Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Miicel Madhusudan Dutter Jiban Charit

Basu,jogindranath · 2010/02/9

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

এম
কে
জীবন চরিত
এনেদকে
মা
যােগীন্দ্রনাথ।

पशुसमानत किन न्टक । सतर মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন- ভাত। বিদ্যালয়-পাঠ্য সংরণ। শ্ৰীযােগীন্দ্রনাথ বসু বি, এ প্রণীত। কবির কবিত্ব বুঝিয়া লাভ আছে, সন্দেহ নাই, কিন্তু কবিত্ব অপেক্ষা কবিকে বুঝিতে পারিলে আরও গুরুতর লাভ। ** কবিতা কবিৰ কীর্তি, তাহাত আমাদের হাতেই আছে, পড়িলেই বুঝিব। কিন্তু যিনি এই কীর্তি রাখিয়া গিয়াছেন, তিনি কি ণ, কি প্রকারে, এই কীর্তি রাখিব গেলেন, তাহাই বুঝিতে হইবে।” বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ১৯১০। মূল্য দশ আনা।

}
কলিকাতা।
৯১২ নং মেছুয়াবাজার ইট. “নববিভাকর যন্ত্র
গােপালচন্দ্র নিয়ােগী দ্বারা মুদ্রিত এবং
গ্রন্থকার কর্তৃক প্রকাশিত।

উৎসর্গ-পত্র।
যাহার উৎসাহ, অনুরাগ ও সাহায্য প্রাপ্ত না হইলে
এ গ্রন্থ রচিত হইত না,
এবং
পরলােকগত সুহৃদের প্রতি আজীবনব্যাপী অনুরাগের জন্য
যিনি আমার শ্রদ্ধার পাত্র।
মধুসূদনের সেই চিরনি, অকৃত্রিম সুহৃদ
বাবু গৌরদাস বশাক মহাশয়কে
মধুসূদনের এই জীবন-চরিত
সমাদরে
উপহার অর্পিত হইল।

No text on this page.

বিজ্ঞাপন। বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগের পাঠোপযােগী করিয়া মধুসূদনের জীবন- বৃত্তান্ত সংক্ষেপে প্রকাশিত হইল। ইহার কোন কোন স্থল মূল গ্রন্থ হইতে অবিকল উদ্দত এবং কোন কোন স্থল নূতন করিয়া লিখিত হইয়াছে। মূল গ্রন্থে যাহা প্রায় সাত শত পৃষ্ঠায় ব্যক্ত হইয়াছে, তাহা যে এক শত একষটি পৃষ্ঠায় ব্যক্ত করা সম্ভবপর নয়, তাহা, বােধ হয়, বলিয়া বঝাইবার প্রয়ােজন নাই। ছাত্রদিগের জ্ঞাতব্য কোনও বিষয়, সাধ্যানুসারে, যদিও আমি ত্যাগ করি নাই, তথাপি ইহাতে বহু অসম্পূর্ণতা লক্ষিত হইবে বলিয়াই আমার আশঙ্কা হয়। দুইটা বিষয় ইহাতে সন্নিবিষ্ট করিতে না পারিয়া আমি দুঃখিত। প্রথম, মধুসূদনের গ্রন্থাবলার সমালােচনা ; দ্বিতীয়, তাহার ইংরাজী ভাষায় লিখিত পত্রাবলা। কবিতা রচনার ন্যায় পত্ররচনাতেও মধুসূদনের অসাধারণ শক্তি ছিল। তাঁহার গ্রন্থাবলী সম্বন্ধে বহু জ্ঞাতব্য বিষয় এই সকল পত্রে লক্ষিত হইবে। যাহারা তাহার সাহিত্যিক জীবনের বিকাশ দেখিতে চান, তাহাদিগকে মূল গ্রন্থ হইতে এই সকল পত্র পাঠ করিতে অনুরােধ করি। বাঙ্গালাভাষা-শিক্ষার্থী প্রত্যেক ছাত্রকেই মধুসূদনের কোন না কোন কাব্য হইতে উদ্ধত অংশ পাঠ করিতে হয়। কবির কবিতা পাঠের সঙ্গে কবিকে জানিবার জন্য স্বভাবতঃই আকাঙ্ক্ষা জন্মে। বর্তমান সংস্করণ হইতে সেই আকাঙ্ক্ষা যদি, কিয়ৎ পরিমাণে ও, তৃপ্ত হয়, তাহা হইলে আমার শ্রম সার্থক বােধ করিব। ইতি জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭ কলিকাতা শ্ৰীযােগীন্দ্রনাথ বসু।

No text on this page.

বিষয় নিরূপণ। প্রথম অধ্যায়। বাল্যজীবন।-১৮২৪-১৮৩৬ খ্ৰীষ্টাব্দ ।- জন্মভূমি-বংশ কথা-কুলক্রমাগত প্রকৃতি-পিতার প্রকৃতি-মাতার প্রকৃতি-- বাল্যকথা—বিদ্যারম্ভউচ্চাভিলাষ ও বিদ্যানুরাগ-কাব্যানুরক্তি-রামায়ণ ও মহাভারত পাঠে অনুরাগ-রামায়ণ, মহাভারত পাঠের ফল—শৈশব শিক্ষা-সঙ্গীত- প্রিয়তা-জন্মভূমির সৌন্দৰ্য-জন্মভূমির প্রতি অনুরাগ—শৈশব-শিক্ষার ফল-সাধা- রণ প্রকৃতি—শিক্ষাৰ্থ কলিকাতায় আগমন । ১-২০ পৃষ্ঠা। দ্বিতীয় অধ্যায়।—হিন্দুকলেজ—শিক্ষাবস্থা—১৮৩৭–১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দ - হিন্দুকলেজ ও তাহার শিক্ষকগণ—কলেজীয় শিক্ষা ও গৌরবঙ্গ-সহাধ্যায়ী ও সমকালবী ছাত্রগণশিক্ষাবিবরণ---গণিত ও সাহিত্য-ইংরাজী রচনার অভ্যাস প্রমপ্রবণতা—আত্মসংযমের ও সুনীতির অভাব। ২১-৩১ পৃষ্ঠা। তৃতীয় অধ্যায় ।—শিক্ষাবস্থা-কবিতা রচনার অভ্যাস।—১৮৪১ --১৮৪২ খ্রীষ্টাব্দ।—রিচার্ডসনকে অনুকরণেচ্ছ।-বায়রণ, স্কট এবং মুরের প্রভাব-প্রথম বাঙ্গালা কবিতা-নিজের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দৃঢ় বিশ্বাস—ইংলণ্ড গমনের জন্য আকাঙ্ক্ষা-হিন্দুকলেজীয় শিক্ষার নিষ। ৩২-৪৪ পৃষ্ঠা। চতুর্থ অধ্যায়।খ্রীষ্টধৰ্ম্ম গ্রহণ ও বিশন্স কলেজে অধ্যয়ন ১৮৪৩-১৮৪৭ খ্ৰীষ্টাব্দ ।মধুসূদনের খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম-গ্রহণের কারণ—খ্রষ্টধৰ্ম্ম সম্বন্ধে হেয়ার ও রিচার্ডসন-অপ্রীতিকর বিবাহের প্রস্তাব-পিতৃগৃহত্যাগ ও কেল্লায় অবস্থান -খ্রষ্টধ গ্রহণ -পিতামাতার ব্যবহার—বিশন্স কলেজে প্রবেশ—ভাষা শিক্ষায় অরাগ-উচ্ছলতা ও তজ্জনিত অশান্তি-মাদ্রাজগমন। ৪৫-৫২ পৃষ্ঠা। পঞ্চম অধ্যায় ।--মান্দ্রাজ-প্রবাস।-৮৪৮-১৮৫৬ খ্ৰীষ্টাব্দ। মাজ-বস কালীন অবস্থা-সাহিত্য-সেবা-~-ক্যাপটিভুলেডীৰচনা-ক্যাপটিভ লেডার বণনীয় বিষয়-ক্যাপটিভ লেডার ভাষা ও ভাব-বিবাহ ও পত্নত্যাগ—মাত্রাজে ক্যাপটিভ লেডার সমাদর-কবির উল্লাস ও অবসাদ—কলিকাতায় ক্যাপটি ভ লীর অনাদর-ক্যাপটিভ লেডার অনাদরে মধুসূদনের মনের ভাব-বেথুনের উপদেশ ও পত্র-মধুসূদনের অধ্যয়নশীলত'-সাংসারিক অবস্থা-মান্দ্রাজত্যাগ। ৬৬ পৃথা। নষ্ঠ অধ্যায়।—মান্দ্রাজ হইতে স্বদেশে প্রত্যাগমন—তাৎকালীন বাঙ্গালা সাহিতের অবস্থা, বেলগাছিয়া থিয়েটার।১৮৫৭-১৮৫৮ খ্ৰীষ্টাব্দ।--দেশে প্রত্যাগমন-পূব্বাবস্থার পরিবর্তন-মধুসূদনের নিজের পরিবর্তন -সামাজিক পরিবর্তন-বঙ্গীয় সাহিত্যের অবস্থা-ঈশ্বরচন্দ্রগুপ্ত ও সংবাদ প্রভাকর অবস্থা-ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ও মধুসূদন লক্ষ্য-রত্নাবলীর কলিকাতায় এত্যাগমনের পর মধুসূদনের অবস্থা-নুতন পথে ইংরাজী অনুবাদ-রত্নাবলীর অভিনয়-রত্নাবলীর ইংরাজী অনুবাদের প্রশংসা মধুসূদনের গন্তব্য পণ প্রাপ্তি। ৬৭-৭৯ পৃষ্ঠা। --ধুসূদনের পূবে বাঙ্গালা কবিতার [ ২ ] . সপ্তম অধ্যায়।প্রাচ্য কবিদিগের প্রভাব কাল।--শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী এবং তিলােত্তমাসম্ভব-কাব্য রচনা।-১৮৫৮-১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দ । -বাঙ্গালা নাটক রচনার সঙ্কল্প-শর্মিষ্ঠা অভিনয়—সাধারণের নিকট প্রতিষ্ঠালাভ -পদ্মবতী ও শৰ্ম্মিস্তার অবলম্বনীয় বিষয়-অমত্রচ্ছল সন্ধে মহারাজা যতীন্দ্র মোহনের সহিত কথােপকথন-তিলােত্তমাসম্ভব রচনা-- তিলােত্তমা সম্ভব সম্বন্ধে মধুসূদনের ও মহারাজা যতীন্দ্রমোহনের ভবিষ্যদ্বাণী-তিলোত্তমাসম্ভব সম্বন্ধে সাধারণের মতামত-সাহিত্যে ব্যঙ্গাত্মক গ্রন্থের আবশ্যকতা-একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁয়ারচনা বাঙ্গালা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ । ৮০-৯৩ পৃষ্ঠা। অষ্টম অধ্যায়। পাশ্চাত্য কবিগণের প্রভাবকাল।—মেঘনাদবধ কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য এবং কৃষ্ণকুমারী নাটক রচনা—১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দ। মেঘনাদবধ রচ ৰা-মেঘনাদবধের অবলম্বনীয় বিষয় কাব্যের সগ বিভাগ-বাঙ্গালী সাহিত্যে মেঘনাদবধ কাব্যে স্থান-মেঘনাদবধ কাব্যের সমাদৰ-কাপ্রসন্ন সিংহ মহােদয়ের অভিনন্দন-ব্রজাঙ্গনা কাব্য-কৃষ্ণকুমারী নাটক-বাঙ্গালা সাহিত্যে মধুসূদনের নাটক সমহের কাৰ্য্য। ৯৪-১০৪ পৃষ্ঠা। নবম অধ্যায়।—বীরাঙ্গনা কাব্য রচনা ও ইংলণ্ড গমন।—১০ ৬২ খ্রীষ্টাব্দ ।--পারিবারিক কথা—আত্মবিলাপ-বীরাঙ্গনা কাব্যে গম্ভীর ও কোমল ভাবের সন্মিলন-বীরাঙ্গনার আশ-কাব্য-বিভাগ-বীরাঙ্গনার ভাষা-সা' সারিক কথা-ইংলণ্ড বাত্রা। ১০৫-১১৪ পৃষ্ঠা। দশম অধ্যায় -য়ুরােপ প্রবাস—চতুর্দশপদী কবিতাবলী ।- ১৮৬২–১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দ।-ইংল-গমন—ইংলণ্ডে উপস্থিতি ও গ্রেস ইন ব্যারিষ্টার সমাজে প্রবেশ-যুরােপ প্রবাসকালীন দূরবস্থা -ভাষাশিক্ষা-দীকাব্য -মুদ্রা হরণ-কাব্য-চতুর্দশপদী কবিতাবলী-প্রবাস-কাল সমাপ্তি। ১১৫-১২৬ পৃষ্ঠা। একাদশ অধ্যায় ।-শেষ জীবন-বারিষ্টারী ব্যবসায়, হেক্টর বধ ও মায়াকানন।১৮৬৭-১৮৭৩ খ্রষ্টাব্দ।-য়রোপ হইতে স্বদেশে প্রত্যা গন--ব্যারিষ্টারী ব্যবসায়--সাহিত্যসেবা-তিমূলক কবিতা--হেক্টর বধ- আমি জীবনের কথা--অর্থাভাব ও উদারত-মানসিক যন্ত্রণা হইতে মুক্তি লাভের চেষ্টা শারীরিক অবস্থা-পঞ্চকোটের রাজার অধীনে কাৰ্য-সাংসারিক অবস্থা, মায়াকানন-পীড়িতাবস্থায় শে সাহায্য--উত্তর পাড়ার বাস-পীড়া কালীন দুরবস্থা -আলিপুর দাতব্য চিকিৎসালয়ে গয়ন-হেনরিয়েটার মৃত্যু-নোনােহন থােষ মহা শরের সহিত কথোপকথন-অম অপরাধ স্বীকার ৩ প্রার্থনা --পরলোক- গমন। ১১৭-১৫০ পৃষ্ঠা। উপসংহার।—মধুসূদনের অনুষ্ঠিত কাৰ্য—মধুসুদনের আকৃতি ও প্রকৃতি- ধর্ম বিশ্বাস-মধুসূদনের জীবনের উপদেশ-মধুসূদনের সম্বন্ধে তাঁহার দেশীয়গণের কাৰ্য—মধুসূদনের সমাধিয় প্রতিষ্ঠা। ১৫১-১৬১ পৃষ্ঠা। - । =

No text on this page.

মাইকেল মধুসূদন দত্ত Eggraved-& Printed by K. V. Ses ne & Bros.

মাইকেল মধুসূদন দত্তের
জীবন-চরিত।
প্রথম তাধ্যায়।
বাল্যজীবন।
যশােহর-নগরের আটাশ মাইল দক্ষিণে সাগরদাড়ী নামে একটী ক্ষুদ্র
গ্রাম আছে। প্রাসলিলা কপােতাক্ষী ইহার তিন দিক বেষ্টন করিয়া
প্রবাহিত হইতেছে। বাঙ্গালা ১২৩০ সালের
জন্মভূমি।
১২ই মাঘ, ইংরাজী ১৮২৪ খ্রীষ্টাব্দের ২৫এ
জানুয়ারি, এই গ্রামে মেঘনাদবধ-কাব্য-রচয়িতা মাইকেল মধুসূদন দত্তের
বংশধা।
সাগরদাড়ী মধুসূদনের পূর্বপুরুষদিগের আদি বাসস্থান নয়। তাহার
পিতামহ রামনিধি দত্ত প্রথমে এখানে আসিয়া
মাতামহাশ্রয়ে বাস করেন। রামনিধির চারি
পুত্র। মধুসূদন তন্মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ রাজনারায়ণের পুত্র।
মধুসূদনের পিতা ও পিতৃব্যগণ সকলেই বুদ্ধিমান, উপার্জনক্ষম এবং
স্বধৰ্ম্মানুমােদিত ক্রিয়া, কর্মে একান্ত অনুরক্ত ছিলেন। সে সময়ে যেরূপ

জীবন-চরিত। বিদ্যার সমাদর ও প্রচলন ছিল, তাহার কেহই তাহার উপার্জনে ঐটা করেন নাই। দানশীলতা, সৌজন্য, এবং অতিথি-অভ্যাগতের সেবা প্রভৃতি যে সকল সদ্গুণের জন্য, সাগরদাড়ীস্থ দত্ত-পরিবার, এখনও, তাহাদিগের স্বদেশীয় সমাজে প্রতিষ্ঠালাভ করিতেছেন, ইহাদিগের চারি তার দৃষ্টান্ত হইতেই তাহা তাহাদিগের পরিবারে প্রবেশলাভ করিয়াছিল। মধুসূদনের পিতামহ রামনিধি দত্তের সাংসারিক অবস্থা ভাল ছিল । মধুসূদনের জ্যেষ্ঠ পিতৃব্য রাধামােহন দত্ত হইতেই তাহাদিগের বংশের সৌভাগ্যের সূত্রপাত হয়। রাধামােহন তৎকাল-সমাদৃত পারস্য- ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপন্ন ছিলেন। তাহার উন্নতির সঙ্গে তাহার অপর ভ্রাতা- দিগেরও উন্নতির পথ পরিস্কৃত হইয়াছিল । চারি ভ্রাতাই প্রচুর অর্থ উপার্জন করিতেন ; এবং তাহাদিগের ক্রিয়াকলাপ ও দানাদিদ্বারা বংশ, এক সময়, যশােহর-সমাজে বিশেষ প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিল। কুলক্রমাগত প্রকৃতি অনুসারে মধুসূদন মুক্তহস্তে ব্যয় করিতে পারি- তেন। ধূলিমুষ্টি ও অর্থ উভয়ের মধ্যে তাঁহার কুলক্রমাগত প্রকৃতি। নিকট অধিক ইতরবিশেষ ছিল না। এই ব্যয়শীলতার ন্যায় কবিশক্তিও তিনি, কিয়ৎপরিমাণে, পিতৃপুরুষগণের প্রকৃতি হইতে লাভ করিয়াছিলেন। যদিও তাঁহার পিতৃমাতৃবংশীয়- গণের মধ্যে প্রকৃত কবি নামের উপযুক্ত কোন ব্যক্তি, কখনও, জন্মগ্রহণ * দত্তবংশের ব্যয়ণলতা সম্বন্ধে একটা বৃত্তান্ত নিয়ে সন্নিবিষ্ট হইতেছে। এখন চাকুরীর প্রায় কুড়ি বৎসর পরে মধুসূদনের জ্যেষ্ঠ পিতৃব্য, রাধামােহন দত্ত, পুত্রের কল্যাণােদ্দেশে, একই দিনে ১০৮ কালী দেবীর পূজা করেন। তাহাতে ১০৮টী মহিষ, ১৮ মে, এবং ১০৮ী ছাগ এক সঙ্গে বলি প্রদত্ত হইয়াছিল, এবং ১০৮ বর্ণ- নির্শিত জবাপুপ অঞ্জলি অর্পিত হইয়াছিল। সাগরদাঁড়ীর প্রাচীন ব্যক্তিগণ, এখনও, এই পূজার বিষয় সগৌরবে কীৰ্ত্তন করিয়া থাকে।

বাল্যজীবন। ৩ করেন নাই ; তথাপি তাহার পূর্বপুরুষদিগের মধ্যে অনেকে কবিতা- নুরাগী ছিলেন, এইরূপ শুনিতে পাওয়া যায়। মধুসূদনের পিতা রাজনারায়ণ দত্ত, স্বয়ং কবিশক্তিসম্পন্ন না হইলেও একজন বিশেষ গুণগ্রাহী ও সহৃদয় ব্যক্তি ছিলেন। কবিতা, সঙ্গীত, এবং শিল্প প্রভৃতি সুকুমার কলায় তাঁহার পিতার প্রকৃতি। অসাধারণ অনুরাগ ছিল। আগমনী ও বিজয়া-সঙ্গীত শুনিতে শুনিতে তিনি একেবারে আত্মবিস্মৃত হইয়া যাইতেন। পুরাঙ্গনাদিগের মধ্যে যাহারা শিল্পকাৰ্য্যে পারদর্শিতা দেখাইতে পারিতেন, তিনি, তঁাহাদিগকে উৎসাহিত করিবার জন্য, অনেক সময়, পুরস্কার দান করিতেন । যে সৌন্দর্য্যোপাসনা মধুসূদনের চরিত্রের একটা বিশেষ লক্ষণ ছিল, তাহা তিনি তাঁহার পিতৃ-প্রকৃতি হইতেই লাভ করিয়াছিলেন । চারি ভাতার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বলিয়া রাজনারায়ণ দত্ত, জ্যেষ্ঠ সহাে- দরদিগের বড়ই আদরের পাত্র ছিলেন, এবং সেই জন্য বাল্য হইতে বিলাসিতায় ও ভােগসুখে অভ্যস্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু বিলাসম্পৃহ ছিলেন বলিয়া তিনি, কখনও,বিদ্যাশিক্ষায় অমনােযােগী হন নাই। পারস্য-ভাষায় তাহার অতি সুন্দর ব্যুৎপত্তি ছিল, এবং সেই জন্য তিনি পরে মুন্সী রাজ- নারায়ণ আখ্যা লাভ করিয়াছিলেন। স্বীয় বিদ্যাবুদ্ধি-বলে তিনি, পরিণামে, সদর-দেওয়ানী-আদালতের একজন প্রসিদ্ধ উকীল হইয়াছিলেন। তাঁহার সময়ে তাহার ন্যায় প্রতিপত্তিশালী উকীল সদর-দেওয়ানী-আদালতে অতি অল্পই ছিলেন। অপর ভ্রাতাদিগের ন্যায় তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করিতেন এবং মুক্ত-হস্তে ব্যয় করিতেন। দানশীলতা তাহার চরিত্রের একটা বিশেষ লক্ষণ ছিল। যে সরস বাপটুতাগুণে মধুসূদন সকলকে মুগ্ধ ও পুলকিত করিতে পারিতেন, তিনি তাহা তাঁহার পিতারই নিকট প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। পুত্র, পিতার দোষগুণ উভয়েরই অধিকারী হইয়া ৪ জীবন চরিত। ৩ থাকেন; মধুসূদনেও এ নিয়মের অন্যথা হয় নাই। পিতার বিদ্যা রাগ, সহৃদয়তা, বুদ্ধিমত্তা, এবং বাকপটুতা প্রভৃতি সদ্গুণের সহিত বিলাসিতা, অপরিমিতব্যয়িতা প্রভৃতি দোষও তিনি পিতার নিকট প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। আত্মসংযমেই যে প্রকৃত মনুষ্যত্ব, পিতা, পুত্র কাহারও সে জ্ঞান ছিল না। মধুসূদনের পিতার চারি বিবাহ । প্রথমা পত্নীর জীবদ্দশাতেই রাজনারায়ণ দত্ত আর তিনবার বিবাহ করিয়াছিলেন। মধুসূদন প্রথ- মার গর্ভসত। তাঁহার পিতৃবংশের ন্যায় মাতৃবংশও, এক সময়ে, যশােহর-সমাজে বিশেষ প্রতিষ্ঠাবান্ ছিল। তাহার মাতা জাহ্নবাদাসী বর্তমান খুলনা জিলার অন্তর্গত কাটপাড়ার জমাদার গৌরীচরণ ঘােষের কন্যা ছিলেন। সহৃদয়তা, বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতি গুণ মধুসূদন যেমন তাহার পিতৃ-প্রকৃতি হইতে প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাঁহার মাতার প্রকৃতি। স্বাভাবিক সরল, উদার মন ও প্রেম-প্রবণ, কোমল হৃদয় তিনি তেমনই তাহার মাতৃ প্রকৃতি হইতে লাভ করিয়া- ছিলেন। তাহার মাতার ন্যায় স্নেহপরায়ণ ও পরদুঃখকাতরা রমণী, স্বভাব-কোমলা বঙ্গ-মহিলাদিগের মধ্যে, অধিক দেখিতে পাওয়া যায় । স্বামীর ন্যায় তিনি মুক্তহস্তে দান করিতেন এবং আমেদ, আহলাদে অকাতরে অর্থব্যয় করুন। স্বামিদে বা তিনি পরম ধৰ্ম্ম বলিয়া মনে করিতেন, এবং কখনও কোন ‘বষয়ে স্বামীর প্রতিকূলবৰ্ত্তিনী হইতেন না। তাহার জীবদ্দশাতে রাজনারায়ণ দত্ত যদিও আর তিনটা বিবাহ করিয়াছিলেন, তথাপি তিনি কখনও স্বামীর প্রতি অশ্রদ্ধা বা বিরাগ প্রদর্শন করেন নাই। মধুসূদন মাদ্রাজে গমন করিলে রাজনারায়ণ দত্ত, পুনৰ্বার বিবাহ করিতে ইচ্ছা করিয়া তাহার নিকট বলিয়াছিলেন “দেখ, আমাদিগের পুটী ত আমাদিগকে ছাড়িয়া গেল, তােমার আর সন্তান হইবার আশা নাই, আমাদিগের জলপিণ্ডের উপায় কি হইবে? • বাল্যজীবন। বলিকপ।। জাহ্নবী দাসী, শুনিয়া, অম্লানমুখে বলিয়াছিলেন ; “তুমি পুনরায় বিবাহ কর, তােমার মঙ্গলেই আমার মঙ্গল ; যদি তােমার পুত্র জন্মে, তুমিও স্বর্গ-লাভের অধিকারী হইবে, আমিও হইব।” বহুপত্নীক হইলেও রাজ- নারায়ণ দত্ত, এই সকল কারণে, জাহ্নবী দাসীকেই সর্বাপেক্ষা স্নেহ করিতেন, এবং সকল বিষয়ে তাহার পরামর্শ লইয়া কাৰ্য্য করিতেন। মধুসূদন খ্ৰীষ্টধর্ম গ্রহণ করিলে তিনি, তাহারই অনুরােধে, মধুসূদনকে বহুদিন প্রচুর পরিমাণে অর্থ-সাহায্য করিয়াছিলেন। মধুসূদন যে সময়ে জন্মগ্রহণ করেন, তখন দত্তবংশের বিশেষ সৌভা- গ্যের অবস্থা; সুতরাং তাহার জাতকৰ্ম্মাদি অতি সমারােহের সহিত সম্পন্ন হইয়াছিল, এবং চারি ভ্রাতার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠের পুত্র বলিয়া তাহার আদরের সীমা ছিল না। তাহার জন্মগ্রহণের চারি বৎসরের মধ্যে তাহার আরও দুইটা ভ্রাতা জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু উভয়েরই অতি শৈশবে মৃত্যু হয়। দুইটা ভ্রাতার অকাল মৃত্যুতে এবং অপর ভ্রাতা, ভগ্নীর অভাবে মধুসূদন পিতা, মাতা, পিতৃব্য এবং অন্যান্য আত্মীয়গণের একান্ত স্নেহভাজন হইয়াছিলেন । যে রূপ আদরে ও গৌরবে তাহার শৈশব অতিবাহিত হইয়াছিল, অনেক রাজপুত্রের ও, বােধ হয়, সেরূপ হয় না।* তাহার বাল্যের ভােগবিলাসের কথা আলােচনা করিলে তাহার ভবিষ্যৎ জীবনের অমিতব্যয়িতার ও উচ্ছলতার জন্য, তাহাকে দোষ দিতে প্রবৃত্তি হয় অতিরিক্ত স্নেহবশতঃ গুরুজনেরা তাহাকে সকল কার্য্যে প্রশ্রয় : কিরূপ আদরে তাহার শৈশব অতীত হইয়াছিল, তৎসম্বন্ধে নিম্নলিখিতরূপ দুই একটা গল্প প্রচলিত আছে। তিনি জ্ঞানার্থ গমন করিলে, কি জানি যদি তাহার ফিরিয়া আসিতে বিলম্ব হয়, এই আশঙ্কায়, ক্রমে ক্রমে ৫৭টী চুল্লীতে অন্ন প্রস্তুত হইতে থাকিত। প্রত্যাগমন করিয়া যে চুল্লীর অন্ন সৰ্ব্বাপেক্ষা অসিদ্ধ হইত, তিনি তাহা আহার করতেন।

জীবন-চরিত। দান করিতেন। তাঁহার যখন যাহা ইচ্ছা হইত, তিনি তখন তাহাই করিতেন; বিশেষ অন্যায় কাৰ্য্য করিলেও কেহ তাহাকে নিবারণ করিতেন না। শৈশবে গুরুজনদিগের এইরূপ প্রশ্রয়দানের ফুল এই হইয়াছিল যে, বাল্য হইতেই, মধুসূদন স্বেচ্ছাচারে অভ্যস্ত হইয়াছিলেন ; এবং সেই জন্য উত্তরকালে যে কাৰ্য্য তাহার ভাল বােধ হইত, সঙ্গতই হউক, আর অসঙ্গতই হউক, তিনি তাহা না করিয়া ক্ষান্ত থাকিতে পারিতেন না। অন্যান্য অনেক সদগুণের ন্যায় আত্মসংযম, বাল্য হইতে শিক্ষা না করিলে, পরিণত বয়সে শিক্ষা করা দুরূহ হইয়া দাঁড়ায়। দুর্ভাগ্যক্রমে, পিতামাতার ও আত্মীয়গণের অতিরিক্ত মেহবশতঃ, মধুসূদন শৈশবে আত্মসংযম শিক্ষার সুযােগ প্রাপ্ত হন নাই। শৈশবে মধুসূদন তাহার স্নেহপ্রবণ-হৃদয় জননীর প্রকৃতই অঞ্চলের ধন হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। জাহ্নবীদাসী সম্পূর্ণরূপ, আত্মহারা হইয়াই পুতকে ভালবাসিতেন এবং, একদণ্ডেরও জন্য, তাহাকে চক্ষুর অন্তরাল করিলে অস্থির হইয়া পড়িতেন। মধুসূদন পাঠশালায় যাইলে তিনি ব্যাকুল হৃদয়ে তাহার আগমন প্রতীক্ষা করিয়া থাকিভেন। মধুসূদনের খ্রষ্টধর্ম গ্রহণের পর, তিনি প্রকৃতই জীবন্ম হইয়াছিলেন। সেই অবধি সাংসারিক কোন কার্য্যেই তাহার আসক্তি ছিল না; যতদিন জীবিত ছিলেন, পুত্রের চিন্তাতেই জীবন অতিবাহিত করিয়াছিলেন। তাহার মৃত্যুর সময় মধুসূদন মাদ্রাজে ছিলেন। জন্মের মত পুত্রকে দেখিতে পাইলেন না বলিয়া তিনি সৰ্ব্বদাই আক্ষেপ করিতেন। মৃত্যুর কিয়ৎক্ষণ পূর্বে তিনি কোন আত্মীয়াকে বলিয়াছিলেন ;-“আমি জীবনে মরিয়া আছি ; জ্বলন্ত শােকের আগুনে আমাকে কয়লা করিয়া ফেলি- আছে, আমি মরিয়াই বাচিব; কিন্তু আমার বাছা যে সাত সমুদ্রের পারে রহিয়াছে, তাহার মুখখানি না দেখিয়া আমার মরিতে ইচ্ছা করে না।” মধুসূদনও যখন যাহাকে ভালবাসিতেন, প্রাণ, মন, ঢালিয়া ভালবাসি বাল্যজীবন। - - - - re বাটীর দাস, তেন। ভালবাসিবার এই প্রবৃত্তি এবং শক্তি তিনি তাহার মাতার প্রকৃতি হইতেই লাভ করিয়াছিলেন। বাল্যে মধুসূদন অতি অমায়িক-প্রকৃতি ছিলেন। দাসীদিগকে তিনি অত্যন্ত স্নেহ করিতেন। পুরস্কারের জন্যই হউক বা অন্য কোন প্রয়ােজনেই হউক, তাহারা তাহাকে আসিয়া অনুরােধ জানাই। প্রতিবাসিগণের মধ্যে কেহ তাহাকে কোন দুঃখ জানাইলে তিনি, কখনও, তাহা মােচন করিতে ত্রুটি করিতেন না। তিনি পিতা, মাতার আদরের ধন ছিলেন, সুতরাং তাহার কোন প্রার্থনাই অপূর্ণ থাকিত না। পূর্ণ বয়সে, নানা বিষয়ে, মধুসূদনের প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটিয়াছিল ; কিন্তু শৈশবাজ্জিত অমায়িকতা, সহৃদয়তা এবং পরদুঃখকাতরতা প্রভৃতি গুণের কোনও পরিবর্তন ঘটে নাই। মধুসূদনের সাত বৎসর বয়সের সময়ে তাঁহার পিতা কলিকাতা সদর- দেওয়ানী আদালতে ওকালতী আরম্ভ করেন। বিদ্যার । তিনি, খিদিরপুরে একটা বাটী ক্রয় করিয়া, তথায় অবস্থান করিতেন ; আর মধুসূদনের জননী পুত্রকে লইয়া, সাগরদাড়ীর বাটীতে থাকিতেন। মধুসূদন, মাতার নিকট থাকিয়া, গ্রামস্থ পাঠশালায় অধ্যয়ন আরম্ভ করিলেন। পৃথিবীতে যাহারা প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়া গিয়াছেন, দেখিতে পাওয়া যায়, তাহাদিগের মধ্যে অনে কেরই শৈশবে তাহাদিগের ভবিষ্যৎ জীবনের পূর্বলক্ষণ সূচিত হইয়াছিল। অধ্যয়নাসক্তি ও কাব্যানুরাগই মধুসূনের চরিত্রের বিশেষ বাল্য হইতেই এই দুইটা গুণ তাহার প্রকৃতিতে লক্ষিত হইয়া- ছিল। সাধারণতঃ ধনিসন্তানদিগের, প্রায়ই, লেখাপড়ায় অনুরাগ দৃষ্ট হয় না। তাহার উপর যে সকল বালক গুরুজনদিগের নিকট অধিক আদর প্রাপ্ত হয়, তাহারা বিদ্যাশিক্ষা সম্বন্ধে একবারেই অমনােযােগী হইয়া থাকে। কিন্তু মধুসূদন, ঐশ্বৰ্য্যশালী পিতার একমাত্র সন্তান ০ লক্ষণ।

৮ জীবন-চরিত। এবং গুরুজনদিগের অত্যধিক আদরের পাত্র হইয়াও, কখনও, লেখাপড়ায় ঔদাসীন্য প্রদর্শন করেন নাই। পাঠশালার ছাত্রদিগের মধ্যে কিসে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ হইবেন, ইহাই তাহার প্রধান চিন্তার বিষয় ছিল । কি গ্রামস্থ গুরুমহাশয়ের পাঠশালায়, কি হিন্দু কলেজে, সহধ্যায়িগণের মধ্যে কেহ তাহাকে লেখা পড়ায় অতিক্রম করিবে, ইহা তিনি কিছুতেই সহা করিতে পারিতেন না। উচ্চাভিলাষই মহত্ত্বের ভিত্তিভূমি। উচ্চাকাঙ্ক্ষা ব্যতীত জ্ঞান, ধৰ্ম্ম, অর্থ কোন বিষয়েই মনুষ্য শ্রেষ্ঠতালাভে উচ্চাভিলাষ ও বিদ্যানুরাগ। সমর্থ হয় না। মহত্ত্ববীজ এই উচ্চাষি, বাল্য হইতেই, মধুসূদনের প্রকৃতিতে লক্ষিত হইত। সমকাবী লেখকগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হইব, পূর্ণ বয়সে ইহাই তাহার আকাঙ্গা হইয়াছিল, এবং যতদিন না তাহার সে আকাঙ্ক্ষা পরিতৃপ্ত হইয়াছিল, ততদিন তিনি নিরস্ত হন নাই। তার বালের উচ্চাভিলাষ তঁাহার জননীর প্রদত্ত উৎসাহ-বাক্যে এবং তাঁহার পিতার আদর্শে সম্যক পুষ্টিলাভ করিয়াছিল। তাহার জননী অতি সন্ত্রান্ত গৃহে দুহিত ছিলেন। পিতৃকুলের সন্ত্রামে এবং কৃতী স্বামীর ও প্রতিভাবান পুত্রের গৌরবে তিনি আপনাকে গৌরবান্বিতা মনে করিতেন। সাধারণ নারগণের ন্যায় অকিঞ্চিৎকর প্রবৃত্তি তাহার হৃদয়ে স্থান প্রাপ্ত হইত না। মহদংশে জন্ম গ্রহণ করিলে যে মহদভিলাষ মনুষের হৃদয়ে, স্বভাবতঃ, উদিত হইয়া থাকে, জাহ্নবাদাসী মেধাবী পুত্রের হৃদয়ে তাহা বদ্ধমল করিবার জন্য সর্বদা চেষ্টা করিতেন। মধুসূদনের পিতাও তাহার সম- সাময়িকদিগের মধ্যে একজন প্রতিষ্ঠাবান্ ব্যবহারাজীব ছিলেন। পিতার সম্ভ্রম ও কৃতিত্ব বালক মধুসূদনকে মলাতে প্রণােদিত করিত। সেই জন্য লেখাপড়া সম্বন্ধে তাহাকে, কোন দিন, কাহারও তাড়না করিবার প্রয়ােজন হয় নাই ; নিজের উচ্চাভিলাষ ও আন্তরিক বিদ্যানুরাগ-গুণেই বাল্যজীবন। তিনি বঙ্গদেশের একজন অগ্রগণ্য বিদ্বান্ হইয়াছিলেন। কি পঠদ্দশায়, কি শিক্ষকতা কার্যের সময়, কি ব্যারিষ্টারাবস্থায়, মধুসূদন কখনই বিদ্যো- পার্জন সম্বন্ধে অয় প্রকাশ করেন নাই। ছাত্রাবস্থায় হিন্দু-কলেজে থাকিতে তিনি যেমন যত্নসহকারে গ্রন্থাভাস করিতেন, মান্দ্রাজে শিক্ষ- কত কাৰ্য্য করিবার সময়েও তেমনই করিতেন। মাদ্রাজে থাকিতে তেলেগু, তামিল, হিব্রু ও সংস্কৃত ভাষা এবং ফ্রান্সে থাকিতে ফরাসীস, জৰ্ম্মাণ ও ইতালীয় প্রভূতি ভাষা শিক্ষার জন্য তিনি দেহ, মন নিয়ােজিত করিয়াছিলেন। কলিকাতায় আসিয়াটিক সােসাইটির পুস্তকালয় এবং লণ্ডনের ব্রিটিস মিউজিয়াম, যখনই যেখানে সুবিধা পাইয়াছিলেন, তখনই সেখান হইতে গ্রন্থরাশি আনাইয়া, নিজের জ্ঞান-পিপাসা পরি- তৃপ্ত করিয়াছিলেন। রােগ, দরিদ্রতা, এবং পারিবারিক অশান্তি প্রভৃতি যে সকল বিঘ্ন মনুষ্যের জ্ঞান-লালসা বিশুদ্ধ করিয়া দেয়, মধুসূদনের জীবনে তাহার কোনটিরই অভাব ছিল না; কিন্তু নিত্যপ্রবহনশীল উৎসের ন্যায় তাহার জ্ঞানার্জনস্পৃহা, সংসারের কঠোর নিদাঘতাপের মধ্যেও, তাহার হৃদয় হইতে নিরন্তর নিঃসৃত হইত। এই জ্ঞানার্জনস্পৃহা এবং কাব্যানুরক্তি সম্বন্ধে তিনি তাহার কোন সন্ত্রান্ত বন্ধুকে এইরূপ লিথয়াছিলেন,-- “এ ধরার কভার মন বেদনিলে, কার কর-পদ্ম-স্পশে সারে সে দেন। বরদার দয়াসম? হাত বুলাইলে, জননী, ব্যথিত দেহে, কোথা ব্যথা থাকে? একথা তােমার কাছে অবিদিত নহে।” ** সংসার-যন্ত্রণায় নিপীড়িত হৃদয় যে বাদেবীর “করপদ্মম্পর্শে” সমস্ত যন্ত্রণা বিস্মৃত হইতে পারে, মধুসূদন আত্ম-জীবনে তাহার যথেষ্ট প্রমাণ প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন। * মধুসূদনের অপ্রকাশিত কবিতা হইতে গৃহীত।

জীবন-চরিত। মধুসূদন বহু ভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন এবং বহু গ্রন্থ পাঠ করিয়া- ছিলেন; কিন্তু তাহার সমস্ত শিক্ষার ও কাব্যানুরক্তি-রামায়ণ ও মহাভারত পাঠে অনুরাগ। অধ্যয়নের নির্য, তাহার কাব্যানুরক্তি। নানাদেশীয় কাব্য-শাস্ত্রের অনুশীলনে তাঁহার সমকক্ষ ব্যক্তি, বঙ্গদেশে, বােধ হয়, এ পর্যন্ত, অতি অল্পই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। তাহার জীবনের অন্যান্য অনেক গুণের ন্যায় এই কাব্যানুরাগ ও তাহার জননীর প্রদত্ত শিক্ষা হইতে পরিবর্ধিত হইয়াছিল। সে সময় স্ত্রীলােকদিগের মধ্যে বিদ্যাশিক্ষার বড় প্রচলন ছিল না। কিন্তু জাহ্নবীদাসী, তৎকালে ও, লেখা, পড়া শিক্ষা করিয়াছিলেন। তিনি রামায়ণ, মহাভারত, এবং কবিকঙ্কণ চণ্ডী প্রভৃতি বাঙ্গলা কাব্য সমূহ অতি যত্নের সহিত পাঠ করিতেন। তাহার স্মরণশক্তি অতি তীক্ষ্ণ ছিল ; পঠিত গ্রন্থের অনেক অংশ তিনি মুখে, মুখে আবৃত্তি করিতে পারিতেন। মেধাবী মেধাবী মধুসূদন, আট দশ বৎসর বয়সের সময়ে মাতাকে ও বাটীর অন্যান্য প্রাচীন মহিলাদিগকে এই সকল গ্রন্থ পাঠ করিয়া শুনাইতেন এবং মাতার দৃষ্টান্ত অনুসারে তাহা কণ্ঠস্থ করিতেন। কোন সহৃদয় ব্যক্তি যথার্থই বলিয়াছেন, মনুষ্য মাতৃস্তন্যের সঙ্গে যাহা শিক্ষা করে, জীবনে তাহা কখনও বিস্মৃত হইতে পারে না। মধুসূদনের সম্বন্ধে একথা অতি সুন্দররূপে প্রমাণিত হইয়াছে। বহু ভাষায় এবং বহু গ্রন্থে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াও, মাতৃ-প্রদত্ত শিক্ষার ফলে, রামায়ণ মহাভারত সম্বন্ধে মধুসূদনের অনুরাগের কখনও থৰ্ব্বতা হয় নাই। পূর্ণ বয়সে যখন সংস্কৃত, পারসীক, লাটিন, গ্রীক, ইংরাজ, ফরাসী, জৰ্ম্মাণ এবং ইতালীয়ান পৃথিবীর এই আটটী প্রধান ভাষার রত্ন ভাণ্ডার হার নিকট উন্মুক্ত হইয়াছিল এবং যখন তিনি বাল্মীকি, হােমর, ভার্জিল, দান্তে এবং মিল্টন প্রভৃতি মহাকবিদিগকে সুহৃদরূপে প্রাপ্ত হইয়া- ছিলেন, তখনও তিনি তাহার শৈশবের সহচর, দরিদ্র কাশীরাম দাস ও ৪ বাল্যজীবন। কৃত্তিবাসকে বিস্মৃত হইতে পারেন নাই। তাহার মান্দ্রাজ ইতে প্রত্যাগমনের পর তাহার কোন আত্মীয়, তাহার সহিত সাক্ষা যাইয়া, দেখেন, তিনি একখানি কাশীদাসী মহাভাই মনােযোংক সহিত পাঠ করিতেছেন! মধুসূদন বেশভূষায় এবং আহার, ব্যবহারে সাহেবের ন্যায় থাকিতেন ; সুতরাং তাহার আত্মীয় ব্যঙ্গ করিয়া বলিলেন, “একি! সাহেব লােকের হাতে মহাভারত ?” মধুসূদন হাসিয়া বলিলেন ; “সাহেব আছি বলিয়া কি বইও পড়িতে দিবে না? রামায়ণ, মহাভারত আমার কেমন ভাল লাগে, না পড়িয়া থাকিতে পারি না।" মান্দ্রাজে অবস্থান কালে, যখন, চর্চার অভাবে, তিনি বাঙ্গালাভাষা বিস্মৃত হইতেছিলেন, তখনও তিনি, কলিকাতা হইতে রামায়ণ ও মহাভারত আনাইয়া, যত্নের সহিত, পাঠ করিতেন। কেবল রামায়ণ, মহাভারত নহে; বাঙ্গালা ভাষার অনেক প্রাচীন কাব্যই তিনি অতি সমাদরের সহিত পাঠ করিতেন, এবং সেই সকল কাব্যের অনেক স্থলই তাহার কণ্ঠস্থ ছিল। চতুর্দশপদী কবিতাবলীতে তিনি তাহার স্বদেশীয় কবিগণের প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন, তাহা শিষ্টাচারের জন্য নয় ; তাহা প্রকৃতই তাহার আন্তরিক শ্রদ্ধার ও অনুরাগের ফল। রামায়ণ ও মহাভারত পাঠের সহিত মধুসূদনের ভবিষ্যৎ জীবনের অতি ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ বৰ্তমান আছে। যে মহা- রামায়ণ, মহাভারত পাঠের ফল। গ্রন্থদ্বয়, শত শত বৎসর অবধি, হিন্দু নরনারী- দিগকে অনুপ্রাণিত করিয়া আসিতেছে, এবং সহস্র, সহস্র ভারতসন্তান যাহা হইতে আপন; আপন ভাবী মহত্বের বীজ প্রাপ্ত হইতেছেন, তাহা মধুসূদনেরও প্রকৃতিদত্ত প্রতিভাকে অনুপ্রাণিত করিয়াছিল। বাল্যে পুনঃ পুনঃ রামায়ণ ও মহাভারত পাঠ করিয়া, তিনি তাহার কবিশক্তি- জীবন-চরিত। ; বিকাশের সহায়তা লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার ন্যায় আরও কত ভার- তীয় কবি যে এরূপ সহায়তা প্রাপ্ত হইতেছেন, তাহার সংখ্যা নাই। লােকের বিশ্বাস, কল্পতরুর নিকট প্রার্থনা করিলে, অভীষ্ট বর প্রাপ্ত হওয়া যায়। রামায়ণ ও মহাভারত হিন্দু-সন্তানের পক্ষে সেই কল্পতরু। আমাদিগের জাতীয় জীবন গঠনের পক্ষে এই দুই গ্রন্থ যেরূপ সহায়তা করিয়াছে, ইলিয়াদ ভিন্ন আর কোন কাব্য সেরূপ করিয়াছে কি না সন্দেহ। কত অনুতপ্ত হৃদয় ইহা হইতে শান্তি লাভ করিতেছে ; কত শােকীর্ণ প্রাণ ইহা হইতে সান্ত্বনা প্রাপ্ত হইতেছে ; কত স্বদেশবৎসল ইহা হইতে বীরত্ব ও স্বদেশপ্রেম শিক্ষা করিতেছেন ; এবং কত ভাবুক পুরুষ ইহা হইতে কবিশক্তি পরিপােষণের সহায়তা প্রাপ্ত হইতেছেন। রাজা পরীক্ষিত ইহা হইতে ঘাের অনুতাপযন্ত্রণায় মুক্তি পাইয়াছিলেন ; শিবাজী ইহা হইতে স্বদেশপ্রেম শিক্ষা করিয়াছিলেন ; তুলসীদাস ইহা হইতে ধৰ্ম্ম-জীবন লাভ করিয়াছিলেন ; এবং সেই প্রাচীন কাল হইতে আরম্ভ করিয়া বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারতের 'সহস্র, সহস্র কবি ইহা হইতে আপন, আপন কবিশক্তি পরিপােষণের উপযুক্ত উপাদান প্রাপ্ত হইতেছেন। মধুসূদনের প্রকৃতদন্ত কবিশক্তি বিকাশের পক্ষে যে সকল সামগ্রী অনুকূলতা করিয়াছিল, রামায়ণ ও মহাভারত পাঠ তাহাদিগের মধ্যে সর্বাগ্রে উল্লেখের যােগ্য। কিন্তু এই রামায়ণ ও মহাভারত পাঠ সম্বন্ধে বাল্মীকির ও বেদব্যাসের অপেক্ষা কৃত্তিবাসের ও কাশীদাসেরই নিকট মধুসূদন সমধিক ঋণী ছিলেন। মহর্ষিয়ের সৃষ্ট চরিত্র হইতে যদিও তিনি তাঁহার কাব্যসমূহের ব্যক্তি নির্বাচন করিয়াছিলেন ; কিন্তু তাঁহার ভাষাজ্ঞান, বর্ণনানৈপুণ্য, এবং পুরাণান্তর্গত বিষয় সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা কৃত্তিবাস ও কাশীদাস হইতেই লব্ধ। মেঘনাদবধের ও বীরাঙ্গনার অনেক স্থলেই, সেই জন্য, ইহাদিগের প্রভাব লক্ষিত হইবে।

বাল্যজীবন। মধুসূদনের কাব্যানুরক্তির অপর কারণ তাহার বাল্য-শিক্ষা। শৈশকে গ্রামস্থ পাঠশালায় তিনি যে শিক্ষকের নিকট শৈশব-শিক্ষা। বিদ্যাভ্যাস করিতেন, তিনি পারসীক ভাষায় ব্যুৎপন্ন ছিলেন। ছাত্রদিগকে তিনি অনেক পারসীক ভাষার কবিতা আবৃত্তি করিয়া শুনাইতেন, এবং তাহাদিগকে সেই সকল কবিতা কণ্ঠস্থ করিতে বলিতেন। তিনি নিজে কবিতা রচনা করিতে পারিতেন কি না, তাহা জানিতে পারা যায় না। তবে তিনি যে কবিতানুরাগী ছিলেন, তাহা তাহার ছাত্রদিগের হৃদয়ে কাব্যানুরাগ সঞ্চারিত করিবার চেষ্টা দ্বারাই সপ্রমাণ হইতেছে। শিক্ষক মহাশয়ের উপদেশ অনুসারে মধুসূদন, অল্প বয়সে, অনেক পারসী কবিতা কণ্ঠস্থ করিয়াছিলেন, এবং সমবয়সী- দিগকে তাহা আবৃত্তি করিয়া শুনাইতেন। হিন্দু-কলেজে অধ্যয়নের সময়েও তিনি পারস। “গজল” গান করিয়া সঙ্গীদিগকে আমােদিত করিতেন । মধুসূদনের কাব্যানুরক্তির অপর একটা কারণ তাহার সঙ্গীত-প্রিয়তা। বাল্য হইতে, গতবাদ্যেরও সঙ্গীত-প্রিয়তা। দিকে তাহার প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল। তাহার পিতার ও পিতৃব্যগণের ন্যায় তিনিও আগমনী ও বিজয়া-সঙ্গীত শুনিতে, শুনিতে গলদ এ হইতেন। অবস্থার কোনও রূপ পরিবর্তনে তাঁহার সঙ্গীতানুরাগের হ্রাস হয় নাই। তাহার, ব্যারিষ্টার হইয়া, ইংলণ্ড হইতে প্রত্যাগমনের পর, কোন ব্রাহ্মণ, একবার তাহার নিকট, একটী মােকদ্দমা সম্বন্ধে পরামর্শ জানিবার জন্য গিয়াছিলেন। মধুসূদনের সঙ্গে ব্রাহ্মণের পূর্ব-পরিচয় ছিল এবং তিনি জানিতেন যে, ব্রাহ্মণ অতি সুন্দর “সখীসম্বাদ” * গান করিতে পারেন। মধুসূদন মােকদ্দমার কথা কবিতার ন্যায়, 2 * বিরহ-কাতরা রাধিকার শ্রীকৃষ্ণকে 'সখীর প্রেরিত সাদ “সখীস নামে পরিচিত। ইহার কোন কোন সঙ্গীত অতি হৃদয়স্পর্শী। শিক্ষা ও রুচি পরিবর্তনের সঙ্গে ইহা ক্রমশঃ অপ্রচলিত হইতেছে।

১৪ জীবন-চরিত। রাখিয়া, সখীসম্বাদ শুনিবার জন্য, ব্রাহ্মণকে পীড়াপীড়ি আরম্ভ করিলেন, এবং তাহার নিকট, ক্রমান্বয়ে, দশ পনরটা সখীসম্বাদ শুনিয়া, বিনা অর্থ গ্রহণে, তাঁহার মােকদম সম্বন্ধে উপযুক্ত পরামর্শ দান করিলেন। মধুসূদনের সাহিত্যিক জীবন বুঝিতে হইলে তাহার শৈশব- সম্বন্ধীয় যে সকল বিষয়ের উল্লেখ আবশ্যক, জন্মভূমির সৌন্দয্য। আমরা, একে, একে, তাহার আলােচনা করি- মাছি। তাঁহার পিতামাতার কাব্যানুরাগ, তঁাহার শিক্ষকের কবিতা- প্রিয়তা এবং সেই সঙ্গে তঁাহার নিজের রামায়ণ ও মহাভারত পাঠে এবং সঙ্গীত-শ্রবণে প্রগাঢ় আসক্তি ইত্যাদি যে সকল উপাদানে তাহার ভবিষ্যৎ জীবন গঠিত হইয়াছিল, আমরা, ক্রমে ক্রমে, তাহার সকল গুলিরই উল্লেখ করিয়াছি। কেবল তাহার কপােতাক্ষৗ-সলিল-বিধৌতা, গ্রাম্য-সৌন্দর্য্যপূর্ণ জন্মভূমির বিষয় উল্লেখ করি নাই। প্রকৃতি আপন নীরব ভাষায় যে শিক্ষা প্রদান করেন, পৃথিবীর কোন কাব্য বা কোন উপদেষ্টার উপদেশ হইতে সে শিক্ষা লাভ করিতে পারা যায় না। প্রকৃতির নিত্যনবীন মুখশ্র৷ যে কত অপ্রেমিককে প্রেমিক ও কত অকবিকে কবি করিতেছে, তাহার সংখ্যা নাই। সেইজন্য, মধুসূদনের শৈশবের অন্যান্য অনুকূল উপাদানের ন্যায়, তাহার জন্মভূমির কথারও উল্লেখ আবশ্যক। প্রকৃতির অতি সৌন্দর্যময় নিকেতনে মধুসূদনের শৈশব অতিবাহিত হইয়াছিল। এক্ষণে ম্যালেরিয়ার প্রকোপে ভ্রষ্ট গৌরব হইলেও তাহার জন্মভূমি সাগরদাড়ী অতি সুকোমল গ্রাম্য শােভায় পূর্ণ। নদী, প্রান্তর, এবং বৃক্ষলতা প্রভৃতি যে সকল উপাদান লইয়া বঙ্গের পল্লীগ্রামের সৌন্দৰ্য্য, তাহার কোনটীরই সেখানে অভাব নাই। নিৰ্ম্মলসলিলা কপােতাক্ষী, ইহার তিনদিক বেষ্টন করিয়া, ধীরে ধীরে প্রবাহিত হইতেছে। ঘনসন্নিবিষ্ট বৃক্ষশ্রেণী, শাখায় শাখায় সম্বন্ধ হইয়া, স্থানে স্থানে, তাহার উপর অবনত হইয়া পড়িয়াছে। শ্যামল

No text on this page.

مادی و زرنخالفاظ | : لها !

বাল্যজীবন। ; তৃণাচ্ছাদিত ভূমি, নদীর তট হইতে জলের রেখা পর্যন্ত, প্রসারিত রহিয়াছে। নগরের কৃত্রিমতার সঙ্গে সেখানকার কোন সম্বন্ধ নাই। প্রকৃতি অতি সরল, গ্রাম্য-মূৰ্ত্তিতে সেখানে বিরাজিতা। নদীজলে কুল- ললনাগণ নানাবগাহন করিতেছেন; ক্ষুদ্র, বৃহৎ নানাপ্রকারের তরণী- সমূহ নদীবক্ষে গমনাগমন করিতেছে ; কৃষকবনিতাগণ, কলসীকক্ষে, নদীতটে দণ্ডায়মান হইয়া, একদৃষ্টিতে তাহাদিগের পানে চাহিয়া রহিয়াছে ; রাখালবালকগণ পশুপাল ছাড়িয়া, ইতস্ততঃ ক্রীড়া করি- তেছে ; দেখিলে, নগরের কোলাহল বিস্মৃত হইয়া, সেই সরল, গ্রাম্য সৌন্দর্য্যে মগ্ন হইয়া যাইতে হয়। কপােতাক্ষীর পশ্চিমদিকে দূরপ্রসারিত, শ্যামল প্রান্তর। নদীর উভয় তটে, বৃক্ষলতার অন্তরালে, স্থানে স্থানে, কৃষকদিগের কুটীর ; মধ্যে মধ্যে দুই একটা প্রাচীন বট বা অশ্বথবৃক্ষ। উদ্যান তসমূহের ঘনসন্নিবেশে গ্রামটী মধ্যাহ্নকালেও ছায়াপূর্ণ। মধুসূদনের কণ্ঠস্বর নীরব হইয়াছে; কিন্তু তাহার জন্মভূমির বিহগগণের সঙ্গীতের বিরাম হয় নাই। পাপিয়ার গগনপ্লাবী কণ্ঠস্বরে এখনও তাহা, পূর্বের ন্যায়, দিবারাত্রি প্রতিধ্বনিত হইতেছে। কত অযত্ন-সস্তৃত তরুলতা, উদ্যানজ বৃক্ষরাজীর সঙ্গে সম্মিলিত হইয়া, গ্রামটীকে আরণ্য- শােভায় অলঙ্কৃত করিয়া রাখিয়াছে। মধুসূদনের পৈত্রিক বাসভবনের অদূরবর্তী নদীতটে দণ্ডায়মান হইয়া, একবার, জ্যেঙ্গালােকে, পাপিয়ার দিগন্তপ্লাবী সঙ্গীত শ্রবণ করিতে করিতে, নিস্তব্ধ গ্রামটীর এবং ধীর- বাহিনী কপােতাক্ষীর দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিলে, অতি নীরস হৃদয়ও কবিজনােচিত সরসভাবে পুর্ণ হয় এবং গ্রামটীকে স্কটের ভাষায় “কৰিপুত্রের উপযুক্ত ধাত্রী” Meet nurse for a poetic child বলিতে ইচ্ছা করে। নিদাঘের জ্যোৎস্নালােকে যিনি কপােতাক্ষীর সৌন্দৰ্য:দর্শন করিবেন, তিনি বুঝিতে পারিবেন যে, মধুসূদন যে তাহাকে দুগ্ধস্রোতের সহিত তুলনা করিয়াছেন, তাহা অসঙ্গত হয় নাই।

জীবন-চরিত। খ্ৰীধৰ্ম্ম-গ্রহণের পর, মধুসূদন তাহার জীবনের অতি সামান্য অংশই সাগরদাঁড়ীতে অতিবাহিত করিয়া- জন্মভূমির প্রতি অনুরাগ। ছিলেন। কিন্তু স্বদেশের মনােহারিণী মুত্তি তাঁহার হৃদয়ে চিরজাগরূক ছিল। বাল্যাবস্থায় কোথায় তিনি ক্রীড়া করিতেন, কোথায় বেড়াইতে ভালবাসিতেন, পূর্ণবয়সে তাহা তাঁহার সুস্পষ্টরূপ স্মরণ ছিল। সারদাড়ীর রাস্তাগুলি পাকা করিয়া বাধাইবেন, কপােতাক্ষীতে একটী অবতরণিকা প্রস্তুত করাইয়া দিবেন এবং তাহার কূলে “মাইকেলােন্তান” নামক একটী উদ্যান নির্মাণ করাইয়া, সেখানে একটী বিদ্যালয় স্থাপন করিবেন, এই হার বাসনা ছিল। কিন্তু তাঁহার জীবনের অন্যান্য সহস্র অভিলাষের ন্যায় ইহার কোনটাই পূর্ণ হয় নাই। বহুকাল প্রবাসের পর, একবার সাগরদাঁড়াতে আসিয়া, তিনি বলিয়াছিলেন, “এই মধুমাখা স্থানে আসিলে যেমন আনন্দ পাওয়া যায়, পৃথিবীর আর কোন স্থানে যাইলে সেরূপ পাওয়া যায় না। আর এক দিন কপােতাক্ষীর কূলে বেড়াইতে বেড়াইতে বলিয়াছিলেন, “কপােতাক্ষ ! যে তােমার তীরে পাতার কুটীরে বাস করিতে পায়, সেও পরম সুখী।” সুদূর ফরাসী-ভূমি হইতে তিনি “কপােতাক্ষকে উদ্দেশ করিয়া লিখিয়াছিলেন ; “সতত, হে নদ, ভুমি পড় মার মনে। সতত তােমার কথা ভাবি এ বিরলে সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে শােনে মায়া-যন্ত্র-ধ্বনি) তব কলকলে জুড়াই এ কাণ আমি ভ্রান্তির ছলনে। বহুদেশে দেখিয়াছি বহু নলে, কিন্তু এ স্নেহের তৃৰা মিটে কার জলে ? দুগ্ধস্রোতেরূপী তুমি জন্মভূমি-নে।”

বাল্যজীবন। জননী জন্মভূমির মােহিনীমূৰ্ত্তি তাহার হৃদয়ে কিরূপ গভীরভাব অঙ্কিত করিয়াছিল, ইহা হইতেই তাহা সুস্পষ্ট প্রমাণিত হইবে। সেই জন্যই আমরা বলিয়াছি, মধুসূদনের সাহিত্যিক জীবন বুঝিতে হইলে তাহার শৈশব সম্বন্ধীয় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে, তাহার জন্মভূমির কথারও উল্লেখ আবশ্যক। মধুসূদন জননী প্রকৃতির নিকট যে অনুকূলতা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, শৈশবে তাহার কিরূপ ফল ফলিয়াছিল, এইবার শৈশবশিক্ষার ফল। আমরা তাহার আলােচনা করিব। শিক্ষা- বিস্তারের সঙ্গে লােকের প্রতিভা বিকাশের, দিন দিন, নূতন নূতন সুযােগ উপস্থিত হইতেছে । এখন কত দ্বাদশবর্ষীয় বালকের লিখিত কবিতা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইতেছে; কিন্তু মধুসূদনের সময়ে দেশের সে অবস্থা ছিল না। যতদিন তিনি, দেশে থাকিয়া, গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় অধ্যয়ন করিতেন, ততদিন তাঁহার পক্ষে কবিতা রচনা দ্বারা নিজের ভবিষ্যৎ জীব- নের আভাস প্রদর্শন করিবার সুযােগ ছিল না। কিন্তু তাহার স্বাভা- বিক প্রতি অন্যরুপে প্রকাশিত হইত। তাহার সঙ্গীতানুরাগের বিষয় পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। বাল্যকালে তাহার কণ্ঠস্বর অতি এবং তিনি সঙ্গীত করিতে অত্যন্ত ভালবাসিতেন। অত্যন্ত গীতির দুই একটা চরণ ভুলিয়া গেলে, তিনি নিজে তাহা পূরণ করিয়া দিতেন। সময়ে সময়ে, দুই একটা গান রচনা করিয়া সঙ্গীদিগকে শুনাইতেন, এবং শিক্ষকের নিকট যে সকল পারসী কবিতা অভ্যাস করিতেন, বাঙ্গা- লায় তাহার অনুকরণ করিবার চেষ্টা করিতেন। তাঁহার আরও একটা অভ্যাস ছিল। তিনি নিজে গল্প রচনা করিয়া সীদিগকে শুনাইতেন। পাছে, তাহার রচনা বলিয়া বুঝিলে, সঙ্গী তঁাহার গল্প শুনিতে না চান, সেই তিনি, “ইহা অমুকের নিকট শুনিয়াছি, এইরূপ বলিতেন। এই সকল গল্প এত শীঘ্র ও সুন্দররূপে বলিতেন যে, তাহার সমবয়সীরা মধুর ছিল, ১ চীন-চরিত। কিছুতেই তাহা তাহার নিজের রচনা বলিয়া বুঝিতে পারিতেন না। যে কল্পনা একদিন মেঘনা ও বীরাঙ্গনা প্রসব করিয়াছিল, এবং “যাহা অক্লান্তপক্ষ বিহগের ন্যায় স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল কোথাও বিচরণ করিতে টি করে নাই” শৈশবে তাহা এইরূপে বিকাশ প্রাপ্ত হইয়াছিল। মধুসূদনের সাহিত্যিক জীবন বুঝিবার জন্য তাহার শৈশব সম্বন্ধীয় যাহা কিছু বলিবার আবশ্যক, আমরা তাহার সাধারণ প্রকৃতি। সকল গুলিরই উল্লেখ করিয়াছি ; তাহার সাধারণ প্রকৃতি বুঝিবার জন্য এই সময়ের একটা ঘটনা উল্লেখ করিয়া বর্তমান অধ্যায় শেষ করিব। পূর্ণ-বয়সে মধুসূদন দারুণ উচ্ছল হইয়াছিলেন। অকিঞ্চিৎকর সুখের হয় সামাজিক, নৈতিক কোন প্রকার শাসনই তিনি গ্রাহ্য করিতেন না। অলােকসামান্য প্রতিভা সত্ত্বেও, সেই জন্য, তাহার জীবন দুঃখময় হইয়াছিল। তাহার সমকালীন বঙ্গদেশের প্রতিষ্ঠাবান্ ব্যক্তিদিগের মধ্যে উচ্ছল ব্যক্তির অভাব ছিল না। কিন্তু মধুসূদনের এবং তাহাদিগের মধ্যে এই পাথক্য ছিল যে, ঘাের কদাচারী হইয়াও, তাহারা এমনই কৌশলে লােকের চক্ষুতে ধূলি- নিক্ষেপ করিয়া, পলায়ন করিতে পারিতেন যে, কেহ তাহাদিগের কে- গ্রও দেখিতে পাইতেন না। দোষই হউক বা গুণই হউক, লােকের চকুতে এইরূপ ধূলি-নিক্ষেপ করিবার শক্তি মধুসূদনের কোন কালেই ছিল না। নিম্নলিখিত ঘটনা হইতে তাহার চরিত্রের এই বিশিষ্টতা সুন্দররূপ প্রতিপন্ন হইবে। একবার তঁাহার এক পিতৃপুত্র তঁাহাকে, পরামর্শ দিয়া, কোন প্রতিবাসীর গাছ হইতে খেজুররস চুরি করিতে লইয়া গিয়াছিলেন। দুই জনেই গাছে উঠিয়াছেন, এমন সময়ে, যাহার গাছ সে, পানিতে পারিয়া, তাড়া দিল। মধুসূদনের পিতৃপুত্র অনায়াসে পলাইয়া গেলেন ; কিন্তু মধুসূদন, গাছের উপর বসিয়া, উচ্চৈঃস্বরে * মামগতি ন্যায় এণত সাহিত্য-য়ি-লাব। ২৭১ পৃঃ।।

বাল্যজীবন। কঁদিতে আরম্ভ করিলেন ; শেষে বাটীর একজন ভৃত্য আসিয়া, তাহাকে, গাছ হইতে নামাইয়া, লইয়া গেল। পূর্ণবয়সেও তাহার কত জন সাঁ, তাহাকে এইরূপে গাছে তুলিয়া দিয়া, পলাইয়া গিয়াছিলেন ; মধুসূদনের পলাইবার সামর্থ্য ছিল না; তিনি ধরা পড়িয়া নিন্দাভাজন হইয়াছিলেন। এই সকল ঘটনা অতি সামান্য, জীবনচরিতে উল্লেখের অযােগ্য ; কিন্তু এক গাছি তৃণ উর্দ্ধে উৎক্ষেপ করিলে যেমন বায়ুর গতি নির্ণীত হয়, তেমনই এইরুপ সামান্য ঘটনা হইতেও, অনেক সময়ে, মনুষ্যের প্রকৃতি বুঝিতে পারা যায় বলিয়াই উল্লেখ করিতেছি। মধুসূদনের ১২১৩ বৎসর বয়সের সময়ে তাঁহার পিতা তাহাকে, শিক্ষাদানের জন্য, কলিকাতায় আনিতে সঙ্কল্প শিক্ষাৰ্থ কলিকাতায় আগমন। করিলেন। “মহ। বিদ্যালয়” * হিন্দুকলেজের গৌরব তখন দেশব্যাপী হইয়াছিল। রাজনারায়ণ দত্ত পুত্রকে সেই মহা- বিদ্যালয়ে প্রবেশ করাইতে মনস্থ করিলেন। পিতার ইচ্ছানুসারে মধু- সুজন কলিকাতায় আসিলেন এবং, অল্পদিন, খিদিরপুরের কোন ইংরাজী স্কুলে অধ্যয়নের পুর, আনুমানিক ১৮৩৭ খ্রীষ্টাব্দে, হিন্দুকলেজে প্রবেশ করিলেন। নাতিজ্ঞগণ বলিয়া থাকেন,মনুষ্যের ভবিষ্যৎ জীবন গঠনের পক্ষে প্রথম শিক্ষাক্ষেত্র গৃহ, দ্বিতীয় বিদ্যামন্দির। গৃহে পিতা, মাতার এবং আত্মীয়গণের দৃষ্টান্ত দ্বারা মধুসূদনের প্রকৃতির যে অংশ গঠিত হইয়াছিল, আমরা তাহার আলােচনা করিয়াছি। বিদ্যামন্দিরে শিক্ষকদিগের এবং সহাধ্যাম্বিগণের আদর্শে তাহার অপর অংশ যেরূপ গঠিত হইয়াছিল, এইবার তাহার আলােচনায় প্রবৃত্ত হই। প্রসিদ্ধ ইংরাজী সন্দৰ্ভ-লেখক আডিসন বলিয়াছেন, শিক্ষাশূন্য হৃদয় এবং আকর প্রস্তর দুই সমতুল্য। উপমাটি আরও একটু পরিস্ফুট করলে, ৰােখ হয়, বলা অসঙ্গত হইবে না যে, শিক্ষাশূন্য হৃদয় প্রস্তর এবং বিদ্যামন্দির ভাঙ্করা- ৗন হিলে “মহা বিদ্যালয়” নামে চিহিত হত।

২০
জীবনচরিত।
কত অসংস্কৃত প্রস্তর যে, এই ভাস্করালয় হইতে, দেবমূৰ্ত্তি গ্রহণ
করিয়া, বহির্গত হইতেছে, তাহার সংখ্যা নাই। সেই জন্য আমরা
মধুসূদনের সম্বন্ধিনী কথার সঙ্গে, যে কারু-গৃহে তাহার ভবিষ্যৎ জীবন
গঠিত হইয়াছিল, তাহারও কথা আলােচনা করিব।

দ্বিতীয় অধ্যায়। হিন্দু কলেজ—শিক্ষাবস্থা। [ ১৮৩৭–১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দ | মধুসূদন শিক্ষার জন্য যে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিলেন, তাহার অস্তিত্ব লােপ হইলেও, তাহার নাম এক্ষণে শিক্ষিত বঙ্গবাসী মাত্রেরই পরিচিত। বঙ্গদেশ আজ যাহাদিগের কাৰ্যকলাপে গৌরবান্বিত হইয়াছে, তাহা- দিগের মধ্যে অনেকেই এই বিদ্যালয়ের ছাত্র। স্বর্গীয় রামগােপাল ঘােষ, কেশবচন্দ্র সেন, দ্বারকানাথ মিত্র, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, দীনবন্ধু মিত্র, ভূদেব মুখােপাধ্যায়, এবং মহেন্দ্রলাল সরকার প্রভৃতি প্রাচীন হিন্দুকলেজকে অলঙ্কত করিয়াছিলেন। ধৰ্ম্মে, কৰ্ম্মে, চরিত্রে এবং বিদ্যায় ইহারা বঙ্গদেশের গৌরবস্থল। মধুসূদন যখন হিন্দুকলেজে প্রবেশ করিলেন, তখন ইহার পূর্ণ যৌবনাবস্থা। ছাত্রদিগের হিন্দুকলেজ ও তাহার ও শিক্ষকগণের গৌরবে হিন্দুকলেজ তখন শিক্ষকগণ। বঙ্গদেশের বিদ্যালয় সমূহের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়াছিল। ইংরাজী সাহিত্যে অসাধারণ পারদর্শী কাপ্তেন রিচার্ডসন, গণিতশাস্ত্রবিদ রিজ, ভাষা-তত্ত্ববিদ হ্যালফোর্ড এবং ক্লিন্ট প্রভৃতি সে সময়কার প্রসিদ্ধনামা অধ্যাপকগণ ইহাতে অধ্যাপনা করিতেন। জোন্স সাহেব স্কুল-বিভাগের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, এবং স্বর্গীয় রামচন্দ্র মিত্র ও রামতনু লাহিড়ী প্রভৃতি নিম্ন শ্রেণীর শিক্ষক ছিলেন। ইহাদিগের মধ্যে অনেকে, এক এক বিষয়ে, এক একজন প্রসিদ্ধ • ব্যক্তি ছিলেন ; সুতরাং মধুসূদন, সে সময়ে, এদেশের পক্ষে যতদূর সম্ভবপর, ততদূর উৎকৃষ্ট শিক্ষালাভের সুযােগ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

জীবন-চরিত। কলেজে প্রবেশ করিয়াই মধুসূদন একজন উৎকৃষ্ট ছাত্র বলিয়া পরি- গণিত হইলেন। প্রায় প্রত্যেক শ্রেণীতেই কলেজীয় শিক্ষা ও গৌরব। তিনি সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করিতেন, এবং যাহারা তাহার অপেক্ষা বয়ােজ্যেষ্ঠ ছিলেন, অথবা তাহার পূর্বে কলেজে প্রবেশ করিয়াছিলেন, অল্প দিনের মধ্যেই তাহাদিগকে অতিক্রম করিয়া উচ্চ শ্রেণীতে উঠিতে আরম্ভ করিলেন। তাহার কোন সহাধ্যায়ী তাঁহার শিক্ষাবস্থা সম্বন্ধে এইরূপ বলিয়াছেন; “যত্ন ও পরিশ্রমগুণে আমিও হিন্দু কলেজের একজন উৎকষ্ট ছাত্র বলিয়া গণনীয় হইয়াছিলাম, কিন্তু মধু আমাদিগের ভিতর ঔজ্জ্বল্যে তারকামণ্ডলীর মধ্যে বৃহস্পতির ন্যায় ছিল।* তাহার আর একজন সহাধ্যায়ী লিখিয়াছেন, “বয়সে মধু সূদন আমা অপেক্ষা ছােট ছিল, কিন্তু এমনই তাহার বিদ্যাবুদ্ধির জোর যে, আমাদিগের অনেক পরে হিন্দু কলেজে প্রবেশ করিয়া, লম্ফে লক্ষে নিম্নশ্রেণী সকল অতিক্রম করিয়া, অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ের মধ্যে সে আমাদের সমাধ্যায়ী হইয়াছিল। + মধুসূদন যখন হিন্দু কলেজে অধ্য যুন করিতেন, তখন ইহা দুইভাগে বিভক্ত ছিল। সর্বোচ্চ শ্রেণী হইতে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত “সিনিয়ার ডিপার্টমেন্ট”, এবং ষষ্ঠ শ্রেণী হইতে সর্ব- নিম্ন শ্রেণী পর্যন্ত “জুনিয়ার ডিপার্টমেন্ট' নামে অভিহিত হইত। যদিও সৰ্বশুদ্ধ অনেক গুলি শ্রেণী ছিল, তথাপি, উৎকৃষ্ট ছাত্রেরা একবারে দুই তিন শ্রেণী উপরে উঠিতে পারিতেন বলিয়া কাল-বিলম্বের অসুবিধা তাহা, দিগকে ভােগ করিতে হইত না ; এবং সেই জন্যই মধুসূদন অতি অল্প সময়ের মধ্যে কলেজের সর্বোচ্চ শ্রেণীতে উঠিতে পারিয়াছিলেন। "I was a very lull boy at the commencement, but by diligence and exertion became one of the stars of the College of which Modhu was the Jupiter. মধুসূদনের সহধ্যায়ী ও বাল্যসুহৃদ বন্ধুবিহারী দত্ত মহাশয়ের পত্র হইতে উদ্ধত। । নবজীবন ১২৯৪, পৌষ, ৩৪৩ পৃষ্ঠা। ৫ শিক্ষাবস্থা। २० তিনি ১৮৩৭ খৃষ্টাব্দে হিন্দু কলেজে প্রবেশ করেন, এবং ১৮৪২ খৃষ্টাব্দে কলেজ ত্যাগ করেন। হিন্দু কলেজের সিনিয়ার বিভাগের বা উচ্চ শ্রেণীর পাঠ্য বর্তমান সময়ের বি, এ পরীক্ষার পাঠ্য অপেক্ষা নিকৃষ্ট হইবে না; সুতরাং মধুসূদন, ১৮৩৭ হইতে ১৮৪২ পর্যন্ত নূনাধিক এই ছয় বৎসরের মধ্যে, যে প্রায় ইংরাজী বর্ণশিক্ষা হইতে বি, এ শ্রেণী পর্যন্ত পড়িয়া- ছিলেন, ইহা তাহার সুতীক্ষ্ণবুদ্ধির ও মেধাবিত্বের পরিচায়ক, সন্দেহ নাই। তিনি যে বৎসর হিন্দু কলেজের পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন, সেই বৎসর (১৮৪১ খৃষ্টাব্দে) সিনিয়ার ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষার নিয়ম প্রথম প্রবর্তিত হয়। কলেজের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রের সিনিয়র বৃত্তি, এবং তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রেরা জুনিয়ার বৃত্তি পরীক্ষা দিতে পারিতেন। মধুসূদন, পঞ্চম শ্রেণী হইতেই জুনিয়ার বৃত্তি পরীক্ষা দিয়া, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর অনেক ছাত্রকে অতিক্রম পূৰ্ব্বক, বৃত্তি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তাহার সময়ে যেমন অনেক প্রসিদ্ধনামা ব্যক্তি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন, তেমনই অনেক প্রতিভাবান্ ছাত্রও সেখানে অধ্যয়ন করিতেন। তাঁহার সহধ্যায়ী ও সমকালবী ছাত্রদিগের মধ্যে অনেকেই প্রতিষ্ঠাভাজন হইয়াছেন। স্বর্গীয় বাবু প্যারীচরণ সরকার, আনন্দকৃষ্ণ সহাধ্যায়ী ও সমকালবৰ্ত্তী বসু, জগদীশনাথ রায়, কিশােরীচাদ মিত্র, ভূদেব মুখােপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু এবং ভােলানাথ চন্দ্র প্রভৃতি হিন্দু কলেজের অনেক খ্যাতনামা ছাত্র, এই সময় কলেজে অধ্যয়ন করিতেন। বিদ্যা, বুদ্ধি, চরিত্র, এবং রাজদত্ত সম্মান প্রভৃতির জন্য ইহাদিগের অনেকেরই নাম বঙ্গসমাজে পরিচিত হইয়াছে। রাজনারায়ণ বাবুর ও ভূদেব বাবুর নাম বঙ্গীয় সাহিত্য-সেবকগণেরও সুপরিচিত। বঙ্গভাষায় ধৰ্ম্মনীতি ও সমাজনীতি বিষয়ক কয়েক খানি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ ইহাদিগের লেখনী-প্রসূত। নানা ছাত্রগণ।

२४ জীবন-চরিত। বিষয়ে বঙ্গসমাজ ইহাদিগের নিকট যে ঋণ প্রাপ্ত হইয়াছেন, তাহা বিস্মৃত হইবার নয়। মধুসূদন যে এইরূপ প্রতিষ্ঠাবান্ ছাত্রগণের মধ্যে “ঔজ্জ্বল্যে তারকা মণ্ডলীর মধ্যে বৃহস্পতির ন্যায় ছিলেন,” ইহা শিক্ষাবিবরণ। তাহার প্রতিভার পক্ষে সামান্য গৌরবের বিষয় নয়। তাহার সহধ্যায়ী ও সুহৃৎ বাবু ভূদেব মুখােপাধ্যায় তাহার ছাত্রাবস্থা সম্বন্ধে এইরূপ লিখিয়াছেন ; “কৰ্ম্মক্ষেত্রে অবতরণ করিয়া, ক্রমে ক্রমে, আমাকে অন্যূন কুড়ি লক্ষ ছাত্রের সংস্রবে আসিতে হইয়াছিল, কিন্তু মধুর ন্যায় প্রতিভা আর কাহাতেও কখন দেখি নাই।” গ্রামস্থ পাঠশালায় অধ্যয়ন করিবার সময়ে মধুসূদনের চরিত্রে যে সকল গুণ লক্ষিত হইত, হিন্দু কলেজের শিক্ষায় তাহা সমারূপ পরিবদ্ধিত হইয়াছিল। বিদ্যোপার্জনে অনুরাগ, অধায়নাসক্তি এবং উচ্চাভিলাষ প্রভৃতি তাহার শৈশবের গুণগুলি কলেজীয় শিক্ষায় আরও অধিক স্ফতি- লাভ করিয়াছিল। পাঠশালার কোন ছাত্র লেখাপড়ায় তাহাকে অতিক্রম করিলে, তিনি তাহা সহ্য করিতে পারিতেন না; 'কলেজেও যাহাতে তাহার কোন সহাধ্যায়ী তাহাকে পরাস্ত করিতে না পারেন, তজ্জন্য তিনি পরিশ্রম করিতে ক্ৰটী করিতেন না। কীটের ন্যায় কেবলই গ্রন্থমধ্যে আবদ্ধ থাকিবার অভ্যাস তাহার কোন কালেই ছিল না। স্বভাবতঃ তিনি রহস্য- প্রিয় ছিলেন, এবং সহাধ্যায়িগণের সহিত আমােদ, কৌতুক ইত্যাদি পূর্ণমাত্রায় করিতেন। কিন্তু লেখাপড়া করিতে বসিলে আমােদ, আহলাদ কিছুই তাহার মনে থাকিত না। বিষয়বিশেষে মনঃসংযম করিবার শক্তিও তাহার অসাধারণ ছিল। পড়িতে আরম্ভ করিলে ক্ষুধা, তৃষ্ণা সমস্তই তিনি বিস্মৃত হইতেন। কলেজের মধ্যে একজন বহুগ্রন্থপাঠী ছাত্র বলিয়া তাহার প্রতিষ্ঠা ছিল । কলেজের পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নের সময়ে তিনি ইংরাজী-সাহিত্য-সম্বন্ধে এত গ্রন্থ পাঠ করিয়াছিলেন যে, বর্তমান শিক্ষাবস্থা। এ .. সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিধারী অনেক উৎকৃষ্ট ছাত্রও তত পাঠ করেন কি না সন্দেহ। পাঠাবস্থায় সাহিত্যেরই দিকে তাঁহার অধিক অনুরাগ ছিল; এবং অন্য বহু সাহিত্যসেবীর ন্যায় তিনিও, সাহিত্যের প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগবশতঃ, গণিত-চর্চা সম্বন্ধে ঔদাসীন্য-প্রকাশ করিতেন। নিম্ন শ্রেণীতে অধ্যয়নের সময়ে তাহার গণিতে বিরাগ ছিল না ; বরং অন্য কেহ তাহাকে গণিতে অতিক্রম করিলে তিনি অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করিতেন। কিন্তু উচ্চ শ্রেণীতে উঠিয়া যতই তিনি সাহিত্যের আলােচনা করিবার সুযােগ প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন, ততই তাঁহার গণিতের প্রতি অশ্রদ্ধা বদ্ধিত হইতে লাগিল। গণিতের সময়ে,হয়, তিনি কোন উপন্যাস বা কাব্য পড়িয়া কাটাইতেন, না হয়, একবারেই স্বশ্রেণীতে উপস্থিত থাকিতেন না। গণিতের প্রতি তাঁহার এইরূপ বিরাগ সম্বন্ধে কিন্তু একটি কথা বলা আবশ্যক। অনেকে এমন আছেন যে, গণিতে কিছুতেই তাহাদিগের বুদ্ধির স্ফুর্তি হয় না, এবং সহস্র চেষ্টা করিলেও তাহাদিগের মস্তিষ্ক গণিতের জটিলতা ভেদ করিতে পারে না। মধুসূদন এ শ্রেণীর অন্তর্গত ছিলেন না। গণিতে যে তাহার স্ফতি হইত না, তাহা নয় ; ভাল লাগিত না বলিয়া, স্বেচ্ছাক্রমেই, তিনি গণিতনুশীলন ত্যাগ করিয়াছিলেন; কিন্তু যে দিন ইচ্ছা হইত, তাহাতে এমনই পারদর্শিতা দেখাইতে পারিতেন যে, সকলেই দেখিয়া বিস্মিত হইতেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ এক দিনের একটি ঘটনা উল্লিখিত হইতেছে। প্রসিদ্ধনামা রিজ সাহেব হিন্দুকলেজের গণিতধ্যাপক ছিলেন। * গণিত-শাস্ত্রে তাহার অসাধারণ পারদর্শিতা ছিল । যাহারা তাহার নিকট অধ্যয়ন করিয়াছেন, তাঁহারা বলেন যে, তাঁহার ন্যায় গণিতজ্ঞ ব্যক্তি বুদ্ধির ইনি সম্রাট প্রথম নেপালিয়নের ধ্বজা-বাহক ছিলেন বলিয়া এসিদ্ধি আছে জীবন-চরিত। এদেশে অতি অল্পই আসিয়ছেন। মধুসূদনের ন্যায় বুদ্ধিমান্ ছাত্রকে গণিতনুশীলন ত্যাগ করিতে দেখিয়া, তিনি প্রথমে অনেক বুঝাইয়া- ছিলেন। কিন্তু যখন দেখিলেন যে, মধুসূদন কিছুতেই গণিতাধ্যয়নে প্রস্তুত নহেন, তখন নিশ্বাস হইয়া ক্ষান্ত হইয়াছিলেন, তাঁহাকে আর কোন কথা বলিতেন না। একদিন তিনি এমনই একটি দুরূহ প্রশ্ন দিলেন যে, গণিতে বিশেষ পারদর্শী ছাত্রদিগের মধ্যে কেহ তাহার উত্তর করিতে সমর্থ হইলেন না। ইহার কিছুদিন পূর্বে মধুসূদনের ও তাহার সহাধ্যামিগণের মধ্যে সেক্সপীয়ার ও নিউটন উভয়ের মধ্যে প্রতিভায় কে শ্রেষ্ঠ, এই কথা লইয়া তর্ক-বিতর্ক হইয়াছিল। বাবু ভূদেব মুখােপাধ্যায় ও আরও দুই একজন গণিত ও সাহিত্য। গণিত-পক্ষপাতী ছাত্র নিউটনের পক্ষ সমর্থন করিয়াছিলেন। মধুসূদন সাহিত্য-সেবক, তিনি সেক্সপীয়ারের পক্ষ সমর্থন করিয়া বলিয়াছিলেন, “সেক্সপীয়ার চেষ্টা কৰিলে নিউটন হইতে পারিতেন, কিন্তু নিউটন চেষ্টা করিলে কখনও সেপীয়ার হইতে পারিতেন না।” এই কথার পর হইতে মধুসূদন যে গােপনে, গােপনে অঙ্ক কসিতে শিখিতেছিলেন, তাঁহার সহধ্যায়িরা কেহ তাহা জানিতেন না। এক্ষণে রিজ, সাহেবের প্রশ্নে অপর সকলকে অধােমুখ দেখিয়া, মধুসূদন অঙ্ক কসিতে আরম্ভ করিলেন। ভূদেব বাবু অল্পক্ষণ পরেই দেখিলেন, মধুসূদন অঙ্কটা কসিয়া প্রায় শেষ করিয়া আনিয়াছেন। তিনি, বিস্মিত হইয়া, রিজ সাহেবকে বলিলে মিজ, সাহেব, মধুসুদনকে স্কুলের বাের্ডে, সকলের সমক্ষে, অঙ্কটা কসিতে বলিলেন। মধুসূদন অতি সুন্দর প্রণালীমে অঙ্কটা কসিয়া আসিলেন এবং ভূদেব বাবুর গা টিপিয়া, তিন মাস পূর্বের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া, বলিলেন, “কেমন, সেক্সপীয়ার চেষ্টা করিলে যে নিউটন হইতে পারিতেন তাহা দেখিলে ত? কিন্তু আমার গণিত শেখা এই পর্যন্ত শেষ।”

অধ্যয়নাবস্থায় মধুসূদন যে কেবল একজন বহুগ্রন্থপাঠী ছাত্র বলিয়া পরিচিত হইয়াছিলেন, তাহা নয় ; কলেজের ইংরাজী রচনার অভ্যাস। মধ্যে একজন উৎকৃষ্ট ইংরাজী-লেখক ছাত্র বলিয়াও প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। ইংরাজী-রচনায় তাহার সম- কক্ষ ছাত্র কলেজের মধ্যে অতি অল্পই ছিলেন। সভাসমিতিতে রচনা- পাঠ করা এবং সংবাদপত্রে লেখা তখনকার ছাত্রদিগের মধ্যে বহুল প্রচ- লন ছিল। কি শিক্ষক, কি অভিভাবক, সকলেই ছাত্রদিগকে এ সম্বন্ধে উৎসাহদান করিতেন। উচ্চশ্রেণীর ছাত্রদিগের মধ্যে অনেকেরই কোন না কোন সংবাদপত্রের সহিত সম্বন্ধ ছিল। নিম্নশ্রেণীর ছাত্রেরা, সেরূপ সুযােগের অভাবে, উচ্চশ্রেণীর ছাত্রদিগের অনুকরণে, হস্তলিখিত সংবাদপত্রের প্রচার দ্বারা গ্রন্থকার হইবার বাসনা চরিতার্থ করিতেন। মধুসূদন ও তাঁহার হিন্দু-স্কুলস্থ সহাধ্যায়িগণ, একত্রে, এইরূপ একখানি হস্তলিখিত সংবাদপত্র প্রচার করিতেন। এই পত্রখানি তিন চার মাস চলিয়াছিল। কাপ্তেন রিচার্ডসন, নবীন লেখকদিগকে উৎসাহিত করি- বার জন্য, প্রতি সপ্তাহে, ইহা নিয়মমত পাঠ করিতেন। কিন্তু বালক- বালিকা ধূলি-খেলার সংসার যেমন দেখিতে দেখিতে প্রকৃত সংসারে পরিণত হয়, মধুসূদনের সেই বাল্যক্রীড়াও, তেমনই, অল্পদিনের মধ্যে, প্রকৃত ব্যাপারে পরিণত হইয়াছিল। ইহার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি একখানি সংবাদপত্রে লিখিবার সুযােগ প্রাপ্ত হইলেন। হিন্দু কলেজের শিক্ষক, বাবু রামচন্দ্র মিত্র, এই সময়ে, সিককৃষ্ণ মল্লিকের প্রতিষ্ঠিত “জ্ঞানান্বেষণ’ পত্রিকা সম্পাদন করিতেন। মধুসূদনের কোন সহধ্যায়ী তাহাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মন্তব্য, সংবাদ ইত্যাদি লিখিতেন। মধুসূদন, তাহা অবগত হইয়া, জ্ঞানান্বেষণে লিখিতে আরম্ভ করিলেন। তাঁহার লিখন- প্রণালীতে প্রীত হইয়া, সম্পাদক তাহার লিখিত বিষয়গুলি, আহলাদ সহ- কারে প্রকাশিত করিতে লাগিলেন। এইরূপে সপ্তদশৰ বয়সে, হিন্দু ২৮ জীবন-চরিত। কলেজের পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়নের সময়ে, মুদ্রান্ত্রের সঙ্গে মধুসূদনের সম্বন্ধ আরব্ধ হইল। বিদ্যানুশীলনে অনুরাগের ন্যায় মধুসূদনের স্বাভাবিক প্রেম প্রবণতা এবং পরদুঃখকাতরতাও, কলেজে অধ্যয়না- প্রেমপ্রবণতা। বস্থায়, তাহার প্রকৃতিতে সম্যক্ পরিস্ফুট হইয়াছিল। রাজপথের রােরুদ্যমান ভিক্ষুক বালক ও দারিদ্র্যপীড়িত, সহাধ্যায়ী ছাত্র উভয়েরই অভাব মােচনে বালক মধুসূদন সমভাবে তৎপর ছিলেন। পিতা মাতার অনুগ্রহে তাহার অর্থাভাব ছিল না ; বিপন্নের সেবায় ব্যয় করিয়া তিনি, অনেক সময়, পিতৃদত্ত অর্থের সার্থ কতা করিতেন। কিন্তু দানশীলতা অপেক্ষা প্রেম প্রবণতাই তাহার চরিত্রের সমধিক উল্লেখযােগ্য লক্ষণ। যাহারা তাহার সহিত ঘনিষ্ঠরূপে পরিচিত, তাহারা সকলেই একবাক্যে বলেন যে, তিনি যেমন প্রেম- প্রবণ ও স্নেহা হৃদয় ছিলেন, অতি অল্প লােকই সেরূপ দৃষ্টিগােচর হয়। তাঁহার সহাধ্যায়ী, সু প্রসিদ্ধ "Travels (of a Hiniu” নামক গ্রন্থ প্রণেতা, বাবু ভােলানাথ চন্দ্র বলেন; “Modhu fully justified his name-he was al] --মধু-all that endeared one t() another,” —বাল্যবন্ধুদিগকে তিনি সম্পূর্ণরূপে আত্মবিস্মৃত হইয়াই ভাল বাসিতেন। ডিসরেলী যথার্থই বলিয়াছেন, “মানুষ পূর্ণবয়সে যতই ভাল বাসুন, বাল্যবন্ধুতার উল্লাস অথবা অবসাদ কখনও প্রাপ্ত হইতে পারেন না। জীবনের কোন সুখ বাল্যবন্ধুতার সুখের ন্যায় হৃদয় পূর্ণ করে না; ঈর্ষা অথবা নৈরাশ্যের কোন যন্ত্রণা এমন :নিষ্পেষক অথবা মর্মভেদী বলিয়া বােধ হয় না। বাল্যবন্ধুতায় যে মধুরতা, যে আত্মবিসর্জন, পরস্পরের প্রতি যে অসীম বিশ্বাস, বিরহে যে তীব্রতা, এবং পুনর্মিলনে যে দ্রবী- তাব, অপর কোন বয়সের প্রণয়ে তাহা ঘটিবার নয়। বাল্যবন্ধুতার শিক্ষাবস্থা । - - - - - - - me নৈরাশ্যে কত হৃদয় যে নিষ্পিষ্ট এবং কত আশা যে বিশুষ্ক হইয়া যায়, তাহার সংখ্যা নাই। বাল্যবন্ধুতা হইতে অনেকের ভবিষ্যৎ জীবনেরও আভাস প্রাপ্ত হওয়া যায়। লর্ড বায়রণ তাঁহার বাল্যবন্ধুতার প্রসঙ্গে afcariscana; "My School-friendships were with passions.” এই প্রেম-পিপাসু বালক বায়রণের পরিণাম কি হইয়াছিল, তাহা কাহারও অবিদিত নাই। প্রেমপিপাসু বালক মধুসূদনেরও বাল্যবন্ধুতার আলােচনা করিলে, তাহার ভবিষ্যৎ জীবনের আভাস প্রাপ্ত হওয়া যাইবে। পঠশায় যাঁহাদিগের সহিত তাঁহার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল, তাহাদিগের মধ্যে বাবু, ভূদেব মুখােপাধ্যায়ের এবং বাবু গৌরদাস বসাকের নাম বিশেষরূপ উল্লেখযােগ্য।* মধুসূদন এই সময় গৌরদাস বাবুকে যে সকল পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহা হইতে তাহার বাল্যপ্রেমের প্রগাঢ়তা, অধ্যয়নাসক্তি, উচ্চাভিলাষ, স্বেচ্ছাচারপ্রিয়তা এবং উদ্দাম ঔদ্ধত্য প্রভৃতি দোষ, গুণ অনেক জানিতে পারা যায় । কিন্তু পত্রগুলি ইংরাজীতে লিখিত বলিয়া আমরা তাহা উদ্ধৃত করিতে নিরস্ত হইলাম। কৌতূহলী পাঠক ,মধুসূদনের বিস্তৃত জীবন-চরিতে তাহা দেখিতে পাইবেন। মধুসূদনের শিক্ষাবস্থা সম্বন্ধে আরও দুই চারিটী কথা বলা আবশ্যক। অসাধারণ বিদ্যাবুদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াও তিনি যে আত্মসংযম ও সুনীতির শান্তিতে জীবন অতিবাহিত করিতে পারেন অভাব। নাই, আত্মসংযমের ও নীতি-পরায়ণতার সম্বন্ধে ভক্তিভাজন ভূদেববাবুর নাম বঙ্গের কৃতবিদ্যমাত্রেরই পরিচিত ; সুতরাং তাহার পরিচয় প্রদান নিষ্প্রয়ােজন। বাবু গৌরদাস বসাকেরও নাম সাধারণের অবিদিত নয়। ইনি কলিকাতার সুপ্রসিদ্ধ বসাক বংশীয়। হিন্দুকলেজের পাঠ সমাপন করিয়া ইনি, বহুদিন, যােগ্যতার সহিত ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেটের কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, এবং কলিকাতার একজন অনারারী মাজিষ্ট্রেট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ও আসিয়াটিক সােসাইটির একজন উৎসাহী সভ্য ছিলেন।

জীবন-চরিত। ঔদাসীন্যই তাহার প্রধান কারণ। তাঁহার সর্বনাশের বীজ পদ্দশাতেই তাহার চরিত্রে উপ্ত হইয়াছিল। তাঁহার পিতা ওকালতী করিয়া যথেষ্ট অর্থ উপার্জন করিতেন, সুতরাং মধুসূদনের অর্থাভাব ছিল না। একমাত্র সন্তান বলিয়া তাহার জননী, তাহাকে ব্যয়ের জন্য, প্রয়ােজনাতিরিক্ত অর্থ দিতেন। সুতরাং মধুসূদন বেশভূষায় ও ব্যয় সম্বন্ধে কলেজের লক্ষপতির সন্তানদিগেরই ন্যায় চলিতেন। হিন্দুকলেজ, প্রধানতঃ, ধনিসন্তান- দিগেরই জন্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল এবং কলিকাতার প্রসিদ্ধ ধনবান্ পরিবারের বালকেরাই তথায় অধ্যয়ন করিতেন। সুতরাং বিলাসপ্রিয়তা হিন্দু-কলেজের ছাত্রদিগের মধ্যে বড়ই সাধারণ ছিল। এই বিলাস প্রিয়তা সম্বন্ধে মধুসূদন আর অপর সকলের অগ্রবর্তী ছিলেন। নিত্য নূতন, নূতন পরিচ্ছদ এবং নূতন নূতন গন্ধদ্রব্য না হইলে তাহার পরিতৃপ্তি হইত না। অতি অকিঞ্চিৎকর কাৰ্য্যেও তিনি সময়ে সময়ে, প্রয়ােজনাতিরিক্ত অর্থব্যয় করতেন। তাহার একদিনের ব্যবহার হইতে তাহার প্রকৃতি অনুমান করিতে পারা যায়। একদিন সাহেব ক্ষৌরকারের দোকান হইতে চুল ছাঁটিয়া আসিয়া মধুসূদন সহাধ্যায়ী- দিগকে বলিলেন ; “দেখ, আমার কেমন সুন্দর চুল ছাঁটা হইয়াছে, আমি ইহার জন্য এক মােহর দিছি।” কিন্তু এই বিলাসপ্রিয়তা অপেক্ষা গুরুতর আরও কোন কোন দোষ, এই সময়ে, তাঁহাকে স্পর্শ করিয়াছিল, এবং সেই সকল দোষই, পরিণামে, তাহার সর্বনাশের কারণ হইয়াছিল। তাহার সমকালবর্তী হিন্দুকলেজের আরও বহু ছাত্র পঠদ্দশায় তাহারই ন্যায়, দুর্বলতা দেখাইয়াছিলেন। তবে তঁাহারা, একবার ঋলিতপদ হইয়া, আবার উঠিয়াছিলেন, দুর্ভাগ্যক্রমে, মধুসূদন তাহা পারেন নাই। অধ্যয়নাবস্থায় মধুসূদনের চরিত্রে যে সমস্ত দোষ, গুণ পরিস্ফুট হইয়াছিল, আমরা একে একে, তাহা আলােচনা করিয়াছি। তাহার শিক্ষাবস্থা। ৩১ অধ্যয়নশীলতা, সাহিত্যানুরাগ, প্রেম-প্রবণতা, বিলাসিতা প্রভৃতি সমু দায়ই উল্লিখিত হইয়াছে; কিন্তু যে শিক্ষা তাহাকে “কবি মধুসূদন” করিয়াছিল, তাহার উল্লেখ করা হয় নাই। কবি-শক্তি মনুষ্যের প্রকৃতি-দত্ত গুণ ; সুতরাং হিন্দুকলেজের শিক্ষায় মধুসূদন যে তাহার কবিশক্তি লাভ করিয়াছিলেন, তাহা নয়। তবে হিন্দু কলেৰীয় শিক্ষা হইতে তাহার প্রকৃতি-দত্ত শক্তি যে ঘূৰ্ত্তিলাভের সুযােগ প্রাপ্ত হইয়া ছিল, তাহাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নাই। আমরা পরবর্তী অধ্যায়ে ইহা বিস্তৃতরূপে আলােচনা করিব।

তৃতীয় অধ্যায়। শিক্ষাবস্থা—১৮৪১-৪২ খ্রীষ্টাব্দ ;-কবিতা-রচনায় অভ্যাস। হিন্দুকলেজের প্রসিদ্ধনামা শিক্ষক, কাপ্তেন ডি এল রিচার্ডসনের প্রদত্ত শিক্ষাই মধুসূদনের কবিশক্তি-বিকাশের প্রধান সহায় হইয়াছিল। রিচার্ডসনের নাম, ক্ৰমশঃ, বিলুপ্ত হইয়া আসিতেছে ; কিন্তু তিনি যে, এক সময়ে, এদেশের বিন্মণ্ডলীর কিরূপ সমাদর-ভাজন ছিলেন, এবং এদেশের অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তির জীবনগঠনে কিরূপ সাহায্য করিয়া- ছিলেন, এখন তাহা অনুমান করা দুঃসাধ্য। তিনি প্রথমে ইষ্ট ইণ্ডিয়া- কোম্পানির অধীনে সৈনিক.কাৰ্যে ব্ৰতী হইয়া, এদেশে আগমন করেন, এবং সৈনিক-কার্যের সহিত সম্বন্ধ হইতেই তিনি সাধারণের নিকট কাপ্তেন রিচার্ডসন নামে খ্যাত। কিন্তু তাহার স্বাভাবিক প্রবণতা সাহি- ত্যেরই দিকে ছিল। কিছুদিন সৈনিক-বিভাগে কার্যকরিবার পর, তিনি কোম্পানির অধীনতা ত্যাগ করেন, এবং, অল্পদিন, ভারতের তদানীন্তর শাসনকর্তা, মহাত্মা লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের সহচারিত্ব করিয়া, ১৮৩৫ খ্রীষ্টাব্দে, হিন্দু কলেজে প্রবেশ করেন। ইষ্ট-ইণ্ডিয়া- কোম্পানির অধীনে কাৰ্য্য করিবার সময় হইতেই তিনি একজন সুলেখক বলিয়া প্রসিদ্ধিলাভ করিয়াছিলেন। সেই সময়কার ভারতীয় ও ইংলণ্ডায় অনেক প্রধান, প্রধান সংবাদপত্রের সহিত তাহার সম্বন্ধ ছিল। তদ্ভিন্ন কয়েকখানি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র কবিতা-পুস্তক প্রণয়ন ও সাহিত্য- বিষয়ক পত্রিকার সম্পাদন দ্বারা তাহার নাম তাঁহার দেশীয় পণ্ডিত- মণ্ডলীরও পরিচিত হইয়াছিল। কিন্তু তাহার নিজের রচনাশক্তি অপেক্ষা শিক্ষাবস্থা-কবিতা রচনার অভ্যাস। অন্যের রচনার দোষ, গুণ নির্বাচন করিবার ক্ষমতার জন্যই তিনি সমধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন। প্রকৃত কবি-কৌলীন্য উপলব্ধি করিবার তাহার ন্যায় শক্তি অতি অল্প লােকের মধ্যেই দৃষ্টিগােচর হয়। তাহার ছাত্র- দিগের মধ্যে অনেকের বিশ্বাস যে, কাব্যশাস্ত্রের রসাস্বাদ ও অর্থগ্রহ করিতে রিচার্ডসনের ন্যায় সুনিপুণ অধ্যাপক এদেশে অতি অল্পই আসিয়াছেন। তাহার অধ্যাপনা প্রণালীও অতি চমৎকার ছিল। যে গ্রন্থ তিনি অধ্যাপনা করিতেন, তাহার দুরূহ অংশ সমূহ তিনি এরূপ নৈপু- ণ্যের সহিত পাঠ করিতে পারিতেন যে, তাহার একবার আবৃত্তি মাত্র, ছাত্রদিগের, অনেক স্থলে, তাহার অর্থগ্রহ হইত । সুপ্রসিদ্ধ লড মেকলে তাহার সেক্সপীয়ার-আবৃত্তি সম্বন্ধে তাঁহাকে বলিয়াছিলেন যে, “আমি ইংলণ্ডে প্রতিগমন করিলে, ভারতের আর সমস্ত বিষয় বিস্মৃত হইতে পারি, কিন্তু তােমার সেক্সপীয়ার-আবৃত্তি বিস্মৃত হইতে পারিব না।” আধুনিক অনেক অধ্যাপকের ন্যায় তিনি কেবল দুরূহ শব্দের বা দুর্বোধ্য পদের ব্যাখ্যা করিয়াই পরিতৃপ্ত হইতেন না, ছাত্রদিগের মনােবৃত্তির যাহাতে উন্মেষ হয়, তজ্জন্য যথােচিত চেষ্টা করতেন। তিনি তাহাদিগের ভাবগ্রাহিতার উদ্দীপন করিবার জন্য, তাহাদিগের সম্মুখে বাহাজগতের ও অন্তর্জগতের গূঢ় সৌন্দর্য প্রকটিত করিতেন এবং তাহাদিগকে বলিতেন, “দেখ, এই বাহ্যজগৎ কেমন সুন্দর! কেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ! এই নক্ষত্ৰ-মণ্ডিত আকাশ, এই তরঙ্গায়িত মহাসমুদ্র, এই সৌন্দৰ্য্যময় প্রদোষ, এই বাসন্ত-কুসুম-সজ্জিত উপবন কি অপূৰ্ব্ব শােভায় সুশােভিত ! পতির নিকট সতীর ন্যায় প্রকৃতি কবিগণেরই নিকট আপনার সৌন্দর্য্য প্রকাশ করেন। সাধারণের নিকট প্রকৃতির যে মূর্তি শুষ্ক ও কঠোর বলিয়া বােধ হয় কবির নিকট তাহা সরস ও লালিত্যময় প্রতীয়মান হয়। প্রতীয়মান হয়। তােমরা কৰি হও, ৰাহ্যজগতের অদৃষ্টপূৰ্ব : শােভা দেখিয়া মুগ্ধ হইবে। সেই সঙ্গে ৩ জীবন-চরিত। মান-হৃদয়েরও গূঢ় রহস্য আলােচনা করিতে শিক্ষা কর।* অপমানিত মানব-হৃদয় প্রতিহিংসায় কি পিশাচমূর্তি ধারণ করে, তাহার দৃষ্টান্ত দেখ সাইলকে ; ভবিষ্যতে কি ঘটিবে চিন্তা না করিয়া প্রেমিক কেমন পতঙ্গের ন্যায় অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপ দেয়, তাহার দৃষ্টান্ত দেখ রােমিও ও জুলিয়েটে ; প্রণয়িনীর উপর সন্দেহ জন্মিলে প্রণয়ী কিরূপ উন্মত্তের ন্যায় কাৰ্য্য করে, তাহার দৃষ্টান্ত দেখ ওথেলােয়। এই বাহাজগতের ও অন্তর্জগতের রহস্যভেদ করিতে না পারিলে, তােমাদিগের শিক্ষার সার্থ- কত হইবে না। দেখ, যে মহাকবিগণ এই অপ্রত্যক্ষ জগৎ, বর্ণনা গুণে, তােমাদিগের প্রত্যক্ষ করাইতেছেন, তাহাদিগের কি সৃষ্টিনৈপুণ্য, কি রচনাকৌশল! যদি সুলেখক হইতে চাও, তবে ইহাদিগকে আদশ কর। এইরূপ শব্দবিন্যাস এবং এইরূপ ভাষার পারিপাট্য না হইলে রচনার উৎকর্ষ হয় না।” এরূপ শিক্ষাদানে যে ফল প্রত্যাশা করা To a * তাহার সারসংগ্রহের ভুমিকায় রিচার্ডসন লিখিয়াছিলেন ;- To cold and vulgar minds how large a portion of this beautiful world is a dreary blank! They recognise nothing but an uninteresting monotony in the daily aspect of the earth or sky. It is the spirit of poetry which keeps the world fresh and young. poetical eye every morning's sun seems to look rejoicingly on a new creation. Poetry widens the sphere of our purest and most permanent enjoyments. It makes the familiar new, the past present, the distant near. It is the philosopher's stone discovered it transmutes everything into gold. তিনি অন্য এ লিখিয়াছিলেন- । It is the part of poetry to lift us above the reach of petty cares and sensual desires ; and to make us feel that there is some thing pobler and more permanent than the ordinary pleasures of the world. It is a species of religion, Poets are nature's priests. They lead us "from nature up to nature's God."

শিক্ষাবস্থা-কবিতা রচনার অভ্যাস। যাইতে পারে, তাহাই ফলিয়াছিল। রিচার্ডসনের ছাত্রগণের মধ্যে অনেকে সুপণ্ডিত ও সুলেখক হইয়াছিলেন। রিচার্ডসন, অনেকবিষয়ে, তাহার ছাত্রদিগের আদর্শস্বরূপ ছিলেন। তাহার দৃষ্টান্তে তাহার ছাত্রগণের হৃদয়ে রিচার্ডসনকে অনুকরণেচ্ছা। ইংরাজী ভাষায় গদ্য, পদ্য রচনা করিবার প্রবৃত্তি উদিত হইত। অন্যান্য খ্যাতনামা লেখকগণের রচনার ন্যায় তাঁহার মিজের রচনাও তিনি, অনেক সময়, ছাত্রদিগকে পাঠ করিয়া শুনাইতেন। তাহার সুললিত কবিতায় ও হৃদয়গ্রাহিণী আবৃত্তিতে তাহার ছাত্রগণের হৃদয় সহজেই মুগ্ধ হইত। তাঁহারাও আশা করিতেন, “কতদিনে কাপ্তেন সাহেবের ন্যায় সুলেখক হইতে পারিবেন। রিচার্ডসন? ছাত্রদিগের এই আশা যাহাতে পূর্ণ হয়, তজ্জন্য চেষ্টার ক্রটি করিতেন না। তিনি তাহাদের রচনা অতি যত্নের সহিত সংশােধন করিয়া দিতেন, এবং তাহাদিগকে উৎসাহিত করিবার জন্য অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট রচনাগুলি কোন সাহিত্য-বিষয়ক পত্রিকায় প্রকাশ করাইতেন। এরূপ সাহায্য ও উৎসাহ প্রাপ্ত হইলে, ছাত্রদিগের উচ্চাভিলাষ এবং রচনা-প্রবৃত্তি সহজেই বর্ধিত হইয়া থাকে। কাপ্তেন সাহেবের ন্যায় সুলেখক হই, রিচার্ডসনের ছাত্রছাত্রেরই হৃদয়ে এই বাসনা প্রবল ছিল। অন্যান্য ছাত্রেরা রিচার্ডসনের কেবল গুণগুলিরই অনুকরণ করিতেন; কিন্তু মধুসূদন তাহার দোষগুলি পৰ্য্যন্ত অনুকরণ করিতে ছাড়িতেন না। তাহার কোন সহাধ্যায়ী বলেন ; “একদিন মাধ্যাহিক ছুটির সময়ে, যখন কলেজের অন্যান্য ছাত্রেরা আমােদ, প্রমােণ করিতেছিলেন, মধুসূদন, তথন, একা, গৃহের এক নির্জন অংশে বসিয়া, রিচার্ডসনের বাঁকা বাঁকা হস্তাক্ষরের অনুকরণ করিতেছিলেন। স্কুল-বিভাগের প্রথম শিক্ষক, জোন্স সাহেব, দেখিতে পাই, তাহার পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। মধুসূদনকে তগতচিত্তে রিচার্ড জীবন-চরিত। সনের লেখার অনুকরণ করিতে দেখিয়া, তিনি হাসিয়া বলিলেন ; “মধু, তুমি কি মনে কর, কাপ্তেন সাহেবের মত বাঁকা বাকা হাতের লেখা হইলে তুমি একজন বড় লােক হইবে?” মধুসূদন লজ্জায় নিরুত্তর রহিলেন এবং ব্যস্ততার সহিত লিখিত বিষয়টা লুকাইয়া ফেলিলেন। রিচার্ডসনকে অনুকরণ করিবার ইচ্ছা মধুসূদনের কিরূপ প্রবল ছিল, এই ঘটনা হইতে তাহা প্রমাণিত হইবে। মধুসূদন যখন পঞ্চম শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন, সেই সময়ে রিচার্ডসনের “সারসংগ্রহ পুস্তক প্রকাশিত এই পুস্তকের ভূমিকা অতি উপাদেয়। কাব্যানুশীলনের দোষ, গুণ রিচার্ডসন তাহাতে অতি সুন্দররূপে আলােচনা করিয়াছেন। মুদ্রিত হইবার পূৰ্ব্বে তিনি তাহা তাঁহার ছাগণের নিকট পাঠ করিয়াছিলেন। মধুসূদন এবণ করিয়া পুলকিত হইলেন, এবং মনের আবেগ সম্বরণ করিতে না পারিয়া, সকলের সমক্ষেই বলিয়া উঠিলেন, “আহা, আমি যদি ইহার লেখক হইতাম” , “I wish I hacl bec17 the author of it" ) সেই সুকুমার বয়সে, নিজের ভবিষ্যৎ- সম্বন্ধে, মধুসূদনের কিরূপ উচ্চাভিলাষ জন্মিয়াছিল, তাহার এই মন্তব্য হইতে পাঠক তাহা অনুমান করিতে পারিবেন। রামায়ণ, মহাভারত পাঠ করিয়া যে কবিত্ববাজ মধুসূদনের হৃদয়ে অঙ্কুরিত হইয়াছিল, রিচার্ডসনের প্রদত্ত শিক্ষা ও আদর্শে তাহা এইরূপে উদ্ভিন্ন হইবার সুযােগ প্রাপ্ত হইল। কলেজের অতি নিম্নশ্রেণী হইতেই মধুসূদন ইংরাজীতে গদ্য, পদ্য রচনা করিতে আরম্ভ করিলেন। যদিও তাঁহার পূর্ণ বয়সের রচনার সহিত তাহার বাল্য-রচনার বিশেষ সম্বন্ধ নাই, তথাপি তাহার সাহিত্যিক জীবন কিরূপে আর ও পরিবর্ধিত হইয়াছিল, সেই সকল কবিতা হইতে তাহা অনুমান করতে পারা যায়। পূর্ণবয়সে তিনি মিল্টনকে তাহার আদর্শরূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন কিন্তু পঠন্দশায় বায়রণই তাহার আদর্শ ছিলেন। বায়ন, কট এবং • শিক্ষাবস্থা-কবিতা রচনার অভ্যাস। মূর এই তিন জনেরই আদর্শে তিনি, তখন, বায়রণ, স্কট এবং মূরের তাহার রচনা প্রণালী গঠিত করিয়াছিলেন। এভাব। তিনি ইহাদিগের অনুকরণে কতদূৰ কৃতকাৰ্য্য হইয়াছিলেন, তাহার ‘ক্যাপটিভ লেডী” ও এই সময়কার লিখিত কবিতাগুলি পাঠ করিলেই তাহা বুঝিতে পারা যায়। সৰ্বাংশে নির্দোষ না হইলেও, ইংরাজী ভাষাভিজ্ঞ পাঠক সেই সকল কবিতা হইতে বুঝিতে পারিবেন যে, ভারতীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষিত এবং অষ্টাদশ বর্ষবয়স্ক একজন যুবকের পক্ষে বিদেশীয় ভাষায় সেরূপ কবিতা লেখা সামান্য প্রতিভার পরিচায়ক নয়। কবিশক্তি মনুষ্যের অতি দুর্লভ গুণ ; দেবানুগ্রহ ভিন্ন ইহা প্রাপ্ত হইবার সম্ভাবনা নাই। বাগদেবতা মধুসূদনকে এই দুর্লভ শক্তি এরূপ মুক্তহস্তে দান করিয়াছিলেন যে, তিনি যখন যে ভাষা শিক্ষা করিতেন, অতি অল্পায়াসেই তাহাতে কবিতা লিখিতে পারিতেন। আলেজার, পােপ তাহার নিজের সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছিলেন, মধুসূদনেরও সম্বন্ধে, বােধ হয়, তাহা প্রয়ােগ করা যাইতে পারে। প্রকৃতই তিনি “Lisped in numbers for the numbers came." পােপের ন্যায় তিনিও বাল্যসুহৃদিগকে কবিতায় পত্র লিখিতেন, এবং কবিতা রচনা করিয়া উপহার দিতেন। কোন একটী বস্তু চাহিবার বা প্রত্যর্পণ করিবার সময়ে তিনি বাল্যবন্ধুদিগের নিকট, কখন কখন, কবিতাতেই মনের ভাব ব্যক্ত করিতেন। অবশ্য এরূপ কবিতায় কোন বিশেষ সৌন্দৰ্য্য থাকা সম্ভবপর নয়; কিন্তু সৌন্দৰ্য্য না থাকুক, যিনি পূর্ণবয়সে মেঘনাদবধ রচনা করিয়াছিলেন, তাঁহায় কিশাের-বয়সের সেই কবিতা-ক্রীড়া দেখিলে, পাঠক অবশ্যই কৌতুক লাভ করিবেন। মধুসূদনের এই সময়কার পত্ৰ, অথবা কবিতা যাহা কিছু প্রাপ্ত হওয়া যায়, সমস্তই ইংরাজীতে লিখিত। বাঙ্গালা ভাষারই সঙ্গে ৩ জীবন-চরিত। মধুসূদনের নাম চিরদিন গ্রথিত থাকিবে ; প্রথম বাঙ্গালা-কবিতা । সুতরাং তাহার ইংরাজী রচনা অপেক্ষা শৈশবের বাঙ্গালারচনা পাঠ করিতেই পাঠকগণের আগ্রহ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তাহাদিগের সে আগ্রহ পূর্ণ হইবার সম্ভাবনা নাই । ছাত্রাবস্থায় মধুসূদন বাঙ্গালাভাষার কিছুমাত্র অনুশীলন করেন নাই । বাঙ্গালাভাষা অশিক্ষিত ও বৰ্ব্বরের ভাষা এবং তাহা বিস্মৃত হওয়াই ভাল, হিন্দুকলেজের অন্য অনেক ছাত্রের নায় তঁাহারও এই সংস্কার ছিল। একবার মাত্র তিনি তাঁহার প্রিয়-সুহৃদ গৌরদাস বাবুর অনুরােধে বর্ষাঋতু-বৰ্ণনা-প্রসঙ্গে একটা কবিতা রচনা করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহা বর্তমান সংস্করণে প্রকাশের যােগ্য নয়। তাঁহার সমকালবী অন্যান্য অনেক শিক্ষিত ব্যক্তির ন্যায় মধুসূদনও মনে করিতেন, ইংরাজী সাহিত্যের অনুশীলন ও ইংরাজী ভাষায় গ্রন্থ রচনা দ্বারাই যশ ও অর্ধ লাভ করিতে পারিবেন । বাঙ্গালা ভাষা- সম্বন্ধে কখন কোন প্রসঙ্গ হইলে তিনি অবজ্ঞার সহিত বলিতেন, “বাঙ্গালা-ভাষা ভুলিয়া যাওয়াই ভাল।” মধুসূদনের বিশেষ অপরাধ ছিল না। বাঙ্গালা-ভাষার তখন যে অবস্থা ছিল, তাহাতে পাশ্চাত্য- ভাষায় সুশিক্ষিত কোনও ব্যক্তির পক্ষে তাহার অনুশীলন দ্বারা তৃপ্তিলাভের সম্ভাবনা ছিল না। যাহাদিগের চেষ্টায় বাঙ্গালা-ভাষা এক্ষণে সমৃদ্ধিমতী হইয়াছেন, তাহাদিগের কেহই তখন লেখনী ধারণ করেন নাই। অন্যের কথা দূরে থাকুক, বাঙ্গালা ভাষার পিতৃস্থানীয় বাবু অক্ষয়কুমার- দত্ত ও বিদ্যাসাগর মহাশয় পৰ্য্যন্ত তখন বাঙ্গালা-সাহিত্যে অপরিচিত ছিলেন। কাশীদাস, কৃত্তিবাস প্রভৃতি বাঙ্গালা-ভাষার যে দুই একজন কবির প্রতি মধুসূদনের অনুরাগ ছিল, তাহাদিগের কাৰা কলেজে পঠিত হইত না। রামরাম বসু-প্রণীত “প্রতাপাদিত্য-চরিত,* ও মৃত্যুঞ্জয়- বিদ্যালঙ্কার-প্রণীত “পুরুষ-পরীক্ষা প্রভৃতি গ্রন্থ তখন কলেজের পাঠ্যপুস্তক শিক্ষাবস্থা-কবিতা রচনার অভ্যাস। - ১০ - ৩ *** * ১ • ছিল। এই সকল পুস্তকের ভাষা যে কি উপাদেয়, তাহা বর্ণনা করিয়া বুঝাইবার সম্ভাবনা নাই। সিনিয়ার-বৃত্তি-পরীক্ষার একখানি প্রশ্নপত্র হইতে কয়েকটী পংক্তি নিম্নে উদ্ধত হইতেছে। সে সময়কার ছাত্রেরা বাঙ্গালা-ভাষা আলােচনার কিরূপ সুযােগ প্রাপ্ত হইতেন, এই উদ্ধৃত অংশ হইতে তাহা প্রমাণিত হইবে :- “শ্লাঘা অতি নিন্দনীয়া । মাথা দ্বারা সর্বসাধাৰণ মনুষ্য অহঙ্কারযুক্তের ন্যায় প্রকাশ পায়। তাহাতে সব্বলােক তুচ্ছতা করে এবং কেহ তাহাকে আদর করে না। আর আপনার প্রশংসায় কি আপনি প্রশংসিত হয় ? তা কখন হয় না। যেন আপনার নয়ন দ্বারা স্বীয় নয়নের গুণ দোষ দেখিতে পায় না, তাহার ন্যায় জানিব। আর আত্ম-প্রশংসা হেতু পরের গুণ-জ্ঞান-করণে সমর্থ হয় না। সেই ব্যক্তির শাস্ত্রাবিজ্ঞান কি প্রকারে হইতে পারে ? অতএব শাখা বিদ্যার প্রধান প্রতি- বন্ধিক। হয়; তাহাতে পরম জ্ঞান, পরম সুখের কথা কি কহিব, সামান্য সুখও হইতে পারে না। যেমন উষ্ণ অঙ্গার কাঠাদিকে দগ্ধ করণে সমর্থ হয় না, কেবল স্বয়ং উত্তপ্ত অন্যকেও উত্তপ্ত করেন, তাহার ন্যায় আত্মশ্লাঘাকারী ব্যক্তি আপনি উপযুক্ত হনে এবং অন্যকেও উত্তাপিত করেন, এতদ্রপ অন্যান্য দোৰ জানিবা”। একদিকে বাঙ্গালা ভাষার এইরূপ অবস্থা, অপর দিকে দেশের রাজ- প্রতিনিধি হইতে সাধারণ লােক পর্যন্ত সকলেই ইংরাজী ভাষার অনু- শীলনে উৎসাহদান করিতেছিলেন ; সুতরাং, এ অবস্থায়, যে সে সময়- কার ছাত্ৰমণ্ডলীর হৃদয়ে, স্বদেশীয় ভাষার প্রতি উপেক্ষা জন্মিয়া, ইংরাণী:ভাষারই প্রতি অধিক অনুরাগ জন্মিবে, তাহা অসম্ভব নয়। পূৰ্বেই বলিয়াছি যে, সে সময়কার কৃতবিদ ও সন্ত্রান্ত ব্যক্তিগণ সকলেই ছাত্রদিগকে রচনাভ্যাসে উৎসাহ দিতেন। শিক্ষা-সমিতির বাষিক বিবরণীতে ছাত্রদিগের রচিত সর্বোৎকৃষ্ট প্রবন্ধ ও প্রশ্নোত্তর- গুলি মুদ্রিত হইয়া প্রকাশিত হইত। পুরস্কারবিতরণসভায়, গবর্ণর জেনারেলের বা অন্য কোন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীর এবং দেশীয় ও য়ুরােপীয় নিমন্ত্রিত সম্রান্ত ব্যক্তিগণের সমক্ষে, তাহা পঠিত হইত ; ৩ ;

৪০ জীবন-চরিত। ছাত্রের তজ্জন্য বৃত্তি, এবং স্বর্ণ-রৌপ্য নির্মিত পদক ও পুরস্কার ইত্যাদি প্রাপ্ত হইতেন। এইরূপ উৎসাহলাভের ফলেই সে সময়কার ছাত্রদিগের মধ্যে অনেকে, পরিণামে, সুলেখক হইতে পারিয়া: ছিলেন। মধুসূদন যখন সিনিয়ার বিভাগের দ্বিতীয় শ্রেণীতে অধ্যয়ন করেন, সেই সময় খ্যাতনামা বাবু রামগোপাল ঘােষ, স্ত্রীশিক্ষা- বিষয়ক সর্বোৎকৃষ্ট রচনার জন্য, দুইটী পদক দিতে প্রতিশ্রুত হন। হিন্দু কলেজের মধ্যে যে দুই জন ছাত্র প্রতিযােগিতায় সর্বোৎকৃষ্ট হইবেন, তাহারা পুরস্কার প্রাপ্ত হইবেন, এইরূপ নির্দিষ্ট ছিল। মধুসূদন এই প্রতিযােগিতায় প্রথম ও ভূদেবর দ্বিতীয় হইয়াছিলেন, এবং তজ্জন্য, গুণানুসারে, স্বর্ণনিৰ্ম্মিত ও রৌপ্যনির্মিত পদক প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। স্ত্রীশিক্ষা-সম্বন্ধে মধুসূদনের বাল্যাবধি কিরূপ সংস্কার ছিল, এই রচনা হইতে তাহা অনুমান করিতে পারা যায়। রচনাটা ইংরাজীতে লিখিত বলির আমরা তাহা উদ্ধত করিতে বিরত হইলাম। কাপ্তেন রিচার্ডসনের যত্নে মধুসূদনের লিখিত অনেক কবিতা সে সময়কার কোন কোন সাহিত্য-বিষয়ক পত্রিকায় নিজের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে প্রকাশিত হইত, এবং সেই জন্য, ছাত্রাবস্থাতেই, দৃঢ়বিশ্বাস। মধুসূদন অনেকের নিকট একজন ভাবী সুকবি বলিয়া প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন। তিনি, যে পূর্ণবয়সে একজন কবি হইবেন, তাহার সমকালবী ছাত্রদিগের সকলেরই সে সম্বন্ধে প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল। অনেকে তাহাকে তখনই “কবি” বলিয়া ডাকিতেন । মধুসূদনের নিজেরও দৃঢ়-সংস্কার জন্মিয়াছিল যে, একদিন জগৎ তাহার কবিত্বের গৌরবে বিস্মিত হইবে। তিনি তাঁহার প্রিয়কবি বায়রণের জীবনচরিত পাঠ করিয়া, তাহার সুহৃদ গৌরদাসবাবুকে লিখিয়াছিলেন -“আমি এক্ষণে টমাস মুরের লিখিত আমার প্রিয়কবি বায়রণের জীবন- চরিত পাঠ করিতেছি। বাস্তবিকই ইহা একখানি অপূৰ্ব গ্রন্থ।

শিক্ষাবস্থা—কবিতা রচনার অভ্যাস। আমার বড় সাধ হয় যে, আমি যদি কখনও একজন প্রসিদ্ধ কৰি হইতে পারি, তুমি আমার জীবন-চরিত লিখিবে। যদি আমি ইংলণ্ড যাইতে পারি, তাহা হইলে যে আমি একজন প্রসিদ্ধ কবি হইব, তাহা নিঃসন্দেহ। অষ্টাদশবর্ষ-বয়স্ক একজন বালককে নিজের সম্বন্ধে এরূপ ভবিষ্যদ্বাণী করিতে দেখিলে বিস্মিত হইতে হয়। কিন্তু ইহাতে বিস্ময়ের বিষয় কিছুই নাই। বাল্যাবধি নিজের শক্তি ও সামর্থ্য সম্বন্ধে এইরূপ বিশ্বাসই প্রকৃত মহত্ত্বের চিহ্ন এবং মনুষ্যের ভবিষ্যৎ উন্নতির সােপান। আপা- ততঃ প্রগৰ্ভতা-পূর্ণ বােধ হইলেও ইহা অন্তর্নিহিত শক্তির পরিচায়ক। বালক মধুসূদনের ভবিষ্যদ্বাণী সার্থক হইয়াছে কি না, বঙ্গ-সাহিত্য- তাহার সাক্ষ্য-দান করিতেছে। ইংলণ্ড-গমন-সম্বন্ধে পঠন্দশা হইতে মধুসূদনের কিরূপ প্রগাঢ় বাসনা ছিল, তাহার পত্রের উদ্ধত অংশ হইতে পাঠক ইংলণ্ড গমনের জন্য আকাকা। তাহা অনুমান করিতে পারিয়াছেন। ইংলণ্ড কবি-প্রসবিনী ; সেক্সপীয়ার, মিল্টন এবং তাঁহার প্রিয়কবি বায়রণের সুতরাং ভক্ত যেমন আরাধ্য-দেবের অধিষ্ঠান-ক্ষেত্ৰ-দর্শন নিজের আধ্যাত্মিক কল্যাণের অনুকূল বলিয়া মনে করেন, মধুসূদনও তেমনই ইংলণ্ড গমন তাহার কৰি শক্তি-পৰিপুষ্টির পক্ষে অত্যাবশ্যক বলিয়া বিবেচনা করিতেন। তিনি তমলুক দর্শন করিয়া তাঁহার প্রিয় বন্ধু গৌরদাস বাবুকে কয়েকখানি পত্র লিখিয়াছিলেন । তমলুক সমুদ্র হইতে অৰিদূরে নদীমুখে অবস্থিত। তমলুক গমনের পথে ইংলণ্ডগামী অর্ণব-পােত-সমূহ দর্শন করিয়া, মধুসূদনের বালক-হৃদয় উচ্ছসিত হইত। *“I am reading Tom Moor's Life of my favourite Byron :- splendid book upon my word. Oh! How should I like to see you write my life, if I happen to be a great poet, which, 'I am almost sure, I shall be if I can go to England !" ; জননী।

৪২ জীবন-চরিত । তিনি গৌরদাসবাবুকে লিখিয়াছিলেন ;—“কাল যে তােমার সহিত আমার সাক্ষাৎ হইবে না, তজ্জন্য আমি দুঃখিত, কিন্তু, গৌর, এই দুঃখের মধ্যে আমার একটা শান্তি আছে ; অচিরকাল মধ্যে যে মহা- সমুদ্রের বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া আমি ইংলণ্ডের গৌরবময় ভূমিতে উপনীত হইব, আমি সেই সমুদ্রের নিকটে আসিয়াছি। সমুদ্র এখান হইতে অধিক দূরে নয়। কত জাহাজই ইংলণ্ডে গমন করিতেছে দেখিয়াছি।** কেবল পত্রে নয়, কবিতাতেও মধুসূদন হৃদয়ের উচ্ছাস ব্যক্ত করি- তেন। তাহার ধারণা জন্মিয়াছিল যে, ইংলণ্ড গমন করিতে না পারিলে * "I am grieved to think that I will not meet ye tomorrow : but Gour, there is one consolation for me. I am come nearer that sea which will perhaps see ine at a period -- which I hope is not far off-ploughing its bosoms for England's glorious shore. The sea from this place is not very far ; what a number of ships have i seen going to England" ! সেইরূপ একটা কবিতা নিম্নে প্রদত্ত হইল † Oft like a sad bird I sigh To leave this land, though mine uwn land it be : Its green robed meads.-gay flowers and cloudless sky. Though passing fair, have but few charms for ne. For I have dreamed of climes more bright and free Where virtue dwells and heaven-born liberty Makes e'en the lowest happy ;--where the eye Doch sicken not to see man bend the knee To sordid interest : --climes where science thrives, And genius doth receive her guerdon meet ; Where man in all his truest glory lives, And nature's face is exquisitely sweet : For those fair climes I heave the impatient sigh, There let me live and there let me die. KIDERPORE, 1842 শিক্ষাবস্থা-কবিতা রচনার অভ্যাস। ১৩ তাঁহার কবি-শক্তির বিকাশ হইবে না; কিন্তু তাঁহার জীবনে ইহার বিপরীত ফলই লক্ষিত হইয়াছে। মেঘনাদবধ, বীরাঙ্গনা এবং ব্রজাঙ্গনা প্রভৃতি তাহার উৎকৃষ্ট গ্রন্থ গুলি, সমস্তই, তাহার ইংলণ্ড-গমনের পূর্বে লিখিত হইয়াছিল। ইংলণ্ড হইতে প্রত্যাগমনের পর, তিনি যে দুইখানি গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন, তাহা তাহার গৌরব রক্ষা করিতে পারে নাই। হিন্দুকলেঞ্জীয় শিক্ষা মধুসূদনের প্রকৃতি-গঠনে কিরূপ কাৰ্য্য করিয়াছিল, পাঠক, এইবার, বােধ হয়, তাহা হিন্দু কলেজীয় শিক্ষার নিষ্কর্য। বুঝিতে পারিয়াছেন। আমরা দেখাইয়াছি যে, তিনি যে সময় শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন, তাহা রচনাশক্তি পরি- বর্ধনের অনুকুল ছিল, এবং তিনি যে শিক্ষকের নিকট শিক্ষিত হইয়া- ছিলেন, তিনি একজন সুকবি ও কবিতার উৎসাহদাতা ছিলেন। সেই সঙ্গে আমরা ইহাও দেখাইয়াছি যে, আবাল্য মধুসূদনের হৃদয়ে কাব্যানুরাগ ও অনুকরণেচ্ছা প্রবল ছিল। সুতরাং স্বাভাবিক শক্তির ও প্রবণতার সঙ্গে এইরূপ অনুকূল সামগ্রী সমূহের সম্মিলন হইলে যাহা হইবার সম্ভাবনা, মধুসূদনের ভাবী জীবনে তাহাই হইয়াছিল। নিজের আভ্যন্তরীণ শক্তির বিকাশের সঙ্গে তাহার আশা ও উচ্চাভিলাষ বর্ধিত হইয়াছিল, এবং অষ্টাদশবর্ষ বয়সেই তিনি বঙ্গদেশের প্রধান প্রধান ইংরাজী সাহিত্যবিষয়ক পত্রে লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহাতে তাহার পরিতৃপ্তি হইত না ; তিনি ইংলণ্ডের Bentley's Miscellany এবং Blakwood's Magazine প্রভৃতি পত্রে কবিতা প্রেরণ করিতেন। নিজের রচিত কবিতা শৈশব-সুহৃদদিগকে উৎসর্গ করিয়া, তাহার তৃপ্তিবােধ হইত না, তিনি ওয়াডওয়ার্থের ন্যায় কবিকুলতিলককে উদ্দেশ করিয়া কবিতা উৎসর্গ করিতেন। * মধুবনের বিস্তৃত জীবনচরিতে উহার লিখিত এই সকল পত্র ও কবিতা প্রদত্ত হইয়াছে।

৪৪ জীবন-চরিত। কলেজে অধ্যয়নের সময় মধুসূদনের চরিত্রে যে সমস্ত দোষ, গুণ অঙ্কুরিত হইয়াছিল, পরবর্তী ঘটনাসমূহ তাহাদিগেরই পরিবর্ধন করিয়া- ছিল ; নূতন কিছু উৎপাদন করিতে পারে নাই। এই সময়েই আমরা দেখিতে পাই যে, মধুসূদন অমিতব্যয়ী, বিলাসী এবং ধৰ্ম্মনীতি ও সমাজ- নীতি সম্বন্ধে উদাসীন। কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও দেখিতে পাই যে, তিনি অধ্যয়নশীল, কাব্যানুরাগী, প্রেম-পিপাসু, পরদুঃখ-কাতর এবং উদ্দেশ্য- সাধনে দৃঢ়ত। এই সময়ে তিনি জীবনের যে লক্ষ্য নির্বাচন করিয়া- ছিলেন, কোনরূপ ভাবী ঘটনাই তাহা তাহার দৃষ্টিপথ হইতে অপসারিত করিতে পারে নাই। কিন্তু তিনি যে পথ অবলম্বন করিয়া লক্ষ্যস্থলে উপনীত হইবার জন্য চেষ্টা করিতেছিলেন, তাহা বিধাতার মনােনীত ছিল না। অকস্মাৎ তাহার জীবনে এমন একটা অচিন্তিত-পূৰ্ব ঘটনা উপস্থিত হইল যে, লক্ষ্যস্থলে উপনীত হইবার জন্য, তাহাকে পূৰ্বপথ পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক, নূতন পথে গমন করিতে হইল। ঘটনাটা কি, পরবর্তী অধ্যায়ে তাহা উল্লিখিত হইবে।

গ্রহণের কারণ। চতুর্থ অধ্যায়। খ্রীষ্টধৰ্ম্ম-গ্রহণ ও বিশল্প-কলেজে অধ্যয়ন। [ ১৮৪৩:৮৪৭ খৃষ্টাব্দ ] আমরা পূর্ব অধ্যায়ে মধুসূদনের জীবনের যে অচিন্তিত-পূর্ব ঘটনার মধুসূদনের খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম উল্লেখ করিয়াছি, তাহার ধর্মান্তর গ্রহণই সেই ঘটনা। কি জন্য যে তিনি খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, অন্যের পক্ষে অভ্রান্তরূপে তাহা নির্দেশ করা কঠিন। কেহ কেহ, খ্ৰীষ্টীয় কলেজে অধ্যয়ন করিয়া ও খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম-প্রচারকদিগের উপদেশ শ্রবণ করিয়া, খ্ৰীষ্টধর্ম গ্রহণ করিয়া থাকেন, কিন্তু মধুসূদনের খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম-গ্রহণ সম্বন্ধে সেরূপ কোন কারণ ছিল না। হিন্দু কলেজীয় শিক্ষা খ্ৰীষ্টধর্ম গ্রহণের পক্ষে অনুকূল ছিল না, বরং প্রতিকূল ছিল, বলা যাইতে পারে। যে দুইজন হিন্দু কলেজের ছাত্রদিগের নেতা, শিক্ষক এবং আদর্শ- স্বরূপ ছিলেন, সেই ডেভিড হেয়ার ও রিচার্ডসনের মধ্যে কেহই খ্রষ্টধর্মে আস্থাবান্ ছিলেন না। হেয়ার হিন্দু স্কুলকে প্রাণাপেক্ষা অধিক ভালবাসিতেন, ' এবং এদেশে ইংরাজী শিক্ষার প্রচলনের অন্য আপনার সর্বস্ব উৎসর্গ করিয়াছিলেন। তখন ইংরাজী শিক্ষার প্রতি লােকের এখনকার ন্যায় অনুরাগ সঞ্চার হয় নাই। ইংরাজী শিক্ষায় ধােপ হইবার ভয়ে কলিকাতার অনেক সান্ত ব্যক্তি, তখন, সন্তানদিগকে ইংরাজী শিক্ষা দিতে সঙ্কুচিত হইতেন। ইহার উপর কলেজের ছাত্রদিগের মধ্যে কেহ খ্ৰীষ্টধর্ম গ্রহণ .. কৱিলে হিন্দুকলেজের বিশেষ অমিষ্ট হইবে, এবং সেই সঙ্গে এদেশে ইংরাজী।

৪৬ জীবন-চরিত। শিক্ষা প্রচলনের পথ অবরুদ্ধ হইবে এই ভাবিয়া, মহাত্মা হেয়ার সর্বদা সতর্ক থাকিতেন। ছাত্রেরা যাহাতে খ্রীষ্টধর্ম সম্বন্ধে হেয়ার ও রিচার্ডসন। খ্রষ্ট-ধৰ্ম্মপ্রচারকদিগের সংসগে কিছুতেই আসিতে পারে, তজ্জন্য তাহার প্রখর দৃষ্টি ছিল। রিচার্ডসন যদিও হেয়ার সাহেবের ন্যায় তীক্ষ্ণদৃষ্টি ছিলেন না, তথাপি খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম সম্বন্ধে তাহার যে আন্তরিক অনাস্থা ছিল, তাহা তিনি ব্যক্ত করিতে জটি করিতেন না। এরূপ অবস্থায় হিন্দু কলেজের শিক্ষা যে মধুসূদনের ধর্মমত পরিবর্তনের কারণ নহে, তাহা একরূপ সিদ্ধান্ত করা যাইতে পারে। তাহার সহিত যাহারা ল্যাবধি ঘনিষ্ঠরূপে পরিচিত ছিলেন, তাহারা বলেন যে, “মধু যে খ্রষ্টধর্ম গ্রহণ করিবে, আমরা তাহা কখন কল্পনাও করি নাই। অকস্মাৎ তাহার খ্ৰীষ্টধর্ম গ্রহণের সংবাদে আমরা সকলেই বিস্মিত হইয়াছিলাম। মধুসূদনের পরিবারস্থ ব্যক্তিগণেরও বিশ্বাস এইরূপ। তাহার বলেন, “ধৰ্ম্ম-বিশ্বাসের অনুরােধে মধুসূদন খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেন নাই; খ্রষ্টধৰ্ম্ম গ্রহণ করিলে তাহার যুােেপ গমনের সুবিধা হইবে, এবং তিনিও অপ্রীতিকর বিবাহের দায় হইতে অব্যাহতি অপ্রীতিকর বিবাহের প্রস্তাব। পাইতে পারিবেন, এই ভাবিয়াই তিনি খ্রষ্টধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। ইংলণ্ড-গমন সম্বন্ধে তাঁহার কিরূপ আগ্রহ ছিল, আমরা পূর্বেই তাহার আলােচনা করিয়াছি। কলেজের দ্বিতীয় শ্রেণীতে অধ্যয়নের সময়ে তাঁহার পিতা, মাতা তাহাদিগের স্বদেশস্থ কোন সম্রান্ত জমীদারের কন্যার সহিত মধুসূদনের বিবাহের সম্বন্ধ স্থির করিয়াছিলেন। বিৰাহ করিলে তাহার ইংলণ্ড-গমনে ব্যাঘাত ঘটিতে পারে ভাবিয়া মধুসূদনের এ বিবাহে সম্মতি ছিল না। ক্যাটা মধুসূদনের পিতা, মাতার মনােনীত হইলেও, তাহার নিজের মনােনীতা ছিল না। তিনি তাঁহার কোন পিতৃব্যপুত্রকে এ সম্বন্ধে এইরূপ এক পত্র খ্রীষ্টধর্ম-গ্রহণ ও বিশল্প-কলেজে অধ্যয়ন। ১৭ লিখিয়াছিলেন ;-“আমি কিছুতেই বিবাহ করিবনা। আমি এমন কাজ কৰিব যে, সেজন্য, বাবাকে চিরকাল দুঃখ করিতে হইবে।* অপরিণামদর্শী মধুসূদন তখন জানতেন না যে, তাঁহার সঙ্কল্পিত কার্যের বিষময় ফল পিতার অপেক্ষা তাহাকেই অধিক ভােগ করিতে হইবে। তিনি পিতার নিকট আপনার অসম্মতি জ্ঞাপন করিলেন, কিন্তু তাহাতে কোন ফল হইল না। পুত্রের উপর পিতার চিরন্তন অধিকার আছে এবং মধুসূদন বালক, নিজের হিতাহিত বুঝিবার তাঁহার শক্তি কি, এইরূপ সরল বিশ্বাসবশতঃ মধুসূদনের পিতা, পুত্রের অসম্মতি সত্ত্বেও, তাহার বিবাহ দিতে সঙ্কল্প করিলেন। একদিকে পিতামাতার সঙ্কল্পিত বিবাহ সম্বন্ধে তাহার এইরূপ বিরাগ ছিল ; অপরদিকে তাহার পরিচিত কোন খ্ৰীষ্টধর্মাবলম্বিনী বালিকার রূপগুণের তিনি একান্ত পক্ষপাতী ছিলেন। খ্রষ্টধর্ম গ্রহণ করিলে এই কুমারীর সঙ্গে তাহার বিবাহ হইতে পারে, যে কোন কারণেই হউক, তাঁহার এইরূপ আশা জন্মিয়াছিল। তখন ইংলণ্ড-গমন এখনকার অপেক্ষা শতগুণ অধিক দোষাৰহ ও সমাজবিরুদ্ধ কাৰ্য্য ছিল। ইংলণ্ড- গমন সম্বন্ধে মধুসূদন স্থির প্রতিজ্ঞ ছিলেন, এবং বুঝিয়াছিলেন যে, তজ্জন্ঠ, তাহাকে, একদিন না একদিন, সমাজচ্যুত হইতেই হইবে। সুতরাং এখন সমাজ ত্যাগ করিলে, যদি তিনি মনােনীত পত্নীলাভ করিতে এবং সেই সঙ্গে নিজের অপ্রীতিকর বিবাহের দায় হইতে অব্যাহতি পাইতে পারেন, তবে তাহাই করা কর্তব্য, তাহার এইরূপ ধারণা হইল। মনে মনে এইরূপ স্থির করিয়া একদিন, অকস্মাৎ, তিনি পিতৃগৃহ হইতে অদৃশ্য হইলেন। মধুসূদন যে পিতৃগৃহ-ত্যাগ। খ্রষ্টধর্ম গ্রহণ করিবেন, তাঁহার আত্মীয়গণের মধ্যে কাহারও মনে সেরূপ সন্দেহ কখনও উদিত হয় নাই; সুতরাং তাহার এরূপভাৰে গৃহত্যাগের সংবাদে সকলেই চমকিত হইলেন। ;

৪ জীবন-চরিত। খ্রষ্টধর্মগ্রহণেচ্ছু বালকেরা, পাছে, আত্মীয়গণের অনুরােধে, ধৰ্ম্মত্যাগে অস্বীকৃত হয়, সেই ভয়ে খ্রীষ্টান যাজকগণ তাহাদিগকে, আপনাদিগের গৃহে স্থানদান করিয়া,আত্মীয়, স্বজন হইতে দূরে রাখিতে চেষ্টা করিতেন। মধুসূদনের সম্বন্ধে তাহারা আরও কঠোরতর উপায় অবলম্বন করিলেন। মধুসূদনের পিতা একজন সন্ত্রান্ত ও সঙ্গতি-সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন, এবং কলিকাতার অনেক প্রতিপত্তিশালী পরিবারের সহিত তাহার আত্মীয়তা ছিল। কলিকাতার পুলিস, তখন, এখনকার ন্যায় সুগঠিত ও ক্ষমতা- শালী ছিল না। পাছে মধুসূদনের আত্মীয়গণ তাহাকে তাহাদিগের হস্ত হইতে বলপূৰ্ব্বক উদ্ধার করিয়া লন, সেই ভয়ে, খ্রীষ্টান যাজকগণ, মধুসূদনকে অন্যত্র না রাখিয়া, একবারে ফোর্ট উইলিয়ম-দুর্গের মধ্যে আবদ্ধ করিয়া রাখিলেন। মধুসূদনের পিতা লাঠি ওয়াল ও বড় কি- ওয়ালাদিগের সাহায্যে পুত্রকে উদ্ধার করিবেন, আশা করিয়াছিলেন কিন্তু তাহার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হইল। কয়েক দিন এই ভাবে কেল্লায় অবস্থিতির পরে, ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দের ৯ই খ্রষ্টধৰ্ম্ম-গ্রহণ। ফেব্রুয়ারি, মধুসূদন খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হইলেন। সেইদিন হইতে তাহার মধুসূদন নামের সঙ্গে মাইকেল নাম সংযুক্ত হইল। এই উপলক্ষে মধুসূদন যে ধৰ্ম্মসঙ্গীতটী রচনা করিয়াছিলেন, তাহা নিম্নে প্রদত্ত হইল। 1. Long sunk in superstition's night, By Sin and Satan driven, I saw not.--cared not for the light That leads the blind to Heaven. 11. I sat in darkness, -Reason's eye, Was shut --was closed in me :-- I hastened to Eternity O'er Error's dreadful sea ! } খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম-গ্রহণ ও বিশল্প-কলেজে অধ্যয়ন। ৪১ III. But now, at length, thy grace, O Lord ! Bids all around me shine : I drink thy sweet, -thy precious-word, I kneel before thy shrine ! 11. ; I've broke Affection's tenderest ties For my blest Savior's sake ; All, all I love beneath the skies, Loid : I for Thee forsake! খ্রষ্টধর্ম গ্রহণ করিয়া মধুসূদন যদিও পিতৃগৃহ ত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন ; তথাপি পিতা, মাতার স্নেহ হইতে পিতামাতার ব্যবহার। বঞ্চিত হইলেন না। তাঁহার জননী তাহাকে আত্মহারা হইয়া ভালবাসিতেন ; সে ভালবাসার কিছুতেই পরিবর্তন ঘটিবার সম্ভাবনা ছিল না। মধুসূদনের গৃহ হইতে অন্তর্ধান অবধি তিনি আহার, নিদ্রা ত্যাগ করিয়াছিলেন ; এবং যে দিন তিনি শুনিলেন যে, মধুসূদন, সত্যই, খ্ৰীষ্টধর্ম গ্রহণ করিয়াছেন, সেই দিন অবধি তিনি উন্মাদিনীর ন্যায় হইয়াছিলেন । যিনি মধুসূদন কতক্ষণে কলেজ হইতে প্রত্যাগমন করিবেন, এই প্রত্যাশায় পথের দিকে চাহিয়া থাকিতেন, পুত্রের এরূপ ব্যবহারে তাহার প্রাণে যে কি নিদারুণ বেদনা লাগিয়া- ছিল, তাহা বলিয়া বুঝাইবার সম্ভাবনা নাই। তাহার অবস্থা দেখিয়া রাজনারায়ণ দত্ত পুত্রকে, সময়ে সময়ে, গােপনে, গৃহে আহ্বান করিতে বাধ্য হইতেন, কিন্তু সমাজের ভয়ে তাহাকে গৃহে রাখিতে সাহসী হইতেন না। হিন্দুধর্ম ত্যাগ করিলেও মধুসূদন যাহাতে, সুশিক্ষিত ও যশস্বী হইয়া, পরিণামে, সুখী হইতে পারেন, মধুসূদনের পিতামাতা তজ্জন্য যথােচিত চেষ্টা করিয়াছিলেন। দেশীয় খৃষ্টান ও ইংরাজ-বালকদিগের শিক্ষার জন্য তৎকালে শিবপুরে শিল্প-কলেজ জাবন-চরিত । তিনি যে, নামক একটী উচ্চশ্রেণীর বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। মধুসূদন সেখানে অধ্যয়ন করিতে ইচ্ছা প্রকাশ করিলে, বিশল্প-কলেজে প্রবেশ, তাহারা আনন্দের সহিত তাহার ব্যয়ভার বহন ভাষা-শিক্ষায় অনুরাগ। করিতে স্বীকৃত হইলেন। হিন্দু কলেজ যেমন মধুসূদনের রচনা-শিক্ষার, বিশন্স কলেজ তেমনই তাহার ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্র । মধুসূদন সাধারণের নিকট কবি বলিয়াই প্রসিদ্ধ, কিন্তু ভারতবাসীদিগের মধ্যে একজন কিরূপ বহুভাষাবিদ ব্যক্তি ছিলেন, তাহা অনেকেই অবগত নহেন। ইংরাজী ভাষা তাহার মাতৃভাষারই ন্যায় ছিল। লাটিন, গ্রীক, ফ্রেঞ্চ, জাৰ্ম্মাণ এবং ইতালিয়ান, এই কয়টী ভাষায় তিনি অক্লেশে কথােপকথন করিতে এবং পত্রাদি লিখিতে পারিতেন। ইহার মধ্যে ফরাসী ও ইতালীয় ভাষায় তাহার এতদূর অধিকার ছিল যে, তিনি তাহাতে কবিতা পর্যন্ত লিখিতে পারিতেন। এই ছয়টা য়ুরােপীয় ভাষা ভিন্ন সংস্কৃত, পারসীক, হিব্রু, তেলেগু, তামিল এবং হিন্দুস্থানী, এই ছয়টী ভাষাতেও তাহার অক্সাধিক অভিজ্ঞতা ছিল ; সুতরাং মাতৃভাষা বাঙ্গালা ছাড়া বারটী বিভিন্ন ভাষার সহিত তাহার পরিচয় ছিল । তাহার সমাধিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠার সময়ে, সুপ্রসিদ্ধ ব্যারিষ্টার, বাবু মনােমােহন ঘােষ বলিয়াছিলেন, মধুসূদনের সমকালবৰ্তীদিগের মধ্যে তাহার ন্যায় বহুভাষাবি ব্যক্তি আর কেহ ছিল কি না সন্দেহ। বাস্তবিক ও ভাষা-শিক্ষা সম্বন্ধে তাহার ন্যায় অসাধারণ শক্তি অতি অল্প লােকের মধ্যেই দৃষ্টিগােচর হয়। বিশগ-কলেজ হইতেই তাহার এই ভাষা-শিক্ষা সম্বন্ধে প্রবণতা পরিস্ফুরিত হইতে থাকে। * As a linguist and a scholar, he had scarcely any equal among his contemporaries, and there is hardly any individual, even m these days, among his countrymen who could excel him in his knowledge of the European languages, and in the literature, boul! ancient and modern, of European countries.

খ্রষ্টধৰ্ম্ম-গ্রহণ ও বিশল্প-কলেজে অধ্যয়ন। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নের সময়ে তিনি ইংরাজী ও পারসীক ভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন। বিশন্স কলেজে প্রবেশ করিয়া তিনি গ্রীক, লাটিন এবং সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করিতে আরম্ভ করেন। বিশ কলেজের অনেক অধ্যাপক বহুভাষায় সুপণ্ডিত ছিলেন ; তাহাদিগের দৃষ্টান্ত হইতেই মধুসূদনের হৃদয়ে ভাষা শিক্ষা সম্বন্ধে অনুরাগ উদ্ভূত হইয়াছিল। মধুসূদন বিশল্প-কলেজে চারি বৎসর কাল অধ্যয়ন করেন। ভাষা- শিক্ষা ও কবিতানুশীলন সম্বন্ধে তিনি এই কয় উচ্ছ, ঙ্খলতা ও তজ্জনিত বৎসরে যথেষ্ট উন্নতি করিয়াছিলেন। কিন্তু অশান্তি। দুঃখের বিষয় এই যে, বিদ্যাবুদ্ধির উন্নতির সঙ্গে তিনি এখানে সদাচার ও সংযম সম্বন্ধে উন্নতি লাভ করিতে পারেন নাই। বিশন্স কলেজে তিনি নিজেই নিজের অভিভাবক ছিলেন। তাঁহার কার্যকলাপ পৰ্যবেক্ষণ করিবার উপযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক কেহ নিকটে থাকিতেন না। তাহার পিতা, মাতা তাহাকে মাসিক প্রচুর অর্থ প্রদান করিতেন; কিন্তু মধুসূদন যে সে অর্থ কি রূপে ব্যয় করিতে ছেন, তাহারা তাহার সংবাদ রাখিতেন না। কলেজ গৃহের অভ্যন্তরে যথেষ্ট শাসন ছিল; কিন্তু কলেজের বাহিরে, অবকাশ দিনে, ছাত্রের কে কিরূপ ব্যবহার করে, কর্তৃপক্ষীয়েরা তাহার বড় সংবাদ পাইতেন না। অসংযতচিত্ত ও অপরিণামদর্শী ব্যক্তির জগতে শান্তির আশা কোথায় ? মধুসূদনের হৃদয়ের শান্তি ক্রমশঃ অন্তহিত হইতে লাগিল। তাহার স্নেহপ্রবণ-হৃদয় জননার অনুরােধে তিনি, মধ্যে মধ্যে, পিতৃগৃহে আগমন করিতেন; কিন্তু সেখানেও শান্তির প্রত্যাশা ছিল না। ধর্মমত ও সামাজিক আচার, ব্যবহার লইয়া, সময়ে সময়ে, পিতার সহিত তাঁহার বাদানুবাদ হইত। পিতা তিরস্কার করিতেন; শাসনে ও সংযমে অনভ্যস্ত মধুসূদনের তাহা সহ্য হইত না; তিনি উদ্ধতের ন্যায় প্রত্যুত্তর দিতেন। তাঁহার পিতা, শেষে বিরক্ত হইয়া, তাহার মাসিক সাহায্য জীবন-চরিত। বন্ধ করিয়া দিলেন। মধুসূদনের জননীর স্নেহের হ্রাস, বৃদ্ধি ছিল না। স্বামীর ও পুত্রের মধ্যে এরূপ মনােবা দেখিয়া, তিনি দারুণ যন্ত্রণা অনুভব করিতেন, কিন্তু প্রতিবিধান করার তঁাহার শক্তি ছিল না । মধুসূদনের হৃদয়ের অশান্তি ক্রমশঃ বর্ধিত হইতে লাগিল। যে সকল আশায় তিনি খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহার কিছুই তিনি প্রাপ্ত হইলেন না। যাহারা তাহাকে ভালবাসিতেন, এবং তিনিও যাহাদিগকে ভালবাসিতেন, ধর্মমত পরিবর্তনের জন্য, তাহার সেই বাল্যসুহৃগণও তাঁহার নিকট হইতে ক্রমশঃ দূরবর্তী হইয়া পড়িতেছিলেন। মধুসূদনের মনে সংস্কার জন্মিল যে, জগতে তাহাকে স্নেহ করিতে কেহ নাই । স্বদেশ তাহার নিকট প্রবাস এবং পিতৃগৃহ তাঁহার নিকট অরণ্যবৎ প্রতীয়মান হইল। কলিকাতা ছাড়িয়া, অন্য যে কোন স্থানেই হউক, যাইতে পারিলে, তাঁহার হৃদয়ের শান্তি ফিরিয়া আসিবে, তাহার এইরূপ ধারণা জন্মল। বিশ-কলেজে মান্দ্রাজ-প্রেসিডেন্সীর অনেক ছাত্র অধ্যয়ন করিতেন। তাহাদিগের মধ্যে দুই এক জনের সঙ্গে মধুসূদনের ঘনিষ্ঠত জন্মিয়াছিল। তাহাদিগের নিকট মান্দ্রাজের কথা শুনিয়া তিনি মনে করিলেন যে, সেখানে যাইলে তিনি সুখী হইতে পারিবেন। গােপনে, গােপনে সমস্ত পরামর্শ স্থির হইল ; অবশেষে, একদিন, পিতা, মাতা, আত্মীয়, বন্ধু কাহাকেও কিছু না বলিয়া, মধুসূদন বঙ্গদেশ ত্যাগ করিলেন। শ্রমিন।

পঞ্চম অধ্যায়। মাদ্ৰাজ-প্রবাস । [ ১৮৪৮–১৮৫৬ খৃষ্টাব্দ কি অবস্থায় মধুসূদন মাদ্রাজে গমন করিয়াছিলেন, আমরা পূর্ব অধ্যায়ে তাহার উল্লেখ করিয়াছি। তিনি মান্দ্রাজবাসকালীন অবস্থা। যখন মাদ্রাজে উপস্থিত হইলেন, তখন তাহার অবস্থা এখনকার ন্যায় ছিল না। এখন রেলওয়ের ও বাষ্পীয়-পােতের প্রচলনে মাদ্রাজের দূরতা অপনীত হইয়াছে ; কিন্তু তখন মাত্রাজ-গমন এখনকার দিনের ইংলণ্ড-গমনের ন্যায় কষ্টসাধ্য ছিল বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। এখন দুই চারি জন বাঙ্গালী, বিষয়-কাৰ্যোপলক্ষে, মাদ্রাজে বাস করিতেছেন, কিন্তু তখন মধুসূদনের স্বদেশীয় একজন লােকও, বােধ হয়, সেখানে ছিলেন না। সেখানকার ভাষা, এবং আচার, ব্যবহার কোন বিষয়েই মধুসূদনের অভিজ্ঞতা ছিল না। জাতীয় ধৰ্ম্ম ও জাতীয় পরিচ্ছদ পরিত্যাগ করাতে, তিনি হিন্দুসমাজের ঘৃণার আস্পদ হইয়াছিলেন। ইহার উপর তিনি আবার রিক্তহস্ত। পাঠ্যপুস্তকাদি বিক্রয় করিয়া যে সামান্য অর্থ সঙ্গে লইয়া গিয়াছিলেন, পাথেয় প্রভৃ- তিতে, অল্পদিনের মধ্যেই, তাহা নিঃশেষ হইয়াছিল। একেই ত এই নিঃসম্বল অবস্থা, তাহার উপর মাদ্রাজে পঁহুছিবার পরই তিনি বসন্তরােগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন ; সুতরাং কিয়ৎকাল তাহাকে দারুণ দুরবস্থায় জীবনযাপন করিতে হইয়াছিল। পিতার সহিত মনােমালিন্য আর ৫৪ জীবন-চরিত। ; হইবার সঙ্গেই তাঁহার অর্থাভাব উপস্থিত হইয়াছিল। কিন্তু যত দিন তিনি কলিকাতায় ছিলেন, তাঁহার স্নেহময়ী জননী, স্বামীর অজ্ঞাতসারে, তাহাকে মধ্যে মধ্যে অর্থ সাহায্য করিতেন, সুতরাং দারিদ্র্য-জনিত ক্লেশ যে কি মর্মভেদী, মধুসূদন এত দিন তাহা সম্পূর্ণরূপ অনুভব করেন নাই। কিন্তু এই সময় হইতে তিনি প্রকৃত প্রস্তাবে তাহার তিক্ত আস্বাদ প্রাপ্ত হইলেন। নিরুপায় হইয়া তাহাকে মাদ্রাজের দেশীয় খ্রীষ্টান ও ফিরিঙ্গী-সম্প্রদায়ের সাহায্য প্রার্থী হইতে হইল। তাহারা মধুসূদনকে পরিত্যাগ করিলেন না। তাহাদিগের অনুগ্রহে তিনি পিতৃমাতৃহীন, ফিরিঙ্গী বালকদিগের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা-কাৰ্য্য প্রাপ্ত হইলেন। তাঁহার অর্থাভাব ক্লেশ কথঞ্চিং দূরীভূত হইল; এবং তাহার নিজের ভাষায় বলিতে হইলে, “প্রবল ঝটিকা অতিক্রম করিয়া কূল 'প্রাপ্ত হইলে নাবিক যেমন শান্তিলাভ করে,” তিনি তেমনই শান্তিলাভ করিলেন। পৃথিবীর অনেক আপাত-প্রতীয়মান অমঙ্গলের ন্যায় মধুসূদনের মান্দ্রাজ, প্রবাস-কালান দুরবস্থাও, এক বিষয়ে, সাহিত্য-সেবা। তঁাহার ভবিষ্যৎ কল্যাণের কারণ হইল । প্রকৃতি তাঁহার অভ্যন্তরে যে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নিহিত করিয়া রাখিয়াছিলেন, নিরাশার ও দরিদ্রতার সংঘর্ষে এইবার তাহা উদগত হইবার সুযোেগ লাভ করিল। উপায়ান্তরের অভাবে তিনি, অর্থাগমের জন্য, সাহিতের উপর নির্ভর করিতে বাধ্য হইলেন। এতদিন তিনি, অনুশীলনাথ এবং অবকাশ-কালের বিনােদনের জন্য, সাহিত্যের সেবা করিয়া আসিতে- ছিলেন; কিন্তু এখন তাহাকে প্রাণধারণাৰ্থ সাহিত্যের আশ্রয়-গ্রহণ করিতে হইল। তিনি মাদ্রাজের প্রধান প্রধান সংবাদপত্রসমূহে প্রবন্ধ লিখিতে আরম্ভ করিলেন। তখন এদেশীয়দিগের মধ্যে অতি অল্প লােকই তাহার ন্যায় সুন্দর ইংরাজী লিখিতে পারিতেন, সুতরাং স্বল্প মাত্রা-প্রবাল। কালেরই মধ্যে তাঁহার সুখ্যাতি চতুর্দিকে ব্যাপ্ত হইল এবং মাদ্রাজের কৃতবিদ্যসমাজে তিনি একজন সুলেখক ও সুপণ্ডিত বলিয়া প্রতিষ্ঠা- লাভ করিলেন। যদিও হিন্দুকলেজে পাঠ করিবার সময়েই মধুসূদনের লিখিত অনেক কবিতা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হইয়াছিল, ক্যপটীভ লেডী রচনা। তথাপি এতদিন তিনি গ্রন্থকাররূপে সাধারণের সমক্ষে আবির্ভূত হন নাই। মাদ্রাজে তিনি যে সমস্ত পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখিতেন, তাহাদিগের মধ্যে Madras Circular & General Chronicle, Madras Spectator 99: Athaeneum af foa- খানির নাম উল্লেখযােগ্য। প্রথমােক্ত পত্রিকাখানির জন্য তিনি, কবিতায় একটা উপাখ্যান লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। সাধারণের পরিতােষে ও উৎসাহে উৎসাহিত হইয়া, তিনি ইহা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত করেন। এই উপাখ্যানের নাম ক্যাপটিভ-লেডী ; প্রকৃত প্রস্তাবে ইহাই তাহার প্রথম গ্রন্থ। ইতিহাস-প্রথিত পৃথীরাজের চরিত্র অবলম্বন করিয়া, ক্যাপটিভ, লেডী রচিত হইয়াছিল। রাজকুমারী সংযু- ক্যাপটিভ লেডীর বর্ণনীয় ক্তাকে পৃথীরাজের হস্ত হইতে রক্ষার জন্য, রাজা জয়চন্দ্র তাহাকে দ্বীপমধ্যস্থিত একটী গিরিদুর্গে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন। পৃথ্বীরাজ ভাটবেশে সেখান হইতে রাজকুমারীকে হরণ করিয়া লইয়া যান ; এবং তাহার পর মুসলমানগণ পৃথ্বীরাজের রাজধানী অবরােধ করিলে, পৃথ্বীরাজ, তাঁহা- দিগের হস্তে পরাজিত হইয়া, অগ্নি প্রবেশ দ্বারা প্রাণত্যাগ করেন। ইহাই সংক্ষেপে ক্যাপটিভ-লেডীর বর্ণনীয় বিষয় ! ঘটনা-বৈচিত্র্য, অথবা ভাবের লালিত্য অনুসারে বিচার করিলে, ক্যাপটিভ-লেডীতে উল্লেখ যােগ্য বিশেষ কিছুই নাই ; কিন্তু একটা কারণে ইহা আলােচনার বিষয়। ;

জীবন-চরিত। ভাব। উপযুক্ত। তরুণ-বয়সে ইংরাজী ভাষার উপর মধুসূদনের কিরূপ অসাধারণ অধিকার জন্মিয়াছিল এবং ভাষা ও ভাব সম্বন্ধে তাহার স্বাভাবিক প্রবণতা কিরূপ ছিল, ইহা হইতে তাহা অবগত হওয়া যায়। ইহার দুই একটী স্থল পাঠ করিলে মনে হয়, যেন বায়ণ, মূর বা স্কটের কোন গ্রন্থ পাঠ করিতেছি। মেঘনাদবধের যে তেজঃ প্রদীপ্ত ভাষা বঙ্গীয় কবিতায় এক অভিনব শক্তি সঞ্চার করিয়াছে, কাপটীভ-লেডীতে তাহার প্রথম স্ফুর্তি দেখিতে পাওয়া যায়। মধুসূদনের ভাষা যে তাঁহার পূর্ববর্তী বাঙ্গালি কবিগণের ভাষা হইতে বিভিন্ন, তাহার প্রধান কারণ এই যে, তিনি তাহা কোমল-মধুর সংস্কৃত ভাষা হইতে শিক্ষা করেন নাই ; সমধিক ওজোগুণান্বিত পাশ্চাত্য ভাষা ক্যাপটিভ, লেডীর ভাষা ও সমূহ হইতে শিক্ষা করিয়াছিলেন। ক্যাপটিভ, লেডী পাঠ করিলে মধুসূদনের রচনাপ্রণালীরও আদর্শ বুঝিতে পারা যায় । যে অলঙ্কার-বিন্যাস-প্রিয়তা মধুসূদনের রচনার একটা বিশেষ লক্ষণ, কাপটিভ, লেডীর সর্বত্রই তাহার আতিশয্য লক্ষিত হইবে। ক্যাপটিভ, লেডীতে প্রযুক্ত অনেক অলঙ্কার ও ভাব, পরে, তিনি তাহার অন্যান্য কাব্যে, পরিবর্তিত আকারে, ব্যবহার করিয়াছিলেন। ক্যাপটিভ, লেডীর সঙ্গে ভিসন্দ-অফ-দি-পাষ্ট ( Visions of the past) নামক আর একটী অসম্পূর্ণ কবিতা প্রকাশিত হইয়াছিল। ভিসন্স-অফ-দি-পাষ্টের অবলম্বনীয় বিষয় কি, ইহার বর্তমান অসম্পূর্ণ আকার হইতে অনুমান করিতে পারা যায় না। স্বদেশ ও সমাজ হইতে বিচ্যুত হইয়া মধুসূদন, একরূপ নিৰ্বাসিতের ন্যায়, মাত্ৰাজে উপস্থিত হইয়াছিলেন। বিবাহ করিয়া, এই স্থানে, তিনি প্রথমে গৃহস্থাশ্রমে প্রবিষ্ট হন। ক্যাপটিভ- বিবাহ ও পত্নী-ত্যাগ। লেডী প্রকাশিত হইবার অল্পদিন পূর্বে, তিনি মাত্রা প্রস। রেবেকা মাটাভিসনাম্নী স্কচ:বংশেৎপন্ন একটী কুমারীর পাণিগ্রহণ করেন। আশ্ৰমধৰ্ম্ম প্রতিপালন পূর্বক সুখ ও ধৰ্ম্মোপার্জনই বিবাহের উদ্দেশ্য। কিন্তু আশ্ৰমধৰ্ম প্রতিপালন করিয়া সুখী হইতে হইলে, যে সহিষ্ণুতার, স্বার্থত্যাগের এবং আত্মসংযমের প্রয়ােজন, মধুসূদনের চরিত্রে তাহা ছিল না। বিবাহের কয়েক বৎসর পরে পত্নীর সহিত তাঁহার সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন হইয়াছিল। মাদ্ৰাজ-প্রেসিডেন্সী-কলেজের তদানীন্তন কোন শিক্ষকের দুহিতা কুমারী হেরিয়েটাকে পত্নীভাবে গ্রহণ করিয়া তিনি জীবনযাপন করিয়াছিলেন। ইহার পর তাঁহার পত্নী, পুত্রাদির কথা দেখিলে, পাঠক এই শেষােক্তা মহিলার ও তাঁহারই গর্ভজাত পুত্র, কন্যাদির কথা বলিয়া বুঝিয়া লইবেন। আমরা পূৰ্বে বলিয়াছি, “ক্যাপটিভ-লেডী” রচনা করিয়া, মধু সূদন মাত্রাজের কৃতবিদ্যসমাজে প্রতিপত্তি লাভ করিয়াছিলেন। মাজ্জাজের প্রায় সমস্ত প্রধান প্রধান সংবাদ- মাত্রায় ক্যাপটিভ, পত্রে তাহার কাব্যের সুখ্যাতি প্রকাশিত লেডীর সমাদর। হইয়াছিল। আথিনীয় পত্রিকার কোন ইংরাজপ-প্রেরক, “ক্যাপটিভ, লেডীর সমালােচনা করিয়া লিখিয়া- ছিলেন ; “ইহাতে এমন অনেক স্থান আছে, যাহা বায়রণ অথবা স্কট নিজের রচনা বলিয়া পরিচয় দিতে কুণ্ঠিত হইতেন না; ” ( what believe neither Scott nor Byron would have been ashamed to own)। বিদেশীয় ভাষায় গ্রন্থ রচনা করিয়া পঞ্চ- বিংশবষবয়স্ক একজন যুবকের পক্ষে এরূপ প্রশংসালাভ অবশ্যই গৌরবের কিন্তু প্রতিভাবান্ পুরুষগণ যেমন সাধারণের অপেক্ষা বিদ্যাবুদ্ধিতে শ্রেষ্ঠ হন, তাহাদিগের আকাঙ্ক্ষাও তেমনই উচ্চতর হইয়া থাকে। সুতরাং এরূপ প্রশংসা অন্যের পক্ষে যথেষ্ট হইলেও মধুসূদন তাহাতে পরিতৃপ্ত হইতে পারেন নাই। না হইবার একটা বিশেষ বিষয়।

৮ জীবনচরিত। ছিলেন ; কারণ ছিল। শূন্যগর্ভ প্রশংসা লইয়া পরিতৃপ্ত থাকা কাহারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাহার গৃহে অন্নাভাব ঘটিতেছিল, তিনি প্রশংসা লইয়া কি করিবেন ? মান্দ্রাজের কৃতবিদ্য-সমাজের প্রশংসায় তিনি, প্রথম প্রথম, বড়ই উল্লাসিত ও আশ্বস্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু কবির উল্লাস ও অবসাদ । প্রথম উচ্ছাস প্রশমিত হইবার পরেই, নিরাশা ও অবসাদ আসিয়া উপস্থিত হইল। কেহ বায়রণের, কেহ স্কটের কাব্যের সঙ্গে তার কাব্যের তুলনা করিতেছিলেন ; আর তিনি, মুদ্রা- যন্ত্রের ঋণ পরিশােধ করিতে না পারিয়া, যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া বেড়াইতে- এরূপ অবস্থা গ্রন্থকারের পক্ষে বড় উৎসাহহাদ্দীপক নয় । মধুসূদনের আশা ছিল, অন্ধকারাচ্ছন্ন মান্দ্রাজ তাহাকে অর্থদানে উৎসাহিত না করুক, জ্ঞানােজ্জল কলিকাতা, নিশ্চয়ই, তাহার কাব্যের সমুচিত সমাদর করিবে। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে মধুসূদনের সে আশাও উন্ম লিত হইয়াছিল। মান্দ্রাজে অর্থাগমের সুবিধা না হউক, অন্ততঃ সুলেখক বলিয়াও, তিনি প্রতিষ্ঠালাভ করিতে পারিয়াছিলেন । কিন্তু কলিকাতায় তঁাহার ভাগ্যে তাহাও ঘটে নাই। যাহারা বিদ্যাবুদ্ধিতে সে সময়কার কলিকাতা-সমাজের অগ্রণীস্বরূপ ছিলেন, তাহারা “ক্যাপটিভ, লেডীর” সম্বন্ধে একরূপ উপেক্ষাই প্রদর্শন কলিকাতায় ক্যাপটিলেডীর করিয়াছিলেন । যে সকল সংবাদপত্র সম্পা: অনাদর। দকের নিকট “ক্যাপটিভ, লেডী” সমালােচনার জন্য প্রেরিত হইয়াছিল, তাহারা কেহই, তাহার সম্বন্ধে বিশেষ কোন প্রশংসাজনক কথা বলিয়া, কবিকে উৎসাহিত করেন নাই। উৎসাহ দেওয়া দূরে থাকুক, ইংরাজী ভাষায় গ্রন্থ লিখিয়া প্রতিষ্ঠালাভের দুরাশা যেন তিনি হৃদয়ে পােষণ না করেন, কেহ কেহ এই ভাবেই তাহাকে উপদেশ দিয়াছিলেন । নিজের সাংসারিক অভাবের ও মানসিক অশান্তির বিষয় উল্লেখ করিয়া, মধুসূদন ক্যাপটিভ, লেডীর ভূমিকায় ৫ মন্দা-প্রবাস। লিখিয়াছিলেন যে, “যে অবস্থায় পড়িয়া তিনি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন, তাহা কৰিশক্তিবিকাশের উপযােগিনী নয়।” কোন সম্পাদক, এই উপলক্ষ করিয়া, তাহার দরিদ্রাবস্থারও প্রতি বক্রোক্তি করিতে ক্ৰটী করেন নাই। মধুসূদনের সাহায্যার্থ, তাহার কলিকাতাস্থ বন্ধুগণ, “ক্যাপটিভ, লেডী” বিক্রয়ের জন্য, যথেষ্ট চেষ্টা করিয়াছিলেন । কিন্তু তাঁহারা পঞ্চাশ, ষাট জনের অধিক গ্রাহক সংগ্রহ করিতে পারেন নাই। দুই একজন কৃতবিদ্য, অথবা পদস্থ ব্যক্তি গ্রন্থকারকে মৌখিক উৎসাহ দিয়াছিলেন বটে, কিন্তু মধুসূদন বুঝিয়াছিলেন যে, তাহা তাঁহার গ্রন্থের গুণের জন্য নয়, তাঁহার নিজের প্রতি অনুকম্পা প্রদর্শনার্থ। কিন্তু সাহিত্য সম্বন্ধে মধুসূদন কাহার ও অনুগ্রহের বা অনুকম্পার ভিক্ষুক ছিলেন না। যাহারা কাব্য-জগতে সকলের শীর্ষস্থানীয়, তাহাদিগের সমকক্ষ হইবেন, এবং তাহার কবিত্বের গৌরবে জগৎকে বিস্মিত করিবেন, "astound the world with his fame" বাল্যাবধি ইহাই তাহার আকাঙ্ক্ষা ছিল। সুতরাং এরূপ অনুকম্পা প্রদর্শনে, উৎসাহিত না হইয়া, তিনি বরং ব্যথিত হইয়াছিলেন। নিজের শক্তি ও সামথ্য তিনি বুঝিতেন ; উপেক্ষাকারীর উপেক্ষা এবং অনুকম্পাশীলের অনুকম্পা সমভাবে প্রতা- খান করিয়া তিনি, স্বতন্ত্র পথ দিয়া, লক্ষ্যস্থানে উপনীত হইবার সঙ্কল্প করিলেন। মধুসূদন অনেক বিষয়ে চপল ও অস্থির-চিত্ত ছিলেন ; কিন্তু এক বিষয়ে তাহার কখনও মতিভ্রম হয় নাই। ক্যাপটিভ লেডীর অনাদরে সাহিত্যের সেবা করিয়া অক্ষয় কীৰ্ত্তি লাভ মধুসূদনের মনের ভাব। করিব, এ সম্বন্ধে তাহার লক্ষ্য, ধ্রুবতারার ন্যায়, চিরদিন, নিশ্চল ছিল। নিন্দা, উপেক্ষা, দরিদ্রতা, পারিবারিক অশান্তি, কিছুতেই তিনি সে লক্ষ্য হইতে বিচলিত হন নাই। ক্যাপটিভ, লেডী প্রকৃত প্রস্তাবে তাহার জীবনের প্রথম উদ্যম। প্রথম উদ্যমে জীবন-চরিত। • নয়। অকৃতকার্য হইলে, অনেকেই নিশ্বাস ও ভগ্নোৎসাহ হইয়া পড়েন। কিন্তু মধুসূদন ভগ্নোদ্যম হইবার পাত্র ছিলেন না। ক্যাপটিভ লেডী” অনাদৃত হইলেও তাঁহার লক্ষ্য পূর্বের ন্যায় নির্দিষ্ট রহিল ; তবে এক বিষয়ে একটী অতি গুরুতর পরিবর্তন ঘটিল। লক্ষাস্থলে উপনীত হইবার জন্য, এতদিন তিনি যে পথ অবলম্বন করিয়াছিলেন, এখন তিনি তাহার দুর্গমতা অনুভব করিতে পারিলেন। “ক্যাপটিভ লেডী” প্ৰকা- শিত হইবার পূর্ব পর্যন্ত তাহার ধারণা ছিল যে, ইংরাজী সাহিত্যেরই অনুশীলন দ্বারা তিনি অক্ষয় কীত্তি লাভ করিতে পারিবেন; কিন্তু এখন হইতে তাঁহার সে ভ্রম দূরীভূত হইল। সুস্পষ্টরূপে তখনও বুঝিতে না পারুন, এই সময় হইতে তাহার উপলব্ধি এন্মিল যে সেক্সপীয়রের এবং মিন্টনের ভাষায় চিরস্থায়ী কীৰ্ত্তিলাভ বিদেশীয়ের পক্ষে সুসাধ্য মাাজে তাহাকে কেহ এরূপ কথা বলেন নাই। কলিকাতায় যাঁহাদিগের নিকট তিনি বিশেষ সমাদরের আশা করিয়া- ছিলেন, তাহাদিগের মধ্যে দুই একজন তাহাকে তাহার ভ্রম প্রদর্শন করিতে পরায়ুখ হন নাই। ইহাদিগের মধ্যে একজনের নাম বিশেষ উল্লেখযােগ্য। ইনি আমা'দগের দেশের স্ত্রী-শিক্ষার প্রবর্তক, সুপরি ৮িতনামা, ড্রিঙ্ক ওয়াটার বেথুন। মহাত্মা বেথুনের উপদেশ ও পত্র। বেথুন, তখন আমাদিগের দেশের ব্যবস্থা- সচিব ও শিক্ষাসমাজের ( Education (ouncil) সভাপতি ছিলেন । সুতরাং তাহার ন্যায় ব্যক্তির মতামত যে কতদূর মূল্যবান্, তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। বেথুন যে ভাবে কাপটিভ লেডীর সমালােচনা করিয়াছিলেন, তাহা প্রকৃতই তাহার ন্যায় মহাত্মার উপযুক্ত হইয়াছিল। তিনি গ্রন্থকারকে ব্যঙ্গ করিয়া তাহার প্রথম উদামে অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন নাই ; সস্নেহ উপদেশবাক্যে, তাঁহার প্রলম্বিত পথের কুটিলতা নির্দেশ করিয়া দিয়া, গন্তব্য স্থলে উপস্থিত হইবার জন্য, মাজ-প্রবাস। অপেক্ষাকৃত সরল, সুপথ নির্দেশ করিয়া দিয়াছিলেন। অনেকে মহাত্মা বেথুনকে কেবল বঙ্গদেশে স্ত্রীশিক্ষার প্রবর্তক বলিয়া সম্মান করিয়া থাকেন। কিন্তু তিনি যে আমাদিগের জাতীয় সাহিত্যের উন্নতির জন্য কত চেষ্টা করিয়াছিলেন, তাহ, বােধ হয়, অতি অল্পলােকই অবগত আছেন। বঙ্গীয় সাহিত্যের উন্নতির জন্য, আমরা যে সকল বৈদেশিক পুরুষের নিকট ঋণা আছি, মহাত্মা, বেথুন তাহাদিগের অন্যতম। তাৎকালীন ইংরাজী-শিক্ষিত সম্প্রদায়ের হৃদয়ে বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ সঞ্চার করিবার জন্য, তিনি যেরূপ চেষ্টা করিয়া- ছিলেন, বৈদেশিকদিগের মধ্যে আর কেহই বোধ হয়, সেরূপ করেন নাই। সংবাদপত্রের স্তম্ভে, সভাস্থলে বক্তৃতায়, কথােপকথনকালে এবং পত্রে, সৰ্ব্বত্রই, তিনি বাঙ্গালা-ভাষা সম্বন্ধে নিজের অনুরাগ ব্যক্ত করিতেন। শিক্ষাসমাজের অধ্যক্ষরূপে যখনই তিনি কোন বিদ্যা- লয়ের পুরস্কার প্রদান-সভায় উপস্থিত থাকিতেন, তখনই তিনি, সেখান- কার ছাত্রদিগের হৃদয়ে যাহাতে বাঙ্গালা ভাষার প্রতি অনুরাগ সঞ্চার হয়, তজ্জন্য উপদেশ দিতেন। বিদ্যালয়ের ছাত্রদিগের হৃদয়ে বাঙ্গালা ভাষার প্রতি অনুরাগ সঞ্চার হইতেছে কি না, ইহাই অনেক স্থলে তাহার প্রথম জিজ্ঞাস্য ছিল। এরূপ অবস্থায় মধুসূদনের ন্যায় প্রতিভাবান্ নবীন লেখককে যে তিনি, বাঙ্গালা ভাষার অনুশীলনে উপদেশ দিবেন, তাহা সহজেই অনুমান করা যাইতে পারে। মধুসূদন বেথুনকে তাহার “ক্যাপটিভ লেডী” উপহার প্রেরণ করিলে বেথুন প্রত্যুত্তরে মধুসূদনকে যে পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহা হইতে বাঙ্গালা- ভাষার প্রতি তাহার কিরূপ অনুরাগ ছিল, তাহা সুস্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়। মহাত্মা বেথুনের ন্যায় মধুসূদনের বন্ধুগণও তাঁহাকে বাঙ্গালা ভাষার অনুশীলনে আহ্বান করিতেছিলেন। তাহার প্রিয়-সুহৃদ গৌরদাস বাবু, ৬২ জীবন-চরিত। --- 24 » « • যদিও নিজে, বাঙ্গালা ভাষায় পারদর্শী ছিলেন না, তথাপি মাতৃ ভাষার অনুশীলন ভিন্ন যে কোন গ্রন্থকারের পক্ষে স্থায়ী প্রতিষ্ঠালাভের সম্ভাবনা নাই, তাহা বুঝিতেন। সেই জন্য তিনি, বাঙ্গালা ভাষায় কাব্য রচনার জন্য, মধুসূদনকে সর্বদা অনুরােধ করিতেন। গৌরদাসবাবুর অনুরােধ, মহাত্মা বেথুনের সস্নেহ উপদেশ, এবং কলিকাতার শিক্ষিত সমাজের ঔদাসীন্য মধুসূদনের পক্ষে, পরিণামে মঙ্গলজনক হইল। তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, বিদেশীয় ভাষায় যতই অধিকার থাকুক, তাহাতে কাব্য-রচনা করিয়া চিরস্থায়ী গৌরব-লাভ করা কাহারও পক্ষে সহজ নয়। শুভক্ষণেই মধুসূদনের মনে এ কথা উদিত হইয়াছিল । যদি তিনি, স্বদেশীয় সাহিত্যের সেবা না করিয়া, কেবলই ইংরাজী সাহিত্যের সেবায় জীবন অতিবাহিত করিয়া যাইতেন, তাহা হইলে তিনি তাহার সমসাময়িকদিগের মধ্যে একজন উৎকৃষ্ট ইংৰাজী:লেখক ও সুপণ্ডিত ব্যক্তি বলিয়া প্রতিষ্ঠালাভ করিতে পারি তন; কিন্তু জাতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে কখনই স্থায়ী গৌরবলাভে সক্ষম হইতেন না। শুভক্ষণে মধুসূদন নিজের ভ্ৰম বুঝিতে পারিয়াছিলেন । এই সময় হইতে তাহার দৃষ্টি তাহার শৈশবের অনাদৃত মাতৃভাষার উপর পতিত হইল, এবং মাতৃভাষার অনুশীলন করিয়া যাহাতে তিনি চিরস্থায়ী গৌরব লাভ করিতে পারেন, তজ্জন্য তাহার বাসনা জন্মিল। হিন্দু কলেজে অধ্যয় নের সময়ে তিনি বাঙ্গালা ভাষার অনুশীলনে কিরূপ প্ররােচনা প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, আমরা পূর্বে তাহার উল্লেখ করিয়াছি। মাতৃভাষা বলিয়া তাহাতে স্বভাবতঃ তাহার যতটুকু অধিকার ছিল, মান্দ্রাজে আলােচনার অভাবে তাহা ৪ ক্রমে বিলুপ্ত হইয়া আসিতেছিল। তথাপি তাঁহার সংস্কার জন্মিল যে, বাঙ্গালা ভাষাই তাহার কবিশক্তি বিকাশের প্রকৃত ক্ষেত্র এবং তাহাতেই তিনি অক্ষয়কাত্তি লাভ করিতে পারিবেন। ভাষাকে অলঙ্কত করিবার উদ্দেশে, এই সময় হইতে তিনি বিদ্যালয়ের মাদ্ৰাজ-প্রবাস। বালকের ন্যায়, আগ্রহে ও পরিশ্রমে নানা ভাষা ও নানা গ্রন্থ অধ্যয়ন করিতে আরম্ভ করিলেন। নিজের এই সময়কার অধ্যয়নপ্রণালী সম্বন্ধে মধুসূদন গৌরদাস বাবুকে যাহা লিখিয়াছিলেন, তাহা পাঠ করিলে বিস্মিত হইতে হয়। বিলাসিতার ও ভােগাসক্তির মধ্যে মধুসূদনের বিদ্যোপার্জন- স্পৃহা কিরূপ প্রবল ছিল, পাঠক ইহা হইতে তাহা অনুমান করিতে পারিবেন। মধুসূদন আলস্যে সময়ক্ষেপ করিতেছেন সন্দেহ করিয়া গৌরদাস বাবু তাঁহাকে লিখিয়াছিলেন ; “এরূপ বৃথা সময়ক্ষেপ করা তােমার কর্তব্য নয় ; তুমি যদি তােমার শক্তি ও সামর্থ্য মাতৃভাষার সেবায় নিয়ােজিত করিতে, তাহা হইলে তাহা কতই ফল প্রদ হইত।” মধুসূদন প্রত্যুত্তরে লিখিয়াছিলেন ; “আমার জীবন এখন বিদ্যালয়ের বালকের অপেক্ষা, অধিক কার্যে ব্যস্ত। মধুসূদনের অধ্যয়নপীহা। আমার কার্যপ্রণালী এইরূপ ; ৬টা হইতে ৮টা পর্যন্ত হিব্রু ; ৮টা হইতে ১২টা পর্যন্ত স্কুলে অধ্যাপনা ; ১২টা হইতে ২টা পর্য্যন্ত গ্রীক ; ২টা হইতে ৫টা পর্যন্ত তেলেগু ও সংস্কৃত ; ৫টা হইতে ৭টা পর্যন্ত লাটিন, এবং ৭টার পর হইতে ১০টা পর্যন্ত ইংরাজী। ইহার পর কি তুমি বলিবে যে, আমি আমার মাতৃভাষাকে অলঙ্কত করিবার জন্য প্রস্তুত হইতেছি না’ ?* বিধাতা মধুসূদনকে স্বাস্থ্য ও প্রতিভা উভয়ই মুক্তহস্তে দান করিয়াছিলেন, বিদ্যোপার্জন সম্বন্ধে তিনি তাহার অপব্যবহার করেন নাই। তিনি বঙ্গদেশের সর্ব- শ্রেষ্ঠ কবি কি না, সে সম্বন্ধে মতভেদ থাকিতে পারে; কিন্তু বঙ্গীয় ; ; * "My life is more busy than that of a school-boy. Here is my routine : 0-8 Hebrew ; $--12 school ; 12-3 (Greek; ০-5 Telegu and Sanskrit ; ; 5-7 Latin ; 7-10 English. Am I not preparing for the great object of embellishing the tongue of my fathers ?”, মধুসূদনের মাত্রা প্রবাসকালীন লিখিত পত্র হইতে উদ্ধত। বিস্তৃত জীবনচরিত দেখ।

৩৪ জীবন-চরিত। কবিগণের মধ্যে তিনি যে বিদ্যাবত্তায় সকলের অগ্রগণ্য, তাহা, বােধ হয়, কেহই অস্বীকার করিতে পারিবেন না। মধুসূদন, মাতৃভাষাকে অলঙ্কৃত করিবার জন্য, এইরূপে প্রস্তুত হইতে- ছিলেন বটে, কিন্তু মাদ্রাজে তাহার সে অভিলাষ পূর্ণ হইবার সম্ভাবনা ছিল না । গ্রন্থ রচনা দ্বারা তথায় প্রতিষ্ঠালাভের সুবিধা দূরে থাকুক, বৎসরান্তে কাহারও সহিত মাতৃভাষায় একটী বাক্য-বিনিময়েরও সুযােগ ছিল না। আটবৎসরব্যাপী প্রবাস বড় সামান্য সময় নয় ; এই দীর্ঘ প্রবাসের ফলে বাঙ্গালা ভাষায় মধুসূদনের যৎসামান্য যে জ্ঞান ছিল, তাহাও, ক্রমে, বিলুপ্তপ্রায় হইয়াছিল। বাঙ্গালা ভাষার সহিত পাছে তাহার সম্বন্ধ লােপ হয়, সেই আশঙ্কায় তিনি কলিকাতা হইতে তাঁহার বালের প্রিয়গ্ৰন্থ কাশীদাসী মহাভারত ও কৃত্তিবাসী রামায়ণ আনাইয়া পাঠ করিতেন। কিন্তু, বাঙ্গালা দেশে প্রত্যাগমন করিয়া, তিনি যে আবার মাতৃভাষার অনুশীলন করিতে পারিবেন, ইহা তাহার নিকট দুরাশা বলিয়া প্রতীয়মান হইয়াছিল। ঘটনা কমে, কতক গুলি কারণে, মধুসূদনের মাত্রাজত্যাগ অনিবার্য। হই। উঠিল। তিনি বঙ্গদেশে প্রত গমন করিতে বাধ্য হইলেন ; তাহার ভাবী জীবনের পথও সেই সঙ্গে পরঙ্কত হইল। মধুসূদনের মান্দ্রাজ গমনের তিন বৎসর পরে, তাহার মাতৃবিয়ােগ মৃত্যুর সময় মধুসূদনের সঙ্গে তাহার সাংসারিক অবস্থা ; মাতার সাক্ষাৎ হয় নাই। মাতার মৃত্যুর মান্দ্রাত্যাগ। চারি বৎসর পরে মধুসূদনের পিতা ও পরলােক গমন করেন। মধুসূদন সে সংবাদ প্রাপ্ত হন নাই। তঁাহার আত্মীয়, জনগণ তাহার কোন সংবাদ রাখিতেন না, তিনি তাঁহাদিগের সংবাদ লইতেন না। মধুসূদন পরলােক গমন করিয়াছেন, এই বিশ্বাসে তঁাহা- দিগের মধ্যে কেহ কেহ মধুসূদনের পিতার পরিত্যক্ত সম্পত্তি অধিকার মাজা-প্রবাস। - * * * A * এ " / \"-A ; করিয়া বসিয়াছিলেন। খ্রীষ্টধৰ্ম্ম-গ্রহণের ফলে মধুসূদন, পূৰ্ব্ব হইতেই, আত্মীয়, বন্ধুগণের স্নেহ হইতে বিচ্যুত হইয়াছিলেন ; তাহার উপর আট বৎসর ব্যাপী প্রবাসের ফলে এমনই ঘটিয়াছিল যে, তাহার পিতৃগৃহে তাহার জন্য দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিবার লােক কেহ ছিলেন না। স্বদেশে, বিদেশে সকলেই তাহার কথা ভুলিয়া আসিতেছিলেন ; কেবল একজনের নিকট তাহার স্মৃতি, সমভাবেই, জাগরূক ছিল। তাহার প্রিয় সুহৃদ গৌরদাস বাবু তাহার কথা ভুলিতে পারেন নাই। তিনি পূৰ্বেরই ন্যায় সস্নেহে মধুসূদনকে পত্র লিখিতেন, এবং তাহার সাংসারিক অবস্থার অনুসন্ধান লইতেন। মধুসূদনের পিতার মৃত্যুর পর তিনি দেখিতে পাইলেন যে, তাঁহার পরিত্যক্ত সম্পত্তি অনন্য আসিয়া অধিকার করিতেছে, অথচ মধুসূদন বিদেশে অন্নাভাবে হাহাকার করিতেছেন। তিনি মধুসূদনকে, স্বদেশে প্রত্যাগমনপূৰ্ব্বক, পৈত্রিক সম্পত্তি অধিকার করিবার জন্য, অনুরােধ করিয়া, পত্র লিখিলেন। এদিকে মধুসূদনেরও, সাংসারিক অবস্থা সুবিধাজনক ছিল না। কল্পনায় তিনি যে সুখের বাসভবন নির্মাণ করিয়াছিলেন, তাহা কেবল আকাশকুসুমে পর্যবসিত হইয়াছিল। সামাজিক প্রতিষ্ঠা, পারিবারিক সুখ, কিছুই তাঁহার ভাগ্যে স্থায়ী হয় নাই। তিনি মাত্রাজের একমাত্র দৈনিক পত্রিকা “স্পেক্টেটরের” (Spectator। সহকারী সম্পাদক এবং স্থানীয় প্রেসিডেন্সি কলেজের একজন শিক্ষক নিযুক্ত হইয়াছিলেন। সুলেখক ৰলিয়া তাহার প্রতিপত্তি পূৰ্ব্ববৎ অক্ষুন্ন ছিল, কিন্তু তাহার প্রাণে কিছু মাত্র শান্তি ছিল না। চিরাভ্যস্ত অপরিমিতব্যয়িতা দোষে তিনি তখনও অর্থাভাবে ক্লেশ পাইতেছিলেন, এবং নিজের উচ্ছল ও অসংযত ব্যবহারের জন্য তাহার পারিবারিক জীবনও অশান্তিময় হইয়াছিল। মান্দ্রাজ তাহার নিকট কন্টকশয্যায় পরিণত হইল। “ক্যাপটিভ লেডী” বচনার পর, এবং তাহার প্রথমা কন্যা ভূমিষ্ঠ হইবার অব্যবহিত পূৰ্ব্বে, জৗবন-চরিত। তিনি উৎসাহে লিখিয়াছিলেন –“Heigh ho ! my stars are brightening”—কিন্তু বাস্তবিক তাহার গ্রহ সুপ্রসন্ন হয় নাই; তিনি কেবল বিড়ম্বিত হইয়াছিলেন মাত্র। নিরাশায় মর্মাহত হইয়া তিমি শেষে বলিতে বাধ্য হইলেন, “হায় ! সাংসারিক উন্নতির জন্য যেরূপ আশা করিয়াছিলাম, আমার ভাগ্যে তাহা ঘটিল না (“I have not thriven so well in the world as I had exepected”) i বঙ্গদেশে প্রত্যাগমনের জন্য গৌরদাস বাবুর আহ্বান তাহার নিকট বড়ই সময়ােপযােগী বােধ হইল। তিনি মাতৃভূমির ক্রোড়ে প্রত্যাগমন করিতে প্রস্তুত হইলেন, এবং ১৮৫৬ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে, আট বৎসর কাল বাসের পর মাত্রা ত্যাগ করিলেন ।

ষষ্ঠ অধ্যায়। মাদ্রাজ হইতে স্বদেশে প্রত্যাগমন—তাৎকালীন, বাঙ্গালা সাহিত্যের অবস্থা -বেলগাছিয়া থিয়েটার। ! ; আট বৎসর পরে মধুসূদন মাদ্রাজ হইতে বঙ্গদেশে প্রত্যাগমন করি- লেন। তাঁহার এই দীর্ঘ প্রবাসকালের মধ্যে, স্বদেশে প্রত্যাগমন, পুন্দা- নানাবিষয়ে, তঁাহার স্বদেশে অতি গুরুতর বস্থার পরিবর্তন। পরিবর্তন সংঘটিত হইয়াছিল। তিনি স্বদেশে প্রত্যাগমন করিলেন বটে, কিন্তু স্বদেশ বলিলে লােকে যাহা বুঝে, তাঁহার পক্ষে তাহার কিছুই ছিল না। তাহার নক, জননী লােকান্তরিত হইয়াছিলেন ; তাহাকে প্রত্যুগমন করিয়া লইবার লােক তাঁহার পিতৃ- গৃহে কেহই ছিলেন না। কলিকাতায় যে গৃহে তিনি, বাল্যে, পিতামাতার সঙ্গে সুখে বাস করতেন, তাহা আর একজনের অধিকৃত হইয়াছিল। তাহার জন্মভূমিতেও তাহার জন্য স্থান ছিল না। তাহার সুসম্পর্কীয়- গণের মধ্যে অনেকে তাহাকে চিনতে পারিলেন না; যাহারা পারিলেন, তাহাৱাও তাহাকে, ধৰ্ম্মচ্যুত বলিয়া, গ্রহণ করিতে সমর্থ হইলেন না। তাহার শৈশব-সুহৃদদিগের মধ্যে কেহ পরলােক গমন করিয়াছিলেন ; কেহ স্থানান্তর গিয়াছিলেন কেহ তাহার কথা বিস্মৃত হইয়াছিলেন ; কেহ ৰা, বিস্ত না হইলেও, তাহাকে দেখিয়া, আর সেই শৈশবের অনুরাগ প্রকাশ করিলেন না। তাহার চতুর্দিকে অপরিচিত মুখমণ্ডল স্বদেশে ফিরিয়া আসিয়াও তিনি বিদেশী ;-রঙ্গভূমি পট-পরিবর্তনের সঙ্গে যেমন অভিনব আকার ধারণ করে, বঙ্গদেশও তাঁহার সম্বন্ধে তেমনই এক নূতন আকার ধারণ করিয়াছিল। ;

জীবন-চরিত মধুসূদন নিজেও পরিবর্তিত হইয়াছিলেন। আটবৎসরব্যাপী প্রবাসের ফলে তাহার আকৃতি, প্রকৃতি সমস্তই পরিবর্তিত হইয়াছিল। তিনি পূর্বাপেক্ষা স্থূলকায় হইয়াছিলেন এবং মধুসূদনের নিজের পরিবর্তন। তাহার কণ্ঠের স্বর অনুরূপ হইয়াছিল। য়ুরােপীয় মহিলার পাণিগ্রহণ করিয়া, এবং বিজাতীয় সমাজের সংসর্গে বাস করিয়া, তিনি আহারে, পরিচ্ছদে এবং আচার ব্যবহারে, সম্পূর্ণরূপে, বৈজাতিক হইয়া দাড়াইয়াছিলেন। আলােচনার অভাবে তিনি স্বদেশীয় ভাষা বিস্মৃতপ্রায় হইয়াছিলেন। বন্ধুবান্ধবদিগের সহিত কথােপকথন কালে ইংরাজীভাষায় ও ইংরাজী রীতিতেই মনের ভাৰ ব্যক্ত করিতেন ; কচিৎ যে দুই একটা বাঙ্গালা শব্দ ব্যবহার করিতেন, তাহাও বিকৃত বৈজাতিক সুরে। হিন্দু কলেজে পাঠের সময়, তিনি, বাঙ্গালা ভাষার প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শনের জন্য, কখনও কখনও যে বলিতেন, “বাঙ্গালা ভাষা ভুলিয়া যাওয়াই ভাল’ মাত্রা প্রবাসের ফলে তাহার বালের সেই পি-ৰাক্য, কিয়ৎ পরিমাণে, সত্যে পরিণত হইয়াছিল। কেবল মধুসূদনেরই পরিবর্তন ঘটে নাই। রাজনীতি, সমাজ, ধৰ্ম্ম, ভাষা, প্রত্যেক বিষয়েই, এই সময়ের মধ্যে, সামাজিক পরিবর্তন। বঙ্গদেশে অতি গুরুতর পরিবর্তন ঘটিয়াছিল। বাষ্পনের ও তাড়িত বাৰ্তাৰহের প্রচলনে সমাজের সম্মুখে অনিৰ কর্মক্ষেত্রের দ্বার উদঘাটিত হইয়াছিল, এবং সেই সঙ্গে লােকের চিন্তা- স্রোতও নূতন পথে ধাবিত হইতে আরম্ভ করিয়াছিল। চতুর্দিকেই পরিবর্তন, পুরাতনের সহিত নূতনের সংগ্রাম। পশ্চাত্য ভাষা ও পাশ্চাত্য সমাজের সঙ্গে প্রাচ্য ভাষার ও প্রাচ্য সমাজের সংঘর্ষে এক অভিনব শক্তি সমুৎপন্ন হইয়া সমস্ত বঙ্গদেশকে আন্দোলিত করিতে আরম্ভ করিয়াছিল। সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, সকল বিষয়েই মধুসূদন যে পরিবর্তন-যুগের সূত্রপাত দেখিয়া গিয়াছিলেন, ফিরিয়া আসিয়া তিনি বাঙ্গালা সাহিত্যের অবস্থা। = তাহাদিগের পূর্ণবিকাশ দর্শন করিলেন। মধুসূদন তখন জানিতেন না যে, তাহারও প্রতিভা এই পরিবর্তন যুগা সম্বন্ধে কিরূপ কাৰ্য্য করিবে। ঐশ্বরিক বিধান বলে, উপযুক্ত সময়ে, তিনি বঙ্গদেশে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। মধুসূদন সাহিত্য-সেবক ;- সাহিত্যেরই সহিত তাহার ঘনিষ্ঠসম্বন্ধ- রাজনীতির অথবা সমাজ-নীতির সহিত তাহার বড় সম্বন্ধ ছিল না। সেই সাহিত্য সম্বন্ধেও তাহার প্রবাসকালের বঙ্গীয় সাহিত্যের অবস্থা। মধ্যে বঙ্গদেশে যুগান্তর উপস্থিত হইয়াছিল। তিনি যখন হিন্দুকলেজে অধ্যয়ন করিতেন, তখন বাঙ্গালা ভাষার প্রতি শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মনের ভাব কিরূপ ছিল, আমরা পূর্বে তাহার উল্লেখ করিয়াছি। বাঙ্গালা ভাষার আলােচনা করা দূরে থাকুক্‌, “বাঙ্গাল ভাষাতে আমার তেমন অভিজ্ঞতা নাই” একথা বলা, নব্য শিক্ষিত সম্প্রদায়ের অনেকে গৌরবজনক মনে করিতেন। কিন্তু মধুসূদন যখন মাদ্রাজ হইতে প্রত্যাগমন করিলেন, তখন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এবং বাবু অক্ষয়কুমারদত্তের প্রতিভাগুণে বাঙ্গালাভাষা আর এক অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছিল। মধুসূদনের মাত্রাজ হইতে প্রত্যাগমনের পূর্বেই বিদ্যাসাগরমহাশয়ের বেতালপঞ্চবিংশতি, জীবন- চরিত ও শকুন্তলা প্রভৃতি গ্রন্থ প্রকাশিত হইয়াছিল ;. এবং মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের যত্নে ও বাবু অক্ষয়কুমারের প্রতিভাগুণে তত্ত্ববােধিনী তখন বঙ্গসাহিত্যে এক নূতন যুগের প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল। বাঙ্গালা ভাষায় যে ওজস্বী, গম্ভীর রচনা হইতে পারে এবং সাহিত্য, বিজ্ঞান, ধৰ্ম্মনীতি প্রভৃতি যে কোন বিষয়ই যে, ইংরাজী ভাষার ন্যায়, বাঙ্গালা ভাষাতেও আলােচিত হইতে পারে, তত্ববােধিনী-পত্রিকা, তখন, তাহা শিক্ষিত ব্যক্তিগণের নিকট প্রতিপাদন করিয়াছিল। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এবং অক্ষয় বাবুর রচনা হইতে ইংরাজী-শিক্ষিত-সম্প্রদায় তখন বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, তাঁহাদিগের মাতৃভাষা অনাদরের সামগ্রী জীবন-চরিত। নয়; ক্ষমতাবান্ লেখকের হস্তে তাহা অসাধারণ শক্তি বিকাশ করিতে বাঙ্গালা ভাষার প্রতি এইরূপ অনুরাগ-সঞ্চারের সঙ্গে কাব্য ও কবিতা সম্বন্ধে সাধারণের কুচিরও পরিবর্তন রচন্দ্র গুপ্ত ও সংবাদ- আর হইয়াছিল। যতদিন ইংরাজী-শিক্ষিত একর। ব্যক্তিগণ বাঙ্গালা ভাষার আলােচনায় প্রবৃত্ত হন নাই, ততদিন সাধারণ বঙ্গীয় পাঠকের কচি মার্জিত ও বিশুদ্ধ ছিল না। এখন যেমন সংবাদপত্র ও কবিতা দুইটা স্বতন্ত্র বিভাগে পরিণত হইয়াছে, মধুসূদনের মান্দ্রাজগমনের পূর্বে সেরূপ অবস্থা ছিল । কবিবর ঈশ্বরচন্দু গুপ্তের সম্পাদিত, তখনকার সর্বশ্রেষ্ঠ পত্র, সংবাদ প্রভাকর, কবিতা-প্রধান ছিল। সাধারণ পাঠকগণ, ইহার গদ্যাংশ ত্যাগ করিয়া পদ্যাংশই আদরের সহিত পাঠ করিতেন। গুপ্ত-কবির কবিতা এখন ক্রমশঃ অপ্রচলিত মধুসূদনের পূবে বাঙ্গালা- হইয়া আসিতেছে ; সুতরাং তিনি যে, এক কবিতার অবস্থা। সময়, বঙ্গীয় সাহিত্যের উপর কিরূপ একাধি- পত্য করিয়া ছিলেন, এখন তাহা অনুভব করা সহজ নয়। তাহার প্রণীত কোনও পুস্তক প্রকাশিত হইলে, এবং তাহার পত্রিকায় কোন রহস্যগর্ভ কবিতা প্রচারিত হইলে, লােকে তাহা দেখিবার জন্য উৎসুক হইয়া থাকিতেন। তাহার ব্যঙ্গ-কবিতাসমূহ লােকের নিকট এত সমাদৃত হইত যে, অনেক সময়, প্রভাকরের দ্বিতীয় সংস্করণের দ্বারা সাধারণের ঔৎসুক্য পরিতৃপ্ত করিতে হইত। বালক, বৃদ্ধ, যুবা সকল শ্রেণীর মধ্যেই গুপ্তকবির কবিতার অনুরাগী ও অনুকরণকারী লােক বর্তমান ছিলেন। তঁাহায় পূর্বে বঙ্গভাষায় কৰিশ্রোত ভারতচরেই প্রদশিত পথে প্রবাহিত হইতেছিল তিনিই কেবল, আপনার প্রতিভাগুণে, তাহার গতির পরিবর্তন করিয়া- বাঙ্গালা সাহিত্যের অবস্থা। ছিলেন। তাহার সমকালবৰ্ত্তী কবিতা-লেখকগণের মধ্যে প্রায় এমন কেহই ছিলেন না, যিনি, কিয়ৎপরিমাণে, তাহার প্রভাবের বশবর্তী না হইয়াছিলেন। সে সময়কার ইংরাজী ভাষায় অনভিজ্ঞ মধ্য-বয়কদিগের এবং প্রাচীন সম্প্রদায়স্থ ব্যক্তিগণের মধ্যে ত তাহার একাধিপত্যই ছিল ; নব্য-বয়স্ক, ইংরাজী শিক্ষিতগণের মধ্যেও যাঁহারা তখন কবিতা লিখিতে অভ্যাস করিতেছিলেন, তাঁহারাও তঁাহার কবিতা আদর্শরূপে গ্রহণ করিতেন। অধিক কি স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র এবং সুপ্রসিদ্ধ নাটককার দীনবন্ধু মিত্র ও তাহার প্রভাব অতিক্রম করিতে পারেন নাই। মৈশ্বরী ( Mesmerism ) বিদ্যাবিৎ যেমন মন্ত্রমুগ্ধ ব্যক্তিকে ইচ্ছানুসারে পরিচালিত করেন, ঈশ্বরচন্দ্রও তাহার সমকালীন বঙ্গীয় লেখকদিগকে, এক দিন, সেইরূপ করিয়াছিলেন। কিন্তু কোন জাতির সাহিত্য, চিরদিন, ব্যক্তিবিশেষেরই প্রদর্শিত পথে বিচরণ করিবে, প্রকৃতির নিয়মে তা কখনও সম্ভবপর নহে। উপযুক্ত সময়ে বঙ্গসাহিত্যে মধুসূদনের অভূদয় হইয়াছিল ; তাহার সময় হইতে বাঙ্গালা কবিতার গতি ভিন্নমুখী হইয়াছে। গুপ-কবির কাৰ্য্য যেস্থানে শেষ হইয়াছিল, মধুসূদনের কাৰ্য্য ঠিক সেইস্থান হইতে আরব্ধ হইয়াছে। ইংরাজী শিক্ষার ফলে, তখন, বঙ্গদেশে এমন এক শ্রেণীর পাঠক আবিভূত হইয়াছিলেন যে, গুপ্ত কবির কবিতায় তাঁহাদিগের তৃপ্তিলাভের সম্ভাবনা ছিল না। বাবু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, গুপ্ত-কবির কবিতার সমালােচনা স্থলে যথার্থ ই বলিয়াছেন যে, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের পর হইতে “খাটি বাঙ্গালা কথায় বাঙ্গালির মনের ভাব খুজিয়া পাই না। * * * মধুসূদন, হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ শিক্ষিত বাঙ্গালির কবি—ঈশ্বরগুপ্ত বাঙ্গালার কবি; এখন আর খাটি বাঙ্গালি কবি জন্মে না -জন্মিবার যাে নাই—জলিয়া * ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতা সংগ্রহে প্রকাশিত “জীবনচরিত।” এ - - - ৭২ জীবনচরিত। । * Arr4 • কাজ নাই। বাঙ্গালার অবস্থা আবার ফিরিয়া অবনতির পথে না গেলে, খাঁটি বাঙ্গালি কবি আর জন্মিতে পারে না।** পাশ্চাত্য শিক্ষারই গুণে যে বাঙ্গালা সাহিত্য হইতে এই “খাঁটি বাঙ্গালি কবির তিরােধান ঘটিয়াছে, তাহা বলা অতিরিক্ত। অভাব অনুসারেই সৃষ্টি। পাশ্চাত্য শিক্ষা বঙ্গীয় পাঠকের হৃদয়ে যে অভাব উৎপাদন করিয়া দিয়াছে, আধুনিক বাঙ্গালি কবিগণ তাহাই পূরণ করিতেছেন। গুপ্ত-কবির সময় হইতেই এই পরিবর্তন-যুগের সূত্রপাত হইয়াছিল। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত নিজে যদিও ইংরাজী ভাষায় অভিজ্ঞ ছিলেন না; তথাপি ইংরাজী শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের মুখে শুনিয়া, অনেক কবিতার মৰ্ম্ম অবগত ছিলেন। পাশ্চাত্য ভাষা প্রচলনের সঙ্গে দেশীয় সাহিত্যের উপর যে একটা নূতন শক্তি কার্য করিতে আরম্ভ করিয়াছে, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির প্রভাবে, তাহা তিনি অনুভব করিতে পারিয়াছিলেন; এবং নিজেও, কিয়ৎপরিমাণে, সে শক্তির দ্বারা পরিচালিত হইয়াছিলেন। তাঁহার “সৰ্ববাদিসম্মত স্তোত্র”, (Universal Prayer ), নামে ইংরাজী সাহিত্যে সুপরিচিত কবিতার আদর্শে ও অনুকরণে রচিত হইয়াছিল । পাশ্চাত্য সাহিত্যের যে আলােক, মাধ্যহিক সূর্যকিরণ-সদৃশ প্রভায়, মধুসূদনে প্রতিবিম্বিত হইয়াছিল, ঈশ্বরচন্দ্রে তাহার প্রথম রশ্মি নিপতিত হইয়াছিল। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রে, পাশ্চাত্য ভাবের প্রতিবিম্বন হইলেও, প্রাচ্য ভাবেরই প্রাধান্য ; মধুসূদনে ঠিক ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ও মধুসূদন। ইহার বিপরীত। ঈশ্বরচন্দ্রে এক যুগের শেষ, মধুসূদনে অপর যুগের প্রারম্ভ। মধ্যে ব্যবচ্ছেদ ছিল, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য উভয় ভাবের সমন্বয়ে অনুপ্রাণিত একজন কবি, উভয়ের সংযােগসূত্ৰৰূপে, তাহা পূর্ণ করিয়াছিলেন । ইনি পদ্মিনী-উপাখ্যান-প্রণেতা, স্বর্গীয় বার রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। ঈশ্বরচন্দ্র ও মধুসূদন উভয়েরই সহিত ইহার ঘনিষ্ঠতা ছিল। ইনি একের বাঙ্গালা সাহিত্যের অবস্থা। শিষ্য, অপরের সুহৃদ। রঙ্গলাল বাবুর কবিতায় ঈশ্বরচন্দ্রের প্রভাব সুস্পষ্ট বর্তমান রহিয়াছে ; মধুসূদন তাহার পরবর্তী, সুতরাং মধুসূদনের প্রভাব তাহার উপর তাদৃশ প্রসারিত হয় নাই। কিন্তু অরুণ যেমন সূর্যের আবির্ভাব সূচনা করে, তিনিও তেমনই বঙ্গ-সাহিত্যে মধুসূদনের ন্যায় একজন যুগ-প্রবর্তক কবির আবির্ভাব সূচনা করিয়াছিলেন । তাহার “পদ্মিনী উপাখ্যান”, “কৰ্ম্মদেবী” প্রভৃতি গ্রন্থ প্রাচীন ও নব্য রীতির সংমিশ্রণে রচিত কাব্যের অতৃৎকৃষ্ট নিদর্শন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের শেষ বয়সের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কবিতা, রঙ্গলাল বাবুর “পয়িনী উপাখ্যান” এবং তাহার পর মধুসূদনের গ্রন্থাবলী যিনি মনােযােগের সহিত পাঠ করিবেন, তিনি বুঝিতে পারিবেন যে, জীব-জগতে, যেমন, ক্রমপরিণতি-অনুসারে, উচ্চ হইতে উচ্চতর জীবের আবির্ভাব হয়, মানসিক জগতের বিকাশ ক্ষেত্র সাহিত্যেও, তেমনই, শ্রেষ্ঠ হইতে শ্রেষ্ঠতর কাব্য, ইতিহাস বা দশনশাস্ত্র উদ্ভূত হইয়া থাকে। এইবার আমরা বাঙ্গালা সাহিত্যের কথা ছাড়িয়া মধুসূদনের নিজের কথা বলিব। মধুসূদন যখন মাদ্রাজ হইতে কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিলেন, তখন তিনি একবারেই নিঃসহায় কলিকাত। এত্যাগমনের পর ও নিঃসম্বল। বন্ধুবান্ধবদিগের চেষ্টায়, অল্পদিনের মধুসূদনের অবস্থা। মধ্যে, তিনি কলিকাতার পুলিস আদালতে একটী কেরাণীগিরির কার্য্য প্রাপ্ত হইলেন এবং পরে ভাষান্তরকারীর (Interpreter) পদে উন্নীত হইলেন। সাধারণের অজ্ঞাত এবং অপরিচিত ভাবে তাঁহার দিন গত হইতে লাগিল; কিন্তু তাহাকে অধিক দিন এইরূপে জীবনযাপন করিতে হয় নাই। সেই সময় বঙ্গদেশে এমন একটা মহৎ অনুষ্ঠান হইয়াছিল যে, মধুসূদনের ভাবি-জীবনের পথ তাহা দ্বারা পরিক্ষত হইল, নৃতন পন্যে। এবং তিনি আপনার বিধিনির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্র ৭৪ জীবন-চরিত। * * * * প্রাপ্ত হইলেন। মধুসূদনের জীবনের সহিত তাহার ঘনিষ্ট সম্বন্ধ আছে বলিয়া আমরা তাহার একটু বিস্তৃত আলােচনা আবশ্যক মনে করিতেছি। যদিও ভারতবর্ষে, অতি প্রাচীনকালেই, নাট্যশাস্ত্রের অনুশীলন হইয়াছিল বলিয়া জানিতে পারা যায়, তথাপি বাঙ্গালাদেশে অতি অল্পদিন মাত্র নাটকাভিনয়ের সূত্রপাত হইয়াছে। বাঙ্গালীর জাতীয় সাহিত্যের ন্যায় জাতীয় নাট্যশালারও অভূদয় ইংরাজাধিকারে হইয়াছে। ইংরাজসমাজ চিরদিনই নাটামােদের অনুরাগী। আফ্রিকার শ্বাপদপূর্ণ বনভূমিতে হউক, আর উত্তর-মেকর তুষারাবৃত প্রদেশেই হউক, যেখানেই দশজন ইংরাজ আছেন, সেখানেই তাহাদিগের জন্য একটী নাট্যশালা প্রতিষ্ঠিত দেখিতে পাওয়া যায়। অধিক কি, সমুদ্রবক্ষবাহী অর্ণবপােতেরও উপর তাহ- দিগের অভিনয়ক্রিয়ার বিরাম হয় না। এদেশে ইংরাজরাজ্যের সূত্রপাত হইতেই তাহারা নাট্যশালা সংস্থাপন করিয়াছিলেন। সেই সকল নাটা- শালায় গমনাগমন হইতে সে সময়কার দেশীয় সম্রান্ত ব্যক্তিদিগের মধ্যে কাহারও, কাহারও হৃদয়ে নাটকাভিনয়ের প্রতি অনুরাগ সঞ্চার হইয়া- ছিল ; এবং তাহার ফলে, কলিকাতার কোন কোন ধনাঢ়া ব্যক্তির গৃহে সংস্কৃত ও বাঙ্গালা নাটকাভিনয় হইয়াছিল । এইরূপ অভিনয়ের উদ্যোক্তাদিগের মধ্যে পাইকপাড়ার সুপ্রসিদ্ধ সিংহ:পরিবারস্থ রাজা প্রতাপচন্দ্রের ও রাজা ঈশ্বরচন্দ্রের নাম বিশেষরূপ উল্লেখযােগ্য। তাহারা, এই সময়, আপনাদিগের বেলগাছিয়াস্থিত উদ্যানে রত্নাবলী নাটকের অভিনয়ের জন্য বিপুল আয়ােজন করিতেছিলেন। রাজাদিগের উভয় ভ্রাতার তৎকালীন কলিকাতা-সমাজে বিশেষ প্রতিপত্তি ছিল। অতুল ঐশ্বর্যের অধিপতি এবং সাধারণের হিতকর অনুষ্ঠানসমূহের উৎসাহদাতা বলিয়া রাজপুরুষেরা তাহাদিগকে যথেষ্ট সম্মান করিতেন। তদ্ভিন্ন, ইংরাজ, পারসী, ইহুদী প্রভৃতি সকল সম্প্রদায়েরই লােকদিগের সহিত বেলগাছিয়া নাট্যশালা। ««« «« At re - 4u তাহাদিগের ঘনিষ্ঠতা ছিল। বেলগাছিয়া-নাট্যশালার অনুষ্ঠানের কথা শুনিয়া তাহাদিগের মধ্যে অনেকে অভিনয় দর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া- ছিলেন। এত অর্থ ব্যয় করিয়াও তাঁহাদিগকে নিমন্ত্রণ করা হইবে না, এবং করিলেও, বাঙ্গালা ভাষায় অনভিজ্ঞতাবশতঃ, তঁাহারা অভিনয়ের রসাস্বাদ করিতে পারিবেন না, এই ভাবিয়া রাজারা স্থির করিলেন যে, রত্নাবলী, ইংরাজীতে অনুবাদিত করাইয়া, অভিনয়ের সময়, ভাষায় অনভিজ্ঞ দর্শকদিগকে এক এক খণ্ড প্রদান করিবেন। ক্ষণেই তাহাদিগের হৃদয়ে এইরূপ সঙ্কল্প উদিত হইয়াছিল ; তাহাদিগের সেই সঙ্কল্প হইতেই মধুসূদনের ভবিষ্যৎ জীবনের পথ পরিষ্কৃত হইল। কলিকাতার অন্যান্য অনেক সম্ভ্রান্তগৃহেয় যুবকদিগের ন্যায় বাবু গৌরদাস বসাকও বেলগাছিয়া নাট্যশালার রত্নাবলীর ইংরাজী অনুবাদ। একজন প্রধান উদ্যােক্তা ছিলেন। মধুসূদন তখন মান্দ্রাজ হইতে প্রত্যাগমন করিয়া পুলিস আদালতে কাৰ্য্য করিতে- ছিলেন। রত্নাবলীর ইংরাজী অনুবাদ করা স্থির হইলে, গৌরদাস বাবু তাহার উপর এই ভার দিবার প্রস্তাব করিলেন। মধুসূদনের নাম বেলগাছিয়া-নাট্যশালার অনুষ্ঠাতৃগণের অবিদিত ছিল না। হিন্দুকলেজে অধ্যয়নাবস্থা হইতেই ইংরাজী সাহিত্যে সুপণ্ডিত বলিয়া তাহার প্রতিষ্ঠা ছিল, এবং ক্যাপটিভ-লেডী হইতে অনেকেই ইংরাজী ভাষার উপর তাহার অসাধারণ অধিকারের পরিচয় প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সুতরাং রাজারা, আলাদের সহিত, গৌরদাসবাবুর প্রস্তাব অনুসারে, মধুসূদনের উপর রত্নাবলী অনুবাদের ভার প্রদান করিলেন। এই হইতে রাজাদিগের উভয় ভ্রাতার এবং স্বর্গীয় মহারাজা সার (তৎকালে বাবু । যতীন্দ্রমােহন ঠাকুরের সহিত মধুসূদনের ঘনিষ্ঠতা আরব্ধ হইল। কবিশক্তির ন্যায় * মধুসূদনের সাহিত্যিক জীবনের সহিত ইহাদিগের তিন জনের সম্বন্ধ অতি যনিষ্ঠ। ইহাদিগের সাহায্য, এবং অনুরাগ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন বলিয়াই মধুসূদন, তাদৃশ জীবন-চরিত। সরস কথােপকথনশক্তিতেও মধুসূদন অদ্বিতীয় ছিলেন। যে সভায় তিনি উপস্থিত থাকিতেন, পাণ্ডিত্যে, বাকপটুতায়, এবং রহস্যনৈপুণ্যগুণে তিনি তাহার প্রাণ-স্বরূপ হইতেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি বেল, গাছিয়া নাট্যশালার অনুষ্ঠাতাদিগের প্রতিষ্ঠাভাজন হইলেন। তাহার কৃত অনুবাদ সকলেরই মনােনীত হইল। রাজারা নিজ ব্যয়ে তাহা মুদ্রিত করাইলেন এবং মধুসূদনকে তাহার পারিশ্রমিক স্বরূপ পাঁচ শত টাকা দিলেন। অল্প দিনের মধ্যে, সেরূপ প্রতিষ্ঠা লাভে সমর্থ হইয়াছিলেন। মধুসূদনের জীবন- চবিতে ইহাদিগের বিশেষ পরিচয়-প্রদান নিষ্প্রয়োজন, আমরা কেবল দুই চারটা কথা বলিয়াই নিরস্ত হইব। মহারাজা সাৰ যতীন্দ্রমোহনের নাম এক্ষণে বঙ্গের শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেরই পরিচিত। কিন্তু অনেকে কেবল তাহাকে অতুল ঐশ্বয্যের অধিপতি বলিযাই অবগত আছেন। তিনি যে, বঙ্গীয় সাহিত্যের উন্নতির জন্য, এক সময়, কিরূপ চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং নিজে যে একজন কিরূপ গুণগ্রাহী, সুপণ্ডিত এবং সুকুমার কলাবৎ ব্যক্তি ছিলেন, তাহা বোধ হয় অবগত নহেন। মধুসূদনের জীবনের সহিত তাহার সম্বন্ধ অচ্ছেদ্য। বাঙ্গালা সাহিত্যে অমিত্রচ্ছন্দের প্রবর্তন করিয়া মধুসূদন যখন প্রাচীনত্ব --পক্ষপাতী ব্যক্তিকেই তাঁহার সাহিত্য-শত্রু-স্থানীয় করিয়াছিলেন, ইনি এবং ইহার ন্যায় আরও দুইচারিজন ব্যক্তিই তখন তাহাকে আশ্বস্ত করিয়াছিলেন। উপযুক্ত স্থলে পাঠক তার দূরদশির ও গুণগ্রাহিতার পরিচয় প্রাপ্ত হইবেন। রাজা প্রতাপচন্দ্র এবং রাজা ঈরচ পাইকপাড়ার প্রসিদ্ধ লাল বাবুর বংশধর ছিলেন। অল্পবয়সে পরলােক গমন করাতে হাদিগের নাম ও প্রতিপত্তি ক্রমেই বিলুপ্ত হইয়া আসিতেছে। কিন্তু বঙ্গীয় সমাজ ও বঙ্গীয় সাহিত্য ইহাদিগের নিকট, এক সময়, বহু উপকার প্রাপ্ত হইয়াছিল। শিক্ষাবিস্তার, সমাজ-সংস্কার, রাজনৈতিক আন্দো লন, সাধারণের হিতকর যে কোন রূপ অনুষ্ঠান হউক, সকল এতকাযই ইরা সহানুভূতি প্রকাশ করিতেন। সুপ্রসিদ্ধ ব্রিটিস ইণ্ডিয়ান সভা, এক সময় ইহাদিগেরই অর্থসাহায্যে জীবিত ছিল। কলিকাতার মেডিক্যাল কলেজের দ্বার:রাগীদিগের আবাস প্রধানতঃ ইহাদিগেরই ব্যয়ে নির্শিত হইয়াছিল। রাজা প্রতাপচন্দ্র ও রাজা ঈশ্বরচন্দ্র ও পঞ্চাশ সহস্র টাকা দান করিয়াছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উদ্যােগে সংস্থাপিত সে সময়কার বালিকাবিদ্যালয় সমূহের উন্নতিসাধন কাযে তাহার প্রধান উদ্যোগী ছিলেন। অন্তঃপুরস্ক মহিলাগণের শিক্ষা তখন এদেশে সম্পূর্ণ নৃতন ছিল : রাজা এতাপচন্দ্র জপনার দুহিতার জন্য শিক্ষয়িত্রী নিয়োগ করিয়া, এ সম্বন্ধে প্রথম } বেলগাছিয়া নাট্যশালা। এইরূপে অভিনয়ের সমস্ত আয়ােজন সম্পূর্ণ হইলে, ১৮৫৮ খৃষ্টাব্দের একুত্রিশে জুলাই, রত্নাবলী প্রথমবার অভিনীত রঙ্গালী-অভিনয়। হইল। প্রথম দুই বারের অভিনয়ে কেবল বাঙ্গালী দর্শকগণই উপস্থিত ছিলেন। তৃতীয় ও চতুর্থ বারের অভিনয়ে বাঙ্গালী দর্শকদিগের সঙ্গে ইংরাজ, মুসলমান ইহুদী প্রভৃতি সকল সম্প্র- দায়ের লােকই আহুত হইয়াছিলেন। বঙ্গদেশের শাসনকর্তা সার ফ্রেডারিক হ্যালিডে, হাইকোর্টের বিচারপতিগণ, কমিশনার, ম্যাজিস্ট্রেট প্রভৃতি উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারিগণ এবং কলিকাতার প্রধান প্রধান সম্রান্ত ব্যক্তি সকলেই অভিনয়স্থলে উপস্থিত ছিলেন ; বঙ্গদেশে আর কখনও এরূপ ভাবে কোন নাটক অভিনীত হয় নাই। অভিনয়ক্রিয়া কিরূপ সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী হইয়াছিল, এতদিন পরে তাহা বর্ণনা করিয়া বুঝাই- পথ প্রদর্শন করিয়াছিলেন। বিধবাবিবাহ-প্রচারের জন্যও তিনি প্রচুর যত্ন ও অপর্যাপ্ত অর্থব্যয় করিয়াছিলেন। মধুসুদন ইহাদিগের উভয় ভাতার নিকট যথেষ্ট সাহায্য প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তাহার লেখা হইতে আমরা ইহাদিগের সম্বন্ধে যে দুইটা স্থল উদ্ধত করিতেছি, পাঠক তাহা হইতে ইহাদিগের গুণগ্রাহিতার পরিচয় প্রাপ্ত হইবেন। "Should the drama ever again flourish in India, posterity will not forget these noble gentlemen-the earliest friends of our rising national theatre.” যদি কখনও ভারতবর্ষে আবার নাট্যশাস্ত্রের আবৃদ্ধি হয়, তবে ভবিষ্যৎ বংশীয়গণ আমাদিগের জাতীয় নাট্যশালার প্রথম সুহৃদ এই মহানুভব ব্যক্তিগণকে বিশ্ব ত হইবেন না। (শস্মিষ্ঠা নাটকের ইংরাজী অনুবাদের ভূমিকা)। রাজা ঈশ্বরচত্রের মৃত্যুতে তিনি লিখিয়াছিলেন ;-- আমাদিগের পরমাত্মীয় রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ মহাশয় অকালে কালগ্রাসে পতিত হওয়াতে দর্শন-কাব্যের উন্নতি বিষয়ে যে কতদুর ক্ষতি হইয়াছে, তাহা দর্শন-কাব্য-প্রিয় মহাশয়গণের অবিদিত নহে। আমি এই ভরসা করি যে, মৃত রাজা মহাশয় যে বীজ রােপণ করিয়া গিয়াছেন, তাহার বৃতি বিষয়ে অন্যান্ত মহাশয়েরা যত্নবান হন। এই কাব্য বিষয়ে উক্ত রাজা মহাশয় যে আমাকে কতদুর উৎসাহ প্রদান করিয়াছিলেন, তাহা মনে পড়িলে ইচ্ছা হয় না যে, আর এ পথের পথিক হই। হায়! বিধাতা এ তুমি এতি কেন প্রতিকূলতা একাশ করিলেন। কৃষ্ণকুমারীর উৎস-পত্র। ০ জীবনচরিত। বার সম্ভাবনা নাই। বেলগাছিয়া নাট্যশালার দর্শক ও অভিনেতৃ- গণের মধ্যে যাহারা এখনও জীবিত আছেন, তাহারা সকলেই একবাক্যে বলেন যে, সেরূপ অনুষ্ঠান ইহার পূর্বে বঙ্গদেশে কখনও হয় নাই। তানলয়বিশুদ্ধ সঙ্গতি, সুচারু দৃশ্যপট, সুরুচিসঙ্গত বেশভূষা এবং সর্বো- পরি স্বভাবানুযায়ী অভিনয়, যাহা কিছু দর্শককে প্রীত,ও বিমুগ্ধ করে, তাহার সকলগুলিরই সেখানে আমােফন হইয়াছিল। অর্থে ও পরিশ্রমে যাহা সম্ভবপর, তাহার কিছুই ত্রুটি হয় নাই । বজয় দশকের সমক্ষে যেন এক অভিন, স্বপ্নময় রাজ্য অবতারিত হইয়াছিল । অভিনয়-ক্রিয়ার সাক্ষী হিন্দু কলেজের একজন সুযােগ ছাত্র এ সম্বন্ধে আমাদিগকে লিখিয়াছিলেন, “একেইত নাট্যশালা সৰ্বাঙ্গসুন্দর ; তাহার উপর অচেষ্ট্রা যতদুর মনােম হইতে পারে, তাহা হইয়াছিল। ইহাতে রঙ্গভূমির শােভা ইন্দ্রালয়ের ন্যায় হইয়াছিল, এ কথা বললেও অত্যুক্তি হইতে পারে না। শ্রোতা মাত্রই মােহিত হইয়াছিলেন এবং আমি স্বাভাৰিক অনেক বিষয়ে সিনকাল, (Cynical ) আমিও, ক্ষণকাল, মােহিত হইয়াছিলাম।” রত্নাবলী-অভিনয়ের প্রশংসা সমস্ত বঙ্গদেশময় ব্যাপ্ত হইল। সে সময়কার প্রধান প্রধান সংবাদপত্রসমূহ এক- রত্নাবলীর ইংরাজী অনুবাদের বাক্যে তাহার সুখ্যাতি করিতে লাগিল; সেই ঐশংসা। সঙ্গে রত্নাবলীর ইংরাজী অনুবাদকেরও নাম চতুর্দিকে প্রসারিত হইল। বঙ্গের ছছাটলাট ও তাহার সহধর্মিণী হইতে সংবাদপত্র-সম্পাদকগণ পর্যন্ত সকলেই অনুবাদ দর্শনে পরিতুষ্ট হইলেন। তৎকালপ্রসিদ্ধ হরকর-পত্রিকার সম্পাদক এই অনুবাদের প্রশংসা করিয়া লিখিয়াছিলেন যে, “এরূপ বিশুদ্ধ ইংরাজী রচনা আমরা কখনও দেখি নাই। বাঙ্গালীর লেখনী হইতে এরূপ লেখা যে হয়, আমরা জানিতাম না। কেবল বাঙ্গালী নহে, কলিকাতার মধ্যে অনেক রত্নাবলীর ইংরাজী অনুবাদ। ইংৰাজও, এরূপ লিখিতে পারিয়াছি বলিয়া, আপনা আপনি শ্লাঘ প্রকাশ করিলে, অহঙ্কত বলিয়া দূষিত হইবেন না !* * রত্নাবলীর এই ইংরাজী অনুবাদ হইতে মধুসূদন তাহার জীবনের গন্তব্য পথ প্রাপ্ত হইলেন। যশােমন্দিরে মধুসূদনের গন্তব্য পথ প্রাপ্তি। আরােহণের পথ অতীব দুল্লক্ষ্য, কিন্তু একবার তাহার সােপান পংক্তি দৃষ্টিগােচর হইলে আরােহণকারীকে আর বিশেষ ক্লেশ ভােগ করিতে হয় না, দৃঢ়পদে অগ্রসর হইলেই তিনি গন্তব্যস্থলে উপনীত হইতে পারেন। বেলগাছিয়া নাট্যশালার সহিত সম্বন্ধ, মধুসূদনকে তাহার চিরপ্রার্থিত যশােমন্দিরে আরােহণের সােপান- পংক্তি প্রদর্শন করিয়াছিল। লক্ষ্যস্থলে উপনীত হইবার জন্য, আর কখনও তাঁহাকে, পথভ্রান্ত হইয়া, ইতস্ততঃ পৰ্য্যটন করিতে হয় নাই। ধীরভাবে, অথচ দৃঢ়পদক্ষেপে, অগ্রসর হইয়া তিনি আপনার গন্তব্য স্থান প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ভাবষ্যৎ-বংশীয়গণ রত্নাবলীর ইংরাজী-অনুবাদ বিস্মৃত হইবেন বটে, কিন্তু তাহা মধুসূদনের জীবনের পথ কিরূপে পরিষ্কত করিয়া দিয়াছিল, সে কথা বিস্মৃত হইতে পারিবেন না। খলীয় রাম চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের লিখিত।

সপ্তম অধ্যায়। প্রাচ্য কবিদিগের প্রভাবকাল। শর্মিষ্ঠা, পদ্মবতী এবং তিলােতমা-সম্ভব-কাব্য-রচনা। [ ১৮৫৮-১৮৫৯ খৃষ্টাব্দে ] এক দিন রত্নাবলীর অভিনয়াভাস ( Rehearsal) দেখিতে দেখিতে মধুসূদন, গৌরদাস বাবুকে বলি- বাঙ্গালা নাটক-রচনার সঙ্কল্প । লেন; “দেখ, কি দুঃখের বিষয় যে, এই এক থানা অকিঞ্চিৎকর নাটকের জন্য, রাজারা এত অর্থবা করিতেছেন।” গৌরদাস বাবু শুনিয়া বলিলেন, “নাটকখানা যে অকিঞ্চিৎকর, তাহা আমরাও জানি; কিন্তু উপায় কি? ভাল নাটকপাইলে, আমরা রত্নাবলী অভিনয় করিতাম না, কিন্তু ভাল নাটক বাঙ্গালা ভাষায় কোথায়?" মধুসূদন বলিলেন, “ভাল নাটক ? আচ্ছা, আমি রচনা করিব।” গৌরদাস বাব শুনিয়া হাসিয়া উঠিলেন। বাঙ্গালা ভাষায় মধুসূদনের যতদূর জ্ঞান, তাহা তাহার অগােচর ছিল না। গ্রন্থরচনা দূরে থাকুক, বাঙ্গালা ভাষায় একখানা পত্র লিখিতে হইলে যে, মধুসূদনের শিরঃপীড়া উপস্থিত হইত, তাহা তিনি জানিতেন। কিন্তু তিনি, তখন, ভাব গােপন করিয়া, বলিলেন,“ভালই! ইচ্ছা হইলে চেষ্টা করিয়া দেখিতে পার।” মধু- সূদন বুঝিতে পারিলেন, গৌরদাস বাবু মুখে তাহাকে যাহাই বলুন, অন্তরে হার কথায় অস্থা-স্থাপন করিলেন না; কিন্তু তিনি সে সময় আর কোন কথা বলিলেন না। উপেক্ষায় নিরস্ত থাকা মধুসূদনের প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল।

শর্মিষ্ঠা ও পদ্মাবতী রচনা। ৮১ গৌরদাস বাবুর সহিত এইরূপ কথােপকথনের পর দিনই তিনি আসিয়া- টিক সােসাইটির পুস্তকালয় হইতে সে সময়কার প্রচলিত কতকগুলি বাঙ্গালা পুস্তক ও সংস্কৃত নাটক সংগ্রহ করিয়া আনিলেন, এবং মনাে- যােগের সহিত তাহা পাঠ করতে আরম্ভ করিলেন। ইহার কয়েক দিন পরেই তিনি শৰ্ম্মিার পাণ্ডুলিপির কিয়দংশ গৌরদাস বাবুকে দেখিবার জন্য দিলেন। যে মধুসূদন, ইহার কিছুদিন পূৰ্ব্বে, বাঙ্গালা রচনায় পৃথিবী লিখিতে “প্র-থিবী” লিখিয়া আসিয়াছিলেন, সহসা, তাহার গ্রন্থের এইরূপ পাণ্ডুলিপি পাইয়া গৌরদাস বাবু বিস্মিত হইলেন।* রাজা প্রতাপ চন্দ্র, রাজা ঈশ্বরচন্দ্র, এবং মহারাজা যতীন্দ্রমােহনও, গৌরদাস বাবুর মুখে মধুসূদনের নাটক-রচনার কথা শুনিয়া, অতান্ত কৌতূহলাক্রান্ত হইয়াছিলেন। ইংরাজী-নবী, মাদ্ৰাজী সাহেব, মধুসূদন বাঙ্গালা ভাষায় গ্রন্থ রচনা করিতেছেন, ইহা সকলেরই পক্ষে যেন বিস্ময়ের বিষয় হইয়াছিল ; পাণ্ডুলিপি পাঠ করিয়া সকলেই চমৎকৃত হইলেন। ইহা- দিগের সকলের উৎসাহে মধুসূদন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, শৰ্ম্মিষ্ঠার অবশিষ্টাংশ সম্পূর্ণ করিলেন। রাজাদিগের সুহৃদ্ এবং পরিজনদিগের মধ্যে ইংরাজী ‘শক্ষিত, নব্য সম্প্রদায়স্থ ও ইংরাজী অনভিজ্ঞ, প্রাচীন সম্প্রদায়স্থ দুই শ্রেণীরই লােক ছিলেন। শর্মিষ্ঠার দোষ, গুণ সম্বন্ধে এই উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশেষ মতভেদ হইল। প্রাচীন রীতির পক্ষপাতিগণ, মধুসূদনের রচনায় নানাবিধ অলঙ্কার-শাস্ত্রোক্ত দোষ নির্দেশ করিয়া, তাহার প্রতি উপেক্ষা প্রদশন করিলেন। কিন্তু নব্য সম্প্রদায় তাহাতে নিরস্ত হইলেন না ! মধুসূদনের ন্যায় তাঁহারাও অলঙ্কার- * ইহার কিয়দিন পূৰ্ব্বে, হুগলী নাল স্কুলের শিক্ষকতার জন্য, মধুসূদন প্রতিযোেগ পরীক্ষায় উপস্থিত হইয়াছিলেন। ভূদেব বাবুও এই পদের জন্য প্রার্থী ছিলেন। পরীক্ষার পর মধুসূদন, বাহিরে আসিয়া, ভূদেব বাবুকে জিজ্ঞাসা করিলেন,“ভাই,পৃথিবী কথাটার নান কি?” ভূদেব বাবু যাহা জানিতেন, বলিলেন। মধুসূদন তখনমান্দ্রাজ ফেরৎ সাহেব ; সাহেব ঢঙে বলিলেন, (Oh no, it must be-এ-থিবী •• জীবন-চরিত। শাস্ত্রোক্ত দোষ, গুণের বিশেষ সংবাদ রাখিতেন না। মধুসূদনের নাটকের ভাষা সুমধুর, বণিত বিষয় চিত্তাকর্ষক, এবং অঙ্কিত চরিত্রগুলি স্বভাবানুযায়ী হইয়াছে দেখিয়াই তাহারা পরিতৃপ্ত হইলেন। নাটক- খানি প্রচীন, কি আধুনিক রীতি অনুসারে লিখিত, তাহা অনুসন্ধান করিতে তাহাদিগের তাদৃশ আগ্রহ হইল না। মহারাজা যতীন্দ্রমােহন এবং রাজা ঈশ্বরচন্দ্র এই দলের নেতা ছিলেন। তাঁহার, শর্মিষ্ঠার পাণ্ডুলিপি পাঠ করিয়া, বিশেষ পরিতুষ্ট হইলেন এবং তাহা বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনীত হইবার সম্পূর্ণ উপযুক্ত বলিয়া অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন; মহারাজা যতীন্দ্রমােহন নিজে শৰ্ম্মিষ্ঠার জন্য কয়েকটি সঙ্গীত রচনা করিলেন। শেষাঙ্কের শিব-স্তোত্ৰ-বিষয়ক সুমধুর সঙ্গীতটি তাহারই রচিত। এইরূপে গ্রন্থ সম্পূর্ণ হইলে রাজারা, মধুসূদনকে উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদান পূৰ্ব্বক, শৰ্ম্মিষ্ঠা নিজেদের ব্যয়ে মুদ্রিত করাইলেন। শর্মিষ্ঠা ১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দের প্রারম্ভে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় এবং ১৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দের ৩রা সেপ্টেম্বর, মহা সমা- শৰ্ম্মিস্থা-অভিনয়। রােহের সহিত, বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনীত হয়। রত্নাবলী-অভিনয়-কালের ন্যায়, এবারও, কলিকাতার প্রধান গ্রধান ব্যক্তিগণ অভিনয়-ক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। পূর্বের ন্যায় এবারও, বাঙ্গালা ভাষায় অনভিজ দর্শকগণের জন্য, অভিনীত নাটক ইংরাজীতে অনুবাদ করা হইয়াছিল। মধুসূদন নিজেই নিজের গ্রন্থের অনুবাদ করিয়াছিলেন। নাট্যশালা কিরূপ মনােহর এবং অভিনয়ের আয়ােজন কিরূপ সৰ্বাঙ্গ সুন্দর হইয়াছিল, আমরা পূর্বে তাহার আলােচনা করিয়াছি। সেইরূপ সুচাৰু দৃশ্যপট, সেইরূপ প্রকৃতি সঙ্গত অভিনয় এবং সেইরূপ তানলয়বিশুদ্ধ সঙ্গীত, সুতরাং দর্শকগণ এবারও, সোহিত হইলেন। অভিনয়ের প্রশংসার সঙ্গে অভিনীত নাটকের প্রশংসা সর্বত্র ঘােষিত হইল।

শর্মিষ্ঠা ও পদ্মাবতী রচনা। ৮৩ রত্নাবলীর অনুবাদ হইতে মধুসূদন ইংরাজাভাষায় সুপণ্ডিত বলিয়া প্রতিষ্ঠালাভ করিয়া ছিলেন ; শর্মিষ্ঠারচনা হইতে, এইবার, বাঙ্গালা ভাষা- তেও সুলেখক বলিয়া সম্মানলাভ করিলেন। সাধারণের নিকট বেলগাছিয়া নাট্যশালার প্রতিষ্ঠালাভ। অনুষ্ঠাতৃগণ ঐশ্বর্য্যে ও সন্ত্ৰমে তাৎকালিক কলিকাতা-সমাজে বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিলেন ; সুতরাং তাহাদিগের সমাদরে মধুসূদন সাধার- ণেরও সমাদরভাজন হইলেন। যে সকল ঘটনায় লােকের উন্নতির পথ পরিষ্কৃত হয়, বিধাতার অনুগ্রহে ও নিজের প্রতিভাবলে, তিনি তাহা প্রাপ্ত হইলেন। প্রকৃতি-দত্ত প্রতিভার সঙ্গে প্রতিভার উৎসাহদাতা বন্ধুও তিনি লাভ করিলেন। রাজা প্রতাপচন্দ্র ও রাজা ঈশ্বরচন্দ্র, রাজোচিত উদারতার সহিত, তাহার প্রতিভার সম্মান করিলেন। তাহাদিগের কৃপায় দুৰ্ব্বহ ঋণভার বিমােচিত হওয়ায় মধুসূদনের চিত্ত সুস্থ হইল ; তিনি উৎসাহের সহিত সাহিত্যের সেবায় প্রবৃত্ত হইলেন। ইংরাজী ভাষায় গ্রন্থরচনা করিয়া মধুসূদনের ভাগ্যে কিরূপ পুরস্কার মিলিয়াছিল, আমরা পূৰ্ব্বে তাহার উল্লেখ করিয়াছি। বাঙ্গালা ভাষায় গ্রন্থরচনা দ্বারা এক্ষণে তাহার চিরাভিলষিত বাসনা চরিতার্থ হইবার সুযােগ উপস্থিত হইল। নাটকৰচনাতেই তিনি নিজের শক্তির পরিচয় পাইয়াছিলেন ; কাল বিলম্ব না করিয়া, তিনি আর একখানি নাটক রচনায় প্রবৃত্ত হইলেন। তাহার প্রথম নাটক, শৰ্ম্মিষ্ঠা-মহাভারতীয় যযাতি-উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত হইয়াছিল। চন্দ্রবংশীয় মহারাজ যযাতির পদ্মাবতীর ও শন্মিষ্ঠার সহিত ঋষিদুহিতা দেবযানীর এবং অসুররাজ- অবলম্বনীয় বিষয়। কুমারী শস্মিষ্ঠার বিবাহ এই নাটকের বর্ণনীয় বিষয়। তাঁহার দ্বিতীয় নাটক, পদ্মাবতী, গ্রীক পুরাণে ছাপাতে রচিত হইয়াছে। গ্রীকপুরাণের সুপরিচিত সুবর্ণ আপেল উপাখ্যানের ;

৮৪ জৗবন-চরিত। - ৮ = = 514 - - - - - ৭ কথোপকথন। আদর্শে বিদর্ভরাজ নীলধ্বজের সহিত মাহিষ্মতীপুরীর রাজকন্যা পদ্মা- বতীর মিলন এই নাটকে বর্ণিত হইয়াছে। মধুসূদন সৰ্বাংশে গ্রীক পুরাণের অনুকরণ করেন নাই। তিনি পদ্মাবতী নাটকে গদ্য ও পদ্য উভয়ই ব্যবহার করিয়াছেন। পদ্যগুলি অমিত্রচ্ছদে লিখিত। এই অমিত্র- চ্ছদ প্রবর্তনের জন্যই মধুসূদনের নাম বঙ্গসাহিত্যে অমর হইয়াছে। যে অবস্থায় তিনি অমিত্রচ্ছদ প্রবর্তনে প্রণােদিত হইয়াছিলেন, তাহা অতীব বিস্ময়কর। আমরা নিম্নে তাহার উল্লেখ করিতেছি। পূৰ্বেই বলিয়াছি যে, বেলগাছিয়া নাট্যশালার সহিত সম্বন্ধ হইতে মধু- সূদনের সঙ্গে মহারাজা যতীন্দ্রমােহনের পরিচয় অমিত্রচ্ছল সম্বন্ধে মহারাজ। হইয়াছিল। মধুসূদন কবি এবং মহারাজ। যতীন্দ্রমােহনের সহিত কাব্যানুরাগী ছিলেন ; সুতরাং তাহাদিগের মধ্যে, অতি অল্পদিনেই, বিশেষ ঘনিষ্ঠতা উৎপন্ন হইয়াছিল। কাবা ও সাহিত্য সম্বন্ধে তাহারা, অনেক সময়ে, নানা প্রকার কথােপকথন করিতেন। মধুসূদন যে সময় তাহার শৰ্ম্মিনাটক রচনায় ব্যাপৃত ছিলেন, সেই সময়, একদিন, নাটক ও অমিত্ৰচ্ছদ সম্বন্ধে কথা পড়িলে, মধুসূদন মহারাজা যতীন্দ্রমােহনকে বললেন ; “যতদিন বাঙ্গালী ভাষায় অমিত্রচ্ছন্দের প্রবর্তন না হইবে, ততদিন বাঙ্গালা নাটক সম্বন্ধে বিশেষ কোন উন্নতির আশা নাই।” মহারাজা শুনিয়া বলিলেন, “বাঙ্গালা ভাষার যেরূপ প্রবণতা, তাহাতে যে ইহাতে, কোন দিন, অমিত্রচ্ছদ প্রবর্তিত হইবে, তাহার সম্ভাবনা অতি অল্প।” মধুসূদন বলিলেন ; “আমি তাহা মনে করি না। চেষ্টা করিলে আমাদিগের ভাষায় অমিত্রচ্ছদ প্রবর্তিত হইতে পারে।” মহারাজা বলিলেন, “বাঙ্গালা ভাষার গঠন বিবেচনায় ইহাতে অমিত্রচ্ছদ প্রবর্তিত হওয়া কোন মতেই সম্ভবপর নহে। ফরাসী ভাষা আমাদিগের ভাষা অপেক্ষা অধিকতর উন্নত, কিন্তু আমি যতদূর অবগত আছি, তাহাতে ইহাতে শর্মিষ্ঠা ও পদ্মাবতী রচনা। ৮৫ ; অমিত্ৰচ্ছন্দে রচিত কোন কাব্য নাই।” মধুসূদন বলিলেন, “সত্য ; কিন্তু আপনাকে স্মরণ রাখিতে হইবে যে, বাঙ্গালা ভাষা সংস্কৃত ভাষার তুহিত; এরূপ জননীর সন্তানের পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়।” মধুসূদনের এবং মহারাজার মধ্যে কিয়ৎক্ষণ এইরূপ বাদানুবাদের পর মধুসূদন বলিলেন ; ‘আমাদিগের ভাষায় অমিত্রচ্ছদ প্রবর্তিত হইতে পারে কি , আমি আপনাকে তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখাইতে প্রস্তুত আছি। যদি আমি স্বয়ং অমিত্রচ্ছদে কোন গ্রন্থ রচনা করিয়া আপনাকে দেখাই, তাহা হইলে আপনি কি করবেন ? অপর কেহ, সে অবস্থায়, এরূপ কথা বলিলে, হয় ত, উপহাস্পদ হইতেন; কিন্তু মধুসূদনের শক্তি সম্বন্ধে তখন আর কাহারও অবিশ্বাস ছিল না। মহারাজা যতীন্দ্রমােহন, মধুসূদনের কথা শুনিয়া, বলিলেন ; “ভাল ! আমি তাহা হইলে পরাজয় স্বীকার করিব এবং আপনার অমিত্ৰচ্ছন্দে রচিত গ্রন্থ মুদ্রাঙ্কনের ব্যয় প্রদান করিব। আপাততঃ তুচ্ছ ঘটনা হইতে, কত সময়, যে কত মহৎ কাৰ্য্য সম্পন্ন হয়, উপরি উক্ত ঘটনা তাহার একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণস্থল। তাহাদিগের সেই কথােপকথনের ফলে, বাঙ্গালা ভাষার পদ্যে যে, ভবিষ্যতে, কিরূপ পরিবর্তন ঘটিবে, মহারাজা যতীন্দ্রমােহন বা মধুসূদন কেহই, তখন, তাহা কল্পনা করিতে পারেন নাই। কিন্তু সেই হইতে বাঙ্গালাভাষায় একটি নূতন ছন্দ প্রবর্তিত হইয়াছে ; অথবা কেবল নূতন ছন্দ কেন ? সেই হইতে বাঙ্গালা ভাষার কবিতাশ্রোত এক অভিনব পথে প্রবাহিত হইতে আরম্ভ করিয়াছে। মধুসূদন যে পদ্মাবতী নাটকে-অমিত্ৰচ্ছদ ব্যবহার করিয়াছিলেন, উপরি উক্ত ঘটনাই তাহার কারণ। আদ্যোপান্ত অমিত্রচ্ছন্দে একখানি নাটক রচনার জন্য, মধুসূদনের, তখনই, বাসনা ছিল; কিন্তু সেরূপ আমূল পরিবর্তন করিলে তাহার গ্রন্থ সাধারণের আদরণীয় হইবে না, এই আশঙ্কায় তিনি পদ্মাবতীর কলিদেবের অংশমাত্র অমিচ্ছন্দে রচনা ;

জীবনচরিত। করিয়াছিলেন। মহারাজা যতীন্দ্রমােহনের সহিত কথােপকথনের পর হইতে তিনি মনােযােগের সহিত বাঙ্গালা কবিতার আলােচনায় প্রবৃত্ত হইলেন। বাল্যে, আহার, নিদ্রা বিস্মৃত হইয়া, তিনি যে দুই বাঙ্গালি কবির গ্রন্থ পাঠ করিতেন, অনেক দিনের পর, আবার তিনি তাহার সেই প্রিয় কবি কাশীদাসের ও কৃত্তিবাসের কাব্য পাঠ করিতে আরম্ভ করিলেন। জননী প্রকৃতির অনুগ্রহে তিনি কবিশক্তি লাভ করিয়াছিলেন। স্বদেশীয় প্রাচীন কবিগণের কাব্য পাঠ করিয়া তিনি বাঙ্গালা ভাষার প্রবণতা বুঝিয়া লইলেন। পাশ্চাত্য মহাকবিগণের কাব্য হইতে তিনি অমিত্ৰচ্ছন্দের গঠন প্রণালীতে অভ্যস্ত হইয়াছিলেন। স্বাভাবিক সঙ্গীতপ্রিয়তা বশতঃ তাহার কর্ণ, সহজেই, শকের হুস্ব, দীর্ঘ- নিরূপণে ও বর্ণসংস্থান-জনিত মাধুৰ্য্য অনুভবে সক্ষম হইল। কিয়দ্দি- নের মধ্যেই তিনি তিলােত্তমার প্রথম ও দ্বিতীয় সর্গ রচনা করিয়া মহারাজা যতীন্দ্রমােহন ঠাকুরকে দেখাইলেন। তিলোত্তমাসম্ভব-রচনা। তখন কাহারও আর সন্দেহের কারণ হিল না। মহারাজা যতীন্দ্রমােহন নিজে এবং স্বর্গীয় ডাক্তার রাজেন্দ্র লাল মিত্র প্রভৃতি সুপণ্ডিত ব্যক্তিগণ, একবাক্যে স্বীকার করিলেন যে, মধুসূদন তাহার প্রতিজ্ঞাপালনে সম্পূর্ণরূপ কৃতকার্য হইয়াছেন। সেদিন মধুসূদনের জীবনের যে কি আনন্দের দিন, তাহা বর্ণন করা নিষ্প্রয়ােজন। সহৃদয় ব্যক্তি মাত্রই তাহার আনন্দে আনন্দিত হইলেন। ডাক্তার মিত্র মহােদয়ের সম্পাদিত বিবিধার্থ-সংগ্রহ তখন- কার শিক্ষিত-সমাজের অন্যতম মুখপাত্র ছিল। তিলােত্তমার প্রথম ও দ্বিতীয় সর্গ তাহাতে প্রকাশিত হইল এবং বাবু রাজনারায়ণ বসু প্রভৃতি অনেক সুপণ্ডিত ব্যক্তি, তাহা পাঠ : করিয়া, গ্রন্থকারকে প্রচুর প্রশংসা করিলেন। কাব্যের অবশিষ্টাংশ সম্পূর্ণ হইলে মহারাজা যতীন্দ্রমােহ, আনন্দের সহিত, তাহার মুন্ত্রাঙ্কনের প্রতিশ্রুত ব্যয় শর্মিষ্ঠা ও পবতী রচনা। ৮৭ --- - - - । প্রদান করিলেন। ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসে তিলােত্তমা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হইল। যে দেশে কোন গুণবান্ পুরুষ জন্মগ্রহণ করেন, সে দেশ সৌভাগ্যবান্ ; কিন্তু যে দেশে গুণবানের সমকালে তাহার গুণের সমাদর করিবার উপযুক্ত ব্যক্তিগণ বর্তমান থাকেন, আরও অধিক সৌভাগ্যবান্ । বঙ্গভূমির বড়ই সৌভাগ্য যে, তাহার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিগণ যে সময়ে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন, সে সময় তাহাদিগের গুণের সমাদর গুণের সমাদর করিবার উপযুক্ত ব্যক্তির অভাব হয় নাই। এখন বাঙ্গালাসাহিত্যে অমিত্ৰচ্ছন্দ-পক্ষপাতী লােকের অভাব নাই ; কিন্তু তিলােত্তমাসম্ভব প্রকাশের সময়ে এ অবস্থা ছিল না। সময় বাঁহারা ইহার প্রচার সম্বন্ধে সহায়তা করিয়াছিলেন, তাহারা আমাদিগের জাতীয় সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তিমাত্রেরই সম্মানের পাত্র। অমিত্রচ্ছদ প্রবর্তন সম্বন্ধে মধুসূদন যাহাদিগের নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক উৎসাহ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, মহারাজা যতীন্দ্রমােহন তাহাদিগের অন্যতম। অমিত্রচ্ছন্দের প্রবর্তনের সঙ্গে বাঙ্গালা ভাষায় যে কি গুরুতর পরিবর্তন ঘটিবে, মধুসূদনের ন্যায় মহারাজাও তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন। স্বল্পবুদ্ধি ব্যক্তিগণ কার্যের প্রারম্ভে তাহার গুরুত্ব অনুভব করিতে পারে না; কিন্তু প্রকৃত প্রতিভাবান্ ব্যক্তিগণ কার্যের সূচনা দেখিয়াই তাহার পরিণাম বুঝিতে পারেন, এবং সেই জন্যই সমাজে তাঁহাদিগের প্রতিষ্ঠা। সাহিত্যসংসারে, তখনও, একরূপ অপরিচিতনামা মধুসূদন, অপ্রচলিতচ্ছলে, একখানি কাব্য রচনা করিয়াছিলেন। দেশের অনেক কৃতবিদ্য ও প্রতিষ্ঠাভাজন ব্যক্তি তাহার প্রতি অবজ্ঞার কুটী- নিক্ষেপ করিতেছিলেন ; এই সময় ভবিষ্যদ্বক্তার ন্যায় মহারাজা যে সেই কাব্যের ভাৰী গৌরব সম্বন্ধে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন, ইহা তাহার দূরদর্শি- ;

৮ জীবন-চরিত। তার পক্ষে অবশ্যই বিশেষ গৌরবজনক। তিলােত্তমাসম্ভব সম্বন্ধে মধু- সূদনের ও মহারাজা যতীন্দ্র- মধুসূদন তাহার তিলােত্তমাসম্ভব-কাব্য মহা- মােহনের ভবিষ্যৎ বাণী। রাজাকে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। তিলােত্তমার স্বহস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি তাহাকে উপহার প্রদানপূর্বক তিনি তিলাে- ওমার উৎসর্গ পত্রে এইরূপ লিখিয়াছিলেন :- “যে ছন্দোবন্ধে এই কাব্য প্রণীত হইল, তদ্বিষয়ে আমার কোন কথাই বল। বাহুল্য ; কেন না, এরূপ পরীক্ষবৃক্ষের ফল, সদ্য পরিণত হয় না। তথাপি আমার বিলক্ষণ প্রীতি হইতেছে যে, এমন কোন সময় অবশ্যই উপস্থিত হইবে, যখন এদে- শের সাধারণ জনগণ ভগবতী দেবীর চরণ হইতে মিত্রাক্ষর স্বরূপ নিগড় ভগ্ন দেখিয়া চরিতার্থ হইবেন। কিন্তু, হয় , সে শুভকালে এ কাব-চয়িতা এতাদৃশী ঘােতর মহানিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকিবে, যে কি ধিক্কার, কি ধন্যবাদ, কিছুই তাহার কর্ণকুহরে প্রবেশ করিবে না”। মধুসূদনের ভবিষ্যৎ-বাণী সফল হইয়াছে কি না, আধুনিক বঙ্গ- সাহিত্য তাহার সাক্ষ্য দান করিতেছে। মহারাজা যতীন্দ্রমােহনও এ সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছিলেন, তাহাও নিস্ফল হয় নাই। তিলােত্তমাসম্ভব হইতে বাস্তবিকই বাঙ্গালা সাহিত্যে এক উন্নততর যুগ প্রবর্তিত হই- আছে। মধুসূদন তিলােত্তমার পাণ্ডুলিপি তাহাকে উপহার প্রদান করিলে মহারাজা তাহার প্রত্যুত্তরে যাহা লিখিয়াছিলেন, পাঠক তাহা হইতে বুঝিতে পারিবেন যে, বঙ্গভাষার অমিত্ৰচ্ছন্দে রচিত প্রথম কাব্য যাহার নামে উৎসৃষ্ট হইয়াছিল, তিনি তাহার অনুপযুক্ত নহেন। মহারাজা লিখিয়াছিলেন ;- I know not how to thank you adequately for the very valuable present of the manuscript focaigat in the Poet's own hand-writing! I will preserve it with the greatest care in my Library, as a Monument that marks তিলােত্তর উৎসর্গ-পত্র।

শর্মিষ্ঠা ও পদ্মাবতী রচনা। * * * * a grand epoch in our literature, when Bengali poetry first broke thro' the fetters of rhyme and soared exultingly into the lofty region of sublimity which is her genuine province. Time will come when the poem will meet with due appreciation, and will find that high place in the estimation of posterity it so richly deserves. I feel sure that my descendants, should I have any, will then be proud to think that the manuscript in the author's autorgraph of the first blank-verse Epic in the language, is in their possession, and they will honour thcir ancestor the inore that he was fortunate enough to be considered worthy of such an invaluable present by the poet hinself. তিলােত্তমাসম্ভব পৌরাণিক সুন্দ-উপসুনের উপাখ্যান লইয়া রচিত হইয়াছিল। মধুসূদন সৰ্বাংশে মূল উপাখ্যানের অনুসরণ করেন নাই স্থানে স্থানে নিজের মৌলিক কল্পনা প্রদর্শন করিয়া এবং প্রাচ্য ও প্রতীচ্য অনেক কাব্যের ভাব গ্রহণ করিয়া তিনি ইহা রচনা করিয়া- ছিলেন। অমিত্রচ্ছদ রচনায় তখনও তিনি পরিদর্শিতা লাভ করিতে পারেন নাই। সেইজন্য তিলােত্তম-সম্ভবের কোন কোন স্থানে অপরি- পক্কতা দৃষ্ট হয়; কিন্তু তাহা হইলেও গম্ভীর্যে ও মাধুর্যে ইহা যে মেঘনাদবধকাব্যের পূর্ববর্তী হইবার যােগ্য, তাহাতে সন্দেহ নাই। তিলােত্তমাসম্ভব বঙ্গীয় জনসাধারণের নিকট কিরূপ সমাদর প্রাপ্ত হইয়াছিল, সে সম্বন্ধে দুই একটা কথা বলা আবশ্যক। তিলােত্তমা প্রকাশের পর প্রায় পঞ্চাশ বৎসর গত হইয়াছে। তিলোত্তমাসৰ-সম্বন্ধে সাধা- সুতরাং ইহা যে, এক সময়, বঙ্গীয় পাঠক-সমাজে রণের মতামত। কিরূপ আন্দোলন উপস্থিত করিয়াছিল, এতদিন পরে তাহা উপলব্ধি করিবার সম্ভাবনা নাই। নিন্দা অবজ্ঞা এবং ;

জীবন-চরিত। উপহাস অজস্রধারে কবির উপর বর্ষিত হইয়াছিল। তাঁহাকে উপ- হাসাম্পদ করিবার জন্য, অমিত্রচ্ছদের বিকৃতি করিয়া, কত জনে কত হাস্যোদ্দীপক কবিতা প্রচার করিয়াছিলেন। সেই সকল কবিতা ক্রমে বিস্মৃতি-সাগরে নিমগ্ন হইয়া যাইতেছে ; এখন আর তাহাদিগের উল্লেখ অনাবশ্যক। নিন্দা, বিদ্রুপ এবং শ্লেষােক্তি সহ্য করিয়া মধুসূদন যেরূপ দৃঢ়তার সহিত তাহার গন্তবাপথে অগ্রসর হইয়াছিলেন, তাহা প্রকৃতই বীরােচিত। ফরাসী কবি ভিক্তর হিউগাে এবং ইংলণ্ডীয় কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের ন্যায় দুই চারিজন পাশ্চাত্য মহাকবির জীবনেই কেবল সেরূপ দৃঢ়তা লক্ষিত হয়। লােকের সমালােচনায় উপেক্ষা-প্রদর্শন বাল্য হইতেই মধুসূদনের অভ্যাস ছিল এবং সেই জন্য তাহার চরিত্রের অনেক দোষ সংশােধিত হইতে পারে নাই। কিন্তু অমিত্ৰচ্ছন্দের প্রবর্তন সম্বন্ধে তাহার এই দোষ তাহার মঙ্গলের কারণ হইয়াছিল। চিরাভা দৃঢ়তার সহিত বিরুদ্ধবাদীদিগের কথায় উপেক্ষা করিয়া তিনি গন্তব্যপথে অগ্রসর হইয়াছিলেন। ভবভূতি, তাঁহার সমকালবী পণ্ডিতমণ্ডলীর উপেক্ষায় অবজ্ঞা প্রদর্শন পূৰ্ব্বক, সগর্বে, লিখিয়াছিলেন ; “যে নাম কেচিদিহ নঃ প্ৰথয়স্তাবাং জানন্তি তে কিমপি তান্ প্রতি নৈয যত্ন। উৎপস্থতেহস্তি মম কোহপি সমান-ধৰ্ম্মা, কালো হয়ং নিরবধি বিপূল চ পৃথী!” মধুসূদন, ভবভূতির এই গর্বিত বাক্য উদ্ধৃত করিয়া তিলােত্তমায় সন্নিবিষ্ট করিয়াছিলেন। ভবভূতির ন্যায় তাহারও ভবিষ্যৎবাণী যে সফল হইয়াছে, তাহা, বােধ হয়, বলিবার আবশ্যক করে না। মধুসূদনের এই সময়কার রচিত আরও দুই খানি গ্রন্থের উল্লেখ করিয়া আমরা বর্তমান অধ্যায় শেষ করিব। শর্মিষ্ঠার পরেই তিনি এই দুইখানি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। ইহা- সাহিত্যে বাঙ্গাত্মক গ্রন্থের অবশ্য। দিগের মধ্যে প্রথম, একেই বলে কি সভ্যতা, এবং দ্বিতীয় বুড়শালিকের ঘাড়ে রোঁয়া। === • শর্মিষ্ঠা ও পথাৰতী রচনা। হইবার জন্য, দুইখানিই প্রহসন, এবং দুইখানিই বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনীত রচিত হইয়াছিল ।* মধুসূদন বাঙ্গাল ভাষার অমিত্রচ্ছন্দের ন্যায় এই জাতীয় গ্রন্থেরও সৃষ্টিকর্তা। প্রহসন সকল দেশেই সামাজিক উপপ্লবের ও অশান্তির নিদর্শক। যখনই কোন সমাজ কোন বিরুদ্ধাচারের প্রাবল্যে উৎপীড়িত হয়, তখনই তাহাতে প্রহসন বা বাঙ্গাত্মক গ্রন্থের আবির্ভাব হইয়া থাকে। গ্রন্থকারগণ সমাজের শিক্ষক। যখন সমাজে ধৰ্ম্ম ও সদাচার বিরাজ করে, তখন তাহারা শান্ত মৃত্তিতে অবস্থান করেন, কিন্তু যখন দুঞ্জিয়ার ও কদাচারের প্রাবল্যে সমাজ উপত হয়, তখন তাহাদিগকে, অপরাধীদিগের শান্তির জন্য, সুতীক্ষ্ণ কশা গ্রহণ করিতে হয়। এই হইতেই সাহিত্যে প্রহসনের ও ব্যঙ্গকাব্যের সৃষ্টি হইয়া থাকে। রাজপুত-কবি চাঁদ যথার্থ ই বলিয়াছেন, “শত্রুর করবালাপেক্ষা কবির কাব্য-শেল সহস্রগুণ তীক্ষ্ণ।” স্বদেশ-নিৰ্বাসিত, কুটীরবাসী ভল্টেয়ারের মুখের এক একটা কথায় যুরােপের কোন কোন মুকুটধারীর যে অন্তৰ্দাহ হইত, তাহা সকলেরই পরিচিত। বাস্তৰিকও সংসারে দেখিতে পাওয়া যায় যে, কবির মর্মভেদী বাক্যবাণের ভয়ে, শত শত ক্ষমতাবান্ পাষণ্ড আপনাদিগের দুপ্রবৃত্তি সংযত বা গােপনে চরিতার্থ করিতে বাধ্য হয়। কিন্তু যেমন প্রকৃত বলবান্ পুরুষগণই মহাস্ত্র ব্যবহার করিতে সমর্থ হন, সেইরূপ কেবল প্রতিভাবান পুরুষগণই ব্যঙ্গাস্ত্র প্রয়ােগে সম্যক্ কৃতকার্য হইয়া থাকেন। দুর্বল ব্যক্তি দ্বারা প্রযুক্ত হইলে তাহা ত্বক ভেদ করে মাত্ৰ, মৰ্ম্ম স্পর্শ করিতে পারে না। মধুসূদনের কৈশোের ও যৌবন কলিকাতা-সমাজের যে অবস্থায় অতিবাহিত হইয়াছিল, তাহা শান্তিপূর্ণ ছিল । পাশ্চাত্য সমাজের দৃষ্টান্তে ও পাশ্চাত্য শিক্ষার ফলে তখন কলিকাতা-সমাজ * বিশেষ কারণে কোন খানিই অভিনীত হয় নাই।

জীবন-চরিত। উপদ্রুত ও অশান্তিগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছিল। তখন, তথায়, শিক্ষিত- নামধারী এমন এক শ্রেণীর লােকের আবির্ভাব হইয়াছিল যে, তাঁহার, সভ্যতার ও সমাজ-সংস্কারের নামে, স্বেচ্ছাচারের ও উচ্ছলতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করিতেছিলেন । দলবদ্ধ হইয়া মদ্যপান, হিন্দুশাস্ত্র নিষিদ্ধ দ্রব্য ভক্ষণ, এবং স্বদেশীয় প্রত্যেক আচার, ব্যবহারে অশ্রদ্ধা প্রদর্শন, ইহাই তাহাদিগের নিকট সভ্যতার ও সমাজ-সংস্কারের চরমসীমা বলিয়া বিবেচিত হইত। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ তাহাদিগের নিকট অজ্ঞ ও কৃপাপাত্র বলিয়া উপেক্ষিত হইতেন, এবং শাস্ত্রগ্রন্থ সমূহ তাহাদিগের নিকট অবিশ্বাস্য ও কুসংস্কার পূর্ণ বলয় অনাদৃত হইত। লােকে ইহাদিগকে “ইয়ংবেঙ্গল” বলিত। এই ইয়ং বেঙ্গলের ভয়ে কলিকাতা-সমাজ একদিন তটস্থ হইয়াছিল। মধুসূদন নিজে এবং তাহার সহাধ্যায়ী ও সুহৃদ্‌গণের মধ্যে অনেকে এই “ইয়ং বেঙ্গল” সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূত ছিলেন। তাহার একেই কি বলে সভ্যতা এই শ্রেণীকেই লক্ষ্য করিয়া রচিত হইয়াছিল। কিন্তু একেই কি বলে সভ্যতা তাকালিক সমাজের একাংশ মাত্র চিত্রিত করিয়াছিল ; অপরাংশ চিত্রণেরও প্রয়ােজন ছিল। কেবল ইংরাজী-শিক্ষিত, নব্য সম্প্রদায়েরই অনাচারে হিন্দু-সমাজ যে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে, তাহা নয় ; বকধৰ্ম্মা, প্রাচীন সম্প্রদায়ের কুব্যবহারে তদপেক্ষা শতগুণ অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। মধুসূদনের সময়ে এই শ্রেণীর কতকগুলি লােকের কলিকাতায় ও তাহার নিকটবর্তী পল্লীসমাজে বিশেষ প্রতিপত্তি ছিল। বাহিরে হিন্দুধর্মানুমােদিত ক্রিয়াকর্মের অনুষ্ঠান করিলেও ইহাদিগের চরিত্র ও ব্যবহার হিন্দুশাস্ত্র-সমূহকে উপহাস করিত। মধুসূদনের দ্বিতীয় প্রহসন, “বুড় শালিকের ঘাড়ে রোয়া’, শ্রেণীর লােকদিগকে লক্ষ্য করিয়া লিখিত হইয়াছিল। সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে মধুসুদনের প্রহসনদ্বয়ের যদিও, ক্ৰমশঃ, অপ্রচলন শর্মিষ্ঠা ও পদ্মাবতী রচনা। হইতেছে, তথাপি, গ্রন্থােল্লিখিত বিষয়ের যথাযথ বর্ণনা ও চরিত্র-চিত্ৰণ- পটুতা সম্বন্ধে, অতি অল্প সংখ্যক বঙ্গীয় প্রহসনই অদ্যাপি ইহাদিগের সমকক্ষ হইতে পারিয়াছে। মধুসূদন কেবল তিন বৎসর মাত্র বাঙ্গালা-সাহিত্যের চর্চা আরম্ভ করিয়াছিলেন। তাহার প্রথম গ্রন্থ শর্মিষ্ঠা ১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দের প্রারম্ভে প্রচারিত হইয়াছিল; ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দ শেষ হইবার পূর্বেই তাহার একেই কি বলে সভ্যতা, বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁয়া, পদ্মাবতী নাটক, এবং তিলােত্তমাসম্ভব-কাব্য, উপযুপরি আর এই চারিখানি গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ; সুতরাং বাঙ্গালা-সাহিত্যের এ বিভাগে তিনি সর্বোচ্চ স্থান প্রাপ্ত হইলেন। প্রাচীন রীতির পক্ষপাতী ব্যক্তিগণ তাহার প্রতি, তখনও, উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন না করিলেও নব্য সম্প্রদায় তাহার গুণের একান্ত পক্ষপাতী হইলেন এবং প্রাচীন, নব্য, সকলেই, এক- বাক্যে, তাঁহাকে একজন অসাধারণ প্রতিভাবান্ ব্যক্তি বলিয়া স্বীকার করিতে বাধ্য হইলেন। সাহিত্য-শিল্পশালায় তাহার শিক্ষাকালের এই- রূপে অবসান হইল, এবং তিনি, স্বাধীনভাবে, নিজের উদ্ভাবনীশক্তি প্রদশন করিতে প্রস্তুত হইলেন। তাহার উদ্যমের ফল কি হইয়াছিল, পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা তাহার আলােচনা করব।

অষ্টম অধ্যায়। মেঘনাদবধ রচনা । পাশ্চাত্য কবিদিগের প্রভাব-কাল। মেঘনাদবধ কাব্য, ব্রজাঙ্গনা-কাব্য এবং কৃষ্ণকুমারী-নাটক রচনা। [ ১৮৬১ খ্ৰীষ্টাব্দ | শর্মিষ্ঠা ও তিলােত্তমাসম্ভব রচনা হইতে মধুসূদন যে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন, তাহার জীবনের এই অংশে আমরা তাহার ফল দর্শন করি। ভাষার লালিত্য, ভাবের উৎকর্ষ, রচনার গাম্ভীর্য এবং গ্রন্থােল্লিখিত চরিত্র- সমূহের সৌষ্ঠব প্রভৃতি গুণ সম্বন্ধে তাঁহার এই সময়কার রচিত গ্রন্থগুলিই তঁাহার গ্রন্থাবলীর মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট। মেঘনাদবধ, কৃষ্ণকুমারী, ব্রজাঙ্গন এবং বীরাঙ্গনা এই সময়ের অন্তভূত। ইহার পর হইতে মধুসূদনের প্রতিভার পতন ঘটিয়াছে। একদিকে, এই সময়, যেমন তাহার প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ হইয়াছে, অপরদিকে, তেমনই, তাহার পাশ্চাত্য-ভাব-প্রবণতাও, এই সময়, পূর্ণতালাভ করিয়াছে। শর্মিষ্ঠা ও তিলােত্তমাসম্ভবে তিনি বহুল পরিমাণে সংস্কৃত কাব্যসমূহের ভাব গ্রহণ করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহার এই সময়কার রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে ব্রজাঙ্গন ভিন্ন অপর সকল গুলিতেই প্রাচ্য ভাব অপেক্ষা পাশ্চাত্য ভাবেরই প্রাধান্য লক্ষিত হইবে। ব্রজাঙ্গনা, কৃষ্ণকুমারী এবং মেঘনা বধ, প্রায়, একই সঙ্গে আরব্ধ এবং একই সঙ্গে সম্পূর্ণ হইয়াছিল । তিলােত্তমাসম্ভব প্রকাশিত হইবার অল্পদিন পরেই মধুসূদন মেঘনাদ- বধ-কাব্য আরম্ভ করিয়াছিলেন ; ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে ইহার প্রথমাংশ গ্রন্থাকারে প্রক্কাশিত হয়। দ্বিতীয়াংশ পরে প্রকাশিত হইয়াছিল।

পাশ্চাত্য কবিদিগের প্রভাবকাল। বিষয়। মধুসূদনের কোন গ্রন্থেরই প্রকৃত সমালােচনা বর্তমান সংস্করণের উদ্দেশ্য নয়। তবে মেঘনাদবধ-রচয়িতার জীবনীতে মেঘনাদবধের আলােচনা থাকিলে ইহা অসম্পূর্ণ থাকিবে বলিয়া আমরা, সংক্ষেপে, দুই একটা প্রয়ােজনীয় কথা বলিব। মেঘনাদবধ রামায়ণের চিরপরিচিত, পুরাতন কথা অবলম্বনে বি- চিত। রাক্ষসরাজের পুত্র বীরকেশরী মে- মেঘনাদবধের অবলম্বনীয় নাদের মৃত্যু ইহার প্রতিপাদ্য বিষয়। কিন্তু রামায়ণের সেই পুরাতন কথা লইয়া রচিত হইলেও ইহাতে অনেক নূতন কথা আছে। ইহার রাক্ষসগণ রামা- যুণের বীভৎসরসের আধার, নরশােণিতপ্রিয় জীৰ নহেন। বীরত্বে, গৌরবে, ঐশ্বর্যে এবং শারীরিক সৌন্দর্য্যে সাধারণ মনুষ্য হইতে শ্রেষ্ঠ হইলেও, তাহারা মনুষ্য। আচার, ব্যবহারেও আর্যসমাজ হইতে তাঁহা- দিগের সমাজের কোন পার্থক্য নাই। আৰ্য নরনারীগণের ন্যায় তাহা- রাও যজ্ঞ ও দেবপূজা করেন ; ধূপ, দীপ, নৈবেদ্য এবং গঙ্গাজল তাঁহাদিগেরও পূজার অঙ্গ। তাঁহাদিগেরও কুললক্ষ্মীগণ, স্বামী পুত্রের কল্যাণের জন্য, শিবারাধনা করেন এবং সতী পতির সঙ্গে চিতারােহণ করেন। তাঁহাদিগেরও গৃহে পার্থিব ঐশ্বর্যের অধিষ্ঠাত্রী রূপে রাজলক্ষ্মীর সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত এবং মহামায়া তাহাদিগেরও পুরাধিষ্ঠাত্রী। আর্য রামায়ণের যে নরমাংসাসী রাক্ষসরাজ, সীতাদেবীকে “প্রাতরাশরূপে ভক্ষণ করিবে বলিয়া, মধ্যে মধ্যে, ভীতি প্রদর্শন করিতেন, মেঘনাদ- বধের পাঠক তাঁহাকে দেখিতে পান না। মেঘনাদবধে রামায়ণে অনুল্লিখিত, এমন কি রামায়ণবিরােধী, অনেক কথাও লক্ষিত হয়। রামায়ণের রায় ইলিয়াড ও ইনিয়া প্রভৃতি পাশ্চাত্য কাব্যসমূহের অনেক ঘটনা, পরিবর্তিত আকারে, আকারে, ইহার অন্তর্নিবিষ্ট হইয়াছে। রামায়ণের আশ হইতে ইহার বাদশও ভিন্ন। মহর্ষির প্রদর্শিত মার্গ জীবন-চরিত। পরিত্যাগ করিয়া কবি ইহাতে রামচন্দ্রের ও লক্ষ্মণের অপেক্ষা রাক্ষস পরিবারদিগেরই প্রতি অধিক সহানুভূতি প্রদর্শন করিয়াছেন। মেঘনাদযধ-কাব্য নয় সর্গে বিভক্ত। তিন দিনের ও দুই রাত্রিয় ঘটনা এই নয় সর্গে বর্ণিত হইয়াছে। ভগ্ন- কাব্যের সর্গ-বিভাগ। দূতের মুখে বীরবাহুর মৃত্যু-সংবাদ শ্রবণ করিয়া রাক্ষসরাজকর্তৃক মেঘনাদকে সেনাপতি পদে অভিষেক প্রথম দিবসের ঘটনা। হরপার্বতীর অনুগ্রহে লক্ষ্মণের স্বপ্ন-দর্শন ও অস্ত্রলাভ, রাত্রির ঘটনা। দেবরাজের ও শচীদেবীর কৈলাসে গমন, লক্ষ্মণের দেবীপূজা, প্রমীলার লঙ্কা-প্রবেশ এবং সীতাদেবীর সঙ্গে সরমার কথোপকথন প্রভৃতি কাব্যের অনেক প্রধান ও উৎকৃষ্ট অংশ এই রাত্রির ঘটনারূপে বর্ণিত হইয়াছে। মেঘনাদের মৃত্যু ও লক্ষ্মণের শক্তিশেল, দ্বিতীয় দিব- সের ঘটনা। রামচন্দ্রের যমপুৰ্বীদর্শন দ্বিতীয় রাত্রির এবং প্রমীলার চিতারােহণ, তৃতীয় দিবসের ঘটনা। কিন্তু কবির অনুপম কল্পনা গুণে এই তিন দিবস মাত্র ব্যাপী ঘটনা অতি দীর্ঘ কালের কার্য্য বলিয়া আমাদিগের মনে হয়। আমরা, বর্তমান বিস্মৃত হইয়া, অতীতের মধ্যে নিমগ্ন হইয়া যাই এবং নরলােকবাসী হইয়াও কল্পনানেত্রে দেবালােকের অনুপম চিত্র দর্শন করিয়া কৃতার্থ হই। কবিবর হেমচন্দ্র ইহার সম্বন্ধে যথার্থই লিখিয়াছেন “সত্য বটে, কবি গুরু বাল্মীকির পদচিহ্র লক্ষ্য করিয়া, নানা দেশীয় মহাকবিদিগের কাব্যোদান হইতে পুষ্পচয়নপূর্বক, এই গ্রন্থখানি বিরচিত হইয়াছে। কিন্তু সেই সমস্ত কুসুমরাজীতে যে অপূৰ্ব্ব মাল্য গ্রথিত হইয়াছে, তাহা বঙ্গবাসীরা চিরকাল যত্নসহকারে কণ্ঠে ধারণ করিবেন।” “যে গ্রন্থে স্বর্গ, মর্ত, পাতাল, ত্রিভুবনের রমণীয় এবং ভয়ানক প্রাণী ও পদার্থসমূহ সম্মিলিত করিয়া পাঠকের দর্শনেন্দ্রিয়-লক্ষ্য চিত্র ফলকের ন্যায় চিত্রিত হইয়াছে। যে গ্রন্থ পাঠ করিতে করিতে ভুতকাল পাশ্চাত্য কবিদিগের প্রভাবকাল। 5 * r = = * * A বর্তমান, এবং অদৃশ্য বিদ্যমানের ন্যায় জ্ঞান হয় ; যাহাতে দেব, দানব, মানব-মণ্ডলীর বীৰ্য্যশালী, প্রতাপশালী, সৌন্দৰ্য্যশালী জীবগণের অদ্ভুত কার্যকলাপ দর্শনে মােহিত এবং রােমাঞ্চিত হইতে হয় ; যে গ্রন্থ পাঠ করিতে করিতে কখন বা বিস্ময়, কখন বা ক্রোধ, কখন বা করুণ-বসে আর্দ্র হইতে হয় ; এবং বাষ্পকুললােচনে যে গ্রন্থের পাঠ সমাপ্ত করিতে হয়, তাহা যে বঙ্গবাসীরা চিরকাল বক্ষে ধারণ করিবেন, ইহার বিচিত্রতা কি?” দোষ, গুণ সমস্ত লইয়া মেঘনাদবধ যে বাঙ্গালাভাষার সর্বোৎকৃষ্ট কাব্য। তাহা একরূপ সৰ্ববাদিসম্মত। কিন্তু ইহার অনেক ঘটনা ও ভাৰ অন্যান্য কাব্য হইতে গৃহীত বলিয়া কেহ কেহ বাঙ্গালা সাহিত্যে মেঘনাদ- মধুসূদনের প্রতিভা ও মৌলিকতা স্বীকার ৰধকাব্যের স্থান। করিতে কুণ্ঠিত হন। তাঁহারা বলেন যে, মেঘনাদবধের প্রতিপত্রে যখন অন্যান্য মহাকবিগণের হস্তচিহ্ন বর্তমান, তখন ইহাতে কবির গুণপণ বা উদ্ভাবনীশক্তি কোথায় ? কিন্তু তাহারা বিবেচনা করেন না যে, কতকগুলি মৃত জীবের কঙ্কাল হইতে অস্থি সংগ্রহ করিয়া, একটী অভিনব জীব সৃষ্টি যেরূপ কঠিন, অন্যান্য কাব্য হইতে ভাব সংগ্রহ করিয়া, একখানি নবীন কাব্য প্রণয়ন করাও সেইরূপ কঠিন। তাঁহা- দিগের আদর্শ অনুসারে বিচার করিলে অন্যের কথা দূরে থাকুক, মিন্টন এবং সেক্সপিয়ারকেও গৌরচ্যুত হইতে হয়। প্রাচ্য প্রতীচ্য মহাকবিগণের কাব্যের ভাব এখনও অক্ষুন্ন মহাসমুদ্রের ন্যায় বর্তমান রহিয়াছে; কিন্তু তাহারা কি বলিতে পারেন যে, বঙ্গসাহিত্যে আর একজন মধুসূদন জন্মগ্রহণ না করিলে আর একখানি মেঘনাদবধ রচিত হইৰে। প্ৰকৃতির রাজ্যে উপাদানের অভাব নাই, কিন্তু, সেই সকল উপাদান হইতে সামগ্রী সংগ্রহ করিয়া, নূতন কিছু সৃজন করাতেই প্রকৃত প্রতিভার পরিচয়।

জীবন-চয়িত। মধুসূদন তাহার কাব্যে যে উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিয়াছেন, তাহা ত্যাগ করিলেও ইহা বাঙ্গালাভাষায় যে শক্তি সঞ্চার করিয়াছে, কেবল তাহারই জন্য ইহা অমরতা লাভ করিবে। জাতীয় প্রবণতার ন্যায় জাতীয় শক্তিও সাহিত্যে প্রতিবিম্বিত হইয়া থাকে। মধুসূদন যে তাহার কাব্যে বীরােচিত ভাষা ও বীরােচিত ভাৰ সন্নিবিষ্ট করিতে পারিয়াছেন, ইহা আমাদিগের জাতির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আশা প্রদ। ক্ষীণকায়, নির্জীব বাঙ্গালীর অভ্যন্তরে অন্তনিহিত শৌর্য ও তেজস্বিতা না থাকিলে এরূপ কাৰ্য কখনই রচিত হইতে পারিত না। কবি তাহার কাব্যের প্রথমে যে ভবিষ্যৎ বাণী করিয়াছেন, তাহা সফল হইবে। মধুমক্ষিকার ন্যায়, নানা দেশীয় কাব্যকুসুম হইতে মধু সংগ্রহ করিয়া, তিনি যে অপূৰ্ব্ব মধুচক্ৰ নিৰ্মাণ করিয়া গিয়াছেন, যতদিন বাঙ্গালা ভাষা থাকিবে, ততদিন গৌড়ীয় জনগণ, তাহাতে, সত্যই, “আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।” তিলােত্তমাসম্ভব বঙ্গীয় জনসাধারণের নিকট কিপ সমাদর প্রাপ্ত হইয়াছিল, আমরা পূর্বে তাহার উল্লেখ নাদবধ কাব্যের সনদ। করিয়াছি। মেঘনাদবধেরও সমাদর সম্বন্ধে দুই একটা কথা বলিব। বঙ্গের শ্যামল তৃণাচ্ছাদিত, সমতল ক্ষেত্রে অকস্মাৎ কোন পর্বত শৃঙ্গের উত্থান দেখিলে দর্শকদিগের হৃদয়ে যেরূপ বিস্ময় জন্মে, মেঘনাদবধ কাব্য বঙ্গী পাঠকগণের হৃদয়ে, একদিন, সেইরূপ বিস্ময় উৎপাদন করিয়াছিল । যেন বীণাধ্বনি শ্রবণ করিতে করিতে তালস কর্ণে গম্ভীর ভেরী-নিনাদ প্রবেশ করিল ; যেন নিরিণীর কুলু কুলু নিনাদে অভ্যস্ত শ্রবণে জলপ্রপাতের ভীষণ গর্জন এবিষ্ট হইল। শ, মিত্র সকলেই চমকিত হইলেন। যে শ্রেণীর পাঠকগণ, তিলােত্তমা সম্ভব পাঠ করিয়া, মধুসূনকে উন্মাদ-প্রলাপী বলিয়া স্থির করিয়াছিলেন, পাশ্চাত্য কবিদিগের প্রভাবকাল। তাঁহাদিগের মধ্যে কেহ, কেহ, তখনও, তাহাকে উপহাস করিতে নিরন্ত হইলেন না। কিন্তু চিন্তাশীল ও গুণগ্রাহী ব্যক্তিমাত্রই বুঝিতে পারি- লেন যে, মধুসূদন বাঙ্গালা ভাষাকে কি অমূল্য উপহার প্রদান করিয়া- ছেন। অমিত্ৰচ্ছন্দ সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের অভিপ্রায় প্রথমাবস্থায় অনুকুল ছিল না, মেঘনাদবধ পাঠ করিয়া তাহার পূর্বসংস্কার দূরী- ভূত হইল ; তিনি মধুসূদনের গুণের একান্ত পক্ষপাতী হইলেন। কলিকাতার তাৎকালিক ধনাঢ্য ব্যক্তিদিগের মধ্যে যাঁহারা মধুসূদনের প্রতিভার সম্মান করিয়া সম্মানিত ও বঙ্গভাষানুরাগিগণের কৃতজ্ঞতা ভাজন হইয়াছেন, তাহাদিগের মধ্যে রাজা প্রতাপচন্দ্রের, রাজা ঈশ্বর- চন্দ্রের ও মহারাজা যতীন্দ্রমােহনের নাম আমরা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি। মেঘনাদবধের সঙ্গে মহাভারতের লব্ধ প্রতিষ্ঠ কালীপ্রসন্ন সিংহ মহােদরের অনুবাদক বাবু কালীপ্রসন্ন সিংহ মহােদয়েরও অভিনন্দন। নামােল্লেখ আবশ্যক। মধুসূদন যখন পুলিশ আদালতে কাৰ্য্য করিতেন, তখন, কালীপ্রসন্ন বাবুকে অনারারী ম্যাজি ষ্ট্রেটরূপে, মধ্যে মধ্যে, তথায় উপস্থিত হইতে হইত। সেই হইতে তাহাদিগের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়াছিল। উভয়ের মধ্যে বয়ােগত পার্থক্য থাকিলেও, গত কোমলতায় ও মধুরতায় অতি নিকট সম্বন্ধ ছিল। দুই জনেরই প্রকৃতি, স্বভাৰতঃ, অতি সরল ও নেহপ্রবণ ছিল ; সুতরাং অল্পদিনের মধ্যেই তাঁহারা পরস্পরের প্রতি বিশেষরূপ অনুরক্ত হইয়াছিলেন। প্রতিভাবানের প্রতি সমুচিত সমাদয়-প্রদর্শন মহাভারতের অনুবাদ হইতে কালীপ্রসন্ন বাবুর নাম বঙ্গের শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রেরই পরিচিত হইয়াছে। কিন্তু মাতৃভাষার সেবার জন্য, তিনি যে কিরূপ যত্ন, কিরূপ পরিশ্রম ও কিরূপ অর্থব্যয় করিয়াছিলেন, অতি অল্প লােকই তাহা অবগত আছেন। ত্রিংশৎ মাত্র বয়সে তাহার মৃত্যু হয়, কিন্তু এই সময়ের মধ্যে তিনি দেশীয় নাটশাস্ত্রের উন্নতির ও মাতৃভাষার সমৃদ্ধি-সাধনের জন্য, ন্যূনাধিক, আড়াই পক্ষ মুজা ব্যয় করিয়াছিলেন।

১০০ জীবন-চরিত। এবং নির্ভীকচিত্তে নিজের মতামত প্রকাশ করা কালীপ্রসন্ন বাবুর চিরন্তন অভ্যাস ছিল। অমিত্ৰচ্ছন্দের প্রবর্তন হইতেই তিনি মধুসূদনের গুণের পক্ষপাতী হইয়াছিলেন এবং লঘুচেতা লেখকগণ তাহাকে বিপ করিতেন দেখিয়া তাহার তীব্র প্রতিবাদ করিতেন। মেঘনাদবধ প্রকা- শিত হইবার কিছুদিন পূর্বে তিনি বিদ্যোৎসাহিনীসভা নামে একটা সাহিত্য-সভা স্থাপন করিয়াছিলেন। কলিকাতার অনেক কৃতবিদ্য ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই সভার সভ্য ছিলেন। কাল প্রসন্ন বাবু, এক্ষণে, সেই সভা হইতে, মধুসূদনকে অভিনন্দন-পত্র প্রদান করিবার অভিলাষ করিয়া, কলিকাতার প্রধান প্রধান ব্যক্তিদিগকে নিমন্ত্রণ করিলেন। মধুসূদনের গুণানুরাগী ব্যক্তিগণ, সকলেই, সেই সভায় উপস্থিত হইলেন। কালী প্রসন্ন বাবু, তাহাদিগের ও বঙ্গের সাধারণ শিক্ষিত-মণ্ডলীর প্রতি নিধি রূপে, মধুসূদনকে অভ্যর্থনা করিয়া, তাহাকে একখানি অভিনন্দন পত্র ও একটী রৌপ্যনিৰ্ম্মিত, মূল্যবান পানপাত্র উপহার প্রদান করিলেন। এতদিন মধুসূদনের বন্ধুগণ, কেবল, ব্যক্তিগত ভাবে, তাহার প্রতিভার সম্মান করিয়া আসিতেছিলেন ; কালীপ্রসন্ন বাবু, বিদ্যোৎসাহিনী সভা হইতে অভিনন্দন করিয়া, এইবার, তাহাকে প্রকাশ্য রূপে সম্মানিত করিলেন। সাধারণ বঙ্গসমাজ ও কালী প্রসন্ন বাবুর কার্যের অনুমােদন করিতে পরাঘুখ হইলেন না। এক বৎসরের মধ্যেই মেঘনাদবধের প্রথম সংস্করণ নিঃশেষ হইল, এবং দ্বিতীয় সংস্করণের সময় স্বর্গীয়, কবিবর হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় তাহার এক সুদীর্ঘ সমালােচনা লিখিয়া, গ্রন্থের সঙ্গে প্রকাশিত করিলেন। তদ্ভিন্ন বাবু রাজনারায়ণ বা প্রভৃতি আরও অনেক গুণগ্রাহী ব্যক্তি, সংবাদপত্রের স্তম্ভে ও সভাস্থলে তাহার দোষ, গুণ আলােচনা করিয়া, গ্রন্থের ও গ্রন্থকারের প্রতিষ্ঠা বর্ধিত করিলেন। মধুসূদনের বাল্যাবধি পরিপােষিত আশা, এতদিনে, চরিতার্থ হইল। নিন্দা, উপহাস এবং কটুক্তিতে ঐক্ষেপ পাশ্চাত্য কবিদিগের প্রভাবকাল। করিয়া তিনি, দৃঢ় প্রতিজ্ঞতার সহিত, যে পথে অগ্রসর হইতেছিলেন, এতদিন পরে তাহার সীমাস্থলে উপনীত হইলেন। ধৰ্ম্মে হউক, সামাজিক কার্যে হউক, বা সাহিত্যে হউক, যাঁহারা কোনরূপ পরিবর্তন করিতে চাহেন, তাহাদিগকে প্রায়ই লাঞ্ছিত ও অপমানিত হইতে হয়। তাহাদিগের মৃত্যুর পরই লোকে, তাহাদিগের কার্য্যের গুরুত্ব বুঝিয়া, তাঁহাদিগকে সম্মান করেন; জীবিতাবস্থায় সম্মান তাহাদিগের ভাগ্যে প্রায়ই ঘটে না। কিন্তু মধুসূদনকে এ বিষয়ে, কিয়ৎপরিমাণে, সৌভাগ্য- বান বলিতে হইবে। নিজের কর্মদোষে, জীবনের শেষাবস্থায়, কষ্ট ভােগ করিলেও, একথা স্বীকার করিতে হইবে যে, তাঁহার স্বদেশীয় ও সমকালবর্তিগণের মধ্যে অনেকে তাহার প্রতিভার সম্মান করিয়াছিলেন। মেঘনাদবধ সম্বন্ধে আমাদিগের বক্তব্য শেষ হইয়াছে ; এইবার ব্রজাঙ্গনা ও কৃষ্ণকুমারী-নাটক সম্বন্ধে দুই চারিটী কথা বলিয়া আমরা বর্তমান অধ্যায় শেষ করিব। মধুসূদনকে একেই কি বলে সভ্যতা ও তিলােত্তমাসম্ভব এক সঙ্গে রচনা করিতে দেখিয়া ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্র বাবু রাজনারায়ণ বসুকে লিখিয়াছিলেন ;- “গ্রন্থকার যখন এক হস্তে এরূপ হাস্যরসেদ্দীপক চিত্র অঙ্কনে নিযুক্ত ছিলেন, তখন তিনি অপর হতে কিরূপে তিলােত্তমাসম্ভবে মিল্টনের ন্যায় গাম্ভীর্য্য প্রকটিত করিলেন, তাহা চিন্তা করিলে আমার বিস্ময় জন্মে।** তিলােত্তমাসম্ভব ও একেই কি বলে সভ্যতা এক সঙ্গে রচনা যদি বিস্ময়ের বিষয় হয়, তবে মেঘনাদবধ ও ব্রজাঙ্গনা এক সঙ্গে রচনা তদপেক্ষা শতগুণ অধিক বিস্ময়কর। একদিকে রণভেরীর দিগন্তভেদী সুগভীর নিনাদ, অপর দিকে মলয়-মারুত-সমানীত, সুমধুর *"It is a wonder to me how the author could paint so humorous picture with one hand, while the other was busy with depicting the Miltonic grandeur of Tilottama”.

জীবনচরিত। বংশীধ্বনি; একদিকে স্বর্গ ও নরকের বিস্ময়কর দৃশ্য, অপর দিকে বাসন্ত-কুসুম-সুশশাভিত, পিককুলনিনাদিত বৃন্দাবনের চারু চিত্র ; যুগপৎ শ্রবণ ও দর্শন কৰিলে পাঠককে স্তম্ভিত ও মােহিত হইতে হয় । অমিত্ৰচ্ছন্দের প্রবর্তন না করিয়া মিত্ৰচ্ছন্দে, এবং বীররসের প্রবর্তন করিয়া আদিরসে গ্রন্থরচনা করিলেও মধুসূদন বাঙ্গালি কবিদিগের মধ্যে কিরূপ স্থান লাভ করিতেন, ব্রজাঙ্গনাকাব্য হইতে আমরা তাহার প্রমাণ প্রাপ্ত হইতে পারি । শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবন পরিত্যাগ করিয়া, মথুরায় গমন করিয়াছেন, বৃন্দাবন শূন্য ; বৃন্দাবনের সকলই আছে ; সেই কলকলনাদিনী যমুনা, সেই শ্যামশােভাময় তমাল-কুঞ্জ, সেই চির- পরিচিত ময়ুর ময়ূরীগণ, সেই কুসুমগন্ধবাহী মলয় সমীরণ, সকলই আছে; এখনও সেখানে 'মুঞ্জরয়ে তরুবলী, গুঞ্জরয়ে সুখে অলি প্রেমানন্দ মনে।” কিন্তু রাধিকার হৃদয় শূন্য—রাধিকা বিরহে উন্মাদিনী; তাহার এই উন্মাদৰ ব্ৰাঙ্গনার বর্ণনীয় বিষয়। অন্যান্য বৈষ্ণব কবিগণের কাব্যের ন্যায় ইহাতে ভাববৈচিত্র নাই। কবি একবারে বিগলিত-ধারা রাধিকার বিষাদিনী মূর্তি পাঠকের সম্মুখে অবতারিত করিয়াছেন। আঠারটা কবিতায় ব্রজাঙ্গনা সমাপ্ত হইয়াছে। ইহার ভাষা মধুসূদনের গ্রন্থসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সুমধুর ও সংস্কৃতভাবাপন্ন। সম্ভবতঃ জয়দেবের ও বিদ্যাপতির ভাষার আদর্শে মধুসূদন তাহা গঠন করিয়াছিলেন। জানার সুমধুর বংশীধ্বনির সঙ্গে কুমারী কৃষ্ণার মর্মভেদী বিষাদোচ্ছাসও কবির লেখনী দ্বারা অতিব্যক্ত কৃষ্ণকুমারী নাটক। হইয়াছিল। মহারাণা প্রতাপ সিংহের বংশ- ধর, উদয়পুরাধিপতি মহারাজা ভীমসিংহের দুহিতা কৃষ্ণকুমারীর বিষাদময় জীবনের আখ্যায়িকা, কৃষ্ণকুমারী নাটকের বর্ণনীয় বিষয়। সীতা ময়ন্তী যে বংশের কুলবধু কৃষ্ণকুমারী সেই পবিত্র সূৰ্য্যৰংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন ; লােকে তাঁহাকে আদর করিয়া, রাজস্থানে কুসুম পাশ্চাত্য কবিদিগের প্রভাবকাল। L= * * * * * * বলিয়া ডাকিত। কৃষ্ণকুমারীর রূপ, গুণে মােহিত হইয়া জয়পুরের অধীশ্বর, জগৎসিংহ এবং মরুদেশের অধীশ্বর মানসিংহ তাঁহার পাণি প্রার্থী হন, এবং উভয়েই প্রতিজ্ঞা করেন যে, কৃষ্ণকুমারীকে প্রাপ্ত না হইলে, উদয়পুর ধ্বংস করিবেন। কৃষ্ণকুমারীর পিতা রাজা ভীমসিংহের অবস্থা তখন এরূপ শোচনীয় হইয়াছিল যে, প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীদিগের হন্ত হইতে ৰাজ্যৰক্ষা করিবার তাহার সামর্থ্য ছিল না। কৃষ্ণকুমারীই সকল অশান্তির মূল স্থির করিয়া, তিনি কৃষ্ণকুমারীকে হত্যার জন্য আদেশ দান করেন। চারুশীলা কৃষ্ণা, বংশের মর্যাদা রক্ষার জন্য, বিষ পান করিয়া প্রাণত্যাগ করেন। সংক্ষেপে ইহাই কৃষ্ণকুমারীর ঐতিহাসিক কথা। মধুসূদন, ইতিহাসের সামান্য পরিবর্তন করিয়া, কৃষ্ণকুমারীর মৃত্যু খাঘাত দ্বারা ঘটিয়াছিল, এইরূপ বর্ণন করিয়াছেন। মধুসূদনের নাটক সমূহের মধ্যে কৃষ্ণকুমারীই সর্বোৎকৃষ্ট। করুণ রসের উদ্দীপনে তিনি যে কিরূপ নিপুণ ছিলেন, ইহা হইতে তাহার পরিচয় প্রাপ্ত হওয়া যায়। মধুসূদনের কাব্যসমূহের ন্যায় তাহার নাটকগুলি বাঙ্গালা সাহিত্যে স্থায়ী প্রতিষ্ঠা লাভ করে নাই। এক্ষণে, বাঙ্গালা সাহিত্যে মধুসূদনের দিন দিনই, তাহাদিগের অপ্রচলন হইয়া নাটকসমূহের কাৰ্য্য। আসিতেছে। মধুসূদন যে ভাষায় নাটক রচনা করিয়াছিলেন, বর্তমান বাঙ্গালা ভাষা হইতে তাহা ক্রমশঃ স্বতন্ত্র হইয়া দাড়াইতেছে ; লােকের রুচির ও মানসিক প্রবণতারও পরিবর্তন ঘটিতেছে ; সুতরাং তাহাদিগের লুপ্ত-গৌরব আর পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হইবার সম্ভাবনা নাই। কিন্তু জীব-জগতে যেমন এক শ্রেণীর কাৰ্য্য শেষ হইলে আর এক শ্রেণীর জীব তাহাদিগের স্থান অধিকার করে, সাহিত্য জগতেও তেমনই এক জাতীয় গ্রন্থের বিলােপ ঘটিলে, আর এক জাতীয় গ্রন্থ তাহাদিগের স্থলাধিকারী হয়। কিন্তু তজ্জন্য বিলুপ্ত জীবের '১৪ জীবন-চরিত। বা বিলুপ্ত গ্রন্থের কার্যকারিতা ফলহীন হয় না। মধুসূদনের নাটক- সমূহের কার্য শেষ হইয়া গিয়াছে। কিন্তু, এক সময়ে, তাহারা নববভিন্ন বঙ্গসাহিত্যের যে উপকার করিয়াছিল, তাহা উত্তরকালীন নাটকীয় ইতিহাসে অবশ্যই স্মরণীয় হইবে।

নবম অধ্যায়। বীরাঙ্গনা-কাব্য রচনা ও ইংলণ্ড-গমন। { ১৮৬১ খ্ৰীষ্টাব্দ | মধুসূদনের সাহিত্যিক জীবনের আলােচনায় আমরা অনেক কাল, তাহার পারিবারিক জীবনের কোনও প্রসঙ্গ পারিবারিক কথা। করিতে পারি নাই। পাঠকবর্গের কৌতূহল উদ্দীপিত হইতে পারে, তাহাতে এমন কোন উল্লেখযােগ্য ঘটনাও ছিল । পূর্বের ন্যায় তিনি পুলিস-আদালতে কাৰ্য্য করিতেছিলেন। নিজের বেতন, পুস্তক বিক্রয়ের আয়, এবং পৈত্রিক সম্পত্তি হইতে তাহার যে অর্থাগম হইত, তাহাতে মধ্যবিত্ত গৃহস্থের ন্যায় স্বচ্ছন্দে তাহার দিনপাত হইত। কলিকাতায় প্রত্যাগমনের পর তাহার একটী পুত্র ও একটী কষ্ট জন্মিয়াছিল ; এবং বাঙ্গালা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক বলিয়া তাহার নাম বঙ্গসমাজে সুপরিচিত হইয়াছিল । সুতরাং, সাধারণতঃ, যে সকল সামগ্রী লইয়া মনুষ্য পারিবারিক জীবনে সুখী হয়, তাহার কিছুই তাহার অভাব ছিল না ; অথচ, একদিনের জন্য, তিনি সুখী ছিলেন না। সুখ বাহিরের কোনও সামগ্রীর উপর নির্ভর করে না ; সুখ মনুষ্যের নিজের মনে ও আত্মসংযমে। কিন্তু মনকে কেমন করিয়া সংযত ও সমাহিত রাখিতে হয়, মধুসূদন তাহা জানিতেন ; সুতরাং ধন, যশ, পরিবারবর্গের স্নেহ, কিছুই, তাহাকে তৃপ্তিদান করিতে পারে নাই। বাহিরে লােকে দেখিত, মধুসূদন বিলাসী, আমােদনিরত ও উদ্বেগশূন্য; কিন্তু অভ্যন্তরে তাহার হৃদয় বিষম যন্ত্রণায় দগ্ধ হইত। বাবু সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরােধে তিনি এই সময়কার তত্ববােধিনী পত্রিকায়* “আত্ম-বিলাপ” নামক একটা কবিতা লিখিয়া- * ১৮৬১ খৃঃ অঃ আশ্বিন মাস জীবন-চরিত। ছিলেন। এই কবিতাটা পাঠ করিলে বুঝিতে পারা যায় যে, কিরূপ অতৃপ্তির ও অশান্তির মধ্যে মধুসূদনের জীবন অতিবাহিত হইত। শাস্তিদাতার উপর নির্ভর না করিয়া, তিনি যে সাংসারিক সামগ্রীতে শান্তির আশা করিয়াছিলেন, তাহাকে তাহার উপযুক্ত ফল ভােগ করিতে হইয়াছিল। প্রেমের কুসুমহার, নিগড়রূপে, তাহার চরণযুগল আবদ্ধ করিয়াছিল; মণি আহরণ করিতে যাইয়া বিষম বিষে তাহার শরীর জর্জরিত হইয়াছিল এবং কুসুম সংগ্রহ করিবার সময়ে মাৎসৰ্য-কীট বিষদশন দ্বারা তাহাকে দংশন করিয়াছিল । নিজের জীবনের এই বিষাদময় অভিজ্ঞতা মধুসূদন তাহার আত্ম- আত্মবিলাপ। বিলাপ-কবিতায় অতি মর্মস্পর্শিনী ভাষায় ব্যক্ত করিয়াছেন। চতুর্দশপদী কবিতাবলীর শ্যামাপক্ষা নামক একটা কবিতায় তিনি লিখিয়াছেন যে, বিহগের আর্তনাদ মনুষ্য, অনেক সময়, সঙ্গীত বলিয়া ভ্রম করে। তাহার এই আত্মবিলাপও অনেকে কেবল সুমধুর কবিতা ৰলিয়া উপভােগ করেন; কিন্তু যাঁহারা কবির জীবনের ঘটনাবলীর সহিত পরিচিত, তাহারা বুঝিবেন যে, ইহা শ্রুতি-সুখকর কবিতামাত্র নহে; ইহা যন্ত্রণা-নিপীড়িত কবির মর্মান্তিক আর্তনাদ। আত্মবিলাপ কবিতাটা নিম্নে প্রদত্ত হইল ;- আত্ম-বিলাপ। “আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু, হায় ! তাই তাৰি মনে? বন-প্রদাহ বহি কাল-সি পানে যায়, কিয়াব কেমনে? দিন দিন আয়ুহীন, হীনবল দিন দিন ;- তবু এ অাশার নেশা দুটিল না -একি গায় ! * রোদন নিনাদ কিরে লোকে মনে করে মধুমাখা গীতখনি অজ্ঞানে বিচারি।। চতুর্দশপদী-কৰিতাৰী-শ্যামাপনী।

বীরাঙ্গনা-কাব্য রচনা ও ইংলণ্ড-গমন। ১০৭ রে প্রমত্ত গন মম! কবে পােহইবে রাতি? জাগিবি রে কবে ? জীবন-উদ্যানে তাের যৌবন-কুম-ভাতি কতদিন রবে ? নীবিন্দু দূর্বাদলে নিত্য কিরে ঝলমলে,- কে না জানে অপুবিশ্ব অষু-মুখে সদ্যঃপাতি ? নিশার স্বপন সুখে সুখী যে কি সুখ তার ? জাগে সে কাদিতে। ক্ষণ এভা প্রভা দানে বাড়ায় মাত্র আধার, পথিকে ধাধিতে! মরীচিকা মরুদেশে নাশে প্রাণ তৃৰা-ক্লেশে ; এ তিনের ছল সম ছল রে এ কুমার। : প্রেমের নিগড় গড়ি পৰিলি চরণে সাধে ; কি ফল লভিলি ? জলন্ত পাবকশিখা লোভে তুই কাল-ফাদে উডিয়া পড়িলি। পতঙ্গ যে রঙ্গে ধায়, ধাইলি, অবোধ, হায়! না দেখিলি, না শুনিলি, এবে রে পরাণ কাঁদে। বাকী কি খিলি, তুই! বৃথা অর্থ অন্বেষণে, সে সাধ সাধিতে ? কত মাত্র হাত তাের মৃণাল-কন্টকগণে কমল তুলিতে। নারিলি হরিতে মণি, দংশিল কেবল ফণ; এ বিষম বিষজ্বালা ভুলিবি, মন ! কেমনে ? যশোলা লোতে আয়ু কত যে ব্যয়িলি, হায়, কব তা কাহারে ! সুগন্ধি-কুসুম-গন্ধে অন্ধ কীট যথা ধায় কাটিতে তাহারে ;- মাৎস্য বিষদশ, কামড়ে যে, অমুক! এই কি লতিলি ফল অনাহারে, অনিদ্রায় ? মুকুতা-ফলের লােভে ডুবে রে অতল জলে যতনে ধীবর, শত মুক্তাধিক আয়ু কলসিন্ধু-লতলে ফেলিস পার ! ফিরি দিবে হারাধন, কে তােরে, অবোধ মন ? হায় রে ভুলিৰি কত আশার কুহলে!”

১০৮ জীবন-চরিত। মনের এইরূপ অবস্থা সত্বেও মধুসূন যে, ধীরভাবে, গ্রন্থ রচনায় সময়ক্ষেপ করিতে পারিতেন, ইহাই আশ্চৰ্য্য। কিন্তু গ্রন্থরচনাই তাহার সান্ত্বনার একমাত্র উপায় হইয়া দাড়াইয়াছিল। মর্মান্তিক যাতনা বিস্তৃত হইবার জন্যই তিনি, অনেক সময়, বাদেবীর চরণে শরণাগত হইতেন। যে সময় অসহ্য যন্ত্রণায় তিনি এইরূপ আর্তনাদ করিতেছিলেন, সেই সময়ই তাহার আর একখানি অত্যুৎকৃষ্ট গ্রন্থ বীরাঙ্গনা-কাব্য রচিত হইতেছিল। তাহার পারিবারিক জীবনের আলােচনা অপেক্ষা তাহার সাহিত্যিক জীবনের আলােচনাই অধিকতর প্রীতিপ্রদ। আময়া, সেই জন্য, তাহার পারিবারিক কথা ছাড়িয়া, তাহার বীরাঙ্গনা-কাব্যের আলােচনায় প্রবৃত্ত হইব। মেঘনাদবধে যেমন মধুসূদনের প্রতিভার গম্ভীর এবং ব্রজাঙ্গনায় যেমন তাহার কোমল অংশের পরিস্ফুটন হই- বীরাঙ্গনা-কাশ্যে গম্ভীর ও যাছে, বীরাঙ্গনা-কাব্যে তেমনই এই উভয়ের কোমল ভাবের সম্মিলন। সম্মিলন হইয়াছে। মধুসূদন তাহার একখানি পত্রে লিখিয়াছিলেন যে, “মেঘনাদবধের পর বীররস বিষয়ে অভিনব উদ্যম কেবল পুনরুক্তি মাত্র হইবে; গীতিকবিতারও দিকে আমার প্রবণতা আছে, আমি সেই দিকে চেষ্টা করিব।” মধুসূদনের সেই প্রবণতার ফল তঁাহার ব্রজাঙ্গনা-কাব্য। অসামান্য প্রতিভা গুণে বীররস প্রধান কবিতার ন্যায় গীতিকবিতাতেও যদিও তিনি কৃতকার্য হইয়া- ছিলেন, তথাপি তাহার স্বভাবতঃ বীরত্বানুরাগী হৃদয়, তাহার অজ্ঞাত সারে, পুনর্বার বীররসেরই দিকে প্রত্যাবৃত্ত হইয়াছিল। ললিত পদাবলী সৃজন করিয়া তিনি বিরহ-বিধুর শ্রীরাধিকার মর্মবেদনা ব্যক্ত করিয়া- ছিলেন, কিন্তু মেঘনাদবধের যে গম্ভীর ভেরী-নিনাদ একবার তাঁহার লেখনী হইতে উদগত হইয়াছিল, ব্রজাঙ্গনার মৃদুমধুর বংশীধ্বনিতে তাহা নিমগ্ন হয় নাই। গােপবালাগণের মােননিনাদের মধ্যে, যমুনার বীরাঙ্গনা-কাব্য রচনা ও ইংলণ্ড-গমন ; কলকল শব্দের অভ্যন্তরে, এবং বৃন্দাবনের তমালজির মর্মর-ধ্বনিতে, কখনও, তাহা তাহার কর্ণে প্রতিধ্বনিত হইতে বিরত ছিল না। তাহার প্রতিভা মেঘনাদবধের গাম্ভীর্য এবং ব্রজাঙ্গনার মাধুৰ্য, একাধারে, সম্মিলিত করিতে প্রস্তুত হইল ; ইহার ফল বীরাঙ্গনা-কাৰ্য। বীরাঙ্গনায়, সেই জন্য, একদিকে বনবাসিনী, ঋষি-বালিক। শকুন্তলার করুণ মৰ্ম্ম- বেদনা এবং অপরদিকে বীর-প্রসূতি, তেজস্বিনী জনার হৃদয়ভেদী তিরস্কার সম্মিলিত হইয়াছে। বীরাঙ্গনা মেঘনাদবধ ও ব্রজাঙ্গনা-কাব্যের সংযােগসূত্ৰ-স্বরূপ এবং মধুসূদনের প্রতিভার গম্ভীর ও কোমল অংশের সম্মিলনস্থল। সুপ্রসিদ্ধ রােমক-কবি ওভিদের (Ovid) বীরপত্রাবলীর (Heroic Epistles) আদর্শে মধুসূদন তাহার বীরাঙ্গনা বীরাঙ্গনার আদশ। কাব্য প্রণয়ন করিয়াছেন। ব-পত্রাবল ন্যায় বীরাঙ্গনা-কাব্যও প্রসিদ্ধ। পৌরাণিক মহিলাগণের পচ্ছলে গঠিত যে সমস্ত দোষগুণ ওভিদের পত্রাবলীর বিশেষ লক্ষণ, বীরাঙ্গনাতেও তাহা লক্ষিত হয়। উভয় গ্রন্থেই প্রেমিক-হৃদয়ের রহস্য পরিজ্ঞানে অসামান্য নৈপুণ্য, উভয় গ্রন্থেই উদ্দাম কল্পনা এবং সেই সঙ্গে ধৰ্ম্মনীতির ও সমাজ- নীতির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শিত হইয়াছে। কিন্তু বীরপত্রাবলীর সহিত বীরাঙ্গনার এইরূপ সাদৃশ্য আছে বলিয়া তাহাতে মৌলিকতার অভাব নাই। পত্রাকারে কাব্য-রচনা যে সম্ভবপর, মধুসূদন তাহাই কেবল ওভিদের নিকট শিক্ষা করিয়াছিলেন ; কোনও. স্থলে তাহার গ্রন্থের ভাবাপহরণ করেন নাই। বীরাঙ্গনাকাব্য—দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা, সােমের প্রতি তারা; দ্বারকানাথের প্রতি রুক্মিণী, দশরথের প্রতি কৈকেয়ী, লক্ষ্মণের প্রতি শূর্পণখা; অর্জুনের প্রাত দ্রৌপদী, দুর্যোধনের প্রতি ভানুমতী, ময়দ্রথের প্রতি দুঃশলা, কাব্য-বিভাগ।

জীবনচরিত। শান্তনুর প্রতি জাহৰী, পুরুরবার প্রতি উর্বশী এবং নীলধ্বজের প্রতি জনা এই একাদশ সর্গে বিভক্ত। ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দে ইহা রচিত এবং পর বৎসরের প্রারম্ভে ইহা প্রকাশিত হয়। যাহার নিকট মৃত্যুশয্যা পর্যন্ত মধুসূদন আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন, “বঙ্গকুল-চূড়া” সেই মহাত্মা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের “চিরস্মরণীয় নামে” ইহা উৎসৃষ্ট হইয়াছে। ভাষার লালিত্যে বীরাঙ্গনা মধুসূদনের অমিচ্ছন্দে রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট। যাহাদিগের যাহাদিগের বিশ্বাস বীরাঙ্গনার ভাষা। অমিত্র, গম্ভীর রচনায় এবং বীররসের পক্ষে উপযােগী হইলেও, মধুর কোমল ভাবের উপযুক্ত নয়, বীরাঙ্গনার ভাষা তাহাদিগের সে ভ্রম দূর করিবে । বীরাঙ্গনার ভাষা মধুর অথচ ওজস্বী, প্রাঞ্জল অথচ গম্ভীর, এবং কবির কল্পনা-তরঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে যেন উত্থান- পতনশীল। ইংৰাব্দীভাষায় যিনি অমিত্ৰচ্ছন্দের প্রবর্তন কষিয়াছিলেন, তাহার দ্বারা তাহার উৎকর্ষ সাধন হয় নাই ; তাহার পরবর্তী কবিগণেরই দ্বারা হইয়াছিল। কিন্তু বাঙ্গালাভাষায় অমিত্ৰচ্ছন্দের প্রবর্তন এবং তাহার উৎকর্ষ সাধন, এই উভয় গৌরবই মধুসূদনের প্রাপ্য। বীরাঙ্গনা রচনার পর হেমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, এবং রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি বঙ্গের প্রতিভাবান্ লেখকগণ অমিত্ৰচ্ছন্দে কবিতা লিখিয়াছেন। কিন্তু তাঁহাদিগের ভাষা বীরাঙ্গনার ভাষা অপেক্ষা উন্নত হয় নাই। ইহা বহুদিন পৰ্যন্ত চতুর্দশারী অমিত্ৰচ্ছন্দের ভাষার আদর্শ স্বরূপ থাকিৰে। বীরাঙ্গনা-কাব্য মধুসূদনের প্রতিভা বিকাশের উৰ্দ্ধতম সীমা-স্বরূপ ইহার পর হইতে তাহার প্রতিভার অধােগতি আর হইয়াছে। মহারাজা যতীন্দ্রমােহন ঠাকুরের অনুরােধে, মহাভারতীয় কোন ঘটনা এবং বাবু রাজনারায়ণ বসু মহাশয়ের অনুরােধে, সিংহল-বিজয়-বৃত্তান্ত অবলম্বন করিয়া, তিনি দুইখানি কাব্য রচনা করিতে মনস্থ করিয়াছিলেন।

বীরাঙ্গনা-কাব্য রচনা ও ইংলও-গমন। ১১১ দুই খানিই প্রথম অংশ লিখিত হইয়াছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কোন খানিই সম্পূর্ণ হয় নাই। সুনিপুণ ভাস্করের খােদিত মূৰ্ত্তির ভগ্নাংশ হইতে যেমন শিল্পীর নৈপুণ্য অনুমান করা যাইতে পারে, এই সকল অসম্পূর্ণ কবিতাতেও আমরা তেমনই মেঘনাদবধ-রচয়িতার হস্তচিহ্ন দর্শন করিতে পারি। মধুসূদনের অনেকগুলি অসম্পূর্ণ কাৰের ও কবিতার বিষয় আমরা উল্লেখ করিয়াছি। যেরূপ মানসিক অশান্তিতে মধুসূদনের অধিকাংশ জীবন অতিবাহিত হইয়াছিল, তাহাতে তাহার আর কাৰ্য্য অসম্পূর্ণ দেখিয়া আমরা বিস্মিত হই না। তিনি যে এতগুলি গ্ৰন্থ বীর- ভাবে সম্পূর্ণ করিতে পারিয়াছিলেন, বরং ইহাতেই বিস্মিত হই। তাঁহার আত্ম-বিলাপ-কবিতা আমরা পূর্বেই আলােচনা করিয়াছি; তাহার স্মরণার্থ-লিপিরও দুইটা মন্তব্য নিম্নে উদ্ধত হইতেছে। তাহা হইতে পাঠক অনুমান করিতে পারিবেন যে, যিনি, মেঘনাদবধ রচনা করিয়া, শত শত নর, নারীর হৃদয় পরিতৃপ্ত করিয়াছিলেন, তাঁহার নিজের দিন কিরূপ অতৃপ্তিতে অতিবাহিত হইত। ১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দের ৪ঠা ফেব্রুয়ারীর স্বাক্ষরিত স্মরণার্থ-লিপিতে বীরাঙ্গনা-কাব্য সম্বন্ধে তিনি লিখিয়াছিলেন It is my intention, God willing, to finish this poem (Tatatata) in XXI Books. But I must print the XI already finished. The proceeds of the sale of the ist part must defray the expenses of printing the second. "Born an age too soon"-a time will come when these works of mine will fill the pockets of printers, booksellers, painters et hoc genus omne and now I am obliged to "shell out." বীরাঙ্গনা কাৰে জনা-পত্রিকা শেষ করিয়া তিনি এইরূপ লিখিয়াছিলেন। • মধুসূদন বিস্তৃত জীবনচরিতে এই সকল কবিতা প্রদত্ত হইয়াছে।

১১২ জীবনচরিত। The epistle of poor wat must be revised and printed along with the Second set. I am very unpoetical just now. God knows in what all this trouble, anxiety, and vexation will end. যে সকল কারণে মধুসূদনের জীবনে শান্তি ছিল না, অর্থাভাবই তাহাদিগের মধ্যে প্রধান। পুলিশ-আদা- সাংসারিক কণা। লতের কার্য্য, পৈত্রিক সম্পত্তি এবং পুস্তক- বিক্রয় হইতে তাহার যে আয় হইত, তাহাতে তাহার ক্লেশ ছিল না। মধ্যবিত্ত গৃহস্থের ন্যায় তাহাতে সচ্ছন্দে তাহার দিনপাত হইতে পারিত। হরিশ্চন্দ্র মুখােপাধ্যায় মহাশয়ের মৃত্যুর পর তিনি, কিছু দিনের জন্য, হিন্দুপেটিয়ট-পত্রিকার একজন নিয়মিত লেখক হইয়াছিলেন। তাহা- তেও তাহার কিছু কিছু অর্থাগম হইত। কিন্তু হইলে কি হইবে? ব্যয়-সম্বন্ধে তাহার প্রকৃতি যেরূপ ছিল, তাহাতে, অতুল ঐশ্বর্যের অধিপতি হইলেও, তাহার অর্থাভাব-ক্লেশ দূর হইত কি না সন্দেহ। তাহার মনে হইত, অর্থচ্ছ দূর করিতে পারিলেই তিনি সুখী হইতে এবং অবাধে সাহিত্যের সেবা করিতে পারিবেন। ইংলণ্ড গমনের জন্য বাল্য হইতেই তাহার বাসনা ছিল। ইংলণ্ডে যাইয়া ব্যারিষ্টার হইয়া আসিতে পারিলে তাহার অর্থাভাব-ক্লেশ দূরীভূত হইবে তাহার এইরূপ ধারণা জন্মিল। তাঁহার পিতা মৃত্যুকালে যে ভূ-সম্পত্তি রাখিয়া গিয়াছিলেন, তাঁহার পিতৃপুত্রগণের সঙ্গে মােকদ্দমায় জয়লাভ করিয়া, তিনি এক্ষণে তাহার অধিকারী হইয়াছিলেন। সেই সম্পত্তি পনি দিয়া তিনি ইংলণ্ড গমনের সঙ্কল্প করিলেন। এইরূপ স্থির হইল যে, পত্তনিদার মধুসূদনকে তাহার ইংলণ্ড গমনের ব্যয় নির্বাহাৰ্থ কিয়ৎ- পরিমাণ অর্থ অগ্রিম দিবেন, এবং তাহার পত্নী, পুত্রাদির ব্যয় নির্বাহা, মাসিক দেড়শত করিয়া টাকা দিবেন। এইরূপ ব্যবস্থার ফলে মধুসূদনকে পরে কিরূপ বিপদগ্রস্ত হইতে হইয়াছিল, পরবর্তী অধ্যায়ে পাঠক তাহা দেখিতে পাইবেন। বৈষয়িক এইরূপ ব্যবস্থা করিয়া, বীরাঙ্গনা-কাব্য রচনা ও ইংলণ্ড-গমন । ১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দের ৯ই জুন, মধুসূদন ক্যাণ্ডিয়া ইংলও-যাত্রা। নামক জাহাজে ইংলণ্ড যাত্রা করিলেন। বঙ্গ-সাহিত্য সেইদিন হইতে একটা প্রতিভাবান্ সন্তানের পূজায় বঞ্চিত হইলেন। ইংলণ্ড গমনের পূর্বে তিনি যে কবিতায় বঙ্গভূমির নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা, নিম্নে উদ্ধত হইল;- বঙ্গভূমির প্রতি। রেখো, মা, দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে। সাধিতে মনের সাধ, ঘটে যদি পরমাদ, মধুহীন করােনা গাে তব মন-কোকনদে। এবাসে দৈবের বশে, জীব-তারা যদি খসে এ দেহ-আকাশ হতে, নাহি খেদ তাহে। জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে, চিরন্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে? কিন্তু যদি রাখ মনে, নাহি, মা, ভরি শমনে ; মক্ষিকাও গলে না গাে পড়িলে অমৃত-হ্রদে ! সেই ধনা নরকুলে, লােকে যারে নাহি ভুলে, মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্বজন ;- কিন্তু কোন্ গুণ আছে, যাচিৰ যে তব কাছে, হেন অমরতা আমি, কহ গো শ্যাম জন্মদ। তবে যদি দয়া কর, ভুল দোষ, গুণ ধর, অমর করিয়া বর দেহ দাসে, সুবরদে। ফুটি যেন স্মৃতি-জলে, মানসে, মা, যথা ফলে, মধুময় তামরস কি বসন্ত, কি শরদে। ।

fiue
سه
old Ray! – all that I lace say
مه
Kagamento
ها AT
:
elerr یہ 7) 4:47
منه و نه به
عن
د ا سکے ممے
ablets
le seccar a
Temarie
qa-sfqs
effectionate
Mechalmtdat
মধু নর হস্তলিপির প্রতিরূপ
১১৪

দশম অ্যায় য়ুরােপ-প্রবাস—চতুর্দশী কবিতাৰুলী। [১৮৬২-১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দ | ইংলওগমন। অষ্টাদশবৰ বয়স হইতে মধুসূদন যে আশা হৃদয়ে পােৰণ করিয়া আসিতেছিলেন, এতদিন পরে তাহা পূর্ণ হইল। শস্য-শ্যামলা জন্মভূমি, বাগমপ্রফুল্লা ভাগীরথী, এবং প্রথম জীবনের ক্রীড়া-নিকেতন “প্রাসাদনগরী” কলিকাতার নিকট বিদায় গ্রহণ করিয়া মধুসূদন অর্ণবপাের্তে আরােহণ করিলেন। সেক্সপীয়ার, মিল্টনের জন্মভূমি, হােমর, ভাজ্জিল, দান্তের লীলাক্ষেত্র য়ুরােপ-ভূমি দর্শনের জন্য তিনি চলিয়াছেন, তাঁহার হৃদয়ের ভাব বর্ণন করা নিষ্প্রয়ােজন। দেখিতে দেখিতে সেন্টপল ধৰ্ম্ম-মন্দিরের উচ্চ শৃঙ্গ নিমগ্ন হইয়া গেল, গঙ্গাকূলবর্তী নারিকেল বৃক্ষরাজি অদৃশ্য হইয়া আসিল, এবং গঙ্গার বাজল সংস্পর্শে ঈষদারক্ত ৰারির পরিবর্তে সুনীল সাগরা ক্রমে তাহার দৃষ্টিপথে পতিত হইল। মধুসূদন মহাসমুদ্রে উপস্থিত হইলেন। মহাসমুদ্র তঁাহার নিকট অপরিচিত ছিল না; মাদ্রাজে অবস্থানকালে তাহার গভীর গর্জন শ্রবণ করিয়া এবং তাহার বিশাল মূর্তি দর্শন করিয়া তিনি পুলকিত হইয়াছিলেন। আবার যে কখনও তিনি তাহার গাম্ভীৰ্য্য উপলব্ধি করিয়া কৃতার্থ হইতে পারিবেন, তাঁহার সে আশা ছিল না; কিন্তু বিধাতার বিধানে তাহার আশা পূর্ণ হইয়াছিল। ১৮৬২ খ্রীষ্টাব্দের জুলাইমাসের শেষভাগে মধুসূদন ইংলণ্ডে উপস্থিত হইলেন, এবং (Gray's Inn) গ্রেইন নামক প্রসিদ্ধ ব্যারিষ্টার সমাজে জীবন-চরিত প্রবেশ করিলেন। তঁাহার ব্যারিষ্টারী শিক্ষা- ইংলণ্ডে উপস্থিতি ও গ্রেস ইন কালের বিস্তৃত বিবরণ প্রদান অনাবশ্যক। ব্যারিষ্টার-সমাজে প্রবেশ। তিনি যে ব্যবসায় শিক্ষা করিতে গিয়াছিলেন, তাহা তাহার উপযুক্ত ছিল না। আন্তরিক অনুরাগ না থাকিলে, কেবলমাত্র সাংসারিক ইষ্টসিদ্ধির জন্য, যদি কোন কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হওয়া যায়, তাহা হইলে তাহার যেরূপ পরিণাম হইয়া থাকে, মধুসূদনের ব্যারিষ্টারী ব্যবসায়ের পরিণামও সেইরূপ হইয়াছিল। কি পরীক্ষাস্থলে, কি কৰ্ম্মক্ষেত্রে, কোথাও, তিনি ব্যবহারশাস্ত্র সম্বন্ধে পারদর্শিতা দেখাইতে পারেন নাই। কয়েক বৎসর অধ্যয়নের পর, কোনও রূপে, ব্যারিষ্টারী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া তিনি স্বদেশে প্রত্যাগমন করিয়াছিলেন । ; কিন্তু উল্লেখযােগ্য কোনও সম্মান বা প্রতিপত্তি তাহার ভাগ্যে কখনও ঘটে নাই। আমরা বলিয়াছি যে, মধুসূদনের সর্বোৎকৃষ্ট গ্রন্থের ন্যায়, তাহার নিজের জীবন ও এক বিষাদান্ত কাবা। কি জন্মভূমি যুরোপ-প্রবাসকালীন বঙ্গদেশে, কি মান্দ্রাজে, কিয়ুরােপে নিরবচ্ছিন্ন দুরবস্থা। শান্তি তাহার ভাগ্যে কোন স্থানেই ঘটে নাই। তাহার য়ুরােপ-প্রবাস কালে আমরা তাহার এই বিষাদময় জীবন-কাব্যের এক সুদীর্ঘ অধ্যায় দেখিতে পাই। যেরূপ দুর্দশায় তাহার প্রবাসকাল অতিবাহিত হইয়াছিল, তাহার স্বদেশীয়গণের মধ্যে অতি অল্পলােকই তাহ অবগত আছেন। “দয়ার সাগর” বিদ্যাসাগর মহাশয় তাহাকে সাহায্য না করিলে মধুসূদন, কখনই, ব্যারিষ্টারী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, স্বদেশে প্রত্যাগমন করিতে পারিতেন না। হয়ত, অর্থাভাবে, বিদেশের কোন কারাগারে বা দরিদ্রনিবাসে তাহার জীবন শেষ হইত। নিজের অবস্থা না বুঝিয়া সহসা একটি ব্যয়সাধ্য ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করিয়াছিলেন বলিয়া যে মধুসূদনের সেরূপ দুর্দশা ঘটিয়াছিল, তাহা নয়। মনুষ্যপ্রকৃতি য়ুরােপ-প্রবাস। ১১৭ r না বুঝিয়া তিনি যে অপাত্রে বিশ্বাস স্থাপন করিয়াছিলেন, তাহারই ফলে তাহাকে সেরূপ দুর্দশা ভােগ করিতে হইয়াছিল। যে অবস্থায় তিনি য়ুরােপ যাত্রা করিয়াছিলেন, আমরা পূৰ্ব্ব অধ্যায়ে তাহার উল্লেখ করি ছি। বাঁহাদিগের উপর তিনি নিজের বৈষয়িক কার্যের ভারাৰ্পণ করিয়া গিয়াছিলেন, তাহার স্বদেশত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই, তাহারা আপন আপন কর্তব্যপালনে পরান্মুখ হইলেন। নির্দিষ্ট, মাসিক অর্থ-সাহায্যে বঞ্চিত হওয়াতে মধুসূদনের এবং তাহার পত্নীর বিপদের সীমা রহিল না। স্বামীর অসাক্ষাতে কোনরূপ ব্যবস্থা করা অসম্ভব দেখিয়া মধুসূদনের পত্নী স্বামীর নিকট গননই যুক্তিযুক্ত বলিয়া বিবেচনা করিলেন এবং মধু- সূদনের স্বদেশত্যাগের এক বৎসরের মধ্যে, আপনার শিশু দুইটীকে লইয়া, য়ুরােপে স্বামীর নিকট উপস্থিত হইলেন। অকস্মাৎ এইরূপ ব্যবৃদ্ধিতে মধুসূদন বিষম বিপদে পড়িলেন। সপরিবারে যুবরাপে বাস সহজ নয় ; তাহার উপর মধুসূদন আবার পরিমিতব্যয়ী ছিলেন না। সুতরাং তাহার সঞ্চিত অর্থ, অল্প দিনের মধ্যে, নিঃশেষ হইয়া আসিল, এবং প্রয়ােজনীয় ব্যয় নির্বাহাৰ্থ অলঙ্কার, বস্ত্র, গৃহসামগ্রী ইত্যাদি সমস্তই ক্রমে গবর্ণমেন্ট- বন্ধক-আফিসে আবদ্ধ হইল। অমিত্রচ্ছদ প্রবর্তনের জন্য বাবু কালী প্রসন্ন সিংহ মধুসূদনকে যে সুন্দর রৌপ্য পান-পাত্র উপহার প্রদান করিয়াছিলেন, অর্থাভাবে, তিনি তাহাও পৰ্য্যন্ত বন্ধক দিতে বাধ্য হইলেন। ফরাসী ভাষাশিক্ষার সুবিধার সঙ্গে অপেক্ষাকৃত অল্পব্যয়ে সংসারনিৰ্বাহ হইবে বলিয়া, এবং তাহার পত্নীয় স্বাস্থ্যের জন্য, মধুসূদন ফ্রান্সের অন্তর্গত ভরসে নগরে আসিয়াছিলেন ; অর্থাভাবে ইংলণ্ডে ফিরিয়া যাইতে পারেন নাই। তরসেসে অবস্থানকালে তাহার দুর্দশা চরমসীমায় উপনীত হইয়াছিল। সেখানে, কোন কোন দিন, সত্যই তাহাকে অনশনে দিনপাত করিতে হইত। ঋণের জন্য পাছে তাহাকে কারাগারে যাইতে হয়, এই আশঙ্কায় মধুসূদন ১১৮ জীবন-চরিত। সর্বদা উৎকণ্ঠিত থাকিতেন। একটা দয়াবতী ফরাসী মহিলা, তাহার দুরবস্থা অবগত হইয়া, এই সময়, তাঁহার যথেষ্ট উপকার করিয়াছিলেন । সম্রাপ্তবংশীয়, দরিদ্র ব্যক্তিগণ, মর্যাদাভঙ্গের ভয়ে, পাছে, প্রকাশ্য সাহাষ্যগ্রহণ না করেন, এই জন্য কোন কোন ফরাসী দাতবা সমিতি, অতি সঙ্গোপনে, তাহাদিগকে সাহায্য করিয়া থাকেন। মধুসূদনের দুর্দশার বিষয় জ্ঞাত হইয়া এইরূপ একটী দাতব্য-সমিতি, তাহার অজ্ঞাতসারে, তাহার গৃহের দ্বারে আহাৰ্য্য সামগ্রী ও শিশুদিগের জন্য দুগ্ধ রাখিয়া যাই- তেন, তাহাতে কোনরূপে দিনপাত হইত। কিন্তু এরূপ অবস্থায় কত দিন চলিতে পারে ? যাহাদিগের কথার ও প্রতিশ্রুত অর্থসাহাযাের উপর নির্ভর করিয়া তিনি য়ুরােপে গমন করিয়াছিলেন, এ সময় অর্থ- প্রেরণ দূরে থাকুক, বারম্বর পত্র লিখিলেও তাহারা প্রত্যুত্তর দিতেন । মধুসূদন, উপায়ান্তর না দেখিয়া, সেই অশরণের শরণ. “দয়ার সাগর” বিদ্যাসাগর মহাশয়েয় শরণাপন্ন হইলেন । মধুসূদনের য়ুরােপ- গমন সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর মহাশয় বিশেষ উৎসাহ-প্ৰকাশ করিয়াছিলেন। আপনার দুরবস্থা জ্ঞাপন করিয়া মধুসূদন, এক্ষণে, তাহাকে এক পত্র লিখিলেন। যে হৃদয়, কোন দিন, শরণাগতের আর্তনাদ শ্রবণ করিয়া নিশ্চিন্ত থাকিতে পারে নাই, মধুসূদনের দুঃখে যে তাহা উদাসীন থাকিবে, তাহা কখনও সম্ভবপর নয় । মধুসূদনের পত্র পাইবামাত্র বিদ্যাসাগর মহাশয় তাঁহার স্বাভাবিক মহত্ত্বের ও সহৃদয়তার উপযুক্ত কাৰ্য্য করিলেন। তাহার নিজের নিকট সে সময় মধুসূদনের প্রয়াে- জনানুরূপ অর্থ ছিল না; তিনি, ঋণ করিয়া, মধুসূদনকে পনর শত টাকা পাঠাইয়া দিলেন। ইহার পর আরও কয়েক বার তিনি মধুসূদনকে সাহায্য প্রেরণ করিয়াছিলেন। মধূসূদন বিদ্যাসাগর-মহাশয়ের প্রদত্ত ঋণের কিয়দংশ মাত্র পরিশােধ করিতে পারিয়াছিলেন । অবশিষ্ট তাহার মৃত্যুকাল পর্যন্ত অপরিশােধিত ছিল । ;

য়ুরােপ-প্রবাস। মধুসূদন প্রধানতঃ ব্যারিষ্টারী ব্যবসায় শিক্ষার জন্য ইংলণ্ডে গমন করিয়াছিলেন । কিন্তু য়ুরােপীয় ভাষা সমূহে অধিকার লাভও তাহার ঘুরােপ-গমনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। ইংলণ্ডে আগমন করিয়া তিনি তাহার এই বাসনা চরিতার্থ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। য়ুরােপ হইতে তিনি তাঁহার প্রিয় সুহৃদ গৌরদাস বাবুকে যে সকল পত্র লিখিয়াছিলেন, সেই সকল পত্রে তিনি তাহার ভাষা শিক্ষার বিষয় ব্যক্ত করিয়াছেন। এই সকল ভাষার সাহায্যে ভাষাশিক্ষা। স্বদেশীয় সাহিত্যের সমৃদ্ধিসাধন করিবার জন্য তাহার একান্ত বাসনা ছিল। তিনি গৌরদাস বাবুকে লিখিয়াছিলেন যে, এক একটি য়ুরােপীয় ভাষায় অধিকার-লাভ আর এক একটী বিস্তৃত ভূখণ্ডের অধিকার-লাভ সমান। আইন-অধ্যয়নের অনুরােধে যদিও তিনি অধিক সময় কবিতা-রচনায় ব্যয় করিতে পারিতেন না, তথাপি, স্বাভাবিক প্রবণতা বশতঃ, তাহা হইতে একবারে নিরস্ত থাকিতে সক্ষম হইতেন না। ইংরাজী, ফরাসী, এবং ইতালীয় প্রভৃতি ভাষায় কবিতা- রচনা করিয়া তিনি অবকাশকাল বিনােদন করিতেন। ফরাসী অথবা ইতালীয় ভাষায় প্রকৃত প্রস্তাবে গ্রন্থ রচনা করিব বলিয়া তিনি কখন ও সঙ্কল্প করেন নাই। তাহার বিশ্বাস ছিল যে, কোনও ভাষায় কবিতারচনার ক্ষমতা না জন্মিলে তাহাতে প্রকৃত অধিকার জন্মিয়াছে, একথা বলা যায় না। সেই জন্য তিনি নিজের ভাষাজ্ঞানের পরীক্ষার্থ এই দুই ভাষায় কবিতারনার অভ্যাস করিতেন। কিন্তু ইংরাজী- ভাষায় কবিতা রচনা সম্বন্ধে তাহার অন্য উদ্দেশ্য ছিল। ইংরাজী ভাষায় গ্রন্থ রচনা করিয়া ইংরাজ-কবিগণের সমকক্ষ হইব, বয়স ও অভিজ্ঞতা- বুদ্ধির সঙ্গে তাহার এই বাল্যসংস্কার অন্তহিত হইলেও পাশ্চাত্য পণ্ডিতদিগকে ভারতীয় কাব্য হইতে দুই একটী রত্ন সংগ্রহ পূর্বক উপহার প্রদান করিবার জন্য তাহার এক নূতন বাসনা জন্মিয়াছিল।

জৗবন-চরিত। উদ্দেশ্যে তিনি ভারতীয় কাব্যসমূহের সীতাকাবা। গৌরবম্বরূপ সাতচরিত্র অবলম্বনে ইংরাজী ভাষায় একখানি কাব্য রচনা করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। সাতার বনবাস-বৃত্তান্ত হইতে তাহার কাব্য আরব্ধ হইয়াছিল ; কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, দুই তিন শত পংক্তি লিখিয়াই, তিনি ইহা পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। 'সীতা' কাব্য ভিন্ন কতক গুলি ইংরাজী খণ্ডকবিতাও তিনি য়ুরােপ- প্রবাস কালে, রচনা করিয়াছিলেন, এবং বাঙ্গালা ভাষাতেও সুভদ্রাহরণ ও দ্রোপদী-স্বয়ম্বর নামক দুইখানি নূতন কাব্য মুদ্ৰাহরণ-কাব্য। আরম্ভ করিয়াছিলেন। বলা নিষ্প্রয়ােজন যে, কোন খানিই তিনি সম্পূর্ণ করতে পারেন নাই। মানসিক অশান্তির জন্য ‘সুভদ্রাহরণ' কাব্য সম্পূর্ণ করিতে না পারিয়া তিনি চতুর্দশপদী কবিতাবলীতে বিষাদে লিখিয়াছিলেন “তোমার হরণ-গীত পাব বঙ্গাবরে নবহানে, ভেবেছি, সুভদ্রা-সুন্দরি । কিন্তু ভাগ্যদোযে, শুভে! অশর লহরী- তাই, যা গ্রীষ্মে জলরাশি সরে। কিন্তু ভবিষৎ কথা কহি) ভবিষ্যতে ভাগ্যবানত কবি পূজি দ্বৈপায়নে ঋষিকুল-ৰত্ন দ্বিজ, গাবে লো ভারতে তোমার হরণগীত, তুষি বিজ্ঞ জনে লভিবে অবশ, সাঙ্গি ও সঙ্গীত-ব্রতে। মধুসূদনের ভবিষ্যৎবাণী সফল হইয়াছে ; মহর্ষি দ্বৈপায়নের পূজার কলে কবিবর নবীনচন্দ্র যে অপূৰ্ব্ব কাব্য রচনা করিয়াছেন, তাহা তাহাকে বাঙ্গালা সাহিত্যে অমর করিবে। তিলােত্তমাসম্ভব কাব্যের একটা নুতনসংস্করণ করিবার এবং বীরাঙ্গনা - য়ুরােপ-প্রবাস। কাব্যের অসম্পূর্ণ পত্রিকাগুলি সম্পূর্ণ করিবার জন্যও মধুসূদন য়ুরােপে থাকিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন ; কিন্তু তাহার কোন চেষ্টাই সফল হয় নাই। মধুসূদনকে যে অবস্থায় রােপে বাস করিতে হইয়াছিল, আমরা তাহার উল্লেখ করিয়াছি। সে অবস্থায় মনের ভাব ধারাবাহিক রূপে গ্রথিত করিয়া কাব্য রচনা করা সম্ভবপর নয়। সাময়িক উচ্ছাসে তিনি এক একটী নূতন বিষয় আরম্ভ করিতেন, কিন্তু, তাহার পর, দৃঢ়তার ও সহিষ্ণুতার অভাবে, তাহা পরিত্যাগ করিয়া, আবার একটী নূতন বিষয় আরম্ভ করিতে বাধ্য হইতেন। এই জন্য একমাত্র চতুর্দশপদী কবিতা- বলী ভিন্ন তাহার যুবরাপে আরব্ধ গ্রন্থসমূহের চতুর্দশপদী কবিতাবলী। কোনখানিই সম্পূর্ণ হয় নাই। কবিতাবলীও, স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ভাবের কবিতায় গ্রথিত না হইলে, সম্পূর্ণ হইত কি না সন্দেহ। ফ্রান্সের অন্তর্গত ভার্শে নগরে অবস্থান কালে ইতালীয় কবি পেতরাকার অনুকরণে মধুসূদন ইহা প্রণয়ন করিয়াছিলেন। অমিত্ৰচ্ছন্দের ন্যায় চতুর্দশপদী কবিতাও তাহার দ্বারা বাঙ্গালাভাষায় প্রথম প্রবর্তিত হইয়াছে। “চতুর্দশপদী-কবিতাবলী’ নানাবিষয়িণী- চুরনব্বইটী কবিতায় সংগঠিত। প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য, স্বদেশীয় ও বিদেশীয় গুণিগণের প্রতি সমাদর, ভারতীয় কাব্য ও পুরাণােক্ত ঘটনা, এবং মধুসূদনের নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা প্রভৃতি নানাবিষয় অবলম্বনে রচিত কবিতা ইহাতে স্থান প্রাপ্ত হইয়াছে। জননী “ভারত-ভূমি" হইতে আরম্ভ করিয়া স্বদেশীয় “কেউটিয়া সাপ” এবং “বউকথা-পাখী পৰ্য্যন্ত কবি ইহার বিষয়ীভূত করিয়াছেন। চতুর্দশপদী-কবিতাবলী, সৌন্দর্যে মধুসূদনের অন্যান্য কাব্য অপেক্ষা নিকৃষ্ট হইলেও, একটি কারণে বিশেষ আলােচনার যােগ্য। মধুসূদনের কবিশক্তির পরিচয় প্রাপ্ত হইতে হইলে যেমন তাহার মেঘনাদবধ ও বীরাঙ্গনা পাঠ করা আবশ্যক, মধুসূদনকে জানিতে হইলে, তেমনই ১২২ জীবন-চরিত। তাহার চতুর্দশপদী কবিতাবলী পাঠ করিবার প্রয়ােজন। সেইজন্য আমরা চতুর্দশপদী কবিতাবলীর একটু বিস্তৃত সমালােচনা করিব। ইহার অনেক কবিতায় তঁাহার হৃদয়ের ভাব প্রতিবিম্বিত হইয়াছে এবং অনেকগুলিতে তিনি তাহার জীবনের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করিয়াছেন। গ্রন্থের প্রারম্ভেই গ্রন্থকর্তার পরিচয় সৃষ্ট হইবে। তাহার পর প্রথম বয়সে বাঙ্গালা-ভাষা সম্বন্ধে মধুসূদনের কিরূপ বিরাগ ছিল, এবং “বঙ্গ-কুললক্ষ্মীর” আদেশে তিনি কি রূপে মাতৃভাষার অনুশীলনে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তিনি তাহার উল্লেখ করিয়াছেন। শৈশবে তাহাদিগের গ্রন্থ পাঠ করতে করতে তিনি আহার, নিদ্রা বিষ্ম হইতেন এবং যাহাদিগের গ্রন্থ হইতে তিনি ভাষা-শিক্ষার সঙ্গে ইহার সব্বোৎকৃষ্ট গ্রন্থ গুলির উপাদান সংগ্রহ করিয়াছিলেন, ইহার পর তঁাহাদিগের পাত তাহার সম্মাননা দৃষ্ট হইবে । কৃত্তিবাস, কাশীদাস, মুকুন্দরাম, ভারতচন্দ্র এবং তাহার অবহিত পূর্ববর্তী কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রত্যেকেরই প্রতি মধুসূদন উপযুক্ত শ্রদ্ধা পশন করিয়াছেন। তাহার স্বদেশীয় এই সকল কবির সঙ্গে তাহার সমকালবী ফরাসী-কবি ভিতর হিউগাে এবং ইংলণ্ডর রাজকবি আলফ্রেড টেনিসনেরও প্রতি তিনি সম্মান প্রদর্শন ক্রী করেন নাই। কবি গুরু বামাক, মধুরভাষা জয়দেব, কবিকুলতলক কালিদাস, পণ্ডিতবর গােষ্ট কর ইতাণায় কবি দান্তের সম্বন্ধে এক একটা কবিতা রচিত হইয়াছে। মধুসূদন যখন ফ্রান্সে অবস্থান করেন, সেই সময় দান্তের মৃত্যুর ত্রিশ-বাৎসরিক মহোৎসব সম্পন্ন হয়। য়ুরােপীয় অনেক কবি তদুপলক্ষে কবিতা-উপহার প্রেরণ করিয়াছিলেন । মধুসূদনও এই উপলক্ষে একটা কবিতা রচনা করিয়া, তাহা ফরাসী ও ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ পূর্বক, ইতালীরাজের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। ইতালীরাজ ভিক্টর ইমানিউয়েল, তাহা পাঠ করিয়া, প্রীতি প্রকাশ য়ুরােপ-প্রবাস । { পূৰ্ব্বক, মধুসূদনকে এক পত্র লিখিয়াছিলেন, এবং তাহাতে লিখিয়াছিলেন যে, “আপনার কবিতা গ্রন্থিরূপে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যকে সংযুক্ত করিবে।” ( It will be a ring which will connect the orient with the occident ) * এই সকল কবিতার সঙ্গে ভারতীয় কাব্য ও পুরাণােক্ত ঘটনা অবলম্বনেও অনেক কবিতা রচিত হইয়াছে। কবি- কক্ষণের “কমলে-কামিনী ও “শ্রান্তের টোপর,” ভারতচন্দ্রের “অন্নপূর্ণার ঝাঁপি, রামায়ণের “সীতার বনবাস. বনবাস." মহাভারতের ‘গদাযুদ্ধ’ সুভদ্রাহরণ” প্রভৃতি অনেক বিষয় চতুর্দশপদী কবিতাবলীতে স্থান প্রাপ্ত হইয়াছে। প্রবাসে স্বদেশের স্মৃতি বড়ই মধুর ; প্রত্যেক সামগ্রীই যেন একটা অপূর্ব সৌন্দর্য্যে উদ্ভাসিত বলিয়া মনে হয়। সেইজন্য মনােমুগ্ধকর ফরাসভূমিতে থাকিয়াও মধুসূদনের হৃদয় তাহার বাল্যের প্রিয়নদী কপােতাক্ষী, স্বদেশের নীলাকাশস্থিত তারকা, জ্যোৎস্নধৌত-রজনী, নক্ষত্ৰমণ্ডিত ছায়াপথ এবং নদীকূলস্থিত শিব- মন্দির স্মরণ করিয়া উচ্ছসিত হইত। তিনি কবিতায় হৃদয়ের ভাব ব্যক্ত করিয়াছেন। কিন্তু এই সকল কবিতার অপেক্ষা যে গুলিতে তিনি তার জীবনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করিয়াছেন, সেইগুলিই অধিক চিৰাকর্ষক। মধুসূদনকে চিনিতে হইলে সেই গুলি পাঠ করা বিশেষ প্রয়ােজন। মধুসূদন হিন্দুধৰ্ম্ম ত্যাগ করিলেও হিন্দুভাব তাহার হৃদয়ে কিরূপ রাজত্ব করিত, এবং বৈদেশিক আচার, ব্যবহারের অনুকরণ করিলেও স্বদেশানুরাগ তাঁহার হৃদয়ে কিরূপ গভীর ছিল, চতুর্দশপদীর অনেক কবিতায় তাহা ব্যক্ত হইয়াছে। চতুর্দশপদী-কবিতাবলীর সঙ্গেই মধুসূদনের সাহিত্যিক জীবন প্রকৃত পস্তাবে সমাপ্ত হইয়াছে। ইহার পর তিনি আর যাহা রচনা করিয়া- * দুর্ভাগ্যক্রমে মূল পত্রখানি পাওয়া যায় নাই। বগীয় মনােমােহন ঘােষ মহাশয়, স্মরণ করিয়া একাৰুে তাহা হইতে এই পংক্তিটি বলিয়াছিলেন।

জীবন-চরিত।
ALL ৭' *5
ছিলেন, তাহার উল্লেখ না করিলেও ক্ষতি নাই। য়ুরােপীয় বিভিন্ন
ভাষা শিক্ষার সময়ে, সেই সকল ভাষার সাহায্যে, মাতৃভাষাকে সমৃদ্ধিমতী
করিবার জন্য তাহার যে বাসনা জন্মিয়াছিল, তাহা হৃদয়ে উথিত হইয়াই
হৃদয়ে বিলীন হইয়াছিল। নিজের পরিণাম বুঝিতে পারিয়া চতুর্দশপদী-
কবিতাবলীতে তিনি, বঙ্গভাষার নিকট শেষ বিদায় গ্রহণ করিয়া,
লিখিয়াছিলেন -
“বিসজ্জিব আজি, মাগো, বিস্মৃতির জলে
হৃদয়-মণ্ডপ, হায়! অন্ধকার করি
ও প্রতিমা। নিবাইল, দেখ, হোমানলে
মনঃকুণ্ডে, অশ্রুধারা মনেদুঃখে ঝরি।
শুকাইল দুরদৃষ্ট, সে ফুল্ল কমলে,
যার সন্ধামোদে অন্ধ এ মন, বিস্মরি
সংসারের ধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম ! ডুবিল সে তরি
কাব্যনদে খেলাই যাহে পদতলে
অল্পদিন। নারি, মা, চিনিতে তােমারে
শৈশবে অবােধ আমি! ডাকিল। যৌবনে
যদিও অধম পুত্র, মা কি ভুলে তারে ?
এবে ইন্দ্রপ্রস্থ ছাড়ি যাই দূর বনে!
এই বর, হে বরদে, মাগি শেষবারে,-
জ্যোতির্ময় কর বঙ্গ ভারতনে।”
-
মধুসূদনের নূরােপ প্রবাসকাল এইরূপে সমাপ্ত হইল। ব্যারিষ্টারী
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দের
প্রবাসকাল-সমাপ্তি।
প্রারম্ভে তিনি স্বদেশাভিমুখে যাত্রা করিলেন ।
তাহার এই সময়কার লিখিত একখানি পত্র উদ্ধত করিয়া আমরা
বর্তমান অধ্যায় শেষ করিব। মধুসূদনের য়ুরােপ-প্রবাসকালে খ্যাত
নামা ব্যারিষ্টার স্বর্গীয় মনোেমােহন ঘােষ মহাশয়ের পিতা পরলােক

য়ুরােপ-প্রবাস। গমন করেন। মধুসূদনের পিতার সঙ্গে তাহার প্রগাঢ় সৌহার্দ্য ছিল। মধুসূদন, মননামােহন বাবুর জননীকে সান্ত্বনাদানের জন্য, এই পত্র লিখিয়াছিলেন। পাঠক ইহাতে একদিকে মধুসূদনের স্বভাব-কোমল স্নেহ- প্রবণ হৃদয়ের, এবং অপরদিকে তাঁহার অলঙ্কার বিন্যাসের ও শব্দাড়ম্বর প্রিয়তার নিদর্শন প্রাপ্ত হইবেন বলিয়া আমরা ইহা অবিকল উদ্ধত করিতেছি। মেঘনাদবধ ও বীরাঙ্গনা-রচনার পরেও মধুসূদনকে এরূপ ভাষায় পত্র লিখিতে দেখিয়া আমাদিগের মনে হয় যে, তিনি রাজনারায়ণ বাবুকে তাঁহার বাঙ্গালাভাষায় অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছিলেন, তাহা অ প্রকৃত নয়।* বাস্তবিকই ভাব ও কল্পনা শব্দ সংগ্রহ করিয়া আনিত, তাহাকে চেষ্টা করিয়া শব্দসংগ্রহ করিতে হইত না। শ্রীচরণ-কমলেষু। জেঠা মহাশয়ের স্বৰ্গ-প্রাপ্তি-সংবাদে যে কি পৰ্য্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি, তাহ পত্রে লেখা বাহুল্য। সংবাদ পাইবা মাত্রই আমার স্ত্রী ও আমি প্রিয়বর মনােমােহনের বাসায় যাইয়া, তাহাকে এ বাটীতে আনিয়া সাধ্যানুসারে সান্ত্বনা করিবার চেষ্টায় আছি ; আপনি তন্নিমিত্তে উৎ- কষ্ঠিত হইবেন না। আপনি পরম জ্ঞানবতী, সুতরাং ইহা কখনই আপনার নিকট অবিদিত নহে যে, এরূপ তীক্ষ্ণ শর-স্বরূপ শােক এ সংসারে সর্বদাই মানবকুলের হৃদয় বিন্ধন করে। পিতৃ-চরণ-দর্শন-সুখ প্রিয়বর যে আর এ পৃথিবীতে লাভ করিতে পারিবেন না, ইহাতে তিনি নিতান্ত ক্ষুন্নমান। এ দাসেরও আশা-লতা ছিন্ন হইল। ভাবিয়াছিলাম যে, কৃতকার্য হইয়া, দুই ভাই একত্রে দেশে ফিরিয়া যাইব, এবং আমি কিঞ্চিৎকালের নিমিত্ত নিৰ্ব্বাণস্নেহাগ্নি পুনৰ্ব্বার পদ-সেবা করিয়া প্রজ্বলিত *I am not a good scholar. The thoughts and images bring oul words with themselves :--words that I never thought I knew. Here is a mystery.

জীবন চরিত।
৭ ।
করিব। কিন্তু এ অশান্ত জলাঞ্জলি দিতে হইল। এক্ষণে আপনি
অরণপথে রাখিয়া আশীর্বাদ করিলে চরিতার্থ হইব। প্রিয়র তারপথে
কলিকাতায় যে সংবাদ পাঠাইয়াছেন, তাহা বােধ করি পাইয়া থাকিবেন।
তিনি এদেশ হইতে অতি ত্বরায় ফিরিয়া যাইবার চেষ্টায় আছেন।
যতদিন এখানে থাকেন; তাহার মনের বেদনা লঘুতর করিতে কোন
মতেই অমনােযােগী হইব না। নিবেদনমিতি।
আশীর্বাদাকাজী
দাস মধুসূদন দত্ত।

একাদশ অধ্যায়। শেষ জীবন ব্যারিষ্টারী ব্যবসায়, হেক্টরবধ ও মায়াকানন। [ ১৮--১৮৭৩ খ্রীষ্টাব্দ | পাঁচ বৎসরকাল প্রসের পর, ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসে, মধুসূদন যুগােপ হইতে স্বদেশে প্রত্যাগমন করিলেন । সুয়োপ হইতে স্বদেশে মাজ-বাসকালের ব্যায় এবারও তিনি এত্যাগন। দীর্ঘকাল পরে স্বদেশে প্রত্যাগমন করিয়া- ছিলেন, কিন্তু এবার তাহার অবস্থা কতই বিভিন্ন! মা হইতে প্রত্যাগমনের সময়ে, পিতামাতার মৃত্যুতে, এবং আত্মীয়-বন্ধুগণের ব্যবহারে তিনি আপনাকে প্রকৃতই অনাথ বলিয়া মনে করিয়াছিলেন। নিজের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে প্রত্যয় থাকিলেও, তখন, তাহার আশা প্রগাঢ় অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন ছিল। বঙ্গীয় সমাজের নিকট তখন তিনি একরূপ মৃত ছিলেন বলিলেও হয় ; দুই একজন সহৃদয় সুহৃদ ভিন্ন কেহ, তখন, তাঁহার সংবাদ রাখিতেন না। কিন্তু বিধাতার অনুকূলতায় এখন তাঁহার জীবনের এক নূতন দিন আর হইয়াছিল। এখন, তিনি মেঘনাদবধ- কাৰে কৰি, ছয়টী য়ুরােপীয় ভাষায় অভিজ্ঞ, এবং ভারতের সর্বপ্রধান বিচারালয়ের ব্যারিষ্টার। বিদ্যা, বুদ্ধি এবং পদমর্যাদা, এখন, তাহাকে তাঁহার স্বদেশের গৌরৰস্থল করিয়াছিল। তাঁহার প্রবাসকালের মধ্যে তাঁহার কাৰ্যসমূহের যশঃসৌরভ সমন্ত বঙ্গদেশে পরিব্যাপ্ত হইয়াছিল। কত হয় তাহার অগােচরে তাহাকে আশীর্বাদ করিত, তাহার কল্যাণের ১২৮ জীবন-চরিত জন্য প্রার্থনা করিত এবং উৎসুকভাবে তাঁহার স্বদেশ-প্রত্যাগমন প্রতীক্ষা করিত। স্বদেশের এবং স্বজাতীয়গণের গৌরবস্থল ও কল্যাণভাজন হইয়া তিনি এইরূপে জন্মভূমিতে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। যে মহাত্মা, তাহার প্রবাসকালে সাহায্য করিয়া, তাহাকে অপরিশােধনীয় ঋণে আবদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিলেন, এখনও, তাহার দয়ার বিরাম ছিল না। বিদ্যাসাগর মহাশয় মধুসূদনের ব্যবসায়ের সুবিধার জন্য পূর্ব হইতে আয়ােজন করিয়া রাখিয়াছিলেন। তাহার এবং অন্যান্য বন্ধুগণের সাহায্যে, নানা প্রকার প্রতিবন্ধক অতিক্রম করিয়া, তিনি কলিকাতা হাইকোর্টে প্রবেশাধিকার লাভ করিলেন । ১৮৬৭ খ্ৰীষ্টাব্দ হইতে মধুসূদন কলিকাতা হাইকোর্টে ব্যারিষ্টারী করিতে আরম্ভ করেন। তাহার ব্যারিষ্টারী ব্যারিষ্টরী-ব্যবসাপ্প। ব্যবসায় সম্বন্ধে অধিক কথা বলিবার প্রয়ােজন নাই। তিন ব্যারিষ্টারী ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হওয়াতে বাঙ্গালা সাহিত্য নিদারূণ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল, কিন্তু তাহার অবলম্বিত ব্যবসায় বিন্দু- মাত্রও লাভ হয় নাই। ব্যবহারশাস্ত্রকে উন্নত করা দুরে থাকুক, তিনি নিজের সাংসারিক অবস্থার উন্নতি করিতে পারেন নাই। তাহার সমকালীন দেশীয় ব্যারিষ্টারদিগের মধ্যে বিদ্যা, বুদ্ধিতে তিনি সকলের অগ্রগণ্য ছিলেন, কিন্তু আইন ব্যবসায়ে কৃতকার্য হইতে হইলে বিদ্যা, বুদ্ধির সঙ্গে অন্য যে সকল গুণ থাকা আবশ্যক, তাহা তাঁহার ছিল না। তিনি কবি-কবির ন্যায় কল্পনা-নেত্রে জগৎ দর্শন করিতেন। ভাবের তরঙ্গে তাহার নিকট যুক্তি ও প্রমাণ নিমগ্ন হইয়া যাইত। ব্যবহারশাস্ত্রের কুটতর্ক তাঁহার স্বভাব-সরল কবি-প্রকৃতির উপযুক্ত ছিল না। তাহার মৃত্যুর পর হিন্দু-পেটিট-পত্রিকা যথার্থই লিখিয়াছিলেন C, nursed on the lap of poetry he was not the man to suck the moisture of life frorn the dry bones of lau শেষজীবন। না। পূৰ্ব্ব অনেক বিষয়ে তাহার প্রকৃতি বাস্তবিকই এরূপ ছিল যে, তাহা ব্যবহার- জীবের উপযুক্ত নয়। বিচারদিগের সন্তুষ্টিসাধন করিয়া কার্যোদ্ধার করিবার কৌশল তিনি একেবারেই অবগত ছিলেন না। হাইকোর্টের তৎকাল প্রসিদ্ধ বিচারক সার লুই জ্যাকসনের সহিত তাহার প্রায়ই বাদানুবাদ হইত। বিকৃত কণ্ঠস্বর ও তাহার অকৃতকাৰ্য্যতার একটি প্রধান কারণ ছিল ; বিচারকগণ তাহার বক্তৃতায় প্রীতিলাভ করিতেন এই সকল কারণে মধুসূদন ব্যারিষ্টারী ব্যবসায়ে কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। তিনি যে একেবারেই অকৃতকার্য হইয়াছিলেন, তাহা নয় ; তবে তাহার ন্যায় প্রতিভাবান্ ব্যক্তির নিকট যাহা প্রত্যাশা করা যাইতে পারে, তাহা হয় নাই বলিয়াই আমরা তাহার ব্যবসায়ে অকৃতকার্যতার কথা বলিতেছি। প্রথম প্রথম তাহার ব্যবসায়ে বিলক্ষণ আশার চিহ লক্ষিত হইয়াছিল। সুপণ্ডিত ও সুলেখক বলিয়া তাহার নাম, হইতেই, সকলের পরিচিত ছিল। সুতরাং তাহার সমসাময়িক, অন্যান্য দেশীয় ব্যারিষ্টারদিগের অপেক্ষা অল্পকালের মধ্যেই তাহার ব্যবসায়ের সুবিধা হইয়াছিল, এবং এক বৎসরের মধ্যে তাহার আয় মাসিক এক হাজার হইতে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত হইয়াছিল। কিন্তু ইহার পর আর বড় উন্নতি হয় নাই ; বরং তাহার প্রথমার্জিত প্রতিপত্তি ক্রমশ হ্রাস হইয়া আসিয়াছিল, এবং শেযে, উপায়ান্তরের অভাবে, তিনি প্রিতি- কাউসিলের অন্যতম অনুবাদকের কার্য্য গ্রহণ করিতে বাধ্য হইয়া- ছিলেন। “চঞ্চল ধনদার" প্রদলাভের জন্য তিনি জননী দেবীর আরাধনা ত্যাগ করিয়াছিলেন। তাঁহাকে সপত্নৗর সেবা করিতে দেখিয়া বাৰেী তাহার হৃদয়মন্দির হইতে অন্তন্ধান করিলেন; কিন্তু কমলাও তাহার প্রতি প্রসন্না হইলেন না। মধুসূদন, রঙ্গলাভের আশায়, রত্নাকরে নিমগ্ন হইয়াছিলেন, কিন্তু রত্ন প্রাপ্ত হইলেন না; তাঁহার মুখ কেবলই ক্ষারবানিতে পূর্ণ হইল। ;

জীবনচরিত। • যুােেপ হইতে প্রত্যাগমনের পর মধুসূদন ছয় বৎসর কাল জীবিত ছিলেন। এই ছয় বৎসরের মধ্যে তিনি, সাহিত-সেবা। বাঙ্গালা সাহিত্যের জন্য, বিশেষ কিছু করিয়া যাইতে পারেন নাই। অর্থ উপার্জনের চেষ্টাতেই তাহার দিন গত হইত ; বাৰেীর সেবার দিকে তাহার দৃষ্টি ছিল না। তবে তাহার তার আজন্ম-কৰির পক্ষে সাহিত্য-ক্ষেত্র হইতে একেবারে সম্পূর্ণ অব- সর গ্রহণ কিছুতেই সম্ভবপর ছিল না; সেই জন্য, মধ্যে মধ্যে, সাহিত্যের সেবা না করিয়া, তিনি নিরস্ত থাকিতে পারিতেন না। য়ুরােপ-প্রবাস কালের ন্যায়, এখনও, তিনি, দুই একটি নূতন বিষয় অবলম্বন করিয়া, গ্রন্থ রচনা করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, কিন্তু সম্পূর্ণ করিয়া যাইতে পারেন নাই। এই সকল অসম্পূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে তিনখানির কথা উল্লেখ মােগ্য। প্রথম নীতিমূলক কৰিমালা, দ্বিতীয় হেক্টরৰধ, তৃতীয় মায়াকানন। নীতিমূলক কবিতাগুলি, “ঈশপস্ ফেবলসেৱ” (Aesop's Fables) আদর্শে, বাঙ্গালা কথামালার প্রণা- নীতিমূলক কবিতা। লীতে, লিখিত হইয়াছিল। নিজের অর্থ- ভাৰক্লেশ দূর করিবার আশায়, বিদ্যালয়ের পাঠ্যগ্রন্থ হইবার জন্য, মধু- সূদন, সম্ভবতঃ, তাহা রচনা করিয়াছিলেন। সেই সকল কবিতার মধ্যে অনেকগুলি অতি সুন্দর। বালকদিগের পাঠ্যপুস্তকে স্থান প্রাপ্ত হইয়া তাহাদিগের কয়েকটা সাধারণের পরিচিত হইয়াছে। তাহার মৃত্যুর পর সাধারণ পত্রিকাতে কয়েকটা প্রকাশিত হইয়াছিল ; কয়েকটা এখনও অসম্পূর্ণ ও অপ্রকাশিত রহিয়াছে। নীতিমূলক কবিতাগুলি মধুসূদন ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দে রচনা করিয়া ছিলেন। তাহার হেক্টরবধও এই বৎসর হেক্টর-বধ। প্রকাশিত হয়। যাহার সহিত বাল্যাবধি * রসাল ও স্বর্ণলতিকা, মেধা ও চাতক, সুষ্য ও মৈনাক ইত্যাদি শেষজীবন। মধুসূদন “প্রণয়-সূত্রে চিরগ্রথিত ছিলেন, তাঁহার সেই শৈশব-সুহৃদ ভূদেব মুখােপাধ্যায় মহাশয়ের নামে ইহা উৎসৃষ্ট হইয়াছে। হেক্টরবধ মধুসূদনের গ্রীকভাষার ও হােমরের প্রতি অনুরাগের ফল। ট্রয়-রাজ- কুমার, মহাবীর হেক্টরের মৃত্যু ইহার প্রতিপাদ্য বিষয়। মধুসূদন ইহা সম্পূর্ণ করিয়া যাইতে পারেন নাই। ইলিয়দের দ্বাদশ সর্গ পৰ্য্যন্ত বর্ণিত বিষয় লইয়াই তিনি তাঁহার গ্রন্থ শেষ করিয়াছেন। গদ্যরচনা মধুসূদনের প্রতিভার উপযােগিনী ছিল না। যে অতিরিক্ত অলঙ্কার-বিন্যাস-প্রিয়তা তাহার সর্বোৎকৃষ্ট পদ্যগ্রন্থগুলিকেও, স্থানে স্থানে, দুর্বোধ্য ও কৃত্রিমতা- পূর্ণ করিয়াছে, গদ্যে তাহার আধিক্য হইলে তাহা কখনই পাঠকের প্রীতিকর হইতে পারে না। হেক্টর-বধের ভাষা ব্যাকরণদুষ্ট, গ্রাম্যতা- পূর্ণ, এবং আদ্যোপান্ত পাশ্চাত্য-ভাবানু প্ৰাণিত বলিয়া, ইংরাজী ভাষায় অনভিজ্ঞ পাঠকের পক্ষে দুর্বোধ্য। “পাগণ্ডশঙ্কা,” “পিত্তল-পদ, ‘কুঞ্চিত-কাঞ্চন-কেশর-মণ্ডিত অশ্ব,” ‘ভূকম্পকারী জলদলপতি এবং “পাতালকৃতবসতি দেবগণ”: ইত্যাদি পদগুলি, পাশ্চাত্যভাষাভিজ্ঞ পাঠকের পক্ষে কোনরূপে অর্থবােধক হইলেও, সাধারণ পাঠকের বােধগম্য নহে। “রণিলে,” “নিবেদিলে,” প্ৰদানিবেন” ইত্যাদি ক্রিয়াগুলি, পদ্যে বিশেষ আপত্তিজনক না হইলেও, গদ্যে কখনই প্রয়ােগযােগ্য নয়। তবে হেক্টরবধের ভাষার এই একটি গুণ আছে যে, হােমরের ভাষার আদর্শে গঠিত বলিয়া, ইহা তেজোময় ও উৎসাহহাদী পক। দোষগুণ সমস্ত লইয়া হেক্টরবধ সম্বন্ধে এ কথা বলিলে অসঙ্গত হইবে না যে, মধুসূদন এই গ্রন্থ প্রকাশিত না করিলেই ভাল করিতেন। নীতিমূলক কবিতামালার ন্যায় এখানিও বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক হইলে তাহার অর্থাভাৰ-ক্লেশ দূরীভূত হইবে, এই প্রত্যাশাতেই, বােধ হয়, তিনি ইহা প্রকাশ করিয়াছিলেন। হেক্টবধের সঙ্গে মধুসূদনের সাহিত্যিক জীবন প্রায় শেষ হইয়া ১৩২ জীবন-চরিত ; ; ছিল ; সুতরাং এইবার আমরা তাহার অন্তিমজীবনের বিষাদময় ইতিহাস বর্ণনায় প্রবৃত্ত হইব। ইংলণ্ড হইতে প্রত্যাগম- অন্তিমজীবনের কথা। নের পর মধুসূদন ছয় বৎসর মাত্র জীবিত ছিলেন; ইহার মধ্যে নূনাধিক পাঁচ বৎসর তিনি হাইকোর্টে ব্যারিষ্টারী করেন। ব্যারিষ্টারী ব্যবসায়ে তিনি কতদূর কৃতকার্য হইতে পারিয়া- ছিলেন, সে কথা পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে । ব্যারিষ্টারী দ্বারা তিনি যেরুপ আয়ের আশা করিয়াছিলেন, তাহা ঘটে নাই ; অথচ তাহার ইচ্ছানুরূপ ব্যয়ের সঙ্কোচ ছিল না। ভবিষ্যৎ উন্নতির প্রত্যাশায় এবং পদমর্যাদা ও সমরক্ষার জন্য তিনি, ঋণ করিয়া, অবস্থাতিরিক্ত ব্যয় করিতেন। মাদ্রাজে ও য়ুরােপ-প্রবাসকালে অর্থাভাবে নিদারুণ ক্লেশ ভােগ করিয়া ও তঁাহার চৈতন্য হয় নাই। অনেক সময় তিনি, নিতান্ত হিতাহিত জ্ঞানশূন্যের ন্যায়, অকারণে, অথবা সামান্য কারণে, প্রচুর অর্থব্যয় করিতেন। . যে পৈতৃক সম্পত্তির উপর নির্ভর করিয়া তিনি, য়ুরােপ- প্রবাসকালের ব্যয় নির্বাহাৰ্থ, ঋণ করিয়াছিলেন, তাহা সমস্ত বিক্রয় করিয়াও তাহার ঋণ পরিশােধিত হয় নাই। সুতরাং ঋণভার স্কন্ধে লইয়াই তাহাকে প্রথম হইতে ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইতে হইয়াছিল। দিকে ব্যয়ের অনুরূপ আয় ছিল না। সুতরাং মধুসূদনের ঋণ এবং সঙ্গে সঙ্গে মানসিক অশান্তি ও ক্রমশঃ বদ্ধিত হইতে লাগিল। কেবলই যে উচ্ছলতায় অথবা বিলাসিতায় অর্থব্যয় হইত, তাহা নয় ; অনেক সদনুষ্ঠানেও তিনি মুক্তহস্তে অর্থ সাহায্য করিতেন। করিতেন। অর্থের প্রতি তাহার বিন্দুমাত্রও মমতা ছিল না; স্বর্গীয় মনােমােহন ঘােষ মহাশয় বলিতেন যে, কাহাকেও সাহায্য করিবার সময়, মধুসূদন কখনও গণনা করিয়া টাকা দিতেন না। একমুষ্টিতে বা দ্বিমুষ্টিতে যাহা উঠিত, তাহা প্রার্থীকে বিদায় করতেন। এরূপ ব্যক্তির পরিমিত অর্থে সঙ্কুশন হওয়া সম্ভবপর নয়। যতক্ষণ কিছু সম্বল থাকিত, সৎকার্যেই হউক, ।

শেষজীবন। ১৩০ আর অসৎ কাৰ্য্যেই হউক, ধূলিমুষ্টির ন্যায় মধুসূদন ব্যয় করিতেন। তাহার পর, অর্থাভাব হইলেই, ঋণের জন্য ব্যাকুল হইয়া বেড়াইতেন। নিজের সংসারনির্বাহের জন্য, হয়ত, তিনি কিছু ঋণ করিয়া আনিয়াছেন, সেই সময় কোন দূরসম্পৰ্কীয় আত্মীয় অথবা কোন দারিদ্র্যপীড়িত পরিচিত ব্যক্তি আসিয়া তাহাকে দুঃখ জানাইলে, নিজের দুরবস্থা সত্ত্বেও, মধুসূদন তাহাকে একেবারে নিরাশ করিয়া ফিরাইয়া দিতে পারিতেন না। বাবু দ্বারকানাথ মিত্র হাইকোর্টের জজ হইলে বাঙ্গালী ব্যারিষ্টার ও উকীল মাত্রই পরম আহলাদিত হইয়াছিলেন। কিন্তু মধুসূদন, অপর সকলের ন্যায়, কেবলই, মৌখিক আনন্দ প্রকাশ করিয়া নিরস্ত থাকিতে পারেন নাই। সমব্যবসায়ীদিগকে ও বন্ধুদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া এক সুবৃহৎ ভােজ দিয়াছিলেন। তাহাতে যথেষ্ট অর্থ ব্যয় হইয়াছিল। এইরূপ কারণেও মধ্যে মধ্যে ব্যয় হইত। উদারতা ও দানশীলতা, কখনও কখনও, মাত্রাধিক হইয়া দাঁড়াইত। আমরা দৃষ্টান্ত স্বরূপ একটী ঘটনার উল্লেখ করিতেছি। একবার মধুসূদনের এক বাল্যসুহৃদ, তাহার কোন পরিচিত ভদ্রলােককে সঙ্গে লইয়া, মধুসূদনের নিকট একটী মােকদ্দমা সম্বন্ধে পরামর্শ জানিবার জন্য গিয়া ছিলেন। মধুসূদন পরামর্শ দান করিলে, অর্থাভাব ও উদারতা। ভদ্রলােকটী তাঁহাকে তাহার নির্দিষ্ট পারি- শ্রমিক দিতে উদ্যত হইলেন; কিন্তু মধুসূদন কিছুতেই পারিশ্রমিক গ্রহণ করিলেন না। ভদ্রলােকটী বিদায় লইলে মধুসূদন তাহার বাল্যসুহৃদকে বলিলেন, ভাই! তুমি যখন উহাকে আত্মীয় বােধে সঙ্গে লইয়া আসিয়াছ, তখন আমি কিছুতেই উহার নিকট হইতে পারিশ্রমিক লইতে পারি না। কিন্তু আমার গৃহে আজ একটী কপর্দকও নাই; যদি তােমার নিজের টাকা সঙ্গে থাকে, তবে পাঁচটী টাকা ঋণ দিয়া, আমার * পদ্মিনী-উপখ্যান প্রণেতা, স্বগীয় রঙ্গলাল সবুর কনিষ্ঠ বাৰুহরিমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৩৪ জীবন-চরিত। •• • • • • •AAA স্ত্রীকে বলিয়া আইস, যেন উপযুক্ত সময়ে আমার আহাৰ্য্য প্রস্তুত হয়।” একদিকে তাহার এইরূপ উদারতা দেখিয়া যেমন আমাদিগের আনন্দ হয়, অপরদিকে গৃহীত ঋণ পরিশােধের চেষ্টায় তাহার ঔদাসীন্যের বিষয় স্মরণ করিলে আমাদিগের ক্লেশ ৰােধ হয়। অর্থাভাব হইলেই তিনি ঋণ করিতেন, কিন্তু কোথা হইতে যে সে ঋণ পরিশােধ হইবে, সে সম্বন্ধে তিনি একবারও চিন্তা করিতেন না। আমরা পূর্বেই বলিয়াছি যে, তাঁহার য়ুরােপ-প্রবাসকালে গৃহীত ঋণের কিয়দংশ অপরিশােধিত ছিল ; তাহার উপর আরও নূতন নূতন ঋণ হইয়াছিল। শেষাবস্থায় তিনি খণভারে একেবারেই অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন। সামান্য দোকানদার ও দাস, দাসী হইতে আরম্ভ করিয়া আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত, অপরিচিত নানা শ্রেণীর বহু ব্যক্তির নিকট ঋণ রাখিয়া তিনি পরলােক গমন করিয়া- ছিলেন। কাহাকেও বঞ্চনা করিব, মধুসূদন, কখন, স্বপ্নেও, সে কথা মনে করিতেন না। কিন্তু প্রবঞ্চক না হইলেও, বিষয়বুদ্ধির ও কর্তব্যনিষ্ঠার অভাবে তাহার ব্যবহার, সময়ে সময়ে, প্রবঞ্চকেরই ন্যায় প্রতীয়মান হইত। ঋণ-বুদ্ধির সঙ্গে তাহার মানসিক অশান্তি ও উদ্বেগও, ক্ৰমশঃ, বৰ্ধিত হইয়াছিল। বাল্যাবধি যে সকল কু-অভ্যাসে তিনি অত্যন্ত হইয়াছিলেন, বয়সের সঙ্গে তাহা সংশােধিত হয় নাই, বরং ক্রমশঃ দৃঢ়বদ্ধ হইয়াছিল ; এক্ষণে তাহার বিষময় ফল তিনি ভােগ করিতে লাগিলেন। মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ দূর করিবার জন্য তিনি হয় কবিতার না হয় মদিরার আশ্রয় গ্রহণ করিতেন। এরূপ অবস্থায় রচিত কবিতা আর যে সেই পূর্ব প্রতিভার অনুরূপ হইবে, সে সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু তাহাতে কৰিত্ব বা সৌন্দৰ্য্য না থাকুক, তাহার দুই একটা স্কুল কবির তৎকালিক মানসিক অবস্থার সুস্পষ্ট সাক্ষাদান করে। ভগবতী বাৰেীর ন্যায় কমলারও অনুগ্রহভাজন হইবেন, দুর্ভাগ্য কবির এই বড় আশা ছিল; কিন্তু অদৃষ্টের প্রতিকূলতায় তাঁহার সে আশা পূর্ণ হইল না শেষজীবন । ৩ -কিন্তু দেখিয়া তিনি, নিরাশ-হৃদয়ে, কমলাকে সম্বােধনপূর্বক লিখিয়াছিলেন । “ভেবেছিনু, মাের ভাগ্যে, হে রসুন্দরি ! নিৰাইৰে সে রোষাগ্নি, লােকে যাহা বলে হাসিতে ৰাণীর রূপ তব মনে হলে। ভেবেছিনু, হায় ! দেখি ভ্রান্তি ভাব ধৰি ডুবাইছ, দেখিতেছি ক্রমে এই তরী অদয়ে ! অতল দুঃখসাগরের জলে ডুবি : কি যশ তব হবে বঙ্গ-স্থলে ?” সুখ, দুঃখ, সম্পদ, বিপদ সকল অবস্থাতেই যে তিনি বাদেবীর ক্রোড়ে বিশ্রামলাভের চেষ্টা করিতেন, তাহা আমরা তাহার জীবনের প্রত্যেক অংশেই প্রদর্শন করিয়াছি। এ সময়েও তাহার কবিতাকুশল- নের বিরাম ছিল না। তাহার সাংসারিক অবস্থাত এইরূপ তাহার কোন আত্মীয় বলেন যে, “একদিন, এই সময়, তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইয়া দেখি যে, তাহার গৃহের প্রাঙ্গণে ও নিম্নতলে, তাঁহার কোন উত্তমর্ণ ও তাহার অনুচরগণ কোলাহলসহ তাঁহার প্রতি কটুক্তি করিতেছিল, কিন্তু উপরিতলে বসিয়া মধুসূদন অব্যাহত চিত্তে দান্তের কবিতার অনুকরণ করিতেছিলেন। আমি দেখিয়া বিস্মিত হইলাম।” কিন্তু মধুসূদন তখন যে অবস্থায় পতিত হইয়াছিলেন, তাহাতে তাহার পক্ষে, আত্মবিস্মৃতির জন্য কবিতার অপেক্ষা অধিকতর উত্তেজক কোনও সামগ্রীর আবশ্যক হইয়াছিল। কবিতায় তাঁহার হৃদয়ের যে যন্ত্রণা দূরীভূত না হইত, মদিরায় তিনি তাহা প্রশমিত করিবার চেষ্টা পাইতেন। ঋণজনিত অপমান যখন অসহ্য হইত, তখন তিনি অবিশ্রান্ত মদিরা পান করিতেন। তাঁহার ন্যায় প্রতিভাবান্ ব্যক্তিকে এরূপে আত্মঘাতী হইতে দেখিলে যে কিরূপ ক্লেশ হয়, তাহা বলিয়া বুঝাইবার আবশ্যক করে না। মধুসূদন নিজেও জানিতেন যে, তিনি আত্মহত্যা করিতেছেন; কিন্তু আত্মহত্যা ভিন্ন ঋণদায় ও মানসিক যন্ত্রণা হইতে নিষ্কৃতিলাভের উপায় নাই ভাবিয়াই তিনি সুরাচ্ছলে বিষপান করিতেন। • জীবন-চরিত। য়ুরােপ-প্রবাসকাল হইতে মনােমােহন ঘােষ মহাশয়ের সহিত মধুসূদনের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়াছিল। মনােমােহনবাবু মধুসূদনকে, এ অবস্থায়, যথাসাধ্য সাহায্যে ও সান্ত্বনাদানে ত্রুটি করেন নাই। তিনি বলিয়াছিলেন, “একদিন, এই সময় মধুসূদনের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইয়া দেখি যে, বেলা দ্বি-প্রহরের সময়, তিনি গৃহের দ্বার ও গবাক্ষ রুদ্ধ করিয়া, অতি উগ্র, জলস্পশশূন্য সুরাপান করিতেছেন। আমি নিকটে যাইয়া ৰলিলাম, “এ কি, আপনি এ কি করিতেছেন ? ইহার পরিণাম কি হইবে, তাহা কি আপনি জানেন না ?” মধুসূদন মানসিক সন্থণা হইতে মুক্তি বলিলেন, “মনােমোহন, তােমার কি তবে লাভের চেষ্টা। ইচ্ছা যে, আমি নিজের কণ্ঠে নিজে অস্ত্রাঘাত করি।'' মননামােহন বাবু বলিলেন, “সে কি, আমি তাহা বলিব কেন ? মধুসূদন বলিলেন, “এই দ্বি প্রহরের সময়ে, এরূপ ভাবে, সুরাপানের পরিণাম যে কি, তাহা আমি বিলক্ষণ জানি; কিন্তু আমার আর উপায় নাই । কণ্ঠে অস্ত্রাঘাত করিলেও যাহা, এরূপ সুরাপানের পরিণাম ও তাহাই ঘটিবে। তবে অস্ত্রাঘাত অপেক্ষা ইহাতে, আপাততঃ, ক্লেশ অল্প বলিয়াই আনি অস্ত্রের পরিবর্ত্তে সুর ব্যবহার করিতেছি।” হতভাগ্য কবির শেষজীবন কিরূপ নিদারুণ যন্ত্রণায় অতিবাহিত হইয়াছিল এই একটীমাত্র ঘটনা হইতে তাহা শারীরিক অবস্থা। অনুমান করিতে পারা যায়। এরপ অত্যা- চারের ও শারীরিক নিয়ম লঙ্ঘনের পরিণাম যেরূপ হইবার সম্ভাবনা, ক্রমে সেইরূপই হইল। অল্পদিনের মধ্যেই মধুসূদন নানাবিধ রােগে আক্রান্ত হইলেন। রােগ এক প্রকারের নয়। উদরী, কণ্ঠনালীর প্রদাহ, হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়াব্যতিক্রম প্রভৃতি, নানাবিধ দুশ্চিকিৎস্য ব্যাধি, তঁহাকে * মনােমােহন বাৰু বলিয়াছিলেন, মধুসূদনের শেষ কথাগুলি অবিকল এই :- This is a process equally sure but less painful.

শেষজীবন। ১৩৭ আক্রমণ করিল। বিধাতা তাহাকে যে অনবদ্য স্বাস্থ্য প্রদান করিয়া- ছিলেন, নিজের অত্যাচারের ফলে, তিনি তাহা হইতে এইরূপে বঞ্চিত হইলেন। যন্ত্রণার আর সীমা রহিল না। একে দারুণ অর্থাভাব, তাহার উপর পীড়ার যন্ত্রণা। মধুসূদন, ধীরতার সহিত, যদিও এ সকল সহ্য করিতেন, কিন্তু তাহার ঋণদাতাগণ যে, প্রতিপদে, তাহাকে কারাগারে প্রেরণের ভীতি প্রদর্শন করিত, তাহাই তাহার সর্বাপেক্ষা ক্লেশকর বােধ হইত। ঋণদায়ে কারাগারে মৃত্যু অপেক্ষা আত্মহত্যা করাই তিনি শ্রেয়া বলিয়া মনে করিতেন। কবিজীবন দুঃখময় ইহা চির প্রসিদ্ধ ; কিন্তু এমন মর্মান্তিক দুঃখ বুঝি পৃথিবীর অতি অল্প কবির জীবনেই ঘটিয়াছে। ব্যারিষ্টারী ব্যবসায়ে আর কোন উন্নতির আশা নাই দেখিয়া, মধুসূদন, এই সময়, মানভূমের অন্তর্গত পঞ্চ- পঞ্চকোটের রাজার অধীনে কোটের রাজার আইন-উপদেষ্টার (Legal কার্য্য। adviser) পদ গ্রহণ করিয়াছিলেন। কাৰ্যটী স্থায়ী হইলে, আর কিছু না হউক, তাহার অন্নাভাব-ক্লেশ দূরীভূত হইত, সন্দেহ নাই। কিন্তু রাজার চপলতায় বিরক্ত হইয়া, অল্পদিনের মধ্যে, তিনি এই কাৰ্যত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে, তিনি মানভূম পরিত্যাগ পূৰ্ব্বক, কলিকাতায় প্রত্যাগমন করেন। পূৰ্ব্ব হইতেই নানাবিধ পীড়া তাহার শরীরে প্রবেশ করিয়াছিল ; সুতরাং নিয়মমত নিজের ব্যবসায় চালাইতে তিনি সক্ষম ছিলেন না। ১৮৭৩ খ্রীষ্টাব্দে, ঢাকা হইতে প্রত্যাগমনের পর, তাহার রােগ সাংঘাতিক আকার ধারণ করিল। মধুসূদনের পত্নীরও শরীর পূর্ব হইতে ভগ্ন হইয়াছিল ; এই সময় তিনিও অতি কঠিন রূপ পীড়িত হইলেন। পতিপত্নী উভয়ের এইরূপ অবস্থা, চিকিৎসার ও পথ্যের অভাব, দুইটা অপােগণ্ড শিশুর রক্ষণাবেক্ষণের ভার এবং তাহার উপর ঋণদাতাগণের নিপীড়ন, সুতরাং মধুসূদনের যন্ত্রণা পূর্ণমাত্রায় উপ- ১৩, জীবন-চরিত। • স্থিত হইল। এতদিন বন্ধুবান্ধবগণের প্রদত্ত সাহায্যের এবং ঋণের দ্বারা সংসার নির্বাহ হইতেছিল, ক্রমশঃ উভয়ই দুষ্প্রাপ্য হইয়া আসিল। পুনঃ প্রাপ্তির আশা না থাকিলে কয় জন ঋণ দান করিতে পারেন । অন্যের প্রদত্ত সাহায্যের উপরই বা কতদিন নির্ভর করা চলে? গৃহসজ্জা, পরিচ্ছদ ইত্যাদি বিক্রয় করিয়া মধুসূদন দিনপাত করিতে বাধ্য হইলেন; ক্রমশঃ, তাহাও নিঃশেষ হইয়া আসিল। সাংসারিক বন্ধু।। তখন, সত্য সতাই, অন্নাভাব উপস্থিত হইল। শিশুদিগের কোনরূপ ব্যবস্থা করিয়া, মধুসূদনকে ও তাহার পত্নীকে, কোন কোন দিন, অনশনে বা অর্ধাশনে থাকিতে হইত। সুস্থ থাকিলে যে কোনরূপে হউক, তিনি কিছু কিছু উপার্জন করিতে পারিতেন ; কিন্তু শয্যাশায়ী হইয়া তিনি আর কি করিবেন ? সে অবস্থায় বাহা সম্ভবপর, তিনি তাহার টী করেন নাই। স্মৃতিশেষ বঙ্গবঙ্গভূমির অধ্যক্ষ ও অনুষ্ঠাতৃগণ, এই সময়, তাহাকে তাহাদিগের রঙ্গশালার জন্য, একখানি নাটক রচনা করিতে অনুরােধ করিলে তিনি, তাহাদিগের প্রতিশ্রুত অর্থসাহায্যের প্রত্যাশায়, মৃত্যুশয্যায় শয়ন করিয়াও, তাহার শেষগ্রন্থ মায়াকানন রচনা করিয়াছিলেন। মধুসূদন তখন যে অবস্থায় পতিত হইয়াছিলেন, তাহাতে তাহার পক্ষে ধীরতার সহিত গ্রন্থ-চনা করা সম্ভবপর ছিল না ; নিজের বিষাদময় জীবনের প্রতিবিম্বপাত করিয়াই তিনি:স্বরচিত গ্রন্থ সম্পূর্ণ করিয়াছেন। তাহার নিজের জীবনের ন্যায় মায়াকাননও মর্মভেদী আর্তনাদের ও দীর্ঘনিশ্বাসের সঙ্গে সমাপ্ত হইয়াছে। তিনি মায়াকানন বয়ং সম্পূর্ণ করিয়া যাইতে পারেন নাই । তাহার কতকগুলি অংশ সম্পূর্ণ করিয়াছিলেন মাত্র। বঙ্গভূমির অধ্যক্ষগণ, সেই সকল খণ্ডিত অংশ সেচ্ছানুরূপ সংযােজিত করিয়া, তাহার মৃত্যুর পর, তাহা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করিয়াছিলেন। সংক্ষেপে মায়াকাননের বর্ণনীয় বিষয় এই সিন্ধুদেশে মায়াকানন শেষজীবন। নামে এক নিবিড় অরণ্যানী বর্তমান ছিল, মায়াকানন। এবং তাহার অভ্যন্তরে অরণ্যের অধিষ্ঠাত্রী বনদেবীর এক পাষাণময়ী মূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। মায়াকানন সম্বন্ধে সিন্ধুদেশে এইরূপ এক জনশ্রুতি প্রচারিত ছিল যে, “যে লগ্নে দিনমণি কন্যারাশির সুবর্ণগৃহে প্রবেশ করেন, সেই সুলগ্নে যদি কোন পবিত্রস্বভাব কুমারী, কি সুপৰিত্ৰ, অনুঢ় যুব ঐ দেবীর পদে পুস্পাঞ্জলি দিয়া পূজা করেন, তবে তিনি কুমারী হইলে স্বীয় ভবিষ্যৎ পতিকে, আর পুরুষ হইলে আপনার পত্নীকে দেখিতে পান।” এই জনশ্রুতির উপর নির্ভর করিয়া অনেক বিবাহপ্রার্থী পুরুষ ও রমণী মায়াকাননে উপস্থিত হইতেন। এক দিন সিন্ধুদেশের রাজকুমার অজয় ও গান্ধারদেশের রাজকুমারী ইদুমতী, উভয়েই, আপন আপন ভবিষ্যৎ পত্নী ও পতি সন্দর্শনের প্রত্যাশায়, পরস্পরের অজ্ঞাতভাবে, মায়াকাননে প্রবেশ করিয়া, উভয়কে সন্দর্শন করেন। কিন্তু অজয় ও ইন্দুমতীর সম্মিলন বিধাতার অভিপ্রেত ছিল না। পরস্পরের প্রথম সর্শনের দুই বৎসর পরে, উভয়েই নিরাশ হৃদয়ে, আত্মহত্যার দ্বারা দেবীর সম্মুখে যন্ত্রণার অবসান করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ইহাই সংক্ষেপে মায়াকাননের বর্ণনীয় বিষয়। মধুসূদন তখন যে অবস্থায় পতিত হইয়াছিলেন, তাহাতে আত্মহত্যা দ্বারা যন্ত্রণার অবসান করিবার ইচ্ছাই তাহার হৃদয়ে দিবারাত্রি জাগরূক থাকিত। সেই জন্য তাঁহার রচিত গ্রন্থেও তাদৃশ ভাব পরিব্যক্ত হইয়াছে। যে অবস্থায় এই সময় মধুসূদনকে দিনপাত করিতে হইত, এবং যে অবস্থায় তিনি মায়াকানন রচনা করিয়াছিলেন, তাহা চিন্তা করিলে ব্যথিত হইতে হয়। রােগের যন্ত্রণায়, কখনও কখন, তিনি মূচ্ছিত হইয়া পড়িতেন; রক্ত-মনে শরীর, মধ্যে মধ্যে, অবসন্ন হইয়া আসিত; অথচ তাহারই মধ্যে অর্থাভাব-ক্লেশ কঞ্চিৎ দুরীভূত হইবে ভাবিয়া, লেখনী হবে যখন যে ভাবটী হৃদয়ে উদিত হইত, তাহা লিপিবদ্ধ ।

১৪ নীবন-চরিত করিতেন। নিজের যখন লেখনীধারণের সামর্থ্য না থাকিত, তখন কোন বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তি নিকটে থাকিলে তাহার দ্বারা অভিপ্রেত বিষয় লিখাইয়া লইতেন। এরূপ ভাবে রচিত গ্রন্থ যে নির্দোষ বা চিত্তাকর্ষক হইতে পারে না, তাহা বলা নিষ্প্রয়ােজন। সেই জন্য মায়াকাননের দোষগুণ সম্বন্ধে কোনরূপ মতামত প্রকাশ না করাই সত। নাটক-রচনার সঙ্গে মধুসূদনের সাহিত্যিক জীবন আবব্ধ হইয়াছিল, নাটক রচনার সঙ্গেই তাহা এইরূপে সমাপ্ত হইল । মায়াকানন মধু সূদনের অন্যান্য গ্রন্থের ন্যায় বঙ্গসাহিত্যে সুপরিচিত নয়; কিন্তু যিনি কবির জীবনের এই সময়কার ঘটনাবলী অবগত আছেন, তিনি ইহা পাঠ করিবার সময় বুঝতে পারিবেন যে, ইহার অনেক স্থল কবির হৃদয়ের শােণিত দ্বারা লিখিত। হায়! প্রতিভার সঙ্গে চরিত্র, নীতি- জ্ঞান ও সাংসারিক বৃদ্ধি মিলিত থাকিলে, বােধ হয়, পৃথিবীর অনেক কবিরই জীবন তাহাদিগের কাব্যের ন্যায় শােকান্ত হইত না। মায়াকাননের ন্যায়, “বিষ না ধনু গুণ” নামক আরও একখানি নাটক, মধুসূদন এই সময় বজরঙ্গভূমির জন্য, লিখিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহার অতি সামান্য অংশমাত্রই তিনি রচনা করিতে পারিয়া- ছিলেন। বঙ্গবঙ্গভূমির অধ্যক্ষগণ তাহাকে যে পারিশ্রমিক প্রদান করিয়াছিলেন, তাহাতে তাহার, অসময়ে, যথেষ্ট উপকার হইয়াছিল। কিন্তু সেরূপ সাহায্যের দ্বারা তাহার ক্লেশ স্থায়ীভাবে দূরীভূত হইবার সম্ভাবনা কোথায়? বঙ্গদেশে সে সময় মধুসূদনের গুণ-পক্ষপাতী ব্যক্তির অভাব ছিল না, সুতরাং মধুসূদনের দুরবস্থা সাধারণের গােচর করিলে বঙ্গসমাজ যে তাহার দুঃখে উদাসীন থাকিতেন, তাহা বােধ হয় না। কিন্তু নিজের দুরবস্থা নিতে সাধারণের গােচর করা মধুসূদনের ন্যায় ব্যক্তির পক্ষে কিছুতেই সম্ভবপর ছিল না; তিনি বরং সপরিবারে অনশনে শেষহীন। ১৪১ থাকিতে পারিতেন, কিন্তু নিতান্ত আত্মীয় ও সুহৃদ ভিন্ন কাহারও নিকট কখনও নিজের দুরবস্থা ব্যক্ত করিতে পারিতেন না। যাঁহাদিগের সহিত তঁাহার ঘনিষ্ঠতা ছিল, তাহাদিগের প্রায় সকলেই তাহাকে পুনঃ পুনঃ ঋণ- দান বা সাহায্যদান করিয়াছিলেন ; সুতরাং তাঁহাদিগেরও বিশেষ অপরাধ ছিল না। নিজের দুর্দশার সূত্রপাত হইবার পরে মধুসূদনকে তঁাহার, দুহিতা শৰ্ম্মিষ্ঠার বিবাহ দিতে হইয়াছিল ; জষ্টিস্ দ্বারকানাথ মিত্র প্রভৃতি অনেকেই, সে সময়, তাহাকে যথাযােগ্য সাহায্য করিয়াছিলেন। মহারাণী স্বর্ণময়ীকে একবার তাহার গ্রন্থাবলী উপহার প্রেরণ করিলে তিনিও মধুসূদনকে পাচ শত টাকা প্রদান করিয়াছিলেন । রােগশয্যায় মধুসূদন যাঁহাদিগের নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক উপকার পীড়িতাবস্থায় শেষ সাহায্য। প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাঁহাদিগের মধ্যে স্বনাম- খ্যাত, স্বদেশবৎসল ব্যারিষ্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহােদয়ের নাম প্রথমেই উল্লেখযোগ্য। বন্দ্যোপাধ্যায় মহােদয় কোন কার্যে প্রশংসার প্রার্থী ছিলেন না। কিন্তু আত্মীয়, বন্ধুদিগের বিপদে তিনি নীরবে যেরূপ সাহায্যদান ও সহানুভূতি প্রকাশ করিতেন, অতি অল্প লােকই তাহা অবগত আছেন। মধুসূদন এবং তাহার পত্নী হেনরিয়েটা, মৃত্যুশয্যা পর্যন্ত, মুক্তকণ্ঠে, তাহার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়া গিয়াছেন। বন্দ্যোপাধ্যায় মহােদয়ের ন্যায় স্বর্গীয় মনােমােহন ঘােষ মহাশয়ও মধু- সূদনকে সাহায্য করিতে ক্রুট করেন নাই। ইহাদিগের দুইজনের সাহায্য প্রাপ্ত না হইলে মধুসূদনকে আরও দুর্দশায় জীবন শেষ করিতে হইত, এবং তাহা হইলে তাহার শিশু দুইটীকে প্রকৃতই ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করিতে হইত। আমরা পূৰ্বেই বলিয়াছি যে, শেষাবস্থায়, রােগের যন্ত্রণার অপেক্ষা ঋণের যন্ত্রণাই মধুসূদনের পক্ষে অধিকতর ক্লেশকর হইয়াছিল। ঋণদাতাদিগের হস্ত হইতে নিষ্কৃতিলাভের জন্য, কিছু দিন, কলিকাতা হইতে অন্যত্র বাস করা তাহার পক্ষে একান্ত আবশ্যক হইয়াছিল।

১৪২ জৗবন-চরিত। এই সময় উত্তরপাড়াস্থ সুপ্রসিদ্ধ জমীদার, স্বর্গীয় বাবু জয়কৃষ্ণ মুখো- পাধ্যায়, তাহার দুর্দশা অবগত হইয়া, সহৃদয়তার সহিত, তাহাকে উত্তর- পাড়ায় যাইয়া অবস্থিতির জন্য, আহ্বান করেন। মধুসূদন তদনুসারে দুই তিন মাস উত্তরপাড়ার গঙ্গাকূলবর্তী উত্তরপাড়ায় বাস। প্রসিদ্ধ লাইব্রেরিগৃহে বাস করিয়াছিলেন । ইহার পূৰ্ব্বে আরও একবার তিনি সেখানে অবস্থান করিয়াছিলেন । জয়কৃষ্ণ বাবু নিজে, তাহার সুযােগ্য পুত্র রাজা প্যারীমােহন, এবং তাহার পরিবারস্থ সকলে মধুসূদনকে যথেষ্ট সম্মান ও শ্রদ্ধা করিতেন। তাহা- দিগের সাহায্য ও সহানুভূতি প্রাপ্ত হওয়াতে মধুসূদনের যন্ত্রণা অনেক পরিমাণে প্রশমিত হইয়াছিল। জয়কৃষ্ণ বাবুর সহৃদয় ও পরদুঃখকাতর পৌত্র, বাবু রাসবিহারী মুখােপাধ্যায়, মধুসূদনের নিকট সর্বদা অবস্থান করিয়া তাহাকে, সেরূপ অবস্থায়, যত দূর সানা-দান করা সম্ভবপর, তাহার কিছুরই টা করেন নাই। তাহার সদ্ব্যবহারে মধুসূদন পরম পরি- তােষ লাভ করিয়াছিলেন। উত্তরপাড়ায় মধুসূদন এক রূপ মৃত্যুশয্যায় শয়ান ছিলেন, বলিলেও হয়; কিন্তু সেখানেও তাহার স্বভাবসিদ্ধ কবিতা- নুশীলনের বিরাম ছিল না। যে দিন একটু সুস্থ থাকিতেন, সে দিন, তাঁহার প্রিয় কবি মিল্টন ও দান্তে প্রভৃতি গ্রন্থ হইতে অনর্গল কবিতা আবৃত্তি করিয়া, সকলকে পরিতৃপ্ত করিতেন, এবং কেহ তাহাকে দেখিতে আসিলে, নিজের ভ্ৰমণ-বৃত্তান্ত বা অতীত জীবনের অভিজ্ঞতা বর্ণন করিয়া, তাহাকে আপ্যায়িত করিতেন। মধুসূদনের শেষজীবনের বিবরণ লেখক এবং পাঠক উভয়েরই পক্ষে ক্লেশকর। এক এক দিনের ঘটনা চিন্তা করিলে মনে হয় যে, বঙ্গদেশের দীনতম ভিক্ষুকও বুঝি তাহার অপেক্ষা শান্তিতে প্রাণত্যাগ করে। এক দিনের একটা ঘটনা নিয়ে বিবৃত হইতেছে। মধুসূদনের উত্তরপাড়ায় অবস্থানকালে গৌরদাস বাবু সর্বদা তাহাকে দেখিতে যাইতেন। একদিন, তিনি তাহার সহিত শেষজীবন। ১৪৩ সাক্ষাৎ করিতে যাইয়া দেখেন যে, একটি মলিন শষ্যার উপর শয়ন করিয়া, মধুসূদন মুহুর্মুহু রক্ত বমন করিতেছেন। তাঁহার পত্নী হে রিয়েটা, নিম্নে গৃহতলে পতিত হইয়া, রােগের যন্ত্রণায় আর্তনাদ করিতে ছেন। গৌরদাস বাবু হেরিয়েটাকে মূচ্ছিতাপ্রায় দেখিয়া তৎকালােচিত সাহায্য দানের জন্য, অগ্রসর হইলেন। কিন্তু নিজের যন্ত্রণার অপেক্ষা স্বামীর অবস্থাই তখন হেরিয়েটার পক্ষে অধিকতর ক্লেশকর হইয়াছিল। তিনি অতি কাতর স্বরে, গৌরদাস বাবুকে বলিলেন ; “আমার জন্য চিন্তা নাই ; আমি মরিতে ভয় করি না; যদি পারেন, আমার স্বামীর প্রাণ- রক্ষা করুন।” গৃহের এক দিকে এই দৃশ্য! অপরদিকে একটি পাত্রে কতকগুলি পষুষিত অন্ন, ব্যঞ্জন পড়িয়াছিল। মধুসূদনের ক্ষুধাতুর শিশু দুইট, কিয়ৎক্ষণ পূর্বে, সেই পযুষিত অঙ্গে পীড়াকালীন দুরবস্থা। উদরপূর্তি করিয়াছিল। তাহাদিগের ভুক্তাবশিষ্ট অল্পের দুর্গন্ধে আকৃষ্ট হইয়া অসংখ্য মক্ষিকা রােগীদিগকে উত্যক্ত করিয়া তুলিয়াছিল। হায়! এই কি মেঘনাদবধের কবির উপযুক্ত অবস্থা! যিনি, কল্পনানয়নে লঙ্কাপুরীর ঐশ্বৰ্য্য প্রত্যক্ষ করিয়া, বর্ণনাগুণে, তাহা পাঠকের মনশ্চক্ষুর সম্মুখে অবতারিত করিয়াছিলেন, সংসারের কঠোর কর্মক্ষেত্রে তাঁহাকে এই অবস্থাতেই জীবন শেষ করিতে হইয়াছিল। আত্মত কাৰ্য্যের পরিণাম অতিক্রম করা কাহার সাধ্য ? মধুসূদন স্বহস্তে যে বিষতরুর বীজ বপন করিয়াছিলেন, তাহাকে তাহারই ফল ভােগ করিতে হইয়াছিল। উত্তরপাড়ায় তাহার পীড়া ক্রমশঃ বদ্ধিত হইতে লাগিল দেখিয়া মধু- সূদন, মৃত্যুর ৭৮ দিন পূর্বে, কলিকাতায় প্রত্যাগমন করিলেন। সপরি- বারে কলকাতায় স্বাধীনভাবে বাস করিতে পারেন, তখন তাহার সাংসা- রিক অবস্থা এরূপ ছিল না। নিদারুণ রােগে তিনি একেবারে উত্থানশক্তি রহিত হইয়াছিলেন ; কোনও স্থান হইতে একটা কপর্দকও আয়ের ১৪৪ জীবন-চরিত লরে গমন। প্রত্যাশা ছিল না ; ইহার উপর তাহার পত্নী, কতক্ষণে, পরলােক গমন করিবেন, এইরূপ অবস্থাপন্ন হইয়াছিলেন। কে তাহাদিগের ঔষধ পথ্যাদির ব্যবস্থা করিবেন, কে বা তাহাদিগের সেবা, শুশ্রুষা করিবেন ? সুতরাং মধুসূদনের বন্ধুগণ, তাহার পত্নীকে আলিপুর দাতব্য-চিকিসা- তাহার দুহিতা শৰ্ম্মিষ্ঠার আশ্রয়ে রাখিয়া, তাহাকে আলিপুর দাতব্য-চিকিৎসালয়ে প্রেরণ কাই যুক্তিযুক্ত বলিয়া স্থির করিলেন । হায়! বঙ্গের নব কবি- শিরােমণির ভাগ্যে এই শােচনীয় পরিণাম ছিল । নিজের সুখের জন্য, তিনি যে, জনকজননীর প্রাণে বেদনা দিয়া, স্বধৰ্ম্ম ও সমাজ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন, দাতব্য চিকিৎসালয়ে আশ্রয়গ্রহণ দ্বা. এত দিন পরে, তাহাকে সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইল। মনুষ যতই যন্ত্রণা ভােগ করুক, মৃত্যুশয্যায় শয়ন করিয়া, আত্মীয় স্বজনের মুখ দেখিতে পাইলে তাহার যন্ত্রণার অনেক উপশম হয়। কিন্তু আত্মীয়, বন্ধুগণের মুখ দেখা দূরে থাকুক, তাঁহার মৃত্যুশয্যাশায়িনী, হতভাগিনী পত্নী কি অবস্থায় অবস্থান করিতে ছিলেন, মধুসূদনের পক্ষে তাহাও দর্শন করিবার সম্ভাবনা ছিল না। মধুসূদনের জীবন আদ্যোপান্ত দুঃখের কাহিনী বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। কিন্তু এরূপ মানসিক যন্ত্রণা তিনি জীবনে আর কখনও ভােগ করেন নাই। নিদারুণ রােগের মধ্যে যখন, এক একবার, তাঁহার চৈতন্য হইত, তখন পীড়িত পত্নীর ৪ শিশু দুইটার কথা স্মরণ হওয়াতে তাহার নয়ন অপূর্ণ হইয়া আসিত। কখনও কষ্টে হৃদয়ের ভাব সংযত করতেন, কখনও বা বালকের ন্যায় অধীরভাবে ক্রন্দন করিয়া ফেলিতেন। তাঁহার এবং তাহার পত্নীর পীড়া ক্রমে শেষাবস্থায় উপনীত হইল। পতি, পত্নার মধ্যে কে, অপরকে ফেলিয়া, অগ্রে পরলােক গমন করিবেন, ইহাই তখন তাহাদিগের উৎকণ্ঠার বিষয় হইল। মধুসূদন এত ক্লেশ ভােগ করিয়াছিলেন, তথাপি বুঝি তাহার অপরাধের পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত হয় নাই শেষজীবন। ১৪৫ –তাই বিধাতা, তঁাহার শিক্ষার জন্য, চরম দণ্ড বিধান করিলেন । হেনরিয়েটার মৃত্যু। মধুসূদনের মৃত্যুর তিন দিন পূর্বে তাহার শেষ জীবনের সুখদুঃখ-সঙ্গিনী, অভাগিনী হেনরিয়েটা পরলােকগমন করিলেন। মধুসূদন তখন দাতব্য-চিকিৎসালয়ে, মুমূযু অবস্থায়, অবস্থান করিতেছিলেন ; তাহার এক পূর্বতন ভৃত্য আসিয়া তাহাকে এ সংবাদ প্রদান করিল। মধুসূদনের অশ্রুর উৎস তখন শুদ্ধ হইয়া গিয়াছিল, তিনি কেবল কাতরস্বরে বলিলেন, “জগদীশ ! আমাদিগের দুই জনকেই একসঙ্গে সমাধিস্থ করিলে না কেন ? কিন্তু আমার আর অধিক বিলম্ব নাই ; আমি, সত্বরই, হেনরিয়েটার অনুবর্তী হইব।” মধুসূদন যদিও বুঝিয়াছিলেন যে, তাহার যন্ত্রণার অবসান হইয়া আসিয়াছে, এবং সে অবস্থায়, অধিক দিন, তাহাকে পৃথিবীতে বাস করিতে হইবে না, তথাপি এই বিপৎপাতে ভঁহার হৃদয় একেবারে নিষ্পিষ্ট হইয়া গেল। পত্নীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার উপযুক্ত সংস্থান তাহার ছিল ; বন্ধুবান্ধবগণের অনুগ্রহে তাহা কোন রূপে সংগৃহীত হইল। হতভাগিনী পত্নীর সমাধির উপর অশ্রুপাত করিয়া তিনি যে শান্তিলাভ করিবেন, দারুণ পীড়া তাহাকে সে সৌভাগ্য হইতেও বঞ্চিত করিয়াছিল। মনে- মােহন বাবু ও তাঁহার আর দুই একটী সুহৃদ, হেরিয়াটাকে সমাধিস্থ করিয়া, দাতব্য-চিকিৎসালয়ে, মধুসূদনকে এই সংবাদ দিবার জন্য, উপ- স্থিত হইলেন। পাছে অর্থাভাবে পত্নীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া না হইয়া থাকে, সেই আশঙ্কায় মধুসূদনের হৃদয় উদ্বিগ্ন ছিল। তিনি মনােমােহন বাবুকে দেখিয়া বলিলেন, “কেমন মনােমােহন, সকল ত ভদ্রোচিত সম্পন্ন হইয়াছে ? কোনও ত্রুটীত হয় নাই ?” মনােমােহন বাবু বলিলেন না; আমাদিগের এ অবস্থায় যাহা মনােমােহৰ খোৰ মহাশয়ের সম্ভবপর, তাহার কিছুই কুটী হয় নাই।” সহিত কথোপকথন। মধুসূদন তখন মনােমােহন বাবুকে বলিলেন, '১০ ১৪৬ জীবন-চারত। ; “মনােমােহন! তুমি যত্নের সহিত সেক্সপিয়ার পড়িয়াছিলে ; ম্যাকবেথের সেই কয়টী পংক্তি কি তােমার স্মরণ হয় ?” মনােমােহন বাবু বলিলেন, “কোন কয়টী পংক্তি”? মধুসূদন বলিলেন, “লেডী-ম্যাকবেথের মৃত্যুসংবাদে ম্যাকবেথ যাহা বলিয়াছিলেন, সেই কটী পংক্তি। আমার স্মৃতিশক্তি বিলুপ্ত হইয়া আসিতেছে, কোনও কথা আর আমার স্মরণ হয় না, কিন্তু দেখ দেখি, আমি সেই কয়টী পংক্তি আবৃত্তি করিতেছি, আমার কোন ভ্রম হয় কি না।” মধুসূদন, এই বলিয়া, ম্যাকবেথ হইতে সুস্পষ্টরূপে সেই কয়েকটী পংক্তি আবৃত্তি করিলেন এবং করিয়া বলিলেন, “কেমন মনােমােহন, ঠিক হইয়াছে ত? মনােমােহন বাবু বলিলেন, “ঠিক হইয়াছে ; কিন্তু এখন এ সকল কথায় প্রয়ােজন কি ? আপনি আরােগ্য লাভ করবেন, চিন্তা নাই।” শুনিয়া মধুসূদন একটু হাসিলেন। বােধ হয়, সে হাসির অর্থ এই যে, যে কিরূপ আরোগ্য লাভ করিব, আমার মনই তাহা বুঝিতেছে। পরে মনােমােহন বাবুকে বলিলেন, “দেখ, এই চিকিৎসালয়ের পরিচারক এবং ধাত্রীদিগকে পুরস্কার দিতে পারি, আমার এমন সম্বল নাই। ইহারা অর্থ প্রয়াসা, ইহাদিগকে কিছু কিছু পুরস্কার দিতে পারিলে, ইহারা আমায় একটু অধিক যত্ন করিত। যদি প্রতিদিন একটা করিয়া টাকা ব্যয় করিতে * Tomorrow, and to-morrow, and to-morrow, Creeps in this petty pace from day to diy, To the last syllable of recorded time, And all our yesterdays have lighted fools The way to dusty death. Out, out, brief candle ! Life's bút a walking shadow ; a poor player, That struts and frets his hour upon the stage, And then is heard no more ; it is a tale Told by an idiot, full of sound and fury, Signifying nothing." -- শেষজীবন। ১১৭ পারিতাম, তবে এ অবস্থায় কিছু শান্তি পাইতাম।” মনােমােহন বাবু বলিলেন, “প্রতিদিন একটী করিয়া টাকা? সে জন্য আপনি চিন্তা করিবেন , যে উপায়েই হউক, তাহা সংগৃহীত হইবে।” তখন মধুসূদন বলিলেন ; “মনােমােহন! তোমায় আর অধিক কি বলিব ? আমার শিশুগুলি যেন অন্নাভাবে প্রাণত্যাগ না করে, এই দেখিও।” মনােমােহন বাবু বলি- লেন, “আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, যদি আমার নিজের সন্তানগণের অন্না- ভাব না হয়, তবে আপনার শিশু গুলিরও হইবে না। মধুসূদনের বিশুষ্ক মুখ, ক্ষণকালের জন্য, প্রফুল্ল হইল; তিনি সস্নেহে মনােমােহন বাবুর হস্তধারণ করিয়া বলিলেন, “মনােমােহন! জগদীশ্বর তােমার কল্যাণ করুন্।” মনােমােহন বাবু ইহার পর বিদায় গ্রহণ করিলেন। মনােমােহন বাবুর সঙ্গে এই বিদায়ের পর মধুসূদন তিন দিবস জীবিত ছিলেন। সেই তিন দিনের অধিকাংশ সময়ই তিনি নিজের অতীত জীবনের কার্যাবলীর আলােচনায় অতিবাহিত করিয়াছিলেন। তাঁহার নিজের অবিমৃশ্যকারিতার ফলেই যে তাহার তাদৃশ দুর্দশা ঘটিয়া- ছিল, এ চিন্তা মর্মান্তিক শেলের ন্যায় তাহার হৃদয় বিদীর্ণ করিত। কেহ তাহাকে দেখিতে আসিলে তিনি তাহার নিকট মুক্তকণ্ঠে আপনার ক্রটী স্বীকার করিতেন, এবং উচ্ছলতার ও অসদাচারের পরিণাম কি তাহা বুঝাইবার জন্য, নিজের অবস্থার উল্লেখ করিয়া, তাঁহাকে সাবধান হইতে বলিতেন। মৃত্যুর পূর্বদিন রেভারেণ্ড কৃষ্ণমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে সংবাদ দিয়া আনাইয়া তিনি অনেকক্ষণ অবধি তাঁহার সহিত ধর্মালােচনা * মনােমােহন বাবু সে সত্য বিস্মৃত হন নাই। তিনি পুত্রবৎ স্নেহে মধুসূদনের পুত্র আলবাট নেপােলিয়নকে প্রতিপালন করিয়াছিলেন। আলবাট তাঁহারই উদ্যোগে অহিফেন-বিভাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া Sub-Deputy Opium Agentএর কাৰ্য্য প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অল্পদিন হইল, তরুণ বয়সে আলবার্টের মৃত্যু হইয়াছে।

১৪৮ জীবনচরিত। v - - - * করিয়াছিলেন, এবং ভগবানের নিকট ক্ষমা অন্তিম অপরাধ-ধীকার ও প্রার্থনা করিয়া বলিয়াছিলেন, “আমি সেই প্রার্থনা। দয়াময়ের করুণারউপর নির্ভর করিয়া মরিতেছি। তিনি যে পাপীতাপীর উদ্ধারের জন্য খ্ৰীষ্টকে পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছিলেন, আমি ইহাতে বিশ্বাস করি। সংসার কেবল কর্মক্ষেত্র নয়, মানবাত্মার শিক্ষাক্ষেত্র। কেহ বাল্যে, কেহ বা যৌবনে, কেহ সম্পদে, এবং কেহ বা বিপদে শিক্ষা লাভ করেন। রােগ, শােক এবং দরিদ্রতার কশাঘাত প্রাপ্ত না হইলে দুরন্ত মানব-সন্তানের চেতনা হয় না। যিনি যে দণ্ডের উপযুক্ত, বিশ্ববিধাতা তাহার প্রতি সেইরূপ দণ্ডবিধান করিয়া তাহাকে উদ্বোধিত করেন। ভগবানের অবাধ্য সন্তান মধুসূদন এতদিন তাহাকে চিনিতে পারেন নাই; তাই সেই ন্যায়বান্ প্রভু, স্বীয় দয়াগুণে, তাহার প্রতি অতি কঠোর দণ্ড বিধান করিয়া, জীবনের শেষ মুহূর্তে, তাহার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করিলেন। আত্মকৃত কাৰ্য্যের অনিষ্টকারিতা হৃদয়ে উপলব্ধি করিয়া, এবং যিনি ইহ পরকালের প্রভু তাহার চরণে সম্পূর্ণরূপে আত্ম সমৰ্পণ করিয়া, মধুসূদন যে পৃথিবীর শিক্ষাকার্য সমাপ্ত করিয়াছেন, ইহা চিন্তা করিলে তাহার প্রথম জীবনের দুর্বলতার কথা আমাদিগের আর স্মরণ থাকে না। যে দিন তিনি পরলােক গমন করেন, সেই দিন প্রাতে তাঁহার ভ্রাতুস্পুত্র, স্বর্গীয় ত্রৈলােক্যমােহন দত্ত তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছিলেন। মধুসূদনের শরীর তখন অবসন্ন এবং বাঙ নিষ্পত্তির শক্তি তখন লুপ্তপ্রায় হইয়া আসিয়াছিল। তিনি ভ্রাতুষ্পত্রকে বলিলেন, “ত্রৈলােক্যমােহন! জীবনের কোনও আশা পূর্ণ হয় নাই, অনেক আক্ষেপ লইয়া মরিতেছি, এখন বলিবার শক্তি নাই; তুমি আর এক সময় আসিও, অনেক কথা বলিবার আছে, তােমায় বলি। কিন্তু আর বলা হইল না; প্রাণের বেদনা ভাষায় ব্যক্ত করিবার অবসর বিধাতা তাহাকে দিলেন না। সেই দিন, ১৮৭৩ খৃষ্টাব্দের ২৯শে জুন শেষজীবন। ১৪৯ পরলােকগন। রবিবার, বেলা দ্বিপ্রহর দুইটার সময়, তাহার প্রাণবায়ু বহির্গত হইল। বাল্যে যাঁহার সেবার জন্য দাসদাসীগণ ব্যগ্র হইয়া থাকিত, পাছে কোনও বিষয়ে তাঁহার পরিচৰ্য্যার ঐটী হয়, এই চিন্তায় যাঁহার পিতা, মাতা ও আত্মীয়গণ ব্যাকুল হইয়া থাকিতেন, আজ এই শেষ দিনে, চিকিৎসালয়ের ভৃত্য ও শুশ্রুষা- কারিণী ভিন্ন তাহার মুখে জলগণ্ডুষ দিবার জন্য একজনও কেহ নিকটে ছিলেন না। রাজপথের ভিক্ষুক ও অনাথগণের সহিত একত্রে বঙ্গের বর্তমান সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি এইরূপে পরলােক গমন করিলেন। যে কাৰ্য্য সম্পাদনের জন্য বিধাতা মধুসূদনকে পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছিলেন, তাহা সম্পন্ন হইয়াছিল। জননীরূপিণী মাতৃভাষার সেবা করিয়া এবং আত্মসংযমের অভাবে প্রতিভার পরিণাম কতদূর শােচনীয় হইতে পারে, তাহার দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করিয়া, তাহার আত্মা প্রলােভনময় পৃথিবী পরিত্যাগপূৰ্ব্বক উদ্ধলােকে প্রস্থান করিল। সংসারের পিচ্ছিলয়ে ভ্ৰমণ করিতে করিতে অতি সবল পুরুষকেও স্খলিতপদ হইতে হয়; দুৰ্বল মধুসূদনের কথাত স্বতন্ত্র ; কিন্তু তিনি জীবনে যে সকল ভ্ৰম, প্রমাদ করিয়াছিলেন, তাহার পূর্ণ প্রায়শ্চিত্ত করিয়া গিয়াছেন। কর্মক্ষেত্র পৃথিবা হইতে তিনি যে অভিজ্ঞতা লইয়া গিয়াছেন, তাহা তাঁহার পার লৌকিক কল্যাণ করিবে। সুখে অথবা দুঃখে তাহার জীবন যে ভাবে অতিবাহিত হউক, তাহার মানব-জন্ম-ধারণ নিরর্থক হয় নাই ; তিনি তাহার স্বদেশকে এক বিষয়ে উন্নত ও গৌরবান্বিত করিয়া গিয়াছেন। মাতৃভাষার সমৃদ্ধি-সাধন করিয়া তিনি তাহার স্বদেশীয়গণের যে উপকার করিয়া গিয়াছেন, বিশ্ববিধাতা তজ্জন্য, অবশ্যই, তাহাকে পুরস্কৃত করিবেন। পরলােকে তাহার জ্ঞানপিপাসু আত্মা যেমন অনন্ত উন্নতির পথে অগ্রসর হইবে, ইহলােকেও তেমনই তাঁহার কার্য্যের পুরস্কার স্বরূপ তাঁহার মাতৃভাষার সেবকগণ, কৃতজ্ঞচিত্তে, তাহার নাম স্মরণ করিবেন। যতদিন ;

১৫০ জীবনচরিত । , , * * *5 বাঙ্গালা ভাষা থাকিবে, ততদিন তাহার স্বদেশীয়গণ, সত্যই, তাহার কাব্য- সমূহ হইতে “আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।”

উপসংহার। মধুসূদনের জীবনের বিষাদময়ী আখ্যায়িকা সমাপ্ত হইল। এইবার, আমরা তাহার অনুষ্ঠিত কার্যের আলােচনা মধুসূদনের অনুষ্ঠিত কাৰ্য্য। করিয়া, আমাদিগের গ্রন্থ সম্পূর্ণ করিব। গ্রন্থ গ্রন্থকর্তার হৃদয়ের প্রতিবিম্ব-ফলক ; পৃথিবীর অন্যান্য অনেক গ্রন্থকারের ন্যায় মধুসূদনেরও গ্রন্থাবলীতে আমরা তাহার হৃদয়ের প্রতিবিম্ব দর্শন করিতে পারি। একেই কি বলে সভ্যতা ও চতুর্দশপদী- কবিতাবলীতে তিনি তাহার জীবনের যে অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করিয়াছেন, আমরা তাহার কথা বলিতেছি না। যে চিত্তবৃত্তি পারিবারিক ও সাহিত্যিক প্রত্যেক কার্য্যেই তাহাকে প্রণােদিত করিত, আমরা তাহারই ভাৰসাদৃশ্যের কথা বলিতেছি। মধুসূদনের প্রতিভা এবং তাহার চরিত্র, উভয়ই পরস্পরের অনুরূপ। সৎপথেই হউক, আর অসৎপথেই হউক, পারিবারিক জীবনেই হউক, আর সাহিত্য-সম্বন্ধেই হউক, কোনরূপ নিষেধ-বিধির বশবর্তী হইয়া কাৰ্য করা তাহার প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ছিল। ইহারই ফলে, একদিকে যেমন সামাজিক নিয়ম উল্লঙ্ঘন করিয়া, তিনি অবলম্বিত ধৰ্ম্মে, বৈবাহিক সম্বন্ধে, এবং আশ্ৰমিক আচার, ব্যবহারে স্বেচ্ছানুরূপ কাৰ্য্য করিয়াছিলেন, অপরদিকেও তেমনই স্বদেশীয় সাহিত্যে, চির প্রচলিত প্রথার উচ্ছেদসাধন করিয়া, তিনি নূতন, নুতন রীতি প্রবর্তনে প্রণােদিত হইয়াছিলেন। তাঁহার সর্বোৎকৃষ্ট কাব্য মেঘনাদবধ ও তাহার সর্বোৎকৃষ্ট নাটক কৃষ্ণকুমারী যেমন বিষাদান্ত, তাহার নিজের জীবনও তেমনি মর্মান্তিক শােকান্ত। সকল পাইয়াও মধুসূদনের ন্যায় হতভাগ্য কৰি বঙ্গদেশে আর কেহ জন্মগ্রহণ করেন নাই। দারিদ্র্য জীবন-চরিত। un । কবিজীবনের চিরসহচর ; সুতরাং দারিদ্র্য-প্রপীড়িত বলিয়া আমরা মধুসূদনকে হতভাগ্য বলিতেছি না। সাংসারিক সুখ, সম্পদের জন্য মনুষ্য বিধাতার নিকট, সাধারণত, যে সকল সামগ্রী কামনা করে, যা ব্যতি- রেকেই তিনি তাহার অধিকাংশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। মেহময় জনক জননী, মধ্যবিত্তরূপ ঐশ্বৰ্য্য, অনবদ্য স্বাস্থ্য, সরল উদার প্রাণ, অনন্যসাধা- রণ প্রতিভা এই সকলের অধিকারী করিয়া জননী প্রকৃতি তাহাকে সংসারের কাশ্যক্ষেত্রে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহার ন্যায় আত্মীয়, বন্ধুদিগকে প্রাণ ভরিম ভালবাসিতে পারিতেন কে ? পরকে আপনার করিবার জন্য তেমন করিয়া প্রাণ ঢালিতে জানিতেন কয় জন ? গুণবানের প্রতি সম্মান, উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা, অপকারীর অপকারে উপেক্ষা প্রভৃতি গুণে কয়জন তাহার সমকক্ষ ছিলেন ? উঁহার সহ- ধ্যায়ী বাবু ভােলানাথ চন্দ্র বলেন ; “ঈর্ষা বা বিদ্বেষ কাহাকে বলে, মধু সূদন তাহা জানিতেন না; তাহার হৃদয় মধুময় ছিল।” “There was no gall, no acrimony in him, he was all 11" IETS জীবনের প্রাতঃকাল কি মনােহর! কনক-কিরণরঞ্জিত উষার ন্যায় তাহা কি অপূৰ্ব শােভাই বিকাশ করিয়াছিল। পিতা, মাতার তিনি সর্বস্বধন ; লক্ষপতির সন্তানের ন্যায় সুখ, সচ্ছন্দে তাহার শৈশব অতি- বাহিত ; যে বিদ্যালয়ে তিনি অধ্যয়ন করিতেন, তাহার উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক মণ্ডলীর মধ্যে তিনি বৃহস্পতিতুল্য। তাহার জীবনের মধ্যাহ্নও ইহার উপযুক্ত। ভারতের সর্ব প্রধান বিচারালয়ের তিনি ব্যারিষ্টার ; পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট ভাষা সমূহে তিনি সুপণ্ডিত ; দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিগণ তাঁহার সুহৃদ ও প্রতিভার উৎসাহদাতা; সমকালবী লেখকগণের মধ্যে প্রতিভায় তিনি অগ্রগণ্য। কিন্তু এই মনােহর প্রভাতের এবং এই সমুজ্জ্বল মধ্যাহ্নের পর কি ঘেরান্ধকারময়ী রজনী মধুসূদনের জীবনকাশ আবৃত করিয়াছিল! যে যন্ত্রণায় তাহার শেষজীবন অতিবাহিত হইয়াছিল, উপসংহার। তাহার পুনরুল্লেখ নিপ্রয়ােজন। পৃথিবীর কীট, পতঙ্গেরও মস্তক রাখিবার স্থান আছে, কিন্তু বঙ্গের নব্য-কবি-শিরােমণির ছিল না। যে পরা- ভােজন ও পরাবসথে শয়ন আমাদিগের নীতি-শাস্ত্রকারগণ মৃতুল্য বলিয়া বৰ্ণন করিয়াছেন, মধুসূদনের ভাগ্যে তাহারও অপেক্ষা অধিকতর ক্লেশ ঘটিয়াছিল! আশ্রয়ের অভাবে তাঁহাকে পরগৃহে বাস এবং নিম্নের অভাবে তাহাকে পরদত্ত পিতে জীবন রক্ষা করিতে হইয়াছিল। তাঁহার প্রিয়তম পুত্র-কন্যাগণ, কখনও উপবাসে, কখনও বা পর্যষিত অন্নে দিনপাত করিত। তিনি যাহাদিগকে প্রাণের অপেক্ষাও অধিক ভাল বাসিতেন, তাহাদিগের মধ্যে এক জন, বিনা পথ্যে, বিনা চিকিৎসায়, প্রাণত্যাগ করিলেন; মৃত্যুশয্যায় শয়ন করিয়া এ সমস্তই তাহাকে দেখিতে হইয়াছিল। আর পরিশেষে, তিনি নিজে, রাজপথের ভিক্ষুকের ন্যায়, দাতব্য-চিকিৎসালয়ে প্রাণত্যাগ করি- লেন। যাঁহার রচনা পাঠ করিয়া সহস্র সহস্র নরনারী তাহাকে আত্মীয়ের অপেক্ষাও আত্মীয় বলিয়া মনে করিতেন, মৃত্যুশয্যায় চিকিৎসালয়ের শুশ্ৰষাকারিণী ভিন্ন আর কেহ যে তাঁহার মুখে জলগণ্ডুষ দিতে নিকটে ছিলেন না, ইহার অপেক্ষা অধিক শােচনীয় পরিণাম আর কি হইতে পারে? সেইজন্যই আমরা বলিয়াছি যে, সকল পাইয়াও মধুসূদনের ন্যায় হতভাগ্য কবি বঙ্গদেশে আর কেহ জন্মগ্রহণ করেন নাই। সত্যই তাহার জীবন তাহার সর্বোৎকৃষ্ট কাব্যের ন্যায় শােকান্ত ; একটীতে অপরের ছায়া সুস্পষ্ট বর্তমান রহিয়াছে। মধুসূদনের প্রতিভাগুণে বাঙ্গালা সাহিত্যে যে পরিবর্তন ঘটিয়াছে, এক্ষণে আমরা তাহার আলােচনা করি। বাঙ্গা,সাহিত্যে তিনি সাধারণের নিকট অমিত্রচ্ছন্দের প্রবর্তক মধুসূদনের কার্য্য। বলিয়াই প্রসিদ্ধ ; কিন্তু অমিত্রচ্ছদের ন্যায় অভিনয়ােপযােগী প্রহসন, বিয়ােগান্ত-নাটক, এবং চতুর্দশপদী-কবিতাও ১৫০ জীবন-চরিত। তাহার দ্বারা বঙ্গভাষায় প্রকৃৰ্তিত হইয়াছে। ইংরাজী-শিক্ষিতগণের মধ্যে তিনিই, প্রথমে, পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা অবলম্বনে নাটক- রচনা এবং প্রাচীন বৈষ্ণব-কবিগণের আদর্শে কাব্য-রচনা করিয়া- ছিলেন। প্রতিভাবান ব্যক্তিদিগের গৌরব অপহবেচ্ছু ব্যক্তি কোন দেশেই বিরল নহে; সুতরাং মধুসূদনের নিন্দকের অভাব ছিল না। কিন্তু তাহার অনুষ্ঠিত কার্যের ফলাফল অতিস্থূলদর্শী ব্যক্তিও, এক্ষণে, প্রত্যক্ষ করিতেছেন। বঙ্গভাষা সম্বন্ধে তাহার প্রধান ও সর্বশ্রেষ্ঠ কাৰ্য্য ইহার অন্তনিহিত শক্তির আবিষ্করণ। মেঘনাদ- বধ রচনা অপেক্ষা ইহা আমরা তাহার প্রতিভার অধিকতর পরিচায়ক ও গৌরবজনক কার্য্য বলিয়া বিবেচনা করি। মহারাজা যতীন্দ্রমােহন ঠাকুরের সহিত বিতর্ক করিয়া তিনি যে অমিত্রচ্ছদ প্রবর্তন করিয়াছিলেন, তাহা দ্বারা বঙ্গভাষা যে কেবলই অমিত্ৰচ্ছনের উপযােগিনী, এ কথা প্রতিপন্ন হয় নাই ; বঙ্গভাষা যে, যে কোনও রূপ রচনার উপযােগিনী, ইহাই প্রমাণিত হইয়াছে। চতুর্দশপদী হউক, আর দ্বাদশপদী হউক, অমিত্ৰচ্ছদ হউক, আর মিত্ৰচ্ছন্দ হউক, গীতিকবিতা হউক, আর বীররসপ্রধান কাব্যই হউক, বঙ্গভাষা কোনও একটা রীতির অনুপযােগিনী, এ কথা আর এখন কাহারও বিশ্বাস নাই । “মাতৃভাষারূপ রত্নপূর্ণ খনির” দ্বার তিনি আবিষ্কার করিয়া গিয়াছেন ; যে কোন উদ্যোগী পুরুষ, এক্ষণে, তাহা হইতে রত্নাহরণে সমর্থ হইবেন। বঙ্গভাষা সম্বন্ধে মধুসূদনের দ্বিতীয় কাৰ্য, প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য আদর্শের সম্মিলন। ভারতের ভবিষ্যৎ সাহিত্য নিরবচ্ছিন্ন পাশ্চাত্য আদর্শে অথবা নিরবচ্ছিন্ন প্রাচ্য আদর্শে গঠিত হইবার আর সম্ভাবনা নাই। ইংরাজী সাহিত্য ভারত-বাসীদিগকে যে শিক্ষা প্রদান করিয়াছে, ভারতে ইংরাজ-রাজত্বের অবসান হইলেও, তাহার প্রভাব অহিত হইবে না। প্রাচ্য এবং প্রতীচ্য উভয় রীতির সম্মিলনেই উপসংহার। ; ভাবী ভারত-সাহিত্য গঠিত হইবে। মধুসূদনের কাব্যে ইহার সুন্দর দৃষ্টান্ত প্রদর্শিত হইয়াছে। ভারত-কবির মাধুৰ্য্য ও কোমলতার সঙ্গে পাশ্চাত্য কবিগণের ওজস্বিতার সম্মিলন করিয়া তিনি বাঙ্গালা পদ্যকে সমুন্নত করিয়াছেন। ইতালীরাজ ভিক্তর ইমানুয়েল মধুসূদনের প্রতিভা সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছিলেন, তাহা স্বরূপ-কথনই হইয়াছে ; তাহার কবিতা প্রকৃতই গ্রন্থিরূপে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যকে সংযুক্ত করিয়াছে। মধুসূদনের গ্রন্থে বিজাতীয় ভাবের প্রাবল্যের জন্য আমাদিগের ক্লেশ হয়; কিন্তু তিনি পথ-প্রদর্শক ; নূতন পথে পথ-প্রদর্শককে প্রায়ই স্খলিতপদ হইতে মধুসূদনের অনুবর্তিগণ, সাবধানতার সহিত, তাহার পদাঙ্কের অনুসরণ করিলে, জাতীয়ভাব বিসর্জন না করিয়া, বাঙ্গালা সাহিত্যকে আরও সমুন্নত করিতে পারিবেন। বাঙ্গালাকাব্য ও কবিতাসম্বন্ধে মধুসূদনের তৃতীয় কাৰ্য্য সাধারণের রুচি-সংস্কার। এখন যে এখন যে আর বিদ্যাসুন্দরের ন্যায় কাব্য শিক্ষিত সমাজে প্রতিষ্ঠালাভ করিবে, সে সম্ভাবনা নাই। মেঘনাদবধ যে আদর্শ সংস্থাপিত করিয়াছে, তাহা এখন বহুদিন পর্যন্ত বাঙ্গালা সাহিত্যের প্রবণতা নির্ণয় করিবে। ইংরাজী সাহিত্যই যে এই রুচি-পরিবর্তনের মূল, তাহাতে সন্দেহ নাই; কিন্তু মধুসূদনের কাৰ্যও উপেক্ষণীয় নহে। তিনি এতগুলি গ্রন্থ রচনা করিয়া গিয়াছেন, কিন্তু বীরাঙ্গনার তারা- পত্রিকা ভিন্ন আর কোন স্থলেই অসৎ আদর্শের বা অসৎ নীতির সমর্থন করেন নাই। যে লঘুচিত্ততা বহু বঙ্গীয় লেখকের রচনায় পরিব্যক্ত, মধুসূদনের রচনায় তাহা কুত্রাপি লক্ষিত হইবে না। তিনি অতি অল্প দিনমাত্র বাঙ্গালা সাহিত্যের সেবা করিয়াছিলেন, কিন্তু সেই অল্পদিনের মধ্যে তিনি যাহা করিয়া গিয়াছেন, অপর কাহারও কাৰ্য্যের সহিত তাহার তুলনা হয় না। কাব্যে, নাটকে, গীতি-কবিতায় এবং প্রহসনে, সর্বত্রই তাহার প্রতিভা বঙ্গসাহিত্যের সম্পদ বৃদ্ধি করিয়াছে।

জীবন-চরিত। মধুসূদনের পূর্ববর্তী হউন বা পরবর্তী হউন, এক বিষয়ে, এ পর্যন্ত কোন বাঙ্গালী কবি তাহার সমকক্ষ হইতে পারেন নাই। পুরুষােচিত শক্তিতে বঙ্গসাহিত্যে তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী কেহ নাই।* মধুসূদনের সঙ্গীতে, অনেক স্থলে, তালভঙ্গ হইয়াছে, রাগ রাগিণীর ব্যভিচার ঘটিয়াছে, তথাপি সে সঙ্গীত পুৰুষকণ্ঠোচিত; সুগায়িকা নটীর তানলয়বিশুদ্ধ কাকলীধ্বনি নহে। জলদ-নির্ঘোষের ও সাগর-গর্জনের ন্যায় সে সঙ্গীত আমাদিগকে চমকিত ও বিস্মিত করে। মেঘনাদবধ পাঠ করিতে করিতে অতি দুর্বল হৃদয়ও উৎসাহে উদ্দীপিত হয়। বঙ্গসমাজ, তাবেশ পরিত্যাগ করিয়া, সংসারের কঠোর সংগ্রাম-ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হউক; জ্যোৎস্নালােকে শয়ন করিয়া বংশীধ্বনি শ্রবণের পরিবর্তে, প্রখর দিবালােকে রণভেরীর গভীর নিনাদে অভ্যস্ত হউক, ইহাই আমরা প্রার্থনা করি ; এবং সেইজন্য মধুসূদনের ন্যায় কবির আমরা অনুরাগী । পৌরুষ পুরুষােচিত ভাষার সহচর ; সুতরাং মেঘনাদবধ বাঙ্গালিকে নিশ্চয়ই পৌরুষলাভে সাহায্য করিবে। মধুসূদন বঙ্গদেশে অনাদৃত হন নাই সত্য; কিন্তু তাহার ন্যায় কবির যে সম্মান প্রাপ্য, তাহার স্বদেশীয়গণ এখনও তাহাকে তাহা প্রদান করিবার উপযুক্ত হন নাই। যদি বঙ্গদেশ কোন দিন পুরুষােচিত শৌর্য লাভ করিতে পারে, তবেই এদেশে মধুসূদনের ন্যায় কবির প্রকৃত সমাদর হইবে। এক্ষণে মধুসূদনের আকৃতি ও প্রকৃতি সম্বন্ধে দুই চারিটা কথা বলিব । তিনি দেখিতে নাতিদীর্ঘ, নাতিখৰ্ব্ব ছিলেন। প্রৌঢ় বয়সে তিনি অপেক্ষাকৃত স্থূলাঙ্গ হইয়াছিলেন, কিন্তু প্রথম আকৃতি ও প্রকৃতি যৌবনে তাহার শরীর বিশেষ সুগঠিত ও সবল ছিল। কৃষ্ণবর্ণ হইলেও তিনি দেখিতে সুপুরুষ ছিলেন। তাহার মুখে এমন একটা কমনীয় ভাব ছিল যে, দেখিবামাত্র লােকের চিত্ত তাহার প্রতি কোনও সহৃদয় ব্যক্তি যথার্থ ই বলিয়াছেন; মেঘনা বীনা করিলে শ্রবণ বাঙ্গালা মহিলা-ভাষা না বে কখন। ;

উপসংহার। * * ; আকৃষ্ট হইত। প্রশস্ত ললাট, আকৰ্ণবিশ্রান্ত, উজ্জল নেত্রদ্বয়, সতেজ সবল দেহ, দেখিলেই তিনি যে একজন প্রতিভাবান্ পুরুষ তাহা সুস্পষ্ট পৰিব্যক্ত হইত। তাহার আকার, ইঙ্গিত, প্রত্যেক কাৰ্য্য, পুরুষােচিত ভাব প্রকাশ করিত, এবং যে ভাবপ্রবণতা কবি-প্রকৃতির বিশেষ লক্ষণ, তাহা তাহার প্রত্যেক কথায় ও প্রত্যেক কাৰ্য্যে সূচিত হইত। বাল্য হইতে পূর্ণবয়স পর্যন্ত তাহার স্বাস্থ্য অতি সুন্দর ছিল নিজের অমিতাচারের ফলেই, শেষে, তিনি ভগ্নস্বাস্থ্য হইয়াছিলেন ; মিতাচারী হইলে, সম্ভবতঃ, তিনি দীর্ঘজীবী হইতে পারিতেন। মধু সূদনের সাধারণ ব্যবহার সম্বন্ধে অনেকের মনে অনেক রূপ ভ্রম আছে। আহার এবং পরিচ্ছদ সম্বন্ধে তিনি জাতীয়ভাব পরিত্যাগ করিয়াছিলেন বলিয়া কেহ, কেহ তাহাকে স্বদেশের প্রতি অনুরাগশূন্য বলিয়া সন্দেহ করেন। কিন্তু বাস্তবিক তাহা নয়। আচার, ব্যব- হারে বৈদেশিক রীতির অনুকরণ করিলেও তাঁহার হৃদয় স্বদেশ প্রেমে পূর্ণ ছিল। তাহার লিখিত পত্রের অনেকস্থলে তাঁহার স্বদেশ শানুরাগ পরিস্ফুট রহিয়াছে। ইংলণ্ড হইতে প্রত্যাগত অনেকের ন্যায় তাহারও এই ভ্রান্ত সংস্কার ছিল যে, য়ুরােপীয়দিগের সমকক্ষ হইতে হইলে, আহার, ব্যবহার প্রত্যেক বিষয়ে, তাঁহাদিগেরই সদৃশ হওয়া আবশ্যক। তিনি বলিতেন, “আমাদিগের পূর্বপুরুষগণ যেমন মুসলমান-রাজত্বকালে আহাৰ্য, পরিচ্ছদ, গৃহসজ্জা প্রভৃতিতে মুসলমানী রীতির অনুকরণ করিয়াছিলেন, ইংরাজ-রাজত্বে আমাদিগেরও তেমনই ইংরাজী প্রথার অনুকরণ করা কর্তব্য।” একবার একটী সভাস্থলে, কতকগুলি লােক, তাঁহাকে অভিনন্দন করিয়া, তাহার বৈদেশিকভাব- প্রিয়তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করিলে মধুসূদন প্রত্যুত্তরে বলিয়াছিলেন ; “বন্ধুগণ! আমার বৈদেশিক পরিচ্ছদের জন্য, আপনাদিগকে চিন্তত হইতে হইবে না; আমার কোট, বুট যা, কোনদিন, সাহেব হইয়াছি ;

‘১৮ জীবন-চরিত বলিয়া আমার বিশ্বাস জন্মাইয়া দেয়, তবে একবার একখানি দর্পণের দিকে চাহিলেই আমার সে দুর হইবে; আমার বর্ণই আমার জাতি স্মরণ করাইয়া দিবে। মধুসূদনের ধর্মবিশ্বাস কিরূপ ছিল, আমরা পূর্বে তাহার কিঞ্চিৎ আভাস দিয়াছি। খ্ৰীষ্ট-ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে তাহার বিশ্বাস ধৰ্ম্ম-বিশ্বাস। কিরূপ, কেহ একথা জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিতেন ;—“খ্রষ্টধর্ম জগতে সভ্যতা প্রচারের একটি বিশেষ উপায় ; কেহ ইহার বিরুদ্ধে কোন কথা বলিলে আমি তাঁহার সঙ্গে ধৰ্ম্মযুদ্ধে প্রস্তুত আছি ; কিন্তু আমার মানসিক প্রবণতা হিন্দু ধৰ্ম্মেরই দিকে।”* বিকও হিন্দুভাব তাহার মনে এরূপ প্রবল ছিল যে, বিজয়াদশমী প্রভৃতি উৎসব দিনে তিনি, কখনও কখনও, ভাবে গগদ হইয়া পড়িতেন। মধু- সূদনের খিদিরপুরস্থ পৈত্রিক ভবন তিনি তাঁহার কোন বাল্যবন্ধুকে বিক্রয় করিয়াছিলেন। তাহার এই বাল্যবন্ধু । তাঁহার মাতাকে মাতৃ- সম্বােধন করিতেন । একবার জগদ্ধাত্রা-পূজার নিমন্ত্রণে তাহার বাটীতে উপস্থিত হইয়া দেবীমূর্তি-দর্শনে মধুসূদন এরূপ মুগ্ধ হইয়াছিলেন যে, অনর্গল অশ্রুপাত করিতে লাগিলেন। আপনার শৈশবের ঘটনাবলীর সঙ্গে স্বর্গীয়া জননীর কথা স্মরণ হওয়াতে তিনি মাতার উদ্দেশে বলিলেন, “মা ! তােমার মােগ্য পুত্র তােমার গৃহ কেমন সাজাইয়াছে, আমি তােমার অযােগ্য সন্তান, আমার দ্বারা তােমার কোন ইচ্ছাই পূর্ণ হয় নাই ; আমি কেবল তােমায় ক্লেশ দিয়াছি মাত্র।” বাহিরে কোট, হ্যাটের কঠোর আবরণের মধ্যে বাঙ্গালি হৃদয়ের স্বাভাবিক কোমলতা মধুসূদনের * তাহার কথাগুলি এই ;- Christianity is a civilising agency. I would fight like a crusader if any one would speak against it, but iny real feeling is Hindu. + বাবু হরিমােহন বন্দ্যোপাধ্যায়।

'উপসংহার। অনেক কাৰ্যে এইরূপ প্রকাশিত হইত। খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম গ্রহণের পর যে দুই একবার তিনি সাগরদাড়ীতে গিয়াছিলেন, প্রত্যেক বারই, আত্মীয় ও প্রতিবাসিগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া, অতিমধুর ব্যবহারে সকলকে আপ্যায়িত করিয়াছিলেন। দেশের কোন আত্মীয় কলিকাতায় আসিয়া তাহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিলে তিনি পরম যত্নে তাহাকে অভ্যর্থনা করি- তেন। মধুসূদনের চরিত্রে নৈতিক দুর্বলতা যথেষ্ট ছিল; কিন্তু স্বার্থ- পরতা, ক্রুরতা, পরশ্রীকাতরা প্রভৃতি নীচভাব একবারেই ছিল না। উদার, সরলভাৰ পুরুষ কুপথগামী হইলে তাহার চরিত্রে যে সকল দোষ থাকিবার সম্ভাবনা, মধুসূদনের প্রকৃতিতে সেই সকল দোষই ছিল। মিতাচারে ও ইন্দ্রিয়-সংযমে অভ্যস্ত হইলে তাহার স্নেহপ্রবণ হৃদয় গার্হস্থ্য জীবনে অতি মধুময় ফল প্রসব করিত। মধুসূদনের জীবনের ইতিহাস অপূৰ্ব শিক্ষাপ্রদ। প্রতিভা যতই সমুজ্জল হউক, আত্মসংযম না থাকিলে তাহার মধুসূদনের জীবনের উপদেশ। পরিণাম যে কিরূপ শশাচনীয় হইতে পারে, ইহা হইতে আমরা তা শিক্ষা করিতে পারি। মনুষ্য যতই বিদ্বান্ ও বুদ্ধিমান্ হউন, ধৰ্ম্মৰ ব্যতীত যে জগতে শান্তির প্রত্যাশা নাই, তাহার জীবন তাহার ও দৃষ্টান্ত স্থল। যাহারা প্রতিভার অভিমানে ধৰ্ম্মের ও নীতির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করেন, এবং নিজের সুখের ও স্বার্থের জন্য পিতা, মাতা, সমাজ সকলের প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন করেন, তাহারা যেন মধুসূদনের পরিণাম হইতে শিক্ষালাভ করেন। তরুণবয়সে নীতিশিক্ষার ও সদৃষ্টান্তের অভাবে আমাদিগের দেশের কত প্রতিভাবান যুবক কিরূপ চরিত্রহীন ও আচার-ভ্রষ্ট হইতেছেন, তাহার জীবন হইতে আমরা তাহাও অনুমান করিতে পারি। মধুসূদনের ভয়ঙ্কর প্রায়শ্চিত্ত তাঁহার উন্মার্গগামী স্বদেশীয়গণের উপকার করিবে। বঙ্গভাষা কাহাকে লইয়া গৌরবান্বিত, আধুনিক ৰদীয় কবিদিগের মধ্যে প্রতিভাগুণে স্বদেশের ও জীবন-চরিত। - স্বসমাজের মুখ কে উজ্জল করিয়াছেন,এবং গুণবান, জ্ঞানবান ও হৃদয়বান হইলেও বঙ্গীয় কোন্ কবির পরিণাম সর্বাপেক্ষা শােচনীয়, এই তিন প্রশ্নেরই উত্তরে ভবিষ্যত্বংশীয়গণ বলিবেন, “হতভাগ্য মধুসূদন।” মধুসূদনের মৃত্যুর পর তাঁহার স্বদেশীয়গণ তাহার জন্য যাহা করিয়া- ছিলেন, তাহার আলােচনা করিয়া, এইবার, মধুসূদনের সম্বন্ধে তাহার আমরা আমাদিগের গ্রন্থ সম্পূর্ণ করিব। বঙ্গ- দেশীয়গণের কাৰ্য। সাহিত্যের জন্য মধুসূদন যাহা করিয়া গিয়া- ছেন, তাহার স্বদেশবাসিগণ তাহার উপযুক্ত কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করিয়া- ছেন, এ কথা বলিতে পারিলে, আমরা সুখী হইতাম। কিন্তু হায়! সে কথা বলিবার সুযােগ কোথায় ? মধুসূদনের ন্যায় কবির উপযুক্ত জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন এ পর্যন্ত সংস্থাপিত হয় নাই। অথভাবে মধুসূদনের মৃতদেহ নিতান্ত হীনভাবে সমাহিত হইয়াছিল এবং বহুদিন পর্যন্ত তাঁহার সমাধির উপর কোনরূপ স্মৃতিস্তম্ভ সংস্থাপিত না হওয়ায় তাহ ক্রমে লুপ্ত হইবার সম্ভাবনা হইয়াছিল। কিন্তু বিধাতা বঙ্গদেশকে সে কলঙ্ক হইতে রক্ষা করিয়াছেন। কয়েক বৎসর হইল; তাহার সমাধির উপর এক মৰ্ম্মর প্রস্তরনির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ প্রতি- মধুসূদনের সমাধিস্তন্তপ্রতিষ্ঠা। ঠিত হইয়াছে। বঙ্গের ধনাট্য, মধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র, অনেকেই, তজ্জন্য অর্থ সাহায্য করিয়াছিলেন। ১৮৮৮ খৃষ্টাব্দের ১লা ডিসেম্বর, ব্যারিষ্টার মনােমােহন ঘােষ মহাশয়, সাধারণের সমক্ষে, সেই সমাধিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। বঙ্গেয় সুশিক্ষিত নর নারীগণের প্রতিনিধিস্থানীয় অনেকে, মধুসূদনের সমাধিক্ষেত্রে উপস্থিত থাকিয়া, জাতীয় কর্তব্য, কিয়ৎ পরিমাণে, সম্পাদন করিয়াছিলেন। মৃত্যুর কয়েক বৎসর পূর্বে মধুসূদন স্বয়ং তাহার যে সমাধিলিপি রচনা করিয়াছিলেন, তাহা তাঁহার সমাধিস্তম্ভে উৎকীর্ণ হইয়াছে। মনােমােহন বাবু তাহার বক্তৃতায় যথার্থই বলিয়াছিলেন ;- উপসংহার। • The poet has himself left behind him meniorials far more precious and far more lasting than any thing that either the wealth or the skill of his admiring countrymen could secure for bim. His works will be read with admiration by generations yet unborn, and his name will live so long as the Bengali language and the Bengali race will live. ব্রাহ্মধর্ম প্রচারক, স্বর্গীয় প্রতাপচন্দ্র মজুমদার মহাশয় এই উপলক্ষে যাহা বলিয়াছিলেন, বঙ্গভাষানুরাগী ব্যক্তি মাত্রই তাহা অনুমােন করিয়া ঈশ্বরের নিকট প্রার্থনা করিবেন যে, “যেখানে, কবিদিগের বৈকুণ্ঠে, কবিকুলরাজ হােমার, দান্তে, মিল্টন এবং আমাদিগের কালিদাস, ভবভূতি স্বর্ণসিংহাসনে বিরাজিত রহিয়াছেন, আমাদিগের গৌরবান্বিত প্রিয় কবিও সেখানে সম্মানে ও চিরশান্তিতে বিরাজিত থাকুন।” তাঁহার সমাধির উপর যে প্রস্তরময় স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, কালে, হয়ত, তাহা চূর্ণ হইবে, কিন্তু তিনি স্বয়ং তাহার গ্রন্থাবলীরূপ যে অক্ষয় স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করিয়া গিয়াছেন, তাহা চিরদিন তাহার গৌরব ঘােষণা করিবে। যতদিন বাঙ্গালা ভাষার ও বাঙ্গালিজাতির 'অস্তিত্ব থাকিবে, ততদিন বঙ্গ-সাহিত্য হইতে “শ্রীমধুসূদন” নাম বিলুপ্ত হইবে না। গ্রন্থকারের শ্রদ্ধাভাজন সুহৃদ, হেয়ার ও হিন্দুস্কুলের খ্যাতনামা শিক্ষক স্বর্গীয় হরলাল রায় মহাশয় মধুসূদনের সম্বন্ধে যথার্থ ই বলিয়াছিলেন ;- “নামে মধূ, হৃদে মধু, ৰাকো মধু যার, এ হেন মধুয়ে ভুলে সাধ্য আছে কার :* মির-সম্পাদক বাবু নরেন্দ্রনাথ সেন মহাশয়ের অধিনেতৃত্বে মধুসূদনের মৃত্যুর দিবস অনেক সাহিত্যসেবী, এক্ষণে, তাহার সমাধিক্ষেত্রে মিলিত হইয়া থাকেন। মধুসূদনের জন্মদিবস উঁাহার জন্মভূমি সাগাড়ীতেও একটা উৎসব সম্প্রতি আর হইয়াছে। মধুসূদনের কোন স্মৃতিচিহ্ন তাহার জন্মভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হউক, সাগরদাড়ী- বাসিগণ ইহা একান্ত প্রার্থনা করেন। বঙ্গীয় সাহিত্য-সেবকগণ কি তাহাদিগের এই প্রার্থনা পূর্ণ করিবেন না? সম্পূর্ণ ।

No text on this page.

EEEE
----
ও,পথিক-বৰ,জন্ম যদি তব
বঙ্গোষ্ঠি ক্ষণকাল! এসমাধি স্থলে
(জননকোলে শিশুলভয়ে যেমতি
বিরাম) মহীর পদে মহা নিদান্ত
দত্তকুলােদ্ভৰ কৰি শ্ৰীমধুসূদন!
যশাের সাগরদাড়ী কক্ষ তীরে
জন্মভূমি, ভমদাগ দত্ত মামতি
রাজ নারায়ণ নামে, জননী জাহৰী।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
.
|
=
।
মধুসূদনের সমাধিস্তম্ভ

No text on this page.

মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবন-চরিত। শ্ৰীযােগীন্দ্রনাথ বস্ত্র বি এ-প্রণীত। অপ্রকাশিত কবিতা, পত্র এবং গ্রন্থাবলীর সমালােচনা-সম্বলিত। টেষ্টবুক-কমিটি কর্তৃক পুরস্কার প্রদানের এবং পুস্তকালয়ের জন্য অনুমােদিত। মূল সম্বর্ধিত চতুর্থ সংস্করণ। এই গ্রন্থের পরিচয়-প্রদান নিষ্প্রয়ােজন। ইহার ভাষা যেমন বিশুদ্ধ ও মধুর, ইহার বর্ণিত বিষয়ও তেমনি শিক্ষাপ্রদ ও চিত্তাকর্ষক। মধুসূদনের জীবনবৃত্তান্তের সঙ্গে তাহার সমসাময়িক ঘটনাবলীর ইতিহাস এবং তাহার গ্রন্থাবলীর বিস্তৃত সমালােচনা ইহাতে প্রদত্ত হইয়াছে। ইহাতে সন্নিবিষ্ট মধুসূদনের লিখিত ইংরাজী পত্রগুলির ন্যায় সুলিখিত পত্র অতি অল্পই দেখিতে পাওয়া যায়। পূৰ্ব্ব সংস্করণের অনেক অংশ পরিবর্তিত ও পরিবন্ধিত হইয়া বর্তমান সংস্করণ প্রকাশিত হইয়াছে। মধুসূদনের, ভূদেব বাবুর, রাজনারায়ণ বাবুর, মহারাজা সার যতীন্দ্রমােহন ঠাকুরের এবং রাজা প্রতাপচন্দ্রের ও রাজা ঈশ্বরচন্দ্র প্রভৃতির লিখাে- চিত্রের সঙ্গে, মধুসূদনের পৈত্রিক ভবনের, তাহার জন্মভূমি সাগরদাঁড়ীর, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের, হিন্দুকলেজের খ্যাতনামা শিক্ষক ডি এ রিচার্ড- সনের হাফটোন চিত্র ইহাতে প্রদত্ত হইয়াছে। বঙ্গভাষার অনুরাগী ব্যক্তি মাত্রেরই ইহা পাঠ করা কর্তব্য।

গ্রন্থ সম্বন্ধে অভিপ্রায়। ANRITA BAZAR PATRIKA.-"The book before us is the first regular biography in the Bengali Language, and it may compare favourably with some of the best biographical works of the west. HINDOO PATRIOT.-It is one of the first class biographical works that have yet made their appearance in our language. INDIAX DAILY VEIS. -- The work has supplied a desideratum in the Bengali Language and ought to be in every Bengali library, private and public. INDI.1.1 MIRROR. · Like the subject of the memoir, Babu b. gindra Xath Bus has immortalised himself by being the writer of the first biography, properly so called, in the Bengali Language. INDIAN MESSENGER-The author's diction is chaste and elegant, his powers of narration are of a high orcler The Book is altogether the best biography in the Bengali Langunge. BESG: LEE-It is a noble inomumert of the great poei. Every Bengali, (very lover of his country and his country's literatures should provide himself with a copy of the Buok. (XIVERSITY MAGAZINE-The biography is one of the best written in ludia. The style is hcautifully simple and the spirit appreciative. ENGLISHMAX-The work has been most careſully prepared and reflects great credit upon its author who has done an important service to Bengal and to her great poet. STATESMAX In the perforinance of his self-im. posed task, which we can well believe was also a labour of love, the author has exhibited a conscientiousness which would have done creclit to a German Savant, ( ৩ ) সঞ্জীবনী।-কি ভাষা, কি চিন্তাশীলতা, কি পাণ্ডিত্য, কি মনে হারিত্ব, সর্ব বিষয়েই ইহা বাঙ্গালা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন-চরিত। যিনি এই পুস্তক পাঠ না করিবেন, তিনি বঙ্গসাহিত্যের একটি উজ্জ্বল রত্বের পরিচয় পাইবেন না। তাহার বঙ্গসাহিত্যের জ্ঞান অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে। বঙ্গবাসী।—যােগী বাবুর এই গ্রন্থের সমকক্ষতা করিতে পারে, এমন পুস্তক বাঙ্গালা ভাষায় কেন, বােধ করি, অন্য ভাষাতেও অতি অল্পই থাকিবার সম্ভাবনা। গ্রন্থখানি যে কেবল উপাদেয় এবং মনােহর হইয়াছে তাহা নহে; এই গ্রন্থ অনেক অংশেই বাস্তবিক অপূৰ্ব্ব হইয়াছে। নব্যভারত।—পৃথিবীর যে কোন ভাষায় এমন গ্রন্থ প্রকাশিত হইলে দেশবাসীর গৌরব হয়। হিতবাদী।—ইহা কেবল জীবনচরিত নয়, একখানি উৎকৃষ্ট সমালােচনা-গ্রন্থ এবং কবির সময়ের একখানি উৎকৃষ্ট আলেখ্য। মাইকেলের সৌভাগ্য যে, তিনি যােগন্দ্র বাবুর ন্যায় জীবনচরিত-লেখক পাইয়াছিলেন। মহারাজা সার যতীন্দ্রমােহন ঠাকুর।-“আপনার এ গ্রন্থ অনেকাংশে অপূৰ্ব্ব ; ইতিপূর্বে বা ইহার পরে এরূপ জীবন-চরিত বঙ্গভাষায় প্রকাশিত হয় নাই। জীবন-চরিতের সহিত তীক্ষ্ণ সমা- লোচনা এবং কবির সময়ের যথাযথ চিত্ৰ সন্নিবিষ্ট হওয়ায় গ্রন্থখানি অতি উপাদেয় হইয়াছে।” RAJ NARAYAN BOSE.-It is destined to be as immortal as the principal productions of the poet him. self. I greatly rejoice at the appearance of such a work in the language.

( ৪ ) নবীনচন্দ্র সেন।—এমন সৰ্বাঙ্গসুন্দর জীবন চরিত বাঙ্গালায় আর কখনও বাহির হয় নাই। আপনি মধুসূদনের দোষগুণ, প্রতিভা, অপ্রতিভা, নিরপেক্ষভাবে অঙ্কিত করিয়া, পাঠকের নয়নের সম্মুখে মধুসূদনের একটী জীবিত আরেখ্য প্রকটিত করিয়াছেন। ইহাতে আপনি কি শক্তি, কি ক্লেশসহিষ্ণুতা, কি উদ্যম দেখাইয়াছেন, তাহা যিনি এই অপূৰ্ব জীবন-চরিত পড়িবেন, তিনিই বুঝিতে পারিবেন। মধুসূদনের এবং তৎসঙ্গে বঙ্গাব্য-সাহিত্যের এমন অন্তরদশী, কাব্য- রসজ্ঞ, নিরপেক্ষ সমালােচনা বঙ্গদর্শন-বান্ধব-যুগের পর আর যে পড়িয়াছি স্মরণ হয় না। শ্রীইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ।—চরিতবর্ণনের গ্রন্থরচনায় কোন ব্যক্তি, কোন ভাষায়, আপনার অপেক্ষা কৃতিত্ব দেখাইতে পারিয়াছেন বলিয়া আমার জানা নাই। কালীপ্রসন্ন ঘােষ।—আপনার পুস্তক, সৰ্বাংশে, বাঙ্গালা সাহিত্যের ক্ষেত্রে একদিকে একখানি আদর্শ পুস্তক হইয়াছে। শ্রীচন্দ্রনাথ বসু।-এমন প্রাণপণে, এরূপ সর, ও বিশুদ্ধ মনে, এদেশে, এ পর্যন্ত, কেহ কাহারও জীবন-চরিত লেখে নাই। জীবন- চরিত লেখকদিগের মধ্যে এমন ধর্মভীরু, পক্ষপাতশূন্য ভক্ত বড়ই কম দেখিয়াছি। শ্রীশিবনাথ শাস্ত্রী।-কবিবর মধুসূদন যেমন কবিতারাজ্যে নবভাব ও নবশক্তির অবতারণা করিয়াছিলেন, তুমিও তেমনি জীবন চরিতের নূতন প্রণালী প্রবর্তিত করিয়া বঙ্গসাহিত্যে কীৰ্ত্তিস্থাপন কৰিলে। মূল্য ২• ভিঃ, পি, খরচ।। ৩০নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট সংস্কৃত-প্রেস-ডিপজিটরাতে এবং কলিকাতার প্রধান প্রধান পুন্তকালয়ে পাওয়া যায়।

No text on this page.

Cover Printed by k. . Ses ne & Bros. 60 & 67 Bechu Chocerle St. 41.CUTTA

No text on this page.

No text on this page.

Miicel Madhusudan Dutter Jiban Charit

Author
Basu,jogindranath
Title
Miicel Madhusudan Dutter Jiban Charit
File name
Miicel Madhusudan Dutter Jiban Charit
Text
OCR done
Citation
1910
Published
2010/02/9
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
189
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
Basu,Jogindranath
DLI number
511219
Barcode
4990010018387.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
TB3hiLSlDb2
Download PDF

Miicel Madhusudan Dutter Jiban Charit