Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Bhakta-charitamrita

Chattopadhyay,aghoranath · 2010/01/15

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ভক্ত-চরিতামৃত অর্থাৎ শ্রীগৌরাঙ্গপ্রবর্তিত বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের আদি- ওঃৎ রূপ, সনাতন ও জীব- গোস্বামীর জীবনচরিত। প্রেম-ভজিতত্ত্বের সমালােচনা সম্বলিত “ধৰ্ম্মঃ প্রােজঝিত কৈতবােহ পরমােনিৰ্ম্মৎসৱাণাং সং শ্রীমদ্ভাগবত। শ্ৰীঅঘােরনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রণীত। শ্রীঅধরচন্দ্র বসু কর্তৃক প্রকাশিত। কলিকাতা, ১৭নং রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়ের স্ট্রীট, “মণিকা প্রেসে শ্রীনটবিহারী ঘােষ দ্বারা মুদ্রিত। ১৩০০ সাল। মূল • দশ আনা।

No text on this page.

উৎসর্গ।
পরম পূজ্যপাদ
স্বর্গীয় রামতারণ চট্টোপাধ্যায়
জ্যেষ্ঠতাত মহােদয়ের
শ্রীচরণ কমলে
এই গ্রন্থ
একান্ত ভক্তি সহকারে
উৎসর্গীকৃত
হইল।

No text on this page.

সূচিপত্র।
বিষয়।
পৃষ্ঠা।
/
১
২০
२४
৪০
৫৩
অবতরণিকা
শ্রীরূপ ও শ্রীসনাতন গােস্বামী–পূৰ্ববিবরণ
ঐ চৈতন্যের সহিত মিলন ও বৈরাগ্যোদয়
সনাতনের রাজকৰ্ম্ম পরিত্যাগ ও কারাবাস
শ্রীরূপের প্রয়াগ গমন ও ভক্তি-তত্ত্ব শিক্ষা
সনাতনের কারামুক্তি ও শ্রীচৈতন্যের সহিত মিলন
কাশীধামে “সনাতন-শিক্ষা-তত্ত্ববিচার বা শ্রীকৃষ্ণতত্ত্ব
সম্বন্ধবিচার বা জীবতত্ত্ব
অভিধেয়-তত্ত্ব
প্রয়ােজন-তত্ত্ব
সনাতনের “বৈষ্ণবতি” বিষয়ে উপদেশ গ্রহণ ও
বৃন্দাবন যাত্রা
শ্রীরূপের নীলাদ্রি গমন •••
সনাতনের নীলাদ্রি গমন
বৃন্দাবনবাস ও জীব গােস্বামীর বিবরণ
পরিশিষ্ট।
s
৮১
}}
১৪৭

No text on this page.

অবতরণিকা। তান্ত্রিকদিগের রহস্যময় জুগুষ্পিত ভীষণ ব্যবহারে যখন বঙ্গদেশ শুষ্ক নীরসমূর্তি ধারণ করিয়াছিল, ন্যায় শাস্ত্রের বাদবিতণ্ডা, তান্ত্রি কাচারের পঞ্চম”-কার ও প্রাণশূন্য আড় রময় বাহক্রিয়া মাত্র যখন ধর্মের স্থান অধিকার করিয়াছিল, সেই সময়ে শ্রীচৈতন্য নবদ্বীপধামে জন্ম গ্রহণ করিয়া উত্তপ্ত মরুময় বঙ্গদেশে হরিভক্তির প্রবল বন্যা প্রবাহিত করিয়া- ছিলেন। তাহার ভক্তি-গদ গদ দিব্যকান্তি সর্শন করিয়া ও অমৃতায়মান ভক্তি-পরিপ্লত উপদেশ বচন শ্রবণ করিয়া সংসারতাপে উত্তপ্ত শত শত ব্যক্তির প্রাণ পরিতৃপ্ত হইতে লাগিল। তিনি অনুচরবৃন্দ সমভিব্যাহারে প্রমত্তভাবে হরিগুণানুকীৰ্ত্তনে প্রবৃত্ত হইয়া যখন মহাভাব-রসে মগ্ন হই- তেন, তখন কেহই অশ্রু বিসর্জন না করিয়া থাকিতে পারিত । চৈতন্যচন্দ্রের প্রেমভক্তির প্রবল তরঙ্গে শত শত । ব্যক্তির মােহবন্ধন ছিন্ন হইয়াছে, সহস্র সহস্র জ্ঞানী মানী বিষয়ী লােক জ্ঞানের অভিমান মানের গৌরব ও বিষয়াসক্তি পরিত্যাগ করিয়া হরিভক্তিতে উন্মত্ত হইয়াছে। পর্ণকুটীর- বাসী দীন দরিদ্র হইতে রাজ্যেশ্বর পাৎসা উজির সকলেই চৈতন্যচন্দ্রের মাহাত্ম্য ও প্রভাব অনুভব করিয়াছিলেন। জাতি বর্ণ আচার বিচারের প্রাচীর ভেদ করিয়া পরাভক্তিতে উন্মত্ত হইয়া তিনি হিন্দু মুসলমান স্ত্রী পুরুষ সকলেরই নিকট ভক্তিধন বিলাইতেন। কেবল বঙ্গদেশ নয়, অঙ্গ ৰ কলিঙ্গ বলা বারাণসী প্রয়াগ শ্রীবৃন্দাবন যেখানেই তিনি পদার্পণ করিয়াছেন, সেইখানেই প্রেমভক্তির বিপুল উচ্ছাস উচ্ছসিত হইয়াছে। জগাই মাধাইয়ের ন্যায় মহাপাষণ্ডীগণ তাহার অদ্ভুত ক্ষমা বৈরাগ্য ও হরিভক্তি সন্দর্শন করিয়া নবজীবন লাভ করিয়া- ছেন। রূপ সনাতন ও রঘুনাথ দাসের ন্যায় বিপুল ঐশ্বৰ্য্যবান ও ক্ষমতাবান লােকেরাও শ্রীচৈতন্যের সুবিমল মুখকান্তি সন্দ- শন ও তাহার শ্রীমুখবিনিঃসৃত প্রাণপরিতৃপ্তিকর অমৃতস্যন্দী উপদেশ মালা শ্রবণ করিয়া সংসারের ধন জন মান সম্রম বিষবৎ পরিত্যাগ করত অতি দীনভাবে দিনপাত করিয়া কেবল হরিকথাপ্রসঙ্গে কালযাপন করিয়াছেন। বাহুল্য যে চৈতন্য দেবের অমানুষিক ঈশ্বরপ্রেম ও অন- সাধারণ সংসারবৈরাগ্য দর্শন করিয়া যে সকল ঈশ্বরানুরাগী সাধুপুরুষ সংসারকে আবর্জনাবৎ বর্জন পূৰ্ব্বক তৎ প্রবর্তিত ভক্তপরিবারের আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের কঠোর বৈরাগ্য ও অহৈতুকী হরিভক্তির বিষয় চিন্তাকরিলে আমাদের সংসারসক্ত নীরস চিত্তও চমকিত হইয়া উঠে। চৈতন্যানুচরদিগের মধ্যে যে কতিপয় ব্যক্তি বৈষ্ণব সম্প্র- দায়ের শীর্ষস্থান অধিকার করিয়াছিলেন, তাহাদিগের মধ্যে শ্রীমৎ সনাতন ও রূপ, শ্রীজীব ও রঘুনাথ দাস, গােপালভট্ট ও রঘুনাথভট্ট, এইছয়জন গােস্বামীই বিশেষ বিখ্যাত। বৈষ্ণব সমাজে ইহারা আদিগুরু বলিয়া সম্মানিত হইয়া থাকেন। ইহাদের মধ্যে প্রথমােক্ত তিন জনের অর্থাৎ সনা- তন, রূপ ও শ্রীজীব গােস্বামীর জীবন বৃত্তান্ত যতদূর অবগত হওয়া যায়, তাহা এই পুস্তকে সঙ্কলিত হইয়াছে। সনাতন, • ও রূপ গােস্বামীর সহিত চৈতন্যদেবের প্রেমভক্তিতত্ত্বের অতি গভীর প্রসঙ্গ হইয়াছিল। পাঠকগণের প্রীতিপ্রদ ও শিক্ষাপ্রদ হইবে বিবেচনা:করিয়া সেই সমুদয় ভক্তিতত্ত্বের আলােচনা এই গ্রন্থে সংক্ষিপ্তভাবে ও যথাসম্ভব সরলভাষায় সন্নিবেশিত করা হইয়াছে। এই সকল প্রেমভক্তিবিষয়ক আলােচনা ও ব্যাখ্যার মধ্যে আমাদের নিজের কথা একটী ও নাই। প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র সমূহের ব্যাখ্যাস্থলে স্বকপােল- কল্পিত মতের অনুসরণ করিয়া চলিলে প্রকৃত পক্ষে সেই সকল শাস্ত্রের মৰ্ম্মোদ্যটিত হয়না, এই কারণ বর্তমান গ্রন্থে বৈষ্ণব শাস্ত্রের যথাযথ ভাব ও ভাষা রক্ষা করিতে বিশেষ প্রয়াস পাইয়াছি। বিষয় গুলি অধিকতর সুবােধ্য করিবার অভি প্রায়ে মধ্যে মধ্যে মূল পয়ার ও শাস্ত্রীয় শ্লোক এবং আবশ্যক- স্থলে টীকাও সংযােজিত করা হইয়াছে। বৈষ্ণব ধৰ্ম্মের সাধন প্রণালী সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ আলােচনা গ্রন্থের শেষ- ভাগে পরিশিষ্ট আকারে নিবদ্ধ করা হইয়াছে। আমি এই গ্রন্থ প্রণয়ন পক্ষে মহানুভব কৃষ্ণদাস কবিরাজ গােস্বামী প্রণীত “চৈতন্য চরিতামৃত, বৃন্দাবনদাস ঠাকুর প্রণীত “চৈতন্য ভাগবত,”কৃষ্ণদাস বাবাজী কর্তৃক অনুবাদিত “ভক্তমাল গ্রন্থ” এবং “চৈতন্য চন্দ্রোদয় নাটক” ও “ভক্তিরত্নাকর” প্রভৃতি বৈষ্ণব গ্রন্থ হইতে বিশেষ রূপ সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছি। প্রায় পাঁচ বৎসর পূর্বে আমি বৈষ্ণব শাস্ত্রের আলো চনায় মনােনিবেশ পূৰ্ব্বক বৈষ্ণবাচাৰ্যদিগের—বিশেষতঃ শ্রীমৎ সনাতন ও রূপ গােস্বামীর বৈরাগ্যপূর্ণ স্বৰ্গীয় জীবনের মাধুর্যে অতি মাত্র আকৃষ্ট হইয়া তাহাদিগের বিষয় বাঙ্গালি পাঠক বর্গের নিকট কিয়ৎ পরিমাণে প্রচারিত করিতে আগ্র- হান্বিত হইয়াছিলাম। কিছু দিন পরে কিয়দংশ লিখিয়া একান্ত ভক্তিভাজন রাজর্ষিতুল্যপূজ্যপাদ পণ্ডিতবর শ্রীযুক্ত বাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়কে দেখাই। তিনি তাহা পাঠ করিয়া সন্তুষ্ট হন, এবং আমাকে এইকাৰ্যে বিশেষরূপে উৎসাহিত করেন। অনন্তর উক্ত মহােদয়ের অভিপ্রায়ানুসারে এই বিষয় লিখিতে প্রবৃত্ত হই। এই পুস্তকের অধিকাংশই ইতিপূর্বে ক্রমপ্রকাশ্যরূপে তত্ত্ববােধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল। এক্ষণে সেই সকল প্রবন্ধ একত্র সঙ্কলিত আদ্যোপান্ত পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত হইয়া পুস্তকাকারে মুদ্রিত ও প্রচারিত হইল। বাল্মীকি-রামায়ণের প্রসিদ্ধ অনুবাদক ও তত্ত্ব বােধিনী পত্রিকার ভূতপূৰ্ব সম্পাদক একান্ত ভক্তিভাজন শ্ৰীযুক্ত পণ্ডিত হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন মহাশয় পরিশ্রম স্বীকার করিয়া এই গ্রন্থের প্রায় সমুদয় স্থলই দেখিয়া দিয়াছেন, এবং ইহার সংস্কৃতাংশের অনুবাদগুলিও তিনি সংশােধন করিয়া দিয়াছেন। এজন্য তাহার নিকটে কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ রহিলাম। ইহা পাঠ করিয়া যদি একজনের হৃদয়েও কিঞ্চিৎ পরিমাণে ভগবদ্ভক্তি ও বৈরাগ্যের সঞ্চার হয়, তাহা হইলেই সমস্ত পরিশ্রম ও অর্থ ব্যয় সার্থক জ্ঞান করিব। শান্তিনিকেতন-আশ্রম। বােলপুর। ২৫ শে পৌষ, ১৩০০। গ্রন্থকার ভক্ত-চরিতামত। প্রথম অধ্যায়। শ্রীরূপ ও শ্রীসনাতন গােস্বামী। পূর্ব-বিবরণ। আমাদের দেশে অনেকেই রূপ সনাতনের নাম শুনি- য়াছেন। বিবিধ বৈষ্ণবগ্রন্থে ইহাদের বিষয় অবগত হওয়া যায়। খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে বঙ্গদেশের তাৎ- কালিক রাজধানী গৌড় নগরে সৈয়দ হুসেন সা নামক একজন মুসলমান রাজপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। * রূপ ও * অতি প্রাচীনকালে এতদ্দেশে আধুনিক মালদহ জেলার অন্তর্গত পদ্মাতীরে “গৌড়” নামে এক প্রসিদ্ধ জনপদ ছিল। কেহ কেহ বলেন খ্রষ্টাব্দের ৭০০১৮০০ বৎসর পূর্বে ভোজ-গােড় নামা কোন নৃপতি এই নগর স্থাপন করেন। সেন বংশীয় হিন্দু রাজগণ ও বিজয়ী আফগান নরপতিগণের রাজত্বকালে এই নগর বঙ্গদেশের রাজধানী ছিল। বল্লাল সেনের পুত্র লক্ষ্মণ সেন এই নগরকে সুসজ্জীভূত করিয়া স্বীয় নামে ইহার “লক্ষ্মণাবতী” নাম রাখিয়াছিলেন। যবনাধিকার কালে সৈয়দ হুসেন সাহা বা দ্বিতীয় আলাউদ্দীন নামা কোন উচ্চকুলােব মুসলমান ১৪ খ্রীষ্টাব্দ হইতে ১৫১২ খ্রঃ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে এই নগরে রাজত্ব করিয়া- ছিলেন। সমুদায় বঙ্গদেশ, বিহার এবং উড়িষ্যা ও আসাম প্রদেশের কোন কোন অংশেও তাহার অধিকার বিস্তৃত হইয়াছিল। ইনি এক- জন পরাক্রান্ত ও অপেক্ষাকৃত ন্যায়পরায়ণ রাজা ছিলেন। হুসেন সা সিংহাসনে আরােহণ করিয়াই চক্রান্তকারী পুরাতন পাইকগণকে কর্ম- চ্যুত করেন ও ঘোর অতাচারী কাছিদিগকে বঙ্গদেশ হইতে দাক্ষিণা ২ ভক্ত চরিতামৃত'। সনাতন উক্ত রাজার উজির অর্থাৎ প্রধান মন্ত্রীর পদে নিযুক্ত ছিলেন। সে সময়ে হিন্দুধর্মের প্রবল প্রতাপ। প্রচুর অর্থলােভেও ব্রাহ্মণসন্তানেরা তখন ম্লেচ্ছসংস্পর্শে আসিতেন না। যাহারা রাজকার্যে যবন সহবাসে থাকি- তেন, হিন্দু সমাজে তাঁহারা নিন্দনীয় হইতেন। যে সম- য়ের কথা বর্ণিত হইতেছে, সেই সময়ের মুসলমান শাসন- কর্তাগণ এতদ্দেশীয় লােকদিগকে উপযুক্ততানুসারে সকল- প্রকার রাজকর্মে নিয়ােগ করিতে ইচ্ছুক থাকিলেও ব্রাহ্ম- ণেরা মুসলমানের সহিত কোনরূপ সম্বন্ধে নিবদ্ধ হওয়াকে যার পর নাই অধর্মাচরণ বলিয়া বিবেচনা করিতেন। সুতরাং ব্রাহ্মণের কায়স্থ ইত্যাদি জাতিই রাজানুগ্রহ লাভ করিয়া দেশ মধ্যে সম্রমশালী হইয়া উঠিয়াছিলেন। এখনকার ন্যায় সে সময়ে যে ব্রাহ্মণজাতি আশ্ৰমাচার প্রদেশে দূরীভূত করিয়া রাজ্যের শৃঙ্খলাবিধান করিয়াছিলেন। এই সময়ে লােদী বংশীয়েরা দিল্লীর সম্রাট ছিলেন। এই বহুজনাকীর্ণ মহৈশ্বৰ্য্য-সম্পন্ন নগর প্রাচীন কালে ভারতবর্ষের মধ্যে একটী প্রধান নগর বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল। এক সময়ে ইহার নামানুসারে সমগ্র বঙ্গবাসীগণ “গৌড়ীয়” নামে অভিহিত হইতেন। প্রায় এক শতজন রাজা দুই হাজার বৎসর এখানে রাজত্ব করিয়াছিলেন। কালের পরিবর্তনে ১৫৭৫ খ্রীষ্টাব্দে এই নগরে মহামারী উপস্থিত হইয়া প্রতিদিন সহস্র সহস্র লােক মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিল, এই কারণে গৌড় একবারে জনশূন্য হইয়া যায়। পরে এই পরিত্যক্ত ও ধ্বংসাবশিষ্ট নগরের মহামূল্য প্রস্তাদি লইয়া গিয়া মুরসিদাবার সৌধ সকল নির্মিত হইয়াছিল। এক সময়ে যে স্থান শত শত রাজন্য বর্গের লীলানিকেতন ছিল, তাহা এখন নিবিড় অরণ্যানী সমাচ্ছন্ন হইয়া ব্যাঘ্র ভ:কাদি ব্যপদকুলের প্রমােদকাননে পরিণত হইয়াছে। গৗড়ের প্রাচীন অট্টালিকাদির ভগ্নচিন্তু কিছু কিছু অদ্যাপি দেখিতে ওয়া যায়।

প্রথম অধ্যায়। পরিভ্রষ্ট হইতে বিশেষরূপে অভ্যস্ত হয়েন নাই, তাহার প্রমাণস্থলে আমরা রূপ সনাতনের নাম উপুন্যস্ত করিতে পারি। রূপ সনাতন কোন জাতীয় ছিলেন, ইহা লইয়া অনেকে বিবাদ করেন। কেহ বলেন, তাহারা মুসলমান ছিলেন এবং কেহ কেহ এরূপ বলেন যে, তাঁহারা যদিও ব্রাহ্মণ ছিলেন, কিন্তু মুসলমান নবাবের দাসত্ব করতে সমাজচ্যুত হইয়াছিলেন, এবং কোন প্রকারে মুসলমান- ভাবাপন্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন। এই সিদ্ধান্তই আমাদের নিকট সমীচীন বলিয়া বোধ হয়। রূপের দবিরখাশ ও সনাতনের সাকরমল্লিক এই দুই যাবনিক নাম বা উপাধি ছিল। চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে রূপ সনাতনের জন্ম- বিবরণাদির কোন উল্লেখ নাই। পিতামাতা তাহাদের কি নাম রাখিয়াছিলেন, তাহাও জ্ঞাত হওয়া যায় না। তঁাহারা যে ম্লেচ্ছজাতি ম্লেচ্ছসঙ্গী অস্পৃশ্য পতিত বলিয়া আপনাদিগকে পরিচিত করিতেন, ইহা ঐ গ্রন্থের নানা- স্থানে লিখিত আছে। “ভক্তিরত্নাকর” লেখক বলেন, রূপ সনাতনের পিতা পুরুষ-পুরুষানুক্রমে পরম নিষ্ঠাপরায়ণ ব্রাহ্মণ ছিলেন, আর তাহারা অর্থ লােভে যবনের দাসত্ব করিতেছেন, ইহা চিন্তা করিয়া অনুতপ্ত হৃদয়ে দুই ভ্রাতা আপনাদিগকে যবন অপেক্ষাও হীন ম্লেচ্ছ বলিয়া কথন কখন উল্লেখ করিতেন। যাহা হউক, বোধ হয় এই কার- ণেই অনেকে রূপ সনাতনের মুসলমানকুলে জন্ম সম্বন্ধে সন্দেহ করিয়া থাকেন। কিন্তু তাহারা যে বিপ্রকুলােব উচ্চবংশজাত ছিলেন, তাহাতে কোনও সন্দেহ নাই।..

ভক্ত-চরিতামৃত। “চৈতন্য চন্দ্রোদয় নাটক,” “ভক্তিরত্নাকর,” লঘুতােষণী” এবং “বৈষ্ণব তােষণী” প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠ করিলে অঙ্গত হওয়া যায় যে, ভরদ্বাজগােত্রসস্তৃত যজুৰ্বেদীয় ব্রাহ্মণবংশে কর্ণাটরাজ সর্বজ্ঞ জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি স্বীয় পুত্র অনিরুদ্ধকে রাজ্যভার অর্পণ করিয়া পরলােক গমন করেন। অনিরুদ্ধের দুই স্ত্রীর গর্ভে রূপেশ্বর ও হরিহর নামে দুই পুত্র হয়। রূপেশ্বর শাস্ত্রবিদ্যায় ও হরিহর শঙ্ক- বিদ্যায় পাণ্ডিত্য লাভ করিয়াছিলেন। জ্যেষ্ঠ রূপেশ্বর কনিষ্ঠ কর্তৃক রাজ্যচ্যুত হইয়া, মাতা ও স্ত্রীকে সঙ্গে লইয়া পৌরস্ত্যদেশে শিখরভূমির রাজার অধিকারে আসিয়া বাস করেন। সেই স্থানে তাহার এক পুত্র ভূমিষ্ঠ হয়। পুত্রের নাম পদ্মনাভ। পদ্মনাভ গঙ্গাবাস করিবার অভিপ্রায়ে গঙ্গাতীরবর্তী নবহট্ট (নৈহাটী) গ্রামে আসিয়া বাস করিয়া- ছিলেন। ইনি জগন্নাথমূর্তির উপাসক ছিলেন এবং যাগ- যজ্ঞ ধর্মোৎসবাদিতে পমানন্দে কালযাপন করিতেন। পদ্মনাভের আঠারটি কন্যা ও পাঁচটি পুত্র জন্ম গ্রহণ করি- য়াছিল। পুত্রগণের নাম পুরুষােত্তম, জগন্নাথ, নারায়ণ, মুরারি ও মুকুন্দ। সর্বকনিষ্ঠ মুকুলের পুত্র কুমার। কুমার পরম ধাৰ্মিক শুদ্ধাচারী ও নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ছিলেন। কথিত আছে, যদি তিনি কখন দৈবাৎ যবন দর্শন করিতেন, তাহা হইলে প্রায়শ্চিত্ত না করিয়া সেদিন আর অন্নজল গ্রহণ করি- তেন না। ইনি অতিশয় নিরীহ প্রকৃতির লােক ছিলেন। কুমার জ্ঞাতিবর্গের অন্যায় ব্যবহারে উদ্বিগ্ন হইয়া নবহট্টের বাস পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক পূর্ববঙ্গের বাকলীচন্দ্রদ্বীপে (আধুনিক প্রথম অধ্যায়। বাকরগঞ্জ) গিয়া বাস করেন। যাতায়াতের সুবিধার নিমিও যশােহরের অন্তর্গত ফতোয়াবাদ নামক গ্রামে দ্বিতীয় বাসস্থান নির্দিষ্ট করিয়াছিলেন। এই ফতােয়াবাদ গ্রামেই রূপ সনাতন জন্মগ্রহণ করেন। কুমার দেবের অনেকগুলি সন্তান হইয়াছিল; তন্মধ্যে জ্যেষ্ঠ সনাতন, মধ্যম রূপ, কনিষ্ঠ বল্লভ বা অনুপম বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে খাতি লাভ করিয়াছেন। রূপ ও সনাতন বাল্যকালেই নানা বিদ্যাতে ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। সাৰ্বভৌম ভট্টাচার্যের সহােদর বিদ্যা- বাচস্পতির নিকটে সনাতন গােস্বামী যথানিয়মে শ্রুতি স্মৃতি প্রভৃতি বিবিধ শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়াছিলেন। বৈষ্ণব তােষণী ও দশম টিপ্পনী গ্রন্থে সনাতন স্বীয় গুরুর উল্লেখ করিয়াছেন। রূপ সনাতনের বৈষয়িক বুদ্ধিও বিশেষ প্রখর ছিল। গৌড়াধিপতি হুসেন সাহা তাহাদের বিদ্যা বুদ্ধির পরিচয় পাইয়া সনাতনকে সচিবের পদে ও রূপকে প্রধানতম রাজকার্যে নিয়ােজিত করিয়াছিলেন। এই সময়ে ইহারা রাজকার্য্যোপলক্ষে গৌড়-রাজধানীতে আসিয়া তৎ- সন্নিহিত রামকেলি গ্রামে বাস করিয়াছিলেন। এই * “সর্বজ্ঞ জগদগুরু নাম বিরাজ। মহাপূজ্য যজুৰ্বেদী গোত্র ভরদ্বাজ। তাঁর পুত্র অনিরুদ্ধ দেৰ ইন্দ্র সম। চন্দ্রেও করয়ে স্পর্ধা যশ সর্বোত্তম। মহীপতি পূজিত দেবজ্ঞ লক্ষ্মীবান। পৃথিবীতে বিখ্যাত মহিষীদ্বয় তান । রূপেশ্বর হরিহর নামে পুত্রদ্বয়। বহুগুণ সর্বত্র বিদিত অতিশয় । শাস্ত্রে বিচক্ষণ জ্যেষ্ঠ পুত্র রূপেশ্বর।

ভক্ত-চরিতামৃত। স্থানে অদ্যাপি বর্ষে বর্ষে বৈষ্ণবদিগের একটা প্রকাণ্ড মেলা বসিয়া থাকে। শস্ত্রে মহাপ্রবীণ কনিষ্ঠ হরিহর। বিভাগ করিয়া দোহে দিয় রাজ্যভার । শ্রীকৃষ্ণের ধামপ্রাপ্তি হইল পিতার । কত দিন পরেনােক সংঘট্ট করিয়া। লইল জ্যেষ্ঠের রাজ্য কনিষ্ঠ হরিয়া। রাজ্য গেল রূপেশ্বর পত্নীর সহিতে। অষ্ট অশেযুক্ত আইলা পৌরস্ত্য দেশেতে । শিখরেশ্বর সখ্যতাতে সুখ পাই। রূপের দেব বাস করিল তথাই। শ্রীরূপেশ্বরের পুত্র পদ্মনাভ নাম। পরম সুন্দর সর্বগুণে অনুপাম। পদ্মনাভদেব সে শিখর ভূমি হইতে। আইলেন গঙ্গাতীরে বাসস্পৃহা চিতে। নবহট্ট গ্রামে বাস কৈলামহাশয়। নৈহাটী নাম যার সৰ্ব্ব লােকে কয়। তথা পদ্মনাভ দেব মহাহৰ্ষ চিতে। শ্রীপুরুষোত্তম মূর্তি পূজয়ে যত্নেতে। করি যজ্ঞ উৎসব পরমানন্দ হৈল। অষ্টাদশ কন্যা পঞ্চ পুত্র জন্মাইল। শ্রীপুরুষােত্তম জগন্নাথ নারায়ণ। মুরারি মুকুন্দ এই পুত্র পঞ্চজন। পুরুষােত্তম জ্যেষ্ঠ সর্ব কনিষ্ঠ মুকুল। সৰ্বাংশে প্রবীণ সৰ্বোত্তম গুণবৃন্দ। মুকুন্দ দেবেব নন্দন শ্রীকুমার। বিপ্রকুল প্রদীপ্ত পরম শুদ্ধাচার । যদি অকস্মাৎ কভু দেখয়ে যবন। করে প্রায়শ্চিত্ত অন্ন না করে হিণ। জ্ঞাতিবর্গ হৈতে উদ্বেগ হৈল মনে। ছাড়িলেন নবহট্ট গ্রাম সেই ক্ষণে। নিজগণ সহ বঙ্গদেশে শীঘ্র গেলা। বালাচন্দ্রদ্বীপ এমেতে বাস কৈলা।

E প্রথম অধ্যায়। রূপ সনাতন কেবল সৎকুলজাত ব্রাহ্মণ সন্তান ছিলেন না, বিদ্যাবুদ্ধি ও ভগবৎভক্তিতেও পরম প্রবীণ ছিলেন। তাহারা রাজকার্য্যের অবকাশ কালে ভাগবতাদি ভক্তিশাস্ত্র অধ্যয়ন ও হরিকথা প্রসঙ্গের নিমিত্ত পবিত্ৰচেতা সাধু সজ্জন- দিগের সঙ্গলাভ করিতেন। এই অবস্থায় ইহারা“হংসদূত” ও “পদ্যাবলী” নামক গ্রন্থ রচনা করেন,এইরূপ প্রবাদ। বাল্য- কাল হইতেই ইহারা বৈষ্ণব ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। রাম- কেলিতে স্বীয় বাসভবনের নিকটে রাধাকুণ্ড ও শ্যামকুণ্ড নামে দুইটী কদম্বকানন-পরিশােভিত জলাশয় খনন করিয়া- ছিলেন। তাহারা সেই আশ্রমনিকুঞ্জে দুই সহােদরে শ্রীহরির ধ্যানধারণায় নিমগ্ন হইতেন। ইহাদের কাৰ্যকুশলতায় সন্তোষলাভ করিয়া গৌড়েশ্বর ইহাদিগকে স্বল্পকরে অনেক লাভবান জমিদারী দিয়াছিলেন। রূপসনাতন অতুল সম্পত্তির অধিপতি হইয়াও ধর্মপ্রসঙ্গে সময় যাপন করি- তেন। অল্পদিনেই জ্ঞানী ধার্মিক ও দানশীল বলিয়া তাহাদের যশঃসৌরভ বিস্তৃত হওয়ায়, তাহাদের সভায় নবদ্বীপ প্রভৃতি স্থানের জ্ঞানী, পণ্ডিত, নৰ্তক, বাদক ও কবিগণের সমাগম হইত। তাহারা সকলকেই যথাযােগ্য যশােরে ফতয়াবাদ নামে গ্রাম হয়। গতায়াত হেতু তথা করিল আলয়। কুমার দেবের হৈল অনেক সন্তান। তার মধ্যে তিন পুত্র বৈষ্ণবের প্রাণ। রূপ সনাতন শ্রীবল্লভ এই ত্রয়। সুগােত্র অন্যত্র যে অর্চিত অতিশয়।” ভক্তিরত্নাকর ও

ভক্ত-চরিতামৃত।
*,
দান করিয়া সন্তুষ্ট করিতেন। তাহারা কর্ণাট দেশ হইতে
পূৰ্বপুরুষ ও অন্যান্য জ্ঞাতি কুটুম্বগণকে আনিয়া রামকেলিতে
বাস করাইয়াছিলেন এবং জীবিকার জন্য তাহাদিগকে অর্থ
ও ভূমি দান করিয়াছিলেন।', চৈতন্যের অলৌকিক
চরিত্র ও সন্ন্যাসবৃত্তান্ত লােক-পরম্পরায় শ্রুত হইয়া রূপ
সনাতন তাহার প্রতি একান্ত অনুরক্ত হইয়াছিলেন।
চৈতন্য প্রভুর দর্শন লালসায় ব্যথিত হইয়া ও 'স্বীয় জীবনের
কর্তব্য সম্বন্ধে উপদেশ প্রার্থনা করিয়া তাহার প্রভুর
নিকটে কএক বার দৈন্যপত্ৰীও প্রেরণ করিয়াছিলেন।
চৈতন্যদেব এই সকল পত্রের উত্তরস্বরূপ এই সংস্কৃত কবি-
তাটী লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন।
“পরব্যসনিনী নারী ব্যগ্ৰাপি গৃহকৰ্ম্ম।
তমেবাস্বাদস্তত্যন্তনবসন্সরসায়নং ॥”
অর্থাৎ পরপুরুষে অনুরক্তা কুলস্ত্রী গৃহকর্মে ব্যস্ত
থাকিয়া যেমন মনে মনে রসবিশেষ আস্বাদন করে, তদ্রুপ
বিষয়কৰ্ম্মে সংলিপ্ত থাকিয়াও ভগবানে চিত্ত মগ্ন রাখিবে।
রূপ সনাতন এই ভাবেই কাল যাপন করিতে লাগিলেন।

দ্বিতীয় অধ্যায়। শ্রীচৈতন্যের সহিত রূপসনাতনের মিলন ও বৈরাগ্যোদয়। কিছু দিন পরে যখন গৌরাঙ্গদেব নীলাচল হইতে বৃন্দা- বন যাত্রা কত কলনাদিনী ভাগীরথীর উভয় তীরবর্তী জনপদবাসিগণকে হরিভক্তির প্রবল উচ্ছাসে আপ্লুত করিয়া গৌড়নগরের সন্নিকটবর্তী রামকেলি গ্রামে আসিয়া উপনীত হইলেন, এবং নাম সংকীর্তনের মধুর নিনাদে নগরবাসি- গণকে চমকিত করিয়া তুলিলেন ; তখন চৈতন্যের মুখারবিন্দনিঃসৃত হরিনামসুধা পান করিবার জন্য এবং তাহার পবিত্র সহবাসসুখ সম্ভোগ করিবার জন্য তাঁহার উদ্দেশে জনস্রোত প্রবাহিত হইতে লাগিল। যুবজনাে- চিত যৌবনশ্রীর সহিত সন্ন্যাসীবেশ গৈরিক বস্ত্রাদির সমাবেশ হওয়াতে প্রতপ্ত কাঞ্চনকান্তির ন্যায় গৌরের অপূৰ্ব্ব রমণীয় শােভা হইয়াছিল। তিনি যেখানে যাইতে লাগিলেন, লােক সকল আকৃষ্ট হইয়া তাহার নিকটে আসিতে লাগিল। তাহাতে অশ্রু, পুলক, স্বেদ কম্পাদি অষ্ট সাত্বিক মহাভাবের লক্ষণ দেদীপ্যমান দেখিয়া সকলে মন্ত্র- মুগ্ধের ন্যায় বিহ্বল হইয়া যাইতে লাগিল। গৌরাঙ্গের আগমনে গৌড়নগরে মহা কোলাহল পড়িয়া গেল। “গৌড়ের নিকটে গঙ্গাতীরে এক গ্রাম। ব্রাহ্মণ সমাজে তার রামকেলি নাম ।

ভক্ত-চরিতামৃত।
{
দিন পাঁচ সাত প্রভু সেই পুণ্যস্থানে।
আসিয়া রহিল যেন কেহ নাহি জানে।
সূর্যের উদয় কি কখন গােপ্য হয়।
সর্বলােকে শুনিলেন চৈতন্য বিজয়।
সর্বলােকে দেখিতে আইসে হমনে।
স্ত্রী বালক বৃদ্ধ আদি সজ্জন দুর্জনে।
নিরবধি প্রভুর আবেশময় অঙ্গ।
প্রেম ভক্তি বিনা আর নাহি কোন রঙ্গ।
হুঙ্কার গর্জন কম্প পুলক ক্রন্দন।
নিরন্তর আছাড় পাড়েন বনে ঘন ॥
নিরবধি ভক্তগণ করেন কীৰ্ত্তন।
তিলার্ধেক অন্যকর্ম নাহি কোন ক্ষণ ।
হেন সে ক্রন্দন প্রভু করেন ডাকিয়া।
লোক শুনে ক্রোশেকের পথেতে থাকিয়া।
যদ্যপিও ভক্তিরসে অজ্ঞ সৰ্ব্বলােক।
তথাপিও প্রভু দেথি সভার সন্তোষ ।
দূরে থাকি সৰ্ব্ব লােক দণ্ডবৎ করি।
সবে মিশি উচ্চকরি বলে হরি হরি।
শুনিমাত্র প্রভু হরিনাম লােকমুখে।
বিশেষ উল্লাস বাড়ে প্রেমানন্দ সুখে।
হেন সে আনন্দ প্রকাশেন গৌর রায়
যবনেও বলে হরি অন্যের কি দায়।

দ্বিতীয় অধ্যায়।
১১
যবনে ও দুরে থাকি করে নমস্কার।
হেন গৌরচন্দ্রের কারুণ্য অবতার।
নির্ভয় হইয়া সৰ্ব্বলােক বলে হরি।
দুঃখশােক ঘর দ্বার সকল পাশরি ।
নিরন্তর সন্ন্যাসীর উৰ্দ্ধ রােমাবলী।
পনসের প্রায় যেন পুলক মণ্ডলী ॥
ক্ষণে ক্ষণে সন্ন্যাসীর হেন কম্প হয়।
সহস্র জনেও ধরিবারে শক্তি নয় ।
দুই লােচনের জল অদ্ভুত দেখিতে।
কত নদী বহে হেন না পারি কহিতে।
কখন বা সন্ন্যাসীর হেন হাস্য হয়।
অট্ট অট্ট দুই প্রহরেও ক্ষমা নয়।
কখন মূচ্ছিত হয় শুনিয়া কীৰ্ত্তন।
সবে ভয় পায় কিছু না থাকে চেতন।
কত দেখিয়াছি আমি ন্যাসী যােগা জ্ঞানী।
এমত অদ্ভুত কভু দেখি নাহি শুনি।
কহিলাম এই মহারাজ তোমাস্থানে।
দেশ ধন্য হইল এ পুরুষ আগমনে।”
চৈতন্য ভাগবত-অন্তখণ্ড।
গৌড়াধিপতি নগরাধ্যক্ষের প্রমুখাৎ এই সমুদায় শ্রবণ
করিয়া কেশব বসু নামক একজন হিন্দু কর্মচারীকে সবি-
শেষ জিজ্ঞাসা করিলেন। সে ব্যক্তি ভীত হইয়া চৈতন্যের
মাহাত্ম্য গােপন করিয়া বলিল যে, একজন বৃক্ষতলা,

৫ ১২
ভক্ত চরিতামৃত।
ভিখারী সন্ন্যাসী তীর্থ পর্যটনের জন্য আসিয়াছে, দুই
চারিজন লােক তাহাকে দেখিতে আইসে এইমাত্র। সহর
কোতােয়াল মহারাজের নিকটে মিথ্যা গ্লানি করিয়াছে,
হুজুর তাহার কথায় কর্ণপাত করিবেন না। কেশব বসু
রাজাকে এইরূপে প্ৰবােধ দিয়া গােপনে একজন ব্রাহ্মণ
পাঠাইয়া চৈতন্যকে এইস্থান হইতে চলিয়া যাইতে অনু-
রােধ করিল। তৎপরে রাজা একদিন দবিরখাশকে নিভৃতে
জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিলেন,-
যে তােমারে রাজ্য দিল যে তােমার গোসায়।
তােমার দেশে তােমার ভাগ্যে জন্মিল আসিয়া ॥
তােমার মঙ্গল বাছে বাক্য সিদ্ধ হয়।
ইহার আশীর্বাদে তােমাৰ সৰ্ব্বত্ৰেতে জয়।
মােরে কেন পুছ তুমি পুছ আপনমন।
তুমি নরাধিপ হও বিষ্ণু অংশ সম।
তোমার চিত্তে চৈতন্যেরে কৈছে হয় জ্ঞান।
তােমার চিত্তে যেই লয় সেই প্রমাণ ।
চৈতন্য চরিতামৃত, মধ্যখণ্ড ১ম পরিচ্ছেদ।
যে দুর্ধর্ষ যবনরাজ হুসেন সা উড়িষ্যার রাজার সঙ্গে
যুদ্ধ করিয়া এক সময়ে হিন্দু দেবমূর্তিও দেউলাদি নষ্ট করি-
য়াছিলেন, সেই হুসেন সা চৈতন্যের অলৌকিক মহিমা ও
কীর্তিকলাপ শ্রবণ করিয়া বিস্মিত হইলেন এবং ফোন
প্রকার উৎপীড়ন করা দূরে থাকুক,-গৌরচন্দ্র যাহাতে
স্বচ্ছন্দে গৌড়নগরে প্রেমভক্তি বিতরণ করিতে পারেন,
তাহার উপায় কঁরিয়া দিলেন। রাজা বলিলেন, তােমরা

দ্বিতীয় অধ্যায়। চৈতন্যকে গরিব সন্ন্যাসী বলিও না। এ ব্যক্তি নিশ্চয় দৈবশক্তিশালী মহাপুরুষ। দেখ, আমি দেশের রাজা, তথাপি বিনা বেতনে আমি এত লোককে কখনও একত্র করিতে পারি না। আর শত শত নর নারী আত্মীয় পরিজন ত্যাগ করিয়া আনন্দিত মনে ইহার সঙ্গে সঙ্গে রহিয়াছে। আমি যদি ছয়মাস বেতন দিতে বিলম্ব করি, তাহা হইলে ভৃত্যগণ আমার বিরুদ্ধে মন্ত্রণা করিবে। আর ইহার আজ্ঞা সকল দেশের শত সহস্র লোকে কায়মনােবাক্যে পালন করিতেছে। ঘরের খাইয়া লােকে ইহার সেবাতে নিযুক্ত রহিয়াছে, আবার ভালরূপে সেবা করিতে না পাইয়া তাহা দের আক্ষেপই বা কত! ইনি স্বাধীনভাবে আপনার শাস্ত্র মত কাৰ্য্য করুন, যেখানে ইচ্ছা ভ্রমণ করুন,কাজি কিম্বা কোতােয়াল কেহ যেন ইহার হিংসা না করে। ইহা বলিয়া রাজা গৃহে গমন করিলেন। রূপসনাতন গৃহে আগমন করিয়া চৈতন্যচরণ দর্শনের জন্য দুই ভ্ৰাতায় যুক্তি করিতে লাগিলেন, এবং নিস্তব্ধ নিশীথ কালে মন্ত্রীবেশ পরিত্যাগ করিয়া দুইজনে নে যাত্রা করিলেন। প্রথমে নিত্যানন্দ ও হরিদাসের সহিত তাহাদের সাক্ষাৎ হইলে, তাহারা দুই ভাইকে গৌরের নিকটে লইয়া গেলেন। রূপসনাতন গলবস্ত্র হইয়া দন্তে তৃণ ধারণ করত করঘােড়ে অতি দীন- হীনের ন্যায় চৈতন্য-চরণে কঁদিতে কাদিতে বলি- । লেন, “জয় জয় শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য দয়াময়। পতিত পাবন জয় জয় মহাশয়। २

১৪
ভক্ত চরিতামৃত।
নীচজাতি নীচ সঙ্গে করি নীচ কাষ।
তােমার অগ্রেতে প্রভু কহিতে বাসি লাজ ॥
পতিত তারিতে প্রভু তোমার অবতার।
আম বহি জগতে পতিত নাহি আর।
.
জগাই মাধাই হৈতে কোটি কোটি গুণ।
অধম পতিত পাপী আমি দুই জন।
ম্লেচ্ছজাতি ম্লেচ্ছসঙ্গী করি ম্লেচ্ছকৰ্ম্ম।
গােব্রাহ্মণদ্রোহী সঙ্গে আমার সঙ্গম ।
মাের কৰ্ম্ম মাের হাতে গলায় বান্ধিয়া।
কুবিষয় বিষ্ঠাগৰ্তে দিয়াছে ফেলাইয়া।
আমা উদ্ধারিতে বলী নাহি ত্রিভুবনে।
পতিতপাবন তুমি সবে তােমাবিনে।
আমা উদ্ধারিয়া যদি দেখাও নিজবল।
পতিতপাবন নাম তবে সে সফল ॥”
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড প্রথম পরিচ্ছেদ।
ভ্রাতৃদ্বয়ের ভক্তিনিষ্ঠা ও বিনয়দৈন্য দেখিয়া চৈতন্য
পরম প্রীত হইয়া বলিলেন, তােমরা দৈন্য পরিত্যাগ কর,
তােমরা আমার পুরাতন দাস। পূর্বে আমাকে যে সকল
পত্র শিখিয়াছ, তাহাতেই তােমাদের হৃদয় ও ব্যবহার
জানিতে পারিয়াছি। কেবল তােমাদিগকে দেখিতেই
আমি রামকেলি আসিয়াছি, নতুবা অন্য কোন প্রয়ােজন
নাই। তােমরা যখন বিদ্যাবিয়সম্পন্ন সৰ্ব্বাংশে
হইয়াও আপনাদের হীনতা অনুভব করিতেছ, তখন,
শ্রেষ্ঠ

দ্বিতীয় অধ্যায়। শ্রীহরি তোমাদিগকে সত্বরেই উদ্ধার করিবেন। তোমরা বিষয় ত্যাগ করিয়া নিশ্চিন্ত মানস হও। আমি পশ্চাৎ তােমাদের সঙ্গে মিলিত হইয়া সবিশেষ বলিব। পরম বৈষ্ণব তােমরা দুই ভাই ধন্য, কিন্তু আমাকে এরূপে স্তব- স্তুতি করিও না, আমি ক্ষুদ্র জীব, তােমরা আমাকে আশীৰ্ব্বাদ কর যেন আমার শ্রীবৃন্দাবন দর্শন হয় ও আমার হৃদয়ে যেন কৃষ্ণভক্তি স্ফুর্তি পায়। এই বলিয়া উভয়কে আলিঙ্গন করিয়া চৈতন্য বলিলেন, সকলে কৃপা করিয়া ইহাদিগকে আশীর্বাদ কর, ইহারা উদ্ধার হউন। নিত্যা- নন্দ, হরিদাস, শ্রীবাস, গদাধর প্রভৃতি ভক্তগণের চরণে রূপ সনাতন প্রণাম করিলেন। ভক্তগণ উচ্চকণ্ঠে হরিধ্বনি করিয়া নিস্তব্ধ নৈশগগন প্রতিধ্বনিত করিয়া তুলিলেন। চৈতন্য বলিলেন, অদ্য হইতে ইহঁদের রূৰ ও সনাতন নাম হইল, বাবনিক নামে অরি কেহ ইহাদিগকে ডাকিতে পারিবে না। রূপ সনাতন বিদায় হইবার সময় চৈত- ন্যকে বলিলেন, প্রভু, এই স্থান হইতে শীঘ্র প্রস্থান করুন। যদিও যবনরাজ আপনাকে এখন ভক্তি করি- তেছে, কিন্তু যবন জাতিকে বিশ্বাস নাই। আর এত লোক সংঘউ লইয়া বৃন্দাবন গমন করাও ভাল নয়। “আইলেন যবে শুনি রূপ সনাতন। রাত্রিযােগে গিয়া লইল চরণে শরণ ॥ মহু স্তুতি মতি করি চরণে পড়িয়া। আর্তনাদ করে অতি বিষাদিত হইয়া

ভক্ত-চরিতামৃত।
প্রভু বড় কৃপা কৈল দুয়া হইয়া।
সংক্ষেপ্তে কহিল কিছু উপদেশ দিয়া
বিষয় ত্যজিয়া হও নিশ্চিন্ত মানস।
পশ্চাৎ মিলিব আমি কহিব বিশেষ।
রূপ সনাতন নাম দুহকারে দিয়া।
পুনঃ ফিরি পুরুষােত্তম গেলেন চলিয়া”
ভক্তমাল গ্রন্থ।
*মহাপ্রভু তুষ্ট হৈয়া কহিল বচন
ধন্য তুমি দুই বড় পরম বৈষ্ণব।
কিন্তু আমা প্রতি না করিই হেন স্তব।
আমি জীব তােমরা আশীষ কর মােরে।
বৃন্দাবন দেখি যেন কৃষ্ণভক্তি স্বরে।
যদ্যপি সৰ্বজ্ঞ তভু জিজ্ঞাসিলা তারে।
কি নাম দোহার কহ আমার গােচরে ?
সাকর মল্লিক নাম সনাতনের ছিল।
রূপ সাকর মল্লিক অভিধা জানাইল।
প্রভু কহে তুমি হও অতি মহজ্জন।
তোমার এমত নাম না হয় শােভন
ত্রিকালজ্ঞ প্রভু জানে সৰ্ব্বসমাচার।
সনাতন বলি নাম রাখিল তাহার ॥”
চৈতন্য চন্দ্রোদয় নাটক, নবম অঙ্ক।
রূপ সনাতন গৌরচন্দ্রের দর্শন লাভ করিয়া কৃতকৃতার্থ
হইয়া গৃহে ফিরিলেন। পৃথিবীর ধনজন সন্ত্রমসম্পত্তি
সুখ-সৌভাগ্য সমস্তই অসার, বিষয়লিগা পরিত্যাগ করিয়া
০

দ্বিতীয় অধ্যায়।
১৭
:
না।
নিশ্চিন্ত মানস হইয়া হরিচরণাশ্রয় করাই কেবল মানব
জীবনের সার্থকতা ও শান্তিলাভের হেতু, এই ভাব তাহা-
দের হৃদয়ে দৃঢ়রূপে মুদ্রিত হইল ; বৈরাগ্যের তীব্র অনল
হৃদয়ে প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। রূপ সনাতন দরিদ্র ছিলেন
বঙ্গেশ্বরের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। মানসম অর্থ
বিত্তে তাহার গৌড়েশ্বরের নিম্নেই পরিগণিত হইতেন।
কিন্তু “ন বিত্তেন তর্পণীয়ােমনুষ্যঃ” অর্থ বিত্তেতে মানবা-
ত্মার তৃপ্তি নাই। মনুষ্য শতবর্ষজীবী পুত্র পৌত্র লাভ
করুক, হস্তী হিরণ্য অশ্বাদির অধিপতি হউক অথবা মহ.
দায়তন ভূমির অধিকারী হউক, তাহার অন্তরাত্মা কিছুতেই
যথার্থ তৃপ্তি ও আরাম লাভ করিতে পারে না। যে বৈ
ভূমা তং সুখং নাল্পে সুখমস্তি” ক্ষুদ্র বিষয় রাজ্যে সুখ নাই,
ভূমা পরমেশ্বরেতেই মানবাত্মার পূর্ণ পরিতৃপ্তি। মানবের
অন্তরে যে মুহূর্তে অনন্ত ভূমা পরমেশ্বরের মঙ্গল ভাব
প্রস্ফুটিত হয়, সেই মুহূর্তেই ক্ষুদ্র বিষয়ের প্রতি তাহার
অনুরাগ হ্রাস হইয়া যায়। যথার্থ বৈরাগ্যের লক্ষণ এই যে
প্রাণ মন যতই ঈশ্বরের প্রতি অনুরক্ত হইবে, তদিতর
পদার্থের প্রতি ততই বিরাগ উপস্থিত হইবে।
পর্যন্ত বিষয় কামনা ও বিষয়ে প্রবৃত্ত ইন্দ্রিয়গণের উত্তেজনা
থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত চিত্তের বিক্ষিপ্তি অপরিহার্য।
বিক্ষিপ্ত চিত্তে পরমাত্মার শ্রবণ মনন অসম্ভব। এই জন্য
ভক্ত সাধক ও যােগার্থীরা বিষয় কামনা পরিহার করিয়া
নিশ্চিমানস হইবার জন্য ভূয়ােভূয়ঃ উপদেশ দিয়াছেন।
সংসারের সহিত সমুদয় সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করা বিষয়কামনা,.
৩

১৮ ভক্ত চরিতামৃত। ত্যাগের অর্থ নহে। বিষয়ের প্রতি পূর্ণ আসক্তি পরি ত্যাগ করাই তাহার তাৎপৰ্য। যাহারা ঈশ্বরের প্রিয়- কাৰ্য বােধে সংসারধর্ম প্রতিপালন করেন, তঁাহারা বিষয়- বিষে জর্জরিত না হইয়া শান্তি সম্ভোগ করেন। ফলতঃ সুমিষ্ট সুপক্ক সুরসাল ফল ভক্ষণ করিলে, যেমন আর নিম্বফলের প্রতি আস্থা থাকে না, সেইরূপ যাহারা জীবনে একবারও ঈশ্বরপ্রেমের আস্বাদ লাভ করিয়াছেন, তাহারা আর কুটিল সংসারের সেবা করিতে পারেন না। সৎপ্রসঙ্গ সাধুসঙ্গ, শ্রীচৈতন্যের পবিত্র সহবাস ও ভক্তিবিগলিত মধুর উপদেশ, এবং দেব প্রসাদে রূপ সনাতনের চিত্তভূমিতে প্রেমভক্তির বীজ অঙ্কুরিত হইয়াছে। মধুমত্ত মধুকরের ন্যায় হরিচরণারবিন্দ তাহাদের এখন একমাত্র আশ্রয়। বৈরাগ্যের কি অমােঘ প্রভাব। এই বৈরাগ্যের প্রভাবেই কপিল বস্তুর রাজকুমার ইন্দ্রের ন্যায় অতুল ঐশ্বৰ্য্য, প্রমদ- কানন, জীবনতােষিণী পতি প্রাণা প্রণয়িনী ও সুকুমার শিশু সন্তানকে পরিত্যাগ করিয়া পথের ভিখারী হইয়া- ছিলেন। হরিপ্রমে মাতােয়ারা নিমাইচন্দ্র বৈরাগ্যের তেজে উদ্দীপ্ত হইয়াই শচীমাতার স্বর্গীয় স্নেহের বন্ধন ছেদন করিয়াছেন, এবং নিরপরাধ বিষ্ণুপ্রিয়ার অশ্রু- সিক্ত বিষগ্ন মুত্তিকেও উপেক্ষা করিয়াছেন। গৃহে ফিরিয়া আসিয়া রূপ সনাতন বিষয়ুবন্ধন মােচনের উপায় চিন্তা করিতে লাগিলেন, ও যাহাতে অচিরে বিষয়- বাসনা হইতে মুক্ত হইয়া চৈতন্যচরণাশ্রয় করিতে পারেন, তজ্জন্য বহু অর্থ ব্যয় করিয়া সৎব্রাহ্মণের দ্বারা পুরশ্চরণ দ্বিতীয় অধ্যায় । . করাইলেন। নিশ্চিন্ত হইবার জন্য পরিবারগণকে চন্দ্র দ্বীপ ও ফতােয়াবাদের বাটীতে পাঠাইয়া দিলেন। প্রথ- মতঃ রূপ গােস্বামী কৰ্ম্মস্থান পরিত্যাগ করিয়া গােপনে নৌকাররাহণে ধনসম্পত্তি লইয়া বাটীতে আসিলেন, ও বিত্ত- বিভব ধনরত্ন ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব কুটুম্বগণকে বিভাগ করিয়া দিলেন। * আবশ ক হইলে সনাতন ব্যয় করিতে পারি- বেন বলিয়া গৌড়ের কোন বণিকের নিকটে রূপ দশহাজার মুদ্রা গচ্ছিত রাখিয়া গিয়াছিলেন ।, এ যাত্রায় গৌরাঙ্গের বৃন্দাবন যাওয়া হইল না। বহু লােক সমারােহে আড়ম্বর করিয়া বৃন্দাবনযাত্রা করা অবৈধ জ্ঞানে তিনি রাজমহলের নিকটবর্তী কানাই- নাট্যশালা হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া পুনৰ্ব্বার নীলাদ্রি অভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন, এবং নীলাদ্রি হইতে ম: এ সম্বন্ধে এদেশে এইরূপ জন প্রবাদ প্রচলিত আছে যে, শ্রীচৈতন্যের সহিত সাক্ষাতের পর একদিন রাত্রিকালে রূপ রাজকার্যের অনুরােধে নবাব কর্তৃক আহত হন। রাত্রি দ্বিপ্রহর, মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছে, প্রচণ্ড ঝটিকা বহিতেছে, রজনী গাঢ় অন্ধকারে ভাষণ মূর্তিধারণ করিয়াছে, এমন সময়ে রূপ গোস্বামী রাজপ্রাসাদ অভিমুখে অতিকষ্টে পদব্রজে চলিতেছেন। পবিপাশ্বে এক মেথরের কুটীর ছিল। রূপের পদশব্দ শুনিয়া মেথর-গৃহিণী স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিল, “এই ভয়ঙ্কর, রাত্রিতে কে ঘরের বাহির হইয়াছে ?” মেথর বলিল, “বােধ হয় কুকুর যাইতেছে।” মেথরপত্নী বলিল, “এরাত্রে কুকুর ও গৃহের বাহির হয় না, নিশ্চয় কোন ধনী লােকের চাকর যাইতেছে।” এই কথ! রূপ শুনিতে পাইলেন। মেথরাণীর বাক্যে স্বীয় জীবনের প্রতি রূপের ঘৃণ। উপস্থিত হয়। অর্থের লােভে সামান্য পশুঅপেক্ষাও নিকৃষ্ট বৃত্তি অবলম্বন করিয়াছি, এইচিন্তা রূপের দিয়ে দারুণ যন্ত্রণা উৎপাদন করে এবং তৎক্ষণাৎ তিনি গৃহসংসার পরিত্যাগ করিতে সংকল্প করেন।

ভক্ত-চরিতামৃত। * শৈলকলতাকুঞ্জবেষ্টিত বনুপথে বৃন্দাবন গমন করিতে মনস্থ করিলেন। শ্রীরূপ এই সংবাদ অবগত হইয়া গৌরের উদ্দেশে পুরুষােত্তমে দুইজন ভৃত্যকে প্রেরণ করিলেন। ভৃত্যের গৌরচন্দ্রের বৃন্দাবন গমন-বার্তা প্রেরণ করিলে শ্রীরূপ এই সংবাদ সনাতনকে লিখিয়া পাঠাইলেন ও কনিষ্ঠ ভাতা বল্লভকে সঙ্গে লইয়া ব্যাকুল হৃদয়ে ত্রিধারাধারিণী ত্রিণেীসঙ্গম প্রয়াগাভিমুখে যাত্রা করিলেন। আর এক নাম অনুপম। “য সন্দর্ভ” প্রভৃতি বৈষ্ণবশাস্ত্র- প্রণেতা ভক্তিমান পণ্ডিত প্রবর জীব গােস্বামী ইহারই সন্তান। বল্লভের তৃতীয় অধ্যায়। সনাতনের রাজকৰ্ম্ম পরিত্যাগ ও কারাবাস । সনাতন এখনও রাজকার্যে নিযুক্ত রহিয়াছেন। এখন পর্যন্ত তাহার বিষয়-বন্ধন উন্মােচিত হয় নাই। তাহার হৃদয়ে বৈরাগ্যের অনল প্রধুমিত হইতেছিল, মন সদাই উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত। সনাতন এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিলেন, রাজা আমাকে অনুগ্রহ করেন, এই রাজানু- গ্রহই আমার বিষম বন্ধন। রাজা যদি কোনরূপে আমার প্রতি বিরক্ত হন, তাহা হইলে আমি ' এই যন্ত্রপাঙ্গাল হইতে অব্যাহতি পাই।

তৃতীয় অধ্যায়।
২১
*এথা সনাতন গোসাঞি ভাবে মনেমন।
রাজা মােরে প্রীতি করে সে মাের বন্ধন।
কোন মতে রাজা যদি মােরে ক্ষুব্ধ হয়।
তবে অব্যাহতি হয় করিল নিশ্চয়।”
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড, ১৯শ পরিচ্ছেদ।
সনাতন মনে করিলেন, অসুস্থতার ভান করিয়া যদি
রাজকার্যে অনুপস্থিত থাকি, তাহা হইলে রাজা বিরক্ত
হইবেন, এবং রাজা বিরক্ত হইলেই আমার নিস্কৃতি। সনা-
তন রাজদরবারে না গিয়া গাহে রহিলেন, এবং নির্জনে
পণ্ডিতগণের সঙ্গে ভক্তিশাস্ত্র অনুশীলন করিতে লাগি-
লেন। মন্ত্রীর অসুস্থতার সংবাদ অবগত হইয়া রাজা
চিকিৎসক প্রেরণ করিলেন। চিকিৎসক পরীক্ষা করিয়া
গিয়া বলিল, পীড়ার কথা সর্বৈব মিথ্যা। একদিন সনা-
তন পণ্ডিতগণের সঙ্গে ভাগবত গ্রন্থ আলােচনা করিতে-
ছেন, অকস্মাৎ গৌড়েশ্বর স্বয়ং এক জন ভৃত্য সমভিব্যাহারে
সেই সভামণ্ডপে আসিয়া উপনীত হইলেন। সকলে
সসমেউঠিয়া রাজাকে বসিতে আসন দিলেন। গৌড়-
রাজ সনাতনকে বলিলেন, রাজবৈদ্য বলিয়াছেন তােমার
কোন ব্যাধি নাই, অথচ তুমি রাজদরবারে গমন কর না,
তােমার এ কিরূপ ব্যবহার ? তােমাকে লইয়াই আমার
সকল মন্ত্রণা, তােমা ব্যতীত রাজকৰ্ম্ম অচল হইয়াছে, তুমি
কাৰ্য পরিত্যাগ করিয়া গৃহে বসিয়া থাকিলে আমার যে
সৰ্ব্বনাশ হয়। তােমার মনের কথা খুলিয়া বল। সনা-
पन
বিনীতভাবে বলিলেন, আমার দ্বারা আর রাজকর্ম,

২২ ভক্ত-চরিতামৃত। . হইয়া উঠিবে না, আপনি অন্য মন্ত্রী নিযুক্ত করুন। সনা- তনের কথা শুনিয়া রাজা মহাক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন, তােমার এক ভাই চাক্লা সব ফেরার করিয়া ফেলিয়াছে, জীব- পশু মারিয়া দস্যর ন্যায় সৰ্ব্বস্ব লুঠ করিয়া পলাইয়া গেল, আর তুমি কাজ কামাই করিয়া আমার সর্বনাশ করিতেছ। রাজা রূপকে ডাকাত, বলায় সনাতন অন্তরে বিরক্ত হইয়া গম্ভীরভাবে বলিলেন, আপনি স্বাধীন রাজা, অপরাধীকে আপনি ইচ্ছামত শাস্তি দিতে পারেন। এই কথায় রাজা আরও বিরক্ত হইলেন এবং সনাতন পলা- ইতে না পারেন, এ জন্য তাঁহাকে বন্দী করিবার আদেশ দিয়া গৃহে গমন করিলেন। এই সময়ে উড়িষ্যাধিপতির সহিত সীমান্ত প্রদেশ লইয়া হুসেন সাহার যুদ্ধ উপস্থিত হইয়াছিল। কি ক্ষণ মন্ত্রী সনাতনকে সঙ্গে লইয়া সমর- ক্ষেত্রে গমন করেন, রাজার ইহা একান্ত ইচ্ছা। সনাতনকে কারাগার হইতে আনাইয়া রাজা এই বিষয়ের প্রস্তাব করিলে, সনাতন উত্তর করিলেন, হুজুর! আপনি দেবতা ব্রাহ্মণকে দুঃখ দিতে যাইবেন, আমি তাহাতে ফেগ দিতে পারি এমন শক্তি আমার নাই। ইহা শুনিয়া পাৎসা ক্রোধান্ধ হইয়া উঠিলেন। পরে সনাতনকে কারা- গারে বান্ধিয়া রাখিয়া বিষগ্ন হৃদয়ে সংগ্রামক্ষেত্রাভিমুখে প্রস্থান করিলেন। রাজা সনাতনের কাৰ্যদক্ষতা ও সচ্চ- বিত্ৰতাতে অতিশয় মুগ্ধ ছিলেন। কেবল রাজকীয় কাৰ্যানুরোধে কারাগারে বন্দী করিতে বাধ্য হইয়া- ছিলেন। -

তৃতীয় অধ্যায়।
শ্রীসনাতন সদা উৎকণ্ঠিত মন।
বৈরাগ্যের পথে সদা রাখিল নয়ন।
:
গ
রাজা কহে তােমার মনের কথা কিবা।
কাৰ্যে নাহি যাহ নাহি বুঝি কি করিব।
এক ভাই তােমার ফকির হৈয়া গেল।
তুমিহ তাহাই বুঝি করিব ভাবিলা।
তবে সনাতন কহে অন্তরের মৰ্ম্ম।
আমা হইতে আর নাহি চলিবেক কৰ্ম্ম ॥
তথ্য বুঝিয়া সনাতনে রাখে কারাগারে।
কয়েদ রাখিয়া কিন্তু বিষাদ অন্তরে।”
ভক্তমাল গ্রন্থ।
*অস্বাস্থ্যের ছদ্ম করি রহে নিজ ঘরেণ
রাজকার্য ছাড়িল না যায় রাজদ্বারে।
লােভী কায়স্থগণ রাজকার্য করে।
আপনি স্বগৃহে করে শাস্ত্রের বিচারে।
রান্দা কহে তােমার স্থানে বৈদ্য পাঠাইল।
বৈদ্য কহে ব্যাধি নাহি সুস্থ যে দেখিল ।
আমার যে কিছু কাৰ্য্য সব তােমালা।
কাৰ্য্য ছাড়ি রহিল। তুমি ঘরেতে বসিয়া।
মাের যত কাৰ্য্য কাম সব হৈল নাশ।
কি তোমার হৃদয়ে আছে কহ মাের পাশ।
সনাতন কহে নহে আমা হৈতে কাম।
আর একজন দিয়া কর সমাধান।
০

28
ভক্ত-চরিতামৃত।
এত শুনি গৌড়েশ্বর উঠি ঘরে গেল।
পলাইবে বলি সনাতনেরে বান্ধিলা।”
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড ১৯ পরিচ্ছেদ।
চতুর্থ অধ্যায়।
শ্রীরূপের প্রয়াগ গমন ও ভক্তিতত্ত্ব শিক্ষা।
রূপ ও তদীয় কনিষ্ঠ ভ্রাতা অনুপম মল্লিক অতিকষ্টে
প্রয়াগতীর্থে উপনীত হইয়া দেখিলেন গৌরচন্দ্র ত্রিবেণী-
স্নান করিয়া বিন্দুমাধব দেবদর্শনে বহির্গত হইয়াছেন, শত
শত লােক তঁাহার অনুগামী হইয়াছে। দেবমূর্তি দর্শন
করিয়া গৌরের ভাবসিন্ধু উথলিয়া উঠিয়াছে। প্রেমাবেশে
হরিধ্বনি করিয়া উৰ্দ্ধবাহু হইয়া নৃত্য করিতেছেন। সহস্র
সহস্র নরনারী প্রেমে বিগলিত হইয়া নাম সংকীর্তনে যােগ
দান করাতে প্রেম ভক্তির মহাভাবােচ্ছাস হইয়াছে প্রমত্ত
ভক্তগণের নামকোলাহল, গভীর হরিধ্বনি ও প্রেমাে-
ছাসের প্রচণ্ড বন্যাতে যেন প্রয়াগ নগর ডুবিয়া যাইতেছে।
“কেহ কান্দে কেহ হাসে কেহ নাচে গায়।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলি কেহ গড়াগড়ি যায়।
গঙ্গা যমুনা প্রয়াগ নারিল ডুবাইতে।
প্রভু ডুবাইল কৃষ্ণপ্রেমের বন্যাতে।
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড। ১৯শ পরিচ্ছাে।

চতুর্থ অধ্যায়।
কীৰ্ত্তনাননে উন্মত্ত বিপুল জনস্রোতে রূপ ও অনুপম
কোথায় ভাসিয়া গেলেন। ভিড় ঠেলিয়া ভিতরে প্রবেশ
করিতে না পারিয়া নৃত্যকীৰ্ত্তন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা
করিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পরে কীৰ্ত্তন কোলাহল থামিয়া
গেল। দাক্ষিণাত্যপ্রদেশীয় এক বিপ্র গৌরচন্দ্রকে নিমন্ত্রণ
করিয়া নিজগৃহে লইয়া গেলেন। চৈতন্যচন্দ্র উক্তবিপ্রগৃহে
নির্জনে উপবিষ্ট আছেন, এমন সময়ে তৃণগুচ্ছ দন্তে করিয়া
দীনহীন অকিঞ্চন বেশে শ্রীরূপ ও বল্লভ আসিয়া উপস্থিত
হইলেন। গৌরসুন্দরের প্রেমরঞ্জিত রূপমাধুরী নিরীক্ষণ
করিয়া তাহারা প্রেমে পুলকিত হইয়া দূর হইতে দণ্ডবৎ
প্রণাম করিলেন।
“বিপ্রগৃহে প্রভু আসি নিভৃতে বসিলা।
শ্রীরূপ বল্লভ দুহে আসিয়া মিলিলা
দুই গুচ্ছতৃণ দুহে দশনে ধরিয়া।
প্রভু দেখি দূরে পড়ে দণ্ডবৎ হা।”
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড। ১৯শ পরিচ্ছেদ।
বিষয়লাশ মুক্ত ব্যাকুলহৃদয় বৈরাগী শ্রীরূপকে দর্শন
করিয়া চৈতন্যের মন প্রসন্ন হইল; আইস আইন বলিয়া
সংবর্ধনা করিলেন এবং
“ন মে ভক্তশ্চতুৰ্ব্বেদী মদ্ভক্তঃ পচঃ প্রিয়।
তস্মৈ দেয়ং ততােগ্রাহ্যং স চ পূজ্যো যথাহহং ।”
*অর্থাৎ ভগবান বলিতেছেন, চতুর্বেদাধ্যায়ী পণ্ডিত হইলেই আমার
ভক্ত হওয়া যায় না, অতি নীচ জাতীয় চণ্ডালও ভক্তিতে আমার প্রিয়
য়। এরূপ ভক্তকেই দান করিবে ও তাহার দান গ্রহণ করিবে; তিনি ।
আমার ন্যায় পূজা।

ভক্ত-চরিতামৃত। C এই শ্লোক পাঠ করিয়া দুই ভাইকে প্ৰেমালিঙ্গন দান করিলেন। ‘প্রভু দেখি প্রেমাবেশ হইল দুহার । শ্রীরূপে দেখি প্রভুর প্রসন্ন হইল মন। উঠ উঠ রূপ আইস বলিলা বচন। কৃষ্ণের করুণা কিছু না যায় বর্ণম। বিষয় কূপ হইতে তােমা কাড়িল দুইজন। প্রভু কৃপা পাঞা দুহে দুই হাত বুড়ি। দীন হঞা স্তুতি করে বিনয় আচরি।” চৈঃ চঃ মধ্য খণ্ড, ১৯শ পরিচ্ছেদ। শ্রীচৈতন্য রূপ ও বল্লভকে আলিঙ্গন করিয়া নিকটে বইলেন এবং সনাতনের সংবাদ জিজ্ঞাসা করিলেন। রূপ বলিলেন, তিনি রাজদ্বারে বন্দীদশায় রহিয়াছেন, আপনি যদি উদ্ধার করেন, তবেই তিনি উদ্ধার হইবেন। চৈতন্য বলিলেন সনাতন কারাবাস হইতে মুক্তি লাভ করিয়াছেন, অচিরাৎ তাহার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হইবে। শ্রীরূপ ও অনুপম প্রয়াগেই রহিলেন। প্রেমরমে অতি- ষিক্ত হইয়া ভক্তগােষ্ঠীতে ধর্মপ্রসঙ্গে অতি সুখে কাল- যাপন করিতে লাগিলেন। প্রয়াগের অদূরে যমুনার পর পারে আয়ুলী গ্রাম। তৎকালে সেখানে বল্লভভট্ট নামে একজন জ্ঞানী ও ভক্ত ব্রাহ্মণ বাস করিতেন। তিনি চৈত- ন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া গেলেন। চৈতন্য, রূপ ও অনুপমের সঙ্গে বল্লভভট্টের পরিচয় করাইয়া দিলেন। তাহারা ভট্টাচাৰ্য-দুর হইতে চতুর্থ অধ্যায়। ২৭ প্রণাম করিলেন। ভট্টাচাৰ্য আলিঙ্গন করিতে অগ্রসর “আমরা অস্পৃশ্য পামর আমাদিগকে স্পর্শ করিবেন না” এই বলিয়া রূপ ও অনুপম দুরে সরিয়া পড়ি- লেন। এই ব্যবহারে ভট্টাচাৰ্য্য বিস্মিত হইলেন; কিন্তু ইহাদের দৈন্য বিনয় দেখিয়া চৈতন্য হর্ষে পুলকিত হইয়া ভঙ্গি করিয়া বলিলেন, ভট্টাচাৰ্য্য, তুমি একজন প্রবীণ কুলীন এবং বৈদিক যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণ, তুমি ইহাদিগকে স্পর্শ করিও না, ইহারা অতি হীন জাতি। চৈতন্যের ইঙ্গিত বুঝিতে পারিয়া ভট্ট বলিলেন, ইহাদের মুখে যখন নিরন্তর হরিনাম নৃত্য করিতেছে, তখন ইহারা যে সৰ্বশ্রেষ্ঠ তাহাতে আর সন্দেহ নাই। ইহা শুনিয়া চৈতন্য ভট্টকে বহু প্রশংসা করিলেন এবং প্রেমাবিষ্ট হইয়া শাস্ত্রীয় শ্লোক পাঠ করিয়া বলিলেন, শুদ্ধভক্তিরূপ প্রজ্জ্বলিত অগ্নিতে যাহার নীচজাতিজনিত পাপ সকল দগ্ধ হইয়া হৃদয় নির্মল হইয়াছে, এপ্রকার চণ্ডালকেও পণ্ডিতেরা সম্মান করেন। কিন্তু হরিভক্তিহীন নাস্তিক বেদজ্ঞ হইলেও তাহাদের নিকট সম্মান প্রাপ্ত হয় না। প্রাণবিহীন পুত্তলিকাকে লােক- রঞ্জনের জন্য বহুমূল্য বশনভূষণে সুসজ্জিত করা যেমন বিড়- *“অহােত শপচোহত গরীয়ান্ যজ্জিগ্ৰে বৰ্ত্ততে নাম তুভ্যং। তেপু স্তপন্তে জুহুৰুঃ সৰ্যঃ ব্রহ্মানুচুনাম গৃণন্তি যে তে।” গত ৩য় কর। যে ব্যক্তির জিহ্বার্থে তােমার নাম বর্তমান, সে চণ্ডাল হইলেও রীয়ান , যাহারা তােমার নাম গ্রহণ করেন; তাহারাই প্রকৃত তপস্যা করেন, হােম করেন, তীর্থে স্নান করেন, বেদাদি অধ্যয়ন করেন বং তারাই আৰ্য অর্থাৎ সদাচার-নিরত।

২৮ ভক্ত-চরিতামৃত। স্বনা মাত্র, সেইরূপ ভগবদ্ভক্তিহীন ব্যক্তির সংকুলে জন্ম, শাস্ত্রজ্ঞান, জপ পুরশ্চরণীদি সকলই বৃথা। আয়ুলী গ্রামের পাদদেশ বিধৌত করিয়া প্রসন্নসলিল। যমুনা প্রবাহিতা। ভক্তবৃন্দের সঙ্গে নিরন্তর ধর্ম প্রসঙ্গ এবং কল্লোলিত-কালিন্দীর সুস্নিগ্ধ-শ্যামল-বারিধারা সন্দর্শন করিয়া চৈতন্য প্রেমাবেশে বিহ্বল হইয়া পড়িলেন। প্রেমে- ন্মত্ত নিমাইচন্দ্রের অদ্ভুত ভক্তিভাবের কথা শ্রবণ করিয়া দলে দলে দর্শকগণ আসিতে লাগিল। ব্রাহ্মণেরা তাহাকে আপনাদের গৃহে নিমন্ত্রণ করিতে লাগিলেন। এখানে থাকিলে প্রেমভরে বাহ্যজ্ঞানশূন্য হইয়া কখন্ বা মধ্য যমুনাতে পড়িয়া যান, এই ভয়ে, ভট্ট, তাহাকে প্রয়াগে রাখিয়া আসিলেন। প্রয়াগে অবস্থানকালে চৈতন্য রূপ গােস্বামীর জীবনে শক্তি-সঞ্চার করিয়া তাহাকে কৃষ্ণতত্ত্ব, ইচ্ছাশক্তি(Wiliforce) প্রভাবে নিজের মানসিক ভাব অন্যের মনে সংক্রামিত করিতে পারা যায়, ইহা বর্তমান সময়ের অনেক মনোবিজ্ঞান- বিদ পণ্ডিত স্বীকার করেন। Mesmerism বা Hypnotism অর্থাৎ মােহনবিদ্যার আলোচনা করিলে ইহা স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান হয়। মান- বের হৃদয়ে যে ভাব খুব প্রবল হয়, মানুষ সেই ভাবের দ্বারা অন্যকে বশী ভূত করিতে সমর্থ হয়, ইহা প্রমাণিত সত্য। সচরাচর দেখা যায় বীর- ভাবাপন্ন ব্যক্তিগণ অঙ্গুলি-সঙ্কেতে শত শত যােদ্ধাকে সংগ্রামক্ষেত্রে পরিচালিত করিয়া থাকেন। ঘাের দুকি আসক্ত ব্যক্তিগণের নীচভাবের দ্বারা আকৃষ্ট হইয়াও অনেককে নীলয়গামী হইতে দেখা গিয়াছে। এই রূপ সকল বিষয়েই সবল ব্যক্তিরা তদপেক্ষা দুৰ্বলকে তাহাদের আয়ত্তা- ধীন করিতে পারে। কিন্তু আধ্যাত্মিক শক্তিই সর্বাপেক্ষা প্রবল। এই শক্তির দ্বারা ধৰ্ম্মপ্রবর্তক মহাত্মার। কোটি কোটি মানবকে। ধর্মভাবে উদ্দীপ্ত করিয়া জগতে ধর্মের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠিত করিয়া গিয়াছেন। সাধু মহাত্মারা যে, আপনাদিগের অধ্যাত্মিক বীৰ্য্য শ্রদ্ধাবান শিষের হৃদয়ে

চতুর্থ অধ্যায়।
ভক্তিতত্ত্ব, রসতত্ত্ব প্রভৃতি সমুদায় ভাগবতসিদ্ধান্ত শিক্ষ।
দিতে লাগিলেন। তিনি রায় রামানন্দের নিকট যে সকল
প্রেমভক্তির পূঢ় সিদ্ধান্ত শ্রবণ করিয়াছিলেন, কৃপা করিয়া
শ্রীরূপকে সে সমুদায় শিক্ষাদিলেন। কবিকর্ণপূর স্বপ্রণীত
“চৈতন্যচন্দ্রোদয় নাটকে” চৈতন্যের সহিত রূপগােস্বামীর
মিলন বৃত্তান্ত বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করিয়াছেন।
“লােক ভিড় তরে প্রভু দশাশ্বমেধে গিয়া।
রূপগােস্বাঞীকে শিক্ষা করা শক্তিসঞ্চারিয়া।
কৃষ্ণতত্ত্ব ভক্তিতত্ত্ব রসতত্ত্ব প্রান্ত।
সব শিখাইল প্রভু ভাগবত সিদ্ধান্ত।
রামানন্দ পাশে যত সিদ্ধান্ত শুনিল।
রূপে কৃপা করি তাহা সব সঞ্চারিল।
শ্রীরূপ হৃদয়ে প্রভু শক্তি সঞ্চারিল।
সৰ্ব্বতত্ত্ব নিরূপণে প্রবীণ করিল ।”,
চৈঃ চঃ মধ্যখও, ১৯শ পরিচ্ছেদ।
রূপ গোস্বামীকে দশ দিন ধরিয়া শ্রীগৌরাঙ্গ পরমার্থতত্ত্ব
শিক্ষা দিলেন। গৌর বলিলেন, রূপ! তোমাকে সংক্ষেপে
ভক্তিরসের লক্ষণ বলিতেছি শ্রবণ কর। ভক্তিরসসিন্ধু
পারাবারশূন্য অনন্ত গম্ভার, তােমাকে তার বিন্দুমাত্র কহি-
তেছি। কেশাগ্র শতভাগ করিয়া পুনঃ শত ভাগ করিলে
যাহা হয়, জীবের স্বরূপ তদপেক্ষাও সূক্ষ্ম রূপে কল্পনা
সংক্রামিত করিয়া দিতে পারেন, ধৰ্ম্ম জগতের ইতিহাসে তাহার প্রমাণের
অভাব নাই। বােধ হয় বৈষ্ণবশাস্ত্রকারগণ ইহাকেই “শক্তিসঞ্চার” নামে
উল্লেখ করিয়াছেন।

ভক্ত-চরিতামৃত। করা যায়। জীব পূর্ণ চিৎ-স্বরূপ ঈশ্বরের অত্যল্প কণামাত্র। ঈশ্বর নিয়ন্তা জীব নিয়মিত, তিনি শাসনকর্তা, জীব শাসনা- ধীন। অনেকে অনন্তস্বরূপ নিত্যচৈতন্যরূপী সৰ্বব্যাপী পরমেশ্বর হইতে জীব অভিন্ন বলিয়া কল্পনা করিয়া থাকেন, ইহা মিথ্যা কল্পনামাত্র। জীব শরীরধারী, জন্মমরণধৰ্ম্ম- শীল বিকারী, তাহা কিরূপে আপনি আপনার নিয়ামক হইবে? অপূর্ণতাই জীবের স্বভাব, আর পরমেশ্বর অনাদন “মহান প্রভুৰ্বৈপুরুষঃ। জীব ও ঈশ্বর সমান, যাহারা এরূপ বলেন, তাঁহারা ভগবৎ-স্বরূপ কিছুমাত্র জানেন না। তাহাদের এই মত অতি দূষণীয়। জলস্থলময় স্থাবরজঙ্গমাত্মক বিশ্বসৃষ্টিকে পূর্ণ চিৎস্বরূপের অতিক্ষুদ্রতম অংশ বলা যাইতে পারে। তন্মধ্যে স্থাবর বাদ দিলে জঙ্গমকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। তির্যক অর্থাৎ কীট পতঙ্গ পক্ষ্যাদি ইতর প্রাণী, জলচর ও স্থলচর জীবজন্তু। স্থলচরের মধ্যে মনুষ্য অতি অল্প। মনুষ্যের মধ্যে ম্লেচ্ছ পুলিন্দ বৌদ্ধ শবর অধিকাংশ। অতি অল্প লােকই বেদনিষ্ঠ। বেদ- নিষ্ঠদিগের মধ্যে অর্ধেক লোক কেবল মৌবিক। ধর্ম অগ্রাহ্য করিয়া বেদনিষিদ্ধ পাপকর্মে তাহার রত রহি: আছে। ধর্মাচারী লােকদিগের মধ্যে কৰ্ম্মনিষ্ঠ লােক অধিকতর, অন্তঃসারশূন্য বাহ্য-অনুষ্ঠান লইয়াই তাহারা বিব্রত। কোটি কৰ্ম্মনিষ্ঠের মধ্যে একজন জ্ঞানী। কোটি জ্ঞানীর মধ্যে একজন জীবন্মুক্ত, কোটি মুক্ত পুরু- ষের মধ্যে একজন হরিভক্ত সাধু অতি দুর্লভ। হরি- ভক্তের কামনাশূন্য এইজন্য শান্ত, ভক্তিতেই যথার্থ শান্তি।

চতুর্থ অধ্যায়।
মুক্ত, সিদ্ধ ও ফলকামীরা অশাস্ত। ভাগবতে কথিত
হইয়াছে,
“মুক্তানামপি সিদ্ধানাং নারায়ণপরায়ণঃ।
সুদুল্লভঃ প্রশান্তাত্মা কোটিপি মহামুনে।”
ভাঃ ৬ষ্ঠ স্কন্ধ।
হে মুনিশ্রেষ্ঠ শুকদেব! যে সকল ব্যক্তি মুক্তি লাভ
করিয়া সিদ্ধ হইয়াছেন, তাহাদিগের কোটির মধ্যে বিষ্ণু
ভক্তিপরায়ণ প্রশান্তচিত্ত ব্যক্তি অতীব দুর্লভ।
“প্রভু কহে শুন রূপ ভক্তি রসের লক্ষণ।
সূত্ররূপে কহি বিস্তার নাযায় বর্ণন।
পারাবারশূন্য গম্ভীর ভক্তিরস সিন্ধু।
তােম চাখাইতে তার কহি এক বিন্দু।
এইত ব্ৰহ্মাণ্ড ভরি 'অনন্ত জীবগণ।
চৌরাশি লক্ষ যােনিতে করয়ে প্রমণ।
কেশাগ্র শতেক ভাগ পুনঃ শতাংশ করি।
তার সম সূক্ষ্ম জীবের স্বরূপ বিচারী ।
তার মধ্যে স্থাবর জঙ্গম দুই ভেদ।
জঙ্গমে তির্যক জল স্থলচর বিভেদ।
তার মধ্যে মনুষ্য জাতি অতি অল্পতর।
তার মধ্যে ম্লেচ্ছ পুলিন্দ বৌদ্ধ শবর।
বেদনিষ্ঠ মধ্যে অর্ধেক মুখে বেদ মানে।
বেনিষিদ্ধ পাপ করে ধৰ্ম্ম নাহি গণে।
ধৰ্মচারী মধ্যে বহুত কৰ্ম্মনিষ্ঠ।
কোটি কৰ্ম্মনিষ্ঠ মধ্যে এক জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ।
ধৰ্মচারী

ভক্ত-চরিতামৃত। কোটি জ্ঞানী মধ্যে হয় একজন মুক্ত। কোটি মুক্ত মধ্যে দুর্লভ কৃষ্ণ ভক্ত। কৃষ্ণভক্ত নিষ্কাম অতএব শান্ত। ভুক্তি মুক্তি সিদ্ধি কামী সকলি অশান্ত ॥” চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড, ১৯শ পরিচ্ছেদ। হে শ্রীরূপ! ভগবানের কৃপাতে ভাগ্যবান মানব ভক্তি- লতাবীজ লাভ করেন। নিয়ত শ্রবণ কীৰ্ত্তনরূপ জলে উক্ত বীজ সেচন করিলে তাহা হইতে ভক্তিলতা অঙ্কুরিত হইয়া ব্রহ্মাণ্ড ভেদ করত সেই লতা গোলােক বৃন্দাবন ধামে হরিচরণ কল্পবৃক্ষে আরােহণ করে, এবং তাহা হইতে প্রেমফল প্রসূত হয়। বৈষ্ণবাপরাধরূপ হস্তী যদি মস্তকো- ত্তোলন করে, তাহা হইলে ভক্তিলতা উৎপাটিত ও ছিন্ন হইয়া যায়। ভক্তিলতার সঙ্গে যদি ভােগবাসনা, স্বৰ্গকা- মনা, মুক্তিবাঞ্ছা, লাভ প্রতিষ্ঠা, জীবহিংসা ও নিষিদ্ধাচার প্রভৃতি উপশাখা মিলিত হয়, তাহা হইলে সেকজল পাইয়া উপশাখাগণই বর্ধিত হয়, মূলশাখা অর্থাৎ ভক্তিলতা আর বাড়িতে পায় না। এই জন্য প্রথমেই উপশাখা ছেদন করা কর্তব্য। অর্থাৎ হরিভক্তি লাভ করিতে হইলে প্রথমতঃ ভুক্তি অর্থাৎ ভােগলালসা, মুক্তি ও স্বর্গােগ প্রভৃতি সমুদায় ফলাভিসন্ধি পরিত্যাগ করিয়া, কেবল হরি- চরণাশ্রয় না করিলে শ্রবণ কীৰ্ত্তনাদি সকল প্রকার সাধন ভজন বৃথা হইয়া যায়। এই ভক্তিলতা অবলম্বন করিয়া সাধক কল্পবৃক্ষ লাভ করেন এবং পরম সুখে সুপক্ক প্রেমফল- আস্বাদন করেন। এই ভগবৎপ্রেমরসাস্বাদনই পরম চতুর্থ অধ্যায়। ফল—পরম পুরুষার্থ। ইহার নিকট চারি পুরুষার্থ তৃণ তুলা*। শুদ্ধ ভক্তি হইতে প্রেম উৎপন্ন হয়।, শুদ্ধ ভক্তির লক্ষণ শ্রবণ কর। অন্য বাঞ্ছা, অন্য পূজা, শুষ্ণজ্ঞান কৰ্ম্মের অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করিয়া পবিত্রভাবে সকল ইন্দ্রিয়ের অনু- কূল্যে হরিপ্রেমসনুশীলন করাই শুদ্ধ ভক্তি, ইহাকেই অহৈতুকী ভক্তি বলাযায়। পিশাচীতুল্যা ভােগবাসনা ও মুক্তিস্পৃহা হৃদয়ে অবস্থিতি করিলে বহু সাধনাতেও প্রেম উৎপন্ন হয় না। নারদ পঞ্চরাত্রে কথিত হইয়াছে, ‘সর্বোপাধিবিনিৰ্ম্ম জং তৎপরত্বেন নিৰ্ম্মলং। হৃষীকেন হৃষীকেশ সেবনং ভক্তিরুচ্যতে।” “সর্বোপাধিৰিনিৰ্ম্মক্ত” অর্থাৎ অন্য বাঞ্ছা পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক, একাগ্রচিত্তে পবিত্র ভাবে ইন্দ্রিয়াদির আনুকূল্যে ভগবদনুশীলন করার নামই ভক্তি। ভাগবতে লিখিত হইয়াছে, ০ * সালােক্য সার্শিঃ সামীপ্য সারূপ্যৈক হুমপুত। দীয়মানং ন গৃহুন্তি বিনা মৎসেবনং জনাঃ।” ভাগবত ৩য় স্কন্ধ। সালোক্য অর্থাৎ আমার সহিত একলােকে বাস ; সাষ্টি কি না আমার নায় ঐশ্বর্যা প্রাপ্তি ; সামীপ্য অর্থাৎ আমার নিকটে থাকা ; সারূপ্য, আমার তুল্য রূপ পাওয়া ; একত্ব অর্থাৎ সাযুজ্য, অামার সুহিত অভিন্ন হওয়া ; এই পাঁচ প্রকার মুক্তি আমার ভক্তকে দিতে চাহিলেও আমার সেবা ব্যতীত তঁ হারা আর কিছুই গ্রহণ করেন না। বৈষ্ণবদিগের মতে ধৰ্ম্ম অর্থ কাম মােক্ষ চতুৰ্বর্গ ফলের অতীত ভগবানে বিশুদ্ধ সেবাময় প্রেমই মোক্ষের চরমদশা রূপ অপবর্গ। বৈষ্ণব শাস্ত্রে ইহার নাম পঞ্চম পুরুষার্থ। । শ্ৰীমন্মধ্বগৰ্য্য “মোক্ষ বিষঙ্গি লাভং” এইরূপ সিদ্ধান্ত করিয়াছে। (শ্ৰীযুক্ত কেদার নাথ ভক্তিবিনোদ সম্পদিত “চৈতন্য চরিতামৃ’ ১২৪পৃষ্ঠা দেখ।)

t
৩৪
ভক্ত-চরিতামৃত।
“মদ্ গুণশ্রুতিমাত্ৰেণ ময়ি সর্বগুহাশয়ে।
মনােগরিবিচ্ছিন্ন। যথা গঙ্গাসােহষুধৌ।
লক্ষণং ভক্তিযােগ্য নির্গুণস্য হ্যদাহৃতং।
অহৈতুক্যব্যবহিত। যা ভক্তিঃ পুরুষােঙ্কমে।” ৩য় স্কন্ধ।
সাগরাভিগামিনী গঙ্গাধারার ন্যায় যে মনােগতি, আমার
গুণ শ্রবণ মাত্র, ফানুসন্ধান নাকরিয়া ও ভেদদর্শন বর্জিত
হইয়া, সৰ্বান্তর্যামী ও পুরুষােত্তম আমাতে অবিচ্ছিন্নভাবে
নিহিত হয়, সেই মনােগতিরূপ ভক্তিই নিগুণ ভক্তিযােগের
লক্ষণ বলিয়া কথিত হইয়াছে। ইহাই অহৈতুকী ও অব্যব
হিত ভক্তি।
“ব্ৰহ্মাণ্ড ভ্রমিতে কোন ভাগ্যবান জীব।
গুরু কৃষ্ণ প্রসাদে পান ভক্তিলতা বীজ।
মালী হা করে সেই বীজ আরোপণ।
শ্রবণ কীৰ্ত্তন জলে করয়ে সেচন।
উপজিয়া বাড়ে লতা ব্ৰহ্মাণ্ড ভেদি যায়।
বিরজা ব্ৰহ্মলােক ভেদি পর ব্যোম পায়।
তবে যায় তদুপরি গােলােক বৃন্দাবন।
কৃষ্ণচরণ কল্প বৃক্ষে করে আরােহণ ॥
তাহ বিস্তারিত হঞা ফলে প্রেমফল।
ইহা মালী নিত্য সেচে শ্রবণাদি জল ।
যদি বৈষ্ণব অপরাধ উঠে হাতি মাতা।
উপাড়ে বা ছিণ্ডে তার শুকি যায় পাতা।
তাতে মালী যত্ন করি করে আবরণ।
অপরাধ হাতী যৈছে না হয় উদগম।
৫

চতুর্থ অধ্যায়।
কিন্তু যদি লতার অঙ্গে উঠে উপশাখা।
ভুক্তি মুক্তিবাঞ্ছা যত অসংখ্য তার লেখা ॥
নিষিদ্ধাচার কুটি নাটি জীব হিংসন।
লাভ প্রতিষ্ঠাদি যত উপশাখাগণ।
সেকজল পাঞা উপশাখা বাড়ি যায়।
স্তব্ধ হা মূলশাখা বাড়িতে না পায়।
প্রথমেই উপশাখা করয়ে ছেদন।
তবে মূলশাখা বাড়ি যায় বৃন্দাবনু।
প্রেমফল পাকি পড়ে মালী আস্বাদয়।
লতা অবলম্বি মালী কল্পবৃক্ষ পায়।
তঁাহা সেই কল্প বৃক্ষের করয়ে সেবন।
সুখে প্রেমফসরস করে আস্বাদন।
এইত পরম ফল, পরম পুরুষার্থ ।
যার আগে তৃণতুল্য
চারি পুরুষার্থ।
শুদ্ধ ভক্তি হৈতে হয় প্রেমের উৎপন্ন।
অতএব শুদ্ধভক্তির কহিয়ে লক্ষণ।
অন্যবাঞ্ছা, অন্য পূজা ছাড়ি জ্ঞানকৰ্ম্ম।
আনুকুল্যে সৰ্বেন্দ্ৰিয় কৃষ্ণানুশীলন।
এই শুদ্ধভক্তি, ইহা হৈতে প্রেম হয়।
পঞ্চ রাত্রে ভাগবতে এই লক্ষণ কয়।
ভুক্তি মুক্তি আদি বাং যদি মনে হয়।
সাধন করিলে প্রেম উৎপন্ন না হয়।”
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড ১৯শ পরিচ্ছেদ।
যেমন ক্রমশঃ ঘনীভুত হইয়া গুড় খণ্ড সার
}
।
ইক্ষু

-
৩৬
ভক্ত-চরিতামৃত।
শর্করা মিছরি ও উত্তম মিছরি প্রস্তুত হয়, সেইরূপ সাধন
ভক্তি হইতে রতির উদয় হয়। রতি গাঢ় হইলে তাহাকে
প্রেম বলা যায়। প্রেমের ক্রমশঃ বৃদ্ধিতে স্নেহ মান প্রণয়
রাগ অনুরাগ ভাব মহাভাব উৎপন্ন হইয়া থাকে। এই
সমুদায় ভক্তিরসের স্থায়ীভাব, ইহার সহিত বিভাব অনুভব
অর্থাৎ উদ্দীপনা ও মনের পূর্ণ একাগ্রতা মিলিত হইলে
ভক্তিরস অমৃত মধুর হইয়া থাকে। ভক্তের প্রকৃতিভেদে
রতিভেদ পাঁচ প্রকার। শান্ত দাস্য সখ্য বাৎসল্য ও মাধুৰ্য্য
এই পাঁচ প্রকার রতিভেদে হরিভক্তিরস পাঁচ প্রকার হয়।
ভক্তিরস মধ্যে এই পাঁচটিই প্রধান।* হাস্য অদ্ভুত বীর
করুণ রৌদ্র ভয়ানক এবং বীভৎস এই সাতটি গৌণ রস।
যে ব্যক্তি যে রসের ভক্ত, তাহার হৃদয়ে সেই প্রধান রস
স্থায়ী ভাবে অবস্থিতি করে। সাধন ভজনে অগ্রসর হইলে
গৌণ রসেরও সঞ্চার হয়।
পুনশ্চ, ভক্তি দ্বিবিধ। ঐশ্বৰ্য্য জ্ঞান-মিশ্রা আর কেবলা।
কে বলা রতি ঐশ্বৰ্যজ্ঞানহীনা কেবল রাগময়ী। ঐশ্বৰ্য্য
জ্ঞানে শান্ত দাস্য রস উদ্দীপিত হয়, কিন্তু বাৎসল্য সখ্য
ও মাধুৰ্য্যরস সঙ্কুচিত হইয়া যায়। ইহার দৃষ্টান্ত এই যে,
বাৎসল্য বসে, শ্ৰীকৃষ্ণ, বসুদেব ও দেবকীর চরণ বন্দনা
করিলে, তাহারা পুত্রকে ঈশ্বরবােধে শঙ্কিত হইয়া আলিঙ্গন
করিতে পারেন নাই। সখ্য রসে, কৃষ্ণের বিশ্বরূপ দর্শন
করিয়া অর্জুনের সখ্য প্রেম সঙ্কুচিত হইয়া গিয়াছিল। ভীত
হইয়া তিনি বলিয়াছিলেন, হে কৃষ্ণ! আমি অজ্ঞানতাবশতঃ
পরিশিষ্ট দেখ।

৩৭ । । চতুর্থ অধ্যায়। তােমাকে যে সখা, যাদব ইত্যাদি তিরস্কারসূচক সম্বােধন করিয়াছি, তুমি সে সকল অপরাধ ক্ষমা কর! মধুর রসে কৃষ্ণ কৌতুকচ্ছলে রুক্মিণী দেবীকে পরিত্যাগ করিয়া যাইবেন বলিলে, কৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব স্মরণ করিয়া রুক্মিণী সন্ত্রস্ত ও মুচ্ছিত হইয়াছিলেন। কিন্তু কেবল প্রতিতে ঈশ্বরের ঐশ্বৰ্যজ্ঞান থাকে না। নন যশােদা কৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব বিস্মৃত হইয়া সামান্য আত্মজ জ্ঞান করিয়া বাৎসল্যভাবে লালন পালন করিতেন। শ্রীদামাদি রাখাল বালকগণ সখ্যভাবে কৃষ্ণের কাঁধে চড়িতেন, ব্রজাঙ্গনাগণ প্রাকৃত নায়ক নায়িকার ভাবে অসঙ্কোচে প্রীতি করিতেন। পরমেশ্বর বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি, রাজগণ-রাজা সব্বশক্তি- মান মহান প্রভু, এই ভাব শান্ত দাস্য রসের প্রাণ। ইহা ভয় ও সম্ভম মুলক, কিন্তু প্রেম মূলক নহে। ইহাকেই ঐশ্বৰ্যজ্ঞান- মিশ্রা বলা যায়। বাৎসল্য সখ্য মধুর রসে এ প্রকার ভয় সম্রম প্রভুত্ব প্রভৃতি সঙ্কুচিত ভাব নাই। তাহা কেবল বিশুদ্ধ প্রীতিতে আত্মসমর্পণের ব্যাপার । এই জন্যই বৈষ্ণবশাস্ত্রে ইহার নাম কেবলা অর্থাৎ ঐশ্বৰ্যাদি সম্পর্ক শূন্য কেবল অনুরাগময়ী। কেবলা রতিতেও দাস্যভাব আছে, কিন্তু তাহা ঐশ্বৰ্যজনিত নহে। পুত্রকে পিতা মাতা যেমন মেহের সেবা করেন ও স্ত্রী যেমন দাসীর ন্যায় স্বামীর সেবা করিয়া থাকেন, ইহা তদ্রুপ প্রেমজনিত সেবা। অতঃপর চৈতন্য পঞ্চবিধরসতত্ব ব্যাখ্যা করিতে লাগি- লেন, ঈশ্বরের স্বরূপ জ্ঞান হইয়া তাহাতে একাগ্র নিষ্ঠা হওয়াই শান্তরস। ভাগবতে ভগবান নিজ মুখে বলিয়াছেন, ৪ ভক্ত-চরিতামৃত। আমাতে বুদ্ধির একান্ত নিষ্ঠাই শম। * ভগবদ্ভক্ত ব্যক্তি একমাত্র পরমেশ্বরকেই প্রার্থনা করেন। পরমেশ্বর ব্যতীত অন্য বিষয়ে তাঁহার আসক্তি থাকে না। স্বর্গ এবং মােক্ষ লাভকেও তিনি নরকের ন্যায় জ্ঞান করেন। শান্ত রসের দুই গুণ—পরমেশ্বরে একান্ত নিষ্ঠা ও বিষয়বাসনা পরিত্যাগ। আকাশের গুণ শব্দ যেমন সকল ভৌতিক বস্তুতেই বিদ্যমান থাকে, সেইরূপ শান্তরসের গুণদ্বয় সর্বপ্রকার ভক্তের জীবনে ব্যাপ্ত হইয়া আছে। শান্তরসে ঈশ্বরের সত্তা মাত্রের জ্ঞান হয়, সুতরাং শান্তরসই ভক্তির পত্তনভূমি। গাঢ় প্রেমের মত্ততা শান্ত রসে হয় না। ঐশ্বৰ্য্য জ্ঞানে সেবা সম্রম গৌরব, ইহা দাস্ত রস। সখ্য রসে বিশ্বাস, বাৎসল্য রসে মমতা, মধুর রস কান্তভাবে অসঙ্কোচ সেবা, মমতাধিক্য ও আত্মসমর্পণ। এই সকল ভাব ক্রমান্বয়ে পরপর রসে অনুভূত হয়। শব্দ স্পর্শ রূপ রস গন্ধ এই ভৌতিক গুণ সকল যেমন ক্রমান্বয়ে পরস্পর মিলনের দ্বারা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়া একাধারে ক্ষিতিতে মিলিত হইয়াছে ; সেই প্রকার শান্তরসের গুণদ্বয় দাস্য রসে, দাস্যরসের গুণ সখ্যরসে,সখ্যের গুণ বাৎসল্যে এবং বাৎসল্যের গুণ কান্তভাবে একাধারে সন্নিবিষ্ট হওয়ায় ইহা মাধুৰ্য্যরস নামে অভিহিত হইয়াছে। এই মাধুৰ্য্যরসে সকল রসের সমাহার হওয়ায় ইহা আশ্চৰ্য্য অমৃতাস্বাদযুক্ত।* হে শ্রীরূপ । * “শমােমন্নিষ্ঠতা বুদ্ধেদম ইন্দ্রিয়সংযমঃ। তিতিক্ষা দুঃখ সংমর্ষে জিপেস্থজয়াে ধৃতিঃ।” ভাগবত-১১ স্কন্ধ। আমাতে বুদ্ধির একান্ত নিষ্ঠার নাম শম, ইন্দ্রিয় সংযমের নাম দম, দুঃখ সহিষ্ণুতার নাম তিতিক্ষা। এবং জিহ্বা ও উপস্থ বশীকরণের নাম ধৈৰ্য্য। * বিস্তারিত ব্যাখ্যা পরিশিষ্টে দেখ।

চতুর্থ অধ্যায়। ভক্তিরসের পথ মাত্র আমি প্রদর্শন করিলাম। ভক্তিরস- সমুদ্রের অনন্ত বিস্তৃতি ও গাম্ভীর্ঘ তুমি এখন আলােচনা কর। এইরূপে প্রেমভক্তিতত্ত্বের ব্যাখ্যা করিতে করিতে চৈতন্য- চন্দ্র প্রেমরসে পরিপ্লাবিত হইয়া রূপ গােস্বামীকে আলিঙ্গন করিলেন, এবং বলিলেন, রূপ! ভগবানের, কৃপাই মূল, তাহার কৃপা হইলে সামান্য মূখেরাও ভক্তিসমুদ্র উত্তরণ করিতে পারে। “ভাবিতে ভাবিতে কৃষ্ণ রয়ে অন্তরে। কৃষ্ণ কৃপায় অজ্ঞ পায় রসসিন্ধু পারে । এত বলি প্রভু তারে কৈল আলিঙ্গন। বারাণসী চলিবারে প্রভুর হইল মন।” চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড ১৯ শ পরিচ্ছেদ। শ্রীরূপকে ভক্তিতত্ত্ব উপদেশ করিয়া গৌরাঙ্গ বারাণসী গমন করিতে উদ্যত হইলে, রূপ বলিলেন, অনুমতি করেন ত আমিও আপনার সঙ্গী হই। আপনার বিরহ আমি, সহ করিতে পারিব না। গৌর বলিলেন, বৃন্দাবনের এত নিকটে যখন আসিয়াছ, তখন বৃন্দাবন ধাম দর্শনার্থ যাত্রা তথা হইতে গৌড়দেশ হইয়া নীলাদ্রিতে আমার সহিত মিলিত হইও। চৈতনাের আদেশে এরূপ ও বল্লভ বৃন্দাবন অভিমুখে যাত্রা করিলেন।

পঞ্চম অধ্যায়। সনাতনের কারামুক্তি ও কাশীধামে শ্রীচৈতন্যের সহিত মিলন। প্রধান রাজমন্ত্রী ঈশ্বরপ্রেমিক সনাতন গৌড় রাজধানীতে বন্দীশালায় অতিকষ্টে কালযাপন করিতেছেন। এই অবস্থায় শ্রীরূপের পত্ৰ আসিয়া পৌছিল। শ্রীরূপ লিখিয়াছেন, আমরা দুই ভাই চৈতন্যচরণ দর্শনের জন্য চলিলাম, তুমি যেরূপে পার ছুটিয়া আইস। মুদীগৃহে দশ হাজার মুদ্রা রাখিয়া আসিয়াছি,অবশ্যক হইলে তাহা দিয়া কোন প্রকারে কারা- বন্ধন হইতে মুক্তি লাভ করিয়া চলিয়া আসিও। এই পত্র পাইয়া সনাতন শ্রীচৈতন্যের দর্শন লালসায় ব্যাকুল হইয়া পড়িলেন। কারাধ্যক্ষকে অনেক মিনতি করিয়া বলিলেন, মিঞা সাহেব! কোঁৰ কোরাণ শাস্ত্রে আপনি মহা পণ্ডিত ও ধার্মিক ব্যক্তি। শাস্ত্রে আছে, নিজ ধন দিয়া একজন বন্দীর কারামােচন করিতে পারিলেও পরমেশ্বর সংসার- বন্ধন হইতে মুক্ত করেন। আমি এতদিন আপনার যে কিছু উপকার করিয়াছি, তাহার প্রত্যুপকার স্বরূপ আপনি আমাকে কারাগার হইতে মুক্ত করুন। আমি আপনাকে পাঁচ সহস্র টাকা দিতেছি। ইহাতে আপনার পুণ্যসঞ্চয় ও অর্থলাভ দুইই সিদ্ধ হইবে। আমাকে বিপদ হইতে উদ্ধার করিলে ভগবান আপনার সকল বিপদ দূর করিবেন। কারাধ্যক্ষ যবন বলিলেন, মহাশয়, আপনাকে

পঞ্চম অধ্যায়।
৪১
ছাড়িয়া দিতে ইচ্ছা হয় বটে, কিন্তু রাজাকে বড় ভয় হয়।
সনাতন উত্তর করিলেন, রাজা দক্ষিণদেশে যুদ্ধে গিয়াছেন,
আসিতেও পারেন; যদি ফিরিয়া আসেন, বলিবেন যে
সনাতন গঙ্গার নিকটে বহির্দেশে গিয়া শৃঙ্খল সহিত গঙ্গায়
ঝাপ দিয়া কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে, বহু অনুসন্ধানেও
কোন উশে পাওয়া যায় নাই। আপনার কোন ভয়
নাই, আমি এদেশ পরিত্যাগ করিয়া দরবেশ হইয়া মকায়
চলিয়া যাইব। * সনাতনের অনুনয় বাক্যে সে ব্যক্তি
সম্মত না হওয়াতে সনাতন সাত হাজার টাকা তাহার
সম্মুখে রাশীকৃত করিলেন। কারাধ্যক্ষ এবারে আর লােভ
সম্বরণ করিতে পারিলেন না, টাকাগুলি আত্মসাৎ করিলেন
এবং রাত্রিকালে গােপনে শৃঙ্খল মুক্ত করিয়া সনাতনকে
গঙ্গাপার করিয়া দিলেন। সনাতন কারাগার হইতে
নিষ্ক্রান্ত হইয়া ঈশান নামক একজন বিশ্বস্ত ভৃত্যকে সঙ্গে
লইয়া চৈতন্যের উদ্দেশে ছুটিতে লাগিলেন। গ্রাম নগরের
প্রকাশ্য রাজপথ পরিত্যাগ করিয়া পার্বত্যবনপথে ফল
মূল জল মাত্র দ্বারা কোনরূপে জীবন ধারণ করিয়া অতি
ক্লেশে পাতরা পৰ্বতে আসিয়া উপনীত হইলেন। এই
পৰ্বতে একজন দস্যু ভৌমিক (ভুঞা) কুটুম্বপরিবেষ্টিত
হইয়া বাস করিত। পথিক লােকের সর্বস্ব কাড়িয়া লইয়া
প্রাণ বিনাশ করাই তাহার ব্যবসায়। সনাতন উক্ত
* সনাতন ব্রাহ্মণকুলে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, ইহা পূৰ্ব্বে প্রমাণসহ
উল্লেখ করা হইয়াছে। সুতরাং তাহার এই উক্তি যে শুদ্ধ মুসলমান
কারাধ্যক্ষের মনন্তুষ্টির জন্য তাহার কোন সন্দেহ নাই।

82
ভক্ত-চরিতামৃত।
ভুঞার নিকট উপস্থিত হইয়া, পৰ্বত পার করিয়া দিতে
অনুরােধ করিলেন। ভুঞার নিকটে একজন গণক ছিল,সে
মাটীতে অঙ্কপাত করিয়া হাত গণিয়া কাহার নিকটে কি
আছে বলিতে পারিত। সেই গণক কাণে কাণে ভুঞাকে
কহিল যে সনাতনের কাছে আটটী সােণার মােহর আছে।
ইহা শুনিয়া ভুঞা আনন্দিত হইয়া অতি সমাদরে তাহাদের
আহারাদির বন্দোবস্ত করিতে লাগিল। সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধিশালী
রাজমন্ত্রী সনাতন, অপরিচিত ভৌমিকের এবম্বিধ সমাদরের
তাৎপৰ্য্য হৃদয়ঙ্গম করিয়া চিন্তিত হইলেন এবং ঈশানকে,
তাহার নিকটে টাকাকড়ি কিছু আছে কি না জিজ্ঞাসা
করিলেন। ঈশান লােভবশতঃ একটী মােহর গােপন
করিয়া বলিল তাহার
নিকটে সাতটী মােহর আছে।
সনাতন ঈশানকে ভৎসনা করিয়া বলিলেন, এই কালম
কেন সঙ্গে আনিয়াছ? সনাতন তখন সাতটী মােহর ভুঞার
হস্তে অৰ্পণ করিয়া মধুর বচনে বলিলেন, আমার কাছে
এই সাতটী মােহর ছিল, ইহা লইয়া ধৰ্ম্ম ভাবিয়া আমাকে
পৰ্বত পার করিয়া দাও। আমি রাজবন্দী, প্রকাশ্য সড়কে
আমি যাইতে পারি না। আমাকে এই বিপদ হইতে উদ্ধার
করিলে তােমার পুণ্য লাভ হইবে। ভুঞা হাসিয়া বলিল,
তােমার ভূতের কাছে আটটী মােহর আছে, আমি তাহা
প্রথমেই জানিতে পারিয়াছি। তুমি অতি সুবুদ্ধি, এই
মােহরের জন্য আজ রাত্রে আমি তােমাকে হত্যা করিতাম।
যাহা হউক, ভাল হইল, আমি পাপ হইতে অব্যাহতি
পাইলাম। আমি মােহর গ্রহণ করিব না, ধৰ্ম্মার্থে তােমাকে

পঞ্চম অধ্যায়। পৰ্বত পার করিয়া দিব। সনাতন বলিলেন, তুমি যদি ইহা গ্রহণ না কর, তাহা হইলে অপর কোন দ্য ইহার জন্য আমার প্রাণ বিনাশ করিবে। তৎপরে ভুঞা চারি জন পাইক সঙ্গে দিলে, সনাতন তাহাদের সাহায্যে রাত্রি- কালে নিবিড় বনের ভিতর দিয়া পৰ্বত পার হইয়া আসি- লেন। পরপারে আসিয়াই ঈশানকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তােমার নিকটে আর একটী মােহর আছে কি না বল। ঈশান বলিল আছে, তখন সনাতন তাহাকে বলিলেন, তুমি মােহর লইয়া গৃহে ফিরিয়া যাও, আমার সঙ্গে তােমার আর যাইবার কোন প্রয়জন নাই। ঈশান কাদিতে দিতে চলিয়া গেল। সনাতন ছিন্নকন্থা ও করােয়া মাত্র সঙ্গে লইয়া একাকী নির্ভয় নিশ্চিন্ত মনে অতি দীন হীন বেশে চলিতে লাগিলেন। ক্রমে হাজিপুর গ্রামের এক উদ্যানে সন্ধ্যাকালে উপস্থিত হইয়া তথায় রাত্রি যাপন করিতে মনস্থ করিলেন। এই হাজীপুর বর্তমান মজঃফরপুর জেলা অন্তর্গত। এখানে গৌড়েশ্বরের কর্মচারীগণ বাস করিতেন । সনাতনের ভগিনীপতি শ্রীকান্ত একজন রাজকর্মচারী। তিনি রাজার আদেশে, ঘােটকের মূল্যস্বরূপ তিন লক্ষ টাকা লইয়া পাত- সাহকে দিবার জন্য দিল্লী যাইতেছিলেন। সম্প্রতি পথিমধ্যে হাজীপুরের এই উদ্যানমধ্যস্থ রাজ প্রাসাদে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন। ঈশ্বরপিপাসু দীনাত্ম সনাতন প্রেমে পুল- কিত হইয়া বৃক্ষমূলে বসিয়া উচ্চৈঃস্বরে হরিনাম করিতে- ছিলেন, শ্রীকান্ত পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনিতে পাইয়া একটু উদ্বিগ্ন হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ প্রাসাদের উপর হইতে ৫ ৪৪ ভক্ত-চরিতামৃত। সনাতনকে দেখিতে পাইলেন। পরে একজন ভৃত্যকে সঙ্গে লইয়া রজনীযােগে সনাতনের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। ফকিরবেশধারী সনাতনের ছিন্নকন্থা মলিন বসন ধূলিধূসরিত অনাহারক্লিষ্ট ক্ষীণ অঙ্গ অবলােকন করিয়া শ্রীকান্তের চক্ষে জল আসিল। খিন্ন হইয়া করুণস্বরে বলিতে লাগিলেন, হায়! সনাতন, তোমার একি দশা! তােমার রাজ্য সম্পদ কোথায় গেল? সুখের শরীরে এত ক্লেশ কিরূপে তুমি সহ্য করিবে ? তুমি এই কঠোর বৈরাগ্য পরিত্যাগ কর, গৃহে বসিয়া শ্রীহরির আরাধনা কর, তােমার এই দীনবেশ দেখিয়া আমার বুক ফাটিয়া যাইতেছে। শ্রীকান্তের সকরুণ মেহবাক্য শ্রবণ করিয়া সনাতন বলিলেন, ভাই, আমাকে আর একথা বলিও না, আমার ভাগ্যে যাহা হয় হইবে, তুমি গৃহে গমন কর। তদনন্তর দুইজনে অনেক কথাবার্তা হইল, সনাতন আপ- নার বন্ধন মােক্ষণের কথা সবিশেষ বলিলেন। শেষে শ্রীকান্ত এইখানে দুই দিন থাকিবার জন্য বিশেষ অনুরােধ করিলেন, কিন্তু সনাতন কিছুতেই সম্মত হইলেন না। তাহার উৎকট বৈরাগ্যের অবস্থা চিন্তা করিয়া শ্রীকান্ত আর কিছু বলিতে সাহস করিলেন না। কেবল শীত নিবারণের জন্য এক খানি শাল দিলেন। সনাতন হাস্য করিয়া তাহা দুরে পরিত্যাগ করিলেন। শ্রীকান্ত পুনর্বার একখানি বনাত আনিয়া দিলেন। মূল্যবান জানিয়া সনাতন তাহাও গ্রহণ করিলেন না। অবশেষে শ্রীকান্তের অনুরােধে একখানি ভােট-কম্বল শীত নিবারণের জন্য লইয়া একাকী গৌরচন্দ্রের উদ্দেশে পশ্চিমাভিমুখে গমন করিতে লাগিলেন।

পঞ্চম অধ্যায়। ৪৫ শ্রীকান্তদত্ত ভােটকম্বল গায়ে দিয়া বৈরাগী সনাতন ভাগী- বুখী উত্তীর্ণ হইয়া অতি কষ্টে বারাণসী ধামে উপনীত হই- লেন, এবং পিপাসাতুর পথিকের ন্যায় ব্যাকুল হৃদয়ে কোথায় চৈতন্য কোথায় চৈতন্য বুলিয়া উন্মত্তের ন্যায় যাকে তাকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। পূর্ণচন্দ্রোদয়ে সাগরবারি যেমন উচ্ছসিত হইয়া বেলাভূমি অতিক্রম করে, প্রেমাবতার গৌরচন্দ্রের প্রেমের আকর্ষণে সনাতনের ভাবসিন্ধু সেইরূপ উদ্বেলিত হইয়া উঠিয়াছে। গণ্ডস্থল ভাসাইয়া গলদ- ধারা প্রবাহিত হইতেছে। আপনার পাপ দুৰ্বলতা বিষয়- ভােগ আর গৌরচষ্ট্রের প্রেমবিল স্বর্গীয় ভাব চিন্তা করিয়া সনাতনের আত্মজ্ঞান উদ্বোধিত হইয়াছে। বৃথা এতদিন বিষয়মদে উন্মত্ত হইয়া কেবল প্রবৃত্তির সেবা করিলাম, আপনার প্রকৃত কল্যাণ চিন্তা করিলাম না, এই মর্মভেদী অনুশােচনার যন্ত্রণাতে বিদ্ধ হইয়া অতি দীন হীন কাতরভাবে বিলাপ করিতেছেন, আর গৌরের অনুসন্ধানে দ্বারে দ্বারে ফিরিতেছেন। ইতিপূর্বে চৈতন্যচন্দ্র প্রয়াগ হইতে নৌকা- রােহণে কাশীধামে আসিয়া চন্দ্রশেখর নামক একজন বৈদ্য- জাতীয় শিষ্যের গৃহে বাস করিতেছিলেন। সনাতন লােক- মুখে এই সংবাদ অবগত হইয়া তথায় উপস্থিত হইলেন। “আমি নীচ অতি অধম, ভিতরে যাইতে আমার অধিকার নাই,” এই মনে করিয়া সনাতন ভিতরে প্রবেশ করিলেন , বহিদ্বারে বসিয়া রহিলেন। শিষ্যবৎসল প্রেমার্জচিত্ত নিমাইচন্দ্র সনাতনের আগমন সংবাদ জানিতে পারিয়া চন্দ্রশেখরকে বলিলেন, দ্বারে একজন বৈষ্ণব আসিয়াছে t ভক্ত-চরিতামৃত। লইয়া আইস। চন্দ্রশেখর সনাতনকে দেখিয়া গিয়া বলি- লেন, দ্বারে বৈষ্ণব কোথায়? একজন দরবেশ রহিয়াছে। চৈতন্য বলিলেন, তাহাকেই লইয়া আইস। সনাতন চন্দ্র- শেখরের সঙ্গে আনন্দ মনে প্রাঙ্গণে প্রবেশ করিলেন। সনাতনকে দেখিয়া চৈতন্য প্রেমােন্মত্তচিত্তে দৌড়িয়া আসিয়া আলিঙ্গন করিলেন। সনাতন অশ্রুসিক্ত গদগদ-বচনে দন্তে তৃণ ধারণ করিয়া চৈতন্যের সম্মুখে আত্মবেদনা জ্ঞাপন করিতে লাগিলেন। “দুই গুচ্ছ দুই করে, এক গুচ্ছা দত্তে ধরে, পড়িল গৌরাঙ্গ রাজা পায়। দুনয়নে শতধারা, যেন রাজদণ্ডী পারা, অপরাধী আপনা মানায়। তােমার চরণ নাহি, ভজি মাের গতি এহি, সংসার ভ্রমণে সদা ফিরি। কদৰ্য্য বিষয় ভােগ, কামাদি ষড়বর্গ রােগ, তাহে ভ্ৰমি সুখ বুদ্ধি করি। নীচ সঙ্গে সদা স্থিতি, নীচ ব্যবহারে মতি, নীচ কর্মে সদাই উল্লাস। এ হেন দুল্ল ভ জন্ম, পাইয়া কি কৈ কৰ্ম্ম, কেবল হইল উপহাস। শরণ লইঃ প্রভু, হে নাথ গৌরাঙ্গ বিভু, করুণা কটাক্ষ মােরে কর। ও রাঙ্গীচরণে মতি, ত্রৈলােক্যের সরগতি, এ অধম জনারে বিচার ॥

পঞ্চম অধ্যায়।
৪৭
সনাতনের আর্তনাদ,
শুনিয়া দৈন্য বিষাদ,
ছল ছল প্রভুর নয়ন।
আলিঙ্গন করিতে চায়,
সনাতন পাছে ধায়,
কহে মােরে না কর স্পর্শন।
তােম স্পর্শ যােগ্য প্রভু, মুঞি ছার নহে কভু,
ঘৃণাস্পদ মাের এই দেহ।
পাপময় সুকদৰ্য্য,
সাধুর সভায় ত্যজ্য,
মােরে স্পর্শ প্রভু না করহ।”
ভক্তমাল গ্রন্থ—দ্বিতীয় মালা।
গৌরচন্দ্র প্রেমে বিগলিত হইয়া সনাতনের গলা ধরিয়া
পুনঃ পুনঃ গাঢ় আলিঙ্গন করিতে লাগিলেন। প্রভুস্পর্শে
সনাতনের ভাবসিন্ধু উথলিয়া উঠিল। চৈতন্য সনাতনকে
নানাপ্রকার প্রবােধ বচনে আশ্বস্ত করিতে লাগিলেন। দুইটি
প্রচণ্ড বেগবতী শ্রোতস্বতী একত্র মিলিত হইলে যেমন
টাভিঘাতি-তরঙ্গ-লহরী উখিত হয়, ভক্তচূড়ামণি চৈতন্য
ও সনাতনের মিলনও তদ্রুপ। উভয়কে সন্দর্শন করিয়া
উভয়ের প্রাণ প্রেমরসে অভিষিঞ্চিত হইয়াছে। তাহাদের
হৃদয়-সিন্ধুতে ভাবের শত সহস্র তরঙ্গ আন্দোলিত হইতেছে,
এবং তাহা উদ্বেলিত হইয়া প্রেমা রূপে গণ্ডস্থল প্লাবিত
করিয়া অজস্র নিঃসৃত হইতেছে। চন্দ্রশেখর তাহাদের
ভক্তিরসরঞ্জিত প্রেম-বিস্ফারিত মুখশ্রী দর্শন করিয়া চমৎকৃত
হইলেন। গৌরসুন্দর সনাতনের হস্ত ধারণ করিয়া তাহাকে
পিড়ার উপরে উপবেশন করাইলেন, এবং প্রেমভরে অঙ্গে
হন্ত বুলাইতে লাগিলেন। সনাতন বলিলেন, প্রভু, আমাকে

৪৮
ভক্ত-চরিতামৃত।
কেন স্পর্শ করিতেছেন? আমি অতি অধম নারকী। সনা-
তনের দৈন্ত বিলাপ অনুশােচনা অবলােকন করিয়া চৈতন্য
বলিলেন, তুমি দৈন্য সম্বরণ কর, তােমার কষ্ট দেখিয়া আমার
বুক ফাটিয়া যাইতেছে। হে সনাতৃন! পতিতপাবন শ্রীহরির
দয়া অপরিসীম। তিনি তােমাকে মহারৌরব হইতে উদ্ধার
করিলেন। তুমি এত দিন বিষয়কুপে নিমগ্ন ছিলে, কৃপাময়
শ্রীহরি তােমাকে বিষয়বন্ধন হইতে মুক্ত করিলেন। তুমি
যথার্থ ভক্তোত্তম সাধু, ভক্তিবলে তুমি ব্ৰহ্মাণ্ড পবিত্র করিতে
পার। আমি আপনাকে পবিত্র করিবার জন্য তােমাকে স্পর্শ
করিতেছি। তুমি পরম ভাগবৎ এবং পরমতীর্থ। ভাগবতে,
যুধিষ্ঠির ধর্মাত্মা বিদুরকে বলিয়াছেন ,
“ভবদ্বিধা ভাগবতা তীর্থীভূতাঃ স্বয়ং প্রভাে।
তীৰ্থীকুৰ্ব্বস্তি তীৰ্থানি স্বাস্থেন গদাতা ॥*
ভবাদৃশ ভগবদ্ভক্তগণ স্বয়ং তীর্থস্বরূপ। যাহাদিগের হৃদয়ে
গদাধর হরি নিরন্তর বিরাজমান, মলিনজনসম্পর্কে তীর্থ
অপবিত্র হইলে তাহার পবিত্রতাবৃদ্ধির জন্যই তাহারা তীর্থ
দর্শনে গমন করিয়া থাকেন, নতুবা তীর্থভ্রমণে তাহাদের
কোন স্বার্থ নাই।
সনাতন বলিলেন, আমি শ্রীহরিকে জানি না, আপনার
অনুগ্রহই আমার উদ্ধারের হেতু।
“প্রভু কহে সনাতন,
তােমার দৈন্যে ফাটে মাের বুক।
কৃষ্ণ যে দয়াল হয়,
ভাল মন্দ না গণয়,
হইল যে তােমায় উন্মুখ । ।
শ্রীমদ্ভাগবত ১ম স্কন্ধ ১৩শ অধ্যায়, অষ্টম শ্লোক।
দৈন্ত কর সম্বরণ,

পঞ্চম অধ্যায়।
কৃষ্ণকৃপা তােমাপরি, যতেক কহিতে নারি,
উদ্ধারিলা বিষয়কুপ হইতে।
নিস্পাপ তােমার দেহ,
কৃষ্ণভক্তি মতি অহ,
তােমা স্পর্শি পবিত্র হইতে।”
ভক্তমাল গ্রন্থ—দ্বিতীয় মালা।
“তাহারে অঙ্গনে দেখি প্রভু ধাঞা আইলা।
তারে আলিঙ্গন করি প্ৰেমাবিষ্ট হইলা ।
প্রভুম্পর্শে প্রেমাবিষ্ট হইল সনাতন।
মােরে না চুইও কহে গদগদ বচন।
দুইজনে গলাগলি রােদন অপার।
দেখি চন্দ্রশেখরের হৈল চমৎকার।
তবে প্রভু তার হাতে ধরি লঞ গেলা।
পিণ্ডার উপরে আপন পাশে বসাইলা।
হস্তে করেন তার অঙ্গ সম্মার্জন।
তি’হে কহে মােরে প্রভু না কর স্পর্শন।
প্রভু কহে তােমা স্পর্শি আত্ম পবিত্রিতে।
ভক্তি বলে পার তুমি ব্ৰহ্মাণ্ড শােধিতে।
তােমা দেখি তােমা স্পর্শি গাই তােমার গুণ।
সৰ্বেন্দ্রিয় ফল এই শাস্ত্র পণ।
এত কহি কহে প্রভু শুন সনাতন।
কৃষ্ণ বড় দয়াময় পতিত পাবন।
মহারৌরব হৈতে তােমার করিল উদ্ধার।
কৃপার সমুদ্র কৃষ্ণ গভীর অপার ।

ভক্ত-চরিতামৃত।
সনাতন কহে কৃষ্ণ আমি নাহি জানি।
আমার উদ্ধার হেতু তোমা কৃপা মানি।”
চৈঃ চঃ মধ্য খণ্ড, ২০ শ পরিচ্ছেদ।
কিরূপে বিষয়বন্ধন উন্মােচিত হইল, চৈতন্য জিজ্ঞাসা
করিলে সনাতন আদ্যোপান্ত বলিলেন। চৈতন্যের আদেশে
তপন মিশ্র ও চন্দ্রশেখরের সঙ্গে সনাতনের মিলন হইল
মিশ্র তাহাকে নিমন্ত্রণ করিয়া গৃহে লইয়া গেলেন। চৈতন্য
বলিলেন, ইহার ফকিরের বেশ দূর করিয়া ক্ষৌর করাও।
অতঃপর ভদ্রবেশ ধারণ করিয়া
সনাতন গঙ্গাস্নান করিলে
চন্দ্রশেখর তাহাকে নূতন একখানি বস্ত্র দিলেন। নূতন বস্ত্র
দেখিয়া বৈরাগী সনাতন তাহা গ্রহণ করিলেন না। দীনভাবে
বলিলেন, যদি বস্ত্র দিতে অভিলাষ হয়, একখানি পুরাতন বস্ত্র
দিন। তপন মিশ্র নিজের পরিধেয় একখানি পুরাতন কাপড়
দিলেন, সনাতন তাহা দুই খণ্ড করিয়া বহির্বাস ও কৌপীন
পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে, রূপ সনাতন মুসলমান রাজার দাসত্ব করাতে কিয়ৎ
পরিমাণে মুসলমান ভাবাপন্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন। দাড়ি গোঁপ রাখা তখন
এদেশে হিন্দুদের মধ্যে সাধারণত প্রচলিত ছিল না। এই জন্য চন্দ্রশেখর
বহিদ্বারে প্রথমে সনাতনকে দেখিয়া হিন্দু-সন্ন্যাসী বলিয়া চিনিতে পারেন নাই;
দরবেশ ফকির মনে করিয়াছিলেন। সনাতনের এই ফকিরের বেশ, পরবর্তী
কালে আউল, সাঁই, নাড়া, দরবেশ, চরণপালী, দুলালদী ইত্যাদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
সাম্প্রদায়িকগণের দাড়ি গোপ' রাখার প্রমাণস্বরূপ হইয়া উঠিয়াছে। উহারা
আপনাদিগকে চৈতন্যসম্প্রদায়ভুক্ত বৈষ্ণব বলিয়া পরিচয় দেয়, অথচ মুসলমান
ফকিরের বেশ ধারণ করে ও কেহ কেহ অনেকাংশে মুসলমানের স্থায় আচরণ
করিয়া থাকে। ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে, "সনান দরবেশ ছিলেন
অলিয়া প্রমাণ উল্লেখ করিতেও দেখা যায়।

পঞ্চম অধ্যায়। করিয়া পরিলেন। এইরূপে বারাণসীতীর্থে ভক্তগণের সঙ্গে সনাতন পরিচয় লাভ করিয়া আনন্দিত হইলেন। সেখানে দাক্ষিণাত্যবাসী এক দ্বিজ বাস করিতেন। তিনি বলিলেন, সনাতন, তুমি যত দিন কাশীতে থাকিবে, আমার বালতে তােমার নিমন্ত্রণ থাকিল। সনাতন বলিলেন, আমি মাধুকরী করিব, ব্রাহ্মণের গৃহে স্কুলভিক্ষা গ্রহণ করিব না। রাজমন্ত্রী এখন দ্বারে দ্বারে মুষ্টিভিক্ষা করিয়া উদর পােষণ করিতে লাগিলেন। সনাতনের ঈদৃশ বৈরাগ্য দেখিয়া চৈতন্য অপার আনন্দ লাভ করিলেন। কিন্তু সনাতনের গাত্রে ভােট-কম্বল রহিয়াছে, বহু মূল্য ভােট-কম্বল বৈরা- গ্যের পক্ষে অবৈধ ; এজন্য চৈতন্য বারম্বার কম্বলের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে লাগিলেন। সনাতন শ্রীচৈতন্যের মনের ভাব অবগত হইয়া ভােট-কম্বল ত্যাগেরু পন্থা অন্বেষণে প্রবৃত্ত হইলেন। দেখিলেন, একজন বঙ্গদেশীয় বৈষ্ণব গঙ্গাতীরে একখানি কথা শুকাইতে দিয়াছে। সনাতন উক্ত বৈষ্ণবকে কম্বল দিয়া তাহার কঁাথাখানি চাহিয়া লইলেন। সনাতনের গাৱে কন্থা দেখিয়া চৈতন্য জিজ্ঞাসা করিলেন, তােমার ভােট- কম্বল কোথায় গেল? সনাতন সকল কথা নিবেদন করিলেন। চৈতন্য বলিলেন, সৎবৈদ্যে কখন রােগের শেষ রাখেন না। যে শ্রীহরি অপার কৃপাগুণে তােমার বিষয়রােগ দূর করিলেন, * মধুকর যেমন প্রতি পুষ্প হইতে বিন্দু বিন্দু মধু সঞ্চয় করে, তদ্রুপ দ্বারে দ্বারে ভ্রমণ করিয়া মুষ্টিভিক্ষা গ্রহণ করার নাম মাধুকরী অর্থাৎ মধুকর-বৃত্তি। বৃন্দাবনে অদ্যাপি শত শত বৈষ্ণব বৈষ্ণবী মাধুকরী অবলম্বন করিয়া প্রাণ ধারণ করিতেছেন।

ভক্ত-চরিতামৃত।
তিনি আর রােগের শেষ কেন রাখিবেন ? তুমি তিন মুদ্রার
ভােটকম্বল গায়ে দিয়া মাধুকরী করিবে, ইহা বৈরাগীর
পক্ষে অধৰ্ম্ম এবং উপহাসজনক। হে সনাতন! দেহ গেহ
পুত্ৰ দাৱা বিষয়ভােগ প্রভৃতি সকল আশা পরিত্যাগ না
করিলে হরিধন লাভ হয় না।
“গনতনের হাতে ধরি, বইলা গেরহরি,
আগমন শুভবার্তা পুছে।
ভােটকম্বল গায়,
প্রভুরে নাহিক ভায়,
বিষয়ের শেষ কিছু আছে।
অন্তরে প্রভু ভাবয়,
ভােটখান আগে চায়,
সনাতন তৎক্ষণে বুঝিলা।
ক্ষণেক বিলম্বে উঠে, গিয়া জাহুবীর তটে,
মনে কিছু যুকতি করিলা।
ভােটকম্বল খান,
এক যে বৈষ্ণব জানি,
তারে দিয়া তার কন্থখানি ।
পরিবর্ত করি নিল,
তেঁহ তাহে তুষ্ট হৈল,
গােসাঞি লইল শ্লাঘ্য মানি।
সেই কান্থা গলে দিয়া, প্রভুর নিকটে গিয়া,
দণ্ডবৎ করিয়া পড়িল।
প্রভু বলে তাহা দেখি,
ছল ছল করে আঁখি,
আলিঙ্গন উঠিয়া করিল।
প্রভু কহে সনাতন,
কৃষ্ণ যে বৃতন ধন,
অনেক যে দুঃখেতে মিয়।

যষ্ঠ অধ্যায়। দেহ গেহ পুত্র দার, বিষয় বাসনা আর, সৰ্ব আশা যদি তেয়াগয় ॥” ভক্তমাল গ্রন্থ—দ্বিতীয় মালা। ষষ্ঠ অধ্যায় কাশীধামে “সনাতন-শিক্ষা”। তত্ত্ববিচার বা শ্ৰীকৃষ্ণতত্ত্ব। সনাতনের কঠোর বৈরাগ্য ও ভক্তিপিপাসা এবং ব্যাকুলতা দর্শন করিয়া চৈতন্যের মন প্রসন্ন হইল। সনাতন ব্যাকুল- হৃদয়ে বিনীত হইয়া চৈতন্য-চরণে নিবেদন করিলেন, প্রভু, আমি নীচ জাতি, নীচ সঙ্গী, অধম ও পতিত। বিষয়-মদে উন্মত্ত হইয়া বৃথা কালক্ষেপণ করিয়াছি, আপনার যথার্থ হিতাহিত কিছুই জানি না। যদি কৃপা করিয়া বিষয়কূপ হইতে আমাকে উদ্ধার করিয়াছেন, এখন আমার কর্তব্য কি, তাহা উপদেশ করুন। আমি কে? আধ্যাত্মিক, আধি- দৈবিক ও আধিভৌতিক এই তাপত্রয় কেন আমাকে জীর্ণ করিতেছে ? কি করিলে আমার মঙ্গল হয় ? পাধ্যবস্তু এবং সাধনতত্ত্বই বা কি? এই সকল গৃঢ়তত্ব আমাকে উপদেশ করুন। “তবে সনাতন প্রভুর চরণে ধরিয়া। দৈন্ত বিনতি করে দন্তে তৃণ লা৷ D

ভক্ত-চরিতামৃত।
।
নীচ জাতি নীচ সঙ্গী পতিত অধম।
কুবিষয় কূপে পড়ি গোয়াইনু জনম।
আপনার হিতাহিত কিছুই না জানি।
গ্রাম্য ব্যবহারে পণ্ডিত তাই সত্য মানি।
কৃপাকরি যদি মােরে করিয়াছ উদ্ধার।
আপন কৃপাতে কহ কৰ্তব্য আমার ।
কে আমি কেন আমায় জারে তাপত্রয়।
ইহা নাহি জানি কেমনে হিত হয়।
সাধ্য সাধনতত্ব পুছিতে না জানি।
কৃপাকরি সবতত্ত্ব কহত আপনি।”
চৈতন্য চরিতামৃত, মধ্য খণ্ড ২শ পরিচ্ছেদ।
চৈতন্য বলিলেন, সনাতন, ভগবৎকৃপা তােমাতে পরি-
পূর্ণ; তুমি সকল তত্ত্বই অবগত আছ। তুমি ভগবানের শক্তি-
ধর, তােমাকে কি আর ব্রিতাপে তাপিত করিতে পারে ?
সমুদায় জানিয়াও দৃঢ় বিশ্বাসের জন্য প্রশ্ন করা সাধুর স্বভাব,
তাই জিজ্ঞাসা করিতেছ। জগতে ভক্তি প্রবর্তন করিবার
পক্ষে তুমিই যােগ্যপাত্র, তথাপি ক্রমে ক্রমে সকল তত্ত্ব
বলিতেছি।
ইহার পর শ্রীচৈতন্য দুই মাস পর্যন্ত প্রতিদিন সনা-
হনকে সাধ্য সাধনতত্ত্বের গভীর সিদ্ধান্ত সকল উপদেশ দিতে
লাগিলেন। * আমরা অতি সংক্ষিপ্তভাবে তাহার উল্লেখ
{
ক
ইতিপূর্বে চৈতন্য রায় রামানদের মুখে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকাতত্ত্ব বিষয়ে
যাহা শ্রবণ করিয়াছিলেন, সার্বভৌম ভট্টাচাৰ্য্যকে দ্বৈতাঙ্কেততত্ব বিষয়ে যাই।
বলিয়াছিলেন, এবং প্রয়াগে রূপকে ভক্তিৰ বিষয়ে যাহা উপদেশ দিয়া-

'যষ্ঠ অধ্যায়। করিতেছি। এই তত্বালোচনাতে প্রধানতঃ চারিটী বিষয় আলােচিত হইয়াছে। যথা,প্রথমতঃ তত্ববিচার বা শ্রীকৃষ্ণ তত্ত্ব; দ্বিতীয়তঃ, জীবতত্ব অর্থাৎ জীবের যথার্থ স্বরূপ কি? তৃতীয়তঃ, জীবের কৰ্তব্য কি ? চতুর্থতঃ, জীবের চরম উদ্দেশ্য কি? বৈষ্ণবশাস্ত্রকারের এই চারিটী বিষয় সাধ্য, সম্বন্ধ, অভিধেয় ও প্রয়ােজন নামে অভিহিত করিয়াছেন। শ্রীচৈতন্য প্রথমে তত্ববিচার ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন। চৈতন্য বলিলেন, হে সনাতন! তত্ত্ববিদেরা এক অখণ্ড অদ্বিতীয় অবিনাশী জ্ঞানবস্তুকেই তত্ত্ব বলিয়া থাকেন। জ্ঞানীরা ইহাকে নিৰ্বিশেষ ব্ৰহ্মরূপে, হিরণ্যগর্ভেপাসক যােগীগণ অন্তর্যামী পরমাত্মারূপে এবং ভক্তেরা লীলাবিহারী ভগবানরূপে কীৰ্ত্তন করেন। * এই সচ্চিদানন্দময় শ্রীহরির ঐশ্বৰ্য্যও অনন্ত। চিচ্ছক্তি, মায়াশক্তি ও জীবশক্তিতে তাহার অনন্ত শক্তি। । তিনি সাশ্রয়, সর্বেশ্বর, সর্বৈ- ছিলেন, সেই সমস্ত তত্ত্ববিচার সনাতনকে শিক্ষা দেন। ইহা বৈষ্ণবসমাজে “সনাতন-শিক্ষা” নামে প্রসিদ্ধ। রূপ, সনাতন ও জীবগােস্বামী ভক্তিরসা- মৃতসিন্ধু, উজ্জ্বল নীলমণি, সন্দৰ্ত প্রভৃতি গ্রন্থে এই সকল তত্ত্ব বিস্তৃত ভাবে আলােচনা করিয়াছেন। * “বদন্তি তত্তবিদস্তত্বং যজ জ্ঞানমন্বয়ং। ব্রহ্মেতি পরমাত্মতি ভগবানিতি শব্দ্যতে ॥” মদ্ভাগবত, ১ম স্কন্ধ । + সমগ্র ঐশীশক্তিকেই এখানে চিচ্ছক্তি বলা হইয়াছে। ইহা অন্তরঙ্গ বা ঈশ্বরের স্বরূপশক্তি, অর্থাৎ এই শক্তি ঈশ্বরে নিত্য বিরাজমান। ইহার অভাবে ঈশ্বরসত্তা অসম্ভব। সৃষ্টিশক্তির নাম মায়াশক্তি, ইহা ঈশ্বর হইতে একটিত হইয়া জগৎসৃষ্টিকায্যে নিযুক্ত। কিন্তু এই সরকাত্তমাে- গুণময়ী মায়িকশক্তি ভগবৎসত্তাকে স্পর্শ করিতে পারে না, এইজন্য ইহার ভক্ত-চরিতামৃত। শ্বৰ্যপূর্ণ, আত্মার আত্মা পরমাত্মা চিদানন্দরূপী ভগবান। ইহাকেই ব্রজেন্দ্রনন্দন শ্রীকৃষ্ণ বলা যায়। ভক্তের হৃদয়ে তাহার অসীম সৌন্দৰ্য্য ও অনন্ত বৈচিত্র প্রকাশিত হয়। শ্রীকৃষ্ণের অনন্ত শক্তির মধ্যে তিনটী শক্তি প্রধান ; ইচ্ছা- শক্তি, ক্রিয়াশক্তি ও জ্ঞানশক্তি। ইচ্ছা ও জ্ঞান ব্যতীত সৃষ্টিক্রিয়া অসম্ভব। এই ত্রিবিধ শক্তির মিলনেই বিশ্ব- প্রপঞ্চ রচিত হইয়াছে। জড়রূপা প্রকৃতি বিশ্বসৃষ্টির কারণ নয়। অন্ধ জড়শক্তি হইতে অনন্তবৈচিত্র্যের আধার, অনন্ত- শােভাসৌন্দৰ্যময় জ্ঞানকৌশলপরিপূর্ণ বিশ্ব রচিত হওয়া অসম্ভব। ঐশীশক্তিই বিশ্বসৃষ্টির আদিকারণ। লৌহ যেমন অগ্নি সংযােগে দাহিকা শক্তি প্রাপ্ত হয়, তদ্রুপ ঐশী- শক্তিদ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া প্রকৃতি জগৎত্রচনাতে নিযুক্ত রহিয়াছে। ঈশ্বরের সৃষ্টিবিষয়িণী ইচ্ছাই জগতের নিমিত্ত ও উপাদান উভয়বিধ কারণ। * ভগবৎশক্তি প্রপঞ্চরূপে অবতীর্ণ হইলে তাহা অবতার নামে সংজ্ঞিত হয়। উপক্ষয়- শূন্য জলধি হইতে যেমন সহস্র সহস্র ক্ষুদ্র জলপ্রবাহ নিঃসৃত হইয়া থাকে, সেইরূপ সত্বনিধি পরমেশ্বর হইতে অসংখ্য নাম বহিরঙ্গা। আর অসংখ্য প্রাণীপুঞ্জের মধ্যে ঈশ্বরের যে চৈতন্য বা চিচ্ছক্তি উপহিত হইয়া থাকে তাহাই জীবশক্তি বা ক্ষেত্রজ্ঞাশক্তি। ঈশ্বরের ইচ্ছা- নুসারে ইহা কখন হাতে বর্তমান থাকে কখন থাকে না; ইহাকে তটস্থা বলে। ( প্রযুক্ত কেদারনাথ ভক্তিবিনােদ বলেন, “জীবতত্বই কৃষ্ণের জীবশক্তি নামক এক শক্তি।” তৎসম্পাদিত ‘চৈতন্যচরিতামৃত” — আদি লীলা।) * ন্যশাস্ত্রে কুন্তকারের দণ্ড চক্ৰাদিকে ঘটের নিমিত্তকারণ ও মৃত্তিকাকে উপাদানকারণ বলে। এজন্য যষ্ঠ অধ্যায়। অবতার প্রাদুভূত হইয়াছে। অদ্বয়জ্ঞানতত্ব শ্রীহরির কেহ অংশাবতার, কেহ গুণাবতার, কেহ ভাবতার, কেহ শব- তার।। হে সনাতন! এখন যুগাবতারের বিষয় বলিতেছি শ্রবণ কর। সত্য ত্রেতা দ্বাপর ও কলি, এই যুগচতুষ্টয়ে ভগবান শুক্ল, রক্ত, কৃষ্ণ ও পীত, কুমন্বয়ে এই চারি বর্ণ ধারণ করিয়া অবতীর্ণ হইয়া থাকেন। যুগধর্ম স্থাপনের “অবতাহসংখ্যেয়া হরেঃ সত্ত্বনিধেৰিা। যথাবিদাসিনঃ কুল্যা সরসঃ সহঃ ॥” ভাগবত ১ম কন্ধ। + বৈষ্ণবশাস্ত্র "চৈতন্যচরিতামৃত” প্রভৃতি গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণের গুণাবতার, অংশাবতার, শতাবশাবতার, যুগাবতার, লীলাবতার প্রভৃতি অবতার এবং স্বয়ংরূপ, তকোত্মরূপ, আবেশরূপ, প্রাভব ও বৈভববিলাস ইত্যাদি অবতার- তত্বসম্বন্ধীয় সাংখ্য ও বৈদান্তিক-বিচারের জটিল বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে। সাধারণ পাঠকের বিরক্তিকর হইবে বিবেচনায় তাহার স্থূলভাব মাত্র এখানে গৃহীত হইল। 1 কলিযুগে ভগবান পীতবর্ণ ধারণ করিয়া অবতীর্ণ হইবেন, ইহা প্রমাণের জন্য কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্যচরিতামৃত' গ্রন্থে ভাগবতের এই শ্লোক উদ্ধৃত করিয়াছেন, আসন বর্ণাস্ত্ৰয়ােহ গৃহুতােহনুযুগং তনু। শুক্রোরক্তস্তথা পীত ইদানীং কৃষ্ণং গতঃ।” ভাঃ ১ম খ্যা। শ্রীধর স্বামীর টীকা সম্মত এই শ্লোকের প্রকৃত অর্থ এই যে, গর্গাচাৰ্য্য কৃষ্ণের নামকরণোপলক্ষে ব্ৰজে আসিয়া নন্দকে বেিতছেন, হে নন্দ। তােমার এই পুত্র প্রতিযুগে শরীর ধারণ করাতে অন্যান্য যুগে ইহার শুরু রক্ত ও পীত এই তিন বর্ণ হইয়াছিল। সম্প্রতি (দ্বাপরযুগে) ইনি কৃষ্ণ বর্ণ হইয়াছেন, এজনা ইহার নাম কৃষ্ণ হইবে। কিন্তু বৈষ্ণবাচার্যগণ অতীত কালের = ভক্ত-চরিতামৃত। জন্য সত্যযুগে ধ্যান-ধারণা, ত্রেতাযুগে যাগযজ্ঞ, দ্বাপরে পূজার্চনা, এবং কলিযুগে কেবল নামসংকীৰ্ত্তন প্রচার করাই যুগাবতারের কাৰ্য। অন্যান্য যুগে ধ্যান-ধারণাদিতে যে ফল লাভ হয়, কলিযুগে একমাত্র কৃষ্ণনাম শ্রবণ কীৰ্ত্তনে সেই ফল প্রাপ্ত হওয়া যায়। * কলিযুগের মাহাত্ম্য শ্রবণ করিয়া সনাতন বলিলেন, কলিতে পীতবর্ণ শ্রীকৃষ্ণের অব- তার কে, অনুগ্রহপূর্বক বলুন। গৌর উত্তর করিলেন, অন্যান্য যুগের অবতার যেমন শাস্ত্র প্রমাণে অবগত হওয়া যায়, কলিযুগের অবতারও সেইরূপ শাস্ত্র দ্বারা জানিতে পারা যায়। অবতার নিজমুখে কখন আত্মপরিচয় দেন না। ‘আসন ক্রিয়ার ভবিষ্যৎকালে প্রয়ােগ অবধারণ পূর্বক এইরূপ ব্যাখ্যা করিয়াছেন ;-শ্রীকৃষ্ণ সম্প্রতি দ্বাপরযুগে কৃষ্ণবর্ণ হইয়াছেন, ইনি সত্যযুগে শুক্লবর্ণ, ত্রেতাযুগে রক্তবর্ণ, ও কলিযুগে পীতবর্ণ ধারণ করিবেন। এই ব্যাখ্যাতে শ্লোকের ‘পীতবর্ণ’ শব্দ লক্ষ্য করিয়া গৌরাঙ্গাবতারের আভাস প্রদান করা হইয়াছে। কবিরাজ গোস্বামী এই প্রকারে ভাগবত ও মহাভারতের আরও কতিপয় শ্লোক কৌশল সহকারে উদ্ধত করিয়া ও অর্থবিপর্যয় ঘটাইয়া কলি- যুগে কৃষ্ণাবতার প্রতিপাদনের চেষ্টা করিয়াছেন। ফলতঃ শ্রীগৌরাঙ্গ শ্রীধর স্বামীর ব্যাখ্যার বিপরীতে কলিযুগে পীতবর্ণ অবতারের বিষয় নােতনকে বলিয়াছিলেন কি না নিঃসংশয়রূপে বলা যায় না। চৈতন্যচরিতামৃত অনুসরণ করিয়া আমরা এই বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করিলাম। * ভাগব-দ্বাদশ স্কন্ধ। বিষ্ণুপুরাণেও লিখিত আছে, “ধ্যায় কৃতে যজন যজ্ঞৈতােয়াং দ্বাপরেই…। যদাগ্নোতি তদাপধ্যাতি কলৗ সংকীৰ্ত্ত কেশবং ॥” বিষ্ণুপুরাণ, ৬ষ্ঠ অংশ। সত্যযুগে ধ্যানের দ্বারা, ত্রেতাতে যজ্ঞাদি কর্মের দ্বারা, এবং দ্বাপরে পুজা অর্চনা করিয়া লােক সকল যে ফলপ্রাপ্ত হয়, কলিযুগে কেবল কেশব- কীৰ্ত্তনের দ্বারা তাহা লাভ হইয়া থাকে।

ষষ্ঠ অধ্যায়। শাস্ত্রকার মুনিগণ অবতারের লক্ষণ নির্দেশ করিয়াছেন, আমাদের ন্যায় ক্ষুদ্র জীবের শাস্ত্ৰবাক্যে এই সকল জ্ঞান জন্মিয়া থাকে। লক্ষণ দুই প্রকার, স্বরূপলক্ষণ ও তটস্থ- লক্ষণ। আকৃতি প্রকৃতি স্বরূপ লক্ষণ, কাৰ্য্য দ্বারা যে জ্ঞান, তাহার নাম তটস্থ লক্ষণ। সনাতন বলিলেন, আপনি বলিতে- ছে, কলিযুগের অবতার পীতবর্ণ এবং নামসংকীৰ্ত্তন ও প্রেমভক্তি প্রচার তাহার কাৰ্য্য; এরূপ লক্ষণাক্রান্ত ব্যক্তি কে? স্পষ্ট করিয়া বলুন, আমার সংশয় নিরাকৃত হউক। সনা- তনের ইচ্ছা গৌরাঙ্গ নিজমুখে আপনার অবতারত্ব ঘােষণা করেন, এই জন্য এই প্রকার কৌশলময় প্রশ্ন করি- লেন। চৈতন্য প্রভু সনাতনের উদ্দেশ্য বুঝিতে পারিয়া ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলেন, সনাতন, চাতুরী পরিত্যাগ কর, শক্ত্যাবেশাবতারের বিষয় বলিতেছি শ্রবণ কর। যাহাতে ভগবৎশক্তির প্রকাশ, তাহাই শক্ত্যাবেশাবতার, ইহা মুখ্য ও গৌণভেদে দ্বিবিধ। যাহাতে ভগবানের জ্ঞান শক্ত্যাদির সাক্ষাৎ প্রকাশ, তাহা মুখ্য। যেমন সনক সনাতনাদিতে জ্ঞানশক্তি, নারদে ভক্তি, ব্রহ্মাতে সৃষ্টিশক্তি, অনন্তে ভূধারণ- শক্তি, পৃথুতে পালনীশক্তি, পরশুরামে দুষ্টের দমনশক্তি প্রকাশিত; এই জন্য ইহরা মুখ্য-শ্যাবেশাবতার। যে বস্তুতে ভগবচ্ছক্তির আভাসমাত্র ফুরিত, তাহাকে বিভূতি বলা যায়। গীতাতে শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন, “যদ্যবিভূতিমৎ সত্ত্বং শ্রীমদূৰ্জিমেববা। • তত্তদেবাবগচ্ছ ত্বং মম তেজোহংশসম্ভব।” যাহা কিছু ঐশ্বৰ্যযুক্ত সম্পত্তিযুক্ত ও বলপ্রভাবাদি .

ভক্ত-চরিতামৃত। সম্পন্ন, তৎসমস্তকেই আমার প্রভাবের অংশ দ্বারা সম্ভুত বলিয়া জানিবে। লীলারসময় শ্রীকৃষ্ণের বাল্য পোগণ্ড কৈশোর প্রভৃতি অনন্তলীলা। অনন্ত দেশে অনন্ত কালে তাঁহার নিত্যলীলতরঙ্গ তরঙ্গিত হইতেছে। তিনি চির- নূতন চিরসৌন্দৰ্য্যময়। জ্ঞানেশ্বৰ্যপূর্ণ মথুরা ও দ্বারকাধামে তিনি পূর্ণ ও পূর্ণতররূপে প্রকাশিত; কিন্তু মাধুৰ্য্যময় প্রেম- ধাম গােকুলে তাহার পূর্ণতম প্রকাশ। তাহার ঐশ্বৰ্য্য মাধুর্যের অন্ত নাই, জীব কোন ছার, ব্ৰহ্মা শিব সনকাদি কেহই তার অন্ত পান না। শ্রুতি সকলও ইহার বিষয় বলিয়া শেষ করিতে পারেন নাই। সেই ননন্দন শ্রীকৃষ্ণই স্বয়ং ভগবান; তাহার সমান বা তাহার অপেক্ষা আর কেহই শ্রেষ্ঠ নাই। তিনি সকল কারণের মূল কারণ, তাহার আদি নাই, কিন্তু তিনি সকলেরই আদি ও গােবিন্দ অর্থাৎ বিশ্ব- সংসার সমস্তই জানিতেছেন। আপনার চিচ্ছক্তিতে তিনি সদা বিরাজিত।' হৈ সনাতন, “কৃষ্ণের ঐশ্বর্য অপার অমৃতের সিন্ধু। অবগাহিতে নারি তার ছুইল এক বিন্দু। এই প্রকারে ভগবানের অনন্ত মহিমা ও অনন্ত ঐশ্বৰ্য্য বর্ণনা করিতে করিতে প্রেমবিল গৌরসুন্দরের মন ভগব- দৈৰ্য্য ও মাধুৰ্য্য সাগরে নিমজ্জিত হইয়া গেল। প্রেমরসে ৰসাৰিত হইয়া বলিতে লাগিলেন; “সনাতন কৃষ্ণ মাধুর্য্য অমৃতের সিন্ধু মাের মন সান্নিপাতি সব পিতে করে মহি দুর্দৈব বৈদ্য না দেয় এক বিন্দু।

ষষ্ঠ অধ্যায়। কৃষ্ণাঙ্গ লাবণ্যপূর মধুর হৈতে সুমধুব তাতে যেই মুখ সুধাকর। মধুব হৈতে সুমধুর তাহা হৈতে সুমধুর, তার যেই স্মিত জ্যোৎস্নার ।। মধুর হৈতে সুমধুর তাহা হৈতে সুমধুর তাহা হৈতে অতি সুমধুর। আপনার এক কণে ব্যাপে সব ত্রিভুবনে দশদিক ব্যাপে যার পুর । স্মিতকিরণ সুকপূরে পৈশে অধুর মধুবে সেই মধু মাতায় ত্রিভুবনে। বংশী ছিদ্র আকাশে তার গুণ শব্দে পৈশে ধ্বনিরূপে পাঞা পরিণামে । সে ধ্বনি চৌদিকে ধায় অণ্ডভেদ বৈকুণ্ঠে যায় জগতের বলে পৈশে কাণে। লােকধৰ্ম্ম লজ্জাভয় সব জ্ঞান লুপ্ত হয় ঐছে নাচায় সব নারীগণে। কাননের ভিতর বাসা করে আপনি তাহা সদা রে অন্য শব্দ না দেয় প্রবেশিতে। আন কথা না শুনে কাণ আন বলিতে বলে আন এই কৃষ্ণের বংশীর চরিতে।” চৈতন্যচরিতামৃত মধ্যখণ্ড, ২১ পরিচ্ছেদ। প্রেমে গদগদ হইয়া চৈতন্য বলিলেন, সনাতন! শ্রীহরির ভক্ত-চরিতামৃত। মাধুৰ্য্যস্রোতে আমি ভাসিয়া যাইতেছি, আমার চিত্তভ্রম উপস্থিত, কি বলিতে কি বলিতেছি কিছুই জ্ঞান নাই। তােমার প্রতি ভগবানের কৃপা অবতীর্ণ। নিজের ঐশ্বৰ্য- মাধুরী তিনি আমার মুখে তােমাকে শ্রবণ করাইলেন। “পুনঃ কহে বাহ্যজ্ঞানে আন কহিতে কহিল আনে কৃষ্ণকৃপা তােমার উপরে। মাের চিত্ত ভ্ৰম করি নিজৈশ্বৰ্য্য মাধুরী মাের মুখে শুনায় তােমারে। আমি ত বাউল আন কহিতে আন কহি। কৃষ্ণের মাধুৰ্য্যস্রোতে আমি যাই বহি। তবে প্রভু ক্ষণ এক মৌন করি রহে। মনে ধৈৰ্য্যকরি পুনঃ সনাতনে কহে৷৷ কৃষ্ণের মাধুরী আর মহাপ্রভুর মুখে। ইহা যেই শুনে সেই ভাসে প্রেমসুখে।” চৈতন্যচরিতামৃত মধ্যখণ্ড, ২১ পরিচ্ছেদ। সপ্তম অধ্যায়। সম্বন্ধ-বিচার বা জীবতত্ত্ব। জীবের স্বরূপ কি ?—এবং জীবের সহিত পরমেশ্বরের সম্বন্ধই বা কি, ইহারই নাম সম্বন্ধতত্ত্ব। হে সনাতন শ্রীহরির নিত্যদাসত্বই জীবের যথার্থ স্বরূপ। জীব পরমেশ্বরের সপ্তম অধ্যায়। অনন্তকালের সেবক। সূর্যকিরণের অতি ক্ষুদ্রতম অংশ যেমন অগ্নিজালারূপে প্রকাশ পায়, জীব সেইরূপ ভগবৎ- শক্তির ক্ষুদ্র প্রকাশ মাত্র। পরমেশ্বর অসীম-অনন্ত-জ্ঞানানন্দ- স্বরূপ, মায়া তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে না, তিনি মায়ার অধিপতি।* জীব জ্ঞানশক্তিতে ঈশ্বরের সমধর্মী, কেবল ও * অনন্তশক্তিশালী পরমেশ্বরের সামান্য একাংশমাত্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃজনপালনাদি কাযে নিযুক্ত আছে, ইহাকেই বেদান্তদর্শনাদিতে মায়া বা প্রকৃতি বলিয়া থাকে। “ন কৃৎস ব্ৰহ্মবৃত্তিঃ সা শক্তিঃ কিকে দেশভাক্।” পঞ্চদশী । অর্থাৎ পরমেশ্বরের সৃষ্টিশক্তির নাম মায়া, তাহা তাহার পূর্ণশক্তি নহে, কিন্তু তাহার পূর্ণশক্তির একদেশমাত্র। ইহা অপূর্ণশক্তি, সুতরাং সদসৎভাবাপন্ন। সত্ব রজ তম এই ত্রিগুণাত্মক মায়া পরমেশ্বর হইতে প্রাদুভূত ও তাহার অধীন, আর জীব ইহার বশীভূত বলিয়া তাহার রজ্জতে সর্পম ও দেহে অাত্মবােধ উপস্থিত হয়। এই ভ্রমনের সাধারণ নাম মায়া। জীবের জ্ঞান ও শক্তি সীমাবদ্ধ, অপূর্ণ; এই অপূর্ণতাবশতঃ ভ্রমজ্ঞান জন্মিয়। থাকে, ইহা তাহার সত্তাগত। ঈশ্বর অপূর্ণশক্তিতে সৃষ্টিলীলা করিয়াছেন বলিয়াই জীবপ্রকৃতিতে এই অপূর্ণতা বিদ্যমান। নচেৎ পরম করুণাময় বিধাতা মানবকে ইচ্ছা করিয়া ভ্রমে ফেলাইয়াছেন, এমন বলা যায় না। আর এক প্রকার মায়া বা ভ্রম আছে, তাহা জীবের স্বকৰ্মাৰ্জিত। ইহা মানবের সংসারাসক্তি ও অহঙ্কারজনিত ভ্রান্তবুদ্ধি। মানব যাহাতে এই মায়ামােহ অতিক্রম করিয়া শ্রেয়ের পথে অগ্রসর হইতে পারে, তজ্জন্য ভগবান তাহার হৃদয়ে স্বাধীন ধর্মবুদ্ধি (conscience) নিহিত করিয়াছেন, ও অন্যান্য অশেষবিধ উপায় বিধান করিয়াছেন। কিন্তু তথাপি যখন মানব কুপ্রবৃত্তির বশপন্ন হয়, তখন সে আপনিই আপনার দুঃখ যন্ত্রণার সৃষ্টিকর্তা, তাহাতে আর সন্দেহ কি ? হিন্দুশাস্ত্রকারগণ মায়ার বিবিধ লক্ষণ নির্দেশ করিয়াছেন। বিশেষ জিজ্ঞাগণ “পঞ্চদশী” প্রভৃতি বেদান্ত দর্শন বিষয়ক গ্রন্থ পাঠ করিবেন।

৬৪ ভক্ত-চরিতামৃত। পরিমাণের নানাতিরেক। জীব যৎসামান্য পরিমিত চিচ্ছক্তির আধার বলিয়া অবিদ্যার অধীন। ভগবানের অংশসস্তৃত ও প্রকৃতিগত অভিন্ন হইলেও ভগবানের সেবকত্বই জীবের প্রকৃতি। সে আপনার ক্ষুদ্রত্ব ও সেবকত্ব অনুভব করিতেছে। কিন্তু মায়াভিভূত হইয়া আত্মস্বরূপ বিস্মৃত হয় এবং আপনার প্রভু ও আশ্রয়দাতাকে ভুলিয়া গিয়া নানা প্রকারে সংসার- দুঃখ ভােগ করে। এই বহির্মুখ জীবের অশেষ দুর্গতি। অপরাধী ব্যক্তিকে রাজা যেরূপ নদীজলে ডুবায় ও উঠায় ; মােহমায়া সেইরূপ ভগবদ্বিমুখ আত্মবিস্মৃত মানবকে কখনও বা স্বৰ্গভােগে প্রলুব্ধ করে, কখনও বা ভীষণ নরকে নিমগ্ন করে। কিন্তু দেখ, ভগবান কি দয়াময়, মায়ামুগ্ধ জীব চির- কাল তাহাকে ভুলিয়া না থাকে, এই নিমিত্ত তাহার উদ্ধারের জন্য তিনি বেদপুরাণাদি শাস্ত্র ও গুরূ পদেশ দ্বারা এবং স্বয়ং অন্তর্যামী চৈত্ত্যআচাৰ্য্যরূপে মানবহৃদয়ে অবস্থিতি করিয়া অনুক্ষণ আত্মস্বরূপ প্রকাশ করিতেছেন। শাস্ত্রের উপদেশ, ভগবদ্ভক্ত সাধু ব্যক্তির কৃপা ও পবিত্র সহবাসে জীব ঈশ্বরে- মুখ হয় এবং মােহের অবসানে পরমেশ্বরই “প্রভু পরি- ত্রাতা” এই জ্ঞান হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ মনে কর, কোন ব্যক্তির পিতা অনেক ধন গৃহমধ্যে পুতিয়া রাখিয়া অন্যত্রে জীবন ত্যাগ করিয়াছেন। পুত্র, পিতৃত্যক্ত ধনের বিষয় কিছু না জানিয়া দারিদ্র দুঃখে দিনপাত করিতেছে। এমন সময় কোন সৰ্বজ্ঞ গণক আসিয়া তাহাকে পিতৃধনের বিষয় বলিলে, সে ব্যক্তি ঘর খুড়িয়া ধনের উদ্দেশ করিতে লাগিল। দৈবজ্ঞ বলিল, দক্ষিণ দিকে খনন করিও না, ভীমরুল বােস্তা সপ্তম অধ্যায়। ৬। • ; আছে, দংশন করিবে; পশ্চিমে যক্ষ আছে, সে বিঘ্ন ঘটা- ইবে ; উত্তরে অজগর সর্প আছে, ওদিকে যাইও না; পূর্ব- দিকে অল্প মৃত্তিকা তুলিলেই ধন পাইবে। সেইরূপ সাধু গুরু ও শাস্ত্রের উপদেশ এই যে, জ্ঞান কৰ্ম্ম ও যােগমার্গ পরিত্যাগ করিয়া একমাত্র শুদ্ধভক্তি যােগে ভজনা করিলেই শ্রীহরিকে লাভ করা যায় । ধন হস্তগত হইলে যেমন পার্থিব সুখ সৌভাগ্য লাভ হয় এবং সুখ লাভ হইলেই দুঃখের নিবৃত্তি সেইরূপ বিশুদ্ধ অহৈতুকী ভক্তিতে জীবের মায়াবন্ধন উন্মুক্ত হইয়া পরমেশ্বরে প্রেম উৎপন্ন হয় এবং পরমেশ্বরের প্ৰেমমাধুর্যে চিত্ত সমাকৃষ্ট হইলে সংসার ক্লেশের শান্তি হয়। কিন্তু সংসার-তাপের শান্তিমাত্রই ভগবদ্ভক্তির উদ্দেশ্য নহে, ভগবানকে লাভ করা ও জীবনে তাহাকে সম্ভোগ করাই ভক্তির মুখ্য উদ্দেশ্য। সাংসারিক সুখ দুঃখের চিন্তা ভক্তের প্রাণে স্থান প্রাপ্ত হয় না। ভগবানই ভক্রের লক্ষ্য, তাহাকে লক্ষ্য স্থলে রাখিলে আনুষঙ্গিকরূপে সংসার-যন্ত্রণার শান্তি হইয়া থাকে। জীবতত্ত্ব সম্বন্ধীয় সারকথা এই যে, অদ্বয়জ্ঞানতত্ত্ব পূর্ণ পুরুষ শ্ৰীকৃষ্ণ স্বরূপ-শক্তিতে অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডে বিহার করি- তেছেন, জীব তাহার অংশ। জীব দুই প্রকার, মুক্ত ও বন্ধ। মুক্ত জীব শ্রীহরির সেবানন্দ সম্ভোগ করিয়া চিরসুখী তাহাদের প্রাণ মন হরিপদারবিন্দে নিত্যকাল উন্মুখ হইয়া রহিয়াছে। মুক্ত জীব কৃষ্ণ লীলার সহায় ও তঁাহার পারিষদ। ভগবহির্মুখ সংসার-সৰ্বস্ব বদ্ধজীব ত্রিতাপে সদাই পরিতপ্ত ও নিরন্তর কাম ক্রোধের অত্যাচারে প্রপীড়িত। দৈবযােগে ;

ভক্ত-চরিতামৃত।
যদি কোন সাধু-বৈদ্যের মন্ত্রোপদেশে মায়া-পিশাচী তাহাকে
পরিত্যাগ করে, তাহা হইলে, হরিভক্তি লাভ করিয়া
শ্রীহরিকে প্রাপ্ত হয়।
“সেই বিভিন্নাংশ জীব দুই প্রকার।
এক নিত্য মুক্ত একের নিত্য সংসার।
নিত্য মুক্ত নিত্য কৃষ্ণ চরণে উন্মুখ।
কৃষ্ণ পারিষদ নাম ভুঞ্জে সেবা সুখ।
নিত্য বদ্ধ কৃষ্ণ হৈতে নিত্য বহির্মুখ।
নিত্য সংসার ভুঞ্জে নরকাদি দুঃখ ।
সেই দোবে মায়াপিশাচী দণ্ড করে তারে।
আধ্যাত্মিক তাপত্র তারে জারি মারে ।
কাম ক্রোধের দাস হা তার লাথি খায় ।
ভ্রমিতে ভ্রমিতে যদি সাধু বৈদ্য পায় ।
তার উপদেশে মন্ত্রে পিশাচী পলায়।
কৃষ্ণ ভক্তি পায় তবে কৃষ্ণ নিকট যায়।”
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড, ২২শ পরিচ্ছেদ।
অষ্টম অধ্যায়।
অভিধেয় তত্ত্ব।
ভগবানের কৃপালাভের উপায় স্বরূপ ভক্তিই একমাত্র
অভিধেয় অর্থাৎ সকল শাস্ত্রের প্রতিপাদ্য বিষয়। ভক্তি-
দ্বারাই ভগবানকে ও ভগবৎপ্রেমধন প্রাপ্ত হওয়া যায়।

অষ্টম অধ্যায়। একমাত্র ভক্তিই শ্রীকৃষ্ণভজনের মুখ্য উপায়। কৰ্ম্মযােগ ও জ্ঞানসাধনের ফল অতি তুচ্ছ। শাস্ত্র নির্দিষ্ট বর্ণাশ্রম সম্বন্ধীয় বিবিধ কর্মানুষ্ঠান ও তাবৎ সাধু কর্মকে কৰ্ম্ম সংজ্ঞা দেওয়া যায়। কৰ্ম্ম থাকিলেই তাহার কর্তা থাকিবে। “আমি করিতেছি” এবম্প্রকার অহঙ্কারজনিত কর্তৃত্বাভিমান কৰ্মা- নুষ্ঠানে অনিবাৰ্য ; সুতরাং তাহা কখনও ভগবৎ প্রাপ্তির প্রকৃষ্ট পন্থা নহে। ভক্তি বিনা ভগবানকে লাভ করা যায় । বেদবেদান্তাদি রাশি রাশি শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়া যাহারা আপনাকে জ্ঞানী মনে করে, তাহারা অতি ভ্রান্ত। ভক্তিশূন্য জ্ঞানে মুক্তি নাই। ভাগবতে কথিত হইয়াছে ; “শ্রেয়ঃ সৃতিং ভক্তিমুদস্ত তে বিভো ক্লিান্তি যে কেবলবােধলব্ধয়ে। তেষামসৌ ক্লেশল এব শিষ্যতে নান্য যথা স্থূলতুষাবঘাতিনাং।” ভা, ১০ম স্কন্ধ । হে বিভাে! যে সকল সাধক শ্রেয়ঙ্কর ভক্তি পরিত্যাগ করিয়া কেবল শুষ্ক জ্ঞান লার্থ যমনিয়মাদির ক্লেশ স্বীকার করে, তুষাবতীর ন্যায় * তাহাদের কিছুই লাভ হয় না, কেবল ক্লেশমাত্রই সার হয়। হৃদয় মন ঈশ্বরাভিমুখ হইলে বিনা জ্ঞানেও মুক্তি লাভ হয়। অর্থাৎ প্রাণ মন ঈশ্বরােম্মুখ হইলে আপনা হইতে জ্ঞানের বিকাশ হয়। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারি বর্ণের এবং ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ * তল লাভের আশায় যাহারা ক্ষুদ্র প্রমাণ ধানা পরিত্যাগ করিয়া স্কুল- প্রমাণ তুব আঘাত করে।

ভক্ত-চরিতামৃত। ও ভিক্ষুক এই চতুরাশ্রমের শাস্ত্রনির্দিষ্ট বিধি পালনের নাম বর্ণাশ্রমধর্ম, এই বিধিবিহিত বর্ণাশ্রমাচারীগণ হরিভক্তিবিহীন হইয়া স্বধর্মের অনুষ্ঠান করিলেও শ্রেয়ঃ লাভ করিতে পারে । জ্ঞানাভিমানী ব্যক্তি ভ্রমবশতঃ আপনাকে জীবন্মুক্ত বলিয়া মনে করে, কিন্তু হরিভক্তি ব্যতীত বুদ্ধি কখনও নির্মল হয় না। ভাগবতে ব্যাস বলিয়াছেন, “হে পদ্মলোচন হরি, তােমাতে ভক্তির অভাব থাকিলে বুদ্ধি কখনও বিশুদ্ধ হয় না, এইরূপ অবিশুদ্ধ বুদ্ধিশালী ব্যক্তিরা ভ্ৰমবশতঃ আপনা- দিগকে মুক্ত মনে করিয়া থাকে। তাহারা পরম পদ মমক্ষের সন্নিহিত হইয়াও তােমার পদারবিন্দ অনাদর করায় তথা হইতে অধঃপতিত হইয়া থাকে।” হে সনাতন! পরমেশ্বরের জ্বলন্ত সূর্যের ন্যায় পুণ্য- স্বরূপের নিকট মায়ার অন্ধকার কখন কি তিষ্ঠিতে পারে? যে ব্যক্তি ব্যাকুল প্রাণে “হে হরি আমি তােমার” এই বলিয়া একবার প্রার্থনা করে, সে মায়াবন্ধন হইতে উত্তীর্ণ হয়। কি ভােগাভিলাষী, কি মুক্তিপিপাসু, কি অন্যবিধ কামনা- পরায়ণ যিনিই হউন, সুবুদ্ধিসম্পন্ন হইলেই গাঢ় ভক্তিযােগে শ্রীহরির ভজনা করিয়া থাকেন। বিষয় কামনা করিয়া কেহ যদি ভগবানের আরাধনা করে, প্রার্থনা না করিলেও ঈশ্বর তাহাকেও আপনার আশ্রয়ে গ্রহণ করেন। ভগবান বলেন, আমার ভজনা করিয়া বিষয়সুখ প্রার্থনা করা অমৃত পরিত্যাগ করিয়া বিষ প্রার্থনা করার ন্যায় কেবল মূখতা! আমি এরূপ মূৰ্থকে আমার চরণাশ্রয়ের পরিবর্তে বিষয়বিষে কেন জর্জ- রিত হইতে দিব। বস্তুতঃ বিষয়লােভে ভগবানের আরাধনা

অষ্টম অধ্যায়।
করিয়া তাহাতে নিবিষ্টচিত্ততা বশতঃ কথঞ্চিত প্রেমরসের
আস্বাদ পাইলে সমুদায় কামনা বিসৰ্জন করিয়া ভগবানের
দাস হইয়া তাহাতে আত্মসমর্পণ করিতেই অভিলাষ হয়।
ভক্তরাজ ধ্রুব বলিয়াছিলেন,
“স্থানাভিলাষী তপসি স্থিতােহহং
'ত্বং প্রাপ্তবান্ দেবমুনীন্দ্র গুহং
কাচং বিচিন্নপি দিব্যরত্নং
স্বামি কৃতার্থেহস্মি বরং ন যাচে।”
হে দেব ! লােকে কাচ অন্বেষণ করিতে করিতে
যেমন দিব্যরত্ন প্রাপ্ত হয়, আমি সেইরূপ রাজসিংহাসনাভি-
লাষী হইয়া তপস্যা করতঃ মুনীদিগের দুলুভ ধন তােমাকে
পাইয়াছি। হে প্রভাে! কৃতার্থ হইলাম, আমার আর বর
লইবার প্রয়ােজন নাই।
“কৃষ্ণ ভক্তি হয় অভিধেয় প্রধান,
ভক্তি সুখ নিরীক্ষক কৰ্ম্মযােগ জ্ঞান।
এই সব সাধনের অতি তুচ্ছ ফল।
কৃষ্ণ ভক্তি বিনা কৃষ্ণ দিতে নাহি বল ।
কেবল জ্ঞান মুক্তি দিতে নারে ভক্তি বিনে।
কৃষ্ণোন্মুখে সেই মুক্তি হয় বিনা জ্ঞানের
চারি বর্ণাশ্রমী যদি কৃষ্ণে নাহি ভজে।
স্বধৰ্ম্ম করিলেও সে রৌরবে পড়ি মজে।
জ্ঞানী জীবন্মুক্ত দশা পাই করি মানে।
বস্তুত বুদ্ধি শুদ্ধ নহে কৃষ্ণভক্তি বিনে।

৭০ ভক্ত-চরিতামৃত। ৫ কৃষ্ণ সূৰ্য্য সম মায়া হয় অন্ধকার। যাহা কৃষ্ণ তাহা নাহি মায়ার অধিকার। কৃষ্ণ তােমার হঙ যদি বলে একবার। মায়া বন্ধ হৈতে কৃষ্ণ তারে করে পার । ভুক্তি মুক্তি সিদ্ধি কামী সুবুদ্ধি যদি হয়। গাঢ় ভক্তি যােগে তবে কৃষ্ণেরে ভজয় । অন্থকামী যদি করে কৃষ্ণের ভজন। মাগিলেও কৃষ্ণ তাঁরে দেন স্বচরণ। কৃষ্ণ কহে আম ভজে মাগে বিষয় সুখ। অমৃত ছাড়ি বিষ মাগে এতবড় মূখ। আমি বিজ্ঞ এই মূর্থে বিষয় কেন দিব। স্বচরণামৃত দিয়া বিষয় ভুলাইব। কাম লাগি কৃষ্ণ ভজে পায় কৃষ্ণরসে। কামছাড়ি দাস হৈতে হয় অভিলাষে।” চৈতন্যচরিতামৃত মধ্যখণ্ড, ২২ পরিচ্ছেদ। হে সনাতন! নদীপ্রবাহে ভাসমান কোন কাষ্ঠখণ্ড কদাচিৎ যেমন তীরসংলগ্ন হয়, সাংসারিক জীবেরও, সেই অবস্থা। কালরূপনদীবেগে আহত জীবদিগের মধ্যে ভাগ্য- বলে কদাচিৎ কেহ উত্তীর্ণ হইতে সমর্থ হয়। ভগবদনুগ্রহে সংসার ক্ষয়ােখ হইলে সাধুসমাগম লাভ হয়। সাধুসহবাসে হৃদয় নিৰ্ম্মল হইয়া পরমেশ্বরেতে রতির উদয় হয়। এবং কোন কোন সৌভাগ্যশালী ব্যক্তিকে করুণাময় ঈশ্বর অন্ত- যামী চৈত্ত্যআচার্যরূপেও আপনার তত্ত্ব, শিক্ষা দেন। ভাগবতে উদ্ধব ভগবানকে বলিয়াছেন, অষ্টম অধ্যায়। “যােহস্তবহিষনুভূতামশুভং বিধুষ- নাচাৰ্য চৈত্তবপুষা স্বগতিং ব্যক্তি।” হে ভগবন্! তুমি শরীরধারী জীবের ৰ্ব্বপ্রকার অশুভ করিয়া তাহাদের হৃদয়ে স্বগতি প্রকাশ করিবার নিমিত্ত বাহিরে গুরুরূপে ও অন্তরে অন্তর্যামীরূপে অবস্থিত থাকিয়া সৰ্ব্বদাই উপদেশ দিতেছ। সনাতন! সাধুসঙ্গের অপার মহিমা। সাধুসঙ্গ দ্বারা হরিভক্তিতে শ্রদ্ধা ও ভক্তিফল ভগবৎপ্রেম উৎপন্ন হয় ও সংসার ক্ষয় প্রাপ্ত হয়। বাস্ত বিক সাধুকৃপা ব্যতীত, সৎবিষয়ে রতি ও ভগবানে ভক্তি দূরে থাকুক, সংসার বাসনারই অবসান হয় না। সকল শাস্ত্রেই সাধুসঙ্গের মাহাত্ম্য বর্ণিত হইয়াছে। ভাগবতে সূত বলিয়াছেন, “তুলয়াম লবেনাপি ন স্বর্গং নাপুনর্ভব। ভগবৎসঙ্গিসঙ্গস্য মানাং কিমুতাশিষঃ।” ভগবদ্ভক্ত সাধুর সহিত অত্যল্প কাল সঙ্গ লাভ হইলে যে ফল হয়, তাহার সহিত স্বর্গ ও অপবর্গেরই তুলনা হইতে পারে না। মনুষ্যদিগের অভীষ্ট তুচ্ছ রাজভােগসুখের সহিত কিরূপে তাহার তুলনা হইবে ? “সংসার ভ্রমিতে কোন ভাগ্যে কেহ তরে। নদীর প্রবাহে যেন কাষ্ঠ লাগে তীরে। কোন ভাগ্যে কারাে সংসার কূয়ােন্মুখ হয়। সাধুসঙ্গে তরে কৃষ্ণে রতি উপজয় । কৃষ্ণ যদি কৃপা করে কোন ভাগ্যবানে। গুরু অন্তর্যামীরূপে শিখায় আপনে

৭২
ভক্ত-চরিতামৃত।
সাধুসঙ্গে কৃষ্ণ ভক্তে শ্রদ্ধা যদি হয় ।
ভক্তিফল প্রেম হয় সংসার বায় ক্ষয়।
মহৎকৃপা বিনা কোন কর্মে ভক্তি নয়।
কৃষ্ণভক্তি দূরে বহু সংসার না যায় ক্ষয়।
সাধুসঙ্গ সাধুসঙ্গ সৰ্ব্বশাস্ত্রে কয়।
লবা মাত্র সাধুসঙ্গ সর্বসিদ্ধ হয়।”
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড, ২২শ পরিচ্ছেদ।
হে সনাতন! শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত এই যে, ভগবানে নির্মল
শ্রদ্ধা উৎপন্ন হইলে বেদবিহিত ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম জ্ঞান যােগ সাধনার
আর প্রয়ােজন নাই। শ্রদ্ধাবান ব্যক্তিরা সকল ধৰ্ম্ম পরি-
ত্যাগ করিয়া কেবল শ্রীহরির শরণাপন্ন হইয়া থাকেন।
ফলতঃ প্রাণের ভােজনেই যেমন সকল ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি
হয়, সেইরূপ ভক্তিপূৰ্ব্বক ভগবান অচ্যুতের আরাধনা
করিলেই সকল কৰ্ম্ম কৃত হয়, ভাগবতে দেবর্ষি নারদ
এই কথা বলিয়াছেন। সুদৃঢ় বিশ্বাসের নাম শ্রদ্ধা। *
শ্রদ্ধাবান ব্যক্তিই ভক্তির অধিকারী। শাস্ত্র যুক্তি
জ্ঞানযােগে যাহার ভক্তি দৃঢ়ীভূত হইয়াছে, তিনিই
সর্বোত্তম ভক্ত। যিনি শাস্ত্রযুক্তি অবগত নহেন, অথচ
দৃঢ় শ্রদ্ধাবান তিনিও মহাভাগ্যবান, তাহাকে মধ্যম বলা
যায়। যাহায় শ্রদ্ধা অতি কোমল, তিনি কনিষ্ঠ। কিন্তু
ইহরাও ক্রমে অজাত্তম
ভক্তোত্তম হইবেন।
রতি প্রেমের
তারতম্যানুসারে ভক্তির তারতম্য হইয়া থাকে। ভাগবতের
* শ্রীমচ্ছঙ্করাচাৰ্য ‘আত্মনাত্মবিবেক” গ্রন্থে লিখিয়াছেন, “গ্ৰন্ধা নাম
গুরুবেদান্তবাক্যে বিশ্বাস।”

অষ্টম অধ্যায়। একাদশ স্কন্ধে ভক্তিলক্ষণে কথিত হইয়াছে, যিনি সৰ্ব্বভূতে আপনার ভগদ্ভাব দর্শন করেন, এবং পরমাত্মার অধিষ্ঠানে সকল বস্তুর অবস্থিতি দেখেন, তিনিই ভক্তোত্তম। যিনি ঈশ্বরে প্রেম, তাহার অনুগত ভক্তজনে মৈত্রী, অজ্ঞ- জনের প্রতি কৃপা ও শত্রুর প্রতি উপেক্ষা করেন, তিনি ভগবদ্ভক্তদিগের মধ্যে মধ্যম। যিনি শ্রদ্ধাপূৰ্ব্বক প্রতিমাতে হরির পূজা করেন, কিন্তু ভগবদ্ভক্ত কি অন্যের পূজা হবেন , তিনি প্রাকৃত ভক্ত, অর্থাৎ কনিষ্ঠাধিকারী ; ক্রমশঃ তিনিও ভক্তোত্তম হইবেন। * “পূৰ্ব আজ্ঞা বেদ ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম যােগ জ্ঞান। সব সাধি শেষে এই আজ্ঞা বলবান। এই আজ্ঞাবলে ভক্তের শ্রদ্ধা যদি হয় । সৰ্ব্ব কৰ্ম্ম ত্যাগ করি সে কৃষ্ণ ভজয় । শ্রদ্ধা শব্দে বিশ্বাস কহে সুদৃঢ় নিশ্চয়। কৃষ্ণ-ভক্তি কৈলে সৰ্ব্ব কৰ্ম্ম কৃত হয়। শ্রদ্ধাবান জন হয় ভক্তি অধিকারী। উত্তম মধ্যম কনিষ্ঠ শ্রদ্ধা অনুসারী। শাস্ত্র যুক্তি শুনি পুনঃ দৃঢ় শ্রদ্ধা যার। উত্তম অধিকারী তিঁহ তরয়ে সংসার। শাস্ত্র যুক্তি নাহি জানে দৃঢ় শ্রদ্ধাবান। মধাল অধিকারী সেও মহাভাগ্নবান । যাহার কোমল শ্রদ্ধা সে কনিষ্ঠ জন। • ক্রমে ক্রমে তিঁহাে ভক্ত হইবেন উত্তম।” চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড ২২শ পরিচ্ছেদ। * ভাগবত, ১১শ স্কন্ধ দ্বিতীয় অধ্যায়। ৪৩৪৪{Sও গ্লোব। ৭ ৭৪ ভক্ত-চরিতামৃত। হে সনাতন! বিষ্ণুভক্তি-পরায়ণ সাধুর জীবনে সকল মহাগুণের সঞ্চার হয়। সংক্ষেপে বৈষ্ণব লক্ষণ বলিতেছি, শ্রবণ কর। কৃপালু, অকৃতদ্রোহ, সত্যবাদী, সমদশী, নির্দোষ, বদান্য, মৃদু, শুচি, অকিঞ্চন, সর্বোপকারক, শান্ত, কৃষ্ণেক- শরণ, * অকাম, নিরীহ, স্থির, বিজিতষড়গুণ, । মিতভুক্, অপ্রমত্ত, মানদ, অমানী, গম্ভীর, করুণ, মৈত্র, কবি, দক্ষ, মৌনী, এই সকল বৈষ্ণব-লক্ষণ বলিয়া জানিবে। ভাগবতে দেবহৃতিকে কপিলদেব বলিয়াছেন, সাধু ব্যক্তি সর্বদুঃখসহন- শীল, কারুণিক ও সকল প্রাণীর সুখদ ; তাহার কেহ শত্রু নাই, তিনি শান্ত ও সরলস্বভাব এবং সুশীলতাই তাহার ভূষণস্বরূপ। হে সনাতন! সাধুসঙ্গ হইতেই হরিভক্তির জন্ম হয়। ভাগবতের উপদেশ এই,-পণ্ডিতেরা বলিয়াছেন, মহংসেবা, সাধুসঙ্গই ‘মুক্তির দ্বার, আর যোষিৎসঙ্গীদিগের সঙ্গই নরকের দ্বার। সেই সাধুরাই মহৎ, যাহারা সর্বত্র সমদর্শী, প্রশান্তচিত্ত, ক্রোধশূন্য, বন্ধুভাবাপন্ন ও সদাচার সম্পন্ন। সৎসঙ্গের মাহাত্ম্য অসীম। ভাগবতে কথিত হইয়াছে ;- “অত আত্যন্তিকং ক্ষেমং পৃচ্ছামাে ভবতােহনঘাঃ। সংসারেহস্মিন্ ক্ষণাৰ্দ্ধোহপি সৎসঙ্গঃ সেবধিমৃণাং।” ভাঃ ১১ স্কন্ধ। হে অনঘ ঋষিগণ! আপনাদিগকে এখন আত্যন্তিক মঙ্গলকর বিষয় জিজ্ঞাসা করিতেছি। এ সংসারে ক্ষণকালমাত্র সৎসঙ্গ লাভেও মহানিধি লাভ হয়। * যিনি সর্বপ্রকারে শ্রীকৃষ্ণ-চরণকেই একমাত্র আশ্রয় করিয়াছেন। ৫ বিজিত মড়গুণ, অর্থাৎ ষড়রিপুজয়ী।

অষ্টম অধ্যায়।
“সতাং প্রসঙ্গান্মমবীৰ্যসম্বিদো
ভবন্তি হৃৎকৰ্ণরসায়নার কথা
তজ্জোষণাদাশ্বপবর্গবত্মনি
শ্রদ্ধারতির্ভক্তিরনুক্রমিষ্যতি ॥”
ভাঃ তৃতীয় স্কন্ধ।
সাধুভক্তজনের সহিত প্রকৃষ্টরূপে সঙ্গ হইলে, হৃদয় ও
কর্ণের সুখদায়ক, আমার বীর্য প্রকাশক কথা উপস্থিত হইয়া
থাকে। তৎসেবনেই শীঘ্র অপবর্গবত্মস্বরূপ শ্রীহরিতে
প্রথমতঃ শ্রদ্ধা, তৎপরে রতি ও অবশেষে ভক্তি উৎপন্ন হইয়া
থাকে।
সনাতন!
অসৎসঙ্গই অনর্থের মূল। অসৎসঙ্গত্যাগই
বৈষ্ণবের শ্রেষ্ঠ সদাচার। স্ত্রীসঙ্গীদিগকে অসাধু ও অভক্ত
বলিয়া জানিবে।
“ন তথাস্য ভবন্মোহহ বন্ধশ্চান্য প্রসঙ্গতঃ।
যােষিৎসঙ্গাদ্যথা পুংসে যথা তৎসঙ্গিসঙ্গতঃ ॥”
ভাঃ তৃতীয় স্কন্ধ ।
রমণীসঙ্গ ও রমণীসঙ্গীদিগের সঙ্গ যেমন মােহ ও বন্ধনেক
কারণ, অন্যের সঙ্গ সেরূপ নয়।
“সত্যং শৌচং দয়া মৌনং বুদ্ধি-খ্রী: শ্ৰীযশঃ ক্ষম।
শমাে দমাে ভুগশ্চেতি যৎ সঙ্গাৎ যাছি সংক্ষয়ং ॥”
ভাঃ তৃতীয় স্কন্ধ।
অসৎ সঙ্গহেতু সত্য, শৌচ, দয়া, সৎপ্রবৃত্তি, বুদ্ধি, লজ্জা, শ্রী,
যশ, ক্ষমা, শম, দম, ঐশ্বৰ্য্য প্রভৃতি সকলি ক্ষয় প্রাপ্ত হয়।

ভক্ত-চরিতামৃত। “তেশান্তেষু মূঢ়েষু খণ্ডিতাত্মম্বসাধুযু। সঙ্গং ন কুৰ্য্যাচ্ছােচ্যেষু যােষিক্রীড়ামৃগেযুচ।” ভাঃ তৃতীয় স্কন্ধ। যাহারা অশান্ত, মূঢ়, খণ্ডিতাত্মা অর্থাৎ দেহেতে যাহাদের আত্মবুদ্ধি, যাহারা শশাকের পাত্র এবং ক্রীড়ামুগের ন্যায় যােমাগণের একান্ত অধীন ; সেই সকল অসাধু জনেব সঙ্গ করিবে না। অগ্নিদাহ মধ্যে লৌহপিঞ্জরে অবস্থান করাও বরং ভাল, তথাপি হরিচিন্তাবিমুখজনের সহিত একত্র বাস করা উচিত নহে। ভক্ত বৈষ্ণব এই সকল দুঃসঙ্গ ও বর্ণাশ্রম- ধৰ্ম্মের অসার কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ করিয়া তৃণাদপি সুনীচ অকিঞ্চন হইয়া শ্রীহরির শরণাপন্ন হইয়া থাকেন। সৰ্বশক্তি- মান ভক্তবৎসল করুণাময় ভগবানকে পরিত্যাগ করিয়া পণ্ডিতগণ কখন অন্যের ভজনা করেন না। শরণাগত অকি- ঋন ভক্তের লক্ষণ এই,--ঈশ্বরসের অনুকূল বিষয় গ্রহণ ও প্রতিকূল বিষয় বর্জন, ‘ভগবান আমাকে রক্ষা করিবেন’ এই বিশ্বাস, তঁাহার রক্ষিতৃত্বে আত্মসমর্পণ, তাহার কাৰ্য সাধনে সুখ দুঃখ চিন্তা না করিয়া আত্ম-নিক্ষেপ করা, এবং তঁাহার শরণ বিষয়ে নিষ্ঠাযুক্ত মতি, এই ছয়টী শরণাগতের লক্ষণ। ভাগবতে ভগবান বলিয়াছেন ;- “মর্ত্যো সদা ত্যসমস্ত কৰ্ম্মা নিবেবিতাত্মা বিচিকীর্ষিতােম। তামৃত্বং প্রতিপদ্যমাননা ময়াত্মভূয়ায় চ কল্পতে বৈ ।” ভঃ ১১শ স্কন্ধ।

অষ্টম অধ্যায়। ৭৭ অর্থাৎ মরণশীল মনুষ্য যখন সমস্ত কৰ্ম্ম পরিত্যাগপূর্বক আমাতে আত্মসমর্পণ করিয়া আমার সেবাকার্য করিতে ইচ্ছুক হন, তখন তিনি অমৃতত্ব লাভ করিয়া আমার সহিত এক হইবার যােগ্য হইয়া থাকেন। অনন্তর চৈতন্য বলিলেন, হে সনাতন! এইরূপে সাধুসঙ্গ ও শরণাগতি লাভ হইলে, মানব ভক্তিসাধনের যােগ্য হয়, মানব-অন্তরে স্বভাবজাত কতকগুলি ভাব নিহিত আছে, ইন্দ্রিয়াদির সাহায্যে যারা সেই ভাবগুলিকে হৃদয়ে উদ্দীপিত করা যায়, তাহার নাম সাধনভক্তি। এই সাধন- ভক্তি হইতেই মহাধন ভগবৎপ্রেম লাভ হয়। কৃষ্ণপ্রেম সাধন করিয়া কেহ লাভ করিতে পারে না, তাহা মানব-হৃদয়- নিহিত নিত্য-সিদ্ধবস্তু। শুদ্ধান্তঃকরণে ভগবানের গুণমহিমা শ্রবণ কীৰ্ত্তনে সেই প্রেমরস উদ্দীপ্ত হইয়া থাকে। সাধন- ভক্তি দুই প্রকার, বৈধী ও রাগানুগা। স্বাভাবিক অনুরাগ নাই, অথচ শাস্ত্রের অজ্ঞায় সে ভজনা তাহাই বৈধী অর্থাৎ বিধিসিদ্ধ। গুরুপদাশ্রয়, দীক্ষা, গুরুসেবা, সদ্ধর্মজিজ্ঞাসা, সাধুদ্দিগের অনুগমন, তীর্থবাস, ভােগত্যাগ, নির্বাহের অতিরিক্ত ভিক্ষা না করা, সেবা ও নামাপরাধৰর্জন, অবৈষ্ণব-সঙ্গত্যাগ, সাধুসহবাস, শিষ্যবৃদ্ধি-বৰ্জন, বহুগ্রন্থা- ভ্যাস-বর্জন, লাভক্ষতিতে সমজ্ঞান, শােকাদির অবশীভূততা, অন্য দেবতা ও অন্য শাস্ত্রের অবজ্ঞা না করা, মনােবাক্যে প্রাণীমাত্রের উদ্বেগের কারণ না হওয়া, অসার গ্রাম্যকথার আলােচনা না করা, ও শ্রবণকীৰ্ত্তনপরিচৰ্য-বিজ্ঞপ্তি- আত্মনিবেদন প্রভৃতি সাধনভক্তির চতুঃষষ্টি অঙ্গ। তন্মধ্যে ৭৮ । ভক্ত-চরিতামৃত। সমপৰ্মী ও আপনা হইতে শ্রেষ্ঠ সাধুদিগের সঙ্গ, নামকীর্তন, ভাগবতপ্রবণ, মথুরাবাস অর্থাৎ ভগবানকে সমীপস্থ জ্ঞান করা এবং শ্রদ্ধাপূৰ্ব্বক শ্ৰীমূর্তির পূজা, এই পাঁচটা প্রধান। কেহ বা এক অঙ্গ কেহ বা বহু অঙ্গ লইয়া সাধন আরম্ভ করেন। এক অঙ্গ সাধনেও অনেক ভক্ত সিদ্ধ হইয়াছেন। অম্বরীষাদি ভক্তগণ বহু অঙ্গের সাধন করিয়া সিদ্ধ হইয়া- ছিলেন। ইহাতে নিষ্ঠা হইলে হৃদয়-নদীতে প্রেমের তরঙ্গ- লহরী ক্রীড়া করিতে থাকে। শাস্ত্রোক্ত এই সকল অঙ্গ সাধনের নাম বৈধী ভক্তি। শাস্ত্র আজ্ঞা মান্য করিয়া কামনাত্যাগ করত যাহারা বৈধী ভক্তিতে ঈশ্বরের ভজনা করেন, তাহারা দেবতা ঋষি ও পিত্রাদির ঋণ হইতে মুক্তি লাভ করেন। * ঘৃণাস্পদ নিষিদ্ধ পাপাচারেও তাঁহাদের মন নিমগ্ন হয় না। ভূক্ত মােহ বশতঃ যদি কখনও বিকল্পে পতিত হয়েন, তাহা হইলে প্রায়শ্চিত্ত না করাইয়া ভক্তবৎসল হরি ভক্তের হৃদয়ে প্রবিষ্ট হইয়া তাহাকে পবিত্র করেন। এই ত বৈধীভক্তি সাধনের বিবরণ কহিলাম। রাগানুগ। । * “দেবর্ষিতৃপ্তণাং পিতৃণাং ন কিঙ্করাে নায়ণী চ রাজ সর্বাত্মনা যঃ শরণং শরণ্যং গততা মুকুন্দং পরিহৃত্য কং।” ভাগবত-একাদশ স্কন্ধ। হে রাজন্ ! যিনি শাস্ত্রনির্দিষ্ট কৃত্যাদি পরিত্যাগ পূর্বক কায়মনোবাক্যে মুকুন্দের শরণাপন্ন হইয়াছেন; তিনি দেবতা, ঋষি, প্রাণী, কুটুম্ব, বা পিত্রাদি কাহারও নিকট ঋণী বা কাহারও কিঙ্কর নহেন।

অষ্টম অধ্যায়। ভক্তির লক্ষণ কহিতেছি শ্রবণ কর। রাগানুগ ভক্তি বিধি- নিষেধনিরপেক্ষ, কেবল রাগময়ী, এইজন্য, বৈধী অপেক্ষা তাহা অতি প্রবলা। বৈধী ভক্তির উদ্দেশ্য এই যে, সাধনে স্বাভাবিক রুচি ও অনুরাগ না থাকিলেও শাস্ত্রবিধির অধীন হইয়া সাধন করিলে ক্ৰমে প্রকৃত প্রেমরসের উদ্দীপন হইবে। ' কিন্তু স্বাভাবিক রুচিতে অনুরাগ-পথে আত্ম- সমর্পণই রাগানুগত ভক্তি। ইহাতে শুষ্ক বিধির অধীন বশতঃ সাধনে ক্লেশ বােধ হয় না, সুতরাং সহজেই পরমে- শ্বরের প্রিয়কাৰ্য অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। মাধুৰ্য্যরসের রসিক ব্রজবাসীজনেরই ইহাতে মুখ্য অধিকার। + ইষ্ট- বিষয়ে কি-না অভিলষিত বস্তুতে শ্রবণকীৰ্ত্তনাদি অনপেক্ষিত স্বাভাবিক প্রেমময় গাঢ় তৃষ্ণা ও অনুরাগ ইহার স্বরূপ- লক্ষণ।। আর আবিষ্টতা তটস্থ লক্ষণ। রাগানুগত ভক্তিতে শাস্ত্রযুক্তির কোন অপেক্ষা নাই। ইহার সাধন দুই প্রকার, বাহ ও অন্তর। বাহিরে, সাধকরূপ বহির্দেহে বৈধীভক্তির ন্যায় শ্রবণ কীৰ্ত্তন করা, এবং অন্তরে ব্রজভাবের কোন সখী সখা বা পিতা মাতাকে আদর্শজ্ঞান করিয়া, সেই আদর্শসাধকের সিদ্ধ দেহ পাইয়াছেন, মনে মনে এইরূপ ভাবনা করিয়া ভগবৎসেবা কর অন্তরসাধন। যিনি এই স্বাভাবিক ভাবরসে মগ্ন হইয়া ভগবানে আত্ম সমর্পণ করেন, তঁহার হৃদয়ে অচিরাৎ ভগবৎপ্রীতি ও রতি অঙ্কুরিত হয়। এবম্বিধ ভক্তেরাই ভগবানকে আত্মবৎ প্রিয়, পুত্রবৎ স্নেহপাল, সখার ন্যায় বিশ্বাসভাজন, গুরুর ন্যায় * পরিশিষ্ট দেখ। + ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, পূর্ব বিভাগ।

ভক্ত-চরিতামৃত।
উপদেষ্টা, বন্ধুর ন্যায় হিতকারী ও ইষ্টদেবতুল্য পূজনীয় জ্ঞান
করিয়া এইরূপে সর্বতােভাবে ভগবানের ভজনা করিয়া
থাকেন, সুতরাং কালচক্র হইতে তাহাদের কোন আশঙ্কা
নাই। *
“রাগানুগা ভক্তির লক্ষণ শুন সনাতন ।
রাগাগা ভক্তি মুখ্য ব্রজবাসী জনে।
তার অনুগত ভরে রাগানুগ নামে।
ইষ্টে গাঢ় তৃষ্ণা রাগ স্বরূপ লক্ষণ।
ইষ্টে আবিষ্টতা তটস্থ লক্ষণ কথন ।
রাগময়ী ভক্তির হয় রাগাত্মিকা নাম।
তাহ শুন লুব্ধ হয় কোন ভাগ্যবান।
লােভে ব্রজবাসীর ভাবে করে অনুগতি।
শাস্ত্র যুক্তি নাহি মানে রাগানুগার প্রকৃতি।
বাহ অন্তর ইহার দুইত সাধন।
বাহে সাধকদেহে করে শ্রবণ কীৰ্ত্তন।
মনে নিজ সিদ্ধ দেহ করিয়া ভাবন।
রাত্রি দিনে করে ব্রজে কৃষ্ণের সেবন ।
এই মত করে যেবা রাগানুগ ভক্তি।
কৃষ্ণের চরণে তার উপজয়ে প্রীতি।
প্রেমাঙ্কুৱে রতি ভাব হয় দুই নাম।
যাহা হইতে বশ হন শ্রীভগবান।
যাহা হইতে পাই কৃষ্ণের প্রেমরস ধন।
এই ত কহিল অভিধেয় বিবরণ।
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড ২২শ পরিচ্ছেদ।
# ভাগবত, তৃতীয় স্কন্ধ ২৫শ অধ্যায়।

.
নবম অধ্যায়।।
প্রয়ােজন তত্ত্ব।
শ্রীগৌরাঙ্গ বলিলেন, হে সনাতন! বেদাদি শাস্ত্রে
সম্বন্ধ, অভিধেয় ও প্রয়ােজন কথিত হইয়াছে। সকল শাস্ত্রে
শ্রীকৃষ্ণই মুখ্য সম্বন্ধ, ভক্তিই একমাত্র অভিধেয়, এবং তাহাতে
বিশুদ্ধ সেবাময়ী প্রেমই একমাত্র প্রয়ােজন। সম্বন্ধ ও অভি-
ধেয় ইতিপূর্বে ব্যখ্যা করা হইয়াছে। সৰ্ব্বশাস্ত্রের প্রয়াে-
জনস্বরূপ ভক্তিফল প্রেমের বিষয় অতঃপর বলিতেছি শ্রবণ
কর। ইহা শ্রবণ করিলে ভক্তিরসের জ্ঞান লাভ হইবে ।
শ্রীকৃষ্ণে গাঢ় রতি হইলেই তাহা প্ৰেমনামে অভিহিত
হয়।* নারদপঞ্চরাত্রে কথিত হইয়াছে,
* ভক্তিরসামৃতসিন্ধুতে রূপগােস্বামী ভাব ও প্রেমের এই লক্ষণ
করিয়াছেন।
“শুদ্ধসত্ত্ববিশেষত্মপ্রেমাংশুমাভা।
রুচিভিশ্চিত্তমাস্থণাকৃদসৌ ভাব উচ্যতে।”
নিল সত্ত্বগুণের দ্বারা বিশেষীকৃত আত্মাতে প্ৰেমসূর্যকিরণ সামভাব
ধারণ করিলে এবং রুচি প্রভাবে সাধকের চিত্ত মসৃণ হইলে তাহার নাম ভাৰ
বলা যায়।
“সমাণিতন্তো মমবাতিশয়াঙ্কিত।
ভাবঃ স এব সাত্মা বুবৈঃ প্রম নিগদ্যতে ॥
যাহাতে অন্তঃকরণ সম প্রকায়ে মসৃণিত অর্থাৎ নির্মলীকৃত হয়, যাহা
‘মমত্বাতিশয়াঙ্কিত অর্থাৎ অতিমাত্র মমতাযুক্ত এবং যাহা ‘সাত্মা’ কিনা
অতিশয় ঘনীভূত, এইরূপ ভাবকে পণ্ডিতেরা প্রেম (প্রেম) বলিয়া থাকেন।

৮২ ভক্ত-চরিতামৃত। “অনন্যমমতা বিষ্ণো মমতা প্রেমসঙ্গ। ভক্তিরিত্যুচ্যতে ভীষ্ম প্রাদোদ্ধব দৈঃ।” অন্যান্য বিষয়ে মমতা না হইয়া কেবল ভগবানে অতিশয় প্রেমযুক্ত মমতাকেই ভীষ্ম, প্রদি, উদ্ধব ও নারদ ভক্তি বলিয়াছেন। * ভাগ্যক্রমে যদি কোন জীবের ভগ- বৎ বিষয়ে শ্রদ্ধা উৎপন্ন হয়, তাহা হইলে সেই শ্রদ্ধাবান মানব সাধু সজ্জনের সঙ্গ লাভ করেন। তৎপরে সাধনারম্ভ, অর্থাৎ সাধুসঙ্গের গুণে ভগবানের নামমাধুৰ্য্য শ্রবণ কীর্ত- নাদিতে মতি হয়। এইরূপে শ্রবণ কীৰ্ত্তনাদি সাধনভক্তি দ্বারা সৰ্বানর্থের নিবৃত্তি হইয়া থাকে। অসৎক্রিয়া কাপট্যাদি অনর্থ নিবৃত্ত হইলে ভক্তিতে নিষ্ঠা হয়, নিষ্ঠা হইতে ভগবৎ মহিমা শ্রবণ কীৰ্ত্তনাদিতে রুচি জন্মিয়া থাকে, এবং রুচি হইতে ক্রমে ভগবানে প্রচুর আসক্তি উপস্থিত হয়। এই আসক্তি হইতে চিত্তভূমিতে কৃষ্ণরতি অঙ্কুরিত হয়। এই কৃষ্ণরতি গঢ়ি হইলে প্রেম বলা যায়। এই সৰ্বানন্দধাম প্রেমই সকল শাস্ত্রের প্রয়ােজন স্বরূপ। যে ভাগ্যবান বক্তির হৃদয়ে এই প্রেমাঙ্কুর উদ্ভূত হয়,ভক্তিশাস্ত্র অনুসারে তাহার জীবনে এই সকল লক্ষণ দেখিতে পাওয়া যায়। তিনি ক্ষমা শীল হয়েন ; প্রকৃত ক্ষোভে তাহার ক্ষোভ বােধ হয় না ; শ্রীহরির সম্বন্ধ ব্যতীত বৃথা কালক্ষ্য তিনি বিষতুল্য জ্ঞান করেণ। ভূক্তি, সিদ্ধি ও ইন্দ্রিয়লালসা তাঁহার হৃদয়ে আর প্রতিভাত হয় না। ভক্ত সৰ্বোত্তম হইয়াও আপনাকে - ভক্তিমীমাংসাসূত্রকার শাণ্ডিত্য বলিয়াছেন, “সা পরানুরক্তি রী- ধরে” । অর্থাৎ ভগবানে পরম অনুরাগের নাম ভক্তি।

নবম অধ্যায়।
অতিহীন জ্ঞান করেন, অহংকারের লেশমাত্রও তাহার জীবনে
থাকিতে পারে না। ভগবৎকৃপার প্রতি তাহার অটল
বিশ্বাস। হরি গুণানুকীৰ্ত্তন ও হরিনাম ধাপান করিবার
জন্য তিনি সমুৎকণ্ঠিত। যে স্থানে হরিলীলাপ্রসঙ্গ হয়,
সেই স্থানেই তিনি বাস করেন। শ্রীহরিতে রতির এই সকল
চিহু ভক্তজীবনে প্রকাশিত হইয়া থাকে।
“এবে শুন ভক্তিফল প্রেম প্রয়ােজন।
যাহার শ্রবণে হয় ভক্তিরস জ্ঞান।
কৃষ্ণে রতি গাঢ় হইলে প্রেম অভিধান।,
কৃষ্ণ ভক্তিরসের সেই স্থায়ীভাব নাম।
এই দুই ভাবের স্বরূপ তটস্থ লক্ষণ।
প্রেমার লক্ষণ এবে শুন সনাতন।
কোন ভাগ্যে কোন জীবের শ্রদ্ধা যদি হয় ।
তবে সেই জীব সাধুসঙ্গ করয় ।
সাধু সঙ্গ হৈতে হয় শ্রবণ কীৰ্ত্তন।
সাধন ভক্ত্যে হয় সানর্থ নিবর্তন।
অনর্থ নিবৃত্তি হইলে ভক্তি নিষ্ঠা হয়।
নিষ্ঠা হৈতে শ্রবণাদ্যে রুচি উপজয় ।
রুচি হৈতে হয় তবে আসক্তি প্রচুর।
আসক্তি হৈতে চিত্তে জন্মে কৃষ্ণে রত্যঙ্কুর।
সেই ভাব গাঢ় হৈলে ধরে প্রেম মাম।
সেই প্রেম প্রয়ােজন সৰ্বানন্দধাম।
যাহার হৃদয়ে এই ভাবান্ধুর হয়।
তাহাতে এতেক চিহু সৰ্ব্বশাস্ত্রে কয়।
০

৮৪
ভক্ত-চরিতামৃত।
এই নব প্রীত্যঙ্কুর যার চিত্তে হয়।
প্রাকৃ ক্ষোভে তার ক্ষোভ নাহি হয়।
কৃষ্ণ সম্বন্ধ বিনা ব্যর্থ কাল নাহি যায় ।
ভুক্তি সিদ্ধি ইন্দ্রিয়ার্থ তারে নাহি ভয়।
সৰ্বোত্তম আপনাকে হীন করি মানে।
কৃষ্ণ কৃপা করিবেন দৃঢ় করি মানে।
সমুংকণ্ঠা হয় সদা লালসা প্রধান।
নাম গানে সদারুচি লয় কৃষ্ণ নাম।
কৃষ্ণগুণাখ্যানে হয় সর্বদা আসক্তি।
কৃষ্ণ লীলাস্থানে করে সর্বদা বসতি ।
কৃষ্ণ রতির চিতু এই কৈল বিবরণ।
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড ২৩শ পরিচ্ছেদ।
হে সনাতন! কৃষ্ণপ্রেমের চিতু এখন সংক্ষেপে বলিতেছি
শ্রবণ কর। যার চিত্তে এই প্রেম উন্মীলিত হয়, তাহার
অন্তরের ভাব কথাবার্তা ব্যবহারাদি বিজ্ঞ ব্যক্তিও
বুঝিতে পারেন না; কেন না প্রেমিক ব্যক্তি প্রাকৃত ভাবের
অতীত। ভাগবতে উক্ত হইয়াছে,
“এবং ব্ৰতঃ স্বপ্রিয় নাম কীৰ্ত্তা
জাতানুরাগােতচিত্ত উচ্চৈঃ
হসত্যথাে রােদিতি রোতি
গায়ত্যুম্মাদবত্যতি লােক বাহ্যঃ।” ভাঃ ১১শ স্কন্ধ।
অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ-সেবাপরায়ণ ব্যক্তি এইরূপ ব্ৰতানুষ্ঠান
করেন। যথা,প্রেমাস্পদ প্রিয়তম শ্রীকৃষ্ণের নাম কীৰ্ত্তন
করিতে করিকে তাঁহার হৃদয়ে অনুরাগ সঞ্জাত হয়, এবং চিত্ত

নবম অধ্যায়।
৮৫
দ্রবীভূত হইয়া যায়। এই অবস্থায় তিনি উচ্চৈঃস্বরে হাস্য
করেন,কখন রােদন করেন, কখন নাম উচ্চারণ করেন,
কখন গান করেন, কখন বা উন্মাদবৎ নৃত্য করেন।
এ প্রকার লােক সকল লােকের বহির্ভূত। এই প্রেম
ক্রমশঃ বর্ধিত হইয়া মেহ মান প্রণয় রাগ অনুরাগ ভাব
মহাভাবে পরিণত হয়। ইক্ষুরস যেমন ক্রমশঃ গাঢ় ও নির্মল
হইয়া মৎস্যী (মিছরি) হয়, রতি প্রেমও সেই প্রকার
ক্রমশঃ গাঢ় হইয়া মধুস্বাদযুক্ত হইয়া থাকে।
অধিকারিভেদে শান্ত দাস্য সখ্য বাৎসল্য ও মধুর এই
পাঁচ প্রকার রতিভেদ হয়। ইহার মধ্যে মধুর রসই সৰ্বা-
পেক্ষা শ্রেষ্ঠ। প্রেমই এই সকল রসের স্থায়ীভাব। ইহার
সহিত বিভাব, অনুভাব, সাত্বিক ও ব্যভিচারী ভাবের মিলন
হইলে প্রেমরসের অপূৰ্ব্বাদন হয়। বিভব অর্থাৎ উদ্দীপনা
দ্বিবিধ। আলম্বন ও উদ্দীপন। শ্রীহরিই আলম্বন ও বংশীনিনাদ
অর্থাৎ হৃদয়করে নিরন্তর ভগবানের অজেয় আদেশবাণীই
উদ্দীপনা। অনুভাব অর্থাৎ মনের পূর্ণ একাগ্রতা, এবং স্তম্ভ
স্বেদ রােমাঞ্চ প্রভৃতি সাত্বিক ও নির্বেদ হর্ষাদি ব্যভিচারী
ভাবের মিলনে প্রেমরস অতি মধুর ও চমৎকারজনক হইয়া
থাকে। ইহা লাভ করিতে হইলে নায়ক নায়িকাকে রসের
আলম্বন করিতে হয়। পুরুষপ্রধান ব্ৰজেন শ্রীকৃষ্ণকে
নায়ক শিরােমণি, আর পাপ্রকৃতিরূপা রাধিকাকে নায়িকা
কল্পনা করিয়া যে সকল ভক্ত সাধন করেন,তাহাদের হৃদয়ে
“সংস্কারযুগলােলা” অর্থাৎ রাধাকৃষ্ণের যুগলভাবসংস্কৃত
রতি উপস্থিত হইয়া প্রেমানন্দরূপে প্রকাশ পাইতে থাকে।

৮৬
ভক্ত-চরিতামৃত।
হে সনাতন! পঞ্চম পুরুষার্থ * কৃষ্ণপ্রেমধনের বিষয়
সংক্ষেপে তােমাকে কহিলাম অভক্তগণ ইহার রসাস্বাদন
করিতে অক্ষম, ভক্ত ভিন্ন ভগবৎপ্রেমের আস্বাদন আব
কেহই জানে না। পূর্বে প্রয়াগে অবস্থানকালে তােমার
ভ্রাতা শ্রীরূপকে রসতত্বের বিচার করিয়া এই সকল বিষয়
আমি শিক্ষা দিয়াছি। সনাতন! তুমি ভক্তিশাস্ত্র প্রচার কর,
মথুরার লুপ্ততীর্থ উদ্ধার কর, এবং বৈষ্ণব-আচারের স্মৃতিশাস্ত্র
প্রচার করিয়া জগতের উপকার কর। শ্রীচৈতন্য এই প্রকারে
সনাতন গােস্বামীকে সকল বিষয় শিক্ষা দিয়া বলিলেন, শুধ,
বৈরাগ্য ও শুফ-জ্ঞান বিষয়ে বিশেষ সাবধান হইৰে।
“কৃষ্ণ প্রেমের চিহ্ন এবে শুন সনাতন |
যার চিত্তে কৃষ্ণপ্রেম করয়ে উদয় ।
তার বাক ক্রিয়া মুদ্রা বিজ্ঞে না বুঝায় ।
প্রেম ক্রমে বাড়ি হয় স্নেহ মান প্রণয়।
রাগ অনুরাগ ভাব মহাভাব হয়।
যৈছে বীজ ইক্ষুরস গুড় খণ্ড সার।
শর্করাসিতা মিছরি শুদ্ধ মিছরি আর।
ইহা যৈছে ক্ৰমে নিৰ্ম্মল ক্রমে বাড়ে স্বাদ।
রতি প্রেমাদির তৈছে বাড়য়ে আস্বাদ।
অধিকারী ভেদে রতি পঞ্চ প্রকার।
শান্ত দাস্য সখ্য বাৎসল্য মধুর আর।
এই পঞ্চ স্থায়ীভাব হয় পঞ্চরস ।
যে রসে ভক্ত সুখী কৃষ্ণ হয় বশ
* এই পুস্তকের ৩০ পৃষ্ঠর 'টাকা দেখ।

নবম অধ্যায়।
প্রেমাদিক স্থায়ীভাব সামগ্রী মিলনে।
কৃষ্ণভক্তি রসরূপে পায় পরিণামে ॥
বিভাব অনুভাৰ সাত্বিক ব্যভিচারী।
স্থায়ীভাব হয় রস মিলে এইচারি।
দধি যেন খণ্ড,মরিচ কপূর মিলনে।
রসালাখ্য রস হয় অপূৰ্বাৰাদনে ।
দ্বিবিধ বিতাব আলধন উদ্দীপন।
বংশীস্বরাদি উদ্দীপন কৃষ্ণাদি আলম্বন ।
অনুভব স্মিত নৃত্য গীতাদি উদ্ভার।
স্তম্ভাদি সাত্বিক অনুভবের ভিতর।
নির্বেদ হর্ষাদি তেত্রিশ ব্যভিচারী।
সবমিলি রস হয় চমৎকারকারী ।
পঞ্চবিধ রস শান্ত দাস্য সখ্য বাৎসল্য।
মধুর নাম শৃঙ্গার রস সবাতে প্রাবল্য ।
*** ব্রজেন্দ্র নন্দন কৃষ্ণ নায়ক শিরােমণি ।
নায়িকার শিরােমণি রাধাঠাকুরাণী ।
নায়ক নায়িকা দুই রসের আলম্বন।
সেই দুই শ্রেষ্ঠ রাধা ব্রজেন্দ্র নন্দন
এই মত দাস্যে দাস সখ্যে সখাগণ।
বাৎসল্যে পিতা মাতা আশ্রয়ে আলম্বন।
এই রসাস্বাদ নাহি অভক্তের গণে।
কৃষ্ণ ভক্তগণ করে রস আস্বাদনে।
সংক্ষেপে কহিল এই প্রয়ােজন বিবরণ।
পম পুৰুষাৰ্থ এই কৃষ্ণ প্রেমধন।”
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড, ২৩শ পরিচ্ছেদ।

ভক্ত-চরিতামৃত।
অনন্তর সনাতন গৌরচরণে দীনভাবে নিবেদন করি-
লেন, আমি নীচজাতি, নীচসেবা করিয়া পামরের অংশ
হইয়াছি।
ব্ৰহ্মার অগােচর যে সকল গভীর সিদ্ধান্ত
আমাকে শিক্ষা দিলেন, আশীর্বাদ করুন, যেন তাহা
আমার হৃদয়ে স্মৃৰ্ত্তি পায়। পারাবারশূন্য অনন্ত-গম্ভীর
সিদ্ধান্তমৃতসিন্ধুর বিন্দুমাত্রও হৃদয়ঙ্গম করিতে অামার শক্তি
নাই। পঙ্গুকে নাচাইতে যদি আপনার ইচ্ছা হয়, তবে
আমার মস্তকে চরণ দিয়া আশীর্বাদ করুন। গৌরাঙ্গ
প্রেমভরে সনাতনের মস্তকে হত্যার্পণ করিয়া বলিলেন, আমি
যাহা কিছু উপদেশ দিলাম, তােমার হৃদয়ে তাহা স্মৃৰ্ত্তিলাভ
সনাতন পুনৰ্বার গৌরচরণে নিবেদন করিলেন, শুনি
আছি সার্বভৌম ভট্টাচার্যের নিকট “আত্মারাম” শ্লোকের
আঠারাে প্রকার ব্যাখ্যা করিয়াছেন। এই আশ্চর্য ব্যাপার
শুনিয়া আমার মন উৎকণ্ঠিত হইয়াছে। কৃপা করিয়া যদি
পুনৰ্বার বলেন, শ্রবণ করিয়া পরিতৃপ্ত হই। চৈতন্য বলি-
লেন, আমি বাতুল, কখন কি প্রলাপ বলিয়াছি, সার্বভৌম
তাহাই সত্য মনে করিয়াছেন। সহজে আমি কিছুই
বুঝিতে পারি না, তােমার ন্যায় সাধুর সঙ্গগুণে যাহা কিছু
মনে হইতেছে, বলিতেছি। এই বলিয়া চৈতন্য মহা
উচ্ছাসের সঙ্গে
“আত্মারামাশ্চ মুনয়ে। নিগ্রন্থঃ অপুরুমে।
কুন্ত্যহৈতুকীং ভক্তিমিথংভূতগুণােহরি।**
* যে সকল মুনি আত্মারাম অর্থাৎ যাঁহারা পরমাত্মাতে নিরন্তর রমণ

নবম অধ্যায়। ৮৯ ভাগবতােক্ত এই শ্লোকের একটি প্রকার ব্যাখ্যা করি- লেন। এই সকল ব্যাখ্যাতে স্থূলতঃ ভক্তিসাধন ও সাধু- সঙ্গের মাহাত্ম ব্যাখ্যাত হইয়াছে। শ্রীহরির সেবা ব্যতীত সকল প্রকার ফলসঙ্কল্প পরিত্যাগ করত মােক্ষবাঞ্ছা পৰ্যন্ত কৈতব-প্রধান । জানিয়া শুদ্ধভক্তিযােগে ভগবানের আরা- ধনা কর্তব্য। ভক্তি বিনা অন্য সাধন অজাগল-স্তনের ন্যায় করেন, এবং “নিগ্রন্থঃ” অর্থাৎ তত্ত্বজ্ঞান নিষ্পন্ন হওয়াতে যাঁহারা বিধি-নিষেধ- রূপ গ্রন্থের বহিভূত হইয়াছেন অথবা ক্রোধ-অহঙ্কাররূপ হৃদয়গ্রন্থি হইতে যাহারা মুক্তিলাভ করিয়াছেন, তাঁহারাও হরির মধুময় গুণে আকৃষ্ট হইয়া তাঁহাকে অহৈতুকী ভক্তি করিয়া থাকেন। ভাগবত ১ম স্কন্ধ ৭ম অধ্যায়। । ধর্মঃ ভােজ বিতকৈতবােহ পরমােনির্মৎসৱাণাং সতাং”। ভাগবত ১ম স্কন্ধ। মহামুনিকৃত ভাগবত শাস্ত্রে, নিম্নৎসর হিংসাদিহিত সৰ্ব্বভূতবৎসল সাধু দিগের অনুষ্ঠেয় মােক্ষ পৰ্য্যন্ত ফলাভিসন্ধিরূপ কাপট্যাদি শূন্য পরমধর্ম নিরূপিত হইয়াছে। এই শ্লোকের টীকায় শ্রীধর স্বামী লিখিয়াছেন, “পরত্বে হেতু প্রকর্ষেণ উজঝিতং কৈতবং ফলাভিসন্ধিলক্ষণং কপটং যস্মিন্ সঃ। প্রশনে মােক্ষাভিসন্ধিরপি নিরস্তঃ। কেবলমীশ্বরারাধন লক্ষণ ধম্মে। নিরূপ্যতে।” “প্রােজৰিত’ শব্দে ‘প্র’ উপসর্গ থাকাতে শ্ৰধর স্বামীর ব্যাখা অনুসারে মােক্ষাভিসন্ধি পৰ্যন্ত কৈতব বলিয়া বুঝিতে হইবে। “কৈতব” অর্থে ছল, কপটতা। ভক্তিশাস্ত্রে মােক্ষবাঞ্ছাকে প্রধান কৈতব বলিয়া উক্ত হইয়াছে। অজ্ঞানতমের নাম কহি যে কৈতব। ধৰ্ম্ম অর্থ কাম বাঞ্ছা আদি এই সব। তার মধ্যে মােক্ষবাঞ্ছা কৈতব প্রধান। যাহা হৈতে কৃষ্ণভক্তি হয় অন্তধন। t ভক্ত-চরিতামৃত। বৃথা। ভক্তিই পরম প্রবল, ভক্তিই সর্বাকর্ষক সৰ্বাহক মহারসায়ন। ইহার গন্ধমাত্রে ভােগাভিলাষ, মুক্তিকামনা ও সিদ্ধিমুখ পলায়ন করে। সৎসঙ্গ,ভগবৎসেবা,ভাগবত পাঠ, নামজপ ও ব্রজভূমিতে বাস, এই পঞ্চবিধ সাধনই প্রধান। ইহার মধ্যে কোন একটা স্বল্পমাত্র অনুষ্ঠিত হইলেই সুবুদ্ধি ব্যক্তির শ্রীহরিতে প্রেমােদয় হইয়া থাকে। ভক্তিপ্রভাবে শ্রীহরির গুণে আকৃষ্ট হইয়া ভক্তগণ সকল কামনা ত্যাগ করত হরিপদারবৃন্দ আশ্রয় করেন। সংসারপথে ভ্রমণ করিতে করিতে যদি সাধুসঙ্গ লাভ হয়, তবে যাগ যজ্ঞাদি সমুদায় কৰ্ম্ম- কাণ্ড পরিত্যাগ করিয়া সেই সাধক কেবল শ্রীহরির ভজনা করেন। ভাগবতে কথিত হইয়াছে, “সৎসঙ্গান্মুক্ত দুঃঙ্গে হাতুং নােৎসহতে বুধঃ কীৰ্তমানং যশে যস্য সকৃদাকর্ণ বােচনং ” ভাগবত ১ম স্কন্ধ। যে সুপণ্ডিত ব্যক্তি সাধুসঙ্গগুণে বিষয়রূপ দুঃসঙ্গ হইতে মুক্তিলাভ করিয়াছেন, তিনি সাধুমুখে কীৰ্ত্তমান ভগ- বানের মনােহর যশোেগান একবারমাত্র শ্রবণ করিতে পাইলে আর সৎসঙ্গ পরিত্যাগ করিতে ইচ্ছা করেন না। হে সনা- তন! তােমার পবিত্র সঙ্গগুণে আমার হৃদয়ে এই সকল অর্থ ত্তি লাভ করিল। সনাতন গৌরমুখে ‘আত্মারাম’ শ্লোকের বিবিধ তত্ত্বগর্ভ গভীর ব্যাখ্যা শ্রবণ করিয়া বিস্মিত ও পুল- কৃষ্ণভক্তির বাধক যত শুভাশুভ কর্ম। সেই এক জীবের অজ্ঞানতমােধৰ্ম” চৈতন্য চরিতামৃত, আদিখণ্ড, প্রথম পরিচ্ছেদ।

দশম অধ্যায়।
কিত হইয়া বলিলেন, ভাগবতের গভীর তত্ত্ব আপনি ব্যতীত
আর কে জানে? চৈতন্য বলিলেন, কেন আমার স্তুতি করি-
তেছ ? ভাগবত শাস্ত্র আলােচনা করিলেই জানিতে পারিবে,
প্রশ্নোত্তরচ্ছলে প্রতি শ্লোক প্রতি অক্ষরে নানা অর্থ প্রকাশ
করিতেছে। সনাতন! আমি একজন বাতুল, শ্লোকের
ব্যাখ্যাতে যে সকল প্রলাপপাক্তি করিলাম কে তাহা মান্য
করিবে? আমার ন্যায় বাতুলেরাই ভাগবতের এবম্বিধ অর্থ
বুঝিয়া থাকে।
দশম অধ্যায়।
সনাতনের
« বৈষ্ণব-স্মৃতি
প্রণয়ন বিষয়ে
উপদেশ গ্রহণ—বৃন্দাবনযাত্রা এবং সুবুদ্ধি-
রায়ের সহিত মিলন।
'সনাতন বিনয়বচনে চৈতন্যচরণে নিবেদন করিলেন,
প্রভু, আমাকে বৈষ্ণবশ্বতি প্রচার করিতে আদেশ করি-
লেন, কিন্তু আমি আচারভ্রষ্ট হীনজাতি, সদাচার কিছুই জানি
, আমার দ্বারা কখনই ইহা সম্পন্ন হইবে না। আপনি এ
বিষয়ে উপদেশ দিয়া কৃতার্থ করুন। চৈতন্য বলিলেন,
সনাতন, ভগবানের কৃপাতে তােমার অন্তরে সমুদায় তত্ত্ব
প্রকাশিত হইবে। তথাপি সংক্ষেপে সুত্ররূপে কিছু বলি-
তেছি।
প্রথমতঃ গুরু-আশয়, গুরুলক্ষণ, শিষ্যলক্ষণ, গুরু
।

ভক্ত-চরিতামৃত। শিষ্যের পরীক্ষা, মন্ত্রের বিচার, মন্ত্রের অধিকারী নির্ণয় ও দীক্ষা বিষয়ে লিখবে। তৎপরে প্রাতঃকৃত্য-শৌচ-আচমন চন্দন-মাল্যধারণ ও পঞ্চাশৎ উপচারে শ্রীহরির পূজা, নাম- মহিমা, নামাপরাধৰ্জন, বৈষ্ণব-লক্ষণ, বৈষ্ণবনিন্দাপৰিবৰ্জন, অনিবেদিতত্যাগ, সাধুসঙ্গ, অসৎসঙ্গত্যাগ প্রভৃতি সাধারণ সদাচার ও বৈষ্ণবাচার সকল পুরাণবচন প্রমাণ দিয়া লিপি- বদ্ধ করিবে । * আমি তােমাকে সংক্ষেপে বলিলাম, তুমি * সমাজ-প্রচলিত ফলশ্রুতিপর্ণ বিবিধ কাম্যকর্মের যাজনা বৈষ্ণব ধৰ্ম্মে নিষিদ্ধ। সুতরাং ভক্তিপথাবলম্বী সংসার-কামনা-বিহীন বৈষ্ণবদিগের নিমিত্ত পৃথক স্মৃতিশাস্ত্র আবশ্যক হইয়াছিল। যে সকল বৈষ্ণব কর্মকা- ণ্ডের বাহ আড়ম্বর পরিত্যাগ করিয়া আপনাদের বিশ্বাসানুরূপ গৃহ-অনুষ্ঠান সকল অবলম্বন করিতে লাগিলেন, তাঁহারা ক্রমশঃ হিন্দুসমাজ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িলেন। প্রেম-ভক্তি-প্রভাবে জাতিভেদাদি লৌকিকাচার চৈতন্যান্য চরদিগের মধ্যে অনেক পরিমাণে শিথিল হইতেছিল। এই সকল কারণে বৈষ্ণবের ক্রমশঃই পৃথক সম্প্রদায়ে পরিণত হইতেছিলেন। এই সকল ভেকা- শ্রিত অর্থাৎ নিয়মপুৰ্ব্বক বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত বৈষ্ণবদিগের নিমিত্ত চৈতন্য- দেব সনাতনকে বৈষ্ণব-স্মৃতি প্রণয়ন করিতে আদেশ করিয়াছিলেন। বৈষ্ণবগণ সাধারণ হিন্দুসমাজ-প্রচলিত ক্রিয়াকলাপ অগ্রাহ, করিয়া প্রেমভক্তিমার্গ অবলম্বন করায় শাক্ত ও হিন্দুসমাজভুক্ত অন্যান্য সাম্প্রদায়িক গণ বৈষ্ণবদিগকে ক্রিয়াহীন পতিত বলিয়া ঘৃণা করিতেন। শাক্ত, বৈষ্ণবের দ্বন্দ্ব এ দেশের একটা প্রসিদ্ধ প্রবাদ। এই ঘৃণা বিদ্বেষ এতদুর প্রবল হইয়া- ছিল যে, উভয়ে উভয়ের ছায়াস্পর্শ করিতেও ঘৃণা বােধ করিতেন। বৈষ্ণব- গণ গোঁড়ামির চুড়ান্ত দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিয়া শাক্তের ব্যবহৃত পূজার উপকরণ বিৰপত্ৰকে তেড়কার পাতা ও জবাপুষ্পকে ওড়ফুল বলিতেন। শাক্তরাও কম নহেন, তাহারা নিরীহ বৈষ্ণষ্ণগণকে নানাপ্রকার বিদ্রুপ উপহাস করিয়া অপদস্থ করিবার অবসর অন্বেষণ করিতেন। বৈষ্ণবগণের সমাজ বহির্ভূত দশম অধ্যায়। ৩ যখন লিখিতে আরম্ভ করিবে, ভগবান সকল কথা তােমার হৃদয়ে প্রকাশ করিবেন। এই প্রকারে তব শ্রীগৌরাঙ্গ আচার অনুষ্ঠান, জাতিভেদের শিথিলতা ও গৌরাঙ্গের অবতারত্ব লইয়াই বিবাদের সূত্রপাত হয়। কালক্রমে বৈষ্ণব ধর্মের বিস্তার হওয়ায় ও অনেকানেক শাক্তমতাবলম্বী গৃহস্থ ব্যক্তি বৈষ্ণব ধর্ম অবলম্বন করায়, এই বিবাদ ক্রমশঃ প্রশমিত হয়। গােস্বামীগণ নিতান্ত ইতর জাতিকেও মন্ত্র দিয়া শিষ্য করিতেন বলিয়া হিন্দু সমাজের হেয় ছিলেন। এই অসম্মান দূর করিবার জন্য তাঁহারা কুলীনদিগকে কন্যাদান করিতে আরম্ভ করেন। ক্রমশঃ শাক্ত ও বৈষ্ণবগণ পরস্পর আদান-প্রদানরূপ বৈবাহিক সম্বন্ধে সম্বন্ধ হওয়ায় বিদ্বেষ ভাব বিদূরিত হয়, এবং বৈষ্ণবগণ সাধারণ হিন্দুসমাজের অনিবিষ্ট হইয়া পড়েন। গােস্বামীগণ অন্তরে যাগযজ্ঞ কাম্যকর্মের বিরােধী হইয়াও সমাজরক্ষার জন্য বাহিরে তদনুষ্ঠানে ব্যাপৃত হইলেন। এই সময় হইতেই গােস্বামী ও অন্যান্য গৃহস্থবৈষ্ণবগণ সমাজভয়ে বৈষ্ণব পঙ্গতে প্রচ্ছন্নভাবে যােগদান করিতে লাগিলেন। এইরূপে হিন্দু সমাজে শাক্ত বৈষ্ণ- বের মিলন সদ্যটিত হয়, এবং বৈষ্ণবভাব অনেক পরিমাণে সমাজ মধ্যে প্রবেশ লাভ করে। যাহারা সমাজ ত্যাগ করিয়াছেক গ্রহণ করিয়াছিল, যদিও তাহাদেরই জন্য সনাতন গােস্বামী হরিভক্তিবিলাসগ্রন্থে বৈষ্ণবের আচার প্রণালী বিধিবদ্ধ করেন, কিন্তু তাহা এক্ষণে আর কেবল বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে বদ্ধ নাই। আৰ্ত্ত মতের ন্যায় হরিভক্তিবিলাসের মত “গােস্বামীমত” বলিয়া বৰ্তমান হিন্দুসমাজে প্রচলিত হইয়া গিয়াছে। এই বৈষ্ণবস্মৃতি স্বরূপ ইরি- ভক্তিবিলাস গ্রন্থ সনাতন গােস্বামী প্রণীত। “হরিভক্তি বিলাস গ্রন্থ কৈল বৈষ্ণব আচার। বৈষ্ণবের কর্তব্যের যাহা পাই পার ?” চৈতন্য চরিতামৃত, অন্ত্যখও। কিন্তু সচরাচর যে হরিভক্তিবিলাসগ্রন্থ দেখিতে পাওয়া যায়, তাহার রচয়িতা গােপালভট্ট গােস্বামী।

১৪
ভক্ত-চরিতামৃত।
সনাতনকে দুই মাস ধরিয়া প্রেমভক্তিরসের সিদ্ধান্ত সকল
উপদেশ দিলেন। কবিকর্ণপূর “চৈতন্যচন্দ্রোদয়” নাটকে সনা-
তনের প্রতি গৌরচন্দ্রের এই সকল অনুগ্রহবৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ
করিয়া বলিয়াছেন,
“গৌড়েশ্য সভাবিভূষণমণিন্ত্যক্ত। য ঋদ্ধাং প্ৰিয়ং
রূপস্যাগ্রজ এষ এব তরুণী বৈরাগ্যলক্ষ্মীং দধে।
অন্তর্ভক্তিরসেন পূর্ণসরসসা বাহেহবধূতাকৃতিঃ
শৈবালৈ পিহিতং
মহাসূর ইব প্রীতিপ্রদন্তদ্বিদাং।”
গৌড় রাজুসভার অলঙ্কার স্বরূপ শ্রীরূপাগ্রজ এই সনা-
তন। ইনি মহাসমৃদ্ধিলক্ষ্মীকে পরিত্যাগ করিয়া তরুণী-
বৈরাগ্যলক্ষ্মীকে আশ্রয় করিয়াছেন। শৈবাল-সমাচ্ছন্ন
মহাসােবরের ন্যায় ইহার হৃদয় ভক্তিরসে পরিপূর্ণ, কিন্তু
বাহিরে মহা বৈরাগীর বেশ ; ইনি ভগবত্তত্ত্ববিদগণের
প্রীতিপ্রদ।
অনন্তর চৈতদেব নীরস-কৰ্ম্মকাণ্ডের কোলাহলময়
কাশীধামে দণ্ডীদিগের সঙ্গে ভক্তিপ্ৰসঙ্গ করিয়া নীলাদ্রি
গমন করিতে ইচ্ছা করিলেন। সনাতনকে বলিলেন, তােমার
দুই ভাই শ্রীরূপ ও বল্লভ শ্ৰীবৃন্দাবনে গমন করিয়াছেন, তুমি
তথায় গিয়া তাহাদের সঙ্গে মিলিত হও। কন্থাকরঙ্গধারী
আমার কাঙ্গাল ভক্তগণ তথায় গমন করিলে যত্ন করিও।
এই বলিয়া গৌরসুন্দর সকলকে প্ৰেমালিঙ্গন দিয়া নীলাচলে
গমন করিতে উদ্যত হইলেন। মহাপ্রভুর বিরহ-চিন্তা
সনাতনের অসহ্য হইল, কাতর স্বরে তিনি বলিতে
লাগিলেন,

০ দশম অধ্যায়। ৯৫ “দূত কহে সনাতন প্রভুপা পাঞ। পড়িয়া কান্দেন প্রভুর চরণ ধরি। আজ্ঞা হয় চলি আমি শ্রীচরণ সহ। সহিতে নারিখ আমি তােমার বিরহ। প্রভু কহে আগে যা দেখ বৃন্দাবন। • পাছে নীলাচলে মাের পাবে দরশন। বহু যত্নে সনাতনে মথুরা পাঠা। নীলাচল মাত্ৰা কৈলা আনন্দিত হা।” চৈতন্য চন্দ্রোদয় নাটক, নবম অঙ্ক। গৌরচন্দ্র রজনীযােগে নীলাচল উদ্দেশে বহির্গত হই- লেন। চন্দ্রশেখর, তপন মিশ্র প্রভৃতি পাঁচজন শিষ্য তাহার অনুসরণ করিয়া কিয়দ্র গমন করিলে, তিনি সকলকে স্নেহ বচনে প্রবােধ দিয়া প্রতিনিবৃত্ত করিয়া বলিলেন, আমি ঝারি- খণ্ডের আরণ্যপথে একাকী গমন করিব। যার ইচ্ছা হয়, ইহার পর আসিও। তদনন্তর সনাতন রাজপথ ধরিয়া বৃন্দাবন অভিমুখে প্রস্থান করিলেন। এদিকে সনাতনের অনুসন্ধানার্থ রূপ ও বল্লভ বৃন্দাবন হইতে গঙ্গাপথে কাশীযাত্রা করিয়াছেন, সুতরাং পরস্পর সাক্ষাৎ হইল না। সনাতন মথুরাতে উপ- নীত হইলে ধ্রুবঘাটে সুবুদ্ধি রায়ের সহিত তাহার পরিচয় হইল। সুবুদ্ধি রায় পরম সমাদরে সনাতনকে গ্রহণ করি- লেন। এখানে সুবুদ্ধি রায়ের বিষয়ে কিছু বলা যাইতেছে। এই সুবুদ্ধি রায় পূর্বে গৌড়ের একজন ধনবান ভূম্যধিকারী ছিলেন। সেই সময়ে সৈয়দ হুসেন সাহা তাহার কর্মচারী ভক্ত-চরিতামৃত। ছিলেন। দীর্ঘিকাখনন কাৰ্যে সৈয়দ হুসেনের কোন অপ- রাধ পাইয়া বুদ্ধি তাঁহাকে কশাঘাত করিয়াছিলেন। কালের বিচিত্র গতি! কিছুদিন পরে হুসেন সাহা গৌড়ের রাজা হয়েন। হুসেন রাজপদে অধিষ্ঠিত হইয়াও পুরাতন প্রভুর প্রতি যথােচিত সম্মান প্রদর্শন করিতেন; কিন্তু তদীয় ক্ষুদ্ৰহৃদয় স্ত্রী স্বামীর প্রতি সুবুদ্ধি রায়ের কশাঘাত বিস্তৃত হয় নাই। অঙ্গের আঘাতচিহ্ন দেখাইয়া উক্ত নারী সুবুদ্ধির প্রাণদণ্ডের নিমিত্ত স্বামীকে প্ররােচিত করিতে লাগিল। হুসেন কিছুতেই স্বীকৃত না হওয়াতে সেই নারী বলিল, তবে উহার জাতি মারিয়া দাও। হুসেন বলিলেন, জাতি নষ্ট হইলে রায় বাঁচিবেন না। শেষে স্ত্রীর বিশেষ অনুরােধে হুসেন সুবুদ্ধি রায়ের মুখে জল ছিটাইয়া দিলেন। জাতিভ্রষ্ট সুবুদ্ধি রায় ঘৃণা, লজ্জা ও নির্বেদে ম্রিয়মাণ হইয়া বিষয় বিভব পরি- ত্যাগ করত বারাণসীতীর্থে উপনীত হইয়া তত্ৰত্য পণ্ডিত- দিগের নিকট প্রায়শ্চিত্তবিধান জিজ্ঞাসা করিলেন। শাস্ত্র- দশী ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা এই পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ তপ্ত ঘৃত ভক্ষণ করিয়া প্রাণত্যাগ করিতে ব্যবস্থা দিলেন। শুদ্ধ-কৰ্ম্ম- কাণ্ড আশ্রয়ী পণ্ডিতদিগের উপদেশে ঘৃত ভক্ষণে আত্মহত্যা করা সুবুদ্ধি রায় সঙ্গত মনে করিলেন না। এই সময়ে বারা- পশীতে চৈতন্যচন্দ্র বাস করিতেছিলেন। ভক্তগােষ্ঠীর ভক্তি প্রসঙ্গ ও প্রেমবিগলিত হরিনামসংকীর্তনের প্রবল প্লাবনে কাশীর ন্যায় নীরস স্থানও সরভাব ধারণ করিয়াছিল। সুবুদ্ধি রায় শ্রীচৈতন্যের বিষয় অবগত হইয়া তাহার নিকটে উপস্থিত হইলেন এবং আদ্যোপান্ত সমুদায় বৃত্তান্ত নিবেদন দশম অধ্যায়। ১৭ করিলেন। চৈতন্য বলিলেন ;- ইহা হইতে যাহ বৃন্দাবন। নিরন্তর কর কৃষ্ণ নাম সংকীর্তন। এক নামাভাসে তােমার পাপ দোষ যাবে। আর নাম লইতে কৃষ্ণচরণ পাইবে । আর কৃষ্ণ নাম লৈতে কৃষ্ণ স্থানে স্থিতি। মহাপাতকের হয় এই প্রায়শ্চিত্তি । চৈতন্য চরিতামৃত, মধ্যখণ্ড। হে রায় ! তুমি শ্রীবৃন্দাবনে গিয়া নিরন্তর হরিনাম সংকীৰ্ত্তন কর। এক নামে তােমার পাপদোষ নষ্ট হইবে, দ্বিতীয় নামে হরিচরণারবিন্দ লাভ করিবে, এবং তৃতীয় নামে কৃষ্ণসহবাসে স্থান পাইবে, ইহাই মহাপাতকের প্রায়শ্চিত্ত- বিধি। ভক্তবর চৈতন্যের আদেশ শিরােধার্য্য করত রায় অযযাধ্যা ও নৈমিষারণ্য পরিভ্রমণ করিয়া বৃন্দাবনে আসি- লেন। এখানে আসিয়া সুবুদ্ধি রায় উৎকট বৈরাগ্যব্রত অবলম্বন করিলেন। শুষ্ক কাষ্ঠ সংগ্রহ করিয়া মথুরার বাজারে বিক্রয় করেন, এক এক বােঝা কাষ্ঠ বিক্রয় করিয়া পাঁচ ছব পয়সা মাত্র উপার্জন হয়। তন্মধ্যে আপনি এক পয়সার চণক চর্বণ করিয়া জীবন ধারণ করেন, অবশিষ্ট পয়সা দ্বারা দুঃখী বৈষ্ণব দেখিতে পাইলে ভােজন করান এবং বাঙ্গালি দেখিলে দধিভাত খাওয়ান ও তৈল মাখান। কিছু দিন পরে রূপ গােস্বামীর সঙ্গে তাহার মিলন হয়। পরে সনাতন গােস্বামীকে পাইয়া সুবুদ্ধি পরমানন্দে মগ্ন হই- লেন। পরম বৈরাগী সনাতন সুবুদ্ধির স্নেহ যত্ন ভাল ভক্ত-চরিতামৃত। বাসিতেন না, তিনি একাকী প্রতি বৃক্ষমূলে ও প্রতিদিন নব নব কুঞ্জে দীন ভাবে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন এবং মথুরামাহাত্ম শাস্ত্র সংগ্রহ পূর্বক বনে বনে পৰ্যটন করিয়া বৃন্দাবনের লুপ্ততীর্থ সকল উদ্ধার করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। শেষাবস্থায় রূপ ও সনাতন দুই ভাই শ্ৰীবৃন্দাবনে বাস করি- তেন। নিরন্তর হরিনামকীর্তন ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও ভক্তিশাস্ত্র প্রণয়ন করিয়া দিন কাটাইতেন। চৈতন্যানুবর্তী সাধকদিগের মধ্যে ইহারা জ্ঞান বৈরাগ্যও ভগবদ্ভক্তিতে সৰ্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। এবং ইহারাই বিবিধ গ্রন্থ ও ভক্তিশাস্ত্র প্রণয়ন করিয়া এদেশে বৈষ্ণবধর্ম প্রচারের বিশেষ সহায়তা করেন। বৃন্দাবন প্রত্যাগত বৈষ্ণব সাধকগণকে চৈতন্য ও তাহার পারিষদগণ রূপ সনাতনের বিষয় সর্বাগ্রে জিজ্ঞাসা করিতেন। ভক্তগণ বলিতেন, “তাহারা গৃহ পরিত্যাগ করিয়া এক এক বৃক্ষমূলে এক এক রাত্রি শয়ন করেন, কখন বা বিপ্রগৃহে স্কুলভিক্ষা, কখন বা দ্বারে দ্বারে মাধুকরী, কখন বা কেবল শুষ্ক রুটী ও চণক ভক্ষণ করিয়া জীবন ধারণ করেন। পরিধানে ছিন্ন বহির্বাস মাত্র। হরিনাম সংকীর্তন ও হরিনাম প্রসঙ্গে অষ্টপ্রহরই মগ্ন হইয়া থাকেন, চারিদণ্ড মাত্র নিদ্রা যান, তাহাও সকল দিন ঘটে না। শ্রীচৈতন্যের পবিত্র চরিত্রচিন্তন, বৃক্ষতলে নির্জনে উপবিষ্ট হইয়া ধর্মগ্রন্থানুশীলন ও ধর্মগ্রন্থ প্রণয়ন করিয়া তাহারা কালাতিপাত করেন।” ভক্তগণের মুখে রূপ সনাতনের প্রশংসা শ্রবণ করিয়া চৈতন্য ও শিষ্যগণ পরমানন্দে মগ্ন হইতেন। “মহাপ্রভুর ছিল যত বড় ভক্ত মাত্র। রূপ সনাতন সবার কৃপা গৌরব পাত্র ।

দশম অধ্যায়।
কেহ যদি দেশে যায় দেখি বৃন্দাবন।
তারে প্রশ্ন করেন প্রভুর পারিষদগণ
কহ তাহা কৈছে রহে রূপ সনাতন।
কৈছে রহে কৈছে বৈরাগ্য কৈছে ভোজন ।
কৈছে অষ্ট প্রহর করেন শ্রীকৃষ্ণ ভজন।
তবে প্রশংসিয়া কহে সেই ভক্তগণ।
অনিকেতন দুহে রহে যত বৃক্ষগণ।
একেক বৃক্ষের তলে একেক রাত্রি শয়ন।
বিপ্রগৃহে স্কুল ভিক্ষা কঁহা মাধুকরী।
ও রুটী চাণ চিবায় ভােগ পরিহরি।
করােয়া মাত্র হাতে কঁাথা ছিড়া বহির্বাস।
কৃষ্ণ কথা কৃষ্ণ নাম নৰ্তন উল্লাস।
অষ্টপ্রহর কৃষ্ণভজন চারিদণ্ড শয়নে।
নাম কীর্তন প্রেমে সেই নহে কোন দিনে।
কভু ভক্তিরস শাস্ত্র করয়ে লিখন।
চৈতন্য কথা শুনে করে চৈতন্য চিন্তন।
এই কথা শুনি মহান্তের মহা সুখ হয়।
চৈতন্যের কৃপা যাহা তাহা কি বিস্ময়।”
চৈঃ চঃ মধ্যখণ্ড, ১৯শ পরিচ্ছেদ।
“তবে চলি গেল গােসাঞি শ্রীবৃন্দাবন ৭
অলৌকিক অসম্ভব গােসাঞির প্রেম।
বৈরাগ্যের সীমা আর আপতিত নেম।
• মূর্তিমান মহাতেজ সমুদ্র গম্ভীর।
শাস্ত্রান্তগা পৃথিবীর মধ্যে একধীর।

।
১০০
ভক্ত-চরিতামৃত।
প্রতিদিন এক এক বৃক্ষতলে বাস।
প্রতিদিন পরিক্রমা নাহিক আলস।
বৃক্ষতলে থাকি সদা গ্রন্থানুশীলন।
অলক্ষ্যে করেন পরিক্রমা বৃন্দাবন ॥”
ভক্তমাল গ্রন্থ, দ্বিতীয়মালা।
একাদশ অধ্যায়।
শ্রীরূপের নীলাদ্রি গমন।
পূৰ্বে কথিত হইয়াছে, সনাতন গােস্বামী চৈতন্য প্রভুর
নিকট বিদায় লইয়া বৃন্দাবনধামে উপনীত হইবার পূর্বেই
রূপ গােস্বামী কনিষ্ঠ ভ্রাতা অনুপমকে সঙ্গে লইয়া সনাতনের
উদ্দেশে গঙ্গাপথে যাত্রা করিয়াছেন। তাহারা প্রয়াগে উত্তীর্ণ
হইয়া সনাতনের বৃন্দাবন গমন সংবাদ অবগত হইলেন।
তৎপরে কাশীতে উপনীত হইয়া তপনমিশ্র ও চক্কশেখর
প্রভৃতির সহিত মিলিত হইলেন। সনাতনের প্রতি প্রভুর
অনুগ্রহ ও প্রেমভক্তিতত্ত্ব শিক্ষাদানের বিষয় অবগত হইয়া এবং
কাশীবাসী দঙী পরমহংসদিগের মুখে চৈতন্য প্রভুর মাহাত্ম্য
শ্রবণ করিয়া রূপ অতিমাত্র আনন্দ লাভ করিলেন। কাশীতে
কিছুদিন অবস্থিতি করত তাহারা' গৌড়দেশ অভিমুখে যাত্রা
করিলেন। ইতিপূৰ্বে বৃন্দাবনধামে অবস্থান কালে রূপ
গােস্বামী কৃষ্ণলীলা নাটক লিখিতে আরম্ভ করেন। নাটকের

একাদশ অধ্যায়। কিয়দংশ অর্থাৎ মঙ্গলাচরণ ও নান্দীশ্লোক বৃন্দাবনেই লিখিত হইয়াছিল। এক্ষণে পথে যাইতে যাইতে নাটকের ঘটনা ভাবিতে লাগিলেন ও তাহা কড়চা করিয়া লিখিয়া রাখিতে লাগিলেন। এইরূপে তাহারা বঙ্গদেশে আসিয়া পৌছিলে অকস্মাৎ জ্বরবিকারে অনুপমের পরলােক প্রাপ্তি হয়। এই সময়ে গৌরচন্দ্র নানাতীর্থ পৰ্যটন করিয়া নীলাচলে আসিয়া বাস করিতেছিলেন। বঙ্গদেশের ভক্তগণ এই সংবাদ পাইবা- মাত্র তথায় গমন করিতে লাগিলেন। রূপও প্রভুকে দর্শন করিবার জন্য উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিলেন। কিন্তু অনুপমেৰ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াদি সমাধা করিতে তাহার কিছু বিলম্ব হইল। তিনি নবদ্বীপে আগমন করিয়া দেখিলেন, ভক্তবৃন্দ চলিয়া গিয়াছেন। রূপ কালবিলম্ব না করিয়া একাকী নীলগিরি গমন করিতে মনস্থ করিলেন। গৌড় হইতে রূপ গােস্বামী নীলাচল আসিবার কালে উড়িষ্যাদেশে সত্যভামাপুর নামক কোন গ্রামে এক রাত্রি বিশ্রাম করেন। এইখানে তিনি নিশাকালে স্বপ্ন দেখেন, যেন এক দিব্যরূপধারিণী রমণী আসিয়া বলিলেন, “আমার নাটক পৃথকরূপে রচনা করিবে। স্বপ্নের কথা মনে মনে বিচার করিয়া রূপ এই সিদ্ধান্ত করিলেন যে, শ্রীকৃষ্ণের ব্রজ- লীলা ও দ্বারকালীলা একত্রে লিখিবার সংকল্প করিয়াছি, এই জন্য সত্যভামা দুই লীলা স্বতন্ত্ররূপে 'লিখিবার জন্য আদেশ করিলেন। তদনন্তর রূপ পুরুষােত্তমক্ষেত্রে সমাগত হইয়া হরিদাসের আশ্রমে বাস করিতে লাগিলেন। হরিদাস নীচ- জাতি যবন, এইজন্য জগন্নাথপুরীতে থাকিতেন না, এক্ষেত্রের =

১০২
ভক্ত-চরিতামৃত।
অনতিদূরে নির্জন স্থানে একটী সামান্য কুটীরে হরিনামরসে
নিমগ্ন থাকিতেন।* চৈতন্যদেব প্রতিদিন হরিদাসের কুটীর
শাসিয়া তাহার সঙ্গে ভগবৎপ্রসঙ্গে মগ্ন হইতেন। রূপ যে
দিন হরিদাসের কুটীরে উপস্থিত হইলেন, সে দিন শ্রীচৈতন্য
তথায় আগমন করিলে রূপ ও হরিদাস তাঁহাকে প্রণাম
করিলেন। বােধ হয় চৈতন্য রূপকে প্রথমে লক্ষ্য করেন
নাই। হরিদাস বলিলেন, রূপ প্রণাম করিতেছেন। রূপের
নাম শুনিয়া চৈতন্যদেব মহা আনন্দিত হইয়া তাহাকে আলি-
• ঙ্গন করিয়া কুগলপ্রশ্ন করিতে লাগিলেন। সনাতনের বিষয়
জিজ্ঞাসা করিলে রূপ বলিলেন, আমি গঙ্গাতীরের পথে
আসিয়াছি, প্রয়াগে আসিয়া শুনিলাম তিনি রাজপথে বৃন্দা-
t
* হরিদাস ও রূপ সনাতন আপনাদিগকে নীচজাতি জ্ঞান করিয়া
জগন্নাথমন্দিরে গমন করিতেন না, তাঁহারা শ্রীক্ষেত্রের বহির্দেশে অবস্থান
করিতেন। সনাতন ও রূপ নীলাচলে গিয়া হরিদাসের আশ্রমেই বাস
করিয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে যিনি যখন নীলাচলে থাকিতেন, চৈতন্যদেব
প্রতিদিন আসিয়া তাহার সহিত সাধন ভজন প্রেমালাপে কিছুক্ষণ যাপন
করিতেন। ফলতঃ রূপ সনাতন যে'যবনভাবাপন্ন ছিলেন, এই ঘটনায় তাহা
আবও বিস্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়।
“হরিদাস ঠাকুর শ্রীরূপ সনাতন।
# জগন্নাথ মন্দিরে এই নাযান তিনজন।
মহাপ্রভু জগন্নাথের উপলভােগ দেখিয়া ।
নিজ গৃহে যান এই তিনেরে মিলিয়া।
এই তিন মধ্যে যবে থাকে যেই জন।
তারে আসি আপনে মিলে প্রভুর নিয়ম।”
চৈতন্য চরিতামৃত, মধ্যখণ্ড ১ম পরিচ্ছেদ।

একাদশ অধ্যায়। বন গমন করিয়াছেন। তাহার সহিত আমার সাক্ষাৎ হয় নাই। অনুপমের গঙ্গালাভসংবাদ রূপ নিবেদন করিলে চৈতন্য দুঃখ প্রকাশ করিলেন। রূপকে হরিদাসের তত্ত্বা বধানে রাখিয়া চৈতন্যদেব সে দিনের মত বিদায় হইলেন। পরদিনে ভক্তগণকে সঙ্গে লইয়া আসিলেন ও রূপ গােস্বামীর সঙ্গে নিত্যানন্দ অদ্বৈত প্রভৃতি বঙ্গদেশীয় ও উড়িষ্যাবাসী ভক্তগণের পরিচয় করাইয়া দিলেন। রূপ বিনয়ে অবনত হইয়া ভক্তগণের চরণবন্দনা করিলেন। রূপের নিরভিমান গভীর জ্ঞান, বিনয়, সৌজন্য ও ভক্তিভাব সন্দর্শন করিয়া ভক্তগণ পরম প্রীতি লাভ করিলেন। অদ্বৈত ও নিত্যা- নন্দকে চৈতন্য বলিলেন,- -রূপে কৃপা কর কায়মনে। তােমা দুর কৃপায় ইহার তৈছে হউক শক্তি। যাতে বিরচিতে পারেন কৃষ্ণরস ভক্তি।” রূপ, হরিদাসের সঙ্গে নিভৃতে পরমানন্দে বাস করিতে লাগিলেন। চৈতন্য প্রতিদিন আসিয়া কিছুক্ষণ ইষ্টালাপ করিয়া যান। ক্রমে জগন্নাথের রথযাত্রা আসিয়া উপস্থিত হইল। রূপ জগন্নাথবিগ্রহ ও ভক্তগণের নৃত্যকীৰ্ত্তন দেখিয়া শুনিয়া কৃতার্থ হইলেন। রথ বাহির হইলে, গৌর- সুন্দর মহাভাবে বিভাের হইয়া একটী, সামান্য আদিরসের শ্লোক পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ করিয়া রথের অগ্রে নাচিতে লাগি লেন। স্বরূপদামােদর ব্যতীত এই শ্লোকের ভাবার্থ আর কেহই জানিত না। এই শ্লোকের সঙ্গে, প্রভুর হৃদয়ের কি সম্বন্ধ, কেনই বা তিনি বারম্বার ইহা উচ্চারণ করিতেছেন, ང་ ভক্ত-চরিতামৃত। তা কেহই বুঝিতে পারিল না। শ্লোকটী এই ঃ- “যঃ কৌমার হরঃ সবহি বরস্তাব চৈত্ৰক্ষপ স্তেচান্মীলিত মালতী সুরভয়ঃ প্রৌঢ়াঃ কদম্বানিলাঃ। সা চৈবাস্মি তথাপি তত্র সুরতব্যাপারলীলা বিধৌ রোেধসি বেতসীতরুতলে চেতঃ সমুৎকণ্ঠতে।” কোন নায়িকা সখীকে সম্বােধন করিয়া বলিতেছে, যিনি কৌমারবয়সে আমার মনােহরণ করিয়াছিলেন, তিনি এখনও আমার কান্ত রহিয়াছেন; পূর্বের ন্যায় মধুযামিনীও বৰ্তমান, প্রস্ফুটিত মালতী কুসুমের সুরভিসংপৃক্ত পরমসুখ- দায়ক সেই বসন্তানিলও প্রবাহিত হইতেছে, এবং সেই আমিও রহিয়াছি; তথা প্রমােদলীলাবিষয়ে রেবাতীরবর্তী সেই বেতসীকুঞ্জ মনে করিয়া আমার চিত্ত সমুৎকণ্ঠিত হইতেছে। রাধাকৃষ্ণের কুরুক্ষেত্রে মিলনাভিনয় স্মৃতিপথে উদিত হওয়াতে তৎভাবানুবিদ্ধহৃদয়ে চৈতন্যদেব এই শ্লোক আবৃত্তি করিয়াছিলেন। রূপ গােস্বামী তাহার মনােভাব বুঝিতে পারিয়া তৎক্ষণাৎ এই শ্লোকের অনুরূপ নিম্নলিখিত কবি- তাটী রচনা করিলেন। “প্রিয়ঃ সােহয়ং কৃষ্ণঃ সহচরি কুরুক্ষেত্র মিলিত স্তথাহং সা রাধা তদিদমুভয়াের সঙ্গমসুখং। তথাপ্যন্তঃ খেলধুরমুরলী পঞ্চম জুষে মনন মে কালিন্দীপুলিন বিপিনায় হয়তি ।” শ্রীরাধা কুরুক্ষেত্রে কৃষ্ণসহ মিলিত হইয়া সখীকে বলি- তেছেন, হে সহচরি! বৃন্দাবনবিহারী প্রাণবল্লভ সেই শ্রীকৃষ্ণ একাদশ অধ্যায়। 'এই প্রভাসযজ্ঞস্থলে উপস্থিত, এবং আমিও এখানে তাহার সহিত মিলিত হইয়াছি, আমাদের পরস্পর মিলনজনিত সুখও সেইরূপ। তথাপি ব্রজধামের নিকুঞ্জকাননােখিত ক্রীড়াশীল মধুরমুরলীরবে যে যমুনাপুলিন আন্দোলিত হইত, তাহার জন্য আমার মন সমুৎসুক হইতেছে। রথ ভাঙ্গিয়া গেলে সকলে আপন আপন আশ্রমে চলিয়া গেলেন। রূপ শ্লোকটা তালপত্রে লিখিয়া চালে গুজিয়া রাখিয়া সমুদ্রস্নানে গমন করিয়াছেন, এমন সময়ে শ্রীগৌরাঙ্গ হরিদাসের আশ্রমকুটীরে আসিয়া উর্দ্ধে দৃষ্টি করিবামাত্র তাল- পত্রে লিখিত সেই শ্লোক দেখিয়া প্ৰেমাবিষ্ট হইয়া পড়িলেন। রূপ স্নান করিয়া আসিয়া তাহাকে তদবস্থায় দেখিলেন এবং প্রাঙ্গণ হইতে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিলেন। চৈতন্য প্রভু আদর করিয়া রূপের পৃষ্ঠে চাপড় মারিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার হৃদয়ের গূঢ় ভাব তুমি কিরূপে টের পাইলে? স্বরূপকে এই শ্লোক দেখাইয়া বলিলেন, “বলদেখি, রূপ আমার মনের কথা কেমন করিয়া জানিল ?” স্বরূপ উত্তর করিলেন, তােমার কৃপা না হইলে কে তাহা জানিতে পারে ? গৌর বলিলেন, নিগূঢ় রসের মীমাংসা বিষয়ে রূপ যে ষােগ্যপাত, প্রয়াগে মিলনকালে তাহা আমি বুঝিয়াছিলাম। এই জন্য ইহাকে শক্তিসঞ্চার করিয়া অনেক বিষয় উপদেশ দিয়াছি। তুমিও ইহাকে রসশাস্ত্রের গুঢ়তত্ব বলিয়া দিও। এই সময়ে রূপ নাটক রচনাতে নিযুক্ত ছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলা ও পুরলীলা পৃথক ভাবে লিখিবার কথা বােধ হয় চৈতন্য অবগত হইয়াছিলেন ; এক দিন গৌর ভক্ত-চরিতামৃত। বলিলেন, “কৃষ্ণকে বাহির নাহি করিহ ব্ৰজ হইতে। ব্রজ ছাড়ি কৃষ্ণ কভু নাযান কঁহাতে।” । * বৈষ্ণবদিগের মতে কৃষ্ণ দুইজন। যদুবংশ সন্তুত কৃষ্ণ আর নন্দনন্দন কৃষ্ণ। বৈষ্ণবেরা গােপেন্দ্রনন্দন কৃষ্ণকেই মাধুৰ্য্যভাবে ভজনা করিয়া থাকেন। তাঁহাদের মতে নন্দনন্দন কৃষ্ণ ব্রজভূমি পরিত্যাগ করিয়া কখন অন্যত্রে গমন করেন না। প্রমাণ স্বরূপে তাহারা লঘুভাগবতামৃতধৃত এই যামল বচন উল্লেখ করেন। “কৃষ্ণোঙ্গো যদুসন্ধুতাে যন্তু গােপেনন্দন। বলাবনং পরিত্যজ্য স কচিয়ৈব গচ্ছতি ॥” বৈষ্ণব টীকাকার বলেন, “যঃ কৃষ্ণো যদুসততঃ স বৃন্দাবন পরিত্যজ্য মথুরায়াং গচ্ছতি। যাে নন্দনন্দনঃ কৃষ্ণঃ স বৃন্দাবনং পরিত্যজ্য পাদমেকং কচিৎ ন গচ্ছতত্যব।” এই কথার সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য বৈষ্ণবাচার্যের। বলেন যে, যৎকালে বসুদেব কংসের কারাগার হইতে কৃষ্ণকে বৃন্দাবনে নন্দ- লয়ে লইয়া যান, সেই সময়ে তাঁহার ক্রোড় হইতে কৃষ্ণ যমুনাসলিলে পড়িয়া গিয়াছিলেন। তিনি ব্যাকুল হইয়া অন্বেষণ করিবামাত্র কৃষ্ণকে প্রাপ্ত হন। বসুদেব যাহাকে জল হইতে উদ্ধার করেন, তিনি শচক্রাদিধারী নহেন, দ্বিভূজমুরলীধরমুর্তি, নন্দনন্দন কৃষ্ণ 'আর দেবকীগর্ভজাত বাসুদেবকৃষ্ণ যমুনা গত হইয়া রহিলেন। পরে যখন অত্রুর ব্রজ হইতে কৃষ্ণকে মথুরায় লইয়া আই- সেন, তখন যমুনার জলে স্নান করিবার সময় তিনি জলের মধ্যে কৃষ্ণকে দর্শন করেন। এই সময়ে গােপেন্দ্রনন্দন রথ হইতে পুনরায় যমুনানীরে গমন করেন ও পূর্বোক্ত যমুনাগত বাসুদেব কৃষ্ণ রথে উখিত হইয়াছিলেন। সম্বন্ধে আর একটী আখ্যায়িকা এই যে, যশােদা একটী কন্যা ও একটী পুত্র প্রসব করিয়াছিলেন। বসুদেব স্বীয় পুত্র সহ যশােদা গৃহে প্রবেশ করিয়া আত্মতনয়সদৃশ যশােদাতনয়কে ক্রোড়ে লইবামা, মেয়ে যেমন বিদ্যুৎ বিলীন হইয়া যায়, সেইরূপ নন্দসুতে বসুদেবহৃত বিলীন হইয়া গিয়াছিলেন।

একাদশ অধ্যায়। দুই লীলা স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করিবেন, রূপের এই ইচ্ছা ছিল, এক্ষণে চৈতন্যের সম্মতি পাইয়া উৎসাহিত হইলেন, দুই কৃষ্ণের পার্থক্য প্রদর্শনের জন্যই পরবর্তী বৈষ্ণবগণ এই সকল আধুনিক আখ্যায়িকার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন। বৈষ্ণবদিগের মতে এই দ্বিভুজ- মুরলীধর পীতাম্বর নন্দনন্দন কৃষ্ণই স্বয়ং ভগবান। গােলােকধামে গােপগােপী- দিগের সঙ্গে তাহার যে মাধুৰ্য্যলীলা, তাহা অনাদি অন্তহীন ও নিত্য। অদ্যাবধি জ্যোতির্ময় ব্রহ্মপুরে সেই নিত্যলীলা তরঙ্গ অবিশ্রাম তরঙ্গায়িত হইতেছে। প্রপঞ্চময় বৃন্দাবন-লীলা এই অপ্রকট নিত্যলীলার বাহ বিকাশ মাত্র। এই মাধুৰ্যময়ী নলীলা প্রকটন জন্য স্বয়ং ভগবানের যে অবতরণ, তাহাই পূর্ণা- বতার।।তদ্ব্যতীত অসুর-সংহার ও যুগধর্মপ্রবর্তন নিমিত্ত যুগাবতার এবং বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ-সাধনাথ ব্রহ্মা বিষ্ণু রুদ্ররূপে শ্রীহরির গুণাবতার প্রভৃতি উক্ত পূর্ণ পুরুষের অংশ শক্তি মাত্র। সচ্চিদানন্দ-স্বরূপ পূর্ণ ব্রহ্মের অসংখ্য শক্তি বিশ্বষ্টিতে অবতীর্ণ হইয়া সৃষ্টিলীলা রক্ষা করিতেছে, সুতরাং অবতারও অসংখ্য। কিন্তু লােক সকলকে শুদ্ধভক্তি শিক্ষা দিয়া নির্মল প্রেমের অধিকারী করিবার জন্য স্বয়ং ভগবান পূর্ণরূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। “অনুগ্রহায় ভূতানাং মানুষং দেহমাত। ভজতে তাদৃশীঃ ক্রীড়াঃ যাঃ ঞ তৎপরােভবেৎ।” (ভাগবত।) ভগবান ভূত সকলকে কৃপাদানের জন্য লীলাচ্ছলে ইহলােকে দেহ ধারণ করেন, তিনি মানব দেহ ধারণ করিয়া মানহােচিত লীলা করেন, যাহা শ্রবণ করিয়া মনুষ্য তাঁহাকে শ্রেষ্ঠজ্ঞান করত তাহাতে রত হয়। এই পূর্ণাবতাররূপ নলীলা প্রকটনজন্য ভগবান স্বতন্ত্র দেহ ধারণ না করিয়া, যুগাবতার কালে তদীয় অংশস্বরূপ ক্ষীরােদশায়ী নারায়ণ দেবকীগর্তে শ্রীকৃষ্ণরূপে অবতীর্ণ হইলে সেই দেহে আবিভূত হইয়া ব্রজধামে প্রেমলীলা প্রকটিত করিয়া- ছিলেন।' অপিচ ভগবানের পূর্ণাবতার কালে অংশাবতার যুগাবতার প্রভৃতি সকলেই সেই বিগ্রহে আসিয়া মিলিত হয়। পুণতম স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণের ভক্ত-চরিতামৃত। এবং পৃথক পৃথক নান্দীপ্রস্তাবনা লিখিয়া লীলাভেদে বিদগ্ধ । মাধব ও ললিতমাধব নামে সংস্কৃত ভাষায় দুইখানি নাটক লিখিতে লাগিলেন। রূপ গােস্বামী কেবল বিষয়বিরাগী হরিভক্ত সাধু ও সংস্কৃতশাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন তাহা নহে, তিনি একজন প্রতিভাশালী কবি। এই সকল গ্রন্থে তাহার ভাবমাধুৰ্য, পদলালিত্য ও স্বাভাবিক কবিত্বশক্তি অতি উজ্জল- রূপে প্রকাশিত হইয়াছে। একদিন হরিদাসের আশ্রমে বসিয়া রূপ নাটক লিখিতে- ছেন, এমন সময়ে চৈতন্যদেব সেইখানে আসিয়া উপস্থিত ০ পূর্ণাবতার সময়ে অর্থাৎ বৈবস্বত মন্বন্তরের অষ্টাবিংশ চতুযুগের দ্বাপর যুগের শেষে পালনকর্তা বিষ্ণুর ভূভারহরণ নিমিত্ত যুগাবতারের কাল উপস্থিত হওয়ায় উভয়ে একত্রে অবতীণ হইয়া ব্রজলীলা প্রকটন ও যুগধর্ম সংস্থাপন করিয়া- ছিলেন। এই জন্য বৈষ্ণবমতে যিনি যুগাবতার, তিনি যদুবংশােদ্ভব ও ভগ- বানের অংশ; আর চিন্দাবনস্থ নিত্যলীলাবিহারী স্বয়ং ভগবান ননন্দন কৃষ্ণ প্রাকৃত বৃন্দাবনে 'শান্ত দাস্থ সখ্য বাৎসল্য ও মধুর ভাবের নির্মল ভক্তি প্রবর্তিত করিয়াই অন্তহৃত হইয়াছিলেন, তিনি কখনও বৃন্দাবন পরিত্যাগ করেন নাই। যদুকুলােদ্ভূত অংশাবতার কৃষ্ণই বৃন্দাবন হইতে মধুর গমন করিয়াছিলেন। এইরূপে বৈষ্ণবেরা দুই কৃষ্ণের স্বাতন্ত্র রক্ষা করিয়াছেন। কিন্তু শ্রীমৎ সনাতন ও রূপ গােস্বামী প্রভৃতি দুই কৃষ্ণের ঈদৃশ পার্থক্য স্বীকার করিয়া কৃষ্ণের ত্রিবিধ প্রকাশ মাত্র বণনা করিয়াছেন । রূপ গােস্বামী ভক্তিরসামৃতসিন্ধুতে বলিয়াছেন, মাধুৰ্য্যপূর্ণ ব্রজে তিনি পূর্ণতম, মধুরা ও দ্বারকাদিধামে পূর্ণতর ও পূণরূপে প্রকাশিত। শ্রীমদ্বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ভাগ- বতের টীকায় বলিয়াছেন, ব্ৰজে যিনি গােপ, তিনিই পূণতম ঈশ্বর কৃষ্ণ, মথুরা ও দ্বারকাপুরে তিনি পুণতর এবং যিনি ক্ষত্রিয়রুপ যুদ্ধবিগ্রহ স্থলে প্রকট, তিনি পূর্ণ কথিত হইয়া থাকেন।

একাদশ অধ্যায়।
ইলেন, এবং কি পুথি লিখিতেছ? বলিয়া লিখিত
পুস্তকের একটা পাতা টানিয়া লইলেন। প্রথমতঃ রূপের
হস্তাক্ষরের প্রশংসা করিয়া চৈতন্য বিদগ্ধমাধবের সেই
শ্লোকটী পড়িতে লাগিলেন।
. “তুণ্ডে তাণ্ডবিনী রতিং বিতনুতে তুণ্ডাবলীলৰূয়ে।
কর্ণক্রোড়কড়ম্বিনী ঘটয়তে কর্ণাৰ্ব্বদেভ্যঃ স্পৃহাং।
চেতঃ প্রাঙ্গণসঙ্গিনী বিজয়তে সৰ্বেন্দ্ৰিয়াণাং কৃতিং।
নােজানে জনিতা কিয়ত্তিরমূক্তৈ কৃষ্ণেতি বর্ণদ্বয়ী ।”
‘কৃষ্ণ' এই দুইটী, বর্ণ যে কি পরিমাণ অমৃত দিয়া গঠিত
হইয়াছে তাহা জানিনা। যখন ইহা রসনাতে নৃত্য করিতে
থাকে, তখন আরও বহু রসনা লাভ করিতে ইচ্ছা হয়, যখন
কর্ণরন্ধে অঙ্কুরিত হয়, তখন অৰ্ব্বদ সংখ্যক কর্ণ পাইবার জন্য
স্পৃহা জন্মে, এবং চিত্তপ্রাঙ্গণে প্রবৃষ্ট হইল সমুদায় ইন্দ্রিয়-
ব্যাপার ইহার নিকট পরাস্ত হইয়া যায়। এই মাধুৰ্য্য-রস
সিঞ্চিত হরিনাম-মাহাত্ম্য-ব্যঞ্জক অপূর্ব শ্লোক পাঠ করিতে
করিতে প্রেমরসময় গৌরচন্দ্র মােবিষ্ট হইয়া পড়িলেন।
হরিদাস উল্লাসে নৃত্য করিতে করিতে বলিলেন, শাস্ত্র ও
সাধুমুথে নামমাহাত্ম্য শ্রবণ করিয়াছি, কিন্তু এমন সুধামাখা
নাম-মহিমা কখনও শুনি নাই।
আর এক দিন গৌরসুন্দর, সাৰ্বভৌম ভট্টাচাৰ্য, রায়
রামানন্দ ও স্বরূপ প্রভৃতি ভক্ত পণ্ডিতগণে পরিবৃত হইয়া
রূপের সন্নিধানে আসিলেন। গৌরের মুখে রুপের প্রশংসা
আর ধরে না, সমস্ত পথ ভক্তগণ সমীপে রূপের গুণ বর্ণনা
করিতে লাগিলেন। ভক্তবৃন্দসহ প্রভুকে দেখিয়া রূপ ও হরি-
A

ভক্ত-চরিতামৃত। দাস সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করিয়া তাহাদিগকে পিড়ার পরে বসা ইলেন এবং আপনারা ভূমিতলে উপবিষ্ট হইলেন। চৈতন্য প্রভু বলিলেন, রূপ! সেই অমৃতময় শ্লোক আবার পড়। রূপ গােসাঞি বিনয়ে অধােবদন, লজ্জাতে পড়িতে না পারিয়া মৌনভাব অবলম্বন করিলেন। তখন স্বরূপ গোসাঞি, চৈত- তের হৃদয়ানুবাদের সেই কবিতা ভক্তগণকে শুনাইলে সকলেই চমৎকৃত হইলেন। এইবার শ্রীচৈতন্য রূপকে নাটকের নাম মাহাত্মের শ্লোকটী পড়িতে আদেশ করিলেন। রূপ গৌরের পুনঃপুনঃ অনুরােধে বিদগ্ধমাধব নাটকের সেই শ্লোক আবার পাঠ করিলেন। শ্রীকৃষ্ণের নামমাহাত্ম্যযুক্ত কবিত্ব- রসপূর্ণ শ্লোকের রসাস্বাদন করিয়া রামানন্দ প্রমুখ ভক্তগণ আনন্দ ও বিস্ময়ে উৎফুল্ল হইয়া বলিতে লাগিলেন, এমন মধুময় নামমহিমা আমরা কখন শুনি নাই। রায় রামানন্দ জিজ্ঞাসা করিলেন, —কোন্ গ্রন্থ কর হেন জানি। যাহার ভিতরে এই সিদ্ধান্তের খনি।” স্বরূপ গােস্বামী রামানন্দকে নাটকের পরিচয় অবগত করিলে, রায়ের অনুরােধে রূপ বিদগ্ধমাধব ও ললিতমাধব নাটকের স্থানে স্থানে পাঠ করিয়া শুনাইতে লাগিলেন। প্রথমতঃ বিদগ্ধমাধবের নালীশ্লোক পাঠ করা হইল। “সুধানাং চান্দ্ৰীণামপি মধুরিমােন্মাদদমনী দধানা রাদিপ্রণয়ঘনসারৈঃ সুরভিতাং । সমন্তাৎ সন্তাপােগমবিষমসংসারধরণী প্রণীতাং তে তৃষ্ণাং হরতু হরিলীলাশিখরিণী।”

একাদশ অধ্যায়। ১১১ যাহাতে সুধাংশুর সুধামাধুৰ্য্যশালিতার গৌরব দমিত হইয়াছে, এবং যাহা রাধাদির প্রণয়রূপ কপূরসংযােগে সৌগন্ধ্য ধারণ করিয়াছে, সেই হরিলীলা-শিখরিণী অর্থাৎ হরিলীলারূপমধুস্বাদযুক্ত পাণীয় তােমার সন্তাপ-বর্ধক অতি দুর্গম সংসার-রূপ-পথ-পৰ্যটন-জনিত তৃষা নিবারণ করুক। এইরূপে প্রেমােৎপত্তি, পূৰ্বানুরাগ, বিকার চেষ্টা, ভাব ও প্রেমের লক্ষণ ইত্যাদি যে রসের যেরূপ প্রেমরসা- ভিষিক্ত কবিত্বময় শ্লোক রচনা করিয়াছিলেন, রূপ গােস্বামী নাটকের মধ্যে মধ্যে পাঠ করিয়া ভক্তগণকে তাহা শুনাইতে লাগিলেন। ভক্তগণ তাহা শ্রবণ করিয়া বিমুগ্ধ হইয়া গেলেন। পূৰ্ব্বকথিক দুইখানি নাটকের নান্দীতে রূপ গােস্বামী ইষ্টদেব বন্দনার যে শ্লোক রচনা করেন, চৈতন্যের ভয়ে তিনি তাহা পাঠ করিতে সঙ্কুচিত হইলেন। এই দুই শ্লোকে আপন ইষ্টদেব শ্রীচৈতন্যের বর্ণনাচ্ছলে চৈতন্যা- বতারের আভাস প্রদান করা হইয়াছিল। ঈশ্ববতার রূপে বর্ণনা ত দূরের কথা, শ্রীচৈতন্য আপনার সামান্য প্রশংসাও সহ করিতে পারিতেন তৃণ হইতে নীচ ও নিরভিমান হইয়া হরিনাম করাই চৈত- ন্যের ধর্ম। কেহ তাহার অন্যায় প্রশংসা করিলে, তিনি বিষ্ণু স্মরণ পূৰ্ব্বক কর্ণে অঙ্গুলি দিয়া মহা বিরক্তি প্রকাশ করিতেন। এই কারণে উক্ত শ্লোক আবৃত্তি করিতে রূপ গােদামী নিরতিশয় সঙ্কুচিত হইলেন। রূপের লজ্জা ও সংকোচ দেখিয়া চৈতন্য বলিলেন, বৈষ্ণবসমাজে গ্রন্থ গুনা- ইবে ইহাতে আর লজ্জা কি, শ্লোক পাঠ কর। না।

ভক্ত-চরিতামৃত।
“রায় কহে কহ ইষ্টদেবের বর্ণন।
প্রভুর সঙ্কোচে রূপ না করে পঠন।
প্রভু কহে কহ কেন কি সঙ্কোচ লাজে।
গ্রন্থের ফল শুনাইবে বৈষ্ণব সমাজে।
চৈতন্য চরিতামৃত অন্তখণ্ড ১ম পরিচ্ছেদ।
শ্রীগৌরের আদেশে রূপ সলজ্জভাবে এই দুইটী শ্লোক
আবৃত্তি করিলেন।
“অনৰ্পিতচরীং চিরাৎ করুণবতীর্ণ কলো
সমর্পয়িতুমুন্নতােজ্জলরং স্বভক্তিশ্রিয়ং।
হরিঃ পুরটর দ্যুতিকদম্ব সন্দীপিতঃ
সদা হৃদয়কন্দরে স্ফুরতু বঃ শচীনন্দনঃ।”
বিদগ্ধমাধব।
যে উন্নতােজ্জল মধুর রস জগতে কথন অর্পিত হয় নাই,
সেই স্বীয় ভক্তিসম্পদ প্রদান করিবার জন্য যিনি করুণ।
করিয়া এই কলিযুগে অবতীর্ণ হইয়াছেন; যাহার দেহচ্যুতি
কনককান্তি হইতেও অতি উজ্জ্বল শােভাযুক্ত, সেই শচীনন্দন
হরি (সিংহ) তােমাদের হৃদয়কন্দরে সর্বদা প্রকাশিত
থাকুন।
“নিজপ্রণয়িতা সুধামুদয়মাপুব যঃ ক্ষিতে
কিরত্যলমুরীকৃত দ্বিজকুলাধিরাজস্থিতিঃ।
স লুঞ্চিততমস্ততিৰ্ম্মম শচীমুখ্যঃ শশী
বশীকৃতজগন্মনাঃ কিমপি শৰ্ম্ম বিন্যস্তু।”
ললিতমাধব।
যিনি ক্ষিতিলে জন্মগ্রহণ করিয়া স্বীয় প্রেমরসামৃত
;
৫

একাদশ অধ্যায়। বহুল পরিমাণে বিস্তার করিয়াছেন, যিনি দ্বিজকুলাধিরাজ এই খ্যাতি লাভ করিয়াছেন, এবং যিনি অজ্ঞানান্ধকার সমূহ বিনাশ করিতেছেন, সেই জগন্মােহন শচীনন্দন শশী আমার অনির্বচনীয় সুখ বিধান করুন। শ্লোক শ্রবণ করিয়া ভক্তগণ পরমানন্দ লাভ করিলেন, কিন্তু শ্রীগৌরসুন্দর নিজের অতিস্তুতি শ্রবণ করিয়া রাগান্বিত হইয়া রূপকে ভৎসনা করিতে লাগিলেন। রামানন্দ বলি- লেন, রূপের বাক্য সহজেই অমৃতরসে পরিপূর্ণ, তােমার স্তুতিরূপ-কপূর বিন্দুর সংযােগে তাহা আরও সৌগন্ধময় হইয়াছে। চৈতন্য বিরক্ত হইয়া বলিলেন, এই সকল উপ- হাসকর লজ্জাজনক কথা শুনিয়া তুমি উল্লসিত হইতেছ ইহাই অতি আশ্চর্য্য! রায় রামানন্দ তাহাকে এই বলিয়া বুঝাইতে লাগিলেন যে, স্বীয় গ্রন্থের মঙ্গলাচরণে অভীষ্ট দেবের স্তুতি করা দোষাবহ নহে, ইহা শ্রবণ করিয়া লােকের সুখ হইয়। থাকে। “তবে রূপ গোসাঞি যদি শ্লোক পড়িল। শুনি প্রভু কহে এই অতি সুতি হৈল । ৪০০ কঁহা তােমার কৃষ্ণরস কাব্য সুধাসিন্ধু। তার মধ্যে কেন মিথ্যা স্তুতি ক্ষার বিন্দু। রায় কহে রূপের বাক্য অমৃতের পূর। তার মধ্যে এক বিন্দু দিয়াছে কপূর। • প্রভু কহে রায় তােমার ইহাতেও উল্লাস। শুনিতেই লজ্জা লােকে করে উপহাস ১১৪ ভক্ত-চরিতামৃত। ০ t রায় কহে লােকের সুখ ইহার শ্রবণে । অভীষ্টদেবের স্মৃতি মঙ্গলাচরণে। চৈঃ চঃ অন্ত্যখণ্ড ১ম পরিচ্ছেদ। অতঃপর রামানন্দ রূপের কবিত্বের বিস্তর প্রশংসা করিলেন। রূপ বিনীত ভাবে বলিলেন, কোথায় সূৰ্য্যসম আপনি, আর কোথায় আমি ক্ষুদ্র খদ্যোত সদৃশ; আপনার সম্মুখে আমার মুখব্যাদান করা মহা ধৃষ্টতা। রূপ গােস্বামীর কবিত্ব শক্তিতে মুগ্ধ হইয়া রায় প্রভুকে বলিলেন, “সহস্র বদনে রূপের কবিত্বের সুখ্যাতি করিতে হয়, অমৃত ধারার ন্যায় ইহাতে মধুর প্রেমপারিপাট্য অদ্ভুতরূপে বর্ণিত হইয়াছে। কবির কাব্য রচনা ও ধানুকীর শস্ত্র নিক্ষেপ বৃথা, যদি তাহা পরহৃদয়ে বিদ্ধ হইয়া তাহার মাথা ঘুরাইয়া না দেয়। রূপের কাব্য শুনিয়া চিত্ত কর্ণ আনন্দে ঘূর্ণিত হয়। চৈতন্য বলি- লেন; “ইহার সালঙ্কার কাব্য অতি মধুর প্রসঙ্গ, এ প্রকার কবিত্ব ব্যতীত মাধুৰ্য্যরস প্রচার হওয়া অসম্ভব। তােমরা সকলে কৃপা করিয়া রূপকে এই বর দাও, যেন ইনি প্রেম- রসময় ব্রজলীলা নিরন্তর প্রচার করিতে পারেন। ইহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সনাতনের ন্যায় বিজ্ঞ ব্যক্তি পৃথিবীতে অতি দুলভ। দীনতা, বৈরাগ্য ও পাণ্ডিত্য তাহাতেই সম্যকরূপে স্থিতি'করিতেছে। এই দুই ভাইকে আমি ভক্তিশাস্ত্র প্রবর্তন করিবার জন্য বৃন্দাবনে পাঠাইয়াছিলাম।” রূপের প্রতি প্রভুর স্নেহ ও কৃপা দেখিয়া ভক্ৰমণ্ডলী সুখী হইলেন এবং প্রীতি-প্রফুল্লহৃদয়ে সকলে রূপকে আলিঙ্গন কৃরিলেন। রূপও সকলের পদবন্দনা করিলেন। বর্ষা চারি মাস অতিবাহিত দ্বাদশ অধ্যায়। | হইলে অদ্বৈত ও নিত্যানন্দ প্রভৃতি স্বদেশে প্রত্যাগমন করিলেন। চৈতন্যদেব যতদিন নীলাচলে ছিলেন, ভক্তিরস- পিপাসু গৌরগতপ্রাণ বঙ্গদেশীয় বৈষ্ণবগণ প্রেমসাগর গৌরের প্রেমানুরাগে আকৃষ্ট হইয়া প্রতি বৎসর রথযাত্রার সময়ে নীলাদ্রিতে আসিতেন। অদ্বৈত প্রভৃতি নীলাচল পরিত্যাগ করিলে রূপ গােস্বামী হরিদাসের কুটীরে থাকিয়া উভয়ে কৃষ্ণকথাপ্রসঙ্গে অতি আনন্দ মনে কালযাপন করিতে লাগিলেন। হরিদাস একদিন বলিলেন,তােমার মহা সৌভাগ্য, তুমি যে সব তত্ত্ব বর্ণনা করিলে, তাহা তুমি, ভিন্ন আর কে জানে বল! রূপ বলিলেন, আমি কিছুই জানি না, প্রভু হৃদয়ে যা প্রেরণ করেন, তাই বলিয়া থাকি। দোলযাত্রা পর্যন্ত রূপ নীলাচলে অবস্থান করেন। তৎপরে গৌরচন্দ্র বলিলেন, “তুমি বৃন্দাবনে গিয়া রসশাস্ত্র নিরূপণ করিয়া ভক্তিরস প্রচার কর, এবং লুপ্ততীর্থ উদ্ধার করিয়া কৃষ্ণসেবা প্রচার কর। সনাতনকে একবার নীলাদ্রি আসিতে বলিও। তদনন্তর রূপ তথা হইতে বঙ্গদেশে আগ- মন করিলেন। . দ্বাদশ অধ্যায়। সনাতন গােস্বামীর নীলাদ্রি গমন। রূপ নিলাদ্রি হইতে স্বদেশে প্রত্যাগমন করিবার কিছু দিন পরে সনাতন বৃন্দাবন হইতে নীলাচলে আসিতে ইচ্ছা ভক্ত-চরিতামৃত। করেন।* সনাতন বৃন্দাবনে সুবুদ্ধিরায় প্রভৃতি বৈরাগী ভক্ত। সাধকদিগের পবিত্র সহবাসে কিয়ৎদিন অবস্থান করিবার পর ঝারিখণ্ডের । বন্য পথে নীলাদ্রি অভিমুখে বহির্গত হই লেন। যিনি রাজসেব্য নানাবিধ সুরস ভক্ষ্য ভােজ্যে পরি- পুষ্ট ও সন্তুপ্ত থাকিয়া পার্থিব সুখৈশ্বর্যের উন্নত মঞ্চে উল্লাস- তরঙ্গে ক্রীড়া করিতেন, বৈরাগ্যের কঠোর প্রেষণ তিনি আর কত দিন সহ করিতে পারিবেন ? অনাহার, অনিদ্রা, পথশ্রম ও ঝারিখণ্ডের অস্বাস্থ্যকর জলপান ইত্যাদি বিবিধ কারণে সনাতনের দেহ অচিরাৎ ভাঙ্গিয়া পড়িল,এবং সর্বাঙ্গে কণ্ডু (চর্মরােগ) উৎপন্ন হইয়া তাহা হইতে শােণিত ও রস নিঃসৃত হইতে লাগিল। শরীরের এই অবস্থা দেখিয়া সনাতনের মনে নির্বেদ উপস্থিত হয়, এবং মনে মনে এই চিন্তা করিতে থাকেন যে, “আমি একে নীচ জাতি, আমার ৫ * রূপ ও সনাতনের জগন্নাথ তীখে আগমন সম্বন্ধে আমরা চৈতন্য চরিতামৃতের বর্ণনা গ্রহণ করিলাম। কিন্তু “চৈতন্যভাগবত” গ্রন্থে লিখিত আছে, রূপ সনাতন দুই ভ্রাতা একত্রে বৃন্দাবন হইতে শ্রীক্ষেত্রে সমাগত হইয়া শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে পুনমিলিত হইয়াছিলেন। “চৈতন্যভাগবত” অস্থ্যখণ্ড, ৭ম অধ্যায়। + চৈতন্যদেব নীলাচল হইতে বৃন্দাবন যাইবার সময় কটক নগর ডাহিনে রাখিয়া গভীর অরণ্যের মধ্যে প্রবেশ করেন ও ক্রমে সঁওতাল ভীল প্রভৃতি অসভ্যজাতীয় পােকদিগের নিবাসভূমি অতিক্রম করিয়া বারাণসীতে উপনীত হইয়াছিলেন। পুরী হইতে সােজাসুজি কাশী যাইতে হইলে ছােট- নাগপুর প্রদেশের অরণ্যসঙ্কুল পার্বত্যপথ অতিবাহিত করিতে হয়। বােধ হয় এই বনপথই বৈষ্ণব গ্রন্থে “দারিখও বনপথ” নামে বর্ণিত হইয়াছে।

দ্বাদশ অধ্যায়। ১১৭ এই পাপ দেহও অতি অসার ; শুনিয়াছি জগন্নাথের মন্দিরের নিকটেই চৈতন্যপ্রভু অবস্থিতি করেন। সেখানে জগন্নাথের পরিচারকেরা কাৰ্যানুরােধে সর্বদাই যাতায়াত করিয়া থাকেন। আমি তাঁহাদিগকে স্পর্শ করিলে আরও আমার অপরাধ বৃদ্ধি হইবে। এ অবস্থায় যদি রথযাত্রা- কালে মহাপ্রভুর সম্মুখে জগন্নাথ দর্শন করিতে করিতে রথ- চক্রে এই তুচ্ছ শরীর পরিত্যাগ করি, তাহা হইলে দুঃখের শান্তি হয় এবং পরলােকে সদগতি লাভ করিতে পারি।” সনাতন এইরূপ চিন্তা করিয়া হরিদাসের সাধনকুটীরে সমু- পস্থিত হইলেন, এবং তৎসঙ্গে প্রেমরসালাপে প্রবৃত্ত হইয়া নিৰ্ম্মল প্রেমানন্দধা সম্ভোগ করত কতক্ষণে গৌরচন্দ্রের সাক্ষাৎকার লাভ করিবেন এই জন্য অতিশয় ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। এমন সময়ে ভক্তবৃন্দ সমভিব্যাহারে গৌরাঙ্গ তথায় আগমন করিলে সনাতনের সহিত তাহার মিলন হইল। চৈতন্য সনাতনকে আলিঙ্গন করিতে যতই অগ্রসর হন, সনাতন ততই পশ্চাতে গমন করেন আর নিতান্ত সন্ধু- চিত কুইয়া বলেন, “প্রভু রক্ষা করুন্, আমাকে স্পর্শ করিবে না, একে আমি অস্পৃশ্য হীন, করসে আমার সর্বাঙ্গ অপ- বিত্র, আপনার চরণে ধরি আমাকে স্পর্শ করিবেন না।” আচণ্ডালে হরিনাম বিতরণ করিবার জন্য যিনি অবতীর্ণ হইয়াছেন; অধিক কি যাহার অলৌকিক প্রেম গলিতকুষ্ঠ- রােগগ্রস্তকেও আলিঙ্গন করিতে পরায়ুখ হয় নাই, তিনি কি প্রেমাস্পদ শিষ ভক্তপ্রবর সনাতনের গাত্র-ক-নিঃসৃত শােণিত রস দেখিয়া তাহাকে ঘৃণা করিবেন ? চৈতন্যদের ভক্ত-চরিতামৃত। সনাতনকে বলপূর্বক হৃদয়ে গ্রহণ করিলেন। তদনন্তর সনা তনের সহিত তাঁহার ইষ্টালাপ হইতে লাগিল । কনিষ্ঠ ভ্রাতা অনুপমের মৃত্যুসংবাদ সনাতন এইখানে আসিয়া অবগত হই- লেন। চৈতন্য অনুপমের ভক্তিনিষ্ঠার প্রশংসা করিলে সনা- তন তাহার গুণ স্মরণ করিয়া বলিলেন,-“অনুপম শৈশবকাল হইতে রামচন্দ্রের উপাসক ছিলেন; নিরবধি রামচন্দ্র ধ্যান ও রামায়ণ শ্রবণ গানে মত্ত থাকিতেন। অনুপমের বিশ্বাসের পরীক্ষার জন্য একদিন রূপ ও আমি তাহাকে শ্রীকৃষ্ণ ভজন করিতে বলিয়াছিলাম। আমাদের অনুরােধে তিনি কৃষ্ণ- মন্ত্র লইতে স্বীকৃত হইয়াছিলেন। কিন্তু রঘুনাথের চরণ কেমন করিয়া ছাড়িব’ এই চিন্তাতে সমস্ত রজনী ক্রন্দন করিয়া প্রাতঃকালে আমাকে বলিলেন, “রঘুনাথের পাদপদ্মে আমার মাথা বিক্রীত হইয়াছে, তাহা কেমন করিয়া টানিয়া আনিব। রঘুনাথের চরণ ছাড়িতে হইবে মনে হইলে আমার যে প্রাণ ফাটিয়া যায়। দয়া করিয়া আমাকে এই আজ্ঞা দাও, যেন জন্মজন্মান্তরে আমি শ্রীরামের চরণ সেবা করি।” তখন আমরা অনুপমকে আলিঙ্গন করিয়া তাহার দৃঢ় ভক্তির প্রশংসা করিলাম। যে বংশের উপর তুমি কৃপাকটাক্ষ কর, তার সকল অমঙ্গল বিনাশ হয়।” “সনাতন কহে নীচ বংশে মাের জন্ম। অধৰ্ম্ম অন্যায় যত আমার কুলধৰ্ম্ম । হেন বংশে ঘৃণা ছাড়ি কৈলে অঙ্গীকার। তোমার কৃপাতে বংশের মঙ্গল, আমার দ্বাদশ অধ্যায়। ১১৯ যে বংশ উপরে তােমার হয় কৃপালেশ। সকল মঙ্গল তাহা খণ্ডে সব ক্লেশ।” গৌর বলিলেন, পূর্বে আমি মুরারিগুপ্তকে এইরূপে পরীক্ষা করিয়াছিলাম। সেই ভক্ত ধন্য, যিনি প্রভুর চরণ পরিত্যাগ না করেন। সেই প্রভুও ধন্য, যিনি স্বীয় ভক্ত দুর্দৈববশতঃ অন্য স্থানে গমন করিলেও তাহাকে ফিরাইয়া আনিয়া চরণে স্থান দেন। অনন্তর শ্রীচৈতন্য সনাতনকে হরিদাসের সঙ্গে কৃষ্ণ- ভক্তিরস আস্বাদন করিতে উপদেশ দিয়া আপনার আশ্রমে গমন করিলেন, এবং ভৃত্য গােবিন্দ দ্বারা উত্তম মহা- প্রসাদ পাঠাইয়া দিলেন। চৈতন্য প্রতিদিনই হরিদাসের কোলাহলশূন্য শান্তিরসাস্পদ আশ্রমে আগমন করিয়া সনা- তনসহ সৎপ্রসঙ্গে কিছুক্ষণ যাপনপূর্বক নিৰ্ম্মল সুখানুভব করিতেন। রথাগ্রে সনাতনের দেহপাত করিবার ইচ্ছা জানিতে পারিয়া একদিন গৌর বলিলেন, “সনাতন ! দেহ- ত্যাগ করিলে যদি ভগবানকে লাভ করা যাইত, তবে মুহূৰ্ত মধ্যে কোটি দেহ নাশ করিতে পারিতাম । ত্যাগাদি তমােগুণের লক্ষণ, তামসিক ও রাজসিক ধৰ্ম্মে কৃষ্ণলাভ হয় না; কেবল ভক্তিপূর্বক ভজন সাধনে তাহাকে লাভ করা যায়। ভক্তি ব্যতীত হরিচরণ প্রাপ্তির আর পথ নাই। ভক্তিতে ভগবানে প্রেম উৎপন্ন হয়, এই প্রেমই কৃষ্ণচরণ প্রাপ্তির একমাত্র হেতু * দেইনাশ করা তামসিক * ন সাধয়তি মাং যােগাে ন সাংখাং ধৰ্ম্ম উদ্ধব। ন স্বাধ্যায়ন্তপ্যাগাে যথা ভক্তিমমার্জিত।” ভাগবত ১১শ স্কন্ধ।

• ভক্ত-চরিতামৃত। ধৰ্ম, তাহা পাপের কারণ বলিয়া জানিবে। ভক্তসাধক। শ্রীকৃষ্ণের বিরহবিকারে ব্যথিত হইয়া প্রাণ বিসর্জন করিতে চায় এবং গাঢ় প্রেমানুরাগ জন্মিলে প্রাণনাথের বিরহজালা অসহ্য হয় সন্দেহ নাই। কিন্তু প্রেম-ব্যাকুলতাই আবার হৃদয়নাথকে হৃদয়ে আনিয়া দেয়। তুমি কুবুদ্ধি পরিত্যাগ করিয়া ভগবানের নাম মহিমা শ্রবণ কীৰ্ত্তন কর, অচিরাৎ কৃষ্ণপ্রেমধন লাভ করিতে পারিবে। নীচজাতি কৃষ্ণ- ভজনের অযােগ্য নহে, সদ্বংশজাত বিপ্র হইলেই তাহার যােগ্য হয় না। হে সনাতন! শ্রীহরির ভজনাতে জাতি- কুলের কোন বিচার নাই। যে হরির আরাধনা করে সেই শ্রেষ্ঠ হয়। দয়াময় ভগবান দীন দুঃখীর প্রতিই অধিক দয়া করেন, কুলীন পণ্ডিত এবং ধনশালী ব্যক্তিরা বড় অভি- মানী। হরি-পদারবিন্দ-বিমুখ দ্বিগুণযুক্ত বিপ্র অপেক্ষা হরিগতপ্রাণ চণ্ডালও বরণীয়, ইহাই ভাগবতের উপদেশ * । ৫ হে উদ্ধব! মৎসম্বন্ধীয় উর্জিত অর্থাৎ সাধনাত্মিকা ভক্তি আমাকে যেরূপ বশীভূত করিতে পারে; কি চান্দ্রায়ণাদি, কি সাংখ্যযােগ, কি সদাচার, কি স্বাধ্যায়, কি তপস্যা, কি ত্যাগ, কিছুতেই তেমন পারে না। * বিদ্বিষড় গুণযুতাদরবিন্দলাভ পাদারবিন্দবিমুখাৎ খপচং বরিষ্ঠং। মধ্যে তদর্পিতমনােবচনেহিতাথ প্রাণ গুনাতি স কুলং ন তু ভূরিমান। শ্রীমদ্ভাগবত ৭ম স্কন্ধ। প্রচ্ছদ বলিতেছেন, ধৰ্ম্ম, সত্য, দম, তপস্যা, আমাৎসৰ্য, লজ্জা, তিতিক্ষা অহিংসা, যজ্ঞ, দান, ধৃতি, বেদাধ্যয়ন, এই দ্বাদশ গুণসম্পন্ন ব্রাহ্মণ যদি হরি- পদারবিন্দবিমুখ হন, তাঁহার অপেক্ষা যে চণ্ডাল প্রাণ মন বাক্য কর্ম ধন সকলই

দ্বাদশ অধ্যায়।
ভজনের মধ্যে শবণ, কীর্তন, স্মরণ, পদসেবা, অর্চনা, বন্দনা,
দাষ্ণ, সখ্য ও আত্মনিবেদন এই নব লক্ষণযুক্ত ভক্তির অনু-
তানই শ্রেষ্ঠ। হরিমেই হরিকে আনিয়া দিতে সমর্থ
ভিন্ন অন্য উপায় নাই; নামসংকীর্তনই সকল সাধনের সার
বলিয়া জানিবে। নিরপরাধে নাম লইলে প্রেমধন লাভ
গৌরের মুখে অকস্মাৎ এই সকল কথা শ্রবণ করিয়া
সনাতন বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন,এবং তাহার চরণে ধরিয়া বলিতে
লাগিলেন “তুমি সকলই অবগত আছ, আমি ত কাষ্টযন্ত্র
মাত্র, যেমন নাচাও, তেমনি নাচি, যেমন করাও তেমনি
করি। আমি অতিহীন পামর, আমাকে জীবিত রাখিলে
তােমার কি লাভ হইবে ?” চৈতন্য বলিলেন, “তােমার দেহ
আমার নিজস্ব ধন, তুমি আমাকে আত্মসমর্পণ করিয়া এখন
ভগবানে সমৰ্পণ করিয়াছেন, আমি তাহাকেই শ্রেষ্ঠ মনে করি, যেহেতু এরূপ
চণ্ডাল হইতে কুল পবিত্র হয়। কিন্তু প্রভূত গর্বিত ঐ ব্রাহ্মণ, কুল দূরে
থাকুক আপনাকেও পবিত্র করিতে পারে না।
* শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণং পাদসেবন;
অর্জনং বন্দনং দাং সখ্যত্মনিবেদনং।
ইতি পূংসাৰ্পিত বিষ্ণে ভক্তিশ্চেন্নবলক্ষণ।
ক্ৰিয়তে ভগবত্যদ্ধা তন্মনন্যহধীতমুত্তমং।
ভগবত গম স্কন্ধ ৫ম অধ্যায়।
প্রহলাদ বলিলেন, হে পিত! ভগবান বিষ্ণুর লীলা মহিমাদি শ্রবণ,
কীর্তন, স্মরণ, ও তাহার পরিচর্যা, অর্চন, বন্দন,তাহাতে দাস্যভাবে কৰ্মাৰ্পণ,
বিশ্বাস ও আত্মনিবেদন এই নবলক্ষণাক্রান্ত ভক্তি যদি ভগবানে সমর্পণ পূর্বক
অনুষ্ঠান করা যায়, আমার বিবেচনায় তাহাই উত্তম অধ্যয়ন।

১২২ ইচ্ছ। ভক্ত-চরিতামৃত। আবার পরের ঐব্য কেন বিনাশ করিতে চাহিতেছ ? ধৰ্মা ধৰ্মা ধর্ম কি বিচার করিতে পার না? 'তােমার দ্বারা আমি বহু প্রয়ােজন সাধন করিব। তুমি বৃন্দাবনে থাকিয়া ভক্ত, ভক্তি, কৃষ্ণপ্রেমতত্ত্ব এবং বৈষ্ণবের নিত্যকৃত্য ও আচার ব্যবহারাদি নির্ধারণ কর। লােক সকলকে বৈরাগ্য শিক্ষা দিয়া ও লুপ্ততীর্থ সকল উদ্ধার করিয়া কৃষ্ণ- ভক্তি ও কৃষ্ণসেবা প্রচার কর, ইহা আমার একান্ত আমি মাতৃআজ্ঞায় নীলাচলে বাস করিতেছি ; বৃন্দাবনে গিয়া এই সকল কার্য করিতে আমার শক্তি নাই। তােমার দ্বারা এই সকল মহৎ কাৰ্য্য আমি সিদ্ধ করিব, তুমি দেহপাত করিবে ইহা কি আমি সহ্য করিতে পারি ? হরিদাসকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, শুন হরিদাস! ইনি পরের দ্রব্য বিনাশ করিতে চাহিতেছেন, তুমি নিষেধ কর, যেন এমন অন্যায়-কাৰ্য্য না করেন। সনাতন চৈতন্যের স্নেহবাক্যে কথঞ্চিৎ আশ্বস্ত হইয়া তদীয় চরণে নমস্কার পূৰ্ব্বক বলিতে লাগিলেন, “তােমার গম্ভীর হৃদয় আমি কি বুঝিব, আমি কাঠপুত্তলিকার ন্যায়, আপনাকে আপনি চিনি , তুমি যা করাও তাই করি।” হরিদাস বলিলেন, ঠাকুর, তােমার গূঢ়তত্ব কে জানিতে সমর্থ ? কোন্ কাৰ্য্য তুমি কাহার দ্বারা করাও, তুমি না জানাইলে কেহই জানিতে পারে না। অনন্তর গৌরচন্দ্র হরিদাস ও সনাতনকে আলি- জুন দিয়া বিদায় হইলেন। চৈতন্যের আদেশমত হরিদাস সনাতনকে বুঝাইয়া বলিতে লাগিলেন, সনাতন, তােমার ভাগ্যের সীমা নাই। তােমার দেহকে প্রভু নিজ বলিতে, দ্বাদশ অধ্যায়। ছেন, ছি, তােমার সমান ভাগ্যবান আর কে আছে ? প্রভুর নিজের দ্বারা যাহা হইবে না, তাহা তুমি করিবে, বৃন্দাবনে অবস্থিতি করিয়া তুমি ভক্তি-সিদ্ধান্ত-শাস্ত্র প্রণয়ন ও আচার নির্ণয় করিয়া লােকশিক্ষা দিবে, প্রেমভক্তি বৈরাগ্য ভগবৎ- সেবা তােমার দ্বারা প্রচারিত হইবে, ইহা অপেক্ষা আর সৌভাগ্য কি আছে ? সনাতন, আমার এই পাপদেহ প্রভুর কোন কাৰ্যেই লাগিল না, আমি মিথ্যা জীবন ধারণ করি, ভারতভূমিতে আমি বৃথা জন্মগ্রহণ করিয়াছি। সনা- তন বলিলেন, তুমি প্রতিদিন তিন লক্ষ হরিনাম সংকীর্তন করিয়া জগতে নাম-মহিমা প্রচার করিতেছ। কেহ আপনি আচরণ করে, কিন্তু প্রচার করে না; কেহ প্রচার করে আচরণ করে না। তুমি আচরণ ও প্রচার দুই কাৰ্য্যই করি- তেছ, তুমি জগতের পূজনীয় ও সকলের, গুরু, তােমার ন্যায় সৌভাগ্যশালী আর কেহই নাই। ক্রমে রথযাত্রার সময় উপস্থিত হইলে গৌড়ের ভক্তবৃন্দ পূৰ্ব্ববৎ নীলগিরিতে আগমন করিলেন। ভক্তসম্মিলনে নীলাচল আবার উল্লাস উৎসবে প্রফুল্লিত ও আনন্দানিল হিল্লোলে আন্দোলিত হইয়া অপূৰ্ব শ্রীধারণ করিল। নিত্যানন্দ, অদ্বৈত, শ্রীবাস প্রভৃতি প্রধান প্রধান ভক্তদিগের নিকট সনাতন পরিচিত হইলেন। সার্বভৌম ভট্টাচাৰ্য্য রামানন্দ প্রভৃতি পাণ্ডিত্য ও ভক্তিরসেয় অদ্বিতীয় রসিকগণ সনাতনের বিনয়াবনত স্নিগ্ধমাধুৰ্য্যপূর্ণ পবিত্র প্রশান্তমূর্তি, আশ্চৰ্য্য ভগবৎপরায়ণতা, জীবন্ত বৈরাগ্যপ্রভাব এবং সুগভীর পাণ্ডিত্য ও শাস্ত্রান্তগা বুদ্ধি সন্দর্শন করিয়া পরম (28 ভক্ত-চরিতামৃত। পরিতােষ লাভ করিলেন। সনাতনের এই সকল অসাধারণ গুণগ্রামের পরিচয় পাইয়া সকলেরই হৃদয়' তাহার প্রতি আসক্ত হইয়াছিল। শ্রীগৌরাঙ্গ জ্যৈষ্ঠ মাসে একদিন ধমেশ্বরটোটা নামক স্থানে কোন ভক্তগৃহে নিমন্ত্রণ রক্ষার্থ গমন করিয়া সনাতনকে তথায় আহবান করিলেন। প্রভুর আহ্বান শুনিয়া সনাতন আাদে উন্মত্তবৎ হইয়া উঠিলেন। পুরী হইতে ষমেশ্বর- টোটা যাইবার দুইটা পথ। একটী সমুদ্রতীরের বালুকা- রাশির উপর দিয়া, ও অন্যটা জগন্নাথ মন্দিরের সিংহদ্বার দিয়া। এই পথটী ঘনবৃক্ষচ্ছায়ায় সুশীতল ও অধিকতর নিকট। কিন্তু সনাতন, আপনাকে সিংহদ্বারে প্রবেশের অযােগ্য জ্ঞান করিয়া সমুদ্রতটের রৌদ্রতপ্ত বক্র পথ অব লম্বন করিলেন। জ্যৈষ্ঠ মাসের মধ্যাহ্নকালে প্রখর সূৰ্য কিরণে সমুত্রের বালুকারাশি অগ্নিবৎ উত্তপ্ত হইয়াছে, বায়ু- সন্তাড়িত প্রতপ্ত বালুকাকণা অগ্নিবৃষ্টির ন্যায় পতিত হইয়া দিক্কল দগ্ধ করিতেছে, এই অবস্থায় সেই বালুরাশির উপর দিয়া সনাতন চলিতে লাগিলেন, পদতল দগ্ধ হইতে লাগিল,তথাপি অনুরাগের মত্ততাতে কিছুমাত্র জানিতে পারি- লেন না। তদবস্থায় সনাতনকে দর্শন করিয়া গৌরচ জিজ্ঞাসা করিলেন,সিংহদ্বারের শীতল পথে কেন আসিলে না? সনাতন উত্তর করিলেন, আমি অস্পৃশ্য অতি হীন দুরাচার, সিংহদ্বারে যাইতে আমার অধিকার নাই। বিশেষত সেখানে জগন্নাথদেবের সেবকেরা সর্বদাই গতায়াত করেন, যদি দৈবাৎ তাহাদিগকে স্পর্শ করিয়া ফেলি,তাহা হইলে আমার সর্বনাশ দ্বাদশ অধ্যায়। হইবে। সনাতনের বাক্যে সন্তুষ্ট হইয়া গৌর বলিলেন, “যদিও তুমি পবিত্রস্বভাব এবং দেব ও মুনিগণের পূজ্য,তথাপি মৰ্যাদা- পালন সাধুর ভূষণ স্বরূপ। মৰ্যাদা লঙ্ঘন করিলে লােক- সমাজে উপহাস্পদ হইতে হয়। তুমি মৰ্য্যাদা রক্ষা করিলে দেখিয়া আমি আনন্দলাভ করিলাম, তুমি এরূপ না করিলে আর কে করিবে ?” এই বলিয়া চৈতন্য করস- শােণিতাক্ত সনাতনকে পুনঃ পুনঃ প্ৰেমালিঙ্গন দান করি- লেন। সনাতন ব্রাহ্মণকুলে জন্মিয়া যবনের দাসত্ব ও ঘনিষ্ঠ সংশ্রব-হেতু তৎসাময়িক হিন্দুসমাজে পতিতবৎ থাকিলেও তাঁহার নির্মলস্বভাব,জ্ঞান বৈরাগ্য ও ভগবন্নিষ্ঠা বশত সকলেই তাহাকে শ্রদ্ধাভক্তি করিত। তিনি এরূপ ক্ষুদ্রচেতা ছিলেন যে এজন্য গর্বিত হইয়া অন্যের মৰ্য্যাদাভঙ্গ করিবেন। বরং তিনি ভক্তগণের এতাদৃশ শ্ৰদ্ধা ভালবাসা এবং গৌর- চন্দ্রের প্রেম আলিঙ্গন ও তাহার প্রশংসার উৎপীড়নে উৎ- পীড়িত হইয়া আপনার হীনতা অনুভব করত নিরতিশয় কুণ্ঠিত হইয়া পড়িতেন। সাধুচরিত্রের লক্ষণই এইরূপ। একদিন সনাতন অতি নির্বিন্নচিত্তে জগদানন্দ পণ্ডিতকে বলিলেন, “আমি প্রভুকে দর্শন করিয়া দুঃখ দূর করিতে এখানে আসিলাম, এখন দেখিতেছি হিতে বিপ- রীত হইল। আমি অতি নিকৃষ্ট পামর, নিষেধ না মানিয়া প্রভু আমাকে আলিঙ্গন করেন, আমার কঙুরক্তরস প্রভুর অঙ্গে স্পর্শ হয়, এই মহা অপরাধে আমার আর নিস্তার নাই। কি করিলে হিত হয় কিছুই বুঝিতে পারিতেছি না।”

ভক্ত-চরিতামৃত।
দিলেন।
সনাতনের অান্তরিক গ্লানি দুঃখ দেখিয়া জগদানন্দ বলিলেন?
বৃন্দাবনই তােমার যােগ্য বাসস্থান। রথযাত্রা দেখিয়া সেই
খানে গমন কর। প্রভু তােমাদের দুই ভাইকে ঐ স্থান
নির্দিষ্ট করিয়া দিয়াছেন। জগদানন্দের পরামর্শ শ্রেয়ঃজ্ঞান
করিয়া সনাতন গৌরকে তাহা জ্ঞাপন করিবেন মনে করি-
লেন। তৎপরে চৈতন্য তথায় সমাগত হইলে, সনাতন দূর
হইতে প্রণাম করিলেন। আলিঙ্গন করিবার জন্য চৈতন্য
বার বার যতই ডাকেন, সনাতন ততই পশ্চাতে সরিয়া
যান। তখন চৈতন্য বলপূর্বক ধরিয়া সনাতনকে কোল
সনাতন কাতর হৃদয়ে বলিলেন, “দেখিতেছি
হিতের জন্য আসিয়া বিপরীত হইল। কোথায় তােমার
সেবা করিবারও যােগ্য নহি, না নিত্য নিত্য আরও অপরাধ
সঞ্চয় করিতেছি। একে আমি পাপাশয়, দুষ্ট নীচজাতি,
তােমার স্পর্শের সম্পূর্ণ অযােগ্য, তাহাতে আমার শরীর দিয়া
ক্লে রক্ত রস নির্গত হইতেছে, তথাপি তুমি বল পূর্বক
আলিঙ্গন কর। ইহাতে আমার কত যে অকল্যাণ হইতেছে,
তাহার সীমা নাই। অনুমতি কর, রথ দেখিয়া বৃন্দাবন
গমন করি। জগদানন্দ পণ্ডিতকে আমি পরামর্শ জিজ্ঞাসা
করিয়াছিলাম, তিনিও এই উপদেশ দিয়াছেন।” ইহা শ্রবণ
করিয়া গৌরচন্দ্র ক্রোধ প্রকাশকরতঃ জগদানন্দকে তিরস্কার
করিয়া বলিতে লাগিলেন, “কি! ব্যবহার ও পরমার্থে তুমি
তার গুরুতুল্য ব্যক্তি, কালিকার জগা আপনার মূল্য না
জানিয়া তােমাকে উপদেশ দেয়, এ অতি আশ্চৰ্য্য।” শ্রবণ
করিয়া সনাতন বলিলেন, জগদানন্দের সৌভাগ্য আমি

দ্বাদশ অধ্যায়। ১৭ জজ জানিলাম। তুমি তাহাকে আত্মীয় জ্ঞানে শাসনচ্ছলে “আত্মতা সুধারস পান করাইয়া আমাকে গৌরবস্তুতিরূপ “ নিনিষিদা-রস” দিতেছ। আজিও আমাকে তােমার আত্মীয় জ্ঞান হইল না, ইহাই আমার মহা দুর্ভাগ্য। সনা- তনের বাক্যে চৈতন্য প্রভু কিঞ্চিৎ লজ্জিত হইয়া বলিলেন, “সনাতনজগদানন্দ তােমা হইতে আমার প্রিয় নয়। তুমি এক জন শাস্ত্ৰদৰ্শী প্রবীণ পণ্ডিত, কত স্থানে তুমি আমাকে ভক্তিতত্ত্ব বুঝাইয়া দিয়াছ, বালক জগা তােমার মর্যাদা লঙ্ঘন করিয়া তােমাকে উপদেশ দেয়, ইহা আমার অসহ। তোমাকে বহিরঙ্গ জ্ঞানে স্তুতি ও জগদানন্দকে অন্তরঙ্গ জ্ঞান করিয়া তিরস্কার করিতেছি এমন মনে করিও না। তােমার গুণে বাধ্য হইয়া তােমাকে স্তুতি করিতে হয়। এক ব্যক্তির বহুজনে মমতা হইলেও সৰ্বত্ৰ সমানভাবে প্রতি প্রকাশ পায় । বৈচিত্র্যই প্রেমের স্বভাব, পাত্র ভেদে তাহার নানা ভাবােদয় হইয়া থাকে। তােমার দেহ আমার নিকট অমৃত- তুল্য ও অপ্রাকৃত। প্রাকৃতবুদ্ধি করিয়া তুমি তাহা ঘৃণা কর, আমি সন্ন্যাসী, পঙ্ক চন্দনে সমদৃষ্টি আমার ধর্ম। তােমাকে ঘৃণা করিলে আমার ধর্ম নষ্ট হয়।” ইহা শুনিয়া হরিদাস বলিলেন, তােমার এ প্রতারণা বাক্য আয়ি মানি না। আমার ন্যায় অধম পাতকীকে যে তুমি চরণে স্থান দিয়াছ, ইহাতে তােমার দীন দুঃখীর প্রতি দয়াগুণই প্রকাশ পাইয়াছে। চৈতন্যদেব ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলেন, হরিদাস সনাতন, তবে প্রকৃত কথা বলি শ্রবণ কর। আমি তােমা- দিগকে সন্তানের ন্যায় স্নেহ করি। মাতা যেমন সন্তানের ১২৮ ভক্ত-চরিতামৃত। মলমূত্ৰ-দূষিত অঙ্গ বক্ষে ধারণ করিয়া সুগভীর আনন্দনীরে নিমগ্ন হয়েন, সনাতনের দেহও আমার পক্ষে সেইরূপ। সনাতনের কক্লেদময় দেহে আমার ঘৃণা হয় না। বৈষ্ণব- শরীরকে সাধারণ মনে করিও না। তাহা চিদানন্দময় ও অপ্রাকৃত। ভক্ত যখন ভগবানে আত্মসমর্পণ করিয়া তাহার নামে দীক্ষিত হয়, শ্রীহরি তখন তাহার দেহকে আপনার ন্যায় অপ্রাকৃত চিদানন্দময় করিয়া লন, ভক্ত সেই অপ্রাকৃত দেহে ভগবানের ভজনা করেন। ভাগবতে ভগবান বলিয়া- ছেন, মরণশীল, মানব যখন সমস্ত কর্ম পরিত্যাগ করিয়া আমার সেবাতে আত্মসমর্পণ করে, তখন সে অমৃতত্ব লাভ করিয়া আমার সহিত একাত্ম হইয়া যায়। সনাতনের শরীরে কভু উৎপন্ন করিয়া ভগবান আমাকে পরীক্ষা করি- লেন, আমি ইহাতে, ঘৃণা করিলে প্রভুর নিকট অপরাধী হইতাম। সনাতন, তুমি দুঃখ করিও না, তােমাকে আলিঙ্গন করিয়া আমি অতুল আনন্দ পাইয়া থাকি। এ বৎসর তুমি এইখানে থাক, তার পর তােমাকে বৃন্দাবনে পাঠাইয়া দিব। চৈতন্য চরিতামৃতে” কথিত হইয়াছে, গ্নৌরাঙ্গ সনাতনকে পুনর্বার আলিঙ্গন করিলে সনাতনের কণ্ডুরােগ আরােগ্য হইল এবং দেহ সুবর্ণকান্তি ধারণ করিল। অনন্তর দোলযাত্রার উৎসব সমাপ্ত হইলে, বৃন্দাবনে গিয়া সনাতন কি কি কাৰ্য করিবেন, তাহার উপদেশ দিয়া চৈতন্য তাহাকে বিদায় দিলেন। বিদায় কালে উভয়ের নয়ন দিয়া অবিরল প্রেমাশ্রুধারা প্রবাহিত হইতে লাগিল। অতি কষ্টে আবেগ সম্বরণ করিয়া সনাতন বিদায় হইলেন।

ত্রয়ােদশ অধ্যায়।
১২১
ইতিপূর্বে গৌরচন্দ্র ছােটনাগপুর প্রদেশের যে যে গ্রাম
জনপদ, এবং নানাজাতি-বিহ-নিনাদিত সুরম্য কাননকুঞ্জ,
প্রফুল্লিত বৃক্ষলতা, স্বচ্ছ-সলিলা গিরিনিঝরিণী ও সুশােজন
গিরিচূড়া প্রভৃতি বিচিত্র প্রাকৃতিক শােভার আকর স্বরূপ
বনভূমির মধ্য দিয়া নানা লীলা বিলাস করিতে করিতে
বৃন্দাবন গমন করিয়াছিলেন, বলভদ্রের নিকট সনাতন তৎ
সমুদায় লিখিয়া লইয়া বৃন্দাবন অভিমুখে চলিতে লাগিলেন।
ত্রয়ােদশ অধ্যায়।
রূপ সনাতনের বৃন্দাবনবাস ও জীব গােস্বামীর
.
পুরুষােত্তম হইতে সনাতন বৃন্দাবন পৌছিবার
কিয়দিন পরে, রূপ গােস্বামী তথায় আসিয়া মিলিত হন।
রূপ, নীলাদ্রি হইতে স্বদেশে আসিয়া অর্থ সম্পত্তি যাহা
কিছু ছিল, আত্মীয় কুটুম্ব ব্রাহ্মণগণকে এবং দেবসেবার জন্য
বিতরণ করিয়া দিলেন। গৌড় নগরে তাঁহাদের পূর্ব সঞ্চিত
যে সকল অর্থাদি ছিল, তাহাও এই জন্য আনাইলেন। এই
সকল কার্য সমাধা করিতে বঙ্গদেশে তাঁহার এক বৎসর
বিলম্ব হয়।
পয়ে নিশ্চিন্ত হইয়া বৃন্দাবনে তক্তমণ্ডলীর
মধ্যে উপস্থিত হন।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রূপ সনাতন, রঘুনাথ দাস ও

ভক্ত-চরিতামৃত। গোপালভট্ট প্রভৃতি সংসারবিরাগী সৰ্ব্বত্যাগী সাধু ভক্ত ম- ত্মাদের সঙ্গে শ্রীবৃন্দাবনেই বাস করেন। রূপ সনাতমের এক মাত্র ভ্রাতুষ্পত্র শ্রীবল্লভনয় জীব গােস্বামীও হরিপ্রেমে মুগ্ধ হইয়া সংসার ধর্ম পরিত্যাগ করেন। বৈষ্ণব গ্রন্থে জীব গােস্বামী সম্বন্ধে লিখিত আছে, তিনি শৈশবকালে রূপ সনাতনের নিকটে রামকেলিতে অবস্থিতি করিতেন। এই সময় হইতেই বৈষ্ণবধৰ্ম্মে তাহার অনুরাগ জন্মিয়াছিল। পরে তাঁহার পিতা বল্লভ রূপ গোস্বামীর সঙ্গে শ্রীচৈতন্যদর্শনার্থ প্রয়াগ গমন করিলে, তিনি চন্দ্রদ্বীপের বাটীতে আসিয়া বাস করিয়াছিলেন। ইনি অল্প বয়সে ব্যাকরণ সাহিত্য অলঙ্কারাদি শাস্ত্রে বিশেষ শিক্ষালাভ করিয়াছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর জীবের বৈরাগ্যোদয় হয় ও তত্ত্বশাস্ত্র অধ্য- য়নের জন্য নবদ্বীপে আগমন করেন। তিনি আজীবন দার পরিগ্রহ করেন নাই। তৎকালে অবধূত নিত্যানন্দ নবদ্বীপ ধামে চৈতন্য প্রবর্তিত হরিভক্তিবিধান প্রচারে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি জীবকে বৃন্দাবন ধাম গমন করিতে অনুমতি করেন। তদনুসারে জীব অবিলম্বে বৃন্দাবনােদ্দেশে যাত্রা করিয়া বারাণসীধামে উপস্থিত হইলে মধুসূদন বাচস্পতির সহিত তাহার সাক্ষাৎ হয়। বাচস্পতি একজন কাশীর প্রসিদ্ধ অধ্যাপক ছিলেন। জীব তাহার নিকটে কিছু দিন ন্যায় ও বেদান্তদর্শন অধ্যয়ন করিয়া অল্প দিনেই কাশীধাম মধ্যে ন্যায় ও বেদান্ত শাস্ত্রে প্রধান পণ্ডিত বলিয়া পরিগণিত হইয়া ছিলেন। অধ্যয়ন সমাপ্ত করিয়া তিনি মথুরা মণ্ডলে চলিয়া আসিলেন, এবং পিতৃব্যদিগের সঙ্গে বাস করিতে লাগিলেন।

প্রয়ােদশ অধ্যায়। ১৩১ তদনধি আর বৃন্দাবন ত্যাগ করেন নাই। জীব, রূপের মন্ত্রশিষ্য ও পিতৃব্যদ্বয়ের অনুরূপ গুণবান, প্রেমিক, ভক্ত, ও সংস্কৃত শাস্ত্রে বুৎপন্ন পণ্ডিত ছিলেন। রূপ গােস্বামীর নিকটে তিনি সমস্ত ভক্তিশাস্ত্র শিক্ষা করিয়াছিলেন। তত্ত্বশাস্ত্রে তাহার জ্ঞান প্রতিভা অসাধারণ ছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ে একমাত্র আচাৰ্যরূপে পরিগৃহীত হইয়াছিলেন। এরূপ কথিত আছে, বিষ্ণুস্বামী সম্প্রদায়ের বল্লভাচার্য প্রণীত “তত্ত্বদীপ” গ্রন্থ জীবকে দেখাইলে, তিনি উক্ত গ্রন্থের ভ্ৰম প্ৰদৰ্শন পূৰ্ব্বক বিস্তর বৈদান্তিক-বিতর্ক উপ- স্থিত করিয়াছিলেন। কেহ কেহ এরূপও বলেন যে, জীব, বেদান্তবিদ্যায় রামানুজের তুল্য পণ্ডিত ছিলেন। যাহা হউক, রূপ, সনাতন ও জীব গােস্বামীকে চৈতন্যপ্রচারিত বৈষ্ণব ধর্মের বেদব্যাস বলা যাইতে পারে। চঁহার জ্ঞানগর্ভ ও প্রেমভক্তিরসাত্মক বিবিধ গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়া শ্রীচৈতন্যের প্রেম ভক্তির ধর্মকে ভারতে দৃঢ় করিয়া গিয়াছেন। রূপ গােস্বামী ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, উজ্জ্বলনীলমণি এবং জীব গগাস্বামী সন্দর্ভ প্রভৃতি গ্রন্থে প্রেমভক্তিরসের গভীর সিদ্ধান্ত সকল সুশৃঙ্খলার সহিত লিপিবদ্ধ করিয়া ভুক্তি-তত্ব-বিজ্ঞান প্রচার করিয়াছেন। বৃদ্ধ বয়সে ইহারা বৃন্দাবনের, দ্বারে দ্বারে যৎসামান্য মাধুকরী ভিক্ষা দ্বারা কুথঞ্চিৎ রূপে জীবন ধারণ করত তরুতল আশ্রয় করিয়া কেবল হরিগুণানুকীৰ্ত্তন, গ্রন্থনুশীলন ও গ্রন্থরচনাতে নিমগ্ন থাকিতেন। ইহারাই এ প্রদেশে বৈষ্ণবধৰ্ম্মের প্রধান প্রচারক ছিলেন এবং শ্রীকু- ষ্ণের বৃন্দাবন-লীলার রস মাধুৰ্য্য কামগন্ধশূন্য পবিত্র ভাবে, ভক্ত-চরিতামৃত। গ্রহণ করিয়া তাহা প্রচার করেন। রূপ গাের্মী ভক্তিরসামৃতসিন্ধুতে ভক্তিরস ব্যাখ্যান, ও উজ্জলনীলমণি গ্রন্থে রাধাকৃষ্ণের লীলা, বিদগ্ধ মাধব ও ললিত মাধব নাটকদ্বয়ে শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলা ও দ্বারকালীলা বর্ণন করেন। তদ্ভিন্ন দানকেলিকৌমুদী, গােবিবিরুদাবলী, মথুরামাহাত্ম্য, হংসদুত, লঘুভাগবতামৃত, স্তবমালা, উদ্ধবসন্দেশ প্রভৃতি বহুসংখ্যক গ্রন্থ তিনি রচনা করেন। সনাতন গগাস্বামী ভাগবতামৃত, হরিভক্তিবিলাস, রাসামৃতসিন্ধু গ্রন্থে ভক্ত, ভক্তি ও কৃষ্ণতত্ব, শ্রীকৃষ্ণের মাধুৰ্য্য রসলীলা ও বৈষ্ণব- দিগের নিত্যকৃত্য আচার ব্যবহারাদি বিবৃত করিয়াছেন। জীব গােস্বামী গােপালচম্পু, উপদেশামৃত, বসন্দর্ভ ॥ প্রভৃতি বহুল গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তদ্ভিন্ন গােপালতাপনী, ব্ৰহ্ম- সংহিতা, উজ্জ্বল নীলমণি প্রভৃতি অনেক গুলি গ্রন্থের টীকা ও ভাষ্য রচনা করিয়াছিলেন। এই সকল গ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় লিখিত। তদ্ব্যতীত বাঙ্গালা ভাষায় রূপ গােস্বামীকৃত রিপু- দমন বিষয়ে রাগময়-কোণ ও সনাতন গােস্বামী প্রণীত কৃষ্ণ- ভক্তিবিষয়ে রসময়-কলিকা এবং জীবগােস্বামী প্রণীত কড়চা গ্রন্থ আছে, কিন্তু এই সকল প্রাচীন গ্রন্থ এক্ষণে অতীব দুপ্রাপ্য। শ্রীচৈতন্য রূপ সনাতনকে মথুরা বৃন্দাবনের বিলুপ্ত প্রায় তীর্থ সকল পুনরুদ্ধার করবার জন্য বারম্বার অনুরােধ করি- * ইহার অন্ত নাম ভাগবতসন্দর্ভ। এই গ্রন্থ ছয় ভাগে বিভক্ত বলিয়া ইহাকে “সন্দর্ভবলে। যথা :—তত্বসন্দর্ভ, ভগবৎসর্ত, ভক্তিসন্দর্ভ, পরমাত্মসন্দর্ভ, কৃষ্ণসন্দর্ভ ও প্রীতিসন্দর্ভ।

এলােদশ অধ্যায়। ছিলেন। * ইহাতে অনুমান হয়, তৎসময়ে মথুরা বৃন্দাবন পরবর্তী কালের ন্যায় প্রসিদ্ধ ছিল না। এক্ষণে যে স্থানে যে যে দেবালয় কুঞ্জ কুটীর প্রভৃতি দেখিতে পাওয়া যায়, তখন তাহা বিদ্যমান ছিল না। চৈতন্যের পরবর্তী সময়ে বৃন্দাবনধাম বিশেষ ভাবে বিখ্যাত হইয়া উঠে, এবং স্থানে স্থানে দেবমন্দির ও সাধক ভক্তদিগের লতাকুঞ্জশশাভিত সুরম্য সাধনাশ্রম সকল প্রতিষ্ঠিত হইয়া দিব্য শ্রীতে শােভান্বিত হয়। চৈতন্যের সময়ে যে দুই চারি জন ভক্তবৈষ্ণব তীর্থদর্শনের উদ্দেশে বৃন্দাবন আসিতেন, তাহারা তীর্থ মনে করিয়া বৃন্দা- বনের নানাস্থানে পরিভ্রমণ করিয়া বেড়াইতেন। যখন শ্রীগৌরাঙ্গ বৃন্দাবন গমন করিয়া রাধাকুণ্ড তীর্থের অনুসন্ধান করেন, তখন কেহই তাহাকে রাধাকুণ্ডের কথা বলিতে পারেন নাই। পরিশেষে তিনি তীর্থ বিলুপ্ত হইয়াছে জানিয়া, একস্থানে ধান্যক্ষেত্রের অল্প জলে স্নান করিলেন। ইহা দেখিয়া তত্ৰত্য অধিবাসীরা বিস্মিত হইয়াছিল। উত্তরকালে এইস্থান রাধাকুণ্ড নামে বিখ্যাত হইয়াছে। পুরীসম্প্রদায়ের গুরুনাধবেন্দ্র পুরী মথুরায় আগমন করিয়া গােপালমূর্তি প্রকাশ করেন, এবং রূপ গােস্বামী মথুরামাহাত্ম-গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়া লােপ প্রাপ্ত তীর্থ সকল পুনঃপ্রকাশিত করিয়াছিলেন । বৃন্দাবনধামে গােবিন্দদেব ও মদনগােপলের সেবা রূপ সনা- তনই প্রচার করেন। মদনমােহন ও গোবিন্দজীর মন্দির, যাহা ভগ্নাবস্থায় এখনও বৃন্দাবনে অবস্থিত আছে, তাহা * কৰি কৰ্ণপুর প্রণীত সংস্কৃত “চৈতন্য চন্দ্রোদয় নাটকের ৯ম অঞ্চ।

১৩৪ ভক্ত-চরিতামৃত। রূপ সনাতন কর্তৃক সংস্থাপিত, এইরুপ কিম্বদন্তী প্রচলিত। আছে। কিন্তু গোবিন্দজীর মন্দিরে ১৫১২ শকের এক শিল্প- লিপি প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে। তাহাতে লিখিত আছে যে, পৃথুরাও কুলােদ্ভব মানসিংহ তাহা স্থাপিত করেন।* চৈতন্য- দেব ১৪৫৫ শকে অন্তর্হিত হয়েন, সুতরাং শিলিপি অনু- সারে গোবিন্দজীর মন্দির গৌরলীলাসমাপ্তির ৫৭ বৎসর পরে প্রতিষ্ঠিত। রূপ সনাতন এতদিন পর্যন্ত ইহলােকে ছিলেন, এরূপ বােধ হয় না। এই মন্দির মানসিংহের প্রতি ঠিত হইলেও রূপসনাতন কোনরূপে তাহার পরম্পরা-কারণ হইতে পারেন। মদনমােহনের মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে ভক্তমাল গ্রন্থে বর্ণিত হইয়াছে যে, সনাতন গােস্বামী প্রথমতঃ যমুনাতটে সূৰ্যঘাট নামক স্থানের সমীপবর্তী এক নিভৃত উচ্চ ভূমি- খণ্ডের উপরে সামান্য কুটীর নির্মাণ করিয়া মদনমােহন-বিগ্রহ সংস্থাপিত করেন। কিয়দিন পরে কোন একজন বণিক নাট্যশালা ও রত্নময়-বেদী-সমন্বিত সুবৃহৎ মন্দির নির্মিত করেন ও মদনমােহন বিগ্রহের রীতিমত সেবার বন্দোবস্ত করিয়া দেন। এইরূপ কথিত আছে, শেষাবস্থায় বৃন্দাবনে অবস্থান- কালে একদিন সনাতন যমুনাতে স্নান করিতে যাইতে- ছিলেন, এমন সময় পথিমধ্যে একটা মূল্যবান রত্ন দেখিতে পাইয়া ভাবিলেন, কোন দীন দুঃখীকে ইহা দান করিবেন। * “তত্ত্ববােধিনী পত্রিকা ১৭৭১ শকাব্দ, ১৩২ পৃষ্ঠা।

. এয়ােদশ অধ্যায়। কিন্তু ধন রত্ন স্পর্শকরা সন্ন্যাসীর পক্ষে নিষিদ্ধ, এই জন্য উহা একখানি খাপরাতে উঠাইয়া লইয়া কোন স্থানে মৃত্তিকা দ্বারা আচ্ছাদিত করিয়া রাখিয়া দিলেন। বর্ধমান প্রদেশ মানকর গ্রামনিবাসী জীবন নামক এক ব্রাহ্মণ অতিশয় দরিদ্র ছিলেন। এ ব্যক্তির অনেক পরিবার অথচ কিছুই অবলম্বন ছিল না। ব্রাহ্মণ অর্থের আকাঙ্ক্ষায় কাশীতে গিয়া বহুদিন শিবের আরাধনা করেন। শিব প্রসন্ন হইয়া স্বপ্নবস্থায় এই আদেশ করেন, বৃন্দাবনে সনাতন নামে এক গোলাঞি আছেন, তাঁহার নিকটে গমন করিলেই তােমার মনস্কামনা পূর্ণ হইবে। এ সংসারে কোন্ সূত্রে কি ঘটনা সঘটিত হয় কে বলিতে পারে ? ব্রাহ্মণের ভববন্ধন মােচ- নের সময় উপস্থিত, তাহা তিনি জানিতেও পারেন নাই, সামান্য ধনের চিন্তাতেই নিমগ্ন হইয়া আছেন; কিন্তু অচিরে তিনি যে পরম ধন প্রণাম ভগবানকে হৃদয়ে লাভ করিয়া ভব-যন্ত্রণা হইতে চিরদিনের মত মুক্তিলাভ করিবেন, তাহা কোন দিন স্বপ্নেও ভাবেন নাই। বিধাতা যখন দুঃখী জনের প্রতি দয়া করেন, তখন কাচ অন্বেষণ করিতে গেলেও তিনি দিব্যরত্ন মিলাইয়া দেন,-গরল প্রার্থনা করিলেও অমৃত দান করেন। ব্রাহ্মণ সনাতনের আশ্রমে সমাগত হইয়া দণ্ডবৎ • প্রণাম করিলেন, এবং আনাবেশে করযােড়ে রহিলেন। সনাতনও ব্রাহ্মণকে প্রণাম করিয়া মিষ্ট বাক্যে বলিলেন “ঠাকুর মহাশয়, তুমি কে?? এবং কি জন্যই বা এখানে আসিয়া আমার প্রতি কৃপা করিলে?” সনাতনের নম্রতাপূর্ণ প্রিয়- বাক্য শ্রবণ করিয়া বিপ্রের চিত্ত চমৎকৃত ও দ্রবীভূত হইয়া ১৩ ভক্ত-চরিতামৃত। গেল। ব্রাহ্মণ সকল কথা সনাতনকে বিজ্ঞাপিত করিতে, সনাতন বলিলেন, আমি ভিক্ষাজীবী, কোথায় অর্থ পাইক? শ্ৰণ করিয়া ব্রাহ্মণের হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া গেল, নিরাশ হৃদয়ে নানাপ্রকারে বিলাপ করিতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণের কাত- রতা দেখিয়া সনাতন আকাশ পাতাল, ভাবিয়া আকুল হই- লেন। এমন সময়ে দৈবাৎ মণির বৃত্তান্ত মনে পড়িয়া গেল। ব্রাহ্মণকে আশ্বাসিত ও শান্ত করিয়া বলিলেন, “ঠাকুর, আমার স্মরণ ছিল না, মহাদেব মিথ্যা বলেন নাই, বহুমূল্য মণি পাইবে, আমার সঙ্গে চল দেখাইয়া দিই।” সনাতন ব্রাহ্মণকে সঙ্গে সইয়া যমুনাতীরে গেলেন, এবং বামহন্তের তর্জনী হেলাইয়া বলিলেন, “এই স্থানের মৃত্তিকা খুড়িয়া দেখ।” ব্রাহ্মণ মৃত্তিকা খনন করিয়া মণি না পাইয়া সনাতন- কে বলিলেন, “তুমি উহা উঠাইয়া দাও।” তিনি বলিলেন, আমি স্নান করিয়াছি, স্পর্শ করিব না। পুনৰ্ব্বার খুজিতে খুঁজিতে ব্রাহ্মণ মণি পাইলেন এবং গোসাঞিকে প্রণাম করিয়া চলিয়া গেলেন। পথে যাইতে যাইতে জীবন মনে মনে এই চিন্তা করিতে লাগিলেন,গোসাঞি এমন মূল্যবান রত্ন কেন আমাকে দিলেন, ইহা রাখা কি স্পর্শ করা দুরে থাকুক, একবার চাহিয়াও দেখিলেন না, আর আমি ইহারই জন্য ব্যাকুল হইয়া ঈশ্বরের আরাধনা করিলাম, এই ত আমার চরিত্র! ছি! ছি! আমার এই ঘৃণিত জীবনে শত ধিক্ ! আর এই রত্নকেও ধিক! এই অসার বস্তু দূরে পরিত্যাগ করিয়া আমি তাহার চরণে শরণ লইব, তিনি যে ধন পাইয়া মজিয়া আছেন, আমি । ত্রয়ােদশ অধ্যায়। । তাই লইৰ, বিনা মূল্যে আমি তাহার পদে বিক্রীত হইব। দক্ষুিদ্র ব্রাহ্মণ এইরূপ ভাবিয়া ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করিয়া বটেশ্বর গ্রাম হইতে ফিরিয়া গেলেন, এবং সনাতনের পদতলে পড়িয়া বলিতে লাগিলেন, “এই তুচ্ছ মণি মুক্তাতে আমার আর প্রয়ােজন নাই, কৃপা করিয়া আমাকে চরণে স্থান দিয়া কৃষ্ণ- প্রেমধন দান করিয়া কৃতার্থ কর।” গোঁসাঞি বলিলেন, “তুমি তাহা পাইবে না, গৃহে গিয়া শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা কর, সংসার হইতে উত্তীর্ণ হইবে।”, ব্রাহ্মণ বলিলেন, “আমি গৃহে যাইব না, তােমার চরণই একমাত্র আমার ভরসা, কৃপা করিয়া মুঢ় জনকে আশ্রয় দাও।” সনাতন বলিলেন, যদি মণি পরিত্যাগ করিতে সমর্থ হও, তবে হরিধন পাইবার যােগ্য হইবে। এই কথা বলিবামাত্র ব্রাহ্মণ মণি যমুনা মধ্যে নিক্ষেপ করিলেন। তাহা দেখিয়া সনাতন মহা আনন্দিত হইয়া ব্রাহ্মণকে গাঢ় আলিঙ্গন করিলেন, এবং বিস্তর প্রশংসা করিয়া কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত করিলেন। ধন্য মনাতন! তুমিই প্রকৃত স্পর্শমণি, তােমার পবিত্র সংস্পর্শে ব্রাহ্মণের ক্ষণস্থালী পার্থিব ধনের পিপাসা মিটিয়া গেল। তদবধি এই ব্ৰহ্মণের বংশধরেরা গােস্বামী বলিয়া বিখ্যাত হইয়াছেন এবং তাহারা মানকর পরিত্যাগ করিয়া কাঠমাড়গাগ্রামে অদ্যাপি বাস করিতেছেন। রূপ সনাতন বিবিধ শাস্ত্রে যদিও প্ৰবীণ পণ্ডিত ছিলেন, তথাপি নিরভিমান নিৰ্ম্মৎসর হইয়া আপনাদিগকে অতি অকিঞ্চন জ্ঞান করিতেন। যাহারা পৃথিবীর মান সন্ত্রম ইন্দ্রিয়তৃপ্তি ভােগেশ্বৰ্য্য তৃণের ন্যায় পরিত্যাগ করিয়া পরমে- ভক্ত-চরিতামৃত। শ্বরের শরণাপন্ন হইয়াছেন, প্রাকৃত জনােচিত গর্ব অভিমান তাহাদের স্বর্গীয় হৃদয়ে কি প্রকারে স্থান পাইবে? একদা একজন দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত পাণ্ডিত্যাভিমানে স্ফীত হইয়া রূপ সনাতনকে বিচার-যুদ্ধে আহ্বান করেন। হরিপ্রেমে প্রেমিক নিরহঙ্কার রূপ সনাতন বিনা বিচারে পরাজয় স্বীকার করিয়া পণ্ডিতকে জয়পত্র লিখিয়া দিলেন। এই সময়ে জীব গােস্বামী যমুনাতে স্নান করিতে গিয়াছিলেন। দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত জীবকে জয় করিতে অভিলাষ করিয়া হস্তী অশ্ব প্রভৃতি সঙ্গে লইয়া মহাসমারােহে যমুনাতীরে উপস্থিত হইলেন, এবং জীবকে বলিলেন, রূপ সনাতন বিচারের ভয়ে আমাকে জয়পত্র লিখিয়া দিয়াছেন, তুমি হয় বিচার কর, নতুবা জয়পত্র লিখিয়া দাও। জীব ইহা শুনিয়া চিন্তা করিয়া দেখিলেন, এ ব্যক্তি রূপসনাতনের মহিমা কিছুই জানে না, পণ্ডিতা- ভিমানী হইয়া তাহাদিগকে পরাভব করিয়াছি মনে করিয়া গর্ব করিতেছে, এই গর্ব খর্ব করা আবশ্যক। এই ভাবিয়া প্রকাশ্যে বলিলেন, বিনা শাস্ত্র প্রসঙ্গে তুমি তাহাদিগকে কি প্রকারে পরাভূত করিলে? যাহাহউক, আমি তাহাদের একজন ক্ষুদ্র শিষ্য, আমাকে পরাভব কর, দেখি কেমন তােমার পাণ্ডিত্য। এই বলিয়া জীব শাস্ত্ৰবিচারে দিগ্বিজয়ীকে পরাস্ত করিয়া তাহার দর্প চূর্ণ করিলেন। রূপ গোস্বামী এই বিচা- রের কথা শুনিয়া অত্যন্ত কুপিত হইলেন,এবং জীবকে ভৎসনা করিয়া বলিলেন,তুমি জয় পরাজয় মান অপমান ত্যাগ করিয়া বৈরাগী হইয়াছ, তবে কেন পরাজয় করিতে ইচ্ছা করিলে ? আপনি পরাভব স্বীকার করিয়া অমানী হইয়া দীনতার সহিত

এয়ােদশ অধ্যায়।
১৩৯
কেন তাহাকে মান ও জয়দান করিলে না? জীব বলিলেন,
গুরুনিন্দা অসহ,-এই জন্য বিচার করিয়াছি। জীব গােস্বামীর
অভিমান নাই, রূপ তাহা জানিতেন, তথাপি লােকশিক্ষার
উদ্দেশে শাসন করিবার জন্য বলিলেন, “অদ্য হইতে আমি
আর তােমার মুখাবলােকন করিব না।” গুরুদেবের এই
বাক্য বজ্রের ন্যায় জীবের হৃদয়ে বিদ্ধ হইল, কাতর হৃদয়ে
অনেক স্তুতি মিনতি করিলেন, কিন্তু তাহাতেও রূপ প্রসন্ন
হইলেন না। অবশেষে অন্ন জল পরিত্যাগ করিয়া যমুনাতটে
নির্জন স্থানে থাকিয়া গুরু-পদধ্যানে নিযুক্ত হইলেন। গুরু-
বিরহ-শােকে দুই নয়নে অবিরল জলধারা বহিতে লাগিল।
কৃচ্ছ সাধ্য তপস্যাতে শরীর জুমে শীর্ণ হইয়া আসিল। সনা-
তন জীবের এরূপ কষ্টকর অবস্থা শুনিয়া দুঃখিত হইলেন
এবং রূপের নিকট গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, যতপ্রকার সদা-
চার আছে,তন্মধ্যে সকলের ইষ্টজনক শ্রেষ্ঠ সদাচার কি? রূপ
বলিলেন, প্রভু, আমার বিবেচনায় জীবে দয়াই সর্বশ্রেষ্ঠ সদা-
চার। সনাতন বলিলেন, তবে কেন তাহা হয় না? তখন
রূপ এই বাক্যের তাৎপৰ্য্য হৃদয়ঙ্গম করিয়া জীবকে আহ্বান
করিলেন, এবং স্নেহসহকারে ছলছল নয়নে আলিঙ্গন করিয়া
পুনগ্ৰহণ করিলেন। জীবও গুরুপদে শত শত প্রণাম করিয়া
কৃতার্থ হইলেন।
রূপ বৃন্দাবনে আগমন করার পর অতি কঠোর ব্রত
অবলম্বন করিয়াছিলেন। কোন দিন অনাহারে কাটাইয়া
দিতেন, কোন দিন কিঞ্চিৎমাত্র দুগ্ধপান করিয়া জীবন ধারণ
করিতেন। সনাতন ইহা অবগত হইয়া একদিন অনুযােগ

১৪০ ভক্ত-চরিতামৃত। করিয়া রূপকে বলিলেন, তুমি অনশন থাকিয়া কৃষ্ণকে কেন, দুঃখ দাও, মাধুকরী ভিক্ষা দ্বারা উদর পূর্ণ কর। তদনুসারে রূপ ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করেন। প্রথমতঃ রূপ নিজে রন্ধন পূৰ্ব্বক ভােজন করিতেন, পরে সনাতনের আদেশে স্বপাক- ডােজন পরিত্যাগ করেন। তৎকালে মহানুভব আকবরশাহ দিল্লীর সম্রাট ছিলেন। তিনি সনাতনের মহত্ত্ব ও সাধুতার বিষয় অবগত হইয়া তাহার দর্শন লালসায় বৃন্দাবনে আইসেন।..বিরক্ত বৈরাগী সন্ন্যাসীর পক্ষে রাজদর্শন অবৈধ জ্ঞান করিয়া প্রথমতঃ সনাতন আকবরের সহিত কথা কহেন নাই। পরে আকবরকে ঈশ্বর-পরায়ণ ভক্ত জানিয়া সম্মান প্রদর্শন পূর্বক আলাপ করেন। সনাত- নের কোন আকাঙ্ক্ষা থাকিলে তাহা পূরণ করিবেন, আক- বরের এই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নিঃসঙ্গ বীতস্পৃহ ভগবৎপ্রেমিক বৈরাগীর কামনা পূর্ণ করা সম্রাটের সাধ্যায়ত্ত নয়। ভগবৎ চিন্তাতে হৃদয়মনকে নিমগ্ন করিয়া সাধুর যে নির্মল শান্তি ও শাশ্বত সান্দ্রানন্দ সম্ভোগ করেন, তাহা পৃথিবীর অতীত বস্তু। ভক্তের হৃদয় যে পিপাসায় পিপাসিত, পৃথিবীর পঙ্কিল বারি- তে তাহা নিবারিত হইতে পারে না। সাধক ভক্ত উদ্ধে • চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্রখচিত অনন্ত নীলাকাশ এবং নিম্নে স- সাগরা সকানন কুসুমকুন্তলা ধরণী, এই বিপুল বিশ্বসৃষ্টিতে ও আপনার মানসপটে প্রেমস্বরূপ পরমেশ্বরের অনন্ত সৌন্দৰ্য্য ও অনির্বচনীয় মহিমা এবং দীপ্যমান মঙ্গলভাব অবলােকন করিয়া যে সুগভীর আনন্দার্ণবে আপনাকে নিমজ্জিত করেন, তাহার সহিত পার্থিব কোন আনন্দের তুলনা হইতে পারে ?

ত্রয়ােদশ অধ্যায়।
১৪১
এন আৰ্য ঋষি বলিয়াছেন,
“নিস্তরঙ্গোহতিগম্ভীরঃ সান্দ্রানন্দসুধার্ঘবঃ ।
মাধুকৈরসাধার একএবান্তি সর্বতঃ ॥”
ঈশ্বর নিস্তরঙ্গ অতি গম্ভীর, নিবিড় আনন্দস্বরূপ, সুধার
সমুদ্র এবং মাধুৰ্য রসের একমাত্র আধার। যাহারা সেই
সুধাসমুদ্রে অবগাহন করিয়াছেন, এবং সেই প্রগাঢ় মাধুৰ্য্য
রসের বিন্দুমাত্রও আস্বাদন করিয়া আকাম হইয়াছেন,
তাহাদের আর কোন্ কামনা অবশিষ্ট ও অপূর্ণ আছে যে,
তাহারা ইতর জনের, ন্যায় রাজপ্রসাদের জন্য লালায়িত
হইবেন? ফ্রান্স দেশীয় কোন ধর্মপরায়ণ মহৎ ব্যক্তি জনকো-
লাহলময় নগর পরিত্যাগ করিয়া শান্তিময় বিজনপল্লীতে
বাস করিতেন। সম্রাট লুই ফিলিপ তাহার ধার্মিকতাতে
মুগ্ধ হইয়া তাহাকে দর্শন করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলে
সেই সাধু পুরুষ বলিয়াছিলেন, আমি রাজপ্রাসাদে গমন
করিলে হতবুদ্ধি ও অপ্রস্তুত হইয়া যাইব, গাঁর রাজা আমার
কুটীরে আসিলে কষ্ট অনুভব করিবেন, অতএব যিনি যেখানে
আছেন, তিনি সেই স্থানেই থাকুন, ইহাই সৎপরামর্শ।
দিগ্বিজয়ী আলেকজান্দার কোন সময়ে গ্রীকদেশীয় সন্ন্যাসী
দায়ােজিনিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে গিয়া রাজ গর্বে গর্বিত
হইয়া বলিয়াছিলেন,-“তুমি আমার নিকটে 'কি প্রার্থনা
কর ?” দায়ােজিনিস তখন রৌদ্র সেবন করিতেছিলেন।
তিনি বলিলেন, তােমার নিকটে আমার কিছুই প্রার্থনা
নাই, তুমি মৎসমীপে দণ্ডায়মান থাকাতে আমার রৌদ্র
পােহাইবার ব্যাঘাত হইতেছে, অতএব তুমি সরিয়া দাঁড়াও,

১৪২ ভক্ত-চরিতামৃত। যাহা তুমি দিতে পার না, তাহা হইতে বঞ্চিত করিও না।” আরব দেশের খ্যাতনামা সম্রাট হাক রশিদ উদ্দেশীয় তাপস- বিশেষের দর্শন লাভের নিমিত্ত জনৈক অনুচরকে তাঁহার আশ্রমে প্রেরণ করিলে, সেই মহাতেজা তপন্থী অনুচরকে গম্ভীর স্বরে বলিয়াছিলেন, আমার নিকটে সম্রাটের কি প্রয়ােজন—আমারই বা তাহার নিকটে কি “প্রয়ােজন ? আমাকে বিষয়ান্তরে আকৃষ্ট করিও না। আমাদের ভক্ত সনাতনও আকবরকে বলিয়াছিলেন, আমার কিছুই আকাঙ্ক্ষা নাই। শেষে সম্রাট নির্বন্ধ সহকারে পুনঃ পুনঃ অনুরােধ করতে সনাতন বলেন, যদি একান্তই আমাদের উপকার করিতে আপনার বাসনা হয়, তবে আমাদের আশ্র- মের যে অল্পস্থানটুকু যমুনার স্রোতে ভাঙ্গিয়া গিয়াছে, তাহা বান্ধাইয়া দিন।* সনাতনের এবম্বিধ তীব্র বিষয়বৈরাগ্য ও জলন্ত ঈশ্বরপ্রেমিক সন্দর্শন করিয়া আকবরের গর্ব অভি- মান দূর হইয়া গেল। বিনয়াবনম্র হৃদয়ে বলিতে লাগিলেন, “যিনি ত্রিজগতের নাথ পরম দুলভ ও দুরাধ্য, তিনি আপনার হৃদয়ধামে সদা বিরাজমান, আপনি সেই দেৱদুলভ * অর্থতত তােমার স্থানে কিছু নাহি চাহি। • এক যে বাসনা যদি শুন তবে কহি। এই যে খমুনাতীরে আমার আশ্রয়। ভাঙ্গিয়া পড়িল জলে অল্পস্থান হয়। এই স্থানটুকু মােরে বান্ধাইয়া দেহ। তব স্থানে মুঞি আর কিছু নাহি চাহ ।” ভক্তমালগ্রন্থ।

ত্রয়ােদশ অধ্যায়। ১৪৩ । মহাধনে পরম ধনী হইয়াছেন, আমি আপনার কোন্ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করিব, আমার রাজত্বের গৌরব বৃথা অভিমান মাত্র।” রূপ সনাতনের প্রাকৃত জীবন সম্বন্ধে অধিক কিছু জানিবার উপায় নাই। বৈষ্ণব গ্রন্থকর্তারা তাহাদের আধ্যা- ত্মিক জীবনের ইতিহাসই বিস্তৃতরূপে বর্ণন করিয়াছেন। যাহা হউক, ইহাদিগের পার্থিব জীবন বৃন্দাবন ধামেই নিঃশে- বিত হয়। চৈতন্যদেবের অন্তর্ধানের ঠিক কত দিন পরে রূপ ও সনাতনের পরলােকপ্রাপ্তি হয়, তাহা আজি ও অসংশয়িতরূপে প্রতিপাদিত হয় নাই। ১৪৭৬ শকে সনাতন “বৈষ্ণব তােষণী” রচনা করেন। তাঁহার আদেশে জীব- গােস্বামী এই গ্রন্থের একটী সংক্ষিপ্ত সংগ্রহ ১৫৪ শকে লিখিয়াছিলেন। “নরােত্তম বিলাস গ্রন্থে লিখিত আছে, চৈতন্যান্তৰ্ধানের অনেক দিন পরে খেতরীনিবাসী নরােত্তম ঠাকুর যখন যৌবনের প্রথমাবস্থায় বৃন্দাবনে ভক্ত- মণ্ডলীতে আন্সিয়া উপস্থিত হন, তাহার অল্পদিন পূর্বে রূপ ও সনাতন গােস্বামী মানবলীলা সম্বরণ করিয়াছিলেন। মহানুভব কৃষ্ণদাস কবিরাজ গােস্বামীর “শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত” গ্রন্থ রচনা ১৫৩৭ শকে । সম্পূর্ণ হয়, তৎকালে কেবল জীব গােস্বামীই জীবিত ছিলেন। বৃন্দাবনে ইহাদের সহিত নবরাত্তম ঠাকুরের সাক্ষাৎ হইয়াছিল। এই সকল কারণে * সজ্জনতােঘণী, ২য় খণ্ড ২২• পৃষ্ঠা। + ২ “শাকে সিগ্নি বাণেদৌ জ্যৈষ্ঠে বৃন্দাবনান্তরে। সূৰ্যাহেংসিত পঞ্চম্যাং গ্রন্থােহয়ং পূর্ণতাং গতঃ।”

১৪৬ ভক্ত-চরিতামৃত। ছেন। ধন, মান বিদ্যা বুদ্ধি সকলই ইহারা পরমেশ্বরের সেবাতে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। ইহাদের প্রদীপ্ত- বহিশিখাববৈরাগ্য ও স্বর্গীয় জীবনের পুণ্য-প্রভায় শত শত ব্যক্তির ঘাের সংসারাসক্তি ও ইন্দ্রিয়তৃষ্ণা তৃণবৎ দগ্ধী ভূত হইয়া গিয়াছে। ফলতঃ ঈশ্বরপরায়ণ সাধুগণের পুণ্য- বারি-বিধৌত মুখমণ্ডলে কি এক অপূৰ্ব্ব স্বর্গীয় ভাব নিহিত আছে। তাহাদের সংস্পর্শ মাত্রে সংকীর্ণচেতা সংসার-সর্বস্ব ইন্দ্রিয়-লােলুপ সহস্র সহস্র লােকের মােহ-যবনিকা মুহূর্ত মধ্যে উদঘাটিত হইয়া যায়। জরা-ব্যাধি-শােকতাপে সন্তপ্ত, বিবিধ দুর্নীতি ও পাপভারে ভারাক্রান্ত এবং সংসারমােদে আসক্তচিত্ত নরনারীর মােহাচ্ছন্ন হৃদয়ে ধর্মের বিমল আলােক প্রতিভাসিত করাই ধৰ্মাত্মা মহাপুরুষদিগের জীব- নের উদ্দেশ্য। রূপ সনাতন প্রভৃতি সৰ্বত্যাগী উদাসীন ভক্ত বৈষ্ণবদিগের সাধু দৃষ্টান্তে এবং ইহাদিগের মুখারবিন্দ বিগলিত ভক্তিরসামৃত-সিঞ্চিত উপদেশ-বচনাবলী, শ্রবণ করিয়া কত কত ধনী-সন্তান পরমার্থ-রসপানে প্রমত্ত হইয়া সংসার-সুখ বিসর্জনপূৰ্ব্বক পথের ভিখারী হইয়াছিনে। এই সময়ে যে কেহ ইহাদের পবিত্র সংস্পর্শে আসিয়াছেন তাহারাই নৰজীবন লাভ করিয়া ধন্য হইয়াছেন। যখন বঙ্গীয় জনসমাজ ভক্তি শ্রদ্ধা বিশ্বাস নির্ভরশীলতা প্রভৃতি হৃদয়ের সুকোমল ভাবকে বিস্মৃত হইয়া কেবল শুষ্ক- কৰ্ম্মবন্ধনে জড়িত ছিল, সেই সময়ে ইহারা শুদ্ধভক্তিরূপ অমৃত ফলের আস্বাদন করত পরবর্তী লােকদিগের জন্য গ্রন্থাকারে তাহা দান করিয়া গিয়াছেন। চারি শত বৎসর ১৪৭ পরিশিষ্ট। পুৰ্ব্বে ইহারা যে সকল অমূল্য সত্য জীবনে পৰিণত ও প্রাণ- প্রদ বাক্যে প্রচারিত করত নীরসচিত্ত লােকদিগের হৃদয়ে প্রেমধারা প্রবাহিত করিয়া গিয়াছেন, তাহা আজিও সুদূরাগত বংশীধ্বনির ন্যায় মর্মস্থলে স্পষ্ট হইয়া আমাদের কঠোর চিত্তকে বিগলিত করিয়া তুলিতেছে। কালের পরিবর্তমে দেশের দুর্ভাগ্যক্রমে যদিও আমাদের দেশের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অতিশয় হীনদশা উপস্থিত হইয়াছে, যদিও তাহারা বিশুদ্ধজ্ঞানানুশীলনের অভাববশত নানাপ্রকার কুসংস্কার, অন্ধতা ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের আশ্রয়-ভূমি হইয়া উঠিয়াছে, তথাপি এই সকল পূর্বতন, বৈষ্ণবাচার্যের অসা- মান্ত সরলতা ও অপরিমেয় প্রেমাভিষিক্ত পবিত্র জীবন, এবং ইহাদিগের প্রদত্ত অমূল্য উপদেশমালা আজিও শত প্রকার অনাচার ও অসাত্ত্বিকতা এবং ভ্ৰষ্টাচার ও পাপা- চারের মধ্যেও বৈষ্ণবসম্প্রদায়কে কিয়ৎ পরিমাণে ধৰ্মভাবে সঞ্জীবিত করিয়া রাখিয়াছে। অদ্যাপি.এই সম্প্রদায়ে যে পরিমাণে অহৈতুকী ভগবদ্ভক্তি, আচারনিষ্ঠা, হরিনাম শ্ৰৱণ-কীৰ্ত্তনাদিতে অনুরাগ ও হৃদয়বিমােহন বিনয়-বৈরাগ্য দেখিতে পাওয়া যায়, অন্যত্রে তাহা অতি দুলাভ। পরিশিষ্ট। বৈষ্ণব শাস্ত্রকারগণ পরমেশ্বরের প্রতি মানবের প্রেম ভক্তিকে প্রধানতঃ পাঁচ ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন। যথা:

১৪৮ ভক্ত-চরিতামৃত। শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মাধুৰ্য্য। শান্তরস দুই গুণ- বিশিষ্ট,—ইহার একটী ঈশ্বরে একান্ত নিষ্ঠা ও অপরটা বিয়াসক্তি বর্জন। আকাশের গুণ শব্দ যেমন যাবতীয় ভৌতিক পদার্থেই বিদ্যমান আছে, সেইরূপ শান্তরসের এই গুণদ্বয় সকল ভক্তচরিত্রের মূলেই নিহিত আছে। শান্তরসের অনুশীলনে মনােমধ্যে ভগবৎ-সত্তার সঞ্চার হয়। সুতরাং ইহাকে ভক্তির পত্তনভূমি বলা যায়। সনক সনাত- নাদি মহর্ষিগণ এই রসের সাধক ছিলেন। দ্বিতীয়তঃ দাস্যরস,–এই রসে শান্তরসের দুই গুণ বিদ্যমান আছে, অধিকন্তু ইহা ভগবদৈৰ্যজ্ঞানজনিত সন্ত্রম ও গৌরবসূচক সেবার ভাবেও পরিপূর্ণ। ঈশ্বনােপাসকগণ সাধারণতঃ এই ভাবের সাধক মধ্যে পরিগণিত হন। তৃতীয়তঃ সখ্যরস, এইয়সে শান্তের অনাসক্তি ও ভগবৎ নিষ্ঠা এবং দাসস্যর সেবা বিদ্যমান আছে। তদতিরিক্ত প্রেমাস্পদ বন্ধুর প্রতি যেরূপ একান্ত বিশ্বাস এবং সর্বতােভাবে সঙ্কোচশূন্য, আত্মী- মতার উদ্রেক হয়, সেই প্রকার এই রসেও ঈশ্বরের প্রতি এই সকল ভাবের সঞ্চার হইয়া থাকে। ভীমার্জন ও শ্ৰদামাদি ব্রজবালকগণ এই রসের সাধক ছিলেন। ইহার পর বাৎসল্য, বাৎসল্যে শান্ত দাস্য ও সখ্যরসের সমুদায় ভাব নিহিত আছে, তদ্ভিন্ন আপনাকে প্রতিপালক ও ভগবানকে প্রতিপাল্যভাবজনিতম্নেহ এই রসের মূল। নন্দ ও যশাে- দার ভাবই বাৎসল্য রস। পঞ্চমতঃ মধুর,-এই রসে পুর্বোক্ত চারি রসের সমুদায় ভাব মিলিত হইয়াছে। অধিকন্তু 'আত্ম- সমর্পণই ইহার মূল ভাব। ক্ষিতি, জল, অগ্নি, বায়ু, পরিশিষ্ট ১৪৯ আকাশ, এই পঞ্চভূতের গুণ যেমন পরম্পরাভাবে মিলিত হইয়া মৃত্তিকাতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়াছে, অর্থৎ শব্দ স্পর্শ রূপ রস গন্ধ এই পঞ্চ তন্মাত্রা মৃত্তিকাতে একাধারে মিলিত ই- য়াছে, সেই প্রকায় শান্তের গুণ দাস্যে, দাস্যের গুণ সখ্যে, সখ্যরসের গুণ বাৎসল্যে ও বাৎসল্যের গুণ কান্তভাবে সন্নি- বিষ্ট হওয়ায় ইহা মাধুৰ্য্যরস নামে অভিহিত হইয়াছে। এই মাধুৰ্য রসে সকল রসের সমাহার হওয়ায় ইহা অমৃতাস্বাদযুক্ত ও হৃদয়ােন্মাদক। পতি প্রাণসতী যেমন প্রাণপতির পতি একান্ত অনুরাগিণী, তদ্রুপ একনিষ্ঠ হইয়া ভগবানের যে ভজনা, বৈষ্ণবশাস্ত্রমতে তাহাই কান্তভাব বা মাধুৰ্যরস। ভক্তিশাস্ত্রানুসারে পঞ্চবিধ রসের মধ্যে এই মধুর রস অর্থাৎ নায়ক নায়িকার ভাবই সর্ব শ্রেষ্ঠ। স্বামী স্ত্রী সম্বন্ধের অভ্যন্তরে সকল প্রেমের সম্বন্ধই অন্তর্নিবিষ্ট হইয়া আছে । সাধ্বী স্ত্রী প্রেমপুলকে পূর্ণ হইয়া অসঙ্কোচে স্বামীকে আত্ম- সমর্পণ করেন, সখীর ন্যায় উপদেশ দেন, দাসীর ন্যায় সেবা করেন, পিতামাতার ন্যায় স্নেহ করিয়া থাকেন এবং শিষ্যের ন্যায় অনুগত হয়েন। এই কারণ দেযৰ মতে মধু রসের সাধনে পরমেশ্বরে চিত্তের উন্নয়ন ও অব্যভিচারী স্থিতি সর্বোৎকৃষ্ট। ব্রজধামের গােপাঙ্গনাগণ এই মাধুৰ্য্য রসে বা নায়ক নায়িকার ভাবে, শ্রীকৃষ্ণের উপাসনা করিতেন। ভগবৎসম্বন্ধীয় স্বাভাবিক স্বতঃসিদ্ধ ভাবগুলিকে হৃদয়ে উদ্দীপন করার নাম সাধন *। সাধন-ভক্তি দ্বিবিধ, বৈধ ৯ “নিত্যসিদ্ধস্ত ভাব প্রকট্যং হৃদি সাধ্যতা।” ভক্তিরসামৃতসিন্ধু নিত্যসিদ্ধ স্বাভাবিক ভাবগুলিকে হৃদয়ে উদ্দীপন করার নামই সাধন।

১৫০ ভক্ত-চরিতামৃত। ও রাগানুগা। স্বাভাবিক অনুরাগ নাই, অথচ শাস্ত্রবিধির। অধীন হইয়া ভৱনা করাই বৈধী অর্থাৎ বিধিসিদ্ধ। ভক্তি- শাস্ত্র এই সাধন-ভক্তির চতুঃষষ্টি অঙ্গ লিখিত হইয়াছে। রাগানুগা ভক্তি বিধি-নিষেধ-নিরপেক্ষ, কেবল রাগময়ী, এই জন্য বৈধী অপেক্ষা তাহা অতি প্রবল। বৈধী ভক্তির উদ্দেশ্য এই যে, সাধন বিষয়ে স্বাভাবিক অনুরাগ। ও রুচি না থাকিলেও সাধন-নিষ্ঠা বশতঃ ক্রমে প্রকৃত প্রেম- রসের উদ্দীপন হইবে। আর স্বাভাবিক রুচিতে প্রবল অনুরাগের পথে আত্মবিসর্জনই রাগাত্মিকা প্রগন্ত ভক্তি। মাধুৰ্য রসের রসিক, ব্রজবাসী জনের ইহাতে মুখ্য অধি- কার #। ইষ্ট বিষয়ে অর্থাৎ অভিলষিত বিষয়ে স্বাভাবিক গাঢ় তৃষ্ণাই ইহার স্বরূপ-লক্ষণ। বর্ষার অবিরত ধারা বর্ষণে সাগরমুখগামিনী স্রোতস্বিনী উচ্ছসিত হইয়া যেমন তটভূমি প্লাবিত করিয়া ছুটিতে থাকে, সেইরূপ বিশুদ্ধ প্রগাঢ় প্রেমা- নুরাগ জন্মিলে সাধক বেদ বিধি লৌকিকাচার কুলমান প্রভৃ- তির বন্ধন ছেদন করিয়া প্রেমময়ের উদ্দেশে প্রধাবিত হয়। বৈষ্ণব শাস্ত্রানুসারে ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম, মােক্ষরূপ চতুৰ্ব্বর্গ ফলপ্হা গরিত্যাগ করিয়া ভগবৎ-প্রেমরস আস্বাদন করাই জীবের চরম উদ্দেশ্য। বৃন্দাবনের গােপ গােপিকার এই, নিঃস্বার্থ প্রেমেই পরমেশ্বরের আরাধনা করিতেন, ইহাই বৈষ্ণবশাস্ত্রের তাৎপৰ্য্য। মথুরা শ্রীকৃষ্ণের জ্ঞানধাম, দ্বারকা ঐশ্বৰ্য্যধাম, আর প্রেমধামের নাম বৃন্দা- বন। উপাসনার মুলই প্রেম। যাহারা ভক্তিপ্রেমােপচারে ভগবানের আরাধনা করেন, তাহাদিগকে এখানে ব্রজবাসী বলা হইয়াছে।

;
পরিশিষ্ট।
ঈশ্বরকে হৃদয়স্বামীরূপে উপাসনা, স্বকীয় ও পরকীয়া
ভেদৈ দ্বিবিধ। প্রেমের তীব্রতা হৃদয়ঙ্গম করাইবার জন্যই
বৈষ্ণবশাস্ত্রে পরকীয়া রসের অবতারণা। ব্রজাঙ্গনাগণ
অন্যের বিবাহিতা পত্নী হইয়াও কৃষ্ণানুরাগিণী,—অর্থাৎ
প্রেমাস্পদের জন্য তাহারা তাড়ন ভৎসন লােকনিন্দা সহ
করিয়া ইই পরলােক, শাস্ত্ৰধৰ্ম্ম, স্বজন পরিজন সকলই পরি
ত্যাগ করিয়াছিল। প্রেমরসােল্লাসের এই হৃদয়ােদর
সুতীব্ৰ মাধুৰ্য্যই পরকীয়া প্রেমের লক্ষ্য ; এই জন্য দৃষ্টান্ত
স্বরূপে রূপকচ্ছলে শ্রীকৃষ্ণের ব্রজবিহার বর্ণিত হইয়াছে।
বস্তুতঃ যখন আমরা বিষয়মমাহে হতচৈতন হইয়া সংসারকে
হৃদয়মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করি, তখনই আমরা সংসারকে পতিত্বে
বরণ করিয়া থাকি। এই সংসারাসক্তিরূপ পতির ক্রোড়
পরিত্যাগ করিয়া ভগবৎপ্রেমেয় আস্বাদন করাই গােপী-
ভাব। গােপীদিগের প্রেম ইন্দ্রিয়-বিকার-জনিত কাম নহে,
তাহা বিশুদ্ধ প্রেম ; ভাবসাম্য বশতঃ প্রাকৃত প্রেমের লক্ষণ
সকল ইহাতে বর্ণিত হইয়াছে মাত্র।
“পমৈব গােপরামাণাং কাম ইত্যগমৎ প্রথং।
ইত্যুদ্ধবাদয়ােপ্যেতং বাঞ্ছন্তি ভগবৎপ্রিয়াঃ ॥”
(হরিভক্তিরসামৃতসিন্ধুবৃত গৌতমী তন্ত্র বচন।)
গােপরামাদিগের প্ৰেম “কাম” এই নামেতে আখ্যাত
হইয়াছে, বস্তুতঃ তাহা বিশুদ্ধ প্রেম। উদ্ধবাদি ভগবদ্ভক্তগণ
তাহা পাইবার জন্য সর্বদা বাঞ্ছা করিয়া থাকেন। যথাযােগ্য
বিষয়ে প্রযুক্ত প্রতি-বাঞ্ছাই প্রেম, অার অযােগ্য বিষয়ে
প্রযুক্ত হইলেই তাহাকে কাম বলা যায়। সচ্চিদানন্দস্বরূপ

।
১৫২
ভক্ত-চরিতামৃত।
পরমাত্মাই জীবাত্মার যথাযযাগ্য প্রীতির বিষয়, ভগবৎসম্বন্ধ।
শূন্য পার্থিব বিষয়ই প্রীতির অযােগ্য বিষয়। 'লৌহ ও স্বর্ণ
উয়ে ধাতু হইলেও যেমন স্বরূপতঃ বৈলক্ষণ্য আছে, কাম
ও প্রেমেও তােপ। কাম অন্ধতমঃ স্বরূপ, প্রেম নির্মল
প্রদীপ্ত সূৰ্য্য। যাহা আত্মপ্রীতির উদ্দেশে অনুষ্ঠিত হয়, তাহ
কাম, আর যাহা সুখ দুঃখ ইন্দ্রিয়বিলাস বিস্মৃত করাইয়া
তনুমনইন্দ্রিয়কে সৰ্ব্বততভাবে ভগবানের সেবা ও প্রীতি-
সাধনে নিযুক্ত করে তাহাই প্রেম। কবিরাজ গােস্বামী
বলিতেছেন,
“গােপীগণের প্রেমের রূঢ়ভাব নাম।
শুদ্ধ নিৰ্ম্মল প্রেম কভু নহে কাম।
কাম প্রেম দোহাকার বিভিন্ন লক্ষণ।
লৌহ আর হেম যৈছে স্বরূপ বিলক্ষণ ।
আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে বলি কাম।
কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম ।
কামের তাৎপৰ্য্য নিজ সম্ভোগ কেবল।
কৃষ্ণ সুখ তাৎপৰ্য মাত্র প্রেমেত প্রবল।
লােকধৰ্ম্ম বেদধৰ্ম্ম দেহধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম।
লজ্জা ধৈৰ্য্য দেহসুখ আত্মসুখ মৰ্ম্ম।
দুস্ত্যজ্য আৰ্যপথ নিজ পরিজন।
স্বজনে করয়ে যত তাড়ন ভৎসন।।
সৰ্ব্বত্যাগ করি করে কৃষ্ণের ভজন।
কৃষ্ণ মুখ হেতু করে প্রেমের সেবন ।
ইহাকে কহিয়ে কৃষ্ণে দৃঢ় অনুরাগ।
স্বচ্ছ ধোঁতবস্ত্রে যেন নাহি কোন দাগ ।
G

পরিশিষ্ট। ১৫৩ অতএব কাম প্রেম বহুত অন্তর। কাম অন্ধতমঃ প্রেম নিৰ্ম্মল ভাস্কর, অতএব গােপীগণের নাহি কাম গন্ধ। কৃষ্ণ সুখলাগি মাত্র কৃষ্ণ সে সম্বন্ধ।” চৈতন্য চরিতামৃত আদি খণ্ড, ৪র্থ পরিচ্ছেদ। নিরুপাধি নির্মল প্রেমের রীতি ও অদ্ভুত গােপীভাবের স্বভাব এই যে, যদিও গােপীর সুখ-সম্ভোগে বাসনা নাই, কিন্তু প্রাণনাথের চরণে হৃদয় মন অৰ্পণ করিয়া তাহার সন্তোষ সাধন হইলে আপনা হইতেই হৃদয়ে অপূৰ্ব আনন্দের উদ্ভব হয়। এই জন্যই গােপীর প্রেম কামগন্ধ শূন্য, যেহেতু গােপীর স্বার্থপর সুখ নহে-কৃষ্ণ-পর মুখ । প্রীতি বিষয়াননে তদায়ান। তাহা নাহি নিজ সুখ বাঞ্ছার সম্বন্ধ ॥ নিরুপাধি প্রেম যাহা তাহা এই রীতি। প্রীতি বিষয় সুখে আশ্রয়ের প্রতি চৈঃ চঃ আদিখণ্ড ৪র্থ পরিচ্ছেদ। প্রীক্সি বিষয় অর্থাৎ প্রতিপা কৃষ্ণের আনন্দেই প্রীতির আশ্রয়স্বরূপা গােপীগণের আনন্দ হইয়া থাকে। প্রেম- স্পদের সুখেই প্রেমিকের সুখ, ইহাই প্রীতির ধর্ম। সুতরাং গােপিকার যে প্রেমানন্দ সম্ভোগ করেন, তাহা নিষ্কাম অহৈতুকী প্রীতির পুরস্কার মাত্র। গােপী-প্রেমের স্বার্থশূন্য বিশুদ্ধতা প্রতিপাদনের নিমিত্ত পুনশ্চ কথিত হইতেছে, এই প্রেমাননে অতিমাত্র বিল হইলে যদি ভগবানের সেবার ব্যাঘাৎ হয়, অর্থাৎ আনন্দ সম্ভোগেচ্ছার প্রাচুৰ্য্যবশতঃ ১৫৪ ভক্ত-চরিতামৃত। কর্তব্য সাধনে অন্তরায় ঘটে, তাহা হইলে সেই প্রেমান কেও গােপীগণ (অর্থাৎ ভক্তগণ) দূরে পরিত্যাগ করেন। “নিজ প্রেমানলে কৃষ্ণ সেবানন্দ বাধে। সে আনন্দের প্রতি ভক্তের হয় মহা ক্রোধে। আর শুদ্ধ ভক্ত কৃষ্ণ প্রেম সেবা বিনে। স্ব মুখাৰ্থ সালােক্যাদি না করে গ্রহণে।' কম গন্ধহীন স্বাভাবিক গােপী প্রেম। নিৰ্ম্মল উজ্জল শুদ্ধ যেন দগ্ধ হেম ॥” চৈঃ চঃ আদিখণ্ড ৪র্থ পরিচ্ছেদ। সুতরাং গােপী গ্ৰেমে অর্থাৎ শুদ্ধভক্তি সাধনাতে কাম- নার গন্ধমাত্রও নাই। এই কারণে বৈষ্ণবাচাৰ্যগণের মতে এই নিৰ্ম্মল অনুরাগমার্গ অবলম্বন বতীত বিশুদ্ধ অকিঞ্চনা ভক্তি লাভের উপায়ান্তর নাই। প্রধান গােপিকা শ্রীরাধি- কাতে এই মাধুৰ্যঞ্জণেপেত মহাভাবময়ী ভক্তির চরম অভি- ব্যক্তি। ভক্তিশাস্ত্র শ্রীমদ্ভাগবতে শ্রীকৃষ্ণের , ব্রজলীলা বিস্তারিতরূপে বর্ণিত হইয়ছে। সাধারণতঃ এই গ্রন্থই ব্ৰবিহার বর্ণনার আদি গ্রন্থ বলিয়া পরিচিত। কিন্তু এই ভাগবতে রাধিকার নাম নাই ।। ভাগবতের রাসপঞ্চা- * ইহার দৃটান্তস্বরূপ কথিত হইয়াছে, শ্রীকৃষ্ণের সারথি দারুক, শ্রীকৃষ্ণকে চার-ব্যজন করিবার সময়ে প্রেমানলে তাহার দেহ অবশ প্রায় হইলে, সেবার বাধা জন্মাইবে বিবেচনায় সেই আনন্দকে তিনি অভিনন্দন করিলেন । ভক্তিরসামৃতসিন্ধু। + বিষ্ণুপুরাণ এবং হরিবংশেও শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনবিহার বর্ণিত হইয়াছে। কিন্তু তাহতেও রাধিকার নাম নাই। মহাভারতেও কেবল সভাপর্বে দ্রৌপ পরিশিষ্ট গায়ে এইরূপ বর্ণিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ রাসমণ্ডল পরিত্যাগ ; করিয়া জনৈক গােপীসহ একাকী রজনীযােগে বনান্তরালে ভ্রমণ করিতে গিয়াছিলেন, এই গােপী সম্বন্ধে অন্যান্য গােপ- বালাগণ বলিতেছেন, “অনয়া রধিতে নূনং ভগবান হরিরীশ্বরঃ। যন্নোবিহায় গােবিন্দঃ প্রীতাে যামনয়দ্ৰহঃ ॥” অর্থাৎ হে সহচরি! এই রমণী আরাধনা দ্বারা ভগবান ঈশ্বর হরিকে নিশ্চয় বশীভূত করিয়াছে। তাহা না হইলে গােবিন্দ আমাদিগকে পরিত্যাগ করিয়া ইহাকে লইয়া প্রীত মনে নিভৃতস্থলে যাইতেন না। এই শ্লোকে “রাধিত” শব্দ হইতেই উত্তরকালে “রাধা” নামকরণ হইয়াছে। 'রাধ ধাতুর অর্থ সাধন, প্রাপ্তি, সন্তোষণ, পূজা। যে আরাধনা করে, সেই রাধা। “রাধতি আরাধয়তীতি রাধেতি নাম- (বৈষ্ণবতােষণী) চক্রবর্তী বলেন, “রাধয়তি কৃষ্ণ বাঞ্ছাপূরণং আরাধয়তীতি রাধা।” রাধিকা যে প্রাকৃত গােপনহেন, বৈষ্ণবশাস্ত্র পাঠে তাহা স্পষ্ট উপলব্ধি হয়। পরমেশ্বরের পরা-প্রকৃতি অর্থাৎ করণম।” দীকৃত কৃষ্ণস্তরের মধ্যে “গোপীজনপ্রিয় এই শব্দমাত্র আছে। ব্রহ্ম বৈবর্ত- পুরাণ ব্যতীত অন্য কোন প্রাচীন শাস্ত্রীয় গ্রন্থে রাধিকার না নাই। কিন্তু অনেকের মতে, প্রচলিত ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অপেক্ষাকৃত আধুনিক সময়ের লিখিত। ইহাতে রাধাকৃষ্ণ সম্বন্ধীয় অতিশয় অনুচিত বর্ণনা দেখিতে পাওয়া যায়। অথর্ব বেদান্তৰ্গত “গােপাল তাপনীয়ােপনিষৎ বৈষ্ণবগণের একখানি প্রামাণ্য গ্রন্থ, ইহাতে একজন প্রধান গােপিকার নাম আছে, কিন্তু তিনি রাধিকা নহেন, তাহার নাম গান্ধী ভক্ত-চরিতামৃত। স্বরূপশক্তির নামই রাধা। রাধা পূর্ণশক্তি, কৃষ্ণশক্তিমান, মৃগমদ ও তদগন্ধ, এবং অগ্নি ও জ্বালা যেমন যুগপৎ ভেদ ও অভেদতত্ত্ব প্রকাশ করে, রাধাকৃষ্ণ তদ্রুপ। রূপ গােস্বামী লিখিয়াছেন, “রাধাকৃষ্ণ প্রণয় বিকৃতিঃহলাদিনী নাম শক্তিঃ শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়-বিকৃতিরূপ হলাদিনী শক্তির নাম রাধা। সৎ-চিৎ-আনন্দ ঈশ্বরের শক্তি। বৈষ্ণব-শাস্ত্রে ইহা সন্ধিনী সম্বিৎ ও হলাদিনী নামে কথিত হইয়াছে *। এই লাদিনী দ্বারা ভগবান স্বয়ং আনাম্বাদন করেন, ও ভক্তচিত্তে আনন্দ বিধান করেন। সমুদায় জীবেই এই শক্তি নিহিত রহিয়াছে। ভগবানের এই লাদিনী বা আনন্দবিধায়িনী শক্তির বিকাশে প্রেম বা অনিন্দ- চিন্ময়রসের অভ্যুদয় হয়। প্রেমের সার ভাব, ভাবের ঘনীভূত বা পরাকাষ্ঠা অবস্থা মহাভাব, এই মহাভাব সমুদায় চিন্তার সার, চিন্তা, এই জন্য ইহাকে চিন্তামণি বলা যায় ; ইহাই শ্রীরাধিকার স্বরূপ-বিগ্রহ। রাধিকার • প্রাকৃতিক দেহ নাই, ললিতাদি সখীনিচয় তাহার কায়বহরূপিণী।। রাধিকার আধ্যাত্মিক রূপ কবিরাজ গােস্বামী এইরূদ্ধে বর্ণনা করিয়াছেন; * “লাদিনী সন্ধিনী সম্বিৎ স্বয্যেকা সৰ্ব্বসংস্থিতৌ । দতপকরী মিশ্র ত্বয়ি নাে গুণ বর্জিতে।” বিষ্ণুপুরাণ ১ম অংশ। * “সচ্চিৎ আনন্দময় কৃষ্ণের স্বরূপ। অতএব স্বরূপ শক্তি হয় তিন রূপ। অনলাংশে হদিনী সদংশে সন্ধিনী। চিদংশে সম্বিৎ যারে জ্ঞান করি মানি।

পরিশিষ্ট। ১৫ ৭ U প্রেমধার মহাভাবরূপা রাধিকার প্রতি ভগবানের মেই সুগন্ধি দ্রব্যের ন্যায়, তাহার সুঘ্রাণ অর্থাৎ উদ্বর্তিত কৃষ্ণস্নেহ রাধিকার অঙ্গের উজ্জ্বলবর্ণ। এই কৃষ্ণপ্রেমরূপ সুগন্ধযুক্ত উজ্জ্বল দেহ পরমেশ্বরের কৃপারূপ অমৃতধারায় স্নাত হইয়াছে। তারুণ্যামৃত বা চিরনবীনত্ব ও লাবণ্যামৃত বা সর্বসৌন্দৰ্য্যরূপ অমৃতরসে তাহা পুনঃ পুনঃ অভিষিক্ত হই- তেছে। লজ্জারূপপট্টবস্ত্র ও কৃষ্ণানুরাগরূপ অরুণবসনে রাধা দেহ শােভা পাইতেছে। প্রণয়ের অভিমান তাহার বআচ্ছাদনী কলিকা। সৌন্দৰ্যকুঙ্কুমপ্রণয়রূপচন্দন ও স্মিতকান্তিকপূরে শ্রীঅঙ্গ বিলেপিত-ও হরিপ্রেমরসমৃগমদে তাহ চর্চিত। প্রচ্ছন্নমান তাঁহার বেণীবিন্যাস। অনুরাগ অধরের তালরাগ, প্রেমকৌটিল্য নয়নযুগলের কজ্জল। হর্ষ পুলকাদি সঞ্চারী ও সুদীপ্ত সাত্ত্বিকভাব এবং রসশাস্ত্রা- স্তৰ্গত নায়ক সমীপে নায়িকার কিলকিঞ্চিতাদি বিংশতি ভাব তাহার শ্রীঅঙ্গের ভূষণ। এই ভাবভূষণে-ভূষিতা, গুণশ্রেণি- রূপপুষ্পমালা ও সৌভাগ্যরূপ-তিলকধারিণী মহাভাবরূপ। রাধিকাদেবী হরিলীলার অনুকূল মনােবৃত্তিরূপাসখীগণ হলাদিনীর সার অংশ তার প্রেম নাম। আনন্দ চিন্ময়রস প্রেমের আখ্যান। প্রেমের পরম সার মহাভাব জানি। সেই মহাভাব রূপা রাধা ঠাকুরাণী। মহাভাৰ চিন্তামণি রাধার স্বরূপ। ললিতাদি সখী তার কায়বুরূপ” চৈঃ চঃ মধ্য খ, ম পরিচ্ছেদ। ১৪ ভক্ত-চরিতামৃত। পরিবেষ্টিত হইয়া নিজ অঙ্গের সৌরভপৰ্যঙ্কে উপবিষ্ট থাকিয়া সৰ্ব্বদা হরিসঙ্গাভ চিন্তাতে ময় আছেন। ভগবানের যশঃ মহিমা শ্রবণ কীৰ্ত্তনেই তিনি নিরন্তর নিমগ্না। তিনি বিশুদ্ধ প্রেমরত্নাকর হৃদয়েশ্বরকে প্রেমরূপসােমরস পান করাইয়া তাহার সকল কামনা পূর্ণ করেন *. এবষ্কৃত শ্রীরাধিকার সহিত শ্রীকৃষ্ণের প্রেমবিলাসবিবর্ত কি প্রকার ? উজ্জ্বল- নীলমণি গ্রন্থে রূপ গােস্বামী বলিতেছেন, “রাধায়া ভবতশ্চ চিত্ত তুনী স্বেদৈৰ্বিলাপ্যক্ৰমাৎ যুঞ্জনুদ্রি নিকুঞ্জকুঞ্জরপতে নিধুতভেদভ্ৰমং চিত্রায় স্বয়মন্বরঞ্জয়দিহ ব্ৰহ্মাণ্ড হৰ্ম্মোদরে ভূয়ােভি নবগহিঙ্গুলভরৈঃ শৃঙ্গাকারুকৃতী।” হে গােবর্ধনবিহারী শ্ৰীকৃষ্ণ। কর্প শিল্পকার এই ব্ৰহ্মাণ্ডরূপ হ মধ্যে তােমার এবং শ্রীরাধিকার চিত্তজতু দুইটী উভয়ের নবপ্রেমানুরাগরূপ হিঙ্গুলবর্ণে বারম্বার বিলে- পন করতঃ প্রেমাগিম্বেদের দ্বারা ক্রমশঃ ভেদরূপ মিথ্যা জ্ঞানবিরহিত করিয়া অর্থাৎ অভিন্নরূপে সংমিশ্রিত করতঃ কেমন অনুরঞ্জিত করিয়া রাখিয়াছে। এই শ্লোকে প্রেমভক্তি যােগের অতি নিগূঢ় ভাব সুচিত হইয়াছে। জীবাত্মা ও পরমাত্মার স্বরূপগতভেদ নিত্য, কিন্তু জীব. যখন প্রবল ব্যাকুলতাতে পরমেশ্বরের সৌন্দৰ্যসাগরে আপনাকে ডুবাইয়া ফেলে, তখন তাহার বাহ্যজ্ঞান বিলুপ্ত হয় এবং আপনার অস্তিত্বও ভুলিয়া গিয়া তন্ময় হইয়া * চৈতন্য চরিতামৃত মধ্যখণ্ড, ৮ম পরিচ্ছেদ।

পরিশিষ্ট। বায়। এই অবস্থায় সে সমুদয়ই ব্ৰহ্মময় দর্শন করে। উপ- রোক্ত শ্লোকে প্রেমে বিগলিত দুইটা চিত্তের অভেদভাৰ প্রকাশ পাইতেছে। কিন্তু ভক্তহৃদয় গভীর প্রেমানন্দে উচ্ছ, সিত হইলে বিবিধ ভাববৈচিত্র্যের উদগম হয়, এই জন্য নবরাহিঙ্গুলে অতি সুন্দর রূপে অনুরঞ্জিত হওয়া বর্ণিত হইয়াছে রাধাকৃষ্ণ একটী আধ্যাত্মিক রূপক। রাধা সাধক, কৃষ্ণ উপাস্য, এইটাই রাধাকৃষ্ণের মূল ভাব। চিত্তরূপ বৃন্দাবনে হৃদয় রাধিকা দয়া শ্রদ্ধা বুদ্ধি প্রেম অনুরাগাদি মনােবৃত্তিরূপ সখীনিচয়-পরিবেষ্টিত হইয়া ভগবানের প্রেম- নন্দ সম্ভোগ করেন, ইহাই এই আধ্যাত্মিক রূপকের মৰ্ম্ম । রায় রামানন্দের সহিত চৈতন্য দেবের যখন সাধনতত্ত্ব বিষয়ে কথোপকথন হয়, তখন তিনি রামানন্দকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, সাধ্য-বস্তু সমুদায় ত জানিলাম, সাধন বিনা ইহা লাভ হয় না; লাভ করিবার উপায় বলিয়া দাও । রামানন্দ, বলিলেন, সখীভাবই সাধনার সার। সখীভাব ভিন্ন আর কোন উপায়েই ইহা লাভ হয় না। সখীভাব “চৈতন্যচরিতামৃত” গ্রন্থে বিস্তারিতরূপে বর্ণিত হইয়াছে। তাহার স্থূল তাৎপৰ্য এই যে, সখীগণের প্রেম নিঃস্বার্থ, সখীগণ রাধিকাকে কৃষ্ণসঙ্গ করাইয়া সন্তুষ্ট হয়। অর্থাৎ মনােবৃত্তিরূপা সখীগণ প্রেমার হৃদয়কে পবিত্রস্বরূপ ঈশ্ব- রের সহবাস করিতে দিয়া আপনারা পরস্পর বিশুদ্ধ প্রেমে পরিপুষ্ট হয়। ঈশ্বরপ্রেম, কল্পলতা সদৃশ, দয়া শ্রদ্ধা অনু রাগাদি মনােবৃত্তি সকল পল্লবপুষ্পপত্র স্বরূপ। লতার মূঙ্গে লিসিঞ্চন করিলে যেমন পুষ্পপত্র প্রকুল্লিত হয়, সেই প্রকার ১০ ভক্ত-চরিতামৃত। প্রাণ যখন বিশুদ্ধ প্রেমযােগে প্রেমম্বরূপ পরমেশ্বরে মিলিত হয়, তখন বুদ্ধি জ্ঞান শ্রদ্ধা ভক্তি প্রভৃতি মানসিক-বৃত্তি সকল আধ্যাত্মভাবে পরিপূর্ণ হইয়া উঠে। এই প্রকারে নিস্পৃহ স্বার্থশূন্য হইয়া স্বাভাবিক অনুরাগভরে যে পবিত্র স্বরূপ ঈশ্বরের শরণাপন্ন হয়, তাহার চিত্তবৃত্তি সকল ধর্মের অনু- কূল হয়, সমুদায় ইন্দ্রিয় মধুময় ও পবিত্র হইয়া যায়। পবিত্র স্বরূপ ভগবানের সংস্পর্শে মনােবৃত্তি সকল পবিত্র হইয়া বিশুদ্ধ প্রেমে পরমাত্মাতে রমণ করে। ইহাই সখী- ভাবের তাৎপৰ্য। ইহা অবিশুদ্ধ ঐন্দ্রিয়ক ভাব নহে। “সহজে গােপীয় প্রেম নহে প্রাকৃত কম। কামক্রীড়া সাম্যে তার কহি কাম নাম।” ভগবানের প্রতি একান্ত অনুরাগ সমুপস্থিত হইলে ভক্তহৃদয়ে কি প্রকার অভাবের উদয় হয়, তাহা বিশদরূপে প্রদর্শন করাই ভাগবতাদি শাস্ত্রকারগণের উদ্দেশ্য। এই কারণে ভক্তিরসের পরিপুষ্টিসাধন জন্য গােপগােপীসংসৃষ্ট শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা প্রাকৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে মাত্র। ফলতঃ আৰ্য শাস্ত্রের সুবহু স্থলই এইরূপ অর্থবাদ ও আল- স্কারিক বাক্যে পরিপূর্ণ। মূল কথা এই যে, উজ্জ্বল প্রেমাব- লম্বনে ভগবানের আরাধনাতে লােক সকলকে প্রবৃত্ত করাইবার জন্য কৃষ্ণের ব্রজলীলার অবতারণা। ভাগবতের রাসলীলা নিবিষ্টচিত্তে পাঠ করিলেই ইহা স্পষ্টতঃ প্রতীয়- মান হয়। এই লীলা শ্রবণে রাজা পরীক্ষিত বারংবার সংশয় প্রকাশ করিয়া বলিয়াছিলেন, ধৰ্ম্মের সংস্থাপন ও অধর্মের বিনাশের নিমিত্ত ভগবান অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, তাহার পরিশিষ্ট। ঈদৃশ নিন্দনীয় আচরণের কারণ কি? 'শুকদেব শ্রীকৃষ্ণের মাহাত্ম্যকীৰ্ত্তন দ্বারা নানারূপে পরীক্ষিতের, সন্দেহ নির- সনের চেষ্টা করিয়া পরিশেষে বলিয়াছেন, ব্রজবধুদিগের সহিত ভগবান বিষ্ণুর এই ক্রীড়া যিনি শ্রদ্ধান্বিত হইয়া শ্রবণ ও বর্ণন করেন, তিনি ত্বয়ায় ভগবানে পরাভক্তি লাভ করিয়া বীরচিত্তে হৃদয়ের রোগরূপকাম শীঘ্র পরিত্যাগ করিবেন। * শুকদেবের এই বাক্যে ভাগবতকারের যথার্থ অভিপ্রায় প্রকাশ পাইতেছে। শ্রীমদ্ভাগবতকার একাধারে মহাদার্শনিক ও মহাকবি। তিনি অসাধারণ প্রতিভাবলে স্বীয় গ্রন্থে রাসক্রীড়াদির বর্ণনার মধ্যেও শ্রীকৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব অক্ষুন্ন রাখিতে বিশেষ প্রয়াস পাইয়াছেন। কিন্তু পরবর্তী পুরাণ ও কাব্যাদিতে ভাগবতকারের ন্যায় দেবচরিত্রের প্রতি তীক্ষ দৃষ্টি দেখিতে পাওয়া যায় না। প্রমাণ স্বরূপ ব্ৰহ্মবৈবর্ত পুরাণ ও জয়দেব গােস্বামীর গীতগোবিন্দের নাম করা যাইতে পারে। অনাবশ্যক বােধে ও অগীলতা দোষ পরি- হারের জন্য ইহার আলােচনা পরিত্যক্ত হইল। শ্রীমদ্ভাগবতে শুকমুখে গােপীদিগের যে মাধুৰ্য্যরশ্রিত ব্রজবিহারের ভাব অভিব্যক্ত হইয়াছিল, পরে তাহাই ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ প্রভৃতিতে বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হইয়াছে। ৫. “বিক্রীড়িতং ব্রজবধুতিরিদঞ্চ বিকে শ্রদ্ধান্বিতােহনুশৃণুয়াদৎ বর্ণয়েদ যঃ। ভক্তিং পরা ভগবতি প্রতিভকামং হৃদ্রোগমাখপহিনােতচিরেণ ধীরঃ ॥” ভাগবত, দশম স্কন্ধ।

ভক্ত-চরিতামৃত। '। তৎপরে ক্রমে • জয়দেব, বিদ্যাপতি, চণ্ডিদাস প্রভৃতি বৈষ্ণব কবিদিগের দ্বারা ইহা পরিপুষ্ট হইয়া শ্রীচৈতনের জীবনে কাষ্ঠাভাব প্রাপ্ত হইয়াছে। চৈতন্য যতিধৰ্ম্ম অবলম্বন করিয়া ভাগবত-উক্ত মাধুৰ্য্যরস আস্বাদন করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। ইন্দ্রিয়সংযম সম্বন্ধে তাহার অতি কঠিন শাসন ছিল। তিনি পরমজ্ঞানী পণ্ডিত ছিলেন। ভাগবতের লীলা সকল তিনি যে প্রাকৃত ভাবে গ্রহণ করিবেন, ইহা কখনই সম্ভব নহে। বিশেষতঃ রামানন্দের সহিত তাহার সাধ্য-সাধন-প্রসঙ্গ পাঠ করিলে স্পষ্টাক্ষরে জানা যায় যে তিনি ব্রজলীলা আধ্যাত্মিক-তত্বেই গ্রহণ করিয়াছিলেন। ভাগবত-প্রােক্ত প্রেমের অত্যারূঢ় ভাব সকল চৈতন্যের জীবনে প্রতিফলিত হইয়াছিল বলিয়া তদীয় শিষ্যগণ তাহাকে একদেহে যুগপৎ রাধাকৃষ্ণের দৃশ্যমান অবতার বলিয়া গিয়াছেন। * ফলতঃ * শ্রীমদ্রুপ, সনাতুন ও জীব গােস্বামী প্রভৃতি বৈষ্ণবাচাৰ্যগণ শ্রীকৃ- ফের চৈতন্যাবতার প্রাণপণে সমর্থন করিয়া গিয়াছেন। চৈতন্যাবতার যে এতদ্দেশে এক প্রকার প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, তাহা ইহাদেরই বিশেষ চেষ্টা ও যত্নের ফলে বলা যাইতে পারে। বৈষ্ণবদিগের মতে স্বয়ং ভগবা- নের অবতারের মুল প্রয়ােজন দুইটী, বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ। ভাগবতাদি শাস্ত্র নির্দিষ্ট ডারহরণাদি অর্থাৎ ধৰ্ম্ম সংস্থাপন ও দুষ্কৃতদিগের বিনাশসাধন, কৃষ্ণ অবতারের বহিরঙ্গ কাণ। আর ব্রজধামে নির্মল প্রেমলীলা প্রচার করা অন্তরঙ্গ কারণ। সেইরূপ কলিযুগে শুকৰ্মকাণ্ডত হরিভক্তিবিহীন লােকদিগকে উদ্ধার করিয়া আচণ্ডালে হরিনাম ও হরিভক্তি বিতরণ করিবার জন্য ভগবান শ্রীচৈতন্যরূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন,ইহা চৈতন্যাবহারের বহিরঙ্গ কারণ। ইহা ব্যতীত অন্তরঙ্গ নিগুঢ় কারণ আছে। শ্রীমদ্রুপ গোস্বামী প্রণীত পরিশিষ্ট। 'মাত্মাবরুদ্ধ মাধুৰ্য্যই যে মাধুৰ্য্যরসের শেষ পরিপাক,চৈতন্যের বিশুদ্ধ জীবনেই তাহা দেখিতে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান । ৬. ৩াহার উল্লেখ যানে। যথা :- *** ওবাযাঃ গুণ মাইমা কাদৃশােবানয়ৈবা স্বাদ্যে গেনদ্ভুিত মৰমা কাদৃশে। বা মদী। সেখা’ ম্যা মনুভব, কাদৃশ বেতিলােভা ওছ।বাঢ্য. সমজান শগ ভসিকে। ** ॥” শ। বাধিকার প্রণযমামা, অর্থাৎ আমার প্রতি তাহার প্রণয়ের পরিমাণ ক? আমার অত মাধুর্ণ বস যাহা কেবল রাধিকা আস্বাদন কবেন তাই । কি কাব ? এই মধুময বসাবান বার তিনি যে আনন্দলাভ কন, •াই বা কিশপ। এই নিষ্ঠা • অনুভব করিতে লোভ জমিনে অ' ৰ অাৰ বমিষা বৃষরূপচন্দ্র সীগ ৰূপ সিও ন্মগ্রহণ কবিলেন। কাবাজ স্বামী এই পাক অবলম্বন বা বাণখাছেন । পুঝে বৃন্দাবনে শাকৃষ্ণ ৰাধিক। স• প্রেমল' ও পসুখ সম্ভোগ করিতেন কিন্তু তাহার অতুল মাখসান খুব কাব্য বিক। যাদৃশ আনন্দশ বতেন, ক পূণ নিন্দ ও পূণপে-অকপলেও তাহা অনুভব করি। না পারিষা, অতীব ক্ষুব্ধ চিলেন। “শা জানি রাবার পেম কত গভী, যাতে আমিও বিল হইযা ,” এইপ চিন্তা কবি। শীস বাবা হৃদযের প্রেমােচ্ছাসে উন্মত্ত হই পডিতেন। এইণন্য এবার প্রকৃতিতে স্বীয প্রেম রসাস্বাদন কবিবার নিমিত্ত পূণস্তু বাব' ও পূর্ণ শক্তিমান কৃষ্ণ উভযে রাধাপ্রকৃতি ও বাবাকা ৩ নণ্ডিত হa এক দেহে গৌবাঙ্গরূপে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। এই কারণে ‘ন্যে এধিকার ন্যায় গৌরবণ হইযাছিলেন, ও আপনাকে বা প্রাণী ভাবনা ববি। কৃষ্ণবিরহে উন্মত্ত্ব ও প্রলপি প্রকাশ করি।

১৬৪ ভক্ত-চরিতামৃত। সময়ে গাের্মীও বৈষ্ণবনেতাদিগের দোষে সাধারণ বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে ইহা অতি বিকৃতাকার ধারণ করিয়াছে। এই প্রণয়রহস্য সাধারণ লােকে পাছে ভুল বুঝে, এই আশঙ্কায় জ্ঞানী বৈষ্ণবগণ, উজ্জ্বলনীলমণি, ললিতমাধব, বিদগ্ধমাধব প্রভৃতি উজ্জ্বল রসের গ্রন্থ সকল সাধারণের মধ্যে আলােচনা ও প্রচার করা অন্যায় বিবেচনা করেন। বঙ্গদেশের অধিকাংশ বৈষ্ণবই মাধুৰ্য্য-রসের সাধক। নেড়া, সহজিয়া, আউলে প্রভৃতি নানা সম্প্রদায়ে তাহাহা এখন বিভক্ত হইয়া পড়ি- যাছে। এই ৱৈষ্ণবগণের মধ্যে এখন নানাপ্রকার ভ্ৰষ্টাচার ও কুসংস্কার রাজত্ব করিতেছে। রাধাকৃষ্ণের প্রণয়-ব্যাপার ও বৈষ্ণবদিগের সাধনতত্ত্ব আলােচনা করিয়া কি আধ্যাত্মিক তত্ত্ব নিশ্চির্য করা যায়, আমরা তাহা দেখিবার চেষ্টা করিলাম। কিন্তু আধুনিক বৈষ্ণব-সমাজে তত্ত্বপক্ষীয় এই সকল আধ্যা- ত্মিক ভাব কিছুমাত্র আদৃত হয় না। অধিকাংশ বৈষ্ণব ইহার মর্ম গ্রহণেও সমর্থ নহে। প্রপঞ্চময় বৃন্দাবন-লীলাই এখন তাহাদের অাদর্শস্থানীয়। সাধারণের মধ্যে এই উজ্জ্বল রস প্রচার করাতে অনেক পরিমাণে যে এদেশের নৈতিক অবনতি সঘটিত হইয়াছে, তাহাতে আর সন্দেহ নাই।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Bhakta-charitamrita

Author
Chattopadhyay,aghoranath
Title
Bhakta-charitamrita
File name
Bhakta-charitamrita
Text
OCR done
Citation
1893
Published
2010/01/15
Publisher
Adharchandra Basu,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
182
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essays
Keywords
Bhakta-Charitamrita
DLI number
510914
Barcode
4990010018110.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
RTGQWliaFD3
Download PDF

Bhakta-charitamrita