Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Arjya-kahini Ed.2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
আয-কাহিনী
দ্বিতীয় সংস্করণ
শ্রীবিষ্ণুবিহারী) ধর-সম্পাদিত
CALCUTTA:
THE BENGAL MEDICAL LIBRARY
201, Cornwallis Street.
মূল্য বাের্ডে বাধা। মাত্র
মূল্য কাগজের কভার।• আনা মাত্র।
All rights reserved.
PUBLISHED BY
BUNKU BEHARY DHUR.
From the "Basudha Office."
22, Fakir Chand Chackraburtty's Lane,
Calcutta.
The Copyright of this book is the property of the
publisher.
৭৮ নং আমহাষ্ট ষ্ট্রীট, নিউ ব্রীটেনিয়া প্রেস হইতে
আব্দুল গফুর দ্বারা মুদ্রিত।
Illustrated by Srijut Preogopal Das.
স্বত্ব ত্যাগপত্র
পরম কল্যাণীয়
শ্রীযুক্ত বন্ধুবিহারী ধর মহাশয়
কল্যাণবরেষু-
মহাশয় !
অামার প্রণীত আৰ্য-কাহিনী” পুস্তকের গ্রন্থস্বত্ব আপনাকে
(উপযুক্ত মূল্য লইয়া) বিক্রয় করিলাম। অতঃপর এই পুস্তকে আমায়
বা আমার উত্তরাধিকারীগণের কোনও স্বত্ব রহিল না, এতদর্থে আমি
সুস্থ ও সবলচিত্তে এই ত্যাগপত্র লিখিয়া দিলাম।
আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী
.
কলিকাতা
২৬শে আষাঢ়,
রাজেন্দ্র লাল চক্রবর্তী
১৩১৫ সাল।
সুচীপত্র বীরাঙ্গনা চরিত্র ১ পৃষ্ঠা + ০ ০ রাণী দুর্গাবতী লক্ষ্মীবাই জবহর বাই * * * ৪ ১৪ • ৫ কৰ্ম্মদেবী পান্না বীরবালক ও বীরনারী ০ ০ ০ ২১ বীর চরিত্র २० চত পৃথ্বীরাজ বাদলচাল ৩০ ০ ০ . . . ৪০ ০ ০ ০ + রাম রণজিৎসিংহ হামির প্রতাপসিংহ पिवयी ০ ০ ০ ৪৪ ••• ৫৪ ••• ৮ ০
No text on this page.
বণবেশে ঋন্সিীৰ ৰাণী লক্ষ্মীবাই।
আৰ্য-কাহিনী রাণীদুর্গাবতী এলাহাবাদের প্রায় একশত ক্রোশ দক্ষিণ পশ্চিমে গড়মণ্ডল নামক একটি বিখ্যাত রাজ্য ছিল। যে সময়ে মােগল সম্রাট আকবরশাহ দিল্লীর সিংহাসনে আরূঢ় হন, সেই সময় পতিহীন দুর্গাবতী গড়মণ্ডলের একমাত্র অধিশ্বরী। দুর্গাবতী অশেষ গুণগরিমায় বিভূষিতা ছিলেন, কথিত আছে, তৎ- কালে দুর্গাবতীর একটি শিশু তনয় ছিল, তিনি তাহার নামে রাজ্য শাসন করিতেন। দেশের কোথায় কি ঘটিতেছে তৎপ্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিতেন, সূক্ষ্মানুসূক্ষ্মরূপে রাজকাৰ্য পর্যালােচনা করিতেন, কোষাধ্যক্ষ, সেনাপতি ও মন্ত্রী সকলকেই কৰ্তব্যাকৰ্তব্য বিষয়ে উপদেশ প্রদান করিতেন। দুর্গাবতী সাধারণের হীতের জন্য অনেক সৎকাৰ্য্য করিয়া গিয়াছেন। তিনি প্রজাপুঞ্জের শ্রদ্ধা ও ভক্তির পাত্রী ছিলেন, তাঁহার রাজত্ব সময়ে দুর্ভিক্ষের করাল মুর্তি, বিপদের ছায়া কিছুই ছিল না। প্রজা- পুঞ্জ সুখে স্বচ্ছন্দে কালাতিপাত করিত। আকবৱসাহ আসফ খাঁ নামক একজন উদ্ধত স্বভাব বিশিষ্ট সেনা- পতিকে নর্মদা নদীর তটস্থ কড়া ও মাণিকপুর নামক প্রদেশের শাসনার্থ আৰ্য-কাহিনী। প্রেরণ করেন। তিনি মাঝে মাঝে নর্মদানদীর পরপারে যাইয়া দুর্গাবতীর অধিকৃতস্থানে নানা প্রকার অত্যাচার ও উৎপাত করিতেন, কিন্তু বিশেষ কিছুই অনিষ্ট করিতে না পারিয়া ভগ্ন মনােরথ হইয়া ফিরিয়া আসিতেন। আসফ, খ গড় রাজ্যের সমৃদ্ধির কথা অবগত ছিলেন, সুতরাং গড় অধি- কার করিবার জন্য তাহার হৃদয়ে লালসা বলবতী ছিল। আসফ খাঁ সম্রাটের অনুমতি পাইয়া আবার সাহসী হইলেন। এবার তাহার চিরপােষিত আশা ফলবতী হইল। ১৫৬৪ অব্দে আসফ খাঁ পাঁচ সহস্র অশ্বারােহী ও দ্বাদশ সহস্র পদাতিক সৈন্য লইয়া গড়মণ্ডলের দিকে প্রচণ্ড বেগে ধাবমান হইলেন। যখন গড়রাজ্যে এই আকস্মিক বিপদবার্তা প্রচারিত হইল, তখন গড়মণ্ডলবাসী আবাল বৃদ্ধ বনিতা সৈন্য, কর্মচারী সকলেই ভয়ে শিহরিয়া উঠিল। চতুর্দিকে এক ভয়ানক হুলস্থূল পড়িয়া গেল। কে কোথায় পলায়ন করিয়া জীবন রক্ষা করিবে তাহার জন্যই ব্যতিব্যস্ত হইল। কিন্তু দুর্গাবতী এই আকস্মিক বিপদে অধীরা হইলেন না। তিনি অবিচলিত চিত্তে যুদ্ধের উদ্যোগ করিতে লাগিলেন, বহুসংখ্যক সৈন্য একত্রিত হইল এবং তাহার পুত্র বীর বল্লভ ও যােদ্ধ বেশে তাহাদের সহিত যােগ দিলেন। দুর্গাবতী কেবল সৈন্য একত্রিত করিয়া ক্ষান্ত থাকেন নাই তিনি স্বয়ং রণবেশে ভূষিত হইয়া এক হন্তে তীর অন্য হন্তে শাণিত তরবারি লইয়া মাতঙ্গ পৃষ্ঠে আরােহণ করতঃ দুরাচার মােগল শত্রুর সম্মুখীন হইলেন। ভয়ঙ্কর যুদ্ধ আরম্ভ হইল, চতুরঙ্গে যে রণােন্মত্ত ভেরী বাজিয়া উঠিল ; আত্মম্ভরী জর আততায়ী মােগলের মনে মনে ধারণা ছিল, “শত হইলেও দুর্গাবতী একটি অবলা মাত্র, তিনি তাহাদের বীরত্বে ছত্র ভঙ্গ হইয়া পলায়ন করিবেন। অবশেষে তাহার বিপরীত ফল ফলিল। দুর্গাবতীর ভয়ঙ্করী মূর্তি সৈন্যগণের দুৰ্বাৰ সাহস, অসি পরিচালন পটুতা প্রভৃতি গুণ দর্শনে যান সেনাগণের অন্তরে এক প্রকার ভীতি উৎপন্ন হইল।
রাণীদুর্গাবতী। দুর্গাবতী ক্রমে ক্রমে দুইবার যবন সেনাদিগকে পরাজিত করিলেন। ছয় সহস্র সেনা আহত হইল, অবশিষ্ট গুলি রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিল। দুর্গাবতীও ছাড়িবার পাত্রী নহেন, ভৈরব রবে তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবিত হইলেন, তিনি কোনওরূপ বিরাম না করিয়া, বিশ্রাম না লইয়া সমস্ত দিবস শত্রুর অনুসরণে তৎপর রহিলেন। পরে যখন দেখিলেন সূৰ্য্যদেব সমস্ত দিবস কিরণ দানে ক্লান্ত হইয়া বিশ্রামার্থ অস্তগিরি মাঝে আশ্রয় লইলেন, পক্ষিগণ কূলায় আশ্রয় লইল, তখনি তাঁহার সেনাগণও বিশ্রাম লইল। দুর্গাবতীর ইচ্ছাছিল কিছুকাল বিশ্রাম করিয়াই যবন সেনাদিগকে পুনরায় আক্রমণ করেন কিন্তু সে আশা ফলবতী হইল না। কেহ কেহ বলিলেন আমরা বড় ক্লান্ত হইয়াছি, কেহ বলিলেন, “যবন সেনা আর আক্রমণ করিবে না; সেনাদিগের মধ্য হইতে এইরূপ নানা উত্তর প্রদত্ত হইল। দুর্গাবতী অনুচরদিগকে পুনৰ্বার অনুনয় বিনয় করিয়া বলিলেন, কিন্তু কাহারও মত ফিরিল না ; কি করিবেন; কাজে কাজেই তিনি সকলের মতে সায় দিলেন। কিন্তু নিজে শনাগুণে দগ্ধ হইতে লাগিলেন, এই সময় যদি তিনি যবন সেনাদিগকে আক্রমণ করিতে পারিতেন তাহা হইলে নিরাপদে আততায়ী ধ্বংস হইত সন্দেহ নাই। এদিকে যবন সেনাপতি আসফ খাঁ দুর্গাবতীর বিশ্রামের কথা শুনিতে পাইয়া আনন্দে মাতিলেন। পরাজয় জনিত অপমান তাহার হৃদয় হইতে পলায়ন করিল। কিরূপে দুর্গাবতীকে অপমানের প্রতিশােধ দিবেন তাহারই উদ্ভাবনে যত্নবান হইলেন। এবং রাত্রি থাকিতেই কতকগুলি সৈন্য লইয়া দুর্গাবতীর বিরুদ্ধে যাত্রা করিলেন ;-এ পর্যন্ত তাহার কামান আসিয়া পৌছে নাই। হিন্দু সৈন্যগণ নিদ্রিত ছিল, হঠাৎ মােগল- সৈন্যের বিভীষণ মর্ম ভেদী হুঙ্কারে চমকিয়া উঠিয়া আকস্মিক বিপদে সকলেই শঙ্কিত হইল। দুর্গাবতী জাসিতা না হইয়া ভীষণ পরাক্রমে সহিত তাহাদিগকে তাড়াইয়া দিলেন।
৪ আৰ্য-কাহিনী। আসফ খা, পর দিবস প্রত্যুষে কামান আসিয়া পৌঁছিলে, আবার আক্রমণ করিলেন। দুর্গাবতী গড়মণ্ডলের অনতি দূরে একটি সংকীর্ণ গিরিরত্মে আশ্রয় গ্রহণ করিয়া তাহাদিগের আক্রমণের বাধা দিতে লাগিলেন। কিন্তু অধিকক্ষণ তথায় থাকিতে পারিলেন না। উপর্যপরি কামানের গােলা আসিয়া তাহাকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল। অবশেষে সুৰ্য উদয় হইলে তিনি একটি বিস্তৃত সমরক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইবার জন্য বাধ্য হইলেন। এবং তথায় যাইয়া দর্পভরে মােগলদিগকে আক্রমণ করিলেন। এই সময়ে বীরবল্লভ সৈন্য মধ্যে থাকিয়া, সৈন্যদিগকে নানা প্রকার উৎসাহ বাক্য দ্বারা উত্তেজিত করিতে লাগিলেন। ক্ষত্র বালকের পরাক্রম দর্শনে মােগলগণ স্তম্ভিত হইল। বীবল্লভ সৈন্য সমভিব্যাহারে যবনের সম্মুখীন হইয়া প্রকৃত বীরের ন্যায় যুদ্ধ করিয়া দুইবার বিপক্ষীয় সেনাদিগকে পরাজিত করিলেন, মােগল সেনাগণ দুইবার পরাজিত হইয়া তৃতীয়বার তাহাকে অনিবাৰ্য পরাক্রমে আক্রমণ করিল, এবার কিছুতেই তিনি তাহাদিগকে বাধা দিতে পারিলেন না। বহুসংখ্যক সৈন্য তাহাকে আক্রমণ করিল, তিনি আহত হইয়া অশ্বপৃষ্ঠ হইতে পতিত হইলেন। দুর্গাবতী, মেহের পুত্তলি প্রাণাধিক প্রিয়তম পুত্রকে আহত দেখিয়া অধীরা হইলেন না। “শিবিরে লইয়া যাও,” এই কথা বলিয়া তিনি ক্ষিপ্ত ব্যাঘ্রীর ন্যায় পুনরায় ভীষণ পরাক্রমে শত্রুর সম্মুখীন হইলেন। চতুর্দিক হইতে উদ্বেল সাগরের ন্যায় মােগল সেনা তাহাকে আক্রমণ করিল। দুর্গাবতী মাত্র তিন শত পদাতিক সেনা লইয়া সাগরের ন্যায় প্রচণ্ড বেগে মােগল সৈন্যদিগকে বাধা দিতে লাগিলেন। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে “হিমালয়ের ন্যায় অটল”-রহিলেন; বিপদকে বিপদ বলিয়াও মনে করিলেন না। হঠাৎ একটি তীর আসিয়া দুর্গাবতীর এক চক্ষে বিদ্ধ হইল। তিনি বীরত্ব সহকারে উহাকে বাহির করিবার চেষ্টা করিলেন কিন্তু তীর বাহির হইয়া অর্ধেক চক্ষুকোটরেই ভাঙ্গিয়া রহিল। তিনি কষ্টকে কষ্ট জ্ঞান রাণীহুর্গাবতী। করিলেন না ; অটলভাবে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে আর একটি তীর তাহার গলদেশে বিদ্ধ হইল, পুনঃ পুনঃ শরাঘাতে তিনি বড়ই কাতরা হইয়া পড়িলেন, দেহ হইতে অনর্গল ধারায় শােণিত পতিত হইতে লাগিল, অধরসিংহ নামক একজন পুরাতন কর্মচারী তাহার নিকটে ছিল, সে দুর্গাবতীকে রণস্থল পরিত্যাগ করিবার জন্য বিনয়ের সহিত অনেক কহিল। দুর্গাবতী তাহাতে অস্বীকার করিয়া বলিলেন, “আমরা আজ বিপাকবশতঃ যুদ্ধে পরাজিত হইয়াছি, কিন্তু তাই বলিয়া কি অপ- মানের লাঞ্ছনাও স্বীকার করিব?—আমরা কি আজ এই অকিঞ্চিৎকর অস্থায়ী জীবনের জন্য চিরস্থায়ী কীর্তি ও ধর্মকে কলঙ্কের অর্ণবে ডুবাইয়া দিব ?—এই কি আমাদিগের মহত্ত্ব ?--এই কি আমাদিগের এত দিনের শিক্ষা ও ক্ষত্ৰব্ৰত পরিপালনের ফল ? দেখ অধর! আমি ভরসা করি তুমি সমুচিত কৃতজ্ঞতা উপহার দিয়া এখন তােমার উপকারের প্রত্যুপকার করিবে। তােমার করে ঐ যে শাণিত তরবারি দেখিতেছি উহা আমার হৃদয়কে উৎফুল্ল করিতেছে। গড়াধীশ্বরী আজ জন্মের মত তােমার নিকটে এই ভিক্ষা প্রার্থনা করে যে,-“তুমি উহার সাহায্যে আজ তাহাকে পরাধীনতার অপবিত্ৰস্পর্শ ও আত্মহত্যার পাপ হইতে পরিত্রাণ কর।” শুনিয়া অধরসিংহ দুর্গাবতীকে নানামতে বুঝাইলেন ;-দুর্গাবতী কিছু তেই রণেভঙ্গ দিয়া পলায়নে স্বীকৃত হইলেন না। অবশেষে যখন দেখিলেন শত্রুগণ তাহার নিকটবর্তী হইয়াছে, তিনি অচিরে বিধর্মী যবন করে বন্দিনী হইবেন, তখন অধর সিংহের হস্ত হইতে বলপূর্বক তরবার লইয়া অম্লান- বদনে স্বীয় বক্ষঃস্থলে প্রবেশ করাইয়া দিলেন। আহত স্থান হইতে অনর্গলভাবে শােণিত প্রবাহিত হইতে লাগিল ;-দেখিতে দেখিতে বীর- বালার কমনীয় কান্তি মলিন হইল,“প্রাণপাখী দেহপিঞ্জর ছাড়িয়া পলায়ন কবিল। ছয়জন হিন্দু সৈনিক দুর্গাবতীর এরূপ স্বদেশানুরাগ দর্শনে প্রবল আৰ্য-কাহিনী। বিক্রমের সহিত শত্রু সৈন্যের মধ্যে প্রবেশ করিয়া, বহুসংখ্যক যবনের শােণিতে রণস্থল কর্দমিত করিয়া স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য অনন্ত নিদ্রায় নিদ্রিত হইল। আজ গড় রাজ্যের সৌন্দৰ্য্য বিলুপ্ত হইয়াছে। কিন্তু বীর মহিলা স্বদেশসেবিকা রাণী দুর্গাবতীর গৌরব বিলুপ্ত হইবার নহে। যতদিন ইতিহাস আছে,যতদিন “জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপিগরীয়সী” এই মধুর বাক্য স্বাধীনতানুরাগীর ধমনীতে শােণিতের ন্যায় প্রবাহিত হইবে, ততদিন দুর্গাবতীর নাম, কীৰ্ত্তি ও গৌরব লােপ হইবে না। কে বলে দুর্গাবতীর মৃত্যু হইয়াছে? ঐ দেখ তাহার কীৰ্ত্তিজা, তাহার প্রভূত পরাক্রম, তাঁহার অলৌকিক সাহস, অনির্বচনীয় গৌরব তাহাকে পবিত্র আৰ্য সমাজে অমর করিয়া রাখিয়াছে। লক্ষীবাই। । যে অসামান্যা মহিমাময়ী বীরাঙ্গনার নাম প্রবন্ধের শিরােভাগে লিখিত হইল। অতি যত্নের সহিত ইহার বৃত্তান্ত সঙ্কলন করিলে যতদূর পরিচয় প্রদান করা হইবে, প্রবন্ধের শিরােভাগস্থ সুধু নামটাই তাহার অপেক্ষা অধিক পরিচয় দিতে সমর্থ। লক্ষ্মীবাই উনবিংশ শতাব্দীর প্রকৃত বীররমণী। ইহার হৃদয় জয়ার সাগর, উৎসাহ অধ্যবসায় ও বীরত্বের আকর স্বরূপ। ইনি ব্রিটিশ সৈন্যের সম্মুখে স্যারহিউবােজ সেনাপতির প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে যে অসামান্য বীরত্ব প্রকাশ করিয়াগিয়াছেন তাহা স্মরণ করিলে এখনও বিয়ে হৃদয় লক্ষ্মীবাই। পাঠক! লক্ষ্মীবাই কে ? কি জন্য তিনি কোমল অঙ্গে লৌহ বৰ্ম পরিধান করিয়া মহাশক্তিরূপে ব্রিটিশ সেনাগণের প্রতিকূলে অস্ত্রধারণ করেন তাহাই লিখিতেছি। ভারতবর্ষের মধ্যস্থলে বুন্দেলখণ্ড নামক পৰ্বতপূর্ণ স্থানে ঝাসি নামক একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের অবস্থিতি দেখা যায়। বস্তুতঃ ঝাঁসি প্রকৃতির অতি প্রিয় স্থান। উহার কোন স্থানে উন্নত পৰ্বত, কোন স্থানে ক্ষুদ্র নিরিণ, কোনস্থানে সরসী, কোন স্থানে বা হরিবর্ণ বৃক্ষাদি সুশশাভিত হইয়া মনােরম শােভ বিকাশ করিতেছে। এই ক্ষুদ্র রাজ্যের পরিমাণ ফল প্রায় দেড় সহস্র বর্গ মাইল ; ঋসি মহারাষ্ট্রীয়দিগের দ্বারা শাসিত হইত। কিন্তু ১৮৫৩ : উহা ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টের শাসনাধীন হয়। যাহার সময় ঝলি ইংরেজ গবর্ণমেন্টের অধীনে আইসে, সেই হতভাগ্য মহারামের নাম গঙ্গাধর রাও। ইনি ১৮৩৮ অব্দে ঝাসির শাসন দণ্ড গ্রহণ করেন। তেজস্বিনী বীরাঙ্গনা লক্ষ্মীবাই ইহারই মহিষী। কিন্তু রাজ্যাধিৰােহণের যােড় বর্ষ মধ্যেই নিঃসন্তান গঙ্গাধর রাও করাল কবলে পতিত হন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি যথানিয়মে একটি দত্তক পুত্র গ্রহণ করিয়া ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টকে একখানি পত্র লিখেন, তাহার মর্ম এইরূপ ছিল। আমি ক্রমে ক্রমেই অতিশয় অসুস্থ হইয়া পড়িতেছি, বােধ হয় সত্বরই কাল সদনে গমন করিব। সুতরাং আমার পূর্ব পুরুষগণের নাম ও আমার বংশলােপ হইবে ইহা ভাবিয়া বড়ই মর্মাহত হইয়াছি, এই জন্যই ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টের সহিত আমার যে সন্ধি হয়, তাহার দ্বিতীয়ধারা অনুসারে আনন্দ রাও নামক আমার একটি নৈকট্য আত্মীয়কে পােষ্যপুত্ররূপে গ্রহণ করিয়াছি। দৈবানুগ্রহে যদি আমি পীড়া হইতে নিষ্কৃতি লাভ করি এবং আমি যেরূপ তরুণ বয়স্ক তাহাতে যদি কোন পুত্র সন্তান জন্মে তবে যথা বিহিত কাৰ্য্য করিব। আর যদি আমি জীবিত না থাকি তবে আমার বিশ্বস্ততার অনুরােধে যেন ব্রিটিশ গবর্ণমেন্ট এই বালক এবং তদীয় জননীকে আৰ্য-কাহিনী। ; আজীবন সমস্ত বিষয়ের সত্বাধিকারিণী রাখেন। তাহাদের প্রতি কখনও যেন কোন প্রকার অসৎ ব্যবহার প্রদর্শন করা না হয়।” এই সময় লর্ড ডালহৌসি ভারতবর্ষের প্রধানতম রাজপদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি গঙ্গাধর রাওয়ের জীবনের এই শেষ অনুরােধ রক্ষা করিতে সমর্থ হইলেন না। যাহার শাসন প্রভাবে পঞ্জাবে ব্রিটিশ পতাকা উড্ডীন হয়, নাগপুর, অযযাধ্যা, মিবার কোম্পানীর অধিকার ভুক্ত হয়, সেতারা রাজ্যে মহারাষ্ট্রীয়দের আধিপত্য লােপ হয়, অধুনা ঝাঁসির বিচার ভার তাহারই উপর আসিল। সুবিচারক ডালহৌসি অবসর বুঝিয়া ঝাসি গ্রহণ করিবার সংকল্প করিলেন। আশাও ফলবতী হইল। অচিরে ঝাঁসি মহারাষ্ট্রীয়দিগের অধিকার চ্যুত হইয়া ব্রিটিশ গবর্ণমেন্টের অধীন হইল। ইহাতে লক্ষ্মীবাই হৃদয়ে বড়ই আঘাত পাইলেন; কিন্তু এই মর্ম জালা অমনি তিরােহিত হইল না, তিনি স্বীয় অধিকৃত স্থান রক্ষা করিবার জন্য যথা সাধ্য প্রয়াস পাইলেন। তদীয় স্বামী যে বরাবর ইংরেজের সহিত বিশ্বস্তভাবে মিত্ররূপে ব্যবহার করিয়া আসিয়াছেন এবং সন্ধিপত্রে যে দত্তক পুত্র গ্রহণের সম্পূর্ণ অধিকার আছে, আরও তাহারা যে সম্পূর্ণরূপে ন্যায় বিচার পাইতে পারেন একথা পুনরায় ব্রিটিশ গবর্ণ- মেণ্টকে অবগত করাইলেন। কিন্তু তাঁহার প্রার্থনা উপেক্ষিত হইল। গবর্ণমেন্ট লক্ষ্মীবাইয়ের কথায় কর্ণপাত করিলেন না। এই অবমাননার জন্য লক্ষ্মীবাই সাতিশয় দুঃখিত ও মর্মদাহে নিপিড়ীতা ও উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন। তাঁহার এই প্রদীপ্ত হুতাশন অচিরে নির্বাপিত হইল না, ক্রোধাগ্নি শিরায় শিরায় প্রজ্জ্বলিত হইয়া উঠিল, তিনি ক্রুদ্ধ হৃদয়ে এই অবমাননার প্রতিশােধ দিবার জন্য উপায় অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। ১৮৫৭ খৃঃ যখন ইংরাজের সহিত সিপাহীগণের ভয়ঙ্কর বিদ্রোহিতা উপস্থিত হয় তখন কানপুর, লক্ষ্মৌ, দিল্লী এবং ইহাব সঙ্গে সঙ্গে বুন্দেলখণ্ডও লক্ষ্মীবাই। তরঙ্গায়িত হইয়া উঠে, এই সময় লক্ষ্মীবাই উপযুক্ত অবসর বুঝিয়া আপনার প্রণষ্ট গৌরব উদ্ধার করিবার জন্য সমুৎসুক হইলেন ; কামিনীর কমনীয় বেশ পরিত্যাগ করিয়া কঠিন বৰ্ম্মে বিভূষিতা হইয়া যােদ্ধ বেশে সমর সাগরে ঝম্প প্রদান করিলেন। তাঁহার সুখ-দুঃখভাগিনী ভগিনী সাহায্য করিবার জন্য সহকারিণী হইলেন। লক্ষ্মীবাই বীরবেশে তুরঙ্গ পৃষ্ঠে আবােহন করিয়া আপনার মারহাট্টা সৈন্য দিগকে উৎসাহিত ও পরিচালিত করিলেন, ব্রিটিশ সেনার সহিত তাহার ভীষণ আহব আরম্ভ হইল। কিন্তু লক্ষ্মীবাই যুদ্ধে কিছুমাত্র কাতরতা দেখাইলেন না। কয়েক মাস তিনি অসীম সাহসে অমিত তেজে ইংরেজ সেনার সহিত যুদ্ধ করেন, সুদক্ষ ব্রিটিশ সেনাপতি স্যার হিউনােজ তেজস্বিনী বীরাঙ্গনা লক্ষ্মীবাইয়ের পরাক্রমে ও অদ্ভুত রণকৌশলে বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইলেন। প্রথম যুদ্ধে লক্ষ্মীবাই ইংরেজ সেনাদিগকে ইতস্ততঃ ছিন্ন ভিন্ন করিয়া দিয়াছিলেন। অবশেষে তঁাহার বহুসৈন্য নষ্ট হইয়াছিল ; তাহাতেও লক্ষ্মীবাইয়ের তেজস্বীতার কিঞ্চিত্র হ্রাস হয় নাই তিনি পুনরায় কাক্সি নগরে ইংরেজ সেনাদিগের সহিত যুদ্ধ করেন কিন্তু অবশেষে কাল্পি ইংবেজ- দিগের হস্তগত হয়। লক্ষ্মীবাই ইহাতে ভগ্নমনােরথ হইলেন না। তিনি মুহুর্তের জন্যও কৰ্ত্তব্যকাৰ্য্য সাধনে বিমুখ হইলেন না। যে অবমাননার তীব্র দংশনে হৃদয় জ্বলিতেছিল, তাহাই স্মরণ করিয়া কৰ্তব্য পথ হইতে বিচলিত ১৮৫৮ অব্দের ১৭ই জুন তিনি পুনরায় গােবালিয়রের নিকট ইংরেজ সৈন্যের সহিত যুদ্ধ করেন কিন্তু এই যুদ্ধেই বীরবালা লক্ষ্মীবাইয়ের পুত্রের জীবনশ্রেতি চিরকালের জন্য অনন্তস্রোতে মিশিয়া যায়। এই ভীষণ সমরে লক্ষ্মীবাই এবং তদীয় ভগিনী মহারাষ্ট্র সৈনিকের অগ্রভাগে থাকিয়া যুদ্ধ করিতে ছিলেন ; যুদ্ধাবসানে যখন উভয়ে প্রত্যা- হইলেন না।
১০ আৰ্য-কাহিনী গমন করিতে ছিলেন তখন বিপক্ষীয় তুরুকসােয়ারের অস্ত্রাঘাতে উভয়ের জীবন অনন্তকালের জন্য বিলীন হইয়া যায়। অবিলম্বে চিতা প্রজ্জ্বলিত হইলে দুই দেহ তাহাতে অর্পিত হইল। দেখিতে দেখিতে বীর- বালার কমনীয় দেহ সৰ্বভু গ্রাস করিয়া ফেলিল। সৌন্দৰ্য্য লাবণ্য পবিত্রতা, উদ্যম, অধ্যবসায় সকলই অনলের সঙ্গে সঙ্গে নিৰ্বাপিত হইয়া গেল। কিন্তু বীরবালার চির কীৰ্ত্তি কখনই লােপ হইবার নহে। কে মনে করিয়াছিল নিগৃহীত নিপীড়িত ভারতে আর কোমলাঙ্গিনী যুব, " এর :সংহারিণী দুর্গারূপে আবির্ভূত হইবে? লক্ষ্মীবাই রমণী হইয়াও যে প্রবল বিক্রমে আততায়ী সৈন্যগণের সহিত যুদ্ধ করিয়াছেন, তাহা অতুলনীয়। এমন কি তাহা স্মরণ করিলে তাহাকে অলৌকিক শক্তিসম্পন্না দেবী বলিয়া নমস্কার করিতে ইচ্ছা হয় । জহুরুবাই। আজ ১৫৮৯ অব্দের ১২ই জ্যৈষ্ঠ, বাহাদুর লৈচাক্ষেত্রে বিক্রমজিৎকে পরাজি, করিয়া অগণ্য মােগল-চম্ সমভিব্যাহারে চিতাের নগরে উপস্থিত হইয়াছেন। চিতােরের সঙ্কটকাল উপস্থিত, এ ঘাের দুর্দিনে কে চিতাের পুরী রক্ষা করিবে?—শিশােদীয় কুলের মানসম্ভ্রম রক্ষা করিতে কে সমর্থ হইবে? যে কতিপয় বীর স্বদেশপ্রেমিকতার মহামন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া “স্বর্গাদপি গরিয়সী” জন্মভূমিকে শত্রু হও হইতে উদ্ধার করিবার জন্য জবহরবাই। অস্ত্রধারণ করিয়াছেন,-তাহ মােগল অনীকিনীর তুলনায় মুষ্টিমেয়, সমস্ত সমুদ্রের তুলনায় কয়েকটী জলবুদ্ধদ। তথাপি রাজপুতবীরগণ ভীত হইলেন না। সহস্র সহস্র জন্তুক দর্শনে কখন কি কেশরীশাবক ভীত হইয়া পলায়ন করে ? রাজা, ৩৭ গবান এক শিঙ্গের নামে শপথ করিয়া প্রাণপণে যুদ্ধ করিতে কৃত ১ ল্প হইলেন এবং প্রচণ্ড গগন বিদারী তৃৰ্যনিনাদে যুদ্ধ ঘোষণা ক.িয়া শত্রু কুলের বিক্রমবহ্নি সন্ধুক্ষিত করিয়া দিলেন। বিজয়ী বাহাদুর বিপক্ষীয় রণ তৃৰ্য্যধ্বনি শ্রবণে স্বীয় কালান্তক সদৃশ কামান সমূহে অগ্নিসংযোেগ করিলেন। কামান সহ বজ্রনিনাদে গর্জিয়া উঠিল, আজ চিতোরের প্রলয় কাল উপস্থিত। প্রকৃতি স্তম্ভিত ;—যেন চিতােরের ভাগ্য লিপি স্মরণ করিয়া ভয়ে ভীত হইলেন। প্রভঞ্জন বহিতেছে না, গাছ নড়িতেছে না, পাতা দুলিতেছে , সকলি নবব, সকলি নিস্তব্ধ । প্রলয় কালেব পূৰ্ব্বে পৃথিবী যেরূপ ধারণ করে আজ চিতাের সেই রূপেই অবস্থিত। কে জানে চিতােরের ভাগ্যে কি আছে ? রাজপুতগণ প্রবল উৎসাহে প্রােৎসাহিত হইয়া সিংহনাদ করিয়া উঠিলেন। এবং শাণিত শর নিক্ষেপদব। বিপক্ষীয় জ্বলন্ত গোলা সমূহকে বাধা দিতে লাগিলেন। দুই একটা লক্ষ্য ব্যর্থ অবশেষে ষষনগণের আগ্নেয় অস্ত্র পুনৰ্ব্বার রাজপুতদিগের বিরুদ্ধে ধাবিত হইল, কামানােগীৰ্ণ নিবিড় ধূমরাশিতে যুদ্ধক্ষেত্র ডুবিয়া গেল। দিবাকর আর প্রখর কর বিতরণে সমর্থ হইলেন না । সংগ্রাম ক্ষেত্র মুহুর্তের জন্য অন্ধকারে প্লাবিত হইয়া গেল। কিছুই নয়ন- গােচর হইল না। অন্ধকার—নিবিড়তর অন্ধকার। যাবৎ হিন্দু মুসলমানে ঘােরতর যুদ্ধ হইল। উভয় পক্ষীয় অসংখ্য অনাকিনী রণশয্যায় শয়ন করিল। তথাপি বাহাদুরে জুয়াশা ফলবতী হইল না। কিছুতেই তিনি চিতোের হস্তত করিতে সমর্থ হইলেন না। হইল। এইরূপ বহুক্ষণ আৰ্য-কাহিনী। অবশেষে সুচতুর লাখি* কৌশল জাল বিস্তার করতঃ বিকা গিরির নিম্ন তলে একটী বৃহৎ সুরঙ্গ খনন করিয়া তাহাতে বারুদ পুর্ণ করিয়া অগ্নি সংযােগ করিল। ভীষণ অশনি নিনাদে বারুদ সমূহ জ্বলিয়া উঠিল। সেই সঙ্গে সঙ্গে দুর্গের ৪৫ হস্ত পরিমিত ভূমি একেবারে উড়িয়া গেল। তথায় হার রাজ কুমার বীর অর্জুনরাও আপনার পঞ্চশত সৈনিক সহকারে যুদ্ধ করিতে ছিলেন। তিনিও দুর্গের সদলে নিপাতিত হইলেন। চিতাের দুর্গের এক অংশ ভাঙ্গিয়া গেল, শক্রসেনা সেই বন্ধু, পথ দিয়া দুর্গের মধ্যে প্রবেশ করিবার উদ্দেশে প্রবলবেগে ধাবিত হইল। কিন্তু চিতােরপুরী কি বীরশূন্য! বীরপ্রস্থ মিবার ভূমি কি অনুৰ্ব্বরা ! এখনও করাল কাল সদৃশ কতিপয় বীর চিতাের পুরীতে জীবিত আছেন। তবে কি তাহারা প্রাণাদপি গরীয়সী জন্মভূমিকে স্নেচ্ছের করে সমৰ্পণ করিবেন ? -কখনই না। যদি দেহে প্রাণ থাকে ;-ধমনীতে ধমনীতে রক্তস্রোত প্রবাহিত হয় তাহা হইলে রাজপুতবীর কখনও কি মাতৃভূমিকে শত্রু হস্তে প্রদান করিয়া নীরবে থাকিতে পারেন ?—পাঠক! ঐ দেখ, এই অসময়ে বীরবর দুর্গারাও, সত্যু ও দদু নামক চন্দাবৎ বীরদ্বয় এবং কতিপয় মাত্র সামন্ত ও সৈনিক সমভিব্যাহারে রন্ধ, সম্মুখে—অটল-অচল দুর্ভেদ্যপ্রস্তর সম, হিমালয়ের ন্যায় স্থিরভাবে দণ্ডায়মান হইয়াছেন। ইহাদের প্রবল বিক্রম রােধ করিতে কে সমর্থ হইবে ? ভীম পরাক্রমে যবন সৈন্য দলে দলে সেই দিকে ধাবিত হইল। রাজপুত বীরদ্বয়ের প্রবল পরাক্রমে অসংখ্য যবনসৈন্য নিপতিত হইতে লাগিল। কিন্তু বারিপিতুল্য অসংখ্য মােগল সেনার সহিত কতিপয় রাজপুত কতক্ষণ যুঝিতে সমর্থ হইবেন? অচিরেই তাহাদের জীবন প্রদীপ নিৰ্বাপিত একজন ইউরোপীয় গোলন্দাজ। ভট্টগণ ইহাকে “লাব্ৰিখা” নামে উল্লেখ করিয়াছেন। ইনি এই ভয়াবহ সময়ে বাহাদুরের সাহায্যার্থে আগমন করিয়াছিলেন ।
জহরুবাই। হইয়া গেল। রণােন্মত্ত যবনসেনা আনন্দে সিংহনাদ করিতে করিতে রন্ধের নিকটবর্তী হইতে লাগিল। অবশেষে সন্মুখে দেখিতে পাইল, আলুলায়িতকেশা যােদ্ধবেশ-পরিহিতা ভীমরূপিণী এক রমণী রণতুরঙ্গে, আরােহণ করতঃ হন্তে ভীষণ ভল্ল লইয়া রন্ধে র পুরােভাগে দণ্ডায়মান। আজ যেন ম্লেচ্ছরূপী অসুর সংহারে রাজপুত রমণী মহামায়া রূপে আবির্ভতা। মুহূর্তের জন্য মােগলসেনাগণের আনন্দধ্বনী রণক্ষেত্রে লয় পাইল,-হর্ষোৎফুলবদন নিষাদে মগ্ন হইল। সকলেই স্তম্ভিত সকলেই বিস্মিত। শনৈঃ শনৈঃ মােগলসেনা অগ্রগামী হইতে লাগিল বটে, কিন্তু বীরনারীর ভল্লের দারুণ প্রহারে অনেক যবনবীর প্রাণত্যগ করিল। অদূরে বাহাদুর গজারূঢ় থাকিয়া বীরনারীর অদ্ভুত বীরত্ব পৰ্যবেক্ষণ করিতেছিলেন। মহাশক্তির শক্তি ব্যর্থ হইল। অসংখ্য মােগল সেনার সহিত কতিপয় মাত্র সৈন্য সহকারে বীরনারী কতক্ষণ যুঝিতে সমর্থ হইবেন? অবশেষে তিনি অনন্যোপায় হইয়া প্রবল বিক্রমে যন সেনাগণের মধ্যে জীবন ত্যাগ করিলেন। পাঠক ! যে রাজপুত রমণী যােদ্ধবেশে তুরঙ্গারােহনে মহাশক্তিরূপে যবন সৈন্য বিনাশ করতঃ অদ্ভূত রণাভিনয় দেখাইয়া সকলকে বিস্মিত করিয়াছেন ইহাকে কি চিনেন ?—ইনি রাঠোরকুল সম্ভতা শিশোদীয় রাজ মহিষী বীরনারী জবহর বাই। চিতােরের বীরপুরুষ ও বীরনারীগণ সকলেই রণশয্যায় শয়ান ; দুর্ধর্ষ যবনগণ এখনই চিতােরে প্রবেশ করিবে ; তবে উপায় কি ? রাজপুত রমণীগণ কি যবনের ক্রিয়াপুতুল হইবে ?—তাহা অসম্ভব। দুর্গের একপার্শ্বে চিতা সজ্জিত হইলে, তন্মধ্যে অগ্নি প্রদান করা হইল। বিভাবসু আপন ক্ষমতা বিকাশ করিলেন। দেখিতে দেখিতে রাণী কর্ণাবতীও সহস্র সহস্র রাজপুত ললনা করুণ হৃদয়ভেদী শােক সঙ্গীতে সংসার কঁাদাইয়া অনলে ঝম্প প্রদান করিলেন। রূপ, লাবণ্য যৌবন, আৰ্য-কাহিনী। সরলতা, বীরত্ব, সহিষ্ণুতা, সতীত্ব সকলই জীবনের সঙ্গে সঙ্গে তিরােহিত হইয়া গেল। মধ্যভারতের যবননৃপতিগণ যতবার চিতাের আক্রমণ করিয়াছেন তন্মধ্যে এইটীই ভীষণতম। এই ভয়ঙ্কর সময়ে দ্বাত্রিংশত রাজপুত সমরক্ষেত্রে নিহত হন। এতদিনে বাহাদুরের অশি। ফলবতী হইল ;---- অসংখ্য রাজপুত নারীর হৃদয় শােণিতে তাহার বহুকালের চিবপােষিত অাশার পরিতৰ্পণ হইল তিনি চিতাের মধ্যে প্রবেশ করিয়া কি দেখিলেন ? দেখিলেন পথে পা নাই,—বিপণিতে ক্রেতা নাই, গছে লােক নাই। লােকালয় শৃগাল কুকুবের লীলানিকেতনা-চিতাের শ্মশান। ওহহ! এ দৃশ্য কি ভীষণ ? কি হৃদয়বিদাবক। কর্ম-দেবী। ভারতবর্ষের মানচিত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে রাজপুতানা প্রদেশের মধ্যে যশলমীর নামক এক জনপদ দৃষ্ট হয়। উহার অনুপাতী পূগল নাম ভূখণ্ডে রণদেব নামক জনৈক ভটি সর্দার ‘মাধিপত্য করিতেন। রণঙ্গদেবের সাধু নামক একটী বীৰ্য্যবান ও তেজস্বী পুত্র ছিল। ইহার বীরত্বে ও তেজস্বীতায় সকলেই মস্তক অবনত করিত। ইনি বিস্তৃত মরুভূমি হইতে সিন্ধুনদের তট পৰ্য্যন্ত আপন আধিপত্য বদ্ধমূল রাখিয়া ছিলেন। মরুভূমিস্থ সকলেই ইহাকে করাল কালের ন্যায় ভয় করিত। একদা সাধু কোন নগর হইতে কতকগুলি ঘােটক ও উষ্ট্র জয় করিয়া সানন্দ অন্তরে মােহিল দিকের রাজধানী ঔরিন্ত নগরের প্রান্ত ভাগ দিয়া স্বীর নগরে প্রতিগমন করিতেছেন, এমন সময়ে মােহিলরাজ বাণিকরাও সাদরে তাঁহাকে সম্ভাষণ করিয়া পাঠাইলেন। সাধু তাহার নিমন্ত্রণ কৰ্ম্মদেবী। গ্রহণ করিয়া যথাকালে তদীয় ভবনে উপস্থিত হইলেন। আহারাদি কাৰ্য্য সম্পাদিত হইল। এদিকে মাণিকরাও সাধুর বীরত্বসূচক নানাবিধ গল্প শুনিয়া কখন বিস্মিত, কখন স্তম্ভিত কখন বা আনন্দিত হইতে লাগিলেন। কিন্তু সেই সমস্ত বীরত্ব কাহিনী অপর একটি লাবণ্যবতী বালিকার কর্ণগােচর হইল।-এ লাবণ্যময়ী যুবতী কে?--ইনি মােহিল- রাজ মাণিকরাওয়ের দুহিতা-কৰ্ম্মদেবী। মুরাধিপ রাও চণ্ডের চতুর্থ তনয় অরণ্যকমলের সহিত ইহার বিবাহ সম্বন্ধ স্থির হইয়াছিল ; কিন্তু কৰ্ম্মদেবীর সে বিবাহ সম্বন্ধে আবদ্ধ হইতে অভিপ্রায় ছিল না। তিনি পূৰ্বেই সাধুৰ অসীম বীরত্ব শুনিয়া তাহাকে আত্মসমর্পণ করিয়া ছিলেন, কিন্তু আজ সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির বৃত্তান্ত স্বকর্ণে শুনিয়া তদীয় মনােগত ভাব প্রকাশ না করিয়া থাকিতে পারিলেন না। সহচরীগণ তাহার মন ফিরাইতে অনেক চেষ্টা কৰিলেন, অনেক বুঝাইলেন কিন্তু কৰ্ম্মদেবী ৩াহাতে দৃপাত না করিয়া বলিলেন “তুচ্ছ রাজসিংহাসন লইয়া কি হইবে ? উচ্চ রাঠোর কুলের পুত্রবধূ হইয়া কি করিব?—আমি যাহাকে প্রাণ, মন সমর্পণ করিয়াছি তাহার দাসী হইয়া থাকিব তথাপি অপরের মহিষী হইতে যাইব না।” ক্রমে এ কথা মাণিক রাওয়ের কর্ণগােচর উইল ; তিনি বিষাদ, ভয় ও ক্ষোভে যুগপৎ ব্যাকুলিত হইয়া উঠিলেন। এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিলে যে মােহিল কুল নিৰ্ম্মল হইবার সম্ভব,অৰণ্যকমলের ক্রোধবেগ কোন ক্রমেই প্রকৃতিস্থ হইবে না, তাই ভাবিয়া আজ নাণিক রাও বিচলিত হইলেন। কৰ্ম্মদেবীকে নানামতে বুঝাইলেন, কিন্তু বীরবালা তাহাতে দৃকপাতও করিলেন না। অবশেষে মাণিকরাও এ বিপদ বার্তা সাধুকে অবগত করাইলেন ; তেজীয়ান সাধু এ আশঙ্কায় ভীত হইলেন না। তিনি বলিলেন “যদি নাবিকেল ফল যথা বিধানে স্কুলে প্রেরিত হয় তাহা আৰ্য কাহিনী। হইলে আমি আপনার দুহিতাকে বিবাহ করি।” অল্পকাল মধ্যে বিবাহ সম্বন্ধ সূচক নারিকেল ফল পূগলে প্রেরিত হইল, এবং ঔরী নগরে যথাবিধানে সাধুর পরিণয় কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়া গেল। নব বিবাহিতা বধূ, বহুমূল্য মণি রত্নাদি, বিবিধ সুবর্ণ, রজত পাত্রে একটি সুবর্ণ নিৰ্ম্মিত বৃষ মূর্তি এবং এয়ােদশটি রাজপুত রমণী সহ সাধু ঔরী নগর হইতে প্রস্থানােত হইলেন। তিনি মাণিক রাওয়ের আগ্রহাতিশয় প্রযুক্ত মাত্র সাত শত ভটি সেনা এবং ৫০ জন মােহিল সৈন্য মাত্র সঙ্গে লইয়াছিলেন। কৰ্ম্মদেবীর ভ্রাতা মেঘরাজ এই সৈন্যের অধি- নায়ক পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। এই পরিণয় বার্তা অরণ্যকমলের কর্ণগােচর হইল, তিনি দারুণ ক্রোধ ও জিঘাংসায় উন্মত্ত হইয়া উঠিলেন এবং চারি সহ রাঠোর সৈন্য লইয়া সাধুর বিরুদ্ধে গমন করিলেন। সাধু যখন ঔরিন্ত নগর হইতে গমন কালীন শ্রম শ্রান্তি মানসে চন্দন নামক স্থানে বিশ্রাম করিতে ছিলেন সেই সময় রােমােন্মত্ত রাঠোর সৈন্য সমভিব্যাহারে অরণ্যকমল তথায় উপস্থিত হইলেন। সাহসী সাধু চাহিয়া দেখিলেন বহুসংখ্যক সৈন্য তাহার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান। যদিও প্রতিদ্বন্দী সৈন্য তাহার সৈন্যাপেক্ষা চারিগুণ অধিক, তথাপি তিনি ভীত হইয়া পলায়ন করিতে চেষ্টা করিলেন না। উভয় পক্ষে ভয়ানক রণ বাধিল। বিভীষণ কৃপাণ পরস্পরের বিরুদ্ধে উখিত হইল। পরস্পর সংঘর্ষণে অনর্গল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হইতে লাগিল। দলযুদ্ধ সাধু বা অরণ্যকমলের অভিপ্রেত ছিল না সুতরাং অনর্থক সেনাবল অপচয় করা অপেক্ষা দ্বন্দযুদ্ধ করিবার মনস্থ করিলেন। কৰ্ম্ম- দেবী অদূরে রথােপরি আরূঢ় থাকিয়া ভীষণ আহব দর্শন করিতে ছিলেন, সাধু এবার শেষ বিদায় প্রার্থনা করিবার জন্য কৰ্ম্মদেবীর সমীপে উপস্থিত হইলেন।
“কৰ্ম্মদেবী ।- ১৭ কী দেবী ধীর ও গম্ভীর স্বরে উত্তর করিলেন,মে, আপনি কাতরে মুদ্ধে লিপ্ত হউন আমি এখানে থাকিয়া আপনার যুদ্ধ নৈপুন্য দর্শন করি। ঈশ্বর না করুন, যদি দৈব দুর্বিপাকে সমর ক্ষেত্রে পতিত হন আমি পর- লােকে গমন কয়িয়া আপনার আদ্ধাঙ্গিনী, হইব। বীরবালার, তেজস্বিনী বাক্যে সাধু দ্বিগুণ উৎসাহে বিপক্ষীয় সৈন্যের উপর পতিত হইলেন। তাহার শাণিত শূল প্রহারে অসংখ্য সৈন্য হত ও আহত হইল; অবশেষে রাঠোররাজকুমার অরণ্যকমলের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। উভয়ে, পর- পর নিকটবর্তী হইয়া সদাচারে ক্ষণকাল মাত্র ব্যয়িত করিলেন। পর ক্ষণেই সাধু তাহার প্রতিদ্বন্দীর মস্তক লক্ষ্য করিয়া শাণিত তরবার প্রহর করিলেন, অরণ্যকমল তৎক্ষণাৎ তাহার প্রতিরােধ করিয়া পুনরায়, সাধুরু মন্তকে আঘাত করিলেন, তন্মুহুর্তেই বজভগ্ন দুইটী মেরু শৃঙ্গের ন্যায় উভয় বীরভূতলে পতিত হইলেন। অরণ্যকমল মূৰ্জিত হইয়া পড়িয়াছিলেন সুতরাং অচিরে তাহার মূচ্ছ। অপনীত হইল। কিন্তু ভাবীর সাধু আর পুনৰ্বার উখিত হইলেন না। তার জীবন-প্রদীপ চিরকালের জন্য অস্তমিত হইয়া গেল। হায়! আজ ১৪৭ খৃঃ মরুভূমির ভীষণ প্রান্তরে পতিপ্রাণ। কৰ্ম্মদেবীর আশাভরসা সকলই নির্ধাপিত হইয়া গেল। কর্ম- দেবীর সেই সারল্য লাবণ্যময়ী, সুকুমারী হাস্যময়ী মূর্তি আজ স্নান ;- সুখের তরুণ তপন উদয় না হইতেই কাল মেঘের আবির্ভাব,-কোমল কোরক প্রস্ফুটিত না হইতেই কীট দংশনে পতিত। কোথায় পতির সােহাগিনী হইয়া আনন্দে মাতােয়ারা হইবেন না, তবিনিময়ে আজ পতি বিরহে ম্লান হইয়াছেন। তাহার সেই লাবণ্য, সেই চারুতা কিছুই নাই। কিন্তু তিনি বীর নারী—তাহাতে কিছু মাত্র দুঃখিত হইলেন না, অচিয়ে দারুণহৃদয় জালা নির্বাপনের জন্য উপযুক্ত আয়ােজন করিতে তৎপর হইলেন। লােকে যাইয়া পতি প্রেমে মগ্ন হইবার জন্য আত্মােৎসর্গ করিলেন। ;
আৰ্য-কাহিনী। অচিয়ে যুদ্ধলে এক চিত। প্রজ্বলিত হইল। মােহিল রাজকুমারী একখানি শাণিত তরবারি প্রার্থনা করিলেন। অচিরে আদেশ প্রতি পালিত হইল। তরবারি প্রদত্ত হইলে তারা অমনি চিত্তে ফৰ্ম্মদেব আপনার একখানি বাহু ছেদন করিয়া জনৈক সৈন্যের হস্তে অৰ্পণ করিয়া বলিলেন ইহা যেন আমার প্রিয়তমের পিতাকে দিয়া বলা হয় যে তাহার পুত্রবধু এইরূপ ছিলেন।” তদনন্তর অপর হন্ত বিস্তৃত করিয়া নিকটস্থ জনৈক সৈনিককে দেশ করিলেন, “ইহা এখনই কর্তন কর।” আদেশ প্রতিপালিত হইল, গর্শকগণ শােকে বিস্ময়ে অভিভূত হইলেন কিন্তু কৰ্ম্মদেবীর জ্যোতির্ময়ী মূর্তির কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য দেখিতে পাওয়া গেল । তিনি ধীর ও গম্ভীর স্বত্রে সেই ছিন্নবাহু মােহিল কুলের ভট্ট কবিকে প্রদান করিতে আদেশ করিয়া, পতির মৃতদেহের সহিত লন্ত চিতায় আরােহণ করিলেন। দেখিতে দেখিতে বীরবালার কমনীয় কান্তি ভঙ্গে বিলিন হইয়া গেল। কৰ্ম্মদেবীর আদেশানুসারে তাহার ছিন্ন বাহু যথা স্থানে প্রেরিত হইল। পৃগলের বৃদ্ধ রাজা রণ দেব সেই বাহু দগ্ধ করিয়া তথায় একটি সরোবর খনন করতঃ তাহাকে প্রতিষ্ঠা করেন। জিও সেই সরোবর কৰ্ম্মদেশীয় সরােবর নামে অভিহিত হইয়া বীর বাশার বীর কাহিনী অক্ষর ও অমরত্ব ঘােষণা করিতেছে।
বীরধাত্রী পান্না। রাজপুত কুল গৌরব পরাক্রান্ত বীরশ্রেষ্ঠ সংগ্রাম সিংহ জীবনলীলা শেষ করিয়া ইহকালের জন্য মিবার ভূমি হইতে বিদায় লইয়াছেন। আজ মিবার ভূমি অমানিশা, গাধারে, আবৃত, মিবার আকাশে সংগ্রাম- উদয় হইয়া সহস্রধারে যে কিৱশ বিকাশ করিতেছিল। আজ বিধর্মী অনাচার যুবন শক্রর চক্রান্ত-জালে পড়িয়া সে কিরণ অস্তমিত হইল। সংগ্রাম সিংহের সুকুমায় তনয়, এক মাত্র দেহের পুলি, জীবনের আশা- লতা, মিরের ভাবী ভরসার স্থল উদয় সিংহ শত্রুর অধীন। ছয় বস- রের বাৰু বিবেচনায় অজ্ঞ, ভালমন্দ বােঝে না শত্রু মিত্র চিনে না সে আপন মনে আসিয়া খেলিয়া আহার পানে তুষ্ট হইয়া খেলিয়া বেড়াই তেছে। ওদিকে পৃথিরানের উপপত্নীর তনয় ববীর মিয়ের সিংহাসনে আৰােহণ করিয়া তাহার সুখের পথে যে কয়েকটা কষ্টক আছে তাহা উৎপাটিত করিতে অগ্রল উদয় সিংহই তাহার প্রধান কণ্টক। আজ এই কণ্টক উৎপাটনে কত সংকল্প হইয়া নবীর নিশা আগমনের অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে নিশা দেবী অন্ধকার-বাস পরিধান করিয়া ধরা ধামে অবতীর্ণ হইলেন। সকলেই আহদি সমাপন করিয়া শয্যায় আশ্রয় লইল। বৃক্ষরাজী সারাদিন হেলিয়া দুলিয়া ক্লান্ত কলেবরে স্থির ও নিশ্চলভাবে খায়মান। প্রকৃতি শান্ত ; রাজবাটীয় প্রায় সর্বত্রই নীরব। রনী গভীর, নিশিথিনী নিস্তব্ধ। উদয় সিংহ আর পানে পরিতৃপ্ত হইয়া সুকোমল শষ্যায় নিশ্চিত ভাবে নিদ্রা যাইতেছেন, ধাত্রী শ্যাপা েউপবিষ্টা থাকিয়া মৃদুল ব্যজনে দেহ শীতল করিতেছে। ক্ষণ- আর্য-কাহিনী। লাগিল। কাল পরে রাজুবাটীতে ঘাের কোলাহল উঠিল। . অবলার আর্তনাদ ও রােদন ধ্বনী রাজপুরী হইতে অনন্ত আকাশ পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হইল, ধাত্রী শিহরিয়া উঠিল। সে ভয় ব্যাকুল মনে চতুর্দিক দৃষ্টিপাত করিতে এমন সময় ক্ষৌরকার • ব্যাকুল মনে কম্পিত কলেবরে ধাত্রীকে জ্ঞাপন করিল। “সর্বনাশ উপস্থিত, বনবীর উদয় সিংহকে হত্যা করিবার জন্য আসি- তেছে।” এই কথা শ্রবণ মাত্র ছাত্রীর মুখমণ্ডল ও হইল । ধমণীস্থ রক্ত শ্রোত স্তম্ভিত হইল। কিন্তু সে বিপদে অধীর না হইয়া উদয়সিংহকে একটা চাঙ্গারির মধ্যে ভরিয়া পত্ৰ দিয়া উপরিভাগ আবৃত করত ক্ষৌর- কার হস্তে প্রদান করিয়া বলিল, “এখনই এই ঝুড়ি লইয়া তুমি এস্থান হইতে পলায়ন কর।” বিশ্বস্ত নাপিত তাহার কথায় দ্বিরুক্তি না করিয়া তদনুযায়ী কাজ করিল, সে উদয় সিংহকে লইয়া অদুরে বেরী নদীর নিভৃত তটে পলায়ন করিল। এদিকে ছাত্রী উদয় সিংহের শয্যায় নিজ তনয়কে শয়ন রাখিল। এমন সময় বনবীর নিস্কোষিত অসি হন্তে উদয় সিংহের অন্বেষণে কুটীর মধ্যে প্রবেশ করিল। ধাত্রী বনবীরের ভয়ঙ্কর মুক্তি ও 'নিষ্কোষিত অসি দেখিয়া ভয়ে বিল হইল, তাহার প্রাণ উড়িয়া গেল, সে কাষ্ঠ পুত্তলির ন্যায় দাড়াইয়া রহিল। বনবীর ধাত্রীর নিকট উদয় সিংহের কথা জিজ্ঞাসা করিলে, ধাত্রী একটি কথাও কহিতে পারিল না, সে নীরবে অধােমুখে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া স্বীয়, তনয়কে দেখাইয়া দিল। বনৰীয় উদয় সিংহ বােথে ধাত্রীপুত্রের বক্ষে তীক্ষ অসি বিদ্ধ করিয়া দিল। ধাত্রীপু { T , ক্ষৌরকার। ইহাৱা, জাজস্থানে “বারি, নামে কথিত। ইহারা জাতংশে নাপিত। কিন্তু ক্ষৌরকারের কাজ করে না। রাজ পরিবারের উচ্ছিষ্ট পরিক্ষার করিয়া থাকে। বিশেষ শিববণ বরাট প্রেসের রাজস্থানে দুষ্টব্য।
বীরবালক ও বীরনারী। ২২ এফৰায় মাত্র আর্তনাদ করিয়া চিরনিদ্ৰায় নিদ্রিত হইল। বনবীয় তাহার অভিলাষ পূর্ণ করিয়া স্থানে ফিরিয়া গেলেন। এদিকে উদয় সিংহকে হত্যা করিয়াছে বলিয়া রাজপুরী মধ্যে ক্রন্দনের ােেল উঠিল, ধাত্রী-পুত্রের দাহ কাৰ্য্য অচীয়ে সম্পন্ন হইল। ধাত্রীর হৃদয়ে যে আলাে মৃদু মৃদু জলিতেছিল, আজ তাহা নিবিয়া গেল। তাহার যে আশালতা এতদিন বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতেছিল, তাহা সমূলে উৎপাটিত হইল। সে নীরবে সজল নয়নে পুরী হইতে বহির্গত হইয়া সেই নাপিতের উদ্দেশে প্রস্থান করিলেন। । যে উচ্চহৃদয়। ধাত্রী আপন পুত্রের শােণিত বিনিময়ে রাণবংশ অনন্ত বিনাশ হইতে রক্ষা করিল ইহার নাম পান্না। পান্না রমণী কুলে জন্মগ্রহণ করিয়া যে মানবের সাধ্যাতীত কার্য সম্পন্ন করিয়াছে, তাহার উদাহরণ জগতে অতীব বিরল। কে কোথায় এত স্বার্থ ত্যাগ করিয়াছে? কাহার হৃদয় এত মহৎ ভাবপূর্ণ? কাহার, অন্তরে এত উচ্চতা বিরাজিত? পান্না, তােমার পঞ্চভৌতিক আত্মা পঞ্চভূতে মিলিয়া গিয়াছে, কিন্তু এখনও তুমি সকলের স্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। তুমি মৃত হইয়াও আজ সজীব। ইতিহাসে তোমার নাম জলন্ত অক্ষরে লিখিত রহিয়াছে, বীরধাঞ্জী পান্না। বীরবালক ও বীরনারী। ১৫৩৮ খ্রঃ যখন মােগল-কুল-তিলক আকবর চিতোর আক্রমণ করেন, সে সময় চিতােয়ের বীর পুরুষও বীরমণীগণ দেশ রক্ষার জন্য বুদ্ধ পরিকর হইয়া জন্মভূমিকে শত্রু হস্ত হইতে রক্ষা করিবার অঙ্গ প্রাণ দিতে দণ্ডায়মান।
আৰ্য-কাহিনী। আজ এক ভীষণ দিন উপস্থিত হইয়াছে। আলাহ চিতােয় আক্রমণ করিয়াছেন, আল কে চিতাের রক্ষা করিবে? রাজপুত-কুল- কলঙ্ক উদয়সিংহ প্রাণভয়ে গিরিগুহায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন; চিতাে- রের ভাগ্যে কি আছে কে বলিতে পারে? চিতাের নগরীকে অকুল সাগরে ভাসাইয়া আজ কিনা সেই বাপ,পারাওয়ের বংশােৰ সংগ্ৰামসিংহ ও হামিরের বংশধর উদয়সিংহ মােগল ভয়ে পলাইত-সিংহ শাৰক কিনা শৃগাল গর্শনে তীত। যে স্থানের অবলাগণ বিপক্ষের আক্রমণে কোমল শরীরে লৌহ বৰ্ম্ম ধারণ করতঃ রণমরে মত্ত হইয়া রণচণ্ডী বেশে অসংখ্য সৈন্য নিপাত পূৰ্ব্বক বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিতেন ; হায় ! আজ সেই ক্ষত্ৰ-বলপ্রদীপ্ত চিতাের সামান্য শক্র ভয়ে ভীত ? একি কম পরিতাপের কথা? তবে কি চিতাের আজ বীয় শূন্য হইয়াছে ?-আজ অর্গাদপি গরীয়সী’ জন্মভূমিকে রক্ষা করিতে পারে এমন বীর কি কেহই নাই ?—সকলেই কি উদয়সিংহের পক্ষানুসরণ করিবে ?-না-কেন শত্রুর বিরুদ্ধে স্বদেশ রক্ষা করতে দণ্ডায়মান হইবে না ? হার ধমণীতে বিন্দুমাত্র ও ক্ষত্রশােণিত প্রবাহিত হয় তাহারা সকলেই দেশ রক্ষার জন্য দণ্ডায়মান হইবে। ঐ দেখ মিবারের এ ঘাের দুর্দিনে, প্রবল শত্রুর আক্রমণ সময়ে, কৈলবার ও বিজোনের 'পতি, আলৌকিক সাহস পূৰ্ব্বক স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য রণবেশে কত শত অরাতি নিধন পূর্বক অক্ষয়কীর্তি স্থাপন করিয়া রণশয্যায় শয়ন করিলেন। আহা! ইহাদের কি অসীম বীরত্ব! কি স্বদেশ প্রতি! আকবর ইহাদের বীরত্বে মােহিত হইয়াছিলেন এবং নিজেও ইহাদের বীরত্ব কাহিনী হল অক্ষরে লিখিয়া গিয়াছেন। আবার ঐ দেখ জয়মর অসাধারণ সাহস সহকারে সমর ক্ষেত্রে অব- ভীর্ণ হইয়াছেন। জয়ম ভীষণ বেগে বন সৈন্তদিগকে আক্রমণ করিলেন। কিন্তু অধিক কাল অরাতি নিধনে সক্ষম হইলেন না ;
বীরবালক ও বীরনারী। অচিরেই তিনি আকবর কর্তৃক অন্যায় যুদ্ধে নিহত হইলেন। ইহা আক কর চরিত্রের একটি দুরপনেয় কলঙ্ক মাত্র। যবনগণ প্রবলবেগে দুর্গতিমুখে ধাবিত হইতে লাগিল। আজ রাণা পলাইত। এখন চিতের ভূমি রক্ষা করিবে কে?-সেনাগণ কাহার উৎসাহে উৎসাহিত হইয়া স্বদেশের জন্য প্রাণপণে রণ করিবে? আজ কি তবে চিতোরের স্বাধীনতা-পূৰ্য্য চিরকালের জন্য অস্তাচলগামী? রাজপুত সৈন্ত নেতাবিহীন হইয়া কিরাত বেষ্টিত মৃগের ন্যায় ইতস্ততঃ বিচরণ করিতেছে। ঐ দেখ একটি বালক এই সময়ে এই ঘোর দুর্দিনে রণমদে মক্ত হইয়া যবন সৈন্য নিপাত করিতেছে ! বালকের বয়স মাত্র সােড় বর্ষ,-এই অল্প বয়সে কমনীয় শরীরে লৌহ বৰ্ম পরিধান করিয়া কি প্রকার বীরত্ব সহকারে রণ কৌশল প্রদর্শন করিয়া যখনসৈন্য নিধন করি- তেছে, যবনসৈন্যগণ তাহার প্রতি ধাবমান হইতেছে,--বালক অমিত তেজে সিংহের স্থায় বিক্রম সহকারে যবনদিগকে তাড়িত করিয়া দিতেছে। ঐ বালকটা কে? উহার নাম পুত্ত। পুৰু একদল সৈন্য বিনাশ করিলেন। আকবর অন্য এক দল সৈন্য লইয়া পুত্তের দিকে ধাবমান হইলেন। হঠাৎ তাহার সৈন্যগণ বাধা প্রাপ্ত হইল। বেলা দ্বিপ্রহর হইয়াছে এই সময় কে মােগল সৈন্যের উপর গুলির পর গুলির আঘাত করিয়া মােগল সৈন্য- গণকে ব্যাকুলিত ও বিধস্ত করিয়া তুলিল। আকবর দেখিলেন তিনটি রাজপুত বীরাঙ্গনা গিরিব আশ্রয় করিয়া দণ্ডায়মান রহিয়াছে এক পুত্ত আক্রমণকারী যবণগণের উপয় অজ গােল বরিষণ করিতেছে। একটি প্রৌঢ় ও অপর দুইটি পূর্ণ যৌবন সম্পন্ন,-যেন নব প্রস্ফুটিত শতদল। তিনটা রমণীই বর্ণে আবৃত, তিনটিই জখে আরূঢ় এবং তিনটি রমণীই অস্ত্র চালনায় বিশেষ রূপে পারদর্শী। যুগপৎ লাবণ্যতায় ও ভীষণতায় আকবর,বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইলেন। এই বীরাঙ্গনা এয়ের পরাক্রমে আৰ্য-কাহিনী। অনেক সৈন্য নিধন প্রাপ্ত হইল। এই তিনটি রমণী পৰ্বত হইতে নদী বাহির হইবার মত প্রবল বেগে রণোন্মত্ত প্রচণ্ডার ন্যায় মােগল সৈন্য দিগকে নিপাত করিতে লাগিলেন। অহে। ইহাদের ফি অসীম সাহস, কি অদ্ভুত বীরত্ব! আকবর ইহাদের বিক্রম দর্শনে দুঃখে ও লজ্জায় অবনত মস্তক হইলেন। এবং রমণীত্রয়কে প্রশংসা করিতে লাগিলেন। পুত্ত- জননী কৰ্ম্মদেবী আত্মজের সাহায্যার্থ, কমলা দেবী জীবন সর্বস্ব স্বামীর জন্য এবং কর্ণাবতী প্রিয়তম ভ্রাতার জন্য রণবেশে দুর্গার ন্যায় ম্লেচ্ছরূপী অসুর সংহার করিতে লাগিলেন। সমরতরঙ্গ প্রবাহিত হইতে লাগিল, ক্ষণে ক্ষণে তিনটি বীরাঙ্গনার গুলির আঘাতে মােগল সৈন্য পতিত হইতে লাগিল। সন্ধ্যা প্রায় সমাগত, যুদ্ধ চলিতেছে, বিরাম নাই। যেন যুদ্ধই তাহাদের আদরের জিনিস। আকবর রমণী ত্রয়ের বীরত্বে মােহিত হইয়া এই প্রচার করিলেন যিনি এই রমণীত্রয়কে জীবিত অবস্থায় ধরিয়া আনিতে পারিবেন তাহাকে বিপুল অর্থ পারিতােষিক প্রদান করা যাইবে।” সে সময় সকলেই উন্মত্ত ছিল, কেহই আকবরের কথায় কর্ণপাত করিতে পারিল না, অনেক মােগল সৈন্য সংহার করিয়া কর্ণাবতী বৃন্তচ্যুত পুষ্পের ন্যায় ভূমিতলে নিপতিতা হইলেন। পুত্ত স্বচক্ষে ভগ্নীর পতন দেখিলেন, একবার মাত্র দৃষ্টিক্ষেপ ফরিয়া পুনরায় মােগল সৈন্ত সংহার করিতে লাগিলেন। কৰ্ম্মদেবী ইহাতে কাতর হইলেন না, তিনি দৃঢ়তার সহিত যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। ইতি মধ্যে কমলাবতীর হস্তে একটি গুলরি আঘাত লাগিল, কমলাবতী এ আঘাতকে আঘাত বিবেচনা করিলেন না ; অবলীলাক্রমে শত্রু নিপাত করিতে লাগিলেন। ক্রমে গােলার উপর গােলার পতনে কমলাবতী ও কৰ্ম্মদেবী ভূতলশায়িনী হইলেন। এবং উভয় পক্ষীয় সৈন্য মধ্যে জল বিন্দুর ন্যায় মিশিয়া গেলেন। কিন্তু ইতিহাসে ইহাদের কীর্তি জ্বলন্ত অক্ষরে লিখিত রহিয়াছে।
২৫ পুও স্বচক্ষে স্ত্রী ও মাতার বীরত্ব এবং অসাধারণ অস্ত্র চালনা বিষয়ে পারদর্শিতা দেখিয়া আশ্চৰ্য্যাম্বিত হইলেন, স্বাধীনতা প্রিয় পুত্ত স্ত্রী, ভগ্নী ও মাতার পতনে ক্ষণকালের জন্য নিস্তব্ধ হইলেন। তিনি দুঃখে সমস্ত বিী যেন অন্ধকার বােধ করিতে লাগিলেন। পুত্ত দুঃখে ও ক্ষোভে দ্বিগুণ ক্রুদ্ধ হইয়া মােগল অনীকিনী আক্রমণ ও সংহার করিতে লাগিলেন। জ্ঞান নাই, চৈতন্য নাই, বিশ্রাম নাই এ অবস্থায়ও তিনি যেন কতই আনন্দ অনুভব করিতেছেন। এইরূপে কিছুক্ষণ যবন দিগকে হত্যা করিয়া রাজপুতকুল-গৌরব স্বাধীনতাপ্রিয় পুত্ত অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করিয়া রণস্থলে শয়ন করিলেন। পুত্ত ! তােমার সাহসিকতায় ধন্য, তােমার আত্মত্যাগে ধন্য, তোমার স্বদেশ প্রেমিকতা তােমার অক্ষয় কীৰ্ত্তি ঐতিহাসিকগণ অনন্তকাল গান করিবে। চণ্ড! একদা মিরাধিপতি রাজা লক্ষ আপন মন্ত্রী পরিষদ ও সন্ত্রা সামন্তবর্গে পরিবৃত হইয়া রাজকার্যের পর্যালােচনা করিতেছেন এমন সময় মারার রাজ রণমল্লের নিকট হইতে নারিকেল ফল লইয়া জনৈক দূত তথায় উপস্থিত হইয়া রাজা লক্ষকে অবগত করাইল, “মহারাণায় জ্যেষ্ঠ পুত্র যুবরাজ চণ্ডের সহিত নিজ দুহিতায় পরিণয় সম্বন্ধ স্থির করিয়া মহারাজ বণমল্ল এই নারিকেল ফল প্রেরণ করিয়াছেন। সে সময় যুব- বাজ চণ্ড তথায় উপস্থিত ছিলেন না। সুতরাং রাজা লাক্ষ দূতকে কিয়ৎ কাল অপেক্ষা করিতে বলিয়া বিনয় ও নম্র বচনে কহিলেন, “অচিরেই চণ্ড আর্য-কাহিনী। আসিয়া এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিবেন।” দূত উপবেশন করিলে রাজা পরিহাস্যচ্ছলে কহিলেন, “আমার বােধ হয় যে আমার মত শ্বেত শ্মশ্রুল বৃদ্ধের জন্য আপনারা এরূপ খেলার দ্রব্য প্রেরণ করেন না।” রাজার এইরূপ কৌতুকাবহ মধুর বচনে সভাস্থিত সকলেই উচ্চরবে হাস্য করিয়া উঠিল। যখন এইরূপ বিদ্রুপাত্মক বাক্যে সভা আন্দোলিত হইতেছিল তখন যুবরাজ চণ্ড স্থির ও গম্ভীর ভাবে তথায় আসিয়া উপনীত হইলেন এবং সভার কথিত সমস্ত বৃত্তান্ত শ্রুত হইলেন। কিন্তু এক কূট চিন্তায় তাহার হৃদয় উদ্বেলিত হইতে লাগিল।—তিনি ভাবীতে লাগিলেন যে রমণীকে পিতা মূহুর্তের জন্য আপন ভাবিয়াছেন কিরূপে তিনি সেই রমণীকে বিবাহ করিবেন ? অবশেষে স্থির করিলেন যে, এ বিবাহে কোন প্রকারেই সম্মত হইবেন না। চণ্ডের এ অভিপ্রায় অচিরে ব্রণার কর্ণ গােচর হইল। তিনি কত উপদেশ প্রদান করিলেন কিন্তু কিছুতেই চণ্ডের দৃঢ় সংকল্প তিরােহিত হইল না। তিনি কত মত বুঝাইলেন কত স্নেহ বচনে কত অনুরােধ করিলেন, কত ভীতি প্রদর্শন করিলেন কিছুতেই চণ্ডের মতি ফিরিল না। রাজা বিষম সঙ্কটে পড়িলেন যেহেতু নারিকেল ফল প্রেরিত হইলে রাজপুত দিগের মধ্যে যদি সেই সম্বন্ধ স্থির করা না হয় তবে কন্যা পক্ষের নিতান্ত অবমাননা হয়। সুতরাং এ বিবাহে সম্মতি প্রদান না করিয়া রণমল্পের নিতান্ত অপমান হইবে তাই মারবার রাজের সম্মান রক্ষা করিবার জন্য বাধ্য হইয়া রাজা বৃদ্ধ বয়সে বিবাহ করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন। ক্রোধভরে গম্ভীর কণ্ঠে চণ্ডকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “ভাল, আমিই সেই কন্যার পানিগ্রহণ করিতেছি কিন্তু তুমি নিশ্চয় জানিও সেই রমণীর গর্ভে যদি কোন পুত্র সন্তান প্রসূত হয় তবে তােমাকে উত্তরাধিকারিত্ব হইতে বঞ্চিত হইতে হইবেশপথকর।” এই কঠোর বাক্যে তেজী চণ্ডের হৃদয় বিচলিত হইল না, সে অচল, অটল ও স্থির ভাবে উত্তর করিলেন, “হা পিতঃ! আমি ভগবান একলিঙ্গের নাম করিয়া শপথ করি- তেছি যে তাহা হইলে আমার উত্তরাধিকারিত্বের সত্ব আমি নিজ হইতেই ত্যাগ করিব।” ভবিতব্যতার লিখন অখণ্ডনীয়, দ্বাদশ বর্ষীয়া বালিকা আজ পঞ্চাশৎ বর্ষীয়ের করে সমাপিত হইল; এ অপূৰ্ব্ব সম্মিলনে এক পুত্র সমুদ্ভত হইল তাহার নাম মুকুল জি। যখন মুকুল জি পঞ্চম বর্ষে পদার্পন করিলেন তখন রাজা শুনিতে পাইলেন যবনগণ পূণ্য তীর্থ গয়াধাম আক্রমণ করিয়াছে। তিনি যমের গ্রাস হইতে পবিত্র তীর্থ উদ্ধারের জন্য যুদ্ধ যাত্রা করিবার উদ্যোগ করিতে লাগিলেন। এ বৃদ্ধ বয়সে আর যে প্রত্যাগত হইবেন এ বিশ্বাস তাহার হৃদয়ে ছিল না, যেন কোন প্রকার অন্তৰ্বিপ্লব সমুদ্ভব না। হয় তজ্জন্য আপনার রাজ্য শাসনের উপযােগী সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা করিতে মনন করিলেন। তিনি অবর্তমানে কে রাজ্য পাইবে, কে উত্তরাধিকারী হইবে। সে সম্বন্ধে চণ্ডের সহিত কোনরূপ আন্দোলন না করিয়া কেবল এই মাত্র বলিলেন, “আমি যে কঠোর ব্ৰতানুষ্ঠান করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি তাহা উদ্যাপন করিয়া যে, দেশে ফিরিয়া আসিতে পারিব এরূপ আশা করি না। যদি আমি প্রত্যাগত হইতে না পারি তাহা হইলে মুকুলের উপজীবিকার উপায় কি ? তাহা হইলে মুকুলের জন্য কোন্ সম্পত্তি নির্ধারিত হইবে ?” তেজস্বী চণ্ড স্থির ভাবে দণ্ডায়মান হইয়া ধীর ও গম্ভীরস্বরে উত্তর করিলেন “চিতােরের রাজাসন!” এই সকল অত্যুদার উত্তরে পাছে রাণার হৃদয়ে সন্দেহ জন্মে তজ্জন্য মনীষা সম্পন্ন চণ্ড পিতার গয়া যাত্রার পূর্বেই মুকুলের অভিষেক কার্য সম্পাদন করিবার মত প্রকাশ করিলেন, চণ্ডের এ অদ্ভুত স্বার্থত্যাগ ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা দর্শনে সকলেই বিস্ময়াপন্ন হইলেন; অচিরে মুকুলের অভিষেক জনিত কাৰ্য্যের ২৮ আৰ্য-কাহিনী। আয়ােজ হইল। চণ্ড মুকুলকে রাজসিংহাসনে স্থাপন করিয়া প্রথমতঃ রাজোপযােগী সম্মান প্রদর্শন পূৰ্ব্বক সর্বদা তাহার নিকট বিশ্বস্তভাবে থাকিবার প্রতিজ্ঞা করিলেন। এই মহৎ ত্যাগ স্বীকারের প্রতিদান স্বরূপ তাহাকে মন্ত্র ভবনে সর্বোচ্চ আসন প্রদত্ত হইল। এবং ইহাও নির্ধারিত হইল যে সেই দিন হইতে যদি কোন সামন্তকে ভূমিবৃত্তি প্রদান করা হয় তবে দান পত্রের শিরােভাগে চণ্ডের ভগ্নচিহ্ন অঙ্কিত থাকিবে। সেই দিন হইতে চিতােরের অধিপতিগণ যাহাকে যে ভূমিবৃত্তি প্রদান করিয়াছেন তাহার শিরােভাগেই শালােম্রাপতির ভগ্নচিহ্ন অঙ্কিত দেখিতে পাওয়া যায়। চণ্ডের হৃদয় যে মহত্ব, বীরত্ব, সহিষ্ণুতা ও উদারতা প্রভৃতি গুণে বিভূষিত ছিল তাহা আর কাহাকেও বুঝাইতে হইবে না। তদীয় অপূর্ব স্বার্থ ত্যাগের বিষয় চিন্তা করিলে সকলই অনুমিত হইবে। পিতার অনুপস্থিতিতে চণ্ড মুকুলের এবং মিবার রাজ্যের মঙ্গল ও উন্নতি সাধনের জন্য অতি দক্ষতার সহিত শাসন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়ের সংসাধন করিতে লাগিল, কিন্তু বিমাতা তাহা সহ্য করিত সমর্থ হইলেন না। তদীয় গুণগরিমার বিষয় সকল ভুলিয়া গেলেন, পৃথিবীতে প্রকৃত কৃতজ্ঞতা, ন্যায়পরতা কোথায়? এই হিংসাদ্বেষ স্বার্থপর, কুটিল সংসারে সে, • স্বর্গীয় অমূল্য রত্ন কি সম্ভাবিত হইতে পারে ? বীরবর চণ্ড আপনার রাজমুকুট বৈমাত্রেয়ের মন্তকে পরাইয়া তাহারই পরিচর্যায় নিযুক্ত হই- লেন। এই স্বার্থত্যাগ ও উদারতাগুণের তিনি প্রতিদানে কি পাইলেন ? পাইলেন হিংসা, দ্বেষ আর ঈর্ষা। পাষাণে হৃদয় বাঁধিয়া রাক্ষসী-স্বভাব। বিমাতা চণ্ডের অনিষ্টের উদ্যোগ করিলেন। • অকৃতজ্ঞ রাজমাতা চণ্ডের প্রত্যেক কাৰ্যই সন্দেহ ও বিদ্বেষের সহিত নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু কোনরূপ ছিদ্র না পাইয়া কেবল অনুমানে নির্ভর করিয়া নিকৃষ্ট প্রকৃতির বশবর্তিনী হইয়া চণ্ডৰ কাৰ্য্যে দোষারপ করিয়া বলিলেন, “চণ্ড রাজ কাৰ্য পৰ্যালোচনা করিবার সুযােগে প্রকৃত রাজ ক্ষমতার পরিচালনা করিতেছেন। তিনি রাণা বলিয়া প্রকৃত পরিচয় দেন না বটে কিন্তু ঐ উপাধিটিকে সুধু নাম মাত্রে পরিণত করি- বার চেষ্টা করিতেছেন।* একথা ক্রমে চণ্ডের কর্ণগােচর হইল, উন্নত হৃদয় বিশিষ্ট চণ্ড মৰ্ম্মে বড়ই আঘাত পাইলেন। এ অপযশ তাহার হৃদয়ে সহ্য হইল না। এ অধ্যায় দোষারােপে তিনি বিমাতাকে সুমিষ্ট তিরস্কার করিয়া ধীরভাবে বলিলেন, “যদি আমার চিতােরের রাজাসন লইবার বাসনা থাকিত, তবে কে আপনাকে রাজমাতা বলিয়া সম্বােধন করিত ? ভাল এক্ষণে আমি চলিলাম, রাজ্য শাসনের ভার সমস্ত আপ- নার উপর ন্যস্ত রহিল, এখন কেবলমাত্র রাজ্যের সুখ দুঃখ সম্পদ বিপদ আপনার উপরই নির্ভর করে, দেখিবেন শিশােদীয় কুলের গৌরব সন্ত্রম যেন অনন্তে বিনাশ না পায়।” উদার-হৃদয়-চণ্ড এই বলিয়া চিতাের ত্যাগ করতঃ মান্দু রাজ্যাভিমুখে যাত্রা করিলেন, কিন্তু ক্রর হৃদয় বিশিষ্ট মাতা একবারের জন্যও তাহাকে চিতাের ছাড়িতে নিষেধ করিলেন না। মান্দুরাজ তাহার প্রকৃত পরিচয় পাইয়া যথােচিত সল্লম সহকারে সাদরে গ্রহণ করিলেন এবং ‘হল্লার নামক জন পদ ভূমি বৃত্তি স্বরূপ প্রদান করিলেন। চণ্ড মিবার ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। মুকুলের দাদাও মাতুল রক্ষক নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু অচিরেই তাহারা ভক্ষকরূপে পরিণত হইয়া উঠিলেন। মুকুলের মাতা এবিষয় কিছুই বুঝিতে পারেন নাই ; অবশেষে শিশােদীয় কুলের একজন ধাত্রীর কথায় তাহার মােহ নিদ্রা ভাঙ্গিল, রাজমাত বিষম সঙ্কটে পতিত হইলেন। এক্ষণে তিনি আত্ম- রক্ষার জন্য উপায় অন্বেষণ করিতে তৎপর হইলেন। তিনি নিজে যে নিজের পদে কুঠার আঘাত করিয়াছেন আজ তাহা সম্যকরূপে বুঝিতে পারিলেন, আজ চণ্ড উপস্থিত থাকিলে তাহার বিপদ কোথায় ? অবশেষে আৰ্য-কাহিনী। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া, ক্ষমা প্রার্থনা করিয়া চণ্ডের নিকট সমস্ত বিষয় জ্ঞাপন করিলেন। চণ্ড মিবারের কোথায় কি ঘটিতেছে সর্বদাই তৎপ্রতি সন্ধান লই- তেন। মিবারের ভবিষ্যৎ ভাগ্য-গগনে যে কাল-মেঘের উদয় হইবে তাহ তিনি পূর্বেই জানিতে পারিয়াছিলেন এজন্য পূর্ব হইতেই উপায় স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন। এক্ষণে তিনি বিমাতার প্রার্থনায় মনের অভিমান সমস্ত ভুলিয়া গেলেন এবং বিশেষ সুকৌশলের সহিত রাঠোর- দিগের কবল হইতে দেশ উদ্ধার করিলেন। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন এক দিনের জন্যও দেশের কোন অহিতকর কাৰ্য্য করেন নাই বরং কনিষ্ঠের অধীনতা স্বীকার করিয়া যাহাতে প্রজাবর্গ সুখে বাস করিতে পারে তৎপ্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখিতেন। মহাবীর পৃথ্বীরাজ। নব প্রণয়িনীর প্রেমে মাতিয়া পৃথি,রাজ শৌর্য বীৰ্য্য বিস্মৃত হইলেন। অমাত্যবর্গের উপর কার্যের ভার দিয়া নিজে সর্বদা অন্তঃপুরেই অতি- বাহিত করিতে লাগিলেন। রাজার ঈদৃশ ঔদাস্তত গতিকে রাজ্য মধ্যে নানা বিশৃঙ্খলা হইতে লাগিল। এই সময় দুরন্ত ভারত-শত্রু সাহাবুদ্দিন গাের্মী ভারতবর্ষে পদার্পণ করে। সাহাবুদ্দিন লাহােরের সীমা পর্যন্ত আসিয়া উপস্থিত হইলে তত্ৰত্য শাসনকর্তা মহাবীর পুলির সসৈন্তে তদীয়প থাবরােধ করিলেন, ঘােরর সংগ্রাম বাধিল, পুন্দির নিহত হইলেন। বিজয়ােৎফুল্ল যবনসেনা “আল্লাহে আকবর” ঘাের রােলে দিগন্ত কম্পিত করিয়া পূর্বদিকে অগ্র- সর হইতে লাগিল।
৩১ মহাবীর পৃথ্বীরাজ। এই সংবাদ পৃথীরাজের কর্ণগােচর হইল কিন্তু তাহাতে তিনি বিপদ অনুভব করিলেন না। সাহাবুদ্দিন দিল্লীর সীমায় পদার্পণ করিয়াছে তখনও পৃথু মােহনিদ্রায় নিদ্রিত। ক্রমে থানেশ্বরের নিকটবর্তী রাম- নারায়ণ গ্রামে উপস্থিত হইয়া শিবির সংস্থাপন করিল। পৃথ্বীরাজ এই সংবাদ পাইয়া গর্জিয়া উঠিলেন। ইঙ্গিতমাত্র রণভেরী বাজিয়া উঠিল। দুই একদিনে লক্ষাধিক সৈন্য সংগ্রহ হইল, সকল রাজন্যবর্গ আসিয়া যােগ দিতে লাগিল যাহাদের সহিত পৃথীরাজের শত্রুতা ছিল তাহারাও আজ শত্রুতা ভুলিয়া আততায়ী সংহার মানসে বন্ধুভাবে মিলিত হইতে লাগিল। আহা! ভারতে আজ কি সুখের দিন ! পৃথীরাজ দ্বিলক্ষ পদাতি, দ্বিলক্ষ অশ্বারােহি এবং তিন সহস্র সমর-মাতঙ্গ লইয়া সমর ক্ষেত্রে উপস্থিত হইলেন। তিন দিবস কিছুই হইল না। চতুর্থ দিবসের প্রত্যুষে যুদ্ধারম্ভ হইল। সাহাবুদ্দিন অশ্ব-পৃষ্ঠে আরােহণ করিয়া সৈন্য মধ্য হইতে তাহাদিগকে সম্বােধন পূৰ্ব্বক বলিতে লাগিলেন, “বীরগণ! তােমরা জিগীষেচ্ছায় স্বদেশ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক স্ত্রীপুত্র আত্মীয় স্বজন ত্যাগ করিয়া এই কাফেরের দেশে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছ, তােমরা পঞ্জাব জয় করিয়াছ এবং সিন্ধুদেশও জয় করিয়াছ সত্য কিন্তু সে সকল স্থল তােমাদের স্বদেশ মধ্যেই বলিতে হইবে। যে সকল বিপক্ষের সহিত যুদ্ধ করিয়াছ তাহারা আমাদের সমধর্মী এবং একইরূপ রণকৌশল সম্পন্ন। অদ্য তােমরা প্রবল সিন্ধুনদের পর পারে উপস্থিত হইয়াছ, পৃষ্ঠদেশে খরস্রোতা কাগার 'নদী বহিতেছে। যদি তােমরা কাফের সৈন্য দেখিয়া ভীত হইয়া পলায়নের চেষ্টা কর, কাগার তােমাদের পথ রােধ করিবে এবং কাফেরের হস্তে একজনও নিস্তার পাইবে না। যুদ্ধ করিয়া যদি পরাভূত হও তাহাতে যে ফল, যুদ্ধ না করিয়া প্রস্থান করিলেও সেই ফল। সুতরাং শৃগালের ন্যায় প্রস্থান না করিয়া সিংহ বিক্রমে প্রাণপণে ৩২, আৰ্য-কাহিনী। যুদ্ধ করাই আমাদের কর্তব্য, জয় পরাজয়ের স্থিরতা নাই। যদি আল্লার দোয়ায় জয় লাভ করিতে পার তাহা হইলে সম্মুখস্থিত বিশাল রাজ্য ও ভারতের মণিকাঞ্চন তােমাদেরই। আমি তােমাদিগের প্রভু বটি কিন্তু এ সকল আমার হইলেও তােমরা যথাযােগ্য লাভে কেহই বঞ্চিত হইবে না। পরিশেষে আমার বক্তব্য এই যে যুদ্ধে জয়ী হইলে তােমাদের পরম- রাধ্য মুসলমান ধৰ্ম্মেরই জয়। এই ধর্মযুদ্ধে যদি প্রাণ যায় তাহা হইলে স্বর্গে যাইয়া পরম সুখে থাকিবে। এ পৃথিবীতে সুখ অল্পকাল স্থায়ী, কিন্তু স্বর্গীয় সুখ অনন্তকাল স্থায়ী, অতএব যুদ্ধে মৃত্যুও শ্রেয়। সুতরাং সাহস করিয়া অগ্রসর হও, শক্রর মুণ্ডচ্ছেদন কর।” এই বলিয়া সাহাবুদ্দিন শরাসন হইতে একটি তীর নিক্ষেপ করত অদুরে সরিয়া গেল। মুসলমান সৈন্যগণ “আল্লাহহা আকবর” বলিয়া প্রবলস্বরে দিগন্ত ঝাপাইয়া শত্রুর অভিমুখে প্রবল বিক্রমের সহিত ধাবিত হইল । পৃথ্বীরাজও নিজ সৈন্যদিগকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া উৎসাহ প্রদান করিতে লাগিলেন। তিনি সৈন্যদিগকে সম্বোধন পূর্বক কহিলেন, “দুরাত্মা ম্লেচ্ছগণ একবার মগরকোটে তােমাদের অসিতেজ অনুভব করিয়াও পুনরায় পতঙ্গবৎ জলন্ত অগ্নি শিখায় দগ্ধ হইতে আসিয়াছে। এবার বহুসৈন্য লইয়া তােমাদিগকে পরাস্ত করিতে-তােমাদিগের স্ত্রীপুত্রদিগকে অনাথ করিতে-স্বর্গাদপী গরিয়সী জন্মভূমিকে জয় করিতে আসিয়াছে ;- একি সামান্য স্পর্ধা! রাজস্থানে যধনের পদার্পণ ? কি আশ্চর্য্য। রাজপুত কি ভীরু? পৃথ্বীরাজের দেহে প্রাণ থাকিতে তােমাদের ভয় নাই। ঐ দেখ শত্রু অগ্রগামী হইতেছে, তোমরাওঅগ্রসর হও, দৃঢ় মুষ্টিতে অসিধারণ কর।‘জয় হর হর একলিঙ্গ” বলিয়া পৃথ্বীরাজ হুঙ্কার ছাড়িলেন। সৈন্থগণও গর্জিয়া উঠিল, ভয়ঙ্কর রণ বাধিল, অসির ঝনৎকার শব্দে, হস্তীর 'বৃহিতে, অশ্বের হ্রেষারবে, পদাতিক ও অশ্বারােহীর আস্ফালনে দিগন্ত ব্যাপ্ত হইল।
মহাবীর পৃথীরাজ। রাজপুতদিগের প্রবল পরাক্রমে মহম্মদীয় সৈন্যগণ ক্ৰমে পলায়নপর । পৃথ্বীরাজ সাহাবুদ্দিনকে আক্রমণ করিলেন। এবং নিজ শাণিত জসির আঘাতে তাহাকে অশ্ব হইতে ভূমিতে নিপাতিত করিলেন। কিন্তু সাহ বুদ্দিনের প্রাণ বিয়ােগ হইল না। মােগল সৈন্যগণ মােগল সৈন্যগণ প্রভুকে পাতিত দেখিয়া যুদ্ধে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিলে হিন্দু সৈন্যগণ তাহাদিগকে বিংশতি ক্রোশ পর্যন্ত তাড়াইয়া দিলেন। সাহাবুদ্দিন ক্রোধে ও ক্ষোতে অবশিষ্ট সৈন্য লইয়া স্বস্থানে প্রস্থান করিলেন। এইরূপে দুইবৎসর কাটিয়া গেলে সাহাবুদ্দিন পুনরায় সুশিক্ষিত ১২০০০ অশ্বারোঠীও বহু সংখ্যক পদাতিক সংগ্রহ করিয়া পুনরায় ভারতাভিমুখে যাত্রা করিলেন। দিল্লীশ্বর পৃথ্বীরাজ ও সার্ধশত হিন্দু নৃপতি, তিন লক্ষ অশ্বারােহী, তিন সহস্র সময় মাতঙ্গ ও অসংখ্য পদাতিক সমভিব্যাহারে পুনরায় থানেশ্বর সমর ক্ষেত্রে কাগার নদীর পূর্বাপারে যাইয়া শিবির স্থাপন করিলেন। হিন্দুগণ ভাগিরথীর পবিত্র সলিল স্পর্শ করিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন যে হয় যুদ্ধে জয়ী হইব নতুবা প্রাণ পরিত্যাগ সুতরাং হিন্দুগণের মনে ধারণা তাহাদের জয় অবশ্য হিন্দু নৃপতিগণ সাহাবুদ্দিনকে বলিয়া পাঠাইলেন যে যদি তোমার স্বীয় জীবনের উপর ধিক্কার জন্মিয়া থাকে তবে কেন এতগুলি লােকের পরিবার অনাথ করিবে? যদি প্রস্থান করিতে বাসনা কর পথ পরিষ্কার আছে। আর যদি নিতান্তই মরিতে সাধ হইয়া থাকে অগ্রসর হও। যদি রজনীর মধ্যে পলায়ন না কর তবে কল্য প্রভাতেই মােদিগকে আক্রমণ ও হৃত সৰ্ব্বস্ব করিব। ধূর্ত যবন চাতুরী জাল বিস্তার করিল। সে যেন এই সগৰ্ব বাক্যে বড় ভীত হইয়াছে এইরূপ ভান করিয়া উত্তর করিল আমি ভ্রাতৃ আদেশে যুদ্ধ করিতে আসিয়াছি। আপনাদিগের সহিত যুদ্ধ করা আমার অভি- প্রেত নহে। তবে ভাতার আজ্ঞাব্যতীত কিরূপে স্বদেশে যাই ? যাহা করিব। ভাবী।
আৰ্য-কাহিনী। হউক আপনাদের এই আদেশ ভ্রাতার নিকট জ্ঞাপন করিলাম, উত্তর আসা পর্যন্ত যুদ্ধ ক্ষান্ত রাখিলে বাধিত হইব। হিন্দুগণ যবনের এই চাতুরীপূর্ণ কথা সরল অন্তরে বিশ্বাস করিয়া আমােদ প্রমােদে মত্ত হইল। শিবিরে মহা সমারােহ চলিতে লাগিল, নৃত গীতাদি আরম্ভ হইল। সকলেই নিরস্ত্রভাবে আমােদে মত্ত রহিল। নিশভাগে ধূর্ত যবন অতর্কিত ভাবে কাগার নদীপার হইয়া হিন্দু শিবির আক্রমণ করিল। ক্ষণ কালের জন্য নৃত্য গীতাদি থামিয়া গেল। শিবিরে এক মহাহুলস্থূল পড়িল, কিন্তু বহুসংখ্যক সেনানী এই অল্প সময়ে রণ শয্যায় সজ্জিত হইয়া শিবির রক্ষায় প্রস্তুত হইল। অবশিষ্টেরাও প্রস্তুত হইল। হিন্দু সৈন্যগণ একবুহ রচনা করিলেন। সাহাবুদ্দিন কোন প্রকারেই বুহ ভেদ করিতে না পারিয়া আবার চাতুরী জাল বিস্তার করিল এবার তাহার সৈন্যগণকে পশ্চাৎ হটাইয়া দিলেন। হিন্দু সৈন্যগণ ভাবিল ইহারা রণে ভঙ্গদিয়া পলায়ন করিতেছে সুতরাং তাহারা ও পশ্চাৎ অনুসরণ করিল ইহাতে হিন্দু সৈন্য ছত্রভঙ্গ হইয়া- গেল। সাহাবুদ্দিন এই অবসরে, দ্বাদশ সহস্র অশ্বারােহীসহ ছত্রভঙ্গ হিনু সৈন্যের মধ্যে প্রবেশ করিয়া অনেককে হত্যা করিতে লাগিলেন। বহুসংখ্যক সৈন্য হত ও আহত হইল। অবশিষ্ট প্রস্থান করিয়া জীবন রক্ষা করিল। দিল্লীশ্বর পৃথ্বীরাজ স্বয়ং বন্দীকৃত ও হত হইলেন। ভারত মােগলের অধিকৃত হইল। পৃথ্বীরাজের নিহত সংবাদ দিল্লীতে পছছিলে পৃথ্বীরাজের স্ত্রী সংযুক্ত অনলের আশ্রয় লইয়া জীবন যাতনা নির্বাপিত করিলেন। হায়! কাগারের সৈকত ভুমিতে ভারতের যে সূর্য অস্তমিত হইল। আরকি সে সূৰ্য্য উদয় হইবে ? আজ যে স্বাধীনতা বিল হইয়া গেল আর কি ভারত তাহা ফিরিয়া পাইবে? যে ঘোর গাধারে বীরবালক বাদলচাঁদ। ৩৫ ভারত ডুবিল সে আধার কি আর সরিয়া যাইবে? প্রতিধ্বনীকে জিজ্ঞাসা কর সেও আশাপ্রদ উত্তর দিবেন। বীরবালক বাদলাদ। যখন দ্বাদশ শতাব্দী মুই গতিতে বাধা বিঘ্ন না মানিয়া বালকের ক্রনে রােগীর আর্তনাদে দৃষ্টিপাত না করিয়া অবিরাম গতিতে চলিয়া গিয়াছে আর এয়ােদশ শতাব্দী তদস্থানাধিকার করতঃকালের কুটীল গতি দেখাইতেছে, সেই সময় চিতােরের অধিপতি' লক্ষ্মনসিংহের খুল্লতাত ভীমসিংহ শিশু ভ্রাতুষ্পপুত্রের রাজ্য রক্ষায় ব্যাপৃত ছিলেন। এ সময় দুরন্ত শক্ত আলাউদ্দিন পদ্মিনী-লাভবাসনায় চিতোর অবরােধ করে। কিন্তু চিতােরবাসী সকলেই বংশগৌরব রক্ষায় ব্যস্ত। পদ্মিনীর অসামান্যরূপলাবণ্যে সম্রাট মােহিত, তাই রাজপুতবংশে কলঙ্কের কালিমা প্রদান করিতে সমুদ্যত। দুরাকাঙ্ক সম্রাটের আশা। ফলবী হইল না। দুরভিসন্ধি সংসিদ্ধ হইল না। অবশেষে পদ্মিনীকে ক্ষণকাল দেখিবার জন্য স্বাভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন। রাজপুতবীর, দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিবিম্ব দেখাইবার প্রস্তাব করিলেন। আলাউদ্দিন তাহাতে অস্বীকার করিলেন না। বন্ধুভাবে কতিপয় অনুচর সঙ্গে করিয়া চিতােরের রাজপ্রাসাদে আসিয়া পদ্মিনীর লাবণ্যময়ী কান্তি দর্শন করি- লেন। পদ্মিনীর রূপলাবণ্যে আলাউদ্দিনের হৃদয় ডুবিয়া গেল। তাহার সে লাবণ্যময়ী চিত্র হৃদয় হইতে অন্তহিত হইল না। কপটী সম্রাট নানাপ্রকার মিষ্টােন প্রদর্শন পূর্বক সরলহৃদয় বিশিষ্ট ভীমসিংহকে চিতাের রাজপ্রাসাদের বাহিরে লইয়া গেল । রাজপুত যুবনের চাতুরী কিছুই বুঝিতে সমর্থ হইলেন না। তিনি নিঃশঙ্ক চিত্তে আলাউদ্দিনের আৰ্য-কাহিনী। সহিত রাজপুরীর বাহিরে গেলেন। সহসা গুপ্তস্থান হইতে কতকগুলি যবন সৈন্য বাহির হইয়া ভীমসিংহকে বন্দি করিয়া যবন শিবিরে লইয়া গেল। অবশেষে সম্রাট প্রচার করিলেন,-“যাবৎ পদ্মিনীকে প্রাপ্ত না হইব তাবৎ ভীমসিংহকে মুক্তি প্রদান করিব না।” “ভীমসিংহ বন্দি হইয়াছেন।” এ সংবাদে আজ চিতােরবাসী সকলেই বিষাদিত। পবিত্ৰ আৰ্য-কুসুম স্নেচ্ছের অধীন হইবে, রাজপুত বনিতা যবনের ক্রিড়া-পুতুল হইবে, ইহা কি রাজপুত প্রাণ থাকিতে সহ করিতে পারে ? এই বিপদাপন্ন সময়ে, দ্বাদশ বর্ষীয় বীরবালক বাদল আপনাদের সম্মান রক্ষায় অগ্রসর হইলেন। বংশের গৌরব রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করিলেন; ভীমসিংহকে উদ্ধার করিবার প্রতিজ্ঞা করিলেন। তদীয় খুল্লতাত গােরা প্রফুল্ল হৃদয়ে বাদলের সহিত যােগদান করিলেন। রাজপুতগণ এককূট মন্ত্রনার উদ্ভাবন করিয়া, আলাউদ্দিনের নিকট সংবাদ প্রেরণ করিলেন। “ভীমবনিতা পদ্মিনীদেবী” বহুসংখ্যক দাসী সঙ্গে করিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে প্রস্তুত হইয়াছেন। এ প্রস্তাবে সম্রাট আহলাদে অধীর হইয়া পড়িলেন, ক্ৰমে পদ্মিনীর আগমনের দিন উপস্থিত হইল। দেখিতে দেখিতে সাত শত শিবিকা সম্রাটের শিবির সন্নিধানে উপস্থিত হইল। শিবিকায় যথার্থই কি সহচরীগণ সহ পদ্মিনী অবস্থিত? না—তাহা কখনই নহে। উহাতে চিতােরের সাহসী সাত শত বীর অবস্থিত ছিল। ইহারা নির্বিঘ্নে মােগল শিবিরে প্রবেশ করিয়া ভীমসিংহকে উদ্ধার করিলেন। অদূরে মােগল অনিকিনীবিরাজ করিতে ছিল, উভয় পক্ষে সংগ্রাম বাধিল। বাদল রাজপুত সৈন্যের অধিনায়ক হইয়া বীরত্মের একশেষ দেখাইতে লাগিলেন। দ্বাদশ বর্ষীয় বালকের অদ্ভুত পরাক্রমে প্রভাতকালীন তারকামালার ন্যায় যবন সৈন্য একে * বীরবালক বাদলচাদ , একে অন্তর্হিত হইতে লাগিল। গােরাও অদ্ভুত পরাক্রমের সহিত যুদ্ধ করিয়া সমরক্ষেত্রে নিহত হইলেন; বীরবালক বাদল ইহাতে অধীর হইলেন না। তিনি দ্বিগুণ সাহসের সহিত অশ্ব চালনা করিয়া, যবন সেনা বিনাশে তৎপর রহিলেন। যে বালক মাতৃকোলে লালন পালন হইবার উপযুক্ত সে আজ প্রাণাদপি গরীয়সী জন্মভূমির জন্য বংশের মর্যাদা রক্ষার জন্য দুর্ভেদ্য কবচে আবৃত হইয়া আততায়ী বিনাশে উন্মত্ত। বালকের অদ্ভুত পরাক্রমে আলাউদ্দিনের উদ্যম ব্যর্থ হইল । তিনি জয়াশায় জলাঞ্জলী প্রদান করিয়া প্রস্থান করিলেন। বাদল যুদ্ধাবসানে রক্তাক্ত কলেবরে গৃহে গমন করিলেন। বাদলের মাতা অক্ষত বালককে ক্রোড়ে লইয়া অনুপম সুখ ভােগ করিতে লাগি লেন। গােরার সহধর্মিণী বাদলের মুখে স্বামীর বিরত্ব শ্রবণে প্রফুল্ল হইয়া, আনন্দের সহিত দয়িতের উদ্দেশে অনুগমনের জন্য প্রস্তুত হইলেন। এবং “বিলম্ব করিলে প্রাণেশ্বর আমায় তিরস্কার করিবেন।” এই বলিয়া অনলকুণ্ডে ঝাঁপ দিয়া আত্ম বিসৰ্জন করিলেন। হায়! এক সময়ে যে ভারত এইরূপ বীরত্বের আবাস ভূমি ছিল, কালের প্রভাবে সে সব অন্তর্হিত হইয়াছে। বীরবালকের এই বীরকীর্তি ‘নব্য-বঙ্গীয় পাঠকগণের মনে বিশ্বাস হইবে কি? অধুনাতন নিরীহ নিপীড়িত ভারত এই বীর বালকের অবিনশ্বর কীর্তির কথা হৃদয়ে ধারণা করিবে কি ?
ন্যায়বান রায়মল। রাজপুতনার অন্তঃপাতী তােতাতঙ্ক নগর ও শূরতাম নামক জনৈক রাজপুতের অধিকৃত ছিল। লীলা নামক জনৈক আফগান বীর বলপূৰ্ব্বক শূরতনকে বহিষ্কৃত করিয়া তদস্থানাধিকার করিলে শূরতন তাড়িত হইয়া মনটদুঃখে আরাবীর পাদদেশে বেদোনাের নগরে আশ্রয় গ্রহণ করিলেন। তারাবাই নামী তাহার একটী লাবণ্যবতী দুহিতা ছিল। তারা শূরনের দুঃখ নিশার একমাত্র তারকা, জীবনের স্নেহলতা আশার আশা ও দগ্ধ হৃদয়ের স্রোতস্বিনী স্বরূপা ছিল। শৈশব সময়ে যখন তারা পিতার ক্রোড়ে শায়িত থাকিতেন তখন শূরতন আপন পিতৃপুরুষগণের কীৰ্ত্তি কাহিনী নানাপ্রকারে গল্প করিতেন। বালিকা তাহা সমাহিত চিত্তে শ্রবণ করিতেন। ক্রমে বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞানের আবির্ভাব হইল, তারাবাইয়ের হৃদয়ে নানাপ্রকার চিন্তা কীট প্রবেশ করিল। লুপ্তগৌরব উদ্ধার করি- বার আশা হৃদয়ে বলবতী হইল। তিনি পুরুষােচিত বেশভূষা পরিধান করিয়া, অশ্বে আরােহণ করতঃ করে ধনুর্বাণ লইয়া যুদ্ধশিক্ষা করিতে লাগিলেন। ক্রমে তারা যুদ্ধবিদ্যায় বিশেষ পারদর্শিনী হইয়া উঠিলেন। যে কয়েকবার তার পিতা তােতাত অধিকার করিতে অগ্রসর হন, সেই কয়েক বারই তিনি অশ্বে আরােহণ করিয়া যুদ্ধ স্থলে অবতীর্ণ হইয়া ছিলেন। তদীয় অদ্ভুত রণাভিনয় দর্শনে অনেক যােদ্ধা তাহার নিকট মস্তক অবনত করিত। ক্রমে বীর বালিকার অদ্ভুত বীরত্ব কাহিনী রাজ- স্থানের সর্বত্র প্রচারিত হইল। অনেক রাজপুত তাহার পাণিগ্রহণ লালসায় প্রােৎসাহিত হইয়া উঠিলেন। কিন্তু রাও শূৰতান প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে “যে ব্যক্তি বাহুবলে তোতা উদ্ধার করিতে সমর্থ হইবেন তারা তাহারই করে অর্পিত হইবে।” এই কঠোর পণ বৃত্তান্ত অবগত ব্যায়বান রায়মন। হইয়া অনেকেই ভগ্ন মনােরথ হইলেন। কেবল মিবায়াধিপতি রাণা রায়মল্পের তৃতীয় পুত্র জয়মল্ল তাহার পাণিগ্ৰহণাভিলাষী হইলেন। কিন্তু তিনি তাহার মােহিনীরূপে এরূপ আকৃষ্ট হইয়াছিলেন যে, শূরতনের প্রতিজ্ঞার প্রতি দৃকপাত না করিয়া অবৈধরূপে অগ্রেই তারাকে হস্তগত করিবার জন্য অগ্রসর হইলেন। শূরতন জয়মন্ত্রের এই অন্যায়চরণে ক্রুদ্ধ হইয়া তাহার প্রাণবধ করিলেন। যে সময়ে জমলের নিধন সংসাধিত হয়, সেই সময় রাওমলের তিন পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ সংগ্ৰামসিংহ দ্বিতীয় পৃথীজের পরাক্রম সহ করিতে অপারগ হইয়া দেশ ত্যাগ করিয়াছিলেন এবং পৃথীরাজও উদ্ধত প্রকৃতি বশতঃ পিতা কর্তৃক নির্বাসিত হইয়াছিলেন। সুতরাং জয়মই একমাত্র পিতার স্নেহের পুত্তলী ও রাজ্যের প্রকৃত উত্তরাধিকারী বলিয়া স্থিরিকৃত ছিলেন। ; জয়মরে নিধনবাৰ্তা শ্রবণ করিলে রাণার হৃদয়ে যে ক্রোধ ও জিঘাংসার উদ্রেগ হইবে তাহা অবশ্যম্ভাবী ; তাই ভাবিয়া সকলেই উদ্বিগ্ন হইলেন ; আজ কে এ সংবাদ রাণার কর্ণগােচর করাইবে? গৃহে গৃহে এ বিষয় লইয়া তুমুল আন্দোলন হইতে লাগিল। কিন্তু একথা অধিক কাল অপ্রকাশিত রহিল না। ক্রমে ক্রমে এ কথা রাজার কর্ণগোচর হইল। সভাসদগণ শূরতনের এবম্বিধ আচরণের উপযুক্ত প্রতিফল প্রদান করিবার জন্য রাণীকে উত্তেজিত করিতে লাগিলেন। কিন্তু রাণা পুত্রের শােচনীয় পরিণামে কাতর হইলেন না। তিনি ধীর ও গম্ভীরভাবে উত্তর করিলেন “যে মূর্গ এরূপ অযােগ্য অনুষ্ঠানের দ্বারা একজন সম্রান্ত বিশেষতঃ বিপন্ন রাজপুতকে অবমানিত করিবার চেষ্টা করিয়াছিল সে আপনার দুরাচরণের উপযুক্ত প্রতিফল প্রাপ্ত হইয়াছে।” উদার হৃদয় রাণা রায়মল্ল ইহা কহিয়া পুত্রহত্যাকারী রাওশূরতনকে ক্ষত্রোচিত কার্যের পুরস্কার স্বরূপ বেদনাের জনপদ পুরস্কার প্রদান করিলেন।
৪০ আৰ্য-কাহিনী। বস্তুতঃ প্রকৃত বীয়ের চরিত্রে এরূপ উচ্চভাব বিরাজিত বটে। জগতের ইতিহাসে এরূপ ন্যায়পরতা এরূপ তেজস্বিতা আর কোথাও পরিলক্ষিত হয় না। যদি চ রােমের প্রধান ম্যাজিষ্ট্রেট কৃত অপরাধী পুত্রকে ঘাতকের হস্তে প্রদান করিয়া জগতে স্বার্থত্যাগের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিয়াছেন ;- কিন্তু রায়মল্ল যে তদপেক্ষা উচ্চাশয় তাহাতে সন্দেহ নাই। এই স্বার্থপর হিংসাদ্বেষ পরিপূর্ণ সংসারে ইহা অপেক্ষা আর দেবভাবের চিত্র কি সম্ভাবিত হইতে পারে ? বস্তুত রায়ম মানব হইলেও দেবপদবাচ্য। --- রণজিৎসিংহ। পাঞ্জাবকেশরী মহারাজ রণজিৎ সিংহ ১৭৮০ খৃষ্টাব্দের ২রা নভেম্বর তারিখে জন্ম গ্রহণ করেন। ইহার পিতার নাম মহাসিংহ ; যখন রণজিতের বয়স মাত্র আট বৎসর তখন ইহার পিতা পরলােক গমন করেন। মহা- সিংহের মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই রণজিৎ ও তদীয় জননী, পিতার দেওয়ান লক্ষ্মীপৎ সিংহের রক্ষাধীন হন। রণজিৎ সিংহ অতিশয় সাহসী, রণপটু ছিলেন। তিনি যে তদানিন্তন সময়ের একজন বীর কুল ধুরন্ধর তদ্বিষয়ে সন্দেহ নাই। পাঞ্জাব প্রদেশ পূৰ্বে দিল্লীপতির শাসনাধীন ছিল। তদনন্তর ১৭৪৭ হইতে ১৭৪৯ এই কয়েক বৎসরের চেষ্টায় মহম্মদসাহআবদালি, নিজ অধিকারভুক্ত করেন। কিন্তু ১৭৫১ খৃষ্টাব্দ হইতে এই প্রদেশ মােগল- সম্রাট-হস্ত হইতে---ছিন্ন হইয়া অফিগান শাসনকর্তার অধিকারভুক্ত হয়।
রণজিৎসিংহ। ৪১ সেই সময় হইতে রজিৎ সিংহের আবির্ভাব পর্যন্ত ঐ দশ দুনিবংশীয় সম্রাটদিগের শাসনাধীন থাকে। মহম্মদশাহ দুরানির পাত্র জামান সাহের কতকগুলি কামান বিত নদীতে পতিত ছিল। রণজিৎ সিংহ বহু কষ্ট স্বীকার করিয়া সেই গুলি পুনরুদ্ধার করতঃ জামান সাহকে প্রদান করেন। জামান সাহ রণজিৎ কর্তৃক এই মহদুপকার প্রাপ্ত হইয়া উপকারের প্রত্যুপকার স্বরূপ তাহাকে লাহাের প্রদেশের আধিপত্য প্রদান করেন। সর্বভুক দাহ্ন বস্তু পাইলে যেরূপ অল্পেই প্রবল হইয়া পড়ে, প্রতিভাশালী ব্যক্তিও তদ্রুপ সামান্য শক্তি প্রাপ্ত হইলে মহাশক্তিরূপে পরিণত হইতে পারেন। উন্নত হৃদয় রণজিৎ লাহাের প্রদেশের শাসনভার পাইয়াই নিরন্ত থাকেন নাই। তিনি শনৈঃ শনৈঃ পঞ্জাবের অদ্বিতীয় অধীশ্বর হইয়া উঠিলেন। তাহার আশা অচিরেই ফলবতী হইল। প্রথমে আফগানদিগকে তাড়িত করিয়া মুলতান নিজ অধিকারভূক্ত করিলেন। তদনন্তর দুর্গম পার্বত্যপথ অতিক্রম করিয়া কাশ্মীরে উপনীত হন। শিখ চমূর প্রবল বিক্রমে আফগান সেনাপতি জব্বর খাঁ পরাজয় স্বীকার করেন। বহুদিনের বিলুপ্ত হিন্দু জয়পতাকা আর কাশ্মীর প্রদেশে উড্ডীন হইয়া মৃদুমন্দ সমীরণে দুলিতে থাকে। রণজিত সিংহ কাশ্মীরে জয়পতাকা উড়াইয়া দিয়াই নিরন্ত থাকেন নাই। ইহার পর পেশােয়া উদ্ধার করিতে উদ্যত হন। যে যুদ্ধে গণজিৎ বীরদের পরাকাষ্ঠা দেখাইয়া পেশোয়া অধিকার করেন সেই নওশেরার সংগ্রাম কাহিনী ভূমণ্ডলে অদ্বিতীয় ও সর্বাগ্রগণ্য। ১৮২৩ খ্রীষ্টাব্দের ১৩ই মার্চ এক তন্মরণীয় দিন। এই দিনে ভারতবর্ষীয়, শিখ বীরগণ সিন্ধুনদ অতিক্রম করিয়া আফগান রাজ্যে আফগান সরদার আঙ্গমখা বীর কেশরী রণক্ষিতের প্রতাপ বিলক্ষণ ৪২ আৰ্য-কাহিনী। অবগত ছিলেন, সুতরাং একাকী সমরে সম্মুখীন হওয়া নিতান্ত বিপদ মনে করিয়া স্বদেশীয় মােসলমানগণের সহানুভূতি ও সহায়তা লাভ করি- বার জন্য প্রার্থনা করিলেন। একে কাফেরের বীরুদ্ধে যুদ্ধ তাহাতে আবার আগাম খার উৎসাহিত বাক্য। আফগান বীরগণ ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া পৰ্বত প্রান্তরাদি স্থান হইতে বিভীষণ রূপে শিখ সৈন্যের বিরুদ্ধে আসিতে লাগিল। বহুসংখ্যক আফগান সৈন্য কাবুল নদীর পার্শ্বে নও- শেরা নগরীতে শিবিরস্থাপন করিল। রণজিৎ সিংহ ও নিশ্চেষ্ট ছিলেন না। তাহার একদল সৈন্য আফগান সৈন্যের গতিরােধ করিতে প্রয়াস পাইল। সুতরাং উভয় পক্ষে ভয়ানক সংগ্রাম আরম্ভ হইল। একদিকে দীর্ঘ বপু বিশিষ্ট আফগানবীর অটল অচলভাবে দণ্ডায়মান হইয়া বিপক্ষীয় আক্রমণের বাধা দিতে লাগিলেন। শিখগণের প্রবল বিক্রমে ক্রমে ক্রমে আফগান অনিকিনী ক্ষয় হইতে লাগিল বটে, কিন্তু তাহাদের অবচলিত অধ্যাবসায় দুর্বার বিক্রম, অটল সহিষ্ণুতার কিঞ্চিত্র ও বৈলক্ষণ্য পরিলক্ষিত হইল না। সমর তরঙ্গ বহিতে লাগিল, দিবস অতিবাহিত হইয়া চলিল, রজনী সমাগত। আফগান সৈন্য যখন দেখিল, গােলা বারুদ সমস্তই নিশেষিত হইয়া গিয়াছে, তখন বিপক্ষীয় সৈন্যের উপর পর্বতস্থ শিলা খণ্ড সংগ্রহ করিয়া নিক্ষেপ করতঃ বিপক্ষীয় আক্রমণের বাধা দিতে লাগিল। আফ- গানগণ যতই পরাজিত হয় ততই দ্বিগুণ উৎসাহে প্রােৎসাহিত হইয়া শার্পলের ন্যায় “আল্লাহে আকবর” এই ভীষণ শব্দে গগন বিদীর্ণ করতঃ আততায়ী সংহার মানসে প্রাণপণে যুদ্ধ করিতে তৎপর হয়। ক্রমে রজনী গভীর হইতে গভীরতর হইয়া উঠিল,বিশ্ব সংসার অন্ধকাবে ডুবিয়া গেল। কিন্তু রণজিৎসিং যুদ্ধে বিরত হইলেন না। এত বিক্রম সহকাৰে আৰী সহাব কবিতে লাগিলেন। আফগান রণজিৎসিংহ। বীরগণ পঞ্চাব কেশরীর পরাক্রম সহ করিতে না পারিয়া অন্ধকারে অঙ্গ ঢাকিয়া বিপক্ষীয় সৈন্যগণের মধ্যে দিয়া পলায়ন করিল। রণজিতের জয় লাভ ঘটিল। বহুকাল পরে পুনর্বার আৰ্য গৌরবের চিহু স্বরূপ বিজয় কেতন আফগান ভুমির মধ্যস্থলে নওশেরার যুদ্ধে উড্ডীন হইয়া নৈশ সমীরণে তুলিতে লাগিল। বস্তুতঃ নওশেরার যুদ্ধবিজয় শিখ ইতিহাসের অতীব গৌরবের বিষয় সন্দেহ নাই। রণজিৎসিংহ যে কেবল পঞ্চাব কেশরী ছিলেন এমত নহে, তিনি সমগ্র ভারতে বীরকুল কেশরী ছিলেন। রণজিতের জীবন চরিত লেখক বলিয়াছেন,-“রণজিৎসিংহ যথার্থ সিংহের ন্যায় বিক্রমশালী ছিলেন এবং সিংহের ন্যায় বিক্রমেই ইহলােক পরিত্যাগ করিয়াছেন।” রণজিৎ বীর- কুলের অগ্রগণ্য, যথার্থ বীরপুরুষ, খ্ৰীষ্টয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে রণজিতের ন্যায় আর কোন বীরপুরুষ জন্মগ্রহণ করিয়াছেন কিনা সন্দেহের বিষয়। রণজিতের শৌর্য বীৰ্য্য অদম্যউৎসাহ অপার ঝুদ্ধি কৌশলই শিখ রাজ্যের উন্নতি লাভের প্রধান কারণ। একাধারে এত সাহস, এত বুদ্ধি এত বীরত্ব রণজিতের ন্যায় আর কাহারও পরিলক্ষিত হয় না। আজিও লাহােরে বীরকেশরী রণজিতের সমাধি স্তম্ভ দর্শন করিলে বিগত বীরত্ব-কাহিনী স্মৃতিপথে উদিত হইয়া মন বিস্ময় সাগরে ডুবিয়া যায়। যদিও কালের প্রভাবে রণজিতের নশ্বর দেহ মৃত্তিকায় বিলীন হইয়া গিয়াছে কিন্তু তাহার কীর্তিকলাপ পােপ হইবার নহে। শ্মশান! তাহার দেহকে ভস্মস্তুপে পরিণত করিয়াছ বটে কিন্তু বীর ফেরীর বীরত্ব-মহিমা কোন প্রকারেই লােপ করিতে পারিবে না। এক সময় কোটি কোটি লােক রণজিৎসিংহের বীরত্বের যশােগান করিয়া বেড়াইবে। কীর্তিই তাহাকে এ নশ্বর সংসারে অবিনশ্বর করিয়া রাখিবে; জগতে কীৰ্ত্তি অক্ষম ও অমর।
হামির। যখন (১৩০৩ খৃষ্টাব্দে) আলাউদ্দিন সিতাের নগর আক্রমণ করেন তখন রাজপুতগণ ‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’ জন্মভূমির মানরক্ষা করিবার জন্য স্বদেশের স্বাধীনতারক্ষার নিমিত্ত প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়া অসংখ্য যবন সৈন্য নিপাতিত করিয়া অনন্ত নিদ্রায় অভিভূত হন এবং সেই সময়ে অরি সিংহ নামক মহাপরাক্রমশালী শৌৰ্যসম্পন্ন রাণা কালগ্রাসে নিপতিত হইয়া স্বাধীনচেতার আত্মত্যাগের জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেন। এই বীরবর অরি সিংহই হামিরের পিতা। অরি সিংহ চান বংশীয় একটি দীন রাজপুতের কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। তিনি মৃগয়ার্থ গমন করিয়া ইহার রূপলাবণ্য ও বীরত্বে মােহিত হইয়া বিস্মিত হৃদয়ে পাণিগ্রহণের ইচ্ছা করেন। • এবং পরে ঐ রমণীকে বিবাহ করিয়া অনন্ত সুখ লাভ করেন। এই দম্পতি হইতেই (১২৯১ খ্রীঃ) বীরবর হামির উৎপন্ন হন। আলাউদ্দিন পদ্মিনী লাভার্থ দিল্লী আক্রমণ করিলে রাজপুতগণ আত্মোৎসর্গের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত প্রদর্শন পূৰ্ব্বক সমর ক্ষেত্রে শায়িত হন। কেবল বংশরক্ষার নিমিত্ত পিণ্ডদানার্থ অজয় সিংহ মিবারের পশ্চিমপার্শ্বস্থিত বিস্তীর্ণ আরাবল্লী পৰ্বত মালার উপত্যকা দেশে কৈলবাহা নামক জনপদে আশ্রয় গ্রহণ করেন। অজয়সিংহ ক্রমে জড়াগ্রস্ত হইতে লাগিলেন তবুও চিতােরােদ্ধার আশা হৃদয় হইতে একেবারে অন্তর্হিত করিতে পারিলেন না। তিনি এক এক * এই রমণী সামান্য কাটা দ্বারা একটী শূকরকে নিহত করায়, একটি চীল দ্বারা অয়ি সিংহের ঘোটকের পা ভাঙ্গায় এবং অরি সিংহের বন্ধু ঘােটক লইয়া ঐ রমণীর সম্মুখে উপস্থিত হইলে তৎকর্তৃক কৌশলে ভূমিতে পতিত হওয়ায় অরি সিংহ অত্যন্ত বিবি ও বগণীকে ধন্যবাদ প্রদান করেন।
হামীর। ৪৫ বার চিতােরের কথা ভাবিয়া বিষাদে শশাকে অভিভূত হইয়া পড়িতেন। আবার আশার কুহকিনী মন্ত্রে মুগ্ধ হইয়া সুস্থতা অবলম্বন করিতেন। কিছুদিন গত হইলে অজয়সিংহ অনেক অনুসন্ধান করিয়া হামিরকে তাহার মাতুলালয় হইতে স্বভবনে আনয়ন করেন। এবং স্বীয় অরি ভীল সর্দার মুঞ্জরের বিরুদ্ধে হামিরকে পাঠাইলেন। হামির প্রতিজ্ঞা করিলেন “যদি মুঞ্জরের মস্তক আনিতে পারি তবে দেশে ফিরিব নচেৎ এই-ই শেষ দেখা। এই বলিয়া বীরবর হামির রণােপয়ােগী অস্ত্র শস্ত্রে শশাভিত হইয়া ভীল শত্রু দমনার্থ গমন করিলেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই স্বীয় বীরত্বে মুঞ্জরের মস্তক ছেদন করিয়া হর্ষোৎফুল্ল চিত্তে কৈল- বারায় প্রত্যাবৃত্ত হইয়া অজয় সিংহকে বিনয় নম্র বচনে বলিলেন,—“তাত! আপনার শত্রুর মুণ্ড চিনিয়া লউন। বীরবালক হামীরের বীরত্ব দর্শনে অজয়সিংহ অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন এবং তাহার গণ্ড দেশ চুম্বন করিয়া মুঞ্জরের মস্তকের রক্তদ্বারা রাজ পুণ্ড প্রদান করিলেন। ইহাতে অজয়- সিংহের পুত্রদ্বয়ের রাজ্য প্রাপ্তির আশা চিরতরে অন্তর্হিত হইল এবং এক- পুত্র রাজ্যলাভ শশাকে মানবলীলা সমাপ্ত করিলেন এবং অপরটা দক্ষিণ- বর্তে যাইয়া আপনার বংশ বিস্তার করিলেন। হামির ১৩০৫ খ্ৰীষ্টাব্দে মিরার রাজ্যে অভিষিক্ত হইলেন। হামির রাজা হইলেন সত্য, কিন্তু তাহার রাজ্য নাই; ধন নাই, সহায় নাই, সম্বল মাই, মাত্র তিনি একাকী; যাহারা সহায় ছিল তাহারা কেহ গতরণে প্রাণত্যাগ করিয়াছে কেহ বা যবনের অধীনতা স্বীকার করিয়াছে। রাজত্ব গ্রহণ করিলে রাজপুত দিগের মধ্যে স্টীকা ভােরা নামে একটী বীরত্ব- নুষ্ঠান প্রচলিত ছিল; সেই নিয়মানুসারে বীর চুড়ামণি হামির পিতৃব্য- বৈরীর বলৈচার নামক রাজ্য আক্রমণ করিয়া তাহার “পশেলিও” দুর্গ অধিকার করিলেন। তাহার বীরত্ব দর্শনে সকলে স্তম্ভিত হইল, এবং 't এই বংশ হইতেই মহাত্মা শিবাজী জন্মগ্রহণ কৰিছিলেন।
আৰ্য-কাহিনী। সকলের মনে চিতােরােদ্ধার করিবার আশা বলবতী হইয়া উঠিল। সকলেই ভাবিল,-“চিতােরাকাশ আর অধিক দিন অধীনতা তিমিরে আবৃত থাকিবে না।” কিছু দিন পরে মহারাজ অজয়সিংহ পরলােক গত হইলেন। যথা- সময়ে তাহার শ্রাদ্ধাদি সম্পাদিত হইল। বীরবর হামির এই হইতে যুদ্ধে অগ্রসর হইয়া প্রায় ষাটি বৎসর সময় একাদিক্রমে যুদ্ধ কার্যে লিপ্ত ছিলেন। হামির রাজত্ব গ্রহণ করিয়া চিতাের উদ্ধারের চিন্তায় ব্যাপৃত হইলেন। তাহার হৃদয় চিতােরের পরাধীনতা দেখিয়া দুঃখে দ্বিধা বিভক্ত হইতে লাগিল, হামিরের সৈন্য অল্প, ইহাদের দেখিয়া যদি কেহ বলেন,-“হামির কি প্রকারে এই সামান্য মুষ্টিমেয় সৈন্য লইয়া সাগরােত্তালতরঙ্গবং যবনের বহু অনিকিনীদিগকে পরাজিত করিবেন ?” হামির গম্ভির চিত্তে তাহা- দিগকে এই উত্তর দিবেন যে,-“ক্ষত্রিয়ের সাহস-ই বল এবং তরবারিই একমাত্র সহায়, এই তরবারি হস্তে থাকিলে রাজপুত কাহাকেও ভয় করে না । তিনি বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, তাহার এই মুষ্টিমেয় সৈন্য লইয়া যবনের বহু অনিকিনীর সঙ্গে কখনই জয়ী হইতে পারিবেন না। এই জন্য তিনি প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তম চিতাের ভূমিকে উদ্ধার করিবার মানসে একটি নূতন উপায় উদ্ভাবন করিলেন তাহাতে তাহার অভীষ্ট সিদ্ধির পথ পরিষ্কত হইল। তিনি বৈরী সমুহের নিমিত্ত পরিখা বেষ্টিত নগর গুলি রাখিয়া তৎ- পার্শ্বস্থ লােকালয় সমূহ উৎসাদিত করিতে লাগিলেন এবং চতুর্দিকে প্রচার করিলেন যে, “যাহারা মহারাজ হামিয়ের অধীনতা স্বীকার করে এবং যাহারা প্রভু বলিয়া মানে তাহারা সত্বর সপবিবারে মিবারের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত শৈলাভ্যন্তবে আবাস স্থাপন করুক নতুবা তাহারা দেশ হামীর। ৪৭ । শক্র বলিয়া অত্যন্ত নিপীড়িত হইবে।” ঘােষণা প্রচারিত হইবা মাত্র লােক সকল দলে দলে মিবার ভূমি পরিত্যাগ করিয়া পৰ্বতাকীর্ণ প্রদেশে নূতন বাড়ী প্রস্তুত করিতে লাগিল, মিবার শ্মশানে পরিণত হইল। রাজ পথ জঙ্গলে পরিপূর্ণ হইল। রাজপুতগণ তন্মধ্যে লুকায়িত থাকিয়া মধ্যে মধ্যে স্বীয় বল প্রকাশ করতঃ যবন সৈন্য নিপাতিত করিতে লাগিল। মুসলমানগণ বহু চেষ্টায় ও তাহার কোন সন্ধান করিতে পারিল না। হামির কৈল বারায় অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। পার্বত্য কৈলবারা জনাকীর্ণ হইল, হামির তথায় “হামির তালাও” নামে একটা প্রসিদ্ধ সরােবর কাটাইয়া তাহার তীরে মিরাধিষ্ঠাত্রী দেবীর মন্দির নির্মাণ করিলেন। যখন মিবার ভুমি এরূপ শােচনীয় দশায় শ্মশানে পরিণত হয়, সেই সময় তদানীন্তন চিতাের রক্ষক মালদেব, কি অভিপ্রায়ে (কে জানে?) আপনার প্রচণ্ড শক্ত হামিরের সহিত স্বীয় দুহিতার বিবাহ প্রস্তাব করিয়া পাঠাইলেন তাহা কেহই প্রথমতঃ নিরূপণ করিতে পারিলেন না। মন্ত্রিগণ মনে নানা প্রকার সংশয়ের উদয় হইল, কিন্তু হামির নির্ভয়ে নিঃশঙ্কচিত্তে সকলের নিষেধ বাক্য অগ্রাহ করিয়া বিবাহে সম্মতি প্রদান করিলেন। তিনি একবারও ভাবিয়া দেখিলেন না যে, এই ভীষণ শত্রুতা সময়ে মালদেব কেন সম্বন্ধ সূচক নারিকেল প্রেরণ করিলেন ? তাহার বয়স্কগণ তাহাকে নিবৰ্ত্তিত করিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু হামির তাহাদের কথায় হৃক্ষেপও না করিয়া গম্ভীর ভাবে বলিলেন “থােমরা কেন চিন্তিত হইতেছ ? মালদেবের যেরূপ উদ্দেশ্য থাকুক না কেন তাহাতে আমার ক্ষতি কি, তজ্জন্য নারিকেল ফল রাখিব না কেন? মাল- দেবের মনে দুষ্টাভিপ্রায় থাকে থাকুক তাহাতে আমার ক্ষতি কি? এই * , এই নারিকেল বাজপুতদিগের বিবাহের সম্বন্স সূচক চিহ্ন।
৪৮ আৰ্য-কাহিনী। সুযােগে, যে চিতাের আমার প্রাণাপেক্ষা প্রিয়তম, ও পিতৃপুরুষদিগের চরণাঙ্কিত সেই সােপান শ্রেণীতে বিচরণ করিতে পারিব ইহাই যথেষ্ট ; কর্তব্য পালনে যত ভীষণতর বিপদ উপস্থিত হউক না কেন রাজপুতের তাহ বক্ষপাতিয়া সহ করা একান্ত উচিৎ। যে রাজপুত সাহসে হৃদয় পূর্ণ করিয়া মূল মন্ত্র হৃদয়ে ধারণ করত কাৰ্য্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন, রাজলক্ষ্মী অবশ্যই তাহার অঙ্কশায়িনী হইয়া থাকেন। সকল কাৰ্য্যেই যত্ন ও সাহস করিতে হইৰে নতুবা কোন কাৰ্যই সম্পন্ন হইবার নহে। আজ যে রাজপুত রণস্থলে প্রাণপণে যুদ্ধ করিয়া ও পরাজিত হইয়া স্থানা- স্তরে পলায়ন করিলেন। কাল দেখিবে সাহসের বলে রাজমুকুট তাহার শিরে শােভা সম্পাদন করিতেছে।” হামিরের বীরত্ব দর্শনে সকলে শুন্তিত হইল, এবং কেহই তাহাকে এই বিষম সাহসিক কাৰ্য্য হইতে নিবৰ্ত্তিত করিতে সাহসী হইল না। বিবাহের আয়ােজন সমাপ্ত হইল ; তরুণবীর হামির পঞ্চ শত অশ্বা- বােহী সৈন্য সহ পিতৃরাজ্যাভিমুখে গমন করিলেন। দূর হইতেই চিতাে- রের উন্নত দুর্গচূড়া দেখা যাইতে লাগিল, হামির চিতাের উদ্ধার করিবার বিষয় ভাবিতে লাগিলেন এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়া বলিলেন ;-“হয় চিতাের উদ্ধার করিব, না হয় এই পবিত্র পিতৃরাজ্যের পদতলে পড়িয়া অনন্ত শষ্যার শয়ন করতঃ, আনন্দে স্বর্গপুরে পিতৃপুরুষের সহিত মিলিত হইয়া অনন্ত সুখে কালযাপন করিব।” এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে তাহারা চিতকারের নিকটবর্তী হইলেন। চৌহানের পঞ্চপুত্র আগমন করিয়া সমাদরে তাঁহাদিগকে গ্রহণ করিলেন; কিন্তু হামির নগরের সিংহরায়ে তােণ • বা অন্য কোন বিবাহ সূচক চিহ্ন না দেখিয়া সন্দিহান হইলেন এবং ভাবি- লেন “বুঝি তাহার বয় দিগের ভাবী কথা যাথার্থে পরিণত হয়। কিন্তু ইহাতেও তিনি নিরুৎসাহ হইলেন না। oারণ রাজপুত্যগের বিবাহের প্রধান নিদর্শন ইহা একটা সমাধাহু ত্রিভুজ।
৪৯ তিনি কিছুকাল পরে চিতাের দুর্গের প্রশস্ত প্রাঙ্গনে যাইয়া উপস্থিত হইলেন এবং বীরাগ্রগণ্য পূর্বপুরুষদিগের বিশালকীৰ্ত্তিস্তম্ভ দর্শনে তাহার মনে সুখ ও দুঃখ যুগপৎ উৎপাদিত হইল। তিনি দেখিতে দেখিতে প্রশস্ত সৌধশ্রেণীর মধ্যে প্রবেশ করিলেন; তথায় মালদেব ও তৎপুত্র বনবীর এবং অন্যান্য সর্দারবৃন্দ সসম্ভ্রমে হামিরকে গ্রহণ করিলেন। দেখিতে দেখিতে হমির বিহালয়ে নীত হইলেন কিন্তু সে স্থানেও বিবাহের কোন উদ্যোগ দেখিতে পাইলেন না। মালদেব অনতিবিলম্বে স্বীয় কন্যাকে আনিয়া তৎকরে সমর্পণ করিলেন। কিন্তু ইহাতেও পরিণয় সূচক কোনও কার্য সম্পাদিত হইল না কেবল বর কন্যার কাপড় গ্রন্থিত ও হস্তেহস্ত সংস্থাপিত হইল মাত্র। হাসিব মালদেবের কু পুরােহিতের নিকট ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন “শান্ত হউন কালে সকলই জানিতে পারিবেন।” হানির এ সকল কথার কিছুই মৰ্ম্ম গ্রহণ করিতে না পারিয়া অত্যন্ত দুঃখিত ও চিন্তিত হইলেন। ক্রমে তিনি বাসর ঘবে নীত হইলেন তথাপিও তাহার চিন্তার শেষ হইল না, তিনি সৰ্ব্বদাই অন্যমনা হইয়া বাস করিতে লাগিলেন। নববধূ হামিরের ঈদৃশ ভাব দর্শনে তাহার চরণতলে পতিতা হইয়া বলিলেন “নাথ। হৃদয়েশ! এ দাসীর অপরাধ ক্ষমা করুন। আপনি কেন এত বিষ হইয়াছেন, তাহার কারণ আমি বুঝিতে পারিয়াছি এবং গিভাই বা কেন এত সঙ্গোপনে পরিণয় কাৰ্য্য সমাহিত করিয়াছেন অনুমতি পাইলে শ্রীচরণে নিবেদন করিতে পারি।” হামির সেই বালিকার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া দেখিলেন,-বালিকার মুখমণ্ডল সুনির্মল সারল্যের আধার এবং জ্যোৎস্না কারে কাষ্ঠে নির্মিত। ইহার শীর্ষদেশ মার প্রতিবিম্ব সুশোভিভ এবং এই তোরণ কন্যাব আবাসস্থানের বহিরে স্থাপিত থাকে। কন্যার সহচরীগণ এই স্থানে উপস্থিত থাকিয়া ঘরকে আবির ও অন্যান্য রঞ্জিত চুর্ণ দিয়। বিবাহিত ব্যক্তির সহিত কৌতুক যুদ্ধ করেন এবং বর কর্তৃক সেই তোরণ নিগণি হইসে রমণী ৫ মান হই। প্রা”কবেন , আৰ্য-কাহিনী। এত শৈশব- বিমণ্ডিত। ইহা দেখিয়া হামির তাহাকে সাদরে-সয়েহে ভূমিতল হইতে উঠাইয়া স্বীয় হৃদয়ে ধারণ করতঃ অভয়প্রদান করিয়া সেই গূঢ় বৃত্তান্ত প্রকটিত করিতে বলিলেন। রমণী পুনর্বার বলিতে আরম্ভ করিল “প্রাণেশ! বল্লভ! এ দাসী বিধবা কিন্তু, তাই বলিয়া এ দাসীকে ঘৃণা করিবেন না। অতি শৈশবে ভবিংশীয় কোন রাজকুমারের সহিত আমার পরিণয় হয়; কিন্তু কোনও যুদ্ধে তিনি প্রাণত্যাগ করেন। বস্থায় বিবাহ হইয়াছিল যাহা আমার এখনও স্মরণ হইতেছে না। সেই অবধি আমি বিধবা অনাথিনী কিন্তু আজ আপনাকে প্রাপ্ত হইয়া আমার মনের দুঃখ দূর হইয়াছে—না জানি কপালে কি আছে ?” বালিকার আর বাক্যস্ফুরণ হইল না, বালিকা প্রাণেশ্বরের হৃদয়ে পড়িয়া কঁদিতে লাগিল। হামির বালিকার সারল্য, সত্যপ্রিয়তা ও প্রগাঢ় অনুরাগ দর্শনে অশ্রুবারি মুছাইয়া অভয় প্রদান করিলেন এবং নিজেও অনেক পরিমাণে চিন্তা হইতে শান্তিলাভ করিলেন। সেকালে রাজপুতদিগের মধ্যে বিধবা বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল না, বিধবা বিবাহকে তদানীন্তন রাজপুতগণ অত্যন্ত ঘৃণ্য ও হেয়স্ক মনে করিতেন। আজ মালদেব তাহাকে অপমান করিল, কেবল তিনি প্রিয়তমার প্রতি চাহিয়া সে সকল অপমান সহ্য করিলেন। পতিপ্রাণা সরলা এই অপমানের প্রতিশােধ লইবার জন্য স্বয়ং প্রাণপতিকে পরামর্শ দিতে লাগিলেন, এবং মােহিত বংশীয় জলধর নামক জনৈক সর্দারকে যৌতুক স্বরূপ প্রার্থনা করিতে বলিলেন। হামির তদনুসারে জলধরকে প্রার্থনা করিলে, মলদেব তাহাকে প্রদান করিলেন। অতঃপর তিনি একপক্ষ মধ্যে জলধরকে লইয়া সস্ত্রীক কৈলবারায় প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং চিতাের উদ্ধারের সুযােগের অনুসন্ধানে রহিলেন। কিছু কাল গত হইলে মালদেবের দুহিতার গর্ভে হামিরের ঔরসে ক্ষেত্ৰ সিংহ নামে একটী নবকুমার প্রসূত হইল। এই আনন্দোৎসবােপ- হামির। লক্ষে মালদেৰ হামিরকে তাহার অধীনস্থ সমস্ত পার্বত্য প্রদেশ অর্পণ করিলেন। ইতিমধ্যে একটা গণক গণনা করিয়া বলিল, “চিতােরের পুত্রক দেবতা ক্ষেত্রপাল দেবের আক্রোশ তােমার পুত্রের উপর পতিত হইয়াছে, অতএব তুমি শীঘ্র চিতােরে যাইয়া বাস কর।” হামি-বনিতা দুঃখের কথায়ও আনন্দ অনুভব করিলেন। তিনি স্বামীর অভীষ্ট সিদ্ধির সহায়তা করিতে পারিবেন বলিয়া দেবরােষের বিষয় জানাইয়া মালদেবকে পত্র লিখিলেন। মালদেব শিবিকাসহ কতকগুলি সৈন্য পাঠাইয়া অনতি- বিলম্বে হামিরপত্নীকে স্বীয় ভবনে আনয়ন করিলেন। তিনি পিতৃভবনে উপস্থিত হইয়া দেখিলেন যে, তাহার পিতা প্রধান প্রধান সামগণসহ মাদেরিয়াস্থ মীরদিগকে দমন করিবার জন্য তদ্দেশে গমন করিয়াছেন। কাজেই হামিরের ভাগ্যলক্ষ্মী সদয় হইলেন। তাহার চিতােরাধিকারের পথ প্রশস্ত হইল। হমির পত্নী জলধরের সহিত পরামর্শ করিয়া তদানীন্তন অবশিষ্ট চিতােরের সৈন্যগণকে বাধ্য করিয়া ফেলিলেন। এদিকে হামির দলবলে চিতােরের নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তিনি বাগোর নামক স্থানে সমস্ত আয়ােজন ঠিক করিয়া অবিলম্বে চিতােরে উপস্থিত হইলেন এবং স্বীয় রণকৌশলে ও বীরত্বে সমস্ত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করিয়া চিতাের অধিকার করিলেন। চিতাের অধিকৃত হওয়ার পর চিতাের আবাল বুদ্ধ বনিতা সকলেই হামিরের অধীনতা স্বীকার করিল। যথাসময় শত্রু দমন করিয়া মালদেব চিতোরে প্রত্যাবর্তন করিলেন ; কিন্তু তাহার বিজয়োজনিত আনন্দ শীঘ্রই মরুভূমে পতিত হওয়াতে শুষ্ক হইয়া গেল। তিনি চিতোরের দুর্গদ্বারে উপস্থিত হইলে সৈন্যগণ ব্যঙ্গ বােধক পটকা ছুড়িয়া মারিল। তিনি এ সকল ব্যাপার দর্শনে সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন এবং নগরমধ্যে প্রবেশ করিয়া সমস্ত বিষয় অবগত হইয়া নৈরাশ্যের বিষমাঘাতে ঘূর্ণিত হইয়া পড়িলেন। তিনি দেখিলেন হায় প্রধান প্রধান সর্দারগণ হামিরের পক্ষ অবলম্বন করিয়াছে, কাজেই আয্য-কাহিনী । { অনন্যোপায় হইয়া আলাউদ্দিনের বংশধর মােবারক খিলিজীর নিকট স্বীয় মনােবেদনা ও অবমাননার বিষয় বিবৃত করিলেন। হামির পিতৃপুরুষ- দিগের চরণাঙ্কিত সিংহাসনে উপবেশন করিয়া মহানন্দে চিতােরের অধি- পতি হইলেন। হামির রাজা হওয়ায় সকলেই সুখী হইল; পার্বত্য স্থানবাসী মনুষ্যগণ পুনরায় পার্বত্য প্রদেশীয় বাড়ী ঘর ভাঙ্গিয়া চিতােরে আসিয়া উপনীত হইল এবং শিশোদীয় কুলের প্রনষ্ট গৌরব উদ্ধারক হামিরকে ধন্যবাদ দিয়া মহােল্লাসে বাস করিতে লাগিল। মিবারের সমস্ত লোক হামিরের বশীভূত হইয়া মালদেবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দণ্ডায়মান হইতে কৃতসংকল্প করিয়া তাহার পতাকা মূলে আসিয়া জড় হইতে লাগিল। হামির ইহাদিগকে সাদরে গ্রহণ করিয়া শিক্ষা দান করিতে লাগিলেন। এদিকে মােবারক মালদেবের পরামর্শানুসারে স্বীয় প্রনষ্টাধিকার পুনরায় উদ্ধার করিতে কৃতসংকল্প হইলেন এবং অনতিবিলম্বে স্বীয় অনীকিনী সহ চিতােরাভিমুখে ধাবিত হইলেন। মােবারকের সৈন্যগণ পার্বত্য প্রদেশ দিয়া যাইতে ক্লিষ্ট হইয়া পড়িল। অনেকে অকালে কালগ্রাসে পতিভ হইল। যাহা হউক কিছুদিন পথে বহু অর্থ ব্যয় ও কষ্ট স্বীকার করিয়া তিনি সিঙ্গুলী নামক স্থানে স্কন্দাবায় স্থাপন করিলেন! হামিরও এ সংবাদ পাইয়া সসৈন্যে সেহস্থানে উপস্থিত হইয়া মােবারক রাজকে আক্রমণ করিলেন। উভয় পক্ষে তুমুণী সংগ্রাম উপস্থিত হইল। বৃক্ষগণ যেন ভীতি বিহ্বল চিত্তে নীরবে দাড়াইয়া যুদ্ধের শেষ সীমা পরিদর্শনার্থ সােৎসুক হৃদয়ে অবিচল হইয়া রহিল। অশ্বগণের হ্রেষারবে হস্তির বৃংহনে সমরভূমি ভীষণ নাদিত হইতে লাগিল ; দেখিতে দেখিতে রাজপুত বীরত্বে বীরবর শিশােদীয় কুলগৌরব হামিরের লোকোত্তর সাহসিকতা অদম্য বীরত্ব ও আশ্চয্য বল কৌশলে যবনগণ পরাজিত হইল, সৌভাগ্যলক্ষ্মী হামিরের অঙ্কশায়িনী হইলেন। হতভাগ্য মােবারক বন্দী ও চিতাের দুর্গে নীত হইলেন, এবং তিন মাস কাল অসহ কারাগারকেশ হামির। ভােগ করিয়া আজমির, রিতম্বর নাগাের ও শুয়ােপুর এবং পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ও একশত হস্তী স্বীয় বিনিময় স্বরূপ প্রদান করিয়া অব্যাহতি পাইলেন। হামির সদর্পে বলিলেন,-“আপনি দিল্লীর সম্রাট বলিয়া ভয়ে আপনাকে অব্যাহতি দেওয়া হইল না। আপনার রাজ্য ভাবিয়া পরম পূজ্যা চিতাের নগরীকে আক্রমণ করিতে আসিয়াছিলেন বলিয়া তাহার এরূপ প্রতিফল পাইলেন। যদি সাধ থাকে পুনরায় চিতাের অধিকার করিতে আসিবেন, এ তীক্ষ্ণ অসি আপনাদের জন্য উন্মুক্ত অবস্থায়ই থাকিবে। আপনার ন্যায় বীরের রক্তপান করিবার জন্য হামিরের তরবারি সর্বদা প্রস্তুত।” মালদেবের সমস্ত আশা ভরসা আকাশ কুসুমবৎ আকাশে মিলাইয়া গেল। তদীয় জ্যেষ্ঠ তনয় বনবীর সিংহ হামিরের অধীনতা স্বীকার করিলেন। হামির তাহাকে সাদরে গ্রহণ করিয়া মৰ্য্যাদার সহিত জীবিকা নিব্বাহাৰ্থ নিমচ, জিয়ণ, রতনপুর ও কৈরায় প্রভৃতি কতিপয় স্থান প্রদান করিলেন। এবং বৃত্তি প্রদান-পত্রিকায় স্বাক্ষর করিবার সময় বনবীরকে বলিলেন, “বনবীর! এরাজ্য আমার পিতৃ পুরুষের এবং আমি তাহা পুনরায় গ্রহণ করিয়াছি এ ভূমিত আমারই। দেখিও ঈর্ষা বশতঃ কুকৰ্ম্মে প্রবৃত্ত হইও না; যে জন্মভূমির জন্য আমার পিতৃ পুরুষগণ অম্লান বদনে মিবার শৈল গাত্র পবিত্র রক্তে কৰ্দমিত করিয়া অনন্ত নিদ্রায় অভিভূত হইয়াছেন, আজ আমি সেই পিতৃ পুরুষদিগের অতি প্রিয়তম মিবার ভূমি সৌভাগ্য লক্ষ্মীর অনুগ্রহে প্রাপ্ত হইয়াছি।” বনবীর হামিরের কথার সারভাগ গ্রহণ করিলেন। তিনি মিবার রাজ্য বর্ধিত করিতে কৃতসঙ্কল্প করিয়া অল্পদিনের মধ্যেই ভীন সহর পুনরুদ্ধার করিলেন। হামিরের বীরত্বে চতুর্দিক আলােড়িত হইল। মিবারস্থ সমস্ত রাজন্যবর্গ পরমানন্দে আপ্লুত হইয়া স্বেচ্ছা বশতঃ উপঢৌকন প্রেরণ করিলেন এবং তো ??দি দ্বারা সহায়তা করিতে লাগিলেন।
৫৪ আৰ্য-কাহিনী। হামির কমে সার্বভৌম নৃপতি হইয়া উঠিলেন। চতুর্দিগস্থ রাজগণ তাঁহার আজ্ঞা-পালনে রত হইল। এবং যুদ্ধ সময়ে সৈন্য সমভিব্যাহারে আগমন করিয়া হামিরের সাহায্য করিতে লাগিল। যে দুর্দিনে চিতােরের স্বাধীনতা হার তাতারগণ গলায় ধারণ করে সে দিন চিতােরের যে ভীষণ দশা উৎপন্ন হইয়াছিল, সে দিন যে চিতাের শ্মশানে পরিণত হইয়াছিল, আজ বীরবর হামিরের প্রতাপে পুনরায় তাহা সুশােভিত হইল। এবং এরূপ প্রাধান্য লাভ করিল যে এই প্রাধান্য বীরবর মােগলরত্ন বাবরের রাজত্ব পর্যন্ত অক্ষুন্নভাবে বিরাজমান ছিল। বীরব হামির বহুকাল প্রবল প্রতাপে প্রতাপান্নিত হইয়া মিরভূমি শাসন করতঃ ১৩৬৫ খৃষ্টাব্দে মানব লীলা সাঙ্গ করিলেন । হামির অতিশয় বীর, তেজস্বী বাহুবল প্রদীপ্ত শৌর্য সম্পন্ন লােক তিনি আজও মিবারবাসীগণের চিরস্মরণীয় মুহাম্মাদিগের নামের সহিত উচ্চারিত হইতেছেন। কে বলে তিনি মরিয়াছেন ঐ দেখ কীৰ্ত্তি তাহাকে জীবিত করিয়া রাখিয়াছে। প্রতাপসিংহের শৌৰ্য্য কুমার সেলিম, সাগরজির জাতিভ্রষ্ট পুত্র মহাবৎ খ। ও চির বিজয়ী মানসিংহ বহুল অনিকিনী সহ অস্ত্র দিতে ভূষিত হইয়া প্রতাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করিলেন। আজ প্রতাপের কিছুই নাই, সহায় নাই সম্পদ নাই সাধের চিতােরের দুর্গ নাই। প্রতাপসিংহ অসহায়, তবুও তিনি বিচলিত হইলেন না। তাহার দুর্দম্য সাহস, মাত্র দ্বাবিংশ সহস্র রাজপুত ও পার্বত্য ভীল এই তিনটাই প্রধান সম্বল, এই তিনের বলে প্রতাপ আজ বলীয়ান। তিনি উদয়পুরের নিকটবর্তী হলদিঘাট নামক একটি
p০
cp
রাণা প্রতাপ।
রণজিৎ সিংহ।
মানসি।
[ আৰ্য-কাহিনী
Lakshmibilas Press.
No text on this page.
প্রতাপসিংহের শৌর্য্য। উত্তুঙ্গ পৰ্ব্বতে শিবির স্থাপন করিলেন। পৰ্বতের নিম্নদেশে রাজপুত সৈন্যগণ যুদ্ধার্থ দণ্ডায়মান, ভীলগণ মােগল সৈন্যকে নিষ্পেষিত করিবার জন্য অসংখ্য শীলাখণ্ড সংগ্রহ করিয়া পৰ্বতশৃঙ্গোপরি দণ্ডায়মান হইল। আজ রাজপুতদিগের মহােৎসবের দিন, এ উৎসবে মত্ত হইয়া রাজপুতগণ “স্বর্গাদপি গরীয়সী” জন্মভূমির সন্মান রক্ষাৰ্থ প্রাণ দিতে সমুদ্যত। এদিগে মােগল বীর জাহাঙ্গীর, মাননিংহ ও মহাবৎ খা, বিশাল সৈন্য সমভিব্যাহারে হলদিঘাটের পাদদেশে উপনীত হইলেন। যুদ্ধ আরম্ভ হইল। রাজপুতগণ বীরকেশরী প্রতাপসিংহের উৎসাহ বাক্যে প্রােৎসাহিত হইয়া ভীষণ শব্দে মোগল সৈন্য বিনাশ করিতে লাগিলেন। ভীষণ সংগ্রাম চলিতে লাগিল; এক পক্ষে প্রতিশােধ বাসনায় ও অপর পক্ষ, স্বদেশ রক্ষার জন্য,“প্রাণাদপি গরীয়সী” জন্মভূমির গৌরব অব্যাহত রাখিবার আশায় যুদ্ধ করিতেছে। প্রতাপ চক্রবৎ সৈন্ত শ্রেণীর মধ্যে ঘুরিতে লাগিলেন এবং মান- সিংহকে অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। মানসিংহ অনেক সৈন্যশ্রেণী দ্বারা বেষ্টিত হইয়াছিলেন বলিয়া প্রতাপ সে স্থানে প্রবেশ করিতে পারিলেন না। কিছু দূর হইতে জীমূতমন্দ্রের ন্যায় ঘাের শব্দে মানসিংহকে ক্ষত্র কুলাঙ্গার বলিয়া তিরস্কার করিলেন। মানসিংহ প্রতাপের কথা শুনিয়াও শুনিলেন না। রাজপুত সেনা স্বাধীনতামন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া ক্ষুধিত সিংহের স্থায় মােগদিগকে আক্রমণ করিল। রাজপুত সৈন্য চিরপূজিত শিশােদিয় কুলের মান রক্ষা করিবার নিমিত্ত কোনও বাধা বিঘ্নের প্রতি দৃষ্টিপাত না করিয়া সাগর তরঙ্গের ন্যায় আঘাত করিতে লাগিল। মােগল সৈন্যও রাজপুতদিগকে আক্রমণ করিল। জাহাঙ্গীর যে স্থানে হস্তীতে আরােহিত ছিলেন প্রতাপ নিজ সৈন্য আৰ্য-কাহিনী। হইলেন, তবুও সহকারে সেই দিকে ধাবমান হইলেন, এবং মােগল সেনাগণকে সংহার করিতে লাগিলেন। প্রতাপ মােগল সৈন্যকে বিধ্বস্ত করতঃ সেলিমের নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাকে বর্ষার দ্বারা এক ভীষণ আঘাত করিলেন। সেলিম লৌহবৰ্ম্মে আবৃত ছিলেন কাজেই বর্ষার আঘাত তাহার হৃদয়ে বিদ্ধ হইল না; প্রতাপের ‘চৈতক’ নামক সুশিক্ষিত অশ্ব সেলিমের হস্তীর শুণ্ডে দুইপা দিয়া দণ্ডায়মান হইল ; প্রতাপ এক আঘাতে মাহতকে শমনসদনে প্রেরণ করিলেন। হস্তী মাহুত বিহীন হইয়া উন্মত্ত ভাবে সেলিমকে লইয়া যুদ্ধস্থান পরিত্যাগ করিল। এদিকে মুসলমানগণ দলে দলে আসিয়া প্রতাপকে ঘেরিয়া দাড়াইল ;-উভয় পক্ষীয় সৈন্যগণ পরস্পরের আঘাতে ঘোর আর্তনাদ করতঃ বাত্যাহত কদলী বৃক্ষের ন্যায় পতিত হইতে লাগিল। প্রতাপ সাতটী ঘাত প্রাপ্ত চৈতন্য নাই,—রণে বীতস্পৃহা নাই ! প্রতাপ তুমিই ধন্য। প্রতাপ এ বিপদের সময়েও মস্তকে রাজছত্র রাখিয়াছিলেন। রাজ- ছত্র দেখিয়া মােগল সেনাদল প্রতাপকে আক্রমণ করিল। প্রতাপের সেনা প্রতাপকে রক্ষা করিবার জন্য মুসলমান সৈন্তের দিকে ধাবিত হইল, উভয় পক্ষে তুমুল সংগ্রাম আরম্ভ হইল। এরূপে প্রতাপ তিনবার মােগল সেনার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিলেন। তিন বারই রাজপুত সেনাগণ প্রাণ দিয়া তাহাকে রক্ষা করিয়াছিল। প্রতাপ পুনরায় শত্রু সেনার মধ্যে প্রবেশ করিলেন, তাহার জ্ঞান নাই, চৈতন্য নাই, তিনি একজন মাত্র বিপক্ষীয় সৈন্য বধ করিয়াছেন, কিন্তু ক্ষণকালমধ্যে দশজন আসিয়া তাহার স্থান পূরণ করিয়া প্রতাপকে আক্রমণ করিতেছে, ক্রমেই প্রতাপসিংহের সৈন্য সংখ্যা হ্রাস হইয়া আসিল। মােগল সেনা প্রতাপকে বিশেষ রূপে আক্রমণ করিল ; এবিপদে প্রতাপকে রক্ষা করে কে? প্রধান প্রধান সামন্তবর্গ সকলেই হত হইয়াছে, এ সময়ে সহায় হ'বে কে ? প্রতাপ অজ্ঞান ;
তিনি এ অবস্থায় দ্বিগুণিত বেগে ম্লেচ্ছসৈন্য আক্রমণ ও হত করিতে লাগিলেন। এদিকে ঝালাপতি মান্না এই আকৰ্মিক বিপদ দেখিয়া ঝালাবংশীয় সৈন্য লইয়া মােগল সৈন্য মধ্যে গমন করিলেন। কাহার সাধ্য তাহার গতি রােধ করে। এবং প্রতাপ যথায় দণ্ডায়মান ছিলেন তথায় উপনীত হইয়া রাজছত্র নিজ মশুকে ধারণ করিলেন এবং মােগল সৈন্যদিগকে বিশেষ রূপে পীড়িত করিয়া, বীর মান্না (১৫৭৬ খ্রীঃ) অনন্ত শয্যায় শয়ন করিলেন। মান্নার পতন দেখিয়া প্রতাপসিংহ বলিলেম, “মান্না! অদ্য আপন জীবন দান করিয়া আমার জীবন রক্ষা করিলেন। মান্না ক্ষীণস্বরে উত্তর করিলেন, “ঝালা-স্বামী রাজপুত-ধৰ্ম্ম জানে এবং বিপদের কালেও রাণাকে ত্যাগ করে না।” দ্বাবিংশ সহস্র সৈন্য মধ্যে চতুর্দশ সহস্র সৈন্য হলদিঘাটে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য অম্লান বদনে প্রাণ বিসর্জন করিল। মাত্র আট সহস্র সৈন্য যুদ্ধস্থল হইতে প্রত্যাগত হইতে পারিয়াছিল। কাজেই প্রতাপকেও অনন্যোপায় হইয়া রণস্থল ত্যাগ করিতে হইল। এ দিবসের রণাভিনয় সমাপ্ত হইলে তিনি চৈতকায়ােহণে প্রস্থান করিলেন। কিন্তু তাহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ দুইজন অশ্বারােহী মােগল সৈয় ধাবমান হইল। প্রতাপের তেজস্বী অশ্ব "চৈতক” একলক্ষে একটা পাৰ্বতীয় নদী পার হইতে গৌণ হইল। চৈতক আহত, প্রতাপ আঘাত প্রাপ্ত। প্রতাপ তাহার পশ্চাতে অশ্বপদ ধ্বনি শুনিতে পাইয়া স্তম্ভিত হইলেন এবং বুঝিতে না পারিয়া ভাবিলেন এবার আর রক্ষা নাই। নিশ্চয় মৃত্যু নিকটবর্তী। মরিব বলিয়া ভীত হইলেন না। পশ্চাৎ ফিরিয়া দেখিলেন তাহার পূর্ব শত্রু সহােদর শক্তসিংহ। প্রতাপ রােষকষায়িত লােচনে বলিলেন, “তুই সংগ্রাম সিংহের পৌত্র হইয়া মােগলের দাসত্ব স্বীকার করিয়াছিস্ ! এক্ষণে ভ্রাতাকে বধ ৫৮ আর্য-কাহিনী। ; করিতে প্রস্তুত ! কুলাঙ্গার! প্রতাপসিংহ আজ সঙ্গের বংশকে নিষ্কলঙ্ক করিবে। শক্ত ইহাতে ভীত বা রুষ্ট হইলেন না;—সম্মুখে আসিয়া বিনয় ও নম্র বচনে বলিলেন, “ভ্রাতার দোষ মার্জনা করিয়া এ কুলাঙ্গারকে আপনার পার্শ্বে স্থান দান করুন।* প্রতাপ দেখিলেন শক্তের পূৰ্বভাব তিরােহিত হইয়াছে, আরও দেখিলেন তাহার চক্ষে জল আসিয়াছে, বহুদিনের শত্রুতা অন্তর্হিত হইল ; দুই ভ্রাতায় সস্নেহে আলিঙ্গন করিলেন। প্রতাপের পশ্চাদ্ধাবিত মােগল সেনাদ্বয় এখন কোথায় ?-শক্ত, শ্রাতার মঙ্গলের জন্য তাহাদিগকে বর্ষার আঘাতে নিপাত করিয়া ভ্ৰাতার সহিত মিলিত হইয়াছিলেন । দুই ভ্রাতায় আজ মহা আনন্দিত --সান্ধ্য সমীরণ ধীরে ধীরে বহিয়া উভয় ভ্রাতাকে শীতল ও আনন্দিত করিতে লাগিল ; কিছুক্ষণ পরে প্রতাপসিংহ বলিলেন। “ভাই! আজ প্রতাপের পরাজয় নহে সম্পূর্ণ জয়ের দিন, আজ যে ধন পাইলাম পরাজয় তার কাছে অতি হেয়, অতি তুচ্ছ, এখন আমরা চিরকাল এভাবে থাকিলে দুই ভ্ৰাতায় স্বদেশ রক্ষা করিতে পারিব। “পথিমধ্যে ‘চৈতকের প্রাণ বিয়ােগ হইয়াছিল, প্রতাপ সেই স্থানে একটী মন্দির প্রস্তুত করিয়া তাহার নাম “চৈতককাচবুতর” রাখেন। এদিকে কমল মীর দুর্গ মােগলের করায়ত্ত হইল, মানসিংহ ধুম্পতি ও গােগুণ্ডা দুর্গ অধিকার করিলেন। মুসলমান সৈনিকগণ প্রতাপের অনুসরণ করিতে লাগিল। প্রতাপ ক্রমে নানা পার্বত্য দেশে বিচরণ করিতে লাগিলেন। প্রতাপের এই আত্ম ত্যাগে শত্রুর হৃদয়ও আত্র হইয়াছিল। এমন কি দিল্লীর প্রধান কর্মচারী প্রতাপের দেশ হিতৈষণায় মােহিত হইয়া নিম্নলিখিত রূপে এক পত্র লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন। “ধন, জন, যৌবন যত কিছু বল, জগতে ইহার কিছুই স্থায়ী নহে, আজ যে, ঐশ্বৰ্য মদে মত্ত হইয়া, ধরাকে সরার ন্যায় জ্ঞান করিতেছে, প্রতাপসিংহের শৌর্য্য। ১৯ কে বলিতে পারে কাল সে দীন বেশে অরণ্যে বিচরণ করিবে না । কিন্তু কীৰ্ত্তিই কেবল জগতীতলে চিরস্থায়ী থাকে। আজ তুমি যে কীত্তি রাখিয়া মরিলে, দুই শতকি দুই সহস্র বৎসর পরেও তােমার প্রেতাত্মাকে কীৰ্ত্তি জীবিত রাখিবে। প্রতাপ তুমিই ধন্য ! তােমার কীর্তিকলাপও ধন্য । তুমি বহু কষ্ট সহ্য করিয়াও জাতি ও মান বিক্রয় কর নাই। বার বার মােগল দ্বারা ক্ষতি সহ্য করিয়াও তাহার অধীনতা স্বীকার কর নাই।ধন্য তুমি, ধন্য তােমার অক্ষয় কীর্তি।” এইরূপ প্রতাপ শত্রুর নিকটও প্রশংসা ভাজন হইয়াছিলেন। প্রতাপ কোন সময় এরূপ কষ্টে পতিত হন, যে তাহার স্ত্রী ও পুত্র বধূ “মল” নামক ঘাষের বীজ দ্বারা রুটী প্রস্তুত করিয়া তাহা আহার করতঃ জীবন ধারণ করিতেন। একদা প্রতাপের একটি শিশু কন্যা এই রুটী খাইতে ছিল, দুর্ভাগ্যবশতঃ একটী বন্য বিড়ালে রুটীখানা কাড়িয়া লইয়া যাওয়াতে বালিকাটি ক্রন্দন করিতে থাকে,প্রতাপ সে ক্রন্দন শ্রবণে এতদূর দুঃখিত হইলেন যে, তিনি অকিবরের নিকট পত্র লিখিয়া আত্মসমর্পণের অভিপ্রায় জানাইলেন।” এই সংবাদে আকবর তাহার দেশমধ্যে মহােল্লাসের অনুষ্ঠান করিলেন। বিকানীরের অধিপতির কনিষ্ঠ ভ্রাতা পৃথিরাজ স্বদেশহিতৈষী ছিলেন, তিনি এসংবাদ শ্রবণে অতিশয় মর্মাহত হইয়া প্রতাপকে নিম্নলিখিত রূপে একখানা পত্র লিখিলেন। “মহারাণা প্রতাপ! হিন্দুদিগের গৌরব, আশা ও ভরসা সমস্তই হিন্দুদিগের উপর ন্যস্ত আছে ; রাণা জানিয়াও তাহা পরিত্যাগ করি- তেছেন। সর্দার গণের সেই বীরত্ব নাই, রমণীগণের সেই সতীত্ব গৌরব নাই, আমাদের জাতীয় বাজারে আকবর একজন ক্রেতা। তিনি সকল কেই ক্রয় করিয়াছেন --কেবল উদয়ের তনয় প্রতাপকে ক্রয় করিতে পারেন নাই। সকলেই হতাশ্বাস হইয়া নয়ােজার বাজারে আপনাদের আৰ্য-কাহিনী। অপমান সহ্য করিয়াছেন।কেবল হামিরের বংশধরকে আজ পর্যন্ত সে অপমান সহ্য করিতে হয় নাই। অগৎ জিজ্ঞাসা করিতেছে নিধন প্রতাপের সহায় কোথায় ? রাজপুতের পুরুষত্ব ও তরবারিই প্রধান সহায়। তিনি সাহস, বল এই সমস্ত অবলম্বনের বলেই স্বাধীনতা রক্ষা করিয়াছেন। বাজারে এই ক্রেতা চিরকাল জীবিত থাকিবে না,-এক- দিন অবশ্যই ইহলােক হইতে অপসৃত হইবে। তখন আমাদের সকলেই জাতির জন্য প্রতাপের নিকট উপস্থিত হইবে, যাহাতে জাতি রক্ষা হয় তাহার জন্য সকলেই প্রতাপের মুখ পানে চাহিয়া রহিয়াছেন।” পৃথীরাজের এই উৎসাহ পূর্ণ পত্রে প্রতাপ দ্বিগুণিত বল প্রাপ্ত হইলেন, ইহা প্রতাপের নৈরাশ্য হৃদয়ে আশার জ্যোতি প্রদান করিল, এবং তিনি পুনরায় স্বদেশে স্বাধীনতা সূর্য উদয় করিবার জন্য ব্যর্থ হইয়া উঠিলেন। প্রতাপ আকবরের নিকটে অধীনতা স্বীকারের সংকল্প পরিত্যাগ করিলেন। কিন্তু এই সময়ে দুরন্ত বর্ষা উপস্থিত হইল। প্রতাপ আর পার্বত্য প্রদেশে থাকিতে পারিলেন না,অগত্যা তিনি মিবার ভূমি পরিত্যাগপূর্বক মরুভূমি অতিবাহন করিয়া সিন্ধু নদীর তটে যাইতে সংকল্প করিলেন এবং কতিপয় বিশ্বস্ত রাজপুতের সহিত আরা- বলী পৰ্বত হইতে উপত্যকা ভূমিতে অবতীর্ণ হইলেন এই সময় তাহার একটী বিশ্বস্ত মন্ত্রী “ভামাসাহ” তাহার পূর্বপুরুষগণের সঞ্চিত সম্পত্তি আনিয়া প্রতাপের নিকট উপস্থিত করিলেন। ভামাসাহের এত সম্পত্তি ছিল যে, তাহার দ্বারা পচিশ হাজার নৈনিক পুরুষের শতবৎসরের ব্যয় অনায়াসে নিৰ্বাহ হইতে পারিত। প্রতাপ পুনরায় স্বাধীনতা মন্ত্রে দীক্ষিত হইলেন, এবং সর্ব সমক্ষে প্রতিজ্ঞা করিলেন, “মন্ত্রের সাধম কিম্বা শরীর পতন হয় স্বাধীনতা রক্ষা করিব, নয় রণক্ষেত্রে অরাতি নিধন করতঃ প্রাণত্যাগ করিব।” অবিলম্বে সৈনিক সকল একত্রিত হইল। এবং প্রতাপ সৈন্য সমভি- প্রতাপসিংহের শৌর্য ৬১ ব্যাহারে আরাবলী পৰ্বত অতিক্রম করিলেন। মােগল সেনাপতি সসৈন্যে সেরিচ নামক স্থানে অবস্থিতি করিতেছিলেন, প্রতাপ প্রবল বেগে মােগদিগকে আক্রমণ করিলেন। দেবীরের যুদ্ধে প্রতাপের জয়- লাভ হইল। সাহাবাজ খাঁ সসৈন্যে নিহত হইলেন। ক্রমে কমলমীর ও উদয়পুর প্রতাপের হস্তগত হইল। চিতাের ও আজমীর ব্যতীত সমস্ত মিবার প্রদেশ প্রতাপের পদানত হইয়া উঠিল। আকবর প্রতাপের বিজয় বার্তা শ্রবণ করিলেন। আকবর দশবৎসর বহু অর্থ ও সৈন্য ব্যয় করিয়া মিবারের যে বিজয় লক্ষ্মী অধিকার করিয়াছিলেন প্রতাপ দেবীরের যুদ্ধে জয়ী হইয়া সে সমস্ত অধিকার করিলেন এবং উদয়- পুরে স্বীয় রাজধানী স্থাপন করিলেন। ধন্য প্রতাপ ! ধন্য তােমার বীরত্ব !! ধন্য তােমার স্বদেশ হিতৈষীতা !!! ধন্য তােমার সহিষ্ণুতা !!! ইহার পর দিল্লীরাজ আর মিবার আক্রমণ করিলেন না, প্রতাপ নিশ্চিন্তমনে রাজত্ব করিতে লাগিলেন। প্রতাপ চিতাের উদ্ধার করিতে না পারিয়া মনােবেদনায় অধীর হইলেন। এইরূপ অন্তদহে অল্পকাল পরেই তাহার অন্তিমকাল আসিয়া উপনীত হইল এবং পেশােল নদী তীরে একটা ক্ষুদ্র কুটীরে তাহার জীবন প্রদীপ নিৰ্বাপিত হয়। মৃত্যুর পূর্বে প্রতাপের বদন হইতে বিকৃত রব বাহির হইতে লাগিল। প্রতাপ পুত্রের বিলাসিতায় নিতান্ত দুঃখিত হইয়াছিলেন। প্রতাপের কষ্ট দেখিয়া একজন সামন্ত কহিল, “মহারাজের এত কষ্ট হইতেছে কেন ?” প্রতাপ উত্তর করিলেন, “যাহাতে জন্মভূমি তুর্কির হস্তগত না হয় তদ্বিষয়ে কোন প্রতিশ্রুত জানিবার জন্য এখনও প্রাণ বাহির হইতেছে না।” পরে বলিলেন—“হয়ত এই কুটীর প্রসাদে পরিণত হইবে, মিবারের স্বাধীনতার জন্য যত চেষ্টা করিয়াছি তাহা হয়ত-এই কুটীর সঙ্গেই আৰ্য-কাহিনী। বিলীন হইবে।” সর্দারগণ শপথ করিয়া বলিলেন, “যে পর্যন্ত মিবার স্বাধীন না হইবে ততদিন কোন হৰ্ম নিৰ্ম্মিত হইবে না”। প্রতাপ সর্দার- গণের বাক্যে আনন্দিত হইলেন, নিৰ্বাননান্মুখ প্রদীপের ন্যায় তঁাহার মুখ মণ্ডল প্রদীপ্ত হইল, তিনি ১৫৯৭ খৃষ্টাব্দে ইহলােক হইতে অপস্ত হইলেন। যদিচ হিমালয়ের অভ্রভেদী চূড়া চূর্ণ হইয়া যায়, যদিচ ও প্রশান্ত ভারত মহাসাগরের বারি রাশি এককালে শুষ্ক হইয়া যায় তাহা হইলেও প্রতাপের এই মানবাতীত কীৰ্ত্তি লােপ হইবে না। ধন্য প্রতাপ ! ধন্য তােমার স্বদেশ বৎসলতা! তুমি মৃত্যুকালেও স্বদেশের জন্য কঁাদিয়াছ !
No text on this page.
* এ
on!
ছত্রপতি শিবজী
ছত্রপতি শিবজী শিবজী ১৬২৭ খৃঃ জিজিবাই নাম্নী জনৈক মহারাষ্ট্র রমণীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন। ইহার পিতার নাম সাহজী। যখন শিবজী তিন বৎসর বয়স্ক তখন সাহজী টুকাবাই নাম্নী আর একটী রমণীর পাণি গ্রহণ করেন। সুতরাং জিজিবাইকে দাদাজী নামক জনৈক বিশ্বস্ত ব্রাহ্মণের রক্ষণাবেক্ষণের ভার প্রদান করিয়া স্বয়ং কর্ণাটাভিমুখে প্রস্থান করেন। দাদাজী পুনানগরে একটি গৃহ নিৰ্মাণ করিয়া তন্মধ্যে জিজিবাই ও শিবজীকে বাস করিতে আদেশ করিলেন। বাল্যাবধি শিবজী দাদাজীর অধীনে থাকিয়াই শিক্ষালাভ করিতে লাগিলেন। শিবজী লেখা পড়ার পারগ ছিলেন না। কিন্তু তিনি ধনুৰ্ব্বান, বর্ষা, অশ্ব চালনা প্রভৃতি বিষয়ে অতিশয় সুনিপুণ হইলেন। মহারাষ্ট্রীয়দিগের মধ্যে ইনিই বিশেষ খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভ করিলেন। বয়ােবৃদ্ধি সহকারে শিবজী তেজীয়ান দৃঢ়কায় ও বলবান হইয়া উঠিলেন। তিনি যে সর্বদাই অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষায় অতিবাহিত করিতেন এমত নহে। বীর কাহিনী শ্রবণ করিতে তাহার বড়ই অনুরাগ ছিল। অবসর মত রামায়ণ, মহাভারতের অনন্ত বীরত্বের কথা শ্রবণ করিতেন। ভারতবর্ষীয় প্রাচীন আর্যবীরদিগের জীবনী শ্রবণেও তদনুরূপ অনুকরণের বাসনা তাহার হৃদয়ে প্রবল হইয়া উঠিল, এবং মুসলমানদিগের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ জন্মিল। তিনি সর্বদাই এইরূপ বলিতেন, “আমি মুসলমানদিগকে পরাজিত করিয়া স্বাধীন রাজা হইব। বস্তুতঃ ইহার বাক্য নিস্ফল হয় নাই। মহারাষ্ট্রে বিজয়পুর রাজের অধিকৃত কতকগুলি গিরি দুর্গ নির্মিত ছিল, কিন্তু অস্বাস্থ্যকর স্থান বলিয়া তথায় অধিক সৈন্য থাকিত না । শিবজী ছলে কৌশলে তাহার অধিকাংশ নিজ হস্তগত করিলেন এবং ১৬৪৮ খ্রঃ শিবজীর কর্মচারী আরাজী স্বর্ণ দেব করুনের উত্তরখও আত্ম- ।
আৰ্য-কাহিনী। সাৎ করিয়া ফেলেন। তখন বিজয়পুরাধিপতি সুলতান ক্রোধে অধীর হইয়া শিবজীর পিতাকে কারারুদ্ধ করিলেন এবং বলিলেন “যদি অমুক দিনের মধ্যে তােমার পুত্ৰ অধীনতা স্বীকার না করে তবে জীবদ্দশায়ই তােমাকে সমাহিত করিব।” পিতার বিপদ বার্তা শ্রবণে শিবজী মহা চিন্তার মধ্যে পড়িলেন, কিন্তু সুবােধ ব্যক্তি কখনও বিপদে কর্তব্য ভুলিয়া যায় না। তিনি বুঝিয়াছিলেন বশ্যতা স্বীকার করাই শঠশত্রুকে প্রসন্ন করিবার উৎকৃষ্ট উপায়। তাই ভয় প্রদর্শন না করিয়া সাজাহানের শরণাপন্ন হইলেন। এবং তাহার অনুগ্রহে পিতার কারামোচন সম্পন্ন করিলেন, শিবজীর পিতা কারাগার হইতে মুক্ত হইলেন বটে কিন্তু সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন হইতে পারিলেন না, চারি বৎসরের জন্য তাহাকে বিজয়পুর অধিপতির নজরবন্দী রূপে থাকিতে হইল। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে শিবজীর কোনরূপ অত্যাচার পরিলক্ষিত হইল না। তাই বিজয়পুর অধিপতি ১৬৫৩ খৃঃ শিবজীর পিতাকে বিনিমুক্ত করিলেন। সাহজী কারাগার হইতে মুক্ত হইলে শিবজী পুনরায় আপন আধিপত্য বিস্তারের মনন করিলেন। যখন আরঙ্গজেব পিতাকে রাজ্যচ্যুত ও কারারুদ্ধ করিয়া স্বয়ং ময়ুরাসনে আরােহণ করেন তখন শিবজীর সহিত বিজয়পুর রাজের সন্ধি স্থাপিত হয়। এই সময় শিবজী পুনার নিকট কঙ্কন প্রদেশের অধিকাংশ স্থানের অধিশ্বর হইয়া- ছিলেন। শিবজীর সাত হাজার অশ্বারােহী ও পঞ্চাশ হাজার পদাতিক সৈন্য ছিল। ১৬৬২ খৃঃ যখন দিল্লীপতির অধিকার লুণ্ঠন করিতে প্রয়াস পান, সেই সময় দক্ষিনাপথে সায়েস্তা খাঁ শাসন কর্তৃত্বপদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি শিবজীকে পরাভব করিয়া পুনা অধিকার করেন এবং শিবজী বাল্যকালে যথায় বসতি করিতেন সায়েস্তা খ। সেই ভবন অধিকার করতঃ তথায় বসতি করিতে আরম্ভ করিলেন। তখন শিবজী সিংহগড় নামক দুর্গে ছত্রপতি শিবলী। আয় লইলেন। সায়েস্তা খাঁ শিবজীর অপূর্ব কৌশলের কথা জানিতেন, সুতরাং তদ্বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকিতেন। “তাহার অনুমতি ব্যতীত কোন সশস্ত্র মহারাষ্ট্রীয় পুনায় প্রবেশ করিতে পারিবে না, এ আদেশ ছিল। কিন্তু এ আদেশে কোন ফল দর্শিল না। সুচতুর শিবজীর অপূর্ব কৌশলে তাহা ব্যর্থ হইয়া গেল। একদা রজনী ঘাের তিমির বসন পরিধান করিয়া পৃথিবীতে অবতীর্ণ। হইয়াছে। সাড়া শব্দটুকু নাই,-পথ ঘাটে লােক নাই,-বাড়ী বাড়ী কোলাহল নাই,ঘরে ঘরে আর প্রজ্জ্বলিত দ্বীপ নাই-ধরা নীরব- নিস্তব্ধ। এই সময় একদল বিবাহ যাত্রী নিশিথিনীর নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিয়া ধীরে ধীরে পুনার অভিমুখে অগ্রসর হইতেছিল। সাহসী শিবাজী মাত্র পঞ্চবিংশতি জন সহচর সমভিব্যাহারে বরযাত্রীর সঙ্গে মিশিয়া পুনায় প্রবেশ করিলেন এবং বরাবর যাইয়া আপন বাটীতে উপস্থিত হইলেন। সায়েস্তা খ। নিদ্রায় অভিভূত ছিলেন সুতরাং বিপক্ষের আক্রমণ প্রতিরােধ জন্য কোন সুযােগ পান নাই। তাহার পরিবারস্থিত কয়েকটী স্ত্রীলােক এই আকস্মিক বিপদবার্তার সংবাদ পাইয়া সায়েস্তা খাঁকে জাগাইয়া ছিল। সায়েস্তাখা শয়নাগারের বাতায়ন দ্বারা পলায়ন করিবার জন্য চেষ্টা করিলেন কিন্তু বিপক্ষীয় কতিপয় ব্যক্তির তরবারির আঘাতে তাহার একটী অঙ্গুলী ছিন্ন হইয়া গেল, যাহাহউক তিনি কোনরূপে প্রাণ লইয়া পলায়ন করিলেন। তাঁহার পুত্র ও অনুচরবর্গ সকলে নিহত হইল। শিবজী আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া সমারােহের সহিত পুনরায় সিংহগড়ে প্রত্যাবর্তন করিলেন। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর এইরূণে বহুকাল অনন্ত কালসাগরে বিলীন হইয়া গিয়াছে। কিন্তু আজও আৰ্য-কাহিনী। শিবজীর বীরত্বকাহিনী বিলুপ্ত হয় নাই। মহারাষ্ট্রীয়গণ আজও আনন্দে শিবজীর এই বীরত্বকাহিনী কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন। শিবজীর মনে বিশ্বাস ছিল মহারাষ্ট্ৰীয়েরা অশ্বারােহী সেনার ফায্যে বিলক্ষণ পটু, সুতরাং তিনি কতকগুলি অশ্বারােহী সৈন্য লইয়া আরঙ্গজেবের অধিকৃত সুরাট নগর লুণ্ঠন করতঃ সিংহগড়ে প্রত্যাবর্তন করিলেন । পরে জল পথেও আপন আধিপত্য বিস্তার করিতে মনন করিলেন, বিপক্ষীয় যে সমস্ত রণতরি ছিল তাহার অধিকাংশ অধিকৃত হইল। একদা তিনি কতকগুলি সৈন্যের সহিত রণতরি আরােহণে যাইয়া বিজয়পুরপতির অধিকৃত কানাড়া দেশের অন্তর্গত বহু সমৃদ্ধি সম্পন্ন কতিপয় নগর লুট করিলেন। মক্কা গমনার্থী যাত্রীগণ সুরাটের বন্দরে আসিয়া জাহাজে আরােহণ করিত। এজন্য সুরাট মুসলমানদিগের একটা পবিত্র স্থান মধ্যে পরিগণিত ছিল। শিবজী সুরাট লুণ্ঠন ও যাত্রীপূর্ণ কয়েকখানি জাহাজ আত্মসাৎ করিয়া ফেলিলেন। এবং নিজের স্বাধীনতা প্রকাশের জন্য তিনি স্বনামে মুদ্রা অঙ্কিত করিতে লাগিলেন; এ সংবাদ শ্রবণে আরঙ্গজেবের অন্তরে দারুণ ক্রোধ ও জিঘাংসার উদয় হইল। তিনি শিবজীকে দমন করিবার অভিপ্রায়ে জয়সিংহ ও দলিপ খা নামক সেনাপতিদ্বয়ের অধীনে কতক- গুলি সৈন্য প্রেরণ করিলেন কিন্তু সুচতুর শিবজী ইহাদের সহিত সম্মুখ- সংগ্রামে প্রবৃত্ত না হইয়া সন্ধির প্রস্তাব করিলেন। এবং অবশেষে অত্যল্প সেনা সঙ্গে করিয়া জয়সিংহের শিবিরে উপনীত হইলেন। জয়সিংহ শিবজীকে যথােপযুক্ত অভ্যর্থনা করিলেন। সন্ধির নিয়ম নির্ধারিত হইয়া অনুমোদনের জন্য সম্রাট সকাশে প্রেরিত হইল। সম্রাটও নিয়ম সকল গ্রাহ্য করিয়া পাঠাইলেন। তদনন্তর শিবজী মােগলের পক্ষ হইয়া তাঁহার সহায়তা করিতে লাগিলেন। পরবৎসর সম্রাট কর্তৃক নানা প্রলােভনে ছত্রপতি শিবাজী। মােহিত হইয়া শিবজী অাপন পুত্র, পাঁচশত অশ্বারােহী ও সহস্র মাওয়ালী সৈন্যের সমভিব্যাহারে দিল্লীতে উপনীত হন। সম্রাট তাহাকে যথােপযুক্তরূপ সম্মান না করিয়া অহঙ্কার প্রকাশ- পূৰ্ব্বক উপেক্ষা প্রদর্শন করিয়া তদীয় গৰ্ব চুর্ণ করিবার প্রয়াস পাইলেন। শিবজী সম্রাট গৃহে সমাগত হইলে তাহাকে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীর আসন প্রদত্ত হইল; ইহাতে তিনি বড়ই মর্মাহত হইয়া তৎস্থান ত্যাগ করিলেন কিন্তু দিল্লী ত্যাগ করিয়া যাইতে সমর্থ হইলেন না। সম্রাট তাহার বাস গৃহে একজন রক্ষক নিযুক্ত করিয়া দিলেন। ইহাতে শিবজী মহাচিন্তার মধ্যে পড়িলেন তিনি কিরূপে দিল্লী হইতে প্রস্থান করিবেন তাহারই উপযুক্ত অবসর অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। প্রথমতঃ সুচতুর মহারাষ্ট্র পতি শিবজী সমাটের নিকট বলিলেন, “দিল্লীর জল বায়ু আমার সমভিব্যাহারী সৈন্যগণের সহ্য হয় না অতএব প্রার্থনা তাহাদিগকে স্বদেশে প্রেরণ করি।” সম্রাট মনে মনে ভাবিলেন,-সৈন্যগণ চলিয়া গেলে শিবর্জী সহায় বিহীন, সুতরাং সহজেই আয়ত্ত হইবেন, এই ভাবিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ অনুমতি প্রদান করিলেন। সৈন্যগণ চলিয়া গেল। শিবজী পীড়ার ভান করিয়া শয্যায় শায়িত রহিলেন। তদন্তর পীড়ার উপশম হইয়াছে এই ঘোষণা করিয়া তিনি বৃহৎ বৃহৎ ঝুড়ি পূর্ণ মিষ্টান্ন ফকির, দরিদ্র ও সন্ন্যাসীদিগকে বিতরণ করিতে লাগিলেন। এইরূপে তাহার গৃহ হইতে মিঠাই পূর্ণ অনেক ঝুড়ি বাহির হইতে লাগিল। অবশেষে তিনি নিজ ভূতকে শয্যায় শয়ন রাখিয়া নিজে এক ঝুড়ির মধ্যে আকঢ় হইয়া অপর একটার পুত্রকে আরােহণ করাইয়া বাহির হইয়া গেলেন। প্রহরীগণ মনে করিল মিষ্টান্ন যাইতেছে সুতরাং তাহারা আর দৃকপাত করিল না। অনতি দূরে এক অশ্ব প্রস্তুত ছিল, শিবজী তাহাতে আবােহন করিয়া পুত্রকে পশ্চাৎভাগে উপবেশন করাইয়া মথুবাভিমুখে প্রস্থান করিলেন।
আৰ্য-কাহিনী। তথায় তাহার এক বন্ধু ছিল তাহার নিকট পুত্র শম্ভুজীকে রাখিয়া, নিজে সন্ন্যাসী বেশে ভ্রমণ করিতে করিতে দক্ষিণা পথে উপস্থিত হইলেন এই সময়ও বিজয়পুরপতির সহিত যুদ্ধ চলিতেছিল, পাছে শিবজী বিজয়পুররাজের সহিত যােগদান করেন এই ভয়ে সম্রাট তাহাকে হস্তগত করিবার প্রয়াসী হইলেন। এবং এক জায়গীর প্রদান করত শিবজীর রাজা উপাধি দৃঢ়তর করিলেন। ইহার পর শিবজী গােলকুণ্ড ও বিজয়পুরের রাজাদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া তাহাদিগকে বড়ই ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিলেন। তাহাতে তাহার বাধ্য হইয়া তাঁহাকে বার্ষিক কর প্রদান করিতে স্বীকার করিলেন। কিছুকালের জন্য যুদ্ধ স্থগিত থাকিল। শিবজী নিজ রাজ্যে শান্তি স্থাপনের জন্য প্রয়াস পাইলেন। এবং রাজ্যের সুশাসন জন্য আইন প্রস্তুত করিতে ব্যাপৃত হইলেন। তারা কৃষকগণের উপর দৌরাত্ম, সরকারের প্রতি প্রবঞ্চনা, কিছুই লক্ষিত না হয় ইহা নির্ধারিত হইল। এবং সেনাদিগকে রাজকোষ হইতে বেতন প্রদত্ত হইবে, যাহা লুণ্ঠন করিয়া পাওয়া যাইবে তাহাতে তাহাদের কোন সত্ত্ব থাকিবে না। তাহা- দিগকে মাত্র পুরস্কার প্রদত্ত হইবে। এবং সৈনিকগণ হাবিলদার, মজুমদার সুবাদার প্রভৃতি পদে বিভক্ত হইবেন। যিনি যত সৈন্যের অধিনায়ক হইবেন তিনিই তদনুরূপ নাম প্রাপ্ত হইবেন। কোন সৈনিক মুসলমানগণের ন্যায় জায়গীর প্রাপ্ত হইবেন না ইহাও নির্ধারিত করিয়া দিলেন। আরঙ্গজেব পুনৰ্ব্বার সৌজন্য প্রদর্শন করিয়া শিবজীকে হস্তগত করিবার চেষ্টা পাইতেছিলেন। কিন্তু শিবজী নির্বোধ ছিলেন না, তিনি সম্রাটের কৌশল জালে জড়িত হইলেন না—প্রলােভন বাক্যে মােহিত হইলেন না—কেবল পূর্বের ন্যায় দক্ষিণা পথে আধিপত্য বিস্তার করিতে লাগিলেন। সুতরাং সম্রাটকে বাধ্য হইয়া প্রকাশ্য সংগ্রামে প্রবৃত্ত হইতে ছত্রপতি শিবাজী। হইল। তাহাতে শিবজী ভীত হইলেন না—তাহার একটি কেশও কম্পিত হইল না। আত্ম মর্যাদার অপমান করিয়া মােগলের আনুগত্য স্বীকার করিলেন না। তিনি বীরের ন্যায় আপন সম্মান অক্ষত রাখিবার জন্য যত্নশীল হইলেন। অচিরেই মােগলের কয়েকটী দুর্গ হস্তগত করিয়া পনর সহস্র অশ্বারােহী সমভিব্যাহারে পুনরায় সুরাট নগয়ে উপস্থিত হন। তিন দিবস পর্যন্ত নগর লুণ্ঠন করিলেন, কিন্তু কেহই সাহসী হইয়া তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিতে সক্ষম হইল না। সুতরাং মহারাষ্ট্রপতি অবাধেই সুরাটের ধনসম্পত্তি লুণ্ঠন করিয়া স্বরাজ্যে প্রত্যাবর্তন করিলেন। শিবজী যখন সুরাট নগর জয় করিয়া প্রতিগমন করিতেছিলেন তখন দায়ুদ খাঁ পাঁচ হাজার মােগল সেনা লইয়া তাহার পশ্চাদ্ধাবিত হইলেন। কিন্তু শিবজীর কিছুই অনিষ্ট করিতে পারিলেন না বরং নিজেই পরাভূত হইয়া ফিরিয়া আসিলেন। এইরূপে শিবজীর আধিপত্য বদ্ধমূল হইতে দেখিয়া আরঙ্গজেব মহাচিন্তিত হইলেন এবং শিবজীর বিরুদ্ধে চল্লিশ সহস্র সৈন্য প্রেরণ করিলেন; শিবজীও এ বিষয়ে ঔদাসীন্য ছিলেন না, তিনিও তদীয় সেনাপতিকে যুদ্ধ করিতে আদেশ প্রদান করিলেন। ইহাই মােগল- সম্রাটের সহিত মহারাষ্ট্রীয়দিগের প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ। ইহাতে অনেক সৈন্য নিধন হয় এবং মােগলেরা সম্পূর্ণ পরাজয় স্বীকার করে। ১৬৬৪ খৃষ্টাব্দে ৬ই জুন মহারাজ শিবজী রায়গড়ে রাজ চক্রবর্ত্তীয় সম্মানিত পদে আরূঢ় হন। বহু শাস্তুদশী বিচক্ষণ মনীষা সম্পন্ন পণ্ডিত গঙ্গাভটু যথাশাস্ত্র বিধানে শিবজীকে রাজ্যাভিষিক্ত করেন। শিবজী রাজ্যাভিষিক্ত হইয়া অপত্যনির্বিশেষে প্রজাপালন করিতে লাগিলেন। নর্মদা হইতে কৃষ্ণা নদী পর্যন্ত দক্ষিণ ভারতবর্ষে তাহার শাসন দণ্ড বিস্তৃত হয়। মহাবীর শিবজী অনেক দেশ জয় করিয়া আয় প্রাধান্য স্থাপনপূর্বক ১৬৮০ খৃষ্টাব্দে ৬ই এপ্রিল ৫৩ বৎসর বয়সে জ্বর রােগে ইহকালের জন্য সংসার হইতে বিদায় গ্রহণ করিয়াছিলেন।
আৰ্য-কাহিনী প্রকাশক প্রতিভাবান শ্ৰীযুক্ত বন্ধুবিহারী ধর প্রণীত গ্রন্থাবলী বঙ্গসাহিত্যে বেশ প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে ; তাহার পুস্তকাবলী ধর্মভাবপূর্ণ, সুন্দর কল্পনা প্রসূত, আবেগময়ী ভাষার ঝঙ্কার হৃদয়ানন্দ- দায়ক; কি রচনা নৈপুণ্যে, কি চরিত্র-চিত্রে, কি ভাব-মাধুর্য্যে, কি ভাষার লালিত্যে বন্ধু বাবুর গ্রন্থনিচয় সৰ্ব্বতােভাবে নূতন ও চিত্তাকর্ষক। তাহার লেখনী নিঃসৃত গার্হস্থ্য উপন্যাস শিক্ষিত সমাজে ও সমস্ত প্রসিদ্ধ সংবাদপত্রে প্রসংশিত কাকীমা (সচিত্র) (দ্বিতীয় সংস্করণ) পাঠ করুন। যদি কোনও অর্জনশীল যুবক সংসারের কর্তৃত্ব লাভ করিয়া ভাই ভাই ঠাঁই ঠাই হইবার সঙ্কল্প করিয়া থাকেন, যদি কোনও হিন্দু-গৃহস্থ কুললক্ষ্মী স্বামীর অর্থ সঞ্চয়ের জন্য তাহাকে এই ঠাই ঠাই হইতে পােষকতা করিবার বাসনা করিয়া থাকেন, তাহা হইলে একবার কাকীমা পাঠ করুন ; দেখিবেন ধর্মের জয় ও অধৰ্ম্মের ক্ষয়। নায়ক নায়িকার চরিত্র সৃষ্টি সম্পূর্ণ নূতন। পরােপকারী ম্যরে সাহেব, অফিষ মাষ্টার মিঃ টমসন, ভ্রাতৃদ্রোহী জ্যেষ্ঠ সহােদর গােপাল, ধর্মপ্রাণ কনিষ্ঠ গােবিন্দ, আদর্শ-বন্ধু পুলিশ ইনস্পেক্টর শচন্দ্র, বড় বৌ মােহিনী, সরােজিনীর আত্মােৎসর্গ ও রাজরাজেশ্বরীর ন্যায় প্রভাবশালিনী পতি- কাঙ্গালিনী কাকীমা (কমলার) চরিত্রপাঠে বুঝিবার অনেক বিষয় আছে। ইহা প্রত্যেক গৃহস্থেরই পাঠ্য। সুন্দর হাফটোন চিত্রাবলী শােভিত, ছাপা, কাগজ উৎকৃষ্ট, মূল্য—কাপড়ে বাঁধা, সােণার জলে নাম লেখা এক টাকা মাত্র। বাের্ডে বাঁধা, রূপার জলে নাম লেখা, • আনা। [ পর পৃষ্ঠা দেখুন।]
০ প্রসিদ্ধ “কাকী-মা” প্রণেতা প্রণীত উপন্যাস গ্রন্থাবলী । ১ম খণ্ড—৪ খানি একত্রে বাধান,—মূল্য । আনা। ১। বিষ-বিবাহ (সামাজিক উপন্যাস) বৃদ্ধ কালীশ্চন্দ্রের বালিকা বিবাহের শােচনীয় পরিণাম, দস্যুদলপতি শিবে ডাকাত, বাল- বিধবা সরস্বতীর চরিত্র অতি অপূৰ্ব্ব । ২। সতী কি কলঙ্কিনী—(গুপ্তপ্রণয়ের নিখুঁত চিত্ৰ) সতী- কুলরাণী চঞ্চলার অপূৰ্ব পতিভক্তি ও স্বার্থত্যাগে পাঠক কখনও অশ্রু সম্বরণ করিতে পারিবেন না। ৩। স্ত্রৈণের পরিণাম -(শিক্ষাপ্রদ গল্প) স্ত্রী-ইচ্ছার বশবর্ত্তী হইয়া কাৰ্য্য করিলে পুরুষের অধঃপতন যে অবশ্যম্ভাবী তাহা ইহাতে স্পষ্টই প্রতিয়মান করা হইয়াছে। বল ও বুদ্ধি—( চিত্তাকর্ষক গল্প ) অনন্ত কৰ্ম্মমালা পরি- পূর্ণ সংসার সাগরে বল ও বুদ্ধির পরীক্ষা। বঙ্কুবাবুর নাটকাবলী যাদব-কলঙ্ক বা চণ্ডী-চরিত—(পৌরাণিক নাটক) ইহাতে উর্বশী উদ্ধার, অষ্টবস্ত্র মিলনাদি আছে। আনা স্থলে ty আনা। রাবণ-কন্যা-সীতা—(পৌরাণিক দৃশ্যকাব্য) ইহাতে মন্দোদরীর গর্ভে সীতার জন্ম, রাবণের দিগ্বিজয়, মেঘনাদের যুদ্ধ সজ্জা, বিভীষণের উপর রাবণের ক্রোধ প্রকাশ ইত্যাদি বিষয় আছে-ভাব ও ভাষা উৎকৃষ্ট। মূল্য ৪০ স্থলে।• আনা। [ পর পৃষ্ঠা দেখুন !! ৪। মূল্য • প্রতিভাবান শ্ৰীযুক্ত বন্ধুবিহারী ধর-প্রণীত গৌরী-দান (সচিত্র ) নূতন সামাজিক উপন্যাস। যে স্বদেশ মন্ত্রে দেশ জাগিয়াছে, তাহারই সাধনা ও সিদ্ধির পথে অগ্রসর হইবার জন্য “গৌরী-দান” লিখিত ; ইহার অস্থিমজ্জায় স্বদেশ প্রেম, স্বদেশ ভক্তি ও স্বদেশ প্রীতি পরিস্ফুটিত হইয়াছে ; ইহা একখানি বাঙ্গালীর সমাজ, সংসার ও ধর্মের নিখুঁত চিত্র। কে আছেন কন্যাদায় গ্রস্ত হিন্দু সন্তান, কে আছেন বাঙ্গালীর বরপক্ষীয় অভিভাবক, একবার গৌরী-দান উপন্যাস পাঠ কবিয়া বাঙ্গালীর প্রকৃত অবস্থা, কাৰ্য্য ও কর্তব্য নির্ণয় করুন। স্বদেশ, সমাজ ও মাতৃদ্রোহী কাশিনাথের অধঃপতন, তােষামােদী দয়াময় ও বলাইচঁাদের অপমৃত্যু, স্বদেশ ও মাতৃভক্তবীর হর- বল্লভের গৌরী-দান” ও ঋণ-পরিশােধ, ব্রাহ্মণ হলধরের সমাজ-শৃঙ্খলা-সং- রক্ষণ. স্পৃহ', অর্থপিশাচ বরকত্তা শ্যামচরণের অধােগতি, বরবেশী শান্তিময়ের অসামান্য স্বার্থত্যাগ, মুসলমান সর্দার রেজাখার প্রভুভক্তি, ইংরাজবণিক মিঃ ইলিয়ট, মিঃ হ্যারিংটন, মিঃ রুস ইত্যাদি সাহেবদিগের কাৰ্য কলাপ, ধৰ্ম্মবীর-মাতা মানদাসুন্দরীর উপদেশ, ষড়ৈশ্বৰ্য্যময়ী কুসুম-স্বরূপিণী হিন্দু- বিধবা সুহাসিনীর স্বধর্ম পালন, পতিপ্রেম-বঞ্চিত বৌ-মা লক্ষ্মীমণি ও মুসলমান সর্দার-পত্নী জোবেদা ও জোহেরার চরিত্র সৃষ্টি সম্পূর্ণ নূতন। মমতায় নির্মমতায়, কোমলে কাঠিন্যে, হে স্বার্থ বিসর্জনে এক জোবেদার চরিত্র অতীব রহস্যময়। প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত ঘটনাচক্রের অনন্ত প্রবাহে আপনি মন্ত্রমুগ্ধবৎ ইহা পাঠ করিবেন। ছাপা কাগজ-উৎকৃষ্ট, চিত্রাবলী প্রসিদ্ধ শিল্পী প্রিয় গোপাল দাসের দ্বারা অঙ্কিত ; বঙ্গসাহিত্যে ইহা একখানি অমূল্য গ্রন্থ। পুস্তক পাইবার ঠিকানা শ্রীগােঠবিহারী ধর এণ্ড ব্রাদার্স। “বধা-এজেন্সী”, ২২নং ফকিরচাদ চক্রবর্তীর লেন, কলিকাতা। এবং সমস্ত প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে। - জ্ঞান-বিজ্ঞানময় অনন্ত তত্ত্বে পরিপূর্ণ অভিনব গ্রন্থ গুগু-সাধন-তত্ত্ব। } যাহা কখনও হয় নাই—এই বার তাহাই হইল। দেশব্যাপী সংগ্রহে গুপ্ত সাধন তত্ত্ব প্রকাশিত হইল। এই গ্রন্থ দ্বাদশ খণ্ডে সমাপ্ত। প্রতি খণ্ডের বিষয় ও ব্যাপার, স্বতন্ত্র এবং সকল ক্রিয়া বিশিষ্ট। বিজ্ঞাপনে সমস্ত কথা বুঝান অসম্ভব,—বিষয় অনন্ত, ক্রিয়া পদ্ধতি অসংখ্য। সংক্ষেপে তাহার আভাস এই রূপ : ১ম খণ্ডে :—জগতত্ত্ব, ব্ৰহ্ম ও ঈশ্বর, প্রকৃতি ও পুরুষ ; আত্মা, ঈশ্বরের সহিত জীবের সম্বন্ধ ; জন্মান্তর তত্ত্ব প্রভৃতি। ২য় খণ্ডে : সুন্দরী সাধন, কালী সাধন, শব সাধন, প্রভৃতি। ৩য় খণ্ডে :-বশীকরণ, শুনুন, উচাটন, প্রভৃতি। ৪র্থ খণ্ডে :—যোগতত্ত্ব ও আসন, প্রাণায়াম প্রভৃতি। • ৫ম খণ্ডে :—বিভূতি বিদ্যা, মহিমা, প্রাকম্য, প্রভৃতি বিবিধ আশ্চৰ্য্য ও অদ্ভুত কাণ্ড করিবার বৈজ্ঞানিক ও ঐন্দ্রজালিক উপায়। ৬ষ্ঠ খণ্ডে :—মেসমেরিজ করিবার বহুবিধ প্রণালী। ৭ম খণ্ডে :—সামুদ্রিক শাস্ত্রমতে হস্তপদ ও কপালের গণনা প্রভৃতি। ৮ম খণ্ডে :-জ্যোতিষ শাস্ত্ৰ মতে কোষ্ঠীগণনা প্রভৃতি। ৯ম খণ্ডে :-ভূতছাড়ান, ভূতনামান, জলপড়া, ফুলপড়া, প্রভৃতি। ১ম খণ্ডে—সর্প চিকিৎসা, বিষ চিকিৎসা প্রভৃতি। ১১শ খণ্ডে :—শাস্ত্রীয় প্রতিপাল্য বিধি নিষেধ বিষয়ক বহুবচন ও তৎ অনুবাদ প্রভৃতি। ১২শ খণ্ডে সন্ন্যাসী মােহকগণের গুপ্ত পুথি হইতে সফলপ্রদ ঔষধৰাজীর ব্যবস্থা সংগ্রহ। এমন গ্রন্থ—এমন বিশ্বব্যাপী সংগ্রহ গ্রন্থ আর নাই। মূল্য ৩, স্থলে ১০০ টাকা। মাশুল • আনা। শ্রীগােষ্ঠ বিহারী ধর এণ্ড ব্রাদাস “ববা”-এজেন্সি, ৩৫৬, অপার চিৎপুর রােড, কলিকাতা।
রঘু-ডাকাত ফুয়াইয়া গিয়াছিল, শত সহস্র গ্রাহকের আগ্রহে আবায় ছাপা হইল। সেই বিশ্ববিখ্যাত রঘুসর্দারের ভীষণ কাহিনী পড়িতে কাহায় না কৌতুহল হয়? অনেক কেবল সেই দুর্দান্ত রঘুডাকাতের নামমাত্র শুনিয়াছেন, কিন্তু তাহার অপূর্ব কাৰ্যকলাপ, অসীম, প্রতাপের কথা সকলকেই বিস্মচকিতচিত্তে পাঠ করিতে হইবে; সকলে সত্বর হউন, প্রত্যহ রাশি রাশি পুস্তক বিক্রয় হইতেছে, এবার ফুরাইলে অনেক দিন অপেক্ষা করিতে হইবে; এবার এই উপন্যাস চিত্রলােভিত ও সুরম্য বঁাধান। মূল্য ১ টাকা মাত্র। মৃত্যু-রঙ্গিণী এই উপন্যাসের নায়িকা সুন্দরী যথার্থই মৃত্যু-রঙ্গিণী বটে; এই রমণী পিশাচী অপেক্ষাও ভয়ঙ্করী, নরহত্যা, নারীহত্যা, স্বামীহত্যা, হত্যার উপরে হত্যা ; এই রমণী সাহসে প্রতাপে, কৌশলে চাতুৰ্যে, শঠতায়, দম্ভে গর্বে কোন অংশে রঘুডাকাতের কম নহে; ইহাকে মেয়ে রঘুডাকাত বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। সুরম্য বাঁধান, সচিত্র। মূল্য ১ মাত্র। রবার্ট ম্যাকেয়ার (ইংলণ্ডে ফরাসীদ) জগদ্বিখ্যাত রেনলড সাহেবের প্রসিদ্ধ ইংরাজী নতেলের বাঙ্গালা অনুবাদ। সকলেই রঘুডাকাতের অনেকানেক ভয়ানক ঘটনার কথা শুনিয়াছেন, কিন্তু সেই দুর্দান্ত রঘুডাকাতও এই বিখ্যাত ফরাসীদ্য ম্যাকেয়ারের নিকট নগণ্য। কি বীরত্বে, কি চাতুৰ্যে, কি কূট মন্ত্রণা, কি ভীষণ ষড়যন্ত্রে দ্য ম্যাকের অদ্বিতীয়—তুলনা হয় না। লণ্ডনের নামজাদা গােয়েন্দা গণের চক্ষে ধূলিমুষ্টি নিক্ষেপ কমিয়া ম্যাকেয়ার গিন্নি করি। তাহার ভয়ানক কাণ্ডকারখানা চুরি উপরে চুরি, খুনের উপরে খুন, ডাকাতির উপরে ডাকাতি, প্রভৃতি ভীষণ কাহিনী মুন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় পড়িতে হইবে। অনেক সুন্দর ছবি আছে। সুলত মূল্য ১• মাত্র। গােষ্ঠবিহারী ধর এণ্ড ব্রাদার্স। বসুধা এজেন্সী, ৩৫৬, পায় চিৎপুর রােড নূতনবাজার, কলিকাতা। ।
সুপ্রসিদ্ধ ডিটেক্টীত ঔপন্যাসিক শ্ৰীযুক্ত পাঁচকড়ি দে মহাশয়ের সচিত্র ডিটেকটিভ উপন্যাস। ১do I/০ ১০ ১/• পরিমল ৭০ মায়াবিনী জীবন্মত-রহস্য নীলবসনা সুন্দরী ১০ গোবিন্দরাম sdo ভীষণ প্রতিশােধ ১০ বিষম বৈসুচন ১০ জয়-পরাজয় শােণিত-তর্পণ ১০ লক্ষটাকা প মৃত্যু-রঙ্গিনী ১ হরতনের নওলা ১১ মনােরম পd০ মায়াবী হত্যাকারী কে সতী শােভনা রহস্য-বিপ্লব ভীষণ প্রতিহিংসা হত্যা-রহস্য প্রতিজ্ঞা-পালন সুহাসিনী রঘু-ডাকাত বাঙ্গালীর বীরত্ব নরবলী শক-দুহিত। সােনার সংসার ১১ দ এই পুস্তকগুলি সাধারণের নিকটে এতদূর আদৃত হইয়াছে যে উর্দ, ইংরাজী প্রভৃতি সমগ্ৰ সভ্যজাতির ভাষায় অনুবাদিত হইতেছে। প্রত্যহ রাশি রাশি বিক্রয় হইতেছে, গ্রাহক সত্বর হউন। শ্রীগােষ্ঠবিহারী ধর এণ্ড ব্রাদাস', বসুধা এজেন্সী, ৩৫৬ অপার চিৎপুর রােড, কলিকাতা।
আমাদিগের পরীক্ষিত কয়েকটা ঔষধ
গহস্থ মাত্রেরই সংগ্রহ করা আবশ্যক
বিপিন-তৈল।
এই তৈল নিয়মিতরূপে ব্যবহার করিলে যাবতীয় চর্মরােগ যথা :
খোষ-পাঁচড়া, চুলকানি, নালি ঘা, শশার ঘা, কাউর, এবং সকল প্রকার
বাতজনিত বেদনা, কনানি চিরে আরােগ্য হয়।
মূল্য ৪ ঔ শিশি • আনা, ২ ঔস শিশি।• আনা।
কার্বলিক টুথ,
পাউডার
সকলরূপ দন্ত রােগের মহৌষধ, মূল্য ডজন • আনা।
এক ভ মনের কম পাঠান হয় না।
বাধকের
অব্যর্থ মহৌষধ
ইহাতে স্ত্রীধৰ্ম্ম কালীন বেশী বা কম রক্তস্রাব, অনিয়মিত স্ত্রীধর্য
শ্বেত বা রক্ত প্রদর মৃত বৎসা ও বন্ধ্যাত্ব, ও পুত্র জন্মের স্নিকর যাবতীয়
রােগ নিঃশেষ আরাম হয়। ১ দিনে উপকার জাত হইবেন। বড় কোটা
টাকা, ছোট কৌটা ১•; ডাঃ মাঃ স্বতন্ত্র ।
নীরােগ শরীরে দীর্ঘ জীবন লাভের ইচ্ছা হইলে এ, সি সরকারের
কিউরেল
সেবন করুন। যাহার শরীর অত্যন্ত কৃশ ও দুর্বল, সৰ্ব্বদাই ক্লান্ত,
কত্তবা কাৰ্যে অমনােযােগীতা ও শারীরিক অবসন্নতা ভাব বােধ হয়, তিনি
এই “কিউবেল সেবন করুন। শরীর সতেজ ও সবল হইবে, ইহা ব্যতীত
“কিউরেল সেবনে সকল প্রকার পারা সংক্রান্ত রােগ মন্ত্রবলের ন্যায়
আরােগ্য হয়। মূল্য প্রতি শিশি ১, মাশুলাদি • আনা।
প্রাপ্তিস্থান -
এজেন্টস-গােষ্ট বিহারী ধর এণ্ড ব্রাদা
( সুধা -এজেন্সী” ৩৫৬, অপার চিৎপুর রোড, কলিকাতা।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.