Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Amar Byabsa Jeeban Ed.1st

Sadhu, Binod Bihari, Ray Saheb · 2010/01/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

আমার ব্যবসা জীবন
প্রথম সংস্করণ, ১৩৩৯।
রায় সাহেব বিনােদ বিহারী সাধু
প্রণীত।
[ সৰ্ব্ব-স্বত্ব-সংরক্ষিত ]
১০-২-৩৩১০ ••

প্রকাশক
বিজয়চন্দ্র দাশ বি, এল, সাহিত্য-ভূষণ,
উল্টাডাঙ্গা রােড, কলিকাতা।
ওরিএন্টাল প্রিন্টিং ওয়ার্কস।
১৮ নং বৃন্দাবন বসাক স্ট্রীট, কলিকাতা
হইতে -
গােষ্ঠবিহারী দে দ্বারা মুদ্রিত।

উৎসর্গ পত্র। আমি একজন নাতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আমরা জাতিগত ও বংশগত ব্যবসায়ী থাকায় আবাল্য ব্যবসায় বুদ্ধির মধ্য দিয়া শিক্ষা দীক্ষা প্রাপ্ত হইয়া আসি- য়াছি এবং নানাপ্রকার অন্তর্বাণিজ্য করিয়াছি কিন্তু কোনটীতেই সাফল্যমণ্ডিত হইতে পারি নাই। শেষে, যাহার আদেশ ও উপদেশ শিরােধার্য্য করিয়া ব্যবসায়ে সাফল্য লাভ করিয়াছি, সেই জগত- বরেণ্য, খুলনার গৌরবরবি, আচাৰ্য্য সার প্রফুল্লচন্দ্রের করকমলে আমার ভক্তি অর্ঘ্যস্বরূপ এই ব্যবসা-জীবন” পুস্তক উৎসর্গীকৃত হইল। • c গ্রন্থকারস্য ।

No text on this page.

৪
রায় সাহেব বিনােদবিহারী সাধু
( গ্রন্থকার )

No text on this page.

নিবেদন। আমার এই ব্যবসা-জীবন” পড়িয়া পাঠকগণ প্রত্যেকেই অন্তরে বিভিন্ন কল্পনা করিবেন সন্দেহ নাই, কিন্তু আমি কোন্ উদ্দেশ্যের বশবর্তী হইয়া ইহা লিখিয়াছি তাহাই বলিতেছি :- মানুষ ব্যতীত প্রত্যেক ইতর প্রাণী যথা—পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ প্রভৃতি সহজাত সংস্কারের দ্বারা তাহাদের জীবিকা অর্জন করিলেও বিশেষ অনুধাবন করিয়া দেখিলে দেখা যায় অনেক পশু পক্ষী নিজ নিজ সন্তানকে কি ভাবে শীকার করিতে হয় তাহা শিক্ষা দেয়। সেইরূপ মানুষ সংসার-সংগ্রামে যে, যে বিষয় দ্বারা সাফল্য অর্জন করে তাহার ভাবী বংশধরদের মধ্যে সকলকে না হউক, কতক- গুলিকে, অন্ততঃ একজনকেও সেই পদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া যাইতে চায় ; এই জন্য প্রায়ই দেখা যায় লব্ধপ্রতিষ্ঠ ডাক্তার, উকিল, ইজিনিয়ার, প্রফেসৰু ইহাদের ছেলে- দিগকে, যে যে বৃত্তি দ্বারা উন্নীত তাহার পরপুরুষের মধ্যে তদনুরূপ প্রতিভাবান্ না হইলেও সেই স্থানে সমাসীন হইবার জন্য কেহ না কেহ প্রস্তুত হয়।

•
০
আমরা জাতিগত ব্যবসায়ী হইলেও যে সমস্ত ঘাত
প্রতিঘাতের মধ্য দিয়া আমার প্রতিষ্ঠিত এই ব্যবসায়ী এই
স্তরে দাড়াইয়াছে, তাহা আমার ভাবী বংশধরদিগকে
জানাইবার জন্য সমস্ত খুঁটিনাটি করিয়া লিখিতে ইহা
একখানা পুস্তকাকারে দাড়াইয়াছে। তাহা ছাড়া আমার
বংশধরগণ এই ব্যবসায়-জীবন আলােচনা করিলে ছােট বড়
এমন অনেক বিষয় শিখিতে পারিবে, যাহা তাহাদের হয়ত
কোন দিন Practical field (কর্মক্ষেত্রে) এ যাইয়া
শিখিবার প্রয়ােজন হইবে না।
এমন যেন কেহ মনে না করেন যে, আমি ব্যবসায়
সাফল্য মণ্ডিত বলিয়া, আমি একজন ব্যবসায় ক্ষেত্রের
উপদেষ্টা—এরূপ অহঙ্কার আমি কোন দিন অন্তরে স্থান
দেই না, যে হেতু আমার নিজের জীবনে এমন অনেক
দেখিয়াছি যে, একই সময়ে আজন্ম ব্যবসায়ী, বিশেষ
শিক্ষিত, লব্ধপ্রতিষ্ঠ পুরাতন ব্যবসায়ীও ফেল মারিয়া
“লাল বাতি জ্বালিয়া বসে, আবার অশিক্ষিত অল্পদিনের
ব্যবসায়ীও সেই ব্যবসায়ে সফলতা অর্জন করে। এই সমস্ত
দেখিয়া শুনিয়া আমি একজন ঘাের অদৃষ্টবাদী হইয়া
পড়িয়াছি। এই পুস্তকের পরিশিষ্টে তাহা বিস্তারিতভাবে
লিখিয়াছি।
* *

এই পুস্তকখানা বিক্রয় করিবার উদ্দেশ্যে লেখা হয়
নাই। নিজের ভাবী বংশধরদিগকে শিক্ষা দেওয়া, বন্ধু-
বান্ধব, স্বজাতি, সমব্যবসায়ী, প্রতিবেশী, বাল্যবন্ধু, সহপাঠী-
দিগকে উপহার দেওয়াই ইহার উদ্দেশ্য। আর যদি কোন
স্কুল-লাইব্রেরীতে, ছাত্রদিগের অধ্যয়নের জন্য চাহিয়া
পাঠান, তাহা হইলেও ঐ ভাবে বিতরিত হইবে। আমার
এই ব্যবসায়-জীবন’ পাঠে কেহ আংশিক মাত্রও সফলতা
অর্জন করিতে পারিলেও আমার শ্রমকে সার্থক জ্ঞান
করিব। ইতি-
কপিলমুনি পাের,
খুলনা।
১৫ই মাঘ, ১৩৩৯।
শ্রীবিননাদ বিহারী সাধু।

No text on this page.

ভূমিকা জানি না, কবে কোন্ যুগে কৰ্ম্মশৃঙ্খলার জন্য বিভিন্ন বর্ণের লােকদিগের বিভিন্ন কর্ম-পদ্ধতি নির্দিষ্ট হইয়া হিন্দুর সামাজিক জীবন গড়িয়া উঠিয়াছিল—একই আৰ্য ভ্রাতৃগণ বিভিন্ন কর্মে প্রবৃত্ত হইয়া সেই সকল কর্মে বংশ-পরম্পরায় সহজাত সংস্কারগুণে অভিজ্ঞতা ও বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করতঃ হিন্দুগণ স্বতন্ত্রভাবে সেই সেই কৰ্ম্ম করিতে থাকায় হিন্দুসমাজে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র এই চারি বর্ণের উদ্ভব হইয়া হিন্দুর সামাজিক উন্নতির পথ কুসুমাস্তৃত করিয়া দিয়াছিল এবং এই বর্ণ বিভাগ ও কৰ্ম্ম-বিভাগ দ্বারা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের হস্তে বিভিন্ন কর্ম ও বৃত্তি নির্দিষ্ট হওয়ায় ভারতবর্ষীয়গণ প্রাচীনকালে শিল্প, বাণিজ্য, দর্শন, গণিত, রাজনীতি প্রভৃতিতে অসাধারণ উন্নতি লাভ করিয়া অন্যান্য দেশবাসীর বিস্ময় উৎপাদন করতঃ তাহাদের শ্রদ্ধা ও আন্তরিক সহানুভূতি লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিল। কালক্রমে সে বর্ণ বিভাগ থাকিলেও সে কৰ্ম্ম-বিভাগ এখন আর ব্রাহ্মণেরা এক্ষণে শূদ্রের করণীয় দাসত্ব বৃত্তি করিতেছে শূদ্রের। ব্রাহ্মণপাচিত ক্রিয়াকলাপের অনুষ্ঠান করিতেছে। বর্ণ বিশেষের এবম্প্রকার বৃত্তির পরিবর্তন হইলেও আমাদের বৈশ্যতেলী সম্প্রদায়ের কিন্তু বৃত্তি পরিবর্তনে আজিও বিশেষ কোন পরিবর্তন • ১৯-Me ...। ** ** *১৪# **** ০ দেখা যায় নাই। বৈশ্যের বৃত্তি বাণিজ্য, কৃষি, পশুপালন হইলেও আমাদের স্বজাতীয় ভ্রাতৃগণ অধিকাংশ স্থলে ব্যবসায় বাণিজ্য করিয়া আজিও সেই অতীত বর্ণস্মৃতির মর্যাদা রক্ষা করিয়া আসিতেছেন। আমাদের সমাজে গবর্ণমেন্টের চাকুরীজীবী বড় একটা নাই। শুধু যে শিক্ষা দীক্ষায় পশ্চাৎপদ বলিয়া আমাদের জাতির ভিতরে উচ্চ গবর্ণমেন্টের চাকুরিয়া নাই, তাহা নহে;-আমাদের বৈশ্যতেলী জাতি চাকুরী করাটাকেই যেন অত্যন্ত ঘৃণাজনক বলিয়া বিবেচনা করেন। তাই অনেক স্থলে দেখিতে পাওয়া যায়—আমাদের জাতির ভিতর অনেকে বি-এ, এ-এ, পাশ করিয়াও স্বাধীন ব্যবসায় অবলম্বন করিয়া জাতীয় গৌরবের পরিচয় দিতেছেন। বুদ্ধিহিসাবে বাঙ্গালী ভারতের এক শ্রেষ্ঠ জাতি হইলেও ব্যবসায়ের বাজারে বাঙ্গালীর সুনাম নাই। বুদ্ধির তীক্ষ্ণতায় ভারতীয় জাতি সকলের মধ্যে বাঙ্গালী সৰ্বশ্রেষ্ঠ—এ কথা সৰ্ববাদী-সম্মত। বাঙ্গালী আপনার তীক্ষ্ণবুদ্ধির অনুশীলন দ্বারা ভারতীয় সাহিত্য, বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন ও রাজনীতি ভাণ্ডারে যে সকল অমূল্য অবদান দান করিয়া আসিয়াছে এবং বর্তমান সময়ে দান করিতেছে-ভারত- বাসী চিরদিনই তজ্জন্য বাঙ্গালীকে শ্রদ্ধার পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করিবে। এ হেন তীক্ষ্ণবুদ্ধিশালী বাঙ্গালী ব্যবসায়ে কেন পশ্চাৎপদ কেমন করিয়া ব্যবসায় আরম্ভ করিয়া বাঙ্গালী দু’দিন পরে ব্যবসায়ে ফেল মারিয়া দেউলিয়া হইয়া বসে—সে সম্বন্ধে গভীর গবেষণা কিংবা তৎসম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করিবার ধৃষ্টতা আমার নাই। তবে আমার জাতিগত বৃত্তি ব্যবসায় বলিয়া ব্যবসায় সম্বন্ধে বলিবার আমার কিছু অধিকার আছে এবং ব্যবসায়ে সাফল্য লাভ করিতে হইলে কেমন করিয়া ধীরে ধীরে কত বাধা বিঘ্ন কাটাইয়া কৃতকাৰ্য্যতা লাভ করিতে পারা যায়—আমার এই ব্যবসায় জীবনেব ৩৫ বৎসরের অভিজ্ঞতা লইয়া আমার ব্যবসা জীবন সম্বন্ধে সংক্ষেপে পাঠকবর্গের নিকট দুই চারি কথা বলিব। যদি কেহ উহা পাঠ করিয়া ব্যবসায়ের সংশয়কুহেলিচ্ছন্ন পিচ্ছিল পথে সামান্য আলােক বর্তিকাও দেখিতে পান-তাহা হইলে আমার এই ক্ষুদ্র ব্যবসায় জীবন লিখিতে লেখনী ধারণ করা সার্থক হইয়াছে বলিয়া মনে করিব। আজকাল বাঙ্গালীর জীবনসংগ্রাম দিন দিন কঠোর হইতে কঠোরতর হইয়া উঠিতেছে- চারিদিকে ব্যবসায় কর-ব্যবসায় কর” রব উঠিয়াছে—আর বাস্তবিকও, অন্ন-সমস্যার সমাধান করিতে হইলে বাঙ্গালীকে বর্তমানে কৃষি ও বাণিজ্য ভিন্ন আর অন্য কোন পথ অবলম্বন করিলে চলিবে না। তাই, যুগােপযােগী বিবেচনায় সাহসে ভর করিয়া আমার ব্যবসায় জীবনের একটা সংক্ষিপ্ত ইতিহাস পাঠকবর্গের নিকট উপস্থিত করিলাম। আশা করি, সহৃদয় পাঠকবর্গের নিকট বর্তমান সময়ে আমার ব্যবসায় জীবনের ক্ষুদ্র প্রসঙ্গ নিতান্ত অরুচিকর হবে না। সুধী পাঠকবর্গ আমার এ ক্ষুদ্র প্রসঙ্গের ভিতর নীরটুকু বাদ দিয়া ক্ষীরটুকু (যদি কিছু থাকে) গ্রহণ করিলে বাধিত হইব এবং ইহা পাঠ করিয়া যদি কেহ ব্যবসায়ে আমার ব্যবসায় জীবনের অনুকরণ করিয়া সাফল্য লাভ করিতে পারেন—তাহা হইলে, আমার প্রবন্ধ লেখনের পরিশ্রম সফল হইয়াছে বলিয়া বিবেচনা করিব। ইউনিভারসিটির ডিগ্রীধারী উচ্চ শিক্ষিতগণ মনে করেন যে ব্যবসায়ে বিশেষ কোন শিক্ষার প্রয়ােজন নাই। • আনার জিনিষ কিনিয়া ॥ আট আনায় বেচিব—কিংবা ১১ টাকার জিনিষ কিনিয়া ১• পাঁচ সিকি বিক্রয় করিব—ইহাতে এমন শিক্ষার আর কি আছে? কিন্তু ইহা তাহাদের মস্ত ভূল। সকল কাজ করিতে গেলে শিক্ষা আবশ্যক—আর ধনােপার্জনের শ্রেষ্ঠ পন্থা ব্যবসায় করিতে গেলে শিক্ষার কোন আবশ্যকতা নাই-ইহা কি কখনও সম্ভব হইতে পারে? যে ওকালতী ব্যবসায় করিবে—ABC. হইতে আরম্ভ করিয়া ১৫|১৬ বৎসর তাহার পড়াশুনা করিয়া ইহা শিখিতে হয়—যে ডাক্তারী করে-তাহারও আই-এ-সি,- বি-এসি, পাশ করিয়া ৬ বৎসর কাল ডাক্তারী অধ্যয়ন করিতে হয়—আর অর্থোপার্জনের শ্রেষ্ঠ শরণি ব্যবসায় করিতে হইলে বিনা শিক্ষায় কাজ আরম্ভ করিতে পারা যায়-ইহা শিক্ষিত যুবকদের একটা ভুল ধারণা এবং সেই জন্যই দেখা যায়—ব্যবসায় সম্বন্ধে কোন প্রকার শিক্ষা লাভ না করিয়া অনেক শিক্ষিত যুবক বেশী মূলধন লইয়া বড় ব্যবসায় করিতে যাইয়া দু’ দিনেই ব্যবসায়ে অকৃত- কায্য হয়। আমার মতে এবং আমার ব্যবসায় জীবনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ফলে যাহা বুঝিয়াছি—তাহাতে এই বলিতে চাই- যেমন লেখাপড়া শিখিতে হইলে প্রথমে হাতে খড়ি-তারপর শিক্ষায় অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে বৎসরে বৎসরে Class promotion হয়-ব্যবসায় শিক্ষা করিতে হইলেও প্রথমে অতি ক্ষুদ্রভাবে ব্যবসায় আরম্ভ করিয়া—step by step করিয়া (ধাপে ধাপে ) উহাতে promotion লাভ করিতে হয়—নতুবা প্রথম হইতে বড় স্কেলে ব্যবসায় করিতে গেলে তাহার ব্যবসায় তাসের ঘরের ন্যায় অচিরাৎ ধূলিসাৎ হইয়া পড়ে। মােটে লেখাপড়া না শিখিয়া যেমন একদিনে 1/০ । বল - wি there 4 ; । * বি-এ, পাশ করা চলে না—সেইরূপ বড় স্কেলে ব্যবসায় খুলিয়া অর্থাগমের বাসনা থাকিলে একদিনে তাহা কার্যে পরিণত করা চলে না। তজ্জন্য ২৪ বৎসর তাহাকে শিক্ষা লাভ করিতে হয়। ব্যবসায় ক্ষেত্রে বাঙ্গালী অনেক পশ্চাৎপদ যে কেন—উপযুক্ত কারণ ছাড়া তাহার আরও অনেক গৌণ কারণ আছে। তাহার কারণ, বাঙ্গালী অমিতব্যয়ী-বাঙ্গালী বিলাসী, বাঙ্গালী আলস্য ও আয়াস-প্রিয়-বাঙ্গালী পরমুখাপেক্ষী ; কিন্তু এই যে বাঙ্গালী আলস্য ও আয়াসপ্রিয়, চিরদিন কিন্তু বাঙ্গালী এমন ছিল না। ইংরাজ রাজত্বের প্রথম আমল পর্যন্ত বাঙ্গালী পরিশ্রমী ও বাণিজ্য-প্রিয় ছিল। ইংরাজ রাজত্বের প্রথমে ইংরাজ-রাজত্ব পরিচালনা করিবার জন্য কতকগুলি কেরাণী তৈয়ারী করিবার প্রয়ােজন হইয়াছিল। সামান্য লেখাপড়া শিখিয়া তখন ইংরাজ বণিকের অধীনে অল্প পরিশ্রমে মােটা মােটা চাকুরী পাওয়া যায়—এই লােভে বাঙ্গালী জীবন পণ করিয়া ইংরাজী শিক্ষায় আত্মসমর্পণ করিয়াছিল। বাঙ্গালীর মস্তিষ্ক অতিশয় উৰ্বর ও বুদ্ধি অতিশয় তীক্ষ্ণ ছিল বলিয়া ভারতীয় অন্যান্য জাতিদিগকে পশ্চাতে ফেলিয়া তাহারা ইংরাজী শিক্ষায় সমধিক অগ্রসর হইয়া উঠিয়া ইংরাজের কেরাণী গিরি প্রায় একচেটিয়া করিয়া আত্মপ্রসাদ অনুভব করিতে লাগিল। ইহাই বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনে পতনের মূল কারণ হইল । বাংলার ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য,এই তিনটা জাতিই ইংরাজের গ্লোলামী কাৰ্য্যে অধিক সংখ্যায় যােগদান করিয়া নিজেদের স্বার্থের জুগ্ন সমগ্র বাংলার ক্ষতি করিয়া স্বাধীন ব্যবসায় বৃত্তি অপেক্ষা স্ব-বৃত্তি চাকুরীর মহিমা ও সম্মান প্রচার করিয়াছিল। তাহার ফল এই দাড়াইয়াছিল যে বাংলার নবশাখ ও অন্যান্য ব্যবসায়ী জাতি দিগেরও এই চাকুরীর দ্বারা স্বল্পায়াসে অর্থোপার্জন ও তৎসঙ্গে সম্মান লাভ করিবার বাসনা অন্তরে জাগরিত হইয়া তাহাদিগকে ব্যবসায়-বিমুখ করিয়া স্ব-বৃতি-পরায়ণ করিয়া তুলিয়াছিল; কারণ, তাহারা চাকুরী- জীবী হইয়া আত্মশ্লাঘা লাভ করতঃ তথাকথিত নিম্নশ্রেণীকে ঘৃণার চক্ষে দেখিত, কিন্তু তাহারা যাহাদের চাকুরী করিত, তাহারা অর্থাৎ সেই ইংরাজেরা কোনদিন জাতিগত বৈষম্য দৃষ্টে চাকুরী দান করে নাই। যােগ্যতা অনুসারেই তাহারা জাতিবর্ণ-নির্বিশেষে সকলকে চাকুরী দিয়াছে। তাহার ফলে যাহারা চিরদিন জাতিগত ব্যবসায়ী ছিল, তাহাদের অনেকেই পৈত্রিক বৃত্তি ত্যাগ করিয়া সম্মান লাভের আশায় উচ্চ ইংরাজী লেখাপড়া শিখিয়া বর্তমানে তাহাদের পৈত্রিক বৃত্তিও ভুলিয়া গিয়াছে, এবং প্রতিযােগিতার বাজারে চাকুরী অভাবে বাঙ্গালী জাতিকে ধ্বংস পথের পথিক করিয়া তুলিয়াছে। আর তার ফলেই, স্ব-বৃত্তি-পরায়ণ বাঙ্গালী জাতি বাংলায় আজ যে দারুণ অন্ন সমস্যার সৃষ্টি করিয়াছে, তাহার জন্য দায়ী কে—তাহার কারণ অনুসন্ধান করিতে গেলে বাংলার ঐ তিন উচ্চ জাতিকেই দায়ী করিতে হয়। সত্যের খাতিরে আজ আমাকে এই কথা বলিতে হইল—আমি কোন জাতি-বিদ্বেষ-পরায়ণ হইয়া এ কথা বলিতেছি, এমন যেন কেহ মনে না করেন। আর দুঃখের কথা বলিতে কি, যাহারা গােলাম,-যাহারা গােলামীর জন্য সর্বদা লালায়িত, তাহারাই যে দেশে ভদ্র বলিয়া সম্মান পায়, আর যাহারা স্বাধীন বৃত্তি ব্যবসায় প্রভৃতি দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করে, 4।

৮। শেষ । We we - - তাহারা যে দেশে অভদ্র ও অস্পৃশ্য আখ্যায় আখ্যায়িত হইয়া মনােবেদনায় কাল যাপন করে,-এমন হতভাগ্য দেশ সারা পৃথিবীর মধ্যে এক বাংলা দেশ ছাড়া আর কোথাও নাই। এ দেশের যদি অধঃপতন না হইবে,-অ-বাঙ্গালীরা আসিয়া এ দেশে বাণিজ্য করিয়া বাঙ্গালীর মুখের গ্রাস যদি কাড়িয়া না লইবে—তবে আর কোন্ দেশের লইবে? বাঙ্গালীর ব্যবসায় বিমুখতার আরও একটা কারণ এই যে চিরস্থায়ী জমিদারী বন্দবস্ত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে খাজনা বা রাজস্ব চিরকালের জন্য নির্দিষ্ট হইয়া যাওয়ায় ভূমির উৎকর্ষ সাধন করিতে পারিলে জমিদারীর আয় বৃদ্ধি হইবে, অথচ খাজনা যাহা নির্দিষ্ট আছে তাহার অধিক গবর্ণমেন্টে দাবী করিতে পারিবে না—এই প্রলােভনে পড়িয়া বাঙ্গলার ধনকুবেরগণ তাহাদের যাবতীয় অর্থ ই জমিদারী কিনিতে নিঃশেষ করিয়া ফেলিয়াছিল, কিন্তু মান্দ্রাজ, বােম্বাই প্রভৃতি অঞ্চলে ও ভারতের অন্যান্য স্থলে চিরস্থায়ী বন্দবস্ত প্রবর্তিত না হওয়ায় তথাকার লােকগণ তাহাদের সঞ্চিত অর্থ জমিদারী কিনিতে ব্যয় না করিয়া ব্যবসায়ে খাটাইয়া বড় বড় ধনী ও ব্যবসায়-প্রবণ জাতি হইয়া পড়িয়াছে। চাকুরীর মােহে পড়িয়া বাঙ্গালী আলস্য-পরায়ণ ও বিলাসী হইয়াছে। বাঙ্গালী আয় বুঝিয়া ব্যয় করিতে জানে না। যাহার ২° টাকা মাসিক আয়—সে ৪০ টাকা ব্যয় করে। শারীরিক কঠোর পরিশ্রম করিতে বাঙ্গালী একেবারেই নারাজ। শারীরিক পরিশ্রম করাকে অনেকে হেয় কাজ বলিয়া মনে করে-তাই শ্রম- বিমুখ বিলাসী বাবু বাঙ্গালী ব্যবসায়ে ভারতের সকল জাতির আজ ## Wই। 't ' *** *#*#s a + + " কল করুন *। ver য ********** পশ্চাতে পড়িয়া রহিয়াছে। তাই আজ দেখিতে পাই—ভারতের সৰ্বশ্রেষ্ঠ বাণিজ্যকেন্দ্র বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত কলিকাতা সহরে বাঙ্গালী ব্যবসায়ী শতকরা ৬ জন মাত্র এবং অ-বাঙ্গালী শতকরা ৯৪ জন। এই সকল অ-বাঙ্গালীরা বাংলায় আসিয়া-লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এই সােণার বাংলা দেশ হইতে দু’হাতে বাংলার ধন- সম্পদ লুটিয়া লইতেছে—আর বাঙ্গালী বাবুরা চাকুরী করিবার আশায়—তাহাদেরই আফিসে আফিসে ধন্না দিয়া হা-অন্ন হা-অন্ন করিয়া কাঁদিয়া বেড়াইতেছে। ইহা বাস্তবিকই নিতান্ত পরিতাপের বিষয়, সন্দেহ নাই। কবে, বাঙ্গালীর চোখ ফুটিবে [-কবে বিলাসী বাবু বাঙ্গালী মােহ-নিদ্রা হইতে জাগরিত হইয়া শ্রমের মর্যাদা বুঝিয়া দলে দলে ব্যবসায় ক্ষেত্রে নামিয়া বাংলার দারিদ্রের দুর্ণাম ঘুচাইবে—বাঙ্গালীর ব্যবসায় বিমুখতা অপবাদ দূর করিবে—তা’ ভগবানই জানেন।

গৌরচন্দ্রিকায় অনেক বেশী বলিয়া ফেলিয়াছি। পাঠকবর্গের ধৈৰ্য্যচ্যুতির ভয়ে অধিক কিছু আর না বলিয়া এইবার আমার ব্যবসায় জীবন সম্বন্ধে বলিতে আরম্ভ করিব। আমার ব্যবসায় জীবন সম্বন্ধে মােটামুটী দুইভাগে ভাগ করা যায় -(ক) পল্লীজীবন (খ) সহর জীবন। প্রথমে পল্লীজীবনের কথাই বলি। খুলনা জেলার অন্তর্গত কপােতাক্ষী নদীর তীরে কপিলমুনি গ্রামে আমার জন্মস্থান। কবে কোন্ যুগে মহামুনি কপিল সুন্দর- বনের এই নিভৃততম অংশে আসিয়া আপন সাধনার স্থান নির্দেশ করিয়া এই কপিলমুনি গ্রাম প্রতিষ্ঠা করেন--তারপর, ইহার উপর দিয়া কত পরিবর্তন বিপ্লব সংঘটিত হইয়া ইহার এই বর্তমান অবস্থার উদ্ভব হইয়াছে-সে সকল কথা প্রত্নতাত্ত্বিক ও ইতিহাস- সেবীগণ আললাচনা করিবেন—সতীশ বাবুর যশােহর-খুলনার ইতিহাসেও এ সম্বন্ধে যথেষ্ট আলােচিত হইয়াছে-ইতিহাস-সেবী মাত্রই তাহা অবগত আছেন। বর্তমান প্রসঙ্গে সে সকল বিষয় আমার আলােচ্য নহে। কপিলমুনি একটী নাতিক্ষুদ্র বাণিজ্যকেন্দ্র। আমার স্বর্গীয় পিতৃদেব যাদবচন্দ্র সাধু এই কপিলমুনিতে দোকানদারী করিতেন। আমাদের কপিলমুনির দোকান খুব বড়ই ছিল—দোকানে মুদিখানা, কাটা কাপড়, ষ্টেশনারী, সােণারূপা সমস্তই বিক্রয় হইত। এক কথায়, জুতা ও চামড়ার জিনিষ ছাড়।

২ আমার ব্যবসা জীবন নিত্য ব্যবহাৰ্য্য সমস্ত জিনিষই আমাদের দোকানে বিক্রয় হইত। নিত্য প্রয়ােজনীয় যাবতীয় দ্রব্যের সমাবেশে আমাদের দোকান গৃহ সৰ্ব্বদা পূর্ণ থাকিত। আবার তেমনি কলিকাতা রপ্তানী করার জন্য দেশ হইতে পাট, ধান, চাউল, হলুদ ইত্যাদি বহুবিধ আমদানী মাল বহু পরিমাণে খরিদ হইত, এই খরিদ বিক্ৰীয় সমষ্টি বৎসরের শেষে কাগজ ঠিক দিলে প্রায় ৬ লক্ষ টাকা কোন কোন বৎসরে দাড়াইত। তখন আমি পাঠশালায় পড়িতাম। সেই পাঠ্যাবস্থায় ১৩০৩ সালে স্বর্গীয় পিতৃদেবের নিকট আমার ব্যবসায় জীবনে প্রথম হাতে খড়ি হয়। তিনিই আমার ব্যবসায় জীবনের আদিগুরু। যদিও আমাদের দোকানে কারবার খুব বড়ই ছিল-তবু তাহার ধারণা ছিল—প্রথম হইতে ছোেট করিয়া আরম্ভ না করিলে কখনও বড় করিয়া ব্যবসায় করা যায় না। তাই তিনি নিয়ম করিয়া দিয়াছিলেন—রবিবার ও বৃহস্পতিবারে হাটে, ট’ বাজারের মধ্যে বসিয়া খুচরা এক এক টেমী করিয়া কেরাসিন তৈল বিক্রয় করিতে হইবে। আমাদের দোকানে শত শত টীন কেরাসিন পাইকারী বিক্রয় হইত,—তা স্বত্ত্বেও আমার ব্যবসায় জীবনের ভিত্তি দৃঢ়ীভূত করিবার জন্য তিনি আমাকে ঐরূপ ছােট কাজ হইতে ব্যবসায়ে অভিজ্ঞতা লাভের জন্য খুচরা এক এক টেমী তেল বিক্রয় করিবার কাজে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। এবং যখন ঐরূপ ভাবে খুচরা বিক্রয় করিয়া এক এক টীন কেরাসিন বিক্রয় করিয়া ফেলিম--তখন তিনি আমাকে ব্যবসায় কাৰ্যে উৎসাহ দিবার নিমিত্ত টীনের দাম পাইকারী হিসাবে আমার নিকট হইতে লইয়া উদ্বৃত্ত পয়সা জল- খাবার খাইবার জন্য আমাকে দিতেন। আমি হাটবারের পরদিন আমার ব্যবসা জীবন সেই পয়সা লইয়া মহাননে আমার অন্যান্য সহপাঠীদের সহিত মিলিয়া খাবার কিনিয়া খাইতাম। এইরূপ ভাবে প্রলােভন দিয়া বানরকে অহিফেন সেবনে বশীভূত করার ন্যায় শৈশবকাল হইতেই ব্যবসায় কাৰ্য্যে আমার নেশা ধরাইয়া দিতেছিলেন। ২৪ হাট টেমী ও কেরাসিন বেচিবার পর আমার স্বতঃই যেন মনে হইল—টেমী বেচিবার সময় কিছু ন্যাড়া কাছে রাখিলেই ভাল হয়। অনেকে হাটে টেমী ও তেল কেনে—কিন্তু পলিতা অভাবে টেমী হাট হইতে জালিয়া লইয়া বাটী যাইতে পারে না। এই মনে করিয়া, পরবর্তী হাট হইতে আমি বাটী হইতে কিছু ন্যাড়া সংগ্রহ করিয়া তৈল বেচিবার সময় তাহা কাছে রাখিয়া দিতাম—খরিদ্দার- গণের আবশ্যকমত তাহা বিনামূল্যে খরিদ্দারগণকে দিতাম। যখন আমার নিকট টেমী কিনিবার সঙ্গে সঙ্গে পলিতা করিবার জন্য আবশ্যকমত নেড়া বিনামূল্যে—বিনা আয়াসে-খরিদ্দারগণ পাইতে লাগিল—তখন শুধু এই সুবিধাটুকু ভােগ করিবার জন্য খরিদ্দারগণ অন্যান্য দোকান ত্যাগ করিয়া আমার নিকট হইতে তৈল ও টেমী কিনিতে আরম্ভ করিল। আমার তেল ও টেমী বিক্রয় খুব বাড়িয়া গেল। আমার পিতৃদেব আমার এই প্রকার ব্যবসায় বুদ্ধি দেখিয়া আমার উপর বিশেষ সন্তুষ্ট হইলেন। বলা বাহুল্য, শেষে অন্যান্য দোকানদারগণ উপায়ান্তর না দেখিয়া আমাকে অনুকরণ করিয়াছিল বটে—কিন্তু আমিই প্রথমে উহা প্রচলন করি বলিয়া খরিদ্দারগণ আমাকে ছাড়িয়া অন্য কোথাও বড় যাইত না। তারপরে যখন ব্যবসায়ে আর একটু পরিপক্কতা লাভ করিলাম- তখন পিতৃদেব আমাকে আর একটু উচ্চ অধিকার দিলেন। টেমী ও ৪ আমার ব্যবসা জীবন কেরাসিন তৈল বিক্রয়ের সঙ্গে তিনি আমাকে খালি বােতল বিক্রয় করিবারও অধিকার দিলেন। এখানেও আমি পূর্বের ন্যায় উদ্ভাবনী- শক্তির পরিচয় দিয়াছিলাম। অনেকে বােতল ও তৈল কিনিত, কিন্তু দড়ি অভাবে ঝুলাইয়া লইয়া যাইতে তাহাদের বিশেষ অসুবিধা হইত। আমি তাহাদের সে অসুবিধা লক্ষ্য করায়—উহা দূরীকরণার্থ তৈল বিক্রয়কালীন খরিদ্দারগণকে আবশ্যকমত কিছু কিছু দড়ি দিবার জন্য বাটী হইতে দড়ি সংগ্রহ করিয়া আমার কাছে রাখিয়া দিতাম। লােকে বােতল কিনিত,-আর সঙ্গে সঙ্গে দড়ি পাইয়া বােতলের গলায় লাগাইয়া স্বচ্ছন্দে তৈলপূর্ণ করিয়া বাটী যাইত। বলা বাহুল্য, টেমী বিক্রয়ের ন্যায় বােতল বিক্রয়ের সময়েও আমার খরিদ্দার সংখ্যা অনেক বাড়িয়া গিয়াছিল। আমার পিতৃদেব আমার ব্যবসায় কার্যে এতাদৃশ কার্যকরী শক্তির পরিচয় পাইয়া মুখে মুখে আমাকে কোন প্রশংসা না করিলেও মনে মনে যে আমার উপর বিশেষ সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন, তাহা আমি তাঁহার ভাব দেখিয়া কতকটা অনুমান করিতে সক্ষম হইয়াছিলাম। এইভাবে এক বৎসর কাটিয়া যাইবার পর ১৩০৪ সালে আমার ব্যবসায় শিক্ষার Class promotion হইল। আমাদের দোকানে গাড়ী গাড়ী আলু পাইকারী ও খুচরা বিক্রয় হইত কিন্তু তা স্বত্ত্বেও, তিনি আমাকে এক বস্তা আলু হাটে বসিয়া /১ এক সের / সের করিয়া খুচরা বেচিবার জন্য হাটের মধ্যে বসাইয়া দিতেন। আমিও আলু বিক্রয়ে আমার লভ্যাংশ বেণী পাইবার আশায় সানন্দচিত্তে তাঁহার আদেশানুযায়ী কাজ করিতাম।

আমার ব্যবসা জীবন এইভাবে ১৩০৪ সাল আমার আলু বিক্রয়ের কাৰ্য্যেই কাটিয়া গিয়াছিল। ১৩০৫ সালে ব্যবসায়ে আমার আর এক ক্লাস উপরে প্রমােশন হইল। ঐ বৎসর হইতে আমাদের দোকানে মুদিখানার খুচরা বিক্রয় কাৰ্যে আমি নিযুক্ত হইলাম। যে সময়ের কথা বলিতেছি- তখন জিনিষ পত্র এরূপ অগ্নিমূল্য হইয়া উঠে নাই। ধান চাউল দেশে খুব সুবিধা দরেই বিক্রয় হইত। টাকায় ১/০ মণ করিয়া ধান্য বিক্রয় হইতে আমি স্বচক্ষে দেখিয়াছি। তখন দেশে ঘি ও দুধ খুব সস্তা ছিল। পাঠকবর্গের মধ্যে অনেকে হয়ত শুনিয়া আশ্চর্যান্বিত হইবেন—যে গব্য ধৃত বর্তমানে /• করিয়া টাকায় বিক্রয় হইতেছে—এবং তাহাও অনেক সময়ে খাট পাওয়া যায় কি না সন্দেহ—সেই গব্য ধৃত আমার প্রথম মুদীখানার জীবনে তৈল বিনিময়ে সম পরিমাণে গ্রহণ করিয়াছি। এক এক বােতল সরিষার তৈল দিয়া তাহার বিনিময়ে এক এক বােতল ঘি লইয়াছি। তারপরে ধৃতের মূল্য বৃদ্ধি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২ বােতল সরিষার তৈল দিয়া ১ বােতল ঘি বিনিময়ে লইয়াছি। এই যে তৈল বিনিময়ে ঘি লইতাম—তাহার একটু কারণও ছিল। আমাদের গ্রামের চতুঃপার্শ্বে বহু নমঃশূদ্রের বাস—তাহারা বিনা খরচায় গরু পুষিত এবং সেই সকল গরুর প্রচুর দুগ্ধে তাহারা বিনা খরচায় ঘি প্রস্তুত করিত। এখন, ব্যঞ্জনাদি রধিতে হইলে ত আর তৈলের পরিবর্তে ঘি দ্বারা রন্ধন করা চলে না—তাই সেই সকল দরিদ্র নমঃশূদ্রের পয়সা দিয়া তৈল কিনিতে অক্ষম হওয়ায় ঘি দিয়া তদ্বিনিময়ে তৈল লইয়া যাইত।

আমার ব্যবসা’ জীবন তারপর কালচক্রের আবর্তনে আবার এক বৎসর কাটিয়া গেল। ১৩০৬ সাল হইতে মুদিখানার কাজ ছাড়িয়া খুচরা কাপড় বিক্রয়ের কাজে নিযুক্ত হইলাম। আমাদের দোকানে বৎসরে অন্ন লক্ষ টাকার পাইকারী কাপড় বিক্রয় হইত। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমাকে “কাপড়ের হাটে” যাইয়া খুচরা কাপড় বিক্রয় করিতে হইত। এইরূপে ১৩০৬৭ সালে খুচরা কাপড় বিক্রয় করিয়া, কাপড় বিক্রয় কার্যে অভিজ্ঞতালাভের পর ১৩০৮ সাল হইতে কাটা কাপড় ও সুতা বিক্রয়ের কার্যে নিযুক্ত হইলাম। কার্তিক হইতে ফান মাস পর্যন্ত আমাদের দোকানে কাটা কাপড় বিক্রয় হইত। তা ছাড়া, বৎসরের বার মাসই আমাদের দোকানে সুতা বিক্রয় হইত। তবে কার্তিক হইতে ফাল্গুন এই কয় মাস কাটা কাপড়ের মরশুম্ বলিয়া সুতা বিক্রয় একটু বেশী হইত। সুতা বিক্রয় বলিয়া পাঠকেরা যেন সামান্য ২৪ টাকার সুতা বিক্রয় মনে করিবেন না। প্রতি হাটবারের দিন সেই সুদূর পল্লীর হাটেও তখনকার সময়ে আমাদের দোকানে ১০ ০ ০১২০০১ টাকার সুতা বিক্রয় হইত। আমাদের গ্রামের চতুঃপার্শ্বে অনেক মুসলমান তন্তুবায়ের বাস ছিল - তাহারা আমাদের দোকান হইতে সুতা খরিদ করিয়া নানাবিধ বস্ত্র বয়ন করিয়া আবার কপিল মুনির হাটে ও নিকটবর্তী হাটে তাহা বিক্রয় করিত। শীতকালে কলিকাতা হইতে কাটা কাপড়ের চালান লইয়া যাইতাম। বিভিন্ন প্রকারের বহু রকমের “ভইল” লইয়া যাইতে হইত। কপিলমুনির হাটে ও বাজারে সেই সকল মাল বিক্রী করিয়াও অনেক মাল উদ্বৃত্ত হইত। অগ্রহায়ণ ও পৌষ—এই আমার ব্যবসা জীবন হইত। দুই মাসে স্থানীয় লােকের কাটা কাপড়ের চাহিদা প্রায় মিটিয়া যাইত। সুতরাং মাঘ মাস হইতে স্থানীয় বিক্রী মন্দা পডিত। সেই সময়ে প্রতি হাটে কর্মচারী সঙ্গে করিয়া নিকটবর্তী রায়পুর, সােলাদানা প্রভৃতি হাটে সাধারণ হাটুরের ন্যায় কাটা কাপড় বিক্রয় করিতে যাইতাম। শুধু কর্মচারীর উপর নির্ভর করিতে পারিতাম । কারণ, বিভিন্ন প্রকারের বহু রকমের কাপড় থাকিত। তাহার মধ্য হইতে কর্মচারীগণ চুরি করিলে ধরিবার কোন উপায় ছিল না। সেইজন্য হাট করিবার সময় নিজে সৰ্ব্বদা সঙ্গে থাকিতে এজন্য রাত্রিজাগরণ, নৌকাযােগে যাতায়াত প্রভৃতি করিতে যে কত পরিশ্রান্ত হইতাম, ভুক্তভােগী ব্যতীত অপরে তাহা বুঝিবে না। তখন আমি পাঠশালার পড়া শেষ করিয়া হাইস্কুলে ভর্তি হইয়াছিলাম। আমাদের গ্রাম হইতে ৫ পাঁচ মাইল দূরবর্তী রারুলী * গ্রামে তত্রস্থ উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ে আমি অধ্যয়ন করিতাম। পিতা নিয়ম করিয়া দিয়াছিলেন যে রবিবারে ও বৃহস্পতি- বারে সপ্তাহে এই দুই হাটবারের দিন আমাকে কপিলমুনির হাটে বসিয়া ঐ সকল জিনিষ বিক্রয় করিতে হইবে। রবিবারের দিন ত স্কুল বন্ধই থাকিত। বৃহস্পতিবারের হাটে বিক্রয় করিবার নিমিত্ত * রারুলী—খুলনার গৌরবরবি স্বনামধন্য একনিষ্ঠ দেশ-সেবক আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্মভূমি। বারুণী স্কুলে পড়িবার সময় হইতে তাঁহার সহিত আমার পরিচয় হয় এবং কি জানি কেন তিনি বরাবরই আমাকে স্নেহ ও প্রীতির চক্ষে দেখিতেন।

আমার ব্যবসা জীবন
ঐ দিন স্কুল হইতে টিফিন্ আওয়ারে (Tiffin hour) ছুটি করিয়া
আসিতে হইত। যদি কোনও কারণে কোনও বৃহস্পতিবারের
হাটে অনুপস্থিত হইতাম-তজ্জন্য পিতার নিকট অজস্র তিরস্কার
শুনিতে হইত। এবং অনুপস্থিতির জন্য সন্তোষজনক কৈফিয়ৎ
দিতে না পারিলে তিনি আমাকে প্রহার পয্যন্ত করিতেন।
এই সময়ে ১৩১২ সালের ফাল্গুন মাসে আমার অগ্রজ ভ্রাতা
বঙ্কবিহারী সাধু অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হন। দাদার মৃত্যুর পর
পিতৃদেব যেন অবলম্বনশূন্য হইয়া পড়িলেন। ব্যবসায়ের সহায়ক
রূপে তাঁহার আপনার লােক দোসর কেহ নাই দেখিয়া তিনি
আমাকে স্কুল ছাড়াইয়া আনিয়া সৰ্ব্বদা কাছে কাছে রাখিয়া ব্যবসায়
শিক্ষা দিতে মনস্থ করিলেন। স্কুল ত্যাগ করিবার আমার বহু
আপত্তি তিনি কর্ণপাত করিলেন না। তিনি আমার আপত্তির
প্রত্যুত্তরে মাত্র বলিলেন “স্কুলে যাহা শিখিবি, আমার নিকট শিক্ষা
করিলে তাহা অপেক্ষা অনেক বেশী শিখিতে পারিবি।”
স্কুলের পড়াশুনা ছাড়িয়া দিয়া আমি সর্বদা পিতার নিকট
থাকিয়া ব্যবসায় শিক্ষা করিতে লাগিলাম। এইরূপে কিছুদিন
থাকিয়া শিক্ষালাভের পর আমি ব্যবসায়ে কিছু কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয়
করিলাম।
১৩১২ সালের শেষে আমি মালগস্ত করিবার জন্য কলিকাতায়
আসিতে আরম্ভ করিলাম। এই মাসগন্ত করার মধ্যেও যথেষ্ট
শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভের জিনিষ আছে। অনেক শিক্ষিত
লােক মনে করিতে পারেন—যখন নগদ টাকা দিয়া মাল খরিদ
করিব—তখন আর মাল কেনার মধ্যে এমন কি বিশেষত্ব থাকিতে

আমার ব্যবসা জীবন ৯ - পারে? কিন্তু বাস্তবিক তাহা নহে। কলিকাতায় যে কোন স্থানে সকল মাল পাওয়া গেলেও এক এক স্থলে এক এক প্রকারের মাল বিশেষ সুবিধা দরে বিক্রয় হয় এবং সেই স্থল হইতে সেই সেই প্রকারের মাল কিনিতে পারিলে একই মাল অপেক্ষাকৃত কম দরে খরিদ করা যাইতে পারে। কোন্ মাল খরিদ্দারে পছন্দ করিবে- কত দরে কিনিয়া কত মুনফা রাখিয়া বেচিলে খরিদ্দার ক্রয় করিতে কোনও আপত্তি করিবে না—ইত্যাদি বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন না হইলে সে ভাল মালগস্তদার হয় না। যাহা হউক, ২৪ বার পিতার সহিত কলিকাতার সমস্ত বিভিন্ন পটীতে মাল ক্রয় করিবার পর আমার মাল ক্রয় করিবার অভিজ্ঞতা লাভ মােটামুটা হইয়াছিল এবং তারপর আমি কর্মচারীসহ নিজে কলিকাতায় আসিয়া দোকানের জন্য মালগস্ত করিয়া লইয়া যাইতে লাগিলাম। এবং ১৩১৩ সাল হইতে দোকানদারীর কাৰ্যে মােটামুটী সব বিষয়ে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া পুরা দোকানদার হইয়া পড়িলাম। আমাদের জন্মভূমিতে আমার পিতার যে দোকান ছিল- তাহাতে তখনকার দিনে গড়পড়তায় বার্ষিক ৬ ছয় লক্ষ টাকা বিক্রয় হইত। তখনকার ৬ লক্ষ টাকার মূল্য যে এখনকার ১২ লক্ষ টাকারও মূল্যের অধিক, তাহাতে সন্দেহ নাই। এত বড় বিরাট কারবার মফঃস্বলে বড় একটা দেখা যায় না। ইহা সহজেই অনুমেয় যে এই বিরাট কারবার সুশৃঙ্খলার সহিত পরিচালন করিতে হইলে অনেক সুদক্ষ কৰ্ম্মচারীর প্রয়ােজন। সৌভাগ্যক্রমে, আমার পিতৃদেব অনেকগুলি সৎ ও উপযুক্ত কর্মচারী লাভ করিতে পারিয়া- ছিলেন। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলিয়া রাখি—আমার পিতার আমার ব্যবসা জীবন কর্মচারী নির্বাচনের ক্ষমতা খুব উত্তম ছিল। তিনি একটা লােককে মাত্র বাহ দৃষ্টে দেখিয়া তাহার অন্তরেরও অনেকটা পরিচয় পাইতেন এবং তাহার কিরূপ কাৰ্য ক্ষমতা আছে—তাহাও নিরূপণ করিতে পারিতেন। পিতৃদেবের যে সকল ভাল কৰ্মচারী ছিল—তাহার মধ্যে ৫ জন কর্মচারীর নাম সর্বতোভাবে উল্লেখযােগ্য। তাহাদের নাম যথা :-১। আনন্দ নাথ ২। কার্ত্তিক নাথ ৩। গােপাল সাধুখাঁ ৪। ষষ্ঠী বাগ, ৫। আনন্দ পােদ্দার। ইঁহারা সকলেই যেমন ছিল বিশ্বাসী—তেমনি ছিল কর্মক্ষম। এই ৫ জন কর্মচারীর মধ্যে আনন্দ নাথ ও কার্তিক নাথ কাপড় ও সােণা রূপা বিক্রয় করিত। চিনি ও গুড়ের কারখানার সর্ব- প্রধান কর্তৃত্ব ছিল ষষ্ঠী বাগের উপর। আনন্দ পােন্দার ছিল- ষ্টেশনারী ও মণিহারী বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধান কর্মচারী। গােপাল সাধুখাঁ ছিলেন তেল, কেরাসিন, ডাল, কলাই ইত্যাদি মােটামুটী মালের উপর। এইরূপে, সেই বিরাট কারবারের এক একটী বিভাগ এক একজন সুদক্ষ কর্মচারীর কর্তৃত্বাধীনে যাওয়ায় বেশ সুশৃঙ্খলার সহিত আমার পিতার কারবার চলিত। এই সকল উপযুক্ত কর্মচারী ভাগ্যগুণে লাভ করিতে পারিয়া আমার পিতা তাঁহার জীবদ্দশায় তাহার ব্যবসায়ে যথেষ্ট উন্নতি করিয়া গিয়াছেন। ১৩১৪ সালে আমার পিতৃদেব ৬৫ বৎসর বয়সে স্বর্গারােহণ করিলেন। তখন আমার বয়স ১৯ বৎসর মাত্র। তখন একেবারে বিষয়, দোকানদারী, জমিদারী সকল ভাই আমার সেই অপরিণত বয়সে নিজ স্কন্ধে আসিয়া পড়িল। সেই তরুণ যৌবনে একেবারে আমার ব্যবসা জীবন এoিn was a v ***** *** IIথনে। s এr #sr * অতগুলি বােঝা ঘাড়ে আসিয়া পড়াতে হঠাৎ যেন দমিয়া গেলাম। এই বিরাট কাৰ্য্য সুশৃঙ্খলার সহিত চালাইতে পারি কি না সে সম্বন্ধে কেমন যেন আমার মানসিক দৌর্বল্য উপস্থিত হইল। উপদেষ্টা নাই—নিকট আত্মীয়ের মধ্যে উপযুক্ত অভিভাবক কেহ ছিল না। যে সকল আত্মীয় বন্ধু ছিলেন, পিতার মৃত্যুর পর তাহারা মুখে মুখে অনেক সদুপদেশ দিলেও মনে মনে সকলে আমার উচ্ছেদে আমার ধন তাহাদেরই ঘরে যাইবে, এই মনে করিয়া তাহারা মনে মনে আমার শত্রুতা সাধনের চেষ্টা করিতে লাগিলেন। আমি তাহা বুঝিলাম। কিন্তু বিরক্ত হইলাম না বা মনে মনে তাহাদের এই প্রকার ব্যবহারে আশ্চর্য্য বােধ করিলাম না। কেন না- বুঝিলাম, বাঙ্গালীর ঘরের ইহা নিত্য ঘটনা। অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র রাখিয়া পিতা পরলােকগমন করিলে তাহার নিকট আত্মীয়ের সকল স্থলেই এইরূপ একটু আধটু শত্রুত সাধন করিয়া থাকে। ইহাতে আর আশ্চৰ্য্য হইবার কি আছে ? কিন্তু মন যেন অতিশয় দমিয়া গেল। পিতার মৃত্যুর পর প্রকৃতই আমার কাজের অসুবিধা দাড়াইয়াছিল। যে পাঁচ জন বিশ্বস্ত কর্মচারীর কথা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি, পিতার মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বে তাহাদের মধ্যে আনন্দনাথ ও ষষ্ঠী বাগ মৃত্যুমুখে পতিত হয়। গােপাল সাধুখাঁ কৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া চলিয়া যায়। আনন্দ পােদ্দার ও কার্ত্তিক নাথ এই দুই জন বিশ্বস্ত কর্মচারী লইয়া আমি পিতার মৃত্যুর পর কাজ আরম্ভ করিয়া দিলাম। কিন্তু এত বড় বিরাট কারবার মাত্র দুই জন

১২
আমার ব্যবসা জীষন
বিশ্বস্ত কর্মচারী লইয়া সুশৃঙ্খলার সহিত চালান অসম্ভব—বিশেষতঃ
দুই জনই বৃদ্ধ। অন্যান্য কর্মচারীগণের মধ্যে অনেকে চুরি
আরম্ভ করিয়া দিল। বৎসরের শেষে হিসাব করিয়া দেখা
গেল—নিম্নের জায়মত ২০০০০ কুড়ি হাজার টাকা লােকসান্
হইয়াছে। তাই দেখিয়া কারবার চালান সম্বন্ধে হতাশ হইয়া
পড়িলাম।
কিস্তি ডােবা-
১২০ )
পাট (বিক্রয়ে লােকসা)-
৩০০ )
পিতৃদেবের চিকিৎসা ও শ্রাদ্ধাদি বাবদ
৮০০০
অবশিষ্ট কর্মচারীগণের চুরি
৭৮৫০,
মােট ২০,০০০,
কুড়ি হাজার টাকা
এই সব দেখিয়া শুনিয়া ১৩১৫ সালে দোকানের কাজ একেবারে
বন্ধ করিয়া দিলাম। দুইজন বিশ্বস্ত কর্মচারী আনন্দ পােদ্দার ও
কার্তিক নাথকে দোকানের মাল চৌকী দিবার জন্য রাখিয়া অবশিষ্ট
কৰ্মচারীগণকে dismiss করিয়া দিলাম। নায়েব গােমস্তাগণ
তাহাদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মফঃস্বলে যে সকল প্রজার সহিত মামলা
বাধাইয়া ছিল,-আমি স্বয়ং মফঃস্থলে গিয়া কাহারও সুদ ছাড়িয়া
দিয়া, কাহারও আসলের কতক অংশ ছাড়িয়া দিয়া, প্রজাদের সহিত
আপােষ মীমাংসা করিয়া ফেলিলাম।
এইভাবে কাজকর্ম গুটাইয়া বসাতে স্নেহময়ী মাতা সর্বদা
ভৎসনা তিরস্কার করিতেন। আত্মীয়দিগের অনেকে মাতাকে

আমার ব্যবসা জীবন গিয়া বুঝাইত “বিনােদ কর্মহীন হইয়া বসিয়া বাপ ঠাকুরদাদার নাম ডুবাইল।” মাতা উত্তেজিত হইয়া আমাকে দোকানের কাজে মনােযােগ দিবার জন্য কত অনুরােধ করিতেন—কত বুঝাইতেন আমার কাজে এই দারুণ অবহেলার জন্য আমাকে কত তিরস্কার করিতেন। সে সকল আমি নীরবে শুনিয়া যাইতাম। কোন বাদ- প্রতিবাদ করিতাম না। ভাবিতাম, অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস যখন সেই তরুণ যৌবনে আমাকে বৃদ্ধের বােঝা ঘাড়ে চাপাইয়া দিয়া আমার সুখের দিনে দুর্দিন আনিয়া দিয়াছে, তখন যতদিন না সুদিন ফিরিয়া আসে, ততদিন শত লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, তিরস্কার ও অপমান-এ সকল বুক পাতিয়া সহ করিতে হইবে।-এই মনে করিয়া মাতার স্নেহ তিরস্কার, আত্মীয় স্বজনের উপদেশ ও ভৎসনা নীরবে সহ্য করিতাম। আর ভাবিলাম-কেমন করিয়া কাজে সুশৃঙ্খলা আনয়ন করিব। দিবানিশি নির্জনে অবসর সময়ে সেই চিন্তাই করিতাম। কিছুদিন এইরূপ চিন্তা করার পর দোকান ঘর ও গুদামের আবশ্যক মত সংস্কার সাধন করিলাম। বিশাল কারবারের যে যে অংশ যেখানে দিলে আমার সকল দিকে সকল কর্মচারীর উপরে নজর রাখা যায় এবং বিক্রয়ের সব টাকাই আমার নিকট তাহাদের আনিয়া দিতে সুবিধা হয়—সেই মত ব্যবস্থা করিলাম। দোকান ঘর ও ২ খানা বড় টীনের গুদাম পৃথক পৃথক ছিল—ঐ ৩ খানা ভাঙ্গিয়া এক লাইন করিয়া একখানা করিলাম। ইহার পর এমন ব্যবস্থা করিলাম যে সমস্ত মালই বিক্রয় হইবার সময় আমার চোখের সামনে দিয়া pass করিতে পারে। এই সকল কাজ করিতে আমার ২২০০ টাকা খরচ হইল।

১৪ আমার ব্যবসা জীবন ১৩১৬ সাল হইতে আবার পূর্ণোদ্যমে কাজে লাগিলাম। কপিলমুনির বাজারে আরও ৫ খানি বড় দোকান ছিল।-তাহাদের সহিত প্রতিযগিতা করিয়া নবীন উদ্যমে আবার কাজ চালাইতে সুরু করিলাম। তারপর ১৩১৬ সালের আশ্বিন মাসে প্রলয়ঙ্কর প্রবল বাত্যা দেশের উপর দিয়া বহিয়া গেল। তাহার রুদ্র প্রকোপে পড়িয়া কত লােকের ঘর দোর ভাঙ্গিয়া চুরিয়া ভূমিসাৎ হইল। কত লােকের দোকান ঘর পড়িয়া গেল। পূৰ্ব্বকথিত যে ৫ খানি প্রতিযােগী বড় দোকান কপিলমুনিতে ছিল-সে ৫ খানি দোকান ঘরই ঝড়ের প্রকোপে পড়িয়া একেবারে ভূমিসাৎ হইয়াছিল। ঝড়ে আমাদের দোকানের উপরের চালের টীন উড়াইয়া নদীর জলে ফেলিয়া দিল। পুনরায় ঐ ৩ খানা ঘর পূর্ববৎ করিতে অতিরিক্ত জন মজুরী দিয়া ১ মাসের মধ্যে সমাধা করিতেও প্রায় ২০০০ ব্যয় হইল। ঝড়ের পর সকলেরই মিস্ত্রি ঘরামী আবশ্যক, কাজেই এক একটা মিস্ত্রির বােজ ২ টাকা হইতে ৩ তিন টাকা পর্যন্ত দিতে হইয়াছিল। ঝড়ে অনেকের ঘর দোর পড়িয়া গিয়াছিল সুতরাং ঝড়ের পরদিন হইতেই আবার সকলের ঘর বাঁধার ধূম পড়িয়া গেল। ঘর বাঁধিতে গেলে কাতার প্রয়ােজন, সুতরাং, ঝড়ের পরদিন হইতেই দোকানে কাতা বিক্রয় বাড়িয়া গেল। ঝড়ের পূর্বদিন ॥ নয় আনা করিয়া কাতার সের বিক্রয় হইয়াছিল। ঝড়ের পরদিন প্রথমে একটী খরিদ্দার কাতা কিনিতে আসিলে বৃদ্ধ কার্ত্তিক নাথ তাহাকে পূর্বদিনের দর।• আনা কহিয়া ফেলিল এবং সেই দরেই তাহাকে কাতা বিক্রয় করিল। ঝড়ের আমার ব্যবসা জীবন পরে লােকের ঘর দুয়ার মেরামতের জন্য কাতার চাহিদা বাড়িয়া যাইবে এবং চাহিদা বৃদ্ধি পাইবার সঙ্গে সঙ্গে অধিক মূল্যে কাতা বিক্রয় করিতে কোন অসুবিধা হইবে না এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে লাভও বেশী হইবে—এ সকল জ্ঞান বৃদ্ধের ছিল না দেখিয়া বৃদ্ধকে। আনা সের দরে কাতা বিক্রয় করার জন্য আমি তিরস্কার করিলাম। এবং তাহাকে ১, এক টাকা মূল্যে কাতা বিক্রয় করিতে উপদেশ দিলাম। দ্বিতীয় খরিদ্দারের নিকট বৃদ্ধ আমার উপদেশ স্বত্ত্বেও ১ এক টাকা সের একথা বলিতে সাহসী না হইয়া • বার আনা সের বলিল এবং দেখিল যে খরিদ্দার বিনা আপত্তিতে ১০ বার আনা সের দরে কাতা কিনিয়া চলিয়া গেল। তখন বৃদ্ধ অধিকতর পােৎসাহিত হইয়া পরের খরিদ্দারগণের নিকট ১ এক টাকা সের দরে কাতা বিক্রয় করিতে লাগিল। শেষে আরও কাতার চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ২, দুই টাকা পর্যন্ত সের হিসাবে কাতা বিক্রয় হইয়াছিল। পূৰ্বেই বলিয়াছি-কপিলমুনির বাজারে আমাদের দোকানের প্রতিযােগী ৫ খানি দোকান ঝড়ের প্রকোপে ভূমিসাৎ হইয়াছিল- আমাদের দোকান ঘরেরও উপরের চালাগুলি ঝড়ে উড়াইয়া লইয়া গিয়াছিল। অন্যান্য দোকানদারেরা টিলিমিসি করিয়া তাহাদের দোকান ঘর সংস্কার করিতে দেরী করিতে লাগিল। আমাদের দোকান ঘর ২/৩ দিনের মধ্যে যথাসম্ভব সুশৃঙ্খল ও সংস্কার করিয়া ঝড়ের তৃতীয় দিবসে কলিকাতায় মাল খরিদের জন্য চলিয়া আসিলাম। কলিকাতায় আসিয়া আর কোন মাল না কিনিয়া এক কিস্তি কাতা কিনিয়া-তাড়াতাড়ি নৌকা বােঝাই করিয়া বাটী

১৬
আমার ব্যবস’ জীবন
গেলাম এবং মাঝিকে এই প্রলােভন দেখাইয়া গেলাম যদি সে
হাটবারের পূর্বদিন কপিলমুনির বাজারে মাল পৌছাইয়া দিতে পারে,
তবে তাহার নির্দিষ্ট ভাড়া ছাড়া আরও ১০ দশ টাকা অধিক
পুরস্কার দিব। বলা বাহুল্য, পুরস্কারের লােভে মাঝিরা প্রাণপণ
শক্তিতে দাড় টানিয়া হাটবারের পূর্বদিন কপিলমুনিতে মাল
পৌছাইয়া দিয়াছিল এবং আমিও আমার প্রতিশ্রুতি মত
তাহাদিগকে ১ দশ টাকা পুরস্কার দিয়াছিলাম। এবং বলা
বাহুল্য, ঐ এক কিস্তি কাতা বিক্ৰী করিয়া আমার ঝড়ে ক্ষতি প্রায়
পূরণ হইয়া আসিল। ঝড়ের পরে প্রকৃতই আমার ব্যবসায়
জীবনের পড়ত ফিরিয়া গেল।
যে ৫ খানি প্রতিযােগী দোকান ছিল, তাহারা তখনও মাথা
তুলিয়া দাড়াইতে পারে নাই।তখনও তাহাদের দোকানঘরের
সংস্কার সাধন তাহারা করিয়া উঠিতে পারে নাই। কাজেই এই
৫ খানা দোকানের বিক্রী আমার এক দোকান হইতেই হইতে
লাগিল এবং প্রতিযগিতা না থাকায় ব্যবসায়ে আমার আশাতীত
লাভ হইতে লাগিল। নূতন কর্মজীবনে ভগবানের অনুগ্রহে এরূপ
আশাতীত সাফল্য লাভে সমর্থ হইয়া নবীন উৎসাহে-উদ্দাম কৰ্ম্ম
প্রেরণায়—অফুরন্ত আশার আশ্বাসে আমার সেই তরুণ জীবনে কি
এক আনন্দ শ্রোতই খেলিয়া গেল।
সেই বিংশ বৎসর বয়ঃক্রম কালে—সেই উৎসাহের আতিশয্যে
-সেই অদম্য কৰ্ম্ম প্রেরণায়—আমার সেই প্রথম ব্যবসায় জীবনে
কি কঠোর পরিশ্রম যে করিয়াছি, ব্যবসায়ী ব্যতীত সে কঠোর
পরিশ্রমের গুরুতা অপর সাধারণের বােধগম্য হইবে না।
২৪ ঘণ্টা

আমার ব্যবসা জীবন ১৭ দিবারাত্রির মধ্যে ২ ঘন্টা পরিশ্রম করিয়াও তখন কিছুমাত্র শারীরিক অবসাদ বােধ করিতাম না। সে তরুণ যৌবনে সে কৰ্ম্মময় জীবনের কঠোরতার কথা স্মরণ করিয়া আজিও আমি বিস্ময় স্তম্ভিত হইয়া যাই যে কোন্ কুহকিনী শক্তির যাদুমন্ত্রে চালিত হইয়া সেই অপরিণত বয়সে আমি তখন অত বেশী পরিশ্রম করিতে সক্ষম হইয়াছিলাম। ১৩১৬ সালের পৌষ মাসে কলিকাতায় যখন মালের চালান লইতে আসি, সেই সময়ে কলিকাতার রাজপথে যে বিপদের সম্মুখীন হইয়াছিলাম, তাহার ভয়াল স্মৃতি জীবনে কখনও বিস্তৃত হইব না। বলিতে কি—সেই ঘটনার পর আমার এক যেন পুনর্জন্ম হইয়া গিয়াছে। আসন্ন মৃত্যুর কবল হইতে ভগবৎ কৃপায় সেইদিন উদ্ধার পাইয়া আমার অন্তরে এই প্রেরণাময় প্রতীতি জন্মিয়াছিল হয় ত ভগবান আমার জীবন দ্বারা বিশেষ কিছু করাইয়া লইবেন। সেদিনকার সেই আসন্ন মৃত্যুর ভয়াবহ স্মৃতি এখনও মনে উঠিলে শরীর রােমাঞ্চিত হইয়া উঠে। ঘটনাটি এই ১৩১৬ সালের পৌষ মাসে মালের চালান লইবার জন্য কলিকাতায় আসি। তখনকার দিনে মফঃস্বলে নােটের বড়ই অভাব ছিল। কাজেই মাল আনিবার সময় কঁাচা টাকা লইয়া আসিতে হইত। বলা বাহুল্য, অন্যান্য বারের ন্যায় এবারও কাচা টাকা লইয়া কলিকাতায় আসিয়াছিলাম। ঘিএর টীনে ৪৫০০ টাকা প্যাক করিয়া এবং ষ্টীলের ট্রাঙ্কে রেজগী, কিছু নােট ও টাকা ইত্যাদিতে ৪০০০ টাকা একুনে মােট ৮৫০০ টাকা সঙ্গে ছিল। কলিকাতায় আসিবার সময়ে সঙ্গে একজন নূতন কর্মচারী ১৮ আমার ব্যবসা জীবন আসিয়াছিল। শিয়ালদহ ষ্টেশনে যখন আমরা আসিয়া পৌছিলাম- তখন রাত্রি আন্দাজ ৪০ সাড়ে চারিটা হইবে। আমাদের তখন কলিকাতায় কোন বাসস্থান ছিল না। হাসী বাগানে বটকৃষ্ণ সাধুখার গদীতে আমরা কলিকাতায় মাল গম্ভ করিতে আসিয়া সেখানে থাকিতাম। আমাদের মাল কিনিবার অধিকাংশ টাকা বড় বাজারে লাগিত। শিয়ালদহে নামিয়া আমরা মনে করিলাম- প্রথমে বড়বাজারে কাপড়ের মহাজনের ঘরে গিয়া কাপড়ের দেয় টাকাগুলি সেখানে দিয়া আসিব। তাহা হইলে আমাদের কাছে তখন আর বেশী টাকা থাকিবে না। তখন আমরা আমাদের নির্দিষ্ট বাসায় চলিয়া যাইব। এই স্থির করিয়া ঘােড়ার গাড়ী ভাড়া করিতে গেলাম। বড়বাজার যাইতে কেহ বলিল ১, এক টাকা- কেহ কিল ৩ বার আনা, অবশেষে একজনের সহিত ॥ আট আনা চুক্তি করিতেই সে আমাদের beddingী সঙ্গে সঙ্গে তুলিয়া তাহার গাড়ীর ছাদে রাখিয়া দিল। আমাদের সঙ্গে এটী লগেজ, একটী টাকার কেনো, একটী বেডিং, একটী ষ্টীল ট্রাঙ্ক ও এক- খানি ভাঙ্গা সাইকেল (মেরামতের জন্য কলিকাতায় আনা হইয়াছিল) ছিল। গাড়ীতে বসিয়া সুটকেটী সম্মুখে রাখিলাম- টাকার কেনেস্তারাটা পায়ের নীচে রাখিয়া দিলাম। গাড়ীর উপরে সাইকেল ও বেডিং রাখিয়া দিলাম। আমার সঙ্গী সেই কর্মচারীটিকে coach boxএর উপর বসাইয়া লওয়া হইল। গাড়ী হারিস রােড, দিয়া চলিতে লাগিল। কিছুদূর চলিবার পর গাভােয়ান আমাকে বলিল-“আমি অত্যন্ত কম ভাড়ায় আপনাদিগকে লইয়া যাইতেছি। এখানে দুইজন passenger (প্যাসেঞ্জার) আছে,

আমার ব্যবসা জীবন
ইহারা হাবড়ায় যাইবে। ইহাদিগকে আমার গাড়ীতে তুলিয়া লই।
আমি গরীব লােক-আমারও দু পয়সা হইবে এবং আপনাদিগেরও
কোন ক্ষতি হইবে না।” আমি তাহার তীব্র প্রতিবাদ করিলাম।
বলিলাম, “তা হতে পারে না; আমাদের সঙ্গে টাকা আছে-
আমরা অন্যলােককে আমাদের গাড়ীতে উঠিতে দিব না।” সেই
লােক দুইটাও তাহাদের পুটুলী দেখাইয়া আমাদিগকে বলিল যে
তাহাদের সঙ্গেও টাকা আছে।
যাহা হউক, আমাদের তীব্র আপত্তিতে গাড়ােয়ান তাহাদিগকে
গাড়ীতে তুলিল না। গাড়ী আবার পুর্বের ন্যায় হ্যারিস রােড,
দিয়া চলিতে লাগিল। কিছুদূর আসিবার পর হঠাৎ ডানদিকের
একটী সরু গলিতে গাড়ােয়ান গাড়ী ঢুকাইয়া দিল। তাহার
কু-মতলব আমি বুঝিতে পারিলাম। সেই চলন্ত গাড়ী হইতে
মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ প্রদান করিয়া সেই বেগবান্ অশ্বের সামনে গিয়া
তাহার রাশ আটিয়া ধরিয়া চীৎকার করিতে লাগিলাম-“আমি
বিপন্ন, তােমরা কে কোথায় আছ, আমাকে সাহায্য কর।”
আমার চীৎকারে কতকগুলি গৃহস্থ ভদ্রলােক ঘটনাস্থলে আসিয়া
আমার নিকট হইতে আনুপূর্বিক সমস্ত ঘটনা শুনিয়া লইল।
তাহারা গাড়ােয়ানকে গালাগালি ও তিরস্কার করিল। তাহারা
গাড়ীর নম্বর টুকিয়া রাখিয়া আমাকে বলিল “আপনি যা, যদি
কোন বিপদ আপদ হয়, আপনি গাড়ােয়ানের নামে কেস্ করিয়া
আপনার টাকা আদায় করিয়া লইবেন। আমরা সাক্ষ্য দিব।”
আমি মনে করিলাম—এ তো ভাল সিদ্ধান্ত দেখিতেছি।
যদি আমি প্রাণে বাঁচিয়া থাকি, তবে ত case করিয়া টাকা

আমার ব্যবসা জীবন আদায় করিব । যাহা হউক, আমি ও আমার সেই কর্মচারী জোর করিয়া চাকা ঘুরাইয়া আবার গাড়ী সদর রাস্তার উপরে লইয়া আসিলাম। গলিটা এত অপ্রশস্ত ছিল যে গাড়ী ঘুরিয়া আসিতে না পারায় পিছনের চাকা ঘুরাইয়া গাড়ীকে বড় রাস্তায় আনিতে হইয়াছিল। পূৰ্ব্ববৎ আবার গাড়ী হারিস বােড়, দিয়া চলিতে লাগিল। গাড়াতলার সন্নিকট আসিয়া গাড়ােয়ান আবার গাড়ীর গতি অকস্মাৎ ডান দিকে ঘুরাইয়া দিল। তখন গ্যাড়াতলায় প্রসিদ্ধ ডাকাইতের দল বাস করিত—তাহারা গুণ্ডামী করিয়া দিনে দুপুরে লােকের প্রাণনাশ করিয়া অর্থাপহরণ করিত। Improvement trust আইন তখন পাশ হয় নাই। তখন কলিকাতার অবস্থা বর্তমান সময়ের মত তাদৃশ উন্নত হয় নাই। এত সব বড় বড় রাজপথ—রাস্তার ধারে এত ঘন ঘন পুলিশ দণ্ডায়মান এ সব তখন ছিল না। গাড়ী ঘুরাইতে দেখিয়া আবার আমি প্রমাদ গণিলাম। আবার গাড়ী হইতে অবতরণ করিয়া চলন্ত অশ্বের মুখের বন্ধু টানিয়া ধরিলাম। গাড়ােয়ানও নামিয়া ঘােড়াকে সােজাসুজি চালাইবার চেষ্টা করিতে লাগিল। ভগবানের ইঙ্গিতে এবং বােধ হয় আমার সুকৃতি বলে ঘােড়া গাড়ােয়ানের কথা না শুনিয়া আমার কথাই শুনিল এবং ঘােড়াকে টানাটানি করার ফলে ঘােড়া রাস্তার ফুটপথের উপর আসিয়া দাঁড়াইল-গাড়ী রাস্তার নীচে রহিল। আমি পূৰ্ব্ববারের ন্যায় আবার সাহায্যের জন্য চীৎকার করিতে লাগিলাম। করিতে লাগিলাম। তখন পাঁচটা আন্দাজ বাজিয়াছিল। অদূরে পুলিস দাড়াইয়াছিল কিন্তু তাহারা কি জানি আমার ব্যবসা জীবন কেন দেখিতে পাইয়াও এবং আমার চীৎকার শুনিয়াও আমার নিকটে আসিল না। সৌভাগ্যক্রমে, সেই সময়ে ৩ জন ট্রামের conductor তাহাদের dutyতে join করিবার জন্য যাইতেছিল। আমার চীৎকার শুনিয়া তাহারা আসিয়া আমার নিকট হইতে আদ্যোপান্ত সব শুনিল। তাহাদের মধ্যে একজন বরিশাল জেলার যুবক ছিলেন। তিনি গাড়ােয়ানের এরূপ আচরণের কথা শুনিয়া ক্রোধান্বিত হইয়া গাভােয়ানকে মারিতে উদ্যত হইলেন। আমি এবং আর দুইজন তাহার সঙ্গী সকলে বুঝাইয়া তাহাকে এ প্রকার প্রতিহিংসা লইতে নিবৃত্ত করিলাম। তখন স্থির করা হইল,- অন্য একখানি গাড়ী পাইলে এ গাড়ীর জিনিষ সেই গাড়ীতে তুলিয়া আমরা বড় বাজারে সেই মহাজনের গদীতে যাইব। এই স্থির করিয়া রাস্তার দিকে গাড়ীর প্রতীক্ষা করিতে লাগিলাম। কিছু সময় পরে একখানি গাড়ী পাওয়া গেল। গেঁড়াতলার মােড় হইতে বড় বাজার পর্যন্ত ৮০ বার আনা ভাড়া চুক্তি করা হইল। কিন্তু যখন এ গাড়ােয়ানের গাড়ী হইতে তাহার গাড়ীতে মাল তুলিবার উপক্রম করা হইল, তখন এ গাড়ােয়ানের ইঙ্গিতে নূতন গাড়ােয়ন আমাদিগকে লইতে অস্বীকার করিয়া চলিয়া গেল। যেহেতু নবাগত গাড়োয়ান মুসলমান এবং পূর্বোক্ত যে গাড়ােয়ান আমাকে বিপদে ফেলিয়াছিল সেও মুসলমান। মহা বিপদে পড়িলাম। তখন অগত্যা উপায়ান্তর না দেখিয়া আমার সেই সঙ্গী কর্মচারীটিকে হারিসন রােড, হইতে আর একখানি গাড়ী ভাড়া করিয়া আনিতে পাঠাইয়া দিলাম। কিন্তু গাড়ী ভাড়া করিয়া আনিতে সেই সঙ্গীটী অযথা বিলম্ব করিতে লাগিল দেখিয়া সেই আমার ব্যবসা জীবন conductor ৩ জন চলিয়া যাইবার উপক্রম করিল। তখন বাধ্য হইয়া অগত্যা মাল ও কেনেতারা মুটে করিয়া লইয়া যাওয়া সাব্যস্ত করিলাম। ৩ জন মুটে ডাকা হইল। তাহাদিগের প্রত্যেককে • আনা করিয়া charge দিব ঠিক করা হইল। তাহারা মােট লইবার উপক্রম করিতেই উপস্থিত ৩ জন ভদ্রলােকের মধ্যে একজন ( সেই বরিশালের ভদ্র লােকটী) আমার নির্বুদ্ধিতার জন্য আমাকে গালি দিতে দিতে বলিলেন-“মহাশয়, আপনার ন্যায় দিশেহারা লােক ত দেখা যায় না। আপনি যাহাদের মাথায় মােট দিতে যাইতেছেন—তাহারা যে মুটে না হইয়া চোর ও বদমায়েস্ না হইতে পারে—ইহা আপনি কিরূপে বুঝিলেন ? উহারা যদি ৩ জন ৩ দিকে হাঁটে, আপনি তখন একাকী কাহার সহিত যাইবেন?” ভদ্রলােকের এই কথা শুনিয়া আমার যেন চৈতন্যোদয় হইল।-মুটেকে মােট মাথায় লইতে বারণ করিলাম। মনে করিলাম, “বিপদের দিনে এমন বন্ধুও অযাচিত ভাবে আসিয়া জুটে?” একটু পরে আমার সেই কর্মচারী একখানি গাড়ী ভাড়া করিয়া সঙ্গে লইয়া আমার কাছে ফিরিয়া আসিল। পূর্বোক্ত গাড়ীর জিনিষ পত্র ঐ গাড়ীতে তুলিবার জন্য পূর্বের যে ৩ জন মুটে কাছে দাড়াইয়াছিল তাহাদিগকে বলিলাম। যাহারা পূর্বে বড়বাজার পৰ্য্যন্ত যাইতে • আনায় স্বীকার হইয়াছিল, তাহারা এখন এক গাড়ী হইতে অন্য গাড়ীতে মাল তুলিতে প্রত্যেকে আট আনা করিয়া চার্জ করিয়া বসিল। তখন সেই ভদ্রলােকটীর উপর আমি মনে মনে শ্রদ্ধার অঞ্জলি প্রদান করিলাম। তিনি নিজে উপ-পড়া হইয়া আমাকে নিষেধ না করিলে এই দুর্বত্তদের হাতে পড়িয়া আমার আমার ব্যবসা জীবন টাকাগুলি হাত ছাড়া হইত, তাহা বুঝিলাম। বৃথা কথায় কাল- বিলম্ব করা উচিত নহে বিবেচনা করিয়া আমরা নিজেরা ধরাধরি করিয়া নবাগত গাড়ীতে সব মালগুলি উঠাইয়া দিলাম। সাইকেল খানি গাড়ী হইতে নামাইবার সময় সেই বদমায়েস গাড়ােয়ান তাহার নিজের সাইকেল বলিয়া দাবী করিয়া বসিল। তারপরে আমাদের সকলের সমবেত তিরস্কার ও ভৎসনায় সে দাবী বাধ্য হইয়া প্রত্যাখ্যান করিল। তখন “আচ্চা” করিয়া এক ধমক লাগাইয়া দিয়া অর্ধেক ভাড়া। চারি আনা পয়সা তাহাকে ফেলিয়া দিয়া আমরা বড়বাজার অভিমুখে সেই মহাজনের ঘরে রওনা হইলাম। সেই ৩ জন ভদ্রলােকও ট্রামের কাৰ্যে যােগদান করিবার জন্য যথাস্থানে চলিয়া গেলেন। দেখিতে দেখিতে ১৩১৬ সালে ভগবানের কৃপায় ভালভাবে কাটিয়া গেল। সেই বৎসর বৎসরের শেষে হিসাব করিয়া দেখা গেল পূৰ্বের লােকান্ প্রায় পূরণ হইয়া গিয়াছে। ১৩১৭ সালে আবার কপিলমুনির অন্যান্য দোকানগুলি মাথা তুলিয়া দাড়াইল। আবার কর্মক্ষেত্রে প্রতিযােগিতার সৃষ্টি হইল। কাজেই সে বৎসর আয় ১৬ সালের মত অত বেশী লাভ হইল না। ১৮১৯ সাল একরূপ ভালভাবেই চলিল বলিতে হইবে। এই দুই তিন বৎসর ব্যবসায় কাৰ্য্য হাতে কলমে করিয়া ব্যবসায় কাৰ্য্যে অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করিলাম। বুঝিলাম, Theoretical শিক্ষা অপেক্ষা জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যে practical শিক্ষা হয়, হার মূল্য অধিক। এইরূপে ১৩১৯ সালে আমার জীবনের এক নূতন অধ্যায় আরম্ভ ২৪ আমার ব্যবসা জীবন হইল। পল্লীগ্রামের সকল প্রকার ব্যবসায় কাৰ্য্যে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়া অবশেষে কলিকাতায় আসিয়া অধিকতর বিস্তৃতারবত্র করিবার ইচ্ছা মনে জাগরিত হইল। পূর্ব হইতে আমদানী রপ্তানী উভয় প্রকার ব্যবসায় কাৰ্য্য করিবার জন্য আমাদিগকে কলিকাতায় আসিতে হইত। কলিকাতায় আড়তদারীর কাৰ্য বিশেষ লাভজনক দেখিয়া কলিকাতায় আসিয়া প্রথমে একটা আড়তদার হইবার ইচ্ছা জন্মিল। এই ইচ্ছাকে কার্যে পরিণত করিবার সুযােগ জুটিয়া গেল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায়—সে কথা পরে বলিতেছি। পূর্বেই বলিয়াছি, কলিকাতার ব্যবসায়ে আমাদের আমদানী ও রপ্তানী উভয়ই ছিল। দেশ হইতে মাল খরিদ করিয়া আমরা কলিকাতায় আসিয়া আড়তে জমা দিতাম। এবং উহা বিক্রয় হইলে আমরা দোকানের জন্য কাপড় ও মুদিখানার মাল কিনিয়া লইয়া দেশে যাইতাম। তখন রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার মহাশয়ের আড়তের সহিত আমাদের কারবার চলিত। আমরা দেশ হইতে চাউল, পাট, ধান ইত্যাদি কিনিয়া উক্ত রায় বাহাদুরের আড়তেই আমদানী করিতাম। এবং কলিকাতায় আসিয়া ঐ খানেই থাকিতাম। কিছুদিন ঐরূপ করার পর একদিন ঘটনাক্রমে রায় বাহাদুর যদুনাথ মজুমদার মহাশয়ের পুত্র পরাক্রমের সহিত আড়ত সংক্রান্ত ব্যাপারে ঝগড়া হইল। সেই আমার শুভ-সংযােগ ! সেই দিন হইতে প্রতিজ্ঞা করিলাম-এবার নিজে আড়তদার হইয়া ব্যবসায় করিব। বাল্যকাল হইতে আমি খুব জেদী ছিলাম। যাহা করিব বলিয়া মনে করিতাম তাহা না করা পর্যন্ত মনে শান্তি পাইতাম না। ঐ বৎসর প্রথমে ধানের আড়ত করি। কিন্তু আমার ব্যবসা জীবন ২৫ ধানের আড়ত সেরূপ লাভজনক বলিয়া বিবেচিত না হওয়ায় কিছুদিন পরে ধানের আড়ত ছাড়িয়া দিয়া পাটের আড়ত করি। এই আড়তদারী কাৰ্য্য আরম্ভ করিবার সময়, “আমি আড়ত করিব” এই সংবাদ জানিতে পারিয়া আমার কনিষ্ঠ ভ্রাতার শ্বশুর, তেলকূপী নিবাসী রাইচরণ সাধুখাঁ মহাশয় আমাকে বিশেষ করিয়া ধরিয়া পড়েন,-যে দেশে ব্যবসাবাণিজ্য কোন প্রকার সুবিধা নাই ; তুমি নূতন আড়ত করিতে যাইতেছ, আমাকে সঙ্গে লও। তার এই প্রস্তাবে আমি প্রথম অস্বীকার করিলাম। কেননা, আত্মীয়স্থলে আর্থিক সম্বন্ধ সুখকর হয় না। কিন্তু তাঁহাদের দুই ভাইএর একান্ত পীড়াপীড়িতে অগত্যা তাহাকে শূন্য বা অর্থাৎ কাৰ্য্যকরী অংশীদার লইতে রাজী হইলাম। পরে, তিনি বিবেচনা করিয়া বলিলেন যে, “শূন্য বরাদার হইয়া গদীতে বসিয়া থাকিলে কর্মচারীগণ আমাকে গ্রাহ করিবে কেন? সুতরাং আমার নিকট হইতে মূলধন বাবদ কিছু টাকা লও।” তাহার কথাটী ভাবিবার বিষয় বটে। আমিও চিন্তা করিয়া দেখিলাম-দেশের বিস্তৃত কারবার, বিষয় আশয়, সমস্ত ফেলিয়া আমাকে সর্বদা কলিকাতায় থাকা সম্ভবপর হইবে না। কলিকাতায় যে সমস্ত কর্মচারী নিযুক্ত করিয়া কর্মে ব্ৰতী হইতেছি, তাহারা সকলেই বিদেশী, কেহ পূর্ব পরিচিত নহে। বহু টাকা পয়সার কাজ। একজন নিজের লােক দায়িত্ব-জ্ঞান লইয়া থাকা উচিত। আরও বিবেচনা করিলাম যে কারবারে লাভ লােকসান উভয়ই সম্ভব। যদি প্রথমবারে লােকসান হয়, তবে এই নবাগত আত্মীয়টা ত পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিবেনই—তখন এই লােকসানের টাকার বখরা

২৬
আমার ব্যবসা জীবন
তাঁহার নিকট লইতে গেলে বা চাইতে গেলে মননামালিন্য এবং
আত্মবিচ্ছেদ ঘটা অবশ্যম্ভাবী। এই সমস্ত চিন্তা করিয়া তাহার
নিকট হইতে মূলধন লইতে স্বীকার করিলাম।
বলিলাম, “কলিকাতার কারবারে বহু টাকা মূলধন প্রয়ােজন।
আপনি কত টাকা দিতে সক্ষম হইবেন ?” তদুত্তরে তিনি বলেন যে
আমি ৫০০০, পাঁচ হাজার টাকা দিব। একাধিক যাহা লাগিবে-
তাহা তােমায় দিতে হইবে। আমি তাহাতেই সম্মত হইলাম।
তিনি অতি কষ্টে ৫০০০, পাঁচ হাজার টাকা যােগাড়যন্ত্র করিয়া
আমার হাতে দিলেন। তাহাতেই আমি তাহাকে মহাজনী ও
কার্যকরী উভয়ই একযােগে তাহার।/৪ পাঁচ আনা চারি পাই অর্থাৎ
ও অংশ বখরাই সাব্যস্ত করিয়া দিলাম। ঐ বৎসর ভগবৎ ইচ্ছায়
আড়ত ফারমে ১৬ আনায় ৭০০০ সাত হাজারের কিছু বেশী টাকা
লাভ হইল। তাহার ও অংশে প্রায় ২৫০০ টাকা তিনি লভ্যাংশ
পাইলেন। তা ছাড়া, রাইচরণ সাধুখাঁ মহাশয় নিজে কিছু মফঃস্বল
হইতে ধার বাকি পাট খরিদ করিয়া আড়তে চালান দিয়াও
কিছু লাভ পাইলেন। মােটামুটী হিসাবে দেখা গেল—তিনি
এ বৎসর প্রায় ৩০০০ টাকা লাভ করিয়াছেন। ৫০০০, পাঁচ
হাজার টাকা বাটী হইতে আনিয়া ১ বৎসরের মধ্যে ৩০০০
টাকা
নগদ লাভ পাইলে সকলেরই মনে একটা অভূতপূর্ব আনন্দ হয়—
তাঁহারও তাই হইল।
১৩১৯ সাল ভাল ভাবেই কাটিয়া গেল। ১৩২০ সালের
শেষে জাৰ্মান যুদ্ধ আরম্ভ হইল। এই যুদ্ধের ফলে ভারতে রপ্তানী
মালের কারবারী লােকের দুরবস্থা ও আমদানীকারক ব্যবসায়ীর

আমার ব্যবসা জীবন
২৭
সুদিন আসিল। আমরা পাটের ব্যবসায়ী।
কাজেই আমরা
রপ্তানীকারক বলিয়া আমাদের দুরবস্থা হইল। তার উপর আবার
ভাগ্যবিপর্যয়—আমার সেই বৎসর দুইখানা কিস্তি ডুবিতেও
অনেক টাকা লােকসান হইল। সঙ্গে সঙ্গে রাইচরণ সাধুখাঁও এক
প্রকার সর্বস্বান্ত হইলেন। তাঁহার মূলধন ও ১৩১৯ সালের লাভ ত
গেলই, অধিকন্তু, আমার নিকট অনেকগুলি টাকা ঋণীও হইলেন।
বৎসর শেষ হইলে হিসাব নিকাশ দেখিয়া “হা হতােস্মি, বক্ষে ও
কপালে করাঘাত”-ইত্যাদি দ্বারা অত্যন্ত শােকপ্রকাশ করিতে
লাগিলেন।
আমি তাঁহাকে অনেক করিয়া বুঝাইলাম। “যে মাটীতে পড়ে
লােক, উঠে তাই ধরে।” যে ব্যবসায়ে শুধু লাভ হয়, সে ব্যবসায়ে
কোন দিন উন্নতি হয় না। যাহাতে লাভ লােকসা উভয়ই হয়,
তাহাই প্রকৃত ব্যবসায়। সুতরাং, এই আড়তদারী কাজে লােকান্
হইয়াছে—ইহাতেই আবার লাভ হইবে। এজন্য ভাবিয়া মন
খারাপ করেন কেন?” আমি তাঁহাকে যতই প্রবােধ দিই—কিছুতেই
মানিতে চান না। এমন সময়ে আমার এক ফকিরের গান মনে
পড়িয়া গেল। আমি সেই ফকিরের গান দ্বারা তাহাকে
বুঝাইলাম,—“দিন দুনিয়ার মালিক বান্দা, লেনা দেনা তার
এক্তার।”—ইত্যাদি।
১৩২০ সালে বাংলাদেশে ভাল পাট জন্মে নাই। বিশেষতঃ,
খুলনা জেলায় ঐ বৎসর খুব কম পাটই জন্মিয়াছিল। আমরা
খুলনা জেলার যে সমস্ত মােকাম হইতে পাট খরিদ করিতাম—সে
সকল মােকামে পাট প্রায় কিছুই জন্মে নাই বলিলেও চলে।

২৮ আমার ব্যবসা জীবন কাজেই, খুলনা জেলা হইতে পাট আমদানী করা অসুবিধা হইবে দেখিয়া নদীয়া জেলাবাসী জনৈক পাটের দালালের যুক্তি অনুযায়ী নদীয়া জেলার দর্শনা রেল ষ্টেশনের অনতিদূরে কুড়ুলগাছি” নামক মােকামে একটী পাটের খরিদা মােকাম খােলা আমাদের উভয়েরই মত হইল। আমি উক্ত কুড়ুলগাছি মােকামে গিয়া সেখানে গদী গুদাম ভাড়া করিয়া আমার জনৈক ভাগিনা ও ভগ্নিপতিকে সেখানকার in-charge করিয়া দিলাম। কুলী কয়াল প্রভৃতি পদে স্থানীয় লােক নিযুক্ত করা হইল। আমি মাত্র সপ্তাহে একবার Inspection করিবার জন্য ও তাহাদিগকে পাট কিনিবার টাকা দিতে সেখানে যাইতাম। কিন্তু খরিদা পাটের উপর বাজার দর অনুসারে বিশেষ পড়ত না হওয়ায় ঐ মাল কলিকাতায় বিক্রয় করিয়া বিশেষ কিছু লাভ হয় নাই। তা ছাড়া, আমার ভাগিনা ও ভগ্নিপতির নির্বুদ্ধিতার জন্য দালালদিগের প্ররােচনায় পড়িয়া পাট কিনিবার জন্য স্থানীয় পাট ব্যবসায়ীগণের নিকট কিছু কিছু টাকা দাদন দেওয়া হইয়াছিল। ঐ দাদনের টাকা অনেক অনাদায় হইয়াছিল। তখন পাটে কিছু লাভ হইতেছে না দেখিয়া কুড়লগাছির সেই পাটের মােকাম বন্ধ করিয়া দিয়া, রামনগর ওরফে দর্শনা রেল ষ্টেশনের সন্নিকটে একটা ঘর লইয়া ভূষি মালের খরিদা মােকাম করা হইল। ভূষি মালের মধ্যে ছােলা ও তিসি কিনিয়া কলিকাতায় চালান দেওয়া হইল। পূৰ্বেই বলিয়ছি, জাৰ্মান যুদ্ধ তখন সবে মাত্র আরম্ভ হইয়াছে, রপ্তানীকারকদের ব্যবসায়ে দুর্দিন আসিয়াছে। তিসি প্রভৃতি তৈল বীজ তখন বেশী মূল্যে ইউরােপে রপ্তানী আমার ব্যবসা জীবন হইতেছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য এমনি যে ঐ ভূষি মাল কিনিয়া বেচিবার সময় বাজার নামিয়া গেল। আবার আমাদের বিক্রয় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজার উঠিল। এইরূপ নানাপ্রকার ভাগ্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়িয়া ব্যবসায় চালানর জন্য ঐ বৎসর হিসাব নিকাশ করিয়া দেখা গেল যে পাটের কাজে, দাদনের অনাদায়ী লােকসানে ও ভূষি মালের কাজে সৰ্ব্ব সাকুল্যে আড়তের মূলধন বলিয়া যেটা উভয়ের স্থিরীকৃত ছিল, তাহা সমস্তই নষ্ট হইয়া গিয়াছিল। তা ছাড়া, রাইচরণ সাধুখাঁ মহাশয়ের নিজ খরিদ পাটেও ঐ বৎসর লােকসান হয়। আর এই লােকসানের জন্যই রাইচরণ সাধুখাঁ মহাশয় বক্ষে ও কপালে করাঘাত দ্বারা শােক- প্রকাশ করিয়াছিলেন এবং আমি পূৰ্ব্ব কথিত মত নানা উপদেশ দিয়া তাহার আশা ও উদ্যম ফিরাইয়া আনিবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। মজুত মাল বিক্রয় শেষ হইয়া যাওয়ায় বাজার দেনা সমস্ত চুক্তি করিয়া—যখন দেখা গেল নিজেদের স্থিরীকৃত মূলধন কিছুই নাই—এদিকে মরশুও চলিয়া গিয়াছে, আর কোন প্রকার মাল আমদানী হইবার আশা নাই, তখন কলিকাতায় থাকিয়া অকারণ খরচ না বাড়াইয়া আড়তের গদী গুদাম ইস্তফা দিয়া, কর্মচারীবর্গকে জবাব দিয়া—উভয়েই দেশে ঘরে ফিরিয়া আসিলাম। এখানে একটা কথা বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য যে—আমি যখন রায় বাহাদুরের ছেলের সহিত ঝগড়া করিয়া বাহির হই-তৎকালীন ঐ আড়তের কর্মচারী—নদীয়া কিশাের ও যুগলকিশাের সাহা নামক দুই ভাইকে—যাহারা রায় বাহাদুরের আড়তে সামান্য বেতনের সরকার ছিল—তাহাদিগকে আড়তের বখরা দিব এই প্রলােভন আমার ব্যবসা জীবন ১৭৫ • দেখাইয়া বাহির করিয়া আনি। ১৩১৯ সালে দাসপাড়া এবং টালায় দুই জায়গায় গদী ছিল। দুই ভাই দুই স্থলে কাজ দেখিত। এবং দুই ভাইকে বেতন বাবদ কিছু না দিয়া লভ্যাংশের ৫ দেওয়া হইয়াছিল। ইহারাও সেই ৭০০০ টাকার অংশে টাকা নগদ পাইয়া আশাতিরিক্ত লাভে উৎফুল্ল হইয়া ঐ টাকার গিনি কিনিয়া বাড়ী লইয়া যায়। যুগলের কাৰ্যে অনেক প্রবঞ্চনা প্রমাণ হওয়ায় এবং রাইচরণ সাধুখাঁকে যুগল তাদৃশ সম্মান করিত না বলিয়া–১৩২০ সালের বৎসরের seasonএর প্রথমে যুগলকে আড়ত হইতে কৰ্ম্মচ্যুত করিয়া নদীয়া কিশােরকে • আনা বখরা দিয়া রাখা হইয়াছিল। অবশিষ্ট • আনা অংশ আমদের উভয়ের মধ্যে তুল্যাংশে ভাগ করিয়া লই। আড়ত ফারমের এই প্রকারের লােকসান্ ও দুরবস্থা দেখিয়া নদীয়া কিশোের হিসাব নিকাশ হইবার পূর্বেই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করিয়াছিল। ১৩২০ সালে আমরা যে গুদাম ভাড়া লইয়া আড়তদারী করিতাম, তাহার আয়তন অপেক্ষা ভাড়া বেশী, কাজেই গদী- গুদাম পরিবর্তন করা আবশ্যক বিবেচনা করিলাম। রাইচরণ সাধুখাঁর মত—এখানে থাকিয়া লােকসান হইয়াছে, এটা অলক্ষুণে জায়গা, সুতরাং এটা পরিবর্তন করিতেই হইবে। যাহা হউক, উভয়ের মত এক হওয়াতে ঐ স্থান পরিবর্তন করিয়া বেলগাছিয়া নগেন ঘােষের গদী গুদাম ভাড়া লইয়া ১৩২১ সাল হইতে এখানে গদী করা হইল। পূৰ্ব্বকৰ্মচারীও কতকগুলি পরিবর্তন করিয়া নূতন কর্মচারী বহাল করা হইল। ১৩২১ সালের শেষ ভাগে আড়ত ফরমে দেখা গেল যে ১৩২০ সালের ফারমের লােকানটা সম্পূর্ণ পূরণ আমার ব্যবসা জীবন হইয়াছে। লাভ বিশেষ কিছু হয় নাই। যাহা কিছু আছে, তেনি বিলেত বাকিও কিছু আছে। যাহা হউক, ১৩২১ সালে এই লােক পূরণ হওয়াতে রাইচরণ সাধুখাঁ যেরূপ ভগ্নোদ্যম হইয়া গিয়াছিলেন, সেটা আবার দূর হইয়া গিয়া তিনি পূর্বের ন্যায় মনের প্রফুল্লতা লাভ করিলেন। আমার দেশের দোকানের অবস্থা মােটের উপর ভালই চলিতেছে। আড়তের কাৰ্য ব্যপদেশে অধিক সময় আমাকে কলিকাতায় থাকিতে হয় বলিয়া কনিষ্ঠ ভ্রাতা কুঞ্জবিহারীর উপরই দোকানের কর্তৃত্ব ভার দেওয়া আছে। যদিও সে অপ্রাপ্তবয়স্ক, তবুও দোকানদারী করার উপযােগ কার্যকরী শক্তি তাহার ছিল। ভগবৎ ইচ্ছায় দিনগুলি ভাল ভাবেই কাটিতেছিল। আমিও ব্যবসায়ের প্রসার বৃদ্ধির জন্য অন্যান্য সুযােগ সংযােগের অনুসন্ধান করিতেছিলাম। ১৩১৬ সালের ঝড়ের পর দোকানঘরের আবশ্যকীয় সংস্কার সাধন করিয়া দেখা গেল—কলিকাতার আমদানী মাল দ্বারাই গুদাম সব সময়েই পরিপূর্ণ থাকে। রপ্তানী মালের অর্থাৎ ধান, পাট ইত্যাদি যে সমস্ত দেশে খরিদ হইত, তাহার জন্য দোকান- সংলগ্ন গুদামে আশানুরূপ স্থানের সংকুলান হইত না। অথচ বাঁধাই মাল ও রপ্তানী মালের কারবারে কোন কোন বছরে বেশ দু’ পয়সা লাভের মুখ দেখা যাইত। এইজন্য, ঝড়ের পর দোকান- ঘর ও দোকান-সংলগ্ন গুদাম সংস্কার হওয়ার পরে বাটীতে গুদাম করিবার মনস্থ করিয়া, ১৩১৬ সালে ঐ কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করি এবং ১৩২২ সালে তাহা সমাধা হয়। এই ছয় বৎসর যাবৎ ক্রমান্বয়ে ৮ লক্ষ ইট প্রস্তুত করিয়া প্রায় ৫ বিঘা জমি একতালা দালানের আমার ব্যবসা জীবন সমান উচু প্রাচীর বেষ্টিত করিয়া তাহার মধ্যে গুদাম প্রস্তুত করি। উদ্দেশ্য ছিল--ইহার ভিতরে একটা Steam Engine পরিচালিত চাউলের কল বসাইব। তখন জার্মান যুদ্ধ চলিতেছে। কলিকাতায় যাবতীয় কলকারখানার অভাব ও অত্যধিক দর বৃদ্ধির জন্য সময়ের অপেক্ষা করিতে লাগিলাম। প্রাচীর বেষ্টিত করিয়া তন্মধ্যে গুদাম প্রস্তুত করিতে ১৪০০০ টাকার কিছু বেশী খরচ হয়। জার্মান যুদ্ধের সময় রপ্তানী মালের অনাদর হওয়ায় ঐ সময়ে ধান ও পাটের দর অত্যন্ত কম হয়। আমি পর পর দুই বৎসর ঐ সমস্ত গুদামে ধান ও পাট প্রচুর পরিমাণে বাঁধাই করি। যুদ্ধ অবসানে যখন আবার চাউল ও পাট রপ্তানী সুরু হইল, তখনই আমার ঐ সব বাঁধাই মাল বিক্রয় করি। বলা বাহুল্য, আমার ঐ বাঁধাই মালে যাহা লাভ হইয়াছিল, তাহাতে প্রায় গুদামের ও প্রাচীরের খরচ উঠিয়া গিয়াছিল। জৰ্ম্মান যুদ্ধ শেষ হইল, কলিকাতায় কলকারখানা আমদানী হইল—সেই সময়ে ভাইএর সহিত মনােমালিন্যের সৃষ্টি হইল। কাজেই আর দেশে চাউল কল বসান হইল না। এমন সময়ে ১৩২৬ সালে আশ্বিন মাসে এক ঝড় হইল— ঐ ঝড়ে প্রাচীর অভ্যন্তরস্থ গুদামের টীনের চালা উড়িয়া গেল- আর তাহার সংস্কার না করিয়া কিস্তি বােঝাই দিয়া টীন কাঠ সমস্ত কলিকাতায় পাঠাইয়া গ্যালিফ, স্ট্রীটের গুদাম প্রস্তুত করিলাম। ১৩২২ সালে আড়ত ফারমে বৎসরের শেষে দেখা গেল ১৪০০০ চৌদ্দ হাজার টাকা নেট মুনফা হইয়াছে। ঐ বৎসর আড়ত ফারমের সহিত রেঙ্গুন চাউলের কাজ খুলিয়াছিলাম।

আমার ব্যবসা জীবন মােটের উপর, এই অতিরিক্ত লাভ হওয়ার জন্য ভিতরে একটু অশান্তির সৃষ্টি হইল। ইহার মূলীভূত কারণ এই যে-কোন যৌথ কারবারে অতিরিক্ত লাভ বা লােকসান হইলে অংশীদারগণের মধ্যে মনােমালিন্যের সৃটি হয়—এটা স্বাভাবিক। কারণ, কারবারের অধিক উন্নতি হইলে অংশীদারদিগের ভিতরে এইরূপ ভাবের উদয় হয় যে কাহার কৃতিত্বে বা পরিশ্রমে এই আশাতিরিক্ত লাভ হইল। তখন যে মনে করে এটা আমারই পরিশ্রম বা কৃতিত্বের ফল, সে-ই তখন নিক্তি ধরিয়া—ওজন করিতে চায়—যে অপরের সহিত আমার বখরা কত হওয়া উচিত। রাইচরণ সাধুখাঁর ঠিক সেই অবস্থা ঘটিল। ১৩২২ সালে আমার মাতৃদেবী পরলােক গমন করেন। তিনি দীর্ঘ দিন রােগ- শয্যায় থাকায় বৃদ্ধাবস্থায় কখন্ মারা যান-শেষ সময়ে সাক্ষাৎ হইবে কি না—এই সমস্ত বিবেচনা করিয়া আমি সর্বদা তাঁহার কাছে কাছে থাকিতাম। কাজেই, কলিকাতায় আড়তের কাজকর্ম দেখা আমার নিজের পক্ষে উল্লিখিত কারণে সম্ভব হইত না বা ঘটিয়া উঠিত না। আমি কলিকাতায় যাতায়াত কম করিলেও আড়ত ফারমে যাহাতে আমদানী বেশী হয়—সেইজন্য দেশে থাকিয়া বেপারী জোগাড় করিতাম ও কপিলমুনি হইতে ৬ মাইল উত্তরে তালা নামক স্থানে নদীর ধারে স্থানীয় জমিদার মৌলবী মেনাতুল্লা খাঁর একটা হাওয়া-খাওয়া বাড়ী ছিল। আমি সেই বাড়ীটী ভাড়া লইয়া গদী গুদামের উপযােগী সংস্কার সাধন করিয়ানিজ খরিদা পাটের মােকাম করতঃ বহু পাট খরিদ করিয়া কলিকাতার আড়তে চালান ৩৪ আমার ব্যবসা জীবন দিয়াছিলাম। কাজেই, দেশে থাকিয়া পক্ষান্তরে আড়তেরই যাহাতে আয় বৃদ্ধি হয়, তাহাই করিতাম। আমার ঐ নিজ খরিদা পাটে খরিদ বিক্রী হিসাবে বিশেষ কিছু লাভ হয় নাই বটে, কিন্তু আড়তের আমদানী খুব বাড়িয়া গিয়াছিল। তাহার ফল এই দাড়াইল আড়তে কমিশন বেশী মুনফা হইল। পূৰ্ব্ব হইতে চুক্তি ছিল- আড়তে বেপারীদিগের আমদানী হউক বা উভয়ের মধ্যে নিজ খরিদা আমদানীই হউক, আড়তে কমিশন তুলাংশে দিতে হইবে। নিজ খরিদার জন্য যাহার যে যে মােকামের যাহা লাভ হইবে, তিনি তাহা নিজে পাইবেন। আড়তে যাহা কমিশন হইবে- পূৰ্ব্ব-লিখিত মত বখরা হইবে। এই ভাবে আমি দেশে থাকিয়া আড়তের আমদানী বৃদ্ধি করিবার জন্য মুনফা বেশী হইয়াছিল। রাইচরণ মনে করিলেন যে আমি কলিকাতায় সব সময়ে থাকি -বেশী পরিশ্রম করি, অথচ বখরার বেলায় আমার কম। আমি নিজে কলিকাতায় সর্বদা উপস্থিত না থাকিলেও আমার প্রতিনিধি স্বরূপ আমার একজন উচ্চ শিক্ষিত ভগিনীপতি বন্ধুবিহারী সাধুখাঁ সৰ্ব্বদা থাকিতেন। ফারম্ হইতে তাহার বেতন বা অংশ কিছু দেওয়া হইত না-তাহাকে যাহা কিছু দেওয়া হইত সমস্তই আমি দিতাম। পূৰ্বেই বলিয়াছি, রাইচরণ লেখাপড়া জানিতেন না। জমা খরচ বুঝিতেন না, বা কোন খরিদ্দার বা দালালের সহিত কথা বলিতে পারিতেন না বলিয়াবলিতেন না। তঁাহার duty ছিল–Iron safeএর চাবি রাখা এবং কোন প্রকার অন্যায় তছ রূপ না হয়, সেইদিকে লক্ষ্য রাখাইহাতেই তিনি মনে করিতেন বিনােদের অপেক্ষা আমি বেশী খাটী-সুতরাং আমার আমার ব্যবসা জীবন বখরা কেন কম হইবে? বলিতে ভূলিয়া গেলাম, ১৬ আনার ভিতরে তাহার ১৪ আনা ব্যতীত অবশিষ্ট ॥৮ পাই সমস্ত আমার নহে। ম্যানেজার রতিকান্ত বাগ, তাহার কার্যকরী বখরা • আনা ছিল। কাজেই আমার বখরা ৮ পাই ছিল এবং আমার ভগিনীপতি বঙ্ককে আমার বখরা হইতে তাহার পারিশ্রমিক দিতে হইত। কাৰ্যতঃ উভয়ের মহাজনী বখরা সমানই ছিল। রাইচরণ ঠিক আমার সামনে কোন দিন একথা বলেন নাই যে আমার বখরা কম, সুতরাং আমাকে বেশী দিতে হইবে। তবে, কর্মচারীদিগের ভিতরে বা অপরের নিকট এই বিষয় লইয়া কয়েক দিন আলােচনা করিয়াছিলেন। ইহাতেই তাহার মনের ভাব বুঝা গিয়াছিল যে তিনি এ বখরায় সন্তুষ্ট নহেন। এ ভাবে আমাকে কিছু না বললেও তিনি অন্য রকমে ছুতা খুজিতে লাগিলেন। আমি যখন কলিকাতায় থাকি, তখন আমাদের রান্না বাড়ীতে প্রায় প্রত্যহ ২১ জন লােক বেশী আহার করিত। তাহা ছাড়া, দেশে আমার Charitable Dispensaryতে যে সমস্ত রােগী আরােগ্য- লাভ না করিতে পারিত, তাহাদিগকে কলিকাতায় আনিয়া হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য seat পাইতে বিলম্ব হওয়ায় ২৪ দিন করিয়া ঐ রােগীদের আশ্রয় দিতে হইত। এরূপ প্রায় ঘটিত। এই অছিলা লইয়া-রাইচরণ বলিয়া বসিলেন “তােমার খরচ বেশী। তােমার সহিত আমার একত্র থাকা চলিবে না।” তদুত্তরে বলিলাম, “বাপ পিতামহের আমল হইতে আমাদের এই অনুদান- প্রথা চলিয়া আসিতেছে—তখন আমিই বা সংস্থান থাকিতে বন্ধ করি কি করিয়া ?” তদুত্তরে রাইচরণ বলিলেন যে আমরা হােটেলে

আমার ব্যবসা জীবন
খাইব, রান্নাবাড়ী উঠাইয়া দাও। রান্নবাড়ী না থাকিলে এ
প্রকারে অনাহুত লােক আসিয়া জুটিবে না।” তাহার মনস্তুষ্টির
জন্য অগত্যা আমাকে তাহাতেই সম্মতি দিতে হইল। এইভাবে
কিছুদিন চলিল বটে, কিন্তু তাহার মনের গ্লানি গেল বলিয়া
বুঝিলাম না।
একদা আমি প্রস্তাব করিলাম যে আমাদের অপেক্ষা যাহাদের
ছোট কারবার, তাহাদের কলিকাতায় গাড়ী ঘােড়া আছে,
সুতরাং আমাদের একখানা গাড়ী ঘােড়া থাকা উচিত। রাইচরণ
তাহাতে ঘাের প্রতিবাদ করিয়া বসিলেন। অগত্যা আমি বলিলাম
“গাড়ী ঘােড় কিনিবার যে খরচ তাহা আমি নিজেই দিতেছি,
আমার নামে খরচ লিখিয়া ফারম হইতে লও। আর, গাড়ী
চালাইবার দৈনিক যে ব্যয় পড়িবে, তাহা উভয়ে ফারম হইতে
দেওয়া হইবে।” আমার যেমন কপিলমুনিতে বড় কারবার ছিল,
রাইচরণেরও তৎকালে তদনুরূপ একটী ছােট কারবার পাটকেল
ঘাটায় ছিল। তাঁহারও কলিকাতায় মালগস্ত করিয়া দেশে পাঠাইতে
হইত। কাজেই গাড়ীখানা থাকিলে নিজেরও প্রয়ােজনে লাগিবে
এই মনে করিয়া তখন স্বীকার করিলেন যে “আচ্চা” তাই হােক।
তাঁহার সেই সম্মতিতে আমার নিজের টাকা দিয়া একখানি
গাড়ী ও একটী ঘােড় কেনা হইল। এবং যেদিন গাড়ী ঘােড়
কেনা হইল, সেইদিন আমি সমস্ত বন্দোবস্ত করিয়া দেশে চলিয়া
আসিলাম। আমি দেশে রওনা হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে তিনিও মত
বদলাইয়া বসিলেন আর ঘােড়ার দানা বা সহিস কোচ ম্যানের
খরচ দিলেন না। অগত্যা আড়তের ম্যানেজার ও আমার ভগিনী-

আমার ব্যবসা জীবন পতি দুইজনে যুক্তি করিয়া কিছু লােকসান দিয়া গাড়ী ঘােড় বিক্রয় করিয়া ফেলিলেন। পাছে তিনি চটিয়া যান, এইজন্য ইহা লইয়া আর আমি বিশেষ পীড়াপীড়ি করিলাম না। ১৩২৩ সালে ম্যানেজার রতি বাগের মৃত্যু হওয়াতে ১৩২০ সালের সেই পৃষ্ঠ প্রদর্শক ম্যানেজার নদেকিশাের সাহাকে আনিয়া পুনরায় রাইচরণ বহাল করিলেন। উহার অনুগ্রহে চাকুরী পাইল বলিয়া ম্যানেজার উহাকেই খাতির বেশী করে। এবং সব সময়ে উহার মত সমর্থন করিয়া চলে। এই সময়ে দেশে আমার এক নূতন বিপদ উপস্থিত হইল। কনিষ্ঠ ভ্রাতা কুঞ্জবিহারীকে কতকগুলি বদমায়েস্ পােক বুঝাইল যে, সাধারণ দেশহিতকর কাৰ্যে যে সমস্ত ব্যয় হয়, তাহা তােমাদের ষ্টেটের টাকার দ্বারাই হয়, অথচ তােমার নাম কেহ করে না—সর্বত্রই তােমার দাদার নাম। তুমি আমাদের কুমিরা গ্রামে আমাদের মতানুসারে এই অনুষ্ঠানগুলি খাড়া করিয়া দাও—তাহা হইলে আমরা সমস্ত খবরের কাগজে তােমার এই সকল দানের কথা প্রচার করিব এবং সেই সেই স্থলে তােমার নামে পাথর খােদাই করিয়া তাহাতে লাগাইয়া দিব। এই প্রকার প্রলােভন দেখাইয়া ভাষাকে বশীভূত করতঃ প্রায় লক্ষাধিক টাকা ব্যয়ের এক ফর্দ ভায়া আমার নিকট কলিকাতায় পাশ করিবার জন্য পাঠাইল। এবং তাহাতে মন্তব্য ইহাও লিখিল যে ইহাতে আপনি অমত করিলে আপনার সহিত মনােমালিন্য ঘটিবে। ইহা আমার করাই স্থির। এবং এই সমস্ত কাৰ্য করিবার জন্য আপাততঃ এক লক্ষ ইট কাটিতে আমি ৮০০, আট শত টাকা দিলাম। সেই চিঠি পাইয়া আমি আর কালবিলম্ব না করিয়া বাট যাইয়া ৩৮ আমার ব্যবসা জীবন ভায়াকে মত পরিবর্তনের জন্য অনেক উপদেশ দিলাম, ভৎসনা করিলাম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। তাহারা এমন যাদুমন্ত্রে ভায়াকে বশীভূত করিয়াছিল যে, আমার কথা অপেক্ষা তাহাদের কথাই ভায় অধিক মূল্যবান্ বলিয়া মনে করিল। কাজেই, ভায়ার কর্তৃত্ব-power নষ্ট করিতে হইল। যাহাতে তাহার হাতে আর টাকা না পড়ে যতদূর সম্ভব তাহার ব্যবস্থা করিলাম। আড়তে পত্র দিলাম। কলিকাতায় যে সমস্ত ঘরে দেনা পাওনা- সে সব জায়গায় পত্র দিলাম। এই সমস্ত বন্দোবস্ত করিতে করিতেও ২১টী আড়তের ব্যাপারীর নিকট হইতে ৫০০-৭০০ টাকা লইয়া ভায়া খরচ করিয়া বসিল। পরে বৌমার গহনা কতকটা নষ্ট করিল। এই সমস্ত অশান্তির জন্য আমি বাড়ী ছাড়িয়া দীর্ঘদিন কলিকাতায় আসিতে পারি না। কাজকারবার ক্রমশঃ গুটাইয়া আনিতে লাগিলাম। এই সুযােগে রাইচরণ সাধুখা গদীগুদামের মালিকের সহিত যৌথ নাম পরিবর্তন করিয়া নিজের নাম পত্তন করিলেন, কর্মচারীদের ভিতরে কাহাকেও বখরা দিব, কাহারও মাহিনা বাড়াইব ইত্যাদি করিয়া তাহাদিগকে বশীভূত করিলেন। যখন দেখিলেন যে তাঁহার আট ঘাট বাঁধা হইয়াছে-তখন তিনি আমার সহিত partition declare করিয়া দিলেন। উহার ব্যবহারে এক কথায় তুলনা করিয়া বলিতে গেলে বলতে হয় যে,-বরযাত্রী আসিয়া বিবাহ করিয়া বসিলেন। দেশের কাৰ্য যতদূর সম্ভব সুশৃঙ্খল করিয়া যখন কলিকাতায় আসিলাম তখন দেখিলাম সমস্তই আমূল পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে।

আমার ব্যবসা জীবন দেশী পাটের আড়তদারী কাজের উপর বরাবরই আমার একটা অশ্রদ্ধা ছিল। যেহেতু, ন্যায় ধৰ্ম্ম বজায় রাখিয়া সব সময়ে আড়তদারী কাজ করা চলে না। কাৰ্য্যক্ষেত্রে বাধ্য হইয়া ব্যাপারীর বা খরিদ্দারের অনিষ্ট করিতে হয়। সে সমস্ত বিষয় লিখিয়া আলােচনা করা যায় না। কোনও অনুসন্ধিৎসু পাঠক আমার সহিত সাক্ষাৎ করিলে বুঝাইয়া দিতে পারি। এই সুযােগে আমি আড়তদারী কাজ ত্যাগ করিবার ইচ্ছা থাকিলেও আড়তের বিলাত বাকি ১০,০০০, দশ হাজার টাকা আমার গায়ে ফেলিয়া দিলেন। জমিদারের জমিদারী বিক্রয় হইয়া গেলে যেমন প্রজার নিকট বাকিপড়া টাকা আদায় করা যায় না, সেইরূপ কারবারী লােকের কারবার বন্ধ হইলে, আর বিলাত বাকি আদায় হয় না। কাজেই, বাধ্য হইয়া আমাকে ছেড়া কাপড়ে তালি দিয়া পরার মত ঐ বিলাত বাকি আদায় করার জন্য, আর এক বৎসর নিজ নামে অন্যান্য নূতন কর্মচারী রাখিয়া অন্যত্র আড়ত চালাইতে হইয়াছিল। বিলাত বাকি ১০০০০, দশ হাজারের মধ্যে বহু চেষ্টা করিয়াও ৪০০০, চারি হাজার টাকার বেশী আদায় করিতে পারি নাই। বাকি ৬০০০, ছয় হাজার টাকা নাজাই খাতায় লিখিয়া আড়তদারী কাজে ইস্তফা দিয়া ঘরের ছেলে ঘরে ফিরিয়া গিয়া ভাইয়ের সহিত পৈত্রিক সম্পত্তির settle করিতে বসিলাম। ভাইকে পূর্ব লিখিত প্রণালীতে স্বাধীনতা বন করিয়া দেওয়ায় তাহার সহিত partition করা অনিবার্য হইয়া উঠিল। ১৩২৩ সাল হইতে ১৩২৬ সালের ভাদ্র মাস পর্যন্ত এই প্রকার নানারূপ অশান্তিতে কাল কাটাইতে হইল। কথাটা ব্যবসায় ৪ ০ আমার ব্যবসা জীবন প্রসঙ্গ না হইলেও লিখিতে বাধ্য হইলাম যে আমার জমিদারী সংক্রান্ত ৩নং অযথা বড় বড় মােকদ্দমা এই সময়ে থাকিয়া-বহু অর্থ অনিষ্ট হইয়াছিল। মােট কথা, আমার ব্যবসায় জীবনে মাতৃ- বিয়ােগের পর হইতে অর্থাৎ ১৩২২ সালের মাঝামাঝি হইতে ১৩২৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত অত্যন্ত দুঃসময় গিয়াছে। ১৩২৬ সালের ভাদ্র মাসে ভাইএর সঙ্গে partition করিয়া কলিকাতায় আসিলাম। আমাদের partition সাধারণ partitionএর মত হয় নাই। Partition করিবার পূর্বে অনেক চেষ্টা করিয়াছিলাম যাহাতে partition না হয়। কিন্তু যখন কিছুতেই কৃতকার্য হইতে পারিলাম না, তখন যতদূর সম্ভব কারবার সঙ্কোচ করিয়া আনিলাম। এই কারবার সঙ্কোচের ফলে partition করিতে বিলম্ব হইলে ভাই ষ্টেটে Receiver appoint করিবে—এইরূপ আয়ােজন করিতে লাগিল দেখিয়া-মজুদ মাল পাট ধান ইত্যাদি যে সমস্ত বাঁধাই মাল ছিল, তাহা উপস্থিত বাজার দরে বিক্রয় করিয়া অনেক টাকা লােকসান হইল। ইহার ফল এই দাড়াইল যে, বাবা মৃত্যুকালে যে টাকা রাখিয়া গিয়াছিলেন, partition কালীন তাহা অপেক্ষা ৫০০০, পাঁচ হাজার টাকা কমিয়া গিয়াছে। কিন্তু ১৩১৪ সাল হইতে ১৩২৬ সাল পর্যন্ত এই ১২ বৎসর মধ্যে এমন কতকগুলি মােটামােটা খরচ করা হইয়াছে যে খরচ গুলি না করিলে চলিত। অথচ তাহার খরচের অঙ্ক ৭২৫০০ টাকা। ভায়ার ইচ্ছা, উভয় পক্ষ হইতে ৫ জন সালিশ মানিয়া partition করা হউক। আমি প্রতিবাদ করিয়া বলিলাম তাহা হইতে পারে না। কেন না, আমার ব্যবসা জীবন ৪১ ব্যবসায়ী লােকের পক্ষে দরিদ্র অপবাদের চেয়ে ধনী গালাগালি ভাল। জগতের নিয়ম এই—নিজের পরমায়ু ও পরের ধন কেহ কম দেখে না। সুতরাং আমাদের যতই থাক্‌, লােকে আমাদিগকে খুব বড় ধনী বলিয়া মনে করে। “সালিশ ডাকিয়া ঘরের কথা পরকে বলিয়া সাধারণের নিকট হাল্কা হইতে দিব না।” তখন অগত্যা এই স্থির হইল যে-নগদ টাকা যাহা আমাদের আছে, তাহা দুই ভাই তুলাংশে পাইব। দেশের সম্পত্তি ও কলিকাতার সম্পত্তি যাহার যাহা হইবে, তাহার তাহা ষােল আনা হইবে। স্থাবর সম্পত্তির Valuation ধরিয়া সম্পত্তি উভয়ের মধ্যে তুলাংশে ভাগাভাগি হইবে। তবে কলিকাতার যাহা সম্পত্তি আছে তাহা একজনে সমস্ত পাইবে। যেহেতু, মনে করিলাম যে হাতীর পিঠ হইতে নামিয়া গাধার পিঠে চড়া একই স্থানে শােভা পায় না বরং বিদেশে যাইয়া হাঁটিয়া বেড়ান ভাল। দ্বিতীয় কথা, কলিকাতা ব্যবসায়ের কেন্দ্র- স্থল—সেখানে ভাগ্যপরীক্ষার সুযােগ ঘটিবে। এই সমস্ত ভাবিয়া আমি কলিকাতায় ভাগ লওয়াই স্থির করিলাম। তদুত্তরে ভায়া বলিল যে “ভাগ আমি করিব এবং আমি আগে লইব”। আমি তাহাতে বাধ্য হইয়া সম্মতি দিলাম। কারণ, বুঝিলাম যে ত্যাগ স্বীকার না করিলে কোন দিন সরিকী বিবাদ নিষ্পত্তি হয় না। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ তাহার জ্বলন্ত প্রমাণ। যদিও ভায়া নিজে ভাগ করিয়া আগে ভাগ লয়, তাহাতে এক হিসাবে আমার ঠকা হইলেও জিত হইবে। কেননা, এই চুল চিরিয়া ভাগ করিবার জন্য যে সময় ও energy নষ্ট হইবে, সেই সময় আমি ব্যবসায়ে খাটাইলে আমার তাহা অপেক্ষা অধিক লাভ হইবে। এই বুঝিয়া আমি

৪২
আমার ব্যবসা জীবন
সম্মতি দিলাম। ফলে এই দাড়াইল, নগদ টাকা আধাআধি হইলেও
স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ভায়ার ভাগে ॥y• আনা ও আমার ভাগে
• ছয় আনা পড়িল। আমি তাহাতেই সন্তুষ্ট হইয়া সন ১৩২৬
সালের ভাদ্র মাসে জন্মভূমিকে নমস্কার করিয়া সপরিবারে কলিকাতায়
চলিয়া আসিলাম।
পূৰ্বেই বলিয়াছি, ভাইএর সঙ্গে partition করার জন্য কাজ
কারবার সঙ্কোচ করা হইয়াছিল। যখন ভাইএর সঙ্গে partition
করিয়া কলিকাতায় আসিলাম, তখন কলিকাতার গুদামে আর
কোন মাল পত্র নাই ; বা, আমি যে সমস্ত ব্যবসা পূর্বে করিয়া
আসিয়াছি, তাহার মরশুম্ তথন নহে। ভাদ্র মাসনূতন
আউশ
ধান্য দেখা দিয়াছে। সে বৎসর খুলনায় উৎপন্ন ফসলের অবস্থা
খারাপ হইবে জানিতে পারিয়া ঝিকরগাছায় মােকাম করিয়া
সেখানে আউশ ধান্য খরিদ করিতে আরম্ভ করিলাম। ঝিকরগাছায়
আমার যে গুদাম ভাড়া করা ছিল, তাহাতে ৩০০০/• মণ ধান
ধরিত,-তাহাই কেনা হইল।
ঝিকরগাছায় ধান খরিদ হইতেছে, এমন সময়ে একটী দালালের
প্ররােচনায় পড়িয়া বেশী পরিমাণে রেঙ্গুণ চাউলের forword
contract করিলাম (speculation)।. যখন সেই চাউল
delivery লইবার সময় আসিল, তখন দেখিলাম, আমার খরিদ
দর অপেক্ষা বাজার ১ এক টাকা মণ প্রতি কমিয়া গিয়াছে।
আরও দেখিলাম, বাজারের অবস্থা ক্রমশঃই নিম্নগামী। সমস্ত
চাউল delivery লইলে বহু টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হইব,—এই
আশঙ্কায় সেই বিক্রেতার সহিত contract settle অর্থাৎ

আমার ব্যবসা জীবন ৪৩ difference দিয়া মিটমাট করাই স্থির করিলাম। কিন্তু বাজার হিসাবে যত টাকা difference দাবী করিল, সমস্ত টাকা আমাকে দিতে হইলে একেবারে দেউলিয়া হইতে হয়। দালাল পরামর্শ দিল,—Firmএর নাম বাইয়া দিন। আমি দেখিলাম, Sellerএর কোন দোষ নাই, দোষ আমার ভাগ্যের। জ্ঞানকৃত একজনকে ঠকাইয়া লাভবান্ হওয়ার প্রবৃত্তি আমার কোন কালেই ছিল না। বা আমার ব্যবসায়ের শিক্ষাগুরু স্বর্গীয় পিতৃদেব এই কথাই সব সময়ে আমাকে উপদেশ দিতেন। কাজেই, দালালের সে কথা না শুনিয়া আমি নিজেই আমড়াতলার সেই sellerএর বাটীতে যাতায়াত করিতে লাগিলাম। পরে বাদসাদ দিয়া যাহা difference settle করিলাম, সেই টাকা দিতেই তখনকার দিনে আমার মূলধন নিঃশেষ হইল; থাকিল মাত্র ঝিকরগাছা মােকামের ৩০ •/• মণ আউশ ধান্য। কলিকাতায় কাজ কারবার না থাকাতে ইতিপূৰ্বেই গুদামগুলি ভাড়া দিয়াছি। নগদ টাকাগুলি সমস্ত হস্তচ্যুত হওয়াতে নূতন কোন কারবারের মতলবও মাথায় আসিতেছে না। এক প্রকার বেকার হইয়া পড়িয়াছি। এমন সময়ে সন ১৩২৭ সালে খুলনায় দুর্ভিক্ষ আরম্ভ হইল। আমার স্বর্গীয় পিতামহ কপিলমুনির বাটীতে একটা স্থায়ী অতিথিশালা স্থাপন করিয়া যান। যখন কনিষ্ঠ ভ্রাতার সহিত partition হয়, তখন এই অতিথিশালার ব্যয় নিয়মিত চালাইবার ভার আমার কনিষ্ঠের উপর পড়ে এবং তজ্জন্য কিছু সম্পত্তিও তাহার তত্ত্বাবধানে দেওয়া হয়। দেশে দুর্ভিক্ষ উপস্থিত হওয়াতে অতিথির **** * * ৪৪ আমার ব্যবসা জীবন সংখ্যা যখন ক্রমশঃ বাড়িতে লাগিল, তখন ভায়া আমাকে পত্র লিখিল,-“যে সম্পত্তি আমাকে অতিথিশালার জন্য দেওয়া হইয়াছে, ঐ সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া দিলেও তাহার ব্যয়ভার সংকুলান হইবে না।” তখন মনে করিলাম,—“যাহাদের ওয়ারেশ সূত্রে আমি আজ এই সুখ সম্পদ ভােগ করিতেছি, তাহাদিগের কীৰ্ত্তি, সামর্থ্য থাকা স্বত্বে নষ্ট করিলে ভগবানের অপ্রিয় হইতে হইবে।” এই মনে করিয়া ঝিকরগাছার মজুত সেই ৩০০০/০ মণ ধান কিস্তি ভরিয়া কপিলমুনি চালান দিলাম। ঐ ধান কপিলমুনি পৌছিলে বােধ হয় ৪০০/৫০০ মণ পরিমাণ বিক্রয় এবং অবশিষ্ট বিতরণে শেষ হইয়া গেল। তখনও দুর্ভিক্ষ প্রবলভাবে চলিতেছে। অনন্যোপায় হইয়া, কলিকাতায় যে সমস্ত মহাজনের সহিত জানাশুনা ছিল, তাহাদের নিকট হইতে প্রায় ৬০ •/• মণ চাউল ও ১০০ জোড়া কাপড় সপ্তাহ কাল ভিক্ষা দ্বারা সংগ্রহ করিয়া দেশে পাঠাইলাম। পূৰ্ব্ববৎ বিতরণ চলিতেছে, ভগবদিচ্ছায় আমার মজুদ চাউলও শেষ হইল,- দেশে নূতন ফসলও দেখা দিল। আমিও একপ্রকার কপর্দকশূন্য হইয়া পড়িলাম। যদিও আমি অর্থশূন্য ও কাজকারবার শূন্য হইয়া বেকার হইলাম বটে, কিন্তু ভগবদিচ্ছায় কাহারও নিকট ঋণী হই নাই। একটা কথা বলিতে ভুল হইয়াছে। যখন ভাতার সহিত partition হয়, তখন দেশের কাজকারবার সমস্ত তাহারই অংশে পড়িল এবং কলিকাতায় করিবার উপযােগী কোন কাজ হাতে না থাকায়, নুতন কিছু করিব—এইরূপ সংকল্প লইয়া ঘুরিতেছি। এমন সময়ে, আমার এক জ্ঞাতি খুল্লতাত উপদেশ দিলেন আমার ব্যবসা জীবন ৪৫ ৫। পঞ্চাশ “যশােহরের Excise Superintendent আমাদের পুরােহিত ঠাকুর, তাঁহাকে ধরিয়া একখানা বড় Excise Shop লওয়া যাইতে পারে, যদি তুমি আমাকে ৫০০ টাকা পূজি দাও—তাহা হইলে আমি এই দোকান হইতে তােমাকে মাসিক টাকা হিসাবে মুনফা দিব এবং আমারও স্বচ্ছলরূপে চলিবে।” তাহার প্রলােভনে মুগ্ধ হইয়া যশোহর যাইয়া এই প্রকার হীন কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইলাম। খুড়া মহাশয়ের অবস্থা এবং চরিত্র—উভয়ই খারাপ থাকাতে Superintendent তাহার নামে দোকান দিতে রাজী হইলেন না। বাধ্য হইয়া আমার ও তাহার দুই নামেই license লইতে হইল। কিন্তু সাইনবাের্ডে চক্ষু লজ্জার খাতিরে আমার নাম না দিয়া, তাঁহার নামের সহিত “এণ্ড কোং যােগ করা হইল। মাসে ৫০ পঞ্চাশ টাকা হিসাবে লাভ পাওয়া দূরে থাকুক, যে ৫০০ পাঁচ শত টাকা মূলধন দিলাম,-তাহার ৫টা পয়সাও ঘরে আসিল না। আমি বৎসরের মধ্যে মাত্র ২ বার-৩৪ ঘণ্টার জন্য গােপনে দোকান Inspection করিতে গিয়াছি, আর সর্বদাই খুড়া মহাশয় থাকিতেন। এই প্রকার লজ্জাকর হেয় কাৰ্য্য করিয়া এই পুস্তকে ইহার আলােচনা করার উদ্দেশ্য এই যে, এমন কোন অন্তর্বাণিজ্য নাই,—যাহাতে আমার অল্প বিস্তর অভিজ্ঞতা নাই। কপিলমুনির দুর্ভিক্ষ শেষ হইলে যখন রিক্ত হস্তে কলিকাতায় প্রত্যাবর্তন করিলাম, তখন যদিও কলিকাতায় গুদাম ও বাড়ী ভাড়ায় আয়ের দ্বারা গ্রাসাচ্ছাদনের কোন কষ্ট নাই, তথাপি কৰ্ম্ম- শূন্য হওয়াতে মানসিক অবস্থা দিন দিন শশাচনীয় হইতে লাগিল।

৪৬ আমার ব্যবসা জীবন একটা কিছু কাজ করিতেই হইবে,—অথচ হাতে টাকা নাই- কাজেই তখন অল্প মূলধনে কি করা যায়, ইহাই চিন্তা করিতে লাগিলাম। শেষ সিদ্ধান্ত করিলাম, একখানি খাবারের দোকান করিব। পূৰ্বে চিন্তা, পরে কাৰ্য ;—সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে ব্রতী হইলাম। মেছুয়াবাজার স্ত্রী ও কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীটের সঙ্গমস্থলে দৈনিক ১ পাঁচ সিকি হিসাবে ভাড়া ঠিক করিয়া একখানি ঘর লইলাম। এবং ঝিকরগাছা হইতে লক্ষ্মণ মােক ও আরও ২ জন লােককে কর্মচারী করিয়া দোকান খুলিয়া দিলাম। খরিদ্দার ডাকিতে বা কোন advertise করিতে হইল না, কারণ, জায়গার গুণেই দরিদ্রে ভাত খায়”। দোকান খােলার সঙ্গে সঙ্গে বিক্ৰী আৱম্ভ হইল। দেখিলাম, দৈনিক খরচ পত্র বাদে প্রথম প্রথম ৩৪ টাকা লাভ হইতে লাগিল। মনে করিলাম, কাজ ভাল ভাবে চালাইতে পারিলে, যাহা হউক, ইহাতে এক প্রকার মন্দ হইবে না। যে সমস্ত লােক কর্মচারী রাখিয়া আমি কর্মক্ষেত্রে ব্রতী হইয়াছিলাম, হাতে কলমে তাহারাই সমস্ত করিত। আমার মাত্র তত্ত্বাবধান ও দেখাশুনা করা ও মাল আনিয়া দেওয়ার ভার ছিল। আসবা পত্র অর্থাৎ কড়াই, বেলী, থালা, বাসন ইত্যাদি লক্ষ্মণ মােদকের নিজেরই। সে ঝিকরগাছা হইতে ঐ সকল আনিয়াছিল। দোকান বেশ চলিতেছে, কিছুদিন পরে একদিন দোকানে যাইয়া দেখি, দোকান ফাক। কিছুই নাই, কি হইল, কোনই অনুসন্ধানে খোঁজ পাইলাম না। ঝিকরগাছায় ছুটিলাম; যাইয়া দেখি, লক্ষ্মণ মােক নিশ্চিন্ত মনে আমার ব্যবসা জীবন ৪৭ তামাক সেবন করিতেছে। আমাকে দেখিয়া একটু সঙ্কুচিত বা লজ্জিত হওয়া কিছুই নহে,-যেন তাহার সহিত কোন কালে কোন সম্বন্ধ ছিল, এরূপ ভাবেরও পরিচয় পাইলাম না। জিজ্ঞাসা করিলাম,-“ব্যাপার কি?” সে বলিল,-“অত খাটিয়া আমরা পারি না। ভাের ৫টা হইতে রাত্রি ১০টা পর্যন্ত কখনও মানুষে খাটিতে পারে ? আরাম, বিরাম, আয়াস, বিশ্রাম, ঘূৰ্ত্তি সমস্ত জলাঞ্জলি দিয়া নিশিদিন ভূতের মত খাটিয়া কি হইবে? পয়সা কি সঙ্গে যাইবে ? আমি শুনিয়া “ন যযৌ, ন তন্থে । লক্ষ্মণকে আমি অবিশ্বাস করিতাম না। এই দোকানে তাহার সহিত partnership বন্দবস্ত ছিল। মালপত্র আমার নিজের নামে বাজার হইতে ধার লইতাম ;-বিক্ৰী করিয়া যাহা তহবিল হইত, পাওনাদারেরা দোকানে যাইয়া গেদা করিয়া লইয়া আসিত। যেদিন লক্ষ্মণ পাততাড়ি গুটাইল, সেদিন দেখিলাম প্রায় শতাধিক টাকা বাজার দেনা। আমি বলিলাম,-“লক্ষ্মণ, তুমি ত শক্তিশেল হানিয়া আসিলে, এখন টাকার উপায়?” উত্তরে বলিল, “আমি কিছু টাকা ভাঙ্গিয়া ফেলিয়াছি; আর যাহা কিছু আমার হাতে আছে, তাহা দেওয়ার উপায় নাই। আপনি ভাবিবেন না। আমি দেনা ক্রমে শােধ করিব।” নগদ বিদায় হইয়া কলিকাতায় ফিরিলাম। কিন্তু খাবারের দোকান করিতে আর প্রবৃত্তি হইল না। পাওনাদারেরা আসিয়া চাপিয়া ধরিল-বাধ্য হইয়া তাহাদের টাকা আমার তৎকালীন বাড়ী ভাড়ার আয় হইতে শােধ করিয়া দিলাম। লক্ষ্মণের নিকট পাওনা টাকা কলিকাতা হইতে কপিলমুনি যাতায়াত কালে দীর্ঘ দিনে ২০১২ ৪৮ আমার ব্যবসা জীষন টাকা করিয়া কিন্তীবন্দী স্বরূপ নগদে ও খাবারে ওয়াশীল করিতে হইয়াছিল। পূৰ্বেই বলিয়াছি, ন্যায় ধৰ্ম্ম বজায় রাখিয়া দেশী পাটের আড়ত- দারী করা চলে না। শ্যামবাজার অঞ্চলে যত প্রকারের মহাজনী কারবার আছে, তন্মধ্যে দেশী পাটের কাজই বড়। তাহার নীচে সরিষা ও লবণ খরিদ বিক্রয়ের কাজ। বরাবরই এই অঞ্চলে আছি। কাজেই, এই ধারেই সমস্ত খরিদ্দার ও দালালের সহিত পরিচিত। ব্যবসা’ কাৰ্য্যের নিয়ম,যে যত বেশী লােকের সহিত honest বলিয়া পরিচিত হইতে পারিবে, সে ব্যবসা কাৰ্যে তত বেশী সাফল্য লাভ করিতে পারিবে। কাজেই, শ্যামবাজার অঞ্চলে একটা লবণ ও সরিষার গােলা করা স্থির করিয়া ২২৪নং গ্যালিফ, স্ট্রীটে ১০ দশ কাঠা খালি জায়গা মাসিক ৮৭২ টাকা ভাড়া স্থির করিয়া পূৰ্বেই lease লইয়াছিলাম। উদ্দেশ্য,-এখানে গদী ও গুদাম করিয়া সরিষা ও লবণের গােলা খুলিব। Lease রেজিষ্ট্রী হওয়ার পরে যখন গদী গুদাম প্রস্তুতের plan পাশ করার জন্য Corporation গেলাম, তখন দেখি, জমিদারের অপর স্বরিক ঘাের প্রতিদ্বন্দ্বী ; ঐ plan পাশ করিতে সে নানা- প্রকার আপত্তি দিয়া বসিল। বৎসরাবধি চেষ্টার ফলে plan পাশ হইল। জমিদার মাস নাই যাইতে খাজনার টাকার তাগিদ দেয়— এইরূপে ২৩ মাস বসাইয়া জমির খাজনা দেওয়ার পর স্থির করিলাম, যতদিন plan পাশ না হয়, ততদিন খােলা জমিতে শাল কাষ্ঠের কাৰ্য করা যাইতে পারে।

আমার ব্যবসা জীবন
৪১
এমন সময়ে কালীপদ দালাল নামক মদীয় জনৈক দেশবাসী
বাল্যবন্ধু আমাকে আসিয়া ধরিয়া পড়িল-B. A. পাশ করিতে
পারি নাই; এগজামিন্ দিয়া ফেল হইয়াছি। কোন চাকরী
বারীর সুবিধা নাই। আমাকে দয়া করিয়া আপনার কাজের
মধ্যে লউন, আমি ব্যবসা করিব।” একজন শিক্ষিত যুবক,
দেশস্থ পরিচিত, বিশেষ বাল্য-বন্ধু, সুতরাং তাহার দাবী মঞ্জুর
করিলাম এবং ঐ জমিতে শাল কাঠের কাজ খুলিবার জন্য যতদূর
সম্ভব, পার্শ্ববর্তী সমস্ত কাঠের গােলার অনুসন্ধানে Theoretical
জ্ঞান লাভ করিয়া কালী বাবুকে যথাযথ উপদেশ দিয়া ৫০০
টাকা সহ B. N. Ryএ কাষ্ঠ খরিদ করিতে পাঠাইলাম।
আমি কাঠের ব্যবসা না করিলেও অন্য নানা প্রকার ব্যবসা
করিয়া ব্যবসা সম্বন্ধে নানারূপ অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছি। আর
কালীবাবু সদ্য কলেজ ফেরৎ হইয়া শুধু Theoretical এর উপর
নির্ভর করিয়া যে সমস্ত কাষ্ঠ খরিদ করিয়া আনিলেন, কলিকাতায়
কাষ্ঠ পৌছাইলে দেখিলাম, তাহার অধিকাংশই Rejection,
তাহাতে অর্ধেক টাকা গড়িবে না। অথচ, একটা নূতন কাজ
আরম্ভ করিলাম,ছাড়িতেও পারি না। অগত্যা নিজে
কালী বাবুকে সঙ্গে লইয়া ই, বি, আর, এ কাষ্ঠ খরিদ করিতে
গেলাম।
জলপাইগুড়ী জেলায় “রাজাভাতখাওয়া” নামক ষ্টেশনে
Bengal Government forest department4 Te
কাষ্ঠ সেখানে নীলামে বিক্রয় হয়। সেইখানে যাইয়া অদৃষ্ট
ভরসায় একটা বড় লটু নীলামে কিনিলাম। কেন অন্তে আমি

আমার ব্যবসা জীবন
কলিকাতায় চলিয়া আসিলাম। কালীবাবু সেখানে থাকিয়া
মাল পাঠাইতে লাগিলেন।
কিছুদিন পরে পূর্ববঙ্গে একটা ঝড় হয়। পূর্ববঙ্গের অধিবাসী-
গণের অধিকাংশই শালের খুটা দিয়া করােগেটের ঘর বাঁধিয়া
বাস করে। এই ঝড়ের ফলে পূর্ববঙ্গে কাঠের চাহিদা বাড়িয়া
যাওয়ায় বেশ দু পয়সা রােজগার করিলাম।
একটা কথা বলিতে ভুল করিয়াছি। ভাইএর সঙ্গে তখনও
partition কাৰ্য শেষ হয় নাই। আমি পূর্ব হইতেই মনে মনে
সংকল্প করিয়াছি আমার নিজের অংশে। চারি আনা পড়িলেও
আমি কলিকাতার ভাগ লইব—কারণ কলিকাতায় ব্যবসা
বাণিজ্যের ও ভাগ্য পরীক্ষার ক্ষেত্র (field) খুব বিস্তৃত। অথচ
কলিকাতায় আড়তদারী কাৰ্য ইতিপূৰ্বে বন্দ করিয়া দিয়াছি।
আবার কি কাৰ্য্য আরম্ভ করা যায়—এই মতলব লইয়া মাঝে মাঝে
কলিকাতায় যাতায়াত করিতেছি-এমন সময়ে একটা নূতন
কাজের সুযােগ জুটিয়া গেল।
আমার দাশপাড়া গুদামের অনতিদূরে যদুনাথ
যদুনাথ দুর্গাচরণ
মজুমদার ফারমের চাউলের কল ছিল। উহাদের মূলধন কম
থাকায় উহারা মহাজনের নিকট হইতে দেনা করিয়া ঐ কল খাড়া
করিয়াছিল। অবশেষে পাওনাদারগণের তাগেদায় জর্জরিত হইয়া
কল বিক্রয় করিয়া তাহাদের দেনা শােধ করিবে-এই সংকল্প
করিয়া আমার নিকট ঐ কল বিক্রয়ের প্রস্তাব করিল। আমিও
এরূপ একটা সুযােগ পাইয়া সহজেই কল লইতে রাজী হইলাম।
৭০০০ সাত হাজার টাকা ঐ কলের মূল্য স্থিরীকৃত হইল।

আমার ব্যবসা জীবন আপাততঃ ১২০০ টাকা পাইলে বলবৎ পাওনাদারগণের দেনা শােধ করিতে পারিবে—এই বলিয়া বায়না স্বরূপ প্রথমে ১২০০ টাকা তাহারা আমার নিকট হইতে লইল। Partition কাৰ্য্য তখনও শেষ হয় নাই। মাঝে মাঝে বাটী যাই--মাঝে মাঝে কলিকাতায় আসি, এইরূপ ভাবে চলিতেছে। কলিকাতায় আসিলেই চাউলের কলে চলিয়া যাই- দেনা পাওনা, খরিদ বিক্রী, মেশিনারী সকল কাৰ্য দেখা শুনা করিয়া অভিজ্ঞতা লাভের চেষ্টা করি। একবার partition সংক্রান্ত কাজে বাটী গিয়াছি, এমন সময়ে চিঠি পাইলাম, যদুনাথ দুর্গাচরণ মজুমদারের ফারম Insolvency file করিয়াছে। তাড়াতাড়ি কলিকাতায় চলিয়া আসিলাম। আমার বায়না দেওয়ায় কোন কার্যকরী হইল না। পাওনাদারগণ কোটে তাহাদের পাওনা হিসাব submit 'করিল। প্রায় ২৩ মাস পরে উক্ত কল নীলাম হইল। কিন্তু যখন নীলামের ডাক হইল, তখন পূৰ্বোল্লিখিত রেঙ্গুন চাউলের contract difference দিয়া বহু অর্থ নষ্ট হইয়া যাওয়ায় আমার মূলধন একেবারে নিঃশেষ হইয়া গিয়াছে, কাজেই আমি আর উক্ত নিলাম ডাকিতে পারিলাম না— আমার সেই ১:০০ বারশত টাকা অকারণ নষ্ট হইয়া গেল। এদিকে চেষ্টার ফলে শ্যামবাজারে গ্যালিফ, স্ট্রীটে যে দশ কাঠা জমি lease লইয়াছিলাম—তাহার plan পাশ হইয়া গেল। দশ কাঠা জমির উপরে গদী গুদাম প্রস্তুত করিতে আবশ্যকীয় কাঠ নিজের গােলার লভ্যাংশ দ্বারা সংকুলান হইল। গদী গুদাম প্রস্তুত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঠের কাজ বন্ধ করিয়া দিলাম। এবং আমার ব্যবসা জীবন পূৰ্ব সংকল্পানুযায়ী কাষ্টম হাউসে (Custom House) এ টাকা জমা দিয়া পর পর কতকগুলি লবণের ভড় আমদানী করিলাম। হাবড়ার বাজারে সরিষা খরিদ করিয়া বাঁধাই করিলাম। ইতি- মধ্যে কালী বাবুর স্ত্রী বিয়ােগ হওয়াতে কাৰ্য্য ত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন। বেতনভােগী ২৪ জন কর্মচারী ব্যতীত নির্ভর করিবার মত কোন উপযুক্ত লােক রহিল না। বাজার দেনা করিয়া শতকরা মাসিক ১একটাকা সুদে পূর্ব পরিচিত মহাজনের নিকট হইতে টাকা লইয়া এই কারবার পাতিয়াছিলাম। কিন্তু বৎসরান্তে হিসাব নিকাশে দেখা গেল, বিশেষ কিছু সুবিধা ত হয় নাই, বরং কিছু লােকসানই হইয়াছে। এমন সময়ে আমার এই গুদামের একটা ভাল ভাড়াটিয়া জুটিয়া গেল। তখন মনে মনে খেয়াল হইল, কারবার করিয়া যখন লাভ হইতেছে না তখন গুদাম ভাড়ার নিশ্চিত আয়ের আশা ত্যাগ করা সমীচীন নহে। সঙ্গে সঙ্গে মজুদ মাল বিক্রয় শেষ করিয়া গদী গুদাম ভাড়া দিলাম । প্রায় ৩৫০ টাকা মাসিক ভাড়া পাই। জমিদারের খাজনা ও ট্যাক্স দিতে ১০০ একশত টাকা বাহির হইয়া যায়। বাকি ২৫ টাকা ঐ গুদামের মাসিক নির্দিষ্ট আয় পাইলাম। ইহা ব্যতীত অন্য গুদাম ও বাড়ী ভাড়া যাহা পাইতাম, তাহাতেই কলিকাতার আবশ্যকীয় সংসার খরচ, ছেলেদের পড়ার ব্যয় ইত্যাদি সংকুলান হইত। আবার কিছুদিন কৰ্ম্মশূন্য হইলাম। মাঝে কারবার করিয়া লােকসানের জন্য দেনা হইয়াছিলাম, ভাড়ার আয়ের দ্বারা সে ঋণ পরিশােধ হইয়া গেল বটে, কিন্তু

আমার ব্যবসা জীবন
কিন্তু মূলধনের
এই প্রকার বেকার থাকার জন্য দেখিলাম,আবাল্যের ব্যবসা
বুদ্ধি যাহা অর্জন করিয়াছি, তাহা হ্রাস হইতেছে।
পরিশ্রম করিতাম, এখন যেন কুড়ে হইয়া যাইতেছি। আবার
পুনরুদ্যমে ব্যবসা করিব, সংকল্প করিলাম।
অভাব। কি উপায়ে মূলধন সংগ্রহ করিব, দিবানিশি ইহাই
চিন্তা করিতে লাগিলাম।
একবার একটা চালু কারবার নষ্ট হইয়া গেলে, পুনরায় সেই
কারবার অথবা অন্য কোন নূতন কারবার জমান যে কত পরিশ্রম
ও চেষ্টা সাপেক্ষ—তাহা ভুক্তভােগী ব্যতীত অপরে বুঝিবে না।
ঘরপােড়া গরু যেমন লাল মেঘ দেখিলে ভয় পায়, আমার দশাও
ঠিক তেমনি হইল। পুনঃ পুনঃ কারবারে নানা প্রকারে লােকসান
দিয়া এবং নিজের মূলধন খাওয়াইয়া বাজার হইতে আর বেশী টাকা
লইয়া কারবার করিতে সাহস হইতেছে না। এমন সময়ে, আমার
দেশের পূর্ব পরিচিত জনৈক ব্যবসায়ী—বিশ্বাসীও বটে,কপিল
মুনি দোকান থাকিতে সে প্রধান কর্মচারীদের মধ্যে একজন ছিল--
নাম দ্বিজবর নাথ,সে আসিয়া জানাইল যে আপনার দোকান
হইতে চাকুরী ত্যাগ করিয়া আসিয়া নিজ গ্রামে একখানি মুদি-
খানার দোকান করিয়া তথাকথিত ভদ্রলােক মহলে ধার বাকি
দিয়া অনাদায় জন্য ফেল হইয়াছি। আমার ভাইপাে, ভাগনে
প্রভৃতি কয়েকজন বালতী প্রস্তুত কাৰ্য্য শিখিয়াছে। আপনি
যদি দয়া করিয়া আমাকে ১০০০ এক হাজার টাকা পূজি
দেন, তাহা হইলে আমি একটা বালতির কারখানা খুলিতে
পারি। আমি বাতির কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হইয়া যতদূর

৫৪
আমার ব্যবসা জীবন
বুঝিয়াছি, তাহাতে আশা করি, হাজার টাকা মূলধন পাইলে
নিজেরা খাটিয়া খুটিয়া বার মাসে বারশত টাকা আয় করিতে
পারিব।
তাহার কথায় আস্থা স্থাপন করিয়া ২৪ দিন ২৪টী বাতীর
কারখানায় আনাগােনা করিলাম। পরে গৌরীবেড়ের মধ্যে
একখানি ঘর মাসিক ১৫ পনর টাকা ভাড়া করিয়া—তখনকার
তহবিলের সমস্ত একত্র করিয়া যে ৭০০১ সাতশত টাকা হইল,
তাহাই তাহার হাতে দিয়া বাতীর কারখানা আরম্ভ করিয়া
পরে আর দিয়া হাজার টাকা পূরণ করিয়া দিব এবং মহাজনী
লভ্যাংশ ॥ আট আনা বখরা. পাইব—এই চুক্তিতে কাজ আরম্ভ
করা হইল।
ঠিক মনে নাই -বােধহয় চারি মাস কাজ চলিবার পর এক
জুয়াচোর দোকানের ষ্টকের পরিমাণ সমস্ত বাতী order দিল।
বলা বাহুল্য, ইতিপূর্বে এই লােক আরও দুইবার নগদ টাকায় অল্প
অল্প এবং বাকি টাকায় লইয়া due মত টাকা পরিশোেধ করিয়া
পরিচিত হইয়াছে, কাজেই সেই অন্ধ বিশ্বাসে গুদামের যাবতীয় মজুদ
মাল প্রায় ৫০০ পাঁচশত টাকার উপর মূল্যের বাতিগুলি তাহাকে
দেওয়া হইল ; সে মাল জগন্নাথ ঘাটে bbok করিল। তাহার
প্রকৃত ঠিকানা ও দ্বিজবরনাথ অবগত নহে। পরে আর তাহাকে
অনুসন্ধান করিয়া পাওয়া গেল, না। মাত্র ৭০০ টাকা মূলধন
লইয়া ৩ মাস না যাইতে যদি ৫০০ টাকা লােকসা যায়, তাহা
হইলে সে কারবারের কি অস্তিত্ব থাকিতে পারে ? পূর্বেই
বলিয়াছি—আমার নিজের বলিতে আর টাকা নাই। এই প্রকার

আমার ব্যবসা জীবন দুঃসময়ে বাজার হতেও আর টাকা ধার করিতে সাহসী না হওয়ায় বার্তীর কারখানা একেবারেই খতম হইয়া গেল। যাহা মজুদ মাল ও যন্ত্রপাতি ছিল, অন্য একটা কারখানায় , আধা কড়িতে বিক্রয় করিয়া ঘরপােড় ছাই যাহা পাইলাম, তাহা লইয়া ঘরে ফিরিয়া, আসিলাম। কলিকাতায় ব্যবসা ক্ষেত্রে যেরূপ প্রতিযগিতা বিদ্যমান, তাহাতে 'ব্যাজ, দিয়া টাকা লইয়া কারবার করিয়া লাভ হওয়া দূরের কথা, অনেক সময়ে ব্যাজের টাকাই সঙ্কুলান হয় না। নিজে ভুক্ত ভােগী হইয়া এই প্রকার অবস্থা উপলব্ধি করিয়া ব্যাজ না দিয়া টাকা সংগ্রহের উপায় উদ্ভাবন করিতে লাগিলাম। ৮নং বনমালী চ্যাটার্জির স্ট্রীটে যে বাড়ীখানায় আমি বাস করিতাম, ঐ বাড়ীখানি আমার স্ত্রীর নামে খরিদ ছিল। জৰ্ম্মাণ যুদ্ধ অবসানে যে সমস্ত লোেক ব্যবসায়ে আশাতিরিক্ত লাভ করিয়াছিল, তাহারা কলিকাতায় জায়গা জমির দাম অতিরিক্ত বাড়াইয়া দেয়। আমার ঐ বাড়ীখানি খরিদ করিয়া প্রস্তুত করিতে ১৬০০০ টাকা খরচ হয়। ঐ সময় এক খরিদ্দার আসিয়া ঐ বাড়ীখানার দর দিল २१.०० টাকা। আমি দেখিলাম, টাকা সংগ্রহের এই অপূৰ্ব্ব সুযােগ। ইহাই স্থির করিয়া বাড়ীখানা বিক্রয় করিবার জন্য মনস্থ করিলে পর আমার স্ত্রী শুনিয়া আপত্তি জানাইল। বলিল, “তােমার অত্যন্ত দুঃসময় যে কোন ব্যবসায় করিতে যাইতেছ, তাহাতে লােকসান হইতেছে। ভাইএর সহিত পৃথক হইয়া কলিকাতায় আমার ব্যবসা জীবন আসিয়া মাথা গুজিবার স্থান আছে ও অন্নসংস্থান আছে। যদি এই বাড়ী বিক্রয়ের টাকা লােকসান হইয়া নষ্ট হইয়া যায়, তাহা হইলে আর কলিকাতায় দাড়াইবার স্থান থাকিবে না। ভাইএর সহিত মনােমালিন্য জন্য অশান্তি ভােগের দায় হইতে নিষ্কৃতি পাইবার বাসনায় দেশ ত্যাগ করা হইল, আবার যদি দেশে যাইয়া থাকিতে হয়, তাহা হইলে চিরকাল ঘাের অশান্তি ভােগ করিতে হইবে।” কথাটী ভাবিবার বিষয় বটে। কিন্তু উপায় কি? ব্যবসা যখন করিতেই হইবে—মূলধন আবশ্যক, সুসার না থাকিলে পসার আছে। বাজারে ধার চাহিলে টাকা পাইতে পারি, কিন্তু সমস্ত টাকা ব্যাজ দিয়া লইয়া কারবার করিলে লাভের আশা আদৌ করা যায় না। আবার ইহাও সত্য কথা যে কিছু টাকা হাতে নিজের বলিয়া থাকিলে, ধার করিতে যত ভরসা পাওয়া যায়, একেবারে রিক্ত হস্তে ধার করিতে তত ভরসা পাওয়া যায় না। এটী সন ১৩২৭ সালের কথা। তখন পাকা সােনার দর ৩২, বত্রিশ টাকা হিসাবে বিক্রয় হইতেছে। মনে মনে সঙ্কল্প করিলাম স্ত্রীর গহনাগুলি বিক্রয় করিয়া কিছু মূলধন সংগ্রহ করিব। এই সঙ্কল্প স্ত্রীর নিকট ব্যক্ত করিলাম যে যখন বাটা বিক্রয় করা তােমার অমত-তখন গহনাগুলি দাও, বিক্রয় করিয়া মূলধন সংগ্রহ করি। গহনা দিতে আপত্তি করিল না বটে, কিন্তু গহনাগুলি বিক্রয় না করিয়া বন্দক দেওয়ার জন্য সনির্বন্ধ অনুরােধ করিতে লাগিল। বঙ্গললনার নিকট গহনা যে কত প্রিয়, তাহা বােধহয় পাঠকবর্গকে আর বেশী করিয়া বুঝাইতে হইবে না। ভাল বিশ্বাসী সেরার নিকট হইতে ১ টাকা দিয়া গহনা করাইলে বিক্রয়লব্ধ আমার ব্যবসা জীবন • আনার বেশী ঘরে আসে না। সেই গহনা বলক দিলে খুব জোর ॥• আনার বেশী পাওয়া যায় না। অবস্থার অবনতি হইলে সেই • আনার জিনিষ ॥ আট আনায় ছাড়িয়া আসিতে হয়। উন্নতি হইলে এবং দীর্ঘদিন হইলে অনেক সময় সেই • বার আনার জিনিষ ১এক টাকা দিয়া কিনিয়া আনিতে হয়। এই সমস্ত বিবেচনা করিয়া বন্দক দেওয়ার জন্য স্ত্রীর অনুরােধ উপেক্ষা করিয়া পােবাকী গহনা বলিতে যাহা ছিল, সমস্তই বাড়ী বসিয়া ভাঙিলাম এবং একত্রে গালাই করিয়া “কামী” করিলাম। যেহেতু, ঐ প্রকারের ভাল গহনা বাজারে বিক্রয় করিতে গেলে পাছে কেহ কোন সন্দেহ করে বা কোন হাঙ্গামায় পড়ি—এই আশঙ্কায় যখন গহনাগুলি বাটী বসিয়া ভাঙিতে লাগিলাম—তখন স্ত্রীর অশ্রু-বিসর্জন আমার স্মৃতিপথে অদ্যাপিও জাগে। আমার বেশ মনে আছে সেই সােনার মূল্য ২৭৪২৮• টাকা হইয়াছিল। আর বাড়ী ভাড়া বাবদ খরচ বাদে যাহা কিছু হাতে ছিল, একুনে তিন হাজারের কিছু বেশী হইল। দেখিলাম মাত্র ৩০০ টাকা নিজের বলিতে আছে। যে সমস্ত বড় বড় ব্যবসা করিয়া দৃষ্টি বড় হইয়া গিয়াছে, তাহাতে এই সামান্য মূলধন কিছুই কাৰ্যকরী হইবে না। তখন মনে মনে অন্য এক উপায় চিন্তা করিলাম। স্বর্গীয়া মাতৃদেবীর নামকরণে যে বিদ্যালয় স্থাপন করিয়াছিলাম, তাহারই ভিত্তি দৃঢ়কল্পে ভাই এর সহিত partition কালীন একটা সম্পত্তি স্কুল কমিটিকে দান করা ছিল। স্কুল কমিটি ঐ সম্পত্তি ৮০০, আট হাজার টাকা মূল্যে বিক্রয় করেন। আমি স্কুলের সেক্রেটারী—আমার through দিয়া ঐ টাকা চাটার্ড ব্যাঙ্কে জমা দেওয়া হয়। নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কমিটীর ৫৮ আমার ব্যবসা জীবন অমতে গােপনে ঐ টাকা আমি ব্যাঙ্ক হইতে উঠাইয়া লইয়া আমার মূলধনের সহিত যােগ করিয়া একুনে ১১০০০ টাকা পূজি হইল। যখন ঐ ১১০০০ টাকা এই প্রকারে সংগ্রহ হইল—তখন মনে মনে চিন্তা করিলাম—শ্যামবাজার অঞ্চলে একখানি উচ্চশ্রেণীর সর্ব প্রকারের কাপড়ের দোকান অর্থাৎ বর্তমানে কলেজ স্ট্রীট মার্কেটে যে প্রকারের “জহরলাল পান্নালাল”, “কমলালয়”, “কাত্যায়নী ষ্টোর” প্রভৃতি দোকান আছে—ঐ প্রকারের একখানা দোকান প্রতিষ্ঠা করিয়া বিলাতী কায়দায় অর্থাৎ whiteaway laidlawএর দোকানে বিক্রেতা যেমন সব young lady,-আমি ঐ প্রকারের young lady নিযুক্ত করিয়া একটা নূতন কিছু করিব, এরূপ সংকল্প করিয়াছি। বলা বাহুল্য, আমি যত প্রকারের মাল খরিদ বিক্রয় করিয়াছি, তন্মধ্যে কাপড়ের কাজেই আমার অভিজ্ঞতা সর্বাপেক্ষা অধিক। পূৰ্বে বলিয়াছি, দেশের দোকানে লক্ষাধিক টাকার কাপড় পাইকারী ও খুচরা বৎসরে বিক্রয় হইত। ঐ সমস্ত কাপড় প্রায় সমস্তই বিলাতী। কেননা, তখন দেশী কাপড়ের এমন আদর হয় নাই। স্বর্গীয় পিতৃদেবের আমল হইতে যাবতীয় ধুতি, সাড়ী ও থান পগেয়াপটীর মেসার্স গৌরীশঙ্কর ক্ষেত্রী ও কটন স্ট্রীটের মেসার্স হাজারী মল হীরালালের ঘর হইতে খরিদ করা হইত। দেশী তাঁতের কাপড় হাওড়ার হাট হইতে, যাবতীয় কাটা কাপড় হাওড়া ও চেতলার হাট হইতে এবং ভাল ভাল পােষাকী কাপড় চানীর চক হইতে, রেশমী পশমী কাপড়, মনােহর দাসের ষ্ট্রীট, খােংরাপটা হইতে খরিদ হইত। পরে যখন কলিকাতায় নিজে আড়ত করিয়া বসিলাম-তখন যাবদীয় বিলাতী কাপড়, ধুতি, সাড়ী আমার ব্যবসা জীবন ও থান মেসার্স গৌরীশঙ্কর ক্ষেত্রী ও হাজারীলালের ঘর হইতে না লইয়া উহারা দালাল দ্বারা বাজার হইতে যেমন “ভইল” সংগ্রহ করিয়া দিত, আমিও সেইরূপ সুমের মল নামক জনৈক দালালের মারফতে বাজার ঘুরিয়া ক্রশ ষ্ট্রীট, সুতাপটা, পচা গলি প্রভৃতি স্থানের বহু মহাজনের ঘরে ঘুরিয়া বাজার যাচাই করিয়া “ভইল” সংগ্রহ করিতাম। এবং আড়তে বসিয়া ঐ টাকা ভুক্তান্ দিতাম। এই ভাবে বিস্তৃতরূপে কাপড়ের কারবার করাতে অন্যান্য কারবার অপেক্ষা কাপড়ের কাজে আমার বেশ অভিজ্ঞতা জন্মিয়াছিল এবং বহু বস্ত্র ব্যবসায়ীর সহিত পরিচিত ছিলাম। পূৰ্বলিখিত নানাপ্রকার কাৰ্য্যে নানাপ্রকার ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া শেষে এইভাবে কাপড়ের দোকান করাই যখন স্থির করিলাম—তখন শ্যামবাজার অঞ্চলে Improvement Trust, ভাঙ্গিয়া মাঠ করিয়া দিয়াছে। মনের মত কোন ঘর নাই। যে সমস্ত নূতন বিল্ডিং ব্রীজ রােডের উপর ও কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটের উপর খাড়া হইতেছে—তাহারই মধ্যে ২১টা পছন্দ করিয়া ভাড়া স্থির করিতেছি—ঘর হইলেই পাইব। কাজ আরম্ভ করিতে কিছু সময় দেরী আছে—এমন সময়ে মনে মনে ইতস্ততঃ করিতে লাগিলাম,—বিক্রেতার জন্য young lady নিযুক্ত করিয়া খরিদ্দার ধরিবার যে ফাদ পাতিতে যাইতেছি-প্রবৃত্তির তাড়নায় পাছে নিজের পা পিছলাইয়া সেই ফাদে যাইয়া যদি আটকাইয়া যাই—তাহা হইলে ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হইবে, বিশেষতঃ কলিকাতার সহরে এ প্রকারের কোন বাঙ্গালীর দোকান নাই। আমি করিয়া কতদুর কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিব কি না চিন্তার বিষয় হইয়া পড়িল।

আমার ব্যবসা জীবন আচাৰ্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্মভূমি ও আমার জন্মভূমি কাছা- কাছি হওয়াতে আমি তাহার নিকট বাল্যাবধি পরিচিত। আমার এবংবিধ দুঃসময়ে কি করিব না করিব—তাহা তাহার নিকট যাইয়া মাঝে মাঝে উপদেশ লইতাম। প্রােক্ত প্রকারে ১১ হাজার টাকা মূলধন সংগ্রহ করিয়া কোন্ ব্যবসা করিব—এ বিষয়ে তাহার নিকট উপদেশ লইতে গেলে, তিনি আমাকে উপদেশ দেন যে কলিকাতা সহরে খাট সরিষার তৈলের অভাব—তুমি একটা ছােট করিয়া খটী সরিষার তৈলের কল কর। কথাটা বিশেষ প্রণিধান যােগ্য—কিন্তু কোন মেশিনারী ব্যবসায়ে ইতিপূর্বে আমার অভিজ্ঞতা লাভ ঘটে নাই। সম্পূর্ণ নুতন রাস্তায় যাইতে ইতস্ততঃ করিতে লাগিলাম এবং অন্যান্য যে সমস্ত ব্যবসায়ে আমার অভিজ্ঞতা আছে—তাহার কোন একটা করিব কিনা সে বিষয়ে তাঁহার সহিত আলােচনা করিলাম। তিনি আমাকে শেষ এই উপদেশ দিলেন যে “কৰ্ম্মণ বাধ্যতে বুদ্ধি।” মানুষ কোন কাজ মাতৃগর্ভ হইতে শিক্ষা করিয়া ভূমিষ্ঠ হয় না। তুমি যদি এই কাজ করিতে ভীত হও বা ইতস্ততঃ কর, তাহা হইলে কোন কলে যাইয়া কিছুদিন শিক্ষা কর। তাহা হইলে তােমার মানসিক দৌর্বল্য হ্রাস পাইবে। তাঁহারই উপদেশ অনুযায়ী স্বর্গীয় ক্ষেত্রমােহন সাধুখাঁর কলে মাসাবধি যাতায়াত করিয়া আবশ্যকীয় মােটামুটী অনেক তথ্যানুসন্ধান করিলাম এবং কতকটা অভিজ্ঞতা লাভও করিলাম। পরে পূৰ্ব্বো- ল্লিখিত ২২৪নং গ্যালিফ স্ট্রীটে ৫০ ব্রেক হর্স পাওয়ারের ( Brake horse power) একটা মটর বসাইয়া মাত্র ২০ খানি ঘানি দ্বারা একটা তেল কল স্থাপন করিলাম। জৰ্মাণ যুদ্ধের সময় হইতে, তৎপর আমার ব্যবসা জীবন বহুদিন পর্যন্ত ইলেকটিক সাপ্লাই নূতন কনেশন দেওয়া বন্ধ রাখিয়াছিল—এইজন্য আমি ঐ মােটর কনেশন্ পাইতে অনেক বেগ পাই এবং অযথা বাজে খরচ করি। যাহা হউক, বহুদিন চেষ্টার পর যেদিন কনেকশন্ পাইলাম,-যে দিন প্রথম আমার মটর ঘুরিল,- সে দিন পঞ্জিকা খুলিয়া দেখি—ঐ দিন সন ১৩২৮ সালের ৮ই বৈশাখ অক্ষয়-তৃতীয়া তিথি। তদবধি এ পর্যন্ত প্রত্যেক বৎসর ঐ তিথিতে আমার নূতন বর্ষ অর্থাৎ হালখাতা মহরতের দিন বলিয়া গণ্য হয়। এইটাই আমার ব্যবসায় জীবনের এই পুস্তকের শেষ অধ্যায়। খাটা সরিষার তৈলের কল করিলাম বটে এবং যথারীতি বিজ্ঞাপন প্রচার কল্পে সংবাদ পত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া, হাবিল বিলি করা, কলিকাতার বাজারে ও মােকামে মােকামে প্লাকার্ড মারা ইত্যাদি যত প্রকারে সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাইতে পারে, সকল প্রকার সম্ভাব্য পথই অবলম্বন করিলাম। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তৎকালে খাটী তেল বলিলে কেহই বিশ্বাস করিতে চাহিত না। এখন মনে হইলে লজ্জা ও ঘৃণা হয় যে সেই সময়ে কত লােক আমার মুখের সাম্নে আমাকে ‘জুয়াচোর’ বলিয়া আখ্যা দিয়া গিয়াছে! কত লােক সেই প্রথম অবস্থায় আমাকে বলিয়াছে- “কলে কখনও খাঁটী তেল হইতে পারে? তােমার জুয়াচুরির নূতন ফন্দীর রিপ আছে বটে।” তাহার উপর অসন্তোষ হওয়া দূরে থাক, আমি আরও অধিক বিনীত হইয়া তাহাকে অনুরােধ করিতাম, ‘মহাশয়, অনুগ্ৰহ করিয়া অন্ততঃ ১ টীন তেল ধার লইয়া যান। খাঁটী এবং ভাল হইলে দাম পরে দিবেন। খারাপ বা ভেজাল হইলে দাম দিতে হইবে না।

আমার ব্যবসা জীবন ৪ • এইভাবে canvass করিবার জন্য ৪ টাকা বেতনে একজন canvasser বহাল করিলাম। তিনি সাইকেল করিয়া তেলের নমুনা লইয়া বাজারে ঘুরিতেন এবং অর্ডার লইয়া আসিতেন। একখানি মানুষের দ্বারা পরিচালিত” বাক্স গাড়ী প্রস্তুত করাইয়া সেই অর্ডার অনুযায়ী মাল নিজের লােক দিয়া যথা স্থানে পাঠাইয়া দিতাম। ইহা যে সম্পূর্ণ ধার— তাহা বলাই বাহুল্য। এই প্রকারের অধিকাংশই খরিদ্দার কলিকাতা বাজারের মুদীখানার দোকানদার ছিল। মাত্র ২০ খানা ঘানির তৈল দৈনিক যাহা উৎপন্ন হইত-- এইভাবে একজন canvasser দ্বারা canvass করিয়া সমস্ত বিক্রয় হইত না বলিয়া নিজেও সাইকেল চড়িয়া নমুনা সহ বাজারে canvass করিতে বাহির হইতান। বলা বাহুল্য, আমি নিজে যেদিন বাহির হইতাম, সে দিন অপেক্ষাকৃত বেশী অর্ডার লইয়া ঘরে ফিরিতাম। খাঁটী তেলের নাম বাজারে নাই বা আমি এই ব্যবসায় ক্ষেত্রে এখনকার মত ক্রেতার বিশ্বাস অর্জন করিতে পারি নাই। কাজেই খাঁটী তেল তৈয়ার করিয়া ভেজালের দরে বিক্রয় করিতে হইত। এইভাবে বৈশাখ হইতে আশ্বিনের পূজা পৰ্যন্ত কল চালাইয়া হিসাব নিকাশ করিয়া দেখিলাম যে প্রায় ৭০০০ সাত হাজার টাকা লােকসান্ হইয়াছে। কলিকাতা বাজারের মুদী দোকানদার কোন দিন কোন মাল ক্যাস্ টাকায় খরিদ করে না। যেমন ধারে কেনে, তেমনি বাসাড়ে খরিদ্দারকে ধার দিয়া মাস কাবারে টাকা লয়, ইহাই চিরন্তন প্রথা। আমি যখন তাহাদের ধার বিক্রয় করিতাম, তখন আমার ব্যবসা জীবন একবার টাকা পাওনা থাকিতেও আবার ধার দিতে বাধ্য হইতাম। ২৪ টন করিয়া তেল—এক এক সময়ে ধার দিয়া এক একজন খরিদ্দারের নিকট শতাধিক টাকাও পাওনা হইত। দুঃখের বিষয়, এই প্রকারের দোকানদার—কোথাও কিছু না, হঠাৎ একদিন দোকান ফাক করিয়া বসে। পূর্বে তাহার কিছুই আভাস পাওয়া যায় না। দোকানদার যদি বাঙ্গালী হয়, তবে ভিটে ছাড়িয়া অন্যত্র যাইয়া অপর নামে সাইন বাের্ড দিয়া আবার ঐ দোকান খােলে। মাড়ােয়ারী হইলে অনেক সময়ে ভিটাও বদলায় না। সাইন বাের্ড খুলিয়া ফেলে—কিছুদিন দোকান বন্ধ রাখে। ২১ জন নূতন অচেনা মুখ কৰ্মচারী বহাল করে। অন্য নামে সাইন বোের্ড দিয়া সেই ঘরে আবার দোকান খুলিয়া বসে। যে নূতন কর্মচারী রাখে, তাহাকে সাধারণতঃ মালিক বলিয়া পরিচয় দেয়। কেন না, দোকান ছাড়িয়া গেলে যেমন একদিকে মহাজনের কিছু টাকা মারিয়া লওয়া যায়, তেমনি অন্য দিক দিয়া নিজেরও লােকসান্ কম হয় না। কেন না, যাহা খরিদ্দারের নিকট পাওনা থাকে, তাহা আর আদায় হয় না। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমার এই প্রকার মুদীকে ধার দিয়া বিক্রীর ফলে একটার পর একটা করিয়া এই ছয় মাসের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ৬টা দোকান ফেল মারিল। তাহাদের নিকট প্রায় হাজার টাকা নষ্ট হইল। মনে মনে প্রমাদ গণিলাম। একে লােকসান্ দিয়া মাল বিক্রী, তদুপরি ধার,-তাহার পর যদি এইভাবে আসল ধ্বংস হইতে থাকে, তাহা হইলে পরিণাম আমার দশা কি হইবে ? ধার না দিলে যখন নিশ্চয়ই বিক্রয় হইবে না, তখন এ ৬৪ আমার ব্যবসা জীষন সমস্ত অজানা অচেনা লােককে ধার দিয়া সমূলে ধ্বংস হওয়া অপেক্ষা খুলনা জেলায় বহু মােকামের বহু খরিদ্দারের সহিত আমার পূৰ্বে পরিচয় ছিল—তাহাদিগকে ডাকিয়া আনিয়া ধার দিতে লাগিলাম। এবং এই সমস্ত মােকামে বেশী করিয়া advertise করিতে লাগিলাম দৈনিক উৎপন্ন তেল যখন বােজকার বােজ কাটতি হইতেছে না, বিক্রী অভাবে কলবন্দ দিতে হইতেছে,-এমন সময়ে সেই পূর্বপরিচিত দ্বিজবর নাথকে কলেজ স্ট্রীট মার্কেটে একটী ষ্ট (Stall) ভাড়া করিয়া একখানা খুচরা তেলবিক্রীর দোকান করিয়া দিলাম। উদ্দেশ্য, সাবেক বাতির কারখানাতে যে টাকা লােকান্ হইয়াছে ; এই তৈলের দোকান দ্বারা লাভ করিয়া সেই টাকা ক্ৰমে ঘরে উঠান। প্রায় ছয় মাস যাবৎ এই দোকানখানা রাখিয়াছিলাম। ইহাতে এই অভিজ্ঞতা লাভ করিলাম যে কলিকাতার বাসাড়ে গৃহস্থ খরিদ্দারেরা, অধিকাংশই বাকি খারাপ তেল বেশী দরে লইবে, অথচ ভাল তেল নগদ টাকায় কম দরে লইবে না। কাজেই, দর কম দিয়াও বেশী কাটতি করিবার আশা নাই বুঝিয়া ৬ মাস পরে দোকানখানি তুলিয়া দিলাম। ইহাতে লাভ বা লােক বিশেষ কিছু হয় নাই। একটা কথা বলিতে ভুল হইয়াছে। দুই প্রকার উপায়ে মূলধন মাত্র ১১০০০ টাকা সংগৃহীত হইল। মটর ও ২০ খানা ঘানি কিনিতে ও ইলেটিকের টাকা জমা দিতে তাহার সমস্তই ফুরাইয়া গেল। যদিও কোন কলওয়ালার বাজার হইতে সরিষা নগদ টাকায় কিনিতে হয় না, কিন্তু আমি এই ব্যবসা ক্ষেত্রে নূতন বলিয়া কোন আমার ব্যবসা জীবন মহাজন আমাকে বিশ্বাস করিয়া ধার দিত না। দেনদারের নিকট পাওনা টাকা due মত আদায় হইত না। সরিষা অধিকাংশ নগদ টাকায় খরিদ করিতে হইত। কাজেই, টাকার অভাব সর্বদাই লাগিয়া থাকিত। পূর্বেই বলিয়াছি, আমার সুসার না থাকিলেও পসার আছে। পূর্ব পূৰ্ব ব্যবসায় করিবার কালীন অনেক মহাজনের সহিত পরিচিত আছি। সেই সব স্থল হইতে ২১ হাজার করিয়া ৪০০০০, চল্লিশ হাজার টাকা বাজার হইতে ধার করিলাম। অবশ্য, এজন্য শতকরা মাসিক ১, এক টাকা হারে সুদ দিতে হইত। টাকা চল্লিশ হাজার বাজার হইতে লইলাম বটে, কিন্তু কোন মহাজন জানিত না যে তাহা ছাড়া অন্য কাহারও নিকট হইতে লইয়াছি। মাসান্তে কলে আসিয়া তাহারা সুদের টাকা পাইলে আসলের নামই করিত না। কিন্তু আমার এদিকে দিনদিন অন্তঃসার শূন্য হইতেছে-কৃষ্ণ- পক্ষের চন্দ্রের মত প্রত্যহ ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছি। এই সমস্ত দেখিয়া কাৰ্যে উৎসাহের পরিবর্তে নিরুৎসাহ আসিয়া দেখা দিল। ৬ মাস কল চালাইয়াও খাটী তেলের নাম বাজারে বাহির করিতে পারিলাম না। তখনও লােকান্ দিয়া বিক্রয় করিতে হইতেছে তখন অনন্যোপায় হইয়া অন্যান্য কলওয়ালার ন্যায় আমিও ভেজাল তেল প্ৰস্তুত করিব-এইরূপ সংকল্প করিয়া আচাৰ্যদেবের নিকট পরামর্শ লইতে গেলাম। তিনি আমার কারবারের আনুপূর্বিক সমস্ত অবস্থা শুনিয়া দুঃখিত হইলেন-মুখে নানাপ্রকার সান্ত্বনা দিলেন, কিন্তু ভেজাল করিতে উপদেশ দিলেন না। বলিলেন,-খুব করিয়া কাগজে আমার ব্যবসা জীবন advertise কর, হাণ্ড বিল, প্লাকার্ড বিলি কর। যদি একবার বাজারে নাম বাহির করিতে পার, তাহা হইলে এই সমস্ত বড় বড় ভেজাল কলওয়ালাগণের পিছন থাকিয়া, উহারা ভেজাল করিয়া যাহা লাভ করিবে, খাঁটী তেলের কল ছােট হইলেও তাহা অপেক্ষা তােমার বেশী লাভের আশা আছে।” কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। “দাও মহাশয়,” একথা আর কেহ বলে —সর্বত্রই “নাও মহাশয় করিয়া চলিতে হইতেছে। পাছে আরও লােকান্ হইয়া একেবারে ডুবিয়া যাই—এই আশঙ্কায় এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখিয়া কল বিক্রী করিয়া দেনা শােধ করিবার সংকল্প করিলাম। আমার সেই বাল্যবন্ধু কালীবাবু তাঁহার স্ত্রীবিয়ােগের সময় কৰ্ম্মত্যাগ করিয়া চলিয়া গিয়াছিলেন; পরে, তেল কল খুলিবার সময় পুনরায় আসিয়া জুটিলেন। লভ্যাংশের অংশ তাহাকে দেওয়া স্থির করিয়া কাজে লাগান হইল। কিন্তু দৈনন্দিন আমার এই প্রকারের দুরবস্থা দেখিয়া তিনি নিজেই প্রস্তাব করিয়া বসিলেন—“আমি গরীব লােক, আমার এই প্রকারের লােকসান্ দেওয়া পােষাইবে না। আমার নিত্য কিছু চাই। সুতরাং আমার যােগ্যতা অনুসারে বেতন স্থির করিয়া দিন।” একে লােক্সানের জন্য মনের গতি খারাপ, তাহার পর, কালীবাবুর এই ব্যবহারে মনের গতি আরও খারাপ হইল। আমি বলিলাম-“বখরাদারী ত ত্যাগ করিয়া যাইতেছেন- কিন্তু যে টাকা কলে লােকসান হইতেছে তাহার কি হইবে?” শুনিয়া কালীবাবু, একটু হাসিয়া উত্তর দিলেন—“শূন্য ভাগী কোন দিন আমার ব্যবসা জীবন লােকসান হইলে নগদ টাকা বাটী হইতে আনিয়া দিতে দেখিয়াছেন? তাহারা চিরকাল লাভ হইলে লইয়া থাকে।” আমি দেখিলাম কথাটা সত্য বটে। ইতিপূর্বে, যে সমস্ত লােকের সহিত শূন্য বখরা দিয়া যে কোন কাজ খুলিয়াছি, একমাত্র মাগুরার দ্বিজবর নাথ ব্যতীত আর সকলেই লােকান্ দেখিলে পলাইয়াছে। এখন আমার এই কালীবাবু নামক বন্ধুটী উচ্চ শিক্ষিত বলিয়া তাহার নিকট এরূপ কথা শুনিতে প্রস্তুত ছিলাম না। কাজেই তাহাকে আর বেতনভােগী করিয়া রাখিতে আমার প্রবৃত্তি হইল না। চারিদিকেই এই প্রকার বিভীষিকা দেখিয়া কল বিক্রয় করিবার জন্য কৃতসংকল্প হইলাম। বহু দালালের নিকট আমার এ সংকল্পের কথা প্রচার করিয়া তাহাদিগকে খরিদ্দার দেখিতে বলিলাম। কল বিক্রয়ের জন্য কাগজেও advertise করিলাম। দুই চারিট enquiry আসিল বটে, কিন্তু কোন ভাল গ্রাহক জুটিল না। একজন লােক গ্রাহক বলিয়া আসিয়া দাঁড়াইয়া ৩৪ দিন যাতায়াত করিল-পরে দেখিলাম লােকটা খরিদ্দার নহে—একটী জুয়াচোর। তখন তাহাকে তাড়াইয়া দিয়া নিমজ্জমা তরুণীকে রক্ষা করিবার জন্য মাঝিকে যে ভাবে হাল ধরিতে হয়, আমি এই ব্যবসায়ে সেই রূপ ভাবে লাগিয়া গেলাম। সময়ে আহার নাই, নিদ্ৰা নাই, বিরাম নাই, বিশ্রাম নাই— কিসে কারবারটা দাড় করাইতে পারিব, এই চিন্তা মনে সর্বদাই জাগরূক থাকিত। অবসাদ বলিয়া কথাটী অভিধান হইতে আমার পক্ষে উঠিয়া গেল। সৰ্ব্বদাই কর্মে ডুবিয়া থাকিতাম। এই সময়ে অপ্রত্যাশিত ভাবে একটা সুযােগ আসিয়া জুটিয়া গেল।

৬৮ আমার ব্যবসা জীবন ইষ্ট ইণ্ডিয়ান রেলের goods departmentএর কুলীরা তাহাদের কি এক দাবী পূরণের জন্য সমস্ত লাইনের কুলীগণ কাৰ্যবন্ধ করিয়া একযােগে ধৰ্ম্মঘট করিল। হাওড়ার বাজারে পশ্চিম ভূষিমাল ও সরিষা ইত্যাদি যাবতীয় রবি শস্যের নিত্য একটা বাজার বসে। সমস্ত কলওয়ালা এই বাজার হইতেই সরিষা খরিদ করেন। এই প্রকার ধৰ্ম্মঘটের জন্য আমদানী কমিয়া গেল। সরিষার বাজারও ক্রমশঃ তেজ হইতে লাগিল। তখন বাজারে আমার অপেক্ষাকৃত একটু পসার হইয়াছে। ২|৪ জন মহাজন due তে মাল ছাড়িতে আরম্ভ করিয়াছে। সরিষা এই ক্রমােত বাজারে পর পর কিছু বেশী খরিদ করিলাম। ধৰ্ম্মঘট এত দীর্ঘদিন থাকিবে—তাহা প্রথমে বুঝি নাই। যাহা হউক, যেমন মজুদ মাল ছিল এবং যাহা খরিদ করিলাম, তাহাতে কিছু লাভ পাইলাম। এই ভাবে চৈত্র মাস পর্যন্ত কল চালাইয়া হিসাব নিকাশ করিয়া দেখি—আশ্বিন মাস পর্যন্ত লােকসানের ৭০০, সাত হাজার টাকা বাকি ছয় মাসে প্রায় উঠিয়া গিয়াছে। কাগজ নিকাশ করিয়া দেখিয়া আমার যে আনন্দ হইল—এখন বােধ হয় বৎসরান্তে ৫০,০০০ পঞ্চাশ হাজার টাকা লাভ পাইলেও সে আনন্দ হয় না। যেহেতু মনে এইটী আশা হইল যে, ব্যবসাটী বােধ হয় দাড় করাইতে পারিলাম। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়া, হাবিল বিলি করিয়া, প্লাকার্ড মারিয়া যে advertise হয়—জিনিষ দিব ভাল, দাম লইব সস্তা ইহাপেক্ষা ভাল advertise আর কিছুতেই হয় না। আমার অবস্থা ঠিক তাহাই হইল। বৎসরাবধি খাটী তেল ভেজাল দরে

আমার ব্যবসা জীবন
সরবরাহ করিয়া ভগবদিচ্ছায় আমার তেলের চাহিদাও উত্তরােত্তর
বাড়িতে লাগিল। তখন ২০ খানা ঘানি স্থলে সন ১৩২৯ সালে
ঐ মটরের শক্তি অনুসারে আর ১৬ খানা ঘানি উহার সহিত যােগ
করিলাম।
কল ঘােটই হউক আর বড়ই হউকসঙ্গে একটু workshop
থাকিলে, কাজের নানা অসুবিধা হয়। কাজেই, ঐ ১৩২৯ সালে
একখানা লেদ ৩০০০ টাকা মূল্যে ও একটা ড্রিল মেশিন্ ১২০০
টাকা মূল্যে খরিদ করিয়া ও আনুসঙ্গিক অন্যান্য যন্ত্রপাতি সহ ঐ
কলসংলগ্ন একটা workshop করিলাম।
ঘানি বাড়াইতে ও ওয়ার্কসপ করিতে আমার একুনে আর
৭৫৭ সাড়ে সাত হাজার টাকা খরচ হইল। সন ১৩২৯ সালে
কাগজ নিকাশ করিয়া দেখি—এ খরচের টাকা উঠিয়া আরও
কিছু লাভের দিকে দাঁড়াইয়াছে। বলা বাহুল্য, তখনও আমি
মহাজনদিগকে মাসে ৪০০
টাকা হিসাবে সুদ দিতেছি।
৩৬ খানা ঘানি দৈনিক নিয়মিত কাৰ্য্য ছাড়া ৪৫ ঘণ্টা দৈনিক
ওভার টাইম করাইয়াও যখন তেলের চাহিদা সংকুলান হইতেছিল
—তখন কি উপায়ে উৎপন্ন তেলের পরিমাণ বৃদ্ধি করা যাইতে
পারে, সেই উপায় চিন্তা করিতে লাগিলাম।
২২|৪নং গ্যালিফ, স্ট্রাটে আমার যে জায়গা ছিল—তাহাতে
আর ঘানি বসাইতে গেলে গুদাম থাকে না, কাজের অসুবিধা
হয় ;-তখন অগত্যা আর একটী ৫• ঘােড়ার মটর কিনিয়া ঐ
একই লাইন ডবল ষ্টাফে (double stuff) চালাইবার বন্দোবস্ত
করিলাম। কল ২৪ ঘণ্টা চলে। মাত্র রবিবারে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন

৭০ আমার ব্যবসা জীবন ও মেরামত করিবার জন্য বন্ধ রাখি। তেল পূর্বের তুলনায় double হইতে লাগিল। একদিক দিয়া যেমন মনের ঘূৰ্ত্তি আসিল, অন্য দিক দিয়া সেইরূপ বিপদ উপস্থিত হইল;—সেটী ইলেটিক সাপ্লাই কোম্পানীর মাসিক বিল দেখিয়া। দেখিলাম ১৬০০ টাকার উপর বিল হইয়াছে। দেখিয়া একেবারে হতবম্ব হইয়া গেলাম। মনে করিলাম-লাইনে অথবা মােটরে কি দোষ আছে, নতুবা এত টাকা বিল হয় কেন? সেই ভুল ধারণার বশবর্তী হইয়া ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ডাকিয়া মেগাম দ্বারা পরীক্ষা করিয়া যখন বুঝিলাম—লাইন মােটরের কোন দোষ নাই, অথচ অযথা কতকগুলি টাকা ব্যয় করিয়া ফেলিলাম, তখন ইহাই চিন্তা করিতে লাগিলাম—কি উপায়ে ব্যয় সংক্ষেপ করা যাইতে পারে। জে, এ, এ্যাঙ্কেলসেরিয়া নামে জনৈক পার্শী ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের ভ্রাতা মেসার্স উইলসন্ রায় নামক ফারমে কাজ করিতেন। আমার কলে ইলেটিক ফিটিংএর যাবতীয় কার্ঘ্য উইলসন্ রায়ের ফারম হইতেই করাইয়াছিলাম। সেই সূত্রে ঐ পাশী ইঞ্জিনিয়ারের সহিত পরিচয়। খরচ কমাইবার জন্য তাহার সহিত আলােচনা করিবার ফলে সে-ই পরামর্শ দিল—ইলেটিক বন্ধ করিয়া গ্যাস এঞ্জিনে চালাইলে ইহা অপেক্ষা খরচ কম হইতে পারে। তাহারই উপদেশ অনুসারে এবং তাহার through দিয়া অর্থাৎ সেই দালালী পাইবে—এইভাবে মেসার্স আলফ্রেড, হার্বাট ( ইণ্ডিয়া) লিমিটেডের ফারমে একটী ৪৫ ঘােড়ার গ্যাস এঞ্জিনের অর্ডার দিলাম।

আমার ব্যবসা জীবন ৭১ যথাসময়ে এঞ্জিন আসিল। উহারাই বসাইয়া লাইন চালু করিয়া দিল। মটরের সঙ্গে গ্যাস এঞ্জিনের খরচা কমি বেশী হিসাব করিবার জন্য ১২ ঘণ্টা গ্যাস এঞ্জিন ও ১২ ঘণ্টা মটর—একই লাইনের উপরে পৃথক পৃথক্‌ যােগান রাখিয়া পৰ্য্যায়ক্রমে একমাস চালাইয়া দেখিলাম,-সত্যসত্যই ইলেকটিক অপেক্ষা গ্যাসের খরচ শতকরা প্রায় ২০, কুড়ি টাকা কম। মনে আবার একটু স্ফুর্তি আসিল। তাহার ফলে, ২২৫নং জমি প্ৰজাই স্বত্ত্ব এবং তদুপরি ১টা টীনের গুদাম ৭০০ টাকা মূল্যে খরিদ করিয়া ২২|৪নং গুদাম ২২৫নংএ সরাইয়া লইয়া ২২|৪নং এ আর ৩৬ খানা ঘানি বসাইয়া দিলাম। তখন একুনে ৭২ খানা ঘানি একদিকে মটরে ও একদিকে গ্যাস এঞ্জিনে চলিতেছে। সন ১৩৩৩ সাল অন্তে কাগজ নিকাশ করিয়া দেখি গুদাম কিনিতে, গ্যাস এঞ্জিন কিনিতে, ৩৬ খানা ঘানি বসাইতে সৰ্বসমেত ২০০০০ কুড়ি হাজার উপর খরচ হইয়াছে। এই খরচ সংকুলান হইয়াও লাভের দিকেও কিছু আছে। আমার উৎসাহের সীমা নাই। মটর উঠাইয়া দিয়া অন্য প্রকারে ব্যয় কমাইবার উপায় উদ্ভাবন করিতে লাগিলাম। মেসার্স আলফ্রেড হার্বাটএর নিকট হইতে গ্যাস এঞ্জিন খরিদ করা সূত্রে মিঃ নিকলসন্ নামে উহাদের জনৈক ইঞ্জিনিয়ারের সহিত পরিচিত হইলাম। সে-ই আমাকে পরামর্শ দিল-একটি অয়েল এঞ্জিন খরিদ করুন—তাহা হইলে আপনার গ্যাস এঞ্জিন অপেক্ষা খরচ আরও কম হইবে। তাহারই পরামর্শ অনুসারে একটা ৫৫ বি, এইচ, পি, ( 55 B. H. P.) অয়েল এঞ্জিন আলফ্রেড, হার্বাটকে ১১০০০ টাকা দর স্থির করিয়া অর্ডার দিলাম। বলা বাহুল্য, ৭২ আমার ব্যবসা জীবন আমার পূর্বে কলিকাতায় গ্যাস এজিন বা অয়েল এঞ্জিন পরিচালিত কোন তল কল প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। রাত্রের জন্য পৃথক ষ্টাফ, বহাল করিয়া ২৪ ঘণ্টা কল চালাইতেছি কিন্তু মােটামুটি হিসাব করিয়া দেখি অর্থাৎ প্রেসূ হইতে যে তৈল উৎপন্ন হয়, তাহা ওজন করিয়া ট্যাঙ্ক ঢালা হয়, তাহাতে বােঝ ৰায় একই সরিষা, একই মেসিন অথচ দিন অপেক্ষা রাত্রিতে তৈল কম হইতেছে। লাভ লােকসান হিসাব করিয়া দেখিলে রাত্রি চালাইয়া লাভ অপেক্ষা লােকসানই বেশী। কিন্তু উপায় কি ? রাত্রে কল চলা বা করিলে উৎপন্ন কমিয়া যাইবে। খরিদ্দারগণের আবশ্যক মত তৈল দিতে না পারায় পসার নষ্ট হইবে। এই সব ভাবিয়া, জানিয়া শুনিয়াও এই লােকান্ সহ করিলাম। যে তৈলটা রাত্রে কম হয়, সে তৈলটা অবশ্য চুরি হয় না। খৈলএর সহিতই থাকিয়া যায়। তখন চিন্তা করিতে লাগিলাম, খইল হইতে তৈল বাহির করিবার কোন উপায় আছে কি না? এমন সময়ে বাংলা ১৩৩০ সালের শেষ ভাগ্যে কলিকাতা ইডেন গার্ডেনে All India Exhibition নামক একটি মেলা বসে। মেসাস জেসপ, এণ্ড কোং হল্যাণ্ড হইতে Expeller নামক এক প্রকার তৈল নিষ্কাষণ যন্ত্র ঐ Exhibitionএ আনিয়া advertise করিতে লাগিলেন যে—এই যন্ত্রের সাহায্যে খইল হইতে তৈল বাহির হয়। ইহা শুনিয়া প্রায়ই Exhibitionএ প্রবেশ করিয়া ঐ কাৰ্য প্রণালী দেখিতাম ও উহাদের ইনচাৰ্য (In-charge) অপিসারের সহিত এইরূপ কথাবার্তা ঠিক করিলাম যে, আমি এক গাড়ী খৈল আনিয়া ইহার কার্যপ্রণালী দেখিয়া সন্তুষ্ট হইলে মেসিনের মূল্য আমার ব্যবসা জীবন १७ ১০,০০০, দশ হাজার টাকা মূল্যে লইতে স্বীকৃত আছি। তাহারা আমার প্রস্তাব সমর্থন করিল। একজিবিশন্ অন্তে মেসিন অপিসে উঠাইয়া লইয়া ইহার কাজ দেখাইবে, এইরূপ কথাবার্তা স্থির হইল। এমন সময়ে কানপুরের একজন মাড়ােঝারী কোন কিছু না দেখিয়াই দশ হাজার টাকা মূল্যে ঐ মেসিন ডেলিভারী লইল। জেশপ, কোম্পানী আমাকে আর ও ভাবে experiment করিয়া দেখাইতে সম্মত হইল না। অনুসন্ধানে জানিলাম সেই মাড়ােয়ারীর কাণপুরে সরিষার তেলের কল আছে এবং সেখানে আরও একটী expeller মেসিন আছে। তখন মনে করিলাম যে একটা চালু করিয়া দ্বিতীয়টা লইতেছে, সে অবশ্যই ইহাতে লাভ না বুঝিলে পুনরায় লইবে কেন? কাজেই, আর বিবেচনা না করিয়া একটী expellerএর জন্য দশ হাজার টাকা মূল্য স্থির করতঃ অর্ডার দিলাম। যদিও তখন কারবারে কিছু লাভ দাড়াইয়াছে, কিন্তু সে লাভ দেখিতে পাইতেছি না। কারবার বৃদ্ধির সঙ্গে মেশিনারী খরিদ করিতে, গুদাম খরিদ করিতে, বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য বিলাত বাকিও বৃদ্ধি হওয়ায় লাভের টাকা ছড়াইয়া আছে। অথচ এক সঙ্গে পরবর্তী অয়েল এঞ্জিন ও এপেলারের জন্য অল্পদিনের মধ্যেই ২১০০০ হাজার টাকা ঢালিতে হইবে। আর ব্যাজ, করিয়া টাকা লওয়া উচিত বিবেচনা করিলাম না। অগত্যা ৮ নং বনমালী চ্যাটার্জি স্ট্রীটস্থ বাড়ীখানাই বিক্রয় করিয়া টাকা সংগ্রহ করার মনস্থ করিলাম। কারবারের দৈনন্দিন অবস্থা পরিবর্তন, কথা প্রসঙ্গে বাড়ী যাইয়া মাঝে মাঝে স্ত্রীর সহিত গল্প করিতাম। তাহাতে তাহার বুঝিতে বাকী ৭৪ আমার ব্যবসা জীবন ছিল না যে চাকা ঘুরিয়াছে। কাজেই, এবার আর বাড়ী বিক্রয়ের প্রস্তাবে বিশেষ কিছু প্রতিবাদ করিল না। তবে, এ কথা প্রতিশ্রুতি দিতে হইল যে ইহাপেক্ষা ভাল বাড়ী একখানা তােমার নামে শীঘ্রই খরিদ করিয়া দিব। এই বাড়ীর মূল্য বােন্ টাইমে ২৭০০০ টাকা দর হইয়াছিল, বর্তমান সময়ে বহু চেষ্টা করিয়াও ১৭০০০ টাকার বেশী দর হইল না। এদিকে অর্ডারী এঞ্জিন ও এক্সপেলারের ইভয়েস (Invoice) আসিয়া গিয়াছে। টাকা শীঘ্রই দরকার, কাজেই ঐ ১৭••০ টাকা মূল্যে বাড়ী বিক্রয় করিয়া ভাড়া বাড়ীতে যাইয়া উঠিলাম। অয়েল এঞ্জিনও এক্সপোর যথাসময়ে আসিয়া গেল। পূৰ্ব্ববৎ মেসার্স আলফ্রেড, হারবার্ট অয়েল এঞ্জিন বসাইয়া চালু করাইয়া দিল। খরচা পড়ত করিয়া দেখি—ইলেকটিকের তুলনায় খরচা শতকরা ত্রিশ টাকা কম হইতেছে। এক্সপেলারের কাৰ্য্য দেখিয়া আনন্দ আর ধরে না। একই সরিষা বাজার হইতে কিনিয়া টী তেল প্ৰস্তুত করিয়া সেই সরিষায় যে তেল পাইতাম, যাহারা কিছু গোঁজা ও বাদাম মিশ্রিত করিয়া অপেক্ষাকৃত খারাপ তেল প্রস্তুত করিত, তাহারা আমাপেক্ষা কিছু বেশী তেল পাইত। পরে Expellerএর দ্বারা আমি দেখিলাম, ঘানিতে সম্পূর্ণ নিষ্কাষণ করিয়া লওয়ার পর খইলে যে তেল থাকে তাহাতে প্রায় প্রতি খই মণে ২ সের করিয়া তেল বেশী পাইতে লাগিলাম। তখন ৭২ খানা ঘানি চলিতেছে। কিছুদিন পূর্ব হইতে পূৰ্বোল্লিখিত কারণে লােকান্ বেশী হইতেছে দেখিয়া শুধু দিনে দিনেই ওভার টাইম (over time) করিয়া ভাের ৫টা হইতে রাত্রি ১০টা পর্যন্ত অর্থাৎ যতক্ষণ নিজে কলে থাকিতে আমার ব্যবসা জীবন পারি, সেই সময় পর্যন্ত কল চালাইতেছিলাম। Expeller ঘরে আসিলে যখন এই প্রকারে লাভ দেখিতে পাইলাম, তখন আবার পূর্ববৎ ২৪ ঘণ্টা কল চালাইতে সুরু করিলাম। দৈনিক কলে যাহা লাভ হওয়ার কথা, তাহা ছাড়া Expeller হইতে উৎপন্ন তেলে প্রায় ৫০ টাকা অতিরিক্ত লাভ হইতেছে। কিন্তু তবু যত লাভ হওয়ার কথা, তাহা পাইতেছি না। কারণ ৭২ খানা ঘানির উৎপন্ন খৈল একটা এক্সপেলারে ঐ সময়ের মধ্যে পেশাই করিতে পারে না। এই প্রকার দেখা লাভের আশা ত্যাগ করিতে না পারিয়া ঐ জেশপ, কোম্পানীর নিকট হইতে অন্য মেকারের আর একটা আধুনিক ধরণের Expeller ৮৫০০ টাকা মূল্যে খরিদ করিলাম। তখন একমাত্র তেল কল ছাড়া অন্য কোন ব্যবসায় নাই। কাজেই, দৈনিক কার্যের একটী প্রােগ্রাম (programme ) করিয়া লইলাম। প্রত্যহ নিয়মিত শীত গ্রীষ্ম বার মাস ভাের ৫টার পূর্বে শয্যাত্যাগ করিয়া গঙ্গাস্নানের পর ৬টার মধ্যে কিছু খাইয়া কলে আসিয়া পৌছি। ১১টা পর্যন্ত বেচা কেনা যাবতীয় কাজকর্ম পৰ্যবেক্ষণ করি, ১১টার পর আহার করিতে বাড়ী যাই। এই কাৰ্য্য বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে একখানি ঘােড়ার গাড়ী খরিদ করিয়াছি। আহার করিয়া ১২টার মধ্যে কলে আসিলে সরকার, ক্যাসিয়ার ইহারা খাইতে যায়—আমিও ব্যাঙ্কের বই, টাকা কড়ি গুনিয়া লিখিয়া লই। উহারা খাইয়া আসিলে উহাদের বিকালের কর্তব্য উপদেশ দিয়া বাহিরের কাজকর্মের লিষ্ট করিয়া টাকা সহ ব্যাঙ্কে রওনা হইয়া যাই। ব্যাঙ্কে টাকা জমা দিয়া বাজারের বা অপিস্ কোয়াটারের যে সমস্ত কাৰ্য্য থাকে তাহা ৭৬ আমার ব্যবসা জীবন সারিয়া রবিবার ব্যতীত প্রত্যহ বেলা ৩টার সময় হাওড়ায় যাই। হাওড়ায় সরিষা খরিদের কাজ সম্পন্ন করিয়া সন্ধ্যার পূর্বে ঘরে ফিরি। পরে রাত্রি ৯টা পর্যন্ত খাতা পত্র, দেনা পাওনা, আগামী কল্যকার প্রােগ্রাম ইত্যাদি সমস্ত ঠিক করিয়া ঘরে যাইয়া ১০টার মধ্যে আহার করি। আমার প্রত্যহ আহারান্তে একটু পড়িবার অভ্যাস আছে। পড়িতে পড়িতে চোখের পাতা জুড়িয়া আসে, শুইয়া পড়ি। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর রাত্রিটা গাঢ় নিদ্রায় অতিবাহিত হয়। আবার পূর্ববৎ প্রত্যুষে ৫টার পূর্বে শয্যাত্যাগ করিয়া কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হই। সাধারণ বাঙ্গালীর মত মধ্যাহ্নে আহারের পর নিদ্রা যাওয়া আমার কোন কালেই অভ্যাস নাই। এইরূপ নিয়মিত ঘড়ি ধরিয়া দৈনিক ১৮ ঘণ্টা কঠোর পরিশ্রম করার ফলেও স্বাস্থ্য আমার বেশ ভালই ছিল। বাল্যকাল হইতে শারীরিক পরিশ্রম করিতে আমি কোনদিন কাতর নই—বরং কাৰ্যান্তরে কখনও বিদেশে গিয়া পরিশ্রম করিবার সুযােগ সংযােগ না ঘটাতে শরীর খারাপ হয়। দিনগুলি ভাল ভাবেই কাটিতেছে। অর্থোপার্জনের সঙ্গে সঙ্গে আগে ব্যাজের দেনা কমাইতে আরম্ভ করিলাম। ১৩৩২ সালের মধ্যে শুধু বাজারের সরিষার দেনা ব্যতীত ব্যাজের দেনা শােধ হইয়া গেল। ৭২ খানা ঘানি রাত দিন চালাইয়াও যখন খরিদ্দারের আবশ্যক মত চাহিদা সঙ্কুলান হইতেছে না, দেখিলাম,তখন ঐ সনের শেষ ভাগে আর একটী ১১০ ঘােড়ার অয়েল এঞ্জিন ৬০ খানা ঘানি ও আমার ব্যবসা জীবন ৭৭ ২টী expellerএর অর্ডার দিয়া ২২৫ নং জমিতে কল extention করার জন্য মনস্থ করিলাম। এই সমস্ত কাজ সমাধা করিতে আমার আরও প্রায় ৪৬০০০ টাকা খরচ হইয়া গেল। ২২৫ নং জমিতে কল বসাইতে গুদাম ছােট হইয়া গেল। তখন অগত্যা ২২৩ নং বাড়ীটা মাসিক ২৫০ টাকায় গদী ও গুদামের উদ্দেশ্যে ভাড়া লইলাম। যখন আমার ২২৫ নং কল বসিতেছে—এই সময়ে কলের পাশ দিয়া কতকগুলি লােকে বাড়ী করিল। তখন তাহারা রাত্রে কল চালাইতে আপত্তি করাতে রাত্রিতে কুল চালান বন্দ রাখিতে হইল। মিউনিসিপ্যালিটীর আদেশ অনুসারে ভাের ৫টা হইতে রাত্রি ৮টার অধিক আর কল চালাইতে পারি না। ৭২ খানা ঘানির পরিবর্তে ১৩২ খানা ঘানি হইল বটে, কিন্তু রাত্রে চলা বন্দ করাতে তেল বিশেষ বাড়িল না। তখন চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ১৫৬ নং অপার সাকুলার রােডে সন ১৩৩৩ সালে ১২০ খানা ঘানি, ষ্টীম এঞ্জিনে পরিচালিত একটী তেল কল মাত্র ২১ ০০০, বাইশ হাজার টাকা মূল্যে খরিদ করিলাম। ঐ কলের সংস্কার করিয়া এবং নূতন ২টী expeller বসাইয়া চালু করিতে প্রায় ৪০,০০০, চল্লিশ হাজার টাকার উপর খরচ হইল। দুইটা কলের উৎপন্ন তেল দ্বারাও যখন চাহিদা বৃদ্ধি অনুভব করিতে লাগিলাম এবং আর কল বাড়াইবার উপায় না থাকায় সন ১৩৩৩ সালের বৎসরান্তে হালখাতার সমস্ত বিলেত বাকী আদায় হইলে পর সন ১৩৩৪ সাল হইতে খরিদ্দার মহলে declare করিলাম যে আর ধার বিক্রয় করিব না। শুনিয়া অনেক খরিদ্দার

৭৮
আমার ব্যবসা জীবন
সরিয়া গেল—অনেক কলওয়ালা টিটকারী দিল। আমার প্রতি
যােগিতায় যে সমস্ত খাঁটী তেলের কল নূতন নূতন গড়িয়া উঠিয়াছিল,
তাহারা ঐ সমস্ত খরিদ্দারগণকে ধার দিতে লাগিল। ফলে এই
দাড়াইল—আমার বিক্রয় কমিয়া গেল। তেল জমিতে লাগিল।
ওভার টাইম (over time) কাজ করান দূরে থাকুক,
নিয়মিত কাজ করাইয়াও দৈনিক উৎপন্ন তেল কাতি করাইতে
পারি না। পুনরায় পূৰ্ব্ব খরিদ্দারগণকে ডাকিয়া ধার দিলে
হাস্যাস্পদ হইতে হইবে, এই মনে করিয়া তাহা আর করিতে
পারিলাম না। তখন চারিদিকে মফঃস্বলে হাবিল ও
প্লাকার্ড সহ ক্যানভাসার পাঠাইলাম। ক্যাস্ টাকায় তেল লইলে
বাজার দর অপেক্ষা মণ প্রতি। চারি আনা কমিশন দিব—ঘােষণা
করিলাম। ব্যক্তি বিচারে তেলের দর কমি বেশী না করিয়া দৈনিক
তেলের দর বাের্ডে বাজার ছাড়া দর কম লিখিয়া নির্ধারিত করিয়া
দিলাম। এই সমস্ত উপায় উদ্ভাবন করার পর আস্তে আস্তে আবার
নগদ বিক্রী বাড়িয়া গেল।
ইহার ফলে এই দাড়াইল যে কারবারে লাভ হউক আর
লােকান্ হউক-টাকার স্বচ্ছলতা হাতে যথেষ্ট হইল। কারণ
যেদিন সরিষা ঘরে পৌছায়—সেইদিন হইতে ৩৪ দিনের দিন
মহাজনের টাকা মিটাইতে হয়। সরিষা ঘরে আসার পর হইতে
১০/১২ দিনের মধ্যে টাকা খালি হইয়া যায়। দুইটী কলের
দৈনিক উৎপন্ন তেল ও খইলের মূল্য তখন প্রায় ৬০০ টাকা
নিত্য আমদানী হইত। যখন এই প্রকার টাকার স্বচ্ছলতা
আসিল, তখন বাস করার জন্য ৭ নং পাল স্ট্রীটের বাড়ীখানা

আমার ব্যবসা জীবন ৭৯ স্ত্রীর নামে খরিদ করিয়া ভাড়াটে বাড়ী ত্যাগ করিয়া উঠিয়া আসিলাম। সন ১৩৩৪ সালের ভাদ্র মাসের একদিন রাত্রিতে খুব বর্ষা হয়। সেই বর্ষার জলে আমার গ্যালিফ, স্ট্রীটের কলের গুদামের ভিতর জল প্রবেশ করিয়া অনেক মাল ভিজিয়া নষ্ট হয়। কলের পিছনেই বাড়ী-রাত প্রায় ২টার সময় উঠিয়া আসিয়া দেখি—অবিশ্রান্ত বর্ষণের ফলে যথেষ্ট লােকসান হইয়াছে। তখনও চেষ্টা করিলে কতক মাল বাঁচান যাইতে পারে। কলের সমস্ত কুলি মজুর লইয়া, নিজে সমস্ত রাত্রি জলে ভিজিয়া যথাসম্ভব সরিষা ও খইল রক্ষা করা হইল। রাত্রের অনিদ্রায় ও জলে ভিজিয়া পরদিন আর বিছানা হইতে উঠিতে পারি না। সর্দি কাসির সঙ্গে হাঁপানীর সৃষ্টি হইল। সঙ্গে সঙ্গে যথারীতি চিকিৎসার ব্যবস্থা করিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য বশত সেই হাঁপানী আমার সঙ্গের সাথী হইয়া আছে। নিজের শরীর ভাঙ্গিয়া গেল। কালীবাবু পুনরায় আসিয়া জুটিয়াছিলেন, সে কথা পূর্বেই বলিয়াছি। সাল তারিখ ঠিক মনে নাই—বােধ হয় ১৩৩২ সালে পুনরায় তাঁহাকে কলিকাতাতে বিবাহ দিয়াছিলাম। সন ১৩৩৩ সালের কারবারের ফল খুব ভাল হওয়াতে বর্ধমান হইতে সীতাভােগ আনিয়া হালখাতায় খরিদ্দারবর্গকে খাওয়ান স্থিরীকৃত হইল। নিজের একখানা এক টনের লরী ছিল। আমার নিষেধ সত্ত্বেও কালীবাবু সেই লরী লইয়া বর্ধমানে ৬০ মণ সীতাভােগ আনিতে চলিলেন। আমাকে বিশেষভাবে অনুরােধ করিলেন,-৬/• মণ সীতাভােগে আপনি যে দর স্থির করিয়া দিয়াছেন, আমি গেলে অন্ততঃ

আমার ব্যবসা জীবন
৬/• মণে ৬ ছয় টাকা দালালী সইতে পারিব। তিনি আমার
বেতনভােগী কর্মচারী ছিলেন না। এই প্রকার খরিদ বিক্রয়ের
মালের উপর কমিশন লইয়াই তাহার চলিত, কাজেই আমি
অনিচ্ছাকৃত সম্মতি দিলাম। ফলে এই দাড়াইল, বর্ধমান যাইবার
পথে লরীখানা উল্টাইয়া গিয়া তাহার অকালমৃত্যু হইল।
একে বন্ধুবিচ্ছেদ, তাহার পর একজন উপযুক্ত কর্মচারী,
কলের সমস্ত কাজকর্শ্বে অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে হারাইলাম। তাহার পর
তাহার স্ত্রী হাইকোর্টে আমার নামে ২৫০০০
টাকার ক্ষতিপূরণের
দাবী দিয়া এক নালিশ রুজু করিল।
ঐ ১৩৩৪ সালে আমার কনিষ্ঠ পুত্রের বয়স তিন বৎসর
চাকরের কোলে উঠিয়া কলে আসিয়াছে, কোন্ অবসরে
কলের ভিতর যাইয়া একটী দিয়াশলাইএর মেসিনে হাত দিয়াছে,
চাকরও কল ঘুরাইয়াছে, আর তাহার ডান হাতের ওটা আঙ্গুল
কাটিয়া পড়িয়া গেল।
গ্যালিফ, স্ট্রীটের কলটী যাহা এ যাবৎ নির্বিবাদে চলিয়া
আসিতেছিল, যাহারা কলের সংলগ্ন আসিয়া বাটী করিল, তাহাদের
ভিতর কয়েকজন মিলিয়া করপােরেশনে এক কেস (case)
উঠাইল,-এই কলের দ্বারা বাড়ী vibration হইতেছে, smoke,
dust, noise ইত্যাদি কারণে স্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত হানি
ঘটাইতেছে। অতএব, অবিলম্বে এই কল তুলিয়া দেওয়া হউক।
করপােরেশনের কমিটী কোটে মােকদ্দমা—যাহার
কাউন্সিলারদিগের উপর প্রতিপত্তি বেশী, তাহার পক্ষে জয়ের
সম্ভাবনা তত বেশী। আমি সামান্য একজন কলওয়ালা মাত্র।

আমার ব্যবসা জীবন ৮১ আপত্তিকারকদিগের মধ্যে কেহ সাব জজ, কেহ উকিল, কেহ এটর্ণি, কেহ জুটবেলার ইত্যাদি। একাদিক্রমে দেড় বৎসর যাবৎ মােকদ্দমা করিয়া বহু অর্থ নানা ভাবে খরচ করিয়া শেষ ফল এই দাড়াইল যে ২২৫ নং গ্যালিফ, স্ট্রীটে যে কল বাড়ান হইয়াছিল, তাহা তুলিয়া দিতে হইল। ঐ সনে বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক ফেল হইয়া ১৮ হাজার কয়েক শত টাকা ডুবিয়া গেল। তাহার আর ১৮ পয়সা পাইলাম না। আবার ১৫৬নং অপার সার্কুলার রােডে যে কলটা কিনিয়াছিলাম, উহার বিক্রেতা ছিল তিনজন। তাহার মধ্যে একজন বিহারীলাল সাধুখাঁ ইনসলভেন্সী ( Insolvency) ফাইল করিল। জানিতেছি, নগদ টাকা দিয়া কল কিনিয়া, রেজিষ্ট্রী অপিসে রেজিষ্ট্রারের সামনে টাকার আদান প্রদান হইয়াছে, ইহাতে আর বিশেষ কি প্রমাণ করিতে হইবে ? এই বলিয়া তদ্বিরের শৈথিল্যের ফলে আলিপুর কোর্টে মােকদ্দমা হারিয়া গেলাম। কলটী বেনামা সাব্যস্ত হইয়া গেল। সন ১৩৩৪ সাল ও ৩৫ সালের কতকাংশ মিলিয়া সময়টা এমনই খারাপ যাইতে লাগিল যে চারিদিক দিয়া নানাপ্রকার অশান্তি, মামলা, মােকদ্দমার জন্য মস্তিষ্ক-বিকৃতি ঘটিয়া উঠিল ভগবদিচ্ছায় বেচা কেনা কিছু হ্রাস হয় নাই। নগদ টাকায় বিক্রীর জন্য অন্যান্য খাঁটী তেলকলওয়ালাদের সহিত প্রতিযােগিতার ফলে পূৰ্ব্ব পূৰ্ব্ব বৎসরের ন্যায় বিক্রীর তুলনায় মুনফা কম হইয়া গেল। ১৩৩৫ সালে আবার এক নূতন বিভীষিকা। আমার কলের শ্রীবৃদ্ধি দেখিয়া যাহারা বহু পুরাতন কলওয়ালা-তাহাদের অনেকের আমার ব্যবসা জীবন ঈর্ষাভাজন হইয়া পড়িলাম। হাবড়ার বাজারে যে সমস্ত দালালের মারফত সরিষা লইতে হয়--তন্মধ্যে একজনের প্রতারণা ধরা পড়ায় তাহাকে বয়কট (boycott) করাতে ঐ দালাল এবং কয়েকজন কলওয়ালা বাজারে রাষ্ট্র করিল যে বর্তমান সময়ে সব কলওয়ালার লােকসান হইতেছে, সুতরাং রায় সাহেবেরও লােকান্ হইতেছে। এই লােকসানের বাজারেও রায় সাহেব নীলমণি মিত্র রােডে ৪ খানি বাড়ী ও মস্ত বড় একখানি বাগানে লক্ষাধিক টাকা ব্যয় করিয়াছে। ইহার উদ্দেশ্য,অচিরাৎ ইনসলভেন্সী (Insolvency) ফাইল করিবে। বিশেষতঃ, সার্কুলার রােডের কল বিনাম সাব্যস্ত হওয়াতে হাইকোর্ট আপিল করিয়া কেস (case) pending ছিল। কালীবাবুর স্ত্রী যে ২৫ হাজার টাকা দাবীর ক্ষতিপূরণের নালিশ করিয়াছিল, সে মােকদ্দমাও তখন pending আছে। কাজেই, অল্পবুদ্ধি মাড়ােয়ারী মহাজনকে আমার বিরুদ্ধে এই প্রকার প্ররােচনা করায় তাহারা অনেকে বুঝিল,—ধার কিনিয়া নগদ বিক্রী করে, এরূপ ব্যবসা সচরাচর দেখা যায় না,এ ক্ষেত্রে যখন এত লােকে বলিতেছে, তখন এ কথার উপর সন্দেহ করা যাইতে পারে না। এইরূপ মহাজনদের মধ্যে ভিতর ভিতর একটা ষড়যন্ত্র করিয়া গত ( ১৩৩৫ সাল) ১০ই ভাদ্র, ২৬শে আগষ্ট, রবিবার তারিখে প্রাতে একদিন সমস্ত পাওনাদারগণ আসিয়া গদীতে ভরিয়া গেল। মহাজন এসােসিয়েশনের নিয়ম আছে যে, ডিউর (due) পূৰ্বে মণ প্রতি এক আনা ব্যাজু বাদ দিয়া লইলে, কলওয়ালার নিকট টাকা তাগিদ করিতে পারে। এই ভাবে সমস্ত মহাজন একত্রিত হইয়া ব্যাজ, কাটিয়া টাকা দিবার জন্য বিল দাখিল করিল। সম

আমার ব্যবসা জীবন
৮৩
-
বিলের সমষ্টি দেখিলাম ১৩২০০০ টাকা। ঐ দিন মাত্র দুই
মহাজনের ৮৫০০ টাকার ডিউ ছিল। এবং ঐ পরিমাণ টাকা
তহবিলে নগদ ছিল, ঐ দিন যাহাদের due ছিল—তাহাদের ক্যাস
পেমেন্ট (cash payment) করা হইল। বাকি সকলের চে
দেওয়া ছাড়া উপায় কি? কিন্তু Central Bankএ Current
accountএ মাত্র ৩৮ হাজার টাকা ছিল।
পূৰ্বেই বলিয়াছি—ধার কিনিয়া নগদ বিক্রীর ফলে সব সময়ে
আমার হাতে টাকার স্বচ্ছলতা থাকিত। Bengal National
Bank ফেল হওয়ার পর হইতে বেশী টাকা আর এক ব্যাঙ্কে
রাখিতাম না। আবশ্যকীয় টাকা Contral Bankএর Current
accountএ রাখিয়া অতিরিক্ত টাকা সমস্ত বিভিন্ন ব্যাঙ্কে যথা-
চার্টার্ড ব্যাঙ্কে, পিএণ্ডও ব্যাঙ্ক, হংকং ব্যাঙ্ক, ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক—প্রভৃতি
ব্যাঙ্কে দালালের Through দিয়া ২/৪ মাস অথবা ৬ মাস
টাইমে fixed deposit করিয়া রাখিতাম। তাহাতে দেখিয়াছি,
বৎসরান্তে পরের টাকা ব্যাজ খাটাইয়া এই ভাবে ৩০ ০০৪ ০ ০ ০
টাকা সুদ আমদানী হয়।
যখন মহাজনগণ এইরূপ অতর্কিতভাবে আসিয়া আমাকে
আক্রমণ করিল, তখন অনন্যোপায় হইয়া central Bankএর
উপরই সমস্ত মহাজনের পৃথক পৃথক চেক্ কাটিলাম। এই
দুঃখের মধ্যে একটা হাসির কথা না বলিয়া পারিলাম না।
২৩ জন মহাজন—তাহারা বলিয়া বসিল, “চে লইয়া বিল ইনফুল
করিব না। ঐ চেকের মূল্য সিকি পয়সাও নহে। যদি ব্যাঙ্ক
টাকা স্বীকার না করে।” শুনিয়া মাথা গরম হইয়া গেল। তাহারা

৮৪ আমার ব্যবসা জীবন যে মহাজন, আমাপেক্ষা বড় ধনী এবং আমার বাড়ীর উপর আসিয়াছে—সে সমস্ত বিস্মৃত হইয়া এই প্রকার অন্যায় কথা বলাতে যদৃচ্ছা গালি মন্দ করিলাম। আমার গালাগালিতে তাহারা উত্তেজিত হওয়া দূরে থাক, বরং হাসিতেই লাগিল। তাহার মধ্যে একজন হাসিতে হাসিতে বলিল, “রায় সাহেবের গায় জ্বালা ধরিয়াছে, উহাকে বকিতে দাও। তােমরা কেহই কোন কথা বলিও না। আমাদের টাকা পাওয়া উদ্দেশ্য, টাকাই যখন পাইতেছি, তখন দুইটা গালি খাইয়া হজম করিতে পারিব। যেহেতু, “জমিদারী গরম কী, দোকানদারী নরম কী, দালালী বেসরকী, ক্ষেতি করম কী, বউ বেটী সরম কী এ সমস্ত কথা আমরা জানি। এই প্রসঙ্গে অশিক্ষিতের নিকট কতকগুলি নূতন কথা শিক্ষালাভ করিলাম। যাহা হউক, রাত্রি ১০টা পর্যন্ত এই ভাবে ব্যাজ, কাটিয়া মহাজনদের টাকা মিটাইলাম। এই প্রকারের payment করিতে দেখিয়া ৩ জন মহাজন বিল দিয়া ব্যাজ, কাটিবে না বলিয়া বিল ফেরত লইয়া চলিয়া গেল। পরদিন সােমবার ১টা না বাজিতে অন্যান্য ব্যাঙ্কের এক লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপােজিটের (Fixed deposit) রসিদ সহ Central Bankএর চিফ, ক্যাসিয়ারের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া গত কল্যকার ঘটনা আনুপূৰ্ব্বিক সমস্ত বলিলাম। বৎসর দুই পূর্বের কথা—একদা central Bankএ মাড়ােয়ারীগণ হুজুগ তুলিয়াছিল, ব্যাঙ্ক ফেল হইবে, সমস্ত টাকা একদিনে চাই। যেদিন এই ঘটনা ঘটে, সেইদিন Central Bankএর Current accountএ অনেক টাকা আমি জমা দেই। Chief Cashier

আমার ব্যবসা জীবন
৮৫
আমাকে দেখিয়া বলিয়াছিলেন, “আজ সকলে টাকা উঠাইতেছে,
আপনি কোন্ বিশ্বাসে টাকা জমা দিতেছেন?” তদুত্তরে আমি
হাসিতে হাসিতে বলিয়াছিলাম-“আমি ছাতু খাই না, চিংড়ী মাছ
খাই, সুতরাং আমার মাথায় ফরাস্ (Phosphorus) বেশী।”
শুনিয়া Chief Cashier খুব হাসিলেন এবং তদবধি আমার সঙ্গে
তাহার একটু বিশেষ খাতির হইয়াছে। সেই ভরসায় Current
Accountএ জমা টাকার অতিরিক্ত চেক্ কাটিয়াছিলাম। মনে
মনে ভাবিলাম, যদি অন্য ব্যাঙ্ক ডিউর পূৰ্ব্বে টাকা না দেয়, তবে
এই সমস্ত রসিদ Central Bankএ মর্টগেজ দিয়া টাকা ধার
করিব। কিন্তু তাহা করিবার প্রয়ােজন হইল না। আমার এই
অবস্থার কথা প্রত্যেক ব্যাঙ্কের এজেন্টদিগের নিকট জানাইলে
লয়েডস্ ব্যাঙ্ক ব্যতীত অন্যান্য সমস্ত ব্যাঙ্কই হাত লাগাত সুদসহ টাকা
মিটাইয়া দিল। কেবল লয়েড ব্যাঙ্ক সুদ দিল না—আসল ২৫ হাজার
টাকা দিল। ঐ সমস্ত টাকা আনিয়া Central Bankএ জমা
দিয়া দেখি, যত চেক্ কাটিয়াছি, সমস্ত ভুক্তান হওয়ার পরেও ১৮
হাজার টাকা Current accountএ জমা আছে। তখন মঙ্গলবার
সকালে যে ৩ জন মহাজন টাকা না লইয়া ফিরিয়া গিয়াছিল,
তাহাদের নামে পিওন বুক দিয়া নােটীশ দিলাম যে, তােমাদের টাকা
প্রস্তুত, ব্যাজ কাটিয়া টাকা লইয়া যাও। যদি তােমরা ডিউতেও
টাকা লও, তাহা হইলেও ব্যাজ, দিতে বাধ্য হইবে। যেহেতু,
অসময়ে আমাকে অপদস্থ করার জন্য বিল সাবমিট (submit )
করিয়াছিলে। টাকা অদ্যই লও বা ডিউ টাইমে লও, ব্যাজ
দিলে টাকা দিব না। আদালতের সাহায্য লইতে হইবে।

আমার ব্যবসা জীবন
এই ঘটনার পরে মহাজনদিগকে যে ছাপান নােটীশ দেওয়া
হইয়াছিল তাহা এই :-
“এতদ্বারা ইণ্ডিয়ান প্রােডাক্ট এসােসিয়েশনের মেম্বারগণকে
জানান যাইতেছে যে, যাহারা বিগত ১০ই ভাদ্র, ২৬শে আগষ্ট
রবিবার ডিউ না হওয়া সত্ত্বেও ব্যাজ, কাটিয়া টাকা লইবার মানসে
আমার কলে আসিয়াছিলেন, তাঁহাদিগের মধ্যে যারা টাকা না
লইয়া স্বেচ্ছায় ফিরিয়া গিয়াছিলেন, তাঁহারা অবিলম্বে আপনাপন
বিল সহ আমার ২২৩, গ্যালিফ, স্ট্রীটের তৈল কলে আসিয়া ব্যাজ,
কাটিয়া টাকা মিটাইয়া লইয়া যাইবেন। হল্লায় যােগদানকারীদিগের
মধ্যে যদি কেহ এই নােটীশ পাওয়া স্বত্ত্বেও না আইসেন, তাহা
হইলে ডিউ তারিখে টাকা লইলেও বাজার দস্তুর ব্যাজ, দিতে বাধ্য
হইবেন। আরও প্রকাশ থাকে যে হল্লাকারীদিগের ভিতরে যদি
কাহারও সরিষার লাট বে-ওজন পড়িয়া থাকে বা ঐ লাটে কোন
প্রকার গােযােগ থাকে, তবে অবিলম্বে দালাল সহ আসিয়া
তাহার মীমাংসা করিয়া ওজন দিয়া বিল করিয়া ব্যাজ, কাটিয়া
সঙ্গে সঙ্গে টাকা লইয়া যাইবেন। ইতি-
রায় সাহেব বিনােদ বিহারী সাধু,
২২৩, গ্যালিফ ষ্ট্রীট, শ্যামবাজার,
কলিকাতা।”
কাহার কত টাকা আছে, তাহা অন্যে দেখিতে পায় না।
তাহার কারবারের অবস্থা, দেনা পাওনার বহর ইত্যাদি
দেখিয়া বাহির হইতে লােকে মনে করে সে একজন বড় ধনী বা
একজন নিধন। বাজারে যত মহাজন সরিষা আমদানী করে,

আমার ব্যবসা জীবন ৮৭ যদিও তাহার অধিকাংশ মহাজনের সহিত আমার লেন দেন আছে, কিন্তু ঐ দিনে সমস্ত মহাজনের সহিত দেনা পাওনা ছিল না। আংশিকভাবে যতগুলির সহিত ছিল, তাহারা এই ভাবে আসিয়া অসময়ে একদিনে কাঁচা পাকা সমস্ত ডিউর টাকা চুক্তি পাইয়া, তদুপরি এই প্রকারের নােটীশ মহাজনদিগকে দেওয়ায় ও হাবড়ার বাজারের বিভিন্ন স্থানে ও মহাজনদিগের এসােসিয়েষন্ অফিসে ছাপান নােটিশ মারিয়া দেওয়ায় আমার বিষয় লইয়া একটা অত্যধিক সােরগােল পড়িয়া গেল। ফলে এই দাড়াইল যে তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের উৰ্বশীদত্ত শাপ যেমন একদা বরে পরিণত হইয়াছিল, যে সমস্ত হীনচেতা পরশ্রীকাতর প্রতিদ্বন্দ্বীগণ আমাকে ফেল করিবার উদ্দেশ্যে এই কাৰ্যে ব্ৰতী হইয়াছিল, তাহাদের অন্তর্দাহ, সঙ্গে সঙ্গে বাজারে আমার ক্রেডিট ( Credit ) বােধ হয় বিশ গুণ বাড়িয়া গেল। মাড়ােয়ারী মহাজনদের ভিতর, নিজেদের মধ্যে সর্বদা হুণ্ডী লেন দেনের কাজ চলিয়া থাকে ;—এই হুণ্ডীর ব্যাজ মাসিক শতকরা • হইতে ॥/ আনা পর্যন্ত উঠা নামা করে। এই ভাবে উহাদের টাকা স্বচ্ছলতা থাকা স্বত্ত্বেও ডিউর পূর্বে সরিষার মণ প্রতি • আনা ব্যাজ কাটিয়া টাকা লইলে, শতকরা ১২ টাকা হইতে ১০ দেড় টাকা ব্যাজ, লােকসান হইয়া যায়। তবু যে ইহারা ব্যাজ, বাদ দিয়া কলওয়ালার নিকট টাকা লয়, ইহার একমাত্র কারণ- সন্দেহ। এত টাকা অমুক কলওয়ালাকে দেওয়া যাইবে কি না? ঐ তারিখে গণ্ডগােল হওয়ার পূর্বে বহু মহাজন বহুবার আমার নিকট হইতে বাজার চুক্তি /• আনা ব্যাজ, বাদ দিয়া টাকা লইয়া গিয়াছে। অথচ এখন যদি কাহারও নিকট হইতে লক্ষ টাকারও ক ৮৮ আমার ব্যবসা জীষন মাল লই এবং তাহাকে বলি, মণ প্রতি ১০ পয়সা ব্যাজ, বাদ দিয়া টাকা লইয়া যাও, তাহাতেও কেহ সম্মত হয় না। পূর্বে কোন মহাজনের নিকট, হয়ত দশ হাজার টাকা বাকী আছে, পুনরায় তাহার নিকট মাল লইতে গেলে হয়ত বলিত,-এ মাল অন্যকে সওদা দেওয়া আছে, অথবা বাজার ছাড়া ৭০ আনা দর বেশী দিত। কেহ কেহ বা বলিত “আমার টাকার দরকার, এ বিল ধার বেচিব ।” মুখে স্পষ্ট কেহ বলিত না, এত টাকার মাল ধার দিয়াছি, আর ধার ছাড়িব না। কিন্তু এই ঘটনার পর হইতে থিয়েটারের পট পরিবর্তনের মত পূর্বের সে সুর কিছুই নাই। যত ইচ্ছা তত মাল লইতেছি, এমন কি আমাপেক্ষা অনেক বড় বড় কলওয়ালাকে যে সরিষা যে দরে offer দেয়, তদপেক্ষা আমাকে ১০, ২৫ পয়সা কম দরে offer দিয়া থাকে। এই যে পরিবর্তন, ইহা ব্যবসার পক্ষে অনেক মূল্যবান্ জিনিষ। সন ১৩৩৫ সাল এই প্রকার সুখে দুঃখে কাটিয়া গেল। বৎসরান্তে কাগজ নিকাশ করিয়া দেখি, অন্যভাবে যতই অশান্তি হউক, ব্যবসায়ে কিছু আছে। সন ১৩৩৬ সালে পূৰ্বোল্লিখিত মামলা মােকদ্দমাগুলি একে একে হার জিতের মধ্য দিয়া মিটিয়া গেল। আবার পূৰ্ব্ব শান্তি ফিরিয়া আসিল। সন ১৩৩৬ সালে বিশেষ কিছু উল্লেখ যােগ্য ঘটনা নাই। তবে, আমি ধার বিক্রয় বন্দ করিবার ফলে এবং আমার বিক্রয়াধিক্য দেখিয়া যে সমস্ত নূতন নূতন ছােট খাটী তেলকল- ওয়ালাগণ আমার প্রতিযােগিতায় দাড়াইয়াছিল, তাহারা ধার বিক্রয় করিয়া সকলেই এক প্রকার দাঁড়াইয়া গিয়াছে। এই আমার ব্যবসা জীবন সমস্ত কলওয়ালাগণের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমার বিক্রী না কমিলেও নগদ টাকায় বিক্ৰী করিবার জন্য মুনফা কম হওয়াতে বৎসরের শেষে আশানুরূপ লাভ হয় নাই। ধারে কিনিয়া ক্যাসে বিক্রী এরূপ কোন বড় ব্যবসা বাজারে অত্যন্ত দুর্লভ। ইহাতে লাভ যতই কম হউক, বােধ হয় ব্যবসাদার মাত্রেরই এরূপ ব্যবসা বাঞ্ছনীয়। ভগবদিচ্ছায় আমার ব্যবসায় এই প্রকারে প্রতিষ্ঠিত হওয়াতে পরের টাকা ঘরে রাখিয়া নিজের তহবিল বড় করা অপেক্ষা ব্যাজ, কাটিয়া ক্যাস্ টাকায় খরিদ করা আরও লাভ জনক হইবে, এইরূপ বিবেচনায় সরিষা ক্যাস্ টাকায় বাজার দস্তুর ব্যাজ, বাদ দিয়া খরিদ করিতে সংকল্প করিলাম। কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারিলাম না। যেহেতু, সরিষার মহাজনগণ যখন নিজের ইচ্ছা করিয়া সন্দেহের বশে কোন কলওয়ালার নিকট হইতে ব্যাজ, বাদ দিয়া টাকা লয়, তখন তাহারা অপমান মনে করে না। কিন্তু ব্যাজ, কাটিয়া টাকা লওয়ার কথা বলিলে তাহারা অপমান মনে করে ও অসন্তুষ্ট হয়। ঐ ভাবে কৃতকাৰ্য হইতে না পারিয়া এক নােটীশ ছাপাইয়া হাবড়। বাজারে বহু জায়গায় দেওয়ালের গায়ে লটকাইয়া দিলাম। ঐ নােটাশ যথাক্রমে ইংরাজী, হিন্দি ও বাংলা ভাষায় ছাপন হইল। তাহাতে লেখা হইল এই ঃ- “এতদ্বারা ইণ্ডিয়ান প্রােডাক্টস এসােশিয়েশনের মেম্বরগণকে জানান যাইতেছে যে, যাহারা ডিউর পূর্বে সরিষা বিক্রীর টাকা লইতে ইচ্ছুক, তাহারা খরিদা মাল মিল ডেলিভারী delivery) অর্থাৎ নিজেরা ভাড়া দিয়া- ( mill

আমার ব্যবসা জীবন
ব্যাজ,
আমার কলে পাঠাইয়া দিবেন। তাহা হইলে আমি বুঝিব
বিক্রেতার ক্যাস টাকার প্রয়ােজন। বাজার দস্তুর ব্যাজ প্রতি
মণে /• এক আনা—গাড়ী ভাড়া ও প্রতি মণে • এক আনা।
সুতরাং ইহাতে মহাজনের লােকসানের কোন কারণ নাই। যদি
কেহ এই ভাবে মিল ডেলিভারী না দিয়া—ডিউর পূর্বে টাকা চান,
তিনি বাজার দস্তুর
বাদ দিলেও টাকা পাইবেন
।” ইতি
পূৰ্বে লিখিয়াছি—মহাজনদিগের টাকা ব্যাঙ্কে fixed deposit
রাখিয়া বৎসরে ৩৪ হাজার টাকা ব্যাজ, পাই। কিন্তু যদি এই
ভাবে সমস্ত মাল মিল ডেলিভারী লইতে পারি, তাহা হইলে ঐ
৩৪ হাজার টাকা পাইব না বটে, কিন্তু প্রায় ১৮১৯ হাজার টাকা
গাড়ী ভাড়া যাহা বৎসরে লাগে—তাহা লাভ হইয়া যাইবে।
এই নােটীশের ফলে আরও একটা সুবিধা এই হইল যে,
ভবিষ্যতে পূর্বের ন্যায় অতর্কিত ভাবে সকলে একত্র হইয়া টাকা
চাহিতে পারিবে না।
যতদিন সরিষার দর বেশী ছিল, ততদিন পর্যন্ত মাঘ, ফান,
চৈত্র, বৈশাখ—এই চারি মাস অর্থাৎ মরশুমের সময় যখন হাওড়া
বাজারে খুব জোর আমদানী হয়, তখন যাহারা তেমন ধনী নহে-
এমত অনেক মহাজন এইভাবে বহু সরিষা, কলপটার মধ্যে একমাত্র
আমাকেই মিল ডেলিভারী দিয়াছিল। সরিষার বাজার পড়িয়া
যাইবার পর হইতে বহু চেষ্টা করিয়াও আর মিল ডেলিভারী
লইতে পারি নাই। যেহেতু, ইহাতে মাড়ােয়ারীগণ হুণ্ডীতে
পটীতে যে হিসাবে ব্যাজ দিয়া টাকা পায়—মিল ডেলিভারী

আমার ব্যবসা জীবন সরিষা বিক্রয় করিলে বর্তমান বাজারে সরিষার দরের সঙ্গে হিসাব করিলে-ব্যাজের পড় তা ডবলেরও বেশী হয়। কাজেই, আমার এ নিয়ম বেশী দিন চলে নাই। যাহাতে নিত্য কঁচা পয়সা আমদানী হয়—এমন কোন ছােট কারবার শুধু কর্মচারীগণের উপর নির্ভর করিলে সে ব্যবসায়ের উন্নতি হওয়া দূরে থাকু-অবনতি অবশ্যম্ভাবী। কারবার ছােটই হউক আর বড়ই হউক, দিনান্তে অন্ততঃ একবার যদি দৈনিক ঘটনাগুলি পৰ্যালােচনা করা যায়—তাহা হইলে কর্মচারীগণের দোষগুণ ধরা পড়ে এবং ঐ ব্যবসা উন্নতিশীল কি অবনতিশীল, তাহাও বুঝা যায়। অবনতিশীল হইলে তাহার প্রতিকারের ব্যবস্থাও সঙ্গে সঙ্গে একটা কিছু মাথায় আইসে। আমি practical fieldএ ঠকিয়া এ জ্ঞান লাভ করিয়া লিখিতেছি। আমার জন্মভূমি খুলনা জেলার অন্তর্গত কপিলমুনি হইতে ঝিকরগাছা পৰ্যন্ত কপােতাক্ষ নদী দিয়া একটী ষ্টীমারের লাইন আছে। ঐ লাইন বহুকাল মেসার্স হােরমিলা কোম্পানীর ছিল। পরে স্থানীয় লােকের সহানুভূতিতে একটী দেশীয় কোম্পানীকে লাইনে দাঁড় করান হয়। Sir P. c. Roy এই কোম্পানীর ডিরেক্টর এবং ডাক্তার ফণিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ইহার ম্যানেজিং ডিরেক্টর। বিদেশী কোম্পানীকে তাড়াইয়া দেশী কোম্পানীকে দাড় করার সময় দেশী কোম্পানীর পক্ষ হইতে স্থানীয় লােকের যে সমস্ত সুখ সুবিধা দিবার কথা ঘােষণা করা হইয়াছিল, বিদেশী কোম্পানী চলিয়া যাওয়ার পরে সে সমস্ত সুবিধা দেওয়া দূরে থাক—বিদেশী কোম্পানী থাকিতে যে ভাড়া ছিল, তাহা অপেক্ষা আরও • চারি আমার ব্যবসা জীবন আনা ভাড়া বাড়ান হইল। তাহাতে আরও বিশেষ অসুবিধা এই হইল যে, লাইনে যে সমস্ত conductor, checker, প্রভৃতি কর্মচারী নিযুক্ত আছে, সকলেই স্থানীয় লােক। তাহারা পক্ষপাতিত্ব করিয়া অনেক সময়ে তাহাদের আত্মীয় স্বজনকে বিনা টিকিটে ষ্টীমারে লইয়া যায়--অনেক সময়ে তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট কাটিয়া দ্বিতীয় শ্রেণীতে চড়িতে দেয়। আর এই সব কারণে প্যাসেঞ্জারগণ অনেক সময়ে পয়সা দিয়া টিকিট কাটিয়াও ষ্টীমারের মধ্যে স্থানাভাবে কষ্ট পান—অনেক সময়ে এমনও ঘটে যে প্যাসেঞ্জারগণ দ্বিতীয় শ্রেণীর টিকিট কাটিয়াও স্থানাভাবে তৃতীয় শ্রেণীতে কষ্ট করিয়া যাইতে বাধ্য হন। গত ১৩৩৬ সালে আমার জন্মভূমি কপিলমুনি গ্রামে ভরতচন্দ্র-ইডোের হাসপাতালের দ্বারােদঘাটনের সময় কলিকাতা হইতে কয়েকজন বিশিষ্ট ভদ্রলােক লইয়া ঐ লাইনের স্টীমারে ঝিকরগাছা হইতে কপিলমুনি যাই। বলা বাহুল্য, আমাদের সকলেরই দ্বিতীয় শ্রেণীর শ্রেণীর টিকিট কাটা হইয়াছিল। কিন্তু ষ্টীমারের কর্মচারীগণের আত্মীয় কতকগুলি লােক বিনা টিকিটে এবং তৃতীয় শ্রেণীর টিকিট কাটিয়া দ্বিতীয় শ্রেণীর পরিমিত স্থানগুলি অধিকার করিয়া লওয়ায়—দ্বিতীয় শ্রেণীতে আমাদের বসিবার স্থান সংকুলান হইতে ছিল না। তখন এই বিষয় লইয়া ষ্টীমারের কর্মচারীগণের সহিত আমার ঝগড়া হইল। আমাদের কপিলমুনির কাৰ্য্য সমাধা হইবার পর তথা হইতে পুনরায় কলিকাতায় আসিবার সময় আমাদের ট্রেণে রিটার্ণ টিকেট কাটা স্বত্ত্বেও আমরা ঝিকরগাছা লাইনে না আসিয়া আমার ব্যবসা জীবন পাটকেল ঘাটার পথে মােটরে কলিকাতায় ফিরিয়া আসিতে বাধ্য হই। কলিকাতায় ফিরিয়া ঐ ষ্টীমার কোম্পানীর ডিরেক্টর আচাৰ্য্য প্রফুল্লচন্দ্র ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডাক্তার ফণিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া ষ্টীমারের কর্মচারীগণের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযােগ যথাযথ বর্ণনা করিলাম এবং ইহাও বলিলাম যে উহাদের মধ্যে অপরাধী কৰ্মচারীকে dismiss না করিলে লাইনে আমি competetion stater i আচাৰ্য রায় ও ফণী বাবু উভয়েই আমাকে অনেক করিয়া বুঝাইলেন এবং ভবিষ্যতে যাহাতে ষ্টীমারের কর্মচারীগণ ঐরূপ ব্যবহার না করে, তজ্জন্য তাহাদিগকে fine করিয়া শাসন করিয়া দিতে চাহিলেন, কিন্তু একেবারে dismiss করিতে স্বীকার করিলেন না। আমি বাল্যকাল হইতে বরাবরই জেদী ছিলাম। । আমি উহাঁদের ঐ বিচারে সন্তুষ্ট না হইয়া-খুলনা হইতে দুইখানা মােটর লঞ্চ কিনিয়া সার্ভে করাইয়া ঝিকরগাছা কপিলমুনি লাইন খুলিয়া দিলাম। ষ্টীমার লাইনের সহিত মােটর লঞ্চের বেশ প্রতিযােগিতা চলিতে লাগিল। ষ্টীমার অপেক্ষা লঞ্চ আয়তনে ছােট বলিয়া ষ্টীমারের আগেই লঞ্চ চলিয়া যায়। কাজেই, অধিকগতিবিশিষ্ট লঞ্চেই প্রথম প্রথম প্যাসেঞ্জার খুব বেশী হইতে লাগিল। এমন কি, লঞ্চে স্থান পাইতে ষ্টীমারে কেহ ইচ্ছ। করিয়া উঠিত না। পূৰ্বেই বলিয়াছি, কঁচা পয়সার কাজ। নিজের দেখাশুনা না করিলে কর্মচারী দ্বারা চুরি অনিবার্য। কলিকাতায় ৩টী তেল ৯৪ আমার ব্যবসা জীবন কলের জন্য কাৰ্যবাহুল্য বিধায় আমার সব সময়ে লাইনে গিয়া দেখাশুনা করিবার উপায় নাই। মাঝে মাঝে লাইনে Inspection জন্য যখন যাইতাম—তখন দেখিতাম passengerও খুব বেশী এবং টিকিট সেলও যথেষ্ট হইয়াছে। কিন্তু অন্য সময়ে আমার অবর্তমানে টিকিট সেল যথেষ্ট কম হইতে লাগিল। তারপরে, আরও একটা অসুবিধা দাড়াইল। বর্ষাকালে কপােতাক্ষী নদী কচুরি পানায় পূর্ণ হইয়া যায়। ষ্টীমএঞ্জিনে পরিচালিত ষ্টীমার কচুরী পানা কাটিয়া স্বচ্ছন্দগতিতে চলিয়া যায় আর মােটর পরিচালিত অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্রায়তন লঞ্চ কচুরি পানা কাটিয়া যাইতে পারে না। সুতরাং লঞ্চের গতি অপেক্ষাকৃত মৃদু হইয়া আসিতে থাকায় ষ্টীমার লঞ্চের আগে যাইতে আরম্ভ করিল। সুতরাং লঞ্চের প্যাসেঞ্জার কমিয়া গিয়া পুনরায় ধীমারের প্যাসেঞ্জার বেশী হইতে লাগিল। একখানি লঞ্চ চালাইতে সারেং, শুকানী, টিকিট মাষ্টার, পেট্রোল ইত্যাদি বাবদ দৈনিক যাহা অনিবাৰ্য ব্যয় নির্দিষ্ট ছিল- ক্রমে ক্রমে টিকিটের সেল যখন তাহা অপেক্ষাও কম হইতে লাগিল, তখন বাধ্য হইয়া-লঞ্চ সার্ভিস বন্ধ করিয়া দিয়া লঞ্চ কলিকাতায় ফিরাইয়া আনিয়া উহা বেচিবার জন্য কাগজে advertise দিলাম। এবং কিছুদিন পরে উপযুক্ত খরিদ্দার পাওয়ায় তাহাদের নিকট লঞ্চ বিক্রয় করিয়া ফেলিলাম। গ্যালিফ স্ট্রীটের কলের পার্শ্ববর্তী বাসিন্দাদের আপত্তির ফলে ১১০ ঘােড়ার অয়েল এঞ্জিনটা স্থানান্তরিত করিয়া রাজার বাগানের কলে লইতে হইল এবং গ্যাস এঞ্জিনটা অত্যন্ত শব্দ দেয় বলিয়া বন্ধ

আমার ব্যবসা জীবন
করিতে হইল। তার পরিবর্তে আর একটী অয়েল এঞ্জিন কিনিয়া
সেই অভাব পূরণ করিতে হইল। ঘানির সংখ্যা সমানই রহিল।
তবে গ্যালিফ, স্ট্রীটে কমিলেও সাকুলার রােডে বাড়িল।
এই সমস্ত উলট পালট করার জন্য আমার অনেকগুলি টাকা
অযথা ব্যয় হইল এবং লাভের মধ্যে একটা গ্যাস এঞ্জিন বাড়িয়া
গেল। পাঠকের বােধ হয় স্মরণ আছে সন ১৩১৯ সালের প্রথমে
কলিকাতায় আসিয়া যেবার ধানের আড়ৎ করি, সেইবার দাশ
পাড়াতে খাল ধারে কলেটারীর জমির উপর একটী গদীগুদাম
খরিদ করিয়াছিলাম। ধান্যের আড়ৎ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে সেটা
অন্য আড়তদারকে ভাড়া দেওয়া ছিল। ৯ টাকা করিয়া মাসিক
ভাড়া পাইতাম। আমি জেদ করিলাম, আর ৬ টাকা দিয়া
১০০ একশ টাকা পুরাইয়া দিতে হইবে। তাহারা জেদ ধরিল
৪, টাকা বাদ দিয়া ৯০ টাকা করিয়া লইতে হইবে। উভয়ের
মধ্যে মতান্তর ঘটায় তাহারা গদী গুদাম ছাড়িয়া দিল। আমিও
আর স্থায়ী ভাড়াটিয়া পাইলাম না। প্রায় দেড় বৎসর যাবৎ গদী
গুদামটী পড়িয়া থাকার পর কলোরী খাজনা, মিউনিসিপ্যাল
ট্যাক্স ইত্যাদি কারণে লােকসান্ হইতেছে দেখিয়া গ্যালিফ,
স্ট্রীটের সেই গ্যাস এঞ্জিনটা দ্বারা এখানে আর ২৪ খানি ঘানি
বসাইয়া আর একটি তেল কল সন ১৩৩৭ সালে স্থাপিত করিলাম।
যে কোন ব্যবসা প্রথম নূতন Start দিতে গেলে অনেক
অসুবিধা ভােগ করিতে হয়, কিন্তু একবার চালু হইয়া গেলে পরে
তাহার যত শাখা প্রশাখা বিস্তার করা যাউক না কেন, একপ্রকার
চলিয়া যায়। বাজারে কিনিতে ও বেচিতে নাম আছে, কাজেই

আমার ব্যবসা জীবন
এই কল চালানর জন্য আর স্বতন্ত্র বেগ পাইতে হইল না। ছােট
কল-বেশী Stuff রাখা চলে না, যে সরকার সেই ক্যাসিয়ার,
উভয় ডিউটী একজনের হাতে থাকায় চুরি করিবার সুযােগ পাইল।
আমি বাঙ্গালী--কাজেই বাঙ্গালী ব্যবসায়ীর মনােবৃত্তি আমি যত
পর্যবেক্ষণ দ্বারা বুঝিতে পারিয়াছি, অন্যান্য জাতীয় ব্যবসায়ীর
মনােবৃত্তি ততটা বুঝিতে পারি নাই। আমি দেখিয়াছি, ব্যবসা
ক্ষেত্রে চাকুরী করিতে আসিয়া যে বাঙ্গাণী যত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়
দেয়—সে তত চরিত্রহীন। এইটাই স্বাভাবিক। উপযুক্ত এবং
বিশ্বাসী দুইটী একাধারে বাঙ্গালীর ভিতরে কম্মচারী পাওয়া দুর্লভ।
সেরূপ হইলে সে চাকুরী করিতে আসে না। নিজেই যে কোন
স্বাধীন ব্যবসা করে।
বাঙ্গালী চাকুরী করিতে আসিয়া ব্যবসায় লাইনেই হউক
বা যে কোন লাইনেই হউক, আগে উপরি আয়ের কি পন্থা
আছে, তাহাই অনুসন্ধান করে। তাহার বেতন যত বেশী
হউক, মনে করে আমার যােগ্যতা অনুরূপ বেতন পাইতেছি না।
তখন মুনিবকে বােকা বানাইয়া নিজে অধিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়া
—উপরি আয়ের রাস্তা খুজিয়া বাহির করে।
আমার দাশপাড়ার কলের অবস্থাও ঠিক এমনি হইল। কল
চালু করার সঙ্গে যাহাকে চার্জ দিলাম, কিছুদিন পরে তাহার চুরি
ধরিলাম। সঙ্গে সঙ্গে dismissও করিলাম। সাবেক পুরাতন
কল হইতে অন্য লোেক বলী করিলাম-লঙ্কায় গিয়া সেও রাক্ষস
হইল। তাহারও চুরি ধরা পড়িল এবং dismiss হইল। পুনরায়
আর একজনকে বদলী করিলাম। সে আর মাল বিক্ৰী করিয়া

আমার ব্যবসা জীবন ৯৭ কাগজে না লিখিয়া চুরি না করিয়া একেবারে তহবিল তছরূপ করিয়া ফেলিল। এইরূপ পুনঃ পুনঃ জালাতন হইয়া সেখানে বিক্রী একেবারে বন্ধ করিয়া দিলাম। মাত্র সেখানে তেল প্রস্তুত হইবে। কোন গ্রাহক আসিয়া উপস্থিত হইলে সেই গ্রাহককে সঙ্গে করিয়া ঐ কলের মুটে বড় কলে লইয়া আসিবে এবং এখান হইতে তাহার আবশ্যক মত মাল দেওয়া হইবে। দাশপাড়ায় উৎপন্ন তেল খইল প্রথম প্রথম ঐ কল হইতেই বিক্রয় শেষ হইত। এই প্রকারের কড়াকড় করাতে খরিদ্দার সরিয়া গেল। কাজেই ওখানকার উৎপন্ন তেল খইল লরী করিয়া বড় কলে আনিয়া বিক্রয় করা হইত। কল ছােট হইলেও একই প্রকারের উৎকৃষ্ট তেল করতে এবং বাজার ছাড়া কিছু উচু দরে বিক্রয় হওয়াতে বৎসরান্তে দেখা গেল কিছু আছে। আমার স্বাস্থ্যভঙ্গ হওয়ার জন্য আর পূর্বের ন্যায় খাটিতে পারি । Management করিতে, করিতে, খাতাপত্র check করিতে একটি বড় কলের ও একটা ছােট কলের খাটুনীর খুব বেশী তারতম্য নহে। কাজেই, দাশপাড়ার কলটী ঐ অবস্থায় বিক্রয় করিব স্থির করিয়া কাগজে advertise করিলাম। ওখানে একটী গ্যাস এঞ্জিনে পরিচালিত ২৪ খানা ঘানি এবং একটী expeller বসান ছিল। এই সমস্ত মেশিনারী শ্যামবাজার কলের ও রাজার বাগান কলের উদ্বৃত্ত জিনিষ। এ সমস্ত নূতন করিয়া খরিদ করিতে কোন টাকা বাহির করিতে হয় নাই। pistos advertisement দেখিয়া একটী ভাঙাইওয়ালা খরিদ্দার জুটিল। ঘর রাখিয়া যাবতীয় মেশিনারী উঠাইয়া লইয়া যাইবে—এমন চুক্তিতে ৬০০০ ছয় হাজার ৯৮ আমার ব্যবসা জীবন টাকা দর দিল। অন্য খরিদ্দার ওখানে রাখিয়া চালাইবে, ঐ বাড়ীর বাবদ মাসিক ৭৫ টাকা ভাড়া দিবে, মেশিনারীর দাম ৫০০০, পাঁচ হাজার টাকা দিবে। ভাবিয়া দেখিলাম, ভাঙাই- ওয়ালার নিকট ১০০০ এক হাজার টাকা বেশী পাইলেও যদি স্থায়ী ভাড়াটিয়া না পাই, তাহা হইলে গুদামটী পড়িয়া থাকিবে। এইরূপ চিন্তা করিয়া শেষে ৫০০০, পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রয় করিলাম। সন ১৩৩৮ সালে এক অভিনব ব্যাপার ঘটিল। পূর্বেই বলিয়াছি, গ্যালিফ, স্ট্রীটের কল বাধ্য হইয়া ছােট করিতে হইয়াছে। কাজেই খরচ কমাইবার অভিপ্রায়ে ২২নং পাকা গুদামটী-- যাহা মাসিক ২৫০ টাকা ভাড়া ছিল,—তাহা ছাড়িয়া দিলাম। ব্যবসায় বাণিজ্য মন্দার জন্য, কলিকাতায় চারিদিকে সমস্ত ব্যবসার একটা depression আসিয়া পড়িল। ২২৫নং গ্যালিফ, স্ট্রটের যায়গা ৭৫ টাকার স্থলে জমিদারকে বলাতে মাসিক ৬০ টাকা ভাড়া করিয়া দিল। কিন্তু ২২৪নং জমির মালিক খাজনা কমাইতে বলায় কমাইল না, অধিকন্তু আমার নামে কয় মাসের বাকি খাজনা বাবদ নালিশ করিয়া দিল। ইতিমধ্যে ২০নং উল্টাডাঙ্গা রােডে প্রায় ৫০ বিঘা জমির উপর প্রকাণ্ড একটী তৈলের কল, পাকা গদী গুদাম, ঘােট বড় ৩টী বয়লার { boiler), ছােট বড় দুইটী এঞ্জিন, মস্ত বড় workshop, আয়রণ ফাউণ্ডারী (Iron Foundry) ইত্যাদি সমস্তই running conditionএ আছে এবং যাহার ভ্যালুয়েশন (valuation) লক্ষাধিক টাকার উপর হইবে, তাহাই বিক্রয় ঘােষণা করিয়া দালাল মাত্র ৩০,০০০ ত্রিশ হাজার টাকা দর দিল।

আমার ব্যবসা জীবন বর্তমান ব্যবসায়ে নানা প্রকার অসুবিধা দেখিয়াও এত সুলভে, এত বড় কল কিনিবার সুযোেগ ত্যাগ করিতে পারিলাম না। ইহাতে এক ঢিলে দুই পাখী মারা হইল। প্রথম কথা, কলিকাতা বাজারে যতগুলি মাড়ােয়ারীর তেল কল আছে, একটীও কোন মাড়ােয়ারী নিজে স্থাপিত করে নাই। সমস্তই বাঙ্গালীর প্রতিষ্ঠিত তেল কল। একটীর পর একটী করিয়া মাড়ােয়ারী বারটীর মালিক হইয়াছে। পূৰ্ব্বাপর বাঙ্গালীর নিকট হইতে মাভােয়ারী লইয়াছে, এটী মাড়ােয়ারীর নিকট হইতে বাঙ্গালীর ঘরে আসিতেছে—ইহাই একটী অভিনব ব্যাপার। তাহার পর ইহাও মনে করিলাম যে এই বড় কলটী কিনিতে পারিলে আর কোন দিন তেলের অভাব বােধ করিব না। ২২|৪নং গ্যালিফ, স্ট্রীট ভাঙ্গিয়া মাঠ করিয়া দিলেও জমিদারকে বিশেষরূপে জব্দ করা যাইবে। আগে চিন্তা পরে কাৰ্য- সঙ্গে সঙ্গে চিন্তানুযায়ী কাৰ্য্য করাতে এক ঢিলে দুই পাখী মারা হইল।

পরিশিষ্ট। একজন ভাবুক বলিয়াছেন –“সকলেই ব্যবসা করে এই ভবের হাটে, কারাে দ্রব্য দরে কাটে, কারাে মাল বিকায় না হাটে, কানাে লাভে মূলে বাড়ে, কারাে আসলে ঘাটে।” কথাটী অতীব সত্য। কলিকাতা বনফিল্ড লেনস্থিত ঔষধের দোকানগুলি তাহার জাজ্জ্বল্য প্রমাণ। মেসাস বটকৃষ্ণ পালের ঔষধের দোকানের উভয় পার্শ্বে অনেকগুলি ঔষধের দোকান আছে। আমি নিজে প্রত্যক্ষ দেখিয়াছি—এমন অনেক ঔষধ আছে, যাহা একই maker, একই জিনিষ, বি, কে, পালের দোকান অপেক্ষা অন্য ঘরে ২১ পয়সা সস্তা পাইতে খরিদ্দার সেখানে যায় না—অথচ এখানে বেশী দাম দিয়াও লইবার জন্য ওমেদারী করিয়া দাড়াইয়া থাকে ও ভিড়ের ধাক্কা খায়। ইহার হেতু কি? যাহারা অদৃষ্টবাদী, তাহারা বলিবেন,এটী ভাগ্যফল। আর যাহারা আধুনিক উচ্চ শিক্ষিত বিংশ শতাব্দীর লােক—পুরুষকারই সব মনে করেন, তাঁহারা অদৃষ্ট বলিয়া কিছু মানেন না। তাহারা বলেন,—ভাগ্য আবার কি ? আমি কিন্তু ব্যবসা জীবনের ঘাত প্রতিঘাত দ্বারা ভাগ্য কথাটা মােটই অস্বীকার করিতে পারি না। আমার নিজের জীবনের একটা উদাহরণ এখানে দিতেছি এই যে সেই বিগত ১৩২৬ সালে যেবার আমি রেঙ্গুণ চাউলের contract করিয়া সৰ্বস্বান্ত হই, আমার সেই contract করার দেড় মাস পরে রাইচরণ সাধুখা

আমার ব্যবসা জীবন
১০১
টন
* ১ ,।
আমড়াতলায় অন্য এক পার্টির সহিত অন্য দালালের হাতে ৫০
চাউল contract করেন। দুঃখের বিষয়, আমি differenceএর
টাকা দিতে ruined হইয়া গেলাম—রাইচরণ সাধুখাঁ সেই
contract settled করিয়া কিছু টাকা লাভ বাড়ী লইয়া
আসিলেন। এখানে পুরুষকার বলিয়া কিছু দেখিতে পাই না।
আমার খরিদের কিছুদিন পরে খরিদ এবং আমার delivery
লওয়ার কিছুদিন আগে delivery লওয়ার time। উভয়েই
একই ব্যবসায়ী—অথচ এক যাত্রায় পৃথক ফল হইল।
এই সব দেখিয়া শুনিয়া ব্যবসায়ে ভাগ্যফল বলিয়া একটা জিনিষ
আছে, ইহা অস্বীকার করিতে পারি না। শাস্ত্রকাররাই
বলিয়াছেন—“ভাগ্যং ফলতি সৰ্ব্বত্র, ন চ বিদ্যা ন পৌরুষঃ।” তবে
এই ভাগ্য জিনিষটা পুরুষকারের আশ্রয় না পাইলে প্রস্ফুটিত হইতে
পারে না। কাজেই ব্যবসায়ে ভাগ্য ফলের দ্বারা উন্নতি হইলেও
পুরুষকার যােল আনা চাই।
এখন ভাবিবার বিষয় এই যে এই ভাগ্য জিনিষটা কি এবং
কি করিয়া পাওয়া যায়? তদুত্তরে আমি বলিব-কৰ্ম্মই ভাগ্যের
পিতামাতা। সৎকর্মের দ্বারাই লােক সৌভাগ্যবান্ হয়। ব্যবসায়ে
সৎকৰ্ম্ম শব্দের অর্থ দান, ধ্যান, ক্রিয়া কৰ্ম্ম নহে—সততা, সৌজন্য,
ন্যায়পরায়ণতা, লােভসংবরণ ইত্যাদি।
কোন দোকানদার যদি খরিদ্দারের সন্তোষ সম্পাদনের জন্য
নিজের স্বার্থের দিকে লক্ষ্য কম রাখিয়া পূর্বোক্ত ব্যবহার করে,
তাহা হইলে সে ত সন্তুষ্ট হইয়া যায়ই। অধিকন্তু তাহার বন্ধুবান্ধব,
আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে স্বেচ্ছাপ্রণােদিত হইয়া ঐ দোকানদারের

আমার ব্যবসা জীবন বিষয় গল্প করে। ফুলের গন্ধ বাতাসে বহন করিবার ন্যায় ঐ দোকানদারের সৎ নাম ঐ ভাবে বাজারে রাষ্ট্র হয়। খরিদ্দারটী যখন দোকানে প্রবেশ করিতেছে—তখনই বুঝিতে হইবে যে সে আমাকে দু’পয়সা দিবার জন্যই আসিতেছে। প্রকৃত ব্যবসায়ী-তাহাকে খরিদ্দার পয়সা দিয়া আরও সন্তুষ্ট হইয়া যায় এবং পরে আসিয়া তাহাকে খুজে, সুতরাং দোকানদারের সকলের আগে মুখমিষ্টি গুণ থাকা সৰ্বতােভাবে প্রয়ােজন। এমন একদিন ছিল—আমরা ছেলেবেলায় দেখিয়াছি, যে যত বেশী ঠকাইয়া লােকের নিকট লাভবান্ হইতে পারিত, সে তত বড় ব্যবসা’দার বলিয়া সাধারণের নিকট বাহাদুরী লইত। কালস্রোতে তাহা বাইয়া গিয়াছে। বর্তমান্ যুগে যে যত সাধারণের নিকট honest বলিয়া পরিচিত, ব্যবসা ক্ষেত্রে তাহার স্থান তত উচ্চে পশার করিতে হইলে ইহা ছাড়া অন্যান্য অনেক উপায় আছে। তন্মধ্যে আর একটা উপায় এই-সাধারণ খরিদ্দারের ধারণা—যাহার ঘরে যত মাল আমদানী বেশী—সে তত সুলভে বিক্রয় করিতে পারে। কাজেই, প্রতিযােগিতার বাজারে একই প্রকারের ব্যবসা পাশাপাশি দোকান করিয়া করিতে হইলে যাহাতে ঘরে অল্প মাল থাকিলেও বেশী দেখা যায়, এমন ভাবে সাজাইয়া রাখিতে হইবে। এইজন্য অনেক মুদী দোকানদার খালি কেরাসিন বা তেলের টীন পেছনে লাট দিয়া সম্মুখে ১০২টী ভরা টীন রাখে ; ভূষি ভরা বস্তা পেছনে লাট দিয়া ডা’ল কলাইএর বস্তা সম্মুখে ২|৪ খানা রাখে। মুদীখানার দোকানের দোকানের পক্ষে এইরূপ। ষ্টেশনারী ও মনিহারী দোকানে অনেক মাল কাগজের বাক্সের প্যাকে আমার ব্যবসা জীবন ১০৩ থাকে। মাল বিক্রয় হইয়া গেলেও দোকানদার খালি প্যাকগুলি ফেলিয়া দেয় না—সেই স্থান পূরণ করিয়া রাখে। যাহারা বস্ত্র- ব্যবসায়ী—তাহাদেরও ঘর সাজাইবার বাহাদুরী আছে। অর্থাৎ এমন ভাবে দোকান সাজাইতে হইবে—যাহাতে অল্প মাল থাকিলেও বেশী দেখা যায়। আমি যখন ছেলেবেলায় ট’বাজারে খুচরা দোকানদারী করিয়াছি—তখনই দেখিয়াছি, ১/০ মণ আমদানী করিলে। সের বিক্রী হয়। আবার সেই মাল।• সের আমদানী করিলে কিন্তু। সের বিক্ৰী না হইয়া ২||• সের বিক্রী হয়। যেখানে হাট, বাজার বা গঞ্জ সৰ্ব্বদা বহু লােকের গতিবিধি অর্থাৎ যেখানে খরিদ্দার না ডাকিলে পাওয়া যায়, সেখানে যদি মাল সুলভে বিক্রেতা—এরূপ সত্যম নাও থাকে, তাহা হইলেও আমদানীর অনুপাতে রপ্তানী বা বিক্রী হয়। কাপড় কাটা কাপড়, পােষাকী কাপড় অর্থাৎ রেশমী, পশমী কাপড় বিক্রেতার পক্ষে দোকানদারী করিতে অনেক অভিজ্ঞতা লাভের প্রয়ােজন। কোনও একটা খরিদ্দার দোকানে প্রবেশ করিলে আগে দেখিতে হইবে সে অন্য দোকান যাচাই করিয়া আসিল কি বরাবর প্রথমে আমার ঘরে আসিল। যদি বােঝা যায় যে অন্য দোকান হইতে উঠিয়া আমার ঘরে আসিয়াছে, তাহা হইলে প্রথমে যে কাপড়টী চায়, বুঝিতে হইবে, সে কাপড়টী অন্য ঘরে দর করিয়া আসিয়াছে। সুতরাং তাহার দর যতদূর সম্ভব সুলভ এমন কি লাভ না করিয়া তাহাকে দর বলিতে হয়—যাহাতে তাহার বিশ্বাস জন্মে যে অন্য ঘর অপেক্ষা এ ঘরে কাপড়ের দর ১০৪ আমার ব্যবসা জীবন সস্তা। যাহারা সাধারণ ধুতি, সাড়ী, ক্রেতা—তাহাদের ভিতরে অনেক খরিদ্দার নম্বর ধরিয়া কাপড় চায়। যে খরিদ্দার নম্বর ধরিয়া কাপড় চাহিবে—তাহাকে অন্ততঃ সেই কাপড়টী বিনা লাভে এমন কি খুব কম লাভে বিক্ৰী করিয়া তাহার বিশ্বাস উৎপাদন করিতে পারিলে পরবর্তী কাপড়ে অর্থাৎ যেটার নম্বর সে না জানে, সেটীতে তাহার লাভ পােষাইয়া লওয়া যাইতে পারে। অনেক সময়ে অনেক খরিদ্দার—যা’’ আনাড়ীর মত দর বলে। তা বলিয়া খরিদ্দারের পরে চটা আদৌ উচিত নহে। অনেক খরিদ্দার অকারণে একই কাপড় অযথারূপে পুনঃ পুনঃ বাবদলি করে, অনেক খরিদ্দার হয়ত ঘাটিয়া ঘুটিয়া শেষকালে লইয়াই চলিয়া গেল। আমি দোকানদার—আমায় সর্বদা স্মরণ রাখিতে হইবে—খরিদ্দার আমার প্রতি যে কোন অপ্রিয় ব্যবহার করুক না কেন—আমি কোন খরিদ্দারের উপরে যেন অপ্রিয় ব্যবহার না করি। যে কোন জিনিষের দোকানদারী করিতে হইলে অল্প বিস্তর দেনা পাওনা না করিলে চলে না। দেনা পাওনা করিতে হইলে লােক-চরিত্র অভিজ্ঞতা একটা বিশেষ কিছু। এ বিষয়ে যাহার যত অভিজ্ঞতা-সে ব্যবসায়ে তত উন্নতিশীল। ধার দুই প্রকারে বিক্রয় হয়—পাইকারী অর্থাৎ দোকানদারকে ধার, খুচরা অর্থাৎ গৃহস্থ খরিদ্দারকে ধার। দোকানদারকে ধার দিলে সে দোকান- দারের দোকানদারী বজায় থাকিলে টাকা বড় একটা মারা যায় না। তবে সেই দোকানদারকে ধার দেওয়ার পূর্বে তাহার বিষয় অনুসন্ধান করিতে হইবে—কত দিনের দোকানদার—পুরাতন বনিয়াদী বংশগত আমার ব্যবসা জীবন ১০৫ দোকানদার কি না—তাহার নিজের কিরূপ মূলধন আছে। এই সব দেখিয়া শুনিয়া বেশী লােভের বশবর্তী না হইয়া সম্ভব মত অল্প স্বল্প ধার দিলে এবং due মত টাকা না দিলে তাহার উপর রীতিমত তাগেদা থাকিলে টাকা অনাদায়ের আশঙ্কা অপেক্ষাকৃত কম হয়। খুচরা বিক্রী অর্থাৎ গৃহস্থ খরিদ্দারকে ধার—এই টাকাই বেশী অনাদাষ হয়। এ ক্ষেত্রে যথাসম্ভব কম লাভে নগদ বিক্রীর চেষ্টা করাই উচিত। নিতান্তই অল্প বিস্তর ধার দিতে হইলে বিশেষ জানাশুনা অবস্থাপন্ন লােক ব্যতীত খুব অতিরিক্ত লাভ করিয়া মাল বিক্রী করিলেও যাকে তাকে ধার দেওয়া উচিত নহে। সাধারণত দেখা যায়-মাল খরিদ বিক্রী হইয়া লােকসান হইয়া যত দোকান ফেল পড়ে, বিলেত বাকি অনাদায়ে তদপেক্ষা বেশী দোকান ফেল পড়ে। বৎসরের শেষে হিসাব নিকাশে কাগজে কলমে যথেষ্ট লাভ দেখিলাম—অথচ ঘরে কিছুই ঘরে কিছুই নাই, এইরূপ দোকানদারের সংখ্যাই অধিক। কোন একটা কারবার কেহ জমাইলে কি বাঙ্গালী কি অ-বাঙ্গালী সর্বত্রই দেখা যায়, তাহার আত্মীয়স্বজনকে কর্মচারীরূপে বহাল করে। এই আত্মীয় স্বজনের মধ্যে অধিকাংশ স্থলে জামাই, শালা, ভগ্নিপতি, ভাগ্নে—ইহাদেরই গতিবিধি বেশী দেখা যায়। যদি ইহারা চরিত্রবান্ ও প্রভুর গুণের অনুকরণ করে, তাহা হইলে সােণায় সােহাগা হয়—সে ব্যবসায় অচিরাৎ উন্নতির দিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু প্রায়ই ইহার বিপরীত দেখা যায়। এই ফারমে অন্যান্য কর্মচারীদের তুলনায় এই সমস্ত আত্মীয়গণ—নিজেদিগকে আংশিক কৰ্ত্তা ১০৬ আমার ব্যবসা জীবন বলিয়া মনে করে কর্তৃত্ব power না থাকিলেও চাল চালিতে ক্রটি করে না। কঁচা পয়সা হাতে পাইয়া প্রায়ই চরিত্রহীন হইয়া পড়ে এবং চুরি করিয়া নিজের কু-প্রবৃত্তির ইন্ধন জোগায়। নিজের guardianএর নিকট এমন সাচ্চা ভাব সর্বদা দেখায়—যেন সে এই ব্যবসায় তরণীর কর্ণধার রূপে আছে। কোন প্রকারে তাহার সম্মুখ দিয়া জল ফাসাইতে পারে না। আগুণ যেমন কাপড়ে বাধিয়া রাখা চলে না, কোনরূপ পাপকাৰ্যও সেরূপ দীর্ঘ দিন গােপন থাকে । যখন ধরা পড়ে, তখন ইহাদিগকে পদচ্যুত ব্যতীত আর কোন রকম শাস্তি দেওয়া চলে না। কাজেই অন্য কর্মচারী অন্যায় কাজ করিতে যত ভয় করে,—ইহারা তত ভয় করে না। অনেক স্থলে দেখা যায়—একটা চতি কারবারের ইহারাই বাস্তুঘুঘু-রূপে আসিয়া কারবারটাকে নষ্ট করিয়া দেয়। কর্মকর্তা সাধারণ কর্মচারীর কাৰ্য্য যত check করে, উল্লিখিত আত্মীয়গুলির কাৰ্য, স্বজন বােধে তত করে না—সেই জন্যই তাহারাও অনিষ্ট করিতে বেশী সুযােগ পায়। আমার নিজের জীবনে এ প্রকার অনেক ঘটিয়াছে। দেশের দোকানদারী, আড়তদারী, তেলকল ইত্যাদি যখন যে প্রকারের ব্যবসা করিয়াছি, প্রত্যেক কাজের ভিতরেই ঐ প্রকারের ২১ জন আত্মীয় পৃষ্ঠপােষক রূপে ছিল। তন্মধ্যে বিগত ১৩৩৩ সালে আমার এক ভাগিনেয় ও দূরসম্পৰ্কীয় ভাইপাে—এক যােগে ৩ মাসের মধ্যে তেলকল হইতে প্রায় দু’হাজার টাকা চুরি করিয়া অপব্যয়ে নষ্ট করিয়া ফেলিল। পরে যে দিন তাহারা ধরা পড়িল-সে দিন তাহাদিগকে তাড়াইয়া দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করা গেল না।

আমার ব্যবসা জীবন ১০৭ ২৩ জন চোর হইয়া কৰ্ম্মচ্যুত হইল বটে, কিন্তু উল্লিখিত আত্মীয় মধ্যে আর যাহারা থাকিল—তাহাদের মধ্যে আদেশ পালন ছাড়া নিজের প্রত্যুৎপন্নমতি বুদ্ধি বা ব্যবসায়ের উন্নতিশীল বুদ্ধি কিছু না থাকিলেও তাহারা কিন্তু মনে করে—এমন কি তর্কস্থলে ভাষায় প্রকাশও করে—“আমরাই রায় সাহেবকে বড় লোেক করিয়া দিতেছি।” আমরা এখানে থাকিতে আমাদের গুণের আদর হইবে না। ইহাদের এই প্রকার ধৃষ্টতা দেখিয়া প্রত্যেককে ২১ বার নিজের গুণের ও কার্যকরী শক্তির পরিচয় দিয়া বড় লােক হইবার জন্য সুযােগ দিয়াছি। দুঃখের বিষয়, ঘুরিয়া ফিরিয়া কঁাধের বােঝা আবার কঁাধে আসিয়া চাপে । একটা পল্লীগ্রামের চলিত কথায় বলে ‘আপন অপেক্ষা পর ভাল। সে কথাটা কিন্তু এই রকম ক্ষেত্রে বেশ খাটে। কোন একটা অপর লােক কর্মচারী রাখিয়া ব্যবসায়ে উন্নতি হইলে তাহাকে মাসিক ৫, পাঁচ টাকা বেতন বৃদ্ধি বা এককালীন ৫০ পঞ্চাশ টাকা পুরস্কার দিলে বা যােগ্যতা অনুসারে পদোন্নতি করিয়া দিলে খুবই আনন্দিত হয়, এমন কি, চির-কৃতজ্ঞতা-পাশে আবদ্ধ থাকে। আর এই সমস্ত আত্মীয়ের দল—ইহাদের ক্ষমতার চতুগুণ দিলেও ইহারা কিছুতেই সে কথা মনে করে না যে আমার ন্যায্য দাম পাইতেছি। ঘরের লােক হইলে যে চোর হইবে না, আর অপর হইলে যে চোর হইবে—তাহার কোন মানে নাই। যে চরিত্রহীন হয়— সে ঘরেরও হইতে পারে, পরেরও হইতে পারে। পর যত ভয় রাখিয়া কাজ করে, আত্মীয় তত ভয় রাখিয়া কাজ করে না।

আমার ব্যবসা জীবন সুতরাং, কর্মচারী আত্মীয় অপেক্ষা পরই ভাল। এখন একমাত্র কথা হইতেছে—লােক চরিত্র বুঝিয়া লইবার শক্তি যাহার যত অধিক, সে তত ভাল লােক নিযুক্ত করিয়া নির্ভর করিতে পারে। ক্ষেত্রে কোন একটী ফসল উৎপন্ন করিয়া সেটা যেমন নিৰ্বিয়ে ঘরে আসে না,-তাহাকে অনেক প্রতিবন্ধকের হাত হইতে অর্থাৎ অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, গরু-বাছুর, পােকা-মাকড়-ইদুর, পাখী ইত্যাদির হাত হইতে রক্ষা করিতে পারিলে তবে সেই ফসলটী ঘরে আনিয়া সুখে ভােগ করা যায়, সেইরূপ কোন একটী ব্যবসায়ের সাফল্য লাভ করিয়া তাহার আয় ভােগ করিতে হইলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলির হাত হইতে রক্ষা করিতে পারিলে তবে তাহার আয় ভােগ করা যায়। (ক) সম-ব্যবসায়ীর সহিত প্রতিমােগিতা। আমার পূর্বের স্থাপিত ব্যবসায়ীর নিকট আমি তাহার সেই মালের ব্যবসা করিতে গেলে, সে বাঙ্গালী হউক আর অ-বাঙ্গালী হউক, প্রাণপণে চেষ্টা করে—যাহাতে আমি তাহার কাছে মাথা তুলিয়া দাড়াইতে না পারি। সেজন্য অনেক সময়ে অনেক প্রতিদ্বন্দীকে দেখা গিয়াছে—আপন নাক কাটিয়া পরের যাত্রা ভঙ্গ করার মত যথাসম্ভব নিজের ক্ষতি দিয়াও নবাগত ব্যবসায়ীকে ফেল করিতে চেষ্টা করে। (খ) ঘরের চুরি—সাধারণত দেখা যায়-বাঙ্গালী কর্মচারীর ভিতর যে যত বেশী উপযুক্ত, সে তত অধিক চরিত্রহীন। তাহাকে যত বেতন দিয়াই রাখা যাক না কেন—কিছুতেই যেন সন্তুষ্ট হইতে চাহে না। বেতন ছাড়া যে একটা কিছু উপরি লাভ আমার ব্যবসা জীবন ১৯ করিতেই হইবে-এই মতলবে সর্বদা ফেরে। যদি কেহ ভাগ্য- গুণে উপযুক্ত এবং বিশ্বাসী একাধারে দুই গুণসম্পন্ন লােক পায়—তাহার ব্যবসায় এই আশঙ্কা থাকে না বটে, কিন্তু বাঙ্গালীর মধ্যে এরূপ লােক পাওয়া দুর্ঘট। যাহারা তেমন হয়, তাহারা পরের চাকুরী করিতে আসে না। স্বাধীনভাবে যে কোন কারবার করে এবং এ প্রকার কারবারে ফেল হইলেও পুনরায় কৃতকাৰ্য হইতে পারিব—এই আশায় পুনরুদ্যমে কার্যে ব্রতী হয়। সহজে বা সহসা পরের চাকুরী স্বীকার করে না। কাজেই, কর্মচারী রাখিয়া কাজ চালাইতে হইলে-ব্যবসায় ছােটই হউক আর বড়ই হউক, ঘরের চুরি বলিয়া একটা অঙ্ক ধরিয়া রাখিতে হইবে। তবে যদি অবাঙ্গালী কর্মচারীকে ভালরূপে দীর্ঘদিন training দিয়া তৈয়ারী করিয়া লওয়া যায়—তবে বাঙ্গালী কর্মচারী দ্বারা যত চুরি হয়, অবাঙ্গালী-কর্মচারী দ্বারা তত হয় না। আবার বাঙ্গালী কর্মচারীর ভিতরে নৈতিক চরিত্র খারাপ হইলে তাহার চোর হওয়া অবশ্যম্ভাবী। অনেক স্থলে দেখা যায় ব্যবসায়ে নিযুক্ত হওয়ার সময়ে যে লােকটা হাবা বােব নিরেট মূর্থ বলিয়া প্রতিপন্ন ছিল এবং তখন সে বিশ্বাসীও ছিল, তাহার পর যেমন ২৪ বৎসর training এর গুণে ব্যবসায় বৃত্তি প্রস্ফুটিত হ’ল—সঙ্গে সঙ্গে কোথা হইতে চৌৰ্য্য বৃত্তিও দেখা দিল। সুতরাং, ব্যবসায় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মচারী বাড়াইতে হয়, এ ক্ষেত্রে লােক চরিত্র জ্ঞান যাহার যত অধিক—তাহার ঘরের চুরি তত কম হয়। (গ) বাহির চুরি।-যাহারা কোন মূল্যবান্ জিনিষের ব্যবসায় করে অর্থাৎ ঘােট জিনিষ—দাম বেশী, এমন জিনিষের ১১০ আমার ব্যবসা জীবন ব্যবসায় করে, চোরের হাত হইতে রক্ষা পাইতে তাহাদের যত সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়ােজন হয়, যাহারা সস্তা জিনিষের ব্যবসায় করে, যেমন বালি, কয়লা, কাঠ, চূণ, ইট ইত্যাদি—তাহাদের চোর ঠেকানর জন্য তত সাবধানতা অবলম্বন করিবার প্রয়ােজন হয় না। ব্যবসা যতদিন ছােট থাকে, অর্থাৎ যতদিন নিজের দুই চোখের সম্মুখে মাল পত্রের আমদানী রপ্তানী হয়—ততদিন পর্যন্ত বাহিরের চুরি খুব কমই হয়, কিন্তু ব্যবসায় প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে যখন পরের চোখ অর্থাৎ কর্মচারীর চোখ দিয়া সব দেখিতে হয়—তখন আর অল্প বিস্তর বাহিরের লােকের দ্বারা চুরি না হইয়া পারে না। কাজেই, মালিকের সর্বদা আমদানী রপ্তানী, গুদামের মাল কমি- কার উপর লক্ষ্য না রাখিলে অনেক সময়ে একেবারে ফাক করিয়া দেয়। এই মাল চুরি ছাড়া ক্যাস চুরিও করিবার জন্য নীচ প্রকৃতির লােকগণ সর্বদা উৎসুক নেত্রে তাকাইয়া থাকে। অতএব, কারবার যেমনই হউক না কেন—স্থানীয় কোন না কোন ব্যাঙ্কের সঙ্গে transaction রাখা ভাল। দৈনিক আমদানী তহবিল-ব্যাঙ্কে পাঠান এবং পাওনাদারকে ব্যাঙ্কের চেক দেওয়া এই নিয়ম রাখিতে পারিলে একদিক দিয়া যেমন চুরির হাত হইতে অনেকটা রক্ষা পাওয়া যায়-অন্য দিক দিয়া সেইরূপ পাওনাদারের নিকট টাকা তহবিলে না থাকার জন্য due খেলাপ জনিত discredit হওয়ার আশঙ্কা কম হয়। কারণ, যে পাওনাদারের যে দিন due থাকে, ব্যাঙ্কে টাকা short থাকিলে চেকটা একটু বিলম্ব করিয়া এবং cross করিয়া সইটা একটু অস্বাভাবিক করিয়া চেকখানা দিলে ৩ দিন সময় পাওয়া যায়—অথচ পাওনা-

আমার ব্যবসা জীবন
১১১
দারও বুঝিতে পারে না যে ইহার ব্যাঙ্কে টাকা নাই।
প্রত্যেক পাওনাদারের সহিত এরূপ নিত্য ঘটিতে থাকিলে তখন
আর পাওনাদারে চেক লইতে চাহে না -- ব্যবসায়ের উপরে বামও
আইসে। কালে ভদ্রে মাঝে মাঝে ইজ্জত বজায় রাখার জন্য
এরূপ করা যাইতে পারে। Due বজায় রাখা যতদূর হউক না
হউক, তহবিলে টাকা বেশী না থাকিলে চুরির সুযােগ দেওয়া হয়
। ব্যবসায়ের পক্ষে এইটাই একটা যথেষ্ট লাভ।
(ঘ) গুণ্ডার উপদ্রব পল্লীগ্রামে বা কোন মফঃস্বলের
ব্যবসায়ে এ উৎপাত বড় একটা নাই—কিন্তু কলিকাতার ব্যবসায়ে
এটী যথেষ্ট আছে। মাল আমদানী রপ্তানী করার জন্য অবাঙ্গালী,
মেড়ো হিন্দুস্থানী কুলি যাহারা মুটে বলিয়া মুখে আনুগত্য দেখায়
তাহাদিগেরই স্বার্থের বিঘ্ন হইলে গুণ্ডা হইয়া বসে। এই ক্লাসের
লােক যদি হিন্দু না হইয়া মুসলমান হয়, তাহা হইলে অধিক
হিংস্র হয়। ইচ্ছামত তাহাদিগকে বহা বরতরপ, করা চলে না।
নিজের অনিষ্ট হইতেছে—বুঝিয়াও সঙ্গে সঙ্গে প্রতীকার করা
অনেক সময়ে সম্ভব হয় না। ইহার জেলকে ভয় করে না-
পুলিসকেও গ্রাহ্য করে না। ছুরি মারিতে গুপ্তাঘাত করিতে
সর্বদাই সিদ্ধহস্ত।
আমি নিজে ভুক্তভােগী হইয়া পাঠকের অবগতির জন্য একটা
ঘটনা বিবৃতি করিতেছি। শ্যামবাজার খালধারে বড় একদল
মুসলমান গুণ্ডা আছে। সাধারণ লােক চক্ষুতে তাহারা মুটে
বলিয়া পরিচিত-মফস্বলের কোন বেপারীর কোন মাল বড়-
বাজার হইতে গাড়ীতে আসিয়া খালে নৌকা বােঝাই হইতে গেলে
=

১১২ আমার ব্যবসা জীষন গাড়ীর সঙ্গে মুটে থাকিলেও তাহারা সেই মুটে দিগকে ধাক্কা দিয়া নিজেরা জোর করিয়া সেই মাল নৌকায় তুলে। পরে ঐ মাল তােলার জন্য মহাজনের নিকট যথেষ্ট দাবী করে। যাহারা পুরাতন ব্যবসায়ী—অর্থাৎ ইহাদিগকে চিনে এবং ইহারাও এ সমস্ত মহাজনদিগকে চিনে—তাহাদের মাল গাড়ীর সহিত আগত মুটোই নৌকায় বােঝাই দেয়। গুণ্ডা সেলামী বলিয়া গাড়ী পিছু কাহারও নিকট •• আনা-কাহারও নিকট। আনা—এইরূপ ইহাদের বরাদ্দ আছে। এ হেন বৃটিশ এ হেন বৃটিশ গবর্ণমেন্টের রাজত্বে প্রকাশ্য রাজ পথে দিবালােকে মহাজনগণ প্রাণের দায়ে ইজ্জতের ভয়ে এই সকল গুণ্ডা সেলামী দিতে বাধ্য হয়। আমার যখন শ্যাম- বাজারে আড়ত ছিল--আমিও দিয়াছি। পরে আড়ত ছাড়িয়া যখন তেলকল করিলাম, তখন কর্মচারীর সংখ্যাও বাড়িয়া গেল। গেটে বন্দুক লইয়া যখন দারােয়ান বসাইলাম—তখনই একদিন মনে খেয়াল হইল—দেখি এ গুণ্ডা সেলামী না দিয়া চলে কি না। তেলকল হওয়ার পরে বড়বাজার হইতে যত সব মাল আসিত গাড়ীর সঙ্গে মুটে থাকিত না। ঘরের বাঙ্গালী মুটেরাই খালে নৌকায় আমদানী রপ্তানী করিত। একদা খালে মাল রপ্তানী গেলে গুণ্ডার সর্দার আসিয়া গুণ্ডা সেলামী দাবী করিল—আমি দিব না বলিয়া হাঁকাইয়া দিলাম। সে দিন বেশী কিছু বলিল । পরে আবার মাল খালে রপ্তানী হওয়ার সময় উহারা সদল- বলে সেই মাল রপ্তানী করার জন্য আসিল। কোন বাধা বিঘ্ন, দোহাই দস্তুর মানিতে চাহে না—জোর করিয়াই মাল উঠাইবে- এইরূপ চেষ্টা করিতে লাগিল, কিছুতেই যখন তাহাদিগকে নিবৃত্ত

আমার ব্যবসা জীবন
করিতে পারিতেছি না—তখন কলে লুট হইতেছে বলিয়া পুলিশ
অফিশে টেলিফোন করিলাম। পুলিশ আসিতে দেখিয়া তখন
উহারা সরিয়া গেল। যাবার সময় বলিয়া গেল বাবুকে ছুরি না
মারিলে ঠিক হইবে না। এই ছুরির ভয় দেখাইয়া উহারা সর্বত্র
প্রভুত্ব বজায় করে। কিন্তু আমার পক্ষে এই ছুরির ভয়টা দৈব
ও সানুকূল হইয়া দাড়াইল। একদা আমার গলায় বড় একটা
abcess হয়—ডাক্তার দ্বারা operation করাইতে হয়—ক্ষত
সারিয়া গেলেও শরীরে দাগটা খুব বড় রকমে অদ্যাপিও আছে।
এই ঘটনার অনতিপরে ঐ গুণ্ডার সর্দার ২৪ জনকে ডাকাইয়া
বলিলাম “দেখ, আমিও একজন তােদের মত গুণ্ডার সর্দার।
আমার ছুরি খাওয়া অভ্যাস আছে—এই দ্যাখ, ছুরির দাগ।
বিশেষতঃ পকেটে রিভলভারও বাহির করিয়া তাহাদিগকে ভাল
ভাবে দেখাইলাম যে আমাকে ছুরি মারিতে আসিলে জীবন লইয়া
ফিরিতে পারিবি না। এই কথাগুলি খুব তেজ ও গর্জনের সঙ্গে
বলাতে গুণ্ডাগণ আমার সহিত সন্ধি করিল যে আপনার মাল
আমরা ছুইব না এবং অপরের মাল আমরা ধরিতে গেলে আপনি
কোন বাধা দিতে পারিবেন না—তাহা হইলে কোন অনিষ্ট করিব
। আমার স্বার্থ সিদ্ধি হইল দেখিয়া-ইহাদের প্রস্তাবে সম্মতি
দিলাম। এই ঘটনা শুনিয়া হয়ত কোন পাঠক মনে করিতে
পারেন যে পুলিশ দেখিলেই যখন গুণ্ডাগণ পলাইয়া গেল, তখন
পুলিসের সাহায্য লইয়াই ত গুণ্ডাগণকে দমন করা যাইতে পারে।
কিন্তু এ ভাবে আমি ২১ বার চেষ্টা করিয়াছি। Local
পুলিশ উহাদের এ গুণ্ডামি জানে-- হয়ত উৎকোচের লােভে কিছু

১১৪ আমার ব্যবসা জীবন বলে না। উপরে দরখাস্ত করিয়া দেখিয়াছি—যাহাদের অনিষ্ট করিতেছে—ছুরি খাইবার ভয়ে তাহারাও সাক্ষ্য দিতে রাজী হয় না। কাজেই ইহাদের প্রভুত্ব অদ্যাপি অক্ষুন্ন আছে। (ঙ) চৌধুরী অর্থাৎ গাভােয়ানের উপদ্রব । কলিকাতার বাহিরে Suburbএ যে সমস্ত বড় ব্যবসায়ের আমদানী রপ্তানী আছে—সেখানে এবং কলিকাতার ভিতরে এক একটা গঞ্জ বা পটী হিসাবে ইহাদের উপদ্রব যথেষ্ট পরিমাণে আছে। কোন মফঃস্বলে বা মফঃস্বল টাউনে এ হাঙ্গামা আদৌ নাই। সুদূর অতীত যুগ হইতে যখন কলিকাতার বাজারে মাল আমদানী রপ্তানীর ব্যাপার একমাত্র গরু বা মহিষের গাড়ীর উপর নির্ভর ছিল—তৎকালীন এক এক পটীতে বা গঞ্জে এক বা একাধিক গাড়ােয়ান সেখানকার মােড়ল অর্থাৎ চৌধুরী আখ্যা লইয়া অজাত- শত্রুরূপে নিজের অধিকার অক্ষুন্ন রাখিয়া আসিতেছে। এই সব চৌধুরীদিগের ভিতরে সকলেই অ-বাঙ্গালী। কোন স্থলে হিন্দু কোন স্থলে মুসলমান উভয় সম্প্রদায় আছে এবং প্রত্যেক চৌধুরীর এক একটা সীমানা নির্দেশ করা আছে। কোন ইউরােপীয়ান পার্টি না হইয়া ইণ্ডিয়ান পার্টি হইলে যত বড় ধনীই হউক বা যত বড় ব্যবসায়ীই হউক—এই চৌধুরীর তাঁবেদারীতে থাকিতে হইবে। কলিকাতা সহরে যত দাঙ্গা হাঙ্গামা, রাহাজানি, riot, লুটপাট অধিকাংই ইহাদের দ্বারাই হয়। গবর্ণমেন্টেয় যে গুণ্ডা আইন আছে—সেটা ইহাদিগকেই লক্ষ্য করিয়া। যে, যে গঞ্জের চৌধুরী হইবে, সেই গঞ্জ হইতে বিভিন্ন ষ্টেশনে, মাল রপ্তানী করিতে হইলে, তাহারই স্থিরীকৃত ভাড়া সে ন্যায্যই হউক আর বেশী হউক,- আমার ব্যবসা জীবন ১১৫ মানিয়া লইতে হইবে এবং আবশ্যকীয় গাড়ীর জন্য তাহারই শরণাপন্ন হইতে হইবে। কোন বাহিরের গাড়ােয়ানকে কম ভাড়া স্থির করিয়া আনিলে সঙ্গে সঙ্গে একটা ফৌজদারীর সৃষ্টি হয়। এইরূপ ক্ষেত্রে অনেক সময়ে বাহিরের গাড়ােয়ান কোন চৌধুরীর সীমানায় যাইতেও চাহে না। সেই চৌধুরীর নিজের অনেকগুলি গাড়ী থাকে—তাহা ছাড়া, সেই পটীতে আর যে সমস্ত গাড়ােয়ান থাকে— তাহা ঐ চৌধুরীর হুকুমে পরিচালিত হয়। নিজের গাড়ী ছাড়া অপর গাড়ীতে মাল রপ্তানী হইলে পটী বিশেষ স্বতন্ত্র রেট (rate)- কোন স্থানে গাড়ী পিছু ১০ পয়সা, কোন স্থানে গাড়ী পিছু • আনা, গাড়ােয়ানরা চৌধুরীকে দেয়। এই প্রকারে চৌধুরীয়ানা, করিয়া লাঠির জোরে কলিকাতার সহরে ২৫ লক্ষ টাকার অধিকারী চৌধুরীও ২৪ জন দেখা যায়। বাঘ যত বড় হিংস্র ও বলবান জন্তুই হউক না কেন—ভাল শিকারীর হাতে যেমন তাহার মৃত্যুও ঘটে, সেইরূপ নিজের তেজ বীর্যের সহিত উহাদের সম্মুখীন হইতে পারিলে অনেক সময়ে পরাভূত করা যাইতে পারে। এখানে চাই সাহস—তেজস্বিতা এবং মরিয়া হইয়া লাগা। আমার জীবনে এই চৌধুরীদিগের ব্যাপার লইয়া ৩ বার ৩টা উল্লেখযােগ্য ঘটনা ঘটিয়াছে। ভগবৎ ইচ্ছায় ৩ বারই কৃতকাৰ্যতা লাভ করিয়াছি। (১) বােধ হয় ১৩১৬ সালের ঘটনা-তখন কলিকাতায় আমার কোন আড়ত বা অন্য কারবার হয় নাই। মফঃস্বল হইতে কলিকাতায় মাল গন্তের জন্য আসিতাম। পােস্তার বাজার হইতে

১১৬
আমার ব্যবসা জীবন
বহু পরিমাণে ডা’ল কলাই কিনিয়া শ্যামবাজার খালে নৌকা
বােঝাই দিতাম। বড়বাজার বিভিন্ন পটীতে—অর্থাৎ যে পটীতে
চৌধুরীর হাঙ্গাম নাই—সে সব জায়গা হইতে শ্যামবাজার মাল
আসিতে গাড়ী ভাড়া (প্রত্যেক গরুর গাড়ী) ॥• আনা হইতে
• আনা, ইহার অধিক কোন দিন লাগিত না কিন্তু পােস্তার
গাড়ােয়ান অর্থাৎ সেই চৌধুরীর সীমানার মধ্যে গাড়ী ভাড়া ১•
পাঁচ সিকার কম আসে না। এই কমিবেশী ব্যাপারে চৌধুরীকে
অনেক রকমে বুঝাইয়া যখন কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিলাম না—তখন
যে সমস্ত ঘর হইতে ডাল কলাই লই—তাহাদিগকে বলিলাম যে
বাহিরের গাড়ী আনিয়া মাল বােঝাই করিব—আপনারা সাহায্য
করিবেন। তাহারা ত কিছুতেই স্বীকৃত নহে। বলিল “ইহা
একেবারেই অসম্ভব।” আমি বলিলাম “২১ গাড়ী মাল নহে—
২৩• গাড়ী মাল, প্রত্যেক খেপে অযথা ভাড়া দিতে হয়।
কাজেই ইহার প্রতীকার না করিয়া পারি না—যত হাঙ্গামা করিতে
হয়—আমি করিব—আপনারা মাত্র দরকার হইলে মােকদ্দমায় সাক্ষ্য
দিবেন। উহারা ছুরির ভয়ে ইহাতেও সম্মত নহে। কিন্তু আমার
এম্‌নি একটা জেদ পড়িয়া গেল যে দেখি কোন প্রতীকার করা
যায় কি না—এই বলিয়া একদিন বাহির হইতে একখানা নগদা
গাড়ী কিয়া মাল বােঝাই করিতে আরম্ভ করিলাম। গােলমাল
হইবে—ইহা পূর্বে জানিয়া গােমাল সুরু হইবার আগেই Mintএর
নিকটে একজন Sergentকে পাইয়া তাহাকে ডাকিয়া আনিলাম
যে দেখ আমার গাড়ী লুট করিতেছে। আমার কর্মচারী দিয়া
গাড়ী আগে পাঠাইয়াছি—৪৫ খানা বস্তা গাড়ীতে পড়িয়াছে-

আমার ব্যবসা জীবন ১১৭ । এমন সময়ে Sergent লইয়া আমি গাড়ীর কাছে উপস্থিত হইলাম। চৌধুরী কোথায় ছিল—সে সদলবলে দৌড়িয়া আসিয়া সেই নগদা গাড়ােয়ানটীকে প্রহার করিতেছে—বস্তাগুলি টানিয়া রাস্তায় ফেলিয়া দিয়া ২ খানা বস্তা লাথি মারিয়া ফাটাইয়া দিয়াছে। ঠিক এনি সময়ে Sergent যাইয়া ঘটনাটা প্রত্যক্ষ করিল। আর প্রমাণের প্রয়ােজন হইল না। Sergentএর সঙ্গে আর ৩টা কনেষ্টবল ছিল। চৌধুরীকে ও আরও ২/৩টী গাড়ােয়ানকে বাঁধিয়া আচ্ছা করিয়া উত্তম মধ্যম প্রহার করিল। পরে যখন তাহাদিগকে বাঁধিয়া থানায় চালান দিবার জন্য প্রস্তুত হইল—তখন কি জানি কি ভাবে স্থানীয় গােলওয়ালা দোকানদার ও চৌধুরী গাড়ােয়ানরা মিলিয়া পুলিসের সহিত একটা Compromise করিল। আমার লাভের মধ্যে এই হইল যে পােস্তা হইতে শ্যামবাজারের ভাড়া চিরদিনের তরে আমার পক্ষে ১০ পাঁচ সিকা স্থলে দ• বার আনা ধাৰ্য্য হইল। (২) বিগত ১৩১৯ সাল হইতে ১৩২৪ সাল পর্যন্ত ৬ বৎসর কাল যখন পাটের আড়ত করি—তখন সেই পটীর চৌধুরীর এলেকাভুক্ত হইয়া অন্যান্য আড়তদারের ন্যায় কাজ চালাইয়াছি। আমি স্থানীয় আড়তদার—পাট আমদানী হয়—অধিকাংশ কিস্তিতে, তাহার সহিত গাড়ােয়ানের কোন সম্বন্ধ নাই। রপ্তানী হয় গাড়ীতে—গাড়ী ভাড়া খরিদ্দারে দেয়। বিভিন্ন স্থানের গাড়ী ভাড়া পাটের খরিদ্দার Association হইতে পূৰ্ব্ব হইতে নির্দিষ্ট করা আছে। চৌধুরীও নির্দিষ্ট আছে। কাজেই, তাহার ভিতর বিশেষ কিছু গােলমাল হয় না বা হইতে পারে না। পরে যখন আমি ১১৮ আমার ব্যবসা জীবন ১৩২৮ সালে সেই চৌধুরীর এলেকাভুক্ত স্থানে তেলের কল Start করিলাম-তখন তাহারা আসিয়া স্বীয় প্রাধান্য বজায় করিতে চেষ্টা করিল। এ গঞ্জে তেল কল মাত্র আমার একা। আর সমস্ত কল হালসী বাগান, গােয়াবাগান, রাজা বাজার অঞ্চলে। তেল বা খৈলের খরিদ্দার আসিলে উহাদের ইচ্ছামত ভাড়া দাবী করে। পূর্বোক্ত পটীর তুলনায় ভাড়া অত্যধিক বেশী হয়। যে খরিদ্দার একবার আসে সে আর দ্বিতীয়বার আসে না। কাজেই, অত্যন্ত অসুবিধা হইতে লাগিল। উহাদিগকে কোন রকমে বুঝাইয়া পারিলাম না। ভাড়া কমাইবে না—চৌধুরীয়ানার দাবীও ত্যাগ করিবে না। বাহিরের গাড়ী আসিয়া মাল বােঝাই করিতে দিবে । দিন দিনই অশান্তি বাড়িতে লাগিল। একদা মেসার্স ড কোম্পানীর নিকট ২৫ টন খৈল বিক্রী করিলাম। এখানে চৌধুরীর এই প্রকারের হাঙ্গামা আছে—ইহা জানিয়া তাহারা মাল লইতে রাজী হইল না। আমি বলিলাম “আপনারা বাহিরের গাড়ী পাঠাইবেন—যত কিছু হাঙ্গামা হয়— আমি ব্যবস্থা করিব।” তাহাদের গাড়ী আসিল। মাল বােঝাই হইতে সুরু হইয়াছে—এমন সময়ে স্থানীয় চৌধুরী সদলবলে আসিয়া ঐ গাড়ীর উপর হইতে বস্তা ফেলিয়া দিতে আরম্ভ করিল। ভয়ঙ্কর উত্তেজিত হইয়া নবাগত গাড়ােয়ানদিগকে ছােট বড় গালাগালি দিতে আরম্ভ করিল। আমার কোন বাধা বিপ্নদোহাই দস্তুর মানিতে চাহে না। গেটে বন্দুক লইয়া দারােয়ান আছে। দারােয়ানট পাঞ্জাবী। তাহাকে হুকুম দিতে বাধ্য হইলাম—“মার ইহাদিগকে।” দারােয়ান উত্তেজিত হইয়া দাঁড়াইল বটে-ইতিমধ্যে একজন আমার ব্যবসা জীবন ১১৯ গাড়ােয়ান (চৌধুরীর লােক) “কোন্ শালা মানেওয়ালা”—এই বলিয়া তাহার হস্তস্থিত সেই মহিষমারা চাবুক দিয়া দারােয়ানকে এক বাড়ি মারিল। দারােয়ান আমার দ্বিতীয় হুকুমের অপেক্ষা না করিয়া—যে গাড়ােয়ানটী চাবুক মারিয়াছিল—তাহার মুখে বন্দুকের কুঁদো দিয়া সজোরে আঘাত করিল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ােয়ানটীর কতকগুলি দাত ভাঙ্গিয়া পড়িয়া গেল। রক্ত দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ােয়ানরা ভয়ঙ্কর উত্তেজিত হইয়া উঠিল। দারােয়ানও বন্দুকে কার্টিজ (cartidges) পূরিল। একটা খুন জখম হইবার সূত্রপাত শুরু হইল। আমি রিভলভার লইয়া বাহিরে আসিয়া বলিলাম,-কলের সীমানার ভিতর পা দিলেই গুলী করিব। তখন গাড়ােয়ানরা সীমানার বাহিরে রাস্তায় গিয়া রাস্তার ছােট ছােট পাথরের গােয় ছুড়িতে লাগিল। আমি অনন্যোপায় হইয়া “কল লুট হইতেছে” বলিয়া থানায় টেলিফোন করিলাম। যতক্ষণ পৰ্যন্ত পুলিস আসিয়া না পৌছিয়াছিল—ততক্ষণ পর্যন্ত গড়ােয়ানরা অনবরত ঐ পাথরের খােয়া ছুড়িতেছিল। পুলিশের দল দূরে আসিতে দেখিয়া গাড়ােয়ানরা পলাইয়া গেল। সে সময়ে স্থানীয় পুলিশ ইনস্পেক্টর লােকটা বিশেষ ভদ্র ছিলেন। আনুপূৰ্ব্বিক সমস্ত ঘটনা শুনিয়া চৌধুরীকে ডাকাইয়া শাসন করিয়া দিলেন—ভবিষ্যতে তুমি বা তােমার কোন লােক কলে পা দিলেই বিনা কৈফিয়তে জেলে পুরিয়া দিব। গুণ্ডা আইনে ধরাইয়া দিব। গাড়ােয়ানের দল সব মুসলমান—আবার পুলিস্ ইনস্পেক্টর তিনিও মুসলমান গাড়ােয়ানরা দেখিল স্বজাতির নিকট সহানুভূতির পরিবর্তে বিপরীত কথা শুনিতে হইতেছে—সুতরাং বেগতিক দেখিয়া তাহার রণে ভঙ্গ আমার ব্যবসা জীবন ১৩৩৯ দিল। তদবধি গাড়ােয়ান বা কোন চৌধুরী আমার কলে আসিয়া কোন উপদ্রব করে নাই তৃতীয় ঘটনা।-এটা সালের ব্যাপার। ভগবদিচ্ছায় তেলকল পটীতে আমি সর্বপ্রকারে প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিয়াছি। খরিদ, বিক্রী, আমদাণী, রপ্তানী উপস্থিত সময়ে আমাপেক্ষা কোন কলে বেশী নাই। বিশেষতঃ আমার অটী কল বিভিন্ন স্থানে থাকার জন্য অনেক সময়ে এক কল হইতে অন্য কলে মেশিনারী পার্ট এবং তেল খইল আমদানী রপ্তানী করিতে হয়। তজ্জন্য আজ ৪ বৎসর যাবৎ একখানা শরী আমার নিজের আছে। ঐ লরীতে আমার নিজের মাল এই প্রকারের আমদানী রপ্তানী করা হয়, তা ছাড়া, যে সমস্ত ডাকের চিঠির অর্ডার বা “ভাসা” খরিদ্দার (অর্থাৎ যাহাদের এখানে গদী নাই) মাল লইতে আইসে, তাহাদিগের অর্ডার অনুযায়ী সমস্ত তেল খইল এই গরীতে বিভিন্ন ষ্টেশনে পাঠান হয়। ইহাতে যে ভাড়া খরিদ্দারের নিকট আদায় হয়, তাহা দ্বারাই লরীর খরচ উঠিয়াও লরীর মূল্য মধ্যে পর পর টাকা ওয়াশীল হইয়া থাকে। লাভের মধ্যে নিজের বিভিন্ন কলে রপ্তানী মালগুলি বিনা খরচায় পাঠান যায়। পূৰ্বে লিখিয়াছি, অন্যান্য পটীতে এক একজন চৌধুরী কতক- গুলি গাড়ােয়ানকে লইয়া প্রভুত্ব করে, কিন্তু এই তেলকল পটীর চৌধুরীয়ানা আবার স্বতন্ত্র। এখানকার প্রত্যেক গাড়ােয়ান নিজে নিজে চৌধুরী। এক একটা গাভােয়ানের একাধিক গাড়ী আছে। এবং সমস্ত গাড়ােয়ানদের এক একটী কল বা ২৪টা গদীয়ান খরিদ্দার নির্দিষ্ট আছে। সেখানে যাহা কাজ পায়, অবশিষ্ট সময় ঐ

আমার ব্যবসা জীবন
১২১
হাবড়া রেল হইতে মাল রপ্তানী করে। এই সব গাড়ােয়ান গুলির
মধ্যে পরস্পর এসােসিয়েশন আছে। কেহ কাহারও খরিদ্দার বা
কলের উপরে যাইয়া অধিকার বর্তায় না। পুলিসের সহিত বা
বাহিরে কোন লােকের সহিত কোন প্রকার গােলমাল বা মামলা
মােকদ্দমা হইলে উহারা সকলে একত্র হইয়া লাঠি ধরে বা চাদা
তুলিয়া মােকদ্দমা করে। নিজেদের ভিতরে কোন গােযােগ
হইলে উহারাই পঞ্চায়েতী করিয়া মীমাংসা করে।
অন্যান্য পটীতে শুধু রপ্তানীর হাঙ্গামা-তেলকল পটীতে আবার
তাহাপেক্ষা একটু বেশী বাড়াবাড়ি। এখানে আবার আমদানীর
হাঙ্গামাও আছে। যে কোন জায়গায় সরিষা বা কোন তৈলবীজ
খরিদ করা হউক না কেন—গরু বা মহিষের গাড়িতে আমদানী
করিতেই হইবে। এই সমস্ত চৌধুরীদিগের সীমানা মধ্যে অর্থাৎ
মাণিকতলা, গােয়াবাগান, হাসীবাগান, রাজাবাগান, চোদার
বাগান, উল্টাডাঙ্গা—এক কথায় বলিতে, যে সমস্ত জায়গায় ষ্টীম
এঞ্জিনে পরিচালিত তৈলের কল আছে, সেই সব স্থলে লরী প্রবেশ
একেবারে নিষেধ। রপ্তানী ত নাই, আমদানীও কোন লরীতে
হইতে পারিবে না। এ পর্যন্ত কোন কলওয়ালা উহাদের প্রতিদ্বন্দী
হইয়া লরীতে আমদানী রপ্তানী করিতে সক্ষম হয় নাই।
তেলকলওয়ালাদের ভিতরে আমার ছাড়া আর কাহারও
নিজের লরী নাই। বিশেষ কথা,-এই চৌধুরীগণের সীমানার
বাহিরে দাশগাড়া ও শ্যামবাজারে আমার আর ২টী ছােট তেলকল
থাকার জন্য একমাত্র আমারই কলে মাঝে মাঝে লীতে আমদানী
ও সব সময়ে এরীতে রপ্তা হইয়া থাকে। শরীর খরিদ্দার

১২২ আমার ব্যবসা জীবন সাধারণতঃ কলিকাতার ১০২০ মাইল চতুষ্পর্শ্বের। চৌধুরীদের সীমানার বাহিরে অর্থাৎ শ্যামবাজার, বাগবাজার, বেলগাছিয়া, পাতিপুকুর প্রভৃতি স্থানে বহু ছােট ঘােট অয়েল এঞ্জিন ও মটরে পরিচালিত তেলকল হওয়ায় এই সমস্ত শরীর খরিদ্দারগণ ঐ সমস্ত কল হইতে নির্বিবাদে লরীতে মাল লইয়া যায়। ইহাতে এই সমস্ত বড় বড় কলওয়ালার স্বার্থের হানি হইতেছে দেখিয়াও ছুরি খাওয়ার ভয়ে কেহ ইহার প্রতিকার করিতে এ পর্যন্ত পারে নাই। গত ২১শে জ্যৈষ্ঠ শনিবার শান্তিপুরের একটী ভাসান” খরিদ্দার আমার উল্টাডাঙ্গা কল হইতে ৬০ বস্তা থৈল খরিদ করে। এবং ঐ মাল লরীতে রপ্তানী হওয়ার জন্য মালের টাকার সঙ্গে লরী ভাড়ার টাকাও মিটাইয়া দিয়া চলিয়া যায়। যখন ঐ মাল আমার লরীতে রপ্তানী হইতে সুরু হইয়াছে তখন একটী গাড়ােয়ান আসিয়া বাধা দিল এই বলিয়া যে এটা আমার খরিদ্দার—আমার গাড়ীতে মাল যাইবে। খরিদ্দার তখন চলিয়া গিয়াছে ; কাজেই তাহার নিকট আর জানিবার উপায় নাই। তখন গাড়ােয়নের দাবী অগ্রাহ্য করিয়া গরীতেই মাল রপ্তানীর অর্ডার দিলাম এবং দারােয়ানকে দিয়া কলের সামনে হইতে ঝামেলা সরাইয়া দিলাম। লরী মাল বােঝাই করিয়া কলের বাহিরে খানিক দূর গেলে সমস্ত গাড়ােয়ানের দল আসিয়া গাড়ী ঘেরিয়া ফেলিল। Driver বাধ্য হইয়া রাস্তায় বরী রাখিয়া কলে আসিয়া খবর দিল। থানায় টেলিফোন্ করিলাম—পুলিস আসিল। ৩টা গাভােয়ানকে লইয়া পুলিস থানায় চলিয়া গেল-বাকি গাড়ােয়ান সরিয়া গেল। এরী একটু

আমার ব্যবসা জীবন
১২৩
দূর না যাইতে আবার গাড়ােয়ানের দল আসিয়া ঘিরিল। লরী বেগে
চালাইয়া যাইতে ইট মারিয়া একটা মুটের মাথা ফাটাইল। এই ভাবে
গত ২১শে জ্যৈষ্ঠ হইতে ১৫ই আষাঢ় তারিখ পর্যন্ত গড়ােয়ানের দল
তাহাদের নিজের কাজ কর্ম ক্ষতি দিয়া সৰ্ব্বদা আমার রাজাবাগান
ও উল্টাডাঙ্গা কলে অশান্তি উৎপাদন করিতে লাগিল। নিজের
লরীতে মাল রাস্তায় বাহির করিলেই ইট মারে,এই ভাবে
আমার কলের ৩৪টী মুটে জখম হইলে পর Driver কাজ করিতে
চাহে না। Driver এর
Driver এর সম্মুখটা spandel_metal দিয়া
ঘিরিয়া দিলাম। অন্য কোন গাড়ােয়ানকে কলে আসিতে দেয়
ন—উহারা নিজেরাও মাল রপ্তানী করে না। তখন বাধ্য হইয়া
Walford কোম্পানীকে আমার মাল রপ্তানীর জন্য Contract
দিলাম। দ্বিতীয় দিন তাহার ড্রাইভারেরও ইট মারিয়া মাথা
ফাটাইল। কোন খরিদ্দার বা দালাল আসিলে ঐ লােক কল
হইতে বাহির হইয়া রাস্তায় গেলে তাহাকে শাসায়—“মাথা
ফাটাইব।” এই ভয়ে কোন লােক কলে আসে না। দিন দিনই
অশান্তি বাড়িতে লাগিল। প্রত্যেক দিনের প্রত্যেক ঘটনা থানায়
ডায়েরী করাইতেছি। শেষকালে একজন সার্জেন্ট ও কয়েকজন
কনষ্টবল উভয় কলে মােতায়েন হইল বটে, কিন্তু উহাদের ভয়ে
কোন খরিদ্দার বা দালাল কলে না আসাতে কল চালান অসম্ভব
হইয়া উঠিল।
অবশেষে পুলিশে পরামর্শ দিল-এ ভাবে উহাদের দমন করা
যাইবে না। আপনারা উহাদের বিরুদ্ধে কোর্টে ১০৭ ধারার কে
রুজু করিয়া দিন। পুলিশের ইঙ্গিত মত কয়েকজন নামজাদা

১২৪
আমার ব্যবসা জীবন
গাড়ােয়ানকে আসামী করিয়া জোড়াবাগান কোর্টে গাড়ােয়ানগণের
বিরুদ্ধে ১০৭ ধারার কে রুজু করিয়া দিলাম। কেস চলিতে
লাগিল। এমন সময়ে জনৈক সরিষার দালালের মধ্যবর্তিতায়
কতকগুলি সর্তে উহাদের সহিত Compromise করার কথা
চলিতে লাগিল। আমার শরীখানা উহাদের নিকট বেচিয়া
ফেলিতে হইবে। আমার কলে মাল আমদানী ও রপ্তানী উহারাই
করিবে। বিভিন্ন ষ্টেশনে মাল রপ্তানী করিতে আমি যে ভাড়া
রেট বাঁধিয়া দিব—তাহাই উহাদিগকে মানিয়া লইতে হইবে-
তাহার অধিক এক কপর্দকও উহারা আমার নিকট দাবী করিতে
পারিবে না। অধিকন্তু, যত গাড়ী মাল আমার কলে আমদানী
বা রপ্তানী হইবে—গাড়ী পিছু এক পয়সা করিয়া উহারা আমাকে
ট্যাক্স দিবে। অন্যান্য সমস্ত সৰ্তে উহারা রাজী লইল—কেবল
পরীর দাম লইয়া—উভয় পক্ষের মতের মিল হইতেছিল না।
আমি যাহা দাম বলিউহারা তাহাপেক্ষা অনেক কম দর হাঁকিয়া
বসে। অবশেষে স্থির হইল—যে কোম্পানীর গাড়ী, সেই
এলেনবারী কোম্পানী, লরীর যে মূল্য ধার্য্য করিয়া দিবে—তাহাই
উভয় পক্ষকে মানিয়া লইতে হইবে। আমার লরী এলেনবারী
কোম্পানীকে exchange দিয়া উহার পরিবর্তে উহাদের
নিকট হইতে নূতন গাড়ী লইলে আমার ঐ পুরাতন লরীর দাম
উহারা ১৭৫০ টাকা দিবে—স্থির হইল। নূতন গাড়ী আর
লওয়া হইল না। এলেনবারী কোম্পানীর valuationএ আমার
পুরাতন লরীর যে ১৭৫০ টাকা দর স্থির হইল, সেই দরেই
গাড়ােয়ানরা আমার শরীখানা কিনিয়া লইল। কিছুদিন ঐ লরী

আমার ব্যবসা জীবন ১২৫ চালাইয়া উহারা ১০০• এক হাজার টাকা loss দিয়া মাত্র ৭৫০ টাকায় ঐ লরীখানা বেচিয়া ফেলিল। মাস দেড়েক মােকদ্দমা চলিবার পর মােকদ্দমার রায় বাহির হইল। আমরা যে দশ জনকে আসামী করিয়াছিলাম- তাহার মধ্যে ৭ জনকে ছয় মাসের জন্য জামিন মােচা দিতে হইয়াছে। অবশিষ্ট ৩ জন বিনা সর্তে খালাস পাইয়াছে। আবার কলে পূর্ব শান্তি ফিরিয়া আসিয়াছে। এই জামিন মােচা হওয়ার ফলে আমার কল হইতে গাড়ােনগণের উপদ্রব বর্তমানে সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হইয়াছে এবং আমার এই তেজস্বিতার ফলে মাত্র আমারই সমস্ত কল হইতে লরীর খরিদ্দারের নিকট মাল বিক্ৰী করিয়া লরীতে রপ্তানী করিতে পারি।

উপসংহার বাঙ্গালীর ব্যবসা প্রায়ই দেখা যায় যে, কেহ কোন একটা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করিয়া সাফল্য লাভ করিয়া অর্থবান্ হইলে, তাহার পুত্র বা ওয়ারেশগণ, বাবু হইয়া যায়। বাল্যকাল হইতে তাহাদের অন্তরে সৰ্ব্বদাই একটা ধারণা বদ্ধমূল হইয়া যায় যে, আমি বড় লােকের ছেলে। বাড়িতে চাকর বাকর থাকেই, সৰ্ব্বদা তাহাদের দ্বারা নিজের সুখ, সাচ্ছন্দ্য, ভােগ, বিলাস হুকুম করিয়া সম্পাদন করে, হয়ত কিছু উচ্চ শিক্ষা অর্থাৎ ইউনিভার্সিটীর ডিগ্রিলাভ করিয়া বিদ্যাভিমানী হইয়া পড়ে, পরে বাঙ্গালীর জাতিগত দোষ আলস্যপ্রিয় হয়। যখন যৌবনে পদার্পণ করে, তখন ফুলে মধু থাকিলে যেমন মৌমাছির দলকে সংবাদ দিয়া আনিতে হয় না, সেইরূপ অর্থ থাকিলে যত সব কুসঙ্গ মােসাহেবের দল আপনি আসিয়া জোটে, শেষে ৩টী W ডবলিউ একে একে আশ্রয় করিয়া বাবা মরার সঙ্গে সঙ্গে কারবারটা নষ্টত হয়ই, পরে ঋণ-জালে জড়িত হইয়া অচিরাৎ সর্বস্বান্ত হইয়া পড়ে। যে আহার নিদ্রা ভুলিয়া, গায়ের রক্ত জল করিয়া, নিজে ভােগ না করিয়া, ভাবী বংশধরের সুখের কামনা করিয়া, একটা কারবার প্রতিষ্ঠা করিয়া অর্থ সঞ্চয় করিয়া রাখিয়া গেল, অথচ একটা মস্ত বড় ভূল করিয়া গেল ছেলেদিগকে ভােগী ও বাবু করিবার সহায়তা করিয়া অর্থাৎ স্নেহের বশবর্তী হইয়া সদা সর্বদা তাহাদের আব্দার অনুযায়ী ভােগ বিলাসের জিনিষ সরবরাহ করিয়া এবং বয়ঃপ্রাপ্ত কাৰ্যক্ষম হইলেও তাহাকে শারীরিক পরিশ্রমের কাৰ্য্যে নিয়ােজিত করিয়া। “কৰ্ম্মশূন্য মস্তিষ্ক শয়তানের আধার”। গীতায় ভগবান বলিয়াছেন, “আমি যাহাকে সর্বদা কর্মে লিপ্ত রাখিয়াছি সে আমার আশীর্বাদের পাত্র।” সেই কৰ্ম্ম নিজের যথেষ্ট থাকিলেও মেহের বশবর্তী হইয়া পুত্রকে শারীরিক পরিশ্রমের কার্যে লিপ্ত না করিয়া কৰ্মচারী দ্বারা ঐ সমস্ত কাৰ্য করাইয়া, ভবিষ্যৎ কারবারটী রক্ষা করার উপযুক্ত শিক্ষাও হাতে কলমে পায় না সঙ্গে সঙ্গে কুড়ে হইয়া যায়। উপসংহারে আমি যাহা লিখিলাম সর্বত্রই যে এই রকম হয় এ কথা আমি বলিতেছি না, তবে সাধারণতঃ প্রায়ই এই রকম ঘটে এবং আমার এই ব্যবসা ক্ষেত্রে ৩৫ বৎসর বহু ব্যবসায়ীর সহিত মিশিয়া মােটামুটী যাহা দেখিয়াছি তাহাই লিখিলাম এবং এই অভিজ্ঞতা লইয়া নিজের ছেলেগুলি যাহাতে ঐ পথাবলম্বী হয়, তজ্জন্য যথাসম্ভব সাবধানও হইয়াছি। প্রত্যেক বিষয় শিক্ষার পর পরীক্ষা দিয়া, শিক্ষায় পারদর্শিতার পরিচয় দিতে হয়, বিগত ১৩৩৩ সালে আমার যে হাঁপানী রােগ হইয়াছিল তাহা বহু চিকিৎসার ফলে এইক্ষণ এই দাড়াইয়াছে যে, কলিকাতায় থাকিলে আমার হাঁপানী হয়, বাহিরে থাকিলে ভাল থাকি। তাই দুই ছেলেকে ব্যবসা শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা করার জন্য এবং নিজে বাহিরে থাকিলে সুস্থ থাকিবার জন্য, উহাদিগকে কার্যের দায়িত্ব ভার দিয়া নিজে অবসর লইয়াছি। সম্পূর্ণ ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Amar Byabsa Jeeban Ed.1st

Author
Sadhu, Binod Bihari, Ray Saheb
Title
Amar Byabsa Jeeban Ed.1st
File name
Amar Byabsa Jeeban Ed.1st
Text
OCR done
Citation
1932
Published
2010/01/27
Publisher
Sri Bijaychandra Das, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
152
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Industries Baed On Macromolecular Materials. Rubber Industry. Plastic Industry
Keywords
Binod Bihari,Sadhu
DLI number
512283
Barcode
4990010019374.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
StYnzhR4ZyB
Download PDF

Amar Byabsa Jeeban Ed.1st