Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Sur-sangit

2009/10/16

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

সুর-সঙ্গীত।

No text on this page.

সুর-সঙ্গীত।
"All worldly shapes must melt in gloom,
The sun himself must die,
Before this mortal shall assume
llis immortality !
I saw a vision in my sleep
That gave my spirit strength to swecp
Adown the gulf of time!
I saw the last of human mould
That shall creation's death behold
As Adam saw her prime.!”
Thomas Campbello
আসাম।
শিলং সাহিত্য-সভা হইতে
শ্ৰীযুক্ত কেদারনাথ চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক
প্রকাশিত।
০

কলিকাতা
৫১।২
সুকিয়া খ্রীট, মণিকা প্রেসে
অধরচন্দ্র বসু দ্বারা মুদ্রিত।

পূৰ্বাভাস । . গ্রন্থকারের মতে “সুর-সঙ্গীত” যথার্থ কাব্য হইয়াছে কিনা সন্দেহ। প্রকৃত কাব্যের যে যে লক্ষণ বা গুণ থাকা আবশ্যক ইহাতে তাহা আছে বলিয়া তাঁহার বিশ্বাস নাই। এক নিশ্বাসে সাতকাণ্ড রামায়ণ আবৃত্তি করার ন্যায় সর্বনিয়ন্তার ত্রিগুণাত্মক লীলা সমূহ এই ক্ষুদ্র গ্রন্থের কয়েক পৃষ্ঠায় বিবৃত করিতে প্রয়াস পাওয়া কেবল মাত্র বাতুলতা ও অহম্মতি প্রকাশ ব্যতীত আর কি হইতে পারে? তবে যেরূপ মহাসমুদ্রে ক্ষুদ্র বুদুদ পরিবৃত তরল-লহরী-মালা আসন্ন বিপ্লবের উন্মত্ত তরঙ্গলীলার পূৰ্ব্বাভাস জ্ঞাপন করে, এই ক্ষুদ্র কাব্য খানিও সেইরূপ ভবিষ্য কালের কোন মহাকবি-রচিত এই মহা বিষয়ের বিশদ-বৰ্ণনাময় ভাবী মহা- কাব্যের পূর্বাভাস রূপে পরিগৃহীত হইতে পারে ইহাই লেখকের আশা, ভরসা, ও মনস্তুষ্টির বিষয় ! হা হউক এই ক্ষুদ্র পুস্তক খানি পাঠ, করিয়া কয়েক জন কৃতবিদ্য ব্যক্তি তৎসম্বন্ধে যেরপ অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন তাহা যথাযথ উদ্ধৃত করিয়া দেওয়া হইল।

y এক্ষণে এই পুস্তক খানি বহুকাল যাবৎ পাণ্ডুলিপি অবস্থায় পতিত ছিল, লেখক সাহস করিয়া জনসমাজে প্রকাশ করিতে পারেন নাই, উপরিউক্ত বন্ধুবর্গের সাগ্রহ উত্তেজনায়, এমন কি অনেকে এখানি নৰ্মাল বিদ্যালয়ের উচ্চশ্রেণী সমূহের একখানি সুন্দর পাঠ্য-পুস্তক হইবে বলিয়া ভরসা প্রদান করায়, ইহা প্রকাশিত হইল,-কাজ ভাল হইল কিনা তাহা সাধারণের এবং শিক্ষাবিভাগের কর্তৃপক্ষদিগের বিবেচ্য। পরিশেষে যে সকল মহানুভব কৃতবিদ্যব্যক্তি বিশেষ যত্ন ও পরিশ্রম সহকারে এই পুস্তকের পাণ্ডুলিপি খানি দেখিয়া দিয়াছেন, গ্রন্থকার কৃতজ্ঞ হৃদয়ে তাহাদিগকে অগণ্য ধন্যবাদ প্রদান করিতেছেন। তাহারা সেরূপ আন্তরিক অধ্যবসায়ের সহিত পুস্তক খানি দেখিয়া না দিলে ইহা আজি সাধারণ সমক্ষে প্রকাশিত হইত কিনা সন্দেহ। শিলং, আসাম । ১লা চৈত্র, ১৩০৪। প্রকাশক !

উৎসর্গ।
সংসার-উদ্যান-প্রান্তে অঙ্কুরিত তরু,
পায় জনমে কভু স্নেহ-নীর-ধারা,
কুঞ্চিত কোমল প্রাণ তপন-পীড়নে,
অবসন্ন অত্যাচারে নর-পশু করে !
জীর্ণ-শীর্ণ দেহখানি বাড়ে ধীরে ধীরে,
শােভাহীন শাখাপত্র বিরস বিরল।
রুগ্ন প্রাণে ক্ষুদ্র তরু রহে ম্লান ভাবে।
কিন্তু কি আশ্চৰ্য হের, শত অপকারে
অনাদরে, নহে শুষ্ক সেই শীর্ণ তরু,
কালের প্রভাবে আহা বাড়ি দিন দিন,
পবন নিস্বনে উচ্চে গাহি দেব গীতি
ক্লেশ-ক্লিষ্ট-বুকে ধরে চারু ফুল-হার ।
শঙ্কিত হৃদয়ে এবে চাহি নর-পানে
দিলা অভিনব-ফল বিনম্র-মস্তকে।

No text on this page.

সু-সঙ্গীত।
সূচনা।
নিজ্জিত নিহত সুর-রিপুগণ,
বৈজয়ন্ত এবে শান্তি নিকেতন,
অনন্ত-পুলক-প্রবাহে মগন,
অসুর-বিজয়ী দেবতা আজ ;
উল্লাস-উৎফুল্ল অনুপম জ্যোতি,
শােভে সুর মুখে সুষমা সংহতি,
নিশা অবসানে নর-ত্বিষম্পতি
ধরেন যেমতি নবীন-সাজ ।

২
সুর-সঙ্গীত।
দেব সভাতলে অমর-নগরে,
বিচিত্র আসন শােভে থরে থরে,
অপরূপ জ্যোতিঃ চৌদিকে বিতরে,
নেহারি মােহিত নয়ন তায় !
স্থির-স্নিগ্ধ-দ্যুতি তাহে দীপ্যমান,
সুবৰ্ণ হীরকে নহে সে নির্মাণ,
নাহিক তাহাতে স্থূল-উপাদান,
স্থূলতার মলা নাহি তথায় ?
এ মর-সংসারে শােভাময় যত
রতন মাণিক্য আছে নানামত,
স্ফটিক, প্রবাল, হেম, মরকত,
আঁখি মন যাহে হরিয়া লয়,
সে সবার শােভা লইয়া যতনে,
মাখি মধুময় মলয়-পবনে,
ছানিয়া সঘনে স্বর্গীয়-কিরণে,
গঠিত সে চারু আসনচয় !
-
বসিয়া তাহাতে অমর-নিকর,
জ্যোতির্ময়-বপুঃ কান্তি মনােহর !
অশরীরী কত সিদ্ধ-বিদ্যাধর,
প্রেম আলাপনে বিহরে কাল ;

সুর-সঙ্গীত। পুরােভাগে চারু আসন খচিত, কুসুমের নব লাবণ্যে রচিত- অমর ঈশ্বর তথা বিরাজিত বিকাশি সভার সুষমা-জাল! বামে বসি শচী অতুলা-সুন্দরী, রূপের বিভায় দিক আলাে করি ; অধরে মৃদুল হাস্যের লহরী খেলিতেছে সুধা-প্রবাহ প্রায় ! “প্রণয়”-সঙ্গিনী “প্রীতি” গুণবতী, কাছে বসি ফুল-মালা গাঁথে সতী, চটুল-নয়নে হেরে নিজ পতি, প্রেম-মন্দাকিনী উথলে তায়। রম্ভা, তিলােত্তমা, মেনকা, উর্বশী, মুরজা, মুরলা,-রূপে পূর্ণ-শশী, আরাে কত শত অমরা রূপসী, কহে পরস্পরে মধুর-ভাষ! প্রবাল-অধরে মৃদু মৃদু হাসি, বিলােল-নয়নে অমৃতের রাশি, কপােল রঞ্জিত রক্তিম-কিরণ, —অরুণ-অঙ্কিত কমল মতন! বহিছে মৃদুল সুরভি-শ্বাস !

সুর-সঙ্গীত।
নিরখিতে সেই নয়ন-ভঙ্গিমা,
অধর গণ্ডের সু-চারু রঙ্গিমা,
ললিত অঙ্গের লাবণ্য-মহিমা,
ঘন ঘন “প্রীতি” অপাঙ্গে চায়
প্রেম-প্রপুরিত হেরি সে চাহনি,
“প্রেম-দেব” মৃদু হাসেন আপনি
পুলকে প্রণয়-ভাবিনী অমনি,
স্মিত-মুখে ফুল গাঁথে মালায় !
বাসব-আদেশে কিন্নর-প্রধান,
বীণা-সহযােগে আরম্ভিল গান,
রাগিনী সহিত রাগ মূর্তিমান
নাচিতে লাগিল ললিত-তালে ।
স্তব্ধ দেব-কুল শুনিয়া সঙ্গীত,
কদম্বের প্রায় তনু পুলকিত,
চতুরিন্দ্রিয়ের * চেতনা রহিত!
শ্রবণে সঙ্গীত-প্রবাহ ঢালে ।
চাহিয়া গায়কে “প্রণয়”-রাজন্
বিদ্রুপ-বিহাসে কহেন বচন,
* পাচ ইন্দ্রিয়ের মধ্যে চারি ইন্দ্রিয়ের চৈতবিলুপ্ত হইল, কেবল শ্রবণেন্দ্রিয়
ধারা সঙ্গীত শুনিতে লাগিল।

সুর-সঙ্গীত।
“সবে কয় শুনি হেসুর-গায়ন।
মােহিনী-মায়ায় প্রবীণ তুমি ;
সঙ্গীতের ছলে সম্মােহিনী-বলে,
ভুলাও নাকি হে দেবতার দলে,
হাসাও কাদাও নাচাও সকলে,
দেখাও নিমেষে ত্ৰিলােক-ভূমি ?
“ত্রি-ভুবন জয়ী আমি সে ‘প্রণয়’,
ত্রি-ভুবন সদা মম বশে রয় !
ভুলাইতে যদি পার হে আমায়,
তবে সে বুঝিব ক্ষমতা তব ?”
ঈষৎ হাসিয়া গায়ক প্রবর,
নত করি শির ‘প্রণয়’-গােচর,
দীনতা প্রকাশি যুড়ি দুই কর
সপ্তমে ধরিল সঙ্গীত নব ।
গাইল কিন্নর—“দেখ দেবগণ!”
—বিস্ময়ে সকলে করিল দর্শন!
“রজত-ভূধরে দেব পঞ্চানন
নিগ্ন গভীর তপসাগরে।
ভয়েতে স্তম্ভিতা প্রকৃতি-সুন্দরী,
ভয়েতে স্তম্ভিতা কানন-বল্লরী;

সুর-সঙ্গীত।
“ভয়ে ভয়ে ভয়ে বহিছে পবন,
নড়ে না পল্লব স্তব্ধ তরুগণ!
ঝরে না কুসুম পবন-তাড়নে
ঝঙ্কারে না অলি গুন্ গুন্ স্বনে !
ভয়ে দ্বিজ-কুল না ধরে তান
ভয়ে নিঝরিণী করে না গান
স্তবধ গম্ভীর ভূধর ডরে !
“অদূরে দাঁড়ায়ে নন্দিকা-ঈশ্বর,
বাম করে ধৃত ত্রিশূল সুন্দর,
দক্ষিণা তর্জনী ওষ্ঠের উপর,
তীক্ষ্ণ-দৃষ্টে চায় প্রকৃতি পানে ;
বিশ্বনাথ যােগী ভােলা ত্রি-লােচন,
বিশ্ব-মাতৃ ধ্যানে আছেন মগন ;
তপের প্রভাবে দীপ্ত কলেবর,
জ্বলিতেছে যেন জ্যোতিষ্ক প্রখর।
দীর্ঘ জটাজুট ভূমেতে লুটায়,
নিঃশব্দেতে গঙ্গা তরঙ্গ ঢােয় !
নিমগন যােগী গভীর ধ্যানে।
“পূজিতে যােগেন্দ্রে জগত-প্রসূতি
আসনে প্রকাশি সু-রূপের দ্যুতি!

সুর-সঙ্গীত।
৭
“মরি কি সুন্দর যােগিনীর সাজ,
জগত-জননী ধরেছেন আজ!
ফুল-ডালা ধরি সঙ্গে সহচরী ;
যােগী পদ-মূলে বসিলা সুন্দরী,
যেন রে রজত-ভূধর- চরণে
সুবর্ণের নদী বহিল।
“লয়ে পুষ্পাঞ্জলি কহিলা পাৰ্বতী
‘এ দাসীরে কৃপা কর পশুপতি!
হও হে সদয় পূরাও কামনা,
পূজিব চরণ মনের বাসনা !
লও পুস্পাঞ্জলি –ধর বি-দল,
পূজি পদ করি জনম সফল’ !
বলি ফুল-দল সঁপিল ।
সহসা বহিল মলয়-পবন,
সহসা হাসিল তরু লতা গণ,
কুহু কুহু রবে ডাকিল পিক,
ভ্রমর-ঝঙ্কারে পূরিল দিক,
সহসা বসন্ত হইল উদয়,.
শিহরিয়া তরু মঞ্জরিত হয় ।
জানু পাতি ভূমে ‘প্রণয়-রাজন”,
আকর্ণ টানিয়া পুষ্প-শরাসন,
সম্মােহন শর হানিল !-

সুর-সঙ্গীত।
“সহসা টলিল ভূধর-শিখর ,
কপিল স্থাবর জঙ্গম নিকর।
শরমে ভবানী ঢাকিলা বদন,
দুরু দুরু হৃদি কাপিল সঘন ।
দল-মল করি আসন টলিল ।
ধূর্জটির জটা সঘনে কপিল।
অসময়ে যােগ ভাঙ্গিল ।
শিহরি যােগীন্দ্ৰ মেলিলা নয়ন,
প্রণয়-রাজনে করে বিপােকন ।
ক্রোধে জটাজুট উর্ধ্ব দিকে উঠে,
ধক-ধ্বব বহি ললাটেতে ছুটে।
ভয়ে দিবাকর পলান সত্বর,
তিমিরে নিমগ্ন বিশ্ব-চরাচর ।
থর থর থর কাপে ত্রি-ভুবন,
ঘাের নাদে সিন্ধু করে গরজন !
অকালে প্রলয় হইল ।
বিশ্ব-বিনাশন ক্রোধ-হুতাশন,
অদূরে ‘প্রণয়ে’ করি দরশন,
কোটী উল্কা সম প্রদীপ্ত হইয়া,
ছুটিল সবেগে ঘাের গরজিয়া,
ত্রিভুবন দগ্ধ করিয়া ।

সুর-সঙ্গীত।
“কি কর কি কর হে শিব শঙ্কর !
বিশ্ব-নাশী ক্রোধ সম্বর সম্বর।
গেল ত্রি-ভুবন,—প্রণয়-রাজন’
পলাও, নেহার ছােটে হুতাশন!
কি হের কি কর অমর ঈশ্বর।
গেল গেল ‘প্রেম’ হও অগ্রসর !
ওই দেখ আহ পুড়িল পুড়িল,
হায় ‘প্রীতি’ তব কি দশা ঘটিল !”—
সহসা “প্রণয়” সভা ছাড়িয়া
উৰ্দ্ধ-উর্ধ-শ্বাসে উঠিয়া ছুটিল !
শচী পাশে “প্রীতি” মূচ্ছিতা হইল।
স্তব্ধ দেব-কুল চৌদিকে চাহিল
বিস্ফারিত আঁখি বিস্ময়-ভয়ে।
হেরি বিদ্যারথী ঈষৎ হাসিল,
নিরবিলা বীণা, মােহিনী টুটিল !
লাজে হেঁট-মুখে ‘প্রণয়’ ফিরিল।
উঠিলেক ‘তি’ চেতন হয়ে!
ভাঙ্গিল চমক দেবতার দলে,
পরস্পরে চেয়ে হাসে কুতূহলে!
পুলকে দেবেন্দ্র বিদ্যারথী গলে
পারিজাত হার অর্পিল!

১০
সুর-সঙ্গীত।
ক্ষণেক বিশ্রাম লইয়া আবার
করিল কিন্নর বীণায় ঝঙ্কার,
—পুনঃ মােহমায়া হইল বিস্তার !--
মধুর সু-কণ্ঠে গাহিল—
“দৈত্য-বিদলিত এ অমরাবতী,
দেবতার ভাগ্যে হ’ল অধােগতি
দেব-বালাগণ, মলিন বদন,
ঘন-আবরণে চন্দ্রমা যেমন !
বদ্ধ-কারাগারে, বিচরিতে নারে,
সদাই শঙ্কিত দৈত্য-অত্যাচারে !
সু-চীর বসন অঙ্গে আচ্ছাদন,
দীনতার ছবি প্রকটে!
দেব-ভােগ্য যাহা সব(ই) দৈত্যগণ
তেজোদৰ্প-বলে গ্রাসিছে সঘন !
আলস্যে জড়িত দেবতা সকল,
যেন রে মােহিনী-মায়ায় বিহ্বল।
অসুর-উচ্ছিষ্ট করিয়া ভক্ষণ,
আপনারে ধন্য মানে অনুক্ষণ ।
কি আছিল সবে কি হয়েছে এবে,
ভ্রমেও বারেক নাহি দেখে ভেবে।
সদাই শঙ্কিত, চমকিত চিত,
অসুরের ঘাের দাপটে ।-

সুর-সঙ্গীত।
“অই শুন কেরে হিমাদ্রির * শিরে
দাঁড়াইয়া তূরী বাজায় গম্ভীরে
সৰ্ব্ব-অঙ্গ হ'তে ছুটে তেজোরাশি,
দশ দিকে জ্যোতিঃ ধাইছে প্রকাশি।
পশিল সে তেজ দেবতা শরীরে
বিদ্যুতের প্রায়,—বাজিল গম্ভীরে
হৃদয়ের যন্ত্র, জড়তা টুটিল,
মােহ-নিদ্রা-ঘাের নিমেষে ছুটিল !
সুরাসুরে যুদ্ধ বাধিল !
“নব বলে বলী দেবতা সকল
মথে দৈত্য-সেনা যেন তৃণ-দল !
ছাড়ে হুহুঙ্কার,—বিশ্ব চরাচর
পদ-ভরে ঘন কাঁপে থর থর !
কোদণ্ড টঙ্কারে হয় বজ্রনাদ,
চমকিত বিশ্ব শুনিয়া সে হ্রাদ !
নব-তেজে দীপ্ত দেবতা সকল !
ছিন্ন-ভিন্ন করে অসুরের দল!
দৈত্যের রুধিরে অমরা ভাসিল !
অমরের পুরী অমরে লইল !
জয় জয় রব হইল !”
* সর্গধামে হিমাদ্রির অস্তিত্ব বিচিত্র নহে।

সুর-সঙ্গীত।
উৎসাহে দেবেন্দ্র করে জয়-রব !
উৎসাহে গর্জিল আর দেব সব !
সুরাঙ্গনা সবে করে হর্ষ-রব,
হেরিয়া অমর-গায়ক
মুখে মৃদু হাসি বীণা নামাইল,
দেবগণে তবে চেতনা লভিল।
শত সাধুবাদে তাহারে তুষিল
চতুর “প্রণয়-নায়ক!”
শুনিয়া সঙ্গীত,
উৎসাহে দেবেন্দ্র,
সুধাপাত্র লয়ে প্রীতির ভরে,
শত সাধুবাদ,
উচ্চারি বদনে,
তুষিল অমর-গায়ক-বরে।
জয় কোলাহল,
দিল দেবদল,
“জয় শচী-পতি” বলি উচ্ছাসে—
সসম্রমে সুধা,
মস্তকে পরশি,
পিয়িল গায়ক একই শ্বাসে !
বলিলা বাসব,
“হে সুর-কলাপি,
বড় প্রতি আজ দিলেহে প্রাণে,
দেব-রাণী সহ,
সুর-বালাগণে
বিমােহিত আজি তােমার গানে।

সুর-সঙ্গীত।
লও বীণা যন্ত্র,
গাও হে আবার
জলদ-গম্ভীরে লাগাও তান,
সৃষ্টি-স্থিতি-লয়,
কি প্রকারে হয়,
গাও গাও সেই মহান্ গান !
কিরূপে সে বিশ্ব,
সৃজিলা বিধাতা,
কিরূপে মানব জনম হয়,
ফল-পুষ্প-বতী,
সেই বসুমতী,
কিরূপে বা পুনঃ পাইল লয় !”
শুনি বিদ্যারথী,
বীণা লয়ে করে,
গাঁথিয়া কঠিন নূতন তন্ত্র,
গাইল গম্ভীরে,
মেঘ-মন্দ্র-সুরে,
কপিল সবার হৃদয়-যন্ত্র।

৩ ০ ০
প্রথম-লহরী।
সৃষ্টি।
অনন্ত গভীর শূন্য ঘন-ঘাের অন্ধকার,
শব্দ-হীন বর্ণ-হীন ভীম অন্ধ-পারাবার !
ক্ষিতি, অপ, তেজ, বায়ু কিছু নাই—কিছু নাই,
আদি-হীন অন্ত-হীন একাকার সব ঠাই !
গ্রহ, তারা, রবি, শশী, অসংখ্য সৌর-মণ্ডল,
সত্ত্বাহীন, নাম হীন, স্থান হীন সে সকল!
অনন্ত-অনন্ত-কোটী কোটী-কল্প-মেয় কাল,
অনন্ত-প্রশান্ত-স্তব্ধ-শূন্যে ব্যাপ্ত তমােজাল !
অনাদি-পরমব্রহ্ম নিগুণ যােগি-প্রবর, ?
গভীর প্রগাঢ় ধ্যানে মগ্ন বিভু নিরন্তর।

সুর-সঙ্গীত।
নিমীলিত তিন নেত্র ত্রি-কালের পরিচয় !
অসম্ভত কাল তদা তমিস্র জঠরে রয়!
বিশাল বিস্তৃত শূন্য সুপ্ত-নীরবতাময়,
ভীষণ আঁধার-সিন্ধু নিথর নিস্তব্ধে রয় ।
কত কোটী বর্ষ-মেয়-কাল এইরূপে গত,
আদিভূত মহাযােগী মহযােগ-নিদ্রারত!
চৌদিকে অসীম-শূন্যে গভীর আঁধার-রাশি
প্রশান্ত গম্ভীর ভাবে শূন্যে শূন্যে রয় ভাসি ।
সে:মহান্ শূন্য-গর্ভে ঘাের তমােরাশি মাঝে
একটী জ্বলন্ত-জ্যোতিঃ মরি কি সুন্দর সাজে।
ভেদি তমঃ শূন্য-পথে জ্যোতি-ছটা নাহি ধায়,
উঠি উঠি মিশে আসি জ্যোতি-অঙ্গে পুনরায় !
এরূপে সচ্চিদানন্দ অধ্যেয় পুরুষ-বর,
রহেন নিগুণ-ভাবে, যােগ-নিদ্রা ঘােরতর !
অসম্ভতা প্রকৃতির ভাবী লীলা সত্ত্বাহীন
মহান্ নিস্তব্ধ ভাবে মহাশূন্যে রয় লীন !
অসীম সাগর-বক্ষে যথা সে কীটাণু দল,
অৰ্ব্বদে অৰ্ব্বদে মিলি ব্যাপ্ত রহে সিন্ধু-জল,
সে ভীম আঁধারে মিশি সূক্ষ্ম পরমাণু স্তর,
প্রশান্ত অনন্ত ব্যাপি স্তন্ধে ভাসে নিরন্তর।
সহসা একটী শ্বাস নিঃসরিলা বিশ্ব-পতি,
পূরিল ওঙ্কার রবে সে অনন্ত শূন্যপথি!

সুর-সঙ্গীত।
;
অগাধ জলধিগর্ভে বিদরিলে অগ্নিগিরি
ঘাের রবে বহি যথা উঠে সিন্ধু বক্ষ চিরি ;--
সে গভীর ব্যোম-ভেদী প্রথম প্রণব-রব
দিগন্তে ছুটিল, শূন্য সংক্ষোভিত করি সব !
দল-মলে অণু-রাশি ভীষণ ভীষণ দোলে,
প্রলয় পড়িল যেন সে বিপুল শূন্য-কোলে !
অন্তরে পরমব্রহ্ম শুনি সে প্রণব গীত
শিহরিয়া করিলেন এক আঁখি উন্মীলিত ।
কাঁপিল বিশাল ব্যোম সেই শিহরণ-বলে,
অনন্ত পুলক ব্যাপ্ত অনন্ত দিগ,মণ্ডলে !
হইল কালের জন্ম, নব দেব-শিশু প্রায়,
নিরখি পরমব্রহ্ম হন পুলকিত কায় ।
সহসা অপূৰ্ব তেজঃ দেহ হতে নিঃসরিল,
প্রকৃতি রূপিনী তদা মহাশক্তি সম্ভবিল ।
সঞ্চরিল সেই শক্তি প্রতি পরমাণু কায়,
সঞ্জীবনী গুণে যেন জড়দেহ প্রাণ পায় ।
অসংযত অণুরাশি উথলে সে শক্তি বলে,
কোটী খণ্ডে চূর্ণ হয়ে চৌদিকে 'ছুটিয়া চলে,
ভীষণ আবর্ত তুলি ঘুরিতে ঘুরিতে ধায়
অনন্তের মহাবত্মে-বিরাট বর্তুল কায়!
নেহারি সে আদ্যাশক্তি অনাদি পুরুষ-বর,
‘ইচ্ছা’রূপ হইলেন তেজোময় কলেবর।
=

সুর-সঙ্গীত।
১৭
কখন+।+ /
!
মিলিল সে তেজোরাশি সেই মহাশক্তি সনে,
প্রকৃতি-পুরুষ বদ্ধ শুভদ প্রেম মিলনে।
সেই সংমিলন ফলে তা সম্ভাবিত হয়,
সত্ব-রজ-স্তমােরূপ শক্তিমান গুণত্রয় ।
মুহূর্তে একত্রে মিলি সে মহান্ গুণ তিন,
মহাশক্তি অঙ্গে অঙ্গে ক্রমশঃ হইল লীন
সৃষ্টি
হেতু রজো-রূপ ব্ৰহ্মারূপে অধিষ্ঠান।
পালন-কারণে সত্বরূপ বিষ্ণু ভগবান!
লয় হেতু তমােৰূপ মহাযােগী মৃত্যুঞ্জয় !
নিগুণ ব্রহ্মের ইতি সগুণ মূরতিয় !
পরমা-প্রকৃতি-বলে অনন্ত-ব্ৰহ্মাণ্ডচয়,
ধাইল আকাশ-পথে তপ্ত অণু-পময়।
“সৃষ্টি” “সৃষ্টি” মহামন্দ্রে সম্ফোভিল নভঃস্থল ;
“সৃষ্টি” “সৃষ্টি” রবে ছুটে ভ্রাম্যমাণ গ্ৰহদল !
মরুভূম মাঝে যথা অসংখ্য বালুকা-রাশি,
কোটী কোটী মহাবিশ্ব মহাশূন্যে যায় ভাসি !
নাহি মানে বিঘ্ন-বাধা অদম্য সুরভি প্রায়,
অনাদি অনন্ত-শূন্যে ভীম বেগে সবে ধায় !
চূর্ণ বিচূর্ণিত কেহ,পরস্পর সংঘর্ষণে,
সংমিলিত কত বিশ্ব কত মহাবিশ্ব সনে ।
কত শত মহাবিশ্ব খণ্ডে খণ্ডে হয় লয়,
ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কত বিশ্ব তাহাতে সৃজিত হয়।
০

১৮
সুর-সঙ্গীত।
“প্রলয়” “প্রলয়” বলি উঠে তায় ভীম-রােল !
“প্রলয়” “প্রলয়” শব্দে উথলিল শূন্য-কোল ।
পরমা-প্রকৃতি হেরি হেন ভাব-বিপৰ্যয়,
সভয়ে বিধাতৃ-পদে ত্বরিতে আশ্রয় লয় ।
অমনি অপূৰ্ব শক্তি তড়িৎ-প্রবাহ প্রায়
মহাশক্তি অঙ্গ হ’তে শূন্য-পথে বেগে ধায় !
শুৰূিল সকল বিশ্ব সেই মহাশক্তি-বলে,
“শান্তিঃ শান্তিঃ” রব উঠে অনন্ত নভােমণ্ডলে ?
অকস্মাৎ অন্তরীক্ষে বিশাল-বিপুলকায়,
সংমিলিত-কোটী-কোটী-প্রজ্বলিত-উল্কা-প্রায়,
প্রখর-প্রদীপ্ত এক বিরাট ভাস্কর”-বর
মণ্ডলী মণ্ডলী করি ঘিরি ঘিরি বিশ্বেশ্বর
মহাশূন্য কোলে ফেরে যেন রে আরতি করি,
পদ্ধ-যােজন-ব্যাপী শূন্যে শূন্য-রেখা ধরি !
নিরখি সে মহাদৃশ্য পরমা-প্রকৃতি সতী,
বুঝিয়া সৃষ্টি-লীলা বিস্ময়-বিভ্রান্ত-মতি,
আপনি আপনা ভুলি ভয়-ভক্তি-বিজড়িত--
কম্পিত-কণ্ঠেতে গায় বিশ্বপতি স্তুতি-গীত।
“নমস্তে প্রণব-রূপ বাক্য-মনঃ-অগােচর! *
অব্যয়, অনন্ত-দেব, ধ্যানাতীত-যােগেশ্বর।
পরাৎপর, পরমাত্মা, শুদ্ধ জ্যোতির্ময় হরি!
পরমা-প্রকৃতিপি, বিধাতা, কলুষ-অরি।
:

সুর-সঙ্গীত।
সৎ-চিৎ-আনন্দ-রূপ অনাদি-পুরুষ বর ।
পরব্রহ্ম, পরম্-পিতা, স্বয়ম্ভু, পরমেশ্বর !
নিত্য, সত্য, শান্ত, শুদ্ধ, একমেবাদ্বিতীয়ম্ ।
নির্বিকল্প, বিশ্ব-রূপ,শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ—ওম্ !*
সহসা সমুখে,
নেহারে প্রকৃতি,
বিরাট আকৃতি পুরুষ-বর!
অনন্ত-আকাশ,
ব্যাপিয়া মুরতি,
বিশাল চরণ, বিশাল কর!
সে বিরাট-পটে,
প্রখর প্রকটে
কোটী কোটী সূৰ্য্য বিরাটকায়,
কোটী কোটী বিশ্ব,
জলন্ত-মূরতি,
মণ্ডলী করিয়া বেড়িছে তায়।
সে ব্ৰহ্মাণ্ড-মূলে,
নেহারে প্রকৃতি,
মহাশক্তি রূপে আপনি থাকি,
বিশ্ব-সৃষ্টি কাজ,
করিছে সাধন,
রজো-রূপ বল হৃদয়ে রাখি!
.
কিন্তু নাহি ঘুচে
সংশয়-কুয়াশা
ভাবিছে প্রকৃতি মনে তখন,
*এ হেন প্রদীপ্ত
জগত ব্রহ্মাণ্ডে,
বিধির কি কাজ হবে সাধন!”

সুর-সঙ্গীত। অমনি সহসা বিরাট শরীরে দেখিলা অপূৰ্ব্ব নবীন ছবি, নানা রূপ ধরি, সে বিশ্ব-মণ্ডল ফিরে শূন্যে—ঘিরি একৈক রবি ! কেহ বা ভীষণ, জ্বলন্ত-আকৃতি, ধূম-বাষ্প-ময় কাহার কায়, কেহ বা দুস্তর জলধির প্রার, দল-মলে জল দুলিছে তায় ! অনন্ত তুষার ময় দেহ কার, ঘুরে ঘুরে ফেরে অনন্ত-কোলে, যেন রে প্রফুল্ল শুভ্র শতদল, নীল জল-তলে মৃদুল দোলে ! কঠিন পাষাণ কারাে দেহখান, ভীষণ শ্মশান মতন রয়, কঠোর কঙ্কর, বুকে সূৰ্য্য-তেজ করিছে ক্ষয়! অখি-মনােহর, শ্যামল-সুন্দর কাহার নবীন কমন কায়, সাগর ভূধর, গুল্ম তরুবর নদ নদী কত শােভিছে তায়। কোথা বিরাজিত সু-চির বসন্ত, কোথাও বা ছয় ঋতুর ক্রম, উলঙ্গ ভূধর, সুর-সঙ্গীত। চির মধুময়, কুসুম-নিচয়, হাসে তরুশাখে তারকোপম। অতি মনােহর, সুন্দর সুন্দর পশু পক্ষী কোথা করিছে খেলা, কোন ভূমণ্ডলে, নিরখে বিস্ময়ে অশরীরী যত জীবের মেলা। কোন বিশ্বময় অগ্নি-গিরিচয় ভীষণ অনল নিয়ত ক্ষরে, চূর্ণ-বিচূর্ণিত, ক্ষয়িত স্থলিত, আপনার ধ্বংস আপনি করে । কোথা নিরুপম, জ্যোতিৰ্ম্ময় বপুঃ জীবের দলে, প্রফুল্ল বদনে, করে বিচরণ, চির-সুখময় জগতী-তলে! হেরে কোন ধরা, সুখ দুঃখ ভরা আধা-আধি যেন আলাে আঁধার ! কান্ত দরশন, কত জীবগণ, হাসে কঁাদে আর•করে বিহার । দেখে মহাশক্তি, সে সকল বিশ্বে দ্রুতগামী মেঘ-ছায়ার প্রায়, কোটী কোটী বর্ষ, স্তরে স্তরে স্তরে, প্রতিবিম্ব রাখি চলিয়া যায় । সুন্দর গঠন

২২
সুর-সঙ্গীত
হেরে সবিশেষ,
সৃষ্টির উন্মেষ
কোন বিশ্ব-ভূমে ক্ৰমশঃ হয়,
অণু হ’তে তৃণ,
তৃণেতে পাদপ,
কীটাণু হইতে মহাজীবচয় !
নেহারে প্রকৃতি-সতী সে সকল বিশ্ব-মাঝে,
সত্ব-তেজ বুকে ধরি নিজে নানারূপে রাজে।
কোথা-রুদ্র-বেশে মুক্ত-কেশে মহাকালে পদে দলি,
দৈত্য-রূপ তমােজালে আলােকাস্ত্রে দেয় বলি।
কোথা—অগ্নিময়ী বিশ্ব-মাঝে কালেরে শাসন করে ।
কোথা—ষড়রিপু জয় করে ষােড়শীর রূপ ধরে।
কোথা—ভুবন-মােহিনী রূপে উজলয়ে ত্রি-ভুবন ।
কোথাজলময়ী বিশ্বে বসি পাতিয়া কমলাসন।
কোথা —নিজ-ভাব-বিপরীতে ধরি রূক্ষ আচরণ,
আপনি আপন ধ্বংস করিতেছে সংসাধন!
কোথা-লােলচৰ্ম্মা সু-ভীষণা জতী রূপেতে বাস।
কোথা—জ্ঞান রূপ দণ্ড ধরি অজ্ঞানেরে করে নাশ!
কোথা—সুবর্ণ আসনে বসি দশদিক উজলিছে।
কোথা—শান্তিময়ী মাতৃরূপে শান্তি-সুধা বরষিছে।
নিরখি প্রকৃতি-দেবী সে মহান্ দৃশ্য-চয়-
সংক্ষুব্ধ হৃদয়-সিন্ধু বিস্ময়-বিপ্লব-ময়--
3

সুর-সঙ্গীত।
বুঝিলা সে সৃষ্টিতত্ত্ব তথা পালনের লীলা !
আপন কর্তব্য কিবা একে একে সমুঝিলা !
কিন্তু ভাবে মনে মনে, “এই লীলা বিধাতার
কত কাল রহিবে সে পরিণাম কিবা তার ?”
অমনি হেরিলা সেই সু-বিশাল দৃশ্যপটে
অকস্মাৎ কি বিষম ভীষণ অনর্থ ঘটে
কক্ষচ্যুত বিশ্ব-রাজ্য সংঘর্ষিত হয়ে হায়
চূর্ণ-বিচূর্ণিত সবে মিশিল ভাস্কর গায় ।
নিবিল সে সৌর-জ্যোতিঃ, মহাশূন্য তমােময় !
অনন্তের সৃষ্টি-লীলা অনন্তে হইল লয় ।--
হেরি সে প্রলয়-মূর্তি হয়ে কণ্টকিত কায়,
কম্পান্বিতা মহাশক্তি লুটাইল ব্ৰহ্ম-পায় !
প্রশান্ত মূরতি তবে ধরিলেন মহেশ্বর,
নিরমল-স্নিগ্ধ-জ্যোতিঃ-বিভাসিত কলেবর।
হেরি সে মােহন-মূৰ্ত্তি পুলকে প্রকৃতি সতী
বাহিরিলা বিশ্ব-কার্যে বিশ্বপতি করি নতি।

দ্বিতীয়-লহরী।
প্রশান্ত গম্ভীরে ওই ‘বিরাট ভাস্কর
ব্রহ্ম-লােক ঘিরি ঘিরি,
মহাশূন্য-বক্ষ চিরি,
ভ্ৰমিছে বিমান-পথে দীপ্ত-কলেবর।
সুরম নীলিম-ময় নিথর আকাশে
তপ্ত-স্বর্ণ-পিণ্ড প্রায়,
জ্বলন্ত শরীরে ধায়,
সুবর্ণকমল যেন সিন্ধু-জলে ভাসে।
নিমিষে নিমিষে কত দৃশ্য অভিনব
সে বিশাল বিম্ব-পটে,
প্রতিভাত হয়ে উঠে,
মুহূর্তে বিলীন হয়-পুনশ্চ উদ্ভব।

সুর-সঙ্গীত।
দুস্তর সাগর রূপ ধরিছে কখন,
জ্বলন্ত মহােৰ্মিদল,
বুকে করে দল-মল,
গভীর বিরাট-দৃশ্য প্রখর ভীষণ
ঝাবাত-বিলােড়িত সাগর আকার,-
জ্যোতির তরঙ্গ-গুলি,
আস্ফালয়ে ঢলি ঢলি,
উথলি উথলি উঠে হৃদি-পারাবার !
কনক-ভূধর-রাজি হৃদয়ে ধরিয়া
কখন অপূৰ্ব্ব বেশে,
সাজে কিবা হেসে হেসে,
কনকের নদ নদী উৎস ছুটাইয়া।
দুর্গম কানন সম হইছে কখন,
জ্বলন্ত বাস্পের তরু
দীর্ঘ, খৰ্ব্ব, স্কুল, সরু,
বিস্তারিয়া শাখা পত্র শােভিছে কেমন।
কাঞ্চন-নগরী প্রায় অতি মুনােহর
কখন সাজিয়া রয়,
অভ্রভেদী হৰ্মচয়,
: সুবর্ণের নীরে যেন রঞ্জিত সুন্দর!

সুর-সঙ্গীত।
এরূপে কতই রূপ প্রতি ক্ষণে ক্ষণে
ধরি সে ভাস্কর বর,
ভ্রমিতেছে নিরন্তর,
মণ্ডলী করিয়া ঘিরি ব্রহ্ম-নিকেতনে।
স্থির-নেত্রে দাঁড়াইয়া প্রকৃতি সুন্দরী
সে ভাস্কর চূড়া’পরে,
বিস্ময়-বিভ্রম-ভরে,
নিরখিছে বিধাতার সৃষ্টির চাতুরী !
বাম করে বাম গণ্ড করিয়া স্থাপিত,
নয়ন পলক হীন,
চেতনা দৃষ্টিতে লীন,
দাঁড়াইয়া আছে যেন পুতলি চিত্রিত !
নেহারে সুন্দরী চাহি বিস্ফারিত চক্ষে
ঘিরি সে ভাস্কর বর
ভ্রমে সপ্ত * প্রভাকর’
লইয়া দ্বি-সপ্ত + ‘বিশ্ব’ নিজ নিজ কক্ষে।
প্রতি প্রভাকর চক্রে ঘিরিয়া আবার
চতুঃসপ্ত * ‘দিবাকর,
ফিরিতেছে নিরন্তর,
কক্ষে লয়ে সপ্ত * গুণ ‘ভুবন’সম্ভার।
* জ্যোতির্বিদ্যা প্রকৃতি’ দৃষ্ট এই সমস্ত ‘বিরাট ভাস্কর’দি অদ্যাপি আবিষ্কার
করিতে সক্ষম হয় নাই।
ত

সুর-সঙ্গীত।
২৭
অনন্ত সাগর-বক্ষে বিম্ব-রাশি মত
সে বিপুল শূন্য গায়,
ঘুরিয়া ঘুরিয়া ধায়,
'কোটী কোটী বিশ্ব-কোটী কোটী ‘বিবস্বত’!
মধুর গম্ভীর মন্দ্রে শূন্য মুখরিত,
যেন সে ব্ৰহ্মাণ্ড-দাম,
একতানে অবিরাম,
করিছে স্রষ্টার মহা মহিমা-সঙ্গীত।
মুহূর্তে মুহূর্তে সেই ভুবন মণ্ডলে
কালের অভেদ্য মায়া
অঙ্কিত করিয়া ছায়া
গাঁথিছে অপূৰ্ব্ব-স্তর আশ্চৰ্য্য কৌশলে।
চাহিয়া চাহিয়া সতী বিস্ময়ে মগন ।
ভাব-ভরে জ্ঞানহীন,
ক্রমে ক্রমে দৃষ্টি ক্ষীণ,
ক্রমশঃ মুদিল বালা চারু ত্রি-নয়ন।
পীড়িত হৃদয় ত্রাসে,ভাৰিছে ব্যাকুলে,
“কিরূপে কেমনে হয়,
বিধাতার অভিপ্রায়
: সাধিব একাকী আমি রহি সৃষ্টি-মূলে ?”

২৮
সুর-সঙ্গীত।
“ওই যে অনন্ত কোটী নিখিল ভুবন,
কি জানি কেমন সবে,
জিজ্ঞাসিলে কেবা কবে,
কাহার সংহতি সেথা করিব ভ্রমণ ?”
সহসা উজলি সেই ভাস্কর-মণ্ডল
উদিল একটী কায়া,
—অনন্ত-পুরুষ-ছায়া-
কাঁপিল সে গ্রহ-বর করি টলমল ।
;
চমকি প্রকৃতি সতী মেলিলা নয়ন ;
দেখিলা সম্মুখে তার
দাড়ায়ে বিরাটাকার
অপরূপ রূপ এক পুরুষ-রতন !
রজত-ভূধর নিভ ধবল শরীরে
ছােটে প্রভা চমৎকার,
বক্ষে পড়ে শ্মশ্রু ভার,
দীর্ঘজটাজুট কিবা শােভিতেছে শিরে।
সমে প্রণতি, করি পুরুষ প্রবরে,
সু-স্বরে সুধান ধনি,
“কহ দেব কে আপনি,
আগমন হেথা কিবা প্রয়ােজন তরে ?”

সুর-সঙ্গীত।
কর-যােড়ে মহাশক্তি করিয়া প্রণাম
সস্মিতে পুরুষ কয়,
“শুন দেবি পরিচয়,
বিশ্বের নিয়ন্তা আমি ‘মহাকাল নাম।”
*ছিলাম সৃষ্টির
মূলে
বিধির ইচ্ছায় ;
বহু বিশ্ব ভ্ৰমিলাম,
বহু শ্ৰম করিলাম,
জীবের নিবাস-যােগ্য করিতে তাহা !
“কিছুতে নারিনু জয়ী হইতে সে রণে ;
প্রবাহের বারি প্রায়
শ্রমবারি অঙ্গে ধায়,
ডুবিল কতই বিশ্ব সে জল-প্লাবনে।
“কত শত তপ্ত বিশ্ব-গর্ভে পশি নীর,
বিদারিল হৃদি তার,
উঠি তেজ ভীমাকার,
ভৈরব আরবে নভেপরশিল শির!
‘ভগ্ন-মনে নিরুদ্যমে বসি তখন
উদিল স্মরণে তবে,
কেমনে সে সৃষ্টি হবে,
প্রকৃতি-পুরুষ দোহে না হলে মিলন।

সুর-সঙ্গীত।
“তাই আসিলাম দেবি তব সন্নিধান ;
যদি হয় অভিমতি,
এস দোঁহে মিলি সতি।
বিশ্ব-ভূমণ্ডলে করি সৃষ্টির বিধান।”
রঞ্জিত শরম-রাগে চারু গণ্ডদ্বয়,
তনুখানি রােমাঞ্চিত,
আঁখি আধ নিমীলিত,
কথা শুনি মৌনে সতী নিম্ন-দৃষ্টে রয়!
নীরব-সম্মতি পেয়ে পুরুষ-প্রবর,
প্ৰীতি-অনুরাগ ভরে,
সসমে সমাদরে
অধরে ছোঁয়ায় ধীরে ধরি সতী-কর।
অমনি সহসা উঠে উথলিয়া
আনন্দে অরুণ-হৃদয়খানি,
ঢলিয়া ঢুলিয়া, লহরী তুলিয়া,
নাচায় পুরুষ প্রকৃতি-রাণী ।
নবীন বসন্তে কুসুম-কানন
নবীন রূপেতে যেমন রাজে,
মানস-মােহন, নয়ন-রঞ্জন,
সাজি তপন সেরূপ সাজে!

সুর-সঙ্গীত।
৩১
লতা’য়ে লতা’য়ে উঠিল লতিকা
কুসুমিত নব তরুর কায়,
হাসিল কলিকা, নবীনা বালিকা,
ঢল ঢল মুখ তুলিয়া তায় !
শাখায় শাখায় বসি পিকগণ
ডাকিল মধুর পঞ্চম-স্বরে
কষিত-কাঞ্চন, দেহের বরণ,
শ্রুতিমূলে সুধা সেচন করে ?
ই
দলে দলে অলি ঘুরিয়া ফিরিয়া
মৃদুল-মধুর গুঞ্জন-ছলে,
হুলুধ্বনি দিয়া, বরণ করিয়া,
দেব-দম্পতিরে ঘুরিয়া চলে!
চারিদিক হতে উঠিল ছুটিয়া
কনকের চারু নিঝর-চয়,
নাচিয়া নাচিয়া, তরঙ্গ তুলিয়া,
বহিল সরি অমীয়-ময়।
বিলােল নয়নে চাহিয়া প্রকৃতি
অধরে টিপিয়া মধুর হাসি,
দেখিতেছে সতী, সে শােভা-সম্প্রীতি,
উছলিয়া পড়ে রূপের রাশি।

৩২
সুর-সঙ্গীত
কর-কিশলয় সাদরে ধরিয়া
কহে মহাকাল “কেন গাে সতি?
আপনা ভুলিয়া, কিসের লাগিয়া,
হইতেছ হেন বিমুগ্ধ মতি ?
“তােমারি ওরূপ—তুমিই সকল,
তােমারি রূপের ছায়াটী ওই ।
বিশ্ব-ভূ-মণ্ডল, হয় শূন্য-তল,
তােমার করুণা কটাক্ষ বই।
“চল চল সতি এবে যাই চল
তন্ন তন্ন করি দেখিতে হবে,
মিয়া সকল, জগত-মণ্ডল,
কি প্রকার জীব কোথা সম্ভবে।”
রাখি পতিস্কন্ধে বামেতর কর,
মৃদু-হাসি “চল” বলিলা সতী,
ত্যজিয়া সত্বর, সে আদিত্য-বর
চলিল উভয়ে তড়িগতি!--
.
হরষে ভ্ৰমিলা দোঁহে বিশ্ব কতশত ;
হেরিলা বিস্ময়-ভরে,
অনন্ত-আকাশ পরে,
গম্ভীর গৌরবে সবে ঘুরিছে নিয়ত।

সুর-সঙ্গীত।
৪৯
জীব-উৎপাদক বীজ নিক্ষেপিয়া তায়,
কত ক্ষুদ্ৰ গ্ৰহমালা
পশ্চাতে রাখিয়া বালা
রাষ্পময় “বৃহস্পতি” নিরখিয়া যায়।
জ্যোতির্ময় উত্তরীয় বক্ষেতে ধশ্নি
অষ্ট-শশি-বিমণ্ডিত
“শনৈশ্চর” শােভান্বিত
নিরখিলা নীলাকাশে ধাইছে ছুটিয়া।
অবশেষে “নাগলােকে” * হয়ে উপনীত
উভয়ে চৌদিকে চায়,
কিছু না দেখিতে পায়,
ঘােতর তমােজালে আঁখি আবরিত !
এই গাে “পাতালপুরী”—–কহিলেন কাল,-
“চির অন্ধকারময়,
রবির কিরণ-চয়
কভু নাহি পশে হেথা ভেদি তমােজাল।
“অই যে সমুখে সতি মসির সমান
হেরিতেছ গ্রহ । আর,
ঘােরতুম অন্ধকার,
ভীষণ-দর্শন উহা, ‘নিরয়’ আখ্যান।
০
* যুরেনস গ্রহ।
। নেপচুণ গ্রহ।
বােধ হয় এই দুই গ্রহকে “পাতালপুরী” ও “নিয়” নামে অভিহিত করায়
কাবাংশে কোন দোষ স্পর্শে নাই।

সুর-সঙ্গীত।
উঠে,
“বিকট কুৎসিত দেহ পূতিগন্ধময়।
রাশি রাশি
ধূম
মসি-বর্ণ বহি ছুটে,
উত্তপ্ত আঁধারে উহা চির-মগ্ন রয়
“বীভৎস রসের সেথা সদা সমাবেশ।
ছুটিতেছে অহর্নিশ
তীব্রতম উৎস-বিষ,
পুরীষ-প্রবাহে নিত্য প্লাবিত সে দেশ ।
“দুঃখ ক্লেশ যন্ত্রণার নিত্য-নিকেতন।
ভুবনের নরগণ
করি পাপ আচরণ
ভুঞ্জিবে অশেষ সেথা দুর্গতি-দহন ।
“হের দেবি! হের অই অজ্ঞাতে তােমার,
কুৎসিত প্রকৃতি তব
ধরিয়া কু-অবয়ব
ভয়ঙ্কর-বেশে তথা করিছে বিহার ।
“নাহি কাজ হেরি উহা চলগাে ফিরিয়া,
নানা আভরণ দিয়া,
কুতূহলে সাজাইয়া,
পুলকে ভ্ৰমির দোহে ‘ভূলােক বেড়িয়া।”

সুর-সঙ্গীত।
এত কহি সতী-কর করিয়া ধারণ
দ্রুতগতি মহাকাল
ভেদিয়া সে তমােজাল
অন্তরীক্ষ-পথে পুনঃ করিলা বােহণ

তৃতীয়-লহরী
ভীম হুতাশন গরজি গম্ভীর
মণ্ডলী করিয়া ভীষণ বলে,
যথা, যবে স্ফীত করিয়া শরীর
অটবীর পানে ছুটিয়া চলে,
ক
চকিত স্তম্ভিত পাদপ-নিচয়
তুলিয়া তুলিয়া শতেক শির
যেমনি সে বহি পানে চেয়ে রয়,
নীরব নিস্পন্দ গভীর স্থির,-
.
করি বায়ু বল, ছুটিয়া নল,
দ্বিগুণ বিক্রমে চৌৗদক গ্রাসি,
ভস্মীভূত করি ভূণ-গুল্ম-দল,
পশে বংশ-বনে যেমতি আসি,

সুর-সঙ্গীত।
পরশিয়া শিখা গগন-মণ্ডলে
বিরাট-ভৈরব আকার ধরে,
মিলিত হইয়া অনিলে-অনলে
যেনরে মুহূর্তে প্রলয় করে,
-
ভীম-শব্দ করি দহে বেণু-বন,
শত শত বােম যেন রে ফোটে।
বায়ুর হুঙ্কার, অনল গর্জন,
ঘাের প্রতিধ্বনি সঘনে ছােটে,
কাপে তরুহুল করি থর থর,
পাবকের গ্রাসে গেলরে সব।
প্রজ্বলিত করি চাৰু কলেবর,
উঠে বহি-শিখা ভেদিয়া নভ!-
মুহূর্তে করিয়া ভস্ম অবশেষ
সেই সে কানন ভুবন-ভরা,
যেমনি সে অগ্নি নিজে হয় শেষ,
ধূ ধূ করে সুধু উলঙ্গ-ধরা !
তেমতি প্রচণ্ড গভীর হুঙ্কারি
প্রকৃতির তেজঃ শরীর হতে,
ঝলকে ঝলকে অনল উগারি
ধাইল সবেগে আকাশ-পথে !

সুর-সঙ্গীত।
ভয়েতে স্তম্ভিত দিক সমুদয়,
সভয়ে কম্পিত জ্যোতিষ্কগণ,
ভাবিল অকালে হইল প্রলয়,
অনলে ব্রহ্মাণ্ড হ’ল দহন।
৩।
ছুটিল রে তেজঃ ভূ-লােকের পানে
প্রদীপ্ত করিয়া বিমান-তল
সে ভীষণ-দৃশ্য নেহারি নয়ানে
উচ্ছসিল ত্রাসে ভূতল-জল !
কোটী উল্কা সম জ্বলন্ত-আকারে,
কোটী বজ প্রায় গর্জন করি,
পড়িল সে তেজঃ বিশ্ব-পারাবারে,
হইল প্রলয় ভুবন ভরি !”
যথা অগ্নি-গিরি হৃদয় বিদারি
হুঙ্কারিয়া উঠে অনল রাশি,
দ্রব-ধাতু-স্রোত সঘনে ফুৎকারি
উদ্ধ পানে ধায় জগত গ্রাসি !
।
সে রূপে গর্জিয়া মহাসিন্ধু-বারি
উচ্ছাসি আলােড়ি “উঠিয়া হায়,
প্রকৃতির তেজঃ সহিতে না পারি !-
উড়িল আকাশে রেণুর প্রায় !

সুর-সঙ্গীত। ৫৫ জলদের রূপে ভাসিল সে জল বিমানে ধূনিত কাপাস প্রায়, প্রকৃতির তেজঃ বিদ্যুৎ-অনল- ঝলকে ঝলকে জ্বলিল তায় । কত বারি-রাশি প্রবাহ বহিয়া পশিল ভুবন-বিবর-তলে, মহাশক্তি-তেজঃ তাহাতে মিশিয়া বাড়ব-অনল রূপেতে জ্বলে । অপমৃত জল, বিলুপ্ত অনল, নগ্ন-হৃদে ধরা বিকট হাসে ! সঁাড়ায়ে উলঙ্গ ভূধর সকল, যেন পঞ্চানন শ্মশান-বাসে ! হের হের অই কি শােভা আকাশে, যেন শত শত শারদ-শশী তরুণ-অরুণে ধরি বাহু-পাশে, ভূ-তলে যেরে পড়িছে খসি। জগত-প্রতি পরমা শকতি আসন ভূলােকে পতির সনে, যেন শুভ্র-শুচি মরাল দম্পতি, উড়িছে আকাশে প্রফুল্ল-মনে।

৫৬
সুর-সঙ্গীত
কৌমুদী বিকাশে বদনের ভাসে,
রূপে দশদিক করেছে আলা
চাঁচর-চিকুর উড়িছে আকাশে,
চরণে দুলিছে তড়িৎ-মালা।
উতরিলা বালা আসি ধরাতলে,
অমনি শিহরি ধরণী-রাণী
শ্যামল কোমল নব-শম্প-দলে
পাতিল সু-চারু আসন খানি?
দাঁড়াইয়া সতী ফেলিলা নিশ্বাস
পতি-কর ধরি হরষ-ভরে,
বহিল মৃদুল সুরভি-বাতাস,
সৌরভে ভুবন আমােদ করে !
নেহারি পুলক-প্রফুল্ল-বদনে
সম্ভাষিয়া কাল প্রকৃতি রাণী
কহে,-“হের দেবি! তব আগমনে,
কি শােভা ধরিল ধরণী খানি।”
ঈষদ্ হাসিয়া স্বয়ম্ভু সুন্দরী
চাহে ধরা পানে প্রীতির ভরে,
ঢুলিয়া ঢুলিয়া তুলিয়া লহরী
চারিদিকে যেন অমিয় ঝরে।

সুর-সঙ্গীত।
৫৭
করে-করে ধরি হরষিত মনে
ভ্রমে দুই জনে ভূ-লােকময়,
ধরণীর বক্ষে সে পদ স্পর্শনে
কত শােভারাশি ফুটিয়া রয় ।
নবীন কোমল স্যাম শম্পদল
প্রকৃতির পদ ধরিয়া শিরে,
ভাবে ঢল ঢল, হইয়া বিহ্বল,
ঢলে ঢলে পড়ে অলসে ধীরে।
শীহরি অঙ্কুরি তরু নানাজাতি
পুষ্প-ফল-দলে অঞ্জলি ধরে,
বিশ্ব জননীরে—ভক্তি প্রীতে মাতি—
নত শিরে সবে প্রণতি করে ।
ভেদিয়া ভূধর ছুটিল নিঝর
কল কল স্বরে তুলিয়া তান!
দুলে দুলে চলে লহরী নিকর
ঢলে ঢলে পড়ে তরল-প্রাণ!
এরূপে প্রকৃতি পতির সংহতি
করেন ভ্রমণ ধরণী-তলে,
যথা হয় চারু চরণের গতি
শােভারাশি তথা পড়ে রে ঢ’লে !

সুর-সঙ্গীত।
ঝরে স্বেদ-বারি ললাটে কপােল,
বিকচ কমলে শিশির প্রায় !
চারু মুকুতার হার যেন দোলে
মৃদুল মৃদুল পবন-ঘায় !
জীব-উৎপাদক বীজ মিলিয়া সে স্বেদ-সনে
পড়িল ধরণী-বক্ষে স্নিগ্ধ-নীর আবরণে।
শিহরিয়া বসুমতী হেরিয়া সে মহাবীজ,
পরম পবিত্র মনে ধরিলা জঠরে নিজ ।
সন্তবিল জীব তাহে সূক্ষ্ম অণু-সমতুল,
ধরণীর ভাবী মহা-জীবের সে আদি মূল।
সহসা প্রকৃতি দেখিলা চাহিয়া
ভূতলে সে নব-জীবের লীলা,
কিবা অভিনব জীবন লভিয়া
ধরণীর বক্ষে করিছে খেলা!
ত্বরিতে ছুটিয়া হৃদয়ে ধরিয়া
পুলকে সে জীবে, কহেন সতী,
—গদগদ ভাষে পত্বিরে ডাকিয়া,
বিস্ময় হরষে পূরিত মতি!

সুর-সঙ্গীত।
৫৯
“দেখ দেখ দেব ! দেখ গাে চাহিয়া,
কি সুন্দর জীব ধরণীতলে!
কোথা হতে কিছু না পাই ভাবিয়া
সহসা উদিল—কি মায়া-বলে ।
“কি জানি কি ভাবে ভুলিল এ মন
নেহারি ইহার মােহন-কায়,
ইচ্ছা করে বুকে রাখি অনুক্ষণ
যতনে পালন করি সুধায় !”
হাসিয়া কহিলা পুরুষ-প্রবর
নিরখিয়া সেই জীবের প্রতি,
“তােমার অঙ্গজ এ জীব সুন্দর
তােমারি প্রভায় জনমে সতি।
“ধরণীর ভাবী মহাজীবগণ
এই জীব হতে জনম লবে,
কর তব শক্তি-কণা বিতরণ,
সেই বলে ক্রমে বিকাশ হবে ।
“তব স্বেদ-নীরে ইহার জনম,
নীরেতে বিকাশ পাইবে এই,
কর! দেবি নীর-নিধিরে অর্পণ .
যতনে ইহারে পালিবে সেই!

সুর-সঙ্গীত।
‘তােমার অন্তরে হেরিয়া ইহারে
যে ভাব উদয় হইল সতি।
‘মায়া’ নামে তাহা জগত-সংসারে
রহিবে--হইবে জীবের গতি।
‘এই ‘মায়া’ হবে অতুল্যা জগতে,
‘মায়ার বন্ধনে বাঁধিবে সব,
জীবের হৃদয়ে পরতে পরতে
‘মায়ার’ গাঁথনি ব্রহিবে তব !”
পরমা প্রকৃতি শুনিয়া ভারতী,
লয়ে সে কীটাণু যতন করি,
যথা পরিমাণ প্ৰদানি শকতি
জলধির কোলে দিলেন ধরি ।
উৎসুক নয়নে চাহিয়া চাহিয়া
বিকাশ-রহস্য হেরেন তায়,
কোটি কোটি জীব মুহূর্তে জন্মিয়া
ক্রমশঃ ক্রমশঃ উন্নতি পায়।
প্রত্যেক ক্রমেতে পরমা-শকতি
দেন শক্তি নব প্রাণীর মূলে,
সেই শক্তিবলে জীবের সন্ততি
লতে উচ্চ স্তর গুণ্ঠন খুলে।

সুর-সঙ্গীত।
হইল ক্রমেতে মীনের আকার,
শ্রেষ্ঠতম জীব জলধি-তলে ।
নবীন জীবনে করয়ে বিহার
প্রশান্ত গভীর অতল-জলে !
ক্রমে মীন হ’তে ‘কমঠ’ শরীরে
হইল উন্নত শক্তির বলে,
অপূৰ্ব্ব মিশ্রনে হয় ধীরে ধীরে
‘বরাহ’ জনম ধরণীতলে।
জনমিল জীব কতই প্রকার
পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গচয়,
কত সরীসৃপ ভীষণ আকার
জনমিল পুনঃ পাইল লয় ।
জন্মিল যােজন-বিস্তৃত-শরীর,
পৃথুল-জঠর যথা বারণ,
রক্তিম-নয়ন—প্রচণ্ড মিহির--
করালবদন ভুজঙ্গগণ !
দীর্ঘ চতুষ্পদে সু-বক্র নখর,
বিদারে ধরণী বিষম ঘাতে।
ভীম গরজনে কাপে চরাচর,
বহে যেন ঝড় নিশ্বাস-বাতে।

৬২
সুর-সঙ্গীত।
সু-বিশাল পক্ষে আবরি গগন,
উড়িল বিপুল বিহঙ্গ-বর।
পক্ষ-বায়ু-ঘাতে চূর্ণ তরুগণ,
বজ্রসম তীব্র ভীষণ-স্বর।
আধ কূৰ্ম্ম আধ গবের গঠন
প্রকাণ্ড-শরীর জীব-নিচয়
জনমিল অতি বীভৎস-দর্শন,
করে বিচরণ ভুবনময়।
মহা-শূর্প-সম পক্ষ বিভীষণ,
ঘাের কৃষ্ণ অজগরের প্রায়,
কুলালের চক্র ঘুরে দু’নয়ন
জনমিল প্রাণী বিশালকায়।
চতুর্হস্ত আর চরণ দ্বিতয়,
আধ সিংহ আধ নরের মত,
জনমিল জীব হেরিতে বিস্ময়
দশন জ্বলন্ত-অশনি-বৎ।
শ্রেষ্ঠ হতে শ্রেষ্ঠ আরাে শ্রেষ্ঠতম
কত জীব জন্মে অবনী’পর,
কিন্তু নাহি হয় পরিতৃপ্ত মন,
জন্মে প্রাণের আদর্শ—“নর” ।

সুর-সঙ্গীত।
হতাশে প্রকৃতি ফিরায়ে বদন
শরমে চাহিলা পতির পানে,
হাসি হাসি মুখে পুরুষ তখন
কহিলেন কথা সতীর স্থানে,-
'এরূপে না হবে মানব জনম,
!
বৃথা হবে আশা, শুন কথা মম !
পূত-উপাদানে নর-কলেবর
হইবে গঠিতে, -পৃথিবী ভিতর
হবে শ্রেষ্ঠ নর,—জীবের প্রধান,
কমনীয়-বপু-দেবতা সমান !
মম তেজঃ লয়ে-মম ছায়া সনে--
তব শক্তি-রাশি মিলায়ে যতনে,
ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুত, আকাশ,
পঞ্চভূতে করি একত্রে বিকাশ,
হইবে গঠিতে মানব শরীর
দয়া মায়া প্রীতি হৃদয়ে দিয়া।
কা"
অফুট কুসুম-কলিকা সমান
দিতে হবে তাহে স্মৃতি, মেধা, জ্ঞান।
—যথা হয় কলি ক্রমশঃ প্রকাশ
ক্রমে হবে নরে বুদ্ধির বিকাশ।
জ্ঞানালােকে
হবে মণ্ডিত হিয়া !

৬৪
সুর-সঙ্গীত।
নর-জন্ম-তত্ত্ব-কথা শুনি সতী
মিলিল পুলকে পতির সংহতি।
ধরি পতি তেজঃ পবিত্র অন্তরে,
নিজ শক্তি সহ সংমিলিত করে,
পতি-ছায়া সনে পঞ্চভূত দিয়া
গড়িল সুচারু মানব কায় ।
দিলা বৃত্তি রাশি হৃদয় পূরিয়া,
দিল ধৃতি, জ্ঞান, অন্তর ভরিয়া,
হৃদপিণ্ড ভরি দিলা প্রাণ-বায়ু,
দিলা সে চেতনা, দিলা পরমায়ু,
পাছে দিলা মহা শকতি তায়।
জন্মিল মানব সুন্দর-গঠন।
পুলকে ধরণী হাসিল মােহন।
হাসে দশদিক স্থাবর জঙ্গম,
অন্তরীক্ষে গান হয় সুধাসম।
পুরুষ প্রকৃতি থাকিয়া অন্তরে
মানবের কাৰ্য দেখেন চেয়ে।
সহসা মানব নিদ্রোর্থিত প্রায়
চমকি উঠিয়া চারিদিকে চায়।
চাহে ধরাধানে বিস্তৃত নয়নে,
স্থির দৃষ্টে পুনঃ নৈহারে গগনে।

সুর-সঙ্গীত।
৪৯
জীব-উৎপাদক বীজ নিক্ষেপিয়া তায়,
কত ক্ষুদ্ৰ গ্ৰহমালা
পশ্চাতে রাখিয়া বালা
বাষ্পময় “বৃহস্পতি” নিরখিয়া যায়।
জ্যোতির্ময় উত্তরীয় বক্ষেতে ধরিয়া
অষ্ট-শশি-বিমণ্ডিত
“শনৈশ্চর’ শােভান্বিত
নিরখিলা নীলাকাশে ধাইছে ছুটিয়া।
অবশেষে “নাগলােকে” * হয়ে উপনীত
উভয়ে চৌদিকে চায়,
কিছু না দেখিতে পায়,
ঘােরর তমােজালে আঁখি আবরিত
এই গাে “পাতালপুরী”—কহিলেন কাল,
“চির অন্ধকারময়,
রবির কিরণ-চয়
কভু নাহি পশে হেথা ভেদি তমােজাল ।
“অই যে সমুখে সতি মসির সমান
হেরিতেছ গ্রহ । আর,
ঘােরতম অন্ধকার
ভীষণ-দর্শন উহা, ‘নিরয়’ আখ্যান ।
.
* য়ুরেন গ্রহ।
+ নেপচুপ গ্রহ।
বােধ হয় এই দুই গ্রহকে “পাতালপুরী” ও
ও নিয়" নামে অভিহিত করায়
কাবাংশে কোন দোষ স্পর্শে নাই।

সুর-সঙ্গীত।
“বিকট কুৎসিত দেহ পূতিগন্ধময় !
রাশি রাশি ধূম উঠে,
মসি-বর্ণ বহি ছুটে,
উত্তপ্ত আঁধারে উহা চির-মগ্ন রয় ।
“বীভৎস রসের সেথা সদা সমাবেশ।
ছুটিতেছে অহর্নিশ
তীব্রতম উৎস-বিষ,
পুরীষ-প্রবাহে নিত্য প্লাবিত সে দেশ ?
“দুঃখ ক্লেশ যন্ত্রণার নিত্যনিকেতন
ভুবনের নরগণ
করি পাপ আচরণ
ভুঞ্জিবে অশেষ সেথা দুর্গতি-দহন ?
“হের দেবি। হের অই অজ্ঞাতে তােমার,
কুৎসিত প্রকৃতি তব
ধরিয়া কু-অবয়ব
ভয়ঙ্কর বেশে তথা করিছে বিহার ।
“নাহি কাজ হেরি উহ চলগাে ফিরিয়া,
নানা আভরণ দিয়া,
“কুতূহলে সাজাইয়া,
পুলকে ভ্ৰৰিব দেহে ‘ভূলােক বেড়িয়া।”

সুর-সঙ্গীত।
৫১
এত কহি সতী-কর করিয়া ধারণ
দ্রুতগতি মহাকাল
ভেদিয়া সে তমােজাল
অন্তরীক্ষ-পথে পুনঃ করিলা রেহণ।

তৃতীয়-লহরী।
ভীম হুতাশন গরজি গম্ভীর
মণ্ডলী করিয়া ভীষণ বলে,
যথা, যবে স্ফীত করিয়া শরীর
অটবীর পানে ছুটিয়া চলে,
চকিত স্তম্ভিত পাদপ-নিচয়
তুলিয়া তুলিয়া শতেক শির
যেমনি সে বঙ্কুি পানে চেয়ে রয়,
নীরব নিস্পন্দ গভীর স্থির,
করি বায়ু বল, ছুটিয়া অনল,
দ্বিগুণ বিক্রমে চৌদিক গ্রাসি,,
ভস্মীভূত, করি তৃণ-গুল্ম-দল,
পশে বংশ-বনে যেমতি আসি,-

সুর-সঙ্গীত।
পরশিয়া শিখা গগন-মণ্ডলে
বিরাট-ভৈরব আকার ধরে,
মিলিত হইয়া অনিলে-অনলে
যেনরে মুহূর্তে প্রলয় করে,
ভীম-শব্দ করি দহে বেণু-বন,
শত শত বােম যেন রে ফোটে
বায়ুর হুঙ্কার, অনল গর্জন,
ঘাের প্রতিধ্বনি সঘনে ছছাটে,
কাপে তরুদল করি থর থর,
পাবকের গ্লাসে গেলরে সর্ব!
প্রজ্বলিত করি চারু কলেবর,
উঠে বহি-শিখা ভেদিয়া নভ!
মুহূর্তে করিয়া ভস্ম অবশেষ
সেই সে কানন ভুবন-ভরা,
যেমনি সে অগ্নি নিজে হয় শেষ,
ধূ ধূ করে সুধু উলঙ্গ-ধরা!
তেমতি প্রচণ্ড গভীর হুঙ্কারি
প্রকৃতির তেজঃ শরীর হতে,
ঝলকে ঝলকে অনল উখারি ,
ধাইল সবেগে আকাশ-পথে !

৫৪
সুর-সঙ্গীত
ভয়েতে স্তম্ভিত দিক সমুদয়,
সভয়ে কম্পিত জ্যোতিষ্কগণ,
ভাবিল অকালে হইল প্রলয়,
অনলে ব্রহ্মাণ্ড হ’ল দহন ।
;
রে তেজঃ ভূ-লােকের পানে
প্রদীপ্ত করিয়া বিমান-তল
সে ভীষণ-দৃশ্য নেহারি নয়ানে
উচ্ছসিল ত্রাসে ভূতল-জল!
কোটী উল্কা সম জ্বলন্ত-আকারে,
কোটী বস্ত্র প্রায় গর্জন করি,
পড়িল সে তেজঃ বিশ্ব-পারাবারে,
হইল প্রলয় ভুবন ভরি।
যথা অগ্নি-গিরি হৃদয় বিদারি
হুঙ্কারিয়া উঠে অনল রাশি,
দ্রব-ধাতু-স্রোত সঘনে ফুৎকারি
উদ্ধ পানে ধায় জগত গ্রাসি !
সে রূপে গর্জিয়া মহাসিন্ধু-বারি
উচ্ছাসি আলােড়ি উঠিয়া হায়,
প্রকৃতির তেজঃ সহিতে না পারি ।
উড়িল আকাশে রেণুর প্রায়।

সুর-সঙ্গীত।
জলদের রূপে ভাসিল সে জল
বিমানে ধূনিত কাপাস প্রায়,
প্রকৃতির তেজঃ বিদ্যুৎ-অনল--
ঝলকে ঝলকে জ্বলিল তায় ।
কত বারি-রাশি প্রবাহ বহিয়া
পশিল ভুবন-বিবর-তলে,
মহাশক্তি-তেজঃ তাহাতে মিশিয়া
বাড়ব-অনল রূপেতে জ্বলে।
অপসৃত জল, বিলুপ্ত অনল,
মগ্ন-হৃদে ধরা বিকট হাসে।
দাঁড়ায়ে উলঙ্গ
ভূধর সকল,
যেন পঞ্চানন শ্মশান-বাসে !
হের হের অই কি শােভা আকাশে,
যেন শত শত শারদ-শশী
তরুণ-অরুণে ধরি বাহু-পাশে,
ভূ-তলে যেনরে পড়িছে খসি।
জগত-প্রসূতি পরমা শকতি
আসেন ভূলােকে পতির সনে,
যেন শুভ্র-শুচি মরাল দম্পতি,
উড়িছে আকাশে প্রফুল্ল-মনে!

সুর-সঙ্গীত।
কৌমুদী বিকাশে বদনের ভাসে,
রূপে দশদিক করেছে আলা
চাঁচর-চিকুর উড়িছে আকাশে,
চরণে দুলিছে তড়িৎ-মালা !
উতরিলা বালা আসি ধরাতলে,
অমনি শিহরি ধরণী-রাণী
শ্যামল কোমল নব-শম্প-দলে
পাতিল সু-চারু আসন খানি?
দাঁড়াইয়া সতী ফেলিলা নিশ্বাস
পতি-কর ধরি হরষ-ভরে,
বহিল মৃদুল সুরভি-বাতাস,
সৌরভে ভুবন আমােদ করে।
নেহারি পুলক-প্রফুল্ল-বদনে
সম্ভাষিয়া কাল প্রকৃতি রাণী
কহে,—“হের দেবি! তব আগমনে,
কি শােভা ধরিল ধরণী খানি।”
স্বয়ম্ভ-সুন্দরী
ঈষ হাসিয়া
চাহে ধরা পানে প্রীতির ভরে,
ঢুলিয়া দুলিয়া তুলিয়া লহরী
চারিদিকে যেন অমিয় ঝরে।

সুর-সঙ্গীত।
করে-করে ধরি হরষিত মনে
ভ্রমে দুই জনে ভূলােকময়,
ধরণীর বক্ষে সে পদ স্পর্শনে
কত শােভারাশি ফুটিয়া রয়।
নবীন কোমল শ্যাম শম্পদল
প্রকৃতির পদ ধরিয়া শিরে,
ভাবে ঢল ঢল, হইয়া বিহ্বল,
ঢলে ঢলে পড়ে অলসে ধীরে।
শীহরি অঙ্কুরি তরু নানাজাতি
পুষ্প-ফল-দলে অঞ্জলি ধরে,
বিশ্ব জননীরে—ভক্তি প্রতে মাতি-
নত শিরে সবে প্রণতি করে।
ভেদিয়া ভূধর ছুটিল নিঝর
কল কল স্বরে তুলিয়া তান!
দুলে দুলে চলে লহরী নিকর
চুলে ঢলে পড়ে তরল-প্রাণ।
এরূপে প্রকৃতি পতির সংহতি
করেন ভ্রমণ ধরণী-তলে,
যথা হয় চারু চরণের গতি
শােভারাশি তথা পড়ে রে ঢ’লে।

সুর-সঙ্গীত।
ঝরে স্বেদ-বারি ললাটে কপােলে,
বিকচ কমলে শিশির প্রায় !
চারু মুকুতার হার যেন দোলে
মৃদুল মৃদুল পবন-ঘায় !
জীব-উৎপাদক বীজ মিলিয়া সে স্বেদ-সনে
পড়িল ধরণী-বক্ষে স্নিগ্ধ-নীর আবরণে !
শিহরিয়া বসুমতী হেরিয়া সে মহাবীজ,
পরম পবিত্র মনে ধরিলা জঠরে নিজ !
সম্ভবিল জীব তাহে সূক্ষ্ম অণু-সমতুল,
ধরণীর ভাবী মহা-জীবের সে আদি মূল !
সহসা প্রকৃতি দেখিলা চাহিয়া
ভূতলে সে নব-জীবের লীলা,
কিবা অভিনব জীবন লভিয়া
ধরণীর বক্ষে করিছে খেলা।
০
।
ত্বরিতে ছুটিয়া হৃদয়ে ধরিয়া
পুলকে সে জীবে, কহেন সতী,
—গদগদ ভাষে পতিরে ডাকিয়া,
বিস্মর হরষে পূরিত মতি!

সুর-সঙ্গীত।
“দেখ দেখ দেব ! দেখ গাে চাহিয়া,
কি সুন্দর জীব ধরণীতলে !
কোথা হতে কিছু না পাই ভাবিয়া
সহসা উদিল--কি মায়া-বলে !
“কি জানি কি ভাবে ভুলিল এ মন
নেহারি ইহার মােন-কায়,
ইচ্ছা করে বুকে রাখি অনুক্ষণ
যতনে পালন করি সুধায় !”
হাসিয়া কহিলা পুরুষ-প্রবর
নিরখিয়া সেই জীবের প্রতি,
“তোমার অঙ্গজ এ জীব সুন্দর
তােমারি প্রভায় জনমে মতি।
“ধরণীর ভাবী মহাজীবগণ
এই জীব হতে জনম লবে,
কর তব শক্তি-কণা বিতরণ,
সেই বলে ক্রমে বিকাশ হবে।
“তব স্বেদ-নীরে ইহার জনম,
নীরেতে বিকাশ পাইবে এই,
কর দেবি নীর-নিধিরে অর্পণ,
যতনে ইহারে পালিবে সেই।

সুর-সঙ্গীত।
“তােমার অন্তরে হেরিয়া ইহারে
যে ভাব উদয় হইল সতি।
‘মায়া’ নামে তাহা জগত-সংসারে
রহিবে—হইবে জীবের গতি।
“এই ‘মায়া’ হবে অতুল্যা জগতে,
‘মায়ার বন্ধনে বাঁধিবে সব,
জীবের হৃদয়ে পরতে পরতে
‘মায়ার’ গাঁথনি রহিবে তব ?
পরমা প্রকৃতি শুনিয়া ভারতী,
লয়ে সে কীটাণু যতন করি,
যথা পরিমাণ প্ৰদানি শকতি
জলধির কোলে দিলেন ধরি ।
উৎসুক নয়নে চাহিয়া চাহিয়া
বিকাশ-রহস্য হেরেন তায়,
কোটি কোটি জীব মুহূর্তে জন্মিয়া
ক্রমশঃ ক্রমশঃ উন্নতি পায়।
৫
প্রত্যেক ক্রমেতে পরমা-শকতি
দেন শক্তি নব প্রাণীর মূলে,
সেই শক্তি বলে জীবের সন্ততি
লভে উচ্চ স্তর গুণ্ঠন খুলে।

সুর-সঙ্গীত।
৬১
হইল ক্রমেতে মীনের আকার,
শ্রেষ্ঠতম জীব জলধি-তলে !
নবীন জীবনে করয়ে বিহার
প্রশান্ত গভীর অতল-জলে !
ক্রমে মীন হ’তে ‘কমঠ’ শরীরে
হইল উন্নত শক্তির বলে,
অপূৰ্ব্ব মিশ্রনে হয় ধীরে ধীরে
‘বরাহ’ জনম ধরণীতলে।
জনমিল জীব কতই প্রকার
পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গচয়,
কত সরীসৃপ ভীষণ আকার
জনমিল পুনঃ পাইল লয় ।
জন্মিল যােজন-বিস্তৃত-শরীর,
পৃথুল-জঠর যথা বারণ,
রক্তিম-নয়ন—প্রচণ্ড মিহির
করাল-বদন ভুজঙ্গগণ।
দীর্ঘ চতুষ্পদে সু-বক্ৰ নখর,
বিদারে ধরণী বিষম ঘাতে।
ভীম গরজনে কাপে চরাচর,
বহে যেন ঝড় নিশ্বাস-বাতে।

সুর-সঙ্গীত।
সু-বিশাল পক্ষে আবরি গগন,
উড়িল বিপুল বিহঙ্গ-বর।
পক্ষ-বায়ু-ঘাতে চূর্ণ তরুগণ,
বজ্রসম তীব্র ভীষণস্বর ।
আধ কূৰ্ম্ম আধ গবের গঠন
প্রকাণ্ডশরীর জীব-নিচয়
জনমিল অতি বীভৎস-দর্শন,
করে বিচরণ ভুবনময়।
মহা-শূর্প-সম পক্ষ বিভীষণ,
ঘাের কৃষ্ণ অজগরের প্রায়,
কুলালের চক্র ঘুরে দু’নয়ন---
জনমিল প্রাণী বিশালকায়।
চতুর্হস্ত আর চরণ দ্বিতয়,
আধ সিংহ আধ নরের মত,
জনমিল জীব হেরিতে বিস্ময়
দশন জ্বলন্ত-অশনি-বৎ।
শ্রেষ্ঠ হতে শ্রেষ্ঠ আরাে শ্রেষ্ঠতম
কত জীব জন্মে অবনী’পর,
কিন্তু নাহি হয় পরিতৃপ্ত মন,
জন্মে প্রাণের আদর্শ-“না”।

সুর-সঙ্গীত।
হতাশে প্রকৃতি ফিরায়ে বদন
শরমে চাহিলা পতির পানে,
হাসি হাসি মুখে পুরুষ তখন
কহিলেন কথা সতীর স্থানে,--
এরূপে না হবে মানব জনম,
বৃথা হবে আশা, শুন কথা মম।
পূত-উপাদানে নর-কলেবর
হইবে গঠিতে,—পৃথিবী ভিতর
হবে শ্রেষ্ঠ নর,-জীবের প্রধান,
কমনীয়-বপু-দেবতা সমান!
মম তেজঃ লয়ে--মম ছায়া সনে-
তব শক্তি-রাশি মিলায়ে যতনে,
ক্ষিতি, অপ, তেজঃ, মরুত, আকাশ,
পঞ্চভূতে করি একত্রে বিকাশ,
হইবে গঠিতে মানব শরীর
দয়া মায়া প্রীতি হৃদয়ে দিয়া
অফুট কুসুম-কলিক সমান
দিতে হবে তাহে স্মৃতি, মেধা, জ্ঞান
জ্ঞান।
—যথা হয় কলি ক্রমশঃ প্রকাশ
ক্রমে হবে নরে বুদ্ধির বিকাশ।
জ্ঞানালােকে হবে মণ্ডিত হিয়া !

৬৪
সুর-সঙ্গীত।
নর-জন্ম-তত্ত্ব-কথা শুনি সর্তী
মিলিল পুলকে পতির সংহতি।
ধরি পতি তেজঃ পবিত্র অন্তরে,
নিজ শক্তি সহ সংমিলিত করে,
পতি-ছায়া সনে পঞ্চভূত দিয়া
গড়িল সুচারু মানব কায় ।
দিলা বৃত্তি রাশি হৃদয় পূরিয়া,
দিলা ধৃতি, জ্ঞান, অন্তর ভরিয়া,
হৃদপিণ্ড ভরি দিলা প্রাণ-বায়ু ,
দিলা সে চেতনা, দিলা পরমায়ু,
পাছে দিলা মহা শকতি তায়।
জন্মিল মানব সুন্দর-গঠন।
পুলকে ধরণী হাসিল মােহন।
হাসে দশদিক স্থাবর জঙ্গম,
অন্তরীক্ষে গান হয় সুধাসম।
পুরুষ প্রকৃতি থাকিয়া অন্তরে
মানবের কাৰ্য্য দেখেন চেয়ে।
‘সহসা মানব নিদ্রোথিত প্রায়
চমকি উঠিয়া চারিদিকে চায় ।
চাহে ধরাঙানে বিস্তৃত নয়নে,
স্থির দৃষ্টে পুনঃ নেহারে গগনে।

সুর-সঙ্গীত।
৬৫
তন্ন তন্ন করি করে নিরীক্ষণ
আপনার অঙ্গ, আপন গঠন
;
চির অন্ধ জন নেহারে যেমন
সহসা নয়ন-রতন পেয়ে।
কিন্তু স্ফুৰ্ত্তিহীন অন্তর তাহার,
জীবন্তে যেন রে জড়ের আকার !
হৃদয়ের ভাব উদাস উদাস,
নিঝুম গম্ভীর মুখে নাহি ভাস।
নাহি সরে বাক্য বদনে তার ।
নিরখি প্রকৃতি পতি পানে চান,
ভগ্ন-হৃদি খানি, বিষন্ন বয়ান।
বুঝি মনােভাব কহিলেন কাল
“গঠহ প্রকৃতি ঘুচিবে জঞ্জাল !
প্রকৃতি বিহনে পুরুষ নয়নে
শূন্য-ময় এই জগদাগার।
“পুরুষে গড়িলে যেই উপাদানে,
সেই সব দেবি! কর এক স্থানে,
দিয়া তব শক্তি তােমার ছায়ায়,
মম তেজ-কলা মিলাও তাহায়,
জন্মিবে রমণী অংশেতে তােমার।
প্রকৃতি-পুরুষে পূরিবে সংসার !”

৬৬
সুর-সঙ্গীত।
শুনিয়া প্রকৃতি, পুলকিত অতি,
গঠিলেন নারী পবিত্র-মনে।
উথলিল স্নেহ নেহারি মুরতি,
ঝরে ক্ষীর-ধারা যুগল-স্তনে!
মুকুরে বিম্বিত ছায়ার মতন,
দীপ হ'তে দীপ্ত প্রদীপ-প্রায়,
প্রকৃতির চারু রূপের কিরণ
প্রতিভাত হ’ল নারীর কায় ।
লাবণ্য-সাগরে বহিল পবন,
উঠিল রুচির তরঙ্গ দুটী !
যুগ্ম শশধরে হইল মিলন,
দুটী হেম-পদ্ম উঠিল ফুটি।
বিমােহিত দেব ত্রি-কাল ঈশ্বর,
যুগল-মাধুরী দর্শন করি,
ছুটিল অন্তরে প্রীতির নিঝর,
বহিল প্রবাহ হৃদয় ভরি !
'হেরেন কাহারে ?—ভাবিয়া বিহ্বল
একটী প্রেমের প্রফুল্ল ফুল!
অপর স্নেহের কলিকা বিমল,
উভয়েরি যেগগা নাহিক তুল!

সুর-সঙ্গীত।
৬৭
ঈষৎ হাসিয়া প্রকৃতি সুন্দরী
বুঝিয়া তখন পতির মন,
দুহিতার কর নিজ করে ধরি
পূজিলেন আসি পতি-চরণ!
নিস্তব্ধ গায়ক-বর বীণা নামাইলা,
ললাটের স্বেদ-বারি বসনে মুছিলা।
কহিলা সে দেবরাজে সু-দীন বচনে,
“কেন ওহে সুর-নাথ এই হীন জনে,
থাকিতে কোকিল-কণ্ঠ সু-কোবিদগণ,
গাইতে এ মহা-গীত করিলে বরণ ?
সহজে দুৰ্বল আমি,-অসাধ্য আমার
করিতে ‘হেমের’ তারে গভীর ঝঙ্কার।
‘নবীনের’ সু-মধুর উচ্চ-কণ্ঠ-রব
নাহিক আমার, তবে কেমনে বাসব !
তুষিব হৃদয় তব সুমধুর গানে,
লভিব যশের মালা সভা বিদ্যমানে?”
শুনি সুরপতি
পুনঃ সাধুকালে
তুষিয়া গায়ক-বরে,
আদেশিলা তারে গাইতে আবার
সুধা-পাত্র দিয়া করে।
'।

সুর-সঙ্গীত।
পিয়িয়া অমৃত
গায়ক প্রবর
নমি শিরঃ সভা-তলে,
করিল হরষে
বীণায় ঝঙ্কার
সুধা রাশি ক্ষরে গলে ।

চতুর্থ-লহরী।
( স্থিতি)
মধুর যামিনী,
চত্রমা-শালিনী
বিমল-রজত-কিরণ-ধারা
ঢালিতেছে শশী, নীলাকাশে বসি,
ভাবের আবেশে আপনা-হারা!
তারকা-বালিকা, নীল-যবনিকা
ধীরে ধীরে তুলি দেখিছে চেয়ে,
* ধরণী কেমন
পরেছে ভূষণ,
মােহন-চাদের কিরণ পেয়ে !
সুক্ষ্ম সুললিত,
সুধা-ধবলিত,
উড়ে যায় মেঘ দু-একখানি,

৭০ সুর-সঙ্গীত। যেন কুতূহলে, বসন-অঞ্চলে, পবন ঢােন প্রকৃতি-রাণী! মনাে-বিমােহন সুরভি পবন মৃদু মৃদু কিবা বহিয়া যায়, কৃশাঙ্গী বল্লরী নৃত্য করি করি, সুধাংশু-কিরণ মাখিছে কায় । তরুর শীরষে বসিয়া হরষে তবকে তবকে কুসুম-রাশি, সুরবালা প্রায়, অধর আগায় চলায় মধুর মৃদুল হাসি। মুখের আবাসে বসিয়া উল্লাসে দু-একটী পাখী করিছে গানও উচ্চে কণ্ঠ তুলি ক্ষুদ্র ঝিল্লী গুলি ভাবে ভাের হয়ে ধরিছে তান! মাখি শুভ্র-কর আছে বসি মহাযােগীর প্রায়। করি ঝর ঝর নিঝর-নিকর কৌমুদী মথিয়া চলিয়া যায়। প্রকৃতি-সুন্দরী চতুরালি করি, খুলিয়া যেনরে রূপের-হাট, খিন্ন-মতি নর তুষিতে অন্তর দেখান তাহারে শােভার-নাট! নীরবে ভূধর

সুর-সঙ্গীত।
৭১
এই নিশাকালে-এ হেন সময়ে
মিছে মানব উদ্ভ্রান্ত হৃদয়ে ।
স্থির-দৃষ্টে চাহি ভূতলের
পানে
চলে ধীরে ধীরে আপন মনে ;
স্বভাবের সেই শশাভা বিমােহন
বারেক নয়নে করেন দর্শন,
বাজেনা তাহার হৃদয়ের তার
প্রকৃতির সেই গানের সনে।
উদ্দেশ্য-বিহীন গতি অবিরাম,
নাহি মানে বাধা না করে বিশ্রাম,
দেখিয়া সে ভাব ব্রততী-বালিকা
চরণে বেড়িয়া ধরিছে তায়।
-ক্ষেপ না করি চলিছে মানব
বি-বাধা সব করি পরাভব,
লুটায় লতিকা আহা মরি মরি,
ছিন্ন-ভিন্ন হয় ললিত-কায়!
=
চলিছে মানব না জানে কোথায় ? '
কেন বা চলিছে, কিসের আশায় ?
কিছু নাহি জানে, কি জাগিছে প্রাণে
চলিছে কলের পুতলি যেন!

৭২
সুর-সঙ্গীত।
হৃদয় গম্ভীর সাগর সমান,
বহে একটী তরঙ্গ-তুফান!
অধর-বেলায় নাহিক খেলায়
একটী হাসির লহরী-ফেন !
উঠে গিরি-শিরে, করে করে
ভ্রমে শূন্য-মনে বিকল-অন্তরে।
জানে আপনা, কিসের ভাবনা,
কেন বা ভাবিছে,কেমন করি ।
এমিতে ভ্রমিতে সহসা আসিয়া
নিঝরিণী তীরে বহে দাড়াইয়া ;
ঝর ঝর স্বরে বারি রাশি ঝরে
সুধাকর-কর হৃদয়ে ধরি !-
নাহি তাহে দৃষ্টি—গম্ভীরে মানব
দাড়াইয়া কূলে নিস্পন্দ নীরব
পাষাণে গঠিত মূরতি যেনরে
বিজুনে স্থাপিত করিল কেহ!
চকিত নয়না হরিণী সকল
আসি দলে দলে পান করি স্কুল
বিস্ময়-স্ফারিত লােচনে চাহিয়া
হেরে মানবের নবীন দেহ!
।

সুর-সঙ্গীত।
৭৩
ধীরে ধীরে সবে নিকটে আসিয়া
তুলিয়া বদন চাহিয়া চাহিয়া
দেখে মুখ তার নয়ন মেলিয়া,
নীরবে কি যেন জিজ্ঞাসে তায় ।
নিস্পন্দ মানব না দেখে চাহিয়া,
নিশ্চল নয়নে রহে দাঁড়াইয়া ।
দেখিয়া সে ভাব হরিণী সকল
ঘ্রাণ করি দেহ চলিয়া যায় ।
একিরে সহসা ভুবন ভরিয়া
শােভা রাশি যেন উঠিল ফুটিয়া,
ঢালিল সুধাংশু খুলিয়া হৃদয়
সুধার আসার সহস্র-ধারে।
মেলিয়া নয়ন হাসিল কলিকা,
ঢলিয়া ঢলিয়া নাচিল লতিকা,
মৃদুল মৃদুল বহিল অনিল,
ছুটিতে না পারে সৌরভ-ভারে
৩
সুমধুর শব্দে বাজিল বাজনা,
-কে বাজায় কোথা নাহি যায় জানা !
উঠে সুধাময় সঙ্গীত লহরী,
প্রতিধ্বনি তুলি ভাসিয়া যায় ।

৭৪
সুর-সঙ্গীত।
নাচিয়া নাচিয়া ছুটিতে ছুটিতে
নিঝরের বারি স্তব্ধ আচম্বিতে।
যেন কোন নব শােভা নিরখিতে
গদ গদ ভাবে নীরবে চায় ।
একিরে আবার নূতন ব্যাপার !
খুলিয়া নূতন শােভার ভাণ্ডার
শত শত শশী হয়ে একাকার
ভূতলে যেনরে উদিল আসি।
কেরে অই নারী অতুল সুন্দরী,
রূপের বিভায় দিক আলাে করি,
আসে ধীরি ধরি, আহা মরি মরি,
অধরে দুলিছে মধুর হাসি !
ভুবনের ভাবী নরের জননী
পুরুষে ভেটিতে আসেন আপনি,
অঙ্গে অঙ্গে যেন হাসে নিশামণি
সঙ্গে সঙ্গে শােভা ছুটিয়া যায় !
প্রকৃতির ছায়ে রমণী গঠিতা,
পুরুষ বিহনে আশ্রয় রহিতা,
স্বতঃ সে অভাব পূরণে চেষ্টিত,
কিন্তু নাহি জানে প্রাণে কি চায়,

সুর-সঙ্গীত।
৭৫
দশদিকে তারে অজ্ঞাত প্রেরণা
চালায় সতত ;-অপূর্ণ বাসনা
পরিণতি-লাভ-চেষ্টা অগণনা
কামিনীর মনে আনি যােগায় !-
কুসুম-ভূষণে অঙ্গ সাজাইয়া,
--জন্মহ’তে নারী অলঙ্কার-প্রিয়া !
কুসুমের গুচ্ছ করেতে ধরিয়া
মরাল-গমনে রমণী ধায় !
পিছে চলে এক হরিণী-বালিকা,
—প্রথম স্নেহের জীবন্ত-কলিকা!-~-
-তার (ও) গলে শােভে কুসুম মালিকা!
নবীন নধর কোমল কায়!
রমণীর চারু চঁাচর চিকুর,
আগুলফ-লম্বিত সুরভি মেদুর,
দুলিছে পশ্চাতে মৃদুল মধুর,
ললিত লহরী খেলিছে তায়।
চলিতে চলিতে চমকি রমণী
নিরখি মানবে দাঁড়াল অমনি,
চাহি স্থির-নেত্রে বিশাল-নয়নী।
হেরেন তাহারে বিস্ময়-ভরে।
.

จฯ
সুর-সঙ্গীত
সঙ্গিনী হরিণী দাড়ায় থমকে,
বিস্ময়-সন্ত্রাস-বিস্ফারিত চখে
করে বায়ু-ঘ্রাণ চাহি মানবকে,
পুনঃ নারী-দেহ আঘ্রাণ করে।
সহসা:মানব চাহিয়া দেখিল,
-যােগ-নিদ্রা যেন সহসা টুটিল !
চারি আঁখি তবে একত্রে মিলিল,
অভিনব ভাবে ভরিল প্রাণি ।
আসি,আশু-গতি নারী-সন্নিধানে
স্থির-দৃষ্টে চাহি নেহারে বয়ানে,
আর বার হেরে সুধাকর পানে,
আবার দেখে সে বদন খানি !
ধরে ধীরে ধীরে রমণীর করে,
অমনি তড়িৎ ছুটিল অন্তরে,
উঠিল তরঙ্গ হৃদয়-সাগরে,
ফুটিল সহস বদনে ভাষ!
উদ্বেলিত-প্রাণে উন্মত্তের প্রায়
কহে কত কথা মদির-ভাষায়,
দুরু দুরু হৃদিথর থর কায়,
নাসিকায় বহে সঘন-শ্বাস !

সুর-সঙ্গীত।
৭৭
- - - - - - -
“কে তুমি গাে বালা আনন্দ-রূপিনি?
জীবন-দায়িনি,—প্রিয়ে,—প্রণয়িণি !~-
—আহা আহা ওরে কি কথা বলি ?
কি জানি কেমনে—কি কথা কহিনু ?
কে বলিছে,আমি ?-কিছু বুঝি না।
কেমনে কহিনু কিছু জানি না !
কে তুমি সুন্দরি !-মম প্রাণেশ্বরি?
এস এস প্রিয়ে হৃদয়েতে ধরি ।
এস প্রিয়তমে, জীবন-সঙ্গিনি,
এস এস দেবি হৃদয়-রঞ্জিনি।”
বলিয়া সােহগে, দীপ্ত অনুরাগে,
চুমিল বালার কমল-মুখ ।
টলিল ভূধর সেই সে সােহাগে !
ঘূরিল মেদিনী নব অনুরাগে !
ছুটিল পবন আনন্দে মাতিয়া !
হাসিল কুসুম নাচিয়া নাচিয়া !
আদি-প্রেমিকের প্রথম চুম্বন,
দিল যেন সবে নুতন জীবন।
ভূতলে
উথলে
অতুল সুখ!
.
নবীন প্রেমের অরুণ-প্রভায়
ধৃতির কমল-কলিকা ফুটায়,

৭৮
সুর-সঙ্গীত
সহসা নেহারে যেন দু-জনায়
নূতন নয়নে নবীনভবে।
সে প্রেম-প্রভাবে অমনি দু-জনা
নিসর্গ-অষ্টার শৃঙ্খল রচনা
নিরখে প্রথম হয়ে হৃষ্ট-মনা -
অভিজ্ঞতা-বীজ অঙ্কুর লভে !
প্রকৃতি পুরুষ নিকটে আসিয়া
সাদরে দোহার মস্তক চুমিয়া,
শুভ-স্বস্তি-বাদে আশিস্ করিয়া,
হলেন অন্তর পুলক-মনে,
মানব-দম্পতি বিস্ময়ে মগন,
উভয়ে নেহারে উভয়-বদন,
বুঝিতে না পারে কিবা বিবরণ,
কে আসিল ? পুনঃ লুকাল ক্ষণে!-
হ’ল সুখ-ময়ী নিশা অবসান,
শ্রান্ত নিশাপতি করেন প্রয়াণ,
বিরহে ব্যাকুল হয়ে তারা-কুল
নীল-সিন্ধু-নীরে ডুবিল সবে !
সারা নিশা,কেলি করি ফুলসঙ্গে
ধৃষ্ট সমীরণ বহে শ্লথ-অঙ্গে

সুর-সঙ্গীত।
গাহিল ললিত প্রভাতি সঙ্গীত
বিহঙ্গম গণ মধুর-রবে !
হিরন্ময়ী উষা রক্তিম অধরে
প্রাণ-উন্মাদিনী হাস্য-সুধা রে !
সে হাস্য-লহরী-ছবি হৃদে ধরি
হাসিল পূর্বাশা রঙ্গিনী-সতী !
সুপ্তা বসুমতি চেতনা লভিল,
শীহরি মানব-দম্পতি জাগিল,
সু-কোমল শষ্প-শয্যা তেয়াগিল,
উঠিল উভয়ে হরষ-মতি!
চাহে চারিদিকে বিস্মিত-অন্তরে,
চাহিল আকাশে আশ্চর্যের ভরে।
মানস-মােহন, নয়ন-রঞ্জন,
হেরিল তরুণ-অরুণ-দ্যুতি;
দেখিয়া সে শােভা দোঁহার হৃদয়
অপূৰ্ব্ব ভাবেতে উচ্ছসিত হয় !
ভক্তি-যুত স্বরে, দোঁহে যুক্ত-করে, ॥
আদিত্য-দেবের করিল স্তুতি!
“নমস্তে সুন্দর-কান্তি, হৃদয়প্রফুল্ল-কারী!
নমঃ নমঃ মহাজ্যোতিঃ, নিখিল তিমির হারী।

৮০
সুর-সঙ্গীত।
নমস্তে মঙ্গলময়, অনন্ত আকাশ বাসী!
নমঃ শান্তি-সুখ-দাতা, দুঃখ-অবসাদ-নাশী।
আঁধারে নিমগ্ন ছিল এ বিশাল ধরাতল,
তুমি হে প্রকাশ হয়ে করিলে সে সমুজ্জ্বল !
জগত-লােচন তুমি, পবিত্ৰকিরণময়,
নিরখিয়া তব রূপ, বিকশিত এ হৃদয় ।
বিতর বিতর ভাতি অনন্ত অনন্ত কাল,
নমঃ নমঃ নমঃ দেব, দীপ্তিমান সু-বিশাল !”-
উঠি ধীরে ধীরে মানব-দম্পতি
ভ্রমে গিরি-শিরে প্রফুল্লিত মতি।
নাচি কত রঙ্গে রমণীর সঙ্গে
চলে সুকুমারী হরিণী-বালা।
সু-রসাল ফল করি আহরণ
করে নর নারী ক্ষুধা নিবারণ,
হইয়া ব্যাকুল তুলি কত ফুল
পরিল দু-জনে গাঁথিয়া-মালা ।
ক্রমে ক্রমে দিবা হয় অবসান,
ক্ষীণ দিনমণি অস্তাচলে যান,
তারা-হার পরি আসি বিভাবরী
তমােবাসে ঢাকে অবনি-কায় ।

সুর-সঙ্গীত।
৪১
হেরিয়া মানব-দম্পতি তখন
বিষাদ-সাগরে হইল মগন !
ভাবিল তপন আঁধারি ভুবন
চিরদিন-তরে চলিয়া যায় ।
ভাবিয়া উভয়ে কাঁদে উভরায়,
ডাকে দিবাকরে কতই কথায়,
বলে—“দিনমণি, আঁধারি অবনি
যেওনা যেওনা এস গাে ফিরে!”
বলি, বার বার ডাকে দু-জনায়,
কাদে হাহাকারে পড়িয়া ধরায়।
যেন কোন জন হৃদয়ের ধন
লয়ে যায় কেড়ে হৃদয় চিরে !
দাঁড়ায়ে হরিণী চঞ্চল নয়নে
চাহে বার বার উভয়-বদনে।
মাঝে মাঝে গিয়া মুখে মুখ দিয়া
নীরব-ভাষায় সান্ত্বনা করে !
মানব-দম্পতি নাহি দেখে তায়,
কাদিয়ে কাঁদিয়ে ধরণী তিতায়!
চাহে ক্ষণে ক্ষণে পশ্চিম গগনে,
ঝর ঝর জল নয়নে ঝরে!

৮২
সুর-সঙ্গীত।
সহসা আঁধারি গগন-মণ্ডল
উদিল নিবিড় জলদের দল,
ঝলকে ঝলকে চপলা চমকে,
ঘন-গরজনে কাপিল ধরা।
চমকি উভয়ে সম্বরি রােদন
গগনের পানে করে বিলােকন,
দেখিয়া তাহার ভীষণ আকার
ভয়ে ভূমি ত্যজি উঠিল স্বরা!-
বহিল প্রবল উন্মত্ত পবন,
তরু গুল্ম লতা করে উন্মলন,
বারিদ-মালায় মুষলধারায়
ঢালিল সলিল করকা-রাজি।
মানব রমণী সন্ত্রাস-হৃদয়
গিরি-গুহা-তলে লইল আশ্রয়,
ভাবিল প্রলয় হইল উদয়,
সকলি বিনাশ হইল আজি!
উভয়ে উভয়ে বাঁধি বাহু-পাশে
বিকল অন্তরে কঁদে হা-হুতাশে !
ঘন বজ্রনাদ রাড়ায় প্রমাদ,
দুরু দুরু হৃদি কাঁপিছে তায় ।

সুর-সঙ্গীত।
কঁদিয়া কাঁদিয়া শ্রান্ত দুই জন,
ক্রমে ঘুম-ঘােরে হয় অচেতন।
হৃদয়ে হৃদয়ে বাঁধিয়া উভয়ে
পর্ণ-শয্যাতলে ঢালিল কায়!
;
হইল প্রভাত,-তরুণ তপন
নিৰ্ম্মল আকাশে হাসিল মােহন
পরিল
ভুবন নবীন
ভূষণ
বিনােদ হাসিটি মাখিয়া মুখে !
মানব-দম্পতি হ’ল জাগরিত,
বিস্মিত নয়নে চাহে চারি-ভিত ।
হেরিয়া স্বভাব-শােভার প্রভাব,
যুগল হৃদয় উথলে সুখে।
ত্যজি শ্যা দোঁহে ঝটিতি উঠিয়া
নিঝরিণী-কূলে আসিল ছুটিয়া,
কল কল স্বরে বিকল অন্তরে
শুনিলা তটিকী করিছে গান !
হেরে তরু-কোলে শ্যামল শাখায়,
তবকে তবকে কুসুম-মালায়,
প্রাণ-মনােমদ সৌরভ-সম্পদ
অবিরাম সবে করিছে দান।
.

সুর-সঙ্গীত।
মৃদুল মৃদুল বহিছে পবন,
ভাবে তাের তনু, মন্থর গমন !
ঢলে ঢলে যায় যথায় তথায়,
বিলায় আপন সঞ্চিত ধন ।
সমস্বরে কিবা তুলিয়া সুতান
বিবিধ বিহঙ্গে করে সুধাগান।
বন-বালা দলে,
প্রতিধ্বনি ছলে,
সঙ্গীত-তরঙ্গে কঁপায় বন।
নবােদিত রবি সুবর্ণ-কিরণ,
ঝলমল করে গগন ভুবন !
দেব শিশু প্রায়, শুভ্র মৃদু কায়
মাখে সে কিরণ নীরদ সব ।
নিরখি সে শােভা মানব-দম্পতি
নব ভাবে হয় উদ্বেলিত-মতি।
চাহি উদ্ধপানে উচ্ছসিত প্রাণে
সু-স্বরে তুলিল সঙ্গীত নব !
কি জানি কি ভাবে ভরিল
হৃদয়,
বচনে বলিতে নারি ;
যেন কার পানে
ধাইতেছে প্রাণ,
যথা প্রবাহের বারি ।

সুর-সঙ্গীত।
be
ভাবিয়া না পাই কে তুমি, কেমন,
কি হেতু হৃদয় কর আকর্ষণ,
কোথা তব গতি, কোথা নিকেতন,
কেমনে জানিতে পারি।
বুঝি তব রূপ হেরি প্রভাকরে ।
আনন্দে বিহঙ্গ কলরব করে,
হাসিছে কুসুম আমােদের ভরে,
নাচে বায়ু নদী বারি !-
গাইছে সকলে মহিমা তােমার,
তােমার করুণা করিছে প্রচার --
আমরাও নমি চরণে তােমার
সে সবারে অনুসারি।
কে তুমি মােদের না জানি তাহায়,
কি বলে বল গাে ডাকিব তােমায় ?
পূজিতে তােমারে কেন মন চায়,
বুঝিবারে নাহি পারি।'

পঞ্চম-লহরী।
এক দীপ হ’তে যথা শত শত দীপ-লতা
ক্রমে ক্রমে প্রজ্বলিত হয়,
একই দম্পতি হতে ধরাতলে সেই মতে
সন্তবিল মানব-নিচয়।
প্রফুল্লিতা বসুমতী হয়ে ফল পুষ্প-বর্তী
যতনে তােষেন নরগণে,
কান্তি-পুষ্ট দেহ খান, উৎসাহে পূরিত প্রাণ,
• ভ্রমে নর মরত-ভুবনে।
চিন্তা-ব্যাধি-বিরহিত, সদা হরষিত-চিত,
স্বভাবে অভাব-হীন সবে,
অবট-আবাসে রয়,
খায় ফল-মূল-চয়,
শান্তি-সুখ লভয়ে নীরবে

সুর-সঙ্গীত।
সদ্যঃ-খনি-সমুখিত ক্লেদ-রাশি-বিজড়িত
মহামূল্য হীরকসঙ্কাশ
মানবের বুদ্ধিজ্ঞান তমােজালে ম্রিয়মাণ,
নাহি জ্যোতিকণিকা-আভাস।
নিকৃষ্ট জীবের প্রায় খায় আর নিদ্রা যায়,
নাহি কাৰ্য্য জীবনে অপর,
আপনি যে কি মহান্ নাহি তাহে কোন জ্ঞান,
নিমীলিত লােচন আন্তর।
এই ভাবে ধরাতলে কত কাল যায় চলে,
কালে কালে বৃদ্ধি নর-কুল,
যেন পঙ্গপাল দল,
পূরিল ধরণীতল
হৃদে ধরি উৎসাহ বিপুল।
নব রাগে মত্ত মন,
দলে দলে পর্যটন
করে সবে অবনী-মণ্ডল,
উত্তর দক্ষিণে ধায়, পূরব পশ্চিমে যায়,
মুখে তুলি মহাকোলাহল।
বন্য-পশু সমতুল,
জ্ঞান বুদ্ধি অতিস্থূল
হিতাহিত বিচার বিহীন,
কঠিন নিষ্ঠুর প্রাণ, অবিদ্যায় মুহমান,
পদে পদে অনাচারে লীন।

সুর-সঙ্গীত।
a
সহসা সে কালে ভেদি, অজ্ঞান আঁধার চ্ছেদি,
অই কেরে মানবের দল
জ্ঞান জ্যোতিঃ প্রকাশিয়া, প্রদীপ্ত করিয়া হিয়া,
আসে ওই পুণ্যভূমিতল ?
বুঝিয়া আপন বল জালিল প্রতিভানল,
টলিল ভূতল পদ-ভরে,
পশু ভাব অবসান, জাগিল নূতন প্রাণ,
নব-ভাব উদিল অন্তরে।
বুঝিল আপন মৰ্ম্ম, আপনার ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম,
আপন মহত্ত্ব করে স্থির,
সমাজ গঠন করি, উন্নতির বস্তু ধরি,
মহা দম্ভে চলে সব বীর ?
নূতন নয়ন পেয়ে
বিশ্বপানে দেখে চেয়ে,
নব-ভাবে উদ্বেলিত প্রাণ,
বিশ্বপতি লীলা হেরি, বাজিল হৃদয়-ভেরী,
গাইল মধুর বেদগান!
চমকিত চিত
শুনিয়া সে গীত
স্তব্ধ ধরাবাসী সবে,
করিল ঝঙ্কার,
সুমধুর গীতি-রবে।
হৃদয়ের তার

সুর-সঙ্গীত। ৮৯ শিরায় শিরায় তড়িৎ খেলায়, টুটিল জড়তা-জাল, সুষুপ্ত-জীবন লভিল চেতন, ঘুচে মহা নিদ্রা কাল। ছুটিল সে গান তুলিয়া সুতান, কাঁপায়ে মেদিনী নভঃ, ধরিয়া সে ধ্বনি ছােটে প্রতিধ্বনি জাগাইয়া জীব সব ! করিয়া শ্রবণ সে গুরু-গম্ভীর গান, ভুলিয়া কুজন স্তব্ধে দ্বিজগণ শুনে সে মধুর তান! নীরব-বদন বন্য পশুগণ বিস্ময়ে চাহিয়া রয়, হইয়া আকুল স্তম্ভিত ভুবন তটিনীর কুল গদ গদ ভাবে বম ! ধরিয়া মােন ছবি যথা পূৰ্বাশায় রবি উদ্ভাসিত করে ভূমণ্ডল, তেমতি সে নরগণ জলি জ্ঞান হুতাশন হৃদাগার করিল উজ্জ্বল !

৯.
সুর-সঙ্গীত।
ধরিয়া সে “আৰ্য”নাম পূত “আর্যাবর্ত” ধাম
নিবসতি করলে সকলে,
বুঝিয়া ধরিত্রী রীত, যত্ন করি সমুচিত,
আহাৰ্য্য আহরে কুতূহলে !
মাতা যথা সু সন্তানে
হৃদয় পীযূষ দানে
প্ৰপুষ্ট করেন কলেবর,
তেমতি ধরণী সতী
হয়ে ফল-শস্য-বতী
মানবে তােষেন নিরন্তর !
ধন-ধান্যে পূর্ণ বাস, বদনে উৎসাহ-ভাস,
রহে সুখে মানব-সন্তান,
ভকতি পূরিত হিয়া,
নানা উপচার দিয়া,
সৰ্ব্ব ভূতে পূজে ভগবান!
কত বর্ষ যুগচয়
এইরূপে গত হয়,
উঠে নর উন্নতি-সােপানে,
বল বুদ্ধি করি ভর
সাধে সবে নিরন্তর
নিজ হিত বিহিত বিধানে !
কত শত সু কোবিদ
পীযূষ-পূরিত-হৃদ
বিহরিল ধরণীর কোলে,
গাইয়া মধুর গান । সুধায় ভরিল প্রাণ,
মন্তু মন সুধার হিল্লোলে!

সুর-সঙ্গীত। সুরপতি সমতুল, কত শত বীরবর তেজঃ-পূৰ্ণ-কলেবর দীপ্তিময়ী করি ধরণীরে, স্বদেশের হিত তরে, জীবন উৎসর্গ করে, যশের মুকুট পরি শিরে! কত কোটী নরপতি ধৰ্ম্মপথে রাখি মতি পুত্র সম পালি প্রজাগণে, দলিয়া অরাতি-কুল, বসিলেন অমর-আসনে ! চমকিত করি বিশ্ব দেখায়ে নূতন-দৃশ্য কত শত বিজ্ঞান-পণ্ডিত যশের সৌরভ মাখি মানবের জ্ঞান-অাখি সযতনে করে উন্মীলিত । ভ্রান্তমতি নরদলে হৃদয়ের মরুতলে ঢালিয়া অমৃত-নিঝরিণী কত যােগী ঋষিচয় হরিনাম সুধাময় করে গান স্তম্ভিয়া মেদিনী! কিন্তু রে মানব-কুলে অনিত্য সুখেতে ভুলে নাছি ভাবে নিত্য-সুখ-ময়ে, • দূরে ফেলি মহা রত্ন কাচ-খণ্ডে করে যত্ন, খায় বিষ সুধা-বিনিময়ে। উদ্ধারিতে পাপিগণ পূর্ণ ব্ৰহ্ম সনাতন আবিভূত হলেন ধুরায়, ৯২ সুর-সঙ্গীত। মানবের রূপ ধরি, জ্ঞান-রূপ বৰ্ম্ম পরি, ধৰ্ম্ম-যুদ্ধ করেন তথায় ! যুক্তি সুদর্শন দিয়া দুস্কৃতেরে বিনাশিয়া অনীশ্বরবাদ প্রতিকূলে সত্য-ধৰ্ম্ম-রথ লয়ে, আপনি সারথি হয়ে, মহারণ করেন বিপুলে! প্রচারি নিষ্কাম ধৰ্ম্ম মানবে বুঝান মৰ্ম্ম, পায় সবে নবীন জীবন, সত্য-সনাতন-নাম- পূর্ণ হ’ল বিশ্বধাম, ধৰ্ম্ম-রাজ্য হইল স্থাপন। . ঘুচিল জঞ্জাল-জাল, গত হয় কত কাল, শান্তি-সুখে থাকে নরগণ, হরিনাম সুধারসে মজি রয় স-হরষে মত্ত-মন-ভৃঙ্গ অনুক্ষণ! হায়রে মানব-গণ অনিত্য-সুখ-প্রবণ, ভ্রান্ত সদা মােহের ফুলনে, না হ’তে দু-দিন গত ত্যজিয়া সে মহাপথ বিপথে ধাইল মুগ্ধ-মনে! প্রমত্ত বিষয়-মদে • দন্তে ফেরে পদে পদে, মত্ত বৃথা জাতি-অভিমানে,

সুর-সঙ্গীত।
হিংসা দ্বেষ পরস্পরে দুৰ্ব্বলে দলন করে,
হীন-জনে পশু সম মানে!
অবিচার অত্যাচারে, পূর্ণ-ধরা পাপ-ভারে,
উঠে ঘাের হাহাকার রব!
দূরিতে দুর্গতি চয়ে সাম্যের নিশান ল’য়ে
আসি এক পুরুষ-ঋষভ
মানবে বুঝান মৰ্ম্ম, “অহিংসা পরমােধৰ্ম্মঃ”,
“নিৰ্ব্বাণ-মুকতি” কথা সার,
শুনি সেই মহামন্ত্র
বাজিল হৃদয়-যন্ত্র,
খুলে গেল অন্তর-দুয়ার !
সাম্য-নীতি সমীচীন
উচ্চ-নীচ-ভেদ-হীন,
সুখে সবে করে কালক্ষয়।
ক্রমে হয় ছন্ন-মতি, পাপ-পুণ্যে সম রতি,
বলে ‘মুক্তি’ নির্বাণে নিশ্চয়” ।
“কিসের কিসের ভয়? কর যাহা মনে লয়,
ইহ জন্ম সুখের নিদান ।
পরকাল নাহি আর, ছলনা সে কল্পনার,
‘নির্বাণেই পূর্ণ পরিত্রাণ !”
এই মন্ত্র সদা জপ,
এই মন্ত্র সদা তপ,
এই মন্ত্র সবার বদনে,
যিনি সে মুক্তির ভেলা তাঁরে করে অবহেলা
ভ্রান্ত নর মােহের ছলনে!

৯৪ সুর-সঙ্গীত। - নিরখি দুৰ্ম্মতি সবে বেদান্তের মােহবে ব্ৰতী এক মানব প্রবর ঘুচায়ে মনের শঙ্কা বিশ্বপতি জয়-ডঙ্কা সঘনে বাজান ঘােরতর ! দিব্যজ্যোতিঃ-বিমণ্ডিত, তনু রুচি-পুলকিত ভগবৎ-প্রেমের সুধায়, জি-অগ্রে সরস্বতী, যেন রে ধূর্জটি-যতি, মুক্ত-কণ্ঠে শিবগুণ গায় । জ্ঞানযােগ প্রকাশিয়া, সবে দিব্য-অাঁখি দিয়া, মুক্তি পথ দেন দেখাইয়া, ‘মায়াবাদ অবসান সৰ্ব্বভূতে ব্রহ্মজ্ঞান করে সবে আনন্দে মাতিয়া ! অনন্ত অমৃত-ধাম মধুর মহেশ নাম প্রচারিল অবনী মণ্ডল, চির-শুষ্ক মরুল পাইল রে স্নিগ্ধ-জল, ফোটে তাহে প্রেম-পুষ্পদল! মহেশ-মহিমা গানে তরঙ্গ তুলিল প্রাণে, ভেসে যায় নাস্তিকতা-ক্লেদ, চারিদিকে জয় রব, হর্ষে নাচে গ্রহ সব, ঈশনাম করে নতভাভেদ ! সেথায় পাশ্চাত্যভূমে মগ্ন অজ্ঞানের-ধূমে পশু-সম রহে নরগণ,

সুর-সঙ্গীত।
ic
ধৰ্ম্ম-হীন শুষ্ক প্রাণ,
নীরস হৃদয় খান,
কলুষিত পাপে সর্বক্ষণ !
কিবা ধৰ্ম্ম কি অধৰ্ম্ম, সু-কৰ্ম্ম কি অপ-কৰ্ম্ম,
নাহি জানে প্রভেদ তাহার,
যেই কাৰ্য্যে ধায় মন
করে তাহা সেইক্ষণ
পাপ পুণ্য না করে বিচার।
ভূতলে অতুল নিধি
“মুসার” পবিত্র বিধি
অনাদরে দলে দু-চরণে,
সদা কদাচারে লীন, বিবেক বিজ্ঞান হীন,
মত্ত সদা ঘৃণিত ব্যসনে ?-
সে অন্ধ-হৃদয়াকাশে ধৰ্ম্ম-জ্যোতিঃ-প্রতিভাসে
আলােকিতে এক নর-বর
ঈশ-নাম অনুরাগে
গাইল দীপক রাগে,
ভাবাবেশে উদ্ৰিক্ত অন্তর ।
শুনি সে মহান্ গান
জাগিল অসাড় প্রাণ,
পাপ-নেশা হ’ল অন্তর্হিত,
নবােৎসাহে মাতি সবে “জগদীশ জয়”-রবে
ত্রি-ভুবন করেআন্দোলিত
ধৰ্ম্ম-গ্রন্থ এক করে,
অপরে কৃপাণ ধরে,
আসি এক নব-ধৰ্ম্ম-বীর

৯৬ সুর-সঙ্গীত। গম্ভীরে মানবে কয় “কর শীঘ্র বিনিময় মন, প্রাণ,—যাহে কর স্থির !” ভাসায়ে ধরণী-অঙ্গ বহিল লােহ-তরঙ্গ, জ্বলে যুদ্ধ-অনল-ভীষণ ! হায় রে অবােধ নরে শান্তিময় ধন তরে, অশান্তিতে ভাসায় ভুবন ! এইরূপে সে জগতে নানাবিধ ধৰ্ম্মমতে পরিভক্ত মানব সন্তান ভিন্ন সম্প্রদায় প্রতি বিশেষ বিদ্বেষ-মতি, করে সবে মহাশত্রু জ্ঞান। মত ভিন্ন হলে পরে আপনার সহােদরে করয়ে “বিধর্মী”-আখ্যা দান । ছায়া না পরশ করে, ঘাের ঈর্ষা পরস্পরে, নিজ করে বধে ভ্রাতৃপ্রাণ! যেই জুন ভক্তি ভরে অনন্ত পুরুষ-বরে অনন্ত পেতে পূজা করে, “পৌত্তলিক” বলি তবে ‘একেশ্বরবাদী সবে ঘৃণা-বিষ ঢালে তার পরে। হায়রে অবােধ নর, অল্প বুদ্ধি তুমি ধর, তাই কর ভেদাভেদ হেন, সুর-সঙ্গীত। ৯৭ এক ব্ৰহ্ম ভগবান, সৰ্ব্বভূতে অধিষ্ঠান, ভূমান্ ভাবনা ভ্রম কেন ? তিনিই সে একেশ্বর, তিনিই সে বহুতর, যাহা ভাব তিনি সে সকলি, ক্ষুদ্র তুমি, ক্ষুদ্র প্রাণ, ক্ষুদ্ৰাদপি ক্ষুদ্র জ্ঞান, ভেদ ভাবি কেন মর অলি ? ঈর্ষাবিষে হ’য়ে মত্ত, বুঝিয়া মূল তত্ত্ব, পরস্পরে ঘৃণা করে সবে, করে কত তর্ক-বাদ, ক্রমে ঘটে বিসম্বাদ, পরিণামে মাতিল আহবে। ভাসায়ে ধরণী-হৃদি নর-শােণিতের নদী বহে খর ভীষণ-আকার । কে বলে মানবগণ দেবতার নিদর্শন, নিত্য এস পিশাচ অবতার! ক্ষীণ বল যেই জন, হয় তার নির্যাতন, সহে সে অশেষ ক্লেশচয়, হায় মূঢ় নরগণ, কেন কর অকারণ ধৰ্ম্ম হেতু অধৰ্ম্ম সঞ্চয় ! ' , ঘুচাইতে বিসম্বাদ, দুরিতে সে পরমাদ, দ্বেষানলে শান্তি বারি দিতে, ৯৮ সুর-সঙ্গীত। কত শত ধৰ্ম্মবীর ক’ন কথা সু-গভীর মানবের ধর্ম সমন্বিতে। সেই তত্ত্ব করি ভর জন কত প্রাজ্ঞ নর দিন কত ভুলে যায় ভেদ, আবার কালের বশে মজি ঈর্ষাবিষ রসে ধৰ্ম্মমতে ঘটায় বিভেদ । শেষে এক বীৰ্য্যবান ব্ৰহ্ম-তেজে জ্যোতিষ্মন মহা শূর আধির্ভিল আসি, সু-যুক্তির অসি ধরে ধৰ্ম্ম সমন্বয় করে সংকীর্ণতা নীচ-ভাব নাশি। উদার ধৰ্ম্মের শ্রোতঃ বিশ্ব করে ওতপ্রােত, ঘুচে যায় বিবাদ-বালাই, এক আ ত্মা এক প্রাণ, এক ধৰ্ম্ম এক জ্ঞান, এক সূত্রে নিবদ্ধ সবাই! ধরা যেন স্বর্গ-পুর নিত্য-সুখে ভরপুর চারিদিকে “শান্তিঃ শান্তিঃ” রব এক তন্ত্রে বাঁধি মন করে সবে অনুক্ষণ জ্যোতির্ময় বিশ্বপতি স্তব ! --- কালচক্র ঘূরে যত, পলে পলে হয় কত পরিবৰ্ত্ত মানব-মণ্ডলে,

সুর-সঙ্গীত।
సిన
ক্রমে যত যায় দিন,
হায় নর অর্বাচীন,
ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম দেয় রসাতলে !
ত্যজিয়া ঈশ্বর-তত্ত্ব
বিজ্ঞানেতে হয় মত্ত,
হেরে বিশ্ব বিজ্ঞান-নয়নে।
“কোথা ধৰ্ম্ম, কে ঈশ্বর” ? ভাবে নর নিরন্তর,
“বিজ্ঞান(ই) ঈশ্বর ত্রি-ভুবনে!”—
নাহি কিছু কথা আর, বিজ্ঞান বিজ্ঞান সার,
বিজ্ঞান সকল জ্ঞান-মূল,
এ প্রপঞ্চ-ময় ধরা
কেবলি বিজ্ঞান ভরা,
বিজ্ঞানে গঠিত নর-কুল !
ধিরে মানবগণ,
ভুলি পরমার্থ ধন
নিজ ধ্বংস করিস্ সাধন!
যিনি সে বিজ্ঞানময়,
হায় মূঢ় পাপাশয়,
তাঁরে কেন হ’স্ বিস্মরণ ?

যষ্ঠ-লহরী।
( লয় )
d
পরিহরি ধর্ম মানব-নিকর,
বিজ্ঞান-সেবায় রত নিরন্তর,
মহাদন্তে ফেরে,—বিশ্ব-চরাচর
ঘন ঘন কাঁপে চরণ-ভরে ;
ধৰ্ম্ম-ভা-হীন শুষ্ক হৃদি-খান
বিকট কঠিন-পাষাণ সমান,
সদা মুখে কুলি—“বিজ্ঞান” “বিজ্ঞান”।
বিজ্ঞানের পূজা নিয়ত করে ।
“কিসের ধরম—কোথায় ঈশ্বর ?
অলীক-প্রবাদ, সত্ত্বা নাহি তার,

সুর-সঙ্গীত।
১.;
“মূখ” লােকে করে ‘ঈশ্বর’ ‘ঈশ্বর,
অর্থ-হীন-বাক্য কে শুনে তায় ?
বিজ্ঞান সমান কি আছে অপর ?
বিজ্ঞান ধরম,-বিজ্ঞান ঈশ্বর,
বিজ্ঞানে গঠিত এই চরাচর,
বিজ্ঞানের বলে শূন্যেতে ধায় !
“কর বিজ্ঞানের উন্নতি বিধান,
হইবে মানব দেবতা সমান,
রহিবে অমর, পাবে দিব্য জ্ঞান,
সদা সুখে রবে ধরণী-তলে।”
এই কথা সদা মানব-বদনে,
এই মন্ত্র জপ শয়নে স্বপনে,
ভরিল ভুবন বিজ্ঞান-প্লাবনে,
ডুবিল ধরম অতল-জলে।
০
বিজ্ঞানের বলে মানব-নিকরে,
বসুন্ধরা-হৃদি ভেদি গভরে,
রত-সম্ভার তুলি থরে থরে,
বিলাসধাহারে সাজায় ধাম;
পশিয়া নির্ভয়ে জলধির তলে
করে তােলপাড় তেজো-দর্প-বলে,

১০২
সুর-সঙ্গীত।
শূন্য করি বুক হরে কুতূহলে
মুকুতা প্রবাল রতন-দাম!
বাঁধি দামিনীরে বিজ্ঞানের পাশে,
বিরচিয়া পাখা মনের উল্লাসে,
মহাদম্ভে সবে উঠিয়া আকাশে,
বিহরে আনন্দে বিহঙ্গ প্রায়।
পাঠায় বারতা দামিনী-বদনে,
জ্বলিছে আলােক দামিনী-কিরণে,
তড়িতের তেজে করিছে রন্ধন,
সাধিছে তড়িতে কত প্রয়ােজন,
তড়িতের বাস, ভেষজ, ভূষণ,
তড়িতের বলে বায়ু ঢুলায় !
বিজ্ঞান-প্ৰভায় মরুভূমি-তলে
নন্দনকানন করে কুতূহলে,
চূর্ণ করে গিরি, শােষে সিন্ধু-জলে,
বিনা মেঘে ঢালে আসার-বারি ;
নীর-নিধি-গর্ভে জ্বালায় অনল,
অনল হইতে বাহিরয়ে জল,
সুধাসম করে তীব্র হলাহল,
হিমানী হইতে মুকুতা-সারি !
।

সুর-সঙ্গীত।
১৪৩
চির ইন্দ্রধনু গগনে ফুটায়,
কোলে কোলে তার দামিনী নাচায়,
ধরিয়া কৌমুদী বিজ্ঞান-প্রভায়
নিত্য পৌৰ্ণমাসী-যামিনী হাসে।
চলে অবহেলে সলিল উপরে,
পশিছে অনলে হরষ অন্তরে,
হাসি মুখে বজ্ৰ বুক পেতে ধরে,
বিজ্ঞানে কুলিশ-প্রতাপ নাশে!
চির-অন্ধ জুনে প্রদানে নয়ন,
বধিরে শুনায় বীণার নিক্কণ,
সপ্তমেতে তান তুলি মূকগণ
গায় নব-রাগে মধুর গান !
থাকিয়া শতেক যােজন অন্তরে
পরস্পরে সবে সদালাপ করে,
ইচ্ছামাত্রে আনে চক্ষের গােচরে
যাহারে হেরিতে চাহে সে প্রাণ!
কল্পনা কুহকী হয় অন্তর্ধান,
চিন্তার, চাতুরী টুটে খান্ খান !
বিজ্ঞানের কাছে সবে হতমান !
অসম্ভব কিছু না রহে আর!

১.৪
সুর-সঙ্গীত।
হৃদয়ের গুপ্ত নিভৃত ভবনে
একটী বাসনা জাগিলে গােপনে
মূর্তিমতী হয়ে জগত-নয়নে
তখনি অমনি করে বিহার।
বিজ্ঞান সহায়ে জীব কলেবর
স্ফটিকের সম করে স্বচ্ছতর,
তন্ন তন্ন করি দেহের ভিতর
করে নিরীক্ষণ সকল স্থল ;
আধি ব্যাধি কোথা করিছে বিরাজ,
কিরূপে শােণিত বহে দেহ মাঝ,
হরষ, বিষাদ, ক্রোধ, ভয়, লাজ,
কেমনে অন্তরে প্রকাশে বল ?
?
বহায় মশকে ঐরাবত-ভার।
উড়ায় বারণে প্ৰদানি ফুৎকার !
বীণা তন্ত্রে করে বজ্রের হুঙ্কার !
পাষাণের ভেলা ভাসায় জলে!
বিধির বিধাম করিয়া ব্যত্যয়,
নাশিতে ভীষণ মরণের ভয়,
দিতে মানবেরে জীবন অক্ষয়,
করে কত যত্ন বিজ্ঞান-বলে।

সুর-সঙ্গীত।
মৃত-সঞ্জীবনী সুধার কারণে
তােল-পাড় যেন করে ত্রিভুবনে,
ভূমে যেন ছিড়ে পাড়ে গ্রহগণে,
এমনি দাপটে ছুটেরে সবে।
লয়ে মৃতকায় ধমনী ভরিয়া
শােণিতের স্রোত দেয় ছুটাইয়া,
হৃদপিণ্ড মাঝে কৌশল করিয়া
দেয় প্রাণ বায়ু যতনে তবে,
কিন্তু নাহি পারে করিতে চেতন,
হায় হীনমতি মূঢ় নরগণ,
ভাব নাহি কিরে পরমাত্মা ধন
পরমাত্মা বিনা কে দিবে তায় ?
তব শক্তি-সিন্ধু-সীমা ওই খানে,
দাড়াও মানব তিষ্ঠ ওই স্থানে,
এহেন দুরাশা তব ক্ষুদ্র প্রাণে,
রে অবােধ, কভু শােভা কি পায় ?
পঞ্চভূতে করি একত্রীকরণ
কর দেখি মরদেহের গঠন,
বুঝিব তােমার বিজ্ঞান কেমন,
জানিব তােমার প্রতিভা তায়।

دهد
সুর-সঙ্গীত।
থাক্ নর-দেহ বিরাট ব্যাপার,
গঠ দেখি তুচ্ছ বালুকা-কণার,
মানিব তা হলে সামর্থ্য তােমার,
পূজিব তােমায় দেবতা প্রায় !
নাহি শক্তি তব করিতে রচনা
ক্ষুদ্রাপি-ক্ষুদ্র তুচ্ছ অণু-কণা,
তবে রে নির্বোধ কি
হেতু বলনা
বৃথা অহঙ্কারে হও অধীর ?
সূক্ষ্ম অণু-তত্ত্ব করিতে নির্ণয়
বিজ্ঞান তােমার মানে পরাজয়,
কেমনে বলনা ওরে দুরাশয়
আত্ম-তত্ত্ব-মূল করিবে স্থির ?
হায় রে দুর্মতি মানব-সস্তান
মােহ মায়া বশে ভুলি আত্মজ্ঞান,
শ্মশানের শূন্য কুম্ভের সমান,
শুষ্ক-হৃ রয় বিজ্ঞান লয়ে।
ঘাের অনাচারে পূর্ণ হয় ধরা,
বাড়ে পলে পলে পাপের পসরা,
পিশাচের পুরী হলাে বসুন্ধরা,
রহে প্রেত পদদলিত হয়ে!

সুর-সঙ্গীত।
২৭
ভাক্ত সাম্য-মন্ত্রে দীক্ষা লয়ে সবে,
সাম্যের পতাকা তুলিয়া গরবে,
বিদারি গগন “সাম্য” “সাম্য রবে,
ভ্রমে ভূমণ্ডলে মানব-দল ;
কাৰ্য কালে কিন্তু ঘাের স্বার্থপর,
দুৰ্ব্বলে পীড়ন করে নিরন্তর,
উঠে হাহাকার ধ্বনি ভয়ঙ্কর,
বিশৃঙ্খল-ময় ধরণী-তল!
নাহি ধৰ্ম্ম ভয়,সমাজ-শাসন,
পরকাল নাহি মানে কদাচন,
পাপ-পুণ্য ?—সে ত মূর্থের কল্পন।
ঈশ্বর ?—কে তিনি ?-কেমন রূপ ?
পূরিল নাস্তিকে জগত-সংসার,
স্বেচ্ছাচার-রাজ্য হইল বিস্তার,
পাপের অনলে হয়ে ছারখার,
হইল অবনী গরল-কূপ!
হেরি অনাচার বীভৎস ব্যাপার
করিবারে সৃষ্টি-লীলা সমাহার
প্রকৃতি-পুরুষ ত্যজি বিশ্বাগার
ব্ৰহ্ম-পদ-মূলে লইলা স্থান

সুর-সঙ্গীত।
৫
স্থবিরা ধরণী হইলা শ্রীহীন,
উৰ্ব্বরতা শক্তি ক্রমে হয় ক্ষীণ,
দুর্ভিক্ষ-অনল জ্বলে দিন দিন,
হাহাকারে জীব ত্যজেরে প্রাণ।
যুগ যুগ ব্যাপি অনাবৃষ্টি হয়,
বিরসা পৃথিবী বিফ-হৃদয়,
মাৰ্ত্তরে তেজঃ ক্রমে হয় ক্ষয়,
নিবিড় আঁধার আসেরে ঘিরে।
করিয়া ব্যাদান, করাল বদন
ঘাের মহামারী দিল দরশন,
উঠে বিশ্বময় ভীষণ রােদন,
হায় রে মানব করিলি কি রে?
মুহুর্তে মুহূর্তে জীব কত শত,-
নর, পশু, পক্ষী, কীট আদি যত,
জল-স্থল-চারী, আকাশ বিহারী,
ত্যজে রেজ্জীবন কে গণে তায়?
কি যে মহাব্যাধি কেহ নাহি জানে,
বিষম সে ব্যাধি ঔষধি না মানে,
ব্যাধিগ্রস্ত যেই, না বুঝিতে সেই,
মরিয়ে সহসা ভূমে লুটায় !
।

'সুর-সঙ্গীত।
.
১০৯
•
কি যেন কিরূপ বিষ ভয়ঙ্কর
অলক্ষিত ভাবে ব্যাপ্ত চরাচর,
অনিল সলিল বিযের আকর,
ক্ষরে যেন বিষ রবির করে ?
চির সুধাময় প্রণয়ী অধর
ধরে যেন কালকূট তীব্রতর ?
জননীর স্তন সুধার নিঝর,
হলাহল যেন তাহাতে ঝরে।
-
ওই হের ওই আকাশের তলে
মধুর ঝঙ্কার তুলি কুতুহলে
উড়ে যায় ওই বিহঙ্গম দলে
পাখা দুটি মেলি মৃদুল-বাতে ;
সহসা এ কিরে লােষ্ট্রের মতন
ভূ-তলে সদলে হইল পতন,
শূন্যে শূন্যে সবে ত্যজিল জীবন
যেন রে নীরব-অশনি-ঘাতে।
ছােটে উদ্ধশ্বাসে কুরঙ্গের পাল,
পাছে পাছে ধায় শাৰ্দল বিশাল,
দৃপ্ত ক্ষুধানলে আকৃতি,ভয়াল,
লক্ষ্য করি মৃগে ভীষণ বলে

১১,
সুর-সঙ্গীত।
;
করে লম্ফত্যাগ করিয়া গর্জন
সহসা ভূতলে হইল পতন,
নিষ্পদ-শরীর জুড়ের মতন,
ত্যজিল জীবন একই পলে।
দীর্ঘকাল গতে প্রবাসী মানব,
হৃদে ধরি শত আশা অভিনব,
দেখিতে স্বজন সুহৃদ-বান্ধব,
দেখিতে সে প্রিয় আপন দেশ
আসিছে আলয়ে উৎসাহে মাতিয়া,
ডাকিবে মায়েরে “জননি” বলিয়া,
দেখি প্রিয়মুখ জুড়াইবে হিয়া,
বুকে ধরি পুত্রে ভুলিবে ক্লেশ।
ওই দেখা যায় সুখের ভবন,
ওই ছুটে আসে পুত্র-কন্যাগণ,
প্রসারি দু-বাহু জননী-রতন
আসেন হৃদয়ে ধরিতে তায় ;
আসে প্রিয়তমা হাসি হাসি মুখে,
সুখের সাগর উথলয়ে বুক ;
সহসা এ কিরে স্বজন-সমুখে
ভূমে ঢুলে পড়ে অভাগা হায় !

সুর-সঙ্গীত।
در
যুবক যুবতী বসি সুখাসনে
দুটি বাহুপাশে বাঁধিয়া দু-জনে
কহে কত কথা প্রেম-আলাপনে,
জ্ঞান-হারা দেহে অতুল-সুখে,
সােহাগে প্রেমিক পুরুষ রতন
করিতে ললনা-বদন চুম্বন
অধরে অধর অর্পিল যেমন
অমনি তুলিয়া পড়িল বুকে!
প্রাণের পুতলি ধরি নিজ-কোলে
ভাসেন জননী সুখের হিল্লোলে,
সুধাংশু-বদনে আধ “মা” “মা” বােলে
ডাকে শিশু মৃদু-মধুর স্বরে,
সােহাগে জননী চুম্বিয়া বদন
পীযুষ-পূরিত মুখে দেন স্তন,
করিতে শিশু চুচুক চুম্বন,
মুদিল নয়ন জনম-তরে ।
বাজে ঘন ঘন কালের বিষাণ,
বাধিল বিষম বিধ্বংসী সংগ্রাম,
সারা ধরাখান হইল শ্মশান,
সাজিল ভীষণ বিকট সাজে।

১১২
সুর-সঙ্গীত।
ঘাের আর্তনাদ আকাশে মিশায়,
পলায় মানব না জানে কোথায়,
জীব-অস্থি-মালা ধরিয়া গলায়
নাচেরে সংহার ভুবন-মাঝে।
একটি মানব-দম্পতি কেবল
-ধরণীর সবে জীবন-সম্বল!
সুখে করে ভােগ শান্তি-নিরমল
সেই অশান্তির চরম দিনে।
পুরুষ তাহার ঘাের বৈজ্ঞানিক,
মানে ঈশ্বরে, সহজে নাস্তিক,
কুটিল তার্কিক, বিষম দাম্ভিক,
বিজ্ঞান-প্রভায় কালেরে জিনে ।
বিজ্ঞানের বলে অপূৰ্ব্ব-কৌশলে
নাশে শারীরিক প্রবৃত্তি সকলে,
রুদ্ধ-গৃহ মাঝে বিজ্ঞান-অনলে
দিবাকল-জ্যোতিঃ ফুটায়ে রয় !
না করে আহার,ক্ষুধা তৃষ্ণা হীন,
বিজ্ঞানে সকলি আয়ত্ত-অধীন।
বিজ্ঞান-প্রভায় পবন কৃত্রিম
গৃহ মাঝে ধীরে মধুরে বয় ।

সুর-সঙ্গীত।
১১৩
বসিয়া পুরুষ, বদন গম্ভীর,
বিজ্ঞানের নব তত্ত্ব করে স্থির,
কাছে বসি নারী চক্ষে ঝরে নীর,
কাতরে পতিরে সম্ভাষি কয়,
“কি হইবে নাথ ! না দেখি উপায়,
নিতান্ত এ বিশ্ব রসাতলে যায়,
মানবের সাধ্য নাহিক তাহায়,
লঙ্ঘিতে বিধির বিধান-চয় !
“প্রাণিশূন্য দেখ হয়েছে ভুবন,
প্রতি পলে পলে নিবিছে তপন,
বাড়িছে নিবিড় অন্ধকার ঘন,
প্রলয়ের বাকি কি আছে আর ?
শুধু মােরা দুটী এ মহাশ্মশানে,
ছিদ্র-কুন্ত প্রায় পড়ে একস্থানে,
আছি শােক-স্মৃতি ধরিয়া পরাণে,
দেহে মাখি পাপ-ভস্মের ভার ।
এ পাপের দেহ অচিরে নিশ্চয়
কালের প্রভাবে হইবে বিলয়,
বাঁচি যতক্ষণ মিলিয়া উভয়
এস করি ঈশ-মহিমা গান।

১১৪
সুর-সঙ্গীত।
“এ বাসনা নাথ করি এই চিতে,
-পূরিবে কি সাধ না পারি কহিতে !
তােমার ও মুখ দেখিতে দেখিতে
যায় যেন এই পাপিনী-প্রাণ !”---
দৃপ্ত সিংহ প্রায় করিয়া গর্জন
করিল উত্তর পুরুষ তখন
“কোথায় ঈশ্বর ?—অলীক স্বপন
আঁখি মেলি কেন দেখিছ তুমি ?
বলিছি তােমায় কত শত বার--
‘নাহিক ঈশ্বর’-বলি সে আবার,
যদি থাকে ঈশ কি শক্তি তাহার
নাশিতে বিপুলা এ বিশ্ব-ভূমি ?
“যদি থাকে জ্ঞান বিজ্ঞানে আমার,
রাখিব পৃথিবী করি অঙ্গীকার।
বৈজ্ঞানিক যেই অসাধ্য কি তার ?
বিজ্ঞানে কি কাজ সাধিতে নারে ?
নিবিছে তপন, নিবুক সম্বর,
বিজ্ঞান প্রভায় নবীন-ভাস্কর
করিব সৃজন, ভাতিবে অম্বর,-
আজ্ঞাধীন মম করিব তারে ।
৫
=

সুর-সঙ্গীত।
১১৫
“বিজ্ঞান-প্ৰভায় নব ধরাতলে
সাজাইব পুনঃ তরু লতাদলে,
পশু পক্ষী নর বিজ্ঞানের বলে
অজর-অমর হইবে সবে ।
এই হের প্রিয়ে বিজ্ঞান-কৌশলে
—চিন্তি কত কাল বসিয়া বিরলে !
করেছি অমৃত তীক্ষ্ণ হলাহলে,
কি ভাবনা আর বলহ তবে ?
“বিন্দু-পরিমাণ এই সুধা পান
কর কর প্রিয়ে তৃপ্ত হবে প্রাণ!
জরা-মৃত্যু-ভয় হবে তিরােধান,
রহিবে এ ভবে অমর-প্রায় !”
এত বলি ভ্রান্ত গরল লইয়া
ললনা-বদনে দিলেক ঢালিয়া,
অমনি রমণী নয়ন মুদিয়া
ছিন্ন-লতা প্রায় পড়ে ধরায় !
চমকি মানব উঠি দাঁড়াইল,
বুঝিতে না পারে-কিসে কি হইল,
ক্ষণে স্থির-দৃষ্টে চাহিয়া রহিল।
প্রাণ-শূন্য সেই দেহের প্রতি,

সুর-সঙ্গীত।
কহিল গম্ভীরে “তুমিও বলনে,
চাতুরীর খেলা খেল মাের সনে ?
ভাল, মম শক্তি দেখাব এক্ষণে,
বাঁচাব আবার তােমারে সতি।
এতেক কহিয়া লয়ে মৃতকায়
যতনে কতেক ঔষধি মাখায়,
কৌশলে নিশ্বাস দেয় নাসিকায়,
তবু নাহি দেহ চেতনা পায় !
ব্যর্থ হ’ল আশা,-মানব সন্তান
বুকে ধরি সেই মৃতদেহ খান,
প্রেমে শতবার চুম্বিয়া বয়ান,
সােহাগে সম্ভাষে কর্তই তায়।
ক্রমে ক্রমে দেহ হইল বিকৃত,
পূতি-গন্ধে দিক হইল পূরিত,
মাংস অস্থি-চয় হইয়া গলিত,
খু’সে খসে পড়ে শরীর হতে।
দেখিয়া মানব উন্মত্তের প্রায়
ছাড়িয়া চীৎকার ত্যজি মৃত-কায়
ভাঙ্গি গৃহ-দ্বার চরণের ঘায়
ছুটিল সবেগে নগর-পথে!

সুর-সঙ্গীত।
১১৭
নগ্ন দেহখান, মূরতি ভীষণ,
ঘূর্ণিত আরক্ত যুগল নয়ন,
ছুটিয়া বেড়ায় মৰ্ম্ম যাতনায়,
কে আছেরে শান্ত করিবে তায় ?
ফিরি ঘরে ঘরে ডাকে উচ্চৈঃস্বরে
“কে আছ মানব আইস সত্বরে,
যেখানেতে যায়, দেখেরে তথায়,
গলিত বিকৃত মানব-কায়!
কেহবা বিকাশি বিকট-দশন
রয়েছে বিস্তারি যুগল-নয়ন,
ফাটি স্ফীতােদর ন্যক্কার-আকর
পূতিগন্ধময় বহিছে নীর!
বিগলিত-মাংস, বিকৃত বদন,
আছে কেহ করি জকুটি ভীষণ,
লােল জিখান, করিয়া ব্যাদান,
দুই কর-তলে চাপিয়া শির!
গলিত-নয়ন-গভীর-গহ্বরে
দরদরে রস কাহারাে নিঃসরে।
কারাে নাসিকায় প্রবল ধারায়
শটিত-মস্তিষ্ক-প্রবাহ বয়!

১১৮
সুর-সঙ্গীত।
হেরে কোথা নারী পূর্ণ গর্ভবতী
রয়েছে পতিতা বীভৎস মূরতি!
বিদীর্ণ জঠর, দৃশ্য ভয়ঙ্কর,
মৃত-শিশু তাহে পচিয়া রয় ।
শিহরি আবার ছাড়িয়া চীৎকার
ছােটে উৰ্দ্ধশ্বাসে ত্যজি সে আগার,
দগ্ধ দেহী মত ছােটে অবিরত
জুড়াইতে যেন দারুণ জ্বালা !
নীরব ভুবন জন প্রাণী হীন,
বিষম বিষাদে যেন রে মলিন,
কাঁদিছে পড়িয়া হৃদয়ে ধরিয়া
গতা প্রাণীর কঙ্কাল-মালা।
ছুটিছে উন্মত্ত মানব-সন্তান,
কোথা যায় কিছু নাহি তার জ্ঞান,
বলে উচ্চৈঃস্বরে “কে কোথা আছরে,
দেখা দিয়া মােরে করহ ত্রাণ!
“এ জ্বালা ত আর সহেনা পরাণে,
আমি রে পিশাচ এ মহাশ্মশানে,
কে আছরে ভাই আইস এখানে,
দেখিয়া তােমারে জুড়াই প্রাণ !”
।
।

সুর-সঙ্গীত।
১১৯
p
--
বলিতে বলিতে দেখে আচম্বিতে
জলৌকা একটী পড়ি ধরণীতে
লুটি-পুটি যায় ধূলার সহিতে,
মৃত্যু যাতনায় জীবন জ্বলে।
দেখিয়া তাহারে উঠায়ে সত্বরে,
বুকে ল’য়ে বলে গদগদ স্বরে
“ওরে প্রাণাধার! তুইরে আমার,
জীবনের সঙ্গী এ মরু-তলে ?
“হৃদয়-শােণিত দিবরে তােমায়,
যতনে বাঁধিয়া রাখিব গলায়,
হবে বিচ্ছেদ তােমায় আমায়,
প্রাণে প্রাণে বাঁধা বু’ব দু-জনে!”
সঙ্কুচিত করি ক্ষুদ্র দেহখান
সহসা সে কীট ত্যজিল পরাণ
আবার চীৎকারি মানব সন্তান
ছুটিল রে আহা উন্মত্ত-মনে !
;
উঠি গিরি-শিরে উচ্চ-কণ্ঠ-স্বরে
ডাকে—রে মানব কোথা কে আছরে,
এস ত্বরা করি নিকটে আমার,
জ্বলে গেল বুক হইল অঙ্গার !

১২,
সুর-সঙ্গীত।
পারি সহিতে যায় যায় প্রাণ,
দেখা দেও ওরে, কর শাস্তি দান!
যে আছরে যথা কও কও কথা,
ঘুচাও আমার মরমের ব্যথা !
ডাকি শতবার তুলি উচ্চ-স্বর,
তথাপি কেনরে না দাও উত্তর ?
এ পৃথিবীতে তবে কেহ কিরে নাই ?”
-প্রতিধ্বনি বলে “নাই”—“নাই”—“নাই” ।
গুনিয়া উত্তর, ছাড়িয়া চীৎকার,
উর্দ-হাতে মত্ত ছুটিল আবার!
দিগ্বিদিক কিছু নাহি তার জ্ঞান,
ছুটে যায় রুদ্র-পিশাচ-সমান ?
নিজ পদ-শব্দ করিয়া শ্রবণ
চমকিয়া ফিরে চাহে ঘন ঘন !
আছাড়িয়া ভূমে পড়ে শতবার,
ছিন্ন-ভিন্ন-দেহে বহে রক্ত-ধার!
মুখে ঘন ঘন প্রকই বচন,
“কে আছরে জীব এ মৰ্ত্ত-ভুবন ?
পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ ভিতরে
যদি কেহ পাক আইস সত্বরে,
থাকিতে এ ভাবে পারিনে রে আর,

সুর-সঙ্গীত।
১২১
হয়েছে জীবন দুর্বিসহ-ভার!
সারা ধরাখান খুজিয়া বেড়াই,
তথাপি কাহারাে দেখা নাহি পাই।
তবে কিরে ভবে কেহ আর নাই ?”
-প্রতিধ্বনি বলে “নাই”—“নাই”—“নাই”!-
হৃদয়-বিদারি চীৎকারি আবার
ভূমে পড়ি নর করে হাহাকার।
ফাটো ফাটো বুক ফাটে নাক আর,
ভীষণ যন্ত্রণা সহিতে নারে।
হইল আকাশে গম্ভীর বচন,
“শান্ত হও নর, মেলরে নয়ন,
ভাবহ অন্তিমে সত্য-সনাতন,
শান্তি পাবে মনে ভজিলে তারে।”
শুনি দৈববাণী শিহরিয়া নর
ধূলি-শয্যা ছাড়ি উঠিয়া সত্বর,
জানু পাতি ভূমে ঘুড়ি দুই করে
উৰ্দ্ধ পানে চাহি ভক্তি-যুত স্বরে
কহে সকাতরে “ওহে বিশ্বপতি?
ঘুচাও ত্বরিতে পাপীর দুর্গতি।
তুমি হে শ্রীনাথ করুণা-নিদান,
অধমের প্রতি হও কৃপাবান।

সুর-সঙ্গীত।
করহে করুণা এ পামর-জুনে,
দেও চির-শান্তি অভয়-চরণে।”
হইল সহসা গম্ভীর গর্জন,
ভীম-ভূ-কম্পনে কঁপিল ভুবন,
উৎপাটিত তরু, চূর্ণ গিরিগণ,
ছিন্ন-ভিন্ন হয় ধরণী-তল !
বিদারি মেদিনী দশদিক গ্রাসি
ঘাের হুহুঙ্কারে উঠে ধূম-রাশি,
প্রলয়-পাবক ছুটে বিশ্ব-নাশী,
অনলে অনল সকল স্থল!-
বহিল প্রচণ্ড প্রলয় পবন,
উঠে ঘূর্ণ পাকে আবৰ্ত্ত ভীষণ !
উথলিল সিন্ধু, নিবিল তপন,
আঁধারে আঁধার ভুবনময় !
দিব্যজ্যোতিঃ এক ছুটিতে ছুটিতে
হের হের অই আসে ধরণীতে,
মিলিত হইয়া সে জ্যোতিঃ সহিতে
মানবের আত্মা পাইল লয় ।
সম্পূর্ণ।
৮

পুস্তক সম্বন্ধে অভিমত। “বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল রেলওয়ের প্রতিষ্ঠাতা,সংস্কৃত ও ইংরাজী ভাষায় সুপণ্ডিত, কাব্যামােদী শ্ৰীযুক্ত বাবু অন্নদা প্রসাদ রায় মহাশয়ের অভিমত :- “বিধাতার লীলা আর কবির কল্পনা উভয়েরই সীমা নাই, তাহা হইলে আজ আমরা “সুরসঙ্গীত” শুনিতে পাইতাম না। পাকশাসনাদি সুরগণ! কলাময়ী কল্পনার সহায়তা ব্যতিরেকে আজ আপনার কল্পকোটীপূৰ্ব্ব সংরচিত সৃষ্টি-রহস্য শুনিয়া মুদিত, বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইতে পারিতেন না,--বিশ্ব স্থিতির পুলকোৎপাদী সুষম- কলেবর সাষ্টাঙ্গ সম্পূর্ণ দেখিয়া শান্তি ও প্রীতি লাভ করিবার উপায়ান্তর পাইতেন না, অথবা কালে পাপােন্মত্ত মানব-কুল আত্মহারা হইয়া কিরূপে প্রলয়ের করাল কবলে অসহায়াবস্থায় প্রত্যবসিত হইবে তাহাও উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইতেন না। আর গায়ক! আপনি ধন্য ধন্য আপনার গাথা রচনা, লােকা- তিগা গীতিশক্তি, অলােকসামান্য, ছন্দোবৈচিত্র্য! এরূপ ষড়জশালী কণ্ঠে, উদাত্তানুদাত্ত স্বরিতময়-স্বরে, হৃদয়ােন্মাদক তানে, মর্মস্পর্শীলয়ে, দীপক-রাগে ও অমৃষ্ট ভাষায় ত্রিগুণাতীত কারণরূপ চিন্ময়ের লীলাগান মন্দার-সুরভিত নন্দন কাননমধ্যে ইন্দ্রাদি সুরগণের সন্নিধানেই শােভা পায়, হীনবুদ্ধি নরলােক ইহার অর্থ কি বুঝিবে ? ক্ষীণকণ্ঠে, দীনস্বরে মলয়-বর্জিত সামান্য রাগিণীতে অসার মানব-লীলা কীৰ্তিত শুনিতে r, যাহারা অভ্যস্ত “সুর-সঙ্গীত-” গায়ক যে তাহাদের কাছে “সুরসঙ্গীত গাইতে প্রয়াস পান নাই তাহা যেন ঠিকই কাৰ্য্য হইয়াছে। কবিঃকরােতি পদ্যানি লালয়ত্যুত্তমম জনঃ। তরুঃ প্রতে পুষ্পনি মরুদ্বহতি সৌরভ। আমার প্রার্থনা সাধুজন কাব্যের অদম্যতেজঃ, অনির্ভিন্ন গভীরত্ব, অনিরুদ্ধবেগ, শাস্ত্র সমন্বয়, অনাৰ্য্যশূন্যতা, ভাষাৰ্জব ও ছন্দঃসারতা প্রভৃতি সদ্গুণরূপ সৌরভসার মরুপে ত্রি-দশালয় হইতে বহন করিয়া মৰ্ত্তালয়ের দিষ্মণ্ডল সুরভান্বিত করিবেন। ( স্বাঃ) শ্ৰীঅন্নদা প্রসাদ রায়। সাহিত্য জগতে সু-পরিচিত, অধুনা শ্রীহট্ট বিভাগের স্কুল সমূহের ডিপুটি ইন্সস্পেক্টর সু-পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত পদ্মনাথ ভট্টাচাৰ্য বিদ্যাবিনােদ এম, এ, মহােদয়ের মত ঃ- সুর-সঙ্গীত পাঠ করিয়া পরম পরিতোেষ লাভ করিয়াছি।আজি কালি বাজারে যে সকল কবিতাপুস্তক প্রচারিত হয় তাহার অধিকাংশই প্রতিভা- বান রবীন্দ্রনাথের অনুকরণে লিখিত।--ভাব, ভাষা ও বিষয় সমস্তই “স্বপ- নের ছায়া পারা”!-কর্ণ সুখকর বটে, কিন্তু হৃদয়ের অন্তস্তলে পৌছিতে পারে না।-বলা বাহুল্য সুর-সঙ্গীত’ ঐ দলের কাব্য নহে;-কবি যদি ভাব ও ভাষার সমাবেশে কাহারও পথানুসরণ করিয়া থাকেন, তবে হমচন্দ্র ও নবী। চন্দ্রের। কিন্তু যে বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন, তাহা সম্পূর্ণরূপে মৌলি এবং বােধ করি উপরােক্ত কবিদ্বয়ের লেখনীকেও • চরিতার্থ করিত।-“সৃষ্টি-স্থিতি-লয়, কি প্রকারে হয়,” হইয়াছে কাব্যের বিষয়, যে-সে ব্যক্তি এ বিষয়ে ভারতী-নিয়ােগ করিলে উপহাসের ভাজনই হইত, কিন্তু কবির ইহাই গৌরবের বিষয় যে তিনি তাহার গ্রন্থে যথেষ্ট কাব্য-নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়াছেন। অবয়বে ক্ষুদ্র হইলেও এই কাব্যই তাহাকে বর্তমান কবিগণের মধ্যে বিশিষ্ট আসন প্রদান করিতে পারিবে বলিয়া আশা করি। (স্বাঃ) শ্রীপদ্মনাথ শৰ্মা (ভট্টাচাৰ্য বিদ্যাবিনােদ এম, এ।) মধ্যপ্রদেশ বামড়া রাজের ভূতপূর্ব প্রাইভেট সেক্রেটারী ও তত্ৰত্য স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিবিধ ভাষাবিদ শ্ৰীযুক্ত রেবতী মােহন দাস গুপ্ত, এম, এ, মহােদয়ের মত :- “সুর-সঙ্গীত” পাঠে পরম পরিতােষ লাভ করিয়াছি। এতৎপাঠে কাব্যরসাস্বাদন এবং উচ্চচিন্তা সাহচর্য এই উভয়বিধ প্রীতিলাভই ঘটিয়াছে। কবি প্রতিভা দৈবীশক্তি, পরিশ্রমায়ত্ত বস্তু নহে। বাদেবী মুক্তহস্তে বর্তমান কাব্যপ্রণেতাকে সেই সুতিভা প্রদান করিয়াছেন। তদীয় ত্রিকাল দর্শিনী প্রতিভা ক্ষণকাল নিমিত্ত আমাদিগকে দিব্য দৃষ্টি প্রদান করিয়াছিল। সেই দৃষ্টিতে আমরা পরব্রহ্ম হইতে প্রকৃতি পুরুষের অভিব্যক্তি ও প্রকৃতি পুরুষের “শুভদপ্রেমমিলন” ফলে সৃষ্টির উৎপত্তি অবলােকন করিয়া ক্লতার্থ হইয়াছি; কীটাণু• হইতে আরম্ভ করিয়া যুগবাহি জীর স্রোতে উন্নত হইতে উন্নততর জীবে বিবর্তন পর্যাপ্ত বেক্ষণ করিয়া বিস্মিত হইয়াছি এবং প্রকৃতি পুরুযে বিশেষ প্রণিধান ;

ফলে স্বকীয় জাতির শুভােদৰ্ক সৃষ্টিক্রিয়া নিষ্পন্ন হইল দেখিয়া নরজাতির অক্ষুন্ন গৌরবে মার্জনীয় আত্মশ্লাঘা অনুভব করিয়াছি। অপিচ মানবকে বৰ্বর সহজবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত অবস্থা হইতে ভূয়ােদর্শন প্রভাবে বিবিধ ধর্ম বিপ্লব উত্তীর্ণ হইয়া পরমাত্মতত্ব লাভে অগ্রসর এবং অধিকারী রূপে দণ্ডায়মান হইতে অবলােকন করিয়াছি। আবার সুদূর ভবিষ্যতে জগন্নিয়, বিস্তৃত জড়বাদ সৰ্বস্ব উমার্গ প্রস্থিত মানবের ধ্বংস সন্দর্শনে ভীত ও স্তম্ভিত হইয়াছি। কবি প্রতিভাদত্ত দিব্যকর্ণ যােগে শেষ মানবের অন্তিম কালীন অনুতপ্ত আর্তনাদ ও ক্ষমাবান পরম কারুণিক পরমেশ্বরের ভয়হারিণী আকাশবাণী শ্রবণ করিয়া আশ্বস্ত হইয়াছি। অবশেষে লয়কালে জীবাত্মাকে ঐশ তেজে মিলিত হইবে দেখিয়া জীবাত্মা ও পরমাত্মার অভেদ সম্বন্ধ প্রত্যক্ষ করত স্বীয় পাপ মালিন্য অপনােদনের সম্ভাবনা বিষয়ে আস্থাবান এবং স্বকীয় নিঃশ্রেয়স লাভ বিষয়ে আশান্বিত হইয়াছি। কবি কল্পনায় গরুড় পতত্র অবলম্বনে উড্ডীন হইয়া দূরবীক্ষণের সুদূর প্রসারিত দৃষ্টির অতীত অসীম অন্তরীক্ষচারী “বিরাট ভাস্করাদি” কত শত লােকে “প্রকৃতি” ও “মহাকালের অনুসরণ করিয়াছি ও সেই লােক সমূহের রচনা, সংস্থা ও গতি বৈচিত্র্য নিরীক্ষণে স্বীয় ক্ষুদ্রতা অনুভব করিয়াছি, তাহার সংখ্যা কে বলিবে ? বিজ্ঞানের অগ্রবর্তিণী হওয়া এবং পাঠককে স্বীয় সমপ্লিব্যাহারে পার্থিব জ্ঞান সীমার অতীত প্রদেশে উপস্থিত করাই কবি প্রতিক্ষার অসাধারণ উচ্চাধিকার। তাই জ্যোতিৰ্ব্বিদের স্বপ্নাতীত ব্ৰহ্মলােক প্রভৃতিতৎপ্রসাদে আমাদের গােচরী- ভূত হওয়ায় অমান্য প্রীতিলাভে সক্ষম হইয়াছি। “ কাব্যের উপকরণ নির্বাচনে “সুর-সঙ্গীত” রচয়িতার মৌলিকতা } 1/o সৰ্বজন স্বীকৃত হইবে ইহা নিশ্চয়। সুবিজ্ঞ পাঠক বর্তমান কাব্য পুরাণ, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞানের কত শত তত্ত্বের কবিতাময়ী স্মৃত্তি সন্দর্শন করিয়া অতুল আনন্দ লাভ করিবেন এবং ভাবসাহচৰ্য্য বলে সেই আনন্দ আরও কতশত গুণে বর্ধিত হইবে তাহা প্রবীণ পাঠক প্রত্যক্ষ না করিয়া কদাপি বিশ্বাস করিবেন না এবং আমরাও সে পরিমাণ নির্দেশের অবিমৃষ্যকারিতায় লিপ্ত হইতে উৎসুক নহি। সুপণ্ডিত শিক্ষকের অধ্যাপনায় ছাত্র এ কাব্য পাঠে জগতের চিরস্মরণীয় মনীষি- গণের চিন্তালব্ধ ভূরি ভূরি তত্ত্বের সহিত পরিচয় লাভ করিবে সন্দেহ নাই। কেবল মাত্র এই কারণেও এ কাব্য নৰ্মাল স্কুলের পাঠ্যরূপে নির্ধারিত হইলে ছাত্র সাধারণের অশেষ কল্যাণ সংসাধিত হইবে ইহাই আমাদিগের ধারণা। ইত্যলং ( স্বাঃ) শীরেবতী মােহন দাস গুপ্ত (এম, এ,) শিলং গবর্ণমেন্ট স্কুলের সুযােগ্য শিক্ষক শ্রীযুক্ত করুণাকান্ত দাস গুপ্ত বি, এ, মহাশয়ের অভিমত :- সৃষ্টি-স্থিতি-লয় “সুর-সঙ্গীতে”র বর্ণিত বিষয়। কবি এই দুরূহ বিষয় বিজ্ঞান দর্শন ও ধর্মশাস্ত্রাদি যত দূর সম্ভব সামঞ্জস্য রাখিয়া নিজ কল্পনা শক্তি, প্রতিভা ও গবেষণার বিশেষ পরিচয় দিয়াছেন। কাব্য খানির অনেক স্থলেই নূতন ভাব দৃষ্ট হয়। ইহা বেশ সুপাঠ্য ও নীতি উপদেশ-পরিপূর্ণ এবং ভাবগ্রাহী পাঠকগণের বিশেষ আদরের সামগ্রী is০ হইবে। “সুর-সঙ্গীত” নর্মাল স্কুলের ছাত্রদের পাঠ্য শ্রেণীভুক্ত হইলে ইহা পাঠে তাহাদের চিন্তাশক্তির বিকাশদ্বার উন্মুক্ত হইবে সন্দেহ নাই। (আঃ) শ্ৰীকরুণা কান্ত দাস গুপ্ত, বি, এ, শিলং গবর্নমেন্ট স্কুল। আসামের শিক্ষা বিভাগের অমর একজন প্রাচীনতম পণ্ডিতের অভিমত :- “সুর-সঙ্গীত” বঙ্গ-সাহিত্য ভাণ্ডারে এক অপূৰ্ব্ব পদার্থ। যাহার যৌবন-প্রতিভা একদিন “শিশুর হাসি.” “কাকাতুয়া” “পায়রামণি” প্রভৃতি পবিত্র কুসুম প্রস্ফুটিত করিয়া কোমলমতি শিশুগণের প্রাণ বিমুগ্ধ করিয়াছিল, আজি তাহারই প্রবীণ প্রতিভা “সুর-সঙ্গীত” নামক পবিত্র জ্ঞানগর্ত্ত সুললিত কাব্য সংরচিত করিয়া অধ্যেতৃযুবক বৃন্দের প্রাণ বিমােহনে প্রয়াসী। অলঙ্কার শাস্ত্রের অভিমতে, ইহা একখানি উপাদেয় “খণ্ডকাব্য”। ইহাতে রীতি, গুণ, রস, ভাব প্রভৃতি সমস্তই বর্তমান। বীররস ব্যতীত ইহ'তে প্রায় সক রসেরই স্ফুৰ্ত্তি আছে।” “আলম্বন ও উদ্দীপন বিভাব” সমন্বিত “শমই ইহার প্রাণ। আমরা এ কাব্যের অভ্যন্তরে প্রাচীন দর্শন শাস্ত্রের সুগভীর তত্ত্ব সকলের কবিতাকারে স্ফ ৰ্ত্তি দেখিতে পাইয়া বিমােহিত হইয়াছি। এ উপাদেয় গ্রন্থখানি নৰ্মাল স্কুলের ১ম ও ২য় বার্ষিক শ্রেণীর পাঠ্যরূপে নিৰ্বাচিত হইলে অধ্যেতৃবর্গের উন্নত-তত্ত্বচিন্তনের দ্বার উন্মুক্ত হইবে। ( স্বাঃ) শ্ৰীকৈলাস চন্দ্র সেন গুপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Sur-sangit

Author
Not Available
Title
Sur-sangit
File name
Sur-sangit
Text
OCR done
Citation
1897
Published
2009/10/16
Publisher
Kedernath Chattopadhayay,assam
Language
Sanskrit
Pages
142
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Lyrics
Keywords
Urbashi
DLI number
513365
Barcode
4990010020350.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
SdkLujyl4go
Download PDF

Sur-sangit