Bally Sadharan Granthagar
Kalpolata Ed. 1st
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
কল্পলতা
শ্রীমণীন্দলাল বস্তু
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স,
২০৩১১, কর্ণওয়ালি, স্ট্রীট, কলিকাতা
প্রথম সংস্করণ
১৩৩৭
507
একটাকা চার আনা মাত্র
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্সের পক্ষে ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস হইতে
গগাবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত
২০১১, কর্ণওয়ালিস ইট, কলিকাতা
শ্রীসুধীরকুমার চৌধুরী বন্ধুবরেষু,
No text on this page.
সূচি
মায়ের দিন
বেহালা
হােটেলওয়ালা
লতিফের গান
ফাকি
মালতী
লেখকের বিচার
শ্ৰীমণীন্দ্রলাল বসু লিখিত
উপন্যাস
রমলা (তৃতীয় সংস্করণ
ছােট গল্প
মায়াপুরী
সােণার হরিণ
রক্তকমল
ছেলেমেয়েদের বই
অজয় কুমার
সােণার কাঠি
কলকা
No text on this page.
মায়ের দিন রাতের অন্ধকার যখন তরল হয়ে আসে, শুকতারা দপদপূ করে তেল-ফুরিয়ে- যাওয়া প্রদীপের শিখার মত, ভােরের ঠাণ্ডা বাতাস বয়, আর মিউনিসিপ্যালিটির ময়লাফেলা গাড়ীগুলাের চাকার ঝনঝনানি শব্দে ঘুমন্ত নগরের জনহীন পথ আকুল হয়ে ওঠে, তখন কমলার ঘুম ভেঙে যায়। সেই সময়ে তার স্নেহঘের কোলে ছােটখুকীর চোখ থেকেও ঘুম চলে যায় ; গাছের পাতা- ঢাকা নীড়গুলিতে পাখীদের গান গেয়ে ওঠার সময় স্নিগ্ধ ভাের- বেলায় ছড়ানো বিছানাতে মা ও মেয়ের খেলায় মায়ের দিনের আরম্ভ হয়। তরল অন্ধকারে মায়ের বড় মুখখানির দিকে চেয়ে সদ্য-জাগা পাখীর ছানার মত “আঁ আঁ শব্দ করে খুকী আপন মনে হাত-পা ছেড়ে, কমলা তার নবীনকোমল অধরে চুম্বন দিয়ে এলানাে শাড়ীটা কোনমতে জড়িয়ে বিছানা থেকে ওঠে, ছেলে- মেয়েদের গায়ে বিছানার চাদরটা টেনে দেয়। সন্ধ্যেবেলায় যে চাদরটা বিছানাতে পাতা হয়েছিল, ভােরবেলায় সে চাদর যে কি করে কুণ্ডলী পাকিয়ে মেঝেতে গিয়ে পড়ে, ছেলেমেয়েদের নিদ্রা- পদ্ধতির সে এক রহস্য। কমলা স্বামীর খাটের পায়ের দিকের ২ কল্পলতা জানলাটা বন্ধ করে দেয়, তােরের আলাে ও ঠাণ্ডা বাতাস যেন স্বামীর ঘুমের ব্যাঘাত না করে। তার পর, সে আবার বিছানাতে শুয়ে ছােটখুকী চঁপুকে বুকে টেনে নেয়, তার তুলতুলে পায়ে হাত বুলিয়ে চাপার কলির মত আঙুলগুলি নিয়ে খেলা করে। সারা দিনের কাজে খুকীকে যে একটু আদর করবে তারও সময় হয় না, এই ভােরবেলা হচ্ছে কমলার মাতৃ-স্নেহলীলার সময়। খুকী মায়ের মুখের দিকে চেয়ে হাসে আর দুধ খায়,-মাঝে মাঝে সুর করে বলে ওঠে- 'আঁ, আঁ, আঁ । দুষ্ট চাপু, চুপ, এক্ষুনি বাবার ঘুম ভেঙে যাবে। চাপু তার ফুলের কুঁড়ির মত চোখ দু’টি নাচায়। খাটের ওপর স্বামী শােন ; তলায় মেঝেতে লম্বা বিছানা,এক দিকে খুকী আর খুকীর মা, তার পর লাখী, তার পর রাণু, তার পর মণা, তার পর শােভা,-বয়সের বাড়তি অনুসারে শােয়, মাঝে একটি করে পাশ-বালিশ ব্যবধান। এই পাশ-বালিশ হচ্ছে প্রত্যেকের বিছানা-রাজ্যের সীমানা। লাখীর দু’দিকে দুই পাশ- বালিশ ও পায়ের দিকেও একটা বালিশ চাই, তার বয়স চার কি না, সেজন্যে চারটে বালিশ না হলে তার চোখে ঘুম আসে না। রাণু কিন্তু ভারি লক্ষ্মী। সে বলে, আমার একটা পাশবালিশও চাই ; কি হবে মা, বাজে বালিশ নিয়ে, আমি ত আর লাখীর মত ছােট নেই যে গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে যাব। ছ’বছর তার বয়স, এরই মধ্যে গিন্নি। সবচেয়ে দুষ্ট হচ্ছে মণা। রাতে ঘুমের ঘােরে সে ঘুরপাক খায়, শােভা বেচারাকে লাথি মেরে তার ওপর দিব্যি মায়ের দিন = • পা তুলে মহানন্দে ঘুমােয় । শােভা যে সবার বড়দিদি এই গৰ্বটুকু বজায় রাখবার জন্যে সে আর নালিশ করে না, ছােট ভাই ঘুমের ঘােরে হাত পা ছেড়ে, তা কি করা যায়। সে মাঝে মাঝে বলে বটে, মা, ও চরুকির পাশে আমি শােব না; কিন্তু সন্ধাবেলায় আর আলাদা বিছানা করতে দেয় না, সে মণার পাশেই শােয়। দু’টো মােটা পাশবালিশের দুর্ভেদ্য প্রাচীর তুলে শােভা ভাবে, আজ নিরাপদে ঘুমানাে যাবে ; কিন্তু রাতে যখন চরকি ঘােরে, কোথায় থাকে পাশ-বালিশ, কোথায় বা থাকে মাথার বালিশ, —মণার এক পা চলে যায় শােভার বিছানাতে, আর এক পা চলে যায় মেঝেতে, চাদরটা তালগােল পাকিয়ে থাকে, কিন্তু কারুর ঘুমের কোনও কতি বা ব্যাঘাত হয় না। খুকীর দুধ খাওয়া শেষ হলে খুকীর চোখ ধীরে ধীরে বুজে আসে, আবার সে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু খুকীর মায়ের আর ঘুমানাে চলে না। কমলা ধীরে উঠে আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে, চুলগুলাে মাথায় কুণ্ডলী করে বেঁধে, ঘুমন্ত ছেলেমেয়েগুলির দিকে সস্নেহ নয়নে চেয়ে দেখে। ইচ্ছে করে প্রত্যেককে বুকে জড়িয়ে চুমমা খায়, কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে না। লাখীকে সােজা করে শুইয়ে দিয়ে তার চারপাশে চারটি বালিশ ঠিক করে রাখে। রাণু কি শান্ত ভাবে ঘুমােচ্ছ, তার কোলের পুতুলটিরও নড়চড় হয়নি। মণাটাকে মেঝে থেকে তুলে বিছানাতে শুইয়ে দেয়, মণা বিড়বিড় করে ব’কে ওঠে - “গােল’ ‘গােল, আর সঙ্গে সঙ্গে পা ছেড়ে—সারা বিকেল ফুটবল খেলে তার আশ মেটেনি। চারিদিক নিঝুম, সবাই ঘুমােয়, ভােরের আলাে পূবের, পাঁচিল ০ দিয়ে আসে, ময়নাটা খাঁচায় উসুখুস করে। কমলা ময়নাটাকে বলে, গােলমাল করি না। তার পর ঝি-চাকরদের জাগাতে নীচে চলে যায়। মধুটা কোনও দিন যদি সকালে ওঠে, দালান বারান্দা সিড়ি সব ধুতে হবে, ধুয়ে শুকিয়ে যাবার আগে যদি সবাই উঠে পড়ে, পায়ে পায়ে কাদা হয়ে যায়। এই ঘােওয়া নিয়ে স্বামীর সঙ্গে কত গােলমাল না হয়েছে। স্বামী বলেন, আচ্ছা, কলকাতা সহরের সব বাড়ীর দালান বারান্দা সিড়ি উঠান সব জল দিয়ে যদি ধুতে হয়, কত জল লাগে বল ত ! অত জল মিউনিসিপ্যালিটি দেবে কি করে? কমলা বলে, তা হিদুর বাড়ী আমি ম্লেচ্ছপনা করতে দেব না। মধুর ঘরের শিকলি ঝঝন্ শব্দে বেজে ওঠে,-হতভাগা ওঠ না, কলে জল এসেছে কতক্ষণ। উঠি মা ! কমলা নিজেই বালতি ও ঝাঁটা নিয়ে সিড়ি ধুতে আরম্ভ করে জানে, ঝাটার শব্দ না শুনলে মধু উঠবে না। আর মা ধুচ্ছেন জানলে সে আর শুয়ে থাকতে পারবে না। চোখ রগড়াতে রগড়াতে মধু ছুটে আসে,- মা আমায় দি, আমায় দিন্। কমলা দরজা খুলে রান্নাঘরে ঢােকে,—সব ঠিক আছে,-রাতে তাহলে বেরাল ঢােকেনি। উনানের ছাই নিয়ে দাত মাজতে মাজতে বাহির হয়ে আসে-ওসব ক্রীম, পাউডারে দাত মাজা তার পােষায় না। মুখ ধুয়ে কমলা ওপরে উঠে আসে, সব দরজার গােড়ায় জল- ছড়া দেয়, শাশুড়ী ঠাকরুণের ঘরের দরজার সামনে দাড়িয়ে
মায়ের দিন
জিজ্ঞেস করে,-মা, রাতে কেমন ঘুম হল? উত্তর আসে, ভাল না
মা। কয়েক দিন হল শাশুড়ীর হাঁপানিটা বেড়েছে। কমলা শােবার
ঘরের দরজায় দাড়ায়, খুকীর সুখস্বপ্নহাস্যভরা মুখখানি দেখে,
তার পর মণাকে ডাকে, থােকা থােকা ! মণা রােজ মাকে বলে,
মা, ভােরে উঠিয়ে দিও, পড়া মুখস্থ করব; কিন্তু কোনওদিন সে
ভােরে উঠতে পারল না। কমলা দু'তিনবার ডাকে, হাত ধরে
ঝাঁকুনি দেয়। মণ গাঁইগুই করে বসে, আবার শুয়ে পড়ে।
ঘুম-ভরা ছেলেকে টেনে তুলতে কমলার ননে বাজে,বলে, ঘুমােক,
কত পড়বে!
স্বামীর, ছেলেমেয়েদের দাঁত মাজার সরঞ্জাম ঠিক করে রেখে,
ওপরের ঠাকুর-ঘর মুছে, উনানে আগুন দিয়ে, স্নান করে কমলা
যখন রান্নাঘরে ঢােকে, তখন সূর্য উঠে গেছে, অরুণ-বথচূড়া
পাঁচিলের ফাক দিয়ে দেখা যায়। তাড়াতাড়ি চায়ের জল
বসিয়ে দিয়ে গয়লার কাছ থেকে দুধ মেপে নেয়। মধুর সিড়ি
বারান্দা দেওয়া হয়ে গেছে, সে এসে দাড়ায়,-মা, চা, বাবু যে
হাঁকছেন।
—হাঁকতে দে, জল বসিয়েছি। চায়ের বাটি না হলে বিছানা
থেকে উঠতে পারেন না, কিন্তু ছেলেমেয়েগুলির যে মাথা খাচ্ছেন।
হ্যা রে, ছেলেমেয়েগুলাের সব মুখ দেওয়া হয়েছে ?
--মুখ ধােওয়া কোথায় মা, সব এখন যুদ্ধ হচ্ছে।
—যুদ্ধ কি রে ?
বালিশ ছোড়াছুড়ি।
। —আবার আজ হচ্ছে, রােস দেখাচ্ছি!
.
কল্পলতা
বিছানা ধামসানাে বা বালিশ ছেড়া কমলা মােটেই পছন্দ
করে না, তার বুকে যেন বাজে, হনহন করে সে ওপরে
চলে যায়।
শশাবার ঘরে দু’পক্ষে যুদ্ধ চলে,-এক দিকে মণ আর লাখী,
অপর দিকে শােভা আর রাণু, তাদের বাবাও মাঝে মাঝে যােগ
দেন। মণ সব চেয়ে ওস্তাদ, তার তাকটা ঠিক হয়। লাখী
বেচারার ছােট বালিশগুলিই সবাই টেনে টেনে ছােড়ে। সে
মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে ওঠে,আমার বালিশ, আমার বালিশ।
তার পর নিজের পক্ষের জয় হচ্ছে দেখে হেসে ওঠে। এই
যুদ্ধক্ষেত্রে
চাপু কিন্তু সুখে নিদ্রা যায়।
মাকে দেখে যুদ্ধটা হঠাৎ থেমে যায়, মণ কিন্তু হাতের বালিশটা
শােভাকে ছুড়ে মারতে ছাড়ে না।
—হতভাগা ছেলেরা, সকালে উঠে কাণ্ড দেখ না, মেরে
সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠে—মা, মণাই ত আরম্ভ করলে—
—আমি! বাঃ, বাবা ত প্রথমে
মা দেখােনা, আমার বালিশ, এই ভুলাে বেরিয়ে গেল।
—মণা শীগগীর ওঠ, হতচ্ছাড়া ছেলে—আর হা গা, তুমি
-তুমি কি শিং ভেঙে বাছুরের দলে-
স্ত্রীকে দেখেই স্বামী শুয়ে পড়েন, নীরবে চোখ বােজেন।
মণা দৃপ্ত ভাবে উঠে চলে যায়, জানে, মা এখন স্নান করে কাচা
কাপড় পরে, সুতরাং তার ওপর কোনও চড় বা চাপড় পড়ার
আশঙ্কা নেই।
অৰ্মীর চা ও ছেলেমেয়েদের সিদ্ধ ওটমিল-মিশ্রিত দুধভন্ন
মায়ের দিন
৭
বাটিগুলি সাজিয়ে মধুর হাতে দিয়ে কমলা ভঁড়ারঘরে তরকারি
কুটতে বসে, ঠাকুর এখুনি এসে পড়বে। মধু এসে দাড়ায়-বাজার
কি আনতে হবে মা ? ঝি ঝামা দিয়ে কড়া মাজতে-মাজতে
কলতলা মুখর করে তােলে। লাখী এসে দাঁড়ায়, সঙ্গে শােভা।
-দেখ মা, লাখী দুধ খাচ্ছে না।
-মা, আমায় বাবা একটু চা দিচ্ছে না কেন?
কমলার সামনে বঁটি,—চারি দিকে তরকারির পাহাড়, আলু
কোটা, পটল কাটা চলছে। তার সঙ্গে হুকুম করা, ছেলেমেয়েদের
অভিযােগের মীমাংসা করা, বামুনঠাকুরের ফরমাস শােনা, সব
চলেছে।
লক্ষ্মী লাখ, দুধ খাও গে, আনার সঙ্গে চা খেও। ওই
রে চাপু জেগেছে, রাণু, নিয়ে আয় ত মা, দুধটা খাইয়ে দেন।
শােভা হচ্ছে পডুয়ে মেয়ে, সে সংসারের কাজে ঘেঁসে না।
রাণুর প্রথম ভাগ শেষ হয়েছে, “ঐক্য বাক্য’ আর তার পােযাচ্ছে
, মূর্খতার অখ্যাতি সে বহন করতে রাজী আছে, বিদূষী বলে
সে বিখ্যাত হতে চায় না। সেজন্যে সংসারের একটু কাজ করতে
পারলে সে খুসি, ততক্ষণ ত মাষ্টার মহাশয়ের কাছে পড়াটা ফাকি
দেওয়া যায়। সে সৰ্ব্বদাই মাকে সাহায্য করতে ব্যস্ত, চাপু
কদলেই সে পড়ার ঘর থেকেও ছােটে।
ঠাকুরকে চাল ডাল বের করে তরকারি বুঝিয়ে, কমলাকে
একবার ওপরে যেতে হয়। বাড়ীখানা এতক্ষণে সরগরম হয়ে
উঠেছে। পড়ার ঘরে মণার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রানু চেঁচাচ্ছে,
কলতলায় ক্ষেত্তরের মা বাসন মাজার সঙ্গে বকবক করছে-
.
৮ কল্পলতা রান্নাঘরে তেলের কর্কল শব্দ হচ্ছে,-আর শশাবার ঘরে কেষ্টো খাটের বিছানা তুলছে,-তলার বিছানাতে লাখীতে চাপতে স্বামীতে মিলে হাসাহাসি চেঁচামেচি চলছে,-বারান্দাতে ময়নাটাও তার সঙ্গে ডেকে উঠছে। কমলা শােবার ঘরের দিকে এখন যায় না, চাপু ‘মা’ বলে চেঁচালে, তাকে কোলে না নেওয়া দু’পক্ষের পক্ষেই কষ্টকর ব্যাপার হবে, শেষে ক্রন্দনের জয়ই হবে। সিড়ির পাশে ঠাকুর ঘরে চলে যায়, সকাল থেকে ঠাকুর-দেবতার একটু নাম করবার সময় পায়নি। সাদা শাড়ীটা ছেড়ে একটা তসরের কাপড় পরে ; কিন্তু আহ্নিক করতে বসে নীচের কলরব কাণে আসে, মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। নীচে মধুর গলা শােনা যায় । কি মাছ পেল, কত পয়সা ফিরল, এ সব জানতে মন উসখুস করে, আহ্নিক তাড়াতাড়ি সেরে চলে আসতে হয়। মাছ কত ভাগ করে কুটতে হবে বলে রান্নাঘরটা পরিদর্শন করে ভাড়ার-ঘরের ঢুকে কমলা দেখে, শাশুড়ি-ঠাকরুণ নীচে নেমে এসে ভাড়ার-ঘরের এক কোণ দখল করে বসেছেন, তার স্নান- আহ্নিকও হয়ে গেছে। শাশুড়ী বলেন, দাও বৌমা, পাণগুলাে আমিই সাজছি ; , বাপু, তােমার এ মেয়ের জ্বালায় পারা গেল না। চাপু ঠাকুরমার কোলে চড়ে নেমে এসেছে, এখন কোল থেকে নামতে চায় না, আলুর খােসা দিয়ে তাকে ভুলােতে হয়। সকালের ঘড়ির কাটাগুলাে ছুটে চলে, ঠাকুরের ঝােল সাঁতলানাে হতে না হতেই কলের ঘরে ছেলেমেয়েদের ভিড লেগে যায়।
মায়ের দিন
থ
লাখী দিগম্বর হয়ে এসে বলে, মা, আমায় কেউ চান করিয়ে
দিচ্ছে না।
মণা বলে, আমার খদ্দরের সার্ট কোথায় মা ?
শােভা বলে, আমি কোন্ শাড়ী পরব?
রাণু মুখ লাল করে বলে, মা, আজ এক মেম আমাদের স্কুল
দেখতে আসবেন, আমি সেই সােণালী ফ্রকটা পরব ?
শােভা মনে মনে বলে ওঠে, সিল্কের শাড়ী পরে গেলে আবার
হেড মিসষ্ট্রে চটেন, নিজেরা ত বিকেলে কত সাজ-গােজ করে
৩
বেরুন হয়।
হ্যা রে, স্কুলে যাবি, আবার সাজগােজ করে যাওয়া কি রে।
রাণুর ইচ্ছা, আজ ফ্রক না পরে শাড়ী পরে যায়, কিন্তু মুখ
ফুটে বলতে পারে না।
দিদিদের দয়া হলে তারা লাখীকে স্নান করিয়ে দেয়। কিন্তু
স্নানের সময় লাখী এত জল ছেড়ে, দুষ্টমি করে, একবার গা
মুছিয়ে দিয়ে আবার গা মােছাতে হয়, দেরী হয়ে যায়, সেজন্যে
সহজে তারা কেউ লাখীকে স্নান করাতে রাজী হয় না। কমলাকে
স্নান করাতে হয়। এই নবনীকোমল দেহে তেল রগড়াননা, সাবান
মাখানাে, বােয়ানাে, জল মােছানােতে আনন্দ আছে, কিন্তু রােজ
সে সুখ উপভােগ করবার সময় কোথায়, মধুকে ডাকতে হয়, দে
বাবা লাখীকে চান করিয়ে। কমলা চাপুকে স্নান করায়।
তার পর দালানে আসন-পিড়ে সশব্দে পড়ে যায়। “ঠাকুর
ভাত দাও।' ‘শীগগীর! ছেলেমেয়েরা গােগ্রাসে গিলতে থাকে।
কল্পলতা
-হ্যা রে মণা, এই ত সাড়ে ন'টা, আস্তে খা -
-মা, আমার আজ পরীক্ষা। ওজর একটা আছেই। কিন্তু
পরীক্ষা আছে বলে আধ ঘণ্টা আগে স্কুলে যাবার কারণ সম্বন্ধে
কেহ প্রশ্ন করে না। মণার মনে শুধু জাগে, কাল দুটো লাট্ট,
হেরেছি, আজ সেগুলির উদ্ধার করতে হবে।
ছেলেমেয়েরা খেতে বসে, একটু দেখবারও সময় নেই, কমলা
তােলা-উনানে তাড়াতাড়ি পটল ও লুচি ভেজে এ্যালুমিনিয়মের
বইএর মতন টিফিনের বাক্স সাজায়। বামুন-ঠাকুরের আলুর দম
এখনও হয়ে ওঠেনি! ভাড়ার-ঘরের দরজার চৌকাটে বসে শাশুড়ী
কিছু তদারক করেন।
‘গাড়ী আয়া বাবা। শােভা আর রাণু ঝড়ের মত ছােটে,
পিঠের ওপর বেণী দোলে, জুতাের হিলগুলাে সিড়িতে খ
করে, বুঝি হিল-ওয়ালা জুতােশুদ্ধ ঠিকরে পড়ে। “ওরে, খাবারের
বাক্স ? সেদিকে তাদের হুস থাকে না, খাতা-বইগুলাে বুঝি হাত
থেকে পড়ে যায়। মধু টিফিনের বাক্স নিয়ে পেছনে ছােটে,
কমলাও উঠে এসে ভাড়ার-ঘরের জালতি দেওয়া জানলা দিয়ে
দেখে,-মেয়ে-দুটো উঠল, দরজা বন্ধ হল, বাস্ চল্ল।
—মা স্কুলে যাচ্ছি। বই ভরা চামড়ার ব্যাগটা দুলিয়ে মণ
সামনে এসে দাঁড়ায়।আজ পরীক্ষা বুঝি ?—হাঁ মা, বলে সে
তাড়াতাড়ি একটা প্রণাম সেরে নেয়।
পরীক্ষার দিন মাকে প্রণাম করে গেলে ফলটা ভাল হবেই,
এ বিশ্বাস তার দৃঢ়। কমলা তার সার্টের কলারটা ঠিক করে
দেয়, গলার বােরামটা আঁটতে চায়।
মায়ের দিন
-থাক মা, ওটা খুলে রাখা ফ্যাসান, আর বা গরম।
নিমেষের মধ্যে মশা অন্তর্হিত হয়ে যায়। এদিকে স্বামী খেতে
বসেন ; তার পাশে লাখী ও চাপু।
চাকরদের জলখাবার দিয়ে, এক হাতে এক বড় পেতলের
বাটিতে চা ও আর এক হাতে পাখা নিয়ে কলা স্বামীর কাছে।
এসে বসে। চা নয়, চায়ের সরবৎ, তাতে চায়ের চেয়ে দুধ ও
চিনির ভাগই বেশী, এতেই বেলা একটা পর্যন্ত চলবে।
মায়ের সঙ্গে চা খাবে, না, বাবার সঙ্গে গরম মাছ-ভাজা খাবে,
এ সমস্যা লাখী সমাধান করে উঠতে পারে না। “চা চাই না’
বলে’ সে গরম মাছ ভাজাই খেতে আরম্ভ করে। তারপর মায়ের
গলা জড়িয়ে চায়ের বাটির দিকে এমন ভাবে চায় যে চা একটু
দিতেই হয়। টাপু কিন্তু একটু আলু খেয়েই সন্তুষ্ট, লক্ষ্মী মেয়ে !
পাণ নিয়ে যখন কমলা উপরে আসে, স্বামীর অর্ধেক সাজগোেজ
হয়ে গেছে, মধু পাখার বাতাস করছে। সে মাকে দেখেই
পাখাটা রেখে অকারণ চলে যায়। কমলা পাখা করতে করতে
দু’একটা সংসারের কথা বলে। সকালের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর এই
মিলন, আফিসের পােষাক পরার অবসরে পাখার বাতাসে
সাংসারিক প্রেমালাপ হয়। কমলা কোটটি ধরে, স্বামী দু’টো
হাত তাতে ভ'রে বলেন,“থ্যাঙ্ক ইউ ডিয়ার। তার পর এক হাতে
টুপি নিয়ে অপর হাতে কমলার ঠাণ্ডা নরম গালে আদর করেন।
কমলার গাল-দুটিতে রক্ত ফেটে পড়ে, বলে, যাও, ঢং করতে
হবে না।
স্বামী বলেন, সংসার-সংগ্রামে রণক্ষেত্রে যােদ্ধার বেশ পরিয়ে
১২
কল্পলতা
পাঠাচ্ছ, বিজয়-তিলক দাও। কমলা একটু ঘাড় বেঁকিয়ে দরজার
কাছে যেন পথ রােধ করে দাড়ায়। এই ভঙ্গীতে তাকে বড়
সুন্দর দেখায়। কোনও দিন বা উচ্ছ্বাসের আবেগে স্বামী
চুমাে খেয়ে ফেলেন। কমলার সমস্ত দেহে পুলকের শিহরণ
লাগে।
তবে আসি প্রিয়ে।
স্বামীর জুতাের শব্দ মিলিয়ে যায়, সদর দরজা বন্ধ হবার
শব্দ কানে আসে, ঘরের মাঝে কমল উদাসভাবে যেন স্বপ্নের
ঘােরে দাড়িয়ে থাকে,-সব কাজ ভুলে যায়। বাড়ীখানা স্তব্ধ,
নিঝুম, মনটা ভারী হয়ে আসে। আঁচল দিয়ে খাটের পায়াগুলাে
ঝাড়ে, অকারণে কুলুঙ্গি থেকে তেলের, ওষুদের শিশিগুলাে নামিয়ে
মুছতে আরম্ভ করে, কিন্তু কাজে মন থাকে না। সকালের
সেই কৰ্ম্মমরী কমলা যেন বদলে গেছে কয়েক মুহূর্তের জন্যে।
দালানের কোণ থেকে একটা ডাক আসে—মা, মা, দেখ না-
কমলা চমকে ওঠে, মনের কুয়াস কেটে যায়, বলে -- যাই,
ঠাকুরকে জিজ্ঞেসা কর ত-মাগুর মাছের ঝােল
হয়েছে কি ?
-ইয়েছে মা।
সাবান দিয়ে দেবার জন্যে রুমাল, গেঞ্জি, মােজা, খুকীর
জামা সব জড় করে মধুকে দিয়ে কমলা লাখীকে মাগুর মাছের
ঝােল ভাত খাওয়াতে বসে। লাখী একটু পেটবােগা, বাবা
মা দাদা দিদিদের সঙ্গে বার বার খাওয়াই তার কারণ। মুখ
তার সারা দিন টুটা চলছে। স্বামী তার জন্যে বকেন, আবার
বাবা,
মায়ের দিন
নিজেই দিতে ছাড়েন না, খাবার সময় সামনে এসে বসলে কিছু
মুখে না দিয়ে থাকা যায় না।
লাখীকে খাওয়াতে বসলেই চঁপু কোথা থেকে টলতে টলতে
চলতে চলতে এসে থালার কাছে থপ করে বসে পড়ে, বলে-
ম্যা ম্যা, ভত, ভত, তএর ওপর এমন একটা জোর দেয় সে না
হেসে থাকা যায় না।
সকালে কাজ হচ্ছিল দ্রুতগতিতে, বেন মেলগাড়ীর ইঞ্জিন
ছুটে চলেছে। এখন কাজ চলে ঢিমেতেলে। ভাড়ারঘরের
খুটিনাটি, বসার ঘরের টেবিল সাজানাে, শােবার ঘরের ঝাড়পোছ
চলে অলস ভাবে। এই ধূলােঝাড়া, গােছানো, সাজানাে, মােছা
যেন পরম উপভােগের সুখকর কাজ।
গিজ্জের ঘড়িতে বারােটা বাজে, দুপুরের বােদ ঝাঁ ঝাঁ করে,
গলির জনস্রোত, গাড়ী চলা মন্দ হয়ে আসে। খাঁচার ময়নাটা
ছাতু ছােল খেয়ে ঝিমােয়, শাশুড়ী ঠাকরুণ মাঝে মাঝে হাঁক
দেন, বৌমা, আর কত বেলা করবে ?
-এই যে মা, ছাদের কাপড়গুলাে তুলে যাচ্ছি।
ছাদের সিড়ির মাঝে জানলার কোণে কিন্তু দাড়াতে হয়,
পাশের বাড়ীর একটি মেয়ের অসুখ, খবরটা নেওয়া দরকার।
জানলায় দাড়াতেই পাশের বাড়ীর বৌ ডাকে,—দিদি, এখনও
খাওয়া হয়নি?
-দেখ না ভাই, কাজের কি আর শেষ আছে।
১৪
কল্পলত
—আর তােমার আবার যে-রকম ঝরঝরে কাজ ভাই।
তার পর জানলায় দাড়িয়ে সংসারের সুখ-দুঃখের কথা আরম্ভ
হয়। পাশের বাড়ীর বৌ বলে, মেয়েটার জ্বর আর ছাড়ছে না,
বাঙ্গালীর ঘরে অসুখ কি লেগেই থাকবে ? বউয়ের মেজাজ
আজ ভাল ছিল না, সংসারের টানাটানি। তার পর কমলার
কাছ থেকে দশ টাকা ধার চেয়ে বসে। কমলা জানায়, পাঁচ
টাকা সে কোনও মতে দিতে পারে, সন্ধ্যেবেলায় যেন বৌ
আসে। কিছু টাকা পাওয়া যাবে শুনে বৌএর মলিন মুখ একটু
উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, মেয়েটার ঔষধ-পথ্য টাকার অভাবে হচ্ছে না।
তার পর পাড়ার গল্প ওঠে, কার ছেলে পিকেটিং করে জেলে গেছে,
কার মেয়ে বােজ পিকেটিং করতে যায়, এত সাহসও আজকাল
মেয়েদের ! এবার পূজোয় খদ্দর ছাড়া কিছু কিনবে না ঠিক
করেছে, কিন্তু খদ্দরের বা দাম। তার পর কমলার নতুন চুড়ির
প্যাটার্ণ টা দেখতে চায়।
একটা ছেলের কান্নার শব্দ আসে, দুপুরের জানলায় নিভৃত
আলাপ ভেঙে যায়।
শাশুড়ী ঠাকরুণকে খাওয়াতে বসিয়ে নিজে খেতে বসতে দেড়টার
আগে হয় না, বাহিরে দালানে ঝি চাকররাও একসঙ্গে খেতে বসে।
খাওয়ার পরও কি কাজের বিরাম আছে? একগাদা সেলাই
পড়ে, ছেলেমেয়েগুলাে কাপড় ছিড়তে ওস্তাদ। তার পর এ সব
খদ্দরের কাপড় সেলাই করাও হাঙ্গামা। মণা কিন্তু খদ্দর ছাড়া
কিছু পরবে না, আর সেই বেশী ছেড়ে। তবু হাফ প্যান্ট করে
ঈড়া কিছু কমেছে।
মায়ের দিন নিঝুম অপরাহ, চাপু মেজেতে একটা কাথার ওপর ছােট বালিশ মাথায় দিয়ে ঘুমােয়। লাখী পাশে বসে অসম্ভব সব কথা বলে, মা, আচ্ছা তুমি বড় না বাবা বড় ? আচ্ছা, তােমার ত বাবার মত গোঁফ নেই, মেয়েদের থাকে না বুঝি? লাখীকে বুকে টেনে চুম খেয়ে কমলা বলে, চুপ কর লাখী, একটু ঘুমােনা বাছা। লাখী তার জন্তু-জানােয়ারের রঙীন ছবিভরা এ, বি, সি, ডির বইখানি নিয়ে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে নিজের মনে মনে কথা কয়। কখন তার চোখ ঘুমে ঢুলে পড়ে, কমলা তাকে কোলে টেনে সরু সুরে গান গেয়ে ঘুম পাড়ায়। ছাদে দু-একটা পায়রা বকবক করে। চারিদিক্ নীরব। জনহীন পথে একটা ফিরিওয়ালার ডাক করুণ সুরের মত ঘুরে ঘুরে ফেরে। একটা চিল ছাদ দিয়ে উড়ে যায়। নীচে চাকরেরা ও ওপরে ছেলেমেয়েরা ঘুমায়। বাড়ীখানা স্তব্ধ, যেন রৌদ্রময়ী রাত্রি, একটা মাছি ভন্ করে ঘােরে। লাখীকে শুইয়ে দিয়ে কমলার আর সেলাই করতে ভাল লাগে । আলমারীটা যেন টানে, যাদুমন্ত্রে ভােলায়। আলমারী খুলে সে সাজানাে কাপড়গুলি আবার সাজাতে আরম্ভ করে। কিন্তু আলমারী সাজানাে আসল ব্যাপার নয়, আলমারীর ওপরের তাকের পেছনে নীল সিল্কের রুমাল মােড়া দুটি ছােট্ট জামা বাহির করে, সে দু’টির দিকে চেয়ে মেজেতে বসে পড়ে, তার মন কোন্ অজানা দেশে উড়ে যায়—এই সময়টা তার দিন-রাতের সুখ দুঃখের কর্মের বাহিরে। জামা দু’টি তার প্রথমা কন্যার, এক বছর হতে হতে নিউমােনিয়াতে সে মারা গেছল; সে কতদিন, পনেরাে যােল বছর হবে। সেই প্রথম-জাতাকে হারানাের সুপ্তশােক ১৬ কল্প ল্পলতা অপরাহ্রে নিস্তব্ধ প্রহরে মনের অতল থেকে জেগে ওঠে,এখন সে শােকের দুঃখজ্বালা নেই, বেদনা গভীর নয়, রহস্যময়, মন কোন্ স্বপ্নলােকে চলে যায়। কমলা ভাবে, সে যদি আজ বেঁচে থাকত পাড়ার নীলিমার মত হয়ত সুন্দরী হত, হয়ত তার এতদিনে বিয়ে হয়ে যেত, ফুটফুটে থােকার মা হত, হয়ত সে। কিন্তু তাকে বড় ক'রে ভাবতে যেন সে পারে না, সেই এক-বচ্ছরের ননীর পুতুলটিই চোখে ভেসে ওঠে, চোখ ছলছল করে। জামা দুটি ভাল করে পাট করে তুলে রেখে আলমারী বন্ধ করে মেজেতে আঁচল পেতে সে বসে। এই অলস মধুর অপরাহু- টুকু তার স্বপ্ন দেখার, স্বপ্নবােনার, মন নিয়ে খেলা করার সময় কত কথা কত সাধ মনে হয়—ঘুমন্ত লাখীর দিকে চাপুর দিকে চেয়ে সাদা মার্বেলের ওপর কালাে চুল এলিয়ে সবুজ পাড় ছড়িয়ে শোেয়, কখন ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে। বারান্দার ঘড়িটা টিকটিক করে, সময় কেটে যায়, বাড়ী নীরব,—যেন রূপকথার ঘুমন্ত রাজকন্যার স্বপ্নপুরী। ঝনঝন শব্দে কড়ার শব্দ হয়, সদর দরজা নড়ে ওঠে। মধু ছুটে গিয়ে দরজা খােলে। দুড়দাড় করে ছুটে, দালান পেরিয়ে, সিড়িতে খটমট শব্দ করতে করতে মণ স্কুল থেকে আসে,-সমস্ত বাড়ী জেগে ওঠে। কমলার ঘুম ভেঙে যায়, চাপু চীৎকার করে কেঁদে ওঠে, ঘুম থেকে জেগে একটু কঁদা তার স্বভাব। বইয়ের ব্যাগটা মেঝেতে ছুড়ে ফেলে মণা তাকে ভােলাতে বসে। চাপু চুপ করলে ম লাখীর চুল ধরে টানে। কমলা ব’কে উঠলে, মণা,
মায়ের দিন
১৭
পকেট থেকে দুটো পেয়ারা বের করে বলে, তােমার জন্যে এনেছি
মা। কমলার আর বকুনি দেওয়া হয় না। শুধু বলে, জুতাে
পােল্, সার্ট ছেড়ে হাত-মুখ ধুতে যা’ ভূত কোথাকার।
—মা বডড ক্ষিদে।
হাত মুখ ভাল করে সাবান দিয়ে ধুগে, পপের যত ময়লা
গায়।
একটু পরেই মেয়েরাও স্কুল থেকে এসে পড়ে। কাপড় জামা
ছেড়েই রাণু চাপুকে আদর করতে বসে, স্কুল থেকে একটি ফুল
এনেছে, সেটি তার হাতে দেয় ।
কমলার সংসারের কাজ আবার আরম্ভ হয় । ছেলে-মেয়েদের
কাপড়-ছাড়া, হাত-মুখ-ধােওয়া তদারক করতে হয়। তার পর
সবাইকে জলখাবার দিয়ে চাপু ও লাখীকে দুধ খাওয়াতে বসে।
বেলা গড়িয়ে যায়, রান্নাঘরে আগুন পড়ে, বাড়ী ধোঁয়াতে ভ'রে
ওঠে। কমলা ঝিকে বকে, এত দেরীতে আগুন দিস্, এখন যদি
বাবু এসে পড়েন? স্বামী আসার আগে চুল বেঁধে গা ধুয়ে নিতে
হয়। শাশুড়ী ঠাকরুণ বলেন, এসাে বৌমা, চুলটা বেঁধে দি।
—নিজেই বেঁধে নিচ্ছি মা। আয়না নিয়ে চুল বাঁধতে বসে। চাপু
এসে আয়নায় উকি মারে, আপন মনে হাসে, মাথার ফিতেটা
টানে, চুল বাঁধতে দেরী হয়ে যায় ।
বড় জালাতন করিস্ সঁপি। চাপুর কিন্তু বকুনিকে গ্রাহ
নেই, নিজের মুখখানা আয়নায় দেখতে সে ব্যস্ত, চিরন্তনী নারী !
কোন দিন শাশুড়ী ছাড়েন না, চুল বাঁধতে বসেন। চুল বাঁধা
হলে সীমন্তে সিন্দুররেখা টেনে বলেন, জন্ম-এয়ােস্ত্রী থাকো,
১৮
কল্পলতা
আশীৰ্বাদ করি। মুখ রাঙা করে শাশুড়ীর পায়ের ধূলাে সীমন্তে
মুছে কমলা গা ধুতে যায়, বুক দুরদুর করে।
স্বামী আসার আগেই কমলা ফলের রেকাব, জলখাবারের
রেকাব সাজিয়ে, ধােওয়া কাপড় গুছিয়ে, ঘরে বসে থাকে, টুকটাক
কাজ করে, যেন প্রতীক্ষা করছে না, কাজ করছে।
ঘরে ঢুকেই খাবারের রেকাব দেখে স্বামী খুসি হন, কমলার
সদ্য সাবান-ধােওয়া গালে আদর করে বলেন, সাঙ্গ হয়েছে রণ !
তুমি এস এস নারি, আন তব হেমঝারি।
—যাও! হাগা, এ প্যাকটাতে কি ?
তােমার জন্যে নতুন শাড়ী।
-হ্যা! খালি ঠাট্টা। থােকার বিস্কুট এনেছ ?
-ওই
ভুল হয়ে গেল।
—দশটা টাকা দিতে হবে আজ।
—কাউকে দিতে হবে বুঝি ?
-না, আমার হাতে কিছু টাকা নেই।
-দেখ, কি সময় পড়েছে, এ টানাটানির বাজার, কিছু টেনে
খরচ করতে হয়।
এই রকম সংসারিক প্রেমালাপ কিছুক্ষণ চলে। বেশীক্ষণ
চলতে পারে না। সাজগােজ ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে খাবার খেয়ে
স্বামী যান বেড়াতে অর্থাৎ মিত্তিরদের বাড়ীর তাসের আড্ডায়
অথবা ইউনিয়ান ক্লাবে।
-ওগাে, আজ সকাল সকাল এসাে।
—হ্যা, বেণী রাত হবে না।
মায়ের দিন
কিন্তু সাড়ে নটা দশটার আগে আর বাড়ী ফেরা হয় না।
তার পর ভাড়ার-ঘরে রান্নাঘরে কাজের অবধি থাকে না।
ঠাকুরকে সব রান্নার জিনিষ দিতে, রান্না বুঝিয়ে দিতে সন্ধ্যে হয়ে
আসে। সন্ধ্যার শাঁখ বাজিয়ে ছাদে তুলসীতলায় প্রদীপ দিয়ে কমলা
প্রণাম করে। তারপর তার আর কাজের বেগে নিশ্বাস ফেলার
সময় থাকে না—দুধ জ্বাল, রুটি লুচি বেলা, কত কাজ ! কাজের
মাঝে মন উগুস্ করে, রাণু, লাখী ও চাপুকে নিয়ে মধু পাড়ার
পার্কে কখন বেড়াতে গেছে, এখনও ফিরল না কেন, মণাও এখনও
হকি খেলে আসে নি, শশাভাটা পাড়ার কোন্ বাড়ীর ছাদে আচ্ছা
দিচ্ছে। হাতের লেচিগুলাে কমলা তাড়াতাড়ি পাকায়।
কলরব করতে করতে ছেলেমেয়ের দল বাড়ীতে ঢােকে, সব মুখ
রাঙা, ঘর্মাক্ত। নানা অনিয়, অভিযােগ, আবদারে রান্নাঘরের
সামনে দালানটা মুখর হয়ে ওঠে। কমলার সে সব শােনার
অবসর থাকে না, সে রুটি বেলে। শাশুড়ী সিড়ির ওপর মালা
জপতে জপতে মাঝে মাঝে বলে ওঠেন, ওরে গােলমাল করিস
। মধু লাখীকে টানতে টানতে এসে বলে, মা, লাখুর ঘুম
পেয়েছে।
—দু’খানা গরম লুচি খাইয়ে দে না বাবা।
চোখ রগড়াতে রগড়াতে লাখী বলে, আমাল পটল ভাজা কৈ?
খেতে বসে কিন্তু লাখীর সব ঘুম চলে যায়, সে আর রান্না-ঘর
উঠতে চায় না। দাদা-দিদিরা যখন মাষ্টার মশাইএর কাছে
শােনা সেরে দালানে খেতে বসে, তখনও তার মুখ চলছে।
কল্পলতা সবার খাওয়া শেষ না হলে সে উঠতে চায় না। খাওয়া শেষে শােভা নিজে মুখ ধুয়ে লাখার হাতমুখ ধুইয়ে দেয়, বলে, চ, শুতে। দলবেঁধে হল্লা করে সবাই শুতে যায় ; চাপুর দুধের বাটি নিয়ে কমলা ওপরে আসে, সবাই কোথায় কি রকম শুল তদারক করে। চারটে বালিশ চার ধারে ঠিক আছে কি না তা দেখে লাখী নিশ্চিন্ত মনে শােয়। মণ স্কুলের গল্প করে ; রাণু বলে ওঠে, বেশী বক্ করিস নে, ঘুমােতে দে। হঠাৎ লাখী উঠে বসে, বলে, বিছানা বড় ঠাণ্ডা। অয়েল-ক্লথের ওপর কথা দিয়ে সে শােবে না, সে কি চাপুর মত ছােট ? মণা আমি বলে ওঠে, কিন্তু রাত্তিরে বিছানা ভেজাতে - রাণু বলে,-তুমিও ত বাপু সেদিন —ঃ ! সে বুঝি আমি—কথাটা ভােলা যে ভুল হয়েছে, তা মণা বুঝতে পেরে চুপ করে। চাপু মায়ের কোলে শুয়ে দুধ খায়, ছেলেমেয়েদের চোখে ঘুম ভরে আসে, ঘরের আলাে নিভে যায়, দালানের আলােটা মিটমিট করে জ্বলে, আবার বাড়ী নিঝুম নিদ্রিত হয়। ছেলেমেয়েদের ঘুম পাড়িয়ে কমলা সিড়ির পাশে দালানের কোণে একটা সেলাই বা একখানা বাংলা মাসিক পত্রিকা নিয়ে বসে। আজ সন্ধ্যেতে অজিত, কি নির্মল, কি সারদা, কেউ আসেনি, সেই কথা মনে পড়ে। এরা হচ্ছে পাড়ার ছেলে, তাকে দিদি বলে ডাকে। সন্ধ্যাবেলায় দালানে প্রায়ই তাদের বৈঠক বসে। কেউ ফাষ্ট ইয়ার, কেউ থার্ড ইয়ারে পড়ে। কাচ ব্রয়, মায়ের দিন ২১ তরুণ মন। সবাই এসে দিদির কাছে কত সংবাদ দেয়, কত অভিযােগ কত আবদার জানায়, সঙ্গে সঙ্গে চা, খাবার, মাঝে মাঝে মাছের কচুরি বেগুনি লাভ হয়। কি তর্ক করতে পারে ছেলেগুলাে। বাংলা মাসিকের একটা গল্প কমলা পড়তে আরম্ভ করে স্বামী- স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা হচ্ছে না, স্ত্রী স্বামীকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে—এই রকম প্লটের একটা গল্প। কি করে স্বামীকে সংসারকে ছেড়ে মেয়েমানুষ চলে যেতে পারে, কলা তা কল্পনা করতে পারে না। সেই দুঃখিনী হতভাগিনীর জন্যে তার চোখে জল আসে, গল্প পড়তে ভাল লাগে না, পত্রিকা মুড়ে রাখে। সিড়িতে মম জুতাের শব্দ হয়, কমলা চমকে ওঠে, তার চোখের তন্দ্রা চলে যায়, স্বামী আসছে । স্বামীকে খাইয়ে নিজে যখন খেতে বসে রাত এগারােটা বেজে যায়। তার পর ঝি চাকর খেলে রান্নাঘর দেওয়া হয়। সদর দরজা বন্ধ আছে কি না দেখে, ভাড়ার-ঘরে কুলুপ দিয়ে পাণ চিবােত চিবােতে কমলা যখন ওপরে ওঠে, দেখে, স্বামী দিব্যি খাটে শুয়ে, নাসিকা-গর্জন হচ্ছে। দালানে সে একটু চুপ করে বসে, আকাশে তারাগুলাে ঝিলমিল করে, গাছের পাতা কঁপিয়ে মৃদু বাতাস বয়। সুখনিদ্রা-শান্ত শিশুগুলির দিকে সস্নেহ নয়নে চেয়ে সে ভগবানের চরণে প্রার্থনা করে, এদের তুমি সুখে শান্তিতে রেখে। —ওগাে শুতে এসাে, রাত যে একটা হবে, বলে স্বামী পাশ ফেরেন।
২২
কল্পলতা
ধীরে ঘরে ঢুকে কমলা চাপুর পাশে শুয়ে নিমেষের মধ্যে ঘুমিয়ে
পড়ে।
এম্নি করে মায়ের দিনের পর রাত, রাতের পর দিন কেটে
যায়।
কিন্তু সেদিন যে কি অঘটন ঘটল কমলা তা নিজেই প্রথমে
বুঝতে পারেনি। মেথরের দল মিউনিসিপ্যালিটির ময়লা-ফেলা
গাড়ী হাঁকিয়ে অনেকক্ষণ চ'লে গেছে। মধু নিজেই উঠে সিড়ির
বারান্দা ধুয়েছে। বাইরে রােদ উঠে গেছে, কমলার তখনও ঘুম
ভাঙেনি। যখন সে জাগল, লজ্জিতভাবে দেখল, স্বামী উঠে
খাটে বসে, ছেলেমেয়েরাও জেগেছে, তবে মায়ের ঘুম ভেঙে যেতে
পারে ভেবে গােলমাল করছে না, ফিসফাস কথা হচ্ছে।
স্বামী বল্লেন, কি গাে, এত দেরী আজ, শরীরটা খারাপ?
—কেন, একদিন দেরী হতে পারে না। আমি কি কল না
কি, যে রােজ এক সময়ে উঠতেই হবে, না আমি কলের কুলি যে
ভােরের ভেঁ বাজলেই কাজে ছুটতে হবে !
-না, তা বলছি না।
কারুর দিকে হৃক্ষেপ না করে কমলা নীচে নেমে গেল। মায়ের
মেজাজ আজ সুবিধের নয় দেখে ছেলেমেয়েরা সেদিন হল্লা বা
বালিশ ছোড়াছুড়ি করতে সাহস করলে না।
সারা সকাল কোনও কাজে কমলার মন লাগল না, দেহ শ্রান্ত,
মনটা কেমন ভার, গত রাতে ভাল ঘুম হয়নি।
দেরীতে উঠে সব বিশৃঙ্খল হয়ে গেল সেদিন ; দশটা প্রায় বাজে
মায়ের দিন সব রান্না হল না, ছেলেমেয়েরা শুধু ডাল ভাত ও ভাজা খেয়ে স্কুলে গেল ; কমলা আপন মনে বলে উঠল, আমি কি মাইনে-করা চাকরাণী, আমার যেমন খুসি আমি কাজ করবাে। স্বামী স্নান করে এসে দাড়িয়ে বল্লেন,-ঠাকুর, যা হয়েছে দাও। সেদিন কমলা বিশেষ কিছু খেলে না, খেতে অরুচি। মধু ও বামুনঠাকুর খাওয়াতে কত পীড়াপীড়ি করলে, তাদেরও ভাল করে খাওয়া হল না। শাশুড়ী ঠাকরুণ বল্লেন, আজ শরীরটা ভাল, নেই বৌমা, শুয়ে থাকগে। কমলা মনে মনে বলে, হ্যা, শুয়ে থাকব, সংসারের কাজ কে করবে ? অপরাহে সে নিজের ঘরে এলিয়ে শুয়ে পড়ল, কোনও সেলাই বা বই হাতে নিলে না। লাখী একটা আবদার করতে গিয়ে থাপ্পড় খেয়ে কেঁদে ঘুমিয়ে গেল। কমলার মন বড় চঞ্চল মনে হল ; তার সেই প্রথম-জাতা কন্যার কথা বার বার মনে পড়তে লাগল। তার ছােট জামা দুটি বাহির করে বুকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে কঁদলে। কেন যে কঁদছে, তা সে নিজেও বুঝতে পারলে না ; কাঁদতে কাঁদতে মন হাল্কা হয়ে আসতে লাগল, বিদ্যুতের ঝিলকির মত তার মন চমকে উঠল, সে বুঝতে পারল, তার কি হয়েছে আজ ; মুখ প্রথমে গম্ভীর হল, তার পর রহস্যময় মধুর সুন্দর হয়ে উঠল। সারা দিনের কাজ সেরে রাতে যখন কমলা শুতে গেল, সে শশাবার ঘরে ঢুকল না, সামনের বারান্দায় লালপাড়ওয়ালা অচল পেতে শুয়ে পড়ল, তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে রইল, একটা তারা খসে পড়ল।
২৪
স্বামী কখন পাশে এসে বসেছেন জানতেই পারেনি। স্বামী
তার মাথায় হাত বুলাতে সে স্বামীর হাতটা নিজের হাতের মধ্যে
টেনে নিলে, স্নিগ্ধ স্বরে বল্লেওগাে ।
—কি।
স্বামীর মুখ তার মুখের উপর নত হয়ে পড়তে সে স্বামীর কানে
কানে কি কথা কয়ে রহস্যময় হেসে উঠল, তারাভরা আকাশ
ঝিকমিক করতে লাগলাে।
স্বামী হেসে বল্লেন—এই ব্যাপার? আবার আর একটি।
যেন কমলাই একমাত্র দায়ী !
অধরে আদর করে বল্লেন, তা বেশ, কাল দিদিকে চিঠি
লিখে দেবাে।
-না গাে না, অত তাড়াতাড়ি নেই, এখনও অত অকর্মণ্য
হইনি।
স্বামী তার তাম্বুল-রঞ্জিত আবেগ কম্পিত ওষ্ঠে চুম্বন করিলেন ।
কমলার চোখে ঘুম এল না। একবার ছাতে ঘুরে এল,
দালানে-ঝােলানাে বিদ্যাসাগর,
বিদ্যাসাগর, গান্ধী, চিত্তরঞ্জনের বাঁধানাে
ফটোগুলির সামনে দাড়িয়ে তাদের প্রণাম করলে। অমন
কোনও মহাপুরুষ তার গর্ভে জন্মাবে, অত পুণ্যবতী নয় সে, তবু
গর্ভবতী নাতার মানস-স্বপ্ন কে বল্তে পারে!
তারাগুলির দিকে চেয়ে কত কথা ভাবতে ভাবতে গভীর রাতে
কমলা ঘুমিয়ে পড়ল।
বেহালা
বৌদি তার ভ্রমরের মত কালাে জ বাঁকিয়ে হীরার মত জ্বলজ্বলে
চোখ কঁপিয়ে বললে,-না।
আবার বললুম, বৌদি আর সাধতে পারি না, একটা গান
শােনাবে কি না ?
বৌদি তার রাঙা অধর ফুলিয়ে সােনার দুল দুলিয়ে সাপের
কুণ্ডলীর মত সুন্দর খোঁপাটা নেড়ে বললে,-না।
বললুম, আচ্ছা, শােন বৌদি একটা গল্প বলছি, এ শুনে দেখি
তুমি কেমন গান না গাও!
বৌদি তার পানে-রাঙা ঠোট থেকে হাসির আবীর ছড়িয়ে বাড়
বাঁকিয়ে মুক্তার মালা একটু বাজিয়ে বলে, হাঁ, ভাই, বলত একটা
গল্প, এই ত বেশ, তা নয় খালি গান আর গান।
ধীরে বললুম, গেল বছর আমার ভারি মজার অসুখ করেছিল,
শুনেছ ?
আলতা মাখা পা দু’টি দুলিয়ে ইজি-চেয়ারে দেহ এলিয়ে ছােট
একটি ‘না’ বলে, বৌদি আমার গল্প শুনতে লাগল ।
শাড়ীর আঁচলটা ঘাড় থেকে ফেলে চেয়ারটা কাছে টেনে নিয়ে
আমি গল্প বলতে লাগলুম।
এই রকম রাত্তির বেলা। সমস্ত দিন অসহ্য গরম গেছে,
রাত্তিরে একটু ঠাণ্ডা হয়েছে। বিছানায় শুয়ে কিছুতেই ঘুম
কল্পলতা আসছে না। এই ইজি চেয়ারটা তখন আমার ঘরে থাকত। একটা নভেল নিয়ে ইজি-চেয়ারটায় শুলুম ; বিচ্ছিরি গল্পটার সুরু, প্রথমেই স্ত্রীর মৃত্যুশােকে স্বামী আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে। নভেলটা রেখে দিয়ে ভাবলুম একটু বেহালা বাজাই। বাক্স খুলে বেহালা বের করে দেখি, ছড়টা আবার ঠিক নেই, টেবিলের উপর বেহালা রেখে দিয়ে ইজি-চেয়ারটা বারান্দায় টেনে শুয়ে পড়লুম। সপ্তমী কি নবমী তিথি হবে, স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না, তারাগুলাে হীরের টুকরাের মত জ্বলজ্বল করছে, ফুরফুরে মিষ্টি হাওয়া বইছে, চোখে মুখে সমস্ত দেহে জ্যোৎস্না ঝরে পড়তে লাগল। কত কি যে হাবিজাবি হিজিবিজি মনে পড়তে লাগল, এই জ্যোৎস্নার কথা কবিরা কত রংএ, রসে, ভাবে, ছন্দে বলেছে, কত যুগের কত প্রেমিকার বিরহের দীর্ঘশ্বাস এতে মেশান, আরও কত কি কথা। জ্যোৎস্নায় যেন ভিজে সমস্ত দেহ-মন ঝিমিয়ে আসতে লাগল, ঠিক ঘুম নয়, চোখ বুজি, কালাে পর্দার ওপর কত কালাে অদ্ভুত মূৰ্ত্তি নেচে বেড়াচ্ছে ; চোখ মেলি, অতি সূক্ষ্মতন্তুময় ওড়নার মত জ্যোৎস্নার আলাে আমার ওপর বাতাসে কঁপছে! দেখ ভাই, মদ কি আফিম কখনও খাইনি, কিন্তু মনে হল যেন একটা নেশা করেছি। কবিরা যে বলে, চাদের আলােয় কি একটা মায়া আছে,মােহমন্ত্র পড়ে লােককে মাতাল করে তােলে তা খুব সত্যি ; জ্যোৎস্না যেন দেহের প্রতি লােমকূপ দিয়ে রক্তের সঙ্গে মিলে গেল, সমস্ত দেহ ঝিমঝিম করছে, যতরকম অসম্ভব কথা, আজগুবি কল্পনা মাথায় আসতে লাগল, এক আফিম-খােরের গল্প পড়েছিলুম, মনে হল ঠিক তার মত অবস্থা। একটু ভয় হল কিন্তু, নেশাটায় ধীরে ধীরে মসগুল হয়ে যাচ্ছি। ;
বেহালা
২৭
হঠাৎ যেন একটা সাদা পর্দা উড়ে গেল, জ্যোৎস্না আরও
উজ্জ্বল হয়ে উঠল, তারাগুলাে যেন নীলপরীদের মত প্রদীপ হাতে
করে আমার দিকে নেমে আসছে।
চোখ বুজে রইলুম। একটা গানের সুর কানে এসে বাজল,
বহুদূর হতে একটা করুণসুরের রেশ, স্তব্ধ নিশীথে অন্ধকার পথের
ধারে একটি বেণুর মৰ্ম্মরধ্বনির মত,—যেন মঙ্গল গ্রহে বসে কে
বেহালা বাজাচ্ছে, তারি অতি ক্ষীণ ঝঙ্কারধ্বনি কানে এসে
লাগছে।
সুরটা কাছে এল, মনে হ’ল তারালােক থেকে নয়,
পৃথিবীর বুক থেকে, এই অন্ধকার ঘুমন্ত বাড়ীর ভিৎ দিয়ে উঠে
আসছে, একটি করুণ মধুর বেহালার ঝঙ্কার। আরও কাছে
এল। না, মাটি থেকে উঠছে ; না, এ সুর যেন কোন অজানা
দেশ থেকে সাগর পার হয়ে দক্ষিণ বাতাসে ভেসে আসছে। আরও
কাছে, হ, এই বাড়ীতে, আমার ঘরের মধ্যে বসে কে বেহালা
বাজাচ্ছে ।
চোখ চেয়ে উঠে বসলুম, মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিলুম, কান দুটো
চুলকালুম। হাঁ আমার ঘর থেকেই ত বেহালার ঝঙ্কার আসছে,
অতি মৃদু, অতি মিষ্টি, একটি তার কেঁপে কেঁপে বাজছে।
অন্য সময় হলে হয়ত ভয়ে মুচ্ছা যেতুম, কিন্তু এ সুর কোন
সােনার স্বপ্নের মত, এত মিষ্টি যে কোনও ভয় হল না, তাছাড়া
কোনও নেশার ঘােরে যেন বাহিরের জগৎ ভুলে গেছলুম।
এবার বেহালার সব তারে ঝঙ্কার উঠছে, যেন একটা গিরি-
ঝর্ণা মুড়ির মল বাজিয়ে নৃত্য করতে করতে চলেছে। কত রকমের
;
২৮ কল্পলতা ; গান, কত সুর বেজে উঠছে। কখনও দক্ষিণ বাতাসে বসন্তের পুষ্পবন উতলা হয়ে উঠছে,-কুহু ডাকছে ; কখনও গ্রীষ্মমধ্যাহ্নে তপ্ত পবনে ঝরা-পাতার দীর্ঘশ্বাস,—ক্লান্ত কপােতের করুণ কণ্ঠ ; কখনও শ্রাবণের অবিরল বারি ঝরার ঝরঝরানি গান,—বেহালা যেন সুরে ক্ষেপে উঠছে, মেঘ ডাকছে, বজ্র আঁকছে, জল কলকল বয়ে ; চলেছে শেষে ধীরে ধীরে তারাগুলি কেঁপে কেঁপে স্তব্ধ হয়ে আসছে,-প্রেমিকের মৃদুগুঞ্জনের মত। এতক্ষণ সুরের মায়ালােকে ভুলেছিলুম, বেহালা বাজান থামতেই গা সির সির করতে লাগল, সুরগুলাে যেন ঘুরে ঘুরে হিমশীতল আঙ্গুরের ডগা দিয়ে গায়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে, কঁপতে লাগলুম, সে বেহালা-বাদক ত আমার ঘরেই বসে আছে । চুপ করে চেয়ারে বসে রইলুম । ঘরের স্তব্ধ অন্ধকার হুঁ করে আছে। একবার ঢোক গিলে বল্লুম-কে ? কোনও উত্তর নেই। জোর করে বলতে চাইলুম, কে বেহালা বাজাচ্ছিলে, ঘর থেকে বের হয়ে এস। কিন্তু গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, কোনও স্বর ফুটল না। ঘর নিঝুম, একটু শব্দ নেই। ভাবলুম, হয়ত আমার মনেরই ভুল, কিন্তু বেহালা ত স্পষ্ট শুনলুম, এখনও তার সুর কানে বাজছে। মরিয়া হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পা টিপে টিপে দরজার গােড়ায় এসে তাড়াতাড়ি সুইচটা টিপে আলাে জ্বালালুম। কেউ ঘরে নেই, বেহালাটা টেবিলের উপর অতি শান্তশিষ্ট নির্দোষী ছেলের মত স্থির হয়ে পড়ে আছে। টেবিলের উপর থেকে একটা মােটা বাঁধান শক্ত বই হাতে নিয়ে তক্তার তলা ঘরের কোণ সব দেখলুম। কেউ কোথাও নেই।
বেহালা মাথা ঝিম্ ঝিম্ করতে লাগল। কি আশ্চর্য্য! সত্যি কেউ ঘরে বসে বেহালা বাজাচ্ছিল, না, আমি কি স্বপ্নে বেহালা শুনলুম? বুকে হাত দিয়ে দেখলুন, বুকটা একটু দ্রুত তালেই ধুকধুক্ করছে। এক গেলাস ঠাণ্ডা জল খেয়ে, মাথায় চোখে মুখে জল দিয়ে শুয়ে পড়লুম। রাতে ঘুম ভেঙে যেতে লাগল, ভাল ঘুম হল না, সেই বেহালার সুরগুলাে যেন সাপের মত আমায় জড়িয়ে নেচে বেড়াচ্ছে। সকালের আলাে ঘরে আসতেই মনটা হাল্কা হয়ে গেল, রাতের কথা একেবারে ভুলে গেলুম। কিন্তু সন্ধ্যা হতেই ভয় হতে লাগল। যতক্ষণ বেহালা বাজে বেশ শুনতে লাগে, কিন্তু তারপর ? রাতে খেয়ে আর একা ঘরে যেতে সাহস হল না। খােকাকে বল্লুম, থােকা গল্প শুনবি আয়। থােকাকে ঘরে টেনে নিয়ে এলুম। তার সঙ্গে তাস খেলতে খেলতে তাদের ইস্কুলের মাষ্টারের গল্প, ছেলেদের গল্প, খেলার গল্প করতে করতে খানিকক্ষণ কাটল। দশটা বাজলেই সে বলে উঠল, দিদি, বড় ঘুম পাচ্ছে। অগত্যা তাকে ছেড়ে দিলুম। বেহালাটা ভাল করে বাক্সে বন্ধ করে ঘরের কোণে রেখে আলাে নিভিয়ে শুয়ে পড়লুম। বারান্দায় জ্যোৎস্নায় গিয়ে বসতে আর সাহস হল না। একটু তন্দ্রা এসেছে, ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। গুমরে গুমরে কান্নার মত অতি করুণ এক সুর ঠিক আমার তক্তার তলা থেকে আসছে, যে কোণে বেহালার বাক্স রেখেছি, সেই কোণ থেকে ক্ষুব্ধ বেদনার হাহাকারের মত বেহালার একটা তার কোন রুদ্ধ
কল্পলতা
।
আবেগে কেঁপে কেঁপে যেন এই ছিড়ে যাবে, অন্ধকার ছােট গর্তে
বন্দী পাখীর মত বেহালাটা যেন বাক্সের মধ্যে ছটফট করছে ; ক্ষুব্ধ
রােষে আর্তনাদ করে উঠছে।
বিছানায় উঠে বসলুম। তারের কঁাপনের সুরের সঙ্গে আপন
বুকের স্পন্দন ধ্বনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। একটা শব্দ হল, বেহালার
বাক্সের ডালাটা যেন খুলে মেঝেতে পড়ল, বেহালার তারে তারে
আনন্দের ঝঙ্কার উঠল
ভীত বিস্মিত চোখে কোণের অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইলুম।
অদ্ভুত অন্ধকারের রংটা, ঠিক কালাে নয়, কালাের ওপর স্নিগ্ধ
নীলের পর্দা কাঁপছে, সেখান থেকে কত রাগরাগিণী নটীর মত
সুরের নুপুর বাজিয়ে নৃত্য করতে করতে কোথায় চলে যাচ্ছে ।
অন্ধকারটা রিম ঝিম করছে। অন্ধকারটার দিকে চেয়ে যেন কোন
মন্ত্রশক্তিতে বিমুগ্ধ হয়ে স্থির হয়ে বেহালা বাজান শুনতে লাগলুম।
কতক্ষণ বেজেছিল বলতে পারি না। মুমূযু হংসের শেষগানের
মত করুণ সুরে বেহালার গান থামল। ঘরের অন্ধকার কঁপতে
লাগল। গা সিরসির করতে লাগল। মনে হল, অন্ধকার কোণে
ব’সে যে এতক্ষণ বেহালা বাজাচ্ছিল সে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
অন্ধকারে দেওয়াল হাড়ে আমার তক্তার পেছন ঘুরে মাথার কাছে
আসছে। গা ছম ছম করতে লাগল। চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, কে ?
আসার উসখুস শব্দ যেন থামল, বেহালার একটি তার অতি
মৃদু কেঁপে মিষ্টি সুরে বলে উঠল, আমি।
চেনা গলা, অনেক দিন আগে যেন শুনেছি। সাহস করে
বললুম, কে তুমি?
বেহালা
বেহালা আবার বেজে উঠল, আমি অসিত।
অসিত ? অমিয়ার দাদা?
হাঁ, আমি আর এখন অমিয়ার দাদা নেই, এক মাস হল আমি
দিল্লীতে নিউমােনিয়ায় মারা গেছি।
পাশ-বালিশটা আঁকড়ে ধরে কাঁপতে লাগলুম, নিরুপায় হয়ে
বললুম, আপনি কেন এখানে এসেছেন?
তােমাকে বেহালা শােনাতে। তুমি একবার আমাকে বেহালা
বাজাবার জন্যে অনুরােধ করেছিলে, মনে আছে ?
হাঁ, অমিয় সেদিন আমার কাছে দিনটা কাটাতে এসেছিল,
আপনি যখন তাকে বাড়ীতে নিয়ে যেতে এলেন, আপনাকে বেহালা
বাজাতে বলেছিলুম বটে।
অনেক রাত হয়েছিল বলে তখন বাজাতে চাইনি, বলেছিলুম,
আর-একদিন এসে বাজাব। তারপরেই দিল্লীতে চাকরী পাওয়ায়
কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হল।
দিল্লী যাবার আগের দিন দেখা করতে এসেছিলেন, সেদিনও
বাজাতে বলেছিলুম বটে
হাঁ, আমি, বলেছিলুম, দিল্লী থেকে ছুটির সময় এসে শােনাব।
সেই কথাটা রাখতে এসেছি।
এখন আপনি
আমি এখন প্রেতাত্মা, তােমার কোনও ভয় নেই।
বিছালর চাদরটা সর্বাঙ্গে মুড়ি দিয়ে শুয়ে বললুম, আচ্ছা,
এখন আপনি যান।
আর বেহালা বাজাব ?
কল্পলতা
চাদরের ভেতর থেকে কোনও মতে বললুম, না।
তােমাকে বলেছিলুম বেহালা শােনাব, তাই এসেছিলুম, আর
এসে শােনাতে হবে ?
অস্ফুটস্বরে বললুম, না। তারপর আপাদমস্তক চাদরে ঢেকে
বালিশে মুখ গুজে পড়লুম।
আচ্ছা Kreutzer Sonataটা শুনিয়ে যাই।
আবার বেহালার ঝঙ্কার উঠল, সুরগুলাে নটীর নূপুরের মত
ঘরে ঘুরে ঘুরে বেজে জুই ফুলের মত আমার বিছানার উপর ঝরে
ঝরে পড়তে লাগল, তক্তা, লেপ, চাদর, বালিশ সব সুরে কঁপতে
লাগল। যতক্ষণ বেহালা বাজছিল, যেন কোন সুধার স্রোতে
ভেসে যাচ্ছিলুম, কিন্তু যেই থামল, সমস্ত দেহ আবার সিরসির
করে কাঁপতে লাগল।
অসিত বললে, চললুম, নমস্কার।
তাকে কোনও উত্তর দিতে পারলুম না, বেহালার সুর ধীরে
বাহিরে ভেসে যেতে লাগল, দূরে আরও দূরে যেতে লাগল, অতি
করুণ ক্ষীণ হয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেল, তারালােকে মিশিয়ে গেল।
বেহালা থেমে গেল কিন্তু ঘরের অন্ধকারে বাহিরে পাণ্ডুর
জ্যোৎস্নায় বেহালার গানের সুরে ঝিমঝিম করছে, সারা রাত
বিছানায় চুপ করে চোখ বুজে পড়ে রইলুম, মাথায় সুরগুলাে
রিমঝিম করতে লাগল।
তার পরের রাত থেকে অবশ্য আর কেউ বেহালা বাজাতে
আসেনি।
আমি চুপ করলুম। বৌদি তার খোঁপাটা খুলে কোঁকড়া চুলগুলি
বেহালা
মেলে দিয়ে উঠে বসে বললে, হয়ে গেল গল্প ? মজার অসুখটা
কি হল ?
ও, মজার অসুখটা ; এর পর থেকেই মাথাটা কেমন ধরত,
সব সময়ে সেই বেহালার সুরগুলাে মাথার মধ্যে রিমঝিম করছে।
ভয় হল, মাথাটা খারাপই হয়ে যাবে নাকি। বাবাকে
একদিন চুপে চুপে সব কথা বললুম।
তখন দাদার এক বন্ধু
নতুন ডাক্তারি পাশ করে বেরিয়েছেন। বাবা একেবারে তাঁকে
আমার কাছে এনে সব কথা বলে দিলেন। আমি ত লজ্জায়
মরি। তবে প্রেকিপসন্টার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতে হবে। তখন
ইয়ােরাপের খুব বড় এক বেহালাবাদক কলকাতায় এসেছিলেন।
নতুন
ডাক্তারের উপদেশ হল, বােজ তার বেহালা বাজান শুনে
আসতে হবে। আশ্চৰ্য্য, দিন চার তার বেহালা বাজান শুনে
আমার মাথার দপদপানি সেরে গেল। কি মজার অসুখ, না ?
বৌদি তার কাল চোখে হাসি-কৌতুকের বিদ্যুৎ ঠিকরে বললে,
ও, সেই ডাক্তারটির সঙ্গেই বুঝি ৭ই
মুখ রাঙা করে বললুম, যাও, আচ্ছা এখনও গান শােনাবে না?
তার দুখানি সুডােল বাহু দিয়ে আমায় জড়িয়ে, লাবণ্যশিখার
মত আঙুল দিয়ে আমার গাল টিপে আদর করে বৌদি বললে,
বিরহের গান শুনতে ভারি ইচ্ছে করছে ? আচ্ছা, একটা
শােনাচ্ছি, ভাই। আমি বলছি, তাের বাসর ঘরে সারা রাত
গান গাইব। ভয় নেই রে, তাের বিয়ের লুচি না খেয়ে মরছি
, যে আবার ভূত হয়ে গান শােনাতে আসব। আর এখন ত
আর একা নও, ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকবে। ভয় কি।
হােটেলওয়ালা • ; সে বছর গ্রীষ্মকালে আমরা জার্মানীতে বেড়াতে গেলুম- সতীশ ঘােয, সিতাংশু সেন ও আমি। কোনের অপূৰ্ব্ব গির্জা রাইন-নদীতে ষ্টীমারে ভ্রমণ ; বন্-এ বিটোফেনের বাড়ি । বালিন কাইজারের দম্ভ, জার্মান-জাতির সভ্যতার রূপ, বিজ্ঞানের সাধনা- ক্ষেত্র ভোেগলালসার লীলাভূমি বার্লিন ; লাইপজিগ ; ড্রেসডেনে চিত্রশালা, অপেরা ; মনসেনে এসে ঘােষ আর নড়তে চাইলে না ; আমাদের প্ল্যান ছিল ভিয়েনা পৰ্যন্ত যাওয়া যাবে । সে বললে, বাকী ছুটিটা সে মুনসেনে কাটাবে, সিতাংশুর সঙ্গে গির্জার পর গির্জা ও আমার সঙ্গে চিত্রশালার পর চিত্রশালা ঘুরতে আর সে রাজী নয় ; সে জার্মানীতে এসেছে কতকগুলি প্রাচীন কালাে পাথরের গির্জা বা মেরী ও যিশুখৃষ্টের রংচঙে ছবি দেখবার জন্য নয়, সে এসেছে ‘লাইফ’ দেখতে, মুনসেনের বীয়ার ও অপেরা ছেড়ে সে আর কোথাও যাচ্ছে না। সিতাংশু বললে, আচ্ছা, ভিয়েনাতে নেই যাওয়া হল, কিন্তু রােথেনবুর্গে যেতে হবে ; দেখ, বেড-ডেকারে লিখছে, বরাথেনবুর্গ ইয়ােররাপের অতি পুরাতন শহর, মধ্যযুগের এক পরমসুন্দর রূপ কালের শাসন এড়িয়ে স্বপ্নের মত জেগে আছে, যেন সময়ের চলা থেমে গেছে এখানে,--চতুর্দশ পঞ্চদশ শতাব্দীর পরিখা-দেওয়াল- ঘেরা নগর, তােরণদ্বার, গির্জা, দুর্গের ধ্বংসাবশেষ হােটেলওয়ালা ঘােষকে মুনসেনে রেখে আমরা দু-জন বােথেনবুর্গের দিকে যাত্রা করলুম। ঢেউ-খেলান ছােট পাহাড়ের সারি, বার্চ বন, পাইন বনের ঘন রহস্য, তরঙ্গায়িত সবুজ প্রান্তরে গির্জার চূড়া ঘিরে লাল-টালি ছাওয়া ছােট ছােট কুঁড়েগুলি,ছােটনাগপুরের পার্বত্য সৌন্দর্যের সঙ্গে বাংলার স্নিগ্ধতা শ্যামলতা মেশান প্রাকৃতিক দৃশ্যপট। ছােট ট্রেন যখন রােথেনবুর্গে এসে থামল তখন সন্ধ্যা হয়-হয়, সবুজ পাহাড়ের গায়ে থাকে থাকে সাজান লাল রঙের ত্রিকোণ ছাদের বাড়ীর সারি, গির্জার চুড়া, তােরণ, স্তম্ভ সন্ধ্যারাগে ঝলমল আকাশের মায়াপটে আগুনের শিখার মত, যেন সবুজরঙের পেয়ালাতে রাঙা মদ গলিত স্বর্ণের মত টলমল । সিতাংশু বেড়ডেকার দেখে ঠিক করে রেখেছিল যে, রাট- হাউসের কাছে ‘রাটকেলার’ হােটেলে গিয়ে থাকা হবে। কিন্তু হােটেলে গিয়ে জানা গেল, ঘর খালি নেই, আমেরিকান ভ্রমণকারীর দল সমস্ত হােটেল দখল করে বসে আছে। সুটকেস-বাহক কুলিটি বললে, বুর্গটোরের কাছে একটি ভাল হােটেল আছে, তবে সে শহরের শেষ প্রান্তে হােটেল সােহাে’। এই মধ্যযুগের প্রাচীন শহরে হােটেল সােহহ! সেইদিকেই যাওয়া গেল। ‘হােটেল সােহাের’ ম্যানেজার জানালেন, সেখানেও স্থানাভাব, সেখানেও আর একদল মার্কিনদেশীয় ভ্রমণকারী ; আর যা দু-খানা খালি ঘর আছে তা আগামী কল্যের জন্য রিজার্ভ করা রয়েছে। সিতাংশু ম্যানেজারের সঙ্গে রীতিমত চেঁচামেচি শুরু করে দিলে, দেখুন, আমরা আসছি ভারতবর্ষ থেকে আপনাদের এই পুরাতন কল্পলতা শহর দেখতে, আর আপনি বলছেন, থাকবার জায়গা নেই– অতিথিদের প্রতি জার্মানীর এমন সময় ক্রমান্ধকারময় নির্জন পথ কার হাস্যে কেঁপে উঠল, হাস্য নয় অট্টহাস্য। ম্যানেজার বললেন, ওই হােটেলের মালিক আসছেন, ওঁকে বলুন। ছাই-রঙের সুট পরা একটি মােটা লােক আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন পথের বাঁক থেকে, যেন চারিদিকের ছায়া মূৰ্ত্তিমা সরব হয়ে উঠল। লােকটি যেমন স্কুল তার কণ্ঠস্বর তেমনি বাজখাঁই, গাল দুটি ফোলা ফোলা, বড় বড় চোখ দুটি ভাসা ভাসা, ষ্টেজের ভাড় বা সার্কাসের ক্লাউনের মত অঙ্গভঙ্গী,অথাৎ জীবনটা একটা পরিহাস, ফৰ্ত্তি করে নাও। অত্যধিক বীয়ার পানে স্ফীত উদর দুলিয়ে লােকটি অট্টহাস্যের সুরে বললেন,—কি ব্যাপার, এত হৈ-চৈ কিসের—হা, হা, শুভসন্ধ্যা বিদেশী অতিথিগণ, রবার্ট নয়মান, হােটেল সােহাের মালিক, আপনাদের ভৃত্যব্রেজিল ? পর্তুগাল ? সিনা—হা হা- সিতাংশু ক্ষুব্ধস্বরে বলে উঠল,ভারতবর্ষ, ভারতবর্ষ । আমরা আসছি- সিতাংশুর বাক্যগুলি তার কণ্ঠস্বরে ডুবিয়ে নয়মান বলে উঠলেন —ইণ্ডার-ইণ্ডার—কালকুটা, গুট- আমি ধীরে বললুম,-এখন আমরা লণ্ডন থেকে এসেছি, জার্মানী বেড়াতে, আপনার হােটেলে দুই-বিছানা-ওয়ালা একখানা ঘর পাওয়া যাবে কি? ক শঙন ? ও লগুন!
হােটেলওয়ালা
লণ্ডন কথাটা শুনে নয়মানের পরিহাস-উজ্জ্বল মুখ কেমন গম্ভীর
হয়ে গেল, থিয়েটারের ভঁড়ের মূৰ্ত্তি গেল বদলে। ম্যানেজারের দিকে
চেয়ে তিনি বললেন, সােয়ারসেনবেয়ার্গ, কোন্ ঘর খালি আছে ?
-কোনাে ঘর ত খালি নেই।
—কেন, আঠার নম্বর ?
—ও ঘর ত কালকের জন্যে রিজার্ভ, এক সুইস দম্পতী কাল
সকালেই আসছেন।
-আচ্ছা, কাল তাদের একটা ব্যবস্থা করে দেওয়া যাবে,
আপনি এদের আঠার নম্বরে বন্দোবস্ত করে দিন—আমার
লণ্ডনের প্রিয় অতিথিদ্বয়, আপনারা যতদিন খুশী এ হােটেলে
থাকুন, এ পুরাতন-শহরে ‘লাইফ এজয়’ করবার কিছু নেই, এ
লণ্ডন নয়, তবে আমাদের যথাসাধ্য আপনাদের মনােরঞ্জন করবার
ব্যবস্থা করব। আসুন, আপনাদের ঘর দেখিয়ে দিচ্ছি।
ডিনার খেয়ে শহরটা একটু ঘুরতে বার হওয়া গেল। আমাদের
দেশে সন্ধ্যার রক্তরাগ বড় ক্ষণিক, দিনের আলাে হঠাৎ নিবে
যায়, রাত্রির অন্ধকারের কালাে পর্দা চারিদিক ঘিরে ফেলে।
কিন্তু ইয়ােরােপে, বিশেষতঃ উত্তর-ইয়ােরােপে, গ্রীষ্মকালে সূর্যাস্তের
পর গােধূলির আলাে অনেকক্ষণ থাকে, রাত দশটা-এগারটা
পৰ্য্যন্ত। সেই গােধূলির আলােয় প্রাচীন শহরটি বড় সুন্দর
লাগল। সিতাংশুর ইচ্ছা ছিল, দ্বাদশ শতাব্দীর যে এক গির্জার
ধ্বংসাবশেষ কাছে কোথায় আছে, তার সন্ধান করবে। আমি
বললুম -- না, শহরে কোথায় ভাল কাফে আছে দেখ, সেখানে
বসা যাবে।
কল্পলতা রাত্রে যখন ফিরলুম তখন হােটেল সােহ সরগরম হয়ে উঠেছে ; একতলার সব ঘর আলােয় ঝলমল, বড় খাবার ঘরের মাঝের সব টেবিল সরিয়ে নৃত্যশালা হয়েছে, কাঠের দেওয়াল ও জানালার পাশে মদের পাত্র রাখার ছােট গােল টেবিল ও চেয়ারের সারি সাজান, এক কোণে নৃত্যের বাদ্য বাজছে, আর আমেরিকান ভ্রমণকারীদের দল হাস্যগীত-গল্পগুঞ্জরণের সঙ্গে নানা প্রকার মদ্যপানের অবসরে নৃত্যচটুল পদের আঘাতে কাচের মত মসৃণ কাঠের মেজে সঙ্গীতমুখর করে তুলছে, গ্লাসে গ্লাসে বীয়ারের ফেনা উপচে পড়ছে, মুখে মুখে হাসি ও গানের উচ্ছ্বাস। বাদ্যযন্ত্র বেশী নয়,একটি পিয়ানাে, দু’টি বেহালা, একটি হার্প ও দু’টি চেলল। আমাদের হােটেল-স্বামী নৃত্যের তালে দুলে দুলে একটি বেহালা বাজাচ্ছেন, চোখ দু’টি অজ্ব করছে, সান্ধ্য- সজ্জার কালাে কোটের লেজের মত পেছনটা বিজয়-পতাকার মত উড়ছে, উচ্ছাসের সঙ্গে বেহালার ছড়ি টেনে তিনি মাঝে মাঝে চেঁচিয়ে উঠছেন,Enjoy ladies and gentlemen enjoy, -valencia, la-la-la-la ; তার সঙ্গে নৃত্য উল্লসিত নরনারীগণ উজ্জ্বল হাস্যে গেয়ে উঠছেন - Valencia la-la-la la- সিতাংশু ও আমি বাইরে বাগানে বসলুম। একটু পরে নৃত্যের বাজনা থামল ; যারা নাচছিলেন, সবাই যে-যার চেয়ারে গিয়ে বসলেন, টেবিল থেকে মদের গেলাস তুলে পান করতে লাগলেন, নৃত্যের শ্রম দূর করে আবার নতুন নাচের জন্য বল সঞ্চয় করতে। হােটেল-স্বামী ঘরের মাঝখানে খালি জায়গাতে তাঁর বেহালা হাতে করে এলেন, সবার প্রতি নত হয়ে অভিবাদন করে ধীরে ;
হােটেলওয়ালা বললেন, প্রিয় আমেরিকান অতিথিগণ, ব্যাভেরিয়ার একটি অতি পুরাতন গান আপনাদের বাজিয়ে শােনাচ্ছি, খাটি ব্যাভেরিয়ার খাটি গ্রাম্য সুর- বেহালা বাজান সুরু হল, বড় করুণ ক্লান্ত সুর, একটু একঘেয়ে, অনেকটা আমাদের ভাটিয়াল সুরের মত, এ গ্রাম্যগীত শতাব্দীর পর শতাব্দী কত কৃষক-কৃষাণীর মুখে মুখে গীত হয়ে এসেছে। হােটেল-স্বামী উদাস চোখে করুণ ভঙ্গীতে বেহালা বাজিয়ে গেলেন, লােকটার মূৰ্ত্তি একেবারে বদলে গেল, কালাে কোটের পেছনটা আর দুলছে না, মাঝে মাঝে কেঁপে উঠতে লাগল । বেহালা বাজান শেষ হতেই সবাই করতালি দিয়ে উঠলেন। তারপর এক মধ্যবয়স্কা আমেরিকান মহিলা পিয়ানােতে গিয়ে দু- বৎসর ধরে তৎকালিক লণ্ডনে অভিনীত এক অপেরেটার জনপ্রিয় এক গানের ফক্সট্র-নৃত্যোপযােগী সুর বাজাতে আরম্ভ করলেন, তার বড, চুল দুলিয়ে, আবার নৃত্য সুরু হল। আমরা যে বাইরে বাগানে বসে আছি, তা হােটেল-স্বামীর চোখ এড়ায়নি। তিনি তার বেহালাটি বগলে নিয়ে আমাদের কাছে ছুটে এলেন,-শুভ সন্ধ্যা, ভারতীয় প্রিয় অতিথিদ্বয়, আপনারা বাহিরে বসে কেন? সম্মুখে এমন নৃত্যগীতের আনন্দ- নদী প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে, আর আপনারা তীরে বসে শুধু সুখলহরীর লীলা দেখবেন! ভাসিয়ে দিন্ তরী এ স্রোতে-- সিতাংশু হেসে বললে,-আমরা বড় শ্রান্ত। -শ্রান্ত! সব শ্রান্তি দূর হয়ে যাবে, আসুন নৃত্যশালাতে, কি ৪০ কল্পলতা ; পান করবেন ?—বীয়ার, মুনসেন বীয়ার, শাস্পেন্, লিকয়, ক্লারেট, সেন্ট জুলিয়ন নৃত্য গৃহে প্রবেশ করতে এক জার্মান মহিলা আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন অভ্যর্থনা করতে। লম্বা ছিপছিপে, কালাে সাটিনের গাউনের রেখা তীরভূমিতে ভেঙে পড়া ক্লান্ত তরঙ্গের মত ; টানা চোখ দুটির তারা ঘননীল, যেন রুবেল ফুল ; মুখখানি ফ্যাকাসে, শরত-শেষের পতনােন্মুখ বৃক্ষপত্রের মত সােনালী। হােটেল-স্বামী পরিচয় করিয়ে দিলেন,-ফ্রাউ আমেলিয়া মাগডালেন নয়মান, আমার স্ত্রী ; এরা প্রিয় ভারতীয় বন্ধু, লণ্ডন থেকে এসেছেন, হে সেন, হে চৌতুরী ( চৌধুরী)। সিতাংশু সহজেই আমেরিকান দলের সঙ্গে মিশে গেল। ফ্রাউ নয়মানের সঙ্গে এক পালা ফক্সট্রট নেচে আমি বললুম—চলুন, বাগানে বসা যাক্, ঘরটা বড় গরম। ঘরে স্থানাভাবও ছিল। দু-জনে বাগানে এসে বসলুম। নৃত্যের উত্তেজনায় ফ্রাই নয়মানের পীতপত্রবর্ণের মুখখানি একটু দীপ্ত রুক্ষ হয়ে উঠেছিল, বাহিরে এসে শীতল কোমল হয়ে এল ধীরে তিনি বললেন,--আজকের আমেরিকানগুলি বড় বেশী হৈ-চৈ করছে। এত গােলমাল আমার ভাল লাগে না। আমি বললুম, এরকম এক প্রাচীন শহরে এসে লণ্ডন প্যারিসের মিউজিক-হলের নতুন গান শুনতে বা চার্লষ্টোন্ নাচ দেখতে ইচ্ছে করে না, তার চেয়ে আপনার স্বামী যে প্রাচীন জার্মান গ্রাম্য গীত বাজালেন, বড় ভাল লাগল। -দেখুন, আজকালকার দিনে পবিত্র বলে কিছু নেই, এই হােটেলওয়ালা ৪১ শহরটা যে একটা মিউজিয়মের মত করে রাখা হয়েছে, তা শুধু নানা দেশের ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে টাকা লুটবার জন্যে, এ আমার ভাল লাগে না। —আপনার স্বামী কিন্তু আমােদে খুব মাততে পারেন। —ওঁর ঐ হৈ-চৈ করাটা অত্যধিক মদ খাওয়ার জন্যে, তা ছাড়া উনি ব্যাভেরিয়া —আপনাকে দেখে উত্তর-জার্মানীর মনে হয় । —ঠিক বলেছেন, আমার বাড়ি বেকে। -কিছু মনে করবেন না, অনেক জার্মান উপন্যাসে পড়েছি, উত্তর-জার্মানদের সঙ্গে ব্যাভেরিয়ানদের মানসিক প্রকৃতির বড় প্রভেদ, সেজন্য তাদের মধ্যে বিবাহ প্রায় সুখের হয় না । -অমন কথা সব ক্ষেত্রে বলা যায় না। তবে কথাটা খুবই সত্য। আমার মন্তব্য এত ব্যক্তিগত হওয়া উচিত ছিল না ভেবে লজ্জিত হয়ে একটু চুপ করলুম। সিগারেট কেসটা খুলে ফ্রাউ নয়মানের সম্মুখে ধরে বললুম-সিগারেট! ধন্যবাদ, আমি ধূমপান করি নে, আপনি স্বচ্ছন্দে খেতে পারেন। একটি সিগারেট ধরালুম। ফ্রাই নয়মান্ ক্লান্তসুরে বলতে লাগলেন,আপনি হয়ত ভাবছেন, আমি কেন এ-রকম বিবাহ করেছি, বিবাহ আমি স্বচ্ছন্দচিত্তেই করেছি, আমাদের বিবাহের একটা ইতিহাস আছে, আমার স্বামী গত মহাযুদ্ধের সময় আমার দাদার সঙ্গে একসঙ্গে বন্দী ছিলেন- ৪২ কল্পলতা বন্দী? কোথায় ? -আমি হচ্ছি আমার স্বামীর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। যুদ্ধের আগে আমার স্বামী লণ্ডনে থাকতেন। সেখানে সােহােতে তার এক রেস্তোরাঁ ছিল -- -সােহােতে ! সেজন্যেই বুঝি এ হােটেলের নাম হােটেল সােহাে। —ঠিক বলেছেন। লণ্ডনে সােহােতে তার রেস্তোরাঁ ছিল, তিনি এক ইংরেজ মেয়েকে বিবাহ করে সেখানে ঘর-সংসার পেতে বেশ সুখেই ছিলেন—তারপর যুদ্ধ বাধল, ইংরেজ গভর্ণমেণ্ট তাকে বন্দী করলে জার্মান বলে, আইল-অফ-মানেতে রাখলে বন্দী করে, তার দোকান বাজেয়াপ্ত হ’লআর তার স্ত্রী কোর্টে ডিভােসের জন্যে দরখাস্ত করলেন, তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেল। একটু থেমে ফ্রাই নয়মান বলে যেতে লাগলেন, যুদ্ধের পর উনি মুক্তি পেলেন, কিন্তু তখন তিনি ভাঙা মানুষ, মস্তিষ্কেরও একটু বিকৃতি হয়ে গেছল, সব সময়ে বিমর্ষ । আমার দাদাও ওঁর সঙ্গে আইল-অফ, মানেতে বন্দী ছিলেন ; তিনি ওঁকে আমাদের বাড়ী নিয়ে এলেন ; স্বদেশের অবহাওয়াতে আমাদের বাড়ীর প্রীতিতে সেবায় রবার্ট ধীরে ধীরে সেরে উঠল, আমাদের নূতন প্রেমের জীবন আরম্ভ হল। কিন্তু তখন কোন কাজকৰ্ম্ম পাওয়া শক্ত, আমার বাবার যা টাকা ছিল, সব দিয়ে তিনি যুদ্ধের ঋণ কিনেছিলেন, যুদ্ধের পর আমরা কপর্দকহীন। এমন সময় আমার এক দূরসম্পর্কীয় দাদামশাই মারা গেলেন, তাঁর দুই ছেলে যুদ্ধে মরেছে, সেই শশাকে বৃদ্ধ মারা গেলেন ; উইলে তিনি আমাকে এই হােটেলওয়ালা ৪৩ হােটেল-বাড়ীখানা দিয়ে গেলেন, আমরা নূতন বিবাহ করে একটা আশ্রয় পেলুম, কাজ পেলুম। তারপর এই কয় বছরে আমার স্বামীর তত্ত্বাবধানে হােটেলের নাম প্রসিদ্ধ হয়ে গেছে ; আমাদের চলে যাচ্ছে ; অতিথিদের মনােরঞ্জন করতে উনি ওস্তাদ—তবে আমার মাঝে মাঝে এত হৈ-চৈ ভাল লাগে না। কিন্তু জীবনটা ত নিছক সুখের জন্য নয়, দেখুন- ফ্রাই নয়মান শ্রান্ত হয়ে চুপ করলেন। আমি বললুম, আপনার জন্যে কোন পাণীয় অর্ডার দিতে পারি ? -না, ধন্যবাদ, কিছু না, আপনি কিছু পান করুন। —আমি একটা কফি নেব। –আচ্ছা, আমার জন্যও একটা কফি বলে দিন। ঘরের মধ্যে বাদ্যযন্ত্র সব নৃত্যের সুরের ঝঞ্চনায় মেতে উঠেছে, হে নয়মান্ সবাইকে মনােরঞ্জন করবার জন্যে একটি জার্মান গান গাইছেন—Ich habe mein Herz in Heidelberg verloren ( আমি আমার হৃদয় হারিয়েছি হাইডেলবেয়ার্গে ) ; মাঝে মাঝে রসিক টিপ্পনীর সঙ্গে গানের পদ ইংরেজীতে অনুবাদ করে দিচ্ছেন বাউলের মত হেলেদুলে নেচে, তাঁর মাথার টাকটা চক্চক্ করছে ; নৃত্যপাগল নরনারীদলে হাসির রােল উঠছে। বাহিরে আমরা দুজন চুপ করে বসে কফি পান করতে লাগলুম, পিছনে পঞ্চদশ শতাব্দীর বুরুজমণ্ডিত নগরততারণদ্বার সঙ্গীনধারী নিশীথ প্রহরীর কালো ছায়ার মত, নির্মল আকাশে তারাগুলাে দপদপ করতে লাগল, বহুশতাব্দীমলিন নগরপ্রাচীরে জ্যোৎস্নার মৃদু আলাে।
৪৪
নৃত্যশালায় হে নয়মানের আনন্দ-নৃত্য বড় করুণ মনে হল,
তার এ নাচগান কেবল মাত্র অতিথিদের মনােরঞ্জনের জন্য নয়,
কোন নিগূঢ় ব্যথাকে হাসির উচ্ছ্বাসে ভােলবার চেষ্টা।
নাচঘর থেকে সিতাংশুকে টেনে নিয়ে যখন শুতে গেলুম তখন
রাত একটা। নয়মা বললেন, এতক্ষণে ত কিছু জমেছে, এর মধ্যে
শুতে যাবেন ! কিন্তু দেখলুম, সিতাংশু এ প্রাচীন নগরের পুরাতত্ত্ব
আলােচনা ছেড়ে তার নৃত্যসঙ্গিনীর সঙ্গে কটেলের মিশ্রণ-তত্ত্ব
সম্বন্ধে যেরূপ ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে সুরু করেছে,
তাতে আর অধিক জ্ঞানলাভে বিপদ হতে পারে।
পরদিন সারাদিন ঘুরে বােথেনবুর্গ দেখা গেল। বিকেলে চা
খাবার পর সিতাংশু বললে,—আমার ভাই দেশে চিঠি লিখতে হবে,
আমি আর বেরুবাে না।
আমি নয়মানের সঙ্গে একটু বেড়াতে বের হলুম।
—আজ সকালে আপনাদের দেখাশােনা করতে পারিনি, ক্ষমা
করবেন, কাল রাত আড়াইটে পৰ্য্যন্ত নৃত্যগীত চলেছিল—
--আজ দুপুরে ত আমেরিকান দলটি চলে গেলেন।
-হাঁ, আজ রাতটা তেমন জমবে না, তবে কাল আর একদল
আসছেন। আমাদের পুরাতন কবরস্থান দেখেছেন? বড় সুন্দর
জায়গা, অমন ফুলের শােভা কোথাও দেখতে পাবেন না।
নগরের পরিখার অপর ধারে দিগন্তেমেশা ঢেউখেলান মাঠের
মধ্যে গােরস্থান, যেমন নির্জন তেম্নি নানা রঙের ফুলের শােভায়
অপরূপ ; সবুজ মাঠে যেন রঙের হােলিখেলা চলেছে, কত রঙের
কত রকমের অপূৰ্ব ফুল সব চারিদিকে ফুটে—শুভ্র লিলি অফ, मि
ন
হােটেলওয়ালা ৪৫ • ভ্যালি, রূপকথার পরীদের ঘন্টার মত ; নানাজাতীয় বন্য গােলাপ ডগ, বােজ, এগলেনটাইন ; লাল ক্লোভার, সাদা ক্লোভার ; ভ্যালেরাইন, চুনীর মত লাল ; ফক্সগ্লাভ, তার রাঙা পাপড়িতে সাদা-হলদে রঙের ফুটকি। নয়মান এক ভাঙা পাথরের ওপর বসলেন, চারিদিকের ফুলের রঙের মেলার দিকে চেয়ে বললেন,—এখানে বসে সূৰ্যাস্ত দেখতে বড় ভাল লাগে । অবাক হয়ে তার দিকে চাইলুম। ছাই রঙের সুট-পরা শান্ত- মূর্তি, করুণ মুখ, ক্লান্ত কণ্ঠস্বর, লােকটা একেবারে বদলে গেছে, অনেক বুড়াে দেখাচ্ছে, এই উদাস রূপ দেখে কে ভাবতে পারে এই লােকটা কাল রাত আড়াইটে পৰ্যন্ত নেচে গেয়ে ভাড়ামি করেছে। চুপ করে তার পাশে বসলুম। যেন আমাকে নয়, অপরাহের ম্লান আলাে ভরা আকাশ- প্রান্তরের প্রতি লক্ষ্য করে তিনি বলে যেতে লাগলেন,-আমার মেয়ে ফুল ভালবাসত, বড্ড ভালবাসত। হাঁ, আমার একটি মেয়ে আছে, আমি লণ্ডনে যে ইংরেজ-ললনা এলিজাবেথকে বিবাহ করেছিলুম, সে-ই তার মাসে মা মেয়ে যে কোথায় আমি তা কিছুই জানি নেহে চৌতুরী, গ্রেসেন এই ফক্সগ্লাভ বড় ভালবাসত, আর রুবেল আর ধীরে তিনি পকেট থেকে একটি ফটো য়্যালবাম বার করে নিজে একবার সব পাতা উল্টে দেখে আমার হাতে দিলেন। দেখলুম, গ্রেসেন নাম্নী একটি ছােট মেয়ের নানা বয়সের ফটোতে ভরা ; ছ’মাসের, এক বছরের, দু-বছরের, প্রতি জন্মদিনে তার ফটো নেওয়া ৪৬ কল্পলতা হয়েছে, বছরের পর বছর ; এগারাে বছরের পর আর ফটো নেই ; শেষের অনেকগুলি ধূসর রঙের পাতা খালি। হে নয় বলে যেতে লাগলেন,যখন যুদ্ধ আরম্ভ হ’ল তখন গ্রেসে বাবােয় পড়েছে, নভেম্বরে তার জন্মদিন ছিল, তার আগেই আমি বন্দী হলুম। বিবাহবিচ্ছেদের পর তার মা তার অভিভাবিকা হলেন, আমার আর কোন সম্পর্ক, কোন দাবী রইল না। যুদ্ধের শেষে 'যখন জার্মানীতে আসার অনুমতি পেলুম, আমি একবার আমার মেয়েকে দেখতে চেয়েছিলুম, আধ ঘণ্টার জন্য ; পনেরাে মিনিটের জন্য ভিক্টোরিয়া ষ্টেশনে আমাদের দেখা হয়েছিল, তখন তার মা আবার বিবাহ করেছেন ; তার স্বাস্থ্য বেশভূষা দেখেই বুঝলুম তার আর তেমন যত্ন আর হয় না। বড় আদরের মেয়ে ছিল। আমি কেঁদে ফেললুম ; সে নতমুখে নীরবে দাঁড়িয়েছিল, আমার কান্না দেখে বললে, বাবা, তুমি কেঁদো না, আমি ভালই আছি, তুমি জাৰ্মানীতে ফিরে যাও, সেখানে নূতন জীবন আরম্ভ কর, আমি যখন সাবালিকা হব তখন নিশ্চয়ই তােমার সঙ্গে জার্মানীতে গিয়ে দেখা করব, এরা এখন ত আমায় যেতে দেবে না- নয়মানের কণ্ঠ চোখের জলে ভিজে স্তব্ধ হয়ে গেল ; চারিদিকে নিস্তব্ধ গােধূলির আলাে। চুপ করে বসে রইলুম। দূরে গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠল সন্ধ্যারতির মত। নয়মান চমকে উঠলেন,—চলুন, আর দেরী নয় --আজ সন্ধ্যার ট্রেনে কয়েকজন সুইস্ আছেন। পথে যেতে যেতে হঠাৎ আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে কাতর- হােটেলওয়ালা ৪৭ স্বরে তিনি বলেন উঠলেন, দেখুন হে চৌতুরী, আপনি যদি আমার একটি কাজ করতে পারেন চিরজীবন আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব। দেখুন, লণ্ডনে গিয়ে আমার মেয়ের সন্ধান করতে হবে আপনাকে, এ নভেম্বরে সে সাবালিকা হবে, সে যদি আমার ঠিকানা জানতে পারে, নিশ্চয় সে আসবে আমার কাছে ছুটে। লণ্ডন থেকে এখানে বড় কেউ আসে না, আর আমার লণ্ডনের পুরাতন বন্ধুদের সঙ্গে কোন যােগ নেই, আমার মেয়েকে খুজে বার করতে হবে—জানি, বার করা খুব শক্ত। সেই জন্যেই ত আপনাকে বলছি, আমার জন্য সে প্রতীক্ষা করছে ধীরে বললুম,—আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব, কিন্তু অত বড় শহরে এক অজানা মেয়েকে বিনা ঠিকানায় খুঁজে বার করা -খুব সম্ভবপর হবে ! আমার মেয়ের নাম,—মার্গারেট এথেলমান, লণ্ডনে আমি শুধু ‘মান্ লিখতুম। কিন্তু বিবাহ- বিচ্ছেদের পর তার মা তার পিতার নাম নেন, ওয়েব ; এখন তিনি বিবাহ করেছেন একজন ব্রাউনকে। খুব সম্ভব আমার মেয়ের নাম বদল হয়েছে, মার্গারেট ওয়েব—এই ফটোখানি রাখুন আপনার কাছে, ব্লণ্ড, সুগভীর নীল চোখ —আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব। তার বেশী আর কি বলতে পারি ? -ধন্যবাদ, হের চৌতুরী, ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন। পরদিন সকালে বিদায় নেবার সময় ফ্রাই নয়মা স্যাণ্ডউইচ কেক ইত্যাদিভরা প্যাকেটটি আমাদের হাতে দিয়ে বললেন, হে চৌতুরী, মার্গারেটের সন্ধান করবেন নিশ্চয়। আমার একটি ৪৮ কল্পলতা ছেলে হয়েছিল, সে দেড় বছরে মারা গেছে, আর আমার ছেলেমেয়ে হবার সম্ভাবনা নেই। মার্গারেটকে যদি পাই, নিজের মেয়ের মত করে তাকে রাখব। লণ্ডনে ফিরে এসে একমাত্র কাজ হ’ল মার্গারেটকে খুজে বার করা। কিন্তু সে লণ্ডনে, না কানাডায়, না অষ্ট্রেলিয়াতে ; সে জীবিতা কি মৃতা, তা কে জানে? বৃথা এ সন্ধান। তবু রীতিমত খুজতে সুরু করলুম। টাইমস্ পত্রিকা, ডেলি টেলিগ্রাফ, ডেলি এক্সপ্রেস, লণ্ডনের প্রধান প্রধান দৈনিক সংবাদপত্রের ব্যক্তিগত কলমে ছাপালুম,- মিস্ মার্গারেট এথেলমান্ ওরফে ওয়েব, তােমার পিতা তমার সহিত দেখা করবার জন্যে বিশেষ অধীর, তুমি শীঘ্র-নম্বর পােষ্ট বক্সে চিঠি লিখবে। একমাস কেটে গেল, কোন চিঠি এল না। ইংরেজ ও ভারতীয় সকল বন্ধু পরিচিত-পরিচিতাদের বলে দিলুম, দেখ, মার্গারেট ওয়েব ওরফে মান নাম্নী কোন মেয়ের সঙ্গে যদি পরিচয় হয় বা তার খবর পাও, তৎক্ষণাৎ আমাকে জানাবে। সবাই সিদ্ধান্ত করে নিলে, নিশ্চয়ই কোন প্রেম-ঘটিত ব্যাপার। মুচকে হেসে বললে, নিশ্চয়ই, মার্গারেট ওয়েবের দেখা পেলেই ধরে নিয়ে আসব তােমার কাছে, কেউ বুঝি তাকে নিয়ে পালিয়েছে। আমার অনুসন্ধান ব্যাপারটা এত জানাজানি হয়ে গেল যে, পথে কোন বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলেই প্রশ্ন করে, কি হে, মার্গারেট হােটেলওয়ালা ৪৯ ওয়েব ওরফে মানের দেখা পেলে ? একদিন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে এক লােক এসে হাজির, তাকে সব কথা খুলে বললুম, দু-তিন দিন ইয়ার্ডের ডিটেকটিভ আপিসে হাঁটাহাঁটি করলুম, তারা কোন সন্ধান দিতে পারলে না। প্রতি সপ্তাহে হে নয়মানকে চিঠি লিখতুম, সন্ধান চলছে, শীঘ্রই খোঁজ পাওয়া যাবে। কিন্তু তিন মাস কেটে গেল, কোথাও কোন খোঁজ পাওয়া গেল না। শরৎকাল শেষ হয়ে শীতকাল এল। সকালে ব্রেকফাষ্ট খেয়ে ড্রয়িংরুমে আগুনের পাশে বসে কলেজপাঠ্য একখানি পুস্তক পড়বার চেষ্টা করছি, মেড এসে একখানি চিঠি দিয়ে গেল। খুলে দেখি ফ্রাই নয়মানের চিঠি, লিখেছেন,—মার্গারেটের সন্ধান ত এতদিনেও পাওয়া গেল না, এদিকে মার্গারেটের কথা ভেবে ভেবে আমার স্বামীর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে গেছে ; তিনি কিছুই খেতে চান না, বলেন, মার্গারেট হয়ত কোথাও না খেতে পেয়ে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার বি-পিতা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, হয়ত লণ্ডনের কোন স্লামে সে অসহায়। তার সকল আমােদমােদ রঙ্গ চলে গেছে, তা ছাড়া এখন ভ্রমণকারীদের দলও বড় আসে না। আমার স্বামী সারাক্ষণ বিমর্ষভাবে বসে ভাবেন ও মদ খান, এরকম করে কিছুদিন গেলে, মার্গারেটের দেখা না পেলে, তার মস্তিষ্কের বিকৃতি হবে। এদিকে কিছু দেখেন শােননন না বলে হােটেল চালান দায়। চিঠিটা পড়ে মন বড় খারাপ হ’ল ; নভেম্বরের লণ্ডনের কালাে আকাশ আরও কালাে বিষন্নতাময় মনে হল, যেন রাতে ও প্রভাতে ৪ কোন তফাৎ নেই। কি করা যায় ভাবছি, দ্বারে সজোরে করাঘাত হল। কাম-ই। —হালাে চৌ, গুডমর্ণিং । —হালাে মেরী । সকালে যে, মভ-রঙের ফকটিতে তােমায় বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে, এ সবুজ ফেল্টের টুপি কবে কেনা হল ? তার সঙ্গে কালাে ভেলভেটের রিবন, বেশ মানিয়েছে। আমায় কগ্রাচুলেট কর, অবশেষে আমরা এগেজড, হয়েছি। -সত্যি! মেরী মেকলে ছিল সতীশ ঘােষের প্রেমিকা। মেরী বলত সতীশ তার ফিয়াসে, আর সতীশ বলত মেরী তার বান্ধবী মাত্র। তাদের মান-অভিমানের অনেক ঝগড়া আমাকে মিটমাট করে দিতে হয়েছে। —শােন, আজ পার্ক রেস্তোরাঁতে আমাদের এনগেজমেন্ট- উৎসব উপলক্ষ্যে একটা ডিনারেট করতে হবে, তার সব ব্যবস্থা করা তােমার ওপর, সতীশকে দিয়ে ওসব হবে না কিন্তু তােমায় কেমন বিমর্ষ দেখাচ্ছে, তুমি তােমার সেই এটায়ুনাল মার্গারেটের কথাই ভাবছ নিশ্চয় ভুলে যাও তাকে, তােমার মত ছেলেকে ফে এমন করে ফেলে যেতে পারে। —মেরী, ব্যাপারটা তােমরা জান না, শােন। মেরীকে সব কথা খুলে বললুম, ফ্রাই নয়মানের চিঠিখানাও দেখালুম। সে বিষন্ন হয়ে উঠল, চিঠি পড়ে তার চোখে জল এল।
হােটেলওয়ালা
শৈশবে সে মাতৃহারা, পিতার আদুরে আবদারে মেয়ে ছিল, এক
বৎসর হ’ল তার পিতা মারা গেছেন।
মেরী বললে, আচ্ছা, মার্গারেটের ফটো তােমার কাছে আছে ?
নয়মা যে ফটোখানি দিয়েছিলেন, সর্বদা সেটি পকেটেই
থাকত, মেরীকে দিলুম।
ফটোটি কিছুক্ষণ চুপ করে দেখে মেরী বললে, দেখ, আশ্চৰ্য্য
আমার মুখ চেখের সঙ্গে মার্গারেটের অনেক মিল, নয়? মনে হয়,
আমার ছেলেবেলার ফটো।
-হ, আশ্চৰ্য্য।
-তুমি এক কাজ কর, তুমি লিখে দাও, তুমি মার্গারেটের
সন্ধান পেয়েছ, আমার একখানা ফটোও পাঠিয়ে দাও, আমি
মার্গারেটের নাম করে একখানা চিঠিও লিখে দিতে রাজী আছি।
—প্রস্তাবটা লােভজনক, কিন্তু
—কিন্তু কি ? তােমরা সব ধৰ্ম্মপুত্র? জীবনে কখনও মিথ্যা
কথা লেখনি, না লােক ঠকাওনি! তােমরা যে কত মিথ্যা
ভালবাসার ভাণ করে কত সরলা তরুণীদের প্রতারণা করেছ তার
হিসাব যদি করা যায়
কাকে প্রতারণা করেছি আমি।
ক্ষমা কর, আমি ব্যক্তিগতভাবে কিছু বলছি নে; কিন্তু
এখন হে নয়মানকে বাঁচান বিশেষ দরকার; বিশেষতঃ একবার
তার মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছিল, আবার ঘটবার খুবই সম্ভাবনা। তুমি
এখুনি চিঠি লিখে দাও, এ চিঠি না লিখলে আজ আমার উৎসবে
আমি কোন আনন্দ পাব না।
••
কল্পলতা হে নয়মানকে চিঠি লিখলুম, মার্গারেটের সন্ধান পেয়েছি ; সে লণ্ডনে আছে, ভালই আছে। তবে তার সঙ্গে দেখা করা বা পুত্র বিনিময় করা এখন যুক্তিযুক্ত নয়। তার এক বন্ধুর কাছে সব খবর পাওয়া গেছে, সে বন্ধুটি তার এখনকার একটি ফটোও দিয়েছেন, কিন্তু তার ঠিকানা বলতে রাজী নন। পর সপ্তাহে ফ্রাই নয়মান্ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে চিঠি দিলেন। তার স্বামী অনেকটা সুস্থ, কিন্তু তার মনে কেমন ধারণা হয়েছে মার্গারেটের বড় অসুখ। এ আইডিয়া তার মন হতে কিছুতেই দূর হচ্ছে না। মার্গারেটের কুশলসংবাদ দিয়ে আবার চিঠি দিলুম। ডিসেম্বরে লণ্ডনে শীত দারুণ হয়ে উঠল। খৃষ্টমাসটা ফ্রান্সে কাটাবার জন্যে এক বন্ধুর নিমন্ত্রণ পাওয়াতে লণ্ডন ছেড়ে প্যারিস গেলুম। জানুয়ারীর মাঝামাঝি যেদিন সকালে লণ্ডন ফিরলুম, পথঘাট ফগে ভরা। বাড়িতে পৌছাতেই মেড এসে এক টেলিগ্রাম দিলে, বললে, টেলিগ্রাম দু-দিন হল এসেছে, আমার ঠিক ঠিকানা জানা ছিল না বলে পাঠান হয় নি। টেলিগ্রাম খুলে দেখি নয়মানের টেলিগ্রাম, লিখেছেন—মার্গারেট কেমন আছে ? বড় চিন্তিত। শীঘ্র জানাবেন তার আবােগ্যলাভ সম্বন্ধে ডাক্তারদের মত কি ? টেলি গ্রাম পড়ে হতভম্ব হয়ে গেলুম। নয়মান কি সত্যিকার মার্গারেটের সন্ধান পেয়েছেন? সে কি সত্যই অসুস্থা? তাড়াতাড়ি মেরী মেকলেকে টেলিফোন করলুম, কেমন আছ তুমি?- -আমি খুব ভাল আছি। আজ গেইটিতে আসছ ত ?
হােটেলওয়ালা
-ইচ্ছে আছে ;
শােন হে নয়মান
টেলি গ্রামের কথা তাকে বললুম।
সে উত্তর দিল, আচ্ছা আমি যাচ্ছি শীগগীর, তুমি ততক্ষণ
বিশ্রাম করে নাও।
দাড়ি কামিয়ে হাত মুখ ধুয়ে বেশ বদল করে ঘরেতেই ব্রেকফাষ্ট
আনতে বললুম।
মেড এসে বললে, মিস মেকলে নীচে আপনার
জন্যে প্রতীক্ষা করছেন।
তাকে অনুগ্রহ করে ড্রয়িংরুমে একটু বসতে বল।
ডিম ও মাংসের ডিসটা অর্ধেক শেষ করেছি, মেড ভীত মুখে
ঝড়ের মত ঘরে প্রবেশ করে উদ্বেগের সঙ্গে বললে,-মিষ্টার চৌধুরী,
প্লিজ শীগগীর নীচে যান।
–কি হয়েছে ?
—আপনার সঙ্গে এক ভদ্রলোক দেখা করতে চান।
—কে বসাও ড্রয়িংরুমে।
—তাকে ড্রয়িংরুমে বসিয়েছিলাম -তিনি অদ্ভুত রকমের।
মিস্ মেকলেকে কি বলেছেন, তার গায়ে হাত দিতে গেছেন, ভয়ে
মিস্ মেকলে খাবার ঘরে পালিয়ে দরজা বন্ধ করে আছেন, আর
ভদ্রলােকটি ড্রয়িংরুমে বসে অদ্ভুত শব্দ করছেন—বিদেশী—এই
তার কার্ড
কার্ডে লেখা-রিচার্ড নয়মা!
ব্যাপারটা বিদ্যুতের মত মনে চমকে উঠল। টেলি গ্রামের
উত্তর না পেয়ে নয়মান লণ্ডনে ছুটে এসেছেন—ড্রয়িংরুমে মেরীকে
তার মেয়ে মনে করে আদর করে ধরতে গেছেন।
৫৪
মেডকে বললুম, মিস্ মেকলেকে বল, তিনি অনুগ্রহ করে
তাড়াতাড়ি তার বাড়িতে চলে যান, টেলিফোনে আমি সব
জানাব।
ড্রয়িংরুমে ছুটে গেলুম। দেখি পিয়ানাে-টুলের ওপর বসে হেয়
নয়মা শিশুর মত ফুপিয়ে কঁদছেন, ধূলােভরা কালাে এক ফার
ওভারকোটে সমস্ত দেহ আবৃত, মাথায় পুরাতন এক ধূসরবর্ণের
টুপি, হাতে ভিজে ছাতা, মলিন শুষ্ক মুখ দাড়িভরা, শুধু চোখ দুটো
আর নাকের ডগা রাঙা টক্ট করছে।
ধীরে বলুম, হে নয়মান, আজ সকালে প্যারিস থেকে
এসে আপনার টেলিগ্রাম পেলুম। আপনার মেয়ের কোন
অসুখের সংবাদ আমি ত পাইনি ; কে আপনাকে এ খবর দিলে ?
আপনি কাদছেন কেন ?
ভাঙাগলায় নয়মা বলে উঠলেন, আমার মেয়ে—আমার
মেয়ে আমাকে চিনতে পারল না ? আমাকে পিতা বলে অস্বীকার
করলে বুঝতুম, কিন্তু বললে,আমি তােমায় চিনি না !
-আপনি ভুল করেছেন, আপনি এখানে যাকে দেখেছেন,
সে আপনার মেয়ে নয়।
--আমার মেয়ে নয় ! আমার মেয়েকে আপনার কাছ থেকে
চিনতে হবে ? সেই চোখ, সেই কথা বলার ধরণ, সেই ঘাড়
নাড়বার ভঙ্গী—আমার মেয়ে নয়। বললে-আমি তােমায়
চিনি না।
—আমি সত্যি বলছি, আপনি ভুল করেছেন।
-ভূল করেছি? তাহলে আমার মেয়ে কোথায় ?
হােটেলওয়ালা
-আমি এইমাত্র লণ্ডনে আসছি, আপনার মেয়ে যে কোথায়
ল ঠিক বলতে পারছি নে, বােধ হয় লণ্ডনে নেই।
-আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারছি নে। আমি বেশ অনুভব
করছি, তার অসুখ করেছে, সে হাসপাতালে, ভারি অসুখ, মাঝে
মাঝে আমায় ডাকছে, বাবা বাবা ! অথচ এই ড্রয়িংরুমে যাকে
দেখলুম আমার মেয়ে বলেই মনে হল ।
—আপনি শান্ত হয়ে বিশ্রাম করুন, সব বুঝতে পারবেন।
ধীরে নয়মানের টুপি ওভারকোট খুলিয়ে রাখলুম। সােফায়
বসালুম। মেডকে কিছু খাবার ও কফি আনতে বললুম। ইংলিশ
ব্রেকফাষ্ট খেয়ে নয়মান কিছু প্রকৃতিস্থ হলেন। ভাগ্যক্রমে বাড়িতে
একটা শােবার ঘর খালি ছিল ; সে-ঘরে বিশ্রামের ব্যবস্থা করে
দিলুম। বিছানাতে শুয়েই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। সারাদিন
অকাতরে ঘুমােলেন। চার দিন চার রাত তার ঘুম হয় নি।
দাড়ি কামিয়ে স্নান করে সান্ধ্য-বেশ পরে নয়মা যখন
সন্ধ্যাবেলায় আমার ঘরে এলেন, একেবারে নুতন মানুষ, যেন কোন
তরুণ জাৰ্মান লণ্ডন-জীবন উপভােগ করতে এসেছেন।
–হের চৌতুরী, রাতটা একটু ‘এজয়’ করতে বার হওয়া যাক,
আসুন, লােহােতে আমার কয়েকটি মদের দোকান জানা আছে,
চমৎকার মদ!
সােহােতে এক ইতালীয়ান রেস্তোরাঁতে বেশ ভাল করে
খাওয়া গেল। নয়মানের ইচ্ছা ছিল, তারপর কোন মিউজিক হল
ও নৃত্যশালাতে যাওয়া, অথবা সােহাের মদ্যশালাগুলি পরিদর্শন
করা। আমি তাকে টেনে কভেন্টগার্ডেন অপেরাতে নিয়ে গেলুম।
এক ইতালীয়ান দল সে রাতে ভেয়ারদির রিগােলেত্তো অভিনয় করছিল। অপেরা দেখার পর থিয়েটার-পাড়ার এক কাফে-রেস্তোরাঁতে এসে বসা গেল। খাওয়াটা নয়মানের উপলক্ষ্য মাত্র, মদ্য পানই উদ্দেশ্য ; একটা লােক যে কত রকমের মদ কত পরিমাণে পান করতে পারে তা দেখে অবাক হলুম। —গু, সেয়ার গুঢ় হে চৌতুরী ! -ভাল লাগছে মদটা। ইয়া ! লণ্ডনেও ভাল মদ মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। বেশ, খুব ভাল, I ain happy with life-খুব ভাল—আপনি বলছেন ওই মেয়েটি আমার মেয়ে নয়, গ্রেসেন নয়, বেশ, মেনে নিলুম আপনার কথাও আমার মেয়ে নয় --তাহলে আমার মেয়ে কোথায়—আপনি বলছেন, জানি নে, বােধ হয় লণ্ডনের বাইরে আপনি জানেন না, কারণ আজ সকালে আপনি প্যারিস থেকে লণ্ডনে এসেছেন, বেশ, মেনে নিলুম-আপনি তার কোন অসুখের খবর পান নি, খুব ভালও মেয়েটি আমাকে বাবা বলে চিনতে চাইল না, তা যখন সে আমার মেয়ে নয় তখন কি করে আমাকে পিতা বলে চিনবে—ভাল, খুব ভাল হেয় চৌতুরী—আপনি শুধু কফি খাবেন? একটা লিকয়র—বেনেডিক্টি? -না, ধন্যবাদ। -বেশ, আচ্ছা, একটা সিগার ? হে ওবার- -ধন্যবাদ। মেয়েটি গ্রেসে নয়, কিন্তু তার মত ঠিক দেখতে। আচ্ছা, হােটেলওয়ালা আমার মেয়ে মার্গারেট তা হলে কোথায়—‘প্ৰােজিট’ হের চৌতুরী—কোথায়, আমরা জানি না, বেশ, একবার তার খবর পাওয়া গিয়েছিল, আবার সে হারিয়ে গেছে, বৃহৎ পৃথিবীর হাজার হাজার মেয়েদের মধ্যে হারিয়ে গেছে—কোনদিন আর তাকে দেখব —আমি তার পক্ষে মূত, সে আমার পক্ষে মৃতা-মৃত, হাঁ, আমা- দের দুজনের মধ্যে যুদ্ধে মৃত হাজার হাজার শবদেহের স্তুপের বিরাট ব্যবধান -তা আমি ভুলে গেছলুম—গুট সেয়ার গুঢ় হে চৌতুরী। সহসা নয়মান মদের গেলাস হাতে দাড়িয়ে উঠলেন—হে আমার অজ্ঞাতবাসিনী কন্যা, তােমাকে আমি হয়ত কখনও দেখব —তুমি—তুমি সুস্থ হও—তুমি সুখী হও- এক চুমুকে গেলাসের সব মদ খেয়ে চেয়ারে বসে তিনি হাঁপাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে ট্যাক্সি করে তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে হল। পরদিন সকালে নয়মা চলে গেলেন। ষ্টেশনে বিদায় নেবার সময় মেয়ের কথা কিছুই বললেন না। ট্রেন ছাড়লে চেঁচিয়ে উঠলেন, গুডবাই লণ্ডন, গুডবাই ইংলণ্ড, আশা করি আর তােমার সঙ্গে দেখা হবে না। সাতদিন পরে। লণ্ডনের শীতের সকাল যেমন কালাে তেমনি ঠাণ্ডা, তেমনি বিমর্ষ ; টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। ব্রেকফাষ্ট খাওয়া তখনও শেষ হয় নি, সহসা মেরী মেকলে এসে হাজির, কালাে গাউন পরা, মুখ মলিন, হাতে একখানা ভিজে সংবাদপত্র। তার বিষয় রূপ দেখে মন দমে গেল। -কি খবর মেরী ? কোন দুঃসংবাদ ? ;
৫৮ কল্পলতা -তােমার মার্গারেটের খোঁজ পেয়েছি। আর সে কিছু বলতে পারল না। সেদিনকার টাইমস্ সংবাদ- পত্র খুলে প্রথম পৃষ্ঠায় মৃত্যু-সংবাদ স্তম্ভটিতে একটি নাম দেখিয়ে হাতের কাগজটি এগিয়ে দিলে। লেখা রয়েছে- চেরিংক্রস হাসপাতালে এক অস্ত্রোপচারের পর, সহসা কিন্তু অতি শান্তভাবে, দুই সপ্তাহের রােগভােগে একুশ বৎসর বয়সে মার্গারেট এথেলমান, আমাদের অতি প্রিয় কন্যা তারপর কোন্ চার্চে কখন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ধৰ্ম্মানুষ্ঠান হবে, কোন্ কবরস্থানে গাের দেওয়া হবে, তা লেখা আছে। লেখাটা তিনবার পড়লুম, অক্ষরগুলি চোখের ওপর নাচতে লাগল, কাগজটা হাত থেকে মেঝের কার্পেটের ওপর পড়ে গেল ; কাঠের পুতুলের মত বসে রইলুম চেয়ারে। মেরী বললে,—ওঠ ড্রেস করে নাও, সতীশ আর দু-চারজন বন্ধুকে এখানে আসবার জন্যে টেলিফোন করছি, সময় বেশী নেই; ক্রাইষ্ট চার্চ অনেক দূর, বারােটায় সার্ভিস, কিছু ফল কিনে নিতে হবে। • “হাঁ, ফুল, অনেক ফুল, সে খুব ফুল ভালবাসত ; ফল্পগ্লাভ পাওয়া যাবে, ব্লবেল- -না, ও-সব ফুল এখন পাওয়া যাবে না, গােলাপ ক্রিসেন- থেমামে ভরে দেব। গােরস্থান থেকে ফিরে এসে সমাধিক্রিয়ার সব বিবরণ দিয়ে ফ্রাউ নয়মানকে চিঠি লিখলুম, টাই পত্রের পাতাটিও কেটে পাঠালুম।
হােটেলওয়ালা পর সপ্তাহে তাঁর চিঠি এল। স্বামীকে তাঁর কন্যার মৃত্যুসংবাদ জানিয়েছেন, তাতে তিনি বিশেষ বিচলিত হন নি। বস্তুতঃ, লণ্ডন থেকে ফিরে এসে পর্যন্ত তিনি বলেছেন, তাঁর কন্যা মৃতা, তাঁর পক্ষে মৃতা ; তার সম্বন্ধে তিনি আর কোন খবর জানতে চান না। এখন সারাক্ষণ তিনি মদে চুর হয়ে থাকেন। মাসের পর মাস কেটে গেল। আবার সুন্দর গ্রীষ্মকাল। এবার কন্টিনেন্টে লম্বা পাড়ি দিলুম, বকাল পর্যন্ত। ফেরবার পথে নয়মান-পরিবারের সঙ্গে দেখা করে আসতে বড় ইচ্ছে হল ; বহুদিন তাদের খবর পাইনি। নুর বেয়ার্গ থেকে মােটরকারে রােথেনবুর্গে পৌঁছালুম দুপুর- বেলা। হের নয়মা আমাকে দেখে আনন্দে লাফিয়ে প্রায় বুকে জড়িয়ে ধরেন—ওয়েলকা ব্রাদার চৌতুরী, কি সৌভাগ্য! সেই প্রাচীন শহর, সেই পুরান হােটেল সােহ, কিন্তু সব কেমন অদ্ভুত অস্বাভাবিক অপরিচিত মনে হল। খাবারের ঘরে খেতে বসে দেখি, দু-দিকের দুই দেওয়ালে দু’খানি মস্ত ফটো এনলার্জমেন্ট, সােনার জলের ফ্রেমে বাঁধান, একটি মৃতাকন্যা মার্গারেটের ছবি, বারাে বছরের গ্রেটসেন ; আর একটি ফ্রাই আমেলিয়া মাগডালেন নয়মানের। —হের চৌতুরী, আপনাকে জানান হয়নি, আমার দ্বিতীয় স্ত্রী গত মার্চ মাসে মারা গেছেন; এখানকার আবহাওয়া তার সহ হচ্ছিল না। আর এক গেলাস বীয়ার হের চৌতুরী, হাল্কারঙের
কল্পলতা
আনা !
আনা-এক গেলাস হাল্কারঙের—আচ্ছা আর এক
গেলাসও নিয়ে এসাে--
ডগডগে লাল ফ্রকের ওপর ছাপান নীল ফুলের সাদা য়্যান
পরে এক অতি স্থূলকায় বেঁটে মধ্যবয়স্কা স্ত্রীলােক পাঁচ আঙুলে
দুইটি বীয়ারের গ্লাস নিয়ে আমাদের সামনে এলেন।
—ইনি আমার নতুন স্ত্রী, আনা,-হে চৌতুরী আমাদের প্রিয়
ভারতীয় বন্ধু, লণ্ডন থেকে আসছেন। একটু বােসস আনা।
আনা কিন্তু বসলেন না। তার অনেক কাজ।
-বুঝলেন কি-না হের চৌতুরী, হােটেল চালাতে একজন কর্তী
থাকা বিশেষ দরকার, না হলে অতিথিদের ঠিক মত সমাদর করা
যায় না।
সন্ধ্যার সময় নয়মানের সঙ্গে বেড়াতে বার হলুম। নগর-পরিখা
পার হয়ে সেই কবরস্থান। তেনি লিলি ক্লোভার ফক্সগ্লাভ, নানা
রংএর ফুলের মেলা, তেমি সুন্দর নীলাকাশ, গােধূলির রাঙা আলাে ;
বড় করুণ লাগল সব।
দুইটি কবর পাশাপাশি ; একটি দ্বিতীয় জাউ নয়মানের, তার
পাশে একটি নকল গাের মার্গারেটের।
নয়মা কতকগুলি ফুল তুলে দুই সমান ভাগ করে দুই কবরের
ওপর ছড়িয়ে দিলেন, তারপর ঘাসের ওপর বসে পড়লেন।
-এখানে বসে সূর্যাস্ত দেখতে বড় ভাল লাগে। রােজ সন্ধ্যা-
বেলায় এখানে এসে বসি।
আমি চুপ করে এক ভাঙা পাথরের ওপর বসলুম।
-আচ্ছা হে চৌতুরী, আপনার কি মনে হয়, সে রাতে
হােটেলওয়ালা । রেস্তোরাঁ আর অপেরাতে না গিয়ে আমরা যদি লণ্ডনের সব হাস- পাতাল ঘুরে ঘুরে গ্রেটসেনের সন্ধান করতুম, তাহলে হয় ত তার দেখা পেতুম। সে বাঁচত না জানি, তবু তাকে একবার দেখতে পেতুম। অশ্রুজলে নয়মানের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। চারিদিকে সন্ধ্যার ছায়া ঘনিয়ে এল। দূরে গির্জার ঘণ্টা বেজে উঠল সন্ধ্যারতির —চলুন, দেরী হয়ে যাচ্ছে, টমাস কুকের এক দল ভ্রমণকারী সন্ধ্যার ট্রেনে আসছে। রাতে ডিনারের পর শহর ঘুরে আবার বাগানে এসে বসলুম। ভেতরে নৃত্যশালা সরগরম। কুক-কোম্পানীর ভ্রমণকারী নর- নারীরদল জীবনের আনন্দ উপভােগ করে নিতে তৃষিত চঞ্চল— ট্যাঙ্গো ফক্সট্র চালসষ্টোন-নৃত্যের পর নৃত্য, সুরা পানের পর সুরা পান। মাঝে মাঝে নয়মান্ তার কালাে কোটের লেজটা দুলিয়ে বার্লিন বা প্যারিসের কোন নূতন অপেরেটের হাস্যকর আদিরসাত্মক গান গেয়ে সটীক অনুবাদ করে সবার মনােরঞ্জন করছেন। আর তার তৃতীয় স্ত্রী স্থলাকায় আনা, কালাে ভেলভেটের এক গাউন পরে পিয়ানাে বাজাচ্ছেন অতি প্রাণহীনভাবে। -এই যে আমার ভারতীয় ব্রাদার, বাইরে বসে কেন! আসুন নৃত্যশালাতে, সম্মুখে এমন নৃত্যগীতের আনন্দ-নদী প্রবাহিত, আর আপনি চুপ করে তীরে বসে থাকবেন, ঝাপিয়ে পড়ুন এস্রোতে ধন্যবাদ হে নয়মান, আমি এখানে বেশ আছি।
৬২ কল্পলতা -বেশ, খুব ভাল, যেমন আপনার খুশী-বীয়ার শাম্পে শুধু কাফি! ভাল, খুব ভাল ! এ গানটা শুনেছেন- I want to be happy but I can't be happy-ha! ha! la la! ha! ha! তাঁর সে অট্টহাস্য কান্নার চেয়েও করুণ হতাশাময়। পরদিন প্রভাতে যখন হােটেল সােহদা ছেড়ে এলুম হে নয়মানের সঙ্গে দেখা হল না, রাত দুটো পৰ্য্যন্ত নৃত্যগীত চলেছিল, তিনি সকালে শ্রান্ত হয়ে নিদ্রিত।
লতিফের গান ঘ্যং ঘ্যং ঘড় ঘড়, কড়, কড়, ঘং ঘং-টং। ছাপিবার কলের গান দীপক-তানে লতিফের কানে বাজিয়া তাহার ঘুম ভাঙাইয়া দিল। যে গলির ছাপাখানায় সে কাজ করে তাহারই সম্মুখের বস্তিতে এক ছােট মাটির ঘরে প্রভাতের আলােয় সে জাগিয়া ময়লা বিছানা হইতে লাফাইয়া উঠিল। ছাপাখানায় কলের গান নয়, কোন্ অজানা কবির গান তাহার প্রাণে উচ্ছসিত, বিছানা তুলিতে তুলিতে হাত-মুখ ধুইয়া চা খাইতে খাইতে বালক-মনের সরল সুখে নূতন দিনের জাগরণের আনন্দে স্বকল্পিত সুরে করিয়া সে গাহিতে লাগিল- ‘আলােকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও। এই একটি মাত্র লাইনই সে জানে। গলির মােড়র ছাপাখানায় যাইলেই দেখিতে পাওয়া যায়, লতিফ ছাপিবার কলের পাশে এক বড় উচু টুলে বসিয়া আছে। কলেতে ছাপিবার কাগজগুলি ঠিক করিয়া রাখিয়া দেওয়া তাহার কাজ। পরণে, লাল-নীল চেক-কাটা এক ময়লা লুঙ্গি, গায়ে প্রায় কিছুই থাকে না, কখনও লাল কি নীল রঙীন গেঞ্জি গায়ে ওঠে কিন্তু সেটা শীঘ্রই ছাপাখানার কালিতে চিত্রিত হইয়া যায় ; কচি বাঁশের মত সুকুমার মুখখানি সুন্দর নয় বটে কিন্তু কি করুণ মধুর • ৬৪ আভা-মাখান, নাকটা একটু থ্যাবড়া, ঠোট মােটা, হলদে ময়লা কয়েকটা দাত উচু হইয়া বাহির হইয়া আছে, গালে কয়েকটি কাল দাগ, তাহার সঙ্গে ছাপার কালির দাগও আছে, উস্কখুস্ক চুলগুলি কখনও মুখের উপর ঝুলিয়া পড়ে, কখনও চারিদিকে ছড়াইয়া থাকে। কিন্তু তাহার চোখ-দুটি অতি সুন্দর, চোখে সব সময়ই একটু উদাস শান্ত দৃষ্টি, চোখের মধুর আলাে সমস্ত মুখে স্নিগ্ধ আনন্দের আভা মাখাইয়া দিয়াছে, শুধু মাঝে মাঝে চোখে একটা শঙ্কিত উদাস ভাব জাগিয়া উঠে, মুখখানি ক্ষুব্ধ ব্যথিত হয়। তাহার হাত আঙ্গুলগুলি বেশ পরিষ্কার কিন্তু সমস্ত দেহ ময়লার ভরা, ছাপার কলের মতন কালাে। কলটা যখন চলে, সে টুলটায় উবু হইয়া বসিয়া এক একখানি কাগজ ঠিক বােলারের মুখে বসাইয়া দেয়, তখন চোখে সজাগ তীক্ষ দৃষ্টি জাগিয়া উঠে, মুখখানিতে একটু শঙ্কিত ভাবের ছায়া পড়ে, কনুইয়ে গাল রাখিয়া স্থির নেত্রে সে কাগজ সাজাইয়া কলের মুখে চাহিয়া থাকে। তার মুখখানি একটু কুঞ্চিত হয়, যেন সে শিষ দিতেছে, কিন্তু সে স্তব্ধ হইয়া থাকে। এই বৃহৎ কালাে কলের পাশে কলেরই মতন কালাে ছােট ছেলেটিকে কলেরই একটা অংশ বলিয়া মনে হয়, কলটি যে ছন্দে কাগজের পর কাগজ টানিয়া গােল করিয়া গুটাইয়া ছাপাইয়া আবার খুলিয়া অপরদিকে সাজাইয়া রাখিতেছে, সেই ছন্দেই লতিফের হাত কাগজের পর কাগজ কলের মুখে জোগাইতেছে, তাহার ওই হাতখানি যেন কলেরই একটা অঙ্গ। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন কলের একটানা ঘড় ঘড় শব্দের সুর শুনিয়া অবিশ্রান্ত ক্ষুব্ধ হইয়া পড়ে, তাহার সুকুমার অন্তরের নীড়ে লতিফের গান ঘুমন্ত কোন গানের পাখী বিদ্রোহী হইয়া জাগিয়া উঠে, তখন সে কলের গানের সহিত পাল্লা দিয়া মাথা দোলাইয়া শিষ দিয়া আপন মনে গান গায়, তাহাকে আর তখন কলের অঙ্গ বলিয়া মনে হয় না। আর যখন কল চলে না, সে কখনও টুলে বসিয়া কলে মাথা রাখিয়া ঘুমায়, কখনও বা কলে ঠেস দিয়া পা দোলাইতে দোলাইতে প্রফের কোনও ছেড়া অংশ, কোনও ছাপা কাগজের টুকরা, নুতন ছাপান ফৰ্ম্মার বাতিল কাগজ তুলিয়া লইয়া পড়ে, কবিতা বা গান হইলে বসিয়া বসিয়া মুখস্থ করে, গানটা ভাল লাগিলে কাগজের টুকরা- টুকু ঘরে লইয়া যায়। এ গান কে লিখিয়াছে তাহা সে জানে না, গানের কি সুর তাহা শশানে নাই, আপন মনে একটা সুর ঠিক করিয়া গানটি গাহিয়া মুখস্থ করে; সব সময়ে কবিতা বা গানের অর্থও বােঝে না, মনে মনে একটা ভাল অর্থ ঠিক করিয়া লয়। কখনও বা পদ্য বা গদ্যের কোনও লাইন পড়িতে বেশ ভাল লাগিলে নিজে সুর বসাইয়া সে গান করিয়া বাঁধিয়া লয়। চা খাওয়া শেষ করিয়া লতিফ তাহার মাথার গােড়ায় কুলুঙ্গি হইতে একখানা খাতা পাড়িল, তাহার মধ্য হইতে দুই টুকরা কাগজ বাছিয়া বাহির করিল, এই দুই কাগজখণ্ড কাল সে ছাপা- খানা হইতে সংগ্রহ করিয়া আনিয়াছে, একটিতে একটি গানের অংশ আর একটিতে এক কবিতা ছাপা। এই দুইটি আজ তাহাকে মুখস্থ করিতে হইবে। গানটি গাহিতে গাহিতে সে বন্তির পঙ্কিল দুর্গন্ধময় পথ দিয়া তাহার ছাপাখানার দিকে চলিল- তােমার আলাে ভালােবেসে পড়েছে মাের গায়ে এসে প্রভাতের আলােয় চারিদিক্ রাঙা হইয়া উঠিয়াছে, কিন্তু বস্তির শেষে হলদে পুরানাে বাড়ীখানি অন্ধকার নিঝুম। পথের ধারের দোতলার ঘরখানির সব জানালা বন্ধ, অন্ধকার কোণে বাড়ীর যুবতী বধূ মেঝেতে লুটাইয়া পড়িয়া আছে। খড়খড়ির ফাক দিয়া আলাের ক্ষীণ রেখাগুলি ঘরের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে, এ আলাে তাহার ভাল লাগিতেছিল না। প্রভাত ত তাহার কাছে প্রভাত নয়, অন্ধকার রাত্রি তাহারই মত শশাকাতুরা একাকিনী বিষাদিনী ছিল, তাহার তারায় তারায় অন্তরের নির্বাক্ বহ্নির মত স্তব্ধ অন্ধকারে অশ্রুজল, সে-রাত্রির প্রহরগুলি অশ্রুতে ভরিয়া ভরিয়া সে একটু শান্ত হইয়াছিল, কিন্তু এ প্রভাতের দণ্ডগুলি আলােকে মাতাল ভ্রমরদলের মত উতলা হইয়া উঠিয়াছে, এ আলাের রেখাগুলি- যেন কে শুভ্র দন্ত মেলিয়া ব্যঙ্গ হাসি হাসিতেছে! আর সে সহিতে পারে না। আর জীবনের ভার বহিতে পারে না। ভাবিয়া ভাবিয়া সে দিশাহারা হইয়াছে। এ চির-দুঃখের পৃথিবীতে জন্ম হইতে সে অনেক সহিয়াছে। ছেলেবেলায় সে বাবা-মাকে হারাইয়াছে, ধনী কাকার গৃহে অনাদরে অবজ্ঞার বির মত সংসারের কাজ করিয়া মানুষ হইয়াছে, কোনও দিন ভাল খাইতে পায় নাই, পরিতে পায় নাই। তাহার যখন বিবাহের বয়স হইল, তাহার রূপ নাই বলিয়া কেহ পছন্দ করে না এজন্য কত বিজপ শুনিয়াছে, তারপর এক দ্বিতীয় পক্ষের বরের লতিফের গান ৬৭ ; সহিত বিবাহ হইল। স্বামীর ঘর করিতে আসিয়া শাশুড়ীর নিকট প্রতিদিন কত লাঞ্ছনা, অপমান, কটু কথা,-তাহার স্বামী মাতাল, সে তাহারই দোষ, সে কেন স্বামীকে শাসন করিয়া সৎপথে রাখিতে পারে না; তাহার স্বামী লম্পট, গণিকালয়ে যায়, সেও তাহারই দোষ, সে কেন স্বামীর মন ভুলাইয়া ঘরে রাখিতে পারে না তাহার স্বামী কত খেয়ালে চলিতেছে, বিষয় উড়াইয়া দিতেছে, সব তাহারই দোষ, সে কেন জোর করিয়া স্বামীকে ধরিয়া পায়ে লুটাইয়া কঁদিয়া সাধিয়া ভাল করে না; তাহার যে এক মৃত সন্তান হইয়াছিল, সে তাহারই দোষ, তারপর যে আর তাহার কোনও সন্তান জন্মায় নাই, তাহাও তাহারই দোষ-শাশুড়ীর সব ভৎসনা গুঞ্জনা সে নত-মুখে সহিয়াছে। কিন্তু গত সন্ধ্যায় যখন সে শুনিল, নােট জাল করার অপরাধে তাহার স্বামীকে পুলিশে ধরিয়া লইয়া গিয়াছে, অনেক বছর জেল হইবে, সে আর সহিতে পারিল না, মূচ্ছিত হইয়া পড়িল। যখন মূচ্ছা ভাঙ্গিল, শাশুড়ীর তীব্র ব্যঙ্গ কঠোর ভৎসনা তাহার কাণে আসিয়া লাগিল—সে ঢং করিয়া মূর্হিত হইয়াছে, তাহার শােক লােক-দেখানাে ঠাট, সে এই বাড়ীর অলক্ষ্মী । আর সে সহিতে পারে না। তাহার স্বামী জালিয়াৎ, তাহার স্বামী জেলের কয়েদী! স্বামীকে সে মনপ্রাণ দিয়া সেবা করিয়াছে কিন্তু তাহার ভালবাসা কোনও দিন পায় নাই। এ ব্যর্থ জীবন শেষ হইয়া যাক, মৃত্যুর স্তব্ধ শীতল অন্ধকারে সকল আলা সকল কান্না নিমেষে শেষ হইয়া তলাইয়া যাক। উম্মত্তার মত উঠিয়া নিৰ্যাতন-ক্ষুব্ধা নারী দেরাজ হইতে বিষের ৬৮ কল্পলতা শিশি বাহির করিল। লুব্ধ হিংস্র চোখে শিশিটির দিকে চাহিয়া রহিল। এই রাঙা টলটলে তরল পদার্থ টুকু চোখ বুজিয়া গলায় ঢালিয়া দিবে—গলা হয়ত একটু জ্বলিবে, বুক হয়ত একটু বেদনায় কঁপিবে, একটু হয়ত ব্যথায় ছটফট করিবে কিন্তু তার পর ত চিরশান্তি, অনন্ত আরাম ! আর ভাবিতে হইবে না, কিছু সহিতে হইবে না। মােহাবিষ্টের মত শিশিটা নাড়িয়া সে একটু দেখিতে লাগিল। শিশিটির দিকে চাহিয়া চাহিয়াই তাহার মন কিছু শান্ত হইয়া গেল। সহসা সে চমকিয়া উঠিল— ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে!’ ও কার কচি মিষ্ট গলা? ও কি মধুর করুণ সুর! কে পথ দিয়া গাহিয়া যাইতেছে “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। কে এমন অদ্ভুত কথা বলিতেছে, এ চির-দুঃখের পৃথিবীতে কে মরিতে চায় না ? একবার সে তাহাকে দেখিতে চায়, তাহার সহিত মুখােমুখি দাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিতে চায়, সত্যই কি মরিতে চাও না? বল, বল, মন খুলিয়া বল, সত্যই তুমি বাঁচিতে চাও? এ ভুবন সত্যই সুন্দর ? জানালার ওপর ছুটিয়া পড়িয়া সশব্দে জানালা খুলিয়া এ বন্দিনী বধূ পথের দিকে চাহিল। একটি মুসলমান ছেলে মাথা নাড়িতে নাড়িতে মাঝে মাঝে আঙ্গুলে তুড়ি দিতে দিতে গান গাহিয়া চলিয়াছে—মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। পূৰ্ব্বদিকে দিগন্তে আকাশের পেয়ালা উপছাইয়া রাঙা আলাে দিকে দিকে লতিফের গান ছড়াইয়া পড়িতেছে। এই স্নিগ্ধাজ্জ্বল নিৰ্ম্মল আলাের স্পর্শে অন্ধকারের দুঃস্বপ্ন যেন দূর হইয়া গেল। শিশির রাঙা বিষে তাহার মন যে মােহাচ্ছন্ন হইয়াছিল, এ রঙীন আলাের মায়া সে মােহ দূর করিয়া তাহার চারিদিকে কি সৌন্দৰ্য-জাল রচনা করিল! এ সুন্দর সােনার প্রভাতে সে মরিবে না, সে বাঁচিতে চায় ! শিশিটা সে পথে ফেলিয়া দিল । সেই মুসলমান ছেলেটি আনন্দদীপ্ত চোখে জানলার দিকে চাহিল, তাহাকে দেখিয়া কি সুন্দর হাসি হাসিয়া, গান গাহিতে গাহিতে চলিয়া গেল। এই হতভাগিনী অপমানিতা নারী মরিতে চায় বটে কিন্তু তাহার গর্ভে যে অজাত-শিশু রহিয়াছে, সে বাঁচিতে চায়, সে এই সুন্দরী পৃথিবীর কোলে জন্মাইয়া সুখ-দুঃখের দোলায় দুলিতে চায়। সেই অজাত শিশুর জীবনের তৃষ্ণায় ভাবী মাতা চঞ্চল হইয়া উঠিল। , সে মরিবে না, সেই শিশুর আনন্দ-তৃষ্ণা মিটাইবার জন্য মা সকল দুঃখ সকল অপমান সহ্য করিবে। প্রভাতের রাঙা আলাের দিকে নীরবে মাথা নত করিয়া সে দুঃখের নবজীবনকে বরণ করিয়া লইল।
সন্ধ্যার উদাস আলাের দিকে উদাস নয়নে চাহিয়া যুবকটি ভাবিতেছিল- নারী! কে তাহাকে বুঝিতে পারিয়াছে ? এ চির-রহস্যময়ী মায়াবিনীর অবগুণ্ঠন খুলিয়া কে তাহার সত্য রূপ দেখিয়াছে ? সে আর দেখিতে চায় না, সে বুঝিতে চায় না, সে নারীর বিষয় ভাবিতে চায় না, নারীর সহিত সব সম্বন্ধ ত্যাগ করিতে চায়। ওরা ভুলায়, মাতায়, খেলায়, ধরা দেয় না। যে মেয়েটিকে সে ভালবাসিয়াছে, সে এখন আর তাহাকে ভালবাসে না, এই কি তাহার ব্যথা? না, সে মেয়েটি এতদিন তাহার সহিত প্রেমের ভণ্ডামি করিয়াছে, সে মেয়েটি তাহাকে সত্যই কোনও দিন ভালবাসিত না, কিন্তু কত আভাসে ইসারায় তাহার চোখের চাওয়ায় প্রেমের লীলায় সে দেখাইয়াছে সে তাহাকে ভালবাসে। সে হয় ত এ তরুণীর ভালবাসা বিশ্বাস করিত। কিন্তু সেদিন সে তাহার বিখ্যাত গায়ক বন্ধুটির সহিত মেয়েটির আলাপ করিয়া দিল, বন্ধুর গানে মেয়েটি বিমুগ্ধ হইয়া গেল, তাহার ব্যবহার একেবারে বাইয়া গেল। ধরা পড়িয়া গেল—মেয়েটি তাহাকে ভালবাসে নাই। ও, ফ্লার্ট। যুবকটি টেবিল হইতে একখানি চিঠি তুলিয়া মুঠায় পূরিয়া পাকাইতে লাগিল। মেয়েটির চিঠি, লিখিয়াছে, সে কেন দু’দিন
লতিফের গান
৭১
আসে নাই, তাহার কি অসুখ করিয়াছে, সে কি রাগ করিয়াছে ?
সে যেন সন্ধ্যায় নিশ্চয় আসে।
, সে সন্ধ্যায় যাইবে না।
আচ্ছা, সে যাইবে। সে মুখের উপর শুনাইয়া আসিবে, সে
মেয়েটির সম্বন্ধে কি ভাবে—সে ফ্লার্ট, সে ভণ্ড !
ও কি।
যাব না গাে অমনি চলে
মালা তােমার দেব গলে-
যুবকটি চমকিয়া লাফাইয়া উঠিল। কে পথ দিয়া গান গাহিয়া
যাইতেছে, কি করুণ মধুর সুর ! ও, ওই প্রেসের মুসলমান
ছেলেটা ; সারাদিনের কাজ শেষ করিয়া ছেলেটি বাড়ী চলিয়াছে,
তাহার হাতে একটু কাগজ, সেই কাগজটা মাঝে মাঝে দেখিতে
দেখিতে ছেলেটি মনের আনন্দে গান গাহিতে গাহিতে চলিয়াছে।
সে এমন অদ্ভুত ভুল সুরে গানটি গাহিয়া চলিয়াছে যে তাহার গান
শুনিয়া যুবকটির হাসি আসিল। ছাপিবার কলের ঘড় ঘড়, শব্দের
সহিত তাল রাখিয়া হাল্কা নাচুনীর সুর তৈরী করিয়া সে গান
গাহিয়া চলিয়াছে। কিন্তু ছেলেটি গানের আনন্দে কি রকম
মশগুল হইয়া চলিয়াছে, তাহা দেখিয়া যুবকটি বিস্মিত মুগ্ধ হইল।
এ সরল মনের আনন্দের স্পর্শ তাহার ব্যথিত হৃদয়ে আসিয়া লাগিল।
সে শিহরিয়া উঠিল।
হাঁ, এই ত তাহার মৰ্ম্মের ব্যথা, তাহার গােপন বাণী, তাহার
স্বপ্ন, সে ত মেয়েটিকে এই কথাই বলিতে চায়।
পাকানাে চিঠিখানি ভাল করিয়া খুলিয়া সন্ধ্যার স্নান আলােয়
৭২ অনেকক্ষণ ধরিয়া সে বার বার পড়িল। সে ভুল পড়িয়াছিল, এ চিঠিখানি সে ভুল বুঝিয়াছিল। এ চিঠি নিংড়াইলে যে অশ্রুজল ঝরে, এর পাতায় পাতায় বিরহ-বেদনা, উৎকণ্ঠাময় প্রতীক্ষা। হায়, সে ভুল ভাবিয়াছে, ভুল দেখিয়াছে। এ সন্ধ্যার অন্ধকারে যেমন সব জিনিষ অস্পষ্ট বৃহৎ দীর্ঘছায়াঘন দেখায়, তেমনই ঈর্ষার বেদনাময় অন্ধকারে সে সমস্ত কথা ব্যবহার বিকৃত বৃহৎ করিয়া দেখিয়াছে। মেয়েটি যখন গায়ক-বন্ধুর প্রতি চাহিয়া একটু হাসিয়াছে, সে ভাবিয়াছে মেয়েটি তাহাকে বিমুগ্ধ করিতে চায়, মেয়েটি একটু অন্তরালে দাড়াইয়া দু'চারটি সামান্য কথা কহিয়াছে, সে ভাবিয়াছে প্রেমালাপ হইতেছে। তরুণী ফ্লার্ট, নয়, সে সত্যই প্রেমিকা, তাহার চারিদিকে কত স্বপ্ন কত আশা কত ইসারা কত স্মৃতি, তাহার সঙ্গে কত প্রভাতের সূৰ্য্যালােক কত রাত্রির জোৎস্না-ধারা জড়ান ; কখনও অলসমধুর মধ্যাহ্ন-অবসরে মৃদুগল্প-গুঞ্জরণ, কখনও রঙীন সন্ধ্যায় রজনীগন্ধা হাহানার গন্ধ, কখনও তারা-ভরা আকাশের তলে সুরের উৎসব, কত সাহানা কত বাগেশ্রী,-এ তরুণী কত আনন্দ-ক্ষণের স্মৃতিপুষ্প দিয়া গাঁথা মালা। ব্যথায় যুবকের চোখ জলে ভরিয়া গেল। তারপর জলে- ধদওয়া চোখে বৃষ্টিশেষে ইন্দ্র-ধনুর মত তরুণীর অপরূপ রূপ ভাসিয়া উঠিল। আজ সে তাহার কাছে যাইবে, ক্ষমা করিতে নয়, ক্ষমা চাহিতে।
লতিফের গান সেই মুসলমান ছেলেটির গান মনের ঘরে ঘরে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বাজিতে লাগিল যাব না গাে অমনি চলে মালা তােমার দেব গলে- ধীরে সে চিঠিখানিকে চুম্বন করিল। ৪ • জমাট চোখের জলের মত একটু জ্যোৎস্না জানালার ফাক দিয়া বিছানায় আসিয়া পড়িয়াছে। মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ কবি এ জ্যোৎস্না- লেখার দিকে সজল নয়নে চাহিয়া শুইয়াছিল। মৃত্যুদূত আজ তাহার দ্বারে আসিয়া দাড়াইয়াছে, এ জীবনের নদী পার করিয়া কোন্ নবলােকে লইয়া যাইবে, সেজন্য তাহার কোনও ভয় নাই; যাত্রীপ্রাণ নবলােকে যাইবার জন্য তৃষিত হইয়া উঠিয়াছে। কিন্তু পাথেয় কৈ? তাহার ভাণ্ডার শূন্য, তাহার জীবন যে ব্যর্থ, এ পৃথিবীর রূপপুরীতে বিশ্বকবি যে তাহার হাতে বাঁশী দিয়া পাঠাইয়াছিলেন, সে কি গান গাহিয়াছে ? কত সন্ধ্যা কত প্রভাতের সােনার আলাে, কত শরৎ কত বসন্তের জ্যোৎস্না- ধারা এ জীবন-পাত্রে ঝরিয়া পড়িয়াছে, তাহাতে যে গানের ফুল ফুটিয়াছিল, যে সুরের কুঁড়ি জাগিয়াছিল, তাহার ত কিছুই নাই, কবে সব ঝরিয়া পড়িয়াছে, শূন্যে মিলাইয়া গিয়াছে! হায়, আজ মৃত্যুর হাতে জীবনের শূন্য পাত্রখানি সে কি করিয়া দিবে? ব্যর্থ, ব্যর্থ, সে।
৭৪ কল্পলতা ‘একদা তুমি প্রিয়ে আমার এ তরুমূলে বসেছ ফুল-সাজে সে কথা কি গেছ ভুলে? কে গায় ? পথ দিয়া কে গান গাহিয়া যায়। গানের ছােয়ায় রুগ্ন বৃদ্ধ বিছানায় উঠিয়া বসিল, জানালাটা খুলিয়া দেখিল, কচি বাঁশের বাঁশীর মত একটি মুসলমান ছেলে মাথা দোলাইয়া গান গাহিতে গাহিতে চলিয়াছে। এ সুন্দর জ্যোৎস্না-রাত্রির দিকে চাহিয়া বৃদ্ধ কবি বেশীক্ষণ বসিয়া থাকিতে পারিল না, বিছানায় শুইয়া পড়িল, তাহার সমস্ত দেহে চাদের আলাে ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। প্রিয়া ভােল নাই, তাহার জীবন-তরুর মূলে যে কলা-লক্ষ্মী জ্যোৎস্নারাতে বীণার ঝঙ্কার তুলিয়াছে, সেই কবিতা-রূপিণী প্রিয়া একবার মূর্তিমতী হইয়া আসে না, মানস-সবােবরের সকল গানের পদ্মের মালা যে তাহার গলায় দোলান, সেই মালাটি সে মৃত্যুর হাতে দিয়া সকল লজ্জা দূর করে না ? আজ তাহার জীর্ণ দেহ, নিষ্প্রভ নয়ন, ভগ্ন কণ্ঠ, কিন্তু একদিন সে ত প্রিয়াকে ফুলসাজে সাজাইয়াছে, সেই ফুলের গন্ধে আজ যাত্রার রাত্রির দণ্ড প্রহর উতলা হইয়া উঠিয়াছে। সে ব্যর্থ নয়। কত শরৎ প্রভাত, কত মাধবী রাত্রির কণ্ঠে সে যে সুরের মালা দোলাইয়া দিয়াছে, সে-সব মালা কবে ছিড়িয়া খসিয়া গিয়াছে, কিন্তু তাহার প্রিয়া এ মালাগুলির কথা ভােলে নাই—সেই হারাইয়া- যাওয়া ভুলিয়া-যাওয়া মালাগুলি মৃত্যু-বধূর গলায় দোলাইয়া তাহার লতিফের গান ৭৫ হাত ধরিয়া সে নব-জীবনের অভিসারে নির্ভয়ে আনন্দে চলিয়া যাইবে। নীলাম্বরী সুন্দরী শ্যামা ধরণীর দিকে চাহিয়া বৃদ্ধ কবি জয়ধ্বনি করিয়া উঠিল, সে ধন্য হইয়াছে। রাত্রি গভীর হইয়াছে, চারিদিক নিঝুম, চাদের আলােয় সেই কদৰ্য্য বীভৎস বস্তিটিও এক মায়াপুরীর মত দেখাইতেছে। বস্তির কোণে ছােট মাটির ঘরে ক্ষীণ প্রদীপের আলােয় লতিফ এক গাদা কাগজের উপর ঝুকিয়া পড়িয়াছে, আজ সে ছাপাখানা হইতে অনেকগুলি টুকরা কাগজ আনিয়াছে, সেগুলি সে বাছিয়া বাছিয়া পড়িতেছিল, যে লাইনগুলি ভাল লাগিতেছিল, সেগুলি তাহার এক মােটা খাতায় গুণ গুণ করিয়া গান করিতে করিতে টুকিতেছিল। এ খাতাখানি ছাপাখানার দপ্তরী তাহাকে উপহার দিয়াছে। লেখা শেষ হইল, সে প্রদীপ নিভাইয়া দিল, ছােট জানালা দিয়া একটু জ্যোৎস্না তাহার গায়ে আসিয়া পড়িল। ধীরে উঠিয়া জানালা দিয়া আকাশের দিকে চাহিল। জ্যোৎস্না-ধােওয়া এক টুকরা নীলাকাশ নীলকান্তমণির মত জ্বলজ্বল করিতেছে। তাহার দেহ-মন কি এক অজানা আনন্দে ভরিয়া উঠিল। জানলাটা ভাল করিয়া খুলিয়া দিয়া ধীরে সে তার মলিন বিছানায় শুইয়া ঘুমাইয়া পড়িল। ঘুমের ঘােরে মাঝে মাঝে সে ছাপিবার কলের ঝঙ্কার শুনিয়া চমকিয়া উঠিতে লাগিল— ঘ্যং ঘ্যং ঘড় ঘড়, ঘ ঘ ঘং ঘং-টং।
ফঁাকি দাদামশাই! এখনও ঘুমােস নি সুধা, কি কষ্ট হচ্ছে মা? , দাদামশাই কোন কষ্ট নয়, তুমি এবার ঘুমােতে যাও, কোন দরকার হলে ডাক্বােখন। সে ঘুমের ওষুধটা- , দাদামশাই, ওষুধ খেলেও আমার ঘুম হবেনা, তার চেয়ে তুমি একটু গল্প করা, আমি গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি। মাতৃহারা ক্ষুদ্র বালিকা সুধাকে কত রাত কত গল্প বলিয়া দাদামশাই ঘুম পাড়াইয়াছেন, কিন্তু আজ এ মৃত্যুপথযাত্রিণী যক্ষ্মা- বােগাক্রান্তা নারীকে তিনি কি গল্প বলিয়া ভুলাইয়া ঘুম পাড়াইবেন। তার হৃদয় কত সুখ-দুঃখের স্মৃতিতে ভারী হইয়া চোখ দুইটি জলে ভরিয়া আসিল, ভাঙা গলায় তিনি বলিলেন, দেখ সুধা-তারপর আর কিছু বলিতে পারিলেন না, শুধু দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া বেদনায় স্তব্ধ হইয়া রহিলেন। অদূরে সমুদ্রের একটানা করুণ কল্লোলধ্বনি তাহার ভগ্ন জীবনের দীর্ঘ হতাশ্বাসের মত কাণে আসিয়া বাজিতে লাগিল, বাহিরে মৃদু জ্যোৎ থম্ থম্ করিতে লাগিল। ঘরের অন্ধকারময় স্তব্ধতা পাষাণভারের মত দাদামশায়ের বুকে যেন চাপিয়া ধরিল, তিনি ধীরে ধীরে পাশের ঘরে গিয়া বসিলেন, সুধা, এখন একটু বেদানার রস খাবে?
ফাকি ৭৭ আচ্ছা দাও দাদু,কটা বেজেছে এখন ? এখন প্রায় দশটা। মােটে দশটা ? আমার মনে হচ্ছে যেন কত রাত হয়েছে, যেন এ রাতের আদি নেই—শেষও হবেনা-হা, দাদামশাই, আলােটা এ ঘরে নিয়ে এস, ওই কোণে রাখ, চোখে লাগবে যে- , লাগবে না, বাইরে বড় জ্যোৎস্না, চোখ দুটো যেন আলা করছে, ঘরে আলাে থাকলে বাইরেটা তবু অন্ধকার হবে— দাদামশাই আলােটা মাথার দিকে জাল্লার পাশে রাখিলেন। তারা-ভরা আলােছায়াময়ী রাত্রি এতক্ষণ মৃত্যুর মত স্তব্ধ রহস্যময় নিঃশব্দ-চরণে শিয়রে দাড়াইয়াছিল, ঘরে আলাে আসাতে ঘর হইতে একটু সরিয়া দাঁড়াইল। বেদনার রস খাইয়া সুধা কিছুক্ষণ চুপ করিয়া দেওয়ালে ঘরের নানা জিনিষের অদ্ভুত ছায়াগুলি দেখিতে লাগিল। দাদামশাই ভাবিলেন, সুধার এবার ঘুম আসিতেছে। সহসা সে বলিয়া উঠিল—আচ্ছা দাদামশাই তুমি কি দুপুরে ওঁর চিঠিটা পড়ে শুনিয়েছিলে?—আমার ঠিক মনে পড়ছে না চিঠির কথা হইতেই দাদামশায়ের বুকের পাঁজর যেন অসহনীয় বেদনায় কঁপিয়া উঠিল, আপনাকে দমন করিয়া তিনি বলিলেন- ‘, তােমাকে ত বললুম হ্যা, ঠিকই ত তুমি বললে, উনি এক জরুরী মােকদ্দমায় ব্যস্ত, শেষ হলেই আসবেন। দেখ, আমার সব এলােমেলাে হয়ে যায়, ।
৭৮.
?
আমি বছিলুম কি, ওর যদি বিশেষ কাজ থাকে উনি এখন নাইবা
এলেন, আমি ত একটু সেরে উঠেছি-
, আমি চিঠি লিখে দিয়েছি শীগগীর আসতে, এ বুড়াে কি
তাের সেবা করতে পাবে, নাতজামাইয়ের সেবায় দুদিনেই সেরে
উঠবিশেষের কথাগুলি হাসির সুরে বলিলেন বটে, কিন্তু কথা-
গুলি ব্যঙ্গের মত শােনাইল, শ্লেষ বাক্যগুলিতে নিজেই মর্মাহত
হইয়া স্তব্ধ হইলেন।
কিন্তু কথাগুলি সুধার বুকে বিশেষ আঘাত করিল না, তাহার
হৃদয় যেন অসাড় হইয়া গিয়াছে, বাইরের অন্ধকারের দিকে চাহিয়া
সে ধীরে বলিল—আমি বলছিলুম কি দাদু, থােকাকে শুধু যদি
পাঠিয়ে দিতে পারে, একদিনের জন্য, কতদিন আমি তাকে দেখিনি,
মনে হচ্ছে যেন কত বছর, কতদিন হবে ?
প্রায় একমাস হবে
একমাস—আচ্ছা ঠাকুরপাে’র এখন ছুটি ; ওরা যদি থােকাকে
একবার পাঠায়, দু’দিনের বেশী আমি তাকে রাখবনা—আমি
একবার দেখব—আচ্ছা দাদামশাই, থােকা এখানে এলে তার কি
কোন ভয় আছে, তা যদি থাকে-
, মা, সে আমি ঠিক ব্যবস্থা করব
আচ্ছা, আমি কোলে নিতে পারব ত তাকে ?
কোন ভয় নেই, তােমার থােকা তােমার কাছে এলে তার
কোন রােগ হবেনা-
তুমি কাল ডাক্তারবাবুকে একবার জিজ্ঞেস কোবরা -ওরা কবে
আসবে লিখছে,-কাল ?
=
ফাঁকি
৭৯
দু’একদিন দেরী হবে, মকদ্দমাটা শেষ না হলে
হ্যা, ঠিক, মকদ্দমার কথাটা আমি ভুলি গেছলুম,—আচ্ছা,
ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস কোবরা আমি এখন একটু বেড়াতে পারি
কিনা, তা হলে কাল সকালে কতকগুলাে ঝিনুক কুড়িয়ে নিয়ে
আসি-
সে আমি নিয়ে আব’খন।
, তােমার কষ্ট হবে, খােকা ঝিনুক পেলে নিশ্চয় খুব খুসি হবে,
আর সেই মুচিটাকে একবার আসতে বােলােতহরিণের চামড়ার
কি সুন্দর জুততা নিয়ে এসেছিল, খােকার পায়ে বেশ মানাবে নয়
দাদামশাই?
হা, বেশ মানাবে।
আচ্ছা, চিঠিটা কি তােমার কাছে আছে ?
আর এখন চিঠি শশানেনা মা, তা হলে রাতে একেবারে ঘুম
এ ক’রাত আমার একটুও ঘুম হয়নি, জান, একটু টুল আসে
হঠাৎ চমকে উঠি, মনে হয় যেন থােকার পায়ের মিষ্টি শব্দ—কিন্তু
চোখ চাইলেই কোথায় মিলিয়ে যায়—আচ্ছা ও ত সমুদ্রের ডাক
, বাতাসে ঝাউ গাছগুলাের শব্দ হচ্ছে।
ও, মাঝে মাঝে মনে হয় যেন গাড়ীর শব্দ শুনছি, যেন গাড়ী
করে আমার খােকা আসছে; সব এমনি গুলিয়ে যায়। দাদামশাই।
;
কি মা!
সেই চিঠিটা একবার,-না, তােমার পড়তে হবেনা, আমায় শুধু
দাও আমি হাতে করে’
কল্পলতা সেটা কোথায় যেন রাখলুম মনে পড়ছে না ত, দেখি বােধ দাদামশাই আলাে লইয়া পাশের ঘরে গেলেন, এবং আলােটি সে ঘরে রাখিয়া দিয়া যেন কোন অজানা অন্ধকার পথে একা দিশাহারা হইয়া অসাড়ভাবে দাড়াইয়া রহিলেন। সুধার সকরুণ জীবনের মত চিঠিটাও একটা মস্ত ফঁাকি। প্রায় একমাস হইল দাদামশাই সুধাকে তাহার মাতাল স্বামীর ঘর হইতে জোর করিয়া লইয়া আসিয়াছেন, এই একমাসের মধ্যে সুধার স্বামীর কোন চিঠিই আসে নাই। দাদামশাই যখন সুধাকে লইয়া আসেন তখন স্বামী কিছু আপত্তি করিলেও শাশুড়ী বিশেষ কিছু আপত্তি করিলেন না। সুধা যখন সুস্থ, সবল ছিল তখন তাহাকে দিয়া সংসারের সমস্ত কাজ করাইয়া লওয়া চলিত, কিন্তু এখন এ রুগ্না, অকর্মণ্যার জন্য শুধু ঝির খরচ নয়, ডাক্তারের খরচও বাড়িয়াছে, একটা যন্ত্র ভাঙ্গিয়া গেলে যেমন সেটাকে দূর করিয়া লােকে নূতন যন্ত্রের অর্ডার দেয়, সুধার শাশুড়ী তেমনি সুধাকে বিদায় দিয়া, তাহার এক নূতন কৰ্ম্মপরায়ণা বধুর দরকার একথা ঘটকীমহলে জানাইয়া দিলেন। তবে দাদামশাইয়ের আদিক্ষেতা বা দরদটা যে তিনি পছন্দ করিলেন না তাহা লােক- সমাজে জানাইবার জন্য তিনি সুধার চারবছরের থােকাকে নিজের কাছে আটকাইয়া রাখিলেন, বলিলেন-তােমাদের মেয়ে তােমরা নিয়ে যেতে পার, আমার নাতিকে আমি দেবােনা। অপ্রেম অনাদর নির্যাতনের মধ্যে স্বামীর ঘরে সুধা এই খােকাকে বুকে করিয়া সকল দুঃখ সহজে বহিয়াছে,
ফাকি
৮১
খােকাকে আবার দেখিতে পাইবে এই ভাবিয়া তাহার মন
দুলিতেছিল।
দাদামশাই সুধার স্বামীকে আসিবার জন্য কয়েকখানা চিঠি
লিখিয়াছিলেন, কিন্তু কোন উত্তরই পান নাই, শুধু মাঝে স্বামী
কিছু টাকা পাঠাইয়া দিয়াছিল, আর মণিঅর্ডার কুপনে দু’লাইন
লেখা ছিল, এখন আদালতে বড় বেশী কাজ, মক্কেলরা কিছুতেই
ছাড়ে না, যাবার সময় নেই, বারবার চিঠি লিখে বিরক্ত করবেন না।
-
দাদামশাই! খুজে পাচ্ছনা বুঝি, আচ্ছা থাক—
এই যে মা-
আচ্ছা কাল দিও, আমি কি ভাবছিলুম জান ?
কি রে?
কি আশ্চয্যি আমার এতদিন কখনও মনে হয়নি
কি মা?
আচ্ছা দাদু, মার মুখ তােমার মনে আছে ত ?
তাের মা!
মার সত্যিকার মুখ আমার খুব অস্পষ্ট মনে আছে, তবে সেই
যে ফটোটা আছে—দেখ দাদু থােকার মুখ ঠিক মায়ের মুখের মত
হয়েছে, চোখ দুটোও ঠিক সেইরকম টানা টানা-আমি কি
করে বুঝলুম জান, আমার মনে হল, মা যেন ওই জানলার কোণ
থেকে আমার দিকে চেয়ে আছেন, ঠিক তার মত একখানা মুখ
হঠাৎ সে মুখ মিলিয়ে গেল, আবার ভেসে উঠল-দেখি, সে ত
মার মুখ নয়, থােকার, কিন্তু ঠিক মায়ের মুখের মত –কৈ চিঠিটা ?
৮২ কল্পলতা দাদামশাই তাহার পকেট হইতে একখানা অফিসের চিঠি বাহির করিয়া কম্পিতহস্তে সুধাকে দিলেন। সুধা ইংরেজী জানেনা, এই ভরসা। বাহিরের মেঘে চাদ ঢাকা পড়িয়াছে, বাতাস উদ্দাম হইয়া উঠিয়াছে, সাগরের ডাক ডমরুধ্বনির মত বাজিতেছে। কাশিয়া কাশিয়া বুকের যে পাঁজরগুলিতে ব্যথা হইয়াছে তাহাদের উপর রােগশীর্ণ হাতে চিঠিটা ধরিয়া সুধা শান্ত হইয়া শুইল। অন্ধকার রাত্রির তারাগুলি মাতার করুণ ব্যাকুল অনিমেষ চাউনির মত তাহার রােগশয্যার উপর ঝুকিয়া পড়িল। দাদামশাই ধীরে ঘর হইতে বাহির হইয়া সম্মুখে বালির উপর বসিয়া অন্ধকারময় অনন্ত সমুদ্রের দিকে শূন্যনয়নে চাহিয়া রহিলেন। কিছু ভাবিবার, কঁদিবারও তাহার যেন শক্তি নাই। দুপুরবেলা ইজিচেয়ারে শুইয়া থােকার জন্য রেশমের মােজা বুনিতে বুনিতে শ্রান্ত হইয়া সুধা একটু ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। দাদামশাই ধীরে তাহার পাশে আসিয়া দাড়াইলেন, ধীরে মাথায় হাত বুলাইতে লাগিলেন, চুল কত উঠিয়া গিয়াছে, মাথাটা যেন শুকাইয়া ছােট হইয়া গিয়াছে। কয়েকটা মাছি মুখে উড়িয়া বসিতেছে দেখিয়া তিনি ধীরে ধীরে পাখার মৃদু বাতাস করিতে লাগিলেন, শীর্ণ মুখখানি রােগের আভা-মণ্ডিত হইয়া কি করুণ। সুধা একটু উসখুস করিয়া জাগিয়া উঠিল ; দাদামশাই পাখার
ফঁাকি
৮৩
•
বাতাস করিতেছেন দেখিয়া মিটি মিটি চাহিয়া করুণ-মধুর হাসিল
তারপর দাদামশাইয়ের হাত হইতে পাখাটি লইয়া বলিল-দাওনা
দাদামশাই, তােমায় একটু হাওয়া করি
আমি এই জানলাটা খুলে দিচ্ছি, তাহলে খুব হাওয়া
আসবে-
আচ্ছা দাও, আজ কত তারিখ দাদামশাই ?
আজ বােধ হয় ১২ই
ও! তাহলে চারদিন আছে, জান মােলই হচ্ছে থােকার
জন্মদিন, ও এখনও মােজাটা কত বাকি, কিছু বােনা হয়নি, খালি
ঘুমিয়ে পড়ি
এখন তােমার যে পরিপূর্ণ বিশ্রাম দরকার।
, এ আমায় বারণ করতে পারবেনা,,এ-চারদিনে এটা আমায়
শেষ করতেই হবে, আচ্ছা যােলইয়ের মধ্যে থােক। নিশ্চয়ই এসে
পড়বে- জাননা আমি কি স্বপ্ন দেখছিলুম ? আমি দেখছিলুম,
খােকা এসেছে, আমি তাকে এই মােজাটা পরিয়ে দিলুম, তারপর
হরিণ-চামড়ার সুন্দর জুততা—কি সুন্দর দেখাচ্ছিল—আমার
গলা জড়িয়ে চুমাে খেয়ে বলে,-ভারি দুষ্ট, মা, আমায় ফেলে
এসেছিলে, আমার মন কেমন করে যে—দাদু, আচ্ছা আনাটায়
ত তােমার কাপড় আর পাঞ্জাবী রয়েছে ত? হ্যা, ঠিক মনে
হচ্ছিল, থােকার সেই লাল জরিপাড় ধুতিটা আর সিল্কের পাঞ্জাবীটা
ঝুলছে—খােকা,—খ্যা!
সহসা সুধার এক কাশির বেগ আসিল, কাশিতে কাশিতে
খানিকটা রক্ত মুখ দিয়া উঠিল, কিছুক্ষণ বসিয়া মৃদু আৰ্তনাদ
৮৪ কল্পলতা করিয়া শ্রান্ত হইয়া সে চোখ বুজিয়া শুইয়া পড়িল। তাহার হাতে বােনা রেশমের মােজাপরা থােকার কচি পা-দু’টি মুদিত নয়নের অন্ধকার পটে বার বার ভাসিয়া উঠিতে লাগিল। সেই জুতা মােজা পরিয়া থােকা যেন দস্যিপনা করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, তাহার দুরন্ত পায়ের শব্দের মত সাগরের তরঙ্গধ্বনি তাহার কাণে আসিয়া বাজিতে লাগিল। গভীররাতে সুধা ঘুমাইয়া পড়িয়াছে ভাবিয়া দাদামশাই নিঃশব্দ- চরণে তাহার ঘরে ঢুকিয়া তাহার শয্যার পাশে বসিলেন। সুধা কিন্তু জাগিয়াছিল, সে ধীরে বলিয়া উঠিল—কে, দাদামশাই ? তােমাকে আজ সারাদিন দেখিনি কেন ? দাদামশাই শিহরিয়া উঠিলেন, তাঁহার চোখ দিয়া যে টসটস করিয়া জল পড়িতেছে তাহা সুধা অন্ধকারে বুঝিতে পারিল না। আচ্ছা, দাদু কালত সকালে ওরা আসবে, দেখ, আমি ভােরে প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়ি, আমায় কিন্তু কাল ভােরে জাগিয়ে দিও, ভােরবেলায়ই ত ট্রেণ আসে— দাদামশাই গভীর নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন—মাগাে ! তাহার স্বামী ও পুত্র কাল সকালে আসিবে এই স্বপ্নমাধুরীতে সুধা নিমগ্ন ছিল, মেহসুধায় তাহার হৃদয় কাণায়-কাণায় ভরা। ধীরে সে বলিল—আচ্ছা, আজ কোন চিঠি আসেনি ? চিঠি সত্যই সেদিন একখানা আসিয়াছিল। সেটা সুধার
ফাকি
৮৫
স্বামী লেখে নাই, তাহার দেবর দাদামশাইকে লিখিয়াছে। সে
লিখিয়াছে, থােকার কয়েকদিন হইতে খুব জ্বর, বৌদির জন্য ভয়ঙ্কর
কঁদে। দাদা থােকার কান্নার জন্য বিরক্ত হইয়া আর রাতে
বাড়ীই আসেন না, তিনি আগে মাঝরাতে বাড়ী ফিরিতেন,
এখন সমস্ত রাতই বাহিরে থাকেন। বৌদিকে দেখিতে তাহার
ভয়ঙ্কর ইচ্ছা করে, কিন্তু তাহার মা শাসাইয়াছেন, সে যদি দেখিতে
যায় তবে তাহাকে আর বাড়ী ঢুকিতে দিবেন না। এদিকে
খােকার চিকিৎসার কিছুই হইতেছে না, সে যে কি করিবে কিছুই
বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছে না। বৌদি কেমন আছেন তা যেন
তাহাকে নিশ্চয় জানানাে হয়। তরুণ মনের অনেক ব্যথার কথাই
সে লিখিয়াছে। তাহার চিঠিখানি পাইয়া দাদামশাই আজ
দিশাহারা হইয়া গিয়াছেন।
সুধা বলিল, মােজাটা কিন্তু একটু বােনা বাকী আছে, তা
তার জন্যে থােকা রাগ করবেনা, কালই আমি শেষ করে দেবাে
কিন্তু তুমি এলে, আর মনটা কেমন হু হু করছে—এতক্ষণ আমি
আকাশের দিকে চেয়ে যেন থােকার মুখ দেখছিলুম, তারাগুলাে
যেন তার সুন্দর চাউনি, না, আমার কেমন ভাল লাগছে না••
মনে হচ্ছে খােকার যেন ভয়ঙ্কর অসুখ কোরেছে, সে মা, মা, বলে
কঁদছে—অন্ধকারে হাড়ে বেড়াচ্ছে, আমাকে খুজে পাচ্ছেনা
দাদামশাই!
দাদামশাই আর আপনাকে দমন করিয়া রাখিতে পারিলেন
, এ মিথ্যার মায়াজালে ভারাক্রান্ত হইয়া ছটফট করার চেয়ে
সত্যে মুক্তি ভাল, -সে মুক্তি যতই নিৰ্মম র বেদনাময় হােক্ !
কল্পলতা
তিনি ভাঙাগলায় বলিয়া উঠিলেন—ওরে সব ফাকি, তােকে
সব মিথ্যা
সহসা তিনি থামিয়া গেলেন। সুধার কাশির বেগ আসিয়াছে।
কাশিতে কাশিতে সে উঠিয়া বসিল, ঝড়ে-দোলা লতার মত
কপিতে লাগিল।
কাশি থামিয়া গেলে সুধা যখন একটু শান্ত হইল, দাদামশাই
আর তাহাকে কিছু বলিতে পারিলেন না। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে
ডাকিলেন, মা!
না, দাদু, কষ্ট না, কিছু কষ্ট না, আমি এখন একটু ঘুমােতে
চেষ্টা করি, আমায় কিন্তু ভােরে জাগিয়ে দিও।
পরদিন বিকেল বেলায় সমুদ্রতীরের সম্মুখে বারান্দায় বসিয়া
সুধা তাহার থােকার ফটোটি দেখিতেছিল। এ ফটোটি তাহার
দেবরের একবন্ধু তুলিয়া দিয়াছিল। খুব ভালাে ওঠে নাই, তবু
এই অস্পষ্ট ছবিখানি সে থােকার রূপমাধুরী দিয়া ভরিয়া দুই
চোখ দিয়া পান করিতেছিল। ঘরের ভিতর দাদামশাইয়ের পায়ের
শব্দ শুনিয়া সে ধীরে ডাকিল—দাদামশাই।
অপরাধীর মত দাদামশাই তাহার পাশে আসিয়া দাড়াইলেন ।
তােমায় এনি ডাকলুম দাদামশাই, বােসােনা চেয়ারটায়।
দাদামশাই ; তােমার পাকাচুলগুলাে তুলি এস ত—
ওরে আমার সব চুলই যে পাকা !
;
কঁকি
৮৭
দেখত কাণে কি ময়লা—বলিয়া সুধা আঁচল দিয়া কাণ পরিষ্কার
করিয়া দিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু একটা কাণ পরিষ্কার করিয়াই
পরিষ্কার করিবার উৎসাহ চলিয়া গেল। দাদামশাই তাহার
মাথায় ধীরে হাত বুলাইয়া বলিলেন—কেমন আছিস, সুধা?
মন্দ কি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে কি জান, আমি যেন নেই,
আমি থাকা না-থাকার বাইরে গেছি—তুমি অমন করে চেওনা
হ্যা, আমার এখন কিরকম মনে হচ্ছে জান? আমরা সব ছায়া,
সব ফাকি, বাস্তব কিছু নেই—এই সামনে বালির পাড়, ওই যে
সমুদ্র ঠিক যেন ছবির মত আমার চোখে লাগছে, এই যে তুমি
বসে আছ, ওই যে লােকজন চলেছে, সব যেন ছবির মত ভেসে
চলেছে—ওই যে থােকার ফটোটা আর এই যে বাইরের ঘর-বাড়ী
জিনিষ-পত্তর লােকজন আমি কোন তফাৎ বুঝতে পারিনে
সব ছায়াবাজীর মত মনে হয়—মাঝে মাঝে আমি নিজের গায়ে
চিমটি কেটে দেখি সত্যি আমি আছি কিনা—ফাকা সব ফাকা,
এই ঘর, এই মন, এই আকাশ, সব ফাকা, তার মধ্যে সবাই
ছায়ার মত ঘুরছি—তােমার কি এরকম মনে হয়?
সত্যিই রে ফঁাকি সব ফঁাকি, আমি মিথ্যা দিয়ে একটু সুখস্বর্গ
তাের জন্থে রচনা কছিলুম-কিন্তু ফাকি দিয়ে—ওরে—
তুমি কেঁদোনা দাদামশাই, আমি জানি, আমি ঠাকুরপাের
চিঠি পড়েছি।
দাদামশাইয়ের সমস্ত দেহ রিঝিম করিয়া উঠিল, তিনি
চারিদিকে অন্ধকার দেখিলেন। দুচোখ দিয়া টন্ টন্ করিয়া
জল পড়িতে লাগিল।
bb
কল্পলতা
তুমি কঁদ্ছ, কিন্তু আমার চোখে ত জল আসে না দাদামশাই,
আমার কাছে সব মায়া, মিথ্যা মনে হচ্ছে,—কে এল, কে এল না,
কাকে দেখলুম, কাকে দেখলুম না, সব মিথ্যা-এ হাসি মিথ্যা,
এ কান্না মিথ্যা, এ সুখ মিথ্যা, এ বেদনা মিথ্যা, সমস্ত সংসার যে
ফাকি—তুমি কেঁদোনা দাদু-ওঃ!—উঃ!-
সুধার চোখে অশ্রু উৎসারিত হইয়া উঠিল না বটে, কিন্তু
কাশির বেগ আসিল।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনাইয়া আসিয়াছে, আকাশে কয়েকটি
তারা ফুটিয়া উঠিয়াছে। সুধা বারান্দা হইতে উঠিয়া ঘরে চুপ
করিয়া বিছানায় শুইয়াছিল।
সহসা সে বলিয়া উঠিল, দাদামশাই, তুমি ভেবােনা, তারা
আসবে, খােকার আসার সময় কাছে আসছে আমি বুঝতে
পারছি, আসছে তারা।
দাদামশাই দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া চুপ করিয়া রহিলেন।
আচ্ছা, সবই যদি মিথ্যা, হয়ত ঠাকুরপাের চিঠিও ত মিথ্যা,
তবে থােকা আসবে না কেন? মাঝে-মাঝে অন্ধকার দেওয়ালের
গায়ে আমি কি দেখতে পাই জান ?--খােকার কাপড়, জামা,
খেলনা, বাসন--তার ইঞ্জিন-গাড়ীটা এক নিমিষের জন্য দেওয়ালের
গা দিয়ে চলে কোথায় অন্ধকারে পাড়ি দিলে—ওই তার পদ্মকাটা
রেকাবখানা, দেওয়াল দিয়ে গড়িয়ে পড়ল—তার দুধের বাটি তার
সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে-ওরে বাছা
সুধা, চুপ কর !
ফাকি
৮৯
•
চুপ করব কি ; আমি যে শুনতে পাচ্ছি, সে আসছে—উনিও
আছেন—আসবেন তিনি-তখন হয়ত আমার জ্ঞান থাকবে না,
তখন হয়ত আমি তাকে চিনতে পারব না, কিন্তু তার পায়ের ধূলাে
একটু আমার মাথায় দিও।
=
রাত্রি আরও গভীর হইয়াছে, আকাশ তারায় ভরিয়া
গিয়াছে ; মৃদু চাপা আর্তনাদের মত সমুদ্রের ডাক বাতাসে
ভাসিয়া আসিতেছে।
দাদামশাই, আমার কোন দুঃখ নেই, কারুর ওপর আমার
রাগ নেই, তােমার কাছে আজীবন যে স্নেহ পেয়েছি, তা ত
ফঁাকি নয় ; আমার বাবার সময় আছে, কিন্তু তােমাকে আমি
ছাড়বনা—আর জন্মে তুমি নিশ্চয় আমার ছেলে হয়ে জন্মাবে--
তুমি আর ফাকি দিয়ে পালাতে পারবে না
, মা তােকে আমি ফঁাকি দেবােনা-
হ্যা, দাদামশাই, এ-জন্মে তুমি আমার যা করেছ তার আমি
কিছু শােধ দেবাে, ছেলেবেলায় কবে সে বাপ-মা হারিয়েছি কিন্তু
তাদের অভাব কোনদিন আমায় বুঝতে দাওনি। এবার তােমাকে
আমি বুকে করে মানুষ করব।
হ্যা, মা, আমাকে তুই ছাড়িসনে—তুই যদি যাস্ ত
আমাকেও নিয়ে চল।
কিন্তু তুমি ভাবছ দাদামশাই, আমি মিথ্যে বছি,-না,-
থােকা আছে, আমি যে দেখতে পাচ্ছি, সেই ঘােট-ঘরের কোণে
কল্পলতা
ম্লান প্রদীপের আলাে, ময়লা বিছানায় সে এতক্ষণ ছট্ফট্ করছিল,
ঠাকুরপাে তাকে কোলে করে বসেছিল -সে কঁছিল, আমার
জন্য গুমরে মরছিল—তার কান্না থা, হৃদয়ের বেদনা শেষ হ’ল
এবার সে যাত্রা করেছে-
সুধা !
হ্যা, এবার আমাকে তৈরী হতে হবে তার জন্যে, তার মােজাটা
আমার হাতে দাও ত, কিন্তু ঝিনুক, তুমি কিছু ঝিনুক কুড়িয়ে
নিয়ে এস–ঝিনুক নিয়ে আমার সঙ্গে সে খেলা করবে
মা !
কার সঙ্গে সে আসছে জান, সে মিথ্যা নয়, সে ফাকি নয়, সে
মৃত্যু, সে স্বয়ং যম।
বৌদি !
দেখ সুধা কে এসেছে।
কে? মা, যাই মা, একটু দাড়াও, এখনও যে থােকা
বৌদি! বৌদি কেমন আছেন দাদামশাই ?
ওত আজ সন্ধ্যে থেকে ভুল বছে, জ্ঞান নেই। থােকা কৈ ?
থােকা ত’ নেই দাদামশাই, তাকে বাঁচাতে পারলুম না, তাই
ছুটে এলুম বৌদিকে যদি বাঁচাতে পারি।
তােমার মা আসতে দিলেন ?
মাকে বলে এসেছি, মা, তােমাদের আমায় তাড়াতে হবে না,
আমি তোমাদের ছেড়ে চললুম।
ফাকি ওগাে, কি মদের গন্ধ তােমার গায়ে, কত মদ খাও তুমি—উ: কেমন জ্বর জ্বর লাগছে, কত বাসন মাজব- ভুল বছে- ভুল, ভুল সব ভুল—ওগাে, চলে, কটা রাত হবে—শরীরে যে কিছু নেই তােমার—আজ নাই বা গেলে বৌদি, আনি এসেছি- এসেছিস, আয়, আয় বাছা, কোলে আয় তাের মা তাের জন্যে মরতে পারছে না-উঃ-উঃ-ওঃ- প্রবল কাশির বেগ আসিল। রক্তবমন করিয়া সুধা বিছানায় লুটাইয়া পড়িয়া দীর্ঘশ্বাস টানিতে লাগিল। অকূল অন্ধকারময় সাগরের ঝােড়াে বাতাসে ঘরের আলাের শিখা কঁপিতে লাগিল। দাদামশাইয়ের চোখে সমস্ত সংসার অন্ধকার ফাকি মনে হইল। তিমিরাবগুণ্ঠিতা রহস্যময়ী স্তব্ধ স্নিগ্ধ রাত্রির মত মৃত্যু নিঃশব্দ-চরণে গৃহে প্রবেশ করিল।
ইরা কফি পানের পর সুহৃৎ তার সিগারটা ছাই-দানিতে ঠেকিয়ে রেখে বলতে আরম্ভ করলে, বড়দিনের ছুটিতে ট্রেনে দিল্লী যাচ্ছিলাম। পাটনা পার হতেই সকাল থেকে বিষ্টি সুরু হ’ল। পশ্চিমের দিকে বেশ শীত পাবে আশা করেছিলুম, বিষ্টি পাব ভাবিনি। অষ্ট্রিয়া থেকে দেশে ফিরে বাংলার বাইরে আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে উঠতে পারিনি, সেজন্য কসেস আরম্ভ হতেই কলিকাতা থেকে বার হয়েছিলাম প্রফুল্লচিত্তে, বহুদিন পরে দিল্লীর আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে মনে ভেবে। কিন্তু পথের বৃষ্টিভেজা দিনের কালাে রূপের দিকে চেয়ে মন ভারী হয়ে গেল। আকাশের এমন বিচ্ছিরি কালাে রং শীতের লণ্ডনের আকাশে কোন কোন দিন দেখেছি, তাছাড়া আর কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না ; এ যেন চঞ্চলগতি ইঞ্জিনের ধোঁয়ার কুণ্ডলী জমে জমে স্তরের পর স্তর ঘন অন্ধকার সৃষ্টি করেছে, ক্ষুদ্র নত আকাশ ছড়িয়ে দিকচক্রবাল জুড়ে সে অন্ধকার এক ঘেরাটোপের মত পথঘাট মাঠ বন ঘিরে আছে ; প্রান্তরভরা ঝেড়াে হাওয়ার মধ্য দিয়ে হা হা শব্দে ট্রেণ যতই অগ্রসর হতে লাগল ততই মনে হ’ল অন্ধকারের এ সঘন আবরণ ধীরে ধীরে কাছে আরও কাছে এগিয়ে এসে চলন্ত ট্রেনকে চেপে জড়িয়ে ধরবে ;
ইরা
তারপর ইঞ্জিনের শ্বাসরােধ হয়ে যাবে, এক আশাহীন অন্ধ
অন্ধকারের গর্তে দিশাহারা হয়ে আমরা হাহাকার করব, কিন্তু
বাতাসের হতাশ্বাসে আমাদের আর্তনাদ আমরা পরস্পরেও শুতে
পাব না।
সারাদিন সারাপথ সেজন্য আকাশের দিকে চাইনি, একখানা
ইতালীয়ান নভেলে মুখ গুজে পড়েছিলাম। মাঝে মাঝে বিষ্টির
ঝাপটা জানালার কাঠের উপর করাঘাত করছিল অভিমানিনী
নারীর মত।
এলাহাবাদের কাছাকাছি আসতে বিকেল হয়ে এল, মনটা
কেমন চঞ্চল হয়ে উঠল, ভূষাকালি দিয়ে লেপা শীত-সন্ধ্যার আকাশ
বড় করুণ মনে হল, যেন কোন বিরহিণী প্রতীক্ষিত প্রিয়ের পথের
দিকে চেয়ে ক্লান্ত বিনিদ্র নয়নে রাতের পর রাত যে-সব প্রদীপের পর
প্রদীপ জ্বালিয়েছে তাদের শিখা হতে কাজললতার জমান ভূষা এ
আকাশভরা অন্ধকারে ছড়িয়ে গেছে ; মিলনের লগ্নে নয়নের কোণে
যে কাজল জ্বলজ্বল করত, তা আজ শূন্য আকাশের সজলতায়
মিশিয়ে গেছে।
ট্রেন এলাহাবাদ ষ্টেশনে ঢুকতেই বুকের রক্ত দুলে উঠল। তাই
ত! আশ্চৰ্য্য! মনেই হয়নি! ইরার কথা মনেই পড়েনি।
ইরা ও এলাহাবাদ আমার অন্তরে এক-তারে বাঁধা। ট্রেনে
এলাহাবাদ পার হয়ে গেছি অথচ নেমে ইরার সঙ্গে দেখা করে
যাইনি, জীবনে এমন কখনও ঘটেনি।
কুলিকে ডেকে বেডিং সুটকেশ নামিয়ে তাড়াতাড়ি ষ্টেশনে
নেমে পড়লাম। তাড়াতাড়ি একটা টাঙাতে গিয়ে উঠে বল্লাম।
৯৪ মনে পড়ল, যতবার এলাহাবাদ ষ্টেশনে নেমেছি, ইরা নিজে ষ্টেশনে এসে আমাকে নিয়ে গেছে তাদের মােটরে। টাঙা ছোেটাতে ব'লে দিলাম। বিষ্টি থেমেছে, কিন্তু ঠাণ্ডা কনকনে বাতাস বইছে, ওভারকোটের বােতামগুলো এটে দিয়ে আকাশের দিকে চাইলাম, আকাশ একটু পরিষ্কার হয়ে আছে, ভারী কালাে ক্যানভাসের মত অন্ধকারের আবরণ পৃথিবীর ওপর চেপে ছিল, তা ধীরে ধীরে উপরে উঠছে। ইরাদের বাড়ীটা ছিল শহর ছাড়িয়ে, শহর থেকে বহুদূরে নদীর ধারে। তার ঠাকুরদা ছিলেন এলাহাবাদের এক নাম-করা উকিল ; শেষজীবনে তিনি ওকালতি ছেড়ে সন্ন্যাসী নিয়ে থাকতেন ; শহরের মধ্যে পুরাতন আমলের বাড়ীতে থাকতেন না, নদীর তীরে উন্মুক্ত প্রান্তরের মধ্যে নির্জনে বাংলা ধরণের বাড়ী করে ছিলেন। সে-বাড়ীর নাম এলাহাবাদের সব টাঙাওয়ালাদের জানা, সুতরাং পথনির্দেশ কতে হ’ল না। স্তম্ভিত আকাশের তলে ভিজেমাটির গন্ধভরা পথের দুধারে গাছপালার সজল সবুজের দিকে চেয়ে ভাবতে লাগলাম—কতদিন পরে আবার ইরাকে দেখব, আট বছর পরে ! ইয়ােরােপে যাবার সময় বােম্বাই যাবার পথে এলাহাবাদে একদিন থেমেছিলাম, তার পর সাত বছর অষ্ট্রিয়াতে কেটেছে, দেশে ফিরে ইরার কোনও খোঁজ নেওয়া হয়নি। ভাবতে লাগলাম, আট বছর পরে ইরা কেমন দেখতে হয়েছে ? তার একটি ফোটো কতবার চেয়ে পাঠিয়েছি, কিছুতেই পাঠায়নি। একটু বয়স হলেই বাঙালী মেয়েদের ফোটো তােলার সঙ্কোচবােধ কেন এত বেশী হয় বুঝি না ; তারা বােঝে না, লােকে প্রিয়জনের ইরা ৫ ফোটো চায় সুন্দর বলে নয়, স্মৃতি ব'লেও নয়, প্রেমের প্রতীক বলে: চায়, সে ছবি কল্পনাকে উদ্দীপিত করে। তা ইরা যতই বদলাক, দেখলেই তাকে চিনতে পারব। আমাকে হঠাৎ দেখে সে কি অবাক হয়ে যাবে ? ভাবতে ভাবতে খেয়াল হয়নি, গাড়ীটা কখন শহর ছাড়িয়ে ক্রমান্ধকারাচ্ছন্ন শূন্য মাঠের মধ্যে নির্জন পথ দিয়ে চলেছে, পশ্চিমের মেঘস্তুপের ওপর একটু সােনালী আলো ঝিমিক করছে। সহসা সামনে এক প্রকাণ্ড গাছ সমস্ত পথ জুড়ে দাড়াল গাছ নয়, গাছের কঙ্কালতার মােটা লম্বা গুড়ি হতে পত্রহীন বিবর্ণ শীর্ণ শাখাপ্রশাখার জাল ধূসর আকাশের পট জুড়ে নাগনাগিনীর মত দিগদিগন্তে প্রসারিত, পেছনে হাল্কা কালাে মেঘে সন্ধ্যার রঙীন আভা ক্ষীণ রক্তের স্রোতের মত টানা। চমকে উঠলাম। সেই সময়ে গাড়ী থামল। গাড়ােয়ান জানালে, বাড়ীতে হাজির হয়েছি। বদীর্ণ বৃহৎ বৃক্ষটির পাশে কালাে বাড়ী চাখেই পড়েনি, গাছের নীচে তার অস্পষ্ট ছায়া দেখে মনে হ’ল, যেন এক বৃহৎ অটোপাস্ বক্র দীর্ঘ বাহুগুলি মেলে বাড়ীটাকে চেপে ধরেছে, তাকে পীড়ন কবে, শােষণ করবে। ইরাদের বাড়ীতে আগে যতবার গেছি, সকাল বেলায় পৌঁছেছি। সূর্যের আলােভরা প্রভাতে এ বিজন শূন্য প্রান্তর প্রজ্বলিত প্রদীপের মত সুন্দর দেখাত, গাছপালায় নদীজলধারায় আলাে ঝিকিমিকি করত। বাড়ীর পার্শ্বে এই বহু-প্রাচীন বৃক্ষটিকে পূৰ্ব্বে যতবার দেখেছি, তার শাখাপ্রশাখা ঘন সবুজ পাতার ভারে আনত ; এক ৯৬ কল্পলতা অদ্ভুত রঙের ফুল ফুটুত গাছটাতে, বাড়ী ঢােকবার পথের ওপর ছড়িয়ে থাকত। কিন্তু সেই স্তব্ধতাভারাক্রান্ত শীত-সন্ধ্যায় দিগন্ত- প্রসারিত শূন্য কৃষ্ণ প্রান্তরের মধ্যে নিকষমণির পেয়ালার মত আকাশের তলে শীর্ণ-জীর্ণ বৃক্ষবেষ্টিত স্তব্ধ বাড়ীটি শুধু অজানা নয়, রহস্যময় ভীতিপ্রদ বলে মনে হল। ঠিক সেই সময় পশ্চিমের মেঘপ ঠেলে সূর্যের সপ্তাশ্বচালিত স্বর্ণ রথের রক্তিম আভার প্রকাশ হ’লতার অগ্নিবর্ণ চক্রের দ্যুতিতে চারিদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, বিষ্টি-ভেজা আকাশপ্রান্তর, কালাে গাছের ডালের জাল, গােলাপ লতা-ছাওয়া প্রবেশদ্বার, টলমল নদী জলধারা সব এক অলৌকিক আলােকে ঝিলিমিলি করতে লাগল ; সে আলাে মুগ্ধ করে না, বুকের রক্তে দোলা দেয়। বাড়ীখানা মৃতের মত স্তব্ধ, সাড়াহীন। অনেক ডাকাডাকির পর এক পশ্চিমে চাকর বার হয়ে এল, তার জ্বলজ্বলে রাঙা চোখ, লম্বা কালাে দাড়ি, মাথায় মােটা ঝুটি, সন্ধ্যার রঙীন আললা তার ওপর পড়ে তাকে অপার্থিব করে তুলেছে। চাকরটি জানালে যে, সাহেব মেমসাহেব কেউ বাড়ীতে নেই, তবে এক ঘণ্টার মধ্যে মেমসাহেব আসবেন আশা করা যায়। বেডিং সুটকেশ নামাতে ব’লে টাঙার ভাড়া চুকিয়ে বাড়ীতে না ঢুকে বাগানের দিকে গেলাম। ড্রয়িংরুমের সামনে ফুলের বাগান নদীর তীরে ; ওদিকে নদীতে প্রায়ই চড়া পড়ে থাকত, বালির ওপর বহুদুরে জল ঝিকিমিকি করত। ফুলের বাগানটি ছিল আমাদের অতি প্রিয় ; কি শরতে কি শীতে যখনই গেছি, দেখেছি, বাগানে ফুলের ঐশ্বৰ্য্য উপচে পড়ছে, ইরা ৯৭ —গােলাপ, ক্রিসেনথিমা, ডালিয়া, য়্যাষ্টর, প্যান্সি, কানেশন, লিলি, আমরস্-রঙের ফুলঝুরি ; সকাল বিকাল বেতের চেয়ারে ব’সে ওখানে আমাদের চায়ের আড্ডা ও গানের সভা হত। কিন্তু বাগানে ঢুকে চোখে জল এল ; কি উদাস করা তার রূপ! সারাদিন রােদে ঘুরে জলে ভিজে না খেয়ে মা-হারা দস্যি ছেলে যখন সন্ধ্যায় বাড়ী ফেরে, তার যেমন উস্কখুস্ক করুণ মূৰ্ত্তি হয়, এ তেমনই মলিন বেদনাময়। কেতকীর ঝাড় ভেঙে পড়েছে, গােলাপের ডাল সব মাটিতে ললাটাচ্ছে, করবীর ঝােপ লণ্ডভণ্ড ; যদি কোনও ফুল না ফুটত, সমস্তটা যদি জঙ্গল হয়ে যেত, তাহলে অত খারাপ লাগত না ; কিন্তু সেই অযত্ন-রক্ষিত বাগানে মাঝে মাঝে ফুল ফোটার প্রয়াস বড় করুণ। মনটা খারাপ হয়ে গেল, আর কনে শীতের বাতাসে বেশীক্ষণ বাইরে থাকতে ইচ্ছাও করল না, বারান্দা পার হয়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলাম। প্রশস্ত ঘর, সুন্দর সাজান। ঘরের মাঝে রাশিচক্র আঁকা কারুকার্যময় পেতলের গােল টেবিলের ওপর এক মােরাদাবাদী ফুলদানিতে মাসেল নীল ভরা, তার হলদে রং পেতলের রঙের সঙ্গে মিশে গেছে ; টেবিলের তিন দিক জুড়ে লক্ষে ছিট দিয়ে ডবল ম্প্রিঙের গদি-মােড়া সােফা, সােত্ত, চেয়ার সাজান ; চারকোণে পেতলের বড় গামলাতে পাম গাছ। স্কাই-লাইটগুলি দিয়ে ঝরা সন্ধ্যার মলিন আলােতে সব অস্পষ্ট আবছায়াময় দেখাচ্ছিল ; বলাকারদল-আঁকা জামরঙের পর্দাটা সরিয়ে একটা ফ্রেঞ্চ-জানালা খুলে দিলুম ; বাহিরে আকাশ আরও রাঙা হয়ে উঠেছে, ভয়ঙ্কর কালাে মেঘপুঞ্জের ফাক দিয়ে ঝরা সে আলাে, যেন কোন তীরবিদ্ধ ৭ ৯৮ কালাে পাখীর বুক থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে। সে অপূৰ্ব্ব রঙীন আলােয় ঘরটা অবাস্তব হয়ে উঠল। চোখে পড়ল, ফায়ার প্লেসের ম্যান্টেলপিসের ওপর নটরাজের ব্রঞ্জের মূর্তি, নীল দেওয়ালে যেন কালাে কালীতে আঁকা, এই মূর্তিটির সঙ্গে বাড়ীর পাশে দিগন্তবিস্তৃত বক্ৰশীর্ণ শাখাময় গাছটির সাদৃশ্য অনুভব করে চমকে উঠলাম, সে গাছটিও যেন এই মূর্তিটির মত কোনও তাণ্ডবনৃত্যে যােগ দিতে চায় । মূর্তিটির ওপর দেওয়ালে এক বড় ছবি—ভান গঘের “সূৰ্য্য- মুখীফুল”—মেহগনির ফ্রেমে বাঁধান, এ ছবিটা আমি পাঠিয়েছিলাম মনুসেন থেকে ইরার বিবাহের উপহার রূপে। রঙীন আলােছায়ার স্বর্ণ পীত-বর্ণের ফুলগুলি আগুনের ফুলকির মত জ্বলজ্বল করে উঠল। ঘরটি আগেকার মতনই সাজান, তবু সব জিনিষ কেমন অজানা, ঘরে-বাইরে অলৌকিক আলাে ; বড় অসােয়ান্তি অনুভব করলাম । ফায়ার প্লেসের ডানদিকে দরজা, পাশের ঘরে যাবার ; বাঁদিকে রিভলভিং বুক কে। বুক কেসের ওপর ম্যাগাজিনের গাদা ঘাটতে গিয়ে এক ছবির য়াম্ হাতে ঠেল, সেইটা নিয়ে একখানা চেয়ার টেনে বাম ফ্রেঞ্চ-জানলার কাছে। স্কাই- লাইটগুলি নিষ্প্রভ হয়ে এল, যেন ঘুম-পাওয়া ছেলের ক্লান্ত চাউনি ; সিলিংর পর খানিকটা দেওয়াল হলদে রঙের, তারপর হাল্কা নীল, যেন একটা হলদে পাড়ের নীলশাড়ী বহুদিনের ব্যবহারে মলিন, সন্ধ্যার আলাে-ছায়ায় টেবিল-চেয়ার ফুলদানী পিয়ানাে সব ঘর করুণ কাতরতায় ভরা।
ইরা
;
মন প্রফুল্ল করূতে য়্যাদাটা খুললাম, ইরার ফোটোর
য়্যাদা, আমারই তােল তার নানা বয়সের ফোটো। যাবাষ্টা
খুলতেই এলাহাবাদের সেই বিজন নদীতীরের রঙীন করুণ সন্ধ্যা
মিলিয়ে গেল, আমার প্রথম-যৌবনের প্রথম প্রেমস্বপ্নমধুর দিনগুলির
ছবি ভেসে উঠল।
তখন ইরা ছিল আমার বােন বিভার সহপাঠিনী বন্ধু, কলেজে
একসঙ্গে পড়ত। তার বাবা এলাহাবাদে থাকতেন, সেজন্যে
মেয়েকে কলকাতার কলেজের বর্ডিঙে রাখতে হয়েছিল ; কিন্তু ইরা
চিরদিন বাড়ীতে মানুষ, বাের্ভিঙে তার মন টিকৃত না, শুধু শনি-
রবিবার নয়, সব ছােট ছুটিতে আমাদের বাড়ী ছিল তার বন্ধুত্বের
আশ্রয়, তার গল্পের আড্ডা, গানের আসর। কলেজ-জীবনে আমি
তাদের সিনিয়ার ছিলাম, সেজন্যে পড়াশােনা সম্বন্ধে পরামর্শ দিতে
আমার ডাক পড়ত তাদের আড্ডায় ; পরামর্শ দেবার পরও থেকে
যেতাম ; ইরা প্রথম প্রথম একটু সঙ্কোচবােধ করলেও কিছুদিন পরে
আমি না হলে তাদের আডডা জমতই না, গানের আসরে সঙ্গত
করবার লােকের অভাব হত ।
ধীরে ধীরে ইরাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ
যােগ হয়ে গেল ; ইরার বাবা মা কলকাতায় এলে আমাদের
বাড়ীতেই উঠতেন, আর পূজার ছুটিতে প্রতি বছর বিভাকে নিয়ে
আমায় এলাহাবাদে ছুটতে হত।
প্রথম-যৌবনের হারান দিনগুলি থেকে একটি সুন্দর মধুর ক্ষণ
শুভ্র মুক্তার মত স্মৃতি-সমুদ্রের অতলতা হতে উঠে এল।
শরতের এক দুপুরবেলা। পূজার ছুটির ক’দিন বাকী।
চারতলার ছাদে সিড়ির পাশে আমার পড়বার ছােট ঘরে বসেছিলাম, সামনে কি একটা পরীক্ষা ছিল, বইয়ের রাশি চারিদিকে স্তুপীকৃত, পড়ায় মন ছিল না। সেদিন শরৎ-মধ্যাহ্নের অপরূপ সূর্যালােক ছিল স্তব্ধ অতলতায় বিলীন, সামনে পান্নাসবুজ মাঠের ওপারে সাদা বাড়ীর সারির উপর সুবিস্তীর্ণ দিক্চক্রবাল ভরে শুভ্র মেঘের পুঞ্জ দেখাচ্ছিল যেন সাগরগামী বলাকার দল সাদা ডানা মুড়ে ঘেসাঘেসি চুপ করে শুয়ে আছে ; অন্তরে কোনও চঞ্চলতা ছিল না, শুধু ইচ্ছা হচ্ছিল, ওই মেঘ্যুপের মত আকাশের সুনীল শয্যায় শুয়ে দক্ষিণ ফ্রান্সের রৌদ্রপুষ্ট দ্রাক্ষাগুচ্ছের রসধারাময় সােনালী মদিরার মত শরতের আলােকরা পান করি উপছে-পড়া ইন্দ্রনীল পেয়ালা থেকে । ইজিচেয়ারে বসে দিবাস্বপ্নের জাল বুনছিলাম। কার ডাকে চমকে উঠলাম! চেয়ে দেখি দরজার সামনে ইরা! ইরা বিভাকে খুজতে ছাদে এসেছে। বললাম, এস, কি সুন্দর নীল আকাশ দেখ ! বললে, না, তােমার পড়ার ক্ষতি হবে। বললাম, মােটেই , তুমি একটু গল্প করে গেলে তারপর পড়ায় মন বসতে পারে, কিন্তু এমনি যদি চলে যাও, তারপর পড়াশােনা অসম্ভব হবে। মৃদু হেসে সে ঘরে ঢুকূল। ইজিচেয়ারে তাকে বসিয়ে তার পাশে বেতের চেয়ারে বসলাম। কি গল্প হয়েছিল মনে নেই, অতি তুচ্ছ সামান্য কথাই হবে, জলবিম্বের মত অলীক। সেদিন ইরাকে বড় সুন্দর দেখেছিলাম- পিচফল রঙের শাড়ীর সবুজ পাড় কালাে চুলের ওপর, হাতে কয়েকগাছি সােনার চুড়ির ঝিকিমিকি, হরিণের মত কালাে দুই ইরা ১০১ চোখে স্বপ্নলােকের আভা,—সে শরতের মধ্যদিনে নির্জন ছাদের কোণে আমার গ্রন্থবিকীর্ণ ছােট ঘরের মধ্যে ইজিচেয়ারে হেলিয়ে- বসা শ্যামলী কিশােরীর মুখে যে অপরূপ সৌন্দৰ্য্যালােক দেখেছিলাম, সে সৌন্দৰ্য্য জীবনে আর কখনও দেখব না। গল্পে গানে হাসিতে বিষ্টিতে ভরা সেই দুপুরবেলার তুলনা কোথায় ! এক পশলা বিষ্টি এল, বিষ্টির ছাট ঘরে আতে লাগল, আমাদের চোখেমুখে। বললাম, ইরা, একটা বর্ষার গান গাও। হেসে বললে, কি বল, এ শরতের ক্ষণিক ধারার সঙ্গে কি বর্ষার গান গাওয়া যায়, গান আরম্ভ করতে করতেই যে বর্ষণ শেষ হবে। বললাম, বড় ইচ্ছে করূছে একটা গান শুতে। রহস্যময় চোখে একটু হেসে উঠল, বড় সুন্দর ছিল তার হাসি, গাল দুটি একটু রাঙা হয়ে ফুলে উঠত, দু-চোখের তটে কিসের কঁপন লাগত। বললে, একটা নতুন গান শিখছি, শােন, কিন্তু আস্তে আস্তে গাইব। ঝিরিঝিরি বাদলধারার সঙ্গে সে মৃদুস্বরে গাইতে আরম্ভ করলে ‘এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মাের ! যখন গান থা বিষ্টি থেমে গেছে, কৃষ্ণচূড়া ও নারিকেল গাছের পাতাগুলি ঝিকিমিকি করছে, কিন্তু আমার মনে যে মাদল বাজতে শুরু হয়েছিল তা আর থাম্তে চাইল না। ধীরে ইরার হাতখানি নিজের হাতে টেনে নিলাম, বারিস্নাত আকাশের আলাের মায়ার দিকে চেয়ে সে হাত ধরে কতক্ষণ বসেছিলাম জানি না, যখন খেয়াল হ’ল দেখি ইরা উঠে চলে গেছে। সেই ইরাকে এতদিন পরে আবার কি রূপে দেখব !
১০২
কল্পলতা
য়্যালবাষ্টা মুড়ে চারদিকে চাইতে চম্কে উঠলাম। আমি যখন
এক শরৎ-মধ্যাহ্নের সুমধুর স্মৃতির স্বপ্নরাজ্যে ছিলাম, ধীরে ধীরে
সন্ধ্যার রঙীন মায়া মিলিয়ে গেছে, রাত্রির নিবিড় তিমিরে ঘরবাড়ী
পথ মাঠ নদী আকাশ ঘন আচ্ছন্ন ; আকাশে একটি তারাও
নেই, ঘরে টেবিল চেয়ার ছবি ফুলদানি সব অন্ধকারে একাকার।
মনে হল, বহুক্ষণ ঘরে বসে আছি! গভীর রাত হয়ে গেছে ।
কিন্তু কই, ইরা এল না! চাকরটা কোথায় ? একটু ভয়
করে উঠল।
দাড়িয়ে উঠে চাকরটাকে একটা হাঁক দেব ভাবছি, একটা
জোলাে ঝােড়াে বাতাসে ফ্রেঞ্চ-জানলার কাচগুলি ঝনঝন করে উঠল,
পর্দাগুলাে দুলিয়ে এক সুদীর্ঘনিশ্বাস ঘরের অন্ধকার গুলিয়ে দিলে ।
তারপর সব নীরব ; কি ,গভীর স্তব্ধতা! কালাে পাথরের মত
সে স্তব্ধতা পৃথিবীর বুকে চেপে, ঘরের অন্ধকারে সে স্তব্ধতা
ঘনীভূত কালাে পিচের মত। দাড়াতে গিয়ে পা কেঁপে উঠল ;
চেঁচাতে গিয়ে গলার স্বর বার হ’ল না।
অন্ধকার যেমন শব্দহীন তেমনই সঘন ; নিজের হাতও দেখা
গেল না ; কোথাও একটু আলাে নেই ? প্রদীপের একটু স্তিমিত
শিখা? চোখ দুটো জ্বলতে লাগল। পকেটে দেশলাইও নেই,
আলাের সুইচটাই বা কোথায়! কিন্তু সেই কৃষ্ণ স্তব্ধতায় একটু
নড়তে, উঠতে, শব্দ করতে ভয় হ’ল ।
চোখ বুজতে চাইলাম, পারলাম না; সে মহানীরব তিমিরপুঞ্জ
আমাকে যাদু করলে, ক্ষুধিত চোখে চেয়ে রইলাম কি দেখবার
আশায় !
;
ইরা
১০৩.'
;
মনে হ’লফায়ার প্লেসের ডানদিকের দরজাটা কে খুললে ;
দরজা খােলা কি বন্ধ অন্ধকারে তা কিছুই দেখা যায় না; বাহিরের
রাত্রির অন্ধকারের সঙ্গে ঘরের অন্ধকার এক হয়ে গেছে ; তবু
মনে হ’ল, কে দরজা খুললে ; শব্দ একটু হ’ল না, নিস্তব্ধতা তেমনই
ভয়ঙ্কর ; তবু মনে হ’ল, দরজা খুলে কে দরজার পাশে চেয়ারে
বলে ; যে বলে তাকে দেখতে পাওয়া অসম্ভব, নীর অন্ধকারের
পটে আরও নিবিড়তম ঘনীভূত ছায়া ; তবু মনে হ’ল, পিচফল
রঙের শাড়ীর সবুজ পাড় কালাের ওপর : সে অন্ধকারে রক্তিম
পীত সবুজ নীল সব একাকার ; তবু মনে হ’ল, সবুজ পাড়ের
পিচফল রঙের শাড়ী অন্ধকারে রঙীন কুঙ্কটিকার মত।
তারপর যা ঘটল তা ভাষায় বােঝান অসম্ভব। বড় বিচিত্র,
ভাষাতীত সে অনুভূতি।
দেখলাম বললে ভুল হবে ; সে অন্ধকারে কিছু দেখা সম্ভবপর
কিন্তু আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করলাম,
আমার চৈতন্য দিয়ে ; যে মূর্তিটি দরজার পাশে চেয়ারে বসেছিল,
সে ধীরে উঠল, আমার দিকে করুণ নয়নে চাইলে, তারপর সে
অন্ধকারে ঘরে বসে একা গান গেয়ে উঠল
•
ছিল না ;
!
‘এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর,
শূন্য মন্দির মাের!
সে গানের সুর যন্ত্রের না মানবকণ্ঠের, ভৌতিক না স্বাভাবিক
তা বিচার করবার বুদ্ধি তখন লুপ্ত, সময়ের গতির উপলব্ধি
ছিল না।
১০৪
কল্পলতা
;
;
;
অনুভব করলাম, অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব কালের ধারা
এক সঙ্গমে মিশে এক স্রোতে প্রবাহিত ; সেই সম্মিলিত প্রবাহের
সঙ্গে এই ঘরবাড়ীভরা পৃথিবীব্যাপী গভীর স্তব্ধ অন্ধকার আমার
চারদিকে আবর্তিত হচ্ছে ; সুর জেগে উঠছে সে আবর্তনে ! এ
সুর তিমিরময় স্তব্ধতার সৃষ্টি, তারই আলােড়নে উৎসারিত।
শব্দকে স্তব্ধতা চায় না, এ ধ্বনিকে নীরব করতে চায়। কিন্তু
নবজাত সুরধ্বনি আপন আনন্দে অন্ধ তমিস্রময় নিস্তব্ধতার কঠিন
শিলাকে খান্ খান্ করে ভাঙতে চায়।
শব্দের সঙ্গে নিস্তব্ধতার দ্বন্দ্ব চলেছে ; তাই, কখনও গানের
সুর ক্ষুব্ধ, কর্কশ, লড়াই করছে ; কখনও সে সুর করুণ অশ্রু-
জলসিক্ত, অন্ধ নীরবতা ভেদ করে একটি শব্দের কমল ফোটাবার
বেদনায় আতুর।
শেষে নিঃশব্দতার জয় হল। গান শেষ না হয়ে সহসা থেমে
গেল। মহানীরবতা এ অশান্ত সুরধ্বনিকে আপনার মধ্যে সংহত
বিলীন করে নিলে, সমুদ্র যেমন আপন বক্ষের চঞ্চল তরঙ্গকে
আবার আপনার অতলতায় শান্ত করে।
তারপর, সে সঘন অন্ধকারে কি ভয়াবহ নিস্তব্ধতা। যেন
প্রলয়শেষে মহানিশার মহাভয়ঙ্কর নিশ্চল চির প্রশান্তি।
এতক্ষণে ভয় পেলাম। সে নীরবতায় গা সির সির করে
কথাটা মনে হতেই হাত-পা কাপতে লাগল।
যতক্ষণ গানের শব্দ ছিল, যাদুমন্ত্রে মুগ্ধ ছিলাম, অন্ধকার ছিল
ঐন্দ্রজালিক সুরে ভরা। কিন্তু গান থাতেই চেতনায় সহজবুদ্ধি
ফিরে এল। সে বুদ্ধি বললে, গানটা ভৌতিক।
উঠল ।
ভৌতিক!
ইরা
১০৫
;
বেশ অনুভব করলাম, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আছে ; দেহের রক্ত
চলাচল ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর ; এ নিস্তব্ধতায় শুধু একমাত্র শব্দ হচ্ছে
আমার বক্ষের স্পন্দনধ্বনি, সে ধ্বনি এ নীরবতায় ছন্দ-হারা ; বুকের
এ ধুকধুকানির শব্দ মৃদু হতে মৃদুতর হচ্ছে, ধীরে ধীরে এ মহানিঃশব্দতায়
বিলীন হয়ে যাবে, গানের সুর যেমন নীরব হয়ে গেল।
শব্দ, একটু শব্দ না হলে আমি মরে যাব!
ঠিক সেই সময় ঝড় উঠল ; নদী পার হয়ে, বাড়ী কাপিয়ে,
দরজা জানলা দুলিয়ে ঝােড়াে হাওয়া হা হা শব্দে মাতালের মত ঘরে
ছুটে এল, ভান্ গঘের ছবিটা ঝন্ ক'রে পড়ে গেল, তারপর
এক প্রচণ্ড শব্দ শুনে আমি লাফিয়ে উঠলাম।
মনে হ’লমত্ত
ঝঞ্চা এক প্রকাণ্ড বনকে নির্মূল করে তুলে, গাছপালাগুলিকে
তাণ্ডবনৃত্যে নাচাতে নাচাতে নিরুদ্দেশে নিয়ে যাচ্ছে।
আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি, ঠিক সেই সময় সে ঝড়
যদি না উঠত, সে গাছভাঙার ভয়ঙ্কর শব্দ যদি না আসত,
তাহলে আমি তিমিরময় মহানীরবতার ভারে মূৰ্জিত হয়ে পড়তাম,
হয়ত বুকের স্পন্দনধ্বনিও নীরব হত।
ঝড়ের বাতাসের সঙ্গে আমি নেচে উঠলাম, মরিয়া হয়ে
বারান্দায় ছুটে বার হয়ে গেলাম, দেহের রক্তস্রোত আবার দ্রুত
তালে নাচতে লাগল ঝড়ের মত্ত নৃত্যের ছন্দে। চীৎকার করে
উঠলাম, আছি, আমি আছি ! ঝড় তার প্রত্যুত্তরে হাঃ হাঃ
করে অট্টহাস্য করে উঠল। হাত ছুড়ে চীৎকার করে ছুটোছুটি
আরম্ভ করে দিলাম পাগলের মত,—নিজেকে কোনরকমে বাঁচিয়ে
রাখতে হবে।
১০৬
কল্পলতা
ঝড়ের বাতাসে বারান্দায় মাঠে কতক্ষণ দাপাদাপি করেছিলাম
জানি না, একটা মােটরের হর্ণ শুনে আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম।
চিরপরিচিত সে শব্দ কি মধুর লাগল !
মােটরের তীব্র আলাে বাড়ীর দরজার দিকে এগিয়ে এল !
আলাে! আলাে ! জয়, তিমিরবিদারক আলাের জয়! আলাে
দেখে এত আশা এত আনন্দ হতে পারে, জীবনে কখনও অনুভব
করিনি।
অধীর হয়ে মােটরকারের হেড-লাইটের দিকে ছুটে
গেলাম।
রাতের অজানা ভৌতিক পৃথিবী দুঃস্বপ্নের মত
মিলিয়ে গেল।
ড্রাইভার আমার পাশ কাটিয়ে বাগানের দক্ষিণে সদর বারান্দার
সামনে গাড়ী থামালে। কালো দাড়িওয়ালা চাকরটা কোথায়
ছিল, সে তাড়াতাড়ি বারান্দার ইলেকটিক আললা জ্বালিয়ে
মােটরকারের দরজা খুলে বললে, —এক সা’ব আয়া !
গাড়ী থেকে এক তরুণী নামল ; মনে হ’ল তাকে চিনলাম,
ইরা। আট বছর আগে ইরাকে যেমন দেখেছি, ঠিক তেমনই
আছে !
মেয়েটি গাড়ী থেকে নেমে চাকরকে বলে, কে ?
ইরার গলার স্বর একটু বলেছে। আমি এগিয়ে গিয়ে
বললাম, আমি ! চিন্তে পাচ্ছ? কেমন আছ ইরা?
বিস্মিত হয়ে সে আমার মুখের দিকে তাকালে, তারপর স্নান
হেসে বললে, ও, আপনি ! আপনি সুহৃৎদা! আমি রেবা !
রেবা ! কত বড় হয়েছ !
ঠিক তােমার দিদির মত দেখতে
হয়েছ ! দিদি কোথায় ?
ইরা
sot
–দিদি!
দিদি ! তার মুখ ছলছল করে উঠল।
—কি? রেবা !
—দিদি!
দিদি নেই, ছ'মাস হ’ল মারা গেছেন। আপনি
দেশে ফিরেছেন শুনেছিলাম, কিন্তু আপনার ঠিকানা
কারুর কাছ থেকে জানতে পারলাম না, একটু খবর দিতে
পারিনি।
—ও!
--আসুন !
-না, আর বসব না, আমি যাই, রাতের ট্রেনেই দিল্লী
যেতে হবে।
সে কি বলতে যাচ্ছিল, আমার মুখ দেখে ভয় পেলে।
একটু পরে বললে,—আজ রাতেই যেতে হবে? আচ্ছা চলুন,
আপনাকে ষ্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসি।
বাড়ী ছেড়ে মােটরকারে বার হলাম। বিষ্টি আরম্ভ হ’ল ;
ঝােড়াে হাওয়া নদীর এপার থেকে ওপার পর্যন্ত মর্মভেদী
হাহাকারে আর্তনাদ করছে। পেছন ফিরে চাইতে জনশূন্য তৃণশূন্য
প্রান্তরের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত বিদীর্ণ করে বিদ্যুৎ চকে
উঠল ; তার তীব্র চঞ্চল আলােয় দেখলাম, বাড়ীর ওপর সেই
শীর্ণ কৃষ্ণ বৃহৎ বৃক্ষটি নেই, ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। বুঝলাম, তারই
ভেঙে পড়ার শব্দে আমি ঘরের নীরব অন্ধকারে চমকে লাফিয়ে
উঠেছিলাম, প্রাণ পেয়েছিলাম। শুধু সে গাছের কয়েকটি শুকনাে
ভাল বাড়ীর পাশে ঝড়ের বাতাসে বড় করুণভাবে দুলছে, যেন
কোনও রােগিণীর অস্থিসার দীর্ঘ আঙুলগুলি নড়ে নড়ে হাতছানি
১০৮
কল্পলতা
দিয়ে ডাকছে, অন্ধকারে আকাশে হাতড়ে হাতড়ে যাকে খুঁজছে
তাকে পাচ্ছে না।
সেদিকে আর চাইতে পারলাম না, দু’চোখে জল ভরে এল,
সামনে গর্জমান অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইলাম। রেবাও চুপ
করে আমার গা ঘেঁসে বসে রইল। সারা পথ কোনও কথা
হ’ল না।
ষ্টেশনে আমাকে নামিয়ে রেবা বললে, ফেরবার পথে নামা
চাই কিন্তু।
দিল্লী থেকে ফেরবার পথে এলাহাবাদে নিশ্চয় নামব, কথা দিয়ে
রেবার কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
মালতী ; ; ; ভাদ্রের নদী কানায় কানায় ভরা ; কোথাও তরঙ্গের ভঙ্গী নাই ; দুই তীরের সুবর্ণ-বর্ণের শস্যক্ষেত্ৰ জলমগ্ন ; সুবিস্তীর্ণ জলরাশি দিগন্ত ব্যাপিয়া-শান্ত পরিপূর্ণতার রূপ ! শরত-প্রভাতের স্বচ্ছ আলােকে হরিতশ্যাম চিত্রপট ঝলমল করিতেছে ; মাঝে মাঝে নদী-জলধারা মৃদু বাতাসে আন্দোলিত হইয়া ছলছল করিয়া উঠিতেছে। ডেপুটিবাবুর বজরা ধীরে চলিয়াছে। মাঝিরা সারা রাত্রি লগি ঠেলিয়া ঠেলিয়া এক প্রকাণ্ড বিল পার হইয়া শ্রান্ত ; ভাের বেলা বজরা বড় নদীতে আসিয়া পড়িয়াছে ; সকালের বাতাস উঠিতেই পাল তুলিয়া দিয়া মাঝিরা তাম্রকূট সেবনের বন্দোবস্ত করিতেছে। সুকুমার ‘টুরে’ বাহির হইয়াছে। সঙ্গে স্ত্রী মনােরমা। বিবাহ বহুদিন হইয়াছে কিন্তু ডেপুটি-গৃহিণীর কোনও সন্তান হয় নাই। স্বামী ‘টুরে’ বাহির হইলে তিনিও স্বামীর সহিত বাহির হন। তা ছাড়া, এবার জমিদার বাড়ীর বজরা পাওয়া গিয়াছে, পৃথক রান্নাঘর, স্নানের ঘর প্রভৃতির অত্যন্ত সুবন্দোবস্ত ; পাড়িও দীর্ঘ। বজরার ছাদে এক বেতের চেয়ারে বসিয়া সুকুমার শারদ-নদীর ;
১১০ শােভা দেখিতেছিল,—জলময় অগাধ পরিপূর্ণতা, দিকে দিকে রৌদ্রোজ্জর শ্যামশ্রী, আকাশে নিৰ্ম্মল নীলিমা। পৃথিবী যে কি অপূর্ব সুন্দরী, তাহা সে কোনও দিন এমন গভীর ভাবে অনুভব করে নাই। কিন্তু এই বাধাহীন সােনালি আলােকময় আকাশ, এই বহুদূরবিস্তৃত স্তব্ধ জলরাশি, এই মৃদু হিল্লোলিত শস্যক্ষেত্রের গাঢ় সবুজ হইতে চঞ্চল মেঘস্তুপের মায়াময় শুভ্রতা পর্যন্ত অসীম পৃথিবী ভরিয়া যেমন গভীর শান্তি তেমনই করুণাপূর্ণ বিষন্নতা। সুকুমারের দুই চোখ ছলছল করিয়া উঠিল। পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের সহিত বুঝি গভীর বেদনা জড়িত। নদীটি একটু সঙ্কীর্ণ হইয়া আসিতেছে, অদূরে ছােট গ্রাম, তীরে বড় নারিকেল, খেজুর, আম নানা প্রকার ছায়াতরু, বাঁশবন, শরবন। একটি বৃহৎ বটবৃক্ষ, অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহের মত, জীর্ণ, স্তব্ধ। পাতা প্রায় সব ঝরিয়া পড়িয়াছে, শুধু সুদীর্ঘ শাখা-প্রশাখাগুলি আঁকিয়া বাঁকিয়া বিদ্যুল্লতার মত কোন মত্ত আবেগে দিগবিদিকে প্রসারিত! মাঝিরা সেই পুরাতন বটবৃক্ষের নীচে বজরা বাঁধিল । চাপরাসী সেলাম করিয়া নিবেদন করিল, হুজুর নন্দি গ্রাম যেতে হলে এখানে নামতে হবে। নন্দি গ্রামের পেয়াদা ঘাটে বসে আছে দেখছি। পথে নন্দিগ্রামে ইস্পেনে যাইবার কথা। সুকুমার উঠিয়া দাড়াইল। কোট প্যান্ট, পরিয়া চা খাইয়া সে তৈরীই ছিল। চাপরাসীকে বলিল, আমার হাট ও ছড়ি নিয়ে এস। নন্দিগ্রাম এখান থেকে কতদূর?
মালতী চাপরাসী উত্তর দিল, আজ্ঞে দু’ মাইল পথ হবে। সুকুমার বুঝিল, দুই ক্রোশের কম হইবে না, ঘােড়া পাইলে সুবিধা হইত। পাল্কী বা গরুর গাড়ীতে যাওয়ার চেয়ে হাঁটিয়া যাওয়া ভাল। শীঘ্র বাহির হওয়া দরকার। ডেপুটি-গৃহিণী বজরার ভিতর হইতে বাহির হইয়া আসিয়া বলিলেন, ওগাে, বেশী দেরী করাে না। আর আদালীকে দিয়ে দু’টো মুরগী পাঠিয়ে দিও, শীগগির, মিঠে কোর্মা করব, কেমন ? সুকুমার তাহার স্ত্রীর দিকে বিস্মিত হইয়া চাহিল। আট বৎসর তাহাদের বিবাহ হইয়াছে, তবু মাঝে মাঝে কেন মনে হয়, তাহার স্ত্রী তাহার নিকট সম্পূর্ণ অপরিচিতা, সে অবাক্ হইয়া যায়। স্ত্রী বলিলেন, কি, অমন হাঁ ক'রে চাইছ কি ? দেখ, আলু আর দু’দিন হবে, এ গ্রামে যদি আলু পাওয়া যায়, দেখােত। আচ্ছা—বলিয়া সুকুমার মাথায় সােলার টুপি দিল। তীরে নামিয়া একটু চলিতেই সুকুমার চমকিয়া উঠিল, থমকিয়া দাড়াইয়া চারিদিকে বিস্মিত নয়নে দেখিতে লাগিল। এই গ্রাম, এই পথ তাহার বহু-পরিচিত মনে হইল, যেন কোন্ পূৰ্ব্ব-জন্মে দেখা, কোন্ স্বপ্নে জানা। তাহার মনে হইল, এমনি এক করুণ মধুর প্রভাতে ওই বটগাছের নীচে তাহাদের নৌকা আসিয়া লাগিল, সে তাহার বন্ধুর সহিত উৎসুক অন্তরে আনন্দে তীরে নামিল,
১১২
কল্পলতা
হাস্যে গল্পে গ্রাম্য-পথ মুখরিত করিয়া চলিল। সে কি কোনও
স্বপ্নে এই শান্ত সৌন্দৰ্য-লােকে আসিয়াছিল ?
ধীরে সুকুমারের মনে পড়িল। বােধ হয় নয় বৎসর পূৰ্ব্বে
হইবে। তখন সে এম্-এ পড়ে। সতীশ রায় তাহার অন্তরের
বন্ধু ছিল। সে কলিকাতায় মানুষ, বাঙলার গ্রামের সহিত
বিশেষ পরিচিত নয়। কোনও ছুটিতে সতীশ তাহাকে জোর
করিয়া নিজের দেশে লইয়া আসিয়াছিল। এমনই সুন্দর প্রভাতে
সতীশ ও সে কি আনন্দে ওই বটগাছের ধারে নৌকা হইতে
লাফাইয়া পড়িয়াছিল! বটগাছটি এমন জীর্ণ কঙ্কালসার ছিল না,
তাহার শাখা-প্রশাখা ঘন সবুজ পাতার ভারে আনত ছিল, তাহার
স্নিগ্ধ ছায়ায় পারাপারের খেয়াঘাট ছিল। তখন শরৎ কি শীত,
কি বসন্তকাল মনে পড়িল না, সে প্রভাতে আকাশের আলাে আরও
নিৰ্ম্মল, আরও উজ্জল ছিল, বাতাসের স্পর্শ আরও মধুর ছিল,
প্রকৃতির শােভায় কোথাও বিষন্নতা ছিল না। সে আকাশ,সে আলাে
কোথায় গেল? এ জীবনে আর কি তাহার দেখা মিলিবে না ?
ওই শূন্য মাঠে হাট বসিয়াছিল, এই বিজন নদীতীর বিপণি-
নৌকায় ভরা ছিল, নদী এত স্ফীত, এত প্রশান্ত ছিল না, কিন্তু
সুকুমারের মানস-নদী ছিল কূলে কূলে ভরা।
সতীশ ও সুকুমার তীরে নামিতেই এক বালিকাকণ্ঠে “দাদা”
আহ্বানধ্বনি তাহাদের কানে আসিয়া পৌছিল, কিন্তু সুমিষ্ট
আহ্বানকারিণীকে কোথাও দেখা গেল না। সতীশ হাসিয়া
বলিল, ও মালতী, কোথায় নিশ্চয় লুকিয়ে আছে, বটগাছের
পেছনে হবে। মাতি!
মালতী
১১৩
বটগাছের পেছন হইতে এক কিশােরী হাসিয়া ছুটিয়া আসিয়া
“দাদা” বলিয়া সতীশকে প্রণাম করিল। সতীশ তাহাকে একটু
আদর করিয়া বলিল, ইনি আমার বন্ধু সুকুমার, মস্ত কবি। মালতী
মুগ্ধ চোখে সুকুমারের দিকে চাহিল, সদ্য-ফোটা শেফালির মত স্নিগ্ধ
চাহনি। দাদার বন্ধুকেও প্রণাম করা উচিত ভাবিয়া সুকুমারকে
প্রণাম করিতে আসিল। না, না, কর কি ?বলিয়া সুকুমার
একটু পেছনে সরিয়া গিয়া মালতীর হাত ধরিল, মালতী ঘাড় হেঁট
করিয়া কোনও মতে প্রণাম সারিয়া লইল। তাহার মুখ রাঙা
হইয়া উঠিল।
—দাদা শীগগির চল, মাসীমা বড় ভাবছেন, তােমাদের কাল
সন্ধ্যেতে আসবার কথা ছিল, মাসী সারা রাত ঘুমােন নি-
সতীশ বলিল, বা, আমরা যে কাল তীরনের বিলে পথ হারিয়ে
সারারাত ঘুরেছি—চ, তাের জন্যে ভাল শাড়ী আর ছবির বই
এনেছি।
তিনজনে গ্রাম্যপথ দিয়া চলিল। মধ্যে সতীশ, এক পার্শ্বে
সুকুমার, অপর পার্শ্বে মালতী। মালতী সতীশকে বাড়ীর ও
গ্রামের নানা সংবাদ বলিতে বলিতে চলিল, তাহার সুমিষ্ট কুমারী-
কণ্ঠে সরল হাস্যলহরী চারিদিকে উচ্ছসিত হইয়া উঠিল। সুকুমার
নীরব-মুখে মালতীর কণ্ঠস্বর বাক্যধারা শুনিতেছিল, বাঙলাভাষা যে
এত সহজ, এত মিষ্ট হইতে পারে, তাহা সে কোনও দিন ভাবে নাই।
মালতীর কথা সে সতীশের নিকট বহুবার শুনিয়াছে। পিতৃ-
মাতৃহীনা এই বালিকা সতীশের মাসতুত বােন। সতীশের মা’র
কোনও কন্যা-সন্তান নাই, তিনি মালতীকে আপন কন্যার অধিক
০
১১৪ কল্পলতা ; যত্নে রাখিয়াছেন। সতীশের ইচ্ছা মালতীকে কলিকাতায় আনিয়া স্কুলে পড়ায়। কিন্তু সতীশের মাতা কলিকাতায় আসিয়া থাকিতে চান না, গ্রামের জমিজমা দেখিবার ভার নায়েব মহাশয়ের হাতে দিতে তিনি নারাজ। একবার তিনি কলিকাতায় আসিয়া থাকিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন, এই বদ্ধ নগরে ক্ষুদ্র বাড়ীর মধ্যে দু’দিনেই হাঁপাইয়া উঠিয়াছিলেন। তিনি অল্পবয়সে বিধবা হইয়াছেন, সতীশ তাহার একমাত্র পুত্র ; আপন বুদ্ধি-পরিশ্রমে ক্ষুদ্র জমিদারীর পরিচালনা করিয়া তিনি সতীশকে মানুষ করিয়া তুলিয়াছেন। মালতীও সতীশের মা’কে ছাড়িয়া থাকিতে চায় না, সেজন্য কলিকাতায় আসিয়া তাহার শিক্ষালাভ হইল না। সে গ্রামের স্কুলে কিছুদিন পড়িয়াছে, তারপর সতীশ যখন ছুটিতে যায় তাহাকে পড়াইতে বসে ; বই পড়া বিশেষ হয় না, নানা গল্পে সে দেশের বিজ্ঞানের নানা কথা তাহাকে বুঝাইতে চেষ্টা করে। মালতীকে সুকুমারের অপূৰ্ব্ব বােধ হইল। ডুরে শাড়ীপরা, কেঁড়া চুল পিঠে দুলিতেছে, আয়ত কৃষ্ণ চক্ষু দু’টিতে স্নিগ্ধ সরলতা, সহজ হাসি মাখান ; সুস্থ দীর্ঘ তনু বিকশিত, সদ্য- প্রস্ফুটিত মৃণালের মত, কিন্তু মুখখানি অতি কচি ; শ্যামবর্ণ, এই শরতের শ্যামশ্রীর মধ্যে গৌরবর্ণ মানায় না, তাহার শ্যামবর্ণ-ই সব চেয়ে সুন্দর দেখায় ; বালিকার চঞ্চলতা তাহার চক্ষের নাচনে, দেহের ভঙ্গীতে ; নিষ্কলুষ চিত্তের স্বচ্ছতা সরল সুকুমার মুখে প্রকাশিত। বিকচোন্মুখ কুঁড়ির ওপর ভৃঙ্গের মত তাহার কিশােরী তনুতে যৌবন আসিয়া বসিয়াছে, তাহার অন্তরবাসিনী সে সংবাদ এখনও জানে না। • ;
মালতী • গ্রাম ছাড়াইয়া তাহারা অবারিত মাঠের মধ্যে আসিয়া পড়িল যতদূর চক্ষু যায় সােনালী ধানের ক্ষেত, হরিতে হিরণে সবুজে সুনীলে কি অপরূপ শােভা! ক্ষেতের মধ্য দিয়া একটি পায়-হাটা পথ আঁকিয়া বাঁকিয়া গিয়াছে, এই পথ দিয়া সতীশের বাড়ী যাইতে হইবে। চারিদিকে সতীশদের জনি, কয়েক শত বিঘা। --হুজুর ওদিকে পথ নেই, নন্দি গ্রাম যাবার পথ এদিকে— যেন স্বপ্ন হইতে জাগিয়া চমকিয়া সুকুমার চাহিল। সম্মুখে তা-ধারী দুই পেয়াদা, চারিদিকে শূন্য প্রান্তর ধূ ধূ করিতেছে, কোথাও ধানকাটা হইয়া গিয়াছে, কোথাও পােড়াে জমি, কোথাও জল জমিয়া পানায় ভরিয়া গিয়াছে। ডেপুটি-জীবনের মূৰ্ত্তিমান সাক্ষ্যস্বরূপ পেয়াদা-দুইটি আবার বলিয়া উঠিল, হুজুর পথ এদিকে, ওদিকে মাঠের মধ্যে কোথায় যাবেন ? সুকুমার গম্ভীরস্বরে বলিল, রায়দের বাড়ী যাবার পথ কোন দিকে হবে ? স্থানীয় পেয়াদাটি উত্তর দিল, কোনও পথ নেই হুজুর, আলে আলে যেতে হবে। তাদের ত কেউ নেই হুজুর, বাড়ী ভেঙে পড়েছে, সব জঙ্গল হয়ে গেছে। সুকুমার বলিল, আচ্ছা, তােমরা যাও। আজ আর নন্দি গ্রামে যাওয়া হবে না, তােমরা ফিরে যাও, আমার এদিকে একটু কাজ আছে। পেয়াদারা অতি বিস্মিত হইয়া সেলাম করিয়া চলিয়া গেল। কাদা ভাঙিয়া, আল পার হইয়া, কাশবনের পাশ দিয়া,
১১৬
কল্পলতা
বাঁশবনের মধ্য দিয়া জঙ্গলময় বাগানে ঢুকিয়া সুকুমার এক ভগ্ন
অট্টালিকার সন্ধানে চলিল মাথা হইতে টুপি দুইবার পড়িয়া
গেল, জামা দু’জায়গায় ছিড়িয়া গেল, হাত পা ক্ষত বিক্ষত হইতেছে,
সেদিকে তাহার লক্ষ্য নাই। তাহার মনে হইল, তাহার সহিত
সতীশ ও মালতী হাসিয়া গল্প করিতে করিতে চলিয়াছে।
মালতী বলিল, দেখ দাদা, কি সুন্দর ধান হয়েছে।
সতীশ উত্তর দিল, মা খুব খুসি।
—হ দাদা, মাসীমা তিনটে নূতন গােলা করেছেন ; জানাে
দাদা, কাল দয়ের ওদিকে কাদাখোচা পাখী দেখেছি, তােমার বন্ধু
বন্দুক ছুড়তে জানেন?
বন্দুক ত একটি এনেছেন, কি শিকার করেন দেখা যাক।
—জানাে দাদা, কালি গ্রামে বাঘ বেরিয়েছে, আহা পরশু দু'টো
বাছুর নিয়ে গেছে না কি, তােমার বন্ধুকে বাঘ শিকার করতে নিয়ে
-ওরে বুড়ি, উনি কবি যে, উনি কি এখানে বাঘ শিকার
করতে এসেছেন, উনি এসেছেন প্রকৃতির শােভা দেখতে,-গাছ,
ফুল, পাখী চিনতে, পাড়াগাঁয়ে চাষারা কেমন থাকে তাই
জানতে।
—দাদা, এবার কিন্তু আমাদের কপির চাষ করতে হবে।
আম-জাম-বাগান ভরিয়া বাতাস মর্মরিত হইয়া উঠিল।
মালতীর সরল হাস্যোজ্জ্বাস সুকুমারের কানে বাজিতে লাগিল।
কোথায় সেই দহ ? দহটি প্রথম দেখিয়া সুকুমার চমৎকৃত
হইয়াছিল। চার মাইল লম্বা ও প্রায় এক মাইল চওড়া এই
দহ হ্রদের মত মনে হয়। সতীশের পিতা এই দহের তীরে
পৈতৃক পুরাতন বাড়ী ভাঙ্গিয়া প্রকাণ্ড দোতলা বাড়ী নির্মাণ
করিয়াছিলেন।
বৃহৎ ভগ্ন অট্টালিকার সম্মুখে সুকুমার আসিয়া দাঁড়াইল।
দরজা-জানালার পাল্লাগুলি কে খুলিয়া লইয়া গিয়াছে, সম্মুখের
বারান্দা ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে, দেওয়ালে বহুস্থানে বালি খসা,
একদিকের ছাদ নীচু হইয়া বাড়ীটি যেন হেলিয়া গিয়াছে, নানা
বন্যলতা বাড়ীর সর্বাঙ্গ জড়াইয়া উঠিয়াছে, চারিদিকে খেজুর
নারিকেল গাছের ভিড়।
জলাভূমি ; সেই দিগন্তবিসারী নিৰ্ম্মল দহ আর নাই। শােলা,
কলমী, কচুরী পানা, চেঁচো ঘাসে বদ্ধ জলা। তীরের নিকট
কোথাও বা লাল সাদা নানা রং-এর শাপলা ফুল। কাকচক্ষু
অগাধ জলরাশি গলিত রজতধারার মত টলমল করিত, সূর্যোদয়
সূর্যাস্তে তাহাতে রং-এর হােলিখেলা হইত, মেঘের ছায়া পড়িত,
চাদের মায়া ঘনাইত, অন্ধকার রাত্রে দর্পণের মত চকমক করিয়া
উঠিত। কোথায় সেই দহ ?
ভাঙা ঘাটে এক পাথরের উপর সুকুমার বসিয়া পড়িল।
তাহার যেন আর দাড়াইবার শক্তি নাই। ঘাটের বানাে বসিবার
;
১১৮ স্থান অশ্বখমূলবিদারিত। চারিদিকে প্রাচীন শাখাবহুল বৃক্ষগুলি আন্দোলিত করিয়া হা হা করিয়া বাতাস বহিয়া গেল! সম্মুখে সবুজের পঙ্কিল আস্তরণের মধ্যে একটু জল রৌদ্রে ঝিকমিক করিতেছে, অশ্রুভরা নয়নের মত করুণ। স্বপ্নছবির পর ছবি ভাসিয়া উঠিল। কোন্ পূৰ্ব্ব সুখ-জীবনের কথা। বহু বৎসর পূর্বে সতীশ ও মালতীর সহিত কাটানাে এই দহের ধারের দিনরাতগুলি। গল্পের একটানা সূতায় সে-কথা সে ভাবিতে পারিল না, বেদনার টানে সূতা বার বার ছিড়িয়া গেল। স্মৃতি কথক নহে, সে চিত্রশিল্পী, চিরপ্রবহমান জীবন হইতে কয়েকটি দৃশ্য বাছিয়া সে ছবি আঁকিয়া রাখিয়াছে। সুকুমারের মনে পড়িল খণ্ড খণ্ড ঘটনা। = কলিকাতায় কখনও সে ভােরে উঠিত না। কিন্তু সতীশদের গ্রামে আসিয়া প্রতিদিন সে সূর্যোদয়ের পূর্বে উঠিত। দহের ধার দিয়া শিশির-ভেজা ঘাসের উপর বহুদূর চলিয়া যাইত, তাল নারিকেল পত্রগুলির মধ্য দিয়া সূর্যোদয় দেখিতে বড় ভাল লাগিত। এক ঊষায় জাগিয়া দেখিল, সতীশ তখনও ঘুমাইতেছে, তাহাকে জাগাইল না, একা ঘর হইতে বাহির হইল। চারিদিক্ তখনও ছায়াভরা, প্রকাণ্ড প্রাঙ্গণে ধানের গােলাগুলি পার হইয়া সে গগায়াল ঘরের সম্মুখে আসিয়া পড়িল। পরিচ্ছন্ন বৃহৎ গােয়াল ঘর, তাহার আঙ্গিনাতে এক পরিতৃপ্ত, পরিপুষ্ট গাভীর পার্শ্বে মালতীর স্নিগ্ধ মূর্তি, আবছায়ায় রহস্যময়। সুকুমার পা টিপিয়া গাভীর দিকে অগ্রসর হইল। তরল অন্ধকারে অজানা মানবমূর্তি দেখিয়া
মালতী
১১৯
গাভীটি ভীত হইয়া লাফাইয়া উঠিল, তাহার পায়ের আঘাতে
দুধে-ভরা এক পিতলের বাতি উল্টাইয়া পড়িল। মালতী চেঁচাইয়া
উঠিল, পুটি কি করলি ! তারপর সুকুমারকে দেখিয়া উচ্চহাস্যে
বলিয়া উঠিল, ও আপনি! বেশ! চোরের মত আসছেন কেন,
আপনার জন্যে কি হ’ল দেখলেন ?
সুকুমার বিস্মিত হইয়া বলিল, আমার জন্যে ?
মালতী উত্তর দিল, বা, আপনাকে দেখে ভয় পেয়েই পুটু
বাতি ওল্টালে। তা বেশ, মাসীমা বলেছিলেন, আপনার জন্যে
ক্ষীর-কমলা আর চন্দ্রপুলী করবেন, তা আর খেতে পেলেন না।
সুকুমার লজ্জিত হইল। বলিল, দেখ, মাসীমাকে বলে না,
তুমি গাঁ থেকে কিছু দুধ আনবার ব্যবস্থা কর। মালতী কলহাস্য
করিয়া উঠিল, আচ্ছা আচ্ছা, আপনার দুধের কথা ভাবতে হবে না।
তাহার সরল হাসির মত সুন্দর, শুভ্র ফোন দুগ্ধস্রোত গােষ্ঠপ্রাঙ্গণে
প্রবাহিত হইয়া গেল। গাভী পুটু মালতীর হস্তের একটি মৃদু
চপেটানত লাভ করিল।
সুকুমার দহের তীরে আসিয়া বসিল, শুকতারার দপদপানি,
উবার আলাে, জলের শীতল অতলতা তাহার বড় মধুর লাগিল।
একদিন প্রভাতে মালতী আসিয়া সতীশকে বলিল, দাদা,
আজ দয়ে সাঁতার কাটবে চল ; তােমার বন্ধু সাঁতার কাটতে
জানেন ?
সুকুমারের সাঁতার শিক্ষা কলিকাতায়, গােলদীঘির সুইমিং
ক্লাবের সে এক উৎসাহী সভ্য।
১২০
কল্পলতা
তিনজনে মিলিয়া সাঁতার কাটিতে চলিল। সতীশের মাতা
মালতীর এত দুরন্তপনা পছন্দ করিতেন না, কিন্তু সতীশ তাহাকে
প্রশ্রয় দিত বলিয়া তিনি বাধা দিতে পারিতেন না।
গাছ হইতে জলে লাফাইয়া পড়া, জল ছোড়াছুড়ি, মাতামাতি,
ডুব-সাঁতার -- সে কি সহজ সুখ !
তিনজনে সাঁতার প্রতিযােগিতা। সুকুমার বেশী দূর যাইতে
পারিল না, দহের জল যেন ভারী। সতীশ ইচ্ছা করিয়াই, অতি
পরিশ্রান্ত, এরূপ ভাব দেখাইল। প্রতিযােগিতায় জিতিয়া মালতীর
কি হাসি, কি আনন্দ! বহুদূর সাঁতার কাটিয়া গিয়া তিনজনে
যখন দহের তীরে বিশ্রাম করিতে বসিল, সুকুমার মুগ্ধনেত্রে দেখিল,
মালতীর জলে-ভেজা কালােচুলে সূর্যালােকের ঝলমলানি, হাস্যদীপ্ত
আননে অধরে স্নাততনুর রেখায় রেখায় আলােক-লীলা। যেন
কোন স্বপ্নময়ী নাগবালা সূৰ্য্যহসিত জলরাশির অতলতা হইতে উঠিয়া
আসিয়াছে।
বিজন স্তব্ধ মধ্যাহ্ন ; দহের স্থির জলে শুভ্র মেঘস্তুপের ছায়া,
বাঁশবন তালবনের ছায়া।
সুকুমার এক গাছের তলায় বসিয়া একটি ইংরেজি কবিতার
বই পড়িতে চেষ্টা করিতেছিল। গাছের ওপর হইতে একটি পেয়ারা
তার বই-এর ওপর আসিয়া পড়িল। সে উপরে চাহিয়া দেখিল,
গাছের পাতার আড়ালে মালতী লুকাইয়া। ধীরে সে গাছে
উঠিতে চেষ্টা করিল, মালতী গাছ হইতে লাফাইয়া পালাইতে গেল,
সুকুমার তাহার পেছন ছুটিল, আম-বাগানে দু’জনে ছুটাছুটি পড়িয়া
মালতী
১২১
গেল। লাফাইয়া পড়িতে গিয়া মালতীর পা একটু মচকাইয়া
গিয়াছিল, সুকুমার সহজে তাহাকে ধরিয়া ফেলিল, তাহার কোমল
হাত দৃঢ় করিয়াই ধরিল। মালতী হাসিয়া চেঁচাইল, উঃ, লাগছে
ছেড়ে দিন। তাহার সমস্ত মুখ আরক্ত। সুকুমার আরও দৃঢ়
করিয়া দুই হাত ধরিল। সহসা মালতী কঁদিয়া ফেলিল ; তাহার
সত্যই লাগিতেছিল। সুকুমার হাত ছাড়িয়া হতভম্ব হইয়া
দাড়াইয়া রহিল। ধীরে বলিল, মালতী, আমায় ক্ষমা কর ।
লজ্জায় কান্না চাপিয়া মালতী চলিয়া গেল। সুকুমারের চোখে
প্রখরালােকদীপ্ত পৃথিবী বড় শূন্য মনে হইল। সে আনমনা
গাছতলায় বসিয়া পড়িল।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরে মালতী এক শালপাতার ঠোঙাতে
অপরিমিত লঙ্কা লবণ মিশ্রিত আমের আচার লইয়া আসিয়া যখন
বলিল, খাবেন? লঙ্কা খাওয়া অভ্যাস না থাকিলেও সে হাসিমুখে
‘উঃ আঃ করিয়া সমস্ত আচার শেষ করিল।
সে-সন্ধ্যাটি সে জীবনে ভুলিতে পারিবে না। ঘর অন্ধকার,
বারান্দায় বসিয়া সে সূৰ্যাস্ত দেখিতেছিল। পূৰ্বাকাশ কালো
মেঘে ছাওয়া, পশ্চিমাকাশের মেঘস্তপে রঙের সঙ্গে রঙের ঠেলাঠেলি,
দহের জল গলিত স্বর্ণের মত।
সুকুমার দেখিল, অদূরে অঙ্গন দিয়া মালতী প্রদীপ হস্তে
চলিয়াছে, তুলসীতলায় সন্ধ্যা দিয়া যাইতেছে, দেবী প্রতিমার মত
মুখখানি প্রদীপের শিখায় উদ্ভাসিত, কি স্নিগ্ধ, কি অপরূপ !
তাহার ইচ্ছা হইল, সে বলিয়া ওঠে, মালতী, আমার গৃহ
১২২
কল্পলতা
অন্ধকার, ওই প্রদীপ হস্তে তুমি আমার গৃহে এসাে, ওই মঙ্গলস্নিগ্ধ
শিখায় আমার জীবন আলােকিত করিয়া তােল।
সুকুমারের যৌবন-হৃদয়ের যে বিজন গৃহে জীবন-প্রিয়ার জন্য
আসন পাতা হইয়াছে, প্রেমারতির প্রদীপ অনাগতার প্রতীক্ষায়
নীরবে জ্বলিতেছে, সে গৃহে মালতী কখন নিঃশব্দ চরণে প্রবেশ
করিয়াছে, তাহা সে জানিতে পারে নাই। সে সন্ধ্যায় প্রেম-প্রদীপ
জ্বলজ্বল করিয়া উঠিল।
আর একটি দ্বিপ্রহর, নিঝুম উদাস আলােয় দিবা-স্বপ্নের জাল
বােনা যায়।
জমিদারীর কোনও মােকদ্দমা তদারকের জন্য সতীশকে সহরে
যাইতে হইয়াছে, সেখানে কয়েকদিন থাকিতে হইবে। তা ছাড়া
মালতীর জন্য এক সৎ-পাত্রের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে, কোন
উকীলের পুত্র। তাহাকেও দেখিয়া সব খোঁজ-খবর লইয়া
আসিবে।
সুকুমার এক কদমগাছের তলায় বসিয়া টুর্গনিভের ‘অন্ দি
ইভ’ বইখানি পড়িতেছিল। বইখানি তাহার দুইবার পড়া,
আর-একবার পড়িতে চেষ্টা করিয়া আনমনা হইয়া উঠিতেছিল।
মালতী সহাস্যে আসিয়া বলিল, বা, বেশ, সারাক্ষণ নিজে নিজে বই
পড়ছেন, আমায় ত একটু পড়ান না?
-শুনবে এই বইয়ের গল্প ?
—বলুন, নিশ্চয় শুনব। মালতী চুল এলাইয়া গাছের গুড়িতে
ঠেস দিয়া পা ছড়াইয়া বসিল।
মালতী
সুকুমার টুর্গনিভের উপন্যাসের গল্পটি বলিয়া যাইতে লাগিল।
তরুশ্রেণীর মর্মরে, মক্ষিকাদলের গুঞ্জরণে, দিগন্তে পুঞ্জিত সবুজের
স্তব্ধতায়, দহের জলের ঝিকিমিকিতে, বাঁশের পাতায় আলাের
কম্পনে, মালতীর স্নিগ্ধ কালাে চোখের চাওয়ায় দিবস আরও মধুর,
আরও উদাস হইয়া উঠিল।
সুকুমার যখন গল্প শেষ করিল, করুণ-কাহিনী শুনিয়া মালতীর
চোখ ছলছল করিয়া উঠিয়াছে। মালতীকে বড় সুন্দর দেখাইল।
সুকুমার মালতীর হাত নিজ হাতে টানিয়া লইল। মালতী
বাধা দিল না ; শ্যাম চিত্রপটে ছবির মত বসিয়া রহিল।
সুকুমার ধীরে বলিল, মালতি, তােমাকে আমি ভালবাসি।
যেন টুর্গনিভের গল্পের উপসংহারে নিজ জীবনের গল্প বলিতেছে।
মালতী যেন স্বপ্ন হইতে জাগিয়া উঠিল, হাত টানিয়া লইল,
আয়ত কালাে চোখ-দু’টি আরও কাল হইয়া উঠিল।
সুকুমার বলিল, শােন মালতি, আমায় তুমি বিয়ে করবে,
কেমন রাজী ?
মালতী আবার স্বপ্নাবিষ্ট হইয়া গেল ।
সুকুমার বলিল, কি, মৌন সম্মতি লক্ষণং ?
মালতী মায়াময় হাসিয়া বলিল, তার মানে ?
সুকুমার বলিল, তার মানে হচ্ছে, তুমি রাজী ব'লেই চুপ করে
আছ।
মালতী উচ্চহাস্যে বলিল, বা, আমি কি জানি?
সুকুমার বলিল, তুমি জানাে।
এবার মালতী গম্ভীর হইল, ধীরে বলিল, সত্যি বলছেন ?
১২৪
কল্পলতা
সুকুমার অস্ফুটস্বরে বলিল, হাঁ সত্যি।
মালতীর মুখ রাঙা হইল। সে বলিল, বেশ, তাহলে দাদাকে,
মাসীমাকে বলুন।
সুকুমার বলিল, তােমার দাদা আসুন।
মালতী নিমেষে উঠিয়া অন্তর্হিত হইল। জলে নীলাকাশের
ছায়ার দিকে চাহিয়া সুকুমার বসিয়া রহিল।
তারপর দুইদিন মালতীর বিশেষ দেখা পাওয়া গেল না।
ক্ষণিকের জন্য দেখা দিয়া সে পালায়।
সুকুমার দেখিল, তাহার হাস্য মৃদু, তাহার গমন মন্থর, তাহার
দৃষ্টি গভীর হইয়াছে। কোন গম্ভীর স্নিগ্ধ নারীপ্রকৃতি চঞ্চলা
সরলা বালিকার দেহে মনে ধীরে ভরিয়া উঠিতেছে। কখন যাদুমন্ত্রে
তাহার বালিকা-জীবন শেষ হইয়া নারী-জীবন আরম্ভ হইল, সে
জানিতে পারিল না।
তৃতীয় দিন মালতী ধরা দিল।
রাত্রে চাদ উঠিয়াছে চমৎকার। দহের ঘাটে সুকুমার
বসিয়াছিল চুপ করিয়া, এ কোন রূপকথার মায়াপুরী।
মালতী আসিয়া মৃদুস্বরে বলিল, নৌকো চালাবেন ? ঘাটে
একটি দুই দাড় নৌকা বাঁধা।
দুইজনে নীরবে নৌকায় গিয়া উঠিল, অতি মৃদুভাবে দাড়
টানিয়া চলিল, জলের ছপছপ, শব্দে জ্যোৎস্না রাত্রি শিহরিত হইয়া
উঠিল।
দুইধারে মায়াময় বৃক্ষশ্রেণীর মর্মরিত অন্ধকার, সম্মুখে রজতশুভ্র
মালতী
১২৫
টলমল জলপথ, উন্ধে স্তব্ধ নীলাকাশ জ্যোৎস্নধৌত। কয়েকটি
সামান্য কথা, মাঝে মাঝে হাসি, দাড় ছাড়িয়া এলাইয়া বসা।
পদ্মবনে তাহারা নৌকা থামাইয়া বহুক্ষণ বসিয়া রহিল।
চেঁচাইয়া কথা কহিতে পারিল না, সহাস্য মৃদু গুঞ্জরণ।
গভীর রাত্রিতে যখন তাহারা বাড়ী ফিরিল, তাহাদের দেহমন
কোন অতল সুধারসে কানায় কানায় ভরিয়া উঠিয়াছে।
পরদিন অপরাহে সুকুমারের বাড়ী হইতে টেলিগ্রাম আসিল।
সুকুমার তাহার প্রিয় গাছের তলায় বসিয়াছিল, বােধ-হয় মালতীর
প্রতীক্ষা করিতেছিল। চতুর্দিকে যে প্রাণ-ধারা মৃত্তিকা ভেদ
করিয়া উঠিয়াছে, শাখায় শাখায় আলােকের অভিমুখে অগ্রসর
হইয়াছে, এই পল্লবিত পুষ্পিত প্রাণােচ্ছ্বাসের স্পন্দন আপন অন্তরে
অনুভব করিতেছিল।
টেলিগ্রাম লইয়া আসিলেন সতীশের মা। উৎকণ্ঠিত হইয়া
জিজ্ঞাসা করিলেন, কোনও দুঃসংবাদ নয় ত ?
সুকুমার ভীতস্বরে বলিল, মা’র বড় অসুখ, আমায় আজই
যেতে হবে। তাঁর হার্ট, খারাপ, বাড়াবাড়ি হয়েছে।
সতীশ সহর হইতে ফিরিয়া আসে নাই। তাহার জন্য প্রতীক্ষা
করা চলিবে না। সতীশের মাতা সুকুমারের কলিকাতা যাইবার
সব বন্দোবস্ত করিতে চলিলেন। সন্ধ্যার সময় নৌকায় বাহির
হইলে ভােরে ট্রেন পাওয়া যাইতে পারে।
সতীশের মাকে প্রণাম করিয়া সুকুমার যখন তাহার হাত-ব্যাগ
লইতে সন্ধ্যার আলােছায়াময় গৃহে প্রবেশ করিল, দেখিল, মালতী
১২৬ কল্পলতা ভূমিতে নতজানু হইয়া তাহার বিছানাতে মুখ গুজিয়া কঁদিতেছে। ধীরে সে মালতীর হাত ধরিল, মাথায় হাত বুলাইল, মালতী কাপিয়া দাড়াইয়া উঠিল, তাহার বুকে মুখ গুজিল, দুই চক্ষু দিয়া দুই কপোল বহিয়া অশ্রু অঝােরে ঝরিতে লাগিল। এই চিরহাস্যময়ীর ক্রন্দন সুকুমার বেশীক্ষণ সহ্য করিতে পারিল না, তাহার বুক বুঝি ভাঙ্গিয়া যাইবে। সে শুধু বলিল, মালতি, কেঁদো না, আমি গিয়েই চিঠি দেব। মাঝিরা যখন নােকা ছাড়িয়া দিল, সূর্যের স্বর্ণরেখা মিলাইয়া গিয়াছে, আকাশ তারায় তারায় ভরা। সুকুমার ব্যথিত ক্ষুধিত চোখে তটভূমির দিকে চাহিয়া রহিল, বটবৃক্ষের অন্তরালে কে দাড়াইয়া কঁপিতেছে, মনে হইল। সে মালতী। তটভূমি ছায়ার মত মিলাইয়া গেল, চারিদিকে সজল গম্ভীর অন্ধকার নিবিড় হইয়া আসিল। তারপর ? তারপরের দিনগুলির কথা সুকুমারের ভাবিতে ইচ্ছা হইল না। কিন্তু স্মৃতির ধারা মুক্তি পাইয়া অদম্য স্রোতে প্রবাহিত, কে তাহার গতি রােধ করিতে পারে। কলিকাতায় ফিরিয়া সুকুমার দেখিল, মা সারিয়া উঠিয়াছেন, একদিন অসুখ একটু বাড়িয়াছিল, সেজন্য টেলিগ্রাম করা হইয়াছিল। সতীশকে সে চিঠি লিখিল কিন্তু তাহাতে মালতীর সহিত বিবাহ সম্বন্ধে কিছুই লিখিল না। মালতীকে একটি ছােট চিঠি লিখিবে ভাবিল, কোনও কথা খুঁজিয়া পাইল না।
মালতী ১২৭ ; ; মালতী যেন কোনও গ্রাম্য রূপকথার স্বপ্ন। নদীর তীরে, আম্রবনের ছায়ায়, গােলাভর গােষ্ঠ প্রাঙ্গণে, দহের পদ্মবনে, চালােকের মায়ায় তাহাকে মানায় ; কলিকাতার কৃত্রিম সভ্য- জীবনে অর্থগর্বিত সমাজে তাহার স্থান কোথায় ? সুকুমার বুঝিল, মালতীকে তাহার জীবন-সঙ্গিনী করা অসম্ভব। সে যদি কোনও চরের ধারে নিভৃত শান্ত পল্লীতে জীবন যাপন করিত, তাহা হইলে মালতীকে বিবাহ করিয়া সুখী হইত। এদিকে সুকুমারের অসুস্থ মাতা অতি শীঘ্র পুত্রবধূর মুখদর্শনের জন্য ব্যাকুলা হইয়া উঠিলেন। এ বিষয়ে তাহাকে উৎসাহিত করিবার লােকের অভাব ছিল না। মনােরমার পিতা সুকুমারের পিতৃবন্ধু ; মেয়েটিকে মায়েরও পছন্দ ; তাহার ভ্রাতা সুকুমারের স্কুল-কলেজের সহপাঠী। পিতৃবন্ধু স্বয়ং আসিয়া যখন প্রায়ই সুকুমারকে চায়ে বা রাতের ডিনারে নিমন্ত্রণ করিয়া যাইতে লাগিলেন, সুকুমার নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করিতে পারিল না। মনােরমাদের বাড়ীর টেনিস-ক্লাবে সে নিয়মিত সভ্য হইয়া উঠিল। কিছুদিন পর দেখিল, মনােরমার হাতে-তৈরী চা’র একটা অপূৰ্ব্ব মিষ্টতা আছে ও মনােরও বিশেষ ‘চার্মিং; সাধারণ মেয়েদের মত সে নয়। বিকালবেলা টেনির্যাকেট ঘােরাইতে ঘােরাইতে সুকুমার বালীগঞ্জের দিকে যাইতেছিল, পথে সতীশকে দেখিয়া বিস্মিত হইয়া দাড়াইল। সতীশের মুখ মলিন, চুল উস্কখুস্ক। সতীশ একটু কর্কশ স্বরেই বলিল, বেশ তােমায় তিনখানা চিঠি দিলুম, কোনও উত্তর নেই, তােমার বাড়ীর দিকেই যাচ্ছিলুম।
১২৮ কল্পলতা সুকুমার লজ্জিত হইয়া বলিল, বড় অন্যায় হয়ে গেছে । এলে ? মায়ের অসুখে সতীশ দৃঢ়স্বরে বলিল, শােন, মা ও মালতীকে নিয়ে এসেছি, আমার সেই পুরানাে ঠিকানা —ওঁরা এসেছেন ? —হ, মালতীর যে কি অসুখ করেছে, কিছুই বােঝা যাচ্ছে না -তুমি চলে আসার পর থেকেই যেমন রােগা তেম্নি দুৰ্বল হয়ে পড়েছে-বলে, বুকের মধ্যে কি রকম একটা ব্যথা করে, মাঝে মাঝে একা ছাদে গিয়ে কাদে-বলে খানিকটা কঁদলে বুকের ব্যথাটা কমে হঠাৎ কি অসুখ—সুকুমার আর বলিতে পারিল না, কোনও রকমে আপনাকে সংযত করিয়া রাখিল। - মা বললেন, চল কলকাতায়,ডাক্তারদের দেখাই,কি যে হয়েছে, মেয়েটা মুখ ফুটে বলে না, কেঁদে কেঁদেই কি প্রাণটা দেবে ! তাই নিয়ে এসেছি কলকাতায়। দু’ তিনজন ভাল ডাক্তার দেখালুম, সবাই বলে, মনের অসুখ। জান ত, ওর কি কচি মন ; ওর কষ্ট দেখে আমার রাতে ঘুম হয় না—কি যে ওর ব্যথা, কিছু মুখ ফুটে বলে না-র্যাকেটটা যে তােমার হাত থেকে পড়ে গেল সুকুমার কোনও উত্তর করিল না। -শােন, আজ সন্ধ্যেতে এসাে, মা তােমার সঙ্গে পরামর্শ করতে চান—তােমার কথা রােজই বলছেন- -দেখ ভাই, আজ আমার একটা বিশেষ ‘এগেজমেন্ট রয়েছে, আমি কাল যাব
মালতী
১২৯
;
-আচ্ছা, কাল নিশ্চয় এসাে, আমি সারাদিন বাড়ী থাকব।
বালীগঞ্জ যাইতে সুকুমারের আর ইচ্ছা করিল না, কিন্তু কে যেন
তাহাকে টানিয়া লইয়া গেল। দুইদিন হইল মনােরমার সহিত
তাহার ‘এনগেজমেন্ট হইয়া গিয়াছে।
পরদিন সর্তীশের বাড়ী যাওয়া হইল না। চন্দননগরে গঙ্গার ধারে
এক সুন্দর বাগান পাওয়া গিয়াছে, পিকনিকের ব্যবস্থা হইয়াছে।
বহু প্রতিবাদ সত্ত্বেও সুকুমারকে মনােরমাদের সঙ্গে যাইতে হইল।
তার পরদিন টেনিস-টুর্ণামেন্ট আরম্ভ ; প্রথম খেলাতেই
সুকুমার।
সত্যই কি সে একটু সময় করিয়া মালতীকে দেখিতে যাইতে
পারিত না?
দিনের পর দিন আপনাকে নানা কাজে অকাজে জড়াইয়া সে
মনকে বােঝাইতেছিল, তাহার সময় নাই।
ভাবী শ্বশুরের সুপারিশে গবর্ণমেণ্ট-চাকরির চেষ্টা চলিতেছিল।
বঙ্গ-গবর্ণমেন্টের কয়েকজন উচ্চতন ইংরেজ কর্মচারীর সহিত
দেখা করা বিশেয আবশ্যক বিবেচনা করিয়া, সে দার্জিলিং
চলিয়া গেল।
সাতদিন পরে যখন সে কলিকাতায় ফিরিয়া আসিল, সতীশ
তাহার মা ও বােনকে লইয়া দেশে ফিরিয়া গিয়াছে।
সতীশকে চিঠি লিখিয়া কোনও খবর লইতে সে লজ্জা বােধ
করিল।
সংবাদটি কোনও সহপাঠী বন্ধু তাহাকে লিখিয়া পাঠাইয়াছিল।
তিন মাস পরে হইবে ।
কল্পলতা মনােরমার সহিত মহা ধূমধামে তাহার বিবাহ হইয়া গিয়াছে। ডেপুটিগিরি চাকরিও লাভ হইয়াছে। বাঙলার কোনও ম্যালেরিয়া-প্রপীড়িত সহরে গিয়া সে ম্যালেরিয়াক্রান্ত। অসুখের সংবাদ জানিয়া মনােরমা তাহার পিতার সহিত স্বামীর নব কৰ্ম্মস্থলে যেদিন আসিল, সেই দিনই সন্ধ্যায় বন্ধুর পত্ৰ আসিল। অপরাহে প্রচুর কুইনিন খাইয়া রাগ মুড়ি দিয়া সুকুমার ‘সার্কিট হাউসের বারান্দায় বসিয়াছিল। ডাকপিয়ন চিঠি দিয়া গেল। দীর্ঘ পত্রটি দুইবার পড়িল, সব যেন বুঝিতে পারিল না, কুইনিন খাইয়া তাহার মাথা ঝিমঝিম করিতেছে। শুধু এইটুকু বুঝিল, মালতীর মৃতদেহ দহের জলে পাওয়া গিয়াছে! অন্ধকার রাত্রিতে একটি ছােট নােকা লইয়া মালতী দহ পার হইতে চেষ্টা করে ; দহের মধ্যস্থানে গিয়া তাহার নৌকা উল্টাইয়া যায়। সে অত্যন্ত দুর্বল ছিল। সে ইচ্ছা করিয়া ডুবিয়াছিল, না, তাহার সাঁতার কাটিবার শক্তি ছিল না, তাহা কেহ বলিতে পারে না। সে রাত্রিতে সুকুমারের আবার জ্বর আসিল, জ্বর উঠিল একশ পাঁচ ডিগ্রি ; সমস্ত রাত্রি ও পরদিন সে বিকারগ্রস্ত হইয়া ভুল বকিল, ‘মালতি’ মালতি। অর্ধসংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাহাকে কলিকাতায় লইয়া আসিতে হইল চিকিৎসার জন্য । দুইমাস পরে যখন সে সুস্থ হইয়া উঠিল, সতীশকে দীর্ঘ পত্র লিখিল। কোনও উত্তর আসিল না।
মালতী খোঁজ লইয়া জানিল, মালতীর মৃত্যুর সাতদিন পরেই সতীশের মাতার মৃত্যু হইয়াছে। সতীশ তাহার সমস্ত জমিদারী বেচিয়া ব্রেজিলে চলিয়া গিয়াছে। দক্ষিণ আমেরিকায় জমি কিনিয়া সে বসবাস করিবে। শুধু পেতৃক বাড়ী ও দহ বৃদ্ধ নায়েবের তত্ত্বাবধানে রাখিয়া গিয়াছে। কোথায় সেই দহ ? শরতের মধ্যাহ্নলােকপ্লাবিত শৈবালপূর্ণ দহের দিকে চাহিয়া সুকুমার দুই চক্ষের অশ্রু আর চাপিয়া রাখিতে পারিল না, ছােট শিশুর মত কোপাইয়া ফোঁপাইয়া কঁদিতে লাগিল। জনহীন জীর্ণ বনানী উদাস বাতাসে মাঝে মাঝে হা হা করিয়া উঠিল। অতি পরিশ্রান্ত ভাবে সুকুমার যখন বজরাতে ফিরিল, সূৰ্য্য মধ্যগগন অতিক্রম করিয়া গিয়াছে। চারিদিকে শুষ্ক প্রখর আলাে। মনােরমা স্বামীকে দেখিয়া উদ্বিগ্নভাবে ছুটিয়া আসিলেন, এতক্ষণ কোথায় ছিলে, পেয়াদারা খুজে খুজে হয়রান হয়েছে। এ কি, রােদে মুখ কালী হয়ে গেছে, অসুখ করে নি ত ? মনােরম স্বামীর কপালে মুখে হাত বুলাইয়া বলিলেন, কি ঠাণ্ডা তােমার হাত, গা যেন হিম। শােন, আর স্নান কোরাে না, গরম জল করে রেখেছি, হাত মুখ ধুয়ে খেতে এস। মাংসটা ঠাণ্ডা হয়ে গেল, একটু পরে মনােরমা যখন সকল খাবার আনিয়া টেবিলে ১৩২ রাখিলেন, দেখিলেন স্বামী অতি ক্লান্ত, অতি উদাসভাবে চেয়ারে বসিয়া। -বা, ওঠ, হাতে মুখে একটু জল দিয়ে এসাে। ওগাে, দেখ ত মাংসটা কেমন হয়েছে ! একটি ছােট প্লেটে মুরগীর মিঠে কোৰ্ম্মা আনিয়া মনাের স্বামীর সম্মুখে ধরিলেন। সুকুমার এক টুকরা মাংস হতাশভাবে মুখে পুরিল, রান্না আলুনী মনে হইল। লবণহীন মাংসখণ্ড কোনরূপে গিলিয়া সে উঠিয়া দাড়াইল। তাহার যেন দম আট- কাইয়া যাইতেছে। বেগে বাহিরে গিয়া সে মাঝিদের হুকুম দিল, নােঙর তুলিয়া নৌকা ছাড়িয়া দিতে। তকমাধারী পেয়াদাটি বলিল, হুজুর, নন্দি গ্রামে— সুকুমার ক্ষুব্ধকণ্ঠে হুকুম দিল, দরকার নেই—নােঙর তােল, চল, এগিয়ে চল— লেখকের বিচার অবনীর ‘ললিত-লাবণ্য’ কথা, সিতাংশুর “বালীগঞ্জে ভূতুড়ে বাড়ি ও সতীশের ‘অনন্ত তৃষ্ণা’ গল্পগুলির পর আমার গল্প তােমাদের তেমন ভাল লাগবে না। আমি যা বলব তা গল্প নয়, আমার দৃঢ়বিশ্বাস, এ-ঘটনা ঘটেছিল, অর্থাৎ ঘটা উচিত ছিল। গত মাসে সতীশ চৌধুরীর বাড়ীতে ডিনার-খাওয়া তােমাদের নিশ্চয় মনে আছে। চৌধুরীর কোনও ডিনার আমি ভুলতে পারি , ও লােকটা খাওয়ার আঃ ওস্তাদের মত আয়ত্ত করেছে। যেমন বর্ণ ও রেখা-ছন্দের সামঞ্জস্যে চিত্রের সৌন্দর্য প্রকাশিত হয় যেমন বেহালার সঙ্গে পিয়ানাের বা শরদের সঙ্গে বায়াতবলার যথাযথ সঙ্গতে সুরের সমন্বয়ে জলসা জমে ওঠে, তেমনই আহার্যের সঙ্গে পানীয়ের যথােচিত সম্মিলনেই আহারের আনন্দসৃষ্টি হয় ; ভােজ্য প্রচুর ও বিচিত্র হলেই হয় না ; আহাৰ্য্য নির্ধারণে চাই সংযম এবং ডিনারের প্রতি কোর্সের খাদ্যের সঙ্গে পানীয় নির্বাচনে চাই পান-বিলাসীর সূক্ষ্ম আভিজাতিক রুচি; চৌধুরীর প্রতি ডিনারে আহাৰ্য্য ও পানীয়ের শুধু বৈচিত্র্য নয়, আনন্দময় ঐক্য পাওয়া যায় বলেই তার ডিনারগুলি এমন উপভােগ্য। ডিনার খেয়ে যখন বাড়ী ফিরলুম, রাত বারটা বেজে গেছে, কে আমায় মােটরে বাড়ী পৌছে দিয়ে গেল, অবনী তুমিই বােধ ;
১৩৪
কল্পলতা
হয়। হাসছ কেন,—বুঝেছি, তুমি বলতে চাও, মােটরে বাড়ী
পৌছে না দিয়ে গেলে, একা বাড়ী ফেরবার মত অবস্থা আমার ছিল
, তা হয়ত সত্যি।
আমার ড্রয়িংরুম তােমরা দেখেছ, বাড়ীর একতলার প্রায়
সমস্ত অংশ জুড়ে, তার পাশে বারান্দা, তারপর দোতলাতে ওঠবার
সিড়ি। সিড়িতে উঠতে গিয়ে দেখি, ডুয়িং-রুমে আলাে জ্বলছে ।
এত রাত্রে ড্রয়িংরুমে কে আলো জ্বালাল।
খােলা দরজার পর্দা সরিয়ে দেখি, ঘর লােক-ভরা, সব অজানা
অদ্ভুত মূৰ্ত্তি ! এত রাতে এত লােক আমার জন্যে প্রতীক্ষা করছে
আর গেট খােলবার সময় দরােয়ান একটা কথাও বললে না ?
ঘরের আলাে বড় অপূৰ্ব্ব লাগল, এ-আলাে কলিকাতা ইলেটিক
কোম্পানীর বৈদ্যুতিক আলাে নয়, এ সূর্য্যের বা চন্দ্রের আলােও
নয়, এ কোনও অতীন্দ্রিয়-লােকের আলাে।
ঘরে প্রবেশ করতেই একটা সােরগােল পড়ে গেল।
—এই যে এতক্ষণে এসেছেন।
—খাওয়া বেশ ভালই হয়েছে দেখছি।
—পান ততােধিক, আমরা এদিকে এক ঘণ্টা বসে।
বিস্মিত ভাবে বললুম, ক্ষমা করবেন, আমি কাউকে ঠিক চিনতে
পারছি না, কোনও জরুরী কে নাকি, পুলিস কে?
সােফাতে একটি মােটা লােক বসেছিল, সার্কাসের ক্লাউনের
মত হা, হা করে সে অদ্ভুত হেসে উঠল,“ওহে, আমাদের চিনতে
পারছে না!
সামনের ‘সেটি’তে এক মধ্যবয়স্কা নারী ব’সে, শুষ্ক মুখ, শীর্ণ
লেখকের বিচার দেহ, চোখ দুটি অস্বাভাবিক জ্বলজ্বল করছে। কোণে গদি-আঁটা চেয়ারে এক তরুণ যুবক, কালাে কোঁকড়া চুল, কবির মত স্বপ্নভরা চোখ। রজনীগন্ধা-ভরা ফুলদানির পাশে দোলানাে-চেয়ারে এক তরুণী, বর্ষাস্নাত শ্বেতকরবার মত করুণ সুন্দর। অপর দিকে এক কিশােরী গভ-রঙের শাড়ী পরে, শ্রাবণ-জ্যোৎস্নায় অপরাজিতা লতার মত মধুর উদাস । আরও অনেক বিচিত্ৰবেশী বিভিন্ন বয়সের নরনারী। মনে হল, তাদের যেন কোন স্বপ্নে দেখেছি, চেনা হয়েছিল, কিন্তু জানা হয়নি, সব ভুলে গেছি। নােটা লােকটি পরিহাসের সুরে হেসে উঠল,-ভয় নেই, চেয়া:টায় ব’স, ‘ভারতী’তে ‘ক্লাউন' বলে একটি গল্প লিখেছিলে মনে পড়ে? -হাঁ, সে ত অনেক বছর আগে হবে। —আমি সেই ক্লাউন, আমার কথাই তুমি লিখে নাম করেছিলে। আমার আসার বিশেষ ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু এরা, বিশেষ করে ইনি, কিছুতেই ছাড়লেন না। বঙ্গভরা চোখ নাচিয়ে সে শাণ। নারীটির দিকে চাইল। ক্লাউন বলতে লাগল,—‘মা’ গল্পটা মনে পড়ে ? ইনি সেই মা। তােমার গল্পে এর সাত বছরের ছেলে টাইফয়েড়ে মারা যায়, চার বছর ধরে ইনি মৃত ছেলের জন্যে শােক করছেন, প্রতীক্ষা করছেন, এখন এসেছেন তােমার কাছে, তার প্রতি কেন এ অবিচার, কেন তাঁর ছেলে মারা যাবে, তুমি ত তাঁর ছেলেকে বাঁচিয়ে দিতে পারতে। আর এরা সব তােমার গল্প-উপন্যাসের নায়ক- নায়িকারা—এই হচ্ছে বিশু পাগল, কোণে গুম হয়ে বসে আছে, ওই তােমার তরুণ কবি রেবস্ত, ওই মাধবী কেশে শ্বেতকরবীর নালা কল্পলতা জড়িয়েছে, ওই চিরবিরহিণী অপরাজিতা-এরা এসেছেন তােমার বিচার করতে, তুমি তােমার খুশীমত তাঁদের জীবন গড়েছ, ভেঙেছ, কেন তারা এত দুঃখ পাবেন চিরদিন, তুমি কি ওঁদের সুখী করতে পারতে না ? হা, হা, এবার বড় মুস্কিলে পড়েছ, লেখক। ব্যঙ্গের সুরে সে উচ্চৈস্বরে হেসে উঠল, যেন জীবনটা একটা অট্টহাস্য। ধীরে বললুম, আমি লেখক মাত্র, মানব-সংসারে যদি দুঃখ, মৃত্যু, বিচ্ছেদ না থাকত, আমিও সে-কথা লিখতুম না, আমার কি অপরাধ? শীর্ণ। নারী ব্যথিত স্বরে বলে উঠল, কার কি অপরাধ আমি জানিনা, বুঝি না, আমি চাই আমার ছেলেকে, আমার মাণিককে ফিরিয়ে দাও। -আমি চাই আমার স্বামীকে। কেন তিনি আমায় ত্যাগ করে চলে যাবেন এক ঘৃণিতা নারীর সঙ্গে ? -আমি চাই আমার প্রেমিক, আমার অজিতকে, সে ত সত্যি আমায় ভালবাসত, আমায় বিবাহ করবে বলেছিল, তুমি কি আমার সুখ-মিলন-কথা লিখে তােমার উপন্যাস শেষ করতে পারতে না? কেন ভুমি আনলে ইন্দ্রাণীকে, অজিত তার রূপ দেখে ভুলে গেল, আমাকে ত্যাগ করে চলে গেল --আমাদের প্রেম-মিলনপথে তুমি কেন আনলে ইন্দ্রাণীকে? -আর আমি? হৈমন্তীকে আমার মত কে ভালবাসত, কে ভালবাসে? নিজ হাতে তাকে আমি খুন করলুম, হৈমন্তী শরৎ- শেফালির মত পবিত্র নিস্পাপ,.তাকে আমি সন্দেহ করলুম ; কেন .
লেখকের বিচার ১৩৭ তুমি শরতকে আনলে আমাদের জীবনে ? সে শুধু আমার মনে সন্দেহ জাগাত, নিজ স্ত্রীকে ভাবলুম অবিশ্বাসিনী, তুমি লেখক শরতের চরিত্র একে পেলে বাহবা, আমি হলুম স্ত্রী হত্যাকারী ! আমি বললুম, দেখ তােমরা যদি একে একে তােমাদের কথা বল, তাহলে তােমাদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করতে পারি। শীণ নারী বলে উঠলেন, আগে আমার উত্তর দাও, কেন আমার ছেলে মরবে, টাইফয়েড রােগ থেকে ত কত ছেলে সেরে ওঠে, তুমি কি গল্পে লিখতে পারতে না, আমার ছেলে সেরে উঠল ? বললুম, মা, তুমি কি ভাবাে, তােমার ছেলের মৃত্যুতে আমার অন্তরের ব্যথা, তােমার ব্যথার চেয়ে কিছু কম ? তুমি জানাে, আমিও তােমারই মত তােমার রুগ্নশিশুর শিয়রে রাতের পর রাত ভয়ব্যাকুল চক্ষে জেগেছি ; তুমি জাননা, আমিও তােমারই মত তার রােগমুক্তির জন্যে প্রার্থনা করেছি। মনে পড়ে, যে-রাতে তােমার ছেলের মৃত্যু হয়—সন্ধ্যায় ডাক্তার বলে গেল, খােকা অনেকটা ভাল আছে, সেই আশ্বাসবাণী শুনে ভুমি ভাবলে রাতে একটু ঘুমােবে, শ্রান্তিতে তুমি তার শয্যাপাশ্বে ঘুমিয়ে পড়লে, আমি কিন্তু বিনিদ্র নয়নে জেগে রইলুম। শ্রাবণের মধ্যরাতে আকাশের সব তারা নিবিয়ে বৃষ্টি এল, দ্বারে দেখলুম, কার করাল কৃষ্ণ ছায়া, সে যম। দ্বার রােধ করে দাড়ালুম, বললুম, নিদ্রিত মায়ের কোল থেকে রুগ্ন পুত্রকে তুমি নিতে পারবে না, আমি মাকে জাগিয়ে দেব। বম বললে,তুমি বাধা দিও না, সৃষ্টির সত্যকে তুমি লঙ্ঘন করতে চাও ! আমি যম, আমি অমােঘ শাশ্বত নিয়ম, কল্পলতা করা বৃথা ; যিনি জন্মমৃত্যুর আমি আজ্ঞাবহনকারী ভৃত্য মাত্র, আমার কাছে প্রার্থনা অধিপতি তাঁর কাছে প্রার্থনা কর, কিন্তু সে প্রার্থনাও বৃথা হবে, সৃষ্টিকর্তা নিজ নিয়ম-জালে আপনি বাঁধা পড়েছেন। পারলুম না যমকে বাধা দিতে, নিশীথ রাত্রে তােমার ঘর থেকে সে তােমার ছেলেকে নিয়ে গেল, তুমি নিদ্রিতা ছিলে, ঝঞ্চাক্ষুব্ধ শ্রাবণ নিশীথাকাশের মত আমার চোখে অশ্রুর বন্যা উথলে উঠেছিল। তা যদি না হত তা হলে পারতুম কি তােমায় সৃষ্টি করতে, তােনার কথা লিখতে কি পারতুম ? তােমার মনের বেদনা আমার রেখাঙ্কিত ললাটে আমার শার্ণ কপােলে ; তােমার আশাহীন কালাে চোখের দিকে চেয়ে বিশ্বস্রষ্টাকে আমিও রাতের পর রাত প্রশ্ন করেছি ; উত্তর পেলুম না, কিন্তু শােকাতুরা মাতার দিব্য মূর্তি দেখলুম ; তুমি ছিলে চঞ্চলা বালিকা, নিজ স্বার্থকামিনী, সুশান্বেষিণী, তুমি বদলে গেলে, নিজ সুখ-সম্পদের দিকে চাইলে না, তুমি হলে সেবিকা, পৃথিবীর সব মা-হারা সন্তানদের ভুমি বুকে টেনে নিলে ; তােমার দুঃখ-বেদনা যদি না জানতুম, তােমার কথা কি লিখতে পারতুম এমন করে ? পুত্র-মৃত্যুপীড়িতা মাতা কোনও উত্তর দিল না, দীপ্ত নয়ন যুগল অশ্রুতে অন্ধ হয়ে গেছে। বিরহিণী অপরাজিতা বললে, অজিতকে ত মৃত্যুতে নিয়ে যায়নি, নিয়ে গেল এক ডাইনী, সে মায়াবিনীকে তুমিই ত আমাদের জীবনে আনলে, তােমার গল্প হয়ত বেশ জমল, কিন্তু আমার জীবন হ’ল ব্যর্থ, শূন্য। তুমি তােমার উপন্যাসের একটা
লেখকের বিচার
উপসংহার লেখ—অজিত বুঝতে পেরেছে ইন্দ্রাণী মেকী, তার
ক্ষণিক রূপের মােহ ভেঙে গেছে, অজিত বুঝবে আমার প্রেম কত
সত্য, আমি তার জন্য প্রতীক্ষা করছি, সে আমার কাছে ফিরে
আসুক, তােমার উপন্যাসের কি সুন্দর শেষ হবে বল দেখি।
বললুম, আমার সমস্যা দেখছ না, অজিতকে তােমরা দুজনেই
ভালবাস, আমি কার সঙ্গে তার মিলন ঘটাই ? অজিত যাকে
ভালবাসবে, তার সঙ্গে মিলন হওয়া ভাল নয় কি ? তোমার সঙ্গে
যদি অজিতের বিবাহ দিম, আজ ইন্দ্রাণী এসে আমার প্রশ্ন করত,
আমাদের মিলন কেন হবে না, আমরা পরস্পর পরস্পরকে
ভালবাসি ? হয়ত তোমাদের বিবাহ-বন্ধন ছিন্ন হয়ে যেত।
– মিথ্যা কথা, ইন্দ্রাণী কি অজিতকে আমার মত ভালবাসে !
ও অজিতের টাকায় ভুলেছে।
-মানলুম, কিন্তু জীবনের বিপুল পথে মানব-দেহমনের লােভ
মােহ ক্ষুধা বাসনা কামনাকে তুমি কোনও নিয়মে নিয়ন্ত্রিত করতে
পার? আমি দিতে পারি অজিতকে তােমার হাতে, কিন্তু তুমি
রাখতে পারবে কি? দীর্ঘ বিচিত্র জীবনপথে কত নবীনা ইন্দ্রাণী
অজিতের হৃদয়-দ্বারে আঘাত করবে, অজিতের হৃদয় উদাস হবে,
তার পায়ে শৃঙ্খল দিয়ে রাখতে পার, কিন্তু তার প্রেন পাবে কি ?
চাও তুমি তােনার ব্যর্থ প্রেমের কারাগারে তার অশান্ত বুভুক্ষু
দেহমনকে বন্দী করে রাখতে?
-কেন সে আমায় ভালবাসবে না? তুমি ত উপন্যাসে
লিখতে পার, সে আমায় মনপ্রাণ দিয়ে ভালবাসল, তুমি ত তাকে
তেমনই করে সৃষ্টি করতে পার।
১৪ ০
কল্পলতা
-অজিতকে আমি তােমার প্রেমিকরূপেই সৃষ্টি করতে
চেয়েছিলুম, আমি লিখতে চেয়েছিলুম, সত্যিকার প্রেমিক আজীবন
অনুরক্ত স্বামীর কথা, আঁকতে চেয়েছিলুম আদর্শ গার্হস্থ্য-জীবন।
কিন্তু মানুষের মন ত আমার হাতের পুতুল নয়, সে সজীব, সক্রিয়
অগ্নিগর্ভ, পৰ্বতগুহাবতীর্ণ। নদীধারার মত সে যে কোন্ পথে যাবে,
পুরানাে পাড় ভাঙবে, নূতন তীর গড়বে, তার পথের নির্দেশ কে
করতে পারে! সজীব মানুষ যখন আমার উপন্যাসে আসে, তাকে
ত শৃঙ্খলিত সামাজিক অনুশাসনপীড়িত করে আপন ইচ্ছা আদর্শ
মত চালাতে পারি না, সব বাধা শৃঙ্খল ভেঙে সে তার নিজ
যাত্রাপথ করে চলে, আমি তার পথ চলার কাহিনী লিখি।
দোলানাে-চেয়ার থেকে দীর্ঘ কৃষ্ণ অক্ষিপৃক্ষ্ম কঁপিয়ে মাধবী
আমার দিকে চাইল। বললুন, মূর্তিমতী বেদনার মত তুমি মূক
বসে আছ, মাধবী, তুমি ত কিছু বলছ না? আমার আত্মার
সুগভীর বেদনা দিয়ে তােমায় সৃষ্টি করেছি, তুমি আমার প্রেমের
কাহিনী জানাে। শােন, তােমরা আমার গল্প শােন :
আমি যখন কিশাের ছিলুম, এক কিশােরীকে ভালবেসেছিলুম,
সে ছিল আমার জীবন-রূপকথার রাজকন্যা, তাকে ঘিরে রচতুন
যৌবনস্বপ্ন, জীবন-মায়াজাল। কিন্তু সে সুন্দরীর মন ছিল অন্যমনা,
সে ভালবাসত আর-এক যুবককে, আনমনা হয়ে সে বসে থাকত
আমার পাশে। জেদ হ’লজয় করব ওই কিশােরী-চিত্তকে।
আমার প্রেমের সাধনায় সে মুগ্ধা হ’লতাকে জয় করলুম; যৌবনে
লেখকের বিচার ১৪১ তাকে জীবনসঙ্গিনীরূপে পেলুন। তারপর বাহির হলুন পৃথিবীর বিপণিতে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার লুটে আনতে হবে প্রিয়ার পদপ্রান্তে সেখানে স্বর্ণের জন্য হানাহানি, কাড়াকাড়ি, স্বার্থের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত, অর্থ-আহরণের প্রবল সংগ্রামে মেতে গেলুম। প্রথম যৌবনের প্রেম-বিহ্বল দিনগুলি স্বপ্ন হয়ে গেল ; প্রিয়া যখন গান গায়, আমার এস্রাজ বাজাবার সময় হয় না; প্রিয়া যখন ছবি আঁকে, আমার রং গুলে দেবার অবসর কোথায় ? বাণিজ্য করে আনলুম স্বর্ণ, ব্যাঙ্কে তহবিল উঠল উপছে। প্রিয়াকে সাজালুম,-কর্ণে মুক্তার দুল, কণ্ঠে হীরার মালা, অঙ্গুলিতে নীলার অঙ্গুরীয়, কটিতে স্বর্ণময় কাঞ্চী, পদে মণির নূপুর। গঙ্গাতীরে তৈরি করলুম বিচিত্র প্রাসাদ প্রিয়ার জন্য। জার্মান দেশ হতে এল স্থপতি, ইতালী হ’তে এল বিচিত্র বর্ণের মৰ্ম্মর প্রস্তর, চৈনিক কারিগর তৈরি করল গবাক্ষ, পারসিক রীতিতে নির্মিত হ’ল স্নানাগার। প্রাসাদের চারিদিকে রমণীয় উদ্যান রচনা করলুম-পূৰ্ব্বদ্বারে অশােকবীথিকা, পশ্চিমে তালতমালশ্রেণী, উত্তরে পদ্মদীঘি, দক্ষিণে নীপবন, করবীকুঞ্জ। কিন্তু প্রিয়ার মন রইল অন্যমনা, আনমনা হয়ে সে সুদূরে চেয়ে থাকে, প্রেমতৃষিতা। সেদিন সন্ধ্যায় পশ্চিমাকাশের বর্ণোৎসবে পৃথিবী রঙীন, হেনা- হাহানাকুঞ্জের গন্ধোচ্ছ্বাসে বাতাস মাতাল, নদীর জল কূলে কূলে ভরা। বিপণি থেকে গৃহে ফিরলুম ; চন্দনকাষ্ঠের দ্বার খুলে পারস্য কার্পেটমণ্ডিত অধিরােহণী অতিক্রম করে প্রিয়ার কক্ষের ;
১৪২ কল্পলতা ; দিকে গেলুম। সে সন্ধ্যায় প্রিয়া পরেছিল মাধবী-রঙের শাড়ী, কণ্ঠে ছিল রজনীগন্ধার মালা ; আমাকে দেখে প্রিয়া স্মিতমুখে, চকিত-পদে এগিয়ে এল, শ্বেতপ্রস্তরের গৃহতল দর্পণের মত দীপ্তিময়, পদযুগল ফুটে উঠল রক্তকালের মত, কিন্তু প্রিয়ার মন ছিল আনমনা, কাচের মত মসৃণ নেঝেতে পা গেল পিছলে, সে মূচ্ছিতা হয়ে পড়ল, শুভ্র মর্মরে রক্তপদ্মের পাপড়ি ছড়িয়ে লুটিয়ে পড়ল। সে মূৰ্ছা ভাঙল না, অন্যমনা হয়ে আমার গৃহে চলতে চলতে প্রিয়ার চরণ স্খলিত হ’লমৃতু এল। পশ্চিমাকাশের বর্ণোৎসব শেষ হয়ে অন্ধকার এল, আমার অগণিত অশ্রুবিন্দু অনন্ত আকাশ ভরে জ্বলে উঠল। সে-রাতে বিধাতাকে জিজ্ঞাসা করেছিলুম, তাকে যদি পেলুম, কেন তার ভালবাসা পেলুম না, তাকে এমন করে কেন তুমি আমার কাছ থেকে নিয়ে গেলে ? বােবা আকাশ কোনও উত্তর দিল না। উন্মাদ হয়ে প্রাসাদ ভেঙ্গে দিলুম, প্রিয়ামৃত্যুবেদনা অহর্নিশি অন্তরে বহন করে মহা উন্মাদনায় দেশ হতে দেশান্তরে ঘুরেছি। জীবনের সেই অপরিসীম বেদনাসমুদ্র মন্থন করে তুমি এলে মাধবী, তুমি এলে তরুণ কবি রেবন্ত ; তােমরা আনলে নবদৃষ্টি, নববাণী মানবজীবনে, সংসারের সুখদুঃখ পৃথিবীর সৌন্দৰ্য্য নূতন চোখে গভীর ভাবে দেখলুম। আগে যাদের হৃদয়ের ব্যথা বুঝিনি, যাদের তুচ্ছ অবহেলা করেছি, তাদের বীরত্ব, তাদের মহত্ত্ব দেখলুম, আত্মার নবজন্ম হ’ল। তুমি খুনী, তুমি ঘৃণিতা, তুমি পাগল, তুমি ক্লাউন, তােমাদের সঙ্গে অন্তরের পরিচয় হ’লতােমাদের সমব্যথী হলুম। তােমাদের দুঃখের কথা লিখেছি, তােমাদের আত্মার সংগ্রামবেদনার লেখকের বিচার ১৪৩ কাহিনী। প্রিয়াবিরহকাতর আমার অন্তর দিয়ে যা অনুভব করেছি তাই লিখেছি, আমি কথাশিল্পী, তােমাদের দুঃখে সমবেদনায় কঁদতে পারি, আমি দার্শনিক নই, মানবজীবনে দুঃখের অর্থ কেমন করে বলব ? আমি শুধু বুঝেছি, অপরূপ এই পৃথিবী, মহান এই মানবজীবন । আমি চুপ করলুম। ঘর-ভরা স্তব্ধতা কঁপতে লাগল তেল- ফুরিয়ে-যাওয়া প্রদীপের শিখার মত। সহসা বিশেপাগল হাততালি দিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠল—আমি পারি, আমি পারি বলতে, এস আমার সঙ্গে। বিশে-পাগল পূবদিকের সবুজ পর্দা সরিয়ে আমার লাইব্রেরীতে যাবার দরজা খুলে দিলে। সবাই চমকে দাড়ালুন। লাইব্রেরীতে নটরাজ শিবের একটি মূর্তি আছে দেখেছ, মূর্তিটির দিকে বিশু ছুটে গেল, হাতজোড় করে নতজানু হয়ে মূর্তির সামনে বসল। চোখে চমক লাগল । মনে হল, এ আমার লাইব্রেরী নয়, ভারতীয় কোন গুহামন্দিরের গর্ভগৃহের সম্মুখে আমি দাড়িয়ে, গর্ভগৃহের অন্ধকারে অগ্নিকান্তি নটরাজ বিগ্রহ। গৃহের দ্বার শঙ্খ- পদ্মক্ষে।দিত কারুকার্যময় প্রস্তর-নির্মিত ; দ্বারের দক্ষিণে গঙ্গা ও বামে যমুনার লাবণ্যময়ী মূর্তি উৎকীর্ণ, অমৃতনিষ্যন্দিনী রূপ কঠিন প্রস্তর ভেদ করে পদ্মের মত ফুটে উঠতে চায়—জ্যোত্মশুভ্র গঙ্গা তরুচ্ছায়ায় মকরের ওপর বঙ্কিম ভঙ্গীতে দাড়িয়ে, এক হস্তে পূর্ণ জলকুম্ভ, অপর হস্তে প্রস্ফুটিত পদ্ম ; নীলােৎপলবণা যমুনা কূৰ্ম্মের ওপর দাড়িয়ে, তাঁর এক হস্তে চামর, অপর হস্তে নীলােৎপল। গর্ভগৃহে দশদিকে যােড়শ হস্ত প্রসারিত করে অপরূপ নটরাজ- •৭ ১৪৪ কল্পলতা ; মূৰ্ত্তি—দক্ষিণ হস্তগুলিতে ডমরু বজ্ৰ শূল পাশ টঙ্ক দণ্ড সর্প ও অভয়-মুদ্রা ; বাম হস্তগুলিতে অগ্নি থেটক ঘণ্টা কপাল খঙ্গ পতাকা শুচিমুদ্রা ও গজহস্তভঙ্গী; পিঙ্গল জটাভারে অর্ক ধুতুরা-পুষ্প, চন্দ্র, গঙ্গামূৰ্ত্তি ; কণ্ঠে মুক্তার হার, সর্প-হার,বকুলের মালা ; বামস্কন্ধে ব্যা- চৰ্ম্ম ; কর্ণে কুণ্ডল; হস্তে পদে মণিমাণিক্যবিজড়িত বলয় ; অগ্নিশিখা- বেষ্টিত পদ্মের ওপর দক্ষিণ পদ; নৃত্যচঞ্চল বামপদ শূন্যে স্থাপিত। বিশে-পাগল অট্টহাস্য করলে—হাঃ হাঃ! পদ্ম-পীঠ ঘিরে অগ্নিশিখা নেচে উঠল। চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল। নটরাজ নৃত্য শুরু করলেন। নৃত্যের তালে তালে হস্তের নানা অস্ত্র দিকে দিকে ছুড়ে ফেলে দিতে লাগলেন। পরম বিস্ময়ে দেখলুম, নানা অস্ত্রের বদলে আমার গল্প-উপন্যাসের নায়ক-নায়িকারা তার অগণিত হস্তে পুত্তলিকার মত শশাভিত। নটরাজ তার ডমরু ছুড়ে ফেলে দিলেন আমার দিকে, যেন তিনি বললেন, আমার ডমরু তুমি বাজাও, আমি তােমার সৃষ্ট নরনারীদের নিয়ে নৃত্যে মাতি। দেখলুম, পুত্রশােকাতুরা মাতা, চিরবিরহিণী প্রেমিকা, জীবনের হলাহলপায়ী পাগল, সবাই মেতেছে তার হস্তে জন্মমৃত্যু সুখদুঃখের নৃত্যের উন্মাদনায় । আকাশের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত বিসর্পিল গতিতে বিদ্যুৎ চমকে গেল। অশনি-গর্জনে চমকে জেগে দেখি, সিঁড়ির পাশে বারান্দায় বেতের লম্বা চেয়ারে শুয়ে আছি, আমার চোখেমুখে বৃষ্টির জল অঝােরে ঝরে পড়ছে, বাতাসে অন্ধকার আকাশ হা হা করে উঠল।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.