Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Beer Balak
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বীর বালক
ফুম্য-) (পর
শৈল স্মৃতি গ্রন্থ-সংগ্র
প্ৰদাত্ৰীশ্ৰীমতী নিশারাণী ঘোষ,
৩৫১, পদ্মপুকুর রোড।
No text on this page.
বীর বালক
(কাব্য)
শ্ৰীমতী (প্রফুল্লময়ী)দেবী ।
প্রণীত
কলিকাতা
প্রমথনাথ সেন
প্রকাশিত
কলিকাতা,
১নং অক্রুর দত্তের গলি,
“বী”প্রেসে
পপতি ঘােষ
মুদ্রিত।
উৎসর্গ।
পরম স আনাম্পদ ভক্তিভাবন শ্রীযুক্ত গণেশ দ
দাসগুপ্ত এম, এ, বি, এল, শ্রীচরণ কমলে।
দাদা,
হেমতে আনন্দ ভরা,
হিমসিক্ত বসুন্ধরা,
হরষে মােহিনী উষ। সুষমা ছড়ায় ;
ললাটে বালার্ক ভাসে,
আঁচলে কুসুম হাসে,
কলকণ্ঠ মধুম্বরে আগমনী গায়।
হাসিমুখে দেববালা জগত জাগায় !
আজি বিজয়ার পরে,
আসিয়াছি হর্ষতরে,
প্রণমিতে পূজনীয় ! ও রাতুল পায় ;
আশার কুহকে ভুলি’ মােজ কুসুম তুলি
আনিয়াছি প্রীহ চিতে পুজিতে তােমায়।
উৎসাহ-শিশিরে তব প্রস্ফ ট প্রসুন নব,
কাহার চরণ তলে দিব উপহার ?
জানি আমি, 'অর্থ মম, বড়ই অযােগ্যতম,
এ নহে অনন্ত-গন্ধ নন্দন-মন্দার !
বুঝিয়াছি তব হিয়া, গঠিত দেবত্ব দিয়া
সে সাহসে এনেছি এ পূজার সস্কার ;
সস্নেহ করুণ আঁখি,
তার পানে চাবে নাকি ?
লহ ও যুগল পদে ভক্তি নমস্কার।
মেহাভিলাষিনী-
প্রফল।
No text on this page.
ভূমিকা
আমি সানন্দে পাঠকবর্গের সহিত “বীর বালক” রচয়িত্রীর
পরিচয় করিয়া দিতেছি। গ্রন্থকীর সহিত আমার পরিচয়
নাই। কিন্তু অবগত হইলাম তিনি সম্রান্ত বংশের জনৈক তরুণ
বয়স্কা মহিলা। তাঁহার এই প্রথম উদ্যম। তাঁহার এই রচনা
পাঠ করিয়া আমি বিস্মিত হইয়াছি, তিনি যে এই অল্প বয়সে
মাইকেলের ছন্দোবন্ধ ও ভঙ্গী কিরূপ আয়ত্ত করিয়াছেন এবং
কিরূপ সরল শুদ্ধ ভাবে তিনি তাহার কোমল ভাবগুলি প্রকাশ
করিতে পারেন। সুখের বিষয় যে এই মহিলা কবি আধুনিক
ভাবহীন ঝঙ্কারে মুগ্ধ হইয়া বিপথে যান নাই এবং সেই দুর্নীতির
দুষিত বায়ু তাহাকে স্পর্শ করে নাই। আশা করি যে গ্রন্থকত্রী
সময়ে বঙ্গীয় কাব্য সাহিত্যে উচ্চ স্থান অধিকার করিবেন।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
সুরধাম,
..}
১লা আগষ্ট ১৯০৯।
No text on this page.
বীর বালক।
প্রথম সর্গ।
এখনাে শ্রবণে তব বাজে কি আসিয়া
ভগীরথ শঙ্খধ্বনি আকুলিয়া হৃদি ?
হরশির-বিহারিণী অয়ি ভাগিরথী ।
উৰ্ম্মি বাহু তুলি তাই আখাসিয়া তায়
চঞ্চল তরঙ্গ ভঙ্গে ছুটিছ জননি!
কোথা ভস্মীভূত কোন্ রসাতলবাসে
সাগর সন্ততিৰৰ্গ! কলুষনাশিনি !
কিতেছ কলগনে তাপিত সন্তানে
পাপ দুঃখী অভাগারে, অনন্ত অমৃতে
দিবে বলি জুড়াইয়া! ভস্মীভূত হেথা
আজি কত শত বর্ষ ভারতসন্তান,
পরাধীনতার পাপে বিধি অভিশাপে ;
চিহ্ন মাত্র জড়দেহ ভস্মস্তুপ প্রায় !
কে হেন তাপস হবে ভগীরথ যথা,
আনিয়া ত্রিদিব হ’তে কৰ্ম্ম-মন্দাকিনী,
দয়া করি তারিবে এ ভীম মৃত্যু হতে
২
বীর বালক।
হতভাগ্য নিরাশয় অসংখ্য মানবে!
প্লাবিয়া ভারতবর্ষ পূণ্য স্রোতধারা
কবে যাবে বহি আহা! পাপ ধৌত হয়ে
আবার ভারত কবে দাঁড়াবে জগতে
আপনা নির্ভর করি ? অজি স্বপ্নসম,
মনে জাগে তােম। হেরি অতীত কাহিনী
কবি গুরু বাল্মিকীর প্রিয় পােবন
বিস্তৃত কানন বক্ষে তব উপকূলে।
“ম। নিষাদঃ” মহাবাক্য, আদিকাব্য যাহা,
যেথা উচ্চারিলা কবি! আজি দ্রবময়ী ।
কহ শুনি সেই গাথা, জনকসুতারে
প্রজানুরঞ্জন তরে যবে দাশরথী
আজ্ঞা দিলা লক্ষ্মণেরে বিসর্জিতে বনে
কেমনে আশ্রয় লভি তরু শাখাচ্যুতা
সে ব্রততী, জগতেরে দিল উপহার
অতুল্য প্রসূন দুটী, বীরত্বের খনি!
আপন নন্দন করে রক্ষঃ কুলান্তক
কেমনে শায়িত হ’ল ভীষণ সংগ্রামে
সে পূর্ব গৌরব বাৰ্তা কহ আজি সতি!
নিয়ে শােভে পাদদেশে বীচিমালা তুলি
কলুষনাশিনী গঙ্গা কল নিনাদিনী ;
উন্ধে শােভে মহাঋষি বাল্মিকী আশ্রম।
বীর বালক ত মথিয়া ভারত সিন্ধু পূত রামায়ণ- অমৃত তুলিয়া যেথা দিল। মানবেরে ! কল্পনা সমুদ্র হতে তুলি রত্নরাজি, গাথিয়। অমূল্য হার অতুলন ভবে অাপন প্রতিভাবলে সাজাইলা ঋষি জন্মভূমি জননীরে ! শান্ত তপোবন। প্রীতির অপূৰ্ব ছবি যেন চিত্রপটে ! অপরাহ্নে রক্ত রবি ডুবিছেন ক্রমে পশ্চিম গগন প্রান্তে ; রক্তে রাঙ্গা কর প্রতি তরু শিরে প্রতি লতা গুল্ম মানে স্তব্ধ তপােবন বুকে, সায়াহ্ন গগনে রক্তকর লেখা পশি সাজাইছে তারে। যেন বা আনন্দ তরে সেজেছে প্রকৃতি রক্তাম্বরা সুসজ্জিত নববধূ সম সেই দীপ্তি মাখি কায়ে! কি করুণ তান, গাহিছে জাহ্নবী সতী! কুলে কুলে তার খেলিছে কুরঙ্গ শিশু; প্রতি পদক্ষেপে, অন্তর আনন্দ ব্যক্ত করিয়া পুলকে বন হ'তে বনান্তরে যেতেছে ছুটিয়া ! ব্যাধের নিঠুর বংশী পশিয়া শ্রবণে নাহি টানে মৃত্যুমুখে! দ্রুমশিরে শিরে, গাহিছে আনন্দ গাথা বিহঙ্গম দল
৪
বীর বালক।
স্বাধীন সানন্দ চিত্তে ! বনফল ফুলে
বন নিঝরিনী নীরে তৃপ্ত সর্বক্ষণ।
স্বাধীনতা সেবা পাখী উন্মুক্ত অন্তরে
পাহে স্বাধীনতা গান মুক্ত বায়ু মাকে ।
বন অন্তরালে কত পাতার কুটীর
ভূমিখণ্ড পরিস্কৃত ঋষি শিশু করে
ত্ন ভরে প্রতিদিন। অপরাহ হেরি
ক্রীড়া করে শিশুগণ মিলি পরস্পরে
বন মাঝে। হিংসা দ্বেষ নাহি শিক্ষা পায়
শান্তির সরসী মাঝে আনন্দ হিল্লোলে
ভাসে ফুল্ল পুষ্প নিত।
অদূর কুটীরে
উপবিষ্টা মা জানকী শােক বিমলিনা
চিন্তাক্ষীণ, শীর্ণ ত, লাবণ্য অতুল
সমুজ্জ্বল আরাে যেন শােকয়া পড়ি
যেন পূর্ণিমার চন্দ্র খণ্ডমেঘ মাঝে
আবরিত! সিগ্ধ কান্তি মুখে মেহতাসে
প্রশান্ত ললাট পট দর্পণের মত
নিৰ্ম্মল উজ্জ্বল অতি; নেত্র জ্যোতির্ময়।
উদার করুণাময় মধুর চাহনি !
জুড়াতে পিত হিয়া তৎপর সতত
স্নেহ মাখা দৃষ্টি টুকু! কি দীপ্তি বদনে।
গত জননী যথা গিরি রাজপূরে
বীর বালক।
শিব চিন্তা নিমগণ আত্মহারা উমা
উদাস ব্যাকুল দৃষ্টি, যেন লক্ষ্যহীন
সম্মুখে তাপস পত্নী প্রিয় সখী র
তমসা” করুণাময়ী পসিনৗ বামা।
হাপি’ নেয় জল ভরা কাতরতাম
তমসার মুখ পরে (যথা ক তারা
নিশা শেষে নত দৃষ্টি চাহি বিশ্বপনে
আবেশ অবশ দৃষ্টি ; কহিলা জননী
“নীরনিধি নীরদানে বিমুখ কি কভু,
হতভাগ্য চাতকেরে? কিন্তু কহ সখী ।
কেন সে অভাগা তবু ‘জলুদে বলিয়া
দারুণ নিদাঘ দিনে উদ্দেশে জলদে
ভিক্ষা যাচে? জল আশে কভু সুধা মুখি।
বস্ত্র জ্বালা ধরি বুকে অনন্ত পিপাসা
মিটায় অনন্তে পশি! সেই তৃপ্তি তার।
হের হােথা সুৰ্য্য মুখী ভানু উপাসিকা
চাহিয়া চাহিয়া অতি অতৃপ্ত অন্তরে
তা পানে, দিবা শেষে সমস্ত জীবন
সমত যৌবন দানি নয়ন মুদিয়া
শেষ করে নিজ কাজ! সেকি ডরে কয়
ৰৰি করে দগ্ধ হতে? তুষ্ট সে আতপে!
সে ভাবে জীবনে তার সার্থকতা সেই !
বুৰি করে সখি? পশি ফুলবনে
বীর বালক।
হাসায় অসংখ্য পুপে, তবু সূৰ্য্য মুখী
মৃদু রশ্মি-কণা বক্ষে বন্য জন্ম মানি
অনন্ত আরাম লতে' জীবন সপিয়া।
আমার সে যশরমিণ্ডিত ভাস্কর
জানিয়ে সখিরে ! আমি একান্ত আমারি
তাহার অসীম প্রেম শিখায়েছে মােরে
মাতৃ ভাবে বিলাইতে স্নেহ সুধা ধারা
তৃষিত তাপিত প্রাণে ! সমুদ্র যেমন
অনন্ত অতলস্পর্শী দিগ্বিদিক হীন
অনুপম, অতুলন নীলাকাশ যথা,
তাঁহার প্রেমের তুল্য তার প্রাণ শুধু
এ সংসারে।”
নেত্র বাহি জিনি মুক্তাহার
তরল মুকুতা ধারা প্রবাহিত হয় !
সতীর নয়নাসারে পবিত্র সুবধা ;
উথলিয়া অন্তরের গুপ্ত মৰ্ম্ম স্থান,
বিদারিত হিয়া হ'তে তপ্ত রক্ত ধারা
যেনবা সলিল হয়ে বহে শত পারে!
অমৃত নিন্দিত ভাষে কহিলা তমসা,
( ব্যথিতে বুঝিল হায়! ব্যথিতের হিয়া!)
মুছ সীতা! অশ্রু বিন্দু, আজন্ম দুঃখিনী
আশাহীনা ব্যর্থ জন্ম! চাহি’পুত্র পানে
বহ সতি! সরিয়া আগ্নেয় ভুর!
বীর বালক।
তােমার পবিত্র স্মৃতি, আত্মত্যাগ কথা
যুগ যুগান্তরে সতি! অমর রহিবে !
কেন নেত্রে ভাসে সেই পঞ্চবটী বনে
প্রীতির বিচিত্র স্বপ্ন তােমা দোহাকার !
শুনিনু আশ্রমে অজি অশ্বমেধ যাগে
দীক্ষিত রাঘব, হেথা নিমন্ত্রণ দিতে
আসিয়াছে রাজদূত শ্রীরাম আদেশে,
সুধাইলা কোন ঋষি ( শুনিনু শ্রবণে ।
মহা কৌতুহলী চিত্তে “কহ দুতবৰ !
হ'য়েছেন পরিণীত পুনঃ রৰুমণি ?
নতুবা কেমনে দীক্ষা লইলেন কই
বিপত্নীক নরনাথ ?” হাসি' ম্লান হাসি
কহিলেন রাজদূত * নহে ঋষিবর
স্থাপিয়া সুবর্ণময়ী রাজ্ঞীর মূরতি
রাজ সিংহাসন বামে, ব্রতচারী ভূপ;
কি সাধ্য ভুলিবে প্রভু জনক সুরে ?
চির প্রীতি পাবার রাঘবের হৃদি
যায়নি নিদাঘ তাপে শুকায়ে সজনি !
ওই স্বচ্ছ হৃদিখানি অজ্ঞাত কেমনে
রহিবে তাহার কাছে ? নন্দন মন্দার
অনাঘ্রাত বহে কহু দেবেজের পাশে ?”
দূর প্রাঙ্গন হ'তে ডাকি ‘মা’ ‘মা’ বলে
দশম বর্ষীয় শিশু লৰ কুশ পশি
বীর বালক।
গৃহ মাঝে নিরখিল কাদিছেন মাতা
তপ্ত অশ্রু গণ্ড প্লাবি’ চুমিছে বসুধা !
থামিল মল্লার তানে সুমধুর গীতি
অর্থ ব্যক্ত ভাবময় অন্তুরের গাথা
থেমে গেল, অর্থ পথে ফুল উল্লাস!
দারুণ আঘাতে হায় ! ক্ষুদ্র বীণা হ'তে
ছিড়িল দুইটী তার বাদকের করে ।
অসহ বেদনা লতি ছুটিয়া দু'জনে
মাতৃ অঙ্কে বসি মুখ আবরিল দুখে
গৈরিক বসন প্রান্তে ! অশ্রুধারা হায়!
মাতৃ বক্ষ-মহা স্বর্গ ভক্ত সন্তানের
সিক্ত করি বাড়াইলা মায়ের যাতনা।
নব দুৰ্ব্বাদল-শ্যাম সুন্দর বরণ
শিশুদ্বয়, মাতৃ অঙ্কে, রক্ত বস্তু মাঝে
শাভিল অপূর্ব অতি! পৃষ্ঠে শরাসন
দুলিল ঈষৎ।
ধীরে কহিলা তমসা,
“মুছ নেত্ৰ সুধাময়ি।
ভুল গত কথা
বেদনা দিওনা প্রাণে হে পুত্র বৎসলে !
প্রাণাধিক পুত্ৰ কঁদে ! শিরিষ মুকুলে
না সবে আঘাত সখি! হের তাপসিনি!
অগ্রসর মাহাঋষি তােমার আশ্রমে
সেই জ্যোতির্ময় কান্তি নিরখি নয়নে
বীর বালক ।
উঠিয়া সম্রমে সতী দুকুল বসনে
মুছি' নেত্র, পাদ্য অর্ঘ্য আনিলা ত্বরিতে,
অগ্ৰসরি লব কুশ মহা ভক্তি ভরে
আবাহনি মহর্ষিরে আনিল ভবনে !
দীর্ঘ দীপ্তিপূর্ণ দেহ, শুভ্র সুনির্মল।
চন্দ্রকর রেখা যেন রজত শিখরে
সুরছিয়া আছে পড়ি'! সিগ্ধ তৃপ্তিময়
সন্তুষ্ট প্রসন্ন কাত্তি; কানন বলে,
আচ্ছন্ন নিয়াহু শিরে দীর্ঘ জটা ভাবু
প্রশস্ত ললাটে জ্বলে প্রতিভার জ্যোতি
বিরাজ শশাঙ্ক যথা চন্দ্র চূড় ভালে!
কল্পনার পিতা, বাণীবর
পুত্র প্রিয় !
দৃষ্ট করুণায় ভরা ! মৃদু পদক্ষেপে
প্রবেণি কুটার মাকে সুমধুর ভাবে
কহিলেন,
“মা জননী কুশল সকল ?
আত্ম সমর্পণ করি ভগবান পদে
সুগীয় অম্লান শান্তি লভেছ ত সতি!
তুষ্ট আমি আজি বংসে ! তব পুত্র পরে
কহিতে তাদের কথা আসিয়াছি হেথ,
মেধাবি মধুর ভাষী তদ্রুপ বিনয়ী
সত্যবাদী পুত্র তব, ঋষিগণ যত
তুই লব কুশে হেরি ; তা বুদ্ধি বলে
বীর বালক।
এই বাল্যে অদ্বিতীয় ধনুর্বিদ দেহে।
গাহে সুধাময় কণ্ঠে যবে রামায়ণ,
মনে হয় ধন্য মাের লেখনী ধারণ !
আজি নিশি শেষে বৎসে ! ভাবিয়াছি চিতে
না উদিতে বালরবি উষার অঞ্চলে
চিত্র কৃট গিরি' শিরে করিব গমন
যজ্ঞ শেষে সপ্তাহান্তে ফিরিব আশ্রমে।
বৎসগণ ! নিজ কাৰ্য্য সাধ’ সাবধানে,
নিত্য শান্তি বিরাজিত এ আশ্রম মাঝে,
সযত্নে রধিও তাহা, এক নিষ্ঠ চিতে
আপন কর্তব্য নিত্য পল ধনুর !
নাফিরে অতিথি যেন অনাহারে কভু
এ আশ্রমে, আসি বৎস ! কি কব অধিক,
অনুষ্ঠিত কাৰ্য্য সাধি' ফিরিব সত্বরে !”
নীরবে নমিলা পদে ভ্রাত। দুই জন
বন্দিলেন সীতা দেবী। সায়ং কৃত্য তরে
শিষ্য সঙ্গে গঙ্গাতীরে চহিল। ধীমান্।
শাখার ঘণায়ে আসে ক্রম শিরে শিরে
যথা আশা জ্যোতিঃ হীন সীতার হৃদয়ে
চির অন্ধকার বসে নিষ্ঠ র নির্মম !
বীর বালক।
১১
দ্বিতীয় সর্গ।
স্তব্ধ দ্বিপ্রহর। সূৰ্য-কলােজ্জল নতে
খও বণ্ড শুভ্র মেঘ রয়েছে সজ্জিত।
প্রচণ্ড মার্তণ্ড তাপে পিতা বসুধা।
তাপিত কুলার মাঝে বিহঙ্গমগুলি,
মাঝে মাঝে ক্ষীণ স্বরে ডাকিছে চাতক।
আপন কুটার মাঝে জনকনন্দিনী
মূর্তিমতী পবিত্রতা বসিয়া নীরবে,
অঙ্ক কাছে পূহুদ্বয় উপবিষ্ট সুখে,
চাহিয়া সতৃষ্ণ নেত্রে পুত্র মুখপানে
বিষন্ন বদনে মা তা থাকিয়া থাকিয়া
ফেলিছেন দীর্ঘশ্বাস, উঠিছে চমকি
দেহ অঙ্কে সুখাসীন প্রাণের নন্দন।
বুঝিরে অন্তরমাঝে ভাসিতেছে আজি
শত অতীতের কথা, আশা নিরাশার
শত স্বপ্ন, ভগ্ন দীর্ণ চূর্ণ ক্ষমাঝে
ক্ষীণ আশালতা উঠে আশ্রয় তুলসি
আতপে তাপিত চিত্ত ম ভূ মাঝারে
কেমনে কে জানে, কবে গিয়াছে বহিয়
কীণ নিঝরিণী এক!
কি দুর্ভাগ্য অহহ!
চির দুঃখ ক্লিষ্ট চির পতিব্রতা সীতা!
১২
বীর বালক।
সমুদ্র মেখলা স্বর্ণ-শঙ্কা অবরােধে
গানন বাসে যবে বন্দিনী জননী,
নিত্য ভাবি প্রেমময় দশরথাত্মজে
আশার কুহক স্বপ্নে গিয়াছে কাটিয়া
দশ মাস! প্রেম স্বর্গে ছিল স্থান ; আহা!
আজি কতদুরে—মাঝে কত ব্যবধান !
প্রলয় গর্জনশীল ভীষণ সাগর,
স্মৃতি উৰ্ম্মিমালা তুলি আসিছে গ্রাসিতে
বিরহ সন্তপ্তা দীনা জনক হারে !
যবে সিন্ধু উপকূলে বানর কটক
সঙ্গে রক্ষী দাশরথী উতরিলা বেগে
সমুদ্রে পাইতে পথ উপবাসী হয়ে,
আরাধিলা ঘুমনি ; অহঙ্কার ভরে
পথ নাহি দিলা সিন্ধু, না শুনিলা কানে
রাঘবের কাতরতা। গর্জিয়া সরােষে
এর শাঘাতে প্রভু শাসিলা সাগরে ;
বানর বাহিনী লয়ে সলিল মাঝারে
প্রস্তরে গাঁথিয়া পথ সেতুবন্ধোপরি
স্থাপিয়া শঙ্কর মূৰ্ত্তি, কীৰ্ত্তি চিরস্থায়ী
রহিলা ভারতবর্ষে করিলা উদ্ধার
বক্ষ রাজালয় হতে; আজি কোথা প্রভু,
কোথ। ভাগ্যহীনা চির অণণা দাসী
কনকদুহিতা? কোথা দেবর লক্ষ্মণ
•
বীর বালক।
চির পুত্ৰাধিক প্রিয়, না দিবে অভয়
কেহ আর জানকীরে?
মুক প্রায় হিয়া
নীরবে থাকিয়া হায় ! না কারে তথ্য
মধুমাসে অলিপুঞ্জ পুষ্প কুঞ্জমাঝে!
সে উদ্যানে নাহি মৃদু স্নিগ্ধ সমীরণ !
কলকণ্ঠে মধুগীতি নাহি গাহে সেথা
দাবদ চিত্ত মাঝে না মুঞ্জরে হায় !
শান্তি পুষ্প।
পুত্র শিরে স্থাপি কম্বয়
সুধীরে কহিলা মাতা চাহি মুখ পানে
‘কহ বৎস! নিত্য দেহে আনন্দিত চিতে
মহর্ষি নির্দিষ্ট কাৰ্য সাধিছ যতনে ?
সষ পালিত নিত্য তােমরা যেমন
প্রাণাধিক মহর্ষির, তেমনি আশ্রমে,
প্রতি তরু লতা গুল্ম, প্রতি উপবন,
স্বহস্ত পালিত তাঁর রক্ষিত যতনে ;
সম দৃষ্টি সদা আহা কানন নিবাসী
প্রতি জীৰে ; অনাহায়ে যায়নাত ফিরি
কভু পুত্র ! চির পূজ্য অতিথি তাহার ?
লতে' নিত্য প্রীতি ভরে কত কতী
বন ফল জল সনে? খেলে নাকি আসি
চঞ্চল কুরঙ্গ শিত, ভীতি হীন চিতে
১৪
বীর বালক।
শ্যামল প্রাঙ্গনে নিত্য খেলি ত যেমন?
আপন অভ্যস্ত বিদ্যা আবৃত্তি করিয়া
লভ' নিত্য নব পাঠ শিক্ষা গুরু পাশে ?
আনন্দ প্রােজ্জ্বল নেত্রে হসিত আননে
কহিলা কুমার “মাগাে! সুরক্ষিত সব
তপােবনে, যত্ন ভরে প্রাণপণ কৰি
মহর্ষির প্রতি আজ্ঞা চাহি পালিবারে
ততােধিক হর্ষ আর কি আছে জগতে ?
জননী গাে ! নিত্য বসি' পদ প্রান্তে তার
শিক্ষা করি রামায়ণ সুরন লয়ে
গাহিব'রে, হিয়। মাঝে অস্পষ্ট একটা
বিশুদ্ধ আনন্দ পারা যায় যেন বহি' !
কি অতুল কাব্য মাগো! সৃজিল ধীমান্ !
শুনিতে শুনিতে নিত্য সে বীরত্ব গাথা
যেন শত জনমের পরিচিত বলি
মনে হয় রঘু বীরে। নিভৃতে যদি মা,
অন্য মনে রহি' কভু জাগ্রত নয়নে
নিরখি, আনন্দময় জ্ঞানে সমুজ্জ্বল
মধ্যাহ্ন মিহির মত বিক্রম, বিনয়ে
আবরিত, যথা রবি রশ্মি ধরি বুকে
নিগ্ধ চন্দ্রমার জ্যোতিঃ নেত্ৰ তৃপ্তিকর !
গগনে উদিলে কভু শারদ দিবসে
সপ্তরঙ্গে সুচিব্ৰিত ই শরাসন
বীর বালক।
একদৃষ্টে হেরি তাহ, মনে হয় মাগো!
ঐরাম কামুক ওই অতীব বিশাল
দেখা বিধাতা কৃপা করিয়া মােদেরে।
কতদিন গেছে মাগাে! গভীর নিশীথে,
দেখিয়াছি প্রীতি স্বপ্ন অতি মনােহর !
খেন বীণা করে মােরা তাপস নন্দন,
গাহিতেছি রামায়ণ রাজসভা তলে ;
রাঘব-ঐশ্বর্য-দীপ্তি ঝলসি'ছে আঁখি ;
আজন্ম বন নিবাসী, নাহি চিনি' মাের।
কত রত্ন মুক্তাহার সম্বিত সেথায় !
সমুজ্জ্বল স্বর্ণময় রাজ সিংহানে
রঘু কুলমনি রাম বসিয়া গৌরবে,
কত সুবিমল সুখ উপজয়ে চিতে।
তার পরে ভেঙ্গে যায় কুহক স্বপন!
গাঁথিতে গাঁথিতে হার অশ্রু মুক্তাসহ
কানন-প্রফুট পুষ্পে, যায় মা ছিড়িয়া !
কেন গাে! কাদিছ পুন ! কহ কোন দুঃখে
নিত্য ভগ্ন হিয়া তব ? জননি আমার !
এ জীবনে নির কি হবে নয়ন?
আজন্ম দুঃখিনী তােমা কন্ গুরুদেব
সারা জন্ম প্রাণপণে চেষ্টা করি দেহে
পারিব না ম্লান মুখে ফুটাইতে হাসি ?
দিব মা অমৃত ধার অন্তরে ঢালিয়া”
বীর বালক।
কাদিলা কুমারয় মাতার হৃদয়ে
শির রাখি, ঝরে যথা কুসুমেশিশির!
উচ্ছসিত শােক বেগ করি, সম্বরণ,
রঘু কুল রাজলক্ষ্মী ভগ্ন কণ্ঠস্বরে
প্রবােধিলা পুত্রদ্বয়ে ধরি বক্ষ মাকে
শাভিল সুবর্ণ বৃক্ষে হীরক সুন্দর !
জীবনের শেষ আশা শেষ লক্ষ্যস্থল।
রাজেন্দ্র নন্দন আহা! যদি না জন্মিত
দুঃখিনী জানকী গর্তে রাজ সিংহাসনে
রাজ রাজেশ্বর পিতা ধরিতেন বুকে!
রম্য রাজ হৰ্ম্ম মাঝে কনক আসনে
সযত্নে রক্ষিত রক্ষী প্রাণাধিক সুতে !
নয়নের তারা বলি বৃদ্ধা পিতামহী
সস্নেহে লালিত সদা হৃদয় মাঝারে !
শুধু অপরাধ, ওরা সীতার কুমার !
তাই আজো নাহি জানে পিতৃ পরিচয় ;
তাই বনবাসী, হায় ! কানন বলে
আবরিত কচি ত ; সুৰ্য বংশধর
জন্ম ভরি’ রাজ্য পালি' স্থবির বয়সে
ৰাণপ্রস্থ অবলম্বি পশেন কাননে ;
নিষ্ঠ অদৃষ্ট আহা ! দশম বৎসরে
হেরিল অযােধ্যা সে চির পূণ্যভূমি !
জটাজুট ধরি এই জীর্ণ পর্ণ গেহে
বীর বালক ।
গিয়াছে কাটিয়া যেগো সাপের শৈশব !
রাজপুত্র পারিষদ শ্বাপদ সকল।
হিংস্র জীব সমাকুল গহন কাননে
রাজধানী, বৃক্ষ তল রাজ অট্টালিকা!
রাজছত্র তরুচ্ছায়া, বনল মূল
রাজ ভােগ্য আহারায়, অঞ্জলি পুরিয়া
পিপাসায় পিয় বারি বাঙ্গসুতদ্বয়,
ঐব্রাম অঙ্গজ এর রঘুবংশধর !
এ দুঃখ রাখিতে স্থান আছে কি ধরায় ?
জানিল না পরিচয়, না চিনিল পিতা,
হেরিল না পিতৃব্য সে চির মেহময়,
শত্রু ভরত আর লক্ষ্মণ ধীমান্ !
যে বীরত্ব গাথা শুনি আনন্দিত হিয়া
এদের নিজস্ব তাহা পিতার অর্জিত।
বীর পুত্র, বীর নিজে এই বাল্যকালে,
ভয়ে না সুধাত শিশু নিজ পিতৃ কথা !
চিরারাধ্য পিতৃপদে করিতে প্রণাম
আকুলি উঠিত হিয়া, না কহিত তাহা
যত্নভরে সঙ্গেপনে পােষিত অন্তরে
মার প্রাণে লাগে পাছে কহিলে সে কথা ;
পুনঃ পাছে বহে নীর জননীর চোখে ;
হেরিত মায়ের কর শজ্ঞ সমুজ্জ্বল
সুন্দর সিন্দুর ভালে!
বীর বালক।
উঠিয়া কুমার
হেরিলা দিনেশ ক্রমে পশ্চিম গগনে
রক্ত মেঘদল মাঝে পড়িছেন ঢলি !
কহিলা “মা, দিবাশেষ, অপরাহ্নকালে
মহর্ষি দেল কাছে শিক্ষালাভ হেতু
চলিনু আমরা, আজি আসিব নিশীথে ;
না ভাবিও অকুশল থাক মা কুটীরে !”
মহানন্দে শরাসন তুলি নিল করে
মরকত মণি যেন সাজিলা সুন্দর
স্বর্ণময় রৌদ্রকরে ! চলিলা দু’জনে
প্রণমিয়া মাতৃপদে ঘন বন মাঝে!
বীর বালক।
১১
তৃতীয় সগ।
বসিয়া দিবস শেষে পােবন মাঝে,
দেবল, বাল্মিকী শিষ, মিলিল আসিয়া
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিশু সেথা ঠামল প্রান্তরে
আনন্দে কহিল সবে,
“গুরু ভক্তি কথা।
কহিবে আজিকে কিছু, শুনিব সকলে ;”.
কহিলেন ব্রহ্মচারী,
উপম কথা
জাননাকি ভ্রাতৃ বৃন্দ? গুরু সে বটুরে
নিত্য শিক্ষা দেন পাঠ, শিক্ষা অবসরে
একদা কহেন তারে
“হে প্রিয় দর্শন!
হের মম বৎস সহ সুন্দর গােধন
আজি হতে তব প্রতি অর্পিলাম ভার,
রক্ষিতে তাদেরে।”
শিষ্য পদাজ বন্দি,
নীরবে স্বীকার করি গােধন লইয়া,
মে নিত্য মাঠে মাঠে। গত কত দিন
একদা কহেন গুরু ডাকি শিষ্যবরে
“কহ শিষ্য ! গাভী বৎস বিশীর্ণ কি হেতু।
গাভী দুগ্ধ নাহি পিও কদাচ বাছনি ?”
২০
বীর বালক।
গুরু আজ্ঞা করি শিরে নিত্য ভিক্ষা করি
শরীর রক্ষেন শিষ্য। পুনঃ কন গুরু
“কিহেতু নিরখি কহ বলিষ্ঠ ভােমারে ?
পান কর গাভী দুগ্ধ বৎসেরে পীড়িয়া ?”
বিনয়ে কহিল শিষ্য আৰ্য! নহে তাহ,
ভিক্ষা অন্নে করি মম জীবন ধারণ।”
আদেশিলা গুরু তাহে “ভিক্ষা দিবসের
দিবসান্তে প্রতিদিন অর্পিব আমারে।”
দিবসের ভিক্ষালব্ধ তণ্ডুল সকল
রাখি বিপ্র গুরু পদে, ফিরিত নিশীথে
মুষ্টিমেয় ভিক্ষা লাগি, উপবাসী দেহ
শ্রান্ত ক্লান্ত, মুষ্টি মাত্র ভিক্ষান্ন লভিয়া
সন্তোষে ফিরিত গৃহে। গুরুর আদেশে
ক্রমে নিবারিল তাহা, অবশেষে ফিরি
দিবা শেষে অর্ক পত্র করিত ভক্ষণ,
ভমিত সমস্ত দিবা গাভীর বক্ষণে।
ক্রমে হীন বল তনু, দৃষ্টি ক্ষীণ ক্রমে,
পরিশেষে দৃষ্টি হীন ; শব্দ লক্ষ্য করি
তথাপি রাখিত গাভী অক্লান্ত অন্তরে!
কি কঠোর ব্রহ্মচর্য্য! কি কঠোর তপ।
এহেন সাধনা বলে বুঝি মানবে
দেবত্ব লতিতে পারে!
“পরে ভ্রাতৃগণ!
বীর বালক।
একদা দিবস শেষে গােধন না লতি,
সভয়ে ফিরিছে খুজি কানন কাতারে,
নয়নে গিয়াছে পড়ি ঘন যবনিকা ।
সুধা নিধি সুধা করে প্লাবিলা বসুধা ;
তার কাছে ধূমময় অন্ধকার সব ।
যেন গুরু পাদমূলে অতি অবহেলে
অমূল্য নয়ন রত্ন দিয়াছে কুমার
গুরু দক্ষিণার মত গুরুর ইঙ্গিতে।
মিতে সে ঘাের বনে অন্ধকূপে এক
সহসা পতিত বিপ্র ; কাতর ক্রন্দনে
ডাকিল দেবতাগণে লভিতে উদ্ধার,
লতিতে জীবনাধিক গুরুর গােধন।
হায়! সে বিপন্ন জনে না তুলিলা কেহ
শুনি তার কাতরতা !
শেষ দিবা ভূমে,
সুধীরে দিনেশ পশে অস্তাচল চূড়ে।
সন্ধ্যা আসে, অবশেষে উদিত চন্দ্রমা n;
ভিক্ষা ল'য়ে দিবসের শিষ গুণমনি,
ফিরে পােবন সঙ্গে, চিন্তান্বিত গুরু;
উৎকণ্ঠায় ঋষিবর অন্বেষণ ভরে
চলিলেন বন পথে গহন কান্তারে।
উচ্চৈস্বরে ডাকে বি ‘উপম বলি
শুরু কণ্ঠস্বর শুনি মুছিয়া নয়ন
২২
বীর বালক।
কহে উপম, “প্রভাে! নেত্রহীন আমি।
জানি গােধন কোথা গহন বিপিনে,
খুজিতে তাহারে আজি পথ ভ্রান্ত হয়ে
অন্ধকূপ মাঝে দেব! হ'য়েছি পতিত।”
অগ্রসরি গুরু তার দুঃখাকুলচিতে
কহিলেন “উঠ শিষ্য! ধর মম কর ;
বহু দুঃখ লভিয়াছ, আজি শিক্ষা শেষে
লভিনু গুরু দক্ষিণা ; মহা তুষ্ট আমি।
আজি ফির নিজ বাসে আনন্দিত চিতে।”
আসিয়া আলয়ে বিপ্র, বনজ ভেষজে
অশ্বিনী কুমারে স্মরি আরােগ্য করিল
অন্ধ নেয়।
“কহ কি ভক্তি অতুল।
কি দৃঢ় সংশতচেতা আছিল কুমার।
আশীৰ্বাদ কর মােরে, যেন তার মত
প্রভু পাদপদ্মে মতি রাখি অবিচল
তরি এই ভবার্ণবে অতি অবহেলে !”
কে যেন কহিল ডাকি
"কোথা লব কুশ!
দুর্দান্ত তুরঙ্গ এক পশি তপােবনে
নাশে তরু লতা গুল্ম ছিড়ে পুষ্পদল !”
উঠিলা সত্ৰাসচিতে জানকী কুমার ।
হেরিলা কানন মাকে অদূরে একটা
বীর বালক।
২৩
সৰ্ব্ব সুলক্ষণ অশ্ব পশিয়া আশ্রমে,
বিচরিছে বয়ামুক্ত আত্ম ইচ্ছামত।
আসিয়া অশ্বের কাছে দেখিলা দু’জনে,
জয়পত্ৰ বহি শিরে ভ্ৰমিছে ঘােটক।
অঙ্কিত রয়েছে পত্রে উজ্জ্বল অক্ষরে ;
“অবােধ্যার মহারাজ দশানন জয়ী
বীরকুল চূড়া রাম নরেন্দ্র রাঘব
করিবেন অশ্বমেধ মহাযজ্ঞ, তাই
এ অশ্ব হয়েছে স্থির যজ্ঞ অশ্ব বলি,
পৃথিবী ভ্রমিবে ‘হয়', রক্ষিতে তাহারে
নিযুক্ত শক্ত, সদা শত্ৰুগ্ন সংগ্রামে ;
বীরেন্দ্র নন্দন হেন কে আছে জগতে
যে রােখিবে অশ্বগতি আপন বিক্রমে ?”
মহারােষে গরজিয়া উঠিলা কুমার
“এই হের ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধ আবাহন!
এত দর্প নাহি সহে, বােধ অশ্বগতি,
লতা গুল্মে সুবেষ্টনে বেষ্ট তুরঙ্গমে।
ছাড়িব বিনা রণে ; প্রিয় শিষ্য মােরা
চির দিন মহর্ষির, বহু যত্ন ভরে
শিক্ষা করি অস্ত্রবিদ্যা; শুভ অবসর
পরীক্ষিতে বাহুবল আজি বীরমণি!
লঙ্কেশ বিজয়ী আজি অরি আমাদের।
মৃগেন্দ্র নন্দন কভু শিবা শিশু সনে
২৪
বর বালক।
পরীক্ষা কি করে বীৰ্য ? বিখ্যাত ভারতে
রঘু বংশধর যত অমিত বিক্রমী,
বিখ্যাত ভারতে তথা শিক্ষা মহর্বির।
এই যােগ্য প্রতিপক্ষ, রণক্ষেত্র মাঝে
শত্রুঘ্ন হেরিবে ভ্রাতঃ! বিস্মিত নয়নে,
কোথা পােবন মাঝে জননীর স্নেহে,
বন্ধিক বালক ক্ষুদ্র প্রতিদ্বন্দী তার!
এ সৌভাগ্য দশ বর্ষে কে লভেছে কবে ?”
মিলি দোহে মহােল্লাসে, সুদৃঢ় বন্ধনে
বাধিল সে দিব্য অশ্বে। বসি তরুতলে
কহিতে লাগিল লব, বুঝিতে ভ্রাতার
মনােভাব, ধীরে ধীরে,
“বাঁধিনু তুরগে
বীর দর্পে গর্ব ভরে ; স্মরিও সােদর!
স্বর্ণ-লঙ্কা বিজয়িনী সেনানী সহিত
অযোধ্যা গৌরব রবি ভরতের বাহু
মিলিয়াছে প্রাণাধিক, এবে অযযাধ্যায়।
ভরতের আজীবন ব্রহ্মচর্য দিয়ে
অর্জিত বীরত্ব শৌৰ্য্য একত্র আজিকে
ইজিত জয়ী বীর সৌমিত্রি সহিত ।
অদূরে নিরখ বীর! নীলিম গগনে
রাজে অপদ বুজ, বীর পদ ভার
বিকম্পিতা বসুন্ধরা, শক্ত বুঝিবা
বীর বালক।
আসে অশ্ব খুজিতে এ আশ্রম মাঝারে।
দৃঢ় চিত্তে কহ ভ্রাতঃ ! অসমর্থ মােরা
অযােধ্যা গৌরব আজি রাহুর মতন
গ্রামিতে আনন্দ ভরে ?
অদম্য বিক্রমে
অগণ্য বিপক্ষ হেরি মহােৎসাহ ভরে
সমর তরঙ্গে রঙ্গে পড়িতে ঝপায়ে
ভীতি কি আসিবে তব ?
দেখ চিন্তা করি
এক চিত্তে প্রাণাধিক!”
মহা বৃণা ভরে
কহিলা কনিষ্ঠ তারে,
“তপােবন মাঝে
নাহি রাজ্যলিঙ্গা, নাহি ইন্দ্রিয় বশ্যতা ;
এক মাতৃ গর্ভে জন্মি রক্ষঃ কুলাঙ্গার
বিভীষণ কিংবা নহি সুগ্রীব আমরা
অসহিষ্ণু ক্ষুদ্র চেতা ; অক্ষয় কবচ
আবরিত অঙ্গ দোহে ; মাতৃ দুগ্ধ মম
এতকি অসার ? বৃথা পালিলা জননী
দশ বর্ষ মহা মেহে? অযােগ্য শিষেরে
শিক্ষা দিতে মহর্ষি কি করেন প্রয়াস।
জননী ব্রহ্মচারিণী সদা ব্ৰত বতা
পুত্রদ্বয় কুশনার্থে, যা
বে তার?
এত তুচ্ছ উপাদানে গঠিত এ প্রাণ
পারিব না বৈরী ভাবে লক্ষ্মণ আরামে
বীর বালক।
দেখাইতে, কি শিখেছি মহর্ষির কাছে ?
মাতৃ অ অঙ্গে বহি ধন্য জন্ম মােরা,
ব্ৰহ্ম অস্ত্র মাতৃ নাম, অথবা সােদর!
পরীক্ষা করিছ মােরে ? বেদনা লাগিছে:
রণ ক্লেশ হবে মম সে কথা স্মরিয়া ?
বিনা কষ্টে ইঃ সিদ্ধি হবে কি সােদর!
দেহ দাসে পদদূলি মাখি সৰ্ব্ব দেহে,
গুরু ভক্তি পুণ্য রথে আরােহী হইয়া,
মাতৃ পদ রেণু কণা লইয়া ললাটে
চল রণাঙ্গনে।
উঠ ভ্রাতা দুই জন
আলিঙ্গিল পরম্পরে। প্রভাত তপনে
মধ্যাহ্ন মার্তণ্ড দীপ্তি, কি শােভা মহান!
কটি তটে বলুকল, পৃষ্ঠে পূর্ণ তুণ,
করে শােভে শাসন, মুখে হর্ষ ভার ;
দাড়াইলা মহােল্লাসে স্মরি গুরুদেবে।
শুনিলা প্রান্তর শেষে জাহ্নবী পুলিনে,
বহু সৈন্য কল নাদে আবৃত কানন।
বীর বালক।
২৭
চতুর্থ সর্গ।
“হে সারথি! রথ রশ্মি কর সম্বরণ!
শান্ত কর অশ্বগণে;
যেন না বিনাশে
মহা যত্নে সংরক্ষিত এ দিব্য আশ্রম
প্রকৃতির শােভাময় আনন্দ উদ্যান।
কি শান্তি এ তপােবনে হে মুতবর!
উচ্চ শীর্ষ শাল, তাল, তমাল, শাল্মলী,
অনুক¥ি ঋষি শির যেন জটাজুটে
আবৃত করেছে অঙ্গ! গগন পরশি
দীর্ঘ সমুন্নত কায়ে নিস্তব্ধ নীরব।
মূৰ্য্য বুশি জ্বলে শিরে; ধ্যান মগ্ন যথা
বল্মীক ও প মাঝারে মহর্যি বাল্মিকী!
শিষ্যত্ব লইবে বলি ধ্যান মগ্ন তরু!
মুনি শিশু কণ্ঠে কণ্ঠ মিলায়ে হরষে
সাম গীতি গাহে ওই বিহঙ্গম দল!
পুন্বেষী মধু লুব্ধ চঞ্চল মধূপ
পশি মঞ্জু কুঞ্জ মাঝে আনন্দেতে যেন
গভীর ”কার গাহে গুণ গুণ ছলে।”
তাগিরথী উপকূলে সুন্দর স্তনে
রাজ সৈন্য পুরােভাগে দশরথাত্মজ
সৌমিত্রী শক্ত বীর বিম্বিত নয়নে
দেখিছেন, হিংসা ভুলি সিংহ শিখেলে
বীর বালক।
কুরগমগণ সঙ্গে! নামি রথ হতে
ত্ৰস্ত স্বরে রঘুমনি সুধাইলা সুতে,
“কহ সুত! কোথা অশ্ব ? জাহ্নবী পুলিনে
কে দেখেছে বিচরিতে? না হেরি কি হেতু ?
অথবা অশান্ত অশ্ব নাশে পােবন,
বাঁধিলেন আর্যগণ বিরক্ত অন্তরে ?
বড় ভীতি আসে চিতে! অগ্রসর হয়ে
হের হে সুত প্রবর! কোথা তুরঙ্গম
গেল মনােরথ গতি।”
হেরিলা অদূরে
আবদ্ধ তুরঙ্গ দৃঢ় লতিকা বন্ধনে।
কন্দর্প নিন্দিত কান্তি দু'টী ঋষি সুত
দাড়ায়ে সদর্প ভঙ্গী, মরকত মনি
গঠিত সে কম বপু, অঙ্গে অঙ্গে তায়
করুণ প্রবাহ বহে বদনে যেন বা
গৌরব বিনয় বিদ্যা মিলি পরস্পরে
কৌতুকে করিছে ক্রীড়া! ক্ষুদ্র কবে,
পৃষ্ঠে দোলে ক্ষুদ্র জটা সিংহ শিশু সৰ,
আপন বীরত্ব জ্যোতিঃ সমুজ্জ্বল দেহে!
নির্ভীক প্রসন্ন ঠাম ;
দৃষ্টি মহিমায়
উদ্ভাসিত, যথা পীত রৌদ্র বিভাসিত
শরতের সুনির্মল মেঘ মুক্তাকা!
ক্তোৎপল নিন্দি ভূজে করেছে বার
বীর বালক।
২৯
ক্ষুদ্র শাসন ঢাল, কটিতে দুলিছে
খরধার তী অসি উলঙ্গ সতত।
নীরবে সৌমিত্রী শুধু তীব্র দৃষ্টি দিয়ে
হেরিছে কিনাের দ্বয়ে, সায়াহ্ন গগনে
প্রীতির অপূৰ্ব স্বপ্ন যেন মূর্তিমান !
অগ্রসরি যুবরাজ কহিলা সস্নেহে,
“কুমার! এ তুরঙ্গম অশান্ত নির্ভীক,
শান্তিময় স্তব্ধ এই বিরাট আশ্রমে
অজ্ঞাতে প’শেছে অশ্ব ; পদভরে তার
সযঃ পালিত লতা বিদলিত হেরি
লজ্জিত হয়েছি আমি; আছেন আশ্রমে
মহাঋষি ? পদাম্বুজে করি প্রণিপাত
ফিরিতাম অশ্বলয়ে।”
সুসম ভরে,
করিয়া অভিবাদন সুবিনীত স্বরে
কহিলা কুমার লব,
“ক্ষম বীরমণি!
বালকের প্রগলভতা, ‘চিত্র কূট’ পর
যজ্ঞ হেতু গিয়াছেন মহর্ষি, আমরা
আশ্রম রক্ষার তরে দণ্ড-পানি সদা ।
অশ্বমেধ মহাযজ্ঞে দীক্ষিত রাঘব
শুনেছি শুকণে, আজি তুরঙ্গ পাইয়া
হেরিনু বিজয় পত্ৰ-আবদ্ধ ললাটে
বীর বালক।
একাকী ফিরিছে অশ্ব, নিৰ্ব্বীর কি মহী ?
ধরে তুরঙ্গ কেহ এ লিখন দেখি ?
রােধিয়াছি অশ্বগতি আমরা দুজনে।
মুক্ত করি লহ বলি! আপন বিক্রমে,
প্রকাশিয়া বীর বীৰ্য, জিনিয়া সমরে।
আশ্রমে অতিথি তুমি নরেন্দ্র নন্দন!
ক্ষণেক নিশ্চেষ্ট রহি’ লহ বীরবর!
অতিথির পূজা, হেথা বসি ক্ষণকাল,
ক্লান্ত যদি পথ শ্রমে করহে বিশ্রাম ।
শুনিয়া শিশুর বাণী সচকিত চিতে
ভাবিছেন রাজ পুত্র “উম্মত্ত কি হবে
দেবরূপী ঋষি শিশু? নতুবা কি লাগি
অসম সাহসে আজি কহিছে আমারে
‘সংগ্রামে জিনিয়া অশ্ব লহ মুক্ত করি’
সুদৃঢ় সংযত বাক্যে ! কোন্ ভাগ্যবানে
সম্বােধে এ শিশুদ্বয় ‘জনক’ বলিয়া!
অজ্ঞাতে কি হেতু মম অন্তর নয়ন
আকৃষ্ট হতেছে ক্ৰমে ঋষিত পরে?
চুম্বক আকর্ষে যথা লৌহে, কেন আজি
শুনে মধু বাক্যাবলী মনে পড়ে মম
নব বিবাহিতা সীতা চির পূজনীয়া,
হর-ধনু ভঙ্গকারী সে কিশাের বীরে ?
সেই শ্যামােজ্জল কান্তি ভাসে নেত্র পথে-
বীর বালক।
উচ্চারে কভু
আস্তে পুনঃ কহে লব ভাঙ্গি চিন্তা তার,
“হে সুধা! সুনীরবে ভাবিছ কি হেতু ?
উপহাস বাক্য বীর !
ভ্রমেও বাল্মিকী-শিশ বর্ষীয়ান্ জনে।”
মৃদু মধুময় কণ্ঠে কহিলা কুমার,
“সমুদ্ভুত কোন কূলে কহ বৎসগণ !
কিবা পিতৃ পরিচয়, দীক্ষা গুরু কেবা।
জাননাকি সূৰ্য-বংশ-অবতংসবীর,
ক র নিধনকারী স্বর্ণলঙ্কাজয়ী,
নর নারায়ণ বামে? অশ্ব দেহ ছাড়ি
দেহ দেহে পরিচয় হে বীর বালক!
রাম সম মুখকান্তি কি হেতু নেহারি ?”
দমিয়া বর্ধিত ক্রোধ সুগম্ভীর স্বরে
কহিল কনিষ্ঠ কুশ বীরেন্দ্রে চাহিয়া,
বনবাসী শিশু মােরা, শিষ্য বাল্মিকীর,
এই মাত্র পরিচয় হে রাজনন্দন!
মানবের সৌসাদৃশ্য মানবে সম্ভবে,
সতত এ ধরা মাঝে। নিত্য গুরু কাছে,
শিক্ষা করি অস্ত্রবিদ্যা অতীব যতনে।
ডরি আরণ্য গজ কেশরী শার্দ লে
বধিতে সম্মুখ রণে; তলামি সতত
যােগ্যতর প্রতিদ্বন্দী করিতে সংগ্রাম।
রাজ-প্রতিনিধি তুমি স্বাগত কাননে
৩২,
বীর বালক।
বহু ভাগ্যে আমাদের ; বড় বা চিতে,
দেখাব স্নায়ুধ শিক্ষা আমরা দুজনে।
প্রসিদ্ধ ইক্ষাকু বংশ মহা ধনুর্দ্ধর ;
আপনি বীরেন্দ্র তুমি, শুনিয়াছি মাের।
ধর ধনু মহাবাহু ! প্রতিদ্বন্দী কর
যারে ইচ্ছা হয় তব! চরিতার্থ থােক
আজন্ম পােষিত হৃদে যে মহা বাসনা !
সাবধানে দেহে বলী লইব শিখিয়া
আজি এ সমরাঙ্গনে যুদ্ধ প্রথা তব।”
বিস্মিত শক্রঃ বীর। হেরিল কি বিতা
কিশােরের কম কান্তি করিছে উজ্জ্বল !
কি অদম্য যুদ্ধ স্পৃহা শিশুর অন্তরে।
আবার সস্নেহ ভাষে কহিলা কুমার
“ঋষি শিশু, তব বাক্যে পরিতুষ্ট আমি,
বুঝিয়াছি আছে শক্তি কম ভুজযুগে ।
কিন্তু ও কোমল কায়ে হানিব কেমনে
মন্ত্রপূতঃ অস্ত্র মম ? যাইবে বিদারি
এ কঠিন হিয়া তাহে! রণে দেহ ক্ষমা
ফির নিজ বাসে বৎস! কি হেতু না জানি
অজ্ঞাত স্নেহ তরঙ্গে ফেলেছে প্লাবিয়া
কর্কশ শক্র হৃদি ! আজি মনে পড়ে
শত অতীতের কথা শােক ব্যথাময়!
কেন এই আত্মহত্যা চাহিছ কুমার ?”
বীর বালক।
;
শিশুর আরক্ত নেত্ৰ উঠিল জ্বলিয়া
শুনিয়া এ হেন ভাষ; কহিলা গম্ভীরে,
“যুদ্ধে মৃত্যু আত্মহত্যা ক্ষত্র পুত্র হ'য়ে
না বুঝি, সৌমিত্রি ! তুমি কহিছ কেমনে!
দুলিবে মন্দার মালা দেববালা করে
রক্ষিয়া প্রতিজ্ঞা বাক্য অস্ত্রাহত কায়ে
শায়িত হইব রণে শরশয্যা পাতি,
বুঝাও শিশুরে বীর !
এ সৌভাগ্য হতে
আর কি ঐশ্বৰ্য চাহে ক্ষত্রিয় কুমার ?
বীর তুমি, বীর ধৰ্ম্ম শিখাও শিশুরে।
যদি রণে দেখ পৃষ্ঠ, করিও ধিক্কার
কহিও অসত্যভাষী” আমা দোহাকারে!
হের হে লবণঘাতী! নাশে তব সেনা
অশ্বে গজে তপােবন; উড়ে ভীত চিতে
বিহঙ্গম নীড় ছাড়ি, মৃগ শিশুগণ
তৃণগুচ্ছ পরিহরি ছুটিছে তরাসে
কানন জননী বুকে, না সহে পরাণে
ত্বরা করি কর রণ!
ওনি শেষ কথা
বিষগ্ন শত্ৰু বীৰ কহিলা দু'জনে
*একান্ত সমর বাঞ্ছা কর যদি দেহে
প্রতিদ্বন্দী তুলতর লহ খুজি তবে।
হের অগণিত সেনা শিক্ষিত সকলে।”
৩৪
বীর বালক।
সেনাপতি চন্দ্রচূড়ে কহিলা ডাকিয়া,
“সত্বরে সমর দেহ এ শিশু যুগলে।”
মহােল্লাসে সীত। সুত সিংহ পরাক্রমে
নিনাদিল। মহাশজ্ঞ রাজসৈন্য মাঝে ;
নিস্তব্ধ সে সিন্ধুবুকে বহিল ঝটিকা।
অচিরে প্রবৃত্ত কুশ চন্দ্রচূড় সনে
করিতে সম্মুখ যুদ্ধ। সৈন্যদলে লব
বলিল, “প্রস্তুত আমি করিতে সমর
অসংখ্য শক্রর সহ।”
উঠিল হুঙ্কারি
রাজসৈন্য মহাদন্তে শিশু অরি দেখি।
কি ভয় কুমার ! ওই কুটীরে জননী
করিছে কুশল ভিক্ষা দেবতার পদে।
সতীর নয়নাসারে সিক্ত ভাগ্যবান
সমরে অমর সদা ! লহ শিরােপরে
আশীৰ্বাদ ; উদ্দেশেতে বর্ষিছে যা মাতা
ঘন হুহুঙ্কার রবে আবৃত কানন।
মুহুর্মুহুঃ সিংহনাদে মাতিল সমরে
অযযাধ্যার সুশিক্ষিত বিশাল বাহিনী।
হেরিয়া শিশুর শৌর্য শর ক্ষেপ প্রথা
বিস্মিত সৈনিক বৃন্দ'; আচ্ছন্ন গগন
অস্ত্রজালে, অন্ত্রমুখে জ্বলিছে অমল।
দেখিয়া অপূৰ্ব্ব যুদ্ধ শত্রুঘ্নে সম্ভাষি
বীর বালক।
কহিলা ডাকিয়া সুত।
“হের যুবরাজ
কি অদ্ভুত শর শিক্ষা, কি ক্ষিপ্ৰ সন্ধান।
কত সৈন্য গত প্রাণ শিশুর সমরে !
রক্ত গন্ধে উত্তেজিত ব্যাশিশু সম,
‘অগ্রসর ‘অগ্রসর’ ডাকিছে বালক
এ নহে খদ্যোৎ, বীর ! এ অগ্নি ভীষণ,
রক্ষা কর সৈন্য দলে, সহিবে কেমনে
এ ভীম বিক্রম কহ, এ কেশরী শিশু
না হবে অযোগ্য প্রভাে! প্রতিদ্বন্দী তব।”
“সত্য ব বাক্য সুত।”
বিস্ময়ে রাঘব
অগ্রসর প্রীত চিত্তে লব সন্নিধানে ;
কহিল। প্রশংস মান নয়নে চাহিয়া,
“বাখানি তােদর বীর্য রে বার কুমার।
হেরিনু অপূৰ্ব ৰাৰ্য্য ও ভূজ মৃণালে !
নাহি চাহি ইহ হ'তে ধন্য মৃত্যু আর ।
ধন্য বীর পণা বৎস! এবে ফির ঘরে
জনক জননী প্রাণে সহিবে কেমনে,
থর শরে ছিন্ন হ’বি শ্যাম শতদল!
কেমনে রাক্ষস সম মমতা পাসরি
বধিব তােদের শিশু! দেহ ভিক্ষা মাের
তােমাদের ধন্য প্রাণ ! বুঝি বা বাছনি।
৩৬
বীর বালক।
মাতৃস্তনে গলে ক্ষীর, অশ্রু বহে চোখে,
নিশীথ দ্বাণায়ে আসে না পেয়ে তােদেরে
বিজয়ী বীরের মত ফির মাতৃ বুকে!
হতভাগ্য আমি, তাই বাঞ্ছ জাগে ঈদে
হে দেব বাতি শিশু! লইতে হৃদয়ে
চারু কোকনদ যুগ্ম চন্দন চর্চিত !”
“বিনা রণে অশ্ব তব না দিব ছাড়িয়া”
বিনাশি অব্যর্থ লক্ষ্যে সৈনিক সকল,
কহিছে প্রসন্ন মুখে কুমারে সম্ভাষি
“বিনা রণে অশ্ব তব না দিব ছাড়িয়া।”
সরােধে সৌমিত্রী বীর কহিলা হুঙ্কারি
“এস তবে যুদ্ধ সাধ মিটাব অচিরে।”
শুনি সে আহ্বান বীর দাঁড়াল ফিরিয়া !
স্ফীত জট। সিংহ শিশু করী শিশুসহ
করিতে করিতে যু, মেঘনাদ শুনি
ক্ষণেক নিশ্চেষ্ট রহি’ চাহে উর্ধপানে
যথ। মহা সিংহনাদে ঘােষি' প্রত্যুত্তর,
তেমনি ফিরিল বীর, সমর উল্লাসে
সাপটি ধরিলা করে ভীম প্রহরণ।
মহা শব্দে পৃষ্ঠে তুণে গরজে সঘণে
মন্ত্র পূতঃ অঞ্জ রাজি রণ বুশ’ রবে।
‘রাখিও শিষের গান' কহিলা কুমার
আদা গুরুদেব-চরণ সরােজে!
বীর বালক ।
চন্দ্রচূড় গত প্রাণ পতিত সময়ে,
রণজয়ী বীর শিশু ঘন সিংহনাদে
মুখরে কানন।
মহারােষে দ্রুত করে
ভাজি ধ্বদা নাশি অর্থ আবাহি সাবধী
সকুওল শত্রুঘ্নের মস্তক ছেদিয়।
সদম্ভে উঠিল গর্জি ;
অযােধ্যা নগরে
অজ্ঞাত আশঙ্ক। ভরে কম্পিত সহসা
সুমি । মাতার হৃদি! অন্তঃপূরে হায়
সুচরিতা - হকীৰ্ত্তি শুক্র বনিতা
অজ্ঞাতে সিন্দুর বিন্দু ফেলিল মুছিয়া
কঙ্কণে আহত তার সুঠাম ললাট ;
বহিন অজস্র ধারা সীতার নয়নে।
ছত্র ভঙ্গ সৈন্যদল যথা বঁধ ভাঙ্গি
ছুটে দ্রুত তরঙ্গিনী; জাহ্নবী জীবনে
সমর্গে জীবন কে, বঁচিল কেহবা।
আনন্দে বিজয় শঙ্খ বাজায়ে কুমার
মেহ আলিঙ্গনা বন্ধ হইল দুজনে।
জানিনা কোন্ মিত্র পতিত সমরে।
বীর বালক।
পঞ্চম সর্গ ।
নিশি অবসানে ধীরে অবােধ নগরী
জাগিয়া মেলিল আঁখি ‘জয় রাম’ বলি,
উৎসকের মহােৎসাহে ছিল এতদিন
প্রফুল্ল অযােধাবাসী বালবৃদ্ধ যুবা
সুসজ্জিত ছিল সদা মনােহর বেশে।
সজ্জিতা আছিলা পুরী, রাম রম্ভা তরু
প্রতি গৃহদ্বারে, নিয়ে পুণ্যোদকে ভর
দিব্য কুম্ভ, শােতে' শিরে আমের পল্লব।
প্রতি গৃহ চূড়ে উড়ে মহল কেতন।
মৃদুল পবনে তাহে দোলে ফুলহার।
কিন্তু আজি প্রাণহীণ হহীণ অতি
বিষন্ন অযােধ্যা, 'হে নাহি হর্ষরব ;
ঢালেনা শ্রবণে মধু বিহঙ্গ কাকলী।
ভগ্নদূত ফিরিয়াছে অযােধ্যা নগরে
বহি পৰাজয় বার্তা সীত পতি কাছে।
শত্রুঘ্নের মৃত্যুবাণী শুনিয়া শ্রবণে
বাহিনী সজ্জিত করি’ রাজ আজ্ঞা লতি
গিয়াছে ভরষ্ঠ বীর লক্ষ্মণের সনে,
দমিয়া দুর্দম রিপু শিশু দুই জন,
আনিতে সে যজ্ঞ অশ্ব অযােধ্যানগরে।
বাজেনা বাদিত্ৰ আজি মধুর নিক্কনে
বীর বালক ।
৩৯
গাহেনা মঙ্গল গীতি নাগরিকদল ।
নরব রাক্ষস কপি ফিরিছে নগরে।
যজ্ঞ দর্শনের তরে সমাগত সেথা
রক্ষ রাজ বিভীষণ নিকষানন্দন ;
মিত্র শশাকে শােকাকুল কিষ্কিন্ধ্যা ঈশ্বর।
ফিরাইয়া তুরঙ্গম কবে শুভ দিনে
ফিরিবেন রণজয়ী ভাতা দুই জন
আছে সবে প্রতীক্ষায় অযােধ্য। পরে।
স্নিগ্ধ অপরাহ্ন; সূৰ্য্য রক্তকরচ্ছট।
নিয়ে শুৰ অদলে করিয়া রঞ্জিত
সূর্যাস্তের পূর্বাভাস করিছে প্রকাশ।
নিভৃত মন্ত্রণাগারে বশিষ্ঠ সংহতি
আসীন সুবর্ণাসনে ব্রতধারী ভূপ,
বিশ্ব চরাচর খ্যাত সূৰ্য্য বংশ চূছু,
নরপতি রামচন্দ্র দশরথাত্ম ।
সুপ্রশান্ত, সৌম্য মূর্তি উদার গম্ভার।
মরকত নিন্দি কান্তি অতুলন ভবে,
প্রশস্ত উন্নত বক্ষ বীরত্ব আধার,
নিৰ্ম্মল ললাট পট, অঙ্কিত তাহাতে
রাজদণ্ড, লেখা যেন উজ্জ্বল অক্ষরে
বিধির অব্যর্থ লিপি “রাজ-রাজ্যেশ্বর,
দীর্ঘ কৃষ্ণ কেশপাশ মলয়ে দুলিছে
শিরস্ত্রাণ পাশে, মুখে মালিন্য ঈষৎ,
৪০
বীর বালক।
কি অটল গাম্ভীর্যের দৃঢ় আবরণে
আবরিছে রঘুপতি অসহ্য বেদনা !
অদূরে দুয়ারপ্রান্তে দ্বাররক্ষী রূপে
ভক্ত শ্রেষ্ঠ মহাবলী অঞ্জনা নন্দন,
পারেনা চাহিতে বীর নয়ন তুলিয়া
প্রভুর আনন পানে! মনে পড়ে তার
ঋষ্যমুক গিরিশিরে যথা একদিন
সীতাহারা ক্ষুব্ধমতি জানকী বল্লভে
দেখেছিল সঙ্গে রথী সৌমিত্রী লক্ষ্মণ
কাতর উজ্জ্বল কান্তি অঞ চিহ্ন অতি
সুস্পষ্ট নীলাজ নেত্রে দেখেছিল বীর,
দারুণ বর্ষার দিনে সে গিরি করে,
রামের নয়ন নীর করিত প্রকাশ
সতত অন্তর ব্যথা। আজি স্তব্ধ হয়।
লুটায়ে লক্ষ্মণ কোলে সীতারে স্মরিয়া
ঢালিয়াছে বারিধার যুগল নয়ন।
আজি আহা! সুনীরবে কৌশল্যা কুমার
প্রজার সন্তুষ্টি রূপ দেবের দুয়ারে
বলি দিল। প্রাণাধিকা বনিতারে গয়!
( নিরপরাধিনী বালা) নিম হৃদয়ে !
সতীর সে দুঃখময় ভীষণ স্মিরিতি
দহে নিত্য অনুক্ষণ, পীড়ে রাজ সাজ
বীর বালক।
৪১
।
সদা দেহে, বহিতেছে নীরবে ভূপাল
চাহিয়া অন্তর স্থিতা জানকীর পানে,
সে অসহ্য যাতনার স্মৃতি বিষময়।
বহিছে গৈরিক স্রাব সতত অন্তরে !
শত্রুঘ্নের মৃত্য বার্তা সে অনল মাঝে,
ভাষণ ইন্ধন আজি। কত সবে আর
চর্ণীকৃত ভস্মীভূত সে মহান্ হৃদি!
দৃষ্টি ফিরাইলা বীর, অবারিত ধারে
বহিল বিষাদ অ সীতারে স্মরিয়া,
মা জননি” বলি আহা! ত্যজিলা নিশ্বাস ।
নৃহা জননীরে স্মরি মাতৃভক্ত যথা!
কহিলা বৈদেহী নাথ, বশিষ্টে চাহিয়া
বিষাদ ব্যাকুল ভাষে,
“কি আর জগতে
আছে কহ মহাত্ম! প্রিয় অভাগার
প্রাণ মাের রহিয়াছে রণস্থলে যখ।
প্রাণাধিক প্রিয় ভ্রাতা ভরত লক্ষ্মণ
দেহ মাত্র আছে পড়ি অযােথায় এবে।”
সস্নেহে বশিষ্ঠ দেব কহিলা হারে
“নিয়তি অখণ্ডনীয় শুনি শাস্ত্র মুখে,
নর কুললাম তুমি স্থির বুদ্ধিমান
কিবা উপদেশ তােমা দিব মহারাজ।
তােনারে বিঞ্জ হেরি বিষ এ পুরী
বীর বালক।
যথা চন্দ্র করজালে সজ্জিত ধরণী
মেঘান্তরে নিশাকান্ত করিলে গমন
মলিনা প্রকৃতি সতী সহসা অমনি
বিষন্ন অযােখা পুরী তেমতি আজিকে।
স্বাগত এ মহাযজ্ঞে মিত্রগণ তব
সুগ্রীব, গুহক রাজ, বিভীষণ বলী
নিজ অনুচর সঙ্গে, কাতর তাহার
শক্রম্নের শােকে এবে।”
কহিলা দুয়ারে,
দাড়াইয়া হনুমান্ “হে বীর কেশরি
আগত সন্দেশবহ, রাজ আজ্ঞা যাচে
দাড়াইয়া দ্বার প্রান্তে।”
ত্ৰস্তে মহারাজ
কহিলেন খান বীর! আন সমাদরে
ত্বরা করি বার্তাবহে এ প্রকোষ্ঠ মাঝে।
রাজ অনুমতি লভি পশিল সেখানে
ছিন্ন ভিন্ন বেশধারী রাজ অনুচর।
সাগ্রহে কহিলা শূর, “কই সমাচার
সত্বরে হে দূতবর! কোথা হ'তে তব
এই বেশে আগমন ?”
নমি মহৰ্ষিরে
সম্ভমে নমিল দৃত রাজ' যােগীরে,
কহিল কাতর কণ্ঠে, “কি কহিবে দাস,
বীর বালক।
আজি রাজ সন্নিধানে? দুমুখের মত
সে ভীষণ বাণী মুখে আনিব কেমনে?
মহারাজ, বাক্য নাহি অাসে রসনায় !”
সত্রাসে কহিলা প্রভু, “হে সন্দেশবহ !
এসেছ কি রণক্ষে হইতে হেথায় ?
রণ বাৰ্তা কহ পু! বিলম্ব না সহে,
আজ্ঞাবহ বার্তাবহ তুমি চিরদিন,
সত্যবাদী! সত্য বাক্যে সদা প্রীত আমি।”
কহিলা সজল চক্ষে কম্পিত বচনে
“কি কহিব রঘুপতি !
সমর কাহিনী
দেখিয়াছি নরমণি! এ দীর্ঘ জীবনে
বহু যুদ্ধ, কিন্তু হেন অসম-সমর
দেখি নাই, শুনি নাই নর রসনায়।
শায়িত সসৈন্যে রণে বীরকুল চূড়া
ভ্রাতৃদ্বয় তব বলী ! মহা ঝা যথা
নিম্মুলিয়া অরণ্যাণী মহা মহীরুহে
বিনাশে, মেনি সেথা হে লঙ্কা-বিজয়ি !
বিশাল বিটপী সম পতিত সময়ে
রাজপুত্র দুইজনে, ছত্রভঙ্গ সেনা
হায়রে বিগত জীব জাহ্নবী জীবনে।
বাঁচিয়াছে একুবাৰ্তা বহিবে বলিয়া
দাসের কঠোর প্রাণ সে ভীম সংগ্রামে।
৪৪
বীর বালক।
কিন্তু যে ভয়াল দৃশ্য দেখেছি নয়নে
তাহা হ’তে মৃত্যু নহে অধিক ভীষণ।”
স্তম্ভিত ভীষণ বাক্য পশিয়। শ্রবণে
স্বর্ণাসনে মহারাজ কৌশল্যা কুমার
যথ। নীলাম্বর স্পশী শালবৃক্ষ মরি!
বজ্রাঘাতে স্তব্ধ কায় জ্বলা দুগ্ধ চিতে।
চৈতন্য লভিয়া প্রভু কাঁদিলা বিষাদে
কাদে খেদে মহাবল অঞ্জনা কুমার,
শােক রুদ্ধ কণ্ঠ স্বরে কহিল। নৃমনি,
“আজি ফুরাইল সব, হা ভ্রাতা আমার!
বীরমণি ! কুলচূড়া, বিখ্যাত ভুবনে
ভাতৃভক্ত অনুরক্ত, জীবন দেউটী
অকালে ফুৎকারে হায় ! কে দিল নিয়ে ?
অবহেলে ক্ষুদ্র শিশু কালানল রূপে
আনন্দ কানন মাের জীবনের আশা
কেমনে দহিল হায় সম্মুখ সমরে !
কোদও টঙ্কারে যার কাপে দশদিশি
ব্ৰহ্মচর্যে বীৰ্য যার সংযত হৃদয়ে
সঙ্গে যার অনুযাত্রী মেঘনাদজয়ী
শিশুর সমরে আজ পতিত তাহারা ।
হেন অবিশ্বাস্য কথা সত্য হবে হায়!
রামের অদৃষ্টগুণে হা ভাগ্য বিধাতা।
বীর বালক।
৪৫
এ ভীষণ শক্তিশেল কে হানিল কহ
কে আলি সমরানল দহিল তাহাতে,
রামের জীবনিশক্তি অন্ধের নয়ন ?
শেষ সুখ শান্তি তােরা এই অভাগার
মহীতলে, কে মায়াবী হরিল রে তায়!
কেমনে রহিবে রাম এ ছার ভুবনে ?
সােনার বাণিজ্যে আজি না জানি কিরূপে
অমূল্য মাণিক ত্রয়ে দিনু বিসর্জন
অগাধ সাগর নীরে ! ডুবিল গােস্পদে
অভাগার আশা তরী বিধি বিড়ম্বনে!
অশ্বমেধে ভ্রাতৃমেধ হায়রে আমার!
কেমনে পশিব আজি অন্তঃপুর মাঝে
কাদিছেন হা অভাগ্য! যথায় জননী
সুমিত্রা কেকেয়ী আধা, সঙ্গে ভাগ্যহীন।
দেবী তুল্যা পুবধূ ! কি চণ্ডাল আমি !
দুঃখ দিতে সবাকারে জন্ম অভাগার,
উজ্জ্বল এ কুলগৰ্ব খর্ব মম করে !
মাের তরে বৃদ্ধ পিতা বিগত জীবন
বনবাসী ব্রহ্মচারী লক্ষ্মণ সুমতি,
সঙ্গে ব্রহ্মচারী হায়! শক্র ভরত !
আজিকে চরম দুঃখ নাশিনু তাদেরে,
নির্দয় রাক্ষম সম! দিয়াছেন সপি
মম করে আ্যাগণ প্রাণাধিকয়ে,
v
৪ ৬
বীর বালক।
রক্ষিতে হ’লনা শক্তি হারানু অনাসে!
রহিনু অাগ্য মূঢ় অবােধ্যা নগরে
প্রাণাধিক দ্বয়ে দিয়ে ভীষণ সমরে !
হ৷ ধিক্ কঠোর প্রাণ, নাহি যায় যাহা
তােদের বিয়ােগ বার্তা পশিয়া শ্রবণে
এস ভ্রাতঃ! সবে মিলি তৃষিত অন্তরে
ভ্রাতৃ সম্বােধনে সুধা সিঞ্চিয়া হরষে !
সদা অনুগত মোর আজ্ঞাবহ সদা
রে লক্ষ্মণ ! আজ্ঞা পেয়ে জনকসুতারে
বিসর্জিলে ঘাের বনে পাষাণ হইয়া।
সম্বরিতে অশ্রুজল গেল বিদারিয়া
ওরে মাের প্রিয় ভক্ত! ও অন্তরখানি!
নীরবে পালিলে তবু নিৰ্ম্মম আদেশ !
আজ্ঞা মাের না লইয়া অজ্ঞাত প্রদেশে
কেমনে চলিলে আজি কহ ধনুর্ধর।
লজ্জা নাহি দেহ আর, কাঁদিছে কাতরে
হতভাগ্য ভ্রাত| হেথা দাও দেখা তায়।
রাখিবে রাঘব এবে অন্তরে তােদেরে
দিবেনা এ মহীতলে নামিতে এবার।
অাহত ক্ষত অঙ্গ যাবে জুড়াইয়া
মেহে তার প্রাণাধিক! জুড়াবে অভাগা
ধরিয়া তাপিত বক্ষে হারানিধিগণে!
আল নাহি সহে আর কত সবে কহ
বীর বালক।
৪৭
ক্ষুদ্র মানবের হৃদি ? চাহে যে ভাঙ্গিতে।
শায়িত অসংখ্য সৈন্য জাহ্নবী পুলিনে
“নরভুরক্ষঃ” বলি দিতেছে ধিক্কার
তীব্র অভিশাপে হায়! অমােধ্যা নিবাসী।
ঘুচাও এ অমানিশা এ কলঙ্ক কালি !
কহ মােরে, বাচাইব কেমনে তাদেরে ?”
হতাশ্বাষে মহেস নীরব সখেদে !
সুধীর সংযত কণ্ঠে কহিল। তখন
মহর্ষি বশিষ্ঠ দূতে,
“কহ দূতবর !
কেমনে সংগ্রাম করি পড়িল। সকলে
শিশু হস্তে, কহ শুনি সেই বিবরণ।”
শিহরি কহিল দূত,
“বর্ণিব কেমনে
অপূৰ্ব্ব সে রণ প্রভু, শিশুর সংগ্রামে
অযযাধ্যার যােদ্ধবৃন্দ অজেয় প্রত্যেকে,
আপনি বীরেন্দ্রদ্বয় সৈন্যাধ্যক্ষ হে
পরাজিত সবে ; দেব! কি উল্লাস ভরে
গজ্জিল অায়ুধ দিব্য শিশু শরাসনে!
শিশু মুখে কি ভীষণ হুহুঙ্কার রব!
ক্ষুদ্র অহি শিশু হায়, রথ গজ হীন
করিল ভীষণ যুদ্ধ দাড়ায়ে ভূতলে,
তুচ্ছ জ্ঞানে দু’টী সৈন্য অগ্রসর রণে।
৪৮
ব র বালক।
ক্ষণ মাত্র রণ হায় ! নয়ন নিিমষে
নাশি’ আততায়ী শিশু হাসিয়া কহিল,
“শিশু সহ রণ ইচ্ছু নাহি কিরে কেহ
এ বিশাল চমু মাঝে হে ধানুকী দল !”
এই রূপে সৈন্য ক্ষয় কতক্ষণ ধরি
দ্বন্দ যুদ্ধে অগ্রসর ভরত লক্ষ্মণ
সার্ধ প্রহরেক রণে শায়িত সেথায়
হে বীরেন্দ্র ! বীর শ্রেষ্ঠ ভ্রতৃদ্বয় তব !”
উঠিয়া সুত করে মুছিয়া নয়ন
প্রলয় জীমূত মন্দ্রে কহিলা নৃমনি!
“কে রবে নীরবে আজি ক্ষত্র পুত্র হয়ে,
ভীরু কাপুরুষ সম অন্তঃপুর মাঝে!
প্রতি হিংসা রক্ত তৃষ্ণা উঠুক জাগিয়া,
জাক্ ক্ষত্রিয় ধৰ্ম্ম অসির ঝঙ্কারে।
সাজ যুদ্ধে রক্ষ! কপি, সাজাও বাহিনী
লঙ্কাপতি বিভীষণ বিভীষণ রণে।
সাজরে সুগ্রীব মিত্র! কপি সৈন্য সনে ;
পদাঘাতে জাগরিত ভীম ফণাধারা
ফণী, কোটী ফণা মেলি চলরে ধাইয়া
কোথা মাের ভ্রাতৃ হন্তা দুরন্ত অরাতি !
দহিবে রে বিষদাহে উন্মত্ত রাঘৰ।
আপনি পশিৰ আজি সাজি বীম সাজে
ভেটিতে সম্মুখ রণে ভ্রাতৃঘাতী দ্বয়ে!
বীর বালক।
৪৯
হেরিব সে ছদ্ম শিশু কেহেন ভূতলে,
বাধল সম্মুখ রণে ভ্রাতা তিন জনে।
আপনি কি মৃত্যু পতি ছদ্মবেশ ধরি
আসিয়াছে রণাঙ্গনে শিশুরূপে হায় !
মিশায়ে নয়ন লাের ভ্রাতৃঘাতী লােহে
তর্পণ করিব ভ্রাতঃ! এ প্রতিজ্ঞা মম !”
অজ্ঞা দিল। সেনানীরে সাজিতে অহবে
রণ রণ রবে ভেরী উঠিল বাজিয়া
সজ্জিত বীরেন্দ্র যত যাইতে সমরে !
বীর বালক।
যষ্ঠ সর্গ।
বিধির অব্যর্থ লিপি ! যজ্ঞ অশ্ব তরে,
ভরত লক্ষ্মণ যবে সাজায়ে বাহিনী,
বীরেন্দ্র বিক্রমে আসি পশিল আশ্রমে,
জাগিয়াছে কার চিত্তে, জাহ্নবী পুলিনে
রচিয়া অন্তিম শয্যা আয়ুধ নিকরে
শায়িত হইবে হায় ! শিশুর সংগ্রামে
ব্রহ্মচারী যােদ্ধাদ্বয় ! ধৌত করি কুল
হর প্রিয়া ভাগিরথী বহেন নীরবে;
রক্ত বর্ণ তরঙ্গিনী, ঈষদুৰ্দ্ধে তার,
বহিছে শােনিত নদী নিস্তব্ধ নীরব।
ফিরিছে গৃধিনী শিবা আনন্দ অন্তরে,
শ্মশান ভাবিয়া চিত্তে মহা ঘাের রােলে!
সে মহা শ্মশান ক্ষেত্রে করি’ বিচরণ,
রক্ষিয়াছে যােদ্ধাদ্বয় আহত সৈনিকে।
মুমূমুলভেছে শান্তি মহা ক্লেশ হতে।
ঢালিয়াছে অশ্রুধারা সর্ব অঙ্গে তার।
আদ্ৰ হিয়া ভাতৃ স্নেহে, জাগিয়াছে মনে,
যদিরে অপর ভ্রাতা কর্তব্যের তরে
পড়িত সমরাঙ্গনে, অন্তিমে তাহার
ভাসিত অন্তর মাঝে মাতৃ মুখ সনে,
ভাতার আনন্দ পূর্ণ প্রিয় কণ্ঠস্বর !
বীর বালক।
পরশি কোমল করে আহতের কায়ে
মন্ত্র মুগ্ধ সম দোহে মৃদু কণ্ঠস্বরে
সুধাইছে “ক্ষত স্থানে যন্ত্রণা কেমন ?”
বিস্ময়ে মরণক্ষণে শিশু অঙ্কশায়ী
কত সৈন্য, আঁখি জল করেছে বর্ষণ !
যুদ্ধ কালে কালান্তক কাৰ্ম্ম ক টঙ্কার
করিয়াছে যেই ভূজে স্নেহ শ্লথ তাহা !
কাৰ্য শেষে জয়ী বীর মাতৃ অঙ্ক পরে
ফিরিয়াছে অঙ্গ ধৌত করি গঙ্গোদকে।
মাতৃ স্নেহে সুর্ণীতল দোহার অন্তর,
প্রবােধিয়া জননীরে ফিরিল প্রভাতে
প্রিয় তটিনীর তটে, শােভে' শুক তারা
তখনাে উষার ভালে, অঞ্চলে আমরি!
তরুণ অরুণ রশ্মি রাজিছে ঈষৎ।
তটিনী অদূরবর্তী শাল তরুতলে
বসিয়া কহিল লব,
“এখনাে কি লাগি,
নাহি দেখি নীল নতে অশ্বপদ ধূলি ?
ভ্রাতৃ হারা ক্ষুদ্ধ চিত্ত
ক্রুদ্ধ রঘুনাথে
প্রলয়ে সংহার মূর্তি শূলী শঙ্কু সম
প্রতিশােধ ইচ্ছু কেন না হেরি এখন?
গত নিশাকালে শুধু ভাবিয়াছি চিতে,
প্রাণাধিক ভগ্নদূত কহিবে যখন
বীর বালক।
“পতিত হে রঘুপতি ভ্রাতৃবৃন্দ তব”
কেমনে সে বজ্রবাণী ধ্বনিবে গম্ভীরে
সীত। শশাকে নিয়মান রাঘব পরাণে!
মণিহারা ফণীসম উঠিবে গর্জিয়া !
সুরক্ষিত রাজ চমু প্রায় নষ্ট সব,
অবশিষ্ট রক্ষোজয়ী বানর বাহিনী।
হেরিব সুমন্ত্র চালিত বিমানে
বীর ত্রাস রযুমনি লঙ্কেশ বিজয়ী,
কি ভাগ্য শিশুর আজি। পূজিব হরষে
সে বীরেন্দ্রে শর দিয়ে বীর উপচারে।”
নীলাভ নভােমণ্ডলে চাহিয়া দু'জনে
অতীব তৃষিত আঁখি, চাতক যেমতি
নব জলধর পানে। বহুক্ষণ পরে
পশ্চিম গগন প্রান্তে ঘন ধূম সম
ধূসর বরণে ক্রমে আবরিল যেন
সচকিত বীর শিশু ; দেখিতে দেখিতে
কহে কুশ,
“অরিন্দম! পূর্ণ মনস্কাম
দ্রুতগতি মহীপতি অগ্রসর হেথা,
অশ্বপদ ধূলি হেরি, মহাশব্দ শুনি,
মহর্ষির মহাপ্রিয় পােবন ত্যজি,
অদূর প্রান্তর মাঝে দাঁড়াইয়া বীর!
রঘুনাথে বীরপণা দেখাব সেথায়।”
বীর বালক।
আলিঙ্গিয়া পরস্পরে গাঢ় মেহ ভয়ে,
পরস্পরে মুখপানে চাহিল ক্ষণেক!
কহে লব, “সাবধানে পশিও সমরে,
যদি ভাই, এই হয় শেষ আলিঙ্গন
জন্ম ভরি’ মনে রেখ দুঃখ না ভাবিও
স্নেহময়ী জননীরে প্রবােধ বচনে
বুঝাইও, অশ্রুধারা দিও না ফেলিতে।
যদি হয় রণ জয় মায়ের প্রসাদে,
নাগ পাশে রেখ’ বাঁধি পবন নন্দনে,
মাতৃপদাম্বুজ তলে দিব উপহার
বীরত্বের পরিচয় পাইবে জননী।”
আনন্দে ত্বরিত গতি সাজিল দুজনে
রণসাজে, বলল অঙ্গ আবরণ
অাটিয়া বাধিলা দেহে, অসি কটিমূলে
বাধিল সুদৃঢ় করি ; গরজে সবনে
তূণ মধ্যে মহা অস্ত্র ব্রহ্মশিরা আদি।
ভক্তি ভরে নতজানু গুরুর উদ্দেশে;
স্মরিলা অন্তর মাঝে মার চরণ !
গৰ্ব্বস্ফীত তেজোদৃপ্ত উন্নত শরীর
চক্ষে খেলে মহােৎসাহ, মহােৎসাহ প্রাণে
ক্রীড়াঙ্গমে সাথী হেরি নবােৎসাহে যথা
নাতে রাসকের হিয়া।
৫৪
বীর বালক।
ভাগীরথী পার হয়ে শত শত সেনা
বিকটদর্শন যত বানর কটক
মহাশব্দে মুখরিত করিল আশ্রম।
দুগ্ধ শ্বেত পতাকায় আচ্ছন্ন গগন।
কিবা মনােহর দৃশ্য ! পশ্চাতে পুষ্পক
সুমন্ত্র চালিত অশ্ব বসি সে বিমানে,
ক্ষুব্ধ চিন্তাক্লিষ্ট চিত্ত বিষগ্র রাঘব ;
সুনীল গগনে যেন আসিছে ঘনায়ে
বরষার মেঘমালা, গিরি শিরে যেন,
ধূসর তমসা জাল ফেলেছে ঢাকিয়া !
শুষ্ক অ চিহ্ন গণ্ড, শুষ্ক যেন প্রাণ
উৎসাহ উদ্যম হারা। রাজসজ্জা কায়ে,
সুবৰ্ণ কিরীটি শিরে, মণি জ্বলে তায়,
অঙ্গে শােভে অঙ্গস্ত্রাণ রতন খচিত।
নীলাজ নয়নদ্বয় (চাহিল যা দিয়ে
পূজিতে শঙ্করী পদ) শােক স্নান যেন
শুনিয়া কর-ঘাতী ভ্রাতার পতন!
“সতর্কে রহিও ভ্রাতঃ ! রথ, রথী হীন
মায়ের অঞ্চল নিধি আমরা আজিকে”
উপদেশ বার্তা বলি রাজ রথ পাশে
আসিয়া নিরখে লব কৌশল্যা নন্দনে।
আজন্ম তৃষিত নেত্ৰ আহা! মিগ্ধ আজি,
তাপ দগ্ধ গিরি যথা ঃষ্টি ধারা পাতে।
বীর বালক।
ওই ভূজবলে ?
অজ্ঞাত পুলকে দেহ উঠিল শিহরি
কি যেন অভাব তার পরিপূর্ণ আজ
চরিতার্থ জন্ম যেন ভাবিল সে চিতে!
সমােধি মধুরারাবে মৃদু কণ্ঠস্বরে,
কহিলেন রঘুপতি,
“হে প্রিয় দর্শন।
এ ক্ষেত্রে কি প্রতিদ্বন্দী তােমরা আমার ?
শায়িত কি মহাবাহু ভ্রাতা তিনজন
যেন নবনীত দিয়ে
গঠিত মৃনাল কান্তি কম ভূজযুগ !
এত তীক্ষ্ণ, এত তীব্র, শিশু সৰ্প সম
তােমাদের অস্ত্র বৎস! বিশাল বাহিনী
হেরিতেছি নিপাতিত তােমাদের করে !
ধন্য মহা বীৰ্য যােদ্ধা! পরিতুষ্ট আমি।
অজ্ঞাতে বিজয়-লক্ষ্মী করেছে বরণ,
তােমা দোহাকারে আজি এ সমর স্থলে।
রাজটীকা দিব অাঁকি’ ও দিব্য ললাটে
সুরেশ সুলত শির শােভিবে কিরীটে--
পুত্ৰাধিক যত্নে দোহে পালিবে রাঘব
রণে দেহ ক্ষমা, অশ্ব দেহ মাের ছাড়ি।
চল সঙ্গে যজ্ঞাগারে ; জীবিত কি কহ
পিতা তব ভাগ্যবান মাতা ভাগ্যবতী ?
সম্ভবে কি এত বীৰ্য তাপস নন্দনে ?
বীর বালক।
শান্তি প্রিয় ঘিজসুত অস্ত্রবিদ হেন?
ধন্য করি কোন বংশ, অলঙ্কার রূপে
উজলিছ কহ দোহে।”
জুড়ি যুগ্ম কর,
কহিলা কুমারদ্বয় সুবিনীত স্বরে ;-
“আজন্ম নবনিবাসী তাপসকুমার,
আমরা বাল্মিকী শিষ্য শুন মহারাজ !
এইমাত্র পরিচয় জানিবে দোহার।
কি প্রশংসা আমাদের এ সমর জয়ে
কহ দেব! দিনমণি নিজ তেজ দিয়া
চমারে জ্যোতিষ্মন করেন সতত,
তাই সে শীতল কর প্লাবে বসুন্ধরা ;
ধন্য কহ শিক্ষা-গুরু সে তাপসবরে।
কুতুহলে যজ্ঞ অশ্ব রণ পণ করি
বাঁধিয়াছি মহারাজ! ফিরাইতে তাহে
শায়িত সসৈন্যে হেরাতৃবৃন্দ তব।
আজ্ঞা দেহ নরােত্তম তব সৈন্যদলে
করিতে সম্মুখ যুদ্ধ ; সাজায়ে বাহিনী
এস রণে ধরি ধনুঃ, যে কাৰ্ম্ম ক খরি
বিনাশিলে লঙ্কাপুরে লঙ্কেশ-বিজয়ি !
রক্ষঃ সনে দশাননে, এ প্রার্থনা মশ।
কোমল করুণ কণ্ঠে কহিলা যণি,
চাহিয়া সতৃষ্ণ আঁখি শিশু মুখপানে-
বীর বালক।
“ব সত্য গুরু তব; কিন্তু ধীরবর।
প্রতিবিম্ব ধরিবারে নিজ অঙ্গ পরে
সুস্বচ্ছ দর্পণ বৎস!
সক্ষম সতত,
নহে কভু মৃৎ পাত্র প্রতিবিম্বগ্রাহী।
দেখিতেছি আজি বলি! তােমরা তেমনি
মহর্ষির শিক্ষা লভি নিজ প্রতিভায়।
অতুল বীরত্ব রত্ন মণ্ডিত আজিকে!
কিন্তু তবু ব্যথা আসে এ পােড়া পরাণে
ভাবিতে, হানিব অস্ত্র ও কম শরীরে !
চির ভাগ্যহীন রাম, সুভাগ্য হইলে
তােদেরি মতন শিশু চিদানন্দরূপী
শিখিত আয়ুধ ক্রীড়া বসি রথ পাশে!
রাখ বাক্য ধনুর্ধর, ছাড় রণ পণ
এস অভাগার বুকে।
কেন পুত্র বলি
মনে হয় ? হেরি যেন আমারি শৈশব
আজি মূর্তিমান হায় ! আমার নয়নে !
সীতার সারল্য আর কোমলতা ছবি,
অঙ্গে অঙ্গে হেরি যেন, অন্তর আমার
উথলিত, মসিন্ধু ঝটিকা পরলে
বিক্ষুব্ধ যেমতি হায়! তােরা পুত্র কার ?
গেরা কিরে জানকীর শেষ লক্ষাস্থল ?”
বিরক্তি রক্তিম মুখে কহিলা সঙ্গে
শিশুলব, “রঘুমনি! তুমি নরপতি
৮৫
বীর বালক।
এ রাজ্যের, প্রজাপুঞ্জ পুতুল্য তব
ভাগ্য দোষে নরমনি! পুত্রহীন তুমি
বালকে দেখিয়া তাই ও অন্তর মাঝে
লুক্কায়িত স্নেহধারা কুলঃবী হয়ে
আকুল করিছে তব ও মহান্ হিয়া !
নিবার রণে বীর! স্থির প্রজ্ঞ মােরা;
তােমার সংগ্রাম প্রথা শিখাও আজিকে
শিশুদ্বয়ে, দেখ বলি, পরীক্ষা করিয়া
কি শিক্ষা লভেছি দোহে মহর্ষির কাছে।
কি কহিব মহারাজ, দেখ ভাবি মনে
বিন্দু ভীতি থাকিলে এ অন্তর মাঝারে
তব আজ্ঞা ধরি শিরে রাখি শরাসন
ফিরিতাম সুকুটীরে। তুমি পৃথ্বীপতি,
মাগিতে জীবন ভিক্ষা তব সন্নিধানে
কি লজ্জা শিশুর কহ ? করিয়াছি পণ
‘বিনা রণে অশ্ববরে না দিব ছাড়িয়া
দেহে বহে উষ্ণ রক্ত, নাচিছে ধমনী
রণবাদ্যে, কহ মােরে ফিরিব কেমনে
আমরা বাল্মিকী শিষ্য অপমান করি
মহর্ষি প্রদত্ত দিব্য আয়ুধ নিকরে ?
ধর ধনুঃ মহারাজ! জিনিয়া সংগ্রামে
দণ্ড দেহ এ অবাধ্য প্ৰজাঘয়ে তব
উনি শিশু মুখে শেষ শপথের কথা,
বীর বালক।
আজ্ঞা দিলা মহামতি আপন সেনারে,
করিতে সম্মুখ রণ; ধরিলা আপনি
দীপ্তিময় শরাসন দশাননঘাতী।
দক্ষিণে সুগ্রীব মিত্র, বামে বিভীষণ,
সম্মুখে রক্ষিছে রথ পবন তনয় ;
ভীম মূৰ্তি কপি চালিত বাহিনী।
অগ্রসর রক্ষসৈন্য রণে ভয়ঙ্কর।
কহিলেন রঘুনাথ
“লহ মহারথি,
ইচ্ছামত রথ অশ্ব বাছিয়া দুজনে,
কর যুদ্ধ,
সসম্ভ্রমে উত্তরিল দোহে ;
ধন্য তব আনুকূল্য, কিন্তু মহামতি,
নহি মােরা এ জীবনে সুখ অভিলাষী,
আজন্ম সুখ পালিত। কঠোর জীবনে
লভিয়াছি বাল্যকালে অনন্য সুলভ
কঠোরতা, মহারাজ, রহিব ভুতলে।”
বাজিল সমর বাদ্য ঘন রােলে
উত্তরিল প্রতিধ্বনি দিগন্ত বিদারি।
??
বীর বালক।
সপ্তম সর্গ।
সপ্তাহ অতীত প্রায়, ভীষণ সংগ্রাম!
একা অভিমন্যু যথা কুরু বুহ মাঝে,
বিমথিল কৌরবেরে কেশরী বিক্রমে
সামান্য কিশাের বীর! অথবা ত্রিদিবে
উমার কুমার যথা দৈত্য দলপতি
বীরেন্দ্র ‘তারক’ সঙ্গে ত্রিদিবের তরে !
শিশুর সমর হেরি বিস্মিত রাঘব !
জাগিছে মানসে র, ঋষি যজ্ঞাগারে
ছিলেন শৈশবে যবে যজ্ঞরক্ষী রূপে
অনুজ লক্ষ্মণ সঙ্গী, এমনি কৌশলে
বিনাশিয়া রক্ষঃগণে মায়াবী মারীচে
অর্ধমৃত শরহাত করেছিল হায়।
আচ্ছাদিত শরজালে মধ্যাহ্ন গগনে
ভগবান অংশুমালী, কুলক্ষয় হেরি!
নাহি পুষ্পকের সেই শয্যা মনােহর ;
নাহি গতি, শরজালে রুদ্ধ দশদিক
সন্ত্রাসিত রঘুমনি শিশুর সমরে!
নাগপাশে বদ্ধ দূরে অঞ্জনানন্দন
চির অরিন্দম রণে ; নয়ন পলকে
রাঘবের ব্ৰহ্মঅস্ত্র বিনাশিল বীর
শেলপাটে, বিন্দু ধর্ম মুছিতে ললাটে
৩
বীর বালক।
খণ্ড খণ্ড অশ্ববৃন্দ, কম্পিত বিমান,
ছিন্ন কণ্ঠ সুমন্ত্রের, সত্বরে ভূতলে
অবতীর্ণ সীতানাথ অসি চৰ্ম্ম ধরি,
হুঙ্কারি কহিল লব, “সম্বর নৃমনি!”
যমদণ্ড সম অস্ত্র সরকার গতি
উগারিয়া অস্ত্রগণ ছুটিল চকিতে
রাঘবের বক্ষ লক্ষ্যে, হেরিয়া নৃপতি
দাড়াইলা শূল করে শূলী শসম,
স্মরি নিজ ইষ্টদেবে, বিধিল আসিলা
ভয় করি অসিচৰ্ম্ম, রাঘবের বুকে,
নিপতিত রঘুনাথ শশাণিতা ভূমে,
মধ্যাহ্ন মিহির আহা লুটায় যেমতি
মহীতলে! রাহুগ্রাসে পূর্ণশশী আজি!
পরাজিত বক্ষঃ সৈন্য বিপুল আয়াসে
হুঙ্কারিল কুশ, নাশি বানর বাহিনী!
রক্তাপ্লুত অঙ্গে দোহে আলিঙ্গন করি
মহাশঙ্খ বাজাইল বিজয় উল্লাসে।
অচৈতন্য হনু তাহে জাগরিত হায় !
বিষাদে কপী হেরে পতিত সমরে
রাঘবেন্দ্র, বরঅঙ্গ লুষ্ঠিত ভূতলে;
মন্ত্রীশ্রেষ্ঠ জাম্বুবান শায়িত সংগ্রামে।
পতিত সুষেন, গয়, গবা, অঙ্গ,
সুগ্রীব বানর রাজ উমা তারা পতি,
বীর বালক।
অচৈতন্য বিভীষণ রক্ষঃগণ সনে !
মহা রণক্ষেত্র মাঝে শায়িত সকলে
খর শরাঘাতে, খেদে অবসন্ন কায়ে
“হায় প্রভাে !” বলি কপি মুচ্ছিত আবার !
বক্ষ হ'তে—ভক্ত বীর যেই বক্ষ মাঝে
‘ম’ নাম ‘রাম' মূৰ্ত্তি বহিত হরষে,
সেই বক্ষ হ'তে বেগে বহিয়া রুধির
সিক্ত সৰ্ব্ব দেহ, বলী নিস্পন্দ বিষাদে।
শুনিয়া সে শব্দ কুশ চাহে চারিদিকে
হেরিল জীবিত কিন্তু সংজ্ঞাহীন কপি।
কহিল, “শুনেছি বীর!
অমর এ হনু
জানকীর আশীর্বাদে রবে চারিযুগ !
লহ বাধি বৃক্ষ শাখে, কুটীরে ইহারে,
যুদ্ধ শেষ সমাচার কহিব মায়েরে ।
বলিয়াছি এতদিন ‘মােরা ক্রীড়া করি
রাজপুত্রগণ সহ, দেখাইব আজি
সে ক্রীড়া জীবন মৃত্যু দিল নিৰ্বাচিয়া।
কৰ্ব্ব র গৌরব খৰ্ব্ব যার ভুজবলে
সেই মহাবলী আজি নিপতিত রণে
বন্দী হনু (চিরদিন অজেয় সমরে )
শিশুর শানিত অস্ত্রে আজিকে হেথায়।”
থামিয়াছে ভীমরণ, মহাবেগ ভরে
নদ পতি লীন হয়ে সশব্দে সাগরে
বীর বালক।
নিস্তব্ধ নীরব, ঝা অন্তে নীরনিধি
গম্ভীর সুস্থির অতি। নিৰ্ম্মল গগন,
মহাদুঃখে দিনেশ্বর সর্ব অঙ্গ হতে
যেন রক্ত পড়ে ঝরি অস্তাচল শিরে।
অন্ধকার সুনীরবে আচ্ছাদিতে আসে
রণক্ষেত্র, গঙ্গাদেবী সাজিয়া মােহিনী
খেলিছে মৃদু মলয়ে বালিকার মত
উৰ্ম্মি বাহু তুলি, বক্ষে সাজে অভিনব
শ্বেত পুষ্প মাল্য সম শুভ্র ফেন রাশি
রক্ত রবি কর পড়ি তরঙ্গ উপরে
প্রবাল মুকুত সম রাজিছে সুন্দর!
কি লীলা করিছে সতী বেলা বিলম্বিতা-
ধ্যান মগ্ন শম্ভু শিরে খেলে যথা সুখে !
মাতৃস্নেহ ধারা সম পিবত্ৰ নিৰ্ম্মল
মনাে বিমােহিনী শােভা অপরাহ্ন কালে।
থামিয়াছে যােদ্ধা মুখে মহান্ত রব,
অঘের গর্জন আর মাতঙ্গ বৃংহতি
না করে কম্পিত পৃথী, ধ্বংসশেষ সেনা
অবসাদে অচৈতন্য সপ্তাহের শেষে।
সজ্জিত অরণ্য মাঝে দাবানল রূপে
দহিয়াছে শিশুদ্বয় অমিত বিক্ৰমে ।
নীরব আবাস মাঝে জনক দুহিত
বীর বালক।
চিন্তাক্লিষ্টা, দুঃখভারে অবনত হিয়া ;
সহসা আকুল হয়ে নয়ন যুগলে
বহিয়া সলিল ধারা, ভিজিল বসন।
হাহাকারে ভরে হিয়া ; অস্ফ ট আরাবে
অন্তরের অভ্যন্তরে কে কাদে বিষাদে।
যেন কার জীবনের সুখস্বপ্ন শত
আকাশ কুসুম সম মিশাল অাকাশে !
গাঁথা মালা আছে পড়ি; রয়েছে পড়িয়া
পূজার নৈবেদ্য, হায় ! শূন্য হৃদাগার,
প্রেমের দেবতা কার নাহি সে মন্দিরে !
একাকিনী মা জননী, না পশে সেখানে
রণ কোলাহল রব ; না জানে বার,
শুনে নিত্য নিশা শেষে পুত্রদ্বয় কাছে,
মৃগয়া করিতে আসে রাজপুত্রগণ,
আশ্রম রক্ষার তরে থাকে লব কুশ।
মহর্ষি নাহিক বাসে অরক্ষিত দেহে,
শিক্ষিত তাহাতে, সদা ফিরে অস্ত্ৰকরে।
মানস সরস মাঝে স্বর্ণ পদ্ম সম,
স্নেহের প্রসূন দুটী, ছিড়িয়া কি কেহ
সীতার জীবনী শক্তি হরিল হায়রে ?
কাতরে কঁদিছে হিয়া তাই কি আজিকে
শত দিবসের কথা শত সুখ দুখ,
চিত্রপটে সুচিত্রিত চিত্রের মতন,
বীর বালক।
একে একে দেখা দিল অন্তর মাঝারে।
তিলে তিলে অগ্নিজালা দহিছে হৃদয়,
ধূমহীন চিহ্নহীন সে বহ্নি ভীষণ।
বিশাল এ বিশ্বতলে অভাগী, সীতার,
অন্তর প্রস্তর মাঝে ক্ষীণতােয় দু’টী
প্রীতির নিঝর বহে করিয়া শীতল
এ অসহ্য জ্বালা অতি মানস মােহন,
বৃক্ষ শম্ভু শূলপাণি ! না শুকায় যেন
প্রচণ্ড মার্তণ্ড তাপ সে নিঝর দ্বয়ে।
রক্ষা কর শিবরাণি ! সতি, কাত্যায়নি।
ক্ষীণ এ তারকা দুটী, গভীর তিমিরে
আচ্ছন্ন অন্তরাকাশে ক্ষীণ দীপ্তি মরি।
নিবায়াে দয়াময়ি! রক্ষ রণে বনে।
জগৎ জননী তুমি, মাতৃ হিয়া তব
অবিদিত নহে মাগাে !
স্মর মা আজিকে
সুকুমার কাৰ্ত্তিকেয়ে।
একাকিনী সীতা;
দিবসের কাৰ্য শেযে পুষ্পেদ্যান মাঝে
ভ্ৰমিছেন ; মৃদু মন্দ সান্ধ্য সমীরণ
কুসুম সুবাস হরি, আসিল ছুটিয়া
জুড়াইতে জানকীর বর বপু খানি
তপােক্লিষ্ট দুঃখে ম্লান। কাষায় বসনা
পতিতা সানী সহ এক ভাবে
বীর বালক।
A
পুত্রের কুশল বার্তা চিন্তেন নীরবে।
কুসুম ফুটিল কত ; বেলা, গন্ধরাজ,
মল্লিকা, বাসন্তী পুষ্প বকুল গােলাপ
আবরি শ্যামল পত্রে অর্ধ অঙ্গ (যেন
চতুর ভ্রমর ভয়ে) ঈষৎ হাসিয়া।
রূপসী মালতী যুথী ফুটিল গৌরবে,
অৰ্ধক্ষ ট কেতকীর মধুময় ঘ্রাণ,
বহিল মলয়ানিল আমােদে মাতিয়া।
শ্মশান নিবাসী শিব অঙ্গ আভরণ
ধুস্ত রা, চাহিল অতি মদালস চোখে,
দেবদেব ধ্যান যথা গম্ভীর সুন্দর!
দিবাশেষে দিনেশেরে হেরিয়া পশ্চিমে,
পশ্চিমে পড়িল ঢলি পতিপ্রাণা সতী
সূৰ্য্যমুখী, রাঙ্গা মুখ হয়েছে মলিন
একদৃষ্টে রহি চাহি সমস্ত দিবস
ভানু পানে, অথবা সে ইষ্ট দেবতায়,
হেরিবে, নিশা আসি দিবে আবরিয়া
তাই ভাবি। কি নিষ্কাম মধুর সাধনা !
সমস্ত কামনা আর যায় পূর্ণ হয়ে
ক্ষুদ্র কায়ে প্রাতে যবে বাশারুণ দুতি
পড়ে আসি, আত্মহারা সিদ্ধিলাভ করি।
যথা পতিপ্রাণা সতী তারত গৌরব
কাৰ্যশেষে পতি যবে রণক্ষেত্র মাঝে
বীর বালক।
৬৭
পাতিয়া শায়ক-শয্যা লভেন বিরাম,
চাহি পতি মুখপানে চিতানলে সতী
লভেন উপাস্য দেবে জীবন সপিয়া।
যেন শুধু জীবনের ছিল প্রয়ােজন
‘নবােঢ়। জীবন হ’তে শুধু পতি তরে।
আজি কাৰ্যশেষ, প্রভু স্বৰ্গগত 'এবে
পারে কি রহিতে দাসী ইষ্টদেবে ছাড়ি।
আসিয়াছে পতিপদ চিহ্ন লক্ষ্য করি
ছাড়ি পিতৃ মাতৃ অঙ্ক, আজি জন্ম শেষে
সে পদাঙ্ক হেরি শুধু যাইবে স্বরগে,
অক্ষয় সিন্দুর বিন্দু ললাটে লইয়া।
পবিত্র ভারতবর্ষ জাত ক্ষুদ্র ফুল,
কর্তব্য পালিয়া প্রাণ সপে অবহেলে!
সুশুভ্র উপলখণ্ডে বসি নত জানু
জননী, আবৃত স্কন্ধ আবৃত আনন
কৃষ্ণ কেশ জালে, যেন কী শুগু আসি
পড়িতেছে পদ্মপরে; অশ্রুর হিল্লোলে
নীল ইবির নিলি নন যুগল,
প্লাবিয়া, মুক্তা সদৃশ তরল সলিল
কপােল বহিয়া বা বসন ভাসায়।
কাতরে কহিলী দেবী, "নিত্য তকালে
হে মার্তণ্ড, কুলপতি। পূজে শুচি হয়ে
তব কুলবধু তোম, হে জব সঞ্চাশ!
বীর বালক।
রঙ্গ সুরক্ষণে প্রভু, রক্ষঃ কুলান্তকে
সহ ভ্রাতা; রাখ দেব ! সীতার বচন
কুলােজ্জ্বলকারী পুত্রে দেখাে দয়াময়!
জানে অর্চনা সীতা, না জানে মহিমা
আপন স্বার্থের লাগি তনয়া তােমার
হে ব্ৰহ্ম স্বরূপি, তােমা চাহে অর্চিবারে।
ক্ষম তার বাতুলতা, অপরাধী সীতা
চরণ সবরাজে, কেন মলিন কিরণে
বিষাদ ব্যথিত দৃষ্টি চাহিছ কাতরে ?
কহ তাহা পূজনীয় ! অথবা কি আজি
কাতরা হেরিয়া মােরে মলিন ভাস্কর ?
আজো উন্মাদিনী সীতা, দেহ শান্তি তারে
হে অন্তৰ্য্যামি প্রভু, রঘু কুলমনি !
আজন্ম বিষাদ ব্যথা যে অভাগী তরে
ভুঞ্জিয়াছ মহাভাগ ! স্বর্ণ মূৰ্ত্তি গঠি
কেন তারে এ সম্মান করিছ নৃমনি!
আজিও অভ্যস্ত সীতা ‘আৰ্যপুত্র’ বলি
জপিতে তােমার নাম, শিখেনি সে দাসী
স্বার্থহীন প্রজা সম পূজিতে তােমারে !
সমস্ত অন্তর রাজ্যে হে রাজা আমার।
যে আসন পাতিয়াছ, জন্ম জন্ম দাসী
দিবে আনি রাজকর ও পদ রাজীবে!
আর কি জনমে তার হেরিবে না প্রভু!
বীর বালক।
রাজ রাজ্যেশ্বর মূৰ্ত্তি মহিমা মণ্ডিত
বাহ নেত্রে ? এ নিশা কি হবেনা প্রভাত ?
সীতার জীবন্ত স্বর্গ সুখ মােক্ষদাতা !”
ভগ্ন হ’ল কণ্ঠস্বর, অজ্ঞাতে কেমনে
গৈরিক অঞ্চল খানি টানি কণ্ঠপরে
নমিলা ভূতলে, আহা! পূৰ্ব্ব গিরি শিরে
নমে যথা উষা, তার ইষ্ট দেবতায় !
বীর বালক।
অষ্টম সর্গ।
“জনী গাে ! দ্বার প্রান্তে নিরখ আসিয়া,
তােমার চরণ পদ্মে আনিয়াছি আজি
অর্জিত গৌরব চিহ্ন। বীরত্বের গাথা
শুনি নিত্য রামায়ণে ; আজি দেখাইব,
তােমার দুঃখের ধন লব কুশ দেহে
মহর্ষির শিক্ষা বলে কি রত্নে আজিকে
ভূষিত হয়েছে দেবি। দেখ মা দুঃখিনি!
স্নান মুখে হাসি রশ্মি ফুটাও মা আজি!
আমাদের চির কাম্য প্রিয় পুরস্কার।
সিংহ শিশু সম মাগাে! তব আশীর্বাদে
জগতেরে দেখায়েছি সতীর সন্তান।”
আনন্দ আবেশে ছুটি আসে লব কুশ
দ্বারে রাখি তৃণ রজু আবদ্ধ করিয়া
বীর শ্রেষ্ঠ হনুমানে।
আনন্দে তাদের
গদ গদ কণ্ঠস্বর, রাঘব বনি
আসিলা আনন্দ চিত্তে পুত্রের সম্মুখে
কহিলা হসিত মুখে,
“দীর্ঘ সারা দিন,
নাহি কিরে এক বিন্দু ক্ষুদ্রঅবসর
আসিতে কুটীরে বৎস! অপরাহ কালে?
একাকিনী গৃহে আমি, শুষ্ক বনকল
বীর বালক।
৭১
কাদি খেদে,” (প্রদীপের স্তিমিত আলােকে
হেরিলা কোমল কায়ে অস্ত্র কত শত )
“একি দেখি প্রাণাধিক, কি খেলা খেলিয়া
অস্ত্র ক্ষত সৰ্ব্ব অঙ্গে রক্ত দ্বারা বাহে !
হা অভাগ্য! কম কায়ে কোন সে নিঠুর
আঘাতিল অস্ত্র, আহা! শিরীষ কুসুম
কে দিল কণ্টকাঘাতে বিদারিত করি?
অন্ধের নয়ন তােরা বার্ধক্যে সম্বল,
কেন দ্বন্দ কর কহ রাজ পুত্র সনে
ক্রীড়াচ্ছলে, বয়ােজ্যষ্ঠ সবে তােমাদের।”
অফ ট কাতর কণ্ঠে কে চাহে সলিল
দ্বার দেশ হতে ? মাতা ছুটিলা বাহিরে
আধ অন্ধকার, আধ গােধূলি আলােকে
হেরিলা অন্ধ চেতন, বদ্ধ অবয়ব
সুদৃঢ় লতা বন্ধনে, পবন কুমার
চির প্রিয় ভক্ত তাঁর পুত্ৰাধিক চির।
বিস্ময়ে অচিরে মাতা পকর দিয়া
ঘুচাইলা বদ্ধ বীরে বন্ধন হইতে
অঙ্গে হস্ত বুলাইয়া কহিল আদরে
“হেথা কি কারণে ৰস। প্রাণাধিক মাের।
মৃত্তিকা লুণ্ঠিত তুমি কেন এ দশায় ?
কোথা তব প্রভু মােরে কহ বীমণি !”
পদ্ম গন্ধে মিগ্ধ আহা! বীরে, শরীর,
;
१२ বীর বালক। মেহময় হস্তম্পর্শে লভিল, চেতনা ! ধীরে ধীরে অতি ধীরে মেলিয়া নয়ন হেরিল শিয়রে তার সুধায় কুশল জননী জনক-বালা রাঘব ঘরণী ! কাদিয়া লুটাল বলী মাতৃ পদাম্বুজে, অক্ষয় স্বর্গে তাহার ; পােষিত যেমতি কানন কেশরী লুটে প্রভু পদতলে ! উল্লাসে কহিল লব, “মাগো! অযােধ্যার নরপতি রামচন্দ্রে, সহ ভ্রাতৃগণ সসৈন্যে বধেছি আজি সম্মুখ সমরে, কপিশ্রেষ্ঠ মহাবীরে এনেছি বাঁধিয়া, শুনেছি অমর কপি।” হাহাকার করি ভূতলে লুটাল সতী শিরে কর হানি আকুল নয়ন নীরে ভিজিল ধরণী ; যথা সুশােভিতা লতা নিঠুর কুঠারে ছিন্ন হয়ে পৃথ্বীতলে লুটায় সহসা ! অথবা সরসী জলে বালক-নখর- বিচ্ছিন্ন পদ্মিনী যথা ভাসে মনােখেদে ! আকুল কুন্তল জালে আবৃত বদন, ঢাকে যথা পূর্ণচন্দ্রে কাল কাদম্বিনী ! উঠিয়া কপীন্দ্র কহে,
বীর বালক।
৭৩
“কি হেরিনু আজি!
বিসজ্জিতা মা জানকী নয়ন সম্মুখে
দেখালে বিধাতা আজি ভাগ্যহীনা বেশ।
মাগো! কোথা প্রভু মম, সুধাও তােমার,
পিতৃঘাতী পুত্রদ্বয়ে! কত বর্ষ পরে
ও রাতুল পাদপদ্ম হেরিনু নয়নে !
আজি মনে পড়ে, মাগাে! স্বর্ণলঙ্কা মাঝে,
রক্ষঃ গৃহে অবরুদ্ধা আছিলে যখন,
দেখেছিনু সন্ত্রাসি বিশীর্ণ মোরে
যথা পােলয়া রমা অম্বুরাশি তলে!
মথি রক্ষঃ বীৰ্য-সিন্ধু করিনু উদ্ধার
বহু দুঃখে, আজি পুনঃ অয়ি লগ্নি সতি!
কহিতে কি কুসংবাদ আসিয়াছে দাস !
এমন মমতাময়ী কুসুম কোমলা
তুমি মা, নন্দন তব কুলিশ-কঠোর !
টলিলা এক বিন্দু, অনুনয়ে হায় !
নাহি দিলা পরিচয় রাঘব নিকটে
মহা হিমাচল সম স্ফীত বক্ষ করি
স্থির ছিল রাঘবের সে মহা সংগ্রামে !
পিতৃহন্তা হায় দেবি! ভীষণ সমরে
বধিয়াছে প্রভুগণে। কি কহিব আজি!
জননি! একদা তােমা এসেছিনু বলি
‘সত্বরে আসিয়া প্রভু রঘুকুল চুড়া
•
৭৪
বীর বালক।
উদ্ধারিখে কুললক্ষ্ম । বর্ধি দশাননে।”
আজি কোথা সে আখাস? কোথা নরােত্তম ?
সুধাও ঘ, পুত্রে তব কোথা ঘুঘুমণি?
প্রাণপণে নিবারিয়া আক্রমণ হ'তে
জ্ঞানহারা বুথপার্শ্বে আছিনু পড়িয়া।
মাগাে! পিতৃঘাতী শিশু ধরেছ জঠরে!
অযযাধ্যা আঁধার আজি হাহাকারে ভরা।
আনন্দিত পুত্র তব রাঘবে বধিয়া।”
মুছিলা অজস্র ধারা অঞ্চলে জননী।
আরক্ত নয়নদ্বপ্ন যেন রজবা,
সিক্ত সে গৈরিক বন্ধু । ছুরিত অধর ;
মহা প্রলয়ের পূৰ্বে ৰসুধার মত
প্রশান্ত হৃদয় ; আজি অলিতেছে তাহে
দ্বাদশ সুর্যের আলা। মুখে ভাসে এক
অপূৰ্ব কিরণ যেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ;
প্রলয় বিষাণ বাজে অন্তরে বাহিরে।
বাহিরে চন্দ্রমা-কর-ধৌত বসুন্ধরা
হাসিছে পুলক ভরে। পনস সুর
শাল তাল তমালাদি মহামহীরুহে
আবরিত তপােবন ; মাঝে মাঝে তার
লতা কুঞ্জ পায় শােভা। কি সেজেছে আজি
চন্দ্র-কিরিটিনী-নিশি নক্ষত্র রতনে।
নীলাম্বরে ছায়াপথ কি পােতন।
বীর বালক।
ধ্যান মগ্না প্রকৃতির অঙ্ক হ'তে শুধু
উষা ভ্রমে ঝঙ্কারিছে পাপিয়া কোকিল।
নিথর জাহ্নবী জল ; নাহি বহে তাহে
নৃত্যশীল উৰ্ম্মিমালা মৃদু শব্দ তুলি।
উঠিয়া জনক সুতা কহিলা কাতরে
“বীর কুলৰ্ষত তােমা জানে জগজ্জনে,
অরিন্দম মহাযােদ্ধা বাল্যকাল হ'তে।
হর ধনু ভাঙ্গি প্রভু তুষিলা জনকে ;
লভিলে অভাগী সীতা। বীর পুরস্কার
দুর্ভাগ্য আসিয়া তােমা করিল বরণ।
হে সুধম্বা, বালিয়াতি! বানর সহায়ে
বর্ণলঙ্কা হতে মােরে করিলে উদ্ধার !
রক্ষঃকুল রিপু তুমি কুল মণি !
চির সুদুর্ধর্ষ তােমা জানে তব অরি।
ক্ষুদ্র বালকের রণে, তুচ্ছ শরে তার,
দিলে প্রাণ অবহেলে! অভাগিনী সীতা,
আত্ম পরিচয় কথা বহু যত্ন ভরে
রাখিয়াছে সঙ্গোপনে তব পুত্র কাছে।
আপন নন্দন তব পিতৃহন্তা আজি!
সীতার অদৃষ্ট লিপি নিষ্ঠুর নির্মম !
হেরিলে মলিনা যারে পদ্মনেত্ৰ হ'তে
বহিত সলিল ধারা, কাঁদে সে দুঃখিনী,
রক্ষা কর প্রাণ ভার।
বীর বালক।
আজি খেলা শেষ !
বিসজ্জিতা অভাগিনী ছিল শুধু নাথ !
সীমন্তে লিন্দর বিন্দু, শঙ্খ ধরি করে ;-
কল্যাণ কামনা তব করি অহর্নিশি।
দীর্ঘ দশ বর্ষ দাসী ছিল অপেক্ষায় ;
আজি ফুরাইল সব! উঠ বৎস! তবে,
পুত্ৰাধিক চিরদিন তুমি মতিমান্ !
বন্ধু এই অভাগীর, কর শেষ কাজ,
সাজাও সত্বর চিতা, যথা লঙ্কাপুরে,
অগুরু চন্দন কাষ্ঠে সাজাইলে বলি!
স্নাত হয়ে অনীরে। নারিবে শােধিতে
তােমার ভক্তির ঋণ এ জীবনে সীতা।
লহ এ নন্দন দ্বয়ে স্মৃতি চিহ্ন মোর !
ইহ জীবনের খেলা শেষ হ’ল আজি।
নিৰ্বাসিতা অভাগিনী যাইবে চরণে,
নববধূ সম তার পদাঙ্ক লক্ষিয়।
অন্তিমে সে মহাস্বর্গে লভিব মিলন,
যেথা নাহি দুঃখ, ভীতি, বিষাদ বেদনা।
আজি কহি মৃত্যুক্ষণে ওরে লব কুশ !
রাজার কুমার তােরা রঘুকুলজাত !
জাহ্নবী জীবনে মম যায়নি জীবন
তােরা গর্ভে ছিলি বলে শুধুরে বাছনি।
বিদলি বিমথিতা এ সীতা-সাগরে
বীর বালক।
৭৭
০
অমূল্য মাণিক তাের সুধা সঞ্জীবনী
ছিলি যাদু ! রাজপুত্র কাননে নিবাস ;
বনফলে তৃপ্ত ; তৃপ্ত তাপস জীবনে ;
সৰ্ব্বত্যাগী ; তৃপ্ত সদা মাতার অঞ্চলে ;
দুঃখ নহে তাহা। তােরা রাঘব কুমার,
না পাইলি পরিচয়, শুধু বীৰ্য দিয়ে
জগতে দেখালি, তাের। ক্ষত্রিয় নন্দন!
আজন্ম বঞ্চিত হায় ! পিতৃস্নেহ হ'তে,
অবশেষে সমূলেতে নাশিলি সে তরু!
যবনিকা গেল পড়ি ভবিষ জীবনে,
না রহিল সুখ আশা ! শায়িত সংগ্রামে
খুলতাত সিংহবীৰ্য্য ভরত, লক্ষ্মণ,
শক্র-শত্রুর রণে। যা তােরা ফিরিয়া
পিতৃহীন দীনবেশে অভাগীর ধন !
যেথা অশ্রু বিসর্জিছে সরষু পুলিনে
আঁধার অযােধ্যা পুর হাহাকারে ভরি
পুত্র শশাকাতুরা মাতা কৌশল্যা কৈকেয়ী
সুমিত্রা মমতাময়ী;' বল গিয়ে যাদু,
‘জননীগো! অভাগিনী জানকীর মাের।
শেষ স্মৃতিচিহ্ন। যেথা উৰ্মিলা মাগুবী
শ্রুতকীৰ্ত্তি ;
এ যৌবনে বিধবা হায়রে !
অনলে হইল ডালি কোমল প্রসূন।”
অবারিত অশ্রু মুছি কহিলা কুমার
৭৮
বীর বালক।
( প্রলয়ে গরজে যথা নীল মেঘমালা)
“দাবানলে দহে দেবি ! ক্ষুদ্র বালকের
অন্তর কুসুম কুঞ্জ, না দাও ইন্ধন!
অসহ্য এ অনুতাপ! বীর পুত্র মােরা
শ্রীরাম আত্মজ, প্রিয় শিষ্য মহর্ষির
জননী জানকী তুমি, তেজ বীর্য মাগাে,
তাই এত অঙ্গে অঙ্গে।
কেন না কহিলে
দশরথাত্মজ পিতা অভাগা নন্দনে !
কেন এ কলঙ্ক ডালি,-না ঘুচিবে যাহা
যাবচ্চন্দ্ৰ দিবাকর উদিবে গগনে
দিলে মা তনয়ে তব ?
হায় কি নিয়তি!
ভুল গত কথা দেবি ! চিতার অনলে
জুড়াব অন্তর জ্বালা ; মৃত্যুভয়ে কভু
ভীত কি তনয় তব জীবনে জননি!
কেশরী ঔরসে কভু জনমে শৃগাল ?
ইচ্ছিত মানবজন্ম তব সুখ লাগি
ছিল সদা, কিন্তু ভাগ্য এমনি কঠোর,
পিতৃঘাতী কুলাঙ্গার গঠিল হায়রে!
মরণে ডরিব যদি, বীর দম্ভ ভরে
ৰাধিতাম অশ্বমেধ যজ্ঞ তুরঙ্গমে ?
ক্ষত্রিয় নৃপতি বীৰ্য ছিল কি অজ্ঞাত
তােমার নন্দন কাছে রণক্ষেত্র মাঝে ?
গঞ্জনা না দেহ মাতা! চল গঙ্গাতীরে
বীর বালক।
৭১
!
দেখিব মরণ চিহ্ন অঙ্কিত বদনে,
সুপ্ত শৌৰ্য সৌন্দর্যের মিলিত মহিম!
তাই বুঝি পিতা মােরে বলেছিলা হায়,
“কোথা তব পিতা বৎস, জাত কোন কূলে?”
কটু কহি মহাদম্ভে ডাকিছু সমরে।
তাই এত অনুকম্পা, মেহ-থ-কর
করিল সমর তাত! ভুলিব কেমনে
অহাে !
সে ভীষণ স্মৃতি! কি অভাগ্য মাের,
সম্ভাষিনু পুত্র আমি অস্ত্র দিয়ে রে!
জালি অগ্নিকুণ্ড তাহে পশিব দুজনে
আজি দেবি, এক বৃন্তে জন্ম দোহাকার,
জীবনান্তে এক সঙ্গে পড়িব ঝপায়ে
পিতার ক্ষমার লাগি জ্বলন্ত হুতাশে।”
পবিত্র নয়নধারা পবিত্র যেন বা
জাহ্নবী জীবন, বহে রক্তগণ্ডস্থলে,
শােকরুদ্ধ কণ্ঠস্বর কি জ্বলা প্রকাশ।
উত্তপ্ত হইল বায়ু দীর্ঘশ্বাস তাপে।
সীতার শান্তির গৃহ বিষাদে মগন,
স্তব্ধ,-যথা ঝঞ্চা পূর্বে সুনীল সাগর
অথবা জলদাৰ্বত নীল নতঃ ছবি।
বীর বালক।
নবম সর্গ।
প্রশান্ত নিস্তব্ধ আজি শােক মূহ্যমান্
মহানিশি ; মহাদৃশ্য জাহ্নবী সৈকতে !
সে মহা শ্মশান ক্ষেত্রে আজি লীলাশেষে
পতি পদ ধরি শিরে আদর্শ ললনা
ভারত কুমারী এক সহমৃতা হবে !
পৃথ্বী সুতা, রাজঋষি পালিতা শৈশবে,
পৃথ্বী অধিশ্বর ম ষা, রাজেন্দ্র ঘরণী,
আজন্ম পরীক্ষা-পূতা, চির পতির
দুঃখ-জ্বালা-ময়ী এই বিশাল ধরণী
দিল না জীবনব্যাপী মহা সাধনায়
সিদ্ধি এতটুকু ; শুধু অগ্নি লেলিহান
অন্তরে বাহিরে সদা লতিয়াছে সতী ;
আজি শেষ তার ! প্রতি দুঃখময় দিবা
অবসান হয়ে দুঃখে আসিত শৰ্বরী,
আজি সে দুঃখের নিশি যাবে ফুরাইয়া,
লভিবেন সাধ্বী সতী আপনার তপে
তপােসিদ্ধিরূপী তাঁর ইষ্ট দেবতায়।
সুপবিত্র অশ্রুজলে অশােক কানন,
আর সে জাহ্নবী তীরে বাল্মিকী আশ্রম
প্রতি পদক্ষেপ পূতা বিশাল বসুধা,
ধন্য তার দীর্ঘশ্বাস বহি নিজদেহে
v
বীর বালক।
মরুত মণ্ডল, ধন্য অগ্নি পরীক্ষায়
সৰ্ব্ব ভক্ষ্য হুতাশন, ধন্য শতবার
ধরি বক্ষে সতী চিতা পদধূলি বহি
জননী ভারতভূমি। গৌরব হার
শ্রেষ্ঠ সহমৃতা সতী ভারত কুমারী ;
ক্ষত্রিয়ের মহাবীৰ্য্য অসি সাধনায়,
ব্রাহ্মণের সৰ্ব্বত্যাগী নিস্পৃহ স্বভাবে,
বৈশ্যের বানিজ্যে আর শূদ্রের সেবায়
জাতীয় জীবন পূৰ্ব্বে আছিল উজ্জ্বল !
আজি কোথ। সেই দিন, আজি কোথা হায়,
সেই সুমহান্ দৃশ্য, প্রজ্জ্বলিত চিতা
পাবক শিখারূপিনী সালঙ্ক, তা সতী,
পতি পদ অঙ্কে ধরি লভিছে নিৰ্ব্বাণ !
মৃত্যু ভীতি দূর হয়ে কবে পুনরায়
শিখিবে স্বধৰ্ম্ম তরে মরিতে ভারত ?
এ জড় মরণ গ্রাসে কবে মুক্ত হবে ?
কবে পুনঃ মহাশক্তি! অাবি আবার
রত্নময়ী ভারতেরে করিতে উদ্ধার ?
অভয়া বরদা রূপে মহাকালী বেশে
এ মহা শশ্মশানক্ষেত্রে আয় মা আজিকে!
বীরেন্দ্র পৃষ্ঠবাহিনি ! অয়ি দশ ভূজে !
আয় মা পুত্র বৎসলে !
এ পােড়া ভারতে
কে আনিবে সিদ্ধি, শৌৰ্য্য শিবেরে আবার ?
বীর বালক।
শিবানি! সৰ্বমঙ্গলে! আয় মা বারেক
করুণা করিয়া এই কাতর সন্তানে!
গঃ
ধিকি ধিকি হুতাশন জ্বলিল শ্মশানে,
স্তবধ মূৰ্জিত চন্দ্র মেঘ অন্তরালে।
খণ্ড খণ্ড মেঘদল অভ্ৰমালা মত
আসিছে গগন গায়ে, যেন দেবগণ
আপন বিমানে চড়ি আসিছে বিমানে
হেরিতে সতীর চিতা পুত্রের ভকতি।
নিস্তব্ধ সে মহাক্ষণে গৃধিনী শকুনি,
স্থির হরপ্রিয়া, যেন নিস্পন্দ বিষাদে।
ধীরে ধীরে সুনীরবে মৃতদেহ আনি
স্নান করাইল লব; অগুরু চন্দনে,
চৰ্চিত করিল অঙ্গ। পুষ্প আনি কুশ
সাজাইল সৰ্ব্বদেহ ভাসি আঁখিনীরে।
হেরিতে লাগিল দোহে অতৃপ্ত নয়নে
গৌরবেতে উদ্ভাসিত রাজ কলেবর,
মৃত্যুর অসাধ্য যেন করিতে হরণ
মহিমার মহাজ্যোতিঃ। অঙ্গ হিম অতি,
নিমীলিত নেত্ৰদ্বয় কি মাধুরী তাহে !
প্রশান্ত বদনে রাজে শান্তি সুধাময়!
অস্ত্র ক্ষত সৰ্ব্ব অঙ্গ ধৌত অশ্রুজলে।
দেখ দেব! আঁখি মেলি কে বসিয়া আজি
বীর বালক।
যুগল চরণতলে ঢালে আঁখিধারা।
চাহিয়া অনল পানে অশ্রুসিক্ত আঁখি
জননী জনকসুতা কহিলা কাতরে,
“চির স্নেহময় তুমি জানকীর ভালে
বৈশ্বানর ! একবার সাগর সৈকতে
দিয়াছিলে তনয়ারে মহাস্বর্গে তার
অনন্ত আনন্দধাম পতি পদমূলে;
আজিও জুড়াতে জ্বালা রঘুকুলবধূ
এসেছে রাঘব সাথে ; মানব জীবনে
নাহি আর সাধ প্রভু, দেহ দয়া করি
এই বর বৈদেহীরে, পাপ মুক্ত হয়ে
আপন পতিরে লভে তােমার প্রসাদে
সুরপুরে।
আৰ্যপু, ভেবেছিনু মনে
তিলে তিলে দগ্ধ হয়ে হৃদয় অনলে,
করিব কঠোর তপ, জন্মান্তরে যেন
তােমারি চরণপ্রান্তে পায় দাসী স্থান,
আর না বিচ্ছেদে যেন দহে এ পরাণ ।
দীর্ঘ দশবর্ষ পরে পড়িয়াছে মনে
বুঝি এ দাসীর কথা, তাই দয়া করি
লইলে করুণাসিন্ধু ! ও রাঙ্গা চরণে!”
আর না সঠিল বাণী-বীণাপাণি করে
নীরবিলা বীণা আহা, মধুর ঝঙ্কারি।
সচকিতে বীর শিশু হেরিলা অদুরে,
৮৪
বীর বালক।
জ্যোৎস্নালােকে শুভ্র যেন রজত শিখরী
ওঁ”কার পবিত্র গাথা উচ্চারিত মুখে,
মৃদুগাত, মহাদীপ্তি দেবনিত কায়ে,
•মহর্ষি বাল্মিকী-পূজ্য গুরু তাহাদের।
উঠিয়া কুমারদ্বয় শােক ম্লান মুখে,
কুন্দ অশ্রুধারা চক্ষে, কৃতাঞ্জলি পুটে
প্রণমিয়া মহার্যরে, কহিল বিষাদে,
“প্রভো! এ অন্তিমক্ষণে মহা ভাগ্য মানি
পাই দর্শন তব; দেহ পদধূলি,
অন্তিম বিদায় দেহ। কি কুক্ষণে দেব,
শিক্ষা বিলে অস্ত্রবিদ্যা এ অভাগাদ্বয়ে!
তব দত্ত অস্ত্র বলে, দৃপ্ত তব তেজে,
অশ্বমেধ যজ্ঞ অশ্ব বাঁধিনু দুজনে;
বধি সম্মুখ রণে শত্রুঘ্ন, ভরতে
লক্ষ্মণ শ্রীরাম সহ, কি কহিব তােমা ।
আজি পাই পরিচয় জননীর কাছে-
রঘুনাথ পিতা, মাতা জনক দুহিতা!
পরীক্ষিত বাহুবল পিতারে বধিয়া,
‘পিতৃঘাতী’ এ কলঙ্ক আঁকিয়াছি তাত,
নিৰ্ম্মল এ শিশুলে ! প্রায়শ্চিত্ত তরে
অনলে সপিবে দেহ হতভাগ্যদ্বয়।”
প্রশান্ত মধুর কণ্ঠে কহিলা ধীমান্
“অদ্ভুত বীরত্ব বৎস! অগ্নি কি কখনাে
ভস্ম আচ্ছাদিত হয়ে পারে রহিবারে ?
বীর বালক।
কত ক্ষণ পারে জ্যোতিঃ লুকাতে ভাস্কর ?
ধন্য আমি তােমাদের অস্ত্র গুরু হয়ে!
তােমরাও ধন্য বৎস! লঙ্কেশ বিজী
সসৈন্যে শায়িত যদি ওই ভূজবলে।
অয়ি সুলক্ষণে ! নাহি পশ চিতামাঝে,
যােগবলে জ্ঞাত আমি সকল কাহিনী,
আয়ুঃ হীন নহে রাম; হের লক্ষ্মি অয়ি !
মৃত সঞ্জীবনী সুধা লভিয়াছি আমি,
অচৈতন্য রঘুনাথ জাগিবে অচিরে।
অন্তরালে যাহ বৎসে, না রহ সম্মুখে।
ভগবান! পূর্ণ কর তব মনস্কাম
শিশুর জীবন ভরি শৌর্বে ইহাদের
যেন সমুজ্জ্বল ইয় সমস্ত র ত ;
এ প্রাচ্য গগনে যেন নব সক্ষ। পরে
আৰ্য্যের গৌরব রবি, লভে মহাযশঃ,
সুসাশনে পূর্ণ যেন হয় ধরাধাম,
রাম রাজ্যে যথা নাথ
নীরব ধীমান
পাষাণ পুলা সম স্থির অবিচল -
ভাস্কর গঠিত যেন ভাধর প্রতিমা।
দৃষ্টি ইংলোক ঘড়ি পরব্রহ্ম পদে
মিলিয়াছে, হৃদিপশ্ন উঠেছে ফুটিয়া,
নীরবে নমিলা সেথা ভক্তি ভরা প্রাণে !
বীর বালক।
চৈতন্য পাইয়া প্রভু জানকী বল্লভ,
হেরিলা বীরেন্দ্র তার ভ্রাতা তিনজন
জাগিয়ামেলিছে আঁখি অবসন্ন কায়ে।
সবিস্ময়ে নরনাথ হেরিলা শিয়রে,
( যেন ধন্বন্তরি-নিজে ) ঔষধি লইয়া
দাড়াইয়া মহাঋষি চ্যবন নন্দন।
স্নিগ্ধ দৃষ্টি মুখে তার পতিত নীরবে
হেরিছেন মৃত্যুম্নান মুখাজ কেমনে
রক্ত ধারা লভি পুনঃ হ’তেছে উজ্জ্বল !
শুষ্ক তরু যথা মরি! বসন্ত দিবসে
সুরসেতে যায় ভরি নব কিশলয়ে।
শিথিল ধমনী ক্ৰমে রক্তধারা বহে,
ক্রিয়াশীল হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক সবল,
নষ্ট স্মৃতি জাগে চিত্তে, উঠিয়া বসিয়া
নমিলা বিনয়ে প্রভু মহা কবিবরে!
কাতরে কহিলা রে,
যদি কৃপা করি
দিলে প্রাণদান প্রভাে! অভাগা কিঙ্করে,
বাঁচাও এ কপিসৈন্য রাক্ষস সংহতি !
সুধীরে কহিলা ঋষি,
“হের রঘুপতি,
জাগিল আহত সেনা ঔষধি পরয়ে,
তব ভ্রাতৃত্রয় সহ-জাগে যথা নয়
নিশা শেষে সুপ্তি হ'তে সতেজ শরীরে।
বীর বালক।
।
কি সাধ্য আমার হেন বাঁচাইব যাহে
মৃত জীবে! প্রাণদাতা আপনি বিধাতা।
বহু ভাগ্য বলে আজি পাই তােমার
এ কাননে রঘুমণি ! অতিথির বেশে।
ক্ষম মম শিশুমতি শিষ্য অপরাধ,
আতিথ্য লইয়া কর কৃতার্থ আমারে।
নরনাথ, সত্যব্রত দশরথ বলী,
সত্যপ্রিয় পুত্র তুমি দেব ভক্ত সদা;
আব্ৰহ্ম ভুবনে শুনি তব কীৰ্ত্তি গাথা
চির স্মরণীয় রবে, রঘুকুল চূড়া !
ক্ষমা, শান্তি, স্মৃতি, ধৃতি, বিদ্যা, বীৰ্য, মেধা
একাধারে মূৰ্ত্তি ধরি নিবসে তােমাতে !
হে ক্ষত্ৰকুল গরিমা। চল মম বাসে
শ্রান্তি দূর করি বৎস! ফিরিও আলায়।”
সুগম্ভীর শঙ্খধ্বনি জানাইল জীবে
নিশি অবসান, উষা আসিল নামিয়া
( মানব সৌভাগ্য যথা জীবনের কুলে )
সুমেরু শিখরী শিরে; সাম বেদ ধ্বনি,
উচ্চারিলা উচ্চে যত তাপস সকল।
শুকতার। ম্লান মুখে রহিল চাহিয়া
বিস্তৃত গগন বক্ষে। পূৰ্ব্ব নভস্থল
রঞ্জিত সুবী রাগে। ফুলবালা যত
নিরখিতে রাঘবেরে, বন পথ পাশে
মেলিল নয়ন যেন হাসিয়া মধুরে।
বীর বালক।
তরু শিরে ধীরে ধীরে বিহঙ্গমগণ
জাগিয়া ধরিল তান, যথা গঙ্গাতীরে
গাহিছেন গঙ্গা স্তোত্র “মাতৰ্গঙ্গে” বলি
তেজঃপুঞ্জ কলেবর মহর্ষি সকল,
অনুকারি ফুকারিছে শ্যামা শুক শারী
শান্তি দেবী মূৰ্ত্তিম ভী এ দিব্য আশ্রমে।
দেবতার ভূমি নহে পবিত্র এমন
সেথা আছে রাজ্য লিপ্স}, আছে দ্বন্দ দ্বেষ
হেথা শান্তি অবিচল নিত্য নবরূপে।
সুব্রত দীক্ষিত সদা সদাচার ব্রত
তপােনিষ্ঠ ঋষিগণ আৰ্য্যবংশধর।
কহ মােরে আজি তুমি ওহে শব্দবহ!
শত যুগ যুগান্তের স্মৃতিবহ তুমি
কত ‘বাজপেয় কত শত অশ্বমেধে
পরিষ্ক ত পূতগন্ধি হােনল ধূমে !
কহ মােরে মহামতি! ফিরিবে কি পুনঃ
সেই ধৰ্ম্ম প্রাণ যুগ আবার ভার ত ?
কোথা রসাতল বাসে নিয়াছে ভাসায়ে,
সেই সাধনার ক্ষেত্র সােনার ভারত ?
অযােধ্যা সরযু তীরে আজিও তেমনি,
কোথায় শ্রীরাম ? হায় ! রাম রাজ্য কোথা?
সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.