Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Pushpapunja
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
পুষপপুঞ্জ।
শ্রীমতী ষােড়শীবালা দাসী
প্রণীত।
দেবপদ ভক্তি মনে,
পুজে ধনী বহুধনে,
সে দেবে কি দীনজনে,
বনফুলে পুজে না।
নন্দন কানন মাঝে,
পারিজাত পুষ্প সাজে,
তা বলে কি শিম্বী পুষ্প,
সে কাননে ফুটে না।
কলিকা।
৯৭ নং কলেজ ঐট সােমপ্রকাশ ডিপজিটরীদ্বারা
গ্রন্থকত্রীর জন্য প্রকাশিত।
৪৮.মং ওয়েলিংটন স্ট্রীট ভারবি যন্ত্র তারিণীচরণ দাস :
দ্বারা মুদ্রিত।
Fi,
• •
No text on this page.
বিজ্ঞাপন। কোন কোন ব্যক্তি পুরুষের লিখিত পুস্তকে স্ত্রীলােকের নাম দিয়া তাহা মুদ্রিত ও প্রকাশিত করেন। এ দেশের স্ত্রীজাতি এখনও ভাল লেখা পড়া জানেন না, সুতরাং তাঁহারা দয়ার পাত্রী। গ্রন্থে যদি গুণ না থাকে, তবে বড় একটা গালি খাইতে হইবে না,-এই তাহাদের আশা ভরসা। গ্রন্থকার হওয়া চাই, কিন্তু খােমটার ভিতর থাকিয়া । আমাদের স্নেহের পাত্রী এই বাল কবী পাছে সাধারণের সেই সন্দেহ চক্ষে পড়েন, তাই কয়েক জন বন্ধুর অনুরােধে আমি ইহাতে এই কয়েক ছত্র লিখিতে বাধিত হইলাম। ষােড়ষীবালা বালক নন, বঙ্গীয় যুবক নন-তিনি বঙ্গের রমণীকুলের অলঙ্কার। এই ফুলের তােড়া তিনি নিজে গাখিয়াছেন, ইহাতে পুৰুষ মালীর হাত নাই। পুষ্প গুলিতে অনেক কাটা থাকিতে পারে, পাপড়ীতে পাপড়ীতে কীট থাকিতে পারে, কিন্তু যাহার হৃদয় আছে, একবার তিনি দেখিবেন, বালিকা মনের কোমলভাব কেমন সরল পথ দিয়া ফুটিয়া বাহির হইয়াছে। এমন ভাসা ভাসা অকপট কোমলত্ব, সেই কোমলত্বে একটু আদর মাখান, বালিকার স্বভাব ভিন্ন কঠিন পুৰুষে কখনও দেখা যায় না। অনেকগুলি কৰি বেশ স্বপ্নের ছয়াময় সৌন্দর্য্যে ভূষিত হইয়াছে। কলিকা } শ্রীরঙ্গলাল মুখখাপাধ্যায়। ২২শে জ্যৈষ্ঠ ১২৯১।
No text on this page.
পরম আরাধ্যতম
শ্ৰীযুত রামচরণ বসু পিতা ঠাকুর
মহাশয় শ্রীপাদপদ্মে।
দেব।
স্নেহের তনয়া বলে
অর্পিলাম পদতলে
বাল্যখেলা মত কটি কবিতা প্রসূণে,
যত্নে ক্ষুদ্র গুচ্ছ গেঁথে ভাের হয়ে আমােদোতে
পূজিনু চরণ মাখি ভকতি চন্দনে।
প্রসন্নয়নে তাত
একবার দৃষ্টিপাত
করিবেন এই ক্ষুদ্র পুষ্পপুঞ্জ পানে।
তা'হলে হৃদয় মাের আনন্দে হইবে ভাের
সার্থক করিব বোধ এক্ষুদ্র জীবনে।
শ্রীচরণাভিলাষিণী
সেবিকা প্রিয় নন্দিনী
যােড়শীবালার
ভিক্ষা এই
শ্রীচরণে।
No text on this page.
পুষ্পপুঞ্জ।
বিভুবন্দনা
১
কোথা হে করুণাময় জগত-ঈশ্বর।
তােমার মহিমা, প্রভু! ব্যাপ্ত চরাচর
জগতের পিতা তুমি, করুণা-অর্ণব,
পৃথিবী-পালক,সৰ্ব্ব জীবের বল্লভ।
যে দিক যখন আমি নিরখি নয়নে,
তােমার মহিমা দেখি সকল ভুবনে।
যখন যে দ্রব্য দেখি কেবল তােমার
অনন্ত মহিমা-রাশি করিছে প্রচার।
কোন্ রূপে কোন্ স্থানে তব অবস্থান,
কে পারে করিতে, নাথ! তােমার সন্ধান ?
কোন্ দেবে আবির্ভাব, কিসে মুক্তি হয়,
কে পারে করিতে দেব? তােমার নির্ণয় ?
২
৪
শুধু জানি দয়াময়, তুমি সর্বময়,
জগতের পিতা তুমি সকলেতে কয়।
কি মহৎ কিবা নীচ সবার দেহেতে,
সমভাবে আছ তুমি সকল স্থানেতে।
৫
সকলি জগৎপতি তােমারি সৃজন,
জগতের পতি, তুমি জগৎ-জীবন।
তুমি অনাথের নাথ, পতিতপাবন,
দীনের আশ্রয় তুমি, অধমতারণ।
অন্তর্যামী পিতা তুমি, কি বলিব আর,
হৃদয়ের ভাব সব জানিছ আমার।
দিবানিশি পাপ-পথে মন মম ধায়,
কি সাধ্য আমার নাথ ! ফিরাই তাহায়।
৭
হে সচ্চিদানন্দ বিভাে, মঙ্গল-আলয়,
হে দীনতারণ প্রভাে, অনাথ-আশ্রয়।
দেবদেব মহাদেব পিতা পরাৎপর,
দয়া করি পদচ্ছায়া দেও হৃদিপর।
সকলি হইতে পারে তােমার ইচ্ছায়,
সুবুদ্ধি কুবুদ্ধি তুমি প্রদাননা সবায়।
সকলের মন তুমি জান ভাল মতে,
তৰ কাছে কেবা পিতঃ পারে লুকাইতে ?
পুপ।
ওহে দেব জ্যোতির্ময় জগৎ-ঈশ্বর,
তুমি যদি কর দয়া কন্যার উপর,
এ পাপ-হৃদয় হবে স্বর্গের সমান,
সুপবিত্র হবে দেহপূর্ণ হবে জ্ঞান।
অজ্ঞান তনয়া পিতঃ আমি যে তােমার,
পাপের আধার মম এই দেহভার ।
পতিতপাবন তুমি দয়ার নিধান,
কৃপা করি কৃপাময় কর পরিত্রাণ।
প্রভাতকালের প্রার্থনা।
বিভাবরী বিভাতিল, উষাদেবী আইল।
উষা হেরি লাজে মরি, শশী অন্তে মাইল।
শশীসনে তারাগণে অদর্শন হইল।
মৃদু মৃদু প্রভাতের সমীরণ বহিল।
বিহগ মধুর স্বরে বিভুগুণ গাইল।
নিজ নিজ বাস ত্যজি শূন্যপথে ধাইল ।
-সুবর্ণ বরণে ধরা সুরঞ্জিত করিয়ে।
অই ভানু পূৰ্বাকাশে দেখা দিল হাসিয়ে।
সরােবরে মনােহর সরােজিনী ফুটিল।
রূপে তার সরােবর চারুশােভা ধরিল।
৪
পুষ্পপুঞ্জ।
কুমুদিনী ম্লান বেশে বিমুদিত হইল।
অলকা বদনে যেন কুলবালা টানিল ।
মৃদুল হিল্লোলে খেলে সরােবর সলিলে।
হেলে দুলে পাতা লতা প্রভাতের অনিলে ।
বায়ুভরে বার বার লতা পাতা কাঁপিছে।
যেন সেই দয়াময় শ্রীচরণে নমিছে।
আনন্দে পূরিত ধরা বালারুণ কিরণে।
ফুটিল কুসুম কত নানাবিধ বরণে ॥
সাজিয়ে প্রকৃতি সতী মনােহর বেশেতে।
অরুণ-আলােক পীত বাস পরি দেহেতে ॥
কুসুমের অলঙ্কারে চারু শােভা ধরিয়ে ।
গম্ভীর প্রশান্ত ভাবে আঁখি যেন মুদিয়ে ॥
একমনে রতধ্যানে প্রফুল্লিত বদনে।
সপিতেছে আপনারে পরমেশ চরণে ॥
নিশার নীহার-বিন্দু তরুহতে ঝরিছে ।
আঁখি-জলে তরু যেন বিভুপদ পূজিছে।
কোথা হে জগৎনাথ জগতেরি জনক।
দয়াময় জগদীশ সর্বজন-পালক।
কোথা হে সচ্চিদানন্দ মঙ্গলেরি আলয়।
অনাথের নাথ বিভাে, দীন জন-আশ্রয়।
প্রণমে পাপিনী সুতা ভক্তিনত জীবনে।
পাপ ক্ষমা করি নাথ ! রেখ তব চরণে।
হে পিতা করুণাময় তব কাৰ্য্য করিয়ে।
আজিকার দিন যেন সুখে যায় চলিয়ে।
শিশুর হাসি।
প্রাণের যাতনা কিছুই জানেনা,
সুখের দুখের নাহিক ভাবনা,
মনেতে নাহিক চিন্তার তাড়না,
সুখের জীবনে আপনার মনে,
হাসিতেছে শিশু আনন্দ ভরে।
অপূৰ্ব্ব সে হাসি সরলতাম,
সে হাসির তুল্য নাহিক ধরায়।
স্বর্গীয় সে হাসি অতুল আভায়,
বদনে বিকাশি সুন্দর দেখায়,
অনুপম ভাব হাসির পরে।
ভুবন-মােহন অকলঙ্ক হাসি,
প্রতি পদে পদে যেন রাশি রাশি
উগারি উগারি অমৃত প্রকাশি,
স্বর্গীয় কিরণে সংসার বিভাসি,
জগত করেছে, আনন্দময়।
হেরিলে সে হাসি মানবের মন,
হয় সে অতুল সুখেতে মগন,
সন্তাপী যে, হেরে জুড়ায় জীবন,
সংসার বিরাগী সন্ন্যাসীর মন,
হেরিলে সংসারে বাসনা হয়
পপুঞ্জ।
যখন হৃদয় চিন্তায় মগনে,
প্রাণের যাতনা ভাবি এক মনে,
হয়েছে অধীর মরম-বেদনে,
কিছুতে সান্ত্বনা নাহি হয় মনে,
তখনাে হেরিলে ও সুধা-হাসি,
চিন্তা পাপীয়সী পলায় অন্তরে,
মরমের জ্বালা, দুখ যায় দূরে,
শান্তির উদয় হয় যে অন্তরে,
প্রফুল্লতা আসে মনের ভিতরে,
অপূৰ্ব আনন্দ-সাগরে ভাসি।
চিন্তা নিপীড়িত জনের মনেতে,
এক দণ্ডে কেবা পারে সুখ দিতে,
হেন মহৌষধি কি আছে জগতে,
মুহূর্কেকে পারে জগত ভুলাতে,
বিনা হাসি-ভরা শিশু-বদনে।
ধনী কি নিধন, সাধু কি নির্দয়,
শিশুকে হেরিলে সবার হৃদয়
স্নেহের সলিলে নিমগন হয়,
দুর্দান্ত পিশাচ দস্যু নিরদয়,
তাহারা দেখে স্নেহের মনে।
চুম্বক মণিতে লৌহেরে যেমন,
দূরে হতে দেখে করে আকর্ষণ,
সেইরূপ শিশু সুধা-সমন্বিত,
নারী কি নরের হৃদয়-নিহিত
অকৃত্রিম স্নেহ কাড়িয়া লয় ।
পপুঞ্জ।
পবিত্ৰতাময় শান্তির আগার,
ললিত লাবণ্য সারল্য-আধার,
সুখের আলয় পীষুষের খনি,
হয় হাসি-ভরা শিশু-মুখখানি,
কিছু এর সনে তুলনা নয়,
শিশু-আস্য-দেশে হাস্য মনােহর,
জুড়ায় যেমন তাপিত অন্তর,
কি আছে এমন ইহার মতন,
জুড়াতে তাপিত জনের জীবন,
কি আছে এমন এ বিশ্বময় ?
সরলতা-পটে পবিত্রতা রাখি,
স্বর্গীয় হাসিতে প্রফুল্লতা মাখি,
চাঁদের চাঁদনী মুখে মিশাইয়া,
নয়ন-জুড়ান ছবিটি আঁকিয়া,
রাখিলা বিধি শিশুরে ধরায় ।
চারুপূর্ণ শরদেন্দু-বিনিন্দিত,
চারুমুখে আধদন্ত প্রকাশিত,
সুমধুর হাসি যবে খেলা করে,
ঝরে যেন তায় সুধা ঝর ঝরে,
বিভাের করিয়া মানব-মন।
লােহাগ-মাখান ননীর পুতুল,
দেখিলে হৃদয়ে ধরিতে ব্যাকুল
পুষ্পপুঞ্জ।
হইবে নিশ্চিত দর্শকের মন,
শিশু হেন হয় হৃদয়-রঞ্জন,
এমনি হৃদয়-জুড়ান ধনু।
শিশুর মধুর হাসির উপরে,
কি যেন মাখন আছে স্তরে স্তরে,
সে রত্ন যেন এ পৃথিবীর নয়,
সব যেন তার স্বর্গীয়তাময়,
কিবা সুধা ধরে শরদ ইন্দু।
সে মধুর হাসি হেরেছে যে জন,
সে জানে কেমন হৃদয়-রঞ্জন,
সে হাসিতে যেন পরম পিতার,
করুণামাখান আছে অনিবার,
সে হাসি কেবলি সুখের সিন্ধু !
স্বচ্ছ সুবিমল সরসীর জলে,
সমীর সুধারে খেলায় হিল্লোলে,
তাহাতে যেমন প্রফুল্ল কমলে,
রূপের ছটায় সরসী উজ্বলে
চল চল করি অমিয় ঝরে।
তার চেয়ে শিশু হৃদ্সর-জলে,
মৃদুল মধুর আনন্দ-অনিলে,
প্রফুল্ল তরঙ্গে হেলে দুলে খেলে,
সুধা-হাসি ধরে বদন-কমলে,
জগ-জন-মন মােহিত করে।
পুষ্পপুঞ্জ।
হাস হাস শিশু হৃদয় ভরিয়া,
অমৃতের ধারা অধরে ঢালিয়া,
স্বর্গীয় সুভাব বিস্তার করিয়া,
এসুখ বয়স যাবে রে চলিয়া,
হাস শিশু হাস খুলিয়া মন।
বহিয়া যাইবে একাল, রতন।
তাই বলি শিশু হাস সর্বক্ষণ,
মােহিত কর এ জগ-জন-মন,
চারু মুখে হাস ও হাসি রতন,
যায় যায় বয়ে সুখ জীবন।
প্রাকৃতিক শিক্ষা।
দিবা অবসান প্রায় পশ্চিম গগনে।
অস্ত যান দিবাকর লােহিত বরণে।
নাহিক তেমন আর পূর্বের মতন।
হুতাশন মত সেই প্রখর কিরণ।
সন্ধ্যা সমীরণ বয় মৃদু মৃদু তায়।
প্রকৃতির শােভা হেরি জীবন জুড়ায় ।
বিশুদ্ধ নলিনীবালা বিষন্নময়।
জগতের অনিত্যতা দেয় পরিচয়।
কে বলিবে প্রভাতের ফুল্ল কমলিনী।
অতুল মাধুৰ্য্যময়ী নয়ন-রঞ্জিনী ।
একি সেই মনােরমা নলিনী-সুন্দরী।
এ বিশুষ্ক বিষাদিনী যাহা এবে হেরি
১০
পুষ্পপুঞ্জ।
অদুরে কুসুমােদ্যানে করিছে ভ্রমণ।
মনােরমা বালা দ্বয় প্রসন্ন বদন।
বালেন্দু সদৃশানন অতি মনেহয় ।
চুম্বিছে অলকাগুচ্ছ বদন উপর ।
প্রত্যেক কুসুম প্রতি বিচলিত মনে।
দেখিতেছে মুগ্ধ হয়ে বিস্মিত নয়নে ॥
দুই বরষের পূর্বে ছিল এই স্থান।
তরু লতা-তৃণ-শূন্য মরুর সমান।
অত্যল্প দিবস মধ্যে কেমনে এমন।
হইল এ চারুতর কুসুম কানন ॥
ভাবি তাই সবিস্মিত আশ্চৰ্য্য-নয়নে।
দেখিছে প্রত্যেক বিকশিত পুষ্প পানে।
এমন সময়ে বায়ু বহি ধীরে ধীরে।
স্বন, স্বন, রবে যেন বলিল গম্ভীরে।
বল বালা কি দেখিছ বিমুগ্ধ নয়নে।
কি দেখিছ একচিত্তে প্রতি পুষ্প পানে।
এই যে উদ্যান দেখ অতি মনােহর।
যাহা হেরি হইয়াছ মােহিত-অন্তর।
এই স্থান ছিল পূৰ্বে জঞ্জাল-পূরিত।
ছিলনা এমন শােভা কুসুম-শােভিত।
বহু শ্রমে প্রাণপণে করেছে যতন।
তবে হইয়াছে হেন কুসুম-কানন ।
এই যে কুসুমগুলি মধুরতাময়।
যত্নেতে কি ফল ফলে দেয় পরিচয় ৷
পুষ্পপুঞ্জ ।
১১
নিশ্চয় জানিও শিশু যতনের ফল,
যতনে নিশ্চিত হয় সাধিত সকল।
আরাে এই চারুতর কুসুম-নিচয়,
ঈশ্বরের মহিমার দেয় পরিচয়।
প্রত্যেক কুসুম দেখ কেমন চিত্রিত,
সুন্দর শােভায় করে মন বিমােহিত।
হেন চারু শিল্পী যেই জগত-জীবন,
ছার সুখে মােহি তরে ভুলনা কখন।
বহুকাল পরে সােদর মিলনে উক্তি
১
এস সুহাসিনি,
প্রাণের ভগিনি
বহু কাল পরে
মিলন হলাে।
২
সুচারু আনন,
করি দরশন,
আমার জীবন,
জুড়ায়ে গেল।
কত মাস এল,
কত মাস গেল,
না দেখি তােমায়,
আমার মন।
১২
পুষ্পপুঞ্জ
জীবন-বিহীন,
সরসী যেমন,
আছি তেমতি,
হইয়া বােন।
৪
আজি তবানন,
করি দরশন,
বিষাদ-যাতনা,
যাইল দূরে।
আনন্দ সলিল,
পুন পূর্ণ হলাে,
আমার বিশুষ্ক,
হৃদয়-সরে।
একই গভেতে,
আছিনু উতভতে,
ভূমিষ্ঠ হইয়া,
একই স্থানে
অশন শয়ন,
ক্রীড়াদি ভ্রমণ,
করিছি শৈশবে,
হরষ-মনে।
পুষ্পপুঞ্জ ।
সে সুখ কালেতে,
হতনা মনেতে,
এভাবনা কভু,
তিলার্ধ ক্ষণ।
শৈশব পরেতে,
তােমার সহিতে,
বিচ্ছেদ হইবে,
আমার বােন।
ভাবিতাম মনে,
আমরা দুজনে,
জীবন পর্যন্ত,
হরষ-মনে।
১১
শৈশব কৌমারে,
যৌবন কৈশােরে,
যাপিষরে দিন,
একই স্থানে।
এমনি করিয়ে,
হাসিয়ে খেলিয়ে,
কাটাব সদাই,
আনন্দে দিন।
১৪
পুষ্পপুঞ্জ।
১৩.
একত্রে এমনি,
দুইটি ভগিনী,
থাকিব হইয়া,
বিষাদ-হীন।
১৪
সে আশা ফুরাল,
সুখাশা ঘুচিল,
তােমাতে আমাতে,
বিচ্ছেদ হলাে।
১৫
সুখের ভাবনা,
পূরণ হলােনা,
মন আশা বােন,
মনে মিশালাে
১৬
কিশাের বয়সে,
গেলে দূর দেশে,
সুখের স্বপন,
ভাঙ্গিল মাের
১৭
তব সাথে বােন,
গেল মম মন,
বিষাদের ঘােরে,
হইনু ভাের।
১৫
পুষ্পপুঞ্জ।
১৮
গােদরা সােদর,
প্রাণের দোসর,
এক বৃন্তে কত,
কমল হাসে।
ভিতরে ভিতরে,
গাঁথা দৃঢ় করে--
ফুলটী টানিলে,
বোটাটী আসে।
২০
ভাই বােন মত,
স্বার্থ-বিরহিত,
হেন প্রেম আর,
কি আছে বল ।
জীবন মরণে,
মেহের বন্ধনে,
আছে দৃঢ়বধা,
এ ধরাতল।
ভাল বাসি যারে,
আনন্দে আদরে,
সম্ভাষি হারে,
বােন কি ভাই।
পুষ্পপুঞ্জ।
২৩
ভাই বােন হেন,
সােহাগ-মাখান,
প্রিয় সম্বােধন,
জগতে নাই।
২৪
এত গাঢ়তর,
জগত উপর,
ভাই বােন সম,
আত্মীয় নাই।
২৫
তােমার যাহারা
আপন, তাহারা
আমার আপন,
দেখিতে পাই।
শৈশব-সঙ্গিণী,
সুখেরি সুখিনী,
দুখেরি দুখিনী,
দেহে দোহারি
২৭
এমরতে বােন,
ইহার মতন,
স্বর্গীয় বন্ধন,
নাহিক হেরি।
পুষ্পপুঞ্জ।
দৃঢ়-মেহ ডােরে
ধাধা পরস্পরে
কখন হেঁড়েনা
এ ক্ষের।
আশ্চৰ্য্য এমন,
দূরে গেলে বোন।
আরাে হয় ?
বন্ধন ভার।
যদিও ভগিনি
অন্তরেতে তুমি,
অন্তরে অন্তরে
করিতে বাস ।
আঁখির কাছেতে
হাসিতে হাসিতে
সদা দেখিতাম
হতে প্রকাশ।
সেই যে ভগিনী
হৃদয় তােষিণী
শৈশব সঙ্গিনী
সদা পূৰ্ব্বেতে।
অমিয় বদনে,
অমিয় বচনে,
দিদি সম্বােধনে
মােরে ডাকিতে।
১৮ পুষ্পপু ! সেই স্বরধ্বনি বীণা সম শুনি করে প্রতিধ্বনি সদা শ্রবণে। বিষাদিত চিত মােহিত করিত; বীণা যন্ত্রমত বাজিত প্রাণে। চারিদিক পানে চকিত নয়নে দৃষ্টি করিতাম বিস্মিত হয়ে । কোন দিকে তােরে পুন নাহি হেরে কাদিম শােক- দগ্ধ হৃদয়ে। মুদিলে নয়ন, হেরিতাম বােন। কিন্তু তােরে মন- মন্দির মাঝে। মােহিনী মুরতি সরল আকৃতি পবিত্রতা ধীর সুন্দর সাজে।
পুষ্পপুঞ্জ।
১৯
মুরতি সরল
বিকচ কমল
সম ঢল ঢল
সুষমা ধরে।
স্নেহানিল পেয়ে
হেলিয়ে দুলিয়ে
বেড়াত ভাসিয়ে
হৃদয় সরে।
কখন ভগিনি
নিদ্রা কুহকিনী
ভুলাত আমায়
ছলনা করি।
দেখিতাম, বােন।
মধুর স্বপন
তােমার মিলন
কত সুখেরি ।
একত্রে দুজনে
যেখানে যেখানে
করেছি ভ্রমণ
হরষ মনে ।
গিয়া সেখানেতে
আকুল মনেতে
কাদিয়াছি কত
কাতর প্রাণে।
২০
পুষ্পপুঞ্জ।
কুসুম কাননে
রােপিনু যেখানে
গােলাপ পাদপ
দোহে সুখেতে।
হতে মুকুল
না ফুটিতে ফুল,
গেলে তুমি বােন।
দূর দেশেতে।
সে গাছে যবেলাে
কুসুম ফুটিল
নিরখি সে শােভা
কত যে খেদে।
যত তাহা হেরি
পড়ে অশ্রুবারি
ফুকারি ফুকারি
কাদি বিষাদে।
জীবন মােহন
নয়ন রঞ্জন
বিকচ শােভিত
কুসুমগণে।
মম মনে হত
হলাহল মত
ভাল না লাগিত
আমার মনে।
২১
পুষ্পপুঞ্জ।
পূর্ণ শশধর
সুধা-সুখকর
বিতরিত কর
যে দিন বােন।
ভীম প্রজ্বলিত
হুতাশন মত
দ্বিগুণ জ্বলিত
আমার মন।
অই চারু হাসি,
অই মুখ-শশী
হৃদয় গগণে
উদয় হয়ে!
স্নেহ জ্যোছনায়
সুস্নিগ্ধ আভায়
উজল করিত
মম হৃদয়ে।
কত যে যাতনা
বিষম বেদনা
সদাই পশিত
আমার মনে।
এই যে ভবন
শশান মতন
জ্ঞান হত বােন।
মম নয়নে।
২২
পুষ্পপুঞ্জ।
বিষের সমান
হ’ত সৰ জ্ঞান,
আকুল পরাণ
দিন কি রাতে।
তােমারে স্মরণ
করি সুদু বােন।
একটুকু সুখ
হ’ত মনেতে।
নয়ন আসার
সদা অনিবার
ঝরেছে আবার
সরব ক্ষণ।
একত্রে সদাই,
থাকিয়াছি ভাই।
কেমনে তাহার
ভুলিবে মন।
তােমার বিহনে
যে যাতনা মনে
দিবস রজনী
পেয়েছি আমি
আসে ভাষায়
বলা নাহি যায়
জানেন কেবল
অন্তর যামী
পুষ্পপুঞ্জ।
হৃদয় তােষিণী
সন্তাপ হারিণী
এস আদরিনি।
প্রাণের বােন।
চারু মুখে হেসে
এস। কাছে এসে
জুড়াও আমার
তাপিত মন।
মধুর হাসিনী
মধুর ভাষিণী
এস সুহাসিনি
মধুর ভাষে।
সেই সুধা বােলে
ডাক দিদি বলে
যে মধুর ভাষা
তাপ বিনাশে ।
লৌহের শিকলে
বল প্রকাশিলে
ছিড়িবার তরে
ছিড়িয়া যায়।
মেহের শিকল
করিলেও বল
তিল অর্ধ খানি
টুটেনা তায়।
২৪
পুষ্পপুঞ্জ।
আজিকে বােনরে
আমার অন্তরে
কি সুখ উথলি
বেড়ায় খেলে ;
হলে দেখাবার
সে সুখ আমার ;
দেখাতাম দিদি।
হৃদয় খুলে।
প্রতি ধমনীতে
প্রত্যেক শিরাতে
আনন্দে শােণিত
বহিছে বলে ।
হৃদয় আমার
আজি সুখাধার
নিশ্বাস প্রশ্বাস
আনন্দে চলে।
যে দিকে নয়ন
পড়িতেছে বােন !
আনন্দে মগন
সকলি আজ।
তব আগমনে
আমার নয়নে
সকলি ধরেছে
আনন্দ সাজ।
:
পুষ্পপুঞ্জ।
२४
আজি দয়াময়
বিধির কৃপায়
সে সুখের দিন
পুন আসিল।
সুখের দিনেতে
তােমাতে আমাতে
আবার বােনরে
মিলন হলে
অধিক কি আর
আছে বলিবার
প্রাণের ভগিনি
তােমার কাছে।
* - .
মরমের ব্যথা
যাক,
অন্তরের কথা
তােমার নিকটে
প্রকাশ আছে।
যাক, বােন !
সে কাহিনী। থাক,
হৃদয়ে হৃদয়--
ব্যথাটী মাের।
তুমি সুখে থেকো,
দিদি বলে ডেকো,
তাতেই সুখীলাে
ভগিনী তাের।
৪
२५
পুষ্পপুঞ্জ।
বিরলে বালা।
কই না ত কথা,-কও না যে কথা, তাই ।
নিস্পন্দ-নয়নে !-চিত্র কি তুমি ?
পড়েছে কালিমা মুখে চিন্তায় ডুবিয়া ;
চিকুর খুলিয়া চুম্বিছে ভূমি !
হাতটী গালেতে থুরি, মু-খানি নামায়ে,
এক এক বিন্দু অশ্রু ফেলিছ ;
না হইলে চিত্র পট; অঞ্চল টানিয়া
কেন না চক্ষের ধারা মুচিছ ?
এসেছি কখন কাছে,-দেখিতেছি কত ;
তুমিত দেখ না ফিরায়ে আঁখি ?
নিপুণ পটুয়া কেউ বিষাদ-ছায়ায়
চিত্রপট খানি রেখেছে আঁকি।
মধুর স্বরেতে, কাতর রবেতে, বিষাদিত চিতে কহিল বালা ;
আমি অভাগিনী,বিরল-বাসিনী,বিধবা-নন্দিনী দুখের মালা।
দিতে পরিচয়, ফাটে এ হৃদয়, সুধু দুঃখময় এদেহ লতা ;
ভাই দুঃখী মনে,এসেছি বিজনেবল জগজনে, একটি কথা।
অতি অভাগিনী,চির অনাথিনীবিজনবাসিনী বিধবাগণে;
বলি এই বাণী, বিরলবাসিনী, লুকাল অমনি বিজনবনে।
অতুলনা শােভাময় মনােহর পৃথিবীতে,
যাহাতে করিছ বাস সুখ পুনঃ জীবনেতে ।
হেন চারু ভূমণ্ডল
কেমনে দেখিলে বল ?
পুষ্পপুঞ্জ।
কেমনে হইল এই দেহখানি চারুতর ?
কাহারি যতনে হলাে এতদীর্ঘ কলেবর
একবার অন্তরেতে
বসি ভাব বিরলেতে,
যে সব সুন্দর দৃশ্য জুড়ায় নয়ন মন,
কাহার যতনে করিভেছ দরশন ?
এ সংসারে ভালবাসে সকলেই সকলেরে,
বাঁধা আছে এ জগত সুধু মায়া স্নেহডোরে ;
ভালবাসে স্নেহকরে,
পরস্পর পরস্পরে,
ভালবাসা প্রতিদান ভালবাসা সবে চায়।
আপনি বাসিয়া ভাল কেবা বল সুখী হয় ?
শত কুবচন বল
তবু কার অশ্রুজল,
ভিজাইবে ধরাভল তব দুখে বিদেতে ?
কাতরে স্মরিবে দেবে তব দুখ ঘুচাইতে ?
শৈশবেতে ছিলাম যে জড়ের মতনাকার
ছিল ক্ষমতা কিছু হত পদ নাড়িবার ।
সে সময় ব্যগ্রচিতে
কেবল সময় মতে,
অশন বসন দানে রেখেছেন এ জীবন ;
লালন পালন তরে হয়ে বিচলিত মন ।
বিনা স্নেহময়ী মাতা
কে করে যতন এখা।
২৮
পুষ্পপুঞ্জ।
যাহার যতনে এনে এই দীর্ঘ দেহখানি
আর কেহ নন তিনি মঙ্গলময়ী জননী।
কে আছে জননী মত স্নেহময়ী এসংসারে ;
জননীর মতন কে পারে স্নেহ করিবারে ?
কত কষ্টে সযতনে,
পালেন অপত্যগণে,
দশ মাস দশ দিন উদরে ধারণ করি
নিজের দেহের প্রতি মায়ামােহ পরিহরি,
আপনি প্রহরী থাকি
নয়নে নয়নে রাখি,
নিজ রক্ত স্তন দুগ্ধ পিয়ান যতনে কত,
হেন স্নেহবতী আর কে আছে জননী মত,
আন্তরিক স্নেহ হেন দয়া করে কোন জন
জননীর মতন কে আছে আত্ম পরিজন ?
এমন যতন করে
কে আর সােহাগ ভরে,
সন্তোষে রাখিতে সদা চেষ্টা করি প্রাণপণে,
আপনার সুখশান্তি ত্যজি সব ব্যর্থ মনে,
ক্ষুধা নিদ্রা ত্যাগ করে,
সন্তানের সুখ তরে,
দিবানিশি ব্যস্ত মনে মঙ্গল চিন্তেন কত,
এমন মঙ্গলময়ী কে আছে জননী মত?
এমন সহৃদ, আর কেবা আছে এ জগতে,
সর্বদাই অনুকূল সুখ দুখে বিপদেতে ;
পুষ্পপুঞ্জ ।
জননী মতন আর,
স্নেহ দয়া করিবার,
ক্ষমতা আছে বা কার কোন জনেই বা পারে,
তুলনা নাহিক যার মমতার এসংসারে ।
অকৃত্রিম স্নেহময়ী
কে আছে জননী বই ?
কে আর যতনে বল সর্বদাই আদরয়
কাহার এমন আছে মিষ্টবাক্য শক্তিময় ?
নিকটে আসিয়া যবে দাঁড়ান আনন্দময়ী,
হৃদয় আনন্দে পূরে সবিস্ময়ে চেয়ে রই।
কি অপূৰ্ব ইষ্টরাশি
উপনীত হয় আসি,
কি জানি কেমন ভাবে আনন্দে বিভাের হই,
সকলি ভুলিয়া যাই স্নেহেরি জননী বই!
আপনারে যাই ভুলে,
প্রাণ ভরে মা মা বলে,
ডাকি হেন মিষ্ট কথা কে আনিল এ ধরায় ?
এ কথা আপনি ফুটে কেহনা শিখায়ে দেয়।
গাল ভরা মা কথাটি কে আনিল কে শিখাল,
মরতে স্বর্গীয় সুধা কেবা সে ঢালিয়া দিল?
মা ভাযাটি সুধাময়
কেহনা শিখায়ে দেয়,
এ কথা আপনি উঠে হৃদয় ভিতর হতে,
শােক দুঃখ পীড়িতের জীবন জুড়ায়ে দিতে।
পুষ্পপুঞ্জ।
প্রাণ পুরি গাল ভরে,
ডাকি যবে জননীরে,
হৃদয় আমার যেন প্রমােদ পূরিত হয়,
সে সময়ে চতুর্দিক দেখি যেন শান্তি সুধাময় ।
দারুণ রােগের জ্বালা সহে যবে এ জীবন,
দেবাবাস হতে প্রাণ অন্তর্হিত হয় যেন,
উৎকণ্ঠিত হয় মন
দেহ হয় জ্বালাতন।
মা কথা হৃদয় হতে বাহিরায় প্রাণভরে,
যাতনা জুড়ায়ে যেন যায় ক্ষণেকের তরে।
হৃদয়েতে ভয় পেলে,
অথবা যাতনা হলে,
একথা আপনি উঠে হৃদয়ভিতর হতে,
ভয় জ্বালা শােক দুঃখ সকলি অন্তরে দিতে
ভুলে জননী স্নেহ স্বর্গের পবিত্র ফুল,
সুখে দুঃখে ঐ মেহটি সদাই যে অনুকুল।
যখন জীবন যাবে,
সে সময়ে বাহিরাবে
মা বাণী হৃদয় হতে ইহ জনমের মত,
ঐ কথাটিতে হবে শেষ শ্বাস বিনির্গত।
সুখ দিতে মানবেরে,
দয়াময় দয়াকরে
দিয়াছেন গাঢ় স্নেহ জননীর হৃদয়েতে,-
মেহময়ী মা জননী স্বর্গনিধি এমরতে।
পুষ্পপুঞ্জ।
সুখের বাল্যকাল ।
সুখের শৈশবকাল স্মরিলে এখন,
বিস্ময়ে বিষাদে মম পুর্ণ হয় মন।
এবে সে ঘটনা হলে স্মৃতিতে উদয়
নিশীথের স্বপনের মত বােধ হয়।
যেমন হয়েছে হায় চিন্তাপাপে জরা,
এই মন ছিল সদা শান্তিপুর্থ ভরা।
যে নয়নে শােভে এবে নয়ন আমার,
এ নয়ন ছিল পূর্বে আনন্দ আধার।
ফিরায়েছি যেই দিকে যখন নয়ন,
দেখিয়াছি সুধু সুখ পূরিত ভুবন।
কি অপূৰ্ব্ব হর্ষভরা ছিলরে হৃদয়,
সৰি যেন সুখময় ছিল সে সময়
তখন যা ছিল হায় এখন ত তাই,
কেবল মনের মাঝে সরলতা নাই।
সেই পৃথী সেই নভাে সেই চরাচর,
সেই রবি সেই শশী নক্ষত্র নিকর,
সেই তরু সেই লতা সেই গ্রাম্য বন,
সেই চারু সবে পূর্ণ নির্মল জীবন
সেই রূপ বিকসিত সুষমা ধরিণী,
শােভিতেছে সরােবরে প্রফুল্ল নলিনী ;
অই চারু সরােজের মালা পরি গলে,
থাকিতাম কত সুখে কত কুতুহলে।
পুষ্পপুঞ্জ।
গলে পরি বহুমুল্য চারুরত্নহার,
হয় কি তেমন সুখ অন্তরে কাহার?
তেমনি প্রভাতে পাই ভানুর কিরণ,
তেমনি প্রভাতে শুনি বিহগকুজন ;
সে কুজন সহ বালকণ্ঠ মিশাইয়ে
গাইতাম কত গীত নাচিয়ে নাচিয়ে।
তেমনি রজনীকালে হয় চন্দ্রোদয়,
জ্যোছনা উজল সেই মত সুখময়,
সে শশি কিরণে যত মিলি সঙ্গীগণে,
কত খেলা খেলিতাম চেয়ে শশিপানে ;
সেই বাল্য ক্রীড়াস্থল সুখের আলয়,
যাহা হেরি উথলিত আনন্দে হৃদয়,
পুত্তলিকা পুত্র নিয়ে মিছার সংসারে,
কত সুখে থাকিতাম সানন্দ অন্তরে,
ভাবিতাম সে সময় কি সুখসংসারে,
সংসারী লােকেরা কত সুখে বাস করে।
এবে দেখিলাম বটে কি সুখ সংসারে
কুটীলতা কপটতা পূরিত সুদূরে।
এই যে জলদে নভাে আচ্ছন্ন করিছে,
এই ত জলদে হায় গম্ভীর ডাকিছে,
নাচিছে চপলা বালা অাখি ঝলসিয়ে
পড়িছে বৃষ্টির ধারা তেমনি করিয়ে।
সে সময় আনন্দেতে বিভাের হইয়ে
নাচিম বৃষ্টিজলে সানন্দ হৃদয়ে।
পুষ্পপুঞ্জ।
সকলি তেমনি আছে, কিন্তু নাহি হায়,
তেমন পবিত্র হৃদি-সরলতা তায়।
কেন রে জীবন আজি পাপের আধার ।
কেন রে বিষাদে ঝরে নয়ন আমার।
সে কালের সহ এবে কিছুই না মিলে,
কেহ কি বলিবে এবে আমারে দেখিলে ?
এই কি রমণী সেই। ছিল যেই বালা
সর্বদাই হাস্যময়ী সরলা চপলা ?
হাসিত খেলিত সদা দিবস রজনী,
আপনার ভাবে তাের থাকিত আপনি ?
সুখ দুখ পাপ পূণ্য কোনই ভাবনা
তিলেকের তরে বলি কভু ভাবিতনা ?
কালের নিয়মে হায় কিছুই থাকেনা,
বদনে জাগিছে এ বিষাদ ভাবনা।
প্রথম অবস্থা হায় মানব জীবনে,
কত শীঘ্র গত হয় প্রফুল্লিত মনে।
ক্রমে ক্রমে বাল্যকাল যত গত হয়,
হৃদাকাশে সুখ-শশী ক্ৰমে অস্ত যায়।
বিষাদ আঁধার করে ঢাকে হৃদাকাশ,
বহে হে ভীমরূপে হতাশ বাতাস।
ক্রমে ক্রমে এ প্রলয়ে দুঃখের জীবন,
কাল জল প্লাবনেতে হয় নিমগন ।
৩৪ পুষ্পপুঞ্জ। মানবের মন। কি দিয়া রচিত হলাে মানবের মনরে খুঁজে না পেলাম কত করিনু যতন রে । কখন যে বােধ হয়, পূর্ণিমার চন্দ্রোদয়, অবনী আলােকময় রমণীয় আকারে। বিমল পূর্ণিমা নিশি, গগনেতে পূর্ণশশী, বিতরে কিরণ জাল সুস্নিগ্ধতা মাখা রে । পুন দেখি আরবার, ঘেরি ঘাের অন্ধকার, অমাবস্যে পূর্ণ নভাে মেঘ জাল ঢাকা রে। ঘোর অন্ধকারচয়, ঢাকে দিক সমুদয়, আর না বিতরে বিধু রশ্মি সুধা-মাখারে। ঘন গরজয়ে ঘন, ভীষণ বজ, পতন, যেন ভূমণ্ডল সদা করে টলমল রে। ক্ষুন্ন চিত্তে অবিরল, ঘন বর্ষে অাখি জল, পাথার করিয়া দেয় অবনী মণ্ডলরে। কভু দেখি নিরমল, স্বচ্ছ সরসীর জল, আনন্দ অনিল ভরে করে ঢল ঢল রে। পেয়ে সে আনন্দানিলে, সুখঢেউ-বহে জলে, হেলে দুলে যেন কত সন্তোষ কমল রে । কি ভাবেতে পরক্ষণে, চিন্তারূপ প্রভঞ্জনে, আসি তােলপাড় করে সরসীর চিতরে। কোথা বা বিমল জল, কোথা সে হিল্লোল গেল, বিক কমল দল করে উৎপাটিত রে। • না জানি মানব মন কি দিয়া রচিত রে ।
পুষ্পপুঞ্জ। কি দিয়া রচিত হলে মানবের মন রে, খুঁজে না পেলাম কত করিনু যতন রে ! কালি দেখিয়াছি যায়, সুগুণে ভূষিত-কায়, ধরণীর অগ্রগণ্য হইবে যেজন রে । যাহার হৃদয়াকাশে, ধৰ্ম্মরূপ শশী হাসে, দয়ারূপ জ্যোছনায় উজলে ভুবন রে। দীন দরিদ্রের বন্ধু, সরলতা স্নেহ সিন্ধু, সমভাবে সবাপরে বিতরে যতন রে। কুরতা শঠতা পাপ, হিংসা দ্বেষ ক্রোধ তাপ, অধৰ্ম্ম কাহারে বলে স্বপনে যেজন রে, জানিত না বুঝিত না, ছিল না দুষ্ট কামনা, সুধু ধৰ্ম বাসনাতে পূরিত জীবন রে । আজি কেন দেখি তায়, ঘােরতর পাপময়, কলঙ্ক রাশিতে দেহ করেছে পূরণ রে ? কোথা পবিত্ৰতাময়, মন তার সদাশয়, কোথা তার অকলঙ্ক পবিত্র জীবন রে ? হয়েছে জীবন তার, ক্রুরতা শঠতাধার, হিংসাদ্বেষ করিয়াছে দেহের ভূষণ রে ? হারায়েছে সেইজন, সুখময় শান্তিধন, দেবের দুলভ নিধি ধরম রতন রে । সুধা ভ্রমে অনিবার, ভখিছে গরলধার, পাপহদ মাঝে ভ্রমে দেয় বিসর্জন রে। দীন দুখী দেখি দ্বারে, হৃদয় আকাশ ঢাকিয়াছে পাপঘন রে। খেদাইয়া দেয় দূরে,
পুষ্পপুঞ্জ।
দেখিলে ধাৰ্মিকবরে, উপহাস করি তারে,
থাকে লয়ে দিবানিশি দুরাচারগন রে।
কোথাতার হৃদিময়,
বিরাজিত গুণচয়,
আজি কি না তার মনে ভরা পাপ রাশিরে।
পাপপথে মন তার,
ভ্রমিতেছে অনিবার,
ঢেকেছে হৃদয় তার প্রবঞ্চনা মসিরে।
অগাধ সাগর বারি, তাহে যথা ক্ষুদ্র তরি,
অবিরল টলমল হেলে দুলে চলে রে।
সংসার সাগর নীরে, অনন্ত চিন্তার ভারে,
মানবের মনতরি অইরূপ দোলে রে।
কোন দিকে ধীর মন, কোথা করে বিচরণ,
কোথা যায় কি সে চায় কে করে গণন রে।
কি দিয়া রচিত হলাে মানবের মন রে ।
খুঁজে না পেলাম কত করিনু যতন রে।
নিশীতে পাপিয়া।
একাকী নীরবে বসি অলিন্দ উপরি,
সুষুপ্ত রজনী কালে, চন্দ্রের কিরণ জালে,
উজল হয়েছে যবে প্রকৃতি সুন্দরী,
সুখ দুখ হর্য হাসি,
বিষাদ যাতনা রাশি,
ভাবি কিসে হয় তারা জীবন মাঝারি।
জগত সংসার কি, কুৎসিত বিকট শােভা,
পাপ পুণ্য ধৰ্ম্ম কিবা,-আমি কি—কাহারি ?
৩৭ পুষ্পপুঞ্জ। কত ভাবি কত কাঁদি কে করে বর্ণন? কভু উৎকণ্ঠিত মনে, স্বভাবের শােভাপানে, ক্ষণেক বিভাের হয়ে ফিরাই নয়ন। হাসে চাঁদ, হাসে ধরা, সকলি হাসিতে ভরা, হাসে অই নিরমল সরসী-জীবন। হরিত পত্রের কোলে, ফল ফুল হেসে দোলে, হাসে অই মনােরম শ্যামতরুগণ । মৃদুল বাতাস হাসে, হাসে লতাগণ। লতার ললিত অঙ্গে, মুকুলের। কত রঙ্গে, হেলে দুলে হাসে কিবা নয়নরঞ্জন। ললিত লতার কায়, পাইয়া মৃদুল বায়, দুলে তাহে শোভে কিবা চন্দ্রিমা শােভন। হাসে যদি চরাচর, তবে কেন এ অন্তর, বিষাদেতে বিষাদিত হয় উচাটন ? যেজন গড়েছে এই সুন্দর ভুবন, এই চাঁদ মনােহর, এম্নিগ্ধ শশিকর, এই যে তারকামালা হীরক মতন, এই যে বিকফুল, এহসিত লতাকুল, এই হাসি-পূর্ণ শ্যাম মহীরূহগণ, ইহাদের যেই জন, করেছেন বিতরণ, এহাসি, আমিত রি হাতের গঠন কেন না হাসিব তবে ইহারা হাসিলে ? কেন না এদের সনে, মিশাইব এ জীবনে, কেন না নাচিব আমি মৃদুল অনিলে ? ;
পুষ্পপুঞ্জ।
কিসের এ চিন্তা-রাশ, কিসের এ দুখশ্বাস,
মুছে ফেল নয়নরে এদুঃখ সলিলে।
ভাবি আমি কার তরে,
কেনই বা অশ্রুবরে ?
হাসি বড় পায় মনে একথা ভাবিলে।
হাসরে হৃদয় আজি এই শােভাসনে।
কেন হেন দুঃখে রয়ে,
বিষাদে নীরব হয়ে,
কারতরে থাকিসরে বল ক্ষুব্দ মনে ?
জগত হাসিছে কিবা, হয়েছে মধুর শােভা,
সুধু আঁখি কঁদিতেছে আকুল জীবনে।
হেনকালে এক পাখী,
অদূর গগণে থাকি,
গাহিল সঙ্গীত সুধা ঢালিয়া ভুবনে।
ছড়াল অমৃতরাশি হৃদয় ভুলায়ে।
সুমধুর কণ্ঠস্বরে,
জগত মােহিত করে,
গাহিল বিলাপগীত কেবল পাপিয়ে ।
ললিত সরল গীত, শুনিয়া আমার চিত,
পড়িল তাহার সনে বিভাের হইয়ে।
ভুলিনু ভাবনা যত, হর্ষে মন বিমােহিত,
শুনিতে লাগিনু তাই মন এলাইয়ে।
দেখিনু কখন পাখী উৎকণ্ঠিত মনে,
কভু বসে তরুশিরে, কভু উড়ে নভােপরে,
ঢলে সুধু শােকগীত আকুল জীবনে।
কি মধুর সেই স্বর,
সুধা যেন ঝর ঝর,
ঝরিতেছে তাহার সে সুমধুর গানে।
পুষ্পপুঞ্জ।
ভাবনা যাতনা যত, করি সব বিদূরিত,
সে মধুর গীত ধ্বনি পশিল শ্রবণে ।
যখন নিঝুম রাতি ঘুমায় ভুন,
চন্দ্রকরে ধরা হয়,
উজ্জ্বল উৎসবময়
বহে তাহে মৃদু মৃদু স্নিগ্ধ সমীরণ,
একাকিনী সে সময়ে,
চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে,
কল্পনার রথে চড়ি জীবন যখন,
সমন-আগরে গিয়ে, পাপী দশা নিরখিয়ে,
কঁদে নিজ পাপ স্মরি বিষাদিত মন।
নানারূপ ভাবনায় হৃদয় সাগরে,
হতাশ বাতাস লাগি, দুঃখ উৰ্ম্মি উঠে জাগি,
ভেঙ্গে ফেলে আশা তট ভীষণ প্রহারে,
সুখময় শান্তি তরি, ঘাের আন্দোলন করি,
ডুবে যায় ভাবনার অকুল পাথারে ।
সে সময়ে পাপিয়ার, কি মধুর গীতধার,
সে জানে কি সুধা আছে পাপীয়ার স্বরে ।
উজল চন্দ্রিকা ভাতি পড়িয়া জগতে,
হাসিছে ধরণী সতী,
তাই ভেবে ক্ষুন্নমতি,
পাখীর নাহিক শান্তি ঘাের রজনীতে।
সবে নিদ্রা মগ্ন ভবে, এহৃদয়ে কিন্তু এবে,
জাগে পাপ অনুতাপ অশ্রু নয়নেতে।
পাপিয়াকি পাপিকায়, আমার মতন হায়,
তাই কাদে এবিজন নিদ্রিত নিশীথে।
নানা এ যে মহাভ্রম অন্তরে আমার ।
৪
পুষ্পপুঞ্জ।
ও গান যে সুধাময়,
ওগান স্বর্গীয় হয়,
ও সুধাসংগীত সুধু পবিত্র আধার }
ওগানের থরে থরে, সুধা সুধু বাস করে,
ওখান যে ব্যক্ত করে পরমপিতার ।
অনন্ত মহিমারাশি, ওগানেতে পরকাশি,
ওখানে রয়েছে যেন পদছায়া তার।
পাপীয়ারে ধন্য তােৰ সাৰ্থক জীবন ।
তাই এ নিশীথকালে, জগত ঘুমায়ে গেলে,
গাও তুমি হৃদি খুলে হয়ে সুখীমন।
সুধু সেই প্রাণধার । জগতের সে পিতার,
অনন্ত মহিমারাশি মধুর কেমন।
ধন্য ধন্য বিহঙ্গম,
ধন্য তাের এ জনম,
পেয়েছিস তুই কি রে তার দরশন।
পাখীরে করিয়ে দয়া বলরে আমায়,
কোথা সে অনাথনাথ, কোথা সে আমার তাত,
কোথা সে সচ্চিদানন্দ প্রভু দয়াময় ?
কি করিলে কোন পথে, গেলে সে জগৎনাথে,
পাবরে দেখিতে কোথা দুঃখীর পিতায় ?
পাখীরে আমায় বল,
মুছি তবে আঁখিজল,
লভি গিয়ে চিরশান্তি সে পদ ছায়ায়।
পুষ্পপুঞ্জ।
৪১
আশা।
অয়ি দেবি চারুশীলে জগত-মােহিনি।
তােমার প্রসাদে পৃথীবাসী প্রাণীগণ,
জীবন ধারণ করি শােভিছে অবনী,
অনন্ত মহিমা তব কে জানে কেমন।
ত্রিভুবন বদ্ধ দেবি তােমার মায়ায়,
নানারূপ মূৰ্ত্তি ধর সময় সময়।
কখন আনন্দে ভরে হৃদয় নাচাও,
কভু নয়নের জলে প্রাণীকে ভাসাও ।
কখন মুরতি ধরি নয়ন রঞ্জিনী,
ভুলাও কাতর জীবে দিয়ে শক্তিদান ।
ভাসাও আনন্দ নীরে জগত মােহিনি,
তব বলে সুখী হয় শােক-দগ্ধ প্রাণ।
কখন মুরতি ধরি ভীমা ভয়ঙ্করী,
প্রাণীরে ধরিয়া মগ্ন কর দুঃখনীরে ।
ব্যাকুল জীবন হয়ে ফেলে অশ্রুবারি,
হাবুডুবু করে জীব বিষাদ সাগরে।
মােহময়ী আশা তুমি তখনি আবার,
জীবন তােণিী মূৰ্ত্তি ধর মায়াবিনি।
দূরকর শােক জ্বালা যত অভাগার,
যাতনা দুরিত হলে পুন হাসে প্রাণী।
৪২
পুষ্পপুঞ্জ।
কখন সন্তোষময় ধর্মের পথেতে,
লয়ে যাও প্রাণীগণে কখন আবার।
ছার নীচ ভয়ানক পাপের সিন্ধুতে,
হতভাগ্য কোন জীবে নিমগন কর
পুত্রশােক দগ্ধপ্রাণ পেতে কাতরা,
অভাগিনী বিষাদিনী দুখিনী জননী,
দিবানিশি ঝরে যার নয়নের ধারা,
কি মন্ত্রে ভুলাও তার দুঃখ মায়াবিনি।
বিস্তর বৈভবশালী ধনাঢ্য মানব,
পুত্র পৌত্রগণে সুখে হইয়া বেষ্টিত,
ধনেশ্বর মত তার থাকিতে বিভব,
তুমি বিনা সেও সদা বিষাদিত চিত।
সন্তাপী জনের তুমি সন্তাপ হারিণী,
দুর্বল জনেরে তুমি দাও মহাবল।
ভীত জন মনে তুমি সাহস দায়িনী,
কে পারে বুঝিতে দেবি তােমার কৌশল ?
?
অপূৰ্ব্ব কৌশল তব জানে কোন জন?
ভােজবাজী মত দেখি তােমার ঘটনা।
বালিকার পুত্তলিকা খেলার মতন,
ক্রীড়ার লয়ে তুমি যত প্রাণীজনা ।
পুষ্পপুঞ্জ।
কি সময়ে, কোন বেশে কোন রূপ ধরি,
কি মন্ত্রে ভুলাও জীবে কোন জনে বল ?
বুঝিতে না পারি দেবি ছলনা তােমারি,
কেবা বল জানে দেবি তােমার কৌশল ?
মােহময়ী দেবী তুমি আশা নাম ধর,
ভুলাও জগত সুধু একটি বচনে।
কত রূপ মুর্তি ধরি জগতে বিহর,
তব দয়া বলে প্রাণী বাঁচে যে জীবনে।
কেন সে সময়ে মন কিভাবে বিভাের হয় ?
যখন উজলি ধরা বিতরি উজল কর,
পূরব গগনে হাসি উঠে দেব দিবাকর,
তরু লতা ফুল ফল
রবি করে ঝলমল
হেলেদুলে ভজে যেন সেই দয়া-পারাবার।
যতেক কুসুম রাশি বিকশিত হল হাসি,
ফুটিল নলিনী বালা আলাে করি সরােবর ;
ঝাঁকে ঝকে দলে দল করি অতি কোলাহল
বিভুগুণ গাহি সুধা ঢালিয়া অবনী পর,
ছাইয়া গগন পথ উড়ে যায় পাখী যত
উজল বিভায় নভ ছাইল জলদ-চয়,
কেন সে সময়ে মন কিভাবে বিভাের হয় ?
যখন দুপুর বেলা ভীষণ মুরতি ধরে,
গগনের মাঝ খানে বসি দেব দিবাকরে,
৪৪
পুষ্পপুঞ্জ।
অনলের সম খর
ভীম ভয়ানক কর,
বিতরেন ধরা পরে যেন অতি রােষভরে ;
অনিল নাহিক বয়
সকলি নীরব হয়,
ঘুমায় সকল জীব দুখ যত দূর করে,
বসিয়া তরুর শাখে একটি না পাখী ডাকে
ধরা যেন অচেতন দারুণ তপন করে,
যেদিকে ফিরাই অখি, অনলের সম দেখি,
নীরব নিঝুম সম ভীষণ ভাবময়,
কেন সে সময়ে মন কিভাবে বিপাের হয় ?
যখন অনন্ত নীল জলধি বারিরপরি,
ডুবু ডুবু দিবাকর লােহিতবরণ ধরি,
লােহিত বরণে ধরা
হেসে যেন হলকরা
হরিতে ভূষিত হয় যত তরু লতা গিরি ;
কেঁদে কেঁদে সরােজিনী লােহিত বরণ খানি
মৃদুল অনিল তারে দোলাইছে ধরি ধরি
ছাইয়া গগন-পথ
দলে দলে পাখী কত
উড়ে যায় মধুমাখা বিভুগুণ গান করি,
দেখি সেই মনােলােভা ধরণীর চারু শােভা
দেখি সেই মনােরম লতাপাতা ফুলময়,
কেন সে সময় মন কিভাবে বিভাের হয় ?
যবে সখি সুবিমল পূরব গগন মাঝে,
সুশােভিত গােলাকার সুচারু আসন সাজে,
৪৫
পুষ্পপুঞ্জ।
বিতরিয়া সুধারাশি সুবিমল চারু শশী,
হাসি হাসি মুখলয়ে কমনীয় ভাবে সাজে।
চারিদিকে তারাদল
করে তথা ঝলমল
সভাসদ ঘিরি যেন রহে মহা মহারাজে।
অমৃদু বায়ু বয়ে
বেলের সৌরভ লয়ে
মধুর সুবাস রাশি ছড়ায় জগত মাঝে ;
সরােবরে সরােজিনী বিকশিত মুখখানি
দেখিয়া মধুর ধরা মনােরম শােভাময়,
কেন সে সময় মন কিভাবে বিভাের হয় ?
যখন নিঝুম থির নীরব গভীরা রাতি
ঘুমায় ধরণী বালা কোমল ভাবেতে অতি
দুএকটি তরু লত। চুপে চুপে কয় কথা
হেলেদুলে চারু দেহ মৃদুল অনিলে মাতি।
সরােবরে সরােজিনী একদিকে বিষাদিনী
আর দিকে সুধাহাসি হাসে কুমুদিনী সতী;
শশীর কিরণে ধরা
রজতের হলকরা
হাসিছে প্রকৃতি সতী বদনে জ্যোছনা ভাতি;
বসিয়া পাদপােপরে
সুধা বিতরণ করে
পাপীয়া ছড়ায় গীত জগত অমৃতময়,
কেন সে সময় মন কিভাবে বিভাের হয় ?
যবে শশী ডুবু ডুবু বিষাদেতে বিষাদিত,
উষার মুকুট আলাে গগনেতে বিভাসিত,
৪৬ পুষ্পপুঞ্জ। হাসি হাসি উষাবতী সহাস বদনে সতী আসেন করিতে যবে জগতকে জাগরিত, অদূরে নলিনী দেখি মুদিলেন চারু আঁখি, দেখিয়া নলিনী বালা সুখে হল বিকশিত । বসি সহকার শাখে কোকিল মধুর ডাকে, জানাতে জগত লােকে তপন হলাে উদিত নিমগন একমনে বিভুপদ আরাধনে হইয়ে প্রকৃতি বালা সরল ভাবেতে রয়। কেন সে সময় মন কিভাবে বিভাের হয় ? যখন সাঁঝের বেলা নবীন নীরদ দল ঢেকে ফেলে একেবারে অপার গগনতল ; অগণিত ধারাকারে পড়ে হুহুরব করে; ঘােরর বায়ুসনে বারিধারা অবিরল। ভেদি ঘাের ঘনঘটা বিকাশি রূপের ছটা হাসে সতী সৌদামনী ধরাকরি ঝলমল। কে যেন অবনী গায়ে হরিবসন দিয়ে সাজায়েছে ধরাদেহ বুটি তাহে তরু দল, হরিত বসন মাঝে নীল বুটি যথা সাজে। বায়ুসনে বারিকণা ছুটে কিবা শােভাময়, কেন সে সময় মন বিভাবে বিভাের হয় ? কেন সে সময়ে আমি পড়িগে বিভাের মনে ? বাসনা হয় গাে মন মিশাই তাদের সনে। সাবের কিরণ জালে নিঝুম নিশার কালে মিশে যায় দেহমন চাদ রবি সমীরণে।
৪৭ পুষ্পপুঞ্জ। বেঁল চাপা সুসৌরভে পাপিয়া মধুর রবে জীবন তরল হয়ে মিশাক, সে গানে। নবীন নীরদ দলে নবীন মেঘের জলে দামিনীর সে উজল মধুর হাসির সনে, উষার সরল ভাবে কোকিলের সুধারবে হরিত বরণ মাখা লতা পাতা তরুগণে, চাদের উজল করে ভানুকর খরতরে মিশে যাক, এ হৃদয় সরল বিভাের মনে। জীবন তরল হােক সে শােভাতে মিশে থােক, জীবন মিশায়ে যাক, নিবিড় বিজন বনে। বিকচ নলিনী বালা রূপে যথা করে আলাে সেই চারু নিরমল অতি, সরসীর সে জীবনে সরােজিনী দেহ পরে এ দেহ বিরাজ করে একটি পাপড়ি হয়ে সুললিত সে নলিনে। তানয় কখনাে নয় কেন মন ভাের হয় কেন আমি বিমােহিত হই গাে তাদের সনে ? চাঁদ রবি পাপিয়ায় লতা পাতা ফুলচয় জ্যোছনা অনিল গায় সেই জগদীশ গানে, অই সব সময়েতে জগত জননী মাতে সেই দয়া পারাবার পরমেশ সে চরণে, তাই সে সময়ে সই হরষে বিভাের হই জগত আকাশে যেন দাঁড়াইয়া দয়াময়, তাই সে সময়ে মন কিভাবে বিভাের হয় ?
৪.
পুষ্পপুঞ্জ।
বাবুই বাসা।
ক্ষুদ্র পক্ষী মনােম অতি চারুতর,
বেঁধেছে কেমন নীড় পাদপ উপর ।
সুন্দর দ্বিতল সৌধ পারিপাট্য শােভা
নিম্নদিকে বাতায়ন মনােহর কিবা ।
নিম্নেতে সুন্দর কক্ষ দৃঢ় করা তৃণে
প্রশস্ত একটি দ্বার রয়েছে গােপনে।
সুড়ঙ্গ মতন সেই ঘরের গঠন,
যদি কভু বৃষ্টি ধারা হয় বরিষণ,
পারে যাইতে সেই নীড়ের মাঝার,
মানব রচিত গৃহ তার কাছে ছার।
সামান্য পদার্থ সুধু গঠিত সুন্দর
ক্ষুদ্র পক্ষী বটে কিন্তু দেখ বুদ্ধি তার।
কেমনে এমন করি করেছে নির্মাণ,
ভাবিলে হৃদয় হয় বিস্ময়ে অজ্ঞান।
সুধু দুট খড় কুট এই ছার দিয়ে,
কেমন সুন্দর দেখ রেখেছে করিয়ে।
এদের বুদ্ধির সঙ্গে করিলে তুলনা,
ছার জ্ঞান হয় শিল্পীদের বিবেচনা ।
কত যতনেতে সদা হয়ে একমন
শিক্ষা করে শিল্পবিদ্যা শিল্পকারগণ।
এরা অতি ক্ষুদ্র পাখী ক্ষুদ্র বুদ্ধিখানি,
কেমনে এমন করে কিছুই না জানি।
।
পুষ্পপুঞ্জ।
উপরে প্রসব গৃহ অতি নিরমল,
তৃণের গালিচা কত সুদৃশ্য কোমল
সাজায়ে রেখেছে তাহে সযতনে অতি,
প্রতি জীবদ প্রিয় সন্তান সন্ততি।
দ্বার বট নাই সেই প্রসব কক্ষেতে,
বহে কিন্তু মৃদু বায়ু মধু লহরীতে।
আছে তায় গুটি কত ছিদ্র চতুষ্কোণ
আনায় বেষ্টিত যেন চারু বাতায়ন।
অই দেখ বহিতেছে মৃদু সমীরণ,
দোলাইছে নীড় খানি করিয়ে যতন !
বুঝেছি বুঝেছি এই দোলন কারণ
কাঁদিতেছে অই ক্ষুদ্র পক্ষী ছানাগণ।
জননী স্নেহের খনি আহার কারণে,
গিয়াছে খুজিতে দূর বিজন কাননে।
হেরে নয়নে সেই ভালবাসা খনি
স্নেহময়ী প্রেমময়ী মধুর জননী,
কঁদে ভারা দুঃখী হয়ে ব্যাকুলিত মনে,
ঈশ্বর সহায় শুধু বিষাদে দুর্দিনে।
বায়ু ভরে ধীরে ধীরে দোলান দোলনা
তাঁহার দয়ার কভু নাহি যে তুলনা।
ধন্য ধন্য জগন্নাথ মহিমা তােমার
বলিতে তােমার কীর্তি সাধ্য আছে কার ?
অদৃশ্য কীটাণু মনে কত বিবেচনা,
দিয়াছ হে কৃপানিধি কে করে বর্ণনা।
এই যে গগন পক্ষী অতি উচ্চতম
তালবৃক্ষে ক্ষুদ্র নীড় কিবা মনােম।
ক্ষুদ্র তৃণ কুটাময় এই পক্ষী নীড়
তােমারি মহিমা গায় অনন্ত নিবিড়।
ক্ষুদ্র আমি অতি ক্ষুদ্র তুচ্ছ, তুচ্ছ হতে
কত না করুণা তবু কর এদেহেতে।
প্রতিপদ চালনেতে আমার জীবনে
করিতেছ অনুগ্ৰহ মেহ-পূর্ণ মনে।
তবু কেন দয়াময় ভুলি গাে তােমায়,
তবু কেন তব পদে মন নাহি যায় ?
দেও পিতা কৃতজ্ঞতা অন্তরে আমার,
পদতলে এই ভিক্ষা চাহি অনিবার।
•00-
সাধের বাসনা।
বড় সাধ যায় মনে আসে সে সুখের কাল,
কাটাই এ বিষাদিত নিদারুণ দুখজাল।
আর রে বালিকাকাল হাসি ভরা মধু মুখে,
তাের স্নিগ্ধ কোলে শুয়ে ভুলে যাই জ্বালা দুখে ।
এই কুৎসা রাশি স্বার্থ আত্মশ্লাঘা দূর করে,
সরল অন্তরে হাসি একবার প্রাণ ভরে।
আত্ম পর ক্রোধ হিংসা দ্বেষ তেজ বিসর্জিয়ে,
তেমনি সুখেতে থাকি আমাদে বিভাের হয়ে।
ছুটিয়া ছুটিয়া সদা জমিব সানন্দ মনে,
মিশাইৰ মন প্রাণ প্রকৃতির শােভা সনে।
পুষ্পপুঞ্জ।
একটুকু মেঘ যবে ছাইবে গগন পরে,
বরষিবে বৃষ্টি ধারা অবনি প্লাবিত করে।
বায়ু সনে বারিকণা কেমন ছুটিয়া চলে,
দেখিব সে শােভা রাশি সানন্দে হৃদয় খুলে।
কেমনে প্রকৃতি বালা মেহে প্রতির মত,
আনে তার পুত্র কন্যা তরু লতা দিবে যত।
আবার তরুণ সেই অরুণ কিরণ দিয়ে,
অঙ্গ মার্জনীর সম দেয় বারি মুছাইয়ে।
যখন সে বারি ধারা পড়ে তরু লতা শিনে,
বায়ু আসে ধীরে ধীরে দুলায় উচ্ছাস ভরে।
বায়ু পেয়ে বারিকণা দোলে কিবা ঝলমল,
ললিত বালার নাকে দুলে যেন মুক্তাফল।
দেখি বসে শােভা রাশি আমােদে হৃদয় খুলে,
বায়ুর লহরী সনে নাচিব রে কুতুহলে।
তরুণ অরুণ আলাে করিব হরষে পান,
চাদের চাদিমা সনে গাহিব মহিমা গান।
তারা মালা গলে পরে কেমন রজনী সতী,
দেখিব সে শােভা রাশি হইয়া বিভাের মতি।
নবীন নধর সেই সুচারু পল্লব রাশি,
কেমনে জ্যোছনা সনে খেলা করে হাসি হাসি।
সুশ্যামল তৃণ দল পৰিত্ৰতা-ভাবময়,
পড়িয়া তাহাতে কিবা উজল খদ্যোত চয়।
ঝকমক করে তারা যেমন সে নীলনীরে,
ঢেউ গুলিখেলা করি তরুণ অরুণ করে।
পুষ্পপু।
সেই সব শােতা সনে মিশাবাে জীবন মম,
দেখিব প্রকৃতি শােভা কি মধুর মনােম।
আয় রে বালিকা-কাল তেমনি হরষ লয়ে,
মাতিরে তেমনি সুখে আমােদে বিভাের ইয়ে।
তাের সরলতা মাখা পবিত্র হৃদয়ে শুয়ে,
ভুলিয়া সংসার জ্বালা দেখি সেই দয়াময়ে।
লতার পাতার সেই হরিত বরণ পরে,
জগত জীবনে দেখি অতুল আনন্দ ভরে !
শুধু মন ভাের হয় যে পিতৃ মহিমা গীতে,
শুদ্ধ প্রীতি হর্ষ রাশি পূর্ণ হক এ মনেতে।
কামিনী কুসুম।
কুসুম কানন মাঝে কামিনীর ফুল,
ফুটিয়া চৌদিক গন্ধে করেছে আকুল।
তাহাতে বহিয়া মৃদু মৃদু সমীরণ,
করিছে চৌদিকে আরাে সৌরভ বহন।
থরে থরে শাখা গুলি শােভিছে সুন্দর,
কে যেন বেঁধেছে তােড়া করে মনােহর।
তার পরে শুভ্রবর্ণ কুসুমের থর,
পাঁচটি পাপড়ি গাথা কিবা মনােহর।
সবুজ পাতার মাঝে শ্বেতবর্ণ ফুল,
নীলনভাে মাঝে যেন নক্ষত্রের কুল।
নীল দুর্বাদল-ক্ষেত্রে মধুর যেমন
খদ্যোঢ়ের মেলা চারু নমুনরঞ্জন।
পুপ।
অথবা যেমন নীল জলপূর্ণ সরে,
কুমুদ কহলার শেতপদ্ম শােভা করে।
ফুলের সদৃশ ঘােট ঘােট শাখাগুলি,
থরে থরে গখা যেন চম্পকের কলি।
সংসার-কানন-মাঝে গৃহপাদ পেতে,
আদর্শ কামিনী ফুল ফুটিলে তাহাতে,
কেমন সুন্দর শােভা কিবা চারুতর,
অন্তরে বাহিরে তার শােভা মনােহর।
সে কামিনী কুসুমের প্রশংসা বাতাসে,
যশের সৌরভ লয়ে চারিদিকে ঘােষে।
দয়ালব্ধ ধৰ্ম্মনীতি সরলতা বলে,
পাঁচটি পাপড়ি তার শােভে দেহ ফুলে
জীবনান্তে নাহি হয় প্রশংসা বিলয়
যশের সৌরভ নাহি কভু লুপ্ত হয়।
যশের সৌরভে যার পূরিত ভুবন,
অসার সংসারে তার সার্থক জীবন।
ধন্য পিতামাতা সেই উদ্যানাধিকারী,
কামিনী কুসুমরূপ তনয়া যাহারি।
পরমেশ কাছে করি এই নিবেদন,
প্রত্যেক সংসারে হক, কামিনী এমন।
} গুপপুঞ্জ।
সােহাগ।
নাচরে আমার জীবনুজীবন,
প্রাণের নলিনী ধন।
নাচরে আমার তনয়া-বতন
জুড়ায়ে তাপিত মন।
সুধামাখা স্বরে সুধা বরষিয়ে,
আধ বােল সুধারাশি ।
মধুর অধরে সুধা প্রকাশিয়ে,
হাসরে মধুর হাসি।
এমন অমূল্য জীবন জুড়ান,
এমন পৃথিবী মাঝে,
বিষাদ যাতনা সন্তাপ ভুলান
রতন আর কি আছে ?
সরলতা মাখা সুন্দর মুখানি,
ভুলান যাতনা জ্বালা।
ও চারু বদনে হাসরে বাছনি,
প্রাণের নলিনী বালা ।
সংসারের দুখ কিছুই জাননা,
জাননা বিশাদ-রাশি।
সরল ওচিত্র মুখে অতুলনা
শুধু জান মধুহাসি।
পুষ্পপুঞ্জ।
নাচরে আমার ননীর পুতুল,
মেহের নলিনীধন।
নাচরে আমার চিত্তবিনােদিনি
জুড়ায়ে পিত মন।
অভিন্নহৃদয়া মেহের ভগিনি
শৈশবের সহচরী ।
হেন স্নেহময়ী যে হৃদিতােষিণী
প্রাণাধিকা তুই তারি।
আমার জীবন জীবন জীবন
তাই এত ভাল বাসি ।
তাই ভালবাসি তােরে প্রাণধন,
চারুমুখে সুধা হাসি।
তাই ভাল বাসি নিন্দিত নলিনি
ললিত সুধমাময়,
নিরখিতে তাের ওবদন খানি
আঁখি লালায়িত হয়।
পীষুষ হাসিনি পীষুষ ভাষিণি
করি পিয়ুষ আলাপ,
পীযূষ হাসিয়ে পিক নিনাদিনি
ভুড়াও মনের তাপ।
কোমল অঙ্গুলী ধীরে ধীরে তুলি
সুধা করি বিতরণ,
মানব অজ্ঞাত সুধা স্বরবলি,
নাচরে জীবন ধন।
মধুর মধুর মধুর হাসিয়ে
অস্ফুট বচনে মাতঃ,
ভুলাইয়ে দেও আমার হৃদয়ে
আছে শােক তাপ যত।
এস আদরিনি অমিয়-আননি
হৃদয় তােষিণি বালা,
হৃদয়ে আসিয়ে হৃদয় মােহিনি
জুড়য়ে হৃদয় জ্বালা ।
এস প্রেমময়ি মেহের জননি
অমৃত মাখান বােল,
বলিয়া বদনে ইন্দু নিভাননি,
মিটাও মনের গােল।
নাচরে আমার প্রাণের নলিনি
মেহের নলিনী ধন,
নাচরে আমার সন্তাপহারিনি
জুড়িয়ে তাপিত মন।
পুষ্পপুঞ্জ।
৫৭
মনের প্রতি।
ওরেরে অবােধ মন এখন কি তাের,
ভাঙ্গিল না ঘুচিল না সুখনিদ্রা যাের ?
সুখ সুখ করি তুই উন্মত্তের সম,
কাটালি এমন উচ্চ মানব জনম।
অনিত্য সুখের শুধু করি অন্বেষণ,
নিত্য সুখ ধৰ্ম্মরত্নে দিলি বিসর্জন।
ভেবে তুই দেখ দেখি ছার সুখ তরে,
কি পাপ না করেছিলি সংসার ভিতরে।
অনিত্য সুখের তরে হয়ে ব্যর্থমন,
নিত্য সুখ ধৰ্ম্মরত্নে দিলি বিসর্জন।
ধিকরে জীবন ততরে ধিক শতবার,
সুধা ভ্রমে করিলিরে গরল আহার।
এখন পাপেতে মজি হলি অচেতন।
এখনও করিলি না চক্ষু উন্মীলন।
অজ্ঞান এখনাে দেখ জ্ঞান চক্ষুমেলে,
কি সুখে আছিস তুই নিত্য সুখভুলে।
হায় হতভাগ্য ক্ষুদ্র ছার মুমতি,
কি করিলি বল দেখি সেদিনের গতি।
যেদিন ভীষণ দিন ত্যজি দেহাগার,
পলাইবে প্রাণপক্ষী ত্যজিয়ে সংসার।
এসব সম্পদ সুখ রহিবে কোথায়,
দিবানিশি যার জন্যে ব্যস্ত মন হায়ু।
৫৮
পুষ্পপুঞ্জ।
শুভদিন সেইদিন সাধুর জীবনে,
অনন্ত সুখেতে সাধু রহিবে সেখানে।
যে ধর্মের তরে সাধু সদা ব্যামন,
দিবানিশি রবে সেই ধৰ্ম্মেতে মগন।
কিন্তু রে পাপীর শান্তি নাহিক কোথায়,
সকল স্থানেতে পাপী প্রায়শ্চিত্ত পায়।
এবে যেন মিথ্যা কথা প্রবঞ্চনা করে,
পূণ্যবান বলে খ্যাত আছিস সংসারে।
এ স্থানের বিচারক না পেলে প্রমাণ,
করিতে পারে না দৃণ্ড দোষীকে প্রদান।
তথায় বিচার কর্তা অতি ন্যায়বানু,
দোষীর দোষের তিনি নাচান প্রমাণ।
রাজার উপর রাজা রাজ রাজেশ্বর,
পৃথিবীর বিচারক জগত ঈশ্বর।
অন্তর্যামী দণ্ড কর্তা অতি ন্যায়বান্,
পাপী সমুচিত শাস্তি করেন প্রদান।
তার কাছে গিয়া তুই কি করিবি বল,
কেমনে ভুলাবি বলি বচন কৌশল।
তাই বলি ওরে মূঢ় কি করিলি বল,
এ নহে সুখের স্থান পরীক্ষার স্থল।
সংসার মরুতে সুখ বারি অন্বেষিয়া,
পাপ মরীচিকাতে যে পড়িলি আসিয়া।
এখন করিবি বল কিসের উপায়,
বিনা ধৰ্ম পথ প্রাণ যায় বুঝি হায়।
৫৯
পুষ্পপুঞ্জ।
ধৰ্ম রূপ হ্রদে শান্তি পূর্ণ পূত পয়,
এ আশা পিপাসা ওরে মিটিবে সেথায়।
এতদিনে যে পাপেতে থাকিয়ে মগন,
দিবস রজনী কাল করেছ যাপন।
সে সময় যদি তুই পতিত পাবনে,
আরাধনা করিতিস, একান্ত জীবনে।
তাহলে অজ্ঞান তাের অসার জীবন,
পবিত্র অনন্ত সুখে হইত মগন ।
এখন এখন তােরে বলি শতবার,
সুধা ভ্রমে বিষ পান করােনা আর।
এখনাে ত্যােগি ছার সুখের বাসনা,
নিত্য সুখ তরে সদা কররে কামনা।
এক মনে ভাব সেই নিত্য নিরঞ্জন,
পতিত পাবন যিনি জগত জীবন।
দয়ার আধার পিভা জগত শাসক,
জগতের নাথ যিনি পৃথিবী পালক।
যাহার নিয়মে হয় সকলি সাধন,
যাহার আজ্ঞায় বদ্ধ এই ত্রিভুবন।
এমন অবাধ্য দেব ঈশ্বর যেজন,
এক মনে তাঁর পদে লওরে স্মরণ।
হে পিতঃ করুণা সিন্ধু জগতের নাথ,
করুণা অপাঙ্গনেত্রে কর দৃষ্টিপাত।
হে দেব জগত নাথ অনাথ শরণ,
কৃপায় পাপীর কর পাপ বিমােচন।
পুষ্পপুঞ্জ।
ক্ষমা কর নাথ এই মিনতি চরণে,
পাপী বলে ঠেলনাক শ্রীপদ নলিনে।
আমি পাপী বড় নাথ মনে ভয় তাই,
লতে ও পবিত্র নাম মনে ভয় পাই।
তােমার পবিত্র নাম জীবন মােহন,
কেমনে এ পাপ মুখে করি উচ্চারণ।
কিন্তু পিতা হয় যদি তনয়া অধমা,
তবু তার পরে স্নেহ থাকে পূৰ্ব সমা।
সে আশায় লইয়াছি শরণ চরণে,
পাপিনী সুতারে পদে রাখ কৃপা মনে।
00
কুলীন বালা।
ব্ৰহ্মাণ্ড সুসুপ্ত ঘাের হয়ছে রজনী,
এমন সময় কাঁদে কে অই কামিনী।
পূর্ণিমা রজনী পূর্ণচন্দ্র দীপ্ত করে,
হাসিছে প্রকৃতি বালা চারু শােভা ধরে।
রজত মণ্ডিত যেন ধরা মনে হয়,
নিশব্দ নীরব নিশি জগত ঘুমায়।
এ হেন মধুর কালে বামা কণ্ঠ স্বরে,
বিলাপ ক্রন্দনে ধরা হৃদয় বিদরে।
শুনিয়া সে চারু স্বর সবারি জীবন,
হতাশ হইয়া যায় শশান মতন।
শ্রোতস্বতী সােপানেতে একাকী বসিয়ে,
অতুলনা পা দুখানি দিয়াছে মিলায়ে ।
৬১
আলু থালু কেশ রাশি চুম্বিছে ভুতল,
নয়নের জলে সিক্ত বদন কমল।
ছিন্ন ভিন্ন বেশ ভুষা উন্মাদিনী পারা,
আকাশের প্রান্তে যেন শােভে শুক তারা।
দেখিলে মানবী বলি মনে নাহি লয়,
কান্তি যেন দীপ্ত এক অপূৰ্ব আভায় !
অনুপম রূপ রাশি তটিনী-তীরেতে,
কমল শােভিছে যেন সরােজ পরেতে।
বিন্দু বিন্দু অশ্রুবারি শােভিছে কপােল,
নীহারের বিন্দু যেন ঝরিছে কমলে।
জগত ঘুমায় যেন নীরব সময়ে,
কে বালা কাঁদিছে আহা ব্যাকুল হৃদয়ে।
ত্যজিয়ে লােকের বাস তরঙ্গিণী তীরে,
কে তুনি ললনে ভাস নয়নের নীরে।
এসময় নিদ্রাগত ধরণীর জন,
নর পশু কীট পক্ষী সবে অচেতন।
নিস্তব্ধ হয়েছে ধরা কে তুমি রমণী,
এসময় তটিনীর তটে একাকিনী।
যক্ষ রক্ষ বালা কিম্বা অপ্সরা কিন্নরী,
সুরবালা কিম্বা কোন নাগের কুমারী।
অভিশাপে পড়ি কিম্বা মনের দুখেতে,
স্বৰ্গ কি পাতাল ত্যজি এসেছ ধরাতে।
এহেন নীরবকাল ধরণী ঘুমায়,
কে তুমি কাহার বালা দেহ পরিচয়।
৬২
পুষ্পপুঞ্জ।
নেত্ৰজল সম্বরিয়া দুখিনী রমণী,
বলিল মধুর স্বরে ভাষা বিমােহিনী ।
নহি যক্ষ রক্ষ বালা অগ্ধরা কিন্নরী,
দেববালা কিম্বা কোন নাগের কুমারী।
বঙ্গদেশে হইয়াছে জনম আমার,
কুলীন কুমারী আমি দুঃখের আধার।
আমার জীবন শুধু বিষাদ আলয়,
পরিচয় দিতে ফাটে পাষাণ হৃদয় ।
অতি অভাগিনী আমি কুলীন নন্দিনী,
তাই কঁদি এসময় হেথা একাকিনী।
কি শুনিবে পরিচয় অভাগী বালার,
বলিলে কমিবে কিছু হৃদয়ের ভার।
কুলীন মহিলা আমি কুলীন উত্তম,
খ্যাতশ্রেষ্ঠ বংশােদ্ভব হন পিতা মম।
দুষ্ট দেশাচার দোষে জনক আমার,
ভাসালেন দুঃখিনী এ তনয়া তাহার।
নির্দয় নির্মম হৃদি জিনিয়ে পাষাণ,
বিবাহ উপজীবিকা কুলীন প্রধান।
বিবাহ করেছে সংখ্যাতীত নারীগণ,
হেন জনে করিলেন মােরে সমর্পণ।
জনক সােদর পতি সবে বিদ্যমান,
কেহ নাহি দেয় কিন্তু থাকিবার স্থান।
বৈভব থাকিতে তবু জননী আমার,
কাটান জীবন সহি যাতনা অপার।
পুষ্পপুঞ্জ।
দয়াবতী দেহস্থান তুমি দয়া করে,
অভাগিনী অনাথা এ কুলীন বালারে।
মম এ বিলাপ ধ্বনি ওহে সমীরণ,
ভারতে সর্বত্র স্থানে করিও বহন।
দেখিলে স্বদেশহিত রত জনগণে,
লহরীর ছলে কাদি বল সে চরণে।
কুলীন বালার দুঃখ করগাে মােচন,
অন্তিমে অনন্তসুখ পাবে সর্বজন।
কি বলিছ কুলু কুলু রবে স্রোতস্বতী,
তব পদে জননী গাে করি এমিনতি।
আরােহী তােমার বক্ষে সদা যায় আসে,
সবাকার কাছে মাগো কাঁদিয়া হতাশে।
মম এবিলাপ ধ্বনি বলগাে জননি,
লহরীরা যেন তাহে দেয় প্রতিনি।
বলােমা কাতর স্বরে একটি বচন,
কুলীন বালার দুঃখ করগাে মােচন।
কেহ যদি নাহি শুনে ভারত মাঝারে,
এদুঃখ বলিও মাতা যাইয়া সাগরে।
তিনি যেন উথলিয়া প্রশস্ত উদরে,
ভারত করেন গ্রাস অনুগ্রহ করে।
হে অনাদি অন্তহীন নভাে মহাশয়,
অনন্ত অমনি দুঃখী আমার হৃদয়।
তারাদল বুকে তুমি শােভিছ যেমন,
দুঃখরূপ তারা মম পূরিত জীবন।
৬৪
পুষ্পপুঞ্জ।
সুচারু চিত্রিত ওহে নীরদের দল,
ঈশ গুণ ব্যক্তকারী জলদ সকল।
ভীষণ গর্জনে তুমি ভারতবাসীরে,
কুলীন বালার দুঃখ বল দয়া করে।
শত শত এইরূপে কত অভাগিনী,
আ ত্মঘাতে প্রাণত্যজে কুলীন নন্দিনী।
হে ঈশ্বর দয়াময় করুণা নিধান,
করুণা কটাক্ষপাতে কর পরিত্রাণ।
ও তব পদে এই ভিক্ষা চাহিছে পাপিনী,
সৃজনা ভারতে আর কুলীন কামিনী।
লও তবে শান্তি নীরে অই তরঙ্গিণী,
অন্তিমকালেতে তুমি সবার জননী।
বলিতে বলিতে বালা কাতর হৃদয়ে,
তটিনীর স্বচ্ছনীরে পড়িল ঝপায়ে ।
সরিৎ সলিলে পড়ি হিল্লোলে ভাসিয়ে,
পড়িল কুলীন বালা অদৃশ্য হইয়ে ।
হায়রে নাহতে কাল বিজয়ার দিনে,
সুবৰ্ণ প্রতিমা গেল অতল জীবনে।
উদিতে কাল রবি অদৃষ্ট গগনে,
নলিনী শুকাল মরি নবীন জীবনে।
হায় এই মত কত কুলীনের বালা,
আত্মঘাতী হইতেছে জুড়াইতে জ্বালা।
কুসুমেতে কীট যথা কণ্টক মৃণালে,
সুবৰ্ণ প্রতিমা হয়ে পড়িল সর্সিলে।
পুষ্পপূঞ্জ।
কত শত গুণবতী রমণী রতন,
কুলীন কামিনী হয়ে অসহ্য বেদন।
সহিতে না পারি হায় বিষাদে স্ববলে,
পড়িতেছে ইচ্ছা করে কালের কবলে।
বিনা দোষে কতবালা ত্যজিছে জীবন,
দেখগগ ভারতবাসী মেলিয়া নয়ন।
বাসন্তী পঞ্চমী উৎসব।
এস প্রিয় ভগ্নিগণ আনন্দে সবাই মিলে,
বাসন্তী পঞ্চমী শুভৎসব কর কুতূহলে।
দেখ বােন আজি যেন সকলি আনন্দময়,
আজিকার সমীরণ যেনগাে আনন্দে বয়।
আজিকার নবােদিত তরুণ অরুণ যেন,
আনন্দ পূরিত কর করিতেছে বিতরণ।
সে আনন্দ কর পড়ি তরু লতা শিরােপরে,
মধুর উজলি তারা আনন্দ বিকাশ করে।
প্রস্ফুটিত কুসুমের সৌরভ আনন্দময়,
সে সৌরভে মত্ত হয়ে অনিল আনন্দে বয়।
তরু লতাগণ সেই আনন্দ অনিল ভরে,
হেলে দুলে দেখ তারা আনন্দ বিস্তার ।
হাসিতেছে নিরমল সরসী সরিৎ জল,
আনন্দ অনিলে বহে আনন্দ তরঙ্গদল।
আনন্দ হিল্লোলে দেখ সরােজিনী নৃত্য করে,
হেসে হেসে হেলে দুলে আনন্দ প্রকাশ করে।
পুষ্পপুঞ্জ।
আনন্দে বিহঙ্গ দল করিছে আনন্দ গান,
আনন্দে গাহিছে তারা সুখে খুলি মন প্রাণ।
সকলি আনন্দময় বীণাপাণী আগমনে,
আমরা বা কেন রব নিস্তব্ধ নীরব মনে।
কবি মাতা বীণাপাণী ভবে এসেছেন আজ,
তাই এ আনন্দময় হয়েছে অবনী মাঝ।
সম্ভাষিতে সরস্বতী দেখলাে বসন্ত রাজ,
সাজাইছে ধরা দেহ নানাবিধ করি সাজ।
নবীন নধর দেশ ললিত পল্লব দিয়ে,
সাজায়েছে তরুলতা ফুল সাজে সুশােভিয়ে।
গন্ধরাজ গন্ধরাজ মাধবী কুসুম রাণী,
লাজময়ী সুৰ্য্যমুখী শেফালিকা সরােজিনী।
নানাবিধ ফুল সাজ পরিয়ে প্রকৃতি বালা,
পূজে মাকে শােভা দেখে জুড়াও তাপীর জ্বালা।
শ্বেতাম্বর পরিধানা বীণা ধরি দুই করে,
দেখ বােন পদ্মপরে জননী বিরাজ করে।
উজ্জ্বল মুরতি খানি স্বর্গীয় প্রভায় ভরা,
জননীর আগমনে স্বর্গোপমা আজি ধরা।
সহাস্য প্রশান্তমুখে বসিয়া প্রসন্ন ভাবে,
স্নেহের দৃষ্টিতে যেন নিরখেন কন্যা সবে।
মা যেন মৃদুলভাবে মধুর হাসিনী হয়ে,
বিদ্যা দিতেছেন সবে গম্ভীর ভাবেতে রয়ে।
এস এস ভগিনির এক প্রাণে সবে মিলে।
সরােজিনী বিনিন্দিত বীণাপাণী পদতলে,
পপুঞ্জ।
ভক্তি চন্দনেতে মাখি আমাদের মনফুল,
আনন্দে অঞ্জলি দিব এস বঙ্গ বামাকুল।
আয় বােন সবে মিলে গাহি এউৎসব গান,
সমীরণ বিহগেরা সকলে ধরগাে তান।
গাওরে বিহঙ্গদল বাসন্তী পঞ্চমী গীত,
লহরীর ছলে বায়ু গাওরে হরষ চিত।
জীবের জীবন দেয় যেন তরু লতাগণে,
দোলাইয়ে ফুল ফল গাহে সুখে তব সনে।
ওহে স্বচ্ছ সরসীর মৃদুল হিল্লোলগণ,
পরস্পরে হেলে দুলে গাও হয়ে সুখীমন।
হাস হাস বিকশিত প্রফুল্ল কুসুম রাশ,
বিণাপাণী আগমনে পূরাও মনের আশ ।
বাজরে হৃদয় বীণা আজি এই শুভক্ষণে,
বাসন্তী পঞ্চমী গীত গাওরে হরষ মনে।
এস প্রিয় ভগিনিরা শৈশব কালের মত,
ভুলিয়া বিবাদ হিংসা দ্বেষ কুৎসা রাশি যত।
মিশাইয়ে মনে মনে একপ্রাণে সৰ্বজনে,
উৎসব করিলাে এস বাসন্তী পঞ্চমী দিনে।
হৃদয় বাঁশরী তান মিলাইয়ে একসনে,
পূজিব জননী পদে আনন্দ বিভাের মনে।
কবীশ্বরি বীণাপাণি বিদ্যাধাত্রি সরস্বতি,
বাগবাদিনি বােধদাত্রি ক্ষীরােদবাসিনি সতি।
ওমা শ্বেতশতদল নিবাসিনি শ্বেতাঙ্গিনি,
বাগদেবি বিষ্ণু বামা মনােমা বিদ্যারণি ।
পুপপুঞ্জ।
দেখ মা করুণাময়ি সুতাদের পানে চেয়ে,
আমরা অজ্ঞান অতি বুদ্ধিশূন্যা মূর্ধ মেয়ে।
দয়াময়ি দয়া করি ভারত তনুয়াগণে,
স্নেহময়ি বিদ্যাদাও করুণাভিষিক্ত মনে।
বৎসরেক আশা করি আছি মা আমরা সবে,
সে আশা জননি আজি পুরাইলে আসি ভবে।
দেখ মা অবনি আজি তব শুভ আগমনে,
আনন্দ সাগরে ভাসে আনন্দ প্লাবিত মনে।
তােমার চরণ হেরি হের গাে মা সুনয়নে,
রহিয়াছে বঙ্গ বালা আনন্দ বিভাের মনে।
বঙ্গের কামিনী ত হয় অতি নীচমতি,
অতি অজ্ঞ জ্ঞানহীনা বিদ্যাহিনা এ ভারতী।
রহিয়াছে খ্যাত যাহা বঙ্গবাসী ঘরে ঘরে,
মুছ গাে মা এ কলঙ্ক তােমার স্নেহের নিরে।
সকল ভারত বালা হয় যেন বুদ্ধিমতী,
আবার তেমনি হােক সীতাখনা লীলাবতী।
তেমনি রমণী রত্ন যেন প্রতি ঘরে ঘরে,
বুদ্ধিমতী বিদ্যাবতী হইয়া বিরাজ করে।
আশীর্বাদ কর মা গাে যেন পুন এই বঙ্গে,
মিলে সব বঙ্গ বালা পুজে গো তােমায় রঙ্গে।
-৩০
পুষ্পপুঞ্জ ঝিঝিপােকা। প্রখর মধ্যাহ্ কালে তপনের তীক্ষ্ণ জালে সন্তাপিত ধরণী যখন, সকলি নিশব্দ হয় সমীরণ নাহি বয় তৃণটির নহে সঞ্চালন। সরসী সরিৎ জলে হিল্লোল নাহিক খেলে তরঙ্গের যেন বহুক্ষণ, দুলে দুলে খেলাইয়ে অতিশয় শ্রান্ত হয়ে গাঢ় ঘুমে হয়েছে মগন। কোলাহল পূর্ণ ধরা বিজন অরণ্য পারা নীরব গম্ভীর হইয়াছে, মানবের গােল স্থির পাখীর কুজন ধীর পৃথী যেন ঘুমায়ে পড়েছে। কে তােমরা সে সময়ে শ্রান্তি দূর না করিয়ে আনন্দেতে পাদপের পরে, প্রফুল্ল অন্তর হয়ে আত্ম পরিজন লয়ে গান গাও সুমধুর স্বরে ?. তপনের তীক্ষ্ণ কর পরশেনা হয়ে খর তােমাদের পবিত্র জীবনে, এক প্রাণে এক তনে ঈশ্বরের গুণ গানে মুগ্ধ হয়ে থাক সুখী মনে। অথবা সায় হলে দিবাকর অন্ত গেলে মৃদু বায়ু বহে যে সময়, ৭ পুষ্পপুঞ্জ। অতি ক্ষুদ্র কীট হয়ে সন্ধার গগন মাঝে একে একে তারা সাজে পৃথিবী শীতল যবে হয় । সে কালেতে সুধা স্বরে ঝিঝি সব রব করে কেহ গান গাহ অনিবার, অনুভব করি মনে ছিছি দেও নরগনে নিরখিয়া পাপ কু-আচার । সদা সানন্দ হৃদয়ে কাটাতেছ সুখেতে জীবন, পাপ পথ পরিহরি ধৰ্ম্ম আচরণ করি করিতেছে সংসার পালন। যে টুকু সময় পাও বৃথা কাজে নাহি দাও অলসতা বিসর্জন করে, শ্রান্তি নাহি দূর করে শিক্ষা দাও মানবেরে হৃদি খুলে ঝিঝি ঝিবি স্বরে। তােমরাই ধন্য অতি তােমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি ক্ষুদ্র কীট বলে লােকে কেন ? ক্ষুদ্র কীট নহ তুচ্ছ তােমারাই অতি উচ্চ তােমাদেরি উন্নত জীবন। কিবে সুধা পূতধাম বিভুর মধুর নাম তােমরা কি জান তাহা বল ? তাহলে আনন্দ ভরে সেই নাম জপ করে মুছি এই পাপ অশ্রুজল। শিখাইব কি নরেরে জানি নর পাপ করে মন নহে মত্ত যে পুণ্যেতে,
পুষ্পপুঞ্জ।
জানিয়া শুনিয়া হেন
চরণ চলেনা যেন
সৎকার্যে পূণ্যের পথেতে।
প্রার্থী এবে বিভু কাছে তােমাদের মনে আছে।
যাহা ধৰ্ম ভাব সরলতা,
ভারি কণা পরিমাণ
করুন আমারে দান
শান্তি সুখ ধৰ্ম পবিত্রতা।
গােলাপ।
হরিত পাতার কোলে গােলাপ কুসুম দোলে
দেখায় কুসুম রাণী নিজ রূপ মাধুরী,
কেমন বরণ ওর
দেখিলে আমােদ ভাের
হয়ে যায় এ জীবন কিবা শােভা আমরি ।
একটু জীবন লয়ে
হরষে বিভাের হয়ে
কি শিখায় মানবেরে বল দেখি ভগিনি ?
ও সরল রূপ রাশি
হেলে দুলে হাসি হাসি
বলে মম মত হও ভারতের কামিনি।
একটি দিবস ভাের থাকিবে জীবন মাের
এতেই সৌরভ মম লয়ে বায়ু ছুটিবে,
দেশে দেশে এ সুবাস
করিবেক পরকাশ
এ মধুর পরিমাণে জগতকে মাতাবে।
গুণের সৌরভ রাশি বামা হৃদে পরকাশি
সুশ বায়ুতে লয়ে জগতেতে ছড়াবে।
হের বালা আঁখি মেলে থরে থরে দলে দলে
কি মধুর মনােরম মম দেহ সুষমা।
৭২
পুষ্পপুঞ্জ।
এক মনে হৃদি খুলে ডাক জগদীশ বলে
যে দিয়েছে এই রূপ গাও তাঁর মহিমা।
প্রভাতকালে সন্তাপীর সন্তাপ।
উদিল তপন গগন মারে
কিরণে উজল করিয়া ধরা
প্রকৃতির কায় তপনের করে
হইল আনন্দে উজ্জ্বল করা।
প্রাত সমীরণ বহি ধীরে ধীরে
কাঁপয়ে সরসী সরিৎ জল,
খেলিল কল্লোল ঢলাঢলি করে
দুলিল ললাহিত সােজ দল।
হাসিছে পৃথিবী তপনের করে
হাসিছে অনিল সরসী জল,
হাসিতেছে অই নিরমল নীরে
বিকচ লােহিত কমল দল।
সবে হাসে আর আমি অভাগিনী
ফেলিতেছি শুধু নয়ন জল,
মম আঁখি জল দিবস রজনী,
ভিজায় কেবল ধরণী তল।
গিয়াছি ভুলিয়া হাসি যে কেমন
ভুলেছি কেমনে হাসিতে হয়,
কিরূপেতে হাসি শােভয় বদনে
ভুলেছি কাহাকে হসিত কয়।
পুষ্পপূঞ্জ।
আনন্দ প্রফুল্ল প্রীতি যে কেমন
ভুলেছি কাহাকে আমােদ বলে,
শুধু মনে জাগে বিষাদ নােদন
সিতেছে সদা নয়ন জলে,
এই যে তপন নয়নে আমার
উদিল গগনে প্রভাতকালে।
যুগ যুগান্তর যেন হয় মনে
এই ভানু রবে গগন ভালে।
কেন এত দীর্ঘ সুখের দিবস
তাবিয়া হতেছে হৃদয়ক্ষীণ,
প্রত্যেক মুহূর্ত দিবস সদৃশ
মাসের মতন প্রত্যেক দিন।
প্রতি পলে পলে গণিতেছি দিন
দুঃখের দিবস যায় না আর,
কতদিন আর এই বলহীন
বহিব নিস্তেজ জীবন ভার ।
বিয়া ভাবিয়া হৃদয় আমার
মনের অনলে হয়েছে ছাই,
স্তরে স্তরে পুড়ে হয়েছে অসার
জীবনেতে সার পদার্থ নাই।
শূন্য দেহ প্রাণ শূন্য দেহ মনে,
ব শূন্য শূন্য নয়নে হেরি,
শূন্য নহে শুধু দুঃখ এ জীবনে
শূন্য নহে শুধু নয়ন বারি।
১০
৭৪
পুষ্পপুঞ্জ।
যেতেছে দিবস আসিছে রজনী
আসিছে দিবস রজনী যায়,
ডুবিছে তপন আসে নিশামণি
পুন ভানু উঠে শশী লুকায়।
কিন্তু এহৃদয়ে আমার রজনী
উঠে না শশী হাসে না তারা,
প্রভাত হয় না বিষাদ যামিনী
অমানিশা প্রায় আধার পারা।
আধার আধার সকলি আঁধার
আধার নয়নে আঁধার ধরা,
অাধার অাধার সকলি অধর
শুধু এজীবনে আঁধার ভরা।
হায়রে আমার জীবন অসার
যায় যায় তবু কেননা যায়,
জীবন প্রদীপ নিৰ্বাণ না হয়
কেন না লাগিয়া দুখের বায়।
শীঘ্র যদি হত দুঃখীর মরণ
তাহলে কিছুনা ভাবিতে হত।
ক্ষীণ দুঃখময় কাতর জীবন
পলকের মাঝে জুড়ায়ে যেত।
ওহে দয়াময় হইয়া সদয়
ঘুচাও দারুণ এজ্বালা মাের,
দয়া করি এই দীন দুঃখময়
হৃদয়কে কর আনন্দে ভাের।
।
পুষ্পপুঞ্জ।
মৃত্যুর নির্ভয় কোমল কোলেতে
অনন্ত নিদ্রাটি যেনগাে পাই,
আর যেন জ্বালা না পাই পদেতে
সকাতরে এই ভিক্ষা গাে চাই।
বাল্যসখী ।
শরতের দিবা হলাে অবসান,
পশ্চিম আকাশে ডুবিছে ভানু।
লােহিত কিরণে বােধ হয় যেন,
সুবৰ্ণ মণ্ডিত ধরার তনু ।
পশ্চিম আকাশে চলি দিবাকর,
ভাবিয়া আপন পূর্বের কথা ।
কোথা সে প্রচণ্ড তাপ খরতর,
ভাবিয়া হৃদয়ে পেয়েছে ব্যথা।
এই কি বিধির কঠোর লিখন,
কিছু চিরস্থায়ী জগতে নয়।
দেখি বিধি লেখা বিষাদে তপন,
হয়েছেন বুঝি লােহিত ময়।
মৃদু মৃদু বায়ু বহি ধীরে ধীরে,
দোলায় তরুর পল্লব ফল।
হেলে দুলে পাতা সান্ধ্যানিল ভরে।
জানায় ধরার অস্থায়ী বল।
পুপপু।
দুলিছে লতিকা কুসুম কলিকা,
সকলি দুলিছে সায়াহ্ন ক্ষণে।
পেয়ে ক্ষিধ্বকাল বালক বালিকা,
খেলিতেছে তারা প্রফুল্ল মনে।
নিরখি সায়াহু মধুর সময়,
শৈশবের কথা আসিল মনে।
হৃদয় মাঝেতে হইল উদয়,
শৈশবের প্রিয় সঙ্গিনী জনে।
কোথা শৈশবের প্রিয় সহচরি,
এস একবার এ চারুকালে।
তেমনি সেজেছে প্রকৃতি সুন্দরী,
রবির লােহিত কিরণ জালে।
তেমনি মধুর বাতাস বহিছে,
কপিছে লতিকা পল্লব ফল।
বাটীর সরসে তেমনি খেলিছে,
অনিলের সনে হিল্লোল দল।
সরসীর তীরে শীতল সমীরে,
চরিছে তেমনি মরালগণে।
তেমনি দুজনে মিলি একস্বরে,
ডাকি এস ভাই প্রফুল্ল মনে।
পুপপুঞ্জ।
গ্রাম্য বালা.ভাই আমরা দুজনে,
কতই আনন্দে মেপেছি দিন।
থাকিতাম সদা প্রফুল্লিত মনে,
দিবানিশি ছিনু বিষাদ হীন।
খেলা করিবার ক্ষুদ্রঘর খানি,
গ্রামের কানন লতার বন ।
গ্রামের সরসী ক্ষুদ্র প্রবাহিনী,
মােহিত সদাই মােদের মন।
অই দেখ বােন দেখিতে দেখিতে,
হাসিয়া মধুর বিমল হাসি।
দীপ্ত করি ধরা স্নিগ্ধ কিরণেতে,
উঠিল গগণে শরৎ শশী।
আশে পাশে তার উঠিল ঘেরিয়া,
ঝিকি মিকি করি তারকগণে।
এই নিশাকালে দুজনে মিলিয়া,
খেলিয়াছি কত সানন্দ মনে।
শৈশব সময়ে কখন স্বজনি,
থাকিতে না ভাই ছাড়িয়া মােরে।
আমিও তেমনি দিবস রজনী,
থাকিতাম নাহি ছাড়িয়া তােরে।
৭৮
পুষ্পপুঞ্জ।
কি পাপে হায়রে বাল্যসহচরি,
পেতেছ এমন যাতনা রাশি।
সে চারু বদনে কতদিন মরি,
হেরেনি সরল মধুর হাসি।
দিবস রজনী হয়ে পাগলিনী,
কি ফল সরল বিলাপ করে।
দেখিলে ত অয়ি চির অনাথিনী,
কোন ফল নাই ধরা ভিতরে।
জগতের নাখ জগত জীবন,
দীনের আলয় অনাথ নাথ।
করুণ অর্ণব পতিত পাবন,
দরিদ্র জনক পৃথিবী তাত।
জানাও যাতনা সে বিভু চরণে,
সে পিতৃহীনের পিতার পায়।
তিনি যদি চান স্নেহ দৃষ্টি দানে,
তােমার যাতনা ঘুচিয়া যায় ।
জগতের পিতা জগত শাসক,
নিশ্চয় চাবেন সদয় মনে।
দেখিবেন পিতা পৃথিবী পালক,
দুঃখিনী বঙ্গীয় বিধবাগণে।
পুষ্পপুঞ্জ।
আমার প্রিয় বয়স্যার মৃত্যুর বর্ণনা।
জগতের একমাত্র সরলতাধার,
পবিত্র মুরতি সেই পুলক পূরিত।
ত্যাজে এ কপট হিংসা মাখান সংসার,
গিয়াছে অনন্তধাম দেবের বাঞ্ছিত।
যে দেখেছে একবার সে মূৰ্ত্তি সরল,
যে শুনেছে একবার সরল বচন।
ভুলিবে না কভু সেই থাকিতে জীবন,
সে প্রতিমা তারি হৃদে রহিবে উজ্জ্বল।
অথবা সে পূত চারু স্বভাব সুন্দর,
শােভা কি পায়গো কভু এপাপ মরতে ?
অথবা নন্দন ত্যজি দেব মনােহর,
পারিজাত ফুটে কিগাে আঁধার বনেতে ?
নহে কিন্তু সে আমার বাল্য সহচরী,
দুই মাসে কিন্তু হেন স্নেহের বন্ধনে।
বেঁধে ছিল সে সরলা, এবে, যদি স্মরি,
উষ্ণ অশ্রুধারা ঝরে কেবল নয়নে।
মনে পড়ে সদা সেই সরল আঁধার,
শুধু সরলতামাখা ছিল সে জীবনে।
বরফের মত শ্বেত পূত হৃদি তার,
একটি মসীর আঁক ছিলনা সে মনে।
৮০
পুষ্প।
ত্যজেছে জগত, বালা জনম মতন,
কিন্তু আমি হাসি মাখা সে চারু মুরতি।
ভুলিব না কভু এই থাকিতে জীবন,
স্বর্গীয় প্রতিমা খানি দেবী মূর্তিমতী।
এক দিন স্বর্ণ চাপা তরুর তলায়,
মধ্যাহ্ সময়ে যেই মােক্ষদা বলিয়া ।
ডেকেছে অমনি বালা আনন্দ প্রভায়,
হাসিতে হাসিতে এল দিক উজলিয়া।
হাস্য মাখা আস্যখানি আলু থালু কেশে,
হাসিতে হাসিতে সে যে ত্বরিত গমনে।
আসিল আনন্দময়ী পাগলিনী বেশে,
এখন সে রূপ রাশি আসিছে স্মরণে ।
নয়ন মুদিলে আমি সে মুরতি খানি,
এখন দেখিতে পাই সেই সরলতা।
তরুতলে বেদীপরে, হাসিয়া তেমনি,
সাদরে ধরিয়া কর কহিতেছে কথা।
সুন্দরী ছিল না কিন্তু কি যে মনােমা,
লাবণ্য মাখান ছিল তাহার কান্তিতে।
সে ললিত লাবণ্যের না দেখি উপমা,
এই স্বার্থ দ্বেষ পূর্ণ কুটিল মরতে।
পুপপুঞ্জ।
ভাগ্যবতী রাখি পতি পুত্র বর্তমানে,
হাসিতে হাসিতে গেছে অমর নগরে।
যেমন থাকিত বালা আনন্দিত মনে,
তেমনি আনন্দে গেল বৈজয়ন্ত পুরে।
দেবী মূর্তিমতী সেই সরলা রমণী,
সংসারের দুঃখ কি সে পারে সহিবারে।
সদা সে সরলচিত্ত পবিত্ৰা কামিনী,
থাকিবে অনন্ত সুখে অমর নগরে।
এক মুহূর্তের তরে বদনে তাহার,
দেখিনি দেখেনি কেহ বিষাদ কালিমা।
আনন্দ আমােদে মগ্ন ছিল অনিবার,
হাস্যমুখী শুধু ছিল আনন্দ প্রতিমা।
বালিকার মত ছিল তাহার জীবন,
আসিলে অপরিচিত ভদ্রের রমণী।
মান করি করিত না ভদ্র সম্ভাষণ,
সাদরে বলিত শুধু অকপট বাণী।
হৃদয়ে উঠিলে কোন কপট ভাবনা,
হৃদয় খুলিয়া তাহা করিত বিকাশ।
অতি দ্রুতগতি ছিল বালিকা গমনা,
প্রতি পদে করিত সে আনন্দ প্রকাশ ।
২
পশেনি জীবনে তার কুচিন্তা কখন,
আত্মশ্লাঘা হিংসা দ্বেষ স্বার্থ কপটতা।
শুধু ছিল পবিত্রতা উদার জীবন,
আনন্দ আমােদ রাশি মাখা সরলতা।
জানি না শিস্পকাৰ্য্য বচন চতুর,
ছিল নাকো বিদ্যাবতী কিন্তু বুদ্ধিমতী।
স্বভাবটী ছিল কিন্তু অতি সুমধুর,
আত্মপর জানিত না, নহে লজ্জাবতী।
কিন্তু তার একরূপ কাৰ্য্য সমুদয়,
জানিত না জগতের কিছু রীতি নীতি।
সকলি তাহার যেন এধরার নয়,
অমানুষী বিদ্যা বলে ছিল বিদ্যাবতী।
যে গুণ আছিল তার হৃদয় ভিতরে,
শিখিতে সে গুণ পারে কিগাে বিদূষিতে।
শিক্ষা যদি পায় লােকে সহস্র বৎসরে,
তবু সেই সরলতা না পারে শিখিতে।
দারুণ পীড়ার ভরে হয়ে, অচেতন,
ছিল তার একমাত্র প্রান্তের তনয়া।
তবু সেই হাস্য ভরা প্রফুল্ল বদন,
ছিল না একটু মাত্র বিষাদের ছায়া।
পুষ্পপুঞ্জ।
অমল কোমল শিশু প্রাণের তনয়,
ত্যজে ছিল ধরাধাম তবু সে সরলা।
বলিত সে সন্তানের জীবন বিলয়, :
হইল কিরূপ করি, হেসে কেঁদে বালা।
বাষ্প ভারাকীর্ণ চক্ষে আধ আধ হেসে,
করিত সে নন্দনের রূপের বর্ণন।
যেখানে থাকুক প্রিয় সূত জানিত সে,
তাহার পুত্রের রবে অনন্ত জীবন ।
অষ্টাদশ বর্ষ ছিল এই জগতেতে,
কিন্তু আমি অষ্টাদশ সহস্র বৎসর,
হলেও তাহার গুণ না পারি বলিতে,
এমনি তাহার ছিল গুন মনােহর।
দুই বৎসরের রাখি প্রাণের কুমারী,
নবম দিনের শিশু প্রাণের নন্দন।
হাসি হাসি মুখ লয়ে সতী সুকুমারী,
ভাগ্যবতী গেছে চলি অমর ভবন।
ঈশ্বরের কাছে এবে করি প্রার্থনা,
অইরূপ যেন মম হাসিতে হাসিতে,
গত হয় এ জীবন, সরলা ললনা,
রয়েছে যেখানে সুখে তার নিকটেতে।
৪
পুষ্পপুঞ্জ।
কার তরে কাঁদি।
কার তরে কাদি প্রাণের ভগিনি,
কার তরে কাদি হয়ে বিষাদিনী,
কার তরে কাদি হয়ে পাগলিনী,
কার তরে কাদি দিবস রজনী,
কার তরে কাদি জানি না।
কিসেরি বা তরে করিরে রােদন,
অশ্ৰবষয় কেন বা নয়,
কাহার তরেতে কাঁদি অনুক্ষণ,
এভবের খেলা জেনে কেন বােন,
করি অনর্থক ভাবনা।
এমহি মণ্ডল শুধু মায়াময়,
কিছুই এভবে চিরস্থায়ী নয়,
সকল পদার্থ ছায়াময় হয়,
মিছার জগতে সব মিছাময়,
জেনেও বােনরে জানি না।
দয়া মেধার জনক দেবতা,
স্নেহময়ী প্রেমময়ী দেবী মাতা,
প্রাণের অধিক ভ্রাতা ভগ্নিগণ,
প্রাণপ্রিয়তম নন্দিনী নন্দন,
প্রাণের সুখের বাসনা।
৮৫
পুষ্পপুঞ্জ।
তিলেক না হেরি আঁদের বদন,
আকুল হৃদয় হয় উচাটন,
ঝরে অবিরত নয়নের ধার,
অমঙ্গল ভয় করি অনিবার,
মনে হয় কত যাতনা।
এহেন তােমার প্রাণের রতন,
এহেন সর্বস্ব জীবন জীবন,
ছাড়িয়া কোথায় করিবে গমন,
আর ভাবিবে না তাদের বেদন,
কোন ভাবনা রবেনা।
জনক জননী আর পরিজন,
মেহের আধার ভ্রাতা ভগ্নিগণ,
সকলি ত্যজিয়া করিতে গমন,
হইবে বােনরে জন্মের মতন,
সঙ্গেতেত কেহ যাবেনা।
আত্মীয় বর্গের স্নেহের বদন,
পাবে নাগাে আর করিতে দর্শন,
অমৃত আধার স্নেহের বচন,
পাবেনাগাে আর করিতে শ্রবণ,
কিছুই দেখিতে পাবে না।
পুষ্পপুঞ্জ।
এক পদ মাত্র করিতে গমন,
সঙ্গেতে রক্ষক দেয় পরিজন,
উত্তম বাছিয়া বসন ভূষণ,
সাজাইয়ে দেয় মনের মতন,
পাছে হয় কোন যাতনা।
সেদিনের কথা কবরে স্মরণ,
কি লবে সম্বল বসন ভূষণ,
কি দিয়া সাজিবে মনের মতন,
সঙ্গেতে রক্ষক লবে কত জন,
যাহাতে রবেনা ভাবনা।
থাকিবে তােমার যত পরিজন,
বহুমূল্যবান্ রতন ভূষণ, ।
কাড়িয়া লইবে জন্মের মতন,
শােকাকুল মনে দিবে বিসর্জন।
কিছুই সঙ্গেতে দিবে না।
ছিন্নবাস দিয়ে দিবেরে বিদায়,
একাকী যাইতে হইবে তােমায়,
ভয় ভীত ভাব যাইবে কোথায়,
দূরদেশে যেতে হবেরে তােমায়,
রক্ষক কেহ ত হবে না।
পুষ্পপুঞ্জ।
যে দেহ সদাই রাখ পরিষ্কার,
আগুনে পুড়িবে সে দেহ তােমার,
অবশিষ্ট কিছু রবেনা ইহার,
ভস্ম হয়ে যাবে অস্থিমাত্র সার,
কিছুই পদার্থ রবে না।
• ~~
তবে কেন থাক গর্বিত জীবনে,
ব্যথা দাও সবে কর্কশ বচনে,
কেন সুখে মত্ত থাক দিবানিশি,
কেন মনে রাখ পাপ তাপ রাশি,
কেন দাও সবে যাতনা।
তবে কেন এত তেজ অভিমান,
এত দম্ভে সবে কর হেয় জ্ঞান,
কেন মিছা ক্রোধ মিছা অহঙ্কার,
কেন মিছা দেহ গর্বের অাঁধার,
কেন এত সুখ বাসনা।
ছাড়িতে হইবে সুন্দর ভব,
এই মুহূতে হইবে নীরব,
একদিনে এবে ফুরাইবে সব,
যাবে ছার প্রাণ হইবে যে শব,
স্মৃণা করি কেহ ছুবেনা।
৮
পুষ্পপুঞ্জ।
এজগতে শুধু কথামাত্র সার,
কিছুই পদার্থ নাহিরে ইহার,
এজগতে কিবা পশু পক্ষিগণ,
কিবা এই ছার মানব জীবন,
কিছুইরে স্থায়ী হবে।
ঐ যে শােভিছে মহীরুহগণ,
করি উচ্চ শির আছে অনুক্ষণ,
কালের গতিতে আসি প্রভঞ্জন,
উহাদের দেহ করিবে পাতন,
চিহুমাত্র বােন রবেনা।
অই যে বােনরে দেখ প্রবাহিনী,
করি অবিরত কুলু কুলু ধ্বনি,
শত উৰ্মীমালা বক্ষে নাচাইয়া,
অসংখ্য তরণী হৃদয়ে ধরিয়া,
গরবেতে কিছু মানে না।
করি তােলপাড় কাপাইয়ে তীর,
আপন বিক্ৰমে হইয়া অধীর,
চলেছে গিরিজা সাগরের পানে,
আত্মদম্ভে ধায় কিছুই না মানে,
উহাও বােনরে রবেনা।
: পুষ্পপুঞ্জ।
৯
অই যে তরঙ্গ ধায় কোলাহলে,
কত মানবেরে গ্রামে গেলে,
অই স্থান দিয়া পদব্রজে বােন,
কত নরগণ করিবে গমন,
নদী বলে বােধ হবেনা।
সুকাবে এ নীর অতল অপার,
বালুময় হবে এ দেহ উহার,
প্রচণ্ড প্রখর পেয়ে ভানুকর,
হবে বালুরাশি উত্তপ্ত প্রখর,
হেন স্নিগ্ধভাব রবেনা।
অইযে সম্মুখে রয়েছে নগর,
শ্রেণীবদ্ধ শােভে সৌধ মনােহর,
কারুকার্য করা চিত্রিত সুন্দর,
গিরিশৃঙ্গ মত স্পর্শিছে অম্বর,
উহাও বােনরে রবেনা।
যবে হয়েছিল সৌধের নির্মাণ,
আসি শিল্পকর কত শত জন,
প্রাণপণে করি গড়েছে সুন্দর,
নয়ন রঞ্জন অতি মনােহর,
ধরায় না হয় তুলনা।
পুষ্পপুঞ্জ।
উহাও হইবেশশান মতন,
কোথা যাবে শােভা নয়ন মােহন।
ওসব সুষমা কলের গতিতে,
হবে মরু মত মিশাবে মাটীতে,
কিছুমাত্র চিনা যাবেনা।
তবে কার তরে দিবস রজনী,
কঁদি প্রিয় বােন হয়ে বিষাদিনী ?
কাতর জীবনে হয়ে পাগপিনী,
তবে কেন কাঁদি প্রাণের ভগিনি,
কার তরে কাঁদি জানি না।
শান্তিময় যেই জগত জীবন,
যাহারে স্মরিলে শান্তি পাবে বােন,
সেই মহাদেব পতিত পাবন,
সে পিতারে বােন কররে স্মরণ,
কোনই যাতনা হবেনা ।
কার তরে কাদি প্রাণের ভগিনি,
কার তরে কাঁদি হয়ে বিষাদিনী,
কার তরে কাদি হয়ে পাগলিনী,
পরম পিতারে স্মরিলে পাপিনী, .
কোন ভাবনা রবেনা।
';
পুষ্পপুঞ্জ। সন্ধ্যাকালের প্রার্থনা। লােহিত বরণ পশ্চিম আকাশ, অন্ত যান দিবাকর। শীতল মারুত গন্ধ ছড়াইয়া, জুড়াইছে কলেবর। নদ নদী জলে ঢেউ গুলি উঠি, খেলিয়া বেড়ায় কিবা । ভাঙ্গা ভাঙ্গা মেঘে রক্তিমা মাখান রেঙ্গেছে নিদ্রালু দিবা। কি ঘুমে ডুবিল -সে কি যােগ নিদ্রা ? বসিল কি বিভু ধ্যানে ? স্থির এ জগত গম্ভীর আকাশ, নিশবদে স্থানে স্থানে, দু-একটি করি ফুটিয়া তারকা, চেয়ে আছে কার পানে ? এই যে বিচিত্র সন্ধ্যার সৌন্দৰ্য্য, জুড়ায় নয়ন মন। এই যে পবন বহি ধীরি ধরি, যাহে বাচে প্রাণীগণ। কটাক্ষে তােমার চলিছে সংসার, তুমি জগতের পিতা। করুণা আধার দেব নিরাকার, মঙ্গলময় বিধাতা।
৯২
পুষ্পপুঞ্জ।
প্রণিপাত করি, ত্রিভুবন ভাত।
ওহে দেব জ্যোতির্ময়।
যেন পাপ মন
তােমার চরণ
তিলেক ভুলি না রয়।
যেখানে যখন
করি অবস্থান
সদা যেন ভক্তি মনে,
স্মরিয়া তােমায়
জুড়াই হৃদয়
এই ভিক্ষা ওচরণে।
আসিছে রজনী
জগতে এখনি
হইবে আঁধার ঘাের।
কিন্তু নাথ যেন
তােমার চরণ
থাকে হৃদে গাথা মাের।
দীনের আশ্রয়
মঙ্গল আলয়
দয়াময় দয়া করে।
পাপিনী কন্যায়
পদে স্থান দেও
এই ভিক্ষা বারে বারে।
সম্পূর্ণ।
শুদ্ধি পত্র। পৃষ্ঠা জ্ঞাপন পৃষ্ঠা শেষ পঙক্তি ছয়াময় ছায়াময় ২৬ ১৯ পঙক্তির পর জননী ” এই হেডিং হইবে। ২৭ ৬ কাহার যতনে করিতেছ কার যতনে বল করিতেই। যাহার কারি န် এনে .এবে ৯ সহ সুব ইরাশি হর্ষরাশি ১১ ৪ দেখি যেন শান্তি সুধাময় দেখি শান্তি সুধাময় စ် দেবাবাস দেবাস ৬ ঐ আসার আমার ধীর আখি কঁদিতেছে ধায় আমি কঁদিতেছি হেমে ৪৪ ৪৬ • ৪৭ ရဲ ১২ ১৬ ৬ ৪ ৪ ০ ০ হেসে নলিনী মিশাক সেখানে নিরমল অতি, সরসীর আররে লতা দিবে গৃহ পদ পেতে অবাধ্য তুনি সন্সিলে আনন্দ বিস্তার কুমুদ মিশাখ সুধা সেখানে নিরমল সরসীর আয়রে লতাদিরে গৃহ পাদপেতে আরাধ্য তুমি সলিলে আনন্দ বিস্তার করে ১৪ ৬৪ २४ ৭ দেয়
| কামিনী মাতঃ হয়।
কামিনী ত হয়,
•
এ
ডেকেছে
হেরেনি
হেরিনি
ডেকেছি
মুহাতে
মুহুর্তে
কোন ভাবনা কোর্মই ভাবনা
২০.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.