Bally Sadharan Granthagar
Kolahal
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কোলাহল
বিমল কর
কলিকাতা পুস্তকালয় প্রাইভেট লিমিটেড
৩নং শ্যামাচরণ দে ষ্ট্রীট, কলিকাভ-১২
চৈত্র ১৩৪৭
প্রকাশক
মােহন চক্রবর্তী
অং সামাচরণ নেট
কলিকাতা-১২
बर
ভােলানাথ হারা
বাণী প্রেস
৩১নং বাহড় বাগান জীট
কলিকাতা
-হানায়
কল বন্ধ করুন! কলটা একটু বন্ধ করুন না। একটি পাঁচ বছরের বালিকা উপর হইতে বলিল। বার কয়েক চীৎকার করিতেই নীচে হইতে একজন গিয়া নীচেকার কলটা বন্ধ করিয়া দিল। নীচেকার কল বন্ধ না করিলে উপরের কলে ভাল ভাবে জল উঠে না। প্রত্যহ বহুবার করিয়া এমনি ধারা চীৎকার না করিলে ও পাশের ঘরের লােকেরা জল পায় না। শশধরের বৌয়ের বিরক্তি ধরিয়া গিয়াছে। বােজ বােজ এ ভাবে চীৎকার করিয়া বলিতে তাহার ভাল লাগে না। টাকা দিয়া ঘর ভাড়া করিয়া জলের জন্য এ চীৎকার করিতে করিতে তাহার যেন বিরক্তি ধরিয়াছে। শশধর দুইখানা ঘর ভাড়া করিয়া এ বাড়ীর ও পাশের অংশটি লইয়াছে। ভাড়া দিতে হয় আঠারাে টাকা মাসে। সে ম্যাকমিলানে চাকরী করে। চারি-পাঁচটি ছেলে মেয়ে লইয়া এ বাড়ীতে সম্প্রতি আসিয়াছে। ঘর দুইখানি তাহার পছন্দ হইয়াছে কিন্তু জলকষ্টের জন্য বােধ হয় তাহাদের ভাগ্যে আর বেশি দিন টিকিবে না। দক্ষিণ দিক খােলা, হু হু করিয়া বাতাস বহে সব সময়। রৌদ্র থাকে অনেকক্ষণ। আলাে বাতাসের অভাব নাই। এ কয়দিনে তাহার বাড়ীখানির উপর কেমন একটা যেন মায়া বসিয়া গিয়াছে। তাহার এক বন্ধু এ বাড়ীর ও দিকের একখানি ঘর লইয়া বাস করে। শশধরের স্ত্রী বিরক্ত হইয়া শশধরকে অন্যত্র বাসা দেখিতে জরুরী কোলাহল-১ ১ তাগাদা দিতেছে। এ ভাবে তাহাদের থাকা সম্ভব নয়। জল না থাকিলে কলিকাতায় বা যেখানেই হউক বাসা করা চলে না। সারা- ক্ষণ জল না হইলে কাহার চলে? সুতরাং এ জলকষ্ট আর সহ্য করা যায় না। বাড়ী ত্যাগ করিতেই হইবে। বিজয়রত্ন শশধরের বন্ধু। তাহারই আগ্রহে শশধরকে এখানে আসিয়া বাসা করিতে হইয়াছে। অন্য সব কিছুই ভালাে, অভাব যা কিছু তা এই জল। শীপদ বিজয়রত্নকে সমীহ করিয়া চলে এবং সেই সূত্রে শশধরের অভাব অভিযােগের প্রতি খর দৃষ্টি রাখে। কিন্তু হইলে কি হইবে, ও পাশের ভাড়াটিয়ারা অতশত বােঝে না। বিনােদবিহারী শশধরের নীচের অংশে দুইখানি ঘর লইয়া কিছুদিন হইতে বাস করিতেছে। বিনােদবিহারীর পিসিমার ছুচিবাই আছে। সব সময় সে কলতলায় বসিয়া থাকে একখানি গামছা পরিয়া প্রায় অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায়। সেদিকে কাহারও সহজে ঘেসিবার উপায় নাই। ফলে নীচের কল হইতে সব সময় জল পড়ে। কলের জল ছাড়া তাহার এক দণ্ডও চলে না। চৌবাচ্চার জল সে আদৌ ছোয় না। জিজ্ঞাসা করিলে বলে, ও জল শুদ্ধ নয়। সুতরাং তাহাকে সব সময় শুদ্ধ করিয়া রাখিতে গেলে কলের পড়ন্ত জল ছাড়া আর কিছুতেই হয় না। পিসিমা নীরদাসুন্দরী কদাকার। মােটা এবং থপথপে। ঘটিয়া ঘাটিয়া তাহার হাতে পায়ে হাজা ধরিয়া গিয়াছে। কলের ঐ অংশ দিয়া কাহারও হাঁটিবার সহজে উপায় নাই। সীমানা সরহদ্দ করিয়া রাখিয়াছে এক ধারের কোণ হইতে আর এক ধারের চৌবাচ্চার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। বিনােদবিহারীর ছেলেমেয়েরা ও ধার দিয়া ঘেঁসে না। নিরীহ মায়ের অনুগ্রহে তাহাদের কতক সান্ত্বনা মেলে। কিন্তু দুর্জয়া পিসিমার দাপটে তাহাদের সে সান্ত্বনা শূন্যে মিলাইয়া যায় ক্ষণে ক্ষণে। ননীবালা ক্ষীণকায়া। আচার-বিচারের ধার ধারে না। কেবল পিসিমার শাসনে তাহার মন বােঝার মত সায় দিয়া জল যায়। পিসিমার নির্দেশ মত চলিলেও তাহার জানিতে বাকী নাই যে চতুরা ননীবালা আধুনিক পর্যায়ের মেয়ে। কেবল তাহাকে সমীহ করিয়া চলে, কিন্তু মনে মনে অতশত ছোয়াছুয়ির ধার ধারে না। নীরদাসুন্দরী মাঝে মাঝে প্রাণপণে চেঁচায়, যাহা মুখে আসে গড় গড় করিয়া বলিয়া যায়। ননীবালা সে কথায় কান দেয় না। হাসিয়া উড়াইয়া দেয়। ইহাতেও রক্ষা নাই তাহার। পিসিমার দাপট ও চীৎকারের শেষ নাই। ক্রমাগত তাহার তুৰ্যনিনাদ চলিতেই থাকে। বিজয়রত্বের বিরক্ত ধরিলে পিসিমাকে ধমক দেয়। কিন্তু সে কতক্ষণের জন্য। সকালের ঘণ্টা-দুয়েক এবং সন্ধ্যার পর সময় টুকুর মধ্যে তাহাকে সংসারের সব কিছু আনা-নেওয়া করিতে হয়। ভিতর- বাহির করিতেই তাহার সময় যায় বেশী। পিসিমা বিজয়রত্নকেই কেবল মধ্যে মধ্যে ভয় করিয়া চলে। এই জলকষ্টের জন্য এবং বিশেষ করিয়া নীরদাসুন্দরীর অত্যাচারে শশধরের স্ত্রীর বিরক্তি ধরিয়া গিয়াছে। সে শশধরকে চব্বিশ ঘণ্টার নােটিশ দিয়া ঘর সংসারের যাবতীয় বাঁধাছাদায় মন দিয়াছে। আর না। সন্ধ্যার পর শশধর অফিস হইতে আসিয়া স্ত্রীর কাণ্ড দেখিয়া অবাক হইয়া গিয়াছে। স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিল, ইতিমধ্যে নীরদাসুন্দরীর সঙ্গে তাহার যে কলহ হইয়া গিয়াছে তাহার পর এ বাড়ীতে শত্রুর সঙ্গে বাস করা অসম্ভব। নীরদাসুন্দরী তাহাকে অকথ্য কথা বলিয়াছে। তাহাদের নিজেদের বাড়ী না হইলেও ভাড়া দিয়া বাস করিতেছে। তাহাদের জলের প্রয়ােজন না মিটাইয়া অন্যকে দেয় না এবং দিবেও না। এই বলিবার পর সে নীচে দাড়াইয়া তাহাকে শুনাইয়া শুনাইয়া যা-তা বলিয়া চলিয়াছে। কাহারও নিষেধ শুনে নাই এবং শুনিবে না তাহারও নির্দেশ প্রকাশ্যে দিয়াছে। এ হেন লােকের সংস্রবে তাহারাই বা থাকিবে কিরূপে। আত্মসম্রম বজায় রাখিতে কে না চায়। ভাড়া বাড়ীতে থাকিতে গেলে কি এই সবও সহিতে হইবে। পরদিন রবিবার। শশধর মােট পোঁটলা বাঁধিয়া রওনা হইল বিকালের দিকে। সকালে বিবেকানন্দ রােডের এক ফ্লাটে অল্প ভাড়ায় ঘরের ব্যবস্থা করিয়া লইতে তাহাকে বিশেষ বেগ পাইতে হইল না। সেদিন ইংরাজী মাসের পনেরােই তারিখ। পনেরাে দিনের নােটিশ দেওয়ার প্রথা শশীপদ করিয়াছে। শশীপদ এই বাড়ীখানি লিজ লইয়া বহু ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করিয়া ইহার বিলি ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে। এ জন্য তাহার বেশ লাভ হয়। এই রকম ব্যবসা করিয়া কলিকাতায় বহু লোেক আরামে বাস করিয়া, কর্তৃত্ব করিয়া, বাড়ীওয়ালা সাজিয়া, কিছু কিছু অর্থাগমেরও ব্যবস্থা করিয়া আসিতেছে। শশধর দুপুরের দিকে তাহার কাছে গিয়া জানাইয়া আসিয়াছে, আজ তাহারা অন্যত্র যাইতেছে, যেহেতু তাহার দ্বারা কোন প্রতিকারের ব্যবস্থা হইল না। এতবার বলিয়াও শশীপদ বিজয়রত্নের পিসিমাকে শাসন করিতে পারে নাই। ভাড়াটেরা সবই এক শ্রেণীর। সকলের সুখ সুবিধা না দেখিলে সে বাড়ীওয়ালার অখ্যাতি বাড়িবে বই কমিবে না। এই অব্যবস্থার জন্য তাহারা আজই অন্য বাসায় যাইবে এ বাসা ছাড়িয়া। পনেরাে দিনের নােটিশ দেওয়ার প্রথা আছে সেজন্য তাহারা পনেরাে দিনের ভাড়া দিতে প্রস্তুত। কিন্তু এই হতচ্ছাড়া বাড়ীতে ও রকম শত্রুর সঙ্গে থাকিতে নারাজ। শশীপদ চুপ করিয়া রইল। তাহার শ্যালক বিজয়রত্নের বন্ধু বলিয়া শশধরের কথায় তাহার লজ্জা হইল। শশীপদ বিশেষ কিছুই করিতে পারিল না যাহাতে শশধরের এ বাড়ীতে থাকার সুবিধা হয়। সুতরাং তাহার উপর চাপ দিয়া পনেরাে দিনের ভাড়া আদায় করিতে সঙ্কোচ বােধ হইল। মাথা নীচু করিয়া শশীপদ কেবল গোঁ গোঁ করিতে লাগিল। বিশেষ কিছু আর বলিতে পারিল না। 3 একখানা ঠেলাগাড়ীতে মােট-পোঁটলা উঠিয়াছে। কতকগুলি বাক্স পর পর পাশাপাশি করিয়া বসান হইয়াছে। তাহার উপর বিছানার দুইটি বড় বাণ্ডিল ও একটি ছােট বাণ্ডিল দড়ি দিয়া বাঁধিয়া তাহার উপর পড়িয়াছে। উপরে বাসনের একটি বস্তা, কাঠের ঘােট ছােট সরঞ্জাম টুল, চেয়ার, আলনা, র্যাক, মােড়া ইত্যাদি। দুইখানি চৌকী মুটের মাথায় চাপাইয়া দিয়া একখানি ঘােড়ার গাড়ীতে চডিয়া সপরিবারে শশধর রওনা হইল। যাইবার সময় কোণের দিককার ঘরের সবরাজের স্ত্রীর সহিত দেখা করিয়া তাহাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাইয়া আসিয়াছে মলিনা। অপরাজিতাকেও শশধরের স্ত্রী মলিনা খুবই ভালবাসে। অপরাজিতা বার বার বলিয়া যাইতেছিল, অন্ততঃ তাহার জন্যও যেন মাঝে মাঝে সে এ বাড়ীতে আসিয়া দেখা করে। শুধু মধ্যে মধ্যে মনের কথা বলিবার সঙ্গী সে পাইবে। সেও মধ্যে মধ্যে তাহার কাছে যাইবে। দুপুরের দিকে তাহার সময় বেশী, কাজেই যত বেশী সম্ভব সে যাইবার চেষ্টা করিবে। আর বিবেকানন্দ রােডের বাসা বেশী দূর নয় যখন, তখন যাইবার অসুবিধা কিসের? মলিনারা চলিয়া গেল। অপরাজিতা ছল ছল চোখে এক দৃষ্টে তাহাদের বিদায় যাত্রা দেখিতেছিল। মলিনার ছােট ছেলেটি বার বার অপরাজিতাকে তাহাদের সঙ্গে যাইবার জন্য তাহার কনক চাঁপা আঙ্গুল লইয়া ইশারায় ডাকিতেছিল। দুই একবার চেষ্টা করিতেছিল গাড়ী হইতে নামিয়া গিয়া অপু খুড়িমাকে ধরিয়া আনে। সে যখন তাহাদের জন্য কঁদিতেছে তখন নিশ্চয়ই অঘাের খুড়াে খুড়িমাকে যাইতে দিবেন। অঘাের খুডাের এই অন্যায় শাসন সে সহ্য করিবে না। তাহারা সকলে চলিয়া যাইতেছে যখন, তখন একা অপু খুড়িমা এই বাড়ীতে কেমন করিয়া কাটাইবে। অপু খুড়িমা তাহাকে খুবই ভালােবাসে। সেও অপু খুড়িমাকে ভালােবাসে। তাহার জন্য অপু খুড়িমা কাঁদিতেছে। এই সব ভাবিতে ভাবিতে প্রণব দিশাহারা হইয়া গেল।
একবার মাকে বলে, একবার বাবাকে বলে, একবার তাহার বড় দাদাকে এক বলে, কিন্তু অবুঝ এবং মায়ালেশহীন কেহই তাহার কথার ভাষা, ভাবের ইঙ্গিত এবং অপূর্ণ কাতর চোখের চাহনি লক্ষ্য করিল না। প্রণবের বড়ই দুঃখ হইল, সে একবার প্রাণপণ শক্তিতে মাকে জড়াইয়া ধরিয়া বুঝাইতে চেষ্টা করিল। মায়ের মনে করুণা জাগিয়া উঠিল। বলিল, অপু, তােমার জন্যে প্রণব বড় কঁদছে, তুমি মধ্যে মধ্যে যেও, তােমাকে ও বড় ভালবাসে। দেখ না তােমার কাছে যাবার জন্যে ও কেমন আকুলি ব্যাকুলি করছে। দিদি আমি কাল যাব। বাসার নম্বরটা কত ? ১৩ নং--না ? আচ্ছা নিশ্চয়ই যাব দেখবেন। বেশ। যেও। শশধরের ইঙ্গিতে কোচম্যান গাড়ী হাঁকাইয়া দিল। গাড়ী চলিতে সুরু করিয়াছে। প্রণব চলন্ত গাড়ীর ভিতরে মায়ের কোলে দাপাদাপি সুরু করিয়া দিয়াছে। তাহার বড় ভাই দীপক প্রণবকে দুই ধমক দিতেই তাহার কান্না সপ্তমে উঠিল। মায়ের কোলের ভিতর দাপাদাপি করিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। অপরাজিতার কাছে যাইবার জন্য সে ব্যাকুল হইয়া উঠিল। অপরাজিতার চোখ ছল ছল করিয়া উঠিল। নির্বাক বিস্ময়ে বালকের ব্যাকুলতা দেখিতে লাগিল। মাত্র চারি বছরের শিশু, মাস ছয়েকের মধ্যে তাহার হৃদয় এমন ভাবে জয় করিতে পারিবে তাহা সে ভাবে নাই। বাসাবাড়ীর আকর্ষণও কম নয়। এই হট্ট- মন্দিরে একদল আসে। একদল যায়। বাসা-বদলের সঙ্গে সঙ্গে আর একদল আসিয়া তাহার স্থান পূরণ করিয়া ফেলে। খালি থাকে না। অন্ততঃ বাড়ীওয়ালার চেষ্টায় তাহার ঘর খালি থাকিবার উপায় নাই। এ যেন মায়ামুকুরের স্থান। এখানেও যাহারা আসে পৃথক পৃথক স্থান হইতে, তাহাদের মধ্যেও অল্প কয়েকদিনের জন্য মায়ার বন্ধন বাধিয়া উঠে। সকলেই জানে ইহা তাহাদের বাসাবাড়ী। সুযােগ ও সুবিধা পাইলেই তাহারা অন্য বাসা ছাড়িয়া যাইতে কালবিলম্ব করে না। তবু যে কয়দিন তাহারা একত্রে পাশাপাশি ঘরে থাকে তাহারই মধ্যে মনের মিল কোথা হইতে যেন আসিয়া দেখা দেয়, তাহা কেবল স্বার্থের অজুহাতে। এবং ইহাদের মাত্রা ছাড়াইলে একদল সরিয়া পড়ে। বাসাবদলের ঘটনা অপরাজিতার পক্ষে নূতন নয়। শশধরেরও ইহা প্রথম বাসাবদল নয়। এবং তাহাদেরও ইহা প্রথম বিচ্ছেদ ব্যথা নয়। তবু তাহার মনের ভিতরটা কেমন যেন ছাৎ ছাৎ করিতে লাগিল। দীপক এবং বিশেষ করিয়া প্রণব তাহার অন্তর জয় করিয়া লইয়াছে। এই অল্প কয়েকদিনের মেলামেশায় একরত্তি বালক তাহাকে যেন আপন করিয়া তুলিয়াছে। উপরের দিকে একবার দৃষ্টি পড়িতেই অপরাজিতা দেখিল কয়েকজন উপর হইতে শশধরের সপরিবারে বাসাবদলের দৃশ্য দেখিতেছে। কিন্তু তাহারা এমন জায়গায় দাড়াইয়া দেখিতেছিল যাহাতে মলিনার বা তাহাদের কাহারও দৃষ্টি সহজে সেদিকে না পড়ে। ঘােড়ার গাড়ীর আবরণের ভিতর হইতে বিশেষ ভাবে লক্ষ্য না করিলে উপরের দিকে নজর পড়ার উপায় নাই। অপরাজিতা একদৃষ্টে তাকাইয়াছিল সেই চলন্ত এবং অন্তর্হিতপ্রায় ঘােড়ার গাড়ীর দিকে। রবিবারের দুপুরের দিকে সকলেই নিজ নিজ ঘরে বসিয়া নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করিতেছিল। একটু মদির নেশায় যেন বাড়ীখানা ঝিমাইতেছিল। শশধরের চলিয়া যাওয়ার সংবাদ প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ীখানিতে একটা অবসাদ ও বিস্ময়ের পটভূমিকার সৃষ্টি হইল। অপরাজিতা উপরে যাইতেই তাহার পাশের ঘরের এক বন্ধু বাহির হইয়া আসিয়া দরজার সামনে দাড়াইল। অপরাজিতা আরে আস্তে বলিল, মলিনাদিরা চলে গেল। যােড়শী একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া বলিল, চলে গেলেন। তারপর আর কোন কথা বলিতে পারিল না। অপরাজিতার মন ভাল নাই। তাহারাও যখন একদিন এমনি ভাবে সিমলা স্ত্রীটের বাসা-বদল করিয়া চলিয়া আসে তখনও তাহার পাশের ঘরের নববধূটি তাহার জন্য অব্যক্ত বেদনায় কঁদিতেছিল। অপরাজিতা তাহাকে অনেক করিয়া বুঝাইয়াছিল। তাহাদের এই বাসা-বদলের ঘটনা নূতন নয়। কোথাও বা আঘাত দিয়া আসিতে হয়। কোথাও বা আঘাত খাইয়া আসিতে হয়। এই যে আঘাত , দেওয়া নেওয়ার সমস্যা ইহা কেবল বাসাবাড়ীতেই ঘটে বেশী তাহা নয়। প্রতিনিয়ত নিত্যনৈমিত্যিক ঘটনার মধ্যে সাধারণত চোখে পড়ে। অপরাজিতা আর একবার লক্ষ্য করিয়া দেখিল, মলিনাদিরা কি সত্যই চলিয়া গেল। ঘােড়া দুইটি এবং কোচম্যান কি কোনমতে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিতে পারি না। কোচম্যানের আর কি! তাহারা যত শীঘ্র খেপ দিতে পারে ততই তাহাদের ভাড়া বেশী জোটে । তাহারা পর-মানুষ, ব্যবসাদার। অন্যের দরদ বুঝিবে কেন? আর দরকারই বা কি তাহাদের। দাড়াইয়া রেলিঙয়ে ভর দিয়া ভাবিতে লাগিল এই কথা। অপরাজিতা একবার মলিনাদির ঘরে গেল। ঘর দুইখানা খােলা রহিয়াছে। ঘরের জিনিসপত্র কিছুই আর নাই। কেবল কতকগুলি জিনিসের আবরণ এ ধারে ও ধারে পড়িয়া রহিয়াছে। ঘর দুইখানি যেন খা খা করিতেছে। একটা বিরাট শূন্যতা কেবল বিরাজ করিতেছে। ভিতরে ঢুকিতেই তাহার প্রাণটা যেন হু হু করিয়া উঠিল। কালকের বর এবং আজকের ঘরের মধ্যে যেন আকাশ পাতাল তফাৎ। কাল যাহা সম্পন্ন এবং একটি নারীর চারুহস্তের পরিপাটি সাজান ছিল আজ তাহার কিছুই নাই। একটা বিরাট ধ্বংসের অগােছাল ভাব নানা দিক দিয়া চোখে পড়ে। যতই অপরাজিতা দেখিতে থাকে ততই যেন তাহার মনের ভিতরটা বেদনার আঘাতে মােচড় দিয়া উঠিতে থাকে। ঘরের ভিতর ঢুকিয়া পা দিয়া ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অব্যবহার্য জিনিসগুলি ছড়াইয়া দেখিতে দেখিতে তাহার চোখে পড়িল একটি ছােট মােমের পুতুল। তাহার বাঁ হাতটি ভাঙ্গা। মাথার একাংশে দাগ বসান। তাহার মনে পড়িল এই পুতুলটি লইয়া প্রণব খেলা করিত। এই পুতুলটি আদর করিয়া সেই একদিন কিনিয়া দিয়াছিল এক ফেরিওয়ালীর কাছ হইতে। একদিন মাথার কাঁটা, সেফটিপিন এবং টেপা বােম কিনিতে একজন ফেরিওয়ালীকে সে ডা এবং যখন এইগুলি কিনিতেছিল প্রণব কোথা হইতে আসিয়া ফেরিওয়ালীর ডালা হইতে এই মােমের পুতুলটি সে হস্তগত করিয়া এবং একরূপ জোর করিয়াই সে তাহার দখল বজায় রাখিয়াছিল। তখন অগত্যা অপরাজিতাকে সেটি কিনিয়া দিতে হয়। পুতুলটি ভাঙ্গা বলিয়া হয়ত তাহারা লইয়া যায় নাই। কিংবা প্রণবের আর এখন আগ্রহ নাই সে জিনিসটির উপর। তাই পোটলার মধ্যে ইহার স্থান হয় নাই। এমনই হয়। অপরাজিতা পুতুলটিকে তুলিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিতে লাগিল। এ দিকে ও দিকে আর বিশেষ কিছুই তাহার চোখে পড়িল না। একটা অব্যবহাৰ্য্য শুপের মধ্যে এবং ছন্নছাড়া আবহাওয়ার মধ্যে তাহার দাড়াইয়া থাকিতে ভাল লাগিল না। তড়িৎবেগে সে সেখান হইতে সরিয়া গেল। বসে। শশীপদ কি একটা কাজে বাহির হইয়া গিয়াছিল। ভিতরে ঢুকিবামাত্র তাহার স্ত্রী প্রশ্ন করিল, প্রণবের মা’রা যে চলে গেল, ওরা তাে নােটিশ না দিয়েই চলে গেল। পনেরাে দিনের ভাড়া নিয়েছে তাে?
না, সেটা আর পারা গেল না।
সে কি রকম ধারা কথা হল? আইন মাফিক ত চলতে হবে।
আজ ওরা চলে গেল না বলে। কাল অন্য লােকেরাও ত হুট করে
চলে যেতে পারে। ওঠ, বললেই চলে, এ কি রকম ধারা।
এমনি একটা বেআইনের মত যা তা করে চলতে গেলে তবেই তােমার
বাড়ীভাড়া চলবে। এতে বুডাের বাড়ী ভাড়া দেবে কি করে মাসে
মাসে? আঁ? বল না গাে ?
আচ্ছা আচ্ছা, বলিয়া শশীপদ পাশ কাটাইয়া যাইবার চেষ্টা
করিতেই তাহার স্ত্রী কটাক্ষপাত করিয়া বলিল, আচ্ছা, আচ্ছা নয়।
এখন তুমি তার কাছে গিয়ে পনেরাে দিনের ভাড়া আদায় কর। না
পারলে চলবে না। এ রকম ধারা যদি কর তাহলে আমি আর এর
ভেতর নাই। যা খুশী তাই কর।
তােমাকে এর জন্যে ভাবতে হবে না। বলিয়া শশীপদ মাথা
চুলকাইতে লাগিলেন। কিন্তু তাহার স্ত্রী সহজে ছাড়িবার পাত্রী নয়।
বলিল, ওতত তােমার মুখে লেগেই আছে। কোণের ঘরের পদ্মর
মায়ের ঘরভাড়া চারমাস বাকী পড়েছিল। কি করে যে তার টাকা।
আদায় করলাম সে তাে আর জান না; বুঝবেই বা কি করে? তাছাড়া
বাইরের দোকান দুটোও বেশ বিনাভাড়ায় দু’দুটো মাস কাটাল।
তাও লােক পাঠিয়ে গালাগালি দিয়ে আদায় করেছি। সে সব খবর
ততা তুমি রাখবে না। কিসে ভাড়া আদায় হয়, কিসে দুপয়সা বেশী
আসে তার ব্যবস্থা করতে গেলে ওসব নােটিশ ফোটিশ দেওয়ার
দরকার। চল বললেই উঠব সে সব করতে দিলে চলবে কেন?
বুঝলে? যাও এখুনি গিয়ে ওটার একটা ব্যবস্থা করে এস।
আচ্ছা, বিজয়কে বলে ওটার ব্যবস্থা করছি।
বেশ তাই কর। তুমি না পার ত আমি নিজেই একটা ব্যবস্থা
করছি এর।
না, তােমাকে আর এ নিয়ে কিছু করতে হবে না।
১০
তবে তুমি ব্যবস্থা কর। তুমি পারলে আর আমার ওতে নজর
দেওয়ার দরকার কি?
কিন্তু দেখাে নীরে পিসিমার ছুচিবাই আর জল কমানাের ব্যবস্থা
না করলে ও দিকের ঘরে আর কোন ভাড়াটে থাকবে না।
আচ্ছা সে হবে। নীরাে পিসিমার রকম সকম ঐভাবের সে কথা
ত আজকের অজানা নাই। বিধবা হবার পর হতেই ওঁর ঐ রকম
ধারা ঢুকেছে। সে তুমি যতই বল না কেন ওর আর পরিবর্তন নাই।
যারা আসবে তাদিকে রয়ে সয়েই নিতে হবে। বলিয়া উষাঙ্গিনী
গজ গজ করিতে করিতে নিজের কাজে চলিয়া গেল।
শশীপদ একদৃষ্টে তাহার গতিভঙ্গি দেখিতে লাগিল। রু এবং
উর্বর টাকে হাত বুলাইতে বুলাইতে তাহার মনে কেবলই তাহার
পিসশাশুড়ি নীরদাসুন্দরীর থপথপে চেহারা, গামছার আবরণে নগ্ন
অবয়বের রূপ-বৈচিত্র্য এবং ছুর্গের কর্কশ ও উচ্চাঙ্গের ধ্বনি
ভাসিয়া উঠিল।
খানিকক্ষণ দাড়াইয়া থাকিয়া সে নিজের কাজে ভিতরে চলিয়া
গেল। যে রকম উৎসাহ লইয়া শশীপদ ভিতরে ঢুকিতেছিল, আর
সে উৎসাহ তাহার রহিল না।
পরদিনই শশীপদ ঘর ভাড়ার নােটিশ ঝুলাইয়া দিল সদর
দরজার সামনে।
ফল অচিরেই ফলিয়া গেল। দুই একখানা ঘরের ভাড়াটে প্রায়ই
জুটিয়া যায়। কলিকাতার মত সহরে বেশীর ভাগ লােক দুই-একখানা
ঘর ভাড়া করিয়া বাস করে। ইহার জন্য বাড়ীওয়ালাকে বেশীদিন
ধরিয়া ঘর খালি রাখিতে হয় না। এবং ভাড়াটেদেরও দুই একখানি
ঘর খুঁজিয়া বাহির করিতে বিশেষ বেগ পাইতে হয় না।
চলমান জীবন। বিচিত্র গতিভঙ্গি এই শ্রেণীর মানুষের।
দিন তিনেক পরে নূতন একঘর ভাড়াটে আসিয়া জুটিল ও দিকের
ঘরে। শশধরের পরিত্যক্ত অংশে।
১১
দুই
মস্ত বড় বাড়ী। খােপের মত নানা ঘরে নানা ভাড়াটে সব বাস
করিতেছে। খােপ খােপ পায়রা পরিবার যেন।
এমনি একঘর ভাড়াটে আসিয়া জুটিয়াছে।
কথা উঠিয়াছে
তাহাদের লইয়া। ভালমাসি অপরাজিতাকে ফিস ফিস করিয়া লাগাইয়া
চলিয়াছে। গুঞ্জনও তুলিয়াছে সারা বাড়ীময়।
দরজার আড়াআড়ি জানালা। ভালমাসি আসিয়া দাড়াইল
জানালার ধারে।
কথা উঠিয়াছে নিজেদের মধ্যে।
সীতা বলিতেছে, আর না। দুদিনেই প্রাণ হাঁফিয়ে উঠেছে।
এ ভাবে থাকার চেয়ে মরাই ভাল। কেন মরতে নিয়ে এলে আমাকে।
কেনই বা এলাম পালিয়ে তােমার সঙ্গে।
ফিস ফিস করিয়া বলিতেছে ললিত, চুপ, আস্তে কথা বল।
লােক কানাকানি হয়ে যাবে। জানাজানি হলেই সর্বনাশ। 'ধরা
পড়ে যাব নির্ঘাত।
কেন? আমরা কি এই নতুন পালিয়ে এসেছি। কত ছেলেমেয়ে
বাপ-মাকে লুকিয়ে পালিয়ে আসে। কেউ উধাও হয়। কেউ ধরা
পড়ে যায়। আমি ও সব গেরাহ্যই করি না। বাপ-মাকে ভয় করি
না তো এদের।
ললিত বলিল, কেন, অসুবিধা কি হচ্ছে তােমার! বেশ তাে
আছি দুজনে নিভৃতে; বেশ তাে চলছে আমাদের।
যা আমাদের কপাল! তােমাদের ভাল লাগে এ সব। আমার
মত ঘরে বন্দী থাকলে বুঝতে। এই ঘর, এই সব। কোথায় বা যাব।
১২
বের হওয়ার পথ তাে রাখনি। রাস্তায় যদি দেখা হয় কারও সঙ্গে তাে
ধরে নিয়ে যাবে। এভাবে গােপন বাস আর কদিন করলে মরে যাব
জানবে। নাঃ, এ আর ভাল লাগে না আমার। সীতা আর্তনাদ
করিয়া উঠিল।
কেন, এতসব লােক বাস করছে। এই এত বড় বাড়ীর এত সব
ভাড়াটে আছে। এমনি ঘর সব তাদের। কই তারা তাে তােমার
মত হাঁফিয়ে ওঠে না। বেশ তাে আরামে আছে। তবে—বলিয়া
ললিত কটাক্ষপাত করিল সীতার প্রতি।
নাঃ. এভাবে তােমার সঙ্গে পালিয়ে আসা আমার উচিত হয়নি।
তােমরা বেটা ছেলে, তােমাদের সব সাজে। আমরা মেয়ে মানুষ।
নেহাৎ বেহায়ার মত পালিয়ে আসা অন্যায়। খুব শিক্ষা পেয়ে গেলাম
তােমার পাল্লায় পড়ে। এমন লােভ দেখাতে পার তুমি। এমন
মন ভােলাতে পার তােমরা। পুরুষ মানুষ মেয়েদের নিয়ে কি যে
ছিনিমিনি খেলে তা বলা যায় না। মরে এতে মেয়েরাই। পুরুষরা
সাধু সেজে বসে আর মেয়েরা তখন লােকলজ্জার মাথা খেয়ে মরে।
মরণ আর কি! সীতা রেগে আগুন হয়।
ভালমাসি সরিয়া দাড়াইল ও ধারে। তাহার চোখ তখন
কৌতূহলের অঞ্জন পরিয়া নাচিতেছে। সােজা চলিয়া গেল অপরাজিতার
ঘরে। ফিস ফিস করিয়া বলিল, যা ভেবেছি ঠিক তাই। শুনবে এস।
ভালবাসার যবনিকা পতন হচ্ছে।
অপরাজিতা হাসিয়া বলিল, ও আর একটা নাটক দেখে কৌতূহল
বাড়িয়ে লাভ কি! ঘরে ঘরে এই সবই চলছে। চলে আসছে।
ভালবাসার খেলা নিয়েই তাে মরেছে সবাই। ও আর নতুন কি
দেখছি মাসি।
ভালমাসি বলিল, মজা ভাল হয়েছে। ছোঁড়াটা ছুড়িকে নিয়ে
বাড়ী থেকে, গাঁ থেকে সরে পড়েছে। উঠবি তাে ওঠ এই বাড়ীর এই
ঘরে। ছুড়িটা এখন পাচ্ছে। কত কথা বলছে শুনবে তাে এস।
অপরাজিতার ইচ্ছা নাই এ সব কথায় কান দেয়। কিন্তু ভালমাসির
আগ্রহের মাত্রা ছাড়াইয়া উঠিয়াছে। তাহাকে জানালার কাছে টানিয়া
লইয়া আসিল জোর করিয়া ।
দুইজনে গায়ে গা দিয়া দাড়াইয়াছে। যেন চোর ধরিবার জ
তৈরী। নিঃশ্বাস বন্ধ করিয়া একমনে কান খাড়া করিয়া শুনিতেছে।
দুপুর বেলা।
ছেলেরা অফিসে স্কুলে। মেয়েরা ঘরে ঘরে শুইয়া
বসিয়া গল্প করিয়া বিশ্রাম করিতেছে। আরাম ভােগ করিতেছে।
কিন্তু ইহাদের এইভাবে জানালার কাছে দাড়াইয়া আড়ি পাতা অন্যে
দেখিলে কি ভাবিবে।
কথা হইতেছে সীতা আর ললিতের মধ্যে।
তবে খবর দাও আমরা এখানে আছি। ফিস ফিস করিয়া বলিল
ললিত।
সর্বনাশ, খেয়ে ফেলবে আমাদের। ধরে বেঁধে নিয়ে গিয়ে
ঘরে বন্দী করে রাখবে। পাঁচ কান ভরিয়ে দেবে সৎমা তােমার।
লােক-লজ্জার সীমা পরিসীমা থাকবে না আর। বলিয়া উঠিল সীতা।
তারপর ফিসফিস করিয়া বলিল, পালিয়ে যেমন এসেছি তেমনি
পালিয়েই বেড়াতে হবে যতদিন পারি। কি আর করব। তােমার
পাল্লায় যখন পড়েছি তখন আমার আর বাকী কিছু থাকবে না।
আর আমার। ফল ভােগ দুজনকেই সমান ভাবে পেতে হবে।
বা কেউ যাবে না। ছাড়া কেউ পাবে কি? হতাশ হইয়া বলিল
ললিত।
অপরাজিতা কাঠ হইয়া শুনিতেছে। ভালমাসি তাহার গা টিপিয়া
বলিল, শুনলে কথা সব এদের। যা ভেবেছি ঠিক নয় কি? অনুমান
মিথ্যা হয় নি। হবেও না।
সীতা বলিল, যা হয় হােক। এখানেই থাকব। তবু শান্তিতে
আছি। গঞ্জনা, কানাকানি, ফিসফিসানির ধার ধারিনে। তুমি আর
আমি। আমরা এমনিভাবেই একান্তে থাকতে চাই। যে যা বলে
মাসি ? বলুক। আমরা সুখে থাকলেই দুনিয়া। লােকের তাতে কি! কার ধার ধারি! বল ? ভালমাসি রাগিয়া উঠিল, বলিল, দাড় মজা দেখাচ্ছি। কাল পুলিশে খবর দিয়ে সুখের সীমা রাখব না। পালিয়ে আসা বের করাচ্ছি। অপরাজিতা হাসিয়া বলিল, নতুন প্রেমে পড়ার ফঁাদ সৃষ্টি কেন কর ঘরে বনেনি। বন আশ্রয় করেছে। সেখানে বাধা দাও কেন? থাকুক না ওরা। এস এস আমরা চলি। সব বুঝে ফেলেছি আমরা। কিন্তু বাধা আর দিও না মাসি। থাকুক ওরা অমনি। ভালমাসি রাগ করিয়া দুম দুম করিয়া দুই পা আগাইয়া গিয়া, বলিয়া উঠিল, মজা দেখাচ্ছি। বনে বাস করা বের করাচ্ছি। পড়েছ আমার পাল্লায়, সহজে ছাড়ছি না। অপরাজিতা বলিল, এক কাজ কর মাসি। বিকালের দিকে যেও ওদের ঘরে। উসকিয়ে উসকিয়ে সব কথা জেনে নিও তত । ও আমার কপাল ! তাও কি করিনি! সন্দেহ কদিন থেকেই হয়েছে। প্রথম দেখায় সন্দেহ জন্মে। তখন থেকেই ঘুর ঘুর করেছি ওদের মধ্যে কতবার। মেয়েটি এমন ধড়িবাজ যে কথাই বলে না। কেবল চাল মারে। জানে না যে কার পাল্লায় এরা পড়েছে। দেখাচ্ছি মজাখানা কালকেই। অপরাজিতা হাত দুইটি ধরিয়া বলিল, মাপ কর মাসি। ওদের আর কিছু করাে না। যা করে করুক। কেন পরের ভাতে কাঠি দিচ্ছ। ওরা যেমন পালিয়ে এসে এখানে উঠেছে। গােপন ঘর- সংসার করছে। করুক না আমাদের কি তাতে ? অপরাজিতা ভালমাসিকে টানিতে টানিতে আনিয়া নিজের ঘরে আসিল। ইজিচেয়ারে বসাইয়া ভালমাসির পায়ের নীচে বসিয়া পায়ে হাত দিয়া বলিতে লাগিল, দোহাই মাসি, এ নিয়ে আর ঘোঁট পাকিও না। ঘর ভেঙ্গো না। বহু কষ্টে ওরা যদি বা বাসা পেল, তার কুটো
সরিয়ে ফাক করে দিও না আর। তাহলে আবার উবে এখান থেকে।
বাসা-ছাড়া করা মহা পাপ, তা জানাে না মাসি।
পাপ! এ কাজে পাপ হয় না। পাপী ওরা। পাপ কাজ ওরা
করে বেড়াচ্ছে। সংসার সমাজ সব ওদের জন্যে নষ্ট হয়।
না পেলে ওদের দেখে আরও অন্য ছেলেমেয়েরা ও কাজ করে বেড়াবে।
বাধা দিতেই হবে! দোব। দোব।
তবে দাও গে ! আমি আর এর মধ্যে নেই। যা পার কর।
তবে বলছি এ কাজ করে ফল ভাল পাবে না। বৃথা পরিশ্রম।
পাঁক ঘাটলে নিজের গায়েই পাক ছিটকে পড়বে। ওরা যত পারুক
অন্যায় করুক আমাদের তাতে কি! অপরাজিতা ভালমাসিকে শান্ত
করিবার চেষ্টা করিতে লাগিল।
অনেকক্ষণ পরে ভালমাসি অপরাজিতার ঘর হইতে উঠিয়া পড়িল,
কাজ আছে, সারিগে কাজ। যাই, উঠি মা! বলিয়া ভালমাসি সেখান
হইতে উঠিয়া পড়িল।
নিজের ঘরে গেল না। আবার আসিয়া সেই জানালার কাছে
আড়ি পাতিয়া দাড়াইয়াছে। কথা শুনিতেছে সীতা আর ললিতের।
মনে হইল, দরজা জানালা বন্ধ করিয়া বিছানায় শুইয়া তাহারা দুইজনে
একান্তে বলিয়া চলিয়াছে—
কাটুক যদ্দিন পারি এমনিভাবে। তারপর যা ঘটে ঘটুক। সীতা
ললিতের গায়ে হাত দিয়া বলিতেছে, বেশ লাগছে কিন্তু। কেমন
নিরিবিলি। বাধা দেবার কেউ নাই। আড়ি পাতারও লােক 'নাই।
আমরা দুজনে বেশ আছি।
ললিত উত্তর দিল, তা আর বলতে, তুমি আর আমি। এখানে কেউ
নাই। বাধা কিসের। দুজনের মধ্যে কোন আগল নাই। একেবারে
আমরা যেন এক সঙ্গে মিলে আছি। একাত্ম হয়ে।
যে যা পারে
করুক না। লজ্জা ঘেন্নায় কান দিলে তাে। ও সব গেরাহই করি না।
সীতা খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল।
ভালােমাসি সরিয়া পড়িল সেখান হইতে। রাগে তাহার সর্ব
শরীর রি রি করিতেছিল। বলিতে বলিতে গেল, দেখাচ্ছি মজাখানা।
প্রেম করার জায়গা পাওনি। হাতে দড়ি দিচ্ছি। কোমরে দড়ি
বেঁধে কাল সকালে থানায় না পাঠিয়ে আর ছাড়ছি না। তখন বুঝবে
পালিয়ে আসার ফল। এখন খুব পিরিত করছ। কর।
ভালমাসি সােজা গেল নীরদাসুন্দরীর কাছে। তাহাকে সব কথা
বলিয়া বসিল।
নীরদাসুন্দরী তাে অবাক! এমন কাণ্ড তাহার বাড়ীতে ঘটিতেছে।
এমন ভাড়াটেকে আশ্রয় দিয়াছে তাহারা। এমন পাপ ঢুকিয়াছে এই
বাড়ীতে। আচ্ছা, আসুক শশীপদ।
যা হয় একটা বিহিত কর তােমরা। আমি চলি। তােমাদের
বাড়ী, তােমাদের আশ্রয়ে আমরা আছি। কোন অঘটন ঘটলে
তার বিহিত তােমরা করবে না তাে কে করবে। এ সব অনাচার
অসহনীয়। প্রতিবিধান কর। তাড়াও ওদের। ওসব কলঙ্কী চাঁদের
মুখ দেখতে নাই।
আচ্ছা, কথা দিলাম এদের বিহিত করবই আমি। শশীপদ আসুক
না সন্ধ্যায়। থানায় খবর পাঠাচ্ছি। ধরে তােত নিয়ে যাক ওদের।
সারা বাড়ীময় গুঞ্জন উঠিয়াছে এই ভাড়াটেকে লইয়া। সকলের
মুখেই সীতাললিতের কথা। ঘরছাড়া ঘরভাঙ্গা এই দুইটি যুবক
যুবতীর কথা।
ক্রমে ক্রমে যতই সীতা আর ললিতের কানে কথাটা ঘােরালাে
হইয়া বেসুরা হইয়া উঠিতেছে ততই তাহারা যেন মরিয়া হইয়া চোখ
রাঙ্গাইয়া শাসাইয়া বেড়াইতেছে, কিসের ভয়, কার ভয়ে চলব।
ভাড়া দোব, বাস করব। চোর না বদমাইস। পালিয়ে এসেছি, বেশ
করেছি। বল না যাকে খুসী, কি করতে পারবে তারা।
ঘরে সীতা আর ললিতের মধ্যে হাসির ছটা উঠিয়াছে।
কোলাহল-২
১৭
বেশ কাণ্ড! লােকে কি ভাবিতে সুরু করিয়াছে। তাহারা
ইহাদের কাছে কি রূপে ধরা পড়িয়াছে।
সীতা শাসাইয়া উঠিল, আমাকে নিয়ে পালিয়ে এসেছে এই তত
কথা ! না হয় লােকে বলুক, তােমাকে নিয়ে আমি পালিয়ে এসেছি।
তা বেশ করেছি। এমন কত ছেলে-মেয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে,
আসছেও। তার কি হচ্ছে। আমাদের ভাল লেগেছে যা তাই
করেছি। কি হবে তাতে? এর মধ্যেই আমাকে দেখে মেয়েরা মুখ টিপে
টিপে হাসতে আরম্ভ করেছে। ছেলেকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে
দেখে। আর কত কি ভাবতে থাকে। প্রথম প্রথম, সত্যি কথা বলতে
কি বড় লজ্জা পেতাম। এখন মজা লাগে দেখতে এদের। তবে
আর বেশীদিন ভাল লাগবে না, অন্য কোথাও উঠে যাই। এরা
ভাবে কি।
হাসিয়া ললিত বলিল, প্রেমে পড়ার ফল ফলল তাহলে! কেমন,
বললাম তাে তখনই, পালিয়ে এস না। কত কান কানাকানি হবে।
প্রাণ টানাটানির ব্যবস্থা। কি হবে এসব করে। ঘরের ছেলে ঘরে
ফিরে যাই।
তা তুমি যেতে পার। আমি পারব না। ঘর ছেড়েছি যখন,
তখন ঘরে ফেরার মুখ কোথায়! হাসিয়া বলিল সীতা।
বেশ কথা বলতে শিখেছ। এই এক বাড়ী লােকের মধ্যে বেশ
চলে বেড়াচ্ছ, না মজা করে বেড়াচ্ছ। বাহাদুর মেয়ে! বলিয়া ললিত
সীতার গাল টিপিয়া দিল।
বাপের একমাত্র আদুরে মেয়ে হলে এমনিই হয়। যা খুসী তাই সে
করে বেড়ায়। বলিয়া সী ললিতের গায়ে চিমটি কাটিয়া দিল।
নীরদাসুন্দরী এই সব কথা আড়ালে দাড়াইয়া শুনিতেছিল আর
সমস্ত শরীর রাগে ফুলিয়া উঠিতেছিল। এমন বেহায়া মেয়ে ছেলে
ততা বাপের জন্মেও দেখিনি। দাড়াও মজা দেখাচ্ছি।
পালিয়ে আসা
বের করছি তােমাদের।
১৮
শশী পদকে সে বলিয়াছে কয়েকবার। কিন্তু ফল হয় নাই। শশীপদ বলিয়াছে, কে কি করে, করে বেড়াচ্ছে তাতে আমাদের কি! মাসে মাসে ভাড়া দেবে, থাকবে। যে যা করে করুক। তাদের পরের কথায় থাকা ঠিক নয়। কিন্তু শশীপদর স্ত্রী এবার বাঁকিয়াছে। সে নিজের কানে শুনিয়াছে সীতা-ললিতের ফিসফিসানি কথা। নীরদাসুন্দরী তাহাকে লইয়া গিয়া সব শুনাইয়াছে। সে এবারে সহজে ছাড়িবে না। রাগ তাহার এত হইত না। কলতলায় কি কথা বলিতে গিয়া সীতা কি উত্তর দিয়াছে তাহাকে কেন্দ্র করিয়া শশীপদর স্ত্রীর রাগ বাড়িয়াছে। সীতা নাকি একটা বিশ্রী ইঙ্গিতও করিয়াছে। ভাের না হইতেই পুলিশ আসিয়া বাড়ী ঘেরাও করিয়াছে। সীতা আর ললিতকে ক্রমাগত প্রশ্ন করিয়া কোন উত্তর না পাওয়ায় তাদের মনে সন্দেহ জন্মিয়াছে একটা। বাড়ীর সবাই আসিয়া জুটিয়াছে সেই ঘরে, ঘরের আসে-পাশে। ভীড় বাড়িয়াই চলিয়াছে। সীতা মুখরা হইয়া উঠিয়াছে। ললিত বেপরােয়া হইয়া উঠিয়াছে। ভয় লজ্জা বলিয়া যে কিছু থাকিতে পারে তাহা যেন তাহারা ভুলিয়া বসিয়াছে। দারােগা জেরা করিয়া চলিয়াছে। উত্তরের মাত্রা শুনিয়া তাহারও রাগ বাড়িয়া উঠিয়াছে। কোলাহলের অন্ত নাই। এমন সময়ে সদর দরজায় জনৈক বৃদ্ধ ভদ্রলােক আসিয়া উপস্থিত হইলেন। হাতে ছাতা আর ছােট একটি ব্যাগ লইয়া বাড়ীর নম্বর দেখিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, এই বাড়ীর মালিক কে ? দেখা করতে চান। শশীপদ ভীড় ঠেলিয়া সদর দরজায় গিয়া দাড়াইল। বৃদ্ধ ভদ্রলােক বলিলেন, আপনার বাড়ীতে নতুন একঘর ভাড়াটে এসেছে—এই দিন কয়েক হ'ল? একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। ?
শশীপদ ঘাড় নাড়িয়া মুখ টিপিয়া বলিল, হ্যা, কেন? দরকার আছে। প্রয়ােজন তাদের। কোথায় কারা ? শশীপদ কটাক্ষপাত করিয়া বলিল, আপনার তার কে? বৃদ্ধ রাগিয়া উঠিয়া বলিল, সে খবরে আপনার দরকার কি? তারা কোথায় বলুন, আমি যাব সেখানে। কোন ঘরে থাকে তারা? ও দিকের ভীড় আসিয়া জমিতে আরম্ভ করিল এ দিকে। সবাই সতৃষ্ণ নয়নে, কৌতূহল বশবর্তী হইয়া বৃদ্ধকে দেখিতে লাগিল। মজা মন নয়। ও ঘরে দারােগা। এ দিকে মূল ফরিয়াদী। আসামীরা ততা ঘরেই আছে। সকলের মধ্যে কৌতুহল জাগিয়াছে পুরামাত্রায়। ইতিমধ্যে সীতা-ললিতের কানে খবর গিয়াছে, জনৈক বৃদ্ধ ভদ্রলােক সদর বাড়ীতে দাড়াইয়া ইহাদের খোঁজ লইতেছে। ব্যাপার চরমে উঠিয়াছে। সীতার চোখ নাচিয়া উঠিল। ললিত হাসিয়া বলিল, একেবারে হাতে নাতে ধরা পড়ে গেলাম দেখছি। এ দিকে পুলিশ। ও দিকে স্বয়ং ফরিয়াদি। পালাবারও পথ নাই। সকলের চোখােচাখি হইয়া গেল। বেশ মজা। এমন সময় হন্তদন্ত হইয়া বৃদ্ধ ভদ্রলােক আসিয়া পড়িলেন ঘরের সামনে। ঘরের অবস্থা তখন চরমে উঠিয়াছে। দারােগা, পুলিশ, বাড়ীর লােকজনে ঘর বারান্দা সব ভর্তি হইয়া গিয়াছে। কানাকানি ও ফিসফিসানির শব্দে বৃদ্ধ বিব্রত ও বিস্মিত হইয়া গেলেন। ভীড় ঠেলিয়া ঘরে ঢুকিয়া বৃদ্ধ দেখিল সীতা আর ললিতকে লইয়া পুলিশের জেরা চলিয়াছে। অবাক হইয়া বৃদ্ধ বলিয়া উঠিলেন, কি ব্যাপার। এ সব কি। আঁা! মা অলকা? বাবা বৃন্দাবন ? দাবােগা হাসিয়া বলিলেন, অলকা, বৃন্দাবন ? কি ব্যাপার! এরা আপনার কে হয় ? ব্যাকুল হইয়া বৃদ্ধ বলিয়া উঠিলেন, আমার মেয়ে আর জামাই।
এ। বলেন কি? বলেন কি? তবে সীতা ছুটিয়া আসিয়া বাবা, বলিয়া তাঁহাকে চাপিয়া ধরিয়া কাঁদিতে লাগিল। ললিত মাথা নীচু করিয়া বসিয়াই রহিল। ব্যাপারটা আরও রহস্যময় হইয়া উঠিল। সকলের চোখ ঘুরিতেছে, কান সতর্ক হইয়া উঠিয়াছে। আশ্চর্য ব্যাপার। একদম নাম গােপন। আচ্ছা ছেলে মেয়ে তাে এরা। দারােগা বৃদ্ধকে বসিতে বলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা এরা তত আপনার মেয়ে-জামাই। কিন্তু এদের নাম কি বললেন ? অলকা আর বৃন্দাবন। তবে এরা এখানে সীতা আর ললিত নামে পরিচিত যে। নাম বদলও করে ফেলেছে। কী ব্যাপার বলুন তাে? বৃদ্ধ বসিয়া পড়িয়া চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছেন। চারিদিকে তাকাইয়া কেবলই বলিতে থাকেন, এদের সব বাইরে যেতে বলুন না! এত ভীড় কেন? কী হল? এঁা, মা অলকা, বাবা বৃন্দাবন, তােমাদের কি হয়েছে? শরীর কেমন আছে? উঃ! বলিয়া আর্তনাদ করিয়া উঠিলেন তিনি। অবশেষে খবর যাহা পাওয়া গেল বৃদ্ধের মুখ হইতে তাহা লইয়া এত বড় বাড়ীর সকলের বিস্ময়ের পরিসীমা রহিল না। অপরাজিতা হাসিয়া বলিল, তা বেশ! ভাল নাটক অভিনয় হয়ে গেল। ভাল- মাসি রাগিয়া উঠিয়াছে। সে বলিল, এমনও জানে এইটুকু এরা। সীতা তত পেটে কম শয়তানি বুদ্ধি ধরে না। শশীপদ হাসিয়া বলিল, আমি আগেই বলেছি, ওসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে না। কি দরকার বাপু অতশতে। ভাড়া দেবে, থাকবে। কে কি করছে, করেছে তার খবরে আমার দরকার কি? নীরদাসুন্দরী বলিল, আচ্ছা ছেলেমেয়ে দুটি হয়েছে। কদিন ধরে এমন সন্দেহে ফেলেছিল যে খেয়ে সুখ নাই, শুয়ে সুখ নাই। কেবল ওদেরই কথা ভেবে মরেছি। ওদের করব, না শেষ পর্যন্ত আমরাই হলাম জদ। বাড়ীর সকলের নানা জনের মুখে নানা ধরণের কথা উঠিয়াছে। অবশেষে একজন বলিয়া উঠিল, সিনেমা কোম্পানীকে খবর দাও, এমন পালা এদের মত আর কেউ করতে পারবে না। শশা হলে তাে হাউস ফুল হয়ে যাবে। টিকিট পাওয়া দায়। অবশেষে ঘটনা যাহা ঘটিল তাহা যেমন কৌতুহলােদ্দীপক তেমনি হাস্যকর। দারােগা শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধের কথায় না হাসিয়া থাকিতে পারিলেন না। ঘটনাটি এইরূপ : বৃদ্ধ ভদ্রলােকের নাম অপরেশচন্দ্র সরখেল। ধনী কিন্তু কৃপণ বলিয়া যথেষ্ট খ্যাতি আছে। তাহারই একমাত্র কন্যা অলকা। কিছুদিন আগে বৃন্দাবন নামে এক যুবকের সহিত বিবাহ দেন। ঘর- জামাই থাকিতে হইবে বলিয়া বৃন্দাবন প্রথমে সম্মতি জানাইয়াছিল, কিন্তু ঘরে আসিয়া জামাই সাজিয়া যখন বসিল, তখন অলকার সঙ্গে অপরেশচন্দ্রের অবনিবনা হইতে লাগিল বৃন্দাবন প্রসঙ্গে। কথায় কথায় অপরেশচন্দ্র একদিন অপমান করিয়া বসিল। ইহাতে অলকার রাগ চরমে উঠিল এবং একদিন বৃন্দাবনকে সঙ্গে লইয়া সে কলিকাতায় পলাইয়া আসিল বাবাকে না জানাইয়া। কলিকাতায় এই বাড়ীতে একটি ঘর ভাড়া করিয়া তাহারা দুইজনে ছদ্মনামে কাটাইতে লাগিল। ইতিমধ্যে অপরেশচন্দ্র কন্যা-জামাতার জন্য পাগল হইয়া সর্বত্র অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। তারপর বহু চেষ্টায় ইহাদের সন্ধান পাইলেন এখানে। শেষ পর্যন্ত অলকা এই চুক্তি করিয়া বাড়ী যাইতে রাজী হইল যে সংসারের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব সে ও তাহার স্বামী লইবে। বৃদ্ধ পিতা আর কিছুতেই হাত দিবেন না। কোন বিষয়ে কর্তৃত্ব পৰ্যন্ত করিতে পারিবেন না তিনি। ধনী কন্যার এই প্রস্তাবে অবশেষে বৃদ্ধ অপরেশচন্দ্র সম্মতি জানাইতে বাধ্য হইলেন।
তিন সীতা-ললিতের কাহিনী সারা বাড়ীতে হাসির বােল তুলিয়াছে। সীতা যখন তাহার বাবার সঙ্গে চলিয়া যায় তখন বাড়ীশুদ্ধ মেয়ে- মহলের সে কি বিদায় সম্ভাষণ। অপরাজিতা সীতার গাল টিপিয়া দিয়া বলিয়াছে, আচ্ছা মেয়ে হয়েছিস তুই। কদিন ধরে তােদর নিয়ে কি কাণ্ডই না হচ্ছিল বাড়ীতে। আমি কিন্তু তখন থেকেই এই রকম একটা আন্দাজ করেছিলাম। সীতার খোঁজ পাইয়া সেদিন তাহার এক কাকা আসিল। সে সমস্ত বাড়ীখানা ঘুরিয়া দেখিয়া বেড়াইল। কোণের দিকে একটা ঘরে এক দম্পতি থাকে। সেখানে গিয়াই হঠাৎ সে থমকিয়া গেল। এ যে তাহাদের মামার বাড়ীর ব্রাহ্মণদের হরি ঠাকুরের বড় মেয়ে সরলা। বৎসর পাঁচেক আগে কায়স্থদের একটি ছেলের সঙ্গে বাড়ী হইতে পলাইয়া যায়। ছেলেটি ভাল চাকরি করে। কিন্তু সে যে এখানে আসিয়া বাস করিতেছে কে জানে। স্তব্ধ হইয়া সে থাকিল কিছুক্ষণ। তারপর গম্ভীর মুখে ফিরিয়া আসিয়া শুধু সীতাকেই বলিল তাহাদের সরলার কথা। সীতা সে কথা তখনি অপরাজিতাকে বলিল। অপরাজিতা আর কাহাকেও না বলিয়া সােজা সরলার ঘরে গিয়া এক চক্কর ঘুরিয়া আসিল। আর পাঁচকান না করিয়া অপরাজিতা গুম হইয়া বসিয়া রহিল। আশ্চৰ্য। পরদিন সরলা বাসা তুলিয়া কোথায় যে চলিয়া গেল কেহই জানিবার অবকাশ পাইল না। সপ্তাহখানেক পরে সে কথাটা অবশ্য রাষ্ট্র হইয়া গেল বাড়ীময়। ২৩
ভালমাসি অবাক হইয়া বলিল, আমার তাে বিশ্বাস হয় না।
এ বদনাম ছাড়া আর কিছু নয়। সরলাকে আমি তাে অনেকদিন
থেকে দেখে আসছি। বাড়ীর অনেকে ভালমাসির কথায় সায় দিল।
তবে একটা কথা—তাহারা এভাবে হঠাৎ সরিয়া পড়িল কেন?
সেই ঘরে আর একদল ভাড়াটে আসিয়া আশ্রয় লইল। সীতা
চলিয়া যাওয়ার কয়দিন পরে তাহার ঘরও ভরিয়া গেল।
অপরাজিতা আশ্চৰ্য্য পুরীর কথা ভাবিয়া দিশা পায় না। সরলার
কথা ভাবিতে বসে। ভাবে সীতা-ললিতের কথা। বেশ অভিনয়
হইয়া গেল যা হােক। এমন জেদি মেয়ে সে জীবনে কখনও দেখেনি।
কৃপণ বৃদ্ধের অবস্থার কথা ভাবিয়া তাহার হাসি পাইল।
হরসুন্দরী ও ভালমাসিতে কথা হইতেছিল।
পর পর দুটো ঘটনা ঘটে গেল এ বাড়ীতে। একদল অভিনয়
করে গেল পালানাের ছল করে এসে। আর একদল সত্যি পালিয়ে এসে
ভাল মানুষের মত কাটিয়ে গেল। বলিয়া হাসিতে লাগিল হরসুন্দরী।
ভালমাসি রাগ করিয়া বলিল, ও সব হাফগেরস্থর আখড়া ভেঙ্গে
দাও শশীপদকে বলে। যত সব বাজে লােক এসে এই বাড়ীতে
থাকবে আর বদনাম উঠবে আমাদের। ভাল বাসা না ভালবাসার
বাড়ী।
শশীপদ আসুক, তাকে দিয়ে ব্যবস্থা করছি। তারপর ফিস
ফিস করিয়া বলিল হরসুন্দরী, আর সব ভাড়াটেরা ঠিক আছে তাে?
হাফগেরস্থের দলে নাম লেখানাে।
চিন্তিত মুখে ভারিক্কি চালে ভালােমাসি বলিল, আর কাকেও তাে
আমার সন্দেহ হয় না। দেখা যাক, একটু লক্ষ্য করে চলি।
এমন সময় অপরাজিতা আসিল। হাসিয়া বলিল, কি সব এমন দু
জনের মধ্যে শলা পরামর্শ হচ্ছে ?
এই তােমাদের ঘর খোজার কথা হচ্ছে। কে বাবা তােমরা।
জানা চাই। সন্ধান নিতে হবে। ও সব বাজে লােকের ঢুকতে দেওয়া
বারণ করতে হবে। পুলিশের ঝাট আর ভাল লাগে না। বাড়ী
খানাকে গেরস্থ বাড়ী করে আর রাখা যাচ্ছে না দেখছি। ভালমাসি
কথাটা সমালাইয়া লইয়া অপরাজিতাকে টানিয়া লইয়া গেল পাশের
একটা ঘরে।
মেয়ে মহলে আলােড়ন উঠিয়াছে। কোলাহল ছড়াইতেছে চারিদিকে।
পুরুষ মহল এতদিন উপেক্ষার ভরে ছিল এই বাড়ীতে। এখন
তাহারাও দলের খবর রাখিতে আরম্ভ করিয়াছে। ঘরে ঘরে সেই সব
কানাকানি চলিতেছে।
শশীপদ হন্তদন্ত হইয়া বাড়ী ঢুকিল।
নীচে কলতলায় হরসুন্দরী কাপড় কাচিতেছিল। তাহাকে সামনে
পাইয়া শশীপদ বলিল, যুদ্ধ! যুদ্ধ!
অবাক হইয়া হরসুন্দরী তাহার পানে চাহিয়াই রহিল।
যুদ্ধ গাে, যুদ্ধ ! যুদ্ধ যে বেধে গেল বলে। ইয়া বড় বড় বােমা
টপাটপ পড়ছে এ বাড়ী ও বাড়ীতে। লোক ছুটছে চারদিকে। আর
বাঁচোয়া নেই। এক দেশের দুটো সহর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এবার
আমাদের পালা। এই মাত্র খবর পেলাম। কোলকাতায় বােমা
পড়বে। দেখবে তখন মজাখানা।
বিরক্ত হইয়া হরসুন্দরী বলিল, যাও যাও। আর বাজে কথা
বলতে হবে না। বােমার ভয় রাখে না এ হরসুন্দরী। বলিয়া নিশ্চিন্ত
নির্ভাবনায় আবার কাপড় কাচিতে লাগিল।
কথাটা উপহাস যােগ্য নয়। সব বাড়ীর পুরুষেরাও কোথা হইতে
এই কথাটাই শুনিয়া আসিয়াছে। তাহারা যেন মজা পাইতেছে
বলিয়া মনে হয়।
মেয়েরাও কথাগুলি শুনিয়া উপভােগ করিতে
লাগিল। কোথায় ভয়! এ যেন একটা চিত্তাকর্ষক সংবাদ।
আবার সংবাদ আসিল পুরুষ মহলে, দাঙ্গা। হিন্দু মুসলমানে
দাঙ্গা হইবে। চরম সে দাঙ্গা।
কথাটা শুনিয়া এবার মেয়েরা ভয় খাইয়া গেল। কিছুদিন হইতে রাজনীতির আলােচনা বাড়ীতে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। সেইসঙ্গে যুদ্ধ আর দাঙ্গা আসিয়া যােগ দিয়াছে। ফলে খবরের কাগজের আনাগােনা বাড়িয়া উঠিয়াছে। দুপুরবেলায় খবরের কাগজ কেহ পড়িত না। এখন মেয়েরা দুপুরে বসিয়া খবরের কাগজ পড়িতে লাগিল। কেহ সকালে বাজার করিতে গিয়া একখানা কাগজ কিনিয়া আনে। কেহ অফিস হইতে ফিরিবার পথে একখানা কাগজ লইয়া আসে। অপরাজিতা বরাবরই কাগজ পড়ে দুপুরে। কিন্তু পরদিনের কাগজ। কাগজখানি গােটা দিন তাহার স্বামী দোকানে রাখে। রাত্রে ফিরিবার সময় সঙ্গে করিয়া আনে। আনিয়া তাকে তুলিয়া রাখে। দুপুরে সেই কাগজ একবার দেখিয়া লইয়া ঘুমাইয়া পড়ে। অথবা ঘুম ধরাইবার জন্য কাগজ পড়িতে বসে। তবে এখন কাগজ পড়িয়া ঘুম আসে না। আনে উৎকণ্ঠা, ভীতির ভাব। যুদ্ধের ছবি দেখিয়া আঁতকাইয়া উঠে সে। সাম্প্রদায়িক কলহ যে দাঙ্গায় রূপান্তরিত হইতে পারে তাহা ভাবিয়া শিহরিয়া উঠে। কি সর্বনাশ! অপরাজিতা ভাবিয়া আকুল হয়। আর এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটিয়া গেল এই বাড়ীতে। কে জানে এই বাড়ীর মধ্যে রাজনৈতিক দল বিশেষের আড্ডা জমিয়াছে কি না। ভাের হইতে পুলিশের সার্চ আরম্ভ হইয়া গিয়াছে। সারা বাড়ী ঘেরাও করিয়া তাহারা শেষ রাত্রি হইতে টহল দিয়া বেড়াইতেছে। দল বিশেষের গােয়েন্দা আগেই খবর দিয়া গিয়াছে। কিন্তু সন্ধ্যা রাত্রেই তাহারা সরিয়া পড়িয়াছে। ঘরে কিছু মাত্র রাখে নাই তাহারা। বেলা হইলে ঘর সার্চ হইল। কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না। সন্দেহজনক জিনিস বা ব্যক্তিরা ইতিমধ্যেই নিখোঁজ।
হতাশ হইয়া পুলিশেরা ফিরিয়া গেল। এবং তখন হইতে বাড়ীর
উপর তাহাদের নজর পড়িল।
আবার জটলা বসিয়াছে মহিলা মহলে।
ঘটনাটা এই রকম :
একঘর ভাড়াটে আসে। দুইখানা ঘর লইয়া তাহারা থাকিত।
স্বামী স্ত্রী একটি ঘরে। অন্য ঘরে তার ভাইয়েরা। অবশ্য এখন
জানা গেল স্বামী স্ত্রী তাহারা নয়। বিপ্লবী দলের নেতা আর তার
সহকারিণী স্ত্রী সাজিয়া একদল সহকারী লইয়া রাজনৈতিক আন্দোলন
চালাইয়া যাইতেছে।
ঘরে বােমা তৈয়ারী হয়। হাবিল জমা থাকে। আরও কত কি
সব হয়। তবে তাহারা অল্পদিন মাত্র ছিল।
সে দল পুলিশ আসিবার আগেই উধাও হইয়াছে। ধরা কেহ
পড়িল না বটে, কিন্তু বাড়ীখানা ধরা পড়িয়া রহিল সকলের কাছে।
একজন আসিয়া বলিল, চঁাদের হাট। আছি বেশ। নানা ঘরে
নানা দল, নানা মত, নানা কাজের ধারা। ঘর ভাঙ্গা, ঘর গড়ার
কারবার চলছে ক্রমাগত এখানে। বাড়ী বটে একখানা। এ বাড়ীর
কথা নাম ইতিহাসে থেকে যাবে।
শশীপদ ব্যস্ত হইয়া উঠে। হরমােহিনী রাগিয়া আগুন। এই
ধরণের লােকের কথা তাহারা ভাবে নাই। এখন ভাবিয়া আকুল।
কালে কালে আর কত কি দেখব।
অবশেষে আর এক আশ্চর্য খেলা দেখাইয়া গেল নীলকান্ত রায়।
অন্য পাড়ার ছেলে এই পাড়ায় আসিয়া জুটিল। জুটিল এই বাড়ীর
নীচেকার একখানা ঘরে। অগ্রিম একমাসের ভাড়া দিয়া কাল রাত্রে
আসিয়াছে। ভাড়া লইবার সময় বলিয়াছে, তাহার স্ত্রী দেশে আছে।
খবর পাঠাইয়াছে কাল আসিবে ডাক্তার দেখাইতে। তাহার নয়,
একটি ছেলের জন্য।
२१
শশীপদ সেই কথায় সম্মতি জানাইয়া নীলকান্তকে বেশী ভাড়ায় ঘরখানি ছাড়িয়া দিল একমাসের ভাড়া অগ্রিম আদায় করিয়া। নীলকান্ত সন্ধ্যাবেলায় আসিয়া ঘর ঠিক করিয়া গেল। যাইবার সময় তালা লাগাইয়া বলিয়া রাখিল, রাত্রেই সে আসিবে। অথবা আসিতেও পারে। অকস্মাৎ সকাল বেলায় দেখা গেল ঘর ভিতর হইতে বন্ধ। ঘরে কে আছে বা কি হইয়াছে কেহ জানে না। বেলা আট্রা বাজিয়াছে তখনও ঘর বন্ধ। কী ব্যাপার! ক্রমে কানাকানি হইতে লাগিল। ফিস ফিসানি চলিতে থাকে। অবশেষে গুঞ্জন উঠে। কিন্তু শেষে যে কোলাহলে রূপান্তরিত হইয়া উঠিবে তাহা কে ভাবিয়াছিল। সকলের সন্দেহ হইল। অতবেলা অবধি ঘর খােলে না কেন ? কে আছে ভিতরে! আছেই বা কেন? আর খােলে নাই বা কি জন্য! সন্দেহ আরও বাড়িতে, বাহির হইতে ডাকাডাকি আরম্ভ হইয়া গেল। দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে কেহ। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। অবশেষে সন্দেহের মাত্রা চরমে উঠিতেই ডাক হইল পুলিশের। পুলিশ আসিল। দরজা ভাঙ্গিয়া ঘরে ঢুকিয়া দেখে সেই নীলকান্ত গলায় দড়ি দিয়া ঝুলিতেছে। অন্ধকার ঘরে এই সব কাণ্ড নীলকান্ত যে কখন করিয়াছে কে জানে। পুলিস নীলকান্তকে নামাইল। খবর পাইতে দেরী হইল না, কে এই নীলকান্ত। নীরদাসুন্দরী হাউ মাউ করিয়া উঠিল, মুখপােড়া ছেলে, ও পাড়া থেকে এসেছে এ পাড়ায় মরতে। মরবার আর জায়গা পেল না। হতভাগা কোথাকার। মরল বটে, সেই সঙ্গে আমাদেরও জড়িয়ে গেল। আবার কোলাহল উঠিল। সারা বাড়ীময় সে কোলাহলে মুখরিত হইয়া উঠিল। অবশেষে তাহা ছড়াইয়া পড়িল পাড়ায়। দলে দলে লােক আসিয়া নীলকান্তকে দেখিয়া যাইতে লাগিল। নানা মন্তব্য উঠিল সকলের মধ্যে। কিন্তু মুস্কিল হইয়াছে শশীপদর। তাহার স্ত্রী মুখরা হইয়া উঠিয়াছে। শশীপদর বাড়ীওয়ালা সাজিবার সখ চরমে উঠিয়াছে। স্ত্রীর হাতে সব কর্তৃত্ব ছাড়িয়া দিতে পারিলে সে যেন বাঁচে। নীলকান্ত বাড়ী হইতে থানায় গেল, তারপর হাসপাতালে গিয়া শ্মশানে যাইবার পথ পাইল। ইতিমধ্যে আত্মীয়রা আসিয়া তাহার জিম্বা লইল। কথাটা এইখানে শেষ হয় নাই। ভয় জাগিয়াছে সকলের মনে। যে ঘরে সে মরিয়াছে, সে দিক দিয়া কেহ যাইতে চায় না। গা ছম ছম করে। ভয় হয়। কে জানে, যদি নীলকান্ত সকলের অলক্ষ্যে হাত বাড়াইয়া ডাক দেয়। ডাক অবশ্য দেয় নাই। অত বড় বাড়ীর অত লােকের ভীড়ে ও শব্দে সে সুবিধা করিতে পারিবে না। ভয় দেখাইবার জন্য নীলকান্ত তাে এ বাড়ী আশ্রয় লয় নাই। আসিয়াছে রাগ করিয়া। তাও স্ত্রীর উপরে। সামান্য মাহিনার কেরাণী সে। সেদিন মাত্র মাহিনা পাইয়াছে। সেই টাকার কিছু স্ত্রীকে দিয়া, বাকী ঘর ভাড়ায় খসাইয়া, অবশেষ নিজের কাছে রাখিয়া নীলকান্ত এই বাড়ীতে আসিয়াছে। আসিয়াই নিজেকে শেষ করিল। ঘটনার কি শেষ আছে। একটার জের শেষ হইতে না হইতে আর একটা আসিয়া জুটিয়া যায়। যেন রীলে বাঁধা ছবি। এই বাড়ীখানা তাহারই নিদর্শন।
চার
পর পর দুর্ঘটনা ঘটিল কতকগুলি। ইহাতে বাড়ীখানি বেশ
সজীব হইয়া উঠিয়াছিল। কিন্তু মাসখানেকের মধ্যে তেমন কোন
ঘটনা না ঘটায় সকলেরই মুখে চোখে তেমন কোন উৎসাহ নাই।
তবে যুদ্ধ যে আসিতেছে, দাঙ্গা যে নিশ্চয়ই বাধিবে, এ সম্বন্ধে
সকলেই নিঃসন্দেহ হইয়া বসিল।
মেয়ে মহলে এই দুই আলােচনার মধ্যে পর পর কয়েকটি উল্লেখ
যােগ্য ঘটনা ঘটিয়া ধামাচাপা ছিল। আবার তাহা জাগিয়া উঠিয়াছে।
ঘরে ঘরে যুদ্ধের প্রস্তুতি। দাঙ্গার জন্য উদ্বেগ লইয়া বসিয়া
আছে সকলে। কি হয় কে জানে? এই লইয়া গবেষণারও
অন্ত নাই।
কাগজে প্রতিনিয়ত দুই পক্ষের উত্তেজনা মূলক খবর বাহির
হইতেছে। তর্জন গর্জন উঠিতেছে।
ভালমাসি কাপড় কাচিয়া উপরে উঠিতেছে। তাহার কানে গেল,
পাশের ঘর হইতে একজন বলিয়া বসিল, নারদ, নারদ, অর্থাৎ লেগে
যা বিবাদ।
বিবাদ লাগুক ক্ষতি নাই। কিন্তু তাহার মধ্যে নিজেরা না থাকে
যেন। তাহা হইলেই হইল।
একজন বলিল, আচ্ছা, ওরা বিশ কোটি, আর এরা পাঁচ কোটি।
কাটাকাটি হয়ে যাক! তাহলে থাকে ওদের পনেরাে কোটি লােক।
বাস, নিশ্চিন্ত আরামে থেকে যাবে। বাধা দেবে কে কাকে। নিঃক্ষত্রিয়
হয়ে যাবে সব। কি বলিস, মন্দ কথা নয়।
অন্যজন বলিল, ঠিক বলেছ, ওদিকে বিশ আর এদিকে পাঁচ।
কাটাকাটি হয়ে যাক। কিন্তু ভাই, এর মধ্যে কারা যাবে আর কারা
থাকবে সেটির হিসেব তাে দিলে না? তুমি, তােমার ভাই, এই দুজন
কোনখানে দাঁড়াবে। কাটাকাটির মধ্যে না কাটাকাটির বাইরে থেকে
যাবে।
বিরক্ত হইয়া আর একজন বলিল, দাদার কথা ছেড়ে দাও। ওর
কথা অমনি। এ কি কথার কথা। এ কি অঙ্কের হিসেব। আর
তাই যদি হ’ল তাহলে যে অঙ্ক কষে তাকে হিসেবের মধ্যেই যেতে হয়।
তাই নাকি? তবে দাদা হিসেবের মধ্যে যাচ্ছ তাে। ঐ পাঁচ
কোটির মধ্যে? আঁ, কি বলছ ? বল ?
বলাবলির আর কিছু নেই। কথা, কথা।
সেই কথার শেষ রাখিয়াছে ভালমাসির ছেলে। সেদিন চাকরি
করিয়া বাড়ী ফিরিতেছিল। রাস্তায় গােলমাল। লােক যখন ছুটা-
ছুটি করিতেছিল তখন ভালমাসির ভাল ছেলে উৎসাহের বশবর্তী
হইয়া ব্যাপার কি জানিতে গিয়া পুলিশের হাতে পড়ে। ভীড়
সরাইতে গিয়া পুলিশ তাহাকেই সামনে পায়। অবশেষে তাহার
ভাগ্যে থানা মিলিল।
ঘটনা ঘটিলেই পুলিশকে তাহার কিনারা করিতে হইবে।
কোন দুই চারিজন লােক ধরিয়া না আনিলে চলিবে না। আসল
নকল যে হোক।
পাঁচজন লােককে ধরিয়া লইয়া পুলিশ থানায় চলিল। আসল,
লােকের পাত্তা নাই। যে পাঁচজন নকল লােক ধরিয়া লইয়া চলিয়াছে
তাহারা পড়িয়াছে বিপদে।
ভালমাসির কাছে খবর আসিল। কাঁদিয়া পড়িল সে শশীপদর
কাছে। তাহার সুপারিশে আর একজনের মারফৎ অন্যজনকে ধরিয়া
অবশেষে ভালমাসির ছেলে ছাড়া পাইল।
বাড়ী ফিরিল সে অনেক রাত্রে।
আবার বাড়ীতে কোলাহল উঠিল। যাহারা ঘুমাইয়া ছিল
তাহারা উঠিয়া পড়িল। দেখিতে চায় তাহাদের অরূপ রতনকে। যাহারা বিছানা পাতিয়া ঘুমাইবার আয়ােজন করিতেছিল তাহারা কাতার দিয়া দাড়াইল ঘরের সামনে। ফিসফাস গুজগাজ চলিতে থাকে। মন্তব্য উঠে নানা ধরণের। ভালমাসির কায়া এখন গালাগালিতে উঠিয়াছে। পুলিশ নিপাত করিয়া ছাড়িতেছে। সেই পাঁচের পাল্লায় পড়িয়া ইহার এই দুর্দশা। তবু যে কাটা- কাটির মধ্যে না পড়িয়া ভালয় ভালয় ফিরিয়া আসিয়াছে এই কথা ভাবিয়া সকলে নিশ্চিন্ত হইল। অনেক রাত্রি পর্যন্ত ভালমাসির আস্ফালন চলিতে লাগিল। নীরদাসুন্দরীও কম যায় না। অপরাজিতা ঘরে বসিয়া স্বামীকে খাওয়াইতে ছিল। দোকানের কাজ শেষ করিয়া বাড়ী ফিরিয়া একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিবে তাহাতেও বাদ সাধিল ভালমাসি। অপরাজিতা বলিল, ও দিকে কান দিও না। খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়। যে বাড়ীতে আছি, এখানে রােজই এমনি ধরণের কাণ্ড না ঘটাই তাে আশ্চৰ্য্য। বাড়ী করতে পার তাে তার চেষ্টা দেখ। খেয়ে সুখ, শুয়ে সুখ। গণ্ডগােলের বালাই থাকবে না। আচ্ছা চিড়িয়াখানায় এসে উঠেছি। বলিয়া হাসিল সে। আমি তাে আছি আরামে। এই নিয়ে কাটে মন্দ নয়। নিত্য নতুন খবর পাচ্ছি। সময় বেশ কাটছে। বাড়ী তাে নয়, সারা শহরটাই যেন এর মধ্যে আছে। দুনিয়ার সব ধরণের এক একটা নমুনা এসে আড্ডা গেড়েছে। বলিয়া অপরাজিতা হাসিতে লাগিল। ঘর ভরতি বাসিন্দায় ! খােপ ভর্তি পাখী যেন। সেই বাসায় বিবাহ আছে। আছে অন্নপ্রাশন, শুভকাজ। ঘর-বসতে বৌ আসে। মেয়ে যায় পরের ঘরে। লােক-লৌকিকতা, নিমন্ত্রণ রক্ষা করার সব নিদর্শনই মেলে এখানে। কিন্তু আশ্চর্য এই বাড়ীর এত পরিবারের মধ্যে আত্মীয় সম্বন্ধ কাহারও সহিত কাহারও নাই। সব ছাড়া ছাড়া ভাব যেন। তবে ভাব করিয়াও লাভ নাই। নিত্য নূতন আসিতেছে যাইতেছে। কত ভাব করিবে আর পরস্পরের মধ্যে। কথায় কথায় ঝগড়া হয়। ফলে বাড়ী ছাড়ে। যাহারা থাকে তাহারা আরও ভাল বাসা পাইলে ক্ষণকাল অপেক্ষা করে না। কাজেই মায়া বলিয়া কিছু ইহাদের মধ্যে দানা বাঁধেনি। না ঘরের প্রতি, না প্রতিবেশীর প্রতি। তবু এমনি করিয়া এই বাড়ীর একদল লােক বাসা করিয়া চলিয়াছে। দিন কাটাইতেছে একরকম করিয়া। নীরদাসুন্দরী ঘরে আপন মনে পান সাজিতে বসিয়াছে। এমন সময় ভালমাসি আসিয়া ভাল মানুষের মত তাহার পাশে বসিয়া বলিল, দিদি, তােমার হাতের সাজা পান বড় মিষ্টি। দাও দেখি একটা। খেয়ে মুখটা বদলিয়ে নিই। নীরদাসুন্দরী হাতের ইশারায় তাহাকে বসিতে বলিল। পান সাজা হইল। নিজে একটা মােটা খিলি মুখে পুরিয়া, দোক্তার কৌটা খুলিয়া দোক্তা খাইয়া বলিল, এই নাও। পান খাও। দোক্তা খাও। মুখে পান দোক্তা পুরিয়া খুশি হইয়া ভালমাসি ফিস ফিস করিয়া বলিল, নীচের ঘর দিয়ে সন্ধ্যেবেলায় যাওয়া যায় না। গা’টা ছম ছম করে ওঠে। অনেকে বলতে আরম্ভ করেছে, নীলকান্ত ভূত হয়ে ঐ ঘরে আছে। নীরদাসুন্দরী গম্ভীর হইয়া গেল। বলিল, চুপ চুপ। ও কথা আর প্রকাশ করে বেড়িও না। তাহলে ভাড়াটে কেউ আসবে না। থাকবে ও ঘরে কেউ। আমি কি একা বলছি। বাড়ী শুদ্ধ সকলেরই যে ও দিকে গেলে গা’টা ছম ছম করতে থাকে। সত্যি ভাই, ও ভূত হয়েই আছে। বলিয়া ভালমাসি চুপ করিয়া রহিল। আমরা কি মানুষ। এই একবাড়ী লােক—এরা সবাই তাে কোলাহল—৩
ভূত। মানুষ হলে কি এ পচা পড়াে বাড়ীতে কে থাকে। যেমন
বাড়ী তার তেমনি লােক। দুইয়ে মিলেছে ভাল।
অপরাজিতা এ দিকে আসিতেছিল। তাহাকে ডাক দিল ভালমাসি।
ও অপু, শােন না। এস না এ দিকে।
অপরাজিতা আসিয়া নতমুখে দাড়াইল। হাতে একখানা কাগজ।
বলিল, অবস্থা ভাল দেখছি না। মারামারি আর কাটাকাটি তাে লেগে
গেল দেখছি। সাবধান মাসি, গতিক সুবিধা নয়। বলিয়া সে হাতের
কাগজখানি মেলিয়া ধরিল।
নীরদাসুন্দরী খেকাইয়া বলিল, ও সব বাজে কথা। বাজে খবর।
ওকি হয়, না হবে।
সত্যি বলছি। খবরের কাগজে কি মিথ্যে সংবাদ বের হয়। দাঙ্গা
আর যুদ্ধ একসঙ্গে বেধে যাবে। উনিও তাই বলছিলেন। জিনিসের
দর হু হু করে বেড়ে চলেছে। বলিয়া স্তব্ধ হইয়া বসিল অপরাজিতা।
গম্ভীর হইয়া নীরদাসুন্দরী বলিল, চালের দর তাে চার টাকা ছিল
মণ। কাল শশীপদ দু’আনা বেশি দিয়ে এনেছে। সে নাকি বলছিল,
দোকানী বলেছে, দর আরও বাড়াবে। তাই দু মণ চাল তাড়াহুড়াে
করে কিনে এনেছি।
ভালমাসি হতাশ হইয়া বলিল, তােমাদের পয়সা আছে দর উঠবার
আগেই কিছু বেশী করে কিনে মজুত করে রাখবে। কিন্তু আমরা
পয়সা পাব কোথায়। দিন আনা দিন খাওয়ার দলে যে আমরা।
বাড়ে বাড়ুক। যা ভাগ্যে আছে হবে।
পরিবেশ অন্য দিকে মােড় ফিরিল। রাজনৈতিক আলােচনা বন্ধ
হইয়া বাজারনৈতিক গবেষণায় সকলে মন দিল।
T
অবস্থা সেই রকম দেখছি। দোকানের সব জিনিস আটকে রাখছি।
এখন বিক্রী রয়ে সয়ে করব। বলিয়া অপরাজিতার স্বামী খাটে বসিয়া
পা দোলাইতে লাগিল।
৩ঃ
অপরাজিতা বলিল, তাহলে ব্যবসা চলবে কি করে?
ঐ তাে ব্যবসার মজা। বাজার উঠবার মুখে জিনিস মজুত করে
কম দামে কেনা মাল চড়া দামে বিক্রী করব। তাতে লাভ হবে বেশী।
অঘাের গম্ভীর চালে কথাগুলি বলিয়া অপরাজিতার পানে তাকাইল।
সব জিনিসের দর কি বেড়ে যাবে ?
যাবে না? হু হু করে বেড়ে যাবে। যুদ্ধ বাধলেই বাজারের
অবস্থা আগুন হয়ে উঠবে।
আমার দোকানের মজুত মালের দাম
আন্দাজ দশ হাজার টাকার মত। একমাস বন্ধ রেখে হঠাৎ চড়ার
মুখে খুললে বিশ হাজার টাকা হয়ে যাবে। আমার মত সব ব্যবসায়ীর
এই চাল। বলিয়া অঘাের গম্ভীর হইল।
অপরাজিতা বলিল, তাহলে ব্যবসায়ীর হাতেই দর। হঠাৎ তাহার
ভালমাসির কথা মনে পড়িয়া গেল। গরীব মানুষ। মজুত কি রাখবে।
দিন আনা দিন খাওয়া যাদের চলে তারা এমনি করে চড়া দরে জিনিস
খেয়ে পেটে চড়া পড়িয়ে দেবে। যুদ্ধ তাে ধনীর জন্যে। তারা বসে
বসে মজা লুটবে। আর টাকার গদীতে বসবে। গরীবরা যাবে
যুদ্ধে, মারবে, মরবে। এই তাে দুনিয়া। বলিয়া গভীর নিঃশ্বাস
ফেলিয়া অপরাজিতা চুপ করিয়া রইল। তাকাইয়া দেখিল তাহার
স্বামী ভবিষ্যৎ লাভের আশায় বসিয়া পা নাচাইতেছে।
অঘাের বলিল, নীচেকার ঘরটা তত কেউ ভাড়া নেবে না। এতে
ভূতের আড়া। ঐ ঘরটি ভাড়া নিতে হবে।
অপরাজিতা আঁতকাইয়া উঠিল, সর্বনাশ, ও ঘরে কে যাবে।
ঘর নিয়ে লাভ কি।
বােকা মেয়ে, ঐ ঘরে থাকবে মজুত মাল। কাল অনেক টাকার
জিনিস কিনবার অর্ডার দিয়েছি। ঐ ঘরে এনে মজুত রাখব।
মাসকয়েক গুদোমজাত করে রাখলেই দেখবে ডবল দাম হয়ে যাবে।
লাভ বেশী হইবে জানিয়াও অপরাজিতা খুসী হইল না.. বলিল,
যা ভাল বোেঝ কর।
তুমি একবার শশীপদর বৌয়ের কাছে যাও। বল এস ঐ ঘরটা
আমি ভাড়া নােব। বাইরের ঘর। লােকজন এসে বসবার জায়গা
নাই। তবে ভাড়া যেন কম হয়। কদাচ বলবে না যে আমি গুদোম
করব। তাহলে চড়া ভাড়া আদায় না করে ছাড়বে না। বললে
অঘাের।
বেশ সন্ধ্যায় নিরিবিলি পেয়ে কায়দা করে কথাটা বলব। কিন্তু
সুবিধা করে দিচ্ছি এতে আমাকে কি বকশিস দেবে ? বলিয়া বড় বড়
চোখ তুলিয়া অপরাজিতা স্বামীর পানে তাকাইল।
অঘাের বলিল, কি চাও। সবই তত তােমাকে দিয়েছি। ভাল
ভাল শাড়ী আর গয়না পেলে খুসী হবে তােত ?
। আমাকে নগদ টাকা দেবে। নিজের কাছে রাখব। কিন্তু
কিসে খরচ করব তার কৈফিয়ৎ চাইতে পাবে না।
দান খয়রাৎ করবে?
নিশ্চয়ই। অপরাজিতা মনে মনে ভাবিল, তােমার পাপের পয়সা
খরচ করে পুণ্যি করবার সাধ নাই। তবে এমন কিছু করব যাতে
তােমার পাপ ক্ষয় হয়ে আসবে।
বেশ তাই করবে। কিসের আপত্তি। গণ্ডার মারতে পারি তত
ইদুর বিলি করতে কষ্ট হবে না। ঐ টাকায় বাড়ী কিনব একটা। সেই
ভেবেই দম ধরে আছি। অঘাের কথাটা বলিয়া দেখিল অপরাজিতা
অন্য দিকে চাহিয়া কি যেন ভাবিতেছে।
আচ্ছা আমি এখন উঠি। এলাম শুধু ঐ ঘরটা নেবার জন্যে।
ঐ কথা বলবার জন্যে তুমি এক্ষুনি যাও। রাত্রে শুনে আগাম এক
মাসের ভাড়াটাও দিয়ে দোব। ঠিক তত! চলি। বলিয়া অঘাের
তাহার গলাবন্ধ কোট গায়ে চড়াইল।
অপরাজিতা আর কথা বলিল না। সে যেন তখনও কিভাবিতেছে।
অঘাের চলিয়া গেলে হতাশ হইয়া বিছানায় শুইয়া পড়িল।
একটু পরে বাহির হইতে ডাক আসিল, অপু মা। ও অপু মা।
শুয়ে পড়েছ ? পরক্ষণে দরজা খুলিয়া নীরদাসুন্দরী ঘরে ঢুকিল। বলিল, সেই যে বলে এলে কথাটা! তাই ভাবছি। এক কাজ করলে হয় না। ঐ ঘরে একটা শান্তি স্বস্ত্যয়ন করলে কেমন হয়? ভাড়া খাটাতে হবে যখন, তখন ফেলে রাখি কি করে। যে সব মুখ-পােড়া ভাড়াটে আছে, বাইরের কেউ এলে জানিয়ে দেবে। নিজেরা নেবে না। দেবে না অন্য কাউকে। মজা দেখাতে চায় আমাদের। কি বলে? অপরাজিতা হাসিয়া বলিল, কেউ ভাড়া না নেয়, নিতে না দেয়, আমাকে দিও। কত ভাড়া নেবে বল? কম হওয়া চাই কিন্তু। বাইরের ঘর করব। লােক এলে বসবার জায়গা নাই একটুকুও। নীরদাসুন্দরী অবাক হইয়া বলিল, তুমি নেবে। তার আর কথা কি মা! আপাততঃ যা খুসী তাই দিও। দশ টাকা ছিল, আট টাকা দিও। কি বরাবরের জন্মে নেবে তত ? না ভয়ে ছেড়ে দেবে এক মাস দেখে। বলিয়া তাহারপানে স্থির ভাবে তাকাইয়া রহিল। অপরাজিতা গম্ভীর হইয়া বলিল, ঘর নিচ্ছি আমার জন্যে। তাে ও সব খেয়াল নাই। যে সে আসে, ঘরে এসে ওঠে। একটা ঘর, তাতে অত জিনিস। বসি কোথায়, বসাই কোথায় তার ঠিক নাই। নিজের গরজ। জাননা তােত কৃপণ মানুষ উনি। খরচ বাড়াতে গেলে চীৎকার করে ওঠেন। তা মাসি, আমি নিচ্ছি। আমিই ভাড়া দোব আমার হাত খরচ থেকে। তাই বলি পাঁচ টাকায় ঠিক করে নাও। ছ মাসের ভাড়া অগ্রিম দোব আমি। কিন্তু একটা কথা গােপন রাখবে বাপু! ওঁকে বলবে, সবাইকে বলবে যে ঘরখানা এমনি ওদের ব্যবহারের জন্যে আপাততঃ ছেড়ে দিলাম। তবে আমাকে রসিদ আমারই নামে দিতে হবে। খুসী হইয়া নীরদাসুন্দরী বলিল, বেশ তাই হবে মা। তােমার কথা কি ফেলতে পারি। শশীপদকে বলে তাই ব্যবস্থা করছি। অপরাজিতা বলিল, তবে টাকাটা নিয়ে যাও। রসিদটা সন্ধ্যায় যেন আমাকে চুপি চুপি দিয়ে যেও। পাঁচকান না হয় যেন।
লইল।
জতাকে বুকে
A
বাক্স খুলিয়া টাকা বাহির করিয়া নীরদাসুন্দর হাতে দিতেই
সে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করিল না। খুসী মৰে চলিয়া গেল।
যাইতে যাইতে বলিল, পাঁচকান হবে না কথা দিচ্ছি। আমি যা বলব
তাই হবে। তুমি আমি ছাড়া আর কেউ জানতে পারবে না।
নীরদাসুন্দরী চলিয়া যাইতে অপরাজিতা এক চোট হাসিয়া
সেও কম ব্যবসায়ী নয়। কি রকম মাল সওদা করা গেল।
স্বামীকে একথা জানাইলে সে যে কি আদর করিবে তাহা ভাবিতে
ভাবিতে অপরাজিতা পুলকিত হইয়া উঠিল।
অনেক রাত্রে অঘাের দোকান হইতে ফিরিল। আসিয়াই এই
অপ্রত্যাশিত ও অভাবনীয় খবর পাইয়া খুসীতে অপরাজিতাকে
জড়াইয়া ধরিয়া বার বার আদর করিতে লাগিল।
অপরাজিতা বলিল, ভাড়া কিন্তু পনেবাের কম হবে না। আর
আগাম একশত টাকা দিতে হবে। না হলে সব ভেস্তে দোব। তারপর
ফিস ফিস করিয়া বলিল, মাত্র পাঁচ টাকায় ব্যবস্থা করে ফেললাম।
রসিদ দেবে তাে?
রসিদ আগেই আদায় করে নিয়েছি। টাকাটা দাও। বলিয়া
অপরাজিতা রসিদটা দেখাইল।
অঘাের বলিল, আচ্ছা মেয়ে তুমি।
তুমিও লােক কম নও। লােকে মরছে। মরতে বসেছে। আর
তুমি সেই ফঁাকে চড়া দরে মাল ছাড়বার জন্যে এখন থেকে বেশী মাল
কিনে মজুত করে রাখছ। এ কাজ কি ভাল হবে?
ভাল না হলে তুমি ঘর ভাড়া করলে কেন ?
অন্যায় করেছি। করা উচিত ছিল না।
বটে!
তা নয় তত কি? বকশিসটা দাও দেখি ? কেমন হাত তােমার।
জল তাে গড়ে না। কি কষ্টে সংসার চালাই তা আমিই জানি।
ওটা আমার কাছে মজুত থাক না। সুদে আসলে এক সঙ্গে দোব।
পাঁচ বিধায়কের এবার কলিকাতায় নূতন বাসার সবে পত্তন হইল। স্ত্রী এবং একভাই লইয়া তাহার সংসার। ভাইটি এবার দেশ হইতে ম্যাট্রিক পাশ করিয়া কলিকাতার কলেজে পড়িতে আসিয়াছে। ভাইয়ের জন্য বাধ্য হইয়া বাসা করিতে হইল, বলে বিধায়ক তাহার মা বাপকে। আর স্ত্রীকে বলে, হ’ল তাে এবার বাস করা। তােমারই জন্যে। যে তাগিদ। বহুদিন হইতে বিধায়কের স্ত্রী বাসা করিবার জন্য স্বামীকে বলিয়া আসিতেছিল। প্রথমে অনুরােধ। তারপরে উপরােধ। শেষে তাহা জুলুমে পরিণত হইল। যখন তাহাতেও ফল ফলিতেছে না, তখন সপ্তাহান্তে বাড়ী আসিলে স্ত্রী পাশ ফিরিয়া শুইত। কথা বলিত । সাধারণ কাপড় ছাড়িত না। বেশভূষার দিকে সেদিন নজর রাখিত না অন্য অছিলায়। বিধায়কের বাপ মায়ের বিশেষ অমত ছিল না। তবে বাসা করিলে পুত্ৰমুখ দেখা কচিৎ হইবে এই আশঙ্কাও অমূলক নয়। তাহা ছাড়া টাকা পয়সার কথা তাে আছেই। সবই সেখানে খরচ হইয়া যাইবে, তাহাদের ভাগ্যে কি জুটিবে ভগবান জানেন। যে বৌ। বলা তাে যায় না। তবু যতদিন তাহাদের অধীনে আছে থাক। রাখা যায় ভালই। বেশীদিন যে রাখা যাইবে না সে অনুমান প্রবল হইয়া উঠিতেছে। তবু ভালাে যে বিধায়ক এখনও তাহার বাপ মায়ের অনুগত আছে। এতদিন বিধায়ক হারিসন রােডের শান্তিনিকেতনে থাকিত। কলেজের পড়া হইতে চাকুরী আরম্ভ হওয়া পর্যন্ত সে আর কোথাও আশ্রয় লয় নাই। দেশ কাছেই এবং সেই সুবিধার জন্য প্রতি শনিবারেই সে বাড়ী যাইত। সুতরাং বাসা করার সুবিধা ও আরাম হইতে সে একেবারে বঞ্চিত হয় নাই। অফিসের ছুটির সংখ্যা কম নয়। তাহার উপর রবিবার তাে আছেই। কাজেই বিনা ঝাটে বাড়ীতে থাকা তাহার কম ঘটিয়া উঠিত না। বাসা করার মত আর হাঙ্গামা নাই। তাহার বন্ধুদের মধ্যে যাহারা বাসা করিয়াছে, অথচ দোসর বলিতে যাহাদের নাই, তাহাদের অফিসের খাটুনি অপেক্ষা সংসারের সংসারের দেখাশুনা, আনা-নেওয়া করিতে প্রাণান্ত পরিশ্রম করিতে হয়। এত সব পরিশ্রম করিতে বিধায়ক পারে না। এবার আর তাহাকে সে ভাবনা ভাবিতে হইবে না। সেই আশ্বাস দিয়া বিধায়কের স্ত্রী দেওল্প অবলম্বন করিয়া আসিয়াছে। সংসারের নিত্যনৈমিত্যিক কাজে ওস্তাদ বলিয়া মনােজের খ্যাতি আছে। বৌদির দোসর সেই হইল। বিকালের গাড়ীতে মনােজ বৌদিকে সঙ্গে করিয়া কলিকাতায় আসিয়াছে। হাওড়া স্টেশনে বিধায়ক হাজির হইয়া তাহাদের লইয়া আসিল। ষ্টেশন হইতে একখানা ট্যাকসী ভাড়া করিয়া তাহারা সােজা মাণিকতলার বাসায় আসিয়া হাজির। মস্ত বড় বাড়ী। বহু অংশে তাহা বিভক্ত। একখানি দুইখানি করিয়া ঘর লইয়া বহু পরিবার এই বাড়ীতে বাস করে। কোলাহলের অন্ত নাই। আপন আপন সংসার লইয়া সকলেই নির্বিবাদে কৰ্ম্ম-জীবন চালাইয়া যাইতেছে। কোথাও দ্বন্দ্ব, কোথাও মিলন— এই বিচিত্র কোলাহলের পরশ মাখিয়া বিচিত্র পুরীর নরনারীরা বেশ দিন কাটাইয়া যাইতেছে। মাধবী নূতন বাসায় আসিয়া উঠিয়াছে। একে সহর। তাহার উপর কলিকাতার মত সহর। সুতরাং সব কিছুই তাহার কাছে নূতন এবং আশ্চৰ্য্য ঠেকিতে লাগিল। কলিকাতার প্রশস্ত রাস্তায় সারি সারি লােকের যাতায়াত, গাড়ী ঘােড়ার সঘন গতিবিধি, দুইধারের অজস্র সাজান দোকান, প্রকাণ্ড বড় বড় বাড়ী, এই সব দেখিতে তাহার বড়ই ভাল লাগিল। চলন্ত ট্যাক্সিতে বসিয়া বড়বাজার হইতে আরম্ভ করিয়া মাণিকতলা পর্যন্ত সে অনিমেষ নয়নে দেখিয়া ৪০ চলিল। মাধবী যতই দেখিয়া যায় ততই যেন মুগ্ধ হইয়া পড়ে। সহরের যেন শেষ নাই। চলিয়াছে তাে চলিয়াছেই। পল্লী ও সহরের ব্যবধান এইখানে চোখে পড়ে। শ্যাম আস্তরণের পরিবর্তে বাঁধান রাস্তার রুক্ষতা তাহার চোখে যেন ধাঁধা লাগাইয়া দিতেছে। বিধায়ক দশটায় অফিস চলিয়া গিয়াছে। তাহার ভাইও কলেজে পড়িতে গিয়াছে। একা মাধবী নূতন গৃহস্থালী গােছাইতে ব্যস্ত। কাল সবে এই নূতন বাসায় আসিয়াছে। বাসা ঠিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিধায়ক দেশে চিঠি দিয়া ভাইয়ের সঙ্গে স্ত্রীকে পাঠাইবার জন্য বাড়ীতে চিঠি দিয়াছিল। যথারীতি সব আসিয়া গিয়াছে। নূতন সংসার পাতাইতে অনেক কিছুর দরকার। কাল সমস্ত বিকাল ধরিয়া দেওর ভাজে খাটিয়াছে। তবু কিছুই হয় নাই। এখনও জিনিসপত্র কেনার অনেক বাকী। এই ঘরে থাকিত মালতীরা। কে মালতী ? কেন আসিল এবং গেল সে জানে না। আসিয়াছে ভালই। গেল সে তাে আরও ভাল। গেলে এই ঘর পাইত না। অন্য ঘর পাইত কিনা সন্দেহ। মালতী আসিয়াছিল বলিয়া সে ঘর পাইল। কারণ সে চলিয়া গিয়াছে। অন্য কেহ আসিলে যদি না যাইত। মালতীর প্রতি প্রসন্ন হইল মাধবী। এখন ইচ্ছা হইল একবার তাহাকে দেখিতে পাইলে ভাল হয়। মালতীরা চলিয়া যাওয়ার পর আবার একদফা চুণ ফিরাইয়া দিয়াছে বাড়ীওয়ালা। দেওয়ালের গজাল একটিও নাই। মালতীরা যাইবার সময় সবগুলি তুলিয়া লইয়া গিয়াছে। এখনও যে কয়টি লাগিয়া আছে, বােধ হয় সেগুলি সাধ্যমত চেষ্টা করিয়া তুলিতে পারে নাই বলিয়া তাহারা টিকিয়া আছে আশে পাশে অনেকটা স্থান ক্ষত করিয়া। সংসারের নিত্যব্যবহার্য জিনিসের একটা ফর্ণ করিয়া মনােজ প্রথমে মুদিখানার জিনিস, পরে কয়লা, কাঠকয়লা, লােহার উনুন, এনামেলের ৪১ হাঁড়ি, বঁটি, শিল নােড়া, কাঁসার থালা বাসন, ঘটি বাটি ইত্যাদি সব কিছু একে একে আনিয়া শেষে বাজার করিয়া আসিল। কাল রাত্রে মাছের ঝােল ভাত খাইয়াছে। বেশী রান্না-বা করিবার সময় ছিল না। এই সমস্ত আনিয়া গােছগাছ করিতে রাত্রি একটা বাজিয়া গিয়াছিল। পাশের ভাড়াটেগুলি ইহাদের বহুপূর্বেই শয্যা লইয়াছিল। এত রাত্রি পর্যন্ত তাহারা জাগে না এবং ইহাদের নূতন সংসারের খোজ খবর লইতে বড় একটা কেহ আসে নাই। দুইখানি ঘর জল দিয়া ধুইয়া মুছিয়া মাধবী একবেলার মধ্যে বাসের যােগ্য করিয়া লইল। চুণের জল মেঝের স্থানে স্থানে জমাট বাঁধিয়া গিয়াছিল। চুণের সোঁদা ও তীব্র গন্ধে মাধবীর খুবই অস্বস্তি বােধ হইতেছিল। যাহা হউক রান্নাবাড়া শেষ করিয়া বিছানা পাতিয়া সে শুইল। স্বামীকে শােয়াইল। এবং পাশের ছােট ঘরটিতে মনােজ নিজে বিছানা পাতিয়া ইতিপূর্বেই বারকয়েক গড়াগড়ি দিয়া কোমরের ব্যথা মারিয়া লইয়াছে। বিধায়ক মনােজকে ভর্তি করিয়া দিল স্কটিশচার্চ কলেজে। তাহা বাসা হইতে বেশী দূরে নয়। সময়ে সময়ে বাসায় আসিয়া খাইতে পারিবে লেজার পিরিয়ডে। সে সুবিধাও উপেক্ষনীয় নয়। নূতন বাসা। সবাই নূতন। অচেনা অজানা। কত সুবিধা অসুবিধা আছে। মনােজ কলেজ চলিয়া গিয়াছে নূতন উদ্যমে। বিধায়ক অফিস গিয়াছে স্ত্রীর হাতে সাজা পান চিবাইতে চিবাইতে। মাধবী এখন এক বিছানায় শুইয়া আরাম ভােগ করিতে লাগিল। কি ভাবে সাজাইলে ঘরখানি মানায়, এই সব চিন্তা করিতে করিতে তাহার ঘুম মাথায় গিয়া উঠিল। বার কয়েক এ পাশ ও পাশ করিয়া সে একবার উঠিয়া দাড়াইল। নিজের একখানি কুমারী বয়সের ফটো, বিবাহের পর বাপের বাড়ীতে দুইজনের একসঙ্গে তােলা ভাল 82 একখানি ফটো সােজা করিয়া টাঙ্গাইয়া রাখিল। দরজার গােড়ায় একটু ময়লা জমিয়াছিল তাহা পরিষ্কার করিতেই রান্নাঘরের দিকে তাহার নজর পড়িল। সামনের তাকে মশলাগুলি সাজাইয়া রাখিয়াছে। রান্নাঘরের উনান হইতে তখনও আগুনের রেখা মিলাইয়া যায় নাই। ধিকি ধিকি করিয়া আগুন জ্বলিতেছে। পাশে হাঁড়ি কলসী থালা বাটি ঘটি বঁটি শিল নােড়া এবং আনাজের কিছু অংশ ইতস্ততঃ পড়িয়া রহিয়াছে। সেগুলি আর একবার গােছাইয়া পরিষ্কার করিয়া সাজাইয়া রাখিল। মাধবী একবার মনে করিল, উঠিয়া গিয়া রান্নাঘরের ও কোণটা পরিষ্কার করিয়া তারপর নিশ্চিন্তে বসিয়া আরাম করিবে। কিন্তু সকাল হইতেই বেলা একটা পর্যন্ত খাটিয়া খাটিয়া তাহার কোমর ধরিয়া গিয়াছে। শরীরের ক্লান্তি যথেষ্ট দেখা দিলেও নূতন বাসার নূতন গৃহিণী হওয়ার আনন্দ তাহাকে যেন পাইয়া বসিল। আরাম করিয়া একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া মাধবী ভাবিল, এতদিন পরে এই সংসার তাহার কর্তৃত্বে চলিতে থাকিবে। ছােট হইলেই বা, সংসার তাে বটে। বহু দিন হইতে তাহার এই ইচ্ছা মনে মনে বিন্দু বিন্দু করিয়া জমিতেছিল। এজন্য তাহাকে কম বেগ পাইতে হয় নাই। অনেককে বেগ দিয়াছেও। আজ তাহার প্রতিষ্ঠা দেখিয়া মনে মনে সে সত্যি খুশী হইল। কলিকাতা দেখিবার সাধ মাধবীর বহু দিন হইতে মনে জাগিয়া- ছিল। বহুদিন বহুবার স্বামীকে অনুরােধ করিয়াও কোন ফল হয় নাই। বহু দিনের সাধ এবার মিটিল। মাধবী উঠিয়া গিয়া জানালার সামনে দাড়াইল। ছােট গলি দিয়া দুই একটি করিয়া লােক, রিকসা চলিতেছিল। ছােট ছােট ছেলে মেয়েরা ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতেছে। রাস্তার ও পাশের ঘরগুলির দিকে উকি ঝুকি মারিতে তাহার একবার ইচ্ছা হইল। রাস্তার সামনের ঘরখানির জানালায় কালাে পর্দা দেওয়া আছে। ৪৩ তাহারই ফাঁক দিয়া স্পষ্ট ভাবে দেখা গেল একটি তরুণীকে। তাহারই মত। বিস্তৃত পালঙ্কে শুইয়া একখানি বই পড়িতেছে। বয়স তাহার চেয়ে বছর দুই তিন বেশী হয়ত হইতে পারে। গড়ও তাহারই মত, তবে রূপের আর অন্ত নাই। টানা টানা চোখে, প্রশান্ত মুখে এবং অপরূপ সৌন্দর্য্যে সে মহিমান্বিত হইয়া উঠিয়াছে। এমন রূপ মাধবী জীবনে কখনও দেখে নাই। একদৃষ্টে তাহাকেই দেখিতে লাগিল। আলাপ করিবার প্রবল ইচ্ছা মনে জাগিল, কিন্তু হঠাৎ তাহার সঙ্গে কথা বলিবার সাহস জোগাইল না। যদি কিছু সে মনে করিয়া বসে। চারিটার পর কলেজ হইতে দেওর আসিবে। ছয়টার সময় অফিস হইতে স্বামী আসিবে। সুতরাং মাধবী তাহাদের জন্য ময়দা মাখিয়া খানকয়েক পরটা করিয়া রাখিবে। গ্রামে বিকাল বেলায় পুকুরে গিয়া গা ধুইতে যাইত তাহারা সদলবলে। এখানে সে সুবিধা নাই। কলের জলে স্নান। উপরে যাহারা থাকে তাহারা কোণের দিকের ঘেরা একটা জায়গায় স্নান শেষ করিয়া লয়। সাড়ে তিনটায় কলে জল আসে। তখন হইতেই এ দিকের মেয়েরা কাজ কর্ম আরম্ভ করিয়া দেয়। একের পর এক গা ধুইয়া লইতে পাঁচটা বাজিয়া যায়। মাধবী নূতন আসিয়াছে। কোথায় কি করিতে হয়, কে কি বলিয়া বসে, ভাবিয়া আগে হইতেই নিজের কাজ সারিয়া লয়। কাহারও কথার অপেক্ষা সে রাখিতে চায় না। চারিটার মধ্যে গা ধােয়া সারিয়া দেওরকে জল খাইতে দেয়। মনােজ জল খাইয়া প্রথম প্রথম বৌদির সঙ্গে গল্প করিয়া রান্নার ব্যবস্থায় সাহায্য করিয়া শেষ বেলাটুকু কাটাইয়া দিত। এখন কলেজের অনেকের সঙ্গে বন্ধুত্ব করিয়া লইয়াছে। কলেজ হইতে আসিয়া জলযােগ সারিয়া লইয়া সে খেলা করিতে বাহির হইয়া যায়। বৌদির সঙ্গে গল্প করার আর সময় হয় না। ইচ্ছাও থাকে না। মাধবী একা বসিয়া সমস্ত বেলাটা কাটাইয়া দেয়। এখানকার নিঃসঙ্গ জীবনে ইহারই মধ্যে তাহার অবসাদ আসিয়াছে। এখানে ৪৪ এ পাড়ার ও পাড়ার সঙ্গীসাথীরা তাে আসেই না, বিশেষ করিয়া এ বাড়ীর মেয়েরা পর্যন্ত তাহার সঙ্গে সারা দুপুরের মধ্যে একবার দেখা করিতে আসে না, ভাবিতে তাহার প্রাণটা আনচান করিয়া উঠে। স্বামী যখন বাড়ী আসে তখন আর বেলা বেশী থাকে না। তখন হইতে তাহার জীবনে নব বসন্তের আগমন হয়। সমস্ত সন্ধ্যাটা তাহার মন-বসন্তের ফুল ফলে লীলায়িত হইতে থাকে। সন্ধ্যার দিকটা এইজন্য সে ভাল করিয়া সাজিয়া বসিত। বিকালে গা ধুইয়া ভাল একখানা রঙীন কাপড় পরিয়া, পাউডার মাখিয়া, কপালে বড় একটি টিপ পরিয়া যতদূর সম্ভব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হইয়া থাকিতে চেষ্টা করে। দিনের বেলায় এতটা করিবার সময় থাকে না। সকালে স্নান সারিয়া সেই যে রান্নাঘরে ঢােকে, তখন হইতে বেলা এগারােটা পর্যন্ত কথা বলিবার আর তাহার সময় থাকে না। রান্নাবাড়া করিয়া স্বামী দেওরকে খাওয়াইতে খাওয়াইতে সকালের দিকটা বড় তাড়াহুড়া করিয়া কাটিয়া যায়। ও ঘরে দেওর আপন মনে পড়াশুনা করে। বাজার করা ছাড়া এদিকে আসিয়া দুই একটি রসিকতা করিয়া যায়। রসিকতা শুনিবার জন্য হাসিয়া হাসিয়া কথা বলার ধরণ ভাল লাগিলেও রান্নাঘরের আবহাওয়া যেন অন্য রকমের। ঘরখানা কি রকমের যেন। মাধবীর বিরক্ত ধরিয়া যায়। মধ্যে মধ্যে উঠিয়া গিয়া স্বামীর কাছে দুই চারি দণ্ডের জন্য দাড়াইয়া থাকে। দুই চারিটি কথা বলিয়া আমােদ পায়। দেয়ও। রসিকতা করার পর স্বামীর কাছ হইতে অধিক মাত্রা-ছাড়ান রসিকতায় মাধবী লজ্জায় রাঙা হইয়া উঠে। আর দাড়ায় না সেখানে। নূতন বাসায় আসিয়া অবধি বিধায়ককে কোন কাজের ভার লইতে হয় নাই, সুতরাং সে বেশ আরামেই আছে। মাধবী নূতন বাসায় আসিয়া অবধি গৃহিণীপনার পূর্ণ সুযােগ পাইতেছে, সুতরাং সে কম আরামে নাই। মনােজ স্কুলের প্রান্তভাগ ছাড়াইয়া কলেজ জীবনে 3 পদার্পণ করিয়াছে, ছাত্রজীবনের নূতন আলােকের মুখ দেখিয়াছে ; তাহা ছাড়া কলিকাতার আবহাওয়ায় খাপ খাওয়াইয়া লইয়া অনেক বন্ধু লাভ করিয়াছে সে, সুতরাং তাহার মনে আৰন্দের সীমা নাই।' দিন ভালই কাটিয়া যাইতেছে সকলের। দেখিতে দেখিতে বিধায়কের কর্তৃত্বে মাধবীর গৃহিণীপনায় এবং মননজের কর্মনিপুণতায় নূতন বাসার শ্রী ফিরিয়া গেল। একটি দুইটি করিয়া মাধবী ফেরিওয়ালার কাছ হইতে খেলনা টুকিটাকি জিনিস কিনিয়া ঘর সাজাইয়া ফেলিল। অফিস হইতে ফিরিবার পথে বিধায়ক দুই একটি করিয়া ডেক-চেয়ার, ব্ল্যাক, আয়না, ভাল ছবি বাঁধাইয়া আনিয়া ঘর সাজাইতে লাগিল। মনােজ রাস্তার ধারে নূতন কিছু দেখিলেই বৌদিকে সেকথা জানাইতে দেরী করে না। কলেজ যাইবার মুখে মাধবী তাহার পকেটে পয়সা দিয়া মনােজের দরকরা জিনিসের ফরমাস দিয়া রাখে। তিন জনের আপ্রাণ চেষ্টায় নূতন বাসার যে রূপ ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহা দেখিয়া তাহারা নিজেরাই মনে প্রাণে পুলকিত হইয়া উঠিল। একে একে এত বড় বাড়ীর সকলের সঙ্গে দেখিতে দেখিতে কেমন করিয়া তাহাদের পরিচয় জমিয়া উঠিয়াছে তাহা শুনিবার মত। এক বাড়ীতে কিছুদিন থাকিলে অমন মেলামেশা হওয়াই স্বাভাবিক। ও ঘরের অপরাজিতার সঙ্গে মাধবীর এখন গলায় গলায় ভাব। পাশের যােড়শীর সঙ্গে গঙ্গাজল পাতাইয়া ফেলিয়াছে। বাড়ীওয়ালী দজ্জাল বৌটি পৰ্যন্ত মাধবীকে সুনজরে দেখে। তাহার পিসিমা নীরদা- সুন্দরী মাধবীকে এখন বৌমা বলিয়া ডাকে। আদর ও সােহাগ জানাইয়া কথা বলিতে তাহার ভালই লাগে। অথচ এই সুচিবায়ু- গ্ৰস্তা নীরদাসুন্দরীর অত্যাচারে মাধবীর ঘরে আগে যাহারা ছিল তাহারা পলাইয়া বাঁচিল। নীরদাসুন্দরীকে ভয় পায় না এবং ঘৃণা করে না এমন লােক এ বাড়ীতে একজনও নাই। অথচ নূতন ভাড়াটে মাধবী কেমন করিয়া :
মন্ত্রমুগ্ধের মত এই সাপিনীকে বশ করিয়া লইয়াছে ভাবিতে গেলে এতবড় বাড়ীর সকলেই অবাক হইয়া যায়। তিন মাস কাটিতে না কাটিতে মাধবী ঘর দুইখানিকে এবং বাড়ী- খানিকে নিজের মত করিয়া লইল। এতদিন সে সমস্ত দুপুর বেলাটা একলা কাটাইয়া দিত। ইহাতে তাহার অস্বস্তির সীমা থাকিত না। নির্জন কক্ষে এ ভাবে দিনের পর দিন কাটাইতে কেই বা পারে। সমস্ত দুপুরটা একবার শুইয়া একবার জানালায় দাড়াইয়া বসিয়া কাটাইয়া দিত। এখন সমস্ত দুপুরটা তাহার ঘর জম-জমাট থাকে। বাড়ীর যত মেয়ে আছে সব একে একে সাধিয়া মাধবীর ঘরে আসর জমায়। তরুণীরা বসে একধারে, বয়স্কারা বসে অন্যখারে। ঘােট ছােট ছেলে মেয়েরা দুই দলকে দেখে ও নাচিয়া নাচিয়া ফেরে। মাধবী এই সবই চায়। পাড়াগাঁ হইতে অশিক্ষিত মার্জিত রুচি- হীনা মাধবী এই তিন মাসের মধ্যে যে এমন মিশুক ও প্রিয়দর্শিনী হইয়া উঠিবে তাহা কেহই ভাবিতে পারে নাই। ৭ শশীপদ স্ত্রীর সঙ্গে কিছুতেই আঁটিয়া উঠিতে পারে না। নির্বিবােধী মানুষ সে। তাহার স্ত্রী সে দিক দিয়া একেবারে বিপরীত। সমস্ত বাড়ীখানাকে যেন সে নিজের কর্তৃত্বে রাখিতে চায়। প্রত্যেকটি পরিবার যেন তাহার মতামতের অপেক্ষা করিয়া চলে ইহাই সে চায়। নােগা ও ছােট হইলে কি হইবে, তেজ তাহার মুখ চোখ দিয়া সব সময় বাহির হয়। সামনের দিকের বড় ভাড়াটিয়ার বৌ শশীপদর স্ত্রীর অনুরক্ত। সে এ বাড়ীর মধ্যে বেশী ভাড়া দেয়। অথচ তাহাদের সাড়া শব্দ পাওয়া যায় কম। তাহার পাশের একখানি ঘর লইয়া এক বৃদ্ধা তাহার একটি ছেলে লইয়া বাস করে। তাহার দাপটটাই সব চেয়ে বেশী। সমস্ত বাড়ীখানা সে যেন চষিয়া বেড়ায়। সমস্ত দিকে তাহার খর নজর। কে কি করে, কি খায়, সব খোজ তাহার রাখা চাই। কোন কিছু বলিতে কেহ অনিচ্ছা প্রকাশ করিলে সে কৌশলে তাহা বাহির করিয়া তবে ছাড়ে। শশীপদর স্ত্রীর উপরে টেক্কা দিতে এই বৃদ্ধা সব সময় সচেষ্ট। বৃদ্ধা কথায় কথায় সব সময় বলে, বাড়ীওয়ালী বলিয়া সে কি তাহার মাথা কাটিতে পারে। মাসে মাসে সে ভাড়া দিবে। পাই পয়সা বাকী রাখিবে না। সুতরাং কাহারও কোন কথার ধার সে ধারে না। তাপরাজিতা তাহাকে ভালমাসি বলিয়া ডাকে। তাহার দেখাদেখি অনেকেই ঐ নামে ডাকিতে থাকে। ভালমাসি অপরাজিতাকে সুনজরে দেখে। ভালমাসির কাজকর্ম নাই বলিলেই হয়। নিজে বিধবা সিদ্ধপৰু ফুটাইয়া লয়। ছেলের রান্না সকালে সকালে সারিয়া সে সমস্তক্ষণ এ দিক ও দিক করিয়া কাটায়। অপরাজিতার ঘরে ইজিচেয়ারে বসিয়া তাহার সঙ্গে গল্প করিতে সে ভালবাসে। ইজিচেয়ারে বসিবার লােতেই অপরাজিতার সঙ্গে তাহার ভাব। বেশ নরম ও আরামদায়ক, , হাত পা মেলিয়া স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা যায়। ইহা ছাড়া, অপরাজিতাকে বেশী ভালবাসে না কে, সে প্রশ্নের উত্তর দিতে এ বাড়ীর সকলকে মাথা ঘামাইতে হয়। নীরদাসুন্দরীর মত অত ছুচিবায়ের লােককেও অপরাজিতার প্রশংসা করিতে শােনা যায়। শশীপদর ঘােট মেয়ে রেবা, বড় ভাড়াটিয়ার সেজ মেয়ে রেখা এবং কোণের দিকের ঘরের অর্ধেন্দুর কচি ছেলে পুর্ণেন্দু সব সময় অপরাজিতার কাছে কাছে ঘােরে। নিজের ছেলে পিলে হয় নাই বলিয়া সে পরের ছেলে পিলে লইয়া থাকিতে ভালবাসে। তাহার স্বামীর বড়বাজারে একটি বড় দোকান আছে। বেশ লাভ হয় এখন। সুতরাং অল্প খরচ বাদে সমস্ত টাকার অংশই ব্যাঙ্কে জমিতে থাকে। তাহাদের অবস্থা ভালই বলিতে হয়। ভালমাসি আসিয়া অপরাজিতাকে খবর দিয়া গেল, পিসি-ভাইঝিতে ঝগড়া বাধিবার উপক্রম হইয়াছে। নীরদাসুন্দরী ভাইঝি মনােরমাকে খুব গাল পাড়িতেছে। মনােরমা এখনাে সে কথা শুনিতে পায় নাই তাই রক্ষা, নইলে একটা কুরুক্ষেত্ৰকাণ্ড বাধিয়া যাইত এতক্ষণ। ভালমাসির সঙ্গে মনােরমার বনিবনা নাই। নীরদাসুন্দরীর সঙ্গে তাহার বিশেষ অবনিবনাও নাই য়। সুতরাং নীরদাসুন্দরীর পক্ষ লইলে মনােরমা একটু হিমসিম খাইয়া যাইবে। ভালমাসি আর কোন কথা বলিল না। ভাবিতে ভাবিতে সেখান হইতে চলিয়া গেল। শশীপদর স্ত্রী মনােরমা মাঝবয়সী। পাতলা ও টেকি। কথায় তাহার সঙ্গে কাহারও পারিয়া উঠা দায়। এতদিন সে-ই নীরদা- সুন্দরীকে খাতির করিয়া আসিত নিজের পিসিমা বলিয়া। কিন্তু দিন দিন ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কল লইয়া যাহা করিয়া চলিতেছে তাহাতে ও দিককার ঘর দুইখানাতে আর কেহ আসিবে বলিয়া মনে হয় না। আঠারাে টাকার ভাড়া ছাড়া সহজ কথা নয়। আর এ রকমভাবে চলিবেই বা কেন। মাধবীরা ও দিককার ঘর ছাড়িয়া বড় ভাড়াটিয়াদের পাশের কোলাহল একখানা ঘর ও নীচের দিকের একখানা ঘর লইয়াছে। নীচের ঘরে মনােজ থাকিত এবং তাহা কতকটা বাহিরের ঘরের মত ব্যবহার করা চলে। নীরদাসুন্দরীর যে তেজ, তাহার সহিত কথা বলা দায়। সে বাসে কিন্তু জলের বেলায় ও সব আবদার মাধবী কেন কাহারও রাখে না। সুতরাং জল পাওয়া দুষ্কর হইয়া উঠিল। ফলে, হয় তাহাদের এ বাড়ী ত্যাগ করিতে হয়, নইলে সদরদিকে উঠিয়া যাইতে হয়। এই লইয়া পিসি-ভাইঝিতে ঝগড়া। কলতলার ব্যাপারে নিত্যনৈমিত্যিক চীৎকার ভাল লাগে না। সব কোলাহলের কেন্দ্র এই কল যেন। বাড়ীখানাও কোলাহলমুখর। বিধায়ক গােলমাল ভালবাসে না। কলে গিয়া স্নান করিতে পায় না বলিয়া সে কিছু না বলিলেও মনােজ মধ্যে মধ্যে অনুযােগ করে তাহার বৌদিকে। নীরদাসুন্দরীকে সে ভাল চক্ষে দেখিতে পারে না। পারতপক্ষে সে উহার ধার কাছ দিয়া ঘেঁসে না। এই সব অনাচার সহ্য করিতে পারে না বলিয়া সে প্রায়ই আড়াল হইতে দুই একটি কথা কড়াভাবে শুনাইয়া সরিয়া পড়ে। মনােজ একদিন কলঘরে গিয়া দেখিল কল দিয়া সুর সুর করিয়া জল পড়িতেছে। প্রায়ই এমনি হয়, তাহাতে স্নান করার অসুবিধা ঘটে। নীচে গলা বাড়াইয়া দেখিল নীরদাসুন্দরী একখানা গামছা পরিয়া একটা বালতিতে করিয়া ক্রমাগত জল দিয়া বারান্দা উঠান ধুইতেছে। দেখিতে দেখিতে তাহার অধৈৰ্য্য হইল। চীৎকার করিয়া বলিল, কল বন্ধ করুন। কলটা বন্ধ করুন না ! নীরদাসুন্দরী উপরে তাকাইয়া দেখিল মনােজ কথা বলিতেছে। সুতরাং তাহাকে গ্রাহ্যই করিল না। আপন মনে কল হইতে জল লইয়া বালতি করিয়া গা ধুইতে বসিল। মনােজ আবার চীৎকার করিয়া বলিল, কলটা বন্ধ করুন না । কথা বললে গ্রাহ্য করেন না কেন? আমরা কি কারও অনুগ্রহের ওপর এখানে আছি ? ভাল চান তাে এখুনি বন্ধ করুন কল, নইলে নীচে গিয়ে বন্ধ করে আসব তখন বুঝবেন। ভাল কথা বললে শােনা হয় না, না কি ?
নীরদাসুন্দরী আর একবার আড়চোখে চাহিয়া যেন মনােজের কথা গ্রাহের মধ্যেই আনিল না। করছি বন্ধ। বলিয়া যাহা সে করিতেছিল করিতে লাগিল। মনােজের আর সহ্য হইল না। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করিয়া নীচে নামিয়া আসিয়া কল বন্ধ করিয়া দিয়া আবার উপরে চলিয়া গেল। নীরদাসুন্দরীর মাথার টনক নড়িয়া গেল। সে স্থির দৃষ্টিতে মননজের পানে তাকাইয়া তাহার কাণ্ড দেখিতে লাগিল। মনােজ কোন কথা বলিল না। কেবল কলটা বন্ধ করিয়া উপরে চলিয়া গেল, ইহাতে নীরদাসুন্দরী অগ্নিশর্মা হইয়া উঠিল। চীৎকার করিয়া বলিতে লাগিল, একবেলা বাঁদর এল আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে। আরে, তুই আমার সব ছুয়ে দিলি কেন? এত করে ঘর-দোর পরিষ্কার করছিলাম আর তুই অনাচারে এসে সব ছুয়ে দিয়ে গেলি। আস্পর্ধা তাে কম নয় তাের? দাড় তাের মুণ্ডপাত করছি। এতদিন ছিলি কোথায়, উড়ে এসে জুড়ে বসেছিস দেখছি। আমার ওপর টেক্কা দিতে কাউকে দেখিনি। এ ছোড়া দেখছি সকলকে ডিঙ্গিয়ে যায়। মনােজ উপর হইতে গম্ভীরভাবে বলিল, দেখুন কেঁচাবেন না বলছি। জলের অভাবে আমাদের কষ্ট হচ্ছে, আর আপনি এত বেশী করে জল খরচ করলে চলবে না। সব কাজের একটা সীমা আছে। আর যদি কোন দিন এমন করে নীচে কল বন্ধ করতে যেতে হয় তাহলে অনৰ্থ হবে বলে দিচ্ছি। আপনিও এমন সময় বৌদি আসিয়া তাহাকে টানিয়া লইয়া গেল। মাধবী গােলমাল ভালবাসে না। সামান্য জলের জন্য ঝগড়া করিতে চায় না সে। দেওরকে বুড়ির সঙ্গে ঝগড়া-ঝাটি করিতে নিষেধ করিল। মনােজ সেখান হইতে চলিয়া গেল বটে, তবে যাইবার সময় আর একবার নীরদাসুন্দরীকে না শাসাইয়া থাকিতে পারিল না। রাগে তাহার সর্বশরীর যেন রি রি করিতেছিল। এই হইল সূত্রপাত। সূচনা। । কিন্তু ইহাতেই ছেদ টানিল = মাধবী। পরদিন তাহারা সামনের দিকে বড় ভাড়াটিয়াদের পাশে বাসা লইল। এই ঘরখানি মাত্র তিনদিন খালি হইয়াছে। এতবড় বাড়ীতে প্রায়ই একটা না একটা ঘর খালি হয়। কিন্তু বেশীদিন তাহা খালি থাকে না। দোমহলার বাড়ীর সামনের দিকে দুইটি কল, উপরে ও নীচে। কিন্তু উপরের কলে জল সব সময় পড়ে না। নীচের কল বন্ধ না করিলে উপরের দিকে জল উঠে না। এতবড় বাড়ীতে ভাড়াটিয়ার সংখ্যা কম নয়। যাহারা নীচে থাকে তাহাদের কলতলার কষ্ট হাঙ্গামা পােয়াইতে হয় নয়। ইচ্ছামত কলের জলে স্নান করা চলে। যাহারা উপরের তলায় থাকে তাহাদিগকে নীচে নামিয়া আসিতে হয় স্নান করিতে। উপরে যে জল উঠে তাহাতে বিশেষ স্নানের সুবিধা হয় না। তবে নীচেকার কলটা বন্ধ করিলে স্নান রান্না এক রকম চলিয়া যায়। সুবিধা অসুবিধার মধ্যে নানাভাবে বাসিন্দাদের দিন কাটাইতে হয়। কাটাইবার অভ্যাস করিতেও হয়। অন্দর মহলের দিকে নীরদাসুন্দরীর প্রবল প্রতাপে অন্য সব ভাড়াটিয়ারা পাত্তা পায় না। অপরাজিতারা স্বামী-স্ত্রী থাকে। তাহাদের জলের খরচ বিশেষ নাই বলিলেই চলে। যােড়শীদেরও তাই। তাহারা অতটা গ্রাহ করে না। একটা বড় টবে করিয়া জল যাহা ধরিয়া রাখে তাহাতেই তাহাদের চলিয়া যায়। আগের দিকে দুইখানা ঘর লইয়া এক বুড়া ভদ্রলােক থাকেন। তাহার এক বিধবা বােন নীচে হইতে ক্রমাগত জল লইয়া উপরে যায়। সিডিটা তাহাদের কাছেই পড়ে। উপর-নীচে করিতে তাহার আদৌ কষ্ট হয় না। তাহা ছাড়া উপরের কল তো আছেই। সময় অসময়ে তাহাদের একরকম চলিয়া যায়। ছেলেগুলি নীচের দিকে দাপাদাপি করিয়া বেড়ায়। বাহিরের কল, ভিতরের কল, উপরের কল থাকায় যখন যেখানে খুসী তাহাতে হাত মুখ ধুইয়া লয়।
সদর দিকে বড় ভাড়াটিয়ারা আছে। বিধায়ক গিয়া তাহার পাশে জুটিল। কাছেই ভালােমাসি থাকে। এবং সম্প্রতি এক আটিষ্ট সস্ত্রীক আসিয়া জুটিয়াছে। নীচের দিকে অনেকগুলি ভাড়াটিয়া থাকে। তাহাদের খোজ খবর উপরের লােকেরা রাখে না। রাখার প্রয়ােজনও নাই। ক্রমাগত এক আসে এক যায়। অন্দর মহলের অংশটা খালি পড়ায় শশীপদ আবার সেই ঘর ভাড়ার সাইনবোের্ডটা টাঙ্গাইয়া দিয়াছে। ইহার মধ্যে জনকয়েক ভদ্রলােক আসিয়া ঘর এবং ভাড়া সম্বন্ধে দরদস্তুর করিয়া গিয়াছে। ঘর খালি হইলে শশীপদর এক কাজ হইল টু-লেটের সাইনবাের্ডটা টাঙ্গাইয়া দেওয়া এবং কোন আগন্তুক আসিলে তাহার সঙ্গে দরদস্তুর করা ও ঘর দেখান। ভাড়া আদায় করা, রসিদ দেওয়া, ঘরের দেখাশুনা, ভাড়াটিয়াদের অভাব অভিযােগের প্রতিকার করা, এইসব কাজে সে হাত দেয় না। এইসব কাজের ভার তাহার স্ত্রী মনােরমার উপর পড়িয়াছে। সে সমস্তক্ষণ বাড়ীতে থাকে, সুতরাং খবরদারী করিতে তাহার আপত্তি থাকে না। শশীপদ অন্যত্র চাকুরী করে। সকালের ঘণ্টাকয়েক এবং সন্ধ্যার দিক ছাড়া সে সব সময় বাহিরে কাটাইয়া দেয়। এতবড় বাড়ী লইয়া বাড়ীভাড়া বিষয়ে তাহার স্ত্রীর উৎসাহ না থাকিলে এ বাসা এবং এত বড় দায়িত্ব পালন করা তাহার সাধ্যাতীত। অন্দরের দিকে নীরদা- সুন্দরী এবং সদরের দিকে ভালমাসি দুইজনেই সমান। যাহাকে বলে সমগােত্রীয়। ভালমাসির ছুচিবাই না থাকিলেও জলঘাটা তাহার স্বভাব। অল্পজলে তাহার কিছুতেই কুলায় না। কলতলায় একটানা বেশীক্ষণ সময় না কাটাইলেও ঘণ্টায় ঘণ্টায় কলতলায় যাইতে দেখা যায়। মনােজ তাহার বৌদির কাছে গিয়া আস্তে আস্তে বলিল, সকাল থেকে ভালমাসির আটবার কলতলায় যাওয়া দেখলাম। এ দিকের কলতলার অধিকার ও আধিপত্য বজায় রাখিতে তাহার মাত্রাজ্ঞান কম নাই।
তাই নাকি তাহলে জব্দ করবে দেখছি। যে ভয়ে পাও তুমি
সেই দেবী আমি বলিয়া মাধবী একটা ছড়া কাটিয়া হাসিতে লাগিল।
তাহলে দুতরফে দুজনে মিলে আমাদের বাড়ীছাড়া না করে নিষ্কৃতি
দেবে না। বলিল মনােজ।
দরকার নাই ভাই। তুমি অন্য বাড়ীর ব্যবস্থা দেখ। আর ঝগড়া
ভাল লাগে না। এ দিকের সব দেখা হ’ল এবার অন্য পাড়ায় চল।
সেখানকার সব কিছু দেখতে পাওয়া যাবে। বলিল মাধবী।
ঘন ঘন বাড়ী বদলান ভাল নয়। তাতে অসুবিধা আছে অনেক।
বলিতে বলিতে মনােজ এ দিক ও দিক তাকাইয়া কি যেন একদৃষ্টে
দেখিতে লাগিল।
তাহলে জলকষ্টের কি হবে? হতাশসুরে বলিল মাধবী।
আচ্ছা এবার কলতলার ব্যবস্থার সমাধান না করে ছাড়ছি নে।
নিয়ত কল বন্ধ করুন, কল বন্ধ করুন, বলতে আর ঝগড়া করতে ভাল
লাগে না।—কিহে? মনে পড়ল এতদিনে।
না হে, না, মনে পড়ার কি আছে! বাসার নম্বরটা যে ভুলে
গিয়েছিলাম। কাল জামাইবাবু গিয়েছিলেন আমাদের ওখানে, তাই
তাঁর কাছ থেকে ঠিকানাটা পেয়ে তবে এলাম।
মাধবীর ভাই কলিকাতায় থাকিয়া এবার মেডিক্যাল কলেজে
পড়িতেছে। কাল বিধায়ক সেখানে গিয়া তাহাদের ঠিকানা দিয়া
আসিয়াছে। সেই খোজে বিরজা আজ দিদিকে দেখিতে আসিয়াছে।
বৌদি, কে এসেছে দেখাে। বলিয়া মনােজ হাত তুলিল।
কে, ও বিরজা এসেছ? এতদিন তােমাদের পাত্তাই মেলেনি।
আমরা এসেছি প্রায় মাস দুয়েক। এর মধ্যে একবার দেখা করতে
এলে না ভাই। মাকে চিঠি দিয়ে তােমাদের কথা কত লিখলাম।
যাক, এসেছ ভালই করেছ। চল, ঘরের মধ্যে চল।
বিরজা ঘরের মধ্যে গিয়া চৌকির উপর পা ঝুলাইয়া বসিয়া ঘরের
চারিদিকে নজর দিতে লাগিল। তাহার দিদি বেশ পরিপাটি করিয়া
৫০
যেখানে যে জিনিস রাখিলে মানায় সেইমত সাজাইয়া রাখিয়াছে।
ঘরখানি বেশ সাজান হইয়াছে দেখিয়া বিরজা মনে মনে খুসী
হইল।
কি দেখছ-ঘরখানা! বলিয়া মাধবী মুখে কাপড় দিল।
হ্যা, বেশ সাজিয়েছ এই কদিনে। জামাইবাবু বাড়ীর খুব প্রশংসা
করছিলেন। বললেন বাড়ীখানা খুব ভাল। অনেক চাকুরে বাবু
থাকেন। আপদে বিপদে দেখা-শােনার অভাব হবে না। তাছাড়া
এ ঘরখানারও প্রশংসা করলেন কত।
মাধবী আড়াল হইতে বিরজার পানে তাকাইয়া হাসিতে হাসিতে
বলিল, অভাব আর কি ভাই—কেবল যা অবস্ত্রের ! অর্থাৎ
জলের।
কেন, কেন ভাল লাগছে না এ ঘরখানি। জিজ্ঞাসু মুখে বিরজা
তাকাইল মাধবীর পানে।
মাধবী হাসিমুখে বলিল, এই তত বললাম, অভাব যা তা তাে
বললাম। নইলে সব ভাল। তােমার জামাইবাবুর ভাল লাগলেই
ভাল। এতে আর কথা কি ?
তােমার সব তাতেই মন্দ, দিদি। কেন জামাইবাবু তাে এ বাড়ির
ঘরের কথা পঞ্চমুখে প্রশংসা করছিলেন ওখানে। বলিয়া বিরজা
দিদির পানে কটাক্ষ হানিল।
বেশ বেশ, সেই ভাল, এখন বল তত বাড়ীর কথা, তােমাদের কথা,
অনেকদিন ওখানকার কোন খােজ খবর পাই নি।
বিরজা বসিয়া নানা কথার অবতারণা করিল। মাধবী কত প্রশ্ন
বিরজাও তাহার উত্তর একটির পর একটি করিয়া দিয়া
যাইতে লাগিল।
শেষ পর্যন্ত বিরজাকে জল খাওয়াইয়া মাধবী খুসী হইয়া বলিল,
মধ্যে মধ্যে না এলে চলবে না। মনে থাকে যেন দিদিকে।
বিরজা তাহাতে সম্মতি জানাইয়া উঠিল।
করিল।
নীচের তলায় ভীষণ ঝগড়া বাধিয়াছে শশীপদর সঙ্গে নিশানাথের
নিশানাথ কাল এখান হইতে চলিয়া যাইবে। এ বাসা তাহার পছন্দ
হইতেছে না। একখানি ঘর এবং তাহা বিশেষ অন্ধকার বলিয়া
তাহাদের যত আপত্তি।
শশীপদ বলিতেছে, ভাড়াটা মিটাইয়া না দিলে তাহাদের সে
যাইতে দিবে না। অন্ততঃ জিনিসপত্র সে ছাড়িবে না।
নিশানাথ চীৎকার করিয়া বলিতেছে, ভাড়া তাে একমাসের শুধু
বাকী, তাও ছটাকা। এ কটা টাকা না দিয়া তাহারা কলিকাতা
হইতে পলাইয়া যাইবে না। শশীপদর মত এমন চামার লােক সে
জীবনেও দেখেনি।
শশীপদ সে বিষয়ে আর বেশী কথা বলে নাই। বাকী ভাড়া
সম্বন্ধে তাহার ঐ এক কথা। ভাড়া দাও, চলিয়া যাও। বাধা দিবে না,
আপত্তি করিবে না। নইলে সে একেবারে নাচার।
বিষয়টা সামান্য কিন্তু কথায় কথায় বাড়িতে বাড়িতে তাহা ভীষণ
আকার ধরিল। শশীপদও ছাড়িবার পাত্র নয়। সে ভয় খায় না, পিছনে
তাহার স্ত্রী ক্রমাগত সাহস দিতেছে এবং ঝগড়ায় নেপথ্যে যােগান
দিতেছে।
নিশানাথের সেই এক কথা, এখন টাকা নাই। টাকা পাইলেই
সে সাধিয়া দিয়া যাইবে। সামান্য টাকার জন্য সে কলিকাতা হইতে
নিশ্চয়ই পলাইবে না।
নিশানাথকে আজ উঠিতেই হইবে। নইলে একদিনের জন্য
এখানে একমাসের ভাড়া দিতে হইবে অনর্থক। অন্যত্র সে সুবিধা
ভাড়ায় এবং বেশী আলােবাতাসযুক্ত ঘর পাইয়াছে।
শেষ পর্যন্ত যাহা মীমাংসা হইল তাহাতে তাহারা সস্ত্রীক চলিয়া
যাইতে পারিবে। তবে ঘরে যাহা কিছু আছে তাহা তালাবদ্ধ
অবস্থায় থাকিবে। ভাড়া মিটাইয়া দিলেই সে তাহার জিনিসপত্র
দরজা খুলিয়া লইয়া যাইতে পারিবে। ইহার জন্য তাহাকে সে কয়
অন্য দিনের ভাড়া মাপ করিয়া দিবে। তবে বেশী দেরী যেন না হয়। কোন ভাড়াটিয়ার এ ঘর দেখিয়া যাইবার কথা আছে। নিশানাথ কোন মতে শশীপদকে আঁটিয়া উঠিতে পারিল না। বিশেষ করিয়া তাহার স্ত্রীকে। সে যেমন এক-রােখা তেমনি ঝগড়াটে ও জেদী। মহিলা হইয়াও স্বামীর আড়ালে সেই-ই এতক্ষণ ঝগড়া করিয়াছে নিশানাথের সঙ্গে। তাহার কথা বলার ধরণ, আইনমাফিক উক্তির যুক্তিতে সে হতভম্ব হইয়া গিয়াছে। এই সব যুক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ প্রয়ােগ করিতে হইলে তাহাকে আইন শিখিয়া আসিতে হইবে। নইলে এই বাড়ীওয়ালীকে হারাইয়া দেওয়া তাহার পক্ষে সহজ কথা নয়। নিশানাথ আর কোন কথা না বলিয়া রাগে গজ গজ করিতে করিতে চলিয়া গেল। বাড়ীওয়ালা বনাম ভাড়াটিয়ার যুদ্ধে শশীপদর যে জয় লাভ হইল তাহা কেবল তাহার স্ত্রীর জন্যই। শশীপদর সাধ্য নাই অমন ভাড়া- টিয়াকে চাল মারিয়া টাকা আদায় করে। অবশ্য শশীপদও একথা স্বীকার করিয়া লইল। তাই বার কয়েক শুনাইয়া দিয়া তাহার স্ত্রী হাসিতে হাসিতে ভিতরে চলিয়া গেল। তাহারা সদর অন্দরের মধ্যেকার দুইখানা ঘর লইয়া প্রবল প্রতাপে সমস্ত বাড়ীখানার আধিপত্য করিয়া চলিয়াছে। এক বৃদ্ধ- দম্পতি শশীপদকে বাড়ীখানার বন্দোবস্ত করিয়া দিয়া কাশীধামে বাস করিতেছেন। শশীপদ মাসে মাসে সেখানে টাকা পাঠাইয়া, কচিৎ কখন চিঠিপত্রাদি দিয়া বাড়ীর ও তাহাদের সংবাদ পাঠায়। শশীপদর স্ত্রী মাসে মাসে ভাড়া আদায় করে প্রত্যেক তরফের গৃহিনীর মারফৎ। সব ঘরে তাহার অবাধ গতি। সর্বদা নিজের পছন্দ মত ও অনুগত ভাড়াটিয়াদের খোঁজ খবর রাখে। দল বাঁধে, দল ভাঙ্গে। অবস্থান্তর ঘটিলে তাহাদের তাড়াইয়া দেয় চক্রান্ত করিয়া। ঝগড়া করিয়াও কয়েকজনকে তাড়াইয়াছে বলিয়া তাহার একটা বদনাম আছে। আর অপত্য স্নেহ নির্বিশেষে ছেলে মেয়েদের শাসন করে, প্রহার করে।
পয়লা তারিখে নিশানাথ সস্ত্রীক বাসা ছাড়িল হাঙ্গামা কিছু
রহিল না। একখানি রিক্সা ডাকিয়া তাহাতে উঠিয়া বসিল। আগে
পিছু তাকাইবার ভাবনা নাই, ছেলেপিলের হাঙ্গামা নাই, লগেজেরও
ঝাট নাই। একটা বিছানার বাণ্ডিল ও ছােট একটা পোটলা
লইয়া তাহারা বাসা বদল করিল।
রিকসায় উঠিয়া নিশানাথ স্ত্রীকে বলিল, যাক, এবারকার বাসা
বদলের নূতনত্ব আছে।
সে আর বলতে। গিন্নীর কল্যাণে তা অনেক দিন মনে থাকবে।
বলিয়া নিশানাথের স্ত্রী নিশ্বাস ছাড়িল।
নিশ্চয়ই।
কিন্তু একটা কথা, ঘরের জিনিসের হাত পা গজাবে না তাে?
বিশ্বাস নাই। চাবিটা আছে কাছে, দয়া করে আর সেটা চেয়ে
রাখে নি। এই ভাল।
অমন গিন্নীর খুরে প্রণাম জানিয়ে চললাম।
অমন বাড়ীওয়ালী যদি হতে পার তা হলে চল একটা বাড়ী লিজ
নিয়ে চেষ্টা করে দেখি কতদূর গড়ায়।
কতদূর গড়ায়। আর কতদূর কি করতে পারা
যায়। নইলে এভাবে চলে না আর।
থাক খুব হয়েছে। অমন বাড়ীওয়ালী সেজে আর দরকার নাই।
এই ঢের। তবু যদি মাগীর নিজের বাড়ী হ’ত।
রিকসাওয়ালা ডাণ্ডা দুইটি ধরিয়া একটু উপরে বুকের কাছে
তুলিল। তারপর সজোরে একটা টান দিয়া, বার কয়েক হাতের
ঘটিটা বাজাইয়া চলিতে লাগিল।
পিছনের সমস্ত মায়া এক নিমিষে ত্যাগ করিয়া এই দম্পতি হর্ষ
বিষাদে মগ্ন হইয়া রহিল।
লােক তাহাতে অল্পই চলে। রিকসায় চড়িয়া
তাহারা ভবিষ্যৎ ঘরের কথাই ভাবিতে লাগিল।
ক্ষুদ্র গলি।
সাত মাধবীর ভাই বিরজা দিন কয়েক হইতে ঘন ঘন যাতায়াত করিতে সুরু করিয়াছে। কথাটা বাড়ীময় রাষ্ট্র হইতে আর বাকী রহিল না। পিছনে ইতিহাস একটা না থাকিলে কথা উঠে না এবং তাহা লইয়া কানা ঘুসা চলে না। বিধায়ক জানে ব্যাপারটা। তবে সেটা যে এমন গভীর হইয়া উঠিয়াছে তাহা ভাবিতে পারে নাই। চপলা প্রফুল্লবাবুর মেয়ে। অতি সাধারণ ঘরের লােক। তাহার সহিত বিরজার বিবাহ তাহার শ্বশুরমহাশয় দিবেন সে সম্ভাবনার ইঙ্গিতও কাহাকে দিতে পারে না। তাহার কাছে বিরজার বিবাহের প্রস্তাব তুলিলে তিনি এমন দাবী করিয়া বসিবেন যে তাহা মিটান সাধ্য হইবে না প্রফুল্লবাবুর। সামান্য মাহিনার কেরাণী। কি সামর্থ্য আছে তাহার। তাহার পক্ষে এ কথা চিন্তার বিষয়। সুতরাং বাজে কাজে হাত দিতে তাহার ইচ্ছা নাই। হয় আরও ভাল। মাধবীর এ বিষয়ে দৃঢ় ধারণা, তাহার বাপ মায়ের সম্মতি আদায় নিশ্চয়ই সে করিবে। চপলা মেয়ে যেমন শান্ত তেমনি বুদ্ধিমতি। তাহা ছাড়া সে পরমা সুন্দরী। এদিকে তাহার ভাইয়েরও সম্পূর্ণ মত আছে। উপযুক্ত ছেলের উপর কর্তৃত্ব করা বাবার অন্যায়। বিরজা সন্ধ্যার সময় আসিত। এখন সকাল সন্ধ্যায় দুইবার করিয়া আসে। দিদির খোঁজ খবর রাখা তােত দরকার। চপলার সহিত যখন প্রথম আলাপ হয় তখন দুইজনের মন জানা- জানির প্রশ্ন কাহারও মনে উঠে নাই। সুতরাং চপলা তাহাকে প্রথম হইতে মােটেই লজ্জা করিত না। বিরজা হাসিয়া ডাকিত, চপলায়তন। তাস খেলায় সে ওস্তাদ। মাধবীরও তাস খেলার সখ আছে।
সে তাহার ভাই, চপলা ও দেওরকে লইয়া খেলিতে বসিত। দেওরকে পাইলে অপরাজিতাকে ডাকিত। অপরাহের কাজ সারিয়া মাধবী যখন উপরে উঠিবার উপক্রম করিতেছে এমন সময় বিরজার সাক্ষাৎ মিলিল। মাধবী হাসিতে হাসিতে বলিয়া উঠিল, এখুনি তাের কথাই হচ্ছিল। চপলাকে ডাকি, কি বলিস? আজ এক হাত খেলা যাক্। তােমার রান্নাবান্না সব শেষ? নিশ্চয়ই। খেলবি ? ডাকবাে সবাইকে। কাজ আছে ? ডাকো না তােমার চপলায়তনকে। আজ তাকে কঁদাবাে। আজ আর তােমরা বাজী পাবে না দেখাে। তাের চপলায়তনকেই ডেকে আনি। কে বাজী না পায় দেখি ? বলিয়া কটাক্ষ করিয়া মাধবী উপরে উঠিল। পিছনে বিরজা। চপলা আসিল। মাধবীর দেওর মনােজ আসিল। না আসিলে বৌদির কাছে তাহার দুর্গতির একশেষ হইবে। খেলা চলিতে লাগিল। কোলাহলের অন্ত নাই। ঘর ফাটিয়া হাসির রােল উঠিতেছে। এবং প্রতি মুহুর্তে দুইদিক হইতে তীব্র তীক্ষ্ণ বাণ ভাবী দম্পতির উপর চলিতে লাগিল। এক বাজী হারিয়া বিরজা উঠিয়া পড়িল। তাহার পড়াশুনা আছে। আর না। বলিয়া কটাক্ষে চপলার পানে তাকাইল। চপলা ও মাধবী একদিকে বসে। মধ্যে মধ্যে সয়তানি করিয়া মাধবী চপলাকে বিরজার সঙ্গে খেলিতে বসায়। দুষ্টামী বুদ্ধিতে মাধবী কম নয়। বলে, সঙ্গী নাও। সঙ্গী নিয়ে খেল। জীবন- খেলায় খেলতে গেলে এখন থেকে মক্স করে নাও। বিরজা আপত্তি করে না। বেশ খেলিতে থাকে। থাকে তখন কম। লজ্জানত অবস্থায় এই দুই সুকুমার তরলমতি বেশ খেলিয়া চলে। কিন্তু চপলা ও তাহার দিদির বিপক্ষে বসিলে বিরজার উৎসাহ ও উত্তেজনা অতিরিক্ত বাড়িয়া যায়। তবে উত্তেজনা
খেলা শেষ করিয়া মাধবী একটা কাজের অছিলায় দেওরকে
বাহিরে পাঠাইয়া দিয়া নিজে নীচে নামে। যাইবার সময় চপলাকে
বিরজার জিম্মায় রাখিয়া বলে, দেখিস যেন চপল না পালায়।
এই আসছি।
পালালে আমি আর কি করব। ধরে রাখব কি। ওকি আমার
কথা শুনবে না শােনে।
খুব শুনবে। • এসে যদি দেখি পালিয়েছে তাে দুজনের মাথা
ঠুকে দোব। বুঝলে বিরজায়তন ?
আমার অপরাধ ।
বলব, আটকাতে পার নি কেন? আচ্ছা আসি। বস দুজনে
ততক্ষণ। গল্প করতে থাক না কেন বসে বসে।
মিনিট দশেক পরে যখন মাধবী ফিরিল, দেখিল চপলা লজ্জায়
দেওয়ালে ঠেশ দিয়া দাড়াইয়া আছে। আর বিরজা দরজার কাছে
পথ আগলাইয়া তাহার পানে তীব্র দৃষ্টিপাত করিয়া রহিয়াছে।
পাহারাওয়ালা। অবাধ্য পথযাত্রীকে কিছুতেই সে সংযত করিতে
পারিতেছে না।
দুইজনের ব্যবধান অনেকখানি।
এই অবস্থা দেখিয়া মাধবী হাসিয়া বাঁচে না। দুইটি ছেলে
মানুষকে লইয়া যে খেলা খেলিতে বসিয়াছে তাহা সত্যই লীলাচপল।
দুই জনে বিপরীত মুখী হইয়া তৃতীয় জনের অপেক্ষায় দাড়াইয়া
আছে। নির্বাক। স্থির। কিন্তু দুইজনের অন্তরে যে ঝড়ের মাতন
তখন শুরু হইয়াছে তাহার সংবাদ কে রাখে!
সুচতুরা মাধবীর জানিতে কিছুই বাকী রহিল না। হাসিয়া
উঠিয়া বলিল, আ মর! কি সৃষ্টি ছাড়া দাড়ানাের ভঙ্গিমা তােরা
শিখেছিস? বলিয়া দুইজনকে টানিবার চেষ্টা করিল।
যেন
ভালমাসি কখন যে অপরাজিতার ঘরে ঢুকিয়া ইজি চেয়ারে আরাম
করিয়া বসিয়া আছে অপরাজিতা তাহা লক্ষ্য করে নাই। নজর
পড়িতে সে কাছে গিয়া দাড়াইল।
ভালমাসি তাহার কানের কাছে মুখ রাখিয়া ফিস ফিস করিয়া কি
বলিল, অপরাজিতা তাহা বুঝিতে পারিল না। জিজ্ঞাসু মুখে হাঁ
করিয়া তাহার পানে তাকাইয়া রহিল।
ভালমাসি কথাটাকে আরও রহস্যময় করিয়া আরম্ভ করিল,
বুঝলে না, অত মেলামেশা কি ভাল? সােমত্ত বয়েস।
অপরাজিতার ভয় হইল। তাহার সম্বন্ধে ভালমাসি কটাক্ষপাত
করিতেছে না তাে? ভয়বিহ্বল বক্ষে আরও কাছে গিয়া সে জিজ্ঞাসা
করিল, কার কথা বলছ ভালমাসি?
এই সব সােমত্ত ছেলে মেয়েদের কথা। এই সব তাদের
মাখামাখি কথা?
কাদের ?
বড় ভাড়াটেদের অচলার কথা।
কেন সে কি করল ? বলিয়া ফেলিয়া অপরাজিতা মনে মনে
একটা অনুমান করিয়া লইল।
বাইরের ছেলের সঙ্গে অত মেলামেশা কি ভাল? বিয়ে যদি হয়,
তারপর মিশলে কেউ কথাটি পর্যন্ত বলবে না। আমরা সেকেলে
লোেক। ও সব কি আমরা চোখে দেখে চুপ করে থাকতে পারি। না
থাকা যায়।
তা যােক ভালমাসি, যদি অমন ছেলে ওর ভাগ্যে জোটে তাে
জুটে যাক। বাধা দিও না। আমার তাে বাপু ভাল বই খারাপ কিছু
লাগে না। মেশালে ও এসে মিশবে কেন? অমন ছেলের
নাগাল পাওয়া শক্ত।
অপরাজিতার কথাগুলি ভালমাসির ভাল লাগিল না। এ বাড়ীতে
কাহারও কাছে সে আমল পায় না। বাড়ীওয়ালী গিন্নী তাহার উপর
খড়গ হস্ত। সেও তাহাকে গ্রাহ্য করে না। বলে, ভাড়া দিই, কথার
ধার রাখব কেন তার। কিন্তু এত বড় বাড়ীর কাহারও কাছে তাহার
মনের কথা বলিবার ও শােনাইবার লােক না পাওয়াতেই বড়
অস্বস্তি বােধ করে ভালমাসি। অপরাজিতা ও মাধবী কিছুটা শশানে
তাহার কথা। কিন্তু চপলা-বিরজার ব্যাপারে দুইজনেই যেন
একমত।
দ্বিরুক্তি না করিয়া আপন মনে গজ গজ করিতে করিতে ভালমাসি
অগত্যা বাড়ীওয়ালী গিন্নীর কাছেই চলিল। যদি ইহাদের ব্যাপারে
কেহ বাধা দিতে পারে তত সেই একজনই আছে।
অপরাজিতা বার কয়েক বসিবার অনুরােধ করিয়াও কোন ফল
পাইল না! ভালমাসি চলিয়া গেল।
বাড়ীওয়ালী গিন্নী ঘরে বসিয়া ছােট ছেলের কথা সেলাই
করিতেছিল। ঘর নির্জন। ভালমাসি ঘরে ঢুকিবে কি না ভাবিতেছিল,
হঠাৎ অপ্রত্যাশিত ভাবে গিন্নীর সাদর সম্ভাষণে বড়ই খুসী হইয়া
সে ভিতরে পা দিল।
এই তাহাদের প্রথম সম্ভাষণ। ভালমাসি এতটা ভাবিতে পারে
মধ্যে কিছুদিন উভয়ের মধ্যে বাক্যালাপ ছিল না। সুতরাং
সাহস পাইয়া সে একেবারে তাহার কাছে গা দিয়া বসিল। এক গাল
হাসিয়া বলিল, দিদি, সময় বড় পাই না, তাই এ দিকে বড় আসা হয়
আমার। আছ কেমন ?
বােস বোস। আসন দিই। বলিল মনােরমা।
মেঝের উপর বসিয়া তাহার কানের কাছে মুখ লইয়া ফিস ফিস
করিয়া আরম্ভ করিল, তােমাকে বলব না তাে কাকে বলব ? এর যদি
প্রতিকার করতে কেউ পারে তত সে তুমিই।
কি, কথা কি দিদি ?
ওই সােমত্ত ছেলে মেয়ের কথা।
কে, কি হলাে কি?
ও সব তাে ভাল নয়। আর বাপ-মাই বা চুপ করে এ সব দেখে
নাই।
কেন? যেমন দিদি তার তেমনি ভাই। লজ্জা কি এদের কারও
আছে এক বিন্দু।
বাড়ীওয়ালী গিন্নীর আর বুঝিতে বাকি রহিল না। ভালমাসিকে
সমর্থন করিয়া সেও বলিতে আরম্ভ করিল, সত্যি, আমিও দিন কয়েক
থেকে লক্ষ্য করছি, এদের বড় বাড়াবাড়ি আরম্ভ হয়েছে। অসহ।
ঐ ঘরখানা হয়েছে যেন প্রজাপতির আফিস।
তাই দেখ না দিদি? ও সব আমাদের চোখে বড় লাগে। তাই
আমার বলতে আসা তােমার কাছে। বিশেষ করে এক জায়গায়
থেকে এসব বেল্লিপনা আর কত চোখে দেখে চুপ করে থাকব।
আচ্ছা, আমি এর ব্যবস্থা করছি। ও সব আমার বাড়ীতে চলবে
না। সব তাড়াব।
সেইজন্যেই ত শেষে তােমাকে বলা। যদি কেউ এর ব্যবস্থা
করতে পারে সে এক তুমিই। আর কেউ নয়। এ বাড়ীতে কি কেউ
মানুষ আছে। সব যে ধিঙ্গি। বেহায়া। বেহায়ার একশেষ।
সবশেষে অন্য কথা আসিয়া একে একে জুটিল। ভালমাসির
অনেক কথাই এমন আশ্চর্য লাগিল যাহা তাহার শুনিবার কোন
সম্ভাবনা ছিল না। উভয়ের মধ্যে যে বিশেষ মনের মিল আছে
তাহাও নয়। উভয়ে উভয়ের হিতাকাক্ষী যে নয় একথা এ বাড়ীর
কাহারও বুঝিতে বাকী নাই।
ভালমাসি চলিয়া গেল। গিল্পী তাহার ছেলের কথা সেলাই
করিতে লাগিল। এত বড় বাড়ী লিজ লইয়া তাহার উপর দিয়া
নিয়তই যেন ঝড় বহিয়া যাইতেছে। কোথায় কোন ভাড়াটে কি
করিতেছে, তাহার খােজ খবর রাখা চাই। খবরদারিতে হুসিয়ার
থাকিতে হয় সব সময়। নইলে এত বড় বাড়ী শাসনে রাখা যায় না।
সকল ভাড়াটিয়ার অভাব অভিযােগ লক্ষ্য রাখিতে হয়। অবিলম্বে
সে সব প্রতিকার না করিলে, সুব্যবস্থার বিহিত না করিলে তাহারা
চলিয়া যাইতে পারে। সুতরাং ব্যবসায়ে লােকসান না রাখিবার
৬
জন্য এই সব ব্যবস্থার দরকার অনিবাৰ্য হইয়া পড়ে। এবং এই সব করিতে গিয়া কর্তৃত্ব আসিয়া যায়। এত বড় বাড়ী একা শাসনে রাখিতে যে সামর্থ্যের দরকার তাহা তাহার আছে। স্বামীর উপর ভরসা করিলে চলে না। এবং তাহারও যে সময় কম। কাজেই তাহার সব বিষয়ে লক্ষ্য না রাখিলে চলে না। ঝড়ঝাপটা তাহার গায়ে লাগিলেও, একটা কর্তৃত্বের মােহ তাহাকে সব ভুলাইয়া দিয়াছে। এইসব ধরণের নানা কথা ভাবিতে ভাবিতে মনােরমার মন আনন্দে গর্বে ফুলিয়া উঠিতে লাগিল। সন্ধ্যা কখন হইয়াছে। ভালমাসি হাতের রান্না শেষ করিয়া ছেলের অপেক্ষায় বসিয়া আছে। এত দেরী সে কখনও করে না। বরাবর অফিস হইতে বাসায় চলিয়া আসে। তাহার দেরী হওয়ায় ভালমাসির উৎকণ্ঠার সীমা নাই। সমস্ত দিন উপবাসের পর সন্ধ্যার দিকে শরীরটা ঝিমাইয়া আসে। চুপ করিয়া বসিয়া থাকা যায় না। ছেলের অনর্থক দেরী হওয়ায় সে মনে মনে চটিয়া উঠিয়াছে। শুইয়া পড়িতে চায়। কিন্তু ছেলেকে না খাওয়াইয়া, কাজ কর্ম না চুকাইয়া শশাওয়াও যায় না। একবার শুইলে আর উঠিতে ইচ্ছা করে না। তাই আঁচল পাতিয়া মেঝের উপর শুইয়া গড়াইবার আয়ােজন করিতেই পরেশ আসিয়া ঘরে ঢুকিল। ভালমাসির মুখ ভাল নয়। কিছুই মুখে আটকায় না। বিধবা হওয়ার পর হইতে চুচিবাই ও মেজাজের তীক্ষ্ণতা গিয়াছে বাড়িয়া। ছেলেকে অকথ্য ভাষায় গালি দিতে লাগিল। মা মলে শান্তি পাস্! কোথায় এত রাত পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিস? আজ একাদশী না ? সে সব খেয়াল কি আছে। কোথায় গিয়েছিলি? আজ ব্ল্যাক-আউটের মহড়া দিচ্ছিল কি না, তাই সন্ধ্যার দিকে কার্জন পার্কে বসেছিলাম। সাতটা বাজতেই হঠাৎ রাস্তার, বাড়ীর আলােগুলাে সব একে একে নিভে গেল। রাস্তা বাড়ী সব অন্ধকার। কোলাহল-৫ এই আলােকীর্ণ রাস্তা এক নিমেষে অন্ধকার ঘুটঘুটে হয়ে গেল। সে এক চমৎকার দৃশ্য। সব অন্ধকার তাে এ দিকের গলিতে হয় নাই। কিন্তু ও দিকে সব হয়েছিল। ব্ল্যাক-আউটের মহড়া খুব ভালই লাগল। সব অন্ধকার হতেই চৌরঙ্গি রাস্তা ধরে চিত্তরঞ্জন এভেনিউ দিয়ে যখন রাস্তার মধ্যে দিয়ে আসছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল অন্ধকার পাতাল পুরীতে আমি যেন এগিয়ে চলেছি। যানবাহন সব বন্ধ। ভয় নাই। রাস্তা শূন্য। বেশ লাগছিল মা। তা কি হবে এতে? সব অন্ধকার করে সব অন্ধকার করে কি করতে চায় ওরা ? রাত্রে যদি জাপানীরা বােম ফেলতে আসে তাহলে এই সহর অন্ধকার করে তাদের জানতে দেবে না কোথায় সহর! সব অন্ধকার। কিছুই দেখতে পাবে না। এই রকম অন্ধকার করাকেই বলে ব্ল্যাক- আউট। এই তাে সবে আরম্ভ। এর পর কথায় কথায়, যে কোন সময় রাত্রে দিনে কত কি সব করবে দেখাে । যাক দেখতে দেখতে কতই না হ’ল। যা হয় হােক গে। মুখ- পােড়ারা যা খুসী তাই করুক। আলাে নিবিয়ে সব ভূত সাজাক গে ! এ তাে আমাদের ভালর জন্যেই। দেখােনা কি হয় শেষ পর্যন্ত। ও দিকে জাপানীরা যে রকম তােড় জোড় করে এগিয়ে আসছে তাতে তারা এলাে বলে। আসুক গে। চল, খাবি চল। যত সব অনাসৃষ্টি কাণ্ড। এ আর দেখতে ভাল লাগে না। কালে কালে কতই না হবে। এখন কি দেখছ মা। যখন বােমা পড়বে তখন বুঝবে ব্যাপার কি! এই তো সবে সন্ধ্যা হ’ল ! এরােপ্লেনগুলি সার বাঁধিয়া চলিয়াছে আকাশের উপরে। মেঘের টুকরাগুলি যেন বিন্যস্ত হইয়া ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। দেখিতে দেখিতে তাহারা দুরে-বহুদূরে চলিয়া গেল।
অপরাজিতা বলিল, আজ সকালে কি হ’ল শুনিস নি? গড়ের মাঠে এরােপ্লেনের মহড়া হয়ে গেল। ওপর থেকে একটার পর একটা এরােপ্লেন এসে নীচেকার সাজান কৃত্রিম ঘরগুলিতে আগুনে বােমা ফেলে চলে গেল। দেখতে দেখতে তাতে ধরে গেল আগুন। একদল লােক ছিল কাছেই প্রস্তুত হয়ে। তারা ছুটে গিয়ে জ্বলন্ত ঘরের ভেতর থেকে কজন লােককে স্ট্রেচারে করে নিয়ে এসে এ্যাম্বুলেন্স গাড়ীতে করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলে। আর একদল তারা জল দিয়ে আগুন নেভাতে লাগল। এই সব কত কি মহড়া। আচ্ছা মাসি, কেন এসব হচ্ছে? বলিয়া উঠে চপলা। ওলাে জানিস নে। যদি এখানে বােমা পড়ে, তাহলে লােক- গুলােকে বাঁচাতে গেলে কি কি করতে হবে এ তারই মহড়া। এখন যদি এই সব প্র্যাকটিশ না করায়, তবে বিপদের সময় কি করে সাহায্য করবে। লােক মরে একসার হবে যে। হাঁ মাসি, বােমা কি সত্যিই পড়বে? সম্ভাবনা তাে আছেই। নইলে অত তাড়াহুড়া কেন? এই সব ব্ল্যাক-আউট, সাইরেন, সন্ধ্যা হতে দোকান অফিস বন্ধ করা, রাস্তার আলাে নিভিয়ে দেওয়া কেন ? অপরাজিতা খবরের কাগজ পড়ে। তাহার স্বামী দোকানে একখানি করিয়া বসুমতী রাখেন। সন্ধ্যার পর বাড়ী ফিরিবার সময় সেইখানি হাতে করিয়া ফেরেন। অপরাজিতা পর দিন দুপুরে সমস্ত কাজ কর্ম সারিয়া পড়িতে বসে এবং বাড়ীর মেয়েদের নূতন কিছু থাকিলে জানাইয়া দেয় । ভালমাসি ইজিচেয়ারে বসিবার লােভে রােজই একবার করিয়া অপরাজিতার খোঁজ সইতে আসে। সেই সময় নূতন কিছু সংবাদ থাকিলে শুনিয়া লয়। সম্প্রতি ইউরােপে যুদ্ধ বাধিয়াছে। এখানকার জিনিসপত্রের দর নিত্য চড়িয়া যাইতেছে। জাপানীদের যুদ্ধের তােড়জোড় এবং ক্রমশঃ ** ভারতের দিকে তাহাদের লােলুপ আগ্রহ থাকায় ভয় সেইখানে। সঙ্গে সঙ্গে নিত্য নূতন সংবাদের গুরুত্ব ও আগ্রহ বাড়িয়াছে। পুরুষদের সঙ্গে সঙ্গে মহিলারাও এখন এ বিষয়ে উৎসুক। চপলা আসিয়াছিল একখানি ভাল শাড়ীর জন্য। মাধবী মাসিমারা থিয়েটার দেখিতে যাইবে সেই সঙ্গে তাহাকেও যাইতে হইবে। সুতরাং ভাল একখানা শাড়ী না পড়িয়া যাইতে তাহার যেন লজ্জা করে। অস্ফুটে সে কথার ইঙ্গিত করিতেই অপরাজিতা হাসিয়া উঠিল। গালে একটা ঠোনা মারিয়া বলিল, শুধু কাপড়ে কি হবে, আয় তোকে সাজিয়ে দিই। বলিয়া চপলাকে কাছে টানিয়া বসাইল। অপরাজিতা মনের মত করিয়া সাজাইতে বসিয়াছে চপলাকে। নিজের দামী শাড়ী ও গহনাগুলি পরাইয়া অচলাকে সে অপরূপা করিয়া তুলিল। চপলা আয়নার সামনে দাড়াইয়া নিজেকে দেখিয়া খুসী হইয়া উঠিল। অপরাজিতা আসিয়া তাহার গালে আঙ্গুল দিয়া বলিল, তাের মত আর একজনও খুব খুসী হবে। লজ্জায় রাঙ্গা হইয়া চপলা চলিয়া গেল। নবেন্দু ও ষােড়শীর কথা কিছুক্ষণ আগে অপরাজিতার মনে বাসা বাঁধিয়া ছিল। চপলা আসায় তাহার ছেদ পড়ে। এখন চপলা চলিয়া যাওয়ায় আবার এই দম্পতির কথা তাহার মনের মধ্যে ভাসিয়া বেড়াইতে লাগিল। ৬৮ আট ভবানীপুরের একটা ক্লাবে নবেন্দু সভাপতিত্ব করিয়া বড় একটা ফুলের মালা হাতে লইয়া বাসায় ফিরিল। মালাটি বড় বড় লাল গােলাপ ফুলে সাজান। মধ্যে মধ্যে দুই চারিটি জঙ্গলি ফুলে তাহার কোল ভরাইয়া দিয়াছে। মালাটি সত্যই দেখিতে বড় সুন্দর হইয়াছে। নবেন্দু ঘরে আসিয়া নিজের বড় ফটোতে তাহা ঝুলাইয়া দিল। ঘােড়শী ঘরে ছিল না। বােধ হয় ও ঘরে বসিয়া কি করিতেছিল। নবেন্দুর ডাকিতে লজ্জা করিল। দুই চারিবার জোরে জোরে গলা ঝাড়িয়া বিছানায় গা-টা একবার গড়াইয়া লইল। শুইয়া শুইয়া তাহার মনে পড়িল, ক্লাবের বিরাট জনতা, তাহার অপূর্ব বক্তৃতা এবং সম্বৰ্ধনা। এতবড় সম্মান সে এর আগে কখনও পায় নাই। বহুস্থানে তাহাকে সভাপতিত্ব করিতে হইয়াছে। বহু ফুলের মালা তাহার গলায় পড়াইয়া দিয়াছে, কিন্তু আজিকার কথা তাহার ভুলিবার নয়। নিজের ফটোয় তাহার মালাটি ঝুলিতেছে। দেখিতে দেখিতে তাহার অনেক কথাই মনে হইল। তাহার পাশেই স্ত্রীর ফটো। মনে হইল একবার সেই ছবিতে তাহার মালাটি ঝুলাইয়া দিয়া, স্ত্রীর সামনে দেখাইয়া বড় করিবে। কিন্তু উঠিয়া যাইতেই তাহার মনটা হঠাৎ দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল, নাঃ, ঠিক আছে। ও ফুলের মালা ওর গলায় মানায় না। অপদার্থ, অশিক্ষিতা, পেঁয়াে-সমস্ত জীবনটাই তাহার বিষময় করিয়া তুলিতেছে। সে কেবল চায় অর্থ। সম্মান, যশ ও খ্যাতির ধার দিয়াও সে যায় না। ভালবাসা বলিয়া কোন কিছু তাহার বুকে দানা বাঁধিয়া উঠে নাই। বােকা—প্রেমের এতবড় অবাঞ্ছিত মূর্তি দুনিয়ায় আর নাই। মূখ, মূখ! বলিয়া নবেন্দু পাশ ফিরিয়া শুইল। পরক্ষণেই তাহার মনে পড়িল অপরাজিতাকে। শিক্ষিতা, মার্জিতরুচি, শ্ৰীসম্পন্ন, আধুনিক অপরাজিতাকে। শুইয়া শুইয়া সে তাহাকেই কল্পনা করিতে লাগিল। কোন এক সময়ে যােড়শী ঘরে আসিয়া ঢুকিয়াছে। বিছানায় ও ভাবে স্বামীকে শুইয়া থাকিতে দেখিয়া সে কাছে গিয়া বসিল। অথচ নবেন্দু জাগিয়া থাকিয়াও তাহাকে লক্ষ্য করিল না। যােড়শী গায়ে হাত দিয়া বলিল, এ সময়ে শুয়ে আছ যে। কাকার আজ আসবার কথা ছিল। ষ্টেসনেও গেলে না যে বড়। তােমার ঐ বড় দোষ। কাকা বড় চাকরী করেন। তাকে ধরলে একটা ভাল চাকরী মিলে যেতেও তাে পারে। তা নয়, যত সব বাজে ঐ সব নিয়ে থাক। সেই জন্যেই তাে বাবা মা তােমার ওপর কত রাগ করেন। টাকা রােজগার না করলে সংসার চলবে কি করে ? নবেন্দু কোন কথা বলিল না। হাত দিয়া ইসারায় তাহাকে সরিয়া যাইতে বলিল। যােড়শীর কথা তাহার স্বামী গ্রাহের মধ্যে আনিল না দেখিয়া তাহার সমস্ত রাগ গিয়া পড়িল তাহারই উপর। পটুপ করিয়া অকথ্য ভাষায় যা খুসী বলিয়া চলিল। বলিল, তাহার সব কিছু সঞ্চয় শেষ হতে বসেছে। এমন করে সংসার আর চলে না। না শুনবে কারও কথা। শুধু ঐ সবে কি সংসার চলে। যত সব অনাসৃষ্টি কাজ। সময় নষ্ট। অভিমানে দুঃখে নবেন্দুর চোখ ফাটিয়া জল আসিবার উপক্রম হইল। আজ এত বড় সম্মান সে নগরবাসীর কাছ হইতে পাইয়াও এই অন্দরবাসীর কাছে তাহা যেন ভাঙ্গিয়া খান খান হইয়া গেল। এত বড় সম্মান যে কেহ দেখাইতে পারে তাহা তাহার ধারণার অতীত। এত বড় মুখরা স্ত্রী তাহার জীবনে যে কি পাষাণ ভার চাপাইয়াছে তাহা কল্পনা করিতেও কষ্ট হয়। এক মুহুর্তে বিষাদক্লিষ্ট হইয়া সে মুসড়াইয়া পড়িল। সাড়া শব্দ দিল না। ইহাতে যােড়শীর রাগ আরও বাড়িয়া গেল। তাহার এই মূল্যবান কথাগুলি যে শূন্যে মিলাইয়া গেল, এই দুঃখে সে আরও কঠিন হইয়া উঠিল। কর্কশ কণ্ঠে বলিয়া বসিল, আজ অপরাজিতাদিদি দশ টাকা দিলে যে কি হত তা ভাবতে পার কি? ভাল কথা বললে গায়ে মাখা হয় না। অত আর ভালও লাগে না। আমাকে বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দাও। তারপর যা খুসী কর বলতে আসব না আর। বলিয়া যােড়শী রাগ করিয়া ঘর ছাড়িয়া চলিয়া গেল। নবেন্দুর মনে ঝড় উঠিয়াছে। সেই সঙ্গে বৃষ্টি নামাইয়া এক প্রলয়ের সৃষ্টি করিতে পারে বলিয়া আশঙ্কা দেখা দিয়াছে। অনর্থক এই লইয়া ঝগড়া ঝাটি করিতে আর ভাল লাগে না। তাহার মুখ অজ্ঞ স্ত্রীকে লইয়া সে আর পারে না। তাহার যাহা খুসী হয় করুক। সে কিছু বলিবে না। ভাবিয়া বিছানা হইতে উঠিয়া বসিল। টক- টকে লাল গােলাপ ফুলের মালার দিকে একবার সতৃষ্ণ নয়নে চাহিয়া জামা গায়ে জড়াইয়া অবনত শুষ্ক মুখে নবেন্দু বাহির হইয়া গেল। সেদিনকার দেখা থিয়েটার প্রসঙ্গে বিরজা ও মননজের মধ্যে ভীষণ তর্ক বাধিয়া গিয়াছে। মাধবী আর চপলা নির্বাক হইয়া থিয়েটার প্রসঙ্গ শুনিতেছিল। যােড়শী পাশে আসিয়া দাড়াইল। মাধবী বলিল, কি হ’ল মুখ ভার কেন? বরের হাতের টকটকে লাল গােলাপ ফুলের মালা নিয়ে পছন্দ হ’ল না ? না ভাল লাগে আমাকে দিয়ে যাও কাজে লাগাব, বলিয়া একবার বিরজা ও চপলার পানে তাকাইল। মধুর সে হাসি। চপলা লজ্জা পাইয়া মুখ ফিরাইয়া বসিল। বিরজা তর্কের ফঁাকে একটু হাসিয়া লইয়া আবার তর্কে মাতিয়া উঠিল। যােড়শী বলিল, মালা নিয়ে ধুয়ে জল খাব। ও ভাল লাগে না। ও দিকে না ঘুরে অন্য জায়গায় ঘুরলে কাজ হবে সে জ্ঞান ওর নাই। মাধবী সে কথায় খুসী হইল না। ষােড়শীর পানে তীব্র কটাক্ষ পাত করিয়া বলিল, অমন রতনকে চিনলে না এখনও। কপালে দুঃখ
আছে। অপরাজিতা আর তুমি যেমন বিপরীত ধাণের, বর দুজনে
হয়েছে ঠিক তেমনি বিপরীত ধরণের। মিলেছে ভাল।
রবিবারের দিন। বিধায়ক কি একটা কাজে বাহিরে গিয়াছে।
বিরজা থিয়েটার দেখিয়া সে রাত্রি বাসায় গেল না। দিদির কাছে
থাকিবে। মজলিস বসিয়াছে তাই। মাধবীর কাজের তাড়া নাই।
সব কাজ শেষ করিয়া সকাল সকাল থিয়েটার দেখিয়া ফিরিয়াছে।
এখন বসিয়া গল্প করিলে, আড্ডা জমাইলে ক্ষতি কি।
মনােজ বলিল, বৌদির সভানেত্রীত্বে যে বৈঠক বসেছে তার প্রধান
অতিথি কে বলতে পার?
বিরজা বলিতে যাইতেছিল, অচলায়তন; কিন্তু তাহার আগেই
মাধবী বলিল, আজ যােড়শীকে করা যাক।
যােড়শী ও সবের মধ্যে নাই। ও সব আমার ভাল লাগে না।
সভা আর সমিতি। বক্তৃতা আর ফুলের মালা। যত সব—বলিতে
বলিতে যােড়শী অপরাজিতার ঘরের দিকে গেল।
তবে অচলায়তনই হােক। বলিয়া বিরজা মাধবীর পানে
তাকাইয়া দেখিল।
মাধবী হাসিয়া বলিল, মাইরি, ভাইটিকে সবাই বােকা বলে, কিন্তু
দেখছি ও একটু মানুষ হয়েছে। চপলা লজ্জায় সরিয়া গেল।
একটা রহস্যঘন আবরণের মেঘ যেন কাটিয়া যাইতে চায়।
কোলাহল মুখরিত ছােট ঘরখানির আবহাওয়া পরিবর্তিত হইবার
উপক্রম হইল, এমন সময় দূরে সাইরেন বাজিয়া উঠিল। দেখিতে
দেখিতে চারিধার হইতে অনেকগুলি সাইরেনের ওঠা-নামা মরণ
আর্তনাদ চলিতে লাগিল।
মনােজ চীৎকার করিয়া উঠিল, ঐ, ঐ সাইরেন।
চপলা অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া রহিল জানালা ধরিয়া। মাধবী
সরিয়া গিয়া চপলার কাছে দাড়াইল। বিরজা উঠিয়া গিয়া জানালায়
দাড়াইয়া মনােজকে ডাক দিল।
এক দিকে দুইটি যুবক জানালার কাছে দাপাদাপি করিয়া মজা দেখিতে লাগিল। অন্য দিকে দুইটি মেয়ে অবাক বিস্ময়ে চাহিয়া রহিল। অনন্ত আকাশ স্তব্ধ হইয়া রহিয়াছে। সাইরেনের আর্তনাদ তখনও চলিতেছে। রাস্তায় লােক চলা- চলের বিরাম নাই। সকলেই উৰ্দ্ধমুখী হইয়া সাইরেনের শব্দকে ব্যঙ্গ করিয়া চলিয়াছে। মনে একটু ভয় যে কাহারও হইয়াছে তাহা বুঝা যায় না। বরং মজা দেখিতেছে তাহারা। এ. আর. পি-র দল ঘােরাফেরা করিতেছে। রাস্তার লােকজনকে বাড়ীর ভিতর ঢুকিয়া পড়িতে নির্দেশ দিতেছে, কিন্তু কে কাহার কথা শােনে। রসিকতা করিয়া পরস্পর পরস্পরকে সম্ভাষণ করিতেছে। রাস্তায় কাতারে কাতারে লােক আসিয়া জমিয়াছে। সকলেই উৎসুক আগ্রহে চাহিয়া রহিয়াছে। ছাদে বারান্দায় এবং দরজা জানালার সামনে স্ত্রী পুরুষ বালক বালিকারা জড় হইয়া অবাক বিস্ময়ে মজা দেখিতে লাগিল। সাইরেনের শব্দ থামিয়া গিয়াছে। যাহারা যে অবস্থায় ছিল, কিছুক্ষণ আমােদ উপভােগ করিয়া সরিয়া পড়িবার উপক্রম করিতেছে। একটা অবজ্ঞার ভাব সকলের মুখে চোখে। যেন কিছুই হয় নাই। এ একটা রসিকতা মাত্র। ভারি তাে সাইরেন! কি আর করবে এতে! বােমা ! ভারি তাে বােমা ! পড়ুক না! বড় রাস্তায় ট্রাম বাস গাড়ী ঘােড়া বন্ধ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু লােক চলাচলের নিয়ন্ত্রণ নাই। দশ মিনিট পরে আবার সাইরেন বাজিয়া উঠিল। এবার একটানা শব্দ। তারপর চুপচাপ। রাস্তায় যথারীতি ট্রাম বাস গাড়ী ঘােড়া চলিতে লাগিল। আর. পি-র লােকেরা ক্লান্ত হইয়া ফিরিতে লাগিল। সকলেরই চোখে রহস্যঘন উৎকণ্ঠা পুঞ্জিভূত হইয়া উঠিয়াছে। মনােজ হাসিতে হাসিতে বলিল, যাক, বাঁচা গেল। সাইরেনের মহড়া হয়ে গেল। মধ্যে মধ্যে এইরকম আরও হবে। এ.. ৭৩
মাধবী আগ্রহভরে বলিল, কেন ?
পরীক্ষা। এ সব পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা। শত্রুপক্ষ আক্রমণ
করতে এলে সহরবাসীদের সতর্ক করবার এ একটা নিদর্শন। প্রথম
সাইরেন মানে, সাবধান, বিপদ এসেছে। আশ্রয়স্থলে যাও।
তারপর যতক্ষণ না বিপদ কেটে যায় অর্থাৎ শত্রুপক্ষ চলে না যায়
ততক্ষণ অল ক্লিয়ার নির্দেশ দেবে না। অল ক্লিয়ার দিলে সকলে
যথারীতি কাজ করতে থাকবে।
মাধবী গালে হাত দিয়া বলিল, মাগাে! এতে আছে।
মুখপােড়ারা আসেই বা কেন। শুধু শুধু আমাদের ভয় দেখাতে আসা।
মনােজ চোখ দুইটি আরও বড় করিয়া বলিল, বৌদি, সে অনেক
কথা। তারপর চপলার দিকে আঙ্গুল দেখাইয়া বলিল, ওর অবস্থা
দেখেছছ! বলিয়া হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল।
মাধবী অচলাকে কোলের কাছে টানিয়া বলিল, ওর কথা কেন,
আমিই তাে ভয়ে সারা ! কি বিচ্ছিরি শব্দ! যেন মরণ আর্তনাদ।
তারপর অচলাকে বলিল, তুই যা, তাের মা হয়তাে খুঁজছে।
অচলা নিঃশব্দে চলিয়া গেল। মাধবী আর দাড়াইয়া রহিল না।
দেখিল যােড়শী দাপাদাপি করিয়া ঘুরিতেছে। তাহার স্বামী রাগ
করিয়া অসময়ে কোথায় যে গেল কে জানে। মাধবী ছুটিয়া গিয়া
তাহাকে শান্ত করিতে লাগিল।
সমস্ত আবহাওয়া একমুহূর্তে পরিবর্তিত হওয়ায় সকলেই যেন
কেমন ধারা হইয়া গিয়াছে।
৭৪
নয় এত বড় বাড়ীর মধ্যে আর্টিষ্টের বৌ মীনাক্ষির সঙ্গে কাহারও বিশেষ বনিবনা নাই। মেয়েদের মহলে সে নিজেকে বড় ঘরের মেয়ে-বৌ বলিয়া পরিচয় দিয়া আত্মম্ভরিতা দেখায়। বয়স অল্প। রূপের ছটা নাই বলিলেই চলে। অপরাজিতা, মাধবী, অচলা, ঘােড়শী, বড় ভাড়াটিয়ার বৌ, বাড়ীওয়ালী এবং নীচেকার বৌদের কাহারও সঙ্গে তাহার তুলনা করা চলে না। কিন্তু তবু ঔজ্জ্বল্য বাড়াইতে মীনাক্ষির ত্রুটী নাই। সকলের সঙ্গে মিশিলেও পরস্পরের মধ্যে মন খুলিয়া কথা বলিতে দেখা যায় না। অল্পদিন হইল এই নবদম্পতি এ বাড়ীতে একখানি ঘর ভাড়া করিয়া বাস করিতেছে। আর্টিষ্ট পরেশবাৰু কমার্শিয়াল ছবি আঁকিয়া কিছু রােজকার করে। এতদিন সে একটা মেসে থাকিয়া নিজের ব্যবসা চালাইয়া যাইত। আর্ট স্কুল হইতে বছর ছয়েক হইল পাশ করিয়াছে। সম্প্রতি ইউরােপে যুদ্ধ বাধিয়া যাওয়ায় জার্মানীর মাল আসা বন্ধ। ইউরােপীয়ান ফার্মেরও অবস্থা খারাপের দিকে মােড় ফিরিয়াছে। সুতরাং সব সাহেবী বিজ্ঞাপন একরূপ নূতন করিয়া বাহির হওয়া বন্ধ। ব্যবসায়ের দিকটা ভাল নয়। নানাকারণে পরেশের আয় একে একে কমিয়া আসিতেছে। সংসার চালানাে শক্ত। অন্যদিকে ঘুরিয়াও বিশেষ সুবিধা হইতেছে না। কর্মক্লান্ত অবস্থায় ফিরিয়া আসিয়া সে বিছানায় গড়াইয়া পড়িল। মীনাক্ষি কাছেই ছিল। ঘরে বসিয়া কি একটা কাজ করিতেছিল। স্বামীকে আসিতে দেখিয়া এবং অমনভাবে শুইয়া পড়িতে দেখিয়া ব্যস্ত হইয়া উঠিল। কাছে গিয়া বলিল, অমন করে শুয়ে পড়লে কেন? শরীর ভাল নাই ?
আর ভাল। অবস্থা কাহিল। সংসার অচল।
যাও তােমার কেবল ঐ এক কথা। ভারি তাে সংসার। দুটি তত
প্রাণী। বাচ্চাটার কথা ছেড়েই দাও।
তাও আর চালাতে পারি না। ব্যবসায়ের অবস্থা দিন দিন
শশাচনীয় হয়ে উঠেছে। তার চেয়ে এক কাজ কর, তােমরা সব দেশে
যাও। তবু কতকটা সামলান যাবে।
আর তুমি! বলিয়া মীনাক্ষি রােষভরে স্বামীর পানে তাকাইল।
আমি যেমন ছিলাম তেমনি থাকব। সেই পুরােনাে মেসেই যাব
হয়! তাছাড়া বােমার বাজার। কখন যে কি হয় কিছুই বােঝ
যায় না। ও দিকে জাপানীরা হুড়মুড় করে এগিয়ে আসছে। কখন
কি করে বসবে জানা যায় না তাে।
তা আসুক। এদের সঙ্গে পারবে না।
পারুক। কিন্তু বােমা ফেলে একশেষ করে দেবে। জানাে না,
তত এক একটা বােমা কি ভীষণ।
তা হােক। আমি এখান থেকে যাচ্ছি না! তুমি থাকবে আর
আমি যাব কোন চুলােয়। সেটি হবে না।
আমরা তাে ছুটে পালাতে পারব। কিন্তু তােমরা কি করবে ?
আমরাও পালাবাে। আমি কি হাঁটতে পারি না মনে কর।
এত লােক কলকাতায় আছে, তাদের যা হবে আমারও তাই হবে।
সেজন্য ভেবাে না।
এখন বােজ সাইরেন বাজবে। রাস্তায় নােক চলা দায় হবে
রাত্তিরে। সব ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যাবে। পাশের মানুষ চেনা
যাবে না। চুরি পকেটমারদের মরসুম পড়ে যাবে। মানুষ টেকা
দায় হবে তখন।
তা বলে তারা ঘরে এসে আর চুরি করবে না। রাস্তায়—তা সে
রাত্তিরে না বেরুলেই তাে হ’ল।
ঘরে থাকলে কি সংসার চলে ?
সমস্ত দিন ঘাের, কাজ জোগাড় কর। রাত্তিরে না বেরুলেই
তাে হল।
যাক অত শত বুঝি না। তােমাকে বােঝতেও পারব না। যা
ভাল হয় কর।
তা বলে আমি এখান থেকে এক পাও নড়ছি না। অপুদি,
মাধবীদি, ষােড়শীদি, ভালমাসিরা সবাই কেউ তাে যাবার নাম করে
।
কেবল তােমার ঐ এক কথা। বােমা-বােমা! বােমা যেন
ঠিক আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ছে না কি!
তােমাকে নিয়ে আর পারি না। জাপানীরা কি বলেছে জানাে ?
সহর থেকে সবাই সরে যাও। নইলে নির্ঘাৎ মৃত্যু।
যাও, যাও।
যাবে না যদি, তবে খাবে কি ?
যেন ওর টাকাতেই সব চলে। কদিন থেকে আমার কত টাকা
গেল জানাে। তুমি টাকা না দাও, আমার নিজের টাকা ভেঙ্গে
খাব। এখানে একবেলা খেয়েও আরামে থাকব। তা বলে অমন
দেশ-মুখখা আর হচ্ছি না।
তবে মর। আমি আর কিছু বলব না।
আচ্ছা আচ্ছা, হয়েছে। কিছু আর বলতে হবে না তােমায়।
এখন বল রাত্তিরে খাবে কি ?
ভাতই খাব।
তবে বললে যে শরীর খারাপ। সব ধাপ পা কেবল তােমার!
দেখি তােমার গা-টা! বলিয়া তাহার কপালে বুকে হাত দিয়া হাসিয়া
সরিয়া গেল মীনাক্ষি ; বলিল, এত ভয় দেখাতেও পার তুমি! নাও
ওঠো, চা করে দোব একটু।
তাই দাও, বলিয়া পরেশ উঠিয়া বসিল। মীনাক্ষি চায়ের জল
কড়াইবার জন্য ষ্টোভটা টানিয়া বাহির করিল চৌকির নীচে হইতে।
৭৭
ঘােড়শী শুইয়াছিল, বাহির হইতে অপরাজিতা ডাকিল, কি, কি
হচ্ছে।
এসসা দিদি, এইমাত্র গা গড়াচ্ছি। আজ অনেক কাজ করতে
হ’ল কিনা? কোমরটা কটকট করছে। সেই কখন থেকে বসে বসে
কাজ করছিলাম।
অপরাজিতা গিয়া খাটের উপর বসিল।
যােড়শী সরিয়া গিয়া বলিল, ভাল করে বস দিদি! কি খবর?
খবর সব ভালাে। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়া গিয়া বলিল,
সেদিন বরকে অমন করে চটালে কেন ? অমন বর পছন্দ হয় না নাকি ?
যােড়শী নিমেষে গম্ভীর হইয়া গেল।
বল না ?
কি আর বলব? নিত্যি অভাব! এই সেদিন তােমার কাছ
থেকে টাকা নিয়ে তবে সংসার চালাই। সংসার যে কি করে চলবে,
টাকা রােজগার যে কিসে হবে সেদিকে খেয়াল নাই। ওর যত সব
বাজে কাজে হাত। তাই আমার রাগ হয় মধ্যে মধ্যে। তােমার স্বামী
কিন্তু বেশ। দিন রাত টাকা নিয়ে ব্যস্ত।
অপরাজিতা ফস করিয়া বলিল, বর বদল করবে ?
যােড়শীও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, রাজি! দেবে হাত ছেড়ে !
এই মুহূর্তে। তুমি রাজী থাকলেই হ’ল। আমার আপত্তি নাই।
অপরাজিতা যােড়শীকে জড়াইয়া ধরিয়া বিছানায় শুইয়া পড়িল।
কানে কানে বলিল, যে যা চায়, তা পায় না। দুঃখ করে আর লাভ কি
ভাই, তবে সত্যি বলছি, তুমি যা পেয়েছ তার কদর বুঝলে না।
অমন ব্যক্তি আমার ভাগ্যে জুটলে দিনরাত পুজো করতাম কাছে
বসিয়ে। শুয়ে শুয়ে কত গল্প করতাম আর শুনতাম।
যােড়শী বলিল, ওসব বাজে কথা বলল না।
সত্যি ভাই। যে যা চায় সে তা পায় না! তুমি টাকার জন্যে
অলছে। আমি টাকা নিয়ে জ্বলছি।
৭৮
শুইয়া শুইয়া তাহারা দুইজনে মনের কথা বলিয়া চলিল। অপরাজিতা সামনে তাকাইয়া দেখিল লাল টকটকে গােলাপ ফুলের মালাটি এখন কি হইয়া গিয়াছে। তাই বলিয়া বসিল, এ মালা, কখন গলায় পরলে না। হতভাগী কোথাকার! সত্যি দিদি। ওটা দেখা মাত্রই আমার মনটা রাগে জ্বলে উঠেছিল। এখন দেখছি, সত্যি অন্যায় করেছি। সে সময় ও সব কড়া, কথা না বললে উনি অমন করে চলে যেতেন না। যাওয়ার পরই রাস্তায় সাইরেনের শব্দ। ওঁর কত কষ্ট হয়েছিল না তখন। তবে? সত্যি কথা বলি যােড়শী, তােমার যখন যা দরকার হবে আমার কাছ থেকে চেয়ে নিও। পরে সুবিধা হলে দেবে। কিন্তু, মাথার দিব্যি রইল, তাকে টাকার জন্যে যেন গঞ্জনা সইতে না হয়। বেশ দিদি! দাও না কিছু টাকা। ধার হিসেবেই দাও। বেশ দোব। কিন্তু এটা তােমাদের দুজনের জন্যে দিলাম। দুখানা নােট দুজনের জন্যে। তােমার জামা কাপড় আর ওঁর জামা কাপড়। এই টাকায় তােমরা কিনবে। দুজনে দোকানে যাবে। দুজনে পছন্দ করে কিনবে। দুজনে পড়বে। তারপর আমার যা যা করণীয় করব। কি করবে দিদি ? তােমাদের দুজনকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াব একদিন। আমার বড় সাধ। বল রাখবে? বলিয়া অপরাজিতা করুণ চোখে যােড়শীর পানে তাকাইল। দুইজন দুইজনকে জড়াইয়া ধরিয়াছে। দুইজনের চোখেই জল। যােড়শী বলিল, এতও জানাে দিদি ? এই নাও টাকা। কাল তােমাদের সন্ধ্যায় নিমন্ত্রণ থাকল। কাল সকালেই কিনে আনবে কিন্তু দুজনেই দোকানে গিয়ে। বেশ। কি কি, কেমন কেমন কিনব বল ? তােমাদের পছন্দ মত। আচ্ছা দিদি, এ তােমার কি খেয়াল বল তত? তােমাদের দুজনকে ভালবাসি কিনা। তাই।
দুইজনে একেবারে দুইজনকে জড়াইয়া ধরিয়া আছে। অপরাজিতা
স্নেহের অতিশয্যে ঘােড়শীর মুখে গােটা কয়েক চুম্বন দিল।
বাহিরে জুতার শব্দ উঠিল। পরক্ষণে দরজা ঠেলিয়া নবেন্দু
ঘরে ঢুকিয়াই অবাক। তারপর পিছন হটিয়া বাহিরে আসিয়া
দাড়াইল।
অপরাজিতা আর ঘােড়শী তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া হাসিতে
লাগিল। লজ্জাও কম পায় নাই তাহারা।
অপরাজিতা বলিল, আমি চলি ভাই। উনি বাইরে দাড়িয়ে
রয়েছেন। বলিয়া উঠিয়া নিজের কাপড় গােছাইতে লাগিল।
যােড়শীও তাহার কাপড় গােছাইতে গােছাইতে বলিল, যাবে
কোথায়? দাড়াও। তােমায় মজা দেখাচ্ছি। তারপর নবেন্দুকে
ডাকিল, ওগাে ভেতরে এসাে। ওখানে দাড়িয়ে আছ কেন ?
অপুদির কাণ্ড শােন।
নবেন্দু ঘরে ঢুকিয়া তাহাদের দুইজনকে দেখিতে লাগিল।
যােড়শী বলিল, দিদির শখের কথা শােন। আমরা দুজনে
দোকানে গিয়ে আমাদের পছন্দ মত ভাল কাপড় জামা কিনে এনে
তাই প'রে ওর কাছে নেমন্তন্ন খেতে যাব।
বড় লােকের নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ার বিপদ আছে জানাে তাে ?
ও সব আমাদের দ্বারা হবে না।
কেন হবে না? টাকা নাই ?
নাই তাে? কিসে কিনব? দরকার কি যেচে নেমন্তন্ন নেওয়ার ?
সেধে নেমন্তন্ন করতে এসেছে।
নিষেধ করে দাও। ও সব আমাদের পােষাবে না।
অপরাজিতা লজ্জায় কাঠ হইয়া গেল। এক পাশে দাড়াইয়া
রহিল। কাজটা খেয়ালের বশে সে করিয়া ফেলিয়াছে। ভাল হয়
নাই। অন্য ভাবে করিলেই হইত। এখন কি ভাবে কথাটাকে
ঘুরাইয়া লইবে তাহা ভাবিতে লাগিল।
যেচে নয়।
৮০
নবেন্দু বলিল, বড় লােকের গায়ে গা দিয়ে চলতে নাই। পরে পস্তাতে হয়। চলতে হয় সমানে সমানে। অপরাজিতার ইচ্ছা হইল সরিয়া পড়ে। কিন্তু তাহা পারিল না। স্থির হইয়া একপাশে দাড়াইয়া তাহার কর্মফল ভােগ করিতে লাগিল। নবেন্দুকে সে জানে যােড়শী একবার তাকাইল অপরাজিতার পানে। তারপর অবস্থা বুঝিয়া তাহার একটা হাত ধরিয়া বলিল, দিদি, ওঁর কথায় রাগ করাে । আমি সব ব্যবস্থা করে তােমার ওখানে কাল নেমন্তন্ন রাখব। মনে কিছু করবে না। ওঁর কথার ধরণই এই রকম। না, ও কিছু নয়। কিছু মনে করি নি। মনে করবার আছেই কি। বলিতে বলিতে অপরাজিতা সরিয়া পড়িল। সে চলিয়া যাইতে যােড়শী শক্ত হইয়া বলিল, জানাে, দিদি আমাদের যা ভালবাসে এমন কাকেও না। । তােমাকে কি কম ভালবাসে। কথাটা বলিয়া ফেলিয়া পরক্ষণে তাহাকে অন্যভাবে ঘুরাইয়া বলিতে লাগিল। নবেন্দু বুঝিল অপরাজিতার কথা। সত্যই নানাভাবে তাহার উপর অপরাজিতার আন্তরিকতা লক্ষ্য করিয়াছে সে। আজ তাহাকে নিজের ঘরে পাইয়া এমন অপমান করা ঠিক হয় নাই। একটু থামিয়া সহজ সুরে বলিল, এতক্ষণ ধরে আমাদের কথাই হচ্ছিল বুঝি দুজনের মধ্যে? কি সব বলছিল—খুব নিন্দে। ঘােড়শী বলিল, দিদি তােমার কথায় পঞ্চমুখ। তােমাকে সত্যি এদ্ধা করে। ভাল চোখেই দেখে। তােমাকে দেখে বলেই তােত আমাকে কত কথা শুনতে হয়। না, দিদি আমাদের হিতাকাক্ষী। ওকে ভুল বুঝাে না। বলিয়া বালিসের তলা হইতে দুইখানা নােট বাহির করিয়া বলিল, এই নাও দিদির নমস্কারি। দুই হাত পাতিয়া নবেন্দু বলিল, দাও। যােড়শী টাকা দিতেই নবেন্দু তাহা লইয়া মাথায় ঠেকাইল। কোলাহল ৮১
বলিল, অমন শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রতি অন্যায় ব্যবহারে লজ্জিত। চল,
দুজনে গিয়ে ওঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে আসি। এসাে এসাে। কি মনে
করেছেন উনি জানি না।
রাস্তায় টেলিগ্রাম, টেলিগ্রাম, বলিয়া হাঁকিয়া চলিয়াছে খবরের
কাগজের হকাররা।
রাস্তায় তােক জমিয়াছে। সংবাদ গুরুতর। বােমার কথা। আর
যুদ্ধের কথা। জাপানীর আসিল বলিয়া। এদিকে সাজ সাজ রব।
মনােজ একখানা কাগজ লইয়া উপরে উঠিতেছিল।
মুখে
হতাশার ভাব। আর কলকাতায় থাকা চলবে না। এলাে বলে।
বাড়ীশুদ্ধ,সব একে একে আসিয়া মনােজকে ঘিরিয়া ধরিল।
ভালমাসি চীৎকার করিয়া বলিতেছে, গেল গেল, সব গেল।
ইতিমধ্যে কে যেন বলিয়া বসিল, ও ঘরে ঘােট ভাড়াটিয়ারা কাল
দেশে যাচ্ছে। ওরা আর থাকবে না। কখন বােমা পড়ে কে জানে!
প্রাণ থাকতে পালিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
আবার একটা পরামর্শ সভা বসিয়া গেল। এখানে ওখানে
সেখানে। ঘরে ঘরে আলােচনা চলিতে লাগিল।
আর এই সহরে
বাস করা চলে কি না।
একদল ঠিক করিয়াছে, মরি বাঁচি এখানেই থাকিব। আর একদল
বলিতেছে, সুবিধা বুঝিলে পালাইতে কতক্ষণ। অন্য দল স্থির করিয়া
ফেলিয়াছে, আগুনের মধ্যে থাকা ভাল কথা নয়। কাঁচা প্রাণ পরের
হাতে তুলিয়া দিতে তাহারা পারিবে না। আপাততঃ সরিয়া পড়া
যাক। পরে অবস্থা ভাল হইলে আসা যাইবে। নানাজনের নানা মত।
মাধবী অপরাজিতার ঘরে। পাশে চপলা। বিরজা হস্ত দম্ভ
হইয়া আসিয়া ঘরে ঢুকিল। মননজের হাতের কাগজ সে দেখিয়াছে।
মাধবী বলিল, মুস্কিল হল একজনের। না না, দুজনের। দুদিন
পরে ওরা এলেই হত। যত সব বাধা দেবার গোঁসাই।
.
২
অপরাজিতা হাসিয়া বলিল, বাধা কিসের? দুহাত এদের এক
হােক তারপর ওরা হাতাহাতি করে মরুক না কেন ? বলিয়া হাে হাে
করিয়া হাসিতে লাগিল।
চপলা বলিল, আমাদের বাড়ীর কেউ কলকাতা ছেড়ে যাবে
ঠিক হয়ে গেছে।
তা যাবে কেন? ঠেস দিয়া বলিল মাধবী। তারপর বিরজাকে
লক্ষ্য করিয়া বলিল, ওরাও যাবে না।
বিরজা বলিল, আমি যাব না। দেখি না কেমন বােমা পড়ে।
লড়াই হয় দুই দলের।
অপরাজিতা হাসিয়া বলিল, ওদের লড়াই না, তােমাদের দুজনের
লড়াই। বিয়ে তাে হবে না, অনেক বাধা দেখছি।
কথাটা শুনিয়া বিরজা ও অচলার মুখ ফ্যাকাশে হইয়া গেল।
অপরাজিতা তাহা লক্ষ্য করিয়াছে। তাই বলিয়া বসিল, অমন অলক্ষণে
কথা বলতে আছে কি! বােমা, যুদ্ধ, এরােপ্লেন, ব্ল্যাক-আউট হােক
যত খুসি। ওদের ঠেকায় কে? বড় বাড়ীর পিছন দিকের নীচের
তলার ছােট একটা ঘরে থাকবে ওরা দুজনে। সেখানটায় চলবে
ওদের মধুযামিনীর পালা। যারা মরে মরুক! ওদের মারে কে ?
বিয়ে হবেই।
মাধবী বলিল, বড় ভাবিয়ে তুললে ওরা, জাপানীদের জন্যে
পালাব না, পালাব ওদের জন্যে। এমন করে বেড়াচ্ছে দুজনে যে
থাকা যায় না। মুখ যেন ছায়াবাজির ছবি। ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন
হয় কত! আচ্ছা কথা দিচ্ছি, বিয়ে তােমাদের দোব।
একটা শেষ বেশ হয়ে যাক।
অপরাজিতা বলিল, এক কাজ করা যাক। বিয়ে দিয়ে ওদের
কেন পাঠিয়ে দাও না কোন জঙ্গলে। সেখানে বােমা যাবে না,
সাইরেনের শব্দ যাবে না। বলিয়া সে একচোট হাসিয়া লইল।
বিরজা বলিল, চলি দিদি।
তবে যুদ্ধের
তবে এ সময়ে এলি কেন? বলিয়া মাধবী কটাক্ষপাত করিল
বিরজার উপর।
এই তােমাদের দেখতে ? যে অবস্থা দিন দিন।
আমাদের দেখতে না তােমার নিজেরটিকে দেখতে? পড়াশুনা
ভালই হচ্ছে। বাবাকে লিখে দোব সে কথা।
বিরজা দিদির কথা শুনিয়া অবাক হইয়া গেল। তবে দিদির কি
মত বদলাইয়া গিয়াছে।
অপরাজিতা বলিল, ভাইটি, একটু পড়াশুনা কর। পাশ করতে
হবে। । না করলে বিয়ে করে একে খাওয়াবে কি? চপলা তত বলেছে,
ফেল করা ছেলেকে বিয়ে করবে না।
বিরজা দেখিল, বােমার বাজারে সবাই গরম গরম কথা বলিতে
আরম্ভ করিয়াছে। আর থাকা ঠিক নয়।
এমন সময় মনােজ কাগজখানাকে পতাকার মত উড়াইতে
উড়াইতে আসিয়া ঘরে ঢুকিল। সব এক হাে যায় গা ! নিলে সব।
পালাও পালাও। বিরজা, গতিক সুবিধার না। সরে পড়। আজ
রাত্রে এক কাণ্ড হয়ে যাবে। যেখানে এসে ওরা পৌচেছে সেখান
থেকে এখানে আসতে ক’ ঘণ্টার পথ মাত্র। কাল সকালে হয়ত দেখব,
সব সহর গুড়াে হয়ে গিয়েছে। ভাল চাও তত বাড়ী পালাও।
আমি তাে রেডি।
চপলা এক ফাঁকে সরিয়া পড়িয়াছে। বিরজা অপ্রস্তুত মুখে
যাইবার জন্য পা বাড়াইয়াও যাইতে পারিতেছে না।
এই আবহাওয়ার মধ্যে পা টিপিয়া টিপিয়া আসিয়া দাড়াইল
ভালমাসি। তঁাহার চোখ মুখ ফ্যাকাশে হইয়া গিয়াছে। ভাবী
আশঙ্কায় বিপর্যস্ত। ইহাদের মতামত জানিতে চায়।
করিয়াছে, এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়।
সেও ঠিক
৮
। প্রথম প্রথম বড়শীকে কাছে রাখিয়া অপরাজিতা নবেন্দুর সামনে বসিয়া গল্প করিত। তারপর কখন যে তাহারা মুখখামুখি বসিয়া গল্প জুড়িয়া দিয়াছে এবং যােড়শী ও পাশে বসিয়া চায়ের জল গরম করিতেছে কিম্বা অন্য কাজে ব্যস্ত সে খেয়াল কাহারও হয় নি। ইহাদের অভাব কিছুটা মিটাইয়াছে অপরাজিতা এবং অপরাজিতার অভাবও কিছুটা মিটাইতেছে ইহারা। সেদিন থিয়েটার দেখিয়া আসিল অপরাজিতা, যােড়শী ও নবেন্দু। তারপর একদিন গেল সিনেমা দেখিতে তিনজনেই। আর একদিন গেল ইডেন গার্ডেন, চিড়িয়াখানা। এইভাবে অপরাজিতা নানা ভাবে নবেন্দুর সান্নিধ্যলাভের সুযােগ করিয়া লইতেছে। যােড়শীকে এমন ভাবে হাত করিয়াছে যে, সে যাহা বলিবে যােড়শী তাহাই করিবে। অপরাজিতা, নবেন্দু ও ঘােড়শীকে সাজাইয়া আদর যত্ন করে। রান্না করিয়া দুইজনকে খাওয়ায়। ভাল কিছু আনিলেই যােড়শীকে দিয়া নিজে ব্যবহার করে না। একদিন আসিয়া অপরাজিতা হাসিয়া বলিয়া বসিল, তুই যে আমার। আমার যা কিছু সবই তাের। কথাটা যােড়শীকে বলায় সে এক মুহূর্ত দেরী করে নাই তাহা নবেন্দুকে বলিতে। নবেন্দুর মনে আবার ঝড় উঠিয়াছে। অপরাজিতার ব্যবহার তাহার ভাল লাগিতেছে না। আস্তে আস্তে এমন ভাবে সে ইহাদের দুইজনের মধ্যে বসিয়া গিয়াছে যে নড়ান অসম্ভব। তাহাকে ছাড়া কোন কাজই আর ইহাদের হয় না। অপরাজিতা সখী সাজিয়া নবেন্দু আর ঘােড়শীর সেবা করে। বান্ধবী সাজিয়া হাসি ঠাট্টা করিতে থাকে। গৃহিনী সাজিয়া এই দুই ৮
তরুণ তরুণীকে দুই কোলে বসাইয়া অদির করিত আহ্বান করে।
নানা রূপে নিজেকে সে ইহাদের লইয়া ব্যস্ত থাকে। নিজে বেশ
বুঝিয়াছে নবেন্দুর দৃষ্টি কোন দিক দিয়া চলিতেছে। যােড়শীকে
শিখণ্ডি করিয়া না রাখিলে ভাল দেখায় না। নবেন্দুর বুঝিতে আর
বাকী রহিল না অপরাজিতাকে। অপরাজিতারও তাই।
কিন্তু বেশীদিন কথাটা চাপা থাকিল না। তালমাসি একদিন
অপরাজিতার স্বামীকে স্পষ্ট জানাইয়া দিল।
যুদ্ধের বাজারে এই বাড়ীতে অন্তদ্বন্দ্ব আরম্ভ হইয়াছে কয়েক
দলের মধ্যে। ঘটনা যে নানাভাবে ছড়াইয়া পড়িয়াছে এই
বাড়ীখানার বিভিন্ন অংশে তাহার পরিবেশটা অভিনব। . মনােজ
বাইরের ঘরে থাকিত। বিরজার আবহাওয়া তাহাকে পাইয়া বসিল।
মনোজের ঘর হইতে শাড়ীর শব্দ শােনা যায়।
ভালমাসি যতই ঢাক পিটাইয়া বেড়াক না কেন তাহার শক্তি
কোন কাজে লাগিতেছে না। বরং বিষাক্ত আবহাওয়াটা ছড়াইয়া
পড়িতেছে দিন দিন।
মীনাক্ষি ও পাশে যাইতেছিল। ভালমাসি তাহাকে টানিয়া লইয়া
গেল একধারে। ফিসফিস্ করিয়া বলিল, তােমরা এই
যুদ্ধের বাজারে
থাকবে তত ?
মীনাক্ষি বলিল, সেই রকমের ইচ্ছা তত আছে। তবে সবাই যদি
পালাতে আরম্ভ করে তাে আমরা দুজনে একলা থাকব কি করে?
আপনারা কি করবেন ঠিক করেছেন কিছু?
ভালমাসি গম্ভীর হইয়া বলিল, এমনিতেও না, অমনিতেও না।
এ বাড়ীতে থাকা আর সম্ভব নয়। বিষাক্ত আবহাওয়া সর্বত্র ছড়িয়ে
পড়েছে। ঘরে ঘরে কি সব করছে, ঘটছে দেখলে গা ঘিন ঘিন
করে। সবাই সমান। ও সব আর চোখে দেখা যায় না।
মীনাক্ষি সায় দিয়া বলিল, সবাই সমান। বাধা না দিলে ক্রমেই
বেড়ে যেতে থাকে। এক থেকে দুই, দুই থেকে তিন, দেখতে দেখতে
ও সব ব্যাপার গা সওয়া হয়ে যায়। সব ঘরে, সব জায়গাতেই ঐ এক ধারা চলছে। কোথায় যাবেন। বাধা দেবেন কোথায়। আর বাধা দিলেই বা শুনবে কে? স্রোতের ফুল। সব চলেছে একদিকে। একটু থামিয়া মীনাক্ষি ভালমাসিকে বলিল, ওসব ভেবে ফল নাই। ললাকের কথায় থেকে কি ফল! নিজের নিয়ে থাকাই ভাল। চার দিক থেকে এসে জুটেছি। কারও সঙ্গে কারও সম্বন্ধ নাই। এক আসছে এক যাচ্ছে। এ একটা সরাইখানা। ভাঙ্গা হাট যেন। ভালমাসির ভাল লাগিল না মীনাক্ষির কথাগুলি শুনিতে। আঘাত খাইয়া খাইয়া তাহার মন ভাঙ্গিয়াছে বলিয়া আর আগেকার মত চীৎকার করিয়া বেড়াইত না। গায়ে গা দিয়া ঝগড়া করিবার আর প্রবৃত্তি হয় না। চাকা ঘুরিয়াছে। কিন্তু তাহার চাকা কাদায় পড়িয়াছে। ও দিক হইতে চীৎকার শােনা গেল, কে যেন আর একজনকে শাসাইয়া বলিতেছে, বােমার বাজার, এই আছি, এই নাই। ভাল কথা বল। যেতে আর কতক্ষণ। উত্তর হইল, বােমায় তােমার মরণ নাই। হলে বাঁচি। মীনাক্ষির হাসি পাইল। এমন বােমাকে কেন্দ্র করিয়া মানুষ ভালবাসারও লীলাখেলা না দেখাইয়া ছাড়ে না। মীনাক্ষি আগাইয়া চলিল। চপলাকে ধরিয়া মাধবী চুপি চুপি কি কথা বলিতেছে যেন। কাছে গিয়া শুনিতে পাইল, মাধবী একটু আগে তাহাদের লইয়া যে কথা বলিয়াছে তাহা সামান্য রসিকতা ভিন্ন আর কিছু নয়। সেজন্য সে রাগ না করে। মীনাক্ষি থমকিয়া দাড়াইল। মাধবী তাহাকে দেখিয়া হাসিয়া বলিল, এই রাধিকার মানভঞ্জন হচ্ছে আর কি। বিয়ে যে এদের হবে না সে জানি। অমন বাবা যার তার সম্বন্ধে ঠিকই ভেবেছি। তবে যতদিন মানভঞ্জনের পালা গাওয়া যায় ততদিন সময়টা তাে কাটবে এক রকম। ৮৭
চপলা রাগে ছিটকাইয়া সরিয়া গেল।
মাধবী বলিল, যেও না বাছা, ও ঘরে ননীর আঁ আছে। ঘাটে
যেতে হবে। কাণ্ডারীকে ঘাটেই পাবে।
মীনাক্ষি বলিল, দিদি যেন কি।
ঐ নিয়েই তাে আছি। ভাই আর চপলা, দেওর আর মানসী।
দোব দুটোকে গাঁথিয়ে। তারপর মজা দেখুক না। একটু হাসিয়া
বলিল, আচ্ছা এদের দুজনকে বদলানাে যায় না! ভাগ বদলান?
মীনাক্ষি বলিল, তা কি হয়, যার দিকে যার মন।
দূর ছাই! দেখবে? দুদিন কাছে বসতে দিয়ে দুটো কথা
বলতে দিলেই ভালবাসা জমে উঠবে। তখন আগেকার ভালবাসা-
জনের কথা মনেই আসবে না আর।
দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া মীনাক্ষি বলিল, এই-ই দুনিয়ার রীতি।
মাধবী সায় দিয়া বলিল, এই সত্যি, আর সব মিথ্যে! ভালবাসার
পাখা আছে, কেবল উড়ে বেড়ায়। চোখের খেলা শুধু।
যা বলেছ দিদি। আসি তবে।
মাধবীর সেদিনকার কথা শুনিয়া বিরজা ঘাবড়াইয়া গিয়াছিল।
ভয়ে হােক, রাগে দুঃখে অভিমানে হােক সে পর পর কদিন আসিল
। সহরের আবহাওয়া এই কয়দিনেই বদলাইয়া গিয়াছে।
চপলা খুর খুর করিয়া ফেরে। মুখ শুকাইয়া মাধবীর আশে পাশে
ঘুরিয়া বেড়ায়। কথা বড় বলে না।
মাধবীর আর সহ্য হইল না। মনােজকে ডাকিয়া বলিল, যাও ভাই
ঠাকুরপাে, বিরজাকে ডেকে আন একবার।
মনােজ তাে অবাক। বিরজাকে ডাকিতে হইবে অবশেষে।
মােজ না আসিলে থাকিতে পারিত না ; তাহার আসা বন্ধ হওয়ার
কারণ কি? বৌদির সেদিনকার তাড়া খাইয়া আর এ পথ মাড়াইবে
বােধ হয়। মনােজ বাঁকিয়া বসিল।
যে
অবশেষে অনেক সাধ্য সাধনা করিয়া মাধবী মনােজকে
পাঠাইল। বলিয়া দিল, বিরজাকে নেমন্তন্ন করে এস। সে আজ :
এখানে খাবে। আনা চাইই।
মনােজের সঙ্গে বিরজা আসিল। আসিতেই মাধবী তাহার হাত
চাপিয়া ধরিয়া বলিল, রাগ করলে ভাই সে দিনকার কথায়। দুতিয়ালী
করতে গেলে অনেক কিছু শিখতে হয়। এইসব নতুন কথা সবে
শিখেছি তাই তােমার ওপর প্রয়ােগ করে দেখলাম, ভালবাসার
গভীরতা কতটুকু জন্মেছে তােমার! তা দেখছি এখন মাটি কঁচা।
শক্ত হতে দেরী আছে। শক্ত হলে তবে ছাঁচ বাঁধবে। তার অনেক
দেরী এখনও। সে দিক দিয়ে চপলা ঠিক আছে।
বিরজা প্রথমটা ভয়ে ভয়ে ছিল। দিদির কথা শুনিয়া বলিল,
তােমার পাল্লায় যখন পড়েছি তখন নাকানি চোকানি না খাইয়ে কি
আমাদের ছাড়বে।
সকলেই হাসিতে লাগিল। এমন সময় দেখা মিলিল চপলার।
বিরজাকে দেখিয়াই সে যে অত্যন্ত খুশী হইল তাহা আর কাহারও
বুঝিতে বাকি রহিল না।
মাদুর পাতিয়া খেলার আয়ােজন চলিতে লাগিল। সবে তাহারা
একদান খেলিয়াছে এমন সময় সাইরেন বাজিয়া উঠিল।
পরক্ষণে দেখা গেল একঝাক এরােপ্লেন তাহাদের মাথার উপর
দিয়া দ্রুত চলিয়া যাইতেছে।
নিমেষে আবহাওয়া বদলাইয়া গেল। আশে পাশের দরজা জানালা
দুম দাম করিয়া বন্ধ হইতে লাগিল। মনােজ তাড়াতাড়ি ঘরের দরজা
জানালা বন্ধ করিয়া আলাে নিবাইয়া বসিতেই সকলে ভয়ে এতটুকু
হইয়া গেল।
এরােপ্লেনগুলি আবার দুম দুম করিয়া ফিরিয়া আসিতেছে যেন।
কিন্তু এদিক দিয়া কেন ?
একটা প্রচণ্ড শব্দ উঠিল। টিনের উপর বােমা পড়িয়াছে
ঘরের মধ্যে কয়জন একেবারে জড়সড় হইয়া বসিয়াছে। কাহারও
মুখে কথা নাই।
আবার শব্দ। আবার শব্দ।
পাশের ঘর হইতে কে যেন বলিয়া উঠিল, ঐরে। সেরেছে।
দিলে সব শেষ করে। গেলাম আর কি! না পালালে চলবে না।
আর একখানা ঘর হইতে চীকার উঠিল। করুশ সে চীৎকার।
আর্তস্বরে বলিয়া চলিল, আর না, আর না। আর একদণ্ডও থাকা
চলবে না। শেষে বেঘােরে প্রাণটা যাবে। সকাল হােক তাে।
মাধবী বলিল, ভায়া, কপাল তােমার মন্দ। বড় আশা করে
ডেকেছিলাম। সব ভেস্তে গেল।
সব ভেস্তে গেল। পথ দেখ এবার তুমি। তারপর
চপলাকে ধরিতে গিয়া তাহাকে পাইল না হাতের কাছে। জোরে
ডাক দিতেও পারে না। আস্তে আস্তে বলিল, চপলা, ও চপলা।
একটু দূর হইতে অস্ফুট শব্দ আসিল, এই যে আমি এখানে।
কোথায় তুই! ব্যস্ত ব্যাকুল হইয়া উঠিল মাধবী।
চৌকীর নীচে। এক কোণে বসিয়া চপলা সাড়া দিল। এখানে,
এখানে আছি চৌকীর নীচে, কোণের দিকে।
বিরজা, বিরজা কোথায় ?
বিরজা ও ধারে একটা বেঞ্চি ছিল তাহার ভিতর হইতে সাড়া দিল,
এই যে আমি । বেঞ্চির নীচে।
হহ হহ করিয়া হাসিয়া উঠিল মাধবী আর মনােজ। বিরজার মুখ
দিয়া কথা ভাল বাহির হইতেছে না।
মাধবী তাড়াতাড়ি উঠিয়া আলােটা জ্বালিল।
মনােজ বাধা দিয়া বলিল, করছেন কি বৌদি! এখন আলাে
আলে? এরােপ্লেন মাথার ওপর ঘুরছে। দেবে বােমা ফেলে।
আলাে জ্বেলেছ কি মরেছ।
মরুক! মরাই উচিত। তারপর দুইকোণে দুইটি নিরাপদ
আশ্রয়ের মধ্যে ইহাদের দুইজনকে দেখিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল, আ
৩.
আমার কপাল, ভেবেছিলাম এই ফঁাকে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে
এক পাশে সরে থাকবে। তা না পালিয়েছে দেখ এরা কোথায়। এ
ওখানে, ও সেখানে। নিরাপদ স্থান বেছে নিয়ে আগে থেকেই সরে
পড়েছে। আর আমরা দেওর ভাজে মরি আর কি! কি দরদ।
আমাদের ওপর দরদ না থাকতে পারে। কিন্তু তােমাদের পরস্পরের
মধ্যে তাে দরদ থাকা উচিত ছিল। মাধবী আবার হাসিয়া উঠিল
বলিল, এরই নাম ভালবাসা। প্রাণ রাখতে প্রাণান্ত।
মনােজ টিপ্পনী কাটিয়া বলিল, ওদের ভালবাসা অমনি!
মাধবী হাসিতে হাসিতে বলিল, আর না। অনেক শিক্ষা হয়েছে।
বােমা বাজিয়েও শিক্ষা হল না তােমাদের। বােমার ভয়ে হােক, এই
সময়ের ফঁকে হােক, দুটি আপনজন এক হয়ে গায়ে গা দিয়ে মিশে
থাকবে, তা না, এ ওদিকে, ও সেদিকে। কে কার খোঁজ রাখে।
কে কার কথা ভাবে। বিপদ এলে আপন পর চেনা যায়। তােমরা
তাই শেখালে, আর দেখালে আমাদের।
মাধবী উঠিয়া দাড়াইল। কোমরে কাপড় জড়াইয়া দুইজনকে
গম্ভীর স্বরে ডাক দিল, এই বেরিয়ে এস। এস বেরিয়ে। প্রাণের
টান কত। ভালবাসার বেশ নমুনা দেখালে যা হােক।
ও দিকের কোণ হইতে চপলা, এ দিকের পাশ হইতে বিরজা
আসিয়া দাড়াইল শুষ্কমুখে মাধবীর সামনে।
বস এখানে। এমনি ভালবাসা তােমাদের! প্রাণের ভয়ে দে
ছুট! কে কার খোঁজ রাখে। বলিয়া আবার হাসিতে লাগিল।
মনােজ ছুটিয়া গিয়া আলাে নিভাইয়া দিল।
ঘর অন্ধকার। চারিজন এক জায়গায় চুপ করিয়া বসিয়া রহিল।
কে কি ভাবিতেছে অনুমান করা সহজ নয়। বাহিরে তখনও দাপা-
দাপি চলিতেছে।
অপরাজিতা শুইয়া শুইয়া তখন নবেন্দুর কথা ভাবিতেছিল। এইমাত্র
তাহার লেখা একখানা বই পড়া শেষ করিয়াছে। বইখানির নায়িকা মনে হইল সে নিজেই। নায়ক লেখক স্বয়ং। যােড়শী লেখাপড়া জানে না তাই রক্ষা। নইলে এই বইখানা লইয়া সে কুরুক্ষেত্র বাধাইয়া দিত। অপরাজিতা ভাবিতে লাগিল, তাহার মনের কথা যেমন নবেন্দু ধরিয়াছে এমন আর কেহই পারে না। অপরাজিতার মনে হইল, তাহাকে আরও কাছে পাইলে সে সুখী হইত। কি ভাবে পাওয়া যায় তাহাই ভাবিতে লাগিল। কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। বইখানা ও পাশে পড়িয়া আছে। পাশ বালিশটাকে জড়াইয়া ধরিয়া শুইয়া আছে। গায়ের কাপড় খুলিয়া গিয়াছে। এমন সময় বাহির হইতে সাড়া আসিল, যােড়শী, যােড়শী ! তারপর দরজা খুলিয়া দেখিল বিছানায় অপরাজিতা। নবেন্দু একদৃষ্টে তাহাকেই দেখিতে লাগিল। ও ধার হইতে উত্তর দিল যােড়শী, এই যে যাচ্ছি। যােড়শীর কথায় নবেন্দুর চমক ভাঙ্গিল। দুই পা পিছাইয়া আসিয়া নিজের ঘরের দিকে চলিল। দরজার সামনে যােড়শীর সঙ্গে দেখা। একসঙ্গে দুইজনে ঘরে ঢুকিল। জামা খুলিতে খুলিতে নবেন্দু বলিল, কার কাপড় পড়েছ ? একগাল হাসিয়া যােড়শী বলিল, অপুদি তার ভাল কাপড়খানা আমাকে পরিয়ে আমার আটপৌরে একখানি ভুরে সাড়ী নিজে পরে— অবাক হইয়া নবেন্দু বলিল, সর্বনাশ! হয়েছিল আর কি। তুমি শুয়ে আছ মনে করে ও ঘরে ঢুকে পড়েছিলাম। গায়ে হাত দিয়ে ডাকি আর কি- যােড়শী হাসিতে হাসিতে বলিল, দিদির ঐ এক সাধ। খেয়াল বটে! সত্যি আমাদের দুজনকে কি চোখেই না দেখেছে। তােমার কথা বলতে যেন ওর মুখ দিয়ে লাল পড়ে। বড় ভাল মেয়ে। নবেন্দু মনে মনে বিষয়টা অনুমান করিয়া লইল। তারপর অন্য কথা আনিয়া,
বলিল, আর তােত রাখা যায় না তােমাকে। আমি উঠছি মেসে। তুমি
দেশে যাও। এভাবে থাকা যায় না। শুনেছ কজন মরেছে কাল।
এ বােমা তত কিছুই নয়। এই তাে সবে পত্তন হ’ল। এর পর রােজ
আসবে, হানা দেবে। কাল বরং তােমাকে রেখে আসি।
যােড়শী বলিল, অপুদিও সেই কথা বলছিল।
তবে আর কথা কি ? পাড়ি জমাও।
যােড়শী চিন্তিত মুখে বলিল, আমি না হয় চলে যাচ্ছি। কিন্তু
তুমি তাে এই অবস্থার মধ্যে থাকবে। কখন কি হয় কে জানে।
আমার কথা ভেবাে না। অবস্থা বুঝলেই ব্যবস্থা করবাে।
পা তুলেই রইলাম জানবে।
দুইজনে বসিয়া বসিয়া বিদায়ের পালা রচনা করিতে লাগিল।
০১৩
এগার মীনাক্ষি হাসিতে হাসিতে অপরাজিতাকে বলিল, বুঝলে দিদি, বিপদ এলে তখন শত্রু মিত্র জ্ঞান থাকে না। তা বেশ ভালই জানি। এই তত তার নমুনা! বলিয়া ভালমাসি, বাড়ী ওয়ালীর কথা পাড়িল। কয়দিন হইতে এই দুই মহিলার মধ্যে ভীষণ ঝগড়া বাধিয়াছে। উপলক্ষ্য নীরদাসুন্দরী। সন্ধ্যার সময় তুমুল ঝগড়া। হাতাহাতির উপক্রম। এমন সময় সাইরেন বাজিয়া উঠিল। আর যায় কোথায়। ভালমাসি গিয়া নীরদাসুন্দরীকে জড়াইয়া ধরিল। বাড়ীওয়ালী বৌ গিয়া ধরিল ভালমাসিকে। তিনজনে জড়াজড়ি করিয়া ঢুকিল কলতলার মধ্যে নিরাপদ স্থানে। চারিদিক ঘেরা। বােমা পড়িলে তাহার কণা আর ছিটকাইয়া আসিতে পারিবে না। উপরের আকাশে এরােপ্লেনের দাপাদাপি। নীচের কলঘরে এদের মাতামাতি। কোথায় বিপদ। কোথায় কোলাহল। মীনাক্ষি হাসিয়া বলিল, তাহলে শ্যামের বাঁশীর গুণ আছে। সব এক করে দেয়। অপরাজিতা আড়াল হইতে দেখিল নবেন্দু তাহার পানে একদৃষ্টে তাকাইয়া আছে। লজ্জা পাইয়া সে সরিয়া দাড়াইল। মীনাক্ষিকে টানিয়া ও ধারে লইয়া গেল। পরক্ষণে আবার আগাইয়া আসিয়া, দেখিল নবেন্দু ঠিক তেমনি ভাবে দাড়াইয়া আছে। ভাব পরিবর্তন করিয়া অপরাজিতা মীনাক্ষিকে বলিল, সব তােত পালাতে আরম্ভ করেছে। তােমরা যাচ্ছ কবে? পালালেই তাে হয়। ভাল লাগে না থাকতে। এই সব দেখে মনটা খারাপ করছে। কখন কি হয় বলা যায় না। কিন্তু দিদি তুমি ? ১৫
অপরাজিতা জানে তাহার যাইবার স্থান নাই। স্বামী দোকান বন্ধ
করিয়া কখনও কলিকাতা ছাড়া হইবে না। আর সে কি করিয়া
তাহাকে ফেলিয়া কোথায় যাইবে। কিন্তু অন্য কথা বলিল, আমি
সব ঠিক করে রেখেছি। পালালাম বলে। এখানে কি থাকতে আছে
আর। না থাকা যায়।
এমন সময় ঘােড়শী আসিল।
আমি তাে রেডি। সব কথা হয়ে গেল।
সব কথা হয়ে গেল। চললাম। দোষ ত্রুটী
করে থাকলে ক্ষমা করে দিদি। আবার যদি দেখা হয় তত মনের
কথা বসে বসে বলব তখন।
অপরাজিতা অবাক হইয়া বলিল, তুমি একলা যাচ্ছ ?
হা। ওঁর যাওয়া কি সম্ভব ?
তা বটে! পুরুষ মানুষ। ভয়ে পালিয়ে গেলেই বা চলবে কেন?
আর তেমন তেমন দেখলে পালাতে কতক্ষণ!
তবে দিদি একটা কথা বলে রাখি, অনুবােধ সেটা। উনি আমাকে
পৌঁছে দিয়ে এখানে এসে যে কটা দিন মেস ঠিক করতে না পারেন
সে কটা দিন দুটো খেতে দিও। খরচ দেবার মত স্পর্ধা রাখি না।
দয়া করে দেখবে তােমার দাদাকে।
দাদা আবার কবে থেকে হলেন উনি। বলে হাসতে লাগল
অপরাজিতা।
সেই যে একদিন দাদা আর বৌদি বলে আমাদের দুজনকে নিয়ে
কি সব বলে গেলে। বলিয়া অতীতের একটা রঙ্গমঞ্চের পর্দা
অপরাজিতার সামনে ধরিয়া বসিল ষােড়শী।
অপরাজিতা কবে কি কথা বলিয়াছে খেয়ালের বসে তাহা কি
তাহার মনে আছে। ভাবিয়া বলিল, তা হবেও বা। যা বলছ বল।
দাদাই বটেন।
মীনাক্ষি বলিল, তােমরা কথা বল, আমি চলি। কাজ আছে কত।
গােন গাছান বলিয়া ইত্যাদি, সে চলিয়া গেল।
অপরাজিতা শক্ত মুঠিতে যােড়শীকে ধরিয়া বলিল, চল বৌদি,
দাদাকে বলে আসি কথাটা।
যােড়শী অপরাজিতার মুখ চোখের ভাব দেখিয়া তয় খাইয়া গেল।
বলিল, না, না, রাগ কর কেন?
অপরাজিতা মনে মনে ভাবিয়া লইল এই রকম একটা কথা। না
হইলে সুবিধা হইবে না।
দুই জনে ও ঘরে গেল।
যােড়শী বলিল, দেখ আমি তাে চললাম। যতদিন কোন ভাল মেস
পাও ততদিন এখানেই থাকবে। দিদির জিম্বায় রেখে যাচ্ছি
কোন অসুবিধা হতে দেবে না সে।
নবেন্দু হাসিয়া বলিল, মেয়েদের জিম্বায় ছেলেরা থাকবে। না
ছেলেদের জিম্বায় মেয়েরা থাকে।
অপরাজিতা গম্ভীর হইয়া বলিল, ওসব কথা শুনি না দাদা, কাল
থেকে আমার তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। বড় কড়া মেয়ে আমি। যা
বলব তাই করতে হবে। উঠতে বললে উঠবে, বসতে বললে বসবে।
ও আমি পারব না। অন্য পথ দেখ ষােড়শী। তােমার দিদির
অধীনে থাকতে পারি। কিন্তু আমার বােনের অধীনে থাকতে
নারাজ। বলিয়া গম্ভীর হইয়া উঠিল নবেন্দু।
কারণ।
কারণ অনেক। বােনটি লােক ভাল নয়। পেটে পেটে কি সব
মতলব খেলছে।
যােড়শী অপরাজিতাকে বলিল, ওর কথা ছেড়ে দাও। আমি
তােমার জিম্বায় ওকে রেখে যাচ্ছি। এমন শক্ত বাঁধনে বাঁধবে যেন
নড়তে না পারেন। বেয়াদপি করলেই চাবুক লাগাবে।
সে বৌদি হলে পারতাম। বােন হয়ে পারব কি করে?
সবই হবে। যখন যেমন বুঝবে তখন তেমন করবে?
অপরাজিতা বলিল, এস বৌদি, তােমার বিদেয়ি কাপড় নিয়ে যাও।
এখন থেকেই তােমায় বিদেয় করে বাঁচি। বলিয়া নিজেই হাসিতে
হাসিতে তাহার ঘরে চলিয়া গেল।
নবেন্দু বলিল, বৌদির মত মানুষ আর দেখা যায় না।
আমাদের দুজনকে কি চোখেই না দেখেছে। বলিল যােড়শী।
নবেন্দু বলিল, ওকে নায়িকা করে একখানা বই লিখব। নানা
রূপে আমাদের সামনে এসে দাড়ায়। কখনও আমার মা হয়ে কাছে
আসে। তেমনি কাপড় পরে। কখন তােমার মা হয়ে বসে। তেমনি
জামাইতত্ব। কখন বৌদি, কখন বা বােন। সময় সময় কি সেজে
বসে আমাদের সেবা করে। অদ্ভুত মেয়ে। মেয়ে অপরূপা।
তাই তাে বলি, মানুষ বটে একখানা। বলিল ষােড়শী।
দুখানা নয় তত?
হাসিয়া বলে নবেন্দু।
কথা চলিয়াছে অপরাজিতার নানা রূপ সম্বন্ধে দুই জনের মধ্যে,
এমন সময় অপরাজিতা আসিয়া সামনে দাড়াইল। হাতে শাড়ী
একখানা। লালপেড়ে শাড়ী। টকটকে লাল।
নবেন্দু হাসিয়া বলিল, বিদেয়ির বহরটা ভালাে। আমিও তাে
যাচ্ছি ওর সঙ্গে। আমাকে বিদেয়ি দেবে না।
ধমক দিয়া অপরাজিতা বলিল, অমন করে কথা বললে আর আমি
তােমার সঙ্গে কোন সম্বন্ধ রাখব না। কথা খুব শিখেছ।
টপ টপ করিয়া অপরাজিতার চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িল।
সবাই অবাক। অপরাজিতা নিজেও কম অবাক হয় নাই। আর কথায়
কথা বাড়াইয়া লাভ নাই। লজ্জিত হইয়া সে সরিয়া পড়িল।
নবেন্দু ঘােড়শী এক দৃষ্টে অপরাজিতার পানে চাহিয়া রহিল।
সাজ সাজ রব উঠিয়াছে বাড়ীর সকলেরই মুখে।
মুস্কিল হইয়াছে শশীপদ আর তাহার স্ত্রীর। বাড়ীর কর্তা সাজিয়া
বসিয়া বেশ নির্বিবাদে ও কর্তৃত্ব বজায় রাখিয়া চালাইতেছিল। বাধ
সাধিল
যুদ্ধ ও তাহার আতঙ্ক।
কোলাহল-৭
১৭
সকলে চলিয়া যাইবে। এত বড় বাড়ী পড়িয়া থাকিবে। কে ভাড়া দিবে। বাড়ীর মালিককে পত্র লিখিয়া সে কথা না জানাইলে সমস্ত দাবী ও ঝুকি তাহারই উপর গিয়া পড়িবে। তখন ভীষণ ভাবনা ধরিয়াছে এই দম্পতির। কিন্তু বিপদ তত তাহাদের একার নয়। সর্বত্রই এই এক অবস্থা। সকলেই পলাইতেছে। সকল বাড়ীওয়ালার একই অবস্থা। সে কথা ভাবিয়া কতকটা সান্ত্বনা পাইল ইহারা। অবশেষে পত্র লিখিতে বসিল। যুদ্ধের মােটামুটি অবস্থা ও পারিপার্শ্বিক ঘটনা বিবৃত করিয়া জানাইল বাড়ীর মালিককে। পত্ৰ আসিতেও দেরী হইল না। তিনি প্রকৃত অবস্থা আগে হইতেই অনুমান করিয়াছিলেন। সব কথা পরিষ্কার করিয়া লিখিলেন। যাহারা চলিয়া যাইতে চায়, যাইতে পারে। তাহারা কি করিবে সত্বর জানাইয়া চিন্তা দূর কর। বাড়ীর সামনে একটু ভােলা জায়গা পড়িয়াছিল সেখানে ট্রেঞ্চ কাটা হইতেছে। অবস্থা বুঝিলে এই গর্তের ভিতর শুইয়া মানুষ আশ্রয় লইতে পারে। তাহারই আয়ােজনে অনেকে ব্যস্ত। নােটিশ আসিয়াছে বাড়ীর সামনে দরজার মুখে একটা দেওয়াল তুলিতে হইবে। বাহিরে বােমা পড়িলে তাহার টুকরাগুলি যাহাতে বাড়ীর ভিতরে না ঢােকে এ 'তাহারই ব্যবস্থা। শশীপদ মহা ভাবনায় পড়িয়াছে। এত বড় বাড়ীর যাহার বাসিন্দা সেই পুরুষবর্গের মধ্যে কেহ কাহারও সহিত বিশেষ কথাবার্তা বা আলাপ পরিচয় করিত না। এখন সকলেই সকলের পরামর্শ চায়। বসিয়া বসিয়া কথাবার্তা বলে। মেয়েদের তাে কথাই নাই। ঘরে বসিয়া এই কথাই আলােচনা করিতে থাকে। ভালমাসির খােরাক জুটিয়াছে ভাল। এর কথা ওকে, ওর কথা তাকে বলিয়া অবস্থাকে আরও গরম করিয়া রাখিতেছে। তাহারও ভয় ধরিয়াছে কম নয়। ১৮ মহিলা মহলে ভয়ের ভাব বেশী। উৎসাহ ও উত্তেজনা ততােধিক। বাহিরের সংবাদ জানিবার আগ্রহ ক্রমেই বাড়িয়া চলিয়াছে। ছেলেরা নানা গুজব আনিয়া নিত্য নূতন সংবাদ পরিবেশন করিতেছে। কয়দিন হইতে বিরজার কোন সংবাদ নাই। মাধবী ব্যস্ত ব্যাকুল হইয়া উঠিল। এই দুর্দিনে তাহার সংবাদ না লইলে তােল চলে না। মনােজকে ধরিল। প্রথমে খােসামােদ তারপর ঘুষ দিয়া তাহাকে বিরজার খবর আনিবার জন্য পাঠাইল। ঘণ্টা কয়েক পরে মনোজ ফিরিয়া আসিয়া বলিল যে, বিরজা দেশে চলিয়া গিয়াছে। মেসের অনেকেই চলিয়া গিয়াছে অবশ্য যাহারা ছাত্র ছিল। বাকী যাহারা আছে তাহারা সরিয়া পড়ার জন্য তােড়জোড় করিতেছে। ও দিককার অনেক বাড়ী বন্ধ দেখা গেল। এক ফঁাকে মনােজ তাহার সঙ্গীদের লইয়া সারা সহর ঘুরিয়া দেখিয়া আসিয়াছে। অবস্থা ভাল নয়। ঘােড়ার গাড়ী, ট্যাক্সি দুটিতেছে ক্রমাগত স্টেশনের দিকে। স্টেশনে লােকে লােকারণ্য। সব পলায়ন তৎপর হইয়া উঠিয়াছে আর কুলিদের পড়িয়াছে মরসুম। মনােজ বসিয়া বসিয়া মাধবীকে কলিকাতার হালচাল বলিয়া চলে। মাধবীর উপর কড়া চিঠি আসিয়াছে। সত্বর মনােজকে সঙ্গে লইয়া সে যেন চলিয়া আসে। কলিকাতার সংবাদ যে ভাবে তাহারা প্রতিদিন পাইতেছে ও আগন্তুকের কাছে যে সব ঘটনা শুনিতেছে তাহাতে আর সাহস হয় না ওখানে রাখার। কথার অবাধ্য হইবে না। মাধবী আর আপত্তি তুলিল না। স্বামী আসিলেই তাহাকে চাকরীর জন্য সাবধানে থাকিবার, আবার সময় বুঝিলে সরিয়া পড়ার নির্দেশ দিয়া তাহারা দেওর ভাজে ঘর সামলাইতে লাগিল। এত সাজান ঘর। এত যত্ন করিয়া কিনিয়া রাখা সাজান গুছান জিনিসপত্র সব ফেলিয়া তাহারা চলিয়া যাইবে। ফিরিয়া আসিয়া এইগুলি দেখিতে পাইবে কিনা সন্দেহ। হয়তাে ঝড়ীখানাই বােমার আঘাতে গুড়া হইয়া যাইবে। ভাবিতে লাগিল মাধবী। মনােজ কখনও বা ভয় দেখায় বেশী মাত্রায়। কখনও বা সান্ত্বনা দিয়া বলিতে থাকে, ও কিছু নয়। কিছু হবে না। এমন সময় আসিল চপলা। আসিয়াই মাধবীকে ঢিপ করিয়া প্রণাম করিয়া বলিল, দিদি, চললাম। দেশে যাচ্ছি। সব তৈরী। অবাক হইয়া মাধবী চপলাকে দেখিতে লাগিল। বিরজা ও চপলাকে লইয়া সে অনেক কল্পনা করিয়াছিল। সেই বিরজা কদিন হইল চপলার মােহ ত্যাগ করিয়া বােমার ভয়ে পলাইয়া গিয়াছে। আজ চপলাও পাইতেছে সেই বােমার ভয়ে। হায় বোমা। ভালবাসা ইহাদের কাছে কি কিছুই নয়। মনােজ হাসিয়া বলিল, যাও! সবাই যাবে। আমরাও কাল বাড়ী যাচ্ছি। তবে বৌদিকে তােমাদের ঠিকানাটা দিয়ে যেও। মাধবী বলিল, সত্যি, তােদর ঠিকানাটা দে তােল। চিঠি দোব। তােরাও দিবি। আমাদের ভুলিসনি! ভুলিসনি তাের বিরজাকে। দেখি, বাড়ী তাে যাচ্ছি, যদি কিছু করতে পারি। ভাবিস নি। হঠাৎ চপলার চক্ষু সজল হইয়া উঠিল। নীরদাসুন্দরী কোথাও যাইবে না ঠিক করিয়াছে। সবাই চলিয়া গেলেও সে ঠিক থাকিবে এই বাড়ী আগলাইয়া। শশীপদ সরিয়া পড়িবার চেষ্টায় আছে। তাহার দেশ ঘর কোথাও নাই। অবশ্য এককালে ছিল। এখন তাহার নিশানা পাওয়া দায়। সে চেষ্টা করিতেছে কোন দূর সহরে চলিয়া যাইবে। হয়ত বা কাশীতে সেই বৃদ্ধের বাড়ীতেই গিয়া উঠিবে।
বার নীরদাসুন্দরী বলে, সাত কাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে তার, আর ভয় কিসের! যা হয় হােক! সে এক পাও নড়বে না। উপর হইতে ভালমাসি টিপপনি কাটিয়া বলিল, সেই ভাল, কলতলায় বাদ সাধবার কেউ থাকবে না। দিন রাত জল নিয়ে থােক। অপরাজিতা আর এক টিপ্পনি কাটিয়া বলিল, পলতায় কি টালায় যদি বােমা পড়ে তাহলে জল আসবে কোথা থেকে? বিনা জলে কি মাসির একটা দিনও চলবে? নীচে হইতে নীরদাসুন্দরী ব্যঙ্গ কটাক্ষ করিয়া বলিল, ও আমার কপাল! বলে কি দেখ না। গোঁ গোঁ শব্দ করিতে করিতে একদল এবােপ্লেন আকাশে উড়িয়া চলিল। সকলেই অবাক হইয়া উপরের দিকে তাকাইয়া রহিল। কিছুক্ষণ পরে আবার তাহারা ফিরিয়া আসিল। অপরাজিতা বলিল, তাড়া করতে গিয়েছিল। তাড়া খেয়ে ওরা পালিয়ে যাওয়ায় এরা ফিরে আসছে। শশীপদ কোথা হইতে হন্তদন্ত হইয়া আসিয়া বলিল, সর্বনাশ। রেঙ্গুন শেষ। আন্দামান যায় যায়। কলকাতার পালা এবার। নীরদাসুন্দরী বিরক্ত মুখে বলিল, যাক ও সব কথা। যত সব বাজে কথা। হয় হােক। আমি ওতে ভয় খাই না। সামনের বাড়ী, পাশের বাড়ী, ও দিকের বড় বাড়ীর সবাই কদিন হইতে পাড়ি জমাইতেছে। তাহাদের লটবহর আর কথাবার্তার বহর শুনিয়া অনেকের ভয় ধরিয়া গিয়াছে। শশীপদর স্ত্রীরও ভয় ধরিয়া গিয়াছে। সে এখানে একদণ্ড থাকিতে রাজী নয়। থাক বাড়ী, লােক জন, প্রতিবেশী। ভাড়া আদায় করার
নেশা তাহার চলিয়া গিয়াছে। বাড়ীওয়ালী সাজিবারসখও মিটিয়াছে।
দুইজনে পরামর্শ করিয়া ঠিক করিল তাহারাও চলিয়া যাইবে।
বাহিরের বােয়াকে বসিয়া শশীপদ কি যেন ভাবিতেছিল।
নবেন্দু হন হন করিয়া আসিতেছে। হাতে একখানা কাগজ।
শশীপদ জিজ্ঞাসু মুখে বলিল, কি খবর? টেলিগ্রাম নাকি?
কাগজখানা : শশীপদর হাতে দিয়া সে পাশে থপ করিয়া বসিল।
কপালে ঘাম মুছিয়া বলিল, সব শেষ! আর বাঁচবার উপায় নাই।
কাতারে কাতারে সৈন্য চলেছে সীমান্তের দিকে। আর একটা বড়
রকমের আক্রমণ হ’ল বলে। কাল কি পরশু। এবার কলকাতা শেষ
করে দিয়ে তবে ছাড়বে।
শশীপদ হতাশ হইয়া বলিল, আর থাকা যায় না।
ঠিক কথা। এত বিপদের মধ্যে বাস করা যায় না। বলিয়া
নবেন্দু পকেট হইতে চিঠি বাহির করিয়া বলিল, বাড়ী থেকে চিঠি
এসেছে। একদিন অন্তর আসছে। চলে এস। চলে এস। আর
থেকে কি ফল। দিন কয়েকের ছুটি না দেয় তােত চাকরী ছেড়ে দিয়েই
এস। বেঁচে থাকলে চাকরীর অভাব হবে না।
ঠিক বলেছেন। আগে প্রাণ তারপর অন্য সব। সেই প্রাণটাই
যদি গেল অনালে বেঘােরে তবে থাকল কি? বলিল শশীপদ।
হাসিতে হাসিতে নবেন্দু বলিল, তার ওপর আর এক বিপদ
জুটেছে। যারা এখান থেকে পলিয়ে যাচ্ছে। তারা ক্রমাগত যা
তা বলে ওদের সব ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। বলে কি না হাওড়া ব্রিজের
চিহ্ন মাত্র নাই। বড় বড় বাড়ী সব ধূলােয় মিশিয়ে দিয়েছে।
বড়বাজার, ডালহাউসি স্কোয়ার সব শেষ।
একটু থামিয়া আবার বলিতে লাগিল, আচ্ছা মজা হয়েছে। যারা
পালাল তারা না বলেই বা চুপ করে থাকে কি করে। কাপুরুষ বলবে
যে তাদের। তাই যা খুসী তাই বলে তারা ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে। নিজের
সব পালিয়ে এসে যে বুদ্ধিমানের কাজ করেছে সেই কথাই বার বার করে সকলকে বলে বেড়াচ্ছে। ভাবছে খুব বীরত্বপনা দেখালে। বােম পড়ল শ্যামবাজারে। সে কি এতটুকু অঞ্চল। পড়েছে তে বাজারে আর একটা বাড়ীতে। কিন্তু হলে কি হবে। সারা শ্যামবাজার অঞ্চলে যারা থাকে সকলেরই আত্মীয় স্বজন ভাবছে তাদেরই লােকের ওপর সেই বােমা পড়েছে। শশীপদ গম্ভীরভাবে বলিল, গ্রামের লােকেরা একটু বােকা, আর ভীতু। যে যা বলে তাই বিশ্বাস করে বসে। ভেবে দেখে না একটুও। বাইরে থেকে অমন লাগে। চোখের সামনে আমরা যা দেখে ভয় পাই না, ওরা সেখান থেকে তা অনুমান করে ভয়ে সারা হয়। যুদ্ধের কি অবস্থা শুনলেন জানলেন তাই বলুন। যুদ্ধ হবে তত ? হবে মানে? হচ্ছে যে! এতেও বিশ্বাস হচ্ছে না আপনার ? , না। আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। একি কথার কথা! বলিয়া শশীপদ কাগজখানা তুলিয়া ধরিল। ধরিতেই যে ছবি প্রথম পৃষ্ঠায় দেখিল তাহাতে তাহার মাথা ঘুরিয়া গেল। একখানা ভাঙ্গা বাড়ীর ছবি। বাড়ীটা যে প্রকাণ্ড বড় তা তাহার স্তুপ দেখিলেই বােঝা যায়। শশীপদ বলিয়া উঠিল, এ, এ যে সর্বনেশে কাণ্ড! আচ্ছা চলুন। আমিও যাচ্ছি আপনার ঘরে একটু পরে। অনেক পরামর্শ আছে। নবেন্দু হাসিতে হাসিতে বলিল, আমার সঙ্গে পরামর্শ। তারপর সে দ্রুত চলিয়া গেল তাহার ঘরের দিকে। নবেন্দু জামা কাপড় পরিবর্তন করিয়া কঁকা ঘরে পায়চারি করিতে লাগিল। সব শূন্য লাগে যেন। এমন সময় শােনা গেল পাশের ঘরে তাসের আড়া পড়িয়াছে। তাহাদের কোলাহলের অন্ত নাই। যুদ্ধের বাজারে তাহারা বাজী মাৎ করিতে চায়। হাসি পাইল নবেন্দুর। এই এত বড় বাড়ীতে পুরুষের সাড়া শব্দ
মিলিত না। মেয়েরাই হৈ হৈ করিয়া বেড়াইত। এওর ঘরে যাইত।
ও তার ঘরে গিয়া বসিয়া গল্প করিত। তাহারেই যেন সব।
সারাদিন চাকরী করিয়া, ব্যবসা করিয়া বাড়ী ফিরিয়া আসিয়া কে
কোথায় কোন ঘরে পড়িয়া থাকিত কেহ কাহারও খোঁজ খবর রাখিত
। এখন তাহারাই যুদ্ধের বাজারে তাস খেলিয়া আড্ডা দিয়া সারা
বাড়ী ঘর : ঘুরিয়া
বেড়াইয়া হল্লা করিয়া চলিতেছে।
মেসবাড়ী একটা।
এ যেন
নীরদাসুন্দরী একা কল ঘরে। বাধা দিবার কেহই নাই। কল
হইতে অবিরত জল পড়িতেছে। কাহারও প্রয়ােজন নাই। রান্না-
বাড়ার প্রয়ােজন যে অনেকের ফুরাইয়াছে। অফিসের ক্যান্টিনে কেহ
খায়। কেহ বা হােটেলে। নেহাৎ যাহারা পারে না তাহারা নিজেরা
সিদ্ধপক রান্না করিয়া উদর ভরাইয়া লয়।
এত বড় জম জমাট লক্ষ্মীমন্ত বাড়ীখানার এই শ্ৰী হইয়াছে দেখিয়া
শশীপদ মনের দুঃখে ঘুরিয়া বেড়ায়। মেয়েদের কোলাহল, কলগুঞ্জন
যেন কোন যাদুকরের মন্ত্রবলে স্তব্ধ হইয়া গিয়াছে।
শশীপদ গিয়া দাড়াইল নবেন্দুর ঘরের সামনে।
আসুন দাদা, আসুন।
শশীপদকে এরূপ সম্মান কেহ করিত না। বাড়ীওয়ালা সাজিয়া
তাহার মেজাজ যেরূপ গরমে উঠিয়াছিল তাহাতে তাহার সঙ্গে কথা
বলা অনেকের সহজ সাধ্য ছিল না। কেহ কথা বলিলে শশীপদ
ভাবিত খােসামােদ করিতে চায়। ভাড়া বাকী রাখার মতলবে আছে।
কাজেই সেও সেই ভাবে কথা বলিত। তাহার ভাব দেখিয়া অন্যেরাও
সেই মত চলিত। সেই শশীপদ এখন এমন হইয়া গিয়াছে। কেহ
ডাকিয়া কথা বলিলে যেন কৃতার্থ হয়।
পাশের ঘর হইতে চীৎকার উঠিল—বাজি মাৎ।
শীপদ আঁকাইয়া উঠিল।
১০০
নবেন্দু হাসিয়া বলিল, বাজি মাৎই বটে! চাকরী আর খেলা
সংসারের ঝামেলা তাে সব চুকেছে। এ ছাড়া আর কথা কি।
একটা কথা ভুলে গিয়েছি। শুনুন, চোর গুণ্ডার বড় অত্যাচার আরম্ভ
হয়েছে। অন্ধকার রাস্তা। সাবধানে চলবেন।
শশীপদ ভয়ে ভয়ে বলিল, তাই নাকি? এ বাড়ীতে গুণ্ডার,
চড়াও হবে না তাে ?
হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল নবেন্দু, যে মেস বাড়ী করে
তুলেছেন তাতে সে দিক দিয়ে ভয় কিছু নাই। আবার ভয় নাই
বা কেন ?
দিনে সবাই চাকরীর জন্যে বাইরে থাকে। সেই
ফঁকে
শশীপদ আস্তে আস্তে বলিল, তা হলে—অতবড় বাড়ীর দায়িত্ব
ঐ বুড়াে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে যে এমন জব্দ করবে তা কে
জানে? কি বিপদ
এতদিন তাে সে কথা ভাবেন নি। বেশ বাড়ীওয়ালা সেজে
রাজত্ব করছিলেন। বলিয়া নবেন্দু একটা কটাক্ষ করিল।
শশীপদ বলিল, যাই একবার ও ঘরে, কাজ আছে। পরে আসব।
বলিয়া সে চলিয়া গেল।
নবেন্দু বিছানায় শুইয়া পড়িয়া কড়িকাঠ গুণিতে লাগিল।
শনিবার হইলে বাড়ী যাইবার হিড়িক লাগে সকলের। ট্রেনের ভিড় বাড়িয়াছে অসম্ভব। শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে ঘরে ঘরে পুটলীর বহর বাড়িয়া উঠে। ঘরে বসিয়া সবাই সেই কথাই বলাবলি করে। যাবে কেমন করে। যে ভীড়। অথচ প্রতি সপ্তাহে তাহাদের জীবন্ত অবস্থাটা বাড়ীতে না দেখাইলে তাে চলে না। ষ্টেশনের মুখ হইতে প্লাটফরম পৰ্য্যন্ত কাতারে কাতারে লােক দাড়াইয়া আছে। তখনও ট্রেন আসে নাই। প্লাটফরমে ট্রেন ঢােকা মাত্রই চলতি ট্রেনে একে একে সব উঠিয়া পড়ে। ট্রেন যখন থামিল তখন দেখা গেল গাড়ী একদম ভর্তি হইয়া গিয়াছে। ঘরে বসিয়া ট্রেনের গল্প, ভীড়ের গল্প এবং যাত্রীদের দুরবস্থার কাহিনী শুনিতে শুনিতে শশীপদর কান ঝালাপালা হইয়া গিয়াছে। যে ঘরে যাইবে সে ঘরেই ঐ এক কথা। ঘুস দিয়া টিকিট কাটিতে হয়। ঘুস দিয়া ট্রেনের কামরার ভিতর বসিতে হয়। মােটের জন্য কুলিকে বেশী ঘুস দিতে হয়। অত্যধিক ভীড়ের জন্য ষ্টেশনে পুলিশ মিলিটারী বসিয়া গিয়াছে, তাহারাই আবার বেশী ঘুস খায়। আলােকোজ্জল কলিকাতা কালি মাখিয়া বসিয়া আছে। রাস্তার মােড়ে মােড়ে পুলিশের সঙ্গে এ. আর. পি। আললাগুলি কাল টুপী পরিয়া বৌ সাজিয়াছে যেন। এখানে সেখানে গর্ত খুঁড়িয়া ট্রেঞ্চ কাটা হইয়াছে। বাড়ীর সামনে দেওয়াল তুলিয়া নিরাপদ আশ্রয় রাখার ব্যবস্থা হইয়াছে। সদর রাস্তায় অল্প আলাে, গলিতে অন্ধকারের রাজত্ব। জানালা দরজায় যেখানে কাচের পত্তন সেখানে পট্টি বাঁধার ব্যবস্থা
করা হইতেছে। বােম পড়িলে কাচে আঘাত লাগিতে পারে।
তাহার ফলে সেই কাচগুলি বােমার সঙ্গী হইয়া আঘাত দিবার জন্য
ছুটিয়া বেড়াইতে পারে। হয় কাচ খােল, না হয় পট্টি বাঁধিয়া দাও।
শশীপদ দেখে সব ঘরেই পট্টী বাঁধা হইয়া গিয়াছে। তাহার ঘরে
কেবল এই কাজ করা হয় নি। ছুটিল নিজের ঘরে। ন্যাকড়া কাগজ
আর আটা দিয়া কাচের জানালায় পট্টি বঁধিতে লাগিল। তাহার ঘর
একলা কখন আসে, কখন যায় কোন ঠিক নাই। বাড়ীর
উপর তাহার মায়া আর নাই যেন। দেখিতে দেখিতে এ কি হইয়া
শূন্য।
গেল।
মাথায় হাত দিয়া একসময় বসিয়া পড়ে সে ঘরের মেঝের উপর।
দুখানা এরােপ্লেন উপর দিয়া যেন আসিতেছে। শাদা চিক চিক
করিতেছে।
পাশের ঘর হইতে একজন চীৎকার করিয়া উঠিল, জাপানী
এরােপ্লেন রে! একেবারে জাপানী। কি শাদা! আর চিক চিক
করছে কেমন? এ ধরণের এরােপ্লেন কখনও দেখিনি।
শশীপদ বারান্দায় আসিয়া আকাশের পানে তাকাইয়া ঐ
এরােপ্লেন দেখিতে লাগিল। নবেন্দু বাহিরে আসিয়া শশীপদকে টানিয়া
ঘরে লইয়া গেল। অবাক কাণ্ড! এই অবস্থায় দাড়িয়ে দেখছেন?
ভয় নাই এতটুকুও। একেবারে জাপানী মাল! বােমা ফেলল বলে।
শশীপদ হতভম্ব হইয়া গিয়াছে। কত ছােট ঐ দুটি এরােপ্লেন।
অনেক উপরে আছে তাহারা। আশ্চর্য ব্যাপার।
নবেন্দু সাবধান করিয়া বলিল, এমনভাবে যদি থাকেন তাে
বৌদিকে চিঠি লিখে দোব। বাড়ী আগলানাে বের করে দেব।
অমনভাবে আর কখনাে দাড়াবেন না। নীচে কোণের দিকে একটা
ঘর ঠিক করা হয়েছে। সাইরেন বাজলেই সবাই সেখানে গিয়ে
ঢুকবে। একেবারে নিরাপদ আশ্রয়। চারদিক ঘেরা কোন দিক
থেকে ছিটে ছাটা আসার উপায় নাই।
১০৭
সেদিন রাত্রে সবাই শুইয়াছে। অকস্মাৎ সাইরেন বাজিয়া উঠিল
একটানা আর্তনাদ।
দুম দাম, দুড় দাড়, ধপ ধপ শব্দ করিতে করিতে সবাই আসিয়া
সেন্টারে আশ্রয় লইল।
ঘরখানি বড়। অনেকগুলি লােক থাকিতে পারে। অন্ধকার
ঘরে একদল লোেক ভয়ে জড়সড় হইয়া বসিয়া আছে। মধ্যে মধ্যে
টর্চের আলাে ফেলিয়া নিজেদের অবস্থা নিজেরা দেখিয়া লইতেছে।
সাইরেন বাজার সঙ্গে সঙ্গে শব্দ হইল এরােপ্লেনের। দুম দুম
করিয়া চলিতেছে না আসিতেছে কিছু অনুমান করা যায় না। নবেন্দু
বলিল, আজ শেষ রাত্রি।
শশীপদ আর্তনাদ করিয়া উঠিতেই একজন বলিয়া উঠিল, এই চুপ!
চুপ! শব্দ করেছেন তাে মরেছেন।
শশীপদ কঁদিতে দিতে বলিল, আর না। খুব শিক্ষা হয়েছে
আমার। সকাল হলেই পালাব। আর এ বাড়ীর পানে ফিরেও চাইব
। কিসের বাড়ী। কার বাড়ী।
নবেন্দু টিপ্পনী কাটিয়া বলিল, আপনার ভরসায় তাে আমরা আছি।
আপনি চলে গেলে আমরা থাকব কি করে? সে হবে না। আপনার
যাওয়া চলবে না।
আবার এরােপ্লেনের শব্দ।
একজন বলিল, এইদিকেই আসছে না?
আসছে না মানে। এসে একেবারে মাথার ওপর ঘুরছে। বন বন
করে ঘুরছে।
দিলে সাবাড় করে! গেলাম আর কি!
ভগবান বাঁচাও! দোহাই ভগবান!
কালরাত্রি কি আর পােয়াবে না!
কাল পােয়াবে।
চন্দ্রনাথ তখন হইতেই তৈয়ারী হইতেছিল। বলিল, জামা
১০০
কাপড় টাকা পয়সা সব রেডি। সঙ্গেই থাকে। রাত্রে শােবার সময়
বােজ সব কিছু রেডি করে রাখি। সাইরেন বাজা মাত্র তৈরি হয়ে
নিই একমিনিটে। তারপর গুমটি ঘরে আশ্রয় নােব। শেষ হ’ল তাে
হ’ল। না হ’ল তাে এইখান থেকে চোচা দৌড়। প্রথম হাওড়ার
ব্রীজ। তারপর সড়ক। গ্র্যাণ্ড টাঙ্ক বােড়। শেষে বাড়ীর পুকুর
ঘাটে পা ধুয়ে ঘরের ছেলে ঘরে গিয়ে উঠব।
নবেন্দু বলিল, চন্দ্রনাথ ওস্তাদ ছেলে। কিন্তু ওর শালা আরও
ওস্তাদ। সে কদিন থেকে ভােলা চিড়ে চিনি লেবু সব রেডি করে
রেখেছে। কলকাতা শেষ হবার একটু আগেই সরে পড়বে।
আমিও তাে শেষ না দেখে যাব না। আর একজন বলিয়া
উঠিল।
চন্দ্রনাথ ধমক দিয়া বলিল, হাওড়ার ব্রীজ ভাঙ্গবে শুনলাম।
তাহলে যাবে কি করে?
সে এক সমস্যার কথা।
একজন বললে, দে সাঁতার। চিৎ সাঁতার। ডুব সাঁতার।
উপরে তখনও এরােপ্লেন ছুটাছুটি করিতেছে।
নীচে একদল মৃত্যুভয় ভীত জীব বসিয়া হাসির ছড়া কাটিতেছে।
একজন হাে হাে করিয়া হাসিয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে আর একজন
শিয়াল ডাক ডাকিতে সুরু করিল।
শশীপদ হাত জোড় করিয়া বলিল, দোহাই! এই বিপদের মধ্যে
অত বাড়াবাড়ি আর করবেন না। ভালও লাগে এ সব।
ভাললা কি লাগে মশাই। প্রাণের দায়ে করে বসি।
বেশ থামুন। আর না, এবােপ্লেনগুলােকে আগে যেতে দিন।
তার পর নাচ গান হল্লা যা খুসী করবেন। এই করেই তােত সব সময়
কাটাচ্ছেন। মেয়েরা ছিল লক্ষ্মী। বাড়ী ছিল লক্ষ্মীমন্ত। তারা
চলে যাওয়ায় শ্রীহীন হয়ে পড়েছে।
হয়ে পড়েছে। কোথাও এতটুকু ঐ দেখা
যাচ্ছে না। যত সব লক্ষ্মীছাড়ার দল।
আবার সাইরেন।
একজন বলিয়া উঠিল, আবার শব্দ ওঠে যে। আসছে নাকি
আবার? না না, এ যে অল ক্লিয়ার। বিপদ কাটল তাহলে
দুর্গা হরি। দুর্গা শ্রীহরি! বলিতে বলিতে শশীপদ উঠিয়া
পড়িল। গােটাকয়েক টর্চ একসঙ্গে জ্বলিয়া উঠিল ঘরের মধ্যে।
গভীর রাত্রে শশীপদ রাস্তায় আসিয়া দাঁড়াইল। তাহার হাতে একটা
সুটকেশ। এ দিক ও দিক তাকাইয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, মা
খুব মুখ রেখেছ। তােমার সব কিছু থাকল, আমি এই শ্মশান
আগলিয়ে থাকতে পারি না। ভয়কাতর মুখ চোখ ! হাত পায়ের
অবস্থাও তেমন শক্ত সবল বলিয়া মনে হয় না। নবেন্দুর সন্দেহ
হইয়াছিল শশীপদ আর থাকিবে না। সব কিছু ফেলিয়া পলাইবে।
এমন সময় বাহিরে কড়া নাড়ার শব্দ।
দরজা খুলুন।
নবেন্দু দরজা খুলিতেই দেখিল শশীপদ থর থর করিয়া কঁপিতেছে
তখনও। হাতে সুটকেশ।
কি হ’ল।
পালিয়ে যাচ্ছিলাম। রাস্তা থেকে ফিরে এলাম, শুধু আপনাকে
একটা কথা বলবার জন্যে।
কি কথা? আচ্ছা শুনছি ঘরে এসে একটু বসুন না। বসে বসে
বলুন। বড্ড ভয় খেয়ে গেছেন দেখছি। হাত পা যেন কাঁপছে।
বলিয়া সে শশীপদকে টানিয়া আনিয়া খাটের উপর বসাইল।
আমি চলে যাচ্ছি। ভার রইলাে সব আপনার ওপর। তার
জন্যে আপনার ভাড়া আমি কুব করে দেব।
আমি কিন্তু ভাড়া আদায় করতে পারব না।
যে যা দেয় নেবেন। না দেয় চাইবেন না। এখন দেখছি
ভাড়ার ৮েয়ে ভাড়াটের কদর বেশী। তাদের জিইয়ে রাখতে পারলে
বাড়ী থাকবে, ভাড়াও থাকবে। দোহাই, এ ভারটি আপনাকে নিতে
হবে। আপনাকেই কেবল বিশ্বাস করি। ভরসা রাখি।
পাগল নাকি। আমি পালাবার তালে আছি। লোক ভাল
পেয়েছেন। আমার দ্বারা ও সব কাজ কি হয়, না পারি কিছু।
অন্যকে বলুন। আছেন তােত অনেকেই এই বাড়ীতে।
ভরসা হয় না আর কাউকে। যাকে ভার দেব সেই সব ভাড়া,
আদায় করে মেরে দেবে, না হয় সরে পড়বে।
কোথায় যাবেন।
বৌদিরা কোথায় ?
কাশীতে। আমার বাড়ীওয়ালার কাছে। তিনি চিঠি লিখেছেন,
অবস্থা বুঝলেই চলে আসবে। বাড়ী থাক। যারা যেমন আছে, তারা
তেমনি থাক। ভাড়া যে দেবে নেবে, না দিলে তাগিদ দিও না। তবে
যারা আছে এখনও, শেষ পর্যন্ত তারাও থাকবে কিনা সন্দেহ। যদি
দেখ সবাই চলে যাচ্ছে তাহলে দরজা বন্ধ করে তার সামনে ইটের
দেওয়াল তুলে ভাল করে বন্ধ করে দিয়ে চলে এস। কলকাতার বহু
লােক কাশীতে এসে ভীড় জমিয়েছে। তারা নিত্য নতুন গুজব ছড়িয়ে
বেড়াচ্ছে। তাই শুনে সবারই ভয় ধরে গিয়েছে। আমারও খুব ভয়,
ধরেছে। তুমি বরং চলেই এস। যা আমার ভাগ্যে আছে হবে।
-তুমি কি করতে বল ?
নবেন্দু বলিল, তবে আপনার চলে যাওয়াই ভাল। কাল সকালে
সকলকে বলে কয়ে চলে যাবেন। নিজের নিজের ঘর নিজেরা,
আগােব।
এখন আর বসব না! বের হয়ে পড়েছি যে। রাস্তা থেকে
ঘুরে এলাম। শুধু তােমার কাছে একটি কথা বলবার জন্যে এই আসা।
তাহলে বলছ এখন রওনা হ’ব না ?
এত ভােরে। এখন মােড়ে মােড়ে পুলিশ, এ. আর. পি. আর
মিলিটারীতে ছেয়ে আছে। আপনাকে এই অবস্থায় দেখলেই ধরে,
নিয়ে যাবে। সাবধান! এখন কি বের হয়। সকালহােক তারপর
যাবেন।
অবশ হইয়া গেল শশীপদর সর্বশরীর। তাহার বসিয়া বসিয়া
কেবল মনে হইতে লাগিল, কি ছিল, কি হ'ল। কালে কালে
কত না ঘটবে।
নবেন্দু বলিল, আমিও আর বেশী দিন নাই। তবে শেষ দেখা
দেখে যাব। কাশীতে গিয়ে পত্র দেবেন তাে মধ্যে মধ্যে।
পত্র মানে রিপ্লাই কার্ড দোব প্রতিবারেই।
কথা শুনিয়া নবেন্দুর হাসি পাইল।
ভাের হইতেই নবেন্দু বলিল, যাবার আগে সকলের সঙ্গে দেখা
করুন। আমি বরং সঙ্গে থাকব।
তাই করব। কিন্তু রাত্তিরের এত ঘটনার পর আমার হাত-পা
সব যেন পেটের ভেতর ঢুকে গেছে। শরীরে এতটুকু শক্তি নেই।
কি করে যে এতটা পথ যাব তাই ভাবছি। একটু ভাবিয়া বলিল,
আচ্ছা আমি ভাড়া দিচ্ছি, আমাকে পৌছে দিয়ে আসবেন ?
আমার তত ছুটি নেই। কি করে যাই। তার চেয়ে আমি অন্য
লােক দেখছি। সে আপনাকে পৌছে দিয়ে আসবে।
থাক থাক অন্য লােককে বিশ্বাস নাই। আমি একাই যাব।
সকালে উঠিয়া নবেন্দু দেখিল সব ঘর তালা বন্ধ। লােকজনের
সাড়া শব্দ নাই। রাত্রের এই ঘটনার পর সকলেই অত্যধিক ভয়
পাইয়া গিয়াছে। সকাল হইতে যা দেরী। তারপর আর কেহ
একদিনও এখানে থাকিবে না এই অনুমানটা সে করিয়া বসিয়াছিল।
হাত মুখ ধুইয়া স্টোভে চা তৈয়ারী করিয়া খাইয়া নিজের ঘরে
একটি তালা দিয়া সদর দরজায় বড় দুইটি তালা লাগাইয়া শ্রীদুর্গা
বলিয়া সে রওনা হইল।
১১২
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.