Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sri Hattobijay Kabyo Ed.1

Ibrahim Ali, Abu Jekariya Mahammad · 2009/09/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

-

হবিজন্ম কাব্য।
১০০০০-
---
আবু যেকারিয়া মােহাম্মদ ইব্রাহিম আলী
প্রণীত।
প্রথম সংস্করণ।
[সর্ব স্বত্ব সংরক্ষিত।]
১৩১৯
মূল্য ১ এক টাকা মাত্র।

কাকিনা ,
শাহাবিয়া প্রিন্টিং ওয়ার্কস্,
জীবনকৃষ্ণ দাস কর্তৃক মুদ্রিত

This
Poetical work
IS
Dedicated
Major D. Herbert Esqr. I A.,
As
An humble token of the
AUTHOR'S
Sincere esteem and great regard:

No text on this page.

==
।
উৎসর্গপত্র ।
মহামতি হারবার্ট শ্বেতকুল-রতন।
ডওগ্লাস শিরােমণি বুধজন-ভূষণ ॥
বীরকুল চূড়ামণি তাই বীর পদবী।
হেন গুণিজন বিনে সংসার ই অটবী:
দীনহীন দুখিজনে সদা যার করুণ।
পরহিত তৎপর পর তরে বেদনা।
অতি শিষ্ট অমায়িক অহমিকা বিহীন।
আশ্রয়ে বঁচিয়ে যার সহস্র দীনহীন।
আমি অতি দীনহীন লভি যার শরণ।
করিয়াছি শিক্ষালাভ পদমান অর্জন
অসীম করুণা যার এই দাস উপরে।
করূপে ঋণী আছি বাখানিব কি করে ॥
কৃতজ্ঞতা-পরিচিঃ কি দিব হায় রে ।
দেশে দেশে ভ্রমিতেছি উদরের দায় রে ।
ভাই তপ্ত অশ্রু দিয়ে করে’ কাব্য রচন।
ভক্তিভরে তঁার করে করিলাম অর্পণ।
বিনয়াবনত--
গুটাটীকর, শ্রীহট্ট। ইব্রাহিম আলী
১লা ফাঙ্গুন, ১৩১৮ সাল। গ্রন্থকার ।
- -
—

No text on this page.

মূলক। ঐতিহাসিক ঘটনাটি অবতরণিকায় পন্থাকারে। উপক্রমণিকা। কতিপয় বিদ্যোৎসাহী বন্ধু-বান্ধবের আগ্রহ ও উৎসাহে প্রােৎসাহিত হইয়া, অবকাশ সময়ে রচিত এই ক্ষুদ্র কাব্যগ্রন্থখানি অদ্য জনসমাজে প্রচার করিতে সাহসী হইলাম। সময়াভাব বশতঃ এবং নানারূপ অশান্তি নিবন্ধন গ্রন্থখানির বিষয়-গুরুত্বের মৰ্য্যাদা যথাযথ রক্ষা করিতে সমর্থ হই নাই; কেবল উপাখ্যানটি মিত্রাক্ষর ও অমিত্রাক্ষর উভয়বিধ ছন্দে রস ও ভাব যথাসাধ্য বজায় রাখিয়া কাব্য- কারে বিবৃত করিতে প্রয়াস পাইয়াছি মাত্র। কতদূর সফলকাম হইয়াছি বলিতে পারি না। ভরসা করি, সহৃদয় পাঠকবর্গ স্ব স্ব উদারতা গুণে এই অকিঞ্চনের ত্রুটি ও ধৃষ্টতা মার্জনা করিবেন। উপাখ্যানটি আদ্যোপান্ত কাল্পনিক নহে, ইতিহাস- মােটামােটি ভাবে বর্ণনা করিলাম। মৌলভী নাশির উদ্দিন হায়দর-বিরচিত “সুহেল-ই- এমন” গ্রন্থে, আফ্রিকা দেশস্থ তাঞ্জিয়ারাধিবাসী জাবু • আব্দল্লা মােহাম্মদ ইবনে বতুতা নামক সুপ্রসিদ্ধ পরিব্রাজ- কের ভ্রমণ বৃত্তান্তে এবং রায় বাহাদুর কালীপ্রসন্ন বিদ্যা- সাগর সি, আই,ই, মহােদয়ের “ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই- কাহিনী বিবৃত আছে ও দেশ-প্রচলিত কিম্বদন্তীতে অজ পৰ্যন্ত সজীব রহিয়াছে। উপরােক্ত মহােদয়ত্রয়ের গ্রন্থ- সন্নিবেশিত ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বন করিয়া এই ক্ষুদ্র কাব্যখানি রচনা করিয়াছি। কাযেই চিরকাল তাঁহাদের নিকট কৃতজ্ঞতা-পাশে আবদ্ধ রহিলাম। হিন্দু ভ্রাতৃবর্গ দেশকালপাত্র বুঝিয়া, মােসলমান- গণের ধর্মানুমােদিত ক্রিয়াকাণ্ডে প্রতিবাদ করতঃ উভয় সমাজের মধ্যে বিদ্বেষভাব জাগরিত না করিয়া, যাহাতে মিলিয়া-মিশিয়া ভ্ৰাতৃভাবে একত্র বসতি করিয়া স্ব স্ব ধর্মানুযায়ী কর্তব্য পালন করেন, তদ্বিষয়ে তাহাদিগকে প্ররােচিত করার উদ্দেশ্যেই এই গ্রন্থখানি বিরচিত হইল। ইহা যদি উভয় সমাজের মধ্যে একতা সংস্থাপনে বিন্দু- মাত্রও সহায়তা করে, তবে পরিশ্রম সফল মনে করিব। উপাখ্যানটি যৎপরােনাস্তি শােকোদ্দীপক। কাষেই ভাব-সামঞ্জস্য সংরক্ষণ নিবন্ধন ও সত্যের অনুরােধে কোনও কোনও স্থানে দুই একটি অপ্রীতিকর বাক্য প্রয়ােগ করিতে বাধ্য হইয়াছি। আশা করি, হিন্দু পাঠকবর্গ এই অপরাধ অনিবাৰ্য জ্ঞানে ক্ষমা করিবেন। '।

v/
“বসনা”-সম্পাদক কাকিনা নিবাসী কবিবর শ্রীমুক্ত
মৌলভী শেখ ফজলল করিম সাহেব অনুগ্রহ পূর্বক
অতীব যত্নসহকারে এই গ্রন্থখানির প্রফ দেখিয়া দিয়া-
ছেন। এজন্য তাহার নিকট আজীবন ঋণী রহিলাম
যারপর নাই চেষ্টা করা স্বত্বেও গ্রন্থের কোনও
কোনও স্থানে মুদ্রাঙ্কন দোষ রহিয়া গিয়াছে। সহৃদয়
পাঠকগণ অনুগ্রহ পূর্বক সংশােধন করিয়া পাঠ করিবেন।
সমাজের উৎসাহ ও সহানুভূতি প্রাপ্ত হইলে পরি-
শ্রম সফল জ্ঞান করিব। ইতি।
।
তুষভাণ্ডার, রংপুর।
১লা ফাল্গুন, ১৩১৮ সাল।
গ্রন্থকার।

No text on this page.

অবতরণিকা।
(১)
শেখ-কুল-অবতংশ,
মােশ্লেম পরমহংস,
*এমন নক্ষত্ৰ” পূত-প্রভ জ্যোতির্ময়।
শেখ শা জালাল পীর,
মহাজন, ধর্মবীর,
কোরেশজ শেখ ইব্রাহিমের তনয় ॥
(২)
মহাবংশ-সমুদ্ভুত
অলৌকিক গুণ-যুত,
কণ-জন্ম তপােধন নর নরােত্তম।
হৃদি বিভু-প্রেমার,
আস্তে বিভাসিত যার
পূত প্রভা দিব্য-আভা অতি নিরুপম।

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
(৩)
জাতপীর শা জালাল শৈশব-জীবনে,
হয়ে পিতৃমাতৃহীন,
মহাপদে সমাসীন,
ভাসিলেন ভব-নিধি-অকূল-জীবনে
(৪)
বিধাতা সদয় হয়ে কৈলা সদুপায়,
সৈয়দ-কুলজ-পীর,
খুল্লতাত শা কবির,
পুত্রভাবে নিজ গৃহে পলিলেন তায়।
(৫)
একদা বনে কেশরী,
মৃগ-কুল-জাত-অরি,
ধরেছিল মৃগশিশু করিতে আহার।
শুধু নেত্র-তেজ-বলে,
তাড়াইয়া সে শার্পলে,
কৈশােরে করিলা পীর শাবকে উদ্ধার ।
(৬)
হেরে অলৌকিক গুণ আ’মদ কবির,
ভাবিয়া কালেতে ছেলে হবে ধৰ্ম্মবীর,
শুভদিনে শুভক্ষণে;

অবতরণিকা।
দীক্ষা দিয়ে সযতনে,
পবিত্র ইশ্লাম ধৰ্ম্ম করিতে প্রচার ;.
ধৰ্ম্ম উপদেশ দানে,
উদ্ধারিতে হিন্দুস্থানে,
প্রেরিলেন শা. জালালে ভারত মাঝার !!
(৭)
চতুর্দশ শতাব্দীর প্রারব্ধ সময়,
তিন শত ষাঠি সঙ্গে,
ধৰ্ম্মমদে, মাতি রঙ্গে,
দিল্লীধামে আসি পীর হ'লেন, উদয় ।
(৮)
দিল্লীশ্বর আলাদিনে করিয়া দীক্ষিত,
পুরী পাশে নিবসিয়া,
ধৰ্ম্ম-উপদেশ দিয়া,
সাধিতে লাগিল পীর মানবের হিত।
(৯)
দেখ কি কালের গতি,
হেখায় শ্রীহট্ট-পতি,
গোবিন্দ উঠিল মাতি মােশ্লেম-বিদ্বেষে ;
অত্যাচার সমাচার,

৪
শ্রীহটবিজয় কাব্য।
হয়ে হয়ে পরচার;"
ক্রমে ক্রমে দিল্লীত পহু ছিল এসে।
(১০)
বুৰ্হান উদ্দিন নামে প্রজা একজন,
স্বপ্নদেশে পুত্র তরে,
কোব্বানি মানস করে,
লতেছিল পুত্র এক ইন্দু-নিভানন।
(১১)
সপ্তম দিবসে গােৰু করিয়া কোব্বানি,
সকাতরে ভক্তিভরে,
মানস পূরণ করে,
পুত্র-শুভ-কামনায়, যথা স্বপ্নবাণী।
(১২)
গাে-কোব্বানি-বাৰ্তা শুনে গােবিন্দ রাজন,
ক্রোধে অগ্নি মুর্তি হৈয়া,
পিতা-পুত্রে আনাইয়া,
পিতার করিল এক বাহু বিচ্ছেদন
পুত্ৰে দিল নরবলি চামুণ্ডা সদন।
(১৩)
অত্যাচারে জর জর বুহান তখন,
মরে বেঁচে দিল্লীধামে করিল গমন।

অবতরণিকা।
লুঠি দিল্লীশ্বর-পায়,
কেঁদে কেঁদে উভরায়,
আমুল শােক-বৃত্তান্ত কৈল নিবেদন।
হাঁপাতে হাঁপাতে কর অশ্রু বরষণ
(১৪)
মৰ্ম্ম-বিদারক বাৰ্তা করিয়া শ্রবণ
দিল্লীশ্বর আলাদিনে,
ভ্রাতুষ্পত্রে ডেকে এনে,
সসৈন্থে শ্রীহট্ট দেশে কমিলা প্রেরণ,
প্রতিশােধ নিতে করি বৈর-নির্যাতন।
(১৫)
ইতঃপর দূতমুখে করি আকৰ্ণন
সিকন্দর পরাজিত,
সৈন্য তার সন্ত্রাসিত,
সৈয়দ নাসির বীরে করিলা প্রেরণ,
সঙ্গে খ্যাতনামা যােদ্ধা দিলা অগণন।
(১৬)
পৈশাচিক অত্যাচার হয়ে বিজ্ঞাপিত,
সমস্ত মােশ্লেম জাতি কৈল উত্তেজিত।
হয়ে বদ্ধপরিকর,
জালাল সন্ন্যাসীবর,

৬
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
}
সন্ন্যাসীর: দল সহ চলিলা ঐ
দিল্লীশ্বর সেনাপতি,
বীরবর মহামতি,
নাসির সসৈন্যে আসি মিলিলেন বাটে,
সম্মিলিত অনীকিনী চলিল পাটে
(১৭)
হেথা সিকন্দর শাহ যুদ্ধে পরাজিত
গােবিন্দের অগ্নিবাণে,
মসিদ্ধ রসানে,
বিধ্বস্ত মােশ্লেম সৈন্য ভীতি-সন্ত্রাসিত।
(১৮)
নারিয়া আটিতে রণে করি পলায়ন,
সিকন্দর সৈন্যসহ,
ভাবিছেন অহরহঃ,
অনুবল প্রতীক্ষায় চিন্তান্বিত মন।
(১৯)
অকস্মাৎ “অর্ধচন্দ্র” পতাকা ঈক্ষণে,
মাতিয়া উঠিলা সবে,
“আল্লাহু আকবর” রবে,
পূজিল বিশ্বপিতায় উল্লাসিত- মনে।

অবতরণিকা।
৭।
(২০)
অতঃপর উভদলে হয়ে সম্মিলিত,
জালালের প্রতিভাতে,
রণে বিনা রক্তপাতে,
গােবিন্দের সৈন্যদল করে পরাজিত,
অনায়াসে রাজ্যপাট কৈলা অধিকৃত।
(২১)
সিকন্দরে রাজ্য দিয়া শা জালাল পীর,
গুরুর অনুজ্ঞা মত,
স্বাদ-রস-গন্ধযুত,
মৃত্তিকা পাইয়া স্থিতি করিলেন স্থির।
(২২)
তাঁর অনুকম্পা গুণে শ্রীহট্ট যুড়িয়া,
অবিদ্যা-তামস নাশি,
পূত-প্রভা পরকাশি,
ইশ্লামের “অৰ্দ্ধ চন্দ্র” উঠিল নাচিয়া ।
(২৩)
কে হেন কঠোর প্রাণ নির্মম অহৃদী ?
শুনে এই শােক-গাথা,
কার না হৃদয়ে ব্যথা,

হট্টবিজয় কাব্য।
উথলিত উচ্ছসিত মর্মস্থল বিঁধি ?
কে হেন কঠোর প্রাণ নির্মম অহৃদী ?
(২৪)
শা সিয়ার বংশধর কবিকুলাম,
উক্ত শােকগাথা ধরে,
এই কাব্যগীতি করে,
ভক্তিভরে সকাতরে,-
অর্পিল সমাজ করে,
আশা, কোল পেয়ে করে সফল জনম।
অযােগ্য কবির এই প্রথম উদ্যম।
গুটাটকর, শ্রীহট্ট।
১২ই পৌষ,
বিনয়াবনত
ইব্রাহিম আলী
গ্রন্থকায়
১৩১৮ সাল।

মহউবিজয় কাব্য।
(প্রথম খণ্ড)
প্রথম সর্গ।
এই যে সুরম্য পুরী সুরমার তীরে
কত রম্য হৰ্ম্মরাজি শােভে ইতস্ততঃ
“সৰ্বানন্দ বিজয়তে” অঙ্কিত পতাকা
সদর্পে উড়িছে ওই প্রাসাদ চুড়ায়,
পত পত পত শব্দে পবন নিঃস্বনে
কত মঞ্জু কুঞ্জবন কত উৎস ধারা,
সৃজিয়াছে প্রাকৃতিক দৃশ্য মনােহর !!
এই কি:শ্রীহট্টপুরী গােবিলের পাট ?
শিব শৈল:বিরাজিত সন্নিকটে যার
সর্ব ক্রোশ দক্ষিণেতে মহপঠ স্থান
লিঙ্গরূপী সৰ্বানন্দ অধিষ্ঠিত যথা :
অদূরে ঈশান কোণে ভৈরবী আলয়,
মহাবীরূপে যথা বিরাজেন সতী?

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
?
এই কি শ্রীহট্টপুরী সান্নিধ্যে যাহার
চৈতন্য প্রভুর পিতৃ ভদ্রাসন বাটী ?
অদূরে প্রতীচ্যদিকে লাউড় অঞ্চল,
অদ্বৈত প্রভুর জন্ম নবগ্রামে যথা?
প্রাচ্যদিকে রাজে যার বামজহ্বা পীঠ
ভৈরব “ক্রমদীশ্বর” “জয়ন্তী” ভৈরবী ?
এই কি শ্রীহট্টপুরী বক্ষঃস্থলে যার
শাহ জালালের দর্গা সদর্পে বিরাজে ?
সহস্র সহস্র লােক নিশি দিন যথা
ধ্যান উপাসনা মগ্ন পুণ্য কামনায় ?
এই কি শ্রীহট্টপুরী হেথা সেথা যার
অসংখ্য পবিত্র দর্গা “মাজার” বিরাজে?
এই সে হট্টপুরী ; ওই সে প্রাসাদ,
গগাবিন্দের সিংহাসন অভ্যন্তরে যার।
এই যে প্রাসাদ পার্শ্বে চামুণ্ডা মন্দির,
করালবদনা কালী অধিষ্ঠিত যথা-
গলে নর-মুণ্ডমালা বহি-শিখা ভালে,
পদ-তলে শূলপানি মুরতি ভীষণ !
ওই যে বসিয়া সেথা গােবিন্দ-ভূপতি ;-
সম্মুখেতে রাজদণ্ড কনক-মণ্ডিত,
;
# মাজার-মােল্লেম তাপসের সমাধি স্থান।

প্রথম সর্গ ।
মস্তক উপরে ওই রাজ-ছত্র শােভে,
দুই পার্শ্বে দুই জন চামর দোলায়।
নাতি স্থূল, নাতি সূক্ষম নৃপতির দেহ,
শ্যামবর্ণ, দীর্ঘ বাহু, কুঞ্চিত ললাট,
মস্তকে মুকুট,-মণি-মাণিক্য খচিত,
গলে রুদ্রাক্ষের মালা করে নিষ্কাসিত
খুরধার অসি। মূর্তি অতি ভয়ঙ্কর।
সম্মুখেতে সেনাপতি, প্রধান সচিব,
অমাত্য মণ্ডলী, স্ব স্ব আসন উপর
উপবিষ্ট ; ঘােড় করে আছে দাড়াইয়া
আরাে আরাে বহু কর্মচারী, তুফীস্তাবে।
সকলই সন্ত্রস্ত কবে কি হয় আদেশ।
হেনকালে দূত এক সাক্ষাৎ শমন
কহিতে লাগিল যােড় করে “মহারাজ !.
রাজ্যের সর্বত্র শান্তি, নাহি উপদ্রব,
দস্যু তস্করের ভয় নাহিক কোথাও,
নাহিক দুর্ভিক্ষ নাহি মড়কের ভয়,
নিরাতঙ্কে দিনপাত করিতেছে সবে ;
কিন্তু মহারাজ! বলিতে বিদরে হিয়া !
গত কল্য অপরাহে পাতকী যবন
বুহান উদ্দিন শেখ-হায় কি নিষ্ঠুর !!

১২
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
বধিয়া গােন এক করিয়াছে কি যে,
পুত্রের মঙ্গল তুরে-মরি কি সাহস।
হিন্দু দেশ, হিন্দুরাজ্য, ভয় নাই তার
কিমনে এ পূত রাজ্যে কি সাহসে হায় !
করিল করিল পাপী এ গর্হিত কায ?”
রাগে অন্ধ রাজা যেন অনলকণিকা
নেত্রে বিনির্গত, অসি আস্ফালিয়া দর্পে
কহিতে লাগিলা “কি বলিলে, কি বলিলে,
কি বলিলে দূত, মম রাজ্যে হেন কাণ্ড !!.
কি আম্পর্ধা ম্লেচ্ছ যবনের ! নাহি ভয়।
নাহি কিরে দূত প্রাণের মম তার?
তাড়াই রাজ্য হতে যবন প্রজায়,
যম বুঝি রেখেছিল পাপীরে হেথায় ;
যাও দূত, যাও স্বরা আন যেয়ে তারে
পুত্র সহ মম সমিধান ; প্রায়শ্চিত্ত
করিব এখনি উভয়ের মুণ্ডপাতে ;
যাও দূত, যাও করা বিলম্ব না সয়।”
“যে আজ্ঞা” বলিয়া দূত করিল স্থান।
হেথা সেনাপতি গুরু গম্ভীর বচনে
সবিনয়ে “মহারাজ কর অবধান,
ধৈৰ্য্য ধর, স্থির হও, বিবেচনা করি

প্রথম সর্গ।
;
যুক্তি যুক্ত হয় যাহা করহ আদেশ।
যবন দুর্বল নহে, যবন-গৌরব
সমগ্র ভারত জুড়ে আজ প্রতিষ্ঠিত।
নিকটে ঢাকার পাট; যবন নৃপতি,
কে জানে ঘটায় পাছে কোন বিড়
সমীচীন হয় যাহা কর মহারাজ,
পূৰ্ব্বাপর বিবেচনা করি অতঃপর।”
তদন্তে সচিববর কহিতে লাগিলা ,
“মহারাজ! সবিনয়ে মম উপদেশ,
অশুভ কাযেতে কাল বিলম্ব উচিত,
সেনাপতি উপদেশ অতি সমীচীন,
পূর্বাপর বিবেচনা ন্যায়ানুমােদিত ;
রাগাবেশে কাষ করে অর্বাচীন যারা,
অবিমৃষ্যকারী নহে ন্যায়পরায়ণ।
ধৰ্ম্ম অবতার রাজা রাজ-ভিত্তি স্যায়,
অবিচারে অমঙ্গল অতি সুনিশ্চিত।
সবনের প্রতি এবে সুপ্রসন্ন বিধি,
আসমুদ্র ভূমণ্ডলে প্রভুত্ব তাদের।
নিকটে যবন রাজ্য অতি বলবান,
ধৰনেরা ভীরু নহে—অতি বীৰ্যশালী,
ধর্মমদে মাতােয়ারা নির্ভীক অন্তর ;

১৪
হট্টবিজয় কাব্য।
ন
পরস্পরে ঐক্য ভাব অতি দৃঢ়তর।”
এতেক শুনিয়া এক পাষণ্ড অমাত্য,
‘সেনাপতি সচিবের মন্ত্রণা শ্রবণে,
অতীব বিস্মিত আমি হইনু রাজন ।
হিন্দু মােরা—গাে-পূজক, কেমনে সহিব,
গােধনের অত্যাচার, ওহে ধৰ্ম্মরাজ ?
বৈর নির্যাতন স্পৃহা অন্তরে সবার,
বিচারের প্রতীক্ষায় সকলই অস্থির,
ধৰ্ম্মের রক্ষক রাজা, ধৰ্ম্ম অবতার।
ধৰ্ম্মতরে প্রাণ দেয় ধৰ্ম্মবীর যেবা,
পূর্বাপর বিবেচনা কিসের কারণ?
কৰ্ম্ম অনুযায়ী ফল ভােগিবে পাষণ্ড;
গােধনে বধিল পাপী যে পুত্রের তরে
চামুণ্ডা সম্মুখে তার করে শিরচ্ছেদ
যে করে বধিল সেই কর করে ছিন্ন,
দেশ হতে বহিষ্কৃত করিলে তাহায়,
তবে সে মনের খেদ-মিটে সবাকার।”
পূজারি-ব্রাহ্মণ ইতঃপর “মহারাজ।
সচিবের বুদ্ধিশুদ্ধি নারিসু বুঝিতে
সেনাপতি ভীত কেন তাহাও না বুঝি ?
'চামুণ্ডা থাকিতে ভয় কিসের কারণ?
•

-
প্রথম সর্গ।
:
১৫
ধৰ্ম্ম রক্ষা করি লভ চামুণ্ডার প্রীতি
ধৰ্ম্মের গৌরব রক্ষা কর মহারাজ,
অমাত্যের উপদেশ করিয়া পালন।
যবন অস্পৃশ্য, ঘৃণ্য, গােয় নয়াধম,
যবনের নির্যাতন স্বর্গের সােপান ।
যবনের ছায়াপাতে গঙ্গাস্নান বিধি,
পাষণ্ডের মুণ্ডপাত ন্যায়ানুমােদিত।”
হেনকালে দূত আসি হল উপনীত,
বুহান উদ্দিন সঙ্গে, পুত্র অঙ্কে তার।
কহিতে লাগিল দূত বিনম্র বচনে—
“মহারাজ। এই সেই পাষণ্ড যবন,
ঐ তার শিশু পুত্র ক্রোড়ে অবস্থিত,
যাহার কারণে পাপী বধিল গােধনে।”
রক্তিম-লােচনে, রাগে অগ্নি মূৰ্ত্তি যথা
গর্জিতে লাগিলা রাজা বুহানে আহ্বানি
“অরে রে দুৰ্ম্মতি ম্লেচ্ছ কি কৰ্ম্ম করিলি ?
স্ব করে স্ব শিরে কেন কুঠার হানিলি ?
এত কি আস্পর্ধা, তাের ওরে নরাধম ?
নাই কিরে ম্লেচ্ছ তাের প্রাণের আতঙ্ক ?
কি সাহসেবুল মাের রাজ্য অভ্যন্তরে,
—অতি নিরমল যাহা পূত তীর্থময় :
= =

১৬
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
কি সাহসে হেথা তুই করিয়া নিধন
গােধনে, হায় রে পাপ পূত রাজ্যে মম
করেছিল অধৰ্ম্মের বীজ সংবপন !
সমুচিত প্রতিফল পাবি রে এখন,
পুত্র-শিরশেদ আর এক বাহু তাের
বিচ্ছিন্ন হইবে দেবী চামুণ্ডার কাছে,
আমার আদেশে চণ্ডারে খড়গাঘাতে।
আজ রাত্রে মম দেশ ছেড়ে যেতে হবে,
অন্যথায় ঘটিবেক আরাে বিড়ম্বনা।”
ভীতি সমাকুল চিত্তে, কম্পিত শরীরে,
বলিল বুহান অতি বিনম্র বচনে,
“মহারাজ! কৃপা করে ক্ষম অপরাধ,
গাে-বধ ত করি নাই—করেছি কোর্বাৰি।
দারা মম বন্ধ্যা ছিলনা জন্মে সন্তান,
মানস করি তাই পুত্রবতী হলে,
আল্লার নামেতে গােরু করিব কোৰ্বানি
খােদার কৃপায় জায়া হ’ল পুত্রবতী,
করিয়াছি তাই রাজা মানস পূরণ।
অনিত্য সংসার রাজা, নশ্বর জীব,
ভেবে দেখ ভব সম বই বহুতর
নরপাল এসে ভৰে বিৰ দুই গৰ

প্রথম সর্গ।
সদর্পে সগর্বে বিশ্ব করিয়া কম্পিত
অম্বু বিম্ব সম হেথা হয়েছে বিলীন
সুকৃতি দুষ্কৃতি শুধু রহিয়া গিয়াছে।
সংসার অনিত্য রাজা নিত্য পরকাল,
অনিত্যের তরে নিত্যে জলাঞ্জলি দেওয়া
কাঞ্চনের সনে যথা কাচ বিনিময়।
ধৰ্ম্ম-বিগর্হিত কা করি নাই রাজা,
দয়া করে পুত্রটিরে রেখে দাও প্রাণে।
অদৃষ্টের বিড়ম্বনা বুঝিলাম সার,
কেন বা বিধর্মী রাজ্যে করিনু বসতি ?
পুণ্য কাযে পাপ হবে আগে না জানি,
বিধির প্রপঞ্চ মায়া বুঝা অতি ভার।
মহারাজ শিরচ্ছেদ করহ আমার,
পুত্রটিরে রাখ তার মায়ের অঙ্কেতে।”
“কি বলিস্ রে পামর পাষণ্ড দুৰ্ম্মতি”
গর্জিয়া উঠিলা পুনঃ গােবিন্দ রাজন—
“আমার আদেশ কভু না হবে লঙঘন,
সমুচিত প্রতিফল পাবি তুই এবে।
আয়রে চণ্ডাল আয় নিয়ে যারে এরে,
কার্যে পরিণত কর আদেশ আমার ।
পু-শব বসনেতে করিয়া বন্ধন,

১৮'
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
বুৰ্হানের গলদেশে দিবে ঝুলাইয়া।”
চণ্ডাল যমের চর খড়গ হস্তে ত্বরা,
নিয়ে গেল বুহানেরে চামুণ্ডার কাছে।
বুহান কহিল ধীরে “ভাই রে চণ্ডাল
ছাড় মােরে ক্ষণেকের তরে, দেখে নেই
আঁখি ভরে তনয়ের মুখ চিরতরে,
ডেকে নেই একবার জগত-পিতায়।”
করুণা উদয় হ’ল চণ্ডালেরাে মনে,
কহিল চণ্ডাল “আচ্ছা দিলাম সময়,
সেরে নেও তাড়াতাড়ি কি কাষ করিবে,
দেখে নেও ভাল করে তনয়ের মুখ।”
জানু পাতি পুত্র কোলে বুহান তখন,
“জগ-কারণ পালন ধ্বংসকারী ;
ভব-সাগর-ভেলক হে স্বয়স্তো !
করুণা কর না কর ভঙ্গ আশা ;
পাপী পাপ তাপে কাদে তার তারে।
“তুমি না তারিলে যাবে কার দ্বারে ?
স্বয়ম্ভ, বিনা ডাকিবে কারে প্রভাে।
পাপ তাপহারী যে তারক সে;
তার না তার নামে কলঙ্ক রবে।
মায়া-মােহ-বশে করে পাপ বহু,

প্রথম সর্গ ।
অনুতাপানলে এবে চিত্ত দহে,
মায়ামুগ্ধ নর, কদাচার-লীন,
কুমতি প্ররােচিত, কুমাৰ্গ গতি।
মায়া-মােহ-তমাে-পাশ ছিন্ন করে,
জ্ঞানালােক দিয়ে এনে মােক্ষ-পথে,
রাখ মােক্ষ-পথে স্বগুণে তাহারে,
করুণাময় পাতকী তারণ হে !
নিজ ধৰ্ম্মতরে কাল-চক্র-ফেরে,
মহা সঙ্কট আগত শির ‘পরে,
পিতা পুত্র দুহি অরি খড়গতলে,
তব বাঞ্ছা যাহা প্রভাে পূর্ণ কর।
এস ভাই কর এৰে যাহা লয় মনে,
এখন প্রস্তুত আমি নাহি কোন ভয়।”
চণ্ডাল আসিয়া পুনঃ শুনে এই কথা,
লয়ে গেল পিতা-পুত্রে চামুণ্ডার কাছে।
পৈশাচিক কাণ্ড তথা হ’ল সংসাধিত,
চৌদিকে উঠিল “জয় গােবিন্দের জয়।”

দ্বিতীয় সর্গ
এই হিন্দুয়ানীর পার ; ঐ যে কুটীর
জীর্ণ পর্ণ বিনিৰ্ম্মিত, নির্জন, নিভৃত,
গুবাক কদলীতরু বংশ ঝাড় যায়
রাখিয়াছে অন্তরালে দৃষ্টি বহিভূত।
ওই জীর্ণ কুটীরেতে বুহান উদ্দিন
সস্ত্রীক করয়ে বাস নাহি অন্য কেহ
বিনা শিশু পুত্র এক পরিবারে তার।
ওই এলােথেলাে কেশে বুহান-দয়িতা
ভাবিছে অস্থিরা প্রাণে পাগলিনী প্রায়,
ধুলী-বিলুষ্ঠিত-কেশ, কম্পিত শরীর,
আঁখি ছল ছল স্তব্ধ ধ্যানমগ্ন যথা।
ভাবিছে “হায় রে ! আজ রাজার আদেশে
কেন পতি-পুত্রে মম নিয়া গেল দূত।
হায় রে ! কে আছে মাের কাহারে সুধাই
কে মােরে বলিয়া দিবে কি রহস্য ইথে !

দ্বিতীয় সর্গ।
২১
কি যে অমঙ্গল-চিন্তা জাগিতেছে মনে,
কেন প্রাণ মাঝে মাঝে উঠিছে কাঁদিয়া ।
কেন যে অজস্র ধারে নয়নের বারি,
গণ্ড বেয়ে পড়িতেছে সম্বরিতে নারি ?
কেন কণ্ঠ শুষ্ক, তৃষ্ণা ঘন ঘন পায় ?
কেন কর্ণকুহরেতে ক্রন্দনের রােল
শ্রুত হয় মাঝে মাঝে ! মনে হয় কতু
বাছা মাের চিরতরে গিয়াছে ছাড়িয়া
মর্ত্যধাম ; ওই যেন বিরাজে স্বরগে !!
ওই যেন ডাকিছে আমায় ! কবন্ধ যে !
বাছা তাের মস্তক কোথায় ? কেরে বাছা
কোন্ প্রাণে তাের করিয়াছে শিরচ্ছেদ।
একি! একি! একি দৃশ্য ভাসিছে নয়নে !!
হায়! হায়! একি স্বপ্ন দুশ্চিন্তা প্রসূত !
স্বপ্নই বা বুঝি ; ঐ যে আসিছেন পতি।
হায় । ঐ কি পতি মাের ? পুত্র কোথা তবে?
হস্তহীন কেন ইনি! একি দশা হায় !
হায় পতি! হায় স্বামি ! পুত্রধনে মাের
কোথা রেখে এলে ? হায় রে ! মায়ের কোল
কে করিল খালি ! কে ডাকিবে মা, মা বলে ?
হা পুত্র ! হিলাল !! দাড়ারে দাঁড়ারে বাছা !!

২২
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
;
!
চিরতরে ;
নিয়া যারে জননীরে সঙ্গে, দাড়া বাছা !
এই যে জননী ; পতি বিদায় ! বিদায় ।।
এ জনমে শেষ দেখা ক্ষম অপরাধ।”
বজ্রাহত ছিন্ন-শাখ মহীরুহ যথা
বুহান উদ্দিন শেখ এ যে দাড়াইয়া,
সম্মুখে তশ্লিমা বানু, হিলাল-জননী,
অৰ্ধাঙ্গিনী তার, লভিয়াছে চির-নিদ্রা,
প্রাণ তার গিয়াছে উড়িয়া স্বর্গধামে,
যথা পুত্রধন তার করেছে প্রয়াণ
গলে ঝুলে হিলালের শব,
দক্ষ-সূতা-শব যথা স্কন্ধে শঙ্করের ;
নেত্ৰ স্থির, বাষ্পকুল অশ্রু বিগলিত ।
একে একে কত চিন্তা উঠিছে পড়িছে,
হৃদয়ের অন্তঃস্থল করে আলােড়িত,
কেমনে বাহির হয়ে দেশ পর্যটনে
কালচক্রে আসিলেন শ্রীহট্ট নগর
অর্ধাঙ্গিনী সহ,-কালের কুটিলা গতি,
বিধির নির্বন্ধ—স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হয়ে
মানিলেন গাে-কোব্বানি পুত্র কামনায় ;
কি করে লভিলা পুত্র, কিরূপে আবার
জায়া-পুত্র হারাইয়া বহিছেন এবে

দ্বিতীয় সর্গ।
জীবন্ত সমাধি, শুধু ধরণীর ভার ।
ভাবিতে লাগিল। পুনঃ “হায় রে ! নিষ্ঠর
অতি নিদারুণ বিধি কি দোষে আমায়
অকূল জলধি মাঝে দিলে ভাসাইয়া ?
এক মাত্র মিত্র ছিল কলত্র আমার,
তারেও হরিয়া নিলে এবে শুধু একা ;
মানব(ই) ত আমি প্রভাে রক্ত-মাংসধারী,
কেমনে সহিব এত দুঃসহ যাতনা ?
হিন্দু দেশ, হিন্দু রাজা, হিন্দু অধিবাসী
তাতে আমি সকলের অপ্রীতিভাজন
ভাগ্যদোষে ; এবে আমি কি করি উপায় !
আজ নিশিযােগে দেশ ছেড়ে যেতে হবে,
রাজার আদেশ দেশে হয়েছে ঘােষিত,
কাল প্রাতে যেবা মােরে হেরিবে হেথায়,
অর্ধচন্দ্র দিয়ে দিয়ে ঘুরাবে নগর
গর্দভের পৃষ্ঠে, করে লাঞ্ছনার শেষ !!
একি লীলা ভবধব বুঝিতে না পারি,
পূর্ণিমা নিশিতে শশী রাহু করে গ্রাস।
বল্লরী পল্লবময় প্রসুন-কলিকা,
প্রস্ফুটিত পুষ্প কিন্তু পড়য়ে ঝরিয়া
বাঞ্ছাপুষ্প কলিরূপে ছিল এতদিন,
;

২৪
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
পুত্ররূপে মুঞ্জরিত হতে না হতেই
অকালেতে কাল-কীট বৃন্তচ্যুত করে,
ভাসাইয়া দিল মােরে অপার পাথারে!
মােশ্লেম-বিদ্বেষ্টা হিন্দু, হাড়ে হাড়ে বদ,
অতীব কঠোর চিত্ত, নিম্মম, অহৃদী;
প্রতিহিংসা-প্রজ্জ্বলিত অন্তর আমার,
প্রতিশােধ লওয়া চাই যেরূপে সম্ভব।
পুত্র-শব গললগ্ন থাকিবে কি মাের ?
ভাৰ্য্যা-শব রবে হেথা ধুলী বিলুষ্ঠিত ?
কর নাই কিরূপে বা করি সমাহিত।
এই কি ছিলরে বিধি নিয়তি-লিখন
!!
পড়িয়াছি কোরানেতে “তুমি দয়াময়,
পতিত পাবন, প্রভু, বিপদভঞ্জন,
কৃপানিধি,” কৃপা করে দাও পদাশ্রয়,
করুণা করিয়া কর বিপদ মােচন।
অতি দীন হীন আমি, তুমি দীনবন্ধু,
পাপী আমি, তুমি প্রভাে পাতকীতারণ
কৃপাই অভাগা আমি, তুমি কৃপাসিন্ধু,
নিরাশ্রয় আমি, তুমি বিপন্ন-শরণ।
নিজগুণে অভাগারে করহ উদ্ধার,
সত্যের মহিমা প্রভাে দেখাও জগতে,

দ্বিতীয় সর্গ। পাষণ্ডরাজার দেশ কৱি ছারখার, ইশ্লামের পূত প্রভা বাড়াও মরতে।” বুৰ্হান ধ্যানেতে মগ্ন বাহ্য জ্ঞানহীন, মাঝে মাঝে অন্তঃস্থল করিয়া বিদীর্ণ- বিনির্গত শােকোচ্ছাস হা হুতাশ সনে, অগ্নি-গিরি অভ্যন্তর আগ্নেয় উৎপাতে বিদীর্ণ হইলে যথা ধাতব নিস্রাব উৎক্ষিপ্ত প্রক্ষিপ্ত হয় ধূম্রশিখা সহ। হেনকালে তিনজন শ্বেত বস্ত্রধারী --আচ্ছাদিত বসনেতে আপাদ মস্তক- মানব কি স্বরগের সন্দেশবাহক, পুরুষ কি স্ত্রী, কিছু বুঝা নাহি যায় অকস্মাৎ উরিলেন বুহানের কাছে ; মধুর পীযুষবাক্যে সানিয়া তায়— হিলালের শবদেহ লইলেন কেড়ে, মাতা-পুত্র উভয়েরে করাইয়া স্নান “কাফন” “জানাজা” করে, করে সমাহিত আশ্বাসিয়া বুহানেরে মধুর বচনে দিল্লী যেতে উপদেশ প্রদানি তাহায় ----- * কাফন-পবিত্ৰ যন্ত্ৰ-ঘারা শবদেহ আচ্ছাদন করা। জানাজা-মৃত ব্যক্তি মুক্তির জন্য প্রার্থনা। ৪

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
••
অকস্মাৎ হইলেন পুনঃ
ভাবিছে বুহান পুনঃ ভেবাচেকা হয়ে
“কি দেখি ! কি শুনিনু ! সত্য না স্বপন।
সত্যইত দেখি আঁখি রগড়িয়া দেখি,
সত্যইত ! বুঝি এরা স্বর্গ-বার্তাবহ,
স্বয়ম্ভ আদেশে আসি উদ্ধারিলা মােরে,
তাদের আদেশ শিরােধার্য্য ; এবে মাের
দিল্লী ধামে গতি যথা আদেশ তাদের।
মােশ্লেমের আধিপত্য ভারত যুড়িয়া,
দিল্লীতে সাম্রাজ্য পাট, ঢাকায় নবাব
সম্রাটের প্রতিনিধি, অতি বলবান।
যাই তবে দিল্লীতেই যাই, আশা হয়,
তথা গেলে পরামর্শ হইবে সুস্থির।
উদ্যোগ করিব এবে প্রাণ করে পণ
অত্যাচার প্রতিশােধ লইবার তরে।
এখনি প্রস্থান করি যাই তবে যাই
শত্রু-রাজ্যে থাকা আর যুক্তিযুক্ত নয়।”

তৃতীয় সর্গ
০০:০০
ܪ
পূর্ণিমা যামিনী ; হাসিতেছে দশ দিক,
লিয়াছে সুধা-ধারা রজনী রঞ্জন,
তরু লতা জল স্থল বিভাসিত করি।
চকোর চকিত প্রাণে আনন্দে-বিভাের,
পিইছে পীযুষ-ধারা, হয়ে আত্মহারা।
গন্ধরাজ, গাঁদা, বেল, চামেলী, বকুল,
মালতী, গােলাপ, জাতি যুথি অগণন
হাসিতেছে স্থানে স্থানে উজলি বাগান।
প্রেমাবেশে মাতােয়ারা, নৈশ সমীতণ
ভ্রমিতেছে ইতস্ততঃ হরিয়া সৌরভ,
চুষি চুষি প্রতি পুষ্প, প্রেমে ঢল ঢল ।
সরােবরে কুমুদিনী কান্তে আলিঙ্গিয়া
হৃদয় খুলিয়া সুধা করিতেছে পান,
যুগল মিলনে প্রফুল্লিত অলিকুল
গাইছে সুখের গীতি মধুর ঝঙ্কারে।

২৮
শ্রীহট্রবিজয় কাব্য
প্রভঞ্জন মন্ত্রমুগ্ধ হেরি এ উৎসব,
প্রেমােচ্ছাসে মাঝে মাঝে করিছে ধীজন।
কোথা বা ব্রততী কোন গুরু আলিঙ্গিয়া
উঠিয়াছে উৰ্দ্ধপানে, প্রসূনে মুকুলে
করিয়াছে প্রকৃতির সুষমা বর্ধন।
মরি কি বিচিত্র শােভা নিকুঞ্জ যুড়িয়া !!
ভ্রম হয় মর্ত্যে যেন বিরাজে নন্দন।
শ্রীহট্ট-মহিষী ওই চপলা সুন্দরী,
বাপীতটে উপবিষ্টা কনক আসনে,
নিকুঞ্জ কাননে রাজপ্রাসাদ সম্মুখে,
চকিত হরিণী সমা অস্থিরা চঞ্চলা।
উন্নত বপুঃ, যুগ্ম , বিশাল ললাট,
স্থূল নিতম্ব, বিম্বো, ঘন কৃষ্ণ কেশ
আপাদ-লম্বিত, গােলাপ-সন্নিভ কপােল,
মৃগাক্ষি সন্নিভ নেত্র অতি মনােরম
মুনি-ঋষি-মনােহর সর্বাঙ্গ সৌষ্ঠব।
যুবতী রমণী স্ফীত যৌবনের ভরে,
চিন্তায় মলিনা ক্ষুব্ধা যথা সুধাকর
রাহু গ্রাসে প্রভাহীন বিক্ষুব্ধ মলিন।
হেনকালে অকস্মাৎ আসিয়া ফুল্লরা
রুদ্ধশ্বাসে, ভগ্নকণ্ঠে কহিতে লাগিল—

তৃতীয় সর্গ।
২৯
“মহারাণি ! আজ এক অঘট ঘটন
সংঘটিত রাজ্যে তব, অতীব ভীষণ।
এখনাে অস্থির প্রাণ কেমনে বর্ণিব ;
হেরিয়াছি কাণ্ড মাগাে থাকি অন্তরালে।
বুহান উদ্দিন নামে জনৈক যবন
অধ্যাসিত এই রাজ্যে সন্নিকটে কোথা
বন্ধ্যা ছিল কামিনী তাহার—তাই মাগাে,
স্বপ্নাদেশে গাে-কোর্বানি করিয়া মানস
লভেছিল পুত্র এক, ইন্দু-নিভানন।
মানসামুযায়ী তাই করিল গােবধ ;
গগা-খাদক তারা মাগাে তাদের বিধানে
যজ্ঞ-অর্থে গাে-হনন অতি পুণ্য কায,
ছিল যথা সত্যযুগে এই ভূভারতে
দিদিমা বলেছে মােরে বালিকা বয়সে
আছে নাকি কোথা মাগাে শাস্ত্রে আমাদের।
রাজার কোপেতে, মাগাে, গােবধ পাতকে,
চামুণ্ডা সাক্ষাতে তার পুত্র-শিরচ্ছেদ
আর তার বাহুচ্ছেদ হয়ে গেল আজ
বুঝি না মা কবে কি যে রয়েছে অদৃষ্টে !
মুর্হিত হইয়া মাগাে ছিনু এতক্ষণ
পারি নাই তাই আসি জানাতে তােমায়।”
;

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
রাণীর কোমল প্রাণ উঠিল কাঁদিয়া,
উথলিত শােকোচ্ছাস ভেদিয়া মরম।
নেহারিয়া প্রকৃতির শােভা মনােহর,
করতলে ন্যস্ত করে কপোল যুগল,
ভাসিলেন চিন্তাস্রোতে গােবিন্দ-মহিষী ।
মনােমাঝে কত চিন্তা উঠিছে পড়িছে,
ভাসিছে চিন্তার রেখা ললাট-দর্পণে ।
অন্তঃস্থল আলােড়িত চিন্তার তরঙ্গে,
ঝটিকা দাপটে যথা বঙ্গোপসাগর।
প্রাকৃতিক মনােহর সুষমানিচয়
পীড়িছে হৃদয় যথা বৃশ্চিক-দংশন।
দ্বিতীয়া মহিষী বিনােদিনী এতক্ষণ
নিরজনে একা একা কুঞ্জ পৰ্যটনে
ছিলেন ব্যাপৃত, এবে সহসা হৃদয়ে
পাটরাণী বসে একা জাগিয়া উঠিল।
সত্বর চকিত চিত্তে আসি বাপীতটে,
হেরিলেন মহিষীরে চিন্তা অভিভূত,
নিস্তব্ধা, বিষা, দর দর নয়না
কপােল বহিয়া ঝরিতেছে অবিরল ;
মাঝে মাঝে “আহ” “উহু” শােক বিজ্ঞাপক
হইতেছে বিনির্গত, অন্তঃস্থল ভেদি।

তৃতীয় সর্গ।
;
বিননাদিনী আদর্শ রমণী ; মর্ত্যধামে
অতীব দুর্লভ এহেন রমণীরত্ন,
বিদূষী, করুণাময়ী কমগুণখনি,
রূপে গুণে পাটরাণী চপলা সদৃশ,
বিদ্যাবুদ্ধি গুণে কিন্তু বহু শ্রেষ্ঠতর।
কেন দিদি কেন এত বিষন্ন বদন.?”
জিজ্ঞাসিলা বিননাদিনী বিনম্র বচনে।
উত্তরিলা রাজরাণী “হায়, এতদিনে
পূর্ণ বুঝি হল আজ চামুণ্ডা বাসনা !
সহস্র সহস্র অজ মহিষ শােণিতে
মিটে নাই তৃষ্ণা, তাই যবন শিশুর
রক্তে আজি চিরতরে হ’ল নির্বাপিত
সে তৃষা, নিষ্ঠুর কাণ্ড জঘন্য ঘৃণাই !!
স্মরিতে রােমাঞ্চ আসে দেহে; নারী আমি
-নারি নেহারিতে-নাহি মানসিক বল
পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা কুকাণ্ড ভীষণ !
সপ্ত দিবসের শিশু বিনা অপরাধে
—এহেন শিশুরাে কভু সম্ভবে কি দোষ ?
কেমনে বধিল হায়! নৃশংস ঘাতক!
কেমনে নিষ্ঠুর রাজা এহেন শিশুর
শিরচ্ছেদ করিবারে দিলেন আদেশ

৩২
;
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
ইথে কিবর্ধিত হ’ল ধৰ্ম্মের গৌরব ?
ইথে কি লভিলা রাজা চণ্ডিকার প্রীতি ?
চক্ষে চক্ষে হেরিতেছি এই মহাপাপে,
সুবৰ্ণ শ্রীহট্টপুরী হবে ছারখার ;
আর এই রম্য হৰ্ম্ম গােবিন্দ-প্রাসাদ,
-লােকে লােকারণ্য এবে, মুখরিত যাহা
অহর্নিশি কতবিধ আনন্দ আরাবে,
—সম্পূর্ণ উজাড় ; যথা মানব বসতি
করিবে শ্বাপদ তথা রাজত্ব স্থাপন।
যে অবধি শুনিয়াছি ফুল্লরার মুখে
দাসী নাকি আদ্যোপান্ত আমূল বৃত্তান্ত
যথাযথ শুনিয়াছে থাকি অন্তরালে
শিশু মুণ্ডচ্ছেদ কথা হৃদি বিদারক,
যে অবধি শুনিয়াছি সমস্ত কাহিনী
কেমনে শিশুর পিতা পুত্র-কামনায়
হায় দুরদৃষ্ট! মেনেছিল গাে-কোৰ্ব্বানি,
কিরূপে লভিয়া পুত্র স্বয়ম্ভু কৃপায়
গগাবধ করিয়া পূর্ণ করিল মানস,
কেমনে রাজার কোপে তনয়ের মুণ্ড,
আর নিজ বাহু তার চামুণ্ডা সাক্ষাতে
ঘাতকের খড়গাঘাতে হইল বিচ্ছিন্ন,
!

তৃতীয় সর্গ।
যে অবধি শুনিয়াছি সে অবধি সদা
সে লােমহর্ষণ কাণ্ড জাগিতেছে মনে।
কি যে অমঙ্গল চিন্তা:দহিছে হৃদয়।
সদাই কম্পিত প্রাণ অমঙ্গল গ্রাসে।
মহিষীরে প্রবােধিয়া গম্ভীর বচনে
কহিতে লাগিল। বিনােদিনী “কেন দিদি
কেন এত হয়েছ উতলা অধিকার
কি আছে মােদের বল সিদ্ধ কাৰ্যোপরি ?
গতস্য শােচনা নাস্তি বুধের বচন,
কে জানে কাহার কি যে ভবিতব্যতায়
রয়েছে অদৃষ্ট, কি যে নিয়তি কাহার?
অনর্থক শােক-তাপ যুক্তিযুক্ত নয়।
প্রাক্তনের লিপি বােন কে খণ্ডাতে পারে।
মমর সবি দিদি নিয়তি-কিঙ্কর।
চল এবে গৃহে, রাত হয়েছে বিস্তর,
সত্বরই আসিবে রাজা অন্দর মহলে।”

চতুর্থ সর্গ
নিশা অবসান; বায়সেরা ছাদে ছাদে
করিছে চীৎকার উচ্চৈঃস্বরে কা কা নাদে ;
ঘুঘু, বুলবুল, পাপিয়া, দোয়েল, শ্যামা,
কুঞ্জে কুঞ্জে গাইতেছে সুমধুর গান
মধুর কূজনে; অহো! যেন উচ্ছসিত
সঙ্গীত-লহরী স্বভাবের কুঞ্জবনে।
তরুণ ভাস্কর উদ্গ্রীব উদয়াচলে;
রক্তিম লােচনে উকি মেরে হেরিছেন,
প্রাকৃতিক সুষমা নিচয় প্রেমাবেশে;
প্রকৃতি ব্যাপিয়া প্রতিভাত রক্তিমাভা,
কোথা বা জলপ্রপাত-প্রক্ষিপ্ত-সলিলে
প্রবেশি ভানু-কিরণ, রাম ধনুকের---
সপ্তৰৰ্ণে করিছে রঞ্জিত নীরধারা ;
দৃশ্য কিবা মনােহর নয়নরঞ্জন!!
গােলাপ, চামেলী, বেল, মল্লিকা, মালতী,
;

চতুর্থ সর্গ।
রক্তজবা, সূর্যমুখী, বকুল, যূথিকা,
হাস্যমুখে ইতস্ততঃ করিছে বিরাজ ;
প্রভাতিক সমীরণ হেলিয়ে ঢলিয়ে,
গলাগলি কোলাকোলি করিয়া বেড়ায়,
কৃষ্ণ যথা কুঞ্জবনে গােপিনী-বেষ্টিত।
স্বভাবের বাদ্যকর অলির ঝঙ্কারে—
হৃদয়ের প্রতি তন্ত্রী নাচিয়া উঠিছে ;
কালার বাঁশির সুরে গােপিনীর যথা
নাচিত হৃদয়-তন্ত্রী প্রেমের আবেশে।
আয় লাে কল্পনে! চল হেরি যেয়ে এবে
রাজা-রাণী কি আনন্দে আছেন বিভাের।
গােবিন্দের অন্তঃপুর ঐ কি দেখা যায় ?
উন্নত প্রাচীর ওই চৌদিকে বেষ্টিত।
এই কি প্রাসাদ ওই প্রাচীর তােরণ।
কত কুঞ্জ, কত উৎস, কত সৌধরাজি,
প্রাচীরের অভ্যন্তরে এযে বিরাজিত,
অন্তঃপুরের শােভা করিয়া বৰ্দ্ধিত।
ওই কি গাে গােবিন্দের শয়ন আগার ?
কত শিল্প কারুকার্যে রচিত চিত্রিত।
মরকত স্তম্ভ মণি-মাণিক্য খচিত, .
মর্মরের মেজে তায় কনক লেপিত;

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
মর্মরের দেয়ালেতে স্বর্ণ লতাপাতা
মর্মরের ছাদ তায় কতবিধ মণি
অয়স্কান্ত, নীলকান্ত আছে ইতস্ততঃ ।
কত শত কারুকার্য বাখানিতে নারি,
ধন্য রে ভাস্কর তাের যাই বলিহারি !!
ওই স্বর্ণ কেদারায় গউড় গােবিন্দ,
অদূরে বসিয়া ওই দ্বিতীয়া মহিষী,
নিকটে ফুল্লরা দাসী রচে পুষ্পহার ;
ওই অধােমুখে অতি বিষ বদনে
ভাবিছেন কি যে বসে চপলাসুন্দরী।
মরি স্পন্দহীন, মৌনী, স্তবধ, নির্বাক,
দেয়ালে অঙ্কিত নর প্রতিমূৰ্ত্তি যথা।
হেনকালে চপরাণী প্রথমা মহিষী—
কহিতে লাগিলা ধীরে রাজারে সম্বােধি-
“মহারাজ! গত নিশি তৃতীয় মেতে
অতি বিভীষিকাপূর্ণ হেরিনু স্বপন,
কেমনে বলিৰ হায়! নেহারিসু যেন
তুমি আমি বিনােদিনী ফুল্লরারে লয়ে,
ভ্রমিতেছি মননসুখে প্রমােদ কাননে,
করিতেছি মন খুলে কত আলাপন,
হেনকালে অকস্মাৎ যেন পঙ্গপাল

চতুর্থ সর্গ।
৩৭
!
..
আবির্ভূত কোথা হতে সৈনিকের দল
আস্ফালিয়া অসি, অতি ভীষণ-দর্শন।
ছিন্নবাহু নর এক তাদের অগ্রণী !!
তােমারে হেরিব মাত্র রাগে অন্ধ হয়ে
বরষিয়ে বহুবিধ অকথ্য কথন,
তােমার শত্রুর যেন করে মুণ্ডপাত,
ধরে নিয়ে গেল, হায় আমা সবাকায় !
আতঙ্কে মূৰ্জিত হয়ে করিনু চীৎকার
জাগাইয়া দিল দাসী ফুল্লরা তখন।
যে অবধি হেরিয়াছি এই দুঃস্বপন,
জাগিতেছে বিভীষিকা সদাই অন্তরে,
কঁপিছে হৃদয় মন রহিয়া রহিয়া
স্বস্তি নাহি পাই মনে তিলেকের তরে।
বুঝিবা কি অমঙ্গল আনিছ ডাকিয়া,
যবন-শিশুর রাজা দিয়ে নরবলি ।
শিশুর কি দোষ ছিল ওহে মহারাজ ?
অবিচারে রাজ্য কারাে থাকে কি কখন ?
চক্ষে চক্ষে হেরিতেছি এই মহাপাপে,
সােনার এ পুরী নাখ যাবে রসাতল।" -
যবনেরাে পুত্র, পুত্র আমাদের যথা,
যবননা মানুষ, যথা মানুষ আমরা,
'

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
;
যবনাে শরীরী, রাজা রক্তমাংসধারী ;
যৰনেরাে সুখ-দুঃখ আমাদেরি মত।
ভেবে দেখ মহারাজ কি কৰ্ম্ম করেছ,
সময় থাকিতে এবে হও সাবধান।”
হাসিয়া বিকট হাসি কহিলা গােবিন্দ
“হাসি পায় মহারাণী শুনে তাের কথা,
কোন্ গুরু তােরে এই পাঠ শিক্ষা দিল?
বুঝিবা মিশিয়া কোন ভজনিয়া দলে,
শিখেছিলি প্রেমলীলা অনূঢ়া বয়সে,
বিলাইয়া কৃষ্ণপ্রেম কিশােরী সাজিয়া ;
তাই এত বিশ্বপ্রেম উচ্ছসিত হৃদে।
নারী তুই, কি বুঝিবি ধর্মের মহিমা,
যমের মুণ্ডপাত শাস্ত্রে আছে বিধি।
যবননা মানুষ মরি পতঙ্গও পাখী।
মরি মরি কিবা যুক্তি যাই বলিহারি ।
যবন অস্পৃশ্য, ঘৃণ্য, কুকুর অধম,
কুকুরে বধিতে কেবা করয়ে বিচার ?
বিধর্মীর মুণ্ডপাতে পুণ্য উপার্জন ;
অসুরে অর্দিলৈ হয় দেবতারাে যশঃ।
অসুর-মর্দন আখ্যা দেবের বাঞ্ছিত ;
শাস্ত্র কি বুঝিবি তুই ক্ষুদ্রমতি নারী।
;

চতুর্থ সর্গ ।
যবনে আশ্রয় দিমু অর্জনের-ই তরে,
সুযােগের অপেক্ষায় ছিনু এতদিন,
এ মহাযােগে তাই লভিয়াছি যশঃ ;
শাৰ্দল কি ছাড়ে কভু আপন শিকার ?
নিশ্চয়ই মস্তিষ্কে তব জন্মেছে বিকার,
হিন্দু তুমি হেন চিন্তা সাজে কি তােমার ?
আর স্বপ্ন, স্বপ্নই ত মস্তিষ্ক-বিকার,
চিন্তাই প্রসূতি তার—অতি অমূলক।
দুশ্চিন্তা করহ দূর, মন কর স্থির
ক্ষত্রিয়া ভামিনী তুমি নহ ত অবলা।”
এতেক শ্রবণ করি দ্বিতীয়া মহিষী
কহিতে লাগিলা অতি গম্ভীর বচনে—
“উপেক্ষা করাে না রাজা সতীর স্বপন
সতী নারী মহারাণী স্বপ্নাবেশে যাহা
হেরিলেন, আছে তায় ভয়ের কারণ।
সঠিক, অমৃত স্বপ্ন দ্বিবিধই আছে,
বিপদের পূর্বে প্রায় হয় স্বপ্নাদেশ।
স্বয়ম্ভুর প্রীতি কিসে, অপ্রীতি বা কিসে,
নিয়তির লিপি কি যে বুঝ অতি ভার।
ইন্দ্রপুরী অমরায় বৃত্র হয় রাজা,
অময়াে তাড়িত হয়ে পাতালে লুকায়,

জয় কাব্য।
অবিচারে অপযশ দেবতারাে হয়,
রাঘবের বালীবধ কলঙ্ক নিশ্চয়।
আমারাে আঁখিতে রাজা ভাসে বিভীষিকা,
হেরি নানাবিধ কত অঘট ঘটন
কভু ছিন্ন মুণ্ড, কভু কবন্ধ ভীষণ,
কভু ছিন্ন হস্ত, কভু নরের কঙ্কাল,
কখনন শােণিত স্রোত হেরি প্রবাহিত,
কভু হেরি শব লয়ে করিছে কোন্দল
শশাণিত লােলুপ বহু পশু পক্ষিগণ।
কখনাে বিলাপ ধ্বনি শ্ৰত হয় কাণে
কভু প্রাণ কেদে উঠে থাকিয়া থাকিয়া।
মহারাজ! পায়ে ধরি হও সাবধান,
ব্যঙ্গ উপহাস এবে উপযুক্ত নয়।”
হেনকালে সবিনয়ে কহিল ফুল্লরা
“মহারাজ! গত নিশি দ্বিতীয় মেতে
জানি কেন যে মন হ’ল উচাটিত।
চলিলাম শয্যা ত্যজি নিকুঞ্জ কাননে,
হইলাম সুস্থ কিছু সমীর সেবনে।
অকস্মাৎ হেরি-এক অপূর্ব রমণ
—দিব্য আভা প্রতিভাত বদন মণ্ডলে
শেক্স পরিহিতা, মৃদু মন্দ,পদে-- ...।

চতুর্থ সর্গ।
৪১,
প্রাসাদ হইতে অাসে সিংহদ্বার-পানে।
তাড়াতাড়ি যেয়ে আমি আগুলি পথ,
জিজ্ঞাসিমু নাম-ধাম পরিচয় তার ;
কোথা হতে আগমন কোথায় বা গতি।
ক্ষণকাল হেঁটমুখে থাকি অবনত,
কহিলা রমণী মােরে “আমি রাজলক্ষী,
গােবিন্দের রাজত্বের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।
রাজার পাপেতে রাজ্য হবে ছারখার,
তাই রাজ্য ছেড়ে আমি যেতেছি চলিয়া।”
কাকুতি মিনতি কত করিলাম রাজা,
নারিনু ফিরাতে দেবী গেলেন চলিয়া।”
রাগে অন্ধ নরপাল কহিতে লাগিলা-
“অবােধ ললনা তাের অতি অল্পমতি,
রাজনীতি আলােচনা তাদের কি কায ?
জল্পনা কল্পনা এত কিসের লাগিয়া ?
ধীর আমি, ভীতি মাের নাহি পশে মনে।
ননীর পুতুল নহি দ্রবিব সহজে,
ছেলে নহি-জুজু নামে হব জড়সড়,
ক্ষত্রিয় তনয় আমি, বীরের সন্ততি
নহি আমি কামিনীর ব্যসন-কন্দুক।
বুঝি বা কি মন্ত্র জানে পাষণ্ড যবন,
;

হটবিজয় কাব্য
—সত্য ঠিক ঠিক ঐ ডাকিছে টিকটিকি
না হলে কেমনে রাণীদ্বয়, সেনাপতি,
মন্ত্রী আর দাসী এরা উঠিবে ক্ষেপিয়া?
বিপদ! কি বিপদ ? কি ? যবনবাহিনী
আসিবে কি রাজ্যে মাের যুদ্ধ অভিলাষে
বুহানের দুঃখে শশাকে হয়ে উত্তেজিত,
অত্যাচার প্রতিশােধ লইবার তরে?
আসে ত আসুক তায় কিসের আতঙ্ক,
ক্ষত্রিয় কি ওরে কভু বিগ্রহ আহবে ?
শাস্তি না পছন্দ করে ক্ষত্রবীর কভু,
সমরেই ক্ষত্রিয়ের আনন্দ উৎসব।
বাণীদ্বয় শান্ত হও শঙ্কা '
কর দূর
যতদিন আছে এই বাহুদ্বয়ে বল
ততদিন তােমাদের কিসের তরাস ?
বীর আমি, নাহি কোন ভয়ের কারণ।
আর রাজলক্ষী ? কথা সম্পূর্ণ অলীক,
কোথায় যাবেন তিনি রাজ্য কোথা আর ?
এই সব বিভীষিকা দুশ্চিন্তার ফল,
বিকৃত মস্তিষ্ক-জাত-কল্পনা-প্রসূত।”

পঞ্চম সর্গ।
আয় মাে ফরমে ! চল রাজ-দরবারে,
দেখি বেয়ে গােবিন্দের অদ্ভুত
ত বিচার ;
আয় কিন্তু সাবধান রাজা বরাগী,
যদি চটে তবে কিন্তু মুণ্ড রাখা দায়।
না না যাব না তথা থাকিয়া আড়ালে
চোপি দিয়া নিরখিব ; দেখিলি ত কাল
গােবিন্দের বিচারের নমুনা কেমন ?
দেখেছিস আর কি লাে এহেন বিচার।
এই কি বিচারালয় ? বটে বটে এই
দেখেছি, দেখেছি ওই গউড় গােবিন্দ,
প্রধান সচিব এই, ওই সেনাপতি ;
চো চোপ্ শােনা চাই কি হয় মন্ত্রণা।
দেলে দে মুখখানি সাজি তাের চেলা,
—বর্ণিতে বাসনা যাহা নিরখি বা শুনি
তাের-ই গুণে ;-যে মুখস্ পরে অনায়াসে

৪৪
হট্টবিজয় কাব্য।
অন্ধ পায় দৃশক্তি, নির্বাক বচন।
পাত্র মিত্র কোথা, কোথা অমাত্য মণ্ডলী ?
বুঝি বা গুপ্ত মন্ত্রণা হতেছে এখন,
সিংহাসনে সমারূঢ় গােবিন্দ রাজন;
স্থানে স্থানে প্রহরায় সশস্ত্র প্রহরী।
বীরাসনে উপবিষ্ট একজানু পাতি,
সেনাপতি বীরবাহু রণবেশ গায় ।
আজানুলম্বিত বাহু, দীর্ঘ কলেবর,
শ্বেতবর্ণ, লম্বোদর, প্রশস্ত ললাট,
হৃষ্টপুষ্ট শার্পলক্ষ, বক্ষঃ সুবিশাল,
রাজপুত বংশােদ্ভুত বীরচূড়ামণি।
পার্শ্বে মন্ত্রী হৃষীকেশ গম্ভীর বদন,
শ্যামবর্ণ হৃষ্টদেহ, মধ্যম গঠন,
সুশিক্ষিত শাস্ত্রবিদ, অভিজ্ঞ প্রবীণ।
প্রকাণ্ড বিচারাগার, গম্ভীর দর্শন,
একতল হৰ্ম্ম, কিন্তু অতি উচ্চতর ;
কোথা বা কনকপন্ন অতি সুরচিত,
কোথা শোভে কনকের বল্লরী মুকুল।
কোথা বা দোয়েল, শ্যামা, পাপিয়া, ময়না
সুললিত গান করে কনক পিঞ্জরে।
ময়ুর ময়ুরী মূর্তি কনক-রচিত,

পঞ্চম সর্গ।
৪৫
কোথা বা দেয়াল শােভা করিছে বর্ধন,
পেখম ধরিয়া যেন চঞ্চল চরণে
করিছে নৰ্ত্তন; দৃশ্য কি যে মনােরম !!
জলদ গম্ভীর স্বরে গােবিন্দ ভূপতি
কহিতে লাগিলা “সেনাপতি! বীর তুমি,
বীর-ধৰ্মী, বীরাত্মজ, বীরের সন্ততি,
অবাক হইমু কল্য তব ভীরুতায় ;
সর্বৈব অমৃত তব ভীতির কারণ।
কত কত মহাহবে করি জয়লাভ,
কত শৌর্য বীৰ্য্যশালী কতজনে বধি,
সামান্য পিপীলি বধে ভীতির সঞ্চার,
এর চেয়ে লজ্জাকর কি হইতে পারে ?”
উত্তরিলা সেনাপতি বিনম্র বচনে---
“পিপীলিকা ক্ষুদ্র বটে ওহে মহারাজ,
কিন্তু সিংহ লােমস্থিত এ ক্ষুদ্র পিপীলি
নহে ক্ষুদ্র ; সিংহ সম বিক্রম তাহার,
সবল আশ্রিত কভু নহেক দুর্বল।
বুহান সামান্য কিন্তু স্বজাতি তাহার
সিংহ সম পরাক্রান্ত, নহে হীনবল,
পরস্পরে একপ্রাণ-যবন-সমাজ,
ধর্মমদে মাতােয়ারা অতীব নির্ভীক।

৪৬
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
ধৰ্ম্মের উপরে রাজা করেছ আঘাত
বনের ; তাদের বিধানে গাে-কোর্বানি
--যজ্ঞ অর্থে গােহনন—অতি পুণ্যকায়,
ছিল যথা সত্যযুগে এই ভূ-ভারতে।
শিশুবধ কাণ্ড আর বাহু বিচ্ছেদন,
জাতীয়-বিদ্বেষ-জাত হইবে প্রতীত
যবন-সমাজে ; রাজা অতীব সম্ভব
সমগ্র যবন জাতি হবে উত্তেজিত।
ভেবে দেখ মহারাজ ভয়ের কারণ,
কি মহাবিভ্রাট রাজা মস্তক উপর।
যানের কোপদৃষ্টি অতি ভয়ঙ্কর,
তাহাদের সমকক্ষ নাহি ভূ-ভারতে।
কোথায় হস্তিনাপুর, কোথা সােমনাথ ?
শিবের ত্রিশূলস্থিত কাশীধাম কই
কোথায় মথুরা, গয়া, কোথায় অযােধ্যা ?
সকলি ত যবনের করতল-গত।
কোথায় সে বীৰ্যশালী ক্ষাত্র রাজপুত ?
যাদব বেল্লানা বংশ, সেনবংশ লেখা ?
যবন আশ্রিত কেহ কেহ পদানত,
ভগ্নী কন্যা দিয়া কেহ পাতিছে সম্পর্ক।
এখনাে যে এই রাজ্য রয়েছে স্বতন্ত্র
•

পঞ্চম সর্গ।
৪৭
এ কেবল তাহাদের কটাক্ষ আড়ালে
অবস্থিত বলে, শুধু অদৃষ্টের ফেরে,
সাধ করে মহারাজ ডেকেছু বিপদে।”
কহিতে লাগিলা রাজা বিক্ষুব্ধ অন্তরে
“সেনাপতি ! দেখ নাই আগ্নেয়াস্ত্র মম
মন্ত্রসিদ্ধ অগ্নিবাণ—অতি ভয়ঙ্কর ?
দৈববলে বলী আমি অজেয় জগতে,
কেহ না আটিবে রণে আমার সংহতি।
চামুণ্ডা থাকিতে ভয় কেন অকারণ?
কি করিতে পারে তুচ্ছ অস্পৃশ্য যবন ?
মরি । মরি! মন্ত্রীবর অতীব তয়ালু,
তাহার চেহারা দেখে হাসি পায় মনে।
কেন মন্ত্রী কেন এত বিষন্ন বদন ?
ছি, ছি! ছি ছি !! এত ভয় কেন অকারণ?
বিমর্ষ বদনে মন্ত্রীবর “মহারাজ ।
বিপর্যয়, সমন্বয়, সৃজন-সংহ,
প্রকৃতির মহানীতি, নিগুঢ় রহস্য ;
ধ্বংসই সৃষ্টির ভিত্তি, সৃষ্টির প্রসূতি।
অন্তরে বাহিরে এই নীতি বিদ্যমান ;
অলঙ্ঘ্য, অপরিহার্য্য এই মহানীতি।
চন্দ্র, সূৰ্য্য, বৃষ্ণি আদি কত রাজবংশ,

98
শ্ৰহৰিজয় কাব্য।
হস্তিনা, অযযাধ্যা আদি কত মহারাজ্য,
উল্কা সম দশদিক করে উদ্ভাসিত
উল্কা সম পুনঃ রাজা হয়েছে বিলীন।
তাদের কঙ্কালােপরি কত রাজ্য রাজা,
পর পর পর পর হয়ে সমুদ্ভুত
আবার বিলীন হয়ে করিয়াছে স্থান,
পরবর্তী রাজ্য রাজা আসিবার তরে।
বিধির নির্বন্ধ বল, নিয়তিই বল,
এ নীতির রূপান্তর নামান্তর শুধু ;
কালের অঙ্কেতে এই চিরন্তন বিধি
ন্যস্ত, তাই অনেকেই কালচক্র বলে।
মনােরাজ্যে দেখ পুনঃ ওহে মহারাজ!
বিপৰ্যয়, সমন্বয় কত যে ঘটেছে !!
কত ধৰ্ম্ম এ ভারতে জাগিয়া উঠিল,
কত রূপ রূপান্তর করিল ধারণ
কত নাম নামান্তরে হয়ে অভিহিত,
প্রকৃতির মহানীতি করেছে প্রমাণ।
আজ মােরা গাে-পূজক ওহে মহারাজ,
মােরাই ত এক কালে ছিনু গাে-খাদক।
ভারতে এহেন কাল ছিল হে রাজন,
প্রতি হিন্দু মে কালেতে পূজিত অতিখি
;

পঞ্চম সর্গ।
৪৯
পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া ঘরে ঘরে ; গাে-হনন
অতিথি উদ্দেশ্যে ছিল অবশ্য কর্তব্য ;
তাই গােঘ্ন পদ রাজা অতিথিব্যঞ্জক।
আচার অনিত্য রাজা পরিবর্তনীয়,
খাদ্যাখাদ্য এও দেশ-কাল-পাত্র ভেদে।
আচার অনিত্য কিন্তু নিত্য পরব্রহ্ম,
নাম নামান্তরে যিনি বিশ্ব-বিপূজিত।
অনিত্যের কারণেতে নিত্যে বিসর্জন,
কাঞ্চন বদলে যথা কাচের গ্রহণ।
কালের গতির প্রতি সদা লক্ষ্য রেখে,
প্রকৃতির মহানীতি-বিধির বিধান
অনুযায়ী নিজ নিজ কর্তব্য সাধন
অবশ্য কর্তব্য রাজা বিধি অভিপ্রেত।
এ বিধি লঙ্ঘনে হয় অধৰ্ম্ম সঞ্চার,
ধৰ্ম্মনাশে পাপ, পাপে ধ্বংস সুনিশ্চয়,
বিধির নিবন্ধক্রমে আজ এ ভারতে
যবনের আধিপত্য ; আজ এ ভারত
নহে শুধু হিন্দুর ভারত মহারাজ।
হিন্দু আজ হেথা যবনের করায়ত্ত।
নয়নাথ ! যবন অস্পৃশ্য নহে আজ,
তাহাদের পদরজঃ লভিবার তরে

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
;
কত সাধে কত হিন্দু করিছে অর্চন
যবন ঘৃণিত নহে অতীব পূজিত।
এ সময় আমাদের এহেন বিদ্বেষ
সাজে কিহে নরপতে ! ভেবে দেখ মনে!
ভেবে দেখ বিষাদের নিগূঢ় কারণ
ভীতি উদ্দীপক কিনা ওহে নরেশ্বর !”
হেনকালে জ্যোতির্বি চণ্ডিকাচরণ
অকস্মাৎ কোথা হতে হ'য়ে উপনীত—
“হেরিলাম যােগবলে ওহে নরপাল
অতি অমঙ্গল চিহ্ন; কেমনে বর্ণিব ?
হেরিলাম একদল যবন সন্ন্যাসী
পরাভবি তন্ত্রবল মন্ত্রবল তব
করিবে এ স্বর্ণপুরী অচিরে বিধ্বস্ত।
ইশ্লামের অর্ধচন্দ্র অঙ্কিত পতাকা
সদর্পে উড্ডীন হবে চূড়ায় চূড়ায়
প্রতি দুর্গে,-ইশ্লামের বিজয়-কেতন
যুবনের আধিপত্য করিয়া জ্ঞাপন।
চল রাজা যুগপৎ করি পলায়ন
অরণ্য আশ্রয় লভি ফল মুলাহার
সে-ও ভাল ; তবু ত না অবনত শিরে
সেলাম ঠুকিতে হৰে যবন রাজায়।”
1;

পঞ্চম সর্গ ।
উত্তরিলা মহারাজ বিষয় বদনে—
“বুঝিলাম এতদিনে সকলি অসার,
সনাতন হিন্দুধৰ্ম্মে-পবিত্র আচারে
অচিরেই হবে বুঝি সাস্কৰ্য্য সঞ্চার,
সকল-ই অনিত্য বুঝি কিছু চির নহে।
অরণ্য আশ্রয় ! ছি ছি বড় লজ্জাকর,
হাসিবে যবনবৃন্দ দিয়া করতালি,
যা আছে অদৃষ্টে হবে পলাব না ত
জন্মিলে মরিতে হয়, কে ভবে

ষষ্ঠ সর্গ।
===
আইল গোধূলী ; দিবাকর ক্ষুব্ধ চিতে
—পাণ্ডুবর্ণ বিভাসিত বদন মণ্ডলে
চলিছে পশ্চিমাকাশে বিধুর অন্তরে,
বিচ্ছেদের পূর্বাভাস জাগিছে হৃদয়ে।
প্রকৃতি বিমর্ষ ; ধরিয়াছে পাণ্ডুরাগ ;
স্থলে সূর্যমুখী, কোকনদ সরােবরে
কান্ত-শােকে পড়িছে ঢলিয়া অধােমুখে,
ভবিষ্য-বিরহ-চিন্তা-পীড়িত-অন্তরে।
পাণ্ডু-কর বিকীরণে জলাশয় নীর
কাঞ্চনা বিমণ্ডিত ; অনিল প্রবাহে
পর পর পর পর লহরী নিচয়
ছুটিছে নাচিয়া ; ওহহ কিবা মনােহর।
নাচে যথা মুক্তাহার নৰ্তকীর গলে .
মৃদুল হিল্লোলে চুম্বি পীন পয়ােধর,
নিতম্ব হেলায়ে যবে নাচে গরবিনী
;

ষষ্ঠ, সর্গ।
তবলের তালে তালে নূপুর নিক্কনে।
বিহঙ্গম ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরিছে কুলায়,
গােপাল ধাইছে গেহে গােপাল সংহতি,
পথিকেরা শশব্যস্ত তপাসে আশ্রয়,
নাবিকেরা খুঁজিতেছে নিরাপদ স্থান ।
প্রদোষ সময় ; বায়ু সেবনের তরে
পথে ঘাটে নদীতীরে শত শত জন,
সখায় সখায় মিলে করিছে ভ্রমণ
প্রফুল্ল হৃদয়ে—অতি উল্লাসিত মনে।
হেথায় শ্রীহট্টরাজ গউড় গােবিন্দ
কুঞ্জবনে হ্রদতীরে সমীর সেবনে
করিছেন বিচরণ বিক্ষুব্ধ অন্তরে,
ভাসিছে বিষাদ-রেখা ললাট-মুকুরে।
ভাবিছেন মনে মনে “হায় ভগবান,
নিঃসন্তান থাকিব কি আমি, অপুত্রক ?
দিবে না পুত্র কি এক বংশ পিণ্ড তরে?
পুন্নরক ভােগ বুঝি না হবে খণ্ডন ?
পুত্র আশে দুই দার করিনু গ্রহণ,
হা কপাল! দুননা রাণী বন্ধ্যা বুঝি হ’ল !
হায় রে কি আমি মলে থাকিবে না কেহ
বংশে মের বংশধর বংশের দেউটি।

৫৪
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
ধন-জন-রাজ্যপাট সুরূপা কামিনী
দেহ, বল, শান্তি-সুখ সকলি ত আছে,
কিন্তু হায় ভবধব এক পুত্র বিনে
সকলি অসার, রাজ্য অন্ধকারময় ।
কত কৈমু-কত ব্ৰত, কত আরাধনা,
চামুণ্ডার কত সেবা, মহালক্ষী পূজা,
সিদ্ধিদাতা সর্বানন্দে কত যে পূজিনু,
সুচির মানস সাধ পূরিল না তবু !!
মনে হয় গেহ ত্যজি হই বনবাসী,
বনচারী সহ চরি সন্ন্যাসীর বেশে,
অপুত্রক কুলাঙ্গার বংশান্তক যেবা,
কি কায গাহস্থ্যে তার, কি ফল সংসারে ?
বন্ধ্যানারী, নিঃসন্তান পুরুষের মুখ
হায় কি লজ্জার কথা মৰ্ম্ম-বিদারক
প্রাতে উঠে দরশন অতি অমঙ্গল
1;
মনে জাগে যবে দুঃখে ফেটে যায় বুক।
যন্ত্রণা সদলে আসে, কচিৎ একেলা,
এক প্রাণে হায় বিধি কত বা সহিব !
একে পুত্রভািব-শােক, তাতে পর পর
নানা অমঙ্গল বার্তা-মৰ্ম্ম-নিপীড়ক।
একি ! একি! একি পুনঃ!! এযে ধূমকেতু!

যষ্ঠ সর্গ।
বিশাল লাঙ্গুল এযে পরশে ভূতল !!
ওকি পুনঃ!! মুহুর্মুহুঃ তারকা বর্ষণ !!!
এ সব কি ভগবান নিয়তির সূচী ?
কি পাপ করিনু বিধি ? কি পাপে আমার
সােনার এ রাজ্যপাট হবে ছারখার ?
ধৰ্ম্মরক্ষা করিয়াছি যবনে প্রপীড়ি,
গােধনের অত্যাচার প্রতিশােধ তরে।
গাে-ব্রাহ্মণ-সংরক্ষণ অতি পুণ্যকায,
নৃপতির মুখ্য ধৰ্ম্ম, শাস্ত্রের আদেশ ;
বুঝি না তবে যে কেন বিধি এত বাম,
এত দেবদেবী পূজা সবি কি অসার ?
নীরবিল মহারাজ। নীরব মেদিনী।
নিঝুম নিস্তব্ধ যেন সুষুপ্ত ধরণী।
বিদরিয়া অবনীর নিস্তব্ধতা ঘাের,
উঠিল গানের সুর ললিত ঝঙ্কারে
লহরে লহরে ক্রমে সুপঞ্চম তানে,
ঝলকে ঝলকে যেন অমৃত বরষি।
অদূরে নির্জনে যেন আত্মহারা প্রাণে
ধরিত্রীর শােক-তাপ-যন্ত্রণা পাসরি
দিব্যভাবে মাতােয়ারা উল্লাসিত হয়ে
গাইছে সন্ন্যাসী কেহ বিভুস্তুতি গান।

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
শুনিতে লাগিলা রাজা হইয়া বিভাের,
ঝলকে ঝলকে হৃদি উঠিল নাচিয়া,
মনের যাতনা জ্বালা হ’ল অপহৃত,
ধন্য রে সঙ্গীত তাের মােহিনী-শকতি।
গাইতে লাগিলা গান অদৃশ্য সন্ন্যাসী
ভাবেতে বিভোের হয়ে বিভুপ্রেমে ভাসি-
“বিশ্ব-ঈশ্বর সচ্চিদানন্দ বিভাে,
জগ-কারণ নিত্য অনন্ত তুমি ;
মহিমান্বিত নিৰ্ম্মল, কৃপানিধি,
ভবনাশক পালন নাথ তুমি।
দীননাথ সনাতন সত্য প্রভাে
তুমি আদি মধ্য তুমি অন্তগতি ;
তুমি গুপ্ত প্রকাশিত অদ্বিতীয়,
তুমি ইহ-পরকালে খেমঙ্কর।
তুমি বিশ্ব চরাচরে ওতপ্রােত,
তুমি বিশ্ব-বিপূজিত মহেশ্বর,
নিরাকার নিরঞ্জন পূর্ণজ্যোতিঃ
তুমি সর্ব বরেণ্য বিরাট প্রভু।
ত্রিগুণাত্মিক বিশ্ব-প্রপঞ্চ মায়া,
মায়া-মােহ-বিমণ্ডিত ভূমণ্ডল ;
অতি ক্ষুদ্র কীটাদপি কীট আমি

ঘষ্ঠ সর্গ।
ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি অঙ্কশায়ী।
জরাজীর্ণ কায়া কুরুচি প্রবল।
মায়া-মােহ-নিমজ্জিত পাপরত,
মন চঞ্চল পাগল সঙ্গদোষে,
কুমতি-প্রণােদিত কুবত্মগামী,
অবিদ্যা-জাত মােহ-কুহেলিরাশি
জ্ঞান-ভানু-করে স্বগুণে বিনাশি
বক্ষ মােক্ষ-পথে মােরে নিজগুণে
ভব সাগর তারক-ভেলক হে”--
নীরবিলা বনচারী, নীরব প্রকৃতি।
পাতাটি নড়ে না, শ্বাস বহে না পবন ।
পিক না কুহরে, ঝিল্লি করে না ঝঙ্কার,
পেচকো ডাকে না ভ্রমে অমঙ্গল ডাক।
অকালে নিদ্রিতা যেন দিগঙ্গনাগণ
বিভাের শ্রীহট্টরাজ ; তখনাে হৃদয়ে
তরঙ্গে তরঙ্গে কত উঠিছে উচ্ছাস—
সঙ্গীত মােহিনীশক্তি-জাত প্রতিক্রিয়া,
ইতস্ততঃ বিলােকিয়া সুপ্তোখিত প্রায় ;
ভাবিতে লাগিলা পুনঃ শ্রীহট্ট-নৃপতি
কে গাহিল গান ? এযে নূতন নূতন
সকলি মূতন ভাব ! করে স্তুতিগান ।
;

হট্টবিজয় কাব্য
“অদ্বিতীয়” “নিরাকার” “গুপ্ত” “প্রকাশিত”
এ কেমন ঈশ-ভাব! বাতুল-জল্পনা !
কালী, তারা, শিব, দুর্গা, লক্ষী, বল্লামুখী,
গণেশ, বাগেদবী, তারা সবিত সাকার ;
তাদেরি প্রতিমা মােরা অতি ভক্তিভরে
পূজা করি ঘরে ঘরে যােড়শােপচারে।
এ সব কি মিথাতবে ? মিথ্যা মূর্তিপূজা ?
, না, না হিন্দুর এই ধর্ম সনাতন
উম্মাদের-ই গান হবে অলীক জল্পনা,
পাগলের কথা লয়ে কেন ভেবে মরি।”
অকস্মাৎ শঙ্খঘণ্টা উঠিল বাজিয়া
চামুণ্ডা-মন্দিরে ; রাজা চকিত অন্তরে
তাড়াতাড়ি চলিলেন দেবী-গৃহপানে
পূজা সন্ধ্যা তরে আর লইতে প্রসাদ।
f;

শ্ৰহভবিজয় কাব্য।
দ্বিতীয় খণ্ড।

No text on this page.

সপ্তম সর্গ।
(১)
আয়লাে কল্পনে!
তীর্থ পৰ্যটনে,
আয় মােরে নিয়ে চল।
এ দীনজনার,
কেবা আছে আর
তুই বিনে অনুবল ?
বড় সাধ মনে
তীর্থ দরশনে;
ঘুচাব জনম-শােধ।
আমি দুঃখী নর,
নাহিক আতর,
তাই করি অনুরােধ ।
শুনি লােকে কয়,
“এমনে” উদয়,
শেখ শা জালাল পীর
র দীক্ষাগুরু
আশা-কল্পতরু
শা’ আহাম্মদ কবির।
তাঁদের চরণ
করিতে বীক্ষণ,
কত যে আকাক্ষা মনে।
|

৬২ শ্রীহট্টবিজয় কাব্য পদরজ লয়ে, কবি-সহচরি । মােরে দয়া করি নিয়ে চল সে “এমনে”। পূচিত হয়ে, পবিত্র মক্কায় যাব। নিরখি’ তীরথ, চির মনােরথ তব কৃপাতে পূরাব । যদিও দুরাশা,- তােমাতে ভরসা, তুমি দয়া কর যা’রে। মুহূর্ত ভিতর, বিশ্ব-চরাচর নিমেষে ভ্রমিতে পারে। (২) সাবাসি লাে ধনি ! কবি-নেত্ৰ-মণি পলকে আনিলে মােরে। এই যে নেহারি আদন নগরী পবিত্র “হাওয়ার” গােরে। ধরাধরময় স্বাস্থ্যের আলয় এই ত “এমন” দেশ। কোন তুঙ্গগিরি শিরােন্নত করি দেখায় আবহ-শেষ । * হাওয়া-মুসলমানদের আদিপুরুষ মহাত্মা আদমের স্ত্রী। আদন নগরে তাঁহার সমাধি হইয়াছিল বলিয়া প্রবাদ আছে।

সপ্তম সর্গ।
তুষার মণ্ডিত,
সুধা-ধবলিত
।
কোন গিরিশৃঙ্গ পরে।
তপন কিরণ,
হয়ে বিকীরণ,
রামধনু শােভা ধরে।
গিরি-সানুদেশে, এ পাশে ও পাশে,
পর্ণ কুটিরের সারি
স্বল্পতােয়া নােগা,
কোথা বা নিম্নগা
তৃষ্ণৰ্তে জোগায় বারি।
বেদানা আঙ্গুর,
দাড়িম্ব খর্জুর,
পীচ কাফি তরুচয়।
উপত্যকা পরে, হেথা শােভা করে,
“এমন” মরুভূ নয় ।
(৩)
দাড়ালে কল্পনে। দাড়া লই শুনে
কে যে কোথা করে গান।
স্বলকে ঝলকে,
পুলকে পুলকে
নাচিয়া উঠিছে প্রাণ।
দেখেছি দেখেছি, চিনেছি চিনেছি,
শা’ সিয়া তাপস ইনি।
গান গেয়ে গেয়ে,
চলিছেন ধেয়ে,
রক্তগুণে ভঁরে চিনি।

৬৪. হট্টবিজয় কাব্য চল তার সনে, জালাল-সদনে, জালালের শিষ্য ইনি । পাছে পাছে আয়, জালাল-আলয় নিশ্চয় যাবেন তিনি । আত্মহারা প্রাণে, সুললিত তানে, মাতিয়া প্রেমে নবীর। ভকতি মাখান নবী-স্তুতিগান গাহিতে লাগিলা পীর । “যাঁহার কারণ, বিশ্ব-বিরচন “কোরান” যাহার মহিমা গায় । ত্রিজগত প্রভু, স্বয়ং স্বয় “বন্ধু” “বন্ধু” বলে আদরে যায় । আঁহার প্রয়, রবি শশী ভায়, প্রতিবিম্বহীন যাহর কায়। শরীর যাহার, সৌরভ-আধার, যার দেহস্বের “আতর” স্যায় বদন যাহার, সুধার ভাণ্ডার হৃদয় স্বয়, প্রেমে বিভাের। সদা চিন্তা যার, “মানব-উদ্ধার, “পূর্ণ শান্তিলাভ” সমস্যা ঘাের । ৭ সপ্তম সর্গ। অলৌকিক গুণে, ভূচর খেচর, যক্ষ বিদ্যাধর, সজীব নির্জীব জড় কি চেতন। সকলেরি সনে করিতেন যিনি কথোপকথন । মুনি ঋষিগণ, যাহার চরণ, সঙ্গোপনে বসে করয়ে ধ্যান। পরকালে যার, চরণে নিস্তার, যাহার কৃপায় ধরমজ্ঞান ৷ মক্কা মদিনা, কারণে যাঁর, জগতের শীর্ষ তীর্থস্থান। সিরিয়া মিশর, যাহার জ্যোতিতে জ্যোতিষ্মন । তুরাণ ইরাণ, পাশ্চাত্য জগৎ, সভ্য সমুন্নত, লভিয়া যাঁহার জ্যোতিঃ-কল্যাণ। জগত মাঝারে, যাহার কল্যাণে, মােশ্লেম জাতি আজো গরীয়ান । তিনি প্রভু মাের, শেষ পম্বর, শত প্রণিপাত চরণে তার। আমি মূঢ়মতি, জানি ভকতি, তিনি নরােত্তম জগতসার ।

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
নিরক্ষর যেই,
প্রভু মােহাম্মদ,
শৈশব বয়সে যিনি অনাথ।
পিতামহ পর,
পিতৃ-সহােদর,
পালিলেন যারে রাখিয়া সাথ।
বাল্যকালে যাঁকে, সাজিয়া রাখাল,
যেতে হত মাঠে চরা’তে মেষ।
কালচক্র বশে,
বাল্য হ’তে যিনি
ভােগেন কায়িক শ্রমে অশেষ ।
এহেন জনের
কপােল-কল্পিত,
এ হেন কোরান হ'তে কি পারে ?
যেই কোরানের,
এক পংক্তি সম
অদ্যাবধি কেহ রচিতে নারে।
রচনা-চাতুৰ্য্য,
পদসমন্বয়,
বিষয় গুরুত্ব বিরাট ভাব ।
সবি অলৌকিক,
যেই মহাগ্রন্থে,
কি সাধ্য কল্পয়ে নর-স্বভাব।
পবিত্র কোরান,
স্বয়ম্ভুবচন,
মােহাম্মদ-যন্ত্রে হয়ে প্রচার।
অবিদ্যা-তামস,
কলুষ-কল্মষ,
নাশ করে’ নরে করে উদ্ধার ।

সপ্তম সর্গ।
দ্বাদশ বছর,
তপস্যার পর,
ঈশ-সংযােগে লভি দিব্যজ্ঞান।
বহু কষ্টে যিনি
ধৰ্ম্মারে জিনি’
মুক্তিজ্ঞান নরে করিল দান।
পূর্ণ শান্তিধাম,
যাহার ইশ্লাম
দেশ দেশান্তরে হয়ে প্রচার।
কলুষ-কল্মষ,
করিয়ে বিনাশ,
কত শত নরে করে উদ্ধার ॥
বাশক্তি যার
অতি চমৎকার,
ধৰ্ম্ম উপদেশ দিতেন যবে।
ভিন্ন ভাষাভাষী, স্বদেশী বিদেশী
নিজ ভাষা ন্যায় বুঝিত সবে ।
পৃষ্ঠের উপর,
সনন্দ মােহর,
প্রাকৃতিক ছাপ---অঙ্কিত যার ।
এক ভিন্ন নাই,
বিঘােষিলা যিনি এ তত্ত্ব সার।
তিনি প্রভু মোর,
শেষ পয়াস্বর,
শত প্রণিপাত চরণে তাঁর।
আমি মূঢ়মতি, না জানি ভকতি,
তিনি নরােত্তম জগতসার।
উপাস্য জগতে,

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য ধ্রুবসত্য ভাই, এক ভিন্ন নাই, উপাস্য আরাধ্য জগতে আর। নাহিক দোসর, নাহিক সােসর, নাহিক জনক-জননী তঁার। নাহিক আকার, নাহিক বিকার, ব্যাপ্ত চরাচরে জগতময়। তিনি স্বয়ম্ভ, ত্রিজগত প্রভু, তাঁহার ইচ্ছায় সকলি হয়। নবি মােহাম্মদ, মানব-তনয়, তঁাহারি প্রেরিত জগতসার। তাঁহার-ই ইচ্ছা, করিতে পূর্ণ, পাতকী জনেরে করিয়া পার ॥ স্বর্গ আরােহণ, স্বয়ম্ভ-মিলন বঁধুতে বঁধুতে নিগূঢ় কথা। “মানব-উদ্ধার”, “মহাতত্ত্বসার” “ইশ্লামের বিধিব্যবস্থা প্রথা” । ঐ সুখ-মিলন, এ গৃট কথন, প্রভু ভিন্ন কেবা করেছে আর ? পরমার্থ খনি, সাধু গুণমণি, নবি মােহাম্মদ প্রভু আমার ।

সপ্তম সর্গ ।
৭১
মােশ্লেমের মহাতীর্থ এ যে মক্কাধাম,
ও যে রাজে হিরা গিরি কন্দরে যাহার
প্রায়শঃ ধ্যানেতে নবি থাকি মগন।
এই স্থানে মােশ্লেমের ভবকর্ণধার
মােহাম্মদ নবিবর লভিয়া জনম
ইশ্লামের পূতপ্রভা জগতে বিথারি
মােহান্ধ মানবগণে করিলেন ত্রাণ ।
প্রচণ্ড তপন-তাপে বিদগ্ধ মরুভূ,
মরীচিকা, মরূদ্যান, করাল পবন,
অনীর বিশুদ্ধ-বপুঃ অনুর্বর দেশ,
অহরহঃ জাগাইছে ভাবুকের মনে
“আরব প্রদেশ জন খাটি প্রতিকৃতি
আধ্যাত্মিক জগতের ; মক্কা মােক্ষধাম,
মাপথ মােক্ষপথ-অবস্থা-ব্যঞ্জক।”
মরুভূমি, মরীচিকা, জীবপ্ন পবন,
প্রাকৃতিক অন্তরায় মাপথে যথা
নৈরাশ্য, মায়া-চাতুরী, কামনা-ফণিণী
আধ্যাত্মিক পথে তথা রাজে পরস্পর ;
উষ্ট্র যথা এক মাত্র মক্কাপথ-রি,
সহিষ্ণুতা তথা মােক্ষ-পথের তরণী।
একাগ্ৰত অসুবল মাপথে যথা,

१२
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
এক একাগ্রতা মেক্ষি-পথেরাে সম্বল।
মক্কাপথ অহরহঃ ভাবুকের মনে
ইঙ্গিতে নির্দেশ করে’মােক্ষধাম পথ ;
একাগ্রতা মােক্ষ-পথ-পাথেয় সম্বল
স্বত মনে হয় মক্কা যাত্রিকের মনে ;
তাই পূত মক্কাধাম লক্ষ্য মােশ্লেমের।”
বুঝেছি, বুঝেছি এবে এ আশ্রম কার;
কোরেশ-বংশজ পীর সৈয়দ কবির
হেথায় করেন বাস, এ আশ্রম তার ;
শেখ শা’ জালাল পীর তাহার আশ্রিত।
কোরেশ-বংশজ শেখ শা’ জালাল পীর
শৈশব বয়সে হ'য়ে পিতৃ-মাতৃহীন,
ভাসিলেন ভবার্ণবে; অতি সযতনে
খুল্লতাত নিজ গৃহে পালিলেন তারে।
ওই উচ্চ বেদিকায় আ’মদ কবির ;
চতুষ্পর্শ্বে উপবিষ্ট শিষ্যের মণ্ডলী,
অজিন আসনে ওই শা’ জালাল পীর,
মধ্যে অগ্নিকুণ্ড জ্বলে ধক ধক করে।
কহিতে লাগিলা পীর আ’মদ কবির।
শা’ জালালে লক্ষ্য করে,—“বাবা শা’ জালাল !
তােমার তপস্যা ধ্যান সম্পূর্ণ সফল,

সপ্তম সর্গ।
আমি মুঢ়মতি,
অতি অভাজন,
কি শকতি তার করি গুণগান।
বিদ্যা-বুদ্ধিহীন,
কদাচার লীন,
কেমনে দেখাব তাঁহার সম্মান ॥
গুরু না ভজিনু, গুরু না সেবি
না লভিনু কভু পরম অর্থ।
ভবের মায়ায়,
মিছে ভাবনায়,
সাধিলাম শুধু যত অনর্থ ।
এবে অনুতাপে,
দহিছে হৃদয়,
কি হবে কাদিলে সময় গত ।
'যখনকার যা,
তখনকার তা,
বান গেলে তরি চলে কি তত ?
কিন্তু প্রভু মাের,
দয়ার সাগর,
আশা রাখি হৰ দয়াতে পার।
আমি ক্ষুদ্রমতি,
জানি ভকতি,
তিনি নরোত্তম জগতসার।”
।
গান করে’ সমাপন দাঁড়ালেন এসে
অশ্রিমের দ্বারদেশে ; শা’ জালাল পীর
ইঙ্গিতে আদেশ দিলা বসিবার তরে,
বসিলা সন্ন্যাসীবর নির্দিষ্ট আসনে।

৭০ শ্রীহট্টবিজয় কাব্য ? ; কোথায় আসিনু ধনি ? এ নহে “এমন” চারিদিকে ধূ ধূ করে মরুভূ দুস্তর, প্রচণ্ড রবির করে বালুকা কঙ্কর ঝক ঝক ঝলসিছে অগ্নিকণা সম। ভীমবেগে প্রবাহিত উন্মত্ত পবন; বালুকা কঙ্কর রাশি নাচিয়া নাচিয়া উদ্ধপানে উঠিতেছে ঘূর্ণিপাক সহ, অগ্নিকুণ্ড-বিনির্গত-স্ফুলিঙ্গ-সদৃশ । কখনাে বিষাক্ত বায়ু সিরক্কো সিমুম, বহিতেছে ধূ ধূ করে ; তাই উষ্ট্রসারি জানু পাতি নতশিরে বালুকার স্তুপে প্রােথিয়াছে নাসারন্ধু অতি সযতনে। যে দিকে নিরখি হেরি বালুকা সাগর । মাঝে মাঝে দূরে দূরে নিকুঞ্জ সােসর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মরূদ্যান-পথিক আশ্রম- খর্জুর-তেঁতুল-তরু-ছায়া-তুলে রাজে। কোথাও বা মরীচিকা মায়া-স্বরূপিণী পথশ্রান্ত পথিকের করে বিড়ম্বনা, ছায়ারূপে দেখা দিয়ে মরূদ্যান সম, কাছে গেলে বিশ্বসম হইয়া বিলীন । এ নহে “এমন” সখি । এ নহে “এমন” !

সপ্তম সর্গ।
।
৬০
নিষ্ঠা হেরে তুষ্ট হয়ে দিনু সিদ্ধিবর।
যেদিন কৈশােরে তুমি মৃগ শাবকেৱে
শার্পল কবল হতে করিলে উদ্ধার,
নেত্ৰ তেজে তাড়াইয়া মৃগারি কেশরী ;
সেই দিনই বুঝিয়াছি তুমি জাত পীর ।
সুচির বাসনা মাের পূর্ণ কর এবে,
ইশ্লাম প্রচার তরে হিন্দুস্থানে যাও
লহ এই একমুষ্টি পৰিত্ৰ মৃত্তিকা,
স্বাদ-রস-গন্ধযুত ইহার সদৃশ
মৃত্তিকা পাইলে স্থিতি করিও সুস্থির।
অলৌকিক গুণযুত এ মাদুর মম
সঙ্গে লহ বাছ; কসে’ ইহার উপর
অনায়াসে পার হবে দুস্তর-সাগর ।
ধৰ্ম্মবীর তুমি বাছা; মাহাত্মে অেমার
ভারতে ইস্লামধৰ্ম্ম হবে প্রচারিত
বহু দেশ দেশান্তরে ; মরুলকে বাছা
কীৰ্ত্তি তব চিরকাল থাকিবে সজীব।”
নীরবিল শা’ কবির এতেক বলিয়া ।
উত্তরিলা শা’ জালাল বিনম্র বচনে
“শিরােধার্য ভবদীয় অনুজ্ঞা আমার
হে অত । এ অকিঞ্চন শিষ্যাধম তৰ

৭৪
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
ইশ্লাম প্রচার ব্রতে আজ হতে.ব্রতী।
দেহ গুরাে পদরজ কর আশীর্বাদ
পরকালে পাই যেন পদতলে স্থান,
এখনি প্রস্থান করি শিষ্যদল সহ ;
শুভকার্যে শিথিলতা যুক্তিযুক্ত নয়।”
এতেক বলিয়া পীর শেখ শা’ জালাল
গুরু-পদ কোকনদ করিয়া চুম্বন,
তিন শত ষাটিজন শ্যি সঙ্গে লয়ে,
শুভক্ষণে দিল্লীপানে করিলা প্রস্থান।

অষ্টম সর্গ
হেথায় বুহান শেখ কৃতকল্প হয়ে,
বাহিরিলা দিল্লীধামে করিতে গমন,
আছে আতর নাহি সঙ্গসাথী কেহ,
অনুৰল একমাত্র স্বয়ম্ভ-ভরসা।
দু’নয়নে অশ্রু ঝরে অজস্র ধারায়,
হৃদয়ে শােকের ঢেউ উঠিছে পড়িছে,
ঝটিকা দাপটে যথা সাগর-তরঙ্গ
ক্ষিপ্তপ্রায় উঠে পড়ে কাপায়ে দুকূল।
ধৰ্ম্মনিষ্ঠ বুরহান, অটল বিশ্বাসে;
বিশ্বপিতা পদে করি আত্মসমর্পণ,
স্বয়ম্ভু, মাহাত্ম্য চিন্তা করিতে করিতে,
শাস্ত্রের আশ্বাসবাণী করিয়া চিন্তন,
একাগ্র মননে পূজি’ বিপন্ন-শরণে,
ধীরে ধীরে দিল্লী পানে করিল প্রস্থান
জায়া-পুত্র মৃত্যু-শােক-তরঙ্গ-দাপটে,
;

৭৬
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
বাহ-বিচ্ছেদন কথা যদিও তাঁহার
স্বপ্নেও জাগে না মনে, সর্বাঙ্গে তথাপি
বিষম বেদনা জ্বর হয় অনুভূত।
চলিলা বুহান শেখ গুরু নাম স্মরি,
সম্পূর্ণ নির্ভর করি স্বয়ম্ভ, কৃপায় ।
নীরব রজনী, কিন্তু কৌমুদী বিস্নাত,
মস্তক উপরে শোভে নীল নভােদেশ,
ঝলসিছে ঝিকিমিকি তারকা নিচয়,
কনকের বিন্দু যথা নীল চন্দ্রাতপে
ঝলসে নিশীথে দীপ-আলােক-ছটায়।
ঝিল্লী ডাকে ঝি ঝি ঝি ঝি, কোকিল কুহরে,
উড়িয়া উড়িয়া কভু তরুশাখে বসি;
মৃদু মৃদু বহিতেছে নৈশ সমীরণ,
কোথাও বা তরুপত্র করে শর, শর।
চকোরী উধাও হয়ে উড়িয়া উড়িয়া,
কোথাও পীইছে সুধা হৃদয় পূরিয়া ;
শারদীয় নিশাযােগে প্রকৃতি সুন্দরী
করিছেন কেলি যেন সুধার সাগরে।
প্রকৃতির স্তরে স্তরে আনন্দ স্বরূপে
বিরাজিত-হেথা যেন স্বয়ম্ভ, আপনি ;
মনােহর শােভারাশি সদা সমসুরে,
;

অষ্টম সর্গ। ৭৭ কহিছে কোবিদে যেন-বিভু দয়াময়। এহেন নিশীথকালে বুহান উদ্দিন, মৃদুমন্দ পদক্ষেপে চলিছেন ধীরে। দেখ কি বিধির লীলা অচিন্ত মহিমা, অকস্মাৎ জ্যোতির্ময় বিংশতি বর্ষীয় সুঠাম পুরুষ এক সম্মুখে তাহার ঊদ্ধ হ'তে নেমে এসে হৈলা আবিভূত। দিব্যভা-প্রভাকেতে জ্যোস্নাময়ী নিশা হ’ল ক্ষীণপ্রভ কেন লজ্জায় মলিন, বৈদ্যুতিক আলােকেতে যথা মােমবাতি, অথবা প্রভাত তারা যথা রবিকরে, আশ্বাসিয়া বুহানেরে মধুর বচনে, কহিতে লাগিলা সেই জ্যোতির্ময় নর- “ভয় নাহি কর বাবা আমি পুত্র তব স্বর্গ হ'তে আসিয়াছি স্বয়ম্ভ, আদেশ, এই স্বর্গ-ফল পিতঃ করহ ভক্ষণ, শােক-তাপ-জ্বালা-জ্বর হবে অপত। অবাক হ’য়াে না বাবা হেরিয়া আমায়, সপ্ত দিবসের শিশু ছিনু বলে’ তব যখন পাষণ্ড মােরে করিল হনন ; স্বর্গপ্রাপ্ত সই হবে আমার সদৃশ

৭৮
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
ভুলিয়া কি গেলে পিতঃ নবির বচন
স্বর্গীয় পুরুষ হবে বিংশতি বর্ষীয়,
স্বর্গ নারী সবই হবে যােড়শী রমণী ;
নাহি রবে জরা-রোগ-মৃত্যুর তাড়না ।
যে মুহুর্তে শিরচ্ছেদ হইল আমার
আত্মারূপী নবিব র আসিয়া তখনি
করিলেন কোলে মােরে অতি সমাদরে,
চলিলেন স্বর্গপানে লইয়া আমায়।
অল্প পরে এসে বাবা জননী আমার,
মিলিলেন পথে ; তারে নবি মােহাম্মদ
লইলেন সঙ্গে করে বহু সমাদরে,
আঁখির পলকে স্বর্গে পঁহুছিনু যেয়ে।
স্বর্গদ্বারে যবে যেয়ে পঁহুছিনু মােরা,
স্বর্গীয় অপ্সরাগণ জয়ধ্বনি করে,
দিব্য কুসুমের হার পরাইয়া গলে,
আমাদেরে সমাদরে করিল বরণ।
সঙ্গে করে নবিবর লয়ে আমাদেরে
স্বর্গেতে দিলেন বাবা বহু উচ্চস্থান ;
দাসদাসী রূপে বাবা “হুর * গিলমান, ”
* সুরূপা স্বর্গীয় সেবিকা, ইহারা স্বর্গবাসী পুণ্যাত্মগণের পরিচর্চার জন্য
নিয়ােজিত।
+ রূপবান স্বর্গীয় সেবক।

অষ্টম সর্গ।
৭৯
.
সেবা তরে জুটিলেন বহু বহুতর ।
অতীব সুখের স্থান এই স্বর্গধাম,
অনির্বচনীয় সুখ সর্বত্র বিরাজে ;
যখন যে ইচ্ছা বাবা জাগয়ে অন্তরে,
তখনি পূরণ হয় স্বয়ম্ভ, কৃপায় ।
তৃষ্ণা হলে “শরাবন তহুরা” % লইয়ে,
অমনি অপ্সরাগণ হয় উপস্থিত ;
ইচ্ছার উদ্রেক মাত্ৰ ফলতরু শাখা
কাছে এসে নত হয়ে করে ফলদান।
নাহি জরা-মৃত্যু হেথা নাহি শােকতাপ,
নির্বিকার সবই বাবা আনন্দে মগন ;
স্বরূপ দেখায়ে কভু স্বয়ম্ভ, আপনি ;
দিব্যভাবে মাতােয়ারা করেন সবায়।
এহেন স্বর্গেতে পিতঃ করে দিয়ে স্থান,
কহিতে লাগিলা নবি পীযূষ বচনে ;
“শােন এবে কেন এত আদর তােদের, :
জন্ম-মৃত্যু গৃঢ়তত্ত্ব কি যে তােমাদের ;
ইচ্ছাময় কোন্ ইচ্ছা করিলা পূরণ,
নিমিত্ত তােদেরে করে জগৎ মাঝারে।
সর্বশক্তিমান বিভু ধ্রুবসত্য জান ;
-
* স্বর্গীয় অতি সুস্বাদ পানীয়।

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
{
প্রত্যেক কাৰ্য্যের তিনি নিগূঢ় কারণ,
কিন্তু কোন কাৰ্য্য তিনি নিমিত্ত বিহনে
না করেন কভু, এযে-রহস্য তাহার ।
শ্ৰহট্টে ইশ্লামধৰ্ম্ম করিতে প্রচার,
স্বয়ম্ভ, তােদেরে বাছা করিলা নিমিত্ত ;
বাছারে হিলাল এই মহৎ উদ্দেশ্যে,
বিধাতা তােৱে রে বাছা দিয়াছিলা ভবে।
ধন্য তুমি বাছা, আর তােমার কারণ
ধন্য তব পিতামাতা ; তােদের কাহিনী
মােশ্লেম-হৃদয়ে সদা থাকিবে জাগ্রত ;
অনশ্বর কীৰ্ত্তি তােরা করিলে অর্জন।”
এতেক বলিয়া নবি গেলেন চলিয়া
তদবধি আছি মােরা বিভুপ্রেমে ভাের ;
স্বয়ম্ভ আদেশে এবে আসিয়াছি বাবা
তােমারে লইয়া যেতে দিল্লী নগরীতে।”
এতেক বলিয়া সেই জ্যোতির্ময় নর,
কোলে করে বুহানেরে মুহূর্ত ভিতর
ব্যোমমার্গে পৌছাইয়া দিল্লী নগরীতে,
পুনরায় স্বর্গধামে করিলা প্রস্থান।
স্বৰ্গফল ভক্ষণেতে লভি দিব্যজ্ঞান,
বিধির গুঢ়রহস্য করিয়া উদ্ভেদ,
৭

অষ্টম সর্গ।
৮১
বুহান উদ্দিন অতি আশ্বাসিত মনে,
লভিলা আশ্রয় এক পান্থনিবাসেতে।
করিল মনস্থরাত্র হইলে প্রভাত,
দিল্লীশ্বর পদে যেয়ে করি অভিযােগ,
অত্যাচার প্রতিশােধ লইবার তরে,
যথাসাধ্য করিবেন বিহিত বিধান।
১১

নবম সর্গ।
:০০
ভারতের রাজধানী এযে দিল্লীপুরী,
কৃষ্ণততায় যমুনার তীরে অবস্থিত ;
ভুবন বিখ্যাত পুরী, বহু পুরাতন,
অতি পূত কীর্তিস্তম্ভ হিন্দু-মােশ্লেমের।
চতুষ্প মৰ্ম্মরের প্রাচীর বেষ্টিত
শত শত রম্য হৰ্ম্ম রাজে অভ্যন্তরে ;
তােরণের উভপার্শ্বে সশস্ত্র প্রহরী ;
পুরী প্রবেশের এযে প্রশস্ত বীথিকা।
কোন সৌধপার্শ্বে রাজে নিকুঞ্জ কানন,
কোনটি শােভিত অহহ লতা বিতানেতে;
ইতস্ততঃ বিরাজিত সুরম্য ফোয়ারা,
নিকটে বিরাজে ওই কুতুব মিনার।
জগত বিখ্যাত এই কুতুব মিনার,
লােহিত প্রস্তর আর মৰ্ম্মর নির্মিত ;
কুতুব শাহের কীর্তি বিজয় নিশান ;

নবম সর্গ।
জগতে এহেন উচ্চ স্তম্ভ নাহি আর।
গাত্রে বিখখাদিত কত শাস্ত্র উপদেশ,
বিভুর নবতি নাম রাজে বা কোথাও;
মােহাম্মদ বেন্ শামের সুখ্যাতি নিচয়
মাঝে মাঝে রহিয়াছে কোথাও খােদিত।
এই যে বিরাজে হেথা জুমা মসজিদ,
কুতুব উদ্দিন শাহ প্রতিষ্ঠিলা যাহা ;
অভ্যন্তরে পঞ্চ স্তম্ভ অতি রমণীয়
চতুষ্প সুবেষ্টিত প্রশস্ত প্রাঙ্গণে।
অষ্টধাতু বিনির্মিত কৃষ্ণ আভা যুত
অতীব প্রকাণ্ড এক স্তন্ত লম্বমান
প্রাঙ্গণের পশ্চিমার্ধে, বিস্ময়জনক ;
বহু পুরাতন স্তম্ভ জগত বিখ্যাত।
অদূরে বিরাজে ওই ইন্দ্রপ্রস্থ ধাম,
কত শত কীৰ্ত্তিভস্ম ধরিয়া হৃদয়ে ;
শ্রীকৃষ্ণ খাবারণ্য করে পরিষ্কৃত
যুধিষ্ঠির রাজধানী প্রতিষ্ঠিলা যথা।
নিকটে নিগম বেধ ঘাট বিরাজিত
খ্যাতনামা কল্লোলিনী যমুনা সৈকতে,
ধৰ্ম্মপুত্র যুধিষ্ঠির স্নান করে যথা,
করেছিল রাজসূয় যজ্ঞ সমাপন।

৮৪
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
v
আয়লাে কল্পনে! এই রাজবক্সে যাই,
হেরি যেয়ে রাজবাটী অভ্যন্তর ভাগ
লােহিত প্রাচীর এযে রয়েছে বেষ্টিয়া
রাজবাটী ; কতশীর্ষ বিরাজে উপরে।
প্রকাণ্ড চূড়ার নিম্নে এই যে তােরণ,
উভপার্শ্বে প্রতিহারী দিতেছে প্রহরা
খিলান আবৃত এই প্রশস্ত সরণি
সটান চলেছে রাজবাটী অভ্যন্তরে।
চল এই পথে যাই চুপি চুপি আয়
সাবধান কেহ যেন টের নাহি পায়।
বেশ বেশ এযে এক বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণ,
চারিদিকে রম্য হৰ্ম্ম নয়ন রঞ্জন।
স্থানে স্থানে বিরাজিত নিকুঞ্জ কানন,
মাঝে মাঝে মৰ্ম্মরের ফোয়ারা নিচয় ;
কোথাও বা বিরাজিত লতিকা বিতান,
অহহ কি সুরম্য রাজবাটী অভ্যন্তর ।
এযে সমচতুষ্কোণ হৰ্ম্ম মনােহর,
প্রতি পার্শ্বে অতি উচ্চ খিলান দরজা,
প্রতি কোণে দুটী দুটী গবাক্ষ সুন্দর,
মৰ্ম্মরের জাফরীতে রয়েছে আবৃত।
প্রতি দ্বার উপরেতে আরবী অক্ষরে,

নবম সর্গ।
৮৫
“খিলজী আলাউদ্দিন সিকন্দর ছানি,
তন্নিয়ে “রিখ হিজরী সপ্তশত দশ,
মতাবেক সহকৈ তিনশত দশ
খৃষ্ট অব্দ ;” রহিয়াছে প্রস্তরে খােদিত।
আলাদিন সম্রাটের এই ত প্রাসাদ,
সন্দেহ নাহিক ইথে, দেখি যেয়ে চল,
দেখিবি কত যে তথা সুষমা নিচয়।
অহহ কিবা মনােহর প্রাসাদ গঠন,
মৰ্ম্মর নির্মিত মেজে, মৰ্ম্মরের ছাদ,
চতুষ্পৰ্শ মর্মরের দেয়াল বেষ্টিত ;
মধ্যে রাজে স্তম্ভশ্রেণী-বিম্ব আনিভ।
সব-ই যেন চিত্রবৎ সুষমা মণ্ডিত,
কনক প্রসূন, পশু পক্ষীতে চিত্রিত ;
কোথা বা কনকতরু লতিকা নিচয়ে,
কনকের ফুল ফুল রয়েছে ধরিয়া।
প্রাসাদের উপরেতে অর্ধবৃত্তাকার,
মর্মরের শীর্ষরাজি রাজে সারি সারি ;
যে দিকে নেহারি শুধু শিল্পের চাতুরী,
আমূল সমস্ত মণি-মাণিক্য খচিত।
পাপিয়া, দয়েল, শ্যামা, সারিকা, ময়না,
কোথা বা করিছে গান কনক-পিঞ্জরে,

হট্টবিজয় কাব্য
সােনার শিকলে বাঁধা বাজ ভৃঙ্গরাজ,
টীয়া, তােতা, কোথাও বা করে লাফালাফি
এযে হেথা মর্মরের স্তম্ভ চতুষ্টয়,
কত শিল্প কারুকার্যে শশাভিত চিত্রিত।
উপরেতে চন্দ্রাতপ কনক খচিত,
চতুষ্পর্শে ঝুলিতেছে মতির ঝালর।
চন্দ্রাতপ নিয়ে ওই রাজছত্র শােভে,
সিংহাসনে সমারূঢ় রাজছত্র তলে,
শাহান্ শা আলাদিন সিকন্দর ছানি,
মস্তকে মুকুট মণি-মাণিক্য রচিত;
সম্মুখেতে রাজদণ্ড স্বর্ণ বিজড়িত,
করে নিক্কোসিত অসি করে ঝলমল ;
দুই পার্শ্বে দুই জন চামর দোলায়,
অহ কি বিরাট কাণ্ড মােশ্লেম দরবার !!
সম্মুখেতে পাত্র মিত্র আমির ওমরা,
জানুপাতি উপবিষ্ট স্ব স্ব আসনেতে,
আসে পাশে আরাে আরাে বহু কৰ্মচারী,
সবিনয়ে যােড় করে আছে পঁড়াইয়া।
হেনকালে দূত এক হয়ে উপস্থিত
ছিন্নবাহু নয় এক লইয়া সংহতি,
কহিতে লাগিল অতি বিনম্র বচনে,

নবম সর্গ ।
৮৭
ঘােড় করে “জাহাঁপানা অতি মৰ্ম্মান্তক
হয়েছে ঘটনা এক শ্রীহট্ট দেশেতে ;
তথাকার অধীশ্বর গউড় গােবিন্দ,
মােশ্লেম-বিদ্বেষ্টা অতি, অত্যাচারে তার
উৎপীড়িত হয়ে এই ছিন্নবাহু নর
এসেছে লইতে জাহাঁপানার আশ্রয়।”
দিল্লীশ্বর আলাদিন এতেক শ্রবণে,
জিজ্ঞাসিলা লক্ষ্য করি ছিন্নবাহু নরে—
“কই বাছা নির্ভয়েতে আমূল বৃত্তান্ত,
কি নাম তােমার আর কোথায় বসতি।
কোথায় শ্রীহট্ট দেশ, কেবা সে গােবিন্দ,
কেন, কিবা অত্যাচার করিল তােমায়,
গােবিন্দ কি বড় রাজা, কত শক্তিশালী,
একে একে সব বাছা করহ বর্ণনা।”
অশ্রু বিগলিত নেত্রে কঁদিতে দিতে,
কহিল বুহান লুঠি’ দিল্লীশ্বর পদে ;
“জাহাঁপানা সর্বনাশ ঘটেছে আমার,
ফাটিছে হৃদয় শােকে কেমনে বর্ণিব ?
বুহান উদ্দিন শেখ এ দাসের নাম,
হিরাতে নিবাস ছিল পূর্ব পুরুষের ;
বাণিজ্যের ব্যপদেশে, বিধির নিৰ্বন্ধে,

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
সস্ত্রীক করি বাস শ্রীহট্ট নগরে।
শ্রীহট্ট হিন্দুর দেশ, বহু পুরাতন,
সুবর্ণ গ্রামের পূর্বে, সুরমার তীরে,
ক্ষত্রিয় বংশজ রাজা গউড় গােবিন্দ,
ইন্দ্রজাল বিদ্যা বলে অতি বলবান।
মােশ্লেম-বিদ্বেষ্টা রাজা অতীব নিম্মম,
তাড়াইল রাজ্য হতে মােশ্লেম প্রজায়
অত্যাচার করে করে ; কালচক্র ফেরে
রয়েছি আমি শুধু রাজ্য অভ্যন্তরে।
জায়া মম বন্ধ্যা ছিল দেখিনু স্বপন,
গাে-কোব্বানি মানসেতে জন্মিবে সন্তান,
স্বপ্নের আদেশ মত করিয়া মানস
লভেছিনু পুত্র এক অতীব সুন্দর।
জাহােনা পুত্র পেয়ে আনন্দিত মনে,
স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী অতি ভক্তিভরে
সপ্তম দিবসে গরু করিয়া কোব্বানি
মানস করিনু পূর্ণ পুত্র শুভ তরে।
হায় কি বিধির লীলা, হায়রে কপাল।
গাে-কোর্বানি বার্তা শুনে গউড় গােবিন্দ
ক্রোধে অন্ধ হয়ে মােরে তনয় সংহতি
ধরাইয়া লয়ে গেল স্বকীয় প্রাসাদে।

নবম সর্গ।
চণ্ডাল যমের চর তাহার আদেশে,
খড়গাঘাতে বহু মাের করিল ছেদন,
পুজে দিল নরবলি চণ্ডিকা সদন;
পুত্র শব বেঁধে দিল মম গলদেশে।
এবেশে ফিরিশু যবে স্বকীয় আলয়ে,
দারা মােয় হেরে এই বিধি বিড়ম্বনা,
কঁদিতে দিতে আর লুঠিতে লুঠিতে
তৎক্ষণাৎ ইহলোক গিয়াছে ছাড়িয়া।
জায়া-পুত্র হারাইয়া করিয়া বিলাপ,
ডাকিনু একান্ত চিত্তে জগৎ পিয়,
অকস্মাৎ তিন জন স্বর্গীয় পুরুষ
আবির্ভূত হয়ে মােরে করিল উদ্ধার।
জায়া-পুত্র উভয়েরে করে সমাহিত,
আদেশ করিয়া মমরে দিল্লীতে আসিয়া
ভবীয় পাদপদ্মে করিতে নালিশ
আঁখির পলকে তারা হৈল অন্তর্হিত।
তাঁদের আদেশক্রমে আসি হেথায়,
আশা করি পাব জাহাঁপানার আশ্রয়,
প্রতিহিংসা হুতাশন অন্তরে আমার
অহরহঃ রহিয়াছে ভীম প্রহ্মলিত ।
বিধির কৃপায় শুধু আসিয়াছি হেথা,

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
পুত্র মম আত্মারূপে অন্তরীক্ষ পথে,
কোলে করে নিশিযােগে দিয়ে পেছাইয়া
স্বয়, আদেশে পুনঃ গেল স্বর্গধামে।”
কাদিতে দিতে আর হাঁপাতে হাঁপাতে,
আমূল শােক-কাহিনী করিয়া বর্ণন,
আদেশের প্রতীক্ষায় রহিল দাড়ায়ে,
ঝরিতে লাগিল অশ্রু কপােল বাহিয়া।
মৰ্ম্ম-নিপীড়ক বাৰ্তা করিয়া শ্রবণ
অতীব ব্যথিত চিত্তে দিল্লীর ঈশ্বর,
ভ্রাতুস্পুত্র সিকন্দরে ডেকে এনে কাছে,
কহিতে লাগিল। অতি বিক্ষুব্ধ অন্তরে
“যাও বাছা অবিলম্বে শ্রীহট্ট দেশেতে,
সহকৈ অশ্বারােহী সৈন্য সঙ্গে লয়ে ;
মােশ্লেম-বিদ্বেষ্টা হিন্দু পাষণ্ড গােবিন্দে
উপযুক্ত প্রতিফল দেই যেয়ে বাছা।
ধৰ্ম্মরক্ষা করেছিল বুহান উদ্দিন,
গাে-কোব্বানি করে, তারে করে উৎপীড়িত
ধৰ্ম্মের উপরে বাছা দিলরে আঘাত
আমাদের, পাষণ্ড কাফের নরাধমে;
লহ বাছা লহ এবে প্রতিশােধ তার।
বুৰ্হান হইবে তব পথ প্রদর্শক,
;
।

নবম সর্গ।
৯১
লই বাছা সঙ্গে করে তারেও তােমার ;
এযে ধৰ্ম্মযুদ্ধ বাছা; এ যুদ্ধে তােমার
জয় হলে, উভলােকে হইবেক যশঃ।
ঢাকার নবাব হেথা কাৰ্য্য উপলক্ষে,
আছেন সভাতে আজ এযে উপস্থিত ;
ঢাকা তক্‌ যাও বাছা তাহার সঙ্গেতে,
পঞ্চশত অশ্বারােহী তথা হতে নিবে।”
“জো হুকুম” বলে বীর শাহ সিকন্দর
চলিলেন সৈন্য সহ হইতে সজ্জিত।
ইতঃপর লক্ষ্য করে ঢাকার নবাবে,
কহিলেন দিল্লীশ্বর “শােন হে নবাব,
অদ্যই প্রস্থান কর সিকন্দরে লয়ে ;
প্রচুর রসদ আর সৈন্য পঞ্চশত
আরাে সঙ্গে দিয়ে অরে পাঠাবে শ্রীহট্ট।”
“জো হুকুম” বলে পদে মাগিয়া মেলানি,
নবাব ঢাকার পানে করিলা প্রস্থান ;
সিকন্দর সৈন্যসহ মিলিলা আসিয়া,
দুন্দুভি, দামামা, ডঙ্কা বাজিয়া উঠিল।
“আল্লাহু আকবার” রবে কঁপায়ে মেদিনী
চলিল ঢাকার পানে ভীম অনীর্কিনী
বুহান চলিল সঙ্গে অশান্বিত মনে,
ভক্তিভরে রাজ-পদ করিয়া চুম্বন।
•

দশম সর্গ।
হেথা পীর শা’ জালাল শিষ্যবৃন্দে লয়ে,
গুরুদত্ত মাদুরেতে উত্তরি’ সাগর,
অলৌকিক গুণ বলে বিভুর কৃপায়,
অনায়াসে পেঁছিলেন দিল্লী নগরীতে।
দিল্লীর বিখ্যাত গীর ইমাম জামিন,
সাদরে স্ব আশ্রমেতে করে দিয়ে স্থান,
যথাযােগ্য সমাদরে ঐতি-সম্ভাষণে,
পবিত্র সম্যাসিগণে করিল তােষণ।
সিংহদ্বার সম্মুখেতে দুর্গের নিকটে
ইমাম জামিন শা’র পবিত্র আশ্রম ;
খিলিজী আলাউদ্দিন প্রায়শঃ তথায়,
অবকাশে করিতেন ধর্ম আলােচনা।
আহার বিশ্রাম পরে সন্ন্যাসীর দল,
বসিলেন বৃত্তাকারে আশ্রম-সম্মুখে ;

দশম সর্গ।
-
কেন্দ্রস্থলে বসিলেন পীর শা’ জালাল,
সম্মুখে বসিলা তার ইমাম জামিন ।
বহুক্ষণ ধ্যান মগ্ন থাকিলেন সবে ;
কোরেশ বংশজ শিষ্য শা’ সিয়া তাপসে
লক্ষ্য করে, ইতঃপর শা’ জালাল পীর,
ইঙ্গিতে আদেশ দিলা গাহিবারে গান।
ভক্তি-প্রণােদিত চিত্তে মুদিত নয়নে,
গাহিতে লাগিল। শি গুরুর আদেশে-
“গুরাে ! তুমি মােক্ষদ্বার,
তুমি ভব কর্ণধার ;
(তব) রাতুল চরণ বিনে গতি নাহি আর।
ভবস্রোতে ভেসে ভেসে,
পৌছিনু চরণে এসে;
নিজ গুণে ওহে প্রভঙ্গ কর মােরে পার ।
অকূল এ পারাবার,
নাহি তার পারাপার,
(তাই) কূলেতে ব্যাকুল হয়ে করি হাহাকার।
গরজে তরঙ্গ ভারি,
গুয়াে হে ভব কাণ্ডারী ;
এ ভব পাথারে প্রভাে ভরসা তােমার।

৯৪
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
তব পদ অনুসনি,
আরােহি সাধন-তরি,
বিভুর করুণা লভি যাব মােক্ষাগার।”
গানেতে বিহ্বল হয়ে সন্ন্যাসীর দল,
আবার ধ্যানেতে সবে হইলা মগন
দিল্লীশ্বর আলাদিন অতর্কিত ভাবে,
পৌছিয়া, হেরিয়া কাণ্ড হইলা অবাক।
ধ্যান সমাপন করি সন্ন্যাসী সকলে,
চাহিলা নয়ন মেলি; ইমাম জামিন
দিল্লীশ্বরে সসম্ভ্রমে করি সম্ভাষণ,
দিলেন আসন এনে বসিবার তরে।
দিল্লীশ্বর সকলেরে করিয়া সালাম,
বসিলা বিনম্র ভাবে নির্দিষ্ট আসনে
অতঃপর লক্ষ্য করে ইমাম জামিনে,
জিজ্ঞাসিলা আগ্ৰহেতে বিনম্র বচনে-
“করুণা করিয়া প্রভাে সন্ন্যাসীদলের
দেহ পরিচয় মােরে ; সৌভাগ্য আমার
মম রাজ্যে তাঁহাদের শুভ আগমনে
কৃতার্থ হইমু হেয়ে তাঁদের চরণ।”
কহিতে লাগিলা পীর ইমাম জামিন
•

দশম সর্গ। '৯৫ ইঙ্গিতে করিয়া লক্ষ্য জালালের পানে “আমাদের কেন্দ্রস্থলে উপবিষ্ট যিনি, শ্বেতবর্ণ স্বল্প শ্মশ্রু দীর্ঘকায় নর, হৃষ্টপু, পুষ্ট দেহ, বিশাল ললাট, আজানু লখিত বাহু, মনুজ পুৰ, দিব্যচ্যুতি প্রতিভাত আস্ত চক্রবাল, অতি সিদ্ধ পীর ইনি নাম শা’ জালাল সিদ্ধিদাতা, জাতপীর জগৎ বিখ্যাত, চতুষ্পর্শ্বে সব তার শিষ্যের মণ্ডলী। মক্কার প্রসিদ্ধ পীর আ’মদ কবির, মম দীক্ষাগুরু হ’ন খুল্লতাত তার ; শুভক্ষণে গুরুবর করিয়া দীক্ষিত, প্রেরণ করিল তারে ভারত মাঝার।” ইতঃপর লক্ষ্য করে দিল্লীর সম্রাটে, কহিতে লাগিলা পীর শেখ শা’ জালাল- “আসিয়াছি হেথা বাছা গুরুর আদেশে, পবিত্র ইশ্লাম ধৰ্ম্ম করিতে প্রচার ; জীবন উৎসর্গ করি এই মহাব্রতে, আসিনু ভারতে মােরা ছাড়িয়া আরব।” অতঃপর আলাদিন “প্রভাে শা’ জালাল, বাল্যাবধি শুনিতেছি তােমার কাহিনী ;

শ্ৰহট্টবিজয় কাব্য।
স্বয়ম্ভ কৃপায় আজ পূরিল বাসনা,
ভঞ্জন হইল চক্ষু কর্ণের-বিবাদ।
সার্থক হইল আজ আমার জীবন,
হেরিয়া তােমার প্রভাে রাতুল চরণ;
দয়া করে অভাগারে করহ দীক্ষিত,
সুচির মানস সাধ পূর্ণ কর মাের।
কৃপা করে থাক প্রভাে রাজ্যে অধমের,
এ আশ্রমে কিছুর-ই না হইবে অভাব;
অবকাশে অকিঞ্চন সেবিবে চরণ,
আবশ্যক অনাটন করিবে জোগাড়।”
ইতঃপর শা” জালাল করুণা করিয়া,
দীক্ষিত করিলা রাজর্ষভ আলাদিনে ;
দিল্লীরাজ গুরুপদ করিয়া চুম্বন,
রাজপাটে অতঃপর করিল গমন।
সে অবধি দান কৰি ধৰ্ম্ম উপদেশ,
শিষ্যগণ সহ পীর শেখ শা’ জালাল,
ইশ্লাম প্রচার ব্রতে হয়ে মাতােয়ারা,
করিতে লাগিল। বাস জামিন-আশ্রমে।

একাদশ সর্গ
;
ধৰ্ম্ম-মদোদ্দপ্ত শাহ সিকন্দর গাজী,
অশ্বারােহী অৰ্নীকিনী লইয়া সংহতি,
ঢাকার নবাব সনে যথাকালে আসি,
পেঁৗছিল নবাব পাটে সুবর্ণগ্রামেতে ।
অতীব সুন্দর এই নবাবের পুরী
প্রতিষ্ঠিত মহানদ ব্ৰহ্মপুত্র তটে ;
চৌদিকে প্ৰাৰ্চীর, মধ্যে নবাব প্রাসাদ ;
ইতস্ততঃ কুঞ্জবন নয়নরঞ্জন।
প্রাসাদের পার্শ্বে রাজে প্রকাণ্ড মসজিদ,
মজিদ-সম্মুখে বহু সুরম্য ফোয়ারা ;
অদূরে বিরাজে এক ফলের বাগান
কত জাতি ফল তথা রয়েছে ধরিয়া।
নানা জাতি পাখী বসে ফলতরু শাখে,
মাতায় হৃদয় মন মধুর কূজনে ;
মাঝে মাঝে বিরাজিত পুষ্পতরু কত,
;

৯৮
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
শাখায় শাখায় রাজে নানা জাতি ফুল ।
চাটুকার অলিকুল মকরন্দ লােভে,
এ ফুলে ওফুলে বসি উড়িয়া উড়িয়া,
গুন্ গুন্ গান করে মায়ে প্রসূনে ;
লুঠিতেছে মুখ-মধু চুম্বিয়া চুম্বিয়া ।
প্রাকৃতিক দৃশ্য হেরি মনেতে জাগয়,
স্বরগের প্রতিকৃতি এ পুরী নিশ্চয়।
নিবসি নবাব পাটে ক্লান্তি করে দূর,
প্রভাতে শা সিকন্দর বিভুনাম স্মরি,
যথেষ্ট রসদ আর সৈন্যদল লয়ে,
করিলা শ্রীহট্ট পানে যুদ্ধ অভিযান।
অতীব দুর্গম পথ অরণ্য আকীর্ণ,
আরণ্য জীঘাংসু পশুরাজির আশ্রম ;
মাতঙ্গ বৃংহতি আর শার্দল নিনাদ,
প্রায়শঃ হৃদয়ে করে আতঙ্ক সঞ্চার।
এহেন ভীষণ বক্স করি অতিক্রম,
বিভুর কৃপায় গাজী শাহ সিকন্দর,
সৈন্যসহ নিরাপদে পৌছিয়া হাটে,
উপযুক্ত স্থানে কৈলা শিবির স্থাপন।
পালাক্রমে প্রহরায় রাখিয়া প্রহরী,
অনন্য মননে পূজি’ বিপন্ন শরণে

একাদশ সর্গ।
৯৯
সিকন্দর পট্টাবাসে লভিলা বিশ্রাম ;
তাবুতে তাবুতে সৈন্য করিল শয়ন ।
গাজীর মনস্থ নিশি হলে অবসান,
ঊষাতে বিভুর ধ্যান করে সমাপন,
প্রভাতে প্রেরিয়া দূত গােবিন্দ সদন,
করিবেন যথাযথ যুদ্ধ আয়ােজন।

দ্বাদশ সগ
• ৫০
বিস্তীর্ণ প্রান্তর এক গােচারণ মাঠ,
গগাবিন্দের রাজধানী দ্বিক্রোশ দক্ষিণে,
সুরমার পর পারে এযে অবস্থিত।
গুটাটীকরের পাশে ; জন প্রাণীহীন।
তাত নয় একি ! একি !! এষে তাঁবু সারি
সুরম্য পটমণ্ডপ অতি সুরচিত ;
কত শিল্প কারুকার্যে সুষমা মণ্ডিত,
ওই যে বিরাজে মাঠ করিয়া উজ্জ্বল ল
লােকে লােকারণ্য মাঠ নহেত নির্জন,
চৌদিকে প্রহরীগণ দিতেছে প্রহরা ;
পার্শ্ববর্তী জনপদ আজ নিরজন,
আতঙ্কে সমস্ত লােক গেছে পলাইয়া ।
আয় লাে কল্পনে আয় হেরি যেয়ে চল,
এ নির্জন মাঠে আজ একি যে ব্যাপার
আয় চল যাই পটমণ্ডপের কাছে,

দ্বাদশ সর্গ।
;
;-
;
চুপি দিয়া দেখি কেবা ভিতরে ইহার।
দেখেছি দেখেছি এযে সিকন্দর গাজী,
ওযে ছিন্নবাহু নর বুহান উদ্দিন ;
এযে দূত যােড়করে আছে পঁড়াইয়া,
চুপ চুপ শুনি কি যে হয় আলাপন।
জলদ গম্ভীর স্বরে সিকন্দর গাজী,
কহিতে লাগিল। দূতে করিয়া আহ্বান
“যাও দূত, যাও গৌড় গােবিন্দ সকাশে,
এই পত্রখানি মাের দাও যেয়ে তারে।”
“জো হুকুম” বলে দূত করিল প্রস্থান
হেথা সিকন্দর গাজী সৈন্যগণে ডেকে,
সজ্জিত হইতে সবে দিলেন আদেশ;
পাছে অকস্মাৎ অরি হয় উপনীত।
পূর্বেই গােবিন্দ রাজা গুপ্তচর মুখে,
মােশ্লেমের অভিযান-বারতা শুনিয়া
পাত্রমিত্র সকলেরে করে সমবেত,
মনস্থ করিয়াছিল করিতে মন্ত্রণা।
হেনকালে দূত যেয়ে হয়ে উপস্থিত,
সসম্রমে পত্রখানা রাজ-করে দিয়া,
উত্তরের প্রতীক্ষায় রহিল দাঁড়ায়ে';
দূতে হেরে পাত্রমিত্র সকলি স্তম্ভিত।

ক
হটবিজয় কাব্য
সচিবের হাতে রাজা পত্রখানি দিয়ে,
পড়িয়া শােনাতে তারে করিল আদেশ;
সকলি স্তবধচিতে অতি মনোেযােগে,
কান পেতে রহিলেক শুনিতে বারতা।
সচিব খুলিয়া পত্র পড়িতে লাগিল
শােনহে শ্রীহট্টরাজ গউড় গােবিন্দ,
বুহান উদ্দিন শেখ তােমার পরজা,
পাশব অশ্রুতপূর্ব অত্যাচারে তৰ,
দিল্লীশ্বর পদে যেয়ে করেছে নালিশ।
ধর্মের আদিষ্ট কাৰ্য করাতে পালন,
উৎপীড়িত করে তারে করেছ আঘাত
ধর্মের উপরে তুমি মােশ্লেম জাতির :
প্রতিশােধ নিতে তাই আসিয়াছি আমি।
বশ্যতা স্বীকার কর, হও মােসলমান,
নতুবা ধরম যুদ্ধে হও আগুসার
মিটাব আহবে তৰ বিদ্বেষ-বাসনা,
দেখাব ধর্মের তেজ মােশ্লেম-জাতির।
সজোরে পড়িয়া পাতি মন্ত্রী হৃষিকেশ,
স্বগত বিক্ষুব্ধচিতে ভাবিতে লাগিলা—
“রাজধৰ্ম্ম বিগর্হিত কোপ-জাত বিষ,
অঙ্কুরিত হয়ে, হল বৃক্ষে পরিণত ;

দ্বাদশ সর্গ ।
জানি না কি বিষফল ধরিয়া অচিরে,
কি যে মহা অমঙ্গল করে সংঘটন।”
সকলি বিষয়চিত্ত নিস্পল নীরব,
আত্মহারা ভেবাচেকা কাণ্ডজ্ঞানহীন’
ভীষক-নিরাশ-বাণী শুনে রােগী যথা,
অথবা অাসামী যথা শােনে বধাদেশ।
অকস্মাৎ হুহুঙ্কারি গউড় গােবিন্দ
আস্ফালিয়া খরসান কহিল গজ্জিয়া
“সেনাপতি যাও ত্বরা কর যুদ্ধসাজ,
দেখ কি আস্পর্ধা করে পাষণ্ড যবন
প্রবেশিয়া রাজ্যে মম ; দেখাব এখনি
দেখাব ক্ষত্রিয় বাহু কত শক্তিধর
মরি মরি কি আস্পর্ধা !! শৃগাল হইয়া
করেছে যুঝিতে সাধ কেশরীর সনে;
বালুকা হইয়া সাধ রােধিতে সাগর,
পঙ্গু হয়ে তুঙ্গ গিরি করিতে লঙ্ঘন ।
এখনি ঘুচাবু তার মতির বিভ্রম,
যাও ত্বরা সেনাপতি কর যুদ্ধসাজ ;
বাজুক দামামা-ডঙ্কা-দুন্দুভি-বিষাণ,
সাজুক সৈনিকবৃন্দ সমরের সাজে।”
ইতঃপর আহ্বানিয়া স্বকীয় দূতেরে,

১৪
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
কহিল গােবিন্দ “দূতে দেহ তাড়াইয়া,
চূণ
কালী দিয়ে আর শ্মশ্রু পুড়াইয়া
লাঞ্ছিত করিয়ে ; অর্ধচন্দ্র দিয়ে দিয়ে
কর তারে অচিরাৎ সুম্মানদী পার।”
“যে আজ্ঞা” বলিয়া দূত মােশ্লেম-দূতেরে,
অতীব লাঞ্ছিত করে দিল তাড়াইয়া।
অতঃপর সেনাপতি বিষয় বদনে--
“মহারাজ স্থির হও, দেখহ বিয়া
কার সনে যুদ্ধ এবে গেল যে বাধিয়া ;
মােশ্লেম-সম্রাট মহাবীর আলাদিন ;
তাঁর সেনাপতি এই সিকন্দর গাজী।
এ যুদ্ধ সামান্য বলে ভেবনা রাজন,
এ যুদ্ধের ফলাফল অতীব ভীষণ,
রাঠোর তােমরা বংশজাত বীরগণ,
কত শক্তিশালী ছিল, তবুও তাহারা
নারিয়া আটিতে রণে তাহাদের সনে,
অবশেষে হইয়াছে লাঞ্ছিত বিধ্বস্ত।
লজ্জাকর ব্যবহার করিলে হে রাজা,
মােশ্লেম দূতের সনে; যে ইহা শুনিবে
সেই আমাদেরে রাজা দিবে যে ধিক্কার ;
কুত্রাপি কেহ না করে দূতে.অপমান।

দ্বাদশ সর্গ ।
১০৫
যা হ’ক ; মন্ত্রণ করে ওহে নৃপবর .
এখন কর্তব্য কি যে কর নির্ধারণ ।
সন্ধি করা ভাল কি, না যুদ্ধ অনিবাৰ্য্য,
দেখা যাক সবে মিলে বিবেচনা করে।
ইতঃপর মন্ত্রীব কহিতে লাগিলা-
“ভাব দেখে তব রাজা হৈলু বুদ্ধিহারা,
কি বলি কেমনে বলি দিশা নাহি পাই ;
ভাগ্য সনে বুদ্ধিনাশ হয়ে বুঝি যায়,
নিয়তি সুমতি বুঝি করে দেয় লােপ ।
এখনাে ধৈরজ খর ওহে মহীপাল,
বশ্যতা স্বীকার কর, দেখি চেষ্টা করে,
কার্যকরী হয় কি না সন্ধির প্রস্তাব ;
এ সমরে অমঙ্গল অতীব নিশ্চিত।”
এতেক শুনিয়া রাজা রাগে অন্ধ হয়ে,
লম্ফ দিয়া দাঁড়াইয়া কহিল গর্জিয়া-
* ছি ছি ছি ছি ! তােমাদের মন্ত্রণ গুনিয়া
ঘৃণা হয় মনে; না না শুনি না আমি
কাহারাে মন্ত্রণা; যাও যাও সেনাপতি
সত্বর যাইয়া কর যুদ্ধ আয়ােজন।”
ভাবিয়া মনেতে বিধি সম্পূর্ণ-ই বাম,
যুদ্ধের করুিল সাজ মন্ত্রী, সেনাপতি
১৪

হউবিজয় কাব্য।
চৌদিকে দামামা ডঙ্কা বাজিয়া উঠিল,
“সাজ” “সাজ” রবে যেন পায়ে মেদিনী
অসি ভল্ল গদা লয়ে সাজিল বাহিনী,
মন্ত্রসিদ্ধ অগ্নিবাণ লইয়া গােবিন্দ
সুৰ্ম্মা নদী পার হয়ে সমর প্রান্তরে,
উপনীত হয়ে, কৈল বৃহ-বিরচন।
যুদ্ধশাস্ত্র-বিশারদ সিকন্দর গাজী,
অর্ধবৃত্তাকার বুহ করিয়া রচনা
দক্ষিণ বাহুতে স্থাপি সমির উদ্দিনে,
বাম বাহু নেতা করে সয়ফুল্লা বীরে ;
আপনি ব্যুহের কেন্দ্রে করি অবস্থান,
শাস্ত্রের পবিত্র বাণী করিয়া আবৃত্তি,
শােনাইয়া পুরাতন বীরত্ব কাহিনী
যুদ্ধ তরে করিলেন সবে উত্তেজিত।
“দীন দীন” রবে সবে উঠিল। মাতিয়া
কঁপিয়া উঠিল ধরা আহব-আরাবে।
সিকন্দর শাহ বীরে করিয়া আদান,
কহিতে লাগিল রাজা গােবিন্দ গর্জিয়া
“অরে রে দুৰ্ম্মতি ম্লেচ্ছ হ'রে অগ্রসর,
মিটাইয়া দেই তাের সমরের সাধ,
সাধ করে লােষ্ট্র তুই করিলি নিক্ষেপ

:
দ্বাদশ সর্গ।
১০৭
ভীমরুলের ঢাকে, এবে সামাল নিজেরে।
উত্তরিলা সিকন্দর “অরে রে কাফের,
আয় তােরে এক কোপে পাঠাই রৌরবে,
ভোগ যেয়ে নরকের দুঃসহ যাতনা ;
আয় দেখ মােশ্লেমের বাহুবল কত।
নিরাশ্রয় বুহানেরে করে অত্যাচার, .
বেড়েছে আস্পর্ধা তাের, ছিছি লজ্জা নাই
কেমনে দূতের প্রতি অরে রে পাষণ্ড,
করিলিরে আজ পুনঃ মন্দ ব্যবহার।
অসভ্য বর্বর ভিন্ন কে করেরে কোথা,
“ছি ছি ছি ছি যে শুনিবে দিবেরে ধিক্কার
রাজা নামে কৈলি তুই কলঙ্ক আরােপ।*
এইরূপে উভদলে বাকযুদ্ধ করে,
অতঃপর আরম্ভিলা অস্ত্র নিক্ষেপন।
দেখ কি বিধির লীলা, গউড় গােবিন্দ
মন্ত্রসিদ্ধ অগ্নিবাণ করিয়া নিক্ষেপ
মুহুর্মুহুঃ প্রতিপক্ষ সৈন্যের উপরে,
ঘটাইল বিড়ম্বনা নিয়তির ফেরে।
সমস্ত মােশ্লেম সৈন্য ছিল অশ্বারােহী,
অগ্নিবাণে অশ্বরাজি হয়ে ভীতিগ্রস্ত,
হ্রেষা রবে পলাইল ছুটিয়া পশ্চাতে;

১৮
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
প্রাণপণে বীরগণ নারিলা থামাতে।
বুঝিলেন সিকন্দর পদাতিক বিনে,
এক্ষেত্রে জয়ের আশা শুধু বিড়ম্বনা ;
সুদূর নিভৃত এক প্রান্তরে যাইয়া
রহিলেন করে তাই শিবির স্থাপন।
প্রেরণ করিয়া দূত দিল্লী নগরীতে,
পদাতিক সৈন্য সহ অমুল তরে,
রহিলেন তথা করে স্বয়ম্ভু, ভরসা,
অনুদিন পথপানে করিয়া প্রতীক্ষা ।

এয়োদশ সর্গ
০০:
জয়ােল্লাসে বিশ্বধরা, ভাবি ক্ষুদ্রতম শরা
গােবিন্দ ফিরিল পাটে লম্ফ ঝম্ফ দিয়া।
জয় জয় গরজিয়া,
বসুন্ধরা কঁপাইয়া
পশ্চাতে চলিল সৈন্য উল্লাসে মাতিয়া ॥
রাজপুরী পাশে এসে, ফুল্লমমে. হেসে হেসে
আশীষ বচনে সবে করিয়া বিদায়।
বিজয়ে প্রফুল্ল হয়ে,
বিজ্ঞাপিতে রাণীদ্বয়ে
বিজয়-বারতা, রাজা অন্তঃপুরে যায়।
হেথা বসে রাণীদ্বয়ে, ভয়ে সন্ত্রাসিত হয়ে,
কত অমঙ্গল চিন্তা করিছে চিন্তন।
কখনাে ফুল্লরা দাসী, পথপানে দেখে আসি,
রাণীদ্বয়ে বার্তা দেয় করিয়া গমন।
ভাবে চপরাণী মনে, হেরেছিনু যা স্বপনে,
বিধাতা কি ধাম হয়ে ঘটাইল আজ।

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
আর কিরে পতিধনে,
হেরিব না দু’নয়নে,
ছারখার হবে কি রে এ সােমার রাজ ॥
আমি ক্ষুদ্রমতি নারী, কেন যে বুঝিতে নারি,
যবন-শিশুর রাজা দিয়ে নরবলি ।
অনর্থক সাধে সাধে,
ডেকে এনে এ বিপদে
ডুবাইল রাজ্যপাট ডুবাল সকলি।”
অশ্বাসিয়া মহিষীরে, কহে বিনােরাণী ধীরে,
“অনর্থক কেন বােন করিছ চিন্তন।
ইন্দ্রজাল বিদ্যাৰলে, তাড়াইয়া অরিদলে,
অচিরে আসিবে রাজা মােদের সদন ।
হঠাৎ গােবিন্দরাজ, অঙ্গেতে বীরের সাজ,
সদর্পে প্রবেশ করি অন্দর মহলে।
বিজয়ে বিস্ফীত হয়ে,
বীরত্ব-কাহিনী কহে,
আহলাদিত পুলকিত করিল সকলে।
বিজয়-বারতা শােনে, মিলে পৌর নারীগণে,
উল্লাসে মাতিয়া সবে দিল হুলহুলি।
আনন্দে বিভাের হৈয়া, লাজভয় পাশরিয়া,
রাণীদ্বয় সনে রাজা করে কোলাকোলি ।
অতঃপর মহারাণী চপলা সুন্দরী,
প্রেম-গদগদ স্বরে জিজ্ঞাসিলা ধীরে
“মহারাজ, কহ শুনি সমর বারতা,

ত্রয়োদশ সর্গ ।
১১১
কার সনে কেনই বা বেধেছিল রণ,
অরিগণে কিরূপে বা করিলে বিধ্বস্ত,
কোন পক্ষে কত ক্ষতি হইল রাজন?
অকস্মাৎ হে রাজন চলে গেলে রণে,
ভয়েতে অস্থির হয়ে হারায়ে সম্বিত,
কত যে ভাবিনু মােরা, কত যে কদিনু,
কত চিন্তা পর পর জেগেছিল মনে।
ক. দুঃস্বপন কথা করিয়া চিন্তন,
আতঙ্কে বিধুরা হয়ে করিনু নােদন;
ভাবি নিয়তি বুঝি স্বপনের বাণী,
অক্ষরে অক্ষরে আজ ফলাইয়া দিল।
এখনাে অন্তরে রাজা ভীতি-প্রতিক্রিয়া,
আলােড়িত করিতেছে মম অন্তঃস্থল,
এখনাে শশাকের ঢেউ ছুটিয়া ছুটিয়া ;
প্রবাহিত হইতেছে প্রতি ধমনীতে।”
এতেক শ্রবণে রাজা আশ্বাস বচনে,
কহিতে লাগিলা “রাণি, কেন এত ভয়?
ভয়ের কারণ আমি কিছুই না হেরি,
ক্ষত্রিয়-তনয় আমি বীরের সন্ততি,
দৈৰবলে বলী, পুনঃ চামুণ্ডা কৃপায়
মন্ত্রসিদ্ধ অগ্নিবাণ থাকিতে আমার,

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
•
অসুক না যুদ্ধে তবে সমগ্রসংসার ;
তবু না ডরিব রণে; কারণ তত্রাপি
নারিবে করিতে স্পর্শ কেশাগ্র আমার
পাষণ্ড যবন সেই বুহান উদ্দিন,
লইয়াছে এবে দিলীপতির শরণ ;
দিল্লী হ’তে সৈন্য লয়ে সিকন্দর গাজী
এসেছিল মম সনে করিতে সমর।
চামুণ্ডা কৃপায় মম অগ্নিবাণ-ত্রাসে,
তাহাদের অশ্বগণ হয়ে সন্ত্রাসিত ;
ছুটে গেল তীরবেগে ছাড়ি রণভূমি ;
বিনা রক্তপাতে যুদ্ধ করিয়াছি জয়।
বুহান আসিয়াছিল তাহাদের সনে,
কঁদিয়া কঁদিয়া পুনঃ গেছে পলাইয়া ;
বুঝেছি তাহার শােকে বিদ্রবিত হয়ে,
দিল্লীশ্বর সৈন্যদল পাঠাইয়া ছিল।”
এতেক শ্রবণ করি দ্বিতীয়া মহিষী,
কহিতে লাগিল। অতি গম্ভীর বচনে-
“ভেবে দেখ স্থিরভাবে ভীষণ সমর,
অচিরে বাধিবে পুনঃ, দিল্লীর ঈশ্বর
অতীব প্রতাপশালী যবন-সম্রাট।
হটিবে কি সে রাজন সামান্য বাধাতে ?
;

ত্রয়োদশ সর্গ ।
১১৩
ভয় হয় মহারাজ, অচিরে আবার
পঙ্গপাল সম সৈন্য পৌছিবে আসিয়া,
কি মহা আপদ রাজা মস্তক উপর
রাণীর স্বপন নাথ। ফলেছে আংশিক
তাতেও রয়েছে বহু ভয়ের কারণ ;
সময় থাকিতে প্রভাে হওাবধান,
পায়ে ধরি অনর্থক দর্প নাহি কর ।
পাত্রমিত্রগণ সনে করিয়া মন্ত্রণা,
যুক্তিযুক্ত হয় যাহা করহ সুস্থির ;
বিলম্ব না কর রাজা না হও নিশ্চিন্ত,
নিশ্চয় সমর কিন্তু বাধিবে আবার।”
বিরক্ত হইয়া রাজা কহিতে লাগিল--
“তােদের মন্ত্রণা আর নারিব সহিতে,
ক্ষত্রিয়া ভামিনী হয়ে এত ভয় মনে,
কত যে বুঝানু তবু নারিনু বুঝাতে
তােরা কি ভাবিছ মােরে ননীর পুতুল?”
এতেক বলিয়া রাজা বিষন্ন বদনে
পূজা-সন্ধ্যা তরে গেল চামুণ্ডা মন্দিরে
হেথা বসে রাণী ধরে ভাবিতে লাগিলা-
কি কৌশলে আনিবেক পতিরে সুপথে।
;

চতুর্দশ সর্গ
••
প্রাসাদ সম্মুখে মঞ্জু নিকুঞ্জ কাননে,
প্রভাত সময়ে দিল্লীশ্বর আলাদিন
তাপস-কুল-পঙ্কজ শা’ জালাল সনে
করিছেন নিরিবিলি কথােপকথন।
বিয়স-কম-কণ্ঠ-নিঃসৃত-শিঞ্জন,
মধু-মত্ত ভ্রমরের কপট গুঞ্জন ;
কলির সলজ্জ আস্য, কুসুমের হাসি
প্রেমােন্মত্ত সমীরের হৃদয় উচ্ছাস
নেহারি শ্রবণ করি দিল্লী-মহীপাল,
ভাবিছেন কভু “বুঝি মানব-নিকর,
প্রকৃতির অঙ্কে থাকি চুষিয়া চুষিয়া
প্রাকৃতিক গুণ, গড়ে স্বকীয় প্রকৃতি ;
প্রকৃতিতে আছে যথা কপট ভ্রমর
তেমতি মানবে হের লম্পটের দল,
মক্ষিকা যেমতি বসে অক্ষত শরীরে
;
।

চতুর্দশ সর্গ।
;
ইতি উতি ক্ষতস্থান করে অন্বেষণ ;
তেমতি মানবে হের পরশ্রীকাতর
অনর্থক পর কুৎসা করে বিরচন।
স্বভাবের আশীবিষে দুগ্ধ করে দান
পালহ কিন্তু সে জান প্রতিদানে তার
নিশ্চয়ই করিবে হলাহল উদগীরণ ;
মানবেও আছে সর্পধৰ্ম্মি-কুলাঙ্গার ।
প্রকৃতির ফলতরু মৃত্তিকা নীরদ,
বিশ্বপ্রাণবায়ু—যথা মানবের হিতে
আছে সদা নিয়ােজিত ; দেবধৰ্ম্মি-নর
তেমতি পরার্থ তরে বদ্ধপরিকর।”
ভাবিতে লাগিল। পুনঃ শাহ আলাদিন,
ভাবেতে বিভাের হয়ে আপনা বিস্মরি
“কেমনে এ গূঢ়তত্ত্ব নিগূঢ় রহস্য
স্বতঃই অন্তরে মাের হইল উদ্ভেদ ;
বুঝি গুরু শা’ জালাল করুণা করিয়া
১ জাগাইলা মননামাঝে এই তত্ত্ব সার।
অহে! কি বিমল ভাব দিব্যজ্ঞান সনে
জাগিয়া উঠিল মনে ; যে দিকে নেহারি
বিভুর করুণা হেরি ; করুণ নিদান
প্রকৃতির স্তরে স্তরে যেন অনুসূত।”
-

১১৬
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
এইরূপে ভাবাবেশে থাকিয়া বিভাের,
বহুক্ষণ পরে পুনঃ পাইয়া চেতন ;
নিবেদিল দিল্লীপতি শা জালাল পদে
ভক্তি গদগদ স্বরে চিন্তিত অন্তরে
“গুরুবর ! কৃপা করে কর আশীর্বাদ,
ভ্রাতুস্পুত্র মম করি বৈর নির্যাতন,
ফিরে যেন নিরাপদে অচিরে আবার,
সুদূর শ্রীহট্টে গুরাে ! প্রেরিমু তাহায়।
তথাকার অধীশ্বর গউড় গােবিন্দ,
মােশ্লেম-বিদ্বেষ্টা অতি। নিয়তির ফেরে
বুহান উদ্দিন নামে জনৈক মােশ্লেম
সস্ত্রীক করিত বাস রাজ্যেতে তাহার।
নিঃসন্তান আছিল সে; পরে স্বপ্নাদেশে,
পুত্র তরে গাে-কোর্বানি করিয়া মানস
লভি পুত্র করেছিল মানস পূরণ ;
তাহাতে জন্মিল কোপ রাজার অন্তরে।
পিতা-পুত্রে এনে রাজা হয়ে কি নিষ্ঠুর,
পুত্রে দিল নরবলি,কালিকার কাছে ;
পিতার দক্ষিণ বাহু করিল বিচ্ছিন্ন,
পুত্র-শব বেঁধে দিল পিতৃ-গলদেশে।
পৈশাচিক অত্যাচারে--শােকে জায়া তার

চতুর্দশ সর্গ।
কাদিতে দিতে কৈল প্রাণ বিসর্জন,
জায়া-পুত্র হারাইয়া বুহান উদ্দিন,
লয়েছিল আসি হেথা আমার আশ্রয় ।
প্রতিশােধ লইবারে ভ্রাতুষ্পত্রে মম
পাঠাইয়া দিমু তাই শ্রীহট্ট নগরে;
সঙ্গে মহারথী সৈন্য দিয়াছি বিস্তর
আশীষ' হে গুরাে ! যুদ্ধে জয় যেন হয়।”
ধৰ্ম্মবীর শা জালাল এতেক শ্রবণে,
মৰ্ম্ম-নিপীড়িত হয়ে কহিতে লাগিলা-
“কি শােনালে বাছা মােরে ; বিধিল মরম
হৃদি-বিদারক বাৰ্তা আকর্ণন করি ;
বুঝি শ্রীহট্টরাজ অসুর প্রকৃতি,
তমােগুণ বলবান স্বভাব তাহার।
তমোগুণ মানবের মানবত্ব নাশি,
ক্রমে নরে অধােমুখে করি প্রধাবিত,
অসুরত্ব প্ৰদানিয়ে করয়ে পিশাচ,
সত্ত্বগুণ কিন্তু বাছা উদ্ধপথগামী
এই গুণ ক্রমে ক্রমে দেবত্ব প্রদানি,
মানবে ক্রমশঃ তােলে উন্নতি-শিখরে ;
রজোগুণ মানবের মানবীয় গুণ,
. এ গুণ মনুজে বাছা সাজায় সংসারী।

১১৮
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
শ্রীহট্ট নিশ্চয় হবে উপযুক্ত স্থান
ধর্ম প্রচারের তরে, হেন ক্ষেত্রে বাছা
পূত ধৰ্ম্ম পরচার অতীব উচিত ;
অদ্যই প্রস্থান আমি করিব তথায়।”
এতেক বলিয়া পীর আজন্ম কুমার,
আশ্রমে গমন করি, শিষ্যদল সহ
ইমাম জামিন হতে লইয়া বিদায়
চলিলা শ্রীহট্ট পানে গুরু নাম স্মরি।
দিল্লীরাজ শা’ জালালে করিয়া বিদায়,
উঠিলেন অন্তঃপুরে করিতে গমন ;
সিকন্দর শা’র দূত হেনকালে আসি
দাড়াইয়া যােড়করে কহিতে লাগিল
“জাহাঁপানা নিরাপদ আছেন সকলি :
বিধি দুর্বিপাকে কিন্তু সমরে মমাদের
ঘটিয়াছে বিড়ম্বনা; শ্রীহট্ট-নৃপতি
ইন্দ্রজাল বিদ্যা জানে; অগ্নিবাণে তার
ভীত হয়ে বাজীরাজি ছুটে তীরবেগে
ছেড়ে গেল রণভূমি ; প্রাণপণে কেহ
নারিলা থামাতে হয়ে ; হয়ে নিরুপায়
সুদূর প্রান্তরে মােরা স্থাপিনু শিবির।
আসিয়াছি জাহাঁপানা অবল তরে,
;

চতুর্দশ সর্গ।
১১৯
।
পদাতিক বিনে তথা যুদ্ধ অসম্ভব ;
পরাজিত হয়ে অতি বিক্ষুব্ধ অন্তরে,
সকলি আছেন শুধু পথপানে চেয়ে।”
পরাজয়-বার্তা শুনে শাহ আলাদিন
সৈয়দ নাসির বীরে করিয়া আহ্বান,
কহিতে লাগিলা “যাও শ্রীহট্ট নগরে,
দ্বিসহস্র পদাতিক সৈন্য সঙ্গে লয়ে,
নিয়তির চক্ৰফেরে সিকন্দর গাজী
পরাজিত হয়ে রণে প্রেরিলা দূতেরে
পদাতিক অনীকিনী অবল তরে,
যাও ত্বরা সৈন্যসহ দূতের সংহতি।
অব্যাজে প্রস্থান কর, পাইবে রাস্তায়
তাপস-কুল-তিলক শা’ জালাল পীরে ;
তিনিও অনতিপূর্বে করিলা প্রস্থান,
মিলিয়া তাহার সনে যাইও শ্রীহট্টে।”
নাসির উদ্দিন বীর এতেক শ্রবণে,
অবিলম্বে মহারথী সৈন্যগণে লয়ে,
জালালের সৈন্য সনে মিলিলেন বত্মে,
সম্মিলিত সৈন্যদল চলিল শ্রীহট্টে।
শা’ জালাল পীরে বরি সেনাপতি পদে,
ইশ্লামের “অৰ্দ্ধচন্দ্র” করিয়া উডীন,

হট্টবিজয় কাব্য
“দীন” “দীন” “দীন রবে কাপায়ে ধরণী,
হট্টের পানে সবে কৈলা অভিযান।

পঞ্চদশ সগ।
রাণীদের সনে বাকবিতণ্ডা করিয়া,
অতীব বিরক্ত হয়ে শ্রীহট্ট নৃপতি,
চামুণ্ডা মন্দিরে গিয়া দেবীর সাক্ষাতে
সাষ্টাঙ্গে ভকতি ভরে হ’ল দণ্ডবৎ।
নতশিরে পুরােহিতে করি প্রণিপাত,
দেবীর প্রসাদ বর করিয়া গ্রহণ,
ফুল্লমনে পুরােহিতে করিয়া আহ্বান
কহিতে লাগিলা রাজা সমর বারতা।
“গুরুবর ! আজ অণে তব আশীর্বাদে
চামুণ্ডার কৃপাবলে অতি নিকরে
শুধু দিব্যশক্তি বলে বিনা রক্তপাতে
তাড়ায়েছি রাজ্য হতে করিয়া লাঞ্ছিত।
পাতকী বুহান শেখ দিল্লীধামে যেয়ে
করিয়াছে অভিযােগ সম্রাটের পায়,
দিলীশ্বর তার শােকে বিত্ৰবিত হয়ে

১২২
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
পাঠাইয়াছিল সৈন্য প্রতিশােধ তরে।
অবিমৃষ্যকারিতার প্রতিফল এবে
পাইয়াছে হাতে হাতে ; দেখায়ে দিয়েছি
চামুণ্ডা দেবীর বরে-ইন্দ্রজাল বলে,
কত শক্তিশালী আমি এ মহীমণ্ডলে।
রণক্ষেত্রে মুহূৰ্ত্তেক টিকিতে নারিয়া
অগ্নিবাণ তেজে মম, যবন-বাহিনী
ইতস্ততঃ তীর বেগে গেল পলাইয়া
অনায়াসে লভিয়াছি, অনশ্বর যশঃ।
আশীর্বাদ কর গুরাে ! যেন চিরদিন
দেবীপদ-কোকনদে থাকে মাের মন,
ইহলোকে কীৰ্ত্তি যশ করিয়া অর্জন,
পরলােকে পাই যেন দেবীর চরণ।”
বিজয়-বারতা শুনি বিদর্পিত হয়ে,
উত্তরিলা ইতঃপর পূজারি ব্রাহ্মণ
“মহারাজ কোন ভয় নাহিক তােমার,
দেবীর প্রসাদে তুমি অজেয় জগতে ;
সতত প্রসন্না দেবী তােমার উপর,
উভ লােকে হবে তব জয় জয়কার।
পাষণ্ড যবনগণে করে বিতাড়িত,
যে যশঃ করেছে লাভ সমর প্রান্তরে

পঞ্চদশ সর্গ।
এ যশঃ অক্ষয় তব, এ যশের গুণে
পরকালে ইন্দ্রলােক হবে তব লাভ।
সমর-বিজয়-বাৰ্তা করিয়া শ্রবণ,
নাচিছে হৃদয় মম পুলক অবেশে,
আশীর্বাদ করি যেন চিরদিন তুমি
এরূপে করিতে থাক পাষণ্ড দলন।”
ইতঃপর দেবীপদে দণ্ডবৎ হয়ে,
প্রণমিয়া পুরােহিতে লভিয়া বিদায়,
ধীরে ধীরে মহারাজা অন্তঃপুর পানে,
নভেজে ফুল্ল মনে করিল প্রস্থান ।

যােড়শ সগ
হেথা পীর শা’ জালাল গুরুনাম স্মরি,
সম্রাটের সৈন্যদলে অনুবর্তী করে,
সৈয়দ নাসির বীরে লইয়া সংহতি,
শ্রীহট্টের অভিমুখে করিলা প্রস্থান।
জালালের অলৌকিক প্রতিভার গুণে,
শ্রান্তি, ক্লান্তি, পথভ্রান্তি কিছুই না ভােগি,
যথাকালে নিরাপদে পৌছিয়া ঢাকায়,
সুবৰ্ণগ্ৰামেতে সবে লভিলা বিশ্রাম।
নবাবের সম্ভাষণে সম্প্রীত হইয়া,
করিয়া নবাব পাটে রজনী যাপন,
নিশা অবসানে পুনঃ তাপস রতন
চলিলা শ্রীহট্ট পানে বিভুনাম স্মরি।
পশ্চাতে চলিল সারি সারি সৈন্যগণ,
বামপার্শ্বে চলিলেন নাসির উদ্দিন,
সঙ্গে সঙ্গে চলিলেক পতাকা বাহক,

ঘােড়শ সর্গ।
১২৪
মােশ্লেম-জাতীয়-ধ্বজা করিয়া উড্ডীন।
যথাকালে নদরাজ ব্ৰহ্মপুত্র তীরে,
উপনীত হয়ে, পীর ভূমা করুণায়
গুরুদত্ত মাদুরেতে করি আরােহণ
অনায়াসে উত্তরিলা খরস্রোত নদ।
সৈন্যগণে তরি যােগে নদ পার করে
নাসির মিলিলা সঙ্গে ক্ষণকাল পরে,
“আল্লাহু আকবর” রবে কাঁপায়ে মেদিনী,
চলিল আরণ্য পথে মােশ্লেম-বাহিনী।
অতীব দুর্গম বন্ধু গিরি সমাকীর্ণ,
লক্ষ লক্ষ দেবদারু রাজে উভপাশে ;
প্রকাণ্ড প্রস্তর খণ্ড শিলাস্তম্ভ পরে,
খট্টাকারে কোথাও বা রয়েছে বিস্তৃত ;
পার্শ্বে তুঙ্গ শিলাখণ্ড থাকি লম্বমান,
ছায়াদান করি যেন নিবিড় অরণ্যে
সৃজিয়াছে পান্থজন বিশ্রামের স্থান ;
হেরে বােধহয় যেন দৈত্য বিরচিত
কোথা বন্য তুরঙ্গম, কোথা বা কুরঙ্গ
কোথা করীযূথ, কোথা ভুজঙ্গ নিকর,
কোথা বা কেশরী, কোথা মর্কট নিবহ
নিরাতঙ্কে ইতস্ততঃ করিছে রিয়াজ।

১২৬
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
=
••
এহেন দুর্গম পথে তাপস পুঙ্গব,
সৈন্যগণে লয়ে সনে অনায়াসে আসি,
যথাকালে মিলি শাহ সিকন্দর সহ
আদেশিলা সৈন্যদলে স্থাপিতে শিবির।
অনুবল প্রাপ্ত হয়ে সিকন্দর গাজী,
স্বস্তিলাভ করে, সবে অতি সমাদরে
তােষিলেন যথাসাধ্য প্রীতি-সম্ভাষণে
শা’ জালালে করিলেন অতীব সম্মান।
বুহান পাগলপ্রায় আত্মহারা হয়ে,
জালাল-পাদ-পঙ্কজ করিল চুম্বন ;
পীরবর তার শােকে বিদ্রবিত হয়ে,
আশ্বাসিলা তারে অতি মধুর বচনে।
গাজীর বিধ্বস্ত সৈন্য নবতেজে মাতি,
“আল্লাহু আকবর” রবে কাঁপায়ে নিখিল
নবাগত সৈন্যসহ মিলি গলে গলে
পরস্পরে করিলেক প্রীতি-সম্ভাষণ।
জালালের অনুজ্ঞাতে সমগ্র বাহিনী
প্রত্যুষে সুস্থির করি যুদ্ধ অভিযান,
আহারান্তে স্বয়ম্ভর উপাসনা করি,
বিশ্রামার্থ স্ব স্ব স্থানে করিল প্রয়াণ।
শা’ জালাল, সিকন্দর, নাসির উদ্দিনে

ঘােড়শ সর্গ ।
১২৭
সঙ্গে লয়ে আরাধনা করি সমাপন,
বিভুর মাহাত্ম-চিন্তা করিতে করিতে,
গাজীর পট-মণ্ডপে লভিলা বিশ্রাম।
সিকন্দর, জালালের পরিচর্যা করে,
ভক্তিভরে পাদপদ্ম করিয়া চুম্বন,
উল্লাসে বিভুর ধ্যান করিতে করিতে,
স্বকীয় শয্যায় যেয়ে করিলা শয়ন।

সপ্তদশ সগ
০০ ০০০-
বিভাবরী অবসানে এমন’-রতন,
প্রভাতিক উপাসনা করি সমাপন,
আদেশিলা সিকন্দরে, নাসির উদ্দিনে,
সত্বর করিতে অভিযান আয়ােজন।
অনুজ্ঞা ঘােষণামাত্র দামামা বিষাণ,
“সাজ” “সাজ” “সাজ” রবে উঠিল বাজিয়া ;
তাড়াতাড়ি সৈন্যগণ যুদ্ধসাজ পরি,
সারি করে সঁাড়াইল,হইয়া প্রস্তুত।
ইতঃপর মহাবীর নাসির উদ্দিন,
সৈন্যগণে তিনদলে করিয়া বিভক্ত,
অগ্রণীদলের নেতা শা’ জালালে করে,
বরিলা হারে সবে সেনাপতি পদে।
দ্বিতীয় দলের নেতা:করে সিকন্দরে,
আপনি তৃতীয় দলে হইয়া অগ্রণী,
আদেশলা সৈন্যদলে হ’তে অগ্রসর,

সপ্তদশ সর্গ ।
১৯
চলিল সৈনিকদল “দীন” “দীন” রবে।
অরুণ উদয় কালে সমর প্রান্তরে
উপনীত হয়ে করে ব্যুহ বিরচন,
বীরত্রয় নিজ নিজ অনুবর্তী দলে,
প্রদানিল যথাযথ যুদ্ধ উপদেশ।
হেথায় হট্টপতি দূত প্রমুখাৎ,
জ্ঞাত হয়ে মােশ্লেমের বিরাট বাহিনী,
করেছে ছাউনি পুনঃ সমর প্রান্তরে;
সত্বর করিল মহাযুদ্ধ আয়ােজন।
সৈন্যগণে লয়ে রাজা নদী পার হয়ে,
যুদ্ধক্ষেত্রে অচিরাৎ হয়ে উপস্থিত,
যথাযথ সৈন্যরূহ করিয়া রচনা,
আদেশিল সমরের করিতে ঘােষণা ;
রণডঙ্কা উভসৈন্যে উঠিল বাজিয়া,
ধরিল ভীষণ রূপ সমর প্রাক্ত,
বীর হুহুঙ্কারে বসুন্ধরা থরহরি,
কঁপিয়া উঠিল যেন প্রলয় বিষাণে ।
সদর্পে হট্টরাজ লম্ফ ঝম্প দিয়া,
ধৰ্ম্মবীর জালালের সম্মুখীন হয়ে,
দিব্যতেজ দিব্যআভা করি বিলোেক,
ডুয়ে রহিল কাষ্ঠপুতলিকা যথা ।

শ্ৰীষ্ট্রবিজয় কাব্য
অভ্যন্তরে পঞ্চআত্মা কাপিয়া উঠিল,
কণ্ঠতে হইয়া গেল শক্তি লােপ ;
ভাবি মনে ইনি বুঝি “সাম যাদুকর”*-
সভয়ে সসৈন্যে স্বৱা করিল প্রস্থান।
ইতঃপর শা’ জালাল গম্ভীর বচনে,
কহিতে লাগিলা রাজা গােৰিলে আম্বানি,
“ছাড় রাজা বৃথা গৰ্বৰ-বৃথা অহঙ্কার,
ধৰ্ম্মের আলােক লভি পূত কর মন,
পূজ’ শুধু অদ্বিতীয় এক পরমেশে,
এক ভিন্ন নাহি অন্য উপাস্য জগতে।
অসার মুরতি পূজা করি পরিহার,
লহ এক নিরাকার স্বয়ম্ভ-শরণ;
অবিদ্যা-তামুসরাশি রিদুৱিত জুয়ে--
স্বতঃই উদিত হবে জ্ঞানের কিরূণ।
মােেেমর ধর্মগুরু ভকর্ণধার,
মােহাম্মদ বিৱৰ অৱন্তু প্রেরিত ।
ভার প্রদর্শিত পথ করহ গ্রহণ--
ধর্ম, অর্থ, মােঙ্গ, কাম সবুই পাকে রাজা।
নতু সমরের স্বাক্স অস্ত্র-শস্ত্র ভুজি,
ত্ব স্বীকার করে কর ক গান,
*সিম দেশে বিভিন্ন খামখানি।

সপ্তদশ সর্গ।
অথবা ধরম যুদ্ধে হয়ে অগ্রসর,
অদৃষ্টের ফলাফল করহ পরীক্ষা।
এতেক শ্রবণ করি শ্রীহট্ট ভূপতি,
কহিতে লাগিল “আমি বুঝি না এ সব
ধরমের কূটত ; হও আগুসার
সমরে পরীক্ষা হবে ধর্মের মাহাত্ম্য।
পরাজিত হই যদি হব মােসলমান,
জয়লাভ করি যদি তবে তােমাদেরে
একে একে বলি দিব চামুণ্ডা সদনে,
ধর অস্ত্র যদি তবু কর রণসাব।”
উত্তরিলা বীরবর কর তবে রণ,
ধরিব না অস্ত্র আমি আজ এ সর্মরে,
দেখাব ইশ্লাম-ধৰ্ম্ম-প্রভাব অচিরে,
বিলম্বে কি কাষ তবে হও আগুসার।”
শ্রীহট্ট ধরণীপাল এতেক শ্রবণে,
মুহুর্মুহুঃ অগ্নিবাণ করিল নিক্ষেপ,
বিধির মাহাত্মে বাণ প্রত্যাহত হয়ে,
পড়িতে লাগিল নিজ সৈন্যের উপর।
হতাশ্বাস ইয়ে রাজা না হেরি উপায়,
সেনাপতি সচিবের উপদেশ মানি,
রণসাজ পরিহরি জালালের কাছে

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
ইতঃপর করিলেক বশ্যতা স্বীকার ।
কহিতে লাগিল রাজা “হে তাপসমণি!
কৃপা করে চল এবে পুরীতে আমার,
পাত্র মিত্রগণ সনে পরামর্শ করে,
যুগপৎ তব কাছে হইব দীক্ষিত।”
পীরবর শা’ জালাল সবাকারে লয়ে
মাদুরেতে সুৰ্ম্মানদী হইয়া উত্তীর্ণ,
শ্রীহট্ট-নৃপতি-পুরে উপনীত হয়ে,
সৈন্যগণে আদেশিলা স্থাপিতে শিবির।
বুহান, শা’ সিকদার, নাসির উদ্দিনে,
ইতঃপর পীরবর সঙ্গে করে লয়ে,
গােবিন্দের অনুনয়ে প্রসন্ন হইয়া,
প্রীত মনে রাজপাট করিল গমন।
যথাযােগ্য সম্ভাষণে তুষ্ট করে সবে,
কহিল শ্রীহট্ট-ভূপ বিনীত ভাষণে
“শা’ সাহেব দয়া করে দেখাও মহিমা
সন্দেহ ভঞ্জন কর স্বণ প্রকাশি,
সপ্ততল এযে মাের চামুণ্ডা মন্দির
ওই যে মন্দিরে মাের চিরারাধ্যা দেকী ;
ধর্মের মাহাত্মে শুধু এ দেবী মন্দির
বিগ্রহ সহিত যদি পার চুর্ণিঝরে,

সপ্তদশ সর্গ।
নিশ্চয়ই সকলে মােরা হব মােসলমান,
ভক্তি ভরে তব কাছে হইয়া দীক্ষিত।”
ইহা শুনি শা’ জালাল বিভুনাম স্মরি,
ক্ষণকাল হেটমুখে কি যেন ভাবিয়া,
আদেশিলা শা’ পরানে সহােদরে তার
সজোরে “অজান” দিতে মন্দিরের কাছে।
অরম্ভিলা শা’ পরান সজোরে “আজান,
“আজানের সঙ্গে সঙ্গে চামুণ্ডা মন্দির
চূর্ণ চূর্ণ হয়ে গেল বিগ্রহ সহিত,
কাণ্ড হেরে সবে হল বিস্ময়ে আপ্লত।
শা’ জালালে লক্ষ্য করে গােবিন্দ রাজন,
কহিতে লাগিল অতি বিনম্র বচনে,
“পীরবর, আজ যেয়ে করুন বিশ্রাম,
কাল রাতে সবে মােরা হব মোসলমান ;
অন্তরঙ্গ জন সনে পরামর্শ করে,
সবে মিলি এক সঙ্গে হইব দীক্ষিত ।
এতেক শুনিয়া পীর বিদায় হইয়া,
সঙ্গীত্রয় সনে আসি স্বকীয় শিবিরে,
গুরুদত্ত মৃত্তিকার সাদৃশ্য হেরিয়া,
তথাকার মৃত্তিকাতে স্থাপিলা আস্থান।
সান্ধ্য উপাসনা সবে করি সমাপন

১৩৪
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
জয়োল্লাসে স্ফীত হয়ে নবতেজে মাতি;
সকলে নিদিধ্যানে পীরের চৌদিকে,
সয়্যু-ধ্যানেতে বলি হইল বিভোল।
ইতঃপর পুনরায় নৈশ উপাসন।
সবে মিলে সমাপিয়া, করিয়া আহার,
বিচুর মাহাত্ম্য ধ্যান করিতে করিতে,
স্ব স্ব স্থানে সবে যেয়ে করিলা বিশ্রাম,

অষ্টাদশ সগ।
অশান্ত ব্যাকুল পিষ্ট কাল নিষ্পেষণে
হতবুদ্ধি ক্লিষ্টচিত শ্রীহট্টনরেশ
কলে ছুলে শা’ জালালে করিয়া, বিদায়,,
শৰিছে নির্জনে হেথা নিরাশ অন্তরে
“হায় বিধি। একি ছিল ভবিতব্য: লিপি।
বিধি হয়ে কেন তব এহেন অবিধি।
আজ ভুকতি ভরে দেবদেবী পুজে
অন্তিমে লভিনু একি প্রায়শ্চিত্ত: অর?
চামুণ্ডা দেবীর পূজা ঝোড়শােপচারে
তৃত করি কিন্তু অন্তিমে আমায়,
নিঃসহায় ফেলে তিনি কৈলা অন্তর্ধান।
নিমিষে সুখের স্বপ্ন টুটিল সহ।
তব মরুবল দেবদেবী বল,
সবই কি অসৎ, যথা: আকাশ-কুম ?
অথবা মরুভূদৃষ্টমৃগতৃষা সম

১৩৬
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
পান্থজন-পথ-বি-গতি-পণ্ড শুধু ?
অথবা অসার যথা নিশার স্বপন,
অলীক অনৃত শুধু কল্পনা প্রসূত ?
সব মিথ্যা ছল মায়া, সব ভােজবাজী ?
দুর্দান্ত কালের সৃষ্টি নিখিল জগৎ।
নাহি বিধি, নাহি কেহ বিধাতা জগতে ?
অন্ধ কাল যথা ইচ্ছা করিছে সৃজন ?
আবার বিনাশি সব করি ছারখার
খেলিতেছে মায়াখেলা এ বিশ্ব-সংসারে।
অলীক শাস্ত্রের বাণী ছলনা চাতুরী ?
এও শুধু মানবের কল্পনা নিংসৃত ?
পাপ-পুণ্য ধৰ্ম্মাধর্ম মনের কল্পনা।
অসৎ, অন্বত নহে বিধির বিধান ?
ভাঙ্গিল মায়ার ঘুম টুটিল স্বপন।
কোথা যাই! হৃদি জ্বালা কোথায় জুড়াই !!
পারি না? পারি না। আর সহিতে পারি না।
জ্বলে যায় ! জ্বলে যায় ! হৃদয় আমার ।
একি! একি ! এযে ভীম বিকট মূরতি
দানব আসিছে রােষে করাল ব্যাদানে ।
গ্রাসিবে কি! গ্রাসিৰেকি!! গ্রাসিবে কি মােয়ে
কোথা যাই ! কোথা যাই ! কোথায় পলাই !!

অষ্টাদশ সর্গ।
১৩৭
ওকি! যে বিষধর ভীম অজগর ।
মরিশ্ন। মরি হায় ! মরিনু এবার !!
রক্ষা নাই--রক্ষা নাই—কোথায় পলাই ।
নিগূঢ় অরণ্যপথে করি পলায়ন;
যাই—এই পথে যাই প্রবেশি গহনে।
আরণ্য পদে আর কেন করি ভয়?”
!
ধিক্ ধিক্ শত ধিক্ ওহে নরেশ্বর,
ভাৰ্য্যা, পরিজন, প্রজা, অনুগত জনে,
নিঃসহায় ফেলে একা নিজ প্রাণ লয়ে
ছি! ছি! ছি! কেমনে তুমি যাও পলাইয়া ।
বুঝিলে না বুঝিলে না ওহে ভ্রান্ত রাজ?
শান্তিপথ পরিহরি চলিলে বিপথে,
সম্মুখে নরকাবৰ্ত্ত অতি ভয়ঙ্কর,
ফির ফির ওই দেখ শান্তিনিকেতন।
পুণ্যশ্লোক শা’ জালাল নৃকুল-পঙ্কজ,
হিংসা-দ্বেষ-বিবর্জিত শান্তি উপাসক,
তাঁহার আশ্বাসবাণী উপেক্ষা করিয়া,
কেন সাধে ঘটাইছ নিজ বিড়ম্বনা ?
এহেন পবিত্র মহাপুরুষ আশ্রয়ে,
অচিরে অশান্তি জ্বালা হয়ে বিদূরিত,
।

শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
•
হৃদয়ে বিমল শান্তি উঠিত জাগিয়া ;
উভলােকে হ’ত তব সদ্গতি লাভ।
গেলে হে রাজন! হেন সুযােগ ছাড়িয়া,
অতি দূরদৃষ্ট তুমি বুঝি নিশ্চয়,
মুকুতির ঋজু পথ ছেড়ে সাধে সাধে,
চলিলে তিৰ্য্যার্গে ভীষণ রৌরবে।

উনবিংশ সর্গ।
মিশা অবসানে পীর তাপ-ভাস্কর
প্রাজাতিক আরাধনা করি সমাপন,
বুহান, শা’ সিকন্দর, নাসির উদ্দিনে
সঙ্গে লয়ে চলি গেল গােবিন্দ-প্রাসাদে।
পদার্পণ করে তথা করিয়া শ্রবণ,
নিশাযােগে পলায়েছে শ্রীহট্ট-নৃপতি,
আহ্বানিয়া পাত্রমিত্র পুরবাসি-জনে,
তাহাদের অভিমত জিজ্ঞাসিল পীর ।
সকলেই অচিরাৎ নির্ধিধ অন্তরে
পীরের করুণা 'হেরে আশ্বাসিত হয়ে ;
স্বইচ্ছায় ভক্তিভরে চুম্বিয়া চরণ,
যুগপৎ করিলেক বশ্যতা স্বীকার।
পীরবর সকলেরই সংস্থান করি,
বুৰ্হানেরে যথাযােগ্য প্ৰদানি’ জাগির,
সিকদরে বসাইয়া রাজ-সিংহাসনে,

১৪০
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য।
তুষিলা প্রকৃতিপুঞ্জে আশ্বাস-বচনে।
সৈয়দ নাসির আর শিম্ভ কতিপয়ে
ধৰ্ম্ম প্রচারের তরে অনুজ্ঞা প্ৰদানি,
যথাৎ উপদেশ দিয়া তাহাদেরে
পাঠাইলা বীরবর শ্রীহট্ট জুড়িয়া।
অবশিষ্ট শিষগণে নিজ সঙ্গে রাখি
ইশ্লাম প্রচারে হয়ে বদ্ধপরিকর,
আশ্রমে কাতি করে পীর তপােধন,
করিতে লাগিলা দান ধৰ্ম্ম-উপদেশ।
সৌদামিনী-প্রভা সম কৃপাতে তঁাহার,
অচিরে অবিদ্যা-ঘন-তার কিনাশি
নবতেজে পূতপ্রভা করি বিকীরণ
শ্রীহট্টে ইশ্লামধৰ্ম্ম হল পরচার।
চৌদিকে ঘোষিত হল ইল্লাম-বিজয়,
পা ধৰ্ম্ম তথা জয় অতীব নিশ্চয়।

বিংশ সগ।
উপসংহার ।
(১)
প্রকৃতি নাট্য-মন্দির, যবনিকা কাল,
অঙ্কে অঙ্কে জীবচয়,
করিতেছে অভিনয়,
নিয়তি সাজায় দৃশ্য থাকি অন্তরাল।
(২)
নব রসে নব দৃশ্য নব অঙ্কে ভাসে,
রাগিণী রাগের সঙ্গে,
ফে অঙ্কে রণে ভঙ্গে,
নিয়তি “প্রকৃতি-লীলা” কোবিদে প্রকাশে।
(৩)
নবম অঙ্কের শেষে যবনিকা পাত,
এ অঙ্কের অভিনয়ে,

১৪২.
হট্টবিজয় কাব্য
এক পালা শেষ হয়ে,
নূতন পালার পুনঃ হয় সূত্রপাত।
(৪)
শেষাঙ্কে নিয়তি অন্ত করি পুরাতন,
তাহারি কঙ্কালােপরি,
নূতন সৃজন করি,
ক্রমশঃ উন্নত ভাবে দেখায় নটন।
(৫)
সৃষ্টি-স্থিতি ভাঙ্গা-গড়া বিধির মনন,-
প্রকৃতির মহানীতি,
উন্নতি-সােপান-ভিতি,
“প্রাকৃতিক নির্বাচন গরিষ্ট পােষণ।
(৬)
এ নীতির গূঢ়তত্ব বুঝিতে নারিয়া,
অদৃষ্টে রয়েছে যাহা
নিশ্চয় ঘটিবে তাহ,
ভাবয়ে ভ্ৰমান্ধ নয় মায়াতে মজিয়া।
(৭)
অদৃষ্ট কর্মের ফল অন্য কিছু নয়,
বুঝে এ তত্ত্ব সার,

বিংশ সর্গ।
১৪৩
দোষ দেয়: বিধাতার,
অপােগও নরে লতে অদৃষ্ট আশ্রয়।
(৮)
প্রাকৃতিক বিশ্বকোষ” কাব্যের:ভারতী,
প্রচাটিছে নিতি নিতি,
প্রকৃতি-অলঙ্ঘনীতি,
জাগায়ে কোবিদ-চিতে বিধি অনুরতি।
(৯)
এত উৱেদে হয় জ্ঞানের উদয়,
ভেদজ্ঞান পরিহরি,
আরােহি উন্নতি তরি,
ভগবৎ গীতি লভে তাবুক নিচয়।
(১)
প্রকৃতিরনীতি পালি’ যেই জন চলে,
দেশ-কাল-পাত্র মরে
কাৰ্য্য সাধন করে,
ক্রমে ক্রমে উঠে সে-ই উন্নতি-অচলে।
(১১)
প্রাকৃতিক নীতি বেবা করে উলঙ্গন,
অধঃপাতে সুনিশ্চয়

১৪৪
শ্রীহট্টবিজয় কাব্য
যায় সেই নীচাশয়,
ক্রমশঃ নিরয়বয়ে করিয়ে গমন।
(১২)
অবিদ্যা-কুহক বশে ভ্ৰমান্ধ মানব,
স্বার্থে পরমার্থ ভানে,
পূজা করে ঈশ জ্ঞানে,
অস্তিমে তাদের স্থান ভীষণ রৌরব।
স মা প্ত।

শুদ্ধিপত্র। বহিখানি পাঠ করিবার পূর্বে অনুগ্রহ পূর্বক ভ্রমগুলি সংশােধন করিয়া লইবেন। পৃষ্ঠা পংক্তি ঈশান নৈঋত নিধি সিন্ধু শ্রীহট্টে শ্রীহাটে নিষ্ঠর ২৭ সমীতন সমীরণ ১ ২ ৪ ৬ ১ २ নিষ্ঠুর ২৮ ২৯ ১৯ ত ২ উতলা ? ১১ ৪১ ১০ উথলিত উথলিল উতলা মরি সবি কাকুতি কাকূতি তাের তােরা চোপি চুপি অগ্নিকুল সমূত' অতি প্রজ্ঞ 2} ৪৪ ০ পংক্তি পৃষ্ঠা ৫২ অশুদ্ধ চলিছে খেমঙ্কর চলিছে ১৪ ২১ করে কার ৭:৭ আদেশে ৩৮ আদেশ মুহুর্তে ধৈর মুহূর্তে ধৈরষ ১০৭ করেরে কবেরে [ বিঃ দ্রঃ-১০৭ পৃষ্ঠায় ১১শ পংক্তি “দূতেরে লাঞ্ছিত করে করে অপমান” ভ্রমবশতঃ পরিত্যক্ত হইয়াছে। পাঠকগণ অনুগ্রহ পূর্বক পংক্তিটি যথাস্থানে সন্নিবেশিত করিয়া লইবেন। মুহুর্মুহু কয়ে বলী, বলী কৃপায় কৃপায়, ১১২ যুদ্ধে ১০৭ ১৭ মুহুর্মুহু ১৩ কহে ১১১ ২০ ১) ১ ১১৩ মন্ত্রণা যন্ত্রণা ১৯ ঘরে দ্বয় ১১৪ শিঞ্জন শীঞ্জন

পংক্তি
১৭
হয়ে কান, হায়।।
অত্যাচারে অতাচার
করেছে
করেছ
রিয়াজ
মুকুতির
৫
বিরাজ
মুকতির
চলিলেন
জবনিকা
চলি গেল
৪
১৪১
১
যবনিকা

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sri Hattobijay Kabyo Ed.1

Author
Ibrahim Ali, Abu Jekariya Mahammad
Title
Sri Hattobijay Kabyo Ed.1
File name
Sri Hattobijay Kabyo Ed.1
Text
OCR done
Citation
1912
Published
2009/09/5
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
168
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Sri Hatto
DLI number
513333
Barcode
4990010020321.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
RhVydUA0btz
Download PDF

Sri Hattobijay Kabyo Ed.1