Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Gouriyo-gourav Ed.2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
ঐশ্রীগুরুগৌরাঙ্গেী জয়তঃ
গৌড়ীয়-গৌরব
কলিকাতা এলবার্ট হলে বঙ্গাব্দ ১৩৩৬
১২ই শ্রাবণ তারিখে
ঐশ্ৰব্ৰহ্মমাধ্বগৌড়ীয়-সম্প্রদায়ৈকসংরক্ষক ওঁ বিষ্ণুপাদ অষ্টোত্তরশতী
শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গােম্বামি-প্রভুপাদের
অমুকম্পিত
গৌড়ীয়-সম্পাদক
শ্রীমৎ সুন্দরানন্দ|বিদ্যাবিনােদ বি-এ
কর্তৃক প্রদত্ত্ব বক্তৃতার মর্ম
দ্বিতীয় সংস্করণ
গৌরাব্দ ৪৩৩
১নং উল্টাডিঙ্গি জংসন বােড়
কলিকাতা গৌড়ীয় মই হইতে
শ্রীকুঞ্জবিহারী বিদ্যাভূষণ
কর্তৃক প্রকাশিত
২৪৩২ অপার সারকুলার রােড়
কলিকাতা গৌড়ীয় প্রিন্টিং ওয়ার্কসে
শ্ৰীঅনন্তবাসুদেব বিদ্যাভূষণ বি, এ
কর্তৃক মুদ্রিত
গৌড়ীয়-গৌরব
পত্রাঞ্চ
৭
১১
বিষয়-সূচী
বিষয়
পূৰ্বভাষ
মঙ্গলাচরণ
বক্তব্যবিষয়ের প্রণালী-বিচার
শ্রীজীব ও শ্রীবলদেবের প্রণালী বিচার
“গৌড়ীয়”-গবেষণা
“গৌড়ীয়”-আখ্যার বিভিন্ন কারণ
সৰ্ববিষয়ে-গৌড়ীয়-গৌরব
বৰ্ত্তমান জগৎ
সমসাময়িক জগতে গৌড়ীয়ের বাণী
বিশ্ব শান্তির নিদান
তরুণ-সঙ্ঘের প্রতি
অদ্বয়জ্ঞানের অচিন্ত্য স্বভাব
দিব্যকিশাের-মূর্তিই—স্বরাষ্ট্র,
ভাগবত-স্বরাজের বিজ্ঞান
গৌরচরিত্র—স্বরাজ-সাধনার বাস্তব-বেদ
১৪
১৭
২০
পত্রাঙ্ক ২। ২২ ২৮ বিষয় জাগতিক রাষ্ট্রনীতির ব্যভিচার বহুগণবাদ গৌড়ীয়ই—স্বরাজের প্রকৃতপথ-প্রদর্শক অসমাের্ধ গৌরবপাত্রের লঘুত্ব স্বীকার অভিজ্ঞতাবাদের মনীষার লঘুত্ব অভিজ্ঞতাবাদের চারিটী সন্তান অপরােক্ষবাদের ক্রমবিকাশ কৃষ্ণ স্বরাষ্ট্র কেন ? গৌড়ীয়ের ভজন সর্বোৎকৃষ্ট কেন? গৌড়ীয়-গৌরব সুদুর্লভ হলেও সাৰ্বজনীন গৌড়ীয়ের-গৌরব সৰ্ববিষয়ে অতুলনীয় গৌড়ীয়ের বৈরাগ্য-বিচার গৌড়ীয়ের শম-দম-ক্ষান্তি বিচার গৌড়ীয়ের বিশ্বপ্রেমিকা কিরূপ? গৌড়ীয়ের ধ্যানযােগ সহজ ও সর্বোত্তম গৌড়ীয়ের ভক্তি সৰ্বোত্তমা কেন ? গৌড়ীয়ের স্বতঃসিদ্ধ গুণগ্রাম অতুলনীয় কেন? গৌড়ীয়-গৌরবাবলীর তালিকা গৌড়ীয়-গৌরব বিষয়াশ্রয় ভেদে দ্বিবিধ নামশ্রেষ্ঠ তারকব্রহ্ম নাম মন্ত্রশ্রেষ্ঠ কামগায়ত্রী ৩৩ ৩৪ ৩৪ ৩৪ ৪ ০ ৪ ০ ৪১ ৪২ ৪৩ ৪৫ ৪৬ ৪৮ 8 ৪৯ ৫২ সেব্যশ্রেষ্ঠ সাদ্বৈত-সাবধূত-শচীনু গৌড়ীয়ের অসমােৰ্দ্ধ সৌন্দৰ্য্য, মহত্ত্ব ও ঔদার্য্য শ্ৰস্বরূপ দামােদর শ্রীরামানন্দ শ্ৰঠাকুর হরিদাস শ্রীরূপ সনাতন শ্ৰীকবিকর্ণপূর শ্রীদাস গােস্বামী শ্ৰীকবিরাজ গােস্বামী ঐঠাকুর বৃন্দাবন শ্রীঠাকুর নরােত্তম বিশ্বনাথ চক্রবর্তী শ্রীবলদেব বিদ্যাভূষণ গৌড়ীয়ের অন্ধকার যুগ শ্ৰঠাকুর ভক্তিবিনােদ প্রকৃত স্বাধীনতা, স্বরাজ ও অসহযোগ নীতি চৈতন্যের ধৰ্ম্মের সার্বজনীনতা প্রকৃত বিশ্বপ্রেমিকতা কিরূপে হইবে ? স্বদেশহিতৈষিগণের কৰ্ত্তব্য যুগপৎ আচার-প্রচারই জীবে দয়া যথার্থ পরােপকারের প্রণালী দেশ-কাল-পাত্রকে বিষ্ণুসেবায় প্রয়ােগ ৫৭ ৬
|
৬৪
প্রভুপাদের বিশ্বোপকারের দিদর্শন
উপসংহার
সভাপতির অভিভাষণ
সার মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর অভিমত
মিঃ বি, কে, সেনের অভিমত
রায় বাহাদুর ব্যানার্জির অভিমত
৭১
१२
१७
২
ওঁ বিষ্ণুপাদ
শ্ৰী শ্ৰীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গােস্বামি-ঠাকুব
ওঁ বিষ্ণুপাদ ©ল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর শ্রীশ্রীগুরুগৌরাঙ্গেীজত্বঃ গৌড়ীয়-গৌরব পূর্বভাষ কলিকাতাবাসী সজ্জনবৃন্দের আগ্রহাতিশয্যে গত ১২ই শ্রবণ (১৩৩৬), ২৮শে জুলাই (১৯২৯) রবিবার অপরাহু ৫ ঘটিকার সময় কলিকাতার সুপ্রসিদ্ধ আলবার্ট হলের সাধারণ সভায় গৌড়ীয় সম্প্রদায়ৈক-সংরক্ষক ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীশ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গােস্বামী প্রভুপাদের আনু- গত্যে গৌড়ীয়মঠ ও গৌড়ীয়-বৈষ্ণব-সম্প্রদায়ের একমাত্র সাপ্তাহিক মুখপত্র “গৌড়ীয়ের” সম্পাদক পণ্ডিত শ্রীপাদ সুন্দরানন্দ বিদ্যাবিনােদ মহাশয় একটী বিন্মগুলি-মণ্ডিত বিরাট-সভায় গৌড়ীয়-গৌরব সম্বন্ধে একটী অভিভাষণ প্রদান করেন। সভার প্রারম্ভে দিনাজপুরের কুমার বাহাদুর পরম- ভাগবত রাওসাহেব শ্ৰীযুক্ত শরদিন্দুনারায়ণ রায় এম, এ, প্রাজ্ঞ মহােদয় সভাপতি নির্বাচনের প্রস্তাবমুখে সমবেত সভ্যবৃন্দকে আহ্বান করিয়া বলেন,—“আজ আমাদের বড়ই সৌভাগ্য ও আনন্দের দিন ; আজ আমরা গৌড়ীয়ের গৌরবের ঠাকুর গৌরসুন্দরের কথা গৌড়ীয়-সম্প্রদায়ের ২ ; গৌড়ীয়-গৌরব মুকুটমণি প্রভুপাদের অনুগত গৌড়ীয় মঠের বক্তার মুখে শুনিতে পাইব ; আর সভাপতির আসন তলস্কৃত করিবেন- সৰ্বজন-পরিচিত, সধ্বজনমান্য পরমভাগবত স্যার দেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী মহােদয়। আজ গৌড়ীয় মঠই শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর বিশুদ্ধ সাৰ্বজনীন ধৰ্ম্মের কথা বিশ্বের সর্বত্র প্রচারে যত্নবান হইয়াছেন—গৌড়ীয় মঠই সাধ্বভৌমিক বৈষ্ণব-ধৰ্ম্মের কথা আচার ও প্রচারের মহা-চেতনতার আদর্শ লইয়া বিশ্বের দুয়ারে দুয়ারে গৌড়ীয়-গৌরব ঘােষণা করিতেছেন। আজ গৌড়ীয় মঠ এ প্রচারকাৰ্য্য আরম্ভ না করিলে গৌড়ীয়বৈষ্ণব- ধৰ্ম্মের গৌরব জগতে কেহই জানিতে পারি না। যেখানে যত লােকই আজ গৌড়ীয়-ধম্মের কথা বলিতেছেন, আলােচনা করিতেছেন,-সামান্তভাবে আচার-প্রচার করিতেছেন, সকলেই নূনাধিক পরােক্ষ বা অপরােক্ষভাবে বর্তমান শুদ্ধভক্তি-প্রচারের মূলপুরুষ ঠাকুর ভক্তিবিনােদ এবং তাহারই আনুগত্যে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধৰ্ম্ম-প্রচারকারী বিশ্ববিশ্রুত আদর্শ-প্রচার-প্রতিষ্ঠান গৌড়ীয় মঠের নিকট নূনাধিক ঋণী। গৌড়ীয় মঠের প্রভুপাদ ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্ৰীশ্ৰীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গােম্বামী মহারাজ গৌড়ীয়- বৈষ্ণব-সম্প্রদায়ের মুকুটমণি, তাহার শিষ্যগণ ও এক একজন এক একটী দিপাল। পাণ্ডিত্য-গৌরবে, আদর্শ-চরিত্র- গৌরবে, কৃষ্ণার্থে-ভােগত্যাগ-গৌরবে, গুরুগৌরাঙ্গের সেবা- গৌরবে প্রভুপাদের শিষ্যগণ বর্তমান যুগে অতুলনীয়।
গৌড়ীয়-গৌরব এই আলবার্ট হলে কত রাজনীতি-বিষয়ক বক্তৃতা, কত বিষয়-কথার আলােচনা হয়; কিন্তু আজ আলবার্ট হল মহাতীর্থে পরিণত; এখানে আজ হরিকথা হইবে—এখানে আজ গৌড়ীয়-বৈষ্ণব-সম্প্রদায়ের আচাৰ্য পরমহংস প্রভুপাদ, কত বৈষ্ণব-সাধুগণ, হরিকথা-পিপাসু কত মনীষিগণ আগমন করিয়াছেন। আলবার্ট হল আজ মহাতীর্থ। শ্রীচৈতন্যের ধৰ্ম্মেই বেদান্তের সর্বদেশীয় সিদ্ধান্ত পরি- পুটিত রহিয়াছে। উপনিষদে-বেদান্তে অভেদ-শ্রুতি ও ভেদ-শ্রুতি উভয়ই আছে ; কেবল অভেদবাদ স্বীকার করিলে বেদের একদেশীয় বিচার এবং বেদের অন্যান্য মন্ত্রের অবমাননা করা হয়। আবার উপনিষদে ভেদ-শ্রুতি-সমূহ থাকায় ভেদবাদের প্রাবল্য-পরিচয় পাওয়া গেলেও কেবল ভেদবাদ স্বীকার করিলে বেদের অভেদপর শ্রুতির অবমাননা ও একদেশীয় বিচার করা হয়। নিজের ইচ্ছামত তত্ত্বমস্যাদি চারিনী মন্ত্রকে ‘মহাবাক্য বলিয়া ঐ সকল শ্রুতির স্বকপােল- কল্পিত অর্থ করায় এবং সকল বেদের নিদান প্রণবকে ‘মহাবাক্য না বলায় বেদান্তের কল্পিত ব্যাখ্যা হইয়া পড়ে , তাই শ্রীচৈতন্যদেব ভেদ ও অভেদ-শ্রুতির অচিন্ত্য অপূর্ব সমন্বয় ও সম্মান এবং ঈশ্বরমূৰ্ত্তি প্রণবের মহাবাক্যত্ব স্থাপন করিয়া জগতে বেদান্তের সর্বদেশীয় অচিন্ত্যভেদাভেদ-সিদ্ধান্ত প্রকাশিত করিয়াছেন। গৌড়ীয়-সম্প্রদায়ের প্রভুপাদ ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীশ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গােস্বামী মহারাজ
গৌড়ীয়-গৌরব
এই বেদান্ত-সিদ্ধান্তের উপরই প্রতিষ্ঠিত করিয়া গৌড়ীয়-
গৌরবের কথা আজ বিশ্বে ঘােষণা করিতেছেন।
আমি অন্তরের সহিত প্রস্তাব করি, পরম ভাগবত স্যার
দেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী মহাশয় অদ্যকার সভাপতির পদ
অলঙ্কত করুন।”
কুমার প্রাজ্ঞ বাহাদুরের এই সাধু প্রস্তাব সমর্থিত
হইবার পর মাননীয় স্যার যুক্ত ডাঃ দেবপ্রসাদ সৰ্বাধিকারী
সুরিরত্ন, কে টী, সি, আই, ই, এম, এ, এল, এল, ডি
মহােদয় সভাপতির আসন পরিগ্রহ করিলেন।
কুমার
প্রাজ্ঞ বাহাদুর ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল পরমহংস ঠাকুর এবং
সভাপতি স্যার সৰ্বাধিকারী মহােদয়ের গলদেশে বিচিত্র
পুষ্পমাল্য পরাইয়া দিলেন। সভা-গৃহ মুখরিত করিয়া চতুর্দিক
হইতে আনন্দসুচক সম্মিলিত করধ্বনি উথিত হইল।
অতঃপর সভাপতি মহােদয় সভার নির্দিষ্ট সেবা-তালিকা-
সারে সর্বপ্রথমে একটী উদ্বোধন সঙ্গীত কীৰ্ত্তন করিবার জন্য
আচাৰ্য শ্রীপাদ অনশুবাসুদেব পরবিভূষণ প্রভুকে আহ্বান
করিলেন। পরবিদ্যাভূষণ প্রভু সভাগৃহ মুখরিত করিয়া তাহার
স্বভাবসুলভ-সুমধুর
কণ্ঠে নিম্নলিখিত গীতিটী গান করেন।
এমন দুৰ্ম্মতি,
সংসার ভিতরে
পড়িয়া আছি আমি।
তব নিজ জন,
কোন মহাজনে,
পাঠাইয়া দিলে তুমি।
গোড়ীয়-গৌরব
দয়া করি মােরে, পতিত দেখিয়া,
কহিল আমারে গিয়া।
ওহে দীনজন,
শুন ভাল কথা,
উল্লসিত হবে হিয়া ।
তােমারে তারিতে
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য
নবদ্বীপে অবতার।
তােমা হেন কত,
দীন-হীন জনে
করিলেন ভবপার।
বেদের প্রতিজ্ঞা,
রাখিবার তরে,
রুক্মবর্ণ বিপ্রস্তুত।
‘মহাপ্রভু নামে,
নদীয়া মাতায়,
সঙ্গে ভাই অবধূত ।
চৈতন্য গােসাঞী,
নিজ নাম করি’ দান।
তারিল জগৎ,
তুমিও যাইয়া,
লহ নিজ পরিত্রাণ।
সে কথা শুনিয়া, আসিয়াছি নাথ,
তোমার চরণ-তলে।
ভকতিবিনােদ,
কাদিয়া কাদিয়া,
আপন কাহিনী বলে ।
নন্দত যিনি,
গৌড়ীয়-গৌরব ; ; সভায় কলকাতা ও তন্নিকটবর্ত্তী বহু স্থান এবং বিভিন্ন দেশ-দেশান্তর হইতে বহু গণ্যমান্য, সজ্জন, শিক্ষিত, সাধু, বৈষ্ণব,প্রবীণ, প্রাচীন এবং তরুণ-স উপস্থিত হইয়াছিলেন। মহারাজা স্যার শ্ৰীযুক্ত মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী কে টি, সি, আই, ই ; কুমার বাহাদুর রায়সাহেব শ্রীযুক্ত শরদিন্দু নারায়ণ রায় এম, এ, প্রাজ্ঞ ; শ্রীযুক্ত অমরেন্দ্র নারায়ণ পাল চৌধুরী এস, ডি, ও, হাওড়া; রায়বাহাদুর শ্রীযুক্ত ডাঃ চূণীলাল বসু সি, আই, ই; মিঃ বি, কে, সেন এ, পি. এম, জি, বেঙ্গল এণ্ড আসাম ; রায়বাহাদুর এ, সি, বসু; শ্ৰীযুক্ত সতীশ চন্দ্র বসু জমিদার কলিকাতা, শ্রীযুক্ত নীলমণি আঢ্য ; শ্রেষ্ঠ্যাৰ্য্য শ্ৰীযুক্ত জগদ্বন্ধু দত্ত ভক্তিরঞ্জন, শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী অ্যাড- ভােকেট, মিঃ নির্মল চন্দ্র সাহা, রায়বাহাদুর গােবিন্ লাল ব্যানার্জি, অধ্যাপক শ্রীযুক্ত অমূল্য চন্দ্র আয়কট, এম, এ বি, এল ; অধ্যাপক শ্রীযুক্ত শচীন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী কাব্য- ব্যাকরণ-সাংখ্য-বেদান্ত-ষড়দর্শনতীর্থ সাহিত্য-শাস্ত্রী সুদর্শন- বাচম্পাত; পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত হরিপদ বিদ্যারত্ন এম,এ, বি, এল ; ডাঃ শ্ৰীযুক্ত সুরেন্দ্র কুমার ঘােষ এম, এ ; পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত নগেন্দ্রনাথ ভট্টাচাৰ্য কাব্য-ব্যাকরণতীর্থ প্রভৃতি বহু বহু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি সভাস্থল বিমণ্ডিত করিয়াছিলেন ।
অভিভাষণ মঙ্গলাচরণ মূকং করােতি বাচালং পঙ্গুং লঘয়তে গিরি। যৎকৃপা তমহং বন্দে শ্রী গুরুং দীনতারণম্ । অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া। চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ। নামশ্রেষ্ঠং মনুমপি শচীপুত্রমত্র স্বরূপং রূপং তস্যাগ্রজমুরুপুবীং মাথুরীং গােষ্ঠবাটীম্। রাধাকুণ্ডং গিরিবরমহ! রাধিকা-মাধবাশা প্রাপ্তে। যস্য প্রথিত-কৃপয়া শ্রী গুরুং তং নতােহম্মি । অযােগ্যতা-জ্ঞাপন ও ক্ষমাপ্রার্থনা মাননীয় সভাপতি মহােদয় এবং সমবেত সুধী ও সজ্জন- মণ্ডলি ! আমি আপনাদিগকে যথাবিহিত অভিবাদন জানাচ্ছি। এই সভায় আমার গুরুবর্গ, আমার উপদেষ্ট- বর্গ, আমার শিক্ষকবৰ্গ, বিদ্বান, সজ্জন, সুধী, মনীষী এবং সর্বতােভাবে সৰ্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ উপস্থিত আছেন। এ সূত্রে আপনাদের সম্মুখে উপদেষ্টস্বরূপে দাড়াবার কোন প্রকার ধৃষ্টতা আমার চিন্তায়ও আসতে পারে না। আজ আপনাদের দ্বারাই উৎসাহিত হয়ে—আপনাদের আদেশ শিরােধার্য করে
৮
গৌড়ীয়-গৌরব
আপনাদের প্রাণারামের কথা-নৈবেদ্য পরিবেশন করূতে
সাহসী হয়েছি। এই নৈবেদ্যের উপকরণ শ্রেতি-পরম্পরায়
প্রাপ্ত ; কিন্তু আমার সর্ববিধ অযােগ্যতার দরুণ যদি এ
নৈবেদ্য-পরিবেশনে কোন প্রকার দোষ বা ত্রুটী প্রবেশ
করে, তাহলে-স্বভাবসুলভ সহিষ্ণু আপনার ক্ষমাশীল
আপনারা পরিবেশনকারীর অনিপুণতা ও অপ্রৌঢ়ত্ব বিচার
করে ক্ষমা করবেন।
বক্তব্য-বিষয়ের প্রণালী-বিচার
অদ্যকার বক্তব্য বিষয় বিজ্ঞাপিত হয়েছে “গৌড়ীয়-
গৌরব”। যা’র গৌড়ীয়মঠের সাপ্তাহিক পত্র ‘গৌড়ীয়
পাঠ করেন, তারা বােধ হয় আরও জেনে থাকবেন যে,
যথাক্রমে আরও দুই রবিবার এস্থানেই গৌড়ীয় মঠের আচার্য্য
ও অন্যান্য প্রচারকগণ “গৌড়ীয়-সাহিত্য” ও “গৌড়ীয়-দর্শন
সম্বন্ধে আরও দুইটী অভিভাষণ প্রদান করূবেন। এই তিন
দিনের অভিভাষণ একটা বিশেষ প্রণালীবদ্ধভাবে সাজান
হয়েছে। নৈয়ায়িকগণ যেরূপ পদার্থের আকারে বিষয়
সন্নিবেশ করে থাকেন, বৈষ্ণব বৈদান্তিকগণও তেমনি
সম্বন্ধ, অভিধেয় ও প্রয়ােজন—এই তিন শ্রেণীতে তাদের
বক্তব্য বা বিচার গ্রথিত করে থাকেন। মূল প্রতিপাদ
বিষয় বা যে বস্তুটার সহিত আমরা বিশেষভাবে সংশ্লিষ্ট বা
সংবদ্ধতা'ই ‘সম্বন্ধ। সেই সম্বন্ধ-বস্তুটীকে কেন্দ্রীভূত করে
গৌড়ীয়-গৌরব কোন বিশেষ ফললাভের জন্য যে সাধনা বা উপায় হব- লম্বিত হয়, তারই নাম—অভিধেয়’ ; আর সেই অভিধেয়- যাজনের যেটা পরম ফল, তারই নাম—প্রয়ােজন। শ্রীজীব এবং শ্রীবলদেবেরও এই প্রণালী শ্রীল জীবগােস্বামী তার ভাগবত-সনৰ্ভ বা ষট্সন্দর্ভকে এইরূপ বৈদান্তিক প্রণালীতে সন্নিবিষ্ট করেছেন। প্রথমে তিনি ভাগবতের ‘বদন্তি তত্তত্ত্ববিদ’-শ্লোক অবলম্বন করে তা’র ষট্সন্দর্ভের চাটী সন্দর্ভকে ‘তত্ত্বসন্দর্ভ’, ‘পরমাত্মসন্দর্ভ', ‘ভগবৎসর্ত’ ও ‘কৃষ্ণসন্দর্ভ নাম দিয়ে সম্বন্ধতত্ত্বের বিচার করেছেন। পঞ্চম ‘ভক্তিসন্দর্ভে’ অভিধেয়তত্বের বিচার করেছেন এবং ষষ্ঠ ‘প্রীতিসন্দর্ভে প্রয়ােজনতত্ত্বের চূড়ান্ত মীমাংসা দেখিয়েছেন। চতুরধ্যায়ী ব্রহ্মসূত্রে শ্রীবলদেব প্রথম দুই অধ্যায়ে অর্থাৎ সমন্বয়-অবিরােধ্যায়ে সম্বন্ধতত্ত্ব, তৃতীয় সাধন-অধ্যায়ে অভিধেয়তত্ত্ব এবং চতুর্থ ফলাধ্যায়ে প্রয়ােজনতত্ত্ব বিচার করেছেন। তিনদিনের অভিভাষণ যথাক্রমে প্রয়ােজন, অভিধেয় ও সম্বন্ধ-বিচারে গ্রথিত আলবার্ট হলে আমাদের এই তিন দিনের বক্তব্য বিষয় তিনটীও ঐরূপ বৈষ্ণব-বৈদান্তিক-প্রণালীতে সজ্জিত হয়েছে। তবে সেই বৈদান্তিক প্রণালী গৃহীত হলেও গৌড়ীয়-গৌরব আপাতদৃষ্টিতে আমাদের বক্তব্যগুলির যেন একটুকু ক্রম- বিপৰ্যয় মনে হচ্ছে অর্থাৎ প্রথমে সম্বন্ধ-তত্ত্বের কথা না বলে, সর্বাগ্ৰেই প্রয়ােজন-তত্ত্বের বিচার বলা হবে। প্রয়োজন-বিষয়ক বিচার সর্বাগ্রে বলার কারণ এই, আমরা কোন কাজ করূতে গেলে সৰ্ব্বাগ্রেই তা’র ফল অনুসন্ধান করি-এ কাজ করে আমাদের কি ফল লাভ হবে ? গৌড়ীয়-দর্শন, গৌড়ীয়-সাহিত্যের কথা শুনে-- জীবনে প্রতিপালন করে আমাদের ব্যষ্টির, সমষ্টির বা সমাজের অসংখ্য সমস্যা, অসংখ্য অভাব, অসংখ্য প্রয়ােজনের কি সমাধান হবে ?—এ প্রশ্ন স্বতঃই আমাদের হৃদয়ে জেগে ওঠে। তাই সর্বাগ্রে ফলশ্রুতি আলােচনার দরকার । এখানে ফলশ্রুতি-অর্থবাদ নহে ‘গৌড়ীয়-গৌরব’ সেই ফলশ্রুতি ব্যাখ্যা করবেন। এখানে ‘ফলশ্রুতি’ মানে অর্থবাদ নয়, এটা ও সঙ্গে সঙ্গে আমাদের একটুকু স্মরণ রাখা দরকার । “গৌড়ীয়”-গবেষণা ‘গৌড়ীয়-গৌরব’-এই শব্দটীর ভিতরে দুটো পদ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে,-একটা—‘গৌড়ীয়’, আর একটা ‘গৌরব’ । গৌড়’-শদ ঈয়’ প্রত্যয় করে ‘গৌড়ীয়, আর ‘গুরু’-শব্দ অণ, করে 'গৌরব। এখানে ‘গৌড়-সম্বন্ধে পুরা- গৌড়ীয়-গৌরব ১১ তত্ত্ববিৎ, প্রত্নতত্ত্ববিৎ প্রভৃতির যে সকল আলােচনা আছে, তা উল্লেখ করতে গেলে তাতেই একটা বড় বক্তৃতা হয়ে পড়বে। সুতরাং আমরা বাক্য-গৌরব-ভয়ে স্থান-বিচারের দিক্ থেকে মােটামুটি এটুকু বলতে পারি যে, নিরুক্তকার যাঙ্কেরও বহু পূর্বে মহর্ষি পাণিনিপ্ৰােক্ত গৌড়পুর, বরাহ- মিহিরের বৃহৎসংহিতায় কথিত গৌড়পুর, কূৰ্ম্ম ও লিঙ্গপুরাণে উক্ত শ্রাবন্তিপুত্র মহাতেজা বংশক যেখানে বস্তি নগরী নির্মাণ করেছিলেন, সেই গৌড়দেশ; বিষ্ণুশর্মা হিতােপদেশে যেখানে কৌশাম্বী নগরীর কথা উল্লেখ করেছেন, কৃষ্ণমিশ্র প্রবােধচন্দ্রোদয় নাটকে রাঢ়দেশকে যে গৌড়প্রদেশের অন্তর্গত বলেছেন, রাজ বঙ্গিণীর কাশ্মীর-রাজ ললিতাদিত্য ও তৎপুত্র জয়াদিত্য যে গৌড়প্রদেশ দর্শন করেছেন, কিম্বা আর্যাবর্তের মধ্যে যে পঞ্চগৌড়ের নাম- “সারস্বতাঃ কান্যকুজা উৎকল মৈথিলা যে। গৌড়াশ্চ পঞ্চধা চৈব পঞ্চগৌড়াঃ প্রকীৰ্ত্তিতঃ ॥” —প্রভৃতি শ্লোকে উল্লেখ রয়েছে, কবিকঙ্কণেরও পূর্বে মাধবাচাৰ্য “চণ্ডীমঙ্গলে” বাদসাহ আকবরকে আর্যাবর্তের অধিপতি’-উপাধি প্রদান করে যে কবিতা লিখেছেন, “পঞ্চগৌড় নামে দেশ পৃথিবীর সার। একাব্বর নামে রাজা অৰ্জ্জুনাবতার।” আবার সেনবংশীয় প্রথম নরপতি বিজয়সেনের গৌড়ের অধীশ্বর হওয়ার কথা, বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেনের .
গৌড়ীয়-গৌরব ভাগীরথী-তীরে ‘গৌড়' নামক নগরে ত’র রাজধানী স্থাপন করুবার কথা—যা’র ভগ্নাবশেষ—যার স্মৃতিচিহ্ন আজ ও মালদহ জেলার অন্তর্গত গঙ্গার প্রাচীনগর্ভে, প্রাচীন গৌড়নগরে লুপ্তগৌরবের সাক্ষ্য প্রদান কচ্ছে, আবার সেই বল্লালসেনের পুত্র লক্ষ্মণ সেন কিছুকাল পরে নবদ্বীপে যে আর একটী রাজধানী স্থাপন করেছিলেন এবং প্রাচীন গৌড়নগর হতে সেনবংশীয় নৃপতিগণ তাদের সাম্রাজ্য-সিংহাসন নবদ্বীপমণ্ডলে এনেছিলেন বলে নবদ্বীপ- মণ্ডলের যে ‘গৌড়ভূমি’ আখ্যা হয়েছিল, যা ইতিহাসের পুরাতন পৃষ্ঠায় অঙ্কিত রয়েছে, আজও যে গৌড়পুরে সেনবংশীয়গণের প্রাচীন-স্মৃতি-বল্লালদীঘী, বল্লালশুপ, বৃতিবল্লালদীঘী, চরবল্লালদীঘী প্রভৃতি বিরাজমান থেকে বঙ্গদেশের শেষ-হিন্দুরাজগণের প্রাচীন স্মৃতি ধারণ কচ্ছে, সেই গৌড়ের ইতিহাস প্রত্নতাত্ত্বিকগণের একটা বিপুল গবেষণা-গৌরবরূপে পড়ে রয়েছে। আমরা বর্তমানে এক্ষেত্রে সেই গবেষণার গহন বনে প্রবেশ করুবার আবশ্যকতা মনে করি না। “গৌড়ীয়”-আখ্যার বিভিন্ন কারণ পাত্ৰবিচাবের দিক থেকে অনেকে বলেন,--সূৰ্য্যবংশীয় মান্ধাতার দৌহিত্রের নাম গৌড়” ছিল, তাঁ’রই শাসিত রাজ্য ব'লে আৰ্যাবর্তের নাম গৌড়' হয়েছে। আবার গৌড়ীয়-গৌরব পারমার্থিক ‘ইতিহাসের পৃষ্ঠায় দেখতে পাওয়া যায়, শঙ্করাচার্যের পরম গুরু সাংখ্য কারিকাভাষ্য-লেখকের নাম- গৌড়পাদ । আমাদের পূর্বাচাৰ্য পূর্ণপ্রজ্ঞ মধ্ব কোন কোন স্থানে ‘গৌড়পূৰ্ণানন্দ’ বলে উল্লিখিত হয়েছেন। খৃষ্টপূৰ্ব চতুর্থ শতাব্দীতে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রমধ্যে গৌড়- দেশােদ্ভব ‘গৌড়িকা” নামক এক প্রকার রৌপ্যের কথা দেখা যায়। বাল্মীকি-রামায়ণেও ‘গৌড়'-নামক রজতের উল্লেখ আছে। গৌড়পূৰ্ণানন্দ’ মধ্বাচাৰ্যও রৌপ্যপীঠপুরে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কেউ কেউ বলেন, ‘গুড়-শব্দ হ’তে ‘গৌড়-শব্দ নিষ্পন্ন। বৈদিকযুগে সােমরস-পান- প্রথার ন্যায় বঙ্গদেশবাসীর মধ্যে গুড়জাত সুরাসব-পানের প্রথা প্রচলিত ছিল। তা হতেই বঙ্গদেশবাসীর ‘গৌড়ীয়’ আখ্যা হয়ে থাকবে। যা হোক, বঙ্গদেশবাসী বা আৰ্য্যা- বৰ্ত্তবাসী ‘গৌড়ীয়’ শব্দে অভিহিত হলেও চৈতদেবের সময় হতে তার চরণাশ্রিত বৈষ্ণবগণই ‘গৌড়ীয়-শব্দের প্রসিদ্ধার্থের প্রতিপাদ্য বিষয় হয়েছেন। শ্রীচৈতন্যচরিতা- মৃতকার শ্রীকবিরাজ গােস্বামী প্রভু চরিতামৃতের মঙ্গলা: চরণেই লিখেছেন, “এ তিন ঠাকুর গৌড়ীয়াকে করিয়াছেন আত্মসাথ। এ তিনের চরণ বন্দে, তিনে মাের নাথ।” এরূপও হতে পারে, হয়ত যে-স্থানে মহাপ্রভুর চরণাশ্রিত উৎকলদেশীয় ভক্তগণকে ‘ওটীয় (উড়িয়া) বলা ১৪ গৌড়ীয়-গৌরব হ'ত, সেস্থানে বঙ্গদেশীয় ভক্তগণকে ‘গৌড়ীয়’-নামে ডাকা আবার দাক্ষিণাত্যকে ‘পঞ্চদ্ৰবিড়’ বলা যায়। চারজন বৈদিক বৈষ্ণবাচাৰ্যই বিদেশে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বিশিষ্টাদ্বৈত সিদ্ধান্ত-প্রচারকারী রামানুজা- চার্য্য দাক্ষিণাত্যে অন্ধ, প্রদেশের মহাভূতপুরীতে, শুদ্ধদ্বৈত সিদ্ধান্তপ্রচারকারী মধ্বাচাৰ্য ম্যাঙ্গালাের জেলার পাজকা ক্ষেত্রে, চিন্ত্য-দ্বৈতাদ্বৈতবাদপ্রচারকারী নিম্বাদিত্য দক্ষিণ- পথের মুঙ্গেরপত্তন গ্রামে এবং শুদ্ধাদ্বৈতবাদপ্রচারকারী বিষ্ণুস্বামী দাক্ষিণাত্যে পাণ্ড্যপ্রদেশের মাদুরা জেলার চন্দনবনে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেই আচাৰ্য-চতুষ্টয় তাহাদের অন্যতম মন্মধ্বচার্যের তত্ত্ববাদ- শাখাবলম্বী বৈষ্ণবগণের সহিত সিদ্ধান্ত-বিচারে মহাপ্রভুর অনুগত বৈষ্ণব-সম্প্রদায়ের বিচার-বৈশিষ্ট্য প্রদর্শনের জন্য মহাপ্রভুর অনুগত সম্প্রদায় ‘গৌড়ীয়’-নামে পরিচিত হয়ে থাকবেন। সর্ববিষয়ে--গৌড়ীয়-গৌরব সম্বন্ধ-অভিধেয়- প্রয়ােজন, উপাস্য-উপাসনা-উপাসক, কৰ্ম্ম-জ্ঞান-যােগ, জ্ঞান-বৈরাগ্য-ভক্তি, দ-সাহিত্য-বিজ্ঞান- শিল্প, সমাজনীতি-রাষ্ট্রনীতি-অর্থনীতি, বয়ন-একায়ন, বর্ণাশ্রম-পারমহংস্য, সার্বজনীনতা-বিশ্বপ্রেমিকতা, দয়া- পবােপকার-দেশসেবা,মৈত্রী-সমন্বয়--সর্ববিষয়ে—সৰ্ব্ববিচারে “গৌড়ীয়” কিরূপ গৌরবান্বিত, তাই আজকার বক্তব্য এবং
গৌড়ীয়-গৌরব
বিষয়। এই বিপুল বিরাট বিষয় এক দিনে দেড় ঘণ্টার
বক্তৃতায় বলা সম্পূর্ণ অসম্ভব। অন্ততঃ যদি প্রত্যহ দু’ঘণ্টা
করে ক্রমাগত দু’মাসকাল এ বিষয় বর্ণনা করা হয়, তাহলে
এই বিবাট বিষয়ের একটা দিদর্শন হতে পারে। আজ
কেবল ঐ দিদর্শনেরই একটা মুখবন্ধুমাত্র করা ছাড়া
সমবেত মনীষিবৃন্দের বহুমূল্য সময় ও ধৈর্য্যের উপর অধিক
হস্তক্ষেপ করবার অধিকার পাচ্ছি না; তবে একথা দৃঢ়ভাবে
বলতে পারা যায়, প্রকৃত অর্থনীতির দিক দিয়ে বিচার করলে
এরূপ আলােচনায় আমাদের সময়ের খুবই সদ্ব্যবহার হবে।
বৰ্ত্তমান-জগৎ
বর্তমানে সর্বত্রই একটা আন্দোলনের হাওয়া বইছে।
এই সকল আন্দোলন যে সকল সাহিত্য গড়ে তুলছে,
সেই সকল সাহিত্য-প্রতীকের মুখে একটা কথা খুব
উজ্জ্বলরূপে ফুটে উঠেছে দেখতে পাওয়া যায়। সেই
ক’টা কথাকে এরূপভাবে বলা যেতে পারে,
‘গড়িয়াতােলা-বাদ”, “বিপ্লব-বাদ”, “বিদ্রোহবাদ।”
“গড়িয়া-তােল।-বাদটা,” আপাতদৃষ্টিতে ‘বিপ্লববাদ বা
‘বিদ্রোহ-বাদের’ পরিপন্থী বলে মনে হয়। “গড়িয়া-তােলা-
বাদটা হচ্ছে—ব্রহ্মার ক্রিয়া বা দক্ষের ক্রিয়া। “গড়িয়া-
তােলা” মানে-ব্ৰহ্মার দিকে গতি-ব্রহ্মের দিকে নহে;
যাকে বলে জনন-ক্রিয়া। এটা হচ্ছে ঐ দক্ষের কাজ,
রুদ্রের সঙ্গে যার বিদ্বেষ। আর “বিপ্লব-বাদ” বা “বিদ্রোহ
গৌড়ীয়-গৌরব
বাদটা হচ্ছে-রুদ্রের ক্রিয়া বা রুদ্রের দিকে গতি অর্থাৎ
বর্তমান আন্দোলনের হাওয়া গণ-গড্ডলিকাকে তাদের
অজ্ঞাতসারেই হউক বা জ্ঞাতসারেই হউক বিতাড়িত কচ্ছে
জন্ম ও ভঙ্গের দিকে। তরুণসত্ব বলছেন,-“পুরাণকে
চুরমার করে দাও, নূতন করে গড়ে তােল।” আবার
আর একবল বলছেন, “আমরা ঠাকুরমা-মনােভাব বা
ধামাচাপা-নীতিগুলিকেই পূৰ্বপুরুষ বা পুরাতনের উপর
অবৈধভাবে আরােপ করে তা নিয়েই আমাদের কর্মের
সাধনায় বােধিসত্ত্বা লাভ করুব ;” এটাও কিন্তু ঐ নির্বাণ
বা রুদ্রের ভঙ্গলীলার দিকেই গতি-প্রবণতা।
দিকে—স্থিতির দিকে অর্থাৎ বিষ্ণুর দিকে আমাদের
আন্দোলনের গতি নেই। আন্দোলন ভাল, বিদ্রোহ
ভাল না হলেও বিপ্লব ভাল, যদি তার গতি স্থেমের দিকে
হয়। আমরা কিন্তু একটা বড় সত্য ভুলে গিয়েছি যে,
যেটা গড়ে তুলব, সেটাই আবার ভেঙ্গে যাবে। আবার
যেটা ভাঙব, তার কারণ নাশ না হলে আবার সেই
কারণ-বীজ কাৰ্য্যরূপে গড়ে উঠবে, পুনরায় ভাঙ্গা-গড়ার
দিগবাজি খেলা খেলার জন্য ।
সমসাময়িক জগতে গোড়ীয়ের বাণী-
*স্বভাবের পথে চল”
আজকাল আমাদের প্রিয় তরুণসঘ এবং আমাদের
পূজনীয় মাননীয় শ্রদ্ধার্য প্রাচীন-পন্থিগণ তাদের যে যে নিষ্ঠা
গৌড়ীয়-গৌরব ১৭ নিয়ে কাজ কচ্ছেন, গৌড়ীয়-গৌরব তঁাদের সেই বৃত্তিকে নষ্ট না করে কেবলমাত্র স্বভাবের পথে চলতে বলছেন। ভাঙ্গা, গড়—এ দুটোই আমাদের স্বভাব নয়, এ দুটা আগন্তুক নিসর্গ একট। বিকৃত দ্বিতীয় অভ্যাস। স্থিতি বা সত্তাটাই হচ্ছে আমাদের নিত্যস্বভাব ; সত্তাকেই ‘সত্য বলা যায়, সতনুকেই ‘বিষ্ণু বলা যায় । এক অদ্বিতীয় তরুণের উপাসনাই বিশ্বশান্তির নিদান আমাদের তরুণসঘ—আমাদের দেশের ভাবী অাশার স্থল। সেই তরুণসঙ্ঘ, যুব-সঙ্ঘ এক তরুণের—এক কিশােরের সেনাপতিত্ব স্বীকার করে চলুন, তাহলেই বিশ্বশান্তি আবে—বিশ্ব-সমস্যার সমাধান হবে—বিশ্ব-ঐক্যতানের মহামন্ত্রে সকল আকাঙ্ক্ষার চরমসীমা লাভ করূতে পাবেন। বহু তরুণ যদি আমাদের সেনাপতি হয়, তাহলে সেখানে chaos ( বিশৃঙ্খলা, গোলযােগ) এসে যাবে -cosmos ( সুশৃঙ্খলিত নিয়মিত সুগঠিত জগৎ ) থাকবে না। আমরা কিন্তু সকলেই cosmosএর জন্যই স্বরাজ-সাধনা বলুন, বিল্পব-বাদ বলুন, অর্থনীতি বলুন, রাষ্ট্রনীতি বলুন-সব করূতে যাচ্ছি। তরুণসঘ বােধ হয় জানেন, Acosmism (জগন্মিথ্যাত্ববাদ) নিরাস করে cosmos (সুশৃঙ্খলিত জগৎ) এর harmony (ঐক্যতান)-অপ্রাকৃত সুগঠিত নিত্য- ২ ১৮ গৌড়ীয়-গৌরব জগতের সত্যতা-স্থাপনই—গৌড়ীয়-গৌরব। যে cosmos এর কথা একদিন লােক-পিতামহ ব্রহ্মা বলেছিলেন- শিয়ঃ কাস্তাঃ কাঃ পরমপুরুষঃ কল্পতরবে দ্রুম ভূমিশ্চিন্তামণিগণময়ী তােয়মমৃতম্। কথা গানং নাট্য গমনমপি বংশী প্রিয়সখী চিদানন্দং জ্যোতিঃ পরমপি তদাস্বাঘমপি চ। স যত্ৰ ক্ষীরাব্ধিঃ সুবতি সুরভীভ্যশ্চ সুমহান্ নিমেষাজ্জাখ্যো বা ব্রজতি নহি যাপি সময়। ভজে শ্বেতদ্বীপং তমহমিহ গােলােক মিতি যং বিদস্তে সন্তঃ ক্ষিতিবিরলচারাঃ কতিপয়ে। ৩ [ সেই বৃন্দাবনে কান্তা—ব্রজল্পী গােপীগণ, কান্ত- পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণ, বৃক্ষগণ—সকলেই কল্পতরু, সমস্ত ভূমিই— চিন্ময়, জল-অমৃত, কথা—সঙ্গীত, গমন—নাট, কৃষ্ণ- বংশী—প্রিয়সখী, এবং সর্বত্র চিদানন্দ-জ্যোতি: ইনুভূত ; অতএব বৃন্দাবনই পরম আস্বাদ। তথায় কোটি কোটি সুরভি হইতে চিন্ময় মহা-ক্ষীর-সমুদ্র নিরন্তর স্রাবিত হই,তছে এবং ভূত-ভবিষ্যরূপ খণ্ডরহিত চিন্ময়কাল নিত্য বর্তমান সুতরাং নিমেষাৰ্দ্ধও ভূতধৰ্ম্ম প্রাপ্ত হয় না। সেই শ্বেত- দ্বীপরূপ পরমপীঠকে আমি ভজনা করি। সেই ধামকে এই জড়জগতে বিরলচর অতি অল্পসংখ্যক সাধুব্যক্তিই ‘গােলােক’ বণিয়া জানেন ] • তরুণ-সঙেঘর প্রতি তাই বলি—হে প্রিয় তরুণসঙ্ঘ ! তোমরা সেই এক তরুণের—এক শ্যামের উপাসক হও, যে তরুণের কথা—যে কিশােরের কথা একদিন তরুণ স্বয়ং তরুণদলের সেনাপতিত্ব গ্রহণ করূবার এক অভিনয় দেখিয়ে তােমাদের এই গৌড়- পুরের, এই বা লার দ্বারে দ্বারে বলেছিলেন, নীলাচলের নীলসাগরের কূলে নবীন-সন্ন্যাসিরূপে মৈথিলী-কবির সঙ্গে আলাপ করেছিলেন,-“শ্যামমেব পরং রূপং, বয়ঃ কৈশােরকং ধ্যেয়ম্।” নবকিশাের-নটবর অদ্বয়জ্ঞানের অচিন্ত্য স্বভাব এই তরুণে পুরাতনতা ও তারুণ্যের অপূর্ব অচিন্ত্য- সমন্বয়সেই তরুণের বাঁশরীর ঐক্যতানে বিরােধ ও মিলনের অচিন্ত্য-সমন্বয়। তাই পুরাণ-পন্থিগণও সেই আদ্য পুরাণ-পুরুষের উপাসনা করেন, ‘অদ্বৈতমচ্যুতমনাদিমনন্তরূপ- মাদ্যং পুরাণ-পুরুষং নবযৌবঞ্চ। বেদেষু দুলভমদুল ভমাত্মভক্তে গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি।” দিব্যকিশাের-মুর্তিই—স্বরাষ্ট্র, ভাগবত-- স্বরাজের বিজ্ঞান এই অদ্বিতীয় তরুণ যেখানে স্বরাষ্ট—এই তরুণকে ২০ গৌড়ীয়-গৌরব লইয়া যেখানে স্বরাজ-সাধনা, সেখানেই ঐক্যতান- সেখানেই বিশ্ব-শান্তি। শ্রীমদ্ভাগবত-গ্রন্থখানা সেই স্বরাজ- সাধনার বাস্তব-বিজ্ঞান। গৌড়ীয়-গৌরব চৈতন্যদেবের জ্বলন্ত জীবন সেই স্বরাজ-সাধনার বাস্তব বেদ। এটা । রূপক-কথা নয়—প্রস্তাবিত স্বরাজের রঙিন নেশা নয়, এটা একমাত্র বাস্তব-কথা। জাগতিক রাষ্ট্রনীতির ব্যভিচার প্রাচীন ইতিহাসের অসংখ্য উদাহরণের দিকে তাকিয়ে যদি কেবল বর্তমান রাষ্ট্রনীতির ইতিহাসের পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠার দিকেও তাকান যায়, তাহলে দেখতে পাওয়া যাবে, আমাদের প্রস্তাবিত বিশ্ব-সমস্যার সমাধানে কি প্রকার সাম্প্রদায়িকতা, আর জাতীয়তার নামে জাতীয় বিদ্বেষ প্রবেশ করেছে ও করছে। যে চীন বাণিজ্য-জগতের আদর্শরূপে সভ্যজগতের কাছে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, যে বৰ্তমান চীনকে শতাব্দীর মােহন্দ্রা হতে জাগরূক কবার জন্যে মাসিয়ে বয়ােডিন ও তাহার পত্নী প্রাণপাত চেষ্টা করেছিলেন ; যে কোন কারণেই হউক, সে চেষ্টার প্রতিফল পেয়েছেন তাঁরা, যখন বর্তমান চীনের জাতীয়দলের সেনাপতি চিয়াং কাইসে বরােডিন-দম্পতিকে নির্বাসিত করেছেন; চীন ও রুশিয়ায় আজ যুদ্ধ বাধবার উপক্রম হয়েছে। এলাহাবাদে যে নিখিল ভারতীয় কংগ্রেস- ;
গৌড়ীয়-গৌরব
কমিটীর অধিবেশন হচ্ছে, তাতে যে সকল বাদবিতণ্ডা
প্রকাশিত হয়েছে, তাতেও আমাদের প্রস্তাবিত পন্থার
প্রতি অনেকেই নিষ্ঠাবান্ থাকতে পারেন না। তাই
এ সময় আমাদের প্রস্তাবিত বিশ্ব-সমস্যা-সমাধান-স্বপ্নের
মােহন্দ্রা একটুকু ভেঙ্গে দিয়ে—গণগডডলিকার আপাত
উত্তেজনার মােহ একটুকু দূরে ফেলে রেখে যদি হিতকারিণী
শ্রুতিমাতার মঙ্গলােপদেশ শ্রবণ করি, তাহলে জানতে
পাব আমরা যে, বহুগণবাদের দোহাই দিয়ে আমাদের
নিজস্ব-স্বাধীনতা, আমাদের নিজস্ব-স্বরাজ পরিত্যাগ কছি,
সেটা ঠিক এই রকম,
যথাপি হিরণ্যনিধিং নিহিতমক্ষেত্রজ্ঞা উপর্যুপরি
সঞ্চরন্তান বিনেয়ুরেবমেবেমাঃ সৰ্ব্ব। প্রজা অহরহগচ্ছন্ত্য
এতং ব্রহ্মলােকং ন বিনন্ত নৃতেন হি প্রত্যুঢ়াঃ।
যেরূপ খনিজতত্ত্ব বিদ্যায় অনভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ সােণার
খনির উপর দিয়ে সহস্রবার বিচরণ করে থাকে অন্যত্র
হ’তে অর্থ আনবার জন্য,—অথচ যার উপর দিয়ে হামেস।
যাতায়াত কচ্ছে, সেখানে যে সোনার খনি রয়েছে, তা
মােটেই জানতে পারে না, সেইরূপ জগতের লােকসকল
স্বরাজ-স্বাধীনতা-শান্তির সন্ধানে অন্যত্র ছুটাছুটি করছে,
কিন্তু তাদের আপন দেশ যেখানে, সেখানে একবারও
যাচ্ছে না—কত বিপথে যাচ্ছে, স্বভাবের পথে একবারও
ফিরে তাকাচ্ছে না ; ক্ষুদ্রের দিকে যাচ্ছে-বৃহৎএর দিকে,
গৌড়ীয়-গৌরব
স্বরাটের দিকে যাচ্ছে না। মিথ্যায় আচ্ছন্ন হয়ে আপনদেশ
শ্বেতদ্বীপের কথা জানতে পাছে না!
বহুগণবাদ—সত্যানুসন্ধিৎসা-বাধক
শ্রুতি আমাদিগকে জানিয়েছেন, আমাদের শাশ্বতী
শান্তির পথ বহুগণবাদের উপর নির্ভর করে না; গণ-গড়-
লিকা সকল সময়ে আত্মমঙ্গলের উপদেশ শুনতে চায় না,
“শ্রবণায়াপি বহুভির্যে ন লভ্য
শৃন্তোহপি বহবাে যং ন বিদুঃ ।
আশ্চর্য্যে। বক্তা কুশলেহস্য লব্ধ।
আশ্চর্য্যো জ্ঞাতা কুশলাশিষ্ট।”
এই শ্রুতির ‘বহুভি’, ‘বহবঃ এবং ‘আশ্চৰ্য-এই
কথাগুলি একটুকু প্রণিধানযােগ্য। এখানে শ্রুতি বহু
গণবাদ নিরাস করেছেন। গীতাও তাই বলেছেন,
“মনুষাণাং সহস্রেষু কশ্চিদ্যততি সিদ্ধয়ে।
যততমপি সিদ্ধানাং কশ্চিন্মাং বেত্তি তত্ত্বতঃ ।”
তাহলে সেই শাশ্বতী শান্তির পথ কি? সেই পথ
বহু নহে, সেটি—একায়ন ; সে কথাও শ্রুতি উপদেশ
করেছেন,
“নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানা-
মেকো বহুনাং যো বিদধাতি কামান্।
তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরা-
তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম।”
.
*গৌড়ীয়ই-স্বরাজের প্রকৃত পথ-প্রদর্শক আজ সর্বত্রই স্বরাজ-সাধনা হউক; পারমার্থিক ব্রাহ্মণ- জগৎ এই স্বরাজ-সাধনার মন্ত্রে পুনরায় সমগ্র বিশ্বকে উজ্জীবিত করে তুলুন, আজ ক্ষত্রিয়-জগং অম্বরীষের ন্যায় রাজনীতি গ্রহণ করুন, বৈশ্য-জগৎ আজ পরমার্থে বৈশ্যত্ব লাভ করুন। গৌড়ীয়-গৌরব সেখানেই, যেখানে এই প্রকার স্বরাজ-সাধনার সর্বোত্তমতা প্রদর্শিত হয়েছে। পূৰ্বেই বলেছি, সম্বন্ধ-গৌরবে, অভিধেয়-গৌরবে, প্রয়ােজন-গৌরবে—গৌড়ীয়-গৌরব। গৌড়ীয় স্বরাটের সঙ্গে নিত্যসম্বন্ধ পাতিয়েছেন। গোড়ীয়ের সম্বন্ধ তার সঙ্গে, যার কথা শ্রুতি ব’লছেন,-“ন তৎ সমশ্চাত্যধিকশ্চ দৃশ্যতে।” যিনি—“নিত্যে। নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাং”, যিনি স্বয়ং বলেছেন, “ব্ৰহ্মণে। হি প্রতিষ্ঠাহমমৃতস্তাব্যয়স্য চ। শাশ্বতস্য চ ধৰ্ম্মস্ত সুখস্যৈকান্তিকস্য চ।” -আমি জ্ঞানীদিগের চরমগতি ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ আশয় বা পৰ্য্যাপ্তি। অমৃতত্ব, অব্যয়ত্ব, নিত্যত্ব, ঐকান্তিক মুখরূপ ব্রঙ্গরস আমাকেই আশ্রয় করে রয়েছে। অসমােৰ্দ্ধ গৌরবপাত্রের লঘুত্ব-স্বীকার এত বড় গুরু জিনিষ—এত বড় গৌরবের পাত্র যেখানে স্বয়ং লঘুত্ব স্বীকার কৰ্ত্তে প্রস্তুত হচ্ছেন, সেখানেই গৌড়ীয়-গৌরব। এমনই প্রীতি-পরাকাষ্ঠা -এমনই সম্বন্ধ- ২৪ গৌড়ীয়-গৌরব সম্মিলন যে, গুরুকে লঘুভাব অঙ্গীকার করাচ্ছে। এখানে কেবল Fatherhood of God ( ভগবানের পিতৃত্ব- ভাব ) নয়—Sonhood of Godhead (ভগবানের পুত্রত্ব, নন্দননত্ব) এর বিচার এসে পড়েছে। সৰ্বজগতের পালকগণের একমাত্র পালক আজ নন্দ-যশােমতীর অলিন্দে বঁধা-তঁাদের চিরপাল্য ; সৰ্ব্বকারণ-কারণ অজ-পুরুষ আজ যশোমতীর ক্রোড়শায়ী। শ্রীরামানুজ যেখানে পরম সম্রমের সহিত দূর থেকে বিষ্ণুর অর্চন করূছেন, সেখানে স্বয়ং কৃষ্ণ গৌড়ীয়-গৌরবে-গৌরবান্বিত জনগণকে নিজ কঁাধে চড়িয়ে তাদের উচ্ছিষ্টের উচ্ছিষ্ট খেয়ে সর্বাপেক্ষা অধিক প্রীতি পাচ্ছেন। তত্ত্ববাদী যেখানে রুক্মিণীশের সন্ত্রমযুক্ত পূজা করূছেন, সেখানে ব্রজনাগরীগণ নবতমাল-নীলদূতি-কদম্ববন- দেবতাকে সেবাগেীরবে তাদেরই হস্তামলক কৰ্তে পেরেছেন। চিন্ত্য দ্বৈতাদ্বৈতবাদী নিধাদিত্য বা তার প্রতি আরােপিত বিচার যেখানে মাধ্যাক্কি-লীলার কোন সন্ধানই পান নেই, গৌড়ীয়-গৌরবে-গণিীগণ সেখানে সেবা-গৌরবে সেই গুঢ়া লীলার উপকরণ হয়েছেন। বিষ্ণুস্বামী যেখানে নৃ-পঞ্চাস্তের, কিম্বা পরবর্তিকালে গৌড়ীয় প্রতিযােগী আরােপিত বিষ্ণুস্বামীয় মত যেখানে পুষ্টিমার্গ রচনা করেছেন, সেখানেও কমার্গীয় বিচার গােপনে প্রবেশ করে যে রাধিকা-মাধবের গূঢ়। সেবা প্রাপ্ত হন নাই, সেইস্থানে গৌড়ীয়-গৌরবের সাম্রাজ্য-সিংহাসন সম্প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
অভিজ্ঞতাবাদের মনীষার লঘুত্ব
গৌড়ীয় গৌরব অভিজ্ঞতাবাদের উপর একটা বিপ্লক
আনয়ন করেছে। তাই মনে হয়, মহামনীষী রাজা রাম
মােহন রায়, ভাণ্ডারকার এবং তাঁদেরই অনুগামী মেনি-
কল, কেনেডি প্রভৃতি অভিজ্ঞতাবাদ নিয়ে গৌড়ীয়-গৌরব
বুঝতে গিয়ে তাঁদের জাগতিক মনীষার লঘুত্ব প্রমাণিত
করে ফেলেছেন।
অভিজ্ঞতাবাদের ৪টী সন্তান—(১) বিশুদ্ধ
নাস্তিক্যবাদ, (২) সন্দেহবাদ, (৩)
অজ্ঞেয়তাবাদ ও (৪) মায়াবাদ
অভিজ্ঞতাবাদের সন্তানস্বরূপ চাটী ভগবদবিমুখতা,
আর অপরােক্ষবাদ বা বাস্তব অভিজ্ঞতাবাদের সুদর্শন হতে
চারটি ভগবদুন্মুখত জগতে প্রচারিত রয়েছে। প্রথম
মুখে অভিজ্ঞতাবাদী হয়ে আমরা যখন খাওয়া-দাওয়া-
থাকার সুখটাকেই আমাদের পরম প্রয়ােজন বিচার করি,
তখন আমরা ভগবান বলে কোন বাস্তব বস্তুর অস্তিত্ব
স্বীকার কর্তে চাই না। কারণ, আমার উপরওয়ালা
যদি কেউ থাকেন, তা হল আমার প্রভু সাজা হয় না,
আমার যথেচ্ছাচারিতার পথেও কাটা পড়ে। এরই নাম
বিশুদ্ধ নাস্তিকতা (Atheism) বা তর্কমূল প্রতিপক্ষায়।
ড়িীয়:গৌরব
ইন্দ্রিয় জ্ঞানে সকল তর্ক আশ্রিত।
যখন এই
স্পষ্ট
নাস্তিকতা কিছু অস্পষ্ট আকার ধারণ করে, তখন আমরা
সন্দেহবাদ আশ্রয় করি-বাস্তব বস্তু আছে কি না অাছে,
সে বিষয়ে আমাদের সন্দেহ উপস্থিত হয়। একে পাশ্চাত্য
দার্শনিকগণ Scepticism ও বলে থাকেন। ভগবদ্বিমুখত।
যখন আরও ঈষৎ অস্পষ্ট হয়ে প্রকাশিত হয়, তখন
আমরা অজ্ঞেয়তাবাদের আশ্রয় গ্রহণ করি। অজ্ঞেয়তা-
বাদের বিচারে বাস্তব সত্য বা ভগবান্ বলে কোন জিনিষ
থাকলে ও তার স্বরূপ যখন আমাদের অধিগম্য নয়, তখন
না থাকারই সমান। অজ্ঞেয়তাবাদী ( Agnostic)
বলেন,
*Absolute is unknowable. Even though its
existence were known, its nature would remain
unknown and unknowable. Absolute cannot
possibly be a self-conscious personal being."
তার পর ভগববিমুখতা যখন একেবারে প্রচ্ছন্ন বা একান্ত
অস্পষ্ট হয়ে উঠে, তখন সেটা অভিজ্ঞতাবাদের আশ্রয়ে সব
চেয়ে তার বড় প্রিয়পুত্র ও আদরের পাত্র হয়। এরই
নাম—মায়াবাদ বা Pantheism, এই মায়াবাদে বাস্তব
সত্যকে নপুংসক-লিঙ্গ বা জড়নিৰ্বিশেষরূপে বিচার
করা হয়।
অপরােক্ষবাদের ক্রমবিকাশ (১) বাসুদেব, (২) লক্ষীনারায়ণ, (৩) সীতারাম ও (৪) রাধাগােবিন্দের উপাসনার ক্রমতারতম্যোপলব্ধি । যখন ভগবদুন্মুখতার বিকাশ হতে থাকে, তখন বস্তুর ক্লীবত্ব-বিচার থেকে ক্রমে দর্শনের গতি পুং ও পুংমিশ্র-বিচারের দিকে ধাবিত হয়। ভগবদুন্মুখতার প্রথম বিকাশে একল-পুরুষােত্তম বাসুদেবের উপাসনা ; তদন্তর্গত ক্রমবিকাশমুখে মৎস্য, কূৰ্ম্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামনাদির পঞ্চক্রম-বিস্তৃতি ; সাধারণ বিচারে তাহা স্ত্রীভাব-বর্জিত কিন্তু তাহাদেরও নিজ নিজ লক্ষ্মী আছেন। ভগবদুন্মুখতার ক্রমবিকাশের দ্বিতীয় স্তরে পুং-স্ত্রী-মিশ্রভাবের উপাসনায় বৈকুণ্ঠস্থ লক্ষ্মীনারায়ণ ও তদন্তৰ্গত জামদগ্ন্যাদি ক্রমাবতার- উপাসনা শ্রেষ্ঠ বলে বিচার করা হয়। কিন্তু অভিজ্ঞতাবাদী স্বীয় অধিকারে বলেন, পুং-স্ত্রী-মিশ্রভাবের উপাসনা হতে, কেবল-পুংভাব বা বাসুদেবের উপাসনাই ভাল, আবার তদপেক্ষা পুংভাব হতে নপুংসক নিৰ্বিশেষ ব্ৰহ্মবিচারই ভাল। তৃতীয় স্তরে যে সীতারামের উপাসনা, তাতে জন্য-জনক-ভাব থাকায় তাহতে জন্ম-জনক-ভাবহিত লক্ষ্মীনারায়ণের উপাসনাই ভাল ; আবার রাধাগােবিন্দের উপাসনা হতে রাম-সীতার উপাসনাই ভাল, কেননা, শ্রীরামচন্দ্র কেমন একপত্নীব্রতধরের আদর্শকেমন পিতৃসত্য- ২৮ গৌড়ীয়-গৌরব পালকের আদর্শকেমন প্রজারঞ্জকের আদর্শ! আর কৃষ্ণ বহুবল্লভ ‘গােপবধুটিবিট নাগর, চেল-চৌর। রামচন্দ্র রাবণের দ্বারা নিজপত্নী সীতাকে (অসুর মােহনার্থ মায়া- সীতাকে হরণ করাবার আদর্শ প্রদর্শন করেছিলেন, তার কৃষ্ণ নরােচিত নৈতিক চরিত্র স্বয়ং উলঙ্ঘন করে পরনারী হরণ করেছিলেন, সুতরাং অভিজ্ঞতাবাদীর জড় জাগতিক বিচারে কৃষ্ণের উপাসনা অপেক্ষা রামচন্দ্রের আদর্শ অনেক উন্নত। কৃষ্ণ স্বরাষ্ট্র কেন ? গৌড়ীয়-গৌরবগণ স্বরাটের উপাসক ; স্বরাটের নিরঙ্কুশ স্বেচ্ছাচারিতা যদি না থাক্ল, তাহলে তাকে স্বরাষ্ট্র বলা যায় না। প্রপঞ্চে ইন্দ্রিয়জ-জ্ঞানানুসরণকারী অভিজ্ঞতা- বাদীর ধারণায় এই যে বিপ্লব, ইহা কেবল দেখিয়েছেন- গৌড়ীয়-গৌরব—এখানেই গৌড়ীয়ের গৌরব। পুরুষের দ্বারা পুরুষােত্তমের শক্তি-হরণ-অভিনয়ের আদর্শে যেন পুরুষােত্তমের স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্কোচ হয়ে পড়েছে, তাই গােপীকুমুদ-বন্ধু কৃষ্ণ, স্বরাট, কৃষ্ণ (Spiritual Despot) কৃষ্ণ—যিনি গৌড়ীয়-গৌরবের স্বরাজ-সাধনার চিন্তামণি, তিনি আজ অভিজ্ঞতাবাদীর ধারণায় বিপ্লব প্রদর্শন করে যখন বলভদ্র ও বয়স্যগণের সহিত মথুরায় প্রবেশ কচ্ছেন, মথুরানাগরীগণের দ্বারা অভিনন্দিত হতে হতে যখন হাস্য- লাস্যে মথুরার রাজপথ দিয়ে চলেছেন, তখন কংসের এক
গৌড়ীয়-গৌরব
অনুচরের সঙ্গে দেখা। ঐ কংসভৃত্য কংসের জন্য বিবিধ
সুন্দর বসন-ভূষণ নিয়ে রাজবাড়ীর দিকে গমন কছিল। কৃষ্ণ
তাকে দেখেই তার নিকট কতকগুলি উত্তম বস্ত্র চাইলেন।
কংসের অনুচররাজপুরুষ, আর কৃষ্ণ একটা তরুণ-ছােক্রা
কতকগুলি তরুণ বয়স্যের সঙ্গে রঙ্গরস করতে কতে
কোথায় চলছে ; রাজপথ দিয়ে চলছে এই যথেষ্ট, তার
আবার বেয়াদবী দ্যাখ! রাজার বহুমূল্য বস্ত্র গুলি পরুবার
সাধ হয়েছে। তখন রাজভৃত্য বলে উঠল,
“ঈদৃশবে বাসাংসি নিত্যং গিরিবনেচরাঃ।
পরিধত্ত কি মুত্তা রাজদ্রব্যাণ্যভীথ ।
যাতাগু বালিশ মৈবং প্রার্থং যদি জিজীবিষা।
বন্তি ঘৃন্তি লুন্তি দৃপ্তং রাজকুলানি বৈ।”
ওরে দুবৃত্তগণ ! তােরা জঙ্গল লােক, গিরি কাননে মাত্র
বিচরণ করে থাকি, তােরা কি কখনও এরূপ কাপড়
পরতে পারি? রাজার জিনিষ প্রার্থনা কছি, এত বড়
তােদের আস্পর্ধা! তােদের মত নির্বোধ আর নেই। যদি
বাঁচবার সাধ থাকে, তাহলে সাবধান, ফের ও কথা বলি
নে, শীঘ্র পলায়ন কর। জানি, রাজপুরুষের তােদের মত
অহঙ্কারী ব্যক্তিকে বন্ধন, প্রহার ও তার সকল সম্পত্তি
হরণ কৰ্তে পারে।
কংসরাজের ভৃত্য জাত না যে, সে স্বরাষ্ট্র পুরুষের সঙ্গে
কথা কইছে ; কংসের ভৃত্য মনে করছিল, আমার মালিক
গৌড়ীয়-গৌরব
কংস ;
কংস, বস্ত্রগুলির মালিক-কংস, মথুরানগরীর মালিক
কিন্তু আজ যে, সকল মালিকের মালিক, কংসের
মালিক,-কংসের কারণের কারণ স্বরাট পুরুষ এসেছেন,
সে কথা নির্বোধ
অভিজ্ঞতাবাদী বুঝতে পারে নি।
কৃষ্ণ কি কবুলেন?
“এবং বিকধমান কুপিতে দেবকীসুতঃ।
রজক স্ত করাগ্ৰেণ শিরঃ কায়দােতয়ৎ ॥
সেই বস্তুরঞ্জকের দেহ তা’র মস্তক হতে বিচ্ছিন্ন করে
দিলেন। জড়বিচারপর অভিজ্ঞতাবাদীর চক্ষে এটা একটা
বড় নীতি-লঙ্ঘনের ব্যাপার। কিন্তু অখণ্ড পরমর্থনীতির
নিকট খণ্ডিত জাগতিক নীতি পরাভূত, সৰ্বতন্ত্র-স্বতন্ত্রের
নিকট অস্বতন্ত্র সকল বিচার তিরস্কৃত। গােলাৰ্দ্ধ-১৮০
তাংশকে অংশবিশেষ বা গােলক-৩৬০ অংশকে অংশাত্মক
বলা গেলেও সেখানে যেরূপ কোণজ অঋজু-জন্য কোনও
অভাব বা সঙ্কীর্ণতা নেই—স্বরাষ্ট্র পুরুষেও সেরূপ কোনও
প্রকার হেয়তা নেই। নিরঙ্কুশ-ইচ্ছার পূর্ণ পৰ্য্যাপ্তির মূৰ্ত্তবিগ্রহ
—সেই পূর্ণপুরুষ কৃষ্ণ।
এজন্যইকৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ম্।”
এ উপাস্য-গৌরব আছে বলেই “গৌড়ীয়ের গৌরব”।
গৌড়ীয়ের ভজন সর্বোৎকৃষ্ট কেন ?
জগতে অধিকাংশ লোকই অধৰ্ম্মকে প্রয়ােজন জ্ঞান
তন্মধ্যে অল্পসংখ্যক লােক ধৰ্ম্ম-অর্থ-কামকে
করেন ;
গৌড়ীয়-গৌরব প্রয়ােজন বিচার করেন, অতি মুষ্টিমেয় লােক মােক্ষকে প্রয়ােজনরূপে গ্রহণ করেন, আর সুদুল্লভ লােক মােক্ষ- ধিক্কারী ভক্তির আশ্রয় করেন, আবার জগৎছাড় লােক ভগবদবৈকুণ্ঠ-প্রেমের আকাঙ্ক্ষা করেন। প্রেমের মধ্যে আবার গােপীপ্রেমের মাধুরীকে ‘প্রয়ােজন-বিচার নৃলােকে সম্ভব নহে বলেও অত্যুক্তি হয় না, আবার গোপী- প্রেম হ'তে ও দুর্লভতর বার্ষভানবীর কৃষ্ণপ্রেমের কথা। সেরূপ নিপ্রেমের বিস্তারকারী রাধামাধবের যদি কোন অবতার হয় অথবা পরম-প্রেম-পরাকাষ্ঠা-ভরবতী শ্রীরাধিকার যদি কোন অবতার হয়, তাহলেই সে প্রেম অনুভূত হতে পারে। শ্রীরাধামাধব-মিলিত-তনু গৌরসুন্দর এই স্বভক্তিশ্রীরূপ উন্নতােজ্জলরস বা বার্ষভানবীর প্রীতি- পরাকাষ্ঠা জগতে দান করে গৌড়ীয়কে গৌরবান্বিত করেছেন। গৌড়ীয়-গৌরব সুদুল্লভ হ'লেও সার্বজনীন এই গৌরবে সকলেই গৌরবান্বিত হয়ে গৌড়ীয় হতে পারেন। ফ্রান্সবাসীই হউন, আমেরিকাবাসীই হউন, জার্মান- বাসীই হউন, রুশিয়া-প্রুশিয়াবাসীই হউন, চীন-জাপান- বাদীই হউন, কামস্কাকাবাসীই হউন, সূৰ্য-নক্ষত্রবাসীই হউন, যে কোন গ্রহবাসীই হউন, আর ঝারিখণ্ডের ব্যাঘ্র- মৃগ-বনলতার ন্যায় পশু-উদ্ভিজ,জন্মই প্রাপ্ত হউন, সেই গৌড়ীয়-গৌরব . অপ্রাকৃত স্বরাজের সাধনা করে গৌড়ীয়-গৌরব-শিরোমণি গৌরসুন্দরের—গৌড়ীয়-গৌরব-বর শ্রীস্বরূপ-রূপ-সনাতন- রঘুনাথ-শ্রীজীব এবং তাদের ভৃত্যানুভূত্য গৌড়ীয়-গৌরব- গণের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সকলেই গৌড়ীয়-গৌরবে গৌরবান্বিত হতে পারেন। গৌড়ীয়-গৌরব সকলের নিজস্ব সম্পত্তি--সকলের পৈতৃক-স্বরাজ। গৌড়ীয়ের গৌরব সর্ববিষয়ে অতুলনীয় গৌরসুন্দরকে যারা আশ্রয় করেছেন, সেই গৌড়ীয়- গৌরবগণের বৈরাগ্য, শম, দম, ক্ষান্তি, স্বাধীনতা, মৈত্রী, সমতা, ধ্যান, ধারণা, ভক্তি জগতে অতুলনীয় ; তাই গৌড়ীয়-গৌরব-কবি গেয়েছেন, আস্তাং বৈরাগ্যকোটির্ভবতু শমদমক্ষাস্তিমৈত্ৰাদিকোটি- স্তত্ত্বানুধ্যানকোটির্ভবতু ভবতু বা বৈষ্ণবী-ভক্তিকোটি। কোট্যংশোহপ্যস্য ন স্যাদপি গুণগণে যঃ স্বতঃসিদ্ধ আস্তে শ্ৰমচ্চৈতচন্দ্রপ্রিয়চরণনখজ্যোতিরামােদভাজাম্। [ প্রবল বৈরাগ্যই হউক, শম-দম-ক্ষান্তি-মৈত্তাদি "অসংখ্য গুণই থাকুক, নিরন্তর ব্ৰহ্ম ও জীবাত্মার ঐক্য- বিষয়িনী চিন্তাকোটীই বা হৃদয় অধিকার করুক অথবা বিষ্ণু সম্বন্ধিনী কোটি ভক্তিই বর্তমান থাকুক, শ্রীচৈতন্যচন্দ্র প্রয়- ভক্তগণের পদনখজ্যোতিঃ-প্রমােদিত জনসমূহে যে স্বভাব- সিদ্ধ গুণাবলী সদা বর্তমান, তাহার কোট্যংশের এক অংশও অন্যত্র অসম্ভব ] গৌড়ীয়ের বৈরাগ্য-বিচার গৌড়ীয়-গৌরব গৌরভক্তগণ যে বৈরাগ্যের আদর্শ প্রদর্শন করেছেন, বৈরাগ্যের সেরূপ সৰ্ব্বতােমুখী বিচার অন্য কোথায়ও দেখতে পাওয়া যায় না। জগতে একদেশী বৈরাগ্যের বিচার, ফবৈবাগ্যের বিচার যুগ-যুগান্তর ধরে যথেষ্ট প্রচারিত ছিল এবং এখনও আছে। কিন্তু সর্বদেশী যুক্তবৈরাগ্যের বিচার গৌরসুন্দরের কৃপায় ঐরূপের রসা- মৃতসিন্ধুতে যেমনটীভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তার উপমা আর কোথায়ও নেই। ফবৈরাগ্য ও যুক্তবৈরাগ্যের বিচার একমাত্র রসামৃতসিন্ধুতেই আছে-গৌড়ীয়গণের জীবন- ভাগবতেই আছে। সিদ্ধার্থের বৈরাগ্য, শঙ্করাচার্যের বৈরাগ্য অদ্ভুত, সন্দেহ নাই; কিন্তু রায় রামানন্দের বৈরাগ্য, পুণ্ডরীক বিদ্যানিধির বৈরাগ্য, দাস গােস্বামী প্রভুর বৈরাগ্য কিরূপ সৰ্ব্বতােমুখী বৈরাগ্য, কিরূপ বৈরাগ্যের চুড়ান্ত মীমাংসা, তা গৌড়ীয়-গৌরবে-গৌরবান্বিত না হলে, অভিজ্ঞতাবাদের চশমা নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা বলেই মনে হয়। রামানন্দের অদ্বিতীয় বৈরাগ্যের কথা যুগ-যুগান্তর ধরে লােক আলােচনা করুন, গৌড়ীয়-গৌরবের দিদর্শন পেতে পারবেন। তাঁদের বৈরাগ্যবিপ্রলম্ভ বৈরাগ্য ; সেটা পরিপূর্ণ রসময়-রসের প্রস্রবণ সেখানে। বার্ষভানবী সেই বৈরাগ্যের বিগ্রহ। আর অন্য সব বৈরাগ্য --শুষ্ক।
গৌড়ীয়ের শম-দম-ক্ষান্তি বিচার “শমে মন্নিষ্ঠতা বুদ্ধেঃ”,“দম’ অর্থে—ইন্দ্রিয় সংযম, ক্ষান্তি অর্থে—সহিষ্ণুতা বা ক্ষোভের কারণ উপস্থিত হলেও চিত্তের অক্ষুব্ধাবস্থা, ‘মৈত্র’ শব্দে—বিশ্ব-প্রেমিকতা। সনক-সন- নারদাদির শম-দম ততদ্ভুত; কিন্তু সেই শম, সেই দম, যেখানে সেবা-চাঞ্চল্যে, যেখানে অধিরূঢ়মহাভাব-রসের বন্যায় প্লাবিত হয়ে পড়েছে—সেখানকার শম, সেখানকার দম, সেখানকার ক্ষান্তি কত বড় ! শ্রীবাসের ক্ষান্তি, শ্রীধরের ক্ষান্তি কিরূপ-গৌড়ীয়-গৌরবের পতাকা উড্ডীন করেছে । গৌড়ীয়ের বিশ্বপ্রেমিক কিরূপ? শ্ৰল বাসুদেব ঠাকুরের “জীবের পাপ লঞ। মুই করি নরক ভােগ। সকল জীবের প্রভু ঘুচাও ভবরােগ।” অথবা “ভারত ভূমেতে হৈল মনুষ্যজন্ম যার। জন্ম সার্থক কর, করি’ পর উপকার।” “যারে দেখ তারে কহ কৃষ্ণ উপদেশ। আমার আজ্ঞায় গুরু হা তার এই দেশ।” প্রভৃতি নিষ্কপট বিশ্ব-প্রেমিকতার আদর্শ আর কোথায় আছে ? গৌড়ীয়ের ধ্যানযােগ সহজ ও সর্বোত্তম প্রেমবিলাস-বিবর্তে গৌড়ীয়-গৌরবে-গৌরবান্বিতগণের অধিরূঢ় মহাভাবে যে সহজ ধ্যানযােগ, তার কাছে বিশ্বা- মিত্রের ধ্যান, সৌভরীর ধ্যান, কোটি কোটি ধ্যান- স্তিমিত-লােচন-যােগি-ঋষির গিরিকরে যুগযুগান্তরব্যাপিনী সাধনা উপমারূপেও দাড়াতে লজ্জা বােধ করে।
গৌড়ীয়-গৌরব
তাই কুরুক্ষেত্রের স্যমন্তপঞ্চকে ব্রজনাগরীগণ কৃষ্ণকে
বলেছিলেন,
“আহুশ্চ তে নলিন-নাভ পদারবিন্দ
যােগেশ্বরৈহৃদি বিচিন্ত্যমগাধববধৈঃ।
সংসারকুপ-পতিতােত্তরণাবলম্বং
গেহং জুযামপি মনদিয়াৎ সদা নঃ॥”
“নলিন-নাভ, তুমি ধ্যান শিখাচ্ছ কাদের? আর লােক
হাসিয়ে কাজ নেই। আমরা ত আর যােগেশ্বর নই, আর
তাদের ন্যায় সংসার হতে উদ্ধারও চাইনে। তােমার
যােগি-ঋষি-তপস্বিগণ বিষয় হতে চিত্ত কুড়িয়ে নিয়ে
তােমাতে চিত্ত সংলগ্ন করবার জন্য কতই না অভ্যাস-যােগ
অবলম্বন করেন, আর আমরা তােমা হতে চিত্ত কেড়ে নিয়ে
তা’কে বিষয়ে লাগাবার জন্য কত সাধ্য-সাধনাই না করে
থাকি, কিন্তু আমাদের চিত্তভৃঙ্গকে তােমার চরণকমলের
মধু ছেড়ে শত চেষ্টাতেও অন্যত্র দিতে পারি না। তাই
বলি,-নাথ, ছলনা ছাড়, আমাদের ধ্যান শিখাতে যেয়ে
না।” যা’রা গৌড়ীয়-গৌরবে গৌরবান্বিত, তাঁদের ধ্যান
এইরূপ স্বাভাবিক, কাজেই তাদের ধ্যানের সঙ্গে অন্য
কোটি কোটি প্যানের তুলনা হয় না।
গৌড়ীয়ের ভক্তি সর্বোত্তমা কেন?
অপরের কোটি কোটি বিষ্ণুভক্তি থাকুক, কিন্তু গৌড়ীয়-
গৌরবে গববিণী যারা, তাদের সঙ্গে সেই ভক্তির কোন
গৌড়ীয়-গৌরব ; তুলনাই হতে পারে না। প্রহ্লাদ ত’ ভক্তের উপমানস্বরূপ প্রহলাদ অহৈতুক ভক্তের আদর্শ। “যস্ত আশীষ আশাস্তে ন স ভৃত্য স বৈ বণি”—একদিন প্রহলাদই বলতে পেরে- ছিলেন। ভগবানের করপল্লব, যা ব্রহ্মাদি দেবতার উপরও স্থাপিত হয় নাই, সেই শ্ৰীকরকমল প্রহলাদের মস্তকে স্থাপিত হয়েছিল। আবার প্রহলাদ থেকে পাণ্ডবগণের কৃষ্ণপ্রীতি আরও ঘনীভূত। ভগবান্ সখারূপে, মাতুলেয়- রূপে, সুহৃরূপে, বচনানুবর্তিরূপে, উপদেশকরূপে একমাত্র পাণ্ডবগণের গৃহেই অবস্থান করূতেন। প্রহলাদের গৃহে পরব্রহ্ম সকলের সাক্ষভাবে অবস্থান করেন নি। মুনি- গণ যেরূপ পাণ্ডবদের গৃহে পরব্রহ্মকে দর্শন করূতে যেতেন, প্রহলাদের গৃহে সেরূপ যান নি। ভগবান্ মালেয়দি- রূপে প্রহলাদের গৃহে অবস্থান করেন নি। প্রলাদের স্তব- স্তুতিতে তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু প্রহলাদের প্রতি প্রসন্ন হয়েছিলেন, কিন্তু কৃষ্ণ স্বয়ং নিজ ইচ্ছায়ই পাণ্ডবগণের প্রতি প্রসন্ন ছিলেন। আবার পাণ্ডবগণ হ’তেও যাদবগণের প্রতি কৃষ্ণের প্রীতি আরও অধিক। যাদবগণের সঙ্গে ভগবানের শয্যা, আসন, ভােজন, যৌনসম্বন্ধ, পিণ্ডবন্ধ,—সবই আছে। আবার যাদব- গণ অপেক্ষাও উদ্ধবের কৃষ্ণপ্রীতি আরও বেশী। কৃষ্ণ বলেছিলেন,-“হে উদ্ধব, তুমি যেমন আমার প্রিয়, ব্ৰহ্মা, শঙ্কর, সঙ্কৰ্ষণ, মহালক্ষ্মী, এমন কি, আমার নিজের বিগ্রহও সেরূপ প্রিয় নয়।” উদ্ধব অপেক্ষাও ব্রজ-
গৌড়ীয়-গৌরব
রামাগণের প্রতি কৃষ্ণের প্রীতি আরও বেশী। উদ্ধব
যাদের কথা বলেছেন,-“আমি যেন ব্রজবনিতার পদরেণু
পাবার জন্য বৃন্দাবনের গুল্ম-তরু-লতা-ওষধির কোনও কিছু
হতে পারি। কেননা, ব্রজগোপীগণ দুস্ত্যজ স্বজন
আৰ্যাপথ পরিত্যাগ করে মুকুন্দের পদবী ভজনা করেছিলেন
আবার ব্রজগোপীগণের সকলের প্রীতি একত্র করেও
কৃষ্ণকে বেঁধে রাখতে পারে না যা’র প্রীতির কাছে, সেটা
হচ্ছে বৃষভানুজার প্রীতি। সকলকে ছেড়ে কৃষ্ণ বৃষভানু-
নন্দিনীর অনুসন্ধান করূতে ধাবিত হয়েছিলেন। সকল গুরুর
গুরুকে লঘু স্বভাব করাতে পারেন যে প্রীতি, যেখানে
নীলমণি আপনাকে বিকিয়ে দিয়ে চিরঋণী হয়ে থাকেন,
এমন যে সেবার চরমকাষ্ঠা, সেই সেবার গৌরব করূতে পারেন
বার্ষভানবীর অনুগত যারা। তারাই গৌড়ীয়-গৌরব।
গৌড়ীয়ের-স্বতঃসিদ্ধ গুণগ্রাম অতুলনীয় কেন ?
শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের প্রিয় যারা, তাদের চরণনখ-জ্যোতিতে
আনন্দেদ্ভাসিত যারা, তাদের
তাদের যে সকল স্বতঃসিদ্ধ
গুণগ্রাম আছে, তার কোটী অংশের এক অংশও অন্যে
নেই। ভক্তিরসামৃতসিন্ধুকার কার কি গুণ আছে, তার
একটা বিশ্লেষণ-বিচার দেখিয়ে বলছেন, পঞ্চাশটী গুণ
বিন্দু-বিন্দু-রূপে মানুষে আছে, সেই পঞ্চাশটী গুণ এবং
আরও পাঁচটী গুণ বিশেষভাবে ব্ৰহ্মাদি দেবতায় আছে,
আর সেই পঞ্চান্নটী গুণ, তার সঙ্গে আরও পাঁচটী গুণ,
৩৮
গৌড়ীয়-গৌরর
;
সৰ্বসমেত ষাটুটি গুণ পূর্ণভাবে নারায়ণে আছে ; আর চারটি
গুণ, যা নাকি নারায়ণেও নেই, সেই চৌষষ্টি গুণ পরি-
পূর্ণভাবে একমাত্র কৃষ্ণেই আছে। এ ছাড়া বিশেষ পঁচিশটী
গুণ শ্রীরাধারাণীতে আছে।
গৌড়ীয়-গৌরবে গরবিণী যারা, সেই বার্ষভানবীর
অপ্রাকৃত অন্তরঙ্গ জন এই সকল গুণেরই উত্তরাধিকারিণী ।
কাজেই তাদের গুণের সঙ্গে অন্যজনের গুণের তুলনাই
হয় না।
গৌড়ীয় গৌরবাবলীর তালিকা
গৌড়ীয়ের গৌরব কি কি, তার একটা তালিকা
আমাদের গৌড়ীয়-গৌরব শ্রীল দাস গােস্বামী প্রভু তার
‘মুক্তাচরিত গ্রন্থের মঙ্গলাচরণে দিয়েছেন, যে শ্লোকটী
আমরা গুরুপ্রণাম-শ্লোকরূপে পূৰ্বে উচ্চারণ করেছি,
“নামশ্রেষ্ঠং মনুমপি শচীপুত্রমত্র স্বরূপং
রূপং তস্যাগ্রজমুরুপুরীং মাথুরীং গােষ্ঠবাটীম্।
রাধাকুণ্ডং গিরিব মহো! রাধিকা-মাধবাশা
প্রাপ্তো যস্য প্রথিত কৃপয়া শ্রীগুরুং তং নতােহম্মি।”
“গুরাের্ভাবঃ ইতি গৌরবম্” গুরুর ভাব বা গুরুত্বকে
‘গৌরব’ বলে। গুরুদেবই—স্বয়ং গৌড়ীয়-গৌরব। তাই
তিনি সকল গৌড়ীয়-গৌরব প্রদান কর্তে পারেন।
গৌড়ীয়গণের মধ্যে এই গুরুদেবের আদর্শ যেরূপ গৌরবময়,
সেরূপ আদর্শ আর অন্যত্র কোথায় ও দেখতে পাওয়া যায়
গৌড়ীয়-গৌরব না। কোন কোন সম্প্রদায়ে গুরু-স্বীকারেরই প্রয়ােজনীয়তা বােধ হয় না। অবশ্য এইরূপ বিচার কতটা সমীচীন, তার যুক্তি প্রদর্শন করা এই অল্প সময়ে অসম্ভব। আবার কোন কোন সম্প্রদায়ে সাময়িক গুরু স্বীকৃত হয়। এরূপ কল্পিত গুরু দ্বারা কোন কল্পিত অভীষ্ট কল্পিতভাবে সিদ্ধ করিয়ে নেবার পরে গুরুকে তার আসন হতে বিতাড়িত করা হয়, তখন গুরুশিষ্যভেদ থাকে না ;- “গুরুনৈব শিষশ্চিদানন্দরূপঃ শিবােহহং শিবােহহ”। শুনা যায়, কোন কোন স্থানে এমনও প্ৰখ আছে যে, শিষ্য আপনাকে সিদ্ধ অভিমান করে কাৰ্যতঃ গুরুশিষ্য-ভেদ ভঙ্গ করবার জন্য গুরুকে যষ্টি-দ্বারা প্রহার করে থাকে। তত্ত্ববাদী ও রামানুজাদি বৈষ্ণব-সম্প্রদায়ে গুরুদেবকে অত্যন্ত সন্ত্রম-চক্ষে দর্শন করা হয়; কিন্তু সম্পূর্ণ অনর্থমুক্ত *গৌড়ীয়ের” গুরুগৌরব অত্যন্ত প্রীতিময় সম্বন্ধযুক্ত। দেব সন্ত্রমযুক্ত দূরের বস্তু নন—কিন্তু অত্যন্ত নিকটতম নিত্য সঙ্গী-রাধাগােবিন্দের সেবার চিরসহায়কারিণী বার্ষভানবীর অভিন্নকলেবর সখী। এরূপ গুরু-গৌরবের উদাহরণ অন্যত্র নেই- ‘গুরুরূপা সখীবামে, ত্রিভঙ্গ-ভঙ্গিম-ঠামে চামরের বাতাস করিব।” নিকুঞ্জযুনাে রতিকেলিসিদ্ধ্যৈ যা যালিভিযুক্তিরপেক্ষণীয়। তত্রাতিদাক্ষাদতিবল্লভ বনে গুরােঃ শ্ৰীচরণারবিন্দম্ ।
গৌড়ীয়-গৌরব সেই গুরুদেবের সুবিখ্যাত কৃপায়ই সকল গৌড়ীয়-গৌরক লাভ হয়। গৌড়ীয়-গৌরব বিষয়াশ্রয়ভেদে দ্বিবিধ সেই সকল গৌড়ীয়-গৌরব বিষয় ও আশ্রয়ালম্বনভেদে দু’রকম। বিষয়ালম্বন বা সেব্যতত্ত্ব-অদ্বয়বস্তু। তিনি এ জগতে আমাদের কাছে তিনটী মূর্তিতে প্রকাশিত হন (১) তারকব্রহ্মনাম, (২) মন্ত্র, (৩) শ্ৰশচীনন্দন। (১) নামশ্রেষ্ঠ তারকব্রহ্মনাম এই নামই—এ জগতে সেই চিঘিলানধামের বার্তা-সম্পূট এবং স্বয়ং ভগবৎস্বরূপ চিন্তামণি। অতিন্দ্রিয় বস্তু বা রাজ্যের খবর জানতে হলে অথবা জানাতে হলে শব্দ ছাড়া আর অন্য কোনও উপায় নেই। তাই শাত্মক নাম ও মন্ত্র ব্যতীত অন্য কোনবস্তুই আমাদিগকে বর্তমানে ভগ- বানের অভিজ্ঞান প্রদান করতে পারে না। এই নামের কথা কঠতি এইরূপভাবে কীৰ্ত্তন করেছেন, *সব্বে বেদ যৎপদমিমনতি, তপাংসি সৰ্বাণি চ যদ্ধ দন্তি। যদিচ্ছন্তো ব্রহ্মচর্য্যঞ্চরন্তি, তত্তে পদং সংগ্রহেণ ব্রবীমি ওমিত্যেৎ ॥ *এতদ্ধ্যেবাক্ষরং ব্ৰহ্ম এতদেবাক্ষরং পরম্ । এতদ্ধে।বাক্ষরং জ্ঞাত্ব যে যদিচ্ছতি তস্য তৎ। এতদাসম্বনং শ্রেষ্ঠমেতালম্বনং পরম্। এতদানং জ্ঞাত্বা ব্ৰহ্মলােকে মহীয়তে ।”
গৌড়ীয়-গৌরব ৪১ এই প্রণব অর্থাৎ যা দ্বারা আমাদের আরাধ্যবস্তু প্রকৃষ্ট- রূপে স্তুত হন, তাহা অসম্প্রসারিত নাম, ইহাই শব্দব্রহ্ম- বেদের বীজ। এই নাম বা প্রণব এবং নামী একই বস্তু। চYন্দাগ্য বলছেন, “অথ খলু য উদ্গীথঃ স প্রণববা যঃ প্রণবঃ স উদ্গীথ।” এই নাম-স্বরাটের পাদ-নখাঞ্চল আরতি করূছেন নিখিল- বেদের সারভাগ উপনিষদ্-রত্নমালা, আর নিবৃত্ততৃষ্ণ মুক্তকুল সেই আরতির সঙ্গে কীৰ্ত্তন ধরেছেন,- “নিখিলশ্রুতিমৌলিরত্নমালাতিনীরাজিতপাদপঙ্কজান্ত। অয়ি মুক্তকুলৈরুপামানং পরিতত্ত্বাং হরিনাম সংশ্রয়ামি।” এই তারকব্রহ্মনাম সেই চিলীলামিথুন রাধা-গােবিন্দেরই মাধুৰ্যময়ী চিবিলাসলীলা গান করূছেন, আর আশ্ৰয়ালম্বনগণ বিপ্রলম্ভ-ব্যাকুল হয়ে সেই লীলার অনুসন্ধান করূছেন সম্বােধনাত্মক পদের দ্বারা ;- “হে হরে বৃষভানুনন্দিনী, হে বার্ষভানবীবল্লভ কৃষ্ণ ! হে রাধিকারমণ রাম । জগচ্চিত্তচৌর-চিত্তহারিণী হরে।” (২) মন্ত্রশ্রেষ্ঠ কামগায়ত্রী আর মনন-ধৰ্ম্ম হতে ত্রাণ লাভ করে “গৌড়ীয়” কাম- দেবের কামপূরণে আত্মসমর্পণ করছেন, সম্প্ৰদানাত্মক কামবীজ ও নমঃ-শব্দ-পরিপুটিত পদের দ্বারা। গৌড়ীয়ের গানের উদ্দেশ্যে জপ্য মন্ত্র—কামবীজ কামগায়ত্রী। কেবল গৌড়ীয়েরই আছে, এ মন্ত্র-গৌরব গৌড়ীয়-গৌরব % এ গৌরব কামগায়ত্রী মন্ত্ররূপ, হয় কৃষ্ণ-স্বরূপ, সাদ্ধ চব্বিশ অক্ষর তার হয়। সে অক্ষর চন্দ্র হয়, কৃষ্ণে করি’ উদয়, ত্রিজগৎ কৈল কামময়। বেদমাতা গায়ত্রী কামগায়ত্রীরূপা গােপীজন্ম লাভ করে 'অপ্রাকৃত নবীন মদনের সেবায় অধিকার পেয়েছিলেন। (৩) সেব্যশ্রেষ্ঠ সাদ্বৈত-সাবধুত-শচীপুত্র শচীপুত্ৰই—গৌড়ীয়-গৌরব। কেবল গৌড়ীয়েরই আছে। বিশ্ববাসী যিনি এই গৌরবে গৌরবান্বিত হবেন, তিনিই শচীপুত্র চৈতন্যকে লাভ করে অচেতনতার মােহন্দ্রা হতে জাগরূক হতে পাবেন। গৌড়ীয়ের গৌরবের ঠাকুর গােরাচঁাদকে শ্বেতদ্বীপ-গৌড় হ’তে ভোম- গৌড়ে আনয়ন করেছেন শান্তিপুরনাথ অদ্বৈতাচাৰ্য। আর গৌড়ীয়ের ঠাকুরের কথা গৌড়ের দ্বারে দ্বারে আচণ্ডালে বিতরণ করেছেন-গৌড়দেশকে প্রেমবন্যায় ভাসিয়েছেন পতিতপাবন নিতাইচাদ—যার পাদপদ্মপরাগ গৌড়ীয়- গৌরব-প্রদর্শনীর দ্বারােদঘাটনের একমাত্র কুঞ্চিকাস্বরূপ। সেই চৈতন্যচন্দ্রে সব আছে, কোনও কিছুর অভাব নেই “সৌন্দর্য্যে কামকোটিঃ সকল জনসমাহদনে চন্দ্রকোটি- বাৎসল্যে মাতৃকোটিদিশবিটপিনাং কোটিরৌদাৰ্যসারে। গাম্ভীর্যেইভোধিকোটিমধুরিমণি সুধাক্ষীরমাধ্বীক-কোটি- গোরােদেবঃ স জীয়াৎ প্রণয়রসপদে দর্শিতাশ্চৰ্য্যকোটি।
গৌড়ীয়-গৌরব যিনি সৌন্দর্য্যে কোটিকাম, যিনি সর্বজীবের সুস্নিগ্ধতা বিধানে কোটিচন্দ্র, যিনি বাৎসল্যে কোটিমাত, বদান্যতার পরাকাষ্ঠায় যিনি কোটিকল্পতরু, যিনি গাম্ভীর্য্যে কোটি মহাসাগর, মাধুর্যে কোটি অমৃতসার, দুগ্ধসার ও মধুসার, এবং শৃঙ্গার-রস বিষয়ে যিনি কোটি চমৎকারিতা প্রদর্শন করিয়াছেন অর্থাৎ পূৰ্ব্ব পূর্ব রস-কোবিদ-প্রদর্শিত শৃঙ্গার- রস-মাধুৰ্য্য অপেক্ষা শ্রীগৌরসুন্দর-প্রদর্শিত প্রণয়-রস কোটিগুণে অধিক চমৎকারিতাবিশিষ্ট, সেই লীলাময় গৌরসুন্দর জয়যুক্ত হউন। চৈতন্যপ্রিয়-নখজ্যোতিরুদ্ভাসিত জনগণের অসমােৰ্দ্ধ সৌন্দৰ্য্য, মহত্ত্ব ও ঔদার্য্য শচীপুত্রের কথা দূরে থাকুক, শচীপুত্রের প্রিয়তমগণের চরণনখ-জ্যোতির প্রভা অতুলনীয়া ; চৈতন্যপ্রিয়জনের চরণনখজ্যোতি যে পৰ্য্যন্ত আমাদের দর্শনের বিষয় হয়, “তাবব্ৰহ্মকথা বিমুক্তিপদবী তাবঃ তিক্তভবে- ভবিচাপি বিশৃঙ্খলত্বময়তে নাে লােকবেদস্থিতি। তাবচ্ছাস্ত্রবিদাং মিথঃ কলকলো নানাবহিৰ্ব্বত্মসু চৈতন্যপদম্বুিজপ্রিয়জনে যাবন্ন দৃগ গােছরঃ।” যে কাল পর্যন্ত শ্রীচৈতন্য-পাদারবিশ মকরন্দ-ভৃঙ্গ- অন্তরঙ্গ-জন দর্শনের বিষয় না হন, সে কাল পর্যন্তই ৪৪ গৌড়ীয়-গৌরব নিৰ্বিশেষ-ব্রহ্মবিচার এবং ঈশ্বর-সাযুজ্যাদি মুক্তিমার্গ তিক্ত বােধ হয় না, সে কাল পর্যন্তই লােকমৰ্য্যাদা ও বেদমৰ্য্যাদ বিশৃঙ্খলতা প্রাপ্ত হয় না। অর্থাৎ লােকে ও বেদে পরিনিষ্ঠিত মতি পরিত্যক্ত হয় না, সেকাল পর্যন্তই বিবিধ বহির্মুখ- মার্গে বিচরণশীল শাস্ত্রবিৎ অর্থাৎ পণ্ডিতম্মন্য ব্যক্তিগণের স্ব স্ব মতবাদ লইয়া পরস্পর বিবাদ অবশ্যম্ভাবী। সেই গৌড়ীয়-গৌরব চৈতন্যভক্তগণ পরম নিষ্কিঞ্চন হয়েও এরূপ বিভবযুক্ত যে, তাদের নিকট “কৈবল্যং নরকায়তে ত্রিদশপূরাকাশপুষ্পায়তে দুৰ্দান্তেন্দ্রিয়কালসৰ্পপটলী প্রােৎখাতদংষ্ট্রায়তে। বিশ্বং পূর্ণসুখায়তে বিধিমহেন্দ্রাদিশ্চ কীটায়তে যৎ কারুণ্যকটাক্ষবৈভববতং তং গৌরমেব স্তুমঃ।” গৌরসুন্দরের কৃপাকটাক্ষ-সম্পদে সম্পত্তিশালী গৌরভক্তগণের নিকট যােগিজনসাধ্য কৈবল্য বা ঈশ্বরসাযুজ্য নরকের ন্যায় প্রতীত হয়, সকাম স্বধৰ্ম্মনিষ্ঠজনের বাঞ্ছিত বা সফল অমরাপুরী আকাশ-কুসুমের ন্যায় অলীক বলিয়া বােধ হয়, কালসর্পরূপ দুর্দান্ত ইন্দ্রিয় সকল উৎপাটিত-বিষদন্ত-অহিকুলের ন্যায় আচরণ করে, পরিদৃশ্য- মান বিশ্ব পরিপূর্ণ সুখ-ধাম বলিয়া অনুভূত হয় অর্থাৎ সৰ্বত্রই ভগবদ্ভাব পরিলক্ষিত হয়, এবং ব্ৰহ্মাধিপত্য, ইন্দ্রাধিপত্য প্রভৃতি পদবীসমূহ কীটের ন্যায় অতি তুচ্ছ জ্ঞান হয়, সেই গৌরসুন্দরকে আমরা স্তব করি। যে
৪৫
গৌড়ায়-গৌরব
গৌড়ীয়-গৌরব গৌড়ীয়েশ্বর স্বরূপ দামােদর
সে’সকল গৌড়ীয়-গৌরব চৈতন্যভক্তের শিরােমণি
সমস্ত গৌড়ীয়ের অধীশ্বর—শ্রীস্বরূপ দামােদর। বিশ্বজগতের
পক্ষে কোষ্টী সব চেয়ে বড় মঙ্গল, বড় দয়, সব চেয়ে বড়
পরােপকার, সব চেয়ে বড় ‘মুস্কিল-আসান, সব চেয়ে
বড় অর্থনীতি, সব চেয়ে বড় স্বরাজ, সব চেয়ে বড়
স্বাধীনতা, সব চেয়ে বড় কাম্য, তার সন্ধান তিনিই
দিয়েছেন ;-
“হেলােঙ্কলিত-খেদয়া বিশদয়া প্রােন্মীলদামোদয়।
শামাচ্ছাস্ত্ৰবিবাদয় রসদয়া চিত্তপিন্মেদিয়া।
শদ্ভক্তিবিনােদয়া সমদয়া মাধুৰ্যমৰ্যাদয়
শ্রীচৈতন্য দয়ানিধে, তব দয়া ভূয়াদমন্দোদয়া।”
হে দয়ার সাগর শ্রীচৈতন্য, তােমার যে অমন-উদয়-
কারিণী দয়া অবলীলাক্রমে জীবের যাবতীয় মনস্তাপরূপ অনর্থ
ধূলির ন্যায় দূরে উৎক্ষিপ্ত করিয়া দিতে পারে, তােমার যে
সর্বপ্রকাশিকা দয়ায় প্রকৃষ্টরূপে পরমানন্দ প্রকাশিত হয়,
তােমার যে দয়ার উদয়ে শাস্ত্রের বাদপ্রতিবাদ নিরস্ত
করিয়া চিত্তকে সরস করিয়া দেয়, তােমার যে দয়া চিত্তে
প্রৌঢ়ানন্দ বা দিবব্যান্মাদের উদয় করাইয়া নিরন্তর
হলাদিনীর মুখ বন্ধন করে
এবং প্রেমবিলাস-বিবর্তে
অভিষিক্ত করিয়া মাধুৰ্য্যের পরাকাষ্ঠা প্রাপ্ত করায়, সেই
অমন্দোদয়-দয়া আমার প্রতি বর্ষিত হউক।
}
৪৬
গৌড়ীয়-গৌরব
গৌড়ীয়-গৌরব-শিয়ােমণি রামানন্দ
স্বরূপের মিত্র-রূপ ও ত’র অগ্রজ সনাতন। স্বরূপের
আর এক মিত্র-রায় রামানন, তারা উভয়েই মহাপ্রভুর
অন্তর-বেত্তা। রামানন্দ উৎকল বা দক্ষিণদেশবাসী হলেও
তিনিও গৌড়ীয়ের শিরােভূষণ-গৌড়ীয়-গৌরব-রবি।
মহাপ্রভু স্বয়ং রামানন্দের মুখে বক্তা হয়ে জগতে
গৌড়ীয়-গৌরবের
চূড়ান্ত
মীমাংসা প্রকাশ করেছেন। প্রথমে
জীবের উচ্ছ,ঙ্খলতা-বৃত্তি ও ভোগ-প্রবৃত্তি অত্যন্ত প্রবল
থাকায় সাধারণ জীব দৈববর্ণাশ্রমরূপ স্বধর্ম পালনে
সেশ্বরনৈতিক ধৰ্ম্মজীবন আরম্ভ করেন এবং তার অধিকারে
তার চেয়ে আর বড় কোন বস্তু দেখতে না পাওয়ায় সেই
বর্ণাশ্রম-ধৰ্ম্মকেই পরম সাধ্য জ্ঞান করেন-দৈববর্ণাশ্রম-ধৰ্ম্ম
ঠিক অনুসরণ করূতে না পেরে যখন অদৈব-বর্ণাশ্রম-ধর্মের
আশ্রিত হন, তথন বিষ্ণুতােষণ পরিত্যাগ করে ইন্দ্রিয়
তােষণের জন্যই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ধর্মপ্রবৃত্তির ৰিতীয় স্তরে
কৃষ্ণে-কার্পণরূপ কর্মমিশ্র ভক্তিকেই যখন ‘সৰ্বসাধ্যসার
বলে জ্ঞান হয়, তখন যৎ কয়রাষি’-শ্লোকই অবলম্বন
হয়। কিন্তু এরূপ বিচারও অত্যন্ত বাইরের বিচার, এতে
মুখে ফলানুসন্ধান না থাকলেও ‘আমি ফর্পণকারী-
এরূপ আন্তরিক অভিমান থাকে। তার পর ফলভােগত্যাগ
বা নৈষ্কর্মের বিচারকেই ‘সাধ্যসার’ বলে মনে হয়; কিন্তু
এতেও নিজের ত্যাগাভিমান ও প্রকৃত অস্মিতা থাকে
গৌড়ীয়-গৌরব ৪৭ ব’লে আত্মার সহজভাব উদিত হয় না। তার পরে সাধকের একটা জ্ঞানমিশ্র, যােগমিশ্র বিচার এসে উপস্থিত হয় । কিন্তু এতে পরম সবলা ও নিরপেক্ষা ভক্তিকে-আত্মার সহজ স্বভাবকে দুর্বল ও সাপেক্ষ বিচারে কৃত্রিমতা-রাহু দ্বারা গ্রাস করাবার চেষ্টা থাকায় সর্বাকর্ষক নিত্য আকর্ষণের মাঝখানে একটা আড়াল এসে পড়ে। তার পরে জ্ঞানশূন্যা ভক্তি ; এখানে মহাপ্রভু প্রথমে বললেন-“এহহ হয়। তার পরে প্রেমভক্তি বা স্থায়িভাব; এখান হ’তে প্রেমের অঙ্কুর উদিত হয়। লোল্যজনিত প্রেম না হলে সুকৃতিজনিত বৈধভক্তি কৃষ্ণকে আকর্ষণ করতে পারে না। দাস্যরসে মমতাযুক্ত হয়ে প্রেম অধিকতর সমৃদ্ধ হয় ; তথাপি দাস্যপ্রেম ‘উত্তম’ নহে। সখ্যপ্রেম উত্তম; কেননা, দাস্যে একটা সমরূপ কন্টক থাকে। সখ্যে বিশ্রতা ; আবার বাৎসল্যে দাস্যের মমতা, সখ্যের বিশম্ভ এবং তদুপরি স্নেহাধিক্যের সহিত যুক্ত হয়ে প্রেমকে আরও সান্দ্র করে তােলে, পরম পালক সেখানে পাল্য হয়ে পড়েন,-গুরু সেখানে লঘু হয়ে পড়ে। আবার সেই সমস্ত রসের যত কিছু মধুরিমা যখন সম্পূর্ণ সঙ্কোচশূন্য সৰ্বাঙ্গ-সেবাপ্রাণময় কান্তভাবের সঙ্গে মিলিত হয়, তখনই প্রেম-পরাকাষ্ঠার প্রস্রবণ প্রবাহিত হয়। অশুল্ক-সেবিকা গােপীগণের প্রেমঋণ কৃষ্ণের অপরি- শােধ্য। এই গােপীপ্রেম। সাধ্যাবধি হলেও শ্ৰীবৃষ- ৪৮ গৌড়ীয় গৌরব ভানুজার প্ৰেমাই সাধ্যশিরােমণি। এক শ্রীবাভানবীর জন্য নন্দকুলচন্দ্রমা যাবতীয় গােপললনাকে পরিত্যাগ কৰ্ত্তে ও দ্বিধা বােধ করেন না—এমনই বার্ষভানবীর সেবা-শশাভা। এ সকল গৌড়ীয়-গৌরবের কথা এক রামানন্দের মুখেই জগতে প্রকাশিত হয়েছে। রামানন্দের অপ্রাকৃত অলঙ্কার- শিল্প-বিজ্ঞান নিত্যকৃষ্ণসেবার অলঙ্কাররূপেই বিরাজিত। রামানন্দ-পরমহংসকুলচূড়ামণি। রামানন্দের মুখে মহা প্রভু আরও তেরটী পরিপ্রশ্নের উত্তর প্রকাশ করিয়ে জগতে যে অমূল্য উপদেশ-রত্ন বিতরণ করেছেন, তা নিখিল বেদ- বেদান্তের চরম নির্যাস। বিদ্যার বিচার, প্রতিষ্ঠার বিচার, সম্পত্তির বিচার, দুঃখ-বিচার, মুক্তি-বিচার, ধৰ্ম্ম-বিচার, শেয়াে-বিচার, ধ্যেয়-বিচার, বান্তব্য-বিচার, কীর্তনীয়- বিচার, শ্রোতব্য বিচার, বুভুক্ষু ও মুমুক্ষুর গতিবিচার রামানন্দ রায় জগতে প্রকাশ করে সমগ্র বিশ্বে গৌড়ীয়- গৌরব বিজয়- বৈজয়ন্তী উড্ডীন করেছেন। গগৗড়ীয়-শিয়াের ঠাকুর হরিদাস মহাপ্রভুর একমাত্র শিক্ষা যে নাম-ভজন, তারই একনিষ্ঠ আচার-প্রচার, মাপ্রভুর শ্রীমুখ-গাথা তৃণাদপি' শ্লোকের মূর্তবিগ্রহরূপে ঠাকুর হরিদাস শব্দ-ব্রহ্মের মহামহিমা প্রকাশ করে নিখিল বিশ্বে গৌড়ীয়-গৌরব-দুন্দুভি ঘােষণ। করেছেন।
১১ গৌড়ীয়-গৌরব গৌড়ীয়-গৌরব-মুকুট-মৌলি শ্রীরূপসনাতন রামানন্দের মিত্র-রূপ-সনাতন, তাদের বৈরাগ্য অতুলনীয়। দবিরখাস ও সাকরমল্লিক—যারা দুজন গৌড়েশ্বর হুসেন শাহের রাষ্ট্রপরিচালনের দুটী প্রধান হস্তস্বরূপ ছিলেন, যারাই কাৰ্যতঃ গৌড়ের অধীশ্বর ছিলেন, তারা কিরূপ জাগতিক সাম্রাজ্যবাদকে নিষ্ঠীবনের স্থায় পরিত্যাগ কর আদর্শ প্রদর্শন করে শ্রীচৈতন্যের সেনাপতিরূপে স্বরাট পুরুষ কৃষ্ণের স্বরাজের বার্তা জগতে প্রচার করেছেন, কিরূপ স্বরাজ-সাধনার বিজ্ঞান, কিরূপ স্বরাজ-সাধনার শিল্প জগতে অক্ষয়রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, তার সাক্ষ্য শ্রীরূপের ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’, ‘উজ্জ্বলনীলমণি, “লঘুভাগবতামৃত’, ‘স্তবমালা’, ‘ললিতমাধব’, বিদগ্ধমাধব', “নাটকচন্দ্রিকা প্রভৃতি এবং শ্রীল সনাতনের ‘বৃহদ্ভাগবতা- মৃত, ‘বৈষ্ণবতােষণী’, ‘হরিভক্তিবিলাস’ প্রভৃতি। সনাতন- পুরুষ গৌরসুন্দর সনাতন-ক্ষেত্র কাশী হতে সনাতনের দ্বারা গৌড়ীয়-গৌরবের সম্বন্ধ-তত্ত্ব-বিচার-সুরধুনী, সতীর্থরাজ প্রয়াগ হতে ঐরূপের দ্বারা গৌড়ীয়-গৌরবের সম্বন্ধাভিধেয়- প্রয়ােজনত-বিচারের ত্রিবেণীধারা জগতে প্রবাহিত করেছেন। কবিকর্ণপুর-আর একটী গৌড়ীয়-গৌরব গৌড়ীয়ের আর একটা গৌরব-রবি কবিকর্ণপূর সনাতন ও শ্রীরূপের ঐ গৌরব-গাথা গেয়েছেন- গৌড়ীয়-গৌরব গৌড়েশ্য সভা-বিভূষণমণিন্ত্যক্ত। ষ ঋদ্ধাং শ্রিয়ং রূপস্যাগ্রজ এষ এব তরুণীং বৈরাগ্যলক্ষ্মীং দধে। অন্তর্ভক্তিরসেন পূর্ণসরসসা বাহেহবধূতাকৃতিঃ শৈবালৈঃ পিহিতং মহাসর ইব প্রীতিপ্রস্তত্বিদাম্ । প্রিয়স্বরূপে দয়িতস্বরূপে প্রেমস্বরূপে সহজাভিরূপে। নিজামুরূপে প্রভূরেকরূপে ততান রূপে স্ববিলাসরূপে। [গৌড়েশ্বর হুসেন সাহ বাদশাহের সভা-বিভূষণ-মণিস্বরূপ রূপাজ শ্রীসনাতন গােস্বামী সমৃদ্ধ রাজসম্পদ পরিত্যাগ- পূৰ্ব্বক নবীন-বৈরাগ্য-লক্ষ্মীর আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। শৈবালাচ্ছাদিত মহাসবােবরের ন্যায় তাহার অন্তর কৃষ্ণপ্রেম- রসে ভরপূর, আর তিনি বাহে অবধূতাকৃতি। সেই সনাতন তত্ত্বকোবিদগণের প্রীতিপ্রদ ছিলেন। শ্ৰীমন্মহাপ্রভু ভক্তস্বরূপ, দয়িতস্বরূপ, প্রেমময়স্বরূপ, স্বাভাবিক মনােজ্ঞরূপবিশিষ্ট, নিজ অনুরূপ, মুখ্যরূপ, স্ববিলাসরূপ শ্রীরূপে ভক্তিরসশাস্ত্র বিস্তার করিয়াছিলেন। গৌড়ীয়-গৌরব-শিখামণি দাস গােস্বামী শ্রীরূপের অনুগ, স্বরূপের গোষ্ঠীল রঘুনাথ দাস গােস্বামী প্রভু। গৌড়ীয়-গৌরব-শিরাের দাস গােস্বামীর বৈরাগ্যের তুলনা জগতে মিলিতে পারে না। এই সেই বিপ্রলম্ভ-বৈরাগ্য—আশ্রয়-শিরােমণি শ্ৰীমতীর কৈঙ্কর্যে বিশিষ্টরাগের মূর্ত বিগ্রহ—এই বৈরাগ্য। সেই দা* } গৌড়ীয়-গৌরব গােস্বামীর কথা দাস গােস্বামীর চরণানুচর কবিরাজ গােস্বামী প্রভু বর্ণন করেছেন। ইন্দ্রসম ঐশ্বৰ্য্য, অপ্সরা-সম স্ত্রী, মাতা-পিতার একমাত্র পুত্রত্বের গৌরব, আভিজাত্যের গৌরব, যে গৌড়ীয়-গৌরবের নিকট তুচ্ছ অকিঞ্চিৎকর হয়েছে, সেই গৌড়ীয়-গৌরব দাসগােস্বামী প্রভুর উপমাস্থল সেই গৌড়ীয়-গৌরবই স্বয়ং। কোন স্বারাজ্য-পরিভাবিত মতি হয়ে গৌড়ীয়-গৌরবগণ পার্থিব-স্বর্গীয়-প্রয়ােজন, এমন কি, মুক্তিকে পৰ্যন্ত পিশাচী-ব্যাঘ্ৰী জ্ঞান করতে পেরে- ছিলেন; অধিক কি, নারায়ণগাপাসকগণের কাম্য বৈকুণ্ঠ- সাম্রাজ্যও যাদের লালসার সামগ্রী হয় নাই, বর্তমান জগৎ যদি গণগড্ডলিকার আপাত উত্তেজনা হ'তে একটুকু নিবৃত্ত হয়ে একবার তাদের কৃপা বিচার করেন, তাহলে গৌড়ীয়ের গৌরব কোথায় বুঝতে পাবেন, *অসত্তা বেশ্যা বিজ মতিসৰ্বস্বহরণীঃ কথা মুক্তিব্যাঘ্ৰী ন শৃণু কিল সৰ্বাত্মগিলনীঃ। অপি ত্যক্ত। লক্ষ্মীপতিরতিমিতাে ব্যোমনয়নীং ব্রজে রাধাকৃষ্ণে স্বরতিমণিদৌ ত্বং ভজ মন।” [ হে মন, তুমি অসর্তা (অসজ্জনের সহিত স্থিতি) রূপ বেশ্যাকে পরিত্যাগ কর, যেহেতু উহা বুদ্ধিরূপ সৰ্বস্ব- ধনকে হরণ করিয়া থাকে , তুমি সর্বাত্মগ্লাসিনী মুক্তিরূপা ব্যাঘ্রীর কথাও শ্রবণ করিও না; এমন কি, লক্ষ্মীনারায়ণ- রতি,যাহা পরব্যোমে লইয়া যায়,তাহাকেও পরিত্যাগ করিয়া ।
৫২ গৌড়ীয়-গৌরব ব্রজে রাধাকৃষ্ণের ভজন কর, সেই চিল্লালামিথুনই আত্মস্থিত প্ৰেমৰূপ মহামণি প্রদান করিয়া থাকেন। ] গৌড়ীয়ের গৌরবস্ত-কবিরাজ গােস্বামী রঘুনাথের অনুগ কবিরাজ গােস্বামীর কথা আর কি বলব! কবিরাজ গােস্বামী—গৌড়ীয়-গৌরব-স্তম্ভ। আজ গৌড়ীয়-গৌরবের মধুরিমা গৌড়দেশের ঘরে ঘরে কে জান্ত, যদি গৌড়ীয়-ভাষায় কবিরাজ চরিতামৃত-মধুচক্র রচনা না কতেন! অশীতিবর্ষবয়স্ক প্রবীণ শিরােমণির পরােপকার- চিকীর্ষ। আশ্চর্যজনক। কবিরাজ গােস্বামী গৌড়ীয়-ভাষায় চৈতন্যচরিতামৃত বিতরণ করে সেই উপনিষদের বাণী “শৃম্বন্তি বিশ্বে অমৃতস্য পুত্ৰাঃ” মন্ত্রের তাৎপৰ্য প্রকৃত প্রস্তাবে জানিয়েছেন, অচৈতন্য মর বিশ্বকে প্রেমামর-তরুর অমৃতফলদানে চৈতন্য ও অমৃত করেছেন। তাই তঁা'র অনুগ আর একটী গৌড়ীয়ের গৌরব-পূর্ণচন্দ্র ঠাকুর নরোত্তম গেয়েছেন, কৃষ্ণদাস কবিরাজ, রসিক ভকত মাঝ, যেহে। কৈল চৈতন্যচরিত। গৌরগােবিন্দ-লীলা, শুনিতে গলয়ে শিলা, তাহাতে না হৈল মাের চিত।” গৌড়ীয়ের ব্যাস ঠাকুর বৃন্দাবন গৌড়ীয়ের গৌরব-গাথা গোঁড়ীয়ের দ্বারে দ্বারে গৌড়ীয়- ভাষায় গাহিবার নিত্যভার প্রাপ্ত হয়ে গৌড়ের নৈমিষ, গৌড়ীয়-গেরব কাননে এসেছিলেন গৌড়ীয়ের ব্যাস নারায়ণীনন্দন ঠাকুর বৃন্দাবন-যার কাছে সমগ্র বিশ্ব চিরঋণী। গৌড়ীয়-গৌরবােম-ঠাকুর নরােত্তম গৌড়ীয়-গৌরব-পূর্ণচন্দ্রগণের যা’র কথাই বলতে যাওয়া যায়, তাদের কথা বলতে গেলেই মনে হয়, মক্ষিকা যেরূপ মুখে মেরু ধারণ করূতে পারে না, তজপ এ ক্ষুদ্র অযােগ্য জীব তাঁদের অগণিত গৌরবের কথা লেশমাত্র ও স্পর্শ করূতে পারূছে না। প্রাক্তন-পরিচয়ে রাজা কৃষ্ণানন্দের একমাত্র পুত্র ছিলেন -নরােত্তম। রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য, আভিজাত্য, পাণ্ডিত্য, শ্ৰী- যা জগতের কাম্য, সেই সকল কাম্য-বস্তু, এমন কি, সার্বভৌম-পদ, রসাধিপত্য, পঞ্চবিধা মুক্তি গৌড়ীয়- গৌরবগণের সেবা-লৌল্যের নিকট কিরূপ তিরস্কৃত, তার আদর্শ দেখিয়েছেন—ঠাকুর নরােত্তম। গৌড়ীয়-গৌরব- বিশ্ব-চক্রবর্ত্তী বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর সেই ঠাকুর নরােত্তমের শ্রীচরণ আরতি করে গেয়েছেন, “মুৰ্তৈব ভক্তিঃ কিময়ং কিমেষ বৈরাগ্যসারন্তনুমান্ন লােকে। সংভাব্যতে যঃ কৃতিভিঃ সদৈব তস্মৈ নমঃ শ্ৰীল নরােত্তমায়” এই মনুষ্যলােকে যা’কে নিরীক্ষণ করে বিচক্ষণগণ সৰ্ব্বদা তর্ক করে থাকেন,—এ পুরুষ কি মূর্তিমতী ভক্তি? অথবা বৈরাগ্যের সার ? সেই শ্ৰীল নরােত্তম প্রভুকে আমি প্রণাম করি।
৫৫ গৌড়ীয়-গৌরব গৌড়ীয়-গৌরব-বিশ্ব-চক্রবর্তী বিশ্বনাথ ব্রজবাসী গােম্বামিগণের অপ্রকটের পর যে শুদ্ধভক্তি, সুরধুনী শ্রীনিবাস আচার্য্য, ঠাকুর নরােত্তম ও শ্যামানন্দ প্রভুকে আশ্রয় করে প্রবাহিত ছিল, সেই ভক্তিধারা ঠাকুর নরােত্তমের চতুর্থ অধস্তন-সুত্রে বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুরই সংরক্ষণ করেছিলেন। আমাদের এই ঠাকুরটী গৌড়ীয়- বৈষ্ণব-ধৰ্ম্মের মধ্যকালীন সংরক্ষক ও আচাৰ্য। তার “কিরণ-বিন্দু-কণা, এ তিন নিয়েই বৈষ্ণব-পণ”। চক্রবর্ত্তী ঠাকুর ভক্তির পথ প্রদর্শন করে অনাথ বিশ্বকে সনাথ করেছেন। তাই তার নাম-বিশ্বনাথ। আর ভক্ত-চক্রের মধ্যে প্রােজ্জ্বল-জ্যোতিষ্করূপে বিরাজিত ছিলেন বলে তার নাম—চক্রবর্তী। রসিকেন্দ্রমৌলি-চক্ৰবৰ্ত্তিপদ বিপুল গৌড়ীয় সংস্কৃত সাহিত্যের রসচক্র রচনা করবার পরও একটী কার্যের দ্বারা গৌড়ীয় গৌরবের বিজয়স্তম্ভ বিশ্ব-বৈষ্ণব-সমাজে চির- প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জয়পুরের গতাগিরিতে রামানুজ- ( কাহারও মতে রামানন্দী সম্প্রদায়ের তদানীন্তন অাচাৰ্য- গণ “গৌড়ীয়-বৈষ্ণবের কোন বেদান্তের ভাষ্য নাই, সুতরাং যে ধৰ্ম্ম বেদান্তের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়, তাকে সনাতন ও সাত সাম্প্রদায়িক-ধৰ্ম্ম বলা যেতে পারে না বলে যখন এক বিতণ্ডা উত্থাপিত করেছিলেন, তখন জয়পুর-রাজ সবাই- জয়সিংহ-বিতায় ১৬২৮ শকাদায় এই বিতণ্ডার মীমাংসার জন্য বৃন্দাবনের গৌড়ীয়-বৈষ্ণব-সম্প্রদায়কে আহ্বান করেন।
গৌড়ীয়-গৌরব তখন গৌড়ীয়-বৈঞ্চবগণের চক্রে চক্রবর্তিরূপে অতি বৃদ্ধ চক্রবর্তী ঠাকুর ভজনানন্দে মগ্ন থাকলেও সম্প্রদায়ের এই সেবার কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। একমাত্র গৌড়ীয়ের ধৰ্মই বেদান্তের অকৃত্রিম-ভাষ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত, শ্রীমদ্ভা- গবতই বেদান্তের অকৃত্রিম-ভাষ্য এবং গৌড়ীয়-বৈষ্ণবধর্মের প্রমাণস্বরূপ, এল জীবপাদের ষট সন্দৰ্ভাদি এবং গােম্বামি- গণের গ্রন্থ-গৌরব ঐ বেদান্ত-ভাষ্যেরই বিবৃতি—একথা জানালেও যখন প্রতিপক্ষ নিরস্ত হলেন না, তখন চক্রবর্ত্তী- পাদ তাঁর শিষ্য-প্রতিম পণ্ডিত কুল-মুকুট মহামহােপাধ্যায় শ্রীপাদ বলদেব বিদ্যাভূষণ প্রভুকে জয়পুরের বিচার-সভায় পাঠালেন। আচার্যবংশধরভিমানিগণ তখন আপনাদের ব্ৰহ্মমাধ্ব-গৌড়ীয়-সম্প্রদায়-গৌরব ভুলে গিয়ে সাধারণ বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। গৌড়ীয়-গৌরব-বিভূষণ বিদ্যাভূষণ বলদেব বলদেব বিদ্যাভূষণ রসিকানন্দ মুরারী প্রভুর চতুর্থ অধস্তন এবং প্রাক্তন পরিচয়ে খণ্ডাইৎ বৈশ্যকুলে আবিষ্কৃত হলেও চক্রবর্ত্তী ঠাকুরের আদেশে আচার্যের কাৰ্য্য করে- ছিলেন। তিনি বিচারে প্রতিপক্ষীয়গণকে পরাস্ত করে শাস্ত্রোক্ত সাত্বত-সম্প্রদায়-চতুষ্টয়ের অন্যতম মাধ্ব-সম্প্রদায়ের 'আনুগত্যের পরিচয় প্রদান এবং শ্রীগােবিন্দদেবের আদেশে অতি অল্প সময়ে বেদান্তের সর্বদেশীয় তাৎপৰ্য বিবৃত করে অচিন্ত্যভেদাভেদ-সিদ্ধান্তমূলক গােবিন্দভাষ্য রচনা কবুলেন।
গৌড়ীয়-গৌরব এইদিন গৌড়ীয়-বিশ্বের একটী যুগান্তরের দিন, এইদিন গােবিলৈকান্তির হস্তস্থিত গৌড়ীয়-বিজয়-বৈজয়ন্তী-গােবিন্দের কৃপানুকূল মলয়ানিলে উড্ডীন হয়ে জয়পুরের গলতা-গিরির শিখর দেশ হতে বিশ্বে জয় ঘােষণা করূল। বলদেব- গৌড়ীয়ের বেদান্তাচাৰ্য্য। চারুজন সাত্বত-বেদান্তাচার্যই বিড়ীয়; কিন্তু একমাত্র আমাদের বেদান্তাচাৰ্যই গৌড়ীয়, —ইহা সমগ্ৰ গৌড়ীয়ের কত বড় গৌরবের কথা । গৌড়ীয়ের অন্ধকার যুগ বেদান্তাচাৰ্য বলদেব বিদ্যাভূষণ শ্রুতি, স্মৃতি ও ন্যায়- প্রস্থানত্রয় রচনা করে গৌড়ীয়-গগনকে গৌরবের মাধ্যাহ্নিক ভাস্কর-প্রভায় সমুজ্জ্বল করুবার কিছুকাল পর হতেই আবার ধীরে ধীরে যখন গৌড়ীয়-গৌরব-ভাস্কর-প্রভা অস্তাচলের অভিসারে চললেন, তখন গৌড়ীয়-গগন ঘন-ঘটায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। কেবল মাঝে মাঝে চপলার চকিত চমকের ন্যায় কচিৎ দুই একটা ভজনানন্দী মহানুভব গৌড়ীয়-গগনের নীরবপ্রান্তে আপনাদের সেবা-সৌদামিনীর চমক প্রকাশ করে দুই একটা লক্ষহারা পথিকের সহায়ক হতেন। বলদেবের অধস্তন-সূত্রে গৌড়ীয়-গৌরব-সার্বভৌম শ্রীল জগন্নাথ দাস মহারাজ, গৌড়ীয়-গৌরব-চূড়ামণি পরমহংস শ্ৰীল গৌরকিশাের প্রভৃতি ভজনানন্দী বৈষ্ণব-সম্রাট তাদের আচারময় জীবন-ভাগবতের পত্রগুলিকে হীরকের অক্ষরে গৌড়ীয়-গৌরবে অঙ্কিত করে গেলেন।
৩ গৌড়ীয়-গৌরব গৌড়ীয়-বিনােদ-ঠাকুর ভক্তিবিনােদ গৌড়ীয়-গগন যখন ভীষণ তমসাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল, মায়া- বাদ-কুঙ্খটিকা, পাশ্চাত্য-শিক্ষা-দীক্ষার অনুকরণে সাময়িক বহিৰ্ম্ম খ-রুচির অনুকূল করে-গড়া এক বিকৃত নবীন ব্রহ্মবাদ, দেহৈকসৰ্বস্ববাদ, আত্মম্ভরিতাবাদ, চিজ্জড়সমন্বয়বাদ যখন প্রাকৃত-সহজিয়াবাদের হেয়তা দর্শন করে প্রকৃত গৌড়ীয়ের গৌরবের প্রতিও শ্রদ্ধাহীন হয়ে পড়ল,—গৌড়ীয় তখন গৌরবের পাত্র হওয়া দূরে থাকুক, যখন শিক্ষিত ও সভা সমাজের নাসিকা-কুঞ্চনের পাত্র হয়ে পড়ল—গৌড়ীয়ের গৌরবের ঠাকুর গৌরসুন্দরের বিশ্বজনীন বিমল প্রেমধর্মের কথা—নিজের দেশের গৌরবের কথা—নিজের জন্মগত অধিকারের কথা—নিজের পিতার কথা ভুলে গৌড়দেশ- বাসী যখন পরদেশ হতে আমদানী বিলাসিধৰ্ম্মের কুহকে বা “মাকড় মারূলে ধােকড় হয়” প্রভৃতি নীতিনিৰ্দিষ্ট দেহৈক- সৰ্বস্ববাদের অপস্বার্থপর ধামাচাপা দেওয়া-মতের মােহে নির্জীব হয়ে পড়েছিল, তখন গৌড়পুরন্দরের অমন্দোদয়- দয়ার অবতার ঠাকুর ভক্তিবিনােদ গৌড়ীয়-গগনের অন্ধকার বিদূরিত করে গৌড়-গগনে প্রকাশিত হলেন। ভক্তি বা হলাদিনীর বিনােদ অর্থাৎ আনন্দ বৰ্দ্ধন হয় যে ভগবৎকৃপা- শক্তি হতে, সেই কৃপাশক্তি আজ বিশ্বে গৌড়ীয়-গৌরবের * জগতের পিতা কৃষ্ণ যে না ভজে বাপ। পিতৃদ্রোহী পাতকীর জন্মে জন্মে তাপ।
বহু লুপ্ত গৌড়ীয়- গৌড়ীয়-গৌরব বাণী ঘোষণা করলেন। তার কৃপায় গৌড়ীয়ের লুপ্ত-গৌরব সমূহ আবার লােক-লোচনের সম্মুখে আবিষ্কৃত হলো। তিনি তার প্রভুর গৌড়ীয়-গৌরব-সার্বভৌম শ্রীল জগন্নাথের নির্দেশে মহাপ্রভুর লুপ্ত আবির্ভাব-স্থলী শ্ৰীযােগ- পীঠের আবিষ্কার করলেন, গৌড়ীয়-গৌরব নবদ্বীপমণ্ডলের বিভিন্ন স্থান পুনরায় আবিষ্কৃত হলো। গৌরব-গাথার গ্রন্থরাজি প্রকাশিত করলেন—গৌড়দেশে নামহট্ট প্রকাশিত হলাে—লৌল্যমূল্যে সেই নামচিন্তামণি বিকি-কিনি হতে থাকলাে। গৌড়ীয়-গৌরবাচার-সমূহ যুগপৎ অচার প্রচারপ্রাণতার সঙ্গে আবার প্রচলিত হলাে। ভক্তিবিনােদ প্রভু বিশ্ববৈষ্ণবসভা হ’তে বিশ্ববাণী ঘােষণা করূলেন, “হে ভ্রাতৃগণ, মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের বিবরণ, উপদেশ ও শাস্ত্র-সিদ্ধান্ত বিশেষ যত্ন সহকারে স্বাধীন বিচারের সহিত নিরপেক্ষভাবে আলােচনা করিলে তাহাকে ‘সৰ্বাচাৰ্য্য বলিয়া স্বীকার করিতে বাধ্য হইবে—যতপ্রকার সাম্প্রদায়িক গুরুর বিষয় লিখিত আছে, সকলেই তাহার অধীন, এরূপ দৃষ্ট হইবে। শ্ৰমচ্চৈতন্যদেব সৰ্ব্বজীবের ‘চৈত্ত্যগুরু’ হইয়াও পূর্ণভাবে আবির্ভূত হইয়াছেন, অতএব জীবসকল সমস্ত বন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া শ্রীচৈতন্যদেবের স্বাধীনতারূপ পাদপদ্মমধু পান করিতে থাকুন।
গৌড়ীয়-গৌরব প্রকৃত স্বাধীনতা, স্বরাজ ও অসহযােগনীতি ভক্তিবিনােদ প্রভু যখন নাম-টু স্থাপন করে প্রকৃত স্বাধীনতা ও স্বরাজের বার্তা বিশ্বের দুয়ারে ঘােষণা করলেন, —যখন “অসৎসঙ্গ ত্যাগ-এই বৈষ্ণব আচার”-এই গৌর- বাণী প্রচার করুলেন, তখন ও অসহযােগ-নীতি প্রচারিত হয় নাই, তখনও স্বরাজের কথা বাংলায় আলোচনা হয় নাই। ভক্তিবিনােদ ঠাকুর জানালেন, যদি বাংলাকে বিশ্বের দ্বারে নিত্য উদঘাটিত রাখতে চাও, তাহলে বাংলার গৌরব, গৌড়ীয়ের গৌরব গৌড়ীয়দর্শন, গৌড়ীয়- সাহিত্য ও গৌড়ীয়-গৌরবের নায়ক গৌরসুন্দরের বার্তার বিজয়-বৈজয়ন্তী বিশ্বের দ্বারে দ্বারে সংরাপিত কর। গৌর সুন্দরের স্বাধীনতারূপ পাদপদ্মমধু পান করে নিত্য স্বরাজ লাভ কর, অগৌড়ীয় ধারণা—আমাদের জন্মগত অধিকারের বাধক যাহা, তার সঙ্গে অসহযােগ-নীতি অবলম্বন কর ; তাই ভক্তিবিনােদ ঠাকুর আবার স্বদেশ বাসিগণকে আহ্বান করে বল্লেন,- চৈতন্যের ধর্মের সার্বজনীনতা *ভারতবর্ষের কতিপয় মানবকেই উদ্ধার করিবার জন্য যে মহাপ্রভুর অবতার, এমন নয় ; কিন্তু জগতের সর্বপ্রদেশে নিত্যধর্ম প্রচার করিয়া জীবসকলকে উদ্ধার করাই তঁাহার প্রয়ােজন ছিল। তিনি শ্রীমুখে নিম্নলিখিত কথাটা বলিয়াছেন, গৌড়ীয়-গৌরব “পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম। সর্বত্র প্রচার হইবে মাের নাম।” এই অবিতর্ক আজ্ঞা যে সত্বরই কার্যে পরিণত হইবে, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। জগতে যত প্রকার ধর্ম আছে, সে সমস্তই পরিপক্কাবস্থায় এক নামসংকীৰ্ত্তন-ধৰ্ম্ম হইয়া পড়িবে, ইহা নিশ্চয় সত্য বলিয়া বােধ হয়।” প্রকৃত বিশ্বপ্রেমিক কিমপে হইবে ? আহা! যেদিন ইংলণ্ডে, ফ্রান্সে, রুশিয়ায়, প্রশিয়ায় ও আমেরিকায় তত্তদ্দেশস্থ ভাগ্যবস্ত পুরুষসকল নিশান-ডঙ্কা-খােল-করতালদি লইয়া মুহুর্মুহুঃ নিজ নিজ নগরে শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভুর নাম উল্লেখ পূর্বক হরিনাম- কীৰ্ত্তনের তরঙ্গ উঠাইবেন, সে দিন কবে হইবে! আহা যে দীন বিলাতীয় শ্বেতবর্ণ পুরুষ-সকল একদিক হইতে ‘জয় শ্রীশচীনন্দনকি জয়’–এইরূপ ধ্বনি করত প্রসারিত হইয়া অপরদিকে অম্মদেশীয় ভক্তবৃন্দের সহিত আলিঙ্গন পূৰ্ব্বক ভ্ৰাতৃভাব করিবেন, সেদিন কবে হইবে ! যেদিন তাহারা বলিবেন,হে আৰ্য-ভ্রাতৃগণ ! আমরা প্রেম- সমুদ্র চৈতন্যদেবের চরণাশ্রয় করিয়াছি, এখন তােমরা দয়া করিয়া আমাদিগকে আলিঙ্গন দাও, সেদিন কবে হইবে! যেদিন পবিত্র চিন্ময় বৈষ্ণব-প্রেমই সৰ্বজীবের একমাত্র ধর্ম হইবে, ও সমুদ্রে নদীগণের ন্যায় সমস্ত ক্ষুদ্র
গৌড়ীয়-গৌরব
ক্ষুদ্ৰ ধৰ্ম্ম অনন্ত বৈষ্ণবধর্মে আসিয়া মিলিত হবে, সেদিন
কবে হইবে।”
স্বদেশহিতৈষিগণের কর্তব্য
“হে স্বদেশহিতৈষি মহাত্মগণ আপনারা সমবেত
হইয়া আপনাদের পূর্বপুরুষদিগের নির্দোষ ব্যবস্থা সকলকে
নির্মাণ করত প্রচলিত করুন। আর বিদেশীয় লােকের
অন্যায় পরামর্শক্রমে স্বদেশের সবিধি লোপ করিতে যত্নবান্
হইবেন না। যাহারা ব্রহ্মা, মনু, দক্ষ, মবীচি, পরাশর,
ব্যাস, জনক, ভীষ্ম, ভরদ্বাজ প্রভৃতি মহানুভবগণের কীত্তি-
সন্ততি-স্বরূপ এই ভারতভূমিতে বর্তমান আছেন, তাঁহার।
কি নবীন জাতিনিচয়ের নিকট সাংসারিক ব্যবস্থা শিক্ষ।
করিবেন? অহহ! লজ্জা রাখিবার আর স্থান দেখি না! বর্ণা-
শ্রম-ব্যবস্থা নির্দোষরূপে পুনঃ প্রচলিত হইলে ভারতের সকল
প্রকার উন্নতিই হইতে পারিবে, ইহা আমার বলাই বাহুল্য।”
যুগপৎ আচার-প্রচারেই জীবে দয়া
ঠাকুর ভক্তিবিনোেদ বা তার গৌরসুন্দরের বাণীর
আদর্শ শুধু বক্তৃতা-মঞ্চে হাত পা ছুড়ে গিয়ে গৃহে ক্লান্ত
হ'য়ে ইতর কাৰ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়া নয়, মুখে এক প্রকার
কাজে আর একপ্রকার, তা নয় ; প্রচারে ও আচারে
দু’রকম হওয়া নয়, ভক্তিবিনােদ ঠাকুরের আদর্শ ছিল—
আচার ও প্রচার যুগপৎ হবে। প্রচারমুখে আচার
গৌড়ীয়-গৌরব
আমাদের সমগ্র চরিত্রকে
চেতনময়,-অমৃতময় করে
তুলবে। তাই ঠাকুর ভক্তিবিনােদ নিজে আচরণ করে
উপদেশ দিয়েছেন ;-
“আচার বা প্রচার-কার্যে নিযুক্ত হইতে গেলে প্রথমে
সাধুদিগের ধর্ম শিক্ষা করা আবশ্যক। শিক্ষা করত কেহ
কেহ স্বয়ং আচার করিবার পূর্বেই প্রচার-কাৰ্য করিতে
থাকেন, তাহাতে যথেষ্ট ফল হয় না। স্বয়ং আচরণ না
করিয়া ধৰ্ম্ম প্রচার করিলে জগতে নানাবিধ উৎপাত উপস্থিত
হয়। ইতিহাসে এবং নরগণের দৈনন্দিন-চরিত্রে ইহার
ভূরি ভূরি উদাহরণ দেখা যাইতেছে।
প্রচার
করিতে হইলে অগ্রে স্বয়ং আচার করা আবশ্যক।
রুচিক্রমে যে সকল ভক্ত সাধুদিগের ধর্ম আচরণ করিতে
করিতে ভজনাননে নগ্ন হইয়া প্রচার-কা অনাদর করেন,
তাঁহাদিগের অপেক্ষা প্রচারকর্তা জগতের অধিক উপকার
সাধন করেন।
যথার্থ পরােপকারের প্রণালী
কি করে বিশ্বের দ্বারে দ্বারে সেবাশ্রম খুলতে হবে-
ভীষণ দুর্ভিক্ষের দুর্দিনে কিরূপ অলসত্র স্থাপন করতে
হবে কিরূপ করে পরোপকারের প্রচার করতে হবে,
তা’র আদর্শ ঠাকুর ভক্তিবিনােদের বিশ্ব-বৈষ্ণব-ভারতী
ঘােষণা করে বলছেন,
বারে বারে এইরূপ শিক্ষা দিতে দিতে যদি একটা জীব ও
গৌড়ীয়-গৌরব
এক বৎসরে উদ্ধার হইয়া কৃষ্ণভজন করে, তবে বৈষ্ণব
নিজ-কার্যে বিশেষ সুখ লাভ করেন। জীবের ভাগ্যোদয়
হইলে কৃষ্ণোন্মুখী প্রবৃত্তির উদয় হয় না। তৎকাৰ্য্যে
জীবকে সাহায্য করাই বৈষ্ণবের হৃদগত জীবে দয়ার
একমাত্র পরিচয়। জীবকে কৃষ্ণোন্মুখ করাই বৈষ্ণবের
প্রধান কাৰ্য। যে স্থলে স্থূল শরীরের রােগ-নিবৃত্তি বা
ক্ষুন্নিবৃত্তি করাই প্রধান উদ্দেশ্য হয়, সে স্থলে বৈষ্ণবতা
নাই। * সর্বোচ্চ বৈষ্ণবদিগের হৃদয়ে জীবে দয়া অত্যন্ত
প্রবল। তিনি বলেন,
“জীবের পাপ লঞ মুঞি করি নরকভােগ।
সকল জীবের প্রভু ঘুচাও ভবােেগ।”
দেশকালপাত্রকে বিষ্ণুসেবায় প্রয়ােগ
ঠাকুর ভক্তিবিনােদ বৰ্তমান বিজ্ঞানের যুগে সমস্ত দেশ,
কাল, পাত্রকে বিষ্ণুর সেবায়—হেমের সেবায় নিযুক্ত
করূবার আদর্শ দেখালেন। বর্তমান যুগের বিজ্ঞান তার
নব নব উদ্ভাবন-শক্তি নিয়ে কেবল জন্ম ও ভঙ্গের সেবার
দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তাই বিজ্ঞানের চরম উন্নতির
পরিণাম-স্বরূপ সেদিনকার মহাসমরানল প্রজ্বলিত হয়ে
উঠেছিল। ঠাকুর ভক্তিবিনােদ জানালেন,-“সকল দেশ,
কাল, পাত্রকে েেমর সেবায় নিযুক্ত কর, তাহলে তােমরা
চির-রক্ষিত হতে পারবে—অমৃত হতে পারবে। বাপীয়-
শফট, বৈদ্যুতিক-বান, খ-বিমান-বিজ্ঞানের যত কিছু
৬৪ গৌড়ীয়-গৌরব শিল্পের যত কিছু সব ভগবদ্ভক্তি প্রচারে নিযুক্ত কর। সেকেলেপন্থিগণ মনে করেন, মহাপ্রভু যখন বাষ্পীয়-শকটে বৃন্দাবন যান নি, ইংরাজী ভাষায় ভক্তি প্রচার করেন নি, মহাপ্রভুর ভক্তগণ যখন গ্রন্থ ছাপেন নি, তখন সময় নষ্ট করে ছ'মাস ধরে হেঁটে হেঁটে হাঁটা-পথে বৃন্দাবন যাওয়া, স্লেচ্ছ ভাষায় প্রচার না করা, প্রেসে গ্রন্থ না ছেপে তালপাতায় গ্রন্থ লিখে রেখে-দেওয়ার নামই—মহাপ্রভুর ধর্মের যথার্থ অনুসরণ ! ঠাকুর ভক্তিবিনােদ মানুষের এই সকল সেবা-জড়তার ধারণা ভেঙ্গে দিয়ে সমস্ত দেশ, কাল, পাত্রকে গৌরসুন্দরের সেবায় নিয়ােজিত কবার আদর্শ দেখালেন। ঠাকুর ভক্তিবিনােদের চরিত্ৰ সৰ্বতো- মুখী স্বতঃসিদ্ধ সেবা-প্রতিভাময় ছিল, তাই এই বিজ্ঞানের যুগে তার কৃপায় গৌড়ীয়ের লুপ্ত গৌরব পুনঃ বৈষ্ণব- বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে প্রকাশিত হয়ে উঠল। বিশ্ব-বৈষ্ণব-রাজসভার বর্তমান পাত্ররাজের বিশ্বোপকারের দিদর্শন ভক্তিভাগীরথীর ভগীরথ বৰ্ত্তমান যুগের শুদ্ধভক্তি- প্রচারের মূল পুরুষ ঠাকুর ভক্তিবিনােদের পদাঙ্ক অনু সরণ করেই গৌড়ীয়মঠ সমগ্র বিশ্বে গৌড়ীয়-গৌরব-ভারতী বিতরণ করূছেন। আজ সমগ্র সভ্য-জগৎ স্পন্দিত-নন্দিত হয়ে উঠেছেন—এ ঐক্যতানের মহা-আহ্বানে সাড়া দিয়ে ছেন--মহামিলনের মহামন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছেন। বিশ্ব- বৈষ্ণব-রাজসভার বর্তমান পাত্ররাজ প্রভুপাদ আজ বিশ্ব- গৌড়ীয়-গৌরব মানবের নিকট গৌড়পুরের মহা-মন্দির হতে গৌড়ীয়-গৌরব- বৈজয়ন্তী উড্ডীন করেছেন। গৌড়পুরের সারস্বত-তীর্থে বিশ্ব-বৈষ্ণব-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। শুমন্তপঞ্চকের সরস্বতীকুঞ্জে সেদিনকার সূৰ্য্যোপরাগে আট লক্ষ লোেক— যারা গৌড়ীয়-গৌরবের কোন কথা কোনদিন শােনেন নি’, তারাও গৌড়ীয়ের গৌরবের ঠাকুরের ভুবনমঙ্গল নাম-রূপ-গুণ-লীলা শুনে চমৎকৃত হয়েছেন-“গৌড়ীয়” হয়েছেন। আবার গৌড়ীয়-গৌরবের ঠাকুর কৃষ্ণানুসন্ধান লীলা আবিষ্কার করূতে করূতে পাগল-পার হয়ে যে যে পথ-প্রান্তে পদ-পল্লব স্থাপন করেছিলেন, সেই সকল স্থানে —সেই সকল মহাতীর্থে শ্রীচৈতন্য-চরণ-চিহ্ন স্থাপিত হচ্ছে। বিশ্ব-মানব-ইতরকাৰ্যে উদভ্রান্ত-পান্থ, পথে যেতে যেতে যখন সেই অপ্রাকৃত পাদ-পল্লব দর্শন করূবেন, শিলালিপি- মধ্যে শ্রীচৈতষ্ণের লীলাগাথা পাঠ করূবেন, তখন সেই স্বদেশহারা পথিকেরও অকস্মাৎ ধ্রুবতারার সন্ধান লাভ হয়ে যাবে—সংসার-মরুর শুষ্কতা ও কুহক বুঝতে পেরে গৌড়ীয়- গৌরবে গৌরবান্বিত হ’বার পিপাসা জেগে উঠবে। উপসংহার গৌড়ীয়ের গৌরব এক বৈষ্ণব-কবি গেয়েছেন, “তােমার গরবে রূপসী তোমার রূপে।” যে গৌড়ীয়-গৌরব-বরের গৌরব-গাথা হতে গৌড়ীয় গরবিণী হাম, গৌড়ীয়-গৌরব আজ গৌরবান্বিত, যে গৌর-গাথ। আজ গৌড়ীয়-বিশ্বে গৌড়ীয়ের গৌরব ঘােষণা কচ্ছেন, যা’র কৃপা-গৌরবে রাধিকা-মাধবের সেবার আশাবন্ধ পর্যন্ত আমাদের সৌভাগ্যে লাভ হতে পারে, সেই রূপানুগবর গৌড়ীয়-গৌরব-দাতা শ্রীগুরুদেবের শ্রীচরণ বন্দনা করে উপসংহার করছি। সভাপতি স্যার যুক্ত ডাঃ দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী মহােদয়ের অভিভাষণ অপূর্ব পাণ্ডিত্যপূর্ণ যে বাগ্মিতা-স্রোতে নিমজ্জিত হয়েছিলাম, তার পর সভাপতির অভিভাষণের কোন স্থানই হতে পারে না। আজ গােড়ীয় আজ গােড়ীয় মঠের দ্বারা গৌড়ীয়- সাহিত্য-দর্শনের দ্বার উদঘাটিত হােলো। আজকাল চতুর্দিকে বিশ্বসাহিত্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা শুনতে পাই, কিন্তু এ জাতি যদি আবার জন্মে—আবার নবজীবন পায়, তাহলে বিশ্ব-বৈষ্ণব-সাহিত্য ও বৈষ্ণব-বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করূতে পাবে। ভারতের স্থানে স্থানে যে লুপ্ত রত্ন রয়েছে, তার উদ্ধার সম্বন্ধে ভারতের লােক অনেকটা পরাজুখ। আমাদের ভাণ্ডার উন্মুক্ত করূবে বিদেশের লােক—এটা বড়ই আশ্চর্যের কথা। বিদেশে নাম-প্রচারের আয়ােজনের সূচনার কথা -যাহা গৌড়ীয় মঠের বক্তা বলেন, তা আরও বিপুলভাবে হওয়া আবশ্যক। ভক্তিবিনােদ ঠাকুর বর্তমান বিজ্ঞান-শিল্পের সাহায্যে দেশ- গৌড়ীয়-গৌরব কাল-পাত্রকে মহাপ্রভুর নাম-প্রচারে সেবায় নিয়ােগ ক- বার আদর্শ প্রদর্শন করেছিলেন। সেই নাম-প্রচার-কাৰ্য্য বাপীয়-পােত, এরােপ্লেন প্রভৃতির সাহায্যেও হওয়া আবশ্যক (করতালী)! গ্রীস, য়ুরােপ ও আমেরিকায় ভারতবর্ষ হতেই সভ্যতার বীজ উপ্ত হয়েছিল। যুবােপ আমেরিকায় যীশুখৃষ্টের যে বাণী ঘােষিত রয়েছে, তাও ভারতের ভাবে—ভারতের নীতিতে অনুপ্রাণিত। ভারতের নীতিতেই যীশুর শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রচার অনুপ্রাণিত হয়েছিল। সেই শিক্ষার প্রভাবেই wilcox প্রভৃতির গ্রন্থের সূচনা। শিশু যীশুকে নিয়ে তার মাতা-পিতা পলায়ন করূবার পরে তাদের গুপ্তবাস যে স্থানে হয়েছিল, সে স্থান হতে যীশু ভারতবর্ষের ধর্ম-নীতিতে নিশ্চয়ই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। আপনারা যদি একটুকু মনােনিবেশ করে যীশুর শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রচার অনুধাবন করেন, তাহলে দেখতে পাবেন, ভারতের ধর্মশিক্ষার প্রভাব মহাত্মা যীশুর উপর বিস্তারিত হয়েছে। বাইবেলের উপর ভারতবর্ষীয় সুপ্রাচীন নীতির বিশেষ ছায়াপাত রয়েছে। ভারতীয় দর্শনের নিকট ইউরােপ চিরঋণী। গৌড়ীয় মঠের অধিবেশনের সভাপতির পদ গ্রহণ করূবার জন্য আহূত হওয়ার পরে কয়েকজন পণ্ডিত আমার নিকট গিয়েছিলেন; ত’দিগকে আমি এলবাট হলের সভায় “গৌড়ীয়-গৌরব” সম্বন্ধে অভিভাষণের কথা জানিয়ে
৬৮
গৌড়ীয়-গৌরব
জিজ্ঞাসা করুলাম, “গৌড়ীয়-গৌরব’ সম্বন্ধে আপনাদের
অভিমত কি? আপনারা কা’কে ‘গৌড়ীয়-গৌরব’ মনে
করেন? তারা কেউ গদাধর, কেউ জগদীশ, কেউ কুল ক
ভট্ট, কেউ বা পরবর্তী এবং আধুনিক মনীষিগণের নাম
করলেন, কিন্তু কেউ মহাপ্রভুর নামটী করলেন না।
আমি তঁাদিগকে বল্লাম, আপনারা এত নাম করূলেন,
কিন্তু কই গৌরসুন্দরের নাম ত’ উচ্চারণ করলেন
! তঁারা বলেন, তিনি ছিলেন অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন
মহাপুরুষ, তার কথা স্বতন্ত্র।
আজকার গৌড়ীয় মঠের বক্তা যদিও মহাপ্রভুর নাম
করেছেন, সাহিত্য ও দর্শনের দিক হতে গৌরসুন্দরের
অপূৰ্ব গৌরবের কথা বলেছেন, তথাপি তা’কে ‘গৌড়ীয়
বলে গৌড়ীয় এবং গৌড়ীয়েশ্বরের ঈশ্বর বলেই স্থাপন
করেছেন। সুতরাং গৌড়ীয়-গৌরব না বলে আজকার
গৌড়ীয় মঠের অভিভাষণকে আমরা ‘গৌর-গৌরব’ অর্থাৎ
‘গৌরই—গৌরব’ এবং গৌরবই—গৌর’-এই আখ্যায়ও
অভিহিত করতে পারি।
গৌড়ীয় মঠের বক্তা অপূৰ্ব পাণ্ডিত্য ও ওজস্বিনী
ভাষার সাহায্যে গৌড়ীয়ের যে ঐশ্বৰ্য-গৌরব, মাধুৰ্য-গৌরব
এবং ঔদাৰ্য্য-গৌরব প্রদর্শন করেছেন, গৌড়ীয়ের সেই লুপ্ত
গৌরব যদি পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে এরূপ
গৌড়ীয়-গৌরব ভাবেই প্রচার এবং এ অপেক্ষা আরও অধিক প্রচারের আয়ােজন হওয়া আবশ্যক। আজ আমি আমার দক্ষিণে(গৌড়ীয়-মঠাচাৰ্য্য শ্ৰীশ্ৰীমদ্ভক্তি- সিদ্ধান্ত সরস্বতী গােস্বামী ঠাকুর) এবং বামে (মহারাজ স্যার শ্ৰীযুক্ত মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী বাহাদুর ) যে দু’জনকে পেয়ে ধন্য হয়েছি, তাদের দ্বারাই গৌড়ীয়-গৌরব বিশেষভাবে প্রসারিত হচ্ছে ও হবে। ভক্তিবিনােদ ঠাকুর লুপ্ত-বৈষ্ণব- গ্রন্থের উদ্ধার করেছেন, আরও অনেক বৈষ্ণব-গ্রন্থ লুপ্ত আছে, সরস্বতী ঠাকুর এবং মহারাজের দ্বারা উহাদেরও উদ্ধার হওয়া আবশ্যক। যে ভিত্তির যে ভিত্তির উপর গৌড়ীয়- গৌরব স্থাপিত, সেই গৌড়ীয়-গৌরব-গ্রন্থাবলীর একটা সুলভ সংস্করণের প্রচার হওয়া আবশ্যক। গৌড়ীয় মঠ হ’তে অনেক বৈষ্ণবগ্রন্থ প্রচারিত হচ্ছে, গৌড়ীয় মঠ যদি সমস্ত গৌড়ীয়-গ্রন্থাবলীর একটী সুলভ সংস্করণ প্রকাশ করেন, তাহলে অনেকেই সেই গ্রন্থ সংগ্রহ করতে পারেন। ভক্তিবিনেদ ঠাকুর স্থান-কাল-পাত্রভেদে বৈষ্ণব- জগতের যা’ করে গিয়েছেন, বৈষ্ণব জগতে আজও তার উপলব্ধি হয় নাই। ভক্তিবিনােদ ঠাকুর যুগ-ধৰ্ম্মই জাগিয়ে দিয়েছেন, তিনি এ সম্বন্ধে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে যে ব্যবস্থা করেছেন, তা যথেষ্ট। এইরূপভাবে পুরাতন বৈষ্ণবধর্মকে নবীনতায় পুনরুদ্দীপ্ত করে না দিলে সাধারণ লোেক এর গৌরব উপলব্ধি করতে পারে না। আমি গৌড়ীয়- গােড়ায়-গোরব মঠের আচাৰ্যদেবের আদেশে এই বৈষ্ণব-সভায় উপস্থিত হয়েছি বটে, কিন্তু আমি এ বৈষ্ণব-সভার সভাপতির পদ গ্রহণে সম্পূর্ণ অযােগ্য। কেবল নামে ‘সৰ্বাধিকারী হলে কি হয় ? কিন্তু এ কাৰ্যে অনধিকারী। আমি আপনাদের আহ্বানে এই বৈষ্ণব-সভায় উপস্থিত হয়ে আজ আমাকে বিশেষ গৌরবান্বিত এবং আপনাদের নিকট কৃতজ্ঞ মনে কছি। মহাপ্রভুর মাহাত্ম সব দিক দিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। যারা বলেন, চৈতন্যদেব ভক্তির দোহাই দিয়েই তার ভক্তগণকে পেয়েছিলেন, তারা কি একবারও ভেবে দেখেন যে, বাসুদেব সাৰ্বভৌমের মত নৈয়ায়িক, বৈদান্তিক, দার্শনিক, প্রকাশানন্দ সরস্বতীর মত জ্ঞানী পণ্ডিত সন্ন্যাসী যার চরণে আত্মবিক্রয় করেছিলেন, তার কথাগুলি ভাব- প্রবণতা নয়,ঠার মহিমা সৰ্বশ্রেষ্ঠ। বৃন্দাবনের মহিমা- প্রচার, লুপ্ত-বৃন্দাবন-উদ্ধার; বারাণসী, গয়া, নবদ্বীপ প্রভৃতি তীর্থস্থান মহাপ্রভু ও মহাপ্রভুর ভক্তগণের দ্বারা তীর্থভূত হয়েছে। গৌড়ীয় মঠের আচাৰ্য্য সরস্বতী ঠাকুরকে এবং তার শিষ্য পণ্ডিত বক্তৃমহােদয়কে ‘গৌড়ীয়-গৌরব’ সম্বন্ধে এইরূপ তৃপ্তিকর অভিভাষণ প্রদানের জন্য আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কছি। সভাপতি স্যার সৰ্বাধিকারী মহােদয়ের অভিভাষণের গৌড়ীয়-গৌরব ৭১ পর মহারাজা স্যার শ্রীযুক্ত মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দী বাহাদুর নিম্ন- লিখিত সংক্ষিপ্ত অভিভাষণটী প্রদান করেন। মহারাজা স্যার মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী বাহাদুরের অভিভাষণ সভাপতি মহাশয় এবং সমবেত ভদ্রমণ্ডলি ! আজ এই সভায় এসে গৌড়ীয়-মঠের বক্তার নিকট হতে যে মধুরবর্ষী বক্তৃতা শ্রবণ করা গেল, তা অতি অপূৰ্ব্ব। সমস্ত বৈষ্ণব জগতের ইতিবৃত্ত এবং সাহিত্য, ব্যাকরণ দর্শন, ইত্যাদি ভক্তিশাস্ত্রের কিরূপ প্রচার হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্ত এমন গবেষণাপূর্ণ বাগ্মিতায় শ্রবণ করে পরম পরিতৃপ্তি লাভ করেছি। বক্তাকে হৃদয়ের সহিত ধন্যবাদ প্রদান করি, মহাপ্রভু তার দীর্ঘজীবন প্রদান করুন। তিনি যেন তার যােগ্যতম গুরুর আজ্ঞাবাহী হয়ে মহাপ্রভুর কথা এই রূপ মধুরভাবে সকল দেশে প্রচার করূতে পারেন। আমাদের দেশে যাতে মধ্যে মধ্যে এরূপভাবে বৈষ্ণবধর্মের প্রচার হয়-দেশে দেশে, গ্রামে গ্রামে যা’তে এরূপভাবে মহাপ্রভুর কথার প্রচার হয়, তার জন্য যত্ন করা উচিত। গৌড়ীয় মঠের বক্তগণ যদি এরূপভাবে স্থানে স্থানে বক্ত তা দিয়ে মহাপ্রভুর ধর্ম প্রচার করেন, তবে দেশের পরম উপকার হতে পারে এবং একাৰ্য্য তাদের দ্বারাই সুসম্পন্ন হবে। বৈষ্ণবধর্ম সম্বন্ধে আমার বেশী কিছু বন্ধুর নই।
१२
•
গৌড়ীয়-গৌরব
আপনারা আজ কার গৌড়ীয় মঠের বক্তার মুখেই জানতে
পেরেছেন যে, বৈষ্ণবধর্ম একটা স্থান-কাল-পাত্রগত সঙ্কীর্ণ
ধৰ্ম্ম নয়, ইহা সাৰ্বজনীন ধৰ্ম্ম। আমরা বলতে সাহসী হই,
বৈষ্ণবধৰ্ম্মের মত ধৰ্ম্ম পৃথিবীতে আর নাই।
দেশ-বিদেশে
যত ধৰ্ম্মের নীতি ও উপদেশ আছে, আমার মনে হয়, সে
সমস্তই এই বৈষ্ণবধর্ম হতে গৃহীত হয়েছে। (করতালি)!
বৈষ্ণব-ধৰ্ম্মে এমন একটা জিনিষ আছে, যা আর অন্য
কোন ধর্মে নাই; সে সব কথা বলতে গেলে অনেক রাত্রি
হয়ে যাবে। আজ গৌড়ীয়-বৈষ্ণবাচার্য মহােদয়ের
(শ্রীশ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গােস্বামী প্রভুপাদের) নিকট
আমরা বিশেষ কৃতজ্ঞ ; কেননা, আমরা আজ তারই অনুগ্রহে
গৌড়ীয়-বৈষ্ণব-মঠের বক্তার নিকট হতে গৌড়ীয়-সাহিত্য,
দর্শন ও ইতিবৃত্তের মধুর
মীমাংস।
শুনতে পেয়েছি।
আমরা গৌড়ীয়-বৈষ্ণবাচাৰ্য্য সরস্বতী ঠাকুরকে আমাদের
হৃদয়ের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
মিঃ বি, কে, সেন
অতঃপর মিঃ বি, কে, সেন সাধারণের পক্ষ হইতে সভা-
পতি স্যর সৰ্বাধিকারী মহােদয়কে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন
এবং বলেন,—“গৌড়ীয় মঠের আচাৰ্যপাদের কৃপায় আজ
শিক্ষিত-সম্প্রদায়ের সর্বত্র “গৌড়ীয়-গৌরব প্রচারিত
হইতেছে, বিশেষতঃ গৌড়ীয় মঠ বর্তমান যুগে আদর্শ আচার ও
প্রচারের দ্বারা যেরূপ জগতের মহােপকার সাধন করিতে
গৌড়ীয়-গৌরব
ছেন, তাহাতে সত্যানুসন্ধিৎসু ব্যক্তিমাত্রেরই তাহাদের
প্রচার-প্রণালীর প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা ও ভক্তির উদয়
হইতেছে। গৌড়ীয় মঠের প্রচারকগণের নিষ্কলঙ্ক চরিত্র,
শিষ্টাচার ও লােক-সেবা আদর্শ-স্থানীয়।
মিঃ সেন সাধারণের পক্ষ হইতে সভাপতি মহােদয় ও
গৌড়ীয় মঠের প্রচারকবৃন্দকে এইরূপ ধন্যবাদ এবং শ্রদ্ধা
জ্ঞাপন করিবার পর পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত হরিপদ বিদ্যারত্ন এম, এ,
বি, এল, মহাশয়, মহারাজ স্যার মনীন্দ্র চন্দ্র নন্দী বাগদুর
এবং সমবেত শ্রোতৃমণ্ডলীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
রায় বাহাদুর ব্যানার্জি
শ্ৰোতৃমণ্ডলীর পক্ষ হইতে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বঙ্গনাহিত্যের পরীক্ষক রায় বাহাদুর শ্রীযুক্ত গােবিন্দ
ব্যানার্জী মহাশয় সভা-মধ্যে দণ্ডায়মান হইয়া বলেন,
“আমি শ্রোতৃমণ্ডলীর পক্ষ হইতে আমার প্রাণের আবেগ ও
আন্তরিকতার সহিত গৌড়ীয় মঠের বক্তা শ্ৰীযুক্ত সুন্দরানন্দ
বিদ্যাবিনােদ মহাশয়কে ধন্যবাদ না দিয়ে থাকতে পারছি
না; আমি সভাপতি মহাশয়কেও ধন্য বাদ দিচ্ছি।
আমার ভাষা নেই, যাতে সম্যগভাবে গৌড়ীয় মঠের
বক্তার অপূর্ব পাণ্ডিত্য ও বক্তৃতা-প্রণালীর মধুরতার
কথা বর্ণন করতে পারি। আমি কিছু কিছু বঙ্গীয়
সাহিত্যাদির আলােচনা করে থাকি, সমস্ত বঙ্গীয়
সাহিত্যিক সম্প্রদায়ের নিকট আমার নিবেদন, তারঃ গৌড়ীয়
৭৪
গৌড়ীয়-গৌরব
মঠের এই বক্তার সমস্ত কথাগুলি ভালরূপে অনুধাবন
করবার চেষ্টা করুন, সমাজ তাহলে সত্য সত্যই লাভবান
হতে পারবেন। আজ গৌড়ীয় মঠের এই বক্তা এমন
সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করে উদীয়মান সমাজের নিকট
গৌড়ীয়-সাহিত্য এবং দর্শনের দ্বার উদঘাটিত করেছেন যে,
সে কথা কি ভাষায় প্রকাশ করূতে হবে, তা আমি
জানি না। বক্তৃতা শুনতে শুনতে আমার মনে হলো, যে,
বঙ্গীয়-দর্শন ও সাহিত্য-জগতের সম্মুখে আজ এক অপূর্ব
আলােক উজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছে। আমি অনাহুত হয়েই
কিছু কথা বল্লাম, কারণ, out of the fulness of the
heart, the mouth speaketi.” যারা গৌড়ীয় বৈষ্ণব
অভিমান করেও আজকার সভায় উপস্থিত হতে পারেননি।
তারা আজ নিশ্চয়ই বঞ্চিত হয়েছেন। যদিও গৌড়ীয়
মঠের বক্তৃতার বিষয় আমার যােগ্যতার অনেক বাইরে,
তথাপি আমি শ্রোতৃমণ্ডলীর পক্ষ হতে বলছি, এরূপ বক্তৃত
সত্য সত্যই গৌড়ীয়ের গৌরব-বাংলার গৌরবস্বরূপ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.