Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Dipali
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দীপালী
No text on this page.
কাব্যপ্রিয় সুহৃদ্বর
শ্ৰীযুক্ত প্রিয়নাথ সেনকে
এই গ্রন্থ
উপহার
প্রদত্ত হইল
No text on this page.
দীপালী
শ্রীপ্রমথনাথ রায় চৌধুরী প্রণীত
সন ১৩০৮
কুন্তলীন প্রেস হইতে
শ্রীপূর্ণচন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত এবং ৩৫২ বিডনষ্ট্ৰীট
শ্ৰীঅনুকূলচন্দ্র বসু কর্তৃক প্রকাশিত
মূল্য ১ টাকা
সূচী ••• পৃষ্ঠা বিষয় দীপালী ১ ত অসময় । ৪. ১১ ১২-১৬ ১৭-~~-২০ ২১-২৫ ২৬- সাধন-সঙ্কল্প রূপ-বৈচিত্র আত্ম-পরিচয় সমালােচকের প্রতি কবি গীত-লক্ষী অপূর্ব বন্দনা শ্বশুরকন্যার খুব কবি-সম্ভাষণ অরু আর তরু লােকান্তরিত পরলােকবর্তিনী ডাক্তার ৩ অমূল্যচরণ বস্তু ৩২-৩৪ ৩৫-৩১ ৩৭ _ ৪ ৪৩ ৪১-~-৪১ महौ বিষয় ৪২-৪২ ৪৩-- ---৪৩ ৪৪-৪৪ ৪৫-৪৫ ৪৬-৪৬ ৪৭-৪৭ ৪৮-৪৮ ৪৯- ৪৯ বন্ধুতা বিচিত্র সখ্য দুঃখের স্তোত্র সুখ-দুঃখ দুঃখে সুখ জীবনযাত্রা হতভাগ্যের প্রাপ্য নিবেদন কবির কৈফিয়ৎ মৰ্ম্মাহত দুর্দিনের গান ভিক্ষায়াং নৈব নৈব চ অনুনয় , পরিবর্তন নিমজ্জিতের স্বপ্ন প্রত্যাবর্তন চুম্বন (১) চুম্বন (২) আলিঙ্গন (১) ৫১-৫৪ ৫৫-৫৬ ৫৭-৫৯ ৬২-৬৫ ৬৬-৬৯ ৭০-৭২ ৭৩-৭৩ ৭৪-৭৪ ৭৫-৭৫ সূচী • পৃষ্ঠা ৭৬-৭১ ৭৭-৭৭ اوسطه বিষয় আলিঙ্গন (২) যাই, তবে যাই । তুমি ধ্রুবতারা! আরাে শুন! জীবন-চিন্তা আবেদন শিল্পীর প্রেম ৭৯৭৯ ? ? ? ৮৭ খুকুর ঘুম ৯১-৯ খুকুর হাসি ৯৭-৯৯ ১০০-~~১০২ ১০৩-১০৪ ১০৫-১০৭ পল্লী-বালকের জল্পনা একটি অশ্বথের প্রতি একটি কথা বিরহের অভিনন্দন চির-বিরহিনী পল্লীবালার কথা হতভাগ্যের কাহিনী নীরে তীরে ১০৮-.--১১১ ১১২-~-১২০ ১২১-~~~ -১৩১ ১৩২-১৩২ ১৩৩-১৩৩ অনুরক্তা ১৩৪-১৩৪
সূচী
পৃষ্ঠা
১৩৫-১৩৫
১৩৬-১৩৭
১৩৮-১৪৩
১৪৪-১৪৬
১৪৭–১৪৯
বিষয়
পরিত্যক্তা
মৃত্যুঞ্জয়
সতী
সাভরণা ও নিরাভরণ
দেব-দর্শন
অনুযােগ
বাদল-গাথা
শারদী
বসন্তের আগমন-উক্তি
দুর্দিনের চিত্র
যাত্রার উদ্বোধন
১৫০-~-১৫১
১৫৪-১৫৬
১৫৭-১৬০
১৬১-~-১৬৪
১৬৫-১৬৭
১৬৮-১৭০
দীপালী
নূতন নেশার
পাঠায়ে দিলাম তােমার ও পারে
আমার প্রদীপমালা,
তরুণ তৃষার
সাজায়ে বরণডালা।
নদী আলাে করি যায় পাড়ি ধরি
এক স্থির লক্ষ্য লাগি,
কোকনদ-প্রায়
ও চরণ-ছায়
শরণ লইবে মাগি।
জাগি সারারাতি ভাসাইব বাতি একে একে একে জ্বালি;
আমার জগতে এসেছে আজিকে দীপালী,
সাধের দীপালী ।
আগে হতে এসে বসে আছ ঘাটে
কি দুরাশে, হে পিয়াসী!
দেখিবে কি চেয়ে আসে স্রোত বেয়ে।
... অভিরাম দীপরাশি;
দীপালী
স্বর্ণ-ঢেউ তুলি
আসে হেলি দুলি
হৃদয়ের তালে তালে ;
টানিবে নীরবে তীর-পানে সবে
জড়ায়ে কি স্নেহ-জালে !
জাগি সারারাতি ভাসাইব বাতি একে একে একে জ্বালি;
আমার জগতে এসেছে আজিকে দীপালী,
মধুর দীপালী।
;
অকূল পাথারে
এ পারে নদীটি রঞ্জিয়া ভরিয়া
ভাসে মাের দীপমালা ;
কোনটি উজল
যেন জ্বলজ্বল
তপ্ত বাসনার জ্বালা ;
কোনটি আঁধারে
যেন নব বিভা আঁকা ;
কোনটি চকিত ;
কোনটি স্তিমিত ;
কোনটি কালীতে মাখা।
জাগি সারারাতি ভাসইব বাতি একে একে একে জ্বালি;
আমার জগতে এসেছে আজিকে দীপালী,
সাধের দীপালী।
;
দীপালী
নিঃশেষ করিয়া দিতেছি পাঠায়ে
প্রাণের প্রদীপগুলি ;
এক এক করি আঁচলে আবরি
নিয়ে যেও ঘরে তুলি ;
একটি নিশির
উৎসব অধীর,
তাহারে বাসিও ভালাে;
দেখিও আমার
আঁধার এ পার
তুলিয়া আমারি আলাে।
জাগি সারারাতি ভাসাইব বাতি একে একে একে জ্বালি
অামার জগতে এসেছে আজিকে দীপালী,
মধুর দীপালী !
দীপালী
অসময়
মালা নয়, জ্বালা এ যে আছি বুকে করি,
ধর ধর অঞ্জলী আমার ।
কাটা যদি থাকে তা’য়, চরণকমল-ছায়
স্নেহে তবু নিও উপহার।
নাই মাের ছায়া, জল,
শুধু ধূধূ মরুস্থল,
সর্বনেশে তৃষার ভাণ্ডার ;
ধর ধর অঞ্জলী আমার !
ও পারে হাসিছে কারা, এ পারে একেলা
লুটাতেছি গুমরি গুমরি।
খেয়া-তরী শেষবার হয়ে গেছে নদী পার,
ফেলিয়াছি অসময় করি ;
নদীজলে রক্ত ভাসে, বালুরাশি হাহা শাসে,
এল এল আঁধার সর্বরী :
লুটাতেছি গুমরি গুমরি !
৪
দীপালী,
ভয়ে ভয়ে চেয়েছিনু তােমারে যেদিন,
কেন ধরা দিলে না তখন ?
ভেঙ্গে ভেঙ্গে বার বার রচেছিনু উপহার,
বৃথা গেছে অনেক যতন !
আসিয়াছ, হে নিয়ে, এ দুর্দিনে, অসময়ে
দেখিবারে দাসের সাধন!
কেন্ ধরা দিলে না তখন ?
কোথা সেই পদ্মবন, বসন্ত-বিলাস,
হােক্ অাজ শ্মশানে বাসর ;
করুণ প্রসন্ন মুখে
এলে যদি ভক্ত-দুখে,
ফিরে যাবে ম্লান সকাতর ?
সাজানু বরণডালা, হাসিমুখে লও মালা,
লওথে কণ্টক কঙ্কর ;
হােক আজ শ্মশানে বাসর ।
৫
দীপালী ।
সাধন-সঙ্কল্প
যতক্ষণ আছে ভাষা, বাঁধি বুকে আশা
গেয়ে যাই গান ;
মথিয়া হৃদয়-সুধা জগৎজনারে
করাই তা পান।
হস্তে শােভে বীণা-বেণু, অধরে অমৃত,
হে মাের দেবতা,
হে কবিতা, হে কল্পনা, আনিতেছ বহি
কি মধু বারতা !
শিখাইছ বার বার অমর রাগিণী,
তবু আমি ভুলি ;
মায়া-যন্ত্র হাতে দিয়ে তুলিছজাগায়ে,
তবু আমি ঢুলি !
শুনিছ না, শত কবি লক্ষকোটি সুরে
তুলিয়াছে তান?
সে কোন্ গীত ধ্বনি মাের কণ্ঠ হ'তে
পাবে আজি প্রাণ।
দীপালী
চাহিছ প্রসন্ন মুখে, দেখে মাতে হিয়া ;
পাব না ত লাজ ?
ধর তবে স্নেহালােক সম্মুখে আমার,
সাধি তব কাজ ।
যতক্ষণ আছে, ভাষা, বুকে বাঁধি আশা
গেয়ে যাই গান,
মথিয়া হৃদয়-সুধা জগৎজনারে
করাই তা পান।
ছাড়িব না রূপ-পূজা, হে লাবণ্যময়ী,
হেরি ক্রুদ্ধ আঁখি,
শােধিছে অযুত ভক্ত সৌন্দর্য্যের ঋণ,
তবু পড়ে বাকী।
উধাও উঠিব ভেদি মেঘ-আবরণ,
লুটিব মাধুরী ;
জলে স্থলে যেথা আছে লুকান’ সুষমা,
করিব তা চুরী!
৭
দীপালী
ফিরিয়া আসিব পুন বাস্তবের কূলে,
মােদের সংসারে ;
মিথ্যা যেথা মহাবলী, সত্য পদানত,
পদে পদে হারে !
অন্যায়ের তীব্র নিন্দা, মহত্ত্বের স্তুতি
গাব বিশ্বমাঝে ;
পূণ্য যদি নাহি জাগে, পাপ কি রবে না
মৰ্ম্মে মরি লাজে ।
যতক্ষণ আছে ভাষা, বুকে বাঁধি আশা
গেয়ে যাই গান ;
মথিয়া হৃদয়-সুধা জগৎজনারে
করাই তা পান।
শেষে ছুটি !---বাষ্পছন্ন ঘন-বায়ুস্তরে
ঘুম, শুধু ঘুম ;
এ লােকের গানগুলি রবে লােকান্তরে
নিস্তব্ধ, নিঝুম !
দীপালী
তবু বুঝি ক্ষীণতম রেশটুকু প্রাণে
করিবে গুঞ্জন,
আপনার কণ্ঠ শুনি কখনাে চকিতে
পাব বা চেতন !
;
নিরখিব মহাকাল চলিছে তেমনি,
কল্লোলে হিল্লোলে,
তার চোকে নিদ্ৰা নাই ; কন্যা বসুন্ধরা
ঘুমাইছে কোলে।
নবযুগ নবশ্লোক নবকবি-মুখে
শুনিছে তখন,
আমারাে পুরাণ গীত গদগদ চিতে
কৰূিছে স্মরণ।
যতক্ষণ আছে ভাষা, বাঁধি বুকে আশা
গেয়ে যাই গান;
মথিয় হৃদয়-সুধা জগৎজনারে
করাই তা পান।
দীপালী
রূপ-বৈচিত্র্য
রূপ, তােরে দেখেছি উষায়
বাণী-বেশে কমল-ভূষায় ;
সদ্যস্নাত সুধা-সরে, ধরা মুগ্ধ পদভরে ;
কণ্ঠে গীত, আননে প্রতিভা;
অঙ্গে অঙ্গে খেলে নব বিভা।
রূপ, তােরে অন্তরে, বাহিরে
দেখিয়াছি প্রাসাদে, কুটীরে,
এক সাজে এক কাজে,--- অধম অক্ষম মাঝে
নির্বিচারে বটিছ প্ৰসাদ,
নাই তৃপ্তি, নাই অবসাদ !
রূপ, তাের তপস্বিনী-ছবি
দেখিয়াছে সে যুগের কবি !
প্রিয়-ধ্যানে সে কুমারী পাষাণের ঘর ছাড়ি
বনে বনে ফিরে রাজবালা,
কাপে স্তন, নাচে মণিমালা !
দীপালী
রূপ, তাের বিজয়িনী-ছবি
দেখিয়াছে এই ভক্ত কবি !
মধ্যাহ্নে বিরল-বেশ মুক্ত করি সিক্ত কেশ
বসি শান্ত বিনম্র মহিমা,
গৃহলক্ষী, প্রণয়-প্রতিমা।
রূপ, তােরে দেখেছি নিশায়।
বৃন্তচ্যুত সেফালির প্রায়,
জড়িত স্খলিত বাণী, করতলে রাখি পাণি
দুই চক্ষু জলে ভরি, হায়,
চেয়েছিলি নিভৃতে বিদায় !
দীপালী
আত্ম-পরিচয়
হে বঙ্গ-রূপসী, আমি তােমাদেরি
আপনার গৃহ-কবি !
মনের হরষে আঁকি বসে বসে
তােমাদের শত ছবি;
কোনটি অরুণ, কোনটি করুণ,
সবি আমি ভালবাসি;
মানস-আগারে ধরে না আমার
সে অসীম রূপরাশি।
নীরব নিশীথে ভাব-সমাধিতে
বলি যবে মহা ধ্যানে,
সহসা উছসি ভরি উঠে বুক
তোমাদের জয়গানে।
দীপালী
মহিমার মাঝে ডুবায়ে তুলিকা
আঁকি বসে মায়া-ছবি ;
হে বঙ্গ-রূপসী, আমি তােমাদেরি
আপনার গৃহ-কবি !
বাসর যাপিতে যাও যবে ধীরে।
অধীর বধূর বেশে,
হৃদি-স্তরে-স্তরে তরঙ্গের পরে
তরঙ্গ পড়িছে হেসে;
উঠে কি না উঠে সলাজ চরণ!---
আঁকি বসে সেই ছবি ;
হে বঙ্গ-রূপসী, আমি তােমাদেরি
আপনার গৃহ-কবি ।
যবে গৃহকাজে ফির গৃহমাঝে
হাসিমুখে ঘামে নেয়ে,
আজানুচুমিত এলােকেশপাশ
পড়ে মুখে-চোখে ছেয়ে ;
দীপালী
আপনা-বিলান কি উদার শােভা!-
আঁকি বসে সেই ছবি ;
হে বঙ্গ-রূপসী, আমি তােমাদেরি
আপনার গৃহ-কবি!
রােগীর শিয়রে আছ জাগরিতা,
ক্ষুধা-তৃষা নাহি মানি,
ঢালিছ বসিয়া সেবা-সুধাধারা
আত্মপর নাহি জানি’
ভাবে মুগ্ধ রােগী,-এ কি দেববালা?
আঁকি বসে সেই ছবি ;
হে বঙ্গ-রূপসী, আমি তােমাদেরি
আপনার গৃহ-কবি !.
অনাথ-আতুর মা বলে দাড়ায়
তব আঙ্গিনায় ডাকি,
আপনার পুজি দাও তারে ধরে
মুছি সকরুণ আঁখি।
১৪
দীপালী
সে গােপনদান কেহ নাহি জানে !----
অাকি বসে সেই ছবি ;
হে বঙ্গ-রূপসী, আমি তােমাদেরি
আপনার গৃহ-কবি ।
খােকা কোলে বসি, ছাড়িছে না, আছ
এতবেলা অনাহারে ;
হেনকালে দ্বারে ক্ষুধিত অতিথ,
নিজ অন্ন দিলে তারে।
ক্ষমা-ক্ষেমভরা কি মাতৃমুরতি !
অাকি বসে সেই ছবি ;
হে বঙ্গ-রূপসী, আমি তােমাদেরি
আপনার গৃহ-কবি।
তােমাদেরি স্নেহে তােমাদের গৃহে
মাের অবারিত দ্বার ;
সাথে সাথে থাকি প্রতিদিন রাখি
নিত্যকার সমাচার।
দীপালী
তােমরা শুনিবে,—তাই গাঁথি গান;
দেখ বলে,--আঁকি ছবি;
হে বঙ্গ-রূপসী, আমি তােমাদেরি
আপনার গৃহ-কবি !
১৬
দীপালী,
সমালােচকের প্রতি কবি
প্রেমে প্রতিষেধ?
মায়ামন্ত্রে বাঁশী সাধা, মানিবে কি বিধি-বাধা ;
শাস্ত্রের নিষেধ।
মুক্তপক্ষ যুক্তিহীন গগনে উডডীন লীন
বিহগী আমার,
পায়ে দিয়ে বেড়ীখানি ধূলায় আনিবে টানি,
এই কি বিচার !
সােণার পিঞ্জরে ভরি নিজ মনােমত করি
শিখাইবে বুলি ?
তােমার সােহাগ-যত্নে স্বভাবসঙ্গীত-রত্নে
সে কি যাবে ভুলি !
মিছে উপদেশ !
হে সমালােচকবর, তর্ক বাড়ে তর্কোপর,
নাহি পায় শেষ।
১৭
দীপালী
তর্কের সীমান্তে দূরে
বসি শান্ত অন্তঃপুরে
মায়াবিনী বালা ;
সেথা শুধু প্রতিরাশি, শুধু হাসি, শুধু বাঁশী,
দীপে দীপে আলা !
সুষমারে প্রাণ সঁপি কর তারি মন্ত্র জপি
মন্দির-প্রবেশ
খুলি দ্বার অন্তঃপুরে
আসিবে নূতন সুরে
সাধন-আদেশ।
চল, তাই চল্ !
দ্বন্দ্ব-কোলাহল ছেড়ে
বাহিরিব ধূলি ঝেড়ে
দুইটি পাগল।
তুমি শ্রোতা, আমি কবি, ডুবে গেছে আর সবি;
বাজাইব বীণা ; ।
শুধু প্রেম-গীত, ভাই, শুনাব, দেখিব তাই
ভাল লাগে কি না!
জাগে যদি কোন সুখ, কারাে কথা, মধু-মুখ
নীরবে নিরালা,
তখন কি প্রাণ খুলে
কণ্ঠে মাের দিবে তুলে
তব জয়মালা ?
দীপালী
৩.
তুমি একদিকে,
আছ ধরি মাপকাঠি, খ্যাতি, নিন্দা দিবে বাটি
রচনা-বণিকে ;
আছ জয়-টক্কা লয়ে সজাগ-চকিত হয়ে
জাগাতে অবনী ;
যদি আপনারে ভুলি ধরে কেহ পড়া-বুলি,
দিবে ধন্যধ্বনি।
তব রুক্ষ ও নিকষে
সৌন্দর্য দেখিবে কষে,
কত মূল্য কার ;
লঙ্ িপদাঙ্কিত পথ যে ছুটাবে মনােরথ,
তারি তিরস্কার !
অন্যদিকে, প্রিয়া
কুঞ্জের দুয়ার ধরি
নিঃশব্দ-প্রতীক্ষা করি
আছেন চাহিয়া।
বেণী-বন্ধ গন্ধাকুল
মাতায় মধুপে ;
আনন্দে পড়িয়া পায়
নূপুর বন্দনা গায়
ভক্ত-বন্দীরূপে;
সৃজিয়া মধুর ভুল
১৯,
দীপালী
অঙ্গের ভূষণ যত
বিশ্ৰন্ত আলাপে রত ;
হাসে বক্ষ-বাস;
মরমের প্রেম-শশী উজ্জ্বল করিছে বসি
রূপের আকাশ।
কোথা যাবি কবি?
একদিকে কোলাহল,
অন্যদিকে ঢলঢল
আনন্দের ছবি ।
বিচারক, ক্ষম মােরে, আর কি এ হিয়া ঘােরে
তব যুক্তি-পাকে ?
কে যেন অন্তর হতে
সহজ সুন্দর পথে
সাধনারে ডাকে ;
এস তবে, এস প্রিয়ে, যা রুদ্ধ-রােষ নিয়ে
যশ আর জয় ;
খােল তব কুঞ্জ-দ্বার,
ধর ধর উপহার
কবির হৃদয় !
২০
দীপালী
গীত-লক্ষী
প্রেম, তুমি জন্মে জন্মে সঙ্গ নিলে মাের
সঙ্গীতের বেশে,
জন্মান্তর-স্মৃতি তাই ফুটিছে বাঁশীতে
নিমেষে নিমেষে।
তুমিও ছাড় নি মােরে, আমিও ছাড়ি নি,
প্রেমেরি এ ধারা !
দুজনে বেড়াই নেচে দুঃখের জগতে
মদে মাতােয়ারা।
তরঙ্গিত ধ্বনিসিন্ধু তােল তল হতে
রমার মুরতি ;
বেজে উঠে ভাব-রাজ্যে দেউলে দেউলে
মঙ্গল-আরতি ;
দীপালী
তুমি আর আমি করি কি যে সুধা পান,
কেহ নাহি জানে ;
আশে-পাশে এ সংসারে ধূধূ চিতা জ্বলে
ভাবের শ্মশানে।
সৃজন-প্রত্যুষে বিশ্ব কেবলি আঁধারে
করিত কি বাস ?
বাঁশী নাই, হাসি নাই, ছিল বক্ষে ধরি
চির-সর্বনাশ ?
কবে তুমি প্রীতি-লক্ষী, এলে পুষ্পরথে
আলােকি ভূতল ;
হাসিল উদ্ভিদ-রাজ্য ; ভাসিল সরিতে
শত শতদল !
ভৃঙ্গ-বঁধু গুঞ্জরিয়া ভৃঙ্গবধূ-পদে
সঁপিল পরাণ ;
স্তব বাঁধি কোকিলারে উতলা কোকিল
করিল আহ্বান ;
দীপালী
;
ছেয়ে গেল ছন্দ-গীত দেখিতে দেখিতে
বিশ্ব-চরাচরে ;
জাগি ছন্দহীন কবি অনাদৃত বাঁশী
তুলি নিল করে।
সেই মহােৎসবে মাতি সদ্যসিক্ত প্রাণে
তরুণ উচ্ছ্বাসে
শূন্য মন্দিরের দ্বার পূর্ণ মুক্ত করি
ছিনু কার আশে !
সে যে তুমি, হে জাগ্রত প্রণয়-দেবতা,
এলে মোের ঘরে
বিকাশি এ হৃদিপদ্ম তব সুকুমার
পাদপদ্মভরে।
সাধকের সুধা-স্বপ্নে জন্ম নিলা বুঝি
প্রীতির আধার ;
করুণা-কোমল আঁখি, ওষ্ঠে সদা-হাসি,
কণ্ঠে গীতিধার!
২৩
দীপালী
কবে জেনেছিলে মাের অজ্ঞাত বেদনা
তব লাগি, প্রিয়া ।
তাই মধু-মূৰ্ত্তি ধরি পশিলে সেদিন
পূর্ণ করি হিয়া।
প্রথম মিলন-মােহে ছিনু যবে দেহে
মৌন, মুগ্ধ, মূক,
ছিল কাছে কৌতূহলী অদৃশ্য প্রকৃতি
বুঝি জাগরুক !
সে লিখিল বসি বসি মােদের কাহিনী
সহস্র রূপকে,
বনে বনে ফুলে ফুলে গগনে গগনে
মেঘের স্তবকে।
রটিনু আমার ছন্দে সে মধু-মিলন,
মনে পড়ে বালা ?
সঙ্গীতের পুরস্কার দিলে শেষে গলে
তব কণ্ঠমালা।
২৪
मौलानौ
চক্ষু ভরি এল নেশা, কণ্ঠ ভরি তৃষা,
বক্ষ ভরি তাপ;
বাঁশরীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভরিয়া উঠিল
প্রেমের প্রলাপ !
২৫
দীপালী
অপূর্ব বন্দনা
হা রে কলঙ্কী প্রেম,
কে বলেছে তােরে পরশ-মাণিক ;
কে বলেছে তােরে হেম।
আমি জানি তাের লীলা যুগে যুগে,
সব রহস্য, ভাই ;
যেই বরিয়াছে তােরে, দুর্ভাগা,
তারি ভাগ্যেই ছাই!
ও রে প্রাণান্ত মায়া,
আমি মরিয়াছি আঁকড়ি বক্ষে
তাের অশান্ত ছায়া !
নব বসন্তে তুলিয়া সােহগে
করিনু গলার হার,
আজ হাতে বেড়ী, চরণে নিগড়,
বক্ষে পাষাণ-ভার!
২৬
দীপালী
ও রে ব্যাধি, তাের তথ্য
জানি ; আরাে জানি তার মধু ভােগ,
নিদান বিধান পথ্য !..
সারাটি জীবন উপবাস সহি
মিছার সাধনা সাধা ;
কাঙ্গালের বেশে নিকুঞ্জে এসে
নিশি জাগি জাগি কাঁদা
হা রে জ্বলন্ত শিখা,
পড়িয়া লয়েছি তােমার আলােকে
আমার ললাট-লিখা !
তােমায় আমায় হয়েছি বন্দী
মরণ-সন্ধি-পাশে,
চলেছি ছুটিয়া দুইটি অন্ধ
সর্বনাশের গ্রাসে !
ও রে সুন্দর তাপ,
আমার জীবনে লেগেছে তােমার
অব্যর্থ অভিশাপ!--
২৭;
দীপালী
তবু তােরে চাই, তবু ভালবাসি ,
যত বাজে,—চাপি বুকে ;
বাঁশরী বাজায়ে ফিরি খেলাইয়া
কাল-ফণীটিরে সুখে।
দীপালী
শ্বশুর-কন্যার স্তব
ওগাে ও শ্বশুর-কন্যা,
যুগে যুগে তুমি ধন্যা !
যেদিন প্রথম নব মহিমায়
তােমরা রূপসী, উদিলে ধরায়,
সেদিন অগণ্য হৃদি-যমুনায়
ডেকেছিল কোন্ বন্যা ?
টীকা-ভাষ তব মােহন উক্তি ;
নয়নে ঝলকে মনুর যুক্তি ;
হারায়ে তত্ত্ব ; ঘুচায়ে মুক্তি ;
ধরণী কৃতাৰ্থমন্যা !
২৯
मौलानो
,
••
আনিছ মিলন ; হানিছ বিরহ
কত শুভ সন্ধি ; মধু বিগ্রহ;
মনােমন্দিরে রহ, তুমি রহ
সুখালসে অচৈতন্যা ।
কখনাে চতুর চক্ৰকারিণী,
কখনাে মধুর বক্র মানিনী,
মিছে ভঙ্গ ! ডরি না ভামিনী,
কুহকীর অগ্রগণ্যা !
বিপ্র যথা হৃষ্ট পেলে মিষ্ট স্বাদ,
ছেলে যথা তুষ্ট হলে পড়া বাদ,
কণামাত্র পেলে তােমার প্রসাদ,
বেঁচে যাই, হে শরণা!
ঘােরাও তােমার মহলে মহলে ;
পােড়াও তােমার মধুর অনলে ;
বহ বহ প্রাণে সুধা-হলাহলে
লহরী অরণ্যা !
দীপালী
কৌতুক-রণে ভুরুভঙ্গিনী,
আরামে আয়েসে রস-রঙ্গিনী,
বিপদে বিপাকে সখী-সঙ্গিনী,
তুমি রমা, নহ অন্যা!
চিরবিজয়িনী, যােক শুধু জয়,
আমি হারি যেন তব জয় হয় ;
শিখি আর লিখি জয়-পরাজয়
তব কাছে, হে বরণ্যা !
লিখি তব স্তুতি হৃদয়-রক্তে,
কবিরে তােমার বসাও তক্তে ;
বরাভয় দিয়ে অধম ভক্তে
কর ধন্য, অয়ি ধন্যা !
ওগাে ও শ্বশুর-কন্যা,
যুগে যুগে তুমি ধন্যা !
দীপালী
কবি-সম্ভাষণ
কিরণের অগ্রদূত যেন পূর্বাকাশে
নম্র-পদে আসে,
পরিপূর্ণ প্রতিভার অসম্পূর্ণ ছবি,
হে কিশাের রবি
সন্ধ্যাসুন্দরীর রূপে ঢালিয়া পরাণ
কি গাহিলে গান !
কৈশোের-স্বপনে ভাের বন্ধনবিহীন
সাধনা নবীন
মেঘে মেঘে খুজি ফিরে বাঞ্ছিতের লাগি
আলিঙ্গন মাগি
ভাষা-ভাবে মাখামাখি মগ্ন একাকার
ঝরে গীত-ধার।
দীপালী
পশিলে যৌবন-বনে নেশা তৃষা সাথে
সাধা বাঁশী হাতে;
এল অন্তঃপুর ছাড়ি মায়া-বেণু শুনি
মানসী তরুণী
জাগি উঠি বঙ্গবাসী পুলকিত চিতে
উন্মাদন গীতে,
দেখিল প্রাণের গান তব কণ্ঠনে
ধ্বনিত পরাণে !
তাই শত সুখ-দুঃখ, আশা-সাধ সনে
তুমি পড় মনে !
কাব্য-মন্দিরের সেই মানস-মহিমা,
লক্ষনীর প্রতিমা !
তারপরে, ছুটিয়াছ কোন্ ঊৰ্দ্ধ পানে
কল্পনা-বিমানে!
চারিদিকে দীপ্ত রশ্মি পড়ে ঠিকরিয়া
আঁখি ঝলসিয়া ;
বিচিত্র প্রেমের মন্ত্রে প্রিয়ার বন্দনা
করিছ রচনা
;
দীপালী
কত সকরুণ গাথা, মহত্বের ছবি,
অভিনব সবি।
বীণা আজ পূণ্যশ্লোক মহাশূন্যে ঘােষে
অপার সন্তোষে !
হে মহৎ, হে সুহৃৎ, হে বরেণ্য রবি,
নমােনমঃ, কবি !
৩৪
দীপালী
অরু আর তরু
কলারাজ্যে দুটি রাণী !
প্রতিভার বুঝি যমক-কন্যা রমা আর বীণাপাণী!
একজন তারি
রূপেরে নিঙ্গাড়ি
আঁকে স্বর্ণ তুলি লয়ে ;
অন্যে, কথা কয় স্বপনের সনে বাঁশরীর তান-লয়ে ।
স্বদেশী ভকত কবি
মায়া-রাজ্যে পশি দেখিয়া লয়েছে তােমাদের ছায়া-ছবি।
ঊরি মধুমাসে
কল্পকুঞ্জ-বাসে
ফুটালে সেফালীরাশি !
লুঠি’ সৌরভ যুগ্ম:স্বপ্নসম মিলাইলে পাশাপাশি।
কেন ভেঙ্গে দিলে খেলা ?
তােমাদের রবি ডুবেছিল বুঝি থাকিতে অনেক বেলা ।
আছ, কিম্বা নাই, বুঝিতে না পাই ;
-ফুল-বালিকার যথা—
গগনে পবনে খচিত রচিত তােমাদের ব্রত-কথা ।
৩৫
দীপালী
হাসে শূন্যে শত তারা,
তােমরা কোথায় সহস্রের মাঝে রয়েছ রহস্যে হারা !
ধ্যান-নিমগন
ও মহাভুবন,
সাধকের প্রিয় দেশে
চলেছ কি ছুটি অপূর্ণ অতৃপ্ত ভাবের আবেশে ভেসে।
মাঝে মাঝে আমি তাই
নিশীথ-গগনে চাহিয়া চমকি, যেন কার সাড়া পাই।
গাঁথি যবে শ্লোক,
দেখা দেয় অকস্মাৎ
তােমরা,তরুণী মেঘে মেঘে সেথা বেড়াও কি হাতে হাত?
দুর স্বপ্নলােক
;
ধরার কাঙ্গাল কবি
তবে ত না জানি তােমাদের বলে আঁকিয়াছে কত ছবি!
রহি অসীমায়
কল্পনা-খেলায়
এখনাে কি ফির মাতি ?
অথবা সকল হারায়ে আঁধারে ঘুমাইছ দিবারাতি!
দীপালী
লােকারিতা
অতি নিদারুণ বার্তা সিন্ধুপার হতে
পশিল ভারতে;
নিবাইল গৃহে গৃহে হর্ষ-দীপশিখা
শশাকের ঝটিকা ;
সমস্ত প্রজার প্রাণ আত্ম-সুখ ভুলি
উঠিল আকুলি !
এ ত নহে, মহারাজ্ঞী, প্রভাবে প্রতাপে,
রাজশক্তি-তাপে
কোটি কোটি ভক্তোপরে হয়েছিলে জয়ী,
হে মহিমাময়ী ।
তােমারে করিয়াছিল পূজার প্রতিমা
তােমারি মহিমা।
৩৭
দীপালী
শুধুই কি ছিলে তুমি অতুলনা রাণী,
হে নারী কল্যাণী ?
তুমি স্নেহময়ী মাতা; আদর্শ দুহিতা ;
পত্নী অনিন্দিতা।
অতিথিবৎসলা তুমি; দরিদ্ৰপালিনী;
উদার গৃহিণী !
বহুগুণবিমণ্ডিত তব পরিবার ;
প্রতিভা তােমার !
দুর্লভ-সৌভাগ্যদীপ্ত ঐশ্বর্যের মাঝে
ন্যায় নিষ্ঠা রাজে;
তব স্বর্ণ-প্রাসাদের জয়ােন্নত চূড়ে
পূণ্য-কেতু উড়ে।
••
একদিন ছিলে, দেবী, নিখিলের মাঝে
রাজলক্ষী-সাজে ;
আজ জাগ প্রাণে প্রাণে মূৰ্ত্ত পবিত্রতা,
আরাধ্য দেবতা !
ধন্য ধন্য, মৃত্যু তব হরে নাই জ্যোতি,
অয়ি জ্যোতিষ্মতী।
দীপালী
ধন্য ধন্য, আছ বেঁচে কালের কবলে
আত্মকীর্তি-বলে !
কত রাজ্য কত রাজা মিশে যাবে পরে
সময়-সাগরে ;
অশেষ ভবিষ্য-পটে তুমি ভাত’ রবে
অক্ষয় গৌরবে।
এ নহে, গাে স্বৰ্গগতা, আপাত-মধুর
মিথ্যা চাটু-সুর ;
স্তাবক স্থাপিতে নারে তুচ্ছ বন্দ্যজনে
উচ্চ সিংহাসনে ;
আপনি ভারত-লক্ষী তাপি মনস্তাপে
দুঃসহ বিলাপে,
দীন ক্ষীণ কবিকণ্ঠে করিলা ঘােষণা
মৃত্যুর
বন্দনা
সেই আদ্ৰ আৰ্ত্ত স্বরে মিশায়েছে তান
ত্রিশকোটী প্রাণ।
দীপালী
পরলােকবর্তিনী
সপ্ত-সিন্ধুপারে বসি, অয়ি বিদেশিনী,
অয়ি রাজ্ঞী, অয়ি লক্ষী, নিয়েছিলে জিনি
ত্রিশকোটি ভকতের হৃদি-সিংহাসন।
মাতৃসম মুক্ত স্নেহে, নারীর মতন,
জুড়ায়ে দাসত্ব-ক্ষত, নিগড়ের ব্যথা
ন্যায় সনে বিতরিলে করুণা মমতা
বহু বর্ষ ধরি।—নিত্য গদগদ চিতে
মৃত্যুমুখ হ’তে তােমা চাহিত রাখিতে
শতলক্ষ আরাধনা। বিয়ােগে তােমার
তাই এত হা হুতাশ, এত হাহাকার !
তাই কবিকণ্ঠে উঠি স্তুতি অগণন
নাহি মানে শ্রান্তি তৃপ্তি। করি প্রাণপণ,
তােমার মহিমা-ভাতি, সুশুভ্র গৌরব
শুভ্রতর করিবারে নাহি পারে স্তব।
দীপালী
ডাক্তার ও অমূল্যচরণ বসু
হে অমূল্য, মুল্য নাই তােমার গুণের !
সংসার ধনীর বন্ধু ; দুর্ভাগা-দীনের
তুমি নিয়েছিলে ভার! জাগে অনাথিনী
মুমূর্ষ, পুত্রের পার্শ্বে কাল-নিশীথিনী ;
দুবেলা জোটে না অন্ন, কি সাহস তার
বৈদ্যের দক্ষিণা আর ঔষধ-সম্ভার
যােগাইবে এক সাথে ; লয়ে অবসাদ
প্রতি পলে মাতৃস্নেহ গণিছে প্রমাদ।
হেনকালে আশাতীত সৌভাগ্যের প্রায়
দেখা দিলে সে কুটীরে ; নিপুণ সেবায়
পুত্ৰ-দান দিলে মায়ে!—সে কাহিনী সনে
শত কীৰ্ত্তি-কথা তব, আঁকিয়াছে মনে
একটি অমূল্য-স্মৃতি ; সদ্য অশ্রুজলে
কবি পাঠাইছে পূজা তারি পদতলে।
;
•
০১
দীপালী
;
••
বন্ধুতা
হে বন্ধুতা, জানি তুমি আজন্মের সাথী ;
তব কণ্ঠ লাগি তাই জয়মাল্য গাঁথি
একান্তে নিয়ত; নাহি হয় মনােমত,
নাহি হয় শেষ ! দুরূহ হৃদয়-ব্ৰত
অসম্পূর্ণ পড়ে থাকে ; কে চাহে, কে পারে
সবটুকু স্নেহ-ঋণ শােধ করিবারে
নিমেষে নিঃশেষে ! থাক স্তুতি; সে দেহে
কাছাকাছি ঘেঁষে থাকি ; ডুবি শুভ মােহে !
জান না কি কালবশে সুখের সংসার
সহসা বিমুখ হয়! নামে অন্ধকার
স্বর্গ হতে মানবের গৃহে; অকাতরে
স্নেহ-মুৰ্ত্তি দণ্ড হলে নত শিরােপরে!
তুমি চির-ক্ষমাভরা স্থির-প্রসন্নতা,
নীরবে জুড়ায়ে দিও সব গ্লানি ব্যথা।
82
দীপালী
বিচিত্র সখ্য
ওরে সর্বনাশ, ওরে দুর্ভাগা ভিখারী,
এসেছ আমারি দ্বারে আজি অনাহারী !
মিটাব ভৈরব ক্ষুধা ; আমি ভক্ত তৰ,
বাঁধিব তােমার লাগি স্তব অভিনব
ভয়াল করল ছন্দে ; প্রলয়-বিষাণে
যােষিব তােমার জয় ; হৃদয়-শশ্মশানে
শুন খলখল হাস্য ; চণ্ড তালে তালে
চলিছে তাণ্ডব নৃত্য ! দাও তপ্ত ভালে
রক্তসিক্ত অদৃষ্টের বিভূতি-তিলক।
তুমি আমি:সৃজনের অশুভ যমক
মিলিয়াছি ভালাে ! এস প্রীত স্ফীত মনে
বন্দী হই আজন্মের সৌহার্দ্য-বন্ধনে।
দুটি ক্ষিপ্ত শান্তিহীন অনাক্ষীবাহন
আরাে ঘনতর করি প্রেম-আলিঙ্গন।
৪৩
দীপালী
দুঃখের স্তোত্র
হে দুঃখ, তােমারে আমি যত বাসি ভালাে,
তত তব অসন্তোষ ! জ্বালাে, তবে জ্বালাে
তােমার ক্ষুধিত চিতা ; আজি শেষ বার
সর্বস্ব আহুতি দিই চরণে তােমার !
কিছু রাখিব না আর ; ছাই, শুধু ছাই,
তব স্নেহ প্রতিদান, মাথে লব তাই !
ওহে বন্ধু, মনে নাই, পূর্ব জন্ম হতে
খসিয়া পড়িনু যবে জন্মান্তর-স্রোতে,
তুমি কাণ্ডারীর বেশে চলে এলে সাথে;
অনুরাগরক্ত হস্ত রাখি ভক্ত-মাথে
আশীর্বাদ উচ্চারিলে, দ্বিধাহীন মনে
তােমারে বরি সেই জন্ম-সন্ধিক্ষণে ;
তদবধি ছন্নমনে বসি সারা বেলা
প্রমত্ত পতঙ্গ আমি, করি অগ্নি-খেলা!
৪
দীপালী
সুখ পাই নাই ব'লে, হে বিশ্ব-বিধাতা,
তােমা’পরে মিছে অভিমান! তুমি দাতা,
আমি দীন, যা দিয়েছ করুণা প্রকাশি,
তাই কেন প্রাণপণে ভাল নাহি বাসি
বহু ভাগ্য মানি ! ত্যজিলাম অসন্তোষ ;
বাম অদৃষ্টেরে আর নাহি দিব দোষ ;
স্বর্গ হতে পাঠালে যা মানবের ঘরে,
প্রভু হয়ে পাঠালে যা সেবকের তরে,
হােক দুঃখ, নির্বিচারে শিরে লব তুলি ;
আশামুগ্ধ তৃষালুব্ধ আপনারে ভুলি
ভ্ৰমিব অশ্রান্ত নিত্য জীর্ণ ভগ্নরথে
ধূলিধূসরিত দগ্ধ অন্ধকার পথে !
একদা দাড়াব কাছে দীর্ঘ রাত্রি জাগি,
সাধনের পুরস্কার গর্বে লব মাগি।
;
৪৫:
দীপালী
দুঃখে সুখ
হে দয়াল, কণ্টকিত কুসুমের প্রায়
সুমহৎ দুঃখ, এও তােমারি ইচ্ছায় !
স্বহস্তে সাজায়ে সবে পাঠালে যখন
মৰ্ত্ত-প্রবাসের তরে, হ’ল কতজন
সৌভাগ্যের বরমাল্য বিমণ্ডিত ভাল,
এক প্রান্তে দাঁড়াইয়া ছিল এ কাঙ্গাল
জর্জরিত ঈর্ষা-বিষে ; বহু স্নেহে ডাকি
গুরুতর দুঃখভার তার শিরে রাখি
চাহিলে প্রশংস-নেত্রে?-- সদ্য স্ফীত মনে
চলে এমু কল্লোলিত সহযাত্রী সনে।
তদবধি নিখিলের উৎসব উল্লাস
দুর্ভাগার ভাগ্য ল’য়ে করে পরিহাস।
মাের আছে এই তৃপ্তি, হে সদয় স্বামী,
দাসের দুরূহ ব্রত পালিতেছি আমি।
;
দীপালী,
জীবনযাত্রা
দুদিনের এই বিশ্ব, এ দুনিয়াদারী,
তারে ভাগ্যটুকু লয়ে করে কাড়াকাড়ি
যমে আর প্রেমে ? বাসরের দীপশিখা ।
তাররা মাঝে মরণের কাল নাম লিখা
কালের কালীতে ? রক্তমাখা সর্বনাশ
খাণ্ডা হাতে নৃত্য করে, ফেলে তপ্ত শ্বাস
ভাগ্য-সূত্রোপরে! সুখ-দুঃখ সেই টানে,
শৃঙ্খলিত চলিয়াছে এক অন্ত পানে;
তাই নিত্য মৰ্ম্মাহত স্নেহ-প্রেম সাথে
বিদ্বেষাে বেদনা পায় একই আঘাতে।
তবে হেথা কোথা ঠাই, কোথা অবসর
বিরােধের সৌহার্দ্যের ? ক্লান্ত নেত্রোপর
যতক্ষণ ঘুমঘাের নাহি আসে ছেয়ে,
সুধা-স্রোতে সােজা পথে চল তরী বেয়ে!
৪৭
দীপালী
হতভাগ্যের প্রাপ্য
বিশ্বে আমি লক্ষীছাড়া, নিঃস্ব, হতভাগা;
কলঙ্কমণ্ডিত ভালে রহিয়াছে দাগা
বিধাতার অভিশাপ-ছাপ! কিসে ভুলি,
সংসার-সাগর মথি আনিলাম তুলি
আমার গরল-ভাগ ! তবু আমি হাসি ;
বাজাই বেদনাভরা সাধনার বাঁশী
দুদ্দিনে আনন্দভরে ! কেহ নাহি জানে,
কি দারুণ ব্যথাখানি ঢেকে রাখি গানে
পরাণ ঢালিয়া ! তারে কেন দ্বেষ, ভাই ?
আমি ত তােদের স্বার্থে অংশ নাহি চাই ।
খেলাঘরে বসে বসে অবােধ একেলা
ধূলি মেখে সারাদিন করি ছেলেখেলা।
সকলে অবজ্ঞাভরে ফেলে গেলে ধুলে
একটি খেলার বাঁশী, লই তা তুলে !
৪.
দীপালী
নিবেদন
দিনের কলঙ্কভরা ভাঙ্গা বাঁশী লয়ে
উদাসীন আসিয়াছি তােমার আলয়ে
সান্ত্বনার আশে, মা গাে! সংসার-সাগর
গরজে পশ্চাতে যেন ক্রুদ্ধ অজগর!
কাণে আসে হাহাকার! রাখ, মােরে রাখ ;
তােমার উদার বক্ষে স্নেহ দিয়া ঢাক
আমার বেদনা-ক্ষত ; সুমঙ্গল পাণি
সর্বাঙ্গে বুলায়ে দাও; বল শান্তি-বাণী।
হের, নম্র সন্ধ্যাসত তােমার দুয়ারে
ধীরে করে করাঘাত; ভাগীরথীপারে
সূর্য অস্ত গেল ; লঘু শুক্লমেঘ প্রায়
ঝাঁকে ঝাঁকে হংসসারি উড়ে চলে যায়।
বল, মাগাে, বল্ এই প্রশান্ত নির্জনে,
আমার খেলার বাঁশী রাখিলি চরণে!
৪৯.
দীপালী
কবির কৈফিয়ৎ
বিলম্বে এসেছি আজ বহিয়া সাধনা
তােমার উদার দ্বারে। হে কমলাসনা,
জান না কি সংসারের রথচক্র সনে
ভক্ত আছে বাঁধা পড়ি! মদমত্ত মনে
তারেও ফিরিতে হয় শত ছদ্ম সাজে,
স্বার্থ হতে স্বার্থান্তরে, কাজ হ’তে কাজে ;
শত ক্ষুদ্র জয়-লাভ, তুচ্ছ যশােগান
তারেও ঘুরায় পাকে! তােমার আহ্বান
কখন ধ্বনিয়া উঠে, নাহি বুঝি কিছু,
তখন সকল ভুলি ছুটি তারি পিছু
অসীম অকূল পানে; নয়নের আগে
খুলে যায় শােভা-রাজ্য ! সদ্য অনুরাগে
তােমারে ডাকিয়া বলি,-শােভনা, আমায়
হেথা হ'তে আর যেন দিও না বিদায় ।
।
দীপালী
মর্মাহত
গােপন আঘাত লয়ে দূরে থাকা ভালাে।
আঁধারের গুপ্ত-বাণে বিদ্ধ হয়ে মৰ্ম্মস্থানে
লুকাইল দিবসের আলাে;
অমল উজ্জ্বল দিন ভাবে নি কি সেইদিন,
সৃজনের প্রথম প্রভাতে,
এক স্নিগ্ধ ছায়াতলে
হাতে হাতে আঁধারের সাথে ।
অকস্মাৎ কি নির্ঘাত
বেজেছিল গুপ্তাঘাত,
টুটি গেল দৃঢ় মােহ-পাশ ;
অভাগা দেখিল চেয়ে মর্মে মর্মে ব্যথা পেয়ে,
বিশ্বাসের হয়েছে বিনাশ !
বিচরিবে কুতূহলে
৫১.
দীপালী
তুমি মুগ্ধ, একদিন পুলকে দেখ নি,-
শস্যশ্যামা বসুন্ধরা,
উর্ধে স্বচ্ছ নীলাম্বর।
সুহাসিনী পূর্ণিমা-রজনী ;
জ্যোৎস্না-ধারে নেয়েনেয়ে হৃষ্ট পিক উঠে গেয়ে;
কুঞ্জবনে শুন নি বাঁশরী ;
কাঁদে নীচে নদীজল
চর্চ ছছ
স্বপ্নবেশে শিহরি শিহরি!
চারিদিক হ’তে তােরে আদরে লইল ব’রে
বিশ্ব দিল উদার আশ্বাস ;
তারি সাথে পড়ে মনে, এ দুর্দিনে, এ কুক্ষণে,
বিশ্বাসের হয়েছে বিনাশ !
।
;
রে অবােধ, মিছে তুই সাজাইলি ডালা ;
অশ্রুসিক্ত অর্ঘ্যরাশি কেহ ত লয় নি আসি ;
বৃথা গেছে গাঁথিলি যে মালা;
প্রদীপ নিয়ে ঘরে থাক পড়ে ধূলি’পরে,
কোন্ সাধ আনিবি রে প্রাণে!
পুন, শ্রান্তি-অবশেষে ছুটিবি কি মরুদেশে,
মৃগতৃষ্ণা,—হিয়ার সন্ধানে ?
দীপালী আবার নূতন করে । কে বাঁধিবে মায়া-ডােরে, কে জাগাবে জীবনে উচ্ছ্বাস। ছলছল চোকে আশা জানায় কাতর ভাষা,-- বিশ্বাসের হয়েছে বিনাশ! আর কেন ? ওরে তুই, ভুল ভেঙ্গে আয়; যারা ছিল আপনার, তারা কাছে নাই আর, দূরে দূরে রত ছলনায়; দুটি বাক্যে, শুষ্ক- হাসে হৃদি-তৃষ্ণা নাহি নাশে, সে জাগায় অতীতের কথা কারাে নাহি দিও দোষ, ধৈৰ্য্য ধর, ত্যজ রােষ; বক্ষে ধরি বাক্যহীন ব্যথা শান্ত তাপসের মত থাক লয়ে মৌনব্রত, ভুলে যেও বাসনা-বিলাস। শূন্য ভগ্ন মনােরথে ঘােষিও না পথে পথে, বিশ্বাসের হয়েছে বিনাশ। পলে পলে ফুটিতেছে পেলব জীবন, মৰ্ম্ম মাঝে নব প্রীতি তরুণ করুণ গীতি মৃদু মৃদু করিছে গুঞ্জন ; ৫৩
দীপালী
বুকভরা সুধা লয়ে আকুল বাকুল হয়ে
সুকুমার সরল অন্তর
ঢালিতেছে অনিবার হৃদি-রক্ত উপহার ;
এ সংসার হেরিছে সুন্দর!
মােহের অমিয়-সরে মগ্ন থাকি স্বপ্নভরে
নি তারা নির্ভয়ে নিশ্বাস ;
সেথা গিয়ে আর্তগানে জাগায়ােনা প্রাণে প্রাণে,
বিশ্বাসের হয়েছে বিনাশ !
৫৪
দীপালী
.
দুর্দিনের গান
ও রে মন, তাের ভাগ্য-গগনে
নিভিল আলাে ;
মিছে প্রাণপাতে এ সুদীর্ঘ রাতে
প্রদীপ জ্বালাে ;
হারে ও অবােধ, জনমের শােধ ঘুমান’ভালাে।
জেনেছি তােমার নব-নিকুঞ্জে
পড়েছে বাজ ;
মধুনিশি জাগি
কর কার লাগি
বাসক-সাজ ;
আর সেদিনের সােণার স্বপন ফলে না আজ।
বুঝেছি তােমার পূর্ণ-সাগরে
লেগেছে ভাটা ;
অন্ধের মত
বৃথা গেছে যত
বিপথে হাঁটা;
এখন ভ্রমণে শ্রান্ত চরণে বিধিছে কাঁটা।
দীপালী
***
শূন্য হ’তে চুপে অভিশাপ-শেন
মেলিল পাখা;
বিষ-নিশ্বাসে বায়ু বহে আসে
অনল-মাখা
রােষে আক্রোশে ঘুরিছে কুটিল কালের চাকা।
গেছে গেছে, হায়, এ জনম-শােধ
সকলি চুকে ;
অন্ধ-আবেগে
চাপিছ সবেগে
পাষাণে বুকে ?
ঝলকে ঝলকে রক্ত উঠিছে পরশ-সুখে ।
৫৬
मौंगाली
ভিক্ষায়াং নৈব নৈব চ
আসি নাই আমি প্রেমের ভিখারী ।
তােমার কাছে
জুড়ি দুটি পাণি
ফিরিব না, রাণী,
দয়ার পাছে !
সেদিনের সেই অতি-নির্ভর
আর কি আছে ?
ছিল যেথা কারাে প্রাসাদ-আবাস,
রাজার সাজ,
কাঙ্গালের বেশে
সে কি সেথা এসে
লুটাবে আজ!
প্রেমের জগতে নাই কি গরব,
পতন-লাজ ?
দীপালী
মনে পড়ে, সেই প্রথম মিলন
হৃদয়-সাথে ;
আধ জানাশােনা, প্রেম-আনাগােনা,
দিবসে রাতে
;
আবিরে আবিরে লালে লাল খেলা
ফাগুন-প্রাতে।
মনে নাই, সেই কেড়ে নিলে মাের ।
সাধন-বাঁশী :
সঁপিয়া আপন মরমের ধন
পড়িনু ফঁাসী?
আজি নিকুঞ্জে আগুন লাগায়ে
দেখিছ হাসি।
সে আলিঙ্গন, চুম্বন-দাগ
ফেলেছ মুছে ;
কাণে কাণে নিতি
গুঞ্জন-স্মৃতি,
গেছে কি ঘুচে ?
বিরাগ-অধরে অনুরাগ-সুধা
আর কি রুচে।
मौनाली
থাক থাক, সখী, অতীতে ফিরিয়া
কি কাজ তবে ;
স্মৃতির দুয়ার
ঠেলি বারবার
খুলে কি হবে ?
আরামের ঘুম ভাঙ্গিবে কেবল
আৰ্ত্ত রবে !
শেষবার শুধু দেখিতে এসেছি
চোকের দেখা ;
দেখে যাব, খেলা, যাপ সারা বেলা
কেমনে একা ;
আবার ও চোকে পড়িবে অভাগা
ললাট-লেখা!
দীপালী
অনুনয়
ভালবাসি কি না বাসি—তুমি সুধায়াে না,
তুমি সুধায়াে না !
এখনাে যে সুষুপ্ত ভুবন,
ফুলগন্ধে দুলু ঢুলু বন,
স্বর্গে মর্ত্যে স্বপনের গুপ্ত আনাগােনা !
তুমি সুধায়াে না, তুমি সুধায়াে না !
আবেগে কাঁপিছে হিয়া—কিছু সুধায়াে না,
মােরে সুধায়াে না !
অরুণ উঠিছে ফুটি ধীরে
নিশান্তের নিঃশব্দ তিমিরে,
নিস্তব্ধ মেঘের প্রান্তে ফলাইছে সােণা !
তুমি সুধায়াে না, তুমি সুধায়াে না।
দীপালী
ভাষা অশ্রুজলে ভাসে,—মােরে সুধায়াে না,
কিছু সুধায়াে না !
শিশিরশীতল অন্ধকারে
অস্তশিখরের পরপারে
তােমার ও মত্ত বীণা লভুক্ সান্ত্বনা !
তুমি সুধায়াে না, তুমি সুধায়াে না !
ওগাে, ক্ষমা দাও মনে,—আহা, সুধায়াে না,
কিছু সুধায়াে না!
অধরের দ্বার রােধ করি
বসায়েছি সজাগ প্রহরী,
সেই ভালাে, দুজনায় আধ জানাশােনা।
তুমি সুধায়াে না, তুমি সুধায়াে না !
বঁধু, সখা, দেবতা গাে,--আর সুধায়াে না,
মােরে সুধায়াে না !
ধৈৰ্যহারা ওগাে কৌতুহলী,
কি বলিতে কি জানি কি বলি।
থাক মৌন-মন্দিরেতে মুগ্ধ-আরাধনা।
তুমি সুধায়াে না, তুমি সুধায়াে না!.
দীপালী
পরিবর্তন
তােমারে চিনিতে, নারী, আর নাই বাকি ;
সেদিন শপথ লয়ে পরলে যে ‘রাখী,
খুলে লও ! আর তব মাগি না প্রসাদ
কায়ােমনােবাক্যে এই করি আশীর্বাদ,
সুখী হও বিস্মরিয়া; ভােলা ভাল, বালা,
সর্বনেশে ভালবাসা দেয় বড় জ্বালা !
রমণীয় ওই তব রমণী-হৃদয়ে
প্রণয়ের হা হুতাশ কাজ নাই ব’য়ে।
আর ত ঘুরি না, সখী, মােহের পশ্চাতে ,
দারুণ দুর্দৈব সম ফিরি সাথে সাথে
জ্বালাব না, জ্বলিব না। মুক্তি দিলে আজ,
ধরিনু আঁকড়ি পুন সংসার সমাজ ;
স্বর্গ ধরিবার আশে উঠেছিনু, হায়,
ধূলার দুলালে, দেবী, ফিরালে ধূলায় ।
ধন্য তুমি, সন্ন্যাসীরে বানালে সংসারী ;
তােমার এ গুণপনা বাখানিতে নারি ।
৬২
দীপালী
মনের পসরা খুলি কড়া-ক্রান্তি গুণি
রাতদিন সংশয়ের ধুক ধুকু শুনি
জীবন কাঁদিয়া গেছে। লেনা-দেনা ছাড়ি
ডুবায়ে বাণিজ্য-তরী সিন্ধু দিনু পাড়ি।
হাজার হাঙ্গর নক্র বসে সে অতলে,
যাত্রাপথে আক্রমিল মােরে দলবলে ;
শুনে সুখী হবে তুমি,--দিয়ে সবে ফাঁকি
সাতারি উঠি কূলে নির্বিঘ্নে একাকী।
ঘুচে গেছে দুঃখ-দৈন্য, আপদ-বালাই ;
ভুলিলে কি, তুমিই যে ভুলাইলে, ভাই,
বাহিরে রয়েছে বিশ্ব, বিশ্বের বারতা।
দেবতা ভুলিলা দাসে, ভুলিনু দেবতা।
তুমি সপত্নীরে সঁপি বীণা-বেণু, বালা,
হারাইনু কবিতার আদরের মালা !
"তােমার বিদায় আজি ; যাও হাসিমুখে,
তােমার সতীন নিয়ে ঘর করি সুখে !
গাে, না, বলিনু যাহা, সব মিথ্যা কথা;
অন্তরের অন্তঃপুরে গুমরে যে ব্যথা,
দীপালী
সে মানে না অভিমান, জানে না সে ছল ;
অগুন্ঠিতা অকুণ্ঠিতা অমল সরল
সে ভাব-বালিকা। তার হিয়া সদা দহে
তােমার বিবেকতিক্ত বিরাগে বিরহে;
পাগল করিছে মােরে সহস্র আব্দারে ;
অবােধ, শশানে না কিছু, কি করিব তারে !
;
ওই শােন, গাছে গাছে নাচে কুহুস্বর ;
জাহ্নবী কল্লোলি উঠে; কাঁপে থরথর
ভাবাবেশে বিটবী বল্লরী ; বন ভরি
কাণাকাণি বেদনায় উঠিছে মর্মরি ;
মৌন হৃদি-বিনিময় তারায় শশীতে
ক্ষণে ক্ষণে ; জ্যোৎস্না যায় বাসর জাগিতে;
তরুণ নিশায় লয়ে দারুণ হুতাশ,
‘নিশি গেল’ ‘নিশি গেল’শ্বাসিছে বাতাস।
এল এল মধুরাত্রি, আমাদের, তরে
কুঞ্জে নিয়ে অন্ধকার ; দূরে, লাজভরে
5.
দীপালী
কোলাহল লুকাইল ; কর পাত্র পূরা,
দাও দাও, পান করি তব তীব্র সুরা।
আবার এ নেত্র ভরি ছেয়ে এল নেশা,
প্রলাপ ফুটিল মুখে ; স্বপ্নে মােহে মেশা,
তুমিও বারেক, সখী, জাগাও হৃদয়,
আমার সঙ্কল্প হরি কর মােরে জয় ।
দীপালী
নিমজ্জিতের স্বপ্ন
উপরে সলিল, তলায় সলিল,
চৌদি সলিলময় ;
চেতনার মাঝে মৃদু কলকলে
স্বপনের স্রোত বয়।
যেমনি ডুবি, রভসে মজিনু,
হেরিনু কি চমৎকার ;
পাতাল-প্রাসাদে মহলে মহলে
খুলিল গােপন দ্বার।
সলিল-স্বপন সলিলেরি মত
কভু স্বচ্ছ নিরাময় ;
কখনাে গভীর, কখনাে অধীর,
হাসি আর অশ্রুময়।
দীপালী
ঘুচে নি আমার জীবনে শৈশব
বসুধা-মাতার স্নেহে;
উদিল যৌবন, এলাম যখনি
সলিলসখার গৃহে।
প্রসন্ন-আনন মৎস্যনারীগণ
বেড়িয়া বেড়িয়া মােরে,
নাচিয়া নাচিয়া গাহিল মধুর,
বাঁশরী অধরে ধরে।
কলকোলাহলে দেয় করতালি
সাগর-কুমার যত,
দোল্ দোল দোল্ দুলিছে দোলায়
হর্ষ-পাগলের মত।
বিস্ময়ে হেরিনু,--এই কি সে রমা
জলতল আলাে করি ?
বসি যেন মৌন হতাশের মায়া
মাের প্রিয়া-রূপ ধরি।
দীপালী
পড়িনু চরণে; শুনিনু স্বপনে,
মুরতি কহিছে শেষে,
এসেছি অতলে তােমারি লাগিয়া,
তােমারেই ভালবেসে।
অভিমানভরে কহিনু কাঁদিয়া,
নির্দয় দেবতা, ব,
প্রণয় কি তাের ধরে না ধরায়,
তাই খোঁজে রসাতল ?
হেরিনু কাহারে প্রিয়ার সকাশে
প্রিয়জন-বেশে সাজি;
চিনিনু মরণে; কহিনু,—দেবতা,
সময় কি হ'ল আজি ?
সহসা সলিল হইল আবিল
জটিল নিয়তি সম ;
পাশাপাশি হেসে মিলাল নিমেষে
যুগল দেবতা মম।
দীপালী
কোথায় পালাল সােণার স্বপন
পাথারে অবােধ ছলে !
তীরেতে দাঁড়ায়ে জননী ধরণী,
ঝাঁপায়ে উঠি কোলে!
দীপালী
প্রত্যাবর্তন
গিয়াছিনু সুদূর প্রবাসে
সুদুর্লভ রতনের আশে !
শান্ত সাগরের গায় পালে লেগেছিল বায়,
মেঘ নাহি ছিল নীলাকাশে।
ভেসেছিনু রতনের আশে।
দুরাশে পিয়াসে শান্তিহীন,
রৌদ্রতাপে গেল সারাদিন।
এ কি রে ললাট-লেখা, রতনের নাই দেখা,
ঘুরি একা সিন্ধুপথে দীন
ছলনা সহিয়া সারাদিন !
নীল জলে তলাইছে বেলা ;
ভাসিতে লাগিল মাের ভেলা।
নাই জ্ঞান,--আসে রাত্রি, নাহি কেহ সহযাত্রী;
আনমনে চলিনু একেলা ;
ভাসিতে লাগিল মাের ভেলা।
দীপালী
অন্ধকারে জাগিনু শিহরি ;
তখন জেগেছে বিভাবরী।
স্রোতে গিয়েছিনু ধেয়ে, ফিরিনু উজান বেয়ে,
দুই চক্ষে জল এল ভরি ;
ফিরায়ে আনিনু কূলে তরী।
।
কে তুমি রয়েছ কূলে বসি,
নিশান্তের যেন পাণ্ডুশশী ।
উদাস করুণমুখী
কার দুখে তুমি দুখী,
জেগে বসে আছ মহীয়সী,
কে তুমি এখনাে কূলে বসি ?
প্রভাতে ডাকিলে বারে বারে ;
তখন নারিনু চিনিবারে।
দুরাশে অবাধ্য প্রাণ
মানে নাই সে আহ্বান,
ভেসেছিল অজানা পাথারে ;
তখন নারিনু ফিরিবারে।
৭১
দীপালী
দীপ জ্বেলে, গণ্ডে রাখি পাণি
ক্ষমাভরা কে তুমি, কল্যাণী ?
মত্ত বায়ে বার বার কাঁপিয়াছে দীপাধার,
নিবিতে চেয়েছে শিখাখানি ;
আঁচলে ঢেকেছ স্নেহ মানি।
ধর তবে মাের ক্ষীণ কর,
দেখাইয়া চল তব ঘর।
হের, আর নাই রাতি,
স্নিগ্ধ শয্যা দিও পাতি;
সর্বাঙ্গে বুলায়াে কম কর ।
আঁচলে মুছায়াে অথর।
আমি কিছু পারিব না দিতে,
সেবা শুধু নিব মুগ্ধ চিতে।
সাঙ্গ এবারের মত
স্বপন কল্পনা যত ;
তুমি গেয়াে; তােমার সঙ্গীতে
বারমাস ঘুমাব নিভৃতে।
৭২
দীপালী
চুম্বন
(১)
চুম্বন-চুম্বক, না ও পরশ-মাণিক,
সখী, তাের চারু ওষ্ঠাধর ?—দুটি ঠিক
দুই গুণে বিমণ্ডিত ! আছে বর্তমান
মাের কাছে এ তত্ত্বের জাজ্বল্য প্রমাণ ;--
জীবনে সহিয়াছিনু বহু নিস্ফলতা ;
করেছিনু পরিপাক বহু বিষ-ব্যথা ;
সে সবার তলচারী গৃঢ় অভিশাপ
হরিয়া সকল সুধা, সমস্ত উত্তাপ
করেছিল এ অধর লৌহ-সুকঠিন,
দম্ভের বিজয়স্তম্ভ ! শেষে একদিন,
জান সব,লৌহ গেল রস-আহরণে
সুপক্ক বিম্বের পানে ঘ্রাণে আকর্ষণে !
শিহরি দেখিনু আরাে অপূর্ব ঘটন,-
লৌহ আর লৌহ নাই, হয়েছে কাঞ্চন!
••
৭৩
দীপালী
চুম্বন
(২)
শুধু দেবতারি ভােগ্য জানিতাম সুধা ;
মানবের ভাগ্যে সার তৃষা আর ক্ষুধা !
সে ভ্ৰম গিয়াছে ঘুচি; তাই ভাবি মনে,
দেবাসুরে যুদ্ধ হ’ল কিসের কারণে?
কেহই পায় নি সুধা ; খেলিয়া চাতুরী
নারী বুঝি রেখেছিল সুধা করি চুরি
অধর-ভাণ্ডারে ; বৃথা সমুদ্রমন্থন ;
দেবতা পান নি যাহা, পেয়েছি সে ধন
বিনা দ্বন্দ্বে, বিনা ক্লেশে ! প্রিয়ে, তাের আঁখি
সেই গাে প্রথম স্বর্গে নিল মােরে ডাকি।
স্বপনে না জাগি ?—দুটি অমর অমরী
নিঃশেষে অধর-পাত্র দিনু শূন্য করি।
ভাসিতেছিলাম যবে সুধার সাগরে,
দবতারা ছিল চেয়ে মর্ত্যে ঈর্ষাভরে।
৭৪
দীপালী
আলিঙ্গন
\
(১)
ললিত বাহুর ছায়ে দুখানি যৌবন
লভিল রে এতদিনে সম্পূর্ণ মরণ !
থামিল বিদ্যুৎ-নৃত্য, অশান্ত ঝটিকা,
নিভে গেল বাসনার শেষ-দীপশিখা !
বিলাস-বিভ্রম কোথা, লীলা-কলা-ছল,
কটাক্ষে প্রলয়-জ্ঞান, হাস্যে অশ্রুজল ?
হৃদয়-মৃগয়া তরে ছিদ্র-অন্বেষণ,
জয়, পরাজয়, সন্ধি সবি সমাপন!
নাই আর শতমতে মন-জানাজানি ;
আধ-শঙ্কা আধ-লাজে মৃদু কাণাকাণি।
হিয়ায় হিয়ায় এবে কথা গুরু গুরু ;
সরস পরশরসে কাপে বক্ষ ঊরু।
মুদিত অলস নেত্র ঘুমঘােরে সারা ;
প্রতি অঙ্গ মাঝে হ’ল প্রতি অঙ্গ হারা !
৭৫
দীপালী
আলিঙ্গন
( ২ )
পেলব চপল সূক্ষম স্বেচ্ছাচারী মন,
সেও কি হয়েছে বন্দী বাহুর মায়ায় ।
তবে বুঝি মােহমত্ত এই আলিঙ্গন
শুধু দুটি শূন্যসার ছায়ায় ছায়ায় ?--
তাই রে বন্ধন ব্যর্থ, শ্লথ ভুজ-লতা
নিরাশ-হুতাশভরে কাঁপে থাকি থাকি ;
যতই নিকটে টানে, থেকে যায় বাকী ;
যুড়ে না গভীর ক্ষত ; ঘুচে না ক ব্যথা।
ঘুমাইছে নিশীথিনী, নিস্তব্ধ আলয়,
বাতায়ন-পথে জ্যোৎস্না ঢালিছে কিরণ ;
এ নিশীথে ভিন্ন করি নিবিড় বন্ধন
কেন উর্দ্ধে উড়ে যায় অতৃপ্ত হৃদয় ?
এ নহে নিবৃত্তি, এ যে বিচিত্র চেতনা ;
সৃষ্টিছাড়া কসনার বিচ্ছেদ-বেদনা।
দীপালী
যাই, তবে যাই!
•
যাও ফিরে, আর কেন ? বৃথা অাঁখিজল !
তরণী মেলিছে পাখা, পবন চঞ্চল
দিল দোল কল-হাসি’; উঠিল জোয়ার ;
হের, কাঁপে থরথর পরিত্যক্ত পার
আসন্ন বিচ্ছেদ-ত্রাসে! ওই জলরাশি
মুহূর্তে আঁধার হয়ে নিবে মােরে গ্রাসি !
বাজিল যাত্রার ডঙ্কা;-যাই, তবে যাই ;
অকূল পাথারে মাের তরণী ভাসাই !
অয়ি করুণার ছবি, কেন ম্লানমুখে ?
আমিও পাষাণভার চাপি’ আছি বুকে।
জানি না ফিরিব কবে ; না-ই ফিরি যদি ?
যােগাইও বিরহের মায়া-মহৌষধি,
নিৰ্বা কল্যাণ-বাঞ্ছা! সে হবে আমার
রােগ-শােক-বিপত্তির পরম নিস্তার।
৭৭
দীপালী
•
তুমি ধ্রুবতারা !
দিগন্তচুম্বিত এই আকুল সলিল
এই শান্ত নভস্থল—শুধু নীলে নীল
এই তীরতরুরাজি-হরিৎ-বিস্তার ;
পীত শস্যে স্ফীত এই অঞ্চল ধরার ;
করুণ কোমল এই বিদায়-সময় ;
চারি চক্ষে চেয়ে এই অঞ-বিনিময় ;
এই লজ্জা-দুরুদুরু প্রণয়-সম্ভাষ ;
সুখদুঃখভরা এই গভীর বিশ্বাস ;
-আঁকি লয়ে স্মৃতি-পটে, পথ বাহি ধীরে
ঘন লােকালয় মাঝে যাবে শেষে ফিরে।
বহুদিন—বহুদিন মাের অদর্শন
মলিন করিবে কি গাে অতীত স্বপন ?
ভাবিও, অভাগা কেহ অকূল পাথারে
তুমি ধ্রুবতারা পানে চাহে বারে বারে ।
৭৮
দীপালী
আরাে শুন !
হে সরলে, আরাে শুন, ফুরায় সময় ;
জান না চক্রান্ত-চক্র-কুটিলতাময়
সংসারের লীলা-খেলা! তব কর্ণে চুপে
জপিবে আমার নিন্দা সবে শত রূপে ;-
প্রণয়, দুরাশা ভ্রান্তি !---বুঝাবে তােমায় ;
জানাবে তােমার কাছে সহস্র প্রথায়,--
প্রেমে অবিশ্বাসী আমি ; মধুর প্রবাসে
বাঁধা পড়িয়াছি আমি নব প্রেম-পাশে!
এ কথাটি সত্য কিন্তু, করিও প্রত্যয় ;
সেখানের যাহা কিছু শােভা-আভাময়,
তারি সাথে ভালবাসা হয়েছে আমার ;
তারি মাঝে হেরি, প্রিয়ে, প্রকাশ তােমার !
বসি দূর দূরান্তরে করিও স্মরণ,
তােমার সােণার স্মৃতি পূজে কোন জন।
৭৯
দীপালী
জীবন-চিন্তা
শাস্ত্র ত্রাসে ঘােষে চিরদিন,
এ জীবন মহা প্রহেলিকা
আপনার মােহ-পাশ রচে
আপনারি অন্ধ অহমিকা!
সুখ দুঃখে ভেদ মাত্র নাই,
নিঃসঙ্কোচে বলে মায়াবাদ
দুদিনের অসার সংসারে
এ সকলি প্রপঞ্চ প্রমাদ !
তাই ভাবি, আমিও ত এ জগতে আছি,
আমি কেন ভালবেসে সুখী ;
আমি কেন ভালবেসে বাঁচি ?
বসে আছি বিনিদ্র নয়ন
মগ্ন করি নিশীথের মাঝে,
সুপ্তি-সাগরের পরপারে
শুনিতেছি স্বর্গ-বীণা বাজে।
৮
দীপালী
মুগ্ধ বিশ্ব শত রূপ ধরি
পশিতেছে, অন্তরে আমার
জলে স্থলে এত সুধা শােভা,
নাই কোন অস্তিত্ব ইহার ?
তাই ভাবি, আমিও ত এ জগতে আছি,
আমি কেন ভালবেসে সুখী ;
আমি কেন ভালবেসে বাঁচি ?
;
ওই যে বাজিছে দূরে বাঁশী,
বহিয়া যেতেছে জ্যোৎস্নাধারা
বনে বনে ফুটিছে মুকুল,
মত্ত বায়ু ফিরে দিশাহারা !
এই মৌন মহা মহােৎসব,
এ কি শুধু জড়ের স্বভাব ;
নিখিলের প্রমােদ উচ্ছ্বাসে
নাই কারাে শুভ আবির্ভাব !
তাই ভাবি, আমিও ত এ জগতে আছি,
আমি কেন ভালবেসে সুখী ;
আমি কেন ভালবেসে বাঁচি ?
দীপালী
;
আমি যারে সঁপিয়াছি মন,
যে আমার জীবনের আলাে ;
তারে পেয়ে জেনেছি হারে,
তার বিশ্বে বাসিয়াছি ভালাে ।
অবিচ্ছিন্ন জন্ম-সূত্রপাশে
আশা-ত্রাস একসাথে বাঁধা ;
কারাে কাছে ধন্য এ জীবন ;
কারাে কাছে শুধু মিথ্যা ধাঁধা।
তাই ভাবি, আমিও ত এ জগতে আছি,
আমি কেন ভালবেসে সুখী ;
আমি কেন ভালবেসে বাঁচি ?
তর্ক ক্রমে বক্র হয়ে চলে,
মীমাংসার নাহি পায় দেখা ;
সব-দ্বিধা দূর হয়ে যায়
প্রেম যবে কাছে আসে এক।
২
দীপালী
হৃদয়ে হৃদয় রাখি,তবে
বুঝা যায় বন্ধন-পুলক ;
নিমেষে সংশয়-জাল ভেদি
জুলি উঠে সত্যের আলোেক।
আমি চাই, যতদিন এ জগতে আছি,
আমি যেন ভালবেসে যাই ;
আমি যেন ভালবেসে বাঁচি!
:
দীপালী
আবেদন
ওহে মৃত্যু, তুমি আছ, তাই আছে আশা,---
বিশ্বে ভালবাসা
কুটিল কালের চক্রে ঘুরি কোনদিন
নাহি হবে লীন।
সেই সুকুমার পান্থ শ্রান্তিভরে যবে
অবসন্ন হবে,
বক্ষে তুলে লয়ে যাবে তারে সযতনে
উদার ভবনে ;
মন্ত্র পড়ি হিম-হস্ত রাখি তপ্ত-কায়ে
তুলিবে জাগায়ে ।
ধাইবে নবীন বলে পান্থ পূর্বপথে
পুন পূণ্য ব্রতে!
৮
৮৪.
দীপালী
৫
;
জরা আসি অকারণ অনুতাপে রােষে
যৌবনেরে দোষে ;
প্রাতে পরি’ ফুল-সাজ ভাবে সন্ধ্যাবেলা
তারে ছেলেখেলা
স্মরিতে অতীত কথা, দুঃস্বপন গণি
চমকে অমনি
তরুণ হৃদয়গুলি সুখে যবে হাসে;
বৃদ্ধ বসে শাসে;
রূপেরে বিক্রপ করে ; প্রেম-নিন্দা ঘােষে
প্রবীণ-সন্তোষে !
এই প্ৰেম-পরিণাম ?—ছাই, শুধু ছাই !
আর কিছু নাই ?
দেখিতেছি আশেপাশে ঘটিছে এমন,
তাই ভীত মন
তােমার আপন কণ্ঠে চাহিছে শুনিতে
অভয় বাণীতে,
বল তবে, বল মৌনী,—প্রেম জয়ী হবে,
চিরঞ্জীবী রবে ।
দীপালী
সরল সরস মনে করি বহু আশ
পালিনু বিশ্বাস ;
তারে আজি রাজপদে করিব বরণ,
দিব সিংহাসন ;
তুমি তার ভালে দাও তব নাম লিখা
দীপ্ত ললাটিকা !
••
ওহে মৃত্যু, যদি কভু আমার আকাশে
মেঘ করে আসে
হৃদয়-পূর্ণিমা মাঝে পূর্ণচন্দ্র-হাস
রাহু করে গ্রাস ;
জীবনের মধুমাস সব মধু কাড়ি
যায় ভক্তে ছাড়ি;
কালজীর্ণ যৌবনের সৌন্দৰ্য্য শুকায়,
দীপ্তি নিভে যায় ;
তখন-তখন এসে, হে পরাণ-প্রিয়,
কাছে ডাকি নিও;
মণিহারা-ফণী সম রাখিও না মােরে
প্রেমহীন করে !
৮৬
দীপালী
শিল্পীর প্রেম
ধন্য ধন্য, পাষাণসুন্দরী,
আছ তুমি ভাস্করের গৃহ আলাে করি।
ওষ্ঠে শ্বেত শুষ্ক হাসি, অকম্পিত কেশরাশি;
লাবণ্য কঠিন হয়ে নিল কি মূরতি ?
কটাক্ষে নাই সে জ্বালা, কণ্ঠে শুকায় না মালা,
নাহি ফুটে অশ্রু-ঢালা করুণ মিনতি ;
বক্ষে নাই দুরু দুরু,
কভু নাহি কাঁপে উরু,
নাহি সুখ-শিহরণ অকারণ মােহে ;
চিরদিন গীতহীন বীণাখানি কোলে লীন,
আদিকাল হতে বুঝি প্রেম নাহি দোঁহে!
শিল্পী শুধু সে পাষাণে দেবতা বলিয়া জানে;
তার কাছে উদাসীন এ মৃত-মহিমা
পাষাণ-পুত্তলী নয়, পরাণ-প্রতিমা।
প্রতিদিন ঊষায় সন্ধ্যায়
শিল্পী তারে প্রাণ ভরে স্বহস্তে সাজায়।
নিজে জ্বালি সন্ধ্যাবাতি দেখে চুপে সুপ্ত ভাতি,
ফিরে যেতে যেতে থামে আশার নেশায় ;
৮৭
দীপালী
যদি খিম্ন আঁখি-তারা পেয়ে পরিচিত সাড়া
অকস্মাৎ জ্বলি উঠে তরুণ তৃষায় ?
কখনাে অহরি ফুল দোলাইয়া দেয় দুল,
কবরী এলাতে গিয়ে ভাসে আঁখি-নীরে ;
সােহগে জড়িত বাণী, ধরে যবে বাহুখানি,
সরায়ে কেহ ত নাহি লয় ধীরে ধীরে !
অনাঘ্রাত পুষ্প দুটি গৌর বক্ষে থাকে ফুটি ;
বসনে ঢাকিয়া কেহ দেয় না ত লাজে ।
একটি ইঙ্গিত তরে প্রত্যাশা কাঁদিয়া মরে,
ব্যর্থ সাধ ব্যথা পেয়ে ফিরে মনােমাঝে!--
তবু মুগ্ধ সে পাষাণে দেবতা বলিয়া মানে;
তার কাছে উদাসীন এ মৃত-মহিমা
পাষাণ-পুত্তলী নয়, পরাণ-প্রতিমা। !
ধন্য ধন্য, মােহিনী পাষাণী,
আগে ছিলে ভাস্করের মানসের রাণী ।
শূন্য করি স্বর্ণ-বেদী
সেবকের মর্ম চ্ছেদি’
বাহিরে আসিলে কবে সাজিয়া পাষাণে।
আজ আছ গৃহ মাঝে বৃথা গৃহলক্ষী-সাজে ;
ও হস্ত নহে ত লিপ্ত করুণা-কল্যাণে !
मोनाली
নাই ক্ষম-দুর্বলতা, , সে বিনয়-কোমলতা,
সুমধুর সেবা স্নেহে নাই তব ভার ;
সুদিনের কেহ নহ, দুঃখ-দৈন্য নাহি সহ,
আপনারে বিলাবার নাহি অধিকার !
পদে পড়ি' ভক্ত-হিয়া পূজে তােমা রক্ত দিয়া,
হৃদয়ের সুধাপাত্র করিছে নিঃশেষ ;
শূন্য দৃষ্টি শূন্যে তুলি তুমি আছ সব ভুলি,
নাই কোন অসন্তোষ, নাই প্রীতি লেশ !–
হায়, শিল্পী এ পাষাণে দেবতা বলিয়া মানে ;
তার কাছে প্রাণহীন এ মূঢ়-গরিম
পাষাণ-পুত্তলী নয়, পরাণ-প্রতিমা !
ঘুমাও, গাে ঘুমাও মুরতি,
নাই জরা মৃত্যু, নাই নিষ্ঠুর নিয়তি।
এ শুধু তােমারে ঘিরে মায়ামন্ত্র জপে ধীরে
ঘুমের কুহেলিভরা অনন্ত রজনী ;
অন্ধকারে থাক ঢাকা
অসীম রহস্যমাখা
তব জড়-জীবনের অপূর্ব জীবনী ;
যে যাদু-পরশে মােহি’ ঘুমাইছ, শিলাময়ী,
কারাে কাছে নাহি তার জাগরণ-মণি !
দীপালী
-
কবি আছে স্তব বাঁধি’, গুণী আছে বীণা সাধি,
ভুবনমােহন রূপ থাক, মরে থাক্ ;
হতাশের অশ্রুজল
ধুয়ে দিক পদতল,
বাসনার শতদল যাক্, ঝরে যাক!
ভক্ত কিন্তু, এ পাষাণে দেবতা বলিয়া জানে ;
তার কাছে প্রাণহীন এ মূঢ়-গরিমা
পাষাণ-পুত্তলী নয়, পরাণ-প্রতিমা !
দীপালী
খুকু যখন
মায়ের বুকের সুধার ধারা চুমে’
মগন ছিল ঘুমে
পুতুল-ছেলে বুকের কাছে চাপি,
হ’তেছিল করুণ তরুণ-রাতে কাণাকাণি
স্বপ্নরাণীর সাথে,
অধরটি তাই উঠতেছিল কপি !
বাহিরের গােল ছিল না এককণা, পাগল বাতাস
ছাড়ি দস্যপনা
মণির গায়ে করতেছিল হাওয়া ;
নীরব রাতে বিজন দীঘীর জলে ঢেউগুলি সব
বেড়ায় কুতূহলে,
পদ্মদলের হ’তেছিল নাওয়া ।
৯১
দীপালী
একটি তারা
বাতায়নের ছিদ্রপথে ঢুকি
মায়ূতেছিল উকি
অধীর স্নেহে যাদুর মুখের পরে ;
ত্রিদিব-জ্যোৎস্না ধরার বিভাটিরে সােহাগভরে
পরশ করি ধীরে
মধুর হয়ে ফিতেছিল ঘরে।
শিবার দলে প্রহর গেল হাঁকি,
মুকুলগুলি ।
মেতেছিল আঁখি,
আমবাগানে উঠতেছিল ঘ্রাণ ;
পিন্সীখানি গাঁয়ের গাঙ্গ দিয়া যেতেছিল
দুরের
শ্রান্ত নেয়ে তুলতেছিল তান।
বিড়ালছানা,ঝিনুক, দুধের বাটি, খেলনা, দোনা,
ছােট্ট রঙিন লাঠি
আকুল মনে গতেছিল ক্ষণ,--
ঘুম ভেঙ্গে সেই মায়াবিনী মেয়ে কাহার পানে
হাবে আগে-চেয়ে,
রাখবে কাহার গরব-ভরা মন !
১২
দীপালী
সাথে সাথে ছায়ার মত লেগে দেবতা আছেন
শিয়রে যার জেগে,
পড়ুক না তার আইমা ঝুমে’ ঝুমে’ :
ঘুমের মাসী হাত বুলায়ে দেহে মােহন মন্ত্র
জপতেছিলেন স্নেহে,
সােণা আমার বিভাের ছিল ঘুমে !
ভাবতেছিলাম সারাটা দিন ধ'রে, ছন্দ গাঁথব
মনের মতন করে ;
ভাষা হবে আরও পরাণ-লােভা !
মিছে যেতাম কিসের পাছে ছুটে ? কাব্য আমার
থাত ঘরেই ফুটে’ ;
দেখতেছিলেম খুকুর ঘুমের শােভা !
১৩
দীপালী
খুকুর হাসি
দেখেছ ত, শ্যামল কুঞ্জকোণে
একটি মাত্র গােলাপকুঁড়ির সা’র ;
আধার বনে পড়ে না কি মনে,
একটি স্মিত খদ্যোতিকার হার ?
মনে পড়ে, মেঘলা দিনের পরে
একটি প্রাতে একটু আলাের ছিটে ;
দেখ নি কি, কমল-সরােবরে
রক্তরাগের একটি রেখা মিঠে ।
রঙিন দুটি রূপক উপমায়
সাধ্য কি, সে হাসির ছবি আঁকি,
সকল ভুবন শূন্য করেও যবে
বাকীর ভাগ্যে থেকেই যায় বাকী।
আঘাত পেয়ে কাতর যবে প্রাণ,
খুলি রে সেই সুধার উৎস-মুখ ;
কোথা হতে সরস পরশ এসে
জুড়ায়ে দেয় বেদন-বিদ্ধ বুক।
৯৪
দীপালী
;
উঠে আসে চপল চটুল স্রোতে
বিমল প্রাণের খাঁটি দীপ্তিটুক্ ;
উঠে আসে অনেক কবির গান,
অনেক যুগের অনেক দুঃখ সুখ।
জটিল তত্ত্ব পায়ের ভৃত্য সম
আপনি সেধে বাঁধন পরে আসি ;
হাসির মাঝে বাজতে থাকে মিশে
বিশ্বতানের ধ্বনি-ধরা বাঁশী।
ছুটতে থাকে বেগে থাকি থাকি
“তরল স্বচ্ছ খুসীর ফোয়ারা ;
মায়ের দুটি ত্রস্ত্র ব্যস্ত আঁখি
দিতে থাকে সভয়-পাহারা ।
অতুল ধনের অধিকারী যারা,
তারা কভু তৃপ্তি মানি রয় ?
তাদের শুধু ‘হারাই' ‘হারাই’ ডাক,
প্রাণের মাঝে সদাই দস্যুভয় !
দীপালী
;
মা ভাবে, এ সুধার ভাণ্ড দান,
দাসীর প্রতি প্রভুর দয়ার বিধি;
হঠাৎ কখন বিমুখ হবেন প্রভু,
নিবেন কাড়ি মায়ের বুকের নিধি !
হাসির মাঝে জগতখানি হাসে,
আপদ-রিষ্টি পালায় বহু দূর ;
ভবনখানি সুখের স্রোতে ভাসে,
রুক্ষ-মুখের গরিমা হয় চুর !
তুমি বিজ্ঞ, ভাবছ মনে মনে,
?
এ কেবলি হাসি-- -অবােধ-হাসি
এ যে নিগৃঢ় নধর অলােক বিভা,
স্বর্গে মর্ত্যে ফুটায় আলােকরাশি ।
হাসির মাঝে কোথায় ভেসে যাবে,
হে বিরাগী, তােমার অভিমান ;
জান না, এ ছেলেখেলার মাঝে
ছদ্মবেশী দেবের অধিষ্ঠান।
দীপালী
পল্লী-বালকের জল্পনা
আমায় কিন্তু জাগিয়ে দিও কালকে সকালবেলা,
কাকে বড় মজার দিন, কালকে রথের মেলা!
এতে যেন গােটি না হয়, দেখাে কোনাে মতে ;-
কাকে যাব রথে, মা গাে, কাকে যাব রথে !
গুরুমশায় নিজে যাবেন রথের মস্ত মেলায় !
কালকে কেবল কাটবে দিন হাসি খুসি খেলায়।
জাগিয়ে দিও, ভাের বাজাবে যখন নহবতে
কালকে যাব রথে, মা গাে, কাকে যাব রথে !
;
বলছ তুমি, আমি না কি করি না ক পড়া ?
নাস্তা বলল, ছড়া বলল,-মুখস্থ মাের করা!
একটি দিনের ছুটি চাই, মা, হয় যদি তাের মত ;---
কালকে দেখবাে রথ, মা গাে, কালকে দেখবােরথ !
৯৭
দীপালী
রাত পোহাতেই যাবে বিপিন, বলেছে সে আমায়,
আমার তরে থাকবে বসে খানিক তালতলায়
বেণী এসে জুটবে শেষে কলুপাড়ার পথে।
কালকে যাব রথে, মা গাে, কালকে যাব রথে !
••
রাস্তাটি নয় নেহাৎ কম, তাতে খানিক বাঁকা ;
মনে করে আমার সঙ্গে দিও কয়েক টাকা;
কত খাবার, মজার জিনিষ উঠবে শতে শতে!
কালকে যাব রথে, মা গাে, কালকে যাব রথে।
ভুলাে যখন লক্ষী হয়ে থাকবে বসে বাড়ী,
রঙিন ফানুস, সােলার ঝাড় আস্বাে না ক ছাড়ি;
আবাে,-বাজায় কলের পুতুল বেয়াল নিয়ে গৎ।
কাকে দেখবাে রথ, মা গো, কালকে দেখবাে রথ !
দিদির সঙ্গে হয়ে আছে জম্মের মত আড়ি,
তার জন্যেও কিনতে হবে কল্কাপেড়ে সাড়ী;
পরে যদি, আন্তে পারি ছােট্ট একটি নথ।--
' কাকে দেখবাে রথ, মা গাে, কালকে দেখবােরথ:
১৮
দীপালী
.
নেয়ের দলে বাছ লাগিয়ে আসবে ‘সারী’ গেয়ে;
নৌকাগুলি একে একে ভিড়বে কিনার ছেয়ে ;
হালকা হাওয়ায় রঙিন নিশান কবে রে পপ,
কাকে দেখবাে রথ, মা গাে, কাকে দেখবােরথ !
কোথাও হবে রামমঙ্গল, কোথাও বা কেত্তন
সে সব ছেড়ে দোলায় চড়ে দুবাে মোরা ক'জন ;
সাপের খেলা, সঙের টং দেখবাে সুরু হতে ;
কালকে যাব রথে, মা গাে, কালকে যাব রথে, !
লােকের ভিড়ে কিসের ভয়, আমরাও একটি দল,
সবার সঙ্গে নেচে গেয়ে কবাে কোলাহল ;
দূরে থেকে ঠাকুরের পা’য় হয়ে দণ্ডবৎ
আমিও টাবাে রথ, মা গাে, আমিও টাবাে রথ !
৯১
দীপালী
একটি অশ্বত্থের প্রতি
হে অশথ, তােমার তলায়,
কতকাল হ’ল গত, হইত বুড়ীর ব্রত',
উলুধ্বনি মুখরিত মধুর গলায়,
হৃষ্ট সধবার সারি উ ছায়ে রঙিন সাড়ী
হাসি হাসি দাড়াইত ঘিরিয়া তোমায়,
পরশি তােমার কায়, ‘মানত রাখিয়া পায়
প্রীত মনে তব কাছে মাগিত বিদায়
ঈষৎ দোলায়ে শাখা আশীষ মঙ্গলমাখা
তুমিও জানাতে সবে পাদপ-ভাষায় !
হে অশথ, সেদিন কোথায় ?
••
হে অশথ, তােমার তলায়
ছেলে মেয়ে একসাথে খেলিতে আসিত প্রাতে,
মায়ের বকুনি খেতাে ফিরি অবেলায় ;
আবার পড়িলে বেলা, জমিত নূতন খেলা,
গৃহ-দদল বাঁধা এমনি মায়ায়।
দীপালী।
পদিনে সারাবেলা তব ছায়ে হাত মেলা,
আশ-পাশ ছেয়ে যেত চালায় চালায়
কেনা-বেচা, কলরব, মাতামাতি, মহােৎসব ;---
গ্রামের গরব যেন রচিত মেলায় !
হে অশথ, সেদিন কোথায় ?
হে অশথ, তােমার শাখায়
শুকেরা বাঁধিত বাসা,
যুগলের ভালবাসা
আবরি রাখিতে স্নেহে পল্লব-পাখায় ;
জড়সম শিষ্ট-রূপে
মিলন দেখিয়া চুপে,
সহসা উঠিতে নাচি রস-ভঙ্গিমায় !
সিক্ত করি সে বাসর শিশুর অফুট স্বর
মঙ্গল আনিত ডাকি তব আঙ্গিনায় ;
তুমি জাগি রজনীতে ঘুমপাড়ানিয়া গীতে
নিথর রাখিতে সেই মুখর কুলায় !
হে অশথ, সেদিন কোথায় ?
হে অশথ, তােমার ছায়ায়
কত না ব্যথিত চিত্ত জুড়াতে আসিত নিত্য,
তুষিয়াছ অতিথিরে সরস সেবায় ;
দীপালী
তারা তৃপ্ত মনােরথে সংসারের শত পথে
; একে একে চলে গেছে পরম হেলায়।
তবু তাপিতের লাগি শ্রান্তিহীন আছ জাগি
দীর্ঘ দিন দীর্ঘ রাত্রি শূন্য প্রতীক্ষায় ;
দুঃখী অথর্বের মত
আঘাত সহিছ কত,
কত ঝঞ্ঝা, কত বজ্র আপন মাথায় !
হে অশথ, আজিকে বৃথায় !
;
হে অশথ, তােমার তলায়
পূর্বব স্মৃতি গেছে মুছে, সে বন্ধন গেছে ঘুচে,
তব সনে সে অতীত লুটায় ধূলায় ;
ভ্রষ্ট-শাখা, পর্ণহীন,
দাঁড়ায়ে রয়েছ, দীন,
মহত্ত্বের ভস্মশেষ কঙ্কালের প্রায় ;
আছ পল্লী-বৃদ্ধ মত রিক্ত আশীর্বাদে রত,
তাই আসি শান্তিহীন তােমার ছায়ায়;
বুকে তব নাই বল,
বেদনায়ু টলমল
করুণা উছলি উঠে তবু সান্ত্বনায় !
হে অশথ, আজিকে বৃথায় !
১০২
দীপালী
একটি কথা
একখানি তরী আছে, দুইজনে বাই,
মরা-গাঙ্গে ভরা-পালে ছুটে চলে যাই ;
পড়িলে বায়ুর বেগ, হাল দিয়ে তারে
দাড় টেনে চলে যাই জনহীন পারে।
বালু ঘুরে ঘুরে উড়ে, ভরা চৈত্রমাস,
ঘরে ঘরে চৈত-পূজা, আমােদ-উচ্ছ্বাস।
,
একমাত্র গান জানি, গাই দু’জনায় ;
পারে পারে রাখালের বাঁশরী বাজায় ;
আম্রমুকুলের ঘ্রাণ বায়ু আনে ব’য়ে
চকা-চকী বসে থাকে মুখােমুখী হয়ে ;
দুটি বােন্ প্রতিদিন জল নিতে আসে,
আমাদের চেয়ে চেয়ে টিপি টিপি হাসে।
দীপালী
সূৰ্য ডােবে, গা’র চাঁদ হেসে হেসে ওঠে,
ছেলেরা খেলার ঝোঁকে বটতলা ছােটে ;
জ্যোৎস্না এসে উকি দিয়ে দোহা পানে চায়,
সর্বদেহে শুভ্র কর সােহগে বুলায় ;
নাই সেথা বেণে-বউ, মুক্তোঠাকুরাণী,
নাই সেথা ঠাপাঠারি, নাই কাণাকাণি !
এইমত দুইজনে বাহি এসে তরী,
গ্রীষ্ম যায়, বর্ষা আসে শ্যাম-সাজ পরি ;
গুরু গুরু মেঘ ডাকে, নেচে উঠে প্রাণ ;
ক্ষেতে ক্ষেতে ছড়া ছড়া ফলে আশুধান ;
ছেলে মেয়ে সেজে গুজে ধেয়ে চলে রথে
বুড়া-বুড়ী হাত ধরে হাঁটে গাঁ’র পথে।
ছােট তরী’পরে শুধু দু’জনার ঠাঁই,
দোহার নিশ্বাস-বাস দুইজনে পাই;
ডুবে গেল একদিন ঝড়ে'তরীখান,
দু’জন দু’পারে উঠে বাঁচাইনু প্রাণ
তদবধি ছাড়াছাড়ি তাহার, আমার,
তরী নাই, নদীটুকু কিসে হই পার !
দীপালী
বিরহের অভিনন্দন
দূরে আছি, আরাে দূরে যাই, যা ছিলাম আমি রব তাই;
যত মৌন, যত দীর্ঘ হােক ছাড়াছাড়ি,
আমি তােমারি, শুধু তােমারি !
অন্তরের অনন্ত-নিৰ্বর
বহি বহি হবে না কাতর,
সুধা মাের পাবে না বিকার ;
তােমার শিশিরসিক্ত পথে আমার অধীর পুষ্পরথে
মনে মনে হবে অভিসার ।
স্বপ্ন মাের, স্মৃতি মাের কে লইবে কাড়ি ?
আমি তােমারি, শুধু তােমারি !
দীপালী
ওই রূপ, যৌবন-অমিয়া কাল যদি হরি লয়, প্রিয়া,
দানশেষে ম্লান হেসে দেখিও, ভিখারী,
আমি তােমারি, শুধু তােমারি !
দেব-পদে যে ফুল শুকায়, সে যে উঠে ভক্তের মাথায়!
প্রেমাে ধন্য হয় জীর্ণ হয়ে !
মাতাইয়া এ মন্দিরখানি যদি কভু না জাগ, পাষাণী,
সাধনার প্রতিদান ল'য়ে,
জেনাে, নিত্য সেবা-রত তােমার পূজারী!
আমি তােমারি, শুধু তােমারি !
কি ভাবিছ, কি করিছ কাজ, জানিও না, কারে চাও আজ;
মাের যন্ত্রে এক মন্ত্র উঠিছে ঝঙ্কারি,
তুমি আমারি, শুধু আমারি !
দূর শূন্যে যেন লক্ষ্য-তারা সহস্রের মাঝে হয়ে হারা
বাঁধিয়াছ অদৃশ্য-বাঁধনে,
পাছে, যাত্রী করে দি ভুল, তরী তার হারায় দুকূল,
আছ তাই বিনিদ্র নয়নে।
মৃত্যুপথে, ঘুর্ণিস্রোতে, হে মাের কাণ্ডারী,
তুমি আমারি, শুধু আমারি !
দীপালী
সুরঞ্জিয়া সন্ধ্যার আঁধার
পাঠাইছ তব সমাচার,
শেষে, চুপে পশ’ চোর হৃদয় বিদারি ;
তুমি আমারি, শুধু আমারি !
অপ্সরার অস্ফুট নূপুরে,
কিন্নরীর ক্লান্ত বীণাসুরে
ছেয়ে আসে নিদ্রার সঙ্গীত,
সেইক্ষণে অন্তঃপুর হতে
উঠে এস কবির জগতে
স্বপ্ন-সিন্ধু করি তরঙ্গিত!
প্রভাতে বিদায়-স্তব্ধ, নেত্রে অশ্রুবারি।
তুমি আমারি, শুধু আমারি !
দীপালী
চির-বিরহিনী
ঘুমায় জগত, ঘুমায় আলয়,
আমি জাগি একাকিনী ;
লাঞ্ছিত চাঁদেরে কোলে লয়ে জাগে।
কৃষ্ণপক্ষ নিশীথিনী!
গুরুভারনত ব্যথিত বাতাস
পড়িতেছে টলি টলি ;
নীলাম্বর হ'তে শ্যাম শস্পােপরে
স্বর্গ-অশ্রু পড়ে গলি।
তটিনী রটিছে কি খেদ-বারতা,
কোন্ বিরহীর মায়া !
আঁধার জগতে তীরতরুরাজি
দেখে নিজ ম্লান-ছায়া !
.
দীপালী
।
ঝরে পড়ে ফুল রহিয়া রহিয়া,
যেন উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ;
একটি কোকিলা বিলাপ প্রলাপে
আকুলিছে কুঞ্জ-বাস !
ঘুমায় জগত, ঘুমায় আলয়,
আমি জাগি একাকিনী;
লাঞ্ছিত চাদেরে কোলে লয়ে জাগে
কৃষ্ণপক্ষ নিশীথিনী !
ওই চঁাদ সম আমার গগনে
ছিল যে গরবে বসি,
প্রেম তার নাম, আজি সে লাঞ্ছিত,
আমার মানস-শশী।
কে এল সে কোন্ বসন্ত-উষায়
তরুণ রবির প্রায়,
পরাণে পরশি পরশ-মাণিক
সােণা করে দিল তায়।
১৫৯
দীপালী
হেরিনু সহসা প্রীতি-পদ্মাসন
তৃষায় করিছে সাের ;
হৃদিরাজ আসি বসিলেন হাসি
আঁধার কুটীরে মাের !
শেষে বুঝিলাম,—সে শুধু বঞ্চক,
আলােক ভেবেছি যারে !
ফুরাইল সব ; প্রেম দেখি পড়ি
লুটায় শশাণিতধারে !
সে অবধি বুকে লুকায়ে আহতে
মরণেরে দিই ফাকি ;
উন্মাদের মত মিছে হাসি, কাঁদি,
গান গাই থাকি থাকি ।
হােক না দলিত,--সে মাের ঊষার
একটি পূজার ফুল ;
টুটিছে মরম, পুষিতেছি, তবু
একটি সােণার ভুল।
৭।
দীপালী
ঘুমায় জগত, ঘুমায় আলয়,
আমি জাগি একাকিনী;
লাঞ্ছিত চঁাদেরে কোলে লয়ে জাগে
কৃষ্ণপক্ষ নিশীথিনী !
১১১
দীপালী
পল্লী-বালার কথা
আমি পল্লীনিবাসিনী অনাথিনী দীনা,
পিতৃ-মাতৃহীনা।
শৈশবে বন্ধনে বাঁধি স্বর্গে গেলা স্বামী,
জান অন্তর্যামী।
শ, জা আদি যবে রুধি অশ্রুধারে
ফিরিলা সংসারে,
বৃথা অন্নবিনাশিনী অলক্ষী বধূরে
}
ঠেলি দিলা দূরে।
বালিকা !---ফিরিনু আমি প্রিয় পিতৃগৃহে,
মুক্ত মাতৃস্নেহে;
এলাম শ্মশান ছাড়ি হাসিতে হাসিতে
বাসর যাপিতে।
বক্ষে টানি মুখ চুমি পিতা স্নেহভরে
গদগদ স্বরে
কত কি যে সুধাইলা :–জননী নিভৃতে
লাগিলা কাঁদিতে।
দীপালী
তারপরে, একদিন আঁধারি সংসার
জনক আমার
গেলা স্বর্গে; কিছুদিনে মাও দিলা ফাকি ;
আমি রৈনু বাকি।
শেষ-ভরসার স্থল, ধাত্রীমা’র করে
সঁপি মাতা মােরে
মুদিলেন সকরুণ নিষ্প্রভ নয়ন
জন্মের মতন।
বৃদ্ধার যতনে স্নেহে মাতৃহীন হিয়া
রহিল ভুলিয়া ;
অচিরে, শৈশব-স্বর্গ তেয়াগিল মােরে
পড়িনু কৈশােরে।
ক্রমে ক্রমে নিজ দশা বুঝিনু সকল,
জীবন বিফল
এতদিনে জানিলাম, সার মাত্র,--কাদা,
,
হাসি--মিথ্যা, ধাধা!
;
১১:
দীপালী
ধীরে ধীরে মুঞ্জরিল মাের কুঞ্জবন
পূজার কারণ ;
কুহরিল পিক পিকী বাসনার শাখে
লাগি পাখে পাখে।
বিকাশের দিন এলে, ফুল ফোটে গাছে,
শাস্ত্র নাহি বাছে ;
বুঝিলাম বাধা-বিধি, --মিছার বিচার
সমাজ-রাজার !
চরিতেছে ধেনুকুল দূরে দূরে মাঠে,
পদ্মদীঘী-ঘাটে
গিয়াছিনু কবে যেন স্তব্ধ দ্বিপ্রহরে
একা জল তরে!
হেরিনু শিকারী-বেশে তরুণ যুবকে
লক্ষ্য করে বকে,-
কহিনু নিকটে গিয়া ত্রস্ত ব্যস্ত হয়ে
বিনয়ে নির্ভয়ে,
মুঢ় মূক পশুপক্ষী কহে না ত কথা,
রাে বাজে ব্যথা !
১১৪
দীপালী
আরাে কি কহিতে যাব,---বিহবলা বিবশা,
থামিনু সহসা।
কুটিকুটিল মূৰ্ত্তি মিলাল নিমেষে,
কহিলেন হেসে,
“অধম এ ভক্তোপরে হে করুণাময়ী,
হ'লে আজি জয়ী;
সুখে থাক্ স জীব, ছাড়িনু শিকার,
শপথ আমার ;
নিৰ্মম হৃদয় মম রক্ততৃষা সনে
রাখিনু চরণে !”
আহা, কিবা শুনিলাম বংশীর সুম্বনে
আধেক স্বপনে ;
চমকি সরিনু দূরে, সদ্য লাজভরে
ফিরিলাম ঘরে ;
চরণ চলে না আর, থমকি দাঁড়াই,
ফিরে ফিরে চাই ;
পলক না পড়ে আর লুব্ধ-নেত্রোপর,
সে বড় সুন্দর!
দীপালী
পথে যেতে উচ্চারিনু শত বার করি
সরমে শিহরি,
“নিৰ্ম্মম হৃদয় মম রক্ততৃষা সনে
রাখিনু চরণে !”
অবশেষে, আঁরি কথা হল জপমালা;
বসিয়া নিরালা
স্বপ্নসঙ্গিনীর সনে খেলি আর হাসি,
কাঁদি, ভালবাসি।
লােকমুখে শুনিলাম তার নাম ধাম,
যত গুণগ্রাম ;
পল্লী-জমিদার-পুত্র,---কে না জানে তারে ?
মাের দেবতারে !
একদিন বসেছিনু বসন্ত-সন্ধ্যায়
শূন্য আঙ্গিনায়,
দূর বাঁশবন হ’তে আসিছে বাতাস
বহি হা হুতাশ ;
১১৬
দ পালী
••
দীপ ল’য়ে কে পশিল আঁধার, আলয়ে
হরষে বিস্ময়ে
চিনিল সে অতিথিরে তৃষিত অন্তর,---
সে বড় সুন্দর!
আচম্বিতে মন্দিরের দ্বার গেল খুলি,
লাজ শঙ্কা ভুলি
বাঞ্ছিতেরে বসাইনু স্বর্ণবেদী'পরে
মহা ভক্তিভরে ;
আবার নূতন করে করিলাম দান
মুগ্ধ মন প্রাণ ;
কিছু নাহি বিচারি; কহিল অন্তর,
সে বড় সুন্দর !
কেটে গেল কত দিন মধুর মিলনে
স্বপনে স্বপনে ;
কত মধুরাত্রি গেল হর্ষ-ফাগ মাখি
স্মৃতিচিহ্ন রাখি!
১১৭
দীপালী
০
কে জানিত এর মাঝে স্বর্গ-অভিশাপ
ল’য়ে তীব্র তাপ
নির্ঘাত পড়িবে আসি ক্রুদ্ধ বজ্র সম
মঞ্জ কুঞ্জে মম !
উঠিল মুখরি তাই পল্লীর রসনা ,
অনল-শসনা
ভরিল দোহার তরে কলঙ্কের ভরা,
মিথ্যা-সত্যে গড়া !
তিনি সমাজের দাস, যশের কাঙ্গাল,
আমি যে জঞ্জাল !
নিরপরাধিনী প্রতি তাই হয়ে বাম
কিনিলা সুনাম !
সমাজ ক্ষমিল রে ; মুদ্রা মধু-রবে
জিনি নিল সবে !
হ’ল শুধু মাের কথা,- আমারি লাঞ্ছনা,
কৌতুক-জল্পনা।
তার কুঞ্জ উজলিবে বালবধূ-লতা!--
এও সত্য কথা ?
#
দীপালী
---
স্বচক্ষে আসিনু দেখি শুভ-সমারােহ,
ঘুচে গেল মােহ।
নিবাইব অন্তজ্বালা ব্যর্থ অভিশাপে,
নিষ্ফল বিলাপে ?
পুষিলাম রক্ততৃষা গুপ্ত-বহ্নি সম
মর্মে মর্মে মম !
সহেনা সহেনা হেন প্রেম-অপমান,
শ্বাসে অভিমান
তবু তারে ভালবাসে অবােধ অন্তর,
সে বড় সুন্দর!
তাহার বিবাহদিনে সুকৌশল করি
খাদ্য সনে ভরি
দিলাম মধুর বিষ প্রিয়েরে সাদরে
তপ্ত প্রেমভরে।
ফলিল আমার সাধ ;--বরযাত্রা-ক্ষণে
আনন্দ-ভবনে
উথলিল শােক-বন্যা ; অকালে উৎসব
ভেসে গেল সব !
দীপালী
হেরিলাম দিব্য কান্তি পড়িয়াছে ঢলি
হলাহলে জ্বলি !
এ কি দশা ? শ্মশানেও কি কহে অন্তর,
সে বড় সুন্দর!
হাসি নাই, অশ্রু নাই, কথা নাই মুখে,
চিতা জ্বলে বুকে !--
বাহিরিনু দেশ ছাড়ি কখন কেমনে,
কিছু নাই মনে !
মৃত্যুরে দিয়েছি ধরে সাধ করে আমি
আপনার স্বামী !
ঘুচানু এয়ােতি-চিহ্ন,আশা অভিলাষ,
লইনু সন্ন্যাস ;
দেশে দেশে পথে পথে ঘুরি একাকিনী,
চির-উন্মাদিনী !
সুধু তারে ভালবাসে বঞ্চিত অন্তর,
সে বড় সুন্দর!
১২৫
দীপালী
হতভাগ্যের কাহিনী
“আয়, নিশীথিনী, আয় ঘাের হয়ে
অস্তগিরির গহ্বর হতে,
ভুলায়ে দে মাের শাণিত-স্মৃতি,
ভাসায়ে নে তাের আবিল স্রোতে।
;
ঢেকে রাখ তাের বিঘাের বিবরে,
নাই যেথা শশী, একটি তারা ;
ঘূরিব একাকী উল্কা-সমান,
শান্তিবিহীন, আলােকহারা !”
জনহীন পার, শান্ত প্রদোষ,
কুলু কুলু নদী বহিয়া যায় ;
মানব-ভাষার ব্যথায় গলিয়া
থমকি থামিয়া ফিরিয়া চায়।
দীপালী
নিঃশ্বাস ছাড়ে তপ্ত বাতাস,
মর্মরি উঠে তরুর পাতা ;
বিলাপিছে যুবা, বকিছে প্রলাপ,
প্রিয়ার কোলেতে লুটিছে মাথা।
আর্দ-হৃদয়, কহে স্নেহময়ী,
কণ্ঠে করুণা পড়িছে ক্ষরি ;
“কেন এ প্রলাপ, হেন অনুতাপ ?
সুধালে ভুলাও ছলনা করি !”
কহে যুবা, “আজ দিব ভুল ভাঙ্গি, ,
পড় না ভাঙ্গিয়া সে কথা শুনি’ ;
দেবতা বলিয়া জান তুমি মােরে,
আমি নরাধম, পামর, খুনী !”
আরাে শুর্ন,--আরাে নিদারুণ কথা,
“তােমার পিতার হন্তা আমি।”
নারী কহে চকি',-“ধিক্ এ মিথ্যায় ;
তুমি স্নেহময় আমার স্বামী।
১২২
দীপালী
তীরবেগে যুবা দাঁড়া’ল উঠিয়া,
(মরমে আহত, তরুণী চাহে, )
ঘুরিতে লাগিল চপল-চরণে,
হাতে হাত চাপি বেদনা-দাহে !
প্রাণেশের পানে তুলি স্নেহ-আঁখি
বলে নারী,-“বুক পাতিয়া আছি,
দিতে হবে মােরে আধেকের ভার,
সাথী বলে যবে লয়েছ বাছি।”
কহে যুবা,—“আমি বরেছি তােমায় ?-
বরেছে সে মাের রক্ত-তৃষা !
বলিব সকলি ; বিরল বিজনে
ঘনায়ে উঠুক তরুণ নিশা !
•
দু’কূল ছাপায়ে উক্ আঁধার,
আঁধার কাহিনী শুনিও মাের
ফিরায়াে না মুখ, দেখিও, সদয়ে,
শিথিল করাে না বাহুর ভাের !
দীপালী
মনে আছে, সেই প্রথম মিলন,
দুইটি প্রাণের তরল খেলা ;
হাসিতে হাসিতে কাঁদিয়া জাগিনু ,
অকূল সাগরে ভেসেছে ভেলা !
কোথা সে বিচিত্র চেতনাভরা
হাসি-লােদনের রঙ্গালয় ;
কৰ্ম্মস্রোতের চল-তরঙ্গ
অতুল পাথারে পেয়েছে লয় ।
ক্ষীণ হয়ে এল সংসার-ধ্বনি,
দূরে মিলে গেল তটের রেখা ;
বক্ৰ সাগর দাড়াল রুষিয়া ,
নূতন জগৎ ,--আমরা একা । !
সংসারে যারা ভালবেসে যায়,
তারা শুধু মরে আগুনে দহি;
তাদের জীবনী-উৎস খুলিয়া
যুগ যুগ যায় সুধায় বহি ।
দীপালী
সেই সুধা-স্মৃতি ছন্ম থাকিয়া
কবিরে শিখায় অমর গাথা ;
নবীন যুগলে কুহকে বঁধিয়া
বলে,নাই, নাই প্রণয়ে ব্যথা।
একদা মধ্যাহ্নে মিলিনু দেহে
সঙ্কেত-স্থল-মাঠের মাঝে ;
আমি দাঁড়াইনু সজল নয়ন,
তুমি চেয়েছিলে করুণ লাজে ।
পড়িছে কি মনে ? কহিনু তােমারে,
‘কেন অভাগারে সঁপিলে মন ।
হবে না মিলন তােমায়, আমায়,
তােমার পিতার কঠিন পণ।
পড়েছি তােমার পিতার চরণে,
করেছি অনেক মিনতি স্তব ;
এক কথা তাঁর,---‘কুলহীন তুমি,
ছাড় এ কু-আশা দুরাশা সব! ”
দীপালী
উত্তরিলে তুমি,-“শুনেছি সকল ;
পিতার কৌলিন্যে শতেক ধিক্ ;
বরেছি তােমারে প্রেমের আলােকে,
সেই ত বিবাহ হয়েছে ঠিক !
আজীবন আমি রহিব অনুঢ়া,
যদি নাহি পাই তােমারে স্বামী!
আর কারাে হাতে পরিব না মালা ;–
কহিনু, সাক্ষী অন্তর্যামী!
;
সেই শেষ দেখা ; অতৃপ্তি বহি
শূন্য জগতে ফিরি একা
-অকারণে ক্রোধ, বিরাগ, বিরােধ,
নয়নে কালিমা, ললাটে রেখা ।
মনে হত যেন বিশ্ব রাজক,
মিছে ক্রন্দন দেবতা লাগি ।
নিরাশা-দাহনে সকলি পুড়িল,
প্রেম ছিল শুধু ক্ষুধায় জাগি।”
দীপালী
নিঃশ্বাসি যুবা থামিল সহসা,
শ্রান্ত বুঝি রে বিপুল শ্রমে ;
বাড়িয়া উঠিল গাঢ় নীরবতা,
তিমির ঘনাতে লাগিল ক্রমে।
কহিতে লাগিল কাহিনী আবার ।
শুষ্ক অধর সরস করে,
“দেখিতে গেলাম পিতারে তােমার,
ভুগিতেছিলেন একদা জ্বরে।
এমনি নিশায় স্তব্ধ আলয়,
কোণে জ্বলিতেছে প্রদীপ ম্লান ;
একেলা বৃদ্ধ গুণ গুণ করি
গাহিতেছিলেন ভজন গান।
হাতখানি তুলে লইলাম হাতে,
অঙ্গে দিলাম উত্তরী ঢাকা ;
ধীরে, অতি ধীরে ললাটে ও শিরে
নীরবে করিতে লাগিনু, পাখা।
১২৭
দীপালী
কহিলা বৃদ্ধ ক্রুর বিপে,— ;
‘বুঝেছি, এসেছ ভুলাতে মন ;
ওরে চাটুকার, মিছে এ ছলনা,
নারিবে টলাতে আমার পণ।
;
হা রে মূঢ়, ধিক্, শত ধিক্ তােরে,
সরলা অবলা জানে না কিছু ;
তার আকাশের ধূমকেতু তুই,
চলেছিস্ ছুটে তাহারি পিছু !
কহিনু সরােষে,--‘বৃদ্ধ, তােমারে
বালকের চেয়ে অবােধ মানি;
তাই সহিতেছি বহুদিন হ'তে
কঠোর বিচার, নিঠুর বাণী !
ব্যাধিবিকৃত কুপিত বৃদ্ধ
হানিতে লাগিলা বাক্যবাণ ।-
নিমেষে নিবিল আমার জগতে
উদার-দীপ্তি, বিচার-জ্ঞান।
দীপালী
কখন কেমনে ধরিনু সবলে
রােগীর মুখর কণ্ঠ চাপি!----
নিভে গেল যেন একটি প্রদীপ
শুধুই ঈষৎ ঈষৎ কঁপি !
বাহিরি আসিনু পথে, নিরাপদে,
পদতলে দেখি, ঘুরিয়ে ধরা !
ফিরিনু আলয়ে ;----কেহ না জানিল,
মাথায় বহিয়া পাপের ভরা!
এ বিষ-ােতক করি পরিপাক
বাঁচিয়া রহিনু তােমারি আশে
একদিন এল পূর্ণিমা নিশি,
বেঁধে দিল দোঁহে বিবাহপাশে!
বাঞ্ছিত ধন ধরিনু বক্ষে,
ঘুচিল না তবু পতন-তাপ ;
বহে’ আসে কাছে নরকের ঘ্রাণ,
শুনি প্রেতাত্মার ভীষণ শাপ।”
দীপালী
থামিল অভাগা ;—ঊর্কে উঠেছে
অচল অসাড় অখির তারা;
অন্তরীক্ষে যেন কাহারে চাহি
প্রলাপ বকিছে আপনা-হারা !
অচিরে, সংজ্ঞা আসিল ফিরিয়া
দুখানি নয়ন প্লাবিয়া জলে ;
জীবনবিহীন প্রেয়সীর দেহ
দেখিল, পড়িয়া চরণতলে !
চাহিয়া রহিল,—শিকারী যেমন
দেখে চেয়ে নিজ খেলার শেষ ;
চাহিয়া রহিল,—দস্য যেমন
দেখে চেয়ে তার বিজীত দেশ ।
কাঁদিয়া উঠিল অমনি তটিনী,
শ্বাসিতে লাগিল কাতর বায় ;
চারিদিক হতে এল আহ্বান ,
আয় রে আঁধার, আয় রে, আয়!
দীপালী
স্তব্ধ বিজনে হ’ল স্ফুটতর
করুণ-ভীষণ ঝিল্লি-তান;
আঁধারের শত ছিদ্র বাহিয়া
বাহিরিল যেন মৃত্যু-গান !
হাহা হাসি’ যুবা লাগিল নাচিতে,
ঘাের ব্যাধি তারে গ্রাসিল আসি !-
মৰ্ম্ম ছেদিয়া অভ্র ভেদিয়া
ছুটিল হাহা হা অট্টহাসি !
;
সে হতে নিশীথে শব-বাহকেরা
শিহরি উঠিত শ্মশানে আসি;
দেখিত সভয়ে,-প্রেতের মতন
ঘুরিছে কে যেন হাহা হা হাসি।
দীপালী
নীরে
;
দময়ন্তী দূরে রাখি সহচরী সবে
ছিলা আন-সুখরতা ক্রীড়া-সরে যবে,
সুন্দর সুযােগ বুঝি, শূন্য হ’তে ধীরে
ভেটিল একান্তে আসি নৃপনন্দিনীরে
চতুর মরাল-দূত ! সন্তর্পণে মরি,
উড়িয়া বসিল মুগ্ধ গৌর ভুজোপরি ;
অনুরাগে প্রসারিয়া দুটি তপ্ত পাখা
আলিঙ্গিল পীন বক্ষ, সিক্ত বাসে ঢাকা,
সুরভিত কস্তুরী কুঙ্কুমে ; কণ্ঠ দিয়া
সমতুল নগ্ন-কণ্ঠ নিল জড়াইয়া ।
মধুর ইঙ্গিত-রঙ্গে, সুকৌশলে অতি,
জানাইয়া দিল দূত প্রভুর মিনতি !
হেরি বালা ভূর্জপত্রে ছন্দোবদ্ধ লিখা,
চঞ্চু হতে কাড়ি নিলা প্রণয়-পত্রিকা।
১৩২
দীপালী
তীরে
আর্দ্রবাসে আর্দ্রকেশে বসি তৃণাসনে,
বার বার শিহরিয়া সজল নয়নে,
প্রতিক্ষণে গদগদ নব অনুরাগে,
পড়িলা নলের লিপি, চুম্বিলা সােহাগে
নৃপসূতা! স্বর্ণ-সূচী বিধারে বিধায়ে
রক্তাক্ত করিলা বক্ষ,—ভিজায়ে ভিজায়ে
হৃদয়ের তালে তালে করিলা যােজনা
মধু ছন্দ ; প্রত্যুত্তরে পূরিয়া কামনা,
প্রেমপত্র অঙ্কনত চঞ্চুপুটে দিয়া
আর্ন করি দিল খগে চুম্বিয়া চুম্বিয়া।
বার্তা নিয়া উৎকণ্ঠিত প্রভুর সকাশে
কৃতাৰ্থ বিহগ-দূত উড়িল আকাশে।
শেষ ছায়ালেশ তার মিলাইল যবে,
তরুণী নিশ্বাস ফেলি উঠিলা নীরবে!
দীপালী
অনুরক্তা
নিদ্রিত বিদর্ভরাজ ; বসিয়া শিয়রে
নিদ্রাহীনা দময়ন্তী, বহু যত্নভরে
প্রাণেশের শির রাখি উরু-উপাধানে
নিদ্রাভঙ্গভয়ভীতা অতি সাবধানে
নির্বাক নিশ্চল বসি !----দয়াদেবী মরি,
জাগিছেন দুঃখীপাশে দুখ-বিভাবরী,
ব্যথিতবৎসলা ! স্নিগ্ধ, নত অাখি দিয়া
মমতা সান্ত্বনা, চুপে গলিয়া গলিয়া
সুষুপ্তের অন্তরের বিষ-ক্ষত যত
জুড়াইয়া দিতেছিল প্রলেপের মত ।
পতির বদনে হেরি সুখস্বপ্ন-হাস,
নিশ্চিন্ত আনন্দে সতী ফেলিল নিশ্বাস ;
শ্ৰমালসে ঢুলে এল কাতর নয়ন,
নিত্রায় পড়িলা ঢলি অজ্ঞাতে কখন !
১৩5.
नौशाली
পরিত্যক্তা
সহসা চেতনা লভি শূন্য ভূ-শয্যায়,
কোথা নাথ, কোথা নাথ,—ক্ষণতরে হায়,
উচ্চারিলা উন্মাদিনী!... গভীর গম্ভীর,
তখনি বিহ্বল মুৰ্ত্তি হ’ল পুন স্থির
অসহ বিষাদভরে। অদৃষ্টেরে দুষি’
কাঁদিলা না; শাপিলা না বিধাতারে, রুষি’!
পত্নীত্যাগী রাজ্যনাশী ছন্ন নৃপবরে
নিন্দিলা না, ভৎসিলা না বারেকের তরে!
অর্ধবস্ত্রা, একাকিনী গভীর গহনে
পশিলা রাজেন্দ্রলা পতি-অন্বেষণে।
যেথা যেথা গেল সতী অগ্নিশিখাবৎ,
অন্ধকার ত্রাসে মরি’ ছাড়ি দিল পথ।
বিস্ময়ে দেখিতেছিল তমস্বিনী ভীমা,
ঘুরিছে একটি স্তব্ধ শশাকের প্রতিমা!
১৩৫
দীপালী
মৃত্যুঞ্জয়
মহাভারােক্ত রুরু প্রমদ্বনার উপাখ্যান অবলম্বনে
যুবা বক্ষে লুকায়ে প্রিয়ারে
নিয়তি ফিরাতে চায়!--- মৃত্যু ফিরে ফিরে যায়,
মায়া-গণ্ডি লঙ্ঘিতে না পারে।
সারাদিন গেল চলি;
সহসা উঠিল জ্বলি
মহা শূন্যে দীপ্ত রক্তরাগ !
“কালের শাসন-পাশ কার সাধ্য করে নাশ?
গর্জে মৃত্যু যেন ক্রুদ্ধ নাগ !
O
কেন মিছে ভালবাসাবাসি?
যুবার সম্মুখে এসে কহে মৃত্যু অবশেষে,
নীল ওষ্ঠে নিকরুণ হাসি !----
“চির-মুক্ত মাের পুর; সেথা মােহ করি দূর
প্রেম নিবে বিরাগের ভেক ;
বিস্মৃতি-বিরতি-বিষে মাের কাছে সবারি সে
শূন্য-রাজ্যে হবে অভিষেক!”
দীপালী
যুবা কহে, প্রেম মৃত্যুঞ্জয় !
শ্মশানে, বাসরে সে যে বেড়ায় সমান তেজে ;
ভক্ত হৃদে এনাে না সংশয়!
অৰ্দ্ধ আয়ু দিনু দান, ফিরাও প্রিয়ার প্রাণ ;
শুনি মৃত্যু রহে সবিস্ময়ে !
প্রণয়ের পদোপরে কাল-দণ্ড রাখি, পরে,
গেল ফিরে আপন আলয়ে !
১৩৭
দীপালী:
সতী
কহে পতিহারা দাঁড়ায়ে শ্মশানে,
যাব, গেলা যথা প্রাণের পতি;
ঘিরিয়া তাহারে মত্ত জনতা
বলিছে,—ধন্য, ধন্য সতী ।
অঙ্গে রাঙা চেলী করে ঝলমল,
সিথায় সিদূর, অধরে পাণ;
মালা-চন্দনে আসিছে বহিয়া
কোন্ সুদিনের স্মৃতির ঘ্রাণ!
মৰ্ত্ত-বাসরে ফুরাইল খেলা,
শুকাল কুসুম, নিবিল বাতি ;
তাই বুঝি যায় এ চির-সধবা
অলকা-বাসরে যাপিতে রাতি।
দীপালী
পল্লী ভাঙ্গিয়া জনতা-প্রবাহ
এসেছে শ্মশানে দেখিতে আজ,
হাসিতে হাসিতে পতি ল’য়ে বুকে
ঝাঁপ দিবে সতী অনল-মাঝ !
সাজায়ে দে চিতা, সাজারে দে, ওরে,
আর এ বিচ্ছেদ নাহিক সয় ;
কহে বালা,—দে রে ঘটায়ে মিলন
সবে বলে,—জয় সতীর জয়!
বাজে মৃদঙ্গ, বাজে করতাল,
‘হরিবােল হরি’ উঠিল ডাক ;-
কুলপুরােহিত পড়িল মন্ত্র,
ঘন ঘন ঘন বাজিল শাখ।
আয় মাের কোলে, আয়, চলে আয়,
সজ্জিত চিতা ডাকিছে চুপে ;
চিরবিদায়ের দ্রুত-আয়ােজন
ফুটে পলে পলে শতেক রূপে।
দীপালী
সহসা কে যেন টানিল বসন,
ও শুধু একটি অভাগা ছেলে !
মা’র কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল কখন,
ছলছল চোখে অমিয় ঢেলে।
হেরিল রমণী,-একটি কুসুম
ঝর-ঝর’ যেন নিঠুর টানে;
একবার সতী হেরে পতি-মুখ,
আরবার চাহে তনয় পানে !
কি যেন আঘাত বাজিল পরাণে,
কার এ ভৎসনা বেদনামাখা ;
হেরিলা রমণী শিহরি অমনি,---
শবের ললাটে কুটি আঁকা!
যােড় করি পাণি, মুদিয়া নয়ন
কহিলা পতিরে ধ্যানেতে জানি;
দ্বিধাহীন মনে যাও পরলােকে,
আদেশ তােমার লইনু মানি!
১৫
দীপালী
বাছার আননে তােমারি যে ছবি
যেতেছ রাখিয়া দাসীর তরে ;
তােমার, আমার—সে প্রীতি-চিহ্ন,
যাব না দলিয়া বিরাগভরে।
পতি ল’য়ে বুকে বিস্মিত স্বরগে
গেছ যারা পাপ ধরণী ছাড়ি, ১
হে সতী সুভাগী, হেসাে না তােমরা ;
আমি মায়ামুঢ়া বিধবানারী
;
সুখ-সাধ সবি সঁপিনু চিতায়,
বরিনু দুখের বিধানগুলি ;
শিহরিল নারী,—কে এ ছায়ারূপী,
আশীষ করিছে দু’হাত তুলি !
কহিল শিশুরে কোলে টানি বালা,---
জান না, কি দাহে দহিছে মন!
-যাব তােরে ফেলি মা-হারা জগতে?
আয়, বুকে আয়, জুড়ান’ ধন !
দীপালী
আদরে গলিয়া মা’র বুকে ছেলে
মাথা গুজি সুখে শ্বাসিছে ধীরে ;-
যেন দিশাহারা পক্ষীশাবকে
জননী ফিরায়ে এনেছে নীড়ে।
রােষে আক্রোশে কুতূহলীদল
. গরজে সঘনে,--ধিক্, হা ধিক্ ;
চলে যায় সবে ধিকার রবে
পূর্ণ করিয়া সকল দিক!
লাজে হেঁটমুখ বান্ধব যত,
নারীর কিছুতে লক্ষ্য নাই ;
সে দেখিছে শুধু ধূধূ জ্বলে চিতা,
সে দেখিছে সবি হইছে ছাই।
পাগলিনী-প্ৰায় চেয়ে আছে বালা,
কোলে পড়ি শিশু হারায়ে জ্ঞান
ধীরে, অতি ধীরে নিভে গেল চিতা,
আঁধার হইল দুইটি প্রাণ।
১৪
দীপালী
ছাই-মুঠি তুলি পরশিয়া শিরে
আঁচলে বাঁধিয়া লইল তায় ;
চলে ধীরে ধীরে শশাকের প্রতিমা,
চলিতে চলিতে ফিরিয়া চায়!
শিরে মহাব্ৰত, হৃদয়ে মমতা,
পতির স্মৃতিতে মগন মতি ;
শত ধিক্কার বিরূপ মাঝে
পশিলা আলয়ে সতীর সতী ।
১৪
দীপালী
সাভরণা ও নিরাভরণা
.
পল্লীজমীদার-পত্নী নাম মন্দাকিনী,
যান নিত্য স্নানতরে হর্ষে প্রমােদিনী,
চলে সঙ্গে রঙ্গভরা সহচরী সব;
দারিদ্র্যের যত ত্রুটি, ধনের গৌরব
শতস্তবে ভরি’ তারা দেয় তার কাণে।
যদি কভু যথাযথ ধনীর বিধানে
তিনি শুধু কৃপাহাস্যে চান কারাে প্রতি,
সদ্য স্বর্গ হাতে পায় সেই ভাগ্যবতী !-~-
আপনার সৌভাগ্যের গণ্ডির ভিতর
স্ফীত হইতেছে ক্ৰমে অসার অন্তর !
কি বুঝিবে, স্তাবকের গড়া-পল্লীরাণী,
কত মিথ্যা, কত তুচ্ছ হেন চাটুবাণী !
স্নান সারি’ অঙ্গে ধরি অর্ধেক সম্পদ
পড়ে কি না পড়ে ভূমে পদ-কোকনদ,
ফিরেন আলয়ে ! বাহিরে, পথের মাঝে
বসে থাকে প্রৌঢ়া এক ভিখারিণী-সাজে।
৩৪৪
অখ্যাত অজ্ঞাত সেই দীন প্রতিমার
সর্বাঙ্গে কি যেন জ্যোতি হয় ছারখার
উদ্ধত স্পর্ধিত দর্প। অকারণ রােষে
তাই ধনী-বধু তারে হেরে অসন্তোষে ;
সহচরীগণ সঙ্গে পরম হেলায়
বৃথা মৌন মহিমারে দম্ভে বিধে যায় !
;
--নগর-প্রবাসী কর্তা ; সেথা খােস্-রােজে
জ্বালিয়া বিদ্যুত-বাতি, নৃত্য-গীত-ভােজে
করিছেন রাজপূজা ; (শ্বেতাঙ্গ-সেবার
রাজাবাহাদুরদেরি চির-অধিকার !)
এ যজ্ঞে প্রজারি মাত্র হাড় ক’টি গুড়া।
প্রকাশ্য সভায়, তারে রাজভক্তচূড়া,
বলেন আপনি লাট, !--হেথা পল্লীবাসে
কচিৎ দুর্ভাগা ভিক্ষু যদি কভু আসে,
দ্বারীহস্তে লভি’ কিন্তু, আশাতীত দান
ধৃষ্টগুলি হাসিমুখে করে না প্রস্থান!
অন্তঃপুরে এ সংবাদ দিতে পারে কেবা ?
কত্রীমা’র নহে কাজ কাঙ্গালের সেবা !
मोशालो
লাঞ্ছিতেরে ডেকে নিতে আপন আগারে
প্রৌঢ়া তাই বসে থাকে ধনীর দুয়ারে,
বিষণা লক্ষমীর মত। বিতাড়িতগণে
ডাকে কাছে বহু স্নেহে অতি সযতনে।
সামান্য সম্বল তার, বুকে বজ্রবল ;
ক্ষণেক করুণ-আঁখি হয়ে ছলছল
উৎসাহে জ্বলিতে থাকে। অনাথ আতুরে
লয়ে যায় হৰ্ম্ম হ'তে বহু-বহু দূরে,
বিজন কুটীরে। তার ক্ষীণ উপার্জন
বহুশ্রমলব্ধ, করে আনন্দে বণ্টন
সকলের মাঝে, মৌনে। কে করে গণনা,
দানতৃপ্ত করুণার নির্বাক্ সাধনা !
সখী সঙ্গে ধনী-বধূ নিত্য স্নানে আসি
ভিখারিণী বলি তারে যায় উপহাসি।
নাহি জানে ভাগ্যগর্বে, ঐশ্বৰ্য্যভূষণা,-
তার চেয়ে কত বড় সে নিরাভরণা ।
দীপালী
দেব-দর্শন
;
চলে তরী গঙ্গাবক্ষে ; পাণ্ডা কাছে আসি
কহিল আমারে ডাকি,হের, ওই কাশী !
অপরাহ্নে দূরস্থিত দেউল-মন্দির
মনে হল যেন শত বিহার-শিবির
ভূ-প্রবাসী দেবতার! বাঁধা-ঘাট যত
নিঃশব্দে সাষ্টাঙ্গে যেন হয়ে অবনত
পাবনী জাহ্নবীপদে পড়েছে লুটায়ে !
গদগদ কুলুম্বরে, মৃদু মিষ্ট বায়ে,
পুলকবিহল প্রাণ বন্দিল তখন--
দেবতা না সৌন্দর্য্যেরে—নাহি তা স্মরণ !
পশ্চিমের সূৰ্য্য যবে বসিবেন পাটে,
নামহীন জনহীন স্তব্ধ শান্ত ঘাটে
ভিড়িল অস্থির তরী। সেই ঘাটে বসি
দেখিনু বিধবা-মূৰ্ত্তি, যােড়শী রূপসী
দীপালী
পরি’ পূত শুভ্র বাস স্নাত শুদ্ধ মন,
কাষ্ঠের পাদুকা-পদে করিলা অর্পণ
আহরিত পুস্পাঞ্জলী। চুমি সকাতরে
পতির পাদুকা দুটি তুলি বক্ষোপরে
চলি গেলা যেন এক ত্রিদিবের ছবি !
নিঃশ্বাসিল মুগ্ধ বায়ু, কাঁদিল জাহ্নবী !
সহসা উঠিল বাজি জাহ্নবীর কূলে
মধুর আরতি-শঙ্খ দেউলে দেউলে ।
উঠিল আলােকি’ উদ্ধে স্বর্গরঙ্গশালা,
জ্বলিয়া উঠিল নীচে শত দীপমালা !
—চমকি চাহিল পাণ্ডা ; কহে মােরে ধীরে,-
এইবেলা চল, বাবু, মহেশমন্দিরে,
বিশ্বেশ্বর-সন্দর্শনে।-এস্তে আঁখি মুছি,
কহিনু তাহারে,যাও যথা অভিরুচি ;
দেবতা-সাক্ষাৎ আমি পাইনু এখানে ;
আর কোথা যেতে বল দেবের সন্ধানে ?
১৮
দীপালী
শ্রেষ্ঠতীর্থ
সংসার অসার ; শুধু পড়ি মায়া-ঘােরে
বাড়িছে পাপের বােঝা বহুদিন ধরে ;
একদিন শুভক্ষণে স্মরি দুর্গানাম,
দেব দ্বিজে বয়ােবৃদ্ধে করিয়া প্রণাম
করিলাম তীর্থযাত্রা। উৎসাহে উল্লাসে
ভ্ৰমিনু অনেক তীর্থ, বহু পূণ্য-আশে !
অনাহারে অনিদ্রায় শীর্ণ দেহখানি
ফিরাইতে হ’ল শেষে গৃহমুখে টানি ;-
অমনি সকল ভুলি’, বঙ্গপল্লীকোণে
মাের ক্ষুদ্র বাস্তুখানি, পড়ে গেল মনে!
সুদীর্ঘ বিরহ মাঝে, ওগাে পূণ্যভূমি,
কবে জানাইলে মুগ্ধে কে আমার তুমি !
মিথ্যা বলে মনে হ’ল কাশী হরিদ্বার,
আমার সে বাস্তুভিটা সব তীর্থসার।
১৪
দীপালী
অনুযােগ
হা রে আমার দুর্ভাগা স্বদেশ,
বিলাসিতা ধরেছে তাের প্রবীণ পক্ক কেশ!
দেশের বেশ কচে না আর ; অন্ন বিনা অস্থিসার,
হয়েছে পরি’ কি বাহার, বিদুষকের বেশ!
প্রাণের দৈন্য লুকায়ে প্রাণে ছুটেছ হেসে প্রাসাদ পানে,
গাহিছ জয় শতেক ভাণে, চাটুকারের শেষ !
হা রে আমার স্বদেশ অর্বাচীন,
চিরদিনই তােমার রবি তিমিরে রবে লীন।
একদা তােমার যে সামগীতি
ঘােযিল কত পুণ্য-নীতি,
সে মহালক্ষ্য, উদার-স্মৃতি ভুলিছ দিন দিন !
দ্বিধা না করি অণুমাত্র
নিতেছ জাগি প্রলয়-রাত্র
দিতেছে যত গরল-পাত্র সভ্যতা নবীন।
দীপালী
হা রে আমার সােণার জন্মভূমি,
মঙ্গল শুধু ও শ্যাম অঙ্গ ছিল যে, মাতা, চুমি’!
এখন তােমার যজ্ঞভূমে উঠিছে হাহা শ্মশান-ধূমে ;
যেমন তুমি ছিলে মা ঘুমে, আবার পড় ঘুমি ।
তােমার ভালে তিলক-রেখা গেছিল যাহা ক্ষণেক দেখা,
মুছিয়া এস সে ক্ষীণ লেখা নিবিড় তমে তুমি !
হা রে আমার জন্মভূমি দীনা,
হ’ত না শেষ আমার গান যে তােমার স্তুতি বিনা !
সে বাঁধন আজ ঘুচালে সবি, লাজে হেঁট তাের ভক্ত কবি
দেখে ও তাের সজাগ-ছবি বিলাসে বিমলিনা ;
গাঁথতে গিয়ে স্তুতির হার, উঠছে ফুটে তিরস্কার ;
তােমার তরে, মা আমার, আর ধরুবাে না ত বীণা!
!
দীপালী
বাদল-গাথা
বিরামবিহীন ঝরে বারিধারা,
দুলােক ভূলােক মদে মাতােয়ারা !
মাের চারিপাশ
শুধু হা হুতাশ,
আর কারাে নাই দেখা;
আমি একা, আমি একা!
ডমরু বাজায়ে নাচে মেঘদল,
চঞ্চলা চপলা হাসে খলখল ;
নীলিমার গায়
বাদল-গাথায়
ফুটে রােমাঞ্চের রেখা ;
আমি একা, আমি একা!
গুমরি গুমরি বেড়ায় বাতাস,
এই ঢলে পড়ে, এই ফ্যালে শ্বাস !
রুদ্ধ ঘরে ঘরে
দিবা-দ্বিপ্রহরে
প্রেমপত্র হয় লেখা।
;
আমি একা, আমি একা!
..১৫
দীপালী
তারা-রূপসীরা লুকায়ে আঁধারে
চলেছে ত্রিদিবে দিবা-অভিসারে।
স্বর্গে মর্ত্যে আজ নাই ভয় লাজ,
লুপ্ত যত ছল-শেখা;
আমি একা, আমি একা !
;
ডাহুক-ডাহুকী লাগি পাখে পাখে
কি মধু ব্যথায় মুহু মুহু ডাকে !
ময়ূরীর কাছে কি আজি রে যাচে
উতলা শিখীর কেকা?
আমি একা, আমি একা!
ঘন-ঘনতর নামে বারিধারা,
সারা বিশ্ব আজ কেঁদে হ’ল সারা !
সাধিয়া কাঁদিয়া ফিরে এল হিয়া,
কেহ ত দিল না দেখা ;
আমি একা, আমি একা !
দীপালী
শারদী
অয়ি পৌৰ্ণমাসী,
সুধাই গাে, আমি ধরাবাসী!
স্বর্গ তব কত কাছে,
কি আদর্শ ধরি আছে,
শুনিছ না কিন্নরীর বাঁশী ?
অপ্সরার ওষ্ঠ চুমে’ কি উল্লাস আছে ঘুমে,
যার লাগি ত্রিলােক উদাসী ;
মাধুরী-ভাণ্ডার মর্ত্যে দিবে কি লুটায়ে ।
তুমি পৌৰ্ণমাসী,
তুমি সুখরাশি।
১৫৪
দীপালী
অয়ি পৌৰ্ণমাসী,
তুমি যার চরণের দাসী !---
গ্রহ-পাত্রমিত্র সনে বসি রাজসিংহাসনে
সেই তব হৃদয়-বিলাসী ;
তারা-সঙ্গিনীরা ঘিরে মণি-ছত্র ধরে শিরে,
বায়ু করে ব্যজন উচ্ছ্বসি;
সােহাগের লাজাঞ্জলী কষিছ সঘনে!
তুমি পৌৰ্ণমাসী,
তুমি প্রীতিরাশি !
অয়ি পৌৰ্ণমাসী,
গাহনে নামিছ হাসি হাসি !
সাগরের উৰ্ম্মিগুলি
অনুরাগে ফুলি ফুলি
তােমারে লইল বুকে গ্রাসি ;
গভীর অতল হতে মাতিয়া প্রমােদ-স্রোতে
কলহাস্য তুলিছে বিকাসি!
ছাড়িতে না চায় তােমা ওই পাগলেরা।
তুমি পৌর্ণমাসী,
তুমি হাসিরাশি !
मौनालो
অয়ি পৌৰ্ণমাসী,
দেখা দিলে কানন উদ্ভাসি।
লতা-গহনের মাঝে
খুলি তনু আধ-লাজে
শুক্ল বাস শুকাইছ আসি ।
এলােকেশে—মরি, মরি, মুক্তাধারা পড়ে ক্ষরি,
বনভূমি গেল--গেল ভাসি।
লীলা-রঙ্গে জলে স্থলে করিছ বিহার!
তুমি পৌর্ণমাসী,
তুমি শোভারাশি।
অয়ি পৌৰ্ণমাসী,
আমি বড় রূপ ভালবাসি!
একা শরতের রাতে তােমার রূপের সাথে
তাই ত বেড়াই উপবাসী ;
নাশ’ তৃষা, নাশ’ ক্ষুধা, ঢাল’ সুধা, ঢাল’ সুধা,
আমি বড় সুধার পিয়াসী!
হেথা হ’তে কেড়ে লও আমারে ও বুকে!
তুমি পৌর্ণমাসী,
তুমি সুধারাশি !
১৫৬
দীপালী
বসন্তের আগমন-উক্তি
এসেছি এসেছি আমি, ওরে তরুলতা,
ফ্যাল মুছে আঁখি ;
এসেছি এসেছি আমি, ধর সুধা-গীত,
রে লাজুক পাখী।
ফোট’ ফুল, নাচ’ নদী, ভাস’ মেঘমালা
মাতি মহােৎসবে ;
বৃদ্ধ শীত গেছে অস্তে; আমার প্রভাতে
সুখী হও সবে !
আজি আমি হ’ব রাজা ; হে নীরদ, তুমি
হও ছত্রধারী ;
কুসুম-কিঙ্করীগণ চুলাও চামর,
সিঞ্চ’ গন্ধবারি !
১৫৭
দীপালী
হে পৃর্ণিমা, রঞ্জি’ দাও তােমার চন্দনে
আমার ললাট ;
•এস নির্বাসন হতে পিক-পারিষদ,
কর স্তুতি পাঠ।
কাল অভিষেক করি সঁপি দিল মােরে
ঋতু-সিংহাসন ;
উধাও বিহঙ্গ-দূত রট’ দিগ্বিদিকে
আমার শাসন।
হে নদী, ঘােষণা মাের ঘােষ’ জলপথে
লাস্যে, কল-হাসে,
আজ হ’তে ঘরে ঘরে কাটে যেন দিন,
উল্লাসে বিলাসে।
বিরাগে যে আছে যেথা, আন ধরি সবে
পবন-প্রহরী ;
সাজা দিব বিদ্রোহীরে দয়া ক্ষমা ভুলি
ন্যয়-দণ্ড ধরি ।
मोनालो
পাঠাইব একে একে অন্ধি' বন্দী করি
মন্ত্রে, ইন্দ্রজালে ;
শিখাইবে সখা স্মর রাজভক্তি সবে
বসি বন্দীশালে !
;
হে মুগ্ধ কিশাের কবি, কোথা স্বপ্নঘােরে
রয়েছ ঘুরিতে;
নব আনন্দের দিনে দীপ্ত কলা-রাগ
জাগাও তুরিতে !
হৃদয়-স্পন্দন ধরি উচ্চতম গ্রামে
বাঁধ তব বীণা ;
আজি ফুল্ল শতদলে বসিবেন আসি
মানস-আসীনা।
অতি উন্মাদন গীতে লভি উদ্দীপনা
হৃদয়ে হৃদয়ে ,
দলে দলে নর-নারী আসিবে না মাতি
তরুণ প্রণয়ে ?
मोनोलो
শাখে শাখে কোলাকুলি, নীড়ে নীড়ে নেশা,
হেরি কুতূহলে,
করিবে না হানাহানি প্রীতি-পিচকারী
যুগলে যুগলে?
এসেছি এসেছি আমি, ওরে তরু, লতা,
ফ্যাল্ মুছে আঁখি ;
এসেছি এসেছি আমি, ধন্ সুধা-গীত,
রে লাজুক পাখী ।
ফোট' ফুল, নাচ’ নদী, ভাস’ মেঘমালা
মাতি মহােৎসবে ;
বৃদ্ধ শীত গেছে অন্তে; আমার প্রভাতে
সুখী হও সবে !
দীপালী
দুর্দিনের চিত্র
১৩০৬ সনে দার্জিলিঙ্গে ল্যাসি ও তিস্তানদীর বন্যা উপলক্ষে
অকস্মাৎ যাের রোলে হিমাদ্রিশিখর দোলে;
আইল কি প্রলয়ের কাল ?
এ যেন ভৈরবদল
হাসে ওই খলখল,
নৃত্য করে মেলি জটাজাল ;
শৃঙ্গে শৃঙ্গে এ কি শব্দ,
দশদিক্ ত্রাসে স্তব্ধ,
দীপ্তিহীন দিনের আলােক ;
এ কি কাল-ডঙ্কা বাজে, মেঘের আড়ালে সাজে
শ্মশানের বিশাল কটক ।
হা ধিক, ভূধর-রাজ,
মইতের এই কাজ,
আশ্রিতেরে স্বহস্তে বিনাশ ?
তুমি না অটল, স্থির, চির-মৌনী, ধ্যান-বীর,
যুগ যুগ সাধিছ সন্ন্যাস!
দীপালী
—প্রাণীকুল কুতূহলে
তব স্নিগ্ধ ছায়াতলে
এরি লাগি লইল শরণ ?
করি বহুতর আশ
রচি সেথা সুখ-বাস
নির্ভয়ে করিছে বিচরণ?
হে পাষাণ, হে নিঠুর, সব দর্প করি চূর
সে নির্ভর দলিলে হেলায় ;
ছদ্মরূপ দূরে ফেলি
বিকট বদন মেলি
হুঙ্কারিলে রাক্ষসের প্রায় ;
ভ্রংশ-ধ্বংস-কীর্তিপরে
দাড়াইলে দম্ফভরে
প্রীত নেত্রে হেরি সর্বনাশ;
কাঁপায়ে ত্রাসিত পুরী বাজালে বিজয়-তুরী
সরিলে কি ভীষ্ম উচ্ছ্বাস !
ঘরে ঘরে চারিধারে
হায়-হায়-হাহাকারে
উথলিল শশাকের সাগর ।
সে বিলাপ পরিতাপ উচ্চারিয়া অভিশাপ
পাষাণে কি করিল জর্জর।
১৫
দীপালী
কাঁদ’, পতিহীনা দারা, কাঁদ’, ওগাে পুত্রহারা,
কাদ বসে’ বরষ বরষ ;
অশ্রুজল দীর্ঘশ্বাসে স্নেহ প্রেম বয়ে আসে,
থােক তাতে পাষাণ সরস ।
হা ধিক, পার্বতী সতী,
ধরিয়াছ কি মুরতি।
তুলিয়াছ তুমিও কৃপাণ ?
দিল যাত্রী তরী খুলি, অকস্মাৎ রােষে ফুলি
মেলিলে রসনা লেলিহান !
তােল সবে গ্রাস হতে;-- তাের ও নির্মল স্রোতে
লেখা থাক্ দান অতুলন !
হায় হায়, রে পাষাণী, পলকে ফেলিলি টানি
আপনার মহত্ত্ব-ভূষণ !
স্নেহময়ী ধরা, তােরে
মা বলিয়া জানি, ওরে,
চিরদিন করি তাের পূজা;
ললাটে ভ্রুকুটি আঁকা,
তােমরা হস্ত রক্তমাখা
দয়া-মায়া সবি গেল বুঝা !
দীপালী
অশ্রু মুছাবার তরে কেহ নাই চরাচরে ;
মানবের রােদন বিফল ?
দুদ্দিনের চিত্রগুলি যত দেখে খুলি খুলি,-
কবি-চক্ষে ভরে আসে জল ।
কক
দীপালী
যাত্রার উদ্বোধন
চুপ চুপ, দূরে দূরে সরিয়া দাঁড়াও সবে,
যাত্রী আজ সিন্ধুপারে যায়
বেজেছে আহ্বান-ভেরী, আর বড় নাই দেরি,
পলে পলে সময় ফুরায় ;
অতুল অমূল্য ধন
এই মহা সন্ধিক্ষণ
ব’য়ে যাবে বিষাদ-মায়ায় ?
নিস্তব্ধ পুরীর দ্বারে
উত্তরিতে দাও তারে
সচেতন সজাগ আত্মায় !
তােমাদের সেবা-যত্ন সকলি বিফল করি
যাত্রী আজ বহুদূরে যায় ;
রাখ ব্যাখ্যা তত্ত্ব তথ্য ;---
নিস্ফল ঔষধ পথ্য,
আর কেন ? সময় ফুরায় !
দীপাণী
আন তাই,—থাকে যদি
তন্ত্র মন্ত্র মহৌষধি,
রুগ্ন ভগ্ন আত্মার বােধন
নহে, আনি দাও শান্তি, আপনার ভুল-ভ্রান্তি
আপনি সে করুক শােধন!
আপনি বিমুখ ধরা দিয়েছে বিদায় যারে,
তারে আর রাখিবে কেমনে ?
ফুরালাে দিনের আলাে, মিছে কেন দীপ জ্বালাে?
নিভে যাবে আজিকে পবনে ।
এপারে আসিছে রাত্রি ; ওপারে পেল কি যাত্রী
প্রত্যুষের প্রথম আভাস ?
আজন্মের সঙ্গী সবে
বিদায় দিতেছে যবে,
আর তার কাহারে বিশ্বাস ।
অভাগা পারে নি কিন্তু, প্রাণান্ত বিদায় নিতে
স্থির নেত্র ভাসে অথরে ;
এই সন্ধ্যা,–এই রবি, এই ধরা,--শ্যাম-ছবি,
মুছে যাবে এ জন্মের তরে ।
-
দিপালী
বার বার মুগ্ধ হিয়া ফিরিছে বিদায় নিয়া
প্রতি অণু পরমাণু কাছে ;
হুতাশে আকুল প্রাণ
নিঃশেষে করিছে পান
জন্ম-উৎসে যত সুধা আছে!
,
জোয়ার আসিল উঠে, বাতাস লাগিল পালে,
পূৰ্য্যনাদ.ক্রমে উঠে বাড়ি’
তটের চরণে পড়ি আছাড়ি মরিছে তরী,
যেতে নাহি চায় তারে ছাড়ি’ ;
টুটে গেল মােহবন্ধ,
মিটে গেল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ;
ক্ষুদ্র তরী পড়িল সাঁতারে
ধীরে, তিল তিল করে সংসার যেতেছে সরে
বাষ্পছন্ন অভের আঁধারে।
১৬৭;
দীপালী:
একে একে ধীরে মিলায়ে তিমিরে
ভাঙ্গিল দীপের মেলা ;
দেখিতে দেখিতে কখন ফুরালাে
সাধের ভাসান-খেলা !
শুধু জ্বালাগুলি পুষিলাম বুঝি
এতকাল বুকে করি ;
আজ ছাই ঝেড়ে গেল তারা ছেড়ে
কিরণ-কিরীট পরি ।
দেখিনু চাহিয়া তিমির বাহিয়া
অরুণ উঠিছে ধীরে ;
উষা-সমীরণ করিছে ব্যজন
তাপিত ললাটে শিরে।
দীপালী,
চুলে’ আসে আঁখি,-শুনি, গাহে পাখী;
--ঘরে ঘরে জাগরণ;
নুতন জগতে নব নব পথে
ভ্রমণের আয়ােজন।
হয় ত এ প্রাতে আসিবে জাগাতে
খেলার সাথীরা যত ;
এক দেবােত্তরে পড়সী আমরা,
এক প্রাণ, এক ব্ৰত!
তারা কভু স্তোকে, কভু অনুযােগে
করিবে কি মিছে সাের ?
কিছুতে যে আর অবশ হিয়ার
ভাঙ্গিবে না ঘুমঘাের !
দীপালী
ক’ব বন্ধুগণে,--মা দাও মনে,
ফুরালাে আমার পালা;
প্রাণপণে জাগি’ দেবহার লাগি
ভরেছি নিশার ডালা ।
দিবসের সাজি ভরিবারে আজি
আমারে ডেকো না, ভাই ?-
লয়ে সভার জাগিব কি আর ?-
আজ ত ঘুমাতে যাই।
হাসিয়া হাসিয়া উঠিল ভাসিয়া
তরুণ তরুণ-লেখা;
নদীর কিনারে ধূলির মাঝারে
পড়িয়া রহিনু একা।
পরিক্লান্ত কায়ে আসিল ঘনায়ে
মধু-আলসের ঘোর ;
হরিষে-বিষাদে, হ’ল এইমতে
দীপালীর নিশি তাের !
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.