Bally Sadharan Granthagar
Maharshi Esha
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মহর্ষি ঈশা
জাচার্য
হেমচন্দ্র সরকার, এম এ, ডি ডি
প্রণীত
শ্ৰীমতী শকুন্তলা দেবী, এম এ
সম্পাদিত
১৩৪১
মুল্য ॥ আট আনা মাত্র
প্রকাশক
মতী শকুন্তলা দেবী, এম এ
২৬ কর্ণওয়ালিস্ট, কলিকাতা
প্রিন্টার
এই, সি, মজুমদার
দাদা বুক প্রেস”
• অপার চীৎপুর রােড, কলিকাতা
-
নিবেদন
এই পুস্তকখানি পিতৃদেব অসমাপ্ত রাখিয়া
গিয়াছেন। ইহার শেষের পরিচ্ছেদ লিখিবার সময়
তাহার শরীর বিশেষ অসুস্থ হইয়া পড়ে, তাহার পর
আর তাহার লিখিবার অবসর হয় নাই। তাঁহার
চিন্তার ধারা অনুসরণ করিয়া আমার এই বইখানি
লিখিবার শক্তি না থাকায় সমাপ্ত করিতে পারি নাই।
যতটুকু লেখা ছিল তাহাই অসমাপ্তভাবে প্রকাশ
করিলাম। ভবিষ্যতে যদি সম্ভব হয় ইহা সম্পূর্ণ
করিবার ইচ্ছা রহিল।
No text on this page.
मूकी বিষয় rE pe ১। দশ-জীবনীর উপাদান {, জাতি ও বংশ পরিচয় বাল্যকাল ও শিক্ষা ••• E ••• ৩। বাল্যকাল ••• ৪। ধর্মভাবের উদ্রেক ০ ০ ••• ৪ । ne . । তপস্যা ও ব্রত গ্রহণ ••• ১) ০০০ ৭। গ্যালীলি প্রত্যাবর্তন ও কার্যারম্ভ... ৩ . . ৮ ০ ০ . . . ৮। মণ্ডলী গঠন ৯। শৈল-বেলীর উপদেশ ... ১। গল্পচ্ছলে উপদেশ ১১। বর্গরাজ্য ১২। মহর্ষি দশার প্রচার উম ••• .
No text on this page.
মহর্ষি ঈশা প্রথম পরিচ্ছেদ ঈশা-জীবনীর উপাদান মহর্ষি ঈশার জীবন-কাহিনীর উপাদান একমাত্র বাইবেলের নূতন পুস্তকে পাওয়া যায়। সম-সাময়িক ইতিহাসে ঈশার কোন উল্লেখ নাই। জীবদ্দশায় কেহ তাহার কার্য্যের কোন সন্ধান রাখিতেন না। কেবলমাত্র তাঁহার অল্পসংখ্যক শিষ্যগণ তাহাকে গভীর শ্রদ্ধা করিতেন। তাহারাই ভঁহার স্মৃতি রক্ষা করিয়াছিলেন। অনুরাগী শিষ্যগণের মধ্যে কেহ কেহ তাহার জীবন-কাহিনী লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন। তাহারই চারিখানি জীবনচরিত রক্ষিত হইয়াছে। কিন্তু অনুমান করা হয়, খৃষ্টধর্মের প্রথম যুগে এই প্রকায় জীবনচরিত আরও প্রচলিত ছিল। লুক- বিবৃত জীবনী-প্রারম্ভে লিখিত হইয়াছে যে অনেকে ঈশার
মহর্ষি ঈশা
জীবন-বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। তিনিও তাহাদের
পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া পূৰ্বানুবর্তিগণের নিকট যে প্রকার
শুনিয়াছিলেন, তদনুসারে এই জীবন-কাহিনী লিপিবদ্ধ
করিতে বাসনা করিয়াছেন। সুতরাং মনে হয়, প্রথম যুগে
অনেকগুলি জীবন-কাহিনী ছিল, তন্মধ্যে বর্তমান চারিখানি
রক্ষা পাইয়াছে। এই চারিখানি গ্রন্থ ঠিক কোন সময়ে
কাহার দ্বারা লিখিত হইয়াছিল, তাহা নিশ্চিত জানা
যায় না। গ্রন্থগুলি সেন্ট ম্যাথু, সেন্ট মার্ক, সেন্ট লুক ও
সেন্ট জনের নামে প্রচলিত আছে। কিন্তু ইহারা কে তাহা
নিশ্চিত জানিতে পারা যায় না। ম্যাথু ও জন্ নামে
ঈশার দুইজন শিষ্য ছিলেন। গ্রন্থ দুইখানি তাহাদের
রচিত বলিয়া বিশ্বাস করিবার পক্ষে অনেক বাধা আছে।
যাহারা ঈশার সঙ্গে ছিলেন এবং তাহার কাৰ্যকলাপ স্বচক্ষে
দর্শন করিয়াছিলেন, এমন লােকের রচনা হইলে যে প্রকার
বিবরণ আশা করা যায়, এই গ্রন্থ সেরূপ নয়। ঈশার
মৃত্যুর অনেক পরে এই গ্রন্থ রচনা করা হইয়াছে, তাহার
অনেক নির্দেশ পাওয়া যায়। বিশেষতঃ সেন্ট জনের গ্রন্থের
ভাব ও ভাষা ঈশার শিষ্য জনের লেখা বলিয়া বিশ্বাস করা
কঠিন। এই গ্রন্থে গ্ৰীকদর্শনের ছাপ সুস্পষ্ট লক্ষিত
হয়। ঈশার শিষ্য জন্ গ্ৰীকদর্শনের সহিত পরিচিত
ঈশা-জীবনীর উপাদান ছিলেন বলিয়া মনে হয় না। সেই সময়ে এলেকজাণ্ডিয়া সহরে এক শ্রেণীর দার্শনিক ছিলেন, তাঁহারা ইহুদী ধৰ্ম্ম- ভাবের সহিত গ্ৰীকদর্শনের সামঞ্জস্য করিতে প্রয়াস পাইয়া- ছিলেন। সেই শ্রেণীর কোন লােক তাহাদের ভাবে ঈশার এই জীবন-চরিত রচনা করিয়াছিলেন। ম্যাথু নামে ঈশার একজন শিষ্য ছিলেন। পূৰ্বজীবনে তিনি ঘৃণিত কর-আদায়ের ব্যবসায়ে নিযুক্ত ছিলেন। মহর্ষি ঈশা দয়া করিয়া তাহাকে আপন শিষ্যত্বে গ্রহণ করিয়া- ছিলেন। তিনি ভালরূপ লেখাপড়া জানিতেন বলিয়া জানা যায় না। বাইবেলের পুস্তকগুলি গ্রীকভাষায় লিখিত। ঈশার শিষ্য ম্যাথু গ্রীক ভাষায় অভিজ্ঞ ছিলেন বলিয়া মনে হয় না। তবে এই গ্রন্থখানি ম্যাথুর নামে কেন পরিচিত হইল ? পেপিয়াস নামক একজন প্রাচীন খৃষ্টীয় লেখক তাঁহার স্বরচিত গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, ম্যাথু খৃষ্টের বচনগুলি তাহার মাতৃভাষা এরামেয়িতে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। বােধ হয়, পরবর্তী কোন লেখক ম্যাথু লিখিত বচনগুলি অবলম্বন করিয়া ম্যাথুর নামে প্রচলিত গ্রন্থখানি রচনা করিয়াছেন। বাইবেলের জীবনচরিতগুলি ম্যাথু প্রভৃতির দ্বারা লিখিত তাহার কোন নিশ্চিত প্রমাণ নাই। গ্রন্থগুলির যে নাম দেওয়া আছে, তাহার অর্থ তঁাহাদের রচিত নয়। গ্রীক- ৪ মহর্ষিঈশা শব্দটির (Cata) অর্থ “অনুসারে’; ম্যাথু অনুসারে বা মার্ক অনুসারে লিখিত সুসমাচার। মার্ক নামে ঈশার প্রধান শিষ্য পিটারের একজন সহযােগী ছিলেন। মার্কের নামে প্রচলিত গ্রন্থখানি তাহার রচিত হইতে পারে। ব্যুক নামে সেন্ট পলের একজন অনুগত শিষ্য ছিল। সম্ভবতঃ তিনি বাইবেলের তৃতীয় গ্রন্থের রচয়িতা। এতদ্ভিন্ন তিনি প্রেরিত- গণের কাৰ্য্যাবলী’ (Acts of the Apostles) নাম দিয়া ঈশার মৃত্যুর পরে তাহার শিষ্যগণের কাৰ্য-বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। প্রাচীন খৃষ্টানেরা বিশ্বাস করিতেন, বাইবেলের গ্রন্থগুলি অক্ষরে অক্ষরে সত্য, সেগুলি ঈশ্বর-অনুপ্রাণিত ; অতএব অভ্রান্ত, কিন্তু বর্তমান সময়ে সে মত প্রায় পরিত্যক্ত হইয়াছে। এখন অধিকাংশ খৃষ্টানেরাও স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছেন যে বাইবেলের গ্রন্থগুলিকে অভ্রান্ত বলা যায় না। তাহাতে এমন অনেক কথা রহিয়াছে, যাহা অসম্ভব ও পরস্পর- বিসম্বাদী। প্রথমতঃ বাইবেলে অনেক অতিপ্রাকৃত ঘটনার উল্লেখ আছে। এই বিজ্ঞানের যুগে অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস করা কঠিন। বাইবেলের ন্যায় অন্যান্য ধৰ্ম্মগ্রন্থেও তাতি প্রাকৃত ঘটনার বিবরণ দেখিতে পাওয়া যায়। মহাত্মা বুদ্ধদেব, শ্রীচৈতন্য, হারুকিউলিস, সীজার প্রভৃতির জীবন-
আছে।
ঈশা-জীবনীর উপাদান
চরিতেও বাইবেলের অনুরূপ অতি প্রাকৃত ঘটনার বিবরণ
খষ্টানেরা সেগুলিকে অনায়াসেই অমূলক গল্প
বলিয়া পরিত্যাগ করেন; কিন্তু বাইবেলের ঘটনাগুলিকে
সত্য বুলিতে চান। ন্যায়বিচারে উভয় বৃত্তান্তই সম-দৃষ্টিতে
দেখা উচিত। প্রাচীনকালে সর্বত্রই লোকে অতিপ্রাকৃতে
বিশ্বাস করিতেন। সকল ধৰ্ম্ম-প্ৰবৰ্ত্তকের জীবনে অতি
প্রাকৃত ঘটনার উল্লেখ আছে। এমন কি ধৰ্ম্ম-প্ৰবৰ্ত্তক ভিন্ন
অনেক অসাধারণ লােকের জীবনেও বহু অতিপ্রাকৃত •
ঘটনার বিবরণ দেখিতে পাওয়া যায়। বিশ্বাস করিলে
সকলগুলিই বিশ্বাস করিতে হয়, নতুবা সকলগুলিই সমভাবে
পরিত্যজ্য।
ঈশার জীবন চরিতে এমন বহু ঘটনা
লিখিত আছে, যাহা বর্তমান যুগে বিশ্বাস করা যায়
না।
যেমন মৃত্যুর পরে তাহার সশরীরে পুনরুত্থান,
মৃত ব্যক্তিকে জীবন দান, কুমারীর গর্ভে তাহার জন্ম
ইত্যাদি। কিরূপে যে এই সকল ঘটনা গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট
হইয়াছে, তাহা অনুমান করা যাইতে পারে। এইগুলি
চাক্ষুস দর্শকদিগের লিখিত নয়, ঈশার মৃত্যুর অনেক দিন
পরে গ্রন্থগুলি লিখিত হইয়াছিল। লেখকগণ জনশ্রুতি
অবলম্বন করিয়াই স্ব স্ব গ্রন্থগুলি রচনা করিয়াছিলেন।
সে সময়ে অনুরাগী খৃষ্টীয়মণ্ডলীতে ঈশার জীবনী ও মৃত্যু
E মহর্ষি ঈশা সম্বন্ধে যে সকল আখ্যায়িকা প্রচলিত ছিল, তাহাই গ্রন্থ- গুলির ভিত্তি। সেকালের লােকেরা অন্ধবিশ্বাস-প্রবণ ছিলেন। অতিপ্রাকৃত এবং অলৌকিক ঘটনা সাধারণের সহজেই বিশ্বাস হইত। এমন কি সে যুগে লােকে বিশ্বাস করিতেন যে, অনৈসর্গিক ব্যাপার ভিন্ন মহাপুরুষ হইতে পারে না। ঈশার জীবদ্দশাতেই, অন্ততঃ তাহার মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই তাহার অনুবর্তিগণ তাঁহাকে ঈশ্বরের অবতার বা অংশরূপে বিশ্বাস করিতেন। ঈশার জন্মের অনেক পূৰ্ব্ব হইতেই ইহুদীগণ বিশ্বাস করিতেন যে ঈশ্বর ইহুদীজাতির দুঃখ দূর করিবার জন্য স্বয়ং আসিবেন অথবা বিশেষ কোন প্রতিনিধি প্রেরণ করিবেন। তিনি মেসায়া (Messiah) নামে অভিহিত হইতেন। ঈশার জন্মের সময়ে এই বিশ্বাস বহুবিস্তৃত ও ঘনীভূত হইয়াছিল। ইহুদীগণ বিশ্বাস করিতেন শীঘ্রই তাহাদের দুঃখের দিনের অবসান হইবে; অনতিবিলম্বে মেসায়া আসিবেন। বহু লােকের প্রাণে এই বিশ্বাস জীবন্ত হইয়া উঠিয়াছিল। ব্যাপ্টিষ্ট জন্ তাহার আগমনবার্তা ঘোষণা করিয়াছিলেন। সম্ভবতঃ মহর্ষি ঈশা আপনাকে মেসায়া বলিয়া মনে করিতেন। প্রথম হইতেই না হউক ক্রমে জীবনের শেষ দশায় এই বিশ্বাস তাহার মনে দৃঢ়বদ্ধ হইয়া- তাহার শিষ্যগণ তাঁহাকে মেসায়া বলিয়া গ্রহণ । ছিল ।
ঈশা-জীবনীর উপাদান
করিয়াছিলেন। ঈশার জীবন-কাহিনীগুলি তাহাকে
(Messiah) মেসায়া-রূপে চিত্রিত করিয়াছে। সাধারণ
লােকের মনে মেসায়া সম্বন্ধে যে ধারণা ছিল, জীবন-চরিতে
তাহাই প্রতিফলিত হইয়াছে। আইসায়া (Issiah) প্রভৃতি
পূর্ববর্তী ধর্মাচাৰ্য্যগণ মেসায়ার যে প্রকার বর্ণনা করিয়া-
ছিলেন, বাইবেলের জীবন-চরিত লেখকগণ সেইভাবে ঈশার
জীবন-চরিত লিখিয়াছিলেন। বাইবেলের পুরাতন গ্রন্থে
লিখিত আছে, মেসায়। অন্ধকে দৃষ্টিশক্তি দিবেন, খঞ্জকে
চলিবার শক্তি দিবেন, কুষ্ঠরােগীকে রােগমুক্তি দিবেন
ইত্যাদি। প্রাচীনকালে ইলাইজা প্রভৃতি প্রাচীন ইহুদী-
ধর্মাচাৰ্য্যগণও এই প্রকার অন্ধকে চক্ষু দান, মৃত ব্যক্তিকে
পুনজ্জীবিত করা প্রভৃতি অলৌকিক কাৰ্য্য করিয়াছিলেন,
সুতরাং মেসায় নিশ্চয়ই অলৌকিক কাৰ্য্য সম্পন্ন করিবেন
নতুবা তিনি কিসের মেসায়। সাধারণ লােকের মনে দৃঢ়-
বিশ্বাস জন্মিয়াছিল যে, মেসায় অনায়াসেই অলৌকিক কাৰ্য্য
সম্পন্ন করিতে পারেন। এইজন্যই দেখা যায়, লােকে
ঈশার নিকট হইতে অতিপ্রাকৃত কাৰ্যের দাবী করিয়াছে।
তাহারা বার বার বলিতেছে, তুমি যদি মেসায়া হও, তাহার
প্রমাণ দৈখাও। ঈশা এই প্রকার প্রশ্নে বিরক্ত হইতেন।
প্রশ্নকারীগণকে অবিশ্বাসী বলিয়া- তিরস্কার করিতেন। প্রথম
•
স মহষি ঈশা প্রথম প্রমাণ দেখাইতে অস্বীকারও করিতেন। তাঁহার ধৰ্ম্ম-জীবনের প্রারম্ভে ব্যাপ্টিষ্ট জনের নিকটে দীক্ষার অব্যবহিত পরেই মহর্ষি ঈশা নির্জন প্রান্তরে তপস্যার জন্য গিয়াছিলেন বলিয়া উল্লেখ আছে। সেখানে তিনি ৪০ দিন অনাহারে থাকিয়া গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। সেই সময়ে সয়তান আসিয়া তাঁহাকে পরীক্ষা করিয়াছিল বলিয়া বিবরণ অাছে। সয়তান তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, “তুমি যদি ঈশ্বরের পুত্র হও, তবে এই পাথরগুলিকে রুটী করিয়া ক্ষুধা নিবৃত্তি কর।” তদুত্তরে মহর্ষি ঈশা দৃঢ়তার সহিত অতিপ্রাকৃত কাৰ্য্য করিতে অস্বীকৃত হইয়াছিলেন; কিন্তু পরবর্তী জীবনে ঈশা অতিপ্রাকৃত কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, বলিয়া বর্ণিত আছে। এমন কি, তিনি যে মেসায়, তাহার প্রমাণরূপে অতিপ্রাকৃত কার্যের উল্লেখ করিয়াছিলেন। ব্যাপ্টিষ্ট জন কারাগার হইতে শিয্যমুখে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইয়াছিলেন, “তুমি কি মেসায়া ? আর কেহ আসিবেন ?” তদুত্তরে ঈশা দূতগণকে বলিয়া- ছিলেন, “তােমরা আমার কাৰ্যকলাপ দেখিলে, অন্ধ চক্ষু পাইতেছে, খঞ্জ হটিতেছে, মৃতব্যক্তি পুনর্জীবিত হইতেছে, তোমাদের গুরুকে এই সকল ঘটনার কথা গিয়া' বল।” বাইবেলের এই সকল উক্তিতে প্রমাণিত হয় যে, গ্রন্থলেখক- । পরে ঈশা-জীবনীর উপাদান গণ ঈশার অতিপ্রাকৃত কাৰ্যে বিশ্বাস করিতেন, তাহা কিছুই আশ্চর্যের বিষয় নহে। সেই অন্ধযুগে সকলেই এই প্রকার বিশ্বাস অতি সহজেই হৃদয়ে স্থান দিতেন ; কিন্তু বর্তমান সময়ে সে বিশ্বাস চলিয়া গিয়াছে বা যাইতেছে। আমাদিগের পক্ষে অতিপ্রাকৃতই বিশ্বাস করা কঠিন। বর্তমান সময়ের যুক্তি ও বিজ্ঞানবাদী খৃষ্টানগণ বাইবেলের বর্ণিত অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলি লইয়া ঘাের সমস্যায় পড়িয়াছেন। কেহ কেহ স্পষ্টতঃই স্বীকার করিয়াছেন যে, এগুলি অন্ধ- বিশ্বাস-প্রসূত অমূলক আখ্যায়িকা মাত্র। কেহ কেহ এগুলির আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করিয়াছেন। কেহ কেহ বলিতেছেন, ঘটনাগুলি বাস্তবিক অতি প্রকৃত নয়, মানব- প্রকৃতি-নিহিত গৃঢ় শক্তির কাৰ্য। মহর্ষি ঈশা অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন ; তাহার জীবনে অনন্যসাধারণ কোন কোন শক্তি প্রকাশ পাইয়াছিল। তাঁহার প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের গুণে কেহ কেহ রােগমুক্ত হইয়াছিলেন। মহর্ষি ঈশা স্থানে স্থানে বলিয়াছেন, “তােমার বিশ্বাসই তােমাকে রােগমুক্ত করিয়াছে।” দেখা যায়, যেখানে লােকের বিশ্বাস নাই, সেখানে তিনি কিছু করিতে পারেন নাই; এমন কি বর্তমান সময়েও দেখা যায়, বিশ্বাসের বলে লােকে কোন কোন ব্যাধি হইতে মুক্ত হইয়াছে। স্নায়বীয় রােগ প্রভৃতি গভীর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার
মহর্ষি ঈশা
বলে অবসাদিত হয়। বাইবেলের লিখিত ঈশা-অনুষ্ঠিত
কোন কোন কাৰ্য্য এই প্রকার বিশ্বাসের ফল, তাহা স্বীকার
করা যাইতে পারে।
জন্ম ও মৃত্যু-সম্বন্ধীয় ঘটনা ব্যতীত ঈশা সম্পাদিত
অতিপ্রাকৃত কাৰ্য্যগুলিকে নিম্নলিখিত শ্রেণীতে বিভক্ত
করা যাইতে পারে।
১। ভূতগ্রস্ত ব্যক্তিদিগের ভূত ছাড়ান।
২। অঙ্গহীন ব্যক্তিদিগের রােগ মুক্তি।
৩। কুষ্ঠ রােগীদের ব্যাধি মুক্তি।
অন্ধকে চক্ষু দান।
মৃত ব্যক্তিকে জীবন দান।
৬। খাদ্যদ্রব্য প্রদান।
৭। জলের উপর দিয়া গমন।
ইহার মধ্যে কোন কোনটীর স্বাভাবিক ব্যাখ্যা দিতে
পারা যায়, যেমন ভূতগ্রস্ত লােকদিগের ভূত ছাড়ান।
প্রাচীনকালে সকল দেশের লােকের ভূত-প্রেতে বিশ্বাস
ছিল ; এবং এক শ্রেণীর লােক ছিল যাহারা ভূত ছাড়াইত।
বর্তমান সময়ে এই শ্রেণীর রােগ স্বায়বীয় বিকার-প্রসূত
বলিয়া বিবেচনা করা হয়। চিকিৎসকের প্রতি শ্রদ্ধা ও
বিশ্বাসে এই শ্রেণীর লোকদের রোগ মুক্তি হওয়া সম্ভব।
৪।
ঈশা-জীবনীর উপাদান
মহর্ষি ঈশা এই প্রকার কোন কোন রােগীকে সুস্থ করিয়া
থাকিতে পারেন। তদ্রুপ বিকলাঙ্গ কোন কোন রােগীও
বিশ্বাসের বলে রােগ মুক্ত হইয়া থাকিতে পারেন। এই
প্রকার য১টী ঘটনা হইতে তাহার খ্যাতি অন্ধ-বিশ্বাস-প্রবণ
জন-সমাজে ব্যাপ্ত হইয়া থাকিতে পারে। কিন্তু জন্মান্ধকে
চক্ষু দান, মৃত ব্যক্তিকে প্রাণ দান, জলের উপর দিয়া
ভ্রমণ, ৫খান রুটীতে ৫০০০ লােক খাওয়ান ; প্রভৃতির
ব্যাপার বিশ্বাসযােগ্য মনে করা যাইতে পারে না। সেগুলি
অমূলক জনশ্রুতি মাত্র। বাইবেলে লিখিত আছে সত্য,
কিন্তু সেগুলির কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নাই। ঈশার
মৃত্যুর কিছুদিন পরে বিশ্বাসী খৃষ্ট মণ্ডলীতে যে সমুদয়
বিশ্বাস প্রচলিত হইয়াছিল, তাহারই অবলম্বনে লিখিত।
পুস্তকে লিখিত থাকিলেই কোন ঘটনা সত্য বলিয়া বিশ্বাস
করিতে পারা যায় না। বর্তমান বিজ্ঞানের যুগেও আমাদের
চক্ষুর সম্মুখে রামকৃষ্ণ পরমহংস, বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামী
প্রভৃতি সাধু ব্যক্তিদের জীবনচরিতেই তাঁহাদের সম্বন্ধে
এই প্রকার অতিপ্রাকৃত ঘটনা লিখিত হইয়াছে, সুতরাং
প্রাচীনকালে অন্ধ বিশ্বাসের যুগে যে এই প্রকার বিশ্বাস
প্রচলিত ও লিপিবদ্ধ হইবে তাহা আশ্চর্য্য কি? বিশেষতঃ
বাইবেলে বর্ণিত বিবরণগুলি গভীর সন্দেহ উদ্দীপক ।
মহৰি ঈশা
মহর্ষি ঈশার চারিখানি জীবনচরিতে বর্ণনাগুলির মধ্যে
যথেষ্ট পার্থক্য
আছে।
বর্তমান সময়ে কোন
বিচারালয়ে এই সকল বিসম্বাদী বিবরণ সাক্ষ্যরূপে প্রদত্ত
হইলে বিচারক তৎক্ষণাৎ সেগুলিকে অগ্রাহ্য করিতেন।
যেমন দৃষ্টান্তস্বরূপ কয়েকটি ব্যাপারের উল্লেখ করা যাইতে
পারে ; চারিখানি জীবনচরিতের মধ্যে দুই খানিতে তাহার
জন্মের কোন বিবরণ নাই কেবলমাত্র ম্যাথু এবং লুক
প্রণীত গ্রন্থে জন্মের বিবরণ আছে। মার্ক এবং জনে
জন্মের কোন উল্লেখ নাই ইহার কারণ কি? হয় তাহাদের
গ্রন্থ রচনাকালে ঈশার জন্ম বিবরণ সম্বন্ধে কোন কথা
জানা ছিল না নতুবা গ্রন্থকার বিশেষ কোন কারণে তাহা
লিপিবদ্ধ করেন নাই। সেন্ট মার্কের গ্রন্থে জন্ম বিবরণ
উল্লেখ না থাকার কারণ প্রথমটি বলিয়াই মনে হয়।
বাইবেলের জীবনচরিতগুলির মধ্যে সেন্ট মার্কের গ্রন্থ
সর্বাপেক্ষা প্রাচীন বলিয়া বিবেচিত হয়। তাহার রচনা
অপেক্ষাকৃত সরল ও স্বাভাবিক। অপর গ্রন্থকার সম্ভবতঃ
সেন্ট মার্কের গ্রন্থের সহিত পরিচিত ছিলেন। অন্যান্য
জীবনচরিতে এমন অনেক কথা আছে যাহা সেন্ট মার্কে
হয় অন্যান্য গ্রন্থকারগণ সেন্ট মার্কের বিবরণ
অপেক্ষা নূতন ঘটনা সংগ্রহ করিয়াছিলেন নতুবা সেন্ট
নাই।
ঈশা-জীবনীর উপাদান
মার্কের রচয়িতা অন্য গ্রন্থ বর্ণিত রচনাগুলি কাটিয়া ছটিয়া
নিজের গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। ইহার মধ্যে মনে
হয় প্রথম সিদ্ধান্তই অধিকতর সমীচীন। সেন্ট মার্কের
গ্রন্থে ঈশার জন্ম ও বাল্যকাল বিষয়ে কোন বিবরণই
পাওয়া যায় না। সম্ভবতঃ আদিম খৃষ্টীয় মণ্ডলীতে তখন
পর্যন্ত এ সম্বন্ধে কোন কিম্বদন্তী প্রচলিত হয় নাই।
জনের গ্রন্থে মহর্ষি ঈশার জন্মের কোন বিবরণ না থাকার
অন্য কারণ আছে। বাইবেলের চারিখানি জীবনচরিত ভিন্ন
ভিন্ন ভাবে লিখিত এইজন্য তাহাদের মধ্যে অনেক পার্থক্য
দৃষ্ট হয়। পরে তাহার কিঞ্চিৎ আভাস দেওয়া হইবে। সেন্ট
জনের ঈশা গ্রীক-দর্শনের Logos অথবা আদিম স্বগীয় বাণী
বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। গ্রন্থের প্রথমেই লিখিত হইয়াছে ;
“In the beginning was the word and the word was
with God and the word was God".
এখানে দেখা যাইতেছে গ্রন্থকার ঈশাকে ঈশ্বরাংশ-মূলক
বাণী বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। সুতরাং মনুষ্য পিতার কথা
উল্লেখ করেন নাই। ম্যাথু এবং লুক প্রণীত গ্রন্থে মনুষ্য
পিতার উল্লেখ থাকিলেও ঈশাকে তাহার ঔরস পুত্র বলিয়া
স্বীকার করা হয় না। তাহার মাতা মেরীর কুমারী অবস্থায়
অলৌকিক ভাবে তাহার জন্ম হইয়াছিল। জোসেফ তঁাহার
মহর্ষি ঈশা
পালক মাত্র। তিনি প্রথমে মেরীকে সন্দেহ করিয়া তাহাকে
পরিত্যাগ করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন, কিন্তু দৈববাণী প্রাপ্ত
হইয়া মেরীকে পত্নীরূপে গ্রহণ করেন।
ম্যাথু এবং ঝুকের বর্ণিত জন্ম বিবরণের মধ্যেও
অনেক পার্থক্য দেখিতে পাওয়া যায় ।
ম্যাথুর গ্রন্থে
জোসেফ বেথলেহেমের অধিবাসী বলিয়া উল্লিখিত আছে।
ঈশার জন্মের পর দৈববাণী কর্তৃক আদিষ্ট হইয়া হেরােড
রাজার ভয়ে তিনি শিশু ঈশাকে লইয়া সস্ত্রীক মিসর
দেশে পলায়ন করেন এবং তথা হইতে পরে প্রত্যাবর্তন
করিয়া গালীলির অন্তর্গত ন্যাজারেথ নগরে বাস করেন।
লুকের বিবরণ অনুসারে জোসেফ ঈশার জন্মের পূর্ব
হইতে ন্যাজারেথ সহরে বাস করিতেন কিন্তু ঈশার জন্মকালে
রােমান সম্রাটের আদেশ অনুসারে স্বীয় আদিম জন্মস্থান
বেথলেহেম্ গ্রামে গমন করিতে হইয়াছিল। সেখানে
ঈশার জন্ম হয়। এই ঘটনার মূলে কোন ঐতিহাসিক
সত্য আছে বলিয়া মনে হয় না। জীবদ্দশায় ঈশা ন্যাজারি
অর্থাৎ ন্যাজারেথের অধিবাসী বলিয়াই প্রচলিত ছিলেন।
বেথলেহেমে জন্মের কথা পরবর্তী গ্রন্থকারগণের কল্পনা।
পূর্বেই বলা হইয়াছে গ্রন্থকারগণ মহর্ষি ,ঈশাকে
মেসায়া অর্থাৎ ভগবৎ মনােনীত ইহুদীজাতির উদ্ধার-কর্তা
ঈশা-জীবনীর উপাদান
বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। মেসায়া সম্বন্ধে কতকগুলি
কিম্বদন্তী ছিল, তাহার একটি এই যে, মেসায়া দাউদরাজার
বংশে বেথলেহেম্ নগরে জন্মগ্রহণ করিবেন ; তদনুসারে
ম্যাথু এবং লুক বেথলেহেমে তঁাহার জন্মের আখ্যায়িকা
প্রচার করিয়াছেন। ঈশা প্রথম জীবনে গ্যালীলির
স্যাজারেথে বাস করিতেন, সেইজন্য লােকে তাঁহাকে
গ্যালালিয়ান ও ন্যাজারিন বলিত। দাউদের বংশে ঈশার
জন্ম প্রতিপন্ন করিবার জন্য ম্যাথু ও লুক উভয়েই ঈশার
পূৰ্ব্ব-পুরুষগণের একটি তালিকা দিয়াছেন। কিন্তু এই
উভয় তালিকার মধ্যে ঐক্য নাই। সুতরাং এই উভয়
তালিকাকেই ঐতিহাসিক বলা যাইতে পারে না। ইহা
গ্রন্থকারগণের কল্পনাপ্রসূত।
ঈশার মেসায়ত্ব প্রতিপন্ন
করিবার জন্য ম্যাথু ও লু আর একটী কাল্পনিক অখ্যায়িকা
রচনা করিয়াছেন। মেলায় যে মানবের ঔরসে জন্মগ্রহণ
করিবেন, ইহা তাহারা সহ্য করিতে পারিলেন না। এইজন্য
তঁাহারা মেরীর কুমারী অবস্থায় অলৌকিক ভাবে ঈশার
জন্মের আখ্যায়িকার সৃষ্টি করিয়াছেন। পুরাতন বাইবেলে
মেসায়ার একটি নাম ঈশ্বর-পুত্র (Son of God)। তদনু-
সারে • সাক্ষাৎভাবে ঈশ্বরের পুত্ররূপে বর্ণনা করিয়াছেন।
বস্তুতঃ ঈশার জীবনের অনেক ঘটনাই পুরাতন বাইবেলে
মহর্ষি ঈশা
বর্ণিত মেসায়ার প্রতিকৃতিতে রচিত। বাইবেলের অন্তভুক্ত
ঈশার চারিখানি জীবনীতে এই প্রকার বহু অনৈক্য দৃষ্ট
হয়। প্রাচীন খৃষ্টানগণ বাইবেলকে যে অভ্রান্ত ঈশ্বর-বাণী
বলিয়া বিশ্বাস করিতেন তাহাত বলিতে পারা যায়ই না;
এমন কি, এই গ্রন্থে ঐতিহাসিক প্রামাণিকতাতেও বিশ্বাস
করিতে পারা যায় না। অনেক স্থূল বিষয়েও বিভিন্ন পুস্তকে
অসামঞ্জস্য দৃষ্ট হয়। প্রাচীন খৃষ্টানগণ বাইবেল বর্ণিত
ঈশার অলৌকিক কার্য্যের উপরে তাহার ঈশ্বরত্ব প্রতিষ্ঠিত
করিতেন; কিন্তু চারিখানি জীবন-চরিতেই এই বিবরণের
ঐক্য নাই। সেন্ট জনের লিখিত গ্রন্থে ক্যানার বিবাহে
জলকে মদ্যে পরিণত করা ঈশার প্রথম অতিপ্রাকৃত কাৰ্য্য
বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। জন্ এই ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ
দিয়াছেন। ক্যানা নগরে ঈশা-পরিবারের কোন বন্ধুর গৃহে
একটি বিবাহ হয়। ঈশা তাঁহার মাতা প্রভৃতির সঙ্গে
নিমন্ত্রিত হইয়া এই বিবাহে উপস্থিত ছিলেন।
হইতেছে—এমন সময় দেখা গেল, মদ্য ফুরাইয়া গিয়াছে,
গৃহস্বামী লজ্জায় পড়িয়াছেন; তখন ঈশার মাতা মেরী
ঈশাকে এই সংবাদ দিলেন। তঁাহার অভিপ্রায়, ঈশা
তাহার ঐশ্বরিক শক্তিবলে মদ্য সংগ্রহ করিয়া দেন। ঈশ
উত্তর করিলেন, আমার সমৃয় এখনও হয় নাই। ঈশার
ঈশা-জীবনীর উপাদান
মাতা তাহা সত্বেও ভৃত্যদিগকে আদেশ করিলেন, ইনি যাহা
বলেন তাই কর। সেখানে হস্ত-পদাদি প্রক্ষালনের জন্য
কয়েকটি বড় বড় জলপাত্র ছিল। ঈশ। ভৃত্যদিগকে
পাত্রগুলি জলে পূর্ণ করিতে আদেশ করিলেন ; তৎপরে
তাহা নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণের নিকটে লইয়া যাইতে আদেশ
করিলেন। নিমন্ত্রিত ব্যক্তিগণ পান করিয়া দেখিলেন যে,
তাহ পূৰ্ব্বাপেক্ষা উৎকৃষ্টতর সুরা । জন্য এই ব্যাপার
সবিস্তারে বর্ণনা করিয়াছেন; কিন্তু ম্যাথু, মার্ক ও লুকে
ইহার উল্লেখমাত্র নাই। এই ঘটনা সত্য হইলে অন্যান্য
জীবন-চরিতে ইহার কোন উল্লেখ না থাকার কারণ দেখিতে
পাওয়া যায় না। এই প্রকার ঈশাকর্তৃক অনুষ্ঠিত অন্যান্য
অতিপ্রাকৃত কাৰ্য-বিবরণেও বহু পার্থক্য দেখিতে পাওয়া
যায়।
ঈশার অতিপ্রাকৃত কার্যের মধ্যে অন্ধকে চক্ষু
দান একটি প্রধান ব্যাপার। এই বিষয়ে গ্রন্থকারগণের
মধ্যে ঐক্য আশা করা যাইতে পারে।
কিন্তু ম্যাথু
দুইটি বিভিন্ন স্থানে দুইবার অন্ধের চক্ষু দানের উল্লেখ
করিয়াছেন। মার্কেও এই প্রকার দুইটি ঘটনার উল্লেখ
আছে।
কিন্তু লুক ও জনে একবার মাত্র অন্ধকে
(২০শ অধ্যায় ২৯-৩৪) চক্ষু দানের বর্ণনা আছে। ম্যাথু,
মার্ক (১০ম অধ্যায় ৪৬-৫২) ও লুক (৩৮শ অধ্যায়
২
১০
মহষঈশা
৩৫-৪০) তিনজনেই লিখিয়াছেন যে মহর্ষি ঈশা জেরু-
জালেমের পথে জেরিকো নগরে অন্ধকে দৃষ্টিশক্তি দিয়া-
ছিলেন। ম্যাথু ও মার্ক জেরিকো হইতে চলিয়া যাইবার
সময়ে এই ঘটনা হইয়াছিল লিখিয়াছিলেন কিন্তু অ্যাকের
মতে জেরিকো নগরে প্রবেশ করিবার সময়ে এই ঘটনা
হয়।
আর একটি উল্লেখযােগ্য বিষয় এই যে ম্যাথু
দুইজন অন্ধের চক্ষু দানের কথা লিখিয়াছেন কিন্তু মার্ক
ও লুক মাত্র একজনের উল্লেখ করিয়াছেন। আরও
ম্যাথুর বিবরণে দেখা যায় যে ঈশা অন্ধদ্বয়ের চক্ষু স্পর্শ
করিয়া দৃষ্টি শক্তি দান করিয়াছিলেন কিন্তু মার্ক ও লুকে
তাহার কোন উল্লেখ নাই। তিনজন জীবনচরিত লেখক
একই ঘটনার বিবরণ দিয়াছেন বলিয়া মনে হয়, অথচ
তাঁহাদের বিবরণে ঐক্য নাই। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি
বর্তমান সময়ে কোন বিচারালয়ে ভিন্ন ভিন্ন সাক্ষীগণের
মধ্যে এই প্রকার পার্থক্য হইলে তাহাদের সাক্ষ্য গৃহীত
হয় না। ম্যাথু আরও একবার অন্ধের চক্ষু দানের কথা
বলিয়াছেন। (ম্যাথু, ৯ম অধ্যায়, ২৭-৩১) এখানেও
দুইজন অন্ধের দৃষ্টি-প্রাপ্তির উল্লেখ আছে এবং ঈশা
তাহাদের চক্ষুতে হস্ত প্রদান করায় তাহারা দৃষ্টিশক্তি লাভ
করে। মার্ক, লুক ও জনের গ্রন্থে এই ঘটনার কোন
ঈশা-জীবনীর উপাদান
উল্লেখ নাই। ইহার পরিবর্তে মার্ক আর একটি ঘটনার
উল্লেখ করিয়াছেন (মার্ক, ৮ম অধ্যায় ২২-২৬)। এই
ঘটনা বেথসাইজা নগরে হয়। যীশু যখন সেখান দিয়া
যাইতেছিলেন একজন অন্ধ জানিতে পারিয়া তাহাকে
চক্ষু দানের জন্য অনুনয় করে। মহর্ষি ঈশা দয়া-পরবশ
হইয়া তাহার হাত ধরিয়া সহরের বাহিরে লইয়া আসেন
এবং সেখানে তাহার চক্ষুতে থুথু দেন তাহাতে সে কিছু
কিছু দেখিতে পায়, তৎপরে অন্ধের চক্ষুতে হাত বুলাইয়া,
দিলে সে পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি লাভ করে, ম্যাথু, লুক ও জনে
এই ঘটনার উল্লেখ নাই।
জনের গ্রন্থে ম্যাথু, মার্ক ও লুক কর্তৃক বিবৃত অন্ধের
দৃষ্টিশক্তি দানের ঘটনা কয়টির একটিরও বিবরণ নাই।
তৎপরিবর্তে তিনি অন্য একটি ঘটনার বিবরণ দিয়াছেন
যাহা বাইবলের অন্য তিনখানি জীবনচরিতে নাই। জন
একটিমাত্র চক্ষু দানের কথা লিখিলেও, তাহার বিস্তৃত ও
পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়াছেন।
এই ঘটনা কোন ক্ষুদ্র
গ্রাম বা প্রাদেশিক নগরে ঘটে নাই কিন্তু ইহুদী ধর্মের
প্রধান কেন্দ্র জেরুজালেম নগরে ঘটিয়াছিল। ফ্যারেসী
ধর্মযাজকগণ তাহা দেখিয়াছিলেন এবং তদ্বিষয়ে বিশেষ
অনুসন্ধান করিয়াছিলেন। লােকটি জন্মান্ধ ছিল বলিয়া
মহর্ষি ঈশা
উল্লিখিত হইয়াছে। একদিন মহর্ষি ঈশা শিষ্যগণের সহিত
বেড়াইতেছিলেন, পথ-পার্শ্বে একজন অন্ধকে দেখিয়া শিষ্যগণ
জিজ্ঞাসা করিলেন, “এই ব্যক্তি অন্ধ হইয়াছে কাহার পাপে ?
নিজের পাপে না পিতামাতার পাপে ?” ঈশা বলিলেন,
“কাহারও পাপে নয়। এ অন্ধ হইয়াছে এই জন্য ভগবানের
কাৰ্য ইহার মধ্যে দিয়া সম্পন্ন হইবে। আমিই জগতের
আলােক, যতদিন আছি ঈশ্বরের কাৰ্য্য করিব।” এই
রলিয়া তিনি মাটীতে থুথু ফেলিলেন, এবং তাহার দ্বারা
কর্দম প্রস্তুত করিয়া অন্ধের চক্ষুতে লেপন করিয়া দিলেন ;
তৎপরে তাহাকে নিকটবর্তী দিলেয়ান পুষ্করিণীতে গিয়া
চোখ ধুইতে বলিলেন। যখন সে ব্যক্তি পুষ্করিণীর জলে
ধৌত করিল তখন সে স্পষ্টরূপে দেখিতে পাইল।
উপস্থিত লােকগণ এই ঘটনা দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইয়া
গেল। কেহ কেহ সন্দেহ করিল এ বুঝি সে ব্যক্তি
নয়, কিন্তু অপরে বলিল সেই ব্যক্তি।
সে নিজেও
বলিল আমি জন্মান্ধ ছিলাম এখন দেখিতে পাইতেছি।
লােকে তাহাকে ফ্যারিসীদের নিকট লইয়া গেল। তাহারা
অন্ধের দৃষ্টিশক্তি প্রাপ্তির কথা শুনিয়া তাহাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ
প্রশ্ন করিলেন। সেও নির্ভয়ে সরলভাবে সকল কথা
বলিল। ফ্যারিসীরা তাহাকেও বিশ্বাস না করিয়া তাহার
ঈশা-জীবনীর উপাদান
পিতাকে ডাকিলেন। সেও আসিয়া বলিল, এ আমার
পুত্র, জন্মান্ধ ছিল, এখন দেখিতেছি দৃষ্টিশক্তি পাইয়াছে।
ফ্যারিসীগণ তথাপি ঈশার কাৰ্য্যে বিশ্বাস করিলেন না।
উপরন্তু বিশ্রামের দিনে কাজ করার জন্য ঈশাকে পাপী
বলিলেন।
অন্ধ ব্যক্তি এই কথার প্রতিবাদ করিয়া
দৃঢ়তার সহিত বলিল তাহা কখনও হইতে পারে না।
পাপীর দ্বারা এমন কাৰ্য্য হওয়া সম্ভব নয়। আমি জন্মান্ধ
ছিলাম, উনি আমাকে দৃষ্টিশক্তি প্রদান করিয়াছেন;
নিশ্চয়ই ইনি ঈশ্বর-প্রেরিত। উপস্থিত ব্যক্তিগণের
মধ্যে অনেকেই এ কথায় বিশ্বাস করিল কিন্তু ফ্যারিসীগণ
সেই দৃষ্টিশক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে তাহাদের ধর্মমণ্ডলী হইতে
বহিষ্কৃত করিয়া দিল।
মহর্ষি ঈশা অন্ধের বিশ্বাস ও ফ্যারিসীগণের অবিশ্বাস
দেখিয়া দুঃখ করিয়া বলিলেন যাহার বিশ্বাস করে না
তাহারাই অন্ধ এবং যাহারা বিশ্বাস করে তাহারাই চক্ষুষ্মান।
ইহা শুনিয়া ফ্যারিসীগণ বলিল, আমরাও কি তবে অন্ধ ?
তদুত্তরে মহর্ষি ঈশা বলিলেন, “তোমরা যদি অন্ধ হইতে
তােমাদের কোন পাপ হইত না, কিন্তু তােমরা বলিতেছ
যে তােমরা দেখ, সুতরাং তােমাদের পাপ থাকিয়া
যাইতেছে।”
মহাৰি ঈশা
এখানে দেখা যাইতেছে ঈশা আধ্যাত্মিক অন্ধতা ও
চক্ষুর বিষয় বলিতেছেন তবে কি সমস্ত ঘটনাটি
আধ্যাত্মিক রূপক মাত্র ? ফ্যারিসীদিগের অবিশ্বাস এবং
সাধারণ লোকের বিশ্বাস রূপক ছলে বর্ণনা করিবার জন্য
কি এই আখ্যায়িকা বর্ণিত হইয়াছে ? ঈশার সমুদয়
অলৌকিক কার্য্যেরই এই প্রকার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
হইতে পারে।
ঈশাকর্তৃক মৃত ব্যক্তিকে পুনর্জীবিত করার বিবরণেও
চারিজন জীবন-চরিত রচয়িতাদের মধ্যে এই প্রকার অনৈক্য
দৃষ্ট হয়। ম্যাথু, মার্ক ও জন্য একজন মাত্র মৃত ব্যক্তির
জীবন দানের কথা বর্ণনা করিয়াছেন; কিন্তু লুক দুইট
বিভিন্ন সময়ে দুইজন মৃত ব্যক্তিকে পুনর্জীবিত করার কথা
লিখিয়াছেন। ম্যাথু, মার্ক এবং লুক তিনজনেই একটী
ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন; কিন্তু জন্ সম্পূর্ণ বিভিন্ন স্থানে
বিভিন্ন সময়ে অন্য একজন লােকের জীবন দানের কথা
বর্ণনা করিয়াছেন। ম্যাথু, মার্ক এবং লুক তিনজনেই যে
সাধারণ ঘটনাটি উল্লেখ করিয়াছেন, তাহাতে একটি মৃত
বালিকার জীবন দানের বর্ণনা আছে। বালিকাটী একজন
শাসনকর্তার কন্যা বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। মার্ক এবং
লুক কন্যার পিতার নাম জেরা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন
ঈশা-জীবনীর উপাদান
এবং তাহাকে একটা ধৰ্ম্মমণ্ডলীর (Senagogue) শাসনকর্তা
ৰলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ম্যাথুতে এই সকল বিবরণ
নাই; কিন্তু অপর দিকে ম্যাথুর বিবরণ অনুসারে কন্যাটীর
মৃত্যুর পরে তাহার পিতা মহর্ষি ঈশার নিকটে আসেন এবং
তাহাকে বলেন যে, “আমার কন্যার মৃত্যু হইয়াছে, আপনি
আসিয়া তাহাকে পুনজ্জীবিত করুন।”
ইহাতে বুঝা
যাইতেছে, তিনি বিশ্বাস করিতেন, ঈশার মৃত ব্যক্তিকে
জীবন দান করিবার ক্ষমতা আছে। মার্ক ও লুকের
বিবরণে দেখা যায়, জেরা যখন ঈশার নিকট গমন
করিয়াছেন, তখন পর্যন্ত তাহার কন্যা মরে নাই ; কঠিন
রােগগ্রস্থ হইয়াছিল মাত্র। জেরাস তাহাকে রোগমুক্ত
করিবার জন্য অনুরােধ করেন, কিন্তু যীশুর আগমনের
পূৰ্বেই বালিকাটীর মৃত্যু হয়, পথে এই সংবাদ প্রাপ্ত হন।
সংবাদদাতাগণ জেরাসকে বলিল, “তােমার কন্যার মৃত্যু
হইয়াছে ; ইহাকে আর কষ্ট দিবার প্রয়ােজন কি?” ইহাতে
দেখা যাইতেছে, মৃত ব্যক্তিকে জীবন দান করা সম্ভব
বলিয়া তাহাদের বিশ্বাস ছিল না। মহর্ষি ঈশা তাহাদের
কথায় কর্ণপাত না করিয়া জেরাসকে বলিলেন, “ভয় করিও
না, বিশ্বাস কর, তাহা হইলে তােমার কন্যা পুনজ্জীবিত
হইবে।” উপস্থিত লােকগুলি, এই বাক্যে অস্থা স্থাপন
২৪
মহর্ষি ঈশা
করিলেন না; কিন্তু ঈশা জেরাসের সঙ্গে তাহার বাড়ী
গিয়া দেখিলেন, কন্যাটীর মৃত্যু হইয়াছে এবং আত্মীয়-
স্বজনের ক্রন্দন ও কোলাহল করিতেছে। তিনি সমবেত
লােকদিগকে মৃত কন্যার নিকট হইতে বহিষ্কৃত করিয়া
দিয়া তিনজন মাত্র শিষ্যকে লইয়া মৃতদেহের নিকটে গেলেন
এবং মৃতের হস্ত ধারণ করিয়া বলিলেন, “বালিকা, উঠ” ;
বালিকা তৎক্ষণাৎ উঠিয়া বসিল। ঈশা তখন তাহাকে
কিছু খাদ্যদ্রব্য দিতে বলিলেন। ম্যাথুর বিবরণে এই সকল
কথার উল্লেখ নাই।
জেরামের মৃত কন্যাকে পুনর্জীবিত করা ভিন্ন লুক
আর একটি মৃতের জীবন দানের বর্ণনা করিয়াছেন। এটী
আরও বিস্ময়কর। ইনন নগরের একজন বিধবার একমাত্র
পুত্রের মৃত্যু হয়। যখন তাহাকে সমাধিস্থ করিতে লইয়া
যাওয়া হইতেছিল, সেই সময়ে মহর্ষি ঈশা সশিষ্যে তথায়
উপস্থিত হন। বিধবার কাতর বিলাপ ও ক্রন্দন শ্রবণ
করিয়া ঈশার হৃদয় আদ্র হয়। তিনি বিধবাকে বিলাপ
করিতে নিষেধ করিয়া মৃতদেহের পার্শ্বে গেলেন। বাহকগণ
দাঁড়াইল। ঈশা তখন বলিলেন; “হে যুবক, আমি তােমাকে
বলিতেছি, ওঠ।” যুবক তৎক্ষণাৎ শয্যার উপরে উঠিয়া
মৃতদেহের সঙ্গে অনেক লােক যাইতেছিল।
বসিল।
২৫
হইল।
ঈশা-জীবনীর উপাদান
তাহারা এই আশ্চর্য ঘটনা দেখিয়া ভীত ও বিস্মিত
সকলে বলিতে লাগিল, “ঈশ্বর আমাদের মধ্যে
একজন মহাপুরুষ প্রেরণ করিয়াছেন।” এই আশ্চর্য্য
ঘটনার সংবাদ ক্রমে সমুদয় দেশ জুড়িয়া ব্যাপ্ত হইয়া
পড়িল।
উপরােক্ত দুইটী ঘটনার কোনটিই জনের গ্রন্থে উল্লেখ
নাই; কিন্তু তৎপরিবর্তে জন্ অপর একটী ঘটনা সবিস্তারে
বর্ণনা করিয়াছেন, যাহা ইহার অপেক্ষা আরও বিস্ময়কর।
এই ঘটনাটি ইহুদী-ধৰ্ম্মের কেন্দ্র জেরুজালেমের নিকটবর্তী
বেথানী গ্রামে ঈশার প্রিয় এবং অনুগত শিষ্যা মেরী ও
মার্থার পরিবারে সংঘটিত হয়। মেরীর ভ্রাতা মহর্ষি ঈশার
প্রিয়পাত্র ল্যাজারসের কঠিন পীড়া হয়। ঈশা সে সময়ে
জর্ডনের অপর পারে নাতিদূরস্থ প্যারিয়া প্রদেশে অবস্থিতি
করিতেছিলেন। মার্থা ভ্রাতার পীড়াতে শান্বিত হইয়া
মহর্ষি ঈশার নিকট সংবাদ প্রেরণ করেন। কিন্তু ঈশা
সংবাদ পাইয়াও সেখানে আরও দুইদিন অবস্থিতি করেন।
তৎপরে শিষ্যগণকে বলিলেন, “চল, আমরা জুড়িয়া যাই।”
শিষ্যেরা বলিলেন, জুডিয়ার ইহুদীরা আপনার জীবন নাশের
চেষ্টা করিতেছিল, আপনি আবার সেখানে যাইবেন?”
মহর্ষি ঈশা বলিলেন, “পিতার কাৰ্য করিতে হইবে।
মহর্ষি ঈশ
আমাদের বন্ধু ল্যাজারস নিদ্রিত হইয়াছেন। শিষ্যেরা
বলিল, “নিদ্রিত হইয়া থাকিলে জাগিবে।” তাহারা বুঝিতে
পারে নাই যে, তিনি মৃত্যুর কথা বলিতেছেন। তদনন্তর
তিনি সশিয্যে বেথানী গমন করিলেন। সেখানে আসিয়া
শুনিলেন যে, চারি দিন হইল ল্যাজারসের মৃত্যু হইয়াছে।
মার্থা ঈশার আগমন সংবাদ পাইয়াই তাহার নিকট আসিলেন
এবং কাঁদিয়া বলিলেন, প্রভু, ল্যাজারসের মৃত্যু হইয়াছে।
আপনি যদি থাকিতেন, তাহা হইলে সে মরিত না। আমি
জানি, আপনি এখন যাহা প্রার্থনা করিবেন, ঈশ্বর তাহা পূর্ণ
করিবেন। ঈশা বলিলেন, “তােমর ভ্রাতা পুনরুত্থিত
হইবেন।” মার্থা বলিল, “অবশ্য আমি জানি, ল্যাজারস
শেষ দিনে পুনরুথানে উত্থিত হইবেন।” ঈশা উত্তর
করিলেন, “আমি পুনরুত্থান, আমিই জীবন, যে আমাতে
বিশ্বাস করে, মৃত হইলেও সে পুনর্জীবন লাভ করিবে,
তুমি কি ইহা বিশ্বাস কর ?” মার্থা বলিলেন, “ই৷ প্রভু
আমি বিশ্বাস করি। আপনি প্রেরিত ঈশ্বর-পুত্র। যাঁহার
আসিবার কথা আছে।” তৎপরে মার্থা গিয়া তাহার ভগিনী
মেরীকে ডাকিয়া আনিল । মেরী আসিয়া ঈশার চরণে
পতিত হইয়া কাদিতে কঁদিতে বলিল, “প্রভু,, আপনি
উপস্থিত থাকিলে আমার ভ্রাতার মৃত্যু হইত না।” ঈশা
ঈশা-জীবনীর উপাদান
মেরীর কাতর ক্রন্দন শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, তোমরা
তাহাকে কোথায় সমাধিস্থ করিয়াছ? তাহারা বলিল,
“আসুন দেখাইতেছি।” সমাধিস্থানে উপস্থিত হইয়া ঈশা
দেখিলেন, সেটি পাহাড়ের গায়ে খােদিত একটি গুহা।
একটি প্রস্তরখণ্ড দ্বারা তাহার মুখ আবৃত। ঈশা তাহা
সরাইতে আদেশ করিলেন। মার্থা বলিল, মৃতদেহ পচিয়া
দুর্গন্ধ হইয়া থাকিবে, কেন না চারি দিন হইল মৃত্যু
হইয়াছে। ঈশা বলিলেন, “আমি কি তােমাকে বলি নাই
যে, তুমি যদি বিশ্বাস কর, ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশিত হইবে”
তখন তাহারা গহ্বরের দ্বারস্থিত প্রস্তরখণ্ড অপসারিত
করিলেন। মহর্ষি ঈশা ঈশ্বরকে ধন্যবাদ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে
বলিলেন, “ল্যাজারস বাহিরে আইস।” তখন মৃত ব্যক্তি
বাহিরে আসিল, তাহার মুখ এবং গাত্র বস্ত্রে আবৃত ছিল।
ঈশা সেগুলি খুলিয়া দিতে বলিলেন।
উপস্থিত লােকগণ এই আশ্চর্য ঘটনা দেখিয়া বিস্মিত
হইল এবং ঈশাকে ঈশ্বর-পুত্র বলিয়া বিশ্বাস করিল।
তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ জেরুজালেমে গিয়া মন্দিরের
পুরােহিত ও ধর্মযাজকগণকে এই অদ্ভুত ঘটনার বিবরণ
জানাইল।
ইহা শুনিয়া তাহারা চিন্তান্বিত হইল এবং
পরস্পরের মধ্যে বলিতে লাগিল, আমাদের আর নিশ্চেষ্ট
-
মহর্ষি ঈশা
থাকা চলে না। এ ব্যক্তি যে সকল কাৰ্য্য করিতেছে,
তাহাতে সকলে তাহার উপর বিশ্বাস স্থাপন করিবে।
সেই দিন হইতে পুরােহিতের ঈশার প্রাণবিনাশে কৃতসঙ্কল্প
হইয়া তাহার উপায় অন্বেষণ করিতে লাগিল।
ল্যাজারসের পুনর্জীবন ব্যাপারে দেখা যাইতেছে যে,
ল্যাজারস মৃত্যুর পর চারিদিন কবরে ছিল, ম্যাথু প্রভৃতি
বর্ণিত বিবরণে মৃত্যুর অল্পক্ষণ পরেই ঈশা মৃত ব্যক্তিকে
বাঁচাইয়াছিলেন, সুতরাং সন্দেহ হইতে পারে যে, মৃতব্যক্তি
বাস্তবিক মরে নাই, মুচ্ছিত হইয়াছিলেন মাত্র। এই
প্রকার সন্দেহের স্থান না থাকে, এইজন্যই বােধ হয়,
বেথানীর বিবরণে ল্যাজারসের চারি দিন সমাধিগর্ভে থাকার
আখ্যায়িকা রচিত হইয়াছে। যাহা হউক, ল্যাজারসের
বিবরণ যদি সত্য হয়, তাহা হইলে ম্যাথু, মার্ক ও লুকের
গ্রন্থে তাহার উল্লেখ নাই কেন? সত্য ঘটনা না হইলে
এত বড় একটা ব্যাপারের উল্লেখ না থাকা সম্ভব বলিয়া
মনে হয় না। এই সকল কারণে এই সমুদয় ঘটনাকে
ঐতিহাসিক সত্য বলিয়া গ্রহণ করা দুঃসাধ্য।
ঈশা কর্তৃক সম্পাদিত আর একটি অতিপ্রাকৃত
কার্যের আলােচনা এখানে করা যাইতে পারে। বাইবেলে
ঈশার বহু অলৌকিক কার্য্যের বিবরণ আছে। তন্মধ্যে
২৯,
ঈশা-জীবনীর উপাদান
অন্ধকে চক্ষু দান, মৃত ব্যক্তিকে পুনর্জীবিত করা এবং
অল্প কয়েকখানি রুটি দ্বারা বহু লােককে খাওয়ান সর্বাপেক্ষা
বিস্ময়কর।
আমরা এখানে সকল অলৌকিক কার্য্যের
বিবরণ না দিয়া প্রধান তিনটির আলােচনা করিলাম ।
বাইবেলের চারিখানি জীবনচরিতেই অল্প কয়েকখানি রুটির
দ্বারা বহুসংখ্যক লােককে খাওয়ার বিবরণ আছে,
কিন্তু ম্যাথু ও মার্কে দুইটি এইরূপ ঘটনার উল্লেখ আছে।
লুক ও জনে একবার মাত্র এইরূপ ব্যাপারের বর্ণনা
আছে।
ম্যাথু ও মার্ক যে দুটি বিবরণ দিয়াছেন
তাহাদের মধ্যে সাদৃশ্য থাকিলেও পার্থক্যও আছে। ম্যাথু
“বর্ণিত একটি ঘটনায় পাঁচখানি রুটি ও দুইটি মৎস্যে
(ম্যাথু, ১৪শ অধ্যায় ১৩-২১) স্ত্রীলােক ও বালক ভিন্ন
পাঁচ হাজার লােক উদর পূর্ণ করিয়া আহার করিয়াছেন
এবং বার ঝুড়ি রুটির টুকরা উদ্ব ও হইয়াছিল। অপর
দিকে (ম্যাথু ১৫শ অধ্যায় ৩২-৩৯ ) ৭ সাতখানি রুটি ও
কয়েকটি মৎস্যে চার হাজার লােক খাওয়ান হইয়াছিল
এবং সাত ঝুড়ি রুটি উদ্ব ও হইয়াছিল। মার্কের বিবরণও
ইহার অনুরূপ কিন্তু কিরূপে এই অলৌকিক কাৰ্য্য সম্পন্ন
হইয়াছিল তাহার কোন নির্দেশ পাওয়া যায় না। রুটি-
গুলি ভাঙ্গিবার সময় ঈশার হাতে বাড়িয়াছিল না পরিবেশন
মহর্ষি ঈশা
করিবার সময় শিষ্যগণের হাতে বাড়িয়াছিল তাহার কোন
বিবরণ নাই। লুক এবং জনে একবার মাত্র এই প্রকার
অলৌকিক ব্যাপারের বর্ণনা আছে। তাহারা অপরটিকে
বাদ দিলেন কেন বুঝা যায় না। কয়েকখানি রুটি দিয়া
বহু সহস্র লােককে খাওয়ার ব্যাপারটা উপমা মাত্র
কেহ কেহ এইরূপ মনে করেন। খাদ্য দ্রব্য প্রকৃত
রুটি নয় আধ্যাত্মিক রুটি মহর্ষি ঈশা শিষ্যগণের দ্বারা
লােকের আধ্যাত্মিক ক্ষুধা পূর্ণ করিয়াছেন। বাইবেলের
অনেক স্থানে জীবনের রুটি (Bread of life) কথার
উল্লেখ আছে। হইতে পারে, তাহা হইতেই এই আখ্যায়িকার
সৃষ্টি হইয়াছে। বাইবেলে এই প্রকার বহু অতি
প্রাকৃত ব্যাপারের বর্ণনা আছে। লেখকগণ সেগুলিকে
সত্য বলিয়াই বিবেচনা করিতেন। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি
সেগুলি তাঁহারা প্রত্যক্ষ দেখেন নাই। জনশ্রুতির
উপর নির্ভর করিয়া তালিকাবদ্ধ করিয়াছেন। সে সময়ের
লােকেরা এই প্রকার অতিপ্রাকৃত কাৰ্যে সম্পূর্ণ বিশ্বাস
সম্ভবতঃ মহর্ষি ঈশাও অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস
করিয়াছেন। বাস্তবিক তাঁহাদের নিকটে কি অতিপ্রাকৃত
কি প্রাকৃত তেমন প্রভেদ ছিল না।
সে সময়ে বিজ্ঞানের
উন্নতি হয় নাই। প্রাকৃতিক নিয়মে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে
করিতেন।
নাই।
ঈশা-জীবনীর উপাদান
বরং লোকে বিশ্বাস করিত সাধুগণের প্রার্থনায়
ঈশ্বরের ইচ্ছায় প্রাকৃতিক নিয়মের লঙ্ঘন হয়। ঈশা
স্বয়ংই বলিয়াছেন তােমরা বিশ্বাস করিয়া ঈশ্বরের নিকট
যাহা চাহিবে, তিনি তাহাই দিবেন। যদি পৰ্ব্বতকে
অপসারিত হইতে বল তাহাই হইবে। সুতরাং তাহাদের
নিকটে সাধু পুরুষের প্রার্থনায় রােগ মুক্তি, অন্ধকে চক্ষু
দান বা মৃত ব্যক্তিকে পুনজ্জীবিত করা সম্ভব বলিয়া
বিবেচিত হওয়া আশ্চৰ্য্য নয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা
অতিপ্রাকৃতে বিশ্বাস করিতে পারি না। বাইবেল ও
অন্যান্য ধর্ম পুস্তকে যে সমুদয় অতিপ্রাকৃতের বর্ণনা আছে,
আমরা সেগুলিকে কিম্বদন্তী বলিয়াই গ্রহণ করিব।
ঈশার মহত্ত্ব অতিপ্রাকৃত কার্যে নয়, তাঁহার শিক্ষা ও
জীবনের দৃষ্টান্তে সম-সাময়িক লােকের নিকটে অতিপ্রাকৃত
কার্যের জন্য তাহার শিক্ষার আদর হইয়া থাকিতে
পারে কিন্তু অতিপ্রাকৃত কাৰ্য্যগুলি লােকে ভুলিয়া গিয়াছে
ও যাইবে কিন্তু তাঁহার যে অমূল্য শিক্ষা তাহা চিরদিনের
জন্য ধৰ্ম্ম-জগতে অক্ষয় রত্ন বলিয়া সম্মানিত হইবে।
কেবলমাত্র বর্তমান কালের বৈজ্ঞানিক বিচারে বাইবেল
বর্ণিত অতিপ্রাকৃত ব্যাপারগুলি বিশ্বাসের যােগ্য নয়।
ঐতিহাসিক বিচারেও সেগুলি গ্রহণের অযােগ্য। প্রাচীন
মহর্ষি ঈশা কালে বিশ্বাসী খৃষ্টানগণ বাইবেলকে অক্ষরে অক্ষরে অভ্রান্ত বলিয়া বিশ্বাস করিতেন। সে মত ত পরিত্যাগ করিতে হইবেই তদ্ভিন্ন বাইবেলের অন্তভুক্ত ঈশার জীবনচরিত- গুলির ঐতিহাসিক সত্যেও নির্ভর করা যায় না। আমরা দেখাইয়াছি সেগুলির বর্ণনার মধ্যে প্রধান প্রধান ঘটনাতেও বহু পার্থক্য রহিয়াছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে যে সমুদয় অনৈক্য রহিয়াছে তাহা বর্ণনা করিলে পুস্তকের কলেবর বৰ্ধিত হইয়া যাইবে। প্রকৃত কথা এই যে গ্রন্থগুলি সাধারণ মানুষের রচনা, গ্রন্থকারগণ আপন আপন জ্ঞান বুদ্ধি, রুচি, প্রবৃত্তি অনুসারে পুস্তকগুলি রচনা করিয়াছেন। ম্যাথু, মার্ক, লুক ও জনের গ্রন্থে এক একটি বিশেষভাব ও ধারা দেখিতে পাওয়া যায়। গ্রন্থ কয়খানির মধ্যে প্রথম তিনখানি অর্থাৎ ম্যাথু, মার্ক ও লুকে মােটামুটি একটি সাদৃশ্য দেখিতে পাওয়া যায়। এই তিনখানিতে ঈশার জীবন ও কাৰ্য্যের যে বিবরণ আছে, জনের গ্রন্থে তাহার বিবরণে একেবারেই সাদৃশ্য নাই। ম্যাথু, মার্ক এবং লুকের মতে মহর্ষি ঈশা প্রধানতঃ গ্যালীলি প্রদেশেই ধৰ্ম প্রচার করিয়াছিলেন। সেখানে ধর্ম প্রচার করিয়া কয়েক বৎসর পরে জেরুজালেমে গিয়াছিলেন এবং জেরুজালেমে প্রথম যাওয়ার পরেই তাহাকে হত্যা করা হয়। কিন্তু ৫
ঈশা-জীবনীর উপাদান
জনের লিখিত বিবরণে দেখা যায় তিনি একাধিকবার
জেরুজালেমে গিয়াছিলেন। প্রচার কার্য্য আরম্ভ করার
অল্প দিন পরেই তিনি প্রথমবার জেরুজালেমে যান এবং
সেখান হইতে গ্যালীলি আসেন। এই প্রকার বার বার
গ্যালীলি ও জেরুজালেমে যাওয়া আসার উল্লেখ আছে।
এই উভয় বিবরণই সত্য হইতে পারে না। সম্ভবতঃ ম্যাথু,
মার্ক ও লুকের বিবরণই ঐতিহাসিক। জনের গ্রন্থে
অন্যান্য অনেক বিষয়েও ইহাদের হইতে অনৈক্য দেখিতে
পাওয়া যায়। জনের ভাব ও ভাষা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আমরা
পুৰ্বেই বলিয়াছি, জনের গ্রন্থে গ্রীক-দর্শনের প্রভাব বহুল
পুরিমাণে লক্ষিত হয়। জনের ঈশা গ্রীক-দর্শনের লােগ
বা ঈশ্বরাংশসস্তৃত আদিম বাণী। জনের সমুদয় বিবরণ
এই ভাবে প্রণােদিত। ঈশা মনুষ্য বা ঈশ্বর-প্রেরিত মোয়া
মাত্র নন, তিনি স্বয়ং ঈশ্বর। এইজন্য জন্য ঈশ্বরচরিত্রে
কোন প্রকার দুর্বলতা বা অপূর্ণতা দেখাইতে কুণ্ঠিত।
তাঁহার সকল কাৰ্যই পূর্ণ।
ম্যাথু, মার্ক এবং লুক অনেকটা একভাবেই ঈশার
চরিত্র বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু তাহাদের মধ্যেও অনৈক্য
দৃষ্ট হয়। তাহারাও বিশেষ বিশেষ ভাবে ঈশার চরিত্র
অঙ্কণ করিয়াছেন। ম্যাথুর ঈশা ইহুদী ভাবাপন্ন।
লেখক
মহৰি ঈশা সম্ভবতঃ স্বয়ং ইহুদী ছিলেন এবং ইহুদী খৃষ্টানদিগের জন্য স্বীয় গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। তিনি ঈশকে ইহুদীধৰ্ম্মের সংস্কারক বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। ম্যাথুর মতে ঈশার ধর্ম সংস্কৃত ইহুদীধৰ্ম্ম। ইহুদী জাতির উদ্ধারের জন্য ঈশার আবির্ভাব । ইহুদীধৰ্ম্মের প্রাচীন আচাৰ্যগণ অতি প্রাচীনকাল হইতে ঈশার আগমনের বার্তা ঘোষণা করিয়াছিলেন। ম্যাথু পদে পদে পুরাতন বাইবেল হইতে বচন উদ্ধত করিয়া ঈশার মোয়াত্ত্ব প্রতিপন্ন করিয়াছেন। অপর দিকে ঝুকের ঈশা ইহুদী ও অন্যান্য জাতিদের মধ্যে পার্থক্য দেখেন নাই। তাহার শিক্ষা সমুদয় মানব- জাতির জন্য। তঁাহার ধৰ্ম্ম সাৰ্বজনীন ধৰ্ম্ম। ইহা কেবল প্রাচীন ইহুদীধৰ্ম্মের সংস্কারক মাত্র নহে। লুকের গ্রন্থ প্রধানতঃ ইহুদী ভিন্ন অন্যান্য জাতির জন্য লিখিত। ইহাতে অপর জাতিদের প্রতি অবজ্ঞা নাই; বরং তাঁহাদের প্রতি সমাদর দেখাইয়াছেন। ঈশার মৃত্যুর অল্পদিনের মধ্যে আদিম খৃষ্টীয়মণ্ডলীতে দুইটী বিরােধী ভাব ও গতি দৃষ্ট হয়। একদল লােক * ঈশার শিক্ষা ইহুদী জাতি ভিন্ন অপর কাহারও জয় নয়। ম্যাথুর মতে ঈশ অপর জাতিদিগকে অবজ্ঞা করিতেন।
ঈশা-জীবনীর উপাদান
ঈশার শিক্ষা ও ধর্মকে ইহুদীজাতির মধ্যে আবদ্ধ রাখিতে
প্রয়াস পাইয়াছিলেন। তাঁহার। ইহুদী ভিন্ন অপর কোন
জাতীয় লােককে খষ্টীয়মণ্ডলীতে গ্রহণ করিবার বিরােধী
ছিলেন। তাঁহাদের মণ্ডলীতে ইহুদী রীতি-নীতি আচার
প্রভৃতি রাখিবার পক্ষপাতী ছিলেন। বস্তুতঃ তাঁহাদের মতে
খৃষ্টধর্ম মূলতঃ ইহুদীধৰ্ম্ম। ঈশা তাহার কিছু কিছু সংস্কার
মাত্র করিয়াছিলেন। এই দলের কেন্দ্রস্থল জেরুজালেম
এবং ইহাদের নেতা জেম্স্। অপরদিকে আর একটি দল
দেখা দিয়াছিল, যাহাদের মতে খৃষ্টধর্ম সংস্কৃত ইহুদী ধর্ম মাত্র
নহে, উহা একটি অভিনব বিশ্বজনীন ধৰ্ম্ম। ইহার দ্বার
সকলে দেশের সকল জাতির জন্য উন্মুক্ত। মহর্ষি ঈশা
ইহুদী ও অন্যান্য জাতির মধ্যে কোন ভেদ দেখেন নাই।
তাঁহার শিক্ষা সকলের জন্য। ঈশার আগমন পর্যন্ত ইহুদী-
ধৰ্ম্ম নিয়মের (law) রাজত্ব ছিল; কিন্তু তাহার আগমনের পর
ইহুদীধৰ্ম্ম নিয়মের অবসান । এখন হইতে প্রেমের রাজ্য।
ঈশা জাতীয়-সঙ্কীর্ণতা দূর করিতে আসিয়াছিলেন।
ঈশাতে ইহুদী ও অ-ইহুদী নাই (In Christ there
was no Jew or Gentile) এই মতের প্রধান প্রচারক
মহাত্ম। সেন্ট পল। সেন্ট পল খৃষ্ট-ধৰ্ম্মকে ইহুদী সঙ্কীর্ণতার
বাহিরে লইয়া গিয়াছিলেন। তিনি ঈশার ধর্ম রোমান ও
•
মহর্ষি ঈশা
গ্রীকজাতির মধ্যে প্রচার করিয়া ইহাকে সাম্প্রদায়িক
সঙ্কীর্ণতা হইতে বাঁচাইয়াছেন। সেন্ট পলের চেষ্টায়
সফল না হইলে হয় ত খৃষ্টধর্ম ইহুদী-ধর্মের একটি
সম্প্রদায় মাত্র থাকিয়া যাইত। বহুদিন পর্যন্ত এই উভয়
দলে সংগ্রাম চলিয়াছিল। একদল খৃষ্টান ইহুদী-ভাবাপন্ন
(Judaistic) অপর দল সাৰ্বজনীন (Universalistic)।
লুকের গ্রন্থ সাৰ্বজনীন দলের মুখ পত্র। ইহা সকল
জাতির লােকের জন্য লিখিত। তঁাহার গ্রন্থে তঁাহার বহু
নিদর্শন পাওয়া যায়। লুক্ স্বয়ং বােধ হয় গ্রীক অথবা
গ্রীক-ভাবাপন্ন ইহুদী ছিলেন। পলের ভাবের দ্বারা
অনুপ্রাণিত হইয়া স্বীয় গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন।
সম্ভবতঃ মার্কের রচনায় কোন বিশেষ সাম্প্রদায়িক ভাব
ছিল না। তিনি ঈশার জীবন-বৃত্তান্ত যেরূপ শুনিয়া-
ছিলেন যথাযথ বর্ণনা করিয়া গিয়াছিলেন। মার্কের বিবরণ
অপেক্ষাকৃত সরল ও স্বাভাবিক।
মনে হয় ম্যাথু ও লুক
মার্কের বিবরণ অনেক পরিমাণে অনুসরণ করিয়াছেন।
মার্ক পিটারের শিষ্য ও সহযােগী ছিলেন। পেপিয়াস
বলিয়াছেন ঈশার জীবন-চরিত কয়খানির মধ্যে মার্কের
পুস্তক বোধ হয় সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ও প্রামাণ্য। মহর্ষি
ঈশার জীবন সম্বন্ধে মার্কের গ্রন্থই আমাদের প্রধান
বচন ঈশা-জীবনীর উপাদান অবলম্বনীয়। ম্যাথু ও লুকের গ্রন্থে ঈশার উপদেশ ও সম্বন্ধে অনেক নূতন বিষয় জানিতে পারা যায়। ম্যাথুর গ্রন্থে ঈশার উপদেশ বলিয়া অনেক বচন আছে যেগুলি অতি মূল্যবান, লুকেও তাহার কিছু কিছু পাওয়া যায়। ম্যাথু সেগুলিকে যে ভাবে সাজাইয়াছিলেন লক তাহা করেন নাই। ম্যাথুর গ্রন্থে ঈশার উপদেশগুলি একত্রিত করা হইয়াছে। সেই প্রকার ঈশার বর্ণিত আখ্যায়িকা গুলিকেও (Parables) একত্রিত করা হইয়াছে। লুক সেগুলিকে বিচ্ছিন্ন করিয়া ভিন্ন ভিন্ন স্থানে দিয়াছেন। যেমন ম্যাথুর পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম অধ্যায়ে ঈশার উপদেশ- গুলি সন্নিবিষ্ট হইয়াছে। এগুলি শৈলবেদীর উপদেশ নামে প্রসিদ্ধ (Sermon on the Mount)। ম্যাথুর বর্ণনা অনুসারে ঈশা একদিন পৰ্বতােপরি হইতে এই উপদেশ । দিয়াছিলেন। এগুলি জগতের ধৰ্ম্ম-সাহিত্যে অপূৰ্ব্ব রত্ন। তবে এগুলি সমুদয় যে এক সময়ে বিবৃত হইয়াছিল তাহা মনে হয় না। লুক ইহার অধিকাংশ ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ঈশার মুখে দিয়াছিলেন। ম্যাথু উপদেশগুলিকে একত্রে সন্নিবিষ্ট করিয়া সেগুলির সৌন্দৰ্য্য সহজ করিয়াছেন। অনুমান করা হয় ঈশার জীবদ্দশায় অথবা তাহার মৃত্যুর অল্পদিন পরেই তাহার কোন শিষ্য ঈশার উপদেশগুলি
৩০
মহাষ ইশা
সংগ্রহ করিয়াছিলেন আমরা পূর্বেই বলিয়াছি ম্যাথু
এই সংগ্রহকারক বলিয়া কিম্বদন্তী আছে।
ম্যাথু ও
লুকের রচয়িতা মার্কের বিবৃত জীবন বিবরণ ও এই
উপদেশাবলী অবলম্বন করিয়া স্ব স্ব গ্রন্থ রচনা করেন।
এই জন্যই এই তিনখানি গ্রন্থের মধ্যে এইরূপ সাদৃশ্য
দেখিতে পাওয়া যায়। জনের গ্রন্থ সম্পূর্ণ অন্যরূপ।
লেখক পূর্বোক্ত তিনখানি গ্রন্থেব সহিত পরিচিত ছিলেন,
তথাপি তিনি এই গ্রন্থগুলির বিবরণ অনুসরণ করেন নাই।
জাতি ও বংশ পরিচয় খৃষ্ট ধর্মের প্রবর্তক মহাপুরুষ ঈশা, প্যালেষ্টাইনের অন্তর্গত গ্যালীলি প্রদেশের ন্যাজারেথ নামক নগরে ইহুদি জাতির মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন। সে সময়ে প্যালেস্টাইন রােম সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। ইহুদি জাতির তখন চরম দুরাবস্থা। আমাদের পৃথিবীর ইতিহাসে ইহুদি জাতির মত হতভাগ্য জাতি কমই দেখা যায় । ভাগ্যচক্রের আবর্তনে তাহারা পরাক্রান্ত জাতি সকল কর্তৃক বার বার আক্রান্ত ও পদদলিত হয়। ইউরােপ ও এসিয়ার মিলন- সীমায় অবস্থিত থাকায় প্যালেস্টাইন উভয় মহাদেশের বিজয়ী সৈন্যগণের রঙ্গভূমি এবং অধিবাসিগণ পরাক্রান্ত জাতিসকল কর্তৃক বহুবার নিপীড়িত হইয়াছিল। ইহুদি জাতির ইতিহাসের প্রারম্ভে দেখিতে পাই, তাহারা মিশর দেশে প্রবল প্রতাপশালী ফ্যারো কর্তৃক বন্দী হইয়া বহু লাঞ্ছনা ভােগ করে। সেই সময়ে মােজে নামক একজন অসাধারণ প্রতিভাশালী নেতা তাহাদের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাহাদিগকে ফ্যাটের দাসত্ব হইতে মুক্ত করিয়া স্বদেশ প্যালেস্টাইনে আনয়ন করেন এবং তাহা-
৪e
মহৰি ঈশা
দিগকে নূতন ধৰ্ম্ম দিয়া নবজীবনে দীক্ষিত করেন। এখন
হইতে কয়েক শতাব্দী অপেক্ষাকৃত সুখ ও শান্তিতে ইহুদি
জাতি প্যালেস্টাইনে বাস করে। এই কালের মধ্যে
দাউদ নামক একজন নরপতি প্যালেষ্টাইন শাসন করেন।
তাহার অধীনে ইহুদি জাতির শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছিল। পরবর্তী
কালের ইহুদিগণ দাউদের রাজত্বকাল গৌরবের সহিত
স্মরণ করিত। ইহার পর একাধিক্রমে প্যালেস্টাইন,
এসিরিয়া, ব্যাবিলােনিয়া, গ্রীস ও রােম কর্তৃক আক্রান্ত ও
নিষ্ঠুর ভাবে নিপীড়িত হয়। এই সকল দুর্দশা সত্ত্বেও
ইহুদিগণ আপনাদিগকে ঈশ্বরের মনােনীত প্রিয় জাতি
বিবেচনা করিত। তাহাদের সহিষ্ণুতা আশাশীলতা দেখিয়া
মুগ্ধ হইতে হয়। ঈশার মৃত্যুর অল্পদিন পরে এই হতভাগ্য
জাতি স্বদেশ হইতে তাড়িত হইয়া নানাস্থানে বিচ্ছিন্নভাবে
বাস করিতেছে, কিন্তু একদিনের জন্যও তাহারা আশা
হারায় নাই। তাহারা বিশ্বাস করে যে ভগবান মানব
জাতির কল্যাণের জন্য তাহাদিগকে বিশেষ কাজ দিয়াছেন।
তাহাদের এই আশ্চৰ্য্য সহিষ্ণুতা ও আশা-শীলতার মূল
তাহাদের উন্নত ধৰ্ম্ম। পৃথিবীর অধিকাংশ জাতি যখন
পৌত্তলিকতা ও কুসংস্কারে মগ্ন ছিল তখন ইহুদি জাতির
ধৰ্মচাৰ্য্যগণ স্বদেশবাসীগণকে উন্নত একেশ্বরবাদের উপদেশ
৪১
জাতি ওবংশ পরিচয়
দিতেছিলেন। তাঁহারা মনে করিতেন সমগ্র মানব জাতি
তাহাদের নিকট হইতে এই ধর্ম গ্রহণ করিবে। বাস্তবিক
জগৎ পরবর্তী কালে ইহুদি জাতির নিকট ধর্মের জন্য বহু
পরিমাণে ঋণী। বর্তমান সময়ের দুইটি প্রধান ধৰ্ম্ম, খৃষ্টান
ও মুসলমান ধৰ্ম্ম সাক্ষাৎ ও পরােক্ষভাবে ইহুদি ধৰ্ম্ম হইতে
উদ্ভূত।
জগতের ধর্ম ইতিহাসে ইহুদি জাতীর স্থান অতি
উচ্চ। যখন অন্যান্য জাতিগণ রাজ্য ও রাজশক্তির গর্বে
মত্ত ছিল তখন ইহুদি জাতি একান্ত সমগ্র হৃদয়ে ধৰ্ম্ম ও
ঈশ্বর চিন্তা করিতেছিল। তাহার ফলে ক্ষুদ্র ঘৃণিত ও
পদদলিত ইহুদি জাতি সভ্য জগতকে উন্নত ধৰ্ম্ম-ভাব
দিতে সমর্থ হইয়াছে। ইহুদি জাতির বিচিত্র ইতিহাসে
ঈশার যুগ ঘন অন্ধকারময়। প্যালেষ্টাইন তখন প্রবল
প্রতাপান্বিত রােম সাম্রাজ্যের কঠোর শাসনে নিপীড়িত।
ঈশার জীবনকালে অগষ্টস ও টাইবিরিয়ম রােমের সম্রাট
ছিলেন। রােমের সম্রাটের অধীনে কয়েকজন শাসনকর্তা
প্যালেস্টাইনে বিভিন্ন প্রদেশে রাজত্ব করিতেন। ঈশার
জন্মস্থান গ্যালীলি, ভূতপূৰ্ব্ব রাজা হেরােডের পুত্র
এন্টিশসের শাসনে ছিল। হেরোডের অপর এক পুত্র
ফিলিপস্ ট্রেকোনইটিসের টেট্টার্ক অর্থাৎ শাসনকর্তা ছিলেন।
দিত।
ছিল।
মহর্ষি ঈশা
ইহারা ইহুদি থাকায় লােকে তাঁহাদের রাজত্বে বিশেষ
অসন্তুষ্ট ছিল না। কিন্তু জুডিয়া প্রদেশ সাক্ষাৎভাবে
একজন রােমান দ্বারা শাসিত হইত। তাঁহাকে প্রােকিউরেটর
বলা হইত। ঈশার সময় পন্টিয়াস পাইলেট নামে
একজন রোমান জুডিয়ার প্রােকিউরেটার ছিল।
অতি নিষ্ঠুর ধূর্ত ও ক্রুর প্রকৃতির লােক ছিল। রােমান
সম্রাট ধৰ্ম্ম সংক্রান্ত সকল বিষয়ে ইহুদীদিগকে স্বাধীনতা
জুডিয়ার রাজধানী জেরুজালেম ইহুদী-ধৰ্ম্মের
কেন্দ্র ছিল।
সেখানে তাহাদের ধর্ম-মন্দির অবস্থিত।
নিষ্ঠাবান ইহুদিগণ দেশের নানাস্থান হইতে
বৎসরে একাধিকবার জেরুজালেমের মন্দিরে পূজা দিত।
গ্যালীলি প্রদেশের জোসেফ নামক এক ইহুদী গৃহে
ঈশার জন্ম হয়। জোসেফ সূত্রধরের ব্যবসা করিতেন।
ম্যাথু লুক লিখিত ঈশা-জীবনীতে জোসেফ দাউদ রাজার
বংশদ্ভূত বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে, কিন্তু বােধ হয় ইহা
পরবর্তী কালের কল্পনা। যখন ঈশাকে ইহুদী জাতির
উদ্ধার কর্তা, প্রেরিত মেশায় বলিয়া বিশ্বাস করা হইয়াছিল,
সে সময়ে প্রাচীন কিম্বদন্তি অনুসারে দাউদ নৃপতি বংশে
তাঁহার জন্মের প্রবাদ প্রচলিত হইয়া থাকিবে। বাইবেলে
জোসেফের উল্লেখ বেশী দেখিতে পাওয়া যায় না। তদপেক্ষা
জাতি ও বংশ পরিচয়
তঁাহার পত্নী মেরীর বিবরণ অধিক পাওয়া যায়। অনেক
সময়ে ঈশা মেরীর পুত্র বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন।
ঈশা তাহাদের প্রথম সন্তান। বাইবেলে মেরীর কুমারী
অবস্থায় ঈশার জন্ম বলিয়া উল্লেখ আছে। ইহাও
পরবর্তী কালের কল্পনা বলিয়া মনে হয়।
বাল্যকাল ও শিক্ষা
ঈশার বাল্যজীবন সম্বন্ধে বেশী কিছু জানা যায় না।
গ্যালীলির অন্তর্গত ন্যাজারেথ নগরে সম্ভবতঃ খৃষ্টপূৰ্ব তিন
চার সনে ঈশার জন্ম হয়। যদিও ঈশার জন্মদিন হইতে
খষ্টীয় শক গণনা করা হয়, বাস্তবিক ঈশার জন্ম তাহার
পূৰ্বেই হইয়াছিল। হের দি গ্রেটের মৃত্যুর পূর্বেই
ঈশার জন্ম হয়।
ম্যাথু ও লু প্রভৃতির জীবন-চরিতে বেথেলহেম
ঈশার জন্মস্থান বলিয়া বর্ণিত আছে, কিন্তু ইহাও পরবর্তী
কালের কল্পনা বলিয়া মনে হয়। ইহারও মূলে ঈশার
মেসায়া বিশ্বাস। ললাকে যখন বিশ্বাস করিতে আরম্ভ
করিল যে, ঈশা মেসায় তখন তাঁহার বেথেলহেমে জন্মের
প্রবাদ সৃষ্ট হইয়াছিল। কারণ একটা কিম্বদন্তি প্রচলিত
ছিল যে, মেসায়া বেথেলহেমে জন্মগ্রহণ করিবেন। ম্যাথু
অনুসারে ঈশার পিতা জোসেফ, বেথেলহেমের অধিবাসী ;
কিন্তু লুকের মতে জোসেফ, ন্যাজারেথে বাস করিতেন।
ঘটনাক্রমে ঈশার জন্মের সময় সস্ত্রীক বেথেলহেমে উপস্থিত
ঈশার জন্মের পরেই নবজাত সন্তান লইয়া
ছিলেন।
বাল্যকাল ও শিক্ষা
৪৫
স্বীয় বাসস্থান ন্যাজারেথে ফিরিয়া আসেন। ম্যাথুর মতেও
ঈশার বাল্যজীবন ন্যাজারেথে অতিবাহিত হইয়াছিল। তিনি
লিখিয়াছেন, ঈশার জন্মের অব্যবহিত পরেই জোসেফ স্বর্গের
দূতকর্তৃক স্বপ্নে আদিষ্ট হইয়া হেরডের ভয়ে নবজাত সন্তান
লইয়া মিশর দেশে পলায়ন করেন। হেরডের মৃত্যুর
পরে পুনরায় দেবদূতের আজ্ঞানুসারে ন্যাজারেথে আসিয়া
বাস করেন। এই সমুদয়ই পরবর্তী কালের কল্পনা।
বোধ হয়, ঈশা ন্যাজারেথে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং
তাহার প্রথম জীবন ন্যাজারেথেই অতিবাহিত হইয়াছিল।
ন্যাজারেথ সে সময়ে একটি গণ্ডগ্রাম বা ক্ষুদ্র সহর
ছিল। সহরটী এখনও বিদ্যমান আছে ; বর্তমান জনসংখ্যা
প্রায় দশ হাজার। সম্ভবতঃ ঈশার জন্ম সময় ন্যাজারেথ
যেমন ছিল, এখনও প্রায় তেমনই আছে।
দীর্ঘকাল
মুললমান অধিকারে পথগুলি কিছু অপরিষ্কার হইয়া থাকিবে।
ঈশার সময় ন্যাজারেথে সুখ ও শান্তি বিদ্যমান ছিল।
সমগ্র গ্যালীলি প্রদেশই প্রকৃতির মনােরম আনন্দ-কানন ;
ভূমি উৰ্ব্বর, নদী হ্রদে সুজলা, বৃক্ষ-লতায় ভূষিত ন্যাজারেথ
বসন্তকালে বিবিধ সুন্দর পুষ্পে প্রান্তরগুলি ভূষিত থাকিত।
দ্রাক্ষা, অলিভ (Olive) ক্ষেত্রে চারিদিকে পরিপূর্ণ, ন্যাজারেথের
অনতিদূরে নাতিক্ষুদ্র পর্বতশ্রেণী । সমগ্র প্যালেস্টাইন
মহৰি ঈশা
দেশে এমন প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য দৃষ্ট হইত না। প্রকৃতির
এই মনােরম ক্রীড়াক্ষেত্রে ঈশার বাল্যজীবন অতিবাহিত
হইয়াছিল। ঈশার চরিত্রে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রভাব
যথেষ্ট লক্ষিত হয়।
তাঁহার আশ্চর্য্য পৰ্যবেক্ষণ শক্তি
ছিল বলিয়া মনে হয়। তিনি বৃক্ষ, লতা, পত্র, পুষ্প বড়
ভালবাসিতেন। তাহার উক্তিতে পদে পদে ফল-পুষ্পের
উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। কৃষিকার্য্যের সহিত তিনি
সুপরিচিত ছিলেন। বাইবেলের বিবরণে মনে হয়,
ন্যাজারেথে অনেক কৃষি-ব্যবসায়ী বাস করিত। ঈশা কৃষি-
কাৰ্য্য হইতে অনেক দৃষ্টান্ত লইয়া উপদেশ দিতেন। শস্য
বপন, শস্য কর্তন, মেষপাল রক্ষণ, দ্রাক্ষারস পেষণ প্রভৃতি
কথা বার বার উল্লিখিত আছে। কথায় কথায় তিনি পদ্মবন
দ্রাক্ষাক্ষেত্র প্রভৃতির দৃষ্টান্ত দিতেন। তাহার প্রথম ও
প্রধান শিক্ষক প্রকৃতি। বােধ হয়, প্রথম হইতেই তিনি
অনেক সময় একাকী নির্জনে বসিয়া প্রকৃতির সৌন্দৰ্য্য
উপভােগ করিতেন।
এইরূপে প্রকৃতির অনুধ্যানে ঈশা তাহার গভীর ও
অদ্ভুত জ্ঞানলাভ করিয়াছিলেন।
স্কুল কলেজে তাঁহার
শিক্ষা লাভ হয় নাই। সে সময় এখনকার মত স্কুা কলেজ
ছিল না। ইহুদীগণের মধ্যে গ্রামে গ্রামে ধৰ্ম্ম মন্দিরের
৪
বাল্যকাল ওশিক্ষা
সঙ্গে এক একটি পাঠশালা থাকিত। স্থানীয় বালকগণ
সেখানে পড়িতে ও লিখিতে শিখিত। মুসলমানদিগের
মধ্যে যেমন দেখিতে পাওয়া যায় মজিদের সঙ্গে এক
একটি পাঠশালা থাকে, প্যালেস্টাইনেও সেইরূপ ছিল।
এই সকল স্কুলে, পড়িতে ও লিখিতে শিক্ষা দেওয়া হইত।
প্রধানতঃ ধর্মগ্রন্থ পড়ান হইত। ঈশা এই প্রকারে
স্যাজারেথের বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন। তিনি
হিব্রু ভাষা জানিতেন। উত্তরকালে দেখিতে পাওয়া যায়
যে, তিনি হিব্রু ধর্মগ্রন্থ পাঠ করিতেন। হিব্রু
বাইবেলের সহিত তিনি সুপরিচিত ছিলেন। ঈশার সময়
হিব্রু মৃত-ভাষা হইয়াছিল। লোকে যে ভাষায় কথাবার্তা
বলিত তাহার নাম এরামিক। প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র হিব্রু
ভাষায় লিখিত ছিল। এই জন্য অনেকেই হিব্রু শিক্ষা
গভীরভাবে ধৰ্ম্ম-গ্রন্থ আলােচনার জন্য স্থানে
স্থানে উচ্চ শ্রেণীর বিদ্যালয় ছিল। ঈশা এইরূপ বিদ্যালয়ে
শিক্ষার সুযােগ পান নাই। ন্যাজারেথে এইরূপ বিদ্যালয়
ছিল না। দেখা যায় উচ্চ শিক্ষার প্রতি ঈশার তখন
আস্থা ছিল না। এই সকল বিদ্যালয়ে যে সকল তর্ক
বিতর্ক হইত, ঈশা সর্বান্তঃকরণে তাহা ঘৃণা করিতেন।
বিদ্যালয় অপেক্ষা সাধারণ লােকের সহিত কথা-বার্তায়
করিত।
৪
মহর্ষি ঈশা
তিনি অধিক জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন। ইহুদীগণের
মধ্যে সে সময় জ্ঞানের হাওয়া প্রবাহিত ছিল। বিদ্যালয়ে
শিক্ষা লাভ না করিয়াও লােকে জ্ঞান লাভ করিত।
এই হাওয়ার মধ্যে বাস করিয়া প্রতিভাশালী ঈশা গভীর
জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন। ভঁহার বাক্য ও চিন্তাতে
অসামান্য জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রথম বয়স হইতেই
ঈশা গভীর চিন্তাশীল ছিলেন।
ধৰ্ম ভাবের উদ্রেক ধৰ্ম প্রবর্তকগণের প্রথম জীবনে বাহ্য ইতিহাস অপেক্ষা আধ্যাত্মিক-ইতিহাস আরও বিরল। কি প্রকারে ভােগ- ঐশ্বর্যের মধ্যে প্রতিপালিত শাক্য রাজ-তনয় সৰ্ব্বত্যাগী সন্ন্যাসী “বুদ্ধ” হইলেন তাহার ঐতিহাসিক বিবরণ সামান্যই পাওয়া যায়। বেদুইন বালক মহম্মদের নির্ভীক বিশ্বাসী ধর্মবীরে পরিবর্তনও আশ্চৰ্য্য ব্যাপার। অপেক্ষাকৃত আধুনিক সময়ে জ্ঞান-গর্বিত দাম্ভিক অধ্যাপক বিশ্বম্ভরের হঠাৎ মহা বিনয়ী ভক্ত-অবতারে পরিণতি হওয়া আরও বিস্ময়কর। মহর্ষি ঈশার আধ্যাত্মিক ইতিহাসের কোনই বিবরণ পাওয়া যায় না। তঁাহার প্রথম জীবন ন্যাজারেথে অতিবাহিত হইয়াছিল। সম্ভবতঃ প্রথম হইতেই তঁাহার ধৰ্ম্ম অনুরাগ ছিল। লিখিত আছে, যখন তিনি দ্বাদশ বৎসরের বালক সেই সময় দেশ-প্রচলিত প্রথা অনুসারে বালক ঈশা মন্দিরে পূজা দিবার জন্য পিতামাতার সঙ্গে জেরুজালেম গিয়াছিলেন। প্রত্যেক নিষ্ঠাবান ইহুদী বৎসরে এইরূপ তিনবার জেরুজালেম যাইতেন। বালক ঈশার জেরুজালেম গমন বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। কিন্তু ফিরিবার ৪
Go
মহর্ষি ঈশা
পথে দেখা গেল যাত্রীদলের সঙ্গে বালক ঈশা নাই।
পিতামাতা উদ্বিগ্ন হইয়া অনুসন্ধান করিতে লাগিলেন।
তখন যাত্রীদল অনেক দূর আসিয়াছিল। জোসেফ ও মেরী
খুঁজিতে খুঁজিতে তিন দিন পরে জেরুজালেম আসিয়া
দেখিলেন যেখানে মন্দির-প্রাঙ্গণে আচাৰ্যগণ ধৰ্ম্মালােচনা
করিতেছেন, ঈশা গভীর মনযােগের সহিত সেখানে
বসিয়া তাহাদের কথা শুনিতেছেন ও তাহাদিগকে প্রশ্ন
করিতেছেন। সকলে বালকের প্রশ্নোত্তর শুনিয়া বিস্ময়
প্রকাশ করিতেছেন। মেরী ঈশাকে বলিলেন, “পুত্র, কেন
তুমি এইরূপ ব্যবহার করিলে ? দেখ তােমার পিতা ও
আমি ব্যাকুল হইয়া তােমাকে কত খুঁজিতেছি।” ঈশা
বলিলেন, “কেন তােমরা আমাকে খুঁজিতেছ ? তােমরা
কি জান না যে আমি আমার পিতার কাৰ্যে মনযােগ দিব ?”
জোসেফ ও মেরী তাহার কথার অর্থ বুঝিতে পারিলেন
না। ম্যাথু, মার্ক ও জনে এই ব্যাপারের কোনও উল্লেখ
নাই। যদি ঘটনাটি সত্য হয়, তাহা হইলে বার বৎসরের
বালকের পক্ষে ইহা বিশেষ ধৰ্ম্ম ভাবের পরিচায়ক।
ইহার পরে বাইবেলে জোসেফের আর কোনও উল্লেখ
দেখিতে পাওয়া যায় না। সম্ভবতঃ অল্প দিনের মধ্যেই
জোসেফের মৃত্যু হয়। ইহার পরে পরিবার রক্ষণাবেক্ষণের
ধর্ম ভাবের উদ্রেক
ভার মেরীর উপর পড়ে। বাইবেলে অনেক স্থলে ঈশাকে
মেরীর পুত্র বলিয়া পরিচয় দেওয়া হইয়াছে। সম্ভবতঃ
অল্প বয়সে জোসেফের মৃত্যুর জন্য ঈশা মাতার নামে পরিচিত
হইয়াছিলেন।
জোসেফের মৃত্যুর পর মেরী সপরিবারে
ক্যেনা আসিয়া বাস করিয়াছিলেন মনে হয়। কেনা
ন্যাজারেথ হইতে চার পাঁচ মাইল দূরে অবস্থিত একটী গ্রাম।
বােধ হয়, এই সময় এখানে মেরীর পিতৃবংশ বাস করিতেন।
স্বামীর মৃত্যুর পর আত্মীয় স্বজনের নিকটে থাকিবার জন্য
মেরীর কেনায় বাস করা সম্ভব। মেরীর অনেকগুলি
সন্তান ছিল ; বৃহৎ পরিবার-পালনে মেরীকে বেগ পাইতে
হইয়া থাকিবে। জোসেফ সূত্রধরের ব্যবসা করিতেন ;
কিছু সঞ্চয় করিয়া রাখিতে পারিয়াছিলেন বলিয়া মনে
হয় না; ঈশাকে অল্প বয়সেই অর্থ উপার্জনের চেষ্টা
দেখিতে হইয়াছিল। সম্ভবতঃ অল্প বয়সেই তিনি পিতার
নিকট সূত্রধরের ব্যবসায় শিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন।
সে সময় প্যালেস্টাইনে কোনও না কোনও অর্থকরী ব্যবসায়
শিক্ষা করিতেন। প্রচারব্ৰত গ্ৰহণ করিবার পূর্বে ঈশা
সূত্রধরের কাজ করিতেন বলিয়া মনে হয়; কিন্তু অনেক
সময়ই তিনি ধর্মচিন্তায় মগ্ন থাকিতেন। স্যাজারেথের
নিকটবর্তী পৰ্বতশৃঙ্গে গমন করিয়া একান্তে ঈশ্বরের ধ্যানে
মহৰি ঈশা নিযুক্ত থাকিতেন। যৌবনের প্রারম্ভে ঈশার গভীর মৌলিক ধর্মমত গঠিত হইয়া থাকিবে, এবং সম্ভবতঃ অন্তরঙ্গ বন্ধুবর্গের নিকটে তাহা প্রকাশ করিতেন। ঈশার অসাধারণ ধৰ্ম্ম- জীবন এক দিনে গঠিত হইয়াছিল বলিয়া মনে হয় না। তঁাহার গভীর ঈশ্বর-বিশ্বাস, দীর্ঘ চিন্তা ও ব্যাকুল ধ্যানের ফল। সেইরূপ ঈশার উন্নত নৈতিক জীবন বহু সাধনা ও ব্যাকুল প্রার্থনায় গঠিত হইয়া থাকিবে। যদিও কোন বিবরণ পাওয়া যায় না, ইহা সুনিশ্চিত, ঈশার প্রথম জীবন ব্যগ্র-অন্বেষণ, বহু তপস্যা ও গভীর সাধনায় অতিবাহিত হইয়া থাকিবে। মহর্ষি ঈশার ধর্মবিশ্বাসে প্রথম ও প্রধান কথা ঈশ্বর আমাদের পিতা। এই জগতে এক প্রেমময় পিতা আছেন। ঈশার পূর্বে কোনও কোনও দেশে দুই একজন সাধু ঈশ্বরকে পিতা বলিয়া থাকিতে পারেন; কিন্তু ঈশার মুখে এই কথা যেমন জীবন্ত হইয়াছিল, তেমন আর কোথাও হয় নাই। তিনি আপনাকে এবং সমগ্র মানবমণ্ডলীকে ভগবানের সন্তান বলিয়া অনুভব করিতেন; এই জ্ঞান ঈশার নিকট জীবন্ত ও মৌলিক। ইহা তিনি লােকের মুখে বা শাস্ত্র হইতে লাভ করেন নাই, আপনার প্রত্যক্ষ অনুভূতিতে দেখিয়াছিলেন, মানবের এক অদৃশ্য পিতা
ধর্ম ভাবের উদ্রেক
•
রহিয়াছেন ; ঈশা তাহাকে আমাদের স্বর্গস্থ পিতা বলিতেন।
তাঁহার মুখে পিতা, অথবা ফাদার এই বাণী কি মিষ্টই
শুনাইত। তিনি আকাশে, পৃথিবীতে, জলে, স্থলে, স্বজনে,
নির্জনে, প্রকৃতিতে ও মানব-সমাজে সর্বত্র জীবন্ত ঈশ্বরকে
দেখিতেন। ঈশ্বর আমাদিগকে রক্ষা করিতেছেন, পালন
করিতেছেন, আহার দিতেছেন, আমাদের দুঃখ ক্লেশ জানেন,
কাতর ক্রন্দন শােনেন। ঈশ্বরকে সকল কথা বলা তাঁহার
নিকট সকল দুঃখ দৈন্য, নিবেদন করা ঈশার পক্ষে স্বাভাবিক
ছিল। প্রার্থনা তাহার নিকট যুক্তি-তর্কের বিষয় ছিল না
নিঃশ্বাস-গ্রহণের ন্যায় সহজ হইয়াছিল। চাহিলেই পাওয়া
যায়, “চাও দেওয়া হইবে, অন্বেষণ কর পাইবে, দ্বারে আঘাত
কর, দ্বার উন্মুক্ত হইবে; কিন্তু আপনার ইচ্ছা পূর্ণ করিবার
জন্য ব্যস্ত হইও না।” সর্বদা বলিবে, আমার ইচ্ছা নয়,
তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হউক। ঈশ্বর জানেন, কিসে আমাদের
কল্যাণ হয়, তিনি সব দেখিতেছেন। ঈশ্বর প্রেমময় পিতা,
তিনি আমাদিগকে ভালবাসেন ; সুতরাং আমাদের কর্তব্য
তাহাকে ভালবাসা। ঈশার ধর্মের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য
ঈশ্বরকে ভালবাসা। “সমগ্র হৃদয়ের সহিত, সমগ্র শক্তির
সহিত, সমগ্র প্রাণের সহিত ঈশ্বরকে ভালবাস এবং তােমার
প্রতিবেশীকে আত্মতুল্য ভালবাস।” ঈশ্বর যে আমাদের
৫৪
মহৰি ঈশা
পিতা, তাহা হইলে সকল নরনারী আমাদের ভাই-বোেন্।
ঈশ্বরকে ভালবাসার অর্থ সমগ্র মানবকে ভালবাসা। সত্য,
ন্যায়, দয়া প্রতিষ্ঠিত করা। অন্যায় ব্যবহারের সঙ্গে
ঈশ্বরের পূজা হয় না।
প্রকাশ্যে প্রচার-ব্ৰত গ্রহণের অনেক পূর্বেই এই সকল
চিন্তা ঈশার হৃদয় অধিকার করিয়া থাকিবে। সম্ভবতঃ
অন্তরঙ্গ বন্ধুগণের সঙ্গে তিনি এ সকল কথা বলিতেন ;
কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি দল গঠন বা শিষ্য সংগ্রহ করেন
নাই। আপন মনে ধর্মচিন্তা করিতেছিলেন।
দীক্ষা ঈশা যখন একান্তে গ্যালীলি প্রদেশে আপন মনে ধৰ্ম্ম- চিন্তা করিতেছিলেন, সেই সময় প্যালেষ্টাইনের আর এক অংশে, জুডিয়া প্রদেশে একজন অদ্ভুত ধৰ্ম্মপ্রচারকের অভ্যুদয় হইয়াছিল। ইতিহাসে ইনি ব্যাপ্টিষ্ট জন্ নামে পরিচিত। জুডিয়া অনেক বিষয়ে গ্যালীলি হইতে বিভিন্ন প্রকারের। গ্যালীলি সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা, বৃক্ষ, লতা, ফল, পুষ্পে পরিপূর্ণ ; জুডিয়া শুষ্ক, অনুব্বর, প্রস্তর- ময় মরুভূমি। জনের প্রকৃতি দেশের অনুরূপ। তিনি বাল্যকাল হইতে নির্জন মরুপ্রান্তর ভাল বাসিতেন। তাহার পিতা জেকেরিয়স্ জেরুজালেম মন্দিরের পুরােহিত ছিলেন। কিন্তু তিনি জেরুজালেমে বাস করিতেন না ; হেড্রোণের নিকটবর্তী জুডিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে ভঁহার বাড়ী ছিল। জেকেরিয়স্ ও তাহার পত্নী এলিজাবেথের বৃদ্ধবয়সে জনের জন্ম হয়। ইতিপূর্বে তাহাদের কোনও সন্তান হয় নাই। স্বর্গের দূত গেব্রিয়েল জেকেরিয়কে বৃদ্ধবয়সে তাঁহার সন্তানের জন্মের কথা বলেন। জেকেরিয় নিজের পালা অনুসারে একদিন মন্দিরে আরতি করিতেছিলেন, এমন মহর্ষি ঈশা সময় গেব্রিয়েল তাহাকে দেখা দিয়া বলিলেন, ঈশ্বর তােমার প্রার্থনা শ্রবণ করিয়াছেন, তােমার একটি পুত্রসন্তান হইবে; ঈশ্বর তাহাকে মহৎ করিবেন। সে মাতৃগর্ভ হইতেই পবিত্র আত্মদ্বিারা পূর্ণ হইবে, কখনও সুরাপান করিবে না, অনেকে তাহার দ্বারা ধৰ্ম্মপথে অনীত হইবে। জেকেরিয়া এই কথা শুনিয়া বিস্মিত হইলেন এবং বলিলেন, “ইহা কি করিয়া সম্ভব, আমি বৃদ্ধ হইয়াছি, আমার স্ত্রী বন্ধ্যা।” দেবদূত বলিলেন, “আমি গেব্রিয়ে, তােমাকে এই সুসংবাদ দিবার জন্য প্রেরিত হইয়াছি ; তুমি যেমন বিশ্বাস করিতেছ না, আজ হইতে তুমি বোবা হইবে ; যথাসময়ে এই ঘটনা সংঘটিত হইলে পুনরায় কথা বলিতে পারিবে।” যথাসময় এলিজাবেথ একটি পুত্রসন্তান প্রসব করিলেন। লুকের মতে ঈশার মাতা মেরী এলিজাবেথের আত্মীয়া ছিলেন ; জনের জন্মের পূর্বে এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন এবং এলিজাবেথ তাহার ভবিষ্যৎ সন্তানের মহত্ত্বের বিষয় ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন। এই সমুদয়ই উত্তরকালের কল্পনা। তবে ইহা নিশ্চিত যে জন অল্প- বয়স হইতেই ধৰ্ম্ম-প্রবণ ও কঠোর সাধন-পরায়ণ ছিলেন। টাইবেরিয়সের রাজত্বকালে অনুমান আটাশ খৃষ্টাব্দে জুডিয়ার মরু-প্রান্তরে জর্ডন উপকূলে জন্ ধর্ম প্রচার করিতে
৫৭
দীক্ষা
আরম্ভ করেন। তখন তিনি উষ্ট্রলােমের বস্ত্র পরিধান
করিতেন, বনজাত খাদ্য আহার করিতেন, লােকদিগকে
অনুতাপ করিতে উপদেশ দিতেন। যাহারা তাহার উপদেশ
গ্রহণ করিতে প্রস্তুত হইত, তাহাদিগকে জর্ডনের জলে স্নান
করাইয়া দীক্ষা দিতেন। জুডিয়া, জেরুজালেম হইতে বহু
লোক আসিয়া তাঁহার নিকট দীক্ষা গ্রহণ করিত। অনেক
ফ্যারিসিও আসিয়াছিল ; তাহাদের অনেকেই বোধ হয়
মন্দ অভিপ্রায় বা কেবলমাত্র কৌতূহল পরবশ হইয়া
আসিত। জন্ তাহাদিগকে তীব্র ভাষায় তিরস্কার করিতেন ।
অল্পদিনের মধ্যেই জনের খ্যাতি চারিদিকে রাষ্ট্র হইয়া
পড়িল। গ্যালীলিতে ঈশা এই নূতন ধৰ্ম্ম-প্রচারকের কথা
শুনিয়া তাহাকে দেখিতে আসিলেন। জনের সহিত সাক্ষাতে
ঈশার জীবনে নবযুগ আনয়ন করিয়াছিল। ইহার পূর্বে
ঈশার মনে প্রচারব্রত গ্রহণের সঙ্কল্প আসিয়াছিল বলিয়া
মনে হয় না। কিন্তু কেবলমাত্র একান্তে ধর্মচিন্তা ও
ব্যাকুল-হৃদয়ে পথ অন্বেষণ করিতেছিলেন। সে সময়
ইহুদীগণ বিশ্বাস করি যে, জাতির উদ্ধারের জন্য ঈশ্বর
একজন মহাপুরুষকে প্রেরণ করিবেন। সমগ্র জাতি
ব্যাকুল-হৃদয়ে এই প্রেরিত মহাপুরুষ মেসায়ার প্রতীক্ষা
করিতেছিল। মেসায়ার আগমনে বিশ্বাস সর্বত্র ব্যাপ্ত
৫০
মহষ ঈশা
হইয়াছিল।
কেহ কেহ মনে করিতেন, ব্যাপ্টিষ্ট জন্ সেই
মেয়া।
কিন্তু তিনি নিজে আপনাকে মেসায়া মনে
করিতেন না; তবে বিশ্বাস করিতেন, অবিলম্বে মেসায়া
আসিবেন। তিনি বলিতেন, “আমার পরে এক মহত্তর
আসিতেছেন, আমি যাহার জুতার ফিতা খুলিবার যােগ্য নই।
আমি তােমাদিগকে জলের দ্বারা দীক্ষিত করিয়াছি, তিনি
তোমাদিগকে পবিত্র আত্মার দ্বারা দীক্ষিত করিবেন।”
(মার্ক ১, ৭-৮) বাস্তবিক জন্ ঈশাকে মেসায়া বলিয়া
ঘোষণা করিয়াছিলেন কি না, সে বিষয় সন্দেহের কারণ
তবে বাইবেলের নূতন চারিখানি জীবন-চরিতে
লিখিত আছে যে, তিনি ঈশাকে মেসায়া বলিয়া ঘােষণা
করিয়াছিলেন।
জন্ বলেন যে ঈশাকে দূর হইতে
দেখিয়াই ব্যাপ্টিষ্ট জন্ চিনিয়াছিলেন যে ইনিই মেসায়া,
পরদিন জন্ ঈশাকে তাহার নিকট আসিতে দেখিয়া
বলিলেন, “দেখ ঈশ্বরের মেষশাবক যিনি জগতের পাপ
হরণ করিবেন। ইনিই তিনি যাহার সম্বন্ধে আমি বলিয়াছি
যে আমার পরে একজন আসিবেন যিনি আমার উপরে
স্থান পাইবেন কেননা তিনি আমার পূৰ্বে ছিলেন।
কিন্তু আমি তাহাকে জানিতাম না। ইস্রায়েলদিগের
নিকটে তঁাহাকে ব্যক্ত করিবার জন্যই আমি আসিয়াছি
আছে ;
ছিলেন।
मौका
এবং জলের দ্বারা লােক সকলকে দীক্ষিত করিতেছি।”
(জ ১, ২৯-৩০-৩১) ম্যাথু ও লুকের বিবরণেও মনে
হয় ব্যাপ্টিষ্ট জন্য প্রথমেই ঈশাকে মেসায় বলিয়া চিনিয়া-
ছিলেন। কিন্তু মার্কে এ কথার উল্লেখ নাই। ম্যাথুর
মতে জন্ প্রথমে ঈশাকে দীক্ষিত করিতে অসম্মত হইয়া-
তিনি বলিয়াছিলেন তােমার নিকট আমারই
দীক্ষা গ্রহণ প্রয়ােজন, কিন্তু পরিশেষে ঈশার অনুরোধে
তাহাকে দীক্ষা দিয়াছিলেন। সম্ভবতঃ জনের ব্যবহারেই
ঈশার মনে তাঁহার মেসায়ত্বে বিশ্বাস প্রথম অঙ্কুরিত
হইয়াছিল। দীক্ষার পর হইতেই তাহার মনে প্রশ্ন আসিয়া
থাকিবে যে তিনিই কি মেসায়া ? বাইবেলে লিখিত আছে
দীক্ষার পর ঈশা জল হইতে উঠিব। মাত্রই আকাশ বিদীর্ণ
হইয়া গেল এবং পবিত্র আত্মা ঘুঘুর আকারে ঈশার
উপরে আসিয়া বসিল এবং একটি বাণী হইল, “তুমি
আমার প্রিয় পুত্র, আমি তােমাতে প্রীত।” (মার্ক ১-১১) ইহার
অর্থ অস্পষ্ট, বাণী কেবল ঈশা শুনিয়াছিলেন না উপস্থিত
সকলেই শুনিয়াছিলেন ? মার্ক ও লুকে লিখিত আছে,
তুমি আমার প্রিয় পুত্র ইহাতে মনে হয় বাণী ঈশার
জন্য আসিয়াছিল, কিন্তু ম্যাথুতে লিখিত আছে, ইনি
আমার প্রিয় পুত্র ; ইহাতে মনে হয় বাণী সকলের জন্যই
মহৰি উশা
হইয়াছিল। যাহা হউক সত্য সত্যই আকাশ বিদীর্ণ
হইয়াছিল ও একটি ঘুঘু বিদীর্ণ আকাশ হইতে ঈশার
উপরে বসিয়াছিল এবং আকাশে শব্দ হইয়াছিল ইহা
বিশ্বাস করা যায় না। * সম্ভবতঃ দীক্ষার পরে ঈশা তাহার
হৃদয়ে একটি জীবন্ত অনুপ্রাণনা অনুভব করিয়াছিলেন
এবং তাহাই উত্তরকালে তিনি শিষ্যগণের নিকট রূপকছলে
বর্ণনা করিয়াছিলেন। ইহা হইতেই বাইবেলে লিখিত
বিবরণের উদ্ভব।
* তাহা হইলে লােকে তখনই ঈশাকে মেসায়া-পে গ্রহণ করিত। কিন্তু দেখা যায়
উত্তরকালে বহুদিন পর্যন্ত লােকে ঈশার মেয়ত্বে বিশ্বাস করে নাই। এমন কি ব্যাপ্টিষ্ট
জনেরও এ বিষয়ে সন্দেহ ছিল।
তপস্যা ও ব্রত গ্রহণ
আকাশ বাণী শুনুন আর নাই শুনুন ঈশা তাঁহার
দীক্ষাকে অতিশয় গাম্ভীর্য্যের সহিত গ্রহণ করিয়াছিলেন।
দীক্ষার পরে জল হইতে উঠিয়াই তিনি মরু-প্রান্তরে
নির্জনে তপস্যার জন্য গমন করিয়াছিলেন। ইহার পূর্বে
তাঁহার এইরূপ সঙ্কল্প ছিল বলিয়া মনে হয় না, দীক্ষা
হইতেই এই সঙ্কল্প জাগিয়াছিল। নির্জনে সাধনার উদ্দেশ্য
নব অনুপ্রাণনা গভীর ভাবে পরীক্ষা; নির্জনে তিনি
কি ভাবে সাধনা করেন তাহার কোনও বিবরণ পাওয়া
যায় না। এই চল্লিশ দিনের মধ্যে একটি ঘটনার বর্ণনা
আছে ; বাইবেলে লিখিত আছে তিনি চল্লিশ দিন একান্তে
তপস্যা করিয়াছিলেন। সে প্রান্তরে লােক ছিল না,
খাদ্যদ্রব্য পাওয়া যাইত না ; চল্লিশ দিন অনাহারে থাকিয়া
তাঁহার খুব ক্ষুধা হইয়াছিল। ম্যাথু লিখিয়াছেন তখন
শয়তান আসিয়া তাহাকে প্রলােভন দেখাইয়া বলিল, “তুমি
যদি ঈশ্বরের সন্তান তাহা হইলে এই পাথরগুলিকে রুটী
হইতে আদেশ কর।” তদুত্তরে ঈশা বলিলেন, “মানুষ
কেবল রুটী খাইয়া বাঁচে না, ঈশ্বরের মুখ-নিসৃত বাণীতে
জীবন ধারণ করে।” তৎপরে শয়তান তাঁহাকে লইয়া
মহর্ষি ঈশা
জেরুজালেমের মন্দিরের উচ্চ চূড়ায় বসাইয়া বলিল, “তুমি
যদি সত্যই ঈশ্বরের পুত্র হও তাহা হইলে এখান হইতে
লাফাইয়া পড়, কারণ লিখিত আছে ঈশ্বর তােমাকে রক্ষা
করিবার জন্য স্বর্গের দূতদিগের উপর ভর দিবেন; এবং
তাহারা তােমাকে হাতে করিয়া বহন করিবে কেন না পাছে
তােমার পায়ে পাথরের আঘাত লাগে।” ইহার উত্তরে
ঈশা বলিলেন, “আবার ইহাও লিখিত আছে যে ঈশ্বরকে
পরীক্ষা করিবে না।” তৎপরে শয়তান ঈশাকে একটি
উচ্চ পৰ্বত-শৃঙ্গে লইয়া নীচের রাজ্য সকল দেখাইয়া
বলিল, “তুমি যদি আমার পূজা কর, এইসকল রাজ্য
আমি তােমায় দিব।” ঈশা তদুত্তরে সতেজে বলিলেন, .
“দূর হ শয়তান, কারণ শাস্ত্রে লিখিত আছে মানুষ ঈশ্বরের
পূজা এবং কেবল তাহারই সেবা করিবে।” তখন পরাস্ত
হইয়া শয়তান চলিয়া গেল এবং স্বর্গের দূতেরা আসিয়া
ঈশার পরিচর্যা করিতে লাগিল।
প্রলোভনের প্রায় এই প্রকার বর্ণনা আছে। মার্কে ইহার
উল্লেখ-মাত্র আছে। ঈশার প্রলােভন বুদ্ধের প্রলােভনের
অনুরূপ। প্রলোভনের বিবরণ হইতে বুঝিতে পারা যায়
যে এই সময় ঈশার মনে তিনি মেসায়া কি না এই
আন্দোলন চলিতেছিল। নির্জনে চিন্তার সময় তাঁহার
লুকেও ঈশার
তপস্যা ও ব্রত গ্রহণ
মনে হইয়া থাকিবে আমার ক্ষুধা হইয়াছে, খাদ্যের প্রয়ােজন,
আমি যদি সত্যই মেসায় হই তাহা হইলে আদেশ করিলেই
পাথরগুলি রুটী হইতে পারে। সম্ভবতঃ আরও মনে হইয়াছিল
যে আমি যদি মেসায়া হই, তাহা হইলে আমার কোনও বিপদ
হইতে পারে না। বিষয়ের প্রলোভনও মনে উদয় হইয়া
থাকিতে পারে; কিন্তু মহর্ষি ঈশা সবলে ঘৃণার সহিত এই
সকল নীচ চিন্তাকে মন হইতে অপসারিত করিয়া দিয়াছিলেন।
ঈশা সে সময় সাধারণ লােকের ন্যায় শয়তানে বিশ্বাস করিতেন,
প্রলোভনগুলিকে শয়তানের প্ররােচনা বলিয়া মনে করিয়া
থাকিবেন; এবং পরে কোনও সময় শিষ্যগণের নিকটে
তাহা বলিয়া থাকিবেন। সম্ভবতঃ এই সময় হইতেই
তিনি যে মেসায়া এই বিশ্বাস তাহার মনে স্পষ্ট আকার
ধারণ করিয়াছিল; কিন্তু এখনও তিনি নিঃসংশয় হইতে
পারেন নাই। নির্জন তপস্যার পর মহর্ষি ঈশা সম্পূর্ণভাবে
প্রচার-ব্ৰত গ্ৰহণ করিয়াছিলেন। ইহার পর তিনি আর
বিষয় কৰ্ম্ম করেন নাই। দীক্ষার পূর্ব পর্যন্ত তিনি
সূত্রধরের কাৰ্য্য করিতেন। ব্যাপ্টিষ্ট জনের নিকটে দীক্ষা
গ্রহণ করিতে আসিয়া তাঁহার দৃষ্টান্তে ধর্ম প্রচারের সঙ্কল্প
মনে জাগিয়া থাকিবে। তিনি যে আসিয়াই দীক্ষা গ্রহণ
করিয়াছিলেন তাহা মনে হয় না। সম্ভবতঃ কিছুদিন
৬৪ । মহর্ষি ঈশা জনের সঙ্গে বাস করিয়াছিলেন। তৎপরে দীক্ষানন্তর নির্জনে তপস্যা করিতে গিয়াছিলেন। সেখান হইতে ফিরিয়া শুনিলেন জন্ এন্টিপস কর্তৃক ধৃত হইয়া মেবােরের দুর্গে বন্দী আছেন। ঈশা তখন গ্যালীলি প্রত্যাবর্তন করিয়া জনের মত ধর্ম প্রচার করিতে আরম্ভ করিলেন। এই সময় ঈশার উপরে জনের প্রভাব সুস্পষ্ট। ঈশার প্রথম শিক্ষা জনেরই অনুরূপ। জন্ সমাগত লােকদিগকে অনুতাপ ও হৃদয় পরিবর্তন করিতে বলিতেন। “অনুতাপ কর, কারণ স্বর্গ- রাজ্য সন্নিকট।” (ম্যাথু ২-২) ঈশার প্রথম বাণী জুনের শিক্ষার প্রতিধ্বনি। গ্যালীলিতে ফিরিয়া ঈশা বলিলেন, “সময় পূর্ণ হইয়াছে, ঈশ্বরের রাজ্য নিকটে আসিয়াছে, তােমরা অনুতাপ কর এবং সুসংবাদে বিশ্বাস কর।” জন্ তাহার শিষদিগকে বলিতেন, “যাহার দুটি কোট আছে সে যাহার কিছু নাই তাহাকে একটি দিক ; যাহার ঘরে খাদ্য আছে সেও এইরূপ করুক।” তিনি কর-আদায়কারিগণকে বলিতেন “ন্যায্য প্রাপ্য অপেক্ষা অধিক আদায় করিও না” সৈন্যদিগকে বলিতেন, “কাহারও উপর উৎপীড়ন করিও না, কাহারও নামে মিথ্যা অভিযােগ করিও না, স্ব স্ব বেতনে সন্তুষ্ট থাকিও।” (লুক ৩-১১-১২-১৩) আমরা পরে দেখিব মহর্ষি ঈশা এই প্রকার ন্যায়, দয়া ও ত্যাগের উপদেশ দিয়াছেন।
গ্যালীলি প্রত্যাবর্তন ও কাৰ্যারম্ভ
ব্যাপ্টিষ্ট জনের কারাবরােধের পর ঈশা গ্যালীলিতে
প্রত্যাবর্তন করিয়া ধর্মপ্রচার আরম্ভ করিলেন। জুডিয়া
গমন, ব্যাপ্টিষ্ট জনের নিকট দীক্ষা এবং নির্জন তপস্যায়
লােকের চক্ষুতে তাহার প্রতিপত্তি বাড়িয়া গিয়া থাকিবে।
এখন হইতে তিনি প্রকাশ্যে এবং সাহসের সহিত প্রচার
করিতে আরম্ভ করিলেন এবং প্রথম হইতেই তিনি বিশেষ
কৃতকাৰ্যতা লাভ করিয়াছিলেন। ঈশার প্রচারের যথাযথ
বিবরণ পাওয়া যায় না। জনের মতে ক্যানা গ্রামে তাঁহার
কাৰ্য্য আরম্ভ হয়। জোসেফের মৃত্যুর পরে মেরী যদি
ক্যানায় আসিয়া বাস করিয়া থাকেন তাহা হইলে ইহা
সম্ভব হইতে পারে। জুডিয়া হইতে ফিরিয়া ঈশার মাতৃ-
গৃহে আগমন স্বাভাবিক। ক্যানা আগমনের পর তৃতীয়
দিনে সেখানে মেরীর কোনও বন্ধুর গৃহে একটি বিবাহ
ছিল; নিমন্ত্রিত হইয়া ঈশা তাঁহার মাতার সঙ্গে সেখানে
গিয়াছিলেন। ভােজনের সময় সুরা কম পড়িয়া গিয়াছিল,
মেরীর অনুরােধে ঈশা জল মদে পরিণত করেন; এই
ঈশার প্রথম আলৌকিক কাৰ্য, ইহা দেখিয়া লােকে
মহৰি ঈশা
ঈশাকে ধন্য ধন্য বলিতে লাগিল, এবং তাহার শিষ্যগণও
তাহার প্রতি বিশ্বাসী হইল। ইহার পর ঈশা মাতা,
ভ্রাত ও শিষ্যগণকে লইয়া ক্যাপাম গমন করেন; কিন্তু
সেখানে বেশীদিন ছিলেন না। ইহুদী পৰ্ব ‘প্যাস-ওভর’
সন্নিকট হওয়ায় ঈশা জেরুজালেম গমন করেন। ম্যাথু,
মার্ক ও লুকের গ্রন্থে এই সকল ব্যাপারের কোনও
উল্লেখ নাই। ম্যাথু ও লুকের বিবরণে মনে হয় মহর্ষি
ঈশা সর্বপ্রথম ন্যাজারেথে প্রচার আরম্ভ করেন। কিন্তু
সেখানকার লােকেরা তাঁহার প্রতি আস্থা স্থাপন করে
তাহারা লঘুতার সহিত বলিল, “এ ত সূত্রধর
জোসেফের ছেলে, এ আবার কি ধৰ্ম্ম শিক্ষা দিবে?” তাহারা
ঈশাকে পাহাড় হইতে ফেলিয়া দিয়া হত্যা করিতে চেষ্টা
করিয়াছিল। কিন্তু ঈশা, “সাধু নিজের দেশে সম্মান
পান না” এই প্রবাদ-বাক্য উল্লেখ করিয়া ন্যাজারেথ
পরিত্যাগ করিয়া ক্যাপানম গেলেন। ক্যাপার্টমে তিনি
অধিকতর কৃতকাৰ্য্যতা লাভ করিয়াছিলেন। এখন হইতে
ক্যাপানৰ্মই কেন্দ্র করিয়া ঈশা গ্যালীলি উপকূলে প্রচার
করিতে
লাগিলেন। ম্যাথু, মার্ক ও লুকে এই সময়
জেরুজালেম গমমের কোনও উল্লেখ নাই। গ্যালীলি
হ্রদের উপকূলে, নগরে, গ্রাম-সমূহে পর পর গমনাগমন
নাই।
গ্যালীলিপ্রত্যাবর্তন ওকাৰ্যার করিয়া লােকদিগকে ধৰ্ম্ম উপদেশ দিতেন। প্রধানতঃ তিনি ইহুদি ধর্মমন্দিরে গিয়া বিশ্রামের দিনে (শনিবারে) সমাগত লােকদিগকে উপদেশ দিতেন। প্রত্যেক গ্রামে ও নগরে ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ ধর্মমন্দির (Synagogue) থাকিত। বিশ্রামের দিনে লােকেরা ধর্মােপদেশ শুনিবার জন্য সেইখানে মিলিত হইতেন। যে কেহ ইচ্ছা করিতেন শাস্ত্র পাঠ ও ব্যাখ্যা করিতেন। এই প্রথানুসারে ঈশা ধর্ম- মন্দিরে শাস্ত্র পাঠ ও ব্যাখ্যা করিতেন। লােকে তাহার উপদেশ শুনিয়া চমৎকৃত হইতেন। তাহার আগ্রহের সহিত তাঁহার উপদেশ শ্রবণ করিত। সাধারণতঃ এইরূপ সভায় যে প্রকার উপদেশ দেওয়া হইত, লােকে ঈশার উপদেশ তাহা হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন প্রকারে অনুভব করিত। তিনি এক অপূর্ব তেজ ও দৃঢ়তার সহিত বলিতেন যেন এই সব তাঁহার জানা ও পরীক্ষিত সত্য। ধৰ্ম্ম উপদেশের সঙ্গে সঙ্গে তঁাহার রুগ্ন ও ভূতগ্রস্ত লােকদিগকে সুস্থ করার বিবরণও আছে। ক্যাপার্টমের ধৰ্ম্মমন্দিরে উপদেশ দেওয়ার সময় সেখানে একজন ভূত-গ্রস্ত লােক উপস্থিত ছিল। সে ঈশাকে দেখিয়া বলিল, “তুমি এখানে কেন আসিয়াছ, তুমি কি আমাদিগকে বিনাশ করিতে আসিয়াছ? আমাদিগকে পরিত্যাগ কর,
মহর্ষি ঈশ
আমি জানি তুমি কে! তুমি ঈশ্বরের সন্তান।” ঈশা
তাহাকে ভৎসনা করিয়া বলিলেন “চুপ কর এবং ইহার
শরীর হইতে বাহিরে যাও,” তখন ভূতটি তাহাকে যন্ত্রণা দিয়া
বাহির হইয়া আসিল। লােকে এই ব্যাপার দেখিয়া
বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিল “একি কাণ্ড, ভূতেরাও
ইহার কথা শুনিতেছে।” ক্রমে ঈশার খ্যাতি সর্বত্র
ব্যাপ্ত হইল ; দলে দলে লােক তাহার উপদেশ শুনিতে,
রােগমুক্ত হইতে, তঁাহার নিকট আসিতে লাগিল। ঈশা
এইরূপে স্থান হইতে স্থানান্তরে গমন করিয়া সমস্ত
গ্যালীলি উপকূলে ধর্মপ্রচার করিয়া বেড়াইয়াছিলেন।
গ্যালীলি হ্রদটি, উত্তর দক্ষিণে পনের ষােল মাইল ও পূর্ব
পশ্চিমে পাঁচ সাত মাইল চওড়া ছিল। ইহা হাইবিরিয়স
ও জেনেসেরিথ নামেও পরিচিত ছিল। ইহার তীরে
অনেক ছােট সহর ও গ্রাম ছিল, তাহাদের মধ্যে মেডেল,
বেথসাইড, ক্যাপানম, গ্যাডেরা, কেরোজিন প্রভৃতি বাইবেল
ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। অধিবাসীদের অবস্থা
বেশ সচ্ছল ;
লােকের অভাব না থাকায় এই অঞ্চলটি : ধর্ম প্রচারের
অনুকূল হইয়াছিল। আমরা কল্পনা চক্ষুতে দেখিতে পাই,
মহর্ষি ঈশা শিষ্যগণের সঙ্গে পদব্রজে গ্রাম হইতে
গ্রামান্তরে যাইতেছেন এবং গ্রামে গ্রামে অনুগত
গ্যালীলি প্রত্যাবর্তন ওকাৰ্যারম্ভ
গ্রাম-বাসীগণের গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করিয়া মন্দিরে
মন্দিরে ধর্মোপদেশ দিতেছেন। মহর্ষি ঈশার পাদস্পর্শে
এই স্থানসমূহ চিরস্মরণীয় হইয়াছে। বােধ হয় ঈশা
ক্যাপার্টমে অনেক সময় অতিবাহিত করিতেন; ক্যাপার্টমের
লােকেরা তঁাহার বিশেষ অনুগত ছিল। তিনিও
তাহাদিগকে বিশেষ স্নেহ করিতেন। এইজন্য সম্ভবতঃ
তাঁহার প্রিয় শিষ্য পিটরের বাড়ী এখানে ছিল।
মণ্ডলী গঠন গ্রামে গ্রামে পথে পথে ধর্মোপদেশ প্রদান করিয়াই ঈশার কাৰ্য শেষ হয় নাই। সেকালে প্যালেস্টাইনে এমন অনেক ধর্মোপদেষ্টা ছিলেন। কিন্তু ঈশা প্রথম হইতেই তাহার জীবনের কাৰ্য্য গুরুতরভাবে গ্রহণ করিয়া- ছিলেন বলিয়া মনে হয়। কেবল ধৰ্ম্মোপদেশ প্রদান করিয়াই তাহার ব্রত পূর্ণ হয় নাই। স্বর্গরাজ্য সংস্থাপন করাই ভঁহার জীবনের কাৰ্য্য। এইজন্য দেখা যায় ঈশা প্রথম হইতেই মণ্ডলী-গঠনের প্রতি মনােনিবেশ করিয়াছিলেন। তিনি জনসাধারণকে উপদেশ দিতেন ; কিন্তু সর্বদা কে কি ভাবে তাহার উপদেশ গ্রহণ করেন সেই দিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখিতেন। তাঁহার লোক চিনিবার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল ; শ্রোতৃগণের মধ্যে যাহাদিগের প্রকৃতিতে একটু বিশেষত্ব দেখিতেন তাহাদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ- ভাবে মিশিতেন। এইরূপে অল্পকালের মধ্যে মহর্ষি ঈশা একটি অন্তরঙ্গ ভক্ত-মণ্ডলী গঠন করিতে সমর্থ হইয়া- ছিলেন। এই মণ্ডলী ঈশার কাৰ্যের সফলতা ও স্থায়ীত্ত্বের কারণ। অল্পকালের মধ্যেই যখন বিরােধীগণের চক্রান্ত ও মণ্ডলী গঠন নিষ্ঠুরতায় ঈশা প্রাণ হারাইয়াছিলেন, ও তাহার ক্ষুদ্র মণ্ডলী, তাহার শিক্ষা, আদর্শ ও কাৰ্য্য স্বযত্নে রক্ষা করিয়াছিল এই মণ্ডলী গঠনে ঈশার ধর্ম প্রতিষ্ঠার বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায় ; ইহার জন্য তিনি অনেক চিন্তা ও চেষ্টা করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। প্রচার অপেক্ষা সংগঠন-কাৰ্যে তাহার অধিক দৃষ্টি ছিল। সংগ্রহ অপেক্ষা সংরক্ষণে ঈশা অধিক মনযােগ দিতেন। শিষ্য- গণকে তিনি, সমগ্র হৃদয়ের সঙ্গে ভালবাসিতেন, রক্তের সম্পর্কের ভাই-বােনদের চেয়ে শিষ্যগণকে অধিক ভাল- বাসিতেন। তিনি স্পষ্টই বলিতেন, “কে আমার মা? • কে আমার ভাই, কে আমার বােন ? শিষ্যগণের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করিয়া বলিতেন “যাহারা আমার পিতার কাৰ্য্য করে তাহারাই আমার মা, ভাই, বােন।” ঈশার শিষ্য-মণ্ডলীতে প্রবেশ করিবার বিশেষ কোনও পদ্ধতি বা নিয়ম ছিল বলিয়া মনে হয় না; ব্যাপ্টিষ্ট জন্য তাহার শিষদিগকে নদীতে স্নান করাইয়া দীক্ষা দিতেন। ঈশা এই প্রকার দীক্ষা-প্রণালী অবলম্বন করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় না। উত্তরকালে খৃষ্টীয়-মণ্ডলীতে দীক্ষা-গ্রহণের এইটি পদ্ধতি দাড়াইয়াছিল; কিন্তু ঈশার সময় এইরূপ কোনও পদ্ধতির চিহ্ন দেখা যায় না। যাহারা তাঁহার
৭২
মহর্ষি ঈশা
উপদেশে আকৃষ্ট হইয়া তাহার সঙ্গে মিলিত হইতেন এবং
তাহাকে ভালবাসিতেন তাহারাই শিষ্য বলিয়া পরিচিত
হইতেন। শিষ্যদের জীবন ও চরিত্রে উচ্চ আদর্শ আশা
করা হইত; তাঁহাদের জীবন ঈশার শিক্ষার অনুযায়ী
হইত। সকলেই এক প্রকারের ছিলেন না; শ্রদ্ধা ও
অনুরাগ অনুযায়ী জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে শিষ্যগণের
মধ্যে শ্রেণী বিভাগ হইয়াছিল। প্রথম প্রথম সকলেই
তাঁহার নিকট আসিতেন, সঙ্গে থাকিতেন এবং তাহাকে
ভালবাসিতেন। কিছুদিন পরে সাধারণ শিষ্যগণের মধ্য
হইতে ঈশা বাছিয়া বাছিয়া একটি অন্তরঙ্গ মণ্ডলী গঠন
করিয়াছিলেন। এই মণ্ডলীতে বারজন লােক ছিলেন।
জীবনচরিত লেখকেরা তাহাদের নামের তালিকা দিয়াছেন।
সামান্য পার্থক্য থাকিলেও মূলতঃ তালিকাগুলির মধ্যে
ঐক্য আছে। ইঁহাদের অনেকেরই সম্বন্ধে বিশেষ কিছু
জানা যায় না। পরবর্তী সময় তাহারা “প্রেরিত” আখ্যা
পাইয়াছিলেন। কিন্তু ঈশার সময় এই নাম প্রচলিত
হইয়াছিল বলিয়া মনে হয় না। সকলেই সাধারণভাবে
শিষ্য নামে অভিহিত হইতেন। প্রেরিতগণকে বিশেষভাবে
নির্দেশ করিতে হইলে “বার জন” বলিয়া উল্লেখ করা
হইত। ইহাদের অনেকেরই বিশেষ কোনও পরিচয়
মণ্ডলী গঠন পাওয়া যায় না। সকল বিবরণেই সাইমন পিটারকে প্রধান স্থান দেওয়া হইয়াছে। তিনি ধীবর ছিলেন, মৎস্য ধরিয়া জীবিকা-নিৰ্বাহ করিতেন। সেখানে ধীবর ব্যবসায় বিশেষ নিণীয় ছিল না; গ্যালীলি অঞ্চলে অনেকেই এই ব্যবসায় করিতেন। সাইমনের পিতার নাম জোনা। তাহার ভ্রাতা এণ্ড ও ঈশার অন্তরঙ্গ বার জন শিষ্যের মধ্যে ছিলেন, কিন্তু তাঁহার কাৰ্যকলাপের বিশেষ কোনও বিবরণ পাওয়া যায় না। কোন সময় সাইমন ও এণ্ড ঈশার সঙ্গে মিলিত হন সে বিষয় জীবনচরিত- লেখকগণের মধ্যে মতভেদ দৃষ্ট হয়। জনের মতে সাইমন ও এণ্ড প্রথমে ব্যাপ্টিষ্ট জনের শিষ্য ছিলেন সেখানে ঈশার সঙ্গে তাহাদের সাক্ষাৎ হয়। ব্যাপ্টিষ্ট জনের নিকটে ঈশার মহত্ত্বের কথা শুনিয়া এণ্ড তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হন, এবং তাঁহাকে মেসায়া বলিয়া চিনিতে পারেন। তখন তিনি স্বীয় ভ্রাতা সাইমনকে ডাকিয়া এই সংবাদ এণ্ড র নিকটে সংবাদ পাইয়া সাইমন ঈশার কাছে যান। ঈশা তাঁহাকে বলিলেন, “তুমি জোনার পুত্র সাইমন, পরে তুমি প্রস্তর নামে অভিহিত হইবে।” এই বিবরণে মনে হয় এখন হইতেই সাইমন ও এণ্ড ঈশার সঙ্গে যুক্ত হন। জনের মতে ঈশার অন্তরঙ্গ বার জনের দেন।
মহৰি ঈশা
মধ্যে আরও কেহ কেহ ব্যাপ্টিষ্ট জনের শিষ্য ছিলেন,
এবং সেই সময়ই ঈশার সঙ্গে যুক্ত হন। জুডিয়া হইতে
গ্যালীলি প্রত্যাবর্তনকালে ঈশা ফিলিপকে বলিলেন, “আমার
অনুসরণ কর।” ফিলিপ ন্যাথানিয়েলকে বলিল, “আমরা
মুসা এবং পূর্ব আচাৰ্যগণ কথিত মেসায়াকে পাইয়াছি।
তিনি ন্যাজারেথ-বাসী জোসেফের পুত্র ঈশা।” ন্যাথানিয়েল
প্রথমে একথা বিশ্বাস করেন নাই; কিন্তু পরে ঈশার
নিকটে আসিয়া এবং তাহার কথা শুনিয়া বিশ্বাস করেন।
ম্যাধুর মতে গ্যালীলি প্রত্যাবর্তনের পর সাইমন ও এণ্ডর
সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ হয়। একদিন হ্রদের তীর দিয়া
যাইবার সময় ঈশা দেখিলেন সাইমন ও এণ্ড মাছ,
ধরিতেছেন। ঈশা তাহাদিগকে বলিলেন, “আমার সঙ্গে
এস, আমি তােমাদিগকে মানুষ ধরা জেলে করিব।” তাহারা
তৎক্ষণাৎ জাল ফেলিয়া রাখিয়া ঈশার অনুসরণ করিল।
লুকের বিবরণ কিঞ্চিৎ অন্য প্রকার। একদিন গ্যালীলিতে
একখানি নৌকায় বসিয়া কিছু ধর্মোপদেশ দিবার পর
নৌকার অধিকারী সাইমনকে বলিলেন, “নৌকা ছাড়িয়া
দাও।” নৌকা যখন গভীর জলে আসিল, তখন তাহাকে
বলিলেন, “জাল ফেল।” সাইমন বলিল, “আমরা সারা
রাত্রি জাল বাহিয়াছি কিন্তু একটি মাছও পাই নাই।
৭৫
মণ্ডলী গঠন
যাহা হউক আমরা আপনার আদেশ অনুসারে আবার
জাল ফেলিতেছি।” এবারে জালে এত মাছ পড়িল যে
জাল ছিড়িয়া যাইবার উপক্রম হইল। তখন সাইমন
তাহার অংশীদার, জেম্স ও জনকে তাহাদের নৌকা
লইয়া আসিতে ঈঙ্গিত করিল। সকলে মিলিয়া জাল
তুলিল ; এত মাছ পাইল যে দুইখানি নৌকাই ভরিয়া
গেল। সাইমন তখন ঈশার পদপ্রান্তে পড়িয়া বলিল,
“আমি পাপ, প্রভু আপনি আমার নিকট হইতে যান।”
এই অদ্ভুত ব্যাপার দেখিয়া সাইমন ও তাহার সঙ্গীর।
বিস্মিত ও ভীত হইয়াছিল। ঈশা সাইমনকে আশা দিয়া
বলিলেন, “ভয় করিও না, এখন হইতে তােমরা মানুষ
ধরিবে।” তীরে আসিয়া তাহারা সকলে ঈশার অনুসরণ
করিল। ম্যাথুর মতে জন ও জেম্স কিঞ্চিৎ পরে ঈশার
সহিত যুক্ত হইয়াছিল। তাহারা নৌকায় বসিয়া তাহাদের
পিতার সঙ্গে জাল মেরামত করিতেছিল। তাহাদিগের নিকট
দিয়া যাইবার সময় ঈশা তাহাদিগকে বলিলেন, “আমার সঙ্গে
এস,” তাহারা অমনি পিতাকে পরিত্যাগ করিয়া ঈশার
সঙ্গে চলিল। ঈশা কিরূপে তাহাদিগকে চিনিতে পারিলেন
তাহা বুঝিতে পারা যায় না। পূর্ব পরিচয়ের কোনও
উল্লেখ নাই; কোনও কোনও মতে জন ও জেম্স ঈশার
بب
মহর্ষি ঈশা
মাতৃ-স্বসপুত্র। তাহাদের পিতার নাম জেবেডী। আত্মীয়
বলিয়া ঈশা তাহাদিগকে শিষ্য করেন নাই। সাইমন
এগু, জেম্স ও জনের শিষ্যত্বগ্রহণে দেখা যায় যে তাহাদের
আনুগত্যই তাহাদের যোগ্যতার
যোগ্যতার মূল-ভীত্তি। দেখা
যায় সকলেই ঈশা ডাকিবামাত্র আর কিছু চিন্তা না
করিয়াই তাহার অনুসরণ করিয়াছিলেন। মার্কের বিবরণ
ম্যাথুর অনুরূপ। ম্যাথু সম্বন্ধেও এই কথা সত্য। ম্যাথু
কর আদায় করিতেন, সুতরাং লেখাপড়া জানিতেন।
একদিন তাহার কার্যালয়ে বসিয়া কর আদায় করিতেছিলেন,
ঈশা তাহার নিকট দিয়া যাইবার সময় তাঁহাকে দেখিয়া
বলিলেন, “আমার অনুসরণ কর।” ম্যাথু তৎক্ষণাৎ উঠিয়া
তাঁহার সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন।
অন্য শিষ্যগণ সম্বন্ধে বেশী কিছু জানা যায় না। তাহার
নিকট থাকিবার জন্য ও ধর্ম প্রচার করিবার জন্য ঈশা
এই বার জনকে মনােনীত করিয়াছিলেন।
ক্রমে তাহাদের
মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ স্থাপিত হইয়াছিল। উত্তরকালে
সকলে একত্র আহারাদি করিতেন ও সকলে আয়ে ব্যয়ে
এক হইয়াছিলেন।
এই বার জন ব্যতীত ঈশার কয়েক জন অন্তরঙ্গ
নারী শিষ্যা ছিলেন। তাঁহাৱা ঈশার সহিত গভীর শ্রদ্ধা
૧૧
মণ্ডলী গঠন
ও প্রীতির যােগে আবদ্ধ ছিলেন। অনেক সময় তঁাহারা
ঈশার নিকটে থাকিতেন। দেখিতে পাওয়া যায়
কালভ্যারিতে মৃত্যু সময় নারী শিষাগণ শেষ পর্যন্ত ঈশার
সঙ্গে ছিলেন। নারী শিষ্যাগণের মধ্যে মেরী ম্যাকডােনাল্ড
বিশেষ প্রসিদ্ধ। ঈশা তাঁহাকে পাপ-পথ হইতে উদ্ধার
করিয়াছিলেন।
বেথানি গ্রামের দুই ভগিনী মেরী
ও মার্থা ঈশার বিশেষ অনুগত ছিলেন।
জেম্স ও
জনের মাত্র সেলােমের নামও নারী শিষ্যাগণের মধ্যে
দৃষ্ট হয়।
উত্তরকালে শিষ্যগণের মধ্য হইতে আরও সত্তর
• জনকে বাছিয়া ঈশা ধর্ম প্রচার করিতে পাঠাইয়াছিলেন।
মনােনীত শিষ্যগণ ঈশার ধর্মপ্রচারে বিশেষ কৃতকাৰ্য
হইয়াছিলেন। ঈশার জীবদ্দশায় শিষ্যদল খুব বড়
হইয়াছিল বলিয়া মনে হয় না। সংখ্যায় বৃহৎ না হইলেও
ইহারাই ভবিষ্যতে খৃষ্টীয়-মণ্ডলীর ভিত্তি ছিলেন।
শৈল-বেদীর উপদেশ
জগতে ধৰ্মচাৰ্যগণের মধ্যে ঈশার উন্নত স্থান
প্রধানতঃ তাহার উচ্চ শিক্ষা ও অসাধারণ আত্মবলিদানের
উপর প্রতিষ্ঠিত। ঈশা পৃথিবীতে অধিকদিন জীরিত
ছিলেন না। তাহার কাৰ্যকাল তিন বৎসরের অধিক
নহে। কিন্তু এই অল্পকালের মধ্যে তিনি যে উপদেশাবলী
রাখিয়া গিয়াছেন তাহা জগতের ধর্ম-সাহিত্যে, অতুলনীয়।
ঈশার মুখের বাণী বলিয়া বাইবেলে যে উপদেশগুলি
লিপিবদ্ধ আছে কেবল তাহারই জন্য মহর্ষি ঈশা জগতে
চির-পূজ্য হইয়া থাকিবেন। ঈশার উপদেশাবলী অধিক
নহে। কিন্তু তাঁহার প্রত্যেকটি বাণী বহুমূল্য রত্নের
সমান। মানব-জাতি চিরকাল সযত্নে তাহা রক্ষা করিবে।
শৈল-বেদীর উপদেশ নামে প্রসিদ্ধ ম্যাথু, পঞ্চম, ষষ্ঠ
ও সপ্তম অধ্যায়ে বিবৃত উপদেশ অমূল্য রত্ন ভাণ্ডার।
ম্যাথুর বিবরণ অনুসারে একদিন মহর্ষি ঈশা একটি
পৰ্বতের উপরে বসিয়া তাহার শিষ্য ও সমাগত লােক
সকলকে এই উপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন। একদিনে
একাসনে বসিয়া তিনি যে এই অদ্ভুত উপদেশাবলী
প্রদান করিয়াছিলেন তাহা মনে হয় না। অন্যান্য গ্রন্থে
শৈল-বেদীর উপদেশ ইহার অনেকাংশ থাকিলেও সমগ্র উপদেশগুলি একস্থানে লিপিবদ্ধ হয় নাই। ম্যাথু তাহার গ্রন্থে এক এক প্রকারের কথা একত্ৰ সন্নিবিষ্ট করিয়াছেন। উপদেশ- গুলি একত্র সন্নিবিষ্ট হওয়ায় অধিকতর প্রাণস্পর্শী হইয়াছে। উপক্রমণিকাটিও মনােজ্ঞ হইয়াছে। ম্যাথু লিখিয়াছেন মহর্ষি ঈশা জনতা দেখিয়া একটি পর্বতের উপরে গেলেন। তাঁহার শিষ্যগণ নিকটে আসিলে, তিনি বলিতে আরম্ভ করিলেন, “দীনাত্মারা ধন্য, কারণ স্বর্গ- রাজ্য তাহাদিগের জন্য। শােকাৰ্ত্তেরা ধন্য, কারণ তাহারা সান্ত্বনা পাইবেন। নরাে ধন্য, কারণ তাহাৱা পৃথিবীর অধিকার লাভ করিবে। ধর্মের জন্য ক্ষুধিত ও তৃষিতেরা ধন্য, কারণ তাহাদের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হইবে। দয়াদ্রেরা ধন্য, কারণ তাহারা দয়া পাইবে। শুদ্ধ চিত্তের। ধন্য, কারণ তাহারা ব্ৰহ্ম-দর্শন লাভ করিবে। শান্তি সংস্থাপকেরা ধন্য, কারণ তাহারা ঈশ্বরের সন্তান নামে অভিহিত হইবে। ধর্মের জন্য উৎপীড়িতেরা ধন্য, কারণ স্বর্গরাজ্য তাহাদেরই।” এই অমূল্য বাণীর প্রত্যেকটা কথা গভীর অর্থপূর্ণ। * এত সংক্ষেপে এমন উপদেশ * ইহাতে ঈশা মানব জাতির প্রচলিত বিশ্বাস সম্পূর্ণ পরিবর্তন করিয়া দিয়াছেন। সাধারণে মনে করেন দুঃখী, দরিদ্র, শশাকার্ত ও উৎপীড়িতেরা কুপাত্র কিন্তু ঈশা তাহা- দিগের জন্য বর্গরাজ্যে উচ্চ স্থান নির্দেশ করিয়াছেন। .
৮০ মহর্ষি ইশা আর কোথাও লিপিবদ্ধ আছে কি না জানি না। ইহার পরে মহর্ষি আপনার অনুবর্তিগণকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, যখন লােকে তােমাদিগকে আমার জন্য মিথ্যা অপবাদ দিবে, নিৰ্যাতন করিবে এবং তােমাদের বিরুদ্ধে নানা প্রকার কটুক্তি করিবে, “তােমরা আপনাদিগকে ধন্য মনে করিও। আনন্দ কর এবং সুখী হও কারণ স্বর্গে তােমাদের বহু পুরস্কার লাভ হইবে। কারণ ইহারা পূর্ববর্তী আচাৰ্য- গণকেও এইরূপ নিৰ্যাতন করিয়াছিল।” ইহাতে মনে হয় ঈশা তাহার তীক্ষ্ণ-দৃষ্টিতে তাহার অনুবর্তিগণের নির্যাতন সুস্পষ্ট দেখিতে পাইয়াছিলেন। মহর্ষি ঈশা তাহার শিষ্য- গণের জীবনের উচ্চ লক্ষ্য সুন্দররূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়াছিলেন। তিনি পরেই বলিতেছেন, “তােমরা পৃথিবীর লবণ স্বরূপ, কিন্তু লবণ যদি লবণাক্ততা হারায় তাহা হইলে কিসের দ্বারা জগৎ স্বাদু হইবে। তখন ইহা আর কোনও কাৰ্য্যের উপযুক্ত থাকে না। লােকে তখন ইহা ফেলিয়া দেয় এবং সকলে পায়ে দলিয়া যায়। তােমরা জগতের আলো। পাহাড়ের উপরিস্থিত নগর লুকান যায় না। লােকে বাতি জালাইয়া ধামার নীচে রাখে না, কিন্তু বাতি-দানির উপরে রাখে ; এবং ইহা গৃহের মধ্যে সকলকে আলাে দেয়। তোমাদের আলোক এমন ভাবে জ্বলুক যে সকলে তোমাদের ভাল শৈল-বেদীর উপদেশ ৪১ কাজ দেখিতে পাইবে এবং তােমার স্বর্গ পিতাকে ধন্য ধন্য করিবে। তােমরা মনে করিও না যে আমি শাস্ত্রের বিধি বা সাধু-বাক্য নষ্ট করিতে আসিয়াছি। আমি ধ্বংস করিতে আসি নাই কিন্তু পূর্ণ করিতে আসিয়াছি। আমি,সত্যই বলিতেছি যে স্বর্গ ও পৃথিবী যতদিন থাকিবে, ইহার একটি কণামাত্রও নষ্ট হইবে না; কিন্তু সমস্তই পূর্ণ হইবে । সুতরাং যে কেহ এই সকল আদেশের ক্ষুদ্র একটী ভঙ্গ করিবে, এবং মানুষকে এইরূপ করিতে শিক্ষা দিবে, স্বর্গরাজ্যে তাহার স্থান সকলের নীচে কিন্তু যে আদেশ পালন করিবে এবং সেইরূপ করিতে অপরকে শিক্ষা দিবে, স্বর্গ-রাজ্যে সেই বড় বলিয়া গণ্য আমি তোমাদিগকে বলিতেছি তােমাদের ধার্মিকতা যদি পুরােহিত ও ফ্যারাসিদের ধাৰ্মিকতাকে অতিক্রম না করে তাহা হইলে তােমরা কোনমতেই স্বর্গ- রাজ্যে প্রবেশ করিতে পারিবে না। তােমরা শুনিয়াছি, প্রাচীনকালে বলা হইয়াছে হত্যা করিও না। যে হত্যা করিবে বিচারের দিনে তাহার ভয় আছে। কিন্তু আমি তােমাদিগকে বলিতেছি, যে কেহ বিনা কারণে তাহার ভায়ের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করিবে, বিচারে তাহার বিপদ হইবে এবং যে কেহ তাহার ভাইকে বলিবে পাপী, তাহারই হইবে।
২
সময়
মহৰি ঈশা
বিচারকের নিকট হইতে ভয় আছে। এবং যে কেহ
বলিবে মূঢ়, তাহারই নরকাগ্নির ভয় আছে। অতএব তুমি
যদি তােমার পূজার উপহার বেদীর নিকট আনিয়া থাক,
এবং সেখানে মনে পড়ে যে তােমার বিরুদ্ধে তােমার
ভায়ের কোনও অভিযোগ আছে, তাহা হইলে সেখানে
তােমার উপহার রাখিয়া তােমার ভাইয়ের সঙ্গে প্রথমে
সন্ধি-স্থাপন কর, তৎপরে আসিয়া পূজা দিও।
থাকিতে তােমার বিরােধীর সঙ্গে সন্ধি-স্থাপন কর, নতুবা
কখন বিরােধী তােমাকে বিচারকের হাতে সমর্পণ করিবে
এবং বিচারক পুলিশের হাতে দিবে এবং সে তােমাকে
কারাগারে ফেলিয়া দিবে। আমি তােমাকে সত্যই বলিতেছি,
পর্যন্ত না দিয়া সেখান হইতে বাহির
হইতে পারিবে না।
তােমরা শুনিয়াছ, প্রাচীনের বলিয়াছিলেন, ব্যভিচার
করিও না, কিন্তু আমি তােমাদিগকে বলিতেছি, যে
কেহ কোনও রমনীর প্রতি কাম-পূৰ্ণ দৃষ্টি করিবে সে
পূৰ্বেই অন্তরে তাহার প্রতি
ব্যভিচার করিয়াছে এবং
তােমার দক্ষিণ চক্ষু যদি অন্যায় করে তাহা হইলে তাহা
উড়াইয়া ফেল, কারণ সমস্ত শরীর নরকে যাওয়া অপেক্ষা,
একটি অঙ্গ নষ্ট হওয়া, লাভজনক এবং যদি তোমার
শেষ কপর্দক
;
শৈল-বেদীর উপদেশ
দক্ষিণ হস্ত অনিষ্ট করে তাহাকে কাটিয়া ফেল
সমস্ত শরীর নরকে পড়া অপেক্ষা একটি অঙ্গ নষ্ট হওয়া
লাভজনক।
উক্ত হইয়াছে যে, যে কেহ তাহার স্ত্রী
পরিত্যাগ করিবে, সে তাহাকে ত্যাগপত্র দিবে, কিন্তু
আমি বলিতেছি, একমাত্র ব্যভিচারের অপরাধ ব্যতীত
যে কেহ স্ত্রী পরিত্যাগ করিবে তাহাকে ব্যভিচারের পথে
লইয়া যায় এবং সেই পরিত্যক্ত রমনীকে যে বিবাহ করে
সেও ব্যভিচারপাপে লিপ্ত হয়। আরও তোমরা শুনিয়াছ,
প্রাচীনকালের অচার্য্যের বলিয়াছেন, শপথ ভঙ্গ করি
যে শপথ করিবে তাহা পালন করিবে, কিন্তু আমি
তােমাদের বলিতেছি, শপথই করিবে না; স্বর্গের নামে
; কারণ তাহা ঈশ্বরের সিংহাসন, পৃথিবীর নামেও না,
কারণ ইহা তাহার পাদপীট; জেরুজালেমের নামেও নয়,
কারণ ইহা মহান রাজার নগর। তোমার অাপনার মস্তকের
দোহাই দিয়াও শপথ করিবে না, কারণ একগাছি চুল
সাদা বা কাল করিতে পার না। তুমি ‘’ ও ‘না’র
অধিক বলিও না, তাহার বেশী যাহা তাহা মন্দ। তােমরা
শুনিয়াছ, বলা হইয়াছে, চক্ষুর পরিবর্তে চক্ষু, দন্তের
পরিবর্তে দন্ত লইতে পার; কিন্তু আমি বলিতেছি,
অত্যাচারের রােধ করিও না; কিন্তু যদি কেহ তােমার
না।
৮ঃ মহৰি ঈশা দক্ষিণ গণ্ডে চপেটাঘাত করে, অপরটিও পাতিয়া দাও। যদি কেহ তােমাকে এক মাইল যাইতে বাধ্য করে, তাহার সঙ্গে তুমি দুই মাইল যাইও । যে তােমার নিকট চায় তাহাকে দাও, কেহ ঋণ চাহিলে মুখ ফিরাইও না। তােমরা শুনিয়াছ, উক্ত হইয়াছে, তুমি তােমার প্রতিবেশীকে ভালবাসিবে এবং শত্রুকে ঘৃণা করিবে; কিন্তু আমি তােমাদের বলিতেছি, শত্ৰুদিগকে ভালবাস, যাহারা তােমাকে অভিসম্পাৎ করে তাহাদিগকে আশীর্বাদ করিও; যাহারা -তােমাদিগকে দ্বেষ করে তাহাদিগের উপকার করিও এবং যাহারা তােমার সঙ্গে শত্রুতা ও তােমার উপর নিৰ্যাতন করে, তাহাদের জন্য প্রার্থনা কর। যাহাতে তােমরা তােমাদের স্বর্গস্থ পিতার উপযুক্ত সন্তান হইতে পার ; কারণ তিনি তঁাহার সূৰ্য্যকে সমভাবে সৎ ও অসৎ লোকের উপরে উদিত করেন এবং ন্যায়কারী ও অন্যায়কারী উভয়ের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তােমরা যদি যাহারা তােমাদিগকে ভালবাসে কেবল তাহাদিগকেই ভালবাস, তাহা হইলে তােমরা আর কি পুরস্কার পাইবে? ধৰ্ম্ম- হীনেরাও কি তাহা করে না? এবং তােমরা যদি তােমাদের ভাইকেই অভিবাদন কর, তাহা হইলে অন্যের অপেক্ষা কি করিলে ? ধর্মহীনেরাও তেমন করে। তােমরা
শৈল-বেদীর উপদেশ
তােমাদের স্বর্গস্থ পিতার ন্যায় পূর্ণ হও। এখানে আমরা
সুস্পষ্ট দেখিতে পাইতেছি ঈশার শিক্ষা কত উচ্চ।
প্রাচীন ইহুদী-ধৰ্ম্ম উচ্চ নীতির জন্য প্রসিদ্ধ। কিন্তু ঈশার
শিক্ষা ইহুদী-নীতি অতিক্রম করিয়া অনেক উর্ধে গিয়াছে।
ঈশা, ধর্ম ও নৈতিক জগতে মহা পরিবর্তন আনয়ন
করিয়াছেন।
ইহার পরে ঈশা বলিতেছেন, সাবধান, লােককে
দেখাইবার জন্য তাহাদের সমক্ষে তােমাদের দান করিও
না। অন্যথা তােমাদের স্বর্গস্থ পিতার নিকট পুরস্কার
পাইবে না।
অতএব তোমরা যখন দান করিবে অগ্রে
ভেরী বাজাইও না; যেমন কপটাচারীর প্রশংসা পাইবার
জন্য ধৰ্ম্ম-মন্দিরে এবং পথে করে। আমি সত্যই বলিতেছি
তাহারা তাহাদের পুরস্কার পাইবে। তোমরা যখন দান
করিবে, তােমাদের দক্ষিণ হস্ত যাহা করে, বাম হস্ত তাহা
যেন জানিতে না পারে। যাহাতে তােমাদের দান
গোপনে সম্পন্ন হয় এবং তােমাদের পিতা যিনি গােপনে
দেখেন স্বয়ং তােমাদিগকে প্রকাশ্যে পুরস্কার দিবেন।
এবং যখন তােমরা প্রার্থনা করিবে তােমরা কপটাচারীদের
মত হইও না। কারণ তাহারা মন্দিরে এবং পথে
দাঁড়াইয়া প্রার্থনা করিতে ভালবাসে, যাহাতে লােকে
মহর্ষি ঈশা
দেখিতে পায়। সত্যই বলিতেছি তাহারা তাহাদের
পুরস্কার পাইবে। কিন্তু তুমি যখন প্রার্থনা করিবে
তােমার নির্জন গৃহে প্রবেশ করিও; এবং দ্বার বন্ধ
করিয়া তােমার নির্জন পিতার নিকট প্রার্থনা করিও,
তিনি গােপনে দেখেন এবং প্রকাশ্যে পুরস্কার দেন।
তােমরা যখন প্রার্থনা করিবে বার বার বৃথা কথা বলিও
; যেমন ধৰ্ম্ম-হীনেরা করে। তাহারা মনে করে,
অনেক কথা বলিলেই ঈশ্বর শুনিবেন। অতএব তােমরা
তাহাদের মত হইও না ;
মত হইও না; কারণ তােমাদের পিতা
চাহিবার পূর্বেই জানেন তােমাদের কোন জিনিষের
প্রয়ােজন আছে। সুতরাং তােমরা এইরূপে প্রার্থনা
করিও; “হে আমাদের স্বর্গ-পিতা, তােমার নাম ধন্য
তােমার রাজ্য আসুক, স্বর্গে যেমন তেমনি
পৃথিবীতেও তােমার ইচ্ছা পূর্ণ হউক। আজ আমাদের
দৈনিক আহাৰ্য্য দাও। আমাদের অপরাধ ক্ষমা কর,
যে পরিমাণে আমরা অপরাধীকে ক্ষমা করি।
অামা-
দিগকে প্রলােভনে লইয়া যাইও না; কিন্তু আমাদিগকে
পাপ হইতে উদ্ধার কর ; চিরকালের জন্য তােমারই
রাজ্য, তােমারই শক্তি ও মহিমা ; এমেন। কারণ
তোমরা যদি মানুষের অপরাধ ক্ষমা কর তােমাদের
হউক।
৮৭ করিবে, শৈল-বেদীর উপদেশ স্বর্গস্থ-পিতাও তােমাদের অপরাধ ক্ষমা করিবেন। কিন্তু তােমরা যদি মানুষকে ক্ষমা না কর, তিনিও তােমাদিগকে ক্ষমা করিবেন না। আরও তােমরা যখন উপবাস করিবে, কপটাচারীদের মত ম্লান-মুখ হইও না; কারণ তাহারা তাহাদের মুখ মলিন করে যাহাতে লোকে বুঝিতে পারে যে তাহারা উপবাস করিয়াছে। আমি তােমাদিগকে সত্যই বলিতেছি, তাহারা তাহাদের পুরস্কার পাইবে কিন্তু তুমি যখন উপবাস তােমার মুখ ধৌত ও তৈলাক্ত করিও। যাহাতে লােকে বুঝিতে না পারে যে তুমি উপবাস উপবাস করিয়াছ, কিন্তু তােমার তাদৃশ্য-পিতা বুঝিতে পারিবেন; এবং তিনি গোপনে দেখিয়া প্রকাশ্যে পুরস্কার দিবেন। নিজের জন্য পৃথিবীতে ধন রত্ন সঞ্চয় করিয়া রাখিও না, এখানে কীট এবং মরিচায় তাহা নষ্ট করে ; এবং চোরে ভাঙ্গিয়া অপহরণ কিন্তু তােমাদের জন্য স্বর্গে ধন রত্ন সঞ্চয় কর, সেখানে কীটে বা মরিচায় নষ্ট করে না; এবং চোরেও অপহরণ করে কারণ যেখানে তােমার ধন তোমার মনও সেইখানে দেহের আলােক চক্ষু, সেই জন্য তােমার চক্ষু যদি এক-দৃষ্টি হয়, সমস্ত শরীর আলােক পাইবে। কিন্তু তােমার চক্ষু যদি দোষ-যুক্ত হয়, তােমার সমস্ত শরীর করে। । থাকিবে।
মহর্ষি ইশা অন্ধকারময় হইবে। তােমার আলোেকই যদি অন্ধকার হয়, সে অন্ধকার কত গভীর। কোন লােকই দুইজন প্রভুর সেবা করিতে পারে না; কারণ সে হয় একজনকে ঘৃণা করিবে এবং অপরকে ভালবাসিবে, অথবা সে একজনের অনুগত হইবে এবং অপরকে ঘৃণা করিবে। তােমরা একসঙ্গে ঈশ্বর ও কুবেরের সেবা করিতে পারে না। সেই জন্য আমি তােমাদিগকে বলিতেছি, জীবিকার জন্য চিন্তিত হইও না, কি খাইবে, কি পান করিবে ; দেহের জন্যও নয়, কি পরিধান করিবে ভাবিও না। জীবন কি দেহের অপেক্ষা এবং দেহ পরিচ্ছদ অপেক্ষা অধিক নয় ? আকাশের পক্ষীগণকে দেখ, তাহারা বপন করে না, কৰ্ত্তন করে না, গােলায় সঞ্চয় করিয়াও রাখে না; তথাপি তোমাদের স্বর্গস্থ পিতা তাহাদিগকে আহার দেন। তােমরা কি তাহাদের চেয়ে অনেক ভাল নও? তােমাদের মধ্য কে চিন্তা করিয়া তাহার দেহ এক অঙ্গুলী বড় করিতে পার ? পরিধেয়ের জন্যই বা কেন চিন্তা কর ? মাঠের পদ্ম- গুলির বিষয় বিবেচনা করিয়া দেখ, কেমন তাহার বাড়ে ; তাহারা শ্রম করে না, সূতাও কাটে না।
শৈল-বেদীর উপদেশ
তথাপি আমি তােমাদিগকে বলিতেছি সলােমন রাজা
তঁাহার সকল ঐশ্বর্যের মধ্যে ইহাদের একটির মত সজ্জিত
ছিলেন না।
অতএব ঈশ্বর যদি মাঠের ঘাসকে এমন করিয়া সজ্জিত
করেন যাহা আজ আছে, কাল আগুনে ফেলিয়া দেওয়া
হইবে, ও অবিশ্বাসীরা তাহা হইলে তিনি কি তােমাদিগকে
অধিকতর যত্নে সজ্জিত করিবেন না?
অতএব ,কি খাইবে, কি পান করিবে, কি পরিধান
করিবে তাহা ভাবিও না।
কেন না ধর্মহীনেরাই এই সকলের জন্য ব্যস্ত হয়।
তােমাদের স্বর্গস্থ পিতা জানেন যে তােমাদের এই সকল
জিনিসের প্রয়ােজন আছে।
তােমরা সর্বাগ্রে ঈশ্বরের রাজ্য এবং তাহার ধর্ম চাও,
এই সব জিনিস পরে দেওয়া হইবে।
কল্যকার জন্য চিন্তা করিও না, কল্যকার ভাবনা
কল্য হইবে; আজকার ভাবনাই আজকার জন্য যথেষ্ট।
বিচার করিও না, যাহাতে তুমি বিচারিত না হও;
কারণ যে বিচারে তুমি বিচার করিবে সেই বিচারে তুমিও
বিচারিত হইবে এবং যে মাপে তুমি মাপিবে সেই মাপে
তােমাকে পুনরায় মাপিয়া দেওয়া হইবে।
মহর্ষি ঈশা
কেন তুমি তােমার ভাইয়ের চোখে যে কূটা আছে
তাহা দেখিতেছ, কিন্তু তােমার নিজের চোখে যে কড়ী-কাঠ
অাছে সেই বিষয় চিন্তা করিতেছ না ?
কেমন করিয়া তােমার ভাইকে বলিবে যে তােমার
চোখের কূট৷ বাহির করিতে দাও; যখন তােমার নিজের
চোখে কড়ী-কাঠ রহিয়াছে ?
কপটাচারী আগে তােমার নিজের চোখের কড়ি-কাঠ
বাহির করিয়া ফেল ; তখন তােমার ভায়ের চোখের কূটা
বাহির করিতে স্পষ্ট দেখিতে পাইবে ।
যাহা পবিত্র তাহা কুকুরকে দিও না; অথবা
শূকরের সম্মুখে মুক্তা ছড়াইও না, পাছে তাহারা সে-
গুলি পদদলিত করে এবং ফিরিয়া তােমাকে বিদীর্ণ
করে।
কর,
চাও, তােমাকে দেওয়া হবে । অন্বেষণ
পাইবে ; আঘাত কর, দ্বার উন্মুক্ত হইবে।
কেননা যে কেহ চায়, সে পায় ; এবং যে অন্বেষণ
করে সে দেখিতে পায় ; এবং যে আঘাত করে, তাহার
নিকট দ্বার উন্মুক্ত হইবে।
তােমাদের মধ্যে এমন লোক কে আছে যে তাহার
সন্তান রুটি চাহিলে তাহাকে পাথর দেয় ?
শৈল-বেদীর উপদেশ অথবা সে যদি মাছ চায় তাহাকে সাপ দিবে ? তােমরা যদি মন্দ হইয়াও তােমাদের সন্তানকে ভাল জিনিস দিতে জান, তাহা হইলে তােমাদের স্বর্গ- পিতা যাহারা তাহার কাছে চায়, তাহাদিগকে আরও ভাল জিনিস দিবেন। এখানে আমরা দেখিতেছি মহর্ষি ঈশার প্রার্থনায় কি দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ; এবং কেমন সরল যুক্তির দ্বারা তাহা সমর্থন করিতেছেন। তিনি আরও বলিতেছেন, “লােকে তােমাদের প্রতি যেরূপ ব্যবহার করিতে চায়, তােমরাও তাহাদের প্রতি সেইরূপ ব্যবহার করিবে, কারণ ইহাই শাস্ত্র এবং সাধু-বাক্য।” সঙ্কীর্ণ দ্বার দিয়া প্রবেশ কর, কারণ বিনাশের দ্বার প্রশস্ত এবং পথ বিস্তৃত ও অনেকে সেই দিক দিয়া যায়। কিন্তু জীবনের পথ সঙ্কীর্ণ এবং দ্বার অপ্রশস্ত, এবং অল্প লােকই সে পথ দেখিতে পায়। কপট-সাধু হইতে সাবধান থাক, তাহারা মেষশাবকের রূপ ধরিয়া আসে, কিন্তু অন্তরে হিংস্র ব্যাঘ্র । তােমরা ফল দ্বারা তাহাদিগকে জানিতে পারিবে। লোকে কাটা গাছ হইতে কি আঙুর সংগ্রহ করে, না আগাছা হইতে ডুমুর পায় ?
মহর্ষি ঈশা
সেইরূপ প্রত্যেক ভাল গাছে ভাল ফল দেয় এবং
মন্দ গাছে মন্দ ফল দেয়।
ভাল গাছে কখনও মন্দ ফল হয় না, অথবা মন্দ
গাছে ভাল ফল হয় না।
যে গাছে ভাল ফল হয় না, তাহা কাটিয়া আগুণে
ফেলিয়া দেওয়া হয়।
অতএব ফল দেখিয়া জানিতে পারিবে। যাহারা
আমাকে ‘প্রভু’, ‘প্রভু, বলিবে তাহারা সকলেই স্বর্গরাজ্যে
প্রবেশ করিতে পারিবে না; কিন্তু আমার স্বর্গস্থ-পিতার
ইচ্ছা যে পালন করিবে সেই স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করিবে।
সেই দিনে অনেকে আমাকে বলিবে, প্রভু, প্রভু,
আমরা তােমার নামে কি উপদেশ দিই নাই, এবং
তােমার নামে ভূত ছাড়াই নাই; এবং তােমার নামে
অনেক আশ্চৰ্য কাজ করি নাই ?
আমি তখন তাহাদিগকে বলিব, আমি তােমাদিগকে
কখনও জানি না; রে পাপচারীরা, আমার নিকট হইতে
দূরে যাও।
অতএব যে আমার এই সকল কথা শােনে এবং
তদনুসারে কাৰ্য করে,
করে, আমি তাহাকে সেই বুদ্ধিমান
লােকের সহিত তুলনা করি, যে পাথরের উপর বাড়ী
শৈলংবেদীর উপদেশ
নির্মাণ করে।
যখন বৃষ্টি পড়ে, বন্যা আসে, এবং
বাতাস বহে ও বাড়ীর গাত্রে আঘাত করে; কিন্তু তাহাতে
বাড়ী পড়ে না, কারণ উহা পাথরের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
যে কেহ এই সকল কথা শুনে, কিন্তু তদনুসারে
কার্ফ করে না, সে সেই নির্বোধ লােকের মত যে
বালির উপর গৃহ নির্মাণ করে; এবং বৃষ্টি নামে, বন্যা
আসে, বাড়ীতে আঘাত করে ; এবং উহা পড়িয়া যায়,
এবং সেই পতুন অতি ভয়ঙ্কর।
মহর্ষি ঈশা যখন এই সকল বাক্য শেষ করিলেন,
লােকে তাহার উপদেশে বিস্মিত হইল।
শুধু যে সেই অশিক্ষিত ইহুদীগণ বিস্মিত হইয়াছিল
তাহা নহে। যুগের পর যুগ, বিভিন্ন দেশে নানা জাতি
ঈশার এই উপদেশে বিস্মিত হইয়াছে ও হইবে।
মানব-জাতি সাগ্রহে ঈশার এই উপদেশাবলী বক্ষে ধারণ
করিয়া রাখিবে। প্রলয়ের দিনে ধ্বংসের দূত আসিয়া যদি
বলে আমি সব ধ্বংস করিব, কেবল একটি জিনিস
রাখিব ; আমি নিঃসঙ্কোচে বলিব, এই
উপদেশাবলী
রক্ষা কর।
" গল্পচ্ছলে উপদেশ গম্ভীরভাবে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বসকল বিবৃত করা ভিন্ন ঈশা লােকশিক্ষার অপর একটি প্রণালী অবলম্বন করিয়াছিলেন ; তাহা গল্পচ্ছলে উপদেশ। তিনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আখ্যায়িকা বলিয়া বক্তব্য বিষয় লােকের মনে মুদ্রিত করিতে প্রয়াস পাইতেন। গল্পগুলি সরল অথচ গভীর অর্থ-পূর্ণ। গল্পে বক্তব্য বিষয় সহজে বােধগম্য ও গভীররূপে মনে মুদ্রিত থাকিবে বলিয়া দৃষ্টান্ত দ্বারা উপদেশ দেওয়া উদ্দেশ্য বলিয়া মনে হয়; কিন্তু সকলে যাহাতে বুঝিতে না পারে বাইবেলে গল্পের এই উদ্দেশ্য বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। ঈশার শিষ্যগণ জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন কেন তিনি গল্পচ্ছলে উপদেশগুলি দেন। তদুত্তরে ঈশা বলিয়াছিলেন, স্বর্গ- রাজ্যের রহস্য তাহাদের জন্য, সাধারণ লােকের জন্য নয় (ম্যাথু ১৩-১১) আমি গল্পের ছলে উপদেশ দিতেছি যাহাতে তাহারা দেখিয়া ও দেখিতে না পায়, শুনিয়াও বুঝিতে না পারে। ঈশা এই কথা বলিয়াছেন বলিয়া মনে হয় না, কারণ তিনি যখন উপদেশ দিতেছেন
গল্পচ্ছলে উপদেশ
নিশ্চয়ই ইচ্ছা করিতেন সকলেই যেন বুঝিতে পারে।
গল্পগুলি সহজবােধ্য হইলেও শিষ্যগণ তাহার গূঢ় অর্থ
বুঝিতে পারেন নাই। ঈশ একান্তে তাহাদিগকে সেগুলি
বুঝাইয়া দিয়াছিলেন। বাইবেলে অনেকগুলি গল্প লিখিত
হইয়াছে। এখানে আমরা কতকগুলি উদ্ধত করিলাম।
একদিন ঈশা সমুদ্র তীরে একখানি নৌকায় বসিয়া
শিষ্য-মণ্ডলী ও সমবেত লােকদিগকে সম্বােধন করিয়া
বলিলেন।
“একজন কৃষক মাঠে বীজ বপন করিতে
গিয়াছিল। সে যখন বীজ ছড়াইতেছিল তাহার কতকগুলি
পথপার্শ্বে পড়িল, আকাশের পাখীরা তাহা খুটিয়া খাইয়া
ফেলিল। আর কতকগুলি প্রস্তরময় ভূমিতে পড়িল, সেগুলি
হইতে যদিও শীঘ্র অঙ্কুর বাহির হইল, মৃত্তিকার গভীরতা
থাকাতে তাহা রৌদ্রে শীঘ্রই শুকাইয়া গেল। অপর
কতকগুলি কাটা গাছের মধ্যে পড়িয়াছিল, সেগুলি কাঁটা
গাছের চাপে নষ্ট হইয়া গেল ; কিন্তু যেগুলি ভাল জমিতে
পড়িল তাহা হইতে, ষাট, সত্তর, আশি, একশত গুণ
শস্য জন্মিল।” গল্প শেষ করিয়া ঈশা বলিলেন, “যাহাদের
কাণ আছে তাহারা শুনুক।” পরে ঈশা তাঁহার শিষ্যগণকে
গল্পের গূঢ় অর্থ বুঝাইয়া দিয়াছিলেন। তিনি বলিলেন,
“যখন কেহ সৎ উপদেশ শােনে কিন্তু হৃদয়ে তাহা স্থান
মহর্ষি ঈশা দেয় না তাহাকে পথপাশ্বে পতিত বীজের সহিত তাহার তুলনা করিয়াছি। শয়তান আসিয়া তাহার হৃদয় হইতে উপদেশগুলি উঠাইয়া লয় । প্রস্তরময় ভূমি অগভীর হৃদয়ের মানুষ, তাহারা উপদেশ শুনিয়া আনন্দে উৎফুল্ল হয়। কিন্তু সংগ্রাম বা নির্যাতন আসিলেই ভয়ে সব ভুলিয়া যায়। আর কাটা গাছপূর্ণ জমি তাহারা যাহাদের হৃদয় বিষয় ও সংসার চিন্তায় পরিপূর্ণ, তাহাদের হৃদয়ে অঙ্কুরিত সাধু চিন্তাগুলি বিষয় ও অর্থ চিন্তার চাপে মরিয়া যায়; কিন্তু ভাল জমি তাহারা যাহারা ধৰ্ম্ম উপদেশ শােনে এবং হৃদয়ে গ্রহণ করে, তাহারা তিরিশ, চল্লিশ, একশত গুণ ফল প্রসব করে।” এই গল্প হইতে মানব- চরিত্রে ঈশার সূক্ষম জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। ঈশা আর একটি গল্প বলিয়াছিলেন তাহাও কৌতূহল- উদ্দীপক। এটিও বীজ বপন বিষয়ে। ঈশা বলিয়া- ছিলেন, স্বর্গরাজ্য একজন লােকের মত যে তাহার জমিতে ভাল বীজ বপন করিয়াছিল। কিন্তু রাত্রিতে যখন লােকে ঘুমাইতেছিল তখন একজন দুষ্ট লােক আসিয়া সেই জমিতে আগাছার বীজ বপন করিয়া গেল। যখন অঙ্কুর বাহির হইল ক্ষেত্ৰস্বামীর ভূতত্যর দেখিল শস্যের সঙ্গে আগাছা জন্মিয়াছে। তখন তাহারা গল্পচ্ছলে উপদেশ প্রভুকে গিয়া বলিল, “আপনি ত শস্যের বীজ বপন করিয়াছিলেন, তাহা হইলে আগাছা জন্মাইল কোথা হইতে?” ক্ষেত্ৰস্বামী বলিলেন, “কোনও দুষ্ট লােকে তাহা বপন করিয়া থাকিবে।” ভৃত্যগণ জিজ্ঞাসা করিল, “এখন কি আমরা আগাছাগুলি উপড়াইয়া ফেলিব ?” ক্ষেত্রস্বামী বলিলেন, “না” কারণ আগাছা উপড়াইতে গিয়া ভাল শস্য উপড়াইতে পার। শস্য পাকিতে দাও তখন তাহা সংগ্রহ করিয়া গােলাবাড়ী যাইবে এবং আগাছা- গুলি আগুন দিয়া পােড়াইবে। গৃহে প্রত্যাবৃত হইয়া. ঈশ। শিষ্যদিগকে গল্পের নিম্নলিখিত ব্যাখ্যা দিয়াছিলেন । ক্ষেত্র স্বামী মানব পুত্র, ক্ষেত্র পৃথিবী, ভাল বীজ সাধু লােকেরা, মন্দ বীজ দুষ্ট লােকেরা, দুষ্ট বীজ বপনকারী শয়তান শস্য সংগ্রহের সময় পৃথিবীর অবসান এবং শস্য সংগ্রাহকেরা দেবদূত। ভাল শস্য যেমন স্বযত্নে সংগ্রহ করা হয় এবং আগাছা পােড়াইয়া ফেলা হয়, তেমনি পৃথিবী অবসানে ঈশ্বর ঈশ্বর হার তাঁহার দূতদিগকে প্রেরণ করিবেন। তাহারা সাধু লােকদিগকে রক্ষা করিবে এবং দুষ্ট লােক- দিগকে বিনাশ করিবে। এই গল্পের উদ্দেশ্য বােধ হয় জগতে সাধু ও দুবৃত্ত লােকদিগকে একত্র অবস্থানের কারণ নির্দেশ করা। ক্ষেত্রে যেমন পাশাপাশি শস্য ও আগাছা ৭ s মহাৰি ঈশা জন্মাইতে দেওয়া হইয়াছিল, ঈশ্বর তেমনি সাধু ও দুষ্ট লােকদিগকে একত্র থাকিতে দেন। কিন্তু পরিণামে পাপীর শাস্তি ও সাধুর পুরস্কার নিশ্চিত। আর একটি গল্প এতদনুরূপ; ইহাতেও সাধু ও দুবৃত্ত একত্র অবস্থানের কথা বলা হইয়াছে। এখানে স্বর্গ- রাজ্যকে একটি বৃহৎ জালের সহিত তুলনা করা হইয়াছে। ঈশা বলিয়াছিলেন স্বর্গরাজ্য একখানি বড় জালের মতন যাহা নদীতে ফেলা হইয়াছিল। জালে ভাল মন্দ অনেক রকম মাছ পড়িয়াছিল। জেলেরা সব টানিয়া ডাঙ্গায় তুলিল ; তাহার পরে ভাল মাছগুলি বাছিয়া পাত্রে রাখিল এবং মন্দগুলি ফেলিয়া দিল। পৃথিবীর অবসানে এইরূপ হইবে। ঈশ্বর তাঁহার দূতদিগকে আদেশ করিবেন, সাধু লােকদিগকে দুবৃর্ত হইতে বাছিয়া লও, এবং দুবৃত্তদিগকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ কর। তখন বিলাপ ও হাহাকার ধ্বনি উঠিবে। ঈশার অনেকগুলি গল্প স্বর্গরাজ্যের বিষয়ে। ইহার দ্বারা তিনি স্বর্গরাজ্য বলিতে কি বুঝিতেন তাহা বিবৃত করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। একটিতে তিনি স্বর্গরাজ্যকে দম্বলের সঙ্গে তুলনা করিয়াছিলেন। ঈশা বলিয়াছেন, স্বর্গরাজ্য দম্বলের মতন ; যাহার এক বিন্দু কোনও
গল্পচ্ছলে উপদেশ
গৃহিণী এক হড়ী দুধের সঙ্গে মিশাইয়া দেন; ক্রমে
সমস্ত দুধ দই হইয়া যায়।
আর একটি গল্পে স্বর্গরাজ্যকে একখানি জমির সহিত
তুলনা করা হইয়াছে ; যাহাতে অনেক ধন-রত্ন প্রােথিত
ছিল। ঈশা বলিয়াছেন এক জন লােক সন্ধান পাইল
যে একখানি জমিতে অনেক ধন-রত্ন পােতা আছে।
তথন বাড়ীতে আসিয়া যথা সৰ্বস্ব বিক্রয় করিয়া সেই
জমি ক্রয় করুিল। লােকে বলিল কি নির্বুদ্ধিতা ;
লােকটা কি পাগল হইয়াছে ? কিন্তু সে জানে তাহার .
অনেক লাভ হইল।
আর একটি গল্প ঠিক ইহার মত ; তাহাতে ঈশা
বলিয়াছেন, এক জন বণিক মুক্তা ক্রয় করিতে বাহির
হইয়া দেখিল এক জন জেলের নিকট একখানি বহুমূল্য
মুক্তা আছে। কিন্তু সে তাহার যে মূল্য চাহিল বণিকের
তত অর্থ নাই। তখন সে বাড়ী গিয়া তাহার যাহা কিছু
ছিল সমুদয় বিক্রয় করিয়া মুক্তাটি ক্রয় করিল।
“ম্যাথু আঠার চ্যাপ্টার”; “ম্যাথু পঁচিশ”; “ক
১৪-১৫, ১৮-৩”; “মার্ক ১২-১”।
বাধ্যতা ও বিশ্বস্ততা বিষয়ে ঈশার অনেকগুলি গল্প
আছে।
এক জন লােকের দুইটি পুত্র ছিল। লোকটি
১০০
মহর্ষি ঈশা
একদিন এক জন পুত্রকে বলিল, “পুত্র আমার দ্রাক্ষা-
ক্ষেত্রে গিয়া কাজ কর”। সে বলিল, “আমি পারিব না”।
কিন্তু পরে অনুতপ্ত হইয়া দ্রাক্ষাক্ষেত্রে গিয়া কাজ করিতে
লাগিল। লােকটি সেইরূপ অপর পুত্রকেও বলিল, “পুত্র
অামার দ্রাক্ষাক্ষেত্রে গিয়া কাজ কর।” সে বলিল,
যাইতেছি! কিন্তু গেল না। ঈশা জিজ্ঞাসা করিলেন
দুজনের মধ্যে কে বাধ্য। তাহারা বলিল প্রথমটি, ঈশা
বলিলেন অনেক পাপী ও অধম তােমাদের পূর্বে স্বর্গরাজ্যে
প্রবেশ করিবে।
আর একটি গল্প অনেকটা এতদনুরূপ।
একজন গৃহস্থ একখানি দ্রাক্ষাক্ষেত্র প্রস্তুত করাইয়া তাহার
মধ্যে সুরা চুয়াইবার কল ও গৃহ অট্টালিকা নির্মাণ করাইল।
কিছুদিন পরে সে একজন কৃষককে ভাড়া দিয়া বিদেশে
গেল। শস্য সংগ্রহের সময় গৃহস্থ আপনার প্রাপ্য অংশের
জন্য কয়েকজন ভৃত্যকে পাঠাইয়া দিল ; কিন্তু কৃষক
তাহাদের একজনকে প্রহার করিল, আর একজনকে
হত্যা করিল এবং অপরকে তাড়াইয়া দিল। গৃহস্থ সংবাদ
পাইয়া অধিক সংখ্যক ভৃত্য পাঠাইল। . কিন্তু কৃষক
তাহাদের প্রতিও সেইরূপ ব্যবহার করিল, তখন গৃহস্থ
আপনার পুত্রকে পাঠাইল। সে মনে করিয়াছিল যে,
কৃষক পুত্রকে সম্মান করিবে। কিন্তু কৃষক ভাবিল, এই
১০১ গল্পচ্ছলে উপদেশ পুত্র সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ইহাকে হত্যা করিলে সম্পত্তি তাহারই হইবে। তদনুসারে সে গৃহস্থের পুত্রটিকেও বধ করিল। ঈশা জিজ্ঞাসা করিলেন, দ্রাক্ষাক্ষেত্ৰ-স্বামী আসিলে কি করিবে? লােকে উত্তর করিল, দুষ্ট কৃষককে বধ করিবে এবং তাহার জমি অন্য কৃষককে দিবে, যে নিয়মিতরূপে তাহার প্রাপ্য দিবে। এই গল্পে ঈশা ইহুদী ও ফ্যারিসি এবং সম্ভবতঃ নিজের হত্যার প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছেন। বাইবেলে আর কয়েকটি অতি উপাদেয় গল্প আছে ; তাহাতে ঈশ্বরের দয়া এবং ক্ষমার কথা অতি সুন্দররূপে বর্ণিত আছে। ঈশা একদিন বলিয়াছিলেন, একজন পালকের একশতটি ভেড়া ছিল ; ঘটনাক্রমে তাহার একটি হারাইয়া যায়। তখন মেষপালক নিরানব্বইটি ভেড়া ফেলিয়া, হারান ভেড়াটির অনুসন্ধানে বাহির হইল। বহু অন্বেষণের পর যখন ভেড়াটি পাওয়া গেল তখন সে তাহাকে কঁাধে করিয়া আনন্দে বাড়ী ফিরিল এবং প্রতিবেশী দিগকে বলিল, “তােমরা আমার সঙ্গে আনন্দ কর, কারণ আমি আমার হারান ভেড়া পাইয়াছি”। এই গল্প বলিয়া ঈশা কহিলেন, এইরূপ স্বর্গে একজন পাপীর হৃদয় পরিবর্তনে আনন্দ হয়। ঈশ্বর নিরানব্বই জন সাধু অপেক্ষা মেষ- ১০২ মহর্ষি ঈশা একজন পাপীর অনুতাপে অধিক আনন্দ করেন। ঠিক এইরূপ আর একটি গল্প ঈশা বলিয়াছেন। একটি বৃদ্ধার দশটি মুদ্রা ছিল ; হঠাৎ তাহার একটি হাত হইতে পড়িয়া হারাইয়া যায়। তখন বৃদ্ধা প্রদীপ জ্বালিয়া সমুদয় ঘর তন্ন তন্ন করিয়া মুদ্রাটিকে খুঁজিতে লাগিল এবং যখন সে হারান মুদ্রাটি পাইল, বন্ধুগণকে লইয়া আনন্দ করিতে লাগিল। পাপীর অনুতাপ ও ক্ষমা বিষয়ে ঈশার, উচ্চতম শিক্ষা আর একটি গল্পে প্রদত্ত হইয়াছে। ঈশা একদিন শিষ্য- গণকে বলিয়াছিলেন, একজন গৃহস্থের দুইটি পুত্র ছিল। একদিন কনিষ্ঠ পুত্রটি পিতাকে বলিল, আমার প্রাপ্য বিষয় আমাকে ভাগ করিয়া দিন। পিতা তাহাই করিলেন। কিছুদিন পরে পুত্রটি আপনার অংশের সম্পত্তি বিক্রয় করিয়া দূর দেশে চলিয়া গেল। সেখানে অল্পদিনের মধ্যেই আমোদ ও বিলাসে সমুদয় অর্থ উড়াইয়া দিল। ইতিমধ্যে সে দেশে দারুণ দুর্ভিক্ষ হইল। তখন সে অগত্যা পরের চাকরী লইতে বাধ্য হইল। একজন শূকর ব্যবসায়ী তাহাকে শূকর চরাইতে নিযুক্ত করিল; কিন্তু যে বেতন পাইত তাহাতে তাহার উদর পূরিত না। তখন সে । শূকরের খাদ্য খাইয়া ক্ষুধা নিবৃত্তি করিল। একদিন
গল্পচ্ছলে উপদেশ
নিজের অবস্থা চিন্তা করিতে করিতে তাহার মনে হইল,
আমার পিতার কত ভৃত্য আছে, আর আমি এখানে
খাইতে পাইতেছি না। আমি আমার পিতার নিকটে
যাই এবং তাঁহার নিকট নিজের অপরাধ স্বীকার করিয়া
ক্ষমঃ প্রার্থনা করি। আমি তাহাকে বলিব, পিতা আমি
আপনার নিকট অপরাধ করিয়াছি, আমি আর আপনার
সন্তান নামের যোগ্য নই; আমাকে বেতনভােগী ভৃত্য
করিয়া রাখুন। এই ভাবিয়া সে উঠিল এবং পিতার
গৃহাভিমুখে গমন করিল। পিতা অনেক দূর হইতে
তাহাকে দেখিয়া ছুটিয়া আসিলেন এবং তাহার গলা ধরিয়া
চুম্বন করিতে লাগিলেন। সে বলিল, “পিতা আমি আপনার
সন্তান হইবার যোগ্য নই, আমি আপনার নিকট অপরাধ
করিয়াছি, আমাকে আপনার বেতন-ভােগী ভৃত্য করিয়া
রাখুন।” গৃহস্থ তাহার ভৃত্যদের আদেশ করিলেন, আমার
ঘরে সর্বাপেক্ষা যে ভাল পােষাক আছে তাহা আনিয়া
ইহাকে পরাও। ইহার পায়ে জুতা, হাতে অঙ্গুরীয় পরও
এবং একটি, হৃষ্টপুষ্ট গাে-বৎস কাটিয়া ভোজের আয়ােজন
ইহাকে লইয়া সকলে আনন্দ করিব, কারণ এ
হারাইয়া গিয়াছিল, পুনরায় পাইয়াছি ; মরিয়াছিল,
পুনজ্জীবিত হইয়াছে। ইতিমধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র মাঠ হইতে
১০৪ মহর্ষি ঈশা ফিরিয়া দেখিল বাড়ীতে খুব ধুম-ধামের সহিত ভোজের আয়ােজন হইতেছে। সে একজন ভৃত্যকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল; ব্যাপারটা কি ? সে বলিল, তােমার ভাই ফিরিয়াছে; এবং তাহার সম্বর্ধনার জন্য তোমার পিতা মােটা বাছুর কাটিয়া ভােজের আয়ােজন করিতে বলিয়াছেন। ইহা শুনিয়া সে রাগ করিয়া বাড়ীর ভিতরে প্রবেশ করিল না। তখন তাহার পিতা আসিয়া তাহাকে ভিতরে যাইবার জন্য অনুরােধ করিলেন। তদুত্তরে সে বলিল, “দেখুন, এই এত বৎসর আমি আপনার সেবা করিতেছি, কখনও আপনার আজ্ঞা অমান্য করি নাই”। কিন্তু বন্ধু বান্ধবদের লইয়া আনন্দ করিবার জন্য আপনি আমাকে একটি ছাগল ছানা দেন নাই। কিন্তু যেই আপনার কনিষ্ঠ পুত্র যে বিদেশে অসৎ সঙ্গে সমস্ত সম্পত্তি নষ্ট করিয়া ফিরিয়া আসিল আপনি তাহার জন্য স্থূলকায় গাে-বৎস দিলেন। পিতা তখন বলিলেন, বৎস, তুমি ত নিয়তই আমার কাছে আছ, এবং আমার যাহা কিছু আছে সব তােমার, কিন্তু তোমার এই ভাই মরিয়াছিল এখন পুনর্জীবিত হইয়াছে, তাহাকে হারাইয়াছিলাম ফিরিয়া পাইয়াছি। তাহার জন্য আনন্দ করা অন্যায় নয়। এই গল্পটি যেমন গভীর তেমনি স্বাভাবিক, জগতে ধৰ্ম্ম-
গল্পচ্ছলে উপদেশ
১০
সাহিত্যে ইহা অতুলনীয়। ধৰ্ম্ম-রাজ্যে আর কোথাও এত
গভীর সত্য আবিষ্কৃত হইয়াছে বলিয়া মনে হয় না।
ইহা ঈশার শিক্ষার মধ্যে শ্রেষ্ঠতম।: এখানে তিনি এই
গভীর তত্ত্ব আবিষ্কার করিয়াছেন যে ঈশ্বর আপনা হইতেই
ক্ষমা করেন, তিনি কেবল কৰ্ম্মফল প্রদান করেন না।
কেবল ন্যায় বিচার করেন না, তিনি পাপীকে দয়া করেন,
ভালবাসেন, দুবৃর্ত সন্তানের পিতার মত ক্ষমা করিয়া গৃহে
স্থান দেন।
আর একটি গল্পে স্বর্গরাজ্যের আগমনের প্রতীক্ষায়
প্রস্তুত হইয়া বসিয়া থাকিবার আবশ্যকতার কথা
বলিয়াছেন। দশটি অবিবাহিত কন্যা ছিল, তাহাদের মধ্যে
পাঁচ জন বুদ্ধিমতী অপর পাঁচ জন নির্বোধ। নির্বোধ
কন্যারা সঙ্গে প্রদীপ লইয়াছিল, কিন্তু তৈল লয় নাই।
বুদ্ধিমতীরা প্রদীপের সঙ্গে তৈলও লইয়াছিল।
আসিতে বিলম্ব দেখিয়া সকলেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল,
মধ্য রাত্রে চীৎকার-ধ্বনি শোনা গেল, “বর আসিয়াছে, বর
আসিয়াছে”। সেই শব্দে সকলেই জাগিল, কিন্তু ততক্ষণে
নির্বোধ কন্যাগণের প্রদীপের তৈল ফুরাইয়া গিয়াছিল ।
তাহারা বুদ্ধিমতী কন্যাগণকে বলিল, আমাদিকে কিছু
তৈল দাও। তাহারা বলিল, • না; পারিব না, কারণ
লও।
মহর্ষি কশা,
আমাদের তৈল কম পড়িবে। তােমরা
তােমরা তৈল কিনিয়া
তখন নির্বোধ কন্যারা অগত্যা তৈল কিনিতে
গেল। ইতিমধ্যে বর আসিয়া অবশিষ্ট কন্যাগণকে
লইয়া গৃহাভ্যন্তরে গমন করিল এবং দ্বার বন্ধ করিল।
কিয়ৎক্ষণ পরে নির্বোধ কন্যারা ফিরিয়া দ্বারে আঘাত
করিয়া বলিল, “প্রভু, দ্বার খুলুন,” কিন্তু বর ভিতর হইতে
উত্তর করিল, “আমি তােমাদের চিনি না”। ঈশা এই
গল্প বলিয়া বলিলেন, তােমরা প্রতীক্ষা করিয়া থাক, কারণ
তােমরা জান না কখন মানব পুত্র আসিবেন।
বিশ্বস্তা বিষয়ে আর একটি গল্প এইরূপ :--
একজন লােক বিদেশ যাত্রাকালে তাহার ভৃত্যদের
ডাকিয়া তাহাদের স্ব স্ব শক্তি অনুসারে কিছু কিছু অর্থ
দিয়া গেলেন।
এক জনকে পাঁচ মুদ্রা দিলেন, আর এক
জনকে দুই মুদ্রা আর এক জনকে এক মুদ্রা দিলেন।
অনেক দিন পরে দেশে ফিরিয়া ভৃত্যদের ডাকাইলেন এবং
টাকার হিসাব চাহিলেন। প্রথম ভৃত্য বলিল, “আপনি
আমাকে পাঁচ মুদ্রা দিয়াছিলেন, আমি তাহা লইয়া ব্যবসা
করিয়া আর পাঁচ মুদ্রা লাভ করিয়াছি।” প্রভু বলিলেন,
বেশ করিয়াছ, তুমি অল্প বিষয়ে বিশ্বস্ত হইয়াছ তােমার
উপর অনেক সম্পত্তির ভার দিব। দ্বিতীয় ভৃত্যটি
বলিল ;
তীয় দিব।
গল্পচ্ছলে উপদেশ
আপনি আমাকে দুই মুদ্রা দিয়াছিলেন, তাহা
দ্বারা আমি আর দুই মুদ্রা লাভ করিয়াছি। প্রভু
তাহাকেও বলিলেন, বেশ করিয়াছ, সামান্য বিষয়ে তুমি
বিশ্বাসী হইয়াছ ; আমি তােমার হাতে অনেক বিষয়ের
তাহার পর যে ভৃত্যটি এক মুদ্রা পাইয়াছিল
সে আসিয়া বলিল ; মহাশয় আমি জানি আপনি কৃপণ
ও কর্কশ প্রকৃতির লােক। যেখানে বপন করেন নাই
সেখানে কর্তন করিতে চান, সেই জন্য আমি আপনার
মুদ্রাটি লইয়া মাটির মধ্যে পুতিয়া রাখিয়াছিলাম ; এই
তাহা লউন। প্রভু ক্রুদ্ধ হইয়া বলিলেন ; রে দুষ্ট ও
অলস ভৃত্য, তুই যদি জানিস যে আমি কর্কশ প্রকৃতির
লােক, বপন না করিয়া কৰ্ত্তন করি তাহা হইলে আমার
মুদ্রা বাক্সে রাখিলে না কেন? তাহা হইলে ফিরিয়া
আসিয়া আমি সুদ পাইতাম। তিনি তাহার নিকট
হইতে মুদ্রাটি কাড়িয়া লইয়া তাহাকে বাহিরে তাড়াইয়া
দিতে বলিলেন।
বিনয় বিষয়ে ঈশার কয়েকটি সুন্দর গল্প আছে।
স্বর্গরাজ্য ‘স্বর্গরাজ্য’ আসিতেছে, এই কথা বলিয়া ঈশা তাঁহার প্রচার কাৰ্য্য আরম্ভ করিয়াছিলেন; এবং শেষ দিন পর্যন্ত তিনি স্বর্গরাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। স্বর্গ- রাজ্য তাহার শিক্ষার প্রধান কথা ছিল। নানা উপায়ে তিনি স্বর্গ-রাজের ব্যাখ্যা করিতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন। কিন্তু স্বর্গরাজ্য” বলিতে তিনি কি বুঝিতেন তাহা স্পষ্ট হয় নাই। স্বর্গরাজ্য কথাটি তিনি নূতন সৃষ্টি করেন নাই। প্রাচীনকাল হইতেই ইহুদিগণের মধ্যে তাহা প্রচলিত ছিল। ইহুদিগণ বিবিধ জাতির দৈন্য ও দুর্গতির মধ্যে বিশ্বাস করিত তাহাদের জাতির শুভদিন আসিবে। ধর্মাচার্যের বহুদিন ধরিয়া এই জাতীয় শুভদিনের আগমন ঘোষণা করিয়াছেন। ক্রমে এই জাতীয় শুভ- দিন স্বর্গরাজ্য বা ঈশ্বর-রাজ্য নামে অভিহিত হইয়াছিল। পুরাতন বাইবেলে ডানিয়েল নামে পরিচিত গ্রন্থে এই নাম স্পষ্ট আকার ধারণ করে। তাহার পরে ক্রমে সাধারণ লােকের মধ্যেও স্বর্গরাজ্যের আশা প্রচলিত হয়। ঈশার জন্মের পূৰ্ব্ব হইতেই সাধারণ লোকে বিশ্বাস করিত স্বর্গরাজ্য স্বর্গরাজ্য আসিবে। ব্যাপ্টিষ্ট জন ঈশার পূর্বে এই কথা প্রচার করিয়াছিলেন, “অনুতাপ কর, স্বর্গরাজ্য আসিতেছে।” দীক্ষার পরে ঈশাও এই কথা বলিয়া প্রচার আরম্ভ করিলেন। এই ধুয়া তিনি ব্যাপ্টিষ্ট জনের নিকট ইতে লইয়াছিলেন কি না তাহা বলা যায় না। ঈশার শিক্ষায় স্বর্গরাজ্য বৃহত্তর স্থান অধিকার করিয়াছিল। তিনি অনেক সময়েই স্বর্গরাজ্যের কথা বলিতেন। অনুবর্তি- দিগকে স্বর্গরাজ্যে স্থান পাইবে বলিয়া আশ্বাস এবং বিরােধীদিগকে স্বর্গরাজ্যে স্থান পাইবে না বলিয়া ভয় প্রদর্শন করিতেন। গ্যালীলি প্রদেশে ঈশার সময় জন- সাধারণের মধ্যে স্বর্গরাজ্যের আশা খুব প্রবল হইয়াছিল। তবে স্বর্গরাজ্য যে কি সে বিষয়ে কাহারও স্পষ্ট ধারণা ছিল না। অধিকাংশ লােক পার্থিব অর্থে স্বর্গরাজ্য গ্রহণ করিত। তাহারা মনে করিত স্বর্গরাজ্য আসিলে ইহুদিগণ তাহাদের লুপ্ত স্বাধীনতা পুনঃপ্রাপ্ত হইবে। তাহারা বিদেশী রাজার অধীনতা হইতে মুক্ত হইবে। তাহাদিগকে আর কর প্রদান.করিতে হইবে না। * এই আশায় ও উদ্দেশ্যে * ইহুদীদিগের স্বাধীন-রাজ্য পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হইবে। জেরুজেলেমের প্রাচীন ঐশ্বর্য ফিরিয়া আসিবে। অতীতকালে দাউদ রাজার সময়ে ইহুদীগণের অভ্যুদয় কথা লােকের মনে অতিরঞ্জিত হইয়া জাগিয়াছিল। তাহারা আশা করিত ভবিষ্যতে ইহুদীগণের অতীত সুদিন ফিরিয়া আসিতেছে। দাউদের বংশধর পুনরায় রাজা হইবে। ইহুদীগণ নির্বিরে প্রাচীন শাস্ত্র অনুযায়ী নীতি ও ধৰ্ম্ম আচরণ করিতে পারিবে।
ছিল। মহৰি ঈশ সময়ে সময়ে ইহুদীগণ বিদ্রোহী হইয়াছিল। কিন্তু পরাক্রান্ত রাজশক্তি সহজেই সে বিদ্রোহ দমন করিতে সমর্থ হইয়া- কেহ কেহ অপেক্ষাকৃত উন্নততর অর্থে স্বর্গরাজ্য গ্রহণ করিতেন। স্বর্গরাজ্যে পাপ ও দুর্নীতি থাকিবে না। ন্যায় ও ধৰ্ম্ম সুপ্রতিষ্ঠিত হইবে। দুর্নীতি অত্যাচার অবিচার তিরােহিত হইবে। কবে স্বর্গরাজ্য আসিবে সে বিষয়েও ভিন্ন ভিন্ন লােকের ভিন্ন ভিন্ন ধারণা ছিল। কেহ কেহ মনে করিত অচিরেই স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইবে। কেহ বা মনে করিত বিচারের দিনে স্বয়ং ঈশ্বর বা তঁাহার প্রেরিত পুরুষ আসিয়া স্বর্গরাজ্য স্থাপন করিবেন। * আবার অনেকে মনে করিতেন স্বর্গরাজ্য পৃথিবীতে স্থাপিত হইবে না, স্বর্গে ঈশ্বরের সাক্ষাৎ শাসনাধীনে গঠিত হইবে। প্রতিদিন সাধুগণ সেখানে স্থান পাইবেন। পাপীগণ গেহেনা বা নরকে অগ্নিতে পুড়িবে । সাধারণ লােকের মধ্যে স্বর্গরাজ্য সম্বন্ধে এইরূপ বিবিধ ও বিসম্বাদী ধারণা ছিল। এখন প্রশ্ন এই মহর্ষি ঈশার মনে * তাহার পূর্বে পৃথিবীর বহু দুর্দশা হইবে। পাপ ও দুবৃত্ততা চরম সীমায় উঠিবে। মরণের পূর্বে শয়তানের ইহাই চরম চেষ্টা, ইহাকে স্বর্গরাজ্যের জন্যের বেদনা বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। ইহার পরে মেসায়া আসিয়া পৃথিবীর বিচার করিবেন, দুর্নীতি ও দুবৃত্ততা অপসারিত করিবেন; স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত করিবেন। ইহা স্বর্গেও হইতে পারে, পৃথিবীতেও হইতে পারে। একটা মত আছে, যে পৃথিবীতে হাজার বৎসর স্বর্গরাজ্য, তৎপরে তাহা শর্গে লইয়া যাওয়া হইবে। সম্ভবতঃ ইহা পূর্বোক্ত দুই মতের সমম্ব।
স্বর্গরাজ্য ১১১ স্বর্গরাজ্যের ধারণা কি ছিল। দুঃখের বিষয় এ প্রশ্নেরও কোন নিশ্চিত উত্তর পাওয়া যায় না। ঈশ। যদিও সর্বদা স্বর্গরাজ্যের কথা বলিতেন, তিনি স্বর্গরাজ্যের একটি নিশ্চিত ধারণা দিয়া যাইতে পারেন নাই। তবে ইহা নিশ্চিত, ঈশা স্বর্গরাজ্য বলিতে পার্থিব ঐশ্বৰ্য্য বুঝিতেন না। তাঁহার স্বর্গ- রাজ্যের চিন্তায় রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা মিশ্রিত ছিল না ; তিনি পার্থিব উচ্চাশার সম্পূর্ণ উপরে উঠিয়াছিলেন। আমরা দেখিয়াছি দীক্ষার পরে জুডিয়ার মরুভূমিতে পরীক্ষার সময় তিনি রাজনৈতিক দুরাশা পদদলিত করিয়াছিলেন। শয়তান তাহাকে রাজ্য প্রদানের প্রলোভন দেখাইয়াছিলেন কিন্তু তিনি অনায়াসে তাহার উপরে উঠিয়াছিলেন। তদবধি পার্থিব ঐশ্বৰ্য্য চিন্তা তাহার মনে আর স্থান পায় এ বিষয়ে সাধারণ লোক হইতে তাহার সম্পূর্ণ বিভিন্নতা দেখিতে পাওয়া যায়। তবে ঈশার স্বর্গরাজ্য কি ? আমরা দেখিয়াছি কতকগুলি গল্পের দ্বারা তিনি স্বর্গরাজ্যের ধারণা পরিস্ফুট করিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু তাহাতেও বিশেষ কৃতকার্য হন নাই। স্পষ্টই বুঝিতে পারা যায়, তাঁহার মনে যাহাই থাকুক তিনি কথায় স্বর্গরাজ্যের ভাব স্পষ্টরূপে প্রকাশ করিতে পারেন নাই। ইহাও বুঝিতে পারা নাই।
মহর্ষি ঈশা
যায় তাঁহার মনে স্বর্গরাজ্যের ধারণা ক্রমে পরিবর্তিত
হইয়াছিল।
এক এক সময়ে তিনি স্বর্গরাজ্যের এইরূপ
বর্ণনা দিয়াছেন যাহাতে মনে হয় স্বর্গরাজ্য এই পৃথিবীতে
স্থাপিত হইবে না, স্বর্গে হইবে। তাহার শিষ্যগণও অনেক
সময়ে এই অর্থে স্বর্গরাজ্য গ্রহণ করিতেন। তারা
আশা করিতেন স্বর্গরাজ্যে ঈশা দক্ষিণ ও বামে বারখানি
সিংহাসনে বসিয়া বিচার করিবেন। সেখানে প্রধান স্থান
পাইবার জন্য পরস্পরের মধ্যে প্রতিদন্দ্বিতা চলিত।
ঈশা এইরূপ ধারণার প্রতিবাদ করেন নাই, 'তাহাতে মনে
হয় তাহার মনের ভাব এইরূপ ছিল। কিন্তু অন্যত্র
এইরূপ কথা বলিয়াছেন যাহাতে মনে করা যাইতে পারে
যে স্বর্গরাজ্য এই পৃথিবীতেই প্রতিষ্ঠিত হইবে। এমন
কি স্বর্গরাজ্য এখনই বর্তমান। স্বর্গরাজ্য মানবের
অন্তরে, ঈশ্বরের নিয়মের বশবর্তী হইয়া চলা। ঈশা
যেখানে স্বর্গরাজ্য অন্বেষণের উপদেশ দিয়াছেন তাহার
সঙ্গে এই ব্যাখ্যা দিয়াছিলেন, তাহার ধর্ম নীতি অন্বেষণ
কর। ইহাতে স্পষ্ট বুঝা যায় সাধু জীবনই স্বর্গরাজ্য।
অনেক স্থলে স্বর্গরাজ্য বলিতে খৃষ্টীয়-মণ্ডলী বােধ হয়।
স্বর্গরাজ্য আসিতেছে অর্থাৎ মানব সমাজের এক নূতন
অবস্থা আসিতেছে। এতদিন সমাজে এইরূপ অবস্থা
স্বর্গরাজ্য ছিল, এখন অন্যরূপ অবস্থা হইবে। ব্যাপ্টিষ্ট জনের কথা বলিতে গিয়া ঈশা বলিয়াছেন মানব-কুলে ভঁহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর কেহ জন্মগ্রহণ করেন নাই ; কিন্তু স্বর্গরাজ্যে যে নিম্নতম সেও ভঁহার অপেক্ষা বড়, ইহাতে স্বর্গ- রাকে উন্নততর প্রকৃতি দেওয়া হইয়াছে। স্বর্গরাজ্য কখন আসিবে, কিরূপভাবে আসিবে এ বিষয়েও ঈশার কোনও নিশ্চিত মত পাওয়া যায় না। স্থানে স্থানে তিনি এইরূপ বলিয়াছেন যাহাতে মনে হয় স্বর্গরাজ্য আর্সিয়াছে। আবার অন্য সময়ে যাহা বলিয়াছেন তাহ'তে বুঝা যায়, যে তঁাহার স্বর্গারােহণের পর তিনি স্বর্গ হইতে পুনরায় আসিয়া স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত করিবেন । জীবনের শেষ দিকে এই মত সুদৃঢ় হইয়াছিল। এই সময়ে তিনি বিশ্বাস করিতেন তিনিই মেশায়া। সময় এই বােধ তিনি লাভ করিয়াছিলেন তাহা বলা যায় প্রথম প্রথম মেশায়াবুদ্ধি ছিল বলিয়া মনে হয় ক্রমে এই জ্ঞান হইয়াছিল। প্রথম প্রথম ইহা শিথিল ছিল, তখন তিনি শিদিগকে জিজ্ঞাসা করিতেন, তােমরা আমাকে কি মনে কর? সাইমন যেদিন বলিয়া- ছিলেন, “তুমি মেশায়া’ সেদিন তাহার উপর বিশেষ সন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। লােকে যখন , তাহাকে ডেভিডের পুত্র { না। ৮ ১১৪ মহর্ষি ঈশা বলিত তিনি বিশেষ প্রীত হইতেন। এই সকল কারণে বােধ হয় তাহার মনে নিজের মেশায় সম্বন্ধেও প্রথম প্রথম যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। পরে লােকের কথায় সেই জ্ঞান দৃঢ়ীভূত হইয়াছিল ; তখন তিনি দৃঢ়তার সহিত বলিতেন তিনি মেশায়া এবং তিনি স্বর্গরাজ্য স্থান করিবেন। তবে তিনি ইহাও বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে পুরােহিতের তাহাকে যে কোনও উপায়ে হত্যা করিবে। এই জীবনে স্বর্গরাজ্য স্থাপন হইবে না। তিনি মনে করিতেন মৃত্যুর পরে তিনি স্বর্গ হইতে আবার পৃথিবীতে আসিবেন। এই ধারণা তাহার মনে সুস্পষ্ট আকার ধারণ করিয়াছিল। তিনি শিষ্যগণকে বলিতেন, “তােমরা প্রতীক্ষা করিয়া থাক, আমি ফিরিয়া আসিব। শিষ্যগণও এই কথা বিশ্বাস করিয়াছিলেন। আদিম খৃষ্টীয় মণ্ডলীতে ঈশার আগমনে বিশ্বাস বহুদিন পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। কালক্রমে এই বিশ্বাস মন্দীভূত হইয়া যায়। খৃষ্টানগণ স্বশরীরে ঈশার পুনরাগমনে নিরাশ হইয়া সিদ্ধান্ত করেন, ঈশার আত্মা আসিয়া সমাজকে নূতন আকার দিবেন এই কাজ একদিনে হইবার নয়। ধীরে ধীরে ঈশার শিক্ষা জন- সমাজকে পরিবর্তিত করিবে। স্বর্গরাজ্য সেই পরিবর্তিত
১১৫
স্বর্গরাজ্য
সমাজ।
ইহা একটি সামাজিক নব আদর্শ। ঈশ।
স্বর্গরাজ্য বলিতে যাহাই বুঝুন না কেন, তাঁহার মুখের
বাণী জগতে একটি জীবন্ত শক্তি হইয়া কাজ করিতেছে।
আদিম খৃষ্ট-মণ্ডলীর ন্যায় বর্তমান সময়েও খৃষ্টীয় সমাজ,
এমন কি জনসাধারণ স্বর্গরাজ্যের প্রতীক্ষা করিয়া
আছেন।
মহর্ষি ঈশার প্রচার উদ্যম
মহর্ষি ঈশা কেবলমাত্র উচ্চ শ্রেণীর উপদেষ্টা ছিলেন
শুধু হৃদয়গ্রাহী উপদেশ দিয়া তিনি আপনার
কাৰ্য শেষ হইল মনে করিতেন না। একটি জীবন্ত
পর্শ-সমাজ স্থাপন করা স্পষ্টতঃ তাহার লক্ষ্য ছিল।
এই জন্য প্রথম হইতে তিনি দৃঢ় চেষ্টা করিয়াছিলেন।
দুঃখের বিষয় তিনি অনেক দিন কাজ করিবার অবসর
পান নাই। অল্প বয়সেই শত্রুগণের চক্রান্তে তাহাকে
প্রাণ হারাইতে হয়; কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তিনি যে
বৃহৎ কাজের সূচনা করিয়া যান তাহার বিষয় ভাবিলে
বিস্ময়পূর্ণ হইতে হয়। দীক্ষার পরে ঈশা সম্ভবতঃ তিন
বৎসর মাত্র জীবিত ছিলেন। এই তিন বৎসরে তিনি
তাঁহার ধৰ্ম্ম মণ্ডলীর ভিত্তি সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করিতে সমর্থ
হইয়াছিলেন। এত অল্প সময়ের মধ্যে জগতের কোনও
ধর্মসংস্কারক এমন বিপুল কাৰ্য্য করিয়া যাইতে পারেন
১১
মহষি ঈশার প্রচার উদ্যম
নাই। বােধ হয় কাৰ্যারম্ভের পূর্বে তিনি তাঁহার
জীবনের ব্রত বিষয়ে গভীর চিন্তা করিয়াছিলেন। কাৰ্য্যে
হস্তক্ষেপ করিয়া তিনি প্রবল উদ্যমে আরদ্ধ কাজ করিয়া
গিয়াছিলেন। একবারও দক্ষিণে বা বামে দৃষ্টিপাত করেন
নাই। কোনও বাধাই তাহার গতিরােধ করিতে পারে
নাই। নির্ভীক বীরের মত দৃঢ় পদে গন্তব্য পথে
অগ্রসর হইয়াছেন।
জুডিয়া হইতে ফিরিয়া ঈশা গ্যালীলিতে আসেন এবং
যদিন জীবিত ছিলেন তাহার অধিকাংশ সময় গ্যালালিতেই
অতিবাহিত করেন। গ্যালীলি হ্রদের উপকূল ভূমি
তাহার প্রদান কার্যক্ষেত্র হইয়াছিল। সর্ব প্রথমে
তিনি ন্যাজাবেথে গিয়াছিলেন মনে হয়। কিন্তু সেখানকার
লােক: বিরোধিতায় ন্যাজারেথ পরিত্যাগ করিয়া ক্যাপরন
* সিন। এখানকার অধিবাসীরা শ্রদ্ধা ও সম্মানের সহিত
হাকে গ্রহণ করে আগ্রহের সহিত তাঁহার
উদ এবণ করে। এই জন্য ঈশা কাপানন উহার
2ংপান কেন্দ্র স্থাপন করেন। এখান হইতে সশিয্যে
গ্যলিনির নানা স্থানে গমন করিয়া ঈশা তাহার ধৰ্ম্ম-মত
প্রচার করেন। অল্পকালের মধ্যেই গ্যালীলি প্রদেশে
হার নাম বুপ্ত হইয়া পড়িয়াছিল। যেখানে যাইতেন
১১৮
মিলিত না।
মহষি ঈশা
লােকে আগ্রহের সহিত তাহার কথা শুনিতে আসিত।
প্রচারে ঈশার ব্যাকুল উৎসাহ ছিল তিনি অক্লান্ত
দেহে গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে পদব্রজে গমন করিয়া আপনার
মত ব্যক্ত করিতেন। কোথাও বা আশ্রয় মিলিত কোথাও
কোনও গ্রামে গিয়া স্থানীয় ধৰ্ম্ম-মন্দির
বিশ্রাম দিনে উপদেশ দিতেন। তাহার সুযােগ না হইলে
পথপার্শ্বে, নদী তীরে, বৃক্ষমূলে যেখানে স্থান পাইতেন
সেখানে বসিয়া ধৰ্ম্ম ব্যাখ্যা করিতেন। শ্রোতার অভাব
হইত না। তাঁহার সঙ্গে শিষ্যদল থাকিত, স্থানীয় লােকেরাও
এই নবীন প্রচারকের কথা শুনিতে দলে দলে আসিত
এবং তাঁহার অভিনব উপদেশ শুনিয়া মুগ্ধ হইয়া যাইত।
এইরূপে গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে তঁাহার খ্যাতি বিস্তৃত
হইয়াছিল। যেখানে যাইতেন সেখানেই লােকে আগ্রহের
সহিত তাহার কথা শুনিতে আসিত। এইরূপে গ্যালালির
বহু স্থানে তিনি ভ্রমণ করিয়াছিলেন। বিশেষভাবে
ম্যাগডেলা, ডালমাউশ, ক্যাপান, বেথসাইডা. এবং
কোরাজি তাহার প্রধান প্রচার কেন্দ্র বলিয়া প্রসিদ্ধ
হইয়াছিল। এই সকল স্থান অপেক্ষাকৃত বৃহৎ এবং
এখানে ঈশা দীর্ঘকাল থাকিয়া কাজ করিতেন। সুতরাং
এখানে স্থায়ী শিষ্য লাভ হইত।
আসিত।
মহৰি ঈশার প্রচার উদ্যম
যাহারা উপদেশ
শুনিতে আসিত তাহাদের মধ্যে
কেহ কেহ আকৃষ্ট হইয়া অন্তরঙ্গ শিষ্য দলে প্রবেশ লাভ
করিত। গ্যালীলির সীমা অতিক্রম করিয়া সময় সময়
ঈশা অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী স্থানে এবং শিষদিগের মধ্যে
দুইন করিয়া প্রচার করিতে নানা স্থানে পাঠাইতেন।
জেরুসালেম হইতেও লােকে তাহার উপদেশ শুনিতে
জেরুসালেম মন্দির হূদীগণের
যীহুদীগণের জাতীয়
জীবন ও ধর্মের প্রধান কেন্দ্র। তথায় মহর্ষি ঈশা
মহা উদ্যমে প্রচার আরম্ভ করিলেন। জেরুসালেমের
মন্দিরে যীহুদীগণ দোকান খুলিয়া ক্রয়-বিক্রয় করিত।
মন্দির ভগবানের নাম করিবার স্থান, পিতার গৃহকে
তোমরা দর বাসস্থান করিয়াছ—ইহা বলিয়া তিনি
দোকানের জিনিষ পত্ৰ ফেলিয়া তাহাদিগের দোকান
তুলিয়া দিয়াছিলেন।
ঈশার এই সকল কাৰ্য্য মন্দিরের আচাৰ্য্য ও
কর্তৃপক্ষের গােচর হইলে ঈশার দ্বারা তাঁহাদের শক্তি ও
মৰ্যাদার খৰ্ব্ব হইতেছে ভাবিয়া তাঁহাকে বধ করিবার
জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করিয়াছিলেন। অবশেষে
ঈশার বারজন অন্তরঙ্গ শিষ্যের মধ্যে জুড়াস্ নামক শিষ্যকে
প্রলুব্ধ করিয়া ঈশাকে ধৃত করা হইল। তাহার বিরুদ্ধে
১২০
মহৰি ঈশ
কোন যুক্তি প্রমাণ না পাইয়া মন্দিরের আচাৰ্যগণ ও
তাহাদের অনুচরগণ রােমান শাসনকর্তা পাইলেটর নিকট
তাঁহাকে উপস্থিত করিল এবং ক্রুশে বিদ্ধ করা হ.,
করা হউক বলিয়া চীৎকার করিতে লাগিল। কালে
জনসাধারণকে সন্তুষ্ট রাখিবার জন্য বাধ্য হইয়ঃ ইশকে
ক্রুশে বিদ্ধ করিয়া প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়াছিলে। তিন
বৎসর মাত্র মহর্ষি ঈশা যে সত্য ও মত প্রচাঃ করিয়া-
ছিলেন আজও তাহা অক্ষয় হইয়া রহিয়াছে । পৃথিবীর
অধিকাংশ লোক উহা গ্রহণ করিয়া খৃষ্টীয় সf গঠন
করিয়াছে। কিন্তু যে যীহুদীগণ তাঁহার বধে উদ্যোগ
করিয়াছিল এবং যে রােমান শাসনকর্তা অনুমোদি
করিয়াছিল সেই যীহুদী বংশধরগণ স্বদেশ হইতে বঞ্চিত ও
লাঞ্ছিত এবং রােমান সাম্রাজ্য লুপ্ত হইয়াছে ।
সম্পূর্ণ
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.