের কাছ
আজও ওটা সেকেলে পচা জামিয়ারের মত বস্তাবন্দী হয়ে
আছে,-ধোপে টেকে
। হ্যা-ভালবাসা, প্রণয়, এ-সব
আবং স্বীকার করি, তাও আজীবন এক সুরে বলে না।
বিলাতে এ-সম্বন্ধে বহু আলােচনা-গবেষণার পর তাই স্ত্রীজাতিকে
যথেষ্ট স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। সখানে 'আমাদের
ঢাক-টাক গুড় - ওড়, নেই। যখন-তখন চুক্তি ভঙ্গ ও হচ্ছে,
মনের মত নিকচন চলছে। সেঁজামিল ন ইত্যাদি
ইত্যাদি দলে-ভরীদের কথা।
দেবেন বাবুর প্রধান অস্ত্র গলা আর পৌরাণিক প্রমাণ।
তিনি বেহুলা নিয়ে লড়ছেন, আর সীতাসাবিত্রার শরণ নিচ্ছেন।
নৃতবাবু বলছেন বিশ্বাসই ধৰ্ম্মের মূল, তর্কে বহু দূর। যাদেব
তা নেই, তাদের কাছে ভগবান পর্যন্ত না থাকতে পারেন।
তঁার থাকা আর থাকাও তাদের দয়া-মরজির উপর নির্ভর
করে। যার মামলায় নথি দেখিয়ে সতীত্ব জিনিষটা উড়িয়ে
দিতে চান, তাঁদের কাছে পরাজয়-স্বীকারই সমীচীন, ইত্যাদি।
বাইরে বেরিয়ে মুস্কিলে পড়ে গেলুম।
উভয় পক্ষই আমার
মত, জানবার জন্যে জেদ ধরলেন। বললুম-“আমি আমার
সতীত্ব রক্ষা করতে চলেছি, তার চেয়ে বড় ধর্থ এখন আর
মাথায় আসবে না, ভাই। তোমাদের চলুক না,এসে
শুনবােখন। কিন্তু সাবধান
10

১৪৬ পাথেয় শরৎবাবু হেসে বললেন-“ওঃ, কার মত চেয়েছ ! উনি যে বেজায় স্ত্রৈ- প্রশান্ত হাসিতে যােগ দিয়ে, আমার দিকে চেয়ে বললে— “বটে, সত্যি না কি, বিজন!” হাসতে হাসতে বেরিয়ে পড়লুম। দশটার মধ্যে ফিরে এসে দেখি, সভাভঙ্গ সভাভঙ্গ হচ্ছে,—সব দাড়িয়ে। দেবেনবাবু বললেন-“আমরাই হারলাম।” বললুম,-“ও-আলােচনা -হেরে থামিয়ে দেওয়াটা: চিত।” আনন্দময়ী সে বছর কিসে এসেছিলেন, সে কথাটা আজ ন: নেই, কিন্তু এ-কথাটা এ-জন্মে ভুলতে পারবনা যে, তার আসার সাড়া পৌছবার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রদেশে ভিক্ষর ভেরী দিকে দিকে লক্ষ কণ্ঠে বিকট রবে বেজে উঠেছিল যার যেটি প্রাণাপেক্ষা বা প্রাণসম প্রিয়, বিপদের সময় সে সেইটিকে নিরাপদ রাখবার চেষ্টা পায়। সে বস্তুটি তােমার- আমার কাছে মূল্যহীন হ'লেও বা অত্যাবশ্যক না হলেও, তার যে সেটি না হলে নয় । চেতলায় চেলােপটীতে একবার আগুন লাগে। অগ্নিদেব যখন বৈদ্যনাথদের চালা দুখানিতে জিহ্বা স্পর্শ করলেন, বৈদ্যনাথের - দুর্ভিক্ষের দান ১৪৭ ম! পাগলিনীর মত চীংকার করে উপায়ের তরে ছুটোছুটি ক বতে লাগলেন। তার যে যথাসর্বস্ব-নারায়ণ, দু'এক খান। গ: না, কাপড়, বিছানা বাসন, সবই ঐ ঘরে । বারাে-বছরের বৈদ্যনাথ বাড়ী ছিলনা। সে হাপাতে হাপাতে ছুটে এসে মাকে তদবস্থা দেখে বললে, “$ে১ানি, চুপ কর, দ্যাখনা আমি এক মিনিটে সব বার-ক'রে আনছি।” মা তাকে ধরে রাখতে পারলেননা -“ওগাে, 'আমার সব গেল” বলে অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। বৈদ্যনাথ কিন্তু বারের মত একলাফে তার যথাসর্বস্ব অর্থাৎ ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। লােকের প্রিয়াপ্রিয়ের কি বাধা-ধরা বিধি আছে। আমরা থাকতুম জব্বলপুর ক্যান্টনমেন্টে। এই ক্যান্টনমেন্ট জিনিষটি কোনও একটি বড় জায়গার কাঞ্চনment”-করা স্বতন্ত্র অংশ,—সেনানিবাস। যেখানে দেশ রক্ষার সজীব ও নির্জীব মন্ত্র সকল থাকে, আর তাদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিধানের ব্যবস্থা, আপিস, আদালত, হঁপাতাল, ক্লব, ব্যায়ামভূমি, ক্রীড়া-কৌতুকের স্থান, থিয়েটার, পার্ক ইত্যাদি সব সরঞ্জামই মজুদ থাকে। রুটী, মাখম, মটন, exportএর ( অভিজ্ঞর ) পরীক্ষান্তে তাদের পেটে যায়। সেনাপতি, এঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার প্রভৃতি সাহেব-সুবাের বড় বড় বাংলা, বাগান, বারুদ খান, সবই সেথায় হাজির। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, কোথাও ময়লা জমবার জো-টি নেই, Health officer দুবেলা দেখেন। বাজারে পচামাল পাচার হয়না। সংক্রামক রােগ সভয়ে স'রে পড়েন, তুলে

১৪৮
পাথেয়
পা বাড়ালেই সিগ্রিগেস-ব্যাম্পে (Segregation camp-এ)
ভিন্ন-গােয়ালে বন্দী হন।
এর-মাঝেও যদি একটি গােরা-সৈনিক সাধারণ কোন রােগে
অকালে মরে ত হুলস্থুল পড়ে যায়, অষ্টবজ্রের কমিটি বসে,
ব্যারাকের অন্ধিসন্ধি আর চা থেকে মাংস পয্যন্ত পরীক্ষার ধুম
পড়ে যায়, তিন দিস্তে কাগজ কৈফিয়ৎ দিতে খরচ হয়। অর্থাৎ
গােরা মরে কেন এবং মলাে কেন?
কিসের কতি
হয়েছিল,—রাজভােগের ত খুঁং রাখা হয়নি, পাের। তবে ৮০
বছরের আগে মরে কি দুঃখে! মলেই হ’ল ! তাই তার কারণ
বার-করতে আকাশ-পাতাল এক করে ফেলা হয়। সে সময়ে
যমেরও বােধ হয় বেজায় দুশ্চিন্তায় সময় কাটে,-ফিরিয়ে বা
দিতে হয়। ব্যাপারটি এমন কঠিন ।
এই পীঠস্থানগুলির নামই-ক্যান্টমেন্ট।
আমাদের নলের গােপাল ননী খেতেন বটে, কিন্তু এতটা
তােয়াজ তিনি যে পাননি, সে-কথা
এখ-কান বুজে বল।
যায়।
যাক, ওই গােরারাই রাজ্যের সর্বাপেক্ষা প্রিয় এবং মূল্যবান্
আসবাব-বৈদ্যনাথের ঘুড়িলাটাই ! তাই নজরটা ওদের ওপরই
সমধিক। সেটা থাকাও স্বাভাবিক এবং উচিতও। কারণ,
ওরাই জান-মানের রক্ষক। ওদের তরেই ক্যান্টনমেন্ট।
সেই ক্যান্টনমেন্টেই আমরা থাকতুম। আর থাকতো
সরকারী সাঙ্গোপাঙ্গরা (followersরা )—যাদের রসদের ব্যবস্থা

দুর্ভিক্ষের দান
১৪১
সরকারই করে থাকেন, রস মরতে দেননা,-দালরুটীর ত্রুটি
হয়না।
ক্যান্টনমেন্ট গুলো প্রায়ই হয় সহর থেকে কোধিক
তফাতে,-সহরের বদ হাওয়া না সেখানে ধাওয়া করে।
এই সহর গুলি হচ্ছে ভারতের খাসমহল, সাম্যের সনাতন
ভূমি। আগন্তুক মাত্রেই এখানে আশ্রয় পান ;-আকাল, রোগ,
মড়ক সকলকেই “স্বাগত” বলে এখানে গ্রহণ করা হয়। কারুর
বাধা পাবার বালাই নেই।
ছেলে-
রােজই কানে আসতে লাগলাে- অন্নক্লিষ্টের কঙ্কালমূর্তিতে
সহর ভরে গেল, পথে-ঘাটে পা বাড়াবার স্থান নেই।
মেয়েরা ভয়ে বাজার-হাটে বেরােয়না।
আনন্দমঠ পড়ে শিউরে উঠতাম, কখনও ত সে অবস্থা
চোখে দেখিনি। অবতুম, সত্যি এমন হয় না কি! যা হক,
আমরা ক্যান্টনমেন্টে থাকি,-এ নিদারুণ দৃশ্য দেখতে হবেনা।
এ একটা কম স্বস্তির কথা নয়।
হুকুম বেরিয়ে গেছে,চারিদিকে কড়া পাহারা মোতায়েন্-
দুর্ভিক্ষপীড়িত পাখীটিরও ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশপথ রাখা হয়নি।
সে-চেহারা দেখলে কি আর রক্ষা আছে! প্রাণের প্রফুল্লতা,
মনের ঘূৰ্ত্তি, দেহের স্বাস্থ্য এক চাউনিতেই নষ্ট হয়ে যাবে।
সুখের ঘরে এ আপদ আবার কেন !
ক

পাথেয়
“ম্যায় ভুখা ই !”
“থােড়া কুছ খানে দেও, মাঈ-বা?”
“চার রােজ এক দানা নেহি মিলা!”
“বাচ্ছাকে বাঁচাও, মাঈ।”
রাত শেষ হয়েছে, এখন প্রায় চারটে হবে। ঘুম পাতা
হয়ে এসেছিল। আচমকা অস্বাভাবিক করে এই সব আওয়াজে
চমকে উঠলুম। এ কি–ক্যান্টনমেন্টে ! না, তারা নয়। পাহারা
পেরিয়ে আসবে কি করে।
আবার সেই আওয়াজ। কথা বুঝা কঠিন,-একটা
কাতরধ্বনি মাত্র। শুনলে শিউরে উঠতে হয় ।
প্রশান্ত আর আমি বাইরের বৈঠকখানাতেই শুচ্ছিলুম।
দেখি, বালিস থেকে মাথা তুলে শুনছে।
পরক্ষণেই তড়াক করে তার খাট থেকে লাফিয়ে পড়ে
আমার খাটের পাশে হাজির। আমাকে জোরে একটা নাড।
দিয়ে চুপি চুপি জিজ্ঞাসা করলে—“ঘুমূচ্ছ না কি!”
“না,-কেন?”
“এটা কি haunted house? ( ভূতের বাড়ী )
*কে বললে ?”
“কিছু শুনছেন!
“ও বােধ হয়, দু'এক জন দুর্ভিক্ষপীড়িত লােক, অন্ধকারে
ছটকে পাহারা এড়িয়ে এসে পড়ে থাকবে।”

দুর্ভিক্ষের দান
*IIumbug,-আওয়াজটা শুছনা, আর এই গভীর
রাত্রে।”
“গভীর রাত্রি কি হে, চারটে বাজে যে। ঘড়ীটে
দেখনা।”
“দেখেছি,দেশের ধারা ঠিকই বজায় রেখেছ,-এক চুলও
এগােওনি! বিলেত হ'লে অপরাধটার গুরুত্ব বুঝতে পারতে,
ও-রকম একটা ফাদ ( ঘড়ি ) রাখবার মজা টের পেতে। সেখানে
থেকে আমাদের এমন অভ্যাস হয়ে গেছে, ঘুমন্ত বলে দিতে
পারি—সময়টা কত ?
বড় জোর দু'তিন মিনিটের তফাৎ
“এখন তা হলে ক'টা?”
“Quarter to tw০র বেশী নয় (পৌনে দুটোর বেশী নয় )
সে-কথা এখন থাক। ওঠে। দেখি, এদের একবার খোজ
নেওয়া ত দরকার । এতক্ষণ। সব কি করছেন বলা যায়না।”
করবেন আবার কি-বেশ নাক ডাকাচ্ছেন।”
“না না, তামাসা নয়, তুমি ওঁদের thoroughly জাননা,
ফিট-টি হয়ে যেতে পারে—চাই কি হয়েই গেছে, উঠে পড়, উঠে
পড়?”
“তুমিই দেখে এসােনা, তােমার বউদি ত তােমার সঙ্গে
কথা কন।”
“তােমারও একটা duty ( কর্তব্য) আছে
রকম অবস্থায় না গেলে তাকে অপমান করা হবেনা? চল চল।”

পাথেয়
আসল কথা, প্রশান্ত একা যেতে পারছিল না। এই সময়
দেয়ালের পাশেই একটা গোঁগানি শব্দ শুনে সে একদম আমার
ঘাড়ে এসে পড়লো। আমি তাড়াতাড়ি উঠে পড়লুম। বললুম,
সে আমার পাশে পাশে চলে। ঘরে ক্যাম্প জছি,
বাইরে বেরুতেই আলো দেখতে পেয়ে বলে উঠলো-“এ
কি, এর মধ্যে ফুস,--কি দেশ বাবা !”
* এদেশের যেদিকে ১ইবে, (সই দিকেই
পাবে।”
আমার কথায় কাণ না দিয়ে, কথা শেষ না হতেই প্রশান্ত
বললে, “কিন্তু I bet, এটা তোমার haunted house, মাল-র
দেখা মাথায় রইলো, আমি first train-এই ফিরছি।”
আমিও সে-কথায় কান না দিয়ে বললুম--“এদের অবস্থাই
আগে দেখা যাক্ ভাই-iod forbid (ঈশ্বর না করুন।”
“God bless,” বলেই সে একলাফে জানালার সামনে গিয়েই
মুখ ফিরিয়ে দু পা হঠে এসে বললে,-“excuse me আমার
ইস ছিলনা, দুজনেই অসাড়ে ঘুমুচ্ছেন।
তার পরেই চিন্তিতভাবে—“অজ্ঞান হয়েও ত থাকতে পারেন।”
উদ্বিগ্নস্বরে—“সারা—সারা!”
হাসি চেপে তাড়াতাড়ি বললুম, “ঘুমুলে আর কার জ্ঞান
থাকে—কার সাড়া পাবে ! শুনতে পাচ্ছ না, দুটো সুর পাশাপাশি
পাল্লা দিচ্ছে, দুজনে যেন বাহাদুরী-কাঠ চিরছেন !

দুর্ভিক্ষের দান
উৎকর্ণ হয়ে শুনে প্রশান্ত একটা শান্তি নশ্বাস ফেলে
বললে, “Thank God, কিছু নে করেন, বি,--আমাকে
upsct করে ফেলেছিল ! মহিলাদের সম্বন্ধে hil:ctful
হওয়াটা আমি চরম অভদ্রতা বলে মনে করি, ভাই ।"
“তা দেখতে পারি।”
"Now to the danger zone
এই বার বিপদের মুখে )।
ভােল।--ভো, রাসকে, এখন ও ঘুম মার !”
ভােলা চাকরদের কামরা থেকে চোখ গড়তে জাতে
বেরিয়ে এসে বললে-“হুজুর !”
‘য়ার, এই বিপদের উপর আবার এক চোখ দেখান !
দু-চোখ বােজ।-আচ্ছা, হয়েছে। *গীর-—ব শীগগীর,
দ্যাখ”-এই বলে বাঁ হাতের ধ্য। আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ট দিয়ে বাড়া-
বাড়া এক ইঞ্চি দেখিয়ে বললে, “বুঝলি ?”
“আজ্ঞে,-আজ্ঞে, না হুজুর !”
“You checky rasel, দেড় মাসে তোমার মাত্র। জন
২’লন।” এই ব'লে মুসী পাকিয়ে যেতেই ভােলা “বুঝেছি হুজুর”
বলতে বল্‌তে তাড়াতাড়ি ছুটে হুকুম তামিল করে মেজাজ
ঠাণ্ডা করে দিলে।
সুশান্ত এক চুমুক নিয়ে বললে,-“রিভল ভারটা।”
বললুম-“রিভলভার কেন ?”
“কেন ! ব্যাপারটি light ( সহজ ) ভেবােনা। ឬថិ
একটা adventure ( দুঃসাহসিক কাজ )জেনাে।”

১৫৫
পাথেয়
“এটা Non-regulated Provincc, ( মগের মুলুক) সেটাও
জেনাে, রিভলভারের All India (ভারত-জোড়া) Pass
পাস আছে ত?”
ভােলা রিভলভারটা আনতেই প্রশান্ত বললে-* একদম
আমার সুট-কেসের তলায় রেখে দিয়ে আয়,এখুনি—আগে ।”
পরে আমার দিকে চেয়ে বললে—“তুমি ক্ষেপেছ, বিজু,
—আমি কি টোটা রাখি !”
“তবে শুধু শুধু এrisk ( বিপদ বয়ে মরা কেন!”
“তোমরা যে-রকম বীর, শুধু ওর icather cascটা চামড়ার
খাপটা) বার করলেই হাজার লােক হুড়মুড় করে হঠে যাবে, সেটা
স্বীকার কর ত?”
“সেইটিই কি টাটা না রাখবার কারণ?
“কারণ অনেক। একটা কথা মনে রেখো,-তরুণী বা যুবতী
মহিলা ঘরে থাকলে কখনাে অমন ভুলটি করােনা। আমি
ও-জাতটিকে throughly—বিশেষ ভাবে জানি, সামান্য কারণে
ওঁর অসামান্য কাণ্ড করে ফেলেন। যাক্, এন চল, দেখি।”
আমাকেই দোর খুলে আগে বেরুতে হল। পিছন থেকে
খুব মিহি সুরে whisperএর মত “দুর্গা দুর্গা” কানে এলো।
তখনও ঝাপসা ভাব আছে। বাইরে এদিক ওদিক চেয়ে
কিছু দেখতে না পেয়ে প্রশান্ত বললে—“এখনও কি বলতে চাও,
এটা haunted house (ভূতের বাড়ী) নয় ! ভিয়ানা হােটেলে ও
experience (অভিজ্ঞতা) আমার যথেষ্ট হয়ে গেছে, মরতে মরতে

দুর্ভিক্ষের দান
বেঁচে এসেছি। তােমাকে আজই এ বাড়ী বদলাতে হবে,
বিজু। আর এক রাত্তির ও আমি তােমাকে এখানে থাকতে
দিচ্ছিনা?”
রাস্তার ওপারেই হরকিষণবাবুর বাগান। দেখি, তার
ফটকের কাছে বিশ ত্রিশটি ছায়ামুর্তি ;-কেউ দাড়িয়ে, কেউ
ব'সে, কেউ শুয়ে ! বােধ করি, চেঁচাবার আর শক্তি নেই,
এক জন কেবল চি চিঁ ক'রে বার দুই বললে, “তুই খানে দে,
জন চলা যাতা হায়--
প্রশান্ত আমার পেছনেই ছিল, চমকে উঠে আমার কাব ধরে
চুপি চুপি বললে—“শুনলে ! তােমরা ‘রাম রাম’ বলে থাকে।
না !”
চালাকি করে তার রামনাম করে নেওয়াটা শুনে কষ্টে হাসি
চাপতে হ’ল।-হরকিষণবাবুর ফটকের দিকে আঙুল বাড়িয়ে
বললুম-“দেখছনা, আমি যা সন্দেহ করেছিলুম, তাই।”
“বল কি। ভালা, চট করে আমার হাট আর cale,
( বেত)--
ভােলা ভয়ে নড়েনা !
“বেটা, ভয় পেলি না কি ? আমি রয়েছি, ভয় ! এই তাের
দিকে চেয়ে রইলুম-যা,-চ।”
ভােলা খসেনা ।
“বেটা--আমার চাকর হয়ে ভয় ! Shame! কালই দূর
করে দেবাে ! Arrant coward ( হাড়-ভীতু। তােদের রাম

১৫৬ পাথেয় রাম বলতে বলতে যা-না মুখখু। আচ্ছা, এসাে ত বিজু-হাট না হলে হবেনা। —“আমার টোনে Oxford dronc { সায়েবি সুর) থাকায়, -যদি মানুষ হয় তো ছুট মারবেই। তুমি মজা দেখুন??” হ্যাট আনা হয়েছিল ; বলুন- আমি মজা দেখতে চাইনা, ভাই। ওরা মরেই বয়েছে, ওদের আর তাড়াহুড়ো করােনা।” সে তখন তাদের Oxford drone শোনাচ্ছে। তারা ফাণ- ফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে। চক্ষু কোরগত-যেন দূরের তারা। মত জ্বলছে। এক-মাথা ক'রে রুলের বােঝ।-রগের দুপাশ ব’সে গেছে। হর হাড় বেরিয়ে পড়েছে, সবার দাতই বাইরে পেট পিঠ এক, হাত আর আল–মলা চামড়া-কা কঙ্কাল । মানুষের কাটামে। মাত্র। দেখলে ভয়ই হয়, অন্য কোনও ভ'র আসেনা। ০xford droneএ কোনও সাড়া না পেয়ে প্রশান্ত হিন্দি সুরু করলে,-“জডি বাগাে, দি মং করে। জানটা— টোপূখানা হায়--আবি উড়া ডেগা,বাগে ? “খানা”র কথা শুনে কয়েক জন প্রশান্তকে ঘিরে ফেললে- “খানা দেও, সাব,—কুছ থিলাও, সাব।” চেয়ে দেখি, বেশ ফসা হয়েছে, লোেক জমতে শুরু হয়েছে, হরকিষণবাবু উঠে এসে অবাক হয়ে একধারে দাড়িয়ে আছে। বােধ হয়, খবর পেয়ে চি-সাহেব (কোতোয়াল) পাঁচ সাত জন কনষ্টেবল সঙ্গে করে এসে পৌছুলেন ।

দুর্ভিক্ষের দান
প্রশান্ত তখন “হটো : টে।” করছে। চিফ-সাহেবকে দেখে
বললে- “আপনি এসেছেন ভাল হয়েছে, এদের ধ'রে না নিয়ে
গেলে নােড়বেনা। আমাকে ত আগে বার করে দিন্।”
চি-সাহেব বললেন-“ওদের ধরাধরির আর কি আছে,
বাবুজি। ওদের কাছে ঘেবেন্না। আমি ওদের নিয়ে যাবার
উপায় করছি।”
চিফ-সাহেবটি হিন্দু, লােকও ভাল। তিনি কনষ্টবলদের
ইসারা করতেই তারা গুড় আর ভিজে ছোলা এক এক মুটো
দিতে দিতে তাদের নিয়ে চলে।।
প্রশান্ত, Dregspstilence !” বলতে বলতে
ভোল-ভােলা করতে করতে বৈঠকখানায় গিয়ে পৌছল।
হরকিষণবাবু আর আমি ঢুকে দেখি, কার্বলিক -সােপ,
ইউক্যালিপ্ট প্রভৃতি নিয়ে সে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
প্রশান্ত থাকবেন—আজ সে যাবেই। হরকিষণ বাবু নিমন্ত্রণ
করে তাকে আটবলেন।
৪
আমরা চার পাঁচটি উপস্থিত। প্রশান্ত বিলেতের গল্প করছে
—সেখানকার Maidরা (দাসীরা) কি-রকম যত্ন করে, কতটা
interest নেয়, কি সভ্য ! প্রত্যেক movementএ (নড়াচড়ার
ভাব-ভঙ্গিতে) সৌন্দর্য যেন ছড়াতে থাকে, atmosphere
( আবহাওয়া) মধুর হয়ে ওঠে। সেই সুখেই দেশে ফিরতে মন

১৫৮ থে চায়না—ফিরি-ফিরি করেও ছ' মাস কেটে যায় ! Passage money ( কেরবার টাকা) দু’ তিন বার ফুরিয়ে যায়। যাদের হৃদয় আছে, তাদের পক্ষে তাদের সেই করুণ দৃষ্টি আর কাতর অনুনয়-অনুরােধ এড়িয়ে আসা সম্ভব নয়।” ইত্যাদি উত্তেজনা পূর্ণ মিঠে-বর্ণনায় আমাদের সান্ধ্য-সম্মিলন জমে উঠেছে। দেবেনবাবু এসে সংবাদ দিলেন,—“রাস্তাঘাট যে দুর্ভিক্ষ- পীড়িতে দুর্ভেদ্য হয়ে দাড়ালো! ছাউনি ( Cantonment) যে ছেয়ে ফেললে। বড় যে বলছিলেন-কৈ, কোথায় গেল আপনার ক্যান্টনমেন্টের কড়। কায়দা-কানুন!” দেবেনবাবু কথা গুলাে আমাকে লক্ষ্য করেই বললেন। প্রশান্তর অমন উপভোগ্য আলােচনার মাঝখানে দেবেনবাবুর এই সত্য-প্রচারটা মুহূর্তে সকলের উৎসাহ নষ্ট করে দিলে। দেবেনবাবু ছিলেন স্পষ্টবক্তা-prosaic, তাঁর মধ্যে poetryর (পােইটি র) প্রবেশাধিকার ছিলনা। নৃত্যগােপালবাবু বললেন-“দেবেন চোখে কখনও কোন ভাল জিনিষ পড়তে শুনলুমনা।” “ভাল কিছু থাকলে ত পড়বে, নেত্য বাবু! তবে জমিদারী থাকলে, কি বাপের ভাতে থাকলে, অনেক অ-ভালকে ও নিজের রং চড়িয়ে ভাল করে নিতুম। পাঁচ জন পােয্য নিয়ে পঁয়তাশি টাকায় বাজে-খরচ চলেনা। এই ত শুকো-বর্ষা গেল, মাসিক, গুলাে খুললেই দেখি—কবিরা বলছেন- ‘খাল-বিল উথলিয়া উঠে।

দুর্ভিক্ষের দান জল কৈ কোথা রে বাবা ! } আমার চোখে ত খাল-বিল খট খট করে। হ্যা, চাষীদের চোখের জল বটে—উথলিয়া উঠে। তার প্রমাণ ত আর খুঁজে দেখতে হবেনা। প্রমাণ- গুলো সারা দেশময় পায়ে-হেঁটে বেড়াচ্ছে। এই দেখে কি বলতে হবে---‘আহা, কি সুন্দর দৃশ্য--যেন শ্মশানের লম্বা লম্বা পােড়। কাঠগুলো জ্বলন্ত-পেটের প্রদীপ্ত শিখায় পথ আলো করে চলেছে।” শরৎবাবু কড়া করে দাড়িয়ে বলে উঠলেন--“Brav০ ( সাবাস ) দেবেনবাবু, কে বলে ঈশ্বর-গুপ্ত ম'রে গেছেন। ব্যাপ্ত চরাচর।" কথা। সকলেই সহাস্যো সমর্থন করলেন। কেবল নেত্যবাবু বললেন, “আশ্চৰ্য্য করলে শরৎ। শামার ধারণা ছিল, ইনি অক্ষয়-দত্তর অমর আত্মা !” হরকিযণবাবুর আবির্ভাবে আলােচনাট। থেমে গেল। তিনি তার গেষ্ট, { guest প্রশান্তকে নিতে এসেছিলেন। বললুম, দেবেনবাবুর আসল কথাট। ছিল—'ক্যান্টনমেন্টের কড়া পাহারা আকাল-ক্লিষ্টদের আটকাতে পারলে কৈ, তারা যে এক দিনেই ছাউনি ছেয়ে ফেলে। কথাটা কম দুর্ভাবনার নয় । দেখে পৰ্যন্ত বুঝেছি, তাদের আর রুখবে কে, কোন্ শক্তি তাদের বাধা দিতে পারে। প্রাণের চেয়ে প্রিয় কিছুই নেই, তাই যখন তাদের যেতে বসেছে, তখন আর তারা কিসের ভয় রাখে। তাদের মধ্যে চাষী মজুর,

১০
পাথেয়
.
দেহাতি, মধ্যবিত্ত সবই এক হয়ে গেছে, সকলেই মৃত্যুমুখী,
একই পথে চলেছে। তাদের তরে স্বয়ং যম যখন তার ফইক
খুলে দেহেন, তখন মানুষ তাদের আটক করবে কি দিয়ে?
সকালে চিফ-সাহেব বলেছিলেন---‘ওদের ধরবে। কোনটা,
ধরবার আর আছে ।” কথাটা কেটে দেবার নয় :
হরকিষণবাবু অতিষ্ঠ বােধ করছিলেন। বললেন-“বড়-
বাড়ীর ব্যবস্থাটা কাল বােঝাই যাবে, তার পর যতটুকু পারা যায়,
পাঁচ মিলে যা হয় করলেই হবে। এ আলােচনাটা আজ ঠাণ্ডা
২'তে দিলে, কাল আবার গােরূমে নেওয়া যেতে পারবে, কিন্তু
ব্যারিষ্টার সাহেবের খানাটা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে মাটি হয়ে যাবে,--
মুখে করতে পারবেননা। ৯টাও বেজেছে, সুতরাং wit।
your permission-আমি ওঁকে নিয়ে চললুম।”
“নিশ্চয়ই যাবেন,” বলে তার কথাটা সকলেই অনুমােদন
করলেন।
আমাদেরও
হরকিষণবাবু, প্রশান্তকে নিয়ে চলে এলন ।
বৈঠক ভাঙ্গলাে।
আমি বাড়ীর মধ্যে ঢুকছি, দেখি, দুড়দুড় করে ছুটে দুজন
দালানে গিয়ে দম্ নিলেন—সরযূ আর আমার পত্নীদেবী। মুখে
আঁচল দিয়ে সরযূর চাপাহাসি আর থামেনা।
সরযু আমার সঙ্গে কথা ক'। জিজ্ঞাসা করলুম-“ব্যাপার
কি, ভােলার নাক ডাকছে বুঝি?”

দুর্ভিক্ষের দান । তাতে যেন হাসির-কলে দম দেওয়া হ’ল ! দম একটু কমে এলে তিনি জ্ঞিাসা করলেন –“হ্যাগা, কাদের যৌবন-শ সিলোনের বসন্তের মত সঙ্গে ঘােরালো হয়ে দেখা দেয়, সেটা তারা রাখতেও জানে বিশ বছর ?” সৰ্ব্বনাশ, এ যে শান্তর উচ্ছসিত মেড- মাত্মের “ফ্রেজিও- লজি” (বাক্যবিন্যাস ) । বললুম,-“ওঃ, প্রশান্ত যা বলছিল বুঝি ! ও সেলি তী ময়নাগুলাের কথা, এই সেখানকার জল-হাওয়া !” “বটে। আবার তাদের কাতর অনুনয়-অ'রােধে প্রকৃত হৃদয়বাদের বাড়ী ফেরবার ‘প্যাসেজ-মনি’ নাকি পকেট গলে সরে পড়ে,একবার নয়, দুবার নয়, তিন-তিন বার ! তা না ত আর সে-দেশের মানুষ এ-দেশের পুরুষগুলোকে জানােয়ার বানিয়ে রেখেছে!” কথাগুলি বলবার সময় তার হাসি মন্দা প'ড়ে আসছিল, সঙ্গে সঙ্গে মুখে চোখে অতিমান অপমান ও রােষের আলো ও ছায়া লুকোচুরি খেছিল। প্রমাদ আসম দেখে হাসতে হাসতে তাড়াতাড়ি বললুম-“তা হলে প্রশান্ত সত্যিই সার্টিফিকেট পেতে পারে, তার ‘চাল’ বিফল হয়নি—আপনাকে ঠিক ঠকিয়েছে ত?” “চালটা কি শুনি।” “আপনারা যে অন্তরালে উপস্থিত হয়েছেন, সেটা সে জানতে পেরেছিল, আমাকে তাই চোখ টিপে বলে-রােসস। একটা মজা 11 ১৬২ পাথেয় করি। এই ব'লে উচ্চ কণ্ঠে বিলেতের গল্প আরম্ভ করে দেয়, এত জিনিষ থাকতে বিশেষ করে—ঝি-মাগীদের কথা । আপনাদের তখনই বুঝা উচিত ছিল-এক জন মৰ্যাদজ্ঞানসম্পন্ন সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত যুবার পক্ষে ঝিয়েদের যৌবন নিয়ে অতটা উচ্ছসিতভাবে নব-পরিচিত পাঁচ জনের কাছে আত্ম প্রকাশ করা সম্ভবই নয়। প্রশান্তকে অাপনার চেয়ে বেশী কে চেনে । তার ঐ আমােদ-প্রিয় স্বভাবটাই ত সব চেয়ে মধুর। যা, এর মধ্যে আরও একটা রহস্য ছিল- সেটা আমাকে নিয়ে। সকাল থেকে সে আমাকে দু-তিনবার শুনিয়েছে,1{রীজাতি সম্বন্ধে আমার কোনও জ্ঞান নেই, সে নিজে কিন্তু তঁাদের thorougly ( নিখুৎ) বােঝে। সেটা এখন স্বীকার করি কি অস্বীকার সর ইতিমধ্যে আমার পরিবারের সঙ্গে হাসিমুখে চার- পাচবার দৃষ্টি-বিনিময় করেন। বুঝলান—এক জন নূতন বন্ধুর সাক্ষাতে যে অপমানটা অকস্মাৎ এসে গিছিল আর আঘাত করছিল, সেটা চাউনির মাঝে উভয়েরই শু দৃষ্টি পেলে। পেলুম, একটা গর্বের নিশ্বাস ফেলে, হাসি চেপে সরযূবালা বললেন—“ববাঝেন, না-হাই বােঝেন ?” পরেই,-“ও মা কি অধম্ম ! রাত হয়ে গেল যে,-দাদাকে আগে খেতে দাও ত, বউ-দি, তার পর ওঁর বােঝাবুঝির কথা বলছি।” বেশ টের গ দুর্ভিক্ষের দান . আমি আহারে বসলুম। সরযুবালা সুরু করলেন,-“ওঁর বােঝা-বুঝিটে একবার শুনুন, দাদা। বঙ্কিমবাবুর বিষবৃক্ষ পড়েছিলুম, তার অন্য বই গুলাে পড়বার তরে মনটা ভারী চঞ্চল হ’ল। একদিন বললুম, আজকাল ত অনেক ভাল ভাল বই বেরিয়েছে,-এক সেট এনে দাও না। -“কি এলাে জানেন ? রামমােহন রায়ের গ্রন্থাবলী আর এক গাড়ী পদ্মপুরাণ! বোধ হয়, আগামী তিন পুরুষের মধ্যে সে বাড়ার কেউ তা ছোবে না ! শেষ,-পাশের বাড়ীর মেয়েদের দিয়ে উপন্যাস আনিয়ে পড়ি। সেই ব্যবস্থাই চলছে। কেমন মেয়েদের বােঝেন, দেখলেন ! ‘আলিবাবা’ আর ‘তরুবালা’ দেখবার জন্ঠে ভারী হচ্ছে হ'ল। রােজ রোজ এর-ওর কাছে শুনে শুনে আর থাকতে পারি না! বললুম, পাড়ার সবাই আজকালকার নতুন বই দুখানার অভিনয় দেখে এসে ভারী সুখ্যেত করছে, একবার দেখিয়ে আনবে চলল;-এই শনিবার আবার হবে। ও মা, আর এক কোথায় নে-গে উপস্থিত করলেন, দেখি—পাণ্ডব- গৌরব’ সুরু হ’ল ! সে-কি চীৎকার ! -“শরীর বড় খারাপ বোধ হচ্ছে’ বলে তখুনি ফিরে এলুম। —“সে দিন আমার থিয়েটর দেখা হয়নি বলে, আর একদিন স্ব-ইচ্ছায় নিয়ে গেলেন। কি পাপ !-নরমেধ যজ্ঞ । যত ন্যাকড়াপরা নােড়ে-ভােলার দল ! সে দিনও অসুখ করছে বলে ১৬৪ পাথেয় ক বাড়ী কিরে বাঁচি। আর-বলিওনা, যাইওন। ওর ধারণা, -থিয়েটার দেখতে গেলেই আমার অসুখ করে । আমাদের thoroughly বোঝাটার প্রমাণ পেলেন ! —“সকল বিষয়েই আমাদের ঐ রকম বােঝেন! গহনা, কা” প্রভৃতি যেটা পছন্দ করি, ঠিক অন্য জিনিষ এনে বলেন- ‘এই দেখ, তার চেয়ে ভাল আর দামী জিনিষ এনেছি।' কথাটা সত্যি, কিন্তু তা চেয়েছে কে? ট্রাষ্টে পড়ে পচে ! আমি নিন্দে করছিনা, আমাদের thoroughly বােঝাটা কেবল দেখাচ্ছি। আর শুনবেন?” পত্নী শেষ-পা দুখানা মাছভাজা দিয়ে ফিরছিলেন। সরযূর কানের কাছে মুখটা বাড়িয়ে ফিফিস করে বলে গেলেন, “সব শালগ্রামই গােলাকার,--তবে পূজোর জিনিষ!” তার “ফি-ফি’টা আমার অভ্যস্ত-কানে কড়ি,মধ্যমে ছড়ি বুলিয়ে গেল । জাতটিকে চিনি না-চিনি, তারা যে দয়া দরিয়া, সে সম্বন্ধে আমার সন্দেহ ছিলনা। পরিত্রাণ পাবার জন্যে-“উঃ-মস্ত একট। কাটা গলায় আটকালো গো” বলে যাতনা ও নিষ্কৃতির চেষ্টা প্রকাশ করায় উভয়েই all attention হয়ে পড়লেন, অনেক কিছু কায়দা বাতলাতে লেগে গেলেন। “তাই ত, কিছুতেই যে যাচ্ছেনা, হ্যা বউ-দি, তােমাদের সে মেনীটে কোথায় গেল,-বেড়ালকে প্রণাম করলে এখুনি নেমে যায়।”

দুর্ভিক্ষের দান
১৩৫
দেড় হাত তফাতেই পত্নীদেবী মুখে রাজ্যির চিন্তা মেখে
বিমূঢ়বৎ দড়ি ছিলেন ;--তাড়াতাড়ি তাকেই প্রণাম করে
উঠে পড়লাম।
তিনি গরু-গর্ব করতে করতে থর-থর করে রান্নাঘরে গিয়ে
সরযূ খুব হাসতে হাসতে আর-“আপনারা আমাদের যত
চেনেন, আমরাও আপনাদের ততই চিনি” বলতে বলতে তাঁর
সঙ্গ নিলেন।
দিনটা বিষমুখে দেখা দিলে । মেঘে আকাশ আচ্ছন্ন,দেখে
শয্যা ত্যাগ করতে মন চায়না, পাশ ফিরে শুতেই : স্টুা হয়।
কিন্তু রসূ তাড়া দিচ্ছেন—চায়ের জল চড়ানাে হয়েছে।
অ দিন ভেসকে ডেকে তুলতে হয়, আজ সে ফস কাপড়
আর গেঞ্জী পরে ছুটোছুটি করছে। টিফিন-ক্যারিয়ার ভর্তি করা
হচ্ছে।
প্রশান্ত শুয়ে শুয়েই হুকুম করলে—আমার বাস্কেটটা নিতে
ভুসিনি।”
তাকে আবার পাশ ফিরে শুতে দেখে সরযূ ঝঙ্কার দিয়ে বলে
উঠলেন-“উঠে নড়ে-চড়ে দেখে নেওয়া হােনা, ওর এখন
অনেক কাজ, ভােলা, টঙ্গা নিয়ে আয়,—দু’খানা।”

পাথেয়
“পাইপটে দিয়ে যা” বলে প্রশান্ত উঠে বসলো। খােলা
জানালা দিয়ে বাইরের ভাবট। চোখে পড়তেই সে বলে উঠলো--
“ইস, এই দুৰ্যোগ মাথায়-ক’রে লােক রাস্তায় বেরােয় !”
“বেশ ত, কাষ কি !” গম্ভীর ভাবে এই কথা কয়টি বলে
সরযূ চলে যাচ্ছিলেন ।
বললুম—“আপনি কি প্রশান্তর স্বভাবটা জানেননা ? কাল
আমাকে বলেছে-“রন্দর দেখলে আমি এক-পা বেরুতে পারি-
না;-গা চিড়বিড় করে। বিলেতে ঐ বালাইটি নেই—সকলে
তাই ছুটে বেড়ায়। আমারও সেই অভ্যাস হয়ে গেছে, মেঘ
দেখলে ঘরে বসে থাকতে পারিনা-রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি।
ভারী স্মৃর্তি হয়।”
“তার প্রমাণ দেখতেই পাচ্ছি।”
“বেশীক্ষণ দেখতে হবেন।” বলেই প্রশান্ত তড়াক করে উঠে
পড়লো -“দশ মিনিটের মধ্যে বেরিয়ে পড়া চাই,-রদ্র দেখা
দিতে পারে :
সরযূ ৫.সমুখে বাড়ীর মধ্যে ছুটলেন,-প্রশান্ত প্রস্তুত
হতে লাগলো :
জব্বলপুরের প্রভাত একটা উপভােগ্য দৃশ্য। আজ কিন্তু
আমার মনটায় এক টু ও উৎসাহ আছিলনা। প্রকৃতি অপ্রফুল্ল,
মাথার উপর কাক, চিল, শকুন কুগ্রহের মত ঘূরছে, দিকে দিকে
কুকুরের চীৎকার শুনা যাচ্ছে, সে যেন কোন অদৃশ্য পুরীর

দুর্ভিক্ষের দান
১৬৭
অশুভ আহ্বান।
প্রাণটা উদাস হয়ে যাচ্ছে।
এমনটা এক
দিনে ঘটেনি।
দুভি-পীড়িতরা দলে দলে এসে ক্রমেই সহর, সদর ভরে
ফেলছিল,-কেউ পেটের জ্বালায়, কেউ কাজের আশায়।
তাদের চেহারা দেখলে প্রাণ আতঙ্কে শিউরে উঠে, অবস্থা ভাবলে
বুক ফেটে যায়। যিনি যতটুকু পারেন, সাহায্য করতে যান,
ক্রম ভিড় দেখে আর সেই সব জীর্ণ শীর্ণ কৃষ্ণবর্ণ কঙ্কাল দেখে
ভয়ে ভগবানের হাতে ভার দিয়ে পেছিয়ে আসেন।
যার আছে, তারও মুখে রাধা-ভাত উঠেনা।
সরকারের কর্মচারীরা অবশ্য নিশ্চিন্ত ছিলেননা, যতটা
পরছিলেন, ব্যবস্থা-বন্দোবস্তে লেগেছিলেন। অার বিশেষ
করে- সদরে বা ক্যান্টনমেন্টে তারা ঢুকে না উৎপাত করে,
রেগ না ছড়ায়, চিত্তচাঞ্চল্য এনে সুস্থ শরীর না ব্যস্ত করে,-সে-
দিকে খর দৃষ্টি রেখেছিলেন।
প্রশান্তকে 'ব খবর দেওয়া হয়নি,
পলাতে।। হরকষণবাবু তাকে আজ অষ্টাহ আটকেছেন।
তিনি Upr to-date gentleman, তার সঙ্গ পেয়ে প্রশান্ত বেশ
সূৰ্তিতেই কাটাচ্ছিল।
ক্যান্টনমেন্ট থেকে মাল-র” ১৩ মাইলের কম নয়।
সাড়ে সাতটার মধ্যেই কিছু খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়া গেল।

১৬৮
পাথেয়
দূরে ও নিকটে
বুধবার ব্যবস্থা সঙ্গে নেওয়া হ’ল। সরযূ, সাবিত্রী আর ভােলা
একখানি টঙ্গায় আগে আগে চললো, দ্বিতীয়খানিতে প্রশান্ত
আর আমি,—পশ্চাতে।
পূৰ্কেই টঙ্গা-ড্রাইভরদের একান্তে বলে দিয়েছিলুম, -এমন
পথ দিয়ে নিয়ে যায়, যেদিকে দুক্ষিপীড়িতের দেখা নেই।
পাথরের প্রশস্ত পথেই গাড়ী চলো। দু’সার গাছের
ছাওয়া, আকাশ মেঘ-মলিন, পথ ঈশ্ব।
ছােট ছােট পাহাড়। মাঠে পাঁচ সাতটি কঙ্কালসার গাী বা
দু’একটি ঘোড়া বৃথাই তৃণ অন্বেষণ করে বেড়াচ্ছে, আবার মুখ
তুলে এগিয়ে যাচ্ছে। দেখলেই প্রাণটা কেমন করে ওঠে,
দীর্ঘনিশ্বাস আপনা আপনি ঠেলে বেরােয়।
দু’জনেই চুপচাপ চলেছি—নিস্তব্ধতা যেন চেপে ধরছিল।
আমরা যেন গােরস্থানের যাত্রী। নূতন জিনিষ দেখতে যাবার
উৎসাহটা যেন ভিতরে ভিতরে আত্মহত্যা করেছে ।
হঠাৎ এক-পাল কুকুরের ডাক শু: চমকে চেয়ে দেখি,যে
ভয় করছিলুম, তাই। অদূরেই নির্জীব কালমূর্তিতে পথের
দু’ধার পূর্ণ, সঙ্গে সজাব ও সুপুষ্ট তিনটি অপর লােক ও
দেখা যাচ্ছে।
প্রশান্ত বলে উঠলো-*এ কি হে !” মেয়েদের গাড়ীর
ড্রাইভারকে হেঁকে বললে—“গাড়ী রােকো, গাড়ী রােকো।”
তাদের গাড়ী দাড়ালাে। আমাদের গাড়ী এগুতেই সরযু
সভয়ে বললেন-“কেন, কি বলুন দেখি, দাদা,—ওরা কে ?

দুর্ভিক্ষের দান
-
“দেখে বলছি।”
উভয় গাড়ী থেকে নেমে এগিয়ে দেখি,-পথের দু'ধারে
পাথরের বড় বড় চাই, অার তার আশেপাশে অন্ত্রিত কঙ্কালরা
-কেউ সেই পাথরে হাত রেখে হাঁ ক'রে ব'সে, কেউ তাতে
কপাল ঠেকিয়ে কে, কউ থ্য। রেগে ২িপাত হয়ে
পড়ে আছে।
একট টুলের উপর এ ৮ জন দ্রবেশী বার বসে পান
চিবুচ্ছেন যার বিড়ি টানছেন । 'পাশে দুজন ভীমদর্শন
চৌীদার পাথরে বসে খনি টিপছে আর কালদের মধুর
স্বরে মুখভঙ্গী সহ গালি দিয়ে কাজ করতে ভাড়া লাগাচ্ছে।
তার মানে-পাথর ভাঙ্গ, রাস্তা কোপা, ঝুড়ি ভ'রে ভাঙ্গা পাথর
এন রায় ফ্যাল, রাস্তা দুরমুস + র যে যা পারিস। মনিবের
পয়সা ফাকি দিয়ে পাবিনি। উঠে। উঠোলে ও-জলদ।
কাপতে কাপতে উঠে কেউ গতির বঁাটে হাত ঠাকালে,
কেউ পাথর-ভাঙ্গন্ধের স্পর্শ করলে, তার পর শুরু মুখে
হতাশভাবে চৌকীদারদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।
“সিধে কথায় হবেনা দেখছি” বলে তারা চোখ পাকিয়ে
উঠে দাড়ালো।
“এদের মারবি না কি” বলে প্রশান্ত আস্তীন গুটিয়ে
এগুচ্ছিল। আমি টেনে রাখলুম-“তুমি নিজে ল-ইয়ার, তা
মনে রেখো।”

১৭০
পাথেয়
“তবে চল, বাড়ী ফিরি,-এই–গাড় ঘুমাও। Hellish
brutes ( সয়তান)!”
তাদের মধ্যে স্ত্রীলােকর কপালে হাত দিয়ে কেবল “এ
ভগ বান্ !” বলে, আর পােড় কাঠের মত পুরুষ গুলি—“আরে
রামজি। ব'লে সেই দুঃশাসনদের দিকে চেয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে
মােচকে বসে পড়লো !
সরযূ আঁচলে চোখ ঢেকে চঁচিয়ে বললেন,---* আমি পাথর
{ মাল-র) দেখতে আর যাবনা, আমাকে বাড়ী নিয়ে চল।”
তারা বাড়ীর মধ্যে বন্ধ থাকলেও কিছু কিছু শুছিলেন ;
এখন তার বীভৎস রূপ দেখে অধীর হয়ে পড়লেন !
গাড়ী ফিরলো, সব চুপচাপ।
কেবল গাড়ােয়ান দুজন গালি দিতে দিতে--“ঐ চামারবাবু
আর ঐ দু'বেটা কসাই-মনিবের পয়স'টা লুঠছে ! জন দশেক
ঠিকে কুলী নিয়ে রোজ সামান্য কিছু কাজ দেখিয়ে এই দেশে।
লােকের বি ( bill) করে টাকাটা ভাগ করে খায়। এই
গরীব বেচারারা যেমন না খেয়ে মরছি, তেমনই নরছে।
বেইমান দেশের লােকই যদি দেশের লােক মেরে রোজগারের
রাস্তা খোজে, তবে আর কে কি করবে !” ইত্যাদি, তাদের
নিজের ভাষায় বলতে বলতে চললো।
বাড়ী ফিরে রান্নাও হ’ল, খেতেও বসা হ’ল, কিন্তু গ্রাস আর
কারুর মুখে উঠলেন।

= দুর্ভিক্ষের দান ১৭১ “না, এখানে আর নয়" বলে প্রশান্ত উঠে পড়লো। পরিবার বড়ই অপ্রতিভ হয়ে আমাকে বললেন,-“জেনে শুনে তুমি কেন এই দেখতে নিয়ে ‘গয়েছিলে ? দেখ দেখি, কি কাণ্ডটা ঘেটুসো !” অর্থাং সব দোষটাই আমার । আজ শনিবার। ওঁদের মা-র দেখাবার জন্যই ছুটি নিয়েছিলুম। প্রশা যে এমন মনমরা হয়ে পড়বে, সেট আশা করি নি। চুপচাপ বিছানায় পড়ে প'ড়েই বোধ হয় সন্ধ্যা হয়ে যেত। বদি শরৎবাবু না এসে পড়তেন। “এ কি! চারটে বাজে, এখনও শুয়ে ! মাল-রক দেখতে যাবার কথা ছিলনা ? এত শীগগির ফিরলেন কি করে ?” বলতে বলতে শরৎবাবু বৈঠকখানা এসে ঢুকলেন। আমরা উঠে পড়লুন। চাকরকে তালাক দিতে ব'লে মুখ- হাত ধুতে গেলুন। এসে দেখি, প্রশান্ত সিগারেট কে' থেকে একটি সিগারেট বার করে অন্য মনস্কভাবে সেটার এক বার এদিক একবার ওদিক বা হাতের চেটোয় ঢুকছে। শরৎবাবু আমাদের ভাব দেখেই বুঝেছিলেন—কিছু একটা ঘােটেছে, তাই প্রশ্নগুলার পুনরুত্থাপন করতে ইতস্তত করছিলেন। এই সময় হরকিষণবাবুও এসে গেলেন।-“এ কি,খুব সকাল সকাল ফিরেছেন । শরৎবাবুকে ঢুকতে দেখে আমি

১৭২
পাথেয়
এলুম, তা না ত সন্ধ্যের পর আসতুম।
ব্যারিষ্টার সাহেব,
কেমন দেখলেন,-বলুন ত worth seeing নয় কি-দেখবার
জিনিষ, না?"
প্রশান্ত আমার দিকে ইঙ্গিত করে মৃদুকণ্ঠে বললে,-
“বিজনকে জিজ্ঞাসা করুন।”
তিনি আমার দিকে এমন ভাবে চাইলেন, যার মানে-
“ব্যাপার কি।”
সংক্ষেপে ব্যাপারটা তাদের জানিয়ে বললুম –“প্রশান্তির পেটে
আজ এক গ্রাস অন্ন ও যায় নি, মুখে দিতেই পারলেনা।”
মিনিট তিনেক কারুর কথা সরলনা—সকলেই নীরব। পরে
হরকিযণবাবু বললেন,—“ব্যারিষ্টার আমাদের বনেদী বড়ঘরের
ছেলে, জগতের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গে কোনও পরিচয়ই নেই, তাই
এতটা অভিভূত হয়ে পড়েছেন। এ ত দুনিয়ায় কোনও না
কোনও স্থানে দেখা দিচ্ছেই। দেখলে প্রথমটা বিচলিত হতে
হয় বটে, তার পর কর্তব্য এসে উৎসাহ নিয়ে কায করায় ।
সেটাই এখন দরকার। এখানেও কয়েকটি কেন্দ্র খােলা
হয়েছে-যেখানে প্রায় তিনশাে লােককে যথাসম্ভব খিচুড়ি
বিতরণ করা হচ্ছে।”
প্রশান্ত উৎসাহের সহিত বলে উঠলো-“হয়েছে ?”
“হয়েছে বই কি-মানুষ কি চুপ করে থাকতে পারে ! যান,
এখন একটু বেড়িয়ে আসুন।
শরৎবাবু বলেন-“আমিও তাই বলি,-চলুন।”

দুর্ভিক্ষের দান বটে। “আমি আর কোথাও বেরুচ্ছিনা-একদম ইষ্টেশন যাবাে।” “একটু না বেড়ালে এ অবসন্ন ভাবটা কাটবে না। আমি মিলিটারী লাইন ঘেঁসে নেযাব, সে-দিকে ও-সবের সম্পর্ক নেই। একটা কিছু দেখবেননা?—চলুন বাদশা-মন্দির দেখিয়ে আনি, অতি-সুন্দর স্থান-পাহাড়ের উপর। সেখানে একটি গুহা আছে—যা নাকি নর্মদা পৰ্য্যন্ত গিয়েছে। বেশী দূরও নয়, মাইল তিনেকের মধ্যে। উঠে পড়ুন।” হরকিষণবাবু বললেন-“সেই বেশ কথা, দেখবার স্থানও অনেক জায়গা ঘুরেছি, কিন্তু বাদশা মন্দিরের গণেশ- জননী মূর্তির মত—শ্বেত পাথরের অমন life size সৌষ্ঠবপূর্ণ সুন্দর মূর্তি কোথাও নজরে পড়েনি। মুখে মাতৃভাবের অমন সুস্পষ্ট বিকাশ কোথাও দেখিনি! দেখে আসুন-দেখবার জিনিষ। চা খাওয়া হয়েছে কি ?” প্রশান্ত, “All right, ভােলা-চা নিয়ে আয় আর বিস্কুটের টিনটা খুলে ফ্যাল” বলেই, উঠে পড়লাে। চা-পানান্তে নের মিনিটের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে প্রশান্ত, শরৎবাবু আর আমি বেরিয়ে পড়লুম। পাকা পৌনে-তিন মণ ওজনের হরকিষণবাবু, দশ বারাে বছর আগে থেকেই হাঁটা-পথের দাবী ছেড়ে দিয়েছিলেন, তিনি নিজের বাগানে গিয়ে ইজি-চেয়ার নিলেন। মিলিটারী লাইন ঘেঁসে খােলা মাঠের হাওয়া খেতে খেতে চলা গেল। এ দিকে সবই ঝরঝরে, পরিচ্ছন্ন! মাঝে মাঝে

১৭৪
পাথেয়
অফিসারদের বাংলাে-বাগান, ফুলে-ফলে হাসছে। বিবিধ
বর্ণের গােলাপ আর ক্রাইসেনথিমামে উদ্যান আলো করে
রয়েছে। মাঝখানে টেনিস-কোর্ট,-সাহেব-মেমসাহেবরা কি
উৎসাহেই খেলছে! আনন্দের হাসি-নানা সুরে রূপ ধ'রে
ফুটে উঠছে ; প্রত্যেক অঙ্গ আনন্দ-তরঙ্গে গতিশীল,-ভাসছে !
সাবান-সুমার্জিত কুকুর গুলো সেই আনন্দে যােগ দিয়ে
বলের (ballএর) পিছনে ছুটোছুটি করছে ; অস্তগামী সূর্যের
আভায় তাদের লােমগুলি রেশমের মত চক্‌চক্‌ ক'রে উঠছে।
কোনােটিকে কাছে পেয়ে কোনো মেমসাহেব কোলে তুলে’নে
চুমাে খেয়ে ছেড়ে দিচ্ছে! আনন্দের অমরাবতী !
প্রশান্ত হঠাৎ বলে উঠল—“This is life, জীবন একেই
বলে! They know how to enjoy it, এরাই সেটা ভােগ
করতে জানে।”
সারাদিন পরে তাকে ধাতে আসতে দেখে, কোনাে কথাই
কইলুমনা। শরৎবাবু কেবল বললেন-“হাতে আর সন্দেহ
আছে।”
এই রকম কয়েকখানি বাংলাে পার হয়ে “নর্মদা রােডে” ওঠা
গেল। পাথর আর কাকরের পথ-ধপ ধপ করছে, লােকের
ভীড় নেই। দুধারেই বাঁশের ঝাড়–কে যেন টবে বসিয়ে গেছে।
কি সুচ্ছল সমাবেশ !
মাঝে মাঝে ছােট ছােট পাহাড় দেখা দিচ্ছে। পথের
প্রায় সান্নিধ্যেই একটি পাহাড়ের মধ্যে “গুপ্তেশ্বনাথ” মহাদেবের

দুর্ভিক্ষের দান
১৭৫
স্থান, সুন্দর ও শান্তিময়। একটু এগিয়েই অপেক্ষাকৃত উচ্চ
একটি পাহাড়ের উপর “মদন-মহল।” “রাণী দুর্গাবতী” আর
“মদন” ব'লে এক জন প্রসিদ্ধ ডাকাতকে নিয়ে এই স্থানটি ঘিরে
বহু legend ও গল্প-গুজব প্রচলিত। আর এই পাহাড়েই
সেই Balancing Stone বা rock বৰ্তমান,যা দেখবার জন্যে
৭ যার রহস্যোদ্ভেদ করবার জন্যে দূর-দেশান্তর হতে গণিতশাস্ত্রের
ওস্তাদেরা আজও আসেন।
আমাদের লক্ষ্য “বাদশা মন্দির,” তাই এ-সব পচাতে ফেলে
: অগ্রসর হওয়া গেল।-“বাদশা-মন্দির” আর আধ মাইল পথ।
৭
মদন-মহল সম্বন্ধে গল্প করতে করতে এক-পে। পথ পেরিয়ে
*ড়া গেছে।
প্রশান্ত বললে-“তা হলে এটা দেখতেই হয়েছে।
সহসা কতকলা শিয়াল, বােধ করি, রাস্তার কাছেই বসে
ছিল, আমাদের দেখে বনের মধ্যে গিয়ে ঢুকূলে। প্রশান্ত
“By Jove” বলে লাফিয়ে উঠলো। “এ কি! দিনের বেলা,
ক্ষ্যাপা নয় !”
সকলেই সচকিতে সেই দিকে চাইলুম।
যা দেখলুম, তাতে আতঙ্কে তিন জনেরই সর্বশরীরে
শিহরণের সাড়া পৌছে গেল।

১৭৬ পাথেয় ঘন জঙ্গল-পথ-প্রান্তে ক্রমেই বিরল হয়ে এসেছে। তারই মধ্য হতে ধূসর কেশাবৃত একখানি শীর্ণ মুখে দুটি চোখের নিপলক তীব্র দৃষ্টি আমাদের লক্ষ্য করছে দেখে, নেকড়ে-বাঘ বলে ভ্রম হয়েছিল,-এ লােকালশূন্য স্থানে বিচলিত করে দিয়েছিল । কাপড়ের রং মাটির সঙ্গে মিশে থাকায় দেখতে পাইনি। শরৎবাবু সেটা লক্ষ্য করে বললেন,-“কাপড় দেখতে পাচ্ছেন- ন'-মানুষ।” দেখা গেল, সে কষ্টে কাঠির-মত দুখানি কম্পিত হাত তুলে জোড় করলে। প্রশান্তই সর্বাগ্রে এগুলাে, আমরাও চললুম। নিকটে গিয়ে দেখি স্ত্রীলােক, আর তার পাশেই প্রায় ছ' ফিট লম্বা, অস্থি-চৰ্ম্ম-সার একটি পুরুষ প্রল পড়ে আছে। জীবিত, বুঝা যায়না। কি ভয়ানক দৃশ্য, যেন প্রেত-যুগল ! স্ত্রীলােকটি ক্ষীণ অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বললে,-“একটু জল—পাঁচ দিন ইনি জল পাননি। শিয়ালের ভয়ে একে একলা ফেলে খুজতে যেতেও পারিনি, তা হলেই টানান করবে,-তারা সঙ্গেই রয়েছে ! যাবার সময় একটু জল ও দিতে পাচ্ছিনা?” এই বলে লােকটির দিকে চেয়ে এমন একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললে, যা বােধ হয়, ত্রিভুবন ভেদ করতে পারে। তার পর আমাদের দিকে চেয়ে রইল। প্রশান্ত চঞ্চল হয়ে আমার দিকে চাইলে, যেন জানালে, *My kingdom for a horse"! মৃত কি দুর্ভিক্ষের দান ১৭৭ শরৎবাবু জিজ্ঞাসা করলেন,—“বেঁচে আছে কি?” *এখনও আছেন ?” আমিই পুরােনাে লোক, আমিই ছুটলুম। অলই বা কোথায়, অন্বই বা কিসে, তা জানিনা। একমাত্র ভরসা “বাদশা মন্দির।সেবায়েতটি লােক ভাল, পরিচয় আছে। ভগবান্ দয়া করলেন, অর্ধপথেই দেখি, দু’জন শ্রমিক নম্মদায় স্নান করে ফিরছে, দু'জনের হাতেই এক এক লােটা জল। অবস্থা তাদের জানিয়ে—চার চার আনা দেব বলে রাজি করে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত এসে পৌছুন : জল দেখে স্ত্রীলোকটি একবার আকাশপানে চাই, তার পর হাত পাতলে। ২মিকরা ঘটি দিতে চাইলনা, দিলেও সে তুলতে পারত- না, হাতে ঢেলে দিতে লাগল। চুল নিয়ে, ধীরে ধীরে পুরুষটির চোখ-মুখ ধুইয়ে দিতেই সে চেয়ে দেখলে, মুখ থেকে ক্ষীণ স্বরে শুনা গেল--“রে?' “হা,–পিয়াে{ “তােমারা হয় ? পুরুষটি ধীরে “বহুং” কথাটি অভিনব ভঙ্গীতে উচ্চারণ করে, অনেকখানি জল খেয়ে-“ছুট্টি” বলে চোখ বুজলে। “হায় বিনায়ক!" বলে স্ত্রীলােকটি অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো। অনেক বসায় এক অঞ্জলিমাত্র খেলে। একটি ছােট্ট পুটলি 1

১৭
পাথেয়
খুলে একটা লম্বা টিনের কৌটো বার করে তার এ-জগতের শেষ
সম্পত্তি—দুটি টাকা,কয়েক গণ্ডা পয়সা আর একটি নথ, মাটীতে
উপুড় করে ঢেলে দিলে, পুটুলিটাও দূরে ঠেলে দিলে। তার
পর বললে,-“এই টিনটায় জলটুকু রেখে দিন।”
তাতে পাে-খানেকও ধরলােনা।
শ্রমিক দু’জন “আরে রামজী” বলেই দ্রুত প্রস্থান করলে।
এত বললুম, এত ডাকলুম, কিছুতেই কিছু নিলেনা, পয়সার
কথায় কান দিলেন।
সন্ধ্যা আসন্ন দেখে প্রশান্ত বললে,-“এ স্ত্রীলােকটিকে
বাচানাে চাই, বিজুও বাঁচবে।”
স্ত্রীলােকটি আপন-মনে বলে চললো-“আর তুমি কতক্ষণই বা
আছ, আমার সকল ঐশ্বৰ্য তােমার সঙ্গে যাচ্ছে। আজ ১৯ বছর
পরে আমাকে একলা ফেলে যেতে পারবে এই দুনিয়ায় রেখে ?
-যেখানে অন্ন না পেয়ে অকালে তােমাকে যেতে হ’লসেই
দুনিয়ায় অন্ন খেতে আমি থাকবাে ! না... যক, তা যেন না
হয়।”
মাথার ঠিক নেই।
প্রশান্ত বিলিতী অভ্যাসে অনেক বুঝিয়ে বললে,-“তুমি
নিজেই দেখছাে, ও ত আর বাঁচবেনা, তুমি কিন্তু চিকিৎসা
আর আহার পেলে বাচবে। আমরা গাড়ী আছি, চল।
আমরা ওঁকে দেখবার লােক দিচ্ছি। অমন হাজার হাজারও
লােক নিত্য মরছে, উপায় কি? যে যাবেই, তার জন্যে নিজের

দুর্ভিক্ষের দান
প্রাণটা বৃথা নষ্ট কর কেন! তাতে পাপ আছে। জীবন অমূল্য
জিনিষ । গাড়ী আনাই।”
স্ত্রীলােকটি অবাক হয়ে শুনছিল, হঠাৎ বিরক্ত হয়ে বিকৃত
স্বরে বলে উঠলো,—“যাও, দিক্‌ মৎ কবরী! পিপাসিতকে জল
খাইয়েছেন, ভগবান্ আপনাদের ভাল করবেন। প্রাণের মূল্য
এখনও কি আপনার চোখে পড়েনি। কত-বড় প্রাণ আজ
খেতে পেয়ে চলে যাচ্ছে, তা জানেন !-যাও।”
একটু ম্লান হেসে, তাচ্ছিল্যস্বরে বললে,-“ওঁকে এই সময়
ফেলে আমি নিজের প্রাণ বাঁচাতে যাব–১৯ বছর পরে! আর
অপর নােক ওঁকে দেখবে ! সে ওঁকে দেখবার কি জানে।
ওঁর প্রত্যেক শিরার সূক্ষ্ম গতিটি পৰ্যন্ত যে আমার কাছে
আমারই মত পরিচিত! ওঁর ভাগ নেবার অধিকার আর কার
আছে !-যাও!”
পুনরায় উত্তেজিত কণ্ঠে—“যদি একটু জল চান, কি ডেকে
আমার সাড়া না হতাশ প্রাণে কষ্টের শ্বাস ফেলেন, আমার
যে জীবনব্যাপী পূজা ব্যর্থ হয়ে যাবে ! ওঁর কাতর উচ্ছ্বাসগুলির
আশ্রয় যে আমার মাঝে। এ-সব তুমি বুঝবেনা,যাও, আর
দিক্‌ কোরােনা।
কোন প্রকারেই কোন পরিচয় দিলেনা। এ অবস্থায় ফেলে
যেতেও কারুর মন সায় দিচ্ছিলনা। কিন্তু উপায় কি
প্রশান্ত বললে, “বেশ, আমরা গাড়ী আনিয়ে তােমাদের
দু’জনকেই নিয়ে যাচ্ছি, চল।”

১৮ পাথেয় “উনি আর অল্পক্ষণই আছেন, তুলতে গেলেই মারা যাবেন। শান্তিতে যেতে দিন । আমরা . মাটীর মানুষ, মাটীর কোলে মিশিয়ে যেতে দি।” “তার পর, এই জনশূন্য জঙ্গলে, অন্ধকার রাত্রিতে মৃতের পাশে তুমি একলা থাকবে ? তােমাকে দেখবে কে?” *যে আজ দেড় মাহিনা দেখ রহা হায়, যাও–যাও। হামারা রাস্তা সিধা হয়। বড়লােকের দয়া এখন বড় অশান্তিকর,-যাও।” আমরা দেখতে এসে বড়ই সমস্যায় পড়ে গেলুম। না কোনও কাজে লাগছি, না নড়তে পারছি। ক্ষণেক নীরব থেকে বললুম-“মা, আমরা কি আপনাদের কোন কাযে লাগতে পারিনা? আমাদের কিছু বলুন।” একটু শান্ত হয়ে কাতর কণ্ঠে বললেন-“শিয়ালরা আজ তিন চার দিন পিছু নিয়েছে,-আজ দিনের বেলা ও নিষ্কৃতি ছিল- । তাদের আর সবুর সইছেনা। আমার সামর্থ্য ওরা বােঝে। কাল রাতেই এসে ধরেছিল, দিয়েছি। আজ আর পারবনা। আপনাদের দেখে তারা অন্তরালে গিয়ে অপেক্ষা করছে। ওঁর দেহে এখনও প্রাণ রয়েছে, কিন্তু আপনারা চলে গেলেই আমারই চোখের সামনে ওঁকে টানাটানি করবে, ছিড়ে খুড়ে খাবে ! যন্ত্রণায় বিনায়ক আমাকে ডাকবে—আমি যে কিছুই করতে পারবনা! এইবার তিনি ভেঙ্গে পড়লেন-“হায় ভগবান্ !” ব'লে একটি দীর্ঘনিশ্বাস শেষ করেই ফুলে ফুলে কেঁদে ফেললেন। যুক করে বাধা দুর্ভিক্ষের দান ১৮১ কে সে দৃশ্য দেখতে পারে! স্ত্রীলােকের এত বড় অসহায় অবস্থা যে কল্পনাও করা যায়না । প্রশান্ত অমার দিকে অসহায়ের মত চাইলে । বললুম-“তোমরা একটু দাড়াও, আমি উপায় করতে পারি কি না দেখি । আমার আধ ঘটাটাকু দেরী হতে পারে।” দ্রুত বাদশা-মন্দিরে গিয়ে, সেবায়েতকে সব ব'লে, এক জন লােক চাইলুম। সে সারারাত সেখানে উপস্থিত থাকবে, শিলে না উপদ্রব করে। আমরা কালেই আসবে, সে দু’টাকা বকশিস পাবে। সেবায়েত লােক করে দিলেন আর তাকে গাজা খাবার জন্যে আলাদা চার আনা তখনই দিতে বললেন। লোকটি লাঠি, লণ্ঠন, গাঁজা, কলকে আর দেশলাই যােগাড় করে নিয়ে আমার সঙ্গে এলাে : সকলেই বুকটা স্বস্তি বােধ করলুম। স্ত্রীলােকটি বল বল পেলেন ;-বললেন, “এখন আর আমার কোন চিন্তা নেই। এর চেয়ে এ দুনিয়ায় বড় প্রার্থনা আমার আর ছিলনা,ভগবান্ আপনাদের মঙ্গল করুন। কাল সকালে এদিকে যদি একবার আসতে পারেন- কথা অসমাপ্ত থাকতেই প্রশান্ত বলে উঠলো, “নিশ্চয়ই আসবে, আপনি একলা কি করবেন, আপনাকে নিয়ে যাব। তখন ত আর কোনও আপত্তি থাকবেন।'

১৮২
পাথেয়
তার সেই কষ্টন্নি মুমুমু মুখের ভাব একেবারে বদলে গেল,
চক্ষু কি একটা অনির্বচনীয় ভাবে ভেসে উঠলাে। একটা পবিত্র
বিমলজ্যোতি মুখে যেন ছড়িয়ে গেল। যে-মুখ দেখে পূৰ্ব্বে
তিন জনই ভয় পেয়েছিলুম, সহসা সেই মুখে অপূৰ্ব্ব শান্ত-শ
দেখে তিন জনই স্তম্ভিত হয়ে গেলুম। ইনি এই বেশে এই
অবস্থায়ও এত সুন্দরী! কৈ, এতক্ষণ ত লক্ষ্য করিনি।
সরম-ঢাকা স্নিগ্ধ হাসির মধ্যে মৃদুকণ্ঠে বললেন, “উনি গেলে,
আমি কি আর থাকতে পারি ? উনি ছাড়া কি আমি ! নারীর
আর কি রইল, কোন্ ঐশ্বৰ্য্য রইল । উনি যে আমার
স্বামী!”
সন্ধ্যা হল ।
“আমাকে মর্মান্তিক যাতনা থেকে মুক্তি দিলেন, এখন আমার
আর কোন অভাব নেই, ভগবান্ আপনাদের সুখী করুন।
আর কষ্ট পাবেননা, বাড়ী যান।”
বার বার জেদ করে আমাদের ফিরিয়ে আয়,
পথের দুধারে কি আছে না আছে, সেদিকে কারও আর
নজর রইলনা।
যেন একলাটির মত তিন জনই নীরবে
চললুম।
মিনিট পনেরাে পরে প্রশান্ত বলে উঠলাে-“জব্বলপুর আসা
সার্থক হয়েছে, আর কিছু দেখতে চাইনা। এমনটি এ জীবনে

১৮৩
দুর্ভিক্ষের দান
দেখিনি।”
অন্যমনস্ক হয়ে বললে-“বড় সব অপরাধ হয়ে
গেছে!”
শরৎবাবুর জীবনটা এলােমেলাে—বিবাহ করেন নি। মাথা
তুলে বললেন—“সবুর করুন, ব্যারিষ্টার সাহেব, যত গজ্জায় তত
বর্ষায়না। জীবনটা অত ফ্যানা জিনিষ নয়। তবে খুব
বুদ্ধিমতী স্ত্রীলােক বটে, শ্রদ্ধা আকর্ষণ করবার মন্ত্র জানে।
অনেক স্ত্রীলােকেরই ঐটা craft. আমি আপনাদের চেয়ে বহুৎ
দেখেছি।
কাল সকালে বুঝতে পারবেন। আপনারা ভাবছেন
বুঝি প্রাণ দেবে ! হু, অকুলপাথারে পড়বার মুখে ও বাহাদুরী-
কাঠ পাকড়ালে!”
কথা গুলাে তখন বিষাক্ত ছুরির মত আমাদের বি ধছিল।
প্রশান্ত পাছে উগ্র হয়ে ওঠে, আমি তার হাতটা চেপে চুপ করে
থাকতে ইঙ্গিত করলুম।
বাসার কাছে এসে শরৎবাবু প্রশ্ন করলেন, “কাল সকালে
আবার যাচ্ছে। কি।”
প্রশান্ত বির
উত্তেজিত কণ্ঠে বললে, “নিশ্চয়ই।”
*দেখি---রবিবার আছে,” বলে শরৎবাবু নিজের বাসায়
চলে গেলেন। তাঁকে বসতে বলবার মত ভদ্রতা সে-দিন আর
আমাদের এলনা।
প্রশান্তর অনুরােধে রাত্রিতেই দুখানা টা আর একখানা
Platform cart বলে রাখা হল।
.

৮৪
পাথেয়
ভােরেই গাড়ী এসে হাজির হল। আমরা চা খেয়েই রওনা
হলুম। বাড়ীতে ব’লে যাওয়া হ’ল, ফিরতে একটা বেজে যেতে
পারে। সঙ্গে এক বােতল দুধও নেওয়া হল ।
একটু এগিয়েই দেখি, শরৎবাবু দাড়িয়ে।
“চল, ভুলটা ভেঙ্গে আসবেন” ব'লে গাড়ীতে উঠে
পড়ন। কি জানি কেন, দুজনেরই সধ্বাঙ্গ জ্বলে গেল ।
পৌছেই দেখি, নিযুক্ত লােকটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।
“কি রে, খবর কি?”
গিয়া !”
“সব চুক
“মা ?”
মাঈ ভি।”
বললে,-আমরা ফেরবার ঘণ্টাখানেক পরে পুরুষটি কি বলায়
স্ত্রালােকটি তাড়াতাড়ি তার মুখে “জয় রে। মাই” বলে জল
দিতে দিতে বললে-“চলো,-হাম আয়ে!”
—পরে আমার দিকে ফিরে বললে,
কো হামারা
নমস্কার দেকে বােলনা—হামে না আলগ ? তার পর
যেমন দেখছেন, এক ভাবেই রয়েছে, নড়েওনা, সাড়াও দেয়না।
তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে দেখি,—স্বামীর বুকে মাথা রেখে
সতী চলে গেছেন—উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। জীবনের কোন
চিহ্নই নেই।
প্রশান্ত কুমালে চোখ মুছতে মুছতে উত্তেজিত কণ্ঠে বললে,
“বিজন, এক জন ফটোগ্রাফার চাই, ভাই।”

১৫
দুর্ভিক্ষের দান
বললুম, “বিচলিত হয়ােনা প্রশান্ত,-এর সঙ্গে বিলিতী
মিশিওনা।”
সে বুঝলে।
মায়েব ইচ্ছামত নর্মদকুলে একই চিতায় দু'জনকে দাহ
করে যখন বাসায় ফিরে এলুম, দেড়টা বেজে গেছে।
“বাড়ীতে ব’লে আসা হয়নি” ব'লে শরৎবাবু সেই পথের
ধার থেকেই ফিরেছিলেন, বেলা তখন সাড়ে আটটা।
#
প্রশান্ত সেইদিনই সন্ধ্যার বম্বে মেলে চলে গেল।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Patheo

Author
Bandyopadhyay, Sri Kedarnath
Title
Patheo
File name
Patheo
Text
OCR done
Citation
1930
Published
2009/08/5
Publisher
Indian, Press Ltd., Allahabad
Language
Sanskrit
Pages
198
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Short stories
DLI number
513045
Barcode
4990010020061.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Qzi1kom2gVE
Download PDF

Patheo