Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Moghal Pathan Ed.8
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
মােগল পাঠান
-
।
শ্রীসুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
No text on this page.
শুভকে কোন দাগকাটা, পাতা ছেড়া বা
মন্তব্য লিখিলে এবং সাতদিনের মধ্যে
ফেরৎ না দিলে জরিমানা দিতে হইবে।
মোগল
পাঠান।
[ পঞ্চাঙ্ক ঐতিহাসিক নাটক ]
শনিবার ২৪শে আষাঢ়, ১৩২৩ সাল
মনমােহন থিয়েটারে প্রথম অভিনীত।
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রণীত।
১৩৫২-অগ্রহায়ণ
বাকুলিয়া গ্রাম, জেলা হুগলী।
মুল্য ১ দেড় টাকা।
প্রকাশক :-
প্রফুল্লকুমার ধর,
সুলভ কলিকাতা লাইব্রেরী
১০ ৪নং আপার চিংপুর রােড,
কলিকাত।
দি নিউ পশুপতি প্রেস,
৩৩১ নং, অপার চিৎপুর বােড়,
কলিকাতা ।
২। হিন্দুৰীৰ মুল্য মাত্র ১০ টাকা। হিন্দু মুসলামকে কত ভালবাসে মুসলমান হিন্দুকে কত ভালবাসে—মুসলমানকে বাঁচিতে হইলে হিন্দুকে কত প্রয়ােজন হিন্দুকে বঁচিতে হইলে মুসলমানকে কত প্রয়ােজন তাহা বুঝিতে পারবেন। দেশের আত্মসম্মান জাগাইতে দশকে শিক্ষা দিতে এমনই নাটকের অভিনয় সর্বত্র প্রয়ােজন। সংস্করণের পর সংস্করণই নাটকের প্রথম পরিচয়। সরম-১° দেড় টাকা। ৩। অ্যালেকজান্ডার—ইহার অভিনয় দেখিয়াছেন—কিন্তু ভাবিয়াছেন কি--এ নাটকের পরিসমাপ্তি শুধু অভিনয়ে নয়। এ যে মহারাজ পুরুর রক্ত পড়া একথানা জাতীয় ইতিহাস। সৰ্ব্বত্রযুগের—সৰ্ব্ব জগতের বক্ষনদন। অনুভব করুন। আলেকজাণ্ডার। *** • পুরুরাজ ! তুমি শুধু বীর নও। তুমি নানুষ । আলেকজাণ্ডারের তৃৰ্যনিনাদে রিকম্পিত ভারতের সমস্ত পশু যখন আমার পদতলে লুটিয়ে পড়েছিল, তখন একমাত্র তুমি প্রাণের চেয়ে নান বড় করেছিলে, স্বর্গের চেয়ে দেশ বড় করে ছিলে, ইহকাল পর- কালের উপর জন্মভূমিকে স্থান দিয়েছিলে । পানিপথ- অতুলানন্দ র প্রণীত, ( অভিনব তৃতীয় সংস্করণ) মূল্য ১০ টাকা। এমন অল্পায়াসে ষ্টেজ তােলপাড় করিয়া দিতে অন্য কোন নাটক আছেকি? দানীবাবুর বাবরসা—চুণিবাবুর সংগ্ৰামসিংহ—হরিভূষণ বাবুর দৌলত খ স্মরণ করুন। আশ্চৰ্যময়ীর সেই অন্ধ ফুলওয়ালী দেলোর সঙ্গীতময় মর্মবেদনা কি শুনিতে পাইতেছেন না ? মূল্য ১০ সিকা। কলির সমুদ্র মন্থন – ৫০ আনা। ১। কুরুক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণ ১০ টাকা। ত্রিজগতের সেই মুকুটমণি, যশােদার সেই নন্দমুলাল, সেই ননীচোর, সেই বংশীবাদক রাখাল বালকের পাঞ্চজন্য শঙ্খ-নিনাদ । সত্যযুগের একটি—ত্রেতাযুগ একটি—দ্বারের একটি বিচ্ছিন্ন দৃশ্যে নির্মিত একখানি নাটক নহে। যাহার পদস্পর্শ কুরুক্ষেত্ৰ ধৰ্ম্মক্ষেত্র হইয়াছিল—সেই বিরাট চরিত্রের গ্রথিত, চিত্রিত, পরিস্ফুট প্রতিকৃত। কতখানি অনুভূতি প্রেরণা, কতখানি কতনি বিনিত আগ্রহে নাট্যকার এ মহান চরিত্র চিত্রিত করিয়াছেন—তাহা এই কয়েকছত্র হইতে যথাসম্ভব উপলব্ধি করুন। সুলভ কলিকাতা লাইব্রেরী ১০৪, অপর চিৎপুর বােড় কলিকাতা মূল্য মাত্র পুরুষ পরাক্রান্ত আফগান সর্দার। পরে পাঠান সম্রাট। শেরশার জ্যেষ্ঠ পুত্র। ০০০ ঐ পুত্র। ঐ ভ্রাতুস্পুত্র। ঐ চুণারের সহকারী দুর্গাধ্যক্ষ। ••• ঐ গুরু। ••• ০ ০ ০ আদিল জালাল মুবারিজ গাজিখ ফকির রহিম হুমায়ুন •ামরান হিণ্ডাল বহলুল বাইরাম রুমিখ। আবদার নিজাম মদেব ছদ্মবেশী সােফিয়া। মােগল সম্রাট। হুমায়ুনের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা। ••• ঐ ••• ঐ মন্ত্রী। ••• ০০০ ঐ সেনাপতি। ঐ গােলন্দাজ। মিখার ক্রীতদাস। ভিত্তি। যােধপুর-রাণ। ঐ সেনাপতি। কালেঞ্জয় দুর্গাধিপতি। ••• কির্ভিসিংহ ••• ও এ গদ সােফিয়। দিলদার বেগা বেগম ••• শেরশার কন্যা। পাঠান সম্রাট ইব্রাহিম লােভির কন্যা হুমায়ুনের বিমাতা। হুমায়ুনের স্ত্রী। মদেবের কন্যা। ০ ০ ০
মােগল-পাঠান।
প্রথম অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
চুণার দুর্গ।
শেরখ ও তাহার কন্যা দ ।
চাদ। হাঁ বাবা! তােমার কি একটু সবুর সইল না।
শের। কি করব মা! সারাদিন পরিশ্রমের পর ক্ষুধায় পেট জলে
উঠেছে, তার উপর সম্মুখে পৰ্যাপ্ত আহার প্রস্তুত-তখন কি আর সুর
সয়—অগত্যা কোষ থেকে তলোয়ারখানা বের করে তারাই আহার
শেষ কবুলুম !
চাদ। বাবা! তুমি মােগলসম্রাট বাবরসার একজন সেনাপতি
ছিলে—তুমি বার বার একখানা ছুরি চাইলে, কেউ তা দিলে না !
শের। আমি একজন সামান্য সৈনিকের কাৰ্য ক’বৃতুম মা! তাই
বােধ হয় কেউ গ্রাহ ক’বলে না।
চাদ। আচ্ছা বাবা! তুমি যখন তােমার সেই তিনহাত লম্বা
তলােয়ারখানা দিয়ে এক এক টুকরাে মাংস কেটে মুখে দিতে লাগলে
তখন বােধ হয় তােমার সঙ্গে আর যাঁরা আহারে বসেছিলেন, তাঁর
তােমার মুখপানে হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন ?
প্রথম অঞ্চ ] মােগল-পাঠান [ প্রথম দৃশ্য চাই। শের। হাঁ মা ! আমি যখন শেষ করলুম, তারা তখন হাঁফ ছেড়ে আরম্ভ করলে। একথা বাবরসার কানে উঠল আর তুমি বুঝি পালিয়ে এলে ? শের। হাঁ মা ! সেই দিন থেকে বাবরসা যেন কেমন হয়ে গেলেন, আর আমার উপর লক্ষ্য রাখতে তাঁর সমস্ত কর্মচারীদের সতর্ক করে দিলেন। দ। বাবরসা লােক চিনেছিলেন ঠিক। বাবা ! আমার সেই ফকিরের কথা বিশ্বাস হচ্ছে—তুমি হিন্দুস্থানের সম্রাট হবে। শের। ফকিরের কথা । -না মা ! বলত আর একবার শুনি দেখি প্রাণে সাহস পাই কিনা । দ। সেদিন এই ফকিরের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল বাবা ! আমি তাকে এই চুণার দুর্গে প্রবেশের স্বাধীনতা দিয়েছি। শের। আমাকে জিজ্ঞাসা করুলে না মা ! না, বেশ করেছ এখন বলত মা ! সেই ফকির কি বলেছিলো? চাদ। বাবা! তুমি যখন চার বৎসরের শিশু-তখন একদিন একটা পয়সার জন্য বড় বায়না ধরেছিলে—ঘটনাক্রমে, এই ফকির সেই স্থলে উপস্থিত হন; শুনেছি তোমার মুখপানে তাকিয়ে সেই মহাপুরুষ বললেন “আহা, যিনি একদিন হিন্দুস্থানের সম্রাট হবেন—তিনি আজ কিনা একটা পয়সার জন্য লালায়িত”। এই কথা বলেই ফকির কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন! শের। মা মা ! সহস্রবার একথা শুনেছি-সহস্রবার আমার এই ক্ষুদ্র বক্ষ দ্বিগুণ উৎসাহে ফুলে উঠেছে--আমার উষর মস্তিষ্ক বিরাট প্রতিভায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে! কিন্তু মা ! হিন্দুস্থানের মসনদ- একণ্ঠ পথিকের সম্মুখ থেকে মৃগতৃষ্ণিকার মত দূরে—আরও দূরে চলে যাচ্ছে। ফকিরের ভবিষ্যৎবাণী ! অসম্ভব-না, মা,আমার বােধ হয়, ফকিরের কোন গুঢ় স্বার্থ ছিল। ] প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ প্রথম পৃষ্ঠ (ফকিরের প্রবেশ)। ফকির। ঠিক বলেছ। কিন্তু এ স্বার্থ শুধু তােমাতে আমাতে পর্যবসিত নয়—এ স্বার্থ দেশের কল্যাণে, জাতির কল্যাণে উজ্জীবিত। শের! অবিচারে অত্যাচারে দেশ ভরে গিয়েছে—রাজ্যের রক্ষক শত শত পল্লীর উৎসাদন করে, প্রমােদ কুঞ্জের প্রতিষ্ঠা করছে দেশের পুষ্টি সরল কৃষকের রক্তে বিলাস কক্ষ ধৌত ক’বৃছে। শের ! শের। দেশের দুর্গম পথ অলস ভুজঙ্গের মত কুটিল বক্ৰতায় পড়ে আছে—পথিক পথে পা দিচ্ছে—দস্য তাহার আহাৰ্য্য পৰ্যন্ত কেড়ে নিয়ে তাকে সর্বস্বান্ত করে দিচ্ছে—ক্ষুধা তৃষ্ণা তাকে অসাড় করে দিচ্ছে হিংস্ৰজন্তু তার অবশিষ্ট হাড় কখানা পৰ্যন্ত উদরসাং করে ফেলছে !—অগ্রসর হও শের ! বাবরসা তােমার জন্য হিন্দুস্থানে সিংহাসন পেতে রেখে গেছেন বিজয়লক্ষ্মী তােমর শিরে বিজয়-মুকুট পরিয়ে দিতে ব্যাকুল আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। অপরাধ হয়েছে-শত্রুর দুলঘ্য গিরিদুর্গ দেখে, তাদের বিজয়-দন্ত শুনে আমার ক্ষুদ্র প্রাণ ভয়ে, সন্দেহে, আন্দোলিত হয়ে উঠেছিল ; আপনার আশীর্বাদে নবীন উৎসাহে ধমনীর রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে। শপথ ক’রছি—একদিকে শেরখার জীবন—অন্য দিকে হিন্দুস্থানের সিংহাসন। ফকির। শুনে সন্তুষ্ট হলেম—শের ! অন্ধকারে দেশ ভরে গেছে, দেশের মুখ উজ্জ্বল কর। পাঠানের নাম লােপ হয় শের! পাঠানকে রক্ষা কর। খােদা তােমাকে রক্ষা করবেন। [ফকিরের প্রস্থান। ঈদ। বাবা! শুনেছি এই ফকিরের বয়স একশত বৎসরের উপর ; কিন্তু কণ্ঠস্বর এখনও কি স্থির, গম্ভীরদেহ কি দৃঢ় ! শের। ভােগবিলাসত্যাগী মহাপুরুষ নিজেকে প্রকৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন মা ! (নেপথ্যে তােপধ্বনি) একি! তােপধ্বনি কেন?—আবার—আবার ! ;
প্রথম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ প্রথম দৃশ্য
?
(জালালের প্রবেশ)
জালাল। পিতা! সম্রাট হুমায়ুন আমাদের দুর্গে দূত প্রেরণ করে
একশত তােপধ্বনি করতে আদেশ দিয়েছেন—এইটুকু সময়ের মধ্যে
আপনার অভিপ্রায় সম্রাটকে জানাতে হবে—যদি যুদ্ধ করেন—উত্তম
যদি সন্ধি অভিপ্রায় হয়, তাহলে পাঁচশত অশ্বারােহীর সহিত আপনার
যে কোন একটি পুত্রকে প্রতিভূ স্বরূপ তাঁর কাছে প্রেরণ করতে হবে।
দূত অশ্বপৃষ্ঠে দুর্গদ্বারে অপেক্ষা করছে।
শের। জালাল ! সম্রাট বাহাদুরসাকে দমন করতে চিতাের উদ্দেশে
যাত্রা করেছিলেন না ?
জালাল। হাঁ পিতা! পথে আমাদের এই দুর্গ গ্রহণের সংবাদ পেয়ে
আপাততঃ আমাদের বিরুদ্ধে এসেছেন।
শের। যদি কোন উত্তর না দিই
জালাল। অশ্বপৃষ্ঠে দূত হুমায়ুনের কাছে ফিরে যাবে।
আর যদি বন্দী করি?
জালাল। তাহলে শেষ তােপধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে সসৈন্যে হুমায়ুন দুর্গ
অবরােধ করবেন।
শের। তাহলে জালাল ! আমি যে বড় নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে আছি।
জালাল। পিতা যুদ্ধ করুন।
চাঁদ। হাঁ বাবা ! যুদ্ধ কর।
শের। তাইত ! কিছু ঠিক করতে পারছিনা ! জালাল ! চিন্তা কর ।
জালাল। যুদ্ধ করুন।
চাঁদ। যুদ্ধ কর। হুমায়ুনের চতুর্দিকে শক, অবশ্যম্ভাবী পরাজয়।
শের। না মা ! তুমি বুঝতে পারছনা—হুমায়ুনের বল এখন আম।
অপেক্ষা অনেক অধিক, আমি সন্ধি করব—কিন্তু পিতা হয়ে পুত্রকে
শক্রর হাতে সমর্পণ ক’ব কি করে? জীবন্ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবাে
انا
প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ প্রথম দৃশ্য কোন্ প্রাণে-না—যুদ্ধই অবধারিত—কিন্তু জালাল ! এ যুদ্ধে আমাদের ধ্বংস অনিবাৰ্য্য। উপায় নাই—কে যাবে-কাকে ব’লবন। পারবনা। জালাল ! যুদ্ধ করব-হােক পরাজয়। জালাল। তবে কাজ নাই এ যুদ্ধে পিতা। শের। সন্ধি ! না কিছুতেই না—অসম্ভব। জালাল। অসম্ভব নয়—আদেশ করুন, পাঁচশত অশ্বারােহীর সহিত সম্রাট হুমায়ুনের করে আত্মসমর্পণ করি। শের। জালাল ! জালাল ! আমার সমস্ত শক্তি অপহৃত হবে-শত্রুর বিরুদ্ধে একপদ অগ্রসর হব আমি-“আর শত্রু তােমার শিরে খগাঘাত ক’বুবে ! পুত্রের নিধন ! উঃ-না জালাল ! এ হতে পারে না। জালাল । আপনার মত বীরপুরুষের এরূপ চিত্তচাঞ্চল্য শশাভা পায় না। আমি শত্রু-শিবিরে গমন করি—আপনি স্থিরচিত্তে চিন্তা করে, আপনার সমস্ত শক্তি সংগ্রহ করে, শত্রুর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। চিরজীবনের আশা সফল করুন পিতা। শের। চিরজীবনের আশা। ধিক্ আমায়। জালাল ! পুত্রের পিতা হও—তবে বুঝতে পারবে পুত্র-বাৎসল্য ও রাজ্যলিপ্সায় কত প্রভেদ ! জালাল। রাজ্যলিপ্সা নয় পিতা। পৃথিবীতে ধৰ্ম্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠা নশ্বর জগতে এক অবিনশ্বর কীর্তির সৃষ্টি। পিতা! অধর্মের প্রলয় বিষাণ বেজে উঠেছে—এই গভীর নির্ঘোষ স্তব্ধ করে ধৰ্ম্মের ভেরী আপনাকে বাজাতে হবে। পুত্রকন্যার কথা ভুলে যান পিতা! তাদের হয়ত উত্তপ্ত মরুর বক্ষে জন্মের মত পরিত্যাগ করে যেতে হবে কিম্বা তাদেরই কঙ্কালের . উপর সিংহাসন বিস্তৃত করতে হবে। পিতা! অগ্রসর হন—সংসারে পুত্র কন্যা কেউ নয়, সম্মুখে বিরাট কৰ্তব্য আপনাকে আহ্বান করছেবাহন্তে তরবারি ধরে অগ্রসর হন শের। জালাল । জালাল ! জালাল ! একটা বিরাট গরিমায় আমার সমস্ত [ দ্বিতীয় দৃশ্য প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান প্রাণ আপ্লুত হয়ে উঠেছে। তবে এস বৎস—তুমি শত্রু-শিবিরে এস আর আমি নিভৃতে শক্তি সঞ্চয় করি। তারপর জালাল ! আমার শত্রুর বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে হবে। কিন্তু, না—আমি হৃদয় কঠিন করেছি, পারব। জালাল ! তুমি তবে এস। জালাল। আশীর্বাদ করুন, যেন বিজয়-দন্তে ফিরে আসতে পারি। শের। খোদা! তুমিই রক্ষাকর্তা। [ উভয়ের প্রস্থান। দ্বিতীয় দৃশ্য। চুণার দুর্গের অপর পার্শ্ব । ( রহিম ও শেরখর জ্যেষ্ঠ পুত্র আদিলের প্রবেশ) আদিল । থেমােনা রহিম ! গাও-এ সংসার অসার-জন্ম বন্ধন, পরমায়ু যন্ত্রণা, সুখ স্বপ্নকুহক, মৃত্যু শান্তি ! গাও রহিম ! তােমার মধুর কণ্ঠে সপ্তসুর উখিত করে দিগন্ত প্লাবিত করে খােদার নাম গাও। দুনিয়া তার হিংসাদৃপ্ত কুটিল কটাক্ষ ভুলে গিয়ে নিমীলিত নেত্রে খােদার নাম রহিম। আমি ত এ গানের নুতন মৰ্ম্ম কিছু বুঝতে পারলুম না। গানটি গাইতে বড় ভাল লাগে, তাই গাই। এমন হয়ে যাবেন বুঝলে কি আর এ গান মুখে আনি। আদিল। দুঃখ করােনা রহিম ! হৃদয়ের নিভৃত কক্ষে এ আলােক অনেক দিন জ্বলেছে। তােমার মধুর সঙ্গীতে সে আলােক আজ একটু উদ্ভাসিত হ’ল মাত্র। গাও রহিম ! তােমার মধুর কণ্ঠে খােদার মহিমা গাও। চল রহিম ! এ দুর্গ অতিক্রম করে, এ কোলাহলময়ী নগরী পরিত্যাগ করে নির্জনে খােদার নাম করিগে চল। রহিম ! আঁধার পথে আলােক দেখাতে তুমি অশক্ষক বেশে আমার পিতার আশ্রয় নিয়েছে—তিনি ] প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বিতীয় দৃশ্য এখন হিন্দুস্থানের সিংহাসনের জন্য উন্মাদ—চিনতে পারেননি কিন্তু আমি পেরেছি—তুমি সামান্য বালক নও—তুমি খােদার রাজ্য হ'তে এসেছ । রহিম। আচ্ছা শুনেছি—আপনার পিতা এক কোপে একটা বা কেটে ফেলেছিলেন ! আদিল। ভুলাচ্ছ রহিম ? রহিম। না না ভুলাইনি—আমার বড় কৌতুহল হয়েছে। আগে আপনি বলুন, তারপর সুন্দর করে একখানি গান গাইব। আদিল। রহিম! পিতা একদিন সুলতান মামুদের সঙ্গে শীকারে বেরিয়েছিলেন একটা দুর্দান্ত ব্যাঘ্র সুলতানকে লক্ষ্য করে লম্ফ প্রদান করে, কিন্তু পিতা চক্ষের নিমিষে কোষ হতে তরবারি বহির্গত ক'রে এক আঘাতে সেই ব্যাকে দুখণ্ডে বিভক্ত করেন। আমার পিতার নাম ছিল ফরিদ—সেই দিন হ’তে সুলতান নাম দিলেন শের। রহিম। সুলতান মামুদ তাহলে খুব মুক্তহস্ত ত। অমনি ঝনাৎ করে অত বড় একটা উপাধি সেইখানে দাড়িয়েই দিয়ে ফেলেন! আচ্ছা আপনি কেন এই রকম একটা আদিল। যথেষ্ট হয়েছেন আমি চলুম। রহিম। না না, পড়ান অনিহিঁ- - .. জনম অবধি, আমি, তােরে না কিন্তু স্বামি দিন গুলো মিছে গেল কেটে। আমার যা কিছু ছিল কি জানি কোথায় গেল হিংসা বুঝি সব নিল লুটে। তোমায় ডাকিব বলে আসিমু মায়ের কোলে কুহকেতে গেল সব ছুটে। কর্ণ দাও রুদ্ধ করে কর প্রভু! মােরে চরণেতে পড়ি আমি লুটে।
প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বিতীয় দৃশ্য (শেরখার প্রবেশ) শের। অজ্ঞাতকুলশীল বালক ! এই মুহূর্তে দুর্গ হ'তে নিক্রান্ত হও। রহিম। দুর্গাধিপতি! অপরাধ আমার ? কের। অপরাধ! তােমার ব্যাকুল আগ্রহে আমি তােমাকে অশ্ব- রক্ষার ভার দিয়েছিলুম কিন্তু তুমি নিতান্ত অপদার্থ। কোথায়ু বীরকার্যে তুমি আমার পুত্রের সহায় হবে, না, T পেয়ে তার মস্তিষ্ক বিকৃত করে দিচ্ছ। বালক ! এ উদাসীনের গৃহ নয়—এ ফকিরের আন্তান নয়। যাও—এখনই এ স্থান পরিত্যাগ কর। রহিম। দুর্গাধিপ!“বুঝেছি, আপনার মনােমত হয় নাই বুঝি এর সময় এখনও আসে নাই। খোদা না করুন—যখন শত্রু হতে পরাজিত হয়ে দুর্গম অরণ্যে, দুরারোহ গিরিগুহায় আশ্রয় নেবেন—বােধ হয় তখন সে সময় উপস্থিত হবে। শের। উত্তম-ইচ্ছা হয়, অরণ্যে গিরিগুহায় সেই সময়ের অপেক্ষা করগে। যাও রহিম। বেশ তবে বিদায় হই । [ সেলাম করিয়া প্রস্থান। আদিল। পিতা! আমায়ও বিদায় দিন। সেস! শের। আদিল ! তুমি আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র—ভবিষ্যৎ উন্নতির সহায়- তােমার কনিষ্ঠদের আদর্শ ; তােমার এরূপ নিশ্চেষ্টতা শােভা পায় না--- আদিল ! অস্ত্র ধর, সহায় হও। আদিল। আমার ও সব মাথায় আসে না—কিছু ভাল লাগে না। শের। সুবোধ পুত্র আমার ! চেষ্টা কর, ভাল লাগবে। আদিল ! পিপাসার্তকে জল দাও—ক্ষুধার্তকে আহার দাও—আর্তকে রক্ষা কর। শুনতে পাচ্ছনা আদিল ! অত্যাচারী রাজার উৎপীড়নে প্রজার আর্তনাদ। দেখতে পাচ্ছনা আদিল ! বিলাসী রাজার সৃষ্টি দুর্ভিক্ষ, মড়ক, হাহাকার ।
প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বিতীয় পৃ খোদার সৃষ্টিকে দলিত করে দিচ্ছে। আদিল--কৰ্ম্ম কর—ধর্ম এসে নিজে তােমাকে আলিঙ্গন করবে। আদিল। পিতা ! শের। অবাধ্য হ’য়ােনা আদিল ! আমি পিতা-আজ্ঞা ক’ছি পালন কর-নতুবা অধৰ্ম্ম হবে। আদিল । অপরাধ হয়েছে মার্জনা করুন। [প্রস্থান। শের। যাও আদিল—তুমি আমার সুবােধ পুত্র। এত বীতানুরাগ। কিন্তু এ বালকটি কোন শত্রুপক্ষীয় নয় ত! ( নেপথ্যে জমােল্লাস এ কি! এ জয়ধ্বনি কেন । ( জালালের প্রবেশ ) জালাল। পিতা! আমি ফিরে এসেছি। শের। এসেছ! আশা করিনি, যুদ্ধ করে তাদের পরাজিত করেছ ? জালাল। না পিতা ! ফকিরের আজ্ঞা লঙ্ঘন ক’বুতে পারলুম না। আমি পালিয়ে এসেছি। শের। ফকিরের আজ্ঞায় শঠতা করেছ ? (ফকিরের প্রবেশ) ফকির। শঠের সঙ্গে শঠতা অবশ্য কর্তব্য শের! জগতে অধার্শ্বিক বড় প্রবল—যত শীঘ্র পার—ছলে বলে কৌশলে তাদের ধ্বংস করে পীড়িতের পরিত্রাণ কর যদি না পার—তাহলে তােমার মত সহস্র বীরের প্রয়ােজন হবে একজন অধার্শিককে দমন করতে। এখন ইচ্ছা হয়—স্থির চিত্তে আমার উপদেশ গ্রহণ কর। শের। প্রভু আজ্ঞা করুন। ফকির। শুন শের! শুন শের! হুমায়ুন বাহাদুরসাকে পরাস্ত করে আগ্রায় ফিরে গেছে। বিজয়গৰ্ব্বে-স্ফীত মােগল সম্রাট এখন বিলাসে ময়। চতুর্দিক অতর্কিত পড়ে আছে। এই সুবর্ণ সুযােগে তুমি তােমার সমস্ত সৈন্য নিয়ে
প্রথম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ তৃতীয় দৃশ্য
বিহার পদানত করে বঙ্গদেশ আক্রমণ কর--গৌড়ের অকর্মণ্য রাজা
মামুদসা পুরবিকে হত্যা করে গৌড়ের সিংহাসন অধিকার কর। এই মুহূর্তে
অগ্রসর হও শের ! না পার—গঙ্গার জলে আত্মহত্যা করে পৃথিবীর ভার
লাঘব কর।
[ প্রস্থান
শের। জালাল ! বিশ্রামের সময় পেলে না, এই মুহূর্তে অগ্রসর হও।
তৃতীয় দৃশ্য।
আগ্রা-প্রাসাদ-কক্ষ।
মােগল সম্রাট হুমায়ুন, মন্ত্রী সেখ বহলুল, গােলন্দাজ রুমিখা।
বন্দীগণ কর্তৃক স্তুতিগান ।
জয় জয় প্রভু! জয় হে মহান !
তােমারি হাসি প্রকৃতি হাসে
তােমারি কিরণে ধরণী ভাসে
গাহিছে দুনিয়া তব যশ গান ।
বিজলী ঝলসে, অনন্ত আকাশে
তােমারি নয়নে ভ্রুকুটি প্রকাশে
বারি বরষে, পরম হরষে
সমীর দুলিছে গাহি তব গান।
(বাইরামের প্রবেশ )
বাইরাম। সম্রাট। শেরখা বঙ্গদেশ জয় করে গৌড়ের সিংহাসন
অধিকার করেছে।
হুমায়ুন। এ কি সম্ভব সেখজি ।
বহু অইত, অনেক সময়ৰ কথা শট।
প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান তৃতীয় দৃশ্য বাইরাম। শুধু তাই নয়—শেরখ। সমস্ত বিহার দখল করে ফেলেছে। হুমায়ুন। এতটুকু সময়ের মধ্যে শেরখ। এতগুলো কাজ করে ফেলেছে ! কি ব’ছ বাইরাম ? বাইরাম। সম্রাট ! গৌড়াধিপতি মামুদ অতি কষ্টে পলায়ন করে শেরখার হস্ত হতে পরিত্রাণ পেয়েছে। হুমায়ুন। সামান্য পাঠানের এত স্পর্ধা হয়েছে ! রুমিখা। রুমিখা। সম্রাট ! ( অভিবাদন ) হুমায়ুন। তুমি একজন প্রকৃত গােলন্দাজবীর। তােমারই রণপাণ্ডিত্য একদিন দুর্ধর্ষ রাজপুতকে স্তব্ধ করে চিতোর দুর্গে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল । তােমারই প্রতাপে গুজ্জর-ভূপতি বাহাদুরসা অসংখ্য লৌহকঠিন রাজপুতের রক্তে তাঁর প্রতিহিংসাবহ্নি নিৰ্বাপিত করেছিলেন। রুমিখাঁ ! তুমিই একদিন আগ্নেয়গিরর মত মুহুর্মুহু অগ্ন,গারে আমার বিশাল বাহিনীকে ভস্ম করেছিলে। রুমিখ। রুমিখ যত বড়ই বীর হ’কন, সাহানসার দোর্দণ্ড প্রতাপের কাছে তার শির নত হয়ে গেছে। হুমায়ুন। বিশ্বাসঘাতক পাঠানকে শাস্তি দিতে হবে, চুনার দুর্গ হতে শেরখার প্রতিপত্তি সর্বাগ্রে লােপ করতে হবে কিন্তু দুর্গ বড় দৃঢ় গােলন্দাজবীর! চিন্তা কর, যে কোন উপায়ে দুর্গ অধিকার করতে হবে। রুমি। রুমিখার গােলাগুলােও বড় স্থির-বড় দৃঢ়। কিন্তু সম্রাট কৌশলে দুর্গ জয় যদি সহজ সিদ্ধ হয়—তাহলে সাহানসার বােধ হয় আপত্তি হবে না। হুমায়ুন। বাইরাম, মন্দ কি! বাইরাম। কৌশলে যদি জয়লাভ হয়, তবে উভয়ত মঙ্গল। প্রথমত উভয় পক্ষের প্রাণিহত্যা কম হয় ; দ্বিতীয়তঃ শত্রুর সংঘর্ষে দুর্বল হ'তে হয় না। [ ১১
প্রথম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ তৃতীয় দৃশ্য
হুমায়ুন। কি কৌশল কমিখ ।
রুমি। অনুমতি করুন, জাহাপনার সম্মুখে এ কৌশলের অবতারণা
করি।
হুমায়ুন। গােলন্দাজবীর! চুনার দুর্গ জয়ের ভার তােমায় আমি
অর্পণ
কম। যে কোন উপায় অবলম্বন কর। [রুমিখার প্রস্থান
বাইরাম ! তুমি আমার সেনাপতি নও তুমি আমার বন্ধু রুমিখার উপর
অতিরিক্ত বিশ্বাস স্থাপন করে কিছু অন্যায় করেছি?
বাইরাম। সম্রাট ! রুমি কিছু অহঙ্কারী, কিছু উদ্ধত, তবে আমার
দৃঢ় বিশ্বাস—সে যতদিন জাহাপনার অনুগ্রহলাভে সমর্থ হবে—তত দিন
প্রাণ দিয়ে পরিশ্রম করবে।
(রুমির ক্রীতদাস আবদারকে লইয়া রুমিখার বেত্র হন্তে প্রবেশ)
কমি। আবদার! আমি তােমার কে?
আবার। আপনি আমার প্রভু।
কমি। সম্মুখে যে ভুবনবিজয়ী সম্রাটকে দেখতে পাচ্ছ-উনি তােমার
আবদার। আমার প্রভুর প্রভু। ( অভিবাদন) ওঁর সেবায় আমি
প্রাণ দিতে প্রস্তুত।
রুমি। তবে চক্ষু বুজে স্থির হয়ে দাড়াও। (রুমিখর বেত্রাঘাত)
হুমায়ুন। কমিখাঁ ! কবৃছ কি—উন্মাদ তুমি—ক্ষান্ত হও—এ কৌশল
ত্যাগ কর—তােমার বীরত্বই যথেষ্ট হবে।
রুমি। সম্রাট : এ আঘাত গুলাে গােলার আঘাত অপেক্ষা কোমল ;
নিরস্ত হলুম। আমার কাৰ্য শেষ হয়েছে। আবদার ! তােমার বিবর্ণ
মুখ দেখে সম্রাট কাতর। তঁাকে তােমার হাসিমুখ দেখিয়ে সানা দাও।
আবদার। (সহান্তে) সম্রাট । গােলাম আজ বড় ভাগ্যবান
আপনি স্থির হন।
২২ ]
প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ তৃতীয় দৃশ্য হুমায়ুন। বাইরাম! একি! রুমি। আবদার ! এখনি চুনার রওনা হবেত? দুর্গদ্বারে উপনীত হয়ে কি করবে ? আবদার। চীৎকার করে কঁদতে কাঁদতে দুর্গ রক্ষককে আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দেখিয়ে বলব-রুমিখাঁ নামে একজন অত্যাচারী গােলন্দাজ মােগল সম্রাটের অধীনে কৰ্ম্ম করে। আমি তার সহকারী ছিলুম। সেই হিংসুক রুমিখা আমার সুখ্যাতি শুনে বিনা কারণে বেত্রাঘাত করে আমাকে দূর করে দিয়েছে। রুমি। বেশ তার পর? আবদার। আমি অরক্ষিত দুর্গ সুরক্ষিত করতে জানিগােলন্দাজ সৈন্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারি—যদি একটা কৰ্ম পাই—দুর্গ সুরক্ষিত করে দেব—গােলন্দাজদের শিক্ষা দেবতাদের নেতা হয়ে মােগল সম্রাট আর রুমির বিপক্ষে যুদ্ধ করব। রুমি । মনে কর—সাদরে দুর্গে তুমি গৃহীত হলে । আবদার। বেশ করে অরক্ষিত স্থানগুলি দেখে নিয়ে, যত ন পারি পলায়ন করব—আর আমার প্রভুর তােপধ্বনি সহসা দুর্গের ভিতর প্রতি ধ্বনিত হয়ে আমার পলায়ন বার্তা জ্ঞাপন করে দেবে। রুমি। চমৎকার ! তবে এখনি যাত্রা কর-সম্রাটের আজ্ঞা। হুমায়ুন। রুমিখ! তােমার কাৰ্য্য তুমি কর, কিন্তু শপথ কর-কাৰ্য্য শেষ হলে এই গােলামকে আমায় বিক্রয় করবে। রুমি। রুমিখ জাহাপনার গােলাম। বান্দার গােস্তাকি মাপ হয়, গােলাম ল’য়ে কি করবেন ? হুমায়ুন। পরে জানবে। [ প্রস্থান রুমি। আবদার! যথার্থ তুমি ভাগ্যবান—যাও তােমার কাৰ্য কর । [রুমিখা ও আবারের প্রস্থান। [ ১৩.
প্রথম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান।
[ চতুর্থ দৃশ্য
বাইরাম। রুমি যেমন বীর, তেমনি কৌশলী কিন্তু বড় অহঙ্কারী—
বড় উদ্ধত-বড় অসভ্য !
[প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য।
গৌড়।
শেখর ভ্রাতুষ্প মুবারিজ।
মুবারিজ । অন্ধকার ! আহাহা ! কি সুন্দর তুমি! আসমান থেকে
তাড়াতাড়ি নেমে এসে দুনিয়ার বুকে জমাট হয়ে যাও—তােমার হাসিতে
আমার মত নিষ্কলঙ্ক প্রতিভা গুলাে এক সঙ্গে সব ফুটে উঠুক। আর
বেরসিক খােদা ! তুমি কিনা এই অতি শান্ত সুস্থ শুভক্ষণটাকে মােটে
অর্ধেক সময় দিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিলে । আহাহা ! এমন পৃথিবী আর
(গদের প্রবেশ )
ঈদ। কেমন পৃথিবী মুবারিজ ।
মুরিজ। কে—চাঁদ ! আহাহা, তােমার মত গম্ভীর, তােমার মত
অপ্রেমিক নয় দ—কিন্তু একখানা ফুটন্ত দের মত ফুটে থেকে ফুর্তির
জোছনা ঢেলে দিচ্ছে।
চঁদ। তার চেয়ে বল না, একটা প্রশস্ত জোৎস্না মােড়া ফুর্তির পথ
পড়ে আছে আর পৃথিবীটা তােমাদের মত রসিক পুরুষের করম্পর্শে সুবর্ণ
গােলকের মত সেই পথের উপর দিয়ে গড়াতে গড়া'তে চলেছে।
মুরিজ। আহাহা ! চাঁদ তুমি কবি-না দেখে—না অনুভব করেই
বর্ণনা করে ফেলে।
চাঁদ। মুবারিজ ! ভেবে দেখ দেখি কি ছিলে তুমি !
মূরিজ। কেন? কিছু উলট পালট হয়েছে নাকি! না চাঁদ।
১৪ ]
প্রথম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ চতুর্থ দৃঙ্গ
আমি স্ফুৰ্তিরাজ্যের নিরীহ প্রজা, আমার মৌরসীপাট্টা কেউ কেড়ে নিতে
পারবেনা।
চঁদ। আমি কেড়ে নেব। তােমাকে এমন করে ডুবতে দেন।
এই বিরাট সংসারসমরাঙ্গনে বীর বেশে তােমাকে দাঁড়াতে হবে।
মুবারিজ। আহাহা ! অনুরাগ, অনুরাগ! চাদ ! প্রেমে পড়নিত ?
দোহাই তােমার-আজকার রজনীটা মাপ কর, আজ আর চাঁদ উঠবে না
চঁদ ! বড় জমকাল অন্ধকার! চাঁদের আলােয় মজে ভাল, কিন্তু বড় গা ছম
ছ করে। (প্রস্থানােদ্যোগ কিন্তু ফিরিয়া) দুঃখ ক’রনা চাদ ! তুমি বীর
বেশ গুছিয়ে রাখ, আমি ভােরে এসে পরে ফেলবাে। | প্রস্থান।
চাঁদ। মুবারিজ! সত্যই আমি প্রেমে পড়েছি। মন্দ কি, তুমি
শেরখার ভ্রাতুস্পুত্র, আমি শেরখার কন্যা। কিন্তু তােমার এই পশুমৃত্তি
কখনও স্পর্শ ক’বনা। মনের মত করে তোমাকে গড়ে নেব।
গীত।
ভাল যদি বাস কেহ মুখে বলো না।
নীরবে জানায় প্রেম কথা কয়াে না।
নীরব নয়ন কোণে নীরব চাহনীটী ।
মধুর অধরে ওগাে নীরব সে হাসিটী
অখিতে নীরব ভাষা নীরব নবীন আশা
হৃদয় দুয়ারে শুধু যাবে গাে জানা
নীরবে জানায়ো ওগাে নীরব প্রাণের ব্যথা
নীরবে গাহিতে সুখে মিলন বিরহ গাথা।
নীরবে যেন গাে হয়, প্রাণে প্রাণে বিনিময়।
নীরবে রাখিও মনে যেন ভুলাে না ।
(শেখার প্রবেশ )
শের। বিষখ মনে কি ভাবছ মা !
চাদ। একটা বিদ্রোহের কথা বাবা
প্রথম অক] মােগল-পাঠান [চতুর্থ দৃশ্য শের। বিদ্রোহ। আবার কোথা বিদ্রোহ মা! গদ। তােমার অন্তঃপুরে বাবা ! তােমার বংশমর্যাদার শিরে পদাঘাত করেছে। শের। কি বলছ, কিছু বুঝতে পাছি না যে মা ! চঁাদ। বাবা ! যুদ্ধ কর, জয় কর, সম্রাট হও—কিন্তু অবহেলায় তােমার যা আছে তা নষ্ট হতে দিওনা -মুরিজকে জাহান্নমের পথে নেমে যেতে দিও না-তাকে শাসন কর। শের। ঠিক বলেছ, দেখেও দেখিনি, অবসর পাইনি, ভুল করেছি। দ। বল বাবা ! আজ হ'তে তাকে শাসন করবে—তাকে মানুষ করে দেবে। শের। চেষ্টা ক’বকৃতকাৰ্য্য হব কিনা, তা জানি না। চঁদ। তােমার মুখে এমন কথা কেন বাবা? শের। একটা রাজ্য জয়ের চেয়ে একটা চরিত্র জয় যে শক্ত মা ! চাঁদ। তা হ’ক—তবু তুমি বল চেষ্টা ক’ববে—তাকে ভাল কথা বলে বুঝবেনা শুনে, ভয় দেখাবে—তাতেও যদি না হয়—উৎপীড়নে তাকে ব্যতিব্যস্ত করবে। শের। প্রতিশ্রত হলুম চঁদ। বুঝতে পারছ না বাবা ! মুবারিজকে যদি মানুষ করতে পার তাহলে সে যে তােমার মস্ত বড় একটা সহায় হবে। (ফকিরের প্রবেশ) সে যদি সহায় না হয়, কিছু ক্ষতি হবে না শের! কিন্তু বৃথা যুক্তি তর্কে অমূল্য সময় নষ্ট করে যদি তুমি তােমার কর্মের অবহেলা কর, —তাহলে জগতের ক্ষতি হবে। শের। আয় করুন প্রভু! ফকির। তবে শুন শের! বিংশ সহস্র সৈন্য নিয়ে হুমায়ুন স্বয়ং ১৬ ] মা ! ফকির।
প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ পঞ্চম দৃশ্য তােমার চুনার অধিকারে অগ্রসর হয়েছে। পঞ্চাশ সহ মােগল সৈন্য তােমাকে বাংলা হতে বিতাড়িত করতে ছুটে আসছে। শের। উপায় প্রভু। মােটে বিশ সহস্র সৈন্য যে আমার সহায় ! ফকির। এ অরক্ষিত স্থানে মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে তুমি জয়ী হ’তে ত পারবে না, পরিবারবর্গ নিয়ে বিপদে পড়বে। এক কাজ তােমার পরিবারবর্গের ভার আমায় দাও—আর তুমি এই মুহূর্তে কোথায় নিরাপদ স্থান আছে অনুসন্ধান কর—জঙ্গল হয়, পাহাড় হয়, কিছু ক্ষতি হবে না। আর জালালকে এই বিশ সহস্র সৈন্য নিয়ে পঞ্চাশ হাজার মােগলের বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে বল। সে যেন সম্মুখ যুদ্ধ একে- বারে না দেয়—পাহাড়ে জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে, শুধু অতর্কিতভাবে আক্রমণ করবে আর শক্তহস্তে বিপর্যস্ত হবার পূর্বেই পলায়ন করবে। যতদিন তােমার পরিবারবর্গকে নিরাপদ স্থানে না রাখতে পার ততদিন আর কিছু করতে বলবো না। এমনি ক'রে শুধু হুমায়ুনকে বাধা দিতে হবে। ভীত হ’য়ােনা শের ! চুনার যদি তােমার হস্তচ্যুত হয়—হােক— এই বিশ সহস্র সৈন্য যদি ধ্বংস হয়ে যায়—যাক-তথাপি ভীত হ’য়ােনা—মূতন করে সৈন্য সৃষ্টি করে আবার অগ্রসর হতে হবে- এস—চলে এস- [ প্রস্থান শের। খােদা আমার সহায়—কিসের ভয়। [ প্রস্থান। পঞ্চম দৃশ্য চুনার দুর্গ । শেরখার পুত্র আদিল ও সৈনিক গাজিখা শূর আদিল। গাজিখা! এরা যে মােগল সৈ বিষয়ে সন্দেহ নাই। গাজি। মােগল ভিন্ন এত ফৌজ কার ? [ ১৭
প্রথম অঙ্ক ]
মোগল-পাঠান
[ পঞ্চম দৃশ্য
আদিল । কত ফৌজ—আন্দাজ ?
গাজি। বিস্তরবিশ হাজারের কম হবে না। তঁবুই পড়েছে
হাজার খানেক।
আদিল। এত নিকটে! আচ্ছা—গতিবিধি কি রকম দেখলে ?
গাজি। স্থির—যেন কান পেতে কার অপেক্ষা করছে।
আদিল। গাজিখ! আবদারকে সেলাম দাও। [ গাজিখার প্রস্থান।
মােগলের লক্ষ্য এই চুনার দুর্গ ! পিতা বাংলায়—আমার উপর এই
দুর্গের ভার—মােগলের প্রভূত শক্তি—এক ভরসা আবদার।
(নেপথ্যে—দুষমন—দুষমন—আবদার পালিয়েছে)
( দ্রুতবেগে গাজিখার প্রবেশ)
আদিল। আবদার পালিয়েছে ! গাজিখা! বছ কি—আবদার
পালিয়েছে বেইমান পালিয়েছে।
গাজি। তন্ন তন্ন করে খুজেছি—কোথাও নেই—শোবার ঘরে ঢুকে
দেখলুম—এই চিরকুটটা পড়ে রয়েছে দেখুন ত এটা কি !
আদিল। নিজের পায়ে নিজে কুড়ুল মেরেছি।
(পত্রগ্রহণ ও পত্রপাঠ )
‘আমি দুষ মন তবু নিমক খেয়েছি—অনেক আদর যত্ন পেয়েছি, সাবধান
আমরা গঙ্গার দিকে আক্রমণ করব। বেইমান, বেইমান! গাজিখা !
সমস্ত অন্ধি সন্ধি জেনে গিয়েছে—সর্বনাশ করেছে। খােদা ! সরল
বিশ্বাসের এই পরিণাম ! গাজিখা!
আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছ৷
হচ্ছে। কি সর্বনাশ ক’বলুম—কি সর্বনাশ
গাজি। আমার বােধ হয় বেইমান আমাদের নুতন করে ঠকাতে এই
চিরকুট রেখে গেছে।
আদিল। ঠিক বলেছ—চতুর্দিকে ফৌজ মতায়েন রাখবর
গঙ্গার দিকে অল্প রাখ, এ নূতন কারসাজি—মানুষকে আর বিশ্বাস
১৮]
প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ পঞ্চম দৃশ্য ক’বব না। যাও—সকলকে বলে দাও—তারা এখন আহার নিদ্রার সময় পাবে না। [ গাজিখার প্রস্থান। হায় হায় কি সৰ্ব্বনাশ করলুম-কেন বিশ্বাস করলুম ! সৰ্বাঙ্গ দিয়ে রক্ত ঝরে শুকিয়ে জমাট হয়ে গেছে—সেই ভীষণ চীৎকার—ভীষণ যন্ত্রণা—অবিশ্বাস করতে পারলুম না। উঃ কি ভয়ানক ষড়যন্ত্র ! (নেপথ্যে তােপধ্বনি) ইয়া আল্লা! একেবারে ডুবিয়ে দিলে ! (বেগে গাজিখার প্রবেশ) গাজি। দুষমন গঙ্গার দিক হতে আক্রমণ করেছে কিন্তু উপায় নাই বারুদ ফুরিয়ে গেছে। আদিল। কামান দাগ—সমস্ত কামান এক সঙ্গে দাগ । গাজ। বারুদ ফুরিয়ে গেছে—কামান দাগব কি দিয়ে ? আদিল। স্তুপাকার বারুদ ফুরিয়ে গেছে ! গাজি। দুষমন বারুদ ঘরের চাবি নিয়ে পালিয়েছে। আদিল। দ্বার ভেঙ্গে ফেল। গাজি। লৌহ কবাট ভেঙ্গে ফেলা অসম্ভব। আদিল। কামান একটাও নাই ? থাকে যদি কামান দিয়ে দরজা উড়িয়ে দাও। গাজিখ! তােপ দেগে সমস্ত বারুদ জ্বালিয়ে দাও শক্র না দখল করে। [ প্রস্থান (রুনি ও বাইরাম প্রভৃতির প্রবেশ ) গাজি। সেলাম, সেলাম, ঐ শেরখার পুত্র পালাচ্ছে। দোহাই মা’রবেন না, বন্দী করুন । [ বাইরামের প্রস্থান। রুমি। (নেপথ্যে বাইরামকে লক্ষ্য করিয়া) সেনাপতি! শেরখার পুত্রকে হত্যা করনা বন্দী কর । (হুমায়ুন ও আবদারের প্রবেশ) এই দাসৰ আমফিদাও. ভিক্ষা দাও। [ ১৯ প্রখম অঙ্ক ]. মােগল-পাঠান, [ পঞ্চম দৃশ্য Tম ।। ।। । ১ হুমা। না !আবদার আমারও নয়, মেমারও নয়—আবদার মুক্ত। যাও আবদার। যথা ইচ্ছা প্রস্থান কর । আবদার। জাহাপনা দয়ার সাগর, কিন্তু গােলামী না করতে পেলে মরে যাব যে জনাব না জনাব ! জনাব ! স্বাধীনতা আমার কিছুতেই সহ্য হবে নাগােলামী চাই-মাজ হ’তে আমি সাহার গােলাম। গাজি। জনাব ! জনাব ! আমার—দশ। হুমা। তুমি কি করেছ ? আবদার। সম্রাট ! আমি অন্ধি সন্ধি জেনে গিয়েছিলুম বটে, কিন্তু এই গাজিখা সাহায্য না করলে বিনা যুদ্ধে এতটা হত না। গাজি। জনাব ! জনাব ! হুমা । ওঃ তাহলে বিশ্বাসঘাতক—তােমার—পুরস্কার গাজি। জনাব! জনাব! ( কঁপিতে লাগিল ) হুমা। না, কিছু ভয় নাই—সে পুরস্কার খােদা দেবেন। আমি তােমায় পুরস্কার দেব—আজ হ’তে তুমি দুর্গের সহকারী অধ্যক্ষ। [ প্রস্থান ও পশ্চাতে আবদারের প্রস্থান রুমি। সৈন্যগণ ! দ্বিী গােলন্দাজদের সকলের হাত কেটেও+ বাইরামের প্রবেশ ) বাইরাম। রুমিখা । তুমি সম্রাট হুমায়ুন নও। রুমি। স্বীকার করছি বাইরাম ! তুমি না থাকলে আজ রুমখার বীরত্ব গঙ্গার গর্ভে বিলীন হয়ে যেত—তথাপি বলছি উদ্ধত হয়াে না তােমার সৈন্য না পারে-মাের সৈন্য পারবে। রুমি বেঁচে থাকতে নূতন গােলন্দাজ কেউ সৃষ্টি করতে পারবে না । [ প্রস্থান বাইরাম। স্বার্থে আয়াত গৈগেছে! আচ্ছা আরও দিনকতক তােমার উপদ্রব নীরবে সহ্য করব [ প্রস্থান। ২ ] প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ ষষ্ঠ দৃশ্য গাজি। আমিই বারুদ ঘরের চাবি লুকিয়ে রাখলুম-চিরকুট রেখে এতটা কারসাজি কবুলুম-কৌশল করে গঙ্গার ধার থেকে সমস্ত ফৌজ সরিয়ে দিলুম—আমাকেই ফাকি ! এই আমায় রাজাজি করে দেওয়া হ’ল ! সহকারী দুর্গাধ্যক্ষ ! আচ্ছা, সহকারীটা হেঁটে ফেলতে কতক্ষণ —ডুব দিয়েছি যখন মাটি তুলতেই হবে। ঝাড়খণ্ড জঙ্গল। (শেরখ। জঙ্গলের সম্মুখে অশ্ব হইতে অবতরণ করিলেন) শের। (কিছুক্ষণ জঙ্গলের দিকে তাকাইয়া) এই বন ঠিক আমার মত। দুনিয়ার সভ্যতাকে তুচ্ছ করে, মানুষের প্রতাপকে উপহাস করে হিংস্ৰজন্তু বুকে করে স্বাধীন ভাবে দাড়িয়ে আছে। আমারও তাই। আহার নাই—নিদ্ৰা নাই—নিতান্ত যে দিন জুটল’ অশ্বপৃষ্ঠেই সমাধা করতে হ’ল। নিদ্রার বেগ যেদিন সহ্য করতে পারলুম না, অজ্ঞাতে অশ্বপৃষ্ঠে শয়ন করে স্বপ্ন দেখতে হ’ল। এই সুন্দর স্থান, এই জঙ্গলে আশ্রয় নােব। অশ্বপৃষ্ঠে প্রবেশ করা অসম্ভব—অশ্ব ছেড়ে দেব ! না—যদি পথ হারাইহিংস্ৰজন্তু যদি—না, অশ্বপৃষ্ঠে জঙ্গল পরিষ্কার করতে করতে অগ্রসর হব। অশ্ব, শেরখার জীবন—অশ্ব কোথায় রাখব। (সহসা রহিমের প্রবেশ) রহিম। অশ্বরক্ষক উপস্থিত দুর্গাধিপ! শের। একি! রহিম, তুমি এখানে ! রহিম। আজ সেই সময় উপস্থিত হয়েছে। শক্ত হস্তে পরাজিত হয়ে আজ আপনি দুর্গম জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। হৃদয়ের উষ্ণ শশাণিত আজ শীতল হয়ে গেছে প্রশস্ত বক্ষ আজ দারুণ শঙ্কায় [ ২১
প্রথম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
সঙ্কুচিত হয়ে গেছে—ললাটের উজ্জ্বলতা আজ আঁধার নৈরাশ্যে ম্লান
হয়ে গেছে। দুর্গাধিপ! আজ এসেছি সেই সঙ্গীত শুনাতে—মেঘমন্দ্রের
মত যার ভাষা গম্ভীর হুঙ্কারে গর্জে উঠবে—নিশীথ রাত্রে তুৰ্য্যধ্বনির
মত যার মূচ্ছনা বীরের নিদ্রা ভেঙ্গে দেবে।
শের। রহিম! তুমি কে ?
রহিম। আমি অশ্বরক্ষক—দিন অশ্ব, আমি যত্নে রেখে দিই।
(অশ্ব লইয়া চলিয়া গেল—শেরখা বিস্মরে তাকাইয়া রহিলেন।
( রহিমের পুনঃ প্রবেশ ও নেপথ্য উদ্দেশ করিয়া)
রহিম। গাও বীরগণ। তােমাদের গম্ভীর কণ্ঠে এই নিস্তব্ধ জঙ্গল
প্রতিধ্বনিত করে সেই গান গাও।
(নেপথ্যে সঙ্গীত)
আবার পেয়েছি ফিরে
গলিত মূর্তি, দলিত কীৰ্ত্তি, আবার তুলিব শিরে।
আবার গাহিব গান
ফিরিয়া যাইব মায়ের কুটীরে, ভেঙ্গে দেবব অভিমান।
মায়েরে দাড়াব ঘিরে
কাদাবাে মায়েরে, হাসাবাে মায়েরে, ভাসিয়া নয়ন নীরে।
শের। ভস্মের আবরণ উন্মােচন কর, স্বরূপ মূর্তি প্রকটিত হক।
রহিম। পাঠানবীর! আমি শত্ৰু-একদিন শরণাপন্নকে বিনাদোষে
আশ্রয়চ্যুত করেছিলেন, আজ তার প্রতিশােধ নেবো। দুর্গাধিপ! আজ
আপনি আমার বন্দী।
(বংশীতে ফুৎকার ও দ্বাদশ বীরের প্রবেশ )
শের। রহিম! এ আবার কি!
রহিম। এই দুর্ভেদ্য জঙ্গল আমাদের দুর্গ—এই দ্বাদশ অনুচর এই
দুর্গের বশী। (অনুচরদের প্রতি) বন্দী কর।
২২]
প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ ষষ্ঠ দৃশ্য শের। সাধ্য কি। শেখার হস্তে তরবারি থাকতে সে কারও বন্দিত্ব স্বীকার করে না। (অসি নিষ্কাষণ ) রহিম। উত্তম, যুদ্ধ কর, হত্যা করনা, বন্দী করে নিয়ে এস। [প্রস্থান । শের। শেখ জীবিত থাকতে না—এস-আক্রমণ কর, শঙ্কা হয়, পথ ছেড়ে দাওনা দাও, নিরীহ প্রাণী হত্যা করতেও শেরখা কুষ্ঠিত হবেনা। এস ( আক্রমণ উদ্যোগ ও নিজবেশে রহিমের পুনঃ প্রবেশ) সােফিয়া। পাঠান সর্দায় ! ক্ষান্ত হও। শের। তুমি আবার কে মা ? সােফিয়া। নারী, না, না, দলিত। ফণিনী। শেরখা ! বীর তুমি, সহস্র বীরের প্রাণবধ করতে পার, কিন্তু প্রতিহিংসাপরায়ণ। রমণীর রােষ সং ক’তে সাহস কর ? শের। সহ্য করা দূরে থাক আমি তাকে খােদার রােষাগ্নি বলে মনে করি। এই আমি অস্ত্র ত্যাগ করলুম-শেখার সর্বস্ব গেছে—আজ তার দেহের স্বাধীনতাটুকু পর্যন্ত যাক। সােফিয়া। পাঠান সর্দার ! এই জঙ্গল তােমার—এই সব অনুচর, যাদের বিক্রমে বাবরসার দৃঢ়সঙ্কল্পও এক দিন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল, এও তােমার; কিন্তু প্রতিজ্ঞা কর—জীবনের ব্রত কখনও ভুলবে না। শের। জীবনের ব্রত বুঝি নিস্ফল হয় মা ! আমি সর্বস্ব হারিয়েছি। দুৰ্বত্ত মােগলসম্রাট বিশ্বাসঘাতকতা করে আমার চুনার ধ্বংস করেছে। নিষ্ঠুর হুমায়ুন আমার পাঁচশত সুশিক্ষিত গােলন্দাজের হাত কেটে দিয়ে জন্মের মত অকর্মণ্য করে দিয়েছে। জ্যেষ্ঠ পুত্র কারাগারে—মধ্যম বাঙ্গালার পথে হুমায়ুনকে আটক করে বিপদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। পরিবারবর্গ আশ্রয়াভাবে পথে বসে আছে। আর আমি আশ্রয় অন্বেষণে—নিঃসহায় ঘুরে বেড়াচ্ছি। মা! মা! জীবনের ব্রত বুঝি নিস্ফল হয়। [ ২৩ প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ যষ্ঠ দৃশ্য সােফিয়া। পাঠানবীর! কোমল হ’য়ােনা। পিতৃ-সম্বােধন শুতে পৃথিবীতে এস নাই—জীবনের ব্রত নিস্ফল হ'তে দিওনা। নূতন করে সৈন্য সৃষ্টি কর-পুত্র কন্যা ভুলে যাও। পাঠান তুমি—প্রতিজ্ঞা কর, দেহে যতক্ষণ একবিন্দু শােণিত থাকবে, ততক্ষণ মােগলের পশ্চাতে ফিরবে। শের। মা! মা! শপথ করছি। সােফিয়া। আর একটি কথা—তােমার অশ্বরক্ষককে পূৰ্ব্ব পদে নিয়ােজিত কর। শের। মাতােমার আজ্ঞা শিরােধার্য্য-রহিম তােমার কে মা ? সােফিয়া। তবে চল শের! তুমি শত্রুর বিরুদ্ধে ঘােড়া ছুটিয়ে দাও —আমি তােমার পেছু পেছু ছুটি—তুমি শত্রু ধ্বংস করে ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম কর—আমি অশ্বের বল্পা ধরে দাঁড়িয়ে থাকি। শের। কে মা তুমি ? সােফিয়া। আমিই তােমার সেই অশ্বরক্ষক—আমিই তােমার রহিম। শের। একি প্রহেলিকা, খােদা ! মা ! মা ! অপরাধ মার্জনা কর—ধারণা ছিল—এ পৃথিবীতে শুধু আমিই হুমায়ুনের শত্রু—বল মা! সন্তানকে বল—মােগলের উপর তােমার এ বিদ্বেষ কেন ? সােফিয়া । কেন ? আকাশকে জিজ্ঞাসা কর-বনিম্বনে সে উত্তর দেবে। বাতাসকে জিজ্ঞাসা কর-প্রলয় ঝটিকায় সে আর্তনাদ করে উঠবে। পৃথিবীর কাছে উত্তর চাও-ভূমিকম্পে নড়ে উঠে সমস্ত সৃষ্টি উপর থেকে ফেলে দিতে চাইবে। পাঠান বীর ! আমার অনুসরণ কর—রােটাস দুর্গে তােমার সুন্দর বাসস্থান নির্দেশ করে দেব, এস। (প্রস্থানােদ্যোগ ) শের। না মা ! আগে উত্তর দাও। সােফিয়া। তবে শােন শের! হুমায়ুন—হুমায়ুন আমার—উঃ- চোখ ফেটে জল বেরুতে চাইছে। ২৪ ] তার বুকের প্রথম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ যষ্ঠ দৃশ্য শের। তবে কাজ নাই—যথেষ্ট হয়েছে। সােফিয়া। না, ব’—হৃদয় দৃঢ় করেছি—সেই অতীতের ঘটনাকব স্মরণ করে আজ করব। যেদিন চক্ষের সমক্ষে জগতের সমস্ত আলােক নিবে গেল—খােদার মধুর সৃষ্টি দেখতে দেখতে মলিন হয়ে গেল—সেই অভিশপ্ত দিনের কথা শুনাব। শের! প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, সাম্রাজ্য শাসনে তােমার শত্রু হুমায়ুন ; কিন্তু আমার কে জান? আমার স্বজনহন্তার পুত্র হুমায়ুন—আমার পিতৃহন্তার পুত্র হুমায়ুন ! শের। এখনও দেখতে পাচ্ছি—বিস্তীর্ণ পাণিপথক্ষেত্রে আমার পিতার ছিন্নমুণ্ড পড়ে আছে—এখনও দেখতে পাচ্ছি—দিল্লীর পাঠান সম্রাটের রাজমুকুট পাঠানের রক্তে ভেসে যাচ্ছে। এখনও শুনতে পাচ্ছি—পাঠান সম্রাট ইব্রাহিমলােদী—জনক আমার—ছিন্ন মস্তকে গগনভেদী চীৎকার করে ব’লছেন “পাঠান। একত্রিত হও—মােগলকে ধ্বংস কর—মােগলকে [ ২৫ দ্বিতীয় অঙ্ক প্রথম দৃশ্য। [ হুমায়ুনের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা হিণ্ডাল হুমায়ুনের দরবার গৃহে বিলাসে মগ্ননৃত্যগীত চলিতেছে। ] নর্তকীগণের নৃত্যগীত। আয় আয় ভেসে যাই প্রেম-তরঙ্গে প্রণয় সাগর তীরে ভাবি মিছে বসিয়া যা হবার হবে আয়, যাই সবে ভাসিয়া সিয়া কাঁদিয়া প্রাণে প্রাণে মিশিয়া প্রেমের তরণীখানি বাহি নানা রঙ্গে। দূরে ফেলে, অবহেলে লাজভয় অভিমান হৃদয়ে হৃদয়ে তুলি প্রণয়ের সুখতান- প্রণয় সুধার ধারা, পানে হয়ে মাতােয়ারা আবেশে অবশ হয়ে ভাসি এক সঙ্গে। নর্তকীগণ। সেলাম সাজাদা! [ সকলের প্রস্থান। হিণ্ডাল। সাজাদা! সাজাদা! চিরকালই কি সাজাদা থাকতে হবে ? কেন ? সিংহাসনে কারও নাম লেখা আছে! কই তাত নাই। যে উপযুক্ত হবে, যার বাহুতে শক্তি থাকবে সেই সিংহাসনে বসবে। এই ত সৃষ্টির নিয়ম—এই ত খােদার অভিপ্রায়। তবে কেন পৃথিবীর এ অত্যাচার-এ উন্মত্ততা। ২৬ ]
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[প্রথম দৃশ্য
( আবদারের প্রবেশ )
আবদার। পৃথিবীটা যে ঘুরছে, মাথা কি আর ঠিক থাকে।
হিণ্ডাল। কে—আবদার !
আবদার। আবদার বাপ মার কাছে আবদার-সাজাদার কাছে
সাজাদার লেজ ছাড়া আর কিছু নয়।
হিণ্ডাল। তবে কি আমাকে জানােয়ার বলতে চাও?
আবদার। সে দুঃসাহস কি করতে পারি সাজাদা! প্রকৃতির জটিল
রহস্যের কথা ছেড়ে দিন—যে অতি অজ্ঞান, সেও দেখতে পাবে
আকৃতিতে আপনাতে আর জানােয়ারেতে রীতিমত দুপায়ের তফাৎ।
হিণ্ডাল। তাহলে কি করে তুমি আমার লেজ হ'লে ?
আবদার। সরলার্থ কি জানেন সাজাদা! খােদার মর্জিতে যদি
মানুষের লেজ গজা’ত—কিংবা সেই লেজওলা সৃষ্টিটাকে শ্রেষ্ঠ বলে ভেবে
নেবার শক্তি খােদা যদি মানুষকে দিতেন—তাহলে সেই শ্রেষ্ঠ বস্তু হতেন
আপনি—আর আমি হতুম এই লেজ ।
হিণ্ডাল। জানােয়ারকেই তাহলে তুমি শ্রেষ্ঠ বলতে চাও আবদার !
আবদার। না বলে খােদার কাছে অপরাধী হই কেন। আপনিই
কেন দেখুন না—এই প্রথমে আকৃতিটাই ধরুন। একটা লেজ ত
বেশী আছেই তার উপর কারও দুট শিং, কারও বড় বড় পঁাত।
শক্তির কথা ধরুন—মানুষ যখন কোন রকমে একটা জানােয়ারকে পরাস্ত
করতে পারে, তখন তার শক্তির কথা নিয়ে হৈ চৈ পড়ে যায় ।
জানােয়র মানুষের চেয়ে দৌড়য় বেশী, লাফ দেয় বেশী, ভার বয় বেশী,
সাঁতার দেয় বেশী। কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ, মাৎসৰ্য, এ সকল
বিষয়ে মানুষ জানােয়ারকে পরাস্ত করতে চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু পেরে
উঠছে না। মানুষের চেয়ে পণ্ডিত বেশী জানােয়ার, কারণ তারা রীতিমত
একটা জটিল ভাষায় কথাবার্তা কয়।
[ ২৭
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
প্রথম দৃশ্য
হিণ্ডাল। সব স্বীকার করছি—কিন্তু জাননায়ারের হিতাহিত জ্ঞান
কোথায় আবদার ?
আবদার। তা সাজাদ ! জানােয়ারেও ত মানুষের মত বুড়াে বাপ
মার সঙ্গে লড়াই করে—ভাইকে তাড়িয়ে দেয়, পেটের ছেলেকে খেয়ে
ফেলে।
হিণ্ডাল। তাহলে তােমার মত দার্শনিকের মতে আমি হচ্ছি
জানােয়ার—কিন্তু প্রমাণ কর যে তুমি আমার লেজ ।
আবার।
কেন সাজাদা! আপনার ঠিক পেছনটিতে ত আছি।
হিণ্ডাল। আমার পেছনে টের লােক ঘুরে বেড়ায়।
আবদার। ঘুরে বটে—কিন্তু সাজাদা, ভয়ের কথা মুখে আতে
পারি না—আপনি যখন সাহস না পান, তখন যে আমি একেবারে কুণ্ডলি
পাকিয়ে যাই। হাকিম যদি আপনার নাড়ী দেখে, তাহলে আমার
শরীরের উত্তাপ কত বেশ ব’লতে পারে।
হিণ্ডাল। আবদার! তুমি আমার হিতৈষী।
আবদার। কথাবার্তায় টের পাচ্ছেন না সাজাদা! কথাবার্তায় টের
পাচ্ছেন না !
হিণ্ডাল। তবে জেনে রাখ আবদার ! আজ হতে এ সিংহাসন
আমার—অযােগ্য হুমায়ুনের নয়।
আবদার। অযােগ্য না হলে সিংহাসন খালি ফেলে রেখে লড়াই
ক’রতে ছুটে । কিন্তু একটা অনুরােধ সাজাদা! সিংহাসনখানা উলটে
নিয়ে বসবেন।
হিণ্ডাল। রহস্য কোরােনা আবদার! চিন্তা করতে দাও।
আবদার। বহঙ্গ নয় সাজাদ ! প্রথমতঃ অযােগ্য লােকগুলাে
সােজা দিকটায় বসেছিল—দ্বিতীয়তঃ গোলামের একটু দরাজ জায়গা
চাইত। সাজাদা যখন বিনাকারণেই হঠাৎ গরম হয়ে উঠবেন—আমিও
২৮ ]
দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ প্রথম দৃশ্য অমনি দরাজ হয়ে ফুলে উঠে আপ সাতে থাকব। শুধুই যে কুণ্ডলি পাকাতে হবে, এমন কথা নাই ত সাজাদ।। হিণ্ডাল। দেহে শক্তি থাকতে চক্ষুলজ্জার খাতিরে পরম বৈমাত্রেয় ভ্রাতাকে সিংহাসন ছেড়ে দেব ! আবদার। তা কি দেয় ! খুড়তুতাে মাসতুতাে হলেও বা কথা ছিল- একে আপনার পিতার পুত্র, তাতে আবার বৈমাত্রেয় ভাই। হিণ্ডাল! যাও আবদার ! ঘোষণা কর,—এ রাজ্য আজ হতে আমার। আবদার। আজ্ঞে এই চললুম । [ প্রস্থান। (সসাফিয়ার প্রবেশ ) সােফিয়া। আমিও তা’লে আজ হ’তে তােমার হিণ্ডাল! হিণ্ডাল। একি! তুমি কি করে এখানে এলে রূপসি ? সােফিয়া। সেকি হিণ্ডাল! ভুলে গেলে! এই যে তােমার সাঙ্কেতিক চিহ্ন—তুমি যখন বাদশার প্রতিনিধি হয়ে রাজধানীতে রয়েছ তখন এ হুকুম কে অমান্য করবে ! তুমি এই সেদিন লাহােরে আমাকে বললে যে তুমি যদি বাদশা হও, ত’লে আমি হ’ব তােমার প্রধানা বেগম–এত শীঘ্র সে কথা ভুললে চলবে কেন! হিণ্ডাল। না না ভুলিনি—তুমি এসেছ বেশ করেছ। সােফিয়া। এসেছি একটা মস্ত বড় কথা তােমাকে বলতে দেখ, সিংহাসন যদি নিতে চাও, তবে এই মুহূর্তে ঐ বৃদ্ধ বহলুলকে হত্যা কর । তা না হলে কোন কাৰ্য সিদ্ধ হবে না। হিণ্ডাল। সেকি ব’ছ-বৃদ্ধ যে আমাদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছে। সােফিয়া। তাহলেই তুমি বাদশা হয়েছ—না-তােমার পিছু এত দিন বৃথা ঘুরিছি। [ ২৯ [ প্রথম দৃশ্য দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান হিণ্ডাল। রাগ করনা প্রিয়তমে! একটা অপরাধও ত পেতে হবে। সােফিয়া। বিনা অপরাধে হত্যা করতে হবে। আর যদি অপরাধ তুমি চাও-একটু অনুসন্ধান কোবরাপাবে—তার পর দিল্লী আক্রমণ এখন আমি চললুম—আবার দেখা হবে। [ প্রস্থান হিণ্ডাল। ত। ঠিক বলেছে—অপরাধ যদি খোঁজা যায়—নিরপ- রাধীরও অপরাধ একটু অনুসন্ধানে পাওয়া যায়—ঠিক বলেছে। ( আবদারের প্রবেশ ) আবদার। ঘােষণা করে এলুম জনাব! হিণ্ডাল। কোথায় ঘােষণা করলে? আবদার। আজ্ঞে রান্নাঘরে যে যেখানে ছিল—এই ভাড়ার ঘরে হিণ্ডাল। আবদার! সমগ্র মােগল সাম্রাজ্যে দুন্দুভিধ্বনিতে ঘােষণ। কর—মােগল সম্রাজ্ঞা দিলদার বেগমের পুত্র হিণ্ডাল থাকতে ভিখারিণীর পুত্র অকর্মণ্য হুমায়ুন এ সিংহাসনের কেউ নয় । যে প্রশ্ন করবে, আমি তার শিরচ্ছেদ করব। (সেখ বহলুলের প্রবেশ ) বহলুল। রাজ্যে কে তাহলে থাকবে সাজাদা? হিণ্ডাল। তুমি থাকলেই যথেষ্ট হবে। সেখজি! সহায় হও—পদ- . মৰ্য্যাদা অক্ষুন্ন থাকবে! বহলুল । মােগল সম্রাটের জয় হ’ক—সেখজীর পদমর্যাদা অক্ষুন্নই আছে। হিণ্ডাল। মােগলের উন্নতি অবনতি তােমার অনুগ্রহের উপর নির্ভর করবে-আমার সহায় হও বহলুল। মােগলের গােলাম আমি হিণ্ডাল। নৃতন করে রাজ্য গড়ে দেব তুমি তার স্বাধীন অধিপতি হবে। সহায় হও- ৩• ]
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ প্রথম দৃশ্য
আবদার। হ’ন সেখজি! সহায় হন। আপনি মন্ত্রী-আমি
সেনাপতি
বহলুল। তার আগে যেন চিরজনমের মত স্বাধীনতা লাভ হয়-
হিণ্ডাল। তবে তাই হ’ক-সিংহাসনের একমাত্র অন্তরায় দূর হক।
(ছােরা বাহির করিয়া আঘাত )
বহলুল। উঃ (পতন ) খােদা ! খােদা! (পুনঃ আঘাতের চেষ্টা )
আবদার। একেবারে মা’রবেন নাদগ্ধে মারুন।
[ ছােরা কাড়িয়া এহান
বহলুল। সাজাদা! বড় প্রবল অন্তরায় একজন আছেন, আশীর্বাদ
যার মুক্ত আকাশের মত উদার প্রসারে ছড়িয়ে আছে-অভিসম্পাত যার
কুদ্ধ ঝঞ্চার মত অধার্মিককে ধ্বংস করে দেয়। উঃ সাজাদা! কোলে পিঠে
করে তােমাদের মানুষ করেছি--এই তার প্রতিদান !
হিণ্ডাল। কুকুর-কুকুর-এখনও স্পর্ধা! (পদাঘাত)
বহলুল। আর না-আর না-কে আছি, হুমায়ুনকে রক্ষা কর।
হিণ্ডাল। চীৎকার করিস্ না কুকুর ! (পদাঘাত)
বহলুল। উঃ উঃ-খােদা- মৃত্যু)
(বেগে হিণ্ডাল জননী দিদার বেগম, আবদার ও দুইজন
খােজা প্রহরীর প্রবেশ)
দিলদার। হিণ্ডাল ! তাের মস্তকে এখনও বজ্রাঘাত হয়নি! করেছিস
কি ! সেখজি ! সেখজি! হায় হায় ফুরিয়ে গেছে ! (খােজাদের প্রতি)
যাও তােমরা এই মৃতদেহ আমার পালঙ্কে রক্ষা করছে। আমি এই পবিত্র
দেহ পুষ্পে সজ্জিত করে মােগলের সম্মুখে ধ’রব-দুন্দুভিধ্বনিতে তাদের
বলে দেব—এই মহাত্মা মােগলের সিংহাসন রক্ষা করতে রাক্ষস হিণ্ডালের
হস্তে প্রাণ দিয়েছেন। যাও(তথাকরণ)
হিণ্ডাল। জননি! এই বিশ্বাসঘাতক শেখার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেছিল।
[ ৩১
দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান। [ প্রথম দৃশ্য দিন্দার। হিণ্ডাল! মার সম্মুখে মিথ্যা বলি না, জিহবা খসে যাবে। যৌবনে যে তােদের জনকের মত উপদেশ দিয়েছে—সেই নিরীহ ধর্মপ্রাণ সেখজীকে যখন তুই হত্যা করেছি, তখন তুই আমাকেও হত্যা করতে পারি। হিণ্ডাল। জননি, আজ হ’তে তুমি সম্রাট জননী ! দিদার। হুমায়ুন সুখে থাকতােমার অনুকম্পায় আমি পদাঘাত করি। হিণ্ডাল। জননি! হুমায়ুন তােমার সপত্নী পুত্র—আমার শত্রু দিলদার। হুমায়ুন যদি আমার পুত্র হত, আমি তাহলে ভাগ্যবতী হ’তুম। হিণ্ডাল ! ঘাতক! পিতৃহারা হয়ে যে ভাইয়ের স্নেহে ঘুমিয়ে পড়ে ছিলি-সাম্রাজ্যের হানি করে—নিজ প্রতিপত্তি হ্রাস করে যে ভাই তোদের প্রতিপত্তি অক্ষুন্ন রেখেছিল, সেই ভাইয়ের বিরুদ্ধে আজ অস্ত্র ধরে ছি! হিণ্ডাল, তাের জননী আমি—তথাপি অভিসম্পাত করছি, সারা- জীবন সিংহাসন সিংহাসন করে যেন তােকে ছটফট করতে হয়। [ প্রস্থান। হিণ্ডাল। নারি! এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি মােগল সম্রাট-মহিষী হয়ে ছিলে ! কিন্তু আবদার! তুমিও আমার শত্রু-হাত থেকে ছােরা কেড়ে নিয়েছ---এই উন্মত্তা রমণীকে ডেকে এনেছ। আবদার। বান্দার গােস্তাকি মাপ হয়—সে ছােরার আর এক ঘা খেলেই তখনি শেষ হয়ে যেত—দগ্ধা’তে পেতন—আর এমন জিনিস -পাঁচজনকে না দেখাতে পারলে কি আমােদ হয়। হিণ্ডাল। বেশ করেছ—কিন্তু নারি! যাও, নির্বোধ তুমি—কাজ নাই তােমার আশীর্বাদে। [ প্রস্থান আবদার। নির্বোধ ত হবেই সাজাদ।! একে মা—তাতে তােমার মা--কিন্তু—উঃ কি ভীষণ আঘাত-রক্ষা করতে পারলুম না। [ প্রস্থান। ৩৭ ] দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বিতীয় দৃশ্য দ্বিতীয় দৃশ্য চুণার দুর্গাভ্যন্তর। (গাজিখা তামাক খাইতে খাইতে প্রবেশ করিল ) গাজি। ছিলুম সহকারী কেমন কৌশল করে দুর্গাধ্যক্ষকে ফতে করলুম-এখন আমায় ধরে কে! হুমায়ুন এখন নিজেকে নিজেই ব্যস্ত -হা-হা-এখন আমি সর্বেসর্বা। (নেপথ্যে সঙ্গীত ) ঐ ঐ বুঝি আছে—আহাহা—যদি সম্ভব হত—এ গানের ছবি তুলে রাখতুম । কিন্তু বাদসাই তামাকটা পুড়ে গেল—যা-তামাক আর মেয়ে মানুষঅনেক তফাৎ- (মােগল সৈনিকবেশে সােফিয়ার প্রবেশ) সােফিয়া। না সাহেব ! দুটই প্রায় এক রকম—দুটতেই দুনিয়াটাকে ভারি মজ,গুল করে রেখেছ। বেশ করে ভেবে দেখ দেখি সাহেব ! কুণ্ডলি পাকান ধোঁয়াটুকু ঠিক মেয়েমানুষের কেঁকড়া চুলের মতন কি না— একটু রংয়ের তফাৎ বটে। সেই ডাটুকু, ঠিক মেয়েমানুষের গানের মত কি না—আর সেই মুহুর্মুহুঃ চুমুকটুকু রমণীর অধর-চুম্বনের মত কি না! বল সাহেব, বল-তবু আমি তামাকও খাই না—মেয়েমানুষের চুমুও খাই না। হাঃ হাঃ—এসেছে—এসেছো ! আমি মনে করেছিলুম- দুটিদিন মাত্র এসে, আমায় মজিয়ে রেখে—আমার গলায় ফাঁস পরিয়ে, পায়ে বেড়ী পরিয়ে—আমায় আমায় সােফিয়া। (স্বাগত) তােমার গােরের ব্যবস্থা করে- গাজি। আমায় জ্যান্ত গােরে দিয়ে সােফিয়া। ও কি কথা সাহেব ! গাজি। বুঝি ফাকি দিয়ে চলে গেলে—আর এলেনা! সােফিয়া । এসে কি থাকতে পারি গাজি।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ দ্বিতয় দৃশ্য
গাজি। বিবিবিবিবিবি-
সােফিয়া। চুপ চুপ—বিবি বিবি করে চেঁচিও না।
গাজি । কুচ পরােয়া নেই। মােগল বাদশা আমাকে দুর্গের মালিক
করে দিয়ে গেছে, আমি ডরাই কাউকে ? তােমায় এ পােষাকটা দিয়ে
ভাল করিনি বিবি ! তােমার জৌলস ঢাকা পড়েছে।
সােফিয়া। এই পােষাকটা না পেলে, তোমায় দেখতে না পেয়ে
আমি পাগল হয়ে যেতুম ।
গাজি। কুচ পরােয়া নেই—আর তােমায় কষ্ট করতে হবে না-
তুমি এলােচুলে আলুথালু হয়ে ছুটে এসে আমার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে
পড়বে ! বিবি ! মুখ শুকিয়ে গেছে—একটু সরাপ বিবি ! মুখের টোল
টাল গুলাে তুলে নাও, গালের গােলাপি আভা ফুটে উঠুক।
সােফিয়া। (স্বগত) এইবার মজালে !
গাজি। (একগ্লাস পূর্ণ করে ) এস বিবি এস। (মুখের কাছে ধরিল)
সােফিয়া। (হাত ধরিয়া) সাহেব! আহা! তােমার হাত কি নরম
সাহেব! আহা, তােমার দাতগুলি মুক্তোর মত !
( সাহেব আল্লদে হাঁ করিয়া ফেলিল, সােফিয়া তাহার মুখে ঢালিয়া দিল)
গাজি। মিছরির পানা, মিছরির পানা, বিবি ! তােমার হাত যে
আমার চেয়ে মিষ্টি,আমার চেয়ে নরম !
সােফিয়া। কথা কি রাখবে ! আমার রূপও নেই -যৌবনও নেই।
গাজি। বিবিজান ! তােমার কথা রাখব না! আর এক গেলাস
খেতে বলবে তবলনা-বলনা !
সােফিয়া। এত ভালবাস আমাকে সাহেব ! মুখের কথাটা টেনে
নিয়ে বলেছ—তােমায় আমি খেতে বলব! ছিঃ তােমার মুখে তুলে
দেব-এস দাও। ( তথাকরণ)
গাজি । দাও জান্। আমি হাঁ করে থাকি-তুমি চলতে থাক।
৩৪ ]
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মোগল-পাঠান
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
সােফিয়া। যত তুমি হা ক’রছ সাহেব ! তত তােমার দাঁতগুলো ঝক্
ঝক করছে। আচ্ছা—সাহেব ! এক নিশ্বাসে সবটা শেষ করতে পার ?
গাজি। ধর জান্! তােমার আতাের মাখা তুলাের হাতে আমার
নাকটা টিপে ধরে (ঢলে দাও—দেখতােমার কথায় আমি কি না পারি।
সােফিয়া। আচ্ছা তুমি আমায় কেমন ভালবাস দেখব আজ।
( গাজিখার ক্রমাগত পান) !, তুমি আমার কথায় সব পার । আচ্ছা
সাহে! নাচতে পার ? নাচ দেখি—আমি একখানা গান ধরি
সাহেব
গজি। বেশ বেশ—এই আমি আরম্ভ করলুম (নৃত্য)।
সােফিয়া। তাইত, কি গান গাই—আচ্ছা
গীত।
নাচে আমার মিঞা।
যেমন দুধ ছােল। দেখে নাচে দাড়ে বসে টিয়া।
বাঁশীর রবে নাচে ফণী আর হরিণ ছানা
তালে তালে নাচে হাতী বাজিলে বাজনা ॥
আবার দড়ির টানে নাচে ভালুক হেলিয়া দুলিয়া।
তেমনি তেমনি তেমনি করে নাচে আমার মিঞা।
গাজি। বিবিজান ! বিবিজান ! (পতন ও অজ্ঞান হওন)
সােফিয়া। এই আমি চাই— পরিধেয় অনুসন্ধান পেয়েছি, পেয়েছি
বন্দীর ঘরের চাবি পেয়েছি-যাই, থাক্ তুই শয়তান। [ প্রস্থান
গাজি। (শুয়ে শুয়ে) নাচে আমার মিঞা—নাচে আমার মিঞা
বেশ বিবিজান ! আরও কাছে এস—আরও কাছে-নাচে আমার
মিঞা ! নাচে আমার
( আদিলকে লইয়া সােফিয়ার প্রবেশ)
সােফিয়া। চলুম সাহেব-সেলাম
গাজি। ও আবার কে বিবিজান ।
সােফিয়া। ও তােমার যম ! ( পিস্তল উত্তোলন)
দ্বিতীয় অঙ্ক ] মোগল-পাঠান [ তৃতীয় দৃশ্য গাজি। এ্যাঃ এ যে বন্দীবন্দী সােফিয়া। চেঁচিয়ােনা শয়তান—অনেক উপকার করেছ-এই তার পুরস্কার। আদিল। না না, মে’রােনা—শয়তানকে তার শয়তানির চরম সীমায় দাড়াতে দাও সােফিয়া আচ্ছ। মাববনা-উপস্থিত তুমি যাতে আমাদের পেছু নিতে না পার—সেইজন্য তােমার একটা পায়ে একটু দরদ দিয়ে যাই। [ গুলিকরণ ও উভয়ের প্রস্থান। গাজি। উঃ হুঃ দুঃশয়তানি—শয়তানি পলা’ল, পালা’ল— তওবাৎকার—( উত্থান ও কিঞ্চির যাইয়া পতন) উঃ হুঃ হুঃ— পালা’ল—পালা’ল—আওরা আৎ (উত্থান ও কিঞ্চিদ্র যাইয়া পতন ) পলা’ল—পালাল- [ উত্থান ও প্রস্থান তৃতীয় দৃশ্য দিল্লীর উপকণ্ঠ। শিবির। হিণ্ডাল, কামরান ও আবদার । হিণ্ডাল। স্পর্ধা দেখলে দাদা! আবদার। শুধু দেখলেন—একেবার হাঁ হয়ে গেছেন। কামরান। দিল্লীর প্রভুত্ব পেয়ে সেই রাফি-উদ্দিনের এতদুর ঔদ্ধত্য । আবদার। গাধা বলে কিনা—সম্রাটকে পরাস্ত করলেও দিল্লী ছেড়ে দেব না। নিতান্ত বালক—এত ক'রে ভয় দেখালেন—একটু ভয় খেলে না সাজাদা! এমন একটা আহাম্মুককে কি বলে হুমায়ুন দিল্লী-দুর্গ রক্ষার ভার দিয়ে গেছেন তা ত বুঝলুম না। ৩৮ ]
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মোগল-পাঠান
[তৃতীয় দৃশ্য
হিণ্ডাল। যা’—আমাদেরও এখন দরকার নাই ।
আবদার। তা যা বলছেন সাজাদা! যখন কিছুতেই হ’ল না—
তখন কি দরকার। গাধা দিল্লী নিয়ে ধুয়ে খা’ক।
হিণ্ডাল। আমি কিন্তু ছাড়ছিনা দাদা। তােমাকে আগ্রার
সিংহাসনে বসিয়ে, তােমার হুকুম নিয়ে দিল্লী ধ্বংস করবই।
কামরান। না ভাই—আমি সিংহাসন চাই না। বেশ করে ভেবে
দেখেছি-তুমিই সিংহাসনের উপযুক্ত—আমি শুধু ন্যায়ের পক্ষ অবলম্বন
করেছি ভাই! আমাকে রেহাই দিও।
হিণ্ডাল। তাকি হয় দাদা ! বৈমাত্রেয় হলেও তুমি, আমার জ্যেষ্ঠ ।
তুমি থাকতেনা—তা আমি পারব না।
কামরান। তবে আমায় বিদায় দাও ভাই! রাজ্যের বােঝা মাথায়
নিতে পাব না।
আবদার। মারামারিতে কাজ নাই সাজাদা! আমার মাথায়
চাপিয়ে দিন—ঘাড় ভেঙ্গে যায়—আমারই যাবে।
কামরান। বরং পারিশ্রমিক স্বরূপ তােমার আবদারকে আমায়
দিও-তাহলেই যথেষ্ট হবে।
আবদার। সাজাদা! রক্ষা করুন, দু’রকম জল হওয়ায় পেটের
'অসুখ করবে!
হিণ্ডাল। না দাদাবােঝা মাথায় নিতে হয়, আমি নেব—তােমাকে
আমি ছাড়বাে না।
কামরান। ছাড়তেই হবে, দুনিয়ার বাদসাগিরিতেও কামরান
নারাজ। কিন্তু ভাই! রাফিউদ্দিনকে শাস্তি দিয়ে তবে দিল্লী ছেড়ে
যাওয়া উচিত।
আবদার। ঠিক বলেছেন সাজাদা! ভয় খেতে কি আছে ?
দুচারটে ফাকা আওয়াজও করুন ।
[ ৩৭
[ তৃতীয় দৃশ্য •• দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান হিণ্ডাল। বেশ—তুমি একটু অপেক্ষা কর—আমার সৈন্য বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তাদের একবার আমি জিজ্ঞাসা করি। [ প্রস্থান । কামরান। আবদার! অবাক হয়ে দেখছ কি ? আবদার । ইদুরে বেড়াল ধরেছে সাজাদা! কামরান। কি রকম। কোথা হে ? আবদার। আজ্ঞে ঠিক ধরেছ-বেড়ালটা বেশ বড় রকমের নিজের শরীর নিজে ভাল করে দেখতে পায় না। তার উপর ঘুমিয়ে প’ড়েছ, আর ইদুরটা যেমনি ছােট তেমনি চালাক, ল্যাজের আড়াল থেকে ল্যাজ কামড়ে ধরেছে—এই কেটে নিয়ে পালায় আর কি । কামরান। বেড়ালটাকে জাগিয়ে দাও না আবদার । আবদার। বেড়ালটা বড় ম্যাদা। পেটের জ্বালায় লাহাের থেকে ছুটে এসেছে, কিন্তু ল্যাজের জন্য বুঝি—— কামরান। আবদার! হেঁয়ালী রাখ—স্পষ্ট বল । আবদার। তাতে আমার লাভ । কামরান। লাভ যথেষ্ট হবে। তুমি যা চাইবে তাই দেব । আবদার। তাহলে আগ্রার সিংহাসনখানা। কামরান। রহস্য করনা আবদার ! আমাকে বিশ্বাস কর । আবদার। রহস্য নয় সাজাদা! এ আবদার-আর বিশ্বাসের কথা কি জানেন তেমন হয় না! কিন্তু আপনার উপর আমার কি একটা বড় শক্ত টান পড়েছে—দেখবেন গরীব যেন না মারা যায় । কামরান। কামরান থাকতে তােমার ভয় নাই—বল, শীঘ্র বল। আবদার। সাজাদা! আপনি বােধ হয় বন্দী হয়েছেন । কামরান। কি রকম (চতুর্দিক চাহিয়া ) আমি বন্দী! আবদার। সেই জন্যই শিবিরে আপনাকে আহ্বান করা হয়েছে। সিংহাসনের একমাত্র কন্টক এখন আপনি। ৩৮ ] দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােল-পাঠান [ তৃতীয় দৃশ্য কামরান। এ কি সত্য ! আবদার। মিথ্যা মনে হয়, একটু দাড়িয়ে পরফ করুন। আর সত্য মনে হয়, এখনও পথ থাকলেও থাকতে পারে—পালান। কামরান। বটে! হিণ্ডাল! আমার উপর এক চাল। আবদার । যদি অাজকার যুদ্ধে জয়ী হই, তবেই—নতুবা এই শেষ । [ প্রস্থান ( বিপরীত দিক হইতে হিণ্ডালের প্রবেশ) হিণ্ডাল। আবদার । দাদা কই আবদার। স’রে পড়ুন সাজাদা! বড় বেগতিক—সাজাদা আপনাকে বন্দী করবার জন্য ফৌজ আ’তে গেছেন—শীঘ্র পালান। হিণ্ডাল। সে কি ? আবদার। স’রে পড়ুন সাজাদা! বড় বেগতিক—আপনি উপযুক্ত থাকতে তিনি কি সিংহাসনে ব’তে পারেন—তাই পরিষ্কার করে নিচ্ছেন। স’রে পড়ুন—ল্যাজ কুণ্ডলি পাকিয়েছে। হিণ্ডাল। তাইত। আমি যে আগ্রায় গিয়ে শেষ করব’ মনে করেছিলুম। আবদার। স’রে পড়ুন—সরে পড়ুন। হিণ্ডাল। স’রে পড়ব কি হে—হিণ্ডালের দেহেও শক্তি আছে। আবদার। তবে কোমর বেঁধে দাড়ান। (বন্দুক শব্দ) ঐ ঐ এসে পড়েছে—আপনার ল্যাজটা আগে বাঁচিয়ে রাখি। [ প্রস্থান। (কামরানের প্রবেশ ও অসির আঘাতে--হিণ্ডালের আঘাত প্রতিহত করণ) কামরান। হিণ্ডাল! কুকুর ! মােগল-সিংহাসন আমার। হিণ্ডাল। সাবধান কামরান! প্রাণ হারাবে—সিংহাসন আমার । (যুদ্ধ ও কামরানের ফৌজের প্রবেশ) কামরান। বন্দী কর—সিংহাসনের সম্মুখে হত্যা করব। ( সকলে চতুর্দিকে আক্রমণ করিতেছে দেখিয়া হিণ্ডালের পলায়ন) চলাও-চলাও- [ সকলের প্রস্থান। [ ৩৯
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ চতুর্থ দৃশ্য
( আবদারের প্রবেপ )
আবদার। কেয়াবাং-আবদার কেয়াবাৎ! হিণ্ডাল! শয়তান!
তােমাকে তাড়িয়েছি—আগ্রার অনেককে হাত করেছিলে—আর কামরান!
তুমি এবার আগ্রায় যাবে, চল—তােমাকেও তাড়াব—যতদিন সম্রাট না
ফিরে আসেন, ততদিন আবদারের বিশ্রাম নাই। খােদা ! খােদা ! তুমিই
রক্ষাকর্তা—তুমিই রক্ষাকর্তা।
[ প্রস্থান।
চতুর্থ দৃশ্য
রােটাস দুর্গ।
শেরখা ও তাহার ভ্রাতুস্পুত্র মুরিজ।
শের। মুবারিজ ! আদর করে তােমায় বুকে জড়িয়ে ধরেছিলুম,
এই তার পুরস্কার! তুমি অলস লম্পট মদ্যপায়ী—এই কিশাের বয়সে তুমি
ব্যভিচারের প্রতিমূর্তি। সহস্রবার তােমাকে আমি নিষেধ করেছি
সহস্রবার তুমি উপেক্ষা করেছ। প্রতিমুহূর্তে তােমাকে কঠিন শাস্তি দেব
ব’লে প্রতিজ্ঞা করেছি তােমার পিতার মুখ মনে পড়েছে-আমার দৃঢ়
প্রতিজ্ঞাও ভেসে গেছে—কিন্তু আর না-
মুবারিজ । আমাকে বিদায় দিন
শের। বিদায় দেব ! কোথায় যাবে মুবারজ?
মুবারিজ । যে দিকে দু’চক্ষু যায় ।
শের। কি খাবে মুবারিজ ?
মুবারিজ। খােদ। যা মিলিয়ে দেন।
শের। খােদার নাম মনে আছে তােমার ! কিন্তু অলস লম্পটকে
খােদা সাহায্য করেন না।
মুবারিজ। অনশনেও ত অনেক লােক মরে ।
• ]
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মোগল-পাঠান
[ চতুর্থ দৃশ্য
শের। সেও ভাল ! মুবারিজ, মানুষ হয়ে জন্মেছ—এতবড় পৃথিবীটা
একদিন চোখমেলে দেখ লে না ! এমন কৰ্ম্মের জীবন নিশ্চিন্ত আলস্যে
কাটিয়ে দিলে !—খাদ্যের ভাণ্ডারে বসে অনশন বেছে নিলে! তা হবে
—চিন্তা কর—অমৃত আস্বাদে পরমায়ু বৃদ্ধি করবে না, বিষপান করে
আত্মহত্যা করবে ?
মুবারিজ। আমাকে বিদায় দিন।
শের। তােমার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিলুম ! কোন হ্যায়।
( প্রহরীর প্রবেশ)
মুবারিজ। কারাদণ্ড ! কেন? আপনার কি অধিকার
শের। যাও—এই দুৰ্বত্তকে কারারুদ্ধ কর—অবাধ্য হয়--বল
প্রয়ােগ কর। এই রােটাস দুর্গ যতদিন আমার অধিকারে থাকবে,
মুবারিজ এ দুর্গের বন্দী। যে মুক্ত করে দেবে, তাকে এই কারাগারে
পচে মরতে হবে। যাও
প্রহরী। আইয়ে জনাব ! [ প্রহরীর সহিত মুবারিজের প্রস্থান।
শের। আমার কি অধিকার ! মুবারিজ ! তুমি আমার সেই
নিজামের পুত্র—আমার কি অধিকার ? না মুবারিজ, এ অধিকার নয়—এ
আমার স্নেহের কর্তব্য।
( চাঁদের প্রবেশ )
চঁদ। বাবা ! মুবারিজ নিতান্ত অবােধ !
শের। যথেষ্ট সময় দিয়েছিলুম মা! বুঝতে একটু চেষ্টা পৰ্যন্ত
কবলে না !
চাঁদ। বাবা। মুবারিজ মাতৃপিতৃহীন অনাথ
শের। মা ! তাই তার অত্যাচারগুলি এতদিন স্নেহের আবদার বলে
নীরবে সহ্য করে এসেছি।
চাদ। ক্ষমার চেয়ে কঠিন দণ্ড বুঝি বিধাতা সৃষ্টি করেননি
৪১
দ্বিতীয় দৃশ্য ] মােগল-পাঠান [ চতুর্থ দৃশ্য তুমি ভীরু- ঘৃতাহুতির মত হিংসাগুনে জ্বলে উঠে ক্ষমা বহ্নিতেজে শয়তানের প্রাণ গলিয়ে প্রেমের উৎস প্রবহিত করে। শের। এ বিধান অন্ধের জন্য নয় মা! চক্ষের জ্যোতিঃ আছে যার— শুধু একটা আবরণে সে দীপ্তি যার ঢাকা আছে—এ বিধান তার জন্য । চাঁদ! যাবজ্জীবন কারাদণ্ড শুনেও মুবারিজ আমার বিরুদ্ধে তার হাত দুটো পৰ্যন্ত তুললে না ! সে যদি আমার কটাক্ষ উপেক্ষা করে সদর্পে একবার সােজা হয়ে দাড়াত-বুঝতেম—কীট দংশন করেছে মাত্ৰ-অন্তঃসার শূন্য করেনি। আনন্দে আমি ক্ষমা করতে চঁাদ। চঁদ। আজ হ’তে মুবারিজের ভার আমায় দাও বাবা! শের। না মা, তা হয় না—তুমিই ত বলেছ-উৎপীড়ন নইলে চঁদ। বাবা ! শের। কন্যার মুখে এ বড় মিষ্ট ভৎসনা ! তুমিই ত একদিন মুবারিজের বিরুদ্ধে আমাকে উত্তেজিত করেছিলে মা ! না মা-তােমার অপরাধ কি! এ যে স্নেহের কর্তৃত্ব ! বেশ করেছ বাবা, তুমি দুৰ্বলকে শাস্তি দিতে বড় ভালবাস ; কিন্তু ভয়ে মােগলের বিরুদ্ধে অগ্রসর হচ্ছ না। শের। ভয়ে ! না মা! বড় ক্লান্ত আমি—একটু বিশ্রাম ক’ছি- চিন্তা করছি- চুনারে হুমায়ুনের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশােধ, নির্মম অত্যাচারের কঠিন শাস্তি, কঠোর হতে কঠোরতর কি করে হবে। চাঁদ। বর্ষায় দেশ ভেসে গিয়েছে, একপা এগুবার বা একপা পেছুবার শক্তি হুমায়ুনের নাই। দিল্লীতে বিদ্রোহ, আগ্রায় বিশৃঙ্খলা । এ সুযােগ যদি ছেড়ে দাও, তাহলে, আর আসবে না। শের। না মা! ছেড়ে দেব নাআমার চিন্তার শেষ হয়েছে। আচম্বিতে আমি মােগল-শিবির আক্রমণ করব। চঁদ! ছিন্ন হস্ত আমার সেই গােলন্দাজ সৈন্যের মূর্তি দেখতে পাচ্ছি। চক্ষের জল ৪২ ] গদ।
দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ চতুর্থ দৃশ্য মুছবার শক্তি নাই—পরিশ্রম করে উদর পূৰ্তি করবার সামর্থ্যটুকু মােগল কেড়ে নিয়েছে। চাঁদ। এই মুহূর্তে আমি আক্রমণ করব—ঘুমন্ত দেশের উপর দিয়ে প্রবল বন্যার মত শুধু প্রলয়-চিহ্ন রেখে ভেসে যাব। হত্যার মত দুৰ্বার বিক্রমে মুহূর্তে সহস্র মােগলকে ধ্বংস করে হুমায়ুনকে দেখাব মােগল পাঠানে কত প্রভেদ-পাঠানের প্রতিহিংসা কত ভয়ঙ্কর। (সােফিয়া আদিলের হস্ত ধরিয়া প্রবেশ করিল) সােফিয়।। তাই কর পাঠান বীর ! এই দেখ তােমার পুত্র শের। আদিল ! আদিল ! (বক্ষে জড়াইয়া ধরিলেন) চাঁদ। দাদা! (কাঁদিয়া ফেলিলেন ) শের। মা ম-মৃত্যুর মুখ হ'তে কেমন করে ফিরিয়ে আনলে ? সােফিয়া। খােদা ফিরিয়ে নিয়েছেন সর্দার ! (জালালের প্রবেশ) জালাল। দাদা! তুমি এসেছ ! ভাই ভাই ! (আলিঙ্গন ) আদিল। ভাই—এই রমণীর অনুকম্পা—এই রমণীর দুর্জয় শক্তি। জালাল। কে মা তুমি ! নিস্তেজ পাঠানের দ্বারে শক্তি মূর্তিতে এসে দাড়িয়েছ-ভক্তিহীন পাঠানের হস্তে মুক্তির ডালা বিনামূল্যে তুলে দিচ্ছ? সােফিয়া। জালাল! খােদার করুণ শের। মা, মা-বুকের ভেতর তরঙ্গ উঠেছে—ভাষা নাই, ফুটে বেরুতে পারছে না—চেয়ে দেখ মা ! পাষাণ ফেটে আজ জল ঝরছে । তােমায় কি দেব না ! সােফিয়া। পাঠান বীর ! আমায় কি দেবে! তা কি পারবে? না- তা পারতেই হবে! সর্দার! আমি কি চাই জান ? আমি চাই একটা যুগের কীৰ্ত্তির মাথা কেটে দিতে—একটা বিরাট স্ফুর্তির গায়ে আগুন ঢেলে দিতে। পাঠান বীর ! ছিন্নমুণ্ড চাই—আমার পিতৃহন্তা-পুত্রের ছিন্নমুণ্ড চাই দাও এনে দাও—আমি সেই তপ্তরক্তমাখা মুণ্ডের উপর পাঠানের সিংহাসন পা’তব—আমি হুমায়ুনের শিরে পাঠানের কীর্তি গড়ব। [ বেগে প্রস্থান। [ ৪৩
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
{ পঞ্চম দৃশ্য
চাঁদ। খােদার আলো আগে চ'লে গেল—অগ্রসর হও বাবা!
হিন্দুস্থানের রাজা হবে এস।
[ প্রস্থান।
শের। তবে চল আদিল ! চল জালাল! দ্বার দিয়ে খোদার করুণা
বুকের ভেতর সৃষ্টি লুকিয়ে রেখে বন্যার জোরে ভেসে চলেছে । চল
আদিল চল জালাল—সেই প্রবাহে ঝাঁপিয়ে পড়ি—অগাধ গভীরতা-
অসংখ্য রত্ন—ডুব দিতে হবে-খােদর নিহিত সৃষ্টি মাথায় করে তুলতে
হবে।
[ প্রস্থান
পঞ্চম দৃশ্য
মােগল শিবির--
হুমায়ুনের শয়ন কক্ষ।
হুমায়ুন। (স্বপ্ন) হিণ্ডাল ! কেঁদনা। কামরান, হিণ্ডাল, ভাই।
(বেগমের প্রবেশ) তাকি পারি! হিণ্ডাল! ভাই।
বেগা। জাঁহাপনা! ( হুমায়ুন চমকিয়া উঠিলেন)
হুমায়ুন। আল্লা! আল্লা! কে ? সম্রাজ্ঞী । (উঠিয়া বসিলেন)
বেগ। আজ একি ঘুমের ঘটা জনাব । দামামার ছােট ছােট
মেঘমন্দ্রগুলি উষার বাতাসকে কম্মের পথে নাচিয়ে দিয়ে চলে গেল
সানাইয়ের কতগুলি কাকুতি প্রজার প্রতিভূ হয়ে রাজার দ্বারে গুটিকতক
অশ্রুবিন্দু রেখে গেল—কতগুলি সমবেদনা দুনিয়ার ক্ষত বক্ষে শান্তি প্রলেপ
ঢেলে দিয়ে চলে গেল
*. হুমায়ুন। তবু আমার ঘুম ভাঙ্গলাে নানয়! না, ঘুম অনেকক্ষণ
ভেঙ্গেছিল—স্বপ্ন দেখছিলাম। সম্রাজ্ঞি। সে আমার সােণার স্বপ্ন
মনে হচ্ছে আবার দেখি---আবার দেখি ।
বেগা। সে স্বপ্ন সত্য হ’ক জাহাপনা !
৪৪ ]
দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ পঞ্চম দৃশ্য হুমায়ুন। না তা ব’লনাঅধৰ্ম্ম হবে। বল, স্বপ্ন স্বপ্নই থাক সে আমার সােনার স্বপ্ন ! (সহসা বন্দুকধ্বনি) একি! এখনও যে জগতের অর্ধেক প্রাণী ঘুমিয়ে আছে ! বেগ। তাইত বােধ হয় আপনি হুকুম দিয়ে রেখেছিলেন। হুমায়ুন। হুকুম ! কেন ? না—এযে এলােমেলো (নেপথ্যে তুরীধনি) একি! এ যে বাইরামের তুরী ! এ যে মােগলের রণভেরী ( অসি লইয়া প্রস্থান ) ( নেপথ্যে—পাঠান—পাঠান) (প্রহরীর প্রবেশ) প্রহরী। চলে আসুন সম্রাজ্ঞী ! বড় বিপদ বেগা। সাবাস মােগল সাবাস! বড় বিপদ-বড় বিপদ। প্রহরী। পালিয়ে আসুন পালিয়ে আসুন—মুহূর্ত বিলম্ব করলে আর রক্ষা করতে পারব না। বেগা। বাহবা বীর, বাহবা বড় বিপদ—বড় বিপদ—যেখানে মােগল সেখানে বিপদ—যেখানে শক্র সেখানেই মােগলের পলায়ন। প্রহরী। সম্রাজ্ঞী ! পাঠান চতুর্দিকে আক্রমণ করেছে। অনেক কষ্টে এখানে আসতে পেয়েছি চলে আসুন। বেগা। বল, বল, অনেক কষ্টে, অক্ষতদেহে, পৰ্বত লঘন করে— চেয়ে দেখুন সর্বাঙ্গ ক্ষত বিক্ষত হয়ে গিয়েছে। বেগা। এনাম পাবে—ভয় কি। প্রহরী। জাহাপনার হুকুম—পালিয়ে আসুন—পাঠান এসে পড়েছে। বেগ। চ'লে যা গােলাম। তােদের ভারু সম্রাটকে ব’গে শত্রু মােগল সম্রাজ্ঞীকে ছিড়ে কুটে খেয়েছে ! [ প্রস্থান ও প্রহরীর প্রস্থান। (নেপথ্যে—আল্লাহে ধ্বনি) (ঘুমন্ত তনয়াকে লইয়া সম্রাজ্ঞীর প্রবেশ ) বেগ। কি সর্বনাশ ক’লুমকে আছ—আমার দুলারীকে রক্ষা করকে আছ রক্ষা কর (বাইরামের প্রবেশ। [ ৪৫ প্রহরী।
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ যষ্ঠ দৃশ্য
বাইরাম। চলে এস মা, এখনও বাইরাম আছে।
বেগা। বাইরাম ! তুমি আমার দুলারীকে রক্ষা কর।
বাইরাম। দাও মা—চলে এস-খােদা রক্ষা করবেন।
[ দুলারীকে লইয়া বেগে প্রস্থান।
বেগা। না—আমি যাবনা—দুজনকে তুমি রক্ষা করতে পারবে না।
আমার দুলারীকে তুমি রক্ষা কর—আমি মরব জালালের প্রবেশ
জালাল। আপনি আমার বন্দিনী।
বেগা। কে ? পাঠান! শত্রু! বন্দী করতে এসেছ ? মােগল
সম্রাজ্ঞীকে বন্দী করতে এসেছ ? কিন্তু পাঠান! এই ছুরি খানা যদি বুকে
বসিয়ে দিই। ( নিজবক্ষে স্থাপন)
জালাল। তাহলে বুঝি পাঠানের বীরত্বকে মুগ্ধ করে একটা
আসমানের রাগিনী আসমানে মিশে যাবে। কিন্তু তাতে কাজ নাই মা!
আমি চ’লুম
বেগা। না—তবে না—আমি বন্দীত্ব স্বীকার ক’বৃছি। পাঠান।
মােগলের মথিত শির দলিত কর-যন্ত্রণায় মােগল জোর করে একবার
যদি মাথা নাড়া দেয়।
জালাল। তবে এস ম !
[ উভয়ের প্রস্থান।
বর্ষা সমাগমেতরঙ্গায়িত জাহ্নবীর তীর।
( বক্ষে ঘুমন্ত শিৎ-বাইরামের প্রবেশ)
বাইরাম। এই মােগল বাবরসার সঙ্গে এসেছিলাে ।
পাণিপথেই তাহলে শেষ হয়ে যেত। সিক্রির রণভেরীতে মােগলের
প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যেত। সেগুলাে ছিল প্রাণ-এগুলাে
৪ ]
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ যষ্ঠ দৃশ্য
শুধু তার কঙ্কাল ! মােগল ! মােগল! প্রাণ নাই—সাড়া দেবে কে?
দুলারি! দুলারি! ওহােহে—এযে হাসির রাশি, ফুলের বােঝ! কাকে
দেব ! কোথায় নামাব ! বাইরাম, এ আসমানের চেরাগ মাটিতে
নামিয়াে না।
[ প্রস্থান।
(জালাল ও এক দল পাঠানের প্রবেশ)
জালাল। ডুবিয়ে মার—ডুবিয়ে মার। হাজার পাঁচেক শেষ করা
গেছে—আর হাজার তিনেক। তাহলেই বাস-ঐ পালাচ্ছে—চালাও।
(এই সময়ে দেখা গেল গঙ্গাবক্ষে একজন ডুবিতেছে ও উঠিতেছে)
হুমায়ুন। খােদা! (ডুবিয়া গেলেন—একটু পরে উঠিলেন) যে
হাতে হিন্দু গড়েছ—সেই হাতে মুসলমান গড়েছ—গঙ্গার যে হাতে জল
ঢেলেছে—মক্কায় সেই হাতে মাটী ছড়িয়েছ।
(এই সময়ে একটা ভিস্তি মূসক নিয়ে সেই স্থানে আসিল)
ভিস্তি। এটার উপর ভর দাও—এটার উপর ভর দাও।
হুমায়ুন। কে—কে তুমি? (ডুবিলেন ও উঠিলেন)
ভিস্তি। কোন ভয় নেই—বেশ করে ভর দাও।
হুমায়ুন। তুমি কি মনুয! না—মানুষ মানুকে ডুবিয়ে মারে। তুমি
খােদার প্রেরিত—যে হও—আমাকে বাঁচাও আমার বাঁচতে বড় সাধ ।
( ভিস্তি সাঁতার দিয়া মসক টানিয়া কিনারায় লাগাইল ও তীরে দাড়াইল।
হুমায়ুন কোনরূপে উঠিয়া দাঁড়াইয়া কঁপিতে লাগিলেন।) খােদা !
বেঁচেছি না মরেছি ! (দুই একপদ যাইতে, না যাইতে অচেতন অবস্থায়
ভূপতিত হইলেন, ভিস্তি বসিয়া শুশ্রুষা করিতে লাগিলকিয়ৎক্ষণ পরে
কিঞ্চিৎ সুস্থ হইয়া অর্পোখিত অবস্থায়, ভিস্তির দিকে তাকাইয়া)
হুমায়ুন। মানুষ ! ভিস্তির প্রাণে এত দয়া ! (উখান ও তন্ময়
ভাবে ) তােমার নাম ?
ভিস্তি। আমার নাম নিজাম।
[ ৪৭
দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ ষষ্ঠ দৃশ্য মণি মুক্ত। হুমায়ুন। নিজাম। বল কি চাই ? বল, অর্থ চাই ? পান্না জহরৎ—কি চাই? বল-বল-তাই দেব । ভিস্তি। একেবারে বদ্ধ পাগল—তুমি ত নাচার-ফকির। এসব. কোথায় পাবে? হুমায়ুন। আমি নাচার । আমি ফকির ! নিজাম ! আমি কে জান? আমি—আমি—না, নিজাম ! তুমিই বলবেশ করে ভেবে দেখে বল আমি কে! না—তুমি ত জান না তবে ! আকাশ ! বলে দাও আমি কে—আমার নাম উচ্চারণ করে আমার মাথায় ভেঙ্গে পড়। বাতাস! তােমার প্রলয়শ্বাসে একবার আমি কে বলে দাও। মাটি ! আমার নাম করে একবার কেঁপে উঠে ফেটে যাও—আমি তােমার গর্ভে নেমে যাই। নিজাম ! আমি কে জান? ওঃ—আসমানে গড়া বিরাটকীৰ্ত্তি। নিজাম ! আমি মােগল সম্রাট হুমায়ুন। হুমায়ুন, অর্থ কি জান? ভাগ্যবান্“ওঃ দেখলে ভাগ্য দেখলে—ঐ বর্ষার্থীতা উন্মত্ত গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করতে পারবে। (হস্ত হইতে অঙ্গুরী খুলিয়া প্রদান ) নিজাম—এই নাও—আগ্রায় যেও প্রাণদাতা! আমি তােমার নাম—মােগলের ইতিহাসে সােনার অক্ষরে খুদে রেখে দেব । [ প্রস্থান। ভিস্তি। তাইতএত আলেআরে বাবা-বা ! (সােফিয়ার প্রবেশ) সােফিয়া। হাতে কি! এ্যাঃ—এ আংটী কোথায় পেলি? চুরি করেছিস বুঝি ? ভিত্তি। না না আমায় দিয়ে গেল । সােফিয়া। দিয়ে গেল ! কে দিয়ে গেল! কেন দিয়ে গেল? ভিস্তি। একটা লােক গঙ্গায় ডুবে যাচ্ছিল—আমি তাকে তুললুম- তাই বল্পে আমি মােগল সম্রাট হুমায়ুন। ৪৮ ] দ্বিতীয় অঙ্ক:] মােগল-পাঠান [সপ্তম দৃশ্য সােফিয়া। হুমায়ুন ! কোন্ দিকে গেল? এতক্ষণ কতদূর গেছে বলতে পারিস? ভিস্তি। তা অনেকটা গেছে—ছুটে চলে গেল সােফিয়া। তােকে কি বলে গেল-- ভিস্তি। ব’ল্লে—এই আংটিটা নিয়ে আগ্রায় যাস্তুই যা চাইবি- তাই দেব। সােফিয়া। এই বলে গেল ! দেখবড় ভাল বাদশা। তুই যা’ গিয়ে বাদশাই চাইবি-বুঝলি ? ঠিক দেবে—একধার থেকে সােণা, রূপো, মণি, মুক্তো, যেখানে যা আছে, সব আতে ববিতারপর তাের যে যেখানে আছে—সবাইকে ডেকে বিলিয়ে দিবি। তাহলে আর তােদের ভিস্তিগিরি করতে হবে না। আর তাের মসকটাকে টাকার মত গােল গােল করে কাটিয়ে ব’লবি যে আমি এগুলো সােণার দামে চালাতে চাই—বুঝলি—তাহলে তাের একটা নাম থেকে যাবে। এই দিকে গেল বলি না ? [ বেগে প্রস্থান। ভিস্তি। হাঁহ-মাগীত বেশ ব’লে গেল যেতে হবে-যাক— আপাতত পিদিম জবার তেল খরচটাত বেঁচে গেলউ, এত আলো—এত আলো ! [প্রস্থান। সপ্তম দৃশ্য (মােগল সম্রাজ্ঞী বেগা বেগম) বেগা। হাতে করে বিষ খেয়েছি—ম’রতেই হবে । সাধ করে দ্যর হাতে ধরা দিয়েছিমান মৰ্যাদা সব যাবে। হায়, হায় কি সর্বনাশ ডেকে আলুম। (সােফিয়ার প্রবেশ ) সােফিয়া। কি ভাবছ বেগম সাহেবা ? [ ৪৯ ৪
দ্বিতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ সপ্তম দৃশ্য
বেগ। ভাবছিলুম একটা অতীতের ইতিহাস—এখন ভাবছি
শেরখাই বা কে তুমিই বা কে—আমিই বা কে ?
সােফিয়া। এ আর বুঝতে পারলে না মােগল সম্রাজ্ঞী ! শেখ।
একজন অত্যাচারী দ—আমি সেই দশকে দুনিয়ার রত্নের ভাণ্ডার
দেখিয়ে দিই—আর তুমি মােগল সম্রাজ্ঞী--আজ আমাদের লুষ্ঠিত রত্ন
ভাণ্ডার লুণ্ঠন করে মােগলের হাত হ’তে তােমাকে ছিনিয়ে এনেছি।
বেগা। স্বেচ্ছায় বন্দিত্ব স্বীকার করেছি—শেখার সাধ্য কি !
সােফিয়া। গর্ব ক’ববার বিষয় বটে! তা ভালই করেছিলে বেগম
সাহেবা ! তা না হলে গঙ্গায় ডুবে জাহান্নমের পথ পরিস্কার করতে হতাে।
বেগ। কেন ?
সোফিয়া। শুননি? তােমার সমস্ত সৈন্য আমরা গঙ্গার জলে
ডুবিয়ে দিয়েছি। আগ্রায় ফিরে যেতে কাউকে দিই নি। একটা পুরুষ
একটা ঘুমন্ত শিশুকে নিয়ে পালাচ্ছিল। তাদের দুজনকে এক সঙ্গে
ডুবিয়েছি। পুরুষটার জান্ বড় কঠিন ; কোন রকমে উদ্ধার পেলে
কিন্তু সেই ঘুমন্ত শিশু আহা! ঘুম ভাঙ্গতে না ভাঙ্গতে জাহামের
পথে নেমে গেল!
বেগা। ঘুমন্ত শিশু !
সােফিয়া। আহা! এক গােছ ফুলের মত ফুটফুটে—শুধুম
নাকি—দুলারি ব’লে বাদসার এক মেয়ে ছিল।
বেগ। কি নাম—কি নাম দুলারি? সত্য বলছ ?
সােফিয়া। আহা! তােমার সে কি কেউ হয় বেগম সাহেব ?
বেগা। দুলারি? দুলারি! মা আমার মা আমার-আমায়
ফেলে কোথা গেলি মা!
সােফিয়া। হা-হঃ-আমার প্রাণের ভেতর কিন্তু কোথা
হতে একটা জৌলস ফুটে উঠল বেগম সাহেবা ! হাঃহাঃহাঃ-
দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ সপ্তম দৃথ । বেগা। মা ! মা ! কেন তোকে ছেড়ে দিলুম। দুলারি! আমায় ফেলে কোথা গেলি মা ! সােফিয়া। হাস—দুলারি তােমায় বুঝি মা বলে ডাকত বেগম সাহেবা ! হ বেগ।। তুমি কি পিশাচী। সােফিয়া। হাঃ হাঃধরেছ হাঃ হাঃ-ধরেছ ঠিক-পিশাচী ছিলুম না—মানুষে করেছে। যেদিন একটা নূতন জগতের আলাে তােমাদের মুখে এসে পড়ল—একটা কীর্তির সূৰ্য্য আমাদের মাথার উপর দিয়ে রক্তের সমুদ্রে ডুবে গেল—যেদিন তােমাদের বিজয়বাদ্যে একটা ঘুমন্ত সমাৱােহ নেচে উঠল—পাঠানের জাগ্রত গরিম। হাহাকারে কেঁদে উঠে মূচ্ছ। গেল- সেই দিন–মােগল সম্রাজ্ঞি ! সেই দিন হ'তে পিশাচী হয়েছি বেগা। দুলারি! দুলারি । আর কঁদব না—তুই ত এ পৃথিবীর ন’স। তুই যে আসমানের তারা—আসমানে চলে গেছিস। দে মা ! খােদার রাজ্য থেকে মােগলের দেহে শক্তি দেমােগল প্রতিশোেধ নিক। সােফিয়া। পাঠান সে শক্তিকে ছাপিয়ে উঠেছে বেগম সাহেবা ! কিন্তু সম্রাজ্ঞি ! তুমি বড় ভাগ্যবতী—ছিলে আঁধারে—এসেছ আলােকে। মােগল সম্রাজ্ঞি ! একবার আমার পায়ে ধর—আমি তােমাকে পাঠান সম্রাজ্ঞী করে দেব। বেগা। দুর হ রাক্ষসী। দুর হ—আমায় কাঁদতে দে। সােফিয়া। হা হা যথেষ্ট সময় দেব-কেঁদে ফুরুতে পারবে বেগম সাহেবা ! এখনও বলছি সাবধান হওএই উত্থান- পতনের সূক্ষ্ম ব্যবধানে, এই জীবন-মরণের সন্ধিস্থলে দাড়িয়ে, সব ভুলে যাও। চিন্তা করবেছে নাও-আকাশ না পাতাল-অমৃত না গরল- বেহেস্ত না জাহান্নম। [ ৫১ দ্বিতীয় অঞ্চ ] মোগল-পাঠান [ সপ্তম দৃশ্য বেগা। জাহান্নম-জাহান্নম—দূর হ শয়তানি, আমার মুখ থেকে দূর হয়ে যা। সােফিয়া। যাব—যাব—তােমাকে একটু একটু করে জাহান্নমের পথে নামিয়ে দিয়ে হবে যাব। মােগল সম্রাজ্ঞি ! পায়ে ধ’তে লজ্জা হচ্ছে ! হক চেনাচক্র! একদিন আমি ছিলুম উপরে, তুমি নিম্নে--তারপর তুমি উঠেছিলে উপরে—আমি পড়েছিল নিম্নে--এখন আবার শিখর হতে তােমায় নামিয়েছি—এবার তােমায় হা হা হা-দাড়াও দাড়াও—এখনও অনেক বাকি। শােন বেগম সাহেবা-স্থির হয়ে শােন—শেরখা তােমায় দেখে উন্মাদ হয়েছে । তার আকাঙ্খ পূর্ণ কর—যদি না পার—তাহ'লে—উঃ—ভাবতে পারছি , কি বিষম সেই শাস্তি। বেগা। খােদ! তোমার শাস্তি কি শুধু দুর্বলের জন্য ! শক্তিমান যে, অত্যাচারী যে, তার কাছে তােমার শক্তিও কি নীরব নিথর! শেরখাকে অভিশাত দিতে তুমিও কি ভয় ক’বছ খােদা ! সােফিয়া। শেরখার শক্তি খােদার শক্তিকে তুচ্ছ করেছে বেগম সাহেব! সাবধান-সহ রমণী তােমার মত খােদাকে ডাকতে ডাকতে শেখার অত্যাচারে ভস্মীভূত হয়ে গেছে । (শেখার প্রবেশ) শের। মিথ্যাকথা—মিথ্যাকথা। সম্রাজ্ঞি! মােগল সম্রাট আগ্রায় পৌচেছেন। অনুমতি করুন, সসম্মানে আপনাকে সেখানে পাঠিয়ে দিই। সােফিয়া। সর্দার, উন্মাদ তুমি হাতে পেয়ে ছেড়ে দিও না প্রতিশােধ নাও। শের। প্রতিশােধ! রমণীর উপর অত্যাচার। খােদার বিপক্ষে বিদ্রোহ ! চুপ কর মা! শেরখ। শঠ, খল, বিশ্বাসঘাতক; কিন্তু সে যেদিন রমণীর উপর অত্যাচার করতে হাত বাড়াবে, সেইদিন যেন তার ৫২ ] দ্বিতীয় অঙ্ক ] মােল-পাঠান [ সপ্তম দৃশ্য দেহের সমস্ত গ্রন্থি শিথিল হয়ে যায় হৃদয়ের সমস্ত শােণিত যেন জমাট হয়ে যায়। সােফিয়া। শেরখ।! আমি তােমার পুত্রকে উদ্ধার করেছি- আমার আদেশ-প্রতিশােধ নাও। শের। স্থির হয়ে দাঁড়াও মা! দেহের সমস্ত শশাণিত তােমার পায়ে ঢেলে দিই। সােফিয়া। আমি ছাড়ব না, মুঠোর মধ্যে পেয়েছি প্রতিশােধ নেব। শের। সাবধান ভুজঙ্গিনি! বিষ-নিশ্বাস ছেড় না। মােগল সম্রাজ্ঞি। ( জানুপাতিয়া) মাতৃস্নেহ কেমন তা ভুলে গিয়েছি-উৎপীড়নের কোলে তুলে দিয়ে জননী আমার অকালে এ জগৎ ছেড়ে চলে গিয়েছেন। পিতা অবিচার করেছিলেন—বিমাতা অত্যাচার করেছিলেন—বৈমাত্রেয় ভ্রাতার। ষড়যন্ত্র করে পদাঘাতে শেরখাকে দূর করে দিয়েছিলাে। সংসারের উপর দারুণ বীতশ্রদ্ধায় তাই সেই বাল্যের ফরিদ আজ এই নির্মম শেখার মত পাষাণ হয়ে গেছে। মােগল সম্রাজ্ঞি। মার মুখ মনে পড়েছে—মাতৃহীন আমি-তুমি আমার মা, আমি তােমার সন্তান। বেগা। পাঠানবীর! পাঠানবীর! এত উচ্চে তুমি ! কে বলে তুমি শঠ, তুমি বিশ্বাসঘাতক! তুমি ত মানুষের মত আমার সুমুখে এসে দাড়াওনি। একটা বিরাট তীর্থের মত পুণ্যের জ্যোতিঃ মেখে আমার সুমুখে এসে দাড়িয়েছ। রমজানের চাঁদের আলাের মত আমার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছ। পাঠানবীর। আমি যে সব ভুলে যাচ্ছি আমি যে তােমাকে আশীর্বাদ না করে থাকতে পারছি না ! শেরখা! তােমার জয় হ’কমুক্তকণ্ঠে আশীর্বাদ করছি, মােগলের সিংহাসন তােমার হক মােগলের মুকুট তােমার শিরে শশাভিত হক। [ ৫৩
তৃতীয় অঙ্ক
*
প্রথম দৃশ্য
হুমায়ুনের কক্ষ
(হুমায়ুন, কামরান, হিণ্ডাল, দিলদার বেগম)
দিলদার। হুমায়ুন! মৃত্যু দণ্ড দাও।
হুমায়ূন। মা, মা !
দিলদার। হিণ্ডাল নরহন্তা। বিচার কর, মৃত্যু দণ্ড দাও।
হুমায়ুন। একি মূর্তি তােমার মা!
দিলদার। কর্তব্যের দ্বারে মেহের এ পাষাণ-মূর্তি। হুমায়ুন !
হিণ্ডালের অপরাধে তােমার আজ এই দশা—হিণ্ডালের অত্যাচার
ব্যাধির মত সাম্রাজ্যের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে।
কামরান। দাদা! হিণ্ডাল বালক, কুমন্ত্রণায় বিজ্ঞের প্রাণ
দিলদার। সাবধান কামরান! পাপের পক্ষ অবলম্বন কোরো না।
হুমায়ুন। কোন্ নির্জীব দেশের পাষাণ কেটে খােদা তােমাকে
গড়েছেন মা! মা! মা! তুমি যে হিণ্ডালের জননী! চক্ষে জল কই,
বক্ষে বেদনা কই মা!
দিলদার। হুমায়ুন ! কে বড় ? পুত্র, না ধৰ্ম্ম ? পুত্র বাৎসল্য, না
কর্তব্যের আহ্বান ? স্বার্থের সেবা, না সহস্রের আশীৰ্বাদ ? হুমায়ুন ।
চক্ষে জল দেখতে পাচ্ছনা—হয়ত তপ্ত অপাতে চক্ষু গলে যাবে।
৫৪ ]
তৃতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ প্রথম দৃশ্য বেদনা খুঁজছ? হয়ত বক্ষ ফেটে যাবে। তথাপি হুমায়ুন ! এ খােদার, পরীক্ষা—সাবধান। হুমায়ুন। খােদার পরীক্ষা! মা! মা! তােমার আজ্ঞা শিরােধার্য আমি শাস্তি দেব। তবু একটু অবসর দাও মা! আমি একবার চিন্তা কবুব- হিণ্ডাল। খােদা ! এমন ভাই আমাকে দিয়েছ ! দাদা, নরহন্তা আমি—মােহবশে তােমার মত ভাইয়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছি—মৃত্যু দণ্ড দাও—আমি হাসতে হাসতে প্রাণ দেব। মার কথা শুন ভাই ! মৃত্যু দণ্ড দাও। ( ক্রন্দন ) হুমায়ুন। হিণ্ডাল ! ভাই! ভাই! দুনিয়ার পায়ে ধরে তােমার প্রাণ ভিক্ষা করে নোেব। মা! মা! হিল যে আমার ভাই, আমার যত্নে গড় স্নেহ। মা ! ম! এরা যে আমার ভাই। আমার দেহের শক্তি, সাম্রাজ্যের ভিত্তি, মুকুটের জ্যোতিঃ। সেখজি! মহাপুরুষ ! স্বর্গ হ’তে ক্ষমা কর। খােদা ! তােমার কাৰ্য তুমি কর । অক্ষম আমি, আমায় শাস্তি দাও। আর মা ! তোমাকে কি ব’ মা! তুমিও ক্ষমা একবার কঁাদ মা! আমার দুলারি নাই, কিন্তু আমার ভায়ের আছে। আমার কামরান, আমার হিণ্ডাল—আমার দুর্ভাগ্যের চতুর্দিকে ভাবী সৌভাগ্যের মত দাড়িয়ে আছে। আয় হিণ্ডাল, আয় কামরান, শক্রকে দেখাই—আজ আর আমি একা নই। [ হিণ্ডালকে লইয়া প্রস্থান। দিলদার। হুমায়ুন ! হুমায়ুন ! শান্তি দিলে না! (দিয়া ফেলিলেন) তুমি যে প্রজার রক্ষক-খােদা! হুমায়ুন আজ স্নেহের দ্বারে কর্তব্যের বােঝা নামিয়ে দিলে—তুমি ক্ষমা ক্ষমা কর। ( চক্ষে বস্ত্র প্রদান, পরে) কামরান! কই কঁদছ না? কঁদ-কাদ—আর মনে মনে ঈশ্বরকে জানাও, জন্মে জন্মে যেন এমন ভাই পাও। [ স্থান।
তৃতীয় অঙ্ক ] মােল-পাঠান [ দ্বিতীয় দৃ কামরান। তাইত কি হ’ল ! ( আবদারের প্রবেশ) আবদার। আজ্ঞে, বাে’ড়ের কিস্তি মাৎ- কামরান। আবদার! ফসল না—শেষে কিনা কেঁদে জিতল। আবদার। আজ্ঞে জনাব ! সংসারে কেঁদে জেতাটা ঠিক বাে’ড়ের একবার কেঁদে ফেললে আর পেছু ফেরবার জোটি নেই। গেল গেলথাল থাকুল। একবার কাণ ঘেসিয়ে যদি ফেলতে পারেন- তাহলে আর দেখে কে—আপনার ষড়যন্ত্রও ঘুরে গেল—অশ্বচক্রও ফেঁসে গেল-বিনা খরচায় রাজা কায়দা। কামরান। আচ্ছা, ফিরে পাটে দেখা যাবে। [ প্রস্থান। আবদার। ঘাবড়াবেন না, একধার থেকে সব তাড়াবে তবে আবদার আগ্রা ছাড়বে। [ প্রস্থান। দ্বিতীয় দৃশ্য রােটাদুর্গ । ( কারাগারে—মুবাজি, অন্তরালে চাঁদ ) মুরিজ। ওগেল—সমস্ত এক হ'য়ে গেল—দুদিন পরে বুঝি মাথাটাও মাটিতে ঠেকে যাবে! তাহলে কি হবে! মৃত্যু যে তার চেয়ে ভাল, কিন্তু মৃত্যুত হবে না! চাঁদ যে আমায় রাজার ভােগে রেখেছে সে যে বন্দীর আহারের আবরণে বাদসার খানা পাঠিয়ে দেয়—সে যে আমায় মানুষ করতে চেয়েছিলো। ধিক্ মুবারিজ! জ্যেষ্ঠতাতের উপদেশ মনে পড়ছে ? কঁাদ কঁ, মৃত্যুকামনা কর পণ্ড! না- আমি মরব—লৌহ কপাটে আছড়ে পড়ে ম’রব—তাতে যদি না মরতে 3
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
তৃতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
পারি—অনাহারে ম’বুব-রমণীর অনুগ্রহে আর বেঁচে থাকতে চাইনা
ম’রব এখনই ম’বব । (লৌহকপাটে আছড়াইতে উদ্যোগ )
(ঘঁদের প্রবেশ )
চাঁদ।
মুবারিজ !
মুবারিজ। কে ? চাঁদ ! তফাৎ যাও—আমি মরব।
চঁদ। আমি তােমাকে মুক্ত করে দিতে এসেছি।
মুবারিজ। চাইনা-রমণীর অনুগ্রহ চাইনা। আমি মরব—
চাদ। মৃত্যুত তােমার হাতে নয় মুবারিজ ! তার অমিত তেজ
মানুষকে যখন দগ্ধ করতে চায়—সাধ্য কি মানুষের সে প্রকোপ সহ
করে। আবার সে কখন উদাসীন থাকে, তখন সাধ্য কি মুবারিজ ।
তাকে ডেকে আন—এই লৌহ-কপাট হয়ত ভেঙ্গে গুড়াে হয়ে যাবে।
মুবারিজ। তা যদি যায়—আমি তাহলে একবার আলােয় গিয়ে
দাড়াব—চীৎকার করে সকলকে ডেকে বলব—মুবারিজের দেহে শক্তি
আছে—তবে তার প্রাণে বড় জ্বালা সে মরবে তােমরা দেখ।
দ। আবার ঐ কথা মুবারিজ। প্রাণে এত অনুতাপ জেগেছে!
মুরারিজ। এতটা বুঝি হত না! প্রাণ বুঝি এত ক’ত না।
তুমিই কঁদতে শিখিয়েছ। চাদ! কারাগারের অন্ধকারে তােমার
করুণা, তােমার আদর, তােমার যত্ন যখন দেখতে পাই, তখন না কেঁদে
থাকতে পারি না। চঁাদ! বড় নেমে গেছি—মানুষের শক্তির বাইরে
গিয়ে পড়েছি—উপায় নাই—আমি মরব নিশ্চিন্ত হয়ে বুবলম্পট
মুবারিজের জন্য কেউ কঁদবে না।
চঁদ। কঁদবে বই কি মুবারিজ ! কেউ না কাঁদুক একজন
কদবে।
মুবারিজ। চাদ ! সে বুঝি তুমি! চাঁদ! শেরখার কন্যা তুমি
সাবধান, পশুর সঙ্গে সংস্রব রেখনা। মান মর্যাদা সব যাবে। কিন্তু
[ ৫৭
তৃতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
চাঁদ! যদি ফিতে পারতুম—তাহলে—না—গেছে—যাক—আর না—
আমি মরব ।
চাঁদ। কিছু যায় নি মুবারিজ ! পুরুষ তুমি—দেহে শক্তি আছে,
বক্ষের সাহস ফিরে এসেছে, চক্ষের দীপ্তি ফুটে উঠেছে—আর ভয় কি
মুখারিজ ! পুরুষ তুমি ঘুমিয়ে ছিলে—উঠে বসেছ। বিবেক বুদ্ধি সব
জেগেছে—আর কাকে ভয় মুবারিজ !
মুবারিজ। সত্য বলছ? ফি’রতে কি পাব?
চাঁদ। শুধু ভুলে যাও—যা চলে গেছে। শুধু ছেড়ে ফেল—জীর্ণ
বস্ত্রের মত তােমার দেহের আলস্য। শুধু মুছে ফেল চক্ষের জল। শুধু
কান পেত শুন কর্তব্যের ডাক। মুবারিজ—যাও মুক্তি তুমি
মুবারিজ। কোথায় যাব? আমি যে কারাগারে
চাঁদ। তুমি মুক্ত—যাও—জ্যেষ্ঠতাতের পায়ে ধরে ক্ষমা চাওগে-
দয়ালু পিতা আমার, তােমাকে ক্ষমা না করে থাকতে পাবেন না।
মুবারিজ। আর তুমি চাদ, আমার জন্য এই কারাগারে পচে
ম’রবে।
চাঁদ। ক্ষতি কি? আমি নারী, তুমি পুরুষ—তুমি বেঁচে থাকলে
দেশের অনেক কাজ হবে।
মুবারিজ। চাঁদ ! চাদ! এত ভালবাস তুমি আমাকে ! (হস্তধারণ)
ঈদ। বাসি-বুঝি এত ভাল কেউ বাসে না!
মুবারিজ। আর আমি তােমার মাথার উপর একটা অত্যাচারের
বােঝা চাপিয়ে দিয়ে সরে দাঁড়াব। না—তাই যাব, তা না গেলে
আমাৰ পশুবৃত্তি পরিস্ফুট হবে না ত? তাই যাব—দ! তুমি পচে মর
আর আমি—আমিও আর ফিব না চাঁদ ! আমি একবার মােগলকে
দেখাব বানিজ যুদ্ধ করতে পারে কি না। তারপর যদি শক্রর হাতে
মরতে পারি, তবেত বেহেস্ত পেলুমনা পারি—নিজের বুকে নিজে
তৃতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ দ্বিতীয় দৃশ্য
ছুরি মারব। আমি ম’রব—আর ফিরব না। তাই যাবার আগে
চাদ! এস একটিবার চুম্বন করিতে উদ্যত ও শেরখার প্রবেশ)
শের। সাবধান মুবারিজ ! চাঁদ! জান আমি তোমার দুর্দান্ত
পিতাজান এ মুক্তিদানের পরিণাম কি ?
চাদ। জানি বাবা, এই কারাগারে আমাকে পচে মরতে হবে।
শের। পাববে? বেশ করে চিন্তা করে বল—পাবে ?
চাঁদ। দুর্দান্ত পিতার দুর্দান্ত কন্যা আমি-কেন পারব না বাবা?
শের। মুবারিজ ! নারীর অনুকম্পায় মুক্তি চাও?
মুবারিজ। বড় যন্ত্রণা—উঃ মানুষে বুঝি সহ্য করতে পারে না।
শের। তাই বুঝি অবােধ রমণীর স্কন্ধে সে যন্ত্রণার বােঝা চাপিয়ে
দিয়ে চোরের মত স’রে যাচ্ছ ?
চাঁদ। না বাবা! স্বেচ্ছায় এ বােঝ। আমি মাথায় নিয়েছি।
মুবারিজ । না না—আমি জোর করে না, মিথ্যা বলে ভুলিয়ে
রেখে চোরের মত পালাচ্ছি। কিন্তু আমি আর সে মুবারিজ নই
প্রাণের ভেতর থেকে কে যেন বলছে, মুবারিজ মানুষ হয়েছে—চাঁদের
ডাকে তার বিবেক বুদ্ধি সব জেগেছে ।
শের। মুবারিজ ! কঠোরতম যন্ত্রণার জন্য প্রস্তুত হও।
মুরিজ। উঃ উঃ মরে যাব—এর চেয়ে যন্ত্রণা বুঝি পশুতেও সহ
করতে পারে না—পশুর মত ছট ফট করে মরে যাব। আমায় মুক্তি
দিন। আমি মৃত্যুর ভয়ে মুক্তি চাইছিনা -আমি মরব, মানুষের মত মনৰ
দেশের জন্য, জাতের জন্য মানুষ যেমন মাটির উপর শুয়ে তলােয়ারের উপর
মাথা রেখে মরে—সেই রকম ম’রব—আমায় মুক্তি জানু পাতিল )
শের। অসম্ভব মুবারিজ। তােমার পাপে নিরীহ অবলার
কারাদণ্ড হল।
মুবারিজ। আমার পাপে! তাহ'লে—না, সহ করব। কঠোরত
.
[ দ্বিতীয় দৃশ্য তৃতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান যন্ত্রণা সহ্ন করব। চাঁদকে মুক্তি দিন। সে যে আমার দেহে শক্তি এনে দিয়েছে—হৃদয়ে ভক্তি এনে দিয়েছে—আমার মুক্তির পথে আলাে ধরেছে। চাঁদ। বাবা! ঈদ সাধ করে এ কারাদণ্ড বেছে নিয়েছে। সে শেখর মেয়ে, যন্ত্রণাকে ভয় পায় না। কিন্তু বাবা ! তার মুঞ্জরিত বাসনা,তার মুকুলিত সাধনা-নষ্ট করে দিও না। সে যে একটা লুপ্ত রত্নের পুনরুদ্ধার করেছে—একটা সুপ্ত প্রাণকে অনেক ডাকে জাগিয়েছে। বাবা! সে যে একটা গলিত বিবেকের শুশ্রুষা করে তাকে বিচারের পথে দাড় করিয়ে দিয়েছে। বাবা! তার এ কীর্তিটুকু জগৎকে জাতে দাও-নষ্ট করে দিওনা। বাবা! মুবারিজকে মুক্তি দাও—দ সাধ করে কারাগার বেছে নিয়েছে। শের। না, তা হবেনা। আমি বিচার করে শান্তি দেব। কাউকে মুক্তি দেব না। এক কারাগারে দুজনকে আবদ্ধ করব—এক দণ্ডে দুজনকে দণ্ডিত করব! উঁদ! এই নাও মা! মা! (উভয়ের হন্ত ধরিয়া) যে আঁধারের বুকে তুমি আলাের সমারোেহ তুলে দিয়েছ—যে পাথরের বুকে তুমি দেবতার মুর্তি এঁকেছে—যে দেহে তুমি নুতন করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছ—এই নাও মা! সে দেহ আজ হতে তােমার। মূরিজ ! ভ্রাতুপুত্র আমার নিষ্ঠুর নই আমি-কৰ্ত্তব্যের অনুর্বোধে মেহেয় এই অত্যাচার, অভিমান ক’রনা বাপ! আজ পূর্ণ আমার কামনা-ফল গদের সাধনা। [ প্রস্থান। মুরিজ। ঈদ! ঈদ ! (আলিঙ্গন) চাদ। মুরিজ! মুবারিজ ! (গীত) বাহুতে দাও ধরা বাহু বাড়ায়ে, ওগাে সাধনার ধন, মাণিক রতন, অঙ্গে হােগো জড়ায়ে, আজি পুলকে ভূলােক কঁপিয়া, জানাক জগৎ ব্যাপিয়া হৃদয়ের প্রীতি, মিলনের গতি, যাক গাে বিশ্বে ছড়ায়ে। (আজি) বাঁধনে মিলন, মিলনে বাঁধন, অটুট হ’ক ধরায় এ। তুমি-জনমে জনমে, জীবনে মরণে, রেখ রেখ তব চরণ ছায়ে ।
তৃতয়ী অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ তৃতীয় দৃ
তৃতীয় দৃশ্য
আগ্রা দরবার গৃহ।
(হুমায়ুন, কামরান, হিণ্ডাল, বাইম, মন্ত্রী প্রভৃতি সভাসদ ও নিজাম)
হুমায়ুন। বল কি চাই ? তােমার যা প্রাণ চায়—মণি, মুক্তা, পান্না,
জহরৎ-না, তা কেন-তােমার যা ইচ্ছা বল, প্রাণ খুলে বল, ভয়
ক’রনা-সঙ্কুচিত হ’য়ােনা—নিজাম ! তুমি আমার প্রাণ দিয়েছে—তুমি যা
চাইবে, তােমায় তা দিতে প’রব না ! নিশ্চয় পা’রব !
নিজাম। তাইত কি নিই—মণি মুক্তো কত নেব।
না-সেই
মাগী বলেছিলো রাজ্য নিতে—যা নিলে ধন দৌলতও আসবে—বাদসাই
স্ফুর্তিও হবে। বেশ ব’লে দিয়েছে।
হুমায়ুন। ভাবছ ? ভাব, বেশ করে ভেবে বলভয় করনা,
সঙ্কুচিত হয়েন।।
নিজাম। জনাব ! আমাকে বাদশাই দিন।
হুমায়ুন। বাদশাই কেন ?--মণি মুক্ত। পান্না জহরৎ—যত ইচ্ছা চাও
না নিজাম ! না না—অপরাধ হয়েছে। নিজাম! বন্ধু! অভিমান
ক’রনা। আমি শুধু ভাবছিলুমমােগলের সিংহাসন আর, আমায়
ক্ষমা কর। নিজাম ! তােমায় অর্ধদিনের জন্য সিংহাসন ছেড়ে দিলুম,
আজকার রাজকার্য্যের ভার তােমার উপর—এস (বসাইয়া দিলেন)
মন্ত্রি। রাজার আজ্ঞা পালন কর।
[ প্রস্থান।
কামরান। মুখ মুখ তুমি মােগল সম্রাট। [ কামরানের প্রস্থান।
বাইরাম। সব যদি যায়, এটুকু কীৰ্ত্তি বুঝি কখনও যাবে না! [প্রস্থান।
হিণ্ডাল। এত উচ্চে! এ যে ধারণার অতীত ! ধন্য সম্রাট! ধন্য ভাই।
[ প্রস্থান।
[ ৬১
[তীয় দৃশ্য তৃতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান নিজাম। এইবার একটু স্ফূৰ্তির জোগাড় দেখ মন্ত্রি ! গােল গাল টুকটুকে এক ঝাঁক মেয়ে মানুষ—গালে টোকা মরলে রক্ত ফেটে পড়বে। আহাহা ! হুকুম কর-হুকুম কর ! এত গুলো লােক এসেছে, এরাও একটু আরাম পাবে । মন্ত্রী। যথা আজ্ঞা জাহাপনা। [ প্রস্থানােস্থত। দরবারস্থিত ব্যক্তিগণ। হায়! হায়! আমাদের দশায় কি হবে। মন্ত্রী। ব্যস্ত হয়ােনা সব-সবুর কর। [প্রস্থান নিজাম। (চারিদিকে তাকাইয়া) বা, বা, বা-দিনের বেলায় চাঁদের আলাে! ঝুড়ি ঝুড়ি নক্ষত্তর যেন কে চারিদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। বাহবা কি বাহবা ! দেওয়াল গুলাে অবধি হাসছে! বাবা, একেই বলে বাদসাই-ভাবনা নেই—চিন্তে নেই—সােণার বিছানায় শুয়ে-মণি মুক্তোর বালিস মাথায় দিয়ে, পান্না জহরের হাওয়া খেতে খেতে—কেবল মেয়ে মানুষের গান শােনাে-কেবল মেয়েমানুষের গান শােনো-কেবল মেয়েমানুষের গান শােনাে। (গাহিতে গাহিতে নর্তকীদল আসিল) (গীত ) আমার প্রেমের ভিখারিণী। বিয়ােগে মিলনে, কুটীরে ভবনে, তােমাদের অনুগামিনী। (আমরা) প্রখর রবির প্রখর কিরণ পারা। (মােরা) বরিষার মেঘ ঢালিগাে অমিয় ধারা। (আমরা) আঁধারে জমি হয়ে দিশেহারা। (মােরা) আলো ধ'রে ডাকি “এসো পথহারা ॥” কত সাধিয়ে, কত কঁদিয়ে, শেষে ভুলায়ে সবারে পথে আনি। (মােরা) বিনামুল্যে করি যা কিছু দান । (আমরা) প্রতিদানে শুধু শিখায়েছি অভিমান। : ভালবাসা বাসি, প্রাণে মেশামিশি। (দুটো) মিষ্ট কথার কাঙ্গালিনী। ৯] : **** তৃতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ তৃতীয় দৃশ্য নিজাম। ও হাে হো—কোতল কর, কোতল কর, ধর ধর—তােমরা আমায় ধর। নর্তকী। বক্সিস জনাব ! নিজাম। আহাহাত৷ আর ব’তে। মণি মুক্তো পান্না জহর দিয়ে বড় বড় গরুর গাড়ী বােঝাই করব আর এক এক খানার উপর এক একজনকে বসিয়ে নিয়ে যাব। নর্তকী। তবে আমরা চলুম জনাব ! [ প্রস্থান নিজাম। আহাহা ! গেলে গা গেলে ! তা যাও—শুধু রূপে ত পেট ভরবে না—কিছু দানা যোগাড় করে নিই, তারপর তােমাদের সঙ্গে চিহি ক’বুব। মন্ত্রি ! মন্ত্রি ! (মন্ত্রীর প্রবেশ) আমি খয়রাত করব, গরীব দুঃখীকে আমি বিলুব’। দুথলে মণি—চা’র থলে মুক্ত, ছথলে পান্না, আটথলে জহর, দশথলে সােনার ট্যাকা আমাকে এনে দাও। আমি নিজের জন্য কিছু চাই না। মন্ত্রী। যথা আজ্ঞা জাহাপনা। ( যাইতে উদ্যত ) নিজাম। আর একটা কথা, আমার যড়টা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, তার পিঠে একটা মসক চাপান আছে—সেটা থেকে সােণার ট্যাকার মাপে গােল গােল করে কেটে নিয়ে এস, আমি সেগুলােকে সােণার দামে চালাতে চাই। (মন্ত্রীর প্রস্থান। এ সব আমার চাই ব’লেও পারতুম—সেটা ভাল দেখায় না। বেড়ে ফন্দি খাটান গেছে—দেওয়া যাক ফাক করে—মাগী খাল . বলে দিয়েছে কিন্তু বাবা! ছুড়ী ছুড়ী কটাকে না কটাকে না বাগিয়ে যাচ্ছিনা। যাক দরবারস্থিত ব্যক্তিদিগের প্রতি ) ওহে, তােমরা আর কেন ? আর গান হবে না। আজ—সরে পড় সব দেখতে এসে মিনি পয়সায় তামাসা-পেট ভরিয়ে খেতে চাও যে! সয়ে পড়- • [ [ তৃতীয় দৃশ্য •• তৃতীয় দৃশ্য ] মােগল-পাঠান ১ম ব্যক্তি। তামাসা দেখতে আসিনি সম্রাট। আমাদের সর্বনাশ হয়েছে। ২য় ঐ। প্রাণের দায়ে এসেছি জাহাপনা ! তৃতীয় ঐ। আমরা ধনে প্রাণে মরতে বসেছি জনাব! তামাসা দেখতে আসিনি। বহুব্যক্তি। বিচার করুন জনাব! বিচার করুন—অমমাদের রক্ষা করুন। (মন্ত্রী ও অর্থের থলি লইয়া দুই তিন জন প্রবেশ করিল ) নিজাম। এনেছ ? বেশ করেছ ; কিন্তু এই লোক গুলো বড় চীৎকার করছে মন্ত্রি। এদের বিদেয় করে দাও। মন্ত্রী। এরা দুর্দশাগ্রস্ত প্রজা, দরবারে প্রাণের বেদনা জানাতে এসেছে। নিজাম। বাদশার কাছে ! মন্ত্রী তবে কার কাছে আসবে জনাব! প্রজার কর্মসূত্র যে রাজারই কর- ধৃত। (বাইরামের প্রবেশ) বাইরাম। জনাব! শেরখা মােগল রাজ্য আক্রমণ করে দেশ ধ্বংস করছে—আদেশ করুন। নিজাম। শেরখা! সে কে ? না না এসব আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আমাকে জব্দ করবার জন্য এ সব মতলব ! বাদশার কাৰ্য এ সব নয়- এই সব ঝাঁক ঝাঁক মেয়ে মানুষের গান শুতেই ত দিন রাত ফুরিয়ে যাবে-সময় পাবে কোথায় ? বাইরাম । এ সব বাদশার কাজ নয়। তবে কার ? লক্ষ লক্ষ প্রাণের শুভাশুভ যার আজ্ঞাধীন, এ কাজ তঁার নয় ! না—একাজ সেই মহাপুরুষের। বড় গুরুভার বাদশার দায়িত্ব নিজাম। মন্ত্রি! মন্ত্রি ! তােমাদের বাদশাকে ডাক। মন্ত্রী। জনাব ! ( ইতস্ততঃ করিলেন ) নিজাম। এই রকম করে বুঝি তােমরা বাদশার হুকুম তামিল ১৪ ।
তৃতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ তৃতীয় দৃশ্য
কর? যাওডাক—কেন শুনবে ? তোমাদের বাদশাকে আমি কোতল
করব।
(হুমায়ুনের প্রবেশ)
হুমায়ুন। এই আমি এসেছি—হুকুম কর নিজাম !
(নিজামের দ্রুত অবতরণ ও হুমায়ুনের পদধারণ )
নিজাম। জনাব! জনাব ! আমায় রক্ষা করুন।
হুমায়ুন । একি ! একি।
নিজাম। পায়ে ধরি—মাপ করুন জনাব! আমায় এক মাগী শিখিয়ে
দিয়েছিল জনাব ! আমি চোর, ডাকাত, মিথ্যাবাদী।
হুমায়ুন। নিজাম! বন্ধু ! একি, তুমি এমন করছ কেন?
নিজাম। দোহাই জাহাপনা, ছােট লােক আমরা, মনে ক’তুম
রাজ রাজড়ারা পরের পয়সায় কেবল ঘূৰ্ত্তি করে নয়—তাঁদের
মাথায় বড় ভারি বােঝাসে বােঝ পড়লে শুধু রাজার ঘাড় ভাঙ্গে না-
সেই বােঝার চাপে হাজার হাজার প্রজা প্রাণে মারা যায়। দোহাই
জনাব ! রক্ষা করুন। আমি শুধু আপনাকে ফাকি দিইনি, আপনার
অমূল্য সময় নষ্ট করেছি—হাজার লােকের অনিষ্ট করেছি—আপনার
জিনিস আপনি ফিরে নিন—আমায় বিদায় দিন।
হুমায়ুন । না নিজাম ! ঠিক বলেছ—যথার্থই রাজা রাজড়ারা
প্রজার রক্তপাতে আনন্দ করে। মন্ত্রি! শুধু এ ধন রত্ন নিজামের নয়-
তাকে জায়গীর দাও। সমাগত প্রজাদের বলে দাও—আমি অপরাহ্নে
দরবার ক’বব আর দেখ, তাদের যেন কোন কষ্ট না হয়—নিজাম! এস,
কোন ভয় নাই—
নিজাম। না জনাব! আমি কিছু চাই না [ সকলের প্রস্থান।
দরবারস্থিত ব্যক্তিগণ । জয় হক-বাদশার জয় হক। [ প্রস্থান।
[ ৩
তৃতীয় অঙ্ক ] মােল-পাঠান [ চতুর্থ দৃশ্য চতুর্থ দত জঙ্গল মধ্যস্থিত ভগ্ন মসজিদ (সােফিয়া ও আদিল আসিয়া প্রবেশ করিল ) অদিল। এ যে নিবিড় জঙ্গল। সােফিয়া। ভয় হচ্ছে ? হাতে তলােয়ার রয়েছে—বাঘ যদি বেরােয় কাটতে পারবে না? আদিল। এ জঙ্গলে বাঘের চেয়ে তােমার আমার মত মানুষকেই ভয়। সােফিয়া। কেন? এ কথা কেন আদিল ! আমি কি তােমার কখনও কোন উপকার করিনি ? আদিল। তুমি উপকার করনি! তুমি আমার প্রাণ রক্ষা করেছ। সােফিয়া। তবে আমায় অবিশ্বাস কেন আদিল ? আদিল। তবে কাকে অবিশ্বাষ করব ? সূলতান-কন্যা! সরল উদার সেই বালকের মােহনমূৰ্তি ভুলতে পারিনি। সাহাজাদি ! সে কি তুমি ! সে যে মুক্ত আকাশের মত নির্মল—তুহিনের মত শীতল-দর্পণের মত স্বচ্ছ —ফুলের একটি গুচ্ছ! সাহাজাদি! সেই তুষারের মাথার উষার মুকুট, আগুনের ফুল্কি দিয়ে কি করে সাজালে! সেই সুরভিসিক্ত সিগ্ধ শ্বাসে বিষের জ্বালা কি করে মেশালে । সােফিয়া। এই কথা আদিল ! এস, আমায় বিশ্বাস কর। এখানে শুধুই যে বাঘ ভালুক থাকে, তা নয়। আদিল। বুঝেছি সাহাজাদি ! একটা অতীত গরিমা খােদার আশর্বাদ বুকে করে পড়ে আছে। কিন্তু আমায় এখানে কেন ? সােফিয়া। তােমায় দেখাতে, যে প্রাণে শুধু হিংসার কোলাহল- বিষের গর্জন শুনেছ—শহরে লহরে সেই প্রাণে কত আনন্দ উৎসব, কত প্রেমের রাজ্য, কত মিলন গীতির সৃষ্টি হচ্ছে।
তৃতীয় অঙ্ক ] মোল-পাঠান [ চতুর্থ দৃশ্য আদিল । বিচিত্র কি নারি ! সৃজন প্রভাতে সমস্ত বৈচিত্রটুকু যে তুমিই চেয়ে নিয়েছিলে! আশ্চৰ্য্য কি নারি! বক্ষের কটাহে স্নেহের উত্তাপে হৃদয়ের সমস্ত শশাণিত গলিয়ে সুধার উৎসে তুমিই ত সৃষ্টির মুখে ঢেলে দাও—তরুণ সৃষ্টি আকণ্ঠ পান করে তােমারই করুণায় অরুণ কিরণে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। আবার তুমিই ত নারি! সৃষ্টির বুকের উপর দাড়িয়ে তাণ্ডব নৃত্য কর—হিংসার গর্জনে প্রলয়কে ডেকে আন। সােফিয়া। আদিল ! আমি তােমায় ভালবাসি। আদিল। হৃদয়ের সমস্ত রক্ত দিয়ে পূজা করলেও বুঝি তার প্রতিদান হয় না। প্রাণদাত্রি! আমিও তােমায় ভালবাসি। সােফিয়া। ভালবাস? ভালবাস? (উঠিয়া দাড়াইলেন)। আদিল । এ দেহ যে তােমার সাহাজাদি ! ভালবাসব না । তবে এস আদিল ! পায়ের তলায় এ মাটী নয়—এ তীর্থের রেণু, মক্কার মাটী—সম্মুখে এই ধৰ্ম্মরাজের জয়পতাকা। এস আদিল । শপথ করি—আজ হ’তে আমি তােমার তুমি আমার। আদিল। সে কি—অসম্ভব—( উঠিয়া দাড়াইলেন) ৮ সােফিয়া। অসম্ভব কেন আদিল ! অতীতই একদিন বৰ্তমান ছিল ভিখারিণীরই একদিন ঐশ্বৰ্য্য ছিল। আদিল। সম্রাট নন্দিনি । আজ যদি প্রথম দেখা হত, তাহলে হয়ত আদিল ভুলে যেত। কিন্তু সুন্দরি ! আমি যে দেখছি-এক চক্ষে তােমার উদাস দৃষ্টি–অন্য চক্ষে কুটী সৃষ্টি ! এক চক্ষে ধারা তােমার এক চক্ষে হাসি ! আমি যে শুনেছিলক্ষ গীতির মধুর ঐক্যতান- আবার পাছে পাছে লক্ষ যুগের প্রলয়ের গান! কেমন করে বিশ্বাস করব কেমন করে তােমায় জীবন সঙ্গিনী করব নারি! না—তা পারব না। সােফিয়া। আদিল ! আদিল ! ভেঙ্গে দিও না। (৬৭ তৃতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ চতুর্থ দৃশ্য দুঃথ—কিসের আদিল। ভুলে যাও। শক্তিরূপিণী নারি ! এস, পাঠানকে জাগাবে এস। সােফিয়া। আদিল ! যাও—চলে যাও। আদিল। তাই যাই—বৈচিত্রময়ী নারি । তােমাদের এক এক কণা বৈচিত্র দিয়ে পৃথিবীর বিস্ময় গুলি বুঝি গড়া [ প্রস্থান। সােফিয়া। ভেঙ্গে গেল ছিড়ে গেল—আদিল ! আদিল । না- কেন ? অশ্রু, ঝ’রাে না-পুড়ে যাবে সব। কিসের হাহা-রব-হাস হাস-আনন্দ কর । (গীত ) ভেঙ্গে গেছে মাের সােণার স্বপন ছিড়ে গেছে মাের বীণার তার। ( আজি )হৃদয় ভরিয়া উঠিছে কেবল মরমভেদী হাহাকার। যেদিকে তাকাই (শুধু ) নাই নাই নাই সকলি গিয়াছে চলিয়া। আছে বাকী শুধু জীর্ণ স্মৃতিটুকু তাই লয়ে মরি কাঁদিয়া । ফুটে গেছে আ, মিছে কেন আশা ফিরে আশা নাহিক আর । এ কি গান গাইলুম! এ যে ব্যথায় বেজে উঠল-ক্ষোভে কেঁদে উঠল। আদিল ! আদি! ( পিস্তল হস্তে গাজিখার প্রবেশ ] গাজি। এই যে এসেছি—শয়তানি ! খুঁজে পেয়েছিকে তােকে ; সােফিয়া। কে ? চিনেছি—চিনেছি—মা’রবে; না মরতে চাও? [ ৬৮ ]
[ চতুর্থ দৃশ্য
তৃতীয় অঙ্ক ]
মোগল-পাঠান
(ক টীবন্ধ হইতে পিস্তল বাহির করিল) নানা পিস্তল নিক্ষেপ ) মার
মারবড় জ্বালা (নিজের বক্ষ চাপিয়া ধরিল)
গাজি। মা’রব না! শয়তানি! এই মর—
( পিস্তলের ঘােড়া টিপিতে গেল, সহস। আদিল আসিয়া
গাজিখাকে গুলি করিল )
গাজি। ইয়া-আল্লা—মৃত্যু)
সােফিয়া। কে ? আদিল ! কেন আমায় বঁচালে কেন আমায়
ম’তে বাধা দিলে ? না—আদিল! না—আমি মরবতােমায় ভালবাসি
আমি—এস—সঙ্গে যাবে এস-সঙ্গে যাবে এস
( পিস্তল কুড়াইয়া আদিলের প্রতি লক্ষ্য করিল)
বিস্মিত হ’য়ােনা—নারী আমিবল—কেন আমায় বঁচালে?
আদিল। হত্যায় ক্ষেপেছ—উন্মাদিনি! শুন নারি! আজ ঋণ
পরিশােধ।
[ প্রস্থান।
সােফিয়া। (কিছুক্ষণ পরে) কইহাতের পিস্তল হাতে রয়ে গেল
-মা’রতে ত পারলুম না। না—যাও একা আহিল হয়ে
তােমাকে অনুসন্ধান ক’বুববিভিন্ন মূর্তিতে তােমার সুমুখে পড়ার
প্রয়ােজন হয়, ঘৃণ্য বারবিসিনীর বেশে তােমার গায়ে ঢলে পড়ল।
দেখব’ সে আক্রমণ তুমি কেমন করে প্রতিহত কর—দেখব আদিন।
তুমি আমার প্রান কি না!
(ফকিরের প্রবেশ)
ফকির। প্রেমে পড়েছ মা !
সসাফিয়া। হাঁ বাবা ! অন্যায় হয়েছে কি!
ফকির। কাজ বাকী রয়েছে যে মা !
সােফিয়া। কাজ সেরে এসেছি—আর যাব না।
ফকির। (কুদ্ধভাবে) সেরে এসেছিস। তাের সমস্ত চেষ্টা বৃথা
[ ৬৯
তৃতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ চতুর্থ দৃশ্য
হয়েছে। এতদিন যে হিণ্ডালকে তুই হুমায়ুনের বিরুদ্ধে উত্তেজিত
করেছিলি, সেই হিণ্ডাল আবার ভায়ের সঙ্গে মিলেছে তাদের মিলিত
শক্তিতে কাঙ্গীর রণক্ষেত্রে শেরখ পরাজিত হয়েছে। হুমায়ুনের অর্থবল
হানি করতে ভিস্তিকে তুই পাঠিয়েছিলি—সে রাজ্য হাতে পেয়ে ছেড়ে
দিয়ে এসেছে—সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
সােফিয়া। বেশ হয়েছে—কাজ সেরে এসেছি, আর যাব না।
ফকির। অভিমান করেছি—আবার বলছিস্ সেরে এসেছি
পাঠান যে অতল তলে তলিয়ে যাচ্ছে—শেরখ। যে উন্মাদ। মােগল যে
পাঠানের প্রতিপত্তি একেবারে নষ্ট করতে মহাসমারােহে যুদ্ধ আয়ােজন
করছে।
সােফিয়া। যাক ডুবে যাক—কিসের দুঃখ ।
ফকির। কিসের দুঃখ ! সুলতান কন্যা ! পাণিপথের বক্তছবি
মনে পড়ছে না! পিতার ছিন্ন মুণ্ড !
সােফিয়া। চুপ কর চুপ কর, ফকির-চেঁচিও না—
ফকির। চেঁচাব না! অভিমানে সব পণ্ড করছি—কাজ সেরেছি।
কঁদছিস যে! কঁাদকঁদ—দূর হয়ে যা—
সােফিয়া। বাবা। কি করি! অভিমান ভুলে যাব ?
ফকির। আগুন ছোেটা
সােফিয়া। তাই যাই বাবা ! একবার দেখি, যদি ফিরাতে পারি।
ফকির। যা মা! পাঠানের এ জীবন মরণের সন্ধিস্থল। যেটা
ছেড়েছে, সেটা গ্রহণ কর ; যেটা ধরেছে, সেটা ছেড়ে দাও।
সােফিয়া। না বাবা! হুকুম কর—দুটোই নিয়ে কর্ম-সমুদ্রে ঝাপিয়ে
পড়ি।
ফকির। ডুবে যাবি।
সােফিয়া। ডুবে যাব! কিন্তু এ যে বড় কঠিন
.]
তৃতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ পঞ্চম দৃশ্য ফকির! কঠিনটাই সহজ করে নিতে হবে। যাও মা! সময় বয়ে যায়। সােফিয়া। তাই হােক ফকির, কঠিনটাই বেছে নিলুম—পারি কিরি। [ প্রস্থান। ফকির। যাও নারি [ প্রস্থান। পঞ্চম দৃশ্য যুদ্ধ ক্ষেত্রের অপর পার্শ্ব । (জালাল ও পশ্চাৎ পশ্চাৎ মুবারিজ আগমন করিলেন। জালাল। ধন্য তােমার সাহস মুবারিজ ! ধন্য তােমার যুদ্ধ কৌশল। আজ তুমি পাঠানকে রক্ষা করেছ। মুরিজ। কোথায় রক্ষা করেছি—এখনও দুর্দান্ত গােলন্দাজ কমিখার সাক্ষাৎ পাওনি জালাল! এস, পঁড়িয়ােনা—হুমায়ুন কোথায় অনুসন্ধান কর, বন্দী করে নিয়ে যেতে হবে। আজকার যুদ্ধ জয়ে পাঠানের অভ্যুত্থান-পরাজয়ে পতন—এস ছুটে এস ! [ প্রস্থান। (হুমায়ুনের প্রবেশ) হুমায়ুন। ভারতবর্য! ভারতবর্ষ ! লক্ষ বীরের জন্মভূমি, লক্ষ কীর্তি-কিরীটিনী! তুমি না কবির কবিতা, যুগের প্রতিভা ! তুমি না পুণ্য জ্যোতির হিরণ কিরণ-তরল স্নেহের পূত ক্ষরণ ! আজ এ কি মূৰ্ত্তি ! তুফানে বিমানে একি এ নৃত্য-রন্ধ্রে রন্ধে একি এ ধ্বনি! ওঃ- বুঝেছি—আজ তুমি একটা যুগ পালটে দিতে বসেছ—একটা জাতিকে চির বিদায় দিতে সেজেছ! বুঝেছি—আজ মােগলের পালা এসেছে- তাই বুঝি আকাশে বাতাসে আজ বিষের জ্বালা—তুফানে তুফানে অভিসম্পাত ! (সৈন্যের প্রবেশ) [৭১ !
তৃতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[পঞ্চম
সৈন্য। জনাব! হাতী ত’য়েরি।
হুমায়ুন । কে তুই ? হাতী সাজাতে কে তােকে বললে?
সৈন্য। পাঠানের গুলিতে ছুটতে ছুটতে ঘােড়াটা মরে গেল দেখে,
গােলাম জনাবের জন্য
হুমায়ুন। না না চ'লে যা গােলাম, অনেক জানােয়ার মেরেছি
আর না
সৈন্য। আপনাকে দেখলে ছত্রভঙ্গ মােগল প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করবে।
হুমায়ুন। করবে! ঠিক বলছিস? তবে চ—তবে চল্।
( যাইতে উদ্যত ও পিস্তল হস্তে আবদারের প্রবেশ)
আবদার। যাবেন না—ও হাতী পাঠানের-আপনাকে বন্দী করে
নিয়ে যাবার ষড়যন্ত্র হয়েছে। এ লােকটা পাঠান
( আবদার গুলি করিলেন)
সৈন্য। (নেপথ্যে) ইয়া আল্লা-পতন ও মৃত্যু)
আবদার। দেখলেন জনাব ! চলে আসুন
হুমায়ুন। তাইত—কিন্তু আমি ঐ হাতী চড়ব—আমায় দেখতে।
পেলে বিশ্বাসঘাতক মােগল প্রাণ দিয়ে যুদ্ধ করবে না। না না, আমি
ধরা দেব—আমি ঐ হাতী চড়ব-বড় জালা—
আবদার। জনাব, জনাব, দাড়ান। মাহুতটা মল বটে শক্ত
লুকিয়ে আছে কিনা দেখতে হবে। (প্রস্থান ও রুমি আলি)
রুমি। মােগল পালাচ্ছে আগে ভীরু মােগলগুলােকে গুলি কর
আ নইলে শৃঙ্খলা আসবে না। তারপর পাঠানকে দেখাও, রুমি। কেমন
গােলন্দাজ সৃষ্টি করেছে। (তুৰ্য্যধ্বনি) দাসত্ব করতে বড় ভালবাসি
আমি কিন্তু শুধু ঘৃণ্য দাসত্বের ধূলা সর্বাঙ্গে মেখে ফিরে যেতে চাই না।
আমি চাই—প্রভুর উমতির প্রত্যেক সােপানটিতে বীরের পায়ের চিহ্ন রেখে
যেতে-অবনতির প্রত্যেক রাতে পরাজয়ের গরিমা মাখিয়ে রেখে যেতে।
২]
ঘৃতীয় অৰু] মােগল-পাঠান [ পঞ্চম দৃ (নেপথ্যে। বাইরামবাইরাম-কমিখরুমিখ রুমি। একি জাহাপনার কণ্ঠস্বর । জনাব! জনাব! (প্রস্থানােত) (সােফির প্রবেশ ও পগৎ হইতে রুমিখাকে আহ্বান ) সােফিয়া। মিখা! কমিখা। রুমি। (কিছুক্ষণ স্তব্ধ থাকিয়া ) রূপ, না এ ছবি! সােফিয়া। রুমিখা! চিনতে পারছ না বুঝি? তা পারবে কেন পুরুষ যে তুমি রুমি। কখম, না এ বংশীধ্বনি! রুমিখ! কই—এত রূপ ত কখন দেখিৰিতবে কেমন করে ব’বে চিনি-না সাবধান ( প্রকাশ্যে ) সুন্দরি ! সােফিয়া। তাই কি! সে চক্ষু কি তােমার এখনও আছে মিখা? রুমি।/ (স্বগত) একি! এ যে প্রেমের ছবি—ছবির গান ! রুমিখা! বুঝি কঠিন জীবনের অবসান আজ ! সােকিয়া। বাহাদুরসাকে মনে পড়ে? রুমি। পড়ে বই কি সুন্দরি! (স্বগত) কিন্তু কই, এ রূপ ত সেখানে দেখিনি- নাস্তা কেন—এ অযাচিত সৌভাগ্য—মাথা পেতে নাও খি! (প্রকাশ্যে) সুন্দরি! মনে পড়েছে—মনে পড়েছে সোফিয়া। কাকে ধন্যবাদ দেব ? তােমাকে না খােলদাকে ? রুরি। তুমি এখানে কেন সুন্দরি ? সােফিয়া। তুমি এখানে কেন রুমিখা? কমি। গােলাম আমি-প্রভুর আজ পালন করতে এসেছি। সােফিয়া। তােমার বাহাদুর সা থাকতে পারে মানুষ থাকতে পারে+আমার কি কেউ থাকতে নেই পাষাণ ! রুমি। (স্বগত) বুঝেছি, আমায় উপলক্ষ্য। (প্রকা) বেশ —আর কিছু বলবার আছে? সুন্দরি। থাকে, প্রাণ খুলে বল, [ ৭৩ তৃতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ পঞ্চম দৃশ্য আমি দাড়িয়ে শুতে প্রস্তুত আছি । থাকে বল-আমার বড় তাড়াতাড়ি। সােফিয়া। তাত হবেইনাযাও, আর কিছু বলার নাই। রুমি। বেশ, তাহলে (স্থান করিতে করিতে ফিরিয়া) সুন্দরি ! বেশ ক'রে ভেবে দেখে তােমার যা প্রাণে চায় আমাকে বল- (সােফিয়া গম্ভীর হইলেন, রুমিখ। দুচার পা যাইয়া ফিরিল) সুন্দরি ! আমার বিবেক বুদ্ধি সব আছে, বলপ্রাণ খুলে বল কিছু যদি ব’লবার থাকে একটু ভাব, হয়ত মনে পড়বে—তাহলে ( যাইতে যাইতে পশ্চাৎ ফিরিয়া দেখিতে লাগিল ) তাহ'লে—তাহলে প্রায় বাহির হইয়া যায় এমন সময়ে সােফিয়া। শােন শােন আমার মনে পড়েছে। রুমি। (দ্রুত আসিয়া) বলবল—তাইত বলুম, ভাবলেই মনে পড়বে। সােফিয়া। বিবেক বুদ্ধিহীন রুমিখ।! প্রভু যে তােমায় আৰ্ত্তকণ্ঠে আহ্বান করলে ! কই গােলাম ! প্রভুর উদ্ধারে গেলেনা ! বিবেক যে তােমার তুচ্ছ রমণীর রূপের পায়ে তার কর্তব্যের বােঝ নামিয়ে দিলে ! মুখ রুমিখ! এই বিবেক নিয়ে তুমি গােলামী করতে এসেছ? গােলাম! এই বুদ্ধি নিয়ে মােলকে রক্ষা করতে এসেছ? রুমি। একি! সােফিয়া । ভয় নাই, কাম কুকুর! মিত্র মিত্র নই আমি—শত্রু। আমি মােগলের শত্রু—তােমার শত্রু। যাও মূখ। এখনও যাও—দেখ, তােমার কর্তব্য ত্রুটিতে হুমায়ুন বুঝি গঙ্গার জলে ডুবে যায়। (নেপথ্যে তুর্যধ্বনি—রুমিখা চমকিয়া উঠিল) পাঠান। রুমিখাকে বশী কর। [ বেগে প্রস্থান ]; রুমি। এ্যাঃ এ্যাঃ—শয়তানি—শয়তানি গুলি করিল) (নেপথ্যেহাঃ হাঃ হাঃ-ব্যর্থ ব্যর্থ রুমিখা ) ১৪ ] পাঠান।
তৃতীয় অঙ্ক ] মোল-পাঠান [ ষষ্ঠ দৃশ্য জাহ্নবীতীর । (হুমায়ুনের প্রবেশ) হুমায়ুন। আবার জেগেছিল—হাতীর পীঠে বাদশাকে দেখে ভীরু মােগল আবার যুদ্ধে মেতেছিল—আবার পাঠান ডুবছিল- হাতী মরে গেল— অপদার্থ মােগল আবার ডুবে গেল । মােগল ! যুদ্ধ কর—হুমায়ুন মরেনি এখনও, বেঁচে আছে—যুদ্ধ কর । - (শেরখাকে প্রবেশ ) শের। এইবার পেয়েছি—এস হিন্দুস্থানের ভাগ্যবিধাতা! অস্ত্র ধরে আজ শেরখর হস্ত হতে তােমার সাধের সাম্রাজ্য রক্ষা কর । ( আক্রমণ উদ্যোগ ) নানা—অস্ত্রাঘাত করব না—তুমি ত শুধু মােগল সম্রাট নও—তুমি যে সেই হুমায়ুন—বিলাসী হলেও—তুমি সৎ, মহৎ। সাম্রাজ্যে শৃঙ্খলা স্থাপনে অসমর্থ হলেও—তুমি উদার, মহাপুরুষ। তুমি এত সৎ, এত মহৎ, যে এই অভিশপ্ত সংসারে বিমাতার আশীৰ্বাদ লাভে সমর্থ হয়েছ বৈমাত্রেয় ভ্রাতাদের দেহের শােণিতের মত যত্ন করেছ। মহান্ উদার বাদসা ! নগণ্য ভিস্তিকে তুমি মােগলের সিংহাসন ছেড়ে দিয়েছেন। এ আদর্শ আমি নষ্ট করে দিতে চাই না। এস বাদসা ! সন্ধি করি আজ হতে এ মােগল রাজ্য অর্ধেক মােগলের—অর্ধেক পাঠানের। হুমায়ুন। আর—তুমি—পাঠানবীর, তুমি ! তুমি যে শত্ৰুপত্নীকে আয়ত্তের মধ্যে পেয়েও একটু সুবিধা নাওনিমা বলে ডেকেছে—শত্রু হয়েও শত্রুর মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখেছে। অর্থবিজয়ী বীর ! খােদা যখন আজ দু’হাত ধরে তােমাকে সিংহাসনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন—তখন সন্ধি [ ৭৫,
তৃতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
করে তােমার এ বিজয় অরিমার হ্রাস করতে চাই না। এস পাঠানবীর !
অস্ত্র ধর—যুদ্ধ করে আজ পূর্ণ বিজয়ের অধিকারী হও।
শের। মা বলে ডেকেছি-না—তােমার অঙ্গে অস্ত্রাঘাত করতে
পারব না। মােগল সম্রাট ! এ বুকে বড় জালা—যাকে স্পর্শ করবে সেই
জলে যাবেনা—আমি এই নিশ্চেষ্ট পঁড়িয়ে রইলুম।
হুমায়ুন। কিন্তু শত্রু তুমি—আমি তােমাকে ছেড়ে দিতে পারি না।
শের। কর সম্রাট! তবে আক্রমণ কর--এই আমি স্থির দাঁড়িয়ে
রইলুম—যখন বড় অসহ্য হবে—শুধু আত্মরা করব—তােমাকে হত্যা
করব না।
হুমায়ুন। তাহলে আমিই বা তােমাকে কি করে আক্রমণ করি।
শের। তবে কাজ নাই—আক্রমণ প্রতি-আক্রমণে সম্রাট। যাও
বাদসা ! ভবিতব্যতার উপর নির্ভর করে আবার মােগলকে উত্তেজিত
করগে—এস ভাই! মােগল পাঠানকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে আবার দুজন
দুজনের বিরুদ্ধে অগ্রসর হই—ভাগ্যে যা আছে, তাই হক।
পাঠান! পাঠান! মােগলকে আক্রমণ কর।
[ প্রস্থান।
হুমায়ুন। ভাগ্যবান্ হুমায়ুনকে এ আবার কি এক নূতন দৃশ্য
দেখালে খােদা! না-না-শর মহত্বে মুগ্ধ হয়ে শক্তি হারিয়ে না
হুমায়ুন! মােগল ! মোগল ! আক্রমণ কর, পাঠানকে ধ্বংস কর।
• ( প্রস্থান ও মুবারিজের প্রবেশ)
মুবারিজ। সৈন্যগণ! এখনও 'সম্পূর্ণ বিজয়ী হতে পারনি।
এখনও একবার মােগল জিতছে, একবার পাঠান জিতছে—এখনও
পাঠান জীবন-মরণের সন্ধিস্থলে দাঁড়িয়ে আছে—করআক্রমণ কর।
জীবিত বা মৃত হুমায়ুনকে বন্দি করে নিয়ে চল।
(মুবারিজের প্রস্থান ও সােফিয়ার প্রবেশ)
সােফিয়া। পাঠান। পাঠান। আবার বাদসা হাতী
তৃতীয় অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ ষষ্ঠ দৃশ্য আবার মােগল প্রাণ পেয়েছে। কোন দিক লক্ষ্য কর না-সমস্ত: শক্তিতে শুধু বাদসাকে আক্রমণ কর। তাহলেই জয় । [ প্রস্থান। (মিও গেম এম) কইরাম বালকাের দেখতে পাই নি ? রুমি কই আর ত দেখতে পাচ্ছি না। (আবদারের প্রবেশ ) আবদার। সর্বনাশ হয়েছে, একটা হাতী মরে গেল—আবার: একটা নূতন হাতী সংগ্রহ করে বাদশাকে অনুসন্ধান ক’ছিলুম, বাদশাকে পেয়েছিলুম সেনাপতি। বাদশা হাতীর উপর চড়তে না চড়তে, অসংখ্য পাঠান আমাদের পেছু নিলে, হাতী ক্ষেপে গেল— আমাকে ফেলে দিয়ে হাতীটে জাহাপনাকে নিয়ে গঙ্গায় ঝাপিয়ে পড়ল উচু পাড় ভেঙ্গে হাতীটে উঠতে পারলে না—এই ধারে ভেসে আসছে। বাইরাম। ঐ যে ঐ যে আবদার। হাতীর পিঠে ঐ যে বাদশা। ঐ যে মহাত্মা বাবরশার কীর্ভিস্মৃতি -একটা মুমুর্য জাতির জীর্ণ কঙ্কাল ! করেছিস্ কি গঙ্গা! আবার গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিস! না না, তা হবে না—বাইরাম বেঁচে থাকতে তা পারবি না—এই তাের উদর বিদীর্ণ করে কেমন করে আজ বাইরাম বাদশাকে রক্ষা করে দেখ। (ঝম্প প্রদান ) আবার। রুমি! এক্ষেপে প্রদ র করি। r শত ৮ (সসাফিয়া, মুরিজও সৈন্যগণের প্রবেশ) সোফিয়া। কোথায় যাবে কি- ঝাপিয়ে, (#f মুবারিজ ! আক্রমণ কর আবদার। পারলুম না, সেনাপতি! তােমাকে সাহায্য কতে পারলুম না-খােদার কাছে হ’তে শক্তি চেয়ে নাও। রক্ষা করবাদশাকে [ ৭০
তৃতীয় অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ ষষ্ঠ দৃশ্য
সে একটি
রক্ষা কর। যত আবদারের শক্তি থাকবে, ততক্ষণ
প্রাণীকেও জলে নামতে দেবে না।
(যুদ্ধকরণ )
সােফিয়া। সকলে মিলে আক্রমণ কর-আবদারকে হত্যা কর।
আবদার। উঃ—আর পারলুম না সেনাপতি ! বাদশাকে রক্ষা কর
প্রভুকে রক্ষা কর। (পতন )
সােফিয়া। বাস—এইবার সকলে এই গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়–ঐ
হুমায়ুন ভেসে যাচ্ছে—ঐ বাইরাম তাকে রক্ষা করতে গঙ্গায় ভেসেছে-
ঝাঁপিয়ে পড়, ঝাঁপিয়ে পড়–দুজনকেই টুটি চেপে ধরে গঙ্গার জলে
ডুবিয়ে মার।
সৈন্যগণ। আল্লাহােঝম্প প্রদানে উদ্যোগ )
(বেগে শেরখার প্রবেশ )
শের। সাবধান—একটি পা যে জলে দেবে—তাকে আমি হত্যা
করব। স্থির হয়ে দাড়িয়ে দেখ সব—দুনিয়ার ঐশ্বৰ্য্য—দুনিয়ার গৌরব,
গঙ্গার জলে সৰ্ব্ব বিসর্জন দিয়ে প্রাণের দায়ে হজরতের নাম নিচ্ছে।
সাবধান—একপদ কেউ অগ্রসর হয়ােনা—রাজ্য নিয়েছি-প্রাণ নেব
। স্থির হয়ে দেখ-মানব-জীবনের এক একটি অঙ্কের সমাপ্তি কেমন
চর্থতু অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
অগ্রা প্রাসাদ।
শেখ শাহ উপাধি ধারণ করিয়া সিংহাসনে উপবিষ্ট।
পুত্রগণ, ফকির প্রভৃতি চতুর্দিকে দণ্ডায়মান
ফকিরের শিষ্যগণ কর্তৃক সঙ্গীত।
L
গীত।
এস হে মহান, কীর্তিগরীয়ান, নবীন সাজে সাজিয়া,
এস শিশুর অধরে হাসির মতপড়গাে বিশ্বে গলিয়া
এস আঁধার জীবনে সােণার উষা, খােদার আশিস বাণী,
আজ বেদনা ভাঙ্গিয়া উঠুক বিশ্বে গভীর মঙ্গল ধ্বনি,
এস বিশ্বপ্রেমের গানের মত, আকাশ বাতাস ব্যাপিয়া,
এস হে মহান, কীর্তিগরিয়ান নবীন সাজে সজিয়া ।
. এস প্রকৃতির মত দয়া মায়া ফুলে সারাটি অঙ্গ ঢাকিয়া,
বস বিচার আসনে বিকেকের মত ন্যায়ের দণ্ড ধরিয়া,
কর পুণ্যের সেবা, কীর্তির পূজা, দুষ্টেরে কর বলিদান,
দাও তৃষ্ণার জল ক্ষুধার আহার পীড়িতেরে কর ত্রাণ,
জনকের মত গম্ভীর হইয়া, জননীর মেহে গলিয়া,
এস হে মহান্ কীর্তিগরীয়ান্ নবীন সাজে সাজিয়া।
ফকির। শেরশা! খােদার কৃপায় আজ তুমি জয়ী-একটা
রিমার আভা তােমার মুখে ফুটে উঠেছে—একটা মহিমার সমারােহ
{ ৭৯
চতুর্থ অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ প্রথম দৃশ্য
তােমার সাধনার পথে নেচে চলেছে। শেরশা! ধন্য তুমি! ধন্য তােমার
সাধনা।
শের। খােদার কৃপায়—আপনার আশীর্বাদে।
ফকির। কিন্তু তুমি রাজা নও শেরশা! তােমার মুকুটের জ্যোতি
-ঐশ্বর দীপ্তিও রাজা নয়। তােমার সিংহাসন, বাহুর শক্তি, অসির,
তীক্ষ্ণতাও রাজা নয়। যদি প্রজার সুখে তৃপ্তি পাও-প্রজার দুঃখে
কঁদতে পারতবেই তুমি রাজা। যদি পিতার মত গম্ভীর বেদনা বুকে
করে—মাতার মত তরল আশীৰ্বাদ সঙ্গে নিয়ে সিংহাসনে বসতে পার—
তবেই তুমি রাজা। তা না হলে রাজ্যের ব্যাধি তুমি—মহামারী তুমি
অভিসম্পাত তুমি।
শের। একটা জাতির উৎসাদন করে—একটা যুগের কীর্তি নষ্ট
করে—আমি সিংহাসনে বসেছি। আমি রাজা নই-প্রজার গােলাম।
ফকির। না শের! গােলামেরও জীবনে স্বাধীনতা আসে-তােমার
জীবনে স্বাধীনতা কখনও আসবে না। তুমি গােলাম নও শের! তুমি
রাজ্যের জনক-জননী—তুমি বিবেকের দাস-বিবেকের শুশ্রুষা করতে
তােমার জন্ম।
শের। তরবারি স্পর্শ করে শপথ করছি-প্রজার দুর্দশা, দেশের
অভাব, রাজকর্মচারীদের অত্যাচারের কথা আমাকে যে জানাবে-তাকে
আমি প্রচুর পুরস্কার দেবরাজপদে প্রতিষ্ঠিত ক’বব-বন্ধু বলে আলিঙ্গন
করব।
ফকির। শের! পূর্ণ হবে কামনা তােমার !
[ প্রস্থান
সভাসদ। জয় সম্রাটের জয়
( মুরিজের প্রবেশ )
মুবারিজ। জ্যেষ্ঠতাত! কামরান, পাঞ্জাব ছেড়ে দিয়ে আমাদের
সঙ্গে সন্ধি করেছে।
৮. ]
[ প্রথম চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান শের। সামান্য পাঞ্জাবের লােভে তুমি সে শয়তানকে শান্তি না দিয়ে ফিরে এলে? সে মহাপাপ করেছে—ভাই হয়ে ভাইয়ের সর্বনাশ করেছে কি করলে মুবারিজ ! এমন শাস্তি দিয়ে এলেন, যা, শেরশার রাজত্বে বিভীষিকার মত, ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে ভয় দেখাবে ! মুবারিজ। আমায় ক্ষমা করুন জ্যেষ্ঠত। তার স্ত্রী পুত্র কন্যার কাতর ক্রন্দন আমি উপেক্ষা করতে পারলুম না। শের। দু ফোটা চোখের জলের অনুরােধে মস্ত বড় একটা কর্তব্য ভুলে এসেছ! যাক—কিন্তু এ আমার মনের মত হলো না মুবারিজ ! জালাল! এবার বন্দী বাইরামকে নিয়ে এস। জালাল। যথা আজ্ঞা। [ প্রস্থান। (বন্দী বাইরামকে লইয়া জালালের প্রবেশ) শের। বন্ধন খুলে দাও-বন্ধন খুলে দাও। ( সিংহাসন হইতে অবতরণ ও স্বয়ং বন্ধন উন্মােচন) শের। বাইরাম ! বল তুমি কি চাও? বাইরাম। কিছু চাই না সম্রাট। নিজের জীবন বিপন্ন করে, বাদশাকে তাঁর স্বাধীন জীবনের নূতন অধ্যায় আবৃত্তি করতে দিতে পেরেছি, আর আমি কিছু চাই না সম্রাট। শের। কিছু চাও না? ব্যাঘ্রের গহ্বরে এসে দাঁড়িয়েছ, শত্রুর হাতে পড়েছ, কিছু চাও না ! বাইরাম। না সম্রাট! আমি মুক্তি চাই- শের। মুক্তি চাও! আশ্চর্য! বেশ যদি তােমায় মুক্তি দিই, তুমি কি করবে বাইরাম ? বাইরাম। কি করবো ? না—নাব’লবাে«কটু হলেও বলবাে। আমি বাদশাকে অনুসন্ধান ক’রবাে সম্রাট! শক্তি কোথায় খুজবাে।
[ প্রথম দ চতুর্থ অঙ্ক । মােগল-পাঠান নূতন করে মােগল সাম্রাজ্য স্থাপন করবাে, এবার এমন করে গড়ব, যা দেখে পাঠান আতঙ্কে মাটিতে বসে পড়বে। শের। স্পর্ধার কথা বাইরাম! এত সাহস। কিন্তু মনে পড়ে সেই মােগল সম্রাট বাবরশার রাজত্বের দিন ? আমি সামান্য সৈনিকের কাৰ্য ক’তুম। তােমরা যা করতে পারতে না আমি তা সম্পাদন করতুম। কিন্তু তােমরা বাবরশার কাছে, আমার সে বিজয় গরিমা বিকৃত হবে নিজেদের করে নিতে, তারপর উৎপীড়নে লাঞ্ছনায় গঞ্জনা অaষ দূর করে দিতে চেষ্টা করতে। বাইরাম। মনে পরশেরখা—আজ বাদশা তুমি—সে অত্যাচারের আজ ভাল করে প্রতিশােধ নেবে, তাও জানি। উন্মাদ আমি, তাই তােমার কাছে মুক্তি চেয়েছিলুম। না—কিছু অন্যায় হবে না—আজ বাইম যদি শেরশা হত, তা হলে সে আজ বড় কঠিন শাস্তি বাই- রামকে দিত। শের। শাস্তি দিতে? সত্য বলছ ? বাইবামসত্য বলছি—এমন শাস্তি দিতুম, যাতে সে বুঝতে যে সে মস্ত : ৬ টা মহাপাতকের সৃষ্টি করেছে। শের। কিন্তু আমি তােমায় শান্তি দেব না বাইরাম! আমি বন্ধু বলে আলিঙ্গন করলুম। ভাই! তুমি ত আমায় শত্রুর মত লাঞ্ছিত করনি—উৎপীড়নের আবরণে আমার দেহে শক্তি ঢেলে দিতে! বন্ধু । সে লাঞ্ছনা, সে গঞ্জনা, সে উৎপীড়ন, আমার পুরুষকার জাগিয়ে দিত- নূতন সঙ্কল্পে দৃঢ় হ'তে ব’ত-নূতন অধ্যবসায়ে সে সঙ্কল্পকে কার্ষে পরিণত করতে উৎসাহ দিত। যাও বাইরাম ! মুক্ত তুমি। বাইরাম। এ কি সম্ভব! না, না, মুক্তি দিও না বাদশা! মুক্তি দিলেও বাইরাম কৃতজ্ঞ হতে পারবে না। তার প্রাণে বড় আশা, বড় সম-সে বেঁচে থাকলে পাঠানের মস্ত বড় একট। কণ্টক থেকে যাবে।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান শের। কে কবে কোন্ দেশে পাঠানের ভাগ্যাকাশে ধূমকেতুর মত উদয় হবে বলে শের আগে হ’তে তার উচ্ছেদ করতে চায় না। যাও বাইরাম ! যাও বন্ধু! প্রাণে যখন তােমার এই অতুল অধ্যবসায়-- এমন আকাঙ্খা-এমন দৃঢ় সঙ্কল্প,তখন যাও প্রভুভক্ত বীর ! তােমার বাদশার অনুসন্ধান করগে। শােক-দুঃখের আগুনে তােমার সােনার বাদশার বিলাসী প্রাণটুকু পুড়িয়ে খাটী করে নিয়ে এস—পার যদি তােমার 'এ জীবনব্যাপী অধ্যবসায়ের রংএ রং ফলিয়ে কণ্ঠহারের মত ভারতের বক্ষে দুলিয়ে দাও। ভারত আদর করে বক্ষে ধরে থা’—পাঠান সসম্রমে তার সম্মুখে মাথা নােয়াক্। যাও বন্ধু মুক্ত তুমি। বাইরাম। আশা করিনি-মৃত্যু স্থির করে শুধু তােমায় পরীক্ষা করতে আমি মুক্তি চেয়েছিলুম- চেয়েছিলুম-পরীক্ষায় কৃতকাৰ্য বীর ! মহান্ উদার বাদশা ! পাঠানসাম্রাজ্য চির অক্ষুন্ন থাক বলে বাইরাম আশী- ৰ্ব্বাদ করতে পারবে না। তবে বাইরাম পাঠানের হয়ে থােদাকে জানাচ্ছে—যতদিন ভারতে শেরশা থাকবে, ভারতবর্ষ যেন শেরশার যশােগান করে—যতদিন ইতিহাস থাকবে, শেরশার নাম যেন সে আদর করে বুকে ধরে থাকে। দ্বিতীয় দৃশ্য যােধপুর ( মল্লদেব, কুম্ভ, হুমায়ুন ) হুমায়ুন। একটু আশ্রয় রাজা! মহান উদার, রাজপুত রাজ। একটু করুণা—ক্ষুধায় পেট জলে গেলেও আহার চাইব না—অশ্রুজলে চক্ষু ভরে গেলেও কেঁদে তােমার গৃহে অশান্তি জাগাবনা—শুধু একটু আশয়-ম’তে পারছিনা বলে শুধু একটু আচ্ছাদন ! মদেব। ক্ষমা করুন সম্রাট। আমি নির্বিবাদে থাকতে চাই- L [ দ্বিতীয় দৃশ্য চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান বয়সেনা-উৎপাত, উপদ্রব আমি সহ্য করতে পারব না—যান এস্থান ত্যাগ করুন। কুম্ভ। ব’লছেন কি মহারাজ! রাজপুতের জীবন নিয়ে জন্মেছেন, ক্ষুদ্র উপদ্রবের ভয়ে আশ্রয়প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করে, রাজপুতের ইতিহা, কটা উপদ্রব রেখে যেতে চান—অগ্রগামী রাজপুতকে সমস্ত জাতির পশ্চাতে ঠেলে ফেলে দিয়ে যেতে চান। মদেব। রাজপুতের নাম ইতিহাসে যা’তে, অক্ষুন্ন থাকে, আমি তাই ক’ছি, তর্ক ক’রনা। যান সম্রাট। বিবেচনা করে দেখেছি আমি আশ্রয় দিতে পারি না। হুমায়ুন। দয়ার্জছিড়ে আর একবার বিবেচনা করুন মহারাজ ! আজ দীনহীন নমুন-আপনার দ্বারে একটু আশ্রয়—একটু সহানুভূতি একটু কার জন্য যুক্তকরে দণ্ডায়মান। রাজা! পথশ্রমে আমি ক্লান্ত আমার সর্বন্ধ অপহৃত-সৰ্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত—শ মিত্রের আশ্রয়দাতা রাজপুত ! একটু আশ্রয়—একটু দয়া মদেব : না করে আমি নিজের সর্বনাশ ডেকে আনতে পারি —যান সম্রাট! দয়া করে এ স্থান ত্যাগ করুন—আমি পারব না। পা’রতেই হবে মহারাজ! রাজ্য, ঐশ্বৰ্য্য, আত্মীয়, স্বজন সর্বস্ব বিনিময়েও রাজপুতের এ গরিমা উজ্জ্বল রাখতে হবে। এমন সুযােগ আর আসবেনা রাজা! রাজপুতের ইতিহাস কীৰ্ত্তির অক্ষরে খচিত করতে রাজপুতের জীবন সহস্রগুণে গৌরব-বিমণ্ডিত করে দিতে এমন দিন আর পাবেন না। দিন মহারাজ—অশ্রয় দিন আজ হিন্দুস্থানের ভাগ্য বিধাতাকে আপনার কুটীরে আশ্রয় দিয়ে ধন্য হন। রাজপুতের মত লক্ষ বিপদ তুচ্ছ করে রাজপুতের নামের সার্থকতা জগতকে দেখান। মদেব। একজন উন্মাদের উপর তাহলে এতদিন সেনাপতিত্বের [ দ্বিতীয় দৃশ্য চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান ভার দিয়ে এসেছি। তােমার নিজের শক্তির কথা একবার ভাবছন- কেবলনা—এ তােমার উদারতা নয় কুম্ভ-এ তােমার উন্মত্ততা। (কমলার প্রবেশ ) কমলা। উন্মত্ততা ! এই সজীবতা উন্মত্ততা বাবা! তাই যদি হয়—তবে বল বাবা, এই উন্মত্ততায় রাজপুতের সমস্ত ইতিহাসখনা গড়া কি না—সিন্ধুরাজ দাহিরের আত্মবিসর্জন হ’তে রাণা সংগ্ৰামসিংহের জীবন-সংগ্রাম পর্যন্ত একটি করে পাতা উল্টে দেখ বাবা—এক একটি গুরু গম্ভীব উন্মত্ততায় আত্মহারা হয়ে এক একটি মহাপুরুষ—এক একটা রাজপুত কৰ্মবীর সর্বস্ব পণ করে স্থিরলক্ষ্যে ছুটে চলে গেছেন—তারা জয় পরাজয় কাকে বলে জানতেন না বাবা! [কুরুক্ষেত্রের সেই মর্মবাণী, মাধবকণ্ঠ নিঃসৃত সেই মহান মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে, অন্যায়ের বিপক্ষে বিবেকের খঙ্গ উচ্চ করে স্ফীতবক্ষে তাঁরা অগ্রসর হয়েছেন—কত যুগ চলে গেছে, কিন্তু রাজপুতের কীৰ্ত্তি মলিন হয়নি—পৃথিবীর ‘পরমায়ুর সঙ্গে সঙ্গে সেই কীর্তি উজ্জল হ'তে উজ্জ্বলতর হচ্ছে।] মদেব। রাণা সংগ্ৰামসিংহের শত্রুর বংশধর-না-কিছুতেই না— কমলা। ভুল করেছ—সে দিন চলে গেছে বাবা! গুজ্জর সম্রাট সেই দুর্দান্ত বাহাদুর সার অত্যাচারের কথা স্মরণ কর—মহারাণা সংগ্রাম- সিংহের বিধবা মহিষী রাণী কর্ণাবতীর কাহিনী ভুল না—সেই পবিত্র রাখীর কথা স্মরণ কর। আজ তােমার দ্বারে কে বাবা। সেই প্রবল পরাক্রান্ত মােগল বাদশা সেই দয়ার্দ্রচিত্ত, পরদুঃখ-কাতর, হিতব্রত হুমায়ুন—যিনি রাণী কর্ণাবতীর রাখী ঈশ্বরের আশীর্বাদের মত গ্রহণ করে-সমস্ত রাজপুতের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন যিনি বাহাদুর-হস্ত হ’তে রাণা সংগ্রামের চিতাের রক্ষা করে আমাদের মুখ উজ্জল করেছিলেন—যা তােমর। পারনি বাবা—যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে তা সম্পাদন করেছিলেন। শত্রু নয় বাবা! বিধাতার চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বিতীয় দৃশ্য ভবিতব্যে যে বাবরশা একদিন রাজপুতের বক্ষ তাদের চক্ষের জলে সিক্ত করেছিলেন-তাঁরই পুত্র—এই মহাত্মা হুমায়ুন—দু হাত দিয়ে সেই অশ্রু যে মুছিয়ে দিয়েছিলেন বাবা! মল্লদেব। চুপ কর কমলা ! আমাকে আর শিক্ষা দিতে আসিস্ নে । সরল কথা তােরা কিছুতে বুঝবি না! শক্তি কোথা? শেরশা মােগলের এত বড় একটা শক্তিকে যখন নিমেষে চুরমার করে দিলে—তখন সে শক্তির বিরুদ্ধে দাড়াতে মদেবের শক্তি কোথা? কমলা। শক্তি আকাশ থেকে নেমে আসবে বাবা ! একবার অভয় দাও, একবার ভাই বলে ডাক, একবার বুকে জড়িয়ে ধর—দেখতে পাবে, দেবতার শক্তিতে তােমার হৃদয় ভরে উঠেছে—প্রতি শিরা উপশিরায় রাজপুতের রক্ত নৃত্য করছে প্রতি লােমকূপ দিয়ে সে শক্তির উত্তেজনা ফুটে বেরুচ্ছে। আশ্রয় দাও বাবা! বাদশা আজ ফকির হয়েছে—আশ্রয় দাও। প্রয়ােজন হয় আশ্রিতের জন্য প্রাণ দিয়ে এমন কীর্তি সঞ্চয় করে যাওযা সহস্র পৃথিবী জয় করলেও উপার্জন করতে পারবে না—যা দ্বাপরে অষ্টবস্ত্র সম্মিলনে পাণ্ডব-গৌরবের মত রাজপুতের ইতিহাসকে পুরাণের মহিমায় মহিমান্বিত করে রাখবে মলদেব। নানা-অসম্ভব। সম্রাট—আমার উচিত আপনাকে বন্দী করে শেরশার হস্তে সমর্পণ করা—কিন্তু আমি রাজপুত —তা ক’ব না—সময় দিচ্ছি, যা’ন সম্রাট ! এই মুহূর্তে এ স্থান ত্যাগ করুন-নতুবা কমলা। তাহলে আমি আশ্রয় দিলুম বাবা—এস সেনাপতি ! বিকৃত-মস্তিষ্ক রাজার গৌরব অক্ষুন্ন রাখ প্রয়ােজন হয়, উন্মত্ত রাজাকে বন্দী কর। রাজপুতবীর! বর্মের মত আশ্রিতের শরীর শত্রুর আক্রমণ হতে রক্ষা কর—আসুন বাদশা ! আজ আপনি আমাদের অতিথি। মদেব। হুমায়ুন ! হুমায়ুন ! জানতুম তুমি সৎ মহৎ উদার سا চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বিতীয় দৃশ্য কিন্তু একি তােমার অত্যাচার! দুর্ভাগা বাদশা ! ভাগ্যদোষে নিজের রাজ্য হারিয়েছ—আজ আবার একটি শান্তি-কুটিরে অন্তবিপ্লবের আগুন জেলে দিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চাও ! দেখছ কি–কন্যা পিতৃদ্রোহী, সেনাপতি রাজদ্রোহী—আর একটু পরে- হুমাযুন। ঠিক বলেছেন মহারাজ! এই আমি চলুম- কমলা। কোথায় যাবেন বাদশ! হুমায়ুন। পথ ছাড় মা! প্রাণের ভেতর দারুণ আশঙ্কা জেগেছে। পথ ছাড়—শক্তি পেয়েছি যেতে পা’ব ছেড়ে দাও মা আমার সঙ্গে সঙ্গে হাহাকার চলেছে—পালও—পালাও—আমাকে যেতে দাও। এখানে আর নয়-না, এখানে কেন—এ দেশে আর নয়—এ ভারতবর্ষে আর নয়। পিতৃভূমি সেই তুর্কস্থান অভিমুখে চললুম—যতদিন সুযােগ না পাই, ততদিন আর এ ভারতবর্ষে নয় । { প্রস্থান। কমলা। উঃ। আজ রাজপুতের কীর্তিস্তম্ভ একটি আঘাতে তুমি ভেঙ্গে দিলে বাবা ! রক্তে গড়া একটা পবিত্র সমৃদ্ধি ওর ভয়ে আবর্জনার সঙ্গে মিশিয়ে দিলে ! কিন্তু স্থির জে’ন রাজা! যে শেরশার ভয়ে তােমার কম্পিত বিবেক আজ কৰ্তব্য ভুলে গেল—সেই শেরশার হন্ত হ’তে তুমি পরিত্রাণ পাবে না। ঐশ্বৰ্য্য-মদমত্ত পাঠান অচিরেই রাজপুতের ধ্বংসে ছুটে আসবে। একটা না একটা মূর্তিতে এ হাপাপের প্রায়শ্চিত্ত বিচারের দেশ থেকে নেমে আসবে। ( মুবারিজের প্রবেশ) মুবারিজ। সময় বড় কম—তাই অনুমতির অপেক্ষা করিনি, আমার বেয়াদফি মাপ করবেন। ময়। আপনার পরিচয় ? মুরিজ। পাঠান-সম্রাট শেরশার ভ্রাতুপুত্র আমি—আমার নাম মুবারিজ। t, [ দ্বিতীয় দৃ চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান মঙ্গ। এ্যাঃ এ্যাঃ—কি প্রয়ােজনে এসেছেন সাজাদা! মুবারিজ। বিশেষ কিছু নয়—তবে একটা কৈফিৎ নিতে এসেছি। কমলা। দাও বাবা ! যুক্তকরে জাম পেতে বসে পাঠানকে কৈফিয়ৎ দাও—কমলার আবেদন আকাশে পৌচেছে-হুমায়ুনের দীর্ঘশ্বাসে দেবতার প্রাণে ব্যথা জেগেছে। দাও বাবা! কৈফিয়ৎ দাও মল্ল। কই, জ্ঞানতঃ কিছু অপরাধ ত করিনি—কৈফিয়ৎ মুবারিজ। গুরুতর অপরাধ—হুমায়ুনের পশ্চাদ্ধাবন করে আপনার রাজ্যাভিমুখে আমরা ছুটে আসছিলুম-আশা করেছিলুম হুমায়ুনকে বন্দী করে আমাদের হস্তে সমর্পণ করবেন; কিন্তু শুলুম নির্বিঘ্নে হুমায়ুন এ রাজ্যের উপর দিয়ে চলে গেছে। শীঘ্র এর কৈফিয়ৎ দিন- মল। কে বল্পে ? না না—কই আমি ত এ সব কিছু কমলা। সাবধান বাবা! রাজপুতের জিহ্বায় মিথ্যা বলাে না। পাপের বােঝা আর বাড়িয়াে না বাবা! যে পাপ করেছ, তা রাজপুতকে সহ যােজন নিম্নে নামিয়ে দিয়েছে। এখনও সময় আছে—বৃদ্ধ রাজা! বুকের ভেতর থেকে তােমার জড়ত্ব দূর করে ফেল—হৃদয়ের দুর্বলতা নিংড়ে বার করে দিয়ে রাজপুতের ভঙ্গিমায় সােজা হয়ে দাড়াও। শুনুন সাজাদা ! মােগল সম্রাটকে আশ্রয় দেওয়া উচিত ছিল আমাদের ; কিন্তু সামর্থ্য অভাবে তা পারিনি-আমরা তাকে ছেড়ে দিয়েছি পালিয়ে যেতে সুবিধা করে দিয়েছি। প্রয়ােজন হয়- মুবারিজ। আমাকে রাজার সঙ্গে কথা কইতে দাও মা! মূল্প । না না—আর প্রয়ােজন নাই—আমারও ঐ কথা—'কে ছেড়ে দিয়েছি, বেশ করেছি—যান সাজাদা! আর কিছু শুনতে গই । শেরশাকে বলুনগে রাজপুত এর কৈফিয়ৎ অস্ত্রের মুখে দেবে। যান মুবারিজ। উত্তম-তবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন। [ প্রস্থান মল। আমায় ক্ষমা কর কুঙ্ক!
চতুর্থ অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ তৃতীয় দৃষ্ণ
কুম্ভ। রাজা! আজ এক নবীন উৎসাহে আমার বক্ষ ফুলে
উঠেছে—আনন্দে আমার বাকশক্তি রুদ্ধ হয়ে আসছে—আজ আমরা
আপনাকে ফিরে পেয়েছি।
চলুন রাজা-রাজপুতকে শক্ত উপেক্ষা
করেছে—রাজপুতকে শত্রু কুটা দেখিয়েছে—চলুন রাজা, সে কুটী-
কুটীল চক্ষু উপড়ে ফেলে দিতে হবে।
মল্প। চল সেনাপতি—চল মা কমলা--আর একবার জ্বলে উঠবি
চল—অকর্মণ্য বৃদ্ধ রাজাকে আজ যেমন করে ক্ষেপিয়ে দিলি, তেমনি
করে সমস্ত রাজপুতকে ক্ষেপিয়ে দে। গুরু গম্ভীর উন্মাদনায় রাজপুত
আবার একখানা ইতিহাস গড়ে ফেলুক।—বেজে উঠ মা! দ্বাপরের সেই
পাঞ্চজন্য শঙ্খের মত বেজে উঠ-রণােন্মাদে মত্ত করে সমস্ত রাজপুতকে
শত্রুর বিরুদ্ধে চুটিয়ে দে—শত্রু মুচ্ছিত হয়ে রাজপুতের পদতলে
লুষ্ঠিত হক।
সকলের প্রস্থান।
তৃতীয় দৃশ্য
পাঠান শিবির।
(শেরশা, জালাল মুবারিজ)
শের। বল কি মুবারিজ ! যােধপুরের রাজা মদেব হুমায়ুনকে
তার অধিকারের ভেতর পেয়েও ছেড়ে দিলে ! অধীনতা স্বীকার করা
দূরের কথা—এত বড় একটা উদ্ধত অপরাধের জন্য একবার মার্জনা
চাইলে না! মােগলের প্রচণ্ড শক্তিকে আমি নিমেষে বিপৰ্য্যন্ত করে
দিলুম, এ দেখেও একটু ভয় খেলে না! আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা
জালাল। মােগলে আর রাজপুতে একটু তফাৎ আছে বাবা।
{
[ তৃতীয় দৃশ্য
চতুর্থ অঙ্ক ।
মােগল-পাঠান
শের। তফাৎটুকু আমি এক করে দেবো-আমাদের কত ফৌজ
তৈরী হয়েছে জালাল !
জালাল। আশি হাজার।
শের। আশি হাজার ! মুবারিজ ! রাজপুত কত অনুমান কর?
মুবারিজ। প্রায় পঞ্চাশ হাজার।
শের। পঞ্চাশ হাজার! পঞ্চাশ হাজার রাজপুতকে হঠাতে আশি
হাজার তরবারি যদি কোষমুক্ত করতে হয়, তাহলে পাঠানের নামে
কলঙ্ক পড়বে। (সােফিয়ার প্রবেশ)
সােফিয়া। ভুল বুঝছেন সম্রাট ! যদি রাজ্যের মঙ্গল চান, তবে
এই পঞ্চাশ হাজার রাজপুতকে একবারে শেষ করতে হবে। এর জন্য
আশি হাজার কেন—রাজ্যের সমস্ত শক্তি যদি ব্যয় করতে হয়, তাও
করতে হবে ।
শের। কেন?—এমন কথা কেন বলছ মা?
সােফিয়া। ব’লব না। আমি যে রাজপুতকে চিনি। মনে আছে
সম্রাট ! একদিন এই রাজপুতই পাঠানকে নির্মল করবার জন্য তাকে
নিমন্ত্রণ করে এনেছিল। তাকে নির্মূল করতে না পারুনি
সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ ভাল নয় জেনে রাখবেন।
শের। পাঠান কি এতই দুর্বল।
সােফিয়া। পাঠান দুৰ্বল ! না সম্রাট ! কিন্তু রাজপুতের শত্রুতা
বড় ভয়ঙ্কর। ভূমিকম্পের মত এ জাত যখন মাথা নাড়া দেয়
তখন সাম্রাজ্যের মূল ভিত্তি পর্যন্ত নড়ে উঠে। সহস্র বীরের প্রাণের
উন্মাদনা কেঁপে উঠে, মাটির নীচে নেমে যায়। আগুনের মত এ জাত
যখনই জ্বলে উঠেছে, তখনই পতঙ্গের মত লক্ষ আততায়ী তাতে পুড়ে
মরেছে। জনাব ! আবার বলি, যদি পাঠানের মঙ্গল চান, তাহলে এ
জাতকে কিছুতেই বন্ধিত হতে দেবেন না।
চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ তৃতীয় দৃশ্য শের। ভয় দেখিও না মা ! সােফিয়া। ভয় নয় জনাব ! এ জাতের রমণীগুলো তুৰ্য্যধ্বনির মত পুরুষকে জাগিয়ে তােলে হাসতে হাসতে তাদের বীরসাজে সাজিয়ে দেয়। তারা আগুন চিবিয়ে খায়—শর রুধির গায়ে মে, ”জর দেহ ভস্ম করে! শের। চুপ কর মা-চুপ কর-- সােফিয়া। জনাব । এ জাত বীরত্বের পরীক্ষা নিতে যেন পৃথিবীর উপর দাড়িয়ে আছে। ভারতে যে এসেছে, একবার করে এ জাতের সম্মুখে মাথা নামিয়ে গেছে ! এবার আপনার পালা এসেছে জনাব! যদি পূৰ্ব্ব ইতিহাসের পুনরভিনয় দেখতে না চান, তাহলে এ জাতকে ছলে বলে কৌশলে যেমন করে হ’ক ধ্বংস ক’তে হবে—তারপর সেই ভস্মের রেণু মাথায় মেখে বীরের পূজা ক’তে হবে। শের। এ বীরত্বের পূজা ছলে কেন মা? হজরতের প্রেরণায় আজ পাঠানেরও প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে ! খােদার প্রত্যাদেশে আজ লক্ষ পাঠানের প্রাণ সমস্বরে বেজে উঠেছে। তারা বীরের পৃৎ শিখেছে বিশ্বাসঘাতকতা কেন মা ! (ফকিরের প্রবেশ ) ফকির। শেরশা! কাফের, কাফের,বৃথা শক্তি নষ্ট কর না। ছলে বলে কৌশলে তাদের ধ্বংস কর—তারপর তােমার অক্ষয় শক্তি নিয়ে দুষ্টের দমন কর—শিষ্টের পালন কর—জগতে এমন কীর্তি রেখে যাও, যা স্মরণে মানুষ ধন্য হবেবরণে জগতের ঐ ফুটে উঠবে। (সৈনিকের প্রবেশ ) সৈনিক। জনাব! একটা রাজপুত আচম্বিতে এসে একজন পাঠানকে ঘােড়ায় তুলে নিয়ে ছুটেছে—দু’শ পাঠান তার পিছু নিয়েছে। পাঠানকে যদি উদ্ধার করতে না পারে—সমস্ত পাঠান [ ১ ঐ একজন চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ চতুর্থ দৃশ্য আমি হত্যা করব। জালাল ! মুবারিজ ! মস্ত পাঠান নিয়ে আমার অনুসরণ কর। [ সকলের প্রস্থান। ফকির। তাইত মা শেরশার মতিগতি ত ভাল বােধ কছি না। কাফের ধ্বংস করতে এত ইতস্ততঃ করছে! সােফিয়া। দাড়াও ফকির-একটু অপেক্ষা কর। রাজপুত দু’দশ জন পাঠানের শির মাটীতে নামা’ক, তারপর। একটু অপেক্ষা কর, সমস্ত ঠিক করে রেখেছি। ফকির। কি ঠিক করে রেখেচিস্ মা সােফিয়া। যােধপুরের মহারাজ মল্লদেবের প্রধান সেনাপতি কুম্ভ যেন আমাদের সঙ্গে যড়যন্ত্র করে যুদ্ধক্ষেত্রে নিশ্চেষ্ট থাকবে—এই মর্মে একখানি পত্র যেমন করে হ’ক মল্লদেবের হস্তগত করাতে হবে। পত্র লিখে ঠিক করে রেখেছি—শুধু একটা দস্তখত চাই। ফকির। এ পত্রে দস্তখত ত সম্রাট করবে না। সােফিয়া। কৌশলে করাতে হবে না হয় জাল করতে হবে। একটু ধৈর্য ধর ফকির! রাজপুত দিয়ে রাজপুত ধ্বংস করব! পাঠানের রাজ্যে পাঠান থাকবে—রাজপুত কে? [ প্রস্থান। চতুর্থ দৃশ্য রাজপুত শিবির। ( সঙ্গীত-সমাপনান্তে চারণ কবিগণ পড়াইয়া আছেন—যােধপূরাধিপতি মদেবের সেনাপতি কুম্ভ ও পশতে ভঁহার অধীন সৈন্যগণ ) কুম্ভ। শুলে রাজপুত! তােমার কর্মজীবনের অগ্রন্ত্রেীর উচ্চরব- তােমার ধর্ম মন্দিরের গভীর শখধ্বনি। দেখলে রাজপুত! মানস-চক্ষে তােমার মাতৃমূর্তি, ব্যোমস্পর্শী তাের জয়পতাকাতাের বারে শক্ত
চতুর্থ অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ চতুর্থ দৃশ্য
এসেছে-কিসের শঙ্কা। ঐ শােন-আবার শােন—ঐ বিজয়-দুন্দুভি,
ঐ শােন চারণের গান-নূতন তানেতন ছলে আকাশ ভরে উঠেছে।
(চারণ কবিগণ গাহিলেন )
গীত।
প্রতাপে যাহার অরাতি স্তব্ধ বিরাট বাহিনী ছত্রাকার
হুঙ্কারে যার মােগল কীর্তি করিয়া উঠিল হাহাকার
কোরাণ স্পর্শে কহিল বাবর “কভু না মদিয়া করিব ন”
চূর্ণ করিয়া সুরার পাত্র ভিক্ষুকে দিল করিয়া দান।
শৌৰ্য আধার সেই রাজপুত রাখিব তাহার মান,
ধন্যা হইল যাহারে পাইয়া জননী রাজস্থান ।
( মল্লদেবের প্রবেশ)
মল্লদেব। থামিয়ে দাও, থামিয়ে দওে—এ গান রাজপুতানায় কেন?
এ শিলাদিত্যের জন্মভূমি—যে এ গান গাইবে, তার জিহ্বা কেটে
দেবব—যে রাজপুত এ গান শুবে তাকে হত্যা করব।
কুম্ভ। এ সংগ্রামের জন্মভুমি—এখানে যে এ গান না গাইবে, সে
মূক-যে রাজপুত এ গান না শুনবে সে বধির।
মল্লদেব। কুম্ভ! তাই এত আড়ম্বর।
বিশ্বাসঘাতক রাজপুত !
মল্লদেব যে তােমাদের সন্তানের মত পালন করে এসেছে-
কুন্ত। রাজা! রাজা! একি কথা !
মদেব। রাজাকে হত্যা করে নিজে রাজা হলে না, কেন কুম্ভ ?
কুম্ভ। উন্মাদ-উন্মাদ আপনি।
মল্লদেব। উন্মাদ আমি! কুম্ভ! রাজপুতবীর! রাজপুতের সিংহাসন
যবনকে ডেকে দিচ্ছ! এই দেখ—তােমার ষড়যন্ত্রের মানচিত্র—ভয় নাই,
শেরশা অনুকম্পা করে দস্তখত করে দিয়েছেনাও ধর।
( কুম্ভের পত্রগ্রহণ, পাঠ ও ছিন্ন করিতে করিতে )
t৯৩
চতুর্থ অঙ্ক ] মােল-পাঠান [ চতুর্থ দৃশ্য কুম্ভ। মিথ্যা—মিথ্যা—আমি রাজপুত । মল্লদেব। কুম্ভ! (অসি নিস্কোসিত করিতে যাইলেন। কুম্ভ। রাজা! রাজা ! হত্যা করুন আমাকে। (জানু পাতিয়া ব্য: "1) কিন্তু বিশ্বাস করুন, এ শত্রুর ষড়যন্ত্র ! মন্সদেব। শত্রুর ষড়যন্ত্র ! না-তােকে হত্যা করব না-রাজপুত তােকে ভাল করে চিনুক ! সৈন্যগণ ! আমি তােমাদের রাজা, তােমাদের সেনাপতি কুম্ভ শত্রুর সঙ্গে যড়ষন্ত্র করে দেশের সর্বনাশে উদ্যত—দেশটাকে শত্রুর হাতে তুলে দেবার জন্যই তার এই সমরায়ােজন। তােমাদের আর নিজের সর্বনাশের জন্য এ যুদ্ধে প্রয়ােজন নাই। আমার আজ্ঞা, তােমরা ফিরে চল। কুম্ভ। না, না—তা হতে পারে না। (উঠিয়া ) সৈন্যগণ! আমি তােমারে সেনাপতি তােমাদের শিক্ষাদাতা আমি—শত্রুর বিপক্ষে বুক ফুলিয়ে দাড়াতে—অসির আঘাতে দেশের কলঙ্ক অপসারিত করতে আমি তােমাদের শিখিয়েছি। আমার আজ্ঞা মল্লদেব। কুম্ভ! কত ! ( অস্ত্রাঘাতের উদ্যোগ ) কুম্ভ। না রাজা! এখন নয় ( অস্ত্র নিবারণ) কুম্ভের অনেক কাজ বাকী রয়েছে—সে বৃথা প্রাণ দিতে পারে না। তার কর্তব্যের শেষ হক রাজা, পদতলে বসে সে নিজের বুকে ছুরি মারবে। মলবে। । ধিক্ আমায়—তাের মত কুলাঙ্গারকেনা- সৈন্যগণ! তােমরা রাজাকে চাওনা, সেনাপতিকে চাও? সৈন্যগণ। আমরা রাজার দাস-আমরা রাজাকে চাই। মদেব। বেশ, তবে রাজার আজ্ঞা পালন কর। ( কমলার প্রবেশ) কমলা। আর তােমাদের সেনাপতিকে? যে তােমাদের হাসি মুখ দেখে হেসেছে—দুঃখ দেখে কেঁদেছে—সেই সেনাপতিকে চাও না! # ]
চতুর্থ অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ পঞ্চম দৃশ্য
তার মাথায় জোর করে কলঙ্কের বােঝা চাপিয়ে দিচ্ছে বিশ্বের বুকে
বিদ্রুপের মত তাকে ফেলে রেখে যাচ্ছে—এই দুর্দিনে তাকে ফেলে রেখে
যেতে চাও? পঞ্চাশ হাজার রাজপুতের মধ্যে পঞ্চাশ জন তার সহগামী
হতে পার না! একজন তার জন্য প্রাণ দিতে পার না ! না পার
যাও-রাজকন্যা তার নিজের রক্তে বীরের কলঙ্ক ধৌত করে দেবে।
সৈন্যগণ। আমরা ফিরব না। আমরা সেনাপতিকে চাই।
কমলা। তবে এস—একজন হও, একজন এস-কিন্তু সাবধান !
মরতে হবে, রক্ত দিয়ে সেনাপতিকে মুক্ত করতে হবে। রাজার গৌরব
রাজপুতের
গৌরব
অক্ষুন্ন রাখতে হবে।
[ কমলার সহিত সৈন্যগণের প্রস্থান।
মল্লদেব। ক্ষেপিয়ে দিলে—ক্ষেপিয়ে দিলে—এই মেয়ে হতে আমি
পাগল হলুম।
[ প্রস্থার।
কুম্ভ। একি শক্তি দিয়ে পাঠালে ঈশ্বর-একি জ্যোতিঃ—একি এ
আহ্বান! অগ্রসর হও কুম্ভ! এই বিশ্ববিজয়িনী শক্তিতে হৃদয় পূর্ণ করে
নাও—এই তীব্র জ্যোতিতে পথ দেখে নাও-ঐ ভেরীর ডাকে ছুটে
চল—জয় তােমার
[ প্রস্থান।
পঞ্চম দৃশ্য
যুদ্ধক্ষেত্রের অপর পার্শ্ব ।
(দুইজন সৈনিক)
১ম সৈ। লড়াই কই হে চাচা ?
২য় সৈ। আরে শুননি চাচা! আমাদের মূর্তি না দেথে, আটত্রিশ
হাজার হিন্দু রাজার সঙ্গে, আর বার হাজার সেনাপতির সঙ্গে দে দৌড়।
[ পঞ্চম দৃশ্য চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান খিড়কি খুলতে তর সইল না—ভেঙ্গে অন্দরে ঢুকে পড়েছে। আরে চাচা! হিন্দু কি আর লড়তে জানে! (বেগে ফকিরের প্রবেশ) ফকির। বার হাজার রাজপুত আশি হাজার পঠানকে গ্রাস করতে উদ্ধশ্বাসে ছুটে আসছে—সাবধান। পাঠান! সাবধান। [ প্রস্থান। ২য় সৈ। চাচা! বেঁকে যাচ্ছ কেন? বেগতিক-তলােয়ার ধরে সােজা হয়ে দাড়াও। [ প্রস্থান। (কুম্ভের প্রবেশ) কুন্ত। সৈন্যগণ ! রাজপুত বীরগণ ! এ কলঙ্ক শুধু আমার মাথায় পড়ে নাই—আমার আত্মাকে কলুষিত করে তােমাদের সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে। সমগ্র জাতির অস্তিত্বে এ কালিমা লিপ্ত হয়েছে। শুধু আমার রক্তে হবে না—বার হাজার রাজপুতের হৃদয়ের রক্তে এ কলঙ্ক ধৌত করে যশের দীপ্তি ফুটিয়ে তুলতে হবে। সম্মুখে অগণ্য শত্রু ভয় পেয়ােনা রাজপুত! পশ্চাতে নরকের কলরব—পেছিয়ােনা রাজপুত ! মুক্ত অসি, পম্মানে কোষ-নিবদ্ধ করে যদি ফি’রতে পার—গৰ্ব্বদৃপ্ত শেরশার মুণ্ড রাজপদে যদি উপহার দিতে পারতা’হলে মূতন গরিমায় সমগ্র রাজস্থান উদ্ভাসিত হয়ে উঠবেনূতন শক্তিতে রাজপুত সােজা হয়ে দাড়াবে। না পার—ক্ষতি কি-অক্ষয় অমর কীর্তি। [ প্রস্থান। (শেরশার প্রবেশ) শের। পাঠান! পাঠান! মুষ্টিমেয় রাজপুতকে যদি পদদলিত মা করতে পার—তােমার নাম কেউ করবে না। ইতিহাস আবর্জনার মত তােমাকে দূরে ফেলবে—দুনিয়া কুটিলনেলে, তােমাকে বিদ্রুপ করবে। (সম্মুখে দেখিয়া ) জালাল ! জালাল ! পালিয়ােনা পিতার মেহ, মার ভালবাসা সন্তানকে মৃত্যুর গ্রাস হতে রক্ষা করতে পারবে না—ম’রতেই হবে জালাল। মৃত্যুমুখরিত এই রণাঙ্গণে, বীরের คน ] 3.
[ পঞ্চম দৃ চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান তীর্থক্ষেত্রে যদি সমাধি গড়তে পার, হজরতের করুণায় তােমার নামে দুন্দুভি বেজে উঠবে—তােমার নামে ফুল ফুটে উঠবে। [ প্রস্থান। (বল্পমের উপর ভর দিয়া আহত কুম্ভের প্রবেশ) কুন্ত। খাসা রক্ত দিয়েছে রাজপুত ! খাসা রক্ত নিয়েছে। (অর্ধ-শয়ান অবস্থায় উপবেশন ) সব শেষ করেছিলুম—আবার কোথা হতে কাতারে কাতারে পাঠান এল’ক-কাৰ্য শেষ হয়েছে—আশা মিটেছে—একটি একটি করে বার হাজার রাজপুত বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছে। (নিচ্চোষিত অসি হস্তে কমলার প্রবেশ ) কমলা। কুম্ভ ! কুন্ত! কোথায় যাবে তুমি আমায় ফেলে নিষ্ঠুর ! (তরবারি রাখিয়া মস্তক জোড়ে লইয়া উপবেশন) এ আবার তুমি কি ব’ছ রাজনন্দিনি ! কুম্ভের আজ এ বিদায়ের দিনে নূতন জীবনের প্রলােভন কেন সুমুখে ধরেছ কমলা! কমলা। কি ব’ছি—হা পাষাণ ! কমলার নীরব সাধনা আজ আকাশ কুসুমে পরিণত করে কোথায় তুমি চলেছ প্রাণেশ্বর ! কুম্ভ। প্রাণেশ্বর ! কমলা! কমলা! এতদিন তবে একবার ভাল করে কেন বলনিকুও যে তার ব্যাকুল সাধনার কণ্ঠ চেপে ধরে এতদিন চলে এসেছে। কমলা। স্থির হও—ক্ষত মুখ হতে প্রবল বেগে রক্ত ছুটছে । কুম্ভ। ছুটুক কমলা! এ সুখের স্বপ্ন টুটুতে না টুটতে সমস্ত অস্তিত্ব আমার ছুটে বেরিয়ে যা’। একি স্পর্শ রাজনন্দিনি—একি উত্তেজনা একি আনন্দ! যাও কমলা ! ভাল যদি বেসে থাক—একটি কাজ কর- তােমার পিতার কাছে যাওগিয়ে বলগেকুম্ভ বিশ্বাসঘাতক নয়- রাজভক্ত—সে রাজার নামে প্রাণ দিয়েছে-যাও, আমার আর বেশী দেরী নাই। [ ৯৭ [ পঞ্চম দৃশ্য চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান কমলা। কোথায় যাবনাযাব-প্রতি রাজপুতের দ্বারে । দাড়িয়ে এ কথা বলে যাব—যাবার আগে একবার দেখে যাবাে কোন বলে পাঠান বলীয়ান্। (দশ বার জন সৈন্যের প্রবেশ ) সৈন্য। হাঃহাঃহাঃ এই পেয়েছি—কাফেরের সেনাপতি এই যে পড়ে আছে-বাঁধ-বাঁধবেঁধে নিয়ে চল- কুম্ভ। পালাও কমলা! পালাও—এ রাক্ষদের সঙ্গে তুমি পারবে না। কমল।। চুপ করে দাঁড়া রাক্ষসের দল। এ রাজপুতের দেহ, রক্তে গড়া এ একটা স্বর্গের সম্ভার-এ কীর্তির রক্ষী একজন রাজপুতবালা চক্ষের জলে গড়া নয়—হিন্দুস্থানের কোমল মাটিতে বর্ধিত নয়---পাথর গলিয়ে এ দেহ তৈরি---মরুভূমিতে এ দেহ বর্ধিত---লক্ষ রাষ্ট্র বিপ্লবের শক্তিতে এ দেহ ভরপুর। পা’রবিন শয়তানের দল—পৃথিবীর শক্তি নিয়ে এসে দাড়ালেও এ রাজপুতবালাকে হঠাতে পারবিনা। চুপ করে দাঁড়া। সৈন্য। বাঁধ-বাঁধ,ভয় করি না। কমলা। চুপ করে দাড়া শয়তানের দল প্রাণের চেয়ে কিছু প্রিয় প্রাণের নেই মনে করে এ ভুজঙ্গীর শিরে আঘাত কর,। ( অসিনিষ্কাষণ ) সৈন্য। না না কেউ পালিয়ােনা। একে ছেড়ে গেলে আবার বেঁচে উঠবেবধবধবেঁধে নিয়ে যেতে পারলে এনাম পাব কমলা। আয় শয়তানের দল! রাজপুতের শক্তির পরিচয় পেয়েছি-- রাজপুতবালার পরিচয় নে। (উভয় পক্ষের যুদ্ধ) কুম্ভ। এ কি তুমি করলে কমলা ! একটা গতপ্রায় জীবনের জন্য তােমার ঐ অমূল্য প্রাণ নষ্ট করতে চ’ললে ! (উঠিবার চো) ওঃ- সৈন্য। কেউ পিছু ফিরােনা—কেউ পিছু ফিরােনা। কুম্ভ। নানা রকমে ত হবে না। কজনকে তুমি হত্যা করবে কমলা! কতক্ষণ তুমি যুদ্ধ করবে---ওঠ কুম্ভ! তােমার জন্য ১৮ ] [ পঞ্চম দৃশ্য চতুর্থ অঙ্ক ] মােগল-পাঠান নারী হত্যা হয়-ওঠ-যাবার সময় জীবনের শেষ স্পন্দন পাঠানকে দেখিয়ে যাও। (উত্থান ও দুজনকে হত্যা করণ ) পাঠান সৈন্য। বাপরে বাপরে---বেচে উঠেছে [ পলায়ন। কুম্ভ। (কপিতে কাপিতে) কমলা! যাই (মৃত্যু) কমলা। কোথায় যাবে ?-কমলাকে ফেলে কোথায় যাবে নাথ। ( বক্ষের উপর পতন) কুম্ভ ! কুম্ভ! ওহােহে, নিবে গেল নিবিয়ে দিলে—শান্তিতে মরতে দিলে না—ম’রবার আগে একটু বিশ্রাম নেবে বলে শুয়েছিলাে—বিশৃঙ্খলার মত চীৎকার করে জাগিয়ে দিলে বিশ্বাসঘাতক পাঠান সুস্থ হয়ে মরতে দিলে না ! নিবিয়ে দিলে---কমলার সমস্ত জীবনটা আজ অন্ধকার করে দিলে। শাস্তি দেব-প্রতিশোধ নেব—প্রতি রাজপুতের দ্বারে দ্বারে ঘুরব—যেখানে একটা কণা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পাব, ফুৎকারে তাকে বৃহৎ করে পাঠানের সর্বাঙ্গ জ্বালিয়ে দেবা-আলা উদিগরণ ক’বব—আগ্নেয় গিরির মত মুহুর্মুহুঃ অগ্নদগারে পাঠানের রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ব। বাতাবিক্ষুব্ধ সাগর তরঙ্গের মত আছড়ে পড়ে পাঠানের বুক ভেঙ্গে দেব-বজ্রাঘাতের মত পাঠানের জাগ্রত কীর্তির শিরে পড়ে হাহাকার তুলব।
পঞ্চম অঙ্ক। প্রথম দৃশ্য। দরবার ( শেরশা—বিচারাসনে উপবিষ্ট-বিচারপ্রার্থী ব্যক্তিগণ দণ্ডায়মান) কৃষক। জনাব! চাষা আমরা। চষে খুড়ে, দেশের আহার যােগাড় করে দিয়ে,অন্নকষ্টে ম’তে আমরাজলে ভিজে, কাদা ঘেটে পচা পুকুরে দিনভাের ডুবে থেকে, রােগে ভুগে ‘ম’রতে আম---ফসল হক হক, রাজার খাজনা দিতেই হবে। শের। আজ হ’তে খাজনা রহিত হ’ল। ফসল হয়, চাষা খাজনা দেবেলা হয়, কোন চিন্তা নাই। ফসল যা উৎপন্ন হবে, তার চার ভাগের এক ভাগ রাজার ঘরে তুলে দিতে হবে। কৃষক। মােটে চার ভাগের এক ভাগ ! আমরা মাথায় করে দিয়ে যাব। ফিরে যাবার সময় বাদশার জয়গান করতে করতে চলে যাব। একব্যক্তি। জনাব! সুবর্ণ গ্রাম হতে সিন্ধুনদ পৰ্যন্ত প্রশস্ত রাজপথ নির্মাণ করে দিয়ে দেশের দুর্দশা মােন করে দিয়েছেন—পথের উভয় পার্থে কুপ খনন করে দিয়ে জলকষ্ট নিবারণ করেছেন—পান্থনিবাস ১•• ]
পঞ্চম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
| প্রথম দৃশ্য
ফকির।
নির্মাণ করে পথিকের কষ্ট দূর করেছেন। কিন্তু সম্রাট! রাজপথের
বৃক্ষের ফলে পথিকের অধিকার থাকবে না কেন?
শের। কেন থাকবে না—আজ হতে সকলের তাতে সমান অধিকার।
১ম ব্যক্তি। জয় বাদশার জয়
[ প্রস্থান।
শের। 'আর কারও কিছু বক্তব্য আছে ?
(ফকিরের প্রবেশ )
আমার বক্তব্য আছে সম্রাট! না—বক্তব্য নয়
অভিযোেগ। দীন দুনিয়ার মালিকের কাছে আমার নিবেদন।
শের। প্রভু!
ফকির। কে প্রভু? বাদশা আর ফকিরকে প্রভু ? আমি
মর্মাহত বিচারপ্রার্থী।
শের। প্রভু! আজ্ঞা করুন।
ফকির। বড় তৃষ্ণা পেয়েছিলাে---পুষ্করিণীর জল স্পর্শ করতে
গেলুম—দুট কাফের হিন্দু স্নান করছিল তারা আমায় জলে নামতে
দিলে না। মুসলমান জলে নামলে জল অপবিত্র হবে।
শের। নিষ্ঠুর পশু তারা-তৃষ্ণার্তকে জল পানে বাধা দেয়।
ফকির। তৃষ্ণা ছুটে গেল—প্রতিহিংসায় শিরা উপশিরা ফুলে উঠল।
বিচার কর সম্রাট।
র। আজ করুন প্রভু। হতভাগাদের সপ্তাহকাল তৃষ্ণার জল
হতে বঞ্চিত করি।
ফকির। আমি তাদের চিরকালের জন্য জল হতে বঞ্চিত করতে
পারতুম। দেহে এখনও সে শক্তি আছে—এ বিচারের জন বাদশার
কাছে ছুটে আসতে হত না।
শের। তবে আপনিই বিচার করুন।
ফকির। মুসলমান রাজ্যে মুসলমান জল স্পর্শ করলে জল অপবিত্র
পঞ্চম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বিতীয় হবে, এ কথা যে জাতি বলে, মুসলমান-রাজ্যে তার স্থান থাকা উচিত নয়। শের। ব্যক্তিগত পাপে আমি জাতির উৎসাদন করতে পারি না প্রভু! শুধু জাতির উৎসাদন নয়, তাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ ! উঃ—অসম্ভব ফকির। শেরশা! কাফেরের ধর্মে হস্তক্ষেপ করায় পাপ নাই- বরং পুণ্য আছে। শের। মহাপাপ-মহাপাপ- ফকির। (অতীব ক্রুদ্ধস্বরে) শেরশ শের। কুটী কেন প্রভু—সমস্ত পৃথিবী যদি উৎসাহিত করে কোন জাতির ধৰ্ম্মে শেরশা হাত দেবে না। দুনিয়ার যদি শেরশার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে, তথাপি শেরশা ভীত হবে না। ফকির। শেরশা! শুলে না—আচ্ছা থাক। [ প্রস্থান। হিন্দুসভাসদ। সম্রাট শুধু হিন্দুর বাদশা নন-হিন্দুর দেবত'- হিন্দুর দেবতা—জয় বাদশার জয়জয় বাদশার জয় ['প্রস্থান। দ্বিতীয় দৃশ্য। - কালেঞ্জর প্রান্ত। (কমলা)। কমলা। ঘুমন্ত যে, তাকে ডেকে তুলুম-জাগ্রত যে, তাকে সঙ্গে আসতে বললুম-রাজপুতের দ্বারে দ্বারে কেঁদে বেড়ালুম—কেউ শুনলে না ! কেমন করে রাজপুত আজ এমন হয়ে গেল! শেরশার ভয়ে ! —উৎপীড়িত রাজপুত চিরদিন ত তার শির উচ্চে রেখে চলে এসেছে। তবে---এ আকস্মিক পরিবর্তন তবে কি কমলার অদৃষ্টের ফল! আর একজন অবশিষ্ট-কালেঞ্জর-অধিপতি কীৱিসিংহ। কালের প্রান্তে পঞ্চম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বতীয় দৃশ্য এসে দাড়িয়েছি—যাই কি না যাই-না না—এতদূর যখন এসেছি—তখন একবার যাবনা গিয়ে ফিরব না—কিন্তু রাজপুতের এ জাতিগত অধঃপতনের দিনে-কালের কি সেই পূর্বের কালেঞ্জর আছে ! (সেফিয়ার প্রবেশ ) সােফিয়া। বড় দুঃখিত হচ্ছি রাজকুমারি ! কালেঞ্জরের অবস্থা দেখবার আর অবসর হবে না। অন্য পথে যাবার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। কমলা। একি! কে তুমি? সােফিয়া। এখনি অস্ত্র মুখেই সে পরিচয় পাবে রাজপুতবালা ! কমলা। পরিচ্ছদ দেখে বুঝছি তুমি পাঠান-রমণী। সােফিয়া। আর তুমি পাঠানের শত্রু—এখন বুঝতে পাচ্ছ তোমায় আমায় সম্বন্ধ কি ? সেই সম্বন্ধটা ভাল করে ফুটিয়ে তুলতে আজ এখানে এসেছি। অনেক কষ্টে তােমার সন্ধান পেয়েছি। রাজপুতবালা ! পাঠানকে দংশন করতে উদ্যত হয়েছে—তার পূর্বে পাঠানের দন্তে কত বার তার একটু পরিচয় নাও। কমলা। সে পরিচয় নেবার জন্য সর্বদাই প্রস্তুত আছি-এস পাঠান- বালা! (উভয়ের যুদ্ধ ও সােফিয়ার হস্ত হইতে তরবারি পতন) বুঝতে পারছ নারি! তােমার জীবন এখন আমার হাতে, কিন্তু তোমায় হত্যা করব না। যাও পাঠান-নন্দিনি! তােমাদের সম্রাটকে গিয়ে সংবাদ দাও—যে রাজপুত এখনও মরেনি-তার বিশ্বাসঘাতকার শান্তি দেবার জন্য শীঘ্রই তার সঙ্গে আবার সাক্ষাৎ করবে। সােফিয়া। বটে—এতদুর স্পর্ধা! (বংশীতে ফুৎকার ও কতিপয় পাঠান সৈন্যের প্রবেশ) সােফিয়া। বন্দী কর—সর্বাগ্রে যে বন্দী করতে পারবে—এই সুন্দরীকে তার অঙ্কশায়িনী করে দেব। [ ১৭৩ 'T পঞ্চম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বিতীয় দৃষ্ণ কমলা। অয় শয়তানের দল-রাজপুতের মেয়েকে অঙ্কশামিনী করতে হলে কত অস্ত্রের ক্ষত বক্ষে ধারণ করতে হয় তা দেখ। ( সকলে কমলাকে আক্রমণ করিল। সােফিয়া। সকলের আগে যে বন্দী করতে পারবে—সে এই অমূল্য নারীর উপহার পাবে। (কমলার হস্ত হইতে তরবারি পতন ) কমলা। দাড়াও—একটু অপেক্ষা কর-অস্ত্র নিতে দাও—পুরুষ তােমরাবীর তােমরা—অন্ত্রহীনাকে মেয়ােনা। সােফিয়া। সাবধান—যে যুদ্ধে ক্ষান্ত হবে—আমি তাকে হত্যা করব। বন্দী কর- কমলা। কিছুতেই না—এমন ভাবে মরতে পারি না। কে আছ রক্ষা কর, রক্ষা কর নেপথ্যে। ভয় নাই—ভয় নাই। (কীৰ্তিসিংহের প্রবেশ। সােফিয়া। খবরদার—পালা’তে দিও না। কীর্ভিসিংহ। পুরুষে নারীর উপর অত্যাচার করছে আর সেই পুরুষের পরিচালক নারী ! খবরদার শয়তানের দল (তরবারি খুলিয়া পাড়াইলেন-পাঠানগণ সরিয়া গেল )! সােফিয়া। একজন পুরুষের ভয়ে তােমরা পেছিয়ে যাচ্ছ পাঠান। এগােও দুটোকেই হত্যা কর। কীর্ভিসিংহ। সাবধান ! এক পা এগিয়েছ কি মরেছ। (উভয়পক্ষে যুদ্ধ ও সৈন্যগণের পলায়ন) সােফিয়া। পালালে-আবার পালা’লে কাপুরুষের দল। তুমি ? এখনও এ রমণীকে ত্যাগ কর—এ দুষ্টাকে শাসন করতে আমি পাঠান সম্রাট শেরশার প্রেরিত হয়ে এসেছি। কীর্ভিসিংহ। শেরশা শঠ খল বিশ্বাসঘাতক হতে পারে কিন্তু রমণীর উপর অত্যাচার করতে সে কখনও তােমাকে পাঠাবে না—আর তাই ১৪।
পঞ্চম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ দ্বিতীয় দৃশ্য যদি হয়—ঈশ্বর-প্রেরিত হয়েও তুমি যদি আজ এসে থাক—তাহলেও যে অত্যাচার আমি চক্ষে দেখছি—মানুষ আমি নিরস্ত হতে পারি না। সােফিয়া। নিরস্ত হবে না !—আচ্ছা থাক কাফের ভাল করে আমাকে দেখে রাখ—আজ পরিত্রাণ পেলে কিন্তু কাল পাবে না [ প্রস্থান। কীর্ভিসিংহ। আজকের দিন ত কাটুক-কা’কের ব্যবস্থা তখন কা’কে। তােমার পরিচয় পেতে পারি মা! কমলা। পরিচয় দেবার ইচ্ছা ছিল না—কিন্তু তুমি আমার প্রাণ দাতা—শুধু প্রাণদাতা নয়—দেখছি তুমি রাজপুত। তুমি রাজপুত। তােমায় পরিচয় দিয়ে থাকতে পারব না। কীৰ্ত্তি। বল মা! তুমি কে? কমলা। রাজা মল্লদেবের কন্যা আমি—রাজপুতবীর কুম্ভের বাগদত্তা স্ত্রী আমি কীর্তি। মল্লদেবের কন্যা ! এ কি দৃশ্য দেখালি মা ! কমলা। কেন, ৩ননি রাজপুত ! কীর্তি। শুনেছি মা---পাঠানের দোর্দণ্ড প্রতাপে- কমলা। দোর্দণ্ড প্রতাপ নয় রাজপুত! বিশ্বাসঘাতকতা সব শুনেছি—সেনাপতির অমানুষিক বীরত্বের কথাও শুনেছি। তাহ'লেও যে শক্তির সংঘর্ষে এত বড় একটা মােগল-শক্তি চুর্ণ হয়ে গেল—সে শক্তির বিরুদ্ধে রাজপুত কতক্ষণ দাড়া’ত মা ! কমলা। সােজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল যে কীর্তি। তাহলেও সে বড় ভীষণ শক্তি- কমলা। হাঃ ঈশ্বর---দুর্বলতার বন্যায় রাজপুতের দেশ ভাসিয়ে দিয়েছ---সংক্রামক ব্যধির মত এ দুৰ্বলতা রাজপুতের জীবাণু নষ্ট করে দিয়েছে--তবে এ জাতিগত অধঃপতনের দিনে কমলা কি করবেন কীর্তি। এত দুঃখ কেন মা। [ ১৫ কীর্তি।
[ দ্বিতীয় দৃশ্য পঞ্চম অঞ্চ ] মােগল-পাঠান কমলা। হায় রাজপুত! জিজ্ঞাসা করবার আগে এ দুঃখের দুঃখী হয়ে একবার কাঁদলে না। তারা শান্তিতে মরতে দেয়নি রাজভক্তকে রাজদ্রোহী সাজিয়ে দিয়ে শুধু মৃত্যুর মুখে তুলে দিয়ে নিবৃত্ত হতে পারেনি -মুমূর্ষর বক্ষে তারা পদাঘাত করেছে। একটু সুস্থ হবে বলে চেষ্টা ক’রছিল—একটু বিশ্রাম নিতে শুয়েছিল—তা পাঠানের প্রাণে সহ্য হয়নি কীর্তি। আহা! কমলা। প্রাণহীন বীৰ্যহীন রাজপুত ! শুধু এতটুকু একটু আহা বলে চুপ করলে ! শিরা উপশিরাগুলাে তােমার ফেটে পড়ল না ! তবেঈশ্বর—তবে আর কোথায় যাবনা না—যাবেনা গিয়ে ফিরবাে না। কীৰ্ত্তি। কোথায় যাবে মা ? কমলা। কালেঞ্জর-অধিপতি কীৰ্তিসিংহের কাছে যাব। কীর্তি। কীৰ্তিসিংহের কাছে ! কেন মা ! আমি তাঁর একজন সামান্য কর্মচারী---উদ্দেশ্য বলতে বােধ হয় বাধা নাই কমলা। আবার কেন তুমি জিজ্ঞাসা করছ রাজপুত! আমি একবার শেষ চেষ্টা করব—তাঁর পায়ে ধরে কাঁদ-রাজপুতের কীর্তি স্মরণ করিয়ে দেব-যে অত্যাচার আজ তুমি স্বচক্ষে দেখলে রাজপুত ! সে অত্যাচারের কাহিনী তাঁকে শুনাব-এ মূৰ্ত্তি তাঁকে দেখাব। কীর্তি। বড় ভুল করেছ মা! এতটা পরিশ্রম সব পণ্ড হয়েছে- শেরশা তাকে বশ্যতা স্বীকার করতে পত্র লিখেছিলাে—তিনি আজ প্রত্যুষে পাঠানের দরবারে আত্মসমর্পণ করতে চলে গেছেন। প্রাণের ভয় ত আছে মা! কমল। ঈশ্বর! ঈশ্বর। সপয়েছে শক্তি তুলে পিশমি উত্তপ্ত ছেড়ে দিয়ে যাদের বাপ্পারাও ছিল, হামির ছিল ভীমসিংহ ছিল, সংগ্ৰামসিংহ ছি—আজ তাদের এই দশা! যে ১৬ ] পঞ্চম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ তৃতীয় দৃশ্য জাতের রমণীগুলাে হাসতে হাসতে আগুনে পুড়ে মরেছে—সে জাতের পুরুষগুলাের প্রাণে আজ মৃত্যুর আশঙ্কা জেগে উঠেছে-না, না—তবু যাব-কবচীৎকার করে রােষরক্তিমনয়নে কুটী করে দাঁড়াব আমি জাগাব,আবার রাজপুতকে জাগাব—কিছুতেই তাঁকে আত্ম- সমর্পন করতে দেব না। কীর্তি। না মা—আর কীর্ভিসিংহ আত্মসমর্পণ করতে যাবেনা কমলা। তবে কি আপনিই কালেঞ্জর অধিপতি কীর্ভিসিংহ। কীত্তি। হাঁ মা! আমিই কীর্ভিসিংহ—প্রাণে বড় আশঙ্কা জেগেছিল মা—সত্যই কীৰ্তিসিংহ পাঠানের দরবারে আত্মসমর্পণ করতে চলেছিল- আর যাবে না—সে শক্তি পেয়েছে—যাচিঞা করে একটা প্রচণ্ড শক্তি আজ ঈশ্বর কীর্তিসিংহের হাতে তুলে দিয়েছেন। কমলা। ভগবান! একি কমলার অদৃষ্ট ! কীর্তি । আয় মা। শক্তিস্বরূপিণী নারি! ভীম ভৈরবী মূর্তিতে দুর্গের উপর দাঁড়িয়ে—কীৰ্ত্তিসিংহের অদৃষ্ট পরিচালনা করবি আয় কোন শঙ্কা নাই মা! কীর্ভিসিংহের কীৰ্ত্তিজ্যোতিঃ হয় আজ উজ্জ্বল হয়ে উঠুকনা হয় জ্বলে উঠে নিবে যাক। তৃতীয় দৃশ্য কুটীর (ফকিরের প্রবেশ ) ফকির। আহার নাই, নিত্ৰা নাই, তাদের বুঝাতে গেলুম তারা একটু বুঝলে না ! এ কাফেরের দেশে থেকে দেখছি মুসলমানের প্রাণ নিস্তেজ হয়ে গেছে। নতুবা মুসলমান সম্রাটের কাফেরের উপর এই [ ১০৭
পঞ্চম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ তৃতীয় দৃশ্য
পক্ষপাতিত্ব তারা সহ করবে কেন? এই যে একটা জোয়ান আসছে
দেখি একে একবার বুঝিয়ে
(একজন কৃষক লাঙ্গল স্কন্ধে সেই কটীর হইতে বাহির হইল )
কৃষক। কি চাও মিঞা !
ফকির। আমি তােমাকে চাই।
কৃষক। আমাকে! কেন মিঞা ?
ফকির। বিস্তার ধন দৌলত এক জায়গায় দেখে এসেছি—রাশি
রাশি—পাবি?
কৃষক। চেয়ে দেখ মি? (কুটীরের ছাউনি দেখাইল)
ফকির। একি! মানুষের মাথার খুলী দিয়ে ঘরের ছাউনী
করেছি। মানুষের হাত পা দিয়ে—এত মানুষ মেরেছিল। ই।
ঠিক পাবি তুই।
কৃষক। বাদশার হুকুমে—না, বাদশা আদর করে দাড়িয়ে থেকে
গড়ে দিয়ে গেছে। আমার কাঁধে কি দেখছিস মিঞা
ফকির। এ লাঙ্গল—তা বেশ হবে। গায়েও শক্তি আছে।
কৃষক। শক্তি ছিল। তলয়ারের মত বাঁকা, লাঠির মত হোঁৎকা,
গুলির মত গোঁয়ার শক্তি ছিল। বাদশা জোর করে কেড়ে নিয়েছে
না, আদর করে ভুলিয়ে, সেটাকে গলিয়ে পিটিয়ে এই লাঙ্গলের
ফালের মত মােসাম করে রেখে গেছে।
ফকির। তা বেশ হবে—লাঙ্গলখানা মাথার উপর তুলে ঘােরাতে
পারলেজার লােক পেছু হটবে।
কৃষক। জোর করে লাঙ্গলখানা বিশ হাত মাটির নীচে নামিয়ে
দিতে পারি—মাথার উপর তুলে ঘুরিয়ে মানুষের মাথায় মা’রবার শক্তি
আর নাই! (সেই সময়ে এক বৃদ্ধ চকু মুছিতে মুছিতে তাহাদের নিকটে
আসিল) কি বুড়ে! ঘুম ভেঙ্গে গেল?
১৮ ]
পঞ্চম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ তৃতীয় দৃশ্য
বুড়ো। খুব ঘুমিয়েছি- এক ঘুমে রাত কাবার।
কৃষক। বড় অসময়ে কাল এসেছিলি বুড়াে ! খাওয়া দাওয়া
কিছু হয়নি—পেটে ক্ষিদে ছিল তাই এত ঘুমিয়েছিলি।
বুড়াে। রাজার বাড়ীও খেয়েছি—এত আদর, এত যত্ন কোথাও
দেখিনি। সেলাম, এখন বিদায় হই ।
কৃষক। তা কি হয় ! আমি চষে আসিএসে তােকে ভাল করে
খাওয়াব। আমার ছেলে মেয়েদের সঙ্গে ততক্ষণ খেলা ক।
বুড়াে। আমার বড় দরকার—আগ্রায় যেতে হবে—আমি বিদায়
হই—সেলাম-প্রস্থানােদ্যোগ )
কৃষক। বুড়ো বুড়ো। তোর বাক্স নিয়ে গেলিনি! (বুড়ো ফিরিল )
বুড়ে। ওতে কিছু নেই—বয়ে নিয়ে যাব না।
কৃষক। না, তা হবে না-থাক না থাকতাের বাক্স তােকে নিয়ে
যেতেই হবে। ঈড়া বলছি—পালাস যদি মাথা ভেঙ্গে দোব।
(কৃষক লাঙ্গল রাখিয়া বাটীর ভিতর প্র.বশ করিল ।
ফকির। তুমি আগ্রায় যাবে? বাদশাকে বােলল একট। ফকিরের
সঙ্গে দেখা হলো সে ক্ষেপেছে।
বুড়াে। বলব—যদি দেখা করতে পারি।
কৃষকের বাক্স লইয়া প্রবেশ---বুড় বাক্স খুলিলে দেখা গেল
মতির মালা, বুড়াে একগাছি মালা উঠাইল )
কৃষক। এ্যাঃ—ব’ছিলি কিছু নেই !
বুড়াে !
এ পুতুলের গলায় পরিয়ে খেলা করতে হয়—তােমার
মেয়েকে দিও
কৃষক। খবরদার, চ'লে যা ব’ছি-আমারও ঘরে, অমন হাজার
হাজার ছিল—সব বিলিয়ে দিয়েছি। সেগুলাে—ঐ যে মানুষগুলাের
[ ১০৯
পঞ্চম অঞ্চ ]
মােগল-পাঠান
[ তৃতীয় দৃশ্য
খুলি দেখতে পাচ্ছিস-ঐ গুলাের রক্তে ভিজে গিয়েছিল—তাই। যা—
'লে যা
ফকির। চাষা! চাষা! চিনতে পারলি না ? এক এক গাছার
দাম লাখ টাকা কেড়ে নে কেড়ে নে।
বুড়াে। কেড়ে নিতে হবে কেন—আমি নিজেই দিচ্ছি।
কৃষক। (ফকিরের প্রতি) কি বললি? কেড়ে নেবলতার
ফকিরি ঘুচিয়ে দেব-তাের দাড়ী উপড়ে ফেলে দেবে।
ফকির। কি বললি! ফকির আমি-মুসলমান হয়ে তুই আমার
দাড়ী উপড়ে ফেলে দিবি ব’ললি !
বুড়ো। কি আর বলেছে ফকির সাহেব ! গায়েও হাত দেয়নি
মা’তেও যায় নি।
ফকির। কি বলছে! তুমি না মুসলমান-আমার মাথায় লাথি
মেরেছে-মুসলমানের বুকে ছুরি মেরেছে—উঃ, উঃ-আমার কি শক্তি
নেই! ধৰ্ম্মে হাত দিয়েছে—খুন করবাে।
বুড়ো। (মধ্যস্থলে দাঁড়াইয়া ফকির! ফকির । তবে হিন্দুর
ধর্ম-তাদের পুতুল খেলা নয় ফকির ! তাদের ধর্মে হাত দিলে,
তাদেরও প্রাণে লাগে।
ফকির। এ্যাকে তুমি! তুমি কি শেরশার চর।
বুড়াে। প্রভু! দীন
আমি—আশ্রয়হীন আমি-শেরশাকে ক্ষমা
কর—হিন্দুকে ক্ষমা কর। (ছদ্মবেশ খুলিয়া পদ প্রান্তে পড়িলেন)
ফকির। এ্যাঃ এ্যা—একি। শেরশা । শেরশ! হিন্দুর প্রাণে
কি এমনি লাগে শেরশা!
শের। এমনিবাজেবুঝি ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়।
ফকির। শেরশা! শেরশা ! আমি তােমার গুরু নই তুমি
আমার গুরু তুমি আমায় শিক্ষা দিলে।
১১. ]
“পঞ্চম অঞ্চ ]
মােগল-পাঠান
[ তৃতীয় দৃশ্য
শের। আমার শিক্ষাদাতা! আমার আরাধ্য দেবতা।
ফকির। তবে এস শেরশা! তুমি আমার গুরু—আমি তােমার :
গুরু। (আলিঙ্গন) এস শিষ—এস গুরু—এস বাদশা !
কৃষক। এ্যাঃবাদশা ! তাইত।তাইত! বাদশা ! ওরে কে
আছিস ছুটে আয়—ফকিরের দ্বারে বাদশা এসেছে—দীনের ঘরে মাণিক
জ’লেছে- ছুটে আয় ছুটে আয় ।
( বালক বালিকা স্ত্রী কন্যা সকলে ছুটিয়া বাহির হইল ও বাদশার
চারিদিকে ঘেরিয়া নৃত্য গীত )
গীত।
বাদশা ! বাদশা ! আমাদের বাদশা।
আমাদের আশা আমাদের ভরসা।
কণ্ঠে আমাদের উৎসব-গীতি, চক্ষে তুমি গো বিশ্বের প্রীতি,
তুমি যে মােদের নবজীবন ঊষা।
বাদশা ! বদশা! আমাদের বাদশা।
মাথায় ঢেলে দেছ আশীষ বাণী, মরমে তুলেছ আকুলধ্বনি,
আঁধার পথে তুমি দেখায়েছ আলল, দীনের বাপ মা, তুমি বড় ভালাে,
রসনায় ফুটায়েছ কোরাণের ভাষা।
বাদশা! বাদশা ! আমাদের বাদশা।
আত্মায় আত্মায় ধর্ম প্রতিষ্ঠা, প্রাণে প্রাণে দিয়েছ জাগায়ে নিষ্ঠা
ঝরায়েছ অশ্রু ঘাতকের চক্ষে, ফল ফুল ফুটায়েছ মরুর বক্ষে,
ফুটায়েছ দীপ্তি ছুটায়ে কুয়াসা।
বাদাশা ! বাদশা ! আ পদের বাদশা !
শের। এস মা সব—এস ভাই সব—তােমাদের আশীর্বাদ করি—
(সকলকে এক এক গাছি মাল্যদান )
ফকির। শেরশা! শেরশা! চল, অন্ধ আমি—আমার হাত ধর
পথ দেখিয়ে দাও।
[ ১১১
পঞ্চম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ চতুর্থ দৃশ্য
চতুর্থ দৃশ্য
(পল্পী পথ)
(একজন দরবেশ গাহিতে গাহিতে চলিয়া গেল )
(গীত )
পেয়েছিলে যাহা, রেখেছিলে তাহা, দিয়েছিলে ভালবাসা।
গিয়াছে যখন, যা’না তখন, মিছে কেন কর আশা।
আসে যা আসুক, ক্ষতি কি তােমার
যেতে চাহে যাহা ইতি কর তার ;
করুণার সার, বিধির বিচার, একই কথা কঁাদা হাসা ।
সেদিন প্রভাতে কিবা ছিল সাথে
এসেছ জগতে শূন্য দুহাতে
তবে কেন বল, ফেল অশ্রুজল—বিষাদের কেন ভাষা ।
লহ আশীৰ্বাদ, দাও ধন্যবাদ
ছুটুক প্রমাদ, মিটে যা’ সাধ
কৃপায় যাহার, যা নহে তােমার, মিটেছে তাহার আশা।
পঞ্চম দৃশ্য
( বারবিলাসি বেশে সােফিয়া )
সােফিয়া। পরাজয় এ েআজ আমার বুকে ধাক্কা দিয়েছে—আর
আমি বাঁচতে পারি না। চমৎকার প্রতিশােধ নিয়েছি—যে পথটা
ধরেছি, তারই বুকের উপর কটা বিশ্বব্যাপী আন্দোলনের চিহ্ন রেখে
শেষ করেছি—যখন যে ক'জটা আরম্ভ করেছি, বিস্মিত আতঙ্কে মানুষ
আমার দিকে তাকিয়ে দেখেছে ; কিন্তু সমাপ্তি যখন করেছি কেউ
ঘৃণায় চক্ষু সরিয়েছে, কেউ রাক্ষসী বলে দূরে সরে গেছে। জয়ী হয়েও
বিজিত আমি আজ-শকে আহত করে, আমিও আহত আজ। না-
আর আমি বাঁচতে পারি না+কিন্তু শেষ দিনে এমন একটুও কিছু
১১২ ]
পঞ্চম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ পঞ্চম রেখে যেতে কি পারব না—যা দেখে অন্ততঃ একজন বড় দুঃখিনী আমি ব’লে এক ফোটা ঢ’খের জল ফেলবে। আদিল। আদিল ! তোমাকে পাবার লােভে আমি বারবিলাসিনীর ছদ্মবেশ প'রেছি—তােমাকে পেয়েছি, কিন্তু এ বেশ আমার মর্মে মর্মে শেল বিধছে। ওহহ আদিল! তুমি সােফিয়াকে চাওন-বারবিলাসিনীকে চাও—এ জালা যে মৃত্যুতেও যাবে না। (প্রহরীর প্রবেশ ) তােমার সাজাদা আসছে বিবিসাহেব। সােফিয়া। আসছ! বড় সুখবর—এই নে,—এই নে, বকসিস নে। প্রহরী। ল্লি আপনার মঙ্গল করুন। [ প্রস্থান। সােফিয়া। তাই করুন—যা কিছু ছিল সব দিয়ে দিলুমআর কি হবে-বেচারী আমার জন্য অনেক কষ্ট করেছে—ও বসিসের উপযুক্ত পাত্র। ( আদিলের প্রবেশ) আদিল। কাকে বকসিস দিচ্ছ বিবি। সােফিয়া। আমার অদৃষ্টকে আদিল। বেশ ক’বছ—আজ আমাকে কিছু বসিস দাও সােফিয়া। পুরুষ মানুষ নেশার ঝোঁকে অমন ব’কেই থাকে। আদিল। বিশ্বাস হলাে না! সােফিয়া। বিশ্বাস--বিশ্বাস না-না-নেশা ছুটে যাবে পুত্রের কথা মনে পড়বে—পদাঘাত করে চলে যাবে। আদিল। তবে নেশা ছুটবেনা জানা যাবে তবু নেশা ছুবে -নেশায় আমি মজও হয়ে থাকব। বিশ্বাস কর বিবি ! সােফিয়া। স্ত্রী পুত্র না ভুলে যাবে পাবেন- আদিল। তােমার মূর্তি আমার স্মৃতির দ্বারে আঘাত করেছে বিবি। বুঝি সে এই—এই বুঝি সেই ছবি! রূপের তটে গানের তুফান গানের তটে রূপের উজান' না বিবি! সে কোমল ছিল-কঠোর হত। [ ১১৩ [ পঞ্চম দৃশ্য পঞ্চম অঞ্চ ] মােগল-পাঠান তাতে ভয় ছিল—অভয়ও দিত। তাতে হাসি ছিল কান্না ছিল। উদাস হয়ে উড়ে যেত গভীর হয়ে ভয় দেখাত তরল প্রেমে গ'লে প’ড়ত। আর এ বুঝি শুধুই শুভ্র হাসির লহর—বুঝি শুধুই পাগল বাঁশীর গান-বুঝি শুধুই পুণ্য প্রেমের তুফান সােফিয়া। আহা সে বুঝি তােমায় ভালবাসত? আদিল। বুঝি বাসত-বুঝি- যাক ছেড়ে দাও—আমি চাই যা, পেয়েছি তা। সােফিয়া। আহা সেই প্রতিমাকে ছেড়ে ঘৃণ্য বার- বিলাসিনীর প্রেমে আদিল। বারবিলাসিনী যদি তাই হও—তাহলে বুঝি বারবিলাসিনীই ভাল। সােফিয়া। ছিঃ ছিঃ-আদিত আদিল। এ্যাঃ সে কি আমার নাম আদিল ! না না আমার সােফিয়া। বঞ্চনা কেন করছ সাজাদা। আদিল। এঁাঃ সে কি । তুমি! কি করে জানলে ! সােফিয়। অধ্য সাজাদা! বারবিলাসিনী যদি বাদশা- পুত্রের অনুসন্ধান না করবে, | কে করবে সাজাদা! আদিল। তাইত। তা।।ক'রেছ। সােফিয়া। কি করে করবে সাজাদা? আমারা যে দুরি ধ’তে জানি। আদিল। অসম্ভব। বলছ—ভয় দেখাে' সােফিয়া। না ! এই দেখ একখানি দুৰি বাহির করিল। এমাদের হাতের খেলনা বেশ খা'+মা’রবে, মার নাকি। আদিল ! এত ভালবাসা! কই মুরী দেখে ত ভয়
পঞ্চম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ পঞ্চম পৃষ্ঠ
তাইত !
পেলে না! তৰে সেই অভাগিনী চক্ষের জলে পা ধুইয়ে দিতে যখন
চেয়েছিলাে—কেন তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে? কেন তার বুক
ভেঙ্গে দিয়েছিলে ?| আদিল ! কেন তাকে আজ এই হেয় আবরণে দেহ
ঢাকতে বাধ্য করলে?
আদিল ।
এ্যাঃ। তবে কি তুমি সম্রাট-নন্দিনী।
তাইত! সাহাজাদি! হৃদয়েশ্বরি! এস, আদিল পরাজিত আজ।
( আলিঙ্গন করিলেন)
সােফিয়া। ছিঃ ছিঃ—কামুক পুরুষ—এমন জঘন্য তুমি-আজ
বারবিলাসিনীর প্রেমে ভু’ললে—তাহলেত তুমি সব ক’বৃতে পার
নানা ছেড়ে দাও আমি জ’তে চাই আমি তােমায় খুন করব।
আদিল। তাই কর—এই নাও বুক পেতে দিই—
সােফিয়া। (ছুরি তুলিলেন ওপরে নামাইয়া) না না—তা কি
পারি। আমার জীক সর্বষ! তা কি পারি—নিজের বুকে নিজে ছুরি
বসাতে পারি, কিন্তু নিজের বক্ষে ছুরিকা বিদ্ধ করণ)
একি। একি! লীলাময়ী নারি—একি করলে?
(পতনের পূর্বে বক্ষে ধারণ)
সােফিয়া। কিছু না নাথ ! আশঙ্কায়—পাছে তুমি ছেড়ে যাও।
তােমাকে বুঝিয়ে দিতে আদিল ! নারী আশ্রয় না পেলে আশ্রয়ের
পার্শ্বে দাড়িয়ে নিজের দেহ খণ্ড খণ্ড করে—পুরুষের মত নূতন আকা
তার হৃদয়ে জাগে না।
আদিল । প্ৰতিশােৰ! প্রতিশােধ! হৃদয়েরি ! প্রতিহিংসা নিলে।
সােফিয়া। বড় সুখস্পর্শ আদিল ! বড় সুখশষ সুখের
মৃত্যু! আশা মিটেছে বিশ্ব খুঁজে এক ক্ষীণ রশ্মি এনে তাকে সারা
আকাশে জালিয়ে দিয়েছি+সমুদ্র মন্থন করে এক র তুলে কী
[ ষষ্ঠ দৃশ্য পঞ্চম অঙ্ক মােগল-পাঠান শিরে বসিয়ে দিয়েছি। সাধ মিটেছে—পাঠানের মেয়ে আমি পাঠানের রাজ্যে মরতে পাছি। আঃ- আদিল। জীবনে কখনও ভাল করে দেখিনি—আমার জীবন- নাটকের ঘাত-প্রতিঘাত-জ্বামার সংসার চক্রের নি আবর্তন! চল সাহাজাদি! মৃত্যুর শয্যায় আজ তােমাকে ভাল করে দেখিগে চল— মৃত্যুর ফুলে তােমায় সাজিয়ে স্মৃতির পূজা করিগে চল। । ষষ্ঠ দৃশ্য কালের দুর্গ সম্মুখ ( কতিপয় সৈন্যসহ মুবারিজের প্রবেশ ) মুবা। সাবাস রাজপুত ! বড় যুদ্ধ করেছ কিন্তু আর অধিকক্ষণ নয়। (সৈন্যগণের প্রতি ) ভাই সব, এইবার দুর্গের দক্ষিণ দিকে আক্রমণ কর তােপখানা দখল করতে চেষ্টা কর—সিংহ-বিক্রমে রাজপুতদের উপর ঝাপিয়ে পড়–দেখিয়ে দাও, পাঠানেরাও যুদ্ধ করতে জানে। (শেরশার প্রবেশ) শের। যুদ্ধ স্থগিত হ’ক। সন্ধিপ্রার্থী আমিশরহত্যায় আর প্রবৃত্তি নাই। দুর্গাধিপতি কীর্ভিসিংহ যদি এখনি আত্মসমর্পণ করেন বীরের যােগ্য সম্মানে আমি তাকে ভূষিত করব- (কমলার প্রবেশ) কমলা। বীরের মত রাজপুত তােমাকে যখন যুদ্ধ নিতে এসেছিল, বীরের সম্মান তুমি কি তাকে দিয়াছিলে সম্রাট ? না—না, নিষ্কলঙ্ক রাজপুতের চরিত্রে কল-কালিমা ঢেলে দিয়ে, রাজপুতকে ছত্রাকার করে দিয়েছিলে কিন্তু স্থির জে’ন পাঠান—অচিরেই তােমাকে এই পাশের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। ১১৬ ]
পঞ্চম অঙ্ক ]
মােগল-পাঠান
[ ষষ্ঠ দৃঙ্গ
শের। বক্সের মত সাহস নিয়ে কে তুমি বালিকা! আজ নির্মম
শেরশার বুকের ভেতর আশঙ্কা জাগিয়ে দিলে।
কমলা। কে আমি ! না-এখন না-পরিচয় দেব পাঠানের
ধবংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে অট্টহাস্যে যখন হেসে উঠব—তখন আমার
পরিচয় পাবে।
শের। বুঝেছি মা! ব্যথিতের দীর্ঘশ্বাস তুমি একটা ভুল
চিনতে পারিনি-আশীর্বাদের আবরণে সঙ্গ নিয়ে অভিশাপের বােঝ।
চাপিয়ে দিয়ে গেছে পাঠানের অভ্যুত্থান শিরে ভুজদের মত দংশন
করে চলে গেছে—আমার জীবনের সমস্ত অধ্যবসায়টুকুকে পায়ের
তলায় ফেলে দলে রেখে গেছে—কিন্তু সে অধ্যায় শেষ হয়েছে-
তুমি আর সে ভুলের অপরাধে সমস্ত জীবনটা পদতলে নিষ্পেষিত
করে দিওনা। যাও মা! এই আমি অস্ত্র ত্যাগ ক’-লুম—আমি
সন্ধিপ্রার্থী।
কমলা। সন্ধি অসম্ভব—যুদ্ধ অনিবার্য।
রাজপুতের প্রত্যেক
শশাণিত-বিন্দুটুকু তােমার কামানের আগুন নিবিয়ে দিতে প্রস্তুত আছে।
দুর্গের শেষ প্রস্তরখানি পৰ্যন্ত তােমর বীরত্বকে প্রতিহত করবে।
শেয়। যুদ্ধ অনিবাৰ্য ! বেশ তবে যাও মা! তােমার ঐ ক্ষুদ্র প্রাণে
যদি এ পাঠানের অত্যাচার এত বেজে থাকে তবে সে অত্যাচারে
নির্বাণ করে দাও-ও মা যুদ্ধ অনিবাৰ্য। পাঠান! আক্রমণ কর
আক্রমণ কর।
[ শেরশা, মুবারিজ ও পাঠানগণের প্রস্থান।
কমলা। রাজপুত ! গন্তীরস্বরে উত্তর দাও
প্রস্থান।
পঞ্চম অ ]
মােগল-পাঠান
[ সপ্তম দৃ
সপ্তম দৃশ্য
কালের দুর্গাভ্যন্তর
(পাঠান সৈন্যগণ ও মুবারিজের প্রশে)
মুবারিজ। দু এই তােপখানাটুকু আমরা দখল করে—িএখনও
সমন্ত বাকি—এই দুর্গের ভেতর অসংখ্য রাজপুত এক একজন এক
একটা জলন্ত তােপখানার মত বসে আছে। এবার তাদের সম্মুখে
তােমাদের অগ্রসর হতে হবে। ভীত হয়ােনা সৈন্যগণ ! খােদার
প্রত্যাদেশে এ জাত মাথা তুলেছে—এ উচ্চ শির নত করে দেয়—এমন
জাত এখনও সৃষ্ট হয়নি! অগ্রসর হওআল্লার নাম স্মরণ করে
রাজপুতের শক্তিকে প্রতিহত কর।
(সকলের দুর্গমধ্যে প্ররেশ-জালাল ও সৈন্যগণের প্রবেশ)
জালাল। দেখলে সৈন্যগণ ! প্রাণের মমতা তুচ্ছ করে মূবারিজের
সৈন্যগণ আজ এ অকুল বিপদসাগরে ঝাঁপ দিয়েছে—তােমরাও এদের
অনুসরণ কর—এ কীৰ্ত্তি একজনকে অর্জন করতে দিও না পাঠান
তােমরা-যথাষােগ্য অংশ গ্রহণ কর। মৃত্যুর ভয় কর না-ম’রতেই
হবে একদিন—এ কীৰ্ত্তি সঞ্চয় করে রেখে যদি মরতে পারি—দুনিয়া
তােমাদের ভুলবে না।
(সকলের দুর্গমধ্যে প্রৱেশ)
(রাজপুত-সৈন্য ও কমলার প্রবেশ)
সৈন্য। আর উপায় কৈ মা?
কমলা। উপায় খুঁজছ! রাজপুত তােমার বুকের ভিতর এখনও
কর ঢেউ খেলছে—এর মধ্যেই তােমরা উপায় খুঁজছ! লক্ষ উপায়
আমাদের সম্মুখে রয়েছে কিছু দেখতে পাচ্ছ না-না-না-এক
কে পাৰ-একজনকে মেরে এসএকটা অঙ্গ ভেঙ্গে দিতে পায়, তাই
উপায় নেই বলে হতাশ হয়ো না।
৪
প্রথম ও শে রাজকর গ্রহণ কর (অভিধান)। কাব্য "
পঞ্চম অঞ্চ ]
মােগল-পাঠান
[ সপ্তম
(শেরশা ও সৈন্যগণের প্রবেশ)
শের। বৃথা চেষ্টা কোথায় যাবে রাজপুত, তোমার অবরুদ্ধ।
কমল। তাইত তাইত তাহলে সত্যই ত উপায় নেই।
শের। তােমাদের সৈন্যগণকে আত্মসমর্পণ করতে বল মাআমি
সসম্মানে তাদের মুক্তি দেব।
কমলা। তাইত—তাইত-রাজপুতকে আত্মসমর্পণ করতে হবে-
নিজের হৃৎপিণ্ড নিজে উপড়ে শক্রর হাতে তুলে দিতে হবে তাই কর
তাই কর—কিন্তু একটা নূতন রকমে আত্মসমর্পণ করতে গড়া
তােমাদের এ কীৰ্ত্তি মন্দির-গােটা শক্রর
হাতে তুলে দিনা—এমনি
করে পুড়িয়ে ছাই করে শত্রুর মুখে চোখে ছড়িয়ে দাও
( ছুটিয়া একটি মশাল লইয়া বারুদখানার দিকে অগ্রসর হইল)
শের। বারুদখানা দখল করবারুদখানা দখল করন :
কমলা। কখন চর-দখল কর
(অগ্নিদান)
সঙ্গে সঙ্গে বিকটধনি হইয়া সমস্ত জলিয়া গেল ও পরে একার হইয়
গল, পরিষ্কার হইলে দেখা গেল, শেরশা ওকলা আগুনের উপর গড়াইতে
শের। খােদ! খােদা! এ কি করলে !
কমলা। হাঃ হাঃ হাঃ-এ সেই রাজভক্ত কুম্ভের এ ললাটে কল
লেপনের প্রায়শ্চিত্ত-এ সেই শঠতার প্রতিশােধহাঃ হাঃ হাঃ-আমি
কে জান সম্রাট আমি সেই বৃদ্ধ রাণা মদেবের কন্যা সেই ভক্ত
বীর কুম্ভের বাগদত্তা স্ত্রী-ক্ষমা করে সম্রাট–ব্যক্তিগত বিবে এ
প্রতিশােধ নিলু না-প্রজার অপরাধের জন্য রাজা দায়ী; তাই আর
জুনে রাজার উপর প্রতিশােধ নিলুম-কি এন্ডি তেল,
নয় পাঠান জাতির উপ-বীর তুমি ক্ষমা কয়ে। আমি
আমি চম-তুমিও এস সম্রাট।
পঞ্চম অঙ্ক ] মােগল-পাঠান [ সপ্তম শের। একটু দয়া হ’ল না—বিব খেয়ে বিষ উদগার করে দিলি আগুন মেখে পাঠানের সর্বাঙ্গ জড়িয়ে ধ’বলি—বেশ ক’বলি মা ! সে দাষী আমি—খাসা শান্তি দিলি-জীবনের ভার বড় গুরু হয়ে যাচ্ছিল তুই লঘু করে দিলি—মহাপপ আমি-তুই আমার পাপের প্রায়শ্চি করে দিলি—শুভাকাঙ্কিণী মা আমার ! তাের সন্তানের অভিবাদন (পতন) (মুবারিজের প্রবেশ) মুখারিজ। একি—একিতাই সমস্ত সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে খােদা ! খােদা ! একি করেছ। শের। কে ? মুবারিজ! সৈন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে! চুপ চুপ চেচিওনা—আমার নাম করে কেউ কেঁদোনা-তাহলে পণ্ড হয়ে যায় সবসাবধান-আমাকে ধর—দাড় করিয়ে দাও ভয় পেয়োনা কেউ। পাড় করিয়ে দাও দেখছ কি? পুড়ুক—পুড়ে যা-সৰ্বাঙ্গ ছাই হ’র যাক, কিন্তু ভয় নেই—ছেড়ে দাও—যাও—আক্রমণ করবংস কর এতিশােধ নাও-এল--কে আছ, জল দাও-পতন ) (ফকিরের প্রবেশ ) ফকির। শের। জল পান কর। শের। না না-ভুলে বলেছি—দুর্গ জয় না হলে অামি জল কতে পারব না—জালাল। মুরিজ! দুর্গ জয় কর (জালালের প্রবেশ) আলাল। বাবা। বাবা। দুর্গ জয় হয়েছে। শের। দুর্গ আয় হয়েছে? ওহহো-খােদা! খােদা ! (সত্যু ফকির। এটি জীবন্ত আদর্শ দুনিয়ার বুক থেকে সরে গেল- বুঝি দুনিয়ায় শিক্ষার শেয়হয়েছে-পুঝি যত্ন করে সে একে নিয়েছে। যবনিকা ] •
No text on this page.
যাত্রা ও থিয়েটারের কতিপয় পুস্তকাবলী: গ্রীসুবেন্দ্র বন্দোপাধ্যায় -- শীসোরীন্দ্রমােহন চাপায় আগুন নিয়ে গে (ই.ি G*** Aughns Strindbery 14.67** Playing wit1 h: ৫ নাটকের আবাদ । ১০ হিন্দুবীর কুরুক্ষেত্র শ্রীকৃষ্ণ আলেকজান্ডার কলির সমৃদ্ধ মন্থ ধবল এবং বিবি শাপমুক্তি অভুলা যায়- • শিব পবে দাশরথি মৃংখ্যাধি। য~- থাৰ পূ শাস্তি বিক্ষে কু' ~ ফেলি zর * * ঐকৃষ্ণ মুখোপাধ- বাংলও কেশব” । } অমি* পুঙ্গাপাধ্যায় খুলনা বধ , গিশ , কারি টি পলাট ‘স্পঘৈ। ৪৮ তাব গিয়াব চুদে • নৰে নিমাই •| প্রবৃন্দাবন সুখ কলিকা লংফ.এম-১০৪, ঋপর চহপুৰ। ৬. witv),
No text on this page.