Udaynarayanpur Tarun Sangha, Howrah
Third Class Ed.3
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
থার্ডক্লাশ
রবীন্দ্রনাথ মৈত্র
ডি, এম, লাইব্রেরী
৪২, কর্ণওয়ালিশ ফ্রীট
কলিকাতা
প্রকাশক-এগােপালদাস মজুমদার
ডি, এম, লাইব্রেরী
৪২, কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাত।
তৃতীয় সংস্করণ
অশ্বিন, ১৩৪৮
দেড় টাকা
প্রিন্টার—শ্রীঅমূল্য চন্দ্র ভট্টাচার্য
“নিউ সারদা প্রেস”
২১, আতাবাগান থ্রীট, কলিকাতা
বিভিন্ন সাময়িকপত্রে প্রকাশিত
কাহিনীগুলির সমষ্টি মাত্র,
ভূমিকা নিপ্রয়ােজন।
১২ই পৌষ,
}
রবীন্দ্রনাথ মৈত্র
সন ১৩৩৫।
No text on this page.
উৎসর্গ
গদ্ধেয়
অধ্যাপক শ্রীসুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
ভক্তিভাজনেষু
No text on this page.
সূচী বিষয় পৃষ্ঠা থার্ডক্লাশ ১ ••• ৭ ১৪ আপেল তীর্থে লাটের স্পেশাল চণ্ডীমণ্ডপ -প্রত্যর্পণ ১৯ ২৬ ••• ৬। ৭৮ দুলাল নিধিরামের বেসাতি পরের ছেলে বছিরের দরগা গিরিবালার জীবন-পঞ্জী দেশদ্রোহ। শখের করাত ••• ••• ১২ ১০৪ ১১৫ ১২৬
No text on this page.
থার্ডক্লাশ হলুদ রঙ্গের একখানা গাড়ী। বোঁচকা-কুঁচকি, ভাঙা রঙ-ময়লা গণ্ডা পাঁচেক ট্রাঙ্ক, দশ বারােটা ঝুড়ি, গােটা বিশেক ক্যাম্বিসের ব্যাগ, খান চব্বিশ দেশী ও বিলাতী কম্বল, পাঁচ সাতখানা ছেড়া কথা, অগণ্য হুকা-কলকে, পানের ডিবে ও জলের গেলাশ। তার মাঝে মাঝে জুতা—পম্প, চটি, ডাৰ্বি, নাগরাই, ক্যাম্বি, চীনেবাড়ী, তালতলা, ঠঠনে, কটক, আগ্রা সকলেরই নৃতন পুরাতন নমুনা একসঙ্গে। গাড়ীর ভিতরে মাথার কাছে লেখা, “চব্বিশ জন বসিবেক।” চব্বিশ জনের জন্য সাড়ে চারখানা বেঞ্চ। তার আধখানা কলেক্টর সাহেবের আৰ্দালীর দখলে। বেঞ্চের ভিতরের ফাকে ফাকে লক্ষ কোটি ছারপােকা, আর তার উপরে একচল্লিশ জন স্ত্রী, পুরুষ, বালক, বৃদ্ধ, শিশু ঠাসাঠাসি। পাগড়ী, টুপী, তাজ, আলখাল্লা, গেরুয়া, নেংটী, শাড়ী, থান, রসগােল্লা পাড় ও কাশী পাড় কাপড়, পায়জামা ও আচকানের বিচিত্র সমন্বয়। দুর্গন্ধ পায়খানার দরজু দড়ি দিয়ে বাঁধা, হু নেই। একটা বেঞ্চের নীচে একটা মরা ইদুর, আর একটা বেঞ্চের নীচে কতক- গুলাে অনেক দিনের পচা কলার খােসা। তামাক বিড়ি, সিগারেট, গাঁজা, নারিকেল ও ফুলেল তৈল, ময়লা কম্বল ও কঁাথা,
থার্ডক্লাশ
কাবুলির বোঁচকা ও কলেক্টর সাহেবের আন্দালীর ছিপিখােলা
‘রমের’ বােতল। সকলের দুর্গন্ধ একসঙ্গে।
ভাদ্রের গ্রীষ্ম। ঘােট ঘােট ছেলেদের ক্রন্দন। একটু হাওয়ার
জন্য একটি জানালা দিয়া একসঙ্গে তিন চারজন যাত্রীর মুখ বাহির
করিবার প্রয়াস। এই অবস্থায় ঘােষ্টার আবরণে ঘর্মাক্ত যুবতী
সতর্ক অঞ্চল বীজনে শীতল হইবার ব্যর্থ চেষ্টা করিতেছিল। কোণে
একটা বুড়ী সমস্ত অঙ্গের সঙ্গে পা দু’টা গুটাইয়া জ্বরের ঘােরে
পুঁকিতেছিল।
টুং টুং টুং ফু !
ষ্টেশন। চাই মিঠাই’, ‘চাই পান-বিড়ি। এই কুলি এধার !”
‘এবার কোথায় ? দেখছ না ভর্তি ? ওধার যাও!
‘গার্ড সাহেব !”
?
‘ইউ ড্যাম্ !
‘ও টিকিটবাবু, উঠবে কোথায় ?
‘ইসমে ওঠনা কেন?
‘উঠতে দেয় না যে !
‘কেন নেহি দেঙ্গে? গাড়ী উকো বাবার নাকি ? উঠ জদি ।
হালাে গুডমর্ণিং পেজ! টিকিটবাবু গার্ডের গাড়ীর দিকে
ছুটিলেন।
‘ওঠ ওঠ, মহেশ, ঝাণ্ডি দেখাচ্ছে ওঠ, !
?
ঘটাং!
২
থার্ডক্লাশ
ওরে বাপু, এর মধ্যে। এই দুটো ষ্টেশন গােসরাও তাে
বাবা তােমার গাঁটরীটা। ওঃ বড় গরম।
‘ফু?
যাত্রী বর্তমানে চুয়াল্লিশ।
ঘটাৎ! মাথায় টুপী, সাদা কোটপ্যান্ট, রক্তমুখ ফ্লাইং চেকার !
শক্ষিত যুবতী সরিয়া গেল। দু’পা সরিয়া তাহার গা ঘেসিয়া চেকার
দাড়াইয়া সম্মুখের বৃদ্ধকে লক্ষ্য করিয়া হাঁকিল, টিকেট ডেখলাও!”
‘দেখাই সাহেব।
জডি নিকালাে—এই হটো ড্যাম্? পায়ের কাছের হিন্দু-
স্থানী বালক সভয়ে সরিতে গিয়া পড়িয়া গেল।
‘টুমকো টিকিট?
করতে পারিনি সাহেব, দাসপুর যাব।
‘টিকিট নেহি কিয়া ? লে আও রূপেয়া! জডি নিকালাে!
‘দিচ্ছি সাহেব, এই সাত আনা।
‘নেহি হােগা ডেও রূপেয়া!
লােকটি গামছার খুট খুলিয়া আরাে চার আনা বাহির
করিয়া দিল। এই ছিল তার মােট সম্বল।
‘আউর ডেও।
‘আর কোথায় পাবাে সাহেব ? আট আনা টিকিটের দাম,
এগারাে আনা দিলাম—আর পয়সা নেই।
‘আট আনা মাশুল, আউর আট আনা জরিমানা।
থার্ডক্লাশ
এবারের মত মাফ কর সাহেব।
‘বহুঢ় আচ্ছা, এ্যাসা কবভি মট করে। এই হটো, যানে
ডেও। এই মাগি’—বলিয়া ব্ৰস্ত যুবতীকে কনুই দিয়া ধাক্কা দিয়া
বৃদ্ধার পা মাড়াইয়া সাহেব বাহির হইয়া গেল।
‘বাবা গাে মলাম। বৃদ্ধার আর্তনাদ।
‘সাহেব, আমার মাশুল নিলে, টিকিট ?
‘মটু চীল্লাও। সাহেব অন্য গাড়ীতে ঢুকিল।
“বলদপুর ! বলদপুর !” ষ্টেশনের পাের্টার হাঁকিল। আবার
সেই হট্টগোেল। গাড়ীতে উঠিবার জন্য যাত্রীদের সেই দারুণ
প্রয়াস! ষ্টেশন মাষ্টারের বিচিত্র হিন্দী, রেলের কুলির গালাগালি ।
থার্ডক্লাশের যাত্রীথের কোলাহল ও আর্তনাদ।
এই ঘন্টি দেও। ষ্টেশন মাষ্টার হাকিলেন।
“দাড়াও বাবা! ও-সাহেব বাবা, একটু রাখ বাবা! বলিতে
বলিতে পুটুলীহাতে এক বুড়ী আসিয়া গাড়ীর কাছে দাঁড়াইল।
‘হটো বুড়ী ! ছােড় দিয়া।
বুড়ী মিনতি করিয়া কহিল, “আমার বিপিন বাঁচে না বাবা,
সকালে এসেছি বদ্দিবাড়ী, অষুধ নিয়ে যাচ্ছি। বলিয়া সে
গাড়ীতে উঠিতেই টিকিটবাবু তাহাকে ধরিলেন। গাড়ী ছাড়িয়া
দিল। বুড়ী হাতের পুটুলী প্ল্যাটফরুমে ছুঁড়িয়া দিয়া আর্তনাদ
করিয়া উঠিল, 'ওরে বিপিন রে। গাড়ীর শব্দে বাকী কথাগুলি
শােনা গেল না।
৪
থার্ডক্লাশ গাড়ী চলিতেছে। গাড়ীর জানালাগুলি বন্ধ করিয়া দিলে কতক্ষণে অন্ধকূপ হত্যার পুনরাভিনয় হইতে পারে তাহাই ভাবিতেছি এমন সময় গাড়ী থামিল। তৃষ্ণার্ত যাত্রীর দল সমস্বরে চীৎকার করিয়া উঠিল, পানি-পাড়ে, এই পাড়ে। সঙ্গে সঙ্গে আশে-পাশের পঞ্চাশটা জানালার মধ্য দিয়া দেড়শ’ শূন্য ঘটি, গেলাস, বাটি ও মগ বাহির হইয়া আসিল। ‘এই পানি-পাড়ে! এ-ধার! কালাে বাতি হাতে কৃষ্ণবর্ণ, নগ্নপদ টুপী মাথায় পানি-পাড়ে আসিয়া দাঁড়াইয়া দাঁত খি চাইয়া কহিল-এ-ধার! হুকুমসে পানি মিলেগা? তারপর মৃদুস্বরে কহিল, “এক এক লােটা, দোদো পয়সা।” বাঁ-হাতের মুঠা পয়সায় ভরিয়া, ডান-হাতে শূন্য বাতি লইয়া পানি-পাড়ে মহাশয় ফিরিয়া যাইতেছিলেন, এমন সময় কালেক্টর সাহেবের আন্দালী তন্দ্রা ভাঙ্গিয়া হাঁকিলেন, “এই পাড়ে, পানি লে আও।” রক্তচক্ষু পাঁড়েজী মুখ ফিরাইলেন। তারপর দীর্ঘশ্মশ্রু, উষ্ণীষ-শােতিত আৰ্দালীসাহেবকে দেখিয়া হাতের বাতি নামাইয়া রাখিলেন ও সুদীর্ঘ সেলাম করিয়া কহিলেন, “সেলাম হুজুর ! ঘােড়া সবুর কি জিয়ে, টাকা পানি লে আতে হেঁ।” বীরদর্পে আন্দালী সাহেব স্বস্থানে ফিরিয়া আসিয়া গোঁফে তা দিতে লাগিলেন। দশ মিনিট থাকিবার কথা; বিশ মিনিট হইয়া গেল গাড়ী ছাড়ে । গ্রীষ্মের জ্বালায় প্লাটফরমে নামিলাম। পাের্টার আসিতেছিল। ৫
থার্ডক্লাশ
“ওহে, গাড়ী ছাড়তে এত দেরী হচ্ছে কেন বলতে পার?”
“নেহি জান্তা।” পাের্টার চলিয়া গেল।
৫. টিকিট চেকার আসিতেছেন।
“চেকারবাবু, গাড়ীর দেরী হচ্ছে কেন?
“কেজী সাহেবের লেডি (৫) খানা খেতে গেছেন।”
“কেভী সাহেব কে ?”
“হােয়া ফ্র ইওর নােয়িং?” আমার জানিয়া কোন ফল
নাই বুঝিয়া চুপ করিয়া রহিলাম ।
চেকার চলিয়া গেলেন ।
শূন্য বােতল ঘটর ঘট করিতে করিতে সােপানিওয়ালা
আসিতেছিল।
“মিঞা, কেডী সাহেব কে বলতে পার ?”
“নীলগঞ্জের পাটের দালাল। সেকেন ক্লাশে আছেন।”
কেসী সাহেবের লেডি’ আসিলেন, ষ্টেশন মাষ্টার সঙ্গে সঙ্গে
আসিয়া গাড়ীতে তুলিয়া দিলেন। গার্ড সাহেব ষ্টেশন মাষ্টারকে
জিজ্ঞাসা করিয়া নিশান তুলিলেন, গাড়ী ছাড়িল।
আমার কাণে হঠাৎ বাজিল, বুড়ীর সেই আর্তনাদ,-দোহাই
বাবা, একটুখানি রাখ বাবা! ওরে বিপিন—বিপিন রে—
আপেল সােমবারের সকাল বেলা উঠিয়াই ছয় বৎসরের ছেলে বুধ ঘুমন্ত পিতার কাণে কাণে কহিল, “বাবা আজ সােমবার—আজ আবে বাবা ?” নটবর ছেড়া মাদুরখানার উপরে একবার পাশমােড়া দিয়া নিদ্রাজড়িতকণ্ঠে কহিল “আনব।” বালকের সমস্ত মুখ হাসিতে ভরিয়া গেল, তাড়াতাড়ি ছুটিয়া বাহিরে গিয়া তাহার সমবয়সী বড়বাড়ীর ছেলে শ্রীকান্তকে ডাকিয়া কহিল, “আজ বাবা আবে বলেছে, দেখিস্ সন্ধ্যেবেলা।” পিতা-পুত্রের এই গােপন পরামর্শের বস্তু ছিল একটা আপেল । সেদিন শ্রীকান্ত রাস্তায় দাড়াইয়া একটা রক্তবর্ণ ফলে মহা উৎসাহে দন্তবেধ করিতেছিল, বুধ অনেক্ষণ ধরিয়া দরজার ছেড়া চটের আবরণের মধ্য দিয়া শ্রীকান্তের এই ভােজনলীলা দেখিল, তাহার পর যখন লােভ সামলানাে দুঃসাধ্য হইল তখন বাহিরে আসিয়া শ্রীকান্তকে কহিল “কি খাচ্ছিস্ রে ছিরিকান্ত ?” শ্রীকান্ত নির্বিকারচিত্তে কহিল, “আপেল”। বুধা কহিল, “আমাকে এক কামড় দেনা ভাই!” শ্রীকান্ত ফলটীর শেষ অবশেষটুকু তাড়াতাড়ি গালে পুরিয়া কহিল, “উহু!” তারপর চর্বণ সমাপ্ত করিয়া কহিল, “আমার বাবা এনে দিয়েছে, তাের বাবা কেন এনে দেয় না রে?” ৭ থার্ডক্লাশ সাড়ে বাইশ টাকা মাহিনার কেরাণীর ছেলে পাচশত টাকা মাহিনার পুত্রের এই জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিল না। সে কঁাদ কঁাদ মুখে পিতার নিকট গিয়া উপস্থিত হইল। নটবর তখন ছেড়া কামিজটির উপর পাট করা মলিন চাদরখানা জড়াইয়া ন'টার গাড়ী ধরিবার উদ্দেশে যাত্রা করিতেছিলেন, তাহার সম্মুখে দাড়াইয়া বুধা কহিল, “বাবা আমাকে একটা আপেল এনে দিও।” “আচ্ছা” বলিয়া নটবর বাহির হইয়া গেলেন। সন্ধ্যার গাড়ীতে নটবর যখন আফিস হইতে ফিরিতেছিলেন তখন রাস্তার মােড়ে বুধার সহিত দেখা হইল। অন্যদিন বুধার এতক্ষণ দুপুর রাত, আজ আপেলের লােভে আর সে ঘুমাইতে পারে নাই। মাতা জোর করিয়া বিছানায় শােয়াইয়া রাখিয়া গিয়াছিলেন বটে কিন্তু সন্ধ্যার গাড়ী যখন বঁাশীর শব্দ করিয়া ষ্টেশনে প্রবেশ করিল তখন সে নিদ্রার ভাণ ত্যাগ করিয়া রান্না ঘরের দিকে সভয়ে চাহিয়া একেবারে পথে গিয়া উপস্থিত হইল। পিতাকে দেখিয়া ডানহাতখানি প্রসারিত করিয়া কহিল, “বাবা, আমার আপেল ?” নটবর কহিলেন, “ও যাঃ! ভুলে গেছিরে বুধা, কাল দেব।” মুহূর্তে বুধার মুখখানি এতটুকু হইয়া গেল, একটি ছােট নিঃশ্বাস ফেলিয়া সে কহিল, “আচ্ছা।” নটবর সত্যকথা বলেন নাই পথে যাইতে আপেলের দোকান দেখিয়া বুধার ফরমাইসের কথা মনে হইয়াছিল কিন্তু পকেটে একটিও পয়সা ছিল না। দাবােয়া
আপেল
নাই।
রামশরণ সিংহের কাছে চারি আনা পয়সা ধার চাহিয়া কিছু পান
কাল কোথা হইতে চারি আনা জুটিবে তাহা নটবর
জানিতেন না, শুধু নিরাশ পুত্রকে আশ্বাস দিবার জন্য আবার এই
প্রতিজ্ঞা করিলেন।
তার পর দিনও বুধা সমস্ত দিনমান সন্ধ্যার প্রতীক্ষায় কাটাইল।
আজ যে আপেল আসিবে তাহাতে তাহার সন্দেহ মাত্র ছিল না।
বাহিরের দ্বারের পাশে সে দাঁড়াইয়াছিল, দূর হইতে পিতাকে
দেখিয়াই ছুটিয়া আসিয়া তাহার হাত ধরিয়া কহিল, “বাবা আপেল
দাও।” নটবর ক্ষণেকের জন্য মুখ বিকৃত করিলেন তাহার পর
পকেটে হাত দিয়াই বলিলেন, “এই রে! সেটা বুঝি পড়ে গেছে।
হ্যা তাই তাে!” এ উপায় ছাড়া আজ আর বুধাকে প্রবােধ
দেওয়ার অন্য উপায় ছিল না। কিন্তু এই ছলনাটুকু করিতে
নটবরের চোখ ফাটিয়া জল আসিল।
বুধা পির হাত ছাড়িয়া দিল। তারপর সঙ্গ ছাড়িয়া সম্মুখে
গিয়া আবার ফিরিয়া কহিল, “হ্যা বাবা, সেটা কত বড় ছিল ?”
নটবর অঙ্গুলিগুলি বিস্তার করিয়া একটা কল্পিত পরিমাপ
দেখাইয়া দিলেন।
বুধা কহিল, “উঃ খুব বড় ত বাবা! আচ্ছা বাবা আবার কাল
আবে ?”
পরশু সােমবার মাহিনার দিন। নটবর কহিল, “কাল না
বাবা, সােমবার আদ।”
থার্ডক্লাশ
বুধা প্রশ্ন করিল, “সােমবার কবে বাবা?”
“কালকের দিন বাদ সােমবার। দুটো এনে দেব।”
মহা উল্লাসে বুধা কহিল, “অমনি বড় আর লাল এনাে বাবা?”
নটবর কহিলেন, “আচ্ছা।”
বুধা নাচিতে নাচিতে বাড়ীর উঠানে গিয়া দাড়াইয়া কহিল,
“মা, বাবা আমায় দুটো আপেল এনে দেবে, জানাে? খুব বড়।”
রন্ধনশালা হইতে বুধার মাতা স্বামীর দিকে চাহিয়া কহিলেন,
“দেখছ ? না পেতেই এই, পেলে যে কি করবে থােকা!”
বৌবাজারের মােড়ে দাঁড়াইয়া এক কাবুলির দোকানে নটবর
বাছিয়া বাছিয়া দু’টি বড় আপেল পছন্দ করিয়া দাম স্থির করিয়া
খা সাহেবকে কহিলেন, “এ দুটো আলাদা করে রেখে দিও
ফিরিবার পথে নিয়ে যাব।”
দোকানের সেরা আপেল দু’টি। অনেক দিনের প্রার্থিত ফল
দু’টি পুত্রের হাতে দিলে তাহার মুখে যে পুলকের হাসিটুকু দেখা
দিবে, কল্পনায় তাহা দেখিয়া নটবর দত্তের শীর্ণ মুখখানি উল্লাসে
উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল
বেলা তিনটা বাজিতেই মাহিনার বিল লইতে নটবর উঠিয়া
বড়বাবুর ঘরে গেলেন । বড়বাবু বিলখানা নটবরের সম্মুখে
ফেলিয়া দিলেন। বিল দেখিয়াই নটবরের বুকের মধ্যে ধড়াস
করিয়া উঠিল। বিলের পাশে কাজ সম্পূর্ণ না করিবার অজুহাতে
নটবর দত্তের মাহিনা দেওয়া স্থগিত রাখিবার হুকুম লেখা ছিল।
১০
আপেল
লাল পেন্সিলের এই ইংরাজী অক্ষর কয়টা যেন হাতুড়ী দিয়া তাঁহার
বুকের পাঁজর কয়খানি একেবারে চূর্ণ করিয়া দিল। কিছুক্ষণ
চুপ করিয়া থাকিয়া ভগ্নকণ্ঠে নটবর কহিলেন, “বড়বাবু—”
বড়বাবু কহিলেন, “আমি কিছু করতে পারব না মশাই,
সাহেব বড় কড়া লােক জানেন তাে? আপনি সাহেবের কাছে
যান।” বিলখানি তুলিয়া লইয়া নটবর আকাশ-পাতাল ভাবিতে
ভাবিতে বড় সাহেবের দরজায় গিয়া দাড়াইলেন। চাপরাশি খবর
দিলে ভিতর হইতে হুকুম আসিল, “কম্ ই”।”
নটবর সুদীর্ঘ প্রণতি করিয়া কহিলেন “হুজুর আমার মাহিনা
সাহেব তখন ওয়ালটেয়ারে তাঁহার পত্নীকে আগামী বড়দিনের
উপহার পাঠাইবার আয়ােজন করিতেছিলেন, তাঁহার সকল কথা
শুনিবার সময় ছিল না, ইংরাজীতে কহিলেন, “হবে না। কাজ
ফাকী দিলে আমার কাছে কোনও মাফ নেই। যাও।”
নটবর কাদিয়া ফেলিলেন। কহিলেন, “হুজুর।
কালই সারা
রাত খেটে সব শেষ করে দেব।”
সাহেব চিঠি হইতে কলম তুলিয়া কহিলেন, “তা হলে পরশু
মাইনে পাবে।”
“হুজুর, একটা টাকা, অন্তত আট আনা পয়সা দেওয়ার
হুকুম
“নট এ ফার্দিং! যাও”, বলিয়া ফলের দুইটা ঝুড়ি টেবিলের
উপর তুলিয়া লেবেল আঁটিয়া দিলেন “ফর হারি” “ফর নেলী।”
১১
থার্ডক্লাশ হারি সাহেবের পুত্র ও নেলী কন্যা ; উভয়ে তখন মাতার সহিত স্বাস্থ্যবাসে ছিল। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া নটবর বাহির হইয়া আসিলেন এবং বিলখানি বড়বাবুর হাতে দিয়া কহিলেন, কিছু হলাে না।” একবার মনে হইল বড়বাবুর কাছে একটা টাকা ধার চাহিয়া লইবেন। কিন্তু হঠাৎ যেন সমস্ত জগৎটার উপর কেমন ঘৃণা জন্মিয়া গেল, ইচ্ছাটা কাজে পরিণত করিবার আর প্রবৃত্তি হইল না। সমস্ত পথ মনে পড়িতে লাগিল বুধার কথা। কাল রবিবার সমস্তটা দিন বুধা তাহাকে তঁাহার সােমবারের প্রতিশ্রুতির কথা মনে করাইয়া দিয়াছে ; সে বেচারা যে আজ সারাদিন পথের দিকে চাহিয়া থাকিবে সে বিষয়ে তাঁহার সংশয় ছিল না। এতক্ষণে নিশ্চয়ই সে ষ্টেশনের রাস্তার ধারে পিতার প্রতীক্ষায় দাড়াইয়া আছে। তঁহাকে দেখিলেই আগ্রহে ছুটিয়া আসিবে—তাহার পর ? ভাবিতে ভাবিতে নটবর যে বহুবাজারের মােড়ে আসিয়া পৌছিয়াছেন সে খেয়াল আদৌ ছিল না। হঠাৎ এক ঝাঁকামুটের ধাক্কা খাইয়া তাহার চমক হইল। রাস্তার অপর ধারেই সেই আপেলের দোকান। ধীরে ধীরে রাস্তা পার হইয়া গিয়া দোকানের সম্মুখে দাঁড়াইয়া নটবর সেই আপেল দুইটির দিকে চাহিলেন। বুধার কথা মনে হইল ; মনে হইল যেন একটা নগ্নকায় শিশু আগ্রহে হাত বাড়াইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিতেছে, “বাবা আপেল ?” ১২ আপেল আবিষ্টের মত নটবর আপেল দু’টি তুলিয়া লইলেন। পর মুহূর্তেই কে আসিয়া তাহার হাত চাপিয়া ধরিয়া চীৎকার করিয়া উঠিল, “এই চোট্টা হয় !” তাহার পর আর কিছু মনে ছিল না, যখন জ্ঞান হইল তখন নটবর থানার গারদ ঘরে। বেলা পাঁচটা হইতে বুধা ষ্টেশনের পথে দাড়াইয়াছিল। সাড়ে ছয়টার গাড়ী হু হু করিয়া ষ্টেশনে প্রবেশ করিল, তখন আনন্দে তাহার বুক কঁপিয়া উঠিল। তাহার পর যখন যাত্রীরা পথ দিয়া চলিতে লাগিল তখন আর তাহার ধৈৰ্য্য রহিল না। প্রতি মুহূর্তেই সে একবার করিয়া অগ্রসর হইতে লাগিল। প্রত্যেক দূরের মানুষটিকেই পিতা বলিয়া মনে হইতেছিল, আগ্রহে অগ্রসর হইয়া পথচারীর মুখের দিকে চাহিয়া আবার সে ফিরিয়া আসিতেছিল। এমনি করিয়া একঘণ্টা কাটাইয়া যখন আর কেহ রাস্তায় চলিবার রহিল না তখন শুষ্কমুখে সে ফিজিয়া আসিয়া কহিল, বাবা আসেনি মা। বাবা এলে আমাকে ডাকূবে হ্যা, মা ? ইহার পরে নটার গাড়ী ছিল। আজ মাহিনার দিন ; হয়তাে জিনিষপত্র কিনিয়া আনিতে দেরী হইয়া গেছে ভাবিয়া হৈমবতী কহিলেন, “আচ্ছা, তুই ঘুমাে এখন।” রাত্রে যখন বুধা স্বপ্ন দেখিতেছিল যে তাহার ছেড়া জামার পকেট দু’টা আপেলের ভারে ফুলিয়া উঠিয়াছে, তখন দারােগা রিপােট লেখা শেষ করিয়া নটবর দত্তকে চুরি অপরাধে কোর্টে উপস্থিত করিবার অর্ডার লিখিতেছিলেন।
তীর্থে (১) তীর্থ। অতি প্রাচীন ; বিগ্রহ জাগ্রৎ, মন্দির প্রকাও, তাহার সম্মুখে প্রশস্ত চত্বর, চত্বরের মধ্যে নাটমন্দির। নাটমন্দিরে তেত্রিশজন ব্রাহ্মণ তেত্রিশখানি কুশাসনে সারবন্দী হইয়া বসিয়া গীতা, চণ্ডী ও শ্রাদ্ধের মন্ত্র এক মিলিয়া এক দুর্বোধ্য শব্দলােকের সৃষ্টি করিয়াছে। বেলা আটটা। পাণ্ডাবাড়ীর ছেলেরা স্নান সারিয়া যাত্রী পরিবার জন্য রাস্তার মােড়ে দাড়াইয়া বিড়ি ফুকিতেছে। জবা ফুলের মালা গলায়, মাথায় টেরী, কপালে সিঁদুরের ফোটা বাঙ্গীর দল ছুরি ধার দিতেছে। শনিবার। পাঠার দাম চড়িয়া গিয়াছে। (২) বেলা নয়টা। তীর্থযাত্রীর আগমন আরম্ভ হইল। ছারা, ট্যাক্সি, রিক্সা, হাম, ল্যাণ্ডো সর্বপ্রকার বাহনে ভক্তেরা আসিতে লাগিলেন। “হেঁগ, গাে মা, একটা আধলা, লক্ষ্মী মা!” “লেংড়া কাণা কো—” “আরে এদিকে এদিকে । আমার দোকানে বসবেন, আসুন!” “মালা চাই ? পাঠা? কটা?” “কি মুখুয্যে, আমার সাবেক কালের খদ্দের তুমি টাছ!” “ওরে বাজা, বাজা! আরতির বাজনা বাজা!’ পূজা আরম্ভ হইয়াছে। ১৪ ?
তীর্থে রামু মালীর ছেলের জরবিকার, সে মায়ের বাড়ীতে পূজা দিতে আসিয়াছে। স্নান করিয়াছে এক ঘণ্টা, পূজা দিবার অবকাশ পায় নাই। পূজাটা নিৰ্বিয়ে দিতে পারিলে পুত্র নীরােগ হইয়া উঠিবে এই আশায় দাড়াইয়াছিল। “পথ ছাড় ! পথ ছাড় !” রামু সরিয়া পথ দিল। বিলাস হালদার আসিলেন, আজ তাহার পালি। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। বাহুতে সােনার বিছা—তাহাতে গণ্ডা দুয়েক নানা আকারের ললাটে রক্ত চন্দনের রেখা। রামু সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিয়া কহিল, “ঠাকুর আমার পূজোটা?” “দাড়িয়ে থাক্, ক’টাকার পূজো ?” “পাঁচ সিকের।” “দাড়িয়ে থাকু।” কবচ। (৩) মন্দির। তাহার মধ্যে কালীমূর্তি। দুই দিকে চৰ্বির ঘৃত- প্রদীপ । জবাফুল আর বিপত্রে মাতার আকণ্ঠ আবৃত। মূৰ্ত্তির মাথার উপরে বিজলী-বাতি, সম্মুখে প্রকাণ্ড পিতলের থালায় পয়সা আর সিকি পুঞ্জীকৃত। সােরগােল। “কোথা যাচ্ছেন ? দ্বার-প্রণামী দিয়ে যান।” “বাবা নকুলনাথের নামে এক পয়সা।” “পঞ্চায়েতের পয়সাটা দিলেন না ? নিন্ চরণামৃত, দিন পয়সাটা।” পড় বাছা, সৰ্বমঙ্গল মঙ্গলা, দক্ষিণে চার পয়সা, কল্যাণ হােক্ !” “নাও বাছা, উঠে পড়, আমার যাত্রী দাড়িয়ে রয়েছে, তমি একাই সে
থার্ডক্লাশ
•
ঘণ্টাভর মাথা কুছ ।” বৃদ্ধা প্রবাসী সন্তানের কল্যাণে ভিক্ষা
করিতেছিল, সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিয়া পড়িল। “এস গাে এস, চটপট
সেরে নাও। পড়, কালী কালী মহাকালীং-আচ্ছা হয়েছে।
নাও সিদুর আর বেলপাতা, ছেলের মাথায় দিও। আর জোড়া
পাঁঠা মানৎ করে’ যাও, ছেলে ভাল হয়ে যাবে। আর আমাকে
খবর দিও, মানৎ শােধ দেওয়ার দিন আমি নিয়ে আসব।”
বেলা দশটার সঙ্গে সঙ্গে বলির বাজনা বাজিল ; অনেকগুলি
মাথা নমস্কারের ভঙ্গীতে নত হইল সেই সঙ্গে দশ বারােটা
পশু আতঙ্কে আর্তনাদ করিয়া উঠিল।
বলি হইয়া গেল, পূজা দেওয়া হইল না। আশঙ্কায় রামুর
কঁপিয়া উঠিল। আগ্রহে মন্দিরের সিডির দুই ধাপ উপরে
উঠিতেই পূজারী ধমক দিলেন, “আরে সর্বনাশ! নেমে যাও,
নেমে যাও! ভােগ রাগ হয়নি। কি সব অনাচার।”
রামু অপ্রতিভ হইয়া নীচে নামিয়া নর্দামার ধারে দাঁড়াইল।
নর্দামা দিয়া তখন রক্তগঙ্গা বহিয়া যাইতেছে।
(৪)
“ওরে বাজা, বাজা, ভােগের বাজনা বাজা!
ঢােল সানাই একসঙ্গে বাজিয়া উঠিল, ড্যাং না পেী।
“সরে যা, সরে’ যা সব, ভােগ আছে !”
রামু নর্দামার প্রান্ত ছাড়িয়া একেবারে চত্বরে আসিয়া দাঁড়াইল।
১৬
তীর্থে
ভো ঘর! সবুজ রঙের প্রকাণ্ড হাওয়া গাড়ী।
“কে এলেন বুঝি ! সরে’ বা সব, দাঁড়া সরে দাঁড়া! আমার
জপের মালাটা তুলে রাখ ঠাকুর !” বিলাস হালদার চত্বরে
নামিলেন।
নামিল অনবগুষ্ঠিত ভূষণমণ্ডিতা নারীমূর্তি। দীর্ঘ রজনী
জাগরণে আরক্তনে, পরিধানে শুভ্র গরদ, হাতে বেলফুলের মালা।
কুসুম বাইজি! কুসুম বাইজী এসেছেন! ভােগের থালা
সরিয়ে পথ করে দাও ঠাকুর। আসুন! আসুন !!” বিলাস হালদার
গাড়ীর নিকট আসিয়া দাড়াইলেন। পশ্চাতে ডালার দোকানীরা।
“মায়ের পাঠা হবে তো ? কটা?”
“শ্রাদ্ধ করাবেন না চণ্ডীপাঠ ?”
আজ দিন ভাল আছে মা, একটা স্বস্ত্যয়নের যােগাড় করে দিই?
গঙ্গা নাইবেন তাে? না স্নান করে এসেছেন? তিলক হয়নি
যে ! ওরে চন্দন, রক্ত চন্দন আর ছাপগুলো আন, দরজার কাছ
থেকে সবাইকে সরিয়ে দাও ঠাকুর। কার্পেটের আসন বিছিয়ে
?
সম্মুখে বিলাস হালদার, দুই পার্শ্বে পূজারী, পশ্চাতে চারিখানি
থালায় পূজার উপকরণ বহিয়া চারিজন ব্রাহ্মণ। সুন্দরী মন্দিরে
উঠিলেন।
বেলা বারােটা।
পশুর রক্তের ধারা শুকাইয়া কালাে হইয়া
গেছে, পুত্রের পথ্যের সময় উপস্থিত। রামু চঞ্চল হইয়া উঠিল।
২
১৭
থার্ডক্লাশ
কুসুম বাইজী জপ করিতেছেন।
জপ শেষের প্রতীক্ষায়
বিলাস হালদার বারন্দায় দাঁড়াইয়া। চত্বরে মালী, বাণী, পাঠা-
ওয়ালা সাগ্রহে অপেক্ষা করিতেছে।
মায়ের ভােগের অব্যঞ্জনের উপর মাছি উড়িতেছে। কুসুম
বাইজীর মানসিক কি আছে জানা যায় নাই, কাজেই ভােগ
দেওয়া অসম্ভব।
গুডুম ! একটার তােপ।
আর অপেক্ষা করা চলে না। দু’দিনের সঞ্চিত উপার্জনের
বিনিময়ে সংগৃহীত পূজার উপচার একটী খঞ্জ ভিখারীর হাতে
তুলিয়া দিয়া নর্দমা হইতে একটা রক্তচর্চিত বিদ্বদল তুলিয়া মাথায়
ঠেকাইয়া রামু চলিয়া গেল। যাইবার সময় বারবার মন্দিরের
দিকে চাহিয়া রামু মালী যুক্তকরে প্রণাম করিতে করিতে মায়ের
কাছে কি নিবেদন জানাইয়া গেল তাহা সেই জানে।
১৮
লাটের স্পেশাল
মাঘের দ্বিপ্রহর। আঙ্গিনায় রৌদ্রের দিকে পিঠ করিয়া বেণু
সর্দার সম্মুখে একখানি পাথরের থালায় এক রাশ সরুচালি
লইয়া মাধ্যাহিক জলযােগের উপক্ৰম করিতেছিল। রঙ্গীন ভিজা
গামছাখানিতে মাথায় আধ-ঘােমটা টানিয়া স্ত্রী বিরাজ পিঠার
কাঠা-হাতে সম্মুখে দাড়াইয়াছিল। এমন সময় আহ্বান আসিল,
“সর্দারের পােয় বাইরে এসতত একবার।”
দফাদারের কণ্ঠস্বর শুনিয়া বেণু উঠিয়া পড়িতেছিল, বিরাজ
তাড়াতাড়ি কহিল, “মুখের ‘গাটা খেয়ে যাও গাে ।”
“দুখানা খেয়ে আমার পেট ভরবে নারে, বিরাজ! তুই
এখানে দাড়িয়ে থাক্, আমি এক্ষুনি আছি!”
বেণু হাত ধুইয়া উঠিয়া গেল।
মিনিট দশ পর ফিরিয়া আসিয়া হতাশস্বরে বেণু কহিল,
হাতের সরুচালি খাওয়া অদেষ্টে নেই
দে দিকি পাগড়ীটা এখুনি আবার বেরােতে
হবে।”
“এই ভর দুপুরে আবার কোন্ পােড়ার মুখাের মুখ পুড়েছে
যে, তােমায় যেতে হবে ?” বিরাজ কহিল।
“চেঁচানিরে পাগলী। লাটের গাড়ী আছে, পাহারায় যেতে
১৯
বিরাজ !
থার্ডক্লাশ
হবে। দে পাগড়ীটা। দাড়াওগো দফাদার দা, পাগড়ীটা বেঁধে
যাচ্ছি।” দ্বারের দিকে চাহিয়া বেণু কহিল।
বাহির হইতে জবাব আসিল, “একটু চটপট সেরে নাও,
সর্দারের পােয় যেতে হবে আবার পাকা ছ’ কোশ।”
পাগড়ী বাঁধা শেষ হইলে বিরাজ দু’থানা সরুচাকলি হাতে
করিয়া স্বামীর সম্মুখে দাড়াইয়া মিনতি করিয়া কহিল, “আমার
মাথা খাও, এই দু'খানি গালে দিয়ে এক ঘটি জল খেয়ে যাও।
সেদিনও গড়েছি, খেলে না, কোথায় মড়া অগলাতে গেলে !
আজ
“এখন খেলে আর হাঁটতে পারব নারে বিরাজ। সাঁঝে
গাড়ী পার করে দিয়ে পহর রাতেই ফিরে আসব ! তুই উনুনে
একটু জল বসিয়ে রাখি। পিঠেগুলো ভালো করে ঢেকে
রাখগে !”—বলিয়া পিষ্টক-পের দিকে একটি সতৃষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ
করিয়া লাঠি হাতে বেণু চৌকিদার বাহির হইয়া গেল।
স্বামীর বহুদিনের আকাঙ্ক্ষিত সর্বাপেক্ষা প্রীতিকর এই খাদ্যটি
অনেক দিন চেষ্টা করিয়াও সে সম্মুখে বসিয়া খাওয়াইতে পারিল
! পিঠাগুলি গুছাইয়া তুলিয়া বিরাজ গামছায় চোখ মুছিল !
ঘরের বিঘ্নটিকে তত বেণু কোনমতে কাটাইয়া আসিল কিন্তু
পথে আর এক বিঘ্ন উপস্থিত। একটি স্বল্পজল অন্ধকারে ডােবার
ধারে বেণুর সাত বছরের পুত্র মনাই বঁড়শী নাচাইয়া ‘চ্যাং মাছ
ধরিতেছিল। প্রত্যহ দ্বিপ্রহরে এইটি ছিল তাহার নিত্যকর্ম।
২০
লাটের স্পেশাল বেণু তাহার দৃষ্টি এড়াইবার জন্য অতি লঘুপদে আসিতেছিল কিন্তু মনাইকে ফাকি দিতে পারিল না। পিতার পরিচিত নীল পাগড়ী সে দূর হইতে দেখিয়াছিল কিন্তু পিতা অন্য পথে চলিয়া যাইবে ভয়ে, ভাবে ভঙ্গীতে কোনােরূপ চাঞ্চল্য প্রকাশ করে নাই। বেণু সতর্ক পদে নিকটে আসিতেই, সে ছিপ ফেলিয়া এক লম্ফে পথের মাঝখানে উঠিয়া আসিল এবং তাহার পােষাকের প্রান্ত মুঠা করিয়া কহিল, “কোথা যাচ্ছ বাবা?” বেণু বিপদে পড়িল ! সত্য কথা বলিলে মনাই সঙ্গে যাইবার জি ধরিবে। একটু ভাবিয়া কহিল, “কালীতলায়।” জগতে মনাইয়ের ভীতির একমাত্র স্থান ছিল এই বারােয়ারী কালীতলা। সেখানে যত ভূত আর প্রেতের আচ্ছা, কোন সূত্রে এই তত্ত্বটী তাহার শিশু-মস্তিষ্কে প্রবেশ করিয়া বাসা বাঁধিয়াছিল। কালীতলার নাম শুনিয়া সে এক পা পিছাইয়া গিয়া কহিল, “সাঁঝের আগে ফিরবে বাবা, জালে?” পুত্রের সাবিহবল দৃষ্টি দেখিয়া বেণু কহিল, “সাঁঝের আগেই ফিরব মনাই, তুই ঘরে যা” তাহার পর পুত্রকে একটি চুমা দিবার অভিপ্রায়ে দুই হাত বাড়াইয়া তাহাকে বুকে তুলিতে যাইতেছিল, এমন সময় পিছনে দফাদার কহিয়া উঠিল, “পথে দাড়িয়ে আর দেরী কোরাে না, সর্দারের পাে, বেলা ভাটিয়ে আছে।” অগত্যা মাথা নীচু করিয়া পুত্রের গালে তাড়াতাড়ি একটা চুমা ২১ থার্ডক্লাশ দিয়া বেণু কহিল, “ঘরে যা মনাই তাের মা পিঠে নিয়ে বসে আছে।” পিঠার কথা শুনিয়া সে ছিপগাছি তুলিয়া লইয়া বিনা- বাক্যে বাড়ীর পথ ধরিল এবং কিছুদূর গিয়া গলির মােড়ের বেত ঝােপের আড়াল হইতে মুখ বাহির করিয়া পিতাকে অবশ্য অবশ্য সন্ধ্যায় ঘরে ফিরিবার জন্য দ্বিতীয় বার উপদেশ দিয়া গেল। (২) শীতের ছােট শেষ বেলাটি অনেকক্ষণ পূর্বেই শেষ হইয়া গিয়াছে। প্রতি চল্লিশ হাত অন্তর চৌকীদার নামধারী এক-একটা মানব-সন্তান লাঠি ঘাড়ে করিয়া লাটের স্পেশালের প্রতীক্ষায় পঁড়াইয়া খােলামাঠের তীব্র হাওয়ায় শীতে কাপিতেছিল। গাড়ী আসিবার সময় ছিল সন্ধ্যায়, কিন্তু রাত্রি প্রহর উত্তীর্ণ হইয়া গেল গাড়ী তখনও আসিল না। বেণু অধীর হইয়া উঠিল। দিব্য চক্ষে সে দেখিতে পাইল, পাথরের থালায় সরুচালি সাজাইয়া এতক্ষণে বিরাজ প্রদীপ জ্বলিয়া তাহার প্রতীক্ষা করিতেছে। বেণু জিজ্ঞাসা করিল, “গাড়ীর খবর কি দফাদার দা?” দফাদার নিজেও বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিল, কহিল, “মালিক হুজুরদের হুকুম তামিল করতে এসেছি। থানা থেকে বলে দিলে সজ বেলায় যাবে গাড়ী, এখন তাে রাত এক পহর কঁাথাখানাও আনিনি !” দফাদার মাথার পাগড়ী খুলিয়া গায়ে জড়াইল। শীত তখন ক্রমেই তীব্র হইয়া উঠিতেছিল। ২২ লাটের স্পেশাল বস্তুতঃ গাড়ী ছাড়িবার সময় ঘণ্টা পাঁচেক পিছাইয়া দেওয়া হইয়াছিল, কিন্তু গণ্ডগ্রামের চৌকীদারের কাছে সে সংবাদ পৌছে নাই। এমন সময় মেঘ করিয়া আসিল। চৌকীদারের দল প্রমাদ গণিল। ইহার পর যদি বৃষ্টি আরম্ভ হয় তাহা হইলে প্রাণ লইয়া গৃহে ফেরা অসম্ভব, এ কথা দফাদারকে স্পষ্ট ভাষায় জানাইতে কেহই দ্বিধা করিল না। দফাদার একটি ছােট পটলী উচু করিয়া ধরিয়া কহিল, “শীতের ওষুধ সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আয় দেখি !” ইঙ্গিতটা সকলেই বুঝিল। পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে “বােম্ বােম্ ভােলানাথ’ শব্দে স্থানটি মুখর হইয়া উঠিল এবং গঞ্জিকার ধূমে অন্ধকার আরও জমাট বাঁধিয়া গেল। দফাদার ডাকিল, “সর্দারের পাে, কোথায় গা ?” বেণু জবাব দিল, “উহু ! আমি খাব না দফাদার দা।” কালে সে পূরাদস্তুর গঞ্জিকাসেবী ছিল কিন্তু বৎসর তিনেক হইল বিরাজ তাহাকে তাহার শাখা সিদুরের দিব্য দিয়া নেশা ছাড়াইয়াছে ; সেই অবধি বেণু গাঁজার কলিকা স্পর্শ করে নাই। শীতের ওষুধ সেবন করিয়া চৌকীদারের দল কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হইল। কেবলমাত্র বেণু দুই হাঁটু মুড়িয়া তাহার উপর মুখ রাখিয়া শীতে ঠক্ ঠক্ করিয়া কাপিতে লাগিল। হুস! হুস! “উঠে দাড়া সব। লাঠি ঘাড়ে ঠিক হয়ে সানে চেয়ে থাক।” ২৩
ডক্লাশ
দফাদার হাঁকিল ।
হস্! হুস্ ! গাড়ী চলিয়া গেল—মাল গাড়ী।
বিরক্ত হইয়া চৌকীদারেরা অদৃষ্টকে অভিসম্পাত দিল।
দফাদার কহিল, “শীতের ওষুধ আর একবার তৈরী করে' নাও
দেখি, শীত ভয়ে ভাগবে।”
ঔষধ সেবন চলিতে থাকিল, দূর হইতে বেণু ধূম-কুণ্ডলীর
দিকে চাহিয়া রহিল, নড়িল না।
রাত্রি দশটায় দুই এক ফোটা বৃষ্টি পড়িল । বেণু কোনক্রমে
উঠিয়া দাড়াইয়া দেখিল যে, সঙ্গীর। চার পাঁচজন করিয়া কুণ্ডলী
পাকাইয়া ভূমি-শয্যায় আশ্রয় লইয়াছে।
বেণুর মনে হিংসা হইল। সৰ্বাঙ্গ তখন অসহ শীতে আরষ্ট
হইয়া আসিতেছিল ; পদতলের পাথরের নুড়িগুলি মনে হইতেছিল
বরফের টুকরার মত। কিছু দূরে তারের বেড়ায় হেলান দিয়া
দফাদার ঘুমাইতেছিল। বেণু কিছুক্ষণ কি ভাবিল তাহার পর
দফাদারের গাঁজার সরঞ্জামের পুটলীটি বাহির করিয়া আনিল।
কলিকায় আগুন দিয়া সে মৃদুস্বরে কহিল, “কিছু মনে করিনি,
বিরাজ! তাের শাখা-সিদুর অক্ষয় হােক্আজ এক টান না
টালে আর বাঁচব না। বােম্! বােম্!”
অনেক দিনের অনভ্যাস, কলিকায় বার দুই দম দিতেই বেণুর
মাথা ঘুরিয়া উঠিল, লাইনের দিকে ঠিকুরিয়া পড়িয়া সে চীৎকার
করিয়া উঠিল, “মাথায় একটু জল দাও গাে দফাদার দা! সারা
২৪
লাটের স্পেশাল
পিথিম ঘুরছে!”
তাহার আড়ষ্টকণ্ঠ হইতে কথাগুলি বাহির
হইল অতি ক্ষীণস্বরে, তাহাতে দফাদারের নিদ্রাভঙ্গ হইল না।
মধ্য রাত্রি। হিমসিক্ত আচ্ছাদনের নীচে কুণ্ডলী করিয়া
তন্দ্রাচ্ছন্ন প্রহরীর দল কাপিতেছিল।
এমন সময় দূরের কোনাে
সজাগ প্রাণীর কণ্ঠ শােনা গেল, “লাটের গাড়ী। লাটের গাড়ী।”
প্রদীপ্ত আলােক-ফলকে নিশীথের অন্ধকার বিদীর্ণ করিয়া
রক্তচক্ষু লৌহ-দানব ছুটিয়া আসিল। চৌকীদারের দল কপিতে
কঁপিতে ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। কেবল উঠিল না
একজন! যেখানে বেণু সর্দার পাহারায় ছিল সেখান হইতে অতি
ক্ষীণ একটি আর্তনাদ শােনা গেল—মুহূর্তের জন্য। এঞ্জিন কোনও
অজ্ঞাত বস্তুতে বাধা পাইয়া একটু দুলিল কিন্তু তাহার গতি মন্থর
হইল না।
স্পেশাল চলিয়া গেল। পরদিন প্রাতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপিত
হইল যে লাটের গাড়ী নিরাপদে সহরে পৌছিয়াছে।
বেণু সর্দারের নিষ্প্রাণ দেহপিণ্ড যখন সহরের ‘মর্গ হইতে
শতদীর্ণ হইয়া ফিরিয়া আসিল তাহার পূর্বেই বিরাজের
শুখাইয়া কাঠ হইয়া গিয়াছে
২৫
চণ্ডীমণ্ডপ প্রকাণ্ড একটি বেলগাছ। তাহার ছায়ায় মােহন ঠাকুরের চণ্ডীমণ্ডপ। সম্মুখে আঙ্গিনা, প্রথম রাত্রির পরিষ্কার জ্যোৎস্নায় ধব, ধব করিতেছে। কোজাগরের পরের দিনের রাত্রি। চণ্ডীমণ্ডপে সেদিন মােহন- পুরের সমজিপতিদের বার্ষিক বৈঠক। সামাজিক দুস্কৃতিকারীদের বিচার ও দণ্ডদানের সভা। দেবীর আসনের চৌকীতে তখনও সিন্দুর জ জ করিতেছে। সেই আসনকে কেন্দ্র করিয়া কুশাসন এবং পাটি বিছাইয়া সমাজ- পতিরা বসিয়াছেন। প্রাঙ্গণে প্রকাণ্ড নিমের গুড়ি জলন্ত, তাহার পাশে চিমটা হাতে দীর্ঘদেহ বংশী গােপ তামাক জোগাইতেছে। চণ্ডীমণ্ডপে ডাবা থেলাে ও বাঁধা হুকা অস্থাবর সম্পত্তির মত হস্ত হইতে হস্তান্তরে ঘুরিতেছে, পণ্ডিত মহাশয় মহিষ-শৃঙ্গের কৌটা খুলিয়া ঘন ঘন নস্য লইতেছেন! কাশি এবং হাঁচির শব্দে চণ্ডীমণ্ডপ মুখর। “না হে চক্কোত্তি, আর সওয়া যায় না। দিন-কাল ক্রমেই খারাপ হয়ে আছে। তােমরা গায়ে থাক, রাঘবও রয়েছে- তােমাদেরই দেখা-শােনা উচিত, এখন হাল ছেড়ে দিলে শেষে সালাতে পারবে না।” “দেওয়ানজী যা বললেন ঠিক! কিন্তু রাঘব করবে কি ? ২৬ চণ্ডীমণ্ডপ মােহন ঠাকুরের ছেলে হলেই ত হয় না, বয়সটা কি তার ? আপনি থাকুন একটা মাস, দেখুন কি করি!” সাহেবপুরের রেশমকুঠির দেওয়ান হরি মুখুয্যে ম্রেজাইয়ের বােম খুলিয়া স্ফীতােদর বাহির করিয়া কহিলেন, “বুঝি তাে সব দাদা, কিন্তু চাকর আর কুকুর। এই পনেরটা দিন ছাড়া সাহেব ছুটি মঞ্জুর করে না তার কি ? গাঁয়ে থাকতে গেলে চাকুরী ছাড়তে হয়, একবার ভাবি ন্যায়রত্ন মহাশয় কহিলেন, “সর্বনাশ! তুমি আছ তবু মােহন- পুরের গাজনাতলায় ঢাক বাজে হে মুখুয্যে। চাকুরী তত তােমার একার নয়, দশ জনের। দশ জন খাচ্ছে। পাল-পৰ্বণে অতিথ বােষ্টম সেবা হচ্ছে। গােয়াল মালীরা টিকে আছে। দীর্ঘজীবী হয়ে থাক, বাবা !” হরি মুখুয্যে ন্যায়রত্ন মহাশয়ের পায়ের ধূল লইয়া কহিলেন, “এটা কি একটা কথা, পণ্ডিত মশায় ? আপনাদের আশীৰ্বাদই সব, দশ জনের বরাতেই হচ্ছে, আমি তাে নিমিত্ত।” দেওয়ানজী শ্ৰেজাইয়ের বােম আঁটিয়া দিলেন ! চণ্ডীমণ্ডপের সম্মুখে আঙ্গিনায় সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করিয়া দাড়াইল এক বৃদ্ধ। “কে, সাধুচরণ ?” নিজের অপরাধের গুরুত্ব সে জানিত। পিতে কাঁপিতে কহিল, “আজ্ঞে, বাবাঠাকুর !” ২৭
থার্ডক্লাশ
“ওরে বেটা হারামজাদা।”—শশাঙ্ক ঘােষাল হকিলেন।
“খড়ম পেটা করে তাড়াও ব্যাটাকে গাঁ থেকে; ধৰ্ম্ম নষ্ট
করলি”-ন্যায়রত্ন মহাশয় নস্য লইলেন।
সাধুচরণ কপিতে
লাগিল।
দেওয়ানজী ডাকিলেন, রাঘব কোথায় হে? কি করা যাবে
এর, এস দেখি শুনি।”
স্বর্গীয় মােহন ঠাকুরের সন্তান রাঘব ঠাকুর।
বছর ত্রিশেক
বয়স। মাথায় বাবরী, বলিষ্ঠ
সুপুষ্ট দেহ। কপালে সিন্দুরের
ত্রিপুণ্ড, হাতে মােটা বাঁশের লাঠি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা। বয়সে
সকলের ছােট বলিয়া সকলের
সকলের পশ্চাতে এক কোণে বসিয়া
কলিকায় তামাক খাইতেছিলেন। সম্মুখে আসিয়া কহিলেন,
“বিচার আপনারা করুন, খুড়ােমশাই। আপনাদের যা মত হবে
আমারও
“তা কি হয়? দেওয়ানজী কহিলেন, মােহন ঠাকুরের ছেলে
তুমি বাবাজী। বয়সে যাই হও মােহনপুরে তােমার কথাই
আগে।
রাঘব ঠাকুরের গম্ভীর তীব্রকণ্ঠে ধ্বনিত হইল, “সাধুচরণ !”
রাঘব ঠাকুরের দিকে ভয়ে সাধুচরণ চাহিতে পারিল না,
চণ্ডীমণ্ডপের পৈঠায় মাথা রাখিয়া আর্তনাদ করিয়া কহিয়া উঠিল,
“আর করব না, বাবাঠাকুর! এবারকার মত
“বেটা হারামজাদা। এবারকার মত! মােহনপুরের জেলে
২৮
চণ্ডীমণ্ডপ
তুই বেটা তাের পাঙ্গীতে মূৰ্গী রেধে খেল সাহেব। মােহনপুরের
মুখে কালী দিলি বুড়োেকালে হারামজাদা!”
সাধুচরণ রাঘব ঠাকুরের সম্মুখে নতনেত্রে দাঁড়াইয়া কাপিতে
লাগিল মাত্র।
ন্যায়রত্ন মহাশয় নস্যদানী রাখিয়া খড়ম তুলিয়া লইলেন।
সাধুচরণ আর্তনাদ করিয়া উঠিল, “চিত্তির করব, বাবাঠাকুর।
“প্রাচিত্তির। পয়সা পাবি কোথা রে?
কে কে ছিলি
সে পিন্সীতে?
কাপিতে কঁপিতে আরও পাঁচজন নত মস্তকে কম্পমান দেহে
সাধুচরণের পশ্চাতে আসিয়া দাঁড়াইল।
জগু, মানকে, বৈকুণ্ঠ, বিপিন আর শ্যামাদাস ।
“মূর্গী আর পেঁয়াজের গন্ধ বড় ভাল রে হতভাগারা! আবার
তুলসীর মালা রেখেছি!”
জগু, মাণিক, বিপিন প্রভৃতি সমস্বরে কহিল, আর হবে না,
বাবাঠাকুর!”
“আর যদি কখনও হয় তাে, দেখছি লাঠি, পাঁজর ভেঙ্গে দেব।
গত বচ্ছর সনাতনের কথা মনে আছে তাে? যা সব। এবার
কালীপূজোর দিন পাঁচ মন মাছ জোগাতে হবে তােদের ছ’জনকে,
দাম পাবিনি।”
ছয়টি প্রাণী সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া কৃতজ্ঞতা জানাইল।
“তােদের পড়াশুদ্ধ ছেলে-মেয়েকে এখানে পাঠাবি সেদিন
২১
থার্ডক্লাশ
দু’বেলা প্রসাদ পাবে। যা বেটারা! আজ রাত ভাের কীর্তন
করে কাল সকালে স্নান করে আবি, একটু শান্তি দিয়ে দেব।
রাঘব ঠাকুর লাঠি কোলের উপর রাখিয়া আসন লইলেন।
বৃন্দাবন বিশ্বাস আসিয়া দাঁড়াইল। অপরাধ গুরুতর। কায়স্থ
পরিচয়ে পানীয় জল দিয়া সে এক সদ ব্রাহ্মণের ধর্ম নষ্ট করিয়াছে,
অভিযােগ এইরূপ। “পেরনাম হই" বৃন্দাবন যুক্তকরে প্রণাম
করিল।
“কি রে বেলা? বামুন-কায়েতকে জল খাওয়াতে সাধ হয় কন্ঠি
নিলেই পারি। এসব দুর্মতি কেন রে বেকি!” রাঘব ঠাকুরের
কথা শুনিয়া নতশিরে বৃন্দাবন দাড়াইয়া রহিল, জবাব দিল না।
‘বেটা! অধাৰ্মিক চণ্ডাল। ন্যায়রত্ন মহাশয় চীৎকার করিয়া
খড়ম ছুড়িলেন। বাঁ হাতে ললাটের রক্তধারা চাপিয়া বৃন্দাবন
বসিয়া পড়িল। পর মুহূর্তেই উঠিয়া খড়মখানিতে মাথা ঠেকাইয়া
সসম্রমে সেখানিকে চণ্ডীমণ্ডপের বােয়াকে তুলিয়া দিল।
“আর কে আছিস?” রাঘব ঠাকুর হাকিলেন। প্রাঙ্গণের
অন্ধকার কোণ হইতে জন কয়েক লােক উঠিয়া আসিল।
তাহাদের অঙ্গ কম্পমান, মুখ পাংশু।
“বাবাঠাকুর! বাবাঠাকুর !! উন্মাদের মত একটি স্ত্রীলােক
ছুটিয়া আসিল।
“বাবাঠাকুর !”
“আরে ছুনি, ছুসনি, বাদী-বৌ। হােথা থেকেই বল্।”
চণ্ডীমণ্ডপ বাগদী-বৌ ছাড়িল না, রাঘব ঠাকুরের পা জড়াইয়া ধরিল। সমস্ত অঙ্গ অশুচি হইয়া গেল, রাঘব ঠাকুর কুঞ্চিত করিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন। “দিলি ছুঁয়ে সন্ধ্যাবেলায় !” বাগদী-বৌ তথাপি পা ছাড়িল না—“বাচান, বাবাঠাকুর !” “আরে উৎপাৎ, হ’ল কি বল্ দেখি তাের ?” “মান-সরম্ভম সব গেল, বাবাঠাকুর। শেষ বেলায় ঘাঠে গিয়েছিল নারাণী । নেয়ে আবার পথে ও-গাঁয়ের রহিম সর্দারের বেটা বলে কি না—মেয়ে তাে আমার কলসী ফেলে পালিয়ে এসেছে। নজ্জায় মাথা কাটা গেল, বাবাঠাকুর। চণ্ডীমণ্ডপ শুদ্ধ সমাজপতিরা হুকা রাখিয়া উঠিয়া পড়িলেন। আঙ্গিনায় বংশী গােপের হাতের চিষ্টা ঝন্ ঝন্ করিয়া বাজিয়া বৃদ্ধ সাধু মাঝির অ্যাজ দেহ সহসা ঋজু হইয়া গেল। ক্ষতস্থানে খানিকটা ছাই লেপিয়া বৃন্দাবন উঠিয়া দাঁড়াইল। বাম হস্তের বংশ-যষ্টি দক্ষিণ হস্তে ধরিয়া রক্তচক্ষু রাঘব ঠাকুর তিন লক্ষ্যে প্রাঙ্গণ অতিক্রম করিয়া গেলেন, অপরাধীর দল বিনাবাক্যে তাহার অনুসরণ করিল, চণ্ডীমণ্ডপের অঙ্গন শূন্য হইয়া গেল। ন্যায়রত্ন মহাশয় শ্যামা বাগদীনীর হাত ধরিয়া তুলিয়া কহিলেন- ভয় করিসূনে বাগদী-বৌ। আমরা আছি। কার ঘাড়ে কটা মাথা দেখে নেব। আজ রাতে দেওয়ানজীর বাড়ীতে নারাণীকে নিয়ে এসে শুয়ে থাকবি। রামু, জগাই, বৈকুণ্ঠ যা উঠিল।
থার্ডক্লাশ
বাগদী-বৌয়ের সঙ্গে—মা-বেটিকে সাথে করে দেওয়ান-বাড়ীতে
পৌছে দে।”
ইহার পর চল্লিশ বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। মােহন ঠাকুরের
চণ্ডীমণ্ডপ দেনার দায়ে কয়েক হাত ঘুরিয়া শেষে ‘দি মােহনপুর
ড্রামেটিক ক্লাবে’ পরিণত হইয়াছে।
কোজাগরের পরের দিন সন্ধ্যা। আগামী দীপান্বিতার দিন
বারােয়ারী কালীতলায় মেবার-পতনের অভিনয় হইবে, তাহারই
মহলা চলিতেছিল।
ক্লাব-ঘরে জন বিশেক লােক বালক এবং যুবক। কয়েক
জোড়া তবলা, ডুগি, গুটি দুই হাম্মোনিয়াম, একখানা বেহালা
ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত; বেড়ার গায়ে খানকয়েক স্বদেশী ও বিদেশী
অভিনেতার বিচিত্র মুখভঙ্গীর ছবি, গুটিকয়েক বাবরী চুল, জরিদার
চাপকান ও একখানা বড় আয়না।
হার্মোনিয়ামে সুর দিয়া চপল কহিল, “আচ্ছা ‘সি-সার্পে’ ধরে
দাওতে দেখি।” জনকয়েক বালক মুখের জ্বলন্ত বিড়ি মাটিতে
নামাইয়া চীৎকার করিয়া উঠিল, ‘মেবার পাহাড়, মেবার পাহাড়,
যুঝেছিল যেথা প্ৰতাপ বীর।
“ও কি হচ্ছে অনঙ্গ! চিতাের বলছ অমন করে যে ! তােমার
‘ফিলিং হচ্ছে না মােটে। চোখটা একটু বোঁজ-মিঠে রকমের।
ঘাড়টা একটু কাং কর, বাঁ পাটা একটু সামনে। ব্যাস্। অনেকটা
৩২
চণ্ডীমণ্ডপ
হ'য়েছে! মনে ভাবতে থাক তুমি সত্যিকার অমরসিংহ, তাহলে
ঠিক ‘পচার’ আস্বে। ওরে একটা সিগারেট দে।”
স্মাষ্টার মশাইকে একটা সিগারেট দিয়ে যা কমল। আচ্ছা
নাচগুলােতে আমাদের খুব সাকসেস হবে, না ? কি বলেন, মাষ্টার
মশাই ?” অনন্ত উত্তরের প্রতীক্ষায় ব্যাকুলভাবে মাষ্টারের দিকে
চাহিল।
মাষ্টার অশ্বাস দিয়া একবার গা মােড়া দিতে দিতে বলিলেন,
“খুব সম্ভব। আমরা কল্কাতায় ছােরা খুঁজতে খুঁজতে হয়রান,
আর তােমাদের জেলে ছুতাের পাড়া থেকেই তিনটে প্লের নাচের
ছেলে জুটে যায়, তাও বিনি পয়সায় ! কি ? ডাব? না, খাব না
গলা ধরে যাবে, তার চেয়ে চা আনাে।”
“ওরে চায়ের জল চাপিয়ে দে।” তিন চারজন সমস্বরে
আদেশ দিল ।
একটি যুবক হাঁপাতে হাঁপাইতে আসিয়া উপস্থিত।
অনঙ্গ কহিল, “কি প্রেম-কোরক, হাফাতে হাঁফাতে আছিস
যে ?”
“আর শুনো না, অনঙ্গ-দা! বুড়ােরা সব বৈঠক বসিয়েছে,
বছে জাত গেল, ধৰ্ম্ম গেল! যত জেলে মালী ছােট জাতের
ছেলে নিয়ে নাকি আমাদের কারবার, তাদের হাতের জল খেয়ে
চা খেয়ে উচ্ছন্ন যাচ্ছি! হাঃ! হাঃ।”
প্রেম-কোরক হাসিতে হাসিতে বসিয়া পড়িল ।
থার্ডক্লাশ
“ফুল ! ছােট জাত! আর ওরা সব বড় জাত! ওরাই তাে
সর্বনাশ করলেন জাতটার। ও সব গোঁড়ামি
অনঙ্গ রুখিয়া উঠিল।
চপল হাম্মোনিয়ামে সুর দিয়া কহিল, “ছােট জাতই আমরা
চাই, তারা থাকলেই জাত থাকবে।”
“ধা ধিঙ্গাড় ধা, ধিঙ্গাড় ধা ধা” বােল আওড়াইয়া সুধাংশু
তবলায় চাটি দিয়া কহিল, “একবার তেরে কেটে তাক করে দিতে
পার না অন-দা ?
“আর দু’টি বচ্ছর সবুর কর সুধাংশু, মােহনপুরের চেহারা
একদম বলে দেব, দেখে নিও।” অনঙ্গ সিগারেট ধরাইল।
অঙ্গনে আসিয়া দাড়াইল বিপিন মালী। তাহার দৃষ্টি শঙ্কিত।
“কিরে, বিপিন, অত শুকনাে যে?”
“আজ্ঞে বাবু কি বলব, আপনাদের চরণে আছি।
“ব্যাপার কি বলতে দেখি। আবার বুঝি সমাজে ‘ঠেকা”
করেছে, না ?
“না, বাবু। বাড়ীর মেয়েদের তাে ঘাটে যাওয়া বন্ধ হ’ল
বাবু। কাল আমার বােনকে ঘাটের পথে ইসারায় ও পাড়ার
কবির সেখ ডাকছিল, আজ আমার মেয়ের হাত ধরে টেনেছে।
আর ভয় দেখিয়েছে যদি বােনকে তাদের বাড়ী না পাঠাই তবে
বাড়ীতে চড়াও করবে।”
“তুই কি করেছিস?”
৩৪
চণ্ডীমণ্ডপ
“গরীব মানুষ, আমি কি করব, বাবু?
আপনারা একটা
বিহিত করুন।”
চৌকীদারকে বলিস নি ?”
“বলেছি। সে গা’ করলে না। থানায় যেতে বলে। সে তাে
আবার দশ কোশ পথ, ঘর ফেলে যাই কি করে ? আপনারা আছেন
বাপের মত— হাউ হাউ করিয়া বিপিন মালী কাঁদিয়া উঠিল
“এই তােমাদের গাঁয়ের একটা মন্ত ‘ড্রব্যাক’—কাছে থানা
নেই।” বলিয়া মাষ্টার মহাশয় চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিলেন।
“সেটা ঠিক! যে রকম অবস্থা থানা কাছে না থাকলে
চলবার আর উপায় নেই। কাগজে এসব নিয়ে লেখালেখি কর।
বারও দরকার হয়ে পড়েছে দেখছি। শেষে কোনদিন গুণ্ডাগুলাে
আমাদেরই মাথা ফাটিয়ে দিয়ে যাবে। আচ্ছা তুমি যাও বিপিন,
বাড়ীতেই থেকো, কোথাও যেয়াে না। মেয়েদের আর ঘাটে জল
আনতে পাঠিও না। কাল সকালে একবার এসাে। ভেবে-চিন্তে
যা হয় করা যাবে। হঠাৎ তাে কিছু করা যায় না।”
বিপিন চলিয়া গেল। আধ ঘণ্টা পরে সমবেত কণ্ঠস্বরে সমস্ত
পল্পী মুখর হইয়া উঠিল—
“জলিল যেখানে সেই দাবাগ্নি
-সে রূপ-বহি পদ্মিনীর।
ঝাপিয়া পড়িল সে মহা আহবে
যবন-সৈন্য ক্ষত্রবীর।”
প্রত্যর্পণ যে তাহার নাম চাপা রাখিয়াছিল, সে মােটেই ভুল করে নাই। ফুলটির বর্ণের সহিত দেহের বর্ণের কোনও পার্থক্য ছিল না ; কিন্তু চাপার অদৃষ্ট ছিল মন্দ। দশ বছর বয়সে গােপাল বৈরাগীর সঙ্গে তাহার বিবাহ হইয়াছিল, তেরাে বৎসরে সে বিধবা হইল। তখন চাপার মা বাঁচিয়াছিল ; আর একবার চাপাকে পাত্রস্থ করিবার চেষ্টা বুড়ী অনেকবার করিয়াছিল কিন্তু কন্যা রাজী হইল না। তারপর মা মরিয়া গেল। চাপাও নিরুদ্বেগে দিন কাটাইয়া সবে বিশ বৎসরে আসিয়া পৌছিয়াছে। একেবারেই নিরুদ্বেগে দিন কাটাইয়াছে বলিলে মিথ্যা বলা হইবে। তাহার রূপের পূজারীর অভাব ছিল না; নবীন গােয়ালা হইতে আরম্ভ করিয়া ছিদাম বৈষ্ণব পৰ্য্যন্ত সকলেই এক আধবার তাহার অনুগ্রহ প্রার্থনা করিয়া ধমক খাইয়া গেছে। আজকাল আর বড় কেহ চাপার কাছে বিবাহের প্রস্তাব লইয়া আসিত না। একে চাপার ধর্মবাপ গ্রামের জমিদার রাজীববাবুর শাসন, তাহার উপর চাপার তিরস্কার, এই দুইটা পদার্থ পাণিপ্রার্থীদের আক্রমণ হইতে তাহাকে রক্ষা করিতেছিল। চাপা লেখাপড়া কিছু জানিত। গ্রামের প্রাইমারী বালিকা বিদ্যালয়ে লব্ধ বিদ্যাকে সে ক্রমাগত রামায়ণ মহাভারত পড়িয়া
প্রত্যর্পণ
অনেকদূর অগ্রসর করিয়া লইয়াছিল।
সকালে মুড়ি ভাজিয়া
বৈকালে রূপগার বাজারে সে মুড়ি বেচিত। রাত্রে ফিরিয়া তাহার
সঙ্গিনী জমিদার বাড়ীর ঝি লক্ষ্মীবুড়িকে শ্রোত্রীর আসনে বসাইয়া
মহাভারত পড়িত, এইরূপে চাঁপার দিন কাটিয়া যাইতেছিল।
সেদিন শ্রাবণের মেঘ অপরাহ্নেই সন্ধ্যা ঘনাইয়া তুলিয়াছে।
চাঁপা তাড়াতাড়ি মুড়ি বেচিয়া বাড়ী ফিরিল।
গৃহের বাহিরের
আঙ্গিনায় নিম গাছের ঘন ছায়া অন্ধকার রচনা করিয়া রাখিয়াছে।
আঙ্গিনায় পা দিয়াই চাপা দেখিল কে যেন বারান্দায় শুইয়া।
অন্ধকারে স্পষ্ট কিছু দেখিবার উপায় ছিল না, চাঁপা প্রশ্ন করিল,
“কে ও?” কোন উত্তর আসিল না। তখন মুড়ির ডালাটি
রাখিয়া একটি প্রদীপ হাতে করিয়া সে বাহিরে আসিল।
যে শুইয়াছিল তাহাকে চাপা কোনও দিন দেখে নাই। কুড়ি
বাইশ বছরের যুবক চক্ষু মুদিয়া শুইয়াছিল, চাঁপা তাহার কাছে
দাড়াইয়া আবার প্রশ্ন করিতেই যুবক চক্ষু মেলিয়া কহিল, “জল”।
চাঁপা জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে? কি হয়েছে?” যুবক শুধু
কহিল, “জল ! পিপাসা !” চাপা বুঝিল আগন্তুক অসুস্থ। ঘটাতে
জল আনিয়া তাহাকে জলপান করাইয়া গায়ে হাত দিয়া দেখিল
দারুণ জ্বর !
জিজ্ঞাসা করিল, “কে তুমি? এখানে কি করে
এলে ?”
যুবক যাহা বলিল, তাহার সংক্ষিপ্তসার এই যে, তাহার নাম
বনমালী।
মহেশতলায় যাইতে জ্বরের বেগ প্রবল হওয়াতে
থার্ডক্লাশ এইখানে শুইয়া আছে, জ্বর কমিলেই চলিয়া যাইবে। মহেশতলা রূপগাঁ হইতে দুই কোশ। আত্মীয় থাকিলে সেখানে সংবাদ পাঠাইবে ভাবিয়া চাঁপা প্রশ্ন করিল, “সেখানে তােমার কে আছে ?” যুবক সুধু কহিল, “কেউ না। মন্দির দেখতে যাচ্ছিলাম।” চপা একটু বিব্রত হইয়া কহিল, “তাইতাে ! এখানে তােমাকে কে দেখবে? কোথা থেকে বা এলে!” যুবক কহিল, “কাউকে দেখতে হবে না। আর কমলেই আমি চলে যাব। তুমি যাও।” স্বরে একটু তীব্রতা ছিল, চাঁপা তাহা অনুভব করিল। সে আর কিছু জিজ্ঞাসা করিল না, “মাথার কাছে ঘটিতে জল রৈল পিপাসা হ'লে খেও।” বলিয়া চাপা ভিতরে চলিয়া গেল। রাত ন'টায় চাপা একবার বাহিরে আসিল। বনমালী তখন জরের ঘােরে অস্ফুটস্বরে প্রলাপ বকিতেছিল। চাপা প্রমাদ গণিল। বাহিরে এই অবস্থায় একটা মানুষকে কি করিয়া ফেলিয়া রাখা যায়? আর ভিতরেই অপরিচিত যুবাকে স্থান দেয় কি করিয়া ? মানসিক অবস্থা যখন এইরূপ সেই সময়ে লক্ষ্মী আসিয়া উপস্থিত হইল। সমস্ত দেখিয়া সে কহিল, “তা আর কি করবে?” কষ্টের জীব’ ফেলতে তাে পারবে না ! বাইরের ঘরে মাচার উপর বিছানা করে দাও। আহা কার বাছা যেন! সেইটিই সুযুক্তি বােধ হইল; বিছানা করিয়া দুইজনে ধরাধরি করিয়া আনিয়া বনমালীকে ভিতরে শােয়াইয়া দিল। সারা রাত্রি
থাডক্লাশ
ধরিয়া মাথায় জল ঢালিয়া আর পাখার বাতাস করিয়া চাপা যখন
ঘুমাইয়া পড়িল তখন প্রভাত হইয়া গেছে।
সে দিন আর মুড়ি ভাজা হইল না।
(২)
সে দিনও জ্বর পূর্ববৎই রহিল। চাঁপা প্রথম প্রথম একটু
বিরক্তি বােধ করিতেছিল কিন্তু দুপুরে জ্বরের ঘােরে যখন বনমালী
তাহার হাত দুখানি ধরিয়া কহিল, “তুমি অনেক করেছ আমার
জন্যে কিন্তু আমি বােধ করি বাঁচব না।” তখন অকস্মাৎ চাঁপার
চক্ষু দুটি ছল্ ছল্ করিয়া উঠিল। মুহূর্তের মধ্যে নিজের সমস্ত শ্রম
ও অসুবিধার কথা ভুলিয়া গিয়া সে কহিল, “ভয় কি? সেরে
উঠবে। তুমি ঘুমােও, আমি বন্দি ডেকে আছি।”
বেলা তিনটায় মাখন কবিরাজ আসিয়া ঔষধ ও পথ্যের ব্যবস্থা
করিয়া গেলেন।
পাঁচদিন দোকান-পাট ফেলিয়া অক্লান্ত পরিশ্রমে চাপা বনমালীর
সেবা করিল। কবিরাজ যেদিন আসিয়া কহিয়া গেলেন যে, ভয়ের
কারণ আর নাই, সেদিন চাপা আনন্দে কাঁদিয়া ফেলিল। বনমালী
তাহার হাত ধরিয়া কহিল, কঁদছ কেন? আমি সেরে উঠেছি।”
চাপা হাত ছাড়াইয়া পথ্য আনিতে চলিয়া গেল।
অন্নপথ্য পাইবার পর বনমালী কহিল, “তুমি যা করেছ আমার
জন্যে তার শশাধ নেই। যদি ভগবান্ দিন দেন*
৩
থার্ডক্লাশ
চাপা কহিল, “সে সব আর এখন শুনতে পারিনে, হপ্তা ধ'রে
দোকান বন্ধ, এখুনি যাব। তুমি বাইরে বেরিও না ঘরেই বসে
থাক। আর এই ওষুধটা—” বলিয়া এক মােড়ক ওঁড়া তাহার
হাতে দিয়া কহিল, “এটা দুপুরে তুলসী রস দিয়ে খেও। আমি
স্নান সেরে তুলসী তুলে দিয়ে যাব’খন।”
সমস্ত দিন ধরিয়া বনমালী কত কি ভাবিল। এই দরিদ্র
নারীর উপার্জন সে কেবল বসিয়া বসিয়া ভােগ করিতেছে। এ
অবস্থাটা সুখকর নহে। সন্ধ্যায় চাপা ফিরিয়া জিজ্ঞাসা করিল,
“জর আসে নি ?” বনমালী কহিল, “না”। পরক্ষণেই কহিল,
“দেখ আমি যেতে চাই।”
চাঁপার মুখখানা সহসা গম্ভীর হইয়া গেল। অন্ধকারে বনমালী
তাহা দেখিতে পাইল না। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া সে কহিল,
“তা বেশ, যাও না। তা আর আমায় জিজ্ঞেস কেন?” কথাটি ঠিক
অনুমতির মত শােনাইল না দেখিয়া বনমালী চুপ করিয়া গেল।
এক প্রহর রাত্রে যখন দুধ বালি লইয়া চাপা উপস্থিত হইল, তখনও
তাহার মুখের কালাে ছায়াটি কাটিয়া যায় নাই। বনমালী এক
চুমুকে পাত্রটি নিঃশেষ করিয়া কহিল, “দেখ তুমি গরীব। আর
কতদিন আমাকে পুষবে ?
সেইজন্য যেতে চাইছি। এখন ভাল
হয়েছি, বােধ করি যেতে পারব।”
চাপা একবার বনমালীর মুখের দিকে চাহিল। তাহার যে
যাওয়াই উচিত তাহাতে চাপারও কোনও সন্দেহ ছিল না কিন্তু
৪০
প্রত্যর্পণ
মনের একটি কোণে একান্ত অসহায় অতিথিটির জন্য খানিকটা
মম সঞ্চিত হইয়া উঠিয়াছিল, চলিয়া যাও’ বলিতে মন
সরিতেছিল না। অনেক ভাবিয়া কহিল, “দু'বেলা ভাত খেয়েই
চলে যেও।”
“আচ্ছা” বলিয়া বনমালী শয্যা লইল।
(৩)
সে দিন বনমালী ধরিয়া বসিল যে বিকালেও তাহাকে ভাত
দিতে হইবে। আপত্তি করিলে সে অন্য কিছু ভাবিয়া লইতে পারে
ভাবিয়া চাপা কহিল, “বেশ!” কিন্তু তাহার মুখের ভাব বদলাইয়া
গেল, সমস্ত দিন আর সে ভালাে করিয়া বনমালীর সঙ্গে কথা
কহিল না।
বনমালী তাহা লক্ষ্য করিল। কয়েকদিন নিয়ত
নারীর সংসর্গে থাকিয়া রমণীর চিত্ত-বিশ্লেষণের তাহার কিঞ্চিৎ
ক্ষমতা জন্মিয়াছিল।
অপরাহ্নে উনুন জালিয়া চাপা হাঁড়ি চড়াইয়াছে এমন সময়
ভিক্ষার ঝুলি হাতে করিয়া এক বৈষ্ণব আসিয়া আঙ্গিনায় দাড়াইয়া
অতি করুণকণ্ঠে কহিল, “দুটো চাল দাও মা, বৈষ্ণব, একাদশীর
দিন। পারণ কৰ্ব।” আজ একাদশী শুনিয়াই চপার বুকের
ভার যেন অনেকটা লঘু হইয়া গেল, বনমালীর দিকে ফিরিয়া সে
কহিল, “আজ যে একাদশী তা তাে ভুলেই গেছলাম।
বনলামী সমস্ত দিন ধরিয়াই চপার ভাবভঙ্গী লক্ষ্য করিতে-
৪১
থার্ডক্লাশ
ছিল। এ কথাটির উদ্দেশ্য কি বুঝিতে তাহার বিলম্ব হইল না,
কহিল, “তাহলে, আজ আর ভাত খাব না। থাক্।”
চাপার মুখখানি প্রসন্ন হইয়া উঠিল, কহিল, “রুটি গড়ে দেব,
দুধ দিয়ে তাই খেও, কি বল ?”
বনমালী নিতান্ত সুবােধ বালকের মত হহিল, “তাই দিও।”
ভিখারী সেদিন চাপার বাড়ী হইতে তিন দিনের উপযােগী
সিধা লইয়া গেল।
পরদিন বনমালী আর বৈকালে ভাত খাইবার জন্য জি করিল
না, শুধু বাজারে যাইবার সময় এক দিস্তা রঙ্গীন কাগজ আনিতে
চাপাকে বলিয়া দিল। রাত্রে রঙ্গীন কাগজের দিস্তাটি হাতে
করিয়া বনমালীর ঘরে আসিয়া চাপা জিজ্ঞাসা করিল, “আজ কি
ভাত খাবে ?”
এ প্রশ্নের উত্তর বনমালী অনেকক্ষণই ঠিক করিয়া রাখিয়াছিল,
কহিল, “না। এ কয়দিন থাক্ একেবারে পূর্ণিমার পরেই খাব।”
চাপা খুসী হইয়া গেল।
প্রভাতে উঠিয়া চাপা দেখিল যে তাহার ঘরের দাওয়ায় আট
দশটি রঙ্গীন কাগজের খাঁচা, তাহার মধ্যে নানা রঙের পাখী
খাচা আর পাখীর নির্মাণ কৌশল দেখিয়া সে আশ্চৰ্য্য হইয়া
গেল। বেলা হইলে বনমালী যখন চোখ মুছিতে মুছিতে বাহিরে
আসিল তখন চাপা কহিল, “কাল সারারাত জেগে বুঝি এইসব
করেছ ? এরপর যদি অসুখ করে তাহলে কে দেখবে বলতাে?”
৪২
প্রত্যর্পণ
বনমালী সে কথার কোনও জবাব না দিয়া কহিল, “তুমিতাে
বাজারে যাবে, এগুলাে নিয়ে যাবে।”
চাপা কহিল, “কি হবে?”
বনমালী কহিল, “বিক্রি! দু’দশ আনা যা হয় তাই লাভ।
শুধু বসে বসে খাচ্ছি।”
চাপা বলিল, “তাই বলে তুমি রাত জেগে রােগ ক'রে
আমাকে ভােগাবে? আর এ সব বইবে কে ? আমি একা মানুষ
মুড়ি দেখব না পাখী দেখব?”
বনমালী
চুপ
করিয়া গেল।
বৈকালে চাপা দেখিল যে, সূতার সঙ্গে খাঁচাগুলি ঝুলাইয়া
বনমালী বাহির হইয়া যাইতেছে। সকাল বেলার কথাগুলি মনে
পড়িল। তাড়াতাড়ি ছুটিয়া গিয়া কহিল, “তােমাকে আর যেতে
হবে না। দু’দিন ভাত খেয়েছ আর আজ যাবে এক হাঁটু কাদা
ভেঙ্গে বাজারে। এমন মানুষ আমি দেখিনি। দাও দেখি আমার
হাতে।” বনমালী বিনা বাক্যে খাচার সূতাগাছি চাপার হাতে
দিয়া কহিল, “বেশ সাবধান করে নিয়ে যেও। জোর হাওয়া
লাগলে ছিড়ে যাবে।” চাপা মুড়ির ডালি মাথায় করিয়া হাতে
খাঁচাগুলি ঝুলাইয়া চলিয়া গেল। সন্ধ্যায় ফিরিয়া চাপা হাসিতে
হাসিতে কহিল, “এই নাওগাে তােমার খাঁচার দাম। দু’টাকা
ছ’আনা। বনমালী হাত সরাইয়া কহিল, “তুমি রাখ?” চাপা
কহিল, “তােমার জিনিষ—”
থার্ডক্লাশ
বনমালী তাহাকে বাধা দিয়া একান্ত অসঙ্কোচে চাপার
আঁচলের খােটায় পয়সাগুলি বাঁধিয়া দিয়া কহিল, “তুমি যদি না
বাঁচাতে তবে এ খাঁচা কে গড়ত পা ?
চাপা একবার মাত্র বনমালীর দিকে চহিয়া রান্নাঘরে গিয়া
ঢুকিল ।
পরদিন হইতে বনমালী রীতিমত কাগজের ফুল পাখী পাতা
গড়িতে লাগিয়া গেল। চাপা অবসর মত তাহার কাজে সাহায্য
করিত। এইরূপে দিনকয়েক কাটিয়া গেল। একদিন বনমালী
কহিল, “আচ্ছা একটা দোকানঘর ভাড়া করলে হয় না? মুড়ি
মুড়কী থাকবে তার সঙ্গে থাকবে ফুল পাখী খেলনা। দিনের
বেলা সেখানে বসেই কাজ করব।”
চাপা উৎসাহিত হইয়া কহিল, “সে খুব ভালাে হবে। তুমি
বেচা কেনা জান তত? অনেকে আবার ঠকিয়ে নেয়।”
বনমালী কহিল, “তুমি শুধু দাম ব'লে দাড়ি পাল্লা ঠিক করে
দেবে। আর সব আমি নিজে
ইহার পর দোকানে কি কি রাখিবে সে সম্বন্ধে অনেক রাত্রি
পৰ্য্যন্ত আলােচনা হইল। প্রতিবেশিনী মণি বৈষ্ণবীর মত দোকান
করিবার ইচ্ছা চাপার অনেকদিন হইতেই ছিল কিন্তু একা মানুষের
সাধ্য নয় বলিয়া এতদিন অভিপ্রায়টি কার্যে পরিণত হয় নাই
বহুদিনকার আকঙ্খার পূর্ণতা আসন্ন দেখিয়া সে অতিমাত্রায়
উৎসাহিত হইয়া উঠিল, সারারাত এই উৎসাহের উত্তেজনায় তাহার
করব।”
৪৪
প্রত্যর্পণ
ঘুম হইল না। তাহার মুড়ি মুড়কির দোকান কয় বৎসরে নবীন
সরকারের মত মনােহারী দোকানে রূপান্তরিত হইতে
হইতে পারে,
তাহারও একটা সময় সে স্থির করিয়া রাখিল।
চাপার দোকান ঘর ভাড়া করা হইয়া গেছে। মাসিক ভাড়া
সাড়ে পাঁচ টাকা শুনিয়া চাপা প্রথমে একটু দমিয়া গিয়াছিল।
বনমালী আশ্বাস দিয়া কহিল, “সাড়ে পাঁচ টাকা তাে একদিনের
কামাই চাপা। পূজোর বাজারে একদিনে কাগজের হাতী
আর নৌকো বেচে তােমার বছরের ভাড়া তুলে দেব।” চাপা
হাস্যময় স্নিগ্ধ দৃষ্টিপাতে বনমালীকে পুরস্কৃত করিল
রং বেরং কাগজের ফুল দিয়া বনমালী দুইদিন ধরিয়া ঘরখানি
সাজাইয়া ফেলিল। দোকান সাজান হইলে চাপার সঙ্গে তাহার
দুই একজন বান্ধবী সন্ধ্যাকালে দোকান দেখিতে আসিল। কি
চমৎকার ! সমস্ত ঘরখানিতে যেন হাজারখানেক রঙ্গিন প্রজাপতি
উড়িয়া আসিয়া বসিয়াছে। শিল্পীকে প্রশংসা করিয়া মণি বৈষ্ণবী
চাপার কাণে কাণে কহিল, “বড় ভাগ্যিরে তাের চাপা। দেখিস
আবার হেলায় হারাস্ নি যেন!” চাপা লজ্জায় লাল হইয়া গেল।
সেদিন ফিরিতে তাহার রাত্রি হইল। সে একেবাবে ভট্টাচাৰ্য্য
মহাশয়ের নিকট হইতে দোকান খুলিবার দিন পর্যন্ত জানিয়া
আসিয়াছে।
মাথায় মুড়ীর ডালিতে দিস্তা খানেক খবরের
কাগজ।
“এ কাগজ কি হবে চাপা ?” বনমালী জিজ্ঞাসা করিল।
৪৫
থার্ডক্লাশ “ঠোঙ্গা গড়তে হবে যে। সবাই তাে আর আঁচল পেতে মুড়ি নেবে না।” চাপা কহিল । হাত বাড়াইয়া বনমালী কহিল, “দাও। রাতে ক'রে রাখব।” “সারাদিন মেহনৎ করেছ, আবার সারারাত জাগতে চাও? তােমার সখ ত খুব!” এই বলিয়া চাপা একেবারে নিজের ঘরে গিয়া ঢুকিল। আহারান্তে নিজের ঘরে চাপা ঠোঙ্গার জন্য কাগজ কাটিতে বসিয়া গেল। কাল দোকানের অন্যান্য আসবাব-পত্র যােগাড় করিতে হইবে। হাতে কঁচি চলিতেছিল আর চাঁপার সমস্ত মন তখন মুড়ি মুড়কির দোকান হইতে আরম্ভ করিয়া নবীন সরকারের মনােহারী ও গােপাল গােয়ালার সন্দেশের দোকান আশ্রয় করিয়া ঘুরিতেছিল ! বেশ স্পষ্টই সে দেখিতে পাইতেছিল যে, বনমালী রীতিমত মােটা সােটা হইয়া লাল খেরুয়ার বাঁধা খাতাখানিতে বড় বড় টাকার অঙ্ক ফাঁদিতেছে। দোকানের সম্মুখে পথের ধারে অসংখ্য খরিদ্দার আর পিছনে কুলতার বেড়ায় ঘেরা ঘােট বাড়ী- খানির আঙ্গিনায় বসিয়া সােনার সূতায় গাঁথা তুলসীর মালা লইয়া সে জপ করিতেছে। আরাে যে কত প্রকারের মুখস্বপ্নই শরতের মেঘের মত একে একে তাহার মনের উপর দিয়া ভাসিয়া যাইতে ছিল তাহার সংখ্যা নাই। সহসা চাপা চমকিয়া উঠিল। বনমালীর ছবি! খবরের কাগজে বনমালীর ছবি উঠিল কেমন করিয়া ? তাড়াতাড়ি প্রদীপটীর কাছে আনিয়া ছবির নীচে লেখা কয়েক ৪৬
প্রত্যর্পণ
ছত্রে চাপা চোখ বুলাইয়া গেল। নিমিষে কোথা হইতে এক
অন্ধকারের বন্যা আসিয়া তাহার দোকান-পসার বাড়ী-ঘর সব
ভাসাইয়া লইয়া গেল ; রহিল শুধু
বনমালীর ছবি, কয়েক পংক্তি
অক্ষর আর চাপা নিজে। পর মুহূর্তেই দুই হাতে বুক চাপিয়া
ধরিয়া একটা সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস টানিয়া চাপা কহিল, “উঃ I”
একখানি বাঙ্গালা খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনের পৃষ্ঠায়
বনমালীর ছবি, তাহার নীচে লেখা,—“আমার ভ্রাতা শ্রীমান্
বনমালী বসু আজ ছয়মাস হইতে নিরুদ্দেশ। আমার মাতা
তাহার জন্য অন্ন-জল ত্যাগ করিয়াছেন, তাহার বাঁচিবার আশা
নাই। শ্রীমা সামান্য কারণে রাগ করিয়া বাড়ী হইতে চলিয়া
গিয়াছে। যিনি তাহার সন্ধান করিয়া দিবেন, তাহাকে পাঁচশত
টাকা পুরস্কার দেওয়া হইবে।
শ্রীকানাইলাল বসু, বর্ধমান।
রাত্রি শেষ হইতে যখন দণ্ডখানেক বাকী ছিল, তখনও চাপা
কাগজখানি সম্মুখে করিয়া আবিষ্টের মত বসিয়াছিল। সহসা
কাকের ডাকে তাহার সম্বিৎ ফিরিয়া আসিল।
অনেকক্ষণ,
দাড়াইয়া থাকিয়া সে কি ভাবিল, তাহার পর ভিন্ গাঁয়ে তাহার
মামাতো ভাই পােষ্টাফিসের পিওন জলধরের সহিত সাক্ষাৎ
করিতে চলিয়া গেল।
বনমালী যখন সবে হাত-মুখ ধুইয়া বারান্দায় মাদুর বিছাইয়া
বসিয়াছে তখন চাপা ফিরিল। তখন বেলা হইয়াছে। বনমালী
৪৭
থার্ডক্লাশ তাহার মুখের দিকে চাহিয়া কহিল, “কি হয়েছে তােতমার চাঁপা ?” চাঁপা দাতে ঠোট চাপিয়া কহিল, “কিছু না।” তাহার পর মুড়ি ভাজিবার অছিলায় সে বাহির হইয়া গেল, ফিরিল সন্ধ্যার পর। বনমালী অত্যন্ত উদ্বেগে সমস্ত দিন কাটাইয়া সন্ধ্যায় পথে দাড়াইয়া চাঁপার অপেক্ষা করিতেছিল, চাপাকে আসিতে দেখিয়াই কহিল, আজ সারাদিন না দেখে কেবলই ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছি।” কথা শুনিয়া চাপার চোখে জল আসিল। আপনাকে কোনমতে সামলাইয়া সে জবাব দিল, “আজ রতন গাঁয়ে মুড়ির যােগান দিতে গেছলাম।” বনমালী কহিল, “সারাদিন খাওনি তাহলে ! হাত-মুখ ধুয়ে খেয়ে নাও গে। ভাত-তরকারী ঢাকা আছে। আমি একবার দোকানটা দেখে আসিগে।” বনমালী চলিয়া গেল। দাওয়ায় আঁচল বিছাইয়া চাপা ঘণ্টাখানেক গড়াইল, তার পর তুলসীতলায় প্রদীপ দিয়া ভাত লইয়া বসিল। বনমালী তাহারই জন্য ভাত রাঁধিয়া গিয়াছে। বিধাতার কি পরিহাস! অল্পের প্রথম গ্রাসটি কপালে ঠেকাইয়া মুখে দিতে গিয়াই সে ডুরিয়া কাঁদিয়া উঠিল। পরক্ষণেই ভাতের থালা ঢাকিয়া রাখিয়া সে উঠিয়া গেল। সেদিন আর খাওয়া হইল না। কয়দিন হইতে চাপা কেন এত বিমর্ষ আর গম্ভীর হইয়া আছে, বনমালী তাহা বুঝিতে পারিল না। চতুর্থ দিন আহারান্তে জিজ্ঞাসা ৪৮
প্রত্যর্পণ
করিল, “কৈ ? আজ যে দোকান খুলবে! সব আমাকে বুঝিয়ে
সুঝিয়ে দাও।”
চাপা একটি কথা বলিতে গিয়া থামিয়া গেল। কিছুক্ষণ চুপ
করিয়া থাকিয়া শুধু কহিল, “সে আজ থাক্।”
“কেন? সামনে পূজোর মরশুম, এখন থেকে গুছিয়ে না নিলে
তখন কি করবে? একটা যে দোকান তাতাে খদ্দেরের জানা
চাই।” বনমালী কহিল।
চাঁপা তুলসীতলায় গােবর লেপিতেছিল, হতাশা উদাস-স্বরে
অতি মৃদু কণ্ঠে কহিল, “আর দোকান !”
বনমালী শুনিতে পাইল না, ফিরিয়া সেই প্রশ্নই জিজ্ঞাসা
করিল। চাপা দাড়াইয়া উঠিয়া কহিল, “দোকানের কথা জানেন
নারায়ণ । তুমি আর আমাকে কিছু জিজ্ঞেস কোরাে না।”
বনমালী যদিও এ কথার অর্থ কিছু বুঝিল না, তথাপি চপার
মুখ দেখিয়া দ্বিতীয় প্রশ্ন করিবার প্রলােভন সম্বরণ করিয়া গেল।
বৈকালে তাহার ঘরের বারান্দায় মাথা নীচু করিয়া চাপা কথা
সেলাই করিতেছিল আর বনমালী বাহিরের ঘরের বােয়াকে পা
ঝুলাইয়া বসিয়া অবিলম্বে দোকান খুলিবার পক্ষে বিবিধ যুক্তি
দেখাইয়া অনর্গল বকিতেছিল। এমন সময় বাহিরের দরজার
কাছে কে ডাকিল, “চপা বােষ্টমী বাড়ীতে আছ ?” চাপা উত্তর
দিবার পূর্বেই একটি আধাবয়সী ভদ্রলােক এক বৃদ্ধাকে সঙ্গে লইয়া
আঙ্গিনায় প্রবেশ করিলেন। অকস্মাৎ ভ্রাতা ও জননীকে দেখিয়া
৪
৪৯
থার্ডক্লাশ বনমালী একেবারে বিমূঢ় হইয়া গেল। বৃদ্ধা বনমালীকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া ফোপাইয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। চাপা কোন কথা বলিয়া বনমালীর ঘরের বারান্দায় একখানি মাদুর বিছাইয়া দিয়া চলিয়া গেল। বহিরে গরুর গাড়ী অপেক্ষা করিতেছিল। রাধিবার অছিলায় চাপা একটি হাঁড়িতে শুধু জল চাপাইয়া রান্নাঘরে উনুন জালিয়া বসিয়াছিল। এমন সময় ঝড়ের মত বনমালী ঘরে প্রবেশ করিয়া কহিল, “আমি চল্লাম কিন্তু তুমি কেন আমার সঙ্গে চাতুরী করলে আমাকে সইতে পার না বলেই তাে আমি চ'লে যেতাম।” বনমালীকে দেখিয়া চাপা উঠিয়া তাহাকে প্রণাম করিয়া দূরে গিয়া দাড়াইল, বনমালীর অভিযােগের উত্তরে একটা কথাও কহিল না। একবার তাহার দিকে চাহিল মাত্র। বনমালী সে সজল চক্ষুর ব্যথাতুর দৃষ্টির অর্থ বুঝিল না। শ্লেষের স্বরে কহিল, “পাচশশা টাকার লােভ বুঝি!” ভ্রাতা যে তাহার সন্ধানের জন্য পুরস্কার ঘােষণা করিয়াছিলেন তাহা সে জানিত। বনমালীর কথা শুনিয়া চাপার চোখে আগুন জ্বলিয়া উঠিল, কি যেন সে বলিতে যাইতেছিল এমন সময়, “চাপা মা লক্ষ্মী কোথা ?” বলিতে বলিতে বনমালীর মাতা গৃহে প্রবেশ করিলেন, পরে চাপাকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া কহিলেন, “আমি প্রত্যর্পণ চলুম মা, তুমি বুড়ির হারানাে ধন ফিরিয়ে দিয়েছ, তােমার অক্ষয় বৈকুণ্ঠ হবে। আর বলার কিছুই নেই বুড়ীকে বাঁচিয়েছ; যে ক’টা দিন বাঁচব নিত্য তােমার নামে নায়ায়ণকে তুলসী দেব । এই নাও, সংসারে কত দরকার কত রকম আছে, কাছে রাখ।” বলিয়া অনেক প্রকার আশীর্বাদের সঙ্গে ছােট একটা পুটুলী তাহার হাতের মধ্যে খুঁজিয়া দিয়া চলিয়া গেলেন। চাপা অপলক নেত্রে চলন্ত গো-যানখানির দিকে চাহিয়া রহিল। এমন সময় মণি বৈষ্ণবীর রাখাল মাণিক আসিয়া ডাকিল, “চাপা দিদি?” চাঁপার বাড়ীতে কে আসিয়াছে জানিবার জন্য মণি তাহাকে পাঠাইয়াছিল। মাণিককে দেখিয়া চাপার হুস হইল, একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া সে কহিল, “দয়াল হরি। হরি হে।” তারপর রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করিতে গিয়া হাতের মুঠায় ছােট পুটুলিটি চোখে পড়িল। খুলিয়া দেখিল একশত টাকার পাঁচখানি নােট। পুরস্কার! বিদ্রুপের হাস্যে চপার ওষ্ঠ কুঞ্চিত হইয়া উঠিল, সে মাণিককে কহিল, “একটু দাড়াতো মাণিক ! দেখি আমি গাড়ীটা কতদূর গেল !” গাড়ী তখন কেবল বাবুদের দীঘি ছাড়াইয়া গেছে এমন সময় পিছন হইতে হাঁপাইতে হাঁপাইতে ছুটিয়া আসিয়া মাণিক কহিল, “গাড়ী রাখ একটুখানি!” কানাইলাল মুখ বাহির করিয়া
থার্ডক্লাশ
কহিলেন, “কে?” “আমি মাণিক ঘােষ। এই নিন্ চাপা দিদি
পুটুলী ফিরিয়ে দিয়েছে” বলিয়া পুটুলীটি গাড়ীর মধ্যে দুড়িয়া
ফেলিয়া দিয়া সে বাঁকা পথে অদৃশ্য হইয়া গেল। বনমান
জিজ্ঞাসা করিল “কি ও দাদা ?”
কানাই কহিল, “সেই পাঁচশাে টাকার নােট দেখছি ফিরিয়ে
দিয়েছে।”
মুহূর্তের জন্য বিষ্ময়ে বিস্ফারিত হইয়া পরক্ষণেই বনমালীর চক্ষু
জলে ভরিয়া উঠিল।
চাপা আজও মাথায় করিয়া মুড়ি বেচে। সে দোকান ঘর
তালা বন্ধ কিন্তু মাসে মাসে চাপা তাহার ভাড়া যােগাইয়া যায়,
প্রতি সন্ধ্যায় সেখানে সন্ধ্যাদীপ দেয়, কেন তাহা কেহ বলিতে
পারে না।
৫২
দুলাল (১) স্বর্গীয় পিতার একটি গুণ পূর্ণভাবেই পুত্র দুলালচন্দ্রে বৰ্ত্তিয়াছিল। দুলালের পিতা চরণদাস বৈরাগী একজন সুকণ্ঠ গায়ক ছিল। তাহার রচিত মান-মাথুরের পালা আজও সাতপাড়া অঞ্চলে গাওয়া হয়। এখনও কোন বড় ওস্তাদ সে অঞ্চলে আসিলে মজলিসে বসিয়া ইতর-ভদ্র সকলেই স্বর্গীয় চরণদাসের কথা তুলিয়া দুটা গল্প করে। দুলালকে তিন বছরেরটি রাখিয়া চরণ মারা যায়। সে আজ চার বছরের কথা। ইতিমধ্যে দুলালের মা শ্যামা বৈষ্ণবী গােবিন্দ বৈরাগীর সহিত কন্ঠি বদল করিয়া আবার নূতন গৃহে সংসার পাতিয়াছে। তাহাতে দুলালের কোন ক্ষতি-বৃদ্ধি ছিল না। সে আগেকার মতই চারবেলা ভাত খায়, সমস্ত দিন বাড়ী-বাড়ী নাম কীৰ্ত্তন ও মান-মাথুরের এক-আধখানা ভাঙ্গা গান গাহিয়া বেড়ায়। গােবিন্দ প্রহার করিয়াও দুলালকে তার মুড়ী-মুড়কীর দোকানে কাক তাড়াইবার কাজে লাগাইতে পারে না। এই প্রহার পিতার আমলে তাহার ভাগ্যে ঘটিয়াছে কিনা সে কথা তাহার মনে পড়ে না, তবে এখন এটা নিত্যকার ব্যাপারে দাড়াইয়াছে; কাজেই প্রহার তার সহিয়া গিয়াছে।
থার্ডক্লাশ
দিনের পর শুষ্কমুখে বাড়ী ফিরিয়া চারটি ভাত ও এক ঘটি জল
খাইয়া মা’র আঁচলে মুখ মুছিয়া সে শয্যা লয়, পরদিন ঘুম ভাঙ্গিলে
আবার একবাটি ভাত, গুড় ও তেঁতুলের সহিত উদরস্থ করিয়া
প্রহরকালের জন্য দৈনন্দিন সঙ্গীতকলার অনুশীলনে বাড়ী বাড়ী
ঘুরিয়া বেড়ায়।
কিন্তু সহসা একদিন এই নিশ্চিন্ত জীবনযাত্রায় বাধা পড়িল।
সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরিয়া দুলাল দেখিল উঠানে জলচৌকীর
উপর ভদ্রবেশধারী একটি লােক, সম্মুখে তার মা ও গােবিন্দ ;
উভয়ে দাড়াইয়া পরম নিবিষ্ট চিত্তে সে লােকটির সহিত বাক্যালাপ
করিতেছে। ভদ্রলােক দেখিলেই
প্রণাম করিতে হয়, খুব
শৈশবেই চরণ তাহাকে এ কথা শিখাইয়াছিল। সে আসিয়া টিপ
করিয়া আগন্তুকের পায়ের কাছে প্রণাম করিল। আগন্তুক
দুলালের মাথায় হাত রাখিয়া কহিলেন, “বাঃ, বেশ সভ্য তাে
তােমার ছেলেটি, বােষ্টমী!
শ্যামা কোনাে কথা বলিবার পূর্বেই ক্ষুধার্ত দুলাল মা’র আঁচল
টানিয়া কহিল, “ভাত দে মা।”
ভদ্রলােক কহিলেন, “আহা, যাও যাও ভাত দাও গে, কথা
তত হয়েই আছে, সন্ধ্যা হলেই আগাম টাকাটা দিয়ে যাবাে’খন।”
শ্যামা দুলালের হাত ধরিয়া চলিয়া গেল।
ভদ্রলােকট কলিকাতার ‘সুরেন্দ্র থিয়েটিক্যাল যাত্রা পার্টির
ম্যানেজার। তিনি এদিকে তার শ্যালিকার গৃহে বেড়াইতে
৫৪
দুলাল আসিয়াছিলেন। কাল সন্ধ্যায় সেখানে হরিসংকীর্তনে দুলালের গান শুনিয়াছিলেন। এত অল্প বয়সে এমন মিষ্ট কণ্ঠে তান-লয়-শুদ্ধ গান তিনি আর কখনাে শশানেন নাই। তাই গান শুনিয়া ছেলেটির প্রতি তার লােভ হয় এবং সন্ধান লইয়া গােবিন্দের সঙ্গে শ্যামার গৃহে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন। গােবিন্দের মােটেই আপত্তি নাই। তবে শ্যামা? শ্যামাও মাসিক এক-কুড়ি টাকা মাহিনা শুনিয়া অবাক্ হইয়া গেল-তবু ছেলে দূরে চলিয়া যাইবে, এ কল্পনায় মন তার বেদনায় আৰ্ত্ত হইয়া উঠিল। কিন্তু টাকা! এক মাসের মাহিনা নগদ হাতে পাইবে, তা ছাড়া ছেলের ভবিষ্যতের একটা হিল্লে হইয়া যাইবে। মনকে বুঝাইয়া শ্যামা দুঃখ ভুলিবার চেষ্টা করিল। মা’র মুখে অন্যত্র যাইতে হইবে শুনিয়া দুলাল শঙ্কিত দৃষ্টিতে মা’র দিকে চাহিয়া যখন কহিল, “মা, আমি যাব না” তখন এ কথায় শ্যামার মনে আবার সেই বেদনা জাগিয়া উঠিল। গগাবিন্দ রান্নাঘরের দরজায় দাড়াইয়া কহিল, “তুমি উঠে এসােনা। বাবু কি বলছেন, টীকাক’টি নেবে কিনা?” এক-কুড়ি টাকা চট্ করিয়া ফেলিয়া দিতেও শ্যামার মন সরিল । দুলালের দিকে না চাহিয়া সে বাহিরে আসিল এবং আরো কিছুক্ষণ কথা-বার্তার পর নােট দুখানি আঁচলে বাধিয়া আগন্তুকের পা ধরিয়া কহিল, “আপনি আমার বাপ! ওটি বৈ আমার আর কেউ নেই। দেখবেন, আপনার, হাতেই ওকে তুলে দিচ্ছি।
থার্ডক্লাশ
আগন্তুক গােপাল বণিক সহাস্যে কহিলেন’ “ছ'মাস পরে
চিনতে পারবে না বােষ্টমী, তােমার ছেলেকে।” শ্যামা তথাপি
বার-বার করিয়া বলিয়া দিল ; তাহার ছেলে কি কি খাইতে
ভালবাসে কি তার সাধ, এই সবের মস্ত ফর্দ সে দিতে চলিল।
গােপাল বণিক ধৈৰ্য্য-সহকারে সব কথা শুনিয়া কহিলেন, “কিছু
ভেবাে না, দু’বেলা ভাত-মাছ তাে আছেই—তাছাড়া লুচী-মেঠায়ের
ছড়াছড়ি। পূজোর পর ছেলে এলে তার মুখেই সব শুনতে পাবে
গাে?” শ্যামা আশ্বস্ত হইল, দুলাল কিন্তু সারারাত মাকে জড়াইয়া
ধরিয়া কেবলই কহিতে লাগিল, “আমি যাবাে না মা আমি
যাবে না।” গােবিন্দ দু’বার তার চুল ধরিয়া টানিয়া তাকে
রাজী করিবার চেষ্টা করিল। শ্যামা কহিল, “আহা মেরাে না-
আমি বুঝিয়ে বচি।”
শ্যামা অনেক করিয়া বুঝাইল, মিঠাই, মােণ্ডা, কেমন রঙীন
ঝক্মকে সাজ-পােষাক, কত আদর ! তার উপর কলিকাতা
সহর—কত গাড়ী-ঘােড়া, কত বড় বড় বাড়ী, লােকজন! এত
প্রলােভনের কথা • শুনিয়াও দুলাল কহিল, “সেখানে যে তুমি
নেই!”
শ্যামা অঞ্চলে চোখ মুছিল। দুলাল কহিল, “তুমি যাবে
সঙ্গে ?” শ্যামা এ কথার একটা জবাব খুঁজিয়া পাইল, কহিল,
তুই আগে যা, তারপর আমাকে চিঠি দিলেই আমি যাবাে।”
এ ব্যবস্থায় দুলাল রাজী হইল।
দুলাল
পরদিন প্রাতে গােপাল বণিকের হাতে পায়ে ধরিয়া অনেক
মিনতির সহিত ছেলেকে দেখিবার অনুরােধ করিয়া দিতে
কাদিতে শ্যাম| দুলালকে বিদায় দিল। রাত্রির কথা ভুলিয়া
প্রাণপণ শক্তিতে দুলাল মা’র অঞ্চল-প্রান্ত মুঠা করিয়া ধরিয়াছিল
-গগাবিন্দ আসিয়া মুঠা খুলিয়া দুলালকে টানিয়া গাড়ীতে বসাইয়া
দিয়া গাড়ােয়ানকে বলিল, “গাড়ী ছাড়।” গাড়ী চলিতে আরম্ভ
করিল।
দুলাল কঁদিতে কঁদিতে গাড়ী হইতে মুখ বাড়াইয়া
কহিল, “কাল চিঠি দেবাে মা—চলে আসি।”
গাড়ী পথের বাঁকে অদৃশ্য হইয়া গেল ! শুধু একটা আর্ত ভগ্ন
কণ্ঠস্বর বাতাসকে নিমেষের জন্য ভারাক্রান্ত করিয়া তুলিল।
(২)
চিৎপুর রােডের উপর তিন-তলা বাড়ী। তেতালার একটা
ঘরের বাহিরে বড় সাইনবাের্ডে লেখা—“সেই সুপ্রসিদ্ধ সুরেন্দ্র
থিয়েটিক্যাল যাত্রা-পাটি। স্বত্বাধিকারী সুরেন্দ্রনাথ সাহা।
ম্যানেজার শ্ৰীগােপালচরণ বণিক।” গৃহের অভ্যন্তরে অনেকগুলি
ছেড়া মাদুর-বিছানাে । তাহার উপর মাঝে মাঝে বালিশ, ছিন্ন
আবরণ-শূন্য।
ইতস্ততঃ অনেকগুলি বই। অধিকাংশই যাত্রার
পালা, খান-কয়েক সচিত্র প্রেমলিপি, থিয়েটার সঙ্গীত, পাঁচালী ও
কবির লড়াই। ঘরের কোণে গুটিকয়েক বা, তাহাদের গায়ে
নানা বর্ণের লেবেল আঁটা। বাসগুলির উপর কয়েক জোড়া
৫৭
থার্ডক্লাশ তবলা ও খঞ্জনী ; দেয়ালের উপর দিকে খান-কয়েক নগ্ন নারীর বিলাতী ছবি, একটা কুলুঙ্গিতে একটি গনেশের সিদুর মাখা মাটির মূর্তি। মূর্তিটীর পাশে ন্যাড়া জড়ানো একটি গাঁজার কলিকা। দেওয়ালের নীচের দিকে ও গৃহের প্রত্যেকটি কোণ পাণের পিকে বিচিত্রিত। তখন বেলা এক প্রহর। মেঝেয় বসিয়া কয়েকজন অভিনেতা আয়নার সামনে বিচিত্রভাবের মুখভঙ্গী করিতেছিল। গৃহের কোণে একটি ছিন্ন তাকিয়ায় বুক রাখিয়া স্বত্বাধিকারী মহাশয় গড় গড়ার নল মুখে দিয়া দৈনিক জমা-খরচের খাতা পরীক্ষা করিতেছিলেন। এই সময়ে দুলালকে লইয়া ম্যানেজার বাবু গৃহে প্রবেশ করিয়া স্বত্বাধিকারী মহাশয়কে সম্বােধন করিয়া কহিলেন, “দেখুন, এনেছি। তৈরি করে নিতে পারলে “ভড়ের সীতা-নিৰ্বাসন” একেবারে কাণা।” স্বত্বাধিকারী মহাশয় গড়গড়ার নল ছাড়িয়া উঠিয়া বসিয়া কহিলেন, “এ যে একেবারে খােকা দেখচি। পারবে কি?” “পরখ করেই নিন্ না।” “আচ্ছা, একটা গাও তত থােকা।” দুলালের অত্যন্ত ক্ষুধার উদ্রেক হইয়াছিল। সে কহিল, “বড্ড খিদে পেয়েছে।” ম্যানেজার বাবু, চাকর ডাকিয়া দু’ পয়সার মুড়ি আনিবার আদেশ দিয়া কহিলেন, “আসছে খাবার—তুমি ততক্ষণ একটা গেয়ে ফ্যালাে তাে।” ৫৮
দুলাল
হয়।”
দুলাল ভূমিতলে বসিয়া হাত নাড়িয়া একটা পদ কীৰ্ত্তন আরম্ভ
করিল। নিত্যকার মত আজকে গানে প্রাণ তার লুটাইয়া পড়ে
নাই, তবু স্বত্বাধিকারী ও অভিনেতার দল বিমুগ্ধ হইল। স্বত্বাধি-
কারী বলিলেন, “চলবে।
ভালই চলবে।
তবে রাখতে পারলে
তারপর দুলালের গৃহের সংবাদ শুনিয়া কহিলেন, “না,
পালাবার ভয় নেই। আজ থেকেই তালিম দিন। কুশের পাটটায়
গান আছে, আর দু’একটা চণ্ডীদাসের পদ জুড়ে দিলে ছােকরার
সুবিধে হবে।” সেই দিন হইতেই দুলালের শিক্ষার বন্দোবস্ত
হইয়া গেল।
বৈকালে দুলাল জানালা দিয়া বাহিরের জগতটাকে দেখিয়া
লইল। এই কলিকাতা সহর! লােজন, গাড়ী-ঘােড়া! দুলালের
এ-সব মােটে ভাল লাগে না। গাঁয়ের সঙ্গীদের কথা মনে পড়িতে
লাগিল।
আর মনে পড়িল সেই বাবলা গাছের সারি, সেই
বাঁশঝাড় ও গাব গাছের অন্তরালে তাদের সেই ক্ষুদ্র গৃহখানি!
অদূরে এক স্যাকরার দোকানে বসিয়া একটি ছােকরা বাঁশী
বাজাইতেছিল,—কি করুণ সুর ! দুলালের মনটা উদাস হইয়া
উঠিল।
মা’র কথা মনে পড়িল! মা এখন কি করিতেছে ? সেকথা
মনে হইতেই দুই চোখ জলে ভরিয়া উঠিল। বাহিরের বিশ্ব
সে জলে ভাসিয়া কোথায় যে অদৃশ্য হইয়া গেল—আর অশ্রুর
আবছায়ার মধ্যে মা’র মূর্তি সহস্ররূপে তার সামনে ঘুরিয়া ফিরিতে
থার্ডক্লাশ
লাগিল। জানালার গরাদে দুই গাল চাপিয়া অস্পষ্ট স্বরে সে সে
ডাকিল, “মা, মা, মাগাে !”
কতক্ষণ কাঁদিয়া সে ম্যানেজারবাবুর কাছে গিয়া কহিল,
“আমি থাকতে পারবে না এখানে, মা’র কাছে যাব।”
ম্যানেজার বাবু তখন দু’পয়সার ফুলুরীর সঙ্গে বৈকালিক চা
পান করিতেছিলেন, দুলালের কথা শুনিয়া মুখ বিকৃত করিয়া
কহিলেন, “সােনার চাদ আর কি! যা, ওপর-তলায় বসগে।
এখনি মাষ্টার আসবে।” বিষন্ন-ম্লান মুখে দুলাল চলিয়া গেল।
সন্ধ্যায় মােশন-মাষ্টার আসিয়া দুলালকে নানা ভাবে পরীক্ষা
করিয়া স্বত্বাধিকারীকে কহিলেন, “ছেলেটা খুব ভালই মিলেছে
বাবু টিকে থাকলে অসচে পূজোয় নরমেধ যজ্ঞ’ খুব ভাল উৎরে
যাবে।”
দুলালের শিক্ষা শুরু হইল। সেই সঙ্গে দু'বেলা চার পয়সার
মুড়ি-মুড়কী জলখাবারেরও বন্দোবস্ত হইয়া গেল।
ম্যানেজার বাবু
দুলালকে রাস্তায় বাহির হইতে বিশেষভাবে নিষেধ করিয়া
দিলেন। সুরেন্দ্র থিয়েটি ক্যালের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘নিতাই অপেরা’র
ঘর রাস্তার মােড়ে। সে দলের অভিনেতারা সর্বদাই সন্ধান লইয়া
বেড়াইতেছে। এমন একটা রত্নের সন্ধান পাইলে তারা তাকে
গ্রাস করিয়া ফেলিবে। গত বৎসর তাদের একটি ছেলেকে
ভাঙ্গাইয়া নূতন পঞ্চাঙ্ক নাটক ‘সমুদ্রমন্থন’কে এরা একেবারে
জখম করিয়া দিয়াছিল !
৬০
দুলাল দুলালকে সতর্ক করিয়া ম্যানেজারবাবু দরােয়ান, চাকর ও অভিনেতাদিগকে এই বালকটির দিকে বিশেষ সতর্ক দৃষ্টি রাখিবার জন্য আদেশ প্রচার করিলেন। ইট-কাঠের আবেষ্টনে অনেকগুলি দৃষ্টির শৃঙ্খলে পল্লীর দুলাল বন্দী রহিল । মন তার সারাদিন পড়িয়া থাকিত তার সেই গ্রামের মাঠ-ঘাটের মধ্যে। বেলা দশটায় ভাত খাইতে বসিয়া প্রথম যে অন্নের গ্লাসটি সে মুখে তুলিত, সেটা প্রত্যহই অশ্রুজলে অভিষিক্ত হইত। যেদিন মা’র কথা বেশী করিয়া মনে হইত, সেদিন অন্ন আর মুখেও রুচিত না। ইতিমধ্যে ম্যানেজারবাবুকে অনুরােধ করিয়া সে মা’র কাছে একখানা চিঠি পাঠাইয়াছিল। ম্যানেজারবাবু এক- খানা সাদা পােষ্টকার্ড লিখিয়া বিনা মাশুলেই সেখানা পােষ্ট করিয়াছিলেন। দুলাল জানিত যে পত্রপাঠ মাত্র মা এখানে আসিবে। কাজেই দিনকয়েক বিনা বাক্যব্যয়ে সে শিক্ষা গ্রহণ করিতে লাগিত। কিন্তু চিঠি পাইবার দিন হইতে দরজার কড়া নাড়ার শব্দ শুনিলেই ছুটিয়া গিয়া জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া দেখিত এবং পর মুহূর্তেই মুখখানা ছোট করিয়া ফিরিয়া আসিত। এমনিভাবে দেড় মাস কাটিয়া গেল। প্রত্যহ প্রত্যুষের আশা সন্ধ্যায় একেবারে বিলীন হইয়া যাইত। তথাপি দুলাল মা’র আগমন সম্বন্ধে নিরাশ হইতে পারিল না। হইতে পারিল না। এই আশা ও নৈরাশ্যের অবকাশে দুলালের শিক্ষা সমাপ্ত হইল। ৬১ থার্ডক্লাশ (৩) পূজা আসিতেছে। যাত্রার দলের নৃতন পালা “সীতার বনবাস” নাটকের বিজ্ঞাপন বড় বড় রক্তাক্ষরে চারিদিকে প্রচারিত হইয়া গেল। জোড়াসাঁকোর বারােয়ারিতলায় এই যুগান্তকারী নাটকের প্রথম অভিনয় হইবে, স্থির হইয়া গিয়াছে। অভিনয়ের দিন প্রাতঃকালে দুলাল কঁদিতে কাদিতে ম্যানেজারের কাছে উপস্থিত হইয়া কহিল, “আমি মার কাছে যাব।” ম্যানেজার তাহার কথা শুনিয়া দাত-মুখ খিচাইয়া কহিল, “তুমি বেশ ত’ ছােরা! আজ প্লে, আর তুমি যাবে মা’র কাছে! আব্দার আর কাকে বলে !” দুলাল বুঝিল যাওয়া হইবে না! চক্ষু মুছিতে মুছিতে সে চলিয়া গেল। রাত্রে অভিনয় আরম্ভ হইল। স্বত্বাধিকারী দেখিল ম্যানেজার মিথ্যা বলে নাই। কুশের অভিনয়ে দুলাল যে দক্ষতার পরিচয় দিতেছিল তা অপূর্ব। তঁাহার যাত্রার ইতিহাসে এমনটি দেখা যায় শ্রোতার দলও মুগ্ধ হইয়াছিল এবং প্রত্যেক বারই দুলালের আগমনের সঙ্গে করতালিধ্বনিতে তাহাকে উৎসাহিত করিতেছিল। দুলালের চরম কৃতিত্ব ফুটিল শেষ দৃশ্যে, রামায়ণ- গানের অবসানে যখন সীতা আসিলেন এবং কুশবেশধারী দুলাল যখন “এই যে মা” বলিয়া সীতাকে জড়াইয়া ধরিল। শ্রোতাদের চক্ষু সে মিলন-দৃশ্যে ছল-ছল করিয়া উঠিল। বাষ্পরুদ্ধ-কণ্ঠে ৬২ নাই !
দুলাল
অভিনয়ের কথা কয়টি উচ্চারণ করিয়া ফোপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল,
“মা, মা, মাগাে।”
তাহার এই ক্রন্দনে আর ভগ্ন কণ্ঠস্বরে কিছুকালের জন্য
শ্ৰোতৃমণ্ডলী যাত্রার আসর ভুলিয়া যেন কোন্ সুদূর অতীত
লােকে গিয়া উপস্থিত হইল। স্বত্বাধিকারী হইতে বেহালাদার
পৰ্যন্ত দুলালের এই শেষ দৃশ্যের অভিনয়ে আশ্চর্য হইয়া গেলেন।
তাহাদের জীবনে যাত্রার আসরে এমন জীবন্ত অভিনয় করিতে
তাহারা আর কাহাকেও দেখেন নাই।
গান ভাঙ্গিল। চিকের আড়াল হইতে একটি রমণী একখানা
বহুমূল্য শাল কুশের জন্য পাঠাইয়া দিলেন।
পুরুষদের দলেও
দু’একজন পুরষ্কার দিবার জন্য প্রস্তুত হইলেন। তখন দুলালের
ডাক পড়িল। কিন্তু খুঁজিয়া কোথাও তাহাকে পাওয়া গেল না।
অভিনয় শেষে দুলাল সাজ-ঘরে আসিয়া পােক ছাড়িয়া
অপরের অলক্ষিতে একেবারে পথে আসিয়া দাঁড়াইল। তার
সমস্ত অন্তর মা’র বুকে ফিরিয়া যাইবার জন্য অধীর আকুল হইয়া
উঠিয়াছিল।
যাত্রার দলের সাজ-ঘর, ম্যানেজার ও মাষ্টারের
প্রশংসা, শ্রোতাদের উৎসাহ-বাণী এ সব কিছু নয়, কিছু নয়,
কিছু নয়। প্রশ্ন করিতে করিতে সে একেবারে ষ্টেশনে আসিয়া
উপস্থিত হইল। কিন্তু পয়সা চাই—টিকিট কিনিতে হইবে।
নইলে তাে চড়িতে দিবে না! উপায় ? প্লাটফর্মের এদিক-ওদিক
বৃথা ঘুরিয়া ক্লান্ত-পদে গিয়া সে একটা বেঞ্চের উপর বসিয়া
থার্ডক্লাশ
যেন
পড়িল। দুই চোখ মুদিয়া আসিতেছিল—সে ঘুমাইয়া পড়িল।
তখন ষ্টেশনের প্লাটফর্ম জনশূন্য হইয়া আসিয়াছে।
দুলাল স্বপ্ন দেখিতেছিল, সে মা’র কাছে ফিরিয়া
আসিয়াছে, মা’র বুকে মাথা রাখিয়া বলিতেছে, “আমি যাবাে না,
আর যাবাে না মা।” মা তাকে বুকে টানিয়া বলিতেছে
“না, বাবা, না, আর তােমায় যেতে দেবাে না।" সহসা মাথায়
আঘাত পাইয়া সে উঠিয়া বসিল। চোখ চাহিয়া দেখে, সম্মুখে
দাড়াইয়া ম্যানেজার আর চাকর ভােলা। তারা খোঁজ করিয়া
একেবারে ষ্টেশনে আসিয়া উপস্থিত। ম্যানেজারকে দেখিয়াই
দুলালের মুখ শুকাইয়া গেল। সে কাঁদিয়া কহিল, আমি মা’র
কাছে যাবাে ।
চোখ রাঙাইয়া দুলালের কাণ ধরিয়া তাকে বেঞ্চ হইতে
নামাইয়া ম্যানেজার কহিল, “হতভাগা কম ভােগান ভুগিয়েছো!
যাওয়াচ্ছি মা’র কাছে•••” বলিয়া টানিতে টানিতে তাকে
ঘােড়ার গাড়ীতে উঠাইয়া চিংপুর রােডের দিকে গাড়ী হাঁকাইয়া
দিল।
যাত্রার দলে যে আসে সেই দু’দশ দিনে পােষ মানিয়া
যায়—আর এ ছেলেটা বাগ মানিবে না! অধিকারী মহাশয়
রাগে গগম্ করিতেছিলেন। এই সময় ম্যানেজারের সহিত
ঘরে প্রবেশ করিয়া দুলাল নতমুখে অপরাধীর মত দাঁড়াইল।
দেখিবামাত্র পা হইতে চটি খুলিয়া অধিকারী তাহাকে প্রহার
৬৪
দুলাল
করিলেন। দুলাল বিনা বাক্যে সে প্রহার পিঠ পাতিয়া গ্রহণ
করিল।
তারপর একটা ছেড়া মাদুরের উপর উপুড় হইয়া
পড়িয়া কঁদিতে কাদিতে ঘুমাইয়া পড়িল।
সারাদিন না খাইয়া ঘুমে কাটাইয়া সে সন্ধ্যায় যখন উঠিল,
তখন মাথা বিষম ভার বােধ হইতেছে। দুই চোখ রাঙা হইয়া
উঠিয়াছে, জালা করিতেছে! শরীর এমন যে নড়িবার সাধ্য
নাই! গা তাতিয়া আগুন। প্রবল জ্বর ! অত্যন্ত তৃষ্ণা পাইয়া-
ছিল, জলপানের জন্য নীচে সিড়ির উপর পড়িয়া গিয়া দুলাল
কঁদিয়া উঠিল। ম্যানেজার ও দুই-একজন অভিনেতা আসিয়া
তাকে তুলিয়া ঘরে লইয়া গেলেন। রাত্রে কুড়ি গ্ৰেণ কুইনিন
খাওয়াইয়াও ম্যানেজার দুলালের জ্বর ছাড়াইতে পারিলেন না।
শেষ রাত্রি হইতে দুলাল গান গাহিতে সুরু করিল,-
“এই তো এসেছিস মা-
এবার আমায় কর মা কোলে
বনবাসের বড় জ্বালা মা।”
পাড়ার একটা ডিসপেন্সারির কম্পাউণ্ডার আসিয়া দেখিয়া
বলিয়া গেল, বিকার।
সন্ধ্যায় দুলালের গান থামিল, সঙ্গে সঙ্গে সেও ইহজীবনের
মত ম্যানেজার ও অধিকারী মহাশয়ের নিকট হইতে শেষ-বিদায়
লইয়া গেল।
থার্ডক্লাশ
গ্রামের তিন ক্রোশের মধ্যে এক জায়গায় পূজার সময়
দুলালের সেই যাত্রার দলের বায়না ছিল। ছেলে দুলালও সঙ্গে
আসিবে—তা’কে তা’র অতি প্রিয় খাদ্য নূতন ধানের চিড়া
খাওয়াইবে বলিয়া শ্যামা আর একটি স্ত্রীলােকের সঙ্গে চিড়া
কুটিতেছিল। এমন সময় পিওন শ্যামা বৈষ্ণবীকে এক মণি-অর্ডার
আনিয়া দিল।
মণি-অর্ডারে কমিশন-বাদ দুলালের প্রাপ্য মাহিনা ন’ টাকা
ছ’ আনা অধিকারী মহাশয় পাঠাইয়া দিয়াছেন। শেষের ছত্রে
লেখা আছে, জ্বর-বিকারে ২৭শে ভাদ্র দুলাল মারা গিয়াছে।
শ্যামা টাকা কয়টা ছুড়িয়া ফেলিয়া চিড়ার কাঠাটি বুকে করিয়!
চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, “ওরে দুলােদুলাল••• !”
পিওন চলিয়া গেল।
৬৬
নিধিরামের বেসাতি (১) চৈতালীর আবাদ শেষ করিয়া নিধিরাম কলিকাতা আসিত, তাহার পর বর্ষা নামিতেই দেশে ফিরিত, এই কয়টি মাস প্রত্যহ দেখিতাম একচক্ষু নিধিরাম পাঠক মাথায় একটি ঘােট লাল টীনের বাক্স চাপাইয়া হাঁকিয়া যাইতেছে, “চাই-ই চীনা-আ সিদুর।” আর তাহার পশ্চাতে নগ্নকায় শিশুর দল বাদল মিত্রের গলির তন্দ্রালস মধ্যাহ্নকে সচকিত করিয়া চীৎকার করিতেছে, “চাই-ই কানা ইদুর ।” কবে ছন্দরসিক কোন্ শিশুকবি সিন্দুরওয়ালা নিধিরামের এই অপূৰ্ব স্তববাণী প্রথম উচ্চারণ করিয়াছিল তাহা কেহ জানে না। সম্ভবতঃ স্বয়ং কবিরও সে কথা মনে নাই, কিন্তু দীর্ঘকাল ধরিয়া প্রতি বৎসর নব নব শিশু-কণ্ঠ একই ভাষায় নিধিরামকে অভ্যর্থনা করিয়া আসিতেছিল। এই বিরূপ সম্বর্ধনায় নিধিরাম কোনও দিন রাগ করে নাই, প্রত্যুত্তরে মূষিকের অনুকরণে শব্দ করিয়া তাহার শিশু-বন্ধুগণকে খুশী করিয়াছে, দেখিয়াছি। বিশ বৎসর ধরিয়া এইরূপই চলিতেছিল, সহসা একদিন এই নিয়মের ব্যতিক্রম দেখিয়া নিধিরাম আশ্চর্য্য হইয়া গেল। গলির মধ্যে একস্থানে গুটিকয়েক শিশু জটলা করিতেছিল, নিধিরাম ৬৭ থার্ডক্লাশ সেখানে আসিয়া গলার স্বর উচু করিয়া হাঁকিল, “চাই-ই চীনা-আ সিঁদুর!” দূর হইতে দুই-একটি কণ্ঠে পরিচিত প্রতিধ্বনি শােনা গেল বটে, কিন্তু প্রত্যহের মত তাহা জমাট বাঁধিয়া উঠিল না। শিশুর দল নীরবে পরম সম্রমের সহিত একজনকে ঘিরিয়া দাড়াইয়া তাহার কথা শুনিতেছিল। নিধিরাম নিকটে আসিয়া দাড়াইল। কথা কহিতেছিল একটি বালিকা। কোমরে নীলাম্বরী শাড়ীর অঞ্চল জড়াইয়া হাত নাড়িয়া সে প্রতিপন্ন করিতেছিল যে, কাণাকে কাণা এবং খোঁড়াকে খোঁড়া বলিতে নাই এবং যদি কেহ বলে, তবে তাহার সহিত বক্তার জন্মের মত আড়ি এবং পুতুলের বিবাহে সে তাহাকে কদাচ নিমন্ত্রণ করিবে না। সমাজ-চ্যুতির এই নিদারুণ শাস্তির ভয়ে পরিচিত কণ্ঠধ্বনি শুনিয়াও শিশুর দল আজ নীরব হইয়াছিল, নিধিরাম তাহা বুঝিল এবং বক্তাকে একবার ভাল করিয়া দেখিয়া লইয়া নিঃশব্দে ফিরিয়া গেল। সন্ধ্যায় ফিরিবার পথে গলির মােড়ে নীলবাড়ীর দরজায় দ্বিপ্রহরের শিশু-সভার এই নেত্রীটির সহিত নিধিরামের সাক্ষাৎ পরিচয় হইল। নিধিরামকে দেখিয়াই বিনা ভূমিকায় বালিক। কহিল, “তুমি বুঝি আরজন্মে কাণাকে কাণা বলেছিলে, সিদুর- ওয়ালা ?” বলা বাহুল্য জন্মান্তরের কথা নিধিরামের স্মরণ ছিল । শুধু এই নবাগতার সহিত আলাপ জমাইবার অভিপ্রায়ে সে কহিল, “ মা লক্ষ্মী।” “মা বলেছে তাই এ জন্মে তুমি কাণা হয়েছ, না ?” বলিয়াই ৬৮ নিধিরামের বেসাতি সে এক প্রচণ্ড অভিশাপ-বাণী উচ্চারণ করিল, যদু, মধু, ছােটুকু, নিমাই সব্বাই আর-জন্মে কাণা হবে ! তােমাকে খেপায় কি না।” নিধিরাম দাতে জিভ কাটিয়া কহিল, “ও কথা বলতে নেই মা লক্ষ্মী !” মা লক্ষ্মী’ এইবার রুখিয়া উঠিয়া কহিল, “বলব একশাে বার ব ! তারা কেন তােমাকে কাণা বলবে ?” বলিয়াই একটু থামিয়া সে প্রশ্ন করিল, “তুমি বামুন ?” নিধিরাম কহিল, “হ্যা।” প্রশ্নকর্তীর চক্ষে সংশয় ফুটিয়া উঠিল, সে কহিল, “দেখি পৈতে ?” নিধিরাম ছিন্ন শ্ৰেজাইয়ের মধ্য হইতে মলিন উপবীত- গুচ্ছ বাহির করিয়া দেখাইল। বালিকা কহিল, “কাল রাধুর ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে। তুমি মন্তর পড়াবে?” নিধিরাম তৎক্ষণাৎ পৌরােহিত্য স্বীকার করিয়া কহিল, “পড়াব।” “আমরা কিন্তু গরীব মানুষ, দক্ষিণে দিতে পারব না, বুঝলে?” বলিয়া পরম গাম্ভীর্যের সহিত বালিকা কহিল, “এইটি পার হলেই আমি বাঁচি। আর দু’টিকে এক রকমে বিয়ে দিইছি। মাগাে ছেলেমেয়ে মানুষ করা যে কি কষ্ট।” এই বলিয়া পুতুলের ডালা- খানি নিধিরামের হাতে দিয়া সে কহিল, দেখছ, মেয়ের আমার মুখখানা রােদে একেবারে শুকিয়ে গেছে। এখন আবার জল দিয়ে রাখতে হবে, নৈলে পাড়ার লােকে বৌ দেখবার সময় খোঁটা থার্ডক্লাশ দিয়ে বলবে, ববে, বৌ কুচ্ছি।” এমন সময় ভিতর হইতে আহ্বান আসিল, “সরু?” “মাগাে মা ! দেখছ? দু-দণ্ড আপন ছেলেমেয়ের কথা কইবার যাে নেই!” বলিয়া বালিকা উঠিয়া দাড়াইল। পুতুলের ডালা তাহার হাতে দিয়া নিধিরাম কহিল, “তবে আসি মা লক্ষ্মী।” “আমি লক্ষ্মী নইগাে, সরস্বতী। আমাকে মা সরস্বতী বলে ডাবে বুঝলে?” এই বলিয়া বালিকা ভিতরে ঢুকিল। নিধি- রামের সহিত সরস্বতীর পরিচয়ের সূত্রপাত হইল এই প্রকারে। এই মুখরা (২) মেয়েটিকে সহসা নিধিরামের অত্যন্ত ভাল লাগিয়া গেল ! ক্রমে ক্রমে কালীঘাটের পুতুল, গালার চুড়ী, দু-এক টুকরা জরির কাপড় নিধিরামের সিদুরের বাক্সে আশ্রয় পাইয়া অবশেষে সরস্বতীর খেলাঘরে স্থানলাভ করিতে লাগিল। প্রত্যহের আনন্দ- হীন একঘেয়ে কেনাবেচার মধ্যে এই মেয়েটির সঙ্গে দু’দণ্ড কথা কহিয়৷ নিধিরাম আনন্দ পাইত ; সময় সময় নীলবাড়ীর জানালার বােয়াকে সিন্দুরের পেট্রা কোলের উপর রাখিয়া নিধিরাম সরস্বতীর সহিত তাহার মাটির ছেলেমেয়েদের সুখদুঃখের কথা কহিয়া ঘণ্টার কাটাইয়া দিয়াছে ; ভিন্ন পল্লীতে গিয়া বেসাতি বেচিলে দশটা পয়সা রােজগার হয়, এ কথা মাঝে মাঝে মনে হইয়াছে বটে, তথাপি তাহার প্রগলভা বান্ধবীর কথার মােহ পর ঘণ্টা ৭০ নিধিরামের বেসাতি সে কাটাইয়া উঠিতে পারে নাই। অথচ সে কথাগুলি একান্তই নিরর্থক এবং কোনাে দিন নিধিরামেরও কোনও কাজে লাগিবার তাহার সম্ভাবনা ছিল না। বর্ষ। নামিলে নিধিরাম দেশে গেল। সেবার দেশে মারাত্মক রকমের একটা ব্যাধির উৎপাত আরম্ভ হইয়াছিল, তাহার আক্রমণ হইতে নিধিরামও নিষ্কৃতি পাইল না। মাস ছয় ভুগিয়া একদিন মাঘের দ্বিপ্রহরে নিধিরাম তাহার সিন্দুরের লাল বাক্সটি মাথায় করিয়া সরস্বতীর বাড়ীর দরজায় আসিয়া হাকিল, “চাই-ই চীনা-আ সিদুর।” আগেরকার মত আর কেহ দুড়-দাড় করিয়া নামিয়া দ্বার খুলিয়া বাহিরে আসিল না। দ্বিতীয়বার হাঁকিতে নীচের ঘরের একটা জানালা খুলিয়া গেল। জানালায় সরস্বতীকে দেখিয়াই এক গাল হাসিয়া নিধিরাম জিজ্ঞাসা করিল—“বুড়ো বেটার কথা মনে ছিল সরু-মা ?” সরস্বতী ঘাড় নাড়িয়া জবাব দিল । নিধিরাম আশ্চৰ্য্য হইল, সরস্বতী তত কথা না বলিয়া থাকিবার পাত্রী নহে! জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার ছেলেমেয়ে সব ভাল আছে সরু।” এইবার সরস্বতী কথা কহিল, “সে সব আমি রাধুকে বিলিয়ে দিইছি।” ইহার পর আর কোনও প্রশ্ন করিবার সূত্র নিধিরাম খুঁজিয়া পাইল না। খানিক- ক্ষণ অপেক্ষা করিয়া অনেক ভাবিয়া সে কহিল, “একবার বাইরে আবে মা?” সরু কথা কহিল না, পিছন হইতে সরস্বতীর কনিষ্ঠ ভাইটি কহিয়া উঠিল, “মা বলেছে দিদি আর বাইরে যাবে না। ৭১ থার্ডক্লাশ দিদি বড় হয়েছে কি না।” ওঃ! তাই! এইবার নিধিরামের চক্ষে সরস্বতীর পরিবর্তন ধরা পড়িল। এক বৎসর সে সরস্বতীকে দেখে নাই। কিন্তু বর্ষ পূর্বে গৃহযাত্রার দিন সে যে মুখরা চঞ্চলা বালিকার নিকট হইতে বিদায় লইয়া গিয়াছিল তাহার সহিত এ মেয়েটার প্রভেদ বিস্তর। ইহার সহিত কি ভাষায় কোন্ উপলক্ষে কথা কহিবে তাহা সহসা নিধিরাম স্থির করিয়া উঠিতে পারিল । ইতস্ততঃ করিয়া বাড়ী হইতে যে পাটালী গুড় আনিয়াছিল তাহার পুটুলীটি জানালা গলাইয়া সরস্বতীর হাতে দিয়া নিধিরাম কহিল, “বাড়ী থেকে এনেছি সরু-মা, নিয়ে যাও।” তাহার পর নিজ গৃহ সম্বন্ধে দুই-একটি অসম্বন্ধ কথা কহিয়া নিধিরাম চলিয়া গেল, গ্রামের কারিকরের দ্বারা যে বিচিত্র বর্ণের কাঠের পুতুলগুলি গড়িয়া আনিয়াছিল, সেগুলি আর বাক্স হইতে বাহির করিবার অবকাশ হইল না। পরদিন নিধিরাম প্রত্যহের বেসাতি লইয়া নীলবাড়ীর জানালায় দাঁড়াইল, নীচের ঘরে তক্তপােষের উপর বসিয়া সরস্বতী লেখাপড়া করিতেছিল, নিধিরাম মৃদুস্বরে প্রশ্ন করিল, “কি পড়ছ সরু-মা?” সরস্বতী মুখ তুলিয়া নিধিরামকে দেখিয়া হাসিয়া কহিল, “কথামালা।” পরক্ষণেই প্রশ্ন করিল, “মা জিজ্ঞেস করেছে গুড়ের দাম কত?” প্রশ্ন শুনিয়া নিধিরাম থমকিয়া গেল ; তাহার পর শুষ্ক-মুখে কহিল, “দিদিমাকে বােলাে সরু-মা, আমার ঘরের তৈরী গুড়, পয়সা লাগেনি। সরস্বতী কহিল “আচ্ছা।” ৭২
নিধিরামের বেসাতি
ইহার পর আর দুই দিন সে পথে নিধিরাম আসিল না ।
তৃতীয় দিনের মধ্যাহ্নে নিধিরাম যথারীতি নীলবাড়ীর জানালায়
দাড়াইয়া ডাকিল, সরু-মা!” সরস্বতী শ্লেট হইতে মুখ তুলিয়া
একেবারে প্রশ্ন করিল, “দু’দিন কেন আসনি ?” নিধিরামের মুখ
উল্লাসে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল, তাহা হইলে সরু-মা তাহার কথা
মনে রাখিয়াছে! অনুপস্থিতির একটি মিথ্যা কারণ নির্দেশ করিয়া
নিধিরাম অতি সতর্ক মৃদুস্বরে কহিল, “সরুমা ! একখানা বই
এনেছি, পড়বে ?” বলিয়া জানালা দিয়া একখানা বটতলার
কৃত্তিবাসী বাঁধানাে রামায়ণ চারিদিক চাহিয়া সরস্বতীর চৌকীর
উপর রাখিয়া দিল। সরস্বতী ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ছবি
আছে ?”
নিধিরাম হাসিয়া কহিল, “অনেক! রাম, রাবণ, হনুমান সবার
ছবি। আমি পড়তে জানিনে সরু-মা, তুমি আগে পড়ে নাও,
তারপর আমাকে পড়ে শােনাবে।”
সরস্বতী কহিল, “আচ্ছা। তুমি আবার কাল আসবে ?”
নিধিরাম একটি সমুজ্জ্বল আনন্দ-হাস্যের সহিত সম্মতি জানাইয়া
চলিয়া গেল।
s
সরস্বতী রামায়ণ পড়িত আর নিধিরাম সিন্দুরের পেট্র
কোলের উপর রাখিয়া জানালার বােয়াকে বসিয়া শুনিত। মধ্যে
৭৩
থার্ডক্লাশ
যে ইটের দেয়ালের ব্যবধান ছিল, শ্রোতা পাঠিকার কাহারও
তাহা মনে ছিল না। সহসা একদিন ব্যবধান বাড়িয়া গেল।
পাঠ যখন অযযাধ্যাকাণ্ড পর্যন্ত অগ্রসর হইয়াছে, তখন
একদিন নিধিরাম আসিয়া দেখিল, যে সরস্বতীর পরিবর্তে নীচের
ঘরে তক্তপােষের উপর দুইটি ভদ্রলােক পরিষ্কার বিছানায় বসিয়া
তামাক টানিতেছেন। নিধিরাম ডাকিল, “চাই-ই চীনা-অ
সিদুর।” দোতলায় একটা জানালা খুলিয়া গেল, সরস্বতী
দাড়াইয়া বাম হাত মুখে দিয়া ডান হাত নাড়িয়া ইঙ্গিতে জানাইল
যে, সে আজ পড়িবে না। নিধিরাম যে পথে আসিয়াছিল সেই
পথেই ফিরিয়া গেল। গলির মােড়ে সরস্বতীর সখী রাধারাণী
ওরফে রাধু নিধিরামকে সংবাদ জানাইল যে, সরস্বতীর বিবাহ
আসন্ন এবং পাত্র পক্ষ দেখিতে আসিয়াছেন। সরু-মার বিবাহ !
তারপর শ্বশুর-বাড়ী ! সে কতদূর! নিধিরাম একবার ফিরিয়া
দূরে
নীলবাড়ীর দোতালার রুদ্ধ বাতায়নের দিকে চাহিয়া মন্থরপদে
চলিয়া গেল।
তিন চারি দিন ঘরে কাটাইয়া আবার সেই পেটরা মাথায়
করিয়া নিধিরাম গলির মােড়ে আসিয়া একদিন হাঁকিল, “চাই-ই
চীনা-আ সিদুর।”
সে দিন নীলবাড়ীতে নহবৎ বাজিতেছে, নিধিরাম অনেকক্ষণ
অপেক্ষা করিল, উপরের খােলা জানালার ধারে আজ আর
আসিয়া কেহ দাড়াইল না।
৭৪
নিধিরামের বেসাতি
পর দিন হইতে পুনরায় যথারীতি নিধিরামের কণ্ঠস্বর গলির
সৰ্বত্ৰ ধ্বনিত হইতে লাগিল, শুধু নীলবাড়ীর সম্মুখ দিয়া নীরবে
সে চলিয়া যাইত, শত চেষ্টাতেও কণ্ঠে কথা ফুটিতে চাহিত না।
(৩)
নিত্যকার মত সেদিনও নিধিরাম নীরবে চলিয়া যাইতেছিল,
এমন সময় নীলবাড়ীর জানালা হইতে একটি শিশু ডাকিল
“দাড়াও সিদুরওয়ালা ! দিদি তােমাকে ডাকছে।” নিধিরামের
বুক কঁপিয়া উঠিল। ফিরিতেই সে দেখিল নীচের ঘরের জানালায়
সরস্বতী দাঁড়াইয়া। নিধিরাম আনন্দ-গগদ স্বরে কহিয়া উঠিল,
“কবে এলে সরু-মা ? আমি তাে জানিনে তাই
সরস্বতী সংক্ষেপে কহিল, “আজ। ইহার পর নিধিরাম ঘন্টা
খানেক ধরিয়া নিজেই অবিশ্রান্ত কত কথা কহিয়া গেল। শেষে
কহিল, “তােমার সিদুরের কৌটোটা আন তাে সরু-মা। খুব
ভাল উজলি সিদুর আছে।”
সরস্বতীর সােনার কৌটা সিদুরে ভরিয়া নিধিরাম সেদিনকার
মত চলিয়া গেল। তাহার পর হইতে ক্রমে ক্রমে বিচিত্র বর্ণের
কাঠের কৌটায় সিদুরের উপঢৌকন আসিতে আরম্ভ হইল,
সেই সঙ্গে তরল আতা হইতে সুরু করিরা শাঁখের করুন পর্যন্ত
এয়ােতির কোনও সরঞ্জামই বাদ পড়িল না।
সেবার বর্ষায় আর নিধিরাম দেশে গেল না।
৭৫
থার্ড ক্লাশ
আশ্বিনে পূজার পূর্বে সরস্বতী যেদিন শশুর-গৃহে যাত্ৰা করিল,
নিধিরামও সেই দিন দেশে গেল। বর্ষায় বাড়ীতে উপস্থিত না
থাকিবার জন্য আর্থিক ক্ষতি হইয়াছে এই বলিয়া স্ত্রী হইতে
আরম্ভ করিয়া কনিষ্ঠ পুত্র পর্যন্ত নিধিরামকে যথেষ্ট ভংসনা
করিল কিন্তু আর্থিক ক্ষতির প্রকাণ্ড অঙ্কটি তাহাকে মােটেই
বিচলিত করিল না।
০
ফানের বাতাসে কৃষ্ণচুড়ার গাছের ডালে রং ধরিয়াছে।
নিধিরাম কলিকাতায় ফিরিল।
সরস্বতী শ্বশুরবাড়ী হইতে ফিরিয়াছে কি না সে জানিত না।
নীলবাড়ীর সম্মুখে দাড়াইয়া হাঁকিল, “চাই-ই চীনা-আ সিদুর।
কোন সাড়া আসিল না। নিধিরাম গলির পথে ফিরিয়া গেল
কিন্তু কি ভাবিয়া আবার ফিরিয়া আসিয়া কণ্ঠস্বর উচ্চে তুলিয়া
ডাকিল, “চাই-ই চীনা-আ সিদুর !”
অতি ক্ষীণ পদধ্বনি যেন শোনা গেল। নিধিরাম কম্পিত
বক্ষে জানালার ধারে আসিয়া প্রতীক্ষায় দাড়াইল। জানালা
খুলিয়া সরস্বতীর ছােট ভাইটি কহিল, “তােমাকে এ পথে আসতে
মা বারণ করে দিয়েছে সিদুরওয়ালা!”
অজ্ঞাতে কোনও অপরাধ করিয়া ফেলিয়াছে ভাবিয়া নিধিরামের
মুখ শুকাইল। আতা আন্তা করিয়া সে কহিল “কেন ?”
৭৬
নিধিরামের বেসাতি
এমন সময় দরজা খুলিয়া গেল। দ্বারে আসিয়া দাড়াইল
ম্লানমুখী শুভ্রবেশ নিরাভরণা সরস্বতী। নিধিরাম চমকিয়া উঠিল
তাহার পর মাথার পেট্রা মাটিতে নামাইয়া তাহার উপরে বসিয়া
পড়িয়া অর্থহীন উদভ্রান্ত দৃষ্টিতে সম্মুখে চাহিয়া রহিল।
নীলবাড়ীর দরজা বন্ধ হইয়া গেল।
সম্বিং পাইয়া নিধিরাম যখন ফিরিয়া চলিল, তখন তাহার
মাথায় সিদুরের পেট্রা বিশ মণ ভারী হইয়া গিয়াছে।
ইহার পর আর সাত দিন সে গলিতে কেহ নিধিরামকে দেখে
অবশেষে একদিন হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনিয়া জানালা
খুলিলাম। নিধিরামের মূর্তি দেখা গেল। সিঁদুরের পেট্রার
পরিবর্তে তাহার মাথায় একটা প্রকাণ্ড ফলের ঝাকা। তাহার
গুরুভারে অবনত হইয়া বৃদ্ধ নিধিরাম পাঠক ঘর্মাক্ত কলেবরে
নীলবাড়ীর সম্মুখ দিয়া গলির পথে হাঁকিয়া যাইতেছে—“ফল চাই
মা, পাকা ফল।”
নাই।
৭৭
পরের ছেলে বুড়া শম্ভু সরকার স্বগ্রাম ঝাউডাঙ্গাতে পাঠশালা খুলিয়া গত চল্লিশ বৎসর যাবং গুরুমহাশয়ের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন ; এই দীর্ঘকালের মধ্যে শুধু পূজার কয়েকদিন ছাড়া আর কেহ তাহার পাঠশালার দুয়ার বন্ধ দেখে নাই। তাই সেদিন হঠাৎ পাঠশালার দরজায় তালা বন্ধ দেখিয়া পাড়ার লােক আশ্চর্য হইয়া গেল। সন্ধ্যায় দুই একজন প্রতিবেশী কৌতূহলী হইয়া সরকার মহাশয়ের সন্ধান লইতে আসিলেন। সরকার মহাশয় তখন বহুকালের পুরাতন ক্যাম্বিসের ব্যাগের মধ্যে তাঁহার তিনখানি কাপড় ও দুইটি ব্ৰেজাই পাট করিয়া গুছাইয়া তুলিতেছিলেন। প্রতিবেশীরা জিজ্ঞাসা করিলেন, “একি, সরকার মশাই ?” “চছি দাদা, আর পারছিনে। দিনকয়েক ঘুরে আসি। মধু দাসকে ব'লে গেলাম, সে পাঠশালা দেখবে। বাড়ী ঘর যেমন আছে থাকুক ! আর কি হবে এসব !” বলিয়া ব্যাগটি তুলিয়া তাহার ওজন পরীক্ষা করিলেন, তারপর নামাইয়া রাখিয়া কহিলেন, “রতন বৃত্তি পেয়েছিল দাদা!” বলিয়া একটি দীর্ঘ- নিঃশ্বাসের সঙ্গে একখানি ভাঁজ করা কাগজ পার্শ্ববর্তী ভদ্রলােকের হাতে তুলিয়া দিলেন। তিনি সেখানিতে একবার চোখ বুলাইয়া ৭৮
পরের ছেলে
সব, ফিরে
কহিলেন, “এখানি আবার রেখেছেন কেন? দেখে মিছিমিছি
মন খারাপ করা।”
বৃদ্ধ তাড়াতাড়ি কাগজখানি লইয়া কহিলেন, “না থাক!”
তারপর বলিলেন, “বুড়ােকে মনে
“বুড়ােকে মনে রেখে ভাই
আসলে আবার দেখা হবে! আর দেরী করবনা, দুর্গা হরি।
সিদ্দিদাতা গনেশ।” বলিয়া বেতের মােটা লাঠিটার মাথায় ব্যাগ
ঝুলাইয়া লাঠিগাছ কঁাধে করিয়া কহিলেন, “শুধু একটা কথা
দাদা আমি মধুকে বলে গেলাম তােমারাও মনে করিয়ে দিও,
ছেলেগুলােকে যেন মার-ধাের না করে। কে কবে যাবে কে
জানে? দু’দিনের জন্য আর কেন—দুর্গা শ্রীহরি !” শম্ভু সরকার
বাহির হইয়া গেলেন।
রাম দত্ত কহিলেন, “পুত্রশােকে রাজা দশরথ মরেছিলেন, শম্ভ
সরকার তাে ছার। আহা রতন ছেলেটি বড় ভাল ছিল।”
শম্ভু সরকারের স্ত্রী রতনের জন্মের পরদিনই ইহলােক হইতে
বিদায় লইয়াছিলেন। শম্ভু সরকার আর বিবাহ না করিয়া নিজেই
রতনের মায়ের স্থান অধিকার করিলেন। ক্রমে রতন বড় হইয়া
পাঠশালায় ঢুকিল। এবার সে প্রাইমারী বৃত্তি পরীক্ষা দিয়াছিল
কিন্তু ফল বাহির হইবার মাসখানেক পূর্বেই একদিনের জ্বরে হঠাৎ
সে মৃত্যুলােকে প্রস্থান করিল।
অসীম ধৈর্যের সহিত শঙ্কু
সরকার এই আঘাত সহিয়া গেলেন, পাঠশালা রীতিমত চলিতে
লাগিল কিন্তু যেদিন পরীক্ষার ফল ও সেই সঙ্গে পুত্রের বৃত্তি
৭১
থাডক্লাশ প্রাপ্তির সংবাদ বাহির হইল, সেদিন পুত্ৰশােক তাঁহাকে নূতন বাজিল। ঘরে আর কোনমতেই মন বসিতেছিল না ; পাঠশালায় গিয়া যে স্থানটিতে রতন বসিত সেই দিকে দৃষ্টি পড়িত সকলের আগে, আর বুকের মধ্যে ধড়াস্ করিয়া উঠিত; কাজেই আজ শম্ভু সরকার ষাট বৎসর বয়সে জীবনে প্রথম গ্রাম ছাড়িয়া বাহিরে বাহির হইলেন। ( ২ ) মাস-পাঁচেকের মধ্যে তীর্থভ্রমণ শেষ হইল, সম্বলও ফুরাইয়া আসিল। তখন সরকার মহাশয় স্থির করিলেন যে চাকুরী করি- বেন; কিন্তু ভগ্নদেহ বৃদ্ধকে কাহারও কাজে লাগিল না। অগত্যা পদব্রজে দেশে ফিরিবার সঙ্কল্প করিয়া শম্ভু সরকার যাত্রা করিলেন। কান্তপুর আসিয়া প্রথম দিন সন্ধ্যা হইল। বাবুদের অতিথি- শালায় রাত্রিযাপন করিয়া প্রাতঃকালে যখন সরকার মহাশয় ইষ্টমন্ত্র জপিতেছিলেন সেই সময়ে একটি ছেলে আসিয়া পরম কৌতূহলের সঙ্গে শম্ভু সরকারের দিকে চাহিয়া রহিল, তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করিল, “তুমি কে?” ছেলেটিকে সরকার মহাশয়ের ভালাে লাগিল, তিনি মন্ত্রজপ ছাড়িয়া তাহার হাত ধরিয়া কহিলেন “তুমি কে আগে বল।” সে কহিল, “আমি রতন।” রতন শম্ভু সরকারের বুকের মধ্যে ধক্ করিয়া উঠিল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিলেন, “তুমি কার ছেলে ? -
পরের ছেলে
“বাবার ছেলে” রতন জবাব দিল। শম্ভু সরকার পতনের
হাত ধরিয়া কহিলেন, “আমিও বাবার ছেলে, আমার নাম শম্ভু
সরকার।” রতন তাড়াতাড়ি কহিল, “তুমি শম্ভ ?
তােমাকে ডাকছে! চল।” বলিয়াই শম্ভু সরকারের হাত ধরিয়া
টানিল। সরকার মহাশয় বুঝিলেন যে শিশু ভুল করিয়াছে,
তথাপি উঠিয়া কহিলেন, “চল যাই।” তখনকার মত তাহার
মন্ত্রজপ বন্ধ রহিল।
বড়বাবু, ফরাসে বসিয়া তামাক টানিতেছিলেন, এমন সময়
রতন শ সরকারের হাত ধরিয়া উপস্থিত হইয়া কহিল, “বাবা,
তুমি যে ডাকছিলে, এনেছি।”
বড়বাবু হাসিয়া কহিলেন, “কাকে এনেছিস রে?”
“তুমি যে বললে শম্ভু সরকার!” রতন কহিল।
“আপনার নামও বুঝি শম্ভু সরকার, তাই থােকা আপনাকে
টেনে এনেছে। আমি, আমাদের নায়েব শন্তু সরকারকে খুঁজ
ছিলাম। যাহােক আপনি বসুন।” শম্ভু সরকার আসন লইলেন।
তারপর কথাবার্তায় শম্ভু সরকার তাহার জীবনের সমস্ত কাহিনী
আদ্যোপান্ত বলিয়া গেলেন, “শেষে কহিলেন, শেষ-জীবনে যদি
কোথাও আশ্রয় পাই, তাহলে দিন ক’টা একরকমে কাটিয়ে দিই।”
বড়বাবুর দয়া হইল। কহিলেন, “এখানে থাকতে পারেন,
আপত্তি নেই। খােকাকে একটু দেখবেন শুনবেন। দশ টাকা
মাইনে, খােরাক পােষাক—পােযাবে?”
৮১
থার্ডক্লাশ
উঠিলেন, “খুব ! খুব !
শম্ভু সরকার উচ্ছসিত হইয়া কহিয়া
পরম দয়াল আপনি” ইত্যাদি।
(৩)
প্রাতে ও সন্ধ্যায় ঘণ্টাদুই করিয়া পড়াইবার বাঁধা সময় ছিল।
কিন্তু ছাত্র ও শিক্ষক কেহই এই নিয়মের ধার ধারিতেন না।
দিনের বানােঘণ্টার মধ্যে অর্ধেক সময় রতন শম্ভু সরকারের ঘরেই
কাটাইত, অবশ্য পড়া-শুনার কাজে নহে। সুদীর্ঘ জীবনকালের
মধ্যে যত প্রকার অদ্ভুত পশু-পক্ষীর সহিত শম্ভু সরকারের পরিচয়
হইয়াছিল, তাহাদের সকলের কাহিনী সবিস্তারে তিনি তাহার
এই শিশু ছাত্রটির নিকট বর্ণনা করিতেন, রতন খেলা ভুলিয়া
পরম কৌতূহলের সহিত তাহা শুনিয়া যাইত। রতনের খেলার
সাথীর সংখ্যাও কমিয়া আসিয়াছিল ; মাষ্টার মহাশয়কে ছাড়িয়া
অন্যত্র খেলিতে যাইতে তাহার মন সরিত না। অগত্যা
সরকার মহাশয় নিজেই তাহার সহিত খেলিতে আরম্ভ করিয়া
দিলেন। ' ষাট এবং ছয় এই উভয় সংখ্যার মধ্যে যে ব্যবধান
আছে, সরকার মহাশয়ের আচরণে তাহা আর মনে করিবার
কোনও উপায় রহিল না। তিনি কখনও ঘােড়া হইয়া তাঁহার
শিশু ছাত্রটিকে পিঠে করিয়া ছুটিতেন, কখনও তাহার কাঠের
গাড়ীখানিতে দড়ি বাঁধিয় কাছারি বাড়ীর আঙ্গিনায় অসংখ্য
কৌতুহলী দৃষ্টিকে উপেক্ষা করিয়া পরম নির্বিকার চিত্তে
৮২
:
পরের ছেলে টানিয়া লইয়া বেড়াইতেন। এইরূপে বৎসর খানেক কাটিয়া গেল। ইতিমধ্যে শন্তু সরকার দেশে একখানি পত্র লিখিয়াছিলেন, পত্রের উত্তরে জানিলেন যে, বাড়ীর আঙ্গিনায় জঙ্গল জমিয়াছে এবং বাহিরের পাঠশালা ঘরের জীর্ণ দশা ; আগামী বর্ষায় যদি টি কিয়া যায়, তবে বহুভাগ্য বলিতে বহুভাগ্য বলিতে হইবে। সংবাদ শুনিয়া তাঁহার কিছুমাত্র চাঞ্চল্য দেখা গেল না, তিনি হার শিশু ছাত্রটির অধ্যাপনায় পূর্বের মতই মগ্ন হইয়া রহিলেন। রতন সময়ে বাড়ী আসে না, অধিকাংশ সময় মাষ্টারের ঘরেই কাটাইয়া দেয় ; ইহা কিন্তু রতনের মাতার একান্ত অপ্রীতিকর ছিল, এক-আধবার আপত্তির আভাস কৰ্ত্তাকেও দিয়াছিলেন কিন্তু কর্তা তাঁহার স্বাভাবিক ঔদাস্য বশতঃ সে কথায় কর্ণপাত করেন নাই। এদিকে ছেলে পর হইয়া যাইতেছে এই আশঙ্কা মাতাকে ক্রমেই অধীর করিয়া তুলিতেছিল। সেদিন গৃহিণী সঙ্কল্প করিয়াছিলেন যে, কথাটির একেবারে শেষ মীমাংসা করিয়া ফেলিবেন। কর্তার আহার শেষ হইতেই তিনি কহিলেন, “ছেলেকে তত মাষ্টারের হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্তি বসে আছ। পড়াশুনা করে কিনা তার খবরটা কি নিয়ে থাক? না মাস মাইনে গুণে দিয়েই খালাস!” কৰ্তা কহিলেন, “মাষ্টার ভাল, আমি বরাবর দেখছি।” অনেক জিনিষ পুরুষলােক দেখিতে পায় না কিন্তু স্ত্রীলােকের ৮৩ থার্ডক্লাশ চক্ষে পড়ে, এ বিষয়ে একটি সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করিয়া গৃহিণী কহিলেন, “আচ্ছা একবার পরখ করেই দেখনা, ছেলে তাে তােমারই।” রতনের ডাক পড়িল এবং অনতিবিলম্বে পরীক্ষা আরম্ভ হইয়া গেল ; রতন অনায়াসে ধারাপাত ও বােধােদয় আদ্যোপান্ত আবৃত্তি করিয়া গেল। কৰ্ত্তা সহাস্যে কহিলেন, “দেখছ?” পুত্রের কৃতিত্বে মায়েরও যে আনন্দ না হইয়াছিল তাহা নহে, কিন্তু তখন উল্লাস প্রকাশ করাটা সমীচীন মনে করিলেন না এবং তখনকার মতন নীরব হইয়া গেলেন। সন্ধ্যায় গৃহিণী আবার কথা পাড়িলেন কিন্তু অন্য ভাবে সেদিন রতনের সমবয়সী ও বাড়ীর যদু ইংরাজী বলিতেছিল, রতন কিছু বুঝিতে না পারিয়া ফ্যা ফ্যা করিয়া তাহার দিকে চাহিয়াছিল, সে কথাটি কর্তাকে জানাইয়া গৃহিণী কহিলেন, “দেখ একটু ইংরিজী শেখা তত থােকার দরকার। বড় হলে সাহেব- সুবাের সঙ্গে কথা কইতে হবে তাে?” কর্তার কাছে কথাটি মূল্যবান মনে হইল। পাশ না দিক, বড় মানুষের ছেলের ইংরাজী না শিখলে চলে না এ ধারণা তাহারও ছিল। রতনকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “খােকা, তুমি ইরেজী পড় না?” রতন কহিল, “না বাবা। মাষ্টার মশাই তাে পড়ান নি।” কৰ্ত্তা কথা কহিলেন না, গৃহিণী কহিলেন, “মাষ্টার মশাই না পারেন তুমি থােকার ইংরিজী পড়াবার জন্যে নতুন মাষ্টার ঠিক কর। ছেলেকে আমার মুখ করে রাখতে পারবে না।” ৮ঃ T
পরের ছেলে
রতন নীরবে মায়ের কথা শুনিল, তাহার পর মনে মনে
ইংরাজী ভাষার মুণ্ডপাত করিতে করিতে চলিয়া গেল।
(৪)
পরদিন প্রাতে যখন রতন গত রাত্রির কাহিনী সবিস্তারে
সরকার মহাশয়ের নিকট বর্ণনা শেষ করিল, তখন শম্ভু সরকারের
দুই চক্ষু জলে ভরিয়া উঠিয়াছে। তিনি অতি মৃদুস্বরে আপন মনে
কহিলেন, “মায়া ! মায়া ! পরের ছেলে !”
রতন কথা কহিল না। অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া শম্ভু
সরকার জিজ্ঞাসা করিলেন, “হ্যা রে রতন, তুই ঠিক শুনেছিস
গিন্নিমা নতুন মাষ্টার আনতে চেয়েছেন?”
“হ্যা, মাষ্টার মশাই। আমি কিন্তু পড়ব না, আমি মামাবাড়ী
চলে যাব।” রতন ঠোট ফুলাইয়া কহিল ।
সরকার মহাশয় রতনের মাথায় হাত বুলাইয়া অনেক চেষ্টা
করিয়া কহিলেন, “পড়বি বৈইকি বাবা, তা নৈলে কি বিদ্যে হয় ?
পরক্ষণেই আবার প্রশ্ন করিলেন, “আচ্ছা গিন্নিমা আর কি
বলেন? আর বাঙ্গলা পড়তে হবে না? কথামাল, আখ্যানমঞ্জরী
এসব তত পড়াই হয়নি, তুই বললিনে কেন ?” “আমি বলিনি
মাষ্টার মশাই।” রতন অসঙ্কোচে কহিল ।
“তাই ব, তা নইলে
তা নইলে কি আর গিন্নিমা ইংরিজী পড়তে
বল্লেন ? আচ্ছা আমি তাকে বুঝিয়ে বলব।”
গিন্নি-মাকে একটু
থার্ডক্লাশ বুঝাইয়া বলিলেই তিনি বুঝিয়া যাইবেন ভরসায় শম্ভু সরকার একটু স্বস্তি লাভ করিলেন তারপর কেবল বােপােদয়খানা খুলিয়া উদ্ভিদের সংজ্ঞা নির্দেশ করিবার উপক্রম করিতেছেন, এমন সময় কর্তা ডাকিলেন, “সরকার মশাই।” আহ্বান শুনিয়া আপনার অজ্ঞাতেই শম্ভু সরকার কঁদিয়া উঠিলেন। কৰ্ত্তা আসন লইয়া দুই-একটি সাধারণ কথার পর বলিলেন, “খােকা তাে এদিকে মল শেখেনি দেখলাম। কিন্তু জানেন তাে ইংরেজী শেখাও একট, দরকার। এখন থেকেই অল্প-স্বল্প কিছু পড়াশুনা করলে সহজেই কতকটা শিখে ফেলবে। আপনি কি বলেন?” কর্তা ঘুরাইয়া বলিলেও শঙ্কু সরকার ইঙ্গিতটা স্পষ্ট বুঝিলেন, মাথা চুল্কাইতে চুকাইতে কহিলেন, “আজ্ঞে সে অতি যথার্থ কথা, রাজভাষা শেখাই তাে উচিত।” “আপনি তাহলে একটু দেখবেন ও গ্রামের ইস্কুলের মাষ্টারেরা কেউ যদি—” বলিয়াই কর্তা জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি বুঝি ইংরেজী জানেন না?” কোনাে সময় ইংরেজীর অক্ষর পরিচয় শন্তু সরকারের হইয়াছিল, কিন্তু সেটাকে ইংরেজী জানা বলা যায় কি না তাহা তিনি তাড়াতাড়ি স্থির করিয়া উঠিতে পারিলেন না, কহিলেন, “আজ্ঞে বাবু, আমরা সেকেলে মানুষ।” কথাটা শেষ করিবার অবকাশ না দিয়া কৰ্ত্তা উঠিয়া কহিলেন, “আচ্ছা আপনি দেখবেন, আমিও খোঁজ নিচ্ছি।” কত্তা বাহির হইয়া গেলে সরকার মহাশয় রতনকে ছুটি দিলেন। রতন ৬ পরের ছেলে বােধধাদয়ের পাতা হইতে মুখ না তুলিয়াই অত্যন্ত ভারী গলায় জিজ্ঞাসা করিল, “আর পড়াবেন না মাষ্টার মশাই ?” সরকার মহাশয় রতনকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া কহিলেন, “পড়াব বৈকি বাবা? এখন যাও ধারাপাতটা একটু দেখগে, আমি ডাকব’খন।” রতন খিড়কির পুকুরের পৈঠায় ধারাপাত খুলিয়া অনেকক্ষণ বসিয়া রহিল কিন্তু মাষ্টার মহাশয় ডাকিলেন না। বেলা বাড়িলে সে ধারাপাতখানি বন্ধ করিয়া মাষ্টার মহাশয়ের ঘরের দরজার কাছে উকি দিয়া দেখিল যে, মাষ্টার মহাশয় চক্ষু বুজিয়া শুইয়া আছেন। রতন তাহার নিদ্রাভঙ্গ করিবার অভিপ্রায়ে ঘরের পাশে দাড়াইয়া পড়িতে লাগিল, “এক কড়া পােয়া-গণ্ডা, দুই কড়া আধ-গণ্ডা।” শম্ভু সরকার ঘুমান নাই, ডাকিলেন, আয় রতন!” রতন ভিতরে আসিয়া দাড়াইলে সরকার মহাশয় কহিলেন, “আমি একটু তালবাড়ীতে যাচ্ছি রতন, বেলা পড়লে ফিরব। এ বেলা খাবনা, বলে দিস্।” চাদরখানি কঁাধে ফেলিয়া শম্ভু সরকার বাহির হইয়া গেলেন। তালবাড়ী হইতে শন্তু সরকার যখন ফিরিলেন, তখন সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। বড়বাবু বাহিরেই বসিয়াছিলেন, জিজ্ঞাসা করিলেন, “মাষ্টার পেলেন সরকার মশাই?” শম্ভু সরকার আন্তা আতা করিয়া কহিলেন, “আজ্ঞে না।” বলিয়াই হাতের বহিখানা চাদরের নীচে লুকাইয়া একেবায়ে আপনার ঘরে গিয়া ঢুকিলেন। ৮৭ থার্ডক্লাশ বলাবাহুল্য, সরকার মশায় সত্য কথা বলেন নাই। তাল- বাড়ীর মাইনর স্কুলের সকল মাষ্টারেরই বড় বাড়ীর ছেলেটির উপর লােভ ছিল। শম্ভু সরকার একজনের সঙ্গে কথাবার্তাও প্রায় শেষ করিয়া ফেলিয়াছিলেন কিন্তু বৈকালে তাঁহাকে শেষ কথা না দিয়াই চলিয়া আসিয়াছেন। রতন অপরের কাছে পড়িবে ভাবিতেই তাহার মনে হইল যেন জগতের সহিত হৃদয়ের যে যােগসূত্রটি ছিল তাহা একেবারে ছিন্ন হইবার উপক্রম হইয়াছে। রাত্রি গভীর হইয়া আসিতেছে। তালবাড়ী হইতে যে ফাষ্ট বুকখানা কিনিয়া আনিয়াছিলেন, শম্ভু সরকার তাহা খুলিয়া নূতন করিয়া ইংরাজী শিখিতে বসিলেন । রাত্রি প্রায় শেষ হইয়া আসিল তথাপি শম্ভ সরকারের ইংরেজী জ্ঞান কিছুমাত্র অগ্রসর হইল না। অক্ষরগুলি ক্রমাগতই ভুল হইতে লাগিল। বারবার তা আর ক্ষীণ স্মৃতিশক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া শম্ভ সরকার ক্লান্ত হইয়া একটি দীর্ঘনিঃশ্বাসের সঙ্গে বহি বন্ধ করিলেন এবং অনতি কাল মধ্যে পরিশ্রান্ত বৃদ্ধ গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত হইয়া পড়িলেন। প্রভাতে রতন আসিয়া ফিরিয়া গিয়াছে, নিদ্রাভঙ্গের ভয়ে মাষ্টার মহাশয়কে ডাকে নাই। বেলা যখন দশটা তখন হঠাৎ বড়বাবুর খাস মুন্সির ডাকে শন্তু সরকার ধড়ফড়, করিয়া বিছানায় উঠিয়া বসিলেন, “উঃ বডড বেলা হয়েছে দেখছি যে!” মুন্সি মহাশয় কহিলেন, “আজ্ঞে হ্যা, বাবু অনেক্ষণ থেকেই আপনাকে ডাকছেন।”
পরের ছেলে “বাবু ডাকছেন! দুর্গ। শ্রীহরি !” শম্ভু সরকার তাড়াতাড়ি চোখ মুছিয়া বাহির হইলেন। কাছারি-ঘরের বাহিরে চৌকিতে বাবু বসিয়া, তাহার সম্মুখে কে ও! তালবাড়ীর বিনােদ মাষ্টার ! সরকার মহাশয়ের মুখখানি একেবারে পাংশু হইয়া গেল। বড়বাবু সরকার মহাশয়কে ডাকিয়া কহিলেন, “আপনি একেই বুঝি কাল বলে এসেছিলেন ? তা এর দ্বারাই চলবে।” শম্ভ সরকার বিনােদ মাষ্টারের দিকে একবার চাহিলেন, সে দৃষ্টিতে যে আলা ছিল তাহাতে সত্যযুগ হইলে বিনােদ মাষ্টার ভষ্ম হইয়া যাইতেন। বাবু, সে দিকে লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, “আপনি রতনের ইংরাজী একটা বই কিনে এনে দিন্ আজই, বুঝলেন?” শম্ভু সরকার মাথা নােয়াইয়া ‘যে আজ্ঞে’ বলিয়াই সােজ। নিজের ঘরের দিকে চলিয়া গেলেন। সন্ধ্যায় শম্ভু সরকার আপনার জীর্ণ তক্তপােষখানার উপর বসিয়া দূরে কাছারির বারান্দায় যেখানে রতন তাহার নূতন মাষ্টারের নিকট হইতে ইংরাজী বর্ণমালার পাঠ লইতেছিল, সেই দিকে চাহিয়া ছিলেন। রতন বার-বার মুখ তুলিয়া সরকার মহাশয়ের ঘরের দিকে চাহিতেছিল আর সরকার মহাশয়ের চক্ষু আদ্র হইয়া উঠিতেছিল। অনেক্ষণ নীরবে বসিয়া থাকিয়া শেষে কি ভাবিয়া শম্ভ সরকার উঠিয়া গেলেন। বড়বাবু বাগানে পায়চারী করিতেছিলেন, শম্ভু সরকার ৮৯
থার্ডক্লাশ
আসিয়া যুক্তকরে কহিলেন, “বাবু আমাকে বিদায় দিন। আরও
দুই একটা কথাও বলিতে যাইতে ছিলেন কিন্তু গলার স্বর সহসা
অত্যন্ত কপিতে লাগিল, ভালাে করিয়া আওয়াজ বাহির হইল না।
বড়বাবু সহজভাবেই কহিলেন, “যেতে চাইছেন ? কোথায়
যাবেন ?”
“যে দিকে দু’চক্ষু যায়, আর কটা দিনই বা ? একরকম
কেটেই যাবে” শম্ভু সরকার কহিলেন।
“তা বেশ। সন্ধ্যার পর কথা হবে।” শম্ভু সরকার তখনকার
মত ফিরিয়া গেলেন।
রাত্রি প্রহর-খানেকের সময় সরকার মহাশয়ের ডাক পড়িল ।
তাহাকে ছাড়িয়া দিতে তিনি বিশেষ দুঃখ বােধ করিতেছেন, এই
প্রকারের গুটিকয়েক মামুলী কথা বলিয়া দশখানি দশ টাকার
নােট শম্ভু সরকারের হাতে দিয়া বড়বাবু কহিলেন, “আপনার
পারিশ্রমিক যৎকিঞ্চিৎ দিলাম।” নােট কয়খানি হাত পাতিয়া
লইতে তাহার হাত কাঁপিয়া গেল। কোনক্রমে আত্মসম্বরণ
করিয়া নােট কয়খানি ছেড়া জামার পকেটে ফেলিয়া শম্ভু সরকার
বাবুকে প্রণাম করিয়া কহিলেন, “কাল
কহিলেন, “কাল ভােরেই বেরােব।
একবার রতনকে দেখে যাব।
বড়বাবু কহিলেন, “সে তাে ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষণ বুঝি।
সরকার মহাশয় তাড়াতাড়ি কহিলেন, “ঘুমুচ্ছে? আহা! তবে
থাক। সারাদিন তাে বিশ্রাম নেই।”
পরের ছেলে রাত্রি প্রভাতের পূর্বেই শক্ত সরকার তাঁহার সেই পুরাতন ব্যাগের হাতলে ছেড়া গামছা জড়াইয়া ছাতির ডগায় ঝুলাইয়া বাহির হইলেন। পথে উঠিয়া একবার পিছন ফিরিয়া দোতলায় রতনের রুদ্ধ-বাতায়ন শয়নকক্ষের দিকে চাহিয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কহিলেন, “মায়া ! মায়া ! পরের ছেলে !” তাহার পরক্ষণেই দ্রুতবেগে চলিতে আরম্ভ করিলেন। অনির্দিষ্ট দীর্ঘপথে আজ নূতন করিয়া শম্ভু সরকারের যাত্রা আরম্ভ হইল। মাস খানেক পর একদিন বড়বাবুর সম্মুখে বসিয়া রতন বিনােদ মাষ্টারের নিকট অধীত বিদ্যায় পরীক্ষা দিতেছিল সেই সময় পিয়ন রতনের এক পার্শেল আনিয়া উপস্থিত করিল। বড়বাবু কৌতূহলী হইয়া পার্শেল খুলিলেন। মধ্যে প্রায় একশ’ টাকা দামের একটি সােনার ঘড়ি আর একটুকরা কাগজে লেখা ‘বাবা’ প্রেরক শ্রীশম্ভুনাথ সরকার। কোন ঠিকানা নাই অনেকক্ষণ ঘড়িটীর দিকে চাহিয়া থাকিয়া রতনের হাতে ঘড়িটা দিয়া বড়বাবু নীরবে বসিয়া রহিলেন। হঠাৎ তাহার চোখে ছবির মত ভাসিয়া উঠিল একদিনের কথা-বুড়া শক্ত সরকার বাহিরের আঙ্গিনায় হামাগুড়ি দিয়া ঘােড়া হইয়া ছুটিতেছেন, আর রতন তাঁহার পিঠে সওয়ার হইয়া বসিয়া আছে। ৯১
বছিরের দরগা
এর একটু ইতিহাস আছে।
বিশু জন্মিয়াছিল বাগীর ঘরে। কিন্তু তার মা ও পাড়া-
প্রতিবেশী সকলেরই নিশ্চিত ধারণা ছিল যে, সে ছিল পূর্ব জন্মে
ব্রাহ্মণ, কোন পাপে বাণীর ঘরে আসিয়া এবারে জন্ম লইয়াছে।
এই ধারণার কারণও ছিল, পাঁচ বৎসরে পড়িয়াই বিশু একদিন
বলিল, “আমি মাছ খাব না।” মা প্রথমে প্রহারের চোটে তাকে
সল্পচ্যুত
করিবার চেষ্টা করিল কিন্তু বিশু টলিল না। অগত্য।
মাকেও এই জেদী ছেলের জন্য নিজের পরমপ্রিয় খাদ্য মৎস্য
ত্যাগ করিতে হইল। আরও একটু বড় হইলে বিশু জেলে-
বাড়ী হইতে একটা ছােট ডােলক জোগাড় করিয়া সেটাকে
গলায় ঝুলাইয়া পাড়ায় পাড়ায় “জয় রাধা গােবিন্দ” “ভজ
গৌরাঙ্গ” গহিয়া বেড়াইতে আরম্ভ করিল। মা বিরক্ত হইল ;
বিশুর সমবয়সী কেষ্ট ঘােষাল-বাড়ী গরু চরাইয়া মাসে নগদ
এক টাকা উপার্জন করে, অথচ তার ছেলে মায়ের দুঃখ বােঝে
। কিন্তু কিছু বলিবার উপায় নাই। ভগবানের নাম কীত্তন
—তাহাতে বাধা দিলে মহাপাপ! কাজেই নিরুপদ্রবে বালক
বিশ্বনাথ প্রত্যহ সকালে সন্ধ্যায় বাড়ী বাড়ী হরিনাম কীর্তন
করিয়া বেড়াইতে লাগিল।
১২
বছিরের দরগা ইহার পর বিশু যে কাজে হাত দিল, তাহাতে সে যে পূর্বজন্মে ব্রাহ্মণ ছিল এই সত্য নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হইয়া গেল। এমন কি পাঠশালায় পণ্ডিত তারণ চক্রবর্তী পর্যন্ত বলিয়া গেলেন, “দেখাে বাণী-বৌ, এই জলজীয়ন্ত বামুনের কথা। তােমার ছেলে মরে আবার বামুন হবে।” মা কাণে হাত দিয়া কহিল, “যা যা !” ব্যাপারটা এই। বিশু রথ দেখিতে ভিগায়ে গিয়া এক নূতন বিষ্ণুমন্দির নির্মাণের কাজ দেখিয়া আসিয়াছিল। দেখিতে দেখিতে মাথায় তাহার খেয়াল গজাইয়া উঠিল। বাড়ী আসিয়া মাকে কহিল, “আমি হরিমন্দির গড়ব তুই পয়সা দে।” মন্দির গড়িতে কতটা পয়সার দরকার তাহা তে গণিয়া ও কুড়ি হিসাবে বিশুকে বুঝাইবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া বিরক্ত হইয়া বিশুর মা বিড়াল তাড়াইবার লাঠি দিয়া বিশুর পিঠে দু’ঘা বসাইয়া দিল। ইহাতেও বিশুর সংকল্প টলিল না। ভাের না হইতেই সে একটা ঝাকা মাথায় করিয়া গ্রামের বাহিরের ভাঙ্গা শিবমন্দির হইতে সুরকী সংগ্রহ আরম্ভ করিল। দেব-স্থানের মাটি পায়ে লাগিবে বলিয়া মা প্রথমে তাহাকে যথেষ্ট ভৎসনা করিল অবশেষে প্রহার। বিশু চড়-চাপড় বিনা বাক্যবয়ে গ্রহণ করিয়া পুনরায় স্বকার্যে মন দিল। এইবার বিশুর মা চক্রবর্তী মহাশয়ের শরণ লইল ; তিনি তাহাকে আশ্বস্ত করিয়া বলিয়া দিলেন, “খুব সাবধান বাদী-বৌ, ভগবান ওকে দিয়ে তার কাজ করাচ্ছেন।
থাডক্লাশ
বাগড়া দিনে।” ইহার পর বিশুর মা আর পুত্রের সঙ্কল্পে বাধা
দিল না।
(৪)
সুরকী আনিল । কিন্তু বিশুর কল্পনা যতখানি উচু ছিল,
সুরকীর দেয়াল তত উচু হইয়া উঠিল না। মাটি, কাদা, তুষ
ও সূরকীর অপূর্ব মিশ্রণে দেয়াল উঠিল দুই হাত। বিশুর
মুখখানি ছােট হইয়া গেল। কলসগায়ের মন্দিরের মত হইল না
তাে! রাত্রে বিশু মাকে জড়াইয়া ধরিয়া কহিল, “অমনি একটা
মন্দির গ'ড়ে দে মা।” মা পুত্রকে ভরসা দিয়া বলিল, “ছােট
জাতের ছােট মন্দিরই ভাললারে বিশু। ডালে ঠাকুর এখানে
আসবেন।”
পরদিন বিশু প্রাণপণে ঠাকুরকে তাহার ঢােলকের বাজনার
সঙ্গে আহ্বান আরম্ভ করিল। ঠাকুর আসিলেন কিনা জানি না
কিন্তু পাড়ার মাতব্বর বৃন্দবন ঠাকুর আসিয়া জানাইয়া গেলেন যে,
দিন-রাত ঢােলক বাজাইলে তিনি বিশুর কাণ ধরিয়া চৌকীদারের
নিকট লইয়া যাইবেন। চৌকীদারের ভয়ে মা বিশুর ঢােলক
কাড়িয়া লইল। অগত্যা বিশু কোথা হইতে ছােট একটি
আঙ্গুরের বাক্স কুড়াইয়া আনিয়া তাহাতেই তাল দিয়া ঢােলকের
কাজ চালাইতে লাগিল আর মনে মনে কেবলই ঠাকুরকে তাহার
ঘােট মন্দিরটিতে নিমন্ত্রণ করিতে লাগিল।
১৪
বছিরের দরগা সেদিন পূর্ণিমা। বৃন্দাঠাকুরের বাড়ীতে রাস-মহােৎসব উপলক্ষে ঠাকুর আসিয়াছেন, সমস্ত দিন বিশু গান গাহিল, “একবার এস এস হে!” সন্ধ্যাকালে ঘণ্টাখানেক ঠাকুরবাড়ীর পুরােহিতের ভঙ্গীতে বসিয়া ঠাকুরকে তার ছােট মন্দিরে আসিবার জন্য অনেক মিনতি করিয়া বলিয়া দিল এবং রাত্রে যে ঠাকুর আসিবেন তাহাতে আর মনে বিন্দুমাত্র সংশয় রাখিতে পারিল । কারণ পূর্ণিমার রাত্রেই ঠাকুর আসেন, এ কথাটি তাকে বলিয়াছিল তার মা। মা বাতাসী তখন নাসিকাধ্বনি সহকারে ঘুমাইতেছিল, বিশু ঠাকুরের আগমনের প্রতীক্ষায় ঘুমাইতে পারে নাই। উৎসব- বাড়ীতে যখন কীর্তনের প্রারম্ভিক মৃদধ্বনি উঠিল; তখন বিষ্ণু অতি সন্তর্পণে উঠিয়া দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিল। পদশব্দ শুনিয়া পাছে ঠাকুর পলায়ন করেন এই ভয়ে হামাগুড়ি দিয়া তাহার মন্দিরে উকি দিয়া দেখিল-মন্দির শূন্য। নিরাশ হইয়া ফিরিয়া গিয়া সে শয্যা লইল এবং সকালে মাকে জানাইল যে, ছােট মন্দিরে ঠাকুর আসিতে পারেন না, কাজেই তাহাকে বড় মন্দির গড়িতেই হইবে। বড় মন্দির গড়িতে হইলে যে পদার্থ-টির সর্বাগ্রে প্রয়ােজন তাহাও বিশু শুনিল এবং সেই বস্তুটী সংগ্রহ করিবার জন্য পরদিন বারো বছরের ছেলে বিশু মাসিক তিন টাকা মাহিনায় কলসগায়ের বাবুর বাড়ীর বাগানের কাজে ভর্তি হইয়া গেল। কিন্তু এক ক্রোশ দূরে থাকিয়াও বিশু তাহার থার্ডক্লাশ মন্দিরের কথা ভুলিল না। প্রতি শনিবার ছিল তাহার ছুটি সেদিন সে আসিয়া মন্দিরে দীপমালা দিয়া পাঁচ পয়সার বাতাসার লােভ দেখাইয়া পাড়ার বাণী ছেলেগুলিকে জড় করিত। মধ্যরাত্রি পর্যন্ত বিচিত্র বাদ্যধ্বনি ও নাম-গানের শব্দে পাড়ার লােকের কাহারাে চোখে নিদ্রা আসিত না। বছর তিনেক এইভাবে কাটিল। বিশ্বনাথের মনিব বৃদ্ধ বয়সে বৃন্দাবন-বাস করিতে গ্রাম ত্যাগ করিলেন, বিশু ও বিদায় লইল। বিশুর সংকল্পের কথা শুনিয়া তাহার মাহিনা চুকাইয়া আরো একটা মােটা রকমের দান তাহার সহিত যােগ করিয়া বাবু তাহাকে আশীর্বাদ করিয়া বিদায় দিলেন। বিশু মন্দির নির্মাণের পুঁজি লইয়া গ্রামে ফিরিল। অনতিকাল মধ্যে ইট-সুরকীতে বিশুর প্রাঙ্গন ভরিয়া গেল। গ্রামের লােক প্রথমে এতটুকু সন্দেহ করে নাই, কিন্তু যখন বিশুর মা’র মুখে আসল উদ্দেশ্যটি প্রকাশ হইয়া পড়িল, তখন গ্রামের ভদ্রমণ্ডলীর মধ্যে একটু চাঞ্চল্য দেখা গেল। বাদীর ছেলে মন্দির গড়িতেছে। শাস্ত্র-ধৰ্ম্ম সব রসাতলে গেল। দুই একজন বিশুর মাকে ডাকিয়৷ সাবধান করিয়া দিলেন। বাতাসী ব্ৰহ্মশাপের ভয়ে বিবর্ণ মুখে গৃহে ফিরিয়া বিশুর কাছে কাদিয়া পড়িল। বিশু কহিল, “কিছু হবে না। আমি কালই পণ্ডিত ta
বহিরের দরগা
মহাশয়ের পাতি নিয়ে আসব। পণ্ডিত মহাশয় কলস গ্রামের
চতুষ্পাঠীর অধ্যাপক, সে অঞ্চলে তাহার বিধানই প্রামাণ্য ছিল।
কিন্তু বিশুকে আর পাতি আনিতে হইল না, সেই রাত্রেই
বাতাসী কলেরার আক্রমণে ও ব্রহ্মশাপের ভয়ে ইহলােক ছাড়িয়া
প্রস্থান করিল।
ভদ্র-সজ্জনেরা কহিলেন—“শাস্ত্র না মালে
এমনি হয়! ঘাের কলি এখনও হয়নি তাে।”
মা’র মৃত্যুর পর বিশু দিন-দুই খুব কাহিল রহিল। তারপর
দ্বিগুণ উৎসাহে তার দলবল লইয়া মন্দিরের কাজে লাগিয়া
গেল। বৃন্দাঠাকুর ছিলেন গ্রামের মাতব্বর, তার উপর বিশুর
বাড়ী ছিল তারই বাড়ীর পাশে ; বিশুর কীৰ্ত্তন, সঙ্গীদের
হরিধ্বনি, মৃদঙ্গ-করতালের শব্দ তাহারই নিদ্রার ব্যাঘাত জন্মাইত
বেশী ।
ইহার পর বিশুর মন্দির উঠিলে তাহার বিগ্রহের
প্রণামী কমিয়া যাইবারও ভয় ছিল, কাজেই এই বাণী ছেড়ার
উপর তিনি জাতক্রোধ হইয়া উঠলেন। কিন্তু বিশু তখন
বড় হইয়াছে—কাহারও ভ্রুকুটি সে গ্রাহ করিল না।
(৪)
উঠিয়াছে,
মন্দির যখন
অর্ধেক
দুর
তখন এক ঘটনায়
গ্রাম তােলপাড় হইয়া উঠিল। রহিম মিস্ত্রীর স্ত্রীর পূর্ব স্বামীর
এক কন্যা ছিল। তার বিবাহ হইয়াছিল দূর গ্রামের এক
কৃষকের সঙ্গে। সে প্রায় তিন বৎসর পূর্বেকার কথা। এক
৭
থার্ডক্লাশ মাস স্বামীর ঘর করিবার পর সে তাহাকে তালাক দিয়া বাপের বাড়ী পাঠাইয়া দিয়াছিল । রহিম তাহাতে মােটেই দুঃখিত হইল না, তাহার মিস্ত্রির কাজে একজন আপনার লােক জোগানদারের প্রয়ােজন ছিল। আমিনা রহিমের সহিত বিশ্বনাথের মন্দিরের কাজ করিত। হঠাৎ কেমন করিয়া এই মেয়েটিকে বিশুর বড় ভাল লাগিয়া গেল। আমিনাও এই মিষ্টভাষী সুঠাম বাদী যুবাকে ভালাে না বাসিয়া থাকিতে পারিল না। তার কৈশােরে তখন যৌবনের রং ধরিয়াছে। মনে ক্ষুধাও ছিল বিস্তর। কোন কিছু বিচার না করিয়াই এই নবীন প্রনয়ীযুগল প্রেমের দান-প্রতিদান আরম্ভ করিল। একজন বাদি আর একজন সেখ, এ বােধ উভয়ের কাহারও ছিল না। কিন্তু বাদী-পাড়ার যে দুই-একটি রমণীর এ পাণ্ডিত্য ছিল, তারা এই ব্যাপারটিকে লক্ষ্য করিল এবং সেখের বেটীর সহিত বিশুর এই অসঙ্গত ঘনিষ্টতায় ধিক্কার দিল। বাহিরের লােক কিছুই জানিত না, কাজেই কিশাের- কিশােরীর এই প্রেমলীলা অব্যাহত চলিতে লাগিল। একদিন অপরাহ্নে বাবুর বাড়ীর চণ্ডীমণ্ডপে বিশুর ডাক পড়িল। বিশু আসিল; গ্রামের বাবুরা চণ্ডীমণ্ডপ দখল করিয়া বসিয়াছিলেন; পাঁচ সাতটা কলিকায় যুগপৎ তামাক পুড়িতেছিল। গিদ্দা বালিশ হেলান দিয়া বৃন্দাঠাকুর, লালন সকল বিষয়ে abo
বছিরের দরগা
চক্রবর্তী প্রভৃতি মাতব্বরের বসিয়াছিলেন; মণ্ডপের প্রাঙ্গণে
যুক্তকরে আমিনার মাতা, তার পশ্চাতে জনকয়েক তারই
প্রতিবেশী, আর এক কোণে দাড়াইয়া আমিনা মুখে কাপড়
দিয়া কাঁদিতেছিল। এই বৈঠক আর সেই সঙ্গে আমিনার
নাকে দেখিয়া বিশুর বুকের মধ্যে ধড়াস্ করিয়া উঠিল। সে
আসিয়া দাড়াইতেই বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “কেষ্টঠাকুর এসেছেন
বেটা ছােট জাতের আস্পর্ধা দ্যাখাে না। মন্দির গড়বে না !
বেটার পেট-পােরা সয়তানী মৎলব!”
সেখের বেটী, তাের নালিশ?” আমিনার মা দশ মিনিট
পরিয়া নানা কথা কহিয়া গেল। বিশু তার মেয়ের ইজ্জৎ নষ্ট
করিয়াছে, সে বিচার চায়!
বিশুর মাথা ঘুরিতেছিল, আমিনা শেষে তাহার সহিত
প্রতারণা করিয়াছে, এই চিন্তা তার সমস্ত মনকে বিষাক্ত করিয়া
দিয়াছিল, বিশু কথা কহিল না। আমি এতটা মনে করে
নাই। মা’র মনে অনেক দিন হইতেই সন্দেহ ছিল। কিন্তু
সে কিছু দেখিয়াও দেখে নাই। কাল সন্ধ্যায় যখন কানাঘুষায়
কথাটি শুনিয়া বৃন্দাঠাকুর তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইলেন, তখন
সে তার সন্দেহের কথা তাঁকে জানাইল। তারপর তাহারই
পরামর্শ মত আমিনাকে প্রশ্ন করিয়া সকল সংবাদ জানিয়া
লইল। আমিনা এতখানি ঘটিবে তাহা ভাবে নাই, অকপটে
মা’র কাছে সমস্তই বলিয়াছিল। তারপর আজ দ্বিপ্রহরে যখন
থার্ডক্লাশ
স্বয়ং বৃন্দাঠাকুর তাহাদের বাড়ীতে উপস্থিত হইয়া আমিনার
মা’র সহিত গােপনে পরামর্শ করিয়া গেলেন, তখন অন্তরাল
হইতে শুনিয়া ভয়ে তার সর্বাঙ্গ আড়ষ্ট হইয়া গেল। বাবুর
বাড়ীতে আসিতেও সে আপত্তি করিয়াছিল। কিন্তু মা তাকে
প্রহার করিয়া লইয়া আসিয়াছে। সে আমিনাকে হাজির করিবার
‘জবান’ দিয়াছে, তা ছাড়া বৃন্দাঠাকুরের দেওয়া অগ্রিম দশ
টাকার নােট তখনও অঞ্চলে বাধা ছিল, নেমকহারামী সে কি
করিয়া করিবে?
মা’র অভিযােগ শেষ হইলে বিশু তীব্র অথচ বিষন্ন দৃষ্টিতে
আমিনার দিকে চাহিল, তখন সে আরও বেশী করিয়া কাদিতে
লাগিল। চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বিশুকে জবাবদিহি করিবার আদেশ
হইল, বিশু তবুও কথা কহিল না। তখন ছােটলােকের দুফার্যের
জন্য যে শাস্তির বিধান আছে, বিশুর প্রতি তাহাই প্রযুক্ত হইল।
লালন চক্রবর্তীর নির্দেশ মত তাহার পাইক ফেকু সর্দার বিশুর
কাণ ধরিয়া সমস্ত উঠান ঘুরাইতে লাগিল, বিশু আপত্তি করিল
কিন্তু আমিন। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া একেবারে
ফেকু সর্দারের পা জড়াইয়া ধরিয়া কঁদিয়া কহিল, “মামুজী, মাপ
কর! মাপ !”
চণ্ডীমণ্ডপ শুদ্ধ লােক হাসিয়া উঠিল।
কর্ণমর্দন-পর্ব শেষ হইলে বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “তা যেন
হলাে! তারপর এ মেয়েকে বিয়ে করবে কে? কি বল চৌধুরী,
১০০
।
বছিরের দরগা
সেখের বেটী যে ইজ্জং হানির নালিশ করেছে, তার কি করবে?”
চৌধুরী চুপি চুপি কহিলেন, “দু-দশ টাকা দিয়ে বিশে বিদেয়
করে দিক।”
বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “আরে বল কি, জাত-মারা কাণ্ড। দু'-দশ
টাকা! দু’-দশ টাকায় জাত ফিরবে ?” তারপর আমিনার মাতাকে
কহিলেন, “কি গাে সেখের বেটী, দু'-দশ টাকা খেসারত নেবে?”
পূৰ্ব শিক্ষামত আমিনার মা কঁদিয়া কহিল, “টাকায় কি
ইজ্জৎ ফিরবে বাবু? আমার মেয়ে নিয়ে কে ঘর করবে ? বাঙ্গীর
পে। আমার বেটীকে ‘নিকা’ করুক!” এত বড় সংযুক্তিটা এতক্ষণ
সমাজপতিদের মাথায়
মাথায় খেলে নাই দেখিয়া তাহারা আশ্চর্য
হইলেন। বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “আমরা যখন আছি গাঁয়ের
মাথা, তখন বিচার করতেই হবে,—কি বল চৌধুরী ? সেখের
বেটা যা বলে।”
আমিনার মাতার পশ্চাৎ হইতে গুটিকয়েক কণ্ঠ সমস্বরে
কহিল, হ বাবুজী ঠিক হবে বিচার ?”
তখন চণ্ডীমণ্ডপ হইতে আদেশ জারি হইল বিশুকে কলেমা
পড়িয়া আমিনাকে বিবাহ করিতে হইবে
কলেমা পড়িবার কথা শুনিয়া বিশু কঁপিয়া উঠিল ।
পৃথিবীটা তার চোখের সম্মুখ হইতে মুহূর্তে অপসৃত হইয়া গেল।
বিশু সংজ্ঞা হারাইল। কিন্তু বাবুদের পঞ্চায়েতের বিচারের নড়চড়
হইবার যাে নাই। অচেতন বিশুকে লইয়া যাইবার হুকুম পাইয়া
১০১
সমস্ত
থার্ডক্লাশ
আমিনার মা'র প্রতিবেশীরা “আল্লা হাে আকবর” ধ্বনি তুলিল।
চণ্ডীমণ্ডপ হইতে বৃন্দাঠাকুর কহিলেন, “যা বেটারা, নিয়ে যা,
এখানে আর গােল করিস্ নে।”
বিশুর চেতন হইয়াছিল অনেক পূৰ্বেই; কিন্তু আপনার
অবস্থা সম্পূর্ণ বুঝিবার মত জ্ঞান হইল এক প্রহর রাত্রে। দেখিল
যে, আমিনার মাতার কুটীরে সে বসিয়া আছে, তার পাশে বসিয়া
আমিনা তাকে পাখার বাতাস করিতেছে। মাথার উপর একট।
ভারী পদার্থের অস্তিত্ব সে বােধ করিতেছিল—তুলিয়া দেখিল সেটা
একটা টুপী। মুহূর্তের মধ্যে টুপীটা ফেলিয়া দারুণ অন্তৰ্দাহের
আবেগে সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া এবং কোন দিকে না চাহিয়া
একেবারে সােজ। চলিয়া গেল ।
(৫)
“তার পর ?”
পরের কথা অতি অল্প। সমস্ত রাত্রি পাড়ার লােক শুনিল,
বিশু তারস্বরে সুর করিয়া ডাকিতেছে “জয় রাধে গােবিন্দ”, তার
সমস্ত দেহ-মন যেন এই সুরের রূপ ধরিয়া অপ্রত্যক্ষ দেবলােকে
কোন্ অভীষ্ট দেবের সন্ধান করিতেছিল! সুরের বিরাম নাই।
রাত্রি তিন প্রহর হইয়া গেল—গান থামিল না। ভােরের সময়
একটা ভীষণ শব্দ হইল, সেই সঙ্গে গানের সুর থামিল। পাড়ার
লােক ছুটিয়া আসিল।
১০২
বছিরের দরগা
নিজের হাতে শাবল দিয়া খুঁড়িয়া মন্দিরের দেয়াল ফেলিয়া
তাহারই নীচে বিশু আপনার সমাধি রচনা করিয়াছে। বাহির
হইতে দেখা যাইতেছিল শুধু তার রক্তাক্ত সুদীর্ঘ কেশের গুচ্ছ।
গ্রামের ভদ্রলােকেরা আসিয়া ব্যবস্থা দিলেন, ভাঙ্গা দেয়ালের
উপর মাটি চাপা দিয়া বিশুর কবর দেওয়া হাে। ওই মাটীর
ঢিবিটা তাই ।
মজিদে বিশুর নাম হইয়াছিল বছির, তাই ইহার নাম হইয়াছে
‘বছিরের দরগা।
“আমিনা ?”
এই ঘটনার পরদিন বিশুর কবরের উপর শাবল দিয়া আপনার
মাথা ভাঙ্গিয়া সেও মরিয়াছে। সে নাকি মৃত্যুর পূর্বে পাগল
হইয়া গিয়াছিল।
গিরিবালার জীবন-পঞ্জী
(১)
গিরিবালাকে জানিতাম। গ্রামের নদীটির বাঁকের মুখে
বেত-ঝােপের ছায়ার অন্ধকার আশ্রয় করিয়া ছুটির সময় যখন
সন্ধ্যাকালে বােয়াল মাছের সন্ধানে ছিপ ফেলিয়া বসিতাম, তখন
সে ঘাটে প্রদীপ ভাসাইতে আসিত। একখানি গােল মুখ, টীকল
নাক, তাহাতে একটি ছােট নােলক—নিতাই জেলের আট
বছরের মেয়ে—নাম গিরিবালা; প্রতি সন্ধ্যায় সে নদীর স্রোতে
ভাগ্যের প্রদীপ ভাসাইয়া মাটীর ছােট কলসীতে জল ভরিয়া
মৃদুস্বরে ‘বন্দ নাত সুরধনী’ গাহিতে গাহিতে ঘরে ফিরিয়া যায় ।
—গিরিবালার বাল্য-জীবনের এই বৈচিত্র্যবিহীন ইতিহাসটুকুই
আমার জানা ছিল ।
ইহার পর যাহা শুনিয়াছি তাহাই লিখিতেছি। দশ বৎসর
যখন বয়স তখন গিরিবালার বিবাহ হইল এবং সেই বৎসরেই
পিতা নিতাই ও স্বামী সদানন্দ পদ্মায় মাছ ধরিতে গিয়া আর
ফিরিল না।
মায়ের সঙ্গে গিরিবালাও দিল। তাহার পর
নিতাই মাঝির জাল শুকাইবার চালাখানিতে টেকি পাতিয়া
মাতা ও পুত্ৰী পাড়ার লােকের ধান ভানিতে আরম্ভ করিয়া
দিল ।
১০৪
গিরিবালার জীবন-পঞ্জী (২) বৎসর চার-পাঁচ পর একদিন রায়বাবুদের আঙ্গিনায় আছড়াইয়া পড়িয়া গিরিবালার মাতা কাদিয়া জানাইল যে, আজ একমাস হইতে রাত্রিতে তাহার ঘুম নাই। সমস্ত রাত্রি তাহার বাড়ীর চারিপাশে লােকের পায়ের শব্দ শােনা যায়, ভবে তুহির গা ছন্ছন্ করিতে থাকে । তিন-পুরুষ আগে রায়বাবুরা ছিলেন গ্রামের জমিদার ; জমিদারী এখন বাস্তুভিটায় সাড়ে সাত বিঘা জমিতে আসিয়া ঠেকিয়াছে । দেউড়ী এখনও আছে কিন্তু দারােয়ান নাই। তথাপি এখনও বদন রায় মহাশয়কে অনেক অভিযােগ শুনিতে হয়। কিছুদিন পূর্বেও বিচার করিয়া জরিমানা ও নজর বাবদ কিছু প্রাপ্তি ছিল, কিন্তু সম্প্রতি ফজল মিঞ। বাঁশচিটা ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হওয়াতে প্রাপ্তির পথ একেবারে রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। কাজেই এখন বিচার না করিয়া রায়বাবু শুধু পরামর্শ দিয়া থাকেন । দারােগাকে সকল কথা জানাইবার উপদেশ দিয়া তিনি বুড়ী মনিদাকে বিদায় করিয়া দিলেন, দরকার হইলে তাহার পক্ষ হইয়া দাবােগাকে দুই কথা বলিবেন, এ ভরসা দিতেও কুটি করিলেন না। এইবার মানদা বিপদে পড়িয়া গেল। দাবােগা হাকিম। তাহার সহিত কি করিয়া কথা বলা যায়? অনেক ভাবিয়া একদিন সে এক কাঠা সরু ধানের চিড়া লইয়া গ্রামের চৌকিদার নছর থাডক্লাশ সেখের শরণ লইল। উপঢৌকন পাইয়া খুসী হইয়া নছর সেখ দিনকয়েক রোদ হইতে ফিরিবার পথে নিতাই মাঝির বাড়ীর নিকটে হাঁক দিয়া গেল বটে, কিন্তু তাহাতেও গিরিবালার মাতার অস্বস্তির কারণ ঘুচিল না। অবশেষে বিনা পারিশ্রমিকে নছর সেখের ধান ভানিয়া ও গাছের মৰ্ত্তমান কলা উপহার দিয়া বুড়ী একদিন তাহাকে দারােগার নিকট লইয়া যাইতে নছর সেখকে রাজী করিল। সুযােগও ঘটিয়া গেল। পাশের গ্রামেই দারােগা সাহেব তদন্তে আসিয়াছিলেন। নছর সেখকে অগ্রবর্তী করিয়া কালী-গাইয়ের এক ঘটি দুধ হাতে বুড়ী গিয়া সেখানে উপস্থিত হইল। সম্মুখে আসামী ও ফরিয়াদী পক্ষের অনেকগুলি সাক্ষী যুক্ত করে দণ্ডায়- মান; তাহাদের সম্মুখে সদ্যগঠিত ছােট বংশমঞ্চে দারােগা সাহেব বসিয়া, মঞ্চের সম্মুখ দিক্কার একটা খুঁটিতে বাঁধা একজোড়া মুরগী, পিছনের খুঁটিতে বিরাট কৃষ্ণকায় এক খাসী বাধা। গম্ভীর মুখে দারােগা সাহেব লিখিতেছিলেন। মুরগী ও খাসীর সহিত এক ঘটি দুধের তুলনা করিয়া বুড়ী মনে মনে শঙ্কিত হইল; পরক্ষণেই নছর সেখের ইঙ্গিত মাত্রে দারােগা সাহেবের দুই পা জড়াইয়া ধরিয়া অপাতের সঙ্গে সঙ্গে বুড়ী আপনার বক্তব্য বলিতে আরম্ভ করিল। দাবােগা সাহেব অর্ধেক শুনিয়াই কহিলেন, “মেয়ের বয়স কত ?”
গিরিবালার জীবন-পঞ্জী “এই ঘােল বছর হুজুর ! সােমত্ত” “এখন যাও। সরেজমিন তদন্ত করব। হ্যা, তারপর আসামীর দুই নম্বর সাক্ষী বঁটু দপ্তরী।” বাটু দপ্তরী আসিয়া সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। নছর বুড়ীকে লইয়া গিয়া কানে কানে কহিল, “সাঁঝে বাড়ী থেকে জেলের বেটা, দারােগা সাহেব যাবেন।” বুড়ী অকূলে কূল পাইয়া মা মনসার নামে পাঁচ পয়সার বাতাস মানং করিয়া ঘরে ফিরিল। মায়ের মুখে সমস্ত শুনিয়া উচ্ছসিত আনন্দে গিরিবালা খানিক কঁদিল। তাহার পর বেড়ায় টাঙ্গানাে সত্যনারায়ণের ছবির সম্মুখে সম্মুখে গলবস্ত্রে প্রণাম করিয়া কহিল, “লজ্জা-নিবারণ হরি! লজ্জা নিবারণ কর, ঠাকুর!” তখন সন্ধ্যা। তুলসী-তলায় প্রদীপ দিয়া গললগ্ন বস্ত্রাঞ্চলে বার-বার মাটীতে মাথা ঠেকাইয়া গিরিবালা সম্ভবতঃ কোনো প্রার্থনা জানাইতেছিল, এমন সময় দাবােগা সাহেব আঙ্গিনায় প্রবেশ করিলেন। জুতার শব্দে মুখ ফিরাইয়া দারােগাকে দেখিয়া গিরিবালা মুহূর্তের মধ্যে ঘরের পিছনে অদৃশ্য হইয়া গেল। মানদা রান্নাঘর হইতে তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া আসিয়া দাওয়ায় একখানি মাদুর বিছাইয়া দিল। দাবােগা সাহেব আসন লইয়া সমন্ত শুনিয়া গিরিবালাকে ডাকিলেন। পরণের ঘােট কাপড়খানির চারিদিক সামলাইতে সামলাইতে সঙ্কুচিতা গিরিবালা আসিয়া দাঁড়াইল। দুই চক্ষুর সমস্ত শক্তিকে একত্র করিয়া সঙ্ক্যার স্তিমিত আলােকেও ১০৭ থার্ডক্লাশ দাবােগা সাহেব ভালাে করিয়া গিরিবালাকে দেখিয়া লইলেন। মেয়েটি দেখিতে নিতান্ত মন্দ নহে। তখন তাহার মনের গতিট। কোন্ দিকে বুঝিবার জন্য দুই-একটি প্রশ্ন করিতেই লজ্জায় মরিয়া গিরি একেবার ঘরের অন্ধকার বেড়ায় গিয়া মুখ লুকাইল। মানদ। ক্রমাগত ঘরের মধ্য হইতে ঠেলিতে লাগিল, কিন্তু কোনােক্রমেই কন্যাকে বাহিরে পাঠাইতে পারিল না। অগত্যা কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর দারােগা সাহেব উঠিলেন এবং মধ্যে মধ্যে সন্ধান লইবেন—মৃদু হাসিয়া এই প্রতিশ্রুতিটা দিয়া গেলেন। দারােগা চলিয়া গেলে বাহির হইতে নছর চৌকিদার আঙ্গিনায় প্রবেশ করিয়া কহিল, “বেঁচে গেলে জেলে-বৌ হাকিম তােমার সহায় হয়েছেন।” বুড়ী নিশ্চিন্ত হইয়া দুই কর কপালে ঠেকাইয়া দেবতার উদ্দেশ্যে প্রণাম করিল, কিন্তু গিরি সেদিন আর শয্যা ছাড়িয়া উঠিল না। (৩) ইহার পর দিনকয়েক নানা স্থানে তদন্তে যাইবার পথে দারােগা সাহেব প্রতিশ্রুতি মত বুড়ী ও তাহার কন্যার সন্ধান লইতে আসিলেন। কিন্তু সন্ধানের মুখ্য বস্তুটি ঘােড়ার পায়ের শব্দ পাইলেই ঘরের পিছনের ভাঙ্গা বেড়ার ফাক দিয়া যে কোথায় অন্তর্হিত হইয়া যাইত, তাহা মানদাও আবিষ্কার করিয়া উঠিতে পারিত না । কন্যার এই অকৃতজ্ঞতায় বুড়ী লজ্জিত হইত ও ১০৮ গিরিবালার জীবনপঞ্জী কন্যার পক্ষ হইতে হাকিমের কাছে ক্ষমা চাহিয়া, তাহার জন্য প্রতিবারই ভগবানের আশীৰ্বাদ ভিক্ষা করিত। বলা বাহুল্য, এই একঘেয়ে নীরস ক্ষমাভিক্ষা দারােগা সাহেবের বেশী দিন ভালাে লাগিল না এবং বঁাশচিটার হাটের পথে তাঁহার গতিবিপি ক্রমে ক্রমে বিরল হইয়া আসিল। ইহাতে অবশ্য গিরিবালার অবস্থার কোনো ইতর-বিশেষ হইল ; জীবন-ধারা যেমন বহিতেছিল তেমনই বহিয়া যাইতে থাকিল। সমস্ত দিন নানা কাজের মধ্যে আপনার অবস্থার কথাটি বিশেষ মনে থাকিত না, কিন্তু সূর্যাস্তের সঙ্গে-সঙ্গেই জগতের দুর্ভাবনা আসিয়া জুটীত এবং পৃথিবীটাকে মনে হইত একটি জীবন্ত প্রেতপুরী। সহসা একদিন গিরিবালার সমস্ত দুর্ভাবনার সমাপ্তি হইল। সেদিন শ্রাবণের বর্ষণ প্রভাত হইতেই আরম্ভ হইয়াছিল। বর্ষার রাত্রি। প্রথম প্রহরেই পল্লীর বুকে নিশীথের নিস্তব্ধতা ঘনাইয়া আসিয়াছিল। সেই নিস্তব্ধতা ভেদ করিয়া গিরিবালার মাতার কুটীর-প্রাঙ্গণ হইতে সহসা এক আর্ত চীংকারধ্বনি উঠিল। শ্রাবণের বর্ষণ-রব ছাপাইয়া সে আর্তনাদ সুখ-সুপ্ত ভদ্রপীকে পৰ্যন্ত ধ্বনিত করিয়া তুলিল এবং পল্লীর নিদ্রার জড়তা টুটিবার পূৰ্বেই ভরা নদীর তরঙ্গ-কল্লোলে ডুবিয়া গেল। গ্রামে যে একেবারে চাঞ্চল্য উপস্থিত হইল না, তাহা নহে। ওপারের ঝাউবনের অন্ধকারের অন্তরালে যখন গিরিবালাকে ১০৯ থার্ডক্লাশ বহিয়া পান্সী অদৃশ্য হইয়া গিয়াছে তখন পথের মােড়ে নছর চৌকীদারের ভীম গর্জন শোনা গেল ! এদিকে গণেশ মাঝির মুখে সংবাদ পাইয়া হারু ঘােষাল আসিয়া রায়বাবুকে ডাকিয়া তুলিয়া কহিলেন, “যা ভেবেছিলাম রায়বাবু, তাই হ'ল, নিতাই মাঝির মেয়েকে নিয়ে গেল !” রায়বাবু, চক্ষু মুছিয়া রাম নাম জপিতে জপিতে বাহিরে আসিলেন। ক্রমে ক্রমে রায়-বাড়ীর বৈঠকখানায় গ্রামের ভদ্রসন্তানদের একটি ছােট সভা বসিয়া গেল। মাখন ভৌমিকের বয়স অল্প। সখের থিয়েটারে ক্রমাগত লক্ষ্মণের ভূমিকা অভিনয় করিতে করিতে বিপন্ন স্ত্রীলােকের প্রতি তাহার একরকম মমত্ববোেধ জন্মিয়াছিল, সভাস্ত একজন থানায় সংবাদ দিবার প্রস্তাব করিতেই সে কহিল, “থানায় খবর দেওয়া কিছু নয়। আমি যাচ্ছি, আপনারা আসুন!” হারু ঘােষাল ধমক দিয়া কহিলেন, “ওই কাজটি কোরো না বাবাজী! থিয়েটার করতে গিয়ে চিন্তে চড়ালের পা ধরে ‘দাদা’ ‘দাদা' বলে চেঁচাও, সেটা বরং সওয়া যায়, কিন্তু ছােট লােকের হাতে মার খেয়ে আর আমাদের মুখ হাসিও না।” ছোট লােকের হাতে মার খাওয়ার আশঙ্কায় আকস্মাৎ মাখন ভৌমিকের উৎসাহ দপ, করিয়া নিভিয়া গেল এবং অতঃপর থানায় সংবাদ দেওয়াই যে সর্বাপেক্ষা সুযুক্তি সে বিষয় কাহারও মতদ্বৈধ রহিল না। গিরিবালার চরিত্র সম্বন্ধে সত্য-মিথ্যা সর্বপ্রকার আলােচনা হইয়া যখন ক্রমে ক্রমে থামিয়া গেল, তখন একদিন হঠাং সংবাদ ১১০ গিরিবালার জীবনপঞ্জী আসিল যে, গিরিবালাকে বারখালির আমীর সেখের বাড়ীতে পাওয়া গিয়াছে। গ্রাম আবার চঞ্চল হইয়া উঠিল এবং যদিও হাট বার—তথাপি বাশচিট। ইউনিয়ানের প্রেসিডেন্ট চামড়ার দালাল ফজল মিঞার বাড়ীর বাহিরের আঙ্গিনায় কৌতুহলী দর্শকের ভিড় জমিয়া গেল। ক্ষান্তবর্ষণ শ্রাবণ-দিবসের রক্তসন্ধ্যা সমস্ত আকাশকে আরক্ত করিয়া তুলিয়াছিল। সঙ্গী চৌকীদার দু’জনের কাঁধে হাত রাখিয়া টলিতে টলিতে গিরিবালা আসিয়া দাঁড়াইল। ব্যর্থ অশ্রুপাতের চিহু তখনও তাহার কপােলে খায় নাই, জাগরণরক্তিম নিষ্প্রভ চক্ষু দু’টি তখনও সন্ধ্যার রক্তদীপ্তিতে জ্বলিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছিল। চারিপাশের চিরপরিচিত মূর্তিগুলি গিরিবালা একবার দেখিয়া লইল, কিন্তু সেকালের মত আজ আর মাথায় ঘােমটা টানিয়া দিল না। ক্ষণিকের জন্য গ্রামের লােকের মনে হইল এ যেন সে গিরিবালা নহে। এই সময় জনতার পিছন হইতে ছুটিয়া আসিয়া উন্মাদের মত কন্যার বুকে ঝাপাইয়া পড়িয়া মানদা চীৎকার করিয়া উঠিল, “তাের এ দশা কে করেছে গিরি!” উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে নিমেশ কালের জন্য মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া গিরিবালা অঙ্গুলি তুলিয়া আকাশের দিকে দেখাইয়া দিল, কথা কহিল না। ফজল মিঞার হুকুমে আসামী আমীর সেখ হাজির হইল। ফজল মিঞাকে পায়ের নাগরা খুলিতে দেখিয়া আমীর সেখ দুই হাত জুড়িয়া কহিয়া উঠিল, “হুজুর, ও আমার ‘নেকার’ বিবি।” ১১১
থার্ডক্লাশ
সহসা এই কথা শুনিয়া গিরিবালা শিহরিয়া উঠিল এবং সমস্ত
দেহভার ফজল মিঞার পদতলে নিক্ষেপ করিয়া অস্ফুটস্বরে কি
কহিল, তাহা বােঝা গেল না। তাহার মাথায় হাত দিয়া সংক্ষিপ্ত
একটি আস্বাসবাণী উচ্চারন করিয়া ফজল মিঞা আমীর সেকে
থানায় লইয়া যাইতে হুকুম দিলেন। থানা বহুদূর, কাজেই সে
রাত্রি ফজল মিঞার জিম্মায় গিরিবালাকে রাখিয়া মেম্বারেরা হাট
করিতে চলিয়া গেলেন।
গভীর রাত্রে ফজল মিঞার গরুর গাড়ীর গাড়ােয়ান্ কাদের
শুনিতে পাইল, কে যেন তাহার মনিবের বাহিরের কোঠা-
ঘরে মিনতির স্বরে কহিতেছে, “আপনার পায়ে পড়ি হুজুর,
আপনি আমার ধৰ্ম্মবাপ।” তাহার পরই মেঘগর্জনের সাথে
সাথে শ্রাবণ-রাত্রির ধারা নামিয়া আসিল, আর কিছু শােনা
গেল না।
ইহার পর থানা। অভিযােগ দণ্ডবিধি আইনের অনেকগুলি
ধারা ঘেসিয়া গিয়াছে ; মামলা সঙ্গীন আসামীর একরার লইতে
কাজেই গিরিবালাকেও একরাত্রি থানায় অপেক্ষা করিতে
হইল। পরদিন প্রভাতে যখন চৌকীদারের সাথে সে গরুর
গাড়ীতে গিয়া উঠিল, তখন থানার বারান্দায় চেয়ারে উপবিষ্ট
দাবােগা সাহেব এবং তাহার সম্মুখে দণ্ডায়মান শৃঙ্খলিত আমীর
সেখ এই উভয়ের মধ্যে গিরিবালা কোনও প্রভেদ দেখিতে
হইবে।
পাইল না।
১১২
গিরিবালার জীবনপঞ্জী (৪) ইহার পর সাহেব ডাক্তার, লেডী ডাক্তার, পুলিশের বড় কর্তা উকীল, মােক্তার কয়েকদিন ধরিয়া তাহাকে কত কথা জিজ্ঞাসা করিলেন, স্বপ্নাবিষ্টের মত গিরিবালা তাহার উত্তর দিয়া গেল। কি বলিল তাহাও মনে রহিল না। কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড়াইয়া আসামী আমীর সেখ ও তাহার ছয়টী সহচরকে দেখাইয়া আপনার জীবনের কলঙ্কের প্রত্যেকটি কাহিনী সে অতি স্পষ্ট ভাষায় কহিয়া গেল, বলিতে কোথাও বাধিল না। গ্রাম হইতে যে দুই-একজন ভদ্রসন্তান মানদাকে লইয়া মামলা উপলক্ষে সহরে আসিয়াছিলেন, তাঁহার নিতাই মাঝির কন্যার এই নির্লজ্জতায় স্তম্ভিত হইয়া গেলেন। বিচার সমাপ্ত হইয়া গিয়াছে। আদালতের বটতলায় মানদার গরুর গাড়ী গ্রামে ফিরিবার উদ্যোগ করিতেছিল, গিরিবালা ছুটিয়া আসিয়া দুই হাতে চলন্ত গাড়ীর চাকা ধরিয়া কঁদিয়া কহিল, “আমাকে ফেলে যানি মা! নিয়ে চল্ !” ইহার উত্তরে গাড়ীর মধ্যে একজন হাউ হাউ করিয়া দিয়া উঠিল, তাহাকে ধমক দিয়া হারু ঘােষাল গাড়ীর পর্দা তুলিয়া দাত খিচাইয়া কহিলেন, “তা বটেই তাে! বুড়ী তােমাকে নিয়ে এখন পরকাল খােয়া !” গরুর গাড়ীর চাকা হইতে গিরিবালার শিথিল মুষ্টি খুলি। পড়িল, গাড়ী চলিয়া গেল। ১১৩ থাডক্লাশ ললাকের মুখে এই পর্যন্তই শুনিয়াছিলাম, ইহার পর বিচিত্র পুথির বিবিধ তথ্যের নীচে পুরাতন কাহিনীটা একেবারেই চাপা পড়িয়া গিয়াছিল। আজ সহসা গিরিবালার কথা মনে হইবার হেতু আছে। কাল বদলী হইয়া আসিয়া প্রাতে প্রাথমিক পরিদর্শনের কাজে বাহির হইয়াছিলাম, এমন সময় কে চীৎকার করিয়া উঠিল, “ছেড়ে দাও গাে ছেড়ে দাও! আমার দেশের মানুষ যাচ্ছে, ছেড়ে দাও।” মুখ ফিরাইয়া দেখি একটি রমণী পাগলা গারদের মােটা লােহার শিক দুই হাতে ধরিয়া টানিতেছে। নিকটে আসিয়া দাড়াইলাম চিনিতে বিলম্ব হইল না। মাটিতে জানু পাতিয়া বসিয়া আমার মুখের দিকে চাহিয়া গিরিবালা জিজ্ঞাসা করিল, “ওগাে আমার দেশের মানুষ, এমন কেন হ’ল ?” আমার ডাক্তারী বিদ্যায় আর এ প্রশ্নের উত্তর জুটিল না, নীরবে ফিরিয়া গেলাম। ১১৪ দেশদ্রোহী অমরেশ সসম্মানে বি-এ পাশ করিয়া গভর্ণমেন্ট স্কুলে মাষ্টারী জুটাইয়া লইয়াছিল। সমস্ত রাত্রি জাগিয়া এম-এ পরীক্ষার বই পড়া ও সন্ধ্যায় স্কুলের ছেলেদের সঙ্গে খেলা করা ছাড়া তাহার আর কোনও কাজ ছিল না। স্বদেশপ্রেমের বন্যায় তখন সহরের সরকারী স্কুল কলেজগুলি টম করিতেছিল। একদিন খ্যাতনামা ব্যারিষ্টার মিঃ দত্তকে ভগীরথ করিয়া এই বন্যা সহসা দশঘরা গ্রামে প্রবেশ করিল। মিঃ দত্তের নাম আমরা পূৰ্বেই শুনিয়াছিলাম। সংবাদপত্রে তাঁহার অসাধারণ ত্যাগের কাহিনী সে প্রায় প্রত্যহই পড়িত। তাহার ত্যাগ ও চরিত্র অমরেশকে তাঁহার অনুরাগী করিয়াছিল। মিঃ দত্তের আগমনের বার্তা তাহাকে চঞ্চল করিয়া তুলিল। সাহা বাবুদের বাগানবাড়ীতে মিঃ দত্ত বিশ্রাম করিতেছেন। সম্মুখের প্রশস্ত প্রাঙ্গণে অগণ্য নরমুণ্ড। তাহাদের মধ্যে গান্ধী-টুপী মাথায় হলুদ-রংএর ব্যাজ পরিয়া স্বেচ্ছাসেবকের দল শান্তি রক্ষা করিতেছিল। অমরেশ পাশ কাটাইয়া যেখানে মিঃ দত্ত অনুরাগীগণ পরিবৃত হইয়া স্থানীয় ব্যক্তিবর্গের সহিত পরামর্শ করিতেছিলেন, সেই ঘরে প্রবেশ করিয়া নমস্কার করিয়া দাঁড়াইল। একজন কহিয়া উঠিল, “এই যে অমরেশবাবু নিজেই এসেছেন?” ১১৫
থার্ডক্লাশ
দেব।
অমরেশ সে কথায় কাণ দিল না, সে মিঃ দত্তকে দেখিতে লাগিল
ত্যাগী কর্মবীরের এই তাে যােগ্য বেশ। খদ্দরের সংক্ষিপ্ত পরিধান
আর একখানি মােটা চাদর ; অবিস্ত সুদীর্ঘ কেশরাশি। মিঃ
দত্ত অমরেশের প্রশংসমান দৃষ্টি লক্ষ্য করিয়া কহিলেন, “বসুন,
আপনার কথাই বলছিলাম। আপনাকে আমাদের চাই।”
অমরেশ আসন লইয়া কহিল, “আমি কি কাজে লাগতে
পারি ?”
“সমস্ত কাজে। আপনাকে আমি গুরুতর কাজের ভার
আজ আপনারা যদি না আসেন, তবে এই হতভাগ্য
অন্ধ দেশবাসীকে কে দৃষ্টি দেবে? এই অত্যাচার জৰ্জর, বুভুক্ষু
জীবন্ত মানুষগুলাের মধ্যে নবজীবন সঞ্চারের জন্য দেশমাতা
আপনাদের ডাকছেন। আপনারা সাড়া দেবেন না ?” তাহার
পর জালিয়ানওয়ালাবাগের কাহিনী হইতে আরম্ভ করিয়া উড়িষ্যার
দুর্ভিক্ষ পৰ্যন্ত দেশের যাবতীয় ঘটনা মিঃ দত্তের ভাষায় এমন
করুণ হইয়া ফুটিয়া উঠিতে লাগিল যে, অমরেশ অঞ ত্যাগ
করিয়া থাকিতে পারিল না। মিঃ দত্তের কথা শেষ হইলে
সে উঠিয়া দাঁড়াইয়া আবেগ গগদ স্বরে কহিল, “আমি
“আমি সম্পূর্ণ
ভাবে আজ আমাকে আপনার হাতে সমর্পণ কলাম। দেশের
কল্যাণের জন্য আমার দ্বারা যা সম্ভব হতে পারে আপনি
মনে করেন, আমি তা কৰ্ব। আপনি শুধু আদেশ দেবেন।”
মিঃ দত্ত কহিলেন, “আমি তােমাকে দেশমাতৃকার নামে
১১৬
দেশদ্রোহী ; গ্রহণ করলাম। একটা কথা আমি তােমাকে এখানেই জানাচ্ছি —তােমার অন্ন-বস্ত্রের কষ্ট হবে না। তবে আমার দেশ দরিদ্র, তােমার সেবা উপযুক্ত মূল্যে সে কিতে পারবে না। তবে যতদূর সম্ভব হয়— অমরেশ বাধা দিয়া কহিল,-“আমার চিন্তা আমি করিনে। ঘরে মা আছেন, তাঁর প্রয়ােজন স্বল্প ; তিনি যেন আমার জন্য কষ্ট পান দেখবেন।” মিঃ দত্ত কহিলেন, তাঁকে দেখবার ভার আমার। চল বাইরে লােজন অপেক্ষা কচ্ছে।” মিঃ দত্ত সভাস্থলে আসিয়া দাড়াইলেন, পুরনারীরা লাজ পুষ্পাঞ্জলি বর্ষণ করিলেন । 'বন্দেমাতরম্” শকে দশঘরা গ্রামখানি ধ্বনিত হইয়া উঠিল। তাহার পর সর্বসমক্ষে অমরেশকে আনিয়া দাড় স্বহস্তে পুষ্পমাল্য ভূষিত করিয়া মিঃ দত্ত তাহাকে স্থানীয় জন- মণ্ডলীর নেতৃপদে অভিষিক্ত করিলেন। জনতা জয়ধ্বনি দিল। এম-এ পরীক্ষার বইগুলি বাক্সে বন্ধ করিয়া ও ডেপুটীগিরির নমিনেশনের চিঠিখানি ছিড়িয়া ফেলিয়া অমরেশ সন্ধায় স্বগ্রামে আসিয়া উপস্থিত হইল। মাতা পূৰ্বেই সংবাদ শুনিয়াছিলেন, অমরেশকে দেখিয়া কহিলেন, “তুই চাকরী ছেড়ে এলি অমর ? সব ভেবে-চিন্তে দেখেছি তো? বাপের কিছু দেনা-পত্তর আছে তাও তত জানি?” ১১৭ করাইয়া,
থার্ডক্লাশ
অমরেশ কহিল, “ভেবােনা মা, দেশমাতার আশীর্বাদে সমস্ত
মঙ্গল হবে।
যে বিরাট ত্যাগের আদর্শ আজ দেখে এলাম, তা
দেখে কি আর নিজের ক্ষুদ্র চিন্তা নিয়ে থাকা সম্ভব ? তুমি
আশর্বাদ কর।”
অমরেশ মাতার পদধূলি লইয়া মাথায় মাখিল।
ইহার পর একদিন মাত্র আমি অমরেশকে দেখিয়াছি।
গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ী আসিয়াছিলাম। সন্ধ্যা হইতে কালবৈশাখীর
ঝড় শুরু হইয়াছিল, রাত্রি দ্বিপ্রহর—তখনও ঝড় থামে নাই।
বাহিরের ঘরে বিছানায় শুইয়া সেক্সপিয়র পড়িতেছিলাম, সহসা
ডাক শুনিলাম, “সতু বাড়ীতে আছ?”
“কে ?”
“আমি অমরেশ।”
অমরেশ এই দুর্যোগে ! দরজা খুলিলাম। ভিতরে আসিয়া
যে মনুষ্যমূর্তি দাঁড়াইল, অতি পরিচিত ব্যক্তিও প্রথম দৃষ্টিতে
তাহাকে অমরেশ বলিয়া চিনিতে পারি না। তাহার চমৎকার
বর্ণ তামাটে হইয়া গিয়াছে। মাথায় এক বার চুল ;
তাহ।
বাহিয়া তখনও জল পড়িতেছিল। গায়ে একটি ছিন্ন মলিন
পিরাণ, তাহার হাতায় এক টুকরা হলুদ-এর কাপড়ে লেখা
“বন্দেমাতরম্”। পরণের কাপড়খানার নিম্নদ্ধ জল এবং কাদায়
১১৮
দেশদ্রোহী
মাখা। হাতে একগাছ লাঠী। তাহার এই অবস্থা দেখিয়া
আমার চ’খে জল আসিতেছিল। অমরেশ আমার মুখের দিকে
চাহিয়া কহিল, “দুঃখ করােনা সতু! এই বিধাতার বিধান !
কঠোর তপস্যা ছাড়া দেশের মুক্তির কোনাে পথ নেই।”
বলিয়া অমরেশ মাটিতে বসিয়া পড়িল। আমি কহিলাম,
“সব শুছি, কাপড় ছাড় আগে।” “উহু! কাপড় ছাড়বার
সময় নেই। দুটো খেতে দিতে পার কিনা দেখ।”
বৌদিদিকে ডাকিয়া তুলিয়া, রান্নাঘরে যাহা অবশিষ্ট ছিল
আনিয়া দিলাম। অমরেশ খাইতে বসিয়া বলিতে লাগিল, “আজ
চার দিন খাইনি সতু । সতেরাে তারিখে হােসেনগঞ্জের মিটিং
করে কামারদয় আসি। সেখান থেকে নৌখালি, তারপর আজ
প্রাতে রওনা হয়ে এই তােমার এখানে—
“সর্বনাশ! নৌখালি থেকে বরাবর এখানে! চল্লিশ মাইল
পথ !”
“কত মাইল তাতাে গুণিনি ভাই, মায়ের নামে চলে এসেছি।
আবার ভােরেই রূপকাঠি পৌছুতে হবে।”
কথা কহিতে পারিলাম না। আমাদের গ্রাম হইতে রূপকাঠি
অন্ততঃ বিশ মাইল। এই বিশ মাইল পথ এই দুৰ্যোগ মাথায়
করিয়া যে সচ্ছন্দে যাইতে সাহস করে, তাহাকে সাধারণ মানুষ
কখনও বলা যাইতে পারে না । বাধা দিলে সে মানিবে না।
জানিতাম, তথাপি কহিলাম, “রূপকাঠি কি কাল সকালে গেলে
১১৯
থাডক্লাশ
চলবে না?” অমরেশ লাঠিগাছটা তুলিয়া লইয়া কহিল, “তা হয়
সতু। কাল সকালে মিঃ দত্তের বােট রূপকাঠির ঘাটে
পৌছবে। তার আগে আমায় গিয়ে পৌছতে হবে। অভ্যর্থনা,
সভা, তার আহার-বিশ্রাম সব আয়ােজনই আমাকে কৰ্ত্তে হবে।”
“একঘণ্টা জিরিয়ে যাও, বৃষ্টি ধরুক।” আমি কহিলাম ।
অমরেশ উঠিয়া দাড়াইয়া আমার হাত ধরিয়া কহিল, “মনে
কিছু করােনা সতু, তােমার কথা রাখতে পারলাম না, ঝড়-বৃষ্টি
মালে চবে না। ক্লাইভের যে সেনারা বাঙ্গলা জয় করেছিল,
তারা মেঘ-বৃষ্টির দিকে চায়নি, চেয়েছিল সম্মুখে ।
আজ যদি
তাদের হাত থেকে দেশকে ফিরিয়ে নিতে হয়, তবে আমাদেরও
সানে চাইতে হবে, উপরে কিংবা পিছনে চাইলে চবে না।
সামনের পথই সােজা পথ।” বলিয়াই অমরেশ বাহির হইয়া
নিদাঘ-নিশীথের অন্ধকারে মিশিয়া গেল !
বৈশাখী মেঘের
গর্জনের সাথে একটি অতি তীব্র স্বর দূর হইতে শুনিতে
পাইলাম ।
“মায়ের নাম নিয়ে ভাসানাে তরী যেদিন ডুবে যাবেরে ।
ইহার পর আর অমরেশের সঙ্গে আমার দেখা হয় নাই। কিন্তু
তাহার সম্বন্ধে সকল সংবাদ আমি শুনিয়াছি।
গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে অমরেশ দেশসেবা-ব্রতের পুণ্যকথা
কীৰ্ত্তন করিয়া ফিরিতে লাগিল। তাহার নিষ্ঠা, বিশ্বাস ও
চরিত্র-মহিমায় আকৃষ্ট হইয়া দলে দলে লােক যখন উপদেশ লইতে
১২০
দেশদ্রোহী আসিত, তখন সে মৃদু হাসিয়া কহিত, “আমি কেউ নই। সেবা-ব্রতের দীক্ষা নিতে চাও, তবে আদর্শ পুরুষের শরণ লও।” এইরূপে ক্ষেত্র প্রস্তুত করিয়া বীজবপনের জন্য সে মিঃ দত্তকে সহর হইতে আহ্বান করিয়া আনিত। এইরূপে বৎসরের মধ্যে অমরেশ মিঃ দত্তকে লক্ষ লক্ষ লােকের রাষ্ট্রীয় গুরুপদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া দিল। সহসা একদিন পুলিশ আসিয়া বক্তৃতা-মঞ্চ হইতে অমরেশকে আপসারিত করিয়া লইয়া গেল। অমরেশ সমবেত বিক্ষুব্ধ জন- মণ্ডলীকে সম্বােধন করিয়া কহিল, “ভাই সব, আমি চললাম। তােমরা যে ব্রত নিয়েছ, তা জীবন দিয়ে সফল কর! অভাব অভিযােগ প্রয়ােজন সব মিঃ দত্তকে জানাবে। তার উপদেশ ও নির্দেশে চবে, সিদ্ধি নিশ্চয় হবে।” রাজদ্রোহের অপরাধে অমরেশের তিন বৎসর জেল হইল। অমরেশ মৃদু হাসিয়া কহিল, “বন্দেমাতরম্।” জেলে যাইবাব পূর্বে একখানি কাগজের টুকরায় মিঃ দত্তের উদ্দেশে লিখিল, “মাকে দেখবেন।” তাহার পর অমরেশ জেলের গাড়ীতে উঠিল স্বেচ্ছাসেবকেরা জয়ধ্বনি করির। ফিরিয়া গেল। দীর্ঘ তিন বৎসর। ইহার মধ্যে কত পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। দেশ-সেবার ধারা, দেশপ্রেমের সংজ্ঞা সমস্ত বাইয়া গিয়াছে। ১২১ টি
থার্ডক্লাশ
নূতন নূতন দল গড়িয়া উঠিয়াছে।
তাহাদের কাৰ্য অভিনব,
কাৰ্য্যধারা নূতন।
এই নূতন ভাবের আবেষ্টনের মধ্যে একদিন বর্ষার প্রভাতে
ক্ষয়কাশির আক্রমণে জীর্ণ দেহ লইয়া অমরেশ জেল হইতে
বাহির হইয়া আসিল। বাহিরে পরিচিত কাহাকেও দেখিল না।
সহরের এক হােটেলে বিশ্রাম করিয়া সন্ধ্যার গাড়ীতে সে বাড়ী
ফিরিল।
ভােরে বাড়ীর দরজায় ঘা দিয়া সে ডাকিল, “মা?” সাড়া
আসিল না। কিছুক্ষণ পরে হুকা হাতে নবীন পােদ্দার বাহির
হইয়া আসিলেন।
অমরেশ আশ্চর্য্য হইয়া কহিল, “আপনি ?” পােন্দার হুকা
নামাইয়া রাখিয়া করজোড়ে নমস্কার করিয়া কহিল, “এজ্ঞে কি-
কি করি আর ! বামুনের ভিটে মােছলমানে নিলেম ডেকে নেবে,
তাকি দেখতে পারি ? তাই দু’শ আটাশ টাকাতেই নিলাম।
তার বড় লাভ হয়নি; দেখুন না, দক্ষিন পােতার ঘরে একরকম
তােত কিছু ছিলই না। পুকুরের ঘাটে
অমরেশ বাধা দিয়া কহিল, “মা ?”
বৃদ্ধ একটু বিব্রত হইল, তারপর মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে
কহিল, “এজ্ঞে তিনি তত ভটচাজ বাড়ীতে
অমরেশ কথা না বলিয়া ভট্টাচাৰ্য্য বাড়ীর পথ ধরিল।
পােদ্দারের প্রথম কথাতেই বুঝিয়াছিল যে, পিতার ঋণের দায়ে
১২২
দেশদ্রোহী
বাস্তুভিটা বিক্রয় হইয়া গিয়াছে। ভট্টাচাৰ্য-গৃহিণী আঙ্গিনায়
ছড়া-ঝাট দিতেছিলেন, অমরেশকে দেখিয়া ম্লান মুখে কহিলেন,
“এস বাবা, কবে এলে ?” অমরেশ প্রণাম করিয়া কহিল
“আজই। মা কোথায়?”
ভট্টাচাৰ্য-গৃহিণী কহিলেন, হাত-মুখ ধােও, বিশ্রাম কর।”
অমরেশের মনে শঙ্কা ঘনাইয়া আসিল, সে প্রশ্ন করিল “ম
কোথায়।”
ভট্টাচাৰ্য্য-গৃহিণী উচ্চৈস্বরে কঁদিয়া উঠিয়া অমরেশের প্রশ্নের
জবাব দিলেন। অমরেশ করতলে মুখ ঢাকিয়। আচ্ছন্নের মত
বসিয়া রহিল।
দ্বিপ্রহরে মায়ের মৃত্যুর কাহিনী অমরেশ সমস্তই শুনিল।
পুত্রের কারাদণ্ডের সংবাদ পাইয়া বিধবার মূৰ্ছারােগের সূত্রপাত
হইতে আরম্ভ করিয়া পাওনাদারের তাগিদ, অবশেষে বাস্তুভিটা
বিক্রয়, শেষে উন্মাদ প্রায় জননীর অন্নজল ত্যাগ এবং মৃত্যু
সমস্ত কথাই ভট্টাচাৰ্য্য-গৃহিণী সবিস্তারে কহিয়া গেলেন। অমরেশ
নীরবে শুনিয়া গেল মাত্র।
অমরেশ কলিকাতায় আসিয়া দেখিল যে, সে দিনের সে
কলিকাতা আর নাই। স্কুল কলেজে পূর্বের মতন ছাত্রের
যাতায়াত করিতেছে। যে বস্তুটির বিরুদ্ধে তিন-চার বৎসর পূর্বে
থার্ডক্লাশ নিদারুণ বিদ্রোহ বিচিত্র কণ্ঠে ধ্বনিত হইয়া উঠিয়াছিল, সেই কাউন্সিলের দিকে লক্ষ্য করিয়া দেশের রাষ্ট্রীয় আন্দোলনের স্রোত ছুটিয়া চলিয়াছে। যাঁহাদের ত্যাগের আদর্শ তাহাকে একদিন অনুপ্রাণিত করিয়া তুলিয়াছিল, তাহাদের মােটরগাড়ী রীতিমত বেলা দশটায় হাইকোর্টে গিয়া পাঁচটায় ফিরিয়া আসিতেছে। সঙ্গে সম্বল বিশেষ কিছু ছিল না। শিয়ালদায় এক হােটেলে প্রত্যহ একবেলা খাইয়া সে মিঃ দত্তের সঙ্গে দেখা করিবার চেষ্ট। করিল। কিন্তু তাহার নেতৃত্ব তখন মকেলের নিবিড় অরণ্যে ও অগণ্য প্রতিষ্ঠানের শীর্ষে স্থান লাভ করিয়া দুলভ দর্শন হইয়া গেছে, সাক্ষাৎ সহসা মিলিল না। কিন্তু তাঁহাকে অমরেশের চাই-ই। অর্থ সাহায্যের জন্য নহে মায়ের মৃত্যুর জবাব দিহির জন্য । একদিন সুযােগ ঘটিল ; সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেখিয়া সে এক পরামর্শ বৈঠকে গিয়া উপস্থিত হইল। আগামী নির্বাচনের জন্য সভা বসিয়াছিল। জোর বিতর্ক চলিতেছিল সহসা অমরেশ প্রবেশ করিয়া তারস্বরে কহিল, “মিঃ দত্ত! বাইরে আসুন!” মিঃ দত্ত জ্ব কুঞ্চিত করিলেন। একজন সদস্য উঠিয়া কহিলেন, “তুমি কে হে ছােরা ? যাও—বেরিয়ে যাও।” অমরেশ মি: দত্তের দিকে চাহিল, তিনি কথা কহিলেন না। রুদ্ধ-আক্রোশে ফুলিতে ফুলিতে অমরেশ বাহির হইয়া আসিল। ১২৪ ২ দেশদ্রোহী হােটেলে ফিরিয়া দেখিল পূর্বের স্কুলের চাকুরীতে পুনরায় ফিরিয়া ভর্তি হইবার জন্য তাহার দরখাস্তখানি প্রত্যাখ্যাত হইয়া ফিরিয়া আসিয়াছে। অমরেশ শূন্য দৃষ্টিতে বাহিরে চাহিয়া রহিল। বাহিরের রাস্তায় তখন অসংখ্য মােটরকারে স্বেচ্ছাসেবকের দল দেশনায়ক মিঃ দত্তের জন্য ভােট ভিক্ষা করিয়া তারস্বরে জয়ধ্বনি করিয়া ছুটিতেছিল। পরদিন কলেজ স্কোয়ারে বিরাট নির্বাচন-সভায় রক্তচক্ষু, জীর্ণ-বেশ, উপবাসী অমরেশ যখন আসিয়া দাঁড়াইল, তখন মিঃ দত্ত কেবল মাত্র বক্তৃতামঞ্চে উঠিয়া দাড়াইয়াছেন। বক্তৃতা আরম্ভ হইতেই তীরবেগে ছুটিয়া গিয়া অমরেশ তাঁহার সম্মুখে দাড়াইয়া উন্মাদের মত চীৎকার করিয়া উঠিল,- “ভণ্ড—প্রতারক—পশু- অধীর জনতা রুখিয়া উঠিল, দেশদ্রোহী গুপ্তচর-* মুহূর্ত মধ্যে অমরেশের দুৰ্বল দেহ আঘাতে রক্তাপ্লুত হইয়া ভূমিতে লুটাইয়া পড়িল। পরদিন সবিস্তারে স্বদেশদ্রোহী অমরেশ কর্তৃক দেশনায়কের বধ-চেষ্টার কাহিনী সমস্ত সংবাদপত্রে তীব্র ভাষায় প্রচারিত হইয়া গেল। দেশদ্রোহী অমরেশ মধ্যরাত্রেই জীবন দিয়া তাহার দেশ- দ্রোহের প্রায়শ্চিত্ত শেষ করিয়াছিল, কাজেই এ কথার প্রতিবাদ করিবার আর কেহ ছিল না।
শাঁখের করাত
পনের বৎসর পর পশুপতি গ্রামে ফিরিল। এতদিন পাঞ্জাবে
খুড়ার কাছে থাকিয়া পড়াশুনা করিয়াছে, গ্রামের
গ্রামের খবর বড়
জানিত না। সন্ধ্যাকালে গ্রামের প্রধানেরা একত্র হইয়া গ্রামের
এই কৃতবিদ্য সন্তানটির সঙ্গে সাক্ষাৎ করিতে আসিয়া, সংক্ষেপে
গ্রামের সংবাদ তাহাকে জানাইলেন। সংবাদগুলি এই--
বিশ সনের ঝড়ে নৌকা ডুবিয়া জমিদার মধু মিত্র মহাশয়
পরলােক গিয়াছেন। তদীয় পুত্র অনুকূল সম্পত্তি বন্ধক দিয়া
বিলাত যাইবার নাম করিয়া বােম্বাইতে এক সাহেবী হােটেলে
আছে।
রায়-বাড়ীতে রায়-গিন্নী আছেন।
রায় মহাশয় ওলাউঠায় ও
তঁাহার তিন পুত্র মরিয়াছে কালাজ্বরে।
কুণ্ডু-বাড়ীতে কেহ নাই; দুই সরিকে বৎসর দশেক ধরিয়া
কাঠাল গাছের স্বত্ব লইয়া মামলা করিয়া সর্বস্বান্ত হইয়া, শেষে
এক সরিক বগুড়ায় মামাবাড়ী, অপর সরিক মালদয় মাসীবাড়ীতে
গিয়াছে।
বাড়ী খালি, তাহাতে বছিরদ্দি চৌকীদারের মুর্গী ও
ধনাই দাসের গরু থাকে।
ছেলের অভাবে গ্রামের মাইনর ইস্কুলটি উঠিয়া গিয়াছে।
ছেলেরা এক হাফ আখড়াইয়ের দল করিয়াছে, কদম বিশ্বাসের
১২৬
শখের করাত
বাড়ীর দরদালানে দুপুর বেলায় তাস পিটিয়া, সন্ধ্যাকালে আখড়াই
জুড়িয়া দেয়।
গ্রামের মেয়েরা দুপুরে নদীতে এবং সন্ধ্যায় মন্ত্রিকদের এঁদো
পুকুরে স্নান করেন। নদীর ঘাটে যাইবার উপায় নাই। নবিগঞ্জের
চামড়ার গুদামওয়ালার মুন্সী সরকার আর একদল লােক রংদার
লুঙ্গী ও ধােপদস্ত কামিজের উপর ওয়েষ্ট কোট আঁটিয়া মাঝ নদীতে
বিএ সারি গাহিয়। বাচ খেলে, কখনও কখনও ঘাটে বসিয়া
নির্ভয়ে বিড়ি ফুকিতে থাকে।
এই কথা শুনিয়া পশুপতি একেবারে জ্বলিয়া উঠিল, কহিল,
“আপনারা কি করেন ?” নবিন রায় মহাশয় প্রাচীন ব্যক্তি
অনেক দেখিয়াছেন। তিনি কহিলেন, “কি করব দাদা? টাকাই
সব।
টাকার জোরেই সব হয়। গত বৎসর রাধা বােষ্টমী আর
এই বােশেখে মাখন মাঝির জলজ্যান্ত বৌকে ঘাট থেকে তুলে
নিয়ে গেল, কে কি করল ? টাকায় সাক্ষী বােব হয়, পুলিশ
খোঁড়া হয়। আমরা যদি দু’কথা বলতে যাই, তা হলে আর হাটে
যাওয়ার পথ থাকে না।” দাশ ঘােষ কহিলেন, “মান-ইজ্জং সব
মধু মিত্তির মশাইয়ের সঙ্গেই গিয়েছে। জেলেপাড়া নবিগঞ্জের
দালালের উৎপাতে সাফ। বৌ-ঝি ঘরে রেখে জাল বাইতে যাবে
কে ? ভাবছি এই পােষ পেরুলে ঘর দু'খানা ভেঙ্গে নিয়ে সদরে
গিয়ে ঘর তুলব।”
পশুপতি পূৰ্ববং তীব্র স্বরে কহিল, “কোথাও যেতে হবে না !
১২৭
|
থার্ডক্লাশ
আমি দু’দিনে সব ঠিক করে দিচ্ছি। নিশ্চিন্ত থাকুন ! শুধু
ছেলেগুলােকে একবার আমার কাছে ডেকে দেবেন।”
( ২ )
একে বড় মানুষ তাহার পর এম্ এ পাশ; বহুকাল পর
দেশে ফিরিয়াছে। ছেলের দল তাহাকে বড় কেহ দেখে নাই;
কৌতূহলী হইয়া হাফ আখড়াইয়ের দলশুদ্ধ রাত্রি এক
পশুপতির বাড়ীর আঙ্গিনায় আসিয়া দাড়াইল।
পশুপতি
মুগুর
ভজিতেছিল। মুগুর রাখিয়া ছেলেদের
পরিচয় লইয়া কহিল, “তােমরা বেঁচে থাকতে গাঁয়ে এই সব
অত্যাচার হয়! কি কর তােমরা ?” দলের নেতা নরেন্দ্র চক্রবর্তীর
বয়স বছর বাইশ, কিন্তু এই বয়সেই সংসারের যাবতীয় অভিজ্ঞত।
সে লাভ করিয়া অত্যন্ত প্রবীণ হইয়া পড়িয়াছিল। সে কহিল,
“করতে পারি সবই। কিন্তু পিছনে দাড়ায় কে বলুন? সব
কাজেই টাকা চাই। টাকা পেলে দু’দশটা লাঠিয়াল—
পশুপতি রুখিয়া উঠিল, “লাঠিয়াল দিয়ে মা-বােনর ইজ্জং
বাঁচাবে ? এ বুদ্ধি পেলে কোখেকে!”
আপনার সাঙ্গোপাঙ্গ পার্ষদের সম্মুখে ধমক খাইয়া নরেন্দ্রের
নিতান্ত অপমান বােধ হইল। মনের ক্রোধ মনে চাপিয়া
মুখে হাসিয়া কহিল,
“তা আপনি যখন এসেছেন যা বলবেন
করব।”
১২৮
শখের করাত
পশুপতি কহিল, “যা বলবার বব কাল। যা করতে হবে
তাও বহু কাল, বেলা দশটায় এসাে।”
“আজ্ঞে আচ্ছা” বলিয়া নরেন্দ্র চক্রবর্তি চলিয়া গেল এবং পথে
বিড়ি ধরাইতে ধরাইতে পার্ষদবৃন্দের দিকে চাহিয়া কহিল, “হাতী
ঘােড়া গেল তল, ভেড়া বলেন কত জল। কেমন পাঁচকড়ি?”
পাঁচকড়ি সূত্রধর একটু কাষ্ঠ হাসিয়া কহিল, “তা বৈকি প্রভু।
একপ্রহর রাত্রে পশুপতি একাকী গ্রামের পথে বাহির হইল।
তখন হাফ আখড়াইয়ের গান পৰ্যন্ত শেষ হইয়া গিয়াছে। সমস্ত
গ্রাম নিঃঝুম। কাহারাে বৈঠকখানায় প্রদীপ নাই। মল্পিকদের
চণ্ডীমণ্ডপে সারারাত্রি এককালে পাশা চলিত, সে কথা আবছায়ার
মত তাহার মনে ছিল। দেখিল সেখানে গুটিকতক কুকুর
জড়াজড়ি করিতেছে, পথে জনপ্রাণীর সাড়া শব্দ পাইল না, শুধু
নদীর ধারে বাবােয়ারীতলার বানাে বেলগাছের নীচে নবিগঞ্জের
জনকয়েক লােক তাশ পিটিতেছিল, আর একজন বাঁশের বাঁশীতে
আড়খেমটায় একটি পিলু বােয়ায় টপ্পা বাজাইতেছিল।
ভােরে বাইক চাপিয়া প্রথমে পশুপতি গেল থানায় । দারােগা
বাবু অপাঙ্গে এই নবাগত যুবককে দেখিয়া লইলেন, কিন্তু তাহার
ভাব-ভঙ্গী দেখিয়া খুসী হইতে পারিলেন না।
পশুপতি তাহাকে
গ্রামের অবস্থা জানাইয়া পুলিশের কথা কহিতেই দারােগাবাবু
কহিলেন, “পুলিশের সাধ্য কি মশাই! সব গাঁয়ের অবস্থাই এই
রকম, পুলিশ কৰ্বে কি? আপনারা লাগুন ! সাক্ষী জোগাড়
১২১
থার্ডক্লাশ ; করুন, আমরা পিছনে আছি। আপনারা নিজেরা কিছু করবেন , মামলা করলে সাক্ষী জোটাতে পারবেন না; মামলা ফেঁসে গেলে খবরের কাগজে পুলিশকে গালাগাল করবেন!” পশুপতি এই প্রসঙ্গে দ্বিতীয় কথা না বলিয়াই সদরের পথ ধরিল। সাত ক্রোশ পথ অতিক্রম করিয়া মহকুমা হাকিমের কুঠীতে সে যখন উপস্থিত হইল, সাহেব তখন বারান্দায় বসিয়া ‘ব্রেকফাষ্ট করিতে- ছিলেন। পশুপতি কাউদিয়া গ্রামের অবস্থা সংক্ষেপে কহিয়া গেল । সাহেব সদ্য বিলাত হইতে আসিয়াছেন, এই বলিষ্ঠ যুবকটীকে তঁাহার ভালাে লাগিল। ইংরাজীতে কহিলেন, “জানে। বাবু, যে মানুষ আপনাকে সাহায্য করে, ভগবান তাকে সাহায্য করেন। তােমার গ্রামের ছেলেদের নিয়ে একটা পেট্রোল’ আর ‘ডিফেন্স পার্টি গড়ে ফেল ; দেখবে আপনি উৎপাত কমে যাবে, গুডমর্ণিং !” পশুপতি ফিরিয়া আসিল। তাহার পূর্ব আদেশ অনুযায়ী ছেলের দল আঙ্গিনায় অপেক্ষা করিতেছিল, পশুপতি তাহাদিগকে কহিল, “আমি কুস্তির আখড়া খুলছি, সেখানে লাঠি খেলাও চলবে তা ছাড়া সকল রকম খেলার সরঞ্জাম রাখব। তােমাদের সবাইকে আসতে হবে।” ছেলেরা স্বীকার করিয়া চলিয়া গেল। দ্বিপ্রহরে ঘাটে যাইবার পথে নবীন রায় মহাশয়কে ডাকিয়া পশুপতি কহিল, “প্রায় করে তুলেছি দাদামশাই, দু’দিনে ঠিক করে দেব, ভয় পাবেন না।”
শখের করাত ( ৩ ) বৈকালে পশুপতি সরকার-বাড়ীর দোলমঞ্চের সম্মুখের মাঠের একবুক ঘেঁটবন সাফ করিতে লাগিল। মাঠ সাফ হইলে পরদিন সেখানে কুস্তির আখড়া বসিল। নিজের জলপানির সঞ্চিত টাকা নিঃশেষ করিয়া সহর হইতে মুগুর ডাম্বেল প্রভৃতি ব্যায়ামের সর্ববিধ সরঞ্জাম কিনিয়া আনিল এবং দশ টাকা বেতনে একজন লাঠিয়াল শিক্ষক রাখিতেও ত্রুটি করিল না। প্রথম দুই-একদিন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশী হইল না হাফ আখড়াইয়ের দলের বড় কেহ আসিল না। কিন্তু ক্রমে যখন ছেলেরা দেখিল যে, চাঁদা দিতে হয় না অথচ পেট ভরিয়া ছােলা আর গুড় খাইতে পাওয়া যায়, তখন নরেন্দ্র চক্রবর্তী শুদ্ধ আসিয়া কুস্তি করিতে লাগিয়া গেল। সপ্তাহখানেক পর একদিন পশুপতি লাঠি ঘাড়ে করিয়া তাহার বাছা বাছা কয়েকটি সাগরেদের সহিত নবীগঞ্জ গিয়া উপস্থিত হইল। সেখানে চামড়ার আড়তদারের সঙ্গে পশুপতির কি কথাবার্তা হইল জানি না, কিন্তু সেদিন হইতে সন্ধ্যায় তাহার লােকজনের বাচখেলা বন্ধ হইয়া গেল, নদীর ঘাটে বসিয়া বিড়ি ফুকিতেও কাহাকে দেখা গেল না। ক্রমে ক্রমে সন্ধ্যায় নদীর ঘাট গ্রাম-বধূদের কলহাস্য ও করুণ। ঝনৎকারে পুনরায় মুখর হইয়া উঠিতে লাগিল এবং জ্যোৎস্না নিশীথে পল্লী-পথ নিঃশঙ্ক পদসঞ্চারে শব্দিত করিয়া গৃহিণীরা পূর্বের ১৩১ থার্ডক্লাশ মতই পুনরায় রায়-গৃহিণীর নৈশ নারীসভায় যােগদান করিতে থাকিলেন। সেদিন পশুপতি কি কাজে ঘাটের পথে চলিতেছিল রায়-গৃহিণী কয়েকটি তরুণী বধূর পুরােবৰ্ত্তিনী হইয়া সান্ধ্য-স্নান সারিয়া ফিরিতেছিলেন। পশুপতিকে দেখিয়া কহিলেন, “বেঁচে থাক লমী দাদা আমার। তােমার দৌলতে নেয়ে বাঁচছি।” তরুণীরা কেহ কথা কহিলেন না, কিন্তু অবগুণ্ঠনের অন্তরাল হইতে অনেকগুলি চক্ষু যুগপৎ তাহার প্রতি স্নিগ্ধ প্রসন্ন কৃতজ্ঞ দৃষ্টিপাত করিল, পশুপতি তাহা দেখিল এবং রায়-গৃহিণীর আশীৰ্বাদের উত্তরে মাথা নীচু করিয়া নীরবে ঘাটের পথে চলিয়া গেল। পশুপতির উৎসাহে ক্রমে ক্রমে দূর গ্রাম হইতে ছেলেরাও আসিয়া তাহার দলে যােগ দিতে আরম্ভ করিল। খুড়া মহাশয় পাব হইতে লিখিলেন, “বেশ করিতেছ, যদি স্থায়ী করিতে পার, তবে একটা কাজের মত কাজ হইবে।” পিতৃব্যের অনুজ্ঞাক্রমে সে বৎসরের ফসল বিক্রয় করিয়া লব্ধ অর্থ তাহার আখড়ার সৰ্বাঙ্গীন উন্নতিকল্পে ব্যয় করিল এবং মােটা মাহিনা দিয়া কলিকাতা হইতে কুস্তি শিখাইবার জন্য ভােজপুরী পালােয়ান লইয়া আসিল। আখড়ার শিক্ষার্থীর সংখ্যা যখন একশত ছাড়াইয়া গিয়াছে তখন একদিন সহসা পশুপতি দেখিল যে, ভিনগ্রামের জন-ত্রিশেক ১২
শখের করাত
ছাত্র অনুপস্থিত। কারণ অনুসন্ধানের জন্য লােক পাঠাইল,
তাহারা অনুপস্থিতির কারণ কিছু জানাইল না, তবে বলিয়া দিল
তাহারা আর আসিতে পারিবে না । পরদিন নরেন্দ্র চক্রবর্তী ও
তাহার দলের জনকয়েক লােককে দেখা গেল না। তাহাদের
সকলেরই অসুখ।
অকস্মাৎ এতগুলি লােকের একসঙ্গে অসুখ হইবার কারণ
কিছু পশুপতি আবিষ্কার করিয়া উঠিতে পারিল না, তবে
বুঝিল যে ভিতরে কিছু রহস্য আছে। তৃতীয় দিন প্রভাতে
থানা হইতে একজন হাওলদার আসিয়া পশুপতির উদ্ধতন
চতুর্দশ পুরুষের সংবাদ লিখিয়া লইয়া গেল
গেল এবং বৈকালে
নবীন রায় মহাশয় পাংশু-মলিন মুখে আসিয়া পশুপতির নিকট
শঙ্কিত মৃদুস্বরে যাহা বলিলেন, তাহাতেই সমস্ত রহস্যের উদ্ভেদ
হইল।
কয়েকদিন
হইতে জন-দুই আগন্তুক গ্রামে ঘােরা-ফেরা
করিতেছে। দফাদার আসিয়া সকলকে গােপনে জানাইয়া
গিয়াছে যে, কুন্তীর আখড়ায় যাহারা খেলা করে, তাহাদের উপর
কড়া নজর রাখিবার জন্য দারােগার উপর হুকুম আসিয়াছে।
সংবাদ দিয়া নবীন রায় কহিলেন, “তুমি ভাল কর্তেই এসেছিলে
দাদা, কিন্তু আমাদের পােড় কপালে সৈল না, তা আর কি কর্নে
বল ?”
পপতি কোনাে কথা কহিল না।
৩৩
থার্ডক্লাশ (৪) পরদিন আখড়া একেবারে শূন্য হইয়া গেল। পশুপতি তাহার বাছা বাছ। সাগরেদের বাড়ীতে নিজেই গিয়া উপস্থিত হইল। তাহাদের অধিকাংশই শারীরিক অস্বাস্থ্যের দোহাই দিয়া বাড়ী হইতে বাহির হইল না। দুই-চারিজন স্পষ্টই জানাইল যে, দাবােগা- বাবু, আখড়ায় যাইতেই তাহাদিগকে নিষেধ করিয়া দিয়াছেন। পরদিন প্রভাতে পশুপতি সদরে গিয়া উপস্থিত হইল। পুরাতন ম্যাজিষ্ট্রেট বন্দী হইয়া গিয়াছেন, নৃতন যিনি আসিয়াছেন তিনি পাকা সিভিলিয়ান্, তাহার গোফ ও চুলেও পাক ধরিয়াছে। পশুপতির নাম শুনিয়াই তিনি পরিষ্কার বাঙ্গলায় কহিলেন, “এসব চালাকী ছেড়ে দাও বাবু। কুস্তির আখড়ার নামে ছেলে জড় করে Loyalty undermine করছ তুমি, আমি শুনেছি।” পশুপতি তীব্র স্বরে কহিল, “মিথ্যা কথা ! গুণ্ডার হাত থেকে গ্রামের লােকজনকে বিশেষ মেয়েদের বাঁচাবার জন্যই আমি ছেলে- দের শিক্ষা দিচ্ছিলাম, তাহার সঙ্গে পলিটিক্সের কোন সম্বন্ধ নেই।” ম্যাজিষ্ট্রেট টেবিলের কাগজের দিস্তায় নাম সই করিতে করিতে বলিলেন, “গ্রামের লােকজনকে দেখবার জন্য গভর্ণমেন্ট আছে পুলিশ আছে, তার জন্য তােমার কষ্ট করবার দরকার নাই। অবশ্য তুমি যদি কিছু কর্তে চাও, সে তােমার ইচ্ছা, তবে জানবে গভর্ণমেন্ট বােকা নন। গুড মর্ণিং।” ১৩৪
শখের করাত
পশুপতি ফিরিয়া আসিয়া সেই দিনই তাহার দলবলকে ডাকিয়া
পাঠাইল, দুই-একজন ছাড়া কেহ আসিল না। যাহারা আসিল,
তাহারাও আখড়ায় যােগ দিতে কোনমতেই রাজী হইল না।
পরদিন সন্ধ্যাকালে কাহারও নিকট হইতে বিদায় না লইয়া
ভােজপুরী পালােয়ানের সঙ্গে পশুপতি পিন্সীতে গিয়া উঠিল এবং
মুখ ফিরাইয়া মুহূর্তকালের জন্য সন্ধ্যার তিমিরচ্ছায়ায় অদৃশ্য নির্জন
নদীর ঘাটের দিকে চাহিয়া একবার দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিল।
ঘাট নির্জন, কিন্তু শুনিল দূরে কদম বিশ্বাসের বাড়ীর
আঙ্গিনায় হাফ-আখড়াইয়ের গনি আরম্ভ হইয়াছে-
“রমণী পরম রতনে
সুখের শিকলে বাঁধি করছে যতনে।"
আর তাহার সহিত তাল রাখিয়! ওপাড়ে নবিগঞ্জের হাটে
মহরমের লাঠি খেলার একুশখানি কাড়া বাজিতেছে এবং কাছে
রঙ্গিণী খেমটাওয়ালীর বাড়ীর বারান্দায় দারোগাবাবুর জড়িত
কণ্ঠস্বরে নিধুবাবুর টপ্পা ও তাহার সঙ্গীদের অট্টহাস্য ধ্বনিত হইয়
উঠিতেছে
সমাপ্ত
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.