Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Bibahita Jiban Ed.1
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বিবাহিত জীবন
৪ঠা কার্তিক, ১৩৩৫ সাল।
উয়ারি, ইষ্ট এণ্ড হাউসে অভিনীত।
শ্রীনরেন্দ্রনারায়ণ রায় চৌধুরী
প্রণীত।
প্রথম সংস্করণ
মূল্য ৬০ আনা
TUGBAREnsf প্রকাশক- শ্রীদেবেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ পার্শনে এসিষ্টেন্ট, ইষ্ট এণ্ড হাউস, উয়ারী, ঢাকা। Resuanenseuse Se sue ভাকা- নারায়ণ-মেশিন-প্রেসে, রাধাবল্লভ বসাকদ্বারা মুদ্রিত। উeeeeese৩eeeeee
S
Roers
eng
Reener
বঙ্গ দম্পতিদের
-করে-
সসম্মানে অর্পিত হইল
নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ
কৈলাস বাড়য্যে
কৈলাসের স্ত্রী।
# ০ ০
নীহারের স্ত্রী।
অমূল্যবালা
নীহার রায়
দীপ্তিবালা
সমরেন্দ্র বসু
মঞ্জুরাণী
দিগিন্দ্র চৌধুরী
পূর্ণশশী
রামকিঙ্কর দাস
আমােদিনী
সমরেন্দ্রের স্ত্রী।
দিগিন্দ্রের স্ত্রী।
রামকিঙ্করের স্ত্রী।
প্রস্তাবনা
বইতে পারেন, সইতে পারেন, ঢাকতে পারেন যারা,
জেনে রাখ, বিশেষ রূপে বিয়ের যােগ্য তারা—শুধু তারা।
একে যখন গরম হবেন, ঠাণ্ডা থাকবেন অপরে !
একে যখন চোখ, রাঙ্গাবেন, হাসূবে অন্যে জোর করে !
নীরবে মান-অপমান, সুখ-দুঃখ যাবে হজম করে ;
ফেনিয়ে যেন ছােট কথা তুলবেন নাকো বড় করে ।
ক্ষমা করে, স’য়ে নিয়ে, করবেন সংশােধন যারা
খুসী হবেন তারাই জেনােকাটবে বিয়ের ফারা।
No text on this page.
বিবাহিত জীবন
বম অক
প্রথম দৃশ্য
( নীহারের বাড়ীর একটি কক্ষ। নীহার বসিয়া সংবাদ পত্র পড়িতেছে
সম্মুখের টেবিলে চা ইত্যাদি। অদূরে দীপ্তিলত বসিয়া )
নীহার। ওগাে, শােন একটা খবর আছে,আমি পড় ছি শােন
(পড়িল) “দাম্পত্য বিরােধ। চিফ, প্রেসিডেন্সী
ম্যাজিষ্ট্রেটের কোর্টে গতকল্য দাম্পত্য বিরােধ জনিত
আক্রমণের একটা মােকর্দমা উঠিয়াছিল ; ফরিয়াদীর
স্ত্রী একটী ভীষণ প্রকৃতির স্ত্রীলােক বলিয়া মনে হইল,
আর তার মনে সন্দেহপরায়ণতার ভাবটা এত বেশী
যে তার স্বামীর জীবন বিপদাপন্ন।” শুনলে দীপ্তি।
এতে তােমার আরাে জুড়ি আছে দেখছি।
;
বিবাহিত-জীবন
২
দীপ্তি।
দীপ্তি।
তাই নাকি?
নীহার। তুমি ছাড়া সন্দিগ্ধচিত্ততা অন্য স্ত্রীলােকেও আছে,
এটি তােমার একচেটে সম্পত্তি নয়।
দীপ্তি। তুমি তাই ভাবছ, না ?
নীহার। সবটা পড়ব ?
তােমার যা খুসি করতে পার।
নীহার। এই বিষরটি শুনতে ইচ্ছা হচ্ছে না? এই বেচারি
স্ত্রীলােকটির প্রতি তােমার সহানুভূতি হচ্ছে না?
দীপ্তি। সহানুভূতি টুতি সব নষ্ট করে দিতে সক্ষম হয়েছ
তুমি—শুধু তাই কেন, হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতিই।
নীহার। একটা ছাড়া।
দীপ্তি। সেটা কি, শুনি ?
নীহার। নিজকে অত্যন্ত অসহনীয় করে তােলা-চা খাচ্ছ
যে ?
দীপ্তি। রুচি নেই।
নীহার। কাল রাত্রেও তো খাওনি।
দীপ্তি।
দরকার বােধ করিনি।
নীহার। কাল দুপুরেও খেতে বসে খাওনি কিছু।
দীপ্তি। ইচ্ছা হয়নি।
নীহার। তুমি না খেয়ে মারা যাবে যে।
দীপ্তি। তাহলেই তুমি সুখী হবে।
প্রথম অঙ্ক ]
বিবাহিত-জীবন
নীহার। অবশ্য জীবনটা অনেক শান্তিতে কাটবে সে বিষয়ে
সন্দেহ নেই।
দীপ্তি।
আর ইচ্ছামত চলার সুযােগও পাওয়া যাবে।
নীহার। ইচ্ছামত চলা কি রকম?
দীপ্তি।
সে তুমিই ভালাে জানাে।
নীহার। আমি ভেবেছিলুম তােরই বুঝি এটা সম্পূর্ণ জানা
আছে।
দীপ্তি।
তা জানা বৈকি।
নীহার। বলেই ফেল না তবে।
দীপ্তি। এত কষ্ট করে দরকার ?
নীহার। না, বলতেই হবে।
ও বাড়ীর নকুল বাবুর মেয়ে এসেছিল কাল, তুমি কি
ব্যবহারটাই করলে !
নীহার। কি করেছি?
দীপ্তি। আমার সামনেই তাকে বলে সে বেশ সুন্দরী।
নীহার। তাতে কি কোন দোষ হয়েছে ?
দীপ্তি। এতটা বেশী মাখামাখি দেখাতে যাওয়া কেন ? এতে
আমাকেই অসম্মান করা হয়েছে।
নীহার। ঠিক—অন্য স্ত্রীলােকের প্রশংসা কোনাে স্ত্রীলােক
সইতে পারে না সেটা ভুলে যাওয়া আমার উচিত
দীপ্তি।
হয়নি।
প্রথম দৃশ্য
৪
বিবাহিত-জীবন
দীপ্তি।
আর যে একটা মেয়ের সঙ্গেই প্রথম দেখা হয় সেটাই
স্ত্রীর চেয়ে বেশী সুন্দরী এটা কম পুরুষেই মনে না
করে পারে।
নীহার। চমৎকার চলেছে, দীপ্তি ; আমাদের লেখক হয়ে
যাওয়া উচিত, আর দুটিতে মিলে “দাম্পত্য চুম্বকোক্তি
মালা” নামে একটী বই ছাপিয়ে দিলে হয়! আচ্ছা,
তােমার প্রথম অভিযােগ সম্বন্ধে নিজকে দোষী মনে
করে নিলুম; এর পর আরাে কি আছে চালাও।
দীপ্তি।
সেদিন মাঠে বেড়াতে গিয়ে তুমি আমার কাছ ছেড়ে
অমূল্যবালার গা ঘেঁষে ঘেঁষে চলেছ আর তার সঙ্গে
ফচ কেমি করেছ।
নীহার। তুমি ফচকেমী কাকে বলছ ?
দীপ্তি।
এই কাণাকাণি—হাসাহাসি—যেন কত গােপন কথা
আছে, অথবা তা সত্যিও হতে পারে। এর মানে
বতে পারি না—আমি অভিধান নই।
নীহার। যে সব অবােধ্য কথা শােনাও-অভিধান বলেই তাে
তােমাকে মনে হয়। তার পর, চলুক।
দীপ্তি। সেদিন শুনলুম থিয়েটারে নাকি ঘনিষ্টতার আলাপ
পরিচয় কৰ্ত্তে তুমি “গ্রীণরুমে ঢুকেছিলে-সেখানে
এট্রেদের সঙ্গে নাকি খুবই হাসি রং তামাসা
চলেছিল।
প্রথম অঙ্ক ]
বিবাহিত-জীবন নীহার। “গ্রীণরুমে” যদি ঢুকেই থাকি তাহলে আশা করি একটু বেশী দিন “গ্রীণ” থাকতে পারব, নতুবা অকাল- পক্কতা অনিবার্য। দীপ্তি। সে রাত্রে তুমি বাড়ী ছিলে না ; আর এমন এগারােটা বায়ােটা তত তােমার প্রায়ই হয় ; সকল সময় বাইরে বাইরেই আছ—আজ এই স্ত্রীলােকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, কাল ওর সঙ্গে হচ্ছে—চিঠি আসছে আর যাচ্ছে—এসব আর বেশীদিন সইতে পারবনা জেনাে= সাবধান, একদিন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাবে বলছি। নীহার। কিসের সাবধান করছ? দীপ্তি। সে আমার মনেই আছে। নীহার। খবর শুনে কৃতজ্ঞ রইলুম, (উঠিয়া) এখন এই চমৎকার দাম্পত্য প্রাতরাশটি সম্পন্ন করে সকালের ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া যাক। দীপ্তি। কোনাে বিশেষ দেখা সাক্ষাতের তাগিদ নেই আজ —একি সম্ভব ? লাল কি ফিরােজা রঙের কোনাে চিঠিই আসে নি আজ সকালে ? নীহার। না, দীপ্তি। ( বাহিরে পিয়নের ডাক ) দীপ্তি। ঐ তত পিয়ন এসেছে। নীহার। শুলুম। দীপ্তি। নিশ্চয়ই তােমার চিঠি আছে। প্রতি সকালে একটা { প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত-জীবন
অজানা হাতের চিঠি এল তােমার কাছে, এ রকম
ঘটনা নেহাৎ আশ্চৰ্য যে! (নীহার উঠিয়া যাইতে উদ্যত
হইয়া আবার বসিয়া পড়িল। তােমার আর ধৈর্য্যের
পরীক্ষা নিতে চাই না, চাকরের অপেক্ষায় থেকে
দরকার নেই, ছুটে যাও না নিজেই, ইচ্ছা চেপে
রেখে লাভ কি ?
নীহার। ঠিক, যখন বল্লে, যাই।
( লাফাইয়া উঠিয়া বেগে নিষ্ক্রান্ত )
দীপ্তি।
কেমন,
এখন আমার জালে পড়েছ। নিজেই কাল্পনিক
নামে চিঠি দিয়েছি, ইডেন গার্ডেনে দেখা করতে
লিখেছি। এই অবস্থায় আদর্শ স্বামী যে সে কি
করে ?
নিশ্চয়ই স্ত্রীকে চিঠি দেখায়। এখনই
পরীক্ষা হবে। দেখলে বুঝব আমার সব মনের
ভ্রম। না দেখালে নিশ্চিত প্রমাণ হয়ে যাবে, আমার
সংকল্পও স্থির হবে।
(গান)
ওগাে, কে জানে নারীর
হৃদয়ের কথা,
সে যে কি চায়
কি তাহার বল
মরমের ব্যথা!
প্রথম অঙ্ক ]
৭
বিবাহিত-জীবন
কি তাহার আশা কোথা ভালবাসা
কার তরে তার প্রাণের পিয়াসা
আপনা হারাতে চায় সে কোথায়
কোথা তার গেম অভিনয় প্রায়
বিষাদ সন্দেহ, ঈর্ষা ছলনা
কেন জাগে প্রাণে-কে জানে তাহা ।
(হেলাভরে গান গাহিতে গাহিতে নীহারের প্রবেশ
“কোমল কুসুম কলি এনেছি তুলে” ইত্যাদি।)
নীহার। ওরে, এখনই কাপড় নিতে হবে, আটা প্রায় বাজে
(ঘড়ী দেখিয়া ) আজ দুপুরে বােধ হয় ক্লাবেই খাব।
দীপ্তি। কারু নিমন্ত্রণ এলাে নাকি ?
নীহার। না, না।
দীপ্তি। আমার পরিচিত কারু কাছ থেকে চিঠি এসেছে?
নীহার। না, সে রকম তাে নয়।
দীপ্তি। কাজের চিঠি ?
নীহার। হাঁ, হাঁ, কাজের।
দীপ্তি। সেই কাজেই যাচ্ছ ?
নীহার। কাজ ফেলে রাখলে চলবে কেন ?
দীপ্তি। বিশেষতঃ সেই কাজেই যখন আনন্দ।
নীহার। ঠিক বলেছ।
দীপ্তি। তাহলে বেরিয়েই যাচ্ছ ?
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৮
নীহার। হাঁ।
দীপ্তি।
এমন সুন্দর সকালটি, আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে বল্লে
হতাে না ?
নীহার। তা, ইচ্ছা থাকলে চল না।
দীপ্তি। (স্বগত) সঙ্গে নেবে ?
নীহার।
ভেবে দেখলুম-আমাকে দু’তিন জায়গায় যেতে
হবে—দেরী হবে।
দীপ্তি। আমি গাড়ীতে অপেক্ষা করব।
নীহার।
এ ভারী বিশ্রী হবে। তুমি অস্থির হয়ে উঠছ
ভেবে আমার সব কাজ সারাই হবে না। কালকেই
নেওয়া যাবে তােমাকে।
দীপ্তি। আজ নিচ্ছ না তাহলে ?
নীহার। আজ থাক।
দীপ্তি। যেতেই হবে তােমাকে এখন ?
নীহার। যেতেই হবে।
দীপ্তি। অচ্ছিা, যাও। (স্বগত) অবিশ্বাসী কোথাকার-এর
অনুতাপ তােমাকে ভােগ কৰ্তে হবে। (কৈলাস
বাড়য্যে বাহিরে কথা বলিতেছে ) কে এসেছে
বাইরে।
নীহার। ( বাহিরে চাহিয়া) তােমর বন্ধু কৈলাস বাবু ও তার
স্ত্রী। তুমি তাদেরে নিয়ে গল্প কর, আমি কাপড়
প্রখম অঙ্ক ]
বিবাহিত-জীবন
নিয়ে আসি। আশ্চর্য্য দম্পতি—মিলনটি অদ্ভুত
হয়েছে ওদের। বেচারি কৈলাস তালপত্রের মত
পালা ছিপছিপে লােকটি—ঠাণ্ডার ভয়েই অস্থির।
সব জানালাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।
দীপ্তি। তাঁর স্ত্রী এসে সবগুলাে খুলে দেবন এখন।
নীহার।
সে বেচারীর তাে সব সময় অসহ্য গরম। স্বামীটি
হয়েছেন ক্রিজিং পয়েন্ট-এর নীচে, আর স্ত্রীটির হলাে
১০৫ ডিগ্রী ।
দীপ্তি।
এ তােমাকে মানতেই হবে যে তারাও পরস্পর পরস্পরের
খেয়াল অনুসারে চলতে চায়, অন্য অনেকের মত
বিরােধ করে বিরক্তি সৃষ্টি করে না।
নীহার। দেখা যাবে।
( কৈলাস ও অমূল্যবালার প্রবেশ। কৈলাসের আপাদমস্তক
শাল কোট কাম্ফার্টার প্রভৃতি মােটা কাপড়ে জড়াননা,
অমূল্যবালার খুব পাতলা ফুরফুরে পােষাক )
অমূল্য। নমস্কার, নমস্কার।
নীহার। কেমন আছেন ? কেমন আছেন ?
কৈলাস। (কপিতে কাপিতে) বড় ঠাণ্ডা—ওঃ ।
নীহার। (অমূল্যের প্রতি) আপনি ভালাে তাে ?
অমূল্য। ভাললাই—তবে বড় গরম। ওঃ ! জানালাগুলাে
খুলে দিন্ না, একটু হাওয়া আসুক।
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত-জীবন
১০
কৈলাস। না, খুলবেন না, খুলবেন না—খুললে একটি দিয়ে
আমি লাফিয়ে বেরিয়ে পড়ব। আমার অমানুষী
স্ত্রীটি আমার গরম ঘরটি থেকে এই হাওয়ার মধ্যে
আমাকে টেনে এনেছে।
অমূল্য। আহা, বেশ চমৎকার ফুরফুরে হাওয়াটি।
কৈলাস। উঃ আমার কাঁপুনি ধরেছে কিনা। উত্তাপ দরকার।
অমূল্য। আমার দরকার এই হাওয়াটির—সব ক্লান্তি দূর করে
দেয়।
কৈলাস। (কাপিয়া) ওঃ—থামাে–তােমার কথা শুনলেও
আমার হাড় শুদ্ধ ঠাণ্ডা হয়ে ওঠে।
নীহার। বসুন, আমি একটু আসি।
( নিষ্ক্রান্ত)
দীপ্তি। (স্বগত) যদি বেরিয়ে যায়, আমি অনুসরণ করব--
কেমন জব্দ হয় নিজে দেখব।
কৈলাস। (দীপ্তির প্রতি) কোথাও একটা জানালা খােলা
আছে, অনুগ্রহ করে বন্ধ করে দিন। গত সপ্তাহে
একদিন হাওয়াতে বসে ঘাড়টির অবস্থা এমনি হয়ে-
ছিল যে কেনােদিকে চাইতে হলে সমস্ত শরীরটিকেই
সেদিকে ফেরাতে হত।
অমূল্য। ভারি তাে; ঘাড়ে অমন সকলেরই ধরে ।
প্রথম অঙ্ক ]
১১
বিবাহিত-জীবন
কৈলাস। সব আমার স্ত্রীর দোষ আমি পাঁচদিন এই ভাবে
বসেছিলুম (দেখাইল)। ডানদিকে কেউ কথা
কইলে এই ভাবে ফিম (দেখাইল)। বাঁ দিকে
কার সঙ্গে কথা কইতে হলে আবার এই রকম
(দেখাইল)। পিছন দিকে কিছু দেখতে হলে এই
ভাবে (দেখাইল)। কাজেই বন্ধ করে দিন
জানালাটা অনুগ্রহ করে।
অমূল্য। তুমি আমাকে একদিন শ্বাস বন্ধ করে মারবে দেখছি
জানাে না ভাই, কি ভাবে দিন কাটাই এর সঙ্গে ;
প্রচণ্ড গ্রীষ্মের মধ্যে দুটো কম্বল গায় না দিলে ওর
ঘুম হয় না ভেবে দেখ একবার।
কৈলাস। তখনই যে তার বেশী দরকার—গ্রীষ্মের সময়েইতে
হঠাৎ ঠাণ্ডা লেগে যায়। প্রত্যেক বৈশাখে আমার
চারটা সর্দি, একটা বাত—আর দুটো আড়ষ্ট ঘাড়
হয়ে থাকে।
এক সপ্তাহ আগে কি করেছে জানাে । আমি
আগেই ঘুমিয়েছি, মধ্য রাত্রে এমন আতঙ্কিত অবস্থায়
আমি জেগে উঠলুম-আমি বাস্তবিক ভেবেছিলুম
ঘরে আগুন লেগেছে, ঘরের হাওয়া এম্নি গরম
ছিল—শ্বাস রুদ্ধ হবার যাে হয়ে উঠেছিল। মনে
মনে ভাবলুম কি হলাে ? দেখলুম ঘরের জানালা
( প্রথম দৃশ্য
অমূল্য।
বিবাহিত-জীবন ১২ কপাট সব বন্ধ, উঠেইতে জানালাগুলাে সব খুলে দিলুম- কৈলাস। আর আমাকে তক্ষণি মেরে ফেলবার বন্দোবস্ত কলে; উত্তুরে বাতাস বইছিল—কি কাপুনি আমার--শত্তরেওতে এমন কাজ করে না। অমূল্য। বেশ মৃদু আরামদায়ক বাতাস—কিন্তু কি করি ওর দিকে চেয়ে জানালাগুলাে বন্ধ করে ফেলুন তখনি। ওঃ! কি অসহ্য গরমই হয়েছিল। আমি তাে ইজিচেয়ারে একরূপ মূচ্ছে। যাওয়ার উপক্রম ডাকাডাকিতে চাকর উঠে এসে বের করলে ঘরে একটা জাৰ্ম্মেণ স্টোভ, জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে, আগুনের মত জ্বল্ জ্বল্ করছে এক কোণে। আমার মত টেমপারেচারের মেয়েলােক কতটা সয়েছে ভেবে দেখ ! সেদিন থেকে আমার অসুখ লেগেই আছে। কৈলাস। ডাক্তারের পরামর্শেইতাে তাই করেছিলুম-সেই স্টোভ, সরিয়ে অবধিইতত আমার সর্দি কফ, আর ছাড়ছে না—নিষ্ঠুরা, হৃদয়হীনা। (কাসিল) অমূল্য। (দীপ্তির প্রতি) তুমি যে কথাই বলছ না, ভাই। দীপ্তি। মনটা ভালাে নেই। অমূল্য। আঃ! বেচারী স্ত্রীদের মনে ঘােট খাটো কষ্ট লেগেই আছে। প্রথম অঙ্ক 1
বিবাহিত-জীবন
কৈলাস। আর বেচারী স্বামীদেরও তাই। আমার স্ত্রী আমাকে
পশমী কামফার্মর ব্যবহার কর্তে দেবেনা, এর চেয়ে
নিষ্ঠুরতার কথা কোথাও শুনেছেন ?
অমূল্য। নিজের আরাম ছাড়া উনি আর কিছুই ভাবেন না।
কৈলাস। কি করব, আমার আরামের কথা তাে অন্য কেউ,
ভাবে না।
অমূল্য। এমন উদাসীনপ্রকৃতির লােক আর কখনাে দেখিনি।
জীবন নেই, আবেগ নেই, উচ্ছ্বাস নেই। নানা রকম
খেয়াল জাগবে তবে তাে স্বামী–রেগে আগুন হবে,
হাত পা ছুড়বে, জিনীসপত্র ভাঙ্গবে ; কিন্তু উনি
কিছুই করেন না—দিন নেই, রাত নেই, আপাদমস্তক
পশমে ঢেকে বসে থাকবেন যেন পােষাকের
দোকানের মাটীর মানুষটি! বাস্তবিক সে ছাড়া আর
কিছু নয় এটি। (দিপ্তীর প্রতি জনান্তিকে) ওঃ; ভাই,
এর মনে যদি আমার প্রতি সন্দেহ জাগিয়ে তুলতে
পারতুম সে কত সুখেরই হতাে। কিন্তু তােমার
কি হয়েছে ভাই, একেবারে যে চুপ। স্বামীর সঙ্গে
ঝগড়া করেছ না কি ?
দীপ্তি। স্বীকার কচ্ছি সকালে আমাদের কিছু হয়ে গেছে।
অমূল্য। কি খুসির কথা! ( কৈলাসের প্রতি) তুমি রেগে
আমার উপর চোটপাট, করনা কেন ?
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত-জীবন
১৪
কৈলাস। আরে রেগে যদি হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে পড়ি, তাহলে
ঘাম বন্ধ হয়ে যে মরবার যাে হবে।
( বাহিরে যাইবার বেশে নীহারের প্রবেশ
নীহার। আমি একটু ঘুরে আসি। সে জন্যে আপনারা
তাড়াতাড়ি চলে যাবেন না যেন।
দীপ্তি। তা কেন যাবেন । সারাদিন তাে আমি একাই
থাকব।
অমূল্য। (দীপ্তির প্রতি) আঃ! এমন স্বামী পেয়ে তােমার
কত সুখ! (কৈলাসের প্রতি) দেখতে চেয়ে নীহার
বাবুর দিকে, দেখনা তার চালচলনটা কি রকম।
এ রকম পােষাক কেন তুমি পর না?
কৈলাস। আমি ! নীহার বাবুর মতন অমন পালা পােষাক !
তুমি কি আমাকে মেরে ফেলতে চাও? ওর দিকে
চাইলেই যে আমার শরীর ঠাণ্ডায় কাঁপতে শুরু
অমূল্য। (নীহারের প্রতি) আপনি বেরিয়ে যাচ্ছেন বলে
দুঃখিত হলুম। আপনার সঙ্গটি বেশ উপভােগ করা
যাবে ভেবেছিলুম।
দীপ্তি। (স্বগত) নিশ্চয় ওদের মধ্যে কিছু আছে-
( সন্দেহের সহিত উভয়কে লক্ষ্য করিয়া )
প্রথম অঙ্ক ]
১৫. বিবাহিত-জীবন অমূল্য। (নীহারের প্রতি ) একটা কথা আছে। (কাণাকাণি করিয়া হাসিল) হাঃ হাঃ! হাঃ! ভারি অদ্ভুত হবে এখন, না ? নীহার। হাঃ! হাঃ! বাস্তবিকভারি ! অমূল্য। আমি চেষ্টা করব- নীহার।. করুন, করুন—আমি তাে বলেইছি। হাঃ! হাঃ । 'অমূল্য। হাঃ! হাঃ! হাঃ! নীহার। আসি তবে। (দীপ্তির প্রতি) দুপুরে না এলে ফিরতে রাত হতে পারে। আসি। (নিদ্ধান্ত) দীপ্তি। জিজ্ঞেস্ করতে পারি কি আমার স্বামীর কাণে কাণে আপনি কি বল্লেন ? ওঃ! একটা হাসির কথা। দীপ্তি। তাই নাকি ? অমূল্য। বেশ চমৎকার মানুষ উনি—তােমার স্বামীটি। আমার এটি যদি সে রকম হতাে। দীপ্তি। আপনার স্বামীর সঙ্গে এতটা ঠাট্টা তামাসায় এগােতে আমার সঙ্কোচই হ’ততা। অমূল্য। তা এগােও না ভাই, দয়া করে একবারটি তাই কর। দীপ্তি। আপনার কথা বুঝে উঠতে পারছি না, আমি—আমি শুধু এই বছি একটু আগে আমার স্বামীর সঙ্গে অমুল্য। [ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত-জীবন
দীপ্তি।
আপনার ব্যবহার যেমন কুরুচিকর তেমনি সন্দেহ
জনক হয়েছে।
অমূল্য। উনি তাে চমৎকার লােক। ( কৈলাস নিজকে শালে
জড়াইতেছে-সেই দিকে চাহিয়া )
শুনি না, আপনাদের কাণাকাণির বিষয়টা কি ?
অমূল্য। আমি বিশ্বাস নষ্ট করতে পারি না।
দীপ্তি। বন্ধুতার আড়ালে আপনি আমার শান্তি নষ্ট করবেন
এত নীচ হতে পারেন আপনি ? আমি আপনার
ব্যবহার লক্ষ্য করে দেখেছি,এখন আমার দৃঢ় বিশ্বাস
হয়েছে আমার স্বামীর সঙ্গে আপনার গােপন চিঠি
লেখালেখি হচ্ছে; আর কৈলাস বাবু যে ঐখানে
বসে অন্ধতার ভাণ কি করে কর্তে পারেন তাতে
আমি বুঝতে পাচ্ছি না।
কৈলাস। অন্ধতার ভাণ!—কি দেখবার আছে, আমি তােত
জানি না।
অমূল্য। (স্বগত) এ বেশ ; এখন ওর কথায় কাণ দিলেই হয়
শ্ৰমানের।
দীপ্তি। কি দেখবার আছে?—বেরিয়ে যান আমার বাড়ী
থেকে, এখন থেকে আপনারা দুজনের কেউ আর
এ বাড়ীতে ঢুকবেন না।
কৈলাস। আমরা কি করেছি ?
প্রথম অঙ্ক ]
১৭
বিবাহিত জীবন
•
দীপ্তি। ( অমুল্যের প্রতি) আপনাকে একটি ভয়ানক স্ত্রীলােক
বলে মনে কচ্ছি।
কৈলাস।
সে তাই ; আমার কাম্ফার্টার কখনাে রােদে দিয়ে
রাখে না।
দীপ্তি। আপনার স্বামী আপনার আচরণের দোষ ধরতে না
পারেন, কিন্তু আমি এত আত্মসম্মান বর্জিত নই যে
এ মাথা পেতে নেব।
অমূল্য। কি বলছ তুমি ?
কৈলাস। (উভয়ের মাঝে আসিয়া ) অনুগ্রহ করে—অনুগ্রহ
করে--আমাকে উত্তেজিত করবেন না; আপনাদের
কথা কাটাকাটি হলে আমি বাধা দেব, আর এই
সময়ে যে কোনাে বাধাই মারাত্মক হতে পারে।
দীপ্তি। আমি কি বছি তা আর বুঝিয়ে বলতে পারব না,
তবে এখানে আপনাদের আগমনটা আর ঘন ঘন হবে
না আশা করি।
অমূল্য। (কৈলাসের প্রতি) ওর এই নীচ অভিযােগটা ভালাে
করে হৃদয়ঙ্গম না করে তুমি কিছুতেই এ বাড়ী থেকে
বেরিয়াে না ; ঈর্ষাপরায়ণ হও, ওকে চেপে ধর।
আপনারা কি শেষে আমাকে চাকর ডাতে বাধ্য
করবেন ?
অমূল্য। ওগাে, (কৈলাসের প্রতি) এইবারে রেগে উঠতে পাৱনা ?
দীপ্তি।
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
১৮
কৈলাস। না, পারি না। ।
(দীপ্তি একটী জানালা খুলিয়া দিল)
হাওয়া আসূছে; এই স্ত্রীলােকটি আমাকে হত্যা কর্তে
চাচ্ছে। এ
চল, আমরা এ বাড়ী ছেড়ে যাই, নইলে
কিছুক্ষণ পরে আর আমাকে জীবিত দেখবে না—
আমি এসে পরে নীহার বাবুর সঙ্গে দেখা করব এবং
এর একটা সদুত্তর চাব।
অমূল্য। কিন্তু একটা কথা আছে-
কৈলাস। না, না, একটাও না—আমার ডান কঁাধে এরি মধ্যে
বাতে ধরেছে—মাথা থেকে পা পর্যন্ত আমি কঁপছি
-সর্দি লেগে গেছে, শেষে তােমাকে মাস খানেকের
জন্যে আমার সেবা কর্তে হবে। এস, চলে এস।
( অমূল্যকে টানিয়া লইয়া নিান্ত)
দীপ্তি। ( একটা চেয়ারে ধপ করিয়া বসিয়া পড়িয়া) হতভাগিনী
আমি, আমাকে এত দুঃখ দেবার শক্তি তাকে কেন
দিলুম !
এখন ওর পিছন পিছন যাব আমি, ওর
নৈরাশটা চোখে দেখতে বেশ লাগবে।
( বাহিরে ) এখন দেখা কর্তে যাবেন না, বেচারী
এখন একেবারে ক্ষ্যাপা কুকুর হয়ে আছে।
মঞ্জুরাণী। বাহিরে ) আমাদেরে কিছু বলবেনা দীপ্তি।
দীপ্তি। ( বাহিরে চাহিয়া ) এরা কে ? সমরেন্দ্র বাবু আর
তার স্ত্রী ?—কি জঞ্জাল বেরিয়ে যাচ্ছিলুম—এখানে
প্রথম অঙ্ক ]
অমুল্য।
বিবাহিত জীবন
কি কৰ্তে এল ? দেখতে পারি না এই দম্পতিটিকে,
এই তাে মাত্র ছ'সাত মাস হলাে বিয়ে হয়েছে, এরি
মধ্যে সব সময় তারা কথা কাটাকাটি সুরু করেছে-
আমার মত পাঁচ বৎসর যদি এই যন্ত্রণা তারা ভােগ
কর্তো তাহলেও একটা কথা ছিল, কিন্তু বিবাহিত
জীবনে ছ'মাস যেতে না যেতেই এ রকম করা
অন্যায় ।
(সমরেন্দ্র ও মঞ্জুরাণীর প্রবেশ )
(দৌড়িরা দীপ্তির কাছে গিয়া তার হাত ধরিয়া) কেমন
আছ ভাই? খবর না দিয়েই আমরা এসে পড়েছি,
কিছু মনে করাে না—আমরা একটা খবর দিতে
এলুম।
সমরেন্দ্র। কি অদ্ভুত কথা বলুছ রাণী ? আমরা একেত
কোনো খবর দিতে আসিনি।
তাহলে কি জন্যে এসেছি
সমরেন্দ্র। শুধু এইটুকু বলতে যে একজন তার সঙ্গে দেখা কর্তে
চাচ্ছে।
মঞ্জু।
সেটা খবর ছাড়া কি ?
সমরেন্দ্র। না, খবর নয়।
মঞ্জু।
হাঁ, খবর।
?
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
মঞ্জু।
মঞ্জু।
;
সমরেন্দ্র। সে কি করে হবে ?
কাউকে কোনাে কিছু সম্বন্ধে কিছু বলতে আসাকে
খবর দেওয়াই বলে। তুমি কেন আমার কথা কাট ?
দীপ্তি। কি খবর দিতে চাচ্ছ আমাকে?
শুনলে ? দীপ্তিও এটাকে খবর দেওয়াই বলছে।
* সমরেন্দ্র। এ হতে পারে না।
কিন্তু এ তাই।
সমরেন্দ্র । তাই নয় ; ওঁকে তুমি কোনাে খবর দাওনি এখনাে।
মঞ্জু। দিতুম, তুমি বাধা না দিলে
সমরেন্দ্র। আমি বছি ওঁকে। আপনি জানেন কয়েক বৎসর
আগে আমার স্ত্রী আমােদিনী দাসের বাের্ডিংস্কুলে
কিছু দিন ছিল-কলুটোলায়—
মঞ্জ। না, মুর্গিহাটায়।
সমরেন্দ্র। কলুটোলায় ।
মঞ্জু।
আমি বলছি—মুর্গিহাটায়।
সমরেন্দ্র। তুমি যদি এমন করে আমাকে রাগাও, তাহলে আমি
বাড়ী চলে যাব ।
দীপ্তি। থাক-থাক্।
গত রাত্রে একটি বন্ধুর বাড়ীতে হঠাৎ আমাদের
সঙ্গে আমােদিনী দাস ও তার স্বামীর দেখা হয়। তখন
তিনি জানালেন যে তিনি তার স্কুল তুলে দিয়েছেন,
প্রথম অঙ্ক ]
বিবাহিত জীবন
মঞ্জু।
তবে কিছু পাওনা টাওনা আছে সে সব তুলছেন ;
অন্য আরাে নামের মধ্যে তিনি নীহার বাবুর নাম
কলেন।
দীপ্তি। আমার স্বামীর।
হ্যা, তােমার স্বামীর ।
সমরেন্দ্র। রাণী, কি বলছ ? একে আগে থেকেই বিচলিত
করে তুলছ কেন ? তুমি তাে ঠিক জানােনা সে যে
এই নীহার বাবুই ; আমাদের শুধু আন্দাজ মাত্র।
মঞ্জু।
আমি বলছি তােমাকে, নিশ্চয় এই নীহার বাবুই।
সমরেন্দ্র। নিশ্চয় নয়।
নিশ্চয়।
সমরেন্দ্র। দুই জন এক হতে পারে না।
মঞ্জু। একই।
সমরেন্দ্র। এক নয়।
দীপ্তি। রাখুন ; আমার মনের অবস্থাটা ভাবুন।
মঞ্জু।
আমােদিনী দাস তঁার স্বামীর সঙ্গে নীচেই আছেন,
তাঁকে উপরে আসতে বলব ? তাহলে নিজেই এসে
সব বলতে পারবেন।
সমরেন্দ্র। আগে তাদের এর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে
দেওয়া
মঞ্জু।
দরকার।
তার কোনো দরকার নেই।
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
সমরেন্দ্র। নিশ্চয়ই আছে ।
মঞ্জু।
নিশ্চয়ই নাই।
সমরেন্দ্র। আমি বছি আছে।
দীপ্তি। কথাটি কি বল।
মঞ্জু।
হাঁ, বলি। এই আমােদিনী দাস বিধবা—তিনি
এদিকে আবার বিয়ে করেছেন রাম কিঙ্কর নামে
একটা লােককে—লােকটা নাকি আগেকাণাকানি।
কোন ব্যারিষ্টারের বেয়ারা ছিল। লক্ষ্য করে
দেখাে, ওর অভ্যাস যায় নি এখনাে বেল টিপলে
কিম্বা দরজায় ঘা দিলেই ও লাফিয়ে ওঠে—ডাকে
সাড়া দেওয়াটা ওর মজ্জাগত হয়ে আছে কি না।
লাফিয়ে উঠতেই আমােদিনী দাস চোখে শাসিয়ে
ওকে দমিয়ে রাখে—চোখের সেই শাসানির কথা
মনে হলে এখনাে আমার গাকঁপে—আমি কিছুদিন
পড়েছি কি না ওর স্কুলে। দুটিতে বেশ মিলেছে।
স্বামী কথা বলতে উচ্চারণের ভুল করে, আর স্ত্রী
প্রকাশ্যেই তা শােধরিয়ে দেয় বেশ মজা কিন্তু।
সমরেন্দ্র। আরে রাণী, দরকারী কথাটা বল না ওঁকে-বাজে
কথায় কি হবে?
মঞ্জু। বাজে তাে বলিনি কিছু, যা দরকার তাই বলিছি।
সমরেন্দ্র। না, তা বলনি।
প্রথম অঙ্ক'।
বিবাহিত জীবন
মঞ্জু।
মঞ্জ। হাঁ, তা বলিছি।
সমরেন্দ্র। বলনি তুমি।
দীপ্তি। তাদেরে আসতে ব; তাদের মুখেই শােনা যাবে।
(ডাকিল) উপরে চলে আসুন, মিসেস্ দাস, আপনার
স্বামীকে নিয়ে।
সমরেন্দ্র। ওর স্বামীকে ডাকার দরকার কি ?
মঞ্জু।
আছে।
সমরেন্দ্র। না, নেই।
মঞ্জু।
হাঁ, আছে।
সমরেন্দ্র। এসে পড়েছে, গােল করাে না।
তুমিই তাে গােল করেছ।
সমরেন্দ্র। না, করিনি।
মঞ্জু। হাঁ, করেছ। ( রামকিঙ্কর ও আমােদিনীর প্রবেশ)
এই রামকিঙ্কর দাস—আর তার স্ত্রী আমােদিনী
দাস। কি জন্যে এসেছেন বলুন।
আমােদিনী। (রামের প্রতি) আঃ, অত নুইয়ে নমস্কার কর কেন ?
(দীপ্তির প্রতি) নীহার বাবু নামে একটি ভদ্রলােক দু’
বৎসর আগে বছর চৌদ্দ বয়সের একটি মেয়েকে
আমার বােডিং স্কুলে রেখেছিলেন—সেই নীহার বাবু
আর এ বাড়ীর নীহার বাবু এক ব্যক্তি কি না তাই
জানতে এসেছি।
মঞ্জু।
'
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
২৪
দীপ্তি। চৌদ্দ বছরের মেয়ে। আমার স্বামী রেখেছিলেন
আপনার কাছে ?
সমরেন্দ্র। আগে দেখে নি আপার স্বামীই রেখেছিলেন কিনা।
আমােদিনী। ওঁর পূরাে নাম হচ্ছে—নীহার রঞ্জন রায়।
রাম। নীহার রঞ্জন রায়–বাবুলােক--
আমােদিনী। তুমি চুপ কর।
দীপ্তি। ঠিক নামই।
আমােদিনী। শুনেছি সদাগরী আপিসে কাজ কর্তেন।
দীপ্তি। ঠিক।
আমােদিনী। তখনই বিয়ে করেছেন।
দীপ্তি। আর সন্দেহ নেই। যে মেয়েটিকে আপনার কাছে
রাখা হয় সেটি—
আমােদিনী। খুব সুন্দরী!
দীপ্তি। হু।
রাম। ভারি চমৎকার ‘আগ্রন্ বাজাতে পারতাে।
আমােদিনী। আগ্রন্ নয় ‘অর্গাণ। লেখাপড়ার জন্যে
আমার কাছে ততটা রাখা হয় নি তাকে—রাখা
হয়েছিল সেখানে কম পয়সায় একটি ভালাে ভদ্র
জায়গা হিসেবে।
দীপ্তি। একথা তােত আমি আর শুনিনি আগে! কে মেয়েটি
জানি না। তার নাম ?
প্রথম অঙ্ক ]
{
বিবাহিত জীবন দীপ্তি। = আমােদিনী। গীতা। সে এখন কোথায় ? আমােদিনী। সে প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি সম্পূর্ণ অপারগ- দেড় বৎসর আমার সঙ্গে ছিল, তারপর হঠাৎ অন্তর্হিত হয়ে গেল। রাম। কারু সঙ্গে পালিয়েছে বােধ হয়—একটি ছােরা।. আমােদিনী। চুপ কর। রাম। করলুম। আমােদিনী। তার চলে যাওয়ার সময় তার কাছে কিছু পাওনা হয়েছে দেখা গেল হিসেব করে। দুই কুড়ি আড়াই টাকা। আমােদিনী। সাড়ে বিয়াল্লিশ টাকা। দীপ্তি। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। কে মেয়েটা ? ওকে কি আমার স্বামীর-আমার স্বামীর—খুব—খুব -অনুগত দেখাত ? আমােদিনী। খুব। রাম। একদিন হঠাৎ ঘরে ঢুকে দেখি নীহার বাবুর কঁাধে মাথা রেখে মেয়েটি একেবারে সাশ্রু-গঙ্গা বহিয়ে দিচ্ছে চোখে। আমােদিনী। অশ্রুগঙ্গা। রাম। হাঁ, অশ্রুগঙ্গা। [ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
২৬.
দীপ্তি। (স্বগত) এ তারই প্রলােভনে পতিত কেউ হবে,
কোনাে সন্দেহ নেই—এ রহস্য ভেদ করা যায় কি
করে—আচমকা মুখের উপর জিজ্ঞেস্ করে ফেতে
হবে। হু, আচ্ছা হয়েছে—সমরেন্দ্র ও মঞ্জুরাণীর প্রতি
আপনারা এ সম্বন্ধে আমার স্বামীকে একটি কথাও
ববেন না—আমিই প্রথম বলতে চাই। কাল
সকালে এখানে চা খাবার নিমন্ত্রণ রইলাে আপনাদের।
( আমােদিনার প্রতি) আপনারাও আসবেন। আমার
স্বামীকে আপনার কাছে তখন উপস্থিত করব—তখন
মুখের উপর আমার স্বামী কিছুই অস্বীকার কৰ্ত্তে
পাবেন না। আপনারা আসবেন সব--আমার
পরিচিত বন্ধু বান্ধব সকলকেই বলব। (স্বগত)
সকলের কাছে তাকে ধরিয়ে দিতে হবে।
আমােদিনী। তা আস্ব।
দীপ্তি।
কাল সকালে “৭” টায়।
আমােদিনী। ঠিক সময়ে আসব।
( জনান্তিকে) কাল সকালে যে চিড়িয়াখানায় আমাকে
হনুমান দেখাতে নিয়ে যাবার কথা ?
আমােদিনী। সেটা বাদ দিতে হবে।
রাম।
তােমার খালি বাদ দেওয়া, খালি বাদ দেওয়া ; কোন্
দিন জানি তুমি আমাকেই বাদ দিয়ে দেও। তুমি
চিরকাল আমাকে এ রকম নৈরাশ কর।
প্রথম অঙ্ক ]
२१
বিবাহিত জীবন
আমােদিনী। ( তার দিকে ভীষণ ভাবে চাহিয়া ) “নিরাশ” বল।
রাম। আরে বাবারে, এই “নিত্ৰ যুগলের” চাওনির কাছে
আমােদিনী। চুপ। “নি” নয়-“নেত্র”—“নেত্র যুগল”!
(দীপ্তির প্রতি) তাহলে এখন আমরা আসি।
দীপ্তি।
আসুন। (ডাকিল। ওরে, কে আছিস্ রে ! (ডাক
শুনিয়া রামকিঙ্কর লাফাইয়া উঠিয়া অগ্রসর হইয়া “আজ্ঞে”
বলিবামাত্র আমােদিনী তাকে চোখে হাতে শাসাইয়া রাখিল )
আমােদিনী। ভুলে যাও বার বার !
রাম। ও কাটিয়ে উঠতে পারি—তবে কি জানাে-কেউ
মনিবী ডাক ডাকলেই যেন আমার সারা গায়ে সাড়া
পড়ে।
আমােদিনী। আসি তবে, নমস্কার । ( জনান্তিকে) বেশ
ভদ্রলােকের মত নমস্কার করে আসতে যেন ভুল
হয় না।
---উভয়ে নিষ্ক্রান্ত)
মঞ্জু।
(দীপ্তির মুখ হাতে লুকানােরূখিয়া).দেখ ভাই, এ
নিয়ে তুমি এতটা মুষড়ে পড়ােনা।
সমরেন্দ্র। রাণী, তুমি আর এখন মিছে সান্ত্বনা দিতে চেয়ােনা,
তােমার জানা উচিত অনেক সময় চোখের জল
বেরিয়ে যাওয়াই দুঃখের আরাম।
প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
২৮
;
মঞ্জু।
অঞ্জু। , তা তত মনে হয়না; কেঁদে কেঁদে বুক ফাটিয়ে
দেওয়া সেও আবার আরাম।
সমরেন্দ্র। হঁা, সে আরামইতাে।
, আরাম নয় -কখনই নয়—তুমি
তুমি কি করে
জানলে? তুমি তাে কখনাে কঁদো না।
সমরেন্দ্র। বিশেষ কোনাে ঘটনার জন্যে অশ্রু সঞ্চয় করে
রাখাই আমি পছন্দ করি ।
মঞ্জু।
হযখন আমাকে হারাবে ?
সমরেন্দ্র। হাঁ, নিশ্চয়ই তাই রাণী।
আমাদের বিয়ের পর এতটা আদরের কথা আর কখন
বলনি।
সমরেন্দ্র। বলেছি। অবিশ্যি ঠিক ফুল শয্যার পরের দিন
বলিনি।
না, বলনি।
সমরেন্দ্র। হাঁ, আমি বলছি নিশ্চয়-বলেছি।
মঞ্জু। না, বলনি।
দীপ্তি। আপনাদের মধুর দাম্পত্য আলাপ একটু থামান তােল।
সব সময় আমার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে।
আমার স্বামীর সঙ্গে যদি দেখা হয়, অনুগ্রহ করে
এ বিষয় কিছুই বলবেন না; আর নিরুপায় হয়ে
আমি যদি কখনাে বিশেষ কোনাে উপায় অবলম্বন
প্রথম অঙ্ক ]
দীপ্তি।
২৯ বিবাহিত জীবন মঞ্জু। মঞ্জু। মঞ্জু। * করে বসি,তাহলে আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন। (একটা চেয়ারে বসিয়া পড়িল ) এস, আমরা যাই; দুঃখের সময় সঙ্গ ভালাে লাগে না। সমরেন্দ্র। বরং সে সময়ই সঙ্গে থেকে সান্ত্বনা দেওয়া দরকার। আচ্ছা, সান্ত্বনাকারীটি তােত তুমি তুমি কাল আমাকে কেমন সান্ত্বনা দিয়েছিলে যখন সেই ভীষণ শাড়ীটা বাড়ীতে নিয়ে এলাে ? সমরেন্দ্র। তােমার রুচি অনুসারেই এসেছিল। , তা নয়। সমরেন্দ্র। তুমিইতাে বলে এসেছিলে, নীল জমিনে জড়ীর কাজ চাই। মঞ্জু। এটা আমি দেখতেই পারি না। সমরেন্দ্র। ঠিক এটার জন্যেই অর্ডার দিয়ে এসেছিলে। যখন আমি শাড়ীটা পরলুম তখন তুমি বল্লে এমন ভয়ানক কিছু দেখনি তুমি জীবনে। সমরেন্দ্র। আমি বলিনি। মঞ্জু। বলেছিলে-বাড়ী গিয়ে এটা আমি পুড়িয়ে ফেলব। সমরেন্দ্র। লঙ্কাকাণ্ড কত্তে আমি কিছুতেই অনুমতি দিতে পারি না। আমি নিশ্চয়ই পােড়াব, আর তােমাকে রাগাবার জন্যে সেই হলদে রঙের শাড়ীটা সব সময় পরে বসে, থাকব। সমরেন্দ্র। আরে না-না-অমন কৰ্তে নেই। মঞ্জু। মঞ্জু। [ প্রথম দৃশ্য বিবাহিত জীবন ক === (সমরেন্দ্র-মঞ্জু } ডুয়েট গান। সমর। গরবিণী ঠমক মণি— রসের যেন ঝর্ণাখানি! ঝাল টকের মিঠে চাটুনি চাওনা ফিরে চাওনা ধনি- আলিওনা আর এমনি ! মঞ্জু। আমি পরবাে ঐ হদে শাড়ী- দেখলে তুমি যা চট ভারি কাণে দেবাে মতির দু- যাহা তােমার চক্ষু শূল- জেনাে তাতে হবেনা ভুল। সমর। তা যত ইচ্ছে সাজনা সং- দেখাও না তােমার রং ঢং- জানি এসব রােগ ভারি-- পয়জার মারলেই যায় সারি। (ঢের হয়েছে ) চেপে যাও বাড়াবাড়ি! মঞ্জু। মরি মরি কি কথার ছিরি— শুলে চটে মেজাজ ভারি— সায় দেওনা কথায় তুমি তােমার সঙ্গে বনাবনি-- হবেনা মনে ঠিক জানি। (মঞ্জু প্রস্থান) প্রথম অঙ্ক ]
বিবাহিত জীবন
.
সমরেন্দ্র। রাণী, তুমি এমন অদ্ভুত হলে কি করে ? আঃ! একটু
অপেক্ষা কর না ! এমন মেজাজ তাে
মেজাজ তাে কখনাে
দেখিনি বাবা।
মঞ্জু। ( বাহিরে ) আমি একাই বাড়ী যাব।
সমরেন্দ্র। না, যেতে পারবে না।
( বাহিরে ) যাবই।
সমরেন্দ্র।যেতে পারবে না।
মঞ্জু।
( বাহিরে ) যাবই।
সমরেন্দ্র। না, পারবে না।
মঞ্জ। ( বাহিরে ) তােমাকে দেখতে পারিনা আমি।
সমরেন্দ্র। পার।
( বাহিরে ) না, পারি না।
সমরেন্দ্র। হাঁ, পার।
মঞ্জু। ( বাহিরে ) না, পারি না।
সমরেন্দ্র। আঃ! একেবারে জ্বালিয়ে মারুলে।
(পশ্চাতে নিষ্ক্রান্ত )
দীপ্তি।
এর পূর্বে ঠিক ঈর্ষা আর সন্দেহ কাকে বলে টের
পাইনি-এখন যে সত্যিকার মনের কষ্ট ভােগ কচ্ছি
তার তুলনায় আগে যা ভােগ করেছি তা আমার
মনের খেয়াল ছাড়া আর কিছু নয়। কে হতে পারে
এই মেয়েটা? এখন সে কোথায় ও নিশ্চয়ই বেশ
[ প্রথম দৃশ্য
মঞ্জু।
বিবাহিত জীবন
জানে—সন্দেহ নেই মেয়েটায় কাছে গিয়েও থাকে-
হতে পারে এই মুহুর্তেই হয়ত তার সঙ্গ উপভােগ
কচ্ছে। আমি চলে যায় এই বাড়ী ছেড়ে—এ
আর সহ্য কর্তে পারছি না আমি।
(বেগে বাহির হইয়া যাইবে সেই সময় নীহারের প্রবেশ )
নীহার। এত বেগে কোথায় রােয়ানা হয়েছ ?
দীপ্তি।
( মনের ভাব চাপিয়া) এত শীগগির ফিরলে ?
নীহার । ( ডেস্কের কাছে গিয়া ) টাকা রেখে গেছিলাম ভুলে ।
দীপ্তি। আশাকরি বেড়িয়ে খুব খুসি হয়ে এসেছ ?
নীহার। ঘঁ, খুব।
দীপ্তি। অবিশ্যি নিরাশ হয়ে তেমন কিছু বিরক্ত হওনি ;
নিশ্চিত সুখের জায়গাতে মনে মনে ঠিকই ছিল।
নীহার। হাঁ, দীপ্তি, তাই ফিরে এলুম তােমার কাছে।
দীপ্তি। তুমি ভাবতেও পারনি যে তােমার কাজের চিঠি” টি
আমিই লিখেছিলুম।
নীহার। তাই না কি—এা ? এই তুচ্ছ কৌশল করে কি
লাভ হলাে ?
দীপ্তি।
সে বিষয়ে তােমার তৎক্ষণাৎ মনােযােগ দেওয়াতেই
তােমার বিশ্বাসঘাতকতার পরিষ্কার প্রমাণ পাওয়া
গেছে।
নীহার। তাই নাকি? এর চেয়ে ভালাে উপায় কিছু পেলে না?
প্রথম দৃশ্য ]
বিবাহিত জীবন ; দীপ্তি। উপায় উদ্ভাবনের বুদ্ধি খেলানাের আর অবসর কই; এখন আমার দুর্দশা সম্বন্ধে আমার নিশ্চিত ধারণা হয়ে গেছে। নীহার। কি দুর্দশা ? দীপ্তি। লুকোচুরি করে বেড়ায় এমন একটি স্বামী লাভ। (স্বগত) যা শুনেছি সে সম্বন্ধে কিছু বত্ব না মনে করেছিলুম, কিন্তু লােভ সামলাতে পাচ্ছি না। বলতেই হবে, হয়ত নির্দোষও হতে পারে। (উচ্চে ) আচ্ছা, শুন দেখি—“গীতা” নামটি তােমার জানা আছে ? নীহার। (চেয়ার হইতে চকিয়া উঠিয়া) কে বলে গেল সে নাম তােমার কাছে ? কে বলেছে তার কথা তােমার কাছে ? দীপ্তি। ওঃ। এখন আমার আর কোনো সন্দেহ নেই- কোনাে সন্ধে নেই। তােমার উত্তেজনা থেকেই বােঝা যাচ্ছে, তােমার কিছু বার নেই। লুকোবে কি করে ? নীহার। কে এসেছি! এখানে এর মধ্যে ? দীপ্তি। আমি নাম বলব না। নীহার। (দীপ্তির বা পরিয়া) তােমাকে বলতেই হবে। দীপ্তি। ছেড়ে দাও! গায়ের জোর দেখাচ্ছ যে? রাগে [ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৩৪
কি লজ্জা ঢাকা যাবে ? শােন আমার কথা। আমি
কিছু একটা করে বসবার আগে তােমাকে একটা
সুযােগ দেব সদুত্তর দেয়ার। কাল সকালে বাড়ী
থাকবে কথা দাও, এর মধ্যে আমি এ সম্বন্ধে একটী
কথাও তুলব না—সেই পৰ্যন্ত আমি আমার মনের
ভাৰ সমস্ত চেপে রাখব। যে প্রতিশােধ দিতে
যাচ্ছি তাতে আমার আনন্দ নেই কিন্তু সত্যি সত্যি
যদি আমার রাগের কারণ থেকে থাকে এবং তা থেকে
যদি একদিন আমাদের সুখের ঘরে আগুন লাগে তত
সে দোষ একা তােমারই।
( নিষ্ক্রান্ত )
নীহার। কি আছে ওর মনে ? কে এসেছিল এইখানে ?
কার কাছ থেকে শুনলে? কিন্তু কোন উত্তর
দেবার চেষ্টা তাে আমি কর্তে পারি না ; န်
দুর্ভাগিনী মেয়েটা সম্বন্ধে কিছু প্রকাশ করা এখন
আমার পক্ষে অসম্ভব।
(কৈলাসের প্রবেশ)
কৈলাস। না বলে ক’য়েই এসে পড়লুম, মাপ করবেন
জাতুম আপনি বাড়ী ফিরেছেন—আমি এসেছি
আমার স্ত্রীর কথায়—তিনি বলেন—না, আগে ঐ
জানালাটা বন্ধ কৰ্ত্তে হবে-- নিজে গিয়া জানালা বন্ধ
প্রথম অঙ্ক ]
'.
বিবাহিত জীবন
করিল) তিনি বলেন না, তিনি বলেন না—আপনার
স্ত্রী বলেন যে আমার স্ত্রী ও আপনার মধ্যে এক
বেশী মেশামেশি রয়েছে—সেটার মানে কি জানি না না
কিন্তু আমার স্ত্রী জিদ করে বসলেন, আমাকে
আসতেই হবে—এই কণকণে বাতাসে জীবন বিপন্ন
করেই আমাকে আসতে হয়েছে—আমি তাই এসে
আমার তৃপ্তির জন্যে এ কথাটা আপনাকে জিজ্ঞেস
কচ্ছি, এই একটু বেশী মেশামেশিটা সত্যিই আছে
কি না ? যদি না থেকে থাকে তাহলে আপনার
স্ত্রী এসে ক্ষমা প্রার্থনা করুন, আর যদি থেকেই থাকে
তাহলে কি করা যায় বলুন তাে ?
নীহার। আপনি আমার স্ত্রীর মেজাজ তাে বেশ জানেন।
নিশ্চয় জাবেন, তার সন্দেহের কোনাে ভিত্তি নেই।
কৈলাস। তাই হবে জাতুম—এ সব শুধু আমাকে উত্তেজিত
করে তুলবার জন্যে আমার স্ত্রীর চেষ্টা ছাড়া কিছুই
==
নীহার। একটা কথা আছে আপনার সঙ্গে।—( কৈলাসকে
সম্মুখে আনিয়া) আমি যখন বেরিয়ে যাই তখন আপনি
এখানে ছিলেন আপনারা থাকা সময় আর কেউ
কি এসেছিল এখানে ?
কৈলাস। সমরেন্দ্র বাবু ও তার স্ত্রী এসেছিলেন।
[ প্রথম দৃশ্য
। নীহার । বিবাহিত জীবন নীহার। (স্বগত) তারা নিশ্চয় জানে না কিছু-না-না- জানতেও পারে। হাঁ, একটা.উপায় এসেছে মাথায়, ( প্রকাশ্যে ) কৈলাস বাবু,আপনি তাে আমাকে অনেক দিন থেকে স্নেহের চক্ষে দেখে থাকেন। কৈলাস। নিশ্চয়। এতদিনের পরিচয়। নীহার। কি উপায়ে জানি না, আমার স্ত্রী একটী যুবতী মেয়ের সঙ্গে আমার সম্বন্ধে আবিষ্কার করে বসেছেন। কৈলাস। হু, বুঝলুম ! তার সম্বন্ধে আমার কিছুই প্রকাশ করে বদ্বার উপায় নেই। কৈলাস। এখন আপনার অভিপ্রায় ? নীহার। আমার এই মুস্কিলের অবস্থা থেকে আপনি আমাকে উদ্ধার কৰ্তে পারেন। কৈলাস। কি করে ? নীহার। এই মেয়েটিকে আমি কিছুদিন আগে একটা মেয়ে- বাের্ডিংয়ে রেখেছিলাম- কৈলাস। হু! নীহার। সেখান থেকে সে অন্তর্ধান হয়, তার পরে তার আর কোনাে খোঁজ পাওয়া যায় নি। কৈলাস। তারপর ? নীহার। এই একটু আগেই এখন আমার স্ত্রীর নাম করেছে। প্রথম অঙ্ক ] ৩৭ বিবাহিত জীবন কৈলাস। তাহলে অবিশ্যি তিনি সমস্ত আবিষ্কার করেছেন। নীহার। আপনাকে প্রকাশ্যে ঘােষণা কৰ্ত্তে হবে যে সে আপনারি। কৈলাস। কি। নীহার। আপনারি কন্যা--আর আপনার কথা গােপন রাখতেই তার ভার আমাকে নিতে হয়। কৈলাস। বাঃ! আমার স্ত্রী কি বলবে ? সে যে আমাকে খুন করে ফেলবে। আর তার মুখের দিকে চেয়ে ও কথা কি আমি বজায় রাখতে পারব ? নীহার। কিন্তু তিনি যদি জানতে পারেন যে- কৈলাস। কি ? (নীহার কৈলাসের কাণের কাছে কি বলিল- কৈলাস অত্যন্ত আতঙ্কে কয়েক পা পিছাইয়া গেল ) উঃ, আমি মরেছি। নীহার। দেখছেন তাে আপনার সম্বন্ধে যা ভেবেছিলেন তার চাইতেও আমি অনেক বেশী জানি। এখন বুঝতে পারছেন তাে যে এই ষড়যন্ত্র সিদ্ধ করা বেশী শক্ত কথা নয়। আপনি আমাকে সাহায্য না করলে আমাকে বলেই দিতে হবে- কৈলাস। পায়ে পড়ছি, একটা কথাও বলবেন না—আমাকে ঠাণ্ডা জলে ডুবিয়ে রাখুন, সারারাত বাইরে থাকতে [ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
বলুন—যা খুসি তাই করুন, কিন্তু এ কথা ঘুণাক্ষরেও
বলবেন না যে
নীহার। তাহলে আমি যা অনুরােধ কচ্ছি তাই করুন।
কৈলাস। করব--শপথ কচ্ছি হলাে তাে প্রায় পায় ধরিতে
উদ্যত, নীহার ধরিয়া ফেলিল)
নীহার আমাকে বাঁচান--আপনিও বাঁচবেন ৷
প্রথম অঙ্ক }
দ্বিতীয় অক
প্রথম দৃশ্য
কলাসের বাড়ীর একটি কক্ষ। অমুল্যবালা একটি
চিঠি হাতে বসিয়া আছে।
-
অমূল্য। কি আশ্চর্য্য! দীপ্তির চিঠি! দেখি কি লিখেছে,
“দিদি, কালকে যা বলিছি তার জন্যে আমাকে ক্ষমা
করবেন- আমার মেজাজ ভালাে ছিল নাকি
বলেছি বুঝতে পারিনি-এ আমার অন্যায় হয়েছে-
ক্ষমা করবেন। আজ সকালে আমার বাড়ীতে এসে
চা খাবেন—আপনার স্বামীকেও নিয়ে আসবেন,
যেন অন্যথা না হয় আরাে কেউ কেউ আসবেন।
ইতি—আপনার দীপ্তি।” কি আশ্চৰ্য্য স্ত্রীলোেক।
কাকে তার বাড়ী যেতে নিষেধ করেছে, আজকেই
নিমন্ত্রণ করে পাঠিয়েছে। বলেছে যখন, যাবাে।
উনি পােষাক কর্তে কত সময়ই নিচ্ছেন, আমি তাে
প্রস্তুত হয়ে আছি। ওগাে, তােমার হ’ললা ?
কৈলাস। ( ভিতরে) এই তাে হ’লল বলে; এই তিন নম্বর
ওয়েষ্ট কোট লাগাচ্ছি।
অমূল্য। গঞ্জিতে, সার্টে, কোটে, ওয়েষ্ট কোটে এ রকম গােটা
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন ৪০ ছয় গায় লাগায় তবে ছাড়ে! এতগুলাে পরে কি করে যে শ্বাস ফেলে তাই ভাবি। আমি হলে তাে দম বন্ধ হয়ে মারা যেতুম। কাল রাত থেকে ওর কি হয়েছে বুঝছি না—মুখ ভার—সারারাত্রি এপাশ ওপাশ করেছে—মাঝে মাঝে ঘুমের ঘােরে কত কি বলে উঠেছে—একবার বল্লে, “যা বলতে হয় বল- ওকথা ঘুণাক্ষরেও বলল না।” কি ব্যাপার? আজ সকালেও দেখছি রক্তচক্ষু ! খুন খারাপি কিছু করে আসেনি তাে ? ওঃ! প্রশ্ন করে দেখতে হচ্ছে। . (পােষাক পরিয়া কৈলাসের প্রবেশ) কি-কেমন আছ = অমুল্য। ন অমূল্য। কলাস। ভালাে নয়। তােমার যেন জ্বর হয়েছে-দেখি নাড়ী। ( নাড়ী টিপিয়া) তােমার অসুখ ! তুমি থাকো। কৈলাস। যেতে পারবাে-যেতেই হবে। তােমার মানসিক কোনাে উদ্বেগ আছে বলে মনে হচ্ছে। কৈলাস। ভগবান! তুমি কি তুমি কি তাই মনে কচ্ছ ? অমূল্য। তােমার মাথাও গরম-জানালাগুলাে খুলে দি। কৈলাস। নানা কিছুতেই না। অমূল্য। জ্বর এলাে কেন ? দ্বিতীয় অঙ্ক ]
:৪১
বিবাহিত জীবন
কৈলাস। আমি-আমি জানি না।
অমূল্য। তােমার মনে অসুখ।
কৈলাস। দেখ, এমন ভীষণ ভাবে আমার সঙ্গে কথা ক’য়াে
, আমাকে আপাদ-মস্তক কঁপিয়ে তুলছ।
অমূল্য। রাত্রিটা ভারি খারাপ কেটেছে তােমার।
কৈলাস। তাই।
অমূল্য। ঘুমের মধ্যে কত কি বলে উঠেছ।
'কৈলাস। (শঙ্কিত) না! বলেছি নাকি ? কি বলেছি ?
অমূল্য। আমার সন্দেহ সৃষ্টি করবার পক্ষে যথেষ্ট।
কৈলাস। (স্বগত) আরে বাপরে! কি বলেছি কে জানে ?
কি উপায় হবে আমার ?
অমূল্য বল আমাকে—কি জন্যে এমন হয়ে পড়েছ তুমি ?
কৈলাস। (স্বগত) যাক—জানে না—অবার ধড়ে প্রাণ এল।
অমূল্য: বল—উত্তর দাও-কি করেছ তুমি ?
কৈলাস। আমি-আমি কাল সুয়েটার গায় দিয়ে যেতে ভুলে
গেছিলুম।
অমূল্য। মিথ্যাবাদী! প্রবঞ্চক ! এসব খাবে না। কি
ব্যাপার আমাকে না বলা পর্যন্ত তােমাকে অব্যাহতি
দিব না। কিছু একটা হয়েছে নিশ্চয়, আর তার
সঙ্গে নীহার বাবুরও নিশ্চয় যােগ আছে। কাল
রাত্রে তার কাছ থেকে আসা অবধিই লক্ষ্য কচ্ছি
I প্রথম' দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৪২
তােমার পরিবর্তন।
রমাি ঘরের জানালা খুলে রেখে
গেল—সেদিকে লক্ষ্য ছিল নাসারারাত সার্সিভাঙ্গ
দিয়ে বাতাস এল—ক্ষেপ নেই—রাত্রে খেলেও না
কিছু—ঘরে আগুন রাখতেও বলে না—“উঃ!
আঃ!'—শুনেছি সব সারারাত। প্রস্তুত হয়ে নাও,
সব না বল্লে রক্ষা নেই তােমার-এখন একটু আছি
আমি স্বগত) এইবার এই নিশ্চল পাথরটা যদি
কিছু নড়ে উঠে।
(নিষ্ক্রান্ত)
কৈলাস। আমি গেছি; জাম একদিন এ দিন আসূবে।
কিছু সন্দেহ কচ্ছে নিশ্চয়। এখন তাে নিমন্ত্রণ
রাখতে যাচ্ছি—কি নিমন্ত্রণই সে হবে—ওঃ! মনের
এই অবস্থায়—এখন না গিয়েও তো উপায় নেই---
সন্দেহ বাড়বে—তা ছাড়াওঃ! কি করি ? সে
কথা যদি গােপনে রাখে তাহলে আমি যা বল্ব
তাতে সকলের মধ্যে বেশ একটু নাড়া পড়ে যাবে।
যে মেয়েটাকে নিজের বলে ঘােষণা কৰ্ত্তে যাচ্ছি সেটি
কে ? হাঃ! হাঃ!--এখন বুঝছি, আমার ভয়
নেই, সে আমার কথা বলে দিতে সাহস পাবে না;
আমি তার কবলে যেমন, সেও তেমনি আমার কবলে,
কিন্তু আমার কথা সে জানলে কি করে! সে তা
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
৪৩
বিবাহিত জীবন
বলবে না। আমার প্রথমা স্ত্রীটি কি তাহলে এ
অঞ্চলে এসে আবিভূত হয়েছে। সে ত বেঁচে
নেই, এই গুজবই শুনেছিলুম-অবিশ্যি সেটা ঠিক
নয়। কিন্তু এতদিন নিরুদ্দেশ থেকে শেষে-----
ওঃ! উপায় ? (কপিতে লাগিল।
( দিগিন্দ্র চৌধুরী ও পূর্ণশশীকে লইয়া অমূল্যবালার প্রবেশ)
অমূল্য। আসুন, আসুন, আর কেউ নেই এখানে।
কৈলাস। আঃ, দিগিন্দ্র বাবু! আপনার কথাই ভাবছিলুম।
অমুল্য! এরাও নিমন্ত্রণ পেয়েছেন—পথে যেতে জাতে
এসেছেন, আমরাও যাচ্ছি কি না।
পূর্ণশশী। কৈলাস বাবুকে এমন অসুস্থ দেখাচ্ছে কেন?
দিগিন্দ্র। ওর হয়েছে কি ?
অমূল্য। জানি না; কি অসুখ তিনি তত গােপনেই রাখছেন।
পূর্ণশশী। আমারি মতন ; নির্জনে ভুগতে ভালােবাসেন ।
কারু কাছে কিছু মুখ ফুটে না বলে মনে মনেই সব
চেপে রাখেন।
দগিন্দ্র। তােমার বােকামি ।
অমূল্য। আমাদের মতন নিমন্ত্রণ পেয়ে এরাও খুব আশ্চৰ্য্য
হয়েছেন।
পূর্ণশশী। সে দিন ওদের বাড়ীতে গেলে দীপ্তি আমার সম্বন্ধে
ভারি একটা নীচ সন্দেহের ইঙ্গিত করলে।
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন ৪৪ । দিগিন্দ্র। পাগল আর কাকে বলে ? পূর্ণশশী। কিন্তু তার ঈর্ষা ও সন্দেহ হবার কারণ আছে। দিগিন্দ্র। নিশ্চয়, যখন তুমি উপস্থিত। পূর্ণশশী। কালকে আমাদের বাড়ীর কাছ দিয়ে একটি মেয়ের অনুসরণ কচ্ছিলেন নীহার বাবু, সে তত আমরা দেখেছি। দিগিন্দ্র। তাতে কি হয়েছে ? পুরুষ জাতির তাে ইহা স্বাভাবিক অধিকার। অমূল্য। এই আমার স্বামীটি অবিশ্যি সেই নিয়মের ব্যতিক্রম। স্বয়ং উর্বশী যদি তার সমস্ত সৌন্দৰ্য্য নিয়ে সমুদ্র বক্ষ থেকে উঠেই এর সম্মুখে এসে দাড়াতেন, তাহলেও উনি পাছে ঠাণ্ডা লাগে সেই ভয়ে সেই সমুদ্র কন্যার কাছ থেকে শত হস্ত দূরে চলে যেতেন। পূর্ণশশী। নীহার বাবুর আচরণ সম্বন্ধে আমাদের অনুসন্ধানের ফল কৈলাস বাবুকে জানিয়ে দাও। দিগিন্দ্র। ফুঃ ! সে তুমিই বল । পূর্ণশশী। নীহার বাবু যে যুবতীটির অনুসরণ কচ্ছিলেন সেটি শেষে হলদে শাড়ীপরা একটি বয়স্কা স্ত্রীলােকের সঙ্গে মিশল। কৈলাস। (স্বগত) এ! হলুদে শাড়ীপরা বয়স্কা স্ত্রীলােক- সেই-নীহার তােত বলেছে হলুদে শাড়ী পরা। দ্বিতীয় অঙ্ক ?
৪৫ বিবাহিত জীবন পূর্ণশশী। অনেকটা পুরুষের মতন দেখতে ; নীহার বাবু তার সঙ্গে যেন গভীর কথায় মনােনিবিষ্ট হয়ে গেলেন মনে হ’লাে-তারপর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তারাসেই স্ত্রীলােকটি নিকটেই একটা বাড়ীতে ঢুকূলে-আমার চাকর জিজ্ঞেস্ করে জানলে, সে স্ত্রীলােকটি কৈলাস। কি ? (উঠিয়া ) পূর্ণশশী। আসামে কোথায় শ্রীপুর থেকে এসেছে। অমূল্য। (কৈলাসের প্রতি। যেখানে তােমার সম্পত্তি রয়েছে। পূর্ণশশী। এই কিছুদিন মাত্র এখানে এসেছে; তার উদ্দেশ্য নাকি তার স্বামীকে খুঁজে বের করা ; তার স্বামী নাকি তাকে ত্যাগ করে এসেছে ; আশ্চৰ্য্য !—সেই স্বামীটির নাম না কি- কৈলাস। ওঃ! (ধপ, করিয়া একটা চেয়ারে বসিয়া পড়িল), অমূল্য। কি হ’লাে ?—কি হ’ললা ? দিগিন্দ্র। মূচ্ছার মতন অবস্থা দেখছি—জল-জল-- পূর্ণশশী। জল— দিগিন্দ্র। জানালাগুলাে খুলে দাও-জানালাগুলাে খুলে দাও । ( দিগিন্দ্র জানালা খুলিতে যাইবে—অমূল্যবালা আটকাইয়া রাখিল ; কৈলাস জানালা খােলা হইবে শুনিয়া চেয়ার হইতে চমকিয়া উঠিল ; কিন্তু নিজকে দমন করিয়া আবার বসিল) পূর্ণশশী। জল- [প্রথম দৃশ্য বিবাহিত জীবন ৪৪ দিগিন্দ্র। পাগল আর কাকে বলে ? পূর্ণশশী। কিন্তু তার ঈর্ষা ও সন্দেহ হবার কারণ আছে। দিগিন্দ্র। নিশ্চয়, যখন তুমি উপস্থিত। পূর্ণশশী। কালকে আমাদের বাড়ীর কাছ দিয়ে একটি মেয়ের অনুসরণ কচ্ছিলেন নীহার বাবু, সে তাে আমরা দেখেছি। দিগিন্দ্র। তাতে কি হয়েছে ? পুরুষ জাতির তত ইহা স্বাভাবিক অধিকার। অমূল্য। এই আমার স্বামীটি অবিশ্যি সেই নিয়মের ব্যতিক্রম। স্বয়ং উর্বশী যদি তার সমস্ত সৌন্দৰ্য্য নিয়ে সমুদ্র বক্ষ থেকে উঠেই এর সম্মুখে এসে দাড়াতেন, তাহলেও উনি পাছে ঠাণ্ডা লাগে সেই ভয়ে সেই সমুদ্র কন্যার কাছ থেকে শত হস্ত দূরে চলে যেতেন। পূর্ণশশী। নীহার বাবুর আচরণ সম্বন্ধে আমাদের অনুসন্ধানের ফল কৈলাস বাবুকে জানিয়ে দাও। দিগিন্দ্র। কুঃ ! সে তুমিই বল । পূর্ণশশী। নীহার বাবু যে যুবতীটির অনুসরণ কচ্ছিলেন সেটি শেষে হলদে শাড়ীপরা একটি বয়স্কা স্ত্রীলােকের সঙ্গে মিশল। কৈলাস। (স্বগত) এ! হলদে শাড়ীপরা বয়স্কা স্ত্রীলােক- সেই-নীহার তাে বলেছে হলুদে শাড়ী পরা। দ্বিতীয় অঙ্ক। .
৪৫ বিবাহিত জীবন পূর্ণশশী। অনেকটা পুরুষের মতন দেখতে; নীহার বাবু তার সঙ্গে যেন গভীর কথায় মনােনিবিষ্ট হয়ে গেলেন মনে হ’লােতাৱপর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল তারা—সেই স্ত্রীলােকটি নিকটেই একটা বাড়ীতে ঢুকূলে—আমার চাকর জিজ্ঞেস করে জানলে, সে স্ত্রীলােকটি কৈলাস। কি ? (উঠিয়া ) পূর্ণশশী। আসামে কোথায় শ্রীপুর থেকে এসেছে। অমূল্য। (কৈলাসের প্রতি। যেখানে তােমার সম্পত্তি রয়েছে। পূর্ণশশী। এই কিছুদিন মাত্র এখানে এসেছে; তার উদ্দেশ্য নাকি তার স্বামীকে খুঁজে বের করা ; তার স্বামী নাকি তাকে ত্যাগ করে এসেছে ; আশ্চৰ্য্য!—সেই স্বামীটির নাম না কি- কৈলাস। ওঃ! ( ধপ করিয়া একটা চেয়ারে বসিয়া পড়িল), অমূল্য। কি হ’লাে?—কি হ’ললা ? দিগিন্দ্র। মূচ্ছার মতন অবস্থা দেখছি—জল-জল-- পূর্ণশশী। জল দিগিন্দ্র। জানালাগুলাে খুলে দাও—জানালাগুলাে খুলে দাও । ( দিগিন্দ্র জানালা খুলিতে যাইবে—অমূল্যবালা আটকাইয়া রাখিল ; কৈলাস জানালা খােলা হইবে শুনিয়া চেয়ার হইতে চমকিয়া উঠিল ; কিন্তু নিজকে দমন করিয়া আবার বসিল) পূর্ণশশী। জল- ; [প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৪৬
-
অমূল্য। যাচ্ছি আমি।
(নিষ্ক্রান্ত )
(কৈলাস হঠাৎ দাড়াইয়া উঠিয়া দিগি ও পূর্ণশশীর
হাত নিজের হাতে ধরিল )
কৈলাস। আমাকে যদি আপনারা কিছুমাত্র ভালােবাসেন
যদি আমাকে আপনাদের পায়ের কাছে মরে পড়ে
আছি দেখতে না চান তাহলে এই হলুদে শাড়ী-
পরা স্ত্রীলােকটির কথা কাউকে কিছু বলবেন না,
তার স্বামীর নামেরও আর উল্লেখ করবেন না।
দিগিন্দ্র। সে আপনারি নাম।
কৈলাস। জানি—জানি—ভয়ানক গােপনীয় কথা
বিভীষিকা ও নৈরাশ্যের কাহিনী; এক সময়ে বলবাে
সব ; এখন একটি কথাও বলবেন না। আমার
অনুবােধ–সনির্বন্ধ অনুবােধ-পায়ে পড়ছি-
অনুগ্রহ করে—ওঃ । আমার স্ত্রী! (চেয়ারে বসিয়া
পড়িল )
( জল লইয়া অমূল্যের প্রবেশ)
পূর্ণশশী। এখন অনেকটা ভালাে।
দিগিন্দ্র। ভালােই এখন।
কৈলাস। (যেন ভাল হইতেছে সেই ভাণ করিল ) হাঁ, অনেকটা
ভালাে।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
৪৭
বিবাহিত জুীবন
অমূল্য। মুচ্ছ হয়েছিল তাতে আশ্চর্য হচ্ছি না—আমি
আশ্চৰ্য্য হচ্ছি, এই রকম বদ্ধ বাতাসে মােটেই শ্বাস
ফেলছে কি করে ! আমি যে হাঁপিয়ে উঠছি।
আপনারা কিছুক্ষণের জন্যে আমাকে মাপ করবেন
আমার স্বামীর কাছে আমার কিছু জিজ্ঞেস্ করবার
আছে। ( দিগিন্দ্র ও পূর্ণশশী চলিয়া যাইতে উদ্যত) না-
-ঘর ছেড়ে যাবেন না। ( তারা দূরে সরিয়া গেল )
কৈলাস। (স্বগত) কি জানি জিজ্ঞেস্ করতে যাচ্ছে ?
অমূল্য। তুমি
কৈলাস। বল, অমু-
তােমার এই উত্তেজনা এবং মূচ্ছ। যাওয়া কোনাে
আশঙ্কা থেকে ঘটেনি তাে ?
কৈলাস। কিসের আশঙ্কা
অমূল্য
যে এই হলদে শাড়ী পরা স্ত্রীলােকটি হচ্ছে-
কৈলাস। না, না, না—আরে তা নয়, তা নয়।
অমূল্য। আগে আগেই বলে ফেছ-কি নয় ?
কৈলাস। নয়—জানি না। কি না বছিলে তুমি ?
অমূল্য।
অত্যন্ত অদ্ভুত এবং ভয়ানক সন্দেহ সব আমার মনে
উদয় হয়েছে-তােমার প্রথম উদ্দাম যৌবনে দেখা
হয়েছিল এমন কেউ
কৈলাস। না, না, না—অমূ। কি করে একথা ভাবলে-
অমূল্য।
{ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৪৮
কল্পনা করাও কি সম্ভব একথা! উদ্দাম যৌবন
কখনাে আমার হয়নিকখখনাে না; সে রকম
ভেবাে না আমাকে। চল-চল-নীহার বাবুর
বাড়ীতে। প্রস্তুত তাে, চল।
অমূল্য। খুব সন্দেহ হচ্ছে তােমাকে আমার। (সরিয়া গিয়া
গায় একটা শাল জড়াইল)
কৈলাস। আমার কি উপায় হবে। আর এক স্ত্রী রয়েছে সেটা
এড়ানাে সম্ভব হলেও ঐ মেয়েটাই আমার স্ত্রীকে
আমার প্রতি রাগিয়ে তুলতে যথেষ্ট হবে—
কি করি—কি করি। যাক—যাক্, জেগে উঠতে
হবে, জেগে উঠতে হবে, সাহস ধরতে হবে—মনের
সমস্ত সাহস জাগিয়ে তুলব—এইবারে সয়তানীর
আশ্রয় নিতে হবে।
অমূল্য। আমি প্রস্তুত হয়েছি।
কৈলাস। আমিও। এস, খুব ফুৰ্ত্তি করব আজ আমি ; দেখে
আশ্চর্য হয়ে যাবে—এত ফুর্তি করব। আসুন
আপনারা।
অমূল্য। লােকটা পাগল হয়েছে-
দিগিন্দ্র। আশ্চর্য্য।
কৈলাস। আজ আমি নূতন মানুষ হয়ে উঠেছি, সব দরজা
জানালা খুলে দিতে পার তােমরা—আপত্তি নেই।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
;
৪৯
বিবাহিত জীবন
একটা কিছু ভীষণ রকম করে ফেল্ব আজ-কোট
ব্যাপার ছাড়াই আজ নীহারের বাড়ী যাব—এস
দিগিবাবু-তেরে কেটে ধিন্তা-তেরে কেটে
ধিতা তা ধিন্ ধিন্ ।
(নাচিয়া নিক্রান্ত )
পাগল!
দিগিন্দ্র। আশ্চৰ্য্য।
(সকলে অনুসরণ করিল)
অমূল্য।
দ্বিতীয় দৃশ্য
( নীহারের বাটীর একটি কক্ষ। দীপ্তিলতার প্রবেশ)
(দীপ্তির গান)
ভালবাসা হতে জনমে কেন
ঈর্ষার তম বুঝিনা !
প্রদীপ অনলে কোথা হতে আসে
কালাে কাজল কালিমা ;
বল কি অভাব মাের প্রেমে আছে
যাহার কারণে অপর সে খােজে
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
৪ -
বিবাহিত জীবন প্রেম কি যৌবন ? সৌন্দৰ্য্য? সম্পদ ? আমি তাে জানি তা প্রাণের অমৃত! তা নিয়ে তৃপ্ত নয়কো যে জন, হীন লালসায় পূর্ণ তার মন। সে আর যাহা পাক—জীবনে পাবেনা প্রেম-পা’য়ে যাহা ঠেলেছে সে জন—আরনা—আরনা! দীপ্তি। ; ; এখন হয় আমি এই ভীষণ সন্দেহের হাত থেকে মুক্ত হব, নয় দুঃখের শেষ সীমায় গিয়ে পৌছাব ; কাল থেকে তার সম্মুখে একটি কথাও বলিনি; এ সম্বন্ধে চুপ করে থাকব সে সংকল্প আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি ; অজ এক ঘণ্টার মধ্যেই সব জানা হয়ে যাবে। যদি আমার সন্দেহ ঠিক হয়—ঠিক হবে সে আমার দৃঢ় বিশ্বাস-তাহলে সকলে জানবে, আমার প্রতি কেমন অন্যায় করা হয়েছে, সেই জন্যেই সকলকে ডেকেছি। (একটা চিঠি বাহির করিল। এমন সব স্পষ্ট প্রমাণ না থাকলে ভাব তুম, দুনিয়ায় বুঝি আমার কোথায়ও স্থান নেই, কেউ আমাকে দেখতে পারে না, কারু চোখে আমার কিছুমাত্র শ্ৰী নেই এই ত একজন রয়েছে-সে-আমার মুগ্ধ ভক্ত- চিঠিতেও তাই লিখেছে; আমার স্বামীও একদিন তাই বলেছিলেন, তখন কাণ দিই নি-কত ধন রত্ন দ্বিতীয় অঙ্ক ] :
বিবাহিত জীবন
.
** •
এর আছে লােভও দেখিয়েছে ; এই লােভে পা দিলে
খুব আক্কেলটি হয় শ্রীমানের-ইচ্ছা কচ্ছে তাই করি,
একবার মজাটা দেখি। কিন্তু স্বামী যদি নির্দোষই
হয়ে থাকে, পরে যদি সে কথা আমি জানতে পারি,
যদি জানতে পারি যে মেয়েটার প্রতি আমার স্বামীর
একটা দয়া ছাড়া আর কোনাে ভাব ছিল না, তখন ?
তখন আমার নিজের মনের কলঙ্ক নিয়েওঃ! ওঃ!
তাহলে যে আর বাঁচব না, আমি বাঁচবনা, ওঃ ! কে
আছ? ( ক্লান্ত হইয়া চেয়ারে বসিয়া পড়িলরামকিঙ্কর
ও আমােদিনীর কথা বাহিরে শােনা গেল )
আমােদিনী। দেখ, ভদ্রলােকের মত চলাে।
দীপ্তি। ও ! ওরা এসেছে; আমার স্বামী এদেরে দেখেওনি,
এরা যে এখানে এসেছিল তা জানেও না। প্রথম
দেখার সময় কি করে, দেখব।
( আমােদিনী ও রামকিঙ্করের প্রবেশ )
আমােদিনী। ভালাে আছেন তাে ?
রাম। (নমস্কার করিয়া ভূতত্যাচিত ভাবে । আজ্ঞে, শরীর
ভালাে ?
আমােদিনী। চুপ।
দীপ্তি। আপনারা ঠিক কথামত এসেছেন দেখে সুখী হলুম!
{ দ্বিতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন আমােদিনী। এতটুকু ভদ্রতাও কি আমাদের নেই? রাম। ছােট হাজিরার নেমন্তন্ন ! আমি যখন মিঃ ঘােষ ব্যারিষ্টারের আমােদিনী। চুপ! রাম। ভুলেই গেছলুম-কিন্তু কথা কইতে দেবে তাে আমাকে, কথা না কইলে কথােপটেকনের শক্তি হবে কি করে ? আমােদিনী। কথােপঢোকন’ নয় --কথােপকথন-কথা, উপ- কথন-সন্ধি করে হলাে-কথোপকথন। রাম। কতোপকতন—আচ্ছা। আমােদিনী। ‘ত নয়-থ। আমি অনুরােধ কচ্ছি, আপনারা আগে সেই মেয়েটি সম্বন্ধে কোনাে ইঙ্গিত দেবেন না-আমি কথা: তুলে পর যা জানেন সমস্ত বলবেন! (নীহারের প্রবেশ) নীহার। দীপ্তি, আমি— রাম ও আমােদিনীকে দেখিয়া ) একি! (স্বগত) রহস্য এখন ভেদ হয়েছে, ঐ স্ত্রীলোেকটা আমার সন্ধানে এসে আমার স্ত্রীকে সব বলেছে, কিন্তু গােপন কথা সেও জানে না। আমােদিনী। ওঃ! নীহার বাবু, কেমন আছেন? এখানে আমাকে দেখে বিস্মিত হয়েছেন? দ্বিতীয় অঙ্ক] দীপ্তি। )
বিবাহিত জীবন
নীহার। না, ত হইনি।
আমােদিনী। অনেক দিন পর দেখা।
নীহার। প্রায় এক বৎসর পর বােধ হয়।
রাম। “অন” মাস । আমার মনে আছে নীহার বাবু
তখন আমাকে বখশিষ--
আমােদিনী। “অঘান” নয় “অগ্রহায়ণ” ! চুপ।
দীপ্তি।
এদের তুমি জানাে দেখছি।
নীহার। হুঁ, জানি বৈ কি।
দীপ্তি। তাহলে আমি সেই পরিচয়কে আরাে ঘনীভূত করে
দিতে পারায় সুখী হলুম। চলুন, ওরা সব এসেছেন
—সে ঘরে যাই।
( সকলে নিষ্ক্রান্ত)
( কৈলাস উকিঝ কী দিল )
কৈলাস। নীহারকে খুজে এলুম, কোথাও দেখতে পেলুম না
—এখানে যেন তার গলা শুনছিলুম-ওঃ ! আমার
গা কাপছে! দিগিন্দ্র আর তার স্ত্রী যে সেই
স্ত্রীলােককে দেখেছেন তা সে নিশ্চয়ই জানে--
তারা তাে বল্বে না বলেছে-কিন্তু কে জানে!
(নীহারের প্রবেশ) ওঃ, আমার বন্ধু! তােমাকে যে
খুজছিলুম, নীহার বাবু-তারা সকলেই খেতে
গেল, কিন্তু আমার যা মনের অবস্থা তাতে,
দিগিন্দ্র আর তার স্ত্রী তােমাকে দেখেছে ওর সঙ্গে
কথা বলতে!
{ দ্বিতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৫$
নীহার। কার সঙ্গে ?
কৈলাস। হলদে শাড়ী পরা সেই স্ত্রীলােকটার সঙ্গে।
নীহার।
দেখেছে নাকি।
কৈলাস। এতটা—এতটা হতভম্ব ভাব দেখিয়ে না--আমার
ভয় হয়।
নীহার। তারা নিশ্চয় সে সম্বন্ধে কোনাে কথা বল্বে না ?
কৈলাস।
কথা তােত দিয়েছে বলবে না-কিন্তু আমার মনে
অবস্থাটি কি রকম হবে তাদের সামনে ?
কেউ
কথা বল্তে আরম্ভ করলেই আমার ভয়ে মারা যাবার
উপক্রম হবে।
নীহার। সে আমার কাছে ছেড়ে দেন ; কাল আমরা সেই
স্ত্রীলােকটির সঙ্গে দেখা করব এবং কোনাে একটা
বন্দোবস্ত করে ফে।
কৈলাস। আমি যা কিছু বলব যা কিছু করব -যা কিছু দে
-শুধু এ বিষয়টা আমার স্ত্রীর কাছ থেকে লুকিয়ে
রাখতে হবে তােমার, ভাই।
নীহার। আমার উপর নির্ভর করুন, কোনাে ভয় নেই। কিন্তু
মনে থাকে যেন—সেই মেয়েটি সম্বন্ধে পরিষ্কার কণ্ঠে
আপনার বলা চাই। যে শিক্ষয়িত্রীটির কাছে ছিল
সে, সে এখানে—আমার বাড়ীতেই। মনে রাখবেন,
আপনার অনুরােধেই সেই মেয়েটিকে তার কাছে
রেখেছিলাম আমি।
দ্বিতীয় অঙ্ক !
বিবাহিত জীবন
কৈলাস! হা।
নীহার। বলবেন, মৃত প্রথমা স্ত্রীকে দিয়ে আপনার এক মেয়ে
আছে; ততটুকু, আগে আপনি আপনার এই স্ত্রীর
কাছে স্বীকার কৰ্তে সাহস পান নি - কিন্তু এখন
তাই স্বীকার কৰ্তে চাচ্ছেন।
কৈলাস। আমার স্ত্রী কি বলবে ?
নীহার ।
মনে রাখবেন-শপথ করেছেন।
কৈলাস। তা করেছি, কিন্তু সে মেয়েটি কে?
নীহার। সে এক রহস্য, আপনার কাছেও খুলে বল্তে আমার
সাহস হচ্ছে না।
কৈলাস। বুঝেছি ভাই, এক পথেরই পথিক সবাই।
নীহার। আসুন, আপনি বেরিয়ে গেছিলেন তার একটা
অজুহাত সৃষ্টি করে দেব। সাহস ধরুন মনে।
কৈলাস। হাঁ, হাঁ।
নীহার। আ আ করূবেন না যেন।
কৈলাস। না, না।
নীহার। আপনার সাহসের উপরই আপনার নিরাপদ থাকা
না থাকা এবং আমার সুখ নির্ভর কচ্ছে।
কৈলাস। জানি, জানি।
নীহার। আর সামান্য ভয় এবং দ্বিধার ভাবেই আমাদের
সৰ্ব্বনাশ হবে, ভুলবেন না। প্রস্তুত তো ?
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
কৈলাস। একটু অপেক্ষা কর ভাই। (দৃঢ় সংকল্পের সহিত
কোটের গলার বােম লাগাইয়া দিয়া কাম্ফার্টার আঁটিয়া
দিল) যখন আমি উত্তেজিত হব মনে করি, তখন
আগে থাকতেই ঠাণ্ডা লাগা সম্বন্ধে আমি সাবধান
হ’য়ে নেই। আমার সাহস জাগছে-জাগছে-
এই জেগেছে—চল, এখন ধর আমার হাত—চেয়ে
দেখ আমার দিকে। মরিয়া হয়ে যাওয়া-
সাহসের এমন জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পূর্বে আর কখনাে
দেখেছ কি ?
কখখনাে দেখ নি।
চল, এখন
যুদ্ধক্ষেত্রে মন্ত্রের সাধন কিম্বা শরীর পতন।
(নীহারকে টানিয়া লইয়া নিষ্ক্রান্ত)
তৃতীয় দৃশ্য
( সকলে টেবিলের চারিদিকে উপবিষ্ট ; কিছুদূরে ইজিচেয়ারে কৈলাস)
সকলে।
( কৈলাস এবং নীহার ছাড়া) আশ্চৰ্য্য। এতদিন
ব্যাপারটা গােপন রাখা হ’লল! আশ্চর্য্য! আশ্চৰ্য্য ।
নীহার। এখন থাক এ বিষয়। ( অমূল্যবালার প্রতি) এই
ঘটনার প্রকাশে আপনি আশাকরি আপনার স্বামীকে
কম সম্মান করবেন না অথবা কম ভালােবাসবেন না?
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
বিবাহিত জীবন
অমূল্য। না, না; আমার মনে শুধু এই আঘাত লাগলাে,
আমার কাছ থেকে এই কথা গােপন করবার তিনি
দরকার বােধ করলেন 'কেন। যদি ঈর্ষাপরায়ণ
বরাগী মেজাজ হ’তাে আমার, তাহলে গােপন
রাখবার একটা কারণ থাক্ততা; কিন্তু সকলেই তাে
জানেন, আমি কি রকম মানুষ, এই অবস্থায় তিনি .
সব খুলে বল্লেই পারতেন! বেচারি মেয়েটাকে
বাড়ীতেই আতে পারতুম !
সে এখন কোথায়
আছে ?
নীহার। খুব নিরাপদেই আছে, জানবেন; সময় মত সব বলা
যাবে।
দীপ্তি। (স্বগত) মিথ্যা, সব মিথ্যা! নিশ্চয় বলতে পারি।
নীহার। (তার স্ত্রীর প্রতি) এখন, দীপ্তি, শান্ত হয়েছ তাে?
এই ব্যাপারে তােমাকে স্বীকার কৰ্তে হবে, তােমার
ভুল হয়েছে !
দীপ্তি। এই কাহিনীর বিরুদ্ধে যখন কোনাে প্রমাণ পাওয়া
যাচ্ছে না, তখন তাে বটেই; যদিও এখনাে আমি
ভাবছিভারি—ভারি—আশ্চৰ্য্য এটা
এটা যে শুধু
বন্ধুত্বের খাতিরে তুমি এতটা কষ্ট স্বীকার করেছ।
কৈলাস। হাঃ! হাঃ! এখন সুখী হয়েছি ; শান্তি এসেছে
মনে। ( বাহিরে দরজায় কয়েকটি ঘা)
[ তৃতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৫৮
নীহার। কেউ এসেছে।
রাম।
হাঁ, হ, যাচ্ছি। (রামকিঙ্কর লাফাইয়া উঠিয়া বেগে
নিষ্ক্রান্ত)
আমােদিনী। ( চমকিয়া উঠিয়া থামো! থামাে! একেবারে
দরজায় গিয়ে হাজির নাকি!
(রামকিঙ্করের পুনঃ প্রবেশ)
রাম। দরজা খােলা হয়েছে; একজন
আমােদিনী। বােস, আরে বােস।
রাম। (স্বগত) দরজায় ঘা শুনলে স্থির কিছুতেই থাকতে
পারি না। ( বাহিরে কয়েকটি গলায় ঝগড়া শােনা
যাইতেছে )
আপনার ভুল ; নিশ্চয় ভুল হয়েছে।
কৈলাস। (ভয়ের সহিত ) কি ব্যাপার ?
রাম। একজন
আমােদিনী। চুপ।
দীপ্তি। (উঠিয়া) দরজায় চাকরটা কার সঙ্গে ঝগড়া কচ্ছে,
কে জানি।
নীহার। ( উঠিয়া ) ডাকা যাক।
দীপ্তি। না, না—আমি নিজেই যাই।
(প্রস্থান)
কৈলাস। (স্বগত) কি একটা অশুভ আশঙ্কা হচ্ছে; একটু
অগেই আনন্দে নেচে উঠতে ইচ্ছা হয়েছিল, এখন
আবার ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছি।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
একটি স্বর।
বিবাহিত জীবন
অমূল্য। কি হয়েছে ? ঠাণ্ডা লাগছে কি ?
কৈলাস। হুঁ-হ। (কাপিয়া )
অমূল্য। উঃ! একটু হাওয়া নেই ঘরে। উঃ! শ্বাস বন্ধ
হয়ে যাচ্ছে।
মঞ্জুরাণী। আমারাে তাই মনে হচ্ছে।
সমরেন্দ্র। তােমার তা নিশ্চয় মনে হচ্ছে না।
মঞ্জুরাণী। হাঁ,-হচ্ছে—নিশ্চয়ই হচ্ছে।
দিগিন্দ্র। দরজা জানালা খুলে দেব?
কৈলাস। নানা !
রাম। আমার ভারি ‘সান্ত বােধ হচ্ছে।
আমােদিনী। শ্রান্ত। ।
রাম। শ্রান্ত!-(স্বগত) লােকের সামনে আমাকে কি রকম
লজ্জা দেয়।
কৈলাস। চুপ! ঐ নীহার বাবুর স্ত্রী আসছেন।
(একটা চিঠি হাতে লইয়া দীপ্তির প্রবেশ। কৈলাস তাহাকে
ভীতির চক্ষে নিরীক্ষণ করিতে লাগিল-উত্তেজনায়
দীপ্তি কাঁপিতে লাগিল :
দীপ্তি।
যা সন্দেহ করেছিলাম তাই—তাই—সম্পূর্ণ মিথ্যা,
আগাগােড়া মিথ্যা।
নীহার। কি ব্যাপার ?
[ তৃতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৬০
কৈলাস। (স্বগত) মেঝেতে আমি গড়িয়ে পড়ব যে—ওঃ ।
কি জানি ঘটতে যাচ্ছে ।
দীপ্তি। (নীহারের প্রতি তােমার কৌতূহলটাকে একটু চেপে
রাখ; সব জানতে পারবে এখনি; নীচে একটি
স্ত্রীলোেক দাড়িয়ে।
কৈলাস।
(স্বগত) তাই ভেবেছিলাম।
নীহার। হলদে শাড়ী-পরা একটি বয়স্কা স্ত্রীলােক।
কৈলাস। (স্বগত) আমি গেছি । ( সম্পূর্ণ হতাশভাবে ইজি
চেয়ারে গা ঢালিয়া দিল)
দীপ্তি।
সে বল্ছে যে তার স্বামীর নাম কৈলাস।
অমূল্য। (চকিয়া উঠিয়া কি?
দীপ্তি । (কৈলাসকে দেখাইয়া) আর ইনিই তার স্বামী।
কৈলাস। (গােঙরাইয়া) ও! ইচ্ছা কচ্ছে মাটি বিদীর্ণ হােক,
আমি ঢুকে পড়ি।
দীপ্তি। ( অমূল্যের প্রতি) এই চিঠি আপনার।
অমূল্য। আমার ।
আমার ! (চিঠি ছিড়িল) একি! আমি পড়তে
পারবনা মূচ্ছ। যাব-পড়বার ক্ষমতা নেই আমার
এই নি, আর কেউ পড়ুন-( কাছে রাম ছিল তাহাকে
দিল)
সকলে। পড়ুন, রামকিঙ্কর বাবু।
রাম। আমি—আমি পড়তে জানি না।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
বিবাহিত জীবন আমােদিনী। আঃ! তুমি-তুমি এমন ভাবে নিজের কথা প্রকাশ করে দাও! রাম। আপনি পড়ুন। মঞ্জুরাণীকে দিল) মঞ্জ। পড়ব ? অমূল্য। হাঁ, হঁা, পড়ুন—উচ্চে-সারা পৃথিবীর লােক শুনুক। মঞ্জ। ( পড়িল) “এই চিঠির লেখিকা একটি অত্যাচারিতা স্ত্রীলােক। যে রাক্ষস- কৈলাস। আমিও মঞ্জ,। “যে রাক্ষস আপনাকে বিয়ে করেছে, তার অন্য স্ত্রী রয়েছে। আমি সেই ; এতৎসঙ্গে আমাদের বিবাহের প্রমাণ দিলাম-বিয়ে বিশ বৎসর আগে হয়েছে। এখানে আসার আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে- খােরপােষের দাবী করা এবং এই দুবৃত্তকে লােকের চক্ষে ধ’রে দেওয়া—আপনাদের শিবশঙ্করী বানাচ্ছি।” সকলে। একি ব্যাপার ! একি ব্যাপার ! এ! আচ্ছা লোক তাে ! দীপ্তি। বেচারী স্ত্রীলােকটিকে উপরেই ডেকে আনা যাক। কৈলাস। (চেয়ার হইতে লাফাইয়া উঠিয়া) না, না! হাজার ঠাণ্ডা জলাশয়ে আমি চুবুনি খাব, তবু এই স্ত্রীলােকটির সঙ্গে মুখােমুখী হতে পারব না। (তার স্ত্রীর প্রতি) ওগো, তুমি জানাে না, কত যন্ত্রণা আমি ভুগেছি—এই [ তৃতীয় দৃশ্য বিবাহিত জীবন স্ত্রীলােকটার জন্যে কি আমাকে সইতে হয়েছে। প্রথমতঃ আমাকে প্রলােভিত করা হয়েছে—কঁদে ফেলা হয়েছে—তারপর সে আমাকে ছেড়ে যায় নিরুদ্দেশ হয়ে—এক সময় শুনেছিলুম মরে গেছে । কিন্তু অমূল্য। ( ( গাম্ভীর্য সহকারে উঠিয়া) চুপ! তুমি আমাকে প্রবঞ্চনা করেছ। এ ছাড়া আর সবই আমি ক্ষমা কর্তে পাণ্ডুম; সেই মেয়েটির বিষয়, যাকে তুমি তােমার নিজের বলে ঘােষণা করেছ, সেটা আমি সম্পূর্ণ ক্ষমা করেছি। দীপ্তি। ( ভীষণ ভাবে) সম্পূর্ণ মিথ্যা সে কথা! এই পত্র- বাহিকাকে আমি সে কথা জিজ্ঞেস করেছিলুম। ভেবেছিলুম সে-ই এই মেয়ের মা হতে পারে; কিন্তু তা নয় ; আপনার স্বামী আমার স্বামীকে এক মিথ্যা ব্যাপারে পােষকতা করেছেন; তার কখনাে কোনাে মেয়ে ছিল না। আর তুমি—নীহারের প্রতি) পরিষ্কার ধরা পড়েছ; আমি আজই তােমাকে ছেড়ে যাচ্ছি—চিরকালের মত। সকলে। না, না। | আর আমিও আমার এটিকে ছেড়ে যাচ্ছি। (কৈলাসের দিকে অগ্রসর হইল-কৈলাস হাতে মুখ লুকাইল) দ্বিতীয় অঙ্ক ] অমুল্য ।
বিবাহিত জীবন ; ; এখন থেকে আমরা ছাড়াছাড়ি হলুম। যাও, তােমার সেই স্ত্রীর কাছে, আমাকে আর মুখ দেখিও না তুমি। প্রথম থেকেই আমাদের ঠিক মিল হয় নি ; তােমার কৃত্রিম উদাসীনতার এখন কারণ পাওয়া গেল ; ইহা দুষ্ট বিবেক হ’তেই জাত। প্রবঞ্চক। বিদায়, চিরকালের জন্য বিদায়! (বেগে ঘর হইতে নিষ্ক্রান্ত। কৈলাস। ওগাে, ফিরে এস, ফিরে এস, শােন আমার কথা, (দরজার দিকে ধাবিত হইল, কিন্তু হঠাৎ থামিয়া গেল। ওকে অনুসরণ করবার সাহস আমার নেই; তবে অন্যটির সঙ্গে দেখা কর্তে হচ্ছে। না, না, পালাব-- আমি দেশ ছেড়ে পালাব-এ আর আমার দেশ নয়। নীহার। বসুন স্থির হয়ে, শান্ত হােন্। কৈলাস। পারি না; এখান থেকে চলে যাই, চলে যাই- ওঃ! এই দরজা দিয়ে খালে যাওয়া যায়—আমি খালে ডুবে মরব—আমি মরিয়া হয়ে গেছি-আমার কৰ্তব্য আমি স্থির করে ফেলেছি। বিদায় বন্ধুগণ- দুবৃত্ত পশু প্রবঞ্চক বলেই জেনেছে সবাই—এই শেষ, ভাই সব, তােমাদের সঙ্গে আমার দেখা—কৈলাস বানাজ্জিকে আর কেউ দেখতে পাবে না। (বেগে নিষ্ক্রান্ত ) [তৃতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
সমরেন্দ্র। (চকিয়া উঠিয়া) লােকটা ডুবে মরবে।
মঞ্জ। না, মরবে না; চুপ করে বসে থাক; ব্যাপার আরাে
খারাপ করে তুলবে তুমি।
দিগিন্দ্র। সবাই চুপ করে বসুন; আমি তাকে জানি; জল,
দেখলেই কৈলাস বাবুর কলজে হিম হয়ে যাবে;
সব বসে থাকুন।
আমােদিনী। (রামকিঙ্করের প্রতি) তুমি কি তার অনুসরণ
করবে ?
রাম। আমি যে সাঁতার দিতে জানি না, প্রিয়ে।
দিগিন্দ্র। না, না, বসে থাকুন।
দীপ্তি।
কি ! একটাও কথা নাই যে! এক্কেবারে “থ” হয়ে
গেছ! (এতক্ষণ দীপ্তি নীহারের উপর দৃষ্টি বদ্ধ করিয়া
রাখিয়াছিল)
নীহার। দীপ্তি! ( উঠিয়া) বাইর দেখে বিচার কল্লে আমাকে
দোষীই মনে হবে, কিন্তু তুমি তাে সব জানাে না।
যে কারণে আমি এই পথ অবলম্বন করেছি, তা
অজ্ঞাত ; ধৈর্য ধর।
দীপ্তি। অনেক দিন ধৈর্য্য ধরে থেকেছি, আর সইতে পারি না
এখন; এই শেষ মুহূর্ত তােমার বাড়ীতে কাটাচ্ছি
আমি।
নীহার। তুমি কি পাগল হয়েছ ? আমার কথা শুনবে না ?
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
৬৫.
বিবাহিত জীবন
দীপ্তি। না, শুনব না।
নীহার। একবার যদি বাড়ী ছেড়ে যাও, তাহলে আমাদের
অরি কখনাে দেখা হবে না জীবনে।
দীপ্তি। আমারও তাই ইচ্ছা।
নীহার। সাবধান; এখন আমাকে ছেড়ে গেলে-জেনােE
ঠিক জেনাে-সে চিরকালের মত।
দীপ্তি। হাঁ, তাই মনে করেই যাচ্ছি—চিরকালের মত।
(বেগে নিষ্ক্রান্ত)
( সকলে উঠিল)
নীহার। না, না, আপনারা বন বন্ধুগণ, বসুন। ওর কাছে
গিয়ে আমার জন্যে ওকালতি কৰ্তে আমি কাউকে
দিব না; সে তার নিজের পথেই চলুক। আমি
ভুল করে থাকতে পারি, কিন্তু সে যতটা মনে কচ্ছে
ততটা নয়; তার ভিত্তিহীন সন্দেহ-মিথ্যা ঈর্ষা
আমাকে খুব জ্বালিয়েছে-এখন যেখানে খুসি
সে যেতে পারে, আপনারা অনুগ্রহ করে এ নিয়ে
অমাির জন্যে কিছুমাত্র বিচলিত হবেন না, বসুন ;
এ ভাবে আজকের ব্যাপারের পরিণতি হবে,সে আমি
আগে ভাবি নি; কিন্তু দোষ আমার স্ত্রীরই; সে কাণ
দেবে না কথায়-আমার কথা শুনবে না ; আর
এখন— স্বগত) এ বাড়ী আমি ছেড়ে যাচ্ছি—কখনাে
ফিরবনা আর।
( নিষ্ক্রান্ত)
[ তৃতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন,
রাম। চলে গেল ; একেও কি ‘অনুশাসন’ করব, প্রিয়ে ?
আমােদিনী। না, না, ‘অনুসরণ’! বস।
মঞ্জ।
ওকে ফিরান আপনারা। ( ডাকিল) নীহার বাবু !
আরে, কিছু একটা করে বসবে যে—নিশ্চয়ই কিছু
করে বসূবে।
সমরেন্দ্র। করবে না; তুমি বস চুপ করে ; তুমি যদি এখন
তার পিছে ছুট আর বিরক্ত কর, তাহলে তুমিই
তাকে ‘মরিয়া করে তুলবে—যেমন আমাকে করে
তোল।
মঞ্জ। আমি তােমাকে বিরক্ত করে মরিয়া করে তুলি।
সমরেন্দ্র। কর বৈ কি—অনেক সময় অনেক সময়। ।
মঞ্জ। তুমি ভারি ভয়ানক লােক—ভারি—
আমােদিনী। (উঠিয়া) না, না, থামুন, থামুন, রাগের কথা
বলতে নেই। দেখুন না, আমরা দুটিতে কখখনাে তে
রাগের কথা বলি না।
রাম। না, না, “আক্রোধের কথা কখখনাে আমরা কহি না।
মঞ্জু। (সমরেন্দ্রের প্রতি) এখানে বসে অমন ভীষণভাবে চেয়ে
থাকার কোনাে দরকার নেই। জান্তুম, আজ দিন
শেষ হতে না হতে একটা ঝগড়া হবেই-আমার
রূপার ব্রুটা সম্বন্ধে সকালে একবার ঝগড়া করলে
জোর করে বল্লে, খুড়ীমা দিয়েছে এটা আমায়।
দ্বিতীয় অঙ্ক ।
মঞ্জু। বিবাহিত জীবন সমরেন্দ্র। তিনিই তাে দিয়েছেন। মঞ্জু। , তিনি দেন নি-পিসে মশাই দিয়েছেন। সমরেন্দ্র। না, খুড়ীমা দিয়েছেন। পিসে মশাই। সমরেন্দ্র। আশ্চৰ্য্য হাড়-জ্বালানে স্ত্রীলােক। ভয়ঙ্কর লােক। (সমরেন্দ্র-মঞ্জু-ডুয়েট গান) মঞ্জু। হাগা, এমন ধারা কর কেন কথা বল্লে পরে, দাঁত মুখ খিচিয়ে উঠ—মারবে নাকি ধরে? সমর। কথার কাটাকাটি কর্ভে বিধি কল্লেন তােমা সৃষ্টি, দিনরাত এমনি তাই কচ্ছাে প্রলাপ বৃষ্টি। মঞ্জু। খেয়ে দেয়ে কাজ নেই আর তােমার সঙ্গে কথা । কইলুম তাে ব’য়ে গেল—নেই মাথাব্যথা ! সমর। আহা! মুখটি তােমার এমন, যে চুমাে খেলে তায় “পঞ্চতিক্ত” কষায় খাওয়ার কাজ হয়ে যায় ! মঞ্জু। আহা! মুখের ছিরি দেখলে পরে পিত্তি যায় জ্বলে, দেবার নামে নেই কিছু লম্বা চওড়া কথা বলে। সমর। তুমি যত চাও ভালবাসা তত তােমা দিতে পারি, কিন্তু মাপ করা বিধুমুখী, চেওনাকে টাকা কড়ি! মঞ্জু। দিয়ে কত ভরেছে, সে জানে সবাই, চুপ, কর- আবল তাবল বকোনাকো বিকারের রােগীর মত ! সমর। ভাগাভাগি করে নেবাে মােদের মধ্যে চুতুৰ্বর্গ- আমি নিব কাম অর্থ, তুমি নিও ধৰ্ম্ম মােক্ষ। { তৃতীয় দৃশ্য বিবাহিত জীবন মঞ্জু। সমরেন্দ। ; সমরেন্দ্র। যাচ্ছি আমি বাড়ী। আমি যাব না। আর কক্ষপণা বাড়ী যাব না আমি। সমরেন্দ্র। তাতে আমার হিয়াটি একেবারে ভেঙ্গে পড়বে না। তােমার আবার হিয়া! হিয়া কোন দিন ছিল নাকি ? এক সময় ছিল। মঞ্জ। কক্ষণাে নয়। সমরেন্দ্র। দেখ, তুমি আমাকে প্রায় পাগল করে তুলেছ ! আমি বাড়ী যাব ; তুমি আমাকে শাসাচ্ছ, কিন্তু জেনে রেখাে, বাড়ী গেলে আমার কাছ থেকে তুমি কোন- রূপ অভ্যর্থনা পাবে না। মঞ্জু। তাই বলছ নাকি তুমি ? সমরেন্দ্র। হাঁ, বলছি তাে। (বেগে নিষ্ক্রান্ত। তাহলে আমি যাই খুড়ীমার কাছে ; আর কক্ষণে। দেখবে না সে আমাকে, হাড়-জ্বালানে কোথাকার। কি করে যে এর সঙ্গে বিয়ে হ’লল আমার, তাই ভাবছি, পিসেমশাই দিলেন রূপার চটা, সে বলবে—খুড়ীমা। আমাকে বিরক্ত করাই তার উদ্দেশ্য—ইচ্ছা করেই সে কথা কাটাকাটি করে --আমাকে এমন করে যন্ত্রণা দেয়, এই মুহূর্তেই খুড়ীমার বাড়ী যাব-কক্ষণাে আর তার বাড়ীতে পা দেব না। ( নিষ্ক্রান্ত ) তৃতীয় অঙ্ক ] মঞ্জু।
বিবাহিত জীবন ; আমােদিনী। কি হতভাগ্য জীবনই অনেকে বহন করে । হাঁ, প্রিয়ে। পূর্ণশশী। (দিগিন্ত্রের প্রতি) পুরুষগুলাে এই রকম পশুই হয়, মেয়েদের প্রতি কি রকম ব্যবহার করা হয় দেখলে হৃদয় ভেঙ্গে যায় । দিগিন্দ্র। তাতে তােমার কি হয়েছে, তােমার সঙ্গে তাে কেউ খারাপ ব্যবহার করেনি। পূর্ণশশী। তুমি কর ; এই এক ঘণ্টা ধরে এখানে বসে আছি, এপর্যন্ত একটা কথাও তুমি আমাকে বলনি। দিগিন্দ্র। বলবার তাে কিছু ছিল না। পূর্ণশশী। তুমি হয় কুঞ্চিত করে, না হয় পেঁচার মত মুখ ভার করে প্রায় সর্বদাই থাকবছরে হয় ত দুই একবার হাস—কেন, একটু হাসিখুসি থাকলে কি হয় তােমার ? দিগিন্দ্র। সব সময়ে তাে আর পাগলের মত হি-হি করে হাস যায় না ! পূর্ণশশী। হাসতে পারেনা পশুতে—জেনাে, এটা ভগবানের বড় দান যে তিনি মানুষের মুখে হাসি দিয়েছেন- যারা ইচ্ছা করে সে দানে বঞ্চিত হয়, তারা পশুরই সমান! দিগিন্দ্র। হঁা, তুমি যদি সব সময় মান অভিমানের পালাটা [ তৃতীয় দৃশ্য !
বিবাহিত জীবন
৭০
কমিয়ে হাসিখুসি থাকতে, তাহলে আমার পক্ষেও
হাসিখুসি থাকাটা সম্ভবপর হতাে। জেনােহাসিতে
হাসি আকর্ষণ করে আবার একের মুখ ভারে অন্যের
মুখ ও শীগগীরই আড়ষ্ট করে তুলে। সমধৰ্ম্মাক্রান্ত
হলেই পরস্পর আকর্ষণ হয়—ইহা বৈজ্ঞানিক সত্য।
অন্যকে হাসিখুসি পেতে হলে নিজকে প্রথমে
অন্ততঃ জোর করে হলেও হাসিখুসি থাকতে হয়।
দাম্পত্য জীবনে কুঞ্চন ও তর্জন গর্জনের শাসন
হ'তে হাসিমুখে মিষ্টি কথায় সংশােধনের প্রভাব
অনেক বেশী—এবং এই সত্যটি জানা থাকলে
অনেক দম্পতিকেই নাকের জলে চোখের জলে
অন্ধকার দেখতে হতােনা। এক কথায়—তুমি যা
পেতে চাবে-তােমাকে তা দিতে হবে। হাসি
চাইলে হাসতে হবে-আদর চাইলে আদর কর্তে
হবে-এ নিয়মের ব্যতিক্রম করে কেউ যদি শাসনের
জোরে কাছে টেনে আনতে চায়, তা সে কখনই
পারবে না—বরং তাতে দূর হতে দূরান্তরে চলে
যাবে
পূর্ণশশী। আর তুমি জাননা পুই শাক আমি ভাললাবাসি খেতে
—কিন্তু তুমি একদিনও পুই শাক আনবে না বাজার
থেকে।
তৃতীয় অঙ্ক
৭১
বিবাহিত জীবন
দিগিন্দ্র। মেয়েদের অমন বদ রুচিই হয়।
পূর্ণশশী। আমার পােড়া অদেষ্ট।
আমােদিনী। দেখ, তুমি দিগিন্দ্র বাবুর স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতে
পার ?
রাম। তাই নাকি! তা তুমিই ওঁকে সান্ত্বনা কর না।
পূর্ণশশী। আসল কথা কি ভেবে দেখলুম-তােমার সঙ্গে
আমার বিয়ে ঠিক হয় নি।
দিগিন্দ্র। এতক্ষণে ঠিক কথাটি বল্লে-এতদিনই যখন অপেক্ষা
করে ছিলে তখন বিয়েটা আর
না কল্লেই
হতাে।
পূর্ণশশী। দেখ, দশজনের সামনে আমার বয়সের কথা অমন
করে বলল না বলছি।
দিগিন্দ্র। কি হয়েছে তাতে ? তােমার বয়স যদি ত্রিশের
উপরই হয়ে থাকে-
পূর্ণশশী । আমি বাড়ী যাচ্ছি। ( ফিরিয়া গিয়া )
দিগিন্দ্র। বেশ, যাও।
পূর্ণশশী। আমার সঙ্গে তুমি যেতে চাও না?
দিগিন্দ্র। না।
পূর্ণশশী। চিনেছি তােমাকে আমি ; আর আমাদের দেখা
হবে না, তাতে আমি দুঃখিত নই।
দিগিন্দ্র। তাহলে সুখটা দুই দিকেই হবে জেনাে।
[ তৃতীয় দৃশ্য
;
বিবাহিত জীবন
৭২
!
পূর্ণশশী। তাই নাকি! এই কথাই মেনে নিলুম, ( যাইতে
যাইতে) কিন্তু মনে রেখাে, সম্পত্তি সব আমার নামে।
(নিষ্ক্রান্ত)
দিগিন্দ্র।
সে আদালতে দেখা যাবে। (নিষ্ক্রান্ত)
রাম। এখন সব লোেক তাে চলে গেছে, আমার কিছু
বলবার আছে এবং তা আমি পালনই কর্তে চাই;
আমি লােকের সামনে অপমানিত হতে চাই না।
আমােদিনী। কি বলছ তুমি! অপমানিত কাকে বলছ ?
রাম। কেন, এই কথায় কথায় কথার ভুল ধরা।
আমােদিনী। আমি সামনে আছি আর তুমি ভুল করবে-এও
কি কখনাে হয় ! শুদ্ধ করাই যে দরকার।
রাম। দেখ, এ আমি পছন্দ করিনা—আর কখনাে এমন
ভাবে তুমি আমাকে সসম্মান দেখিয়াে না।
আমােদিনী। অসম্মান !
রাম। বেশ, অসম্মান—জানাে তত ‘ক্রােধ হ'লে আমার
‘সজ্ঞান থাকে না।
আমােদিনী। জ্ঞান, ক্রোধ।
রাম। তা হােেেগ ! তুমি ইচ্ছা করেই আমার অর্থ
‘বিক্রয় করে ফেল।
আমােদিনী । দেখ, দেখ, তুমি অমন ভাষা ব্যবহার কৰ্ব্বে, এ
আমি কখনাে সইতে পারব না, এতদিন আমি ছাত্রী
পড়ালুম, আর এখন এমন স্বামী ছিল আমার
কপালে!
[ তৃতীয় অঙ্ক
বিবাহিত জীবন
রাম। বিয়ের আগে যখন বকুল গাছ তলায় বসে থাকতুম, কই
তখন তাে আমার ভাষার ‘সম্বােধনে তােমার মন
ছিল না।
আমােদিনী। সংশোধন! কি আহাম্মুকিই করেছি এমন
লােককে-
রাম। আহাম্মুকি—আর আমি করেছি গােখখুরি
আমােদিনী। কি বােকা ! বেল বাজালে কিম্বা দরজায় ঘা :
দিলেই এখনাে তুমি লাফিয়ে উঠ—ঠিক যেন রামের
কিঙ্করটি !
রাম । দেখ, তুমি আমার ভাষার দোষ সম্বােধন’-না, না,
সংশােধন কর—কিন্তু তুমি নিজে যে ভাষা ব্যবহার
কচ্ছ সেটা কি ‘ভদ্রতাগত’ হচ্ছে ? এ আর আমি
সইতে চাই না। চলুম। আর আমাকে দেখতে
পাবে না।
আমােদিনী। কোথা যাচ্ছ ?
রাম। জানি না কোথায় যাচ্ছি—জানতে চাইও না ; আমার
মনে ‘সুকমল’ স্থানে তুমি ঘা দিয়েছ।
আমােদিনী। সুকোমল ।
রাম। সুকোমল ! তােমাকে আর কখনাে আমি দেখতে
চাই না।
আমােদিনী। (তার হাত ধরিয়া) না, না!
[ তৃতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৭8
রাম।
ছাড় আমার হাত। যা বলি আমি তাই করি-
আমাকে হনুসরণ করাে না—আমি চাই না কেউ
আমাকে ‘হনুসরণ করে।
(রাম-আমােদিনী—ডুয়েট গান)
আমাে। আহা কর কি কর কি কর কি মাণিক
এমন ধারা কৰ্ত্তে নেইযে—জেনাে মনে ঠিক।
রাম। হাত ছাড়, চলে যাও যেথা তােমার ইচ্ছা,
আমার আর সয়না এসব রং ঢং এর কেচ্ছ!!
আমাে। এমন নাগর-রসের বাবু
হাটু জলেই—হাবু ডুবু?
রাম। হা,–একদম উপুচুপু
হয়েছি বিষম কাবু!
আমাে। রাগ করােনা, রাগ করােনা, মুখ করােনা ভার
রাম। কি করব? পারি না যে সিদ্ধ হতে তােমার রসে আর
আমাে। এবার তােমায় শুধরে নেবব—
শুধরে নেবাে তােমা—
রাম। হাঁ, বুঝতে পাচ্ছি।
আমার মত তােমার আর জুটে উঠেনা
আমাে। একটু খানি সমঝে চল-চলবে তুমি ঠিক
রাম। (ঢের চলেছি , আর চল্লে পা ঠিকরে হব একদম্ চিৎ!
[তৃতীয় অঙ্ক
!
৭৫
বিবাহিত জীবন
আমােদিনী। এতটা নির্দয় তুমি হতে পার না।
রাম। তুমি আমাকে “তেজিত করে তুলেছ—সে অবস্থায়
আমি কবন্ধ হয়ে পড়ি-চলুম
(নিষ্ক্রান্ত )
আমােদিনী। ক্রোধান্ধ। (ডাকিল) ওগাে, ওগগা, শুলে !
আমি
মুচ্ছে যাব–মুচ্ছো যাব-জল ! জল-ওঃ ।
ওঃ! (চেয়ারে মূচ্ছা)
[ তৃতীয় দৃশ্য
তৃতীয় অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
সামান্য সাজসজ্জায় সজ্জিত একটি কক্ষ। সমস্ত দরজা
জানালা বন্ধ। টেবিলে একটা মােমবাতি জ্বলিতেছে ।
দরজায় ঘা শােনা গেল। কৈলাস বসিয়াছিল,
একদিকে উকি দিল।
কৈলাস।
এ কে ? এ স্থানে তাে এসে লুকিয়েছি—একটি
কোঠা ভাড়া করে, নাম বদূলিয়ে এখানে বাস কচ্ছি-
বাড়ীওয়ালাকে বলে দেওয়া হয়েছে কাউকে যেন
বলা না হয় যে আমি এখানে আছি--বিশ্ব সংসার
থেকে সরে পড়েছি-এখানেই বাকী জীবনটা
কাটিয়ে দেব ভাবছি—এই রকম একা একাই।
(চেয়ারে বসিল) দু’ দুটো স্ত্রী আমাকে অধিকার কৰ্ত্তে
চাচ্ছে-আর আমি একা-মজা মন্দ নয়! কি
রাত্রিটাই কাটিয়েছি। একবার ভয়ে কেঁপে উঠি, পর
মুহূর্তে কেঁপে উঠি ঠাণ্ডা হাওয়ায়—জানালা দুই
একটা ভাঙ্গা-বাতাস তত তেমূন করে ঠেকানাে যায়
—সেও আবার সারা রাত খট খট করেছে--আমি
ততা ভয়ে অস্থির-ভাবলুম, এই ধরে বুঝি।
তৃতীয় অঙ্ক ]
৭৭.
বিবাহিত জীবন:
(দরজায় ঘা) কে ? ঝি বােধহয়! উঃ! বাতাস,
আছে যে! কম্পন) হিঃহিঃহিঃ—এমন
স্থানে তাে কোনােদিন থাকা হয়নি জীবনে। কোন্
দিক দিয়ে হাওয়া আসছে ? বের কৰ্ত্তে হচ্ছে। এই
হেঁড়া নেড়ায় তাে সব ফাক বন্ধ করা যাবে না।
(ফঁাক বন্ধ করিতে প্রবৃত্ত) এই তো! আরে বাবা!
কতটা ফাক, আজো যে বেঁচে আছি এই আশ্চৰ্য্য।
(আবার দরজায় ঘা—কৈলাস চকিয়া উঠিল—হাতের
ন্যাড়া পড়িয়া গেল)-কে ? না, এত ঝিয়ের ঘা
নয়-পুরুষের ঘা পুলিশ এলে নাকি—খোঁজ
পেয়েছে ?—চুপ! ( কাণ পাতিয়া রহিল ; প্রচণ্ড আঘাতে
আঁৎকিয়া উঠিল) সাড়া দেব ? দেই, নইলে,-কে ?
কে এখানে ?
নীহার। ( বাহিরে ) আরে, দরজা খুলুন। আমি নীহার ।
কৈলাস। আরে,তুমি ভাই, (দরজা খুলিয়া) এস,এস তাড়াতাড়ি।
(নীহারের প্রবেশ ; কৈলাস তৎক্ষণাৎ দরজা লাগাইয়া দিল )
কি ব্যাপার বলল তাে এখন ? কি করে বের কল্লে
আমাকে ? কেন এসেছ? আমার পেছনে পুলিশ
লেগেছে কি ? ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে ? বল, বল ।
নীহার। না, না, ভয় নেই, শান্ত হােন্।
কৈলাস। কিছু আগে তুমিই কি দরজায় ঘা দিয়েছিলে, ভাই ?
[ প্রথম দৃশ্য
;
বিবাহিত জীবন
৭৮
নীহার। হাঁ, হাঁ, ভাবলুম মরে গেছেন নাকি—কোনাে সাড়া
শব্দ পাইনি। একেবারে যে সাবেককেলে
সুলতানের মত হয়ে পড়েছেন—কাছে আসাই শক্ত।
কৈলাস। হাঁ, আমি সুলতানই বটে। দুটো হয়েছে, আরাে
কয়েকটা বিয়ে করব। তার পরে রীতিমত একটা
বেগম মহাল তৈরী করে ফেলব। আঃ! কি
আরামের স্থানই ছিল প্রাচীন তুর্কী! দুই বিয়ের
জন্যেই আমাকে এত নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে এখানে।
আর সে সকল স্থানে স্ত্রীর সংখ্যা দিয়েই মানুষের
গৌরবের পরিমাণ করা হতাে এক কালে ! সেই
কালে এবং সেই স্থানে কেন জন্ম নিলুম না—তাই
ভেবে আপশােষে মরি! কিন্তু তুমি আমার এই
অজ্ঞাতবাসের খোঁজ পেলে কি করে ?
নীহার। আপনি এখানে অজ্ঞাতই থেকে যাবেন, এমনটা আশা
করেননি নিশ্চয় আপনি।
কৈলাস। কেন ?
নীহার। বাড়ীটির মালীক হয়েছেন একজন পুলিশ ইনস্পেক্টর,
আর তা ছাড়া উপরের তলায়ই একজন দারােগা বাস
কচ্ছেন।
কৈলাস।
ওরে বাপরে! গেছি। খােরপােষের দাবী।
(চেয়ারে বসিয়া পড়িল)
তৃতীয় অঙ্ক ]
বিবাহিত জীবন
নীহার। ঝির কাছ থেকে সমস্ত খবর সংগ্রহ করে বুঝেছি
আপনি এখানে আছেন। আমাদের দুই একজন
বন্ধুবান্ধব এখানে অস্বার কথা। দিগিন্দ্র বাবু তাে
দরজায়ই দাঁড়িয়ে আছেন।
কৈলাস। প্রাণ ত্যাগ করার সব চেয়ে সােজা উপায় তুমি
কোষ্টাকে মনে কর ?
নীহার। প্রাণ ত্যাগ করার ?
কৈলাস। হাঁদড়িতে ঝু’লে, বিষ খেয়ে, জলে ডুবে, বন্দুক
চালিয়ে-কোন্ রকমে সব চেয়ে সােজা ?
নীহার। সে বিচার পরে হবে আপনার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা
হয়নি?
কৈলাস। কোন্ স্ত্রী ?
নীহার। দ্বিতীয়া।
কৈলাস। তােমার বাড়ী ছেড়ে আসার পর নয়। আর দেখা
হবে না। তােমার স্ত্রী কেমন ?
নীহার। আমাকে ছেড়ে গেছে।
কৈলাস। ছেড়ে গেছে।
নীহার। আমি তাকে খুঁজছি না, কারণ আজ সকালে যা
খবর পেলুম তাতে সেই মেয়েটি সম্বন্ধে সমস্ত কথা
প্রকাশ করে বলতে এখন কোনাে বাধা নেই
কৈলাস। সেই মেয়েটি।
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৮০
।
নীহার। । ( দরজায় ঘা )
কৈলাস। আরে, কেউ এসেছে।• কে ?
নীহার। দিগিন্দ্র বাবু-এক পথেরই পথিক সব।
কৈলাস। কি রকম?
নীহার ।
সে আর তার স্ত্রীর মধ্যেও ছাড়াছাড়ি হয়েছে।
শুনলুম যে কয়টি দম্পতি কাল আমার বাড়ীতে
উপস্থিত ছিল, কোনােটিই এখন আর অটুট অবস্থায়
নেই—সকলের মধ্যেই ছাড়াছাড়ি হয়েছে।
কৈলাস। আমার দৃষ্টান্তটি তাদের এমনি ভালাে লেগেছে
যে তারা তার অনুসরণ না করে আর পারে নি।
( আবার দরজায় ঘ)
সমরেন্দ্র। ( বাহিরে ) দরজা খুলুন, আপনার সঙ্গে আমরা,
সাক্ষাৎ কর্তে চাই।
(নীহার দরজা খুলিল; সমরেন্দ্র ও দিগিন্দ্রের প্রবেশ)
সমরেন্দ্র। (কৈলাসের প্রতি এতক্ষণে আপনাকে খুঁজে পেলুম।
দিগিন্দ্র। রামকিঙ্কর নীচে দাড়িয়ে, আপনার সঙ্গে দেখা কর্তে
চায়।
কৈলাস।
সে আসতে পারবে না; এখানে এসে আমি
লুকিয়েছি, যাকে তাকে ঢুকতে দেওয়া হবে না-
পরিচিত কয়জনেই বেশ আছি। (সকলে বসিল)
একই অবস্থায় পড়েছি আমরা।
তৃতীয় অঙ্ক ]
৮১
বিবাহিত জীবন
সমরেন্দ্র। নিজের কথা বলতে গেলে স্বীকার কৰ্ত্তে হয় এমন
দুরবস্থায় কখনাে পড়িনি আর ;আর এটুকু ভাবতেও
আরম্ভ করেছি যে স্ত্রীটি হচ্ছে একটি অত্যাবশ্যকীয়
আরামের জিনস।
কৈলাস। যতক্ষণ তাহা একবচন—বহুবচনে রূপান্তরিত হলেই
তা সাংঘাতিক জিনীস।
দিগিন্দ্র। জাম না যে একটি শান্তিহীন রাত্রি কাটিয়েই
আমার স্ত্রী সম্বন্ধে আমার এমন ভালাে ধারণা হয়ে
যাবে।
নীহার। হাঁ, বন্ধুগণ; বিরহ জিনসটা মৃত্যুর মতন অনুপস্থিত
ব্যক্তির গুণ সম্বন্ধে লােকের মনকে সচেতন করে
তুলে।
কৈলাস। এ সঁময় দোষ সম্বন্ধে যে আললাচনা করে,তাকে নিয়ে
তত আমাদের লজ্জিত হওয়া উচিত। হায়! আমার
দ্বিতীয়টি যদি আমার আরামের দিকে আরাে একটু
লক্ষ্য রাখতাে, তাহলে তাকে দেবী আখ্যা দেওয়া
যেত।
সমরেন্দ্র। আমার স্ত্রীর বড় দোষ হয়েছে—সব সময় আমার
কথার বিরুদ্ধে বলা— একটু মােলায়েম করে
বল্লে তেমন কিছু একটা হােত না, কিন্তু পদে পদে
এমন প্রতিবাদ সহ কর। মুস্কিল।
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন ৮২ দিগিন্দ্র। আমার স্ত্রীর দোষ হয়েছে, তার প্রফুল্লতার অভাব- আর তাকে আমি সব সময় আদর করি, তার এই ইচ্ছা। কোলের বিড়ালটির মত সব সময় চাপড়িয়ে আদর করা আমাকে দিয়ে পােয় না। আদর করার মতন মর্জিটা আমার মাঝে মাঝে হয়। কৈলাস। আমরা সকলেই হতভাগ্য,তার মধ্যে আমিই প্রধান ; ভাই সব, তােমাদের একদিন না একদিন আবার মিলন হতে পারে, কিন্তু আমার সে আশা নেই। (দরজায় ঘা) চুপ, !-কে এখানে ? (দরজার কাছে গিয়া ) রাম। ( বাহিরে আমি। কৈলাস। কে ? রাম। আমি রামকিঙ্কর। কৈলাস। তােমার আসা হবে না। রাম। কৈলাস বাবুর সঙ্গে আমার কথা আছে-তার পক্ষে খুব জরুরি কথা। দিগিন্দ্র। আমি আপনাকে বলতে ভুলে গেছিলুম-ঐ রাম- কিঙ্করের নাকি আপনার প্রথমা স্ত্রী সম্বন্ধে আপনাকে কিছু বলার আছে। কৈলাস। সে কি ? তাকে ঢুকতে দেব ? [ তৃতীয় অঙ্ক বিবাহিত জীবন = - নীহার। হাঁ, হাঁ। (কৈলাল দরজা খুলিয়া দিল,রাম কিঙ্করের প্রবেশ ; কৈলাস আবার দরজা বন্ধ করিয়া দিল। রাম। কেমন আছেন, মহাদায়’গণ ? আবার আমাদের এই শুভ গােধূলি লগ্নে দেখা হলাে। কৈলাস। বসুন। (রাম বসিল) রাম। আবার আমরা নাকি সব ‘অব্যাহত’ হয়ে গেছি- ‘অব্যাহত’ বুঝলেন না? আইবুড়াে আর কি শুদ্ধ ভাষায়। আমার স্ত্রীর সঙ্গে কালকের পরে আর দেখা নেই। এখন বাড়ী ফিরে যেতেও ভয় পাচ্ছি। কৈলাস। এই খবর- রন্থি। হাঁ, কিন্তু আগে মনটা একটু স্থির করেনি। মাথার মধ্যে যে ভারি “জলযােগ” হয়ে রয়েছে। নীহার। বলুন, কৈলাস বাবু যে শুনতে অস্থির হয়ে আছেন। শুনুন তাহ'লেজানেন তাে গতকল্য আপনারা সকলে চলে গেলে পর আমার স্ত্রী আমাকে এতটা “কবন্ধ” করে তুলেছিল যে আমি বাড়ী থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যাই—আর কখনাে তার মুখ দেখব না বলে। কৈলাস। তারপর ? রাম। রাস্তা দিয়ে বেগে যাচ্ছি, মনে যে “সংস্কল্প” করে- ছিলাম তাই পালন করব ভাবছি—তখন হঠাৎ একটি [ প্রথম দৃশ্য বিবাহিত জীবন ৮৬ হলদে শাড়ী পরা মেয়েলােকের গায়ের উপর গিয়ে পড়লাম। কৈলাস। (চমকিয়া) ও (উঠিয়া পড়িল) নীহার। চুপ করে বসুন, শেষ পর্য্যন্ত শুনুন। রাম। আমি দেখে তাে এক্কেবারে অবাক-বল্লুম, চিনি যেন ? রক্তের সােথ রয়েছে বােধ হচ্ছে। সে আমার দিকে চাইলে, চেয়ে একেবারে ‘খ’ হয়ে গেল। কৈলাস। ব’লে যাও, বলে যাও। বল্লুম আমি—“পিসীমা”- কৈলাস। পিসীমা ! রাম। বল্লুম-“পিসীমা, তােমার কি পুলিশের ভর নেই, আইনের ডর নেই ?” কৈলাস। কেন? কেন বল ? সকলে। চুপচুপ। নীহার। ব’লে যান। রাম। সে বল্লে—“দেখ রাম কিঙ্কর, আমি খুব একটা কুটিল বিষয়ে এখানে এসেছি-তুমি কাউকে বলাে না যে আমার সঙ্গে তােমার দেখা হয়েছে।” আমি বল্লুম- “পিসী,তােমার বিরুদ্ধে নালিশ আছে; মনে আছে— এক বাড়ীতে আমি চাকর ছিলুম, তুমি ছিলে ঝি ?” কৈলাস। হা ভগবান! ঝি ? আচ্ছা, ব’লে যাও। রাম। জাতে পারলুম-তার স্বামী নাকি- [ তৃতীয় অঙ্ক
বিবাহিত জীবন
৮৫
কৈলাস। কৈলাস বাড়য্যে !
হ; কোনাে বে-আইনী কাজ করে সে আসাম
পালিয়ে যায় এক ডাক্তারের পরিবারের সঙ্গে।
কৈলাস। ঠিক।
রাম। সেখানে জাতি নাম বদূলিয়ে--
কৈলাস। নামও বলিয়েছে। কি নাম নিয়েছে ?
রাম। কি নাম ভুলে গেলাম, বি-বি-
কৈলাস। বিলাসিনী ?
রাম। হাঁ, তাই।
কৈলাস। তা হলে সে জাতিতে শূদ্র ; তার সত্যিকার নাম ?
রাম।
শিবশঙ্করী।
কৈলাস। বাঃ বাঃ! বিয়ে অসিদ্ধ । ও বিয়েই হয়নি, আমি
মুক্ত, আমি মুক্ত। বাঃ রে বাঃ! (নাচিতে লাগিল )
নীহার বাবু, দরজা খুলে দাও,আমাকে বেরুতে দাও।
( নীহার দরজা খুলিল) চলতে রামকিঙ্কর, তােমাকে
ছাড়ছিনে—যে পৰ্যন্ত আমার আইন সঙ্গতা স্ত্রীটিকে
শান্ত কৰ্ত্তে না পারছি সে পর্যন্ত তােমাকে আর
ছাড়ছিনে। বন্ধুগণ, তােমরা আমার সঙ্গী, তােমরাও
চল আমার পিছে পিছে তােমাদের স্ত্রীদেরে খুঁজে
নাও, তাদের সঙ্গে তােমাদের মিলন হাে—আমিই
তার দৃষ্টান্ত দেখাব।
[ প্রথম দৃশ্য
বিবাহিত জীবন ৮৪ (স্বামীগণের গান) বাপরে বাপ, বিয়ে কি ঝারি । ইচ্ছে হয় স্ত্রীগুলিকে পাঠাই যমের বাড়ী-- পরে গলায় দড়ি বেঁধে দুর্গা বলে ঝুলে পড়ি! বাপরে বাপ, বিয়ে কি ঝকমারি ! প্রথম দেখলেম নূতন বৌটি— যনি কচি তেনি মিষ্টি- বছর খানিক যেতে যেতে প্রকট হলেন স্বমূৰ্ত্তিতে। চল্ল তখন মুখ নাড়া সঙ্গে সঙ্গে ঝাটার বারি— বাপরে বাপ, বিয়ে কি ঝকমারি ! দিন রাত এক ঘূৰ্ত্তি ধ্যান করে করে জান হায়রাণ। (তাতে ) এক এক দেবীর এক এক মূর্তি জানিনা কার কিসে তৃপ্তি বলির আমরা অজ মূর্তি কাঁপছি ভয়ে আর ভাবছি বিসর্জনের কত দেরী। বাপরে বাপ, বিয়ে কি ঝারি! কৈলাস! ( রামকিঙ্করের প্রতি) চলত আমার এক মাত্র বন্ধু ও রক্ষক, চল আমার সঙ্গে, চল তােমার পিসী বিলাসি- নীর কাছে। আর–হে আমার একমাত্র আইন- [ তৃতীয় অঙ্ক
৮৭
বিবাহিত জীবন
সঙ্গত পত্নী, আমার দ্বিতীয় নম্বর, তােমার বাহুদ্বয়
বিস্তৃত করে তােমার স্বামীকে অভ্যর্থনা করে নাও।
(রাকিঙ্করকে টানিয়া লইয়া বেগে নিষ্ক্রান্ত)
নীহার। (পিছনে ডাকিল) কৈলাস বাবু, কৈলাস বাবু, কোথায়
যাচ্ছেন দৌড়ে ? ( অন্যান্যের প্রতি) চলুন আমরা
তার অনুসরণ করি, এবং আমাদের স্ত্রীদের ক্ষমা লাভ
কৰ্তে এবং তাদের সঙ্গে মিলন সাধন কৰ্ত্তে পরস্পর
পরস্পরকে সাহায্য করি।
( নিষ্ক্রান্ত )
দিগিন্দ্র। আমি যাব না—আমার প্রতি খুব খারাপ ব্যবহার করা
হয়েছে—আজ ঘণ্টা খানেক আমার বাড়ীর সুমুখে
ঘুরেছি, আর যদিও আমার স্ত্রী জানালাতেই বসা
ছিল, সে আমাকে দেখতে মুখ পৰ্য্যন্ত ফিরায় নি।
সমরেন্দ্র। আমার স্ত্রী কোথায় আছে এখন তা আন্দাজও কর্নে
পারছি না। তার খুড়ীমার বাড়ী যায়নি; সেখানে
আমি গিয়েছিলুম—তাকে দেখিনি। আমি ভারি
বিচলিত হয়ে পড়েছি।
দিগিন্দ্র। আমিও।
সমরেন্দ্র। তাহলে চলুন; বাড়ীতে আপনার স্ত্রীর কাছে
যান, আমার স্ত্রীর সঙ্গে মিলনের উপায় করে দিন।
বন্ধুর কর্তব্য তত তাই। চলুন !
(দিগিন্দ্রকে টানিয়া লইয়া নিক্ষান্ত)
[ প্রথম দৃশ্য
;
বিবাহিত জীবন
৮
দ্বিতীয় দৃশ্য
(একটি বাের্ডিং হাউসের একটি কক্ষ। দীপ্তির প্রবেশ—পিছনে
অমূল্যবালা, মঞ্জুরাণী, পূর্ণশশী এবং আমােদিনী )
অমূল্য। ঐ হতভাগিনী বিলাসিনী বাড়য্য এখানে আছে,
বলছ তােমরা ?
পূর্ণশশী। হাঁ, এই বড়িীর দরজাতেই তাকে দেখেছি কাল
নীহার বাবুর সঙ্গে কথা কচ্ছে।
অমূল্য। যখন বাড়ী নেই, তখন আর একবার এসে দেখা
করব। তার সঙ্গে আমার দেখা কর্তেই হবে। ওঃ!
কি হতভাগিনী আমি !
দীপ্তি। আমিও তাই।
আমােদিনী। আমিও।
পূর্ণশশী। আমিও।
ভয়ানক দুঃখিনী আমি, ভয়ানক।
অমূল্য। আমি বাড়ী গিয়েছিলাম, কিন্তু উনি বাড়ীর কাছেও
ঘেঁষেন নি; উনি নিশ্চয় পালিয়েছেন ; আমি সারা-
রাত চোখ বুজিনি।
আমােদিনী। আমার স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়া অবধি
আমার প্রাণ যেন আর আমাতে নেই—কোথায়
গেছেন তিনি, হায়!
[ তৃতীয় অঙ্ক
মঞ্জু।
বিবাহিত জীবন
মঞ্জু।
আমি আমার খুড়ীর কাছে গেলুমনা, পূর্ণদিদির কাছে
চলে গেলুম-উনি এসে না নিলে বাড়ী যাবনা
সংকল্প করেছি। বাস্তবিক পিশেমশায়ই রূপার
চটা দিয়েছিলেন।
পূর্ণশশী। তুমি যদি আমার কাছে না আসূতে ভাই দীপ্তি,
তাহলে সকাল হওয়ার আগেই আমি মরে যেতুম,
দেখনা, ওঁর নিষ্ঠুরতায় আমার দেহে প্রাণটি মাত্র
আছে বলা যায়।
অমূল্য। উদাসীনতা ! আমার স্বামীর মতন উদাসীনতা আর
কারাে নেই। আমি এক দিন ওর ঈর্ষা জাগাবার
জন্যে বারােটি যুবকের সঙ্গে ইয়ার্কি দিয়েছি, কিন্তু
ওর তাতে খেয়ালই নেই। আর এখন জালুম কিনা
ওর আর এক স্ত্রী রয়েছে। ওঃ ! পেতুম তাকে
একবার এখন কাছে—পাজি, পশু কোথাকার,
প্রবঞ্চক, শঠ! (কাঁদিতে লাগিল)
পূর্ণশশী। ঠিক আমার ওটির মত ; যখনই অন্যদের সঙ্গে বেরােই,
উনি আমার কাছ থেকে যত দূরে সম্ভব চলে যান ;
আমার দিকে ফিরেও তাকান না, একটু চেয়ে
হাসেন না—ভঙ্গী দেখলে মনে হয় কখনাে ভালােই
বাসেননি। আমি-আমি-আমি ভারি হতভাগিনী।
( ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল)
T দ্বিতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
মঞ্জু। (কাদিতে কাদিতে) কেঁদোনা, ভাই পূর্ণশশী ; কেঁদোনা।
আমি—আমি বুক ভেঙ্গে গেলেও কাঁদিনা। ইনি
যেন এটুকু না বলতে পারেন, ওর অনুপস্থিতিতে
আমি এক বিন্দুও চোখের জল ফেলেছি—ভারি
ভীষণ লােক। আমার কথার উল্টো না বল্লে আমি-
আমি তাে তার কত বাধ্য হয়ে থাকতুম, ওঃ!—ওঃ!
(কাঁদিতে লাগিল )
আমােদিনী। (কাঁদিয়া) ওঃ ! ওগাে কোথায় তুমি ? আর
তােমার ভাষা সংশােধন কখখনাে করবনা আমি ; যে
কোনাে অভিধান থেকে তােমার কথা তুমি বেছে
নিও, আমি আপত্তি করবনা!
দীপ্তি। ( কাঁদিতে কাদিতে) আমার দুর্দশা আর কিছুতেই
ঘুচবেনা, সহ্যের সীমার বেশী আমি সয়েছি, আর
সইতে পারি না।
অমূল্য! ভগ্নীগণ! সকলেরই আমাদের এক দশা! সকলেই
চোখের জলে বুক ভাসাচ্ছি ! কিন্তু এ হতে পারবে
না; আমাদের এই দুর্বলতার বিষয় জানতে পারলে
আমাদের স্বামীরা কি বলবেন? না--এদের
মত জীবের জন্যে আমরা কিছুতেই কাব না।
ক চল
আমরা সবে একত্র হয়ে হাসতে আরম্ভ করি।-
হাঃ! হা! হা! হাস, ভগ্নীগণ, হাস। আর
সাহস এবং দৃঢ়তার সহিত ভবিষ্যতের বন্দোবস্ত কর।
[ তৃতীয় অঙ্ক
বিবাহিত জীবন
(শ্রীগণের গান)
পতির সনে সতী এবার
করবে যুদ্ধ ঘােষণা ;
দেখিয়ে দেবাে জগতটাকে
আমরা স্বাধীন জেনানা !
কেঁদোনা কেউ যেন আর
হাস সবে বেদম হাসি,
পলকে প্রমাণ হবে
আমরা কেমন সাহসী।
পতি-জগত করব শাসন
আমরা স্বাধীন ললনা-
পতির সনে সতী এবার
করবে যুদ্ধ ঘােষণা।
অমূল্য। দীপ্তি, তুমি বর্তমানে বােধহয় এখানেই থাকবে।
আমি এখন কারু কারু সঙ্গে একটু দেখা করে আধ
ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসব। ভগ্নী আমােদিনী,
আপনি ত একজন বেশ বুদ্ধিমতী এবং সুশিক্ষিতা
স্ত্রীলােক, চলুন আমার সঙ্গে, আপনার উপদেশের
দরকার আছে আমার ; পথে আপনার স্বামীর
খোজও করা যাবে। মঞ্জুরাণী, তুমি অবশ্য এখন
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৯২
পূর্ণশশীর সঙ্গেই থাকবে। আসি এখন তাহলে,
দেখ, মন খারাপ করে থেকোনা ; স্ত্রীলােকের মতন
হও-নবযুগের স্ত্রীলােকের মতন হও-পুরুষলােকের
জন্যে কেঁদোনা। পুরুষেরা কি! গাঁয়ে মানে না,
আপনি মােড়ল। নিরাশ হ’য়ােনা ; ভগ্নীগণ, সে
সময় আছে, যখন দেশ শাসনে আমাদের শক্তির
প্রাধান্যই ঘােষিত হবে। তখন তাদের বিচার
;
হবে।
মঞ্জু
( আমােদিনী সহ নিষ্ক্রান্ত)
যাই, দীপ্তি, আমাদের সঙ্গে দেখা কর্তে চাও তাে
জানােইত ঐ পাশের বাড়ীতে আমরা আছি।
যদি আমাদের স্বামীর বিষয় কিছু শােন, তাহলে
তৎক্ষণাৎ জানা’য়াে। (পূর্ণশশীকে লইয়া যাইতে যাইতে)
এখন দিগিন্দ্রবাবু যদি বাড়ীর সুমুখ দিয়ে যাওয়া
আসা করেন, তাহলে তাকে আমি ভিতরে ডেকে
নেব।
মঞ্জু।
পূর্ণশশী। না, না, ভাই, ডেকোনা।
ডাক্ব।
পূর্ণশশী। আমি এ কথা শুনতে চাই না।
কথা কাটাকাটি আমার অভ্যাস নয়-তােমাকে
শুনতেই হবে। আমি নিজে দুর্ভাগিনী হলেও
[ তৃতীয় অঙ্ক
মঞ্জু।
বিবাহিত জীবন
পরের সুখ সম্পাদনে মঞ্জুরাণী শিখিল প্রযত্ন, একথা
কেউ বলতে পারিবে না।
(গান)
আপনার প্রাণে আপনি সুখী
যতদিন হ’তে নাহি পার সখি,
জেনাে ততদিন তব সুখ আশা-
মরু ভূমি মাঝে মায়া মরীচিকা।
কাঁদিয়ে তাে তুমি কাঁদাতে পারনা,
সাধিলে চরণে সে-ত গাে গলেনা !
তবে কেন সখি পরে প্রাণ দিয়ে-
সুখ আশে থাক তার মুখ চেয়ে!
—এস, পূর্ণ, বেশ হাসি খুসি হও।
( উভয়ে নিষ্ক্রান্ত)
দীপ্তি। (একা) এখন আমি কি উপায় অবলম্বন করি ?
আমার স্বামী যে দোষী, তার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া
গেছে—তার কাছে যে আর যাওয়া যায় না তা
সুনিশ্চিত। তাে
এখানে তত আশ্রয় নিয়েছি, কিন্তু
পরে আর কোথায় যাই ? বন্ধু বান্ধবদের কাছে ?
আত্মীয় স্বজনের কাছে ? , না, সে অপমান
সইতে পারব না। হতভাগিনী আছি-একা একাই
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
৯৪"
আছি—কারাে কাছ থেকে কৃত্রিম সহানুভূতির
কথা শুনতে পারব না। কৃপা ! সে রকম কোননা
বৃত্তি নেই! ছদ্মবেশী বিজয়ের ভাব ছাড়া তাহা
আর কিছুই নহে। ( বাহিরে চাহিয়া ) ওঃ ! সেই
লােকটি—যে
মধুর চিঠিটি লিখেছিল আমার কাছে
কাল ? তাহলে আমাকে এখানেও খোঁজ করে
এসেছে। কি করি এখন ? তাকে দেখা দেওয়া
যায় না। ঐ শােন, (কাণ পাতিল) আমার
সম্বন্ধে কি জিজ্ঞেস্ কচ্ছে; তার হাত এড়ানাে যায়
কি করে ? স্বামীর উপর প্রতিশােধ নেবার জন্যে
আমি এক রকম উৎসাহ দিয়ে এসেছি এই লােকটাকে
-হয়ত সেতাতেই সাহসে বুক বেঁধে এসে উপস্থিত
হয়েছে—বাড়ী ফিরতে আর পারি না নিশ্চয়—কিন্তু
আত্ম সম্মান হারাতে হয় এমন অবস্থায় পড়লে তাে
চবে না। যাই, স’রে পড়ি।
(নিষ্ক্রান্ত )
( নীহারের প্রবেশ )
নীহার। আমি ঠিক খবর নিয়েছি, আমার স্ত্রী এখানে নেই।
এখনতাে আর গােপন রাখবার কিছু নেই, এখন
সব বলব তাকে। তাকে যদি অতিরিক্ত ঈর্ষা এবং
সন্দেহের কুফল সম্বন্ধে সজ্ঞান করে তুলতে পারি,
[ তৃতীয় অঙ্ক
বিবাহিত জীবন
তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের সুখের উপর যাতে
কোনােদিন মেঘের ছায়া এসে না পড়ে সেই ভাবে
চলতে চেষ্টা করবণ (যাইতে উদ্যত ) কি? এ কে !
( বাহিরে চাহিয়া) আমার স্ত্রীর সঙ্গে সে কথা বলুছে-
আমার স্ত্রী তাকে দূরে ঠেকিয়ে রাখতে চাচ্ছে—সে
তার অনুসরণ কচ্ছে—পাজি কোথাকার।
(বেগে ধাবিত হইয়া নিষ্ক্রান্ত )
{ বাহিরে কৈলাসের শব্দ শােনা গেল }
কৈলাস। এস ভাই, এস, আমার স্ত্রী এখানেই। এস বন্ধু, এস
আমার রক্ষক-( রামকিঙ্করকে টানিয়া লইয়া কৈলাসের
প্রবেশ ; রাম নিজকে ছাড়াইয়া লইবার চেষ্টায় তাহার জামার
হাত ছিড়িয়া গিয়াছে) ঠিকই বলেছ ; রামকিঙ্কর ঠিকই
বলেছ, বিলাসিনী ওরফে শিবশঙ্করী স’রে পড়েছে।
রাম। কিন্তু কৈলাস বাবু, আমার জামা যে বিতাড়িত হয়ে
যাচ্ছে--আমাকে ছাড়ুন।
কৈলাস। না, না, এখন আমার স্ত্রীর কাছে তােমাকে নিয়ে
যাচ্ছি। সে কোথায় ? (ডাকিল) ওগাে, ওগাে!
তারা যে বল্লে—এখানেই ; কোথায় তুমি প্রিয়ে,
কোথায় তুমি ? না, এ বাড়ীতে তাে নয় ;-সারা
সহর খুজে তাকে বের করব। এস, রামকিঙ্কর, এস
বন্ধু, এস আমার রক্ষক, এস।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
রাম। ওঃ, আমাকে ছাড়ুন, আমাকে ছাড়ুন।
কৈলাস। না, না, আমার সাক্ষীকে আমি ছাড়তে পারি না ;
এস, আমি আবার সুখী না হওয়া পর্যন্ত তােমাকে
ছাড়তে পারি না।
(এতক্ষণ কৈলাস রামকে সারা রঙ্গমঞ্চে টানিয়া,
ঘুরাইয়া ছিল—এখন টানিয়া লইয়া নিষ্ক্রান্ত)
তৃতীয় দৃশ্য
বােডিং হাউস।
( ভিতরে নীহারের কথা শােনা গেল)
নীহার। ( ভিতরে) পাজি! বমা কোথাকার! এখানে
কি কচ্ছ তুমি ? (একটা ধস্তাধস্তি এবং চীৎকারের শব্দ)
আমার হাতে কোনাে অস্ত্র নেই, নইলে প্রাণ নিয়ে
তােমাকে যেতে হতাে না এখান থেকে। এস, দীপু,
এস আমার সঙ্গে।
(তার স্ত্রীকে টানিয়া লইয়ানীহারের প্রবেশ; দীপ্তির মুখ মলিন—উত্তেজিত)
দীপ্তি। (যেন জ্ঞানলাভ করিয়া) আঃ! তুমি! তুমি! ওঃ !
(তার হাত ধরিল ; নীহার দীপ্তিকে একটা চেয়ারে বসাইয়া
দিল) ঠিক সময়ে এসেছিলে! খুব শাস্তি হয়েছে
আমার ।
[ তৃতীয় অঙ্ক
৯৭
বিবাহিত জীবন
নীহার। কিন্তু তুমি তাে নিরাপদেই আছ; কে তােমাকে রক্ষা
করেছে ?
দীপ্তি। নীহা রর কাঁধে মাথা রাখিয়া ) আমার স্বামী।
নীহার। তুমি এখানে থাক, আমি লােকটাকে অনুসরণ করে
মজা দেখিয়ে আসছি।
দীপ্তি। (নীহারের শরীর সংলগ্ন হইয়া) না, না; আমার কথা
রাখ, আমার কাছে থাক, আরাে কাছে আমাকে
ফেলে যেয়াে না।
নীহার। ঐ লােকটার একটা সূত্র পেয়েছি আমি—এখন তাকে
আর ছাড়ছি না।
দীপ্তি। তাকে কি তুমি জাননা?
নীহার। জানি বৈ কি!
দীপ্তি। কে কি করে সে?
নীহার। কে ? শােন, দীপু, এই লােকটাই আমার ভগ্নীকে
প্রলােভিত করে—এই হচ্ছে সেই গীতা নামে মেয়েটীর
পিতা—যে মেয়েটী আমাদের ছাড়াছাড়ি ঘটিয়েছিল।
দীপ্তি। পিতা
নীহার। এটুকু বলবার আমার ক্ষমতা ছিল না আগে। আমার
বােনের কাছে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—এখন
তার মৃত্যুতে আর তা বন্দুতে কোনাে বাধা নেই।
দীপ্তি। আমাকে ক্ষমা কর—আরআর শুনতে চাইনা আমি।
[ তৃতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
নীহার। তােমার এ শােনা দরকার। এই দুবৃর্তটাই আমার
ভগ্নীকে ভুলিয়েছিল—আমার ভগ্নীর পরে বিয়ে
হয় খুব ভালাে জায়গায়-এই লােকটার সঙ্গে তার
সম্বন্ধের কথা প্রকাশ হয়ে পড়লে তার সর্বনাশের
কারণ হতে; আমি নিজের শান্তি নষ্ট করেও সেই
গােপন কথার গােপনীয়তা রক্ষা করেছি,আমিই
মেয়েটীর বাপের মত ছিলুম—তার এখন বিয়ে হয়ে
গেছে—সে সুখে আছে।
দীপ্তি। আর নয়, আর নয়। আমি ভারি নির্বোধ এবং
দুর্বলস্বভাব—আর তােমাকে কখনাে আমি সন্দেহ
করব না।
নীহার। দীপু, আর তােমাকে সন্দেহের কারণও কখনাে দেব
। (উভয়ের আলিঙ্গন)
(সমরেন্দ্র ও মঞ্জুরাণী, দিগিন্দ্র ও পূর্ণশশী হাত ধরাধরি
করিয়া হাসিয়া প্রবেশ—পিছনে আমােদিনী)
মঞ্জু। কি ! নীহার বাবু আর দীপ্তি যে আলিঙ্গনবদ্ধ ! তাহলে
তােমাদের সব গােল মিটে গেছে, ভাই ? আমাদের
সব চুকে গেছে। এ বেশ ! দিগিন্দ্রবাবু ও পূর্ণও
মিলে গেছে। আমি দেখলুম দিগিন্দ্র বাড়ীর চারিদিকে
ঘুর ঘুর কচ্ছেন আমি নিজে বেরিয়ে গিয়ে তাকে
তখন টেনে বাড়ীর ভেতর নিয়ে এলুম, আমার স্বামীটি
[ তৃতীয় অঙ্ক
!
•
বিবাহিত জীবন
কাছেই ছিলেন, তিনি ও অনুসরণ কল্লেন। আমরা
কিছু কিছু অভিমান প্রকাশ করলুম, দুই একটা খোঁচা
খোঁচা কথা বল্লুম—তারপর উভয়ে উভয়ের বাহুর
মধ্যে ছুটে গেলুম।
(গান)
বিরহ না থাকলে কি সই
মিলনের সুখ এমন হতাে?
এমন করে দুটি প্রাণে
প্রেমের তড়িত বয়ে যেতাে ?
ভালাে হলাে সব মিলে গেল
এখন যার যেটি সে বুকে নাও
আদর করে সােহগি ভরে
এই এমনি করে চুমাে দাও !
-কেমন ছুটি নি আমরা ?
সমরেন্দ্র। না। আমি
মঞ্জু। চুপ! মনে নেই ? আর কথা কাটাকাটি করবে না,
কথা দিয়েছ যে ?
পূর্ণশশী। আর আমার স্বামী ও ভবিষ্যতে আমাকে খুব আদর
করবেন।
দিগিন্দ্র। হাঁ—
মঞ্জু। তবে আমাদের আমােদিনী দিদিটি এখন তার কৃষ্ণকায়
আমােদটিকে লাভ করেন নি—সেই দুঃখেই তিনি
[ তৃতীয় দৃশ্য
বিবাহিত জীবন
১০০
ক্লিষ্ট আছেন। উনি অমূল্য দিদিকে ছেড়ে আমাদের
কাছে আসেন, এসে শুনলেন তাঁর স্বামী এখানে,
কিন্তু এখানে ত দেখছি না।
নীহার। একটু আগেই কৈলাসবাবু আর রামকিঙ্করবাবু এখানে
এসেছিলেন শুনছি।
( বাহিরে রামকিঙ্কর)
রাম। (বাহিরে) ওগাে, আমােদ!
আমােদিনী! আঃ! ঐ তার গলার আওয়াজ শুনলুম।
(ছেড়। জামা কাপড় লইয়া রাম কিঙ্করের প্রবেশ )
রাম। আমােদ! তুমি এখানে ? ওঃ, দেখতে একবার
আমার দিকে চেয়ে।
আমােদিনী। আমার দিকেও একবার চাওতাে, আমাকে
ক্ষমা কর।
রাম। তােমাকে ক্ষমা, আমােদ! ওঃ! কি ‘বিদারণ’ যন্ত্রণাই
ভুগিছি আমাদের ছাড়াছাড়ির পর। আর দেখ না
অবস্থা—এ কৈলাসবাবুর কাজ—আমি ওর সাক্ষী কি
, তাই টেনে নিয়ে এসেছে, আমার পিসী
শিবশঙ্করী আর তার স্ত্রীর সানে এনে হাজির করবে
বলে। তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে;
পিসী
পালিয়েছে—কৈলাসবাবু আর তার স্ত্রী তাদের অপরাধ
ভুলে গিয়ে আছেন এখানে।
[ তৃতীয় অঙ্ক
বিবাহিত জীবন আমােদিনী। তােমার পিসী শিবশঙ্করী। রাম। এখন কিছু এখন কিছু জিজ্ঞেস করাে না, আমােদ ; একা পেলে সব ‘প্রকাশ্য করে বলব। আমােদিনী। প্রকাশ। রাম এই তােল আবার আরম্ভ করলে আমার উপর সেই ‘সংস্করণ। আমােদিনী। না, না, ভুলে গেছিলুম; আর কখনাে সংশােধন করব না তােমাকে। (অমূল্যকে ধরিয়া নাচিতে নাচিতে কৈলাসের প্রবেশ পাতলা ফুরফুরে পাঞ্জাবী তার গায়ে ) কৈলাস। এই এসেছি! এই এসেছি। বিলাসিনী পৃষ্ঠ ভঙ্গ দিয়েছে। আর এই বিজয়ী বীর তার একমাত্র আইন- সঙ্গত স্ত্রী নিয়ে নিস্পাপ হৃদয়ে এই পাতলা পাঞ্জাবী গায়ে এসে সকলের সম্মুখে দাড়াল। সকলে। পাঞ্জাবী। কৈলাস। হাঁ, নীচে গেঞ্জিও নেই ; আমার স্ত্রী সব শুনেছেন, আর আমাকে ক্ষমাও করেছেন। এই আমার রক্ষকের কাছে এই জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। (রামকে দেখাইল) রাম। কিন্তু আপনার অতিরিক্ত নিগ্রহের উচ্ছ্বাসে আমার ‘পরিচ্ছেদের’ যে এই দুরাবস্থা তা দেখে আপনার [ তৃতীয় দৃশ্য বিবাহিত জীবন ১০২ আমােদিনী। 'নিগ্রহ' নয়, আ- কৈলাস। চুপ করুন, আপনার স্বামীকে তার নিজের পছন্দমত কথা বেছে বতে দিন। একটু নরম হতে হবে উভয় দিকেই, গার্হস্থ্য শান্তির সেই হয়েছে সর্বশ্রেষ্ঠ উপায়। আমি সব বিষয়েই নরম হব। চেয়ে দেখুন আমার দিকে। যে তিন দিন আগে আগা- গােড়া ফুানেলে পশমে বেষ্টিত ছিল, সে-ই এখন আদ্ধির পাঞ্জাবী গায়ে বেরিয়েছে-আসুক এখন শীতের কণকণে উত্তুরে হাওয়া, বর্ষার পূবাে বাতাস আসুক নদীর গভীর জল কিম্বা উত্তর মেরুর বরফ, আমি সব বুক পেতে নিব—সকলের সঙ্গে যুদ্ধ ঘােষণা , করলুম আমি আজ—এই পাতলা পাঞ্জাবীর অস্ত্রে, আজ সক্কলকে পরাস্ত করব। নীহার বাবু, তােমার স্ত্রীটিকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছ তাে? বেশ, বেশforgive and forget প্রথম পরস্পর পরস্পরের মধ্যে যে গুণ দেখে বিয়ে করেছিলুম তা ছাড়া আর সব ভুলে যাও আজ। অমূ, আমাতে কি দেখে তুমি প্রথম মুগ্ধ হয়েছিলে ? অমূল্য। তোমার সব খামখেয়ালি এবং অদ্ভূতত্বের আড়ালে তােমার মধ্যে সত্যিকার ভালােমানুষটি দেখে। কৈলাস। তাহলে যখনি আমার উপর রাগ হবার উপক্রম হবে, [ তৃতীয় অঙ্ক ? L বিবাহিত জীবন তখনি সেই কথাটি মনে করােমার আমিও প্রথম যে ভালােবাসার দৃষ্টিতে তােমাকে দেখেছিলুম, তাই দিয়ে দেখব। নীহার বাবু, তুমি কি জন্যে বিয়ে করেছিলে ওকে ? নীহার। আমি পরিষ্কার স্বীকার পাচ্ছি-ভালােবাসার জন্যে। কৈলাস। আর আপনি, ঠিক সেই জন্যেই বিয়ে করেছিলেন ? দীপ্তি। হাঁ, মহাশয়। কৈলাস। আর আপনারা, সমরেন্দ্র বাবু আর আপনি ? সমরেন্দ্র। একই কারণে। মঞ্জু। ঠিক সেই জন্যেই। কৈলাস। আর আপনি, দিগিন্দ্র বাবু ? দিগিন্দ্র। কারণ, একা থেকে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলুম। কৈলাস। আর আপনিও একক জীবন আর ভালাে লাগছিল বলে ? পূর্ণশশী। ততটুকু দুর্বলতা আমি স্বীকার কচ্ছি। কৈলাস। আর আপনারা-রামকিঙ্কর আর তার স্ত্রী আপনারা বিয়ে করেছিলেন—কারণ- আমােদিনী। অনেক দিন বিধবা থেকে সুখ দুঃখের একজন সঙ্গী পাবার জন্যে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠছিল বলে। রাম। সুখ দুঃখের একজন ‘সহনারী’ পাবার ইচ্ছা হয়েছিল বলে। [ তৃতীয় অঙ্ক বিবাহিত জীবন কৈলাস। বেশ, তাহলে ভবিষ্যতে যেই একাধটুকু বিরােধের উপক্রম হবে দুয়ের মধ্যে, তখনি সেই প্রথম অনুরাগের দিনের কথা মনে করবেন দেখবেন তাতেই মনের ম’লা সব কেটে যাবে। কেমন, সকলে, সম্মত আছেন এই কথায় ? সকলে। হাঁ-হ। কৈলাস। তাহলে আমার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করুন সবাই; এই মিলনকে একটি প্রগাঢ় আলিঙ্গনে সূচিত করে দিন্ ; আমি আদেশ বাণী ঘােষণা করি,প্রস্তুত হােন্। (কৈলাস যেই তার স্ত্রীর হাত ধরিল সকলে তাহা অনুকরণ করিল ) Present ! { কৈলাস তার স্ত্রীর চিবুক ধরিল এবং চুম্বনােম দেখাইল—সকলে তাহাই করিল} Fire! [ সকলে একই মুহূর্তে চুম্বন এবং আলিঙ্গন করিল। এই ভাবেই সমস্ত দাম্পত্য কলহের নিষ্পত্তি কৰ্ত্তে হয়, আর (শ্রোতৃ মণ্ডলীর দিকে ফিরিয়া) আপনাদেরও যদি সেই মত্ হয়, তাহলেই আজ আমাদের দাম্পত্য আনন্দ সাঙ্গ- সুন্দর হবে ; আমরাও এইটুকু মনে করে যেতে পারব যে আজকের শিক্ষা ব্যর্থ হয়নি। নীহার বাবু ও তার স্ত্রীর বেলায় আপনারা ইর্ষা ও সন্দেহ-- পরায়ণতার কুফল দেখেছেন; সমরেন্দ্র বাবু ও তার স্ত্রীর বেলায় মিথ্যা কথা কাটাকাটির কুফল দেখেছেন ; [ তৃতীয় দৃশ্য
১০৫
বিবাহিত জীবন
দিগিন্দ্র বাবু ও তার স্ত্রীর ব্যাপারে দেখেছেন
প্রফুল্লতার অভাবের কুফল ; শ্ৰীমতী আমােদিনীতে
দেখেছেন প্রকাশ্যে সংশােধন চেষ্টার কুফল-আর
আমি ও আমার স্ত্রীর দৃষ্টান্তে বুঝেছেন আপনারা
আমাদের মর্জি এবং অভ্যাসগুলাে পরস্পরের সঙ্গে
খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রয়ােজনীয়তা। তবে এই
দাম্পত্য সাগর পাড়ি দেবার বেলায় এই গুলি
একমাত্র বিপদ না হলেও, এই সব চোরা পাহাড়ের
অস্তিত্বকে পাশ কাটিয়ে চলতে জালে—অনেক ভরা-
ডুবির আশঙ্কাকে ঠেকিয়ে রাখা যায়। কাজেই
আপনাদের মধ্যে যারা এখনাে অবিবাহিত আছেন,
তারা আমাদের কথা একবার ভেবে দেখবেন—কারণ
আপনারাও শীগগীরই বিয়ে করবেন, এবং তাই
করাই উচিত--আর যাদের বিয়ে হয়ে গেছে, তারাও
মনে রাখবেন—পরস্পর বিশ্বাস, পরস্পর ক্ষমা,
পরস্পরের সঙ্গে অভ্যাস খাপ খাইয়ে নেওয়াই হয়েছে
দাম্পত্য সুখের প্রাণ এবং সেই দাম্পত্য সুখই
একমাত্র কাম্য বস্তু আমাদের এই “বিবাহিত
জীবনে।”
(সকলে জোড় বাঁধিয়া অর্ধ বৃত্তাকারে দাঁড়াইল)
[ তৃতীয় অঙ্ক
বিবাহিত জীবন
১০৬
(মিলন গীতি)
ঘুচেছে বিরােধ বুঝেছে এবার
ভুল কোথা কার গেল সে জানা।
মিলেছে আবার হৃদয়ে হৃদয়,
বুঝেছে এ ওর প্রাণের বেদনা।
গেল তমােরাশি—হাসিছে কেমনে
প্রেম শরত সুধাংশু কিরণে।
স্নাত প্রকৃতি দেখনা দেখনা,
প্রাণ ভরিয়ে মিলন গাহনা।
যবনিকা
No text on this page.
No text on this page.