Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kalketu

Dutta,chandrakant · 2010/02/9

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কালকে
শচন্দ্রকান্ত দত্ত সরস্বতী বিদ্যাভূষণ
প্রণীত
প্রকাশক,
শ্ৰীআশুতােষ ধর
আশুতােষ লাইব্রেরী
৩৯১১ কলেজস্ট্রীট, কলিকাতা
ঢাকা ও চট্টগ্রাম।
মূল্য • আট আনা

COPYRIGHT
RESERVED BY THE
PUBLISHER.
ST
PRINTED B1
REBATI MOH.IN DAS
at the Asutosh Press, Dacca

উপহার
কালকেতু
আমার
সমর্পণ করিলাম।
তারিখ
=====

No text on this page.

কালকেতু অতি প্রাচীন কালের কথা,—তাহার পর হাজার হাজার বৎসর চলিয়া গিয়াছে। তখন দেব-লােক, নর-লােক, দৈত- লোক, নাগ-লােকসকলেই মহাদেবের পূজা করিত, ভগবতীর পূজার তখনাে প্রচার হয় নাই। এই জন্য ভগবতী একদিন দুঃখিত হইয়া স্বামী মহাদেবকে ধরিয়া বসিলেন, “দেব, সকলেই নানা উপকরণে আপনার পূজা করিয়া থাকে, কিন্তু আমার পূজা ত কেহই করে না, আপনি যদি দয়া করিয়া ইন্দ্রপুত্র নীলাম্বরকে অভিশাপ দিয়া দেব-লােক হইতে পৃথিবীতে লইয়া যাইতে পারেন, তবে সে যাইয়া পৃথিবীতে মনুষ্য জাতির ভিতর আমার পূজার প্রচার করিতে পারে।”

কালকেতু মহাদের বলিলেন, “বড় কঠিন কথা ভগবতি, নীলাম্বরের শরীরে তিলমাত্র পাপ নাই, কোন্ উপায়ে আমি তাহাকে অভিশাপ দিয়া এই সুন্দর স্বর্গ রাজ্য হইতে শােকদুঃখ- ময় পৃথিবীতে লইয়া গিয়া দেবজন্ম হইতে বঞ্চিত করিব ? তবে যদি ঘটনাচক্রে সে নিজেই পৃথিবীতে জন্ম লইতে ইচ্ছা করে, তবে অবশ্য আমি তাহাকে শাপ দিতে পারি।” ভগবতী তাহাতেই স্বীকৃত হইয়া দেবর্ষি নারদকে এই কাৰ্য সাধনের জন্য ইন্দ্রের সভায় পাঠাইলেন। সুচতুর নারদ না হইলে একটা সুখের সংসারে অনাসৃষ্টি ঘটাইবার ক্ষমতা যে আর কাহারাে নাই । দেবরাজ ইন্দ্র, জয়ন্ত, নীলাম্বর প্রভৃতি শত পুত্র, পাত্রমিত্র, দেব-গুরু বৃহস্পতি এবং পবন, অগ্নি, বরুণ প্রভৃতি দেবগণ, এবং দুর্বাসা, জৈমিনি প্রভৃতি মুনিদিগকে লইয়া স্বর্ণ-সিংহাসনে রাজসভায় বসিয়াছেন, ভাট স্তুতি পাঠ করিতেছে, মাতলি চামর দুলাইতেছে, এমন সময় নারদ বীণা বাজাইয়া হরিণ গান করিতে করিতে আসিয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন। ইন্দ্র তাহাকে প্রণাম করিয়া পদ-ধূলি লইয়া রত্নাসনে বসাইয়া রাজ্যের কুশল জিজ্ঞাসা করিলেন। [ ২ ।

-
ইন্দ্রের সভায় নারদ
কালকেতু |
[ পৃঃ-২

No text on this page.

;
কালকেতু
ধূৰ্ত্ত নারদ বলিলেন, “সে দুঃখের কথা আর কি বলিব
দেবরাজ ? তােমার রাজ্যের ভবিষ্যৎ বড় অমঙ্গলময় দেখিয়া
আসিলাম। নিবাতকবচ, জম্ভ, শুম্ভ, নিশুম্ভ, বাতাপি
প্রভৃতি অসুরেরা দেবতাদিগকে তাঁহাদের বড় সাধের
অমরাবতী হইতে তাড়াইয়া দিবে ; তাহা হইলেই দেবতাদের
কষ্টের আর শেষ থাকিবে না, দেবরাজ !”
নারদের কথা শুনিয়া ইন্দ্রের মনে বড় ভয় হইল।
তাঁহার এত সুখের রাজত্ব বুঝি আর থাকে না। তিনি
জিজ্ঞাসা করিলেন, “তাহা হইলে উপায় কি দেবর্ষি ?”
নারদ বলিলেন, “উপায় আছে। একচিত্তে একশত
আট দিন মহাদেবের পূজা কর, তাহা হইলে তিনি সন্তুষ্ট
হইয়া তােমাকে বর দিবেন।” এই বলিয়া তিনি প্রস্থান
করিলেন।
ইন্দ্র বৃহস্পতিকে শিব পূজার একটা শুভ দিন দেখিতে
বলিলেন। বৃহস্পতি পাঁজি পুথি ঘাটিয়া অনেক বিচার
করিয়া একটা দিন স্থির করিলেন,-এই দিন শিব পূজা
করিলে সকল ইচ্ছা পূর্ণ হয়।
ইন্দ্র এক এক করিয়া সকলের উপর পূজার আয়ােজনের
এক একটা ভার দিলেন,-নীলাম্বরের উপর ফুল তোলার
ভার পড়িল ।
তখন নীলাম্বরের মাথার উপর শকুন ডাকিল, টি-

কালকেতু
টিকি টিক্ টিক্ করিয়া উঠিল,—এই অমঙ্গল-শব্দ কাহারও
কানে গেল না, কেবল নীলাম্বর শুনিলেন। বিপদের
আশঙ্কায় তাহার প্রাণ কাঁপিয়া উঠিল; তিনি ইন্দ্রকে বলিলেন,
“বাবা, ফুল তােলা ছাড়া অন্য কাজ আমাকে দিন,আজ
আমার বাধা পড়িয়াছে।”
পুত্রের কথায় ইন্দ্ৰ ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন, “পিতার কথা
তুমি অবহেলা করিতে চাও নীলাম্বর ?
যযাতির পুত্র পুরু
পিতার ইচ্ছায় নিজ যৌবন তঁাহাকে দান করিয়া নিজে বৃদ্ধত্ব
লইয়াছিলেন ; রামচন্দ্র পিতার আজ্ঞায় রাজ্যের সুখ ছাড়িয়া
বনবাসে গিয়াছিলেন ; পিতার আদেশে পরশুরাম মায়ের
মাথা কাটিয়াছিলেন ; আর তুমি এই সামান্য কাজ করিতে
চাহিতেছ না ? কোনও ভয় নাই তোমার, মনের সন্দেহ
দূর করিয়া নন্দন বনে যাইয়া ফুল তুলিয়া লইয়া আইস ;
নিজের বাগান, তাহাতে ভয় কি ? তােমাকে গাছে উঠিয়া
ফুল পাড়িতে হইবে না, নীচে যে ফুল আছে তাহাতেই যথেষ্ট
হইবে। যাও নীলাম্বর, আমার অাদেশ অবহেলা করিও না।”
পিতার কথায় নীলাম্বর লজ্জিত হইয়া গঙ্গাজলে স্নান
করিয়া ফুল তুলিতে চলিলেন।
[ ৪ ]

কালকেতু
আঁকুশি ও সাজি লইয়া নীলাম্বর নন্দন বনে প্রবেশ
করিয়া দেখিলেন, সেখানে গাছে গাছে, লতায় লতায়, কুঞ্জে
কুঞ্জে, সরােবরে সরােবরে থরে বিথরে কত ফুলই না ফুটিয়া
রহিয়াছে। আনন্দে তাহার প্রাণ ভরিয়া গেল। তিনি
সাজি ভরিয়া কৈরব, কহলার, কিংশুক, কুরুবক, পানিশিয়ালী,
বান্ধুলী, কোকিলাক্ষী, জাতি, মরুবক, অতসী, পারিজাত,
টগর, বাক-সােণা, চাপ, জবা, রামতুলসী, বকুল,আরও
কত কি ফুল তুলিলেন ;-দেবতার বাগানের ফুল কিনা,
তাই নামের ও রকমের অন্ত নাই ! ফুল তুলিয়া আনিয়া
তিনি পূজার মণ্ডপে দিলেন। ইন্দ্র সেই ফুলে শিবের পূজা
করিলেন। এই ভাবে প্রত্যেক দিনই পূজা করিতে হয়।
নীলাম্বরও প্রতিদিনই ভােরে উঠিয়া গঙ্গাস্নান করিয়া ফুল
তুলিয়া আনেন, আর ইন্দ্র পূজা করেন। এই রকমে
কিছুদিন কাটিল।
এক দিন নীলাম্বর ফুল তুলিতে যাইয়া দেখেন, নন্দন
বনে একটী ফুলও ফোটে নাই। তিনি ফুলের জন্য স্বর্গের
যত বন উপবন পাতি পাতি করিয়া খুজিলেন। কিন্তু একটী
ফুলও কোথাও মিলিল না। মিলিবে কেমন করিয়া ?
[ ৫ ]

কালকেতু
ভগবতী যে মায়া করিয়া সমস্ত ফুলই হরণ করিয়াছেন।
ফুল না পাইয়া নীলাম্বরের বড়ই চিন্তা হইল, আজ যে পিতার
শিবপূজাই পণ্ড হইবে। এদিকে বেলাও বাড়িয়া চলিল।
স্বর্গের কোথাও ফুল না পাইয়া তিনি শেষে রথে চড়িয়া
ফুলের জন্য মর্ত্যে নামিয়া আসিলেন। আসিবার সময় পথে
নানা অমঙ্গল তাহার চোখে পড়িল।
মর্ত্যের বিজুবনে তখন ব্যাধ ধৰ্ম্মকেতু একটা হরিণকে
তাড়া করিয়া তাহার পিছু পিছু ছুটিতেছিল। নীলাম্বর আসিয়া
সেইখানে উপস্থিত হইলেন। দেবী ভগবতী স্বয়ং হরিণের
রূপ ধরিয়া মায়া পাতিয়া ধৰ্ম্মকেতুকে বনে বনে ছুটাইয়া
বেড়াইতে ছিলেন। ধৰ্ম্মকেতু হরিণকে নিকটে পাইয়া যেমন
বাণ ছুড়িল, অমনি মায়া-হরিণ অদৃশ্য হইয়া গেল। নীলাম্বর
একটা গাছের নীচে বসিয়া ইহা দেখিতে লাগিলেন। দেখিতে
দেখিতে তিনি ফুলের কথা ভুলিয়া গেলেন। ব্যাধের অমন
হৃষ্টপুষ্ট শরীর ও হাসিভরা মুখ দেখিয়া তাহার মনে হইল,-
ব্যাধের জীবনই সুখের জীবন, কেন আমি ইন্দ্রপুত্র হইলাম ?
এই ব্যাধ ক্ষুধার সময় খায়, তৃষ্ণার সময় জল পান করে ;
আর আমি? বাবা যে পর্যন্ত শিব-পূজা শেষ না করেন, সে
পৰ্য্যন্ত তৃষ্ণায় ছাতি ফাটিয়া গেলেও, এক ফোঁটা জল অবধি
মুখে দিতে পারি না। আমি মালাকারের মত ফুলের সাজি
হাতে করিয়া বনে বনে ঘুরিয়া বেড়াই, পায়ে কত কাটা
[ ৬ ]

ক
কালকেতু
ফোটে, সারা গায়ে কাঁটার আঁচড়ে রক্ত ঝরিয়া পড়ে। আর
এই ব্যাধ লতা দিয়া চুল বাঁধিয়া তীর ধনুক হাতে লইয়া বনে
বনে কত সুখে ঘুরিয়া বেড়ায়, কোনও দুঃখ কষ্টকে সে দুঃখ
কষ্ট বলিয়াই মনে করে না। এই ব্যাধের জন্মই সুখের।”
ভাবিতে ভাবিতে বেলা দুপুর হইয়া গেল। হঠাৎ তাহার
মনে হইল ফুল তােলার কথা। তিনি তাড়াতাড়ি দুই হাতে
ফুল তুলিতে লাগিলেন। ভগবতী এই সুযােগে কাঠপিপড়ার
রূপ ধরিয়া সাজির একটা পলাশ ফুলের মধ্যে লুকাইয়া
রহিলেন। নীলাম্বর তাড়াতাড়ি ফুল লইয়া রথে চড়িয়া
আসিয়া ইন্দ্রের নিকট উপস্থিত হইলেন।
ইন্দ্র যখন সেই ফুলে শিবের মাথায় অঞ্জলি দিলেন,
তখন সেই কাঠপিঁপড়া মহাদেবের জটার ভিতর ঢুকিয়া
তাহাকে এমন ভাবে কামড়াইল যে, সেই বিষে মহাদেব
অস্থির হইয়া পড়িয়া মহাক্রোধে ইন্দ্রকে বলিতে লাগিলেন,
“ইন্দ্র, তুমি স্বর্গের রাজা, আর আমি শ্মশানবাসী সামান্য এক
জন ভিক্ষুক মাত্র ; আমার গলায় হাড়ের মালা, মাথায় জটা,
পরণে বাঘ ছাল, গায়ে ভস্মমাখা; আর তুমি স্বর্ণ-মুকুটধারী
স্বর্গের রাজা, অতুল তােমার ধন সম্পত্তি। আমাকে কাঙ্গাল
দেখিয়া তুমি ঘৃণায় পরিহাস করিতেছ। যদি ইচ্ছা না হয়
তবে এ কপট পূজা করিয়া তােমার দরকার কি?” ক্রোধে
মহাদেবের চক্ষু দিয়া যেন আগুন বাহির হইতে লাগিল।
[ ৭ ]

কালকেতু
ইন্দ্র জোড় হাত করিয়া বলিলেন, “আমার কোনও
দোষ নাই দেব! নীলাম্বর ফুল তুলিয়া আনিয়াছে, ছেলে মানুষ
সে, তাহাকে ক্ষমা করুন।”
মহাদেব নীলাম্বরকে বলিলেন, “সত্য করিয়া বল
নীলাম্বর, কেন তুমি এমন করিয়া কষ্ট দিলে ?”
নীলাম্বর বনে যাহা যাহা দেখিয়াছিলেন, খুঁটিনাটি
করিয়া সব কথাই বলিলেন। তাহার কথা শুনিয়া মহাদেব
ভগবতীর নিকট যে প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন, তাহা মনে পড়িল।
তিনি নীলাম্বরকে অভিশাপ দিলেন,আমার পূজার ফুল
তুলিতে গিয়া তুমি ব্যাধ হইয়া জন্মিবার সাধ করিয়াছিলে,
আমি অভিসম্পাত দিতেছি, সেই পাপের ফলে তুমি শীঘ্র
পৃথিবীতে ব্যাধ হইয়া জন্ম লও।
মহাদেবের অভিশাপ শুনিয়া নীলাম্বরের মাথায় আকাশ
ভাঙ্গিয়া পড়িল। তিনি মহাদেবের পা জড়াইয়া ধরিয়া
চোখের জলে ভাসিয়া তাহাকে তুষ্ট করিবার জন্য স্তব করিতে
লাগিলেন। তাহার স্তবে ভােলা মহেশ্বর সমস্ত রাগ ভুলিয়া
গেলেন। কিন্তু তঁাহার অভিশাপ ত নড়চড় হইতে পারে না।
কাজেই তিনি বলিলেন, “যাও নীলাম্বর, যখন অভিশাপ দিয়া
ফেলিয়াছি, তখন তাহা আর ব্যর্থ হইবে না; তবে তােমাকে
বেশী দিন পৃথিবীতে থাকিতে হইবে না, ভগবতীর ভক্ত হইয়া
তঁাহার দয়ায় একশত কুড়ি বৎসরের মধ্যেই তুমি শাপ
[ ৮ ]

কালকেতু
হইতে মুক্ত হইয়া আবার স্বর্গে চলিয়া আসিবে।”
কিনা, তাই পৃথিবীর একশত কুড়ি বৎসর তাঁহাদের কাছে
অতি সামান্য কয়েকটা দিন। যাহা হউক, দেখিতে দেখিতে
নীলাম্বর অজ্ঞান হইয়া সেখানে এলাইয়া পড়িলেন। তাঁহার
প্রাণ বাহির হইয়া গেল। আত্মীয় স্বজনেরা তঁাহার মৃত দেহ
দাহ করিবার জন্য স্বর্গ-গঙ্গা মন্দাকিনী তীরে লইয়া গেলেন।
নীলাম্বরের স্ত্রী ছায়া দেবী অন্তঃপুর হইতে যখন স্বামীর
মৃত্যু সংবাদ পাইলেন, তখন তিনি পাগলিনীর মত মন্দাকিনীর
তীরে ছুটিয়া গেলেন। সেখানে তিনি স্বামীর চিতার উপর
পড়িয়া আছাড় বিছাড় খাইয়া দিলেন, তারপর স্বামীর সঙ্গে
এক চিতায় পুড়িয়া জীবনের সমস্ত শােক দুঃখের হাত হইতে
নিস্তার পাইলেন।
৪
ব্যাধ ধৰ্ম্মকেতুর স্ত্রী নিদয়া প্রাতে ছােট কুড়ে ঘরখানির
দুয়ারে বসিয়া আছে, এমন সময় দেবী ভগবতী জরতী ব্রাহ্মণীর
বেশ ধরিয়া ভিক্ষার জন্য গিয়া সেখানে উপস্থিত হইলেন।
নিদয়া তাহাকে বসিতে আসন দিয়া পান খাইতে দিল।
ভগবতী বলিলেন, “ভিক্ষা দাও মা ; আজ একাদশীর
পারণ, আশীর্বাদ করি তুমি শীঘ্র ছেলের মা হইবে।”
[ ৯ ]

কালকেতু
নিদয়ার কোনও পুত্র সন্তান ছিল না, সে ভগবতীর
কথায় যারপর নাই আনন্দিত হইয়া বলিল, “আশীর্বাদ করুন
ঠাকুরাণি, যদি আপনার দয়ায় আমি ছেলের মুখ দেখি, তবে
তাহাকে আপনারই চরণের দাস করিয়া দিব।”
ভগবতী বলিলেন, “তােমার কোনও চিন্তা নাই। আমার
কথা অন্যথা হইবে না। তুমি স্নান করিয়া আইস, আমি
তােমাকে ঔষধ দিব ।”
নিদয়া মহানন্দে স্নান করিয়া আসিল। ভগবতী
তাহাকে ঔষধ দিলেন। নিদয়া তাহাকে চাউল, বড়ী ও
নগদ চারিপণ কড়ি দিয়া প্রণাম করিল। ইহার দশ মাস পরে
সত্য সত্যই নিদয়ার একটা ছেলে হইল। এই ছেলেই সেই
ইন্দ্র-পুত্র নীলাম্বর। ওদিকে ভগবতীর কৌশলে নীলাম্বরের
স্ত্রী ছায়াও সঞ্জয়কেতু নামক এক ব্যাধের স্ত্রী হীরাবতীর গর্ভে
মেয়ে রূপে জন্মগ্রহণ করিলেন। ধৰ্ম্মকেতু ছেলের নাম রাখিল
কালকেতু
এবং
সঞ্জয়কেতু মেয়ের নাম রাখিল
ফুল্লরা।
ব্যাধের ছেলে কালকেতু রূপে গুণে শক্তি সামর্থ্যে
ঠিক ব্যাধের মতই হইল। দিনে দিনেই সে যেন বাড়িয়া
উঠিতে লাগিল। দশ বছরের ছেলে চেহারায় ও ক্ষমতায়
যেন বিশ বছরের এক জন যুবকের মত হইয়া উঠিল। সমস্ত
ব্যাধ-বালকের ভিতর অমন শক্তিশালী এক জনও ছিল না।
[ ১০ ]

;
কালকেতু
তাহার মাথায় ঝাড়া ঝাকড়া বাবড়ি চুল, উচু কপাল, চোখ
দুইটী ভাঁটার মত, কপাটের মত বিশাল বুক, গলায় জালের
কাঠি, সিংহের মত কোমর, হাতীর মত চলন, মালকোচা
করিয়া কাপড় পরা, মাথায় জালের দড়ি। সে খেলিতে
খেলিতে যাহাকে ধরিয়া আছাড় মারিয়া মাটিতে ফেলে,
কিছুক্ষণ তাহার উঠিয়া বসিবার ক্ষমতা আর থাকে না,
সমস্ত পৃথিবীটা যেন তাহার চোখের সামনে হলদে হইয়া
বোঁ বোঁ করিয়া ঘুরিতে থাকে। সে খেলার সাথীদিগকে
লইয়া জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরিয়া শজারু, খরগােস, বনবিড়াল
প্রভৃতি তাড়াইয়া ধরে ; বাটুলে পাখী মারে ; তারপর সেগুলি
কাঁধে ফেলিয়া অনায়াসে বাড়ী চলিয়া আসে।
আমাদের যেমন শুভ দিন দেখিয়া ছেলের লেখা-
পড়ার জন্য হাতে খড়ি দেওয়া হয়, ধৰ্ম্মকেতুও তেমনি একটা
শুভ দিন দেখিয়া কালকেতুর হাতে ধনুক দিয়া তাহাকে
তাহার শীকারের সাথী করিয়া লইল। ধৰ্ম্মকেতু বহু চেষ্টা
করিয়াও যে হরিণটা মারিতে পারে না, কালকেতু সেটাকে
তাড়া করিয়া লাঠির ঘায়েই মারিয়া লইয়া আইসে। পুত্রের
এই বীরত্ব দেখিয়া ধৰ্ম্মকেতু তাহার বিবাহ দিবার মনন
করিল।
একদিন কালকেতু বাপ মায়ের সহিত হাটে গিয়াছে।
মা নিদয়া মাংস বেচিতেছে, কালকেতু তাহার কাছে বসিয়া
[ ১১ ]

কালকেতু
আছে। তাহার পাশেই সঞ্জয়কেতু ব্যাধের স্ত্রী হীরাবতী
মাংস লইয়া বেচিতে বসিয়াছে, কাছে তাহার মেয়ে ফুল্লরা
বসিয়া আছে। হীরা অনেকক্ষণ কালকেতুর দিকে দেখিয়া
দেখিয়া ভাবিতে লাগিল, যদি এই ছেলেটীর সাথে ফুল্লরার
বিবাহ দিতে পারে, তবে সে বড়ই ভাল বরে পড়িবে ; এমন
ছেলে কি আর ব্যাধের ঘরে হঠাৎ মেলে ?
হাটে একদিন ধৰ্ম্মকেতু তাহার কুল-পুরােহিত সােমাই
পণ্ডিতকে ধরিয়া বসিল, “আপনি ত ঠাকুর ব্যাধ পাড়ার
সকলের বাড়ীতেই যাওয়া আসা করেন, আমার কালকেতুর
জন্য একটী ভাল কনে খুঁজিয়া আপনাকে দিতেই হইবে।
আমাদের সাতপুরুষের পুরােহিত আপনারা, আপনি যে সম্বন্ধ
ঠিক করিয়া দিবেন, আমাদের তাহাই পছন্দ হইবে।”
সােমাই পণ্ডিতের তখন মনে পড়িল, সঞ্জয়কেতু ব্যাধের
মেয়ে ফুল্লরার কথা। সে বলিল, “আছে, আছে, আমার
সন্ধানে একটী ভাল পাত্রী আছে ; কোনও চিন্তা নাই, আমি
সম্বন্ধ ঠিক করিয়া দিব।
ধৰ্ম্মকেতু সােমাই পণ্ডিতের উপর কালকেতুর সম্বন্ধের
ভার দিয়া নিশ্চিন্ত মনে বাড়ী ফিরিল।
পরদিন যাইয়া সােমাই পণ্ডিত সঞ্জয়কেতুর বাড়ী উপস্থিত
হইল। সঞ্জয় পরমভক্তি সহকারে নিজ হাতে তাহার পা
থােয়াইয়া বসিতে দিল। এমন সময় ফুল্লরা আসিয়া পুরাে-
[ ১২ ]

কালকেতু
হিতকে প্রণাম করিল। সঞ্জয় বলিল, “এই আমার মেয়ে
ফুল্লরা, ঠাকুরমশায়, বেশ বুদ্ধিমতী গুণবতী মেয়েটা আমার।
এ হাটে গিয়া বেশ কিনিতে বেচিতে পারে, রাধেও ভাল,
সংসারের কাজ প্রায় ফুল্লরাই করে, আত্মীয় স্বজন সকলেই
ইহার প্রশংসা করিয়া থাকে। এখন একটী ভাল ছেলে
পাইলেই বিবাহ দেই।”
সােমাই পণ্ডিত বলিল, “তােমার মেয়ে যেমন রূপে গুণে,
এর ঠিক উপযুক্ত বর ধৰ্ম্মকেতুর ছেলে কালকেতু। ছেলে
দেখিয়া তােমার অপছন্দ হইবে না,—দিব্বি ছেলে ! আর
গুণও অশেষ, বােজ বনে বনে ঘুরিয়া শীকার করে, লাঠীর
ঘায়ে পাগলা হাতী ও বাঘ মারিয়া ফেলে, অর্জুনের মত সে
ধনুক ছুড়িতে পারে, এক রত্তি তার আলস্য নাই। এমন বরে
তােমার মেয়ে পড়িলে ভাতে কাপড়ে সে কোনো কালেই কষ্ট
পাইবে না, আর তােমরাও সন্তুষ্ট হইবে যে,-হা, জামাইর মত
জামাই পাইয়াছ।”
ফুল্লরার মা হীরা ত সেদিন হাটেই কালকেতুকে দেখিয়া-
ছিল। আজ পুরােহিতের মুখে কালকেতুর গুণের কথা
শুনিয়া স্বামী স্ত্রী দুই জনেরই মত হইল, তাহার সহিতই
ফুল্লরার বিবাহ দিবে। সঞ্জয় ফুল্লরার সহিত পণ ও যৌতুকের
পরামর্শ করিয়া সােমাই পণ্ডিতকে বলিল, “আমরা পণ ও
যৌতুক বাবদ বানাে কাহণ কড়ি, পাঁচ গণ্ডা শুপারী ও তিন
[ ১৩ ]

কালকেতু
সের গুড় দিব,—বরের বাপের বােধ হয় ইহাতে আপত্তি
হইবে না। আর আপনার ঘটকালী বাবদ পাইবেন বারাে
পণ কড়ি।”
সােমাই পণ্ডিত যাইয়া ধৰ্ম্মকেতুকে সকল কথা বলিল।
ধৰ্ম্মকেতু অত দান যৌতুক ও মেয়ের রূপ গুণের কথা শুনিয়া
আনন্দে সম্মতি দিল। সে সােমাই পণ্ডিতকে সাথে করিয়া
সঞ্জয়কেতুর বাড়ী যাইয়া ক’নে দেখিয়া পত্র করিয়া আসিল।
রবিবার, এয়ােদশী তিথি, রেবতী নক্ষত্রে বিবাহের শুভ দিন
ঠিক হইল।
শুভ দিনে কালকেতু পাল্কী চড়িয়া বরযাত্রীদের সাথে
মনের আনন্দে বিবাহ করিতে চলিল। সঞ্জয় তাহার সাধ্যমত
বরযাত্রীদিগকে খাওয়াইয়া দাওয়াইয়া সন্তুষ্ট করিল।
লগ্নে বিবাহ হইয়া গেল। সঞ্জয় জামাইকে
সঞ্জয় জামাইকে যৌতুক বাবদ
একখানি খুব মজবুত ধনুক ও তিনটা খুব ধারাল বাণ দান
করিল। পাড়াপড়শী সকলেই জামাই দেখিয়া সঞ্জয়কেতুকে
ধন্য ধন্য করিতে লাগিল।
বাসি বিবাহ করিয়া
কালকেতু নূতন বউ লইয়া
বাড়ী ফিরিয়া আসিল। নিদয়া হাসিমুখে বউ বরণ করিয়া
ঘরে তুলিল। তাহার সুখের ঘর আরও সুখের হইল।
এখন আর নিদয়াকে সংসারের প্রায় কোনাে কাজে হাত
দিতে হয় না। ফুল্লরাই বুদ্ধি খাটাইয়া সাজাইয়া গুছাইয়া
[ ১৪ ]

কালকেতু
দিব্বি পরিপাটি করিয়া সকল কাজ সারিয়া ফেলে।
ধৰ্ম্মকেতুও আর বড় একটা শীকারের জন্য বনে বনে ঘুরিয়া
বেড়ায় না। কালকেতুই শীকার করিয়া আনিয়া সংসার চালায়।
তবে সঞ্চয় কিছুই হয় না, রােজ যাহা আসে তাহাই রােজ
খরচ হইয়া যায়। প্রাতে উঠিয়াই কালকেতু এক পেট পান্তা
ভাত খাইয়া তাহার শ্বশুরের দেওয়া সেই ধনুকখানা ও বাণ
তিনটা লইয়া বনে চলিয়া যায়, আর দুপুর বেলা হরিণ, শূকর,
খরগােস ও নানা পক্ষী মারিয়া লইয়া বাড়ী ফিরিয়া আসে।
নিদয়াকে এখন আর মাংস বেচিতে হাটে যাইতে হয় না
ফুল্লরাই মাংসের পসরা লইয়া হাটে গিয়া তাহা বেচিয়া চাউল,
ডাল, বড়, তেল, মুণ, শাক, বেগুণ, কলা, কচু, মাছ,যাহা
দরকার সব কিনিয়া বাড়ী চলিয়া আসে। বাড়ী আসিয়া
নিজেই রাঁধিয়া বাড়িয়া শ্বশুর শাশুড়ী ও স্বামীকে খাওয়াইয়া
নিজে খায়। এইরূপে কালকেতুর সংসার বেশ সুখে ও
আনন্দে কাটিতে লাগিল। ধৰ্ম্মকেতু ও নিদয়া পুত্র ও পুত্রবধূর
উপর সংসারের সমস্ত ভার দিয়া ধৰ্ম্মকর্মে মন দিল যখন
তাহারা দেখিল যে, ছেলে ও বউ বেশ গুছাইয়া সংসার করিতে
পারিতেছে, তখন তাহারা দুই জনেই পুণ্য সঞ্চয়ের জন্য গিয়া
কাশীবাসী হইল। কালকেতু ও ফুল্লরা কাঁদিয়া কাটিয়া
তাহাদিগকে বিদায় দিল।
এবার তােমাদিগকে কালকেতুর আহারের একটা
[ ১৫ ]

কালকেতু মােটামােটি তালিকা শুনাইব। তােমরা শুনিয়া বােধ হয় মনে করিবে, এটা কি রাক্ষস ! রাক্ষসেও বুঝি এত খায় না। কিন্তু কালকেতুর সবই অদ্ভুত। কালকেতু শীকারে বাহির হইয়া গেলে ফুল্লরা যত্ন করিয়া তাহার জন্য রাঁধিতে বসিত। শীকার করিয়া কালকেতু যখন দুপুরে বাড়ী ফিরিত, তখন দূর হইতে ফুল্লরা তাহার পায়ের শব্দ শুনিয়াই বুঝিতে পারি, ঐ তাহার স্বামী আসিতেছে। তখনই সে হরিণের চামড়া পাতিয়া নারি- কেলের মালা ভরিয়া জল দিয়া তাহার খাওয়ার যায়গা করিয়া দিত। কালকেতু তীর ধনুক রাখিয়া হাতে মুখে জল দিয়া খাইতে বসিয়া যাইত। ফুল্লরা মাটির ভাঙে সব জিনিষ পরিবেশন করিত। বীর কালকেতু তাহার সােয়া হাত লম্বা গোঁক জোড়া মুচড়াইয়া কঁাধে জড়াইয়া তালের মত গ্রাসে ভাত মুখে দিত। শােন একবার তােমরা, কালকেতু কি খাইত। তাহা হইলে তােমরা বুঝিতে পারিবে, সে কেমন বীরের মত বীর ছিল। সে প্রথমেই এক নিশ্বাসে তিন হাঁড়ি আমানি খাইত, তারপর চার হাঁড়ি ক্ষুদের জাই, তার সাথে লাউ মিশাইয়া ছয় হাঁড়ি দাল, দুই তিন ঝুড়ি বন-ওল পােড়া, দুইটা হরিণের মাংস, দশগণ্ডা নকুল পােড়া,কচুর ঘণ্ট ও অম্বল দুই হাঁড়ি ;—এত খাইয়াও বুঝি তাহার পেটে আরও একটু ক্ষুধা থাকিত, সে মাঝে মাঝে ফুল্লরাকে বলিত, “দিব্বি রান্না হইয়াছে আজ, আর কিছু আছে কি ?—ভাল কথা, হরিণের ১৬ ] কালকেতু মাংস দিয়া যে দধি আনিয়াছিলাম, একটু দাও দেখি।” ফুল্লরা তাহার পাতে আনিয়া এক হাঁড়ি দৈ ঢালিয়া দিত ; কালকেতু তাহা দিয়া আরও এক হাঁড়ি ভাত শেষ করিয়া উঠিয়া পড়িত। কালকেতুর অত্যাচারে বনের পশুরা অস্থির হইয়া পড়িল। তাহার হাতে কাহারও নিস্তার ছিল না, সে ভালুকই হউক, গণ্ডারই হউক, আর পাগলা হাতীই হউক, একবার কালকেতুর চোখে পড়িলেই হয়। সে শুড় ধরিয়া বড় বড় হাতীগুলাকে আছাড় মারিয়া তাহাদের দাত মােচড়াইয়া ভাঙ্গিয়া ভারে ভারে লইয়া আসে, ফুল্লরা সেই দাত বাজারে লইয়া গিয়া বিক্রি করে। কালকেতু চমরী হরিণ তাড়াইয়া তাহাদের লেজ কাটিয়া লইয়া ছাড়িয়া দেয়, ফুল্লরা সেই চামর বাড়ী বাড়ী ঘুরিয়া টাকায় চারিপণ দরে বিক্রি করে। কাল- কেতু বড় বড় মহিষ ধরিয়া তাহাদের শিং উপরাইয়া লয়, ফুল্লরা সেই শিং গােলাহাটে লইয়া যায়, লােকে শিঙা তৈরী করিবার জন্য তাই খুব সস্তা দরে কিনিয়া লয়। কালকেতু জাল পাতিয়া বাঘ ধরিয়া তাহার চামড়া ও নখ লইয়া আসে, [ ১৭ ] (২)

কালকেতু
সন্ন্যাসীরা সেই বাঘ ছাল ও বালকেরা বাঘ নখ কিনিয়া নেয়।
শশক, হরিণ, শূকর, সে অনায়াসে গণ্ডা গণ্ডা ধরিয়া লতা দিয়া
বাঁধিয় কঁাধে ফেলিয়া বাড়ী লইয়া গিয়া তাহার মাস হাটে
বিক্রি করে।
কালকেতুর এ অত্যাচারে বনের পশুরা প্রমাদ গণিয়।
দল বাঁধিয়া তাহাদের রাজা সিংহের কাছে যাই। উপস্থিত
হইল। বনের সমস্ত পশুদিগকে ঐ ভাবে দল বাধিয়া
আসিতে দেপিয়া সিংহ তাহাদিগকে রাজ্যের কুশল জিজ্ঞাসা
করিল। হস্তীরা তাহাদের ভাঙ্গা দাত সিংহকে দেখাইয়া
কাঁদিয়া বলিল, “মহারাজ, আপনার বনে বাস করিয়া এই
দেখুন আমাদের দুর্দশা, কালকেতু আমাদের দাঁত ভাঙ্গিয়া
লইয়া গিয়াছে মহারাজ, সেই ব্যথায় আমার সাত ভ ই মারা
গিয়াছে।” হরিণ আসিয়া সিংহের পায়ের কাছে গড়াইয়া
কাঁদিয়া বলিল, “কালকেতু আমার সর্বনাশ করিয়াছে
মহরিজ, বংশে বাতি দিতে আমার আর কেউ নাই।”
এইরূপে বনের ছােট বড় যত পশু ছিল, সকলেই সিংহের
কাছে আসিয়া তাহাদের সর্বনাশের কথা বলিল। তাহারা
বলিতে লাগিল, “আমরা আর আপনার রাজ্যে বাস করিব না,
অন্য রাজ্যে চলিয়া যাইব। কালকেতু মানুষ হইয়া একাকী
আপনার রাজ্য ছাড়েখারে দিতেছে, আর আপনি পশুরাজ
হইয়া আমাদের এই বিপদের কোনই প্রতীকার করিতেছেন
( ১৮ ]

কালকেতু
; কাজেই আমাদিগকে প্রাণের দায়ে অন্য বনে যাইয়া
আশ্রয় লইতে হইতেছে।”
পশুদের কথা শুনিয়া সিংহ বড়ই দুঃখিত হইল, আর
তাহার রাগ হইল বেশী সেনাপতি বাঘের উপর। সে বাঘকে
ডাকিয়া দাঁত কড়মড় করিয়া চোখ লাল করিয়া বলিতে
লাগিল, “সেনাপতি, তুমি আমার রাজ্যের কোথায় কি
হইতেছে তাহার কোনই খবর রাখ না, একটা মানুষ আসিয়া
আমার রাজ্যের এত প্রজা মারিতেছে, আর তুমি সেনাপতি
হইয়া কিছুই করিতে পারিতেছ না ! শােন সেনাপতি, কাল
তুমি আমাকে কালকেতুকে দেখাইয়া দিবে, যদি না পার
তােমার বুক চিড়িয়া রক্ত খাইব।”
বাঘ fংহের রাগ দেখিয়া সভয়ে উত্তর করিল, “যে
* জ্ঞাি মহারাজ, কাল সকালেই কালকেতুকে দেখাইয়া দিব।”
পর দিন তাের হইতে হইতেই বড় সেনাপতি, মধ্যম
সেনাপতি, ছোট সেনাপতি, সকলেই বনের এক এক দিকে
ছুটিল, কালকেতুকে খুঁজিয়া বাহির করিবার জন্য। সিংহও
বাহির হইয়াছিল, কিন্তু গণ্ডার «াহাকে বলিল, “মহারাজ,
সামান্য একজন মানুষের বিরুদ্ধে আর আপনাকে যাইতে
হইবে না, অমরাই একাজটা অনায়াসে করিয়া আসিতে
পারিব, কেবল আপনার আদেশ পাইলেই হয়।” গণ্ডারের
কথায় সিংহ খুব খুসী তাহাদিগকেই পাঠাইয়া দিয়া, সে সুগন্ধি
[ ১৯ ]

কালকেতু
চন্দন গাছের তলায় শয়ন করিল। চমরী হরিণের চারি
পাশে দাঁড়াইয়া চামর দুলাইয়া তাহাকে বাতাস করিতে
লাগিল।
ঠিক হইয়াছিল,
কালকেতু ভােরে উঠিয়া হাঁড়ি দুই তিন পান্তা ভাতে
কোনও রকমে জলযােগটা সারিয়া, সাজিয়া গুজিয়া বনে
চলিল ; সাজের ঘটা কত,—লাল কাপড় মাল কোচা করিয়া
পরিল, সারা গায়ে লাল মাটী মাখিল, ঝাকড়া বাড়া বাড়ি
চুলগুলি জালের দড়ি দিয়া শক্ত করিয়া বাঁধিল, তারপর
বিবাহের সময় সে যে ধনুকখানা যৌতুক পাইয়াছিল, তাহাতে
শণের ছিলা লাগাইয়া বাহির হইয়া পড়িল।
ওদিকে সেদিন বনের পশুরাও
কালকেতু
আসিলেই যে যেমন করিয়া পারে তাহার সহিত
যুদ্ধ
বাধাইয়া দিবে। বাঘ থাবা পাতিয়া ঠিক হইয়া বসিয়া রহিল।
যেমনি সে কালকেতুকে দেখিল, অমনি এক লাফে গিয়া
তাহার ধনুক কামড়াইয়া ধরিল। কালকেতু তাহার মাথায়
এমন এক থাবড়া মারিল যে, বাঘের মুখ দিয়া ঝলকে ঝলকে
রক্ত উঠিতে উঠিতে সে ঘুরিয়া পড়িয়া পঞ্চত্ব পাইল। বাঘের
মরণ দেখিয়া এক দল খুব জোয়ান জোয়ান হাতী ছুটিয়া গিয়া
[ ২০
]

কালকেতু
কালকেতুকে ঘিরিয়া ধরিয়া দাঁত দিয়া তাহাকে খোঁচাইতে
লাগিল। বীর কালকেতু একটু মুচকি হাসিয়া লােকে যেমন
কচু গাছ কাটে তেমনি করিয়া সমস্ত হাতীগুলার শুভ কাটিয়া
লইতে লাগিল। তারপর যাহারা আসিল, তাহাদেরও প্রায়
একই গতি হইল। ইহা দেখিয়া সিংহ কেশর ফুলাইয়া লেজ
খাড়া করিয়া মেঘের মত গর্জন করিতে করিতে আসিয়া
কালকেতুর সম্মুখে দাড়াইয়া বলিতে লাগিল, “সাবধান ব্যাধ,
এবার আমার হাতে তাের নিস্তার নাই।”
সিংহের তর্জন গর্জন শুনিয়া কালকেতু হাসিয়া বলিল,
“যাহা হউক, অনেক দিন সিংহ মারা হয় নাই, আজ একটা
পাওয়া গিয়াছে। অনেক দিন খুঁজিয়াছি, কিন্তু পাই নাই,
আজ আপনা আপনিই আসিয়া মরণের সম্মুখে দাঁড়াইয়াছ।”
এই বলিয়া মহাবীর সিংহকে এক ধনুকের ঘা মারিল, ঘা
খাইয়া সিংহ বেচারা ত আর পলাইতে পথ পায় না। কাল
কেতুর ইচ্ছা ছিল, সিংহটাকে মারিয়াই ফেলে; কিন্তু
ভগবতীর বাহন বলিয়া মারিল না, একটু শিক্ষা দিয়াই
ছাড়িয়া দিল।
পর দিন আবার কালকেতু বনে গেল। দূর হইতে
তাহাকে দেখিয়াই দূতেরা যাইয়া সিংহকে সংবাদ দিল। সিংহ
দলবল লইয়া আসিয়া কালকেতুর পথ রােধ করিয়া দাঁড়াইল।
কালকেতু ও সিংহের সাথে রীতিমত যুদ্ধ বাঁধিল। উভয়ের
[ ২১ ]

কালকেতু গজ্জনে মনে হইল, আকাশ বুঝি চৌচিড় হইয়া ফাটিয়া পড়ে, তাহাদের পায়ের ধূলিতে আকাশ ঢাকিয়া গেল। সিংহের নখের আঘাতে কালকেতুর সমস্ত গা ক্ষত বিক্ষত হইয়া দর দর করিয়া রক্ত পড়িতে লাগিল, কালকেতুর বাণের ঘায়ে সিংহেরও সমস্ত শরীর রক্তাক্ত হইয়া গেল, তবু যুদ্ধের বিরাম না, কেহই হঠিতে চায় না। কালকেতু সিংহের লেজ ধরিয়া ঘুরাইয়া মাটীতে তাহাকে কয়েকটা আছাড় মালি, সিংহের মুখ দিয়া ঝলকে ঝলকে রক্ত উঠিয়া মাটী ভিওিতে লাগিল। তবু সিংহের আক্কেল হইল না, সে উঠিয়া কাল- কেতুকে থাবা মারিতে লাগিল, শেষে কালকেতুর ধনুকের ঘায়ে অস্থির হইয়া আর টিকিতে না পারিয়া পলাইয়া প্রাণ বাঁচাইল । কালকেতুও সিংহের যুদ্ধের শব্দে ভালুক তার গর্তে লুকাইয়া ভয়ে কাঁপিতে লাগিল ; বাঘ মহাশয় আস্ফালন করিয়া লেজ তুলিয়া আসিয়াছিলেন সত্য, কালকেতু তাহার লেজ ধরিয়া পাক মারিয়া গাছ পালার উপর দিয়া হাজার হাত দূরে বনের ভিতর ফেলিয়া দিল। ত্রাসে সিংহের তৃষ্ণায় ছাতি ফাটিয়া যাইতে লাগিল, সে বনের ভিতর যাইয়া এক নিশ্বাসে যত পারিল জল খাইয়া একটু শান্ত হইল। সিংহ এবং বাঘের দুর্দশা দেখিয়া আর আর পশু যাহারা আসিয়াছিল, তাহারা রণে ভঙ্গ দিয়া যে যার প্রাণ লইয়া যেখানে পারিল পলাইল, কারণ তাহার পূর্বে অনেক বার এই বীরের হাতে পড়িয়া { ২২ ] ;

কালকেতু
ঠেকিয়া শিখিয়াছে ; তাহারা জানিত যে এই বীরের কাছে
তাহাদের কোনও বীরত্বই কুলাইবে না।
বনের ভিতর একটা তমাল গাছের নীচে ভগবতীর
মন্দির ছিল, মনের যত পশু সেখানে যাইয়া ধন্না দিয়া
পড়িল ।
তাহাদের কান্নায় স্বর্গে ভগবতীর আসন টলিল।
তিনি বিজুবনে পশুদিগের নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
পশুরা যে যেভাবে কালকেতুর হাতে নাকাল হইয়াছিল, তাহা
বলিয়া কাঁদিয়া বুক ভাসাইতে লাগিল। ভগবতী বলিলেন,
“কালকেতু একজন মানুষ হইয়া তােমাদের এতগুলি পশুকে
মারিয়া তাড়াইল, এ বড়ই আশ্চর্য্য কথা ।”
সিংহ বলিল, “কি আর দুঃখের কথা বলিব মা, বলিতে
লজ্জাও হয়, কালকেতু আমার সুমুখের দাঁত কয়টা এক কিল
মারিয়াই ভাঙ্গিয়া দিয়াছে। আর আমি রাজত্ব চাই না মা,
আপনার দাস হইয়া থাকিব শুধু এই চাই।
এক বাঘিনী আসিয়া বলিল, “আমার স্বামীকে কালকেতু
এক বাণ মারিয়া শেষ করিয়া ফেলিয়াছে, তারপর দুইটী পেটের
ছেলে লইয়া তাদের মুখ চাহিয়া কোনও রকমে দিন কাটিত,
তাহাদিগকেও কালকেতু মারিয়া ফেলিয়াছে। আর আমার
এ জীবন রাখিয়া লাভ কি মা ?”
বানর আসিয়া হাত জোর করিয়া বলিল, “আমি বড়
হতভাগ্য মা, আমার সমস্ত বাচ্চা কাচ্চাগুলি কালকেতু ধরিয়া
[ ২৩ ].

কালকেতু
লইয়া গিয়া মানুষের কাছে বেচিয়া ফেলিয়াছে। মানুষের
এখন তাহাদিগকে গলায় দড়ি বাঁধিয়া নাচাইয়া বেড়ায়।”
দেবী সিংহকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “সিংহ, তুমি পশুর
রাজা, তােমার নখের ঘায় পাষাণ চৌচিড় হইয়া যায়, তােমার
গর্জনে ত্রিভুবনের লােক ভয়ে কাঁপে। তুমি কি জন্য
কালকেতুকে ভয় কর ?”
সিংহ কঁদিতে কাদতে উত্তর করিল, “মা, হইলে হইবে
কি আমি পশুর রাজা ? সে যে যমেরও যম। তাহার
পরাক্রম দেখিয়াই যে আমি ভয়ে অস্থির, পলাইবারও পথ
পাই না।”
ভগবতী বাঘকে বলিলেন, “কি হে বাঘ, তুমি ত পশু-
জাতির মধ্যে ক্ষত্রিয়, তােমার নখে হীরার ধার, দাঁত তােমার
বজ্রের মত, তুমি কেন একটা মানুষকে দেখিয়া ভয়
পাও।”
বাঘ কহিল, “কি আর করিব মা? কাছে পাইলে
আমি ঘাড় ভাঙ্গিয়া রক্ত খাইতে পারি, কিন্তু কালকেতু
যে দূর হইতেই বাণ মারিয়াই আমাদের শেষ করিয়া
দেবী হস্তীকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােমার এত বড়
একটা শরীর, দাত দিয়া তুমি পাহাড় চিড়িয়া ফেলিতে পার,
রাগ হইলে তুমি একাই এক একটা প্রকাণ্ড গাছ ভাঙ্গিয়া
[ ২৪ ]

No text on this page.

।
Brojen
ভগবতী পশুদের দুঃখের কথা শুনিলেন
কালকে,
পৃঃ-২৫

কালকেতু
ফেল, আর আজ একটা মানুষের তুমি কিছু করিতে
পারিলে না ?”
হাতী বলিল, “কালকেতু বড় শক্ত মানুষ। সে এমন
করিয়া আমাদের পিঠে বাড়ি মারে যে, যন্ত্রণায় আমরা আর
পলাইতে পথ পাই না, সে আমাদিগকে দুই তিন যােজন পথ
তাড়াইয়া লইয়া গিয়া ধরিয়া আনিয়া ছাগলের দামে বিক্রি
করিয়া ফেলে। দুঃখের কথা আর কত কহিব মা ?”
ভগবতী এইরূপে একে একে সকল পশুর দুঃখের
কথাই শুনিলেন। শুনিয়া সিংহের গলায় একছড়া মালা
পরাইয়া দিয়া বলিলেন, “যাও সিংহ, তােমার কোনাে ভয়
নাই, আজ হইতে কালকেতু আর তােমাকে দেখিতে
পাইবে না।”
অন্যান্য পশুরা আসিয়া দেবীর পায়ে লুটাইয়া পড়িয়া
বলিল, “আমাদের কি দশা হইবে মা?”
ভগবতী তাহাদের গায়ে হাত বুলাইয়া বলিলেন, “যাও
তােমরা, কালকেতু তােমাদের কোনও অনিষ্ট করিতে
পারিবে না।” দেবীর হাতের স্পর্শে তাহাদের গায়ের ঘা ও
ব্যথা দূর হইল। তাহারা সকলে দেবীকে প্রণাম করিয়া
মহানন্দে প্রস্থান করিল।
[ ২৫ ]

কালকেতু
তােমরা অনেকেই গােসাপ দেখিয়াছ। এক রকম
গােসাপ আছে, তাহাদের গায়ের রং ঠিক সােণার মত, এই
জন্য তাহাদিগকে ভাল কথায় স্বর্ণগোধিকা বলে। পশুদিগকে
বর দিয়া মা ভগবতী স্বর্ণগােধিকার রূপ ধরিয়া কালকেতু যে
পথে রােজ বনে আসে সেই পথের ধারে পড়িয়া রহিলেন।
কালকেতু নিত্য নিত্য যেমন সাজ গােজ করিয়া বনে
যায়, আজও সে তেমনি করিয়া বনে চলি। যাইতে যাইতে
সে পথে নানা মঙ্গল চিহ্ন দেখিতে পাইল, যেমন জলভরা
কলসী, দধি লইয়া গােয়ালিনী, বাছুরের সহিত গাভী, ডান
দিকে ব্রাহ্মণ, সাপ, বাঁ দিকে শিয়াল ইত্যাদি,-যাত্রার সময়
এসব দেখিলে ফল খুব শুভ হয়। কালকেতুও এসব শুভ
চিহ্ন দেখিয়া মহাখুসী হইয়া চলিতে লাগিল। ভাবিল, আজ
বনে যাইয়া সে খুব শীকার পাইবে ।
যখন সে বনে গিয়া ঢুকিল, অমনি সেই স্বর্ণগােধিকা
তাহার চোখে পড়িল। তাহা দেখিয়া তাহার মনটা যেন
কেমন হইয়া গেল। সে ভাবিতে লাগিল, “এ পাপটা
আবার কোথা হইতে আসিল ? পথে আসিতে আসিতে যে
সব সুমঙ্গল দেখিয়াছিলাম, এ গােসাপটা দেখিতেছি তাহা সব
[ ৬ ]

কালকেতু
পণ্ড করিয়া দিল। শাস্ত্রে আছে, যাত্রা কালে গােসাপ,
কচ্ছপ, খরগােস, এই সব দেখিলে যাত্রা সফল হয় না। আজ
যদি ভাল শীকার মিলে তবে বুঝিব
তুমি দেবতা, আর যদি
শীকার না পাই তবে তােমাকে ধরিয়া নিয়া গিয়া অাগুনে
পােড়াইব।” ভাবিতে ভাবিতে সে বনে ঢুকিয়া জাল পাতিয়া
পশু তাড়াইয়া আনিবার জন্য সারা বন ঘুরিয়া বেড়াইতে
লাগিল; কিন্তু হায়, সারা বন খুঁজিয়া একটা খরগেস অবধি
তাহার চোখে পড়িল না। সে দেখিল, ঝােপের ভিতর
হরিণের পায়ের চিহ্ন আছে কিন্তু হরিণ নাই, জঙ্গলের ভিতর
শয়ার থাকিবার যায়গা খালি পড়িয়া রহিয়াছে, শূয়ার নাই,
গাছে পাখীর বাসা আছে, কিন্তু পাখী নাই। সারা বন সে
সে পাতি পাতি করিয়া খুজিয়া কিছুই পাইল না। দেবীর
বরে পশুরা সকলেই
অদৃশ্য
হইয়া রহিয়াছে।
এমন সময় দেবী মায়ামৃগের রূপ ধরিয়া কালকেতুর
সম্মুখে আসিয়া লাফাইয়া লাফাইয়া নাচিয়া বেড়াইতে
লাগিল।
এমন সুন্দর হরিণ দেখিয়া কালকেতু মনে মনে
ভাবিতে লাগিল, “এমন সুন্দর হরিণ! অতসী ফুলের মত
গায়ের রঙ, শিং দুইটী সােণার, পায়ে রূপার খুর.ঝক ঝক্‌
করিতেছে, নাকে গজমতি দুলিতেছে, গলায় হীরার গাঁথুনি,
সােনার হার, সমস্ত গায়ে মণি মুক্তা! আমি এতকাল বনে
বনে এত হরিণ শীকার করিলাম, এত রকম রকমের হরিণ
[ ২৭ ]

কালকেতু দেখিলাম, কিন্তু এমন অদ্ভুত হরিণ ত কোথাও দেখি নাই । এটা বােধ হয় কাহারাে পােষা হরিণ, তাই এমন করিয়া ইহাকে সাজাইয়া দিয়াছে। আজ আমার কপাল ভালই, তাই ইহার দেখা পাইলাম, এই জন্যই পথে এত মঙ্গল চিহ্ন দেখিয়াছি। এই হরিণ মরিতে পারিলে আমার সমস্ত কষ্টের শেষ হইবে, মণিমুক্তা টের পাইব ফুল্লরাকে এই সুন্দর ছাল- খানা পরিতে দিব, তাহা হইলে বেশ মানাইবে তাহাকে। হরিণ যখন সম্মুখে পড়িয়াছে তখন আর পলাইবে কতদূর?” ভাবিতে ভাবিতে কালকেতু গোঁফে চাড়া দিয়া শক্ত করিয়া ধনুকে ছিলা লাগাইয়া বাণ জুড়িল, কিন্তু বাণ ছাড়িতে ছাড়িতেই হরিণ কোথায় অদৃশ্য হইয়া গেল। কালকেতু বড়ই মনকষ্টে ধনুকের ছিলা খুলিয়া গাছের তলায় বসিয়া পড়িল। তখন তাহার পেটে ক্ষুধা আগুনের মত দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। সে কংস নদীর জলে স্নান করিয়া পেটের ক্ষুধায় আঁজলা আঁজলা করিয়া জল খাইল, তারপর বনে বনে ঘুরিতে ঘুরিতে ফল খাইয়া মলিন মুখে ভাবিতে ভাবিতে বাড়ীর দিকে চলিল। “হায়, আজ যাইয়া আমি ফুল্লরাকে কি বলিব ? সে হয়ত আমার আশাতেই বসিয়া আছে, আমি মাংস লইয়া বাড়ী ফিরিব তবে সে রাঁধিবে। কিন্তু আমি ত আজ খালি হাতে বাড়ী ফিরিলাম। শ্বশুরবাড়ী হইতে সেদিন দুই আড়া ধান ধার করিয়া আনিয়াছি, তাহা [ ২৮ ]

কালকেতু
শােধ হয় নাই, মুদীর দোকানে তেল ও মুণের ছয় বুড়ি কড়ি
ধার রহিয়াছে, তাহা দেওয়া হয় নাই। আজ আবার কে
আমাকে ধার দিবে ? আজ ত দিন চলিবারই উপায় দেখি না।
হায়, কেন সংসারে জন্ম লইয়াছিলাম ? সংসারে কত লােক
কত সুখে আছে, কিন্তু আমি কেবল দুঃখ ভােগ করিবার
জন্যই সংসারে আসিয়াছি।”—কালকেতু ভাবিতে ভাবিতে
যাইতেছে, এমন সময় আবার সেই স্বর্ণগােধিকা দেখিতে
পাইল। তাহাকে দেখিয়া বীরের শরীর রাগে জ্বলিয়া উঠিল,
সে রাগে গজ্জন করিতে করিতে বলিতে লাগিল, “আজ
তােকেই আমি পােড়াইয়া খাইব। বনে ঢুকিয়া প্রথমে তােকে
দেখিয়াই আজ আমার এই ফল হইল। সারা বন ঘুরিয়া
বেড়াইলাম, একটা শীকারও মিলিল না।
কেবল কষ্টেরই
একশেষ হইল। আজ নকুলের বদলে তােকে পােড়াইয়া
খাইয়াই পেটের জ্বালা জুড়াইব।” এই বলিয়া কালকেতু
এক লাফে যাইয়া স্বর্ণগােধিকাটা ধরিয়া ধনুকের সাথে শক্ত
করিয়া বাঁধিয়া পিঠে ঝুলাইয়া লইল।
বাড়ী আসিয়া কালকেতু দেখিল,—ফুল্লরা বাড়ী নাই।
প্রতিবাসীদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিল, সে মাংস বেচিতে
হাটে গিয়াছে। ধনুকসহ সেই গােসাপটাকে ঘরের মেজয়
ফেলিয়া রাখিয়া কালকেতু বাজারের দিকে চলিল। দূর
হইতে ফুল্লরা শুধু হাতে কালকেতুকে আসিতে দেখিয়া ভারী
[ ২৯ ]

কালকেতু
রাগ হইয়া মনে মনে বলিতে লাগিল, “হায়, নিতান্ত পােড়া-
কপালী আমি, তা না হলে মন স্বামীর হাতে বাবা আমাকে
দিলেন কেন ? পেট ভরিয়া ভাত খাই না, একখানা ভাল
কাপড় পদিতে পাই না,—কেবল সারাদিন হাড় ভাঙ্গা খাটুনি,
পােড়ারমুখাে ঘটক সোমাই পণ্ডিতই যত দুঃখের বােঝা
আমার ঘাড়ে চাপাইল।
কালকেতু ফুল্লরার কাছে য'ইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “আজ
কত বেচিলে ফুল?”
ফুল্লরা রাগে নথ নাড়া দিয়া বলিল, “বেচেছি আমার
মাথা আর মুণ্ডু, ৰাসী মাংস কেউ নিতে চায় কি না ?”
কালকেতু বলিল, “তুমি বাড়ী যাও ফুল্লরা, আমি মাংস
বেচি। বাড়ী গিয়া তোমার স বিমলার মার কাছে কিছু
ক্ষুদ ধার লইয়া বেশ ভাল করিয়া জাউ রাধিও, আর শােন,
দুই তিন হাঁড়ি বন পুই শাক চচ্চড়ী করিও, পেটটা ত কোনও
রকমে ঠাণ্ডা করা চাই। -- আর ঘরে একটা গােসাপ বাধিয়া
রাখিয়া আসিয়াছি, সেটাকে ছাল ফেলিয়া শিক পােড়া করিয়া
রাখিও।—ণ বুঝি ঘরে নাই? একটু মুণও ধার করিয়া নিও।”
ফুল্লরা সেখান হইতে যাইয়া তাহার সইএর বাই।
উপস্থিত হইল। সই ফুল্লরাকে দেখিয়া বড়ই সন্তুষ্ট হইয়া
বসিতে পিঁড়ি দিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ভাল ছিলে সই, এত দিন
দেখি নাই কেন? বাপের বাড়ী গিয়াছিলে বুঝি ?”
[ ৩০ ]

কালকেতু
ফুল্লরা একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “ভগবান
গরীবের হাতে ফেলিয়াছে ভাই, অষ্ট প্রহর উদরের চিন্তাই
করিতে হয়।
কাহারও সাথে দু’দণ্ড আসিয়া কথা বলিবার
কি উপায় আছে ?”
বিমলার মা তেল দিয়া ফুল্লরার চুল আচড়াইয়া বাঁধিয়া
সিঁথিতে সিঁদূর দিয়া কিছু খই মুড়ি খাইতে দিল ! ফুল্লরা তাহা
খাইয়া এক ঘটী জল খাইল
সই এর মাথার দুই
একটা উকুন বাছিরা দিতে দিতে এ-কথায় সে-কথায় ফুল্লরা
দুই কাঠা চাউল ধার চাহিল। বিমলার মা বলিল, “আজ ত
চাল বাড়ন্ত সই, কালা দিব।” ফুল্লরা অগত্যা কিছু কাল
গল্পে সল্পে কাটাইয়া কিছু ক্ষুদ লয়া বাড়ী ফিরি।
৮
এদিকে ভগবতী স্বর্ণগােধিকা মূৰ্ত্তি পরিত্যাগ করিয়া
ষােল বছরের একটি সুন্দরী স্ত্রীলােকের মূৰ্ত্তি ধরিলেন।
তাহার মেঘ-বরণ চুল, ভাসা ভাসা টানা টানা চোখ, বাঁশীর
মত নাক, লাল টুকটুকে ঠোট, দুধে আলতা গায়ের রঙ,
সারে গায়ে হীরা মুক্তা জহরতের গহনা, পরণে পাটের শাড়ী,
আলতা মাখা পা দুখানি, দেবীর সমস্ত গা হইতে যেন
[ ৩১ ]

কালকেতু চাঁদের জ্যোৎস্না ও ফুলের গন্ধ ছুটিয়া ব্যাধের ছােট্ট কুড়ে ঘরখানি আমােদিত করিয়া ফেলিল। ফুল্লরা সখীর বাড়ী হইতে বাড়ী আসিয়া দেখে তাহাদের ঘরের দুয়ারে যেন এক স্বর্গের দেবী দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন। সে অবাক হইয়া তাঁহাকে প্রণাম করিরা জিজ্ঞাসা করিল, “আপনি কে মা, কার বউ, কি জাত ?” ফুল্লরার কথা শুনিয়া দেবী একটু হাসিয়া বলিতে লাগিলেন, “আমি বামুণের মেয়ে, ইলাবৃতে আমার বাড়ী। আমি ঘােষাল বংশের মেয়ে, বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের বউ। ছােট বেলা হইতেই আমি একাকিনী এমন করিয়া ঘুরিয়া বেড়াই। আমার ঘরে সাতজন সতীন আছে, তাহাদের জ্বালায় আমি আর ঘরে থাকিতে পারি না। তুমি যদি দয়া করিয়া তােমার এখানে আমাকে একটু স্থান দাও, তবে কিছু দিন এখানে থাকি।” এই কথা শুনিয়া ফুল্লরার মাথায় যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। তাহার ক্ষুধা তৃষ্ণা দূর হইল, রান্নার কথা ভুলিয়া গেল। সে বলিতে লাগিল, “তুমি এই কচি বয়সে ভদ্র- লােকের বউ হইয়া এমন একেলা ঘুরিয়া বেড়াও, একটুও কি তােমার ভয় নাই ? কেন তুমি এমন করিয়া বেড়াও? তুমি কি স্বামীর উপর রাগ করিয়া চলিয়া আসিয়াছ, মা শাশুড়ী ননদ বকিয়া ঝকিয়া তােমাকে তাড়াইয়া দিয়াছে ? [ ৩২ ]

কালকেতু
চল, তােমাদের বাড়ী যাইয়া তাহাদিগকে বুঝাইয়া সুঝাইয়া
আসি, আর যেন এমন কচি বউ এর উপর তাহারা এমন
করে।”
দেবী একটু হাসিয়া বলিলেন, “আর কি জিজ্ঞাসা কর?
বীরের দুঃখ সহ্য করিতে না পারিয়া তােমাদের ঘরে
আসিলাম। আমার টাকা পয়সা দিয়া তােমাদের দুঃখ দূর
করিব।আমার দুঃখের কথা আর কি বলিব ? একে ত
ঘরে সতিনের জ্বালা, তার উপর আবার স্বামীর গঞ্জনা, স্বামী
বিষভরা পাঁচ মুখে আমায় গাল দেয়। সেই গঞ্জনা সহ্য
করিতে না পারিয়া এখানে আসিলাম। আমার জন্য
তােমাদের ভাবিতে হইবে না, বরং তােমাদের যত খরচ লাগিবে
আমি সব দিব, আমাকে পর মনে করিও না।”
ফুল্লরা বলিল, “তােমাকে ভাল কথা বলি, আমার কথা
শােন। আবার বাড়ী ফিরিয়া যাও, স্বামীর ঘর ছাড়িয়া
আসিয়া ভাল কর নাই। পরিণামে এ পাপের জন্য বড়
কষ্ট পাইবে। স্বামীর বড় স্ত্রীলােকের আর অন্য কোনাে
দেবতা নাই। সীতা, সাবিত্রী, এরা স্বামীর জন্য কত কষ্ট
সহিয়াছেন, আর তুমি এমন বােকা মেয়ে যে সেই স্বামীকে
ছাড়িয়া আসিয়া একা বাড়ী বাড়ী ঘুরিয়া বেড়াও।”
দেবী বলিলেন, “আমি কুলের বউ, আমার নিজের ভাল
আমি নিজে তােমার চেয়ে ঢের ভাল বুঝি। আমায় আর
[ ৩৩ ]
(৩)

কালকেতু তােমাকে উপদেশ দিতে হইবে না। আমি নিজে ইচ্ছা করিয়া তােমার ঘরে আসি নাই; বনে বসিয়াছিলাম, তােমার স্বামী আমাকে ধরিয়া লইয়া আসিয়াছে ; সত্য মিথ্যা তাহাকে যাইয়া জিজ্ঞাসা কর। তুমি আমাকে যাহাই কেন বল না, আমি বীরকে ছাড়িয়া যাইব না। তুমি আমি মিলিয়া মিশিয়া দুই বােনের মত থাকিব, এজন্য আর রাগ কর কেন?” ফুল্লরা দেখিল, এ মেয়ে বড় শক্ত মেয়ে, এ কিছুতেই যাইবে না। তাহার মনে সন্দেহ হইল, স্বামী বােধ হয় ইহাকে সুন্দরী দেখিয়া বিবাহ করিবার জন্য লইয়া আসিয়াছে। তাহা হইলেই ত বড় মুস্কিল, সতিনের জ্বালা যে বড় জ্বালা। একেত তাহাদেরই দিন চলে না, তার উপর আবার আর এক জন ! ভাবিল, “যদি আমাদের সংসারের দুঃখের কথা জানিতে পারে, তবে বােধ হয় আর এখানে থাকিতে চাহিবে ।” এই ভাবিয়া ফুল্লরা তাহার বারমাসের দুঃখের কথা বলিতে লাগিল,-“আমাদের এই ভাঙ্গা কুড়েখানির তাল- পাতার ছাউনী, ভেরেণ্ডার খুট, বৈশাখের ঝড়ে ইহা নিত্যই তখন এমন বােদ হয় যে হাটে যাইতে রােদে পুড়িয়া ছাই হইয়া যাই, ছেড়া কাপড়ের আঁচলটুকু মাথায় দিয়া যে রােদের হাত হইতে নিস্তার পাইব, তাহারও উপায় নাই, এত ছােট একটু ন্যাকড়া পরিয়া থাকিতে হয় ; বৈশাখ মাসে সকল লােকই নিরামিষ খায়, কাজেই মাংস আর বিক্রি [ ৩৪ ] ভাঙ্গিয়া পড়ে ; ;

কালকেতু
হয় না। জ্যৈষ্ঠ মাসে এমন গরম পড়ে যে, পথে যাইতে
যাইতে তৃষ্ণায় তালু শুকাইয়া যায়, কিন্তু মাংসের ঝাঁকা
রাখিয়া একটু জল খাইতে যাইতে পারি না, গেলেই চিল ছোঁ
মাড়িয়া একেবারেই আধ সের তুলিয়া লয়। এমন সর্বনেশে
মাস যে, বৈচের ফল খাইয়া কাটাইতে হয়। আষাঢ়ে
নূতন জলে পথ ঘাট ভাসিয়া যায়, লােকের ঘরেও বড় বেশী
কিছু সম্বল থাকে না, মাংসের ঝাকা লইয়া জলে জলে পাঁকে
পাঁকে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরিয়া বেড়াই, যা ক্ষুদ কুড়া মিলে, তা
কোন রকমে আধপেটা খাইয়া থাকি। শ্রাবণ মাসে দিন রাত
বৃষ্টি পড়ে, সেই বৃষ্টির ধারা মাথায় লইয়া খালি মাথায় মাংস
বেচিতে যাই, সমস্ত গা বাহিয়া মাংসের জল পড়ে, জোঁকে
খাইয়া গা রক্তাক্ত করিয়া দেয়; কিন্তু এমন পােড়াকপাল
যে সাপে খায় না ! ভাদ্র মাসে কাহারও ঘরে-ভাত থাকে না,
গরীবের কষ্টই সকলের চেয়ে বেশী, এই কিরাত-নগরে কেহই
এক মুষ্টি চাউল দিয়াও জিজ্ঞাসা করে না। আশ্বিন মাসে
সকলে নূতন কাপড় নূতন পােক নূতন গহনা পরিয়া আমােদ
আহলাদ করে, আর আমি হতভাগিনী ফুল্লরা উদরের চিন্তা
করি। এই মাসে সকলের ঘরেই দেবীর প্রসাদ থাকে, কাজেই
কেহ আর মাংস কিনিয়া খায় না। কার্তিক মাসে প্রথম শীত
পড়িতে আরম্ভ করে, তখন সকলেই কাপড় গায়ে দিয়া শীত
কাটায়, কিন্তু আমার সম্বল মাত্র হরিণের ছাল । অগ্রহায়ণ
[ ৩৫ )

কালকেতু
মাসে যদিও পেট ভরিয়া খাইতে পাই, তবুও হাঁটুর ভিতর
মাথা গুজিয়া বা আগুন পােহাইয়া বা রােদে বসিয়া শীত
কাটাইতে হয়। পৌষ মাসে পৃথিবীর লােক মােটা কাপড়
ও পশমের গরম কাপড় গায়ে দেয়, আর আমি মাংসের
বদলে যে একখানা ছেড়া কম্বল পাইয়াছিলাম, কোনও রকমে
তাহা গায়ে দিয়া পড়িয়া থাকি,—তাহা গায়ে দিতে সারা
গায়ে ধূলা পড়ে, চোখে ধূলা পড়িবার ভয়ে চোখ অবধি
মেলিত পারি না। মাঘ মাসে কোয়াশায় বন জঙ্গল সব ঢাকিয়া
ফেলে, ব্যাধেরা আর হরিণ খুঁজিয়া পায় না, আর মাঘ মাসে
বেশীর ভাগ লােকই নিরামিষ খায়, সেজন্য মাংসও বিক্রি
হয় না, বনে যাইয়া শাকও তুলিতে পারি না, কারণ মাঘ মাসে
শাক ভােলা দোষ। ফাল্গুন মাসে সকলেরই মন একটা
আনন্দের ভাবে মাতােয়ারা হইয়া ওঠে, কিন্তু আমি হতভাগিনী
পেটের জ্বালায় মরি! তুমি কি সুখে ব্যাধের বউ হইতে চাও?
চৈত্র মাসে যেন পৃথিবী আগুনের মত পুড়িয়া যায়; পেটের
দায়ে মাটীর থালা ঘটি বাটি বাঁধা দিয়া চাউল ধার করিয়া
আনিতে হয়, এ মাসে প্রায়ই আমানি খাইয়া কাটাই।”—
ফুল্লরার এত কথার অর্থ এই যে, সে বারমাসের মধ্যে এক
দিনও সুখে থাকে না।
দেবী ফুল্লরার মনের ভাব বুঝিতে পারিয়া হাসিয়া
বলিলেন, “তােমার কোনও চিন্তা নাই, ফুল্লরা! আমার
[ ৩৬
৩৬ ]

;
কালকেতু
যা ধনদৌলত আছে তার অর্ধেক তােমার ; আমাকে যদি
থাকিতে দাও, তবে খাওয়া পরার আর কোনই কষ্ট
থাকিবে না।”
দেবী তবু যাইতে চাহেন না দেখিয়া ফুল্লরা রাগে ও
অভিমানে এবং হিংসায় একেবারে কাঁদিয়া ফেলিল।
স্বামীর উপর তাহার বড়ই রাগ হইল,—সে-ই ত বন হইতে
এই আপদটাকে লইয়া আসিয়াছে। তখন সে কাঁদিতে
কাঁদিতে কালকেতুর কাছে হাটে চলিল,—আজ আচ্ছা
করিয়া তাহাকে কয়েকটা শক্ত কথা শুনাইয়া দিতে হইবে।
ফুল্লরাকে ঐ ভাবে হাটে উপস্থিত হইতে দেখিয়া
কালকেতু আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিল,-“একি! কি,
হইয়াছে তােমার ফুল্লরা ? ঘরে শাশুড়ী, ননদ, বা সতীন নাই,
তুমি একেলা ঘরের এক জন, কাহার সাথে ঝগড়া করিয়া
এমন কাঁদিয়া কাটিয়া অস্থির হইয়াছ ?”
ফুল্লরা ফুলিয়া ফুলিয়া দিতে দিতে বলিল, “ঝগড়া
করিবার আমার কেউ ছিল না, কিন্তু তুমি যে এক আপদ
জুটাইয়া লইয়া আসিয়াছ। ব্যাধ হইয়া তােমার এমন সাধ ?
কোন্ এক বামুনের ঘরের মেয়েকে বাড়ী লইয়া আসিয়াছ।
[ ৩৭ ]

;
কালকেতু
তুমি কি জান না যে এটা কলিঙ্গ রাজার দেশ; রাজার কাণে
এ কথা গেলে আমাদের আর নিস্তার নাই ? যেই পাপে
রাবণবংশ ধ্বংশ হইল, তুমিও সেই পাপে মন দিয়াছ?”
ফুল্লরার কথা শুনিয়া কালকেতু যেন আকাশ হইতে
পড়িল, রাগে তাহার শরীর জ্বলিয়া উঠিল।
সে চোখ লাল
করিয়া ফুল্লরাকে বলিতে লাগিল, “একি বল তুমি ফুল্লরা ?
সত্য কথা বল, না হইলে এই দা দিয়া মাথা কাটিয়া ফেলিব
তােমার।”
ফুল্লরা বলিল, “তুমি স্বামী, তােমার কাছে কিছুই আমি
মিথ্যা বলি নাই ; বাড়ী চল, দেখিবে বাড়ীতে যেন আকাশের
চঁদ নামিয়া আসিয়াছে,-এমনি মেয়েটার রূপ !”
কালকেতু দোকান পাট তুলিয়া ফুল্লরার সাথে বাড়ী
চলিল। দূর হইতেই সে দেখিল, তাহার বাড়ীখানি যেন
শত চাদের স্কুলােয় ঝলমল করিতেছে । ঘরের দাওয়ায়
যে মেয়েটা বসিয়া আছে, তাহার রূপের ঝলকে আকাশ
অবধি আলো হইয়া গিয়াছে। এমন দেবী মূৰ্ত্তি সে জীবনে
কখনাে দেখে নাই।
বাড়ী পৌছিয়া কালকেতু দেবীর সম্মুখে গড় হইয়া
প্রণাম করিয়া বলিতে লাগিল, “বলুন মা আপনি কে?
আপনি নিশ্চয়ই দেবতা বা ব্রাহ্মণের মেয়ে, এই ব্যাধের বাড়ী
কি জন্য আসিয়াছেন ? দেখিতেছেন, চারি দিকে হাড়ের
[ ৩৮ ]

কালকেতু
গাদা, পচা মাংসের গন্ধ, এই শ্মশানের মতন যায়গায় আপনি
কেন? যদি পথ ভুলিয়া আসিয়া থাকেন তবে চলুন, ফুল্লরার
সাথে গিয়া আমি আপনাকে বাড়ী রাখিয়া আসি।”
দেবী কোনও উত্তর দিলেন না। যেমন বসিয়াছিলেন
তেমনি বসিয়া হাসিতে লাগিলেন। কালকেতু আবার
বলিল, “মা, দিন থাকিতে থাকিতে আপনাকে রাখিয়া আসি।
তীর ধনুক লইয়া যাইব, পথে আপনার কোনো ভয় নাই।
এখানে থাকিলে লােকে আপনার নিন্দা করিবে, আত্মীয়
স্বজন রাগ করিবেন।
ভগবতী তবু কোনাে উত্তর দিলেন না।
কালকেতু
একটু রাগ হইয়া বলিল, “তুমি যে-ই হও না কেন মা, এক্ষুনি
আমার বাড়ী ছাড়িয়া চলিয়া যাও। তুমি বড় ঘরের বউ, বড়
ঘরের মেয়ে, গায়ে তােমার এত জহরত মণি মুক্তার অলঙ্কার,
সঙ্গে পুরুষ মানুষ কেহ নাই, ব্যাধের বাড়ীতে তুমি কোন
সাহসে থাকিতে চাও? তােমার পায়ে ধরিয়া বলিতেছি মা,
তুমি আমার বাড়ী ছাড়িয়া চলিয়া যাও।”
তথাপি দেবী কোনও উত্তর করিলেন না বা উঠিতে
চাহিলেন না দেখিয়া কালকেতুর বড়ই রাগ হইল; সে তাহাকে
ভয় দেখাইবার জন্য ধনুকে বাণ জুড়িল, কিন্তু তাহার হাত
অসাড় হইয়া আসিতে লাগিল। সমস্ত গা থর থর করিয়া
কপিতে লাগিল, মুখে কথা বলিবার শক্তি পর্যন্ত রহিল না।
;
[ ৩৯ ]

কালকেতু
কালকেতুর এই ভাব দেখিয়া দেবী বলিলেন, “বাছা
কালকেতু, আমি ভগবতী, তােমাকে বর দিতে আসিয়াছি।
ধনুকবাণ ছাড়িয়া বর লও। এই আমার মাণিকের অঙ্গুরী
তােমাকে দিলাম, এই এক মাণিক সাত রাজার ধন। তুমি
এই আংট বেচিয়া গুজরাটের বন কাটাইয়া রাজ্য বসাও।
সে রাজ্যের তুমি রাজা হইবে, প্রজাদিগকে নিজের ছেলের
মত পালন করিবে, আর প্রতি মঙ্গলবারে আমার পূজা
করিও।”
কালকেতু হাত জোড় করিয়া নিবেদন করিল, “মা,
আমি অতি হীন জাতি ব্যাধ, মাংস বেচিয়া খাই, আমার ঘরে
আপনি কেন আসিলেন ? আপনার কথা আমার বিশ্বাস
হয় না,-হঁা, তবে যদি দেবী ভগবতীর মূৰ্ত্তি আপনি আমায়
দেখাইতে পারেন, তবে আপনাকে বিশ্বাস করি।”
দেবী একটু হাসিয়া দশভূজা মূর্তি ধরিলেন,—তাহার
দশ হাতে দশ অস্ত্র, ডান পা সিংহের পিঠের উপর, বাঁ পা
অসুরের ঘাড়ে, মাথার মুকুটে যেন শত সূৰ্য্য ধ ধক, করিয়া
জুলিতেছে। তাহার হাতের শূলে অসুরের বুক চিড়িয়া
তীরের বেগে রক্ত ছুটিতেছে। বাম ভাগে কার্তিক ও
স্বরস্বতী, দক্ষিণদিকে গণেশ ও লক্ষী। মায়ের সেই রূপ
দেখিয়া কালকেতু ও ফুল্লরা দুই জনেই অজ্ঞান হইয়া
মাটীতে পড়িয়া গেল। ভগবতী তাহাদিগকে মুচ্ছিত দেখিয়া
[ ৪ ]

No text on this page.

s
ভগবতী কালকেতুকে মাণিকের আংটি দিতে চাহিলেন
কালকেতু ]
[ পৃঃ-৪১

কালকেতু
চৈতন্য লাভের জন্য আশীর্বাদ করিলেন।
তাহারা উঠিয়া
বসিল, তখনাে ভয়ে তাহাদের শরীর থর থর করিয়া কাঁপিতে
ছিল, কালকেতু হাত জোড় করিয়া বলিল, “আগে যেমন
ছিলেন তেমনি হউন না, আপনার এ মূর্তি দেখিয়া আমাদের
বড় ভয় করে।”
বীরের কথায় দেবী আবার সেই সুন্দর রূপ ধরিলেন।
কালকেতু তাহাকে গড় হইয়া প্রণাম করিল। ফুল্লরা
আনন্দে উলু দিল। ভগবতী কালকেতুকে সেই মাণিকের
আংটি দিতে চাহিলেন, কিন্তু ফুল্লরা তাহাকে তাহা লইতে
নিষেধ করিয়া বলিল, “এই একটা আংটি লইয়া আমাদের কি
হইবে ? ইহাতে ত আর আমাদের কপাল ফিরিবে না, উহা না
লওয়াই ভাল।”
ভগবতী বলিলেন, “এই একটা আংটি কিন্তু সামান্য
জিনিষ নয়, এটার দাম সাত কোটী টাকা।” এই কথা শুনিয়া
ফুল্লরা তাহার ঠোঁট উল্টাইয়া হাসিয়াই উড়াইয়া দিল। ভগবতী
তাহার মনের ভাব বুঝিয়া
বলিলেন,
“কালকেতু, আমি
তােমাকে আরও কিছু ধন দিব, ঝুড়ি, কোদাল ও খন্তা লইয়া
আমার সাথে চল।”
[ ৪১ ]
।

কালকেতু ভগবতী কালকেতু ও ফুল্লরাকে লইয়া এক বনের ভিতর একটা ডালিম গাছের নীচে উপস্থিত হইয়া বলিলেন, “কাল- কেতু, এই যায়গায় মাটীর নীচে সাত ঘড়া ধন আছে, মাটী খুড়িয়া তােল।” কালকেতু মহানন্দে মাটী খুড়িতে লাগিল, খুঁড়িতে খুঁড়িতে সাতটা বড় বড় কলসী দেখিতে পাইল। তাহা দেখিয়া কালকেতুর প্রাণে আনন্দের জোয়ার ছুটিল। কালকেতু কলসী কয়টা উপরে তুলিয়া, দেবীকে সেইখানে কলসীর পাহারায় রাখিয়া ভারে করিয়া দুইটা কলসী লইয়া বাড়ী চলিল, ফুল্লরা পেছনে পেছনে গেল। বাড়ীতে ফুল্লরাকে টাকার কলসীর কাছে রাখিয়া বীর যাইয়া আরও দুইটা কলসী লইয়া আসিল। এখন রহিল বাকি তিন কলসী, কালকেতু কলসী দুইটা ভারের এক দিকে বাঁধিয়া লইয়া দেবীকে বলিল, “মা, দেখিয়া শুনিয়া আর এক কলসী দিন, তাহা না হইলে ভারের এক দিকে দুই কলসী আর এক দিকে এক কলসী লইয়া যাইতে বড়ই কষ্ট হইবে। আর যদি না-ই দিতে পারেন, তবে দয়া করিয়া এই কলসীটা আপনিই কাখে করিয়া লইয়া-চলুন।” দেবী আর কি করেন, অগত্যা কসীটা কাখে তুলিয়া লইলেন। কালকেতু তাহার ভারে বাঁধা কলসী দুইটা খুলিয়া দুইদিকে দুইটা বাঁধিয়া লইয়া আগে আগে চলিতে লাগিল। ভগবতী পেছনে পেছনে চলিলেন। কালকেতু কয়েক পা । ৪২ ]

কালকেতু
যায় আর পেছনে ফিরিয়া দেখে,-পাছে ভগবতী কলসীটা
লইয়া পলাইয়া যান! দেবী তাহার মনের ভাব বুঝিতে
পারিয়া হাসিয়া বলিলেন, “ভয় নাই কালকেতু, আমি তােমার
টাকা লইয়া পলাইব না। তুমি নিশ্চিন্ত হইয়া হাটিয়া চল।”
বাড়ী যাইয়া কালকেতু সেই সাত ঘড়া ধন মাটীতে
পুতিয়া রাখিল। ভগবতী বলিলেন, “ইহা হইতে কিছু টাকা
দিয়া গুজরাট সহরে আমার মন্দির তৈরী করিও, আর প্রতি
মঙ্গলবারে ষােড়শােপচারে আমার পূজা দিও। আমার
আশীর্বাদে গুজরাট রাজ্যের তুমি রাজা হইবে।”
কালকেতু বলিল, “আমি অতি নীচ জাতি মা, কে
আমার ব্রাহ্মণ হইবে; আমাকে ছুইলে যে সকলেরই জাত যায়।”
দেবী বলিলেন, “আমার আশীর্বাদে তােমার সকল পাপ
দূর হইল । শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণও তােমার ঘরে আসিয়া পূজা দিবে
এবং দান গ্রহণ করিবে। এস, আমি তােমাদের কানে মন্ত্র
দিয়া তােমাদিগকে পবিত্র করিয়া দেই।” এই বলিয়া
কালকেতু ও ফুল্লরার কানে মন্ত্র দিয়া ভগবতী কৈলাশে
মহাদেবের নিকট চলিয়া গেলেন।
প্রাতে উঠিয়া কালকেতু সেই মাণিকের আংটিটা লইয়া
মুরারি শীল নামক এক বেণের কাছে গেল।
সে যেমন ধনী
তেমনি আবার কৃপণ ; এমন ধনী যে তাহার কত টাকা আছে
সে নিজেই তাহা বলিতে পারে না। এত টাকা, তবু সে ভাল
[ ৪৩ ]

কালকেতু
একটু মাছ দুধ খায় না, একখানি ভাল কাপড় পরে না,-কি
জানি, যদি টাকা কমিয়া যায়। কালকেতু যাইয়া যখন
ডাকিল, “খুড়া বাড়ী আছ ?” মুরারি শীল তখন বাড়ীর
ভিতর বসিয়া টাকা পয়সার হিসাব নিকাশ দেখিতেছিল।
কালকেতুর সাড়া পাইয়া সে কোনও উত্তর দিল না, ভাবিল,
কালকেতুর কাছে মাংসের দাম কিছু বাকি আছে, হয়ত
তাহারই তাগাদা করিতে সে আসিয়াছে। মুরারির স্ত্রী আসিয়া
বলিল, “তােমার খুড়া বাড়ী নাই, আজ খুব ভােরে উঠিয়া
খাতক-পাড়া গিয়াছে। তুমি বুঝি মাংসের পয়সার জন্য
আসিয়াছ ; আচ্ছা কাল দিব,আর শােন, কাল আসার সময়
কিছু শুকনা কাঠ আর কিছু পাকা মিষ্টি কুল আনিও, এক
সাথেই দাম শােধ করিয়া দিব।”
কালকেতু বলিল, “না খুড়ী, আমি মাংসের দামের জন্য
আসি নাই; আমি একটা আংটি ভাঙ্গাইতে আসিয়াছিলাম ;
তা’ খুড়া যখন বাড়ী নাই তখন আর কি হইবে, আর এক
বেণের বাড়ী যাই।”
বেণের স্ত্রী আংটির নাম শুনিয়া বলিল, “দেখি বাবা,
কি আংটি ?”
বাড়ীর ভিতর বসিয়া বেণে সব কথাই শুনিতেছিল,
যখন তাহার কাণে গেল যে, কালকেতু মাংসের দাম চাহিতে
আসে নাই, সে আসিয়াছে একটা আংটি ভাঙ্গাইয়া টাকা নিতে,
[ ৪৪ ।

কালকেতু
তখন তাহা একটা লাভের পথ ভাবিয়া সে ধীরে ধীরে বাহিরে
আসিয়া বলিল, “ভাইপাে যে, আজ বাবা সেই ভােরে উঠিয়া
তাগাদায় বাহির হইয়াছিলাম, এই সবে বাড়ী ফিরিলাম, একটা
পয়সা আদায় নাই বাবা, লােকে নিলে আর দিতে চায় না ;
তারপর তােমাকে এত দিন দেখি নাই যে, ভাল ছিলে ত,
বউমা ভাল আছেন ?”
কালকেতু মুরারির পায়ের ধূলা লইয়া বলিল, “হা খুড়া,
সব ভাল আছি। অবসর মােটেই নাই, সেই ভােরে উঠিয়া
ধনুক বাণ লইয়া বনে যাই, আর সন্ধ্যার সময় বাড়ী ফিরি, তাই
দেখা সাক্ষাৎ করিতে আসিতে পারি না। আজ একটা আংটি
ভাঙ্গাইতে তােমার কাছে আসিয়াছি, এটা লইয়া যাহা উচিত
দাম হয় আমায় দাও।”
মুরারি আংটি লইয়া ওজন করিয়া কষ্টি পাথরে ঘষিয়া
বলিল, “এটা ত বাবা, সােণাও নয়, রূপাও নয়, এটা যে একে-
বারে নীরস পিতল, ঘষিয়া মাজিয়া একেবারে চক্চকে করিয়া
নিয়া আসিয়াছ, এর দাম আর কত হইবে ? ওজনও মাত্র সােল
রত্তি দুই ধান হইয়াছে, দাম হয় মাত্র সওয়া আট আনা। আর
তােমার আগের মাসের মাংসের দাম পাইবে দেড় বুড়ি, মােট
তােমার পাওনা হইল আট আনা আড়াই পয়সা তা কিছু ক্ষুদ
ও কিছু পয়সা নিয়া একেবারে গােলমাল মিটাইয়া যাও।
মুরারির মুখে আংটির দাম শুনিয়া কালকেতু ভাবিতে
{ ৪৫ ]

কালকেতু
লাগিল, “এই আংটির মত বুঝি আমার সেই সাত কলসী
টাকাও মিথ্যা। ভগবতী আমাকে খুব ফাঁকি দিয়া গেলেন।”
সে বলিল, “দাও খুড়া, আংটি আমি ভাঙ্গাইব না, যে দিয়াছে
তাহাকে ফিরাইয়া দিব।”
মুরারি বলিল, “এ আংটির দাম আর এক কড়াও
বাড়িবে না, তুমি আমার ভাইপাে বলিয়া বরং দাম কিছু বেশীই
বলিয়াছি, আমার কাছে কোনও রকম ছল জুয়াচ্ছরি পাইবে না,
তােমার বাবা ধৰ্ম্মকেতু জানিত আমি কেমন লােক ;—আচ্ছা,
যদি তুমি ক্ষুদ নিতে না চাও, তবে নগদ পয়সাই তােমাকে
দিব।”
কালকেতু বলিল, “না খুড়া, আমি অত কম দামে আংটি
বেচিব না, গােলমালের কাজ নাই, আমার আংটি আমায়
ফিরাইয়া দাও। আমি আর এক বেণের বাড়ী যাই।”
বেণে ভাবিতে লাগিল, “হায়, হায়, এমন জিনিষটা হাত
ছাড়া হইয়া যায় ?” তখন সে এই আংটির বদলে আর একটা
আংটি তাহাকে দিয়া দিবার ফন্দী করিতে লাগিল।
ভগবতী আকাশ হইতে এসব দেখিতেছিলেন। মুরারি
যখন আংটিটা বদলাইবার মতলব আঁটিতে ছিল, তখন তিনি
দৈববাণী করিলেন, “এ ধন আত্মসাৎ করিবার চেষ্টা করি না
মুরারি, তাের ভাল হইবেনা। এই আংটির দাম সাত কোটি
টাকা, আংটি রাখিয়া সাত কোটী টাকা কালকেতুকে দিয়া দে,
[ ৪৬ ]

কালকেতু
ভগবতীর বরে দিন দিন তাের ধন বাড়িবে।” এই দৈববাণী
আর কেহ শুনিল না, কেবল মুরারি শীল শুনিল। তখন সে
হাসিয়া বলিল, “শােন ভাইপাে, এতক্ষণ তােমার সাথে হাসি
তামাসা করিতেছিলাম, এ আংটির দাম সাত কোটী টাকা।
অত টাকা তুমি কি নিতে পারিবে ? কতকগুলি বলদ ও
ঘােড় লইয়া আস, বস্তা বাঁধিয়া বলদের পিঠে চাপাইয়া টাকা
বাড়ী লইয়া যাও।”
কালকেতু মহানন্দে সাত লক্ষ পাঁচ হাজার বলদ ও ঘােড়া
কিনিয়া আনিয়া হাজির করিল। মুরারি ধামা ভরিয়া টাকা
গণিয়া বস্তায় ঢালিয়া দিতে লাগিল, কালকেতু তাহা বস্তা
বাঁধিয়া বলদের ও ঘােড়ার পিঠে চাপাইতে আরম্ভ করিল।
সমস্ত বলদ ও ঘােড়ার পিঠে যখন বস্তা চাপান হইয়া গেল,
তখন সে সেগুলি তাড়াইয়া বাড়ী লইয়া গেল। ফুল্লরা অত
টাকা দেখিয়া একেবারে অবাক হইয়া গেল। খরচের জন্য
কিছু উপরে রাখিয়া বাকি সব মাটিতে পুতিয়া রাখিল।
এত টাকা পাইয়া ব্যাধ কালকেতু আর ব্যাধ রহিল
। সে ওসব পাপ কাজ ছাড়িয়া দিল। সে ক্রমে ক্রমে
দেশের ভিতর বেশ একজন গণ্য মান্য সম্রান্ত ভদ্রলােক হইয়া
[ ৪৭ ]

কালকেতু তাহার কত চাকর বাকর, কত দাস দাসী, কত আমলা গােমস্তা, এখন তাহার সম্মানের সীমা নাই। ভগবতী তাহাকে গুজরাটের বন কাটাইয়া সেখানে রাজ্য বসাইবার কথা বলিয়াছিলেন, এখন সে সেই কাজে মন দিল। রাজা হইতে হইলে অনেক জিনিস পত্রের দরকার, রাজায় রাজায় যুদ্ধ বাঁধিতে পারে, এজন্য অস্ত্র শস্ত্রের প্রয়ােজন, হাতী ঘােড়া সৈন্য সামন্তের দরকার। সে ভগবতীর দেওয়া টাকা হইতে সমস্তই কিনিয়া ফেলিল। ব্যাধ কালকেতুর কাণ্ডকার- খানা দেখিয়া দেশ শুদ্ধ লােক অবাক হইয়া গেল। গুজরাটের বন প্রকাণ্ড বন, সাত দিন সাত রাত হটিলেও সে বনের শেষ নাই। কালকেতুকে সেই বন কাটাইতে হইবে, তাহাতে বহু লােক জনের দরকার। সে দেশে বিদেশে মজুর যােগাড় করিবার জন্য লােক পাঠাইল। খবর পাইয়া দেশ দেশান্তর হইতে দলে দলে মজুরেরা আসিয়া হাজির হইল। বন কাটা আরম্ভ হইল। সেই শব্দে বনের যত পশু পক্ষী সব ভয়ে অস্থির হইয়া উঠিল। বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ, গণ্ডার, হাতী প্রভৃতি ভয়ানক জন্তুরা মজুরদিগকে আক্রমণ করিয়া মারিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। কালকেতু তাহা শুনিয়া নিজেই তীর ধনুক হাতে লইয়া বনে বনে ঘুরিয়া সেই সব বন্য জন্তুর হাত হইতে মজুরদিগকে বাঁচাইতে [ ৪৮ ]

কালকেতু
লাগিল। জঙ্গলের সমস্ত গাছপালা কাটা হইল, কেবল যে
সব ফলফুলের গাছ মানুষের দরকারে লাগে বা দেবতাদের
পূজায় ব্যবহার হয়, তাহা কাটা হইল না।
বন কাটা হইলে ভগবতী কালকেতুর বাড়ী ও সহর
নিৰ্মাণ করিবার জন্য বিশ্বকর্মা ও হনুমানকে পাঠাইলেন।
হনুমান বড় বড় গাছ, প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথর আনিতে লাগিল,
আর বিশ্বকর্মা তাহা দিয়া পলে পলে তিলে তিলে এক একটী
করিয়া সুন্দর পুরী নিৰ্মাণ করিতে লাগিলেন। এক ক্রোশ
জুড়িয়া কালকেতুর সাত মহলা বাড়ী তৈরী হইল। বাড়ীর
চারি ধারে পাষাণের প্রাচীর, পূর্বদিকে সিংহ দরজা, উত্তরে
খিড়কী, বাড়ীর ভিতর প্রকাণ্ড এক সরােবর, তাহার চারি
ধারে শ্বেত পাথরের বাঁধানো ঘাট, ফটিকের মত তার জল।
অন্দর মহলে চণ্ডীমণ্ডপ। বিশ্বকর্মা ভাবিয়া চিন্তিয়া খুব
পরিশ্রম করিয়া বাড়ীখানাকে যতদূর সুন্দর করা যায়,
তাহাতে ত্রুটী করিলেন না। কালকেতুর বাড়ী প্রস্তুত
হইয়া গেল, বিশ্বকৰ্মা গুজরাট তৈরী করিতে মন দিলেন,
অল্প দিনে তাহাও শেষ হইল। একে বিশ্বকর্মা মিস্ত্রি, তাহাতে
আবার বীর হনুমান তাহার সাহায্যকারী, তাহার উপর আবার
ভগবতীর আদেশ,-কাজেই নগরটা যে খুবই সুন্দর হইল
তাহা আর তােমাদিগকে বলিয়া দিতে হইবে না।
সুন্দর সহর তৈরী হইল সত্য, কিন্তু সহরে যদি লােকজন
[ ৪৯ ]
(৪)

কালকেতু থাকে, তবে সুন্দর সহরও শ্মশানের মত দেখায়। লােক জন অভাবে এমন সুন্দর সহরও বিশ্রী দেখাইতে লাগিল। ইহা দেখিয়া কালকেতুর মনে বড়ই দুঃখ হইল। সে বহু স্তবস্তুতি করিয়া ভগবতীকে বলিল, “মা, এ লােকশূন্য নগর দিয়া আমার কি হইবে? আমার ত সাধ্য নাই মা, যে আমি লােক- জন আনিয়া এ সহর ভরিতে পারি। তুমি দয়া করিয়া এ সহরে লােকের বসতি করিয়া দাও।” কালকেতুর স্তবস্তুতিতে ভগবতীর দয়া হইল। তিনি রাত্রিতে কলিঙ্গ রাজ্যের ঘরে ঘরে যাইয়া নিদ্রিত প্রজাদিগকে স্বপ্ন দেখাইলেন, “কালকেতু গুজরাট সহর বসাইয়াছে, তােমরা সেই সহরে গিয়া বাস কর, সেখানে গেলে তােমাদের মঙ্গল হইবে, তােমরা প্রত্যেকে ধান, গরু, জমী ও সােণা পুরস্কার পাইবে।” কিন্তু কেহই ভগবতীর কথায় কর্ণপাত করিল না। তখন ভগবতী গঙ্গাকে ডাকিয়া বলিলেন, “তােমাকে একটা কাজ করিতে হইবে বােন, আমি গুজরাট নগর তৈরী করিয়াছি, কিন্তু তাহাতে লােক নাই, তুমি যদি কলিঙ্গ দেশটা জলে ভাসাইয়া দিতে পার, তবে সেখানকার যত প্রজা আসিয়া আমার গুজরাট রাজ্যে বাস করিবে।” গঙ্গা ভগবতীর সতিন, সেই জন্য তিনি ভগবতীর সমস্ত কাজেই হিংসা করিয়া থাকেন। ভগবতীর কথায় গঙ্গা অস্বীকৃত হইয়া বলিলেন, “কেন আমি অমন পাপ কাজ [ ৫০ ।

কালকেতু
করিতে যাইব ? • কলিঙ্গের প্রজারা এমন কি অপরাধ
করিয়াছে যে, আমি তাহাদের সুখের সংসার ভাসাইয়া দিতে
যাইব?—আমার দ্বারা ও-কাজ হইবে না।”
ভগবতী সমুদ্রের কাছে গিয়া সব কথা বলিলেন।
সমুদ্র কি আর তঁাহার আদেশ না মানিয়া পারে? সে হাত
জোর করিয়া বলিল, “মা, আপনি আমাকে যে কাজ করিতে
আদেশ করিবেন, আমি তাহাতেই রাজি আছি।” সমুদ্রের
কথায় ভগবতী সন্তুষ্ট হইয়া ইন্দ্রের কাছে যাইয়া বলিলেন,
“দেবরাজ, তােমার মেঘগুলি আমাকে দাও, আমি ঝড় বৃষ্টি
শিলাপাত দ্বারা কলিঙ্গ রাজ্য নষ্ট করিয়া তােমার পুত্র
নীলাম্বরের জন্য নূতন গুজরাট রাজ্য নির্মাণ করিব।”
ইন্দ্র তখনই মেঘদিগকে ডাকিয়া বলিলেন, “মেঘগণ,
তােমরা যাইয়া কলিঙ্গ রাজ্যে যত পার ঝড়বৃষ্টি ও শিলাপাত
আরম্ভ করিয়া দাও।” ইন্দ্রের আদেশে মেঘেরা বাতাসের
মত বেগে যাইয়া কলিঙ্গ রাজ্য অন্ধকারে ঢাকিয়া ফেলিল।
মুষলধারে বৃষ্টি ও শিল পড়িতে লাগিল, ঝড়ে গাছপালা
ভাঙ্গিয়া মুচড়াইয়া একাকার করিয়া ফেলিতে আরম্ভ করিল।
কত ঘর বাড়ী যে উড়িয়া গেল তাহার সংখ্যা রহিল না।
এদিকে সমুদ্রও সমস্ত নদনদীদিগকে বাণ ডাকিয়া কলিঙ্গ দেশ
ভাসাইয়া দেওয়ার হুকুম করিল, কলিঙ্গ দেশ জলে জলময়
হইয়া গেল, ক্ষেতের শস্য এক রত্তি অবধি ভাসিয়া গেল, কত
[ ৫১।

কালকেতু
গরু, ঘােড়া, কুকুর, বিড়াল ও মানুষ যে মরিল আর ভাসিয়া
গেল, তাহার হিসাব রহিল না।
কলিঙ্গ রাজ্যের যত লােক এইভাবে ঘর বাড়ী হারা
হইয়া উপায় না দেখিয়া ভাল ঘর বাড়ী, জমী ও গরু
পুরস্কারের আশায় যাইয়া গুজরাট রাজ্যে উপস্থিত হইল।
কালকেতু পরম সমাদরে তাহাদিগকে বাড়ী, ঘর, জমজমী,
টাকা পয়সা ও ধান চাউল দিয়া তাহার রাজ্যে বাস করিবার
অনুমতি দিল। এইরূপে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র,
বৈদ্য, মুসলমান ইত্যাদি করিয়া ছত্রিশ জাতি যাইয়া গুজরাট
রাজ্যে বাস করিতে লাগিল। দেখিতে দেখিতে গুজরাট
একটা সুন্দর রাজ্য হইয়া উঠিল।
কালকেতুর এই নূতন প্রজাদের মধ্যে একজন বড়
দুষ্ট লােক ছিল, নাম তার ভাঁড়ুদত্ত। সে রোজ হাটে
বাজারে যাইয়া এক পয়সারও জিনিষ কিনিত না, কেবল
দোকানদারদিগকে ভয় দেখাইয়া ও মারপিট করিয়া
শাকশজী, মাছ, পান, তেল, লুণ ইত্যাদি সব জিনিষই কাড়িয়া
লইত। দোকানদারেরা আর ইহা সহ্য করিতে না পারিয়া
একদিন যাইয়া কালকেতুকে ভাঁড়র অত্যাচারের কথা
জানাইল। কালকেতু শুনিয়া রাগে জ্বলিয়া গেল। তখনই
দূত যাইয়া ভড়কে আনিয়া কালকেতুর সম্মুখে হাজির
করিল। কালকেতু তাহাকে খুব গাল মন্দ দিয়া রাজ্য হইতে
[ ৫২ ]

কালকেতু তাড়াইয়া দিল। ভাঁড়, অপমানিত হইয়া প্রতিজ্ঞা করিল, “আমি যদি হরিদত্তের ছেলে আর জয়দত্তের নাতি হই, তবে তােমার এই হাতী, ঘােড়া, রাজ্যপাট, হাটে বিক্রি করাইয়া ছাড়িব, তুমি বনে বনে আবার শীকার তাড়াইয়া বেড়াইবে, ফুল্লরা আবার মাংসের চুপড়ি মাথায় করিয়া বাজারে মাংস বেচিবে।” ভাঁড়দত্ত সেখান হইতে যাইয়া একেবারে কলিঙ্গ রাজ- সভায় হাজির হইল । তখন নিয়ম ছিল রাজরাজড়ার সাথে দেখা করিতে হইলে নানা জিনিষ দিয়া ডালা সাজাইয়া ভেট লইয়া যাইতে হইবে। ভাড়াও নানা জিনিষ কিনিয়া দিব্বি ভেট সাজাইল,-বাজারের কোনও জিনিষ প্রায় বাদ গেল না। ভাঁড়র এক ছােট ভাই ছিল, তাহার নাম শিবদত্ত ; তাহার দুই পায়ে দুইটা মস্ত বড় গােদ ছিল, এই জন্য এতদিন তাহার বিবাহ হয় নাই। বিবাহ না হওয়ায় শিবু ভাড়ার উপর বড়ই চটা ছিল, ভাড়ার কোনও কথাই সে শুনিত না। ভাঁড়, সেদিন শিবুকে বলিল, “দ্যাখ, ভাই শিবু, এই যে ভেট লইয়া রাজ-দরবারে চলিয়াছি, এবার আমি একটা বড় গ্রামের মােড়ল হইব নিশ্চয়ই। এবার ঠিক তাের বিবাহ করাইব, কোনাে চিন্তা নাই,ভেটটা লইয়া আমার সাথে চলত ভাই শিবু।” এবার শিবুর বিবাহ হইবে, এই আনন্দে সে ভেটের ধামাটা একেবারে মাথায় তুলিয়া লইয়া ভীড়র পিছু পিছু রাজবাড়ী চলিল। [ ৫৩ ]

কালকেতু
ভাড়, রাজার সম্মুখে ভেট রাখিয়া হাত জোড় করিয়া
বলিতে লাগিল, “মহারাজ, আমার একটা নিবেদন আছে।
যে ব্যাধ কালকেতু একদিন বনে বনে ঘুরিয়া শীকার করিত,
আর যার স্ত্রী ফুল্লরা হাটে মাংস বেচিত, সেই কালকেতু
হইয়াছে গুজরাটের রাজা, আর ফুল্লরা হইয়াছে রাণী।
গুজরাট রাজ্য আপনার এই কলিঙ্গ রাজ্যের সর্বনাশ
কলি। কালকেতু আপনার প্রজাদিগকে লােভ দেখাইতেছে,
আর তাহারা দলে দলে আপনার রাজ্য ছাড়িয়া তাহার রাজ্যে
যাইয়া বাস করিতেছে ; দেশ একেবারে উজাড় হইয়া গেল
মহারাজ! কালকেতুর ধন দৌলতের সীমা নাই, সে রাজ্যের
গরীব দুঃখী সবাই সোণার থালায় ভাত খায়, দিন রাত সে রাজ্যে
আমােদ আহলাদ লাগিয়াই আছে। আপনি মহারাজ কিছুই
দেখেন না, আপনার রাজ্যের শ্রীনষ্ট করিয়া এমন একটা
রাজ্য চোখের উপর গড়িয়া উঠিতেছে।” তখনই কোটালের
ডাক পড়িল। সে কেন ওসব কথা মহারাজকে বলে নাই ?
কোটাল ভয়ে কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল, “আমাকে ক্ষমা
করুন মহারাজ, এবার সব খবর ঠিক ঠিকই আপনাকে
আনিয়া দিব।” সে তখনই সন্ন্যাসীর বেশে গুজরাটে চলিল,
[ ৫৪ ]

কালকেতু সেখানকার সব খবর জানিয়া আসিবার জন্য। কয়েকদিন গুজরাট রাজ্যের অলি গলি ঘুরিয়া বহু খবর লইয়া সে আসিয়া কলিঙ্গ রাজদরবারে উপস্থিত হইয়া বলিল, “মহারাজ, যে গুজ- রাট একদিন জঙ্গলে জঙ্গলময় ছিল, সেখানে জঙ্গলের এতটুকু চিহ্নও নাই। কি সুন্দর রাজ্যই কালকেতু স্থাপন করিয়াছে, যেন রামের অযােধ্যা ! তার বাড়ীখানাই বা কি চমৎকার, যেন রাবণরাজার সােণার পুরী ! হাতী ঘােডা, সৈন্য সামন্ত, লােক লস্করই বা কত ! কালকেতু অর্জুনের মত বীর, কর্ণের মত দাতা; প্রজারা তাহার দান পাইয়া মহাসুখে আছে। যাহা দেখিয়া আসিলাম মুহারাজ, পাঁচমুখ হইলেও আমার সাধ্য নাই যে আপনার কাছে তাহা বলিতে পারি।” কোটালের মুখে সমস্ত কথা শুনিয়া রাজা তখনই যুদ্ধের হুকুম দিলেন। রাজ্যময় সাজ সাজ রব পড়িয়া গেল, সৈন্য সামন্ত সিপাহী লস্কর হাতী ঘােড়া যুদ্ধের জন্য সাজিল ; যুদ্ধের বাজনায় ও সৈন্য সামন্তের গােলমালে রাজ্য ভরিয়া গেল। কলিঙ্গ রাজার সৈন্যেরা যখন কালকেতুর রাজ্যে উপস্থিত হইল, তখন কালকেতু রাজসভায় বসিয়া পাত্রমিত্র লইয়া পাশা খেলিতেছিল, এমন সময় দূত আসিয়া তাহাকে যুদ্ধের সংবাদ দিল। কালকেতুর রাজ্যেও সাজ সাজ রব পড়িয়া গেল। সৈন্যেরা মাথায় পাগড়ি বাঁধিয়া গায়ে লােহার বৰ্ম্ম আটিয়া ঢাল তলােয়ার ঝুলাইয়া বাজনার তালে তালে পা [ ৫৫ ]

কালকেতু
ফেলিয়া যুদ্ধের জন্য চলিল। কালকেতুও যুদ্ধের সাজ পরিয়া
ভগবতীকে প্রণাম করিয়া যাত্রা করিল।
দুই দলে তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হইল। বৃষ্টির ধারার মত
বাণ পড়িতে লাগিল। রক্তের নদী বহিয়া চলিল। ভগবতী
যােগিনীদিগকে সাথে লইয়া কালকেতুর সাথে যােগ দিলেন,
কিন্তু কেহ তাহা দেখিতে পাইলেন না। হাজারে হাজারে
কলিঙ্গরাজের সৈন্য, হাতী, ঘােড়া মরিতে লাগিল। যােগিনী-
গণ মনের আনন্দে মানুষের মাথার মালা গাথিয়া গলায় পরিতে
লাগিল আর যে যত পারিল প্রাণ ভারয়া সেই গরম রক্ত পান
করিয়া তাথৈ তাথৈ নাচিতে লাগিল।
ভূতপ্রেত যাহারা
দেবীর সাথে আসিয়াছিল, তাহারা মনের আনন্দে কলিঙ্গরাজের
সৈন্যের ঘাড় মটকাইয়া ভাঙ্গিয়া রক্তটুকু চুষিয়া খাইয়া মড়
মড়, করিয়া মাথাটা চিবাইয়া খাইতে লাগিল। এই ভীষণ
যুদ্ধে কলিঙ্গরাজের সৈন্যেরা আর টিকিতে পারিল না, ব্যাপার
ভাল নহে দেখিয়া যে যার প্রাণ লইয়া পলাইল।
যখন কলিঙ্গের রাজা কালকেতুর নিকট হারিয়া গেলেন,
তখন ভাঁড়ুর মনে বড়ই দুঃখ হইল। সে কলিঙ্গরাজের
সেনাপতিকে বলিতে লাগিল, “চল সেনাপতি, আবার যুদ্ধে
যাওয়া যাউক। এবার আমি তােমাদের সকলের কাছে
প্রতিজ্ঞা করিতেছি, কালকেতুকে আমি বাঁধিয়া আনিয়া
তােমাদের হাতে তুলিয়া দিব, যদি না দেই তবে তােমরা
[ ৫৬ ]

কালকেতু
আমার নাক কান কাটিয়া মাথায় ঘােল ঢালিয়া দশবাজারে
ঘুরাইয়া দেশ হইতে তাড়াইয়া দিও।” ভাঁড়র কথা শুনিয়া
সকলেরই আবার প্রাণে আশা হইল। সেনাপতি যুদ্ধে হারিয়া
আসিয়া বড়ই লজ্জা পাইয়াছিল, এবার সে তাহার প্রতিশােধ
নেওয়ার জন্য আবার সিপাহী লস্কর সাজাইয়া দামামা বাজাইয়া
যুদ্ধে চলিল।
কালকেতুও তাহা শুনিয়া যুদ্ধের যােগাড় করিতে
লাগিল। ফুল্লরা দেখিল, আবার যুদ্ধ বাঁধিবে, এই যুদ্ধে কে
বাঁচিবে কে মরিবে ঠিক নাই। তখন সে কালকেতুর পায়ে
ধরিয়া কাঁদিয়া কাটিয়া বলিতে লাগিল, “এবার আর তুমি
যুদ্ধে যাইও না! তাহারা যখন একবার হারিয়া গিয়াও আবার
যুদ্ধ করিতে আসিয়াছে, তখন এবার যুদ্ধটা বড় রকমেরই
হইবে। আমাদের কাজ নাই যুদ্ধ করিয়া, রাজ্য চাই না
আমরা, চল এদেশ ছাড়িয়া চলিয়া যাই, একটা রাজ্যের জন্য
তুমি প্রাণ দিতে যাইতে পারিবে না। কি হইবে আমাদের
রাজ্য দিয়া ? আগে যেমন ছিলাম এখনও তেমনি থাকিব,
তবু প্রণটা ত বাঁচিবে।” ফুল্লরার কথা শুনিয়া কালকেতুর
মনটাও যেন কেমন হইয়া গেল, সে যাইয়া ধানের গােলা-
ঘরে লুকাইয়া রহিল।
এদিকে কলিঙ্গ রাজের সেনাপতি কালকেতুর কোনও
সৈন্য সামন্ত না দেখিয়া বড়ই চিন্তায় পড়িল, ভাবিল,
[ ৫৭ ]

কালকেতু হয় ত কালকেতু তাহার সিপাহী লস্কর লইয়া কোথাও লুকাইয়া আছে, সুযােগ পাইলেই হঠাৎ আসিয়া তাহাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিয়া একেবারে শেষ করিয়া ফেলিবে। তাহাকে ভাবিতে দেখিয়া ভাঁড়, বলিল, “তুমি এইখানে সৈন্যসামন্ত লইয়া খুব সাবধানে থাক। আমি কৌশল করিয়া দেখিয়া আসি কালকেতু কি করিতেছে। যদি আমার ফিরিয়া আসিতে দুই দণ্ডের বেশী বিলম্ব হয়, তবে তুমি সৈন্য লইয়া কালকেতুর বাড়ী ঘিরিয়া ফেলিও।” এই বলিয়া ভাঁড় কিছু পান ও একজন ব্রাহ্মণ সাথে লইয়া কালকেতুর খোঁজে চলিল। এক দুই তিন করিয়া কালকেতুর রাজবাড়ীর ছয় মহল খুঁজিয়া একেবারে সাত মহলে যাইয়া হাজির হইল। সেখানে ফুল্লরা সখীদিগকে লইয়া বসিয়া যুদ্ধের কথা ভাবিতেছিল। ভাঁড়, ফুল্লরাকে একটা নমস্কার করিয়া বলিল, “খুড়ী, খুড় কোথায় গেল ? তাহাকে আসিয়া এই পান নিতে বল। কলিঙ্গরাজ খুড়ার বীরত্ব দেখিয়া সন্তুষ্ট হইয়া তাহার সাথে সন্ধি করার জন্য এই পান আর এই ব্রাহ্মণকে আমার সাথে পাঠাইয়া দিয়াছেন। আমি রাজার কাছে অনেক বলিয়া কহিয়া খুড়ার সমস্ত দোষ ক্ষমা করাইয়া লইয়াছি। তিনি আমার কথায় খুড়ার উপর খুব সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে এই রাজ্য ছাড়িয়া দিতে চাহিয়াছেন, তা ছাড়া আটখানা রাজ- বাড়ী দিবেন, আর খুড়াকে কলিঙ্গরাজার সেনাপতি করিবেন। [ ৫৮ ] কালকেতু খুড়ী, এবার তােমরা খুব সুখে স্বচ্ছন্দে থাকিবে, যুদ্ধ বিবাদ আর থাকিবে না। আমি ত আর বেশীক্ষণ থাকিতে পারিব না, শীগগীর আসিয়া খুড়াকে এই পান নিতে বল।” ভাঁড় কথায় ফুল্লরা একেবারে আহ্লাদে আটখানা হইয়া গেল, সে ইসারা করিয়া তাহাকে ধানের গােলাঘর দেখাইয়া দিল। চতুর ভাঁড়ুর বুঝিতে বাকি রহিল না যে, কালকেতু ঐ ধানের গােলাঘরে লুকাইয়া রহিয়াছে। এদিকে ভাঁড়র বিলম্ব দেখিয়া কলিঙ্গের সেনাপতি সৈন্য লইয়া আসিয়া কালকেতুর রাজবাড়ী ঘিরিয়া ফেলিল। সিপাহী লস্করের হৈ চৈ শুনিয়া কালকেতু বাহির হইবামাত্র তাহার সহিত সেনাপতির যুদ্ধ বাঁধিয়া গেল। যখন যুদ্ধ হইতেছিল তখন ভগবতী ভাবিতে লাগিলেন, “কালকেতুর পৃথিবীতে বাঁচিয়া থাকিবার সময় ত প্রায় শেষ হইয়া আসিল, কিন্তু যে জন্য নীলাম্বরকে স্বর্গ হইতে পৃথিবীতে পাঠাইয়াছিলাম, আজ পর্যন্ত তাহার কিছুই হইল না, সে আর মাত্র অল্পদিন পৃথিবীতে থাকিবে; ইহার মধ্যেই তাহার দ্বারা পৃথিবীতে আমার পূজার প্রচার করিতে হইবে।” এই ভাবিয়া শরীরের বল হরণ করিয়া লইলেন। কলিঙ্গ- রাজের সেনাপতি তখন অনায়াসে তাহাকে হাতীর পায়ের শিকল দিয়া হাতে গলায় বাঁধিয়া হাতীর পিঠে তুলিয়া লইল। ফুল্লরা সেনাপতির পায়ে পড়িয়া কাঁদিয়া কাঁদিয়া বলিতে ( ৫৯ ] দেবী কালকেতুর কালকেতু লাগিল, “ওগাে স্বামীকে আমার ছাড়িয়া দাও। আমাদের যথাসর্বস্ব তােমরা লইয়া যাও। স্বামীকে আমার প্রাণে মারিও না। আমাকে মার, কাট, শূলে দাও, হাতীর পায়ের নীচে ফেল, তবু স্বামীকে আমার কোনাে ব্যথা দিও না,- ওগাে স্বামীকে আমার ছাড়িয়া দাও, তােমার পায়ে পড়ি কোটাল, স্বামীকে আমার ছাড়িয়া দাও।” ফুল্লরার কথায় সেনাপতির মনে একটু দয়া হইল। সে ফুল্লরাকে বলিল, “তুমি কাঁদিও না, আমি রাজার কাছে বলিয়া কহিয়া কালকেতুর প্রাণ বাঁচাইব। তাহাকে ছাড়িয়া দেওয়ার আমার কোনই ক্ষমতা নাই, তাহা হইলে রাজা আমার গর্দান লইবেন। তুমি চিন্তা করিও না ফুল্লরা, তােমার যাহাতে বিশেষ কোনও কষ্ট না হয়, আমি তাহার ব্যবস্থা করিব।”—এই বলিয়া কোটাল কালকেতুকে হাতীর পিঠে করিয়া সিপাহী লস্করের পাহারায় কলিঙ্গ রাজের নিকট লইয়া গেল। কলিঙ্গ-রাজ সভায় পাত্রমিত্র লইয়া বসিয়া আছেন। এমন সময় কোটাল খুব আহলাদে যুদ্ধ বাজনা বাজাইয়া সৈন্য- সামন্ত লইয়া রাজধানীতে প্রবেশ করিল। ( ৬০ )

কালকেতু
রাজা জিজ্ঞাসা করিলেন, “এ কিসের বাজনা মন্ত্রী ?”
মন্ত্রী বলিল, “মহারাজ, বােধ হয় সেনাপতি যুদ্ধ জয় করিয়া
ফিরিয়া আসিয়াছে।”
সিপাহীরা কালকেতুকে হাতেপায়ে শিকল দিয়া বাঁধিয়া
নিয়া রাজার সম্মুখে হাজির করিল। কালকেতুকে দেখিয়া
রাজা রাগে অগ্নিশর্মা হইয়া বলিলেন, “বেটা, ব্যাধ হইয়া তাের
এমন আস্পর্ধা! আমার অনুমতি না লইয়া তুই গুজরাটের
বন কাটাইয়া রাজা হইয়াছিস্, আর আমাকে সম্মান করিস্ না,
আমার রাজ্যের যত প্রজাকে লােভ দেখাইয়া তুই গুজরাটে
লইয়া গিয়াছিস, আজ আমি ইহার উচিত শিক্ষা তােকে দিব।”
কালকেতু বলিল, “আমি আপনার রাজ্যে বাস করি
না মহারাজ, আমার রাজ্যের রাজা স্বয়ং মহাদেব। আমি
ভগবতীর আদেশে সব কাজ করি ; অনর্থক আমাকে দোষ
দিবেন না, এক দিন জানিতে পারিবেন যে আমার কোনই
অপরাধ নাই।”
রাজা বলিলেন, “বল্ বেটা, কোথায় চুরি ডাকাতি করিয়া
এত টাকা পাইয়াছিস ? ছােট জাত, যাহাকে চুইলে স্নান
করিতে হয়, সে বেটা আমার এত সৈন্য নাশ করিয়া রাজ
সভায় দাড়াইয়া আমার মুখের উপর এত কথা বলে !”
কালকেতু বলিল, “কোথাও চুরি ডাকাতি আমি করি
নাই। দেবী ভগবতী আমার প্রতি সদয় হইয়া ধন দিয়া
[ ৬১ ]

কালকেতু আমাকে ধনী করিয়া দিয়াছেন। তাহারই আদেশে তাঁহারই টাকায় আমি বন কাটাইয়া প্রজা বসাইয়াছি। এতে যদি কোনও দোষ করিয়া থাকি, তবে সে দোষ আমার নয়, সে দোষ ভগবতীর।” রাজা ঠাট্টা করিয়া হাসিয়া বলিলেন, “শােন ছােট- লােকের কথা ! দেবতারা স্তবস্তুতি করিয়া যার চরণ পান , সেই দেবী ভগবতী আসিলেন বেটা ব্যাধকে দয়া করিয়া টাকা দিতে,—পৃথিবীতে আর এমন একজন ধার্মিক লােক তঁাহার চোখে পড়িল না! বেটা মিথ্যাবাদী।” তিনি কোটালকে ডাকিয়া বলিলেন, “যাও কোটাল, একে হাতীর পায়ের নীচে পিষিয়া মারিয়া ফেল।” কালকেতু বীরের মত উত্তর করিল, “সে জন্য কালকেতু ডরায় না মহারাজ, জন্ম হইলে মরণ আছেই। আমি ভগবতীর দাস, তােমার কোনও শাস্তিকেও আমি ভয় করি না।” কোতাল হাতী লইয়া আসিল। পাত্রমিত্র সকলে জোড় হাত করিয়া মহারাজকে বলিল, “মহারাজ, কালকেতু যখন নিজকে ভগবতীর দাস বলিতেছে, তখন তাহাকে প্রাণে মারিয়া ফেলিবেন না, অন্য কোনও শাস্তি দিন।” তখন কালকেতুকে এক অন্ধকার ঘরে পাথর বুকে চাপাইয়া বন্ধ করিয়া রাখা হইল। কালকেতু কারাগারে পাষাণ বুকে লইয়া পড়িয়া [ ৬২ ]

কালকেতু
থাকিয়া ভগবতীর নাম স্মরণ করিয়া কাঁদিয়া বুক ভাসাইতে
লাগিল। তাহার কান্নায় ভগবতীর প্রাণ কাঁদিয়া উঠিল,
তিনি তাঁহার ভক্তের দুর্দশা আর সহ্য করিতে না পারিয়া,
কারাগারে গিয়া কালকেতুর বুকের পাথর নামাইয়া তাহার
বাঁধন খুলিয়া দিলেন। তাহারই জন্য কালকেতুর এমন
দুর্দশা দেখিয়া তিনি বড়ই দুঃখিত ও লজ্জিত লইয়া বলিলেন,
“কালকেতু, পশু বধ করার জন্য তােমার যে পাপ হইয়াছিল,
তাহার জন্যই এই শাস্তি ভােগ করিলে। আর তােমার
কোনও কষ্ট নাই। কাল প্রাতে উঠিয়াই রাজা তােমাকে
গুজরাটের রাজ-পাট দিয়া দেশে পাঠাইয়া দিবে। তুমি পুত্রের
মত প্রজা পালন করিয়া সুনিয়মে রাজ্য শাসন করিও।”
ভগবতীর কথায় কালকেতুর আর বিশ্বাস হইতেছিল
সে বলিল, “খুব হইয়াছে মা, আমি আর ধন দৌলত
রাজ্য-পাট কিছুই চাই না।
চাই না। আমাকে একটা ধনুক আর
গােটা কয়েক বাণ দাও, তাহা লইয়াই আমি আগের মত
মহাসুখে থাকিব, এসব জঞ্জালে আর আমার দরকার নাই।
আজ তুমি আমার বাঁধন ছাড়িয়া কৈলাশে চলিয়া যাইবে,
আর কাল সকালেই রাজা উঠিয়া আমায় খুলে দিবেন।”
দেবী বলিলেন, “না না কালকেতু, তােমার কোনাে
ভয় নাই, যে পর্যন্ত রাজা তােমাকে গুজরাটের রাজ-পাট
দিয়া ছাড়িয়া না দেয়, সে পর্যন্ত আমি কৈলাশে যাইৰ না।”
[ ৬৩ ]

কালকেতু
গভীর রাত্রিতে রাজা যখন ঘুমাইয়া আছেন, তখন
ভগবতী ভীষণ কালী মূর্তি ধরিয়া রাজার শিয়রে স্বপ্ন
দেখাইলেন,-“কালকেতু আমার ভক্ত, তুই তাহাকে এমন
করিয়া শাস্তি দিতেছি। তােকে মারিয়া আমি তাহাকে
কলিঙ্গের রাজা করিব। রাজা হইয়া তাের অভিমান হইয়াছে,
আমি তাের সে অভিমান চূর্ণ করিব, তাের স্ত্রী ফুল্লরার দাসী
হইবে। যদি ভাল চাস ত তাহাকে ছাড়িয়া দে।”
রাজা এই স্বপ্ন দেখিয়া ভােরে উঠিয়া ভয়ে
কপিতে কাঁপিতে গিয়া একেবারে কারাগারে উপস্থিত
হইলেন। কালকেতু রাজাকে দেখিয়া উঠিয়া দাঁড়াইতেই
তিনি তাহাকে ভাই বলিয়া কোলাকোলি করিয়া বুকের
ভিতর টানিয়া লইয়া বলিলেন, “ভাই, তুমি দেবী ভগবতীর
ভক্ত তাহা না জানিয়া তােমাকে কষ্ট দিয়াছি, আমাকে ক্ষমা
কর ভাই। এস আজ তােমায় গুজরাট রাজ্যে অভিষেক
করি, আজ হইতে তুমি গুজরাটের স্বাধীন রাজা।” এই
বলিয়া কলিঙ্গরাজ বহু হাতী ঘােড়া মণিমুক্তা হীরা জহরত
দিয়া কালকেতুকে গুজরাট রাজ্য ফিরাইয়া দিলেন।
কালকেতু মনের আনন্দে সিপাহী লস্কর সহ হাতীতে চড়িয়া
নিজের রাজ্যে চলিল।
গুজরাটে ফিরিয়া দেখিল, তাহার রাজ্যের যত সৈন্য
সামন্ত সব যুদ্ধ মরিয়া পড়িয়া রহিয়াছে, তাহাদের স্ত্রী
1 ৬৪ ]

Alojen

No text on this page.

কালকেতু পুত্র আত্মীয় স্বজন সকলেই হাহাকার করিয়া কাঁদিতেছে। সমস্ত রাজ্য মরণ-কান্নায় ভরিয়া উঠিয়াছে। যে সমস্ত স্ত্রী- লােকের স্বামী মরিয়াছে, তাহারা কালকেতুকে গাল দিতে দিতে মৃত স্বামীর সহমরণে চলিয়াছে। এই সব দেখিয়া শুনিয়া কালকেতুর বড়ই দুঃখ ও লজ্জা হইল। সে মনে মনে ভগবতীকে ডাকিতে লাগিল। ভগবতী স্বর্গ হইতে মন্ত্র- পড়া জল ছিটাইয়া দিলেন, অমনি যেখানে যত মানুষ, হাতী ঘােড়া যুদ্ধে মরিয়াছিল, সব বাঁচিয়া উঠিল। সারা রাজ্যময় একটা আনন্দের রােল পড়িয়া গেল। ফুল্লরা স্বামীকে দেখিয়া ছুটিয়া আসিয়া তাহাকে রাজপুরীর মধ্যে লইয়া গেল। রাজ্যময় কালকেতুর ধন্য ধন্য রব পড়িল। সব চেয়ে ভাঁড়দত্ত দেখিল, মহা মুস্কিল। এখন কলিঙ্গ ও গুজরাট দুই রাজ্যেই তাহার থাকা দায় হইল। তাহারই দুষ্ট বুদ্ধিতে এত অনর্থ ঘটিল, কাজেই দুই রাজ্যের রাজা প্রজা সকলেই তাহার উপর খাপ্পা হইয়া উঠিল। কলিঙ্গ-রাজের ক্রোধটাই তাহার উপর বেশী, কাজেই সে আর কলিঙ্গ দেশে যাইতে সাহস করিল না, কালকেতুর কাছে কাঁদিয়া কাটিয়া গুজরাটে থাকিতেই মনস্থ করিল। [ ৬৫ ] (৫)

কালকেতু
কালকেতুর ক্রোধের শান্তি করিবার জন্য ভাঁড় শাক, বেগুন,
কচু, মূলা, কুমড়া, কলা, ঘি, ময়দা, মাছ ইত্যাদি করিয়া মস্ত
বড় এক ভেট সাজাইয়া লইয়া গিয়া কালকেতুর সম্মুখে
রাখিয়া বলিল, “দেখ খুড়া, আমার কেমন বুদ্ধি! এই বুদ্ধির
জোরেই তুমি আজ গুজরাট রাজ্যের রাজা হইলে। এতদিন
চুপে চুপে রাজা ছিলে, কেহ জানিত না, এখন তােমার
নাম দেশময় ছড়াইয়া পড়িল, সকলে জানিল, হাঁ কালকেতু
বীরের মতন বীর বটে। কলিঙ্গের যে এত বড় রাজা সে
তােমাকে গুজরাটের রাজা বলিয়া স্বীকার করিল, এটা কি
আর কম ভাগ্যের কথা খুড়াে,-এ! লােকের একটা
খারাপ ধারণাই ছিল যে তুমি চুরি ডাকাতি করিয়া এত
টাকা করিয়াছ, কিন্তু এখন আমার বুদ্ধির জোরে বেটাদের
সব সে ভুল ভাঙ্গিয়া গেল, তাহারা সকলে জানিল যে, তুমি
দেবী ভগবতীর একজন অতি বড় ভক্ত, তাহার দয়ায় তুমি
এত ধন পাইয়াছ, আর তােমার এ রাজ্যও তাহার আশীর্বাদে।
তুমি যখন বন্দী হইলে, তখন দুঃখে আমার বুক ফাটিয়া যাইতে
লাগিল —শত হইলেও খুড়া ভাইপাে ত ? ভাগ্যে রাজা
আমার কথা ফেলতে পারে না, তাই বলিয়া কহিয়া কাঁদিয়া
কাটিয়া তােমাকে ছাড়িয়া দিবার হুকুম পাইলাম। আজ যে
আমার কত দূর আনন্দ হইয়াছে, তাহা আর তােমাকে কি
বলিব ?”
[ ৬৬ ]

কালকেতু
কালকেতু এই মিষ্টি কথায় ভুলিল না, বরং রাগে তাহার
আরও গা জ্বলিয়া যাইতে লাগিল। তাহার বুঝিতে বাকি
রহিল না যে ভাঁড়, দুমুখাে সাপ, তাহার এত যন্ত্রণা লাঞ্ছনা সবই
ভাড়ার জন্য। সে বলিল, “বেটা, ছােট মুখে বড় কথা, ভিক্ষার
অন্ন জুটিত না, হাটে হাটে মাগিয়া খাইতি, আমি ঠাই দিয়া ঘর
বাড়ী করিয়া দিয়াছিলাম, জমী, গরু ও ধান দিয়াছিলাম, শেষে
তুই-ই আমার এমন দুর্গতি করাইলি। এখনই বেটা আমার
রাজ্য হইতে বাহির হইয়া যা!”
ভাঁড় বলিল, “আমি ছােট হই বা বড় হই তাহাতে
তােমার কি ? টাকার জোরে বুঝি মানুষকে মানুষ বলিয়া
মনে কর না ? আমি কিছুতেই এ রাজ্য ছাড়িয়া যাইব না,
তুমি ত এই রাজ্যের নাম মাত্র রাজা, এ দেশের সময় রাজা
হচ্ছেন কলিঙ্গ-রাজ, আমি তাঁহার আদেশে এ দেশে বাস
করিতে আসিয়াছি, তাহাকে খাজনা দিয়া আমি এখানে বাস
করিব, তােমার কথায় রাজ্য ছাড়িয়া আমি যাইব না। তােমার
কি ধার আমি ধারি যে তুমি আমাকে দেশ ছাড়িয়া যাইতে
বল ?”
ভাড়ার কথা কালকেতুর আর সহ্য হইল না।
তাহার কোটালকে হুকুম করিল, “ভাঁড়ার মাথা মুড়াইয়া ঘােল
ঢালিয়া, দুই গালে চুণ কালি দিয়া সমস্ত নগরে ঘুরাইয়া দেশ
হইতে তাড়াইয়া দাও।” তখনই নাপিত ডাক, হইল। নাপিত
[ ৬৭ ]

কালকেতু
আসিয়া জলের বদলে ঘােড়ার মূতে ভীড়র মাথা ভিজাইয়া
একটা ভোতা ক্ষুরে চড়চড় করিয়া মাথা চাচিতে লাগিল।
তাহার মাথা কাটিয়া দর দর করিয়া রক্ত পড়িতে আরম্ভ
করিল। তাহার সমস্ত মাথা একেবারে নেড়ে করা হইল না,
পাঁচ যায়গায় পাঁচ এতটুকু চুল রাখিয়া দেওয়া হইল। শেষে
মাথায় ঘােল ঢালিয়া গালে চুণ কালি মাখিয়া গলায় জবা
ফুলের মালা দোলাইয়া কাড়া বাজাইতে বাজাইতে যখন
তাহাকে সারা সহরে ঘুরান হইল, তখন সব দুষ্ট ছেলেমেয়ের
দল হাততালি দিয়া হৈ হৈ করিতে করিতে তাহার পেছনে
পেছনে ছুটিল, কেহ গায়ে ধূলি ছুড়িয়া মারিল, কেহ কেহ থুথু
দিতেও ছাড়িল না।
ভাঁড়কে এই ভাবে অপমান করিয়া কালকেতুর মনে
একটু দয়া হইল, সে তাহাকে আবার ঘর বাড়ী, যায়গাজমী,
ধান গরু দিয়া সেই দেশেই থাকিতে হুকুম দিল।
কালকেতু মনের আনন্দে রাজ্য করিতে লাগিল।
প্রজারা রাম-রাজত্বের মত তাহার রাজ্যে পরম সুখে শান্তিতে
কাল কাটাইতে লাগিল। কালকেতুর যশে নামে মানে দেশ
ভরিয়া গেল। সে প্রতি মঙ্গলবারে মা মঙ্গলচণ্ডীর পূজা করে,
[ ৬৮ ]

এখন
কালকেতু
আর রাজ্যের সব প্রজাদিগকে পেট ভরিয়া প্রসাদ খাওয়ায়।
এমনি করিয়া কালকেতুর দিন কাটিতে লাগিল।
তাহাকে কেহ আর ব্যাধ বলিতে পারে না, দেবী:ভগবর্তীর বরে
সে একজন মস্ত বড় ক্ষমতাবান ধার্মিক রাজা। কিছুদিন
পরে তাহার পুষ্পকেতু নামে একটা ছেলে হইল। সে বড়
হইয়া রাজার ছেলের যত বিদ্যা জানা দরকার, তাহা সবই
শিখিয়া ফেলিল।
একদিন স্বর্গে ইন্দ্র মহাদেবের চরণ ধরিয়া কাঁদিয়া
বলিলেন, “দেব, আর কতকাল নীলাম্বরকে পৃথিবীতে
রাখিবেন ? আমরা যে আর তাহার শোক সহ্য করিতে
পারি না, ছেলে-বউ আমার কাছে না থাকায় এই স্বর্গরাজ্যের
রাজত্বও ভাল লাগে না। শচীদেবী তাহাদের শােকে দিনরাত
কাদিয়াই আকুল। তাহাদিগকে স্বর্গে লইয়া আসুন।
নীলাম্বর খেলায় খেলায় একটা অন্যায় কাজ করিয়া ফেলিয়াছে,
সেই জন্য তাহাদিগকে এমন কঠিন শাস্তি দেওয়া আপনার
মত ভােলা মহেশ্বরের ঠিক হয় না, তাহাদিগকে আপনি ক্ষমা
ইন্দ্রের কান্নায় মহাদেবও দুঃখিত হইলেন, বলিলেন,
“আর ভাবনা নাই দেবরাজ, তাহাদের শাপের সময় শেষ হইয়া
গিয়াছে। শীঘ্রই তাহারা স্বর্গে ফিরিয়া আসিবে।” তারপর
তিনি ভগবতীকে বলিলেন, “যাও পাৰ্বতি, নীলাম্বর আর
[ ৬৯ ]

কালকেতু
তার স্ত্রীকে স্বর্গে লইয়া আইস, তাহাদের পৃথিবীর কাজ শেষ
হইয়া গিয়াছে।
কালকেতু সোণার খাটে ফুলের বিছানায় শুইয়া রাত্রিতে
ঘুমাইতেছে। এমন সময় ভগবতী যাইয়া তাহার শিয়রে
বসিয়া তাহাকে স্বপ্ন দেখাইলেন, “বাছা কালকেতু, তুমি পূর্ব
জন্মে ইন্দ্রের পুত্র ছিলে, তােমার নাম ছিল নীলাম্বর, আর
তােমার স্ত্রী ফুল্লরার নাম ছিল ছায়াবতী। একদিন তুমি
ইন্দ্রের শিব পূজার ফুল তুলিতে পৃথিবীতে আসিয়া ধৰ্ম্মকেতু
ব্যাধকে দেখিয়া মনে মনে ভাবিয়াছিলে, ‘আহা ব্যাধেরা কত
সুখী, যদি ব্যাধ হইয়া জন্মিতাম, তাহা হইলে বড় সুখে
থাকিতাম। এদিকে ক্রমে বেলা বাড়িয়া গেল, তুমি তাড়া-
তাড়ি ফুল ও বেলপাতা তুলিয়া লইয়া চলিয়া গেলে। ফুলের
ভিতর কাঠ, পিঁপড়া আর বেলপাতার ভিতর বেলের কাঁটা
যখন ইন্দ্র সেই ফুল ও বেল পাতায় শিবের মাথায়
অঞ্জলি দিলেন, তখন সেই পিপড়ার কামড়ে ও কাঁটার ঘায়ে
শিব অস্থির হইয়া তােমাকে ব্যাধের ঘরে জন্ম লইবার জন্য
অভিশাপ দেন। তুমি সেই জন্য ব্যাধ হইয়া জন্মিয়াছ।
তােমার স্ত্রী ছায়াবতীও তােমার সহিত সহমরণে গিয়া ফুল্লরা
রূপে জন্ম নিয়াছে। এখন তােমাদের শাপের সময় শেষ
হইয়া গিয়াছে, তােমরা আমার সাথে স্বর্গে চল, কাল প্রাতেই
স্বর্গ হইতে তােমাদের জন্য রথ আসিবে।”
[ ৭০ ;
ছিল।

কালকেতু স্বপ্ন দেখিয়া কালকেতু প্রাতে উঠিয়া দূত পাঠাইয়া সমস্ত প্রজা ও পাত্র মিত্রদিগকে ডাকাইয়া পাঠাইল। কলিঙ্গ-রাজও আসিলেন। সকলের সম্মুখে কালকেতু তাহার পূর্ব জন্মের সমস্ত কথা বলিয়া বলিল, “এখন আমার ও ফুল্লরার স্বর্গে যাইবার সময় হইয়াছে, আজই আমরা স্বর্গে চলিয়া যাইব। পুষ্পকেতু পৃথিবীতে থাকিয়া রাজত্ব করিবে। তােমরা আমাকে যেমন ভালবাসিতে পুষ্পকেতুকেও তেমনি বাসিও। আর তােমরা দেবী ভগবতীর পূজা করিও, দুর্গা পূজা করিলে মানুষের সমস্ত দুর্গতি দূর হয়, মানুষ সুখে থাকে।” কাল- কেতুর কথা শুনিয়া গুজরাটের ঘরে ঘরে কান্নার শব্দ উঠিল, তাহাদের এমন ভাল রাজরাণী তাহাদিগকে ছাড়িয়া আজ চলিয়া যাইতেছে। দেখিতে দেখিতে স্বর্গের রথ আসিয়া উপস্থিত হইল। ইন্দ্রের রথ, মাতলি সে রথের সারথি। কালকেতু ও ফুল্লরা রথে চড়িয়া বসিল। রথ তাহাদিগকে লইয়া বাতাসের মত বেগে স্বর্গের পথে ছুটিয়া চলিল। প্রজারা সকল চোখের জলে বুক ভাসাইয়া উপরের দিকে চাহিয়া রহিল। কালকেতু যাইতে যাইতে মাতলিকে বাপমায়ের কথা, স্বর্গের কথা, শিবপূজার কথা, সমস্ত কথাই একে একে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিল। বহুদিন পরে সে আবার বাপমায়ের দেখা পাইবে এই আনন্দে তাহার প্রাণ ভরিয়া গেল। [ ৭১ ]

কালকেতু
রথ স্বর্গের গঙ্গা মন্দাকিনীর তীরে যাইয়া পেীছিলে
কালকেতু ও ফুল্লরা সেই নদীতে স্নান করিয়া পবিত্র হইয়া
আবার সেই দেবতাদের মত সুন্দর শরীর ধরিল। এখন
তঁাহারা আর কালকেতু ও ফুল্লরা নহেন, তাহারা এখন
নীলাম্বর ও ছায়াবতী। সেখান হইতে রথ আবার তাহাদিগকে
লইয়া যাত্রা করিল। তাহারা যাইয়া ইন্দ্রপুরীতে পেীছিলে
ইন্দ্র ও শচীদেবী ছুটিয়া আসিয়া তাহাদিগকে কোলে তুলিয়া
লইলেন, আনন্দের অশ্রুতে তাঁহাদের বুক ভাসিয়া গেল।
নীলাম্বর ও ছায়াবতী গুরুজনদিগের পায়ের ধূলা লইলেন।
স্বর্গরাজ্যে আবার নৃত্যগীত আনন্দ উৎসবের ঢেউ বহিল।
vi
[ ৭২ 1

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kalketu

Author
Dutta,chandrakant
Title
Kalketu
File name
Kalketu
Text
OCR done
Citation
1923
Published
2010/02/9
Publisher
Ashutosh Dhar, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
92
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Essay
Keywords
Dutta,Chandrakant
DLI number
511147
Barcode
4990010018321.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
StLhNH7MaYG
Download PDF

Kalketu