Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Shri Shri Geetgobinda
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ
(বঙ্গানুবাদ)
শ্ৰীগিরিধর) দাস প্রণীত
শ্রীনিত্যানন রাম দ্বারা
সম্পাদিত
৩৮১ শ্রীগােপাল মল্লিক লেন
শ্রীবিশ্বনাথধাম হইতে নিত্যানন্দ রাম ধারা
প্রকাশিত
১৩৩৯ সাল—শ্রীশ্রীরাসপূর্ণিমা
মূল্য আনা মাত্র।
প্রিন্টার—পূর্ণচন্দ্র
নলিনী প্রেস
২৫নং বাগবাজার স্ট্রীট, কলিকাতা।
• ; ! :: : ০
ofiliiiiiiiittfilitariffit.
(e) ০০ ০০।
•
007200000000raga 2000 8000000000000
৪৩e৪০০০ রেঞ্জe৫০@@@gne৫
“কস্মণ্যেবাধিকারস্ত মা ফলেষু কদাচন।
মা কৰ্ম্মফলহেতু মা তে সম্বোইকৰ্ম্মণি”।
• A+।
!
মহাত্মা শ্রীমৎ বিহারীলাল রাম।
@@@@@@@@@@@
জন্ম-১৭ই চৈ, ১২৫৭ সাল।
মৃত্যু-৬ই অগ্রহায়ণ, ১৩৩৮ সাল।
শুe
No text on this page.
ভূমিকা আমার পরমারাধ্যতম খুল্লতাত ভক্তপ্রবর বিহারী লাল রায় মহােদয়ের বৈষ্ণব-সাহিত্যানুরাগের বিষয় সর্বত্রই সুবিদিত। বৈষ্ণবাচাৰ্য্য শ্রীমৎ রসিকমোহ বিদ্যাভূষণ মহাশয় এবং অন্যান্য বৈষ্ণব পণ্ডিতগণ দ্বারা তিনি যে সকল গ্রন্থ প্রণীত করিয়া প্রকাশিত করিয়াছেন, সেই সকল গ্রন্থ বৈষ্ণব-সাহিত্যে সমাদৃত ও সুপ্রচায়িত হইয়াছে। তজ্জন্ত তিনি বৈষ্ণব সমাজের পরম আশীর্বাদ-ভাজন হইয়াছেন। আমাদের পরম দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে ভক্তপ্রবর রামমহােদয় গত বৎসরে আশা- দিগকে শােক সাগরে ভাসাইয়া ধামে গমন করিয়াছেন। বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রচারকল্পে তাহার অতীব বলবতী তৃষ্ণা ছিল। তিনি জীবিত থাকিলে এই সময়ের মধ্যে আরও দুই একখানি সদগ্রন্থ প্রকাশিত ও মুদ্রিত হইত। চণ্ডীদাস বিদ্যাপতির দ্বিতীয় খণ্ড তাহার জীবদ্দশায় মুদ্রিত হইতেছিল কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে তিনি উহার পরিসমাপ্তি দেখিয়া যাইতে পারেন নাই। উহার কিছুদিন পূর্বে শ্ৰগীতগােবিন্দ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সেই গ্রন্থে রসময়দাসকৃত পন্থানুবাদ মুদ্রিত হইয়াছে; কিন্তু ইহার অনেক পূর্বে বসুমতী যন্ত্ৰালয় হইতে প্রকাশিত গীতগোবিন্দ গ্রন্থের একখানি সংস্করণে উহা প্রকাশিত হয়। যখন চণ্ডীদাস বিদ্যাপতির ২য় খণ্ড যন্ত্রস্থ ছিল, সেই সময়ে গীতগোবিন্দের অন্য একখানি পদ্যানুবাদ শ্ৰীযুক্ত তুলসীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় এই পুথি তাঁহার হস্তাপ করেন। এই পুথিখানি পাইয়া তাঁহাের মনে এই দুঃখ হয় যে যদি তাঁহার গীতগােবিন্দ মুদ্রণের সময় এই পুথিখানি তিনি প্রাপ্ত হইতেন তবে এই পদ্যানুবাদও সেই গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট করিয়া দিতেন। ফলতঃ এই ;
[ y• ] গ্রন্থখানি মুদ্রণের ইচ্ছা তাহার মনে বলবতী ছিল। কিন্তু বিধাতার বিধানে তাঁহাকে এইরূপ বহু আশা ফলবতী হওয়ার পূর্বেই তাহাকে শ্ৰীধামে প্ৰস্থিত হইতে হইল। আমার ন্যায় নিঃস্ব ও অযােগ্য ব্যক্তির দ্বারা তাহার মনােগত বাসনাগুলি পূরণ হইবার কোন সম্ভাবনা নাই ; তথাপি এই গ্রন্থখানি মুদ্রণে তাঁহার যে অভিলাষ ছিল তাহা পূর্ণ না করিয়া স্থির থাকিতে পাবিলাম না। যে পাণ্ডুলিপি খানি আমাদের হস্তগত হইয়া- ছিল তাহা ভ্ৰম প্ৰমাদে পরিপূর্ণ,—উহা কোন অজ্ঞ লােকের লিখিত। এই নকলকারী ব্যক্তির অনবধানতা ও ভাষাজ্ঞানের অভাবে উহা মুদ্রিত করা প্রথমতঃ অসঙ্গত বলিয়াই বিবেচিত হয়, কিন্তু পরে ভাবিয়া দেখিলাম উহা যেমনই হউক আমাকে তাহার বাসনা পূর্ণ করিতেই হইবে। বৈষ্ণব পাঠকগণ অবশ্যই কোন না কোন প্রকারে উহার অর্থ গ্রহণ করিতে পারিবেন। বিশেষতঃ একখানি বিলুপ্ত প্রায় গ্রন্থ এতদ্বারা সংরক্ষিত হইবে। অতঃপর ভাল পাণ্ডুলিপি কাহারও হস্তগত হইলে এবং কোন সদাশয় ব্যক্তির ইচ্ছা হইলে তিনি উহার উত্তম সংস্করণ প্রকাশ করিতে পারিবেন। সম্প্রতি আমি আমার পূজ্যপাদ খুল্লতাত বিহারীলাল রায় মহােদয়ের শেষ-বাসনাগুলির মধ্যে এই গ্রন্থখানি প্রকাশের বাসনাটি পূর্ণ করিবার প্রয়াস পাইয়াছি। দয়াময় শ্রীভগবানের কৃপা হইলে এতাদৃশ অপরাপর বাসন-সম্পূরণেরও প্রচেষ্টা করা যাইবে। গীতগােবিন্দের মূল গ্রন্থ বহুবার বহুজন দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছেন। কোথাও তাহার অভাব নাই, সুতরাং ইহার সঙ্গে মূল এগতগগাবিন্দ সন্নিবেশিত করাির প্রযােজনীয়তা নাই। বিশেষত আমার পুজ্যপাদ খুল্লতাত মহাশয়ের অর্থানুকূল্যে নবপ্রকাশিত অতি প্রাচীন সর্বাঙ্গসুন্দরী টীকা, রসময় দাস কৃত পদ্যানুবাদ ও বিস্তৃত • ] ভূমিকাসহ বৈষ্ণবাচাৰ্য্য শ্রীমৎ রসিক মােহন বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের সম্পাদনায় যে সানুবাদ শ্রীগীতগােবিন্দ গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছেন ইহা তাহারই পরিশিষ্টস্বরূপ। শ্রীপাদ বিদ্যাভূষণ মহাশয়েব সম্পাদনায় এই ক্ষুদ্রকলেবর বিশিষ্ট গ্রন্থখানিও প্রকাশিত হউক ইহাই আমাদের ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নানাকারণে তিনি এই ভার গ্রহণ না করায় আমাদ্বারাই ইহার সম্পাদন কার্য সম্পন্ন হইল। কিন্তু মনে এই আক্ষেপ রহিয়াছেন যে, অপর কোন বিশুদ্ধ পাও- লিপির সহিত মিলাইয়া এই গ্রন্থসম্পাদন করা হইল না। এই গ্রন্থের বহু অংশ মুদ্রণের পরে জানা গেল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের গ্রন্থভাণ্ডারেও ইহার পাণ্ডুলিপি আছে। কিন্তু প্রেসে ইহার মুদ্রণ কাৰ্য্য প্রায় পরি- সমাপ্ত হইয়াছিল। বিশেষতঃ উহার প্রাপণও অল্পসমায়াপেক্ষ নহে। পরিষদের নিয়মানুসারে সদস্য কমিটির সম্মতিভিন্ন উহা প্রাপণের উপায় নাই। মুদ্রণকাৰ্য্যে অধিক দুর অগ্রসর না হইলে সে বিলম্বও করা যাইত। যাহা হইবার, তাহা হইল। শ্রীভগবানের কৃপায় আবার ইহার দ্বিতীয় সংস্করণ করার যদি প্রয়ােজন হয়, তখন সে বিষয়ে কোনও ক্রটি হইবে না। গিরিধর দাস এই পদ্যানুবাদকর্তা। গ্রন্থের শেষে ইনি নিজের পরিচয় প্রদান করেন নাই। কিন্তু কোন্ শকে কোন্ মাসে কোন্ পক্ষে কোন তারিখে কোথায় বসিয়া এই গ্রন্থ লিপিবদ্ধ করা হইয়াছে, তিনি তাহার কিঞ্চিৎ পরিচয় দান করিয়াছেন। উহা এই রূপ- সমাপ্ত করিল গজ-ই-রস-সােমে। কৃষ্ণপক্ষে আষাঢ়ের দিবস পঞ্চমে। পটের তৃতীয়ে কর মধ্যেতে আকার। সেই নদীর নিকটে কেবল পূর্বধার।
[ • ] ইক্রের বাহন পরে দময়ন্তী পতি। বিরচিল সেই গ্রামে করিয়া বসতি। গজ—৮, ই-৫, রস-৬, সােম—১, “অঙ্ক বামা গতিঃ* এই রীতি অনুসারে ১৬৫৮ অর্থাৎ ১৬৫৮ সােলশত আটান্ন শকাব্দে কৃষ্ণ পক্ষে আষাঢ়ের পঞ্চম দিবসে এই গ্রন্থ বিরচিত হয়। কিন্তু হিয়ালী ভাষায় রচিত নদীর নাম আমরা বুঝিতে পারিলাম না। যে পাণ্ডুলিপি দেখিয়া এই গ্রন্থ মুদ্রিত হইল, সেই পাণ্ডুলিপির পাদ- টপ্পনীতে গ্রামের পরিচয় দেওয়ার জন্য লিখিত আছে—নৈসদ নগর”। এই পাণ্ডুলিপি কারের ভাষাজ্ঞান যে অতি অল্প ছিল, তাহা এই পাণ্ডুলিপি পাঠে স্পষ্টতঃ বুঝা যায়। ইনি “নৈষধ” স্থলে “নৈসদ লিখিয়াছেন। ইহা কি পাণ্ডুলিপিকারের স্বকীয় ব্যাখ্যা অথবা তিনি পূর্ব পাণ্ডুলিপি হইতে ইহা নকল করিয়াছেন, তাহা বলা যায় না। নৈষধ নগর নামে কোন গ্রাম আছে কিনা তাহাও জানিতে পারি নাই ইন্দ্রের বাহন পরে দময়ন্তী পতি। বিরচিলা সেইগ্রামে করিয়া বসতি। ইন্দ্রের বাহন—হাতী, দময়ন্তী পতী—নল। ইহাতে হাতীনল নামটী পাওয়া গেল। কিন্তু এই নামে কোন গ্রাম আছে বলিয়া জানা যায় না। কিন্তু ইহাতেই যে পৰ্যাপ্ত হইল তাহা নহে। হস্তী শব্দের বহু পৰ্য্যায় আছে, এবং নল রাজার নামটীরও আরও পৰ্য্যায় আছে। ভালোচনায় যদি প্রকৃত পক্ষে কোন গ্রামের নাম ঘটে তাহাও অনু- সন্ধেয়। দুইশত বর্ষ পূর্বে যে গ্রাম বর্তমান ছিল সে গ্রাম এখন আছে কি না, থাকিলেও উহা সেই নামে এখনও অভিহিত হইতেছে কি না ইহাও বিচাৰ্য। খুব সম্ভব বাঁকুড়া বীরভূম বা বর্ধমানের কোন গ্রামে এই গ্রন্থকারের বাড়ী ছিল। গ্রন্থকারের গ্রামের নাম সম্বন্ধে সবিশেষ [ • ] আলােচনায় হয় তাে কেহ কোন সময়ে যথার্থ তথ্যে উপনীত হইতে পারিবেন। আমরা এস্থলে আন্দাজে কিছুই বলা ভাল মনে করি না। নকলকারীর অনবধানতায় ও অনভিজ্ঞতায় এই গ্রন্থের কোন কোন পক্তির অর্থ-পরিগ্রহ দুর্ঘট হইবে। কিন্তু মােটামুটি ইহার ভাষা অতি প্রাঞ্জল। সংস্কৃত ভাষায় অনভিজ্ঞ পাঠকগণ এই গ্রন্থ পাঠে শ্রীগীতগােবিন্দের আস্বাদ কিয়ৎ পরিমাণে পাইতে পারিবেন। আমাদের এই উদ্যমে বাঙ্গলা ভাষার একখানি প্রাচীন গ্রন্থ অবলুপ্তি হইতে রক্ষা পাইবে, বিশেষতঃ আমার পূজ্যপাদ খুল্লতাত মহাশয়ের একটি আদেশ এই কাৰ্যে প্রতিপালিত হইবে এই সকল মনে করি আমি স্বকীয় ক্ষু শক্তিতে নির্ভর করিয়া ইহা মুদ্রিত করিলাম। ইহাতে কোন শ্রেণীর পাঠকগণের কিঞ্চিত্র উপকার হইলেও এই অর্থ ব্যয় সার্থক হইবে। পরিশেষে সবিশেষ বক্তব্য এই যে এই গ্রন্থের বিক্রয়লব্ধ অর্থ পূজ্যপাদ খুল্লতাত মহাশয়ের স্মৃতি সংরক্ষণকল্পে কোন স্থায়ী সদনুষ্ঠান সম্পাদনের সাহায্য ভিন্ন অন্য কোন কাৰ্য ব্যয়িত হইবে না। নিবেদন নিত্যানন্দ রাম। বিশ্বনাথ-ধাম ৬৮১ শ্ৰীগােপাল মল্লিকলেন।
No text on this page.
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ
(পদ্যবঙ্গানুবাদ)
সংসারার্ণবতারণৈকতরণীং প্রেমপ্রসূন-মং।
সৎসেব্যং হরিনামপূতনিখিলং ভক্তপ্রিয়ং ভক্তি।
শ্ৰীমপসনাতনপ্রিয়তমং কোটীনিন্দাননং।
নিত্যানন্দা সমন্বিতং নরবরং তং নৌমি বিশ্বশুরম্ ।
অশ্য চুণিকা
সংসারঃ-অদৃষ্টাধীন-গরীব-পরিগ্রহঃ ;
প্রসূন-পুষ্পম; সংসেব্যং – সাধুকর্তৃ ভঃ সেব্য।
প্রথমে বন্দিব গৌরচন্দ্র অবতার । যার সম দয়ালু ভুবনে নাহি আর।
ভক্তিভাবে প্রণাম করিয়ে অনুক্ষণ । ভক্তি মুক্তিদাতা রাধাকৃষ্ণের চরণ।
তবে প্রণমিয়ে জয়দেব কবিবর। রাধিকামাধব যার নয়নােচর।
যার কৃত মহাকাব্য শ্রীগীতগােবিন্দ। যাতে প্রীত করে সব কৃষ্ণভক্তবৃন্দ ।
বড়ই বিষম সেই নিগুঢ় বর্ণনা। লােক বুঝাইতে করি প্রকৃত রচনা।
রাধাকৃষ্ণ রাসলীলা নির্জন গহনে। সে সকল বর্ণনা করেন কৃষ্ণ মনে ।
একদিন কৃষ্ণচন্দ্র একান্তে বসিয়া কহেন মনের কথা দূতিকে ডাকিয়া।
শুন দুতি মাের মতি রাধা প্রতি হয়। রাধার বিচ্ছেদে মাের প্রাণ নাহি রয়।
কাম-রে জর জর আমার অন্তর। রাধাকে মিলায়ে প্রাণ রাখহ সত্বর।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ কেমনে আমার সনে হইবে মিলন। তাহার উপায় দূতি কর নিরূপণ ॥ এতেক কাতরবাক্য কৃষ্ণের শুনিয়া। গমন করিল দূতি অতি হষ্ট হইয়া ॥ রাধার নিকটে আসি বলে প্রিয় দূতী। ত্যজ নিজ অভিমান ভজ ব্ৰজপতি। কৃষ্ণচন্দ্রে কেন দেহ এতেক যন্ত্রণা। পূর্ণ কর শশিমুখি মনের বাসনা। ত্যজি নিজ গৃহ-বাস নিবাস গহনে। ধরিল কেবল প্রাণ তুয়া গুণ গানে। হেন অনুগত জনে অনুচিত ক্রোধ। দয়া করি দূর কর মনের বিরােধ এই হরি পূর্ব রাত্রে তােমাকে ছাড়িয়া। বিহার করিল অন্য নারীগণ লইয়া। সেই অপরাধে বড় ভয় পাইল মনে। আসিতে না পারে ধনী তুয়া সন্নিধানে সেই দোষ ক্ষমহ চলহ বৃন্দাবনে। কৃষ্ণ সনে রাস কর নিকুঞ্জ ভবনে। গৃহিণী বিহনে বনসম হয় ঘর । তুমি সে গৃহস্থ কর হরিকে সত্বর। দেখ মেঘ আচ্ছাদিল সকল আকাশ। তাথে হৈতে সূর্যের না হয় পরকাশ । বৃক্ষ সব তমালে করিল অন্ধকার। দেখিতে না পায় অন্য অন্যের আকার। অতএব মিলন করহ দুইজন। কৃষ্ণের বিরহ তাপ করহ খণ্ডন। হেন আনন্দিত স্থান হইতে রসাবেশে। অতি হরসিতে দোঁহে বন পরবেশে কিবা সে বনের শােভা কহনে না যায়। কুসুমিত বন সব ভ্রমে ভঙ্গ তায়। মন্দ মন্দ সুগন্ধি শীতল বায়ু বহে। অতি সুখী সখীগণ কেহ কেহ কহে। অত্যন্ত নির্জন বন যমুনার কূলে। জলচর বনচর ডাকে কুতুহলে। অতি পুলকিত চিত হইয়া রাধা কানু। পথে কুঞ্জম দেখি সবে হৃষ্ট তনু। বৃহঃ স্থলে কুতূহলে রাধিকার সনে। নির্ভয়ে করেন ক্রীড়া সেই কুঞ্জবনে। রাধিকা কৃষ্ণের শােভা না যায় বর্ণন। তড়িতে জড়িত যেন নব ঘনে ঘন । রাধামাধবে রতি-কেলী নানা মত। অতিশয় উৎকণ্ঠা তনু অবিরত। বাক্যের দেবতা কৃষ্ণ সংসারের সার। তার চিত্ত চরিত্রে বিচিত্র চিত্র যার ॥ পদ্মাবতী রাধিকার চরণ সেবিতে। প্রধান সেবক জয়দেব কবি তাতে। সেই জয়দেব কবি করেন কবিতা। রাধামাধবের রতিকেলী রাস কথা - যন কষ্ণ ভক্তগণ আমার বচন। যদি কৃষ্ণ অরণে সরস হয়ে মন।
শ্রীগীতগােবিন্দ কৃষ্ণলীলা বিলাস কলাতে সুনিশ্চয়। যদি তােমাদের চিত্তে কুতুহল হয় । তবে মন দাও জয়দেব কবিতাতে। মধুর কমনীয় কৃষ্ণ রসপদ যাথে । বৈষ্ণবের শ্রদ্ধা কৃষ্ণনামেত কেবল। বিলাসী জনের কৃষ্ণ-বিলাসেই ফল ॥ এই খানে যে যে আছে পণ্ডিত মণ্ডলী। সে সবার দোষ গুণ একে এক বলি উমাপতিধর সর্বশাস্ত্রে সে পণ্ডিত। বাক্যের বিস্তার করে তাথে সে নিন্দিত গগাবর্ধন আচাৰ্য্য তেই কবিত্বে উত্তম। বর্ণনে শৃঙ্গার রস নহে তার সম। অসামর্থ অন্য রস বর্ণন করিতে। এই হেতু বটে দোষ তাঁর কবিতাতে। ঘােয় নামে কবিরাজ তিধর বড়। শ্রবণ মাত্রে সে গ্রন্থ-গ্রন্থনে সে দড়। শুনিতে বুঝয়ে সার উৎকৃষ্ট এ নয়। অনুরত ইঙ্গিতে বুঝে সেই রীতে হয়। শরণের শ্লাঘা রহে সমস্ত পূরিতে। অসমর্থ অন্য রস বর্ণন করিতে । বাক্যের সন্দর্ভ শুদ্ধি গ্রন্থন-বিশেষ। জানেন কেবল জয়দেব সবিশেষ। সম্প্রতি কৃষ্ণের স্তুতি অবতার দর্শে। গীত ছন্দে প্রবন্ধ-করয়ে ভক্তি রসে। প্রলয়-সাগরে ভরি করি চারি বেদ উদ্ধারি। জয় জগদীশ হরি অদ্ভূত মীন রূপ ধরি। অতি বড় পৃষ্ঠে ধরিলা ক্ষিতি। তাহে ব্রণ চিহ্ন চক্রাকৃতি। জয় জগদীশ হরি। অদ্ভুত কচ্ছপ রূপ ধরি। তব দন্ত অগ্রে ধরণী রয়। যেন চন্দ্রে নীল কলঙ্ক হয়। জয় জগদীশ হরি। অদ্ভূত শূকর রূপ ধরি। করকমলের দারুণ নখে। হিরণ্যকশিপু দারিলে সুখে। জয় জগদীশ হরি। অদ্ভূত নরহরি রূপ ধরি। বলিকে ছলিলে ত্রিপদ রূপে। পাইয়া গঙ্গাদি বিনাশে পাপে। জয় জগদীশ হরি। অদ্ভুত বামন রূপ ধরি। ক্ষত্রিয় রক্তে করিলেক হ্রদ। মানে খণ্ডে পাপ বিপদ। জয় জগদীশ হরি। অদ্ভুত ভৃগুপতি রূপ ধরি। রাবণের মুণ্ড কাটিয়া রণে। তুষ্ট কৈল দিয়া দিপতিগণে।
3 শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ জয় জগদীশ হরি। অদ্ভুত রঘুপতি রূপ ধরি। শােভে শুক্লবর্ণ বসন নীলে। হলাঘাত ভয়ে যমুনা মিলে । জয় জগদীশ হরি। অদ্ভূত হলধর রূপ ধরি। যজ্ঞ হতে নিন্দা কৈলে বেদে। দয়া কৈলে দেখি পশুবধে। জয় জগদীশ হরি। "ভূত বুদ্ধ রূপ পরি। ম্লেচ্ছ বিনাশিতে ধরিলে আসি। যেন ধূমকেতু ভয়ের রাশি। জয় জগদীশ হরি। অদ্ভুত কল্কি রূপ ধরি । শুন শুন জয়দেবের এই গী। সুখ শুভ দাতা করে সংসারের হিত। জয় জগদীশ হরি অদ্ভুত দশবিধ রূপ ধরি। বেদ উদ্ধারিলে আর বহিল সংসার। পৃষ্ঠে শােভে ক্ষিতি চিহ্ন ব্রণের আকার অদ্ভুত বরদান দেখিতে বিস্তার। উদ্ধারিল ভূমিখে দৈত্যের বিদার। বলি দৈত্য ছলিল ক্ষত্রিয় কৈল ক্ষয় । রাবণের বধ হলধর কৃপাময় । শ্লেচ্ছ বধ এই দশ ধরিল আকৃতি। সেই কৃষ্ণচন্দ্রে আমি করিনু প্রণতি। গ্রন্থের আরম্ভে বিঘ্নবিনাশ-কারণ। পুনরপি কৃষ্ণচন্দ্রে করেন স্তবন৷ প্রথমেত মধুর মঙ্গল গীত ছন্দে। মঙ্গল গুজ্জরী রাগ করিল সানন্দে । লক্ষ্মীকুচদ্বয় করেছে আশ্রয়। শ্রুতিতে কুণ্ডল, বনমাল উরে । স্থিতি রবি মাঝে লােক মুক্তি কাজে হংস মুনি মানস সরােবরে ! কালিয় গঞ্জ ভুবন রঞ্জন সূৰ্য-যদুকুল-পুষ্করে । গরুড় বাহনে মারি দৈত্যগণে বাঁচাইলে হর্সে সুরপুরে। পদ্ম জিনি চক্ষু তুমি ভবমােক্ষ থাক নিত্য ত্রিভুবন ঘরে জলদ বরণ ধরিলে গােবর্ধন চকোর-শ্রীমুখ-শশধরে । সীতায় ভূষণ করিলে ভূষণ সমরে বধিয়া দশশিরে , তব পাদপদ্মে প্রণমি সানন্দে সুখী কর মিত্র নরে। জয়দেব কৃত মঙ্গলগীত ভাষাতে রচিল গিরিধরে। করিতে শৃঙ্গার রস বর্ণন শংপ্রতি। শৃঙ্গার চিহ্নিত কৃষ্ণ বক্ষে করে স্তুতি।
শ্ৰীশ্ৰগীতগােবিন্দ কমলার দিব্য পয়ােধর যুগ মাঝে। অত্যন্ত সুন্দর গন্ধ কুঙ্কুম বিরাজে। ৬ার দৃঢ় আলিঙ্গন কৃষ্ণ বক্ষ দেশে। নাগিল কুঙ্কুম চিহ্ন মুদ্রার সদৃশে। কামকেলি হইতে শ্রমে ধৰ্ম্ম জলে আক্ত অন্তরে লক্ষ্মী প্রেম কিবা হইল ব্যক্ত এমত কৃষ্ণের অতি অপূৰ্ব্ব হৃদয়। নিরন্তর সবার করুন বিজয়। বিরহিণী রাধিকার বিরহ বর্ণন। সম্প্রতি হইল ইচ্ছা করিতে রচন। বসন্তের শােভা দেখে বলেন রাধিকা। মাধবী ফুল হইতে কোমল অধিকা। কামশরে অতিশয় হইয়া চিন্তাকুল। কৃষ্ণের বিরহ দুঃখ হইতে ব্যাকুল । কৃষ্ণের মিলন হেতু স্মরণ করি ব্রীড়। মনের বাসনা কৃষ্ণ সঙ্গে রাস ক্রীড়া। একচিত্ত হইয়া শয্যায় যায় সখীসনে। কৃষ্ণকে খুঁজিয়া ফিরে অতি দুর্গম বনে রাধাকে কহেন হেন কালে সহচরী। সরস ৰচনে কৃষ্ণ বচন মাধুরী। বসন্ত বর্ণেন কবি বসন্তের রাগে। মান করে নিবেদন করে বনভাগে । কুহু কুহু করি, এমতে বসন্তে হরি করয়ে বিহার। হে সখি সুন্দরি, যুবতী জনে হরি, নাচেন কত পরকার। পবনে লক্ষ- লতা মৃদু বিচলিত, শীতল গন্ধ-বহায়। কোকিল কল কুজিত, কুঞ্জে ভ্রমরীগণ গায় । বকুল ফুলে মধু, পিয়ে মধুকরগণ, তাহে লম্বিত তরু ডাল । গতি দূরে যার, তার প্রতি মনােরথ, মন্মথনে হয়ে কাল। মৃগমদ গন্ধে, তমাল পল্লব, ব্যাপিত হইল সুবাস।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ বিদরিতে কামের, যুবজন হৃদয়, নখ কিবা হইল পলাশ। মন নৃপের ছত্র হেন নির্মিত, কি এ নাগেশ্বর ফুল। শিলীমুখ সদৃশ, তুনি নিরমাওল, পাটলি ফুল অতুল। দেখি বিলক্ষণ, জগত ফুল হল, তরুণ করুণ কিযে হাসে। কেতকী করাত, সদৃশ করি নিরমিল, বিরহি-বিদারণ আশে । মাধবী পুষ্পের, গন্ধে হরে মন, নব মল্লী ফুলবাসে। মুনিজন মনমােহে, তরুণী জন কি করব, পতিযুত তরণী বিলাসে । বিকসিত মাধবী, তরু আলিঙ্গনে, মুকলিত পুলকে আম। অতি পরিসব, যমুনা জলে সেচিত বৃন্দাবনে অনুপম শ্রীজয়দেব রচিত, এই অদ্ভুত বিরচিত, শ্রীগিরিধরের বিহার। সেই অনুপম, মঙ্গল করুন বিথার। বৃন্দাবন লীলা শীতল সুগন্ধ মন্দ বহিছে পবন । তাহাতে বেষ্টিত কৈল এ সকল বন। কিছু কিছু বিকশিত মল্লিকার ফুল। তাহাতে নির্গত হয় পরাগ অতুল।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ । তাহাতে মিশ্রিত গন্ধে বায়ু সুবাসিত। সেই গন্ধে বন সব করেছে আমােদিত Fহয়ে বিরহী মন শেষ হইল আউ। কেতকীর গন্ধে মন্দ মন্দ বহে বাউ । কিবা কাম নরপতি দিয়া পঞ্চবান। পাঠাইল সেনাপতি প্রাণীর সমান। তাহাতে বড়ই সুখ মনের উৎসাহ। বিরহীর প্রতি দুখ অন্তরের দাহি। আর সে বসন্তে পুষ্পগণের প্রকাশ। গান করে অলিগণ হইয়া উল্লাস। প্রকাশিত মধুগন্ধে লােভে ভৃঙ্গগণ। এমিলে নাড়য়ে আম্র মুকুল শােভন। তাথে থেকে ক্রীড়াযুত কোকিল সকল। করয়ে মধুর ধ্বনি অতি কোলাহল সেই শব্দে উৎপন্ন হইছে কর্ণ রােগ। দুঃখিত পথিক জন করয়ে বিয়ােগ। ধ্যান করি পরবাসী ভাবে এক মনে। প্রাণের সমান প্রিয় পাব কত দিনে বিরহে ব্যাকুল সেই স্মরি নিজ নারী। মদন বেদনে দুঃখ মনে ভাবে ভারি। প্রিয়া আগমন প্রেমে হইয়া উলসিত , এই দিন কোনমতে গায়াইব নিত । সরস বসম্ভে সুশীতল বাউ বয় । তাহাতে লােকের সব দাহ ব্যাম হয় । দক্ষিণ পবন সে উত্তর দিকে বয়। তাদেখিয়া মনেতে করেন অভিনয়। চন্দনের কোটরে থাকয়ে নিত্য সাপ। তার বিষজ্বালায়ে বড় পাইয়ে সন্তাপ সেই তাপে কিবা মলয় ছাড়িয়া পবন। স্নান হেতু হিমালয়ে করিল গমন । লােকে বলে সেই বটে দুঃসহ আমার। আর বলি দুঃ দাতা বিহি জনার । শীতল রসাল ডালে মুকুল দেখিয়া । তাহাতে কোকিলগণ হর্ষিত হইয়। কুহু কুহু এই শব্দ করে নিরন্তর। বিরহী জনার শুনিযে কাম জ্বর। শুন সাখ, এই বটে দুরন্ত বসন্ত। বিরহী জনার প্রতি প্রাণ রূরে অন্ত। অবিদগ্ধা নারীসনে ক্রীড়া করে হরি। মিথ্যা করি কভু মানে রাধিকা সুন্দরী প্রত্যক্ষ দেখাব এই মনে করে দুতী। নিকটে আসিয়া এই কহে রাধা প্রতি দূতী কহে শুন শুন রাধিকা সুন্দরী। হের দেশ মাধবের বিলাস মাধুরী। অনেক নারীতে হরি হাস্যমুখ হইয়া। আলিঙ্গন করে কত প্রেম বাড়াইয়া । মনােহর বিলাসেতে বড়ই লালস। মার যেন বাঞ্ছা তেন করেন সরস। নিকট আপন চক্ষে দেখহ রাধিকা। মিথ্যা কি কহিতে পারি হইয়া দুতিক শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ শুনি বিলাসিনী, রাধিকাসুন্দরী, শ্যামেরে দেখিল যাইয়া ॥ বসন্ত সময়ে, বিলাস করয়ে, মুগ্ধ বধুগণ লইয়া। পীতবাস পরি, বনমালাধারী, চন্দন সে কাল অঙ্গে। কেলিতে চঞ্চল, গণ্ডের কুণ্ডল, হাস্য রতি রস রঙ্গে। পীন কুচভরে, কৃষ্ণমুখ চাইয়া আলিঙ্গন করে, কৃষ্ণ গান শুনে আগে। পাছু গােপনারী, নানা তাল করি, গাওত পঞ্চম রাগে। কটাক্ষ করিয়া করয়ে মদন বৃদ্ধি। কোন মুগ্ধ বধূ কৃষ্ণ-মূ-মধু পান করে নিরবধি। মিলিয়া কপােল কহিবার ছলে কর্ণমূলে মুখ দিয়া। নিতম্বিনী কোন পুলকিত কৈল গিয়া । কেলি কুতূহলে যমুনার কুলে দিব্য কুঞ্জ-বেত্ৰ-বনে। প্রেম পরিহাস ধরি পীতবাস নিজ করে ধরি টানে । করিয়া চুম্বন শ্ৰীশ্ৰগীতগােবিন্দ f কহুিকে চুম্বন করে রণ রণ তালি দিতে দিতে তথি। কাহুকে আলিঙ্গন করে কার সঙ্গে রতি হাস্য মুখী পানে হসিত বদনে চাইয়া যায় আন প্রতি। কহে জয়দেব কি আর বলিব যাইয়া তাহার ঠাঞি। সে সব যুবতী কহে তুয়া প্রতি গিরিধরে দোষ নাঞি। দেখ কৃষ্ণ রূপ কিবা মদন মােহন। সংসারের যত লোক করায় রঞ্জন। নীলােৎপল শতদল জিনিয়া শ্যামল মধুর মুরতি অতি অঙ্গ সুকোমল। হেন রূপ দেখি হর্ষ পায় সব কি। বাঁচাইল অনজের উৎসাহ অধিক। কভু কৃষ্ণ কভু গােপী ক্রীড়ে নানা রঙ্গে। মদনে বিহ্বল অতি আনন্দিত অঙ্গে বসন্ত সময়ে হন অবিদগ্ধ হরি। বিহরে হরষে রঙ্গে মুগ্ধ চিত্ত করি। ওগাে সখি হেন লখি অদ্ভুত বিহার। মুৰ্ত্তিমান হইল কিবা আপনে শৃঙ্গার। সুন্দর মুমূঢ় দুই মৌগ্ধ শব্দে বলে। অবিদগ্ধ! সনে ক্রীড়া মুঢ় কহে ছলে। যে যে নারী সনে কৃষ্ণের কভু নাহি প্রীত। তাহাতে বিহার দেখে রাধা সংবিস্মিত। আপন উৎকর্ষতা নাঞি হরি স্থানে। থাকিতে উচিত নহে আর এইখানে। আমারে ছাড়িয়া রতি করে অন্য সনে। এই ভেবে ক্রোধাবেশে যায় অন্য স্থানে। তাহাতে ভ্রমরপুঞ্জ নিরন্তর গুঞ্জে। সেইখানে মাধবী লতার দিব্যকুঞ্জে। তাথে হৈয়া নীল অতি দীন সেই রাই। রহস্থলে কহে কিছু সখী মুখ চাই। অভিলাষ চিন্তাগুণ কীৰ্ণন স্মরণ। উদ্বেগ প্রলাপ ব্যাধি মরণ লক্ষণ।
১• শ্ৰগীতগােবিন্দ জড়তা উন্মাদ এই দশ দশা হয়। বিরহে দশমাবস্থা কহিল নিশ্চয়। হেন দশ অবস্থানে ব্যাকুল হইয়া। কৃষ্ণগুণ গান করে সখি সৰােধিয়া। সই গাে সেই হরি সদা পড়ে মনে। পরিহাস রাস যেই করে মাের সনে। অধরে ধরিয়া বাঁশী করে মধুর গান। চঞ্চল কল কর্ণ ভূষণ নয়ান। ময়ুর চন্দ্রিকা শােভে চাচর চিকুরে। যেন ইন্দ্ৰ ধনু চিহ্ন মেঘের উপরে। সহস্র সুন্দরী আলিঙ্গয়ে প্রেমরসে। কর পদ বক্ষ ভূষয়ে অন্ধকার নাশে। মােহন করিয়া গােপী করিয়া চুম্বন। অধর বান্ধলী সম হসিত বদন। মেঘে ইন্দ্র ধনু শােভে ললাটে চন্দন। নির্দয়ে করয়ে পীন স্তনের মর্দন। গণ্ডে শােভে মণিময় মকর কুণ্ডল। পরি পীতবাস বশ কৈল স্ত্রী সকল । কদম্ব তলাতে বাস করি ভয় হরে । অনঙ্গ তরঙ্গ মনে ক্রীড়য়ে কি মােরে। জয়দেব কহে রাধে ইথে নহে আন্। মােহন মুরতি গিরিধরের তুমি প্রাণ । যদি হরি অপমান করিলে আমার। আমারে ছাড়িয়া অন্যে করয়ে বিহার। তথাপি দারুণ মন তাঁর প্রতি ধায়। নিরন্তর কৃষ্ণের সকল গুণ গায় । শুন দুতি কেমন কেমন হয়ে মাের মন কভু কৃষ্ণ গুণগ্ৰাম করিয়ে গণন। ভ্রমেতেও কৃষ্ণ প্রতি নাহি করে রোষ । পরিতুষ্ট হইয়া দূর করে কৃষ্ণ-দোষ। আমারে ছাড়িরা এই বনে বনমালী। অন্য যুবতীর সনে করে নানা কেলী। পুনঃ প্রতি কুল মাের মন ইহা দেখি। কি করিব কিবা হবে কহ প্রাণ সখি পুনৰ্বার উৎকণ্ঠিত হইয়া সেই রাধা। সখীকে কহেন কিছু মনে পাইয়া বাধা। করাহ আমাতে রতি দহে মন রতি পতি সে হরি পীড়িত মদনে । নিভৃত নিকুঞ্জ ঘরে থাকি নিতি লােকান্তরে হরি রহে গুপত নিবাসে।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ ১১ চতুর্দিকে চাইয়া চাইয়া থাকি চমকিত হইয়া রতি রস মনে করি হাসে। প্রথমে লজ্জিত আমি দেখে হবে হরি কামী কহিব সে লসিত বচন। হাসি রসে সুমধুর বচন শুনিয়া মাের জঘনের খসায় বসন । নবীন পল্লব লয়া শয়ন করিব যাইয়া সেহে শােয় মাের বক্ষ স্থলে। প্রেমে আলিঙ্গন করি চুম্বন করিতে হরি মুখ মধু পিব করি কোলে । অলসে অবশ সনি খেলিতে নারি আঁখি পূলকে খণ্ডিত গণ্ড তাঁর। মাের তনু রতি শ্রমে পরিপূর্ণ হব ঘামে কাম-মদে হরি মাতােয়ার । কোকিলের কলধ্বনি হেন মাের হবে বাণী কাম শত্ৰ বিচারে সে জয়ী। কুসুমে বেষ্টিত কেপে এলাইল কেলি রসে নখে ক্ষত কৈল স্তন দুই ॥ পায়ের নুপুর ঘন ঘন করে রণ রণ পুরাব সুরতজ কাম। বিপরীত রতি রসে বাজ কিঙ্কিনী খসে কেশ ধরে চুম্ব দিব দান । রহি সুখ করিবারে অলস হইব মােরে আধ আধ মেলি হরি আঁখি। আলস্যে অবস দেহ শথ হয়া পড়ে সেই কৃষ্ণ কাম যাচে ইহা দেখি ।
১২ শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ শুন প্রাণ প্রিয় সই উৎকণ্ঠা হইয়া কই কহ হয় কেমন প্রকার। জয়দেব সেই কয় যেন হেন মত হয় গিরিধর সহিত বিহার। আজি কৃষ্ণ বিলাস করয়ে এই বনে। তাহারে দেখিয়া হর্ষ হল মাের মনে। শুন সখি মােরে দেখি হরি ভয় বসে। হাত হইতে বিলাস মুরলী তাঁর খসে কটাক্ষ বঙ্কিম চারু ভুজলতা প্রায়। হেন নারীগণ উৰ্দ্ধ কটাক্ষেতে চায় । অতিশয় ঘৰ্ম্মেতে পূরিত গণ্ডদেশ। ব্ৰজের সুন্দরীতে আবৃত হৃষীকেশ । আমাকে দেখিয়া পুনঃ হইছে লজ্জিত। অন্য হাস্য সুধাতে সে মুখ লালিত। যেন অতি স্পৃহনীয় বস্তুর দর্শনে। আচ্ছাদিত মুখ হইল চাইয়া মাের পানে। ত্রিলােকের নাথ মােরে করে লাজ ভয়। এই হেতু তারে দেখে আনন্দ হৃদয় বিরহে ব্যাকুল হইয়া রাধা পুনৰ্ব্বার। সখী প্রতি নিজ দুঃখ করেন প্রচার। কৃষ্ণেতে মিলন কোন রূপে হ’ণে সখী। মদনে দাহনে মন এই সব দেখি । অল্প অল্প শত শত গোছাতে পূর্ণিত। নূতন অশােক বন অতি প্রফুল্লিত। সেই বৃক্ষ অতি দুঃখে করয়ে আলােক ৷ মাের প্রতি শােকদাতা হইল অশােক সরােবর হইতে বাউ হয়েছে সঞ্চয়। উপবন গন্ধ লইয়া মন্দ ম বয়। হেন মতে প্রাণ মাের প্রাণে দিচ্ছে ব্যথা। শুন সখী ক্ষীণ দেখি সবে দুঃখ দাতা। আত্ৰ তরু আগে চারু হইল মুকুল। মধু খাইয়া গাইয়া বুলে যত ভৃঙ্গী কুল। হেন রমণীয় বৃক্ষ করয়ে অহিত। সুখদাতা নহে কেহ মােরে কদাচিত । করিতে করিতে ক্রীড়া যুবতি সংহতি। রাধা মনে করে হইল বিয়াকুল অতি রাধার যতেক গুণ করিয়া স্মরণ। অনুতাপ করি কৃষ্ণ বলেন বচন। সংসারে করিতে বদ্ধ নিগূঢ় সমান। এমন রাধিকারূপ গুণের নিদান । সকল গােপীকা হইতে রাধিকা রূপসী। সুধাসম বাণী মুখ যেন পূর্ণ শশী। রাধিকাকে হৃদয়ে ধরিয়া সেই হরি। নিরন্তর তার রূপ গুণ ধ্যান করি ।
ঐশ্রীগীতগোবিন্দ
১৩
এমন করিল কৃষ্ণ যত বন ভাগ। ইতস্ততঃ খুঁজিয়া না পাইল রাধা নাথ।
কামশরে বিদ্ধ হইয়া অনুতাপ করি। কালিন্দীর কুলে বিষাদিত হইলা হরি।
আপনা পাসরে নররূপ অবতরি। বিলাপ করয়ে হরি হরি স্মৃতি করি।
হরি হরি হতাদরে গেল সেই রাধা।
কোপে কিবা মনে সেই পাইয়া আর বাধা ।
অপরাধ ভয়ে আমি ফিরাতে নারিল।
গােপীতে বেষ্টিত দেখে মােরে ছাড়ি গেল।
কি করিব সেই রাধা কি বলিব মােরে। কিবা করে ধনে জনে কিবা সুখ ঘরে
ভাবি সেই মুখ যার কোপে বাকা ভুরু। রক্তপদ্ম উ :রে যেন ভ্রমে ভৃঙ্গ চারু
রাধা মনে করে আমি করি নিত্য রমণ। বিলাপ কয়য়ে মিথ্যা বনেতে ভ্রমণ
জানি রাধে অস্ত্র হাতে ভিন্ন ভুয়া মতি।
কোথা গেলা জানি যদি করিও বিনতি।
তুমি প্রিয়ে দেখে মােরে আও এস আও।
পূর্বাবৎ আলিঙ্গন কেন নাহি দাও :
অপরাধ ক্ষম কভু না করিব হেন দেখা দিয়া প্রাণ রাখ পােড়ায় মদন।
জয়দেব কহে, গিরিপর ত্যজ দুঃখ। তিলমাত্র নহে রাধা তােমাতে বিমুখ ।
এই মত বিরহেতে ব্যাকুল হই। বিলাপ করেন কৃষ্ণ নিকুঞ্জে বসিয়া।
মনে করে কাম দেব হ’য়্যা মূমান্। কে পি করি মনে কিবা বিন্ধে পঞ্চবাণ
বিরহ জালাতে সকল হইয়াবিস্মৃতি। বিনয়ে মৃত কথা কহে কাম প্রতি ॥
গীত।
হর নাহি হরি হাম রমণী বিন্দু।
হৃদয়েহি হার নহে ভুজপতি।
ভসম নহে, তনু চদা পর্ণ ।
রমণী সহিত সেই শঙ্কর যোগী ।
চন্দন রেণু ইহ, ভসষ তনু।
কাছ উৎপল রল দ্যুতি
কোপ করি পাঙসি শাহে অনঙ্গ ।
হাম একলি জন বিরহ বিয়ােগী ।
১৪ ঐশ্রীগীতগােবিন্দ কর করে ফুল-শর করি দাপ। যদি শরধর না ধর চাপ। জগত বিজয়ী বনমনথ কহে তােয়। মুরছিত বধে পুন বধ নাহি হােয়। দৃগ, শরে মন মাের হানল রাধা । অবহু নাহি উপসম নাহি ভেল আধা ॥ রাধিকাকে স্মরণ করিয়া পুনৰ্ব্বার। যাহা হৈতে দুঃখ তঁার করেন বিচার। → ধনুতে বিন্ধ কটাক্ষ শায়ক । মাে হইতে পাবে মৰ্ম্ম ব্যথার দায়ক । মারিতে উদ্যম করে কেশ বেস ভার। কুটিল মলিন দুই স্বভাব তাহার । শুনহ সুন্দরি মন্দ করে এই নীত। ভাল হৈয়া মন্দ করে এই অনুচিত । বিম্বসম অধর সুরঙ্গ রঙ্গ তাথে । দেখিয়া আমার মন হয় যে মােহিতে। আদ্যন্ত সুরঙ্গ স্তন মণ্ডল তােমার। কেন মাের প্রাণ হরে অদ্ভুত বিচার । রাধিকাতে আছে মাের মনের সংযােগ। একি দশা কেন হয় বিরহে বিয়ােগ । রাধা অঙ্গ-স্পর্শ সুখে অঙ্গের প্রকাশ। অধরের মাধুরীতে জিহ্বার উল্লাস। সেই স্নিগ্ধ চিহ্ন দেখে জুড়াইত দৃষ্টি। সেই মুখ পদ্ম গন্ধে নাসা করে তুষ্টি। অমৃত সদৃশ বাক্য শুনে সুখী কান। পঞ্চেন্দ্রিয় অসংযােগ বিরহ বিধান । যদি এই সকল বিষয়ে রহিত। তথাপি মানস মাের রাধিকাতে প্রীত। রাধিকাতে যদি মাের না হয় মিলন। বিরহ-ব্যাধি তবে বাড়ে কি কারণ । ভুরুর পল্লব ধনুক মুৰ্ত্তিমা। কর্ণ পাণি গুণে চাই সেই ধনু খান। তরল কটাক্ষ যত সেই করে বাণ। এইরূপে কামবাণ করিল সন্ধান। যে অস্ত্ৰে জগত জয় করিল মদন। সেই অস্ত্রধারীতে কি করিল অর্পণ। যখন জানিল যুদ্ধ যােগ্য কেহ নাই। তখন সে অস্ত্ররাখে রাদিকার ঠাঞি। সেই কামবাণে রাধার বদনে সর্বথা। সেই বটে কামের জয় জঙ্গম দেবতা। মমুনার তীরে কৃষ্ণ অস্থির হইয়া । অতি মনােহর বেত্র কুঞ্জেতে বসিয়া। আকুল হইয়া রাধিকার প্রেম ভরে। অত্যন্ত চঞ্চল চিত্ত ভাবেন রাধারে। হেন কালে রাধিকার সখী আইলা তথা। কৃষ্ণচন্দ্রে কহে রাধার বিরহের কথা।
গীতগােবিন্দ তুজগ মিলত, হে মাধৰ বিরহে বিয়াকুল রাম। কাম শরে কত, হইয়া ভাবিত, শরণ লইল মাে । নিয়ে চন্দন, চাদের কিরণ, মনে বড় দুঃখ পায়। মলয় মারুত, বিষ সম সমদাহে তায়। কামশর শত পড়ে অবিরত, তার হৃদে তুয়া বাস। তােমা রাখিবারে হৃদয় উপরে সজল পদ্ম-পলাশ । বহুত বিলাস করি, অভিলাস সব ছাড়ি, ফুল শয্যা শরশয্যা মানে। তুয়া আলিঙ্গন, সুখের কারণ। তাহে সে করে শয়ন । বহিছে সজল, নয়ান নিৰ্ম্মল, সে মুখ কমল পারা। যেন চন্দ্ৰ হৈতে, রাহু দস্তাঘাতে, গলিছে অমৃত ধারা। মকর উপরি, কাম মুর্ভিধরি, তােমা লেখে মৃগমদে । করে দিয়া শর, মুকুল আস্রের, প্রণাম করিয়া রাধে। পদতলে তব, পড়িল মাধব, নিরন্তর এই কহে।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ বিমুখে তােমার, সেই হৈতে মাের, সুধা নিধি তনু দাহে ॥ মনে ধ্যান করি তােমা আগে ধরি বিলপয়ে কভু হাসে। বিষাদে হাসিয়া স্থানান্তরে যাইয়া মনস্তাপ সব নাশে । হৈয়া সবিনয় জয়দেব কয় গিরিধর কর হিত। করি অভিসার করহ রাধার অভিলাষ মনােনীত । শুন প্রভু কৃষ্ণচন্দ্র কহি তুয়া আগে। এতেক অবস্থা তার বিরহ-বিয়ােগে । নিজ গৃহদ্বার তার খেলার স্থান। হইল রাধার প্রতি বনের সমান। বেষ্টিত আছেন প্রিয় সখীগণ যত। তাঁর প্রতি হইল সব বেড়াজাল মত । অন্তরে তাপ আর নিশ্বাস পবন । জ্বলন্ত অনলসম করে আচরণ। তােমার বিরহে এত দুঃখ রাধিকার। আপনাকে ভাবে সেই মৃগীর আকার । শাৰ্দলের প্রায় বড় করিয়া তৰ্জন। যমসম আচরণ করেন মদন। এ দুঃখ-সাগরে আর নাহিক নিস্তার । দয়াময় হৈয়া কেন না কর বিচার । নিঠুর হইয়া দুর কৈল অনুরাগ। মনে হ’তে তােমা সে করিতে নারে ত্যাগ যার সনে যার প্রেম কেমনে পাসরে। নিঠুর তাহাতে না ছাড়িহ রাধিকারে । অতি অপরূপ তনু ভৈগেল আধা । সে অব মানত গুকতর ভার । এ হরি তুহরি বিরহিনী রাধা । কুচধুগ উপরে মতিময় হার। অঙ্গহি শীতল চন্দনহােয় । তাপিত অন্তর উঠত নিঃশ্বাস । বিষ সম মানত শঙ্কিত হােয়। সতত বহুত জনু মদন হুতাশ।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ
১৭
চোঁদকে খেপত জলভার আঁখি। খণ্ডিত লাল কোমল সম পখি।
করতল মাহ কপােলহি ঘঁজে। বালক চাঁদ উদয় জনু সাজে।
কিশলয় সেজ রচন ভেল জোই। অল্প সদৃশ নিরখত পুন সােই ।
নিশি দিশি হরি হরি করত বয়ানে। বিরহে মরণ জ করয়ে বিধানে।
জয়দেব হৃদয় দুঃখ ভারি। তাপিত জন দুঃখ হর গিরিধারী।
পুনৰ্বার কৃষ্ণে দুতী করে নিবেদন। রাধার বিরহ-জরে যতেক বেদন।
কভু নােম হর্ষ কভু করয়ে শীৎকার। কভু গ্লানি হইয়া কম্প হয় পুনর্বার।
কখন চিন্তিত হইয়া করয়ে বিলাপ। কভু নেত্র কুটিলতা কভু মনস্তাপ।
ভূমে গড়াগড়ি দিয়া উঠিবারে চায়। বান্তি করে ক্ষণে ক্ষণে মূচ্ছ যায় ।
এমন অনঙ্গ জরে সেই নিতম্বিনী। না বাঁচিবে অল্পক্ষণ মনে অনুমানি।
সর্বৈস্ত সদৃশ তুমি প্রসন্ন হইলে। কেন না বাচিব সে শৃঙ্গাররস পাইলে।
সকল গােপীর মধ্যে তার সম নাঞি। অতএব রসদানে রাখিবারে চাই।
এক চিত্ত করি তােমা নিতে পাঠাইল। রসের চিকিৎসা তেয়াগিল ।
কামশরে রাধিকা আতুর বড় হয়। বড়ই দারুণ ব্যাধি নিবারিত নয় ।
তােমা বিনে নহে এই কর অঙ্গীকার। তুমি ত সদ্বৈদ্যম কর উপকার।
যেরূপে রাধার সব দুঃখ দূরে যায়। তেমন প্রকার তুমি করহ উপায়
তুয়া অঙ্গ-সঙ্গ-স অমৃত সমসাধ্য। খুঁজিয়া আমাতে কিছু না হবে ঔষধ্য ।
কায়মনবাক্যে তার তােমাতে বিশ্বাস। দ্রুতগতি যাইয়া পুন করহ বিলাস
যদি দুঃখ রাধার না ঘুচাহ ইহাতে।
জানিল হৃদয় তােমার কঠোর বজ্র হইতে।
কামশরে সন্তাপে তাপিত হইল রাধা।
তােমার বিরহে অতিশয় পাইয়া বাধা।
যদি চিন্তা করে চন্দ্র কোমল চন্দন।
বড়ই তাপিত হয় রাধিকাৰ মন !
।
২
১৮
শ্রীগীতগােবিন্দ
কিন্তুআজি কালি করি কৃষ্ণ হইব মিলন।
এই ক্ষমারসে প্রাণ করয়ে ধারণ ।
তােমা বিনে ওহে নাথ গতি নাহি আর।
অতি সুশীতল প্রিয় তুমি রাধিকার
একান্ত থাকিয়া এই সব করে ধ্যান।
অতি ক্ষীণ ক্ষণমাত্র আছরে পরাণ ।
তােমা অল্প বিচ্ছেদে রাধার গ্লানি যত।
কহিয়ে তােমার আগে শুন নন্দসুত।
পাখাতে মুদিত দেখে আপন নয়ন। তাহাতে বিধিকে রাধা করয়ে গঞ্জন।
নিমিয়ে না দেখি তােমা বিরহ হইত। পূৰ্বকাল ক্ষণমাত্র সহিতে নারিত।
এখন তােমাতে চিরকাল নাহি দেখা। তাহাতে মুকুলিত যত আম্র শাখা।
তা দেখিয়া কেমনে রহিব রাধা তনু। কেবল নিশ্বাস মাত্র আছে শুন কানু।
কৃষ্ণ কহে শুন দুতি আমার বচন। রাধিকারে আনিবারে করহ গমন।
এই কুঞ্জমাঝে করিয়ে নিবাস। রাধা আনি আমার পূরাহ অভিলাস।
বহুত বিনতি মাের কহিবে রাধারে। পূর্বাবস্থা জানাইবে তাহার গােচরে।
রাধার বিরহে মাের প্রাণ নাহি রয়। রাধা বিনে হইল মাের জীবন সংশয়।
মাের প্রাণ রক্ষাহেতু দ্রুতগতি যাও।
কোন পরকারে তারে আনিয়া মিলাও ॥
এতেক কাতর বাক্য শুনি পুনঃ দূতী। রাধিকার নিকটে আইলা দ্রুতগতি।
জোড় করে রাধিকারে বলেন বচন। কৃষ্ণের বিরহ দুঃখ কহি বিবরণ।
গীত।
রাধে, হরি তুয়া বিরহে নিদান।
তোমার হাতের মালা গলাতে পরিয়া কালা
তাথে মাত্র ধরিল পরাণ ।
শ্রীগীতগােবিন্দ মলয় সমীর বয় তাহাতে তাপিত হয় মনমথ করিয়া সংহতি। মনে অনুমান করে বিরহে কি মারে মােরে ফুলশর ফুটিল সংপ্রতি। শীতল কিরণ শশী সদায় পােড়ায়ে নিশি পড়ে ঘন মুছা খাইয়া। যখন মদন-শরে মন তার বিদ্ধ করে বিলপয়ে বিফল হইয়া । শুনিয়া মকর গান আচ্ছাদিত করে কাণ দুই করে করিয়া যতন। বিশেষ হইলে রাতি কামপীড়া বাড়ে অতি বিরহেতে ব্যাকুল চেতন । তােমার করিয়া নাম বিলাপ করয়ে শ্যাম গড়াগড়ি যায় অবনীতে। ত্যজি নিজ গৃহ আশ বিপিনে করয়ে বাস এক ঠাঞি না পারে রহিতে । করি তুয়া অনুরাগ বিভব করিয়া ত্যাগ তুয়া অধর সুধা করি আশ । কবি জয়দেব কয় বিলম্ব উচিত নয় পূর গিরিধর অভিলাষ। পূর্বে যে নিকুঞ্জ বনে তােমার সহিতে। কামের যতেক ক্রীড়া পূর্ণ কৈল যাতে । সেই কুঞ্জ মনমথ মহাতীর্থ মাঝে। পুনৰ্ব্বার তাহাতে থাকিয়া যােগিসাজে নিরন্তর তােমা কৃষ্ণ করিধেয়ান্। তােমার প্রলাপে যত মন্ত্র নিরমাণ ।
২০ শ্ৰগীতগােবিন্দ সেই মন্ত্র জপ করে পুনঃ পুনৰ্বার । কামনা করয়ে এই করিয়া বিচার। তুয়া কুচ কুম্ভ যুগে দৃঢ় আলিঙ্গন। সে হেন অমৃত প্রাপ্তি চিন্তে অনুক্ষণ এ সকল জপ ধ্যান করি দিবানিশি। তপস্যা করয়ে হরি এক কুঞ্জে বসি। কর অভিসার করি রতি রস মদন মনােহর বেশে। গমনে বিলম্ব করে নিতম্বিনী চল চল প্রাণনাথ পাশে ॥ তুয়া নিজ নাম শ্যাম করি সঙ্কেত বাজায় মুরলী মৃদু ভাবে। তুয়া তনু পরশি ধুলি তনু উড়ত রে পুনঃ পুনঃ প্রশংসে। উড়াইতে পক্ষ বৃক্ষদল বিচলিত তুয়া আগমন হেন মানে। দ্রুতগতি সে যে করত পুনঃ চমকই নিরখত তুয়া পথ পানে। শবদ অধীর নুপূর দুরে ত্যজই রিপুর সদৃশ রতি রঙ্গে। কুঞ্জ বনে চল সখি নীল ওড়নী লেহ অঙ্গে । তােড় উর হার কৃষ্ণ উরে শোভিত মেঘে বক পাতি হেন মানি। বিপরীত রমণে কৃষ্ণ উরে সাজবি মেঘে যেন সাজে সৌদামিনী। করি অভিমান কানন ত্যজিব রজনী হইব পরকাশ। অতিতম পুঞ্জ
শ্ৰীশ্ৰগীতগােবিন্দ
২১
শুনি মাের বচন গমন করহ সত্বর
পূহ কানুর অভিলাষ।
অম্বর ত্যজি নিজ
কিঙ্কিনী বেকত
জঘন কর বিরতি রঙ্গে।
নব কিশলয় শয্যাতে লেহ সুন্দরি
করাহ ঘটন শ্যাম অঙ্গে
ত্যজি সব দুঃখ
করহ সখী অন্তর
তিগতি কর অভিসার ।
জয়দেব বচন শুনি কর সুন্দরী
গিরিধর সহিত বিহার।
শুন রাধে কৃষ্ণে তুমি না হয় বিমুখ। তুয়া প্রিয় কৃষ্ণে কেন দেহ এত দুঃখ
বহুত তাপিত কৃষ্ণ বিরহে তােমার । ভাবিতে ব্যাকুল চিত্ত হইয়াছে আমার
তােমার মিলন হেতু বসিয়া নির্জনে। তুয়া আগমন কৃষ্ণ ভাবে মনে মনে।
তুয়া আগমন কৃষ্ণ করত সদা আশ। না দেখিয়ে পুনঃ পুনঃ ছাড়য়ে নিশ্বাস
রাধা এল বলে বনে হয়ে চমকিত। পুনঃ পুনঃ কৃষ্ণ কুঞ্জে খুজিয়া ব্যথিত ।
অন্য পথে এসে থাকে এমতি ভাবিয়া। গদ গদ স্বরে কাঁদে তােমা না দেখিয়া
আসিতে নারিল কিবা গুরুজন ভয়ে।
হা রাধে হা রাধে ব’লে অতি গ্লানি হয়ে ।
কিশলয় শষ্যা পুনঃ করয়ে রচন। আকুল হইয়া পুনঃ করে নিরীক্ষণ।
মনে করে দৃঢ় অনুরাগ তীর সাথে। প্রতারিতা গুরুজনে আসিব পশ্চাতে।
লুকাইয়া আছেন কিবা চিত্ত জানিবারে। এই ভেবে চতুর্দিগ নিরীক্ষণ করে
তােমার লাগিয়া কৃষ্ণ বিষাদিত মনে। অত্যন্ত গ্লানি চিত্ত মদনের বাণে ॥
এ দুঃখে দয়া নাহি তােমার অন্তরে। ত্যজি নিজ কুটিলতা চলহ সত্বরে।
এতেক আমরা তােরে বুঝতে নারিল। বড়ই নিঠুর তুমি এবারে জানিল ।
সন্ধ্যা হলাে এবে অস্ত গেল। দিনপতি। তােমার কৌটিল্য যত করিয়া সংগতি
२२
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ
কৃষ্ণ মনােরথ যত তােমার আশাতে।
নিবিড় অন্ধকার হইল অন্ধকার সাথে ।
যেন চক্রবাক দীর্ঘ করয়ে করুণা । তাহার অধিক মাের তােমাতে গ্রার্থনা।
ত্যজি অভিমান কর দ্রুত অভিসার।
কোন কাজ হইতে এত বিলম্ব তােমার ।
এখন বিফল তাের বিলম্ব গমন। অভিসার করিবারে ক্ষণ বিলক্ষণ।
উৎকণ্ঠা তােমার প্রিয় বসিয়া নির্জনে। অত্যন্তমুগ্ধ। তুমি জানিল কারণে।
হেন অন্ধকার সখী কভু নাহি দেখি।
নিকটে থাকিতে লােক নাঞি উপলখি |
এখন আঁধারে যদি কর অভিসার। লােকের গোচর নহে তাহার থাকার
কহি অদভূত কথা তােমার সাক্ষাতে। শৃঙ্গার করিয়া লজ্জা পাইলা যেমতে
সঙ্কেত করিল নারী এক যুবাসনে। তেমতি করিল অরক্ষিত দুই জনে।
যার স্ত্রীতে যে জনার সঙ্কেত হইল। তার নারী উহার পতিসনে তেন কৈল
অন্যের নিমিত্তেতে দেখা আন সনে। এই অন্ধকারে যখ হইল মিলনে।
ভ্রমে নিজ নিজ স্বামী সনে মিলন দাহার।
উ:পতি ভাবে নিজ পতিতে শৃঙ্গার ১
আলিঙ্গন চুম্বন
দর্শন নখাঘাতে।
কামের প্রকাশ কৈল এসকল মতে ।
রমণ করিতে মাত্র দেহে হইল কথা। তাতে হইল জ্ঞান আপন পরতা
এই দুই দম্পতি হেন অন্ধকারে। জ্জা সম্বলিত রস হইল শৃঙ্গারে।
কৃষ্ণের মিলন পাছে হয় অন্য সনে! ভ্রমতে শৃঙ্গার ভাব হয় কোন খানে ।
এই অন্ধকারে সখি নাহিক বিশ্বাস। বিলম্ব হইলে তুমি হইবে নৈরাশ।
প্ৰয়াস করিয়া তােরে পাঠাইল নিতে।
এ নিঠুরতা তােরে না বুঝি করিতে ।
মিথ্যা গোয়াইহ কাল কিসের কারণে।
ত্যজ রূপবতী মতি বিলম্বন মনে।
শ্রীতগােবিন্দ
২৩
হেন অন্ধকারে যাবে চতুর্দিকেছ ইয়া।
কৃষ্ণকে খুঁজিবে ভয়ে চমকিত হইয়া ।
পাছে পাছে পুরুষের ভ্রমে অন্ধকারে।
রয়্যা রয়্যা চরণ চালাবে ধীরে ধীরে ।।
অনঙ্গ তরঙ্গ অঙ্গে গমন হইয়া।
স্থগিত হইবে কোন রহ-স্থান পাইয়া।
সুমুখী রাধিকা তােরে কি আর বলিব।
হেনরূপে তােরে দেখে কৃতার্থ হইব।
অতএব গমন করহ, ত্যজ রােষ। না গেলে পাইবে দুঃখ মোর নাহি দোষ
ইহার অন্তরে সেই চতুর দুতিকা। পুনৰ্ব্বার বনে যাইয়া দেখিল রাধিকা।
বহুদিন হইতে সেই কৃষ্ণে অনুরক্ত। কৃষ্ণের নিকট যাইতে হইল আশক্ত।
তাবনা করেন রাধা লতার কুটিরে। কৃষ্ণেতে মিলন হব কেমন প্রকারে ।
মাের প্রাণনাথ অন্য নারীতে বিহার। কমল নয়নে কৃষ্ণ পাসরিল মাের।
মাের প্রতি ব্ৰজপতি অতি নিঠুরতা। বঁাচাইল প্রীত চিত ছেড়ে গেল কোথ
এতেক বিলাপ রাধা করিল নির্জনে। দুতীকে কহেন কিছু মধুর বচনে।
শুন প্রিয় প্রাণ সখি রাখ মোর প্রাণ। হরিকে আনিয়া দেহ মোর সন্নিধান
এমন কাতর বাক্য শুনিয়া রাধার। কৃষ্ণের নিকট দূতী গেল পুনর্বার।
গগাবিন্দ দেখিল গিয়। নির্জন গহনে। কিছুই উৎসাহ নাহি মদন বেদনে।
রাধা-মুখ পদ্মে নিরন্তর অনুরাগী । রাধাগুণ গান করে হইয়া বিয়ােগী।
হেন কৃষ্ণ আগে দুতী করি বিবরণ। রাধার বিলাপ কথা কহেন তখন।
গীত।
ওহে নাথ শুন রাধার দুঃখ।
বাস ঘরে নব
পল্লব উপরে,
বসিয়া বিষন্ন মুখ ।
২৪ শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ সেই মুখ বিধু, তার মিষ্ট মধু, যেন রতি করেছে গান। তেমতি তোমারে, দেখে সব চাই, নিভৃতে করিয়া ধ্যান । ভস হইয়া, তােমার নিকট, যাইতে কর যে বল। দুই চারি পদ গমন করিতে, পড় ষে হইয়া বিল । কমল বলয়, কঙ্কণ করিয়া, অঙ্গ তাপ করে না। আগুরের তাপ, বিনাশ করিয়া, তুয়া স্পর্শ করি আশ। মনে পুনঃ পুনঃ, করে নিরীক্ষণ, তোমার রাস বিহার। আপনাকে মানে, তােমার আকার, এখন ভাবনা তার। অভিসার কেন, কৈলে ও রীত, যে রসে প্রাণের নাথ। বারে বারে এই, সখীকে সুধায়, করিয়া হা নাথ নাথ। মেঘের সদৃশ নিবিড় আঁধার, দেখে সেই নিতম্বিনী। করত চুম্বন, পুন আলিঙ্গন, কৃষ্ণ আগমন জানি ৪ শ্ৰীশ্রীগীতগােবিন্দ ২৫ তােমার মিল, গমন দেখিয়া, ত্যজিয়া সকল লজ্জা। বিলাপ করিয়া, করয়ে যােদন, হইয়া বাসক সজ্জা। জয়দেব কহে, শুন গিরিধর, তােমার মিলন হইতে। রাধার এতেক, বিরহ বেদন, দূর কর কোন মতে। পুনঃ পুনৰ্বার রাধা বিরহে তােমার। অন্তরে তাপিত হয় কত পরকার। পঞ্চশর বেদনাতে রােমাঞ্চিত তনু। ঘন ঘন শীৎকার করয়ে তােমা বিনু। অন্তরের জড়িমাতে হইল বিকার। ব্যাকুল হইয়া বনে করেন বিহার । বিপন্ন হইয়া রাধা কাম চিন্তা জ্বরে। নগ্ন হইলা তুয়া স্পর্শ রসের সাগরে। সতত তেমমার ধ্যান করি অবিলম্ব। এই হেতু রাধিকার জীবন বিলম্ব । তােমার লাগিয়া রাধা এত দুংখ পান। সংসারেতে ধূৰ্ত্ত নাহি তােমার সমান। তােমার সঙ্গমসুখ করিয়া বাসনা। তােমার লাগি রাখা এত করয়ে ভাবনা কৃষ্ণ আসি দেখি হইবে মিলন। সেই ভাবে অঙ্গে পরে যত অভিরণ। বৃক্ষের পল্লব যদি পড়ে অচম্বিতে। কৃষ্ণ এল বলে শঙ্কা করেন তাহাতে । এইক্ষণে এসে তুমি করিবে শয়ন। সে হেতু পল্লব শষ্যা করয়ে রচন৷ কৃষ্ণ আইলে কত শত করিব বিলাস। ধ্যান করি করে সব এই অভিলাস হয় কত অনুরত এমত প্রকারে। গমন করহ নাথ তাহার গােচরে। তুমি নাঞি গেলে প্রভু সেই বরত। নিশ পার না হইবে তার নিজনু। ইহার অন্তরে চন্দ্র করিল উদয়। তাহার কিরণেতে নিৰ্ম্মল জ্যোৎস্না হয় । তা দেখি কুলটা রমণ না মানে প্রবােধ। কুলটা যাবার পথে হইল বিরোধ অঙ্গের কলঙ্ক অঙ্গ বড় ফুটতর। আকাশ মণ্ডল তাথে শশাভিত সুন্দর।
শ্রীগীতগােবিন্দ দিক্ সুন্দরী সুদে যেন চন্দনের বিন্দু। তেমতি উদয় হইল পরিপূর্ণ ইন্দু। বৃন্দাবন ভিতর সকল হইল আলা। দেখিয়া রাধার মনে মদনের জ্বালা। এই মত উদয় যদি হইল শশধর। কৃষ্ণের বিলম্ব দেখি রাধা চিন্তান্তর। বহুত বিলাপ করে বিবিধ প্রকারে। পরিতাপ করি কঁাদে অতি উচ্চস্বরে। যার এবার আর কার লব হে শরণ। মানিল সখীর বচন। সময় করিয়া হরি কেন না আইলা । এরূপ যৌবন মাের বিফল হইলা । এ রাত্রিতে যার লাগি বাঞ্ছা কৈল বন। সে হেতু হৃদয় বিদ্ধ করিল মচন। বরঞ্চ মরণ মাের ভাল হেন গণি। কেমনে সহিব আর বিরহ আগুনি।। কি দুঃখ কঙ্কণ মণিময় অলঙ্কার। হরির বিরহানলে সে সকল ভার। মাের প্রিয় না ঘটল এ মধু যামিনী। কৃষ্ণ যার সঙ্গে পূর্ণ হয় সে কামিনী। আমার গলার মালা হৈয়া কামবান্। সুকুমার অঙ্গে মাের বিদ্ধ করে প্রাণ। তার হেতু আমার বসতি ঘাের বনে। সে হরি অ মাতে স্মৃতি নাহি করে মনে ॥ জয়দেব বলে রাধা করহ বিলাপ। তােমা বিনে গিরিধর করে অনুতাপ । কেন না আইল কৃষ্ণ আমার নিকট। বুঝিলাম তবে কিছু হয়াছে শঙ্কট। কি অন্য কামিনী সঙ্গে করিল গমন। খেলাতে করিল বদ্ধ কিবা সঙ্গিগণ । অতিশয় অন্ধকার বটে এই বন। পথ ভুলে অন্য পথে করয়ে ভ্রমণ। এই কুঞ্জবনে আসি অতি অল্প পথে । গ্লানি চিত্ত হইয়া কিবা নারিল আসিতে। বেত্ৰলতা নিৰ্মিত অপূৰ্ব্ব কুঞ্জবন ! শঙ্কেত করিয়া প্রাণনাথ মাের সনে। যেন আইলা এই কুঞ্জ এ সব কারণে। আমাকে বিস্মৃতি কিবা হয় তার মনে। এই সব ভাবনা করেন চন্দ্রমুখী। হেন কালে নিকটে আইলা নিজ সখী। কৃষ্ণ আনিবারে যারে যারে পাঠাইল। বিনা কৃষ্ণ একা সখী দেখিতে পাইল ।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ ২৭ কাৰ্য্য না হইলে তাথে বিগ্ন বদন। বলিতে না পারে কিছু স্বরূপ বচন। রাধিকা দেখিয়া পুনঃ সেই সখী মুখ। অভিপ্রায় করে মনে পায় বড় দুঃখ। সেই কৃষ্ণ অন্য নারী সনে কৈল রতি। আমাকে অবজ্ঞা বড় করিল সংপ্রতি । সেই নারী ভাগ্যবতী পুণ্য কৈল কত । আমারে ছাড়িয়া তেই তাথে অনুরত। কিবা দেখে এলে সখি আপন নয়নে। অতি ম্লান মুখ দেখি তথার কারণে প্রশংসা করিয়া কৃষ্ণের নারীগণ। দুতীকে সংবাদ করি বলেন বচন। যে যে নারী সনে কৃষ্ণ করিল রমণে। তাহাদের রূপ গুণ করিয়ে বর্ণনে। কে যুবতী করে রতি ব্ৰজপতি সনে! তার প্রতি গুণবতী নাহি জগজনে । কামযুদ্ধ সমযুদ্ধ কে করিল বেশ। এথা আইল কিছু ফুল মালা বেচা কেশ। হরি আলিঙ্গনে মনে মদনে বিকার। স্তনের উপরে দোলে মণিময় হার। বিচলিত অলকাতে মুখ শােভা পায়। হরিমুআপনে-সুখে অলস জানায়। চঞ্চল কুন্তল গণ্ড স্থলেতে বিরাজে। নড়িতে এখন ঘন কিঙ্কিণী সে বাজে ।। হরি দরশনে লজ্জা পাইয়া পাছে হাসে। কণ্ঠনাদ করে মগ্ন হইয়া রতিরসে অতিশয় কষ্প পুলক মৃদু হাস। ঘন ঘন শ্বাসে হয় কামের প্রকাশ। শ্রমেতে হইল ঘৰ্ম্ম সকল শরীরে ; রতি রণ পণ্ডিত সে পড়ে প্রিয় উরে । জয়দেব কহে রাধে কিবা কর ভয়। তােমা বিনে গিরিধরের আর কেহ নয় চন্দ্রোদয় দেখি রাধা বিরহে জর্জর। চন্দ্র গুণ ব'লে দুঃখে হইয়া কাতর। কৃষ্ণ মুখ পদ্ম যেই বিরহে পাণ্ডুর। তাহার সদৃশ হরি এই শশধর। উদয় করিয়া সেই শীতল কিরণ। যদ্যপি লােকের তাপ করেন খণ্ডন। তথাপি মদন সঙ্গে করিয়া মৈত্রতা। কাশে ব্যথা দিছে মােরে হইয়া দুঃখিত।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ আজি কৃষ্ণ করয়ে রমণ। কমবাণ ইযুরাশি রমণী বদন শশী চুম্বন করিয়া বারে বারে। পুলকেতে সেই মুখে কন্ত রি তিলক লেখে শোভে মৃগ যেন শশধরে । মেখল সম কেশ তাথে করে নানাবেশ সেই কাম মৃগের কানন। বিদ্যুতের সমতুল তাথে দিলা দুটি ফুল যা দেখে চঞ্চল যুগণ ৷৷ মৃগনাভি করিতে মাখাইস ভালমতে কুচ যুগ নিবিড় গহন । থে পরাইল মত কৈল তার সমজ্যোতি নখ চিহ্ন সুধাংশু যেমন || জিনিয়া মৃণাল কত কোমল শীতল হাত করত কমলের দলে। মাকত নিরমিত মলয়া ভ্রমরা মত তাথে নিয়ােজিল কুতুহলে। অতি স্থূল যে জঘন রমণীর নিকেতন মদনের সােনার আসন। তাহাতে কিঙ্কণী দিয়া বহিদ্বারে নিরমিয়া বাসনা করিল পূরণ। চরণ কমল রং অলক্ত-লক্ষণ যুক্ত নমণিগণের পূজিত। বাহিরে প্রাচীর প্রায় দিয়া অনুরক্ত তায় হৃদয়ে করয়ে নিয়োজিত।
শ্ৰীশ্ৰগীতগােবিন্দ ২১ কোন রমণীর সঙ্গে রতি করে নানা রঙ্গে হলধর ভ্রাতা মহাখল। দিবসে বনের মাঝে বসে থাকি কোন কাজে বল সখী বিলম্বে কি ফল ৷৷ তাের আগে কহি কথা যদি বৃষভানু মুতা তব প্রতিফল দিব তার। কবি জয়দেব কয় এই সে উচিত হয় গিরিধরে এত অহঙ্কার। এইমত বনে হরি করেন বিলাস। সেই রাধিকার হৈল বিরহ প্রকাশ। কৃষ্ণ না আইলে তথা মনে পাইবে ব্যথা। সখীরে বলেন পুনঃ অন্তরের কথা যদি না আইল সখী সে ধূর্ত নির্দয়। তাথে দুঃখ না ভাবিহ আপন হৃদয়। 'অনেক নারীর সেই হইয়া বল্লভ। সচ্ছদে রমণ করে আমাতে দুর্লভ । শুন সখী তাহাতে তােমার কি দোষ। আনিতে নারিব তারেই ইহাতে সন্তোষ। দেখি আজি সেই প্রিয় সঙ্গম কারণ। তায় গুণে আকুলিত হয়ে মাের মন ।। তারে আনিবার তরে উৎকণ্ঠিত হইয়া। আপনি কি আমার চিত অঙ্গেতে ফুটিয়া । কুবলয় সম আঁখি দেখিয়া হরির। কিশলয় সে যে নয় তাপিত শরীর। প্রফুল কমল মুখে দিল যেই মুখ। কাম-শরে কিবা তারে দিতে পারে দুঃখ শ্যামের অমৃত সম মধুর বচনে। আলা নাঞি পাব সেই মলয় পবনে। স্থল পদ্ম জিনি হাত পায়ের পরশে। শশীর কিরণে তাপ না পাইল সে যে সজল জলদ শ্যাম অঙ্গে অঙ্গ যায়। বিরহেতে বিদীর্ণ হৃদয় নহে তার ॥ হেমসম বস্ত্র পরাইয়া করে বাস। পরিজন হাসে সেই না ছাড়িব শ্বাস । ত্রিভুবন জন হইতে যুবা শ্যাম রার। তা সাথে কর যাতে পীড়া নাহি পায় শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ জয়দেব কহে রাধে কর অবগতি। নিকটে পাইবে গিরিধর প্রাণপতি । যখন লগয়ে অঙ্গে মলয় পবন। তখন বড়য়ে অঙ্গে মদন বেদন। তাথে হৈতে রাখার অন্তরে হয় তাপ। পবনের প্রতি বনে করিয়া বিলাপ। মলয় পবন তুমি পর উপকার কারক। জগতের প্রাণ কামে আনন্দদায়ক প্রসন্ন হইয়া মোরে পূর্ণ কর কাম। দক্ষিণ হইয়া মােরে কেন হৈলে বাম ।। কৃষ্ণকে করিয়া মাের আগে অণুক্ষণ। হরি সে আমার প্রাণ এই দিবেন। সম্প্রতি রাতে কৃষ্ণ নহে অনুরক্ত। তথাপি রাধার চিত্ত কৃষ্ণেতে আসক্ত হেন চিত্তে নিন্দা করি কহে মৃদু কথা। যে কৃষ্ণ করিল মনে এতেক অবস্থা রিপুর সদৃশ এই সখীর সম্ভাষ। শীতল পবন মােরে যেমন হুতাশ। অমৃত সদৃশ এই চদ্রের কিরণ। বিষ তুল্য সেও মােরে করয়ে দাহন। এতেক নির্দয় কান্ত প্রতি মাের মন। কেন হেন অনুরক্ত হয় অনুক্ষণ। কি করিব কুবলয় নয়নী সমাজে। নিরন্তর তুষ্টকাম করয়ে অকাজে । শুন হে বচন ওহে মলয় মারুত। রাধাকে করহ পীড়া মনে আছে যত ।। ওহে পঞ্চ বাণ প্রাণ করহ গ্রহণ। পুনৰ্বার নহে মাের এ ঘর করণ। যমের ভগিনী তুবি সবার নির্দয়। তােমার ক্ষমাতে আর মাের কিবা হয়। স্বকীয় তরঙ্গে অঙ্গ করহ সেচন। মাের দেহ-দাহ সাম্য হউক এখন। ইহাতেই জানা গেল রাধার আশয়। প্রাণ ত্যাগ করিবারে করিল নিশ্চয় বিরহে অস্থির চিত্ত হইয়া কাম-জ্বরে। অত্যন্ত ব্যাকুল ধনী স্থির হৈত নারে সন্নিপাতে স্নান কৈলে মরণ কেবল। সে হেতু প্রার্থনা করি সুশীতল জল। হেনরূপে পােড়াইল কত কত নিশি। কামশরে জ্বর জ্বর সেই খানে বসি। সেকালে প্রভাতে প্রিয় প্রণত হইয়া। জোড় হাতে স্তুতি করে রাধা আগে লইয়া। যদি কৃষ্ণ নিতজুত করেন বিনয় । তথাপি কুপিয়া রাধা কৃষ্ণপ্রতি কয়।
ঐশ্ৰগীতগােবিন্দ বিভাষ- হে মাধব যাওয়াত না বল কপট সংবাদ যাও তুমি তার ধাম কোমল লােচন শ্যাম যে তােমার হরষ বিষাদ । জাগিয়া রজনী পুনঃ চক্ষু কৈল রক্তবর্ণ পলক নিমিষ ক্ষণে ক্ষণে । হেন অনুমান চিতে যত অনুরূপ তাথে হৃদ হইতে উঠিল নয়নে। কাজরে মণ্ডিত নেত্র চুম্বন করিতে মাত্র ও মুখ মণ্ডল কলকলে। ওহে কৃষ্ণ কহি স্পষ্ট সভাবে অরুণ ওষ্ট অঙ্গের বরণ হৈল ভাল । করি কাম যুদ্ধ কত নখে তনু হইল ক্ষত তাহাতে হইল রতি জয়। এরকত মণ মাঝে সোনার অখির সাজে তেন শােভা তেমতি উদয় । লেগেছে হৃদয় তলে চরণ কমল আলতা। মনমথ পাছে কিবা নব কিশলয় শোভা দেখা দিল বাহিরে সর্বথ। মাের চিত্তে হয় দুঃখ দেখিয়া তােমার মুখ অধরেতে দশনের চিহ্ন। কোন লাজে কহ তুমি কেবা তুমি কেবা আমি তােমার আমার তন্দুমাত্র ভিন্ন। রতিরস কুতূহলে ৩২ শ্রীগীতগােবিন্দ কেবলে তােমারে ভাল ভিতরে বাহিরে কাল বড়ই তােমার নির্দয় মন। হেন অনুগত জনে কাম পীড়া দেহ লনে মােরে কৃষ্ণ না কর বঞ্চন। মারিতে অবলাগণে ভ্রমণ করহ বনে তােমা প্রতি এ কোন রীতি। শ্ৰীবধে তোমার মতি পূতনা প্রমাণ তথি শিশু হইতে নির্দয় চরিত ।। কার সনে করে রতি পােহাইলে সব রাতি প্রভাতে আইলে কোন কাজে। জয়দেব কবিবর বলে শুন গিরিধর তুমি ধূর্ত বুঝা গেল কাজে।। শুনহ ওহে কৃষ্ণ বলি যে তােমাকে। তােমার সমান ধূর্ত নাহি তিনলোকে তােমার সহিত খ্যাত বড়ই প্রণয়। পাছে তব প্রীতি ভঙ্গ মাের প্রতি হয়। এই হেতু তােমারে বলিতে হয় ভয়। তুমি সে দারুণ খল সবারে নির্দয় । বড় লজ্জা পাই আজি তােমারে দেখিতে । বলিতে না পারি কিছু এই তােমার রাতে। পায়ে অলক্ত রক্ত লেগেছে প্রিয়ার। অরুণ বরুণ তাথে হৃদয় তোমার। অন্তরিল তার প্রতি অনুরাগ যত। হৃদয়েতে ভিন্ন হয়্যা হইল নির্গত। কেলে তােমার ভাল কাল তনু যার। কপট করিয়া কেন দুঃখ দেহ আর ইহার অন্তর পুনর্বার সেই সখী। রহ স্থলে যাও রাতে রাধা চন্দ্র মুখী। মনমথ বানে কত জ্বর জ্বর হইয়া। কাতর অন্তর অতি রস না পাইয়া ।। তা’তে হয় অতিশয় বিষ বদন। হরির চরিত চিন্তা করে অনুক্ষণ। কলহ করিতে দুরে বাস কৈল যাইয়া। মানিনী হইল কোপে বিষন্ন হইয়া হেনকালে নিকটে আসিয়া প্রিয়দুতী। বুঝাইয়া কহেন কিছু রাধিকার প্রতি।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ ৩৩ গীত। হে মাধব না কর মান ৷৷ হইয়া মানিনী আপনা আপনি দগধহ কেন প্রাণ ।। মৃদু বায়ু বয় এমতি সময় হার কৈল অভিসার । ইহার অধিক অপর কি সুখ ভুবনে আছয়ে অরি। জিনি তাল ফল অতি গুরুতর পড়িল অচির দিনে। পরশে পরশ এ কুচ কলস বিফল করহ কেনে। বিষাদিত মনে কেন অকারণে কাদিছ বিফল হইয়া। তােমার সঙ্গতি সকল যুবতী হাসিছে নিকটে রইয়া ।। কমনের দল তা’তে দিয়া জল কেন থাক তাতে শুইয়া । নয়ন যুগল করহ সফল হরিকে দেখ চাহিয়া। পুনঃ পুনঃ মনে দুঃখ কর কেনে হেন না করিও আর। মনের বঞ্চিত শুনিতে অমৃত এনহ মোর ।
৩ঃ শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ বলেছি বহুত বড়ই সুন্দর নিকটে তােমারি আসুন সে হরি বলুন মধুর কথা। আপন হৃদয় দুঃখ অতিশয় কি কারণে কর ব্যথা। কথা এই মত এখন কহি যে তােরে। সে শ্যাম নাগর ছাড়িহ সখি তারে জয়দেব বাণী শুন ঠাকুরাণী এমত উচিত নয়। মান দূর কর ভজ গিরিধর যদি তুয়া মনে লয় । পুনঃপুনর্বার রাধা বিরহে তােমার। যতেক যুবতী সব তােমার অন্তর। অতি স্নিগ্ধ কৃষ্ণে জিনি ক্রুর তুমি অতি । প্রণত কৃষ্ণের প্রতি স্তব্ধ অন্তে রহি অনুরক্ত জনে শেষ করিছ যে হ’তে। সমুখ কৃষ্ণের প্রতি বিমুখ যে মতে । শুন রাধে সেই তো বটে উপযুক্ত। তােরে সব বিপরীত ধনি গুন ব্যক্ত । শীতল চন্দন তাের প্রতি যেন বিষ। চন্দ্রের কিরণ ততরে রবির সদৃশ। তােরে হিম অগ্নি সম করয়ে দাহন। রতি জন্য হর্ষ তােরে বহুত বেদন। দেখিয়া তােমার সেই সকল চরিত। জানিল তােমাতে সেই কাৰ্য বিপরীত। ইহার অন্তরে সেই রাধিকা সুন্দরী। অতি স্নিগ্ধ বেশেতে নিবিষ্ট চিত্ত করি। বড়ই নিশ্বাসে মুখ হয়েছে পাণ্ডুর। কৃষ্ণ দরশন লাগি বড়ই কাতর। কামশরে অতিশয় পাইয়া যাতনা। মনে মনে এই সব করেন ভাবনা। পুনঃ পুনঃ নিজ সখী পাঠাইল হরি। না শুনিল তার কথা অহঙ্কার করি। তাহাতে কৃষ্ণের মনে হইয়াছে দুঃখ। আপনার গুণে কৃষ্ণ হইলা বিমুখ । একে কি করিব এই মনেতে করিয়া। সখীমুখ চায় কিছু লজ্জিত হইয়া।
ঐশ্রীগীতগােবিন্দ
হন রাধা দেখে কৃষ্ণ বড় পাইল সুখ। ক্রোধ তাপ জানিল প্রসন্ন দেখে মুখ ।
রাধার মনের ভাব করি অভিপ্রায়। নিশামুখে নিকটেতে আইলাত রায়।
আসিয়া আনন্দে কৃষ্ণ গহ্ স্বরে। এ সব মনের কথা বলেন রাধারে।
শুন হে সুশীল প্রিয়ে ত্যজ অকারণে মােরে মান।
মদন আগুণ হেন
দহে মন অনুক্ষণ
দেহ মুখপদ্ম মধু পান।
কিছু যদি বল কান্তে জ্যোৎস্নার সদৃশ দন্তে
নাশ করে ভয় অহঙ্কারে।
অধর অমৃত হৈতে তােমার বদন চন্দ্রে
লােভি করে নয়ন চকোরে।
আমাতে নাহিক দোষ তবু যদি কর রােষ
হন ত নয়ন সর বাণে।
বাঁধ ছুঁজ যুগ পাশে দনে দংশই রােষে।
কাবাণ লােচন নােচনে ৷
তুমি সে জীবন ধন তুমি মাের আভরণ
তুমি রত্ন এ ভব সাগরে।
তুমি প্রাণ সমতুল
হও মোরে অনুকূল
এই যত আমার অন্তরে।
নীল কমলের আভা তােমার নয়নের শােভা
যেন রােষ রাঙ্গা উৎপল।
যদি হেন কৃষ্ণ অঙ্গ কামভাবে করে রঙ্গ
তবে তার যোেগ্য হয়ে ফল।
স্তনের উপরে কার বিচলিত মণিহার
তাহে হয়ে হৃদয় রঞ্জন।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ
নিবিড় জঘনে ঘন
থাকিয়া কিঙ্কিণীগণ
কাম আজ্ঞা করন ঘােষণ ।
স্থল কমলের দল
জিনি অতি সুশীতল
বুতি রঙ্গে বড় শােভা পায়।
হৃদয় রঞ্জন মাের
হেন পাদযুগ তাের
রণরঙ্গ করি আর তায়।
তুয়া পদ কিশলয়
কাম বিষ করে জয়
ভূষা তুল্য কর মাের মাথে ।
জ্বলিছে আমাতে কত কামতাপ সূৰ্য্য মত
সে সকল সাম্য হউ তাথে ।
দয়া নাহি করে মনে দুঃখ দেহ দীন জনে
বিচারে না পাবে মাের দোষ।
জয়দেব কবি বলে মিছে দুষ্ট লোেক বলে
গিরিধরে না করিহ থােষ।
প্রিয়াকে কহেন কৃষ্ণচন্দ্র পুনৰ্ব্বার। সুশীতল হইয়া কেন কোপের সঞ্চার।
মনে কর অন্য যুবতীর সঙ্গে রতি। আমাতে সম্বর শঙ্কা ত্যজহ সম্প্রতি।
তােমার নিবিড় স্তন নিবিড় জঘন। তাহাতে সতত মোর হরিল চেতন।
কেবল সে কামােদয় আমার অন্তরে। প্রবেশ করেছ গিয়া হৃদয় দুয়ারে।
অনঙ্গ হইতে অন্য কারাে নাহি গতি।
প্রবেশ প্রকাশে এই ওঙ্গে আছে কতি ।
শুন শুন প্রণয়িনী রতির আরম্ভে। যা করিতে হয় সেই করয়ে বিলম্বে ।
যদ্যপি তােমার বাক্যে না হয় প্রতী *। তবে মােরে দণ্ড কর ইহার উচিত।
শুন মুগ্ধ মাের প্রতি আছে তব ক্রোধ।
দয়া করি দুর কর মনের বিরােধ।
শ্ৰীশ্ৰগীতগােবিন্দ
৩৭
নির্দয় হইয়া দম্ভে করহ দর্শন। মাের অঙ্গ উজ্জ্বল তায় করহ বন্ধন।
কঠোর যুগল স্তনে করিয়া পীড়ন। পুনঃ পুনঃ নিজ কোপ কর সম্বরণ।
অতি দুষ্ট কামােদয় চণ্ডা সমান। কালরূপী চোখ ধনুক বিন্ধে পঞ্চবান্।
সেই বাণে পােড়ে প্রাণ যেন নাহি যায়।
কোপ ত্যজি কর রাগে তাহার উপায়।
কায় দেখে চঞ্চল হইয়াছে মাের প্রাণতুমি যে এ সব দুঃখ করহ মােচন ।
কোপযুত তুমি কিবা হও একবার। হও ত যুগ বঙ্কিম তোমার।
সেই ক্রু কাল সর্পাকৃতি ভয়ঙ্কর। আম হেন যুবা জন মােহে নিরন্তর।
সেই কাল দুষ্ট ভয় ভঙ্গিবার যন্ত্র । তােগার অধর সুধা সেই সিদ্ধ মন্ত্র ।
শুন হে সুন্দরী তােমারে কহি যে কথা।
মোন করি মন কথা কেন দেহ ব্যথা।
হাসি হাসি কোমল বচন কহি মােরে ।
তাথে হৈতে বিরহ যাতনা যাক দূরে।
মােরে তুষ্ট করি কর মধুর আলাপ।
কৃপা দৃষ্টি করি দূর করহ স স্তাপ।
বিমুখ হইছ ন হইয়া সুমুখী।
আমারে না ছাড় প্রিয়ে কর মােরে সুখী।
আমি স্নিগ্ধ প্রিয় তাের আপনি উপস্থিত।
এ জনের পরিত্যাগ না হয় উচিত
যদি ত্যাগ কর এই অনুরক্ত জনে। তেমা সম মূঢ় তবে নাহি জাজনে।
বচন অদ্ভুত দেখি যে তােমাতে। বিবণে করে বলি তােমার সাক্ষাতে।
কিবা পঞ্চশর এই মদনের বাণ। তােমার বদনে বিধি কৈল নিরমান।
বান্ধুলির ফুল জিনি সুরঙ্গ অধর। মৌল ফল জিনি গণ্ড স্নিগ্ধ নিরন্তর।
নীল উৎপল জিনি নয়নে প্রকাশি। কুন্দ জিনি দন্ত তিল ফুল জিনি নাসা।
যে মুখ শিরিশ পুষ্প নিন্দিয়া তােমার। সেই বাণে কাম বিষ্মর বারে বার।
।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ
আর এক অদভুত চরিত তােমার। ক্ষীণ হইয়। এত বল বড় চমৎকার।
বড় মদালসা তাের এ দুনয়ন। বদন এমন ইন্দু অতি বিলক্ষণ ।
তােমা মতি সকল লেকের মনােরমা। কলাবতী তোর রতি অতি অনুপমা
কিবা ধরিয়াছে রম্ভা তাের দুই উরু । বড়ই শূন্দুর চিত্রলেখা দুই ভুরু ।
শুন ধনি ক্ষী হইয়া এত তোর বল। অঙ্গেতে বহিছে সব যুবতী সকল !
এ বড় আশ্চর্য্য কথা শুনিতে বিচিত্র। পৃথিবীতে এসে তোর দারুণ চরিত্র।
একদিন বেশ ক'রে সেই হৃষীকেশ । কুঞ্জবন মাঝে মাঝে করিল প্রবেশ
এই কুঞ্জে প্রবেশ করিয়া ব্ৰজরাজে। পুনরপি চুতী গিয়া কৈল তার কাজে।
দষ্টিলােক অন্ধকারে প্রথম রাত্রিতে।
হেন কালে দূতী গেল। রাধার নাক্ষাতে ।
বহুত দিবস হতে করিযা বিনতি। রাপিকাকে সন্তুষ্ট করিল সেই দুতী ।
অঙ্গে অঙ্গে পরে রাধা নানা অভিরণ । কৃষ্ণের অ•াপ্তি দু:খ হইল তেয়াগণ
অতি আনন্দিত মতি রতি ভাসে।
সখী সনে থাকে বনে হাস্য পরিহাসে।
হেই সময়ে সখী কহেন বাপারে।
কৃষ্ণের নিকটে অভিসার করিবারে ॥
চল চল চল হরি সন্নিধানে ।
কাতর বচনে হরি বহুত বিনতি কার
পদ যুগে করয়ে বিনতি।
মঞ্জুল কুঞ্জের মাঝে
নিরমিঃ কেলী সেবে
সম্প্রতি করিল অবস্থিতি।
নিবিড় জঘন তব কুচ তাের গুরুত।
ধীরে ধীরে করহ বিজয়।
চরণ যুগলপর
মণিময় নুপুর
কর হংস গতি পরাজয় ।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ
৩৯
মােহ এত ধ্বনি সব
মধুর কৃষ্ণের রব
শুনিয়া করহ পৃত পিকে।
অনিবাৰ্য মাের বাণ ভজ কান্ত ত্যজ মান
কামাঙ্কুর বুঝাহ পিক মুখে।
বায়ুতে চঞ্চল পাত তাহাকে করিয়া হাত
কুঞ্জের এ সব লতাগণ।
হেন বুঝি গতায়াতে ডাকিছে তোমাকে নিতে
ত্যজ সখী বিলম্ব গমন।
মদন তরঙ্গ হইতে কুচকত হইয়া তাথে
সূচায় রমণ হরি সাথে।
কুচকুন্ত আপনার
তাথে সুধা তুষার ধার
জলধার সমহার ৩াথে ।
বতিরণ সজ্জ রঙ্গে কর নিজ সখী সঙ্গে
তুমি পরবীণ রতিরণে ।
কিঙ্কিণ ভিওিমি বাদ্য বাজাইয়া চল সদ্য
ত্যজি সব লাজ এইক্ষণে
ধরিয়া সখীর হাতে লীলায় চলহ সাথে
লইয়া পাঁচ লাখ কামান।
বলয়ার ধ্বনি করি আহ্বান করিয়া হরি
রণে মাগে সেই তােমার স্থান।
রাজার নন্দিনী হইয়া
সখী সেনাগণ লইয়া
রণেতে কাতর অপযশ।
কবি জয়দেব কয়
যাইয়া কর রণ জয়
দেখ গিরিধরের সাহস ||
৪ ০ শ্রীগীতগােবিন্দ সেই সখী ঝুঝাইয়া বলেন পুনৰ্ব্বার। কৃষ্ণের বিশিষ্টগুণ যত আছে আর ।। শুন সগী উৎকণ্ঠা হইয়া সেই হরি। চিত্ত দ্রুম হইয়া বলে তােরে নমস্করি। সেই রাধা নিকটে আসিয়া আমা দেখে। দেখিয়া মদন কথা বলে নানা সুখে প্রলাপ করিয়া করি করে আলিঙ্গন। অতি প্রীতে মাের সঙ্গে করয়ে রমণ। তমাল বনে বৈসে অতি অন্ধকারে। নিকুঞ্জে বসিয়া সেই রহে তাের তরে । আকুল হইয়া হরি এ সব চিন্তাতে। নিরন্তর তােমারে দেখিযে চারি ভিতে।। দেখে পুলকিত হয় দেখে আনন্দিত। পুনৰ্বার অপসন্দ হয় আচম্বিত । রাধা এল বলে উঠে করয়ে গমন। তােমা না দেখিয়া মূচ্ছা হয় ঘনে ঘন। অতএব গমন করিতে কর মতি। যাত্রা করিবার যােগ্য এই ভাল রাতি। অন্ধকারে যাইতে বেশ করহ উচিত। কাল কাল অক্ষরে হও বিভূষিত ৷৷ দুই চক্ষু অঞ্জনেতে করহ রঞ্জন। শ্রবণে তমাল গুচ্ছ কর নিয়ােজন। নীল নীল মলি লইয়া নিজ শিরে। কস্তুরীর পত্র লও কুঞ্জের উপরে শুন সখী সর্বব্যাপী এই অন্ধকার। প্রতি অঙ্গ আলিঙ্গন কর যে প্রিয়ার নীল নলিন বর্ণ নিচোল হতে সে সুন্দর। প্রিয় স্থান যেতে সে সুখ নিরন্তর যে ধূর্ত সকল করে নারীকে বঞ্চন। অভিসার করিতে সত্বর যার মন তার প্রতি সুখ দাতা এই অন্ধকার। কার ঠাঞি কদাচিত কর অভিসার। অতএব কুঞ্জেতে না কর বিলম্ব। কৃষ্ণ স্থানে গমন কর ত্যজ দম্ভ। একথা শুনিয়া রাধা করে অভিসার। তাথে কিবা হইল শােভা ঘন অন্ধকার মজুরী সহিত তমালের দলচয়। তাথে হৈতে নীলবর্ণ অন্ধকার হয় || আর দেখ কুঙ্কুম সদৃশ গৌর অঙ্গ। হেন অভিসারিকা নায়িকা হেন রঙ্গ। তার দেবাশয়ে রেখা প্রায় হইয়া। সেই অন্ধকারে পুন মিলিল আসিয়া। যেন সােণা কসিবারে কৃষ্ণবর্ণ শিলা। তাথে হেম রেখা প্রায় বিস্তার হইলা অভিসার করে রাধা এমত প্রকারে। সখীগণ সঙ্গে লইয়া কৃষ্ণ অনুসারে। আনন্দে মগন হইয়া নাচে উচ্চ মুখে। কুঞ্জের দুয়ারে প্ৰেলা মনের কৌতুকে ।
শ্রীশ্রীগীতগোবিন্দ ৪১ তাথে অলি করে কেলী হইয়া মনলােভা। রাধার গমনে দ্বার কিবা হইল শােভা। হাবের মধ্যেতে আছে মণিগণ যত। কচলির হেম ডােরে মণি আছে কত কনক নূপুরে গেহ মনিতে রচিত। করের কঙ্কণ মণিগণেতে জড়িত। এ সব অঙ্গের ছটা তাহার ছটায়। করায় বহুত দীপ্ত দিন কয় প্রায়। এমন সুন্দর এই নিকুঞ্জ ভবন। তাহাতে আছেন কৃষ্ণ মদন মােহন। তার দ্বারে যাইয়া সেই বৃষভানুতা। কৃষ্ণচন্দ্রে দেখে বড় হইল লজ্জিত। ইহার মধ্যেতে রাধার প্রিয় সখী। সেই প্রিয় কথা কহে লজ্জাযুত দেখি। এই কুঞ্জে করহ বিলাস। প্রবেশ করহ রাধে মাধবের পাশ । সুন্দর নিকুঞ্জ তলে যেই কেলি বাসে। হাস্যমুখ হব তাের রতি রভসে । লই শয্যা কৈল নব অশােকের দলে। তরল করহ হার কুচকুত্ত স্থলে। কুসুমে রচিত কৈল সেই বাস (গহ। যেন ফুল হ’তে তাের কমলের দেহ । সুশীতল মলয় পবন বহে যা’তে। রতি যুগ সুললিত গান কর তাতে। এ ঘর নিবিড় বহু নবলতা দলে। যাইয়া জঘন নিজ করহ সফলে । যেই কুঞ্জে মধু খাইয়া গান কবে অলি। কমিশরে রসবতী কর যাইয়া কেলি শিশুগণ সুমধুর করয়ে নিনাদ। দাড়িম্ব দশন ধনি ঘুচাহ বিষাদ । লাজ তাজি মিলন করহ কুঞ্জ ঘরে। জয়দেব কহে তুষ্ট কর গিরিধরে। ইহার অন্তরে সখী রাধার সম্মুখে। রাধাকে বিষন্ন দেখি কহেন কৌতুকে তাের উচ্চ কুচ আর নিতম্ব গুরুতর। এই ভাব হেতু তাের গমন মন্থর। হেন তাের অঙ্গ কৃষ্ণ বহুদিন হইতে। হৃদয়ে রহিতে বড় শ্রান্ত হইল তাতে কন্দর্প হইতে পুনঃ বড়ই তাপিত। বহু শ্রমে এই তাপে হইল। পিপাসিত । অমৃতে পূরিত রাধে তাের বিষধর। পান করিবার ইচ্ছা যায় দামােদর। সেই হেতু কৃষ্ণ বক্ষে করহ শােভন। হাসিতে অমৃত দিয়া সুখী কর মন ।। যদি বল অভিপ্রায় না জানি ইহার। কেমনে কৃষ্ণের কোলে প্রবেশ আমার এই সব সঙ্কোচ করহ যবে মনে। সমাধা করি যে তার এন সাবধানে।
২ ঐশ্রীগীতগােবিন্দ তাের ভুরু আক্ষেপণ সেই মহাধন। তাতে কিনা দাস তুল্য করেছ সে জন! নিত্য তোমার পাদপদ্ম করয়ে সেবন। হেন ক্রীত জনেতে সন্ত্রম অকারণ এ সব সখীর কথা শুনে সেই রাধা। উছলিল চিত্ত তার মনে গেল বাধ । সাধ্বস সহিত চিত্ত আনন্দিত হইয়া। মণিময় নুপুর চরণেতে পরিয়া গােবিন্দ দর্শন লাগি তরল লােচন। প্রবেশ করিল রাধা নিকুঞ্জ ভবন। শ্রীরাধা নিরখ হরিরূপ শােভা। হরষিত বদন মদন করি মানস রাধা রাত রসলােভা নিরখিতে বৃকভা সুতামুখ বিকশিত উপজিল মনে অনঙ্গ। যেন বিধু-মণ্ডল দেখিয়ে *য়ােনিধি বাড়ল মদন তরঙ্গ। অতি লম্বিত নিরল মুকুতা ফল-হার উপর ঔরূ মাঝে। যেন যমুনার জল উপর সুললিত কুচতর ফেন বিরাজে । শ্যামল বরণ কলেবর কোমল পীতবসন কটিদেশে। যেন নীল নলিন মূল কৈল বন্ধন প্রীত পরাগ অশেষে ॥ তরল কটাক্ষ হইতে খণ্ডন অরুণ বরণ রতি রাগে। যেন কমবে শােভে সুন্দর খঞ্জন শারদ সরোয়ে ভাগে।
ঐশ্রীগীতগােবিন্দ ৪৩ কন্টক সীদৃশ মুখ কমলের কিবা পয়কাশ কর কি সুন্দর কুণ্ডল শােভা। ঈষৎ হাস্যাধর করি উলসিত রাধা রতি রস লােভা। জলধর মাঝে উদয় শশি কিরণ তে কুল কুণ্ডল জালে। তিমির হইতে কিব উঠিল শশী মণ্ডল চন্দন তিলক কপালে । অতি পুলকে তনু আওল রতি রণ কাজে। মণিগণ কিরণ হইতে অতি উজ্জ্বল ভূষণ সুন্দর সাজে। শ্রীজয়দেব ভণিত শুন সুন্দরী ত্যজহ সাধ্বস লাজে। গিরিধর সহিতে রিষে কর রতিরস কুঞ্জ নিকেতন মাঝে। ইদানী সে প্রিয়তম দর্শন সময়ে। রাধার নয়নে কত হর্যে অশ্রু বহ। দুই নয়নের অন্ত হইতে ডিঙাইয়া। কর্ণসপ পর্যন্ত গমন করিয়া । গমনের প্রয়াস হইতে অশ্রু যত। বড়ই তরল হইয়া পড়ে তার মত । ধৰ্ম্ম জল পড়ে যেন শ্রমের কারণে। হর্ষ জল পড়ে তেন কৃষ্ণ দরশনে ॥ সেই রসে গৃহে কৃষ্ণ কুসুম শষ্যাতে। রতিরস পাশে বাস করেছে তাহাতে সেই শষ্যা নিকটে রাধার অভিসার। প্রিয় মুখ দরশন করে বার বার। রাধার সঙ্গেতে আছিল প্রিয় সখী। কৃষ্ণ কহে রাধা লইয়া যাবে হাস্যমুখী কর্ণকও ছলে হাস্য করি নিবারণ। ঘর হৈতে বাহির হইল। সখীগণ । কৃষ্ণ কহে একা রাধা থাকে কুঞ্জ ঘরে। এক দৃষ্টে কৃষ্ণ মুখ নিরীক্ষণ করে ৪৪ শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ নয়ান কটাক্ষ বাণ করে আরােপণ । এমন সুন্দর সেই কৃষ্ণের বদন। দেখে সেই মুখ করি রাত রণ সজ্জা। লজ্জাযুত রাধিকার দূরে গেল লজ্জা সখীগণ গেলে রাধার লজ্জা মন্দ হয়। নির্ভয়ে কামের শরে রসের উদয় ॥ সেই অভিপ্রায় হয় মন্দ মন্দ হাস। তাহাতে হইল ফুট অধর উল্লাস। নবীন পল্লব শয্যা হইয়াছে বিস্তার। অর্পিত করেন দৃষ্টি তাতে পুনর্বার হেন রাধিকারে দেখে সরস মানস। তাহাতে কহেন কৃষ্ণ বচন সরস। গীত। রাধা এক তিলে দেখ মােরে। আসি নারায়ণ শরণ লনু তােরে ॥ নবীন পল্লব করাহ প্রবেশ ওপদ কমল দ্বয়। তোমার পায়ের অরি কিশলয় যেন পরাভব হয়। কর-সরসিজে পূজি তুয়া পদ তােমারে আনিল দ্বারে। শয্যার উপরে নূপুর সদৃশ তিল আধ কর মােরে। মুখচন্দ্র হইতে কথা সুধাসম বল হয়ে অকুণ। স্তন উপরের খুচাই বসন বিরহের সমতুল। মাের রতি রসে যেন পুলকিত ও দুর্লভ হয় পয়ােধর। মাের উরে রাখ সে কুচ কলস কাম তাপ দুর কর।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ ৪৫ বাঁচাহ অধর- সুধারস দিয়া মৃত সম এই দাসে। বিরহ-আগুণে দহে মোর তনু মন গেল তোর পাশে পিকু শব্দে মোর শ্রবণ বিকল তাতে কর কণ্ঠ নাদ। শুন শশিমুখী বাজাইয়া কিঙ্কিনী দূর কর অবসাদ। অামাকে দেখিতে তােমার নয়ন মুদিত হয়েছে লাজে। মিছা কোপ করি হইয়াছ বিকল ত্যজ দুঃখ রতি কাজে। জয়দেব কহে শুনহ সুন্দরী তাের কুচ অপম। কর ধরি হরি করল উজল গিরিধর নিজ নাম । এই রতি আরম্ভের মধ্যে বিপ্ন যত । উত্তরে উত্তরে ক্রীড়াবৃদ্ধি হয় কত ৷ যদি বল কিসে হৈতে কোন বিপ্ন হয় । প্রত্যেকে প্রত্যেকে বলি শুনহ নিশ্চয়। প্রথমে যে করিতে নিবিড় আলিঙ্গন । পুলক অঙ্কুর তাথে সেই বিঘ্ন হয় । ষে ক্রীড়ার রসের অভিপ্রায় বিলােকন । তাথে সেই নয়ানে নিমিষ ঘনে ঘন।
শ্রীশ্রীগীতগােবিন্দ
যে অধর সুধা পানে কথা বিচলিত।
সেই কাম-লতাতে আনন্দ হয় চিত৷
এই যা’তে যা’তে বিঘ্ন হইছে প্রকাশ।
সেই সেই বিঘ্ন হইতে পরম উল্লাস।
ক্রীড়াতে বহুত প্রেম বিলাস বহুত । বিঘ্ন হইতে জন্মাইল এই অদ্ভুত।
লােকে বলে সেই বিঘ্নেবন্দনাদি হয়। নানা ক্রীড়া বিশেষের কর যে সঞ্চয়
কুচ যুগে পীড়া পাইয়া রাধা যায় হাথে। অধর কর যে ক্ষত দশন আঘাতে
নখর আঘাতে সকল শরীর হয় ক্ষত। নিতম্ব দেশেতে করে পুনঃ পুনঃ হত
কেশ আকর্ষিয়া দেহ করয়ে লম্বিত। অধর অমৃত দিয়া কর যে মােহিত ৷৷
হেন অবস্থাতে কান্ত কোন তৃপ্তি পাইল।
নিজ অঙ্গে পীড়াতেই কিবা মুখ লইল।
এই বড় আশ্চর্য শুনিতে চমৎকার। মদনের বামাগতি বটে সারােদ্ধার ।
রতি কেলি মহাযুদ্ধ তাহার প্রথমে। কান্তজয় নিমিত্ত রাধিকা সংভ্রমে।
কৃষ্ণের উপরে কৈল ভর্তাকে রাধিকা।
সেই হেতু নাম তার স্বাধীন ভর্তৃকা।
নিজ অঙ্গ ভূষা হেতু বাঞ্ছা করে মনে।
রতি শান্ত কান্ত প্রতি বলেন বচনে।
গীত।
রাধা সরস জানিয়া নিজপরি।
আনন্দ বাজারে কত
রতি করে নন্দ মৃত
সেই কালে বলে তার প্রতি।
যদু নন্দন শুন
চন্দন হইতে দুন
শীতল তােমার দুই হাতে।
মাের দুই কুচতট
কামের মঙ্গল বট
মৃগ মদ পত্র দেহ তাতে।
শ্ৰীশ্ৰগীতগােবিন্দ ৪ অলিকুল জিনে কাল কজ্জল উজ্জল ভাল গড়েছে ও অধর চুম্বনে। সুন্দর করিয়া সেই উজল করহ এই কামবাণ লােচন মােচনে। কুরঙ্গ সদৃশ নেত্র তার দরশনের ক্ষেত্র এই মোর সুস্তন মণ্ডল। তাহাতে পরহ আসি মদনের দুটি কঁসি মণিময় মকর কুণ্ডল। কম জিনিয়া মুখে তার উপর সম্মুখে অলঙ্কার করহ সাজন। যেমন ভ্রমরগণ তাথে কর বিচরণ যেন ২খে হাসে সখীগণ আমার ললাট শশী বড়ই শােভার রাশি ঘুচাহ ইহার শ্রম জল। করি তিলক পঙ্গ দিয়া কর সকলক মনােরথ করই সফল। আমার কচির কেশ তার কর নানা বেশ মদনের ধ্বজের চরি। এলাল করিতে রতি ফুলশর দিয়া তথি ময়ুর পুচ্ছ দেহ তটুপর । জঘন নিবিড়তর সরস সুমনোহর কাম-করি-বরের আদর। ইহাতে যতন করি পরাহ বসন হরি আভরণ কিঙ্কিণী সুন্দর।
3৮
শ্ৰীশ্রীগীতগােবিন্দ
জয়দেব বলে বাণী
শুন রাধা ঠাকুরাণী
সীমা নাঞি ভাগ্যের তােমার।
হইল বড় তাের যশ
গিরিধরে করি বশ
ত্রিভুবন জন রস যার।
বড় বশ হইলা কৃষ্ণ তার প্রেম রসে। পুনৰ্ব্বার বলে কৃষ্ণ সুমধুর ভাষে।
মৃগমদ পত্র হে মাের কুচ স্থলে। ভাল করে চিত্র কর আমার কপালে ।
জঘনে ঘটাই মাের কনক কিঙ্কিণি। মালাতে কেশের বেশ করহ আপনি
দুই করে পরহ বলয়া দুই স্তন। দুই পায়ে নূপুর করহ আরােপণ |
রাধিকা বলিলা যদি সৰ বচন।
শুনিয়া হইলা কৃষ্ণ আনন্দিত মন ।
ত্রিভুবনের পতি অতি পিরীতের রসে। হইলা অধীন রাধিকার প্রেমরসে ।
যেই খানে যে বেশ করিতে যে বলিল ।
অতি প্রীতে পীতাম্বর সে বেশ করিল।
ইহার অন্তরে জয়দেব বিলক্ষণ। এ সব কৃষ্ণের লীলা করিলা বর্ণন৷
দৈন্য ভাবে আপনি বলেন মহামতি।
কৃষ্ণ ভক্ত রসিক উত্তম জন প্রতি ।
সঙ্গীত শাস্ত্রেতে যে যে করিল বিধান।
স্বর গীত নানা ভেদ রাগ ভাল মান।
এ সকল গান্ধর্ব গানেতে নিপুণতা।
এই যে হইল কিছু ইহাতে কবিতা।
আর এক ভগবান্ কৃষ্ণের বিষয়ে।
লীলা অনুসারে ধ্যান করিল নিশ্চয়ে।
আর তার ব্রজ শীলা অতি প্রেমরসে।
শৃঙ্গার বর্ণন সে করিল বিশেষে।
আমি সে পণ্ডিত জয়দেব নামে কবি ।
কৃষ্ণে অাত্মা সমপিয়া কৃষ্ণ পদ সেবি।
শ্রীগীতগােবিন্দ
শ্রীগীতগোবিন্দে বর্ণিল এই সব।
রাধা মাধবের কেলি কলার বৈভব।
মহা বুদ্ধিমন্ত তেই কৃষ্ণ ভক্তগণ।
আনন্দিতে এই সব করহ শােধন।
কৃষ্ণভক্তি-বসে চিত্ত সদাই মগন।
ভাল মন্দ বিচার করিতে বিলক্ষণ।
শ্রীকৃষ্ণ কথাতে তােমাদের সদা রতি।
অতএব এই কাব্যে করিবেন মতি।
রচনা করিল জয়দেব মহাশয়।
এই কাব্য শৃঙ্গার মােহন মন্ত্র হয়।
এ জগতে সেই মন্ত্র উদয় যাবত।
নিজ নিজ গুণ সবে ত্যজহ তাবত।
সুমধুর মধুর লীলা হইব তোমার।
সাকার হইবে তুমি কাকড় আকার ।
স্বাদুমুখ্য ভাই দ্রাক্ষা কে তােমা দেখিবে।
অমৃত তােমারে মৃতবৎ হইবে ।
রসাল তাবত কাল ক্রন্দন করিবে।
রসিক ভকত জনে ক্ষীর নীর বুঝিবে :
নিরন্তর সুধাসম তুমি কান্তা-ধর।
আহ ধরণী তল তাবত সত্বর
এই জয়দেব কবিতা সর্বসার।
ইহা হৈতে মধুর কোথাও নাহি আর।
সুধা সম শ্রবণে স্মরণে খণ্ডে পাপ।
গানে মুগ্ধ ত্রিভুবন যায় মনস্তাপ।
শ্রীগীতগােবিন্দ
হেন জয়দেব কাব্য রচনা সংস্কৃতে।
ভাঙ্গিয়া করিল আমি সকৃত প্রাকৃতে।
এই দোষ ক্ষমিবে শ্রীকৃষ্ণ ভক্তগণ।
বৈষ্ণবের আজ্ঞা হেতু আমার বচন।
সমাপ্ত করিল গজ ইক্ষু রস সােমে।
কৃষ্ণপক্ষে আষাড়ের দিবস পঞ্চমে।
পটের তৃতীয়ে কর মধ্যেতে আকার।
সেই নদীর নিকটে কেবল পূৰ্বধার ।
ইন্দ্রের বাহন পরে দময়ন্তী পতি।
বিরচিল সেই গ্রামে করিয়া বসতি।
ইতি গীতগােবিন্দ মহাকাব্যে প্রাকৃত ভাষায়াং স্বাধীন ভর্তৃকা
বর্ণনে সুপ্রীত পীতাম্বর নাম দ্বাদশ সর্গ।
মহাত্মা শ্রীমৎ বিহারী লাল রাম মহােদয়ের
সপিণ্ডকরণ বাসরে তদীয় মহাপ্রস্থান
জনিত স্মৃতি-সম্বর্ধনা।
(১)
হে দেব, ভক্তির মূর্তি খুল্লতাত মম,
একটি বছর হলাে, গিয়াছ ছাড়িয়া ;
মনে হয় দশ দিক যেন অন্ধতম ;
অন্ধকারে আছি পড়ে তােমা না দেখিয়া ।
(২)
জ্ঞানের প্রদীপ জ্বলি ভক্তি-স্নেহ দিয়া
চাইতে আমাদের মনের আন্ধার;
তােমার শ্রীপদাথুজে নয়ন রাখিয়া
শুনিতাম ভক্তি-কথা বিবিধ প্রকার।
(৩)
একটি বছর হলাে সে পুণ্য-মুরতি
হয়েছেন আমাদের নেত্ৰ-অগােচর।
তথাপি সে সমুজ্জ্বল শ্রীঅঙ্গ-ক্ষুরতি,
মানস-মুকুরে বিরাজিত নিরন্তর।
[ ২ ]
( 3 )
একটি বছর হলাে যদিও এখন
নীরব হয়েছে কণ্ঠ মধুর গম্ভীর,
তথাপি ঝঙ্কার তার করি গো শ্রবণ ;
ওহে দেব দয়াময় প্রেম-ভক্তি-বীর
(৫)
তােমার সে পুণ্য-বাণী পরশি শ্রবণে
জাগাইত আমাদের পুণ্য ভাবচয় ;
আজি কিন্তু সেই সব তব অদর্শনে
শুধু মাত্র হইয়াছে স্মৃতির বিষয়
ভীষ্মের মতন তুমি ছিলে এ ধরায়
সেইরূপ স্থিতপ্রজ্ঞ, কর্মী, স্বার্থহীন,
সেইরূপ সুপ্রতিজ্ঞ কৰ্ত্তব্য-নিষ্ঠায়,-
সেইরূপ গৌরবাহ ;-অথচ সুদীন।
ছিল না অভাব কিছু,—তবু দীন ভাবে
জীবনের প্রতি দিন যাইত তোমার ;
কত সদগুণ লয়ে এসেছিলে ভবে,
ছিলে তুমি শত শত গুণের আধার।
(৮)
অজ্ঞ মােরা বুঝি নাই কত গুণ-খনি
ছিলে তুমি ভক্তবীর মানব সমাজে ।
[ ৩ ]
খনি মাঝে থাকে যথা লুক্কায়িত মণি
ছিল কত গুণরাশি তব চিত্ত-মাঝে।
তােমার গম্ভীর মূর্তি, গম্ভীর প্রকৃতি
স্মরণে জাগায় হৃদে গৌরবের ভাব,
মরণেও হয় নাই তাহার বিকৃতি ;
আকারে অঙ্কিত ছিল তােমার স্বভাব।
(১০)
প্রীতির নয়নে তুমি দেখিতে সবারে,
ঈর্ষা দ্বেষ তব চিত্তে না পাইত স্থান ;
সবাই পূজিত তােমা প্রতি-উপহারে ;
লভিতাম তব পাশে প্রীতির সন্ধান।
(১১)
কৰ্ম্ম-যােগ-জ্ঞান-ভক্তি সাধনের ধন,
বিকশিত হেরিতাম তােমাতে সতত ;
তুমি ছিলে আমাদের সর্বস্ব সম্বল,
লভিয়াছি নিরন্তর শিক্ষা শত শত।
(১২)
কিবা কৰ্ম্ম কিবা জ্ঞান কিবা ভক্তি, ধ্যান,
সর্ববিধ সাধনায় ছিলে তুমি ব্ৰতী ;
সর্ব সামঞ্জস্য পূর্ণ ছিল তব প্রাণ
সকল বিষয়ে তুমি ছিলে সম কৃতী।
-
[ ৪ ]
(১৩)
সত্যব্রত, সত্যে স্থিত, সদা সত্যসার
সত্যের সেবক তুমি ছিলে নিরন্তর ;
প্রগাঢ় সত্যেতে গড়া জীবন তোমার,
সতত্য বিরাজিছ তুমি, নেত্ৰ-অগােচর।
(১৪)
সৎচিৎআনন্দময় অমৃতের ধাম
সিন্ধ ভক্তগণ-লভ্য নিত্য নিকেতন,
তথায় লভেছ দেব তুমি গাে বিশ্রাম
লীলা রসময় সেই বৃন্দা-কানন।
( ১৫)
দেখিতেছ এবে বুঝি যমুনা-লহরী ?
যাহার শ্যামল তটে শ্যামল সুন্দর
রে ধরি ব্রহ্ম-বেণু মধুর মুরলী
আকর্ষয়ে প্রেমিকের চিত্ত নিরন্তর।
(১৬)
আমরা বুঝি নেহারিছ কৃষ্ণলীলা স্থান
তব প্রিয়তম কবি জয়দেব বর্ণিত
সুচির-বাঞ্ছিত তব সেই সুধা-গান
বরষে কি কর্ণে তব গােবিন্দ-চরিত?
(১৭)
নিবীড় জলদ-জালে মেদুর গগন,
শ্যামলিমা বনভূমি শোভে ফলে ফুলে ;
দেখিছ কি এবে শ্যাম তমালের বন
রহঃ-কেলি যুগলের কালিন্দীর কুলে?
(১৮)
দেখিতেছ বুঝি তুমি বসন্ত-বৈভব
কবিবর-বিবরিত শ্ৰীবৃন্দাকাননে ?
জয়দেব কবি কুঞ্জে—সে কাব্য গৌরব,
ললিত লবঙ্গ লতা-নৃত্য সমীরণে।
(১৯)
মধুকর-কম্বিত সে কুঞ্জ-কুটীর
অলিকুল-সঙ্কুলিত কুসুম-বাহার
মধুর কোমল সেই
মৃদুল
সমীর
সুগন্ধি কুসুমগন্ধে চিত্ত-চমৎকার।
(২০)
নিতে বাসিতে ভাল যে সব ঘটন
গীতগােবিন্দ গ্রন্থে হয়েছে বর্ণিত ;
এবে বুঝি নিত্য তাহা কর নিরীক্ষণ
হয়েছে সফল বুঝি সে চির-বাঞ্ছিত ?
[ ৬ ] (২১) মগন্ধ-বুদ্ধ মধুকরের গুন, কুসুমে কুসুমে বসি বসন্ত বাসনে, চুতের মুকুল প্রিয় কোকিল কুজন শ্রবণে পশিছে নিত্য মধুর ঝঙ্কারে। (২২) এহেন আনন্দময় বৃন্দা-কাননে রাধাকৃষ্ণ রাসলীলা, তাহে রাধা-মান- যাহা তুমি মহানন্দে করিতে শ্রবণ ; এবে পাইতেছ তার প্রত্যক্ষ সন্ধান। অভিসরি, বাস সজ্জা উৎকণ্ঠা-বৰ্ণন, বিপ্রলা খণ্ডিতাদি সে দুর্জয় মান ; এবে করিতেছ বুঝি প্রত্যক্ষ দর্শন। প্রেমিক-সমাজে তুমি অতি ভাগ্যবান্ ; (২৪ ) গীতগােবিন্দ-গ্রন্থ-আস্বাদন-তরে ছিল তববলবতী তৃষ্ণা অবিরাম, মুল টীকা অনুবাদ বিবিধ প্রকারে প্রকাশ করিয়া পূর্ণ কৈলা মনস্কাম।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.