Makardah Saraswat Library, Howrah
Santaner Charitra Gathan Ed. 2nd
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
RARAQWAT LIE fundit
HAKARDASHURRAH.
-gI8.
A
Library Book.
(D. P. P's No. 3 Y.B. Dated The 30th July, 1919.)
সন্তানের চৰিত্ৰ গইন।
শ্ৰীসতীশচন্দ্র চক্রবর্তী প্রণীত।
"Reader, believe me when I predict whoever
has a heart and neglect these sacred duties will
long shed bitter tears over his mistake and will
never find consolation for it."-Rousseau.
পাঠক, আমার এই ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করুন, যে কোন
হৃদয়বান্ ব্যক্তি এই সকল পবিত্র কর্তব্যের প্রতি অবহেলা
প্রদর্শন করিবেন, তিনি তাঁহার এই ভুলের জন্য দীর্ঘকাল
অশ্রুপাত করিয়াও কখন সানা পাইবেন না।-রুসস।
দ্বিতীয় সংস্করণ।
আদর্শ পুস্তকালয় ;
পুস্তক প্রকাশক।
১১ মুকিয়া স্ত্রীট, কলিকাতা।
।
সাধারণ সংস্করণ
সৰ্বস্বত্ব সুরক্ষিত।
মূল্য-{
{জ সংস্করণ
প্রকাশক- শ্ৰীশরৎচন্দ্র ব্রহ্ম। সুকিয়া ৪টি, কলিকাতা। PR NTED BY AMIRTA LAJL SIRCAR KATTAYANI M's. PRESS. 39-1 Shibnarayan Das's Lane, Calcut!
QARUVALLIL TIARA
.101
MAKARUA -TIBET DAHL
আমি এই গ্রন্থে মেীলিকতার দাবী করি না। কতিপয়
পাশ্চাত্য মনীষীর সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থে এবিষয়টি যে ভাবে
আলােচিত হইয়াছে তাহার একটা ছায়া পাঠকমণ্ডলীর
সম্মুখে উপস্থিত করিবার জন্যই আমার এ প্রয়াস ; জানি না
আমার পক্ষে ইহা ব্যর্থপ্রয়াস হইয়াছে কিনা। বিষয়টি
গুরু বােধ এবং এতদ্দেশে এই অত্যাবশ্যক বিষয়ের
আলােচনার অভাব উপলব্ধি করিয়াই এই কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ
করিয়াছি। এই পুস্তকের অধিকাংশ মতামত রসস, স্পেন্সার
ফ্রোবেল, লক্ প্রভৃতি পাশ্চাত্য শিক্ষানীতিবিদ পণ্ডিতবর্গের
সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ হইতে গ্রহণ করিয়াছি, এতদ্ভিন্ন স্থানে
স্থানে অন্যান্য কতিপয় গ্রন্থকারের কয়েকখানা গ্রন্থেরও
সাহায্য গ্রহণ করিয়াছি সেজন্য আমি উক্ত পণ্ডিতমণ্ডলী ও
গ্রন্থকার সমূহের নিকট বিশেষরূপে কৃতজ্ঞ।
এই পুস্তক দ্বারা আমি যদি আমার একটি মাত্র স্বদেশীয়
ভ্রাতা কি ভগিনীর অন্তরে সন্তানের নৈতিক শিক্ষার গুরু।
কিছুমাত্র অনুভব করাইয়া তাহাকে তৎসম্বন্ধে সামান্য মাত্রও
পর করিয়া তুলিতে পারি, তবেই শ্রম সার্থক মনে করি ।
পিরােজপুর।
জ্যৈষ্ঠ, ১৩১১।
থাকা।
দ্বিতীয় বারের বিজ্ঞাপন। বহুদিন পূর্বে এই গ্রন্থের প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হইলেও নানা কারণে, বিশেষতঃ কাগজের দুৰ্ম্মল্যতাহেতু এতদিন দ্বিতীয় সংস্করণ বাহির করা হয় নাই। অনেকে আমাকে এই পুস্তকের নূতন সংস্করণ বাহির করিবার আবশ্যকতা জানাইয়াছেন। সুতরাং পূৰ্ববারের ভ্রমপ্রমাদ যথাসম্ভব সংশােধন পূৰ্ব্বক পুস্তকখানি পুনরায় মুদ্রণ করিয়া পাঠক সমাজে প্রচার করা হইল। ভরসা করি দেশের এই নব- জাগরণের দিনে এই পুস্তকখানি পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিকতর আদৃত হইবে । কলিকাতা। মাঘ, ১৩২৮। গ্রন্থকার ।
সূচি। বিষয় পৃষ্ঠা। ১ সূচনা আত্মসংগঠন ১২ বাধ্যতা ১৫ २० ২৪ ২৬ ২৮ ২৯ প্রভুত্বের অপব্যবহার আকস্মিক ঘটনা অজ্ঞানতা ও অসতর্কতাজনিত অপরাধ লঘুশাস্তি তিরস্কার আদর ৫ প্রশ্রয় কায়িকদণ্ডের আবশ্যকতা কায়িক দণ্ডের অপকারিতা সাধারণ ব্যবহার স্পেনসারের উদ্ভাবিত দণ্ড—প্রকৃতির শাসন প্রকৃতির শাসনের বিশেষত্ব স্পেন্সারের মতের সমালােচনা স্বাধীন ইচ্ছা ভাঙ্গিবার অভ্যাস নির্দয়তা অভিযােগ ৪৬ ৪৮ • কান্না মিথ্যাকথা বিলাসিতা ••• প্রশংসা ০ ০ ০ পুরস্কার প্রতিযােগিতা গুণপ্রদর্শন = = ৫ ০ ০ ০ বঞ্চনা ৭১ এ । ৭২. ৭১ অনুসন্ধিৎসা কৰ্ম্ম-প্রবৃত্তি আত্মনির্ভরতা ভ্যাগাভ্যাস শিষ্টাচার মাতার প্রতি সম্মান ৮১ ভালবাসা স ৮৪ * * । ৮৯ ৯০ বিন্দু-ধারণ ধৰ্ম্ম-শিক্ষা দেশ-প্রীতি 0 u উপহার শুদ্ধিপত্র । পৃষ্ঠা পংক্তি শুদ্ধ ৯ মাতাপিতা ১৪ তাহার তাহারা কাটিল ২০ কটিল তাহাদিগকে জনিস তাহাকে ১৭ জিনিস • বান বাণ কহিলেন ১৬ কলিলেন ৪ নরেনের নরেন ৪১ প্রকৃত প্রতি ৪৮ ৮ আছে আছে” ১৬ যন্ত্রণা ৩৪ যন্ত্রনা তাহাকে দরিদ্রতপারী উত্মলিত সততঃ 'তাহাকে দারিদ্র-তী উন্মলিত স্বভাবতঃ ৭৩ ৮৭ ৩ মজ্জাগত মজ্জাগত ১৬ অথবা ১৪ ৯৪ ১৪ অভ্যন্তরীণ লিপিয়াছিল প্রত্যুষ ভূলিবেন অযথা আভ্যন্তরীণ লিখিয়াছিলেন প্রত্যুষ ভূলিবেন ১০ ৯৮
No text on this page.
WAKARWAHI # KAKI Etd:39. ১৪২. * " e- সন্তানের চরিত্রগইন। সূচনা। "It depends upon you whether your children be menor brutes"... lbhot. সন্তানদিগকে নানু অব: পশু । । । ।-এবট। আমাদের দেশে কয়জন লক সী সনের চরিত্রগঠনে যত্নপর, কয়, পিত, কত ; ,সানগণের প্রতি তাহা- দর পfি 4ওঁৰ ন ** :: কেন? সে কথা দূরে থাকুক, কয়জন শিক্ষিত ৬ি। * স সম্বন্ধে আপনাদের কর্তব্যের বিষয় সম্পূর্ণ হব ৩ । . • ? যে সমস্ত অদূরদর্শী অভিভাবক পুত্রকন্যাদিকে + ত; বিবাহবন্ধনে সংবদ্ধ করিয়া জীব- 'এভাতেই তাহাদ ঐেi.g বংশ-প্রদীপ প্রজ্জ্ব- লিত করিবার জন্য বিশেষ ব্যগ্রতা প্রদর্শন করিয়া থাকেন, জিজ্ঞাসা করিতে পারি কি, তাহাদের মধ্য কয়জন সে দীপ- শিখাটিকে উজ্জ্বল রাখিবার উপযুক্ত শিক্ষা নিজ নিজ পুত্র- কন্যাদিগকে দিয়া থাকেন ? সন্তানগণের প্রতি ব্যবহারের উপরেই যে তাহাদের নৈতিক উন্নতি-অবনতি নির্ভর করে, এ কথা কে না জানেন ? তথাপি ভাবী মাতা পিতাদিগকে সন্তান-
২
সন্তানের চরিত্রগঠন।
;
শিক্ষা সম্বন্ধে যে একটি অক্ষর ও বলিয়া দেওয়া হয় না, ইহা
অপেক্ষ! অধিকতর আশ্চর্যেয় ও দুঃখের বিষয় আর কি হইতে
পারে। যদি শুভঙ্করের হার্য। না জানিয়া কোন ব্যক্তি
মুদীর ব্যবসায় আরম্ভ করে, তবে আমরা তাহার কৃতকাৰ্য--
তায় সন্দিহান হই। যওি শাণী বিদ্যা অধ্যয়ন না করিয়া
কে আপনাকে অস্ত্রচিকিৎসক বলিয়া পরিচয় দেয়, তবে
আর সেই ‘হাতুড়ে চিকিৎসকের অনধিকার চর্চায় বিস্মিত
হই, এবং তাহার হস্তে চিকিৎসিত হইতে অনিচ্ছা প্রকাশ
করি ; এমন কি, তাহার হস্তে কোন রােগীর মৃত্যু হইলে এই
চিকিৎসককে ফোজদার। দণ্ডবিধির আমলে আনিতেও চেষ্টা
করি ; অথচ কত লােক যে সন্তানের চরিত্র গঠন সম্বন্ধে, সম্পূর্ণ
অজ্ঞ হইয়াও পিতৃত্ব ও মাতৃত্বের গুরুভার আপন স্কন্ধে এহণ
করেন, ইহাতে আমরা কিছুমাত্র বিস্মিত হই না । সমাজের
অধিকাংশ দুনীতিই যে ঈদৃশ
জনক-জননীগণের অজ্ঞতা ও
অবিমৃষ্যকারিতার বিষময় ফল, একথা অস্বীকার করা অসম্ভব।
অধিকাংশ শিশু বাল্যকাল হইতে মাতাপিতা কর্তৃক যেরূপ
ন্যায়রূপে পরিচালিত হইয়া থাকে, তাহাতে বয়ঃপ্রাপ্ত হইলে
তাহাদিগকে নীতিপরায়ণ দেখিবার আকাঙ্ক্ষা,উন্মত্তের আকা-
ক্ষার ন্যায় কাৰ্য-কারণ-সম্বন্ধ-শূন্য। কারণ মনুষ্য-জগতে
উদ্ভিজ্জগতের ন্যায় বিনা চেষ্টায় সুফল ফলে না।
কিরূপে শিশুর স্বাভাবিক বৃত্তিসমূহের বিকাশে সহায়তা
করিতে হইবে, মাতাপিতা সে বিষয়ে অজ্ঞ হইলে কিরূপ ফল
6 সূচনা। আশা করা যাইতে পারে, তাহা নির্ণয় করা কঠিন নহে। শিশুর পক্ষে যাহা করা স্বাভাবিক ও ন্যায্য, মাতাপিতা স্বীয় অজ্ঞতাবশতঃ শিশুর তাদৃশ কায্যে বিশেষ রূপে বাধা প্রদান করিয়া তাহার সুখ ও শিক্ষার পথ কণ্টকিত করেন এবং শিশুর ও নিজেদের স্বভাব রুক্ষ করিয়া তুলেন। তাহারা যে কাৰ্য্য ভাল বলিয়া বিবেচনা করেন,ভয় অথবা লােভ দেখাইয়া শিশু দ্বারা তাহা সম্পাদন করান ; একবার ভাবিয়া ও দেখেন যে তাহাদের প্রদর্শিত ঐ ভয় ও লােভ শিশুর মনের উপরে কিরূপ অনভিপ্রেতরূপে কাৰ্য্য করিতে পারে। তাহারা শিশুকে সত্যবাদী হইতে উপদেশ দেন অথচ আপনারা তাহার সাক্ষাতে সহস্রবার মিথ্যা বলিতে অণুমাত্র কুষ্ঠিত হন না; মনে ভাবেন শিশু উহা বুঝিতে পারিবে না; কিন্তু ওরূপ ভাব- নাকে চলিত কথায় “মনকে চোখ ঠার দেওয়া” বলে। তাহারা শিশুকে ক্রোধ পরিত্যাগ করিতে পরামর্শ দিয়া পরমুহূর্তেই হয়ত তাহার কোন সামান্য ত্রুটিতে ক্রুদ্ধ হইয়া তাহার সঙ্গে নিতান্ত নির্মমভাবে ব্যবহার করেন এবং এইরূপে আপনাদের ক্রোধহীনতার বিলক্ষণ নিদর্শন দেখান ! শিশুদের শিক্ষা অধি- কাংশ স্থলেই এইরূপ উপস্থিত খেয়াল দ্বারা পরিচালিত হইয়া থাকে; যুক্তি ও বিবেচনা সে শিক্ষার চতুঃসীমায় পদার্পণ করে । সে গুলি কখন বা ক্রুদ্ধ মাতাপিতার ভ্রুকুটীর ভয়ে উদ্ধশ্বাসে পলায়ন করে, কখন বা তাহাদের প্রবল সােহাগ- স্রোতে বহুদুরে ভাসিয়া যায়। তাদৃশ মাতার নিকটে কিরূপ ৪ সন্তানের চরিত্রগঠন। নৈতিক শিক্ষার আশা করা যায়, সন্তান অন্যায় কাৰ্য্য করিয়া অন্যকর্তৃক তিরস্কৃত হইয়াছে বলিয়া, যিনি তাহার পক্ষাবলম্বন পূৰ্ব্বক সেই তিরস্কার সঙ্গে বিবাদ করিতে অগ্রসর হন ? তাদৃশ পিতার নিকটেই বা কতটা ন্যায়পরতা শিক্ষা করা যায়, সন্তান খেলিতে গিয়া পা ভাঙ্গিয়াছে বলিয়া যিনি তাহার পদে ঔষধ-প্রয়ােগের পরিবর্তে পৃ: বেত্র-প্রয়ােগের ব্যবস্থা করিয়া থাকেন। অনেকে এমন আছেন, যাঁহারা অন্যের প্রতি ক্রুদ্ধ হইয়া নির্দোষ শিশুর প্রতি নিৰ্ম্মন ব্যবহার করিয়া থাকেন। অনেকে আবার শিশুর প্র:তে দোষ গুলিও যত্নসহকারে পুষিয়া রাখেন এবং বিবেচনা করেন তাহারা নির্ভয়ে ঐ সমস্ত “সামান্য সামান্য অন্যায় কার্যে প্রশ্রয় দিতে পারেন, কারণ, তাহাদের মতে ওগুলি বয়সের সঙ্গে চলিয়া যাইবে। বয়সের সঙ্গে’ চলিয়া যাইবে সত্য, কিন্তু বয়স থাকিতে নয়। দোষগুলি সামান্য হইলেও একবার অভ্যাসগত হইয়া গেলে এ জীবনে আর উহাদের হস্ত হইতে মুক্ত হওয়া যায় না। অনেকে বৃদ্ধ হইয়াও যে বাল্যের ঐ সমস্ত অন্যায় অভ্যাসের হস্ত হইতে মুক্তিলাভ করিতে পারেন নাই তাহার প্রচুর উদাহরণ আম- দের সম্মুখে বর্তমান রহিয়াছে। তাই, যাহারা সামান্য ব্যাপার বলিয়া বাল্যকালের দোষ সমূহকে উপেক্ষা করিয়া থাকেন, পণ্ডিতপ্রবর সােল তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়াই বলিয়া গিয়া- ছেন যে ব্যাপার সামান্য হইলেও অভ্যাস বড় ভয়ানক জিনিস। আদুরে সন্তান-সুতরাং সে সকলকে প্রহার । করিবে ও গালি দিবে! মাতাপিতা এসম্বন্ধে তাহাকে কিছু বলা আবশ্যক মনে করেন না। তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, বয়সের সঙ্গে ও দোষগুলি চলিয়া যাইবে। কিন্তু হায়! তাহারা একবার ভাবেন না—ভাবিতে পারেন না, শৈশবে মূলােচ্ছেদ না করিলে, ঐ ক্ষুদ্র-দোষ-গুলিই রুদ্র-মূর্তি ধারণ করিয়া মাতাপিতার বুদ্ধিলােপের কারণ হইবে । অনেকে আবার সন্তান-গুলিকে এত অতিরিক্ত আদর করেন, তাহাদের অন্যায় আব্দারে এরূপ অদ্ভুত প্রশ্রয় দেন এবং অবৈধ পােষ- কতা করেন, যে তাহা ভাবিলে লজ্জিত হইতে হয়। নর- সমাজেও বানর-জাতির ন্যায় নির্বোধ অনেক আছে, যাহারা অতিরিক্ত আলিঙ্গন করিয়া স্বকীয় সন্তানের বিনাশ সাধন করিয়া থাকে। এইরূপে মাতাপিতা যে বিষবৃক্ষের বীজ সন্তানের হৃদয়ে স্বহস্তে বপন করিয়া তাহাতে যত্নসহকারে জলসেক করিতে থাকেন, অচিরেই তঁাহারা সেই বৃক্ষের বিষাক্ত ফলের তীব্র আস্বাদ গ্রহণ করিয়া জরিত দেহে জীবন্মতাবস্থায় স্বকীয় দুর্ব দ্ধিতার জন্য ললাটে করাঘাত পূৰ্ব্বক অশ্রুবিসর্জন করি- বার প্রকৃষ্ট অবকাশ পান। মুখ্যতঃ অথবা গৌণতঃ মাতাপিতার নিকটে সন্তানগণ বহু- বিধ পাপকাৰ্য্যই শিক্ষা করিয়া থাকে। অত্যাচার, ক্রোধ, এরূপ প্রবাদ আছে যে বানরগণ সময়ে সময়ে নিজ শাবককে আর করিয়া এরূপ দৃঢ়ভাবে বুকের সঙ্গে চাপিয়া ধরে যে তাহাতেই উক্ত শাবকের হ্য ঘটিয়া থাকে।
সন্তানের চরিত্রগঠন । নিষ্ঠুরতা, মিথ্যাবাদিতা, অসংযম, আড়ম্বরপ্রিয়তা প্রভৃতি সম্বন্ধে অবিবেচক মাতাপিতাই সন্তানের প্রধান গুরু । উদা- হরণের আবশ্যকতা আছে কি? মাতা যখন নিজের বালিকা কন্যাকে সুন্দর পরিচ্ছদে সুশােভিত দেখিয়া তাহাকে ‘রাজ- রাণী’ বলিয়া সম্বােধন করেন, তখন কি তিনি একবারও ভাবিয়া দেখেন তাহার ঐ অতি সামান্য একটী দ্বারা বালি- কার কি ভয়ানক অনিষ্ট সম্পাদিত হইল ? তিনি কি ভাবিয়া দেখেন যে ইহাতে তাহার মা: সক্ষেত্রে অযথা পরিচ্ছদ --গবর্ন অঙ্কুরিত হইল? এইরূপে, লজ্জা ও শীত নিবারণের জন্যই য়ে বস্ত্রাদির প্রয়ােজন, তাহা উক্ত মাতার নিঝদ্ধিতার ফলে, সন্তানের নিকটে বিলাসিতার উপাদানে পরিণত হইল। পাঠক! এখন বুঝিলেন কি, কোন সূক্ষ্ম সূত্র অবলম্বন করিয়া বিলাসিতারূপ ভীষণ দোষ নিরীহ শিশুর পবিত্র হৃদয়ে প্রবিষ্ট হইল? সন্তান আছাড় খাইয়া মাটিতে পড়িয়া কাদিতেছে, মাতা তাহাকে শান্ত করিবার জন্য তাহাকে মারতে পদাঘাত করিতে আদেশ করিলেন। তিনি বুঝিলেন না ইহাতে ঐ সন্তানের হৃদয়ে কি জঘন্য প্রতিহিংসা বৃত্তি উদ্দীপ্ত হইল। মাতাপিতা কি সন্তানকে মিথ্যা বলিতেও শিক্ষা দেননা? শিশু ছুটাছুটি করিতেছে,—মাতা বলিলেন, “খােকা ঘুমাও এসে" । খােকা-না, আমি ঘুমাবােনা। মাতা—যদি ঘুমাও তবে আজই একটা সুন্দর পুতুল কিনে দেব।
চ। শিশু [নই । 1{{{ ই, এত ) । ম স র *লিন কারলেন না। ফলে শিশু ও 1 : 1. * 1 নয়। কাৰ্য্য সাধন করিতে শিক্ষা করিল এবং ৫। তর । ৩ ৪ {হার চিরতরে অবিশ্বাস জন্মিল। অ র ন • • ও {ই। ৫. ভান বশীভূত করিতে পারেন না। এr, মধুর স: কথাও শিশু অনেক সময়ে : লিয়। ।। শিশু পয়ঃ- প্রাপ্ত হইলে ও মতির প্রতি ৪ ধ্বসের র র হয়। একদিন উক্ত মতক , শু• *ল, “আমার এমনি পোডকপাল যে পেল ও গণকে অবিশ্বাস করে!' আর একজন খীসা ৭ম চাং হইতে শুীর ভাবে বলিয়া উঠিলেন, “কলিকাল"। যেন মাতার প্রতি পুত্রের ঈদৃশ অবিশ্বাসের জন্য কল কাই সম্পূর্ণ রূপে দায়ী। অনেক সময়ে না তত। সও। •কে মুখ্য ভাবেও মিথ্যা কথা ৰলিতে এবং মিথ্য। এর দ ক য় থাকেন। সন্তান যদি মাতাপিতার পক্ষ সf 1. নয়। তাদের সুবিধার্থ পটুতার সহিত মিথ্যা বলতে পারে, সে অঞ্চ মাতাপিতা তাদৃশ কুতকাৰ।তার জন্য সার শিশুর মুখ ধন করিয়া থাকেন, আর একে অন্যের নিকট লিয়া থাকে, “নার বাজার কি প্রখর বুদ্ধি” ! কিন্তু তখন তাদের একপরও ভাবিবার গণ- কাশ হয় না যে তাহার বুদ্ধির এৰবিধ প্রখরতার নিকটে তাহাদের সমগ্র যত্নপালিত আশা দ্বিধা বিভক্ত হইয়া অচিরেই বিনষ্ট হইবে ।
৫
সন্তানের চরিত্র গঠন।
পূৰ্বোর্থ উদাহরণগুলি দ্বারা স্পষ্টই বুঝা যায় যে,
সন্তানগণের সহিত ব্যবহারে মাতাপিতাকে বিশেষ সতর্ক
হইয়া চলিতে হইবে । তাহারা সন্তানের সাক্ষাতে প্রত্যেক
কার্য। অত্যন্ত সাবধানে করিবেন এবং প্রত্যেক বাক্য অতীব
সাবধানে উচ্চারণ করিবেন। অন্য কেহ যাহাতে শিশুদের
সম্মুখে অন্যায় আচরণ করিয়া বা অন্যায় বাক্য বলিয়া
তাহাদের হারে বুশ ও ব জ বন করিতে না পারে সে
দিকে ও প্রাক দূ: *শী নাতপিতার তীক্ষ্ম দৃষ্টি থাকা
আবশ্যক: যদি কেহ বলে যে ই অসম্ভব ব্যাপার, যদি ।
কোন পিতা তাহ; 2 ) পরিহার্য কার্যরাশির দিকে
অঙ্গলিনির্দেন কয়। * :{ সহিত বলিতে সাহস করেন যে
এরূপ সাত ::::রে সয় ,ক্ষপ করা তাহার ন্যায় অবস্থার
লােকের " স; সহ, : তাহাকে বলিতে চাই যে
তিনি যেন এ ব্যাপারটিকে নিতা। সামান্য বলিয়া বিবেচনা
না করেন ; অধিক যে সমস্ত লােক পুত্রের জন্য বিষয়-
সম্পত্তি করিয়া যাওয়া ও কোম্পানির কাগজ রাখিয়া যাওয়াই
জীবনের সার ব্রত বলিয়া বিবেচন, করেন, তাহাদের মুখেতে।
এরূপ বাক্য আদৌ শােভা পায় না। কারণ তাহাৱা শত
চেষ্টাদ্বারাও পুত্রের জন্য এমন কোন সম্পত্তি রাখিয়া যাইতে
পারিবেন না, যাহা তাহার নৈতিক চরিত্রের সঙ্গে তুলিত
হইতে পারে। তাঁহাকে আরও বলিতে চাই যে তাহার
প্রদত্ত সময়াভাবের ওজর নিতান্ত কাল্পনিক ও অগ্রাহ্য।
সূচনা। রােমের শাসনকর্তা প্রখ্যাতনামা কেটো গুরুতর রাজকার্যের মধ্যেও তাহার শিশুপুত্রের শিক্ষার ভার নিজ হস্তে রাখিয়া- ছিলেন, এবং দৃঢ় অধ্যবসায়সহকারে সে কায্য অতীব পুত্থানু- পুঙ্খরূপে সমাধা করিতেন এমন কি যাবতীয় কাৰ্য্য পরিত্যাগ করিয়া পুত্রের স্নানের সময়ে, তিনি প্রতদিন নিজে উপস্থিত থাকিয়া স্বীয়পত্নীদ্বার। তাহার স্নান কাৰ্য্য সম্পন্ন করাইতেন। আসমুদ্র ধরার অধিপতি আগষ্টাস * তাহর পৌত্র দিগকে লিখিতে ও সাঁতার দিতে শিক্ষা দিতেন এবং প্রায়ই তাহা- দিকে নিজের সঙ্গে সঙ্গে রাখিতেন। এস্থানে বলিয়া দেওয়া আবশ্যক যে রােমের সম্রাটগণ কোন কোন দিল্লীশ্বর অথবা বঙ্গেশ্বরের ন্যায় রাজকার্য সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থাকিয়া সাদ্যোক্ত পুরুষ সাজিয়া সাক্ষিস্বরূপ বিরাজ করিবার সুযোেগ পাইতেন না! হুজুর’ হইলে ও তঁাহাদিগকে মজুরের ন্যায় খাটিতে হইত। কিন্তু ঐরূপ রাজ্যের রুভার মস্তকে করিয়াও তাহারা সন্তানদিগকে নিজহস্তে শিক্ষা দিতেন। রাজত্বের দুয়ারে, তাহারা পিতৃত্বের মুখোচ্ছেদ করিতেন না। ইংলণ্ডেশ্বরী ভিক্টোরিয়াও আপনার পুত্রকন্যাদিগকে ‘বাইবেল পড়াইতেন ও নীতিশিক্ষা দিতেন। এই সমস্ত উদাহরণ বর্তমান থাকিতে যে পিতা বলিবেন “আমার সময় নাই”, তাহার সত্যবাদিতায় আমরা কিঞ্চিৎ সন্দিহান। ঔরসজাত সন্তান- দিগকে কেবল মাত্র অন্নবস্ত্র প্রদান করিলেই পিতার কর্তব্য * রােমের সম্রাট।
স্তনের চরিত্র গঠন । শেষ হয় না। যিনি তাহ! করেন, তিনি তাহার কর্তব্য আংশিক রূপে সম্পন্ন করে না। প্রত্যেক পিতার নিকটে মাতৃ ভূমি প্রকৃত মনুষ্য দাবী করেন। সাধ্য থাকিতে যে পিতা এই মাতৃঋণ পরিশোধ করিত কৃতি, তিনি পাপী। যে পিতা তাহাকে কুঁত যে পরিবর্তে কতকগুলি দুশ্চরিত্র, শীর্ণকায়, না- * ধারী পি ** জীব প্রদান করিয়া তাহার কষ্টের মা বৃদ্ধি করিয়া দেন, তিনি যদি পা না হন তবে আর পাপী বি ইক ? পাঠক পাঠিক! শুয়া রাখুন, যত দিন গৃহে গৃহে সন্তানের চরিত্র গনের জন্য রীতিমত চেষ্টা না চলিবে, যতদিন মাতাপিতা এ বিষয়ে নান করিয়া শিশুকাল হতেই সন্তানগণের শারীরিক ও নৈতিক মেরুদ ও একসঙ্গে সবল ও সুদৃঢ় করিয়া ঠি ভ না করিবেন, যতদিন পুত্রকন্যাগণ আশৈশব মাতৃস্তন্যের সঙ্গে সুশিক্ষার পীযূষধারা পান করিতে পাইবে, ততদিন কোন রাজনৈতিক আন্দোলনে, কোন সামাজিক সমস্যা পূরণে, কোন স্কুল কলেজ স্থাপনেই আমা- দের দেশের প্রকৃত মঙ্গল সংসাধিত হইবে না। তাদৃশ অসাধ্য সাধনে কৃতসংঙ্কল্প দেশহিতৈষিগণ অচিরেই বিফল প্রযত্ন হইয়া অনুসন্ধানে দেখিতে পাইবেন যে, তাহাদের সমগ্র উদ্যম অপ- বিত্র প্রস্রবণােৎপন্না স্রোতস্বিনীকে পবিত্র করিবার ব্যর্থ চেষ্টায় অপব্যয়িত হইয়াছে। আমাদের দেশীয় একজন চিন্তাশীল না। ; ; লেখক * বলেন, “এখন কিছুকাল আমরা •ীর গৃহের ভিতরে গোড়ার কাজ করিলে তবে গৃহের বাহিরে 1 গাইর উপযু ও অধিকার; হইব।" আমরা কিন্তু এটা বলি না। আমরা বলি উন্নতি করিতে হইলে ভিতরের ও বের কাজ একসঙ্গে চালাইতে হইবে ; ইহার মধ্যে 'শ্চাং ইতর- বিশেৰ নাই : সবই সমান কাজ ; প্রক, ৩ টার পক্ষে সব অত্যাবশ্যক কাজ। বাহিরের ও ভিতরের কাস), ** ওতপ্রাত ভাবে সংবদ্ধ ; এক দিক ভিন্ন অন্য কি চলো । মঙ্গলের পথে অগ্রসর হইতে হইলে য় ন ল করিতে হইলে ; শুধু দক্ষিণ কিংবা শুধু বা পদেশী দূর অগ্রসর হওয়া নিতান্ত অসম্ভব ও তা স্বাভাবিক। এতক্ষণ আমরা সম্মানের রি র গঠন স্বন্ধে দেশ এ্যাপী অজ্ঞতা ও কৃরীতির বিষয় বর্ণনা করিলা ও উহা নিরাকরণের একান্ত আবশ্যকতার কথা উল্লেখ করিলাম। 'ণে মাতা- পিতাদিগকে সেই পুরাতন পন্থা পরিত্যাগ পূর্ণ , সকীয় সন্তান সমূহের মঙ্গলার্থ যে নন পথে অগ্রসর হইতে অনুরােধ করিতেছি, তাহাদের সুবিধার অন্য যে পথ যথাসাধ্য সুগন করিতে চেষ্টা করিব। সনের চরিত্র সবল ও সুস্থ করিতে হইলে মাতাপিতাদিগকে বর্ণিত শিয়গুলির প্রতি বিশেষ মনােযােগী হইয়া কাজ করিতে হইবে। চন্দ্রনাথ বসু। + রাজনৈতিক ক্ষেত্র।
আত্মসংগঠন।
সিতাই হন আর মাতই হন, যিনি সন্তানগঠনের ভার
নিজ হস্তে গ্রহণ করিবেন, সর্ব প্রথমে তাহার আত্মসংগঠন
প্রয়োজনীয়।
মাৰ প্ৰস্তুত করিতে হইলে মানুষ হইতে
হইবে। জনক জননী স্বীয় পুত্র কথাতে তাহাদের ক্ষুদ্র প্রতি-
বিম্ব দেখিতে অাশা করিতে পারেন; কারণ শিশুগণ
উপদেশ অপেক্ষ। দৃষ্টারেই অধিক অনুসরণ করিয়া থাকে,
এবং মাতাপিতার নৈতিক চরি এই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত
হইয়া থাকে। পুত্রকন্যাগিকে ভাল করিতে হইলে, তাহা-
দিগকে প্রহার কর। অপেক্ষ। আপনাদিগকে ভাল করাই
সমধিক ফল প্র: ইর! প্রতিবিম্ব সুন্দর দেখিবার জন্য
হস্তদ্বারা সুরথ অপেক্ষ। একীয় সৌন্দৰ্যবিধানই প্রকৃষ্টতর
পন্থা। মাতাপিতা !নকে প্রহার করিতেছেন, যখনই
একথা শুনিতে প ত য আমাদের মনে হয় যে ঐ প্রহার
ন্যায়: উ. পিতারই প্রণ। তাহারই সন্তানদিগকে
স্বকীয় চরি. এর উত্তরাধিকারিরূপে জগতে আনয়ন করেন।
সন্তান তার নিজের চরিত্রের স্রষ্টা নহে—শৈশবে তাহার
নিয়ামকও নহে। ৯ মাতাপিতা যদি নি সন্তানকে মন্দস্বভাব
সেমুল আইল্স্।
আ ত্মসংগঠন। ? ; প্রদান করিয়া থাকেন, তবে তাহাকে মন্দ দেখিয়া বেত্রধারণ করিলে চলিবে কেন ? মাতাপিতাকে আত্মসংযম, ক্ষমা, ধৈৰ্য্য প্রভৃতি সদ্গুণরাশির অনুশীলন করিতে হইবে; সন্তান- গণের প্রতি আপনাদের দৈনিক জীবনের পবিত্র প্রভাব বিস্তার করিতে হইবে তবেই কালক্রমে সন্তানগণের আজন্মলব্ধ দোষরাশি সংশােধিত হইবে বলিয়া আশা কর। যায়। যিনি সন্তানের প্রকৃত মঙ্গল কামনা করে, তাহাকে স্বীয় চরিত্রের পবিত্র তা দ্বারা সকলের ৬ ও ৩৭। "যােগী হইতে হইবে ; ব্যবহারের মাধুৰ্য্যদর সকলের ভালবাসা আকর্ষণ করিতে হই। যিনি • '৪ লক সমূহের উপরে আর , y; fি;", . নিজ সন্তানকে ও সম্যক্রূপে বশে রাখিতে স': : ::ন না। কারণ সকলে যদি তাহাকে ভক্তি শ্রদ্ধা করে, তা : এ শে শিরাে- বার্য বুলিয়া বিবেচনা করে, তবে তাহ? : '... সে:পি করন » আয়াসসাধ্য হন। .:. {গণ যদি দেখিতে পায় অপর দশজনে ত; * , করে, তাহার সমস্ত আদেশ অবহেলা করে, তবে তদৃর্শ পিত। কি মাতার প্রতি সন্তানগণের অটল বিশ্বাস ও আচল ভক্তি জন্মিতেই পারে না। বলা বাহুল্য মাতাপিতার ইকীয় সাধুতা দ্বারাই নিকটস্থ জনসমূহের উপরে এই প্রভুত বিস্তার করিবেন। অন্যরূপে সংস্থাপিত প্রভুত্ব ফলদায়ক হইবে না। কারণ ভীতি উৎপাদন বা অর্থবিতরণ দ্বারা যে প্রভুর সংস্থাপিত হয়,
১৪
সন্তানের চরিত্র গঠন।
।
ভাই। প্রকৃত প্রভু ২ নহে; মানুষের হৃদয়ের উপর তাহার
কোন অধিকার নাই। কেহ অজস্রধারে অর্থবর্ষণ করিলেও
অরের হয় তাহার উদ্দেশে উন্মীলিত হয় না। যদি অপরের
হৃদয়-পদ্ম উন্মীলিত করিয়া ভক্তি-সুরভি আহরণ করিতে হয়,
তবে প্রেমের পবিত্র কিরণরাশি সহস্রধারে তাহার উপর বর্ষণ
করা আবশ্যক। আর এক কথা,-পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে যে
সন্তানের দোষগুলি প্রায়ই উত্তরাধিকার-সূত্রে মাতাপিতার
নিকট হইতে প্রাপ্ত। সুতরাং তাহার যদি নিজ নিজ দোষগুলি
পরিত্যাগ করিয়া আত্মচরিত্র সুগঠিত না করেন, তবে তাহাদের
ও সন্তানদিগের মধ্যে একই দোষ অবস্থিতি করিবে । এরূপ
হইলে, তাদৃশ পিতা বা মাতার পক্ষে সন্তানের চরিত্রগঠন
করা সম্পূর্ণ অসম্ভব হইবে, কারণ একই দোষে দুষ্ট ব্যক্তিদ্বয়ের
মধ্যে একে অন্যের গুরু হওয়া, এক অন্ধ অন্য অন্ধের
পরিচালক হওয়ার ন্যায় নিতান্ত নিস্ফল।
কে বলিতে পারে,
পরম মঙ্গলময় পরণেশ্বর মানবের মঙ্গল সাধনার্থই মাতাপিতার
দোষগুলি উত্তরাধিকার-সূত্রে সন্তানের চরিত্রে প্রতিফলিত
করিয়া, তাহাদের সম্মুখে স্থাপন পূৰ্ব্বক উভয় পক্ষের দোষ
নিরাকরণেদ্দেশ্যেই এই কৌশলজাল বিস্তার করিয়াছেন কি
? এই আত্মসংগঠন-কাৰ্য্য সন্তানােৎপত্তির পূর্বেই সংসাধিত
হওয়া উচিত। কারণ সে বিষয়টি এত অল্পায়াস-সাধ্য নহে যে
সন্তান জন্মিবার পরেও তাহা সুসম্পন্ন করিয়া উক্ত সন্তানের
চরিত্র গঠন করা যাইতে পারে।
বিশেষতঃ সন্তানকে
•• স্বভাবতই সচ্চরিত্র করিতে হইলে, তাহার জন্মের বহুপূৰ্ব্বেই পিতা ও মাতা উভয়ের চরিত্র সুগঠিত হও। এয়ােনীয় কারণ পূৰ্বেই বলা হইয়াছে, সন্তান তাহার স্বাভাবিক দোষ- গুণগুলি মাতাপিতা হইতেই লাভ করিয়া থাকে । একন জর্মন্ দেশীয় পণ্ডিতকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল, সন্তানের শিক্ষা কত বয়স হইতে আরব্ধ হওয়া উচিত। তিনি উত্তর করিয়াছেন, “সন্তানের পিতামহী ও মাতামহী হইতে।” বাস্তবিক উত্তরাধিকার তত্ত্বের সারবত্তা এতই তাধিক। বাধ্যতা। সন্তানের চরিত্র সুগঠিত করিতে হইলে, পারিবারিক সুশাসন আবশ্যক। : বাধ্যতা সেই সুশাসনের একটি প্রধান সহায়। মাতাপিতাকর্তৃক নানাবিধ ভয় প্রদর্শনের পরে সন্তানগণ যে নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাহাদের আদেশ পালন করে, তাহাকে বাধ্যতা বলে না। অবিলম্বে ও হৃষ্টচিত্তে আদেশ পালন করাই প্রকৃত বাধ্যতার লক্ষণ। আপনার সন্তান যে আপনার যুক্তি-তর্কে বা তােষামােদে বশীভূত হইবে, ইহাও যথেষ্ট নহে। আপনার প্রভুত্বের নিকটে তাহার মস্তক অবনত থাকাই বাঞ্ছনীয়। অবশ্য সন্তানগণকে তাহাদের করণীয় কার্যের ন্যায্যতা ও আবশ্যকতা সময়ে সময়ে যুক্তি- তর্ক দ্বারা হৃদয়ঙ্গম করান কৰ্তব্য ; কিন্তু সন্তানগণের উপরে সন্তানের চরিত্র গঠন। তাহাদের সর্বদা এতটা প্রভুত্ব থাকা উচিত যে সন্তানগণ উহার ন্যায্যতা বুঝিতে না পারিলেও সেই প্রভুত্বদ্বারা তাহাদিগকে অবিলম্বে ঐ কাৰ্য্য করিতে বাধ্য করান যাইতে এখন মাতাপিতা কিরূপে সন্তানের উপরে এই প্রভুত্ব বিস্তার করিয়া তাহাদের সনবিষয়ক বাধ্যতা আদায় করিতে পারেন তাহার আলােচনা কৰিব । পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে, ভক্তি ও ভালবাসার উপরে সংস্থাপিত প্রভুই প্রকৃত প্রভু। সুতরাং আপনি যদি সন্তানগনের উপরে আপনার প্রভুত্ব অক্ষুন্ন রাখিতে চান, তবে আপনার ব্যবহার দ্বারা তাহাদের ভালবাসা আকর্ষণ করুন। কিন্তু ভালবাসা আকর্ষণের পক্ষে প্রাণ ভরিয়া ভালবাসাই একমাত্র উপায় ; সুতরাং তাহাদিগকে লি বাসুন ! * তবেই তাহাদের উপরে আপনার প্রতুত্ব সংস্থাপিত হইবে । তখন তাহাদের কোন অন্যায় কার্যের জন্য তার মৃখন ওল একটু মলিন দেখিলেই তাহারা কাদিয়া ফেলিবে । কারণ যাহার হাসিমুখ দেখিতেই তাহারা অভ্যস্ত, তাহার মলিন মুখ দেখিলে তাহারা নিশ্চয়ই চতুর্দিক অন্ধকার দেখিবে। একজন পিতা তাহার সন্তানদিগকে বড়ই ভালবাসিতেন। তিনি প্রতিদিন অপ- রাহে নিজ কাৰ্য্যস্থান হইতে ফিরিয়া আসিয়া বিশ্রামার্থ উপবেশন করিলে শিশুগণ আসিয়া চতুর্দিকে ঘেরিয়া "It is better far To rule by love than fear."
বাধ্যতা।
বসিত। তিনি তখন তাহাদিগকে নানারূপ আদর করিতেন ;
কাহাকেও বুকে করিতেন, কাহাকেও চুম্বন করিতেন, কাহারও
মাথায় হাত বুলাইয়া দিতেন। • কিন্তু তিনি যেদিন কাৰ্য্যস্থান
হইতে ফিরিয়া আসিয়া শুনিতে পাইতেন যে, তাহাদের মধ্যে
কেহ তাহার অনুপস্থিতিতে কোনরূপ অন্যায় কাৰ্য্য করিয়াছে,
সেদিন আর তিনি তাহাকে আদর করতেন না; এমন কি, সে
কাছে আসিলো তাহার দিকে ফিরিয়াও তাকাইতেন না ;
কিন্তু অন্যান্য ন্তানদিগকে যথারীতি আদর করিতেন। ইহাই
সেই অধ্যয়কারী শিশুর পক্ষে যথেষ্ট শাস্তি হইত। সে
• কাঁদিয়া ফেলিত। পিতার এরূপ ব্যবহারের ফল অতি সুন্দর
হইয়াছিল ; তাহার অনুপস্থিতিতে বাকবালিকাগ বারংবার
তাহাদের মাতাকে জিজ্ঞাসা করিত যে, তাহারা ভাল ব্যবহার
করিতেছে কি না, এবং তাহার। যে ভাল ব্যবহার করিতেছে,
পিতার কাছে তাহা বলেন কি না। এইরূপে,
ঐ পিতা তাহার ভালবাসদ্বারাই স্বীয় সন্তান দিগকে বশে রাখিতে
পারিয়া ছিলেন।
সন্তানদিগকে বশে রাখিতে হইলে তাহাদিগকে বেশী হুকুম
করিবেন না, এবং অন্যকেও বেশী হুকুম করিতে দিবেন না।
ছেলেদিগকে যে সমস্ত আদেশ দেওয়া হয়, তাহাতে তাহাদের
অপেক্ষা মাতাপিতার সুযােগ-সুবিধার দিকেই অধিক লক্ষ্য
থাকে। এরূপ আদেশ বারংবার পালন করিতে হইলে
তাহাদের বিরক্তি জন্মিতে পারে। ছেলে খেলিতে যাইতেছে-
১৮
সন্তানের চরিত্রগঠন।
আপনি সুস্থশরীরে আরামে বিশ্রাম করিতেছেন, এরূপ অবস্থায়
ছেলেকে বলিলেন, “খােকা আমার পাখানা টেপ বসে,
বাহুল্য, এরূপ আদেশ দ্বারা আপনি ছেলের অসুবিধা জন্মাইয়া
নিজের অনাবশ্যক সুখের বন্দোবস্ত করিলেন। চঞ্চল-প্রকৃতি
বালকের এরূপ অলস কার্যে স্বভাবতঃই অনিচ্ছা থাকে।
এরূপ আদেশ পালন না করার দিকেই তাহার প্রলােভন
অধিক ; সুতরাং সে হয়ত ইহা পালন করিতে চাহিবে ন!।
আপনি যদি তাহাকে তাড়না করিয়া উহা করিতে বাধ্য করেন,
তবে সে নিশ্চয়ই আপনাকে স্বার্থপর
বিবেচনা করিবে।
পক্ষান্তরে, আপনি যদি তাহাকে বিনা আপত্তিতে চলিয়া
যাইতে দেন তবে জানিবেন যে, সে আপনার প্রভুত্বকে
অবহেলা করিতে শিখিল । অতএব এরূপ আদেশ না করাই
বুদ্ধিমানের কাৰ্য।
সন্তান দিগকে এমন আদেশ করিবেন না, যাহা আপনি
তাহাদের দ্বারা সম্পন্ন করাইতে চান না। অবাধ্যতা শিক্ষা
দিবার পক্ষে এরূপ আদেশ প্রদান করা অপেক্ষা আর অধিকতর
উৎকৃষ্ট উপায় নাই। খুকী দা নিয়া কাটাকাটি করিতেছে,
মা বলিলেন, “দা রেখে দাও,” খুকী শুনিল না। মা আবার
বলিলেন, কিন্তু খুকী এবারেও মাতার আদেশ অগ্রাহ্য করি,
মাতা অন্যমনস্ক হইয়া নিজের কার্য করিতে লাগিলেন। খুকী
কাটাকাটি করিয়া অনেকক্ষণ পরে দা রাখিয়া দিল। এক্ষেত্রে
খুক শিখিল যে অনায়াসে মাতার আদেশ অবহেলা করা
বাধ্যতা।
যাইতে পারে। অথবা ধরুন যেন, খুকী মাতার আদেশ না
মানিয়া কাটাকাটি করিতে করিতে নিজের হাত কাটিয়া ফেলিল
ও চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল । মাতা,“খুব হইয়াছে,
বলিয়া খুকীর পিঠে “দুম্ দাম্” দুই ধা দিয়া তাহার হাত
হইতে দা কাড়িয়া লইলেন। খুকী বুঝিল, মায়ের আদেশ
পালন না করায় দোষ নাই, তবে দৈবাৎ হাত কাটিয়া যাওয়ায়
দো আছে। সুতরাং সে পর দিবস আবার দা ধরিল, মনে
ভাবল আজ আর ওরূপ দৈব ঘটিতে দিব না। কিন্তু দৈব
কাহারও অধীন নহে, আবার তাহার হাত কটিল।
এবারও
হয়ত মাতা পূৰ্ব্ববৎ ব্যবস্থা করিলেন। খুকা বুঝিল তাহার
প্রতি তাহার মাতার কিছুমাত্র, মমতা নাই। সে মাতার আদেশ
অগ্রাই করিতে অভ্যস্ত হইল এবং মাতার উপরে বিরক্তির
ভাৰ পােষণ করিতে লাগিল। কিন্তু দা ধরিলেই হাত কাটে
দেখিয়া আর কখনও সে উহা ধরিবে না বলিয়া মনস্থ করিল।
মাতা তাহার কন্যাটিকে একটু সতর্ক করিয়া এই শেষােক্ত
প্রকৃতির শাসনের হাতেও রাখিয়া দিতে পারিতেন ; প্রকৃতি-
দেবীই হাত কাটিয়া শিক্ষা দিতেন যে, অসতর্ক ভাবে দা ধরা
অয়। কিন্তু এরূপ অবস্থায় কেহ যদি সেরূপ ইচ্ছা না করেন,
এবং শিশুকে দা ছাড়াই নিতান্ত আবশ্যক বলিয়া বিবেচনা
করেন, এবং তদুদ্দেশ্যে তাহাদিগকে একবার দা পরিত্যাগের
জন্য আদেশ করিয়া বসেন, তবে যে কোন প্রকারেই হউক
তাহাকে দা পরিত্যাগ করাইতে হইবে। এইরূপে সন্তানগণ
সন্তানের চরিত্রগঠন।
যদি দেখিতে পায় যে, মাতা যে আদেশ করেন, তাহা পালন
না করিয়া নিস্তার নাই; তাহারা যদি বুঝিতে পায় যে,
প্রকৃতির শাসনের ন্যায় তাহাদের মাতার শাসনও অবশ্যম্ভাবী,
যদি তাহারা বুঝিতে পায় যে, যেমন, যখনই আগুনে হাত
দেওয়া যায় তখনই হাত পােড়ে, যখনই হাতে সূচীবিদ্ধ হয়
তখনই ব্যথ! অনুভূত হয়, তদ্রুপ যখনই মাতার আদেশ অবহেলা
করা যায় তখনই শাস্তি ভােগ করিতে হয় ; তহা হইলে,
যে সমস্ত শিশুর দুই এবার হাত পুড়িয়াছে, তাহারা যেমন
প্রাণান্তেও অাওনের ! ছে হাত নেয় না, সেইরূপ কেহই আর
প্রাণান্তেও মাতার আদেশ লঙ্ঘন করিবে না। প্রকৃতির কি
সুন্দর শাসন ! যতবার তাহার নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়, ততবারই
শাস্তি-ভােগ করিতে হয়। কিন্তু মাতাপিত সন্তানের অবাধ্যতার
জন্য কখন বা গুরুতর শাস্তি-প্রয়ােগ করেন আবার কখন বা
কোন শাস্তি প্রদান করেন না। এইরূপে একই প্রকারের
অবাধ্যতার জন্য তাহার। দুইবার শাস্তি-ভােগ করিলে, অন্ততঃ
আর দুইবার অবাধে নিস্কৃতিলাভ করে; সুতরাং মাতাপিতার
সামঞ্জস্যহীন ব্যবহারের দোষেই, সন্তানগণ সম্ভাবিত নিস্কৃতির
আশায়, তাবধতা প্রদর্শনে বিরত হয় না।
শিশুকাল হইতেই সন্তানগণকে বাধ্যতা শিক্ষা দেওয়া
উচিত। কেহ কেহ বলেন, শিশুরা উহা শিক্ষা করিতে অক্ষম।
তাহার উত্তরে এই বলা যাইতে পারে যে, আমরা যখন
কুকরাকেও বাধ্যতা শিক্ষা দিতে পারি তখন শিশুকে দিতে
প্রভুত্বের অপব্যবহার। ২১ পরিবার কোন কারণ নাই। “শু গণ নিশ্চয় কুক্কর অপেক্ষাও অধম নহে। শিশুকা হইতে পূর্বোক্ত উপর বাধ্যতা শিক্ষা দিলে সন্তানকে দুই একবারের অধিক শাস্তি দেওয়া আবশ্যক হয় না। সেই দুই একবারও কঠিন শাস্তির প্রয়োজন হয় না। প্রথমতঃ একটু মুখভার করা একটু চোক রাঙ্গা, বা খুব জোর, একটা ধমক্ দেওয়াই যথেষ্ট। ইহা • হই, অবশ্য কঠোরতর শাস্তিও প্রদান করিতে হইবে, কার দ্বারা ভবিষ্যতে বহু কঠোরতম শাস্তির আবশ্যকত। নিরাকৃত হইবে। বাল্যকাল হইতে, এইরূপে শিক্ষিত হইলে, বাধ্য ; তাহাদের স্বভাবসিদ্ধ হইয়া যাইবে; তবে আর ৩াহা? ওরূপ বাধতার চাপে নিজেদের স্বাধীনতার সঙ্কোচ অনুভব করবে না। অধিকন্তু তদুদ্দেশ্যে মাতাপিত কর্তৃক অবম্বিত কঠোরতা সন্তানগণ বয়াে- বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিস্মৃত হইবে; সুতরাং বা কালো প্রদত্ত সেই শান্তির জন্য তাহার মাতাপিতার প্রতি বিরভাব পােষণ করিয়া কৈশােরে নূতন অবাধ্যতা প্রদর্শন পূর্বক নূতন শাস্তির আবশ্যকতা উৎপাদন করিবে না । প্রভুত্বের অপব্যবহার। মাতাপিতা শৈশবেই সন্তানগণের উপরে ভীতিমিশ্র ভাল- বাসা দ্বারা একটা প্রভুত্ব সংস্থাপন করিবেন। কিন্তু যখন একবার তাহারা তাহাতে কৃতকাৰ্য্য তাহাতে কৃতকার্য হইবেন, তখন উপযুক্ত
২২
সন্তানের চরিত্রগঠন।
সংযমের সহিত সেই প্রভুত্বের ব্যবহার করিবেন; এবং শিশুগণ
যতটুকু প্রশ্রয়ের অপব্যবহার না করে, তাহাদিগকে
প্রশ্রয় দিবেন। কথায় কথায় তাদের উপরে প্রভুত্ব খাটাইতে
চেষ্টা করিবেন না।
তাহাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দোষগুলি অর্থাৎ
যাহাতে তাহাদের চরিত্র নষ্ট হইবার আশঙ্কা না থাকে এমন
দোষগুলি মার্জনা করিবেন। কারণ অতিরিক্ত বাঁধাবাঁধিতে
সন্তান ও অভিভাবক উভয়ের চরিত্রই রুক্ষ হইবার সম্ভাবনা।
অধিকন্তু সামান্য সামান্য বিষয়ে শাস্তিপ্রয়ােগ করলে, শাস্তির
সহিত অতিরিক্ত পরিচয় হেতু সন্তানগণের নিকটে তাহার
তীব্রতা কমিয়া যায়। সুতরাং গুরুতর অপরাধ নিরাকরণের
পক্ষেও উহা বিশেষ কার্যকর হয় না। এরূপ অপরাধের জন্য
মাতাপিতা সন্তানকে কখনও গুরুতর শাস্তি প্রদান করিবেন
। কিন্তু যদি একবার কোন ক্রমে কোন ক্ষুদ্র দোষ পরিত্যাগ
করিতেও আদেশ করিয়া বসেন, তবে সে আদেশ পালন
করাইতেই হইবে। কারণ অবাধ্যতা মার্জনীয় নহে; পূর্বে
একস্থানে বলা হইয়াছে যে অন্যায় অভ্যাস জন্মিলে সে অভ্যাস
তাহাদের পক্ষে অমঙ্গলজনক হইবে। আমাদের সেই পূৰ্ব্বকার
কথা, বর্তমানে যাহা বলিলাম তাহার বিরােধী নহে। কারণ
বর্তমানেও আমরা যে ক্ষুদ্র দোষগুলিদ্বারা চরিত্র নষ্ট হইবার
আশঙ্কা করি, সেগুলি মার্জনা করার কথা বলিতেছি না। কিন্তু
ক্ষুদ্র দোষও দুই প্রকারের হইতে পারে ; খেলিবার বেলা মিথ্যা
কথা বলাকে অনেকে ক্ষুদ্র দোষ বলিয়া থাকেন, কিন্তু এই শ্রেণীর
আকস্মিক ঘটনা।
দোষ ক্ষুদ্র হইণে ও মার্জনীয় নহে, কারণ ইহাদ্বারা চরিত্র নষ্ট
হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা আছে। আবার শিশুদিগের লাফালাফি,
ছুটাছুটি, হাসি-চীৎকার এবং জিনিষ ভাঙ্গিবার অভ্যাসও
অনেকের হিসাবে দোষ ; কি এগুলি দোষ হইলেও মার্জনীয়,
কারণ ইহাদ্বার চরিত্র কলঙ্কিত হইবার কোন আশঙ্কাই নাই।
আকস্মিক ঘটনা।
১ানদিগকে তাহাদের অনিচ্ছাকৃত অপরাধের জন্য শাস্তি
দেওয়া নিতান্ত অন্যায়। এরূপ শাস্তির কোন উপকারিতা নাই,
কারণ আকস্মিক ঘটনা হইতে কেহ ইচ্ছা করিয়া বিরত থাকিতে
পারে না। অনেক সময়ে আমরা প্রকৃত অপরাধের সঙ্গে তাহার
আকস্মিক ফল মিশ্রিত করিয়া ফেলি, এবং সেই আকস্মিক
ফলের জন্যই শাস্তিপ্রদান করিয়া থাকি। বালক চেয়ারের
উপরে উঠিয়া টেবিল হইতে একটা জিনিষ আনিবার কালে
অপর একটা বহুমূল্য দ্রব্য ভাঙ্গিয়া ফেলিল। এখন বিবেচনা
করা যাক ঐ বালকের অপরাধ কোন স্থানে। যদি আপনি
পূর্বে তাহাকে চেয়ারে উঠিয়া টেবিল হইতে ওরূপ ভাবে
জিনিষ আনিতে নিষেধ করিয়া থাকেন তবে অবশ্য ঐ মূল্যবান
জনিসটি না ভাঙ্গিলেও সে অবাধ্যতার জন্য শান্তি পাইতে
২৪ সন্তানের চরিত্রগঠন। পারে। কিন্তু আপনি যদি কখনও তাহাকে সেরূপ নিষেধ না করিয়া থাকেন, তবে সে আপনার হাজার টাকার দ্রব্য নষ্ট করিলেও তাহাকে মন্দ বলা অনাবশ্যক। কিন্তু অধিকাংশ মাতাপিতাই ঐ জিনিষ ভাঙ্গাকেই মূল অপরাধ বলিয়া বিবেচনা করেন। অবশ্য এরূপ স্থলে বালককে সতর্ক হইয়া কাজ করিতে মিষ্ট কথায় উপদেশ দেওয়া উচিত অজ্ঞানতা ও অসতর্কতাজনিত অপরাধ। শিশুদিগকে তাহাদের জ্ঞানকৃত অপরাধের জন্য অর্থাৎ তাহারা না বুঝিয়া যে অপকর্ম করে তজ্জন্য শাস্তি দিতে নাই। একটী বালক না বুঝিয়া একখানা বিশেষ প্রানীয় কাগজ ছিড়িতেছে, অথবা কালীর দোয়াতে কলমের উল্টা দিক ডুবা- ইয়া বিশেষ বিজ্ঞতাসহকারে পিতার আইনপুস্তকের পাতার উপরে তাহার চিত্রাঙ্কন নৈপুণ্য প্রকটিত করিয়া অপার আনন্দ উপ- ভােগ করিতেছে ; এরূপ অবস্থায় যে পিতা তাহাকে শাস্তি প্রদান করিতে পারেন তাহার আদৌ সৌন্দর্য জ্ঞান নাই। বান কের এই কাৰ্যনিবন্ধন পিতার বিশেষ অনিষ্ট হইলেও বালক তাহার অপরাধের বিষয় সম্পূর্ণ অজ্ঞ। বালক অন্যকে কাগজ ছিড়িতে দেখিয়াছে, ছবি আঁকিতে দেখিয়াছে, সুতরাং সেও অজ্ঞানতা ও অসতর্কতাজনিত অপরাধ । ২৫ তাহাই করিয়াছে, ইহাতে আর তাহার অপরাধ কি ? এরূপ স্থলে সে যে অপকৰ্ম্ম করিয়াছে একথা তাহাকে শান্তভাবে বুঝা- ইয়া দিয়া তাহার হাত হইতে কাগজ অথবা পুস্তকখানা ধীরে ধীরে নিয়া যথাস্থানে রাখিয়া দেওয়া এব’ ভবিষ্যতে আর সে এরূপ না করে তাহা বলিয়া দেওয়াই উক্ত পিতার কর্তব্য। কিন্তু সাবধান ! তিনি যেন তার বাক বা ব্যবহার দ্বারা সামান্য- মাত্রও ক্রোধের ভাব না দেখান। কিন্তু দুই একর বুঝাইয়া দেওয়ার পরেও শিশু যদি আবার ঐ একই রকম অপরাধ করে, তখন অবশ্য তাহাকে সেই অবাধ্যতার জন্য শাস্তি প্রদান করা উচিত, যে সমস্ত কার্য; তাহারা ভ্রম বা অসতর্কতা বশতঃ করিয়া ফেলে সেজন্যও তাহাদিগকে শাস্তি না দেওয়াই অভি- প্রেত। শিশুদের অজ্ঞতা, ভ্রম বা অসতর্কতা প্রসূত অপকর্মে আমরা অনেক সময়ে অন্যর উদ্দেশ্য আরােপ কয় থাকি। এরূপ আনুমানিক আরোপ দোযাবহ। ঈদৃশ জানায় ও অসত্য দোষারােপের ফলে অনেক সময় আরােপিত দোযসমূহ প্রকৃত পক্ষেই তাহাদের মধ্যে প্রবেশ লাভ করে। তাহাদিগকে মন্দ বলিতে বলিতে প্রকৃতপক্ষেই মন্দ করিয়া তােলা হয়। মাতা- পিতাকে এ সম্বন্ধে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে।
লঘুশাস্তি। এপর্যন্ত আমরা শাস্তিদ্বারা বিশেষভাবে অনাদর প্রদর্শন, ধমক দেওয়া প্রভৃতি লঘুশাস্তিই বুঝাইয়াছি; এবং শিশুদের কৃত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অপরাধে, আকস্মিক অপরাধে, অজ্ঞানকৃত অপরাধে, অসতর্কতা ও প্রমাদাদিজনিত অপরাধে, এরূপ ঘুশাস্তিও যে অপ্রযােজ্য ইহাই বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছি। অবাধ্যতার জন্য প্রথমতঃ উক্তরূপ এবং বাক্যালাপ বন্ধ করা প্রভৃতি বিভিন্নরূপ লঘুশাস্তি প্রযােজ্য। কিন্তু তথাপি যদি তাহারা অবাধ্য আচ- রণে বিরত না হয়, তাহা হইলে অল্পবয়স্ক অপরাধীর পক্ষে কায়িক দণ্ড বিধেয় ; কিন্তু অপেক্ষাকৃত অধিকবয়স্ক অপরাধীর পক্ষে সদুপদেশ ও মিষ্ট ভৎসনাই সমধিক ফলপ্রদ। তিরস্কার। সন্তানকে পূৰ্বাবধি উপযুক্তরূপে পরিচালিত করিতে পারিলে, মাতাপিতার বিরক্তি বা ক্রোধসূচক দৃষ্টিপাতই তৎকৃত অপরাধের যথেষ্ট শাস্তি হইয়া থাকে। কিন্তু যখন সন্তানের ব্যবহারের জন্য তাহাকে তিরস্কার করা নিতান্ত আবশ্যক হইয়া পড়ে, সে সময়েও মাতাপিত বিশেষ ক্রোধ বা অসহিষ্ণুতা তিরস্কার। । দেখাইতে বিরত থাকিবেন । কোনরূপ গ্রানিজনক বাক্য প্রয়ােগ করিবেন না। খুব গম্ভীর ভাবে ও কর্তব্য বােধে আপনাদের কর্তব্য সম্পন্ন করিবেন । তাহা না হলে, মাতা- পিতার কর্কশ ব্যবহারের জন্য সন্তান তাহাদের উপরে মনে মনে বিরক্ত হইতে থাকিবে ; অধিকন্তু তাদের নিকটে তাহাদের প্রদর্শিত বিজাতীয় ক্রোধ ও উন্মত্ত অসহিষ্ণুতা শিক্ষা করিয়া, অকারণে ও সামান্য কারণে অন্যের উপরে তাহা প্রয়ােগ করিবে। তিরস্কারটাকে তীব্র উপদেশ অথবা মধুর ভৎসনার ছাঁচে ঢালিয়া প্রয়ােগ করাই বাঞ্ছনীয়। ভৎসনার সময়ে মাতাপিতা সন্তানদিগের আত্মসম্মানের দোহাই দিবেন। ইংলণ্ডের সুবিখ্যাত রাগবি স্কুলের স্বনামধন্য শিক্ষক মহাত্মা আরডের জীবনী পাঠে অবগত হওয়া যায়, তিনি তাহার ছাত্রদিগকে তিরস্কার করিবার সময়ে পূর্বোক্ত উপায় অবলম্বন করিতেন । একবার, কতকগুলি ছাত্রের ব্যবহারে ক্ষুন্ন হওয়ায় তিনি বিদ্যালয়ের সমস্ত ছাত্রকে একত্র করিয়া তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, “ইহাকেই কি বলে খৃষ্টান্ বিদ্যায় ? সমস্ত কাৰ্যই যদি বলপ্রয়ােগ করিয়া সম্পন্ন করিতে হয়, তবে আমি এস্থানে থাকিতে পারিব না। আমাকে যদি এখানে কারাধ্যক্ষের ন্যায় থাকতে হয়, তবে আমি এই মুহুর্তেই আমার পদ পরিত্যাগ করিব”। সন্তানদিগকে গােপনে তিরস্কার করা উচিত, কারণ অন্য লােকের সাক্ষাতে তিরস্কৃত হইলে তাহারা তাহাদের স্বাভাবিক
২৮
সন্তানের চরিত্রগঠন।
লজ্জা হারাইয়া ফেলিবে, এবং নিজেদের সুনাম নষ্ট হইয়া
গিয়াছে ভাবিয়া আর তাহা রক্ষা করিতে যত্নপর হইবে না।
তখন তাহারা “বকো আর ঝকে। আমি কানে দিয়েছি তুলাে”
বলিয়া নিতান্ত নিলজ্জের ন্যায় যথেচ্ছ ব্যবহার করিতে
থাকিবে। প্রকাশ্যে উপযুক্তরূপ প্রশংসা ও গােপনে তিরস্কার
করাই সর্বথা বিধেয়।
আদর ও প্রশ্রয় ।
জনকজননী সন্তানকে তিরস্কার করিয়া,সেই মুহূর্তেই আবার
তাহাকে আদর করবেন না।
প্রহার ও চুম্বন যেন একই না
চলে। তবে তাহাদের বিরক্তির ভাবটা যেন অনাবশ্যকরূপে
দীর্ঘকা-স্থায়ীও না হয় । এবিষয়ে মধ্যপথই অবলম্বনীয়।
জনক জননী কর্তৃক তিরস্কৃত হইয়া সন্তান যেন পরিবারস্থ
অন্য কাহারও নিকটে প্রশ্রয় না পায় ; কারণ সেরূপ অন্যায়
প্রশ্রয়ে তিরস্কারের তীব্রতা নষ্ট হইয়া কুফলই প্রসূত হয়। মাতা-
পিতা যখন সন্তানের প্রতি বিরক্তি সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করিবেন,
সে সময়ে সন্তানের প্রতি ব্যবহারে পরিবারস্থ কলেই তাঁহাদের
অনুকরণ করিবেন! এই শেষােক্ত বিষয়টির আবশ্যকতা সম্বন্ধে
এতদ্দেশীয় অধিকাংশ লােকই অমনােযােগী। এদেশে মা
ছেলেকে একটু মদ বলিলে অমনি কাকতার স্নেহ-সিন্ধু
উথলিয়া উঠে; পিতা ছেলেকে শাসন করিলে অমনি স্নেহময়ী
•
কায়িক দণ্ডের আবশ্যকতা। জননীর বুকে আদরের বান ডাকিতে থাকে ; সে অদ্ভুত স্নেহো- স্থাস কখনও বা মাতার বক্ষোদেশে অশ্রুপ্লাবন উপস্থিত করে, আবার কখনও বা সন্তানের সম্মুখেই পিতার প্রতি অজস্র কটুন্তি বর্ষণে রূপান্তরিত হয়। এরূপ মাতা ও কাকীমাতা উভ- য়েই সন্তানের মিত্ররূপী শত্ৰু । কায়িক দণ্ডের আবশ্যকতা। “সন্তানদিগকে কেবলমাত্র একপ্রকারের অন্যায়ের জন্য কায়িক দণ্ড প্রদান করা যাইতে পারে, সেটি অবাধ্যতা—মাতা- পিতার প্রভুশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহাচরণ।” (১) শিশুগণ যখন মাতাপিতার আদেশের বিরুদ্ধে এরূপ বিদ্রোহের ভাব দেখাইবে, তখন তাহাদিগকে যে কোন উপায়েই হউক দমিত করা কর্তব্য। রাষ্ট্রীয় বিদ্রোহের ন্যায় পারিবারিক বিদ্রোহ দমনার্থেও সৰ্ব্ব- প্রকার কঠোরতা অবলম্বনায়। এবট, লিখিয়াছেন, একজন অতি সদ্বিবেচক ও দয়াদ্ৰহৃদয় মার্কিন জননী কোন একটা বিষয়ে অবাধ্যতার জন্য তাহার বালিকা কন্যাকে একদিন সকাল হইতে দ্বিপ্রহর পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে তা(ট বার বেত্রাঘাত করিয়া তবে তাহার একগুয়েমি ভাঙ্গিতে পারিয়াছিলেন । যদি তিনি সপ্তম বারের পরেও প্রহার কাৰ্য্য হইতে বিরত হই- তেন তবে চিরদিনের জন্য স্বীয় কন্যাকে নষ্ট করিয়া ফেলিতেন। ( > Lucke "Thoughts on Education”.
সন্তানের চরিত্রগঠন।
আর একটা উদাহরণ ধরুনঃ—পিতা পুত্রকে জিজ্ঞাসা করিলেন
“নরেন বল ত এ অক্ষরটা কি।” নরেন চুপ করিয়া রহিল।
পিতা বলিলেন, বল ‘ক’ ।
নরেন—আমি বলিব না ।
পিতা—নিশ্চয়ই তােমাকে বলিতে হইবে।
নরেন বলিল না । পিতা তাহাকে প্রথমে ধমক দিলেন।
কিন্তু তাহা বিফল হইল দেখিয়া পরে তাহাকে বেত্রাঘাত করি-
লেন এবং বলিলেন, “এখনও বল”। নরেনের মুখে কথা নাই;
পিতা আরও কঠিন ভাবে প্রহার করিলেন, নরেন তথাপি দৃঢ়
নরেনের মাতা নিকটেই ছিলেন,কিন্তু শিশুর পক্ষে একটি কথাও
বলিলেন না। পিতা শিশুকে কিছু চিন্তা করিতে অবকাশ
দিবার জন্য তাহাকে তাহার মাতার নিকটে রাখিয়া কক্ষান্তরে
গেলেন। মাতা নরেনকে বলিলেন, “বল না বাবা, না বলিলে
উনি কিছুতে ছাড়বেন না, আরাে মার খেতে হবে”।
নরেন—আমি মরবাে তবু বলবাে না। পিতা ফিরিয়া
আসিয়া নরেনকে কলিলেন, “এখনও ব”। কিন্তু শিশু
তখনও দৃঢ়। পিতা তখন তাহাকে এরূপ গুরুতরভাবে প্রহার
করিলেন যে,সে আর সহ্য করিতে না পারিয়া কঁাদিতে দিতে
বলিল “বাবা আপার পায়ে পড়ি একটু থামুন, আমি এখনই
বলব। পিতা “বলব আবার কি এখনই বল” এই বলিয়া প্রহার
চালাইতে লাগিলেন। শিশু পরাস্ত হইয়া বলিল “ক” ।
পিতা—এটা কি ?
কায়িক দণ্ডের আবশ্যকতা।
নরেন—“খ”
পিতা-এটা কি ?
শিশু-“গ”
পিতা–যাও তােমার মায়ের নিকটে বলগে। নরেনের
মাতার নিকটে গেল।
মাতা--এটা কি নরেন ।
নরেন-“ক”, এটা ‘খ’, আর এটা ‘গ’ ।
পিতা যদি তাহার কর্তব্যপালনে এত দৃঢ় না হইতেন, তবে
শিশু নিজেকেই পিতা অপেক্ষা অধিক ক্ষমতাশালী বিবেচনা
করিত ; সুতরাং তাহার উপর হইতে পিতার প্রভুত্ব চিরকালের
কেহ কেহ হয় ত বলিবেন, “এরূপ আচরণ
নিতান্ত নৃশংস”। যাঁহারা এরূপ বলিতে চান, তাহাদিগকে
জিজ্ঞাসা করি, তাহারা কি তিক্ত ঔষধ প্রদান করিয়া বাের্গীকে
কষ্ট দেওয়া অপেক্ষা তাহার মৃত্যুই অধিকতর বাঞ্ছনীয় বলিয়া
বিবেচনা করেন? কিন্তু এরূপ গুরুতর শাস্তি প্রদানের সংকল্প
করিবার পূর্বে সন্তানের একগুয়েমির বিষয়ে মাতাপিতাকে
সম্পূর্ণরূপে নিঃসন্দেহ হইতে হইবে। যদি তাহাদের ঘুণাক্ষরেও
সন্দেহ থাকে যে, শিশুর ওরূপ অবাধ্য আচরণের একগুয়েমি
ভিন্ন অন্য কোন কারণ থাকিতে পারে, তবে পূর্বোক্তরূপ গুরু
তর শাস্তি সর্বথা অপ্রযােজ্য। পিতা শিশুকে আদেশ করি-
লেন, “তোমাকে কার যে টাকাটা দিয়াছি সেটা দাও”, শিশু
চুপ করিয়া রহিল।
০২
সন্তানের চরিত্রগঠন।
পিতা—টাকা কি করিয়াছিস্? শিশু নিরুত্তর।
পিতা–বনিনে ? এখনই বল্।
শিশু তথাপি কথা বলিল না । এ স্থলে পিতার যদি
সন্দেহ থাকে যে শিশু তাহা হারাইয়া ফেলিয়া ভয়ে উত্তর
দিতেছে না, তবে তাহাকে শাস্তি দেওয়া অনাবশ্যক। সুতরাং
অন্যায়। শিশুর এবংবিধ আচরণের কারণ একগুয়েমি
নহে, ভয় : টকা হারানাের জন্যও সে শাস্তি পাইতে পারে না,
কারণ উহা এ.টি আকস্মিক ঘটনা। কিন্তু পিতার যদি সেরূপ
কোন সন্দেহ না থাকে ; তাহ'র যদি দৃড় বিশ্বাস থাকে যে,
শিশু ইচ্ছা করাই তাহার আদেশ অমান্য করিতেছে, তবে
তাহার একগুয়েমি
দূর
করিয়া টাকাটা আদায় করা নিতান্ত
আবশ্যক। এক সময়েই যে পিতা বা মাতা সন্তানের সহিত
এরূপ শক্তিপরীক্ষায় নিযুক্ত হইবে তাহা নহে। স্থানে স্থানে
ইহা পরিহার করিয়াও চল। যাইতে পারে। মনে করুন যেন
শিশু আপনার আদেশ লঙ্ঘন করি, এস্থানে আপনি তাহাকে
কেমাত্র মাধ্যতার জন্য একবার শাস্তি দিয়াই বিরত হইতে
পারে। ৬ দ্বারা সব-সময়েই উক্ত আদেশ পালন করাইয়া
সাইবার আবশ্যকতা নাই। কিন্তু একবার যদি আদেশ পালন
করাইয়া লইতে চেষ্টা করেন, তবে কিছুতেই পশ্চাৎপদ হইবেন
। পূর্বোক্ত উদাহরণে যখন বালক বলিল, আমি ‘ক’ বলিতে
পারি না, পিতা তখন তাহাকে সেই অবাধ্যতার জন্য শাস্তি
দিয়াই নিরস্ত থাকিতে পারতেন। কিন্তু পিতা যখন একবার
কায়িক দণ্ডের আবশ্যকতা। বলিয়া ফেলিলেন, “তােমাকে ‘ক’ বলিতেই হইবে, না বলিলে কিছুতেই ছাড়িব না, তখন তাহার সেই কথা কাৰ্যে পরিণত করাইবার উদ্দেশ্যে যত কঠোরতাই আবশ্যক হউক না কেন, তাহা অবলম্বনে ইতস্ততঃ করা তাহার পক্ষে উচিত হইত । অবশ্য, শিশুগণ প্রথম হইতেই উত্তমরূপে পরিচালিত হইলে এরূপ গুরুতর শাসন প্রায়ই আবশ্যক হয় না। প্রথম হইতে উত্তম চিকিৎসা চলিলে বিষ-প্রয়ােগের আবশ্যকতা অল্পই থাকে। পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে যে, শিশুদিগকে কেবলমাত্র অবাধ্যতার জন্যই কায়িক শাস্তি দেওয়া উচিত। সুতরাং এইরূপ প্রশ্ন হইতে পারে- তবে কি অবাধ্যতা ভিন্ন সমস্ত গুরুতর অপরাধগুলিকে বিনা শাস্তিতে ছাড়িয়া দিতে হইবে? না, তাহা নহে; অপরাধ যতই গুরুতর হউক না কেন, যখন তাহা প্রথম বার কৃত হইবে, তখন তজ্জন্য স্থলভেদে উপদেশ অথবা তিরস্কারের ব্যবস্থা করিবেন। কিন্তু যদি ঐ একই অন্যায়কাৰ্য বারংবার অনুষ্ঠিত হয়, তবে বুঝিতে হইবে উহা নিশ্চয়ই ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতার ফল। এরূপ স্থলে উক্ত অবাধ্যতার জন্যই শারীরিক দণ্ড প্রযােজ্য। শাস্তি যত গােপনে প্রয়ােগ করা যায় ততই ভাল। শাস্তিটা তখন তখনই না দিয়া একটু বিলম্বে দেওয়াই অভিপ্রেত, অন্যথা, শাস্তিদাতা ক্রোধদ্বারা পরিচালিত হইয়া অতিরিক্ত শাস্তি প্রয়ােগ করিয়া বসিতে পারেন।
কায়িক দণ্ডের অপকারিতা। নিতান্ত আবশ্যক না হইলে কেহই কায়িক দণ্ডের ব্যবস্থা করবেন না। কি রাজ্যশাসনে, কি পারিবারিক শাসনে, সর্বত্র অন্য সমস্ত উপায় ব্যর্থ হইলে তখন দণ্ডনীতি অবলম্বনীয়। অন্য কোন ঔষধে জীবন রক্ষার আশা থাকিলে কোন সুচিকিৎসকই বিষ-প্রয়ােগের পরামর্শ দেন না। বেত্রচিকিৎসায় বালকদিগের উস্থিত মানসিক ব্যাধি প্রশমিত হইলেও উহাতে পারদঘটিত ঔষধের ন্যায় ভবিষ্যতে নানাবিধ উৎকট উপসর্গ জন্মাইয়া থাকে, কায়িক দণ্ডের অপকারিতা অশেষবিধঃ- ১। ইহাদ্বারা সৎশিক্ষা অসম্ভব। সংযমমিশ্ৰস্বাধীনতাই সংশিক্ষার লক্ষ্য। সুশিক্ষিত লােক শৃঙ্খলিতপদে পথ চলিতে লজ্জনুভব করেন ; আবার উন্মার্গগামিতাও তঁাহার রুচি- বিরুদ্ধ। তাদৃশ ব্যক্তি সর্ববিষয়ক স্বাধীনতা রক্ষা করিয়াও আপনাকে সুপথে রাখিতে সম্পূর্ণ সমর্থ। ঈশ্বর মানবের মনে অবাধ স্বাধীনতাস্পৃহা প্রদান করিয়াছেন। এই স্বাধীনতাকে যথােপযুক্ত প্রশ্রয় দিয়া ও কথঞ্চিৎপরিমাণে সংযত করিয়া সামাজিক জীবনের উপযােগী করাই সৎশিক্ষার উদ্দেশ্য। কিন্তু গুরুতর শারীরিক দণ্ডের সাহায্যে এরূপ ক্ষ হওয়া অসম্ভব।
কায়িক দণ্ডের অপকারিতা । ইহাতে স্বাধীনতা অতিরিক্তরূপে বিনষ্ট হয়, কিন্তু সংযম আদৌ অভ্যস্ত হয় না। যে ব্যক্তির মস্তকোপরি অবিরত কঠোর শাসন- দণ্ড ঘুরিতেছে, তাহার স্বাধীনতা কথার কথা মাত্র ; এবং দণ্ডের হস্ত হইতে মুক্তিলাভের জন্য যে আত্ম-ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাৰ্য্য করে, তাহার আবার সংযম কোথায় ? ২। ইহাতে বালকদিগকে ক্রীতদাসের ন্যায় নিকৃষ্টস্বভাব করিয়া তােলে; কিন্তু যখনই তাহাদের উপর হইতে বেত্র অপ সারিত হয়, অমনি তাহারা স্বমূৰ্তিধারণ করিয়া উদ্দামগজের ন্যায় নিরঙ্কুশত। অকলম্বন করে, ভগ্নধজলপ্রবাহের ন্যায় খরতর ভাব ধারণ ক রয়। থাকে। তখন আর তাহাদিগকে বশে রাখা অসম্ভব হইয়া দাঁড়ায়। ৩। যদিও ৰ। ইহাদ্বারা আপনার সন্তানের অবাধ্যতা সম্পূর্ণরূপে নিরাকৃত হয়, তথাপি সেই অবাধ্যতার সঙ্গে তাহার অন্তর হইতে কতকগুলি মানববাচিত গুণও অপসৃত হইবে। তখন সেই উদ্দামপ্রকৃতি, অবাধ্য বালক একটা প্রাণহীন জীবে পরিণত হইবে; এরূপ প্রাণহীন বালক নির্বোধ লােকদিগকেই সন্তুষ্ট করিতে পারে, কারণ তাহারা চায় নিতান্ত শান্ত প্রকৃতির সন্তান, যে “সাত চড়ে কথা বলে না”, তাহারা চায় বােবার মত সন্তান, যে কোন প্রকার গােলমাল করে না, অথবা করিতে পারে না—তা সে অকৰ্ম্মণ্যই হউক আর প্রাণশূন্যই হউক। অতিবড় দুরন্ত ছেলেও কখনাে কখনো সৎপথ অবলম্বন করিয়া বড় লোক হইতে পরে,কিন্তু উদ্যমশূন্য ভীরু “ভিজা বিড়ালের এখন
সন্তানের চরিত্রগঠন ।
মত ছেলের উন্নতি হওয়া একরূপ অসম্ভব।
শিক্ষিত লােকে
এরূপ প্রাণহীন সন্তান পছন্দ করেন না। প্রাণহীনতা অপেক্ষা
বরং নিরঙ্কুশতাই তাহাদের নিকটে, আদরণীয়। কারণ,
নিরঙ্কুশতাও কাল ক্রমে প্রশমিত হইতে পারে, কিন্তু প্রাণহীন
দেহে প্রাণ সঞ্চারের আশা কদাপি ফলবতী হইবার নহে।
৪। মাতাপিতা দণ্ড প্রয়ােগ করিয়া সন্তানদ্বারা যে সমস্ত
কাৰ্য্য করাইয়া থাকেন, সেগুলি দণ্ডের স্মৃতির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে
জড়িত হওয়ায় চিরকাল তাহার মনে বিরক্তি উৎপাদন করে।
সুতরাং যে সমস্ত বিষয়ে সন্তানের অনুরাগ বৰ্ধিত হওয়া
আবশ্যক, সে সমস্ত বিষয়ে তাহার বিরাগই জন্মিয়া থাকে।
৫। ইহাতে মাতাপিতার প্রতি সন্তাণের বিদ্বেষভাব
জন্মায়।
যে সমস্ত বালক অতিরিক্ত শাসিত হয় তাহারা
কখন খুব ভাল লােক হইতে পারে না ।
-
সাধারণ ব্যবহার।
সন্তানের প্রতি মাতাপিতার সাধারণ ব্যবহার খুব মধুর,
স্নেহপূর্ণ ও সহানুভূতিসূচক হওয়া নিতান্ত আবশ্যক। তাহারা
যেন বিনা কারণে অথবা সামান্য কারণে সন্তানের সঙ্গে সর্বদা
Extravagant young fellows that have liveliness and
spirit come sometimes to be set right and so make able
and greatmen, but dejected minds timd rous and tame
and low spirits are hardly ever to be raised.-Locke.
Those children who have been most chastised
seldom make the best men.---Locke.
সাধারণ ব্যবহার। করেন। কর্কশ ব্যবহার না করেন। অনেক জননী এমন আছেন যাহারা শিশু ঘুমের ঘােরে বিছানায় মূত্রত্যাগ করিয়াছে বলিয়া দ্বিপ্রহর রজনীতে নিদ্রিত শিশুর উদ্দেশে গালিবর্ষণ বলা বাহুল্য, ঈদৃশ আচরণ নিতান্তই হয়। উঠিতে বসিতে সব সময়ে এরূপ ব্যবহার পাইতে থাকিলে শিশু অচিরেই অনায়াসে সমস্ত গালি হজম করিতে শিক্ষা করিবে। সুতরাং উপযুক্ত স্থলেও কোন প্রকার শাসনই আর উহার পক্ষে ফলপ্রদ হইবে না। অহিফেন যাহার দৈনিক আহাৰ্য্যের • তালিকাভুক্ত হইয়াছে সামান্য ঔষধে তাহার উপরে ক্রিয়া করিবে কি ? শুধু যে সন্তানের প্রতি মাতাপিতার ব্যবহার মধুর হইলেই যথেষ্ট হইবে তাহা নহে, পূর্বেই বলা হইয়াছে যে সকলের প্রতি তাঁহাদের ব্যবহার মধুর হওয়া উচিত। তবেই সন্তানদিগের চরিত্র মধুময় দেখিতে আশা করা যাইতে পারে। স্পেক্সারের উদ্ভাবিত দণ্ড। প্রকৃতির শাসন। ইংরেজপণ্ডিত হারবার্ট স্পেন্সারের বর্ণিত শাসন-প্রণালীর মধ্যে কিছু বিশেষত্ব আছে। সুতরাং তাহার এবিষয় সম্বন্ধে মত পৃথকভাবেই আলােচনা করিব। যখন একটী বালক অসতর্কভাবে দৌড়াইতে গিয়া পড়িয়া যায়, তখন সে শরীরে বেদনা অনুভব করে ; এই বেদনাজনিত স্মৃতি তাহাকে কিঞ্চিৎ সতর্কতা প্রদান করে। এইরূপে কয়েক-
সন্তানের চরিত্রগঠন।
বার পড়িয়া পড়িয়া সে বিশেষ সতর্কতা সহকারে চলিতে শিক্ষা
করে। প্রদীপের শিখা দেখিলে বালক কৌতূহলবশতঃ তাহা
ধরিতে চায়, কিন্তু ধরিলেই হাতটী অমনি পুড়িয়া যায়। সেই
স্মৃতি সহসা তাহার মন হইতে অন্তর্হিত হয় না। ইহা
প্রকৃতির শাসন। প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘন করিলে প্রকৃতিদেবী
এইরূপ শাস্তি প্রদানপূর্বক সকলকে ভবিষ্যতে গুরুতর অমঙ্গলা-
পাত হইতে রক্ষা করিয়া থাকেন। প্রকৃতির শাসনের যথেষ্ট
বিশেষত্ব আছে।
প্রকৃতির শাসনের বিশেষত্ব :-
১। নিয়ম লঙ্ঘন করিলে শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। সাধারণ।
জনক-জননীগণ অনেক সময়ে সন্তানদিগের দোষ বিনাশাস্তিতেও
ছাড়িয়া দেন; কিন্তু প্রকৃতিদেবী আমাদের সেরূপ মাতা নহেন।
তিনি কৰ্তব্য-পালনের উপযুক্ত কঠোরতা অবলম্বনে কখনও
পশ্চাৎপদ নহেন।
এ শাস্তি অপরাধের অনুরূপ। গুরুতর অপরাধের
শাস্তিও গুরুতর, সামান্য অপরাধের শাস্তিও সামান্য। সাধারণ
মাতাপিতার ন্যায় প্রকৃতিদেবী কখনও লঘুপাপে গুরুদণ্ড
অথবা গুরুপাপে লঘুদণ্ড প্রদান করিয়া দণ্ডের উদ্দেশ্য পণ্ড
করেন না। শিশু অসাবধানতা বশতঃ একটি পুতুল ভাঙ্গিয়া
গুরুতর বেদও ভােগ করে, কিন্তু অন্য সময়ে আবার ইচ্ছা-
প্রকৃতির শাষনের বিশেষত্ব। পূৰ্ব্বক গুরুতর অপরাধ করিয়াও অনায়াসে নিতি লাভ করে। সাধারণ মাতাপিতার প্রদত্ত শাস্তি অনেকটা এই রূপই হইয়া থাকে। কিন্তু প্রকৃতির শাসন দেখুন—বালক একটি অঙ্গুলি অগ্নিতে দিলে তাহার দুইটি অঙ্গুলি পুড়ে না, কিন্তু অগ্নির মধ্যে ঝাপ দিয়া পড়িলে তাহার সর্বাঙ্গই দগ্ধ হয়। ৩। এ শাস্তির পূর্বে কোনরূপ ভয়প্রদর্শন নাই, ধারে অথচ অবিচলিতভাবে ইহা প্রদত্ত হইয়া থাকে ; যতবার নিয়ম লঙ্ঘন হইবে ততবারই শাস্তিভােগ করিতে হইবে। প্রকৃতিদেব। . কোনরূপ ওজর আপত্তি গ্রহণ করেন না। ৪। প্রকৃতি-দত্ত শাস্তির বিরুদ্ধে কোন আপিল নাই। মা শিশুকে শাস্তিদান করেন, পিতা হয়ত তজ্জন্য শিশুর সাক্ষাতেই মাতাকে তিরস্কার করেন; অথবা পি শাস্তি প্রদান করিতে চান, মাতা হয়ত আসামীকে গােপন করিয়া রাখেন। প্রকৃতি- দেবীর বিচারের উপরে এরূপ কোন অন্যায় হস্তক্ষেপ নাই। ৫। প্রকৃতির শাসন কঠোর হইলেও উপকারী। শিশু। যাহাতে এইরূপে প্রকৃতির নিকটে শাসিত হয়, এবং তাহাদের কার্য্যের উপযুক্ত প্রতিফল প্রাপ্ত হয়, তাহাই মাতাপিতাকে দেখিতে হইবে। তাহারা এই প্রকৃতির শাসনে বাধা প্রদান করিবেন না। কিন্তু এই বলিয়া আবার ইহার সঙ্গে নিজেদের প্রদত্ত শাস্তি যােগ করিয়া শাসনের মাত্রা অনাবশ্যকরূপে বর্ধিত করিবেন না। পূৰ্ব্বোক্ত উদাহরণে হাতকাটাই প্রকৃতির শাস্তি; তদুপরি প্রহার করা যুক্তিযুক্ত নহে। বালক ইচ্ছা ৪ ০ সন্তানের চরিত্রগঠন। করিয়া তাহার পুতুল ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে ; পরদিন খেলিবার সময়ে সে পুতুলের অভাব অনুভব করিয়া কাঁদিতেছে এবং আর একটা নূতন পুতুল চাহিতেছে, এস্থলে এই অভাবজনিত কষ্টই প্রকৃতির শান্তি। তাহাকে কিছুদিন উহা ভােগ করিতে দেওয়া কর্তব্য। কিন্তু তাহা না করিয়া আপনি যদি তৎক্ষণাৎ তাহাকে আর একটা পুতুল কিনিয়া দেন, তবে প্রকৃতির শাসনে বাধা দেওয়া হইবে। পক্ষান্তরে, সে পুতুলের অভাবে কাদিতেছে বলিয়া আপনি যদি তাহাকে আবার প্রহার করেন, তবে অন্যায়- রূপে শাস্তির মাত্রাবৃদ্ধি করা হইবে। সন্তানের সহিত ব্যবহারে মাতাপিতা কিরূপে প্রকৃতির অনুসরণ করিতে পারেন কয়েকটা উদাহরণ দ্বারা তাহা বিশদ- ভাবে বুঝাইতে চেষ্টা করিব। শিশু তাহাব খেলনাগুলি ঘরময় ছড়াইয়া রাখিয়াছে এই অপরাধের জন্য কোনরূপ ভৎসনার আবশ্যকতা নাই। শিশু- দ্বারাই সেগুলি গুছাইয়া রাখুন। এস্থলে ইহা প্রকৃতির অনুরূপ শাস্তি। যদি সে অস্বীকার করে ( অবশ্য সে যদি পূর্ব হইতেই সুশিক্ষিত হইয়া থাকে, তবে অস্বীকার করিবে না) তবে পরদিন সে যখন খেলনাগুলি চাহিবে তখন তাহাকে উহা না দিয়া ধীরে ধীরে বলিবেন, “তুমি সে দিন ওগুলি ছড়াইয়া রাখিয়া- ছিলে আমিই শেষে তুলিয়া রাখিয়াছি। তােমাকে তুলিয়া রাখিতে বলিলেও তুমি তাহা কর নাই অতএব তােমাকে খেলনা না দেওয়াই উচিত।”
প্রকৃতির শাসনের বিশেষত্ব।
৪১
।
অনেক বালক নিজেদের জামা কাপড় সব এদিক ওদিক
ফেলিয়া রাখে। তাহাদিগকে নিম্নলিখিতরূপ শাস্তি প্রদান
করা যাইতে পারে :
পিতা বলিলেন, “আমি বেড়াতে যাব, কে কে যাবে
এখনই চল।”
শিশুগণ-আমরা যাব।
পিতা-তােমাদের জামা কাপড় নিয়ে এস, আমি দুই
মিনিটের বেশী দেরী কোরব না।
শিশুগণ এই কথা শুনিয়া ব্যস্ত হইয়া কাপড় জিতেছে,
না পাইয়া কঁদিতেছে, আর পিতাকে বিলম্ব করিতে আনুরােধ
করিতেছে।
আমার সঙ্গে বেড়াতে যেতে হলে জামা কাপড় সব
ঠিক করিয়া রাখিতে হইবে,যেন, কাজের সময়ে খুঁজিয়া বেড়াতে
হয়। এই বলিয়া পিতা তাহাদিগকে ফেলিয়াই চলিয়া
গেলেন। ইহাই শিশুদের বিশৃঙ্খলতার সমুচিত দণ্ড হইল।
বালক অসতর্কতাবশতঃ খুব বেশী কাপড় ছিড়ে।
যদি তাহাকে প্রহার করা যায়, তবে সে নিজের কৃত অন্যায়ের
কথা না ভাবিয়া বরং তাহার প্রকৃতি কৃত অত্যাচারের কথা
ভাবিয়াই রাগে ফুলিতে থাকিবে। এবিষয়ে প্রকৃতির অনুকরণে
নিম্নলিখিত শাস্তি প্রদান করা যাইতে পারে :-
সে নিজেই তাহার কাপড় সেলাই করিবে। নিজে না
পারিলে অন্যকে তােমােদ করিয়া তাহা দ্বারা করাইয়া
৪২
সন্তানের চরিত্রগঠন।
{
লইবে। এরূপ শাস্তিও যদি ফলদায়ক না হয় তবে উপযুক্তরূপ
ব্যবহার করিলে,ঐ কাপড় যতদিন টিকিত,ততদিনের মধ্যে পিতা
তাহাকে আর নূতন কাপড় কিনিয়া দিবেন না। ইহার মধ্যে
যদি কোন উৎসবাদিতে নিমন্ত্রণ থাকে, বলা বাহুল্য, তবে
তাহাতে তাহাকে নিয়া যাইবেন না। কারণ, ওরূপ কাপড়ে
ভদ্রসমাজে যাওয়া চলে না। বালক তাহার ভগ্নীর খেলনা
ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছে এ অবস্থায় উক্ত বালককে তাহার নিজের
খেলনা তাহার ভীকে দিতে বাধ্য করিতে হইবে। অবশ্য
এই শেষােক্ত শাস্তিকে প্রকৃতির শাসন না বলিয়া সদৃশ .
শাস্তি * বলাই উচিত
বালক মিথ্যা কথা বলিলে তাহাকে মিথ্যাকথার যাবতীয়
ফ ভােগ করিতে দিবেন। তাহার সত্য কথাও মিথ্যা বলিয়া
উড়াইয়া দিবেন, এবং যে অন্যায় সে করে নাই তাহাও তাহার
ঘাড়ে চাপাইয়া দিবেন। এ সম্বন্ধে ইহাই প্রকৃতির শাসন।
সুতরাং ইহারই সহায়তা করা উচিত। তাহা হইলে সে মিথ্যা-
কথার তিক্তফল আস্বাদ করিয়া অচিরেই উক্ত অভ্যাস বিষবৎ
পরিত্যাগ করিবে। এইরূপ শাস্তির আপেক্ষিক শ্রেষ্ঠতাঃ-
১। ইহাতে সন্তানগণ বাল্যকাল হইতেই কাৰ্যকারণের
সম্বন্ধ স্পষ্টরূপে বুঝিতে শিক্ষা করে।
২। শিশুগণ ইহাদ্বারা কাৰ্য্য ও তাহার সৎ ও অসৎ ফলের
# Characteristical Punishment.
Bentham's principles of Legislation.
৪৩
প্রকৃতির শাসনের বিশেষত্ব।
বিষয়ে আপনারাই বুঝিতে পারিয়া আপনাদিগকে সুপথে
চালিত করিতে পারে। এরূপস্থলে তাহাদের মন্দ হইবার
সম্ভাবনা অল্পই থাকে; কিন্তু, পক্ষান্তরে জোর করিয়া বা ভয়-
প্রদর্শন করিয়া তাহাদিগকে অন্যায় অভ্যাস হইতে নিবৃত্ত
করিলে তাহার ফল অধিকদিন স্থায়ী হয় না।
এরূপ শাসন যে খুব ন্যায়ানুমােদিত প্রত্যেক শিশুই
তাহা বুঝিতে পারে। সুতরাং এরূপভাবে শাসিত হইলে
মাপিতার উপরে তাহাদের রাগের কোন কারণ থাকে না।
৪। ইহাতে সন্তান অথবা মাতাপিতার চরিত্র রুক্ষ হইতে
পারে না।
৫। ইহাতে মাতাপিতা ও সন্তানের মধ্যে কোনরূপ মনাে-
মালিন্য ঘটে না, বরং প্রতিই উত্তরােত্তর বর্ধিত হইতে থাকে।
সুতরাং সন্তানের উপরে তাহাদের প্রভুত্ব ক্রমশঃই
দৃঢ়
হইতে
থাকে।
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অবাধ্যতার জন্য শিশুদিগকে প্রহার না করিয়া
প্রকৃতির শাসনের অনুসরণ করাই কৰ্ত্তব্য। কোন ভদ্রলােক
একটি ক্ষুদ্র বালককে খুব ভাল বাসিতেন। তিনি প্রায়ই
তাহাকে সঙ্গে সঙ্গে রাখিতেন। তাহার সঙ্গে একত্রে বেড়াইতেন
ও একত্রে খেলা করিতেন। একদিন তিনি ঐ বালকটিকে
কোন একটা জিনিস আনিতে বলেন। বালক খেলায় মঃ
ছিল, সুতরাং ঐ আদেশ পালন করিতে অনিচ্ছা প্রদর্শন করিল।
ভদ্রলােকটি, কিছু না বলিয়া নিজেই জিনিসটা আনিলেন,
O
৪ সন্তানের চরিত্রগঠন। কিন্তু তিনি যে বালকের অবাধ্যতায় খুব বিরক্ত হইয়াছেন মুখের ভাবে তাহা তাহাকে বুঝিতে দিলেন। সে দিন বিকালে আর তিনি উক্ত বালককে বেড়াইতে নিলেন না। বালক কাদিল। তিনি এই বলিয়া চলিয়া গেলেন, “তুমি যদি আমার কথা না শুন তবে আমি তােমাকে ভালবাসিব না। অন্যের কাছে যাহা পাইতে চাও, অন্যকে তাহা দিতে শিক্ষা কর।” পূর্বোক্তরূপ শাসনে কৃতকার্য হইতে হইলে, শিষ্য ও শাস- কের মধ্যে মধুর সম্পর্ক থাকা আবশ্যক ; পিতাপুত্রের মধ্যেও বন্ধুত্ব থাকা প্রয়ােজনীয়। বন্ধুত্বের সূক্ষতারে দুইটি হৃদয় বদ্ধ থাকিলে প্রবলটাদ্বারা অপরটা সহজেই পরিচালিত হইতে পারে। একের ব্যবহার দোষে অপরটাতে বেদনা অনুভূত হইলে, প্রথমটা তাহা অনায়াসে বুঝিতে পারিয়া নিজের ব্যবহারের সংশােধন করিয়া লয়। একস্থানে একজন যুবক একটা ত্রয়ােদশবর্ষীয় বালককে বড় ভালবাসিতেন। একদিন তাহাদের দুইজনের কোন স্থানে গৌরাঙ্গলীলা শুনিতে যাইবার কথা ছিল। বালকটী আসিয়া যুবকের অপেক্ষায় দাঁড়াইল। যুবক একটু কার্যে ব্যস্ত ছিলেন, তিনি বালকটাকে বলিলেন, “তুমি দেখিয়া আইস গান আরম্ভ হইয়াছে কি না,” বালকটী ইহাতে একটু বিরক্ত হইল এবং বেড়ার পশ্চাতে মুখ লুকাইরা অস্পষ্ট অথচ উদ্ধতভাবে বলিল, “এই রৌদ্রে যায় আসে কি করে তাতে "There should be friendship between the father and the son."Spencer's Education.
প্রকৃতির শাসনের বিশেষত্ব।
'৪৫
বুঝবেন না।” আদেশ প্রদানের সময়ে
রৌদ্রের বিষয়ে
যুবকের খেয়ালই ছিল না। গান আরম্ভ না হইয়া থাকিলে
হাতের কাজ ফেলিয়া যাইয়া অনর্থক বসিয়া থাকায় লাভ
নাই বলিয়াই তিনি ওরূপ আদেশ করিয়াছিলেন। কিন্তু
যুবক যে তার নিজের অসুবিধা দূর করিবার জন্য ঐ বালককে
ততটা পথ রৌদ্রে হটিতে আদেশ করিয়াছিলেন এজন্য মনে
মনে লজ্জিত হইলেন। কিন্তু আদেশ তাহার স্বার্থপরতাপ্রসূত
হইলেও, তিনি যাকে অতটা ভালবাসেন, সে যে তাহার কথায়
এরূপ অবাধ্যতা প্রদর্শন করিবে, ইহা উক্ত যুবকের পক্ষে নিতান্ত
অসহ হইনা। কাছে একটা লােক ছিলেন, নতুবা যুবক তখনই
ঐ বালককে কাছে ডাকিয়া তাহার এই প্রথম অবাধ্যতা ও
অশিষ্টতার জন্য তাহাকে স্নেহপূর্ণ উপদেশ দিতেন; কিন্তু তখন
তাহা না করিয়া তিনি বলিলেন, “আচ্ছা তুমি যাও, আমি
যাইব না।” এই বলিয়া যুবক তাহার নিজের কাৰ্যে মনাে-
নিবেশ করলেন। তিনি ভাবিয়াছিলেন, অতি শান্তভাবে
বালককে যাইতে বলিয়া তিনি বুঝি তাহার নিকটে কায়
বিরক্তির ভাব গােপন রাখিতে পারিয়াছেন। কিন্তু কিছুকাল
পরে যুবক দেখিলেন, বালকটী ফিরিয়া আসিয়া তাহার কাছে
দণ্ডায়মান হইল।
যুবক–ফিরিয়া আসিলে যে?
বালক—গান আন্তের একটু দেরী আছে, তাই আপনাকে
বলিতে আসিয়াছি।
সন্তানের চরিত্রগঠন।
ঐ যে যুবক বলিয়াছিলেন, “তুমি যাও আমি যাইব না।”
উহার মধ্যে যে লুক্কায়িত বিরক্তির ভাব ছিল, তাহাতেই ঐ
কোমলমতি বালকের হৃদয়তন্ত্রীতে আঘাত করিয়াছিল। যুবক
পরেও অন্যরূপে জানিতে পারেন যে, ঐ বালক তাহার প্রদর্শিত
এই অতি সামান্য অংশষ্টতার জন্য নিজেনিজেও অনুতাপ
করিয়াছিল। প্রেমের শাসন এমনই মৃদু অথচ এমনই কার্যকর।
কায়িক দণ্ড সম্বন্ধে স্পোর বলেন –এরূপ শাস্তি অসং-
যতচরিত্র মাতাপিতার দুর্দান্ত সন্তানগণের জন্য আবশ্যক হইতে
পারে। অসভ্য মাতাপিতার অসভ্য সন্তানের পক্ষে ঈদৃশ অসভ্য
উপায় অবলম্বনীয় হইতে পারে; কিন্তু সভ্য সমাজের সুসভ্য
মানবগণ স্বভাবতঃ এরূপ কঠোর উপায়ের প্রতি আন্তরিক ঘৃণা
পােষণ করেন। অন্যত্র তিনি বলেন,-“এরূপ অত্যাচার
যথাসাধ্য পরিহার করিবে, কিন্তু যখন অত্যাচার করা আবশ্যক
হইয়া পড়ে তখন দৃঢ়চিত্তে অত্যাচারী হইবে।”
স্পেন্সারের পূর্বোক্ত মতের সমালােচনা।
স্পেন্সারের পূর্বোক্ত মত অক্ষরে অক্ষরে কার্যে পরিণত
করা অসম্ভব, একথা সকলেই স্বীকার করিবেন। এ সম্বন্ধে
কতিপয় পশুতকৃত সমালােচনা সংক্ষিপ্তভাবে দেওয়া উচিত
বিবেচনা করিতেছি।
বিখ্যাত দার্শনিক পণ্ডিত বেইন তাহার শিক্ষা-সংক্রান্ত গ্রন্থে *
Education as Science.
৪৭ স্পেন্সারের পূর্বোক্ত মতের সমালোচনা। লিখিয়াছেন,“রুসসা ও স্পেন্সারের এই প্রকৃতির শাসন সম্বন্ধীয় মতামতের বিশেষ সারবত্তা আছে ; কিন্তু এ সম্বন্ধে আপত্তিও যথেষ্ট আছে। সর্বত্র প্রকৃতির উপরে নির্ভর করিলে বিপদের সম্ভাবনা আছে। মাতাপিতা সন্তানদিগকে তাহাদের কার্যের সাংঘাতিক ফল হইতে রক্ষা করবেন। সর্ববিষয়ে প্রকৃতির উপরে নির্ভর করা চলে না।” ডাক্তার পেইন্ বলেন, “উপযুক্ত সতর্কতার সহিত শিশু- দিগকে তাহাদের অন্যায় কার্যের স্বাভাবিক ফল ভােগ করতে দেওয়া যাইতে পারে। কিন্তু ইহাকে পারিবারিক শাসনের আদর্শ করিয়া তােলা নিতান্ত অমানুষিক ও অস্বাভাবিক। পূজ্যপাদ ভূদেব বাবু তাহার “পারিবারিক প্রবন্ধে লিখিয়াছেন, “কোন বিখ্যাতনামা ইংরেজ তাহার শিক্ষাসম্বন্ধীয় গ্রন্থে আদ্যো- পান্ত এই ভাব প্রকাশ করিয়াছেন যে, ছেলেকে বিধি বা নিষেধ—মুখে কিছু না শিখাইয়া যাহাতে সকল বিষয়ে সে ঠেকিয়া শিখিতে পারে এমন ব্যবস্থা করা কর্তব্য। এ কথা খুব পাকা কথা তাহার সন্দেহ নাই। ঠেকে শিখিলো শিক্ষা যেমন বদ্ধমূল হয় তেমন আর কিছুতেই হয় না । অতএব সম্ভবত তাহার পরামর্শানুযায়ী চলিবার চেষ্টা করা উচিত। ঠেকে শেখা বা ভূয়ােদর্শন দ্বারা শেখা—এ কথার তাৎপর্য সুখ-দুঃখভােগ- দ্বারা শিক্ষা লাভ করা। যদি পৃথিবীর সকল ব্যাপারের অব্যবহিত পরেই তজ্জনিত সুখ দুঃখের ভােগ হইত, তাহা হইলেই ঐরূপ শিক্ষা-প্রণালী অবলম্বন করা যাইতে পারিত।
৪৮ সন্তানের চরিত্রগঠন। / কিন্তু পৃথিবীর অধিক ব্যাপারই ঔরূপ নহে; অনেক স্থলে সুখ দুঃখ কাল ব্যবধানে সংঘটিত হয়। ছেলে মিষ্টান্ন খাইল, খাইতে বেশ লাগিল—তাদৃশ দ্রব্য ভােজনের সুখই তাহার মনকে আকর্ষণ করিল। দুই চারিদিন পরে তাহার পীড়া হইল ; শিশু মিষ্টান্ন ভােজনের সহিত তাহার পীড়ার কাৰ্যকারণসম্বন্ধ বুঝিতে পারিল না। তাহাকে ঐ সম্বন্ধ বুঝাইয়া না দিলে তাহার কোন শিক্ষালাভই হইবে না। অতএব বুঝাইয়া দিবার প্রয়ােজন আছে, বিধি নিষেধের প্রয়ােজন আছে। স্বাধীন ইচ্ছা সন্তান যদি কথঞ্চিৎ পরিমাণে স্বাধীনইচ্ছা-সম্পন্ন হয় তাহা দেখিয়া মাতাপিতার দুঃখিত হওয়া উচিত নহে। স্পেন্সার বলেন, “স্বাধীনপ্রকৃতি ইংরেজশিশু হইতেই স্বাধীনপ্রকৃতি ইংরেজের উৎপত্তি। একটি ব্যতীত অন্যটি পাওয়া অসম্ভব। জর্মান শিক্ষকগণ বলিয়া থাকেন, একটি ইংরেজ বালক অপেক্ষা দ্বাদশটি জৰ্ম্মান বালককে শাসনে রাখা সহজ। তাই বলিয়া কি আমরা আমাদের বালকগণকে জৰ্ম্মান বালকের ন্যায় নিতান্ত নিরীহ ‘গাে বেচারা দেখিতে ইচ্ছা করি এবং তৎসঙ্গে পরিণত- বয়স্ক জন্মানদিগের বশ্যতা ও রাজনৈতিক দাসত্বকে সাদরে আলি- গন করিব। আমরা তাহাই করিব, না আমাদের বালকদের সেই স্বাধীন ভাব রক্ষা করিয়া আবশ্যক মত শিক্ষাপদ্ধতি পরিবর্তিত ? স্বাধীন ইচ্ছা। করিয়া লইব’ ? অবশ্য এই স্বাধীন ইচ্ছাটা যাহাতে অন্যায় ভাবে পরিচালিত হইয়া একগুয়েমিতে পরিণত না হয়, মাতা- পিতার সেদিকে দৃষ্টি থাকা আবশ্যক। এতদুদ্দেশ্যে বালককে এরূপ ভাবে শিক্ষা দিতে হইবে যে, সে যেন ইচ্ছা করিয়াই সুপথে চলিতে চায় ; কুপথে যাইবার জন্য যেন কদাপি তাহার প্রবৃত্তি না হয় ; তবেই দু’দিক রক্ষা হইবে—তাহার স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হইবে না অথচ সাধুতাও বজায় থাকিবে। “বালক তাহার ইচ্ছানুরূপ কাৰ্য্য করিবে কিন্তু তােমার ইচ্ছানুরূপ ইচ্ছা করিবে * }” ইহার অর্থ এই যে বালককে স্বাধীনভাবে কাৰ্য্য করিতে দেওয়া উচিত, কিন্তু তাহার উপরে সৎশিক্ষা ও সৎদৃষ্টান্ত দ্বারা এমন একটা প্রভাব বিস্তার করিয়া রাখিতে হইবে যে, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাইলেও অন্যায় কাৰ্য্য করিয়া সেই স্বাধীনতার অপব্যবহার করিতে তাহার প্রবৃত্তি না হয়। বালকদিগের স্বাধীন ইচ্ছায় যথাসম্ভব হস্তক্ষেপ না করিয়া তাহাদিগকে শিক্ষা প্রদান করিতে চেষ্টা করা কর্তব্য। + স্বাধীন ইচ্ছা নষ্ট না করিয়া তাহাদিগকে সুপথে রাখাতেই শিক্ষক ও অভিভাবকের কৃতিত্ব। যাহারা তাহা পারেন তাহারাই শিক্ষকতা ও অভিভাবকতার উপযুক্ত * Rousseau's Emile: What is necessary is not to break the child's will but 1o educate in proper direction and this is not to be done by force or fear.-Smiles. Education cannot be promoted by crushing out individuality.-Smiles.
সন্তানের চরিত্রগঠন
পাত্র। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্রকে যথাসম্ভব সম্মান
করিতে হইবে। এ সন্ধে লক্ বলেন, “বাল্যকাল হইতে
বাধ্যতা শিক্ষা দিলে স্বাধীনতার সঙ্গে বাধ্যতার সামঞ্জস্য
রক্ষিত হইতে পারে।”
এজন্য
ভাঙ্গিবার অভ্যাস।
অধিকাংশ শিশুই জিনিসপত্র ভাঙ্গিতে বৃহস্পতি।
মাতাপিতার উদ্বেগের কোন কারণ নাই। ইহার মূলে শিশু-
দিগের অতিরিক্ত কাৰ্য-প্রিয়তাই বর্তমান। জিনিস গড়ক
অথবা ভাঙ্গুক তাহাতে বিশেষ কিছু আসে যায় না, সে
কিছু একটা করে কিনা তাহাই দেখিতে হইবে।' জিনিস
ভাঙ্গা দ্বারা তাহার কুপ্রবৃত্তি সূচিত হয় না। গড়া অপেক্ষা
ভাঙ্গাই সহজ ও শীঘসম্পাদ্য, সুতরাং চঞ্চল-স্বভাব শিশুদের
কাৰ্যতৎপরতার পক্ষে উহাই সমধিক উপযােগী। অতএব
জিনিস ভাঙ্গার জন্য শিশুদিগকে অনর্থক পীড়ন না করিয়া সে
গুলি তাহার নাগাল না পায় এরূপভাবে রাখাই সমীচীন।
নির্দয়তা।
শিশুগণ যাহাতে নিরীহ প্রাণিগণের উপরে অত্যাচার না
করে সে দিকে দৃষ্টি রাখিতে হইবে। নিরীহ জীবের প্রতি
অত্যাচারের এই প্রবৃত্তিটা শিশুদের পক্ষে স্বাভাবিক নহে।
নির্দয়। তাহারা ইহা অন্যের নিকটে শিক্ষা করিয়া থাকে। অনেক লােক এমন আছে যাহারা শিশুদিগকে অন্যকে প্রহার করিতে এবং অন্যের দুঃখে হাসিতে শিক্ষা দেয়। ৰে শিশু জন্মাবধি পিতার ক্রোড়ে উঠিয়া গভীর আনন্দ-ধ্বনির মধ্যে ছাগবলি দেখিয়া আসিতেছে, সে যদি একটু বড় হইয়া ভেক দেখিলেই প্রহার করিতে আরম্ভ করে বা পাখীর ছানা পাইলেই বলি দিতে ইচ্ছা করে,তবে কি বলিব নির্দয়তাটা শিশুদের স্বভাব- সিদ্ধ দোষ? তবে কি বলিব প্রকৃতি দেবীই মানবকে নির্দয় 'করিয়া সৃষ্টি করিয়া থাকেন? মাতাপিতা অনেকসময়ে সন্তান- গণের প্রতি আপনাদের নিষ্ঠুর ব্যবহারদ্বারাও তাহাদিগকে নিষ্ঠুর করিয়া তুলেন । * বালকদিগকে আশৈশব সর্বপ্রকার নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতা হইতে দূরে রাখিতে হইবে । নিরীহ জীবদিগের উপর অত্যাচার করা যে অন্যায়, সেকথা তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিতে হইবে। মাতাপিতার ব্যবহারও যাহাতে সেই উপদেশানুযায়ী হয় সে দিকে দৃষ্টি থাকা আবশ্যক। There is enormous amount of cruelty practised upon animals originating we believe in the physical punishment which has been received in the family or in the school...... ......Blows teach them cruelty to objects which are in their power.--Samuel Smiles.
অভিযোগ।
বালক বালিকাগণ প্রায়ই একে অন্যের বিরুদ্ধে নানারূপ
অভিযােগ উপস্থিত করিয়া থাকে। “ঐ দাদা আমাকে চিমটী
কাটলে,” “ঐ দিদি আমাকে কিল দেখালে” ইত্যাদি
অভিযােগ কুশিক্ষিত বালকবালিকার নিত্যসহচর। প্রায়শঃ
তাহারা ঈর্ষা ও ক্রোধদ্বারা পরিচালিত হইয়াই এরূপ
অভিযােগ উপস্থিত করিয়া থাকে। এ সমস্ত অভিযােগে
প্রশ্রয় না দেওয়াই কর্তব্য। এরূপ অভিযােগ করার ফলে
বালকগণের মন দুৰ্বল হইয়া পড়ে। কিন্তু যদিও অভি-
যােক্তাকে কোনরূপ প্রশ্রয় দেওয়া অভিপ্রেত নহে, তথাপি
অভিযােগ উপেক্ষণীয় না হইলে অভিযুক্ত বালককে গােপনে
তিরস্কার করাও অভিযােক্তার নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করিতে
অনুমতি করা কর্তব্য। কিন্তু অভিযােক্তা যেন জানিতে না
পারে যে আপনি অপর বালককে তিরস্কার করিয়াছেন
বা ক্ষমা চাহিতে বাধ্য করিয়াছেন। কারণ তাহা জানিতে
পারিলে সে ভাবিবে অভিযুক্ত বালক স্বতঃপ্রবৃণ্ড
হইয়াই ক্ষমা চাহিতেছে ; সুতরাং ইহাতে তাহাদের উভয়ের
মধ্যে ভালবাসা দৃঢ় হইবে ।
-
; কান্না। কান্না বালক-বালিকাদিগের একটা কদৰ্য্য অভ্যাস। অভ্যাস ত্যাগ করান আবশ্যক । অনেক পরিবার শিশুদের বীভৎস কান্নাকাটার জন্য ভদ্রলােকের পক্ষে অতিষ্ট হইয়া উঠে। শিশুদিগের অন্যান্য যাবতীয় কুৎসিত অভ্যাসের ন্যায় এ অভ্যাসের জন্যও মাতাপিতারই লজ্জিত হওয়া উচিত; কারণ • এটি তাহাদের প্রদত্ত কুশিক্ষারই অপকৃষ্ট ফল। এজন্য যে কেবল গৃহই অশান্তিময় হয় তাহা নহে, ইহাতে শিশুদিগের চরিত্র ও বিনষ্ট হইয়া থাকে। শিশুদের কান্না দুই প্রকারের প্রভুত্বসূচক এবং কষ্ট- সূচক। অনেক সময়েই শিশুগণ তাহাদের স্বকীয় আধিপত্য বিস্তারের জন্য কঁাদিয়া থাকে। যখন তাহারা স্বশক্তিদ্বারা আপন অভিলাষ পূর্ণকরিতে অক্ষম হয়, তখন চীৎকার ও নয়নজলের সহায়তা গ্রহণ করে। এরূপ কান্না তাহাদের ঔদ্ধত্য ও একগুয়েমির পরিচায়ক। কোন জিনিস লাভের জন্য কান্না, কাহারও সাহায্য-লাভের জন্য কান্না প্রভৃতি অধিকাংশ কান্নাই এই প্রথম শ্রেণীর অন্তর্গত। কখনাে কখনো আবার তাহারা প্রকৃত কষ্টবশতই কঁদিয়া থাকে। এই দুই প্রকারের কান্নার পার্থক্য সহজেই অনুমেয়, কঁদিবার সময়ে তাহাদের কণ্ঠস্বর, মুখের ভাব ও অঙ্গ ভঙ্গী দেখিয়াই তাহা বুঝিতে পারা যায়।
৫৪ সন্তানের চরিত্র গঠন। ইহার কোন শ্রেণীর কান্নাই সমর্থন-যােগ্য নহে। প্রথম শ্রেণীর কান্নার প্রশ্রয় দিলে শিশুদের দুর্দমনীয় প্রবৃত্তিগুলিরই প্রশ্রয় দেওয়া হয়। শিশু যদি কাদিয়াই তাহার ইচ্ছানুরূপ জিনিস লাভে অথবা ইচ্ছানুরূপ কাৰ্য-সাধনে সমর্থ হয়, তবে আর তাহার সুশিক্ষার আশা কোথায় ? যে জিনিসের জন্য সে কঁদিবে তাহাতে তাহাকে কিছুতেই দিবেন না, অধিকন্তু তাহার কান্নাও তখন তখনই থামাইতে হইবে। অনেক শিশু আবার সামান্য একটু কষ্টেই কুঁদিয়া আকুল হয়। এ অভ্যাসও নিতান্ত মন। ইহাতে তাহাদের মন দুৰ্বল হইয়া পড়ে। তাহাদের মনগুলিকে একটু শক্ত করাই আবশ্যক। জীবন দুঃখপূর্ণ ; বিপদাপদ ইহার নিত্যসহচর। সুতরাং সামান্য একটু দুঃখ-কষ্টে মনটাকে গলিতে দিলে চলিবে কেন ? শিশু একটু আছাড় খাইলেই, “আহা! আহা! ষাট ষাট!” বলিয়া তাহার কাছে ত্রস্ত হইয়া ছুটিয়া বাইবার আবশ্যকতা নাই—তাহাকে আবার পড়িতে বলুন, তাহার কান্না দূর করুন, ইহাতে তাহার যন্ত্রনা কমিবে এবং সে ভবিষ্যতে কষ্ট সহিতে সমর্থ হইবে। প্রভুত্বসূচক কান্না নিবারণ করিতে কিঞ্চিৎ কঠোরতার আবশ্যক। “বিরক্তিসূচক দৃষ্টি বা দৃঢ়তা- ব্যঞ্জক আদেশ এবিষয়ে ফলপ্রদ না হইলে অগত্যা বেত্রদণ্ডের সহায়তাও গ্রহণ করিতে হইবে।” * কিন্তু কষ্টসূচক কান্না দুৰ্বলতাপ্রসূত, সুতরাং তন্নিবারণাৰ্থ মৃৎতর উপায়ই অবলম্ব- Locke's Thoughts on Education, নীয় । কান্না। এই শ্রেণীর কান্না নিবারণের জন্য প্রথম প্রথম তাহাদিগকে কাদিতে দেখিলেই ঠাট্টা করবেন, অথবা তাহাদের মন অন্য দিকে আকৃষ্ট করিতে চেষ্টা করিবেন। কিন্তু তথাপি যদি এ কদভ্যাস বিদূরিত না হয় তবে শিশুর বয়ােবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শাসনের কঠোরতারও মাত্রবৃদ্ধি করিয়া তাহার কান্না নিবারণ করিবেন; তবে সে নাত্রাটা প্রহার পর্যন্ত না পৌছানই অভিপ্রেত। আর এক প্রকারের কান্না আছে, তাহা পূৰ্ব্বো দুই শ্রেণীরই অন্তর্গত। সেটি শাসনজনিত কান্না। শিশুগণ শাসিত হইয়া কখন কখন মনােদুঃখে বা প্রহারজনিত যন্ত্রনায় কাদিয়া থাকে, ইহা এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত। কাতর তাব্যঞ্জক কণ্ঠ স্বরই ইহার পরিচায়ক। ইহা থামাইতে চেষ্টা করিবার আবশ্য- কতা নাই, কারণ এরূপ কান্না আত্ম-ইচ্ছা-প্রণােদিত নহে। শিশুগণ আবার কখন কখন শাসিত হইয়া স্বকীয় প্রভুত্বের খর্বতা-নিবন্ধন আক্রোশের সহিত কাদিয়া থাকে। বলা বাহুল্য ইহা প্রথম শ্রেণীর আন্তর্গত। এরূপ কান্না কঠোর হস্তে নিবারণ করিবেন। কারণ ওপ ভাবে কাদিয়া সে আপনার শাসন অগ্রাহ্য করিয়া থাকে। সুতরাং তাহাকে এরূপ ভাবে ছাড়িয়া দিলে শাসনের উদ্দেশ্যই পণ্ড হইবে । তাহার বিদ্রোহী মনকে বশে আনাই শাসনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। কিন্তু সে যদি উচ্চ- চীৎকারদ্বারা আপনার প্রদত্ত শাস্তির অন্যায্যতা ঘােষণা করিতে থাকে, তবে আপনার উদ্দেশ্য-সিদ্ধির সম্ভাবনা ৫৬ সন্তানের চরিত্র গঠন। কোথায় ? শিশু কঁদিলে প্রথমতঃ তাহার কান্নার কারণ- সন্ধান করিবেন। যদি দেখেন তাহার প্রকৃত কোন অভাব আছে, তবে তাহা দূর করতে চেষ্টা করুন। কিন্তু অভাব প্রকৃত হইলেও যদি তাহা দূরকরা আপনার সাধ্যাতীত হয়, চুপ করিয়া থাকুন। তাহার অভাব দূর করিতে না পারিয়া তাহাকে ‘যাদু সােণা' বলিয়া সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করিবেন ; তাহাতে তাহার অভাব বিদূরিত হইবে না, বরং সে বুঝিবে কাদিলেই আদর পাওয়া যায়। কিন্তু তাহার যদি প্রকু কোন অভাব না থাকে, সে যদি অন্যায়রূপে কঁদিতে থাকে, তাহার কান্না নিবারণ করিবেন। অথবা এরূপ অবস্থায় তাকে খুব কাদিতেও দিতে পারেন, সে যত পারে কাদিয়া গলা ভাঙ্গুক, সে দিকে ফিরিয়াও তাকাইবেন না, তাহা হইলে আর কখনও সে এরূপ নিস্ফল চেষ্টায় আসক্তি দেখাইবে না। বালক-বালিকাগণ যেন কখনও তাহাদের খৈয়ালের কান্নাদ্বারা আপনার সহানুভূতি সহানুভূতি আকর্ষণ করিতে না পারে। কারণ তাহার। একবার যদি আপনার দুর্বলতা বুঝিতে পারে, তবে বারংবার তাহাতে আঘাত করিয়া কাৰ্য-সাধনে চেষ্টা করিবে। যদি তাহারা বুঝিতে পায় যে, কান্নাই আপনার সহানুভূতি আকর্ষণের পক্ষে অমােঘ ব্রহ্মাস্ত্র.তবে অবশ্যক হইলে কখনই তাহারা সে অস্ত্র প্রয়ােগে বিমুখ হইবে না। শিশুর খেয়ালের কান্না নিবারণের জন্য প্রথৰতঃ তাহাকে অন্যমনস্ক করিতে চেষ্টা করিতে পারেন।
কান্না,
.
কোনরূপ কৌতুকজনক ব্যাপারে তাহার মন আকৃষ্ট করিতে
পারেন। কিন্তু সাবধান ! সে যেন আপনার উদ্দেশ্য বুঝিতে
পায়—আপনি যে তাহাকে অন্যমনস্ক করিবার জন্য বড়
ব্যস্ত হইয়া তাহাকে ওরূপ কৌতুক দেখাইবার বন্দোবস্ত
করিয়াছেন, একথা যেন সে কিছুতেই বুঝিতে না পারে।
কারণ, তাহা বুঝিতে পারিলে ভবিষ্যতে ওরূপ কোন
আমােদ নক ব্যাপার দর্শনার্থ সে ক্রন্দনেরই সহায়তা গ্রহণ
করিবে।
এমন শিশুও আছে যে না কঁাদিয়া কোন কথাই বলিতে
পারে না—সে কাহাকেও ভাকিতে হইলে কাদিবে,কোন দ্রব্য
চাহিতে হইলে কাদিবে। যে শিশু কথা বলিতে পারে তাহার
এরূপ অভ্যাসের কখনও প্রশ্রয় দিতে নাই। যতক্ষণ সে
কাঁদিবে ততক্ষণ তাহার কাছে যাইবেন না, অথবা তাহাকে
কোন দ্রব্য দিবেন না। কিন্তু যেই তাহার কান্না থামিবে মনি
তাহাকে তাহার ভীষ্পিত দ্রব্য দিবেন। দুই চারিবার এরূপ
করিলে ভবিষ্যতে কোন দ্রব্য পাইবার জন্য সে আর ক্রন্দনের
সহায়তা গ্রহণ করিবে না। রামবাবুর তিনটি পুত্র – কাপ,
অতুল ও অনাথ। ভৃত্য ভজহরি আসিয়া বলিল
,, বাজারে
নেংড়া আম আসিয়াছে। বাবু তাহাকে টাকা দিয়া আম
আনিতে পাঠাইলেন। অনুপ ও অনাথ পথের কাছে আমের
প্রতীক্ষায় দাড়াইয়া রহিল। ভজহরি তাম নিয়া আসিবামাত্র
অনাথ চীৎকার করিয়া কাঁদিতে লাগিল, কারণ সে কোন
সন্তানের চরিত্রগঠন।
গেল।
;
দ্রব্যই না কাঁদিয়া চাহিতে পারে না। অনুপ ভজহরির কাছা
ধরিতে ধরিতে বাড়ীর ভিতরে
ভজহরি
যাই আমের ডালা নীচে নামাইয়া রাখিল, অমনি অনাথ
কঁদিতে কাঁদিতে গিয়া তাহার উপরে পড়িল। অনুপ কাছে
গিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। অতুলের সে দিকে খেয়াল নাই।
সে আপন মনে খেলা করিতেছে। রামবাবু, অতুলকে তথায়
ডাকিলেন,সে আসিল; তখন তিনি অনাথকে বলিলেন, “অনাথ
তুমি জান তােমাদের জন্যই আম আনা হইয়াছিল, তুমি
এরূপ কাদিয়াছ বলিয়া তােমাকে একটা আমও দিব না,
কারণ আমি এরূপ কান্নাকাটা পছন্দ করি না।”অনুপকে বলি-
লেন“তুমি আমের জন্য সেই হইতে পথের ধারে বসিয়াছিলে,
ইহাতে তােমার লােভেরই পরিচয় পাওয়া গিয়াছে ; আমি
এরূপ লােভের প্রশ্রয় দিতে পারিনা। কিন্তু তুমি অনাথের মত
চীৎকার করিয়া আরাে বেশী ত্যক্ত কর নাই বলিয়া তােমাকে
একটা আম দিলাম ; তুমি যদি রাগ করিয়া এটা না নেও তবে
এবৎসরও আর তুমি আম খাইতে পাবে না।” পরে তিনি
অতুলকে বলিলেন, “অতুল তােমার ব্যবহারে আমি খুব সুখী
হইয়াছি, তাই তােমাকে এই পাচটা আম দিলাম।” অতু-
লের নিলোভতার পুরস্কার হইল, এবং অনুপ ও অনাথের
যথেষ্ট শাস্তি হইল।
শিশুগণ যে পর্যন্ত কথা বলিতে না পারে, সে পর্যন্ত
তাহাদের কান্না একেবারে নিবারণ করা অসম্ভব ; কান্নাই
কান্না। ৭ তখন তাহাদের একমাত্র ভাষা। কিন্তু তাই বলিয়া কেহ যেন তাহাদিগকে খুব কাদাইয়া, তাহাদের সেই ভাষার উৎকর্ষ- সাধনেও সহায়তা না করেন। পক্ষান্তরে, তাহাদের ক্রোধ- জনিত প্রভুত্ব সূচক কান্না অতি শৈশব হইতেই নিবারণের জন্য মাতাপিতাকে সচেষ্ট হইতে হইবে। এস্থানে ইহাও বলিয়া দেওয়া আবশ্যক যে, শিশুদিগের প্রথম কান্না প্রার্থনা-সূচক। তাহাতে অবাধ্যতা, একগুয়েমি, কি প্রভুত্ব-স্থাপনেচ্ছাপ্রভৃতির নাম গন্ধও থাকে না। কিন্তু যখন তাহারা দেখিতে পায় যে, তাহাদের প্রার্থনা অন্যায়ভাবে অবহেলিত হইতেছে ; মাতাপিতা ইচ্ছা করিয়া তাহাদের কষ্টের কারণ দূর করিতেছেন না, তখন হইতে ক্রমে ক্রমে তাহাদের মধ্যে পূর্বোক্ত দোষগুলি প্রবেশ লাভ করিতে থাকে। অতএব মাতাপিতাকে এবিষয়ে প্রথম হইতেই সতর্ক হইতে হইবে। কারণ, একবার যদি আপনার ব্যবহারের দোযে শিশুর মধ্যে একগুয়েমি প্রভৃতি প্রবিষ্ট হয়, তবে তাহা দুর করা নিতান্ত আয়াসসাধ্য হইবে, এবং দূর করিতে হইলে সেগুলির সঙ্গে সঙ্গে বালকের হৃদয় হইতে কতকগুলি মান- ববাচিত গুণও অন্তর্হিত হইবে। * * Willfulness can scarcely be banished without injury to some trait of his better nature. Education of Man.- Froebel.
CARSWAT LIEFMAN * * * - - - Estd:-1219, HAMARUSH মিথ্যাকথা। যে সমস্ত বালক নিজেদের দোষগুলি সম্পূর্ণ নগ্নাবস্থায় প্রকাশিত দেখিতে ভয় পায় তাহারাই নানারূপ মিথ্যাকথা দ্বারা সেগুলিকে আবৃত করিতে প্রয়াস পাইয়া থাকে। তাহা- দিগকে লজ্জা দিয়া অল্পে অল্পেই এই কু-অভ্যাসের হাত হইতে মুক্ত করা কর্তব্য। বালক যদি কোন প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে মিথ্যাকথার সহায়তা গ্রহণ করে বুঝিতে পারেন তবে তাহাকে ধীর ও গম্ভীরভাবে সত্য বলিতে আদেশ করুন। যদি সে পথে না আইসে তাহাকে শাসন করুন। কিন্তু সে যদি সত্য কথা বলে ও নিজের দোষ স্বীকার করে, তবে তাহার সত্যপ্রিয়তার প্রশংসা করুন এবং তাহ'র অপরাধ মার্জনা করুন। পরে কখনও তৎকৃত সেই অপরাধের কথা তুলিবেন না। কারণ সে যাহাতে তাহার.ঐ সত্যবাদিতার জন্য ভবিষ্যতে কিছুমাত্র অসুবিধা ভােগ না করে আপনাকে অব- শ্যই তাহা দেখিতে হইবে। কিন্তু সাবধান ! সুধু সন্দেহের উপরে নির্ভর করিয়া তাহাকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করিবেন ন: ; এমন কি, যদি তাহার কোন কথা আপনি স্পষ্টরূপে
মিথ্যাথা।
;
মিথ্যা বলিয়া প্রমাণ করিতে পারিবেন না এরূপ বুঝেন, তবে
তাহা সত্য বলিয়াই ধরিয়া লইবেন; এবং তাহাতে সামান্য
মাত্রও সন্দেহের ভাব দেখাইবেন না। বালকের যশ যতদিন
সম্ভব আপনার নিকটে অক্ষুন্ন থাকিতে দিবেন, কারণ সে যখন
বুঝিবে যে আপনার কাছে তাহার যশ ম্লান হইয়া গিয়াছে
তখনই সে আপনার অনেকটা হাতছাড়া হইয়া পড়িবে।
উদ্দেশ্যে তাহার সামান্য সামান্য মিথ্যাকথাও আবশ্যক
বােধে, উপেক্ষা করা যাইতে পারে। কিন্তু একবার যখন
তাহার সঙ্গে এবিষয়ে আপনার মুখ চেনা চিনি’ হইয়া যাইবে,
একবার যখন সে প্রকাশ্যে মিথ্যাবাদী বলিয়া ধরা পড়িবে,
তখন, আর তাহার সামান্য মিথ্যাকথাটীও উপেক্ষা করিবেন
। কিন্তু যতদিন সে ওরূপ ভাবে ধরা না পড়ে, ততদিন
যেন সে বুঝিতে না পারে যে আপনি তাহাকে অবিশ্বাস
করেন। সে যদি বলে, “আমি ইহা করি নাই,” তাহাকে
আর দ্বিতীয় প্রশ্নটী করিবেন না। কারণ, সে যদি বুঝিতে
পায় আপনি তাহাকে খুব বিশ্বাস করেন, তবে সে আপনার
নিকটে মিথ্যা বলিতে লজ্জিত হইবে। * ইংলণ্ডের সুবিখ্যাত
রাগবী স্কুলের বিখ্যাতনামা শিক্ষক মহাত্মা আর্নল্ডের
সম্বন্ধে তাঁহার ছাত্রদের ধারণা ছিল যে, তঁাহার কাছে মিথ্যা
Trust men and they will be true to you-Emerson.
সন্তানের চরিত্রগঠন।
বলা বড় লজ্জার কথা, কারণ তিনি সব সময়ে সকলকে
বিশ্বাস করেন।
শিশুগণ যে প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গিতে প্রলুব্ধ হইতে পারে তাহা-
দের দ্বারা তাদৃশ প্রতিজ্ঞা করান উচিত নহে। যদি আপনার
অসাক্ষাতে কোনরূপ অন্যায় সংঘটিত হয়, এবং আপনি যদি
জানেন কে এ অন্যায় করিয়াছে, তবে কখনও শিশুর ঘাড়ে
সে দোষ চাপাইতে চেষ্টা করিবেন না; এমন কি সে ইহা
করিয়াছে কি না তাহাও তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবেন না।
কারণ ওরূপ প্রশ্ন-দ্বারা শিশুকে মিথ্যা বলিতেই শিক্ষা দেওয়া
হইয়া থাকে। এরূপ প্রশ্ন নিতান্ত নিৰ্ব দ্ধিতাসূচক এবং
প্রকৃত অপরাধীর নিকটে এরূপ প্রশ্ন করা অপেক্ষা অধিকতর
নির্বুদ্ধিতার বিষয় আর কিছুই হইতে পারে না। কারণ, সে
যদি বুঝে যে আপনি তাহার কৃত অন্যায়ের কথা জানিয়া
শুনিয়াও তাহার দ্বারা সে কথা স্বীকার করাইয়া তাহাকে
ফাঁদে ফেলিবার চেষ্টা করিতেছেন, তবে নিশ্চয়ই সে আপনার
উপরে বিরক্ত হইবে। পক্ষান্তরে সে যদি বুঝিতে পায় যে
আপনি কিছুই জানেন না, তবে নিশ্চয়ই সে উহা আপনার
নিকটে গােপন করিতে চেষ্টা করিবে। উভয়ই সে এরূপ
প্রশ্নদ্বারা মিথ্যা বলিতে প্রলুব্ধ হইবে। এরূপ স্থলে শিশুর
নিকট হইতে এই ভাবে সত্য কথা আদায় করিবার চেষ্টায়
প্রায়ই কুফল প্রসূত হইয়া থাকে।
.
"It is a shame to tell Arnold lie, he always believes
one".- Life of Dr. Arnold.
বিলাসিত।
সন্তানগণ মাতাপিতার নিকটে নিঃসঙ্কোচে তাহাদের
অভাবের বিষয় জ্ঞাপন করিবে, কিন্তু কিরূপে সে অভাব দূর
করিতে হইবে তাহা বিবেচনা করা মাতাপিতারই কর্তব্য।
একটা জামার আবশ্যক, এইটুকু মাত্র তাহারা মাতাপিতাকে
জানাইবে। কিন্তু সে জামাটি গরদের কি লংক্লথের হইবে, লাল
কি কাল রংএর হইবে, তাহা মাতাপিতারই বিবেচনাধীন
হওয়া আবশ্যক। সন্তানকে এবিষয়ে কোনরূপ. বা নিস্পত্তি
করিতে দেওয়া উচিত নহে। যখনই সে বলিবে, “আমার
কাপড়ের পাড় এইরূপ রংএর হওয়া চাই', তারা যেন তখনই
বলেন, “তবে আর আজকাল তুমি কাপড়ই পাইতেছ না।”
তাহারাও যেন সন্তানের অভাব দূর করিতে যাইয়া তাহাকে
একটি ‘ফুলবাবু' করিয়া না তুলেন। অবশ্য তাহারা যে ইচ্ছা
করিয়া সন্তানকে খুব খারাপ জিনিসগুলিই দিবেন তাহা নহে,
তাহার এবিষয়ে নিজ নিজ অবস্থা ও সন্তানদিগের সংযম
শিক্ষার দিকে দৃষ্টি রাখিয়া কাৰ্য করেন ইহাই অভিপ্রেত।
সন্তানগণের খেয়াল নিবৃত্তির পরিবর্তে তাহাদের অভাব নিবা-
রণই যেন মাতাপিতার উদ্দেশ্য হয়। শিশুদের আহাৰ্য্য ও
পরিধেয় প্রদান সম্বন্ধেই যে শুধু এরূপ করিতে হইবে তাহা
নহে, সর্ববিষয়ে, এমন কি তাহাদের ক্ষুদ্র খেলনাটা দেওয়া
সম্বন্ধে ও উহাই সকল মাতাপিতার মূলমন্ত্র হওয়া উচিত।
সন্তানকে কোন একটী দ্রব্য প্রদানের সময়ে সকলের যেন
স্মরণ থাকে যে তাঁহাদের সেই সন্তান শুধু তাঁহাদেরই সন্তান
৬৪ সন্তানের চরিত্রগঠন। p নহে, কিন্তু সে দারিদ্ৰব্ৰত ধারী, বিশ্ববিশ্রুতকীত্তি সেই আৰ্য্য ঋষিদিগেরও সন্তান, যাহাদের উচ্চচিন্তারাশি আজ নির্মল জ্যোৎস্নার ন্যায় সমগ্র জগতে ছড়াইয়া পড়ায় যাবতীয় সভ্য- জাতির বিশাল হৃদয়ে বিস্ময় ও ভক্তি উচ্ছসিত হইতেছে। কোন মাতাপিতা যেন এই মহান্ জাতির বংশধরদিগের মনে বিলাসবাসনা উদ্দীপ্ত করিয়া মূৰ্ত্তিমান্ বিনাশকেই আহ্বান করেন। আমরা বিলাস চাহি না, সংযম চাই, -বিনাশ চাহি না, জীবন চাই। পূজ্যপাদ স্বর্গীয় ভূদেব বাবু লিখিয়া- ছেন, “দরিদ্রের পক্ষে বিলাসিতা বড় সাংঘাতিক রােগ। আমরা এক্ষণে দরিদ্র জাতি। আমাদের সুখােপভােগ চেষ্টা ভাল নয়। গানবাজনা, আমােদপ্রমােদ, বিজয়ী ধনশালী প্রবল-প্রতাপ ইংরেজদিগকে সাজে, আমাদের মধ্যে গান তামাসা নাটকাভিনয়াদি কাণ্ড কোনমতেই শােভা পায় না। অতএব সন্তানকে বিলাসী হইতে দিতে নাই। যিনি আমা- দের মধ্যে ধনবান্ তঁাহারও কর্তব্য ছেলেকে বাবুয়ানা হইতে নিবারণ করিয়া রাখেন। সমাজের যে অবস্থা, তাহার অনু- রূপ ব্যবহারেই সমাজান্তর্গত সকল লােকের পক্ষে বিধেয়। বাঙ্গালীকে অনেক ভার সহ্য করিতে হইবে, অনেক চাপ ঠেলিয়া উঠিতে হইবে, সুতরাং বাঙ্গালীর শিক্ষা কঠোর হওয়া আবশ্যক। প্রতি পরিবারের কর্তাকে এক একটী লাই- কারগ হইতে হইবে, কারণ বাঙ্গালীকে স্পার্টান করিবার নিমিত্ত রাজকীয় লাইকারগ জন্মিবে না।”
প্রশংসা।
বালক বালিকাদের সাক্ষাতে তাহাদের সম্বন্ধে আলোচনা
করিতে নাই। আমরা অনেক সময়ে ভাবি যে শিশুগণ
আমাদের কথার অর্থ বুঝিতে পারে না; কিন্তু তাহা ভুল।
শিশুগণ কথা বলিতে শিখিবার অনেক পূর্বেই কথার অর্থ
গ্রহণ করিতে পারে, ইহা একটু পরীক্ষা করিয়া দেখিলেই
বেশ বুঝিতে পারা যায়। মাতাপিতা শিশুদিগের সাক্ষাতেই
তাহাদের সামান্য সামান্য চতুরতার কথা একে অন্যের
নিকটে হাসিতে হাসিতে বলিয়া থাকেন। শিশু এমন অনেক
কথা বলে ও এমন অনেক কাজ করে, যেগুলি তাহার বয়সের
তুলনায় কিঞ্চিৎ অধিক চতুরতার পরিচায়ক হইলেও কিছুতেই
সমর্থনযােগ্য নহে। সে সমস্ত কথা বা কার্যেও মাতাপিতা
হাসিবার লােভ সংবরণ করিতে পারেন না।
এমন কি
অনেক মাতা কচি শিশুর মুখে অভদ্র গালাগালি শুনিয়াও
হাসিয়া গলিয়া পড়েন, এবং সময়ে সময়ে নিজেরাও শিশুর
সঙ্গে তাহা উচ্চারণ করিয়া থাকেন।
শিশু মনে করে খুব
এক জিনিস শিখিয়াছি, নতুবা ইহা শুনিয়া মা অত হাসিবেন
কেন? সুতরাং সে সৰ্ব্বত্র নির্ভয়ে উহা প্রয়ােগ করিতে
আরম্ভ করে। শিশুগণ নানারূপ অঙ্গভঙ্গী বা মুখভঙ্গী করিয়া
৫
সন্তানের চরিত্রগঠন।
থাকে, মাতাপিতা সেগুলির প্রশংসা করিয়া যে তাহাদের
ক্ষুদ্র হৃদয়ে অহঙ্কার-বহ্নি জ্বালাইয়া দেন ইহাও অন্যায়।
অনেকেই নিজ সন্তানকে কিছু অতিরিক্ত বুদ্ধিমান বলিয়া
মনে করিয়া থাকেন। ইহার কারণ এই যে, তাহারা কেবল
তাহাদের নিজ সন্তানেরই মনােবৃত্তির ক্রমিক বিকাশ
দেখিবার সুযােগ পাইয়া থাকেন। এতদ্ভিন্ন তাহাদের তাদৃশ
বিবেচনার অন্য কোন সুদৃঢ় ভিত্তি নাই। আপনার শিশু যেন
আপনার কথাদ্বারা ঘুণাক্ষরেও নিজকে অপরাপর শিশুগণ
অপেক্ষা কোন বিষয়ে উৎকৃষ্ট বিবেচনা করিবার সুযােগ না
পায়। পণ্ডিত জেম্স্ মিল তাহার বিখ্যাত পুত্র জ ষ্টুয়ার্ট
মিলকে বাল্যকালে কদাপি অন্য বালকের সঙ্গে মিশিতে
দিতেন না। ষ্টুয়ার্ট মিল বাল্যকাল হইতেই অসাধারণ
মেধাবী ছিলেন। পাছে সাধারণ বালকদিগের সঙ্গে মিশিয়া
পুত্র নিজ অসাধারণত্বের বিষয় বুঝিতে পায় ইহাই পিতার
আশঙ্কার কারণ ছিল।
জন্ ষ্টুয়ার্ট মিল দ্বাদশ বৎসর বয়সে
যে সমস্ত পুস্তক পড়িয়াছিলেন এতদ্দেশীয় অনেক কৃতবিদ্য
লােক জীবনে তাহার নাম শুনেন নাই একথা বলিলে বােধ
হয় অত্যুক্তি হয় না। সেই মিল তাহার আত্মজীবনীতে
লিখিয়াছেন, “চতুর্দশ বৎসর বয়সে আমি যে দিন আমাদের
দেশ-প্রচলিত রীতি অনুসারে মহাদেশভ্রমণে বহির্গত হই,
তাহার পূর্ব দিন হাইড, পাকে বেড়াইতে বেড়াইতে নানাবিধ
উপদেশের মধ্যে পিতা আমাকে এই কয়েকটা কথা বলিয়া-
मा ৬৭ ; ছিলেন, “জন্ তুমি বিদেশে যাইতেছ, সে সমুদয় স্থানে দেখিতে পাইবে তােমার সমবয়স্ক যুবকগণ বুদ্ধি-বিবেচনায় ও মানসিক উৎকর্ষে তোমা অপেক্ষা অনেক হীন, সুতরাং অনেকেই তােমার অসাধারণত্বের প্রশংসা করিবে। সাবধান ! সেই সকল প্রশংসাবাদে যেন তােমার হৃদয়ে আত্মাভিমান- বহ্নি জ্বলিয়া না উঠে।” পিতার এই কথা উল্লেখ করিয়া ফুয়াট মিল, লিখিয়াছেন, “বাস্তবিক আমি যে আমার সম- বয়স্কগণ হইতে জ্ঞানে ও শিক্ষায় শ্রেষ্ঠ একথা আমি সেই দিনই প্রথন জানিয়াছিলাম ; ইহার পুৰ্ব্বে পিতা আমাকে কখনও ঘুণাক্ষরে একথা বুঝিতে দেন নাই।” জেমস মিলের ন্যায় সদ্বিবেচক পিতার পুত্র হইয়াছিলেন বলিয়াই আজ ষ্টুয়ার্ট মিলের খ্যাতিতে সমগ্র জগৎ পরিপূর্ণ। বিবেচনার সহিত প্রয়ােগ করিতে পারিলে প্রশংসার উপকারিতাও আছে। সন্তানের কোন সৎকার্যের জন্য মাতাপিতা তাহার প্রতি যে হাসিমুখে সস্নেহ দৃষ্টিপাত করেন উহাই তাহার কাৰ্য্যের উপযুক্ত প্রশংসা। ওরূপ সস্নেহ দৃষ্টিনিক্ষেপের নৈতিক শক্তিও যথেষ্ট। কিন্তু প্রশংসার বাহুল্য নিতান্ত অনিষ্টকর। আমেরিকার সুবিখ্যাত লেখক এবট লিখিয়াছেন,—সুন্দর শিশুগণ যে প্রায়শঃ গর্বিত প্রকৃতির হয়, এই প্রশংসা-বাহুল্যই তাহার কারণ। তাহার মতে অতিরিক্ত সৌন্দৰ্য্যশালী হওয়া দুর্ভাগ্যের লক্ষণ। বস্তুতঃ, খােসার প্রশংসা শুনিতে শুনিতে যদি ভিতরে অহঙ্কারের জন স্টুয়ার্ট মিলের আত্মজীবনী।
সন্তানে, চরিত্রগঠন। ; আগুন জ্বলিয়া উঠে, তবে তাহার দাহনে যে অন্তঃসার ভস্মী- ভূত হইবে ইহা নিশ্চিত। আপনার সন্তান যদি খুব ধর্মপরায়ণ হয়, তাহাও অপরের কাছে বলিয়া বেড়াইবেন না। কারণ, একথা সাব- রণ্যে প্রকাশিত হইয়া পড়িলে লােকে তাকে খুব প্রশংসা করিবে; তাহাতে তাহার অহঙ্কার বাড়িয়া উঠিবে। সে তখন প্রকৃত ধৰ্ম্ম ভাব পরিত্যাগপূর্বক লােকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার জন্য নানা উপায় অবলম্বন করিবে | তাহার প্রার্থনা তাহার দয়ার্ড ব্যবহার, সকলই তখন প্রশংসা আদায়ের উপকরণে পরিণত হইবে। এইরূপে আপনার ধার্মিক শিশু ঘােরতর কপটাচার হইয়া পড়িবে । সন্তানগণকে ঈদৃশ বিবেচনাশূন্য প্রশংসা-বাহুল্য হইতে রক্ষা করা জনক জননীর একাও করা । পুরস্কার। কেহ বালকবালিকাদিগকে পুরস্কার দেওয়ার বিরােধী। ইংরেজ পণ্ডিত লক্ এই মতাবলম্বী। তিনি বলেন, ইহাদ্বারা তাহাদের মনে আকাক্ষা জাগরিত হয় । সন্তানদিগকে কর্তব্যবােধে কার্য করিতে শিক্ষা দেওয়াই অভিপ্রেত। তাহার মতে মাতাপিতার সােহাগ ও স্নেহালিঙ্গন প্রভৃতিই বালকবালিকাদিগের কৃত সৎকার্যের উপযুক্ত পুরস্কার। অবশ্য এ বিষয়ে মতদ্বৈধ আছে। তবে লকে। মতটিও ভাবিয়া দেখিবার বিষয় বটে।
WAT LIBEANS d; if প্রতিযোগিত বালকের মনে অপরের সঙ্গে প্রতিযােগিতার ভাব জাগাইয়া দেওয়া উচিত নহে। শিশুকে তাহার আপনার প্রতিযােগী হইতে দিবেন। সে পূৰ্ব্বে যাহা ছিল তাহা হইতে আপনাকে উন্নত করতে চেষ্টা করুক। রুসাে বলেন, “আমি এমিলিকে বলিব তুমি পূৰ্ব্বাপেক্ষ। এত ইঞ্চি বাড়িয়াছ ; তুমি পূৰ্বে এই বেড়টা লাফাইতে পারিতে, এই বােঝাটা তুলিতে পারিতে, এতদূরে ঢিল ছুড়িতে পারিতে, এক দৌড়ে এতটা পথ যাইতে পারিতে, দেখি তুমি এখন কতদূর কি পার।” অপরের সঙ্গে শিশুর কোনরূপ তুলনা করিতে নাই। যখন তাহার বুদ্ধি বিবেচনা হইসে তখন হইতে তাহার আর কোন বিষয়ে কোনরূপ প্রতিদ্বন্দ্বী রাখিবেন না। রসাের এই মত অনেকের নিকটে অগ্রাহ্য হইতে পারে । কিন্তু ইহার সমর্থ- নার্থ আমরা অন্ততঃ একটী অতি ভাল ছেলের কথা উল্লেখ করিতে পারি, যাকে পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করিতে চেষ্টা করিতে বলায় উত্তর দিয়াছিল, “ওকথা বলিবেন না, উহা ভাবিলে মনে অহঙ্কার আসিয়া পড়ে।” আমরাও তখন তাহার এই কথাট। পাগলের প্রলাপ বলিয়া উড়াইয়া দিয়া- ছিলাম, কিন্তু রুসাের এমিলি পড়িয়া এখন তার বাক্যের সত্যতা কিঞ্চিৎ পরিমাণে উপলব্ধি করিতে পারিতেছি। এমিলি – বখত ফরাসী পত রুসের কল্পিত ছাত্র
সে নম্র ভাবে
গুণপ্রদর্শন।
নেকে আবার দশজনের মধ্যে নিজ সন্তানের গুণপণ
প্রদর্শন করাইতে বড়ই ভালবাসেন। কিন্তু ইহাতে যথেষ্ট
অনিষ্টাশঙ্কা আছে। আপনি আপনার বালিকা কন্যাটাকে
কয়েকটী সংস্কৃত স্তোত্র শিক্ষা দিলেন, সে অতি ধীর ও নম্র ভাবে
সকালে ও সন্ধ্যায় আপনার কাছে সেগুলির আবৃত্তি করিয়া
থাকে। আপনার একজন বন্ধু আসিলেন, আপনি বালিকাকে
তাহার সম্মুখে সেগুলি পাঠ করিতে বলিলেন।
আপনার আদেশ পালন করিল। যাই সে স্তোত্র পাঠ সমাপ্ত
করিল অমনি বন্ধুটী বালিকার ও আপনার সন্তোষবিধানাথ,
নানারূপ প্রশংসাবাদ আরম্ভ করিলেন। বালিকার হৃদয়
অহঙ্কারে নাচিয়া উঠিল। এইরূপ দুই চারি জন বন্ধুর সাক্ষাতে
স্তোত্র পাঠ করাইতে পারিলেই কন্যাটাকে একটী রীতিমত
অভিনেত্রীতে পরিণত করিতে পারিবেন । এইরূপে, যে স্তোত্র
সাহায্যে তাহার হৃদয়খানি ধৰ্ম্ম-ভাবে পূর্ণ হইতে পারিত,
তাহারই সাহায্যে সেখানি ঘৃণ্য অহঙ্কারের লীলাভূমি হইয়া
বসিবে।
অবশ্য যে সমস্ত শিশু স্বভাবতঃ একটু অধিক লাজুক তাহা-
দিগকে উৎসাহিত করিবার জন্য এরূপ প্রদর্শনকাৰ্য্য উপযুক্ত
বিবেচনা-সহকারে প্রযুক্ত হইতে পারে । কিন্তু অধিকাংশ
স্থলেই যে ইহা কুফলপ্রসূ সে বিষয়ে সন্দেহের লেশমাত্র নাই ।
বঞ্চনা।
শিশুদিগকে প্রতারণা করিয়া উপস্থিত কার্যোদ্ধারের চেষ্টা
করিবেন না। শিশুর দাতে পােকা ধরিয়াছে, সে সমস্ত রাত্রি
যন্ত্রণায় নিদ্রা যাইতে পারে নাই। সকাল বেলা পিতা বলিলেন
“দাতটা তুলিয়া ফেলিতে হইবে। ডাক্তার ডাকা হইল ;
ডাক্তার আসিয়া শিশুকে হাঁ করিতে বলিলেন। শিশু দাত
তােলার পরামর্শ শুনিয়াছে, সে কি আর সহজে ‘হ করে ?
ডাক্তার বলিলেন, “একবার ‘হাঁ কর, আমি দাতটা শুধু
দেখিব, দাত তুলিতে হইবে না, একটু ঔষধ দিলেই আরাম
হইয়া যাইবে ।” শিশু তাহার কথা বিশ্বাস করিয়া ‘হ করিল।
ডাক্তার, দেখার ছল করিয়া হস্ত মধ্যে লুক্কাইত যন্ত্র-সাহায্যে
দাঁত টী তুলিয়া ফেলিলেন। শিশুর পিতা ডাক্তারের কৌশলের
খুব প্রশংসা করিলেন; কিন্তু হায় ! তিনি বুঝিলেন না, ঐ
দন্তের সঙ্গে সঙ্গে তাহার সন্তানের হৃদয়স্থিত বিশ্বাসও সবলে
উৎপাটিত হইয়াছে। এরূপ স্থলে, আবশ্যক হইলে, বলপ্রয়ােগ
করিবেন, কিন্তু কদাপি বঞ্চনার সাহায্যগ্ৰহণ করিবেন না।
আর একটা উদাহরণ ধরুন। খুকীর বড় কৃমি হইয়াছে।
কবিরাজ বলিয়াছেন, রােজ সকালে চিরতার জল খাওয়াইলে
কৃমি নষ্ট হইবে ।
মাতা বলিলেন, ‘খুকি ঔষধ খাও এসে।
;
৭২ সন্তানের চরিত্র গঠন। খুকী -না, আমি ওছুদ কাবৈ না,ও ঝান্নাগে (ঝাল লাগে)। মাতা—এ খুব ভাল ঔষধ, মিষ্টি ঔষধ, খাও এসে। খুকী মাতার কথা বিশ্বাস করিয়া মিষ্টি ঔষধ খাইতে যাইয়া আর ও অনেকবার প্রতারিত হইয়াছে, সুতরাং এবারে মিষ্টি ঔষধ খাইবার লােভ সংবরণ করিল। সে ঔষধ খাইলনা। একটী ভদ্র লােক কাছে ছিলেন, তিনি বলিলেন, “খুকি এ ঔষধ মােটেই মিষ্টি নয়, খুব তেত, দেখি তােমার সাহস আছে কি না? তুমি ইহা খাইতে পার কি না? একটু তেতকে যে ভয় করে সে ত মানুষই নয় । তুমি বড় হইয়াছ তুমি তেতকে কেন ভয় করিবে? খুকী ঔষধ খাইল। দেখি এই দুই জনার মধ্যে শিশু কাহাকে অধিক শ্রদ্ধা করিবে ? তাহার প্রতারক মাতাকে, না ঐ সত্যবাদী ভদ্র- লােকটীকে ? এখন বলুন ভয়। এ বিষয়টা সম্বন্ধে মাতাদিগকে বিশেষভাবে সতর্ক করিয়া দেওয়া আবশ্যক। শিশু একটু দৌরাত্ম করিলেই জননীগণ ‘জুজু, বাঘ, শেয়াল, ভূত’ প্রভৃতির শরণাপন্ন হন। শিশুদিগকে শান্ত করিবার পক্ষে ইহা অতীব জঘন্য উপায় সন্দেহ নাই। এইরূপে আমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী জননীগণ অতি শৈশব হইতেই
৭৩
;
আমাদিগকে এমন ভাবে ‘ভূতগ্রস্ত করিয়া তােলেন যে, আমা-
দের সমস্তটা জীবন একরূপ কাপিতে কাপিতেই অতিবাহিত
হয়। সাহস মানবের পক্ষে একটী অত্যাবশ্যক গুণ। অশিক্ষিত
মালীদ্বারা আমাদের হৃদয়ক্ষেত্র হইতে সেই সুদুলভ গুণটী
অঙ্কুরেই উন্মলিত হয়। সাবধান, কেহ যেন আর জুজু
প্রভৃতির অমূল ক ভয় দেখাইয়া অথবা ভূত প্রেতের গল্প
শুনাইয়া আপন সন্তানের জন্য ‘জীয়ন্তে সমাধির ব্যবস্থা না
করেন। তাহাদিগকে এরূপ ‘মরার অধিক মরা করিয়া
বাঁচাইয়া রাখিবার আবশ্যকতা কি ? দেশে পুরুষের আবশ্যক ;
কাপুরুষগণ সমাজের গলিতকুষ্ঠ ; মূখেরাই তাদৃশ ব্যাধি
স্বেচ্ছায় ডাকিয়া আনে।
সন্তানকে যদি সর্ববিষয়ে সাহসী দেখিতে ইচ্ছা করেন,
তবে তাহাকে ভয় প্রদর্শন করিবেন না, কোনরূপ ভয়ের কথা
তাহার নিকটে বলিবেন না। বরং যে সমস্ত জিনিস দেখিয়া
সে সভাবতঃই ভয় পায় আস্তে আস্তে সেগুলির সঙ্গে তাহার
পরিচয় করিয়া দিবেন। আপনার শিশু যদি গােরু দেখিলে
ভয় পায়, তবে তার একটী নিভীক শিশুকে তাহার সাক্ষাতে
গােরুর গায়ে হাত দিতে আদেশ করুন ; তবে সে বুঝিবে
গেরুকে ভয় করিবার প্রকৃত কোন কারণ নাই। এনে
তাহাকে ও গোরুর নিকটে লইয়া যাউম। এইরূপে ক্রমে ক্রমে
সেও গােরুর গায়ে হাত দিতে সাহসী হইবে, এবং ক্রমেই
বুঝিতে পারিবে যে আমরা যত ভয় করি ভয়ের প্রকৃত কারণ
৭৪
সন্তানের চরিত্রগঠন
তত অধিক নহে। অবশ্য, বালকদিগকে কোন অপরিচিত
জীবের গায়ে হঠাৎ হাত দিতে নিষেধ করিয়া দিবেন, তবেই
আর কোনরূপ আশঙ্কার কারণ থাকিবে না। শৈশব হইতেই
সাহসকে সন্তানের রক্তমাংসের সহিত মিশাইয়া দিতে হইবে।
ভীরু বালক কখনও সাহসী পুরুষ হইতে পারে না। শিশু
সৰ্ব্বদমনই রাজচক্রবর্তী ভরত হইবার উপযুক্ত পাত্র। যিনি
কবিগুরু কালিদাসের শকুন্তলা পড়িয়াছেন, দুষ্মন্তপুত্র শিশু
সৰ্বদমনের উজ্জ্বল চিত্র নিশ্চিত তাহার নিসপটে বিরাজিত
আছে। কি নির্ভীকতার ছবি “জিম্ভ সিংহ দন্তাইং দেগণই স্মং”—
(হাকর বেটা সিংহ তাের দাঁতগুলি গণিতে হইবে।) একজন
তাপসী বলিলেন, “সিংহ শাবককে না ছাড়িলে, সিংহ
তোমাকে কামড়াবে।” উত্তর হইল, “অহ্মহে বলায়ং খু
ভীদে। মিহ”–(ও! বড় ত ভয় পেয়েছি !) এই শিশুই ইতি-
হাসপ্রথিতনামা মহাবল ভরত। ইনিই পরজীবনে বিপুল
সাম্রাজ্য সংস্থাপন পূর্বক আপনার নামানুসারে তাহার নাম
রাখিয়াছিলেন ‘ভারতবর্ষ।
।
তানুসন্ধিৎসা।
শিশুগণ যে ‘এটা কি ? ‘এটা কি ? বলিয়া অনবরত
প্রশ্ন করিয়া থাকে, তাহা তাহাদের নিরর্থক খেয়ালমাত্র নহে।
এরূপ জানিবার প্রবৃত্তি তাহাদের জ্ঞানের পরিসর-বৃদ্ধির পক্ষে
অনুসন্ধিৎসা।
৭৫
নিতান্ত আবশ্যক।
সুতরাংশ ওরূপ প্রশ্নে বিরক্ত না হইয়া
তাহার যথাযথ উত্তর প্রদান করা একান্ত কর্তব্য। শিশুর
প্রশ্নের উত্তর দেওয়া’যদি মাতাপিতার সাধ্যাতীত হয়, তবে
মিথ্য। উত্তর প্রদানকরা অন্যায়। এরূপ অবস্থায় শিশুকে স্পষ্ট
বলিবেন যে, এই প্রশ্নের উত্তর তাহারা অবগত নহেন; কিন্তু
নিজেদের অজ্ঞতা-জনিত লজ্জা ঢাকিবার জন্য সঙ্গে সঙ্গে যেন
আবার একথা না বলেন যে, এ প্রশ্নের উত্তর কেহহই জানে
। কারণ, তাহা হইলে শিশু ভাবিতে পারে কেহই যদি এর
উত্তর না জানে, তবে তাহার পক্ষে ও উহা জানিবার চেষ্টা
অবশ্য বিফল হইবে। শিশুকে এরূপভাবে হতাশ করিবার
প্রয়ােজন নাই। বরং সে যদি একটু অধিক-বয়স্ক হয়, তবে
তাহাকে বলা উচিত, “আমরা যদিও ইহার ঠিক উত্তর জানি
, তথাপি তুমি যদি চেষ্টা কর, তবে আজ হউক, কাল হউক
নিশ্চয়ই এর যথার্থ উত্তর জানিতে পারিবে ।” ইহাতে শিশুর
স্বাধীন অনুসন্ধানের প্রবৃত্তি জাগরিত হইবে। আমাদের দেশে
এই প্রবৃত্তিটীর বড় অভাব। যাহাতে বালকবালিকাদিগের
হৃদয়ে এটী অঙ্কুরিত হইয়া ক্রমশঃ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইতে পারে
* I keep six honest serving men.
They taught me all I knew ;
Their names are what and why and wlien,
And How and where and who.- Kipling.
what (কি), why (কেন), when (কখন), how (কেমনে),
where (কোথার), এবং who (কে) এই ছয় জনের কাছে আমি আমার
বে কিছু জ্ঞান আছে তাহ! লাভ করিয়াছি ।
৭ ৬
সন্তানের চরিত্রগঠন।
সকলেরই সে জন্য বিশেষ চেষ্টা করা কর্তব্য। শিশুগণ কখনাে
কখনাে বাহাদুরী দেখাইবার জন্যও প্রশ্ন করিয়া থাকে ; বলা
বাহুল্য, সেরূপ অভ্যাসের প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নহে।
;
কৰ্ম্মপ্রবৃত্তি।
বালক-বালিকাগণ মাতাপিতার অনুকরণে যে সমস্ত
নির্দোষ কাৰ্য্য করিতে চেষ্টা করে তাহা হইতে তাহাদিগকে
ধমক দিয়া বিরত করা কর্তব্য নয়। তাহাদের কৰ্ম্ম-প্রবৃত্তি
এরূপভাবে ব্যাহত হইতে থাকিলে, অচিরেই বিনাশ-প্রাপ্ত
হইবে। খুকী মাতার গাছা দিয়া ঘর নিকাইতেছে ; মাতা
তাকে এক চড় দিয়া গাছ কাড়িয়া নিলেন ও বলিলেম,“এ!
এখন বড় কাজের ঘটা! বড় হইলে কাজের নামে জ্বর
আসবে। কিন্তু তিনি একবার ভাবিয়া দেখিলেন না যে,
যদি প্রকৃত পক্ষেই সেরূপ জ্বর আইসে, , তবে তাহার কারণ
তিনি নিজে। একটী দুই বছরের বালিকা দা দিয়া বরের ভিটি
কাটিতেছে ;একজন জিজ্ঞাসা করিলেন,“কি করি রে খুকি ?”
বালিকা উত্তর করল, “আমি কায কলি”,(আমি কায করি),
সে মাঝে মাঝে প্রায়ই এরূপ ও অন্যরূপ ‘কায করিয়া
আস্ন নির্ভরতা । ৭৭ এরূপ- আগ্রহের সহিত সকলকে ডাকিয়া দেখাইয়া থাকে। স্থলে মাতাপিতার কর্তব্য উক্ত শিশুর উদ্যমকে ধীরে ধীরে ঐ অকায হইতে প্রকৃত কাযের দিকে চালাইয়া নেওয়া, তাহাকে প্রহার করা বা ধমক দেওয়া নহে। আত্ম-নির্ভরতা। বালকবালিকাগণ যাহাতে তাহাদের সাধ্য কাৰ্যগুলি অনন্য- নিরপেক্ষ হইয়া সম্পন্ন করিতে শিখে সে দিকে মাতাপিতার দৃষ্টি থাকা আবশ্যক। আত্ম-নির্ভরতার বরেণ্য ভাবটী এদেশ হইতে অন্তহিত হইয়াছে এবং তৎপরিবর্তে নিলজ্জ পর-মুখা- পেক্ষিতা আমাদের রন্ধে, রন্ধে, প্রবিষ্ট হইয়া সগর্বে রাজত্ব করিতেছে। প্রথম হইতে যত্ন করিলে, বালকবালিকাদিগকে ইহার জঘন্য সংক্রামকতা হইতে রক্ষা করা যাইতে পারে । কাৰ্য্যই যে জীবন এবং অলসতাই যে মরণ, একথা তাহা- দিগকে বুঝাইয়া দিতে হইবে। নিজের নিতান্ত সাধ্যাতীত না হইলে কোন বিষয়ের জন্য পরের সাহায্য গ্রহণ করা যে অন্যায়, একথা তাহাদের মানসপটে স্থায়িভাবে অঙ্কিত করিয়া দিতে হইবে। অসভ্য বা অর্ধসভ্যজাতির মধ্যে অলসতা পৃজিত হইতে পারে ; অলসতার নিদর্শন হস্তাঙ্গুলীর দীর্ঘনখ ;
৭৮
সন্তানের চরিত্রগঠন।
দ্বারা তাহাদের আভিজাত্য সূচিত হইতে পারে; কিন্তু
সুসভ্য সমাজের কথা যে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ, মাতাপিতা নিজেদের
দৃষ্টান্ত দ্বারা সন্তানদিগকে একথা বুঝাইয়া দিবেন। নতুবা
নিজেরা অলসজীবন-যাপন করিলে পুত্রকন্যাদিগকে পরিশ্রমী
দেখিতে আশাকরা বাতুলতামাত্র। বড়ই দুঃখের বিষয়
আমাদের দেশে এখনও অলসতাই পূজিত হইয়া থাকে।
অমুকের মত সুখী লােক আর নাই, কারণ সে ‘কুটাগাছটা
ছিড়িয়া দুভাগ করে না ; “অমুকের মত শান্তিতে কয়জন
আছে ? তার ভাই বড় চাকুরী করে, নিজে পায়ের উপরে
পা রাখিয়া মহানন্দে কাল কাটায়।” এই শ্রেণীর কথা এখনও
এতদ্দেশে প্রচুর পরিমাণেই শুনিতে পাওয়া যায়। পায়ের
উপরে পা রাখিয়া পদ্মাসনে বসিয়া ধ্যানমগ্ন হওয়ায় শান্তি
থাকিলেও তদ্রুপে উপবিষ্ট হইয়া তাম্রকূট সেবনে যে স্বর্গসুখ
লাভ হয় না এতদ্দেশীয় লোেক এখনও তাহা বুঝিল না। একটা
গল্প বলি—একদিন একজন শিক্ষক একটী ছাত্রকে জিজ্ঞাসা
করিলেন, “বলত হরি কর্তা বলে কাকে ?” হরি এই দুরূহ
প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিল না। শিক্ষক মহাশয় অপর একটী
ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “যাদব, তুমি বলিতে পার ?”
যাদব-আজ্ঞা, যে করে সে কর্তা।
* পূৰ্বে চান, শ্যাম প্রভৃতি দেশে সম্রান্ত ব্যক্তিরা সকল প্রকারের
শ্রমসাধ্য কাৰ্য্যকে ঘৃণা করিতেন। তাহাদের মধ্যে যার যত বড় নখ ছিল
সে তত কম কাৰ্য্য করে, সুতরাং সে হত অধিক সম্ভ্রান্ত বলিয়া বিবেচিত
হইত।
আত্ম নির্ভরতা ।
৭১
শিক্ষক- হরি, তুমি বেঞ্চের উপরে উঠে দাড়াও ; এই
সােজা কথাটার উত্তর দিতে পালে না? দেখত
যাদব কেমন উত্তর দিল ।
হরি—আজ্ঞা পুস্তকে তাই লেখে বটে, কিন্তু কার্যে তা
নয়। আমি পুস্তকে পড়াটাই বলি কি চক্ষে দেখা-
টাই বলি এই জন্য একটু ইতস্ততঃ করিতেছিলাম ।
শিক্ষক—চক্ষে আবার কি দেখিস্ রে ?
হরি-আজ্ঞা, পুস্তকে পড়ি, “যে করে সে কৰ্ত্তা” কিন্তু
কার্যে দেখি যে করে সে চাকর ; আর কর্তা
যিনি, তিনি বসে বসে তামাক খান।
হরি বেঞ্চের উপরে দাঁড়াক তাহাতে আপত্তি নাই; কিন্তু
ভূয়ােদর্শন যে হরির কথারই পরিপােষকতা করে তাহা
নিঃসন্দেহ। জনক জননীগণ, এই দেশব্যাপী নিকৃষ্ট ভাবটীকে
বিদূরিত করিয়া পুনরায় ঘরে ঘরে পরিশ্রম ও আত্মনির্ভরতার
পূজা প্রচলিত করা আপনাদের একান্ত কর্তব্য। আপনারা
নিজ নিজ সন্তানকে অতি শৈশবেই এই কথা বলিয়া দিবেন,
—যে ব্যক্তি অলস ভাবে অপরের উপার্জিত ধনে জীবন ধারণ
করে, সে চোর। ধনী কি দরিদ্র, সবল কি দুর্বল, অলস
ব্যক্তিমাত্রই প্রতারক ।*
* He who eats in idleness what he himself has
not earned steals. Rich or poor, powerful or weak,
every
idle citizen is a krave. -Roussean's Emile.
ত্যাগভ্যাস। মাতাপিতা শৈশবেই সন্তানের হৃদয়ে সর্ব প্রকার মহত্ত্বের বীজ নিহিত করিবেন। ক্ষুদ্রত। যেন তাহাদের পবিত্র হৃদয়কে স্পর্শ করিয়া কলঙ্কিত করিতে না পারে। তাহারা উপদেশ ও নিজেদের দৃষ্টান্ত দ্বারা সন্তান দিগকে ত্যাগে অভ্যস্ত করিবেন। শিশুর সাধ্যানুরূপ সৎকাৰ্য-সমুহ তাহাদের দ্বারা সম্পন্ন করাই বেন। দুঃখী-দরিদ্রকে ভিক্ষা দেওয়ার ভারটা বাড়ীর ছেলে- পিলেদের উপরে ন্যস্ত রাখা উচিত। বাল্যকাল হইতেই সন্তানকে ত্যাগে অভ্যস্ত করাইবার উদ্দেশ্যে তাহাকে তাহার হস্তস্থিত খাদ্যাদি অথবা অন্য জিনিস অপরকে দান করিতে বলিবেন। সে যদি তাহা করে, তবে ঘরে আসিয়া তাহাকে তাহার প্রদত্ত জিনিসের দ্বিগুণ দিবেন। এইরূপে তাহাকে বুঝিতে দিবেন যে, যে যত দেয়, সে তত পায়। এতদ্ভিন্ন ওরূপ দান করিলে তজ্জন্য তাহাকে খুব আদর করিবেন। ক্রমে ওরূপ কিছু প্রাপ্তির আশা না থাকিলেও সে দান করিতে ইচ্ছা করিবে; কারণ একবার অভ্যস্ত হইয়া গেলে সে দান করাতেই প্রচুর আনন্দ উপভােগ করিবে, তখন আর কোন- রূপ বাহ প্রলােভনের আবশ্যকতা থাকিবে না। অবশ্য প্রথম হইতেই যদি কোনরূপ প্রলােভনের সাহায্য ব্যতীত আহার ত্যাগাভ্যাস জন্মান যায় তবে তাহাই সমধিক অভিপ্রেত WAT LIETATE Etc.... শিষ্টাচার। সন্তানগণকে প্রথম হইতেই শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া উচিত। সম্মানাদিগকে উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করা, বয়স্য- দিগকে প্রীতি প্রদর্শন করা, এবং কাহারও হৃদয়ে ইচ্ছাপূর্বক আঘাত না করাই শিষ্টাচারের লক্ষণ। মাতাপিতা উপদেশ ও আপনাদের উদাহরণ-সাহায্যে সন্তানগণকে এবিষয়ে শিক্ষিত করিবেন। অনেক পিতা সন্তানদিগকে জন্মেও শিষ্টাচার “শিক্ষা দেন না, অথচ লােকের মধ্যে তাহাদিগকে অশিষ্ট দেখিলে তখন-তখনই তাহাদিগকে ক্রুদ্ধভাবে তিরস্কার করিয়া থাকেন। বলা বাহুল্য, এরূপ তিরস্কারদ্বারা তাহাদের চরিত্র সংশােধন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় সন্তান দিগকে শিষ্টাচার শিক্ষা দিতেও রাতিমত চেষ্টার আবশ্যক। সাময়িক শাসন কাৰ্য্যকর নহে। মাতার প্রতি সম্মান। আমাদের দেশে সন্তানগণ পিতাকে যেমন সম্মান করে মাতাকে সেরূপ কিছুই করে না। অবশ্য ইহার জন্য প্রধানতঃ মাতাই দায়ী। তিনি নিজের ব্যবহারদ্বারা যদি সন্তানের ভক্তি ও সম্মান আকর্ষণ করিতে না পারেন, তবে কিরূপে তাহা পাইবেন ? পিতাও যথেষ্ট দায়ী, কারণ তিনি ৮২ সন্তানের চরিত্রগঠন মাতাকে সন্তানের সম্মান আকর্ষণ করিবার উপযুক্ত শিক্ষা দেন , এবং আপনার প্রভুত্ব খাটাইয়া সন্তানকে তাহার জননীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিতে বাধ্য করেন না। তাইত সন্তান- গণ অনেক সময়ে জননীদিগকে অবহেলার চক্ষে দেখিয়া থাকে। একদিন একটি ক্ষুদ্র শিশু নিজ মাতার ক্রোড়ে বসিয়াছিল,মাতা তাহাকে ক্রোডেকরিয়াই ইষ্টমন্ত্র জপ করিতে- ছিলেন। শিশুটি পা বাড়াইয়া একখানা পাদুকা টানিতেছিল। তাহা দেখিয়া মা বলিলেন, “আমাকে জুতা নিয়া ছুইও না।” শুটি উত্তর করিল, “কেন, তুমি ত আর মানুষ না, তুমি দেখি মা।” শিশুটির বােধ হয় বলিবার ইচ্ছা ছিল, “তুমি ত আর পুরুষ নও,তুমি যে মেয়ে মানুষ ; সুতরাং তােমাকে নিয়া জুতা ছােয়ায় দোষ কি”? অতটা তাহার ভাষায় বুলাইয়া উঠে নাই তাই সে সংক্ষেপে বলিল, “তুমি ত আর মানুষ না।” কিন্তু সে যাহা বলিয়াছিল উহাই কি অনেক বর্ষীয়ান এবং শিক্ষিত লােকেরও জননীগণ সম্বন্ধীয় মতের প্রতিধ্বনি নহে? অনেকে জননীদিগকে মনুষ্যের মধ্যেই ধরেন না একথা বলিলে কি খুব অত্যুক্তি করা হইবে ? সন্তানগণের মন হইতে এই ধারণা দূর করা আবশ্যক। শিশুকাল হইতেই বালক- বালিকাদিগকে স্ব স্ব জননীর প্রতি রীতিমত ভক্তি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিতে শিক্ষা দিতে হইবে। জননীগণও যেন স্তানগণের সহিত ব্যবহারে সর্ব তা ত্মসম্মান বজায় রাখিয়া চলেন। ; ?
td:-1219.
="
AF!
"{w,
ভালবাসা।
সন্তানদিগকে শিশুকাল হইতেই অন্যকে ভালবাসিতে
শিক্ষা দিবেন। তাহারা ত আপন ভাইভগিনীকে ভাল
বাসিবেই ; ত্যপরকে ও প্রাণের সহিত ভালবাসিতে তাহা-
দিগকে শিক্ষা দিতে হইবে। মানুষমাত্রেই যে ভ্রাতৃস্থানীয়
অমূল্য নীতি শৈশবেই তাহাদের হৃদয়ঙ্গম করাইবেন,
এবং যথাসাধ্য এই নীতি অনুসারে তাহাদিগকে পরিচালিত
করিবেন। দেখিবেন তাহারা যেন পরকে ঘৃণা করিতে ও
নিজকে অতিরিক্ত ভাল বাসিতে না শিখে। কারণ, যত
কিছু সঙ্কীর্ণতা ও নীচত, যত কিছু অন্যায় ও অত্যচার,
সকলই স্বার্থপরতাপ্রসূত; সকলই নিজের প্রতি অতিরিক্ত
ভালবাসার তিক্ত ফল। “জগতের অধিকাংশ বিবাদ-বিসংবাদ,
অত্যাচার, নরহত্যা প্রভৃতি দুৰ্বল ও অবিবেচক মাতাপিতা-
দ্বারা নিজ সন্তান-হৃদয়ে ত্রিশ বৎসর পূর্বে রােপিত স্বার্থপর
তার বিষময় ফল।” * সুতরাং মাতাপিতাকে এ বিষয়ে যথেষ্ট
সতর্কতা অবলম্বনপূর্বক এই জঘন্য স্বার্থপরতার মূলে দৃঢ় হস্তে
কুঠারাঘাত করিতে হইবে এবং সন্তানদিগের হৃদয়পদ্মগুলি
*জোসেফ মেটসিনি।
৮৪ সান্তানের চরিত্রগঠন। ভালবাসার পবিত্র গঙ্গাজলে ধৌত করিয়া জগতের পূজার জন্য প্রস্তুত করিতে হইবে। সঙ্গ। মাতাপিতা বিশেষ পরীক্ষা করিয়া সন্তানের জন্য সঙ্গ নির্দিষ্ট করিয়া দিবেন। সন্তানগণ যাহাতে সৎসঙ্গলাভ করিয়া চরিত্রবান্ হইতে পারে সেদিকে সকলেরই বিশেষ দৃষ্টি থাকা উচিত। পুকন্যাদিগকে যত অধিক সময় মাতাপিত। আপন সঙ্গে রাখিতে পারেন ততই মঙ্গলজনক। এতদুদ্দেশে। সন্তানের সঙ্গে মাতাপিতার বিশেষ প্রীতি থাকা বাঞ্ছনীয়, এবং সন্তানদিগকে তাহাদের বয়সের অনুরূপ স্বাধীনতা দেওয়া আবশ্যক ; কারণ শিশুগণ যদি মাতাপিতাকে অন্তরের সহিত ভাল না বাসে, এবং মাতাপিতা যদি তাহাদের সামান্য সামান্য মার্জনীয় অপরাধগুলির জন্যও তাহাদিগকে তিরস্কার করেন, তবে তাহারা যে তাদৃশ মাতাপিতার সঙ্গ পছন্দ করিবে না ইহা কিছুই আশ্চৰ্য্য নহে। সাধ করিয়া কে গারদে থাকিতে চায় ? শিশুগণ যখন মাতাপিতার সঙ্গে থাকিবে, তখন যেন তঁাহারা তাহাদিগকে প্রৌঢ়ের ন্যায় স্থির ও ধীর দেখিতে ইচ্ছা না করেন। বালক বালিকাগণ বালক- বালিকার ন্যায় ব্যবহার করুক, তাহাতে মাতাপিতার আপত্তি করিবার কারণ নাই। তাহারা কোনরূপ অন্যায় ব্যবহার না করিলেই হইল।
স। ৮৫ শিশুদের সঙ্গে মিশিতে হইলে সকলকেই অল্প-বিস্তর শিশু সাজিতে হইবে। নতুবা তাহাদের মন পাওয়া যাইবে না। কারণ, জরা ও যৌবন দোহাকার নাহি হয় একত্ৰ বসতি। যৌবন আনন্দময় সদা জর। কিন্তু চিন্তাপূর্ণ অতি ॥* সুপ্রসিদ্ধ শিক্ষকগণ অনেকেই বালকস্বভাব। রাগ বীর বিখ্যাত শিক্ষক আরনলড বলিতেন, “যেদিন স্কুল ঘরের উপর তলায় দৌড়াইয়া যাইতে পারিব না, সেদিন বুঝিব আমি বালকদিগের শিক্ষকতার অনুপযুক্ত হইয়াছি।” পূজ্যপাদ শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় তাহার প্রণীত সাধু রাম- তনু লাহিড়ীর জীবনচরিতে ভারত বন্ধু ডেভিড, হেয়ারের সম্বন্ধে এক স্থানে লিখিয়াছেন, “স্কুলের বালকদিগের প্রতি হেয়ারের যে কি প্রেম ছিল তাহা বর্ণনীয় নহে। তাহাদিগকে দেখিলে তাহার এত আনন্দ হইত যে তিনি সকল কাজ ভুলিয়া যাইতেন। মধ্যে মধ্যে স্কুলে আসিবার সময়ে নিম্ন-শ্রেণীর শিশুদিগের জন্য খেলিরার বল কিনিয়া আনিতেন, স্কুল ছুটা হইলে ঐ বল উদ্ধে ধরিয়া উদ্বাহু হইয়া শিশুদের মধ্যে “Crabbed Age and Youth Crannot live together ; Youth is full of pleasure Age is full of care”,-Shakespeare.
সন্তানের চরিত্রগঠন। দাড়াইতেন, তাহারা চারিদিক হইতে আসিয়া তাহাকে ঘিরিয়া ধৰিত ; কেহ কোম'র জড়াইত, কেহ গাত্র বাহিয়া উঠিত, কেহ স্কন্ধে ঝুলিত; তিনি তাহাতে মহা আনন্দ অনু- ভব করিতেন।" প্রাতঃস্মরণীয় মহাত্মা রাজা রামমােহন রায় নিজের পুত্র রমাপ্রসাদ রায় ও অষ্টম বর্ষীয় শিশু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে ‘দোল দোল খেলিতেন। দেবেন্দ্র নাথ তখন রামমােহন রায়ের স্কুলে রমাপ্রসাদ রায়ের সঙ্গে একত্র অধ্য- য়ন করিতেন। মহর্ষি নিজে বলিয়াছেন,“রাজার, উদ্যানে একটি বৃক্ষের শাখায় একটা দোনা ছিল। রমাপ্রসাদ ও আমি তাহাতে দুলিতাম ; কখনও কখনও রাজা আসিয়া আমাদি- গের সঙ্গে যােগ দিতেন ; আমাকে কিছুক্ষণ দোলাইয়া তিনি দোলনার উপরে উঠিয়া বসিতেন এবং আমাকে দো দিতে বলিতেন।” কেহ যদি বলেন যে, ছেলেদের সঙ্গে এরূপ ছেলেমি করিলে ছেলেরা আর তাহাদিগকে উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করিবে না; তবে তাহার উত্তর আমরা মহর্ষিকথিত নিম্নলিখিত ঘটনাদ্বারা প্রদান করিতেছি—“আমরা তাহার নিকটে যাইবামাত্র তিনি রমাপ্রসাদকে তঁাহার প্রিয় সঙ্গীত “অজরমশােক জগদালােকং” গান করিতে বলিলেন। রমা- প্রসাদ বড়ই লজ্জায় পড়িলেন। তিনি গান করিতেও পারেন আবার তাঁহার পিতার আজ্ঞা অগ্রাহ্য করিতেও পারেন । সুতরাং আস্তে আস্তে খাটের নীচে গিয়া বসিলেন এবং তথায় করুণাব্যঞ্জকস্বরে গান আরম্ভ করিলেন “অজরমশােক
জগদালােকং। লজ্জা মানব-হৃদয়ের একটা প্রবল বৃত্তি। কিন্তু
তাহাকে রূপ ভাবে পরাভূত করিতে হইলে, বাধ্যতা কিরূপ
মর্জাগত সওয়া আবশ্যক তাহা অনুমান করা কঠিন নহে।
অথচ রাজা ‘দোল দোল খেলিয়া তাহার পুত্রের নিকটে এতটা
বাধ্যতা আদায় করিতে পারিয়াছিলেন। এদিকে তাহার অপর
ক্রীড়াসঙ্গী শিশু-দেবেন্দ্রনাথের উপরে রাজা কিরূপ প্রভাব
বিস্তার করিয়াছিলেন তাহা বােধ হয় অনেকেই জানেন।
তথাপি মহর্ষির নিজের কথায় তাহা অবগত হউন, “রাজার
সহিত আমার এক নিগূঢ় সম্বন্ধ ছিল। তিনি আমাকে কখনও
কোন কথা কহিয়া উপদেশ দেন নাই। তখন আমি বড় ছােট
ছিলাম। তাহার নিকট হইতে উপদেশ লইবার সময় হয় নাই।
তথাপি আমার উপরে তাহার এক নিগূঢ় প্রভাব ছিল।
কার্যের জন্য তিনি পরিশ্রম করিয়া গিয়াছেন, সেই কার্যের
জন্য পরিশ্রম করিবার উৎসাহ আমি তাহার নিকট হইতে
পাইয়াছি। ইংলণ্ডে গমন করিবার সময়ে রাজা আমার
পিতার নিকটে বিদায় নিতে আসিলেন। আমাদের বাড়ীর
অনেক। প্রতিবেশী রাজাকে দেখিবার
জন্য আমাদের সুপ্রশস্ত প্রাঙ্গণে একত্র হইয়াছিলেন। আমি
তখন সেখানে ছিলাম না। তখন আমি সামান্য বালক। তথাচ
রাজা আমাকে দেখিতে ইচ্ছা করিলেন। তিনি আমার
পিতাকে বলিয়াছিলেন যে, আমার হস্তমর্দন না করিয়া তিনি
এ ঝুঁত নগেন্দ্র নাথ চট্টোপাধ্যায় প্রণীত 'মহাত্মা রাজা রামমােহন
রায়ের জীবন চরিত।
সকলে
৮
সন্তানের চরিত্রগঠন।
।
এদেশ পরিত্যাগ করিতে পারেন না। আমার পিতা আমাকে
ডাকাইয়া আনিলেন। তখন রাজা আমার হস্তমর্দন করিয়া
ইংলণ্ডে যাত্ৰাকরিলেন। রাজা যে সস্নেহে আমার হস্তধারণ
করিয়াছিলেন তাহার প্রভাব আমি তখন বুঝিতে পারি নাই ।
বয়স অধিক হইলে উহা র অর্থ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিয়াছি”।
দেখুন পাঠক পাঠিকা, কি সরল অমায়িক ভাব ! কি পবিত্র
শিশু-বাৎসল্য! কি বালক- সুলভ হৃদয়ের কোমলতা! আজ
কাল কয়জন লােক শিশুদের সঙ্গে এমন পবিত্র ও কবিত্বময়
সম্বন্ধ সংস্থাপন করিতে পারেন ও করা আবশ্যক বােধ করেন ?
অথচ দেখুন, নব্যবঙ্গের পিতামহ, বর্তমান ভারতের অন্যতম
আদর্শ পুরুষ, প্রাতঃস্মরণীয় মহাত্মার বালকের প্রতি কি. সরল
সস্নেহ ব্যবহার! রাজপ্রতিনিধি লর্ড উইলিয়ম বেন্টিঙ্ক ও ইচ্ছা
করিয়া সকল সময়ে যাহার দেখা পান নাই, তিনিই কি না
একটী অপােগও শিশুর হস্তমর্দন না করিয়া বিলাত যাত্রা
করিতে পারেন নাই। আর দেখুন, সৎসঙ্গের কি মহনীয়
প্রভাব। “তিনি কখনও কথা কহিয়া উপদেশ দেন নাই।”
কারণ দেবেন্দ্র নাথ তখন ‘বড় ছােট ছিলেন। কিন্তু তাহাকে
দোলনায় দোলাইবার ছলে তাহার, শিশু-হৃদয়খানা যে
অজ্ঞাত অথচ পবিত্র আন্দোলনে আন্দোলিত করিয়া দিয়া-
ছিলেন ; সস্নেহ হস্তমনছলে যে মূর্তিমান্ ধৰ্ম্মবল তাহার
হস্তে অৰ্পণ করিয়াছিলেন, যে স্বর্গীয় তড়িত প্রবাহে তাহার
সৰ্বাঙ্গ পূর্ণ করিয়াছিলেন ; তাহারই প্রভাবে শিশু-দেবেন্দ্রনাথ
;
৮১ মহর্ষি-দেবেন্দ্রনাথ হইতে পারিয়াছিলেন। মহর্ষির নিজের কথায় বলি, “যদিও তিনি আমাকে কোন উপদেশ দেন নাই, তথাচ তাঁহার মুখশ্রী এবং চরিত্র আমার হৃদয়ে গভীরভাবে অঙ্কিত হইয়াছিল। তাহাদ্বারা আমি অনুপ্রাণিত হইয়াছিলাম।” গল্প। গল্প ও উপকথা প্রভৃতির সাহায্যে সন্তানদিগকে নানারূপ সংশিক্ষা প্রদান করা যাইতে পারে। ইহাতে সন্তানদিগের চিন্তাশক্তিও জাগিয়া উঠে। “এই গল্পগুলি নিতান্ত কাল্পনিক ও অসম্ভব না হওয়াই অভিপ্রেত”। * এই সমস্ত গল্পের বিষয় সরল, ভাষা সহজ, ঘটনা সংক্ষিপ্ত ও যাবতীয় কুভাব-বর্জিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। কোনরূপ নীচত। ইহাতে থাকিবে না। এগুলি সৰ্ব্ব প্রকারের উদার ও মহান্ ভাবে পূর্ণ হইবে, যেন ইহাদ্বারা শিশুর মন এক অভিনব সত্য ও সৌন্দর্য্যের রাজ্যে নীত হইতে পারে। এরূপ গল্পে লম্বা লম্বা শব্দ ও অনাবশ্যক ভাবপ্রবণতা সৰ্ব্বথা বচ্চনীয়। বলা বাহুল্য, এ আদর্শের গল্প আমাদেব দেশে অতি বিরল ; নাই বলিলেও হয়। এখানে শিশুদের জন্য যে সমস্ত গল্প আছে তাহার প্রায় অধিকাংশই ভূত-প্রেতে পূর্ণ ; যেগুলির উপরে ভূতের আবেশ হয় নাই, সেগুলি আবার রাজপুত্র ও রাজকন্যার প্রেমের আবেশে Froebel's Education of Man.
! সন্তানের চরিত্রগঠন। পরিপূর্ণ। আজকাল ছেলেদের জন্য নানারূপ গল্প-পুস্তক বাহির হইতেছে সেগুলিও এদোষ হইতে মুক্ত নহে! সুপ্রসিদ্ধ লেখকদিগের প্রদত্ত প্রশংসাপত্রদর্শনে মুগ্ধ হইয়া একটি বালককে উপহার দিবার জন্য একবার এই শ্রেণীর একখানা পুস্তক ক্রয় করি, পুস্তকখানা পড়িয়া দেখি তাহাতে যতটা গল্প প্রায় ততটা “অতি সুন্দর টুটুকে মেয়ে আছে। তাদের কি মুখের গঠন ! কি নাকের ভঙ্গী! কি চোখের ভাব ! একে- বারে বলিহারি! আর এ সমস্ত গল্পের নৈতিক শিক্ষাই বা কত ! “তার পরে একদিন শুভদিন দেখে মেয়েটিকে বিয়ে কল্লে” অধিকাংশ গল্পেরই এই অমূল্য নীতি !! এইরূপে টুক- টুকে মেয়ে ও ফুটফুটে ছেলের বিবাহবর্ণনার সাহায্যে সন্তান- দিগের হৃদয়ে শৈশবেই যে ভাবের বীজ বপন করা হয় ; আস- মানি ও আয়েসার রূপের ফোয়ারার জলসেকে যাহা অতি যত্নে গজাইয়া তােলা হয় ; রােহিণীর পবিম্ববৎ “রাঙ্গা রাঙ্গা সুধামাখা অধরে ফু দিতে দেখিয়া যাহা পরিপক্কতা লাভ করে ; তাহারই প্রভাবে বহু প্রকৃত গােবিন্দলাল মন্দ হইয়া যায়, বহু প্রকৃত শৈবলিনী উন্মাদিনী হইয়া যায়। বিন্দুধারণ। প্রকৃতির শিক্ষা মন্দগামিনী; ইহা ধীরে অথচ উপযুক্ত সময়ে প্রদত্ত হয়; কিন্তু মনুষ্যদত্ত শিক্ষা অসাময়িক। একের বেলা ইন্দ্রিয়গণ কল্পনাকে জাগরিত করে, অন্যত্র কল্পনাই ইন্দ্রিয়- ;
বিন্দুধরণ দিগকে উত্তেজিত করিয়া তাহাদের অকাল-চাঞ্চল্য বিধান করে। তাই অশিক্ষিত ও অসভ্য সমাজ হইতে সুশিক্ষিত ও সুসভ্য সমাজে যোবন ও যৌনশক্তি অপেক্ষাকৃত শীঘই প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে । অতএব যৌন শক্তির তাদৃশ অকালপরিপকনিবন্ধন জননেন্দ্রিয়ের অসাময়িক ও অস্বা- ভাবিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে সন্তানদিগকে সময় থাকিতেই বিশেষরূপে সতর্ক করিয়া দেওয়া, এবং মানব-সৃষ্টির জন্য ঈশ্বরের উদ্ভাবিত কৌশলের পবিত্রতা ও তাহার অপপ্রয়ােগ- প্রসূত অপকারিতা সম্বন্ধে উপযুক্ত সময়ই বুঝাইয়া দেওয়া সন্তানের মঙ্গলাভিলাসী সুসভ্য জনকজননীমাত্রেরই সৰ্ব্ব- প্রধান কর্তব্য। কিন্তু বড়ই দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে লক্ষে একজন পিতা এবং দশ লক্ষে একজন মাতাও এই অত্যাবশ্যক পবিত্র কর্তব্য পালন করেন কি না সন্দেহ। অনেকেই এবংবিধ শিক্ষার আবশ্যকতা হৃদয়ঙ্গম করেন না। যাহারা করেন তাঁহাদের মধ্যে কেহ বা দুরন্ত লজ্জাবশতঃ, কেহ বা অকালে সন্তানের চক্ষু ফুটাইবার অথবা আশঙ্কাবশতঃ এই গুরুতর কর্তব্যের প্রতি অবৈধ অবহেলা প্রদর্শনপূৰ্ব্বক সমাজবক্ষে রােগ, পাপ ও দুর্নীতির প্রবেশপথ সুগম করিয়া দেন। যাহারা এরূপ শিক্ষার আবশ্যকতাই অস্বীকার করেন তাহাদিগকে আমাদের কিছুই বলিবার নাই ; তাহারা নির্বিঘ্নে পুত্রপৌত্রাদিক্রমে নানাবিধ রােগভােগ করিয়া ও সন্তান-সন্ততিগণের পশুসুলভ প্রবৃত্তিসমুহের তাড়নায় মৰ্ম্মে- ৯২ সন্তানের চরিত্রগঠন। মৰ্ম্মে দগ্ধ হইয়া আপনাদের অবিমৃষ্যকারিতার কঠোর প্রায়শ্চিত্ত করিতে থাকুন। যাহারা ইহার আবশ্যকতা সম্বন্ধে চিন্তা করিবার উপযুক্ত শিক্ষায়ও বঞ্চিত, তাহাদিগকে এসম্বন্ধে উপযুক্তরূপে শিক্ষা দেওয়া ও সহায়তা করা দেশহিতৈষী শিক্ষিত ব্যক্তিমাত্রেরই কর্তব্য। যাহারা আবশ্যক বােধেও লজ্জাবশতঃ এবিষয়ে মৌনব্রত অবলম্বন করেন তাহারা যেন সন্তানের সম্বন্ধীয় শিক্ষার ভার অন্য উপযুক্ত লােকের হস্তে ন্যস্ত করেন। সর্বশেষে, যাহারা মনে করেন যে এরূপ ভাবে সতর্ক করিতে গেলে। অনেক সময়ে সন্তানগণের মঙ্গলের পরিবর্তে বরং অমঙ্গল সম্পাদিত হইবে। সতর্ককারীর নিকট হইতেই সেই অজ্ঞাত পাপের বিষয় অবগত হইয়া হয়ত তাহারা কৌতুহল বশতঃ তৎসাধনে যত্নপর হইবে ; তাহা- দিগকে জিজ্ঞাসা করি, তাহারা কি সন্তানদিগকে বহুদিন এবিয়য়ে অজ্ঞ রাখিতে পারিবেন ? দেশে সুশিক্ষকের সম্পূর্ণ অভাব হইলেও কুশিক্ষকের যথেষ্ট প্ৰাচুৰ্যই পরিলক্ষিত হয়। এই সমস্ত কুশিক্ষকগণ আবার অলসও নয়, বরং অনভিপ্রেত- রূপে তৎপর। সুতরাং সন্তানগণ যাহা দুদিন পরে শিখিবেই, তাহা কুশিক্ষকের হাতে কূভাবে শিক্ষা করা অপেক্ষা সুশিক্ষ- কের হাতে তাহার অপকারিতাসম্বন্ধে টীকাটিপ্পনীসহ সুভাবে শিক্ষা করাই কি সৰ্ব্বথা অভিপ্রেত নহে? এ সম্বন্ধে রুসাে বলেন, “যাহা গােপন করা যাইবে না তাহা সকালেই শিক্ষা Let them learn at an early hour that which it is impossible always to conceal from them. Rousseau's Emile. ;
বিন্দুধারণ দেওয়া উচিত। যাহারা সন্তানগণ পাপে লিপ্ত হইবার পরে তাহাদিগকে উহা হইতে নিবৃত্ত করা বুদ্ধিমানের কার্য বলিয়া বিবেচনা করেন, তাহাদের যেন মনে থাকে যে, ঘুণ ধরিলে তাহা ছাড়াইতে চেষ্টা করা অপেক্ষা ঘূণ না ধরিতে দেওয়াই অধিকতর বাঞ্ছনীয় ও সুসাধ্য। কিন্তু যাহারা ঘুণ ধরিবার পর চিকিৎসা করাই উচিত বিবেচনা করেন, তাহারা যেন এবিষয়ে সন্তানগণের বাক্য অথবা আপনাদের অনুমানের উপরে নির্ভর না করিয়া মাঝে মাঝে বিচক্ষণ ও বিশ্বস্ত ডাক্তারদ্বারা পরীক্ষা করাইয়া সন্তানের অবস্থা জানিয়া লন। যখন পরীক্ষায় স্থিরীকৃত হইবে যে তাহারা কোনরূপ অন্যায় অভ্যাসের বশবর্তী হইয়াছে তখনই যেন উপযুক্ত প্রতিকারের চেষ্টা করা হয়। কারণ একবার যদি বিষ প্রবৃষ্ট হইয়া কিছুদিনের জন্য ক্রিয়া করিবার অবকাশ পায়, একবার যদি পাপ অভ্যাসগত হইয়া যায়, তখন উহা বিদূরিত করিতে বিশেষ বেগ পাইতে হয়। তখন সে ব্যাধি ধন্বন্তরিরও দুঃসাধ্য হইয়া থাকে। আবার বলি, মাতাপিতা যেন নিজ সন্তানকে বীৰ্য্যধারণের অত্যাবশ্যকতা উপযুক্ত সময়েই হৃদয়ঙ্গম করাইয়া দেন। বিন্দুপাতই যে আসন্ন মৃত্যুর কারণ, বীর্য্যের অপ- ব্যবহারই যে শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সৰ্ববিধ গুরুতর অমঙ্গলের নিদান ;বীৰ্যাধারণই যে ব্রহ্মচর্যের প্রধান অঙ্গ,; এবং বীর্য ধারণ করিয়াই যে ভারতের ব্রাহ্মণগণ Prevention is better than cure.
সন্তানের চরিত্রগঠন।
জগতের শীর্ষস্থানীয় হইয়াছিলেন, একথা যেন তাহাদিগকে
বিশেষ ভাবে বুঝাইয়া দেন। আর যেন তাহাদিগকে বলিয়া
দেন যে, এ দেহ ঈশ্বরের মন্দির, কাহারও ইহা কলুষিত
করিবার অধিকার নাই। দেহ রক্ষা মনুষ্যের পক্ষে বিধাতৃ-
নির্দিষ্ট পবিত্র কর্তব্য। কেহই নিজের দেহের প্রতি
যথেচ্ছব্যবহার করিয়া কালধ্বংস ও ঘাের নরকের হস্ত
হইতে নিষ্কৃতি পাইবে না।
ধৰ্ম্মশিক্ষ।
সন্তানদিগকে শিশুকাল হইতেই সহজভাৰে ধৰ্ম্মশিক্ষ।
দেওয়া কর্তব্য। কারণ, ধৰ্ম্মভাব বাল্যে তাহাদের মজ্জাগত
করিতে না পারিলে পরিশেষে সে চেষ্টা বিফল হইয়া থাকে।
বিশেষতঃ বালকবালিকাদিগের যে ভারণি ধর্মভাব আছে
অনুশীলন অভাবে তাহা নষ্ট হইতে দেওয়া উচিত নহে। এ
সম্বন্ধে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ভক্তিভাজন রাজনারায়ণ বাবুর কাছে
লিখিয়াছিল, “অপরা বিদ্যার সহিত বালকদিগকে পরাবিদ্যার
উপদেশ দিতে অবহেলা করিবে না। বালককালই বিদ্যা-
শিখিবার মুখ্য কাল, যদি বিবেচনা কর ব্রহ্মবিদ্যা অতি কঠিন
বিদ্যা, ইহা বালকের শিখিবার উপযুক্ত নহে, তবে পরে
ইহার জন্য সন্তাপ করিবে। যখন মনে নিকৃষ্টবৃত্তিসকল প্রবল
হইবে, কামক্রোধাদি বলবান্ হইবে, যখন যৌবনের তরঙ্গ
করালমূর্তি ধারণ করিবে, তখন তাহাতে সেতুবন্ধের চেষ্টা
ধম্মশিক্ষা।
অবশ্য বিফল হইবে। সেই যৌবনকালের পূর্বেই সেতুবন্ধন
করা আবশ্যক “পয়ােগতে কিং খলু সেতুবন্ধৈঃ”। ঈশ্বরেতে
প্রতিবৃত্তির পােষষ্কতা, ধৰ্ম্মবৃত্তিসকলের পােষকতা,
বালককাল অবথি যদি মানবজাতি না পায়, তবে যে কি
অবস্থা হয় তাহার দৃষ্টান্ত রাজকীয় বিদ্যালয়ের সহস্র সহস্র
পূৰ্ব্বকার ছাত্র বিদ্যমান রহিয়াছে। আমার বিবেচনায়
১১/১২ বৎসর অবধি বালকবালিকাদিগকে সহজে সহজে
ধৰ্ম্মশিক্ষা প্রদান করা উচিত। আমি এখানে ব্রহ্মধৰ্ম্ম
বালকদিগকে পড়াইবার যে নিয়ম করিয়াছি তাহা অবগত
আছ। প্রতি রবিবারে অতি প্রত্যুষ হইতে দশ ঘটিকা
পৰ্যন্ত পড়ান হয়।” * রুসো প্রভৃতির মতে, বােধ হয়, ১১/১২
বৎসরের পূঝেই ধম্ম শিক্ষা আরব্ধ হওয়া উচিত। বলা
বাহুল্য ধর্মের নামে কেহ যেন সন্তানদিগকে কুসংস্কারান্ধ
করিয়া না তুলেন।
ধৰ্ম্ম ও কুসংস্কারে স্বর্গ-নরক পার্থক্য।
ধৰ্ম্ম অপার্থিব জ্যোতিঃ, আর কুসংস্কার পার্থিব কর্দম।
কিন্তু অনেকে সেই কর্দমরাশি ‘অষ্টে পৃষ্ঠে ললাটে লেপন
করাকেই চরম-ধৰ্ম্ম ও পরমপুরুষার্থ বলিয়া মনে করেন।
সন্তানগণের প্রকৃত ধর্মচর্চার সহায়তা করিতে এতদ্দেশীয়
জনকগণ অনেকেই হিরণ্যকশিপু। এদিকে পুত্রগণও নিতান্ত
প্রহ্লাদ নহে। সুতরাং এক্ষেত্রে পিতাপুত্র কেহই অপমৃত্যুর
হস্ত হইতে রক্ষা পায় না।
শ্ৰীযুক্ত প্রিয়নাথ শাস্ত্রী সঙ্কলিত মহর্ষির পত্রাবলী।
দেশ-প্রীতি. “সন্তানদিগের নিকট তােমাদের দেশের কথা বল ; অতীতে তাহা যেরূপ ছিল, বর্তমানে যেরূপ আছে ও যেরূপ থাকা উচিত তাহা বল। সন্ধ্যায় যখন সন্তানদিগকে ক্রোড়ে করিয়া বসিবে, যখন তাহাদের সরলতামাখা অস্পষ্ট বুলি শ্রবণ করিয় দিবসের পরিশ্রম বিস্মৃত হইবে, তখন তাহাদের নিকটে দেশ- বিদেশের স্বদেশপ্রেমিক মহাত্মাদিগের পবিত্র নাম ও উজ্জ্বল কাৰ্যকলাপের আলােচনা কর ।”* তঁাহারা দেশের জন্য,দশের জন্য, সত্যের জন্য কত অত্যাচার, কত লাঞ্ছনা সহ্য করিয়াছেন তাহাও বলুন। দেশ-বিদেশের ইতিহাস তাহাদিগের নিকটে গল্পের ছলে বর্ণনা করুন। কোন্ দেশ পতিত অবস্থা হইতে কিরূপে উন্নতি লাভ করিয়াছে তাহা বলুন। তাহাদের মনে সমাজের জন্য, দেশের জন্য, অক্লান্তভাবে পরিশ্রম করিবার প্রবৃত্তি জাগরিত করিয়া দিন। অলসতাকে অন্তরের সহিত ঘৃণা করিতে শিক্ষা দিন। তাহাদিগকে বুঝাইয়া দিন যে ধনী, দরিদ্র, শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকলেই তাহাদের ধন, ঐশ্বৰ্য,জ্ঞান বুদ্ধি, শরীর প্রভৃতির জন্য সমাজের নিকটে ঋণী। যে ব্যক্তি সেই ঋণ পরিশােধ করিতে চেষ্টা না করে সে পাপী। তাহা- দিগকে বলুন যে, জমিদার-পুত্রের ও বসিয়া খাইবার অধিকার জোসেপ মেটাসনি।
;
উপসংহার।
নাই; কারণ তিনি পিতার নিকট হইতে উত্তরাধিকার-সূত্রে
প্রচুর ধন সম্পত্তি পাইলেও, “কোন পিতাই পুত্রকে সমাজের
জন্য কাষ না করিবার অধিকার দিয়া যাইতে পারেন না।”
তাহাদিগকে ইহাও বুঝাইয়া দিবেন যে, আলস্য ত্যাগ করিয়া
কাৰ্য করাই যথেষ্ট নহে। স্বার্থপ্রণােদিত কাৰ্য্যে সমাজের
ঋণ পরিশােধ হয় না। ঐ ঋণ শােধ করিতে হইলে সমাজের
উপকারজনক কাৰ্য করা আবশ্যক যে কাৰ্যে দেশের
ও সমাজের অপকার হয়, এবং যে কাৰ্যে মনুষ্যত্ব বজায়
থাকে না, তাদৃশ কাৰ্য্য অলসতা অপেক্ষাও অধিক অমঙ্গল
জনক। সুতরাং সেরূপ কার্যের প্রতি বাল্যকাল হইতেই
সন্তানগণের অন্তরে বিজাতীয় ঘূণর ভাব জন্মাইয়া দিতে
সচেষ্ট হইবেন।
উপসংহার।
জনকগণ ! শত বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করিয়াও, শত অসুবিধা
মস্তকে ধরিয়াও সন্তানগণের নৈতিক সুশিক্ষার বন্দোবস্ত
করুন। জননীগণ ! ইহাতে কায়মনােবাক্যে সহায়তা করুন।
মনে রাখিবেন সন্তানকে শুধু বিদ্যালয়ে প্রেরণ করিয়া
নিশ্চিন্ত থাকিলে চলিবে না। মনে রাখিবেন নিরীহ শিশুর
দুৰ্বল মস্তকে রাশীকৃত পুস্তকের বােঝা চাপাইয়া তাহাকে
No father can transmit to his son the right of
being useless to his fellows.
৯
KARUAR-HUVAH.
সন্তানের চরিত্রগঠন।
দায়িত্বশূন্য বেত-ও-বেতনসর্বস্ব
শিক্ষকের হস্তে সমর্পণ
করিলেই মাতাপিতার কর্তব্য শেষ হইবে না। মনে রাখিবেন
ভারত মাতার গঠনােপযােগী উপাদানসমূহ সন্তানরূপে
আপনাদেরই করতলগত ; আপনারা আর্দ-মৃত্তিকাবৎ কোমল
ঐ শিশুদিগকে যে ছাঁচে ঢালিবেন, ভারতমাতার গঠনও
তদনুরূপই হইবে। আপনারা যদি মায়ের মুখমণ্ডলে সৌরতেজ
দেখিতে চান, যদি তাহার নয়নযুগল স্বর্গীয় জ্যোতিতে
উদ্ভাসিত দেখিতে চান তবে তাহার উপাদানস্বরূপ আপনাদের
ক্রোড়স্থিত ঐ শিশুসন্তানগুলিকে দেবত্বের ছাঁচে ঢালিয়া
জনকজননীগণ, ভুলিবেন না। আপনাদের গুরুতর
দায়িত্বের কথা, ভূলিবেন না— ভারতের ভবিষ্যৎ আশা ভরসা
সন্তানরূপে আপনাদেরই হস্তে ন্যস্ত। আর কদাচ ভুলিবেন
আপনাদের কর্তব্যের কথা—আপনার প্রতি, পরিবারের
প্রতি, সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি, সমগ্র মানবজাতির
প্রতি প্রত্যেক মানবেরই যে বিধাতৃ-নির্দিষ্ট অবশ্যপালনীয়
কৰ্ত্তব্য আছে-সেই কথা। আপনারা এ সমস্ত কর্তব্য
পালনকরুন, ঈশ্বর আপনাদের সহায় হইবেন।
সমাপ্ত।
লউন।
Fd919
শ্রীসতীশচন্দ্র চক্রবর্তী প্রণীত
সন্তানের চরিত্র গইন”
সম্বন্ধে
কতিপয় অভিমতের সারাংশ ।
প্রবাসী .....কেমন করিয়া সন্তানের চরিত্র শ্রেষ্ঠ আদর্শের অনুকূল
রয়া সংঠন করতে পারা যায় তাহারই উপদেশ এই গ্রন্থে সন্নি-
বশিত হইয়াছে। যাহার! সন্তানের হিতচিন্তা করেন তাহারা
এই পুস্তক পাঠ ক : সলে একত্র অনেক পণ্ডিতের চিন্তালব্ধ ফল সমাহৃত
দেখিতে পাইবেন এই পুস্তুকখানি যে বিশেষ
উপায়ে ও উপকারী হইয়াছে তদ্বিষয়ে
সন্দেহ নাই। এই পুস্তক পাঠ করিয়া সকলেরই সন্তানের
প্রতি নিজ নিজ কর্তব্য অবধারণ করিয়া লওয়া উচিত।
নব্যভাৱত......অামাদের এইরূপ পুস্তকেরই প্রয়ােজন অত্যন্ত
অধিক। আমরা প্রত্যেক জনকজনশী ও অভি
ভাবকগণকে এই গ্রন্থখানি পাই করিতে
অনুরােধ করি।
সার প্রফুল্ল চন্দ্র রায়......এই বই পাঠ করিয়া পরম পরিতোষ
লাভ করিয়াছি।। বাংলা ভাষায় এপ্রকার প্রস্থের
বিশেষ প্রয়ােজন ছিল। আশা করি শিক্ষিত বাঙ্গালী
মাত্রের ঘরে ঘরে ইহা স্থান পাইবে।
সার শুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়--গ্রন্থখামি সাদরে গ্রহণ
করিয়াছি এবং ধন্যবাদের সহিত তাহার প্রাপ্তি স্বীকার করিতেছি ।
পুস্তকখানি অভি সরল ভাষায় লিখিত হইয়াছে এবং বিষয়
গুলি সুশৃঙ্খলার সহিত সন্নিবেশিত হইয়াছে।...জানিবার
মােগ্য অনেক কথা এই পুস্তকে সুন্দররূপে বিব্রত
হইয়াছে।
জজ সাৱদা চরণ মিত্র সন্তানের চরিত্রগঠন ” পাইয়?
উপকৃত জ্ঞান করিতেছি। এরূপ পুস্তক গৃহে গৃহে
অাবশ্যক। কিন্তু এখানি সম্বন্ধে এখন কোন মত প্রকাশ
করিতে পারিলাম না। টেক্সট্ বুক্ কমিটীতে পাঠাইবেন। তথায় যাহা
হয় করা যাইবে।
শ্রীযুভরামানন্দ চট্টোপাধ্যায় বই পানি বেশ ভাল
হইয়াছে। প্রবাসীতে ইহার সমালােচনা বাহির হইয়াছে। যাহাতে
লেখাপ জানা প্রত্যেক মাভাৱ হাতে হাতে
এই বইখানি পড়ে তাহার চেষ্টা করা আবশ্যক।
মহামহােপাধ্যায় ডাক্তাৱসভীশচন্দ্রবিদ্যাভূষণ
—পাঠ করিয়া পরম পরিতােষ লাভ করিলাম। পুস্তকের ভাষা
অতি সুন্দর হইয়াছে। বঙ্গদেশের শিশুদিগকে সুপথে
আনিবার জন্য আপনার নির্ধারিত প্রণালী যে অতিশয় মনােক্ত
ও সুচারু হইয়াছে ইহা বলা যাইতে পারে। বঙ্গভাষায় এসম্বন্ধে এবম্বিং
অন্য কোন পুস্তক এমন ভাবে লিখিত হইয়াছে কিনা বলিতে পারিনা।
আপনি বঙ্গভাষার শ্রীবৃদ্ধি সাধন করিয়াছেন।
শ্ৰীযুত অশ্বিনী কুমার দত্ত-তােমার সন্তানের চরিত্রগঠন”
পড়িয়া বিপুল আনন্দ লাভ করিয়াছি।
এ শ্রেণীর পুস্তক
বঙ্গভাষায় আছে বলিয়া মনে হয় না।
তােমার উপদেশগুলি সুষ্ঠু ও অতীব কাৰ্যকর হইয়াছে এবং তাহা
শিক্ষাতত্ত্ববিদ মনীষিগণের উক্তিদ্বারা সমর্থিত হওয়ায় আরও মূল্যবান
(৩) হইয়াছে। হােমার লিপপ্রণালীও মনােজ্ঞ । বঙ্গবাসী জনকজননী প্রত্যেকের হস্তে তােমার পুস্তক থাকিলে এবং তদনুসারে প্রত্যেক পরবারের শিশু ও বালকগণের চরিত্র গঠিত হইলে দেশের বরিশাল ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের (ৰ্ত্তনে জাতীয় বিদ্যালয়ের) ঋষিকল্প প্রধান শিক্ষক শ্ৰীযুত জগদীশ মুখােপাধ্যায় { পাণ্ডুলিপি দর্শন করিয়) আমাদের জাতীয় উন্নতি সাধনকল্পে এশ্রেণীর পুস্তক আমার বিবেচনায় বাঙ্গালাভাষায় এই প্রথম। তােমর লিপিকৌশলে এই সারগর্ভ উপদেশগুলি আরও সমুজ্জ্বল হইয়াছে। আমি অনুরােধ করি তুমি পুস্তকধানি মুদ্রাঙ্কনদ্বারা সাধারণের মধ্যে প্রচার করিয়া অসংখ্য পিতামাতার অজস্ৰ আশীৰ্বাদ উপার্জন কর। ভারত-স্ত্রী-মহামণ্ডলের বিদুষী সম্পাদিকা কৃষ্ণভামিনী দাসী- পুস্তকখানি পড়িয়া অতিশয় আনন্দিও হইলাম। ইহাদ্বারা আমাদের দেশীয় জনকনগণ যে বিশেষ উপকৃত হইবেন সে বিষয়ে সন্দেহ নাই! যাহাতে এই বইখানি কন্যা ও বধুদিগের হস্তগত হয় তাহা করা প্রত্যেক অভিভাব কে কর্তব্য। উদ্বোধন-Victory must begin at home এই মহদ্বাণী মনুষ্যজীবনের সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান মন্ত্র। পাশ্চাত্য দেশ সমূহে এই বিষয় যথেষ্ট আলােচিত হইতে দেখা যায় এবং যাহাতে শিশুজীবন সম্যক গঠিত হইয়া কালে সৰ্বাঙ্গীন স্ফূর্তি পাইতে পারে তজ্জন্য একটা চেষ্টা তত্তৎ দেশের মনীষিবৃন্দের, সন্তানের পিতামাতার, আত্মীয় স্বজনের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। ঐ চেষ্টার তুলনায় আমাদের দেশ একরূপ নিশ্চেষ্ট বলিলেই হয়। এইরূপ চেষ্টা এবং আলােচনার অভাবে আমাদের দেশের শিশুজীবন দিন দিন কিরূপ, শােচনীয় হইয়া উঠিতেছে পেলে এবং ভাবিলে দুঃখ হয়। এমত অবস্থায় এইরূপ আলােচনা এবং চেষ্টা দেশেৱ, কাহাকেও করিতে দেখিলে আশা এবং আনন্দ হয়। ' “সন্তানের চরিত্র পইন” প্রণেতা সকলেই ধন্য- বাদাহঁ গ্রন্থকার তাহার পুস্তকে সন্তানজীবন গঠনােপযােগী অত্যাবশ্যক বিষয় সমূহের অতি পুঙ্খানুপুঙ্খ আলােচনা করিয়াছেন। আমাদের বিবেচনায় উক্ত আলােচনা দেশকাল অনুযায়ী অতি উপযােগী ও উপাদেয় হই মাছে। আমরা সকলকে এ পুস্তক পাই করিতে অনুরােধ করি। ইহাতে শিশুজীবনের যথেষ্ট জ্ঞাতব্য বিষয় অবগত হইবেন এবং যাহাদের উপর শিশুদের সন্তানদের ভার ন্যস্তৃ হারা এই বিষয় অনেক তথ্য এবং সুনির্দিষ্ট পন্থর সন্ধান পাইবেন। এইরূপ গ্রন্থ স্কুলের পাঠ্যপুস্তকরূপে নিৰ্বাচিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই পুস্তকখানি টেষ্ট বুক কমিটি কর্তৃক উপহার ও লাইব্রেরী পুস্তকরূপে অনুমােদিত হইয়াছে। মূল্য-উৎকৃষ্ট বাঁধাই—১; সাধারণ বাঁধাই প্রাপ্তিস্থান আদর্শ পুস্তকালয়,.. ১১, সুকিয়া ষ্ট্রীট, কলিকাতা কলিকাতার প্রধান প্রধান পুস্তকালয় ।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.