Makardah Saraswat Library, Howrah

Soviet Bigyan Ed. 1st

Sehanabish, Chinmohan Ed. · 2009/08/20

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সাের্ট বিজ্ঞান

No text on this page.

স),
বিজ্ঞান
র
ডাইসন কার্টার
অনুবাদ করেছেন
চিন্মােহন সেহানবীশ
ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশিং হাউস
৮৭,চৌরঙ্গী রােড় কলিকাতা

প্রথম সংস্করণ অশ্বিন ১৩৫৩
ধ্রুব মিত্র।
ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশিং হাউস
৮৭, চৌরঙ্গী রােড, কলিকাতা
কালীপদ চৌধুরী
গণশক্তি প্রেস
৮-ই, ডেকার্স লেন, কলিকাতা
প্রচ্ছদপট
খালেদ চৌধুরী
ব্লক-নিমণি
রিপ্রোডাকশন সিণ্ডিকেট
প্রচ্ছদপট মুদ্রণ
দি সিণ্ডিকেট প্রেস
বাধিয়েছেন
বাসন্তী ৰাইণ্ডিং ওয়ার্কস
কলিকাতা
দাম দু টাকা চার আনা

আশ্চর্য নবজীবনের পূর্বাভাস বিশ্ব ইতিহাসের সব থেকে প্রচণ্ড আক্রমণ প্রতিহত করে সােভিয়েট ইউনিয়ন যে বিস্ময়কর কীতি অর্জন করেছে তারই ফলে রাশিয়া সম্পর্কে তীব্র কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে। সােভিয়েটের বীর যােদ্ধা, সােভিয়েট জীবনের প্রতিটি স্তরের খবর মিত্রশক্তিপুঞ্জের জনসাধারণ জানতে চায়। নাৎসী প্রচারযন্ত্র ও দেশে দেশে তাদেরই দালালেরা মিলে যে মিথ্যার পাহাড় গড়েছিল তারই আড়ালের সত্য সম্পর্কে তাদের আগ্রহের সীমা নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ রাশিয়ার তথ্য, ছবি, গল্প ছাড়াও আরাে কিছু চায় । জেনে শুনে বা অজানতে আমরা সবাই আজ একটা অত্যন্ত জরুরী প্রশ্ন তুলছি। সােভিয়েট ইউনিয়নের আদিম কৃষিজীবী দেশ থেকে পৃথিবীর প্রবলতম শক্তিতে আশ্চর্য রূপান্তরের রহস্য কি ? সাধারণত এ প্রশ্নের যে উত্তর দেওয়া হয় সেটি খুবই মামুলী। “সােভিয়েট ইউনিয়নের সাফল্যের কারণ হল এই যে সে দেশে ১৯১৭ সালে বিপ্লব হয়েছিল আর ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার জায়গায় সেখানে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। এর থেকেই সব কিছু রহস্যের সন্ধান মিলবে।” কিন্তু গণতান্ত্রিক দেশের সাধারণ মানুষ এই উত্তর থেকে কোন জিজ্ঞাসারই জবাব পাবে না। ১৯৩২ সালে সােভিয়েট বিজ্ঞানীদের লেখা পড়ে আমার দৃষ্টি যখন রাশিয়ার দিকে ফেরে তখন থেকেই আমি সােভিয়েট ইউনিয়ন সম্পর্কে ১-১৪)।

; তথ্য সংগ্রহ করছি। “ইফ ইউ ওয়ান্ট টু ইনভেন্ট” নামে আমার বইতে আমি ১৯৩৮ সালে এ কথা বলেছিলাম যে সােভিয়েট ইউনিয়নে এমন সব পরিবর্তনের উপক্রম হয়েছে যার তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ; আর সেই পরিবর্তন কেন যে অনিবার্য, অন্য দেশে এ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে কেন এই বিস্ময়কর পরিবর্তন সে সব কিছুকে ছাপিয়ে যাবে তার কারণও দেখিয়েছিলাম। ইতিমধ্যে এই সব ভবিষ্যদ্বাণী সার্থক হতে চলেছে। মানব জীবনের প্রত্যেক দিকে সােভিয়েট ইউনিয়নের আশ্চর্য অগ্রগতি ঘটেছে। বিশেষজ্ঞ অনুসন্ধিৎসুদের ক্ষুদ্র গােষ্ঠির বাইরে অনেক অগ্রগতির কথা কেউ জানেই না—আর বিশেষজ্ঞরাও সে খবর কাউকে জানাননি। ५ সাধারণ মানুষ নয়—বিশেষজ্ঞ ও বৃত্তিজীবী মহলেরও অধিকাংশ লােক আজ রাশিয়ার প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আসলে ব্যাপার হল এই :- সােভিয়েট ইউনিয়নের মানুষের হাতে এক হাতিয়ার লুকোনাে আছে। সেই হাতিয়ারের সাহায্যে তারা এমন ধরনের এক সামাজিক, রাষ্ট্রনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সংগঠন গড়েছে যা এতদিন অসম্ভব বলে মনে করা হােত। সেই গােপন হাতিয়ারের নাম বিজ্ঞান। অধ্যাপক, এঞ্জিনীয়ার বা আইনস্টাইনদের বিজ্ঞানের কথা বলছি না। বিশ্ববিদ্যালয়, যাদুঘর বা সাধারণ লােকের আয়ত্তের বাইরেকার বিজ্ঞানও এ নয়। সােভিয়েট বিজ্ঞান হল নূতন ধরনের এক বিজ্ঞান—এমন বিজ্ঞান যার মর্ম সাধারণ মানুষে বােঝে—যা তারা প্রয়ােগ করে। বিজ্ঞান হল এক জীবন্ত শক্তিশান্তি বা সংগ্রাম দুই সময়েই যা মানুষের সঙ্গী। সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক প্রতিভা এরই স্বপ্ন দেখেছে...সেই বিজ্ঞান—মানুষের মন যে প্রচণ্ড হাতিয়ারকে গড়েছে—উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে মানুষের বিজয় যাত্রাপথের প্রত্যেকটি বিপক্ষতা ও বাধা অপসারণের যে হাতিয়ার সমস্ত নরনারী ও শিশুর হাতে তা অর্পিত হয়েছে। সােভিয়েট ইউনিয়নে জীবনের এমন কোন দিক নেই যা এই নূতন ধরনের সােভিয়েট বিজ্ঞান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। সােভিয়েটের যা কিছু গােলমেলে, আশ্চর্য, প্রশংসনীয় বা নিন্দনীয় বলে বােধ হয় সবই পরিষ্কার বােঝা যায় এই গুপ্ত হাতিয়ারের কষ্টিপাথরে। এই নূতন বিজ্ঞানের উদ্ভব হল কি করে, এর সিদ্ধি কতখানি, রাশিয়ার প্রত্যেক মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও সব থেকে দরকারী কথা—লালফৌজের কীর্তি বিশ্বের সামনে নাটকীয়ভাবে এর যে প্রচণ্ড শক্তি উদঘাটিত করেছে—তার কথা বলাই এই বইয়ের উদ্দেশ্য। বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় : পৃথিবীতে যত প্রাণী দেখা গেছে মানুষ তাদের থেকে বহুলাংশে পৃথক এই জন্য যে সে আপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক শক্তিগুলিকে ব্যবহার করে। দুনিয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াবার জন্য নিজেকে পরিবর্তন করার বদলে সে আপনার সুবিধার জন্য দুনিয়াকে বদলায়! যে কোনাে আবহাওয়ার উপযােগী সজ্জা সে প্রকৃতির কাছ থেকেই আদায় করে তারই সাহায্যে খাদ্যের সংস্থান করে। প্রকৃতিকে সে বাধ্য করে তার শক্তি, জ্বালানি, আশ্রয় ও সব রকমের আরামের ব্যবস্থা জোগাতে। এক কথায় প্রকৃতিকে নিজ ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করার ক্ষমতা আছে মানুষের। কিন্তু এ সবের মধ্যেই একটা গলদ রয়েছে। আমরা জানি মানুষ বন থেকে বেরিয়ে কত দ্রুতগতিতে অন্য সব প্রাণীকে ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু যবে থেকে সে প্রকৃতিকে জয় করতে আরম্ভ করেছে তখন থেকেই এমন সব ব্যক্তি বা মানুষের দল দেখা গেছে যাদের গা থেকে জঙ্গলের বুনাে গন্ধ কাটেনি। দুরন্ত পশুর মত এই সব অত্যাচারীরা তাদের সঙ্গী মানুষের উপর জুলুম করতে করতে চাইল—অবশ্য সুকৌশলে। তারাই আবিষ্কার করল বর্বর দাসত্ব প্রথা। মানুষ শত শত বছর ধরে এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে অবশেষে এর অবসান ঘটিয়েছে। এর পর পশু-মানবেরা অসংখ্য মানুষকে দারিদ্র্য ও দুর্গতির মধ্যে খাটিয়ে মারবার জন্য একটার পর একটা ব্যবস্থা পত্তন করেছে। সামন্ততন্ত্র ও ভূমিদাস প্রথা তারাই চালু করেছে। ধর্মের জন্য বীভৎস যুদ্ধ চালিয়েছে। মধ্যযুগে চেষ্টা করেছে সমস্ত চিন্তাশক্তির টুটি টিপে মারতে। নূতন নূতন দেশ জয় করে তারা নৃশংসভাবে সেখানকার মানুষদের সর্বস্বান্ত করবার চেষ্টা করেছে। হিটলার ও তার চক্রসঙ্গীরা যে ব্যবস্থা দুনিয়াজোড়া করবার ফিকিরে ছিল—শেষপর্যন্ত এই বুনাে মানুষের। তাকেই কায়েম করতে চেষ্টা করেছে। সে ব্যবস্থার নাম ফ্যাসিজম। যে সব শাসকেরা এই সব নানা ব্যবস্থা কার্যকরী করেছে তাঁদের সকলের মধ্যেই একটি মিল লক্ষ্য করা যায়। তার অসংখ্য লােককে-—সমাজের অধিকাংশ মানুষকেই তাদের প্রচণ্ড শক্তি সম্পর্কে অজ্ঞান রাখবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বহু যুগ আগেই মানুষ সমস্ত মানবসমাজের কল্যাণের জন্য প্রাকৃতিক শক্তিকে ব্যবহারের স্বপ্ন দেখেছে। ক্ষুধা, শীত, রােগ, দুঃখের বিরুদ্ধে অন্ধভাবে লড়াই না করে প্রকৃতিকে জয় করবার জন্য, তীব্র জীবনসংগ্রামের দায় থেকে মুক্তির জন্য, অত্যাচারীর হাত থেকে খালাস পাবার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ একজোট হতে চেয়েছে। এই স্বপ্নকে কি ভাবে জীবন্ত বাস্তবে পরিণত করা যায় মানুষ তা আবিষ্কার করার আগে শত শত বছর কেটে গেল। অবশেষে রহস্যের সমাধান হল। এ হল এক অস্ত্র-প্রকৃতিকে বশ করে তাকে মানবকল্যাণের কাজে নিয়ােগ করার হাতিয়ার। এ অস্ত্রের নাম বিজ্ঞান।

মানুষ এই আশ্চর্য শব্দটা উচ্চারণ করামাত্র অত্যাচারীরা প্রচণ্ড রকম ক্ষেপে উঠল। তারা যখন দেখল যে বিজ্ঞান মানুষকে চিরকালের মত অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি দেবে, ভয় ও কুসংস্কারের বন্ধন ঘােচাবে তখন কর্তারা হুকুম দিলেন বিজ্ঞানকে নিঃশেষ করতে। সেই তমসার যুগে শত শত বছর ধরে বৈজ্ঞানিকদের পরে চলল অকথ্য অত্যাচার। পুড়িয়ে মারা হল, তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন করা হল। কিন্তু এতেও থামানাে গেল । মঠই ছিল তখনকার একমাত্র জায়গা যেখানে গুপ্ত ধন রাখা সম্ভব ছিল। তাই শত শত নিরীহ ধর্মযাজক বিজ্ঞানের মশালকে কোনক্রমে অনির্বাণ রাখল। সে সব বীরদের নাম আমরা জানিও না। বিজ্ঞানের আবির্ভাবের পরবর্তী ঘটনার কথাও সবাই জানে। অত্যাচারীরা যখন দেখল যে বিজ্ঞানকে কোনক্রমেই নিমূল করা যাবে না তখন তারা তাকে আত্মসাৎ করল। বিজ্ঞানকে ব্যবহারে লাগিয়ে তারা আনলাে শিল্প- বিপ্লব। লক্ষ লক্ষ নরনারী ক্ষেত থেকে চালান হল কারখানায়। সেখানে বিজ্ঞানের সৃষ্টি—নানা যন্ত্রপাতিতে তাদের নিয়ােগ করা হল। তারা পেল না বিজ্ঞানের অধিকার। তাদের হাত থেকে বিজ্ঞানকে ছিনিয়ে নিয়ে আত্মসাৎ করল সেই বুননা মানুষেরা। কিন্তু রাশিয়ায় বিজ্ঞান আবার প্রত্যাপিত হয়েছে জনসাধারণের হাতে। প্রত্যেক নরনারী ও শিশু পেয়েছে এর অধিকার। ফলে এটি সব থেকে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে দাড়িয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে এই বিজ্ঞানকে গােপন হাতিয়ার বলা হচ্ছে কেন ? রাশিয়ার লােকেরা কি দুনিয়ার কাছে এর রহস্য উদঘাটিত করবে ?” রুশেরা চেয়েছিল আমাদের এর খবর জানাতে। তারা চায়নি কোন কিছু গােপন করতে। তবে লুকোলাে কে ?

লুকোলে তারাই যারা প্রত্যেক দেশে মহাযুদ্ধের পর থেকেই ফ্যাসিজমের নির্মম ব্যবস্থা গড়ে তুলছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সারা দুনিয়াকে দাসত্ব বন্ধনে বাঁধা আর নূতন বিজ্ঞানকে জনসাধারণের হাতে যেতে না দেওয়া। বিশ বছর ধরে তারা সােভিয়েট ইউনিয়নকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়েছে। কারণ তারা জানত যে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ যদি রাশিয়ার গুপ্ত হাতিয়ার অর্থাৎ নূতন বিজ্ঞানের সন্ধান পায় তবে অত্যাচারীদের দিন ফুরবে, যুদ্ধ মারামারির অবসান হবে আর মানুষ অবশেষে মুক্ত পৃথিবীর স্বাধীন বাসিন্দা হিসাবে পূর্ণ গৌরবের অধিকারী হবে। নূতন সােভিয়েট বিজ্ঞান কোন নির্মম যান্ত্রিক শক্তি নয়—এমন জিনিসও নয়, যাকে বন্দী বা হত্যা করা যায়। মানব হৃদয়ের দুটি সব থেকে সুন্দর আবেগের উপর এর প্রতিষ্ঠা-নরনারী ও শিশুর পরস্পরের প্রতি গভীর ভালবাসা আর মানবতার আদর্শের প্রতি সকলের সুদৃঢ় নিষ্ঠা। ভালবাসা ও শৌর্যের উপরে প্রতিষ্ঠিত এই বিজ্ঞান। দেখা যাক এর সহায়তায় সােভিয়েট ইউনিয়নে কি ধরনের জীবন ও মানুষ সৃষ্টি হয়েছে।

রাশিয়ার প্রত্যুষ আমরা জানি রুশ বিপ্লব আরম্ভ হয় ১৯১৭ সালে। তারপর বছরের পর বছর চলল গৃহযুদ্ধ । তারপর এল বহির্শক্রর হস্তক্ষেপজাত যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত লালফৌজ যখন সমস্ত আক্রমণকারীদের সােভিয়েট ভূমি থেকে হটালাে তখন জাতির শিল্পের অবস্থা শশাচনীয় কারণ ধ্বংসের রূপ ছিল ভয়াবহ। তবে ১৯১৪ সালের আগেও জারের রাশিয়া শিল্প, কৃষি ও সামাজিক দিক থেকে পশ্চাৎপদ জাতি হিসাবে কুখ্যাত ছিল। অন্যতম প্রধান কারণ ছিল শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অবিশ্বাস্য অভাব। ইংলণ্ড, য়ুরােপ ও আমেরিকার সুদীর্ঘ ও গৌরবময় বিজ্ঞানের ইতিহাসের কথা মনে রাখলে আশ্চর্য বােধ হয় যে “পিটার দি গ্রেট’ও রাশিয়ায় একটি বিজ্ঞানাগার প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তিনি যা পারেননি তার বিধবা রানী প্রথম ক্যাথেরিন তা করতে সফল হন। তিনিই ১৭২৫ সালে রুশ একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেন। বহু বছর ধরে কিন্তু একাডেমীতে কোন দেশীয় সভ্য ছিল না—সমস্ত রুশ সাম্রাজ্যে একজনও বৈজ্ঞানিক মেলেনি। ইতিহাসের আর একটি ব্যাপারও অবিশ্বাস্য ঠেকে। সমস্ত রাশিয়ায় প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগের আগে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একশ বছর কেটে গেল। খুব দরাজ মেজাজে জার প্রথম নিকলাস পৃথিবীর মধ্যে এক সময়ে সব থেকে বড় বিরাট পুলকোভা মানমন্দির (লেনিনগ্রাডের চারিপাশে যে যুদ্ধ চলেছিল তার প্রবলতম ঝাপটা গেছে এর উপর) প্রতিষ্ঠা করলেন আর সেটিকে বােঝাই করলেন বিদেশীদের দিয়ে। আরাে পঞ্চাশ ৭ > বছর যাবার পর রুশ বৈজ্ঞানিকদের নাম পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বিশ্বযুদ্ধ লাগবার সময় জারের সাম্রাজ্যে মূলবিজ্ঞান পদার্থবিদ্যায় ৫০ জনের বেশী বিশেষজ্ঞ পাওয়া যেত না। জার্মানীতে ছিল হাজার হাজার পদার্থবিদ। ইংলণ্ড, আমেরিকা ও ফ্রান্স প্রত্যেকেরই ছিল শত শত। মহাযুদ্ধের সময় জার আমলের কয়েকজন বৈজ্ঞানিক দেশত্যাগী হলেন। পরে বিপ্লবের ধোয়া অপসৃত হলে দেখা গেল যে মাত্র জনবারে খ্যাতনামা পণ্ডিত বাকী আছেন। যেমন পাভলভ , কুর্ণাকড ও গুভিটসের মত’লােক। বাকী সবাই পলাতক। যারা থেকে গিয়েছিলেন তাঁরা বিপ্লবের ফলে যে সেভিয়েটতন্ত্র গড়ে উঠেছিল সােজাসুজি তার বিপক্ষতা করলেন। আমাদের কাছে অন্য কথা বলা হলেও কিন্তু এইসব প্রতিবাদকারীদের কোন ক্ষতি করা হয়নি। তাদের কি হল ? একটা দৃষ্টান্ত দেখা যাক। বিপ্লব যখন তাঁর দেশকে আচ্ছন্ন করে তখন আইভান মিচুরিনের বয়স ছিল ৬২ বছর। সারা জীবন তিনি কাটিয়েছিলেন প্রাণীতত্ত্বের গবেষণায়। জার-সরকারের কাছ থেকে তিনি প্রায় কোন আর্থিক সাহায্যই পেতেন না। নির্বোধ রাজপুরুষ ও চরিত্রহীন অভিজাতের দল যখন জনসাধারণের দৌলতে ভােগবিলাসে মত্ত থাকত, তখন মিচুরিনের গবেষণা পােষকতার অভাবে শুকিয়ে মরত। মহাযুদ্ধ যখন লাগল মিচুরিন তখন ভগ্নহৃদয় বৃদ্ধ । তিনি লিখলেন :- “বছরের পর বছর কেটে গেছে। আমার শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসছে। পুরস্কারের চিন্তা না করে সর্বসাধারণের কল্যাণের জন্য সারা জীবন কঠোর পরিশ্রমে কাটিয়ে বৃদ্ধ বয়সে কোন ভরসা না থাকার মত ভীষণ নৈরাশ্যের ব্যাপার আর কি হতে পারে।”

কিন্তু মিচুরিন তখন মারা যাননি। ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত তিনি বেঁচে ছিলেন। জারের দুনিয়ার সমস্ত গ্লানি দুর্নীতি সম্পূর্ণ অপসারিত হতে তিনি দেখলেন। নূতন রাশিয়ার অপ্রতিহত অভিযানের ঢেউ তাকেও ভাসিয়ে নিয়ে চলল। তিনি ভেবেছিলেন তার জীবন বুঝি ফুরিয়ে গেছে —কিন্তু এর পর বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক আবার নূতন গবেষণায় মাতলেন। মৃত্যুর ঠিক আগে—তখন তার বয়স প্রায় ৮০ বছর, তিনি লিখলেন :- “আমার জীবনের রং ফিরে গেছে। সমস্ত জীবন পরিবর্তিত হয়েছে— পূর্ণ হয়ে উঠেছে আশ্চর্য আদর্শনিষ্ঠায়—জীবন আজ আশ্চর্য সুন্দর।” পুরােনো বহু রুশ বৈজ্ঞানিকের জীবনেই এই ধরনের পরিবর্তন এল। যেমন বিখ্যাত পাভলভ, একদা সােভিয়েটতন্ত্রের তীব্র বিরােধিতা করতেন। কিন্তু যতই সময় যেতে লাগল সােভিয়েট সরকার ততই তাকে তার কাজ বিপুলভাবে বিস্তৃত ও পরিকল্পনা কার্যকরী করতে সাহায্য করতে লাগল। তিনিও মেতে উঠলেন উৎসাহে, বৈজ্ঞানিক জগতকে শােনালেন নূতন বিজ্ঞানের কথা। কিন্তু তখন আর তার কথা কেউ শুনতে চাইল না। পাভলভ যখন সােভিয়েটকে আক্রমণ করতেন তখন সবাই ছিল তার প্রশংসায় মুখর। পরে যখন তিনি সােভিয়েটের কীতি ঘােষণা করলেন তখন তার ভাগ্যে জুটল উপেক্ষা। সােভিয়েটকে যারা ঘৃণা করত তারা পাভলভের কণ্ঠে যে সত্য উচ্চারিত হচ্ছিল তা যাতে লােকের কানে না পোঁছােয় তার চেষ্টা করতে লাগল। তাচ্ছিল্য করে তারা বলল “বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিকেরা মারা গেলে রাশিয়ায় আর মাথাওয়ালা লােক থাকবে না। সােভিয়েটে কেমন বুদ্ধিবৃত্তির সৃষ্টি হয় দেখা যাক ?” তারা কি দেখল তার একটা উদাহরণ দিচ্ছি :- সূর্য আজ সােভিয়েটের বশে গল্পটার শুরু অনেক বছর আগে—জার আমলের রাশিয়ায়, সেন্টপিটার্স- বুর্গের এক রৌদ্রস্নাত বাগানে। এক বৃদ্ধ পশ্মশ্রু অধ্যাপকের হাতে তখনি একটি খবরের কাগজ এসে পৌচেছে। পড়তে পড়তে তার চোখ জোড়া ক্রোধে জ্বলে উঠল। কাগজটা হচ্ছে মস্কোয় ছাপা ‘গ্রাজদানিন’। এর মালিক প্রবল পরাক্রম কাউন্ট মেশাচেরস্কি। বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিকের 'পরে এই বনেদী ভদ্রলােকের ছিল অসীম ঘৃণা। অধ্যাপক টিমিরিয়াজেভকে অপদস্থ করবার চেষ্টায় তার ত্রুটি ছিল না। এবার তার কাগজে তিনি জার ও গ্রীক চার্চের দুর্নীতিপরায়ণ নেতাদের শরণাপন্ন হলেন। কাউন্ট মেশচেরস্কি কিন্তু এতই নির্বোধ যে তার সম্পাদকীয় মন্তব্যের শেষ লাইন পড়ে সারা মস্কোয় হাসির রােল উঠল। তিনি লিখেছেন “এই অধ্যাপক টিমিরিয়াজেভ যে সব ধর্মবিরুদ্ধ গবেষণা চালাচ্ছে তা ঈশ্বরের কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে আর পুরােপুরি সরকারের খরচায় আসলে সে প্রকৃতির রাজ্য থেকে ভগবানকে নির্বাসন দিচ্ছে।” টিমিরিয়াজেভ প্রাণ খুলে হাসলেন। পরমুহূর্তেই কিন্তু আবার গম্ভীর হলেন। মেশচেরস্কির হাতে তার সর্বনাশের ক্ষমতা যে রয়েছে যথেষ্ট। বৃদ্ধ তবু ধীরে ধীরে বললেন “আমার আর হারাবার ভয় কিসের? সারা জীবন রুশ চাষীদের জন্যই খেটেছি। জমিদারদের এই কথাটাই বােঝাতে চেষ্টা করেছি যে জমি উর্বর হলে সবারই পেট ভরবে। ওরা শােনননি। একটা গাড়ীর চাকা তৈলাক্ত করা যায় এমন ঘিলু সমস্ত রুশ অভিজাত শ্রেণীর ঘটে নেই।” এর পর আজীবন প্রচণ্ড বিপক্ষতার সঙ্গে লড়াইএ অভ্যস্ত বৃদ্ধ কলম নিয়ে বসলেন মেশাচেরস্কির কড়া জবাব লিখতে। ১৯০৮ সালে টিমিরিয়াজেভ যা লিখেছিলেন আজকের দিনে মিত্রশক্তি পুঞ্জের পক্ষে তা ভবিষ্যদ্বাণীর মত। “মানুষের মধ্যে যাদের মুখ উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে ফেরানাে আর যারা কদর্য অতীতের মায়া কাটাতে পারে —এই দুইএর দুনিয়াজোড়া আসন্ন লড়াইএ স্বাধীনতার পতাকার 'পরে এই কথা লেখা থাকবে বিজ্ঞান ও গণতন্ত্র। এই তােমাদের বিজয় চিহ্ন।” একটি উদারমতাবলম্বী কাগজে এই উত্তর বেরােলাে। বনেদীদের দল উঠল ক্ষেপে। প্রবল পরাক্রান্ত গুপ্ত পুলিশ টিমিরিয়াজেভকে জেলে পাঠাতে চাইল। কিন্তু কিছু করা গেল না। বিজ্ঞান জগতে অধ্যাপক ছিলেন সুপরিচিত। তাই ১৯০৫ সালের অত্যাচারের পর যে রকম আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল পাছে সেই রকম আর একবার হয় জারের মনে ছিল সেই ভয়। রাজপুরুষেরা এই ভালমানুষ বৃদ্ধকে ঘৃণা করত কেন ? তিনি কি বিপ্লবী ছিলেন ? না। তিনি কি তবে নিরীশ্বরবাদ প্রচার করতেন ? মােটেই তবে কি ? সনাতন রাশিয়ার শাসকেরা টিমিরিয়াজেভকে ঘৃণা করত কারণ তিনি ছিলেন বৈজ্ঞানিক—যার সাধনা ছিল রাশিয়াকে বৈজ্ঞানিক উন্নতির দ্বারা সমুদ্ধ দেশে পরিণত করা, ভূয়া ধর্মের আড়ালে যে কুসংস্কার ও জঘন্য অনগ্রসরতা লুকোনাে ছিল তাকে ধ্বংস করা। কাউন্ট মেশূচেরস্কি ও তার দলের লােকদের হাস্যকর মনােভাব যুদ্ধের আগেকার রাশিয়ার এই ছােট হাসির গল্পটি থেকে বােঝা যায়। একজন ।

কৃষিবিশারদ একবার কয়েকজন জমিদারের মাথায় প্রাণপণে এই কথাটা ঢােকাবার চেষ্টা করছিলেন যে বৈজ্ঞানিক কৃষির সঙ্গে প্রকৃতির রাজ্য থেকে ঈশ্বরের নির্বাসনের কোন সম্বন্ধ নেই। জমি সম্পর্কে সাধারণ বুদ্ধির প্রয়ােগই হল তার মূল কথা। বিশেষজ্ঞ বললেন “যেমন ধরুন বসে বসে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করলে শুধু সময়টা নষ্ট হবে। আপনার আর্জি অনুসারে ঈশ্বর বাগানে জল ঢালতে শুরু করবেন এমন নিশ্চয়ই আশা করা যায় না। প্রকৃতির নিয়মে যে মেঘ জমে ওঠে তার থেকেই বৃষ্টি হয়। এই ভাবেই ঈশ্বর কাজ চালান কল ঘুরিয়ে জল ঢালবার মত করে নয়।” একজন বনেদী ভদ্রলােক করুণ হাসি হাসলেন। বললেন “আহা ছােকরা। তুমি বােঝ না। দু রকমের বৃষ্টি আছে। অল্প এক পশলা যখন বৃষ্টি হয় যাতে ধূলােও মরে না তখন তাকে বলে বৈজ্ঞানিক বৃষ্টি। কিন্তু যখন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে মাঠ ঘাট থৈ থৈ করে তখন হয় ভগবানের বৃষ্টি।” এই ধরনের ছেলেমানুষী বিশ্বাসে আচ্ছন্ন হয়ে রাশিয়া শুকিয়ে মরছিল। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, কীটপতঙ্গ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী প্রভৃতি আপদগুলি একটার পর একটা পুরােনাে পৃথিবীর সব থেকে উর্বর আবাদী জমির উপর হানা দিত। টিমিরিয়াজেভের মত লােকেরা দেশকে দুর্দশার পাঁক থেকে উদ্ধার করবার চেষ্টা করলেন। তাদের অক্লান্ত চেষ্টার ফলেই আজ এই নূতন সাধারণতন্ত্র সুদৃঢ় ভিত্তির পরে আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। আজ বৈজ্ঞানিক মহল স্বীকার করে যে কৃষির উন্নতির দিক থেকে কোন জাতিই রাশিয়ার সমকক্ষ নয়। সে দেশের বৈজ্ঞানিকেরা আজ বিশ্ববিখ্যাত। রাশিয়ার মাটি যে বিরাটভাবে ও যে পদ্ধতিতে চাষ করা হয় পৃথিবীর অন্যত্র তা অজ্ঞাত। সােভিয়েটের কতকগুলি সাম্প্রতিক অগ্রগতি তাে বিস্ময়কর।

অবশ্য রুশ দেশের যন্ত্রের সাহায্যে কৃষিকার্য, বিরাট ট্রাক্টর-কেন্দ্র, কুলাক বা অবস্থাপন্ন চাষীদের আধিপত্যের অবসান ও তার যৌথ কৃষির সম্পর্কে অনেক কথাই লেখা হয়েছে। কিন্তু এখানে ও সব ব্যাপারে আমরা ব্যস্ত নই। আমরা যে গল্প শুরু করেছি সেইটাই চালাতে চাই। অথচ এখানে দেখছি সেটি মুখ ঘুরিয়ে পিছু হটে চলেছে, বিজ্ঞান সম্পর্কিত গল্পের বেলা অনেক সময়েই যা হয়ে থাকে। কারণ অধ্যাপক টিমিরিয়াজেভের অনেক আগে থেকেই এ গল্পের সূত্রপাত। হাজার হাজার বছর আগে আদিম মানুষ সূর্যের পূজা করত। তারা বিশ্বাস করত যে সূর্য থেকেই প্রাণের উদ্ভব। অনেক শতাব্দী কেটে গেল—সূর্য পূজারীরাও অন্তর্ধান করল আর তারপর সূর্য যে প্রাণদাতা এই প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করলেন বৈজ্ঞানিকেরা। তখন এ কথা পরিষ্কার হল যে দুনিয়ার সমস্ত প্রাণী প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে সূর্যের পরে নির্ভরশীল। মানুষ সম্পর্কে এই প্রশ্ন নিয়ে প্রথম অনুসন্ধান চালান রবার্ট মেয়ার। জাভায় থাকার সময় এই বিখ্যাত জার্মান ডাক্তার আবিষ্কার করেন যে গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষের রক্ত শীতের দেশের বাসিন্দাদের রক্ত থেকে আলাদা ধরনের। এর থেকেই তিনি যে তত্ত্বে পৌঁছলেন তা আজ স্কুলের ছাত্ররাও জানে যে নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে যে অক্সিজেন যায় তারই সাহায্যে খাদ্যকে আত্মসাৎ করে মানুষের শরীর গরম থাকে। বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মাটি থেকে জল ও খাদ্য আর . সূর্য থেকে শক্তি—এই সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় একটি ঘাসের শিষ। গরুতে ঘাস খায়। আপনি আবার তার মাংস খান। আপনার পেটে গিয়ে তা হজম হয়। কতকটা মাংস এইভাবে আত্মসাৎ করা হয়—আর তারপর আপনি কার্বন ডাই-অক্সাইড প্রশ্বাসের সঙ্গে বার করে দেন। সূর্যের যে তাপে ঘাস সৃষ্টি করে তাই আবার আপনার দেহের তাপ হিসাবে, বাহুর শক্তি হিসাবে দেখা দেয়। আজ আমাদের কাছে এ সব হল পুরােনাে কথা। এ বিষয়ে সন্দেহ পােষণ করার কথা কেউ ভাবতেও পারে না। কিন্তু একশ বছরও হয় নি জীবনধারা সম্পর্কে এই ব্যাখ্যা দেবার জন্য ডাঃ মেয়রকে পাঠান হয় পাগলা গারদে। তার অমর অগ্রজ গ্যালিলিওর মত তার পরেও পীড়ন চলে যাতে যে সহজ সত্য তিনি আবিষ্কার করেছিলেন তা তিনি অস্বীকার করেন। তমসার যুগের কথা এ নয়—এ হল গত শতাব্দীর মাঝামাঝির ঘটনা। মেয়ারের পরে যারা অত্যাচার চালায় তারা বিজ্ঞানকে, সত্যকে ঘৃণা করত। তারা হুকুম তালিম করছিল অত্যাচারীদের, সেই সব বুননা মনওয়ালা মানুষদের, যারা, সব থেকে ভয় করত বিজ্ঞানকে। কিন্তু সত্যকে চাপা রাখা গেল না। কিছু দিনের মধ্যেই আর এক বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক, হেল্মহােন্টস্ স্পষ্ট-ভাষায় বললেন “সূর্যের আলাে গ্রহণ করে গাছেরা বেড়ে ওঠে। গাছের মধ্যে সূর্যের আলাে মিশে গেলে উদ্ভব হয় ‘দাহ্য পদার্থের। তবু এখনও এমন কোন গবেষণার কথা আমরা জানি না যার দ্বারা আমরা সঠিক বলতে পারি যে সূর্যরশ্মি অদৃশ্য হওয়ার পিছনে যে প্রাণশক্তি আছে তারই অনুপাতে গাছের মধ্যে রাসায়নিক পদার্থ গড়ে ওঠে।” কৃষির উন্নতির পক্ষে এই শেষ কথাটি ঐতিহাসিক। সনাতন কৃষির ইতিহাসে এ হল এক মােড় ফেরার স্মারকচিহ্ন। কিন্তু সে সময়ে, হেল্মহােন্টও এ কথা ভাবতে পারে নি।

অধ্যাপক টিমিরিয়াজেভ, সৌরশক্তি থেকেই যে গাছ বেড়ে ওঠে, নিশ্চিত ভাবে সে কথা প্রমাণের জন্য ৫০ বছর ধরে গবেষণা চালালেন। তার মৃত্যুর ঠিক পরেই তাঁর সমগ্র কাজ থেকেই বিস্ময়কর ফল দেখা গেল। টিমিরিয়াজেভ, স্বপ্নাতুর বৈজ্ঞানিক ছিলেন না। তাঁর সর্বপ্রধান সাধনা ছিল চাষীর দুর্গতি ঘুচিয়ে তার জীবনের উন্নতি—বৃষ্টি, ঝড়, সূর্যতাপের নানা অনিশ্চয়তার পরে নির্ভরশীলতা দূর করে দৃঢ়তর ভিত্তির পরে কৃষিকার্যের প্রতিষ্ঠা। তিনি লিখলেন “শুধু দর্শকের ভূমিকায় কোন বৈজ্ঞানিক সন্তুষ্ট হতে পারে না। গবেষক হিসাবে তার কাজ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। মানুষের যুক্তি ও ইচ্ছার কাছে প্রাকৃতিক শক্তিকে নতি স্বীকার করানােই হল তার বিপুল সাধনা।” এ হল বিপ্লবের আগে । যে ঝড়ের ঝাপটার মধ্যে সােভিয়েট ভূমিষ্ঠ হল সেই সময়েই বৃদ্ধ টিমিরিয়াজেভ মারা গেলেন। একটা বিরাট সম্ভাবনা যে রূপ নিচ্ছে এ কথা বুঝবার মত সময় তিনি বেঁচে ছিলেন। মানবকল্যাণের জন্য, “মানুষের যুক্তি ও ইচ্ছার কাছে প্রাকৃতিক শক্তিকে নতি স্বীকার করানাের জন্য মানুষ বিজ্ঞানকে আত্মস্থ করে সমগ্র বিশ্বের গতিধারা নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্যত—এ দৃশ্য তিনি দেখে গিয়েছিলেন। এবার আমাদের কাহিনী দ্রুত চলবে। এর জের টানা যাবে আবার পনেরাে বছর পরে সুদূর সাইবেরিয়ায়। সেখানে ইয়েফ্রেমভ নামে এক তরুণ সাইবেরিয়ান চাষীর হাতে কেমন করে জানি বৃদ্ধ অধ্যাপকের কয়েকটি বই পড়ে। পড়ে সেই যুবকের রােমাঞ্চ হল । বন্ধুদের সে বলল “আমরা দর্শক হয়েই তুষ্ট থাকতে পারি না। আমাদের কাজ প্রকৃতিকে বশ মানাননা।”

বন্ধুরা হেসে বলল “কিন্তু কি উপায়ে ? এক আবহাওয়া নিয়ন্ত্রক যন্ত্র বানিয়ে ?” ইয়েফ্রেমভ প্রচণ্ড আগ্রহ নিয়ে পড়াশুনাে আরম্ভ করল। সূর্যরশ্মি সম্পর্কে বৃদ্ধ অধ্যাপকের কাজ তাকে মুগ্ধ করেছিল । বারবার সে গবেষণাগুলির কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ল। ক্রমে তার মনে রূপ নিল এক আশ্চর্য চিন্তা। সাইবেরিয়ান চাষীদের সাহায্য করার জন্য যে সব কৃষি-বৈজ্ঞানিকদের পাঠানাে হয়েছিল তাদের সে বলল “গাছেরা অবশ্য মাটি থেকেই খাদ্য জল সংগ্রহ করে। কাজেই যেখানে সম্ভব সেচকার্য ও সার ব্যবহার করা ভালই। কিন্তু সত্যিই কি আপনারা মনে করেন যে গমের পক্ষে খাদ্যজল অত্যন্ত দরকারী ?” বিশেষজ্ঞেরা অবাক হয়ে গেল। “বাপু, এ ছাড়া দরকারী জিনিস আর কি হতে পারে ? খাদ্য জল ছাড়া গাছ বাড়তেই পারে না।” “হঁ্যা, কিন্তু সূর্যতাপও তো লাগে।” হাসির রােল উঠল। “হয়ত লক্ষ লক্ষ বছর পরে আমরা সূর্যকে বশ করতে পারব, আর প্রয়ােজন মত আমাদের গমের জন্য সূর্যের আলো দিতে পারব।” ইয়েফ্রেমভের চোখ অদ্ভুত আলােয় দীপ্ত হয়ে উঠল। হঠাৎ টিমিরিয়া- জেভের বই পড়ে পর্যন্ত যে বিরাট চিন্তা তার মাথায় ঘুরছিল সেটা তার কাছে স্পষ্ট ধরা পড়ল। শান্তভাবে সে বলল “আমার মনে হয় সূর্যকে বশ করার কৌশল এখনই আমার আয়ত্তে।” এই বলে সে ভালােভাবে চিন্তা করবার জন্য চলে গেল। তার ধারণা সে লিখেও ফেলল। সেটি হল এই “খাদ্যজল বাতাসকে শস্যে পরিণত করার জন্য গাছেরা যে শক্তি প্রয়ােগ করে—সূর্যতাপই যদি

তার যোগান দেয় তবে সেটাই সব থেকে দরকারী জিনিস।
একর পিছু শস্যের পরিমাণ বাড়াতে হলে প্রত্যেক একরে শস্য ফলাতে
যতট। তাপ লাগে তার পরিমাণও বাড়াতে হবে।"
কিন্তু কি ভাবে ?
ইয়েফ্রেনভের কাছে ছিল এর উত্তর। বুঝতে পারছেন কি ?
পারছেন না। শত শত বছর ধরে এ কথা তীক্ষ্ণ-দষ্টি কৃণিবিশারদদের
চোখ এড়িয়ে গেছে। প্রাচীন কালের বিখ্যাত উত্তর-প্রত্যুত্তর প্রতিবােগিতায়
মিশরের ফিঙ্ক স অনায়াসেই এ ধাধা জিজ্ঞাসা করতে পারত।
উত্তরটি অসম্ভব রকম সহ। একর পিছু বেশ শস্য পেতে হলে
একর পিছু বেশী সূর্যতাপ ব্যবহার করতে হবে, এ কাজ করবার জন্য
প্রয়োজন কিছু গাছ রােপনের স; বাড়ানো।
ইয়েন ভ নখন বিশেজ্ঞদের এ কথা বােঝাতে চাইল তখন তারা
ওকে পাগল ঠা ওলালে । আপনারাও হয়ত তাই ভাবছেন। একর
পিছু বেশী গাছ কেমন করে লাগানো সম্ভব ?
ইয়েমেভ সহজভাবে জানালে; “আমি সে সব জানি না। কিন্তু
আমি বার করব এর উপায় । আমায় ঠিক করে বলুন প্রত্যেক
বর্গ ফুট জমিতে কত শিম শস্য লাগানো সম্ভব আপনারা জানেন কি ?
কৃষিবিশারদের মুখ লাল করে শুধু ইয়েফ্রেনভকে সময় নষ্ট না করতে
উপদেশ দিতে লাগল একর পিছু বেশী শস্য জন্মানাে সম্ভব হলে
শত শত বছর আগেই মানুষ তা করে ফেলত। কিন্তু ইয়েফ্রেনভকে
এ উত্তর খুসী করতে পারল না।
এখন ভাবুন দেখি আমাদের দেশের কোন জমিতে যদি ইয়েফ্রেমভকে
দিন মজুরী করতে হত তবে সে কি করতে পারত ? সরকার কি
পরীক্ষা চালানাের জমিতে তাকে গবেষণা করতে দিত? নিশ্চয়ই
২(১৪)
১৭

। যে লােকটার কোন কালেঙ্গী ডিগ্রী নেই তার উচিত পাগলামি ভুলে 'আপন কাজে মন দেওয়া ! কিন্তু রাশিয়ায় ব্যবস্থা অন্য রকম। সে দেশে বিজ্ঞান শুধু অধ্যাপক ও ডিগ্রীধারীদের আয়ত্তাধীন কোন রহস্যময় ব্যাপার নয়। কৃষিক্ষেত্ৰ- গুলিরও চেহারা আলাদা ধরনের। ইয়েফ্রেমভ এক যৌথ কৃষিক্ষেত্রে কাজ করত। সেটি ছিল একটি বিরাট জমি যার মালিক হল শত শত চাষী ও তাদের স্ত্রীরা। এরা আপন হাতে চাষ করত। তরুণ চাষী এক সভা ডাকলে। সেখানে সবাই এলো। কথাবার্তাও হয়ে গেল। ঠিক হল ইয়েফ্রেমভ গবেষণা করবে । তাকে জমি যােগানো। হল। অনেক সাইবেরিয়ান স্ত্রী ও পুরুম চাষী তাকে সাহায্য করতে এগােলে। সেই গবেষণা থেকে যা বেরােলে সমস্ত সাভিয়েট ইউনিয়নে তার প্রচণ্ড ধাক্কা পোঁছল। ইয়েফ্রেমভ' কথাটি বিভিন্ন ভাষায় একটি নতুন শব্দ হিসাবে গৃহীত হল । হাজার হাজার চাষী ও কৃষিবিদ নিজেদের “ইয়েফ্রেমভপন্থী” বলেন। প্রথম গবেষণা আরম্ভ হল এই ভাবে ইয়েফ্রেমভ ও তার সহকর্মীরা হাজার হাজার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আবাদী জমিতে একটির পর একটি বীজ লাগালাে। দুটি বীজের মধ্যেকার দূরত্ব তারা সযত্নে কমাতে বাড়াতে লাগল। কোন জমিতে দূরত্ব হল আধ ইঞ্চি, কোথাও ও ইঞ্চি, কোথাও বা এক ইঞ্চি বা ঐ ধরনের কিছু । আসলে বিভিন্ন জমির গাছ গুলির মধ্যেকার জায়গার পার্থক্য আধ ইঞ্চিরও কম ছিল। গবেষকরা অত্যন্ত সাবধানে কাজ চালালো। কারণ তারা জানতাে তাদের লক্ষ্য কি । ফলের দিক থেকে এক ইঞ্চির এক দশমাংশের গুরুত্ব খুব বেশী হওয়া সম্ভব। ১৮ বেড়ে উঠবার অল্পদিনের মধ্যেই ইয়েফ্রেমভ প্রমাণ করল যে একটি গমের চারার জন্য ১২ বর্গ ইঞ্চি জমিই যথেষ্ট। অর্থাৎ এক একর জমিতে বহু বীজ রােওয়া সম্ভব আর সে ক্ষেত্রে প্রত্যেকটিই বেশ সতেজভাবে মত সূর্যের আলাে পেতে পারে। হঠাৎ চাষীরা দেখতে পেল কি হয়েছে ? সনাতন পদ্ধতির চেয়ে একর পিছু তারা পাচগুণ বেশী বীজ লাগিয়েছে ও ফসল ফলিয়েছে। অন্যভাবেও জিনিসটা দেখা যায়। বীজ লাগানাের সনাতন পদ্ধতিতে পাঁচ একর জমিতে যে শস্য ফলে ইয়েফ্রেমভ দেখাল যে তা এক একরেই ফলানাে যায় । এই ফলাফল যখন ঘােষিত হল তখন সােভিয়েট কৃষিবিদরা ছুটলেন ইয়েফ্রেমভের জমিতে। আপনারা ভাবতে পারেন ইয়েফ্রেমভের মত একজন চাষী এই রকম আবিষ্কার ঘােষণা করায় এরা চটে না গেলেও অন্তত সংশয়াকুল হবেন । কিন্তু সােভিয়েট ইউনিয়নে কৃষিবিদেরা চাষী আর চাষীরা কৃষিবিদ—কৃমি ও নব বিজ্ঞান সেখানে এক পথের পথিক। ইয়েফ্রেমুভকে উপেক্ষা না করে একজন বিখ্যাত রুশ বৈজ্ঞানিক অধ্যাপক বান্ধি বললেন, গবেষণা ক্ষেত্রে বছরের পর বছর পরীক্ষা চালিয়ে যে সব তত্ত্ব প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরা হয়েছিল ইয়েফ্রেমভের কাজ ঠিক তার উল্টো। বলা হত যে বীজ বপনের এর চেয়ে উৎকৃষ্ট উপায় আর পাওয়া সম্ভব নয়। ইয়েফ্রেমভ এ কথা মিথ্যা প্রমাণ করেছে। অতএব এই মতবাদগুলি ভুল আর তার প্রমাণও মিথ্যা। গবেষণাক্ষেত্রগুলিও ভুল পথে চলেছিল। ইয়েফ্রেমভই ঠিক। সেই হচ্ছে সাচ্চা সােভিয়েট বৈজ্ঞানিক কারণ আমাদের বিজ্ঞান হচ্ছে সমগ্র মানবতার জন্য—সমস্ত মানুষের কল্যাণ কাতে হয় সেই ব্রত উদযাপনের প্রাণোচ্ছল কাজের সঙ্গে এর অঙ্গাঙ্গীযােগ।

কাজেই তরুণ সাইবেরিয়ানের দাবী সত্য বলে প্রমাণিত হল । বুঝতেই পারেন এতে কি পরিমাণে আলােড়নের সৃষ্টি হয়। রাশিয়ার কর্মষ্টি চাষী যারা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার সঙ্গে তাল রাখবার জন্য ফসলের জমি বাছাবার চেষ্টা করেছিল—তাদের যদি বলা যায় যে তারা প্রতি পাচ একরে চার একর জমি নষ্ট করে চলেছে তবে তার ফলটা কি হয় একবার ভেবে দেখুন তো ! অত কথা বাদ দিয়ে আমাদের দেশের চাষীকেও ঐ কথা বলার চেষ্টা করে দেখুন না। আপনি কি বিশ্বাস করেন যে আমাদের জমি থেকে চাষীরা যে ফসল পায় তার পাঁচগুণ ফসল সেখান থেকে পাওয়া সম্ভব ? হয়ত সম্ভব। রাশিয়ার গমের জমি অনেকটা আমাদের মত। ইয়েফ্রেমভের পদ্ধতি অতিদ্রুত সােভিয়েট ইউনিয়নের বিপুল আবাদী জমির ক্ষেত্রে প্রয়ােগ করা হচ্ছে। যৌথ কৃষির পাঠাগারের বই পড়ে যেটুকু শেখা সম্ভব তার বেশী বিশেষ শিক্ষা যার ছিল না সেই তরুণ চাষী কৃষির ইতিহাসের একটি বৃহত্তম অগ্রগতির জনক। তার চেয়ে ও বড় কথা—তার আবিষ্কার সমগ্র রুশ-কৃষকেরা অতি দ্রুত কাজে লাগিয়েছে। জনসাধারণ তাদের নব বিজ্ঞানের বিপুল শক্তির প্রমাণ হিসাবে একে অভিনন্দন জানিয়েছে। সংক্ষেপে, ইয়েফ্রেমভ পদ্ধতিটি এই রকম—প্রত্যেক বিশেষ বিশেন চাষের জমিতে সূর্যরশ্মি কি ভাবে পড়ে সেই অনুসারে বীজ লাগানােই হল এর মূল কথা। পুরানাে পদ্ধতি অনুযায়ী প্রত্যেক ঋতুতে সূর্যের গতিপথ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষকেরাই এর পথ বাৎলে দেন। আবার ইয়েমেভের আবিষ্কারের ফলে গমের ফসল যে রকম বিপুলভাবে বাড়বে তাতে সার ব্যবহার না করলে ২০ জমি নিঃস্ব হয়ে যাবে। সূর্যকে ফসল ফলানাের কাজে লাগানাের এই হল সত্যকার রহস্য। আগে শস্যক্ষেত্রে সার দেওয়ার খরচ পােষাতাে না। এখন পােয় কারণ ইয়েফ্রেমভ পদ্ধতিতে যন্ত্রপাতি ও মেহনতের দিক দিয়ে সামান্য বাড়তি খরচে প্রতি একরে পাঁচগুণ বেশী গম ফলে। গত বছর সােভিয়েটের আবাদী জমিতে s০ লক্ষ টন সার ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যান্য শস্য সম্পর্কে ইয়েমেভের আবিষ্কার প্রয়ােগ করার জন্য “বৈজ্ঞানিক বপন প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে। আলোই খানভের অপেক্ষাকৃত বেশী সুপরিচিত কাজের সঙ্গে ইয়েফ্রেমভের আবিষ্কারের তুলনা চলে । এই সােভিয়েট কয়লা খনির মজুর প্রতি ‘সিটে তার কয়লার ভাগ ১০ টন থেকে ২৫ টনে তেলবার এক উপায় বের করে। দক্ষ জার্মান রুর খনি মজুরেরাও এত কয়লা তুলতে পারে না। পরে টাখানভ ‘সি’ পিছু তার কয়লার ভাগকে ১০২ টনে ঠেলে তােলে। এ এক সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য ও দুনিয়ার উচ্চতম হার। স্টাখানভের আবিষ্কার প্রয়ােগ করে সম্প্রতি আর একজন সােভিয়েট খনিমজুর এক সিটে ৫৩৮ টন তুলেছে। এ এক তাজ্জব ব্যাপার ! ইয়েমেভের গমের ফসলের মত এই কয়লা তােলার আঙ্ক ও অবিশ্বাস্য বােধ হয়। কিন্তু বিদেশী বিশেষজ্ঞরা এ কথার যথার্থ মিলিয়ে দেখেছেন। সােভিয়েটের অন্যান্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ঐ একই ব্যাপার। যেমন মিটার আয়তনের হাপর পিছু ১২ টন ইস্পাত ঢালাই করা। আর এই সব উৎপাদন বৃদ্ধি হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে হয় না ; এতে অদ্ভুত শক্তি বা ধৈর্যের প্রয়ােজন হয় না। এ হচ্ছে মজুরদের চিন্তা, বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ও কর্মোদ্যোগের ফল। স্বয়ং স্টাখানভের ভাষায়—“এর ফলে আমরা এক বর্গ ২১ আমাদের শক্তি ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারি আর আমাদের ফলপ্রসু চিন্তা ধারণাগুলিকে বেশ খেলাতে পারি। এর অর্থ যন্ত্রের উপর মানুষের জয়। প্রত্যেক মজুর নে এঞ্জিনীয়র বা বিশেষজ্ঞের সমান মাত্রার সাংস্কৃতিক ও যান্ত্রিক জ্ঞান আয়ত্ত করতে উদ্যত হয়েছে- এটি তারই সংকেতচিহ্ন। ইয়েফ্রেমভের সাকবেদ আর একজন রুশ কৃষিবিদ র্যাকিটিন ঘন বপনের উপযােগী এক নূতন ধরনের গম বের করেছেন। প্রত্যেক শিষ গমে দুটি বেশী দানা থাকে। কিন্তু তার মানে দঁাড়ায় প্রতি একরে ৪ কোটি অর্থাৎ ৪০ বুশেল বেশী দানা। অর্থাৎ পুরানাে পদ্ধতি অনুযায়ী এই বাড়তি ফসলটাই বেশ ভালো মােট ফসলের সমান ! বিখ্যাত ইউক্রেনিয়ান কৃষিবিদ টি, ডি, লাইসেংকে কৃষিবিদ্যার ক্ষেত্রে একটা আশ্চর্য আবিষ্কার করেছেন ! এর নাম ‘ইয়ারােভাইজেশন। এই ব্যাপারটি খুবই জটিল কিন্তু গানার আপনার পক্ষে সহজ ভাষায় এর মানে হল এই—লাইসেংকো বীজ লাগাবার আগে সেগুলির উপর এমন কতগুলি প্রক্রিয়া চালানাের উপায় বার করেছেন যাতে মাটিতে দেবার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি অতিদ্রুত বেড়ে ইয়ারােভাইজেশনের ফলে মার্কিন মুলুকের চেয়ে অনেক বেশী উত্তরেও ( Farther North) তুলার মত শস্য জন্মানাে যায় । যেখানে আগেই তুষারপাত হয় সেখানে এর সাহায্যে অনেক শস্য দ্রুত পেকে ওঠে। সােভিয়েট ইউনিয়নের সব কোণ থেকে চাষীরা হাজারে হাজারে এসেছে লাইসেংকোর পদ্ধতি আয়ত্ত করতে। এই বৈজ্ঞানিক দেখতেও চাষীর মত। যদিও তিনি বিশ্ববিখ্যাত তবু তার পােষাক ওঠে।

চাষীদের মতই। সারা বছর তিনি চাষী স্ত্রী-পুরুষের সঙ্গে মাঠে মাঠে ঘােরেন, গবেষণা করেন, তাদের শেখান কেমন করে বীজগুলির পরে ‘ইয়ারােভাইজেশন প্রক্রিয়া করতে হয় আর জনসাধারণের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষালাভ করেন। পাঁচ কোটি একরের বেশী ফসলের জমিতে এখন এই প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত বীজ লাগানাে হয়। প্রতি একরে বাড়তি ফসলের পরিমাণ ১০০ পাউণ্ড অর্থাৎ মােট ৫০০ কোটি পাউণ্ড। এই উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্যই সােভিয়েট ইউনিয়ন সমস্ত ইউক্রেনের ফসলের জমি নাৎসী বাহিনীর হস্তগত হলেও খাদ্য সরবরাহ বজায় রাখতে পেরেছিল। প্রধান খাদ্য উৎপাদনের জমিগুলি হারানো দূরে থাকুক সােভিয়েট ইউনিয়ন ১৯৪১ এর চেয়ে ১৯৪২ এ পঞ্চাশ লক্ষ একর বেশী জমি চাষ করেছিল। এর অধিকাংশই ছিল বিজ্ঞানের সাহায্যে রূপান্তরিত নতা কৃ!ি অঞ্চলে। বাইরের বৈজ্ঞানিকরা যাকে পৃথিবীর বৃহত্তম বৃক্ষজনন কেন্দ বলে নাম দিয়েছেন তারই অধ্যক্ষ হয়েছেন লাইসেকো। কিন্তু রুশদের কাছে তার কদর এই ন্যে নয়। তাদের কাছে তার সম্মানের কারণ এই যে তিনি কৃষিজীবী ও সমস্ত দেশের কল্যাণের জন্য প্রত্যেক নূতন বৈজ্ঞানিক গ্রগতিকে চাষের কাজে লাগানাের উদ্দেশ্যে অবিশাম পরিশ্রম করেন। বলা বাহুল্য ইয়েফ্রেমভ, ব্যাকিটিন, লাইসেংকো ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক কৃষিবিদদের এই কাজ সমস্ত বীজ ও অন্যান্য শস্য সম্পর্কেও প্রযুক্ত হচ্ছে। একর পিছু ১০০ বুশেলের কথা শুনে আমাদের হেসে কোন লাভ নেই। গমের ঐ পরিমাণ ফসল একটি বাস্তব সত্য। খুব সম্ভবত দু বছরের মধ্যে সােভিয়েট ইউনিয়নের বিরাট গমের জমি থেকে গড়ে অন্তত এর অর্ধেক হারে ফসল পাওয়া যাবে। থবীতে এত ফসলের কথা কেউ কখনাে শােনেনি। দুনিয়ার গমের বাজারে এর ফলাফল কি হবে ? দর কি একেবারে পড়ে যাবে ? গম বিনিময় কেন্দ্র কি লেনদেন বন্ধ করবে ? ইয়েফ্রেমভ যখন গবেষণা করছিল তখন এ সব কথা সে ভাবেনি। এমন কি এখনও এ সব নিয়ে সে মাথা ঘামায় না। সােভিয়েট বিজ্ঞানে গমের বাজার’, ‘গমের দর' বা গমের ব্যবসা এ সব ব্যাপার নেই। ইয়েমেভের উদ্দেশ্য তবে কি ছিল ? উদ্দেশ্য ছিল খুবই সােজ। চেয়েছিল বৃদ্ধ টিমিরিয়াজেভের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে অর্থাৎ প্রকৃতিকে মানুষের যুক্তি ও ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করাতে। সেদিক দিয়ে এই তরুণ কৃষক তার স্বপ্নের অতীত সাফল্য লাভ করল । সূর্যকে এমনভাবে চাষীর কাজে লাগাল যা কেউ কখনো ভাবতেও পারে নি। প্রত্যেকেই বুঝতে পারে এমন স্পষ্ট, সরল বিজ্ঞানের সাহায্যে সে সূর্যকে মানুষের স্বপক্ষে টেনে নিয়ে এল । ইয়েফ্রেমভের উদ্দেশ্যও ছিল স্পষ্ট। গবেষণা আরম্ভ হওয়ার আগেই তার যৌথ কৃষিক্ষেত্রের চাষীরা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল সে কথা। সেটি হল ; কম মেহনতে বেশী গম ফলানো-নানুষের পেটের জন্য বেশী খাদ্য আর কম খাটুনি—সবলতর মানুষ গড়া ও চাষীর পক্ষে জীবনকে ভালো করে উপভােগ করার জন্য বেশী সময় । আপনাদের কি ব্যাপারটা জটিল বােধ হচ্ছে ? মৃত আইভান মিচুরিন ছিলেন আর একজন সােভিয়েট কৃষিবিদ যার অগ্রচিন্তা আজ লক্ষ লক্ষ চাষীর কাজে লাগছে। তার এক কোটি বিশেষ ফলের গাছ থেকে সাধারণ ধরনের গাছের দ্বিগুণ ফল পাওয়া যাচ্ছে। মিচুরিনের প্রিয় কথা ছিল : ‘প্রকৃতির কাছ থেকে কোন দাক্ষিণ্য আমরা আশা করতে পারি না : আমাদের কাজ হচ্ছে তা আদায় করা।” আর সােভিয়েট চাষীরা সেই আদায়ই করছে। অধ্যাপক সিটসিন এক ধরনের : ২৪ বারােমেসে গম বার করেছেন যা এরিমধ্যে একর পিছু ৩০ বুশেল ফসল ফলাচ্ছে ; প্রকৃতির হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া এই ‘দাক্ষিণ্য থেকে বােঝা যায় যে শীঘ্রই বছরে বছরে বীজ না লাগিয়ে ফি বছর আপেলের মতই গমের ফসল পাওয়া যেতে পারে। রাশিয়ার নরনারী ও শিশুর প্রাত্যহিক জীবন বিজ্ঞান কি ভাবে বদলে ফেলেছে সে সম্পর্কে একটি কথা বলা যায়। যৌগ ক্ষেত্র’, ‘ঐকত্রিকতার বিরুদ্ধে চাষীর সংগ্রাম প্রভৃতি নিয়ে নানা কথা লেখা হয়েছে। রাজনীতিবিদেরা আমাদের বলেন যে আমাদের দেশে ও সব ব্যবস্থা চলবে না। নাম শুনলে ভড়কে যেতে হয় যে ব্যবস্থার—সেটি আসলে কি ? ব্যবস্থাটি খুবই সােজা। কোনরকমে একটি পরিবার জীবিকা সংস্থান করতে পারে এ রকম হাজারটি ছােট ছােট ক্ষেতের জায়গায় সমস্ত ক্ষেতগুলিকে একত্র করা হয়। যন্ত্রপাতিও এক করা হয়। ওটা খানিকটা আমাদের দেশের পুরানাে ‘মৌমাছি’ ব্যবস্থার মত যাতে কোন চাষী অসুস্থ হলে পড়শীরা একজোট হয়ে বীজ লাগাতে বা শস্যকণা ঝাড়ত। সােভিয়েটের কৃষিক্ষেত্রে শুধু ‘মৌমাছিরা সারা বছরই থাকে। সমস্ত ক্ষেতে বীজ লাগানো, ঝাড়া, হাল দেওয়া, গরু বলদের তদারক করা বা অন্যান্য কাজে সবাই হাত লাগায়। যৌথ কৃষির চাষীরা আধুনিক বাড়ীতে বাস করে। সন্ধ্যাবেলা খাবার আগে তারা কাজ সারে—তারপর সিনেমা, সাঁতারের জায়গা, ক্লাব বা থিয়েটারে যায়। বিখ্যাত অভিনয় দল, গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রীরা যৌথ কৃষি থিয়েটারে আসেন। এদের নিজস্ব হাসপাতাল, ঔষধালয়, মােটর রাখার ঘর আছে—আর আছে ছছাটদের জন্য পাঠাগার ও শিশুসদন। তরুণ চাষী বিবাহেচ্ছ স্ত্রী-পুরুষকে নূতন বাড়ী দেওয়া হয় যেখানে তারা থাকতে ও সংসার পাততে পারে।

যৌথ কৃষি হচ্ছে শুধু সাধারণ কল্যাণের জন্য সমস্ত চাষীর একত্র চাষের ব্যবস্থা। বিজ্ঞান রুশ কৃষি জীবনে বিপ্লব এনেছে। চাষী ও শহুরে লােকের তফাৎ এর ফলে দূর হয়েছে। অজ্ঞ, কর্মক্লিষ্ট, ভীরু দরিদ্র রুশ চাষী চিরকালের জন্য অদৃশ্য হয়েছে আর তার জায়গায় দেখা দিয়েছে ইয়েফ্রেমভের মত চাষী। বিজ্ঞানের গােপন হাতিয়ারে সজ্জিত চাষী! চাষী যারা মানুষের কাজের সাথী হিসাবে সূর্যকেও পেতে শিখেছে যাতে গ্রামাঞ্চলে আবার মুক্ত আনন্দময় জীবনের প্রতিষ্ঠা হয় । ২৬ গোপন হাতিয়ার সৃষ্টি নূতন রুশ সরকারের নেতারা প্রথমেই এমন হারে বিজ্ঞানের অগ্রগতির পরিকল্পনা করলেন যা আজগুবী মনে হত। ১৯১৮ সালে লেনিন স্বয়ং এই পরিকল্পনা পেশ করেন। এই পরিকল্পনার নথিপত্র মনুষ্যজাতির অগ্রগতির একটা স্মারকচিহ্ন হিসাবে বিশ্ব ইতিহাসে ধার্য হবে। এর নাম হল “বৈজ্ঞানিক ও যান্ত্রিক কার্যের পরিকল্পনার খসড়া।” ‘একাডেমী অফ সায়েন্সেস অর্থাৎ বিজ্ঞান পরিষদের হাতে এটি দেওয়া হল। প্রথম দিন থেকেই সােভিয়েট ইউনিয়ন বিজ্ঞানের লক্ষ্যের দিকে দ্রুততম গতিতে অগ্রসর হল। পুঁজি বা ধম বা কৃষি সম্পর্কে নীতির পরিবর্তন হােক না হােক বিজ্ঞান সম্পর্কিত নীতি ছিল অবিচলিত। অন্যান্য দেশের বৈজ্ঞানিকরা এই নীতিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করলেন। তবু সে আক্রমণ ও সর্ববাদীসম্মত ছিল না। তার কারণ এই ঃ- বিশ্বযুদ্ধেররা কয়েক বছর আগে থেকেই সমস্ত পৃথিবীর বৈজ্ঞানিক মহল নিজস্ব সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল। শিল্পী ও সংগীতবিদদের সৃষ্টির মত বৈজ্ঞানিক গবেষণাও শুধু আপন আনুগত্যের তাগিদেই চলে—এই সনাতন ধারণা দ্রুত নষ্ট হচ্ছিল। শিল্প গুলি শ্রেষ্ঠ তরুণ বৈজ্ঞানিকদের টেনে নিচ্ছিল। এই যুবকেরা দেখলেন যে অনেক সময় তাদের আবিষ্কারগুলি চেপে রাখা হয়। শীঘ্রই দাবী উঠল যে বৃটেন, আমেরিকা, কানাডা ও অন্যান্য দেশে সরকার সমস্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভার নিক। २१ এই প্রস্তাবের তীব্র বিরুদ্ধতা করলেন অধিকাংশ বৈজ্ঞানিকেরা ও বড় বড় শিল্পগুলি। তাই হার মানতে হল। সরকার যখন সত্যসত্যই জাতীয় গবেষণা পরিষদ স্থাপন করল তখন তার কাজ প্রধানত চলল ব্যক্তিগত শিল্পগুলির স্বার্থে। সর্বদাই টাকার অভাব ও ঔদাসীন্যের চাপে এর কাজ হােত বিড়ম্বিত। সােজা কথায়, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই নীতি চলল যে বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ মুনাফা কবে বড় বড় শিল্পপতিদের পকেটে আর যদি কোনো গবেষণার ফলে লাভের অঙ্ক খাটো হবার উপক্রম হয় তবে তা বন্ধ করতে হবে । আমেরিকায় এই পন্থার জঘন্যতম উদাহরণ সম্প্রতি দেখা গেছে। এ্যাটর্ণী জেনারেল দেখিয়েছেন সে জনকয়েক শিল্পপতি আপন মুনাফা বাচানাের জন্য বিজ্ঞানের অগ্রগতি প'তে ও স্বদেশের জাতীয় প্রতিরােধব্যবস্থা ক্ষুন্ন করতে পিছপা হয়নি। জনসাধারণ এ সব প্রকাশিত হওয়ায় চমকে গিয়েছিল কিন্তু বিশেষজ্ঞদের কাছে এ সব হল পুরােনো কথা। গত পচিশ বছরে টাকার বিনিময়ে বিজ্ঞানকে বারবার বেচাকেনা, প্রয়ােগ বা বরবাদ করা হয়েছে। এই সময়ে রুশদেশে নতন এক ধরনের বিজ্ঞানের আবির্ভব হচ্ছিল। সােভিয়েটের প্রথম আমলের দারিদ্র্য ও দুঃখকষ্ট সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ টাকা ঢালা হল আশ্চর্য এক বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় । যে পরিকল্পনা সর্বত্রই সেদিন সমালােচনা ও পরিহাসের উদ্রেক করেছিল সেটি এই :- প্রথমত রুশ বিজ্ঞান পরিষদ পশ্মশ্রুদের সমিতি থেকে রূপান্তরিত হল ১৮ কোটি মানুষের কল্যাণের জন্য গবেষণা পরিচালনার কেন্দ্রে। দ্বিতীয়ত বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে বিজ্ঞানের ছাত্র ভর্তি করা হল তখনই যখন তারা বিশেষ কোন পারদর্শিতা দেখাতে পারত; কোন মাইনে নেওয়া হত না ; পড়া যতদিন চলত ছাত্রদেরই খরচ দেওয়া হােত। ২৮ তৃতীয়ত বিজ্ঞানের ছাত্রদের কিছুটা সময় শিল্পে বা কৃষিক্ষেত্রে কাজ করতে হােত। চতুর্থত কয়েকটি গবেষণাকেন্দ্রের জায়গার পরিকল্পনা দাবী জানালো “কারখানা ও ক্ষেত পিছু এক গবেষণাগারের।” পঞ্চমত গবেষণার সমস্যাগুলি উঠত শিল্প, কৃষি ও রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা কমিশন থেকে। ভাবুন একবার গুরুগম্ভীর বৈজ্ঞানিকদের কয়লাখনিতে বা ফসল ক্ষেতে কাজ করতে পাঠানাের চেষ্টা হচ্ছে ! কল্পনা করুন আপনার হাতে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা দিচ্ছে আমলা বা অজ্ঞ চাষী মজুরেরা ! বিজ্ঞানী মহলের লােকের। সােভিয়েট পরিকল্পনা দেখেতো চটে আগুন। তারপর তারা কিছুটা ঠাণ্ডা হল। শেষে শুরু হল তাদের অবাক হবার পালা। আসলে লেনিনের প্রস্তাব সাংঘাতিক রকম বৈপ্লবিক ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন ভবিষ্যতের উন্নততর সমাজ সম্ভব করার জন্য মুষ্টিমেয় লােকের কবল থেকে বিজ্ঞানকে উদ্ধার করে লক্ষ লক্ষ মানুষ যাতে তার মর্ম গ্রহণ করতে পারে বা তাকে ব্যবহার করতে পারে তার চেষ্টা করতে। জানেন কি প্রথম কে এই ‘সাম্যবাদী’ প্রস্তাবের কথা ভেবেছিল ? ৩০০ বছর আগে বিখ্যাত ইংরাজ স্থপতি ক্রিস্টোফার লেন ! পৃথিবীর প্রথম বিরাট বৈজ্ঞানিক সংগঠন রয়াল সােশাইটি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করার সময় রেন বলেছিলেন “এই নশ্বর জীবনের দুঃখ যন্ত্রণা লাঘব আর প্রত্যেকের মেহনত অনুযায়ী সম্পদ বিভাগ করার প্রয়ােজনীয় শিল্প বিজ্ঞানের উন্নতিসাধনই হল শান্তিপূর্ণ গভর্নমেন্ট স্থাপনের পথ।” সপ্তদশ শতাব্দীতে স্থাপিত রয়াল সােশাইটির এই 'হল মূল মন্ত্র কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে সােশাইটির সভ্যরা সােভিয়েট কি চায় ধরতে পারলেন না । ২৯ এখন যখন হিটলারী বর্বরেরা আশ্চর্য চমৎকার রেন গির্জাগুলিকে একের পর এক ধ্বংস করে ফেলেছে তখন বৃটেন, আমেরিকা, কানাডা ও অন্যান্য মিত্রশক্তিপুঞ্জের বৈজ্ঞানিকেরা অবশেষে সােভিয়েট বৈজ্ঞানিকদের সঙ্গে হাত মেলাতে যাচ্ছেন। যে বিশ বছর তারা দূরে সরে ছিলেন সেই সময়ে কি ঘটেছে ? তাজ্জব সব ব্যাপার ঘটেছে কিন্তু কোনােটিই তত আশ্চর্য নয় যেমন হচ্ছে - ৩০ কয়লা বশ করার কাহিনী ১৯০০ সালেই রাশিয়ার রাজনৈতিক নেতা লেনিন নূতন দুনিয়া গড়ার কাজে কি ভাবে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করা যায় এই নিয়ে পড়াশুনা আরম্ভ করেছিলেন। শীঘ্রই তিনি এই সিদ্ধান্তে এলেন যে মূল সমস্যা হচ্ছে জ্বালানি বা যান্ত্রিক শক্তির। যদি পৃথিবীময় যান্ত্রিক শক্তি উৎপন্ন করে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া যায় তবেই অবশেষে মানুষ তার প্রকৃতিকে বশ করার সাধনা, “মানুষের ইচ্ছার কাছে প্রকৃতির নতিস্বীকার” সাধনায় সিদ্ধিলাভ করবে। কাজেই লেনিন মনােনিবেশ করলেন বিপুলভাবে যান্ত্রিক শক্তি উৎপন্ন করার প্রশ্নে। এ বিষয়ে তিনি লিখলেনও যথেষ্ট। একদিন তিনি এক চমৎকার প্রস্তাব উপস্থিত করলেন। বহুদিন আগে দুই বিখ্যাত রাসায়নিক-রুশ মেণ্ডেলিভ ও ইংরাজ র্যামসে এই ব্যাপার নিয়ে প্রথম কাজ চালান। তারা মাটি খুঁড়ে কয়লা তােলার ব্যবস্থা বন্ধ করার কথা তুলেছিলেন। তার দেখিয়েছিলেন মাইলখানিক মাটির নীচে থেকে কয়লা কেটে, সেটাকে তুলে রেল বা জলপথে তাকে দূর দেশে পাঠিয়ে তারপর শিল্প বা গৃহস্থের কাজের জন্য চুল্লীতে ফেলে তার থেকে গ্যাস বানানো কত হাস্যকর-জ্বালানি হিসাবেও কয়লার ব্যবহার কত বােকামী। তারা দেখালেন কি ভাবে অল্প কয়লা যদি খনির মধ্যে জ্বালানাে যায় তবে তা থেকে আশেপাশের বিপুল পরিমাণ “কয়লা গরম হতে পারে ও তার ফলে প্রচুর পরিমাণ কয়লার গ্যাস তৈরী হওয়া সম্ভব। এই গ্যাস তখন পাইপে করে যেখানে ইচ্ছা চালান দেওয়া যেতে পারে-রেলপথ বা জাহাজের সাহায্যে কয়লা সরবরাহ করার প্রয়ােজন হয় না। কয়লা স্থানান্তরিত হবার বা তাকে ছোয়ারও দরকার নেই। এঞ্জিনীয়ররা যে এই ব্যবস্থা যা থেকে রুশ ও ইংরাজ খনির মালিকরা প্রচণ্ড মুনাফা করতে পারত তাকে ভালো করে ভেবেও দেখেনি অবিশ্বাস্য বােধ হয়। তারা বলেছিল এ অসম্ভব। রুশ বিপ্লবের জনক লেনিনই হলেন প্রথম মানুষ যিনি এই প্রস্তাবের গুরুত্ব উপলব্ধি করলেন। ১৯১৩ সালের ৪ঠা মের প্রাভদায় তিনি এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন। তিনি স্পষ্টই এ কথা বুঝলেন যে পাতালপুরীতে বন্দী কয়লা হচ্ছে মানুষের বিরুদ্ধ এক প্রাকৃতিক শক্তি। কয়লা খুঁড়ে, তুলে তাকে চালান দেওয়া অত্যন্ত কঠিন, বিপদজনক ও ব্যয়সাধ্য। লেনিন দেখলেন যে মেণ্ডেলিভ ও র্যামসের পথই হল কয়লাকে আয়ত্ত করে তাকে মানুষের ইচ্ছার অধীন করার পথ । আরাে দুটি সম্ভাবনার কথাও লেনিন আগেই বুঝেছিলেন। প্রথমত মাটির তলে অপরিমিতভাবে গ্যাস উৎপন্ন করলে তার ব্যবহারের জন্য এক নূতন ধরনের এঞ্জিন—অতি উষ্ণ গ্যাস টারবাইনের প্রয়ােজন। (রাশিয়া ও অন্যান্য দেশে ঐ এঞ্জিন এখন ব্যবহার করা হচ্ছে কিন্তু যুদ্ধসংক্রান্ত গােপনীয় বিষয় বলে আমরা এখানে তার এখানে তার আলােচনা করতে পারলাম না।) দ্বিতীয়ত, এই গ্যাস টারবাইনের সাহায্যে প্রমাণ খরচার পাঁচ ভাগের এক ভাগ খরচায় বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব। কল্পনা করুন বিপ্লবী লেনিন, য়ুরােপের সর্বত্র পুলিশের তাড়ায় যিনি দেশ থেকে দেশান্তরে পালিয়ে বেড়াতেন তার মাথায় রয়েছে এমন পরিকল্পনা যা য়ুরােপের শিল্পপতিদের নূতন এক শিল্প ও প্রভূত ঐশ্বর্যের সন্ধান দিতে পারত! তিনি কাগজপত্রেও সে পরিকল্পনার কথা লিখে গেছেন। কোনাে পুঁজিপতি কিন্তু নজর দেয়নি এদিকে। রুশ বিপ্লব যখন এল তখন লেনিন রাষ্ট্রসংক্রান্ত ব্যাপার নিয়েই অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তারই মধ্যে কয়লা আলানাের পরিকল্পনাটি তিনি স্টালিনকে বুঝিয়ে দিলেন। স্টালিন পরিকল্পনাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হিসাব করে দেখলেন। বিশেষজ্ঞরা কিন্তু নিরাশার কথাই বললেন। এঞ্জিনীয়ররা মাথা নাড়লেন। চাষী ইয়েফ্রেমভ কি ভাবে সমস্ত কৃষিবিদদের ভুল প্রতিপন্ন করেছিলেন মনে আছে তাে? স্টালিন বৈজ্ঞানিকদের স্মরণ করিয়া দিলেন যে নূতন বিজ্ঞানের অধিকার সমস্ত জনসাধারণের। প্রত্যেকটি প্রস্তাব হাতেনাতে বিচার করে দেখতে হবে। সবশেষে হুকুম হল কয়লা খনিতে আগুন জ্বালানাের পরীক্ষা শুরু করার। গবেষণার ফল তাদের চরমতম আশাকেও ছাপিয়ে গেল । ১৯৩৮ সালে বিরাট গােরলােভকা খনিতে আগুন দেওয়া হল। পরে হল আরাে অনেকগুলিতে। এদিককার কাজ দ্রুত কেঁপে উঠল। রাশিয়ার পাতালপুরীর কয়লাকে গ্যাসে পরিণত করার ব্যাপারটা এত বিপুলভাবে হচ্ছে যে এটিকে একটি আলাদা শিল্পবিভাগ বলে গণ্য করা হচ্ছে। কিভাবে এটিতে কাজ চলে? খুবই সােজা এর উত্তর। একটি খনিতে আগুন দিতে হলে কয়লার স্তর পর্যন্ত পৌছয় এমন দুটি চোঙার দরকার আর একটি গ্যালারী যা সােজাসুজি এ দুটিকে যােগ করে। তারপর কয়লায় আগুন দেওয়া হয়। উপরে মস্ত বড় বড় পাখার হাওয়া একটি চোঙার মধ্যে দিয়ে নীচে পাঠাননা হয়। এর (১৪) বাতাসের পরিমাণের পরেই নির্ভর করে কতটা কয়লা পুড়বে কতটা তাপ উৎপন্ন হবে তার পরিমাণ। তাপ কি রকম হয় ? কল্পনা করুন একটি চুল্লীতে প্রতি মিনিটে শত শত টন কয়লা পুড়ছে। এই প্রচণ্ড তাপের ফলে সমস্ত খনিটি একটি বিপুল পরিমাণ গ্যাস উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়। দ্বিতীয় চোঙাটি দিয়ে প্রচণ্ডভাবে যে গ্যাস বেরােতে থাকে মস্ত বড় বড় পাইপে তা নানা দিকে চালান দেওয়া হয়। এতে একজনও খনিমজুরের দরকার হয় না। কয়েকজন লাগে পাখা চালানাের জন্য। বিশেষজ্ঞরা পরিমাণজ্ঞাপক যন্ত্রের প্রতি লক্ষ্য রাখেন হাজার হাজার টন উৎপাদনের খবরদারি করেন । গােলােকর সংখ্যা থেকে বােঝা যায় যে, ঠিক খনিতে যেভাবে কাজ চলে সেভাবে করলে শতকরা মাত্র ৬০ ভাগ কয়লা উপরে ভােলা যায় কিন্তু এইভাবে আগুন লাগাবার পদ্ধতিতে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ কয়লা গ্যাস হিসাবে উপরে ওঠে। যে কয়লা ব্যবহারে আসত না তা এ ক্ষেত্রে কাজে আসে। আগুন খনির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকবেই। সব থেকে খারাপ কয়লা থেকেও চমৎকার গ্যাস হয়। গ্যাস ব্যবহার হয় কি ভাবে ? তিন উপায়ে। শিল্পের বড় বড় চুল্লীতে অবশ্যই গ্যাস জ্বালানাে হয়। তারপর নূতন অতি-তাপমান টারবাইনে ব্যবহার হয় যার সঙ্গে বিদ্যুৎ-জনন যন্ত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যােগ থাকে। জল বা বাষ্প ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চাইতে এতে খরচ পাঁচ ভাগের এক ভাগ হয় (তার চাইতেও কম)-লেনিনের এই হিসাব এই বিদ্যুৎ-জনন যন্ত্রগুলি সত্য বলে প্রমাণ করেছে। রুশ শিল্পের অগ্রগতির পক্ষে এর তাৎপর্য কি সে বিচার আপনার কল্পনার পরেই ছেড়ে দেওয়া গেল। ৩৪ সবশেষে এই জ্বলন্ত খনিগুলিকে আর এক এমন কাজে লাগানাে হয় যা কেউ ভাবতেও পারেনি। এগুলিকে বিরাট স্বয়ংচালিত রাসায়নিক কারখানা হিসাবে ব্যবহার করা হয়। যেমন, জল ও বাতাস যদি এই পাতালপুরীতে যায় তবে অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন এই চারটি রাসায়নিক মৌলিক পদার্থের সেখানে একত্র সমাবেশ হয়। এর থেকে অসংখ্য রাসায়নিক পদার্থের সৃষ্টি হয়। রুশেরা এখন তাদের নূতন রাসায়নিক কলকারখানা সম্পর্কে বিশেষ সাড়াশব্দ করছে না। কিন্তু যে কোনাে এঞ্জিনীয়র বলতে পারে যে যদি এমন রাসায়নিক কারখানা থাকে যা বানাতে খরচ লাগে না, যাতে প্রায় কোনো কলকজারই প্রয়ােজন নেই, যার-জন্য জাহাজে করে কাচামাল আমদানীর দরকার হয় না, তাপ ও যান্ত্রিক শক্তি যাতে অমনি মেলে আর শুধু হাতল ঘুরিয়ে যা বাড়িয়ে ফেলা যায় তার সম্ভাবনা যেখানেই কয়লার স্তর আছে সেখানেই অতি দ্রুত এই কারখানা বসানাে যায়। এর থেকে যুদ্ধের পরে রাসায়নিক শিল্পের প্রচণ্ড অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু গােলাকার যে সব খনিমজুরদের চাকরী গেল তাদের কি হল ? গােড়া থেকেই পরিকল্পনার উদ্দেশ্যও ছিল তাই—অর্থাৎ খনির নীচের কাজ বন্ধ করা। বরাবরই সে কাজে মানুষের শক্তির অপচয় ঘটেছে। সে কাজ বিপদজনক ও বহু মানুষের জীবনপাত করেই তা সম্ভব হয়ে এসেছে। সােভিয়েট খনি থেকে যাদের সরানাে হল তখনই তাদের অন্যত্র কাজ দেওয়া হল। মাটির নীচের কয়লা পুড়িয়ে যে সস্তা যান্ত্রিক শক্তি ও রাসায়নিক সামগ্রী উৎপন্ন হল তার দ্বারা সোভিয়েট শিল্প এত ভীষণভাবে কেঁপে উঠল যে খনি মজুরদের পুনর্নিয়ােগের পরও আর কাজের লােকের প্রয়ােজন রইল । কতটা !

বিজ্ঞানের কাজ নয় মুনাফা বাড়ান। তার কাজ প্রাকৃতিক শক্তিকে বশ মানাননা। মানুষের অভাব মেটানাে আর তাদের মেহনতের বােঝা কমাননা! হয়ত আমাদের এখানে খানিকটা রাশ টানা উচিত। একটা ব্যাপার ঘুলিয়ে ফেললে চলবে না। চট করে এ সিদ্ধান্ত করা ভুল হবে যে বিজ্ঞান গণতান্ত্রিক ধনবাদী’ দেশগুলিতে মানুষের জন্য কিছু করেনি। ঠিক তার উল্টো! গত পঞ্চাশ বছরে ধনবাদই বিজ্ঞান ও যন্ত্রবিদ্যার প্রচণ্ড অগ্রগতি সম্ভব করেছে। ধনবাদের আগে বিজ্ঞান সম্পর্কে কোন কৌতুহলই ছিল না। শিল্পব্যবস্থাই বিজ্ঞানের , সামনে পথ খুলে দিল তাই বিজ্ঞান দ্রুত এগিয়ে গেল,—দুনিয়াকে নূতন করে গড়ল। আসলে বিজ্ঞান ও ধনবাদ একত্রে এত দ্রুত অগ্রসর হল যে কিছু লোেক সাফল্যের নেশায় মাতাল হয়ে উঠল—দুনিয়ার কাছে ঘােষণা করল । “বড় বড় শিল্পগুলি যে একচেটিয়া অধিকার ভােগ করে তাকে বাদ দিয়ে বিজ্ঞানের অগ্রগতি অসম্ভব। অন্যরা গরীব থাকতে যদি বৈজ্ঞানিক- দের বড় লােক হবার পথ না থাকে তবে তাদের কাজ করবার কোনাে অর্থই থাকে না। মস্তিষ্কের মূল্য দিতে হয় টাকার অঙ্কে।” এই হল পয়লা ভুল। হয়ত আপনারা সােভিয়েট পদার্থবিদ কাপিটার নাম শুনেছেন। হিটলার কর্তৃক রাশিয়া আক্রমণের ঠিক পরেই তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। ইংরাজ বৈজ্ঞানিকেরা তাকে বিজ্ঞান জগতের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান ফ্যারাডে মেডাল প্রদান করেন। দু দিক থেকে এই সম্মান প্রদান আশ্চর্য। প্রথমত এর দ্বারা এই তরুণ সােভিয়েট: বৈজ্ঞানিক জগতের অমর প্রতিভাদের মধ্যে আসন পেলেন। দ্বিতীয়ত এক সময়ে ডাঃ কাপিক্সাকে ইংলণ্ডে থাকবার জন্য বহু টাকা দেবার প্রস্তাব করা হয়। তখন সােভিয়েট গভর্নমেন্টের কাজে তিনি ইংলণ্ডেই ছিলেন। কিন্তু তিনি ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে সােভিয়েট ইউনিয়নে তার গবেষণা চালাবার জন্য ফিরে যান। সেখানে তিনি নেপােলিয়নের সময়কার বিখ্যাত ফরাসী, সাদি কার্ণো যে বৈজ্ঞানিক সূত্র প্রবর্তন করেন তাই নিয়ে পড়াশুনাে করেন। কার্ণোর জটিল অঙ্ক থেকেই যে বাষ্পীয় শক্তি শিল্পবিপ্লবের মূলে ছিল তার সম্ভাবনা বােঝা যায়। পরে ঐ সূত্র ধরেই এঞ্জিনীয়ররা পেট্রোল ও ডিসেল এঞ্জিন আবিষ্কার করেন যা থেকে পৃথিবীতে দেখা দিল মােটর যানবাহনের ব্যবস্থা ও এরােপ্লেন। কাজেই কার্ণোর সূত্রটিকে যে এক শাশ্বত সত্য বলে মনে করা হত এতে আর আশ্চর্যের কি আছে ! কাপিট্‌স এই সূত্রকে দিলেন উল্টে। তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে কিছুদূর পর্যন্ত এই সূত্র অভ্রান্ত। তিনি বুঝতে পারলেন যে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি অনেক দিকে ব্যাহত হচ্ছে কার্ণো সূত্র সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকদের প্রায় অন্ধবিশ্বাসের জন্য। কাপিট্‌সা এই খাটি যুক্তি দেখালেন যে বিজ্ঞানের পক্ষে কোনাে কিছুতেই অত অসংশয়িত বিশ্বাস অনুচিত। অতীতকে পরিবর্তিত করবার চেষ্টা ও তাকে এগিয়ে নেবার পন্থানুসন্ধান থেকেই অগ্রগতির উদ্ভব। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুক্তি দেখানাে এক কথা আর নিজের মতের অভ্রান্ততা প্রতিষ্ঠা করা আর এক কথা। কাপিটা দুটোই করলেন। . সাহায্যে কাগজে কলমে তাঁর ধারণা খাড়া করার পর তিনি সৃষ্টি করলেন এক ক্ষুদ্র যন্ত্র। এ হল এক টারবাইন প্রতি মিনিটে যেটি অতি দ্রুত ৩৭ গতিতে ৬০,০০০ বার ঘােরে। অভূতপূর্ব ধরনের এই টারবাইন ঘণ্টায় ১,২০০ মাইল গতিতে বাতাস ছড়াতে পারে। মামুলী যন্ত্রের চেয়ে অনেক দ্রুত ও সস্তায় এর সাহায্যে ডাঃ কাপিট্‌সা তরল বাতাস ও পৃথিবীর শীতলতম পদার্থ তরল হিলিয়াম বানাতে পারেন। সােভিয়েট ইউনিয়নে এই ছােট্ট টারবাইন একটি বৈজ্ঞানিক ক্রীড়াসামগ্রী মাত্র হয়ে রইল না। সঙ্গে সঙ্গেই অদ্ভুতভাবে শিল্পে এর প্রয়ােগ আরম্ভ হল। কাপিটসা সেই বিরাট জ্বলন্ত কয়লা খনিগুলি থেকে নিলেন গ্যাস। তার টারবাইনের সাহায্যে তিনি ঐ গ্যাসকে অতি শীতল তরল পদার্থে রূপান্তরিত করলেন। রাসায়নিকেরা দেখলেন যে এই তরল গ্যাসের সাহায্যে তাঁর অনেক প্রক্রিয়া করতে পারেন । সামান্য যন্ত্রপাতির সাহায্যে তারা সব থেকে ভালাে মােটর চালাবার তেল, বিস্ফোরক পদার্থের রাসায়নিক উপাদান, কৃত্রিম রবার, প্লাষ্টিক ও অন্যান্য সামগ্রী বানাতে পারলেন। আর জ্বলন্ত কয়লাখনি থেকে পাওয়া গেল অপর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস। এ সব ঘটল অদ্ভুত দ্রুত গতিতে। ডাঃ কাপি তাঁর গবেষণা- গারের প্রথম আবিষ্কার ঘােষণা করার তিন বছরের মধ্যে তারই পরিকল্পিত বিপুলায়তন যন্ত্র সােভিয়েট শিল্প ও লাল ফৌজের জন্য রাসায়নিক সামগ্রী যােগান দিতে লাগল। আমাদের দেশের এঞ্জিনীয়র, রাসায়নিক ও শিল্পপতিরা যারা বােঝেন দুনিয়ার শিল্পজগতে কাপিটার কাজের প্রভাব কি প্রচণ্ড হতে পারে তারাও বুঝতে পারেন না কয়েক পৃষ্ঠা অঙ্ক ও ছােট্ট একটা টারবাইন অত শীঘ্র কি করে বিপুল, নূতন শিল্পপ্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হতে পারে। এর উত্তর অত্যন্ত সহজ। ডাঃ কাপিটার আবিষ্কার হল অত্যন্ত জরুরী ৩৮ এক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি। সােভিয়েট ইউনিয়নে অবিলম্বে এটি সেই ভাবেই গৃহীত হল। আর ঐ দেশে বিজ্ঞান হল সমগ্র জারিত হাতিয়ার। কাজেই কাপিট্‌সার এই আশ্চর্য আবিষ্কার যা সমগ্র জাতির পক্ষে বিপুল কার্যকরী সুবিধার প্রতিশ্রুতি এনেছিল—তাকে সঙ্গে সঙ্গে কাজে লাগানাে হল, শিল্প ও কারখানায় প্রয়ােগ করা হল। এক ঘণ্টা সময়ও নষ্ট করা হয়নি। যে ক্ষিপ্র গতিতে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার কাজে লাগানাে হল তাতে আমাদের দেশে নব-আবিষ্কৃত সােনার খনি বা তেলের খনি নিয়ে যে রকম তাড়াতাড়ি কাজ শুরু হয় তার কথা মনে পড়ে। কিন্তু ‘কাপিট টারবাইন’ সমগ্র রুশ জাতির, বিশেষ করে তা যুদ্ধ- সংশ্লিষ্ট শিল্পের কাজে লাগে আর সােনা বা তেলের খনি আমাদের দেশে একটি লােক বা কোম্পানীর মুনাফা হঠাৎ ফাপিয়ে তােলে। সম্প্রতি বেশ কিছু বই ও প্রবন্ধে দেখানাে হয়েছে গত দশ বছরে সােভিয়েট শিল্প কতটা বেড়ে উঠেছে। ব্যবসাসংক্রান্ত পত্রিকায় এই উন্নতির সমর্থক সংখ্যাও মেলে। কিন্তু অঙ্ক হল নীরস ব্যাপার। যত সব হিসাব আর অঙ্কের তালিকা বেরিয়েছে তার থেকে একটি নাটকীয় ঘটনার মধ্যে দিয়েই রুশ শিল্পের আশ্চর্য অগ্রগতির কথা অনেক বেশী স্পষ্ট বােঝা যায়। ১৯২১ সালে সােভিয়েট ইউনিয়ন যখন ভীষণ যুদ্ধ, মহামারী ও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছিল তখন একদল বৈজ্ঞানিক নীপার নদীর উপরে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনের জন্য একটি বাঁধ তৈরীর পরিকল্পনা করেন। এই বাঁধ এত বিরাট যে কল্পনা করতে গেলেও চমক লাগে। এমন কি মার্কিনদের কাছেও পরিকল্পনাটি বিপুল বােধ হল। রুশদের তখন -না ছিল কৈান বড় বিদ্যুৎ সরবরাহের বাঁধ, না গগনস্পর্শী ইমারৎ, না সমস্ত দেশে এমন বিরাট কোন জিনিস যা নিয়ে গর্ব করা চলতে পারে। ।

কাজেই তাদের কাছে নীপারের বাঁধ ছিল স্বপ্নের সামিল। কিন্তু সেই স্বপ্নকে তারা বাস্তবে পরিণত করল। বাঁধ তৈরী হল—বিপুলভাবে বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপন্ন হতে থাকল এর থেকে। দুনিয়ার অন্যান্য দেশ এই বাঁধ সম্বন্ধে এত কথা শুনেছিল যে বহু লােক এ নিয়ে ঠাট্টা শুরু করল—বলল, এ হচ্ছে রাশিয়ার গাঁজাখুরী, ওদেশের মত পিছিয়ে পড়া জাতের পক্ষে এ প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ অবান্তর। বিশ্বাস করা হত যে রুশেরা নীপার বাঁধের পূজা করে—পবিত্র মন্দির বলে মনে করে একে। এই বিরাট বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়া হয়েছিল বহু পরিশ্রম ও মালমশলা খরচ করে। সমস্ত দেশ তখন ছিল দুর্দশাগ্রস্ত। সােভিয়েটের মানুষ তাদের স্বপ্নকে রূপ দেবার জন্য যে প্রাণপাত করতে পিছপাও হয়নি তারই প্রতীক এটি। এসত্ত্বেও সেখানকার মজুর ও লাল ফৌজের বিশেষজ্ঞেরা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করল ঐ নীপার বাঁধটিকে। খবরের কাগজের হরফে যখন জানা গেল যে বর্তমান জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এঞ্জিনীয়ারিং কীতি সােভিয়েটের নির্মম ‘পােড়া মাটির’ ব্রতপালনে ধূলিসাৎ হয়েছে তখন সমস্ত দুনিয়া অবাক হয়ে গেল। আশঙ্কা হল রাশিয়া বুঝি বা সর্বাঙ্গীন সর্বনাশের সম্মুখীন, তাই মরিয়া হয়ে স্টালিন বাঁধ ধ্বংসের এই হুকুম দিয়েছেন। এই আঘাত যখন এল তখন সােভিয়েট ইউনিয়নের সর্বত্র যে তীব্র আলা ও ক্রোধ দেখা গেল তার অত্যুক্তি অসম্ভব। কিন্তু সে জ্বালা জাতির দৃঢ় প্রতিজ্ঞাকেই ইস্পাত কঠিন করে তুলল। সেই ক্রোধ নিযুক্ত হল আক্রমণকারীদের স্রোতের বিরুদ্ধে আর লাল ফৌজ চালালে লড়াই। সােভিয়েট শিল্প অবসন্ন হয়ে পড়ল না। পৃথিবীর আশঙ্কার উত্তরে রুশ এঞ্জিনীয়াররা শুধু বললেন “নাৎসীরা নিঃশেষ হলে আমরা ৪০ বাঁধের পুনঃসংস্কার করব। কিন্তু তাদের অগ্রগতির মুখে কোন মূল্যবান জিনিসই ফেলে রাখব না। যত মহামূল্য হােক না কেন এতটুকু দরকারী জিনিস তাদের হাতে পড়বে না।” ক্রমে সমস্ত দুনিয়া (বিশেষ করে এঞ্জিনীয়র ও বিশেষজ্ঞরা ) বুঝল কি ব্যাপার ঘটেছে। নীপারের বাঁধ তৈরী হবার পরের দশ বছরে নূতন বিজ্ঞানের সাহায্যে সােভিয়েট ইউনিয়ন পােল্যাণ্ড থেকে মাঞ্চুরিয়া, সাইবেরিয়া থেকে গ্রীষ্মপ্রধান এশিয়া পর্যন্ত সব জায়গায় বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। বিপুল হলেও নীপার বাঁধের বিদ্যুতের অভাব মার্কিন মুলুকেও যা সম্ভব হয়নি এমন দ্রুতবেগে যে বিরাট বৈদ্যুতিক পরিকল্পনা কাজে পরিণত হয়েছিল তার অনুপাতে এ ছিল একটি ভগ্নাংশ মাত্র। দশ বছরে সােভিয়েট ইউনিয়নের চেহারা বদলে গেল। এই পরিবর্তন সম্পর্কে নানা গুজব বাইরের জগতেও মাঝে মাঝে শােনা যেত। খুব কমই কিন্তু মানুষে এ সব কথা বিশ্বাস করত। ৪১ সােভিয়েট পরমাণুর লড়াই পরমাণু চূর্ণ করার কথা আমরা সবাই পড়েছি—পরমাণুর উপাদান সম্পর্কে গবেষণার কথাও জানি। এখন সােভিয়েট ইউনিয়নে কিন্তু চূর্ণীকৃত পরমাণু শুধু বৈজ্ঞানিক কাজেই নয়—হিটলারকে চূর্ণ করার উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হচ্ছে। রুশেরা যুদ্ধের জন্য তাদের পরমাণুদের পর্যন্ত যােগাড় করে ফেলছে। আর পরমাণু চূর্ণ থেকে তৈরী আণবিক গােল লাল ফৌজের অভিযানে সব থেকে কার্যকরী অস্ত্রগুলির অন্যতম হয়ে দাড়িয়েছে। স্টালিনগ্রাদে যখন জার্মান ফৌজ সমূলে বিনষ্ট হচ্ছিল তখনকার হিটলার ও গােয়েবেলসের বক্ত তা হয়ত আপনাদের মনে থাকতে পারে। জার্মান জাতির কাছে এই বক্তৃতায় পরাজয়ের কারণ দেখানাে হত এই যে রুশেরা অসংখ্য ট্যাঙ্ক, কামান ও এরােপ্লেন এনে ফেলেছে। নাৎসী নেতারা তাদের বিস্ময় অকপটে প্রকাশ করেছিল। তাদের তিলমাত্র ধারণা ছিল না কোথা থেকে এই বিপুল জমানাে সাজ সরঞ্জাম হাজির হল। আমেরিকা, কানাডা ও বৃটেন থেকে খুব কম পরিমাণই পাওয়া গিয়েছিল। তখন পর্যন্ত আমাদের বলা হত—হিটলারও বিশ্বাস করত যে গােড়ার দিকের নাৎসী অভিযানে সােভিয়েটের বহু উৎপাদন কেন্দ্র হাতছাড়া হয়েছে। হঠাৎ কিন্তু লাল ফৌজ বিপুল পরিমাণ নূতন যান্ত্রিক অস্ত্রশস্ত্র হাজির করল। এগুলাে তবে এলাে কোথা থেকে ? তার চেয়েও জরুরী কথা এগুলাে বানালাে কে ? ৪২ আমাদের উৎপাদন বিশেষজ্ঞেরা এ প্রশ্নের উত্তর দিলেন এই ভাবে। সােভিয়েট সরকার তার বিপুল দেশের প্রত্যেক নরনারী ও শিশুকে কাজে লাগিয়েছে আর অধিকৃত এলাকা থেকে বহু কারখানা উরাল পর্বতের নিরাপদ জায়গায় সরানাে হয়েছে। এই দুটো জবাবই আংশিক সত্য। কিন্তু এই দুই-এরই মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ ছিল। এখন এ কথা প্রকাশ করা চলে যে ২০০০ মাইল ব্যাপী ফ্রন্টে সােভিয়েট অগ্রগতির পিছনে যে বিপুল পরিমাণ ভারী ভারী যন্ত্রসজ্জার বন্দোবস্ত ছিল সেগুলি সম্পূর্ণ নুতন উৎপাদন পদ্ধতির সাহায্যে তৈরী হয়েছিল। এর মধ্যে কতগুলি ছিল ব্যাপক উৎপাদনের ক্ষেত্রে একেবারে বৈপ্লবিক পন্থা। একদিকে যেমন লাল ফৌজের ট্যাঙ্ক, কামান, বন্দুক, এরােপ্লেন অন্য দেশের চাইতে উৎকৃষ্টতর বলে প্রমাণিত হয়েছে তেমনই আবার সংখ্যার দিক থেকেও সােভিয়েট উৎপাদন আমাদের আগেকার কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গেছে। চূর্ণীকৃত পরমাণু সােভিয়েটের এই নূতন ব্যাপক উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটা মস্ত অংশ গ্রহণ করেছে। ভেবে দেখুন পরমাণু বিস্ফোরণের সাহায্যে বড় বড় সােভিয়েট ফিল্ড কামান বা বাঘা বাঘা ট্যাঙ্ক তৈরী নূতন উৎপাদন পদ্ধতির গােপন রহস্য হল ইলেক্ট্রন। পরমাণু চূর্ণ করলে গােলার মত এই ইলেক্ট্রন বিক্ষিপ্ত হয়। ৩,০০,০০,০০, ০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ ইলেকট্রনের ওজন হল এক আউন্স। এই অবিশ্বাস্য রকম ছােট পদার্থ থেকে যুদ্ধের কারখানার কাজ কেমন করে চলতে পারে ? যানবাহন ও পর্যবেক্ষণের যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে যুদ্ধের সর্বত্রই ইলেক্ট্রনের সাহায্য নেওয়া হয় প্রত্যেক দেশই ইলেক্ট্রনীয় কৌশল প্রয়ােগ ৪৩ করে। আমেরিকা, বৃটেন ও কানাডা যুদ্ধসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিতে ইলেক্ট্রন ব্যবহারের দিকেও খানিকটা এগিয়েছে। কিন্তু সােভিয়েট ইউনিয়নেই শুধু এই অতি ক্ষুদ্র পদার্থকণাগুলি অতিমানবিক শক্তি অর্জন করতে পেরেছে। কারখানার নূতন কৌশল সম্পর্কে আলােচনা করার আগে স্টালিন যে অভিযান শুরু হওয়ার কিছু পূর্বে উৎপাদনের ক্ষেত্রে অভিনবত্বের কথা তুলেছিলেন সে কথা বিশেষ কৌতুহলপ্রদ। তিনি বলেছিলেন যে লড়াইয়ের প্রথম বছরে সােভিয়েটের অস্ত্র শস্ত্র শত্রুপক্ষের চেয়ে ভালাে হলেও সংখ্যার দিক থেকে অভাব ছিল কিছুটা। এই প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন যে বড় বড় উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস বা হাতছাড়া হওয়া সত্ত্বেও এই অসুবিধা দূর হবেই। আমাদের কোনাে ভাষ্যকারই স্টালিনের এই গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতের প্রতি মনােযােগ দেন নি। লাল ফৌজের বিরাট অভিযান শুরু হলে পর সংখ্যার দিক থেকে যে কি অসম্ভব রকম উৎপাদন বাড়ানাে গেছে সে খবর দুনিয়ার কাছে প্রকাশিত হল । তখন সােভিয়েট সংবাদ সরবরাহ সংঘের নেতা আলেকজাণ্ডার সেবাকোভ শুধু বললেন : “দেশের সামরিক শক্তির দিক থেকে নূতন কাচামাল উদ্ভাবন ও নূতন কায়দায় তার ব্যবহার সম্পর্কে সােভিয়েট বিজ্ঞানীদের কাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।” সেবাকোভূ সােভিয়েট ইউনিয়নের কম্যুনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সমিতির সম্পাদক। বাজে কথা বলার তাঁর অভ্যাস নেই। তিনি অকপটেই সমস্ত পৃথিবীকে জানাচ্ছিলেন যে সােভিয়েট বিজ্ঞান ব্যাপক উৎপাদনের ক্ষেত্রে নূতন কৌশল উদ্ভাবন করেছে। এতে : এই নূতন কৌশলের একটি হল ইলেক্ট্রনীয় উৎপাদন পদ্ধতি। মানুষের শক্তির জায়গায় ইলেক্ট্রন ব্যবহার করা হয়। ৪৪ বৈদ্যুতিক মােটরের কথা সবাই জানে। আমাদের কারখানায় যুদ্ধ বা শান্তির সময়কার সামগ্রী তৈরীর জন্য যে শক্তির প্রয়ােজন হয় বিদ্যুতই তা দেয়। এই ভাবে মানুষের মাংসপেশীর শক্তির স্থান নেয় এই বৈদ্যুতিক শক্তি। আপনি কি কখনাে ‘রবট’ বা যন্ত্রমানব দেখেছেন ? এগুলি হল অদ্ভুত বৈদ্যুতিক যন্ত্র যা সহজ সহজ হুকুম তামিল করতে পারে যেমন চেয়ার থেকে ওঠা, হাঁটা বা করমর্দন করা। বহু বছর ধরে লেখকেরা এমন রবটের কথা নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন যা চিন্তা করতে কিম্ব। অন্তত কায়িক পরিশ্রম করতে পারে। সােভিয়েট ইউনিয়নে এখন যন্ত্রমানব সত্যসত্যই কাজ করছে। স্নায়ুর পরিবর্তে এর আছে বৈদ্যুতিক তার। চিন্তার বদলে রবটের মাথায় গিজগিজ করছে ইলেক্ট্রন যার আছে চোখ, নেই কোন ভ্রান্তি বা শ্রান্তি বােধ। চোখের পলকও তাকে ফেলতে হয় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এর চোখ অদ্ভুত সব নক্সার দিকে থাকে তাকিয়ে। তামা, কাচ ও ইলেক্ট্রনে তৈরী এই অদ্ভুত প্রাণীটি বসে থাকে কোনাে অফিসে কিন্তু আধখানা দালান দূরে যন্ত্রাগারে হয়ত তার হাত কাজ করে। এই অদ্ভুত কলটি কি কাজ করে? শুধু এই—এর আলােক- বৈদ্যুতিক চোখ নূতন ধরনের এক রকম নক্সা পাঠ করতে পারে। এই নক্সায় থাকে যন্ত্রের জটিল কাজকর্মের কথা। যন্ত্রমানব নক্সা পাঠ করে, বৈদ্যুতিক হাতের কাছে তারের স্নায়ু মারফৎ পাঠায় ইলেক্ট্রন-চিন্তা আর এক মস্ত ধাতু উৎসারী ‘লেদের উপর সব কিছু নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের তত্ত্বাবধান করে। অর্থাৎ এই যন্ত্র স্থান নেয় লেদ-পরিচালক মানুষের। কিন্তু সােভিয়েট আবিষ্কারের উদ্দেশ্য নয় মানুষের মেহনতকে বাতিল ৪৫ করা। কয়েকটি দরকারী দিক দিয়ে যন্ত্রমানব সব থেকে দক্ষ মানুষ কারিগরের চেয়েও অনেক শ্রেষ্ঠ প্রথমত নক্সা পাঠে এর দক্ষতা অভ্রান্ত, আর ‘লেদ ও সর্বদাই এই নৈপুণ্য অনুযায়ীই কাজ করে। এরই ফলে স্বল্পতম সীমানার মধ্যে ব্যাপকতম উৎপাদন সম্ভব হয়। তার পরে যন্ত্রমানবের পক্ষে ভুল করা সম্ভব নয়। তার যন্ত্রপাতি প্রয়ােগের কাজ যাচাই করার দরকার নেই কারণ নক্সায় যা আছে তা তৈরী জিনিসটাতেও থাকবেই। তারপর যন্ত্রমানব বিনা বিশ্রামে দিনে চব্বিশ ঘণ্টা খাটতে পারে । তার শ্রান্তি নেই, অসুখ বিসুখ নেই—নেই কোন আকস্মিক দুর্ঘটনার আশঙ্কা। আর সবশেষে এই আশ্চর্য যন্ত্র তার একজোড়া চোখ ও কাচের টিউবের ভিতরকার মগজ নিয়ে দুটো, এক ডজন, পঞ্চাশটি, একশটি ‘লেদ’ চালাতে পারে। সব কটাতেই ঠিক একই রকম নিখুঁত কাজ পাওয়া যাবে। উৎকৃষ্ট ধরনের ভারী অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপক উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই রকম আবিষ্কারের মূল্য কি তা সবাই বুঝতে পারে ।। সেবাকোভূ যখন সােভিয়েট বৈজ্ঞানিক কর্তৃক “দেশের সামরিক শক্তির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রুশ কাঁচামাল ব্যবহারের নূতন পদ্ধতি আবিষ্কারের কথা বলেছিলেন তখন তিনি এর ও এই ধরনের আবিষ্কারের কথাই ইঙ্গিত করেছিলেন। কয়েক মাসের মধ্যে বহু সহস্র সুদক্ষ যন্ত্রচালককে শিক্ষিত করে তােলার ‘অসম্ভব’ সমস্যা সমাধান করল সােভিয়েট। যন্ত্র পরিচালনার ভার ইলেক্ট্রনীয় মস্তিষ্কের জিম্মায় ছেড়ে দিয়ে সমস্যার জবাব পাওয়া গেল। যন্ত্রমানবকে যন্ত্রচালনার কৌশল শেখাতে হলে শুধু তার হাতে একটি নূতন নক্সা দিলেই হয়। তার ইলেক্ট্রন চোখে কোনাে নক্সাই জটিল বােধ হয় না। ৪৬ বিস্মৃত ভবিষ্যদ্বাণী ১৯৩১ সালে স্টালিন এক বক্তৃতা দেন। আমাদের দেশে তার কথায় বিশেষ কোনাে মনােযােগ দেওয়া হয়নি। কিন্তু সেই বক্তৃতা ইতিহাসের সব থেকে আশ্চর্য ভবিষ্যদ্বাণীগুলির অন্যতম বলে গণ্য হবে। স্টালিন তার ১৮ কোটি দেশবাসীকে সতর্ক করলেন এই বলে— “আমরা উন্নত জাতিগুলির একশ বছর পিছনে পড়ে আছি।” তারপর তিনি এই ভীষণ ও সাংঘাতিক ভবিষ্যদ্বাণী করলেন “দশ বছরের মধ্যে আমাদের এই ব্যবধান ঘুচাতে হবে নইলে ওরা আমাদের নিঃশেষ করবে।” এই বক্তৃতার দশ বছর পরে হিটলার য়ুরােপের সমস্ত উন্নত দেশগুলির শিল্পপুষ্ট বিশাল বাহিনী সােভিয়েট ইউনিয়নের বিরুদ্ধে চালিত করল। স্টালিন এবার সমস্ত দুনিয়াকে বললেন “জার্মানরা তাদের বিদ্যুত গতিতে জয়ের পরিকল্পনা গােপন রাখেনি। বরঞ্চ তারা সব রকমে এরই জয়ঢাক বাজিয়েছে।......তাদের হিসাবে সােভিয়েট ইউনিয়নকে সাবাড় করতে দেড় থেকে দু মাস সময় লাগবে......এই উদ্ভট পরিকল্পনা যে সব দিক থেকে ভ্রান্ত তা বলা বাহুল্য।” আমাদের সামরিক ও শিল্পবিশেষজ্ঞেরা স্বীকার করেন স্বীকার করেন যে ঐ দশ বছরে সােভিয়েট একশ বছরের অনগ্রসরতা দূর করে হয়ত আরাে বেশী কিছু করেছিল। এ সব হল দশ বছরের মধ্যে। হিটলার ৪৭ ওদের পর্যন্ত করতে চেয়েছিল কিন্তু তার পরিকল্পিত বিদ্যুৎ অভিযান শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়। সবাই চমকে গেল। অন্যান্য সম্মিলিত শক্তির বিশেষজ্ঞরা এখনও হতভম্ব। আর হিটলারের বিশেষজ্ঞরা তাে মুহ্যমান। একশ বছরের অগ্রগতির পথ দশ বছরে অতিক্রম করতে সােভিয়েট কোন্ ইন্দ্রজাল ব্যবহার করেছে ? কোনো ইন্দ্রজালই নয়। তারা প্রয়ােগ করছে নববিজ্ঞান। এরই সাহায্য তারা এমন সব অস্ত্রসজ্জায় নিজেদের সজ্জিত করেছে যা কখনও কোনাে দেশ করেনি। সােভিয়েট ইউনিয়নের বৈজ্ঞানিক ও বিশেষজ্ঞরা ঐ দশটি গুরুত্বপূর্ণ বছরের পরিকল্পনা করেছে আর যােশেফ স্টালিন তাদের পরিকল্পনায় ভাষা যুগিয়েছেন—দিয়েছেন সেগুলি দেশবাসীর হাতে। স্টালিন প্রথমে বলেছিলেন “আমাদের পক্ষে যন্ত্রকৌশলই (অর্থাৎ বিজ্ঞানের কার্যক্ষেত্রে প্রয়ােগ) সব কিছুর নিয়ন্তা।” পরে তিনি বললেন “যন্ত্রকৌশল এখন আমাদের আয়ত্তাধীন। এখন সুদক্ষ কর্মীরাই ( অর্থাৎ যারা বিজ্ঞানকে প্রয়ােগ করতে পারে) সব কিছুর নিয়ন্তা।” ঘটল এই। ১৯১৭ সালে সােভিয়েটে ২১টি মাত্র গবেষণাগার ছিল। ১৯৩৭এ হল ২,২০০টি। এই ভাবে যন্ত্রকৌশল ওরা আয়ত্ত করল। ১৯১৭ সালে ওদের দেশে ১২ কোটি লােক ছিল নিরক্ষর। সালে তাদের ৯ কোটি লােক বিজ্ঞান বুঝতে আর প্রয়ােগ করতে পারত (যন্ত্রপরিচালক )। এই ভাবে তারা পেল সুদক্ষ কর্মী ১৯৩৭ সালে টেকনিক্যাল স্কুল বাদ দিয়েও সােভিয়েটে ৭১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল। সমস্ত য়ুরােপে ১৯৩৭ ৪৮ যত দেশ আছে (গ্রেট বৃটেনও আছে এ হিসাবের মধ্যে এমন কি জাপানকেও ধরা চলতে পারে এ হিসাবে—তাদের সকলকে একত্র করলেও সােভিয়েটের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা ছিল তার চাইতেও বেশী। চণতান্ত্রিক দেশের লােক একদিন সােভিয়েট ইউনিয়নকে ঠাট্টা করত আর বলত এ সব অঙ্ক হচ্ছে গাঁজাখুরী। কিন্তু এ সব মিথ্যা নয়—খাঁটি বাস্তব ঘটনা । অবশ্য ভাগ্য ভালো যে এগুলি সত্য। বৃটিশ দ্বীপপুঞ্জ যেখানে মানুষ হিটলারের নৃশংস রণকৌশলের সঙ্গে পরিচিত—সেখানেও চার্চিল থেকে আরম্ভ করে খবরের কাগজ বিক্রেতা পর্যন্ত সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল যখন স্টালিন দুনিয়াকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে বিদ্যুৎ আক্রমণ প্রতিহত হয়েছে আর “সােভিয়েটর মজুদ অস্ত্রসজ্জা এই এখনই শুধু পুরােপুরিভাবে বাড়তে শুরু করেছে।” এবার একটি বক্ততার কথা বলব যা রাশিয়ার বাইরে বড় একটা শােনা যায়নি। এটি স্টালিনের বক্তৃতা নয়—-এর লক্ষ্য হলেন স্টালিন। “প্রিয় জোসেফ ভিশারিয়ােননাভিচ ! আমরা লক্ষ্য করছি সমস্ত বিশ্বের পরে চরম সংকট আসন্ন । আমরা জানি ফ্যাশিস্টদের উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্ত পৃথিবীর সভ্যতাকে রক্তাক্ত ধ্বংসস্তুপে পরিণত করা, দুনিয়ার মানুষকে নিঃশেষ করা ও দাসত্ব বন্ধনে বাঁধা—ইতিহাসের মুখ পিছনে ফিরিয়ে দেওয়া আর মানব সংস্কৃতিকে দু পায়ে দলা। তুমি বলেছ মানুষই হচ্ছে সব থেকে দামী জিনিস। আমরাও আমাদের সমস্ত শক্তি নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রকে বাঁচাবার জন্য—ছােট বড় প্রত্যেক মানুষের জীবন ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়াই করছি। আমরা মানবধর্মী। আমরা আমাদের মানুষকে ঐশ্বর্য বলে মনে করি। দস্যদের পায়ের নীচে আমরা লক্ষ লক্ষ মুমূষু মানুষের আর্তনাদ শুনছি আর আমরা আমাদের হাতিয়ার ৪৯ ৪-(১৪) বিজ্ঞানকে আরাে আঁকড়ে ধরেছি। আমাদের ভাইবােনদের মৃত্যু, লাঞ্ছনা 'ও অপমান থেকে রক্ষা করবার জন্য বিজ্ঞান আমাদের দেশের অশেষ ধনসম্পদ উদঘাটিত করবে। প্রিয় জোসেফ ভিশারিয়ােনােভিচ । তােমার কাছে এই অলঙ্ঘ্য ও সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি জানাচ্ছি যে আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে আধুনিক প্রগতিশীল বিজ্ঞানের অসীম শক্তি প্রয়ােগ করব। শক্তি ক্রমাগত এগিয়ে চলে, কোনো বাধা মানে না, সমস্ত সীমানা ছাপিয়ে যায় ! বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির প্রচণ্ড শক্তির সাহায্যে আমরা ফ্যাশিস্ট পশুকে সম্পূর্ণ বিনাশ করব।” যে মানুষটি এই কথাগুলি বললেন তিনি হচ্ছেন এক বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক —ভলাডিমির কোমারভ। তিনি হচ্ছেন সােভিয়েটের বিজ্ঞান পরিষদের সভাপতি—অর্থাৎ সমগ্র সােভিয়েট বিজ্ঞানের নেতা। প্রথম প্রথম বােধহয় আপনারা মনে করেছিলেন যে আমি হয়ত সােভিয়েট ইউনিয়নে নূতন বিজ্ঞানের গুরুত্ব বাড়িয়ে বলছি। না, এ কথা সত্যই যে নববিজ্ঞান হচ্ছে রাশিয়ার মহাস্ত্র, বীর লাল ফৌজের ও সােভিয়েট গেরিলার অস্ত্র, হিটলারী কসাইদের হাত থেকে যারা বিশ্ব- সভ্যতাকে বাঁচাচ্ছে সেই সমগ্র রুশ জাতির হাতিয়ার। ডাঃ কোমারভের কথাগুলি আবার সময় নিয়ে পড়ুন। আমাদের দেশের কোনাে বৈজ্ঞানিক বা এঞ্জিনীয়ারকে কি আপনি ঐ ভাষায় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলতে শুনেছেন ? নিশ্চয়ই না। আমাদের বিজ্ঞানকে যে অনাথ বলে গণ্য করা হয়। আমাদের বিজ্ঞানীদের “মাথা ঠাণ্ডা রাখতে ও “প্রাত্যহিক জীবন থেকে দূরে থাকতে” উপদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সােভিয়েট ইউনিয়নে সমগ্র জাতি ও বৈজ্ঞানিক নরনারীর মধ্যে কোনাে পার্থক্য করা হয় না। পরিষদের সভ্য ডাঃ কেলার একটি প্রবন্ধ মারফৎ লেখককে ;

জানিয়েছেন “এ কথা বেশ জোরের সঙ্গেই বলা যায় যে আমাদের সমস্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো পৃথিবীতে এই প্রথম বৈজ্ঞানিক চিন্তার বিরাট পরিণতি ও স্বীকৃতির প্রতিনিধিত্ব করেছে।” কি করে এ সব হল আপনি বলবেন “আসল ব্যাপারটা কি জানা যাক। রাশিয়ায় বিজ্ঞানকে কিভাবে সংগঠিত করা হল ?” স্টালিন ও সােভিয়েট বিশেষজ্ঞরা যে বিস্তারিত পরিকল্পনা রচনা করেছিলেন তার প্রধান প্রধান কাজগুলি হল মােটামুটি এই (১) সােভিয়েটের প্রত্যেক নরনারী ও শিশুর মনে এই ধারণাটি গভীর ভাবে একে দেওয়া হল যে বিজ্ঞান হচ্ছে উন্নততর জীবন লাভের পক্ষে মানুষের হাতিয়ার। প্রমাণিত হল যে জনগণ ঐ বিজ্ঞান বুঝতে ও প্রয়ােগ করতে ভীষণ উৎসুক । (২) লক্ষ লক্ষ চাষী ও মজুরকে তাদের প্রাত্যহিক কাজের সমস্যাগুলি নিকটতম বিজ্ঞান কেন্দ্রে পাঠাতে অনুরােধ করা হল। বিজ্ঞান আর উন্নাসিক রইল না। (৩) দিনরাত্রি গবেষণাগারের কাজের জন্য অকাতরে অর্থব্যয় করা হল। বিজ্ঞানের অগ্রগতি ব্যাহত করার মত আমলাতান্ত্রিক গড়িমসি রইল না। (৪) এঞ্জিনীয়ররা সাগ্রহে প্রত্যেকটি গবেষণাগারের বিবরণী পাঠ করল ও অবিলম্বে সব থেকে যে সব প্রস্তাবের মধ্যে সম্ভাবনার বীজ নিহিত আছে সেগুলিকে নিয়ে কাজ আরম্ভ করল। (৫) এগুলি কার্যকরী হলেই সরকারী পরিকল্পনা কমিশন সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের ক্ষেত্রে এগুলির ব্যাপক প্রয়ােগের ব্যবস্থা করল ।

(৬) শুধু গবেষণা নয়, গভন মেন্টের পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক বিধিব্যবস্থার আরও অনেকটাই শিক্ষিত বৈজ্ঞানিকদের হাতে দেওয়া হল। (৭) শেষ পর্যন্ত চাষী মজুররাই নূতন আবিষ্কারকে যাচাই করতে লাগল কারণ তাদেরই কাজে লাগার জন্য আবিষ্কার! কাজের গতিকে শ্লথ করবার আগেই এইভাবে অবাস্তব ধারণাগুলিকে হটিয়ে ফেলা হল। (৮) জনকয়েক নয়, লক্ষ লক্ষ তরুণ ও বৃদ্ধ যােদ্ধারা যেমন করে লড়াই করতে শেখে তেমনি প্রাণপাত করে বিজ্ঞান শিক্ষা করতে লাগল। বিশ্ববিদ্যালয়ে যা সময় লাগে তার দশ ভাগের এক ভাগ সময়ে এ সব বিষয় আয়ত্ত করা হল। আমাদের দেশে বিশেষজ্ঞরা এখন প্রাণপণে চেষ্টা করছেন যুদ্ধের জন্য বিজ্ঞানকে সংগঠিত করতে ও তার কাজের গতিকে বাড়িয়ে তুলতে। সােভিয়েট ইউনিয়নে বিজ্ঞান বরাবরই ছিল যুদ্ধের জন্য তৈরী। সে যুদ্ধ দুঃখ কষ্ট, প্রাণপাত পরিশ্রমের বিরুদ্ধেও বটে আবার সমস্ত নরনারী ও শিশুর মানবজীবন যাপনের অধিকার সাব্যস্ত করার যুদ্ধও বটে। আপনার কি মনে হয় যে, আমি বাড়িয়ে বলছি ? তাহলে গত বছর সসাভিয়েট বৈজ্ঞানিকদের স্টালিন পুরস্কার প্রদান উপলক্ষে সমস্ত সােভিয়েট নরনারীর কাছে ডাঃ কেলারের বক্তৃতাটির কথা মনে করুন :- “জাতীয় ভিত্তিতে নূতন, উন্নত বিজ্ঞানের পর্যালােচনাই হল আসলে এই পুরস্কারের লক্ষ্য। একটি অভিনব ও প্রধান সামাজিক লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে—জনগণের মধ্যে থেকে অনেক নরনারী এগিয়ে আসছেন। জনসাধারণ এ দের চেনে—এদের প্রতি তাদের আস্থা আছে।...অর্থাৎ মােটর উপর সােভিয়েট ইউনিয়নে বৈজ্ঞানিকের ধরনই গেছে বদলে। বলা যেতে পারে জারের রাশিয়ায় বুদ্ধিজীবীরা ‘দার্শনিকের মত শুধু মস্তিষ্ক চালনা করে সমস্ত দুনিয়া ও তার জটিলতার রহস্য উদঘাটন করবার প্রয়াস করতেন—আর সােভিয়েট ইউনিয়নে আমাদের বিজ্ঞানীদের ডাক পড়েছে দুনিয়া বদলাবার কাজে কোমর বেঁধে লাগতে।” যুদ্ধ সীমান্তের আসল লড়াই ছেড়ে এবার কিছুক্ষণের জন্য ফ্রন্টের পিছনকার জীবনের দিকে নজর দেওয়া যাক।

বিজ্ঞানের হাসপাতাল গড়া কয়েক বছর আগে জনকয়েক ইংরেজ ডাক্তার মস্কোর এক হাসপাতাল দেখতে যান। তারা লণ্ডনে ফিরে খুব উৎসাহের সঙ্গে কি দেখেছেন তার বিবরণ দিতে থাকেন। কেউ কিন্তু তাতে কান দিল না। যারা বর্ণনা পড়ল তারা বলল “আরো এক দফা রুশ প্রচার।” এবার আসল ব্যাপার প্রকাশ হচ্ছে। বৃটিশ ও মার্কিন সামরিক চিকিৎসকদের ঐ হাসপাতাল দেখানাে হয়েছে। এবারকার বিবরণীগুলি মনােযােগের সঙ্গে আলােচিত হচ্ছে কারণ সর্বত্রই চিকিৎসা- বিজ্ঞানীরা বুঝতে শুরু করেছেন যে বিজ্ঞানের এক অঙ্গ, এই ভেষজ- বিদ্যা সােভিয়েট ইউনিয়নে আশ্চর্য রকম এগিয়ে গেছে। এ কথা বুঝবার জন্য ডাক্তার হবার প্রয়ােজন নেই। আপনি যদি ঐ হাসপাতাল দেখতেন তবে সঙ্গে সঙ্গেই আপনিও ধরতে পারতেন রুশ চিকিৎসাবিদ্যায় কি ঘটেছে। কিন্তু মস্কোয় যাবার আমাদের সুবিধা নেই। তাই এ ছাড়া সব থেকে ভালাে পন্থা হিসাবে আমরা একটা কাল্পনিক ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে পারি। মস্কো কেন্দ্রীয় এমারজেন্সি’ হাসপাতালের বাড়ীটা চমৎকার। দেখলে হাসপাতালের চেয়ে প্রাসাদ বলেই ভুল হয়। এর গঠন অন্য রকম হলেও চলত কারণ এই ধরনের হাসপাতালের চেহারা দুনিয়ায় আর কোথাও নেই। এর নামেই প্রমাণ যে এর নামেই প্রমাণ যে এই হাসপাতালে শুধু অতি প্রয়ােজনীয় ব্যাপারেরই ব্যবস্থা হয়। হঠাৎ দুর্ঘটনায় আহত অথবা হঠাৎ রােগাক্রান্ত মানুষেরই এখানে চিকিৎসা হয়।

এই ধরনের রােগীর জন্য বিশেষ হাসপাতালের কি প্রয়ােজন ? রাশিয়ার ডাক্তারের এই উত্তর দেন—“আকস্মিকতার ক্ষেত্রে মানুষের জীবন 'অনেক সময় কয়েক মিনিট, এমন কি কয়েক সেকেণ্ডের এদিক ওদিকের পরে নির্ভর করে। সে ক্ষেত্রে জীবন রক্ষার অর্থ—ঠিক কি কর্তব্য সে সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান, কর্তব্য পালনের উপযােগী সরঞ্জাম হাতের কাছে থাকা আর তাড়াতাড়ি কাজটা সেরে ফেলা। “এমারজেন্সি ওয়ার্ড” থাকলেও সাধারণ হাসপাতাল যথেষ্ট নয়। আমরা একেবারে গােড়া থেকে অর্থাৎ দুর্ঘটনার কারণ থেকে শুরু করেছি আর তার ভিত্তিতেই নূতন চিকিৎসার সংগঠন গড়ে তুলেছি।” ধরুন আপনি মস্কোর কোনাে সাংঘাতিক দুর্ঘটনার সাক্ষী। রাস্তার একটি গাড়ীর সামনে এসে পড়েছেন ধরুন কোনাে বৃদ্ধা। আপনি হয়ত সামনের কোনাে ওষুধের দোকানে দৌড়ে গিয়ে টেলিফোন ধরলেন। আপনি মস্কোতে যার কাছেই খবর দিতে যান না কেন—সে পুলিশ, ডাক্তার বা হাসপাতাল যাই হােক—টেলিফোন পরিচালক আপনাকে সঙ্গে সঙ্গে মস্কো এমারজেন্সি হাসপাতালের লাইন দেবে। সেখানকার টেলিফোন পরিচালিকা মন দিয়ে সব কথা শােনেন। তিনি গলার স্বর থেকে মানুষের মন বােঝার ব্যাপারে বিশেষ শিক্ষা প্রাপ্ত। আপনার কথা বলার ভঙ্গী থেকে তিনি তখনই বুঝতে পারেন যে সত্যই একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, হয়ত বেশ খারাপ রকম দুর্ঘটনাই । আপনাকে বাধা না দিয়ে তিনি একটি সুইচ টেপেন । দু তলা নীচে হাসপাতালের পিছনে রাস্তার উপরকার গ্যারাজে লাল আলাে দপ্ করে জ্বলে ওঠে আর ঘণ্টা বাজে। মস্ত লম্বা সারির থেকে একটি দ্রুতগামী এ্যাম্বুলেন্স গাড়ীর চালক মােটর স্টার্ট করেন। বিশ্রাম কামরা থেকে দুজন ডাক্তার দৌড়ে আসেন এ্যাম্বুলেন্সের দিকে। দশ সেকেন্ড পরে টেলিফোন পরিচালিকা দুর্ঘটনা কোথায় হয়েছে তার ঠিকানা জেনে রেডিও মারফৎ এ্যাম্বুলেন্সকে জানায় আর গাড়ী চলতে শুরু বৈদ্যুতিক ঘড়ির কাটায় সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হয়। হাসপাতালের নিয়মে টেলিফোনের ডাক ও এ্যাম্বুলেন্সের প্রস্থানের মধ্যে দু মিনিটের বেশী সময় লাগতে পারে না। এর বেশী লাগলে তাই নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়। একটি এ্যাম্বুলেন্স বেরিয়ে গেলে আর একটি তার জায়গা নেয় আর আরাে দুজন ডাক্তার পরের ডাকের জন্য প্রস্তুত হন। মস্কোর কেন্দ্রীয় এমারজেন্সি হাসপাতাল এক আশ্চর্য ব্যাপার । মন্ত্র হচ্ছে : “প্রাণরক্ষা ও যন্ত্রণা উপশম।” এই হাসপাতালে আছে ৭০০ বে। ১০০ জন ডাক্তার সব সময়ে কাজের জন্য প্রস্তুত থাকেন আর সমসংখ্যক ডাক্তার থাকেন ‘রিজাভে। এই সব নিয়ে কেন্দ্রীয় হাসপাতাল শান্তির সময়েও বছরে ৬০,০০০ টি আকস্মিক দুর্ঘটনার চিকিৎসা করে। এই বিপুলসংখ্যক দুর্ঘটনার সঙ্গে তাল রাখবার জন্য মস্কো হাসপাতালকে অভ্রান্ত সন্ধানীদের চেয়েও তাড়াতাড়ি কাজ করবার উপযােগী করে সংগঠিত করতে হয়েছে। টেলিফোন পরিচালিকা ও এ্যাম্বুলেন্সচালক নিয়েই এ সংগঠনের আরম্ভ। মস্কোর প্রত্যেক পাড়া ও রাস্তা এদের নখদর্পণে। পাঁচটি এ্যাম্বুলেন্স কেন্দ্র আছে একটি হাসপাতালে আর চারটি মস্ত শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায়। ক্ষিপ্র কাজ করা প্রয়ােজনীয় বলে বহু গাড়ীর ব্যবস্থা আছে আর টেলিফোন পরিচালিকা সুইচ মারফৎ দুর্ঘটনার নিকটতম কেন্দ্রে সংকেত পাঠায়। এ্যাম্বুলেন্স চলে যাবার পর কেন্দ্রীয় হাসপাতালের টেলিফোন পরিচালিকা যিনি ফোন করছিলেন তার কাছ থেকে আরাে বিবরণ পেতে চেষ্টা ।

করেন। রেডিও মারফং এ সব খবর যে ডাক্তাররা ‘কলে’ গেছেন তাদের জানানো হয়। তারপর ‘অপারেশন’ ঘরেও খবর দেওয়া হয় যাতে রােগী যখন পৌঁছয় তখন যেন যে ডাক্তার ও যন্ত্রপাতির দরকার তা তৈরী থাকে। মস্কো হাসপাতালে ‘হাত পাকানাের সুবিধা নেই। কর্মচারীর তালিকায় নাম তুলতে হলে ডাক্তারকে দশ বৎসর কোনাে বিষয়ে বিশেষ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। ধারণা হল এই যে আকস্মিকতার সঙ্গে যুঝতে হলে সব থেকে বেশী দক্ষতার প্রয়ােজন। মস্তিষ্কের অস্ত্র-চিকিৎসক, স্নায়ুবিশারদ, অস্থিবিশেষজ্ঞ, আভ্যন্তরীণ রােগ-চিকিৎসক, রােগ-নির্ণয়বিদ সবারই প্রাণরক্ষার জন্য চব্বিশ ঘণ্টা কাজ। বৃটিশ সামরিক অস্ত্র- চিকিৎসকদের মতে এই হাসপাতালের সরঞ্জাম শুধু আকস্মিক দুর্ঘটনার পক্ষে নয়, দুর্ঘটনাসংক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাময় করবার জন্য পরে জটিল অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার পক্ষেও অপর্যাপ্ত ও অতুলনীয়। এই হাসপাতালেই চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সােভিয়েটের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। রক্ত দেবার সুপরিচিত ব্যাপারটাই ধরা যাক। সমস্ত দুনিয়ায় হাসপাতাল বা যুদ্ধক্ষেত্রের কাজের সুবিধার জন্য মানুষের রক্ত জমিয়ে বা শুকিয়ে রাখা হয়। আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা বেশ সাম্প্রতিকই বলা চলে। রাশিয়ায় বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এর সূত্রপাত। সম্পর্কিত গবেষণার ক্ষেত্রে মস্কো হচ্ছে সর্বদিসম্মত প্রধান কেন্দ্র। অন্যান্য দেশকে এদিকে সে বহু পিছনে ফেলেছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ, একটি সাংঘাতিক রকম রক্তস্রাবী দুর্ঘটনাক্রান্ত ব্যক্তিকে কেন্দ্রীয় এমারজেন্সি হাসপাতালে তাড়াতাড়ি নিয়ে গেলে তাকে জীবিত লােক থেকে নেওয়া জমানাে রক্ত না দিয়ে সােজাসুজি মৃত ব্যক্তির দেওয়া হতে পারে। ধরুন এমন একজন লােকের রক্ত যিনি আগেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। এই বিস্ময়কর নতুন কৌশল আজ অসংখ্য রুশ জীবন রক্ষা করছে। পদ্ধতিটি মস্কো কেন্দ্রীয় হাসপাতালে পরীক্ষা করা হয়। দেখা গেল কোনাে কোনাে মৃত্যুর ক্ষেত্রে রক্ত অন্যান্য রক্তের চেয়েও অনেক বেশী নিরাপদ ও অন্যের দেহে দেবার উপযুক্ত। যখন কোনাে লােক কোনো যন্ত্রণা ভােগ না করে মূহুর্ত মধ্যে মারা যায় তখন তার দেহ থেকে উপযুক্ত উপায়ে রক্ত নিলে একটা আশ্চর্য ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়। যে কোনাে রকমের মৃত্যুর মতই প্রথমে রক্ত জমে যায় কিন্তু শীঘ্রই আবার তা তরল হয়ে যায়। আর কোনাে রাসায়নিক পদার্থ না মেশালেও সেটি তরল থেকে যায়। এই জন্য ও আরো অনেক কারণে অন্য দেহে যােগান দেবার পক্ষে এবং রুগ্ন বা আহত ব্যক্তির নিরাময়ের জন্য মৃত ব্যক্তির রক্তই সব থেকে ভালাে । রুশ ডাক্তারেরা ফ্রন্টে এই প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন। কি ভাবে তা হচ্ছে সে হল সামরিক গুপ্ত খবর। বৃটিশ ও মার্কিন চিকিৎসকদের কাছে পন্থটি প্রকাশ করা হয়েছে। যা দেখেছেন তাই নিয়ে তারা খুবই আগ্রহশীল। যারা মারা গেছেন তাদেরই সাহায্যে মুমূষু নরনারীকে যমের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে যে বীরেরা প্রাণ দিচ্ছেন তারাই অন্য নবজীবনপ্রাপ্ত মানুষের দেহে পুনর্জীবন লাভ করেছেন। নিশ্চয়ই এর চেয়ে বীরত্বমণ্ডিত অমরত্বের কথা কেউ কখনাে ভাবতে পারেনি। কেন্দ্রীয় হাসপাতালের বিশেষজ্ঞেরা যুদ্ধসংক্রান্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বহু গুরুত্বপূর্ণ পথ দেখিয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসার বৈপ্লবিক উপায়টির কথাই ধরুন। সবেরই সূত্রপাত কেন্দ্রীয় হাসপাতালে। পরীক্ষায় প্রমাণ হল যে সাংঘাতিক বৈদ্যুতিক শকের’ রােগীকে যথাসম্ভব কম নড়াচড়া করা উচিত। এ্যাম্বুলেন্স কারিগরেরা অমনি লাগল কাজে। আর অদ্ভুত চাপ লাগানাে এক রকম ‘চোর’ বানালো যাতে রােগী যেখানেই থাকুক না কেন তাকে আলগা করে বেঁধে আস্তে তুলে নিতে পারে। সামরিক চিকিৎসকেরা যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে কারখানামুখখা দৌড়লেন। সেখানে তৈরী হল। উদ্ধার করার ট্যাঙ্ক। এই আশ্চর্য এ্যাম্বুলেন্স প্রচণ্ড যুদ্ধের মধ্যে অনায়াসে ঢােকে, আহত মানুষের ঠিক উপর দিয়ে গড়িয়ে যায় ( চাকার মত কলে তাকে বেঁধে ফেলে ), যন্ত্রের পেটের কাছে একটা লুকোনাে দরজা খুলে সৈন্থটিকে নিরাপদ জায়গায় তুলে নিয়ে যায়। ইতিমধ্যে ভারী ভারী অস্ত্রসজ্জা ডাক্তার, নার্স প্রভৃতি উদ্ধারকারীরা ভিতরের আহত ব্যক্তিকে রক্ষা করতে থাকে। আপনার আমার হয়ত কখনাে মস্কো কেন্দ্রীয় হাসপাতালের “বৈদ্যুতিক শক রােগীর স্ট্রেচার” না লাগতে পারে। কিন্তু আর একটি আবিষ্কার আমাদের সকলের পক্ষেই অত্যন্ত জরুরী। এটি হল অস্ত্রোপচারকে যন্ত্রণামুক্ত করবার নূতন এক পদ্ধতি। কোনাে কোনাে বৃটিশ বিশেষজ্ঞরা অস্ত্রচিকিৎসার ক্ষেত্রে ক্লোরোফর্মের পরে একেই সব থেকে বড় আবিষ্কার বলে মনে করেন। আপনাকে কখনাে স্থানীয় ‘এ্যানেসথেটিক ব্যবহার করতে হয়েছে কি ? যেমন ধরুন দন্তচিকিৎসক দাত তুলবার আগে যে প্রক্রিয়ায় জায়গাটা অসাড় করে নেন বা নাকের উপর যখন ছােটখাটো অস্ত্রোপচার হয়। ১৯৪০ সালে বিখ্যাত সােভিয়েট অস্ত্রচিকিৎসক ভিনেভস্কি এই সুপরিচিত এ্যানেসথেসিয়া’ গুরুতর ক্ষেত্রেও প্রয়ােগ করার সূত্রপাত করলেন। তার কৌশলটা হল নূতন ধরনের। তিনি চামড়ার তলায় খুব কম মাত্রায় নােভােকেন ও পিরকেন ইনজেকশান করতে লাগলেন। যতই মাংস অসাড় হতে লাগল ততই ইনজেকশনের উঁচটা আরাে ভিতরে ঢুকিয়ে অল্প অল্প মাত্রায় অনেকখানি ইজেশান দিয়ে ভিনেভস্কি দেখলেন যে বেশ অনেকটা জায়গা অসাড় করে ফেলা যায়। ছুঁচের মুখের চারিদিকে এই আরামপ্রদ ওষুধের কাজ হতে থাকে। ভিসূনেভস্কির প্রক্রিয়ায় কোন যন্ত্রণা নেই। দু মিনিটের মধ্যেও এতে অসহ্য যন্ত্রণাদায়ক দুর্ঘটনার রােগীও আরাম পায় । বমনের ইচ্ছা বা হৃৎপিণ্ডের দুর্বলতা প্রভৃতি পরবর্তী উপসর্গও এতে নেই। সব থেকে বড় কথা অস্ত্রোপচারের পরে অনেক সময়ই যে স্নায়বিক আঘাত সম্ভবতই ঘটে তা এতে অনেকখানি কমে যায়। গত বছর সােভিয়েট রসায়নবিদরা ভিনেভস্কিকে ‘সভকেন’ নামে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি নৃতন ওষুধ দিয়েছিল। এর এক ফোটা ১০,০০০ ফোটা জলের সঙ্গে মেশালেও এতে কাজ হয় । কোনাে ক্ষতি না করে একজন মানুষকে কয়েক পাঁইট এই জিনিস ইজেশন দেওয়া যায়। জায়গাটা অসাড় থাকে চার থেকে ছ ঘণ্টা। ভিনেস্কি পন্থা এত আশ্চর্য রকম সাফল্যলাভ করল যে এখন এটি মস্কো কেন্দ্রীয় হাসপাতালে হাড় ভাঙা, হাড় কেটে বাদ দেয়া, পেটে অস্ত্রোপচার, ক্যানসার প্রভৃতির ক্ষেত্রে প্রয়ােগ করা হয়। যখন কোনাে অঙ্গ বাদ দেবার দরকার হয় সভকেন দিনের পর দিন জায়গাটাকে অসাড় রাখে যতক্ষণ না পর্যন্ত ক্ষতটা বেশ সেরে আসে। যুদ্ধে আহতদের পক্ষে ভিনেভস্কির পন্থা আশ্চর্য । ফিনল্যাণ্ড অভিযানের যে লড়াই নিয়ে বহু ভুল বােঝাবুঝি হয়েছিল তাতেই সভকেন দ্রুত যন্ত্রণার উপশম ঘটিয়েছিল অথচ তার ফলে সৈন্যরা অসুস্থ বা অসহায় হয়ে পড়েনি। একই রকম অবস্থায় যখন সাধারণ ‘এ্যানেসথেসিয়ার পাশাপাশি } এর পরীক্ষা হল তখন দেখা গেল যে ভিনেভস্কি প্রক্রিয়ায় ক্ষত থেকে মৃত্যুর হার শতকরা ৪০ ভাগ কমে গেছে। মিত্রশক্তিপুঞ্জের চিকিৎসকেরা যে এই সােভিয়েট পন্থা কাজে লাগাতে উৎসুক এ কথা বলাই বাহুল্য। সম্প্রতি রাষ্ট্রদূত মায়েস্কি ও লর্ড হর্ডার ঠিক এই ধরনের সহযােগিতার জন্যই ইঙ্গ-সােভিয়েট মেডিক্যাল কমিটি গঠনে তৎপর হয়েছিলেন। কমিটি যাতে ভালােভাবে কাজ করতে পারে তার জন্য মায়েস্কি এই উদ্বোধনী বক্তৃতা দিয়ে চিকিৎসকদের অবাক করে দেন : “আপনারা না জানতে পারেন যে চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে আমার আজীবন কৌতূহল আছে।” এর পর তিনি হেসে বলেন : “আমার পিতার গবেষণাগারে যখন থেকে গিনি-পিগদের খাওয়ানাে ও পরিষ্কার রাখার ভার আমার উপরে ছিল তখন থেকেই।” বিখ্যাত ইংরেজ অস্ত্রচিকিৎসক, রঙ্কো ক্লার্ক অত্যন্ত আন্তরিকভাবে বললেন : “ইতিহাসের গতিই বৃটেন ও সােভিয়েট ইউনিয়নের জনসাধারণের মধ্যে যে অবিশ্বাসের পর্দা ছিল তা বহুলাংশে অপসারিত করেছে আর আমাদের বুঝতে শিখিয়েছে এমন কোনাে কোনাে জিনিস, বা রক্ষার জন্য সােভিয়েটের মানুষ প্রাণপাত করছে।” “কেন্দ্রীয় এমারজেন্সি হাসপাতালে” যা কিছু আশ্চর্য অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে সবারই ফিরিস্তি এখানে দেওয়া সম্ভব নয়। একটি আধুনিকতম উন্নতি ঘটেছে মাতৃত্ববিদ্যা সম্পর্কে। কেন্দ্রীয় হাসপাতালে একটি “এমারজেন্সি” মাতৃত্ব বিভাগ আছে। এর কাজ আকস্মিক ও কষ্টকর প্রসবের সম্পর্কে। এখানেই সােভিয়েট চিকিৎসকেরা জরায়ুর রক্ত কাজে লাগাবার পন্থা অবিষ্কার করেন। এতদিন প্রসবের পর মাতৃদেহ এই খাঁটি ও প্রয়ােজনীয় রক্ত থেকে বঞ্চিত হত। এখন সােভিয়েট ইউনিয়নের সর্বত্র এই জরায়ুর রক্ত বাঁচানাে হয়। অন্য দেহে চালান দিয়ে প্রাণরক্ষার সাহায্য হয়। মৃত ব্যক্তির রক্ত ব্যবহার সম্পর্কে কি বলা হয়েছিল মনে আছে তাে? কাজেই এ কথা আক্ষরিক সত্য যে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সােভিয়েট চিকিৎসাবিজ্ঞান মূল্যবান মনুষ্যজীবন রক্ষা করে। সম্প্রতি সােভিয়েটে রক্ত সম্পর্কিত গবেষণা একটা আশ্চর্য রকম মােড় নিয়েছে। আপনারা জানেন নানা ধরনের রক্ত আছে। সােজাসুজি এক দেহ থেকে অন্য দেহে রক্ত চালান করতে হলে যিনি দিচ্ছেন তার রক্ত রােগীর রক্তের সমপর্যায়ের হওয়া চাই। বিভিন্ন ধরনের রক্তমিশ্রণ বিপদজনক। কিন্তু এ সমস্যা নিয়ে গবেষণা করতে করতে ডাঃ স্পশু- কুকোস্কি আবিষ্কার করেন যে খুব স্বল্পমাত্রায় ( দু তিন চামচ) বিভিন্ন পর্যায়ের রক্ত কোনাে কোনো রক্তদোষের ব্যারামে দেওয়া চলতে পারে। এরই সূত্র ধরে ডাঃ ব্যাগডাসাবােভ গুরুতর পাকস্থলী ক্ষত রােগীর চিকিৎসা আরম্ভ করেন। পরে তিনি ছাগলের রক্ত ব্যবহারেরও চেষ্টা করেন! ৩০০ ক্ষেত্রে এতে আশ্চর্য ফল পাওয়া গেল। যন্ত্রণা, রক্তপাত ও অন্যান্য উপসর্গ সম্পূর্ণ দূর হল ও ক্ষতও একেবারে সেরে গেল । চর্মক্ষত নিয়েও এ ধরনের কাজ চলছে। হাসপাতাল বা ডাক্তারদের সম্পর্কে কোনাে সিনেমা দেখে থাকলে আপনার নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন অস্ত্রোপচারের আগে অস্ত্রচিকিৎসকেরা কত সযত্নে তাদের সমস্ত হাত ধুয়ে নেন। এর উদ্দেশ্য বীজাণু দূর করা। এইভাবে রােগীর কাপড়জামা ভােয়ালে ও একটা উনুনের মত জিনিস কয়েক ঘণ্টা রেখে সম্পূর্ণভাবে বীজাণুমুক্ত করতে হয়। অস্ত্রচিকিৎসার যন্ত্রপাতি সম্পর্কেও এ কথা খাটে। অবশ্য যথেষ্ট সরঞ্জামওয়ালা হাসপাতালে এ সব করা শক্ত নয় কারণ সেখানে যথেষ্ট সময় পাওয়া যায়। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে কি হয় ? খুব সাংঘাতিক দুর্ঘটনার সময়ই বা কি হয় ? সেখানে হাত ধােয়া বা জীবাণুমুক্তি প্রক্রিয়ায় কালক্ষেপ করার চেয়ে ডাক্তাররা বরঞ্চ রােগীর ছোয়া লাগার আশঙ্কারে সম্মুখীন হন। মস্কো কেন্দ্রীয় হাসপাতালের ডাঃ এ, এস, ড্যাভলেটভকে এ ধরনের ব্যাপার সন্তুষ্ট করতে পারল না। তিনি চাইলেন দ্রুত বীজাণু নষ্ট করবার শক্তি আয়ত্ত করতে। বহুদিন ধরে এ সমস্যা নিয়ে নাড়াচাড়া করে সবশেষে তিনি এক মামুলী রাসায়নিক পদার্থ—হাইড্রোক্লোরিক এসিড নিয়ে পরীক্ষা করেন। প্রথমে তিনি একটি নােংরা বীজাণুভর জলের মত জিনিসে হাত ডােবালেন, তার পরে ফের আবার ডােবালেন স্বল্পমাত্রার এসিডে। তিন মিনিট পরে কোনো পােয় পোঁছা না করেও চামড়ার উপর একটাও বীজাণ পাওয়া গেল না। বিশ মিনিটে এসিড যন্ত্রপাতিকে বীজাণুমুক্ত করল। এই আবিষ্কারটি নিয়ে সযত্নে পরীক্ষা চালানাে হয়। এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয় রাশিয়ার শহরে হাসপাতালগুলিতেও এর ব্যবহার চলছে। অস্ত্রোপচার ব্যাপারটা এতে অনেক সহজ হয়ে গেছে। দু কারণে আমি ড্যাভলেটভের এই আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করছি। এতে আমাদের দেশের যােদ্ধাদের ও প্রাণ রক্ষার সাহায্য হতে পারে। আর এ থেকে সোভিয়েট বৈজ্ঞানিক গবেষণার একটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সে বৈশিষ্ট্য হল সহজের সন্ধান। বারবার আপনারা দেখতে পাবেন যে সােভিয়েট বিজ্ঞানীরা জটিল ও বহু খরচের পন্থা থেকে সরে এসে সহজ ও সস্তা উপায়ের খোঁজ করতে করতে মস্ত বড় আবিষ্কার করেছেন। কেন ? রাশিয়ায় কি ওরা পয়সা বাঁচাচ্ছে ? ড্যাভ লেটভের বীজাণু-মুক্তির প্রক্রিয়াটাই ধরুন। এতে প্রায় } কোনাে যন্ত্রপাতিই লাগে না। আজকাল আমাদের হাসপাতালে বীজাণ- মুক্তির যন্ত্রপাতির জন্য হাজার হাজার ডলার খরচ হয়। বড় বড় কোম্পানিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণার লক্ষ্য হল সাধারণত হাসপাতাল, আফিল, কারখানা ও সৈন্যবাহিনীর জিনিসপত্রের দাম বাড়ানাে কারণ দর যত চড়বে কোম্পানির মুনাফাও তত ফেঁপে উঠবে। কাজেই আমরা দেখতে পাই যে আমাদের হাসপাতাল, আফিস, কারখানা। ও সৈন্যবাহিনীতে উত্তরােত্তর জটিল ও দামী সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে। বলা হয় যে ঐ সব জিনিস সহজ জিনিসের চেয়ে বেশী বৈজ্ঞানিক কিন্তু এ কথা ঠিক হবেই এমন কোনো কথা নেই। চিরদিনই বিজ্ঞানের অন্যতম ধ্রুব লক্ষ্য হচ্ছে জিনিসকে সহজ করা। সােভিয়েট ইউনিয়নে এই উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে সবাই বুঝেছে। সেখানে বৈজ্ঞানিকরা মােটা মুনাফালােভী বড় বড় কোম্পানির জন্যে কাজ করে না। সােভিয়েট বিজ্ঞানীরা কাজ করেন সমগ্র জাতির জন্য। কাজেই তারা চান যাতে বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলি প্রত্যেক নরনারী ও শিশুর কাছে গিয়ে পৌঁছয়। তাই তারা সর্বদাই সােজা জিনিস ও কম দামের জন্য চেষ্টা করেন। ড্যাভলেটভের বীজাণ-মুক্তি পদ্ধতির ক্ষেত্রে এই চিকিৎসকের লক্ষ্য ছিল মানুষের প্রাণ, বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের প্রাণ বাঁচাননা। কোনো টাকাওয়ালা শিল্পপতির নজর জটিল যন্ত্রপাতির দিকে ফেরানাে তার উদ্দেশ্য ছিল না। তার পদ্ধতি এত সহজ যে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনভিজ্ঞ হয়েও এর মর্ম বুঝতে পারে—যুদ্ধের সময় আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার বেলায় বা শান্তির সময়ে কৃষিক্ষেত্রে কোনাে দুর্ঘটনার সময় এ পদ্ধতি প্রয়ােগ করতে পারে। এই ধরনের উন্নতির ফলে লাল ফৌজের চিকিৎসা বিভাগ আজ বলতে ৬৪ পারে যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অনুপাতে এ যুদ্ধে পেটে আঘাত লাগার জন্য মৃত্যু শতকরা ৩০ ভাগ—মাথা, চোয়াল ও বুকের আঘাতজনিত মৃত্যু শতকরা ৫০ ভাগ ও মেরুদণ্ডের আঘাতের ফলে মৃত্যু শতকরা ৮০ ভাগ কমেছে। চোয়াল আড়ষ্ট হওয়ায় বা বিষাক্ত পচা ক্ষতের রােগী আজকাল প্রায় পাওয়াই যায় না। আগেকার যুদ্ধের এই দুই ছিল সব থেকে ভয়াবহ সংক্রামক ব্যাধিদের অন্যতম। আর ভিতরকার বিস্তৃত খবর সামরিক কারণে গােপন রাখা হলেও এ কথা জানা যায় যে সােভিয়েট ডাক্তারদের মুঠোয় আছে য়ুরােপের সব থেকে ভয়াবহ ব্যাধি টাইফাসের প্রতিষেধক ব্যাপকভাবে তৈরী করার কৌশল। মস্কো এমারজেন্সি হাসপাতাল ছাড়বার আগে আরো একজন ডাক্তারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হওয়া দরকার। এর নাম ফিলাটভ। হয়ত এর ছবি আপনার। কাগজে দেখেছেন। রাশিয়া আমাদের মিত্রশক্তি বলে গণ্য হবার পর ফিলাটভ হঠাৎ সারা জগতে বিখ্যাত হয়ে পড়েছেন। তার ক্ষমতা অলােকসামান্য। এই অস্ত্র-চিকিৎসক এমন সব কাজ করছেন যা কেউ কখনো সম্ভব বলে ভাবতে পারেনি। যেমন তিনি অন্ধকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিচ্ছেন। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে রাশিয়ায় কেমন করে মৃত ব্যক্তির রক্ত দিয়ে মুমূর্ষকে বাঁচানাে হয়। ডাঃ ফিলাটভ চোখ নিয়েও তাই করেন। তিনি মৃত ব্যক্তির দেহ থেকে চোখ তুলে নিয়ে জীবন্ত লােকের দেহে বসিয়ে দেন আর তারা চক্ষুষ্মন্ হয়ে ওঠে। ( এখন পর্যন্ত এ ধরনের অস্ত্রোপচার কয়েকটি বিশেষ ধরনের অন্ধতার ক্ষেত্রেই প্রযােজ্য। এ সম্পর্কে আরাে খবর পেতে হলে ডন সােশাইটি, সান ফ্রান্সসিসকো, ক্যালিফোর্ণিয়াতে চিঠি লিখতে পারেন। সেখানকার ডাক্তারেরা ফিলাটভ পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচার করছেন। ৫-(১৪) ডাঃ ফিলাটভ চিকিৎসা জগতে “ণতত্ত্ববিদ” হিসাবে বিখ্যাত। পশুরা ভূমিষ্ঠ হবার আগে গর্ভের ভিতরে কি ভাবে বেড়ে ওঠে সে সম্বন্ধে সম্ভবত তিনি পৃথিবীর সব থেকে বড় পণ্ডিত। তিনি বিশ্বাস করেন চোখের মতই মানুষের দেহের অনেক অংশ এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত করা সম্ভব। তারই এক ছাত্র, ডাঃ ওকুনেভ দাত নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ করে ফেলেছেন। তিনি ছোটদের ‘াত’ জমিয়ে রেখে বড়দের চোয়ালে তা বসিয়ে দেন। সেখানে তুলে ফেলা সঁতের জায়গায় এই নতুন দাত বেড়ে উঠতে থাকে। বাঁধানাে মরা দাঁতের বদলে আপনি পান জীবন্ত দাত । ফিলাটভ মৃত সৈনিকের দেহ থেকে জীবন্ত আহত মানুষের দেহে স্নায়ু, লাগাবার উপযােগী অস্ত্রোপচারের কথা হালে ঘােষণা করেছেন। কাজেই তিনি এমন সব মানুষকে প্রাণ দিচ্ছেন যারা আগে হয় মারা যেত নয়তো অসহায় পঙ্গু জীবন যাপন করত। এই সব অস্ত্রোপচার দেখে বৃটিশ ও মার্কিন সামরিক অস্ত্রচিকিৎসকেরা ফিলাটভ পদ্ধতির সরলতায় আশ্চর্য হয়ে গেছেন শােনা যায়। পৃথিবীর সর্বত্র লক্ষ লক্ষ যন্ত্রণাপীড়িত মানুষের মনে এই আবিষ্কার নূতন আশার সঞ্চার করেছে। এইবার মস্কো এমারজেন্সি হাসপাতাল থেকে বিদায় নেওয়া যাক। হয়ত কিছুক্ষণ ধরে আপনার একটি প্রশ্ন করতে চাইছেন “এই আশ্চর্য জায়গায় যখন কাউকে তাড়াহুড়াে করে নিয়ে যাওয়া হয় তখন এই পুঙ্খানুপুঙ্খ চিকিৎসার খরচ যােগায় কে ?” রােগী যােগায় না—যােগায় সমগ্র জাতি ! এরই নাম “চিকিৎসার সামাজিকতাসাধন” বা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা।” রাশিয়ার বাইরে বহু চিকিৎসক এই ব্যবস্থার ঘােরতর বিরােধী। সম্প্রতি মস্কো কেন্দ্রীয় হাসপাতাল পরিদর্শন করতে গিয়ে জনৈক ইংরেজ সামরিক অস্ত্রচিকিৎসক সেখানকার ডাক্তারদের কাছে নিজের মত ব্যক্ত করেন। তারা কিন্তু এর কথার মানে বুঝতে পারলেন না। একজন রুশ ডাক্তার বললেন “এ ধনতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রের প্রশ্ন নয় ! ডাক্তার, বলুন তো লণ্ডনে যখন আগুন লাগে তখন কি অগ্নিনির্বাপক বিভাগ যার বাড়ী পুড়ল তার কাছে খরচের বিল পাঠিয়ে দেয় ? “নিশ্চয়ই না।” “তবে সেই লােকের যখন অসুখ করে বা দুর্ঘটনা ঘটে তখনই বা তাকে টাকা খসাতে হবে কেন ? আগুন নেভানােতে যদি সবার স্বার্থ জড়িত থাকে তবে মানুষ যাতে সুস্থ থাকে তার প্রতি নজর রাখার সঙ্গেও প্রত্যেকের স্বার্থ জড়ানাে আছে। বরঞ্চ বেশী আছে, কারণ আপনি আবার বাড়ী তুলতে পারেন কিন্তু কবর থেকে আর মানুষকে জিয়ােনা যায় না। এর মধ্যে রাজনীতির নামগন্ধও নেই—এ হল সাধারণবুদ্ধির কথা !” রাশিয়ায় ওরা আরো অনেক দূর অবধি গেছে। কোনাে রােগী সেখানে পয়সা খরচ করে না। চাইলেও সে খরচ করতে পারে না। এটি হল একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ব্যাঙ্কে কত পুঁজি আছে সে হিসাব বাদ দিয়ে প্রত্যেক নরনারী ও শিশুর সামনেই সর্বোৎকৃষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থার দরজা খােলা আছে। রােগীর প্রয়ােজন অনুসারে অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা, নার্স, হাসপাতালের জায়গা পাবার অধিকার, চিকিৎসা, পথ্য ও সব রকম সেবাযত্ন সরবরাহ করা হয়। এ সব বিক্রীর সামগ্রী নয়। যদি কেউ এ সব কিনবার চেষ্টা করে তাে তাকে কিঞ্চিৎ :অপ্রকৃতিস্থ বলে গণ্য করা হয়। করা হয়। কারণ একটা মানুষের জীবন কিনবার সামর্থ আছে কার? রাশিয়ায় স্বাস্থ্যের সমস্যা হল এতই সহজ।

অজ্ঞান থেকে বিজ্ঞানের পথে জারের আমলে রুশ সৈন্যবাহিনী ছিল জনসাধারণের ঘৃণা ও ভয়ের পাত্র। বাধ্যতামূলক সামরিক কর্তব্য পালনের ব্যবস্থা বহু বছরের মত শ্রেষ্ঠ রুশ তরুণদের ঘরবাড়ী থেকে বিচ্ছিন্ন করে জঘন্য অবস্থার মধ্যে থাকতে বাধ্য করত। পুরুষেরা ও তাদের পরিবারবর্গ এই ব্যবস্থাকে সাংঘাতিক নির্বাসনের সামিল মনে করত। দুঃসহ চোখের জলের মধ্যেই তারা নিত বিদায়। পুরানাে রাশিয়ার সৈনিকের ভাগ্য ছিল এই—তার ভােটাধিকার কেড়ে নেওয়া হত, বহু বছর সে স্ত্রী বা পিতামাতার সঙ্গে দেখা করতে পেত না, পদস্থ কর্মচারীরা তার চিঠিপত্রের পরে কড়া নজর রাখত, সে খবরের কাগজ পড়তে পেত না, অসামরিক জনসাধারণের সঙ্গে তাকে মিশতে দেওয়া হত না, সাংঘাতিক চাবুকের মত আরাে অনেক রকম বর্বর শারীরিক শাস্তি তাকে দেওয়া হত, অসদ্ব্যবহারের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ জানাবার কোনাে উপায় ছিল না। উপরওয়ালা কর্মচারীদের এরা “ইওর এক্সেলেন্সি” বলে সম্ভাষণ করত। ছিল সব অভিজাত বংশের আঁস্তাকুড় থেকে কুড়ােনাে। তবু সাধারণ সৈন্যদের তারা গরু ভেড়ার সামিল মনে করত। এর পর রুশ সৈন্যরা যে প্রথমেই জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছিল তাতে অবাক হবার কিছু আছে কি? বিপ্লবের সময় সৈন্যবাহিনীর মধ্যে আমূল অদলবদল দেখা দিল। এই পরিবর্তন যখন এল তখন রাশিয়ার জনগণ মহাযুদ্ধের চার বছরের ৬৮ বিভীষিকার পরও হাজারে হাজারে এগিয়ে এল নূতন বাহিনী লাল ফৌজের স্বেচ্ছাসৈনিক হতে। কিন্তু ইতিহাস লিখতে আমরা বসিনি। সাম্প্রতিক কাল নিয়েই আমাদের কাজ। হিটলার সােভিয়েট ইউনিয়ন আক্রমণ করার আগেও রাশিয়ার বিরাট সৈন্যবাহিনী ও নৌবাহিনী প্রস্তুত হয়েছিল। এতে যােগদান ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু কি বিপুল পার্থক্য এর আগের সঙ্গে! নূতন নূতন দলের যখন ডাক পড়ত অসংখ্য পরিবারে উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োেজন হত, লােকের ভীড় জমতে যে তরুণরা সগর্বে কর্তব্য পালন করতে যাচ্ছে তাদের উপর উপহার বর্ষণ করতে। “ইওর এক্সেলেন্সির” যুগ আর নেই ! লাল • ফৌজের অফিসারেরা উৎসবে যােগ দিতেন। নিরীহ বৃদ্ধ চাষীরা যাদের মন থেকে জারের আমলের সৈন্যবাহিনীর গ্লানিময় বছরগুলাের কথা তখনও মুছে যায়নি তারাও আসত নূতন অফিসারের সঙ্গে হাত মেলাতে, একসঙ্গে খানাপিনা করতে। জারের আমলে সৈন্যবাহিনীর নীতি স্বল্প কথায় এইভাবে বলা যায়— বর্বর নির্বুদ্ধিতা। লাল ফৌজের পিছনকার নীতি হল “বিজ্ঞানের গােপন হাতিয়ার ব্যবহারের শিক্ষানবীসি। শিখবে কে ? মানুষ। তাই মানুষই হচ্ছে—প্রতিটি সৈন্যই হচ্ছে লাল ফৌজের প্রথম ও শেষ কথা। অনেক দিন আগেই লাল পল্টনের সেনারা যাতে দুনিয়ার সেরা সৈনিক হয় বৈজ্ঞানিক প্রণালীতে সে সমস্যা নিয়ে কাজে লাগা হয়েছিল। দু ভাবে এ সমস্যার সমাধান হল। প্রথমত, নূতন শৃঙ্খলাবােধ । এর ভিত্তি হচ্ছে সার্জেন্ট থেকে জেনারেল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে উচ্চপদস্থের কর্তৃত্বস্বীকার। কিন্তু এই উচ্চ- পদস্থেরা অর্থাৎ অফিসারেরা শুধু এক উপায়েই কর্তৃত্বের পদে পৌছতে পারেন—সাধারণ সৈনিক হিসাবে যথাযথ কাল কাজ করার পর অফিসারদের স্কুলে ঢাকা। প্রত্যেক অফিসার একদিন ছিলেন সৈনিক, প্রত্যেক সৈনিক একদিন অফিসার হতে পারে । আর লাল ফৌজে আশ্রিতবাৎসল্যের স্থান নেই। কুল, মর্যাদা, টাকা, শিক্ষা বা রাষ্ট্রনৈতিক প্রতিষ্ঠা কোনাে কিছুর জোরেই একজন যুবক বেসামরিক জীবন থেকে এক লাফে লাল ফৌজের অফিসারের ‘মেসে ঢুকতে পারে না। আবার চামড়ার রং, পিতামাতার জাতি, পাঁচ আঙুলে সহজ পরিশ্রমের চিহ্ন কিম্বা বলরুমে নাচের আসরে বা মদ্যপানে উৎসাহহীনতা—এ সব কোনাে কিছুর অজুহাতেই কোনো সৈনিককে লাল ফৌজের অফিসারদের স্কুল থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়। ঐ স্কুলে ঢুকবার প্রার্থী হতে হলে প্রত্যেককে সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিক হিসাবে কাজ করার নির্দিষ্ট কাল কাটাতে হবে, সামরিক দক্ষতা দেখাতে হবে, প্রমাণ করতে হবে সাহসিকতা, জয় করতে হবে সহকর্মীদের আস্থা আর শিখবার জন্য আগ্রহশীল হতে হবে । প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে যে অফিসারদের স্কুলকে “নেতৃত্বের জন্য অভিজ্ঞ কর্মী সৃষ্টির স্কুল” বলা হয়। এ থেকে বােঝা যায় কি ভাবে অভিজ্ঞ কর্মীর জন্য স্টালিনের আবেদন লাল ফৌজের মনেও সাড়া জাগিয়েছিল। শৃঙ্খলা অটুট রাখার দায়িত্ব শুধু অফিসারদের নয়। এর জন্য সৈন্যদেরও তিন রকম শৃঙ্খলা রাখার দল আছে—কোম্পানী সভা (যেখানে সৈনিকরা নিজ নিজ অসুবিধার কথা আলােচনা করে ), বেয়াড়াদের শৃঙ্খলা মানাবার জন্য ঐ সভায় নির্বাচিত “সহকর্মীদের বিচার সভা” ও সবশেষে অফিসার। খুব কম ব্যাপারই অফিসারদের কাছ অবধি গড়ায়। সে ক্ষেত্রেও সৈনিককে তাদেরই সামনে দাঁড়াতে হয় যারা সাধারণ ৭০ । সৈনিক থেকেই উপরে উঠেছে। বেয়াড়া সৈনিক লাল ফৌজের মর্যাদা রাখছে না এই হল তাদের মনােভাব। সৈনিকেরা অফিসারদের নিজেদের মত মানুষ বলেই ভাবে। ওদের ছাড়িয়ে তার উপরে উঠেছে শুধু দেশাত্মবােধ, দক্ষতা, কঠোর অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার জোরেই। এই সব কিছু মিলে লাল পণ্টনে এক নূতন ধরনের শৃঙ্খলাবােধ গড়ে উঠল। অন্য দেশের সামরিক দ্রষ্টারা এ দেখে অবাক হলেন। তাদের ধাধা লেগে যায়। আসলে বিজ্ঞানের হাতিয়ার ধরবার উপযুক্ত সৈনিক গড়বার পথে এ হল প্রথম পদক্ষেপ। দ্বিতীয়ত, নূতন সৈন্য জীবন। লাল ফৌজের শিক্ষার পাঁচটি লক্ষ্য আছে তাদের রাজনৈতিক, নীতিগত, সাংস্কৃতিক, দৈহিক ও সামরিক উন্নতি। আমাদের দেশে সৈন্যবাহিনীতে রাজনীতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সৈনিকদের নৈতিক জীবনের দায় সপে দেওয়া রয়েছে পাদ্রীদের হাতে। আমরা জানি পাদ্রীরা যতই আন্তরিক চেষ্টা করুক না কেন এ ব্যবস্থা কি ভাবে বানচাল হয়। মায়েরা অনেক সময়ই দেখেন ছেলেরা ক্রমশ দুর্নীতি ও মাতলামির পথে পা বাড়াচ্ছে আর আমরা এ সব “সৈনিক জীবন” বলে উপেক্ষা করি। আমাদের সৈন্য তালিকাভুক্ত লােকগুলির শিক্ষার জন্য সামান্য একটু চেষ্টা হয়—তাদের সাংস্কৃতিক জীবন ও স্বল্পপরিসর। শুধু শারীরিক ও সামরিক শিক্ষা আমাদের দেশে বেশ ভালােভাবেই চলে । সােভিয়েট ইউনিয়নে সৈনিকদের পক্ষে রাষ্ট্রনীতি একান্ত দরকারী মনে করা হয়। লাল পল্টনে নীতিপরায়ণতা খুব মস্ত সমস্যা নয় শুধু এই জন্যই যে সৈনিকজীবনকে সেখানে পারিবারিক জীবনের মত ৭১ করে তুলবার যথাসাধ্য চেষ্টা হয়। তাই প্রাত্যহিক একঘেঁয়ে কাজের প্রাণহীনতা থেকে সেখানে “মুক্তির" প্রয়ােজন হয় না। প্রসঙ্গ আমরা পরে আবার আলােচনা করব ) সাংস্কৃতিক কার্যকলাপ যা হয় তা আমাদের কল্পনারও বাইরে। শান্তির সময় লাল ফৌজের ৩০,০০০ সংস্কৃতিসদন, ৩,০০০ সেনানিবাসের ক্লাব ও ২,০০০ শাখা ক্লাব ছিল। সেনাবাহিনীর গ্রন্থাগারে ছিল আড়াই কোটির উপর বই । প্রত্যহ সৈন্যদের ১৭,২৫,০০০ খবরের কাগজ ও প্রতিমাসে সাময়িক পত্রিকা দেওয়া হত। সৈন্যদের দেশের সব থেকে ভালো অভিনয়, অর্কেষ্ট্রা, ফিল্ম দেখবার জন্য প্রতি বৎসর কোটি কোটি ডলার ঢালা হত আর প্রতি শিবিরে আসতেন বিখ্যাত অভিনেতা, গায়ক, লেখক, বৈজ্ঞানিক ও শিল্পীরা। এরা সৈনিকদের সঙ্গে মিশবার এবং অতীত ও বর্তমানের বিপুল ঐশ্বর্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত করবার সুযােগ পেয়ে নিজেদের সম্মানিত বােধ করতেন। এর উপর প্রায় অর্ধেক সৈন্য সর্বদাই অফিসারদের স্কুলে ঢুকবার জন্য পড়াশুনা করত। ১৪টি বিদ্যায়তন ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০,০০০ অফিসার শিক্ষা করতেন। লাল ফৌজের শিক্ষার পর আর একটি বরাবরকার মূল নীতি হচ্ছে শহরে ও কৃষিক্ষেত্রে বেসামরিক জনসাধারণের সঙ্গে সহযােগিতা। এই সহযােগিতা যে একটা সচেষ্ট উদ্যম প্রসূত নয় অফিসার ও কমিশার ব্যবস্থারই ফল—এই ভাবে ব্যাপারটিকে দেখলেই ঠিক হবে । সমস্ত নেতারা আসেন সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে থেকে, কারখানা ও চাষের ক্ষেতে যারা হাত বা মাথা চালায় তাদের ভিতর থেকেই আসে সৈনিকেরা। তাই সেনাবাহিনী ও জনসাধারণের মধ্যে কোনাে বিচ্ছেদ নেই। এই যুদ্ধে জনসাধারণের সঙ্গে তাদের যােগ বিরাটভাবেই দেখা १२ গেছে। ডিভিশনকে ডিভিশন লাল ফৌজের সৈন্য ক্ষেতে কাজ করেছে, যে সব জায়গায় আক্রমণ আসন্ন সেখানে শস্য কাটবার জন্য এগিয়ে এসেছে। আবার সরবরাহের যখন অত্যন্ত প্রয়ােজন তখন অসংখ্য চাষী সমস্ত শস্য নিয়ে ফ্রন্টে এসে উপস্থিত হয়েছে। শহরে সৈন্যবাহিনী ও বেসামরিক জনসাধারণ আত্মরক্ষার প্রস্তুতি ও নাৎসী বােমা কামানের নাগালের বাইরে শিল্পের যন্ত্রপাতি অপসারণের জন্য বার বার একত্রে কাজ করেছে। সােভিয়েট ইউনিয়ন হচ্ছে একমাত্র য়ুরােপীয় দেশ যেখানে যুদ্ধ আরম্ভ হলে “গণবাহিনীর” কথা ওঠেনি। লাল ফৌজ চিরকালই গণবাহিনী। জনগণের মধ্যেই এর জন্ম, জনগণের সেবাই এর লক্ষ্য, জনসাধারণও আন্তরিকভাবে এর সঙ্গে সহযােগিতা করে। আর প্রত্যেক সৈন্য জানে এ কথা। সে জানে জনগণই লাল ফৌজকে সৈন্য যােগায়-- শেষ দৃঢ়সংকল ও আত্মত্যাগের দ্বারা তারাই ফ্রন্টকে সাহায্য করে। সােভিয়েট লেখক, এরেনবুর্গের ভাষায় “আমাদের লাল পল্টনের সেনারা জানে তারা কি রক্ষা করছে। • তারা রক্ষা করছে পৃথিবীর তরুণতম দেশকে, তারুণ্যের দেশকে। আমরাই দুনিয়াতে সর্বপ্রথম গড়েছি এক সমাজ যা ললাভের পরে প্রতিষ্ঠিত নয়—যার প্রতিষ্ঠা শ্রমনীতির পরে, সৃষ্টিশীল কাজের পরে, মানুষের ঐক্যবােধের পরে।...আমাদের তারুণ্য লড়ছে আমাদের দেশ, আমাদের স্বাধীনতার জন্য কিন্তু তারা বিশ্বের মুক্তির জন্য মনুষ্যত্বের মর্যাদার জন্যও লড়ছে। তারা লড়ছে প্যারিসের দাবীর জন্য, প্রাগের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, দৃপ্ত নরওয়ে, সার্বদের কুটির ও এ্যাক্রোপােলিসের জন্য।” এই ভাবে রাশিয়ায় নূতন ধরনের এক সৈন্যজীবন গড়ে তােলা হল। কি করে হল তার মধ্যে কোনো রহস্য নেই। “ইওর এক্সেলেন্সিকে”

নির্মূল করার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই, সাধারণ বুদ্ধির প্রয়োগের
ফলেই তা হল ।
জার আমলের অফিসারদের নির্বুদ্ধিতার স্থান নিল
বিজ্ঞান।
এর সূত্রপাত একেবারে তলা থেকে কারণ সমগ্র জনগণের
হাতে আজ এই নৃতন হাতিয়ার।
আবার উপর থেকেও ঠিক এই ব্যাপারই হল।
a৪

রুশ বাহিনীর মাথা হিটলার যখন রাশিয়া আক্রমণ করে তখন সোভিয়েট ইউনিয়নে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতপূর্ব রাষ্ট্রদূত, যোশেফ ই, ডেভিস সাধারণের কাছে ঘােষণায় বলেন সে লাল ফৌজ “দুনিয়াকে অবাক করে দেবে।” পরে তিনি বলেন “লাল ফৌজের সৈনিক ও অফিসারদের কৃতিত্ব বা জানি তা থেকে আমি নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে এ হল এক আশ্চর্য সংগঠন আর যুদ্ধ এলে তার চমৎকার পরিচয় মিলবে। লাল ফৌজের আশ্চর্য কীর্তিকলাপ আমার আশাকেও ছাড়িয়ে গেছে—এর নেতৃত্ব অদ্ভুত কীর্তি অর্জন করে তার মিত্রদের পর্যন্ত অবাক করে দিয়েছে। এমন কি জার্মানদেরও এরা তাজ্জব করেছে। যন্ত্রকৌশলের দিক থেকে এ এক মস্ত বড় কীর্তি। সমরবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পানৎসার আক্রমণ প্রতিহত করার নতুন পন্থা নির্ধারণ ও সংগঠনের মধ্যেকার প্রতিভা সােভিয়েট ফৌজের এক ঐতিহাসিক অবদান।” বারবার এই প্রতিভা সারা বিশ্বকে চমৎকৃত করেছে। 'আমাদের বােঝানো হয়েছিল যে লাল ফৌজ হচ্ছে নেতৃত্ববিহীন বিশৃঙ্খল এক জনতা মাত্র। এই জনতাই ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সৈন্যবাহিনী—ভয়াবহ ব্লিৎসক্ৰীগ প্রতিহত করার উপযােগী একমাত্র বাহিনী বলেই প্রতিপন্ন হল। এই বাহিনীর শীর্ষস্থানে আছেন একজন মানুষ অল্পলােকেই যার নাম শুনেছে। তিনি হচ্ছেন লাল ফৌজের ‘চিফ অফ দি জেনারেল স্টাফ’—মার্শাল বােরিস মিখায়েললাভিচ, শাপনিকভ। এই প্রতিভা সম্পর্কে অনেক বই লেখা যায়। আমি শুধু দুটি কথা বলতে চাই। * * ৭৫ জার বাহিনীর কর্ণলে শাপদনিকভ, বিপ্লবের গােড়া থেকেই যে সামান্য কজন অফিসার সােভিয়েটের পক্ষে যােগ দেন তাঁদের অন্যতম। লাল ফৌজের হয়ে তিনি অবিশ্রাম লড়ে এসেছেন। আর একটি কথা হল এই যে জেনারেল হবার আগে শাপনিকভ, ছিলেন একজন বৈজ্ঞানিক ও গণিতবিদ। ১৯১৯ সালে শাপনিকভ ছিলেন সমগ্র লাল ফৌজের ‘চিফ অফ অপারেশন।” ১৯২১ সালে এই ভূতপূর্ব ‘ইওর এক্সেলেন্সিকে রক্ত পতাকাবাহীর সম্মান দেওয়া হল আর তাতে উল্লাসধ্বনি করল সমস্ত রুশজাতি। ১৯২৯ সালে তিনি চিফ অফ স্টাফ’ হলেন। ১৯৩২এ অর্থাৎ স্টালিনের ভবিষ্যদ্বাণীর পরের বছর শাপনিকভ, আধুনিক যুদ্ধ সম্পর্কে গােপনে কতকগুলি বক্তৃতা দেন।...এতে তার অন্যতম ছাত্র ছিলেন স্টালিন ! কাজেই স্টালিন নিজ সিদ্ধান্ত অনুসারে বিশেষজ্ঞের উপযুক্ত শিক্ষায় অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক সমরবিদ্যায় নিজেকে শিক্ষিত করে তুললেন। লাল ফৌজের বহু কীর্তিমান তরুণ জেনারেলই শাপনিকভের হাতে গড়া। তার কাজের জন্য মার্শালকে ১৯৩৪ সালে ‘অর্ডার অফ দি রেড স্টার’ ও ১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় অর্ডার দেওয়া হয়। ১৯৪০ সালে তিনি ‘অর্ডার অফ লেনিন' পান আর ১৯৪১ সালে তার ষষ্ঠিতম জন্ম- বার্ষিকীতে তাকে আবার ঐ সম্মান দেওয়া হয়। তঁার মতবাদগত ও বস্তুনিষ্ঠ প্রতিভাই নাৎসী ও তাদের পেটোয়াদের বিরুদ্ধে লাল ফৌজের অভিযানের আশ্চর্য রণকৌশলের জন্য দায়ী। সামরিক নেতৃত্ব সম্পর্কে শাপনিকভ, তিন খণ্ড বই লেখেন। সমস্ত দুনিয়ায় এগুলি প্রামাণিক গ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃত। এর নাম হচ্ছে- সৈন্যবাহিনীর মস্তিষ্ক।” বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের সাহায্যে এই বই- গুলিতে সর্বোচ্চ সমর পরিষদ গঠনের পদ্ধতি দেওয়া হয়েছে।

হিটলারের সেনাপতির সেনাপতির। এগুলি আগাগােড়া মুখস্থ করে ফেলে। দুর্ভাগ্যক্রমে নাৎসীরা এর থেকে অনেকটা সুবিধা পায়। সৌভাগ্য বশত তারাও পুরােপুরি সুবিধা পায়নি কারণ শাপনিকভের বই লেখা হয়েছিল এমন এক সৈন্যবাহিনীর জন্য বার শুধু সবােচ্চ পরিষদ নয়, প্রত্যেক সৈন্যের হাতে আছে বিজ্ঞানের হাতিয়ার। নাৎসীরা লাল ফৌজের বিজ্ঞাননিষ্ঠকে উপহাস করত। রাশিয়া। আক্রমণের সময় তারা কামানধারী অধ্যাপক অর্থাৎ সোভিয়েট গােলন্দাজ বাহিনী নিয়ে ঠাট্টাও করত যথেষ্ট। তারপর কিন্তু ঐ বাহিনী ‘ব্লিৎক্ৰীগ’ বা তড়িৎ আক্রমণকে চূর্ণ বিচূর্ণ করতে আরম্ভ করল। এরা তবে নিশ্চয়ই আশ্চর্য ধরনের অধ্যাপক। আজ সবাই জানে যে লাল ফৌজের গােলন্দাজবাহিনী দুনিয়ার সেরা—তার কাছা- কাছিও কেউ নেই। এর কারণ শাপনিকভ হাজার হাজার গণিতবিদকে একটি নূতন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার প্রয়ােগ করতে শিখিয়েছিলেন। এর দ্বারা কামানের প্রথম গােলাতেই লক্ষ্যভেদ হয়— “ক্রমশ লক্ষ্যের দিকে এগােতে হয়না—যা ‘তড়িৎ যুদ্ধে’ অচল। আগেকার কালে সৈন্যবাহিনীকে অতিকায় প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা হত ; তার দেহ বিরাট কিন্তু মস্তিষ্ক অতি ছােট মাপের। কারণ পুরানাে সৈন্যবাহিনীতে শুধু সর্বোচ্চ অফিসারদেরই চিন্তা করতে দেওয়া হত। শাপনিকভ এমন ব্যবস্থা করলেন যাতে প্রত্যেক লাল ফৌজের সৈন্য যথাশক্তি তার বুদ্ধি খাটাতে পারে—যাতে প্রত্যেকেই বিজ্ঞানের হাতিয়ারে সজ্জিত হয়। মানুষ মাথা দিয়ে ভাবে। কিন্তু লড়তে গেলে আরাে কিছু চাই। দুর্ধর্ষ সাহস চাই, লড়বার মত আদর্শ চাই আর চাই যুদ্ধের হাতিয়ার সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান। ৭৭ লক্ষ লক্ষ বীর পূর্ব প্রান্তে লড়াই শুরু হবার কিছু পরে নিউইয়র্ক টাইমস'এ এক সাংবাদিকের রুশ সামরিক হাসপাতাল পরিদর্শনের এক বিবরণ প্রকাশিত তিনি শয্যাশায়ী এক তরুণ সৈন্যের কাছে এসে দেখলেন সে খুব কঁদছে। দোভাষীর সাহায্যে তিনি ঐ সৈন্যকে প্রশ্ন করতে লাগলেন। জানা গেল ফ্রন্টে তার দলের গােলন্দাজ বাহিনীর সঙ্গে যােগ দিতে না পারায় সে কঁদছে। নিজের জীবনের জন্য বিন্দুমাত্রও সে চিন্তিত নয়। সে শুধু চায় ফ্যাশিস্ট ধ্বংস করার জন্য স্টালিনের আবেদনে সাড়া দিতে। সাংবাদিক অভিভূত হলেন প্রচণ্ডরকম কারণ ঐ তরুণ সৈন্যের দুটি পা-ই নষ্ট হয়েছিল । ‘বীর’ শব্দটি লাল ফৌজ সম্পর্কিত বক্তৃতায় যত ঘন ঘন ব্যবহৃত হয় এমন আর কিছুতে নয়। রাজনীতিবিদ, সম্পাদক, সাংবাদিক, প্রত্যেক দেশের নরনারী ‘বীর লাল ফৌজের কথা বলেন। এমন কি নাৎসীরা পর্যন্ত সােভিয়েট শৌর্যে অবাক না হয়ে পারে না। মিঃ ডেভিস বলেন : “সব থেকে বড় কথা হল সােভিয়েট ইউনিয়নের, তার মহান নেতা স্টালিন, তার লাল ফৌজ ও প্রত্যেক নরনারীর অদম্য প্রাণশক্তি—যারা কিছুতে যুদ্ধক্ষেত্র ছাড়ে না—প্রত্যেক পরাজয়ের ধ্বংসস্তুপের মধ্যে থেকে যারা সেই শক্তিই অর্জন করে যা নিয়ে তারা আবার এগােয়--ক্রমাগতই এগিয়ে চলে। ডানকার্কের শৌর্যের পাশে এও হল এক জিনিস যা এই ভয়াবহ যুদ্ধই আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে— এই জ্ঞান যে এমন নরনারী আছেন যারা অন্য নরনারী ও শিশু ৭৮ যাতে স্বাধীনতা ভােগ করতে পারে তার জন্য চূড়ান্ত আত্মত্যাগের মধ্যে গরিমা খুঁজে পান।” যদি বলা যায় যে রাশিয়ায় সাহস জিনিসটাকে একটা বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসাবে দেখা হয়েছিল তবে তাতে সােভিয়েট বীরদের গৌরব লাঘব হবে না। অবশ্য নাৎসীরা যে ভাবে তাদের সৈন্যদের উত্তেজক ঔষধ পত্র খাওয়াত বা অর্থহীন রক্ত লােলুপতায় উন্মত্ত করত সে ভাবে নয়। লাল ফৌজকে সাহস যােগান হয়েছিল উৎসাহ দিয়ে। প্রত্যেককে কি নিয়ে সে লড়ছে ও কেন সে লড়ছে অনবরত এই দুটি কথা ভালাে করে বুঝতে উৎসাহ দেওয়া হত। বহু বছর ধরে এই উৎসাহ দেবার কাজ চলেছে “রাষ্ট্রনৈতিক কমিশার” বলে এই পরিচিত লােকদের অবিশ্রাম চেষ্টায় । অনেক দিন আগে রুশ নেতা লেনিন সহজ ভাষায় এদের পরিচয় দিয়েছেন এই ভাবে “কমিশার বাদ দিয়ে আমরা লাল ফৌজ পেতাম না।” এই কমিশাররা কে ? এরা ছিল সৈনিক যারা আপন আপন সামরিক কর্তব্য—যেমন গােলন্দাজ, গাড়ীচালক, পাইলট, সেনাপতি ইত্যাদির কাজ সম্পূর্ণভাবে আয়ত্ত করেছে। সাধারণ সৈনিক হিসাবেই হােক বা সেনাপতি হিসাবেই হােক কর্মশক্তির জন্য এরা ছিল শ্রদ্ধার পাত্র। সােভিয়েট সরকারের প্রতি গভীর আনুগত্যের ইতিহাস এদের প্রত্যেকেরই ছিল ; আসলে স্টালিন এক সময়ে সৈন্যবাহিনীর কমিশার ছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে যখন লাল ফৌজকে ব্যাপকভাবে গ্লানিমুক্ত করা হয় . তখন এই কমিশারেরাই হিটলার রাশিয়ায় যে সব বিশ্বাসঘাতককে কিনে নিয়েছিল তাদের নাম প্রকাশ করে। আপনারা জানেন যুবরাপে রাশিয়াই হল একমাত্র দেশ যেখানে পঞ্চম বাহিনীর জঘন্য ৭৯ বিশ্বাসঘাতকতা করার সুযোেগ পাবার আগেই ধরা পড়ে নিহত হয়েছিল । এ কাজ করেছিল এই কমিশবেরা। তারা এ কাজ না করলে লাল ফৌজ হয়ত বিপর্যস্ত হত—আর আমরাও হয়ত আজ পদানত হতাম হিটলারের। এ কথাটাই আমাদের স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। রাশিয়ার সামরিক শক্তি সম্পর্কে আলােচনার সময় “বিশেষজ্ঞরা” এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়েই সব থেকে বেশী হোঁচট খান। গােলমাল আরাে বাড়ল ১৯৪২ সাল থেকে যখন লাল ফৌজে কমিশার ব্যবস্থা “তুলে দেওয়া হল। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে বিখ্যাত পারে বিখ্যাত মার্কিন সামরিক সমালােচক মেজর-জেনারেল ফিল্ডিং এলিয়ট “দি আমেরিকান কোয়াটালি” পত্রিকায় ১৯৩৮ সালের সােভিয়েট ইউনিয়নের কথা বলতে বলতে গিয়ে লেখেন যে হিটলারের জেনারেল স্টাফ সম্ভবত “টুখাচেভস্কি যে কমিশার নিয়ােগের ব্যবস্থা প্রায় নষ্ট করেছিলেন তার পুনপ্রবর্তনের সংবাদে মস্ত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছেন।” কিন্তু শীঘ্রই জানা গেল যে টুখাচেভস্কি ছিলেন লাল ফৌজের মধ্যেকার জঘন্যতম বিশ্বাসঘাতক আর তিনি কমিশার ব্যবস্থা নষ্ট করতে চেষ্টা করেছিলেন এই জন্যই যে কমিশারেরা তাঁর বিশ্বাসঘাতক অনুচরবৃন্দের ষড়যন্ত্র প্রায় উদঘাটিত করে ফেলেছিল। মস্ত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলা দূরে থাকুক হিটলারের দুশ্চিন্তা এতে ভীষণ রকম বেড়ে গেল। এক বৎসরের মধ্যেই সে সােভিয়েটের সঙ্গে বিখ্যাত অনাক্রমণ চুক্তির জন্য কথাবার্তা শুরু রাশিয়ার ষড়যন্ত্র উদঘাটন, বিচার ও অনাক্রমণ চুক্তি সম্পর্কে আমাদের , পত্রিকা ও বক্তারা অনেক কথা বলেছিলেন। কিন্তু কেউই কমিশারদের কথা এতটুকুও তােলেননি। কিন্তু এই কমিশারেরাই লাল ফৌজের সজীবত রক্ষা করে—এরাই কুইশলিংদের পাঠায় চরম শাস্তির মুখে—এরাই স্টালিন নয়—হিটলারকে বাধ্য করে চুক্তির জন্য চেষ্টা করতে। কমিশাররা রাশিয়াকে বাঁচায়——আমাদেরও বাঁচায়। অবশ্য বিদেশীদের গুপ্তচর বা দালালদের তল্লাস করাই কমিশারদের প্রধান কাজ নয়। তার প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হল আপন দৃষ্টান্ত দিয়ে সমস্ত সৈনিকদের দেখানাে যে আধুনিক যােদ্ধাকে তার নিজের অস্ত্র পূর্ণমাত্রায় আয়ত্ত করতে হবে আর শত্রু পক্ষের কৌশল পুরােপুরি বুঝতে হবে। সৈনিককে এর চেয়ে বেশী আর কোনো জিনিস আত্মবিশ্বাস যােগায় না। কিন্তু কমিশারদের আরো একটা দরকারী কাজ ছিল এক সময়ে সৈনিকদের শুধু যে অফিসারদের মানতে হত তা নয়—অন্ধভাবে মানতে হত—কি কারণে হুকুম জারী হচ্ছে তার কারণ না জেনেই হুকুম তামিল করতে হত। এক বিখ্যাত কবিতার লাইনই তাে আছে “কেন প্রশ্ন করার কথা তাদের কাজ নয়—তাদের কাজ করা ও মরা !” লাল ফৌজে কমিশরের। এই মনােভাবটাই সম্পূর্ণ দূর করল। প্রত্যেক বড় যুদ্ধের আগে, প্রত্যেক সামরিক কৌশল প্রয়ােগের আগে, প্রতিটি ছােটখাটো আক্রমণ, খোঁজখবর নেবার দল পাঠানো বা বােম ফেলার আগে কমিশরের সকলকে এ সবের কারণ বুঝিয়ে দিতেন। সংক্ষেপে এখানে কমিশারদের অন্যান্য কর্তব্যের কথাও বলা হল। স্টালিনের ভাষায় “সেনাপতি যেমন একটি রেজিমেন্টের মাথা, কমিশাররা তেমনি ঐ রেজিমেন্টের পিতা বা অন্তরাত্মা।” কিন্তু কমিশারের যথাসাধ্য সেনাপতিকে সাহায্য করা—যাতে তার কর্তৃত্ব দুর্বল না হয়ে দৃঢ়তর হয় তার চেষ্টা করা। সৈন্যরা জানত যে সমস্ত অফিসারদের সামরিক কথা বা সর্বোচ্চ অফিসারেরে নৈতিক সাহসের অভাবের ৬-(১৪) কথা কমিশার তৎক্ষণাৎ রিপাের্ট করবেন। এও তারা জানত যে নির্ভীকতা, স্থৈর্য, কর্মোদ্যোগ ও ভালাে রকমের লড়াই কমিশারের চোখ এড়াবে না ;—তিনিই দেখবেন যাতে উপযুক্ত লােকের পদোন্নতি ঘটে। এই কমিশার ব্যবস্থার একটি আশ্চর্য বৈশিষ্টও ছিল এই যে এদের নিয়ােগ করা হত সাধারণ সৈনিকদের নয়—অফিসারদেররা, এমন কি সর্বোচ্চ সেনাধ্যক্ষকেও সাহায্য করতে । রুশ ফ্রন্টে মার্কিন ও বৃটিশ সাংবাদিকেরা লক্ষ্য করেছিলেন যে প্রত্যেক অফিসারের এক অচ্ছেদ্য সঙ্গী হচ্ছে এই কমিশার। কোনাে হুকুম জারীর সময় দুজনেরই সই লাগে। এভাবে কাজ বাড়ানো হয় কেন ? এর জবাব খুব সহজ। সামরিক বিশেষজ্ঞ স্বভাবতই লক্ষ্যবস্তু, শত্রুর সামর্থ, রিজার্ভ, অস্ত্রসজ্জা প্রভৃতি সামরিক প্রশ্ন নিয়ে মাথা ঘামান। কমিশারের কাজ হল প্রত্যেকটি পরিকল্পনা দেখা, সব দিকে নজর দেওয়া হয়েছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া। বিশেষ করে মানুষের দিকটায় ছিল তার জোর নজর। কমিশাররা অত্যন্ত সযত্নে সৈন্যদের জীবন রক্ষা করতেন। শুধু সামরিক কৌশল দেখাতে বা বিশেষ লক্ষ্য ভেদের জন্য অনর্থক রক্তক্ষয়ে তাদের সম্মতি পাওয়া যেত না। লাল ফৌজের রণকৌশলের সব থেকে আশ্চর্য দৃষ্টান্ত দেখান মার্শাল সেমন টিমােশেঙ্কো—ফ্যাশিস্ট তাবেদার রাষ্ট্র ফিনল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভার গ্রহণ করার পর। ইতিহাসের সব থেকে বড় সামরিক কীর্তির অন্যতম এটি। ১৯৪০-এর গােড়ার দিকে টিমমাশেঙ্কো সােভিয়েট সীমানার পিছনে ফিনল্যাণ্ডের ম্যানারহাইম লাইনের পূর্ণাঙ্গ হুবহু একটা নকল দূর্গ বানান। এটির পরেই মাসের পর মাস লাল ফৌজ মহড়া চালায়। টিমমাশেঙ্কো ও তার কমিশারেরা যখন আসল ম্যানারহাই লাইন স্বতন স্বতন বনপাতের মল্যে অধিকার করা যাবে এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হলেন তখনই শুধু সত্যকারের অভিযান শুরু হল। এই পদ্ধতি গ্রহণ করার ফলে শুধু যে অনেক প্রাণই বাঁচল তা নয়। উপরন্তু আক্রমণ আরম্ভ বার অতি শী লাইনটি পদস্ত ও অধিকৃত হল । লাল কোজ সে ফিনিশ ক্যাশিস্টদের কয়েক সপ্তাহে হারাতে পারেনি তার কারণ এই। ইতিহাসের প্রত্যেক বিখ্যাত সৈন্যবাহিনীই নিজেকে সব থেকে বেশী সাহসের অধিকারী বলে দাবী করেছে। এই এন রুশের বাহিনী গড়ল সমস্ত সৈন্যবাহিনীর সাহসকে নয়—প্রতিটি সৈন্য, প্রত্যেক মানুষে সাহসকে কেন্দ্র করে। বৈজ্ঞানিকভাবে এ কাজ করা হল। ১৭৯০ সালের ফরাসী বিপ্লবের সময় উদ্ভূত সৈন্যবাহিনীতে কমিশার নিয়ােগ প্রণালী তার গ্রহণ কবুল। বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগে নিঃক্ত কমিশারদের আপন আপন দিকে বিশেষজ্ঞ করে তুলে ওশের সমগ্র সেনাবাহিনীর রূপই দিল বদলে । কমিশারদের বানানো হল এক ই ধরনের অফিসার। তার আসল অফিসারদের জায়গা অবশ্য জুড়ল না। লাল ফৌজের বিশেষত্ব হল এই যে এতে রইল দু দল অফিসার এক দল চালাত সামরিক কাজের বার ---"হ দল পরিচালিত করত মানুষদের। আসল অফিসারেরা রক্ষা করতেন সেনাবাহিনীকে--আর কমিশারেরা বন্ধ করতেন মানুষকে। এর মানে এই নয় যে কমিশাবের গছিয়ে কতেন। মােটেই নয়। জার্মান বান্ত্রিক বাহিনীর প্রথম প্রচও অভিননের মুখে তারাই সেনা- পতিদের আশ্বস্ত করলেন যে সােভিয়েট সৈন্যর! 'তাসম্ভবকেও করতে পারে। নিজেদের বীরত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত দেখিয়ে তার সৈন্যদের দেখালেন যে ‘ব্লীৎস' বা তড়িৎ আক্রমণের ভয় আসলে অনেকটাই শুধু ভয়ই। ধীরতা ও জবরদন্ত প্রত্যক্রমণের সাহায্যে সে আক্রমণ থামানো যায়। অনেক সময় এই কমিশারই ঠার লাল ফৌজ দলকে বলতেন নে সবাইকে শেষ পর্যন্ত লড়তে হবে। কারাের পালাবার যো নেই, ফ্রন্ট পর্যদস্ত হওয়া ঠেকানাের জন্য দলবিশেষের নিশ্চিহ্ন হওয়া প্রয়ােজন। তখন সৈন্যেরা মৃত্যুকে রুখে দাড়াত। কিন্তু মরতে মরতেও তার বুঝত, জানত, কেন তাদের মরতে হচ্ছে । একজন সৈন্য যখন ঠিক বুঝতে পারে কেন তার প্রাণ দেওয়া দরকার, যখন সে জানে যে অন্য সব পথ বন্ধ বলেই তার ডাক এসেছে চূড়ান্ত আত্মত্যাগের--তখন শত্রু হিসাবে সে অত্যন্ত সাংঘাতিক হয়ে দাড়ায়। লাল ফৌজে কমিশারেরা যদি এতই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করত তবে সে পদ তুলে দেওয়া হল কেন ? মস্কো যখন সম্প্রতি জানালো যে কমিশারের পদ আর রাখা হচ্ছে না তখন আমাদের কাগজে ও সাংবাদিক মহলে জোর হৈ চৈ পড়ে গেল। আমাদের বিশেষজ্ঞের প্রমাণ করতে চাইলেন যে কমিশার নিয়োেগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে—কাজের উৎকর্ষের জন্যই এ ব্যবস্থা বাতিল করা হচ্ছে । এর থেকে মিথ্যা আর কিছু হতে পারে না। কমিশারদের একটি পৃথক সামরিক শ্রেণী হিসাবে না রাখার সিদ্ধান্ত হল লাল ফৌজের প্রচণ্ড সংগ্রাম আর প্রত্যক্ষ যুদ্ধে লব্ধ বহু অভিজ্ঞতারই ফল। এ সব লড়াইএ সেনাপতি ও কমিশার পাশাপাশি লড়েছিলেন; সমস্ত রকম সম্ভবপর অবস্থায় তার বিশালভাবে আধুনিক যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তারপর কি হল ? এর মধ্যে কমিশারের। এতটা অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন যে ছােট বড় যে কোনাে ইউনিটের সমস্ত দায়িত্ব তারা নিতে পারতেন। অনেক ৮৪ সময়ই কোনো অফিসার হত হলে সে দায়িত্ব তাদের নিতেও হল । এদিকে আবার সত্যিকারের সামরিক অফিসারের কমিশারদের কাছে শিখলেন কেমন করে আশ্চর্যভাবে মানুষকে উদ্ব দ্ধ করতে হয়- কেমন ভাবে তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। অর্থাৎ কমিশারেরা সমরবিজ্ঞানী হয়ে দাড়ালেন আর অফিসারেরা হলেন রাষ্ট্রনীতিবিদ। এই পারস্পরিক শিক্ষার জন্য দুই ধরনের অফিসারদের মধ্যেকার পার্থক্য কার্যত দূর হয়ে গেল । প্রত্যেকেই হাতের কাজটা শিখে নিল। সােভিয়েট ইউনিয়নে বা প্রায়ই হয়ে থাকে—দুটো বিরুদ্ধ’ ধারণা থেকে একটি সংযুক্ত নতুন ধারণা উদ্ভত হল । এক্ষেত্রে এই নূতন ধারণা হল নতন ছাচের লাল ফৌজ অফিসারের ধারণা নে অফিসার একই সঙ্গে কমিশার ও রণকৌশলী । এই অফিসারই হলেন প্রচণ্ড সােভিয়েট অগ্রগতির প্রাণ। এ" দেই অবয়স, আত্মপ্রত্যয়, দুর্ধর্ষ সাহস, দক্ষতা ও স্বজননিছ। আমাদের সাংবাদিকদের এতটা চমৎকৃত করেছে। আসল কথা হল এই যে আজ যারা লাল সেজের নেতৃত্ব করছেন তারা হলেন অফিসার-কমিশার। সাহসী সেনাদের এই নেতারা দুনিয়াতে ‘বীর’ শব্দটি সম্পর্কে এক নতুন ধারণা সৃষ্টি করেছেন। আশ্চর্য সাহস ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন এরা। সামান্য কয়েকজন মাত্র নয়—লক্ষ লক্ষ লাল ফৌজের সেনাদের এরা উদগ্ধ করেছেন। একজন নাৎসী সাংবাদিক লেগে “রুশের মানুষ নয় । যখন মরে। যাওয়াই স্বাভাবিক হত তখনও এরা লড়েই চলে। কিছুতেই নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না যে এদের শেন লােকটি ও সাবাড় হয়েছে।” কয়েক সপ্তাহ পরে জনৈক রুশ সাংবাদিক লেখেন “এই যুদ্ধে এক নূতন ধরনের ‘বীরের উদ্ভব হয়েছে আমি যাদের নামকরণ করতে পারি ‘স্টালিনগ্রাদের মানুষ। এই মানুষ জানে সে মৃত্যু পর্যন্ত তাকে দৃঢ় থাকতে হবে। স্টালিনগ্রাদের তাদের দ্বার সংরক্ষিত কোনাে জায়গা। এখনই জার্মানর' অধিকার করতে পেরেছে তখনই তার সেই মানুষকে তার কাজের জায়গায় মৃত অবস্থায় পেয়েছে। কোনো একজন বীরের নাম কর আমার পক্ষে শক্ত। কিন্তু ডিভিশনকে ডিভিশন বীরের নাম আমি করতে পারি।” এর কারণ শেম নানুষটি অবদি প্রত্যেকেই মরণ পণ করে সজ্ঞানে, মৃত্যুর দিকে এগো--আর কে প্রতি ইঞ্চি জমির ন্ত স্থান না দিতে বাধ্য করত। অবশ্য লাল ফৌজের আহত ব্যক্তি এই নে ক্ষতের তাড়নার মার। যায় এমন না । বরঞ্চ সােভিয়েট মৃত্যুর স্বল্প হার আমাদের সৈন্যবাহিনীর চিকিৎসক মহলেও বিস্ময়ের সঞ্চার করেছে । ভিশনেভঙ্গির নেতৃত্বে রুশ চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়ের মতই সমান গুরুত্বপূর্ণ কীতি অর্জন করেছেন। আমরা আগেই দেখেছি সােভিয়েটের এক দেহ থেকে অন্য দেহে রক্ত দেবার পদ্ধতি কত উন্নত। যুদ্ধের সময়ে সৈন্যবাহিনীর ডাক্তারের এদিকে আরো অগ্রসর হয়েছেন। এখন একেবারেই পুরােপুরি রক্ত না দিয়ে লাল ফৌজের চিকিৎসা পরিচালকের। ধীরে ধীরে রক্ত দেন। শিরার মধ্যে তাজা রক্ত ফোটা ফোট করে অনেকক্ষণ পরে—এমন কি সমস্ত দিন ধরে দেওয়া হয় । রক্ত দেওয়া ছাড়াও ডাঃ বােরিস কুড়িয়াশভ রক্তের মধ্যেকার একটি রাসায়নিক উপাদান যুদ্ধে প্রাণরক্ষার কাজে প্রয়োগ করার পদ্ধতি বার করেছেন। এই উপাদান হল খুঙ্গিন। সব দেশেই বিজ্ঞানীরা এর কথা জানতেন—এও জানতেন নে নিই হল রক্তের ভিতরকার সেই জিনিস যার জন্য আপনা থেকেই রক্ত জমে গিয়ে ছােট ক্ষত থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয়। কুড্রিয়াশভ বহুল পরিমাণ বিশুদ্ধ থুম্বিন পাবার উপায়ও আবিষ্কার করেছেন। এই দিয়ে সাংঘাতিক আহত লােকদের আভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ অতি শীঘ্র বন্ধ করা যায়। সােভিয়েট ইউনিয়নে এই রাসায়নিক উপাদান বহু পরিমাণে তৈরী করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এই কৃত্রিম থস্বিন পূর্ব সীমান্তে অসংখ্য জীবন রক্ষা করেছে। মাথায় সাংঘাতিক ক্ষতের সময় যখন বােমার টুকরাে মগজে ঢুকে যায় তখন এটা আশ্চর্য কার্যকরী। এর সাহায্যে সােভিয়েট অস্ত্রচিকিৎসকেরা এমন সব মাথায়ও অভ্যন্তরীণ অস্ত্রোপচার করেছেন যা এ পর্যন্ত অসম্ভব মনে করা হত। রােগীর পরে থম্বিনের প্রয়ােগের ফলে কোনাে খারাপ উপসর্গ দেখা দেয় না। যে সব ক্ষত থেকে এর সাহায্যে রক্ত পড়া বন্ধ করা হয় এর প্রয়ােগে আসলে আবার তার থেকে রক্ত ক্ষরণ শুরু হয় না। লাল ফৌজ সম্পর্কে সব শেষে আরো একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে হবে। এ হচ্ছে সেই সব লােক সম্পর্কে যারা সাংঘাতিক আহত হয়ে আর বুদ্ধক্ষেত্রে ফিরতে পারে না—সারা জীবন পঙ্গু বা অসহায় অবস্থায় যাদের কাটাতে হবে। এদের জন্য কি করা হয় ? এভাবেও প্রশ্নটা ভােলা যায় যে সব বীরের স্বাধীনতার জন্য আপন দেহ বা মন বিলিয়ে দিল তাদের জন্য কি করা উচিত ? সােভিয়েট সামাজিক নিরাপত্তা সচিবের উত্তর খুব সােজ।। লাল ফৌজ বা নৌবাহিনীর কোনাে লােক যদি তার পুরানো কাজে ফিরে যাবার উপযুক্ত না থাকে তবে তাকে অন্তত তার পুরানো কাজের বেতনের সমান পেনশন দেওয়া হয়। আসলে স্থায়ী পঙ্গুতার তারতম্য অনুসারে সাধারণত পোন পুরানাে বেতনের চেয়ে অনেকটা বেশীই হয়। ভাবতই সম্ভব হলে খুব কম প্রবীণ ব্যক্তিই পেনশন নিয়ে আলস্যে দিন ৮৭ কাটাতে চায়। এই কথা মনে রেখে লাল ফৌজ ও নৌবাহিনী থেকে পুনর্নিয়ােগের জন্য বহু স্কুল ও হাসপাতাল পােলা হয়েছে। এখানে পঙ্গু লােকেরা তাদের স্বাস্থ্য ও অবস্থা অনুযায়ী কাজ শিখতে পারে। এই সব স্কুলে সে কাজ হয় সে কাজের জন্য—এমন কি অপটু শিক্ষার্থীদের কাজের জন্যও সামাজিক নিরাপত্তা বিভাগ থেকে টাকা দেওয়া হয়। সােভিয়েট জন্মভূমির জন্য কোনাে নরনারী যখন তার দৈহিক স্বাস্থ্য বিসর্জন দেন তখন তাঁকে সাধারণ অসামরিক জীবনে পূনপ্রতিষ্ঠিত করবার সমস্ত চেষ্টা করা হয়। তা সম্ভব না হলে জীবন এই আত্ম- ত্যাগীদের পুরানাে জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার মত পেনশন দেওয়া হয়। ৮ সমগ্র জাতির রণসজ্জা অনেক বিশেষজ্ঞ রাশিয়ার শক্তির কারণ এইভাবে ব্যাখ্যা করেন । সোভিয়েট ইউনিয়নের মানুষ লড়ছে ন্মভূমি রক্ষার জন্য । তাই তারা জার্মানদের ঠেকাতে পারছে ! কি মত? দুটি মাত্র দেশের কথা বলছি—পােল্যাণ্ড ও গ্রীসের জনগণও তো তাদের জন্মভূমি বক্ষার জন্য লড়েছিল। তারা তো পদস্ত হয়ে গেল। আরো অনেকে বলে রুশের আশ্চর্য রকম লড়ছে কারণ তারা তাদের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বাচাচ্ছে। কিন্তু ওয়েক দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্রের নো-সৈন্যরাও অদ্ভুত সাহসের সঙ্গে লড়েছিল যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয় । রাজ ঘছ জর্জের জন্য লড়তে গিয়ে বৃটিশ ও কানাডিয়ান সৈন্য, নৌবাহিনীর লােক ও বৈমানিকেরাও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। রুশের। তাদের জন্মভূমি বা সমাজতন্ত্র রক্ষা করছিল এই কথা বলে সােভিয়েট শৌর্যের ব্যাখ্যা করা যায় না। নিশ্চয়ই এ সবেরও মস্ত প্রভাব রয়েছে। তবুও এই যুদ্ধে বারবার প্রমাণ হয়েছে সে যা কিছু গৌরবের, শ্রদ্ধার তার জন্য লড়াই করেও দেশের পর দেশ হিটলারী বর্বরদের পাশবিকতা, রক্তলােলুপতার কাছে হার মেনেছে। হিটলার রুশেদের পদস্ত করতে পারেনি। তারাই হিটলারকে গুড়িয়ে গেল। হিটলারের বিখ্যাত কালােকোর্তাবাহিনী শীতকাল মস্কোতে না কাটিয়ে রাশিয়ার প্রান্তরে পেল চির শান্তি।

রুশের। সে তাদের প্রিয় মস্কোর জন্য—সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাদের যা কিছু দিয়েছে তার জন্য লড়েছে—এ কথা ঠিক। কিন্তু লড়বার অস্ত্রও তাদের ছিল। আজব দেশ রাশিয়া থেকে যত ঘটনার কথা শােনা গেছে তার মধ্যে এর কাহিনীই হল সব থেকে আশ্চর্য ব্যাপারগুলির অন্যতম। ১৫ বছর আগে রাশিনা সাব্যস্ত করে সমগ্র জাতিকে অস্ত্রসজ্জায় সাজাবার। সামরিক, সরকারী ও বৈজ্ঞানিক নেতারা সযত্নে পরিকল্পনা রচনা করলেন। এই সামগ্রিক যুদ্ধের কেন্দ্রীয় সংগঠনের এত কটমট নামকরণ হল । ওশােয়াভিয়াখিম যে আমরা তাকে বলব “সামাজিক আত্মরক্ষা”। ঠিক হল ব্যাপকভাবে এই আত্মরক্ষা ব্যবস্থা গড়া হবে । তাই কর্তৃপক্ষ জনসাধারণেরই মত চাইলেন। মা ঘটল অভিনবত্বের দিক দিয়ে তা একেবারে তাজ্জব। যুদ্ধের যখন প্রত্যক্ষ বিপদ নেই তখন সমস্ত দেশকে সামাজিক আত্মরক্ষার ব্যাপারে আকৃষ্ট করতে হলে প্রয়ােজন খুব বেশী জনপ্রিয় আবেদনের। পাওয়া গেল। কিন্তু প্রচার বা বক্তৃতা দিয়ে নয়—বর, বলা যেতে পারে মানুষের এক সবব্যাপী দুবলতায়--সব ছেড়ে জুয়াড়ী মনােবৃত্তিতে। বােধ করি সমাজতন্ত্রের আমলেও মানুষের মধ্যে ভাগ্য পরীক্ষা করার, কয়েক টাকা নষ্ট করতে রাজী থাকার—কিম্বা বিনা খরচায় দাও মারার চেষ্টার আশ্চর্য প্রবণতা থাকে । জুয়ার দোষ সম্পর্কে নানা বাজে কথা লেখা হয়েছে। অন্য যে কোনাে জিনিসের মত এও একট। পাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ লােক মাঝে মাঝে ঘােড়দৌড়ের টিকিট কিনতে চায়। রুশেরাও এ দিক থেকে কিছু ভিন্ন জাতের নয় একটি দিক ছাড়া। তারা ঠিক করল বৈজ্ঞানিক মনস্তত্ত্বসম্মত পথে জুয়াড়ী মনােলবকে কাজে লাগাবে—-জাতির উন্নতির জন্য ।

তাই তারা শুরু করল ‘সামাজিক আত্মরক্ষার লটারী খেল । প্রায় বাই এর টিকিট কিনল । ১৯৪ ০-এর অঙ্ক আমার কাছে আছে। সে বছর ‘সামাজিক আত্মরক্ষা লটারী বিজয়ীদের পুরস্কার দেয় আড়াই কোটি রুবল। এর থেকে অনেক বেশী টাকা কর্তৃপক্ষের হাতে রইল । এ টাকা টিকিট বিক্রেতা, ঠক বা জুয়াচোরদের পকেটে গেল না—গেল “সামাজিক আত্মরক্ষার কাজে। ‘সামাজিক আত্মরক্ষা বিভাগ তার বিপুল বাৎসরিক আয়ের সাহায্যে আত্মরক্ষার প্রচুর সরঞ্জাম কিনতে পারল। লটারী স্বভাবতই সকলের আগ্রহ উদ্রেক করল ! ঠিক তেমনই করল আবার সামাজিক আত্ম- রক্ষার প্রচেষ্টা ! গত ১৫ বছর ধরে অবসর সময়ে ও ছুটিতে রাশিয়ার মানুষ সামাজিক আত্মরক্ষা লটারীর টাকায় কেনা সরঞ্জাম দিয়ে যা করল তার কিছুটা এবার বলি । সত্যিকারের অগ্নিকাণ্ডে তাগ্নিনিৰাপকের কাজ, সেতু বাড়া বোমা উড়িয়ে দেওয়া, ডানপিটে কসাকদের মত ঘােড়ায় চড়!, বির বে' জায়গায় টেলিফোন বা রেডিও পরিচালকের কাজ, সত্যিকারের হ! বােম ছোড়া, বেয়নেট চালানাের প্রতিযােগিতা, দিনের 원 জঙ্গলে কাটানো, বৈমানিকদের নজর এড়িয়ে লুকোচুর সমস্ত জেলা জুড়ে নিষ্প্রদীপের মহড়া আর সব থেকে বেশ এরােপ্লেন বানানাে, সারানাে, চালানো ও তার থেকে লাফিয়ে পড়া। সালে রাশিয়ার ছেলেমেয়ের। প্যারাশুট ৫০,০০,০০০ বার লাফিয়ে পড়ে ; বড়ব। প্লেন থেকে লাফায় লক্ষ বার ; হাজার হাজার ছোট বড়রা ছিল গ্লাইডার ক্লাবের সভ্য ও নভােচারিতায় অভিজ্ঞ। এ জিনিস সামাজিক আত্মরক্ষাও বটে আবার দুনিয়ার সব থেকে চমক-লাগানো খেলাও বটে । আমাদের ১৯S

দেশে যখন ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন
সােভিয়েটের ছেলে মেয়েরা তখন, গ্লাইড করছে, উড়ছে—এমন
কি প্যারাশুট নিয়ে ঝাপ খাচ্ছে ।
ঝাপ খাচ্ছে। এরােপ্লেন , পছন্দ করে,
এরােপ্লেন তারা ব্যবহারও করে ।
অবশ্য এ কথা বলতে চাই না সে রুশ পরিবার পছু এক
এরােপ্লেন আছে। মােটেই না। তবুও প্রায় প্রভাব পরিবারেই
অন্তত একজন লােক ‘সামাজিক আত্মরক্ষার জেনাক্ত
আর ‘সামাজিক আত্মরক্ষা’ ক্লাব পিছু একটা প্লে আছে।
এই
প্লেনের মালিক সমগ্র জাতি। বয়স্ক, তরুণ ব; হয় প্রত্যেকেই
অবাধে এটা ব্যবহার করতে পারে। আমাদের এ উট ও গাল
গাইডের মত সােভিয়েটে যে সংগঠন আছে। ছেলেমেয়েদের
গরমের ছুটিতে এরােপ্লেনে বহু দূরে শিবিরে নিয়ে নওয়া হয়। শুধু
তাই নয় ছুটিতে বেড়ানাের ব্যাপারটা মহড়ায় পরিণত হয়—
গন্তব্য স্থানে পৌঁছে
পোঁছে তরুণেরা
তরুণেরা প্যারাশুটে করে শিবিরে নামে।
আমাদের দেশে আমরা পাকা বৈমানিকের পক্ষেও রশুটে লাফানে
জিনিসটাকে বিপদজনক মনে করি। সােভিয়েট ইউনিয়ন স্কুলের ছেলেরা ও
প্যারাশুটের সঙ্গে পরিচিত।
‘সামাজিক আত্মরক্ষা’ রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে প্লে
ও প্যারাশুট লম্যানের সঙ্গে পরিচিত করেছে। #, আছে মস্কো।
এক ছেলে কয়েক শত সঙ্গীদের নিয়ে সুদূর এক কফি অঞ্চলে প্যারাশুট
নিয়ে নামে। ছেলেটা ছিল খানিকটা চালিয়াং চন্দ, পুরনের। দে
নামল এক ক্ষেতের কাজে ব্যস্ত বুড়ো চাষীর কাছে ; সে হাসতে
হাসতে বলল “খবর কি ঠাকুর্দা। এমন জিনিস কে 'তুমি কখনও
দেখনি এ কথা আমি বাজী রেখে বলতে পারি !”
৯২

বুড়ো চাষ বড় হয়ে দাড়াল। চারিদিক দেখে থুতু ফেলল, তারপর বলল নাতি এসেছিস গেল হপ্তায়। কিন্তু সে হল আরো তমের মত তার প্যারাশুট ঝােপে আটকায়নি। থামাে, টান মেরে ন', অস্থেত কি প্যারাশুট কেমন করে সামলাতে হয় তাও তারপর বুড়ো ছেলেটির প্যারাশুট পাট করতে করতে বলেই চলল “ হে আমার ও নীচু থেকে লাফাতে হবে। হয়ত আজ রাতেই ‘সম্মাজিক আত্মরক্ষার মাঠে গিয়ে আমি লাফাব হাবশ্য যদি বৃষ্টি না হয় ।" তারপর ‘ঠাকুর্দা ভুরু কুঁচকিয়ে শেষ করল “আর দি মেশিনগান মহড়া তাড়াতাড়ি শেষ হয় !” রাশিয়ার লক্ষাভেদ সম্পর্কে একটা কথা বলি। লক্ষ লক্ষ বয়স্ক ব্যক্তি ও তরুণের। একেবার ‘সামাজিক আত্মরক্ষার রাইফেল সংঘের গুলী ছেড়া ও দেশে কি ভীষণ উৎসাহ তা বােঝা যায় এর থেকেই সে চার বছর আগে ৬০ दाभ গােলন্দা এ দিকে ওস্তাদার জন্য বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘ভয়ােশিলভ ' পুরস্কার পায়। প্রায় ১০,০০০ বস্তু লােক সবার সেরা অব্যর্থ সন্ধানের বাজী জেতে আর কোনো কোনো ওস্তাদের নাম জগৎ জোড়া। ১৯৩৯ সালে বৃটিশ রাইফেল ক্লাব সংঘ রুশ ‘সামাজিক আত্মরক্ষা দলগুলির সঙ্গে প্রতিযােগিতা চালায়। ফল হল এই যে ২১টি প্রথম স্থানের মধ্যে ১৮টি অধিকার করে সােভিয়েট ওস্তাদের। আর প্রথম পাঁচটি স্থান নেয় একটি বুশ দল ‘সামাজিক আত্মরক্ষার কেন্দ্রীয় লক্ষ্যভেদী ক্লাব'। মস্কোর স্কুলের ছেলেরা নিউ ইয়র্ক ভ্যালি স্ট্রীমের দলের সঙ্গে প্রতিযােগিতা করে ১,২০০-১,১১৫ পয়েন্টে জেতে। স্কি মহড় ও ঘােড়ায় চড়ার দিকে ও সামাজিক আত্মরক্ষার তালিকায় ৯৩ ঐ একই রকম ভালো ফল দেখা গেল। রাশিয়ায় এই দুটি ব্যয়সাধ খেলার দরজা ছােটো বড় প্রত্যেক স্বাস্থ্যবান, স্বাস্থ্যবতীদেরই কাছে খোলা হল। স্কিয়িং ও ঘােড়ায় চড়া নিয়মিত লম্বা দৌড়, জঙ্গলের মধ্যে ঢোকা ও লড়াই এর খেলা প্রভৃতির সাহায্যে আরাে চমকপ্রদ করে তােল ' শান্তির সময় সামাজিক আত্মরক্ষা এই সব করত। যদের কি করেছিল খবরের কাগজ থেকেই তা জানা যায় । मगर জাতি ক্যাশিট দস্যদের প্রতিহত করতে অগ্রসর হয়। কোনে কোনো পরিদর্শক বলেছেন : “বেসামরিক জঙ্গী দল ও গেরিলাবাহিনী সেন ইন্দ্রজালের মত চারিদিকে গজিয়ে উঠল।” ইন্দ্রজাল কিন্তু ছিল না। কোথাও। বহু আগে সামাজিক আত্মরক্ষা এগুলিকে সংগঠিত করে— সমস্ত আন্দোলনে জাতীয় উৎসাহ মােগানাের উপযােগী জনপ্রিয় লটারীর সাহায্যে এর টাকা ওঠে। রাশিয়ার নরনারী য়ুরােপীয় ভূখণ্ডের জনগণের মত নাৎসী দস্যুদের হামলার সামনে দৌড়ে পালায়নি। রুশদের Fঢ় হকার পিছনে অলৌকিক বা অতি-মানবিক কিছু নেই। তাদের বুকে ছিল সাহস । কিন্তু বৈজ্ঞানিক আত্মরক্ষার শিক্ষা ও ছিল তাদের মাথায়। হিটলারের সেনাপতিরা স্বীকার করেছে যে রুশ গেরিলাবাহিনী বাড়তে বাড়তে প্রায় দ্বিতীয় ফ্রন্টের সামিল হয়ে দাড়িয়েছে। রাশিয়ার সাধারণ লােক এই লড়াই লড়তে পারে কারণ পনেরো বছর পরে তারা শিক্ষানবিসী করেছে। ৯৪ নূতন স্বাধীন পরিবার ফ্যাশিস্ট বাহিনী যখন ইউক্রেনীয় জাতির দেশ প্রায় সবটাই মুঠোর মধ্যে এনে ফেলেছিল তখন রাশিয়ার ভিতরকার অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বিজ্ঞান পরিষদের এক বিশেষ সভা হয়। এরই একটি অধিবেশনের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি জিনিস যা আমাদের দেশে অত্যন্ত অদ্ভুত বােপ হবে। বৈজ্ঞানিকেরা সেদিন একত্র হয়েছিলেন মস্ত এক ইউক্রেনীয় কবির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে। এই প:ক্তি কটি থেকেই ইউক্রেনীয় পাঠকেরা কবিকে চিনতে পারবেন । বৈজ্ঞানিক বােগােমােলেট দণ্ডায়মান সশ্রদ্ধ সহকর্মীদের সামনে এগুলি পাঠ করেন :- “সেই মহৎ স্বজন পরিবেশে নতুন সুখী স্বাধীন ঘরে ঘরে নাম আমার স্মরণে এলে, হেসে বােলাে সে কথা দরদী মৃদুস্বরে। এই কবি হলেন শেভচেঙ্কো, মানুষের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও মুক্তি সাধক। সামগ্রিক যুদ্ধের নানান খুটিনাটি নিয়ে ব্যস্ত বিখ্যাত বৈজ্ঞানিকের এক কবিকে শ্রদ্ধা জানাবার সময় করতে পারলেন-কেমন করে এটা সম্ভব হল ? শেভচেঙ্কোর জীবন ও কীর্তির মধ্যেই এর উত্তর মিলবে। তিনি ছিলেন সেই যুগের মানুষ যখন ইউক্রেন জায়েদের কঠোর শাসনের চাপে ছিল অবসন্ন। ভূমিদাস ছিলেন তিনি। এই ভূমিদাসত্ব প্রথার পরে তার ??

ছি) আন্তরিক ঘৃণ। তার দেশের লােক নির্মম জাতিগত নিপীড়নের উপলক্ষ ছিল। শেভচেঙ্কো প্রচার করতেন বিভিন্ন জাতির ও দোর ইউক্রেন ও পােল্যার পাশাপাশি সমস্ত রুশ কে যখন শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল তখন শেভচেঙ্গে তার বিখ্যাত কবিতা “ককেশাস" রচনা করেন। এতে তিনি বলেন কি ভাবে মুক্তির অনির্বাণ শিখ, ককেশাস পাহাড়ের বরফে ঢাকা চুড়ােতেও পোঁছােনো হয়। “সন সম্রাটের। আকণ্ঠ অঞ ও রক্ত পান করতে পারে কিন্তু জাবতী ফুণ মুক্তি-পিপাসুর উষ্ণ রক্ত কখনো নিঃশেষ করতে পারবে না !" এই সব কবিতার জন্য শেভচেঙ্কোকে ভয় কর ত জার ও বড় বড় ভূস্বামীরা কিন্তু তার আসন ছিল জনসাধারণের মনে। মৃত্যুর পরে তার প্রভাব আরাে ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। বিপ্লবের পর সােভিয়েট সরকার যখন ইউক্রেনকে মুক্ত করেন তখন শেভচেঙ্কোর রচনার মস্ত মস্ত সংস্করণ, প্রকাশিত হল আর সর্বত্র ইউক্রেনীয়রা সাগ্রহে তা পড়তে লাগল । হিটলারের চেলারা চেষ্টা করে এই জনপ্রিয়তা নষ্ট করবার। তার: শেভচেঙ্কোর কবিতার বিকৃতি ঘটায়। তারা রচনার খােল নলচে পালটাতে লাগল—উদ্দেশ্য ছিল কবিকে রুশ, পােল, ইহুদী প্রভৃতি অন্যান্য জাতি বিদ্বেষী ইউক্রেনীয় ‘জাতীয়তাবাদী' বলে প্রতিপন্ন করা। কিন্তু এ হল অত্যন্ত খেলাে ধরনের মিথ্যাচার। শেভচেঙ্কোর সমস্ত জীবন ও কাব্যই এর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় । দৃষ্টান্ত হিসাবে বলা যায় শেভচেঙ্কো একবার এক গ্রামে ছিলেন যেখানে হিটলারী ব্রাউন শাট সন্ত্রাসবাদীদেরই পুরানাে সংস্করণ এক দল গুণ্ডাদের জারের চরেরা খুব ক্ষেপিয়ে তুলেছিল। এরা গ্রামের ইহুদীদের পরে হানা দেওয়ার ব্যবস্থা করে। শেভচেঙ্কো গােলমালের জায়গায় দৌড়ে গিয়ে দেখলেন অনেকগুলি বাড়ী তখনও ভীষণভাবে জ্বলছে। একজন যখন চীৎকার করে বলল যে ৯৬ একটি জলন্ত কুঁড়ে ঘরে একজন বাচ্চাকে ফেলে আসা হয়েছে তখন কবি নিজে এগােলেন সে ঘরের মধ্যে আর বার করে আনলেন সেই জীবন্ত শিশুকে। সব সময়েই এই মহৎ ইউক্রেনবাসী তাদেরই ঘৃণা করতেন যারা তার দেশবাসীকে ইহুদী-পীড়কে পরিণত করতে চাইত। তিনি এই কথাটাই প্রমাণ করেছিলেন যে যারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে তারা হচ্ছে ঠিক সেই অত্যাচাৰীৰই দল যার! দাসত্বশৃঙ্খলে বেঁধেছে ইউক্রেনবাসীদেরও। শেভচেঙ্গে। রুশবিদ্বেী ছিলেন এ কথা; মিথ্যা। তিনি ঘৃণা করতেন শুধু জার, অভিজাতবর্গ ও সমস্ত স্বাধীনতার শত্রুদের। বিখ্যাত রুশ গণতান্ত্রিক চারনিয়েশেভ স্কির সঙ্গে বহু বছর ধরে শেভচেঙ্কোর ছিল ব্যক্তিগত সৌহার্দ। এমন কি ইউক্রেনবাসীদের মধ্যেও সে সব নেতা জনগণের সত্যকার বন্ধু তাদের সঙ্গে অত্যাচারীদের অনুচরদের মধ্যে- কার পার্থক্য তিনি স্পষ্টভাবেই দেখাতেন। যেমন তার এক এপিক কবিতার নায়ক রুশ ‘পিটার দি গ্রেটের সঙ্গে যােগ দিয়ে হেটম্যান মেজেপপা নামে এক বিশ্বাসঘাতক ইউক্রেনবাসীকে পরাজিত করেন। আর শেভচেঙ্কো প্রশস্তি রচনা করেন বগােন শ্মেনিটস্কির যিনি সমস্ত জাতির স্বাধীনতার ভিত্তিতে ইউক্রেনবাসীদের উদ্বুদ্ধ করেন তাদের রুশ ভাইদের সঙ্গে হাত মেলাতে। ইউক্রেনীয় বিশ্বাসঘাতক, ভূস্বামী, হােয়াইট গার্ড আর সারা দুনিয়ায় তাদের ফ্যাশিস্ট সাঙ্গপাঙ্গরাই শুধু এই মহান কবির জার্মান বিকৃতি স্বীকার করে জার্মান বাহিনী যখন ঘণ্য ইউক্রেনীয় ঘণ্য ইউক্রেনীয় পঞ্চম বাহিনীদের সঙ্গে নিয়ে সােভিয়েট ইউক্রেনে ঢুকল তখন এই মিথ্যাচারের স্বরূপ প্রকাশ পেল। কারণ জার্মানরা তখন প্রায় ১০০ বছর আগে পরেই তাদের পাশবিক ঘৃণা চরিতার্থ করল। নিল। মৃত ব্যক্তির ৯৭ ৭-(১৪) তারা গেল শেভচেঙ্কোর কবরে যে কবর ইউক্রেনবাসীদের কাছে মন্দিরের মত পবিত্র—আর সেখানে গিয়ে জঘন্যভাবে অপবিত্র করল সে কবর। জার্মানরা এই অর্থহীন কাণ্ড করল কারণ তাদের ফ্যাশিস্ট হৃদয় পূর্ণ ছিল জাতি বিদ্বেযে। তার সেই কবির স্মৃতি পর্যন্ত সহ্য করতে পারল না। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই দিনের যেদিন রুশ, ইউক্রেনীয়, পােল ও সমস্ত জাতির মানুষ ঐ নূতন ও স্বাধীন পরিবারভুক্ত হবে। সব দেশেই ফ্যাশিট ও তাদের দালালের জাতিবিদ্বেষের বিষ দিয়ে মানুষের সর্বনাশ ঘটায়। এ হল এক সনাতন পাপ-ইহুদীর বিরুদ্ধে খ্রীষ্টান, রুশের বিরুদ্ধে পােল, ইউক্রেনিয়ানদের বিরুদ্ধে কসাক, সমস্ত কালােদের বিরুদ্ধে সমস্ত ধলা। শত শত বছর ধরে অত্যাচারীর মানুষের ভ্রাতৃত্বের আদর্শ পাছে বাস্তবে পরিণত হয় এই জন্য ছড়িয়েছে এই বিষ। এই জাতিবিদ্বেষের ফলেই জার্মান জাতি হিটলারী ফাদে পা বাড়ায় । ফ্রান্স, পােল্যাণ্ড, যুগােশ্লোভিয়া, হাঙ্গেরী, রুমানিয়ার সর্বনাশ হয়েছে এরই ফলে । আজকেও ফ্যাশিস্ট ও তাদের দালালেরা আমাদের নিজেদের দেশেও এই বিষ ছড়াচ্ছে। সােভিয়েট ইউনিয়নে অর্থাৎ য়ুরােপের ঠিক সেই অংশেই যেখানে শত শত বছর ধরে জাতিবিদ্বেষের আগুন জ্বলেছে সেখানেই এক আঘাতে সমস্ত মানুষের মধ্যে থেকে এ পাপ ধুয়ে মুছে ফেলা হল। পথ দেখালো বিজ্ঞান—অকাট্য বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি দ্বারা এই কথা প্রমাণ করে যে জাতিগত উৎকর্ষ বা অপকর্ষ বলে কোনো জিনিস নেই। সমান সুযােগ পেলে সব জাতিই সব দিক থেকে সমান। এর বিপরীত মতের স্বপক্ষে এক ফোটাও যুক্তি নেই। বিজ্ঞান কোনাে ঘাের প্যাচ না করে আমাদের সােজা এই কথাই জানায় যে একটিমাত্র বিশু জাতি আছে —তার নাম মানবজাতি । ১৮ জন্ম সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ তখন এই কথাটা পরিষ্কার করে বুঝতে চেষ্টা করলেন যে “মানব প্রকৃতির মধ্যেই" এমন কিছু আছে কি না যা জাতিবিদ্বেষের দেয়। উত্তর হল না। কিন্তু এই অনুসন্ধানের ফলে শীঘ্রই সােভিয়েট ইউনিয়নের জনসাধারণ এই পাপের মূল আসলে কোথায় তা বুঝতে পারল। জাতিবিদ্বেষ ছড়িয়েছে ও এখনও ছড়াচ্ছে একই লােকের --জনসাধারণের শত্রুরা। তাই সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ বিপুল দেশের সমস্ত জাতির জনসাধারণের পৃষ্ঠপােষকতায় বলীয়ান হয়ে ঘােষণা করলেন যে, সে কোনাে রূপেই হােক না কেন জাতিবিদ্বেষ প্রচার এখন থেকে হবে সােভিয়েট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হাপরাধ । অতি দ্রুত দুটো জিনিস দেখা গেল। প্রথমত দমনা জাতিবিদ্বেষ প্রচারকেরা কাপুরুষের মত চুপ মেরে গেল। দ্বিতীয়ত জাতিবিদ্বেষ প্রচারের আসল উৎসগুলি বিচ্ছিন্ন ও উদঘাটিত হয়ে পড়ল। মানুষকে যারা পশু বানাতে চায় উপযুক্ত শাস্তির সাহায্যে তাদের ব্যবস্থাও হল অবিলম্বে । এই নীতি চালু হবার কয়েক বছর পর জাতিবিদ্বেষ আর সােভিয়েট ইউনিয়নে একটা সমস্যা হিসাবে রইল না। এটা হল এমন একটা মস্ত কাজ যে এ দেশে আমরা তার গুরুত্ব ধরতেও পারি না। নাম থেকেই বােঝা যায় যে ইউনিয়ন অফ সােভিয়েট সােশ্যালিস্ট রিপাব লিক কয়েকটি সাধারণতন্ত্রের সমষ্টি। তার উপরে এটি হল ডজন খানেকেরও বেশ জাতির সমষ্টি—যার একটিমাত্র হল “রুশ”। কালাে-ধলা-পীত, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য মানুষের, স্বর্ণাভ আর্য ও কৃষ্ণাভ ‘ইহুদীদের সমস্ত জাতির দেশ এইই। আজারবাইজান, জর্জিয়া, আর্মেনিয়া, তুর্কমেন, উজবেক, তাজিক, কাজাক, কিরঘিজ প্রভৃতি নানা রিপাবলিকে সােভিয়েটের লক্ষ লক্ষ ৯৯ লােক বাস করে যাদের নামও আমরা শুনিনি। এর মধ্যে প্রত্যেকটি দেশেরই স্বতন্ত্র জাতীয় সত্ত্বা, বিভিন্ন ভাষা ও রীতিনীতি আছে। আরাে অনেক জাতি আছে যেমন ভগ্নার তাতার, ক্রিমিয়ার তাতার, বাস্কির, ইস্ক, সেটিয়ান, এভেঙ্ক, আভার, লেজঘিয়ান ও চেচেনরা। বিপ্লবের আগে এদের মধ্যে কয়েকটি জাতি ছিল আমাদের এস্কিমােদের মতই বন্ত ; সবাই ছিল জারের নীতির উপলক্ষ যা দাসদেশ মাত্রকেই নৃশংসভাবে শােষণ করত। দেশীয় ভাষায় স্কুল চালাবার অধিকার তাদের ছিল না। বিশেষ অনুমােদন ছাড়া তারা আপন দেশের বাইরে পা বাড়াতে পারত না। সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠেছিল অসংখ্য ধর্ম মতের অস্তিত্বের জন্য । বৌদ্ধ, মুসলমান, হিন্দু গ্রীক, খ্রীষ্টান, রােমান, ইহুদী, প্রটেস্টান্ট ও আরাে বহু ছােটো খাটো ধর্ম ছিল। তবুও সমস্যার সমাধান হল। সােভিয়েট ইউনিয়ন হচ্ছে একমাত্র বিরাট দেশ যেখানে কোনাে জাতিসমস্যা নেই। ১৮ কোটি লােক আর জাতি- বিদ্বেষের বিষে জ্বলে মরে না। ইউক্রেনের কবি শেভচেঙ্কোর স্বপ্ন রূপ পেয়েছে বাস্তবে। নূতন সােভিয়েট বিজ্ঞান জাতি সম্পর্কে মূলতত্ত্ব মানুষের কাছে উদঘাটিত করে দেখিয়েছে শেভচেঙ্কোর স্বপ্নকে কেমন করে বাস্তবে পরিণত করতে হয় । ব্যাপারটা হল এইভাবে :- প্রথমত সােভিয়েট সরকার প্রত্যেক স্বতন্ত্র জাতির ভাষা, পুরানাে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য যে রক্ষা করতেই হবে এই মূল নীতি নির্ধারণ করল। দেশীয় ভাষায় স্কুল কলেজে শিক্ষার ব্যবস্থা, দেশীয় ভাষায় অসংখ্য বই ও পত্রিকা প্রকাশ, দেশীয় সাহিত্য, সংগীত, লােকগীতি, নৃত্য ও অণেরার জনপ্রিয়তা- সাধন প্রভৃতির সাহায্যেই এ কাজ করা হল। জারের আমলে এ সব নিষিদ্ধ ছিল। সােভিয়েটের রাজত্বে জনগণকে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ ও সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের অতীত ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করবার জন্য প্রচণ্ডভাবে এ সবে উৎসাহ যােগানো হল। দ্বিতীয়ত প্রত্যেক জাতিকে নূতন বিজ্ঞান, নূতন কৃষি, নূতন শিল্প এবং নূতন ও বিশিষ্ট জীবনযাত্রা প্রণালী এই সব নানা ধারায় নূতন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করা হল। এইভাবে বহু জাতি কি করে তারা শক্তি অর্জন করল সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, বুঝতে পারে আগামীকাল জাতি হিসাবে কোন্ জিনিস তাদের প্রেরণা দেবে—যুদ্ধ নয়, দস্যুতা, লুণ্ঠন বা অন্য জাতির উপর শশাষণ নয় বরঞ্চ শিল্প, সাহিত্য, কবিতা, গান, বিজ্ঞান, শ্রম, কৃষি ও নানা শৌর্যবীর্যের কীর্তি কাহিনী। এই নীতি ফলপ্রসূও হল। এমন কি ইউক্রেনবাসীরা জার আমলের শােষণ সত্ত্বেও যারা তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারা অক্ষুন্ন রেখেছিল—তারাও সােভিয়েট শাসনে জাতীয় চেতনা ও গৌরবে প্রচণ্ড রকম উদ্ দ্ধ হয়ে উঠল। তৃতীয়ত জার আমলের বর্বরতার ফলে নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ে যে সব জাতি তাদের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতির সূত্র হারাতে বসেছিল তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি রাখা হল । শত শত বছর ধরে নিঃশেষ করার চেষ্টার ফলে যে সব জাত মরিয়া হয়ে উঠেছিল তাদের অবস্থাও ছিল এই রকম। বিপ্লবের পরে এরা অন্য জাতির মধ্যে আপনাকে নিঃশেষে মিলিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল। সােভিয়েট সরকার কিন্তু এ রকম হতে দিল না। এই সব বিলীয়মান জাতিকে উদ্ধার করল--তাদের নেতারা নয় বরঞ্চ অধিকাংশ সময়েই সেই রুশেরাই যারা আগের দিনে নিজেরা ছাড়া অন্য সব জাতকে দাবিয়ে রাখবার চেষ্টা করত। এই হতভাগ্য জাতির মুক্তির আবহাওয়ায় আবার ধীরে ধীরে তাদের সংস্কৃতির গুপ্ত ধন পুনরুদ্ধার করল, মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে দেখল যে সােভিয়েট ইউনিয়নের অন্য সব জাতির আসরে তাদেরও ডাক এসেছে । আর্মেনিয়ানদের সম্পর্কে এই কথা বিশেষ করে খাটে। গত ১০০ বছরে এরা অন্য যে কোনাে জাতের চেয়ে বেশী দুর্গতি ভােগ করেছে। তুর্কীরা পড়াই করত সে আর্মেনিয়া আর নেই কারণ সেখানকার শো পুরুষ মানুষটিকেও হত্যা করা হয়েছে। আজ কিন্তু আর্মেনােন তির আপন সোভিয়েট রিপাবলিক আছে, দ্রুত অগ্রগতির জন্য যার নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। চতুর্থত সােভিয়েট ভাষাবিদেরা সমগ্র দেশ ঘুরলেন সেই সব আদিম জাতির সন্ধানে জারের আমলে পশুর মত শিকার করা হত যাদের। এদের অদ্ভুত কথাবার্তা ভালাে করে চর্চা করে তারা এদের জন্য লিখিত ভাষাও দাড় করাতে পারলেন। ইতিহাসে এই প্রথম তারা লিখতে শিখল, এক চারণ অন্য চারণকে যে সব লােক গাথা বা কাহিনী এতদিন দিয়ে যেত এবার সে সব তারা কাগজপত্রে লিখে ফেলতে শিখল। এখন সােভিয়েট ইউনিয়নের সর্বত্র প্রায় ডজন খানেক এই রকম জাতির গল্প ও গান প্রচলিত হয়েছে। সােভিয়েট বিজ্ঞানীরা এই কাজটির জন্য বিশেষ গৌরবান্বিত কারণ এর থেকে প্রমাণ হয়েছে যে “আদিম” জাতিরাও লিখিত ভাষা, বই, স্কুল ও স্বাধীনতা পেলে অতি দ্রুত উন্নত জাতির পর্যায়ে উঠতে পারে। স্পষ্টই বােঝা যায় এই চার দফা ব্যবস্থার লক্ষ্য একইসােভিয়েট ইউনিয়নের প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র জাতির সংরক্ষণ ও উদ্বোধন। সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ কি তবে এ আশঙ্কা করেন নি যে কোনো জাতির আত্মপ্রত্যয় বাড়তে বাড়তে আবার সেই পুরানাে ভূয়াে ‘জাত্যাভিমান’ হয়ে দাড়াতে পারে ? তারা কি এ ভয় পাননি যে ডজন ডজন স্বতন্ত্র জাতিদের মধ্যে গােলমাল বাধতে পারে আর সে গণ্ডগােল বেড়ে উঠলে জাতির ঘৃণার আগুন আবার জ্বলতে পারে ? না সে আশঙ্কা ছিল না। কেন ? কেন ? কারণ সােভিয়েট কর্তৃপক্ষ মনুষ্য জাতি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে এ বিষয়ে একেবারে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে জাতিবিদ্বেষ ব্যাপারটা অস্বাভাবিক—অতীতে জনগণের শত্রুরা জেনে শুনে এই বিদ্বেষের আগুন জ্বালিয়ে রাখত কিন্তু সে শত্রুরা নিঃশেষ হলে আগের গণ্ডগােল ব্য বিদ্বেষের পুনরাবির্ভাবের আশঙ্কা নেই। নববিজ্ঞানের ভিত্তির পরে প্রতিছিত আত্মপ্রত্যয় নিয়ে সরকার কবি শেভচেঙ্কোর ‘নতন ও স্বাধীন পরিবার, বহু জাতির পরিবারের স্বপ্ন ব্যাপকভাবে বাস্তবে পরিণত করতে পারলেন। কখনাে কখনে; কথার চেয়ে সংখ্যা অনেক বেশী অর্থব্যঞ্জক। সােভিয়েটের ৭৪টি ভাষায় বই প্রকাশিত হয়—খবরের কাগজ ৭১টি আর পত্রিকা ৬১টি ভাষায় বিপ্লবের পর ৪ ০ টিকা বেশী জাতি এই প্রথম সােভিয়েট বিশেষজ্ঞদের তৈরী লিখিত ভাসা পেয়েছে। শেক্সপিয়রের নাটক ১৭ টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। শেভচেঙ্কোর কবিতা ইনগাস, মলডাভিয়ান, তাজিক প্রভৃতি অদ্ভুত ভাষায় ছাপানো হয়েছে। আর একটি জরুরী কথা। সােভিয়েট ইউনিয়নে প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র জাতির রয়েছে নিজস্ব প্রাণােচ্ছল জীবন। তবু তাদের মৈত্রীবন্ধন ও অচ্ছেদ্য। সােভিয়েটের নানা জাতির মধ্যে ঐক্য বন্ধনের মূলে হল তাদের নূতন জীবনের প্রতি ভালােবাসা, শুধু তাদের আপন আপন জাতি নয় সমস্ত ইউনিয়নকে রক্ষা ও উন্নত করার জন্য তাদের প্রচণ্ড সংকল্প। নতন সােভিয়েট জীবনধারা প্রত্যেক জাতিকে দিয়েছে মুক্তি, পুনরুদ্ধার করেছে জাতীয় সংস্কৃতি ও গৌরব আর সেই সঙ্গে মুছে ফেলেছে সমস্ত সনাতন শােষণ ব্যবস্থা। এবার হয়ত আপনারা বুঝছেন ইউক্রেনিয়ান সােভিয়েট বিজ্ঞানীরা জরুরী যুদ্ধসংশ্লিষ্ট সম্মেলনের মধ্যেও কেন একটি পুরো অধিবেশন শেভচেঙ্কোর সম্মানে উদ্যাপন করেন । এই কবি পরিষ্কারভাবে বুঝেছিলেন জাতীয়তা ও জাতিদন্তের মধ্যেকার পার্থক্য। ‘জাতিদম্ভ হল এক জঘন্য মতবাদ। জাতিবিদ্বেষ রােগের জীবাণু হল এই। ফ্যাশিস্ট দস্যরা এই রােগ ছড়ায় দিকে দিকে। এর বিনাশ ঘটাতে হবে । ‘জাতীয়তা’ হল গৌরবের জিনিস। প্রত্যেক মানুষ তার পূর্বপুরুষ- দের কাছ থেকে এই দুর্লভ মর্যাদার অধিকারী হয়। একে রক্ষা করতেই হবে। কবি শেভচেঙ্কোর দৃষ্টিতে এ সত্য ধরা পড়েছিল সে মনুষ্য জাতি তার জাতি বৈচিত্র্য সত্ত্বেও এক ‘বিপুল পরিবারের মত শান্তিতে থাকতে পারে। একশ বছর পরে সােভিয়েট বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রনেতারা প্রমাণ করলেন তার মতের যাথার্থ । সােভিয়েটের নানা জাতির মানুষের আজ একটি প্রিয় গান হচ্ছে -- “বিপুল মস্কো থেকে সুদূর সীমান্ত, আর্কটিক-সমুদ্র থেকে সমরখন্দ এই দেশে—তাদের এই বিশাল পিতৃভূমিতে মানুষেরা সর্বত্র বুক ফুলিয়ে বেড়ায়।” সত্যই শেভচেঙ্কোকে তার স্মরণ করে শুধু ‘মৃদু মধুর ভাষায়’ নয়- গৌরব গাথায়ও। নাৎসী বর্বরের শেভচেঙ্কোর স্মৃতিমন্দির নষ্ট করলে কিছু যায় আসে না। কবির সত্য অবিনশ্বর। কবির সত্য অবিনশ্বর। সমস্ত জাতির তরফ থেকে ইউক্রেনিয়ান বিজ্ঞানীরা দেশ থেকে ফ্যাশিস্ট বিতাড়ন ও তার পরে নীপার নদীর পারে সুন্দর শেভচেঙ্কো স্মৃতিমন্দির নির্মাণের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন যাতে সে মন্দির সমস্ত মানব :মাজের পবিত্র স্থান হয়ে দাড়াতে পারে । ১০৪ কবির “নূতন ও স্বাধীন পরিবারের স্বপ্ন যে কত সম্পূর্ণভাবে বাস্তবে পরিণত হয়েছে ইউক্রেনিয়ান বৈমানিক আননি আন্দ্রিয়েভের উদাহরণ থেকেই তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় । প্রমাণ হয়। এর কথা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আন্দ্রিয়েভ তার ভাইকে লেখেন যে তিনি হিটলারী দস্যুদের তার বাপ, মা, ভাই, বােনকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে দেখেছেন। চিঠিটি ছিল এতই মর্মস্পর্শী সে তার ভাই রেডিওতে পাঠের জন্য এটি দিয়ে দেন। লক্ষ লক্ষ লােক এ চিঠি শােনে ঠিক যেমন আমাদের দেশে ও লক্ষ লক্ষ লােক বেতারে যুদ্ধসংশ্লিষ্ট চিঠি কিন্তু আন্দ্রিয়েভের চিঠি পড়ার পর এক আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। কোনো আবেদন না করা হলেও শত শত লােক ঐ তরুণকে চিঠি লিখে তার পিতার স্থান নেবার আগ্রহ প্রকাশ করে। নারী চায় তার মায়ের স্থান নিতে। শত শত মেয়েরা তার বােন ও শত শত ছেলেরা তার ভাই হবার দাবী জানিয়ে তাকে চিঠি লেখে। সবাই যুদ্ধের পর আন্দ্রিয়েভ কে তাদের পরিবারভুক্ত করার আগ্রহ জানায়। কেউ জানত না যে আর কেউ এমনি চিঠি লিখছে বা এমন কথা ভাবছে। এই চিঠিগুলির মধ্যে এত ভালােবাসা ও শক্তি পুঞ্জীভূত হয় যে আনানি আন্দ্রিয়েভ এগুলি জাতীয় ঐতিহাসিক মিউজিয়ামে দিয়ে দেন। সেখানে এগুলি সবাই পড়তে পারে। তরুণ আনানি আন্দ্রিয়েভ হাজারখানেক চিঠি পেলেন তার পরিবার- তার নুতন ও স্বাধীন পরিবারের কাছ থেকে।

সােভিয়েট নারী ও বিবাহ সমস্যা সভ্যতার উন্মেষ থেকে নীতিগত সমস্যার সমাধান হয় নি। চূান্ত দুর্নীতি থেকে নানা জাতি কঠোর ইন্দ্রিয়-শাসনের চরমে গিয়ে পোঁচেছে। আজও এমন ধর্মমত আছে যৌন সম্পর্কের পূজা যার অঙ্গ। আবার এমনও আছে যার দৃষ্টিতে যৌন সম্পর্ক হচ্ছে শয়তানের বঙ্গভূমি। 'জাতিগত প্রশ্নের মতই এ সমস্যাটিও ঘােরালো উঠেছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ‘জাতি সমস্যার মত যৌন সমস্যাও’ ‘মনুষ্য প্রকৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত নয়। সােভিয়েট প্রতিষ্ঠার কিছু দিনের মধ্যেই যে বিজ্ঞানীরা যোন, নীতিগত ও পাপ সম্পর্কিত ‘সমস্যাগুলির সমাধানের চেষ্টা আরম্ভ করেন এতে অবাক হবার কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সােভিয়েট রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী, মাদাম লিভিনভ এর যে পরিবর্তন ঘটেছে অল্পের মধ্যে এত নিপুণভাবে তা দেখিয়েছেন যে আমি এখানে তার কথার পুনরাবৃত্তি করব। ওয়াশিংটনে পৌঁছবার অল্পদিন পরেই মাদাম লিটুভিনভ কে নারীদের জাতীয় গণতান্ত্রিক ক্লাবে বক্ত তার জন্য আহ্বান জানানাে হয়। এই ক্লাবের খানাপিনা হচ্ছে ভীষণ কেতাদুরস্ত ব্যাপার। নামকরা মহিলারা এতে যােগ দেন। মাদাম লিট্‌ভিনভ এখানে যেন একটি বােমা ফেললেন। ” নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপাের্টে প্রকাশ প্রকাশ যে তিনি বলেন—“আমি হয়ে লক্ষ্য করছি যে এই সভায় মহিলাদের পরিচয় দেওয়া হচ্ছে শ্রীযুক্ত অমুকের “মনােহারিণী পত্নী” হিসাবে। এর থেকে আমিও বাদ পড়ি নি। রাশিয়ায় কিন্তু এমনটা হয় না। সেখানে ঐ মনােহারিণীর পাত্তা পাওয়া যায় না। আমি একজন রাজ-পুরুষের স্ত্রী বলে সেখানে কেউ অামার বক্ত তা শুনতে আসবে না। সােভিয়েট নারী স্বতন্ত্র ব্যাক্তিত্বের আধিকারিণী । তার প্রতিষ্ঠা তার আপন কীতির পরে । স্বামীর ব্যক্তিত্বের ছায়ামাত্র সে নয়।” সমকক্ষ বলে বড়াই করে যে মার্কিন নারীর। তারা নাদান লিটা ভনভর সুতীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ-প্রকৃত তুলনায় কি ভাবে কাহত হয়েছিল তা বেশ বােঝা যায় । আমাদের দেশের “নারী স্বাধীনতা ও নারী পুরুষের সাম্য" তিনি পরখ করে দেখলেন ও সঙ্গে সঙ্গে সেটা যে কত মেকী তা প্রমাণ গেল। কারণ যতই আমরা নারী পুরুষের সাম্য নিয়ে গলাবাজী করি না কেন আমাদের সাম্য হচ্ছে লােক-দেখানাে। সমস্ত যৌন সমস্যার মূলে আছে অসাম্য। এই সমস্যার ফল কি হয় সে কথা বহুদিন আগেই রুশ গণতন্ত্রবাদী চারনিয়েশেভস্কি (এই রচনায় অন্যত্র ও তার উল্লেখ আছে) বুঝেছিলেন। তিনি লেখেন—“প্রকৃতি নারীকে কী সত্য, দৃঢ় ও তীক্ষ্ণ মননশীলতার অধিকারিণী করেছে। অথচ এই মন সমাজের কোনাে কাজে লাগে । সমাজ এ মনকে তুচ্ছ করে, ধ্বংস করে, নিঃশেষ করে ফেলে যদিও একে উপেক্ষা বা নষ্ট না করে যদি কাজে লাগানাে যেত তবে মানুষ দশগুণ দ্রুতবেগে উন্নতির পথে এগােতে পারত।” সনাতন রুশ দেশে নারী সমস্যার কথা আর এক রকমে প্রকাশ পেত—“মেয়েদের দৌড় হল উনুন থেকে বাড়ীর দরজা অবধি।” বিপ্লব এ সব নির্মূল করল। সােভিয়েট নব-বিজ্ঞানের দরবারে যৌন সমস্যার কথা উপস্থিত করল। সবাই প্রশ্ন করল “মনের দিক থেকে নারী পুরুষের নিকৃষ্ট এ কথা কি ঠিক ?” উত্তর হল “না।” “নারী কি শারীরিক দিক দিয়ে পুরুষের চেয়ে নিকৃষ্ট ?” আবার উত্তর পাওয়া গেল “না” । “তবে সামাজিক দিক দিয়ে নারী পুরুষের মধ্যে কি কোনাে ভেদ নেই ?” এবার বিজ্ঞানীরা বললেন “হঁ্যা আছে।” কার্যক্ষেত্রে, সামাজিক দিকে বা দৈনন্দিন দৈনন্দিন জীবনে নারী পুরুষের যে পার্থক্য আছে তার মধ্যে কোনাে রহস্য নেই। এই প্রশ্ন সম্পর্কে যত সব আজগুবী জিনিস লেখা হয়েছে সে সব উপেক্ষা করে সােভিয়েট বিজ্ঞানীরা নারী-সমস্যার মূলে আঘাত করলেন। “পুরুষ সন্তানকে গর্ভধারণ করে না—করে নারী। গর্ভধারণ ও সন্তানপ্রসব নারীকে পুরুষের সত্যকার রুষের সত্যকার সমকক্ষ হওয়া থেকে বঞ্চিত করেছে । এ রকম হবার কিন্তু কোনাে প্রয়ােজন নেই। আধুনিক সমাজে নারীর সত্যকার স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব।” নারীর সত্যকার স্বাধীনতা অর্জন বলতে সােভিয়েট বিজ্ঞানীরা কি বােঝাতে চান ? এই যে প্রত্যেক নারী মাতৃত্বের দুর্লভ অধিকার, স্বামী ও সন্তান লাভের অধিকার ভােগ করার স্বাধীনতা পাবে—সমগ্র জাতির কল্যাণের জন্য কাজ করার তার মহামূল্য অধিকার ক্ষু করে। সােভিয়েট রাশিয়ার নারীদের বাড়ীতে থেকে সংসার পাতা বা “বৃত্তিজীবী নারী হয়ে সন্তান প্রসবের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা এই দুই এর মধ্যে বাছাই করে নিতে বলা হয়নি। সােভিয়েট নারীদের বলা হল যে জীবিকা অর্জনের সুযােগ না হারিয়েই তাদের পক্ষে বিবাহ, সন্তান পালন ও সংসার করা সম্ভব। ‘জন্ম নিয়ন্ত্রণের দ্বারা সােভিয়েট নারী স্বাধীন হয়নি। নূতন সমাজ- ১০৮ তান্ত্রিক সমাজ গড়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়ে মাতৃত্বের চরম গৌরবান্বিত অধিকার অর্জনই সােভিয়েট নারীকে মুক্ত করেছে। এইভাবে এ ব্যাপার সম্ভব হল – (১) বিবাহিত বা অবিবাহিত প্রত্যেক নারীরই জীবিকানিবাহের উপযােগী কাজ পাবার অধিকার সাব্যস্ত হল । (২) প্রত্যেক নারীকেই সন্তান প্রসবের সময় চিকিৎসা ও হাসপাতালের সেবা বিনা খরচে দেওয়া হল। (৩) সন্তান প্রসবের আগে ও পরে কাজেব অনুপস্থিতির সময় সব নারীকেই পুরা বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা হল । (৪) সব বয়সের মেয়েদেরই বিশেষ করে তরুণীদের মুক্তির-মন্ত্র হিসাবে এই সত্য জানানাে হল সে দেশ ও পরিবারের কল্যাণ—এ দুয়েরই কাজ সম্মানজনক । সােভিয়েট যখন ‘নারীমুক্তির এই নীতি ঘােষণা করে তখন সারা দুনিয়ায় যে বিদ্বেষের প্রচণ্ড ঢেউ ওঠে তার কথা আপনাদের মনে আছে কি ? এর কারণ বার করা শক্ত নয়। সেই একই কুচক্রী দল যারা গতিবিদ্বেষ কায়েম রাখতে চেয়েছিল তারাই আবার চাইল নারী অক্ষমতাও বজায় রাখতে। ফ্যাসিজনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমগ্র মানবতার স্বাধীনতা হরণ । এর পক্ষে মস্ত বড় কাজ হল মেয়েদের স্বাধীনতা একেবারে বিনষ্ট করা। দার্মানী ও ইটালীতে নারী ও তরুণীদের অবস্থা জঘন্থ রকম নীচে নামানাে হয়েছিল। বলা হল ‘কামানের খােরাক মােগাবার’ কাজই তাদের একমাত্র কর্তব্য। তরুণ-তরুণীদের নীতিবােধ বেশ সুষ্ঠুভাবে চুরমার করা হল। সর্বত্র নাৎসী,ও ফ্যাশিস্ট কর্তৃপক্ষ বিবাহের মর্যাদা ও সম্মানকে উপহাস করল। জারজ সন্তান বলে কোনাে জিনিসই রইল না কারণ রাষ্ট্রই ১০৯ পিতার স্থান নিল। জার্মানী ও ইটালীর রাষ্ট্র পারিবারিক ভালােবাসা ও যত্নের তােয়াক্কা না করে অসংখ্য ছেলেমেয়েকে ‘মানুন’ করতে লাগল । নারী ও মায়ের হারালেন স্বাধীনতার শেষ চিহুটুকুও। আর এইভাবে দস্যুরা পরিবার নষ্ট করল, যুবক ও পুরুষদের সমস্ত সুকুমার বৃত্তি ধ্বংস করল এবং এক পুরুষ জোড়া এন সৈন্যদল গড়ে তুলল যাদের ব্যবহার হল পশুদের সামিল। এবার ঘরের কাছে আসা যাক। সােভিয়েটের বিবাহ-বিচ্ছেদ ব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক কথা বলা হয়েছে। রাশিয়ায় বিবাহ-বিচ্ছেদের জন্য শুধু রেজিস্টেশন অফিসে গিয়ে বিবাহ নাকচ করলেই হল। খরচ যৎসামান্য। এর ফলে যে কোনো পুরুষ বা নারী তার স্ত্রী বা স্বামীকে ত্যাগ করতে পারেন। কোনাে আইনগত বা আদালত খরচ নেই। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে ব্যাপারটা অত সহজ নয়। প্রথমত সন্তানদের প্রশ্ন আছে। দ্বিতীয়ত প্রশ্ন আছে সােভিয়েট নীতির । পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা দেখব রাশিয়ার ছেলেমেয়েদের জন্য কি করা হয়েছে। কিন্তু এখানে এ কথা বলা দরকার যে বিবাহ ও বিবাহ-বিচ্ছেদ সম্পর্কে সােভিয়েট সরকারের মনােভাবের পিছনে আছে প্রধানত সন্তানের কল্যাণ কামনা। আমাদের দেশে যে সব মনস্তাত্ত্বিকরা মানসিক ব্যাধি ও উন্মাদরােগ নিয়ে চর্চা করেন তারা সন্তান ও তরুণ- দের পরে বিড়ম্বিত বিবাহের সাংঘাতিক বিষময় প্রভাব সম্পর্কে আমাদের বারবার সাবধান করেন। পিতামাতার মধ্যে যখন মিল থাকে না, তাদের ভালােবাসা যখন গতাসু-সন্তানদের তখন অসম্ভব দুর্গতি। আর তারা যদি বিবাহ-বিচ্ছেদ না করেন (হয়ত বিবাহ-বিচ্ছেদ খরচের দিক দিয়ে বা অন্য কারণে অসম্ভব বলে ) তবে ছেলেমেয়েদের বছরের পর বছর কাটাতে হয় বিদ্বেষ বিয়ে কলুষিত আবহাওয়ায়। নানা ধরনের মানসিক ব্যাধির তারা হয় শিকার। তারা নিজেদের ও অন্যদের পরেও বিশ্বাস হারায়। সােভিয়েট বিবাহ-বিচ্ছেদ নীতির লক্ষ্য ছিল সন্তানদের উপর এই কুফল নিবারণ করা। তাই নিয়ম হল বিবাহিত দম্পতি যদি একত্র বসবাস অসহ্য বােধ করে তবে বিবাহ নাকচ করার পথে কোনাে বাধাই থাকতে দেওয়া হবে না। পিতামাতার মধ্যে একজন সন্তানের লালনপালনের ভার নেবে। আর বিবাহ বিড়ম্বিত হয়েছে কি না এ প্রশ্নের বিচার উকীল বা বিচারকের হাতে না দিয়ে সােভিয়েট বিবাহ-বিচ্ছেদের কানুন এটা তাদেরই হাতে ছেড়ে দেয় যাদের পক্ষে সম্ভব এর জবাব দেওয়া অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রীর হাতে। তারা যদি একত্রে বসবাসে অসুখী বােধ করে তবে বিবাহ-বিচ্ছেদ বিনষ্টির হাত থেকে সন্তানদের জীবন রক্ষা করবে। সােভিয়েট নীতি ব্যাপারটা কি ? সােভিয়েট ইউনিয়নের বিবাহ-বিচ্ছেদ নীতির সমালােচকরা অনেক আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এ নীতি সােজাসুজি দুর্নীতি ও পাপের সড়ক খুলে দেবে এবং বিবাহ ও পরিবারের পরে প্রচণ্ড আঘাত আনবে। প্রচার দিয়ে তারা চেয়েছিলেন সত্যকে চাপা দিতে। আসল কথা হল এই, সােভিয়েট বিবাহ-বিচ্ছেদ নীতি-দুর্নীতি ও পাপ দূর করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই রচিত হয়েছিল। দুর্নীতি ও বারাঙ্গনাবৃত্তির কারণ নিয়ে আলােচনা করা সম্পূর্ণ নিস্ফল । ৫০০০ বছর পরে এই আলােচনা চলছে। সােভিয়েট ইউনিয়নে বিজ্ঞানীদের কাছে প্রশ্নটা ভােলা হল । তারা উত্তরও দিলেন । আলােচনার শেষে এবার কাজ আরম্ভ হল। আজ বিশ বছরের চেষ্টার পর যে ফল পাওয়া গেছে তাই হল এ দিকের সব থেকে ভালাে সাক্ষী আমাদের দেশে যুদ্ধের ফলে বারাঙ্গনাবৃত্তি ও যৌনব্যাধির চিরন্তন সমস্যা আবার মস্ত হয়ে দেখা দিয়েছে। দুই বেড়েছে মারাত্মকভাবে কিন্তু এর জন্য আমরা কি করেছি ? দুই বীভৎস রােগ—সিফিলিস ও গনােরিয়া সাংঘাতিক রকম বেড়ে চলেছে। কিন্তু সােভিয়েট ইউনিয়নে আমাদের যে সব সাংবাদিক আছেন তারা আমার্সের খবর পাঠিয়েছেন যে ঐ দেশে বেশ্যাবৃত্তি প্রায় নেই বললেই চলে। জারের আমলে রাশিয়ায় অসংখ্য নারী এই ব্যবসা রুশ শহরগুলি দুনিয়ার সব থেকে দুর্নীতিপরায়ণ জায়গার মধ্যে গণ্য হত। আজ সে সবই গেছে বদলে। দুর্নীতি ও পাপের সব থেকে যথাযথ মাপকাঠি যৌনব্যাধি আশ্চর্য বকন কমে গেছে। বিখ্যাত মার্কিন সামরিক সাংবাদিক কোয়েটিন রেনল্ডস খবর দিচ্ছেন যে হ্যারিমান কমিশনের সভ্য ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের অফিসের ডাক্তার কমাণ্ডার নর্মান বলেছেন যে লাল ফৌজ ও বিমান বিভাগ যৌন ব্যাধি থেকে প্রায় মুক্ত। এ কথা দুনিয়ার আর কোনাে সৈন্যবাহিনী সম্পর্কে বলা চলে না। ডাক্তার হিসাবে এ জিনিস আমায় চমৎকৃত করেছে। সােভিয়েট ইউনিয়ন পৃথিবীকে নীতি সম্পর্কে এক নতুন ধারণা দিয়েছে। এই নূতন নীতি একটা সূত্রের পরে প্রতিষ্ঠিত—সেটি হল নারী পুরুষের সাম্য। কাজকর্ম সম্পর্কে রুশ নারীর মনােভাবের কথা বিবেচনা করুন। অল্পদিন আগেও অন্যান্য দেশের জনসাধারণ বুঝতে পারত না সােভিয়েট নারীরা কেন রেলগাড়ীর এঞ্জিনীয়র, নাবিক, যন্ত্রবিদ প্রভৃতির কাজ করে। মেয়েদের পক্ষে এ সব কাজ সাংঘাতিক মনে করা হত। কিন্তু এখন যুদ্ধের তাড়ায় যখন দেখা যায় যে আমদের নারী ও তরুণীরা রাস্তায় কাজের-জামা পরে মােটর চালাচ্ছে বা অন্যান্য “পুরুষালি কাজ করছে তখন আমরা প্রতিবাদ জানাই না। অবশ্য মেয়েদের এ সব ভালো লাগলেও তাদের এসব করতে হচ্ছে বলে আমরা প্রায়ই বিব্রত বােধ করি। রাশিয়ার পুরুষশক্তির মারাত্মক ঘাটতির জন্য মেয়েরা কলকারখানায় ঢােকেনি। যে কাজ সে করতে পারে তা করবার অধিকার আছে প্রত্যেক সােভিয়েট নারীর। কাজ পাওয়া সম্পর্কে সে নিশ্চিন্ত। তার উপরে সে:ভিয়েট নারীর পক্ষে দেশের কল্যাণের জন্য যে কোনো কাজই সম্মানজনক। তার জন্য কুণ্ঠিত হবার কথা। সে স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। স্ত্রী লরচালক বলে কোনো রুশ স্বামী বিব্রত হয় না। কাজ করতে পার একটা সম্মান । সোভিয়েট সমাজে একমাত্র কাঙ্ক হচ্ছে আলস্য । অধিকাংশ অন্য দেশের থেকে একেবারে ভিন্নরকম এই মনােভাব নারী মুক্তির পক্ষে খুবই কার্যকরী হয়েছিল। অফিস, কারখানা বা চানের ক্ষেত—সব জায়গারই কাজ সম্মানজনক বলে বিবেচিত হল । সবশেষে সব কাজেই নারীর অগ্রগতির পথে সমস্ত বাধা দূর করা হল। সােভিয়েট নারী হয়েছে জাহাজের ক্যাপ্টেন, কলকারখানা পরিচালক, বৈমানিক ও গভমেন্টের কর্তী। সত্যই তারা পুরুষের সমান হয়েছে বলে সােভিয়েট নারী বিবাহ বা মাতৃত্ব না এড়িয়ে যে কোনো স্থান অধিকার করতে পারে। কেনই বা পারবে না ? পুরুষ কি কাজের সাফল্যের জন্য বিবাহ ও পিতৃত্ব ছেড়েছে? পুরুষের কাছে এ প্রশ্ন হাস্যকর। সােভিয়েট নারীর পক্ষেও তাই। সৈন্যবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত নারীর ক্ষেত্রেও সােভিয়েট ইউনিয়ন ও অন্যান্য দেশের মত মস্ত তফাৎ আছে। প্রায়ই লােকে আমাদের নারীবাহিনীকে উপহাস করে। রুশ নারীরা সৈন্যবাহিনীতে যােগ দেয় এই নিশ্চিত ৮-১৪) বিশ্বাস নিয়ে যে তারা লাল ফেজে যে কোনাে উচ্চ সম্মানজনক স্থানে উঠতে পারে। এইভাবে বেসামরিক জীবনে একজন নারী চিকিৎসক ভ্যালেন্টিনা গােরিনেভূস্কায়আজ একজন ব্রিগেডিয়ার সার্জন! আসলে তিনি হচ্ছেন লাল ফৌজের চিকিৎসা বিভাগের ইন্সপেক্টর । নারী বৈমানিক মেজর ভ্যালেন্টিনা গ্রিজোডুবােজা যুদ্ধের সময়ে নাম করেছেন। বােমারু বিমান চালিকা তিনি। তার মত আরো শত শত নারী আছেন। সম্প্রতি একজন মার্কিন সাংবাদিক মেজর গ্রিজোডুবােভাকে সােভিয়েট তরুণীদের সম্পর্কে প্রশ্ন করেন। তিনি জানতে চাইলেন কাজ করার ফলে তারা পুরুষালি মেজাজের ব কেমলতাবিবর্জিত বা ‘স্বাধীন জেনানা’ হয়ে পড়ে কি না। মজর হাসলেন-“আমার একজন শ্রেষ্ঠ তরুণ বৈমানিক এত বেশ মেয়েলি স্বভাবের যে কোনো পুরুষ তার সঙ্গে কথা বললে সে লাল হয়ে ওঠে। প্রায় সব মেয়েই বিবাহিতা। তার স্বামীদের গৌরব। নারীমুক্তি সােভিয়েট ইউনিয়নে বিবাহ অনুষ্ঠানকে নুতন মর্যাদা দিয়েছে। মানুষের ভালােবাসায় এর ফলে মুক্তির গৌরব এসেছে। বিবাহ-বিচ্ছেদের সংখ্যা এতে ভীষণ রকম কমে গেছে। বেশ্যাবৃত্তি ও সামাজিক ব্যাধিও এর ফলে দূর হয়েছে। আর নারীমুক্তি রাশিয়ায় আর এক বিপুল পরিবর্তন এনেছে। ১১৪ ছােটদের স্বাধীনতা কয়েক বছর আগে আমরা রুশ দেশের ছেলেমেয়েদের সম্পর্কে নানা রকম আজগুবী গল্প শুনতাম। অনেকে বলতেন যে সেখানে বিবাহ উঠে যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ জারজ সন্তান জন্মাচ্ছে আর পরিবারের জায়গায় আসছে এক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—‘শিশুজননক্ষেত্র যেখানে পিতামাতার ভালােবাসা বাদ দিয়ে সন্তান বড় হচ্ছে। আমাদের মস্ত বড় শিশুসদনের ছবি দেখানো হল যেখানে শিশু ও ছােটদের যত্ন নিত সরকারী নার্সের। আসল অবস্থাটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। প্রত্যেক শহর ও বড় কৃষিকেন্দ্রে অবশ্যই সরকারী শিশুসদন ছিল। ইংলণ্ডে আজ এমন ধরনের বহু শিশুসদন আছে। উত্তর আমেরিকাতেও সবত্র আমরা এগুলি প্রতিষ্ঠা করছি। কেন ? শুধু যে সব মায়ের কাজ করেন তাদের শিশুদের তত্ত্বাবধানের জন্য। ছােট শিশুদের যত্ন নেবার হাঙ্গামা থেকে মায়েরা মুক্তি পান। কিন্তু তার চাইতেও বড় কথা হল এই যে শিশুসদনে শিশু বিশেষ যত্ন পায়, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তার স্বাস্থ্য রক্ষা হয়, যথাযথ- ভাবে তাকে ধাওয়ান হয়, অসুখ চট করে ধরা ও সারানাে হয় এবং তাকে জীবন আরম্ভ করার পক্ষে সব থেকে ভালাে শিক্ষা দেওয়া হয়। এই রকম শিশুসদন “পারিবারিক জীবন নষ্ট করে এই অভিযােগ হাস্যকর। কাজের পর রুশ মেয়েরা তঁাদের বাচ্চাদের আনতে যায় (সাধারণত শিশুসদনগুলি কাজের জায়গাতেই হয়ে থাকে যাতে, দুধ খাওয়ানাের জন্য মারা শিশুদের কাছে যেতে পারেন) ও পরে ঘরে নিয়ে যায়। সােভিয়েট সরকার সেই সব দায়িত্বহীন পিতামাতাকে সহ্য করে না যারা শিশুর জন্ম দেয় অথচ তারপর তাদের একটা শিশুসদনে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে। শিশুদের এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য পরিবারের ভিত্তিকে দুর্বল করা নয় দৃঢ় করা। আসলে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে ‘শিশুসদন’ চালানাের ব্যবস্থার মধ্যে বিপ্লবী ব্যাপার কিছুই নেই। আমাদের দেশে বড়লােকেরা সব সময়ই তাদের ছেলেমেয়েদের নার্সদের হাতে দিয়ে দেয়। কোনো কোনাে উঁচু চটকদার সমাজে বাচ্চারা বাপ-মাদের ভালো করে না চিনেই বড় হয়ে ওঠে। সােভিয়েট ইউনিয়ন যখন কর্মরত মেয়েদের শিশুর জন্য প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা। তত্ত্বাবধানের বন্দোবস্ত করল বহু দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা তখন ‘শিশুজননক্ষেত্র” বলে মহা হৈ চৈ শুরু করলেন। সন্তান পরিবার সম্পর্কে সােভিয়েট ইউনিয়নের মনােভাব জামান আক্রমণের ঠিক পরেই একটি ঘটনা থেকে বেশ স্পষ্ট বােঝা যায়। রুশ নারীরা মস্কোতে ‘শিশুদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি জরুরী সভা আহ্বান করেন। উদ্দেশ্য ছিল নাৎসী হত্যাকাণ্ডের ফলে যে সব হাজার হাজার শিশুরা অনাথ হয়েছে তাদের যথাযথ যত্ন নেওয়ার ব্যবস্থা ও তড়িৎ আক্রমণের ফলে যে সব বাচ্চারা সাংঘাতিক আহত অথবা মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত হয়েছে তাদের প্রতি বিশেষ নজর রাখার বন্দোবস্ত করা। একজন নারী প্রতিনিধি বললেন-“ভয়াবহ ঘটনার ঝলসানিতে যে সব শিশুর দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে গেছে সমস্ত জাতির ভালােবাসা দিয়ে আসুন আমরা তাদের ঘিরে রাখি—আসুন মায়ের স্নেহ দিয়ে তাদের লালন করি।” এখন সােভিয়েট নারীরা এই সমস্ত জাতির ভালােবাসা” দ্বারা কি বলতে চান ? তারা কি অনাথাশ্রম বা হাসপাতালের মত প্রতিষ্ঠান গড়ে অনাথদের প্রতিপালনের ব্যবস্থা করতে চাইলেন ? না। তারা এ ধরনের পরিকল্পনার ঘােরতর বিরােধী ছিলেন। তারা পণ করলেন প্রত্যেকটি শিশুকে কোনাে না কোনাে পরিবারে নিতে হবে যেখানে দস্যুদের হাতে হত বাপ-মার ভালােবাসার অন্তত কিছুটা তারা পেতে পারবে। নারীরা আবেদন পাঠালেন। উত্তর এলাে হাজার হাজার বাপ-মার কাছ থেকে। এমন কি ছােটরাও চিঠি লিখে এই অনাথ শিশুদের আহ্বান জানালাে তাদের ভাই বােন হতে। সব অনাথ শিশুই বেশ ভালো পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হবার নিমন্ত্রণ পেল। সােভিয়েট কর্তৃপক্ষও যে এতে সম্মতি জানালেন তাও খুব স্বাভাবিক। সােভিয়েট ইউনিয়নে “শিশুজননক্ষেত্র নেই। আছে জার্মানীতে যেখানে রাষ্ট্র জারজ সন্তানের পিতৃত্বের দায় নেয়, যেখানে পশুর মত নরনারীকে উৎসাহ দেওয়া হয় প্রজননকার্যে, যেখানে পরিবারের মর্যাদা উপহসিত ও অসংখ্য শিশু প্রতিপালিত হয় নানা প্রতিষ্ঠানে। ছােটদের সম্পর্কে সােভিয়েট নীতি বৈজ্ঞানিক পরিচালনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ছােটদের লালনপালনের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়া বৈজ্ঞানিক পন্থা তাে নয়ই বরঞ্চ খুবই বেশী অসন্তোষজনক। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে কোন কিছুই মানুষের ভালােবাসা, সংসার, পরিবার বা বিবাহের স্থান নিতে পারে না। এ কথা অবশ্য ঠিক যে, কোনো কোনো দিকে রাশিয়ার পারিবারিক জীবন যশষ্ট বদলে গেছে। এখানেও নববিজ্ঞানই সরকারী নীতি প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছে। কে না জানে—স্বেচ্ছাচারী বাপ-মার জবরদস্তি প্রপীড়িত, দারিদ্রের ভয়ে শঙ্কিত, জাতি ও ধর্মমত সংশ্লিষ্ট গোঁড়ামির দ্বারা আচ্ছন্ন ও যথাযথ চিকিৎসার অভাবে দুর্বল হাজার হাজার শিশু অত্যন্ত হতভাগ্য জীবন যাপন করে ? সােভিয়েট ১১৭ কর্তৃপক্ষ সাগ্রহে পারিবারিক ঐক্য অক্ষুন্ন রাখবার চেষ্টা করলেও সঙ্গে সঙ্গে ছােটদের মুক্ত করার জন্য কড়া বন্দোবস্ত করলেন। চাষী, কারখানার মজুর, নারী, নিপীড়িত জাতি এবং সমস্ত অত্যাচারিত মানুষের সঙ্গে রাশিয়ার ছোটরাও মুক্তি পেল। এ কাজ চলল স্কুলে। শিশু মনের হদিশ রাখেন যে মনস্তত্ত্ববিদ, যারা শৈশবের ভয়, স্বপ্ন ও আশা আকাঙ্ক্ষার খোঁজ রাখেন তারা হাজার হাজার শিক্ষককে বােঝালেন ছােটদের এই নূতন স্বাধীনতার মর্ম। সােভিয়েট শিশুদের বলা হল—“তােমরা হলে সােভিয়েটের ক্ষুদে নাগরিক। তােমরা স্বাধীন। কারাে সম্পত্তি নও তােমরা। সােভিয়েট শিশুর কোনাে ভয় নেই—তােমাদের সব থেকে আশ্চর্য স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করবার পূর্ণ অধিকার আছে তােমাদের।” এ শুধু কথার কথা নয়। এর প্রমাণ যােগাল সর্বব্যাপী অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার হল কিণ্ডারগার্টেন থেকে কলেজ অবধি। এর প্রমাণ দিল দেশ জোড়া বিনা ব্যয়ে স্বাস্থ্যরক্ষার ব্যবস্থায় শিশুর সব থেকে মূল্যবান সম্পদ রইল যার হাতে। প্রমাণ মিলল প্রত্যেকের সুযােগ লাভের সমান সুবিধা থেকে সারা জীবন প্রতিটি মানুষের আপন সম্ভাবনার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌছবার প্রতিশ্রুত অধিকার থেকে। সব থেকে মর্মান্তিক ঘটনা বােধ হয় এই যে সুযােগের অভাবে শক্তি থাকা সত্ত্বেও ছেলেমেয়েরা বাধ্য হয় তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা বর্জন করতে। শুধু শিশুদের পক্ষেই মর্মান্তিক নয়। সমগ্র সমাজের পক্ষেই এ এক পীড়া- দায়ক ব্যাপার। কত বেঠোফেন তাদের শিশুহৃদয়ে আশ্চর্য সুরের গুঞ্জরন অনুভব করে! তবু তাদের জোটে না শিক্ষক, সংগীত এমন কি একটা পিয়ানােও। নির্বোধ বাপ মা কত আইনস্টাইনকে অঙ্কের ১১৮ মাথা বেশ পরিষ্কার বলে স্কুল ছাড়িয়ে নেয়—বেশ পাকা খাজাঞ্জি করবার জন্য। আমাদের চিকিৎসা বিদ্যালয়ের জাতি-বিদ্বেষ দু কামুনের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞান কত হলডেনের সাধনা থেকে বঞ্চিত হয়! কত ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নিঃসঙ্গ কৃষিক্ষেত্রের একঘেয়েমি থেকে কখনো মুক্তি পায় না ! কশ শিশুর পক্ষে তার স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করবার পথে কোনাে বাধ্য। নেই। কিন্তু শুধু তাই নয়। কর্তৃপক্ষ অবিশ্রাম চেষ্টা করেন প্রত্যেক ক্ষেত্রে শক্তি অনুসন্ধানের যত রকম উপায় সম্ভব তাই দিয়ে শক্তিমান শিশুকে উৎসাহিত এবং বিপুল দেশের সর্বত্র ঐ রকম শিশুর সামনে সব রকম সুযােগের দ্বার অবারিত করার। এর চেয়েও অনেক দরকারী কথা; সুযােগের পথ প্রত্যেক শিশুর জন্যই উন্মুক্ত; কয়লা খনির মজুর, ইতিহাসের অধ্যাপক, স্টেশন কুলী, বৈমানিক, চাষী, ডাক্তার বা লিফট চালক-এদের ছেলেদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করা হয় না। কথা শুধু শিশুটিকে নিয়েই। জার প্রথম আলেকজাণ্ডারের শিক্ষাসচিব শিশুদের সম্পর্কে বলো ছিলেন—“জ্ঞান প্রয়ােজনীয় বটে তবে শুধু তখনই যখন মুনের মত তাকে মানুষের অবস্থা ও প্রয়োজন অনুসারে অল্পমাত্রায় বিলি করা হয়। সমস্ত শিশুকে, এমন কি অধিকাংশ শিশুকে পড়তে শেখালো তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই হবে বেশী।” আর জারের মুখে ছিল তার বিখ্যাত বুলি “বুদ্ধিজীবী—এই শব্দটা আমাৰ কাছে কি ভীষণ বিরক্তিকর!” তাই পুরানাে রাশিয়া ছিল, নিরক্ষরের দেশ। জারের সময় প্রকাশিত হত ৮৫০টি খবরের কাগজ। আজ সেখানে হয় ৯,২৫০টি। কাগজের মােট গ্রাহক সংখ্যা হা ৩,৮০, ৩,৮০,০০,০০০। জারের সময় ১৯১৩ সালে ৮,৭০,০০,০০০ বই ছাপা হত। এখন প্রত্যেক বছর বেরােয় ৬০ কোটি বই। নূতন রাশিয়ায় শ্রেণীবিভাগ নেই। কিন্তু সবার উপরে, সব থেকে বেশী আরামে আছে একটি শ্রেণী ছেলেমেয়েরা। সােভিয়েট শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা আর আমলের বা অন্য দেশের এখনকার অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ অন্য রকম। কিছুদিন হল গণতান্ত্রিক দেশগুলির শিক্ষক সম্মেলনে ছােটদের পাঠ্য ও আমােদ-প্রমােদের ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রতিবাদ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অবস্থা অনেকটা এই রকম : সব থেকে বড় লেখক, শিল্পী ও রসপরিবেশকরা ছােটদের জন্য কিছু করতে পারেন না কারণ ‘শিশুপাঠ্যের বাজারে তেমন পয়সা নেই। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যায় যে অনেক ছােটদের পত্রিকা গল্প পিছু মাত্র দু-তিন ডলার পারিশ্রমিক দেয়। আমি নিজেই তো একবার একটা গল্পের জন্য ৬৭ সেন্ট পেয়েছিলাম যদিও ওটা লিখতে আমার লেগেছিল দু দিন ! থিয়েটার ও হলিউডের অবস্থাও একই রকম। বিশেষ করে ছােটদের জন্য অভিনয় বা ফিল্ম খুব কমই দেখা যায়। কোনো নামকরা অভিনেতা বা অভিনেত্রী স্বপ্নেও ছােটদের জন্য অভিনয় করার কথা ভাবেন না। আমােদ-প্রমােদ ছাড়া অন্য দিকেও একই অবস্থা। ছােটদের জন্য লেখেন এমন বৃটিশ, মার্কিন বা কানাডিয়ান বৈজ্ঞানিকের নাম করবার চেষ্টা করুন তে। আছেন কি একজনাও ? সােভিয়েট ইউনিয়নে কিন্তু সব থেকে মস্ত শিল্পী, লেখক, কবি, শিক্ষাবিদ, ঐতিহাসিক, সংগীতজ্ঞ ও গায়ক, অভিনেতা ও বৈজ্ঞানিকের। ছােটদের কাছে অকুণ্ঠভাবে তাদের ঐশ্বর্য বিতরণ করে। এ কাজের জন্য তাদের মােটা টাকাও মেলে। কিন্তু পারিশ্রমিকই একমাত্র প্রেরণা নয়—এমন কি মূল প্রেরণাও নয়। ছােটদের খুসী করতে, তাদের নিয়ে আমােদ আলাদ করতে, বিশ্বের নানা বিচিত্র কথা বুঝিয়ে বলতে, অতীতের বিপুল কীর্তি দেখিয়ে ও মানবজাতির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা বলে তাদের অনুপ্রাণিত করতে শক্তিমান মাত্রই আত্মশ্লাঘা ও আনন্দ বােধ করেন। রাশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ জীবিত সাহিত্যিক সােভিয়েট ছেলেমেয়েদের জন্য বই লিখে সারা দুনিয়ায় নাম কিনেছেন। নিশ্চয়ই আপনারা এম ইলিনের লেখা New Russian Priner, IOC ooo whys প্রভৃতি বই এর ইংরাজী অনুবাদ দেখেছেন। এঞ্জিনীয়র জোলােটভস্কি ডুবুরীদের লােমহর্ষক বৃত্তান্ত নিয়ে লিখেছেন Under Water Mechanics, বৈজ্ঞানিক মেকুলিয়েভা সূক্ষ্ম মাপজোপ সম্পর্কে The Factory (of Exactness বলে বই লিখেছেন। এগুলি সবই প্রতিভাবান ব্যক্তিদের লেখা চমংকার চমৎকার বই শুধু ছােটদের জন্য লেখা। রাশিয়ায় ছােটরা সাগ্রহে এ সব পড়ে আর তাই অল্প বয়সেই সাহিত্য ও শিল্প- কলা ছাড়াও তারা কৃষি, শিল্প, এঞ্জিনীয়ারিং ও সাধারণভাবে বিজ্ঞান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়। আমােদ-প্রমােদের ক্ষেত্রে সােভিয়েট ছেলেমেয়েদের কিছুতেই মন ওঠে না। ১৮৩টি থিয়েটার আছে শুধু তাদেরই জন্য। সারা দেশে শত শত সাধারণ থিয়েটারও সপ্তাহে একদিন ছােটদের বিশেষ ব্যবস্থা এখানে ফিল্ম দেখানাে হয় না, হয় রীতিমত রঙ্গমঞ্চেব অভিনয়। সব থেকে বড় অভিনেতা, অভিনেত্রীরা এতে নামেন। অপেরার বিখ্যাত গায়ক গায়িকার। এখানে গান করেন। বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও অর্কেষ্ট্রার দল যন্ত্র সংগীতের ব্যবস্থা করেন। আর এই সব শুধু ন-মাসে ছ-মাসে বিশেষ বন্দোবস্ত করে বড়দিনের সময় বা গরমের ছুটিতে হয় না। করে। ১২১ কোটি কোটি সােভিয়েট ছেলেমেয়ে প্রতি হপ্তায় তাদের আমােদ প্রমােদ উপভােগ করে। কোনো শিশুই এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয় না। দরজায় টিকিট বিক্রেতার উৎপাত নেই। প্রত্যেক ছেলেমেয়ের জন্য দরজা খােলা। সােভিয়েট ইউনিয়নের সর্বত্র যে বিরাট ছােটদের পার্ক ও খেলার জায়গা দেখা যায় সেখানেও এই ব্যবস্থা। ভিতরে যখন সুন্দর সুন্দর খেলনা নিয়ে খেলা জমে ওঠে তখন বেড়ার ওধারে কোনাে বিষয় শিশু খেলার দিকে তাকিয়ে থাকে না। খেলনা আছে সবার জন্যই। বই, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলা সবই সবার জন্য। কোনাে দেশেই শৈশব ফিরে আসে না। রুশেরা বলে “আগামী দিনে দুনিয়াটা হবে সুন্দর বসবাসের স্থান। শিশুদের নূতন জীবনকে পাওয়া চাই সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে। তাই আমরা তাদের উপর সব কিছু বর্ষণ করি দু হাতে। সম্পত্তি পাবার জন্য তাদের বাপ-মার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। আমাদের যা কিছু আছে সবই ছেলেমেয়েদের দেবব বলে আমরা ঠিক করেছি। সমস্ত সােভিয়েট ইউনিয়নই হবে তাদের। আর এ সব কিছু আমরা তাদের দিচ্ছি এই মুহূর্তেই। শৈশবের তর সয় না। যৌবন আসে অকস্মাৎ-আনে নূতন সমস্যা, আশা, আকাঙ্ক্ষা। এই যুদ্ধের আগে যে ভীষণ মন্দার যুগ চলছিল সেই সময় আমাদের দেশের তরুণদের বলা হত “ভবিষ্যতহীন উত্তর- পুরুষ”। রাশিয়ায় তরুণ তরুণীদের অবস্থা কেমন ছিল তখন ? দুটি মস্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সােভিয়েটের তরুণদের অন্য দেশের থেকে, পৃথক করেছে। প্রথমত শিক্ষা শেষ হলেই প্রত্যেক • তরুণ তরুণী কাজ ও বেতন সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত শিক্ষা বা ১২২ কোনাে বিশেষ চর্চ। প্রত্যেক তরুণই আপন মানসিক শক্তি ও সাম অনুসারে যতদিন খুসী চালাতে পারে। টাকার জন্য তাকে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাতে হয় না। অবশ্য এ হল শুধু ছােটদের জন্য ঢালা, অবাধ সুযােগ যােগাবার নীতিরই বিস্তৃতি—তারুণ্যের ক্ষেত্রেও। একটা তফাৎ কিন্তু আছে। রাশিয়ায় সব তরুণের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চ শিক্ষার স্কুলের দরজা খােলা নেই। এঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, চিকিৎসার সুল, সংগীতসদন প্রভৃতিতে টাকা দিয়ে ঢােকবার যাে নেই। প্রতিভা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাই শুধু, তরুণদের সেখানে প্রবেশ করার অধিকার দেয়। তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেই সব ছাত্রের ভীড় নেই যারা শুধু ফুর্তি করতে চায় বা উচ্চশ্রেণীর তরুণদের মধ্যে কলেজ ডিপ্লোমার ফ্যাশান আছে বলে যারা এখানে ঢুকতে চায়। বরঞ্চ দরিদ নীচ শ্রেণীতে জন্ম বা জাতির জন্য সোভিয়েট ইউনিয়নে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কাউকে ফেরায় না। উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থার একটিমাত্র লক্ষ্য আছে—খুঁজে বার করে তাদেরই শিক্ষা দেওয়া যারা নিজেদের ও জাতির কল্যাণে সে জ্ঞান প্রয়োগ করতে সক্ষম। এরই যুক্তিগত সিদ্ধান্ত টেনে সাভিয়েট অনেক আগেই বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলা ও শিল্পবিদ্যালয়ের ছাত্রদের বেতন দেবার ব্যবস্থা চালু করে। সমস্ত জাতির চোখে এই তরুণেরা হচ্ছে সমাজের সম্পদ-তারা খাটছে নিজেদের আরাে বেশী সমৃদ্ধ করে তুলতে। পােষকতার জন্য তাদের কেন বাপ-মার মুখাপেক্ষী হতে হবে ? অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্রলাভের জন্য কেন অপেক্ষা করতে হবে পাঁচ বছর—কখনাে বা আট বছর ? ছাত্রদের বেতন দেবার ব্যবস্থা আরাে সুদূরপ্রসারী। তরুণ ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা অক্ষুন্ন রেখে বিয়ে করতে দেওয়া হয়। তারা বিদ্যালয়ের দালানেই ১২৩ সংসার পাততে পারে। যদি তার পরিবার গড়ে তুলতে চায় তবে সন্তান পিছু তাদের বেতনের হার বৃদ্ধি পায়। আমাদের কাছে অদ্ভুত বােধ হলেও এইটেই যুক্তিসঙ্গত। সব থেকে ভালাে ধরনের ছাত্রদের এতে স্কুলে থাকতে উৎসাহ দেওয়া হয়, তারা, শিক্ষার সুবিধা পায় পূর্ণ- মাত্রায়—আবার সেই সঙ্গে ছাত্রদের চিরন্তন নৈতিক সমস্যার সমাধান হয় এতে। সােভিয়েট ছাত্রদের দু বার বম্বা ছুটি মেলে--গরমের সময় দু মাস, শীতকালে দু হপ্তা। বিশ্রামাগার বা স্যানাটোরিয়ামে ছুটি কাটানো যায়, সেখানে তরুণ তরুণীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে—কিম্বা তারা শুধু বিশ্রাম করতে পারে। এই ছুটি বা চিকিৎসার জন্য কোনো খরচ নেই। ট্রেড ইউনিয়ন থেকেই তা দেওয়া হয়। যারা আরাে বেশী সক্রিয়ভাবে ছুটি কাটাতে চায় তাদের জন্য দেশের সর্বত্র দেখবার বা আবিষ্কারের জন্য ভ্রমণের ব্যবস্থা আছে। শুধু তরুণ নয় প্রত্যেক বয়স্কেরই উচ্চশিক্ষার সুযােগ আছে। রাশিয়ায় বয়স্ক শিক্ষার বিপুল পরিকল্পনা এখানে আলােচনা করার মত স্থান আমাদের নেই। মধ্যবয়স অতিক্রম করেও লক্ষ লক্ষ লােক নূতন শিক্ষাব্যবস্থার সুযােগ নিয়েছে আর এইভাবে সােভিয়েটের সব থেকে নামকরা শিল্প বিশেষজ্ঞ, এঞ্জিনীয়ার, কৃষিবিদ ও শিল্পীদের মধ্যে কয়েকজনের সন্ধান পাওয়া গেছে। সােভিয়েট ইউনিয়নে বয়স নির্বিশেষে প্রত্যেক নরনারীর সামনে বৃত্তিলাভ ও বিশেষ শিক্ষা পাবার সুবিধা ছড়িয়ে দিয়ে ‘শিখবার বয়স যায় না' এই পুরানাে কথার যথার্থ কার্যক্ষেত্রে প্রমাণিত হচ্ছে। ছােটদের নিয়েই এই অধ্যায় শুরু। আমরা পোঁচেছি রিণত বয়সে। চিকিৎসা ও ব্যাপক স্বাস্থ্যরক্ষা ব্যবস্থা। সােভিয়েটে বয়স্ক লােকের সংখ্যা, ১২৪ বহুলাংশে দাড়িয়েছে। হয়ত সোভিয়েটের বৃদ্ধদের আমরা দ্বিতীয় সুবিধাভােগী শ্রেণী বলে নামকরণ করতে পারি। কর্মমুখর জীবন থেকে নার অবসর নিয়েছেন তাদের সব রকম সঃ ও আরামের ব্যবস্থা আছে। বৃদ্ধ বয়সে দারিদ্রের ভয় সম্পূর্ণভাবে দূর করা হয়েছে সকলের জন্যই পেসনের ব্যবস্থায়। রােগী ও কর্মশক্তিহীনদের জন্য চমৎকার পরি- বেশের মধ্যে বিশ্রামাগার ও স্যানাটোরিয়াম আছে। সারা দেহ মনে এখনও তারুণ্য অনুভব করে তাদের জন্য আছে প্রাণোচ্ছল নূতন দেশের বিচিত্র ও অফুরন্ত অভিজ্ঞতা হজনের অবকাশ। জীবন ও বকাশ রয়েছে উপভােগের প্রতীক্ষায়। কিন্তু শুধু ছোটদের ও সারা জীবন গেটে তার হবসর অর্জন করেছে তাদের জন্যই কি সুখ?

ধমবিশ্বাসের স্বাধীনতা যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর রাশিয়া থেকে যত বিস্ময়কর খবর এসেছে তার মধ্যে এই খবরের জুড়ী খুব কমই আছে যে ১৯৪১ সালের বড়দিনে সােভিয়েট ইউনিয়নের গির্জাগুলিতে ভক্তদের ভীড় জমেছিল ভীষণ রকম। আমাদের মধ্যে যারা ধর্মপ্রাণ ও যারা নিয়মিত গির্জায় যান বিশেষ করে তাদের বিস্ময়টাই ছিল বেশী। কারণ আমাদের কি বল। হয়নি যে সােভিয়েট ইউনিয়ন হচ্ছে এক ধর্মহীন দেশ, সেখানে সমস্ত গির্জার দরজা জোর করে বন্ধ হয়েছে আর বিপ্লবের সময় সেখানকার গির্জার মাথাদের হত্যা করা হয়েছে ? একটা বছর কেটে গেল। কেউ কেউ বলল যে সােভিয়েট সরকার রাশিয়ায় ধর্মের স্বাধীনতা আছে—দুনিয়াকে এই ধাপপা দেবার জন্য ইচ্ছা করে গােটাকতক গির্জা খুলেছে। কিন্তু ১৯৪৩-এ জানুয়ারীর গােড়ার দিকে আর একটা মস্ত বিস্ময় এদের হকচকিয়ে দিল। ৫ই জানুয়ারী রুশ (Orthodox Catholic Church-এর অস্থায়ী প্রধান পুরােহিত মেট্রোপলিটন সাজিই লাল ফৌজের একটি নুতন ট্যাঙ্ক ডিভিশন গড়ার জন্য এক তহবিল খুললেন। নিজে তিনি দিলেন এক লক্ষ রুবল। এই নূতন ডিভিশনের নামকরণ হল ধর্মপ্রাণ, সাধু ডনস্কয়ের নামে। প্রধান পুরােহিতের ঘােষণার উত্তরে স্বয়ং স্টালিন পাঠালেন ব্যক্তিগত অভিনন্দন ও ধন্যবাদ ধর্মযাজক ও ভক্তদের। এই খবরে অধিকাংশ মানুষই অবাক হল। সাধারণভাবে এই কথাই সবাই বিশ্বাস করত যে সােভিয়েট সরকার ধর্মবিশ্বাস সমূলে নষ্ট করেছে বা গ্লানিময় দারিদ্রের মধ্যে ধর্মকে নির্বাসিত করেছে আর অন্যদিকে চালিয়েছে ধর্মবিরােধী প্রচার। এই নিন্দাবাদ খ্রীষ্টানদের উপযুক্ত নয়। সােভিয়েট সরকার শুধু গির্জাকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন আর সব গির্জাকে আত্মনির্ভরশীল হতে নির্দেশ দিয়েছেন। সােভিয়েট ইউনিয়নে নাস্তিকতার প্রচার হয়েছে কিন্তু আমরা যত ব্যাপকভাবে ভেবেছি ততটা নয়। অনেক বছর আগেই ধর্মবিরােধী রচনা প্রকাশ বন্ধ হয়েছে। রাশিয়ায় ধর্মের উপর কি অত্যাচার চলে? ঠিক কথাটি কি ! আসল কথাটা খুব সােজা। দেশে ধর্মমতের স্বাধীনতা আছে কি নেই এ সম্পর্কে সােভিয়েটের মানুষই হল সব থেকে ভালো বিচারক। রাশিয়ায় ধর্মবিশ্বাসীদের চোখে হিটলারী বর্বরদের অন্যান্য দেশের মত এখানেও আধ্যাত্মিক জীবনের শেষ চিহ্নটুকুও ধ্বংস করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে লাল ফৌজ, সােভিয়েট সরকার, স্টালিন নিজে হলেন ধর্মবিশ্বাসের রক্ষক। কিয়েভ ও গালিকের প্রধান ধর্মযাজক নিকোলাইকে সােভিয়েট সরকার নাৎসী অত্যাচার সম্পর্কে অনুসন্ধানের জন্য বিশেষ রাষ্ট্রীয় সমিতির সভ্য নিযুক্ত করেছেন। এই শ্রদ্ধেয় ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি বলেন-“রুশ ধর্মযাজকদের প্রতি ফ্যাশিস্টরা বিশেষ রকম বিদ্বেষ দেখিয়েছে। কিন্তু রুশ জাতি, তাদের ঐশ্বর্য বা মন্দিরের বিরুদ্ধে জার্মানদের একটি অত্যাচারও যাতে উপেক্ষিত না হয় তা আমরা দেখব।” আমার কাছে পাঠানাে এক লম্বা বিবরণীতে মেট্রোপলিটন নিকোলাই ধর্মযাজক ধর্মযাজিকাদের পরে নাৎসী অত্যাচারের যে তালিকা দিয়েছেন বীভৎসতার জন্য ছাপার অক্ষরে তা অপ্রকাশ্য। জার্মান অফিসার ও সৈন্যরা কি ভাবে গির্জায় ঢুকে “বিশ্বাসীদের সামনেই উদ্ধৃঙ্খল কথাবার্তা বলে, পবিত্র বিগ্রহের পরে থুতু ফেলে, ক্ৰশের অপমান করে তার অনেক . দৃষ্টান্ত তিনি আমায় দিয়েছিলেন। ১২৭ মেট্রোপলিটন নিকোলাই সােভিয়েট সরকারের তরফ থেকে এই সব অত্যাচার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। সরকারও অত্যাচারের জন্য নখন নাৎসী পশুদের বিচার হবে তখন এসবের পূর্ণ প্রতিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সােভিয়েট ইউনিয়ন ছাড়া আর কোন্ রাষ্ট্র স্বাধীনতা ও ধর্মসংশ্লিষ্ট পৰি ধনসম্পদ রক্ষার জন্য সরকারীভাবে এই রকম চেষ্টা করেন ? এ ছাড়া আরো অনেক তথ্য থেকে প্রমাণ হয় সে সোভিয়েট ইউনিয়ন যে শুধু ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা স্বীকার করে তা নয়—বিশ্বাসীদের অধিকার অক্ষুন্ন রাখার জন্য লড়াইও করে। নাৎসীরা এ কথা ভালো করেই জানে। লেনিনগ্রাদের মেট্রোপলিটন অ্যালোই বলেন—“হিটলারের দল সুন্দর রুশ গির্জা ধ্বংস করে আনন্দ পায়।” এই সব গিজা কমুনিস্টর। বস বা আণিকর করেনি। বরঞ্চ রাষ্ট্রের খরচে এর অনেকগুলিকেই ধ্বংস থেকে রক্ষা করা হয়েছে। হিটলারী বর্বরেরা যে সব আশ্চর্য চমৎকার সৌধ ইচ্ছা করে নির্মমভাবে ধ্বংস করেছে তার মধ্যে আছে মােজাইস্কের স্বর্গারােহনের গির্জা, পােভস্কের ক্যাথিড্রাল, ক্যাথেরিনের গির্জা, কালিনিনের শহীদ মন্দির এবং ১০ ৬৫ সালে, নর্মানরা ইংলণ্ড জয় করার আগে প্রতিষ্ঠিত চার্নিগভের রূপান্তরের অমূল্য ক্যাথিড্রাল। পুরো তালিকা দিতে গেলে পাতার পর পাতা ভরে যাবে। লাল ফৌজের জন্য প্রার্থনা করার সময় মেট্রোপলিটন অ্যালেক্সাই বললেন, “সত্যের জন্য যারা অস্ত্র ধারণ করেন ও যারা দেশের জন্য দুঃখ যন্ত্রণা বা শহীদদের মৃত্যু বরণ করেন স্বর্গরাজ্য তাদের জন্যই।” এসব তথ্যের মধ্যে আশ্চর্য ব্যাপার হল এই রাশিয়ার মানুষ গির্জার ললাকেরা যে লাল ফৌজের জন্য টাকা দেয় এতে বিস্ময় বােধ করে না। কিন্ধ এতেও অবাক হয় না যে স্টালিন (যাকে আমাদের ১২৮ বহু পাদ্রী খ্ৰীষ্ট-বিবােধী আখ্যা দিয়েছেন। গির্জা ও বিশ্বাসীদের কাছে ব্যক্তিগত অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। রাশিয়ায় এসব ব্যাপারে লােকে আশ্চর্য হয় না। অবাক হয় অন্য দেশের আমাদের দেশের দেশের লােক—যাদের সােভিয়েট ইউনিয়নে ধর্মমতের স্বাধীনতা সম্পর্কে নানারকম আজগুবী মিথ্যা ক শােনানাে ১৯৪৩ হয়েছে। এই চিঠিটা ভালাে করে পড়ে দেখুন। সালের জানুয়ারী মাসের গােড়ায় মস্কোর ‘এসাম্পশন' গির্জার ধর্মযাজক ভলাডিমির স্টেফানভ এটি লেখেন টালিনকে ‘সাময়িকভাবে অধিকৃত অঞ্চলে আমাদের যে সব ভাইবােন ফ্যাসিজমের কবলে পড়ে ফ্যাসিস্টদের হাতে অবর্ণনীয় লাঞ্ছনা ও নিপীড়ন ভােগ করছেন আত্মার তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে তাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের জন্য আমি গভীর দুঃখ অনুভব করছি। যত শীঘ্র সম্ভব লাল ফৌজ যাতে শত্রুকে পরাস্ত করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে আমি রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কে আমার গির্জার সমস্ত মজুত টাকা-নগদ টাকায় মােট ২,৭৩,০০০ রুবল জমা করেছি। যােশেফ ভিশারিয়াে- নােভিচ, আমি তােমায় অনুরােধ জানাচ্ছি এই টাকা দিয়ে বীর পূর্বপুরুষ নেস্কি ও ডনস্কয়ের নামে দুটি যুদ্ধবিমান বানাতে। সমস্ত মানবতার পরে হিটলারী বর্বরেরা যে দুর্গতি টেনে এনেছে এই শক্তিশালী বিমানগুলি তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করুক।” এ থেকে মনে হয় না কি যে সােভিয়েটে গির্জা শুধু যে স্বাধীন ও রাষ্ট্রের পরিপােষক তাই নয়—তার হাতে বেশ দু পয়সা আছে। গণতন্ত্রগুলিতে কটা গির্জা মস্কোর ‘এসাম্পশান’ গির্জার মত একটি কেন্দ্র থেকে যুদ্ধের জন্য অত টাকা দান করেছে ? মানবতাকে হিটলারী বর্বরতার হাত থেকে বাঁচাবার জন্য কটা গির্জা তাদের সমস্ত মজুত টাকা দিয়েছে ? ১২৯ ৯-১৪) এই সংক্ষিপ্ত তথ্যগুলি থেকে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে ওঠ। যে জাতিকে ‘নাস্তিক’ বলে নিন্দাবাদ করা হয়েছিল সেই আজ ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা ও ন্যায়ধর্মের স্বপক্ষে দঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে।

আশ্চর্য নয়। দুনিয়া এই বই পড়ে আপনি সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌচেছেন যে সারা দুনিয়াতে সসাভিয়েট ইউনিয়নের মত তাজ্জব দেশ আর নেই। সােভিয়েট জীবনের প্রত্যেকটি দিক আমাদের কাছে অপরিচিত, এমন কি বিস্ময়কর। যেমন ধরুন, সােভিয়েট চাষী অবিশ্রাম চেষ্টা করছে তার জমির ফসলের হার ও গরুর দুধের পরিমাণ বাড়াতে। বাজার দর বা দাম ও দুধের বাড়তি আছে কি নেই এ নিয়ে সে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায় না। চিন্তা হচ্ছে চাষের উৎপাদন বাড়ানাে যাতে ক্রমেই বেশী খাদ্য পাওয়া সম্ভব হয়। সঙ্গে সঙ্গে সে কৃষির উৎপাদন পটুতাও বৃদ্ধি করবার চেষ্টা করে। এর ফলে কিন্তু চাষীরা জমি থেকে বিতাড়িত হয় না—ফল হয় চাষী ও তার পরিবারের মেহনতের সময় কমে। আমাদের কাছে এ সবই খুব তাজ্জব বােধ হয় । কারণ আমরা অভ্যস্ত গমের ক্ষেতের দারুণ সংকোচনে, বাড়তি ফসল সম্পর্কিত জটিল সমস্যায়; জমিতে ক্রমাগত ক্রমাগত বেশী যন্ত্র লাগানাে সত্ত্বেও অবিশ্রান্ত চাষের খাটুনিতে। কিন্তু সত্যই কি ব্যাপারটা অতই তাজ্জব ? এ কথা কি বােঝ এতই কঠিন যে চাষের ক্ষেতের আয়তন এমনভাবে ভীত হয়ে ওঠা উচিত যাতে দেশের প্রত্যেক নরনারী ও শিশুর যথেষ্ট পরিমাণ পুষ্টিকর খাদ্য জোটে? এতে অদ্ভুত কি আছে যে কৃষির উৎপাদন দক্ষতা থেকে যে সুবিধা পাওয়া যায় তা সচ্ছল জীবন ও পরিশ্রমের সময় হ্রাসের মধ্যে দিয়ে চাষীদেরই ভাগ্যে জোটা উচিত? এ কথা ভুলবেন না যে আমাদের দেশে কোনাে কোনাে লােক সারা জীবন যথেষ্ট খেতে পায় বা কোনাে কোনাে চাষীর জীবনযাত্রা দামী যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে সহজ হয়ে ওঠে—এতে আমরা অদ্ভুত বা অন্যায় কিছু দেখি না। ভালাে কথা ! এবার তবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এ কথা সে সােভিয়েট কৃষির সত্যকার বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হল শুধু এই সেখানে কোটি কোটি মানুষকে ওর যথেষ্ট খেতে দিচ্ছে, সমস্ত চাষীর জীবনই সহজ করে তুলেছে। সােভিয়েট কয়লাখনির মজুরেরা যখন শুনল যে, যে খনিতে তারা এতদিন জীবিকা অর্জন করত তা বন্ধ করে দেওয়া হবে তখন তারা সত্যসত্যই সেই এঞ্জিনীয়ারদের চীৎকার করে অভিনন্দন জানালাে যারা কয়লা জালাবার নূতন কল বসাতে এসেছিলেন। জমির নীচে তাদের কাজ চিরদিনের মত খতম হয়েছে শুনে তারা ভীষণ খুসী হয়ে উঠল। আমাদের কাছে এ শুধু আশ্চর্য নয়—পাগলামি বােধ হয় । ভাবুনতাে হাজার হাজার খনি মজুর কাজ যাচ্ছে বলে আনন্দে লাফাচ্ছে ! সােভিয়েট খনিমজুরেরা কি তবে পাগল ? তারা জানত যে কয়লা জ্বালানী যন্ত্রকে ঘিরে যে বিরাট রাসায়নিক কারখানা গড়ে উঠবে তাতে কাজ থাকবে ওদের জন্য। সেই নূতন কাজ হবে পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যকর দালানে । খনি- জ্বালানাের প্রক্রিয়া আবিষ্কারের ফলে কয়লা খনির মজুরদের কঠিন, নােংরা ও বিপদজনক মেহনতের দিন ফুরলাে। অবশ্য কেউ কেউ যদি আমাদের দেশে খনির কাজ ছেড়ে অন্যত্র অপেক্ষাকৃত কম বিপদজনক ও স্বাস্থ্যরক্ষার পক্ষে বেশী অনুকূল কাজ পায় তাতে আমরা পাগলামির কিছু দেখি না। কাজেই আমরা এই সিদ্ধান্ত ১৩২ করতে পারি যে সােভিয়েট খনিমজুরের উল্লাসের মধ্যে তাজ্জব ব্যাপার আসলে হল এই যে লক্ষ লক্ষ লােক এর ফলে খনির অন্ধকূপ ছেড়ে দিনের লােয় উন্নততর কাজ করতে পেলো। আমরা দেখেছি শান্তি ও যুদ্ধ—দু সময়েই সােভিয়েট নারীরা কিভাবে পুরুষের পাশাপাশি দাড়িয়ে কাজ করে। ব্যতিক্রম নেই বললেই হয়। বিবাহ ও সন্তান হবার পরও তারা কাজ ছাড়ে না। কাজকে তারা সম্মান মনে করে। আমাদের কাছে আশ্চর্য ঠেকে যখন স্বামী প্রতিপালন করার মত যথেষ্ট রােজগার করা সত্ত্বেও বিবাহিত নারী কাজ চালিয়েই যায়। বর্তমানে যুদ্ধকালীন জরুরী অবস্থায় যে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলিতে কাজ করে মেয়েরা দেশ সেবা করার সুযােগ পেয়েছে এতে আমরা আনন্দিত। তবে শান্তির সময়ে সােভিয়েট নারী যখন কাজ করে তাতে অভিনবত্ব কোথায় ? শুধু এইখানে সে সােভিয়েটে শান্তি বা বুদ্ধ যখনই হােক না প্রত্যেকেই যারা কাজ করে তারা সারা জাতিরই সেবা করে । কারণ সমস্ত কলকারখানার নালিক সােভিয়েট সরকার—সমগ্র জনসংখ্যার স্বার্থেই তা চালানাে হয় । সােভিয়েট নারী শুধু নিজের বা আপন পরিবারের জন্য কখনাে খাটে না খাটে ১৮ কোটি দেশবাসীর কল্যাণের জন্য। সােভিয়েট ইউনিয়নের প্রত্যেকটি ছেলেমেয়ে বাপ-মার জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও আয় নিবিশেষে তার সামর্থের অনুপাতে শিক্ষা পায় । প্রত্যেক তরুণই শিক্ষান্তে কাজ পাওয়া সম্পর্কে নিশ্চিন্ত। কলেজ ছাত্ররা বেতন পায়। এমন কি শিক্ষালাভের সময়েই বিবাহ করতে পারে । আমাদের কাছে এ সব আজগুবী বােধ হয়—মনে হয় রূপকথার দেশের কাহিনী। কিন্তু আমরা জানি যে আমাদের দেশে কোনো কোনো তরুণ টাকার চিন্তা ১৩৩ করে উচ্চতম শিক্ষা পেতে পারে । এই ভাগ্যবানদের সৌভাগ্যের জন্য কেউ দুঃখিত হয় না। আমরা শুধু চাই যে আমাদের মধ্যেকার সব কটি শক্তিমান তরুণই যাতে অনুরূপ সুযােগ পায় । তাই আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে সােভিয়েট শিক্ষানীতির মধ্যে ‘উদ্ভট ব্যাপার হল শুধু এই যে প্রত্যেক তরুণ তরুণীই সেখানে অবাধে আপনার সাধ্যমত শিক্ষা পেতে পারে। কোনো বাধা বা পক্ষপাতিত্বের জন্য তাকে ভাবতে হয় না—আর্থিক সাহায্যের জন্য আত্মীয় স্বজনের দারস্থও হতে হয় না। আমরা এও দেখছি সে সোভিয়েট ইউনিয়নে কেউ অসুস্থ বা আহত হলে বিনা পয়সায় তার সব থেকে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। সব থেকে অদ্ভুত-সে দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা কিনবার যো নেই। 'আমাদের কাছে এটা প্রায় অবিশ্বাস্য ঠেকে। কারণ আজন্মকাল আমাদের স্বাস্থ্য, রােগ ও চিকিৎসার কথা ভাবতে হয় টাকা আনা পাই-এর অঙ্কে। কিন্তু মানুষের প্রতি সােভিয়েট মনােভাব কি সত্যই বেশী যুক্তিসঙ্গত নয় ? মানুষের জীবনকে টাকার চেয়ে মূল্যবান গণ্য করা কি বােকামি ? কালে মানুষ যে ধলা মানুষের মতই কষ্ট পেতে পারে এ কথা মানা কি অন্যায় ? সমস্ত দেশের স্বাস্থ্য অক্ষুন্ন রাখলে কি ব্যবসা মন্দা যাবে ? ভুলবেন না যে আমাদের দেশে কিছু লােক নে টাকাকড়ির কথা না ভেবেই আজীবন সব থেকে ভালাে চিকিৎসা পেতে পারে তাতে আমরা আশ্চর্যের কিছু দেখি না। কোনাে কোনাে বাপ-মা শিশুর জীবন সংশয় হলে যে ডাক্তারকে বলতে পারেন “টাকার কথা ভাববেন না–সন্তানকে বাঁচান” এতেও আমরা অবাক হই না। আমরা শুধু চাই যে সব বাপ-মারই এ সুযােগ মিলুক। ১৩৪ কাজেই আমাদের মানতেই হবে যে সােভিয়েট ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নীতির মধ্যে যা আমাদের অদ্ভুত লাগে সেটি হল এই যে অসুস্থ ও আহতদের চিকিৎসা ও সেবার ব্যবস্থা প্রচণ্ডভাবে বাড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তাই কোটি কোটি লোক সেখানে সর্বোৎকৃষ্ট চিকিৎসালাভ করতে পারে। খরচ সকলেরই—কোনো লােককে ডাক্তারের টাকা গুনতে হয় না। এবার আমরা সােভিয়েট জীবনের এমন একটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলব যা এ পর্যন্ত যত কিছু আলােচনা হয়েছে সে সবের চেয়ে বিস্ময়কর। এই বই-এর সবত্র আমরা একটা কথার পরে বিশেষ জোর দিয়েছি। সােভিয়েট ইউনিয়নে নববিজ্ঞান হল এক প্রচণ্ড হাতিয়ার যার সাহায্যে মানুষ প্রকৃতিকে আপন ইচ্ছার কাছে হার মানায়। কিন্তু কেন ? বিজ্ঞান সােভিয়েটের ১৮ কোটি মানুষকে দেখিয়েছে কি ভাবে রােগ ও অনাহার দূর করতে হয়, কৃষি ও শিল্পের উন্নতি ঘটিয়ে কি ভাবে সর্বব্যাপী সুসভ্য জীবনযাত্রার স্বপ্ন বাস্তবে রূপান্তরিত করতে হয়, হাড়ভাঙা মেহনতের বােঝ কেমন করে তুলতে হয় লক্ষ লক্ষ লােকের কাপ থেকে, কেমন করে সমগ্র দেশবাসীকে আনন্দময় জীবনের উপযােগী অবসর ও স্বাস্থ্যের অধিকারী করা যায়। বিজ্ঞানের গােপন হাতিয়ার সােভিয়েট জনসাধারণকে দিচ্ছে এক অভিনব জীবনযাত্রার ইঙ্গিত। এই নূতন জীবনের আস্বাদ মানুষকে যে দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা আমাদের কাছে আশ্চর্য বােধ হয়। তরুণ কসাক মিখায়েল শােলােকভের কথাই ধরা যাক। রুশ বিপ্লবের গােড়ার দিকে এই তরুণ ডুন নদীর উপত্যকায় যে জীবনধারা বয়ে চলেছিল তারই কাহিনী লিখতে শুরু করে। তার গল্প সােভিয়েট পত্রিকায় সেই সময়েই প্রকাশিত হয় যখন কোটি কোটি নরনারীর অক্ষর পরিচয় আরম্ভ হয়েছে। শােলােকভের রচনা সকলের হৃদয় জয় করল। ১৯২৮ সালে তার বয়স তখন মাত্র ২৩ বছর-- শােলােকভের প্রথম উপন্যাস “এ্যাণ্ড কয়েট স্লো দি ডন” প্রকাশিত হয়। আমরা যাকে “গুরুগম্ভীর’ উপন্যাস বলি—শুধু শিক্ষিত ব্যক্তিরাই সাধারণত যা নিয়ে নাড়াচাড়া করেন—এই বই ছিল সেই পর্যায়ের। রাশিয়ায় কিন্তু হাজার হাজার লােক ও পরে লক্ষ লক্ষ লােক সাগ্রহে এই বই পড়ল। মজুর, চাষী ও সৈন্যেরা কসাকদের সম্পর্কে আরো লিখবার অনুরােধ জানিয়ে তার কাছে পাঠালো অসংখ্য চিঠি। বেরােলাে আর একটা বই। তার প্রশংসা সমালোচনা দুইই হল। লক্ষ লক্ষ লােক এই ‘ডন নদীর উপন্যাস পড়ল ও আলােচনা করল। সবশুদ্ধ আটটি উপন্যাস বেরােলো। অন্য ভাষায় রূপান্তরিত হলে সােভিয়েট ইউনিয়নের বাইরের সাহিত্য সমালােচকরাও স্বীকার করলেন যে শােলােক আধুনিক যুগের মস্ত বই লিখেছেন। এর চেয়েও অনেক বড় কাজ তিনি করেছেন। তিনি সাহায্য করেছেন এক নূতন ধরনের পাঠক সৃষ্টির কাজে। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা যাকে ‘খেলাে’ পত্রিকা ও বই বলে তার বদলে লক্ষ লক্ষ মজুর চাষী এই রীতিমত ‘সাহিত্যিক’ বইয়ের দিকেই ঝুকেছে। অধিকাংশ সােভিয়েটের মানুষ আবিষ্কার করল যে তাদের জীবন, কাজ ও মনােভাব এমন বদলে গেছে যে তারা এখন শােলােকভের চমৎকার উপন্যাসের নাটকীয় ঘটনা ও সংস্থান ও সৌন্দর্য খুব গভীরভাবেই উপভােগ করতে পারে। আর কোনাে দেশে কখনও এমন ব্যাপার ঘটে নি। এই সময়েই আর এক সােভিয়েট তরুণ সংগীতের ক্ষেত্রে প্রায় একই ধরনের কীর্তি অর্জন করেছিলেন। শােলােক যখন লেখা শুরু করেন ডিমিত্রি শােস্টাকোভিচও প্রায় তখনই ‘ওস্তাদী সংগীত সৃষ্টি আরম্ভ করেন।

অনেকগুলি ‘সিম্ফনির স্রষ্টা তিনি। সংগীত সমালােচক বা সমঝদার শ্রোতাদের ক্ষুদ্র গােষ্ঠির সামনে এগুলি বাজানাে হয়নি। সােভিয়েট ইউনিয়নের সর্বত্র ঘরভতি শ্রোতাদের কাছে ‘ডন নদীর উপন্যাসের পাঠকদের কাছে, রাশিয়ার শ্রমজীবী নরনারী ও শিশুদের সামনে ‘অর্কেষ্ট্রায়’ এগুলি বাজানাে হয়। এসব মানুষকে যে জোর করে শোস্টাকোভিচের সিমফনি শুনতে বাধ্য করা হয়নি সে কথা বলাই বাহুল্য। বরঞ্চ তারা গাঁটের কড়ি বার করেছে কনসাটের টিকিট কিনতে, লাইনে দাড়িয়েছে তারই জন্য, শুনেছে সাগ্রহে আর তারপরে হাজার হাজার পত্র লিখেছে নূতন স্রষ্টার সংগীতকে প্রশংসা জানিয়ে, সমালােচনা করে, আরাে ‘সিমফনির দাবী জানিয়ে । আর কোনাে দেশে এমনটি কখনাে হয়নি। এই দুটি দৃষ্টান্ত আমি বেছে নিয়েছি এই জন্য যে আমাদের দেশে সংস্কৃতিবান মহলে শোলােকভ ও শােস্টাকোভিচের সৃষ্টি যথেষ্ট সুপরিচিত। তাদের আপন দেশে আরো অনেক সােভিয়েট লেখক ও সংগীতস্রষ্টার যথেষ্ট নামডাক আছে। বিপ্লবের পরই এদের শক্তি বিকশিত হয়েছে । লক্ষ লোক দরদ দিয়ে এদের অগ্রগতির পথ পরিষ্কার করেছে। নুতন ও সুন্দরতর জীবনধারা আয়ত্ত করার প্রতিটি সুযােগ জনসাধারণ সাগ্রহে গ্রহণ করেছে। অবাক লাগলেও এ কথা অত্যুক্তি নয় যে বিশ বছরে সােভিয়েটের মানুষ অবর্ণনীয় নিরক্ষরতার রসাতল থেকে উঠে সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে অন্য সব দেশকে ছাপিয়ে গেছে। কয়েকটি তথ্য দেখুন। বিপ্লবের পর মােট ১০ ৬টি বিভিন্ন ভাষায় সােভিয়েটে ৭০০ কোটিরও বেশী বই প্রকাশিত হয়েছে। টলস্টয়ের বই বিক্রী হয়েছে এক কোটি বিশ লক্ষ; সম্প্রতি ৯০ খণ্ডে একটি নূতন সম্পূর্ণ ১৩৭ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। পুস্কিনের মৃত্যুর শততম বার্ষিকী উপলক্ষে তার কবিতা, গল্প ও রূপকথা ছাপানাে হয়েছে ৮০লক্ষ কপি। প্রতি বছর রাশিয়ায় ৪৫,০০০ নতন ও মােট আড়াই কোটি বই প্রকাশিত ও অতি দ্রুত বিক্রী হয়। তবুও লক্ষ লক্ষ লােককে গ্রন্থাগারের শরণাপন্ন হতে হয় কারণ জনসাধারণের অসম্ভব চাহিদার তাল সামলানাের মত কাগজ মেলে না। জগদ্বিখ্যাত লেখক ম্যাক্সিম গৰ্কী মারা যাবার কয়েক বছর আগে সােভিয়েট থেকে তার কীর্তির কথা স্মরণ করার জন্য একটি উৎসবের আয়ােজন হয়। মস্ত বড় এক শহর, অনেক শহরের সড়ক ও স্কোয়ার, একটি বিদ্যায়তন, লাল বিমানবাহিনীর একটি স্কোয়াড্রন, এমন কি কয়েকটি কারখানারে। নামকরণ হয় তার নামে। ঐ সময় অবধি সােভিয়েট প্রকাশকেরা ৩,২০,০০,০০০ খণ্ড গকীর বই বিক্রী করে। এই তথ্য ও অঙ্কগুলির তাৎপর্য খুবই গভীর। সােভিয়েট জীবনে যে কি বিপুল পরিবর্তন এসেছে এর মধ্যে আছে তারই প্রতিফলন। কোটি কোটি লােক বিভিন্ন ধারায় প্রবাহিত সংস্কৃতির জন্য আগ্রহশীল। বৈজ্ঞানিক কৃষি যেমন শহরে গ্রাম্য জীবনের ভেদ দূর করতে সচেষ্ট তেমনই সকলের পক্ষে খােলা এই নবজীবনের সড়ক কায়িক ও মানসিক শ্রমনিযুক্তদের মধ্যেকার পার্থক্য চুরমার করে ফেলেছে। অবশ্য সকলেই যে পড়তে ভালােবাসবে তার কোনাে মানে নেই। সােভিয়েট থিয়েটার (যেখানে অভিনয়, নৃত্য, গীতের আসর জমে ) ও ফিমের জনপ্রিয়তা বই এর চাইতেও বেশী। মস্কো আর্ট থিয়েটারের মত দলের খ্যাতি দুনিয়া-জোড়া। অন্যান্য দেশে যখন রঙ্গমঞ্চের দৈন্ত চরমে পৌচেছে সােভিয়েটে তখন হাজার হাজার থিয়েটার, পেশাদার অভিনেতা, অভিনেত্রীরা নিয়মিতভাবে নাটক অভিনয় করে । বিভিন্ন ১৩৮ জাতির মধ্যে সংস্কৃতি অনুরাগ এত বৃদ্ধি পেয়েছে, যে আজ ৬টি বিভিন্ন ভাষায় আড়াই শয়েরও বেশী শুধু জাতীয় থিয়েটারই রয়েছে । উৎকর্ষের দিক থেকেও এদের অভিনয় অনেক সময়ই মস্কো রঙ্গমঞ্চের সমান দরের। তারপর আছে পরীক্ষামূলক থিয়েটার। নৃত্য হয় নূতন ও পুরানাে দুই ধারাতেই। গ্র্যাণ্ড অপে, কমিক অপেরা ও গীতিনাট্য কোনাে কিছুরই অভাব নেই। চাষীদের জন্যও থিয়েটারের ব্যবস্থা ব্যবস্থা আছে। ১৯৩৪ সালে একদল চাষী নরনারী তাদের জেলার সুন্দরতম অঞ্চলেও ঘুরবার জন্য এক থিয়েটারের দাবী জানায়। তখনই এর ব্যবস্থা হল। এতে এত প্রচণ্ড উৎসাহের সৃষ্টি হল যে ১৯৩৯-এ পৌছতে না পৌছতেই দেখা গেল যে শুধু কৃষি অঞ্চলের জন্যই জন্যই ১০,০০০ পেশাদার অভিনেতা অভিনেত্রী নিয়ে ৩০০ টি কৃষি-রঙ্গমঞ্চ গড়ে উঠল। শহরে যে রকম অকৃপণভাবে অভিনয়ের ব্যবস্থা করা হয় যে হঠাৎ বিশ্বাস করে ওঠা যায় না। আমাদের দেশে ' বহু বড় শহরে এক একটা পুরাে ঋতু কেটে যায়—শেক্সপিয়রের একটি নাটকও অভিনয় হয় না। সােভিয়েটে কিন্তু একটি ঋতুতেই মহান ইংরাজ নাট্যকারের একখানি নাটকই (ওথেলো) ১৩টি শহরে অভিনীত হয়। প্রায় পঞ্চাশটি থিয়েটার নিয়মিতভাবে শেক্সপিয়র, গৰ্কী, শিলার, লােপাদা ভেগা প্রভৃতির নাটক অভিনয় করে। সােভিয়েট ফিলমের খ্যাতি খুবই স্বাভাবিক। এখন আমাদের দেশেও ওগুলি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এক ধরনের সােভিয়েট ফিলম আমরা দেখি না। এগুলিতে শিল্পের সঙ্গে বিজ্ঞানের মিল বিজ্ঞানের মিল ঘটানাে হয়।

ধ্বনি ও রং-এর সমন্বয়ে পূর্ণ দৈর্ঘের ছবি ভােলা হয় যাতে ঘড়ি-তৈরী থেকে জীবন্ত নরদেহের বিভিন্ন যন্ত্রের প্রক্রিয়ায় এ সব কিছুর বৈজ্ঞানিক রহস্য চমৎকারভাবে দেখানাে হয়ে থাকে। সুন্দর শক্তিশালী ছবি দেখে এঞ্জিনীয়ারিংএর ছাত্ররা শেখে কেমন করে এরােপ্লেন বানাতে হয়। চাষীদের শেখানাে হয় জীব প্রজননের জটিল তত্ত্ব। চিকিৎসকদের ঢিমে গতিতে সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারের ছবি দেখানাে হয়। এই সব উচ্চাঙ্গের বৈজ্ঞানিক ফিমের বিষয়গুলি কিন্তু সমস্ত সােভিয়েট জনসাধারণের মন পেয়েছে। এ রকম শত শত ফিমের প্রচলন রয়েছে বর্তমানে। অন্য কোনো দেশে এমন বিপুল মাত্রায় দৃষ্টি মারফং শিক্ষাদানের ব্যবস্থা নেই। সােভিয়েট ইউনিয়নে শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন রূপ কোটি কোটি মানুষের—সমগ্র জনসাধারণের জীবনের অঙ্গীভূত হয়েছে। নানা বয়সের অসংখ্য চাষী মজুর ছবি আঁকা, ভাস্কর্য, গান ও রচনা কৌশল আয়ত্তের জন্য শিক্ষা করছে। সমস্ত ইউনিয়নের যৌথ কৃষিকেন্দ্র বা কারখানায় বিশেষজ্ঞরা অনবরত ঘােরেন প্রতিভার সন্ধানে। রেলের ব্রেকম্যান কাল হয়ত সংগীত পরিষদে ঢুকতে পারে। ইউক্রেনের গাে-পালিকার কাছে হঠাৎ লেনিনগ্রাদের ডাক আসতে পারে যােগদানের । ব্রেকম্যান সুরস্রষ্টা ! গাে-পালিকা নটী । আমাদের কাছে এ সব তাজ্জব বােধ হতে পারে কিন্তু সােভিয়েটে নয়। সেখানে শিল্প- সংস্কৃতি সম্পর্কে মানুষের দৃষ্টি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের। তার বিশ্বাস করে যে যা কিছু সুন্দর শিল্পমূল্যযুক্ত ও প্রেরণাদায়ক সবই সর্বসাধারণের। সংস্কৃতিকে তারা উপরতলার ব্যাপার মনে করে । তারা আবিষ্কার করেছে যে সব রকম শিল্পের তাৎপর্য যে কোনাে মানুষ ধরতে পারে, উপভােগ করতে পারে, শিল্পের ক্ষেত্রে ১৪০ প্রত্যেক সৃষ্টিই নূতন আনন্দ ও মহান প্রেরণাময় জীবনের দ্বার খুলে ধরতে পারে। মানবতার বীরত্বমণ্ডিত অতীতের প্রচণ্ড সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার যে সাহস ও শক্তির উৎস তাই দিয়ে সমৃদ্ধ করতে পারে মানবচিত্তকে। যুদ্ধ সােভিয়েট জীবনের পরে সাংঘাতিক আঘাত হেনেছে। জীবনের একটি দিকে কিন্তু বেশী বদল হয় নি। শক্ৰবেষ্টিত নগরেও যে ভাবে সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টার ধারা অব্যাহত রয়েছে তাই দেখে বিদেশী সাংবাদিক মাত্রই চমৎকৃত হয়েছেন। যুদ্ধের অভূতপূর্ব তা শুবের মধ্যেও রুশ দেশের সংস্কৃতি তৃষ্ণার অক্ষুণ্ণতা থেকে স্পষ্ট বােঝা যায় কি ধরনের নূতন জীবনকে রক্ষা করার জন্যই তারা লড়েছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে বিখ্যাত অভিনেতার দল মস্কো মেলি থিয়েটার, যুদ্ধ আরম্ভ হবার পর সাজসরঞ্জাম গুটিয়ে নিয়ে যুদ্ধসীমান্তের দিকে রওনা হয়। সৈন্যবাহিনীর মধ্যে শেক্সপিয়রের মিলনান্ত নাটক “দি টেমিং অফ দি ” দেখার চাহিদা এত প্রবল ছিল যে অভিনেতারা একেবারে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়া সাব্যস্ত করেন। তার এতদূর এগিয়ে গিয়েছিল যে, যে কাজে নিযুক্ত গােলন্দাজের পক্ষে অভিনয় দেখার জন্য কামান ছেড়ে আসা সম্ভব ছিল না। মেলি অভিনেতারা কাদার উপর তক্তা রেখে মঞ্চ বানিয়ে গােলন্দাজরা যাতে অভিনয় ঠিক দেখতে পায় তার ব্যবস্থা করলেন, আবার শত্রুর দৃষ্টি এড়াবার জন্য সমস্ত মঞ্চটাকে ঢাকাটাকি দিয়ে কামুক্লাজ বা ছদ্মবেশেরও সাহায্য নিলেন ! সৈন্যবাহিনী প্রচণ্ড উৎসাহে অভিনয় দেখল। সমস্ত যুদ্ধ সীমান্তে এই রকম অভিনয়ের ব্যবস্থা হয়। আমাদের কাছে অন্তত সব থেকে আশ্চর্য ব্যাপার হল সােভিয়েট অভিনয় গােষ্ঠির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দল, মস্কো আর্ট থিয়েটারের অভিজ্ঞতা। ১৪১ যুদ্ধ শুরু হবার পর এই দল দক্ষিণ যুদ্ধ সীমান্তের পিছনে ঘুরতে থাকে। দিনরাত্রি এর বাকু তেল কলের মজুর, আহত সৈন্য ও কৃষ্ণসাগরের নাবিকদের মত অসংখ্য লােকের সামনে অভিনয় করে দর্শকদের অধিকার দেওয়া হয় পরবর্তী অনুষ্ঠান নির্বাচনের। সৈন্ত, নাবিক ও লেকলের মজুরেরা কি ধরনের জিনিস চাইল আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। তারা দাবী জানাল শপার সংগীতের সুরে বসানাে নৃত্যনাট্যের! হাল্কা আমােদ আল্লদের পরিবর্তে জনসাধারণ ঢাইল এমন সব জিনিস অন্য দেশে জাতি সংকীর্ণ গােষ্ঠির মধ্যেই যার সমঝদার মেলে। সােভিয়েটে সব থেকে উচ্চাঙ্গের নৃত্যও বােঝে ও সাগ্রহে উপভােগ করে তেলকলের মজুরেরাও। গেরিলা নেতা আর্জিয়ানির সত্যকার বৃত্তান্ত থেকে বােঝা যায় সাধারণ সােভিয়েট নাগরিকদের হৃদয়ে সংস্কৃতি অনুরাগের স্থান কোথায়। তার একজন অনুচর একরাত্রে নিভৃতে ডেকে নিয়ে গিয়ে তাকে একটি ম্যাপ দেখাল এবং জার্মান সৈন্যবাহিনীর অনেক পিছনে একটা অত্যন্ত কঠিন ও বিপদজনক কাজ হাসিল করার পরিকল্পনা পেশ করল। আর্জিয়ানি রাজি হলেন। কিন্তু গেরিলা যােদ্ধা চলে গেলে তিনি ডাকলেন আর এক জনকে। তাকেও তিনি দিলেন ঠিক একই কাজ—তবে যাবার পথটা দিলেন পালটে। দু দিন পরে সমস্ত গেরিলা দলের উদ্বিগ্নতা যখন চরমে পৌচেছে তখন দুই যােদ্ধাই ফিরে এল। তারা পেল প্রচণ্ড সম্বধন। উৎসাহে তারা দীপ্ত হয়ে উঠেছিল। “আমরা পেরেছি। আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল ও একত্রে আমরা কাজটা সেরেছি।” কি সেই কাজ যার জন্য দুজন গেরিলা প্রাণ তুচ্ছ করে এগিয়েছিল ? ১৪২ সে কাজ হল মিখায়েলােভঙ্কয়ে নামক গ্রামে গিয়ে কবি পুস্কিনের কবরে একটি ফুলের মালা দেওয়া। এই ঘটনাটি শুনে সােভিয়েট সুরস্রষ্টা মুরাডেলি বলেন—“দেশের মহাকবির প্রতি এদের সম্মান প্রদর্শনের এই প্রয়াস একটা সামরিক প্রচেষ্টার সমান হিসাবে গণ্য করা হয়েছিল। সূর্যরশ্মিকে যেমন চূর্ণ করা যায় না তেমনই এদের সংস্কৃতি অনুরাগও নষ্ট করা অসম্ভব। সােভিয়েটের সর্বত্রই দেখা যায় “সংস্কৃতি-প্রাসাদ”। ইতিহাসে কখনও এ ধরনের প্রাসাদ প্রতিষ্ঠা করা হয় নি। সব সময়েই তার মালিক হত রাজারাজড়ারা। সংস্কৃতি ছিল মুষ্টিমেয় বিশেষ সুবিধাভােগীর সম্পত্তি। সােভিয়েট ইউনিয়নে সংস্কৃতি ও প্রাসাদ দুই-এরই মালিক কোটি কোটি মানুষ সমগ্র দেশবাসী। ঐ আশ্চর্য দেশে “অবসর যাপনের প্রাসাদও দেখতে পাবেন। শুধু ক্রিমিয়া ও ককেশাসেই শ্রেষ্ঠ স্থপতিদের পরিকল্পিত চমৎকার প্রাকৃতিক দশ্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ৫০০ টি এই রকম প্রাসাদ আছে। এগুলি অসুস্থ মানুষের জন্য নয়। কর্মরত নারীপুরুষের জন্য। পরিশ্রান্ত হলে প্রতি বছর দু তিন বা চার সপ্তাহ কাল যে কেউ চমৎকার অবসর যাপন প্রাসাদে গিয়ে কাটাতে পারে—খরচ লাগে না এক পয়সাও সােভিয়েটে প্রাসাদ ও আরাম লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য ! বিপ্লবের আগে সমস্ত রাশিয়ায় ছিল মাত্র ২২ টি ক্লাব। এগুলিও আবার অভিজাতশ্রেণী, ধনিক ও জারের কর্মচারীদেরই দখলে ছিল। আজ সােভিয়েটে আছে ৯৫,০০০ কাব। এর অর্ধেকেরও বেশী হচ্ছে গ্রামাঞ্চলে। সােভিয়েট তরুণেরা আবার নিজেদের জন্য খেলাধূলাের প্রাসাদ বানিয়েছে। পুরাকালের গ্রীসের মত সােভিয়েটের ললাকের। জানে যে পূর্ণাঙ্গ জীবন, সত্যকার সংস্কৃতিসমৃদ্ধ, আনন্দোচ্ছল অস্তিত্বের ১৪৩ জন্য প্রয়ােজন সুস্থ, সবল দেহ। ঘরের বাইরের জীবন সর্বত্রই প্রচণ্ড উৎসাহ পেয়ে থাকে। খেলার মাঠে ফুটবল , বেস বল ও হকির মত প্রতিযােগিতামূলক খেলা চলে বিপুল জনসমাবেশের সামনে। বারটি বিশ্ববিদ্যালয় ও পাঁচটি স্কুলে শুধু স্বাস্থ্যচর্চাবিদদের শিক্ষা দেওয়া হয় । কোনাে বেতন- লাগে না এখানে। আসলে রাশিয়ার খেলাধুলাের সঙ্গে পয়সা কামানাের কোনো সম্পর্ক নেই। সমস্ত দেশে একজন পেশাদার খেলােয়াড় নেই। খেলাধূলো হচ্ছে সমস্ত জাতির স্বাস্থ্য আনন্দের জন্য । ‘খেলাধূলাের প্রাসাদে সবার জন্যই আছে সাতার কাটার জায়গা, টেনিস কোট, ঘােড়া চড়ার বন্দোবস্ত, নৌক। এমন কি সমুদ্রগামী ‘ইয়টেরও ব্যবস্থা। শিকারী ও মাছ ধরার উৎসাহীদের জন্য আছে অরণ্য-স্বর্গে যাবার বন্দোবস্ত। পাহাড় চড়ায় যাদের সখ আছে তাদের জন্য সপ্তাহান্তে ঘুরে আসা থেকে মাসাবধি কাল কাটাবার মত দল পাওয়া যায়। কোটি কোটি মানুষের জন্য আছে প্রাসাদ ও সব রকমের খেলা। বিজ্ঞানের গােপন হাতিয়ারের সাহায্যে সােভিয়েটের মানুষ আজ নিজেদের জন্য এই আশ্চর্য নবজীবনের অধিকার লাভ করেছে। এখানে একটু থেমে আমরা তলিয়ে দেখব সােভিয়েট জীবনের কয়েকটি দিকের কথা যা আমাদের কাছে মােটেই আশ্চর্য ব্যাপার নয়—এমন সব জিনিস যা রাশিয়া ও আমাদের দেশের প্রত্যেকেরই প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। শিল্প, সংস্কৃতি ও খেলা থেকে আমরা এক মুহূর্তের জন্য জীবনের বাস্তব ব্যাপারগুলির দিকে চোখ ফেরাব ‘জীবনযাত্রার মানের দিকে, নীরস টাকা পয়সার হিসাবের দিকে। বেশ জনকয়েক “বিশেষজ্ঞ” আমাদের জানিয়ে দিলেন যে লাল ফৌজের বিস্ময়কর লড়াই খুব সহজে এইভাবে বােঝা যাবে—সসাভিয়েট জনগণ বিশ বছর ধরে তাদের সমস্ত শক্তি ও প্রায় সব টাকাই ব্যয় করেছে যুদ্ধের ১৪৪ ১৯৩৬ উদ্দেশ্যে। তারা ঐ রকম আশ্চর্য ও বিজয়সংগ্রাম চালাতে পারল কারণ শুধু এ জন্যই তারা কুড়ি বছর ধরে সব কিছু বিসর্জন দিয়েছে। এ কথা কি ঠিক ? তথ্য দিয়ে মিথ্যার জবাব দেওয়া চলে। কৃষি ও শিল্পের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানায়নের ফলে সােভিয়েট দুনিয়ার মধ্যে শুধু সব থেকে পরাক্রম- শালী জাতিতে পরিণত হয় নি (হিটলারপদানত সমগ্র য়ুরােপের চেয়েও শক্তিশালী) তার ফলে সমস্ত জাতির জীবনযাত্রার মান, টাকা আনা পাই- এর হিসাবে তাদের আয় প্রচণ্ড রকম স্ফীত হয়ে উঠল ১৯২৮ থেকে ১৯৩৬ এর মধ্যে সােভিয়েট মজুরদের গড় বাৎসরিক বেতন ৭০০ থেকে ২,৭৭ ০ রুবলে পরিণত হল। সালে সােভিয়েট মজুরদের মােট মজুরী দেওয়া হয় ৫৬২৫,০০,০০,০০০ কোটি রুবল। ১৯৪০ সালে এই অঙ্ক দাড়ালো। ১৭৫০০ ০,০০ রুবল। এই বৃদ্ধি হল নগদ টাকায়। এ ছাড়াও আমরা দেখেছি স্বাস্থ্য, আমােদ- প্রমােদের ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা সব দিক দিয়েই জীবনযাত্রার মান উন্নতিলাভ করল। ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৭ এই চার বছরে রাষ্ট্র ও ট্রেড ইউনিয়ন মজুরদের সেবায় মােট ৩২৫০,০০,০০,০০০ রুবল ব্যয় করল । ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০এ এই অঙ্ক ওঠে ৪০০০, ০ ০ ০ কবলে। সােভিয়েট সমালােচকরা আর একটি গল্প ছড়াচ্ছেন যে সে দেশে শ্রমিক আন্দোলনের স্বাধীনতা নেই-ট্রেড ইউনিয়নগুলির অস্তিত্ব আছে শুধু কাগজে পত্রে। তথ্য দিয়ে এ মিথ্যা কাহিনীর জবাব দেওয়া যায়। ট্রেড ইউনিয়ন সােভিয়েট দেশবাসীর সব কিছু অগ্রগতির সঙ্গে জড়িত। সেখানকার ০ ০ } ১ A ১৪৫ ১০-১৪) ট্রেড ইউনিয়ন সভ্যসংখ্যা ১৯১৭ সালে ১৫,০০,০০০র কাছাকাছি থেকে ১৯৪০ এ ২,৫৫,০০,০০০তে দাঁড়ায়। ইউনিয়নগুলি ছিল ৬০ ০ ০ টি ক্লাব-দালান, ১,০০,০০০ টি কারখানা-ক্লাব, ১৫,০০০ গ্রন্থাগার ও ১০,০০০ সিনেমার মালিক—খেলার স্টেডিয়াম, ব্যায়ামাগার, খবরের কাগজ ও গ্রন্থপ্রকাশ প্রতিষ্ঠানের কথাতাে বাদই দিলাম। সােভিয়েট ট্রেড ইউনিয়ন হল সব থেকে প্রাণবান ও সক্রিয় প্রতিষ্ঠান। শান্তির সময় সমস্ত জাতির অগ্রগতি ও নাৎসীদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে জয়লাভের কৃতিত্বের অনেকটাই এর প্রাপ্য। আমাদের পক্ষে এ কথা বােঝ শক্ত নয়। সম্প্রতি আমরা দেখছি যুদ্ধের জন্য শিল্পশক্তির সর্বাঙ্গীন প্রয়ােগের ক্ষেত্রে আমাদের দেশেও ট্রেড ইউনিয়নগুলি কি করতে পেরেছে। শান্তি ও অগ্রগতির জন্যও ইউনিয়ম যে ঐ রকম কাজ করতে পারে তা বােঝা কি খুবই কঠিন। এবার আমরা আর একটি কাহিনীর প্রসঙ্গে আসতে পারি। সােভিয়েটকে যারা সংশয়ের চোখে দেখে এটি হল তাদের বিশেষ প্রিয়। যুদ্ধের শেষের দিকে ও পরে কি হবে তারই সঙ্গে এ গল্পের যােগ আছে। সােজা কথায় ব্যাপার হল এই—রাশিয়াকে কি বিশ্বাস করা চলে ? স্টালিনের আসল আসল মতলব কি য়ুরােপ জয় ও গণতান্ত্রিক দুনিয়ার পরে সাম্যবাদ চাপিয়ে দেবার জন্য জবরদস্তি ? এই সব প্রশ্ন তুলে কৌশলে সংশয়ের বীজ বপন করা হয়। কিন্তু এর উত্তর দিয়ে আমরা এই বিদ্বেষের বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটিত করতে পারি। স্টালিনের কথার পুনরুক্তি করলেই চলবে। বিশ বছর ধরে জনসাধারণের বক্তৃতা, প্রতিশ্রুতি ও বিবৃতির যাথার্থ ও অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণিত হয়েছে। সােভিয়েটের লক্ষ্য সম্পর্কে স্টালিন দুনিয়ার সকলকে জানান :- – ১৪৬

না।
“যুবােপেই থােক আর এশিয়ায়ই হােক-পররাজ্য গ্রাস
বা বিদেশীর পরে আধিপত্য—আমাদের এই ধরনের কোনাে
যুদ্ধকালীন মতলব
মতলব নেই—থাকতেও পারে
প্রথম লক্ষ্য
আছে আমাদের
ও দেশবাসীকে জার্মান-ফ্যাশিস্টদের কবল
থেকে মুক্ত করা।
ও য়ুরােপের অন্য যে সব শৃঙ্খলাবদ্ধ
জাতি আমাদের কাছ থেকে সাহায্যের প্রতীক্ষা করছে তাদের উপর
আমাদের ইচ্ছা বা রাষ্ট্রসংগঠন চাপিয়ে দেবার কোনাে যুদ্ধকালীন
মতলব আমাদের নেই—থাকতেও পারে না। আমাদের উদ্দেশ্য হল
হিটলারী অত্যাচারের বিরুদ্ধে এদের মুক্তি সংগ্রামে সাহায্য করা ও
তারপরে নিজেদের খুসীমত সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এদের আপন
দেশে নিজেদের জীবন যাপনের অধিকার সম্ভব করে তােলা।
দেশের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে কোনাে হস্তক্ষেপ করা চলবে না।”
বিকৃত করার উদ্দেশ্য নিয়েও কোনো সমালােচকের পক্ষে এই সােজ কথার
কোনাে নিগূঢ় অর্থ আবিষ্কার বা বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয় শুধু এই
সহজ কারণেই যে এ কথা এতই সরল যে য়ুরােপ ও আমাদের দেশের
সবাই এর অর্থ বেশ ভালােভাবেই বুঝতে পারে।
ধরুন এবার আমরা এতক্ষণ সোভিয়েট ও সেখানকার মানুষের
কীতি সম্পর্কে যা কিছু বললাম তার একটা গড়পড়তা হিসাব নেবার
চেষ্টা করি।
সােভিয়েট ইউনিয়নের জনগণ তাদের ‘আশ্চর্য নন দেশে’ ঠিক
কি করছে ?
তারা প্রকৃতিকে মানুষের ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করাচ্ছে।
উদ্দেশ্য হল যাতে বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রত্যেক নরনারী ও শিশুর জন্য
প্রাচুর্যের সৃষ্টি হয়। উদ্দেশ্য হল বিজ্ঞানের দ্বারা প্রত্যেকেই যাতে
১৪৭

সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়—পরিশ্রম হাসের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলি প্রয়ােগ করে যাতে আমরা অবসর ও আরাম পাই—মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যাতে সমস্ত জাতির অধিকারে আসে এবং তারা যাতে মানুষজাতিকে যে নূতন ও গৌরবময় জীবনধারা সামনের দিকে টানছে তার রূপ স্পষ্ট দেখতে পায়। বিশ বছরের সােভিয়েট ইউনিয়ন শিল্প ও সংস্কৃতির দিক থেকে আধুনিক জগতে প্রায় অতুলনীয় দুরবস্থা থেকে বড় বড় জাতিগুলির মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করেছে। এই আশ্চর্য নতন জাতি সারা দুনিয়াকে অবাক করে দিয়েছে। নববিজ্ঞান সােভিয়েটকে “অপরাজেয় হিটলারী বর্বরদের প্রতিহত করার মত সামরিক শক্তি যুগিয়েছে। সর্বাঙ্গীন ধ্বংস থেকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তিতে পরিণতি ঘটেছে পচিশ বছরে ১৪৮ মানুষের যোগ্য জীবন “ভয় দেখিয়ে দুনিয়াকে শাসন করা যায়। মর্যাদার অর্থ হল নির্মমতা ও পাশব শক্তি। আমাদের জাতিকে যা কিছু রক্ষা করে তাই হল নীতিসম্মত—যা কিছু তার বিরােধী তাই দুর্নীতিমূলক। নিকৃষ্ট জাতির মানুষকে ধ্বংস করার আমাদের অধিকারের বিরুদ্ধতা করবে কে ? সহজ প্রবৃত্তিই আমাদের জানায় যে আমাদের শুধু শত্রুকে পরাজিত করলেই চলবে না—তাদের সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে হবে ? এ কথা বলেছিল কে ? একজন উন্মাদ ? সমাজদ্রোহী কোননা মানসিক রােগগ্রস্ত ব্যক্তি ? এ কথা বলেছিল হিটলারের অন্তরঙ্গ পরামর্শদাতা ও নাৎসীদের অন্যতম নেতা ডারে। এই জীবটি ভীষণ হিসাব করে পুঙ্খানু- পুঙ্খতার সঙ্গে সেই সব লােকদের লক্ষ্য লক্ষ্য প্রকাশ করছিল যারা দুনিয়াকে এমন যুদ্ধের মধ্যে টেনে আনল যা নৃশংস হত্যা অমানুষিক পাশবিকতার দিক থেকে পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত সংঘর্ষ ঘটেছে তাকে অনায়াসে ছাড়িয়ে যায় শত শত বছর ধরে যুদ্ধবিগ্রহ বিভিন্ন জাতিকে বিধ্বস্ত করেছে। বর্বরেরা শান্তির দেশে হত্যা ও ধ্বংসের বন্যা বইয়েছে। শহর পরিণত হয়েছে ধ্বংস্তুপে । সমস্ত দেশবাসীকে নির্মূল করা হয়েছে। ১৪৯ কিন্তু ইতিহাসে কখনও কোনাে পররাজ্যলােলুপের দল সমস্ত মানবতাকে নিঃশেষ করতে—সমগ্র দুনিয়ার পরে পাশবশক্তির শাসন প্রতিষ্ঠা করতে এভাবে কোমর বাঁধেনি। সমস্ত মনুষ্যজাতিকে এই মারাত্মক সম্ভাবনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। আমাদের মুখােমুখি দাড়াতে হয়েছিল সেই সব বিকারগ্রস্ত প্রাণীদের যাদের একমাত্র নীতি হল নরহত্যা। দশ বছর আগে দুনিয়ার অন্যতম অগ্রগামী জাতি হিসাবে খ্যাত জার্মানী এমন একদল গুণ্ডার হাতে এসে পড়ে যে দুর্দান্ত অপরাধীরাও স্বপ্নে তার কল্পনা করতে পারবে না। সারা দুনিয়ার চোখের সামনে এই গুণ্ডারা জার্মান সভ্যতা বিনষ্ট করতে আরম্ভ করল। সব মানুষকে পশু জ্ঞান করে এর নির্মম ও বিবেকশূন্য চিত্তে জার্মান জাতিকে পশুত্বে পরিণত করতে উঠে পড়ে লাগল। অগ্রগতির ইতিহাসে জার্মানরা যে যে কারণে স্থান পেয়েছিল নাৎসীরা তার সবগুলিই অস্বীকার করল। তারা ধ্বংস করল পরিবার, বিবাহের জায়গায় জার্মানদের মধ্যে প্রচলন করল বর্ণ সাংক ও “নিকৃষ্টজাতিভুক্ত” নরনারীর প্রজনন- শক্তির বিনষ্টি। তারা নষ্ট করল বিদ্যালয়গুলিকে – শিক্ষার জায়গায় সেখানে নিয়মিতভাবে বিদ্বেষ প্রচার শুরু হল। বুদ্ধিকে তারা করল উপহাস—মাথায় তুলল জঘন্যতম পাশব প্রবৃত্তিগুলিকে। মানুষের ব্যক্তিত্বের তারা কণ্ঠরােধ করল—যারা নতি স্বীকার করল না বা নীরব রইল না নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করা হল। ধর্মকে গালাগালি দিয়ে তারা রক্তপাতের জয়গানে মত্ত হয়ে উঠল। এ সব কিছুই নাৎসী দানবের করল যথাসম্ভব—দুষ্টবুদ্ধি অত্যাচার, ও বিভীষিকার যত রকম যন্ত্র বানাতে পেরেছে তারই ১৫০ তারা লক্ষ লক্ষ জার্মানকে পশুতে পরিণত করতে সমর্থও হল। কিন্তু অরণ্যের পশুর চেয়ে এরা অনেক বেশী সাংঘাতিক কারণ নাৎসী পশুরা শুধু পাশবিকতায়ই পােক্ত ছিল না—তারা যান্ত্রিক যুদ্ধের ভীষণতম হাতিয়ার ব্যবহারেও দক্ষ ছিল। প্রায় সমস্ত পুরুষদের যন্ত্র-মানুষের পালে পরিণত করা হল। তাদের গায়ে ছাপ লাগানাে হল ‘স্বস্তিকার। মগজের জায়গায় রইল শুধু নর- রক্তপাতের শাণিত প্রবৃত্তি। এ সব যখন চলছিল সভ্য পৃথিবী তখন চুপচাপ বসে দেখছিল। মন্ত লজ্জার কথা অনেকে নাৎসী বর্বরতার মধ্যে তখন সমালােচনার কিছু খুঁজে পায়নি। আজ বিবেক নিশ্চয়ই জ্বলন্ত শিখার মত তাদের অন্তর্দাহ ঘটাচ্ছে। এর চেয়েও জঘন্য ব্যাপার—বাইরেকার ক্ষমতাশালী ব্যক্তি পরামর্শ, অর্থ ও প্রভাব দিয়ে নাৎসীদের দ্বারা জার্মানীর পাশবিকতা সাধনের কাজে সাহায্য করেছিল। সর্বোচ্চ স্থানেও বর্বর হিটলার বন্ধু, এমন কি ষড়যন্ত্র করবার মত লোেক পেয়েছিল। আর, সারা দুনিয়ার প্রত্যেক কোণ থেকে যে সাবধানবাণী ক্রমশই প্রবল হয়ে উঠছিল তা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত রইল যতদিন না নাৎসী দস্যরা বিপুল সামরিক শক্তি সমাবেশ করে ফেলতে পারল। তখন কিন্তু বড় বেশী দেরী হয়ে গেছে । হিটলার তারপর মানবতার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও ধ্বংসের শক্তি প্রয়ােগ আরম্ভ করল। এ সবের প্রস্তুতি সে প্রকাশ্যেই করেছে—পাশবিক, উন্মত্ত বক্তৃতায় এর উদ্দেশ্য বরাবর সে ঘােষণা করেছে । একে একে দুনিয়াকে হতচকিত করবার মত আকস্মিকতার সঙ্গে নাৎসী বিশ্বাসঘাতকতা ও আক্রমণ য়ুরােপের বড় বড় দেশগুলিকে পদস্ত করল। পরাজিত দেশগুলির পরে যে লুণ্ঠন ও অত্যাচার চলল তারপর হিটলার- পন্থীদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আর সংশয়ের অবকাশ রইল না। নিশ্চিত বােঝা গেল যে তারা নিজেদের ছাড়া সমস্ত জাতির ধ্বংস বা পরাধীনতা চায়—সমস্ত জগৎকে পরিণত করতে চায় এক বিরাট দাসত্বভূমিতে। এই জন্য উদ্দেটাকে ঢাকবার জন্য হিটলার ও তার ‘আর্য' বন্ধু জাপানীরা নানারকম নির্মম কপটতা ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিল । যে সব জাতিকে সে আক্রমণ করল তাদের প্রত্যেকের পরেই দোষারােপ করা হল যে তারা জার্মানী আক্রমণ উদ্দেশ্যে যন্ত্র করছে। শান্তিকামী জাতি- দের উপর সব থেকে রক্তাক্ত অভিযানের সাফাই গাওয়া হল এই সুরে। যে সব স্বাধীন জাতি বাকী রইল তাদের কাছে হিটলার গলাবাজী করত যে নাৎসীরা সমাজতন্ত্রবাদী ও তার ধনিকদের বিরুদ্ধে চাষী-মজুরের স্বার্থরক্ষা করে। এই মিথ্যাচার দিয়ে হিটলার এই কথাটাই গােপন করতে চাইল যে তার চেলারা হল মস্ত পুঁজিদার যারা সমস্ত য়ুরোপকে দাসত্ব শৃঙ্খলে বেঁধেছিল-জার্মান ব্যাঙ্কার ও ভূস্বামীদের তহবিল সেখানকার রক্তমাখা লুষ্ঠিত ঐশ্বর্যে ভারী করে তুলতে। সবশেষে হিটলারপন্থীরা নিজেদের সংস্কৃতি ও ধর্মের ধ্বজাধারী বলে প্রতিপন্ন করতে চাইল ঠিক তখনই যখন হাজার হাজার নিহত বুদ্ধিজীবী, ধর্মযাজক, পাদ্রীর কবরের পরে তাদের নিষ্ঠুর পদক্ষেপ ধ্বনিত হচ্ছিল। এইভাবে নাৎসীরা প্রমাণ করল তাদের মানব বিদ্বেষ। তারা ভাবল মিথ্যা ও নির্মমতা দিয়ে বুঝি সমগ্র মানবতাকে পযুদস্ত করা যাবে। নিজেদের পাশবিকতা সম্বন্ধে সচেতন হওয়ায় তারা মনে করল অন্য মানুষদেরও বুঝি জবরদস্তি করে আপনাদের স্তরে টেনে নাবানাে যাবে মানব মর্যাদা গুড়িয়ে দেওয়া যাবে ভয় দেখিয়ে । কিন্তু হিসাবে তাদের ভুল ছিল। আপন হৃদয় থেকে মানবতাবােধের শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলতে পারলেও এই জীবেরা মানুষের স্বাধীনতা- পিপাসা ও বীরত্বমণ্ডিত আদর্শনিষ্ঠা চূর্ণ করতে পারল না। চেকো- স্লোভাকিয়ার মানুষকে চাবুক মেরে পােষ মানানো গেল না! বিভীষিকা সত্ত্বেও পােল্যাণ্ড নিস্তব্ধ রইল না। গ্রীস ও যুগােশ্লাভিয়া অসম্ভব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে প্রতিশােধের আঘাত হানল ! হল্যাণ্ড, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও নরওয়ে লাদের আশার শিখা অনির্বাণ রেখেছিল। পশুশক্তির অপরাজেয় সামরিক যন্ত্রের কাছে যখন বৃটিশেরা নতি স্বীকার করল না তখন হিটলার সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস ঐ দ্বীপপুঞ্জের পরে অবিশ্রান্ত নৃশংস বিমান আক্রমণ চালাল। তবু লাভ হল না। কাপুরুষের মত আকস্মিক আক্রমণ কৌশল প্রয়ােগ করে জাপান যখন আমেরিকার বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করল তখন ওয়েক দ্বীপে মুষ্টিমেয় মার্কিন সৈন্য অসংখ্য শত্রুসেনার কাছে হার মানার চেয়ে প্রাণ দেওয়া শ্রেয় বােধ করল ! ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে মার্কিন ও দেশীয় সৈন্যরা বহুদিন বর্বরদের অবিশ্রান্ত অভিযান ঠেকিয়ে রেখেছিল। কি ইংলও, কি আমেরিকা কেউই চক্রশক্তির নিষ্ঠুরতম আঘাতের সামনে ভয় পায়নি । তবু সােভিয়েটের বিরুদ্ধে হিটলার য়ুরােপের সমগ্র শিল্প ও সামরিক শক্তি সংহত করে যে বিরাট ও প্রচণ্ড আঘাত করল তার তুলনায় এসব আঘাতও মৃদু বলতে হবে। ইতিহাসে এত বড় আক্রমণ আর কখনাে দেখা যায়নি। কখনো কোনো জাতি ২০০০ মাইল জোড়া সীমান্তের প্রত্যেক জায়গায় এরকম অতর্কিতভাবে আক্রান্ত হয়নি। কোনাে যুগে মঙ্গোল ও হুনেদের আমলেও কোনাে আক্রমণকারী এমন অকথ্য অত্যাচার চালায়নি। বনের পশুকেও সে অত্যাচার লজ্জা দিতে পারে। হিটলারপন্থীরা তাদের পথে যা পড়ল নিঃশেষে সব ধ্বংস করল। নারীর পরে অত্যাচার ও শিশু হত্যা তারা করল দু-একটা নয়...দলে দলে উন্মত্ত তাণ্ডবে মেতে হাজার হাজার বেসামরিক লােকদের দিয়ে তারা বিরাট কবর খোঁড়াল ও তারপরে তাদের হত্যা করল। শত শত জীবন্ত ব্যক্তিকেও কবর দেওয়া হল। শত শত ছেলে মেয়েকে তারা স্কুলে ডেকে এনে দরজা বন্ধ করে আগুন আগুন লাগিয়ে দিল। হাজার হাজার বয়স্ক নর-নারীকে সুদূর উত্তরের তুষারপাতের মুখে তাড়িয়ে যন্ত্রণা দিয়ে মারল। মানুষের দেহধারী এই পশু কুড়ল, বেড়াজাল ও পিস্তলের সাহায্যে সােভিয়েটের মানুষকে পযুদস্ত করতে চাইল। তবু পারল না। সােভিয়েট ইউনিয়নের জনগণ যখন আক্রমণ ঠেকাতে আরম্ভ করল তখন দুনিয়াকে বশ মানানাের নাৎসী স্বপ্ন এমন এক প্রতিরােধের ঘায়ে চুরমার হয়ে গেল যাতে সমস্ত জগত চমকৃত হল। পশুদের অপরাজেয় সমর-মন্ত্রের গতি প্রথমে মন্দীভূত হল—তারপর মস্কো ও লেনিনগ্রাদের দরজায় এসে একেবারে হল রুদ্ধ। দুনিয়াতে তুলনা মেলে না এই রকম ন-মাসের নৃশংস লড়াই-এর। হিটলার যা সৈন্য হারাল...প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পুরো চার বছরেও কাইজারকে তা হারাতে হয়নি। এই প্রচণ্ড যান্ত্রিক বাহিনী, বােমা ও গােলার এই নরক, সােভিয়েটের বিরুদ্ধে নাৎসীদের অন্তহীন নির্মমতার পাশে পূর্ব যুগের সমস্ত তড়িৎ আক্রমণ সামান্য মহড়ার মত বােধ হল। লক্ষ লক্ষ সােভিয়েট সৈন্য, বৈমানিক, গেরিলা, নারী, তরুণ ও ছােটরা প্রাণ হারালাে। গােটা অঞ্চলের পর অঞ্চল শত্রু অধু্যষিত ও ধ্বংসস্তুপে পরিণত হল। লাল ফৌজকে পিছু হটতে হল। কিন্তু তার পণ্টন ছত্রভঙ্গ হল না । লাল ফৌজের লাইন একবারও ভাঙল না। তারপর ১৯৪৩ সালের শীতকালে, টালিনগ্রাদের আশ্চর্য বিজয়ের সূত্র ধরে লাল ফৌজ শুরু করল তার বিরাট অভিযান। তখন প্রকাশ ১৫৪ পেল শাপসনিকভের বিরাট পরিকল্পনা—যুদ্ধ শেষ হওয়ার মুখে শত্রুর থেকে প্রবল হবার পরিকল্পনা। লাল ফৌজ লড়াই-এর যে নূতন অস্ত্রশস্ত্রের রিজার্ভ বার করল তাই দেখে সারা দুনিয়া চমকে গেল আর হিটলারপন্থীরা হয়ে পড়ল আতঙ্কিত। টালিনগ্রাদের পরাজয়ের পর ককেশাস, বস্টভ, খাকভ ও কার্ল্ডের বিপুল পরাজয় সামাদক ইতিহাসে একেবারে অভূতপূর্ব। ১৯৪৩ সালে লাল ফৌজ যে রকম বিজয় গৌরব অর্জন করে কোনো সৈন্যবাহিনী কখনও সে রকম পারেনি। এই বইতে আমরা দেখেছি কি ভাবে সােভিয়েট এই বিরাট সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল, কেমন করে দশ বছরে ফ্যাসিজমের প্রত্যাশিত আঘাত ঠেকাবার জন্য বিজ্ঞানের হাতিয়ার শানানো হল। আক্রমণ যখন এল তখন তার পিছনে ঘরােপের সমস্ত অগ্রগামী দেশগুলির শিল্পশক্তি ছিল। হাতিয়ার তবু তার মান রাখল। কিন্তু এ হাতিয়ার যারা চালাল তারা কি ধরনের মানুষ ? হিটলারের সােভিয়েট ধ্বংস করার বড়াই চূর্ণ করার মত সাহস ও স্থৈর্য তারা পেল কোণ থেকে ? সাহসের কোন পুঁজি থেকে লক্ষ লক্ষ বীবের উদ্ভব হল ? সােভিয়েট ইউনিয়নের মানুস মরিয়া হয়ে লড়েনি। স্বদেশ রক্ষা করছিল বলেই তারা টিকে থাকেনি। স্বেচ্ছাচারতন্ত্রের চাবুকের ঘায়েও তারা যুদ্ধে যেতে বাধ্য হয়নি। সােভিয়েট জনগণ অর্থাৎ সে ১৮ কোটি মানুষ একদিন শুধু হাতে জার শাসনের সশস্ত্র বিভীষিকাকে উৎপাটিত করেছিল—তারা যুদ্ধে গেল – কেন লড়ছে সে সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন হয়ে। যে স্বাধীনতা তাদের কাছে বাস্তব সত্যের রূপ নিয়েছিল—যে স্বাধীনতা দিয়েছিল তাদের নৃতন, মহিমান্বিত জীবনের অধিকার আর অবারিত করেছিল অনন্ত উন্নতির পথ—তাই বাঁচাবার জন্য তারা লড়াই চালাল।

আমাদের পক্ষে এ কথা বােঝা অত্যন্ত দরকার কেন সোভিয়েটের লােক মস্ত এক সৈন্যবাহিনীর মত লড়াই করেছে। তাদের সঙ্গে হিটলার যে সব জাতি ও লােকদের পরাভূত করেছিল তাদের তফাৎ কোথায় ? সােভিয়েট সৈন্যরা ও বেসামরিক লােকেরা জানত যে একটা কারখানা, খনি, রেলওয়ে বা দোকানও হিটলারের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে একটুও মুনাফা করছে না। সােভিয়েট ইউনিয়নে ডিভিডেণ্ড যেনণা করা হয়নি। রক্তাক্ত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে লােকের লাভের অঙ্ক কেঁপে ওঠেনি। তাদের মজুরেরা উৎপাদনের গতি হাস করা জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা মনে করল। যুদ্ধ শেষ হলে তাদের বেকার হওয়ার চিন্তা ছিল না। বলে সােভিয়েট মজুরের সে কাজ দীর্ঘ দিন চলুক এমন কথা ভাবতে ঘৃণা বােধ করে। যুদ্ধের আগেও তাদের নিজেদের ও পরিবারবর্গের নিরাপত্তা ছিল—পরেও থাকবে । সােভিয়েট ইউনিয়নের সৈন্য, বৈমানিক ও নাবিকের লড়াই-এর সময় কত মাইনে পাচ্ছে তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। কারণ পরে বসে খাবার মত টাকা জমাবার চিন্তা তাদের পাগল করত না। পঙ্গুত্ব বা মৃত্যুর সম্ভাবনার সম্মুখীন হতে তারা পারত–স্ত্রী পত্র পথে দাঁড়াবার ভয় তাদের ছিল না। সােভিয়েট তরুণী ও মেয়েরা সৈন্যবাহিনীতে প্রেমিক বা স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করেছে—ফ্রন্টে শত্রুর সামনে এগিয়েছে সাহসে বুক বেঁধে। কারণ তারা লড়ছিল এমন এক জীবনের জন্য যা তাদের দিয়েছে সম্পূর্ণ সমান অধিকার, সব রকম হীনতার পঙ্ক থেকে তাদের দিয়েছে মুক্তি বিবাহকে দুটি সমকক্ষ মানুষের মিলনে পরিণত করেছে আর পরিবারকে দিয়েছে নূতন মর্যাদা ও সম্মান।

; সােভিয়েট যৌথকৃষির নরনার। আশ্চর্য রকম উৎপাদন বাড়াতে পেরেছে ; শত্রুর অগ্রগতির পথে তারা শেষ শস্য কণাও বিনষ্ট করেছে ; পুড়িয়েছে ঘরবাড়ী নাৎসীরা যাতে আশ্রয় না পায়। কিন্তু কেন করেছে এই আত্মত্যাগ ? কারণ সে দেশে চাষীর ভয় নেই কৃষি সংকটের, তার দুর্গতি থেকে কারো ফেপে ওঠার সম্ভবনা নেই।' কৃমি দেশের পক্ষে প্রয়ােজন—চানী জনসংখ্যার অন্যান্য অংশের অংশের মতই জাতীয় আয়ের ভাগীদার । তার কষ্টে অর্জিত অধিকার, স্বচ্ছন্দতর জীবন- যাত্রী ও স্বাচ্ছল্য বাবার জন্য সােভিয়েট চাষী ফসল ফলিয়েছে আবার প্রয়ােজন হলে ধ্বংস করেছে সে ফসল, যােগ দিয়েছে গেরিলাবাহিনীতে। যুদ্ধ যে প্রচণ্ড আত্মত্যাগের দাবী জানালো তার মুখােমুখি হয়ে আর আক্রমণকারীকে পদস্ত করতে যে বিপুল পরিমাণ সাজসরঞ্জাম ও টাকা লাগছে তা দেখেও সােভিয়েট জনসাধারণ এই বিশ্বাস নিয়ে লড় নে শান্তি যখন আবার করায়ত্ত হবে তখন তাদের সরকার সমস্ত জাতীয় আয় খরচ করবে সংস্কারের কাজে, যা কিছু নষ্ট হয়েছে সবই আবার গড়া হবে আর জয়লাভের জন্য যে লড়েনি বা খাটেনি তার ভাগ্য এক পয়সাও জুটবে না। সােভিয়েট ইউনিয়ন জানে যে জয়লাভের পর তাদের সীমানার মধ্যে খাদ্যের জন্য সারি দিতে হবে না। মানুষ শিখেছে কি করে অন্নসত্রের জায়গার সংস্কৃতি ও প্রমােদ সৌধ গড়তে হয়। তারা আবিষ্কার করেছে কি ভাবে ব্যক্তিগত সামর্থকেই জীবনে সুযােগলাভের একমাত্র উপায় করা যায়। তাই তারা লড়াই-এ গেল তাদের সন্তানদের এমন দুনিয়ায় বাঁচবার অধিকার কায়েম করার জন্য সেখানে পুঁজির সুবিধা ও শক্তি হয়েছে খৰ আর যেখানে কা, নিষ্ঠা ও শক্তি দিয়েই শুধু সম্মানের অধিকার জন্মায় । ১৫৭ বর্ণবিভেদ নেই, ‘জঘন্য বিদেশীর প্রতি ঘৃণা নেই, জনসমাকীর্ণ নােংরা বস্তি নেই, চিকিৎসাহীন রােগী নেই, সামাজিক অপরাধ, পাপ ও বেশ্যাবৃত্তি নেই, নিরপত্তাহীনতার ছায়ায় কালো জীবনভর মেহনত নেই, নেই শ্রান্তিভাবে দুর্বহ ও দৈন্ত-পীড়িত বার্ধক্য। গ্লানি সােভিয়েট দূর করেছে। আর তাই সেখানকার মানুষ মৃত্যুপ করে লড়েছে জঘন্য নাৎসীদের বিরুদ্ধে যারা নতন রাশিয়ায় আবার আনতে চায় ঘৃণ্য অতীতের গ্লানি। এই সব যা কিছু অর্জন করা গেছে, যে স্বপ্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে, যত রকম স্বাধীনতার সন্ধান মিলেছে...এই নূতন জীবনের জন্যই লড়েছে সােভিয়েট ইউনিয়ন। বিজ্ঞানের হাতিয়ার সজ্জিত ও তাদের ব্যবস্থায় চরম বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে সােভিয়েটের জনসাধারণ এমন সব শক্তি, সাহস ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিচ্ছে মানুষের ইতিহাসে যার কথা চিরকালের মত স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে । আমাদের প্রয়ােজন তাদের মত দৃষ্টির । বর্বরদের হাত থেকে আমাদের জীবনযাত্রা বাচাবার বিরাট সংগ্রামে আমরা আবিষ্কার করব স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও অগ্রগতির পার্থও। সােভিয়েট ইউনিয়নের মানুষ যেমন তাদের মহান সাধারণতন্ত্রের মাটি থেকে সমস্ত শােষণের অবসান ঘটিয়েছে তেমনই আমাদের জাতিদেরও আমাদের দেশে ও দুনিয়ার দুর্গত দেশগুলিতে সত্যকার মুক্তি আনতে হবে। আমাদের সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে হবে যে হিটলারপন্থী ও তাদের বন্ধুরা একেবারে বিনষ্ট হয়েছে—যাতে আবার সেই পশুরা না শক্তি অর্জন করে। সভ্যতার শত্রুর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য সােভিয়েটের নর- নারী ও শিশু সর্বস্ব ত্যাগ করেছে। বিধবা ও অনাথের সংখ্যা সেখানে কোটির ঘরে। ১৫৮ শৌর্য ও শােকের কি ভয়ংকর বন্ধন আমাদের সােভিয়েট ইউনিয়নের মানুষের সঙ্গে মিলিয়েছে ! সহকর্মী হিসাবে আমরা তাদের উদ্দেশে হাত বাড়ালাম। আমরা তাদের নমস্কার জানাই। রক্ত ও অর অচ্ছেদ্য বন্ধনে আমরা তাদের সঙ্গে বাঁধা। কারণ আজ আমরা জানি যে পূর্ব সীমান্তের যুদ্ধক্ষেত্রে যে মানুষের মৃত্যু হয়েছিল তার প্রাণ দিয়েছিল আমাদের জন্যও। কিন্তু চোখের জলে তাদের জন্য শােক জানিও না কারণ তারা অপরাজেয়-মৃত্যুর মধ্যেও বীরত্বমণ্ডিত। এই মানুষেরা অমর। তাদের দেহ থেকে ঝরা রক্ত আজ ভবিষ্যতের ধমনীর মধ্যে প্রবাহিত। ১৫৯

No text on this page.

কানাডার কম্যুনিস্ট পার্টির কাছে লেখা
ডাইসন কার্টারের
(খালা চিঠি
১১-১৪)

No text on this page.

:
মার্কসবাদের পথে কেন এলাম
প্রিয় টিম,
আমাদের প্রথম সাক্ষাতের পর বহুবার আমরা হাতে হাত মিলিয়েছি।
আজ আমি নিশ্চয় জানি যে আমার হাতের পর তােমার মুঠো হবে
আগের চেয়েও অনেক বেশী জোরালো। এখন আমরা শুধু বন্ধু নই
-আমরা কমরেডও। তােমায় লিখতে বসেছি এই কথা বলবার
জন্য যে বহু বছরের চিন্তার পর আমি লেবার প্রােগ্রেসিভ পাটিতে ।
(LP) যােগ দিয়েছি।
অন্য সবার চেয়ে, টিম তুমি বেশী জাননা কতদিন ধরে কত
পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আমি এই কাজটি করবার কথা ভেবেছি। আমার
পক্ষে এ একটা সাময়িক লােক-দেখানো ব্যাপার নয় ।
কানাডার মজুর পার্টি, মাকস্বাদ ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রবাদের পাটির
সভ্য হয়েছি সে কথা এখন তােমার কাছে খুলে বলতে পারলে
চমৎকার হত। কিন্তু আমরা আছি প্রায় ২০০০ মাইল দূরে। তাই
এ চিঠি মারফৎই সারতে হবে।
এক কথায় আমি IPP তে যােগ দিচ্ছি কারণ কানাডার এইই
হল একমাত্র পাটি যা আমাদের ডােমিনিয়নে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার
জন্য লড়ছে, একমাত্র পাটি যা কানাডাবাসীকে সামনের সংগ্রামে ও
শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্রের পথ দেখাতে পারে।
কেন আমি
* টিম বাক-কানাডার বেআইনী কমুনিস্ট পার্টির সম্পাদক।
+ কানাডার কমুনিস্ট পার্টি বেআইনী হওয়ায় বর্তমানে লেবার প্রােগ্রেসিভ
পাটিই কমুনিস্টদের সংগঠন।

আমার কাছে এর অর্থ হল এই যে IPP সমাজতন্ত্র কি ও কেমন করে তার প্রতিষ্ঠা সম্ভব তা সঠিক জানে। বহু বুদ্ধিজীবী, মজুর, চাষী, বৃত্তিজীবী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লােকদের মত আমিও অনেকদিন দিন ধরেই এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁচেছি যে ধনতন্ত্র এখন অচল আর সমাজতন্ত্র হচ্ছে উন্নততর সমাজ। বহু বছর এই সমাজান্ত্রিক ব্যবস্থায় আস্থার রাষ্ট্রনৈতিক তাৎপর্য কি তা আমি ধরতে পারিনি। কিন্তু জীবনের গতি, মার্কস্বাদ অধ্যয়ন এবং আমার লেখা ও বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম-অবিশ্রাম সত্যানুসন্ধানই যে সব কিছুর সমন্বয় সাধন করছিল এ সব মিলেই আমার ধারণাশক্তিকে উন্নততর স্তরে পৌঁছে দিয়েছে। এখন আমি পার্টিতে যােগ দিচ্ছি কারণ আমি জানি সমাজতন্ত্রের জন্য কাজ করার অর্থ কি। সমাজতন্ত্র কানাডায় ধনবাদী রাষ্ট্রের অবসান ঘটাবে আর তার জায়গায় আনবে নূতন এক রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্র গড়বে তারাই-উন্নততর, শ্রেণীহীন সমাজ সংগঠনে যাদের ঐতিহাসিক অধিকার—হাত ও মাথা চালিয়ে যারা সৃষ্টি করে সেই সব নরনারী। এর ফলে কানাডায় ঘটবে আমূল পরিবর্তন। প্রথমত পুঁজিদার ও তাদের লুব্ধ একচেটিয়া ব্যবসার দ্বারা মজুর, চাষী ও মধ্যশ্রেণীর শােষণ শেষ হবে। এখানে আপােষের কথা উঠতেই পারে । কানাডার বিরাট উৎপাদন যন্ত্র, যানবাহন ব্যবস্থা, শক্তি উৎপাদক কারখানা, সরবরাহের যন্ত্রপাতি, শিল্পে টাকা যােগানাের ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও এই ধরনের জিনিসগুলি মুষ্টিমেয় লক্ষপতি শাসকের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কর্মরত মানুষের রাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে হবে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের সামগ্রী ছাড়া সমস্ত সম্পত্তি হবে সমাজ- তান্ত্রিক সম্পত্তি—তার উপরে অধিকার থাকবে সমস্ত জনগণের ; ১৬৪ আর জমি চিরদিনের বন্দোবস্তে যারা চাষ করে তাদের ইজারা দেওয়া হবে। অন্য লােকের মেহনত থেকে ব্যক্তিবিশেষের মুনাফা কামানাের অধিকার তাই হঠাৎ খতম হয়ে যাবে। ধনবাদী সমাজের যে অন্তহীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক নির্মমতার বিরুদ্ধে দুশো বছর ধরে মানবধর্মীর। প্রতিবাদ করে আসছেন তখনই তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। এ ছাড়াও সমাজতন্ত্র মানুষের প্রয়ােজন 'ও আমাদের বিপুল দেশের অশেষ উৎপাদিকা শক্তি অনুসারে যুক্তিসঙ্গতভাবে কানাডার উৎপাদন সংগঠিত করবে। যারা মেহনত করে তাদের সচেতন ইচ্ছাই হবে এর নিয়ামক। এর ফলে সােভিয়েটের মত এখানেও ক্রমেই উন্নততর জীবনযাত্রা সম্ভব হবে। আমাদের শিল্প ও কৃমি ইতিমধ্যেই যান্ত্রিক দক্ষতা ও লাভের দিক দিয়ে দুনিয়ার সব থেকে শ্রেষ্ঠ দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। সমাজতন্ত্র-শােষকদের দূর করে যারা এর স্রষ্টা সমস্ত লাভকে সেই জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান আয়ে পরিণত করবে আর আরো বাড়িয়ে তুলবে উৎপাদন। গ্রামে ও শহরে আমরা দারিদ্রের বিরুদ্ধে চালাবাে সামগ্রিক যুদ্ধ। মানুষ যা চায় অথচ পয়সায় কুলাতে পারে না। পরিচ্ছন্ন বাড়ী, সুখাদ্য, কাপড়জামা, গাড়ী, রেডিও, রেফ্রিজারেটার, ছুটি কাটাবার জায়গা, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ব্যবস্থা—এ সবই অনায়াসে বিজ্ঞান ও এঞ্জিনীয়ারিং-এর পরিচালনায় এখনকার সমাজ, বিরােধী সংকীর্ণতা পেরিয়ে কল্পনাতীতভাবে তৈরী ও ভাগাভাগি করে নেওয়া সম্ভব। আরাে কথা আছে। কানাডায় সামজতন্ত্র আনতে পারলে সকলের কাছেই জ্ঞান ও সংস্কৃতির দ্বার অবারিত করা সম্ভব হবে। আমাদের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানুষের সব থেকে মহান স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত করতে আরম্ভ করবে। সে স্বপ্ন হল মানুষের মেহনত ও বুদ্ধির প্রচণ্ড শক্তিকে ৫ সংকীর্ণ জীবন-সংগ্রাম থেকে সরিয়ে নিয়ে নতুন দুনিয়া গড়ার বীরত্ব- মণ্ডিত কাজে নিয়ােগ করা। বহু আগেই অস্পষ্টভাবে যে দুনিয়ার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল কিন্তু পূর্ববর্তী কোনাে সভ্যতায়ই তা সম্ভবপর হয়নি। এখন বিজ্ঞান ও সৃষ্টিকলার অগ্রগতির ফলে চির উন্নতিশীল এ দুনিয়া ড়। সম্ভব। কানাডাবাসীকে বিশেষ করে আমার বই “সােভিয়েট বিজ্ঞানের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর একমাত্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েট ইউনিয়ন—যে দেশে নুতন বাস্তব জীবনযাত্র; প্ৰালী শ্রমজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অশেষ সৃষ্টিশক্তির উৎস উন্মুক্ত করে দিয়েছে তার সত্যকার চিত্র দেবার সুযােগ পেয়েছি বলে আমি গৌরবান্বিত। শুধু সেখানেই নয়। দুনিয়ার সুন্দর রূপ স্পষ্ট দেখা যেতে পারে। সেখানে অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্ব সম্পূর্ণ দূর হয়েছে জাতি ও বর্ণের মধ্যেকার বিদ্বেসের জায়গায় সেখানে এসেছে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক প্রীতির সম্পর্ক আর সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের সু-উচ্চ আদর্শ, নূতন, সাহসী, আশ্চর্য অকুতােভয় জাতিগুলির অস্থিমজ্জার মধ্যে প্রবেশ করেছে। সোভিয়েট ইউনিয়ন সত্যই মানুষের আশার বাস্তব প্রতীক। শুধু সেখানেই ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যতের চেহারা। টিম, আমার কাছে ভবিষ্যতের কথা শুনতে শুনতে তুমি তাকে রাত কাবার করে এনেছ। এবার আমি বলতে চাই যে কথা তার সম্পর্ক একেবারে মাটির সঙ্গে। কেন একজন বৈজ্ঞানিক বা লেখক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই এ যােগ দেবার সিদ্ধান্ত নিতে চায় ? ১৪ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতম গবেষণা করতে করতে আমি সসাভিয়েট বিজ্ঞান সম্পর্কে যা কিছু পেলাম তাই পড়া শুরু করি। ব্যাপারটা গড়াল অনেক দূর—পৌছলাম ইতিহাসের রাজ্যে, দর্শনের মধ্যেও। দেখলাম আমার অধ্যাপকের বিজ্ঞানের যে প্রাণহীন ইতিহাস ব্যাখ্যা করেন তা কতদূর বিকৃত। আবিষ্কার করলাম যে আমার অধ্যাপকেরা যার সম্পর্কে ছিলেন সম্পূর্ণ অজ্ঞ সেই হার্জেন হলেন শ্রেষ্ঠ বস্তুবাদী ও বিপ্লবীদের অন্যতম। রাসায়নিক মেশুলিফ যিনি উৎপাদনের পৌনঃপুনিকতার নিয়ম আবিষ্কার করে বিজ্ঞানচিন্তার ক্ষেত্রে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুঃসাহসী কীতি অর্জন করেন তাকে আমার কাছে শুধু আণবিক ওজন নিয়ে ব্যস্ত একালমেড়ে মানুষ হিসাবে প্রতিপন্ন করা হয়েছিল। আমি দেখলাম সেগুলিফ ছিলেন বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের একজন জোরালো প্রবক্তা। আমাদের বলা হয়েছিল অক্সিজেন আবিষ্কর্তা, ইংরাজ রাসায়নিক প্রিস্টলি ছিলেন একজন “নন-কনফরমিস্ট" পাদ্রী। আসলে তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী ও তারেকজন বিপ্লবী বৈজ্ঞানিক বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের বন্ধু । ধীরে ধীরে আমার জাগৃতির ধারা বয়ে চলল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্যালিলিও থেকে ডারউইনের মধ্যে দিয়ে হলডেনা পর্যন্ত। আমাদের বিদ্যায়তনিক মহল যে সব রহস্যময়তা ও গোঁড়ামির দ্বারা আচ্ছন্ন তার জের কাটানো কঠিন ব্যাপার। কানাডার বৈজ্ঞানিকদের এক বিশিষ্ট লক্ষণ হচ্ছে যে তারা জনসাধারণের উপরের তলায়'- রাষ্ট্রনীতি থেকে দূরে থাকার ভান করেন এমন কি শিল্পকলার প্রতি খানিকটা বিরুদ্ধ মনােভাব নিয়ে। আমি যখন লেখা শুরু করলাম তখন আমায় উপেক্ষা ও ক্রমশ তীব্রতর সমালােচনার মুখোমুখি দাঁড়াতে হল। প্রথম কারণ জনসাধারণের বোধগম্য করে বিজ্ঞানের “পতন ঘটাচ্ছি বলে আর তারপর মুনাফার ধ্বংসােম্মুখ মন্দিরে বিজ্ঞানকে আটকে রাখার জন্য ধনতন্ত্রকে দায়ী করতে সাহস হওয়ার জন্ঠ । বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও প্রতিক্রিয়াশীল সরকারী বিভাগের জনকয়েক ১৬৭ বৈজ্ঞানিক মুখপাত্র জ্ঞানচর্চার জগতে ও বৃত্তিগতভাবে আমায় অপদস্থ করতে চেষ্টা করেন। কয়েকবার তাদের এ চেষ্টার ফল হয় উল্টো। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যেতে পারে সেবারকার কথা যখন তারা অপরিচিত এক ইংরাজ ডাক্তার ও তার ‘অসম্ভব' ওষুধ সম্পর্কে লেখা আমার ‘আজগুবী' রচনার বিরুদ্ধে সম্পাদকের কাছে প্রতিবাদ জানান। আলেকজাণ্ডার ফ্লেমিং ও পেনিসিলিন সম্পর্কে ঐটি হল প্রথম লেখা। আবার ১৯৪৩ সালে কয়েকজন এঞ্জিনীয়ার আমায় পাগল ঠাওরান এই জন্য যে আমি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম যে অভিনব গ্যাস টারবাইন একদিন এরােপ্লেনে ব্যবহৃত হবে। আজ ঐ টারবাইন আগেকার সমস্ত মােটরকে বাতিলের পর্যায়ে ঠেলে ফেলেছে আর হাজার হাজার প্লেনে যুগিয়েছে যান্ত্রিক শক্তি। উচ্চপদস্থ যন্ত্রবিদদের এই রকম প্রতিক্রিয়াশীল মনােভাবের আমি আরাে আধ ডজন দৃষ্টান্ত দেখাতে পারি। কিছুদিন আগে হার্ভার্ড মানমন্দিরের খ্যাতনামা পরিচালক ডাঃ হার্লে শ্যালি চমৎকারভাবে এর সার কথাটা বলেন যখন তিনি আমাদের অগ্রগণ্য বিজ্ঞানীদের “গোঁড়ামিকে প্রায় রােগের পর্যায়ভুক্ত” বলে অভিমত প্রকাশ করেন ও দেখান যে তারা জনসাধারণের কাছে সুজাসুজি কিছু বললে বৃত্তির মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে মনে করেন। কিন্তু শ্যালি দেখছেন না কেমন করে এ ব্যাপার হল। অভিজ্ঞতা থেকেই আমি জেনেছি এর কারণ। আজ চাষী, মজুর, মধ্যবিত্ত সবার কাছেই বিজ্ঞানের বিরাট কীতি স্বতঃসিদ্ধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যুদ্ধের জন্য বিজ্ঞানের অকৃপণ প্রয়ােগ ও প্রাত্যহিক জীবনে বিজ্ঞানের কণ্ঠবােধ এ দুই-এর বৈষম্য পীড়াদায়কভাবে প্রত্যক্ষ হয়ে উঠছে। বেশ কয়েক বছর ধরে আমি যন্ত্রবিদ্যার সম্ভাবনার কথা বলে আসছি। বারবার আমি কানাডায় আমাদের বর্তমান জীবনযাত্রা ১৬৮ ও বিজ্ঞান যা সম্ভব করতে পারত এই দুই-এর ব্যবধান দূর করবার চেষ্টা করে ব্যর্থতা বােধ করেছি। আমি যার কল্পনা করেছি কখনও কখনও তা পাগলামি বােধ হয়েছে অন্যের কাছে। কিন্তু উন্নততর জীবনযাত্রার এই আশ্চর্য সম্ভাবনা জেট প্লেন, রাডার বা নিল বস্ত্রের মতই বাস্তব সত্য। এর মধ্যে আজগুবী ব্যাপার হচ্ছে শুধু এই আশা করা যে মুম্ষু ধনতন্ত্র জনসাধারণের জন্য এ সবের ব্যবস্থা করবে। গবেষকরা পর্দার পিছনে একচেটিয়া ব্যবসার ধর্ত নির্মমতার মধ্যেই ধনতন্ত্রের অন্তদ্বন্দ্ব প্রত্যক্ষ করেন। আগেকার যুগে ধনিকেরা শ্রেষ্ঠ যন্ত্র-বিশেষজ্ঞদের ঘুষ নিয়ে ভদ্রলােক বানিয়ে তাদেরই মজুর কমরেডদের শত্রু করে তুলত। আজকাল সে কাজই চলে বিজ্ঞানী—এঞ্জিনীয়ার, যন্ত্রবিদ্যার অধ্যাপকদের নিয়ে। এদের কয়েকজন বিজ্ঞানের মহান ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার মূল্যে একচেটিয়া ব্যবসার কাছে আত্মবিক্রয় করেন ; অধিকাংশেই থাকেন হুশিয়ার ও চুপচাপ। এইভাবে বিজ্ঞান ও জনসাধারণের মধ্যেকার দূরত্ব বজায় রাখা হয়। বিজ্ঞানী ও শিল্পীদের ঐতিহ্যই হচ্ছে রাষ্ট্রনৈতিক সংগ্রাম থেকে দূরে থাকা—এই একান্ত ভূয়া কাহিনী অন্তঃসারশূন্য বুদ্ধিজীবীরাই চালু রাখতে পারে। কিন্তু যখনই কোনাে সামাজিক বা অর্থনৈতিক সমস্যার প্রতি বৈজ্ঞানিক যুক্তি প্রয়ােগ করা হয় তখনই সমস্ত যুক্তি- বিরােধিতা ছাপিয়ে বেরিয়ে আসে সেই আপােষহীন সংগ্রামের রূপ—কোটি কোটি মজুর ও জনসাধারণের সঙ্গে মুষ্টিমেয় পুঁজিদার, শােষক ও তাদের রাষ্ট্রের শ্রেণীসংগ্রাম। টিম, বড় হবার পর থেকেই তােমার সারা জীবন কাটছে শ্রেণীসংগ্রামের সামনের পংক্তিতে লড়াই করে। তুমি জাননা সােজাসুজি একজন খনি ;

বা মিল মজুর কম্যুনিস্ট নীতির যাথার্থ্যও ধরতে পারে। কিন্তু ভাবাে একবার আজকের দিনে বিজ্ঞানী বা এঞ্জিনীয়ারদের বিপত্তির কথা। তার মধ্যে যদি হৃদয়াবেগের কণাটুকু অবশিষ্ট থাকে বা এতটুকু মানুষ" প্রেমের স্বপ্ন তবে যতই তিনি দুনিয়াটাকে পরখ করেন ততই জীবন তার কাছে হয়ে পঁাড়ায় পীড়াদায়ক। প্রাণতত্ব, চিকিৎসা ও কৃষিবিজ্ঞান এবং ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কার শ্যাপল্লী কবিত্বময় ভাষায় আমাদের হাতে দিয়েছে “দেবদূতদেরও উপরে মানুষকে তুলবার ক্ষমতা।” এই শক্তির কণ্ঠরােধ করে সেই শ্রেণী যারা আমাদের সমাজ, ও বিজ্ঞানের মালিক—অর্থাৎ শিল্প ও টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রের একচেটিয়া মালিকেরা। ফ্যাসিজম হার মানার পর এদের কাছে ভবিষ্যত একটি মাত্র দুরূহ সমস্যা উপস্থিত করেছে—কেমন করে সমাজতন্ত্রের দিকে মানুষের অভিযান ঠেকানাের পন্থা খুঁজে পাওয়া যায় । এখন জনসাধারণের সব থেকে নির্বোধ শত্রুরা আণবিক বােমা নিয়ে খুব উল্লাস করছে কারণ তারা সােভিয়েট ইউনিয়ন ধ্বংস ধ্বংস করার জন্য এই ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়ােগ করার কথা ভাবছে। এই কাজে তারা দেখবে যে হিটলারের আর্যশ্রেষ্ঠদের মত ইউরেনিয়মও সমান নিস্ফল। আর আণবিক বিস্ফোরণের::তীব্র আলােয় ধনতন্ত্রের দেউলিয়া অবস্থা আরো কত ভীষণভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে দেখ । আমরা আজকাল যে শক্তি ব্যবহার করি তার চেয়ে কোটি গুণ প্রবলতর এই আণবিক শক্তি যে যুদ্ধের সময় ক্ষিপ্রগতিতে উৎপন্ন করা হল আর এখন শান্তিপূর্ণ কাজে তার প্রয়ােগে যে বাধা দেওয়া হচ্ছে আকস্মিক ঘটনা নয়। প্রয়ােগ’ শব্দটি অত্যন্ত করুণ। রাদারফোর্ড বলেছিলেন যে আণবিক শক্তি এ একটা ১৭০ মানুষের সত্যকার ইতিহাসের সূত্রপাত করবে। কিন্তু টিম, তিনি ভুল করে- ছিলেন কারণ আণবিক শক্তি “প্রয়ােগ” করতে পারে না মুমষু ধনতন্তু। আণবিক শক্তির মুক্তি ও অন্যান্য বিরাট আবিষ্কার সম্ভব শুধু সমাজতন্ত্রের আমলেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, সােভিয়েট শক্তিই হল মানুষের ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের ইঙ্গিত। শত শত বিজ্ঞানী ক্রমে ক্রমে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও যন্ত্রবিজ্ঞানের এই অপরিহার্য ঐক্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছেন। তবু শাসকশ্রেণীর উপর আর্থিক নির্ভরতার জন্য যন্ত্রবিদের চোখ পুরােপুরি ফোটেনি। এর ফলে ভয় ও তার উপরে যে সব সাংস্কৃতিক চাপ দেওয়া হয় তার উন্নাসিকতা একত্র হয়ে তার সামাজিক অনুদৃষ্টি পর্ব করে এবং তাঁকে মজুরদের থেকে দূরে রাখে। এই মজুরেরাই শুধু পারে তার সব্যাপী দাসত্ব ঘােচাতে। সৌভাগ্যক্রমে আমি এই মানসিক ও নৈতিক দুর্গতি থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলাম। তুমি জানো মাঝে মাঝে কতকগুলি “পারিপার্শ্বিকের খোচা” আমায় বাধ্য করে চূড়ান্তভাবে চিন্তা করতে। সংশয়াপন্নদের জন্য আমার প্রিয় দাওয়াই হচ্ছে—“সক্রিয়তা”। ভয় পান বা যারা যুক্তিজাল বিস্তার করে দ্বন্দ্বের ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন তাদের সব থেকে ভালাে উত্তর হল রাষ্ট্রনৈতিক কার্যকলাপ। হলডেন, জোলিও-কুরী, লাজ, ব্লক, আরাগ, পিকাসো বড় বড় বিজ্ঞানী ও শিল্পীরা পর্যন্ত স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে এই পথেই সােজাসুজি এগিয়ে এসেছেন কম্যুনিস্ট পার্টির সভ্য হওয়ার দিকে। সংস্কৃতি সম্পর্কে একটা কথা বলব। শুধু সােভিয়েটেই “সংস্কৃতি জনসাধারণ ও বুদ্ধিজীবী সকলেরই সম্পূর্ণ বােধগম্য ব্যাপার। কারণ সংস্কৃতি অর্থাৎ শিল্প ও বিজ্ঞানগুলির সমন্বয় সেখানে সমগ্র জাতির ১৭১ সম্পত্তি। মুনাফা-লিগার দ্বারা সে সংস্কৃতি কলুষিত নয় আর সংস্কৃতি সম্পর্কে সত্যকার ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক ধারণা দ্বারা তা পুষ্ট । টিম, আমি এখানে বলতে চাই যে বামপন্থী সংস্কৃতি অনুরাগীর দলের ‘উদারপন্থী’ সাহিত্যিক ধারা সম্পর্কে বেশ খানিকটা রঙিন স্বপ্ন দেখার ঝোক আছে। গল্প লেখক হিসাবে আমি খানিকটা সফলতা অর্জন করেছিলাম—একবার হলিউডে বেশ আরামের একটি চাকরী ও আর একবার রেডিও নাটক লেখার সুযােগ পেয়েছিলাম। এই সব লােভ আমার পক্ষে কিছুটা মজার ব্যাপার হলেও আমার চেয়েও অনেক বেশী প্রতিভাবান বহু তরুণ কানাডিয়ানের পক্ষেই সর্বনাশের কারণ হয়েছে। এমন কি গল্প উপন্যাস ছাড়া অন্য রচনা প্রকাশের বেলায়ও জনসাধারণের কাছে পৌছবার জন্য আমায় সুপ্রতিষ্ঠিত প্রকাশকদের ছেড়ে একেবারে ভিন্ন ধরনের নূতন ব্যবস্থা দেখতে হয়েছিল। আমাদের রঙিন স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। বিজ্ঞানের মত কানাডায় সাহিত্যও ধনতন্ত্রের কদর্য কবলে পড়ে অস্থির হয়ে উঠেছে। শিল্পীর ব্যক্তিত্ব, মর্যাদা, তার বাঁচবার প্রাথমিক অধিকার—এই সবই ধনবাদী সমাজের শয়তানীতে গুড়িয়ে যায়। এটি আরো পরিতাপের বিষয় এই জন্য নে আমাদের প্রতিভাবান তরুণদের মন অত্যন্ত সুকুমার আর মজুরদের কাছেও তারা সাদর আহ্বান বা আশ্রয় পায়নি। আমি চাই এ অবস্থার পরিবর্তন। কানাডার কম্যুনিস্টরা অন্য দেশের মতই সমগ্র মানবতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পতাকাবাহী এ কথা স্বীকার করলেই যথেষ্ট হল না। সে দৃপ্ত পতাকা আমাদের তুলে ধরতে হবে যাতে আমাদের সংস্কৃতি-স্রষ্টারা পান সাহস ও দৃঢ়তা। তুমি ও অন্য নেতৃস্থানীয় কমুনিস্টরা আমায় দিয়েছ অমূল্য অনুপ্রেরণা কিন্তু বাঁধনি কোনাে রাষ্ট্রনৈতিক দায়িত্ববন্ধনে। পাটির ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা १२ পাণ্ডুলিপি দেখা বা গ্রন্থ প্রকাশ ব্যবস্থার কাজে আমার সঙ্গে বহুক্ষণ কঠিন পরিশ্রম করেন। কিন্তু মজুর ও চাষী যে বিপুল জনসংঘের সামনে আমি বক্তৃতা দেই বা অনেকে যারা আমায় চিঠি লেখে--সব চেয়ে বেশী এই কানাডাবাসীরাই পারে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কর্মীদের প্রচণ্ড উৎসাহ যােগাতে। যতই আমি জনসাধারণের ঘনিষ্ঠ হতে লাগলাম ততই প্রকাশ্য ভাবে কেউ কেউ যে আমায় ছদ্মবেশী কম্যুনিস্ট বলে অভিযােগ করতে লাগল এ অবশ্য খুবই স্বাভাবিক। তুমি জানো আমার অভিযােক্তারাও জানত যে আমার কখনাে কোনো রাষ্ট্রনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। ধনতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা চেষ্টা করে যাতে জনসাধারণ না জানতে পারে বিজ্ঞান সমাজতন্ত্রের আমলে আমাদের কি দিতে পারে। আমি যখন প্রচণ্ডভাবে আসল কথা খুলে বলতে লাগলাম এই শ্রেণীশত্রুরা তখন আবার পুরােনাে কমুনিস্ট-লাঞ্ছনার পথ ধরল। এই অভিজ্ঞতা আমার রাষ্ট্রনৈতিক চেতনা আরাে তীব্র করে তুলল ও আমায় আবােরা পার্টির কাছে টানল। যাই হােক আমার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক চিন্তা, বৈজ্ঞানিক পাঠাভ্যাস ও যুক্তিতর্ক আমায় L. P. P র সদস্য পদের দিকে এগিয়ে দিতে মস্ত প্রভাব বিস্তার করেছিল। আজ আমি পার্টিতে যােগ দিচ্ছি, কারণ অবশেষে আমি বুঝতে পারছি যে রাষ্ট্রনীতি হচ্ছে একটা বিজ্ঞান। মার্কস্ ও এঙ্গেলসের সৃষ্টি এবং লেনিন কর্তৃক সােভিয়েট শক্তি আবিষ্কার ও স্টালিনের অতুলনীয় ঐতিহাসিক কীর্তি দ্বারা সমৃদ্ধ এই বিজ্ঞান এখন L p pর মধ্যে বিকাশ লাভ করছে। বিজ্ঞানের একটা চূড়ান্ত কষ্টিপাথর আছে—তার ভবিষ্যদ্বাণী কি খাটে? মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন ও স্টালিনের বই আজ পড়লে বােধ হয় যেন দুনিয়ার গবেষণাগারে এক বিরাট ভবিষ্যদ্বাণীর পরীক্ষা দেখছি। কানাডার ১৭৩ কম্যুনিস্টদের সিদ্ধান্ত, কর্মতালিকা ও কনস্ত্র সম্পর্কেও ঐ এক কথাই বলা চলে। আমাদের দেশে যারা কমুনিস্ট নেতৃত্বের নিন্দা করে তার কি অসম্ভব অন্ধ ! আমাদের সময়কার মূল প্রশ্ন সম্পর্কে তুমি ও তােমার কমরেডরা আশ্চর্য অন্ত ষ্টি দেখিয়েছিলে যেমন মুসসালিনী, হিটলার, জাপানী সাম্রাজ্যবাদ, ত্রিশ দশকের সংকট, স্পেন, এবিসিনিয়া, মিউনিকে বৃটিশের কলঙ্ক, ফ্রান্সের ভাগ্য এবং কানাডার রাজনীতির একটার পর একটা সংকটের ব্যাপারে। আমি জন্মেছি দেশপ্রেমিক বৃটিশ পরিবারে। কানাডার প্রতি আমার ভালােবাসা, আমার দেশপ্রেম, বৃটিশ জন্মভূমির জনগণের প্রতি প্রবল নিষ্ঠা এ সবও আমায় কমুনিস্ট করে তুলেছে ! এই যুদ্ধই চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করেছে যে কমুনিস্টরাই সব দেশে বিশ্বস্ত দেশপ্রেমিক। বৃটেনের প্রতি কার নিষ্ঠা বেশী ---১৯৩৫ সালে সােভিয়েটের সঙ্গে মৈত্রীর কথা তুলেছিল যারা সেই কম্যুনিস্টদের,না ১৯৪১ সালে বাধ্য হয়ে সে পথে বাড়ালাে যে টোরীরা তাদের ? কে বড় ফরাসী—বাের্টের ডাকাত ও পেঠার ধ্বজাধারী চেলাচামুণ্ডার। না F FI-এর কমুনিস্টরা। আর এখানে কানাডায় কারা জাতির স্বার্থরক্ষা করেছে—চেম্বারলেনের লােক-দেখানাে যুদ্ধের বিরােধিতা করার জন্য কারারুদ্ধ হল যে কম্যুনিস্টরা তারা, না ১৯৩৯ ও ১৯৪০ সালে যে সব প্রতিক্রিয়াপন্থী একমাত্র ষে সােভিয়েটের শক্তি সমস্ত সভ্যজগতকে সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করল তার বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে উন্মুখ হয়েছিল, তারা ? মিথ্যার বেসাতি করে মােটা মুনাফা যারা লােটে তাদের প্রচারে বিভ্রান্ত মানুষ ছাড়া আর সবারই কাছে এ সবের উত্তর অনাবশ্যক। তােমায় এত লম্বা চিঠি লিখছি বলে মাফ করাে। আরে, অনেক কথা ছিল বলবার। বলবার। হয়ত সব থেকে দরকারী কথা হল এই যে বছর কয়েক ১৭৪ - আগে সমাজতান্ত্রিক কানাডার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমার শক্তি ও সামর্থ নিয়ােগ করার সিদ্ধান্ত নেবার পর জীবন আমায় শেখালো যে IP Pর মার্কসীয় কর্মপন্থা অনুসরণ ছাড়া সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আর কোনাে সম্ভব পথ নাই—এই কারণেই আমি পার্টিতে যােগ দিয়েছি। আমার হাজার হাজার C C F বন্ধুদের কাছে আমি বােঝার চেষ্টা করব কানাডার পক্ষে সত্যকার সমাজতন্ত্র বলতে কি বােঝায় আর কি করে আমাদের ডােমিনিয়ান সােশ্যাল ডেমোেক্রসির রাষ্ট্রনৈতিক বিপদ এড়াতে পারে যার ফলে শুধু সাধারণের শত্রুরাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মার্কসবাদকে আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বলে উল্লেখ করেছি। অন্য সমস্ত প্রভাব ছাপিয়ে I P P র জীবন্ত রাষ্ট্রনৈতিক কার্যক্রমই আমায় পাটির মধ্যে টেনেছে। এইখানে আমি দেখতে পাই সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম বৈজ্ঞানিক পথে ও অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়েছে কানাডার আশু ও তীব্র সমস্যাগুলির সঙ্গে - কাজ, বাড়ী, সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তির লড়াই, অভাবের সর্বনাশী অর্থনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, পারিশ্রমিকের বিরুদ্ধে জঘন্য বৈষম্য নীতি দূরীকরণ, ইউনিয়নগতভাবে নিরাপত্তা, বাসস্থানে ও বৃদ্ধদের আশ্রয়, চাষীদের জন্য ফসলের বাধা দর প্রভৃতি অর্জন। এইই হল একমাত্র বৈজ্ঞানিক রাষ্ট্রনৈতিক কাজ যা সমাজতন্ত্রে পৌছে দেয়। সামাজিক উন্নতিলাভের এই হল লড়াই। ধনতন্ত্রের আমলেও এ উন্নতি অর্জিত হয়েছে ও হতে পারে। এই সংগঠিত লড়াই এর প্রতিটি বিষয়ের মধ্যে মানুষ এগােবে সমাজতন্ত্রের পথে। পিছনের দশ বছরের দিকে ফিরে আমার মনে হয় যে ঐ পথে ইতিমধ্যে আমরা বেশ খানিকটা এগিয়েছি। প্রতিক্রিয়াপন্থীদের যুদ্ধ ভুলে যাবার আকস্মিক ইচ্ছার পিছনে কি আছে ? যেন আমরা সেই চূড়ান্ত দুনিয়া- জোড়া বিজয়, একচেটিয়া ধনবাদীদের সর্বনাশা ফ্যাসিজমের নৃশংস ১৭৫ সামরিক শক্তির সম্পূর্ণ বিনষ্টি কখনও ভুলতে পারি! এই বিজয়লাভে সারা দুনিয়ার মানুস মেহনত ও লড়াই-এর ক্ষেত্রে এমনভাবে এসে মিলেছিল ইতিহাসে সর জুড়ি মেলে না। শান্তি আসার সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র মহাদেশগুলিতে জনসাধারণ শুরু করেছে সমাজতন্ত্রে পৌছবার জয়যাত্র। একথ; অস্বীকার করতে পারে কে ? দ্বিধাগ্রস্তরাই শুধু প্রতিক্রিয়াশীলতার সমৱােত্তর কুটি দেখে ভয় পায়। আমরা আজ চোখ মেলে দেখতে পাচ্ছি এমন দৃশ্য ধনতান্ত্রিক যুগের উন্মেষের পরে যা কখনও দেখা যায় নি : সারা দুনিয়া জুড়ে আজ প্রতিক্রিয়ার শক্তি নয়—অগ্রগতির শক্তি এগিয়ে চলেছে। এবার টিম IPর সভ্য হওয়া সম্পর্কে একটা কথা বলি। পাটি ক্রমেই বেড়ে উঠছে। কিন্তু কোনাে কোনাে ােেক যে এতে যােগ দেয়নি তার কিছু কারণ আছে। শুধু মজুর নয় বৃত্তিজীবীদের সময় একটা খােলাখুলি কারণ থাকে। তারা ভাবে পার্টির সভ্য হলে নিরাপত্তা ক্ষুন্ন হবে। আমাদের উচিত তাদের এই কথা চিন্তা করতে বলা...ধনতন্ত্রে। কি সত্যকার নিরাপত্তা আশা করা যেতে পারে ? এর বাইরেও তাদের চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বহু য়ুরােপীয় দেশ সমাজতন্ত্রের পথে এগােচ্ছে, ঔপনিবেশিক জনগণের অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে, ভয়ে কাপছে সাম্রাজ্যবাদ, সােভিয়েট ইউনিয়নের শান্তিপূর্ণ আশ্চর্য সংস্কার পরিকল্পনা সব দেশের মানুষের কল্পনাকেই স্পর্শ করেছে। এ সবই ক্ষুন্ন করছে ধনতান্ত্রিক নিরাপত্তা। তােমার আমার মাইনের প্রশ্ন নয়। সংশয়াক্লিষ্ট সমাজতান্ত্রিকের সামনে প্রশ্ন হল—কানাডায় বিপুল প্রগতিপন্থী শক্তির জোর বাড়াবাে, না বসে থাকব ক্রমবর্ধমান দুর্গতি সহ্য করে। এ শুধু, ১৭৬

তকতাসম্পন্ন
শেষ কথা
বলি।
এ বিষয়ে সন্দেহ নেই হু হন্তরিকতাসম্পন্ন
লােক মার্কসবাদী পাটির সভ্য হওয়া সম্পর্কে সংশয়ান হয়—তার
মধ্যে আত্মত্যাগের বিষন্ন ছায়ার আশঙ্কা করে।
আমরা। এই সব
বন্ধুদের প্রশ্ন করতে পরিত্যাগের কথা বলছ ?
আজ আমাদের সমগ্র জাতিই হচ্ছে ধনতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়ার পকাষ্ঠের
বলি। আমাদের শহরের বস্তি, আমাদের চাষীদের জঘন্য দৈন্য,
চিকিংসা ও অন্যান্য বিজ্ঞানের ব্যর্থতা, জীবন ধারণের উপযােগী
বেতনের জন্য মনের সুদৃঢ় সংগ্রাম এ সর্বের কথা ভাবে।
আরো এরি শেভবে দেখ বিত্তশালীর অশ্লীল ভােগৈশ্বর্য ।
মুষ্টিমেয় ধনী শশাসক ছাড়া প্রত্যেক নরনারী ও শিশু—আমরা সবাই
বুদ্ধিহীন ও নুব্ধ প্রতিক্রিয়ার কবলে কোনোক্রমে টিকে থাকার জন্য
আমাদের অন্য জনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মাস
করছি।
ইতিমধ্যে সীমাহীন স্বাস্থ্য, সুখ, স্বাধীনতা, সানল উচ্চাকাঙ্ক্ষা
কিছু সমাজতন্ত্র পাওয়া সম্ভব ও আমরা পাবই—স। কিছু মানুষকে
ডাকছে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে—সবই ধনতন্ত্রের কাছে বলি দেওয়া
তাহলে জনগণের মাৰ্কবাদী অগ্রণীদের সঙ্গে যােগ দিতে
হলে ত্যাগের কথা কে তুলতে পারে ?
টিম, আমার পক্ষে পাটির সভ্যপদ পাওয়া হল সব থেকে বড় সম্মান।
‘আত্মত্যাগের কথা কেন ওঠে আমি বুঝি না। যারা নিজেদের ও
আপন দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেয় তাদের প্রতি বিতৃষ্ণা নিয়েই আমি
বড় হয়ে উঠছি। আমাদের সমস্ত হৃদয়াবেগ দিয়ে শিখতে হবে
আমাদের কে একদিকেই প্রয়ােগ করতে, জীবনের সমাপ্ত যন্ত্রণা
ও বছর নষ্ট
১৭৭
১২-১৪)

ত
ও গ্লানিকে ঘৃণা করতে। তাহলেই আমরা মানুষের শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য
আমাদের মনব প্রেমের সত্যকার মর্যাদা দিতে পারব।
তােমার আন্তরিক কমরেড,
ডাইসন কার্টার

নবজাগ্রত নীসমাজের অত্যাশ্চর্যকাহিনা সোভিয়েটার ব কল্যাণী রায়ের এ = = সােডিয়েটের মেয়রী দেশী ত্রিশ বছর আগেকার মজুর-চাষীর বিপ্লব শুধু যে সােভিয়েট দেশের পুরুষদের জীবনেই একটা অচিন্ত্যনীয় পরিবর্তন এনেছে তাই নয়, সেখানকার পশ্চাৎপদ, অশিক্ষিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন নারীসমাজের মধ্যেও এক অত্যাশ্চর্য বিপ্লব ঘটিয়েছে। সমাজের শত পাকে বন্দী মেয়েরা পেয়েছে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সর্বপ্রকারের স্বাধীনতা তাদের জীবনে বিকাশলাভ করেছে এক নতুন সত্য যে তারা পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে ছােট নর...নতুন পৃথিবীতে তারা সমান অংশীদার। সসাভিয়েট মেয়েদের অগ্রগতির গল্প তাই এ দেশের মেয়েদের কাছে এক নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। সে দেশের মেয়েদের যান্ত্রিক অনুকরণ নয় বরং তারা যে আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নবজীবনের পথে পা বাড়িয়েছে সে আদর্শের মর্ম বোঝাই আমাদের বড় সম্পদ। সে দিক দিয়ে কল্যাণী রায়ের ‘সভিয়েটের মেয়ের বইখানি অমূল্য ঐশ্বর্যের সন্ধান দেবে। এমনি বিস্তারিত ও তথ্যপূর্ণ বই বাংলা সাহিত্যে এই সর্বপ্রথম প্রকাশিত হল। দাম দেড় টাকা। যে কোনাে ভালো দোকানে পাওয়া যায় মােভিয়েট দেশ সম্বন্ধে নতুন ও খাঁটি খবর প্যাট স্নোন-এর সবােত্তর রাশিয়া ১৯১৭ সালের ঐতিহাসিক বিপ্লবের পর জার-শাসিত রাশিয়া ও তার অন্তভুক্ত দেশগুলি কি ভাবে নতুন রূপ পেল...কত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে সেখানে গড়ে তুলল কৃষি ও শিল্প, সে খবর আমাদের দেশে অত্যন্ত অল্পই এসেছে। যে অকৃতকার্যতার অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের প্রেরণা নিয়ে ত্রিশ বছর ধরে এক ষষ্ঠমাংশ দেশের মানুষেরা দূর্বার গতিতে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে—সে খবর স্বভাবতই ভারতীয়দের মত ঔপনিবেশিক শশাষণে জর্জরিত মানুষদের মনে নতুন উৎসাহ ও উদ্দীপনা জোগায়। প্যাট স্নোনের নিরপেক্ষ দৃষ্টি ও সাংবাদিক মন দিয়ে দেখা সােভিয়েট দেশের এই চমৎকার ভ্রমণকাহিনী তাই পাঠকদের মনে এক অত্যাশ্চর্য কৌতুহল সৃষ্টি করে। সােভিয়েট দেশের দৈনন্দিন জীবন, পারিবারিক জীবনযাত্রা, শিক্ষাব্যবস্থা, যৌথ খামার, শ্রমশিল্প, বিশ্রামাবাস ও ট্রেড ইউনিয়ন প্যাট শ্লোনের কলমে জীবন্ত রূপ পেয়েছে। সােভিয়েটের রাজনীতি, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ট্রটস্কিপন্থীদের মতবাদ ইত্যাদির ওপর নতুন আলােকপাত করেছেন সাংবাদিক স্লোন। সুধাংশু সরকারের অনুবাদ। পরিচ্ছন্ন ছাপা, বাঁধাই, নিখুঁত গঠনপারিপাট্য ও সােভিয়েট দেশের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বাবােখানা ঝকঝকে ছবি। দাম চার টাকা। যে কোনাে ভালাে দোকানে পাওয়া যায়

No text on this page.

No text on this page.

Soviet Bigyan Ed. 1st

Author
Sehanabish, Chinmohan Ed.
Title
Soviet Bigyan Ed. 1st
File name
Soviet Bigyan Ed. 1st
Text
OCR done
Citation
1946
Published
2009/08/20
Publisher
International Publishing House, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
189
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Other Genres.
Keywords
Science of Soviet
DLI number
513315
Barcode
4990010020304.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
SBj621PZlqh
Download PDF

Soviet Bigyan Ed. 1st