Amta Public Library,howrah

Banglar Samasya

Ghosh,charuchandra · 2010/03/26

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বাঙ্গালার সমস্যা
শ্রীচারুচন্দ্র ঘােষ
প্রবাসী কাৰ্যালয়
২২ আপার সাকুলার রােড,
কলিকাতা

মূল্য আট আনা মাত্র
১২০২ অপার সাকুলার রোড, কলিকাতা, প্রবাসী প্রেস
হইতে শ্ৰমাণিক চন্দ্র দাস কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত

নিবেদন
কলিকাতা
১১ই এপ্রিল, ১৯২৯
শ্রদ্ধাস্পদেষু
“বাঙ্গালার সমস্যা” আদ্যোপান্ত অভিনিবেশ
সহকারে পাঠ করিয়াছি। কি কি কারণে বাঙালী
জাতি এমন মস্তিষ্কশালী হইয়াও জীবন-সংগ্রামে
অবাঙালীর প্রতিযােগিতায় হঠিয়া যাইতেছে তাহা
সুন্দরভাবে আলােচিত হইয়াছে। পরীক্ষা পাশ
করিতেই বাঙালী যুবকের সমস্ত শক্তিসামর্থ্য নিয়ােজিত
হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের তা লইয়া বাহির হইয়া
আসিলে সে এক প্রকার অন্তঃসারশূন্য ও ভগ্নস্বাস্থ্য।
তাহার আর কিছুই অভিনব পন্থা অবলম্বন করিবার
সাধ্য থাকে না। ওকালতি ও ডাক্তারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা
বা চাকুরির উমেদার হওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর নাই।
আমাদের সামাজিক ব্যাধিও অনেক—বলিতে গেলে
আমাদের সমাজে ঘুণ ধরিয়াছে। আমূল সংস্কারের
প্রয়ােজন। প্রবন্ধে এই সকল বিষয় যথােচিত
আলােচিত হইয়াছে। আমার মতে
এই প্রবন্ধ

১০৫-১৫২
রাজনৈতিক সমস্যা
শিক্ষাসমস্যা
শিক্ষার উদ্দেশ্য
শিক্ষার প্রথম সােপান
শিক্ষার বিভাগ
শিক্ষার পদ্ধতি
শিক্ষায় তাড়না ও আদর
সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত
শিশুদের শিক্ষার আদর্শ এবং পিতামাতা ও
অভিভাবক প্রভৃতির কর্তব্য
জননী-প্রতিষ্ঠান
নিজের কথা
১৫৩-১৫৭
১৫৮

স্বদেশবাসীর সেবাকরণেচ্ছু
জনৈক বাঙ্গালীর
নিবেদন

No text on this page.

০ বাঙ্গালার সমস্যা চিন্তাশীল বাঙ্গালী মাত্রেই আজকাল বাঙ্গালা দেশের আর্থিক ও সামাজিক দুরবস্থা বিশেষরূপে অনুভব করিতেছেন। প্রত্যেক বাঙ্গালীর এসম্বন্ধে চিন্তা করা উচিত এবং যাহার যতটুকু সাধ্য উন্নতির সাহায্য করা উচিত। সুখের বিষয় অনেকেই তাহা করিতেছেন। কিন্তু ব্যাধির গুরুত্বের তুলনায় উপস্থিত বিধিব্যবস্থার পরিমাণ অতি অল্প, অথচ প্রয়ােজন অনেক বেশী। বাঙ্গালার বা প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালীর, এই দুরবস্থার নানা কারণ নির্দেশ করা হইতেছে। এই সম্বন্ধে একটি উদাহরণ দিতেছি। বিলাতে গরু- ঘােড়র খাদ্যের জন্য ভার নামক শস্য চাষ করা হয়। কোন স্থানে দেখা গেল এই শস্যের বীজ হইতেছে না। দূর দেশ হইতে বীজ মা আসিলে শস্য জন দুষ্কর। অনুসন্ধানের ফলে বৈজ্ঞানিকগণ বলিলেন যে, সে-স্থানে যথেষ্টসংখ্যক অবিবাহিতা প্রৌঢ়া ও বৃদ্ধা স্ত্রীলােকের অভাবই বীজ না হওয়ার কারণ। কারণটি প্রথমে হাস্যাস্পদ বলিয়া মনে হয়। কিন্তু তাহারা প্রমাণ করিয়া দেখাইলেন যে, এক প্রকার ভ্রমর এই শস্যের ফুলের পরাগ ও মধু আহরণ করে। এক ফুল হইতে মধু ও পরাগ লইয়া যখন ভ্ৰমৰ অন্ত ফুলে যায় তখন আহরিত পরাগের কিছু অন্য ফুলের গর্ভকেশরে লাগিয়া তবে বীজোৎপত্তি হয়। শপর ফুলের পরাগ ব্যতীত ফুলে বীজোৎপত্তি হইতে পারে না। সেখানে এই ভ্রমরের সংখ্যা অতি অল্প এবং অল্পসংখ্যক ভ্রমর সমস্ত ফুলে ভ্রমণ করিতে পারে না। এই কারণে অতি অল্প ফুলেই বীজ হয়। ভ্রমরের সংখ্যার অল্পতার কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেল যে, ভ্রমরেরা মাটির ০ २ বাঙ্গালার সমস্যা ভিতর বাসা করে এবং ইদুরে তাহাদের বাসা নষ্ট করে ও বাচ্চা খাইয়া ফেলে। সেখানে অন্য স্থান অপেক্ষা ইদুরের প্রাদুর্ভাব বেশী। ইহাদের সংখ্যাধিক্যের কারণ ইহাদের ধ্বংসকারী বিড়ালের অভাব। প্রৌঢ়া ও বৃদ্ধা স্ত্রীলােকেরাই এদেশে বিড়াল পােষে। এরূপ স্ত্রীলােকের সংখ্যা কম, অতএব বিড়ালের সংখ্যাও কম। এখন ক্লভার শস্যের বীজ না হওয়ার কারণ কোথায় গিয়া দাড়াইল! এই পৃথিবীর জীবজন্তু, বৃক্ষলতা, মৃত্তিকা ও খনিজ পদার্থ প্রভৃতি সকলই এমনভাবে জড়িত যে, ইহাদের কোন-একটির ব্যবহার বা ব্যবস্থা বদলাইলে অপর অনেকের ক্ষতি-বৃদ্ধি হয়, যেমন পায়ের কড়ে আঙুলের ফোড়ার দরুণ সমস্ত শরীরেরই ব্যাধি উপস্থিত হইতে পারে। বাঙ্গালার বর্তমান দুরবস্থার যে সঠিক কারণ কোথায় তাহা জোর করিয়া বলা যায় না। ইহার সহিত সামাজিক আচার-ব্যবহার, খাদ্য, ধর্মবিশ্বাস, শিক্ষা, রাজ- নৈতিক অবস্থা এবং অনাচার প্রভৃতি সকলই জড়িত। রেল, জাহাজ, উড়োজাহাজ, টেলিগ্রাফ প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের দরুণ পৃথিবীর জাতিসমূহ এক বৃহৎ পরিবারে পরিণত হইতেছে। সকল জাতিরই বাহিরের সম্বন্ধও উন্নতি-অবনতির সহিত কিরূপে জড়িত তাহার দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যাইতে পারে,-আধুনিক যন্ত্রচালিত শিল্পের সংঘর্ষে আসিয়া আমাদের শিল্পের অবনতি ও লােপ । অত এব চারিদিক উত্তমরূপে পৰ্যবেক্ষণ করিয়া সকল দিকেরই উন্নতি আবশ্যক। সকল দিকে নজর রাখিলে কোন একদিকের বহুল প্রচেষ্টাও নিস্ফল হইতে পারে। যে-সকল বিষয়ে উন্নতির প্রয়ােজন সেগুলিকে সমস্যা বলিতেছি। ইহাদের সম্বন্ধে মােটামুটি ভাবে আলােচনা করা এই ক্ষুদ্র পুস্তিকার উদ্দেশ্য এবং আশা, যে, যােগ্যতর দেশহিতৈষী ব্যক্তি এ সম্বন্ধে অভিমত প্রকাশ করিবেন। সমস্যাগুলির সম্পূর্ণ না হােক অন্ততঃ অর্থসমস্যা আংশিক সমাধানের যে পন্থা লেখকের মনে উদয় হইয়াছে তাহাও পুস্তিকার শেষ ভাগে নিবেদন করা হইয়াছে। এই পন্থা কার্যকরী করিবার উদ্দেশ্য লইয়াই লেখক ইহা প্রচারে অগ্রসর হইয়াছে। অর্থসমস্যা আমাদের অর্থসমস্যা কত কঠিন এবং আমরা যে কত গরীব তাহা ধারণা করা যায় না। হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে যে, গড়পড়তায় আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রবাসী প্রত্যেক নর-নারীর দৈনিক আয় তের- চৌদ্দ টাকা, প্রত্যেক ইংরেজ নর-নারীর সাতটাকা, আর ভারতবর্ষের লােকের দুই আনা ! এই হিসাবে ব্যবসা ও কলকারখানায় উন্নত ধনী বােম্বাই প্রদেশের লােকদিগকেও ধরা হইয়াছে। বাঙ্গালা দেশের লােক যে কত দরিদ্র তাহা ইহা হইতে বুঝা যাইবে। আমাদের কত লােক যে অৰ্ধাশনে ও অনশনে এবং একমাত্র কৌপীন পরিয়া দিন কাটাইতে বাধ্য হয় তাহার ইয়ত্তা নাই। দেশের আর্থিক উন্নতি হয় কৃষিশিল্প ও ব্যবসার বারা, বাঙ্গালী শিল্প ও বাণিজ্য হইতে হটিয়া গিয়াছে, কৃষি ব্যতীত চাকুরিই এখন বেশীর ভাগ বাঙ্গালীর অর্থাগমের উপায়, গৃহস্থের কাজ করিবার জন্য যেমন চাকর-ঝি দরকার, জমিদারীর কাজ চালাইবার জন্য যেমন । নায়েব-গােমস্তা আবশ্যক, সেইরূপ দেশের সরকারী কাজ চালাইবার জন্যও কতক লােক প্রয়ােজন, যথা—দারােগা, মুন্সেফ, ডেপুটী, জজ, ম্যাজিষ্ট্রেট, লাট প্রভৃতি। এই সকল চাকুরিজীবী যারা দেশের অর্থাগম হয় না, বরং ইহাদের বেতনাদির জন্যই অর্থব্যয় হয়। উকিল ডাক্তার প্রভৃতিও একরকম চাকুরিয়া। শিল্প ও ব্যবসা হইতে বাঙ্গালীর হটিবার প্রধান কারণ হইতেছে যে, ৪ বাঙ্গালার সমস্যা যাহারা পাশ করা শিক্ষিত’ তাহারা কেরাণী হইলেও সমাজে "ভদ্র এবং যাহারা শিল্পী দোকানদার বা ব্যবসাদার তাহারা অভদ্র’ বিবেচিত হইতে লাগিল। যে শিক্ষিত হইল, শিল্প দোকানদারী বা ব্যবসা তাহার পৈত্রিক হইলেও তাহা ত্যাগ করিয়া চাকুরি, ওকালতী, মােক্তারী প্রভৃতি ব্যবসায়ে প্রবেশ করিল। বাঙ্গালীদের মধ্যে ইংরেজী শিক্ষার প্রচলন শীঘ্র শীঘ্র হওয়ায় এবং ইংরেজীর জ্ঞানে চাকুরি সুলভ হওয়ায় এই শিক্ষার দ্বারা চাকুরি লইয়া ভদ্র হওয়া সকলেরই লক্ষ্য হইল। শুধু যে আমাদের দেশেই এইরূপ হইয়াছে তাহা নহে; বিলাত আমেরিকাতেও এইরূপ ‘ভদ্র’ ও ‘অভদ্রের ভাব এখনও বর্তমান এবং ইহা দূর করিবার জন্য যথেষ্ট প্রয়াস চলিতেছে। আমেরিকায় পরিষ্কার পরিচ্ছদধারী শিক্ষিত ব্যাঙ্কের কেরাণী সাত দিনে যত রােজগার করে, একজন রাজমিস্ত্রির দুই দিনে তাহা অপেক্ষা বেশী আয়। অতএব কাজের পর সন্ধ্যাবেলায় রাজমিস্ত্রি কেরাণী অপেক্ষা বেশী বাবুগিরি করিতে পারে। এই কারণে ঐ সকল দেশে সমাজের এই ভ্রান্ত ‘ভদ্র’ ও ‘অভদ্র’ ধারণা যত শীঘ্র দূর হইতেছে আমাদের দেশে জাতিভেদের দৃঢ় গণ্ডীর দরুণ তত শীঘ্র হইবে না। তবে হইতে আরম্ভ হইয়াছে। যাহাতে রাজমিস্ত্রি, চুতার, তাঁতী, মালীরাও কেরাণী প্রভৃতি ‘শিক্ষিত’শ্রেণীর সমান “ভদ্র” বিবেচিত হয় ঐ সকল দেশে এখন তাহার চেষ্টা চলিতেছে এবং যাহাতে কেবল ব্যবসার দিকে ঝোঁকের দরুণ প্রকৃত শিল্পবাণিজ্য উপেক্ষিত হইতে না পারে তাহারও চেষ্টা চলিতেছে। পূর্বে ভারতের উত্তরাঞ্চলে বাঙ্গালী অনেক চাকুরি পাইত। উচ্চ বেতনভােগ বাঙ্গালীকে দেখিয়া কোন কোন স্থানে এখনও লােকের ধারণা যে বাঙ্গালীদের মধ্যে গরীব নাই। বাঙ্গালী গেল ঐ সকল অর্থসমস্যা প্রদেশে চাকুরি করিতে, আর ঐ সব প্রদেশের লােক বাঙ্গালায় আসিয়া বাঙ্গালার ব্যবসা দখল করিয়া বসিল। এখন সকল প্রদেশেই আইন করিয়া বাঙ্গালীর চাকুরির পথ বন্ধ হইতেছে। যদিও চাকুরি সম্বন্ধেও বাঙ্গালার ঘর অপর সকল প্রদেশের লােকের পক্ষে অবারিত। দেশেই বা আর কত চাকুরি জুটিবে ? ফলে-বাঙ্গালীর ঘরে আজ অন্নাভাব। চাকুরীর চরম হইয়াছে। এই সুদূর ব্রহ্মদেশে বাঙ্গালী আসিয়াছে চাকুরি, ওকালতী, ডাক্তারী করিতে, আর মাড়ােয়ারী, সুরাটা, গুজরাট, দিল্লীওয়ালা, এমন কি, বহু মাত্ৰাজীও আসিয়াছে ব্যবসা করিতে, সমস্ত ব্যবসাই প্রায় ইহাদের ও চীনাদের হাতে। একবার গােয়ালন্দ হইতে রেলে কলিকাতা আসিতেছিলাম। কুষ্টিয়া ষ্টেশনে এক মাড়ােয়ারী তাঁহার পাঁচ ছয়টি পুত্র সঙ্গে লইয়া গাড়ীতে উঠিলেন। পুত্রগণের বয়স ছয়-সাত হইতে সতের-আঠার। দশ- এগার বৎসর বয়স্ক একটি বালক আমার পাশে বসিল। তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম যে, সে তাহার পিতার কাপড়ের দোকানে বসে এবং নিজেদের ভাষা শিক্ষা করে, কখনও কখনও কেহ না থাকিলে কাপড় বিক্রয়ও করে। ভবিষ্যতে কি করিবে জিজ্ঞাসা করিলে সে বুক ফুলাইয়া জোরের সহিত বলিল, ‘আমিও দোকান করিব, বড় বড় ব্যবসা করিব। ইহাদের সাধনা অনুযায়ী সিদ্ধিলাভ হয়। মাত্র সােটাকম্বলই লক্ষপতি হইতে সহায়তা করে। ব্যবসা করিতে টাকা কোথা পাইব বলিয়া হাল ছাড়িয়া বসিয়া থাকে না। বাঙ্গালীর ছেলের আদর্শ ও আশা কি? বাপ, খুড়া, জ্যেঠা, বা প্রতিবেশী কেহ উকিল, ডেপুট, ষ্টেশন মাষ্টার, বা শিক্ষক, বা কেরাণী। ছেলেদের আশা, জোর ডেপুটী, না হয় উকিল, বড় জোর হাইকোর্টের জজ হইব। ডেপুটী জজ হয় কয়টা?—সকলেরই লক্ষ্য ৬ বাঙ্গালার সমস্যা একটা চাকুরি। চাকুরি ছাড়া গতি নাই। লেখাপড়ায় পাশ ছাড়া চাকুরি হয় না, অতএব অবস্থায় না কুলাইলেও যথাসর্বস্ব খােয়াইয়া পাশের পর পাশ ত আগে কর, তারপর যাহা-হােক একটা চাকুরির চেষ্টা। চাকুরিই বা মিলিবে কত ? এখন বাঙ্গালার যেখানেই যান দেখিতে পাইবেন কত যুবক বি-এ, এম্-এ পাশ করিয়া বেকার বসিয়া আছে, রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। বাঙ্গালীর এই চাকুরিরূপ সাধনার ফল এই হইয়াছে যে, এদেশেই একেবারে নিঃস্ব অবস্থায় আসিয়া ব্যবসায়ে কয়েক বৎসরেই মাড়ােয়ারী লক্ষপতি হয়। গুজরাটী, ভাটিয়া, দিল্লী- ওয়ালা প্রভৃতি ব্যবসায়ীরা বাঙ্গালা দেশেই ব্যবসা করিয়া গাড়ী-জুড়ী হাঁকায়, ইন্দ্রপুরী-তুল্য বাড়ীতে বাস করে, আর বাঙ্গালী-ঈশ্বরের দান যে আলাে ও বাতাস—তাহারও অভাব অনুভব করে। চাকুরীর কুফল চাকুরিপ্রিয়তার দরুণ বাঙ্গালী দরিদ্র হইয়াছে, তাহা জাতীয় চরিত্র হীন হইয়া পড়িতেছে। পদস্থ ব্যক্তিকেও নিজ পুত্র বা আত্মীয়ের চাকুরির জন্য নিম্ন পদস্থ ব্যক্তির উমেদারী করিতে দেখা যায়। বি-এ, এম্-এ পাশ করিয়াও বাঙ্গালী-যুবক সামান্য বেতনের 814fa9 ay 'Honoured Sir, 'Respected Sir,''Your Honour,'. প্রভৃতি আত্মসম্মানহানিকর বাক্যসকল দরখাস্তে ও কথাবার্তায় ব্যবহার করে। চাকুরির জন্য বাঙ্গালী আত্মসম্মানজ্ঞান হারাইয়াছে। শিক্ষিতেরাই জাতির অগ্রণী, ইহাদের জাতীয় আদর্শ কত ছােট হইয়া পড়িয়াছে তাহা সকলেরই ভাবিবার বিষয়। পড়াশুনা করিলাম, বড় ডিগ্রি লইলাম, পরে একটা চাকুরি, বড় জোর একটা ডেপুটগিরি বা মুন্সেফি; কিন্তু আয়হিসাবে ডেপুটাগিরি বা মুন্সেফি কি ? মুরগী- ।

৭ চাকুরির কুফল হাটার একটা ছােট দোকানদারের আয়ও ইহাপেক্ষা বেশী। আর হােট ব্যবসাদার হইতেই বড় ব্যবসাদার হওয়া যায়, কারণ তাহাদের পথ অবারিত। বহুদিন পূর্বে কাৰ্যোপলক্ষে একবার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কোন স্থানে গিয়াছিলাম। উপস্থিত এলাহাবাদ হাইকোর্টের এক জজ তখন সেখানে মুন্সেফ ছিলেন। তিনি কহিলেন যে সেখানে বহু বাঙ্গালী রেলের কাজ বা কেরাণীগিরি করে, তাহারা সময় কাটায় তাস ইত্যাদি খেলিয়া, থিয়েটার করিয়া এবং এই সমস্ত নির্দোষ আমােদ-প্রমােদ ব্যতীত অনেকে মদ্যপান ও আনুষঙ্গিক দোষে রত থাকিয়া এবং সর্বোপরি নিজেদের মধ্যে দলাদলি করিয়া। মাসকাবারে মাহিনা পায়, কোনওরূপে দিনের নির্দিষ্ট কাজ করিয়া দিলেই খালাস, আত্মোন্নতির চিন্তাটাও আসে না। তাহার পর কাৰ্যোপলক্ষে বহু স্থান ভ্রমণ করিয়াছি; বাঙ্গালী বাঙ্গালার বাহিরে গেলেও তাহাদের এই দলাদলির ভাব প্রায় সর্বত্রই দেখা যায়। ভিন্ন প্রদেশীয় ব্যবসা- দারদের বাঙ্গালী অপেক্ষা সংখ্যাধিক্য সত্ত্বেও এইরূপ দলাদলি নাই বলিলেও চলে। কারণ তাহাদের একটা চিন্তার বিষয় আছে। চাকুরির বাঁধা মাহিনা, মাসের শেষে বেতন পাইবার নিশ্চয়তা চাকুরিজীবী বাঙ্গালীর আত্মচেষ্টা ও আত্মশক্তিতে বিশ্বাস নষ্ট করিয়া দিতেছে। একটা বাঁধা মাহিনা হইলেই হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচে, ভাবে খাইবার পরিবার ভাবনা হইতে উদ্ধার পাইল। ব্যবসাদারদের নানা দিকে নজর রাখিয়া, নানা পথে শক্তির চালনা করিয়া ব্যবসা বৃদ্ধির এবং আয় বৃদ্ধির সতত একটা চেষ্টা থাকে। এই চেষ্টাশক্তির চালনা হেতু ইহার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়, ব্যবসারও উন্নতি হয়। কিন্তু চাকুরিজীবীর পয়সা যেন অনেকটা চেষ্টা না করিয়াই আসে। দিনের বাঙ্গালার সমস্যা পর দিন কাজ করিয়া যাও। কাজের সহিত পয়সার কোন চিন্তা বা সম্বন্ধ নাই, ব্যবসার সহিত পয়সার যেমন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ, ব্যবসা ভাল না চলিলেই পয়সা কম আসিবে, চাকুরির সহিত পয়সার সম্বন্ধ তেমন ঘনিষ্ঠ নয়। চাকুরির পয়সা যেন অনায়াসলভ্য। এই অনায়াসলভ্য পয়সা আমরা অনায়াসেই, অর্থাৎ বৃথা বাবুগিরিতে খরচ করি । বােম্বাই প্রদেশের স্যর উপাধিধারী বড় বড় ব্যবসাদার বাঙ্গালীর পক্ষে যে-কাপড় ময়লা, সেই কাপড়ের উপর জামা পাগড়ী ও সাদা চাদর ব্যবহার করিয়া লাটের দরবার পর্যন্তও গমন করেন। পয়সা রােজগার সম্বন্ধে এই যে আয়াস ভাব ইহা বাঙ্গালীর যৌথ- কারবার করিবার অক্ষমতার অন্যতম কারণ বলিয়াই বােধ হয়। বহু জনের নিকট হইতে অংশবিক্রয়লব্ধ পয়সা অনায়াসেই আত্মসাৎ করি, বা লাভ লােকসান বিবেচনা না করিয়াই খরচ করি। ওকালতি, ডাক্তারিতেও সম্পূর্ণরূপে না হইলেও অনেকটা সেইরূপ আয়াসের ভাব দেখা যায়। বাঙ্গালীর চাকুরিপ্রিয়তার এক ফল বিবাহে পণপ্রথা। পণপ্রথা উঠাইয়া দিবার জন্য কত সভা সমিতিতে বক্তৃতা হইয়াছে ; প্রতিকার কিছুই হয় নাই। এভাবে হইবার নয়। সকল পিতা-মাতারই স্বাভাবিক ইচ্ছ। যে কন্যা উপার্জনক্ষম পাত্রে পড়ে। বাঙ্গালীর উপার্জন মানে চাকুরি। যে ছেলে লেখাপড়া শিখিয়াছে বা শিখিতেছে, পাশ করিয়াছে, তাহারই চাকুরির সম্ভাবনা বেশী। অতএব কার পিতারা এরূপ ছেলেকে জামাতা করিবার প্রয়াসী হন। যে ছেলের চাহিদা বেশী তাহার দাম, অর্থাৎ পণও বেশী। এরূপ ক্ষেত্রে বরের পিতা সর্বাপেক্ষা বেশী পণ প্রদানক্ষম ব্যক্তির কন্যাকে পুত্রবধুরূপে গ্রহণ করিলে তাহাকে সম্পূর্ণরূপে দোষ দেওয়া যায় না। পণপ্রথার সমাধান ব্যবসা হইবে তখন যখন পাশ না করিয়াও অনেক ছেলে উপার্জনক্ষম হইবে । তাহার পূৰ্ব্বে নয়। একটু চিন্তা করিয়া দেখিলে সকলেই বুঝিতে পারিবেন যে, হিন্দু- মুসলমানের বিরােধেরও এক প্রধান কারণ এই চাকুরি বা চাকুরির ভাগ- বাটোয়ারা। অনেক সময় দেখা যায় ভ্রাতাদের মধ্যে কেহ উচ্চবেতনের চাকুরি করিতেছে ; পয়সা যখন সচ্ছল তখন কেমন উদারভাব ; আত্মীয়গণকে, এমন কি অপরকেও সাহায্য করিতে দ্বিধা নাই। তারপর বৃদ্ধ বয়সে পেন্সন লইয়া যখন বাড়ীতে আসিয়া বসে তখন পয়সার সচ্ছলতা কম হইলে অর্ধহস্ত পরিমিত জায়গার ভাগ লইয়া ভাইদের সহিত কলহ ও মােকদ্দমা করিতে প্রস্তুত। চাকুরপ্রিয়তাই বাঙ্গালীকে দরিদ্র করিয়াছে। আর এই দারিদ্র্যের দরুণ আমাদের মন ক্ষুদ্র হইয়াছে। অভাবে পড়িয়া অনেক সময় আমরা অন্ধ হইয়া যাই। যেখানে সুবিধা এবং যেমন করিয়া হউক দু-পয়সা আয় ও সঞ্চয় করিতে পারিলেই হইল। ইহার জয় হিতাহিত জ্ঞান হারাই এবং অনেক সময় অপরের এবং দেশের পর্যন্ত ক্ষতি করিয়া ক্ষুদ্র স্বার্থ সিদ্ধ করি। আর মাত্র হাজার কতক টাকা সঞ্চয় করিতে পারিলেই মনে করি যে একটা হইয়া গিয়াছি। যিনি লক্ষ টাকা করিয়াছেন তাহার ত কথাই নাই। কিন্তু এক লক্ষ দুই লক্ষ টাকা আবার একটা টাকা। ব্যবসা চাকুরির চরম হইয়াছে। এখন ব্যবসা ও শিল্পের দিকে গতি ছাড়া উপায় নাই। আজকাল অনেক বাঙ্গালীর ছেলের ব্যবসার দিকে ঝোঁক হইয়াছে। ইহা আশার কথা। কিন্তু ব্যবসা করিব বলিলেই ব্যবসা করা ১০ বাঙ্গালার সমস্যা হয় না; ইহার জন্য শিক্ষানবিশী করা আবশ্যক। বাঙ্গালীদের নিজেদের বড় বড় ব্যবসা নাই যে, কোথাও বড় কারবারের শিক্ষানবিশী করিবে। যৌথ-কারবারে ব্যবসা করিবার মত শিক্ষা এখনও পায় নাই তাহাদিগকে ব্যবসার অ, আ, হইতে আরম্ভ করিতে হইবে। যাহারা বড় বড় ব্যবসা আরম্ভ করিতে পারেন করুন, কিন্তু সাধারণ বাঙ্গালীর পক্ষে একমাত্র একমাত্র শিক্ষানবিশী হইতেছে ছােট ছােট ব্যবসা। মাড়ােয়ারী, দিল্লীওয়ালা, গুজরাট, সুরাট, ভাটিয়া, বা পাশী, যাহারা এখন ব্যবসায়ে কৃতী ও ধনী, এমন কোন ঈশ্বরদত্ত বিশেষ ক্ষমতা লইয়া জন্মে নাই কেবল যাহা দ্বারাই ইহারা ব্যবসায়ে উন্নতি করিতে পারিয়াছে। ব্যবসায়ে কৃতিত্ব কেবলমাত্র শিক্ষা ও চেষ্টার ফল। ঐ দিকে শিক্ষা ও মতি হইলে বাঙ্গালীও বড় ব্যবসাদার হইবে। এখনও চাকুরিপ্রীতির দিনেও বাঙ্গালী ব্যবসাদার নাই এমন নয়। ব্যবসাতে উন্নতির পথ অবারিত, ছােট ছােট ব্যবসাদারদেরও সময় সময় এমন সুযােগ আসিয়া পড়ে যে, অল্প সময়ের মধ্যেই বহু উন্নতি করিতে পারে। লাভলােকসান বুঝিয়া সততার সহিত ছােট ছােট ব্যবসা করিতে শিখিলেই ধাপে ধাপে উঠিয়া বড় হইবেই; কিন্তু এক বিশেষ সৰ্ত্ত হইতেছে এই যে, নিজে হাতেকলমে কাজ করিতে হইবে। আয় হইতে বায়াধিক না হয় ইহার জন্য যাহা-কিছু ত্যাগ করিতে হয় তাহা করিতে হইবে। ব্যবসার শিক্ষানবিশীতে বাবুগিরির স্থান নাই। এক জেলার এক প্রবীণ উকীল তাহার পাশ-করা পুত্র ও আত্মীয়গণকে কারবায়ের বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। টেবিল, চেয়ার, টেলিফোনের সমস্ত বন্দোবস্ত হইল; কিন্তু বৎসরান্তেই লালবাতি জালাইতে হইল। অথচ সেই একইরূপ ব্যবসায়ে একজন নয়, ব্যবসা ১১ কয়েকজন মাড়ােয়ারী লক্ষপতি হইল। এবং তাহাদের ব্যবসা যেন চিরস্থায়ী; পুত্রপৌত্ৰাদিক্রমে তাহারা ভােগ দখল করিবে। সামান্য ব্যবসা আরম্ভ করিয়া কিরূপে উন্নতি হয় তাহার দৃষ্টান্ত দুই একটি দিতেছি-এক হিন্দুস্থানী বৰ্ম্ম। রেলে খালাসীর কাজ করিত, কেরাসিন তেল ইত্যাদি প্রতি ষ্টেশনে বিলি করিয়া বেড়াইত। ভুলক্রমে কোন ষ্টেশনে বেশী দেওয়ার দরুণ হিসাবে গরমিল হয় এবং তাহার চাকুরি যায়। তখন সে আর চাকুরির চেষ্টা না করিয়া আমার এক বন্ধুর নিকট সামান্য মাত্র টাকা লইয়া উত্তর-বৰ্মার এক শহর হইতে গুড় কিনিয়া রেঙ্গুনে বিক্রয় করিয়া কিছু লাভ করিল। এইরূপে কেনা-বেচা করিতে লাগিল। ঐ বন্ধুর টাকা সময় মত শােধ দিত এবং দরকার হইলে লইত। কয়েকবৎসর তাহার আর কোন খবর পাওয়া গেল না। পরে হঠাৎ একদিন আসিয়া আমার বন্ধুকে বলিল যে, একবার তাহার দোকানে পদার্পণ করিলে সে কৃতার্থ হইবে। তখন তাহার দোকানে প্রায় দশ-বার হাজার টাকার মাল মজুত এবং সে ছােট-খাট একটি ব্যবসাদার। কলিকাতার এক বাঙ্গালী ভদ্রলােক তাহার এণ্টন্সি ফে-কর একপুত্রের জন্য বহু চেষ্টা করিয়াও কোন চাকরি জোগাড় করিতে পারিলেন না; এমন কি ২৫৩১ টাকা। ঘুষ দিতেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন। যখন কোন চাকরি হইল না তখন এই ২৫০ টাকা পুত্রকে দিয়া বলিলেন, “তুমি এই টাকা লইয়া কিছু করতে পার কি না দেখ।* পুত্রের সুমতি হইল, সে এক মনােহারী দোকানের পত্তন করিয়া কয়েক বৎসরের মধ্যেই বেশ সঙ্গতিপয় হইল। কলিকাতার চাদনীর নীলমণি দত্তের কাটা-কাপড়ের দোকান বাঙ্গালার সমস্যা অনেকেই জানেন। ফিরিঙ্গী-মহল নীলমণি দত্তের দোকানের পােক হইলেই চরম হইল বলিয়া মনে করে। এই নীলমণি দত্তের পিতা সামান্য পকোড়া বা পক্কড় বিক্রয় করিয়া দিনপাত করিতেন। এইজন্য তালতলায়, যেখানে ইহাদের বাস, নীলমণি দত্তের চলিত নাম “নীলুফড়” { নীলুপক্কড়)। নীলমণি এক বাঙ্গালীর কাটা-কাপড়ের দোকানে দুই টাকা বেতনে চাকররূপে নিযুক্ত হন। তামাক সাজিতেন, দোকান বাট দিতেন। নীলমণির বুদ্ধি ও সততা ছিল এবং ক্রমে দোকানের কাজ বুঝিতে পারিলেন। ঐ দোকানের মালিকের মৃত্যু হইলে নীলমণি দোকান চালাইতে থাকেন, পরে অংশীদার হন, এবং আরও পরে নিজেই দোকান করেন। তালতলায় নীলমণি দত্তের এখন এত বাড়ী যে বাড়ী ভাড়ার আয় মাসে দশ-বার হাজার টাকা। তাহার বাড়ীর ভাড়া কম এবং কেহ ভাড়া দিতে না পারিলে কাহারও উপর নালিশ করিতেন না। অন্য বাড়ী দেখিয়া তাহাকে তাহার বাড়ী ছাড়িয়া দিতে বলিতেন। কেহ কেহ এক বৎসর দেড় বৎসর বিনা ভাড়ায় থাকিয়া গিয়াছে। নীলমণি দত্তের এত পয়সা হইলেও বরাবর সাদাসিধা ভাব ছিল এবং লােকের সহিত • অতি অমায়িক ব্যবহার করিতেন। বিশেষ করিয়া কলিকাতার উত্তরাঞ্চলে যদি কেহ খােজ করেন, কত নীলমণি দত্ত দেখিতে পাইবেন। কেহ হয়ত চাকর, না হয় সরকার হইয়া কোন দোকানে কাজ করিতে করিতে নিজের ব্যবসা আরম্ভ করেন; এখন তাহাদের বাড়ীতে হয়ত দুর্গোৎসবে হাজার হাজার, এমন কি, লক্ষ টাকাও খরচ হয়। প্রসিদ্ধ কয়লা ব্যবসায়ী এ, সি, সরকার সামান্য বেতনে কেরাণী-রূপে জীবন আরম্ভ করেন। ( তিন বৎসর পূর্বের কথা লিখিয়াছিলাম, দুর্ভাগ্যক্রমে এখন ইহার ব্যবসা নষ্ট হইয়াছে)। আর এক কয়লার ব্যবসাদারকে ব্যবসা জানি, যিনি রাঁধুনী হইয়া গিয়াছিলেন; ইহার বাড়ীতে এখন দুর্গোৎসবে চল্লিশ হাজার টাকা ব্যয় হয়, একটা বাঙ্গালীর ছেলে চতুর্থ শ্রেণী পৰ্যন্ত পড়িয়া অসঙ্গতি হেতু পড়া ছাড়িয়া সামান্য বেতনে এক কয়লার মালিকের কর্মে নিযুক্ত হয়, পাঁচ সাত বৎসর যাইতে না-যাইতে ২৫০ টাকা বেতনে এক গদির ম্যানেজার হয় এবং এখন নিজের ব্যবসায় আরম্ভ করিয়াছে। হয়ত কালে সে দ্বিতীয় এ, সি, সরকার হইবে। বুঝিয়া ব্যবসা করিতে পারিলে ছােট ছােট ব্যবসাই ক্রমে কিরূপে বড় হয় তাহার এইরূপ কত দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। পয়সা সর্বত্রই পড়িয়া আছে। কুড়াইয়া লইতে জানা চাই। ইহার জন্য শিক্ষা- নবিশীর প্রয়ােজন। বি-এ পাশ করিয়া পুত্রকন্যার জনকরূপে এরূপ শিক্ষানবিশী হয় না। ব্ৰহ্মদেশে প্রায় সব বাঙ্গালীই চাকুরি করিতে আসিয়াছেন, একমাত্র বাঙ্গালী ব্যবসাদার শশীভূষণ নিয়ােগী। অতি সামান্য দোকান হইতে ক্রমে বড় ব্যবসাদার এবং বহু লক্ষ টাকার মালিক হইয়াছিলেন। হাজার হাজার টাকা অকাতরে দান করিয়া গিয়াছেন। পয়সা হইলেও অমায়িকতা কখনও হারান নাই। সম্প্রতি তাঁহার স্বর্গলাভ হইয়াছে, কিন্তু তিনি বঙ্গ সন্তানের সম্মুখে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখিয়া গিয়াছেন। কলিকাতার স্বনামধন্য স্যর রাজেন্দ্রনাথ মুখােপাধ্যায়ও ছােট হইতে কত বড় হইয়াছেন তাহা কাহাকেও নূতন করিয়া বলিতে হইবে না। কলিকাতার স্বনামধন্য বটকৃষ্ণ পাল বা কোম্পানীর ঔষধের দোকানে সামান্য কর্মে জীবন আরম্ভ করেন! শুনিয়াছি তিনি নিজের কর্ম- জীবনের প্রথম সময়ের পরিচয় দিবার সময় কেমন করিয়া ভাত খাইয়া নিজেরাই শড়ী উঠাইতেন তাহা বলিতেন, বটকৃষ্ণ পাল কোম্পানীর বৃহৎ কারবার বাঙ্গালার সম্মুখে এক অতি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, তাহার ১৪ বাঙ্গালার সমস্যা বংশধরেরা দেশের নানাবিধ হিতকর কার্যে সাহায্য করিয়া দেশবাসীর ধন্যবাদের পাত্র হইতেছেন। শিল্প ও ব্যবসা দ্বারা ধন উপার্জন করিতে সক্ষম নহে বলিয়াই পার্শী, মাড়ােয়ারী প্রভৃতির ন্যায় বাঙ্গালী জনহিতকর কাৰ্যে তেমন অর্থসাহায্য করিতে পারে না। পাশীরা নিজ সম্প্রদায়ের জন্য কত বৃত্তি, হাসপাতাল, স্কুল প্রভৃতি স্থাপন করিয়াছে । তাহারা গবর্ণমেন্টের মুখাপেক্ষী নয়। ব্যবসা ও শিল্পে শিক্ষানবিশী চেট্টি সম্প্রদায় মাদ্রাজে চেট্টি নামে এক সম্প্রদায় আছেন। ইহাদের ব্যবসা মহাজনী। দক্ষিণ ভারত, সিংহল, ব্রহ্মদেশ, যাভা, সিঙ্গাপুর প্রভৃতি স্থানে ইহারা মহাজনী কারবার করেন। ইহাদের সংখ্যা মােট প্রায় তিন লক্ষ, কিন্তু ইহাব! গবর্ণমেন্টকে কেবল ব্ৰহ্মদেশেই চল্লিশ লক্ষ টাকা আয়কর দেন। ইহাদের মধ্যে স্যর (এখন রাজা) আনামেলাই চেট্টি প্রভৃতি ধনীদের গৃহে মান্দ্রাজের লাটসাহেব আতিথ্য গ্রহণ করেন। ব্ৰহ্মদেশের সর্বত্রই, এমন কি অনেক পল্লীতে, চেট্টির দোকান দেখিতে পাওয়া যায়। দোকানে একজন এজেন্ট, এবং এজেন্টের অধীন কেরাণী, রাঁধুনী ও চাকর থাকে। সকলেই মান্দ্রাজ প্রদেশীয় । সকলেরই খাওয়া একত্রে হয়; খাওয়ার খরচ দোকানের। খাওয়া ছাড়া কৰ্মচারিদিগকে বেতন দেওয়া হয়। এজেণ্ট তিন বৎসরের জন্য নিয়ােজিত হন। খাওয়া, থাকিবার বাড়ী, এবং দরকার হইলে গাড়ী বা মােটর গাড়ী পান এবং দোকানের কারবারের অনুপাতে বেতন পান। ছোট ছােট দোকানের এজেন্টের বেতন তিন বৎসরে পাঁচ ছয় হাজার টাকা। রেঙ্গুনের এক বড় দোকানের এজেন্টের বেতন ত্রিশ হাজার ব্যবসা ও শিল্পে শিক্ষানবিশী n টাকা। এই বেতনের অর্ধেক নিয়ােজিত হইবার সময় এবং বাকী অর্ধেক তিন বৎসরের শেষে পান। ইহা ছাড়া কমিশন পান। কমিশনের পরিমাঃ লাভ অনুসারে হয়। মেনের যে বড় দোকানের কথা বলিলাম তাহার এজেন্টের কমিশন তিন বৎসরে ষাট-সত্তর হাজার টাকা, কখনও কখনও লক্ষ টাকাও হইতে পারে। ইহা ছাড়া ত্রিশ-পয়ত্রিশ কি চল্লিশ বৎসর কাজ করিয়া বৃদ্ধ বয়সে পেন্সন-স্বরূপ দশ-পনর, কি, বিশ হাজার টাকা পান। মান্দালয়ের এক দোকানের এজেন্টের পরিচয় দিতেছি। ইহার বয়স প্রায় পঞ্চান্ন বৎসর; ইনি ইংরেজী জানেন না। ইহার বেতন তিন বৎসরে বিশ হাজার টাকা, থাকিবার বাড়ী ও গাড়ী পাইয়াছেন। হিন্দুস্থানী সহিস কোচম্যান দরােয়ান ব্যতীত দোকানে নিয়ােজিত আরও চব্বিশ জন লােক মাদ্রাজ প্রদেশীয়। ইহাদের সকলেরই খাওয়া দোকানের খরচে একত্রে খাওয়ার জন্য মাসে প্রায় সাড়ে তিনশত টাকা ব্যয় হয়। এই দোকানের বাড়ী নিজস্ব এবং পঁচাত্তর হাজার টাকায় কেনা হইয়াছে। এজেন্ট মহাশয় আর মাস কয়েক কাজ করিয়া তিন বৎসর পূর্ণ হইলে পেন্স লইবেন। ইনি পনর বৎসর বয়সে এক দোকানে চাকর হইয়া আসেন। দুই বৎসর বিনা বেতনে কাজ করিবার পর পনর টাকা বেতন হয়। ক্রমে চাকর হইতে কেরাণী, কেরাণী হইতে ছােট দোকানের এজেন্ট এবং ক্রমে বড় দোকানের এজেন্ট হন। ইনি নিজে এখন ছয়-সাত লক্ষ টাকার মালিক। এবং নিজে হেজাদা জেলায় দুইটি দোকান খুলিয়াছেন। এক দোকানের এজেন্টকে তিন বৎসরে ছয় হাজার এবং অপর দোকানের এজেন্টকে আট হাজার টাকা বেতন দেন। ইহার দুই পুত্র। দুই জনেই অপর দোকানে চাকররূপে বালার সমস্যা নিযুক্ত আছে। নিজে এত টাকার মালিক এবং নিজের দোকানে অপর লােককে নিযুক্ত করিয়া পুদিগকে পরের দোকানে চাকররূপে রাখিয়া দিয়াছেন কেন জিজ্ঞাসা করায় বলেন যে, এইরূপ না করিলে, কাজ শিখিবে না, বাবু হইয়া যাইবে, বড়মানুষী চাল শিখিবে। ইনি নিজে পিতার নিকট হইতে প্রায় একলক্ষ টাকা পাইয়াছিলেন। ইহার পিতাও নিধন ছিলেন না। ব্যবসার জন্য শিক্ষানবিশীর মূল্য কিরূপ ইহারা বুঝেন। তাহা এই উদাহরণ হইতে প্রমাণিত হয়। এই এজেন্ট মহাশয়ের সহিত একদিন রেলগাড়ীতে যাইতেছিলাম, কাৰ্যোপলক্ষে আমাকে প্রথম শ্রেণীতেই যাইতে হয়। লাইন ভাঙার দরুণ দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্থান না পাওয়ায় তিনিও প্রথম শ্রেণীতে যাইতেছিলেন। গাড়ীতে বসিয়া বসিয়া পরিচয় দিলেন। পনর-বিশ বৎসর পূর্বে সকল চেটিই তৃতীয় শ্রেণীতে চড়িত। এখন সঙ্গতিপন্ন চেট্টিরা দ্বিতীয় শ্রেণীতে চড়ে। বর্ষা রেসে মধ্যম শ্রেণী নাই। আরও পরিচয় দিলেন যে, পূর্বে চোট রা রােজগারের টাকা-প্রতি দুই আনা খরচ করিত ; এখন সভ্যতার তাড়নায় কেহ কেহ টাকা-প্রতি আট আনাও খরচ করে। ইহার পরিধানে সাদা ধুতি, সাদা পিরান এবং সাদা চাদর, পায়ে চটী জুতা। সঙ্গে এক চাকর ছিল; বিছানা করিয়া দিয়া গেল ; খাওয়া হইলে পাত্র পরিষ্কার করিয়া ধুইয়া রাখিয়া গেল। জিজ্ঞাসা করিলে বলিলেন, একদিন এই চাকরও তাহার মত চেট্টি হইতে পারে এবং খুব সম্ভব হইবে। ইহার দোকানের মালিক রাজা স্যর আনামেলাই চেই। ইনি ক্রোরপতি। মান্দ্রাজ, ব্ৰহ্মদেশ এবং সিঙ্গাপুর অঞ্চলে ইহার অনেক দোকান আছে। ইহার পুত্র বি-এ পাশ করিবার পর মাত্রাজে নিজেরই এক দোকানে এক বৎসর কেরাণীগিরিতে নিযুক্ত হন, তাহার পর রেজুনের এক দোকানে এক বৎসর কেরাণীগিরি করিয়া সম্প্রতি ব্যবসা ও শিল্পে শিক্ষানবিশী মাত্ৰাজে ফিরিয়া গিয়াছেন। ফিরিবার পূর্বে ব্রহ্মদেশের সমস্ত দোকান দেখিয়া গিয়াছেন। বাড়ীতে এক বৎসর থাকিয়া সিঙ্গাপুর গিয়া আর এক বৎসর কেরাণীগিরি করিবেন। কেরাণীগিরি করিবার সময় এজেন্টের অধীনে অপরাপর কেরাণীর মতই থাকেন। চেটিরা কখনও পরিবার লইয়া বিদেশে থাকেন না; স্ত্রী-কন্যাগণকে বিদেশে আনেন না। তিন বৎসর কাজের পর দেশে যান ও দেশে এক বৎসর থাকিয়া পুনরায় বিদেশে যান। চেট্টির দোকানে যেকোন চেট্টি যাইয়া যতদিন ইচ্ছা থাকিতে ও খাইতে পায়। মেমিও শহরে একটিমাত্র চেটির দোকান আছে। মেমিও ব্রহ্মদেশের দার্জিলিং। সকল স্থান হইতেই শােক এখানে আসে। আগন্তক চেটিদের খাওয়ার জন্য মেমিওর এই দোকানের মাসে প্রায় চারিশত টাকা খরচ হয়। পৃথক রাধুনী ও চাকরের বন্দোবস্ত আছে। চেট্টির দোকানে চেট্টি ব্যতীত পিলে প্রভৃতি অপর জাতীয় লােকও চাকর কেরাণীরূপে নিযুক্ত হয়। কিন্তু চেট্টি ব্যতীত কাহাকেও এজেন্ট করা হয় না। পিলে প্রভৃতি অপর জাতীয় কেরাণী অনেক সময় নিজে দোকান খুলিয়া বসে। চেটিদের কারবার সম্পূর্ণরূপে সততার উপর স্থাপিত। সকল চেটিং টাকা জমা রাখেন ; ব্যাঙ্কিং কারবার করেন। পােষ্টাফিল সেভিংস ব্যাঙ্কের মত একটি পুস্তকে জমা দেওয়া বা উঠাইয়া লওয়া টাকার হিসাৰ থাকে। অনেকের লক্ষ লক্ষ টাকা চেদের নিকট জমা আছে। এইরূপ গচ্ছিত টাকার জন্য সেভিংস ব্যাঙ্ক অপেক্ষা উচ্চহারে সুদ পাওয়া যায়। যাহারা ইহাদের সহিত কারবার করেন তাহারা নিজেদের গহনা হীরা জহরতের বাক্স চেট্টিদের দোকানে চোর ডাকাতের ভয়ে গচ্ছিত রাখেন। এইরূপে গতি বাক্সের জন্য চেরি। २ ১৮ বাঙ্গালার সমস্যা কখনও রসিদ দেন না, কিন্তু কখনও কোন বাক্স হারাইয়াছে বলিয়া না যায় না। ব্ৰহ্মদেশের চেট্টি রাই ছােট-বড় ব্যবসায়ে মূলধন জোগাইয়া থাকেন। জমি, বাড়ী, গহনাপত্র এবং কলকারখানা বন্ধক রাখিয়াও টাকা ধার দিয়া থাকেন। সেইজন্য অনেক জমি, বহু বাড়ী এবং কলকারখানাও এখন চেট্টিদের হাতে পড়িয়াছে। সিন্ধি ব্যবসাদার চেট্টি সম্প্রদায়ের মত সিন্ধি ব্যবসাদারদেরও কিছু পরিচয় দিতেছি। বিদেশে ভ্রমণের সময় ইহাদের কথা জানিতে পারি। রেঙ্গুন হইতে যে জাহাজে আমি জাপান যাই সেই জাহাজে আমারই কেবিনে প্রথম শ্রেণীর যাত্রী ছিলেন সিন্ধি ব্যবসাদার শ্ৰীযুক্ত বান্দা মল। সিঙ্গাপুরে ইনি প্রথম দোকান খুলিয়াছেন এবং এই দোকানের চাকররূপে কাজ করিবার জন্য দেশ হইতে সাত-আট জন সিন্ধি যুবককে সঙ্গে লইয়া যাইতেছেন। ইহার। তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রী। দক্ষিণ আমেরিকার বুয়ানেস আয়াস শহরে এক সিন্ধির দোকানে ইনি চাকররূপে প্রথমে জীবন আরম্ভ করেন। দোকানের মাল তিনি শহরে ফেরি করিয়া বিক্রয় করিতেন। তারপর নানাদেশে সিন্ধিদের দোকানে কাজ করিয়াছেন। নিজে সিঙ্গাপুরে দোকান খুলিবার পূর্বে জাপানের ইয়োকোহামা শহরে এক দোকানের ম্যানেজার ছিলেন। সিঙ্গাপুরের দোকানে আমাকে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যান। দোকানে মালেব মূল্য কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজার হইতে লক্ষটাকা হইবে। দোকানের উপরেই নিজেদের এবং বারজন চাকরের থাকিবার স্থান। চাকরেরাই রান্না ইত্যাদি সমস্ত কাজ করে এবং দোকানের সিন্ধি ব্যবসাদার কেনা-বেচাও করে। সকলেই কোট পেন্ট লুন পরে এবং কাজ- চালান-গােছ ইংরেজি বলিতে পারে। মালিকের থাকিবার ঘরের আসবাবপত্র সুন্দর এবং তিনি এমন সুন্দর পােষাকপরিচ্ছদ পরেন যে, বাংলা দেশের প্রথম শ্রেণীর ডেপুটিও সেরূপ পরেন না বা পরিতে পারেন না। পৃথিবীর দূর দূর দেশে বড় বড় শহরে যেখানে সুবিধা পাইয়াছে এই সিন্ধি ব্যবসাদারেরা গিয়া দোকান খুলিয়াছে। এই সকল দোকানে গালিচা, আসন, কার্পেট, মােরদাবাদের কাজ করা কাঁসা পিতলের জিনিষ, পাথরের জিনিষ, গালার জিনিষ, গহনা, রেশমী বস্তু, জামা পােযাক প্রভৃতি বিক্রয় হয়। পােষাক তৈয়ারী ও সেলাইয়ের কাজও হয়। মালিক নিজেই দোকান পরিচালনা করেন। নানা দেশে একের অধিক দোকান থাকিলে ম্যানেজার রাখিতে হয়। দোকানের চাকর কেরাণী ম্যানেজার সকলেই সিন্ধি। ইহারাও চেট্টিদের মত বিদেশে পরিবার লইয়া যান না। এখন কেহ কেহ স্ত্রী-পুত্র লইয়া যাইতে আরম্ভ করিয়াছেন। জাপানের ইয়ােকোহামা শহর হইতে আমেরিকার সানফ্রানসিসকো শহর পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরের উপর জাহাজেও একজন সিন্ধি ব্যবসায়ী আমার সহযাত্রী ছিলেন। তাঁহার পিতার ঈজিপ্টে দোকান ছিল। এই দোকানে তিনি চাকর ও পরে কেরাণীরূপে জীবন আরম্ভ করেন। ইহার জাপানের ইয়ােকোহামা শহরে এবং পাশমা কেনালেও দোকান আছে। ইনি তখন ইয়ােকোহামার দোকান হইতে পাশমা কেনালের দোকানে যাইতেছিলেন। ইনি সঙ্গে থাকায় নেলুলু শহরের দুইটি সিন্ধির দোকান দেখিবার আমার সুবিধা হইয়াছিল। ইহাদের একজনের বাড়ীতেও গিয়াছিলাম। এই বাড়ী আমেরিকার বাঙ্গালার সমস্যা ধনীদের বাড়ীগুলির মধ্যে। ইনি নিজের মােটরে আমাদিগকে হনােলুলু শহর দেখাইয়াছিলেন। মাভােয়ারী, খােজা প্রভৃতি ভারতবর্ষের যাহারা এখন ব্যবসায়ে উন্নত তাহাদের সন্তানেরা উচ্চ শিক্ষার দিকে ঝোঁক না দিয়া অল্প বয়স হইতেই ব্যবসায়ে শিক্ষানবিশী আরম্ভ করে। এই মান্দালয় শহরে এক খােজা ব্যবসায়ীর কথা জানি, যাঁহার বাৎসরিক আয় প্রায় লক্ষ টাকা। তাহার পুত্র চাকদিগেরই মত দোকানে ক্রয়-বিক্রয় করিয়া এবং এমন কি, দোকান ঝাট দিয়া কাজ শিখে এবং পরে সক্ষম হইলে তবে গদিতে বসে। ইহারা ইংরেজীর বর্ণজ্ঞান পৰ্য্য দরকার বলিয়া বিবেচনা করে না। ব্যবসায়ে শিক্ষানবিশীর কিরূপ প্রযােজন তাহা বােধ হয় এখন বুঝাইতে সক্ষম হইয়াছি। বাঙ্গালীর ছেলের এখন প্রয়ােজন হইয়াছে চলনসই লেখাপড়া শিখিয়া এই শিক্ষানবিশী অবলম্বন করা। ইহাতে কোনরূপ পাশের দরকার নাই বাঙ্গালী যুবকদের বুদ্ধি ও সামর্থ্যের উপর আমার দৃঢ়বিশ্বাস আছে। ঠিক পথে চলিলে তাহারা সব কাজই, করিতে সক্ষম। দু-দিনের আর্থিক দুরবস্থাতে হতাশ হইবার কোনই কারণ নাই। ঠিক পথে চেষ্টা করিলে অল্প দিনেই সময় ফিরিয়া আসিবে। কবে এবং কখন তাহা আমাদেরই উপর নির্ভর করে। ব্যবসা সম্বন্ধে যেরূপ শিক্ষানবিশ প্রয়ােজন, শিল্প সম্বন্ধেও তাহাই ; বরঞ্চ বেশী। অনেক শিল্প বংশগত। আধুনিক যন্ত্রের আবির্ভাবের পূর্বে অনেক শিল্পই বংশগত ছিল। বিলাত আমেরিকায় mechanical engineering প্রভৃতির জন্য পনের-ষােল বৎসর বয়স হইতেই শিক্ষানবিশী আরম্ভ হয়। সাত-আট-দশ বৎসর শিক্ষানবিশীর পর সিন্ধি ব্যবসাদার ২১ ইহারই বড় বড় শিল্পের অধিনায়ক হয়। ইহার জন্যও পাশের দরকার নাই; তবে পূর্ববর্তী সাধারণ শিক্ষা আমাদের মত পুথিগত এবং সাহিত্য গল্প না হইয়া কাৰ্যকরী হওয়া দরকার। ইংলণ্ডের ন্যায় শিল্পে উন্নত ও অগ্রসর দেশে নানাবিধ শিল্পে যে-সকল যন্ত্ৰী বা ইঞ্জিনিয়ার আবশ্যক হয় তাহাদের শিক্ষা সম্বনে অনুসন্ধান করিবার জন্য সম্প্রতি এক কমিটি নিযুক্ত হইয়াছিল। এই কমিটির রিপাের্টে প্রকাশ যে, এই সকল ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে শতকরা নব্বই জন প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করিয়াই চৌদ্দ বৎসর বয়সে কারখানাতে শিক্ষানবিশরূপে শিক্ষা আরম্ভ করে। বাকি দশ জনের মধ্যে বেশীর ভাগই জুনিয়র টেকনিকাল স্কুল হইতে পনের-যােল বৎসর বয়সে এবং অল্প সংখ্যক মধ্য শ্রেণীর স্কুল হইতে যােল-সতের বৎসর বয়সে শিক্ষানবিশী আরম্ভ করে। বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশ্রেণীর টেকনিকাল কলেজে শিক্ষাপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ারের সংখ্যা নগণ্য। জাপানেও দেখিয়াছি ব্যবসায়ে, দোকানে এবং শিল্পশালায় লােক নিযুক্ত করিবার সময় প্রায় সকলেই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করিয়াছে এইরূপ চৌদ্দ হইতে ষােল বৎসর বয়স্ক কিশােরকেই পছন্দ করে। তাহারা বলে এইরূপ কিশােরকে নিজের মত করিয়া গড়িয়া তােল। সহজ হয়। জাপান যখন নূতন নূতন শিল্প আরম্ভ করিল সর্বত্র টেকনিকাল স্কুল স্থাপন করিয়া শিক্ষানবিশীর অন্য কারখানার অভাব পূরণ করিল। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করিয়াই এই সকল টেকনিকাল * Education for the Engineering Industry : 1. Report of the Committee on Education for the Engineering, Industry. 2. Comment on the Report by Education Bodies, London, H. M. Stationery Office, 1931 ; 18. 3d. net.

বাঙ্গালার সমস্যা স্কুলে ভর্তি হওয়া যায়। শিক্ষা জাপানী ভাষার ভিতর দিয়াই হয় এবং পুস্তকাদিও জাপানী ভাষায় লিখিত হইয়াছে। প্রায় বৎসরখানেক হইল ব্ৰহ্মদেশের ব্যবস্থাপক সভায় ব্রহ্মদেশবাসী কোন সভ্য বৰ্মা ভাষায় শিক্ষা দানের জন্য এক টেকনিকাল স্কুল স্থাপনের প্রস্তাব করেন। এই বলিয়া আপত্তি উঠিল যে, বৰ্মা ভাষায় বই নাই এবং টেকনিকাল জ্ঞান প্রকাশের জন্য অনুরূপ অনেক শব্দই নাই। এই আপত্তিতেই প্রস্তাবটি পণ্ড হইয়া গেল। ভারতবর্ষের সর্বত্রই এই এবং তাহা যে নিছক কাল্পনিক ও ভিত্তিহীন জাপানের দৃষ্টান্তই তাহার প্রমাণ। দেশবাসীরা চেষ্টা করিলেই বাঙ্গালা ভাষায় পুস্তক রচনা এবং বাঙ্গালা ভাষাতেই টেকনিকাল-বিষয়সকল শিক্ষার সুবন্দোবস্ত হইতে বেশী দেরী হইবে না। শিল্প শিল্প কি ? খাদ্য ছাড়া মানুষের আরও অনেক জিনিষ প্রয়ােজন হয়, যথা—পরিধেয় বস্ত্র, বাসন, কৃষি যন্ত্রপাতি -লাঙ্গল, কোদাল কুডুল, কাটারি, কাস্তে ইত্যাদি, ছাতা, জুতা, ছুরি, কাঁচি, ছুট, সুতা, দোয়াত, কাগজ, কলম, পেন্সিল ইত্যাদি, ইত্যাদি। এই সমস্ত জিনিষ প্রস্তুত করার নাম শিল্প। গাড়ী, রেলগাড়ী, মােটর গাড়ী, জাহাজ নির্মাণও শিল্প। খাদ্যের পর সকল মানুষেরই নিত্য প্রয়ােজনীয় জিনিষ হইতেছে বস্ত্র। বস্ত্র বয়নই সকল শিল্পের প্রধান। চারি প্রকার দ্রব্য হইতে বস্ত্র প্রস্তুত হইতেছে। প্রথম-কার্পাস, দ্বিতীয়-রেশম, তৃতীয়-উল এবং চতুর্থ—রেয়। ইহার সকলগুলিই হইল বন্ত্রের কঁচা মাল। রেশম রেশমকীট হইতে উৎপন্ন হয়। উল পশুর লােম। রেয়ন কার্পাসের মত উদ্ভিজ্জ। কাঠকে (বেশীর ভাগই পাইন বা দেবদারু কাঠ) ঔষধসাহায্যে শিল্প গলাইয়া সেই তরল পদার্থকে মিহি সুতার আকারে টানিয়া বাহির করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে শুকাইয়া শক্ত হইলেই যে সুতা হয় তাহার নাম রেয়। ইহা রেশমের ন্যায় দেখায় বলিয়া ইহার পূর্ব নাম ছিল artificial silk বা মেকি রেশম। যে দেশ এই চারি প্রকার বস্ত্রের বা কোন একটির প্রচুর উৎপন্ন দ্বারা নানা দেশের সরবরাহের বন্দোবস্ত করিতে পারিয়াছে সেই দেশই প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করিয়াছে। বাঙ্গালার পূৰ্বসম্পদ প্রধানতঃ বয়নশিল্প হইতেই গঠিত ছিল। ইংলণ্ডের প্রধান সম্পদ সুতার, রেশমের, উলের এবং রেয়নের বয়ন শিল্প হইতে। জার্মানী, ফ্রান্স এবং ইতালীই প্রধানতঃ বয়নশিল্প দ্বারাই বেশীর ভাগ অর্থ উপার্জন করে। পৃথিবীতে যত রেশম সুতা উৎপন্ন হয় আমেরিকার যুক্তরাজ্য তাহার প্রায় অর্ধেকের উপর কিনিয়া লয় এবং নিজেই বস্ত্র বয়ন করিয়া ব্যবহার করে। এই বয়নশিল্প গড়িয়া তুলিবার জন্য রেশম সুতা বিনা মাশুলে আমদানী করে কিন্তু রেশম বন্ত্রের উপর শতকরা ৬• মুদ্রা পর্যন্ত মাশুল নির্ধারিত আছে। জাপান অল্প দিনের মধ্যেই সুতার কাপড় নয়নে অসাধারণ উন্নতি করিয়াছে। ওসাকা শহর এখন জাপানের মাঞ্চেষ্টর।* জাপানে রেশম বয়ন ও রেয়ন বয়ন প্রভূত পরিমাণে উন্নত ও বিস্তৃত হইয়াছে। এই কারণে জাপান এত শীঘ্র ধনী হইবার সুযােগ পাইয়াছে। সুতার সাধারণ বস্ত্রবয়ন এখন মিলে যত সস্তায় হয় হস্ত পরিচালিত গৃহ-তাতে তত হয় না। ইহার জন্য মিল স্থাপন আবশ্যক। কিন্তু রেশম ও রেয়ন্ বয়ন সৰ্ব্বত্রই গৃহ-তঁাতে হইতেছে এবং হইবেও। * এই শহরে যন্ত্রপাতি তৈয়ারীরও প্রধান ক্ষেত্র বলিয়া ইহাকে জাপানের বাহিংহামও বলা হয়।

২৪ বাঙ্গালার সমস্যা তবে অতি উচ্চদরের এবং উচ্চমূল্যের কয়েক প্রকার রেশমী বস্ত্র ছাড়া সাধারণ রেশমী বস্তু আমাদের দেশের মত হাতের তাতে বুনিয়া প্রতিযােগিতা করা অসম্ভব। ইহার জন্য বৈদ্যুতিক তাত আবশ্যক। জাপানে ঘরে ঘরে তবায়েরা বৈদ্যুতিক তাঁত চালাইতেছে। হাতের তঁাত প্রায় উঠিয়া গিয়াছে। আমেরিকাতে শিক্ষিত লােকেরা কাপড় বুনিতেছে। একটি মাত্র শ্রমিক চারিটি তাত দেখাশুনা করিতেছে। এক খাই তা ছিড়িলেই তঁাত বন্ধ হয় এবং শ্রমিক গিয়া জোড়া দিয়া দেয়। আমাদের তন্তুবায়েরা বৈদ্যুতিক তঁত পাইলে যে-কোন দেশের সহিত প্রতিঘােগিতা করিতে সমর্থ হইবে। বয়নশিল্পের পরেই বােধ হয় বাসন-প্রস্তুত শিল্প। জগতের সকল জাতিই যেমন উন্নত হইয়াছে ক্রমেই কঁসা পিতল প্রভৃতি ধাতুর বাসন পরিত্যাগ করিয়া চীনা মাটির বাসন গ্রহণ করিয়াছে। কয়েক শত বৎসর পূর্বে ইংলণ্ডে প্রচলিত কাঁসা পিতলের বাসন লণ্ডন মিউজিয়ামে দেখিয়াছি। অসভ্য জাতিরাও চীনা মাটির বাসন শীঘ্র গ্রহণ করে। ভবিষ্যতে ভারতবর্ষেও ধাতুর বাসন উঠিয়া যাইবে। এখন প্রায় সকল দেশেই চীনা মাটির বাসনেরই ব্যবহার। এই চীনা মাটির বাসন- প্রস্তুত শিল্পে জাপান যত উন্নতি ও বিস্তার করিয়াছে এমন আর কোন দেশ করে নাই। সকল শিল্পেরই এইরূপ আলােচনা এখানে উদ্দেশ্য নয়। এমন কি দেশালাই ও খেলনাটি পৰ্যত এখন কোথা হইতে আসিতেছে সকলেই করেন। শিল্প সম্বন্ধে কয়েকটি সাধারণ কথা এখানে বলিতেছি। প্রথম, অনেক জিনিষেরই মূল্য বেশী নয়, কিন্তু অনেক পরিমাণে কাটতি হইলেই শিল্প লাভজনক হয়। অতএব চাই বাজার।

শির দ্বিতীয়, আজকাল অবাধ গতিবিধির দরুণ যে-কোন দেশের উৎপন্ন দ্রব্য যে-কোন বাজারে বিক্রয়ের জন্য প্রেরিত হয়। সকল দেশেই নানা জিনিষ উৎপন্ন হইতেছে বা উৎপন্নের চেষ্টা হইতেছে। সুতরাং প্রতিযােগিতায় যে সস্তায় দিতে পারে তারই কাটতি বেশী। কাজেই প্রত্যেক জিনিষটি সস্তায় প্রস্তুত করিতে হইবে। কলে যত সস্তায় প্রস্তুত করিতে পারা যায় হাতে কখনই তাহা সম্ভবপর নয়। ইহা বুঝিয়াই জাপান আধুনিক কারখানা ও যন্ত্রপাতি গ্রহণ করিয়াছে এবং নূতন কিছু হইলেই গ্রহণ করে বলিয়াই এত শীঘ্র শিল্পোন্নতি করিতে পারিয়াছে। তৃতীয়, জিনিষ যে বাজারে কাটতি হইবে ইহার মূলে হইতেছে সমতাসাধন, অর্থাৎ প্রত্যেক রকম জিনিষের সকলগুলিই সমান হইবে। ইংরেজীতে ইহাকে বলে standardization, ক্রেতা মূল্য দিয়া একই রকম জিনিষ পাইলে সন্তুষ্ট হয়। জাপান রেশমের সুতার সমতাসাধন করিয়াছে, তাই বৎসরে সত্তর কোটি মুদ্রার সুতা বিক্রয় করে। রেশমের কাপড়ের সমতাসাধন করিয়াছে, তাই বৎসরে বিশ কোটা মুদ্রার রেশম বস্ত্র বিক্রয় করে। ছুরি কাঁচি জুতা ছাতা কাপড় লণ্ঠন প্রভৃতি সকল জিনিষেরই এইরূপ সমতা সাধিত না হইলে আমরা একই মূল্য দিয়া কিনিতে ইতস্তত করিতাম। আর কলের সাহায্যে প্রস্তুত না হইলে সমতাসাধন অসম্ভব হইত। চতুর্থ, আধুনিক যন্ত্রপাতি গ্রহণ করিলেও এই সকল যন্ত্রপাতি লইয়া কাজ করিবার নিপুণ কারিগর আবশ্যক। এই সকল কারিগরের বেতন অন্য দেশ অপেক্ষা আমাদের দেশে কম। পঞ্চম, যন্ত্রপাতি কিনিয়া কারখানা স্থাপন এবং কাচা মাল কিনিয়া জিনিষ প্রস্তুত করিবার জন্য প্রয়ােজন—অর্থ। সকল দেশেই অতি E ২৬ বাঙ্গালার সমস্যা অল্প লােকই ব্যক্তিগত অর্থ দিয়া এইরূপ কারখানা স্থাপন করে। বিশ শত টাকা করিয়া বহু লােকের নিকট সংগ্রহ করিয়াই বড় বড় কারখানা গড়িয়া উঠে ও চলে। আমাদের দেশে এইরূপে মূলধন সংগ্রহ করা যায় না এমন নয়, তাছাড়া কারিগরের বেতনও অল্প। আমাদের কাচা মাল বিদেশীয়ের। লইয়া গিয়া জিনিষ প্রস্তুত করে এবং প্রস্তুত জিনিষ পুনরায় আমাদের দেশে পাঠাইয়া আমাদিগকে বিক্রয় করে। আমাদের কাচা মাল ও বাজার দরজার কাছে। আমরা চেষ্টা করিলেই শিল্পে অগ্রসর হইতে পারি। পূৰ্ব্বে যাহাই হউক এখন আমরা নিজের হাতে দেশের কর্তৃত্ব পাইতেছি এবং শিল্প বজায় রাখিবার জন্য প্রয়ােজন হইলে আইন-কানুনও করিতে পারিব। এখন আমাদের প্রয়ােজন হইতেছে জ্ঞানের। ব্যবসাবাণিজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পাশের আবশ্যক হয় না, সাধারণ শিক্ষার পর চৌদ্দ-পনর বৎসর বয়স হইতে শিক্ষানবিশী করিলেই যথেষ্ট। ব্যবসা যেমন সামান্য মূলধন হইলেই যে-কেহ নিজেই আৰম্ভ করিতে পারে, এক্ষেত্রে তাহা না হইলেও কর্মঠ যন্ত্ৰী তৈয়ার হইলেই কারখানার উদ্ভব হইবে। ইহার জন্য চাই কলকারখানা সমেত নানাবিধ টেকনিক্যাল স্কুল, দেশের লােকই করুক আর গবর্ণমেন্টই কারখানার বদলে এই স্কুলগুলিই যেন প্রকৃত শিক্ষানবিশীর বন্দোবস্ত করে। এখন আমাদের টেকনিক্যাল স্কুল নামে যে সকল শিক্ষা- প্রতিষ্ঠান আছে তাহাতে শিক্ষার বন্দোবস্ত এইরূপ যে, শিক্ষার্থীরা বাহির হইয়া চাকুরি করিবে। বােম্বাইয়ের ভিকটোরিয়া জুবিলি টেকনিক্যাল স্কুল ভারতবর্ষের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট বলিয়া বিবেচিত। ইহাতেও কেবল চাকুরিয়া তৈরী করিবার বন্দোবস্তই আছে। জাপান, আমেরিকা ও বিলাত হইতে ফিরিবার পথে এই স্কুলে গিয়া ও দেখিয়া শুনিয়া শিল্প ২৭ অধ্যক্ষের সহিত এই বিষয়ে আলাপ করিয়া প্রশ্ন করিলাম, জাপানে যেমন দেখিয়াছি আপনার স্কুলে সেরূপ কোন প্রয়ােজনীয় বস্তু উৎপাদনপ্রণালী কেন শিক্ষা দেওয়া হয় না যাহাতে শিক্ষার্থীরা বাহির হইয়া এই সকল বস্তু উৎপাদন দ্বারা জীবিকা অর্জন করিতে পারে ? উত্তরে তিনি বলিলেন যে, তাহা হইলে তাঁহাদের প্রধান উদ্দেশ্য মিলগুলির যন্ত্রী সরবরাহ, তাহা সাধিত হইবে না। সকল বিভাগেই কেবল যন্ত্র চালনাই শিক্ষার বিষয়। বয়নবিভাগে শিক্ষার বিষয় প্রধানতঃ মিলের অনুযায়ী ছােট ছােট যন্ত্রে কার্পাসের পাট ও বস্ত্রবুনন। ইহার সঙ্গে তিনটি, কি চারিটি, হাতের তাঁত আছে, ইহার কাজও শিখান হয়। ইহা দ্বারা হাতের তাতে পারদর্শিতা কিছুই হয় না, যে-কোন তাতির হাতের তাতে পারদর্শিতা। এই স্কুলের শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা অনেক বেশী। অথচ এই স্কুলের নামে ইহার ছাত্রেরা ভারতবর্ষের প্রায় সকল প্রদেশেই হাতের তাতের বিশেষজ্ঞ বলিয়া নিযুক্ত হইয়া আসিতেছেন। ইহাদের বেতন মাসে জাপানের মন্ত্রীদের বেতনের সমান। লােকের চোখে ধূলি নিক্ষেপ ব্যতীত এই ব্যবস্থার আর কোন উদ্দেশ্য হইতে পারে না। শিল্পে গবেষণা ও পরীক্ষার বিশেষ প্রয়ােজন। গবেষণা ও পরীক্ষার দ্বারাই নূতন উন্নত প্রণালী ও যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়। অধিকাংশ স্থলেই শিল্পশালার মালিকগণ একযােগে সমিতি গঠন করিয়া এইরূপ গবেষণা ও পরীক্ষার বন্দোবস্ত করে। আমাদের দেশে বর্তমানে এরূপ ব্যবস্থার সম্ভাবনা নাই। বর্তমান অবস্থায় আমাদের বিশেষ প্রয়ােজন একটি বৃহৎ টেকনিকাল স্কুল বা কলেজ,-যেখানে আমাদের দেশে সম্ভবপর আধুনিক সকল শিল্পের মডেল যন্ত্রপাতির কাৰ্য দেখান ও শিক্ষাদান হইতে ২৮ বাঙ্গালার সমস্যা পারে। স্বচক্ষে কাৰ্য দেখিলে এবং কার্য শিক্ষার সুবিধা হইলে সােকে তাহা সহজেই গ্রহণ করিতে পারে। পৃথিবীর যে-কোন দেশে নূতন যন্ত্রপাতি কিছু আবিষ্কৃত হইলেই অনতিবিলম্বে জাপান তাহা লইয়া গিয়া পরীক্ষা করে এবং প্রয়ােজনমত বদলাইয়া জাপানে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত ও বিক্রয়ের সুবিধা করে। দেশময় উন্নত রেশমকাটাই যন্ত্র এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি এইরূপে প্রচলিত হইয়াছে। শিল্প সম্বন্ধে আর একটি অতি-প্রয়ােজনীয় কথা দেশবাসীকে স্মরণ করাইয়া দিতেছি। এখনও দেশে যে সকল শিল্প আছে তাহা সেকেলে ধরণে চালিত হইলেও এই সকল শিল্পীকে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও উপায় অবলম্বন করিতে সাহায্য করিলে ফল শীঘ্র পাওয়া যাইবে। কারণ তাহাদের যে নিপুণতা আছে তাহার মূল্য কম নহে। যে-কেহ এক পাটি রেশম বা সুতার খাই বাহির করিতে চেষ্টা করিলেই এক খাইয়ের মূল্য বুঝিতে পারিবেন। সকল রকমের কলাকৌশল শিৱীদিগকে শিখাইয়া পড়াইয়া তাহাদিগকে একতাবদ্ধ করিয়া তাহাদের সমবায়ে ও সহযােগে প্রয়ােজনীয় কাজ ব্যাপকভাবে করা অসম্ভব নয়। অধুনা বহু কলাকৌশল লুপ্ত হইয়া দেশের ক্ষতি হইয়াছে, এখনও যাহা আছে তাহা একেবারে নষ্ট হইলে মহা ক্ষতি হইবে। কাজ করিতে করিতেই শিল্পীর নিপুণতা বাড়ে। নিপুণতায় অপর দেশ অগ্রসর হইলেও আমাদিগকেও তাহা অর্জন করিতে হইবে। চেষ্টা এখনই আবশ্যক। শিল্পে উন্নতি করিতে না পারিলে দেশ দরিদ্র থাকিবেই। একমাত্র রেশমশিঙ্গের দ্বারাই জাপানে প্রায় চল্লিশ লক্ষ লােক জীবিকা অর্জন করে এবং ইহাই জাপানের প্রায় অর্ধেক অর্থাগমের উপায়। বস্ত্র বয়ন, রেল নির্মাণ, জাহাজ নির্মাণ প্রভৃতি কাৰ্যে কত শত সহস্র লােকের জীবিকার উপায় হয়। জাপানে ও ইংলণ্ডে টেলিগ্রামের শিল্প ২৯ খামলি কাঠের। কিন্তু আমাদের দেশে এই সমস্তই লােহার, সেগুলি তৈয়ার করিয়াছে বিলাতের কারিগর। অনেক অপ্রয়ােজনীয় জিনিষও আমাদের দেশে ক্রয় করা হয় বিলাতী কারিগরের কাজ 'জোগাইবার জন্য। আর আমাদেরই দেশের শােক কাধ্যের অভাবে অর্ধভূক্ত ৰা অভুক্ত থাকে। ব্যবসায়ে ছােট হইতে কিরূপে বড় হওয়া যায় তাহার উদাহরণ দিয়াছি। আমাদের দেশে শিল্প সম্বন্ধে এইরূপ উদাহরণ দিবার সমান আমার জানা নাই। তবে শুনিয়াছি বােই অঞ্চলে কোন কোন কাপড়কলের মালিক মিলেরই সামান্য কাজে জীবন আরম্ভ করিয়া শেষে নিজে বড় কল স্থাপন করিতে সমর্থ হইয়াছেন। ইউরােপ ও আমেরিকা হইতে দুই একটা উদাহরণ দিতেছি। শ্ৰীযুক্ত হেনরী ফিপস জাতিতে ইংরেজ এবং দরিদ্র জুতা প্রস্তুত কারক বা চর্মকার-রূপে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়া শহরে কর্মজীবন আরম্ভ করেন। তিনি মৃত্যুসময়ে বিরাশি কোটি টাকা রাখিয়া যান। ইনি ভারতের কৃষির উন্নতির জন্য লর্ড কার্জনের হাতে ছয় লক্ষ টাকা দেন এবং ইহা লইয়াই লর্ড কার্জন পুষ। কৃষি কলেজ স্থাপন করেন। প্রসিদ্ধ মােটরগাড়ী নির্মাতা শ্রীযুক্ত হেনরি ফোর্ডের কথা সকলেই জানেন। ইনি এক কৃষকের সন্তান এবং আট বৎসরকাল এক ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানায় অতি অল্প বেতনে কাজ করেন। ইনি এখন পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা ধনী বলিয়া বিবেচিত। সালাইট সাবান প্রভৃতির প্রস্তুতকারী এবং এখন লর্ড উপাধিধারী লর্ড লিভাহম যােল বৎসর বয়সে এক দোকানে কাগজ দিয়া সাবান মুড়িবার কার্যে নিযুক্ত হন। প্রথমে সাবান প্রস্তুত করিয়া নিজেই গাড়ী হাঁকাইয়া গ্রামে গ্রামে বিক্রয় করিতেন।

বাঙ্গালার সমস্যা ইংরেজ আমাদের শিল্প নষ্ট করিয়াছে বলিয়া কেবল হা হুতাশ বা আক্ষেপে কোন ফল হইবে না। যাহা হইয়াছে-হইয়াছে। ক্রোধ ও আক্ষেপ ত্যাগ করিয়া পুনরায় কিরূপে শিল্প গড়িয়া তুলিতে পার। যায় তাহারই চেষ্টা এখন আবশ্যক। বাঙ্গালা দেশেও বয়নশিল্প ছিল, কিন্তু এমন লােকের হাতে যাহাদের দুনিয়ার খবর রাখিবার মত শিক্ষা ছিল না এবং কাজে কাজেই তাহারা অবস্থা বুঝিয়া ব্যবস্থা করিতে পারে নাই। আমাদেরও রেশম উৎপাদন ও রেশম-বয়ন-শিল্প ছিল। প্রধানতঃ ঐ একই কারণে তাহাও হারাইয়াছি। ভারতবর্ষের লােকে এখন পাঁচ-ছয় কোটা টাকার রেশম সুতা ও বস্ত্র বিদেশ হইতে আমদানী করিয়া ব্যবহার করে। রেয়ন এখন নানা দেশে উৎপাদিত হইতেছে তাহার খবর আমরা রাখি নাই। কিন্তু এখন আমরাই বৎসরে চারি কোটী টাকার রেয়ন বস্তু অপর দেশ হইতে ক্রয় করিয়া ব্যবহার করিতেছি। এই বস্ত্র সরবরাহ করিয়া জাপান বিস্তর অর্থ আমাদের দেশ হইতে লইয়া যাইতেছে। প্রকৃত চেষ্টা হইলেই এই সমস্ত ও অপরাপর কত শিল্প আমরা গড়িয়া তুলিতে পারিব। যাহাদের সহিত আমাদিগকে প্রতিযোগিতা করিতে হইবে তাহাদের কার্যপ্রণালীর জ্ঞান এবং আধুনিক উৎকৃষ্ট যন্ত্রপাতি গ্রহণ প্রকৃত চেষ্টার অন্তর্গত। জমিদারী কতকগুলি বাঙ্গালীর ব্যবসা জমিদারী। কিছু পয়সা হইলে সকলেরই আকাঙ্ক্ষা জমিদারী কিনিব। বাঙ্গালা, বিহারের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ইহা এক ফল। গবর্নমেন্ট কর আদায়ের সুবিধার জঙ্ক জমিদারী জমিজমার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন ; যাহার সহিত করিলেন তিনি জমিদার হইয়া বসিলেন। তিনি নির্দিষ্ট খাজনা গবর্ণমেন্টকে দিয়া প্রজার সহিত ইচ্ছানুরূপ খাজনার বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন। গবর্ণমেন্টের খাজনার বৃদ্ধি নাই, কিন্তু প্রজার দেয় খাজনার ক্রমশই বৃদ্ধি হইতে লাগিল, কারণ ইহা জমিদারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। অতএব জমিদারী ব্যবসার ব্যাপার হইয়া দাড়াইল। জমিদারী কিনিয়া প্রজার দেয় খাজনার বৃদ্ধি করিতে পারিলেই লাভ। আজকাল আইন দ্বারা এই খাজনা বৃদ্ধির পরিমাণ ও সময় বঁধিয়া দিয়া কিছু প্রতিকারের চেষ্টা করা হইয়াছে। কিন্তু জমির পরিমাণ মাপ করিয়া বা প্রতারণা দ্বারা প্রজাকে হয়রাণ করিবার এত উপায় আছে যে, তাহা প্রজাদের প্রাণান্তকর। বর্ধিত হারে মিথ্যা রসিদ লিখিয়া এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দ্বারা ইহা আদালতে প্রমাণ করিতে পারিলেই হইল। জমিজমা এইরূপ মিথ্যা প্রমাণ দ্বারা বিনাকারণে হস্তান্তরিত হইয়া যায় । বিহারের অবস্থা যাহারা লক্ষ্য করিয়াছেন তাহারাই দেখিবেন যে, সাধারণ প্রজা প্রায় কুলীর অবস্থাতে পরিণত হইয়াছে। অধিকাংশ স্থলে কাহারও জমিজমা নাই; প্রায় প্রতি বৎসরের জন্য জমি ইজারা লইয়া চাষ করে। সারা বৎসর খাটিয়া যদি কিছু ফসল জমাইতে পারিল, দিন গুজরান হইল। আবহাওয়া ও অন্যান্য কারণে ফসল যথেষ্ট পরিমাণ না হইলে দেয় খাজনার টাকাই উঠে না, ইহা দিবার জন্য পূর্বসঞ্চিত সংস্থান যাহা থাকে, গরু, ছাগল, গহনা, ঘটী, বাটি ইত্যাদি, তাহাও বিক্রয় করিতে হয়। জার্মানীর কৃমি নীলের পর নীলের চাষ প্রায় বন্ধ হইয়াছে। নীলকরেরা এখন প্রকৃতপক্ষে জমিদার হইয়া দাঁড়াইয়াছে। জমিদার দেশীয় হইলেও নীলকরেরা ঠিকমত খাজনা আদায় করিতে পারে বলিয়া অধিকাংশ বাঙ্গালার সমস্যা জমিদারই জমিদারীর ইজারা নীলকদিগকে দিয়া নিশ্চিন্ত হন। নীলকরদের প্রজাদিগকে আটক রাখিবার গারদ আছে; প্রজাদের গরু বাছুর আটক রাখিবার জন্য খোয়াড় আছে, প্রজাদিগকে কায়দায় রাখিবার জন্য বরকন্দাজ খালাসী আছে, আরও কত কি আছে। এই সমস্ত কারণে বিহারে ধনী জমিদার এবং প্রায় কুলী দিন মজুরে পরিণত প্রজা-এই দুই শ্রেণীর লােক দেখা যায়। আর এক শ্রেণী গবর্ণমেন্টের চাকুরীয়া। বাঙ্গালার অবস্থাও ক্রমে এইরূপ দাড়াইতেছে। পঞ্জাবের রায় বাহাদুর স্যর গঙ্গারামের কথা বােধ হয় অনেকেই শুনিয়া থাকিবেন। সম্প্রতি তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে। তিনি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। বহুদিন চাকুরী হইতে অবসর গ্রহণ করিয়া পঞ্জাবে নূতন খাল কাটিয়। যে-সব জমির আবাদের বন্দোবস্ত হইয়াছে এইরূপ বিস্তৃত জমি লইয়া চাষ আবাদের বন্দোবস্ত তিনিও করিয়াছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন জমিদার হইয়াছিলেন। নিজের গ্রামের পতন করিয়াছিলেন, প্রজাদের জন্য সমবায়সমিতি স্থাপন করিয়াছিলেন, চিকিৎসালয় খুলিয়াছিলেন, শিক্ষার বন্দোবস্ত , করিয়াছিলেন এবং আরও নানা সুবিধার মধ্যে রেল ষ্টেশন হইতে গ্রামে যাইবার জন্য ট্রাম লাইন পর্যন্ত বসাইয়াছিলেন। কৃষি সম্বন্ধে পঞ্জাবে প্রচলিত ডাকের বচন” এই বিষয়ে তিনি সিমলায় এক বক্তৃতা করেন। এই বক্তৃতা পুস্তিকাকারে ছাপাইয়া বিতরিত হইয়াছে। ইহাতে তিনি বলেন যে, তিনি একবার বিহারের গ্রামের অবস্থা দেখিতে যান এবং অর্ধনগ্ন কঙ্কালসার প্রজাদের অবস্থা দেখিয়া চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফল কি তাহা বেশ অনুভব করেন। তিনি বলেন, এই বন্দোবস্তের ফল প্রজাদের সহিত জমিদারী জমিদারের অসহযােগ। আর সহযােগের ফল কত শান্তিময় তাহা হার জমিদারীতে গিয়া দেখিতে সকলকেই আহ্বান করেন। এই সূত্রে তিনি অহঙ্কার করিয়া বলেন, তাহার গ্রামের যে-কোন পাঁচটি যুবক 'বাঙ্গালা বিহারের যে-কোন গ্রামের সমস্ত লোককে ছাগল ও ভেড়ার পালের মত তাড়াইয়া দিতে পারে। বাঙ্গালার কোন জমিদার ইহার পাল্টা জবাব দিতে পারেন কি ? বাঙ্গালায় যে মহচ্চরিত্র, প্রজার হিতাকাঙ্ক্ষী জমিদার নাই তাহা বলিতেছি না; কিন্তু তাহারা এখন একনিয়মে বাঁধা পড়িয়াছেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কায়েম রাখিয়া ইহার কুফল প্রশমনের উপায় যে করা যায় না তাহা বিশ্বাস হয় না। চেষ্টার বিশেষ প্রয়ােজন। অপরিমিত খাজনা বৃদ্ধির কুফল যে কি তাহার একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। বাঙ্গালাব কয়েকটি জেলাতে এক সময় বহু পরিমাণে রেশম- কীট পালন করা হইত এবং ইহাতে প্রজাদের লাভও যথেষ্ট হইত। রেশমকীট তুতের পাতা খায় ; এই তুতের জমির খাজনার হার কোন কোন জমিতে প্রতি বিঘায় পনর-ষোল টাকা। যখন লাভ হইত প্রজারা _মনায়াসে এই খাজনা দিত। তার পর রেশমকীট পালনের লাভ যখন কম হইতে লাগিল তখন প্রজারা অত উচ্চ হারে খাজনা দিয়া কাজ চালাইতে পারিল না। বাঙ্গালার রেশমকীট পালনের অবনতির অন্যান্য কারণের মধ্যে ইহাও একটি কারণ। বাঙ্গালার রেশমই প্রথমে জগতে প্রসিদ্ধ ছিল, এখন কিন্তু বাঙ্গালায় রেশমের স্থান নাই। রেশমশিল্প সম্বন্ধে অন্য পুস্তকে বলিব। বাঙ্গালার ভিতর বর্ধমানাধিপতি মহারাজাধিরাজ বাহাদুর খুব বড় জমিদার। ইহার জমিদারী পনিষত্রে বিলি করা আছে। বহু গ্রাম লইয়া এক এক লাট, এক এক লাটের সম্যক খাজনার পরিমাণ ৩৪ বাঙ্গালার সমস্যা নির্দিষ্ট হইয়াছে। ইহার পরিমাণ প্রজাদের নিকট প্রাপ্য খাজনার পরিমাণের চেয়ে কম। হয়ত কোন লাটের জন্য বর্ধমানাধিপতির নিদ্দিষ্ট খাজনা এক হাজার টাকা, কিন্তু প্রজাদের নিকট হইতে আদায় হয় পনর শত টাকা। অতএব যিনি বন্দোবস্ত লয়েন তাহার, অর্থাৎ পত্রনিদারের, প্রাপ্য হইল পাঁচ শত টাকা। পওনিদারকে নিজের লােক রাখিয়া সকল প্রজার নিকট হইতে এই খাজনা আদায় করতে হইবে। কোন প্রজার নিকট হইতে আট আনা, কাহারও নিকট এক টাকা, এইরূপে পত্তনিদারকে চারিদিক হইতে কুড়াইয়া জড় করিতে হইবে। পত্তনিদার সম্যক আদায় করিতে পারুক বা না পারুক, বর্ধমানাধিপতির সর্ত হইতেছে যে, তাহার প্রাপ্য খাজনা পত্তনদারের নিকট হইতে দুই কিস্তিতে আদায় হইবে। এই দুই কিস্তির দিন স্থির আছে এবং ঐ দিনের সূর্যাস্তের পূর্বে দেয় খাজনা উপস্থিত করিতে না পারিলেই লাট নিলাম করা হইবে, এবং যিনি ডাকিয়া লইবেন তিনি নূন পত্তনিদার হইবেন। ঐ যে পাঁচশত টাকা লাভ থাকে তাহার মােহে কত লােক নিলামী লাট ডাকিবার জন্য উপস্থিত থাকে। আশা যে একবার জমিদারী করিবে। আট আনা, এক টাকা, দুই টাকা, পাঁচ টাকা করিয়া প্রজাদের নিকট হইতে আদায় করা কত কষ্ট ও সময়সাপেক্ষ তাহা যাহারা এই কাজ না করিয়াছেন তাহারা সহজে অনুমান করিতে পারিবেন না, অধিকাংশ সময়ে পত্তনিদারকে নিজের ঘর হইতে সূর্যাস্তের পূর্বে টাকা বাহির করিতে হয়। যতদিন পূর্ব- সঞ্চিত বা অন্য উপায়ে অর্জিত টাকা থাকে ততদিন পত্তনিদারই, অর্থাৎ—ভূয়া জমিদারগিরি চলে, তাহা না হইলে সূর্যাস্তের দিন উচ্চ সুদে ধার করিয়া টাকা দাখিল করা হয়। এই টাকা ধার দিবার জন্য মহাজনও টাকার থলি লইয়া উপস্থিত থাকে ; শেষে পত্তনি জমিদারী ; নিলাম হইয়া হস্তান্তরিত হয় এবং পত্তনিদার সঞ্চিত অর্থও হারায়, অধিকন্তু ঋণজালে জড়িত হইয়া পড়ে। এইরূপে পত্তনির মহাল প্রায়ই হস্তান্তরিত হয়। এই ব্যাপারে প্রজাদের যে কতরূপ হয়রানি, কত সেলামীর দাবী, খাজনা বৃদ্ধির দাবী, তাহার ইয়ত্তা নাই। এই বিষয়ে বিশেষ অনুসন্ধান এবং প্রতিকাবের প্রয়ােজন। একটি দৃষ্টান্ত দিতেছি। পাঠ্যাবস্থায় একবার ছুটির সময় বাড়ীতে ছিলাম ; দ্বারকেশ্বর নদীর নিকট আমাদের গ্রাম, একদিন সকালে নদীর পরপারে মহা গােলমাল উপস্থিত। বহুলােক চীৎকার করিতেছে, নিকটে গিয়া দেখি এক জমির ধান লইয়া বিবাদ। কেহ বা ধান কাটিতেছে, কেহ বা কতক লইয়া পলাইতেছে ; কেহ বা পায়ে দলিয়া ধান নষ্ট কবিয়া দিতেছে। কয়েকজন বাধা দিবার চেষ্টা করিতেছে। কারণ জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম এক উকিল নূতন লাট কিনিয়াছেন এবং দখল লইতেছেন। অল্পক্ষণের মধ্যে অধিকাংশই লুট হইয়া গেল এবং যাহা পড়িয়া রহিল তাহ এরূপ ভাবে নষ্ট করা হইল যে, চাষী একট। ধানও ঘরে লইয়া যাইতে পারিল না। দুই কৃষক মাথায় হাত দিয়া বসিয়া বহুক্ষণ চিন্তা করিল, তাহার পর গ্রামের মুখ্যের সহিত আমারই পিতৃব্যের নিকট পরামর্শ লইতে আসিল, কি করিবে। থানায় লুটের ডায়েরী করা হইল, ফল অবশ্য কিছুই হইল না। চাষীর বহুকষ্টে অর্জিত বৎসরের উদরায়ের সংস্থান নির্দয়ভাবে নষ্ট করা হইল। অভুক্ত কৃষক-পরিবারের দীর্ঘ- নিঃশ্বাসের ফল ভােগ করিবে কে? এই যে জমিদারী এক হাত হইতে অপর হাতে যাওয়ার কথা বলিলাম ইহার ফল কি দাড়াইতেছে তাহা যাহারা পল্লী ও মফস্বলের খবরাখবর না রাখেন তাহারা জানেন না এবং এ সম্বন্ধে চিন্তা করেন । বাঙ্গালী এখন দরিদ্র হইয়া পড়িয়াছে। ব্যবসাদার মাড়ােয়ারীরা বাঙ্গালার সমস্যা সামান্য অবস্থা হইতে অল্পদিনের মধ্যে লক্ষপতি হয় এবং জমি, বাড়ী ও জমিদারী বন্ধক রাখিয়া ঋণ দান করে এবং পরে ইহাদের মালিক হইয়া দাড়ায়। কলিকাতায় জমি-জায়গার মালিক এখন কে তাহা কাহাকেও বলিতে হইবে না। মফঃস্বলেও অনেকলে এখন মাড়ােয়ারীরাই মালিক হইয়া দাড়াইতেছে বা দাড়াইয়াছে। আর বাঙ্গালী হইয়াছে বা হইতেছে দাসের দাস, দাসানুদাস। নিজের দেশে নিজের ব্যবসাবাণিজ্য পরের হাতে দিয়া চাকুরির খোঁজে ছুটাছুটি করিয়া বাঙ্গালী আজ কোথায় আসিয়া পৌছিয়াছে এবং কোন পথে চলিয়াছে তাহা কি তাহারা চিন্তা করিবে না ? বাঙ্গালায় পশ্চিমাভীতি বাঙ্গালার জমিদার পত্তনিদারের প্রজাদিগের নিকট হইতে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য পশ্চিমা দারােয়ান, নগদী, আৰ্দালী রাখেন, ইহাদের অস্ত্র ও নিত্য সহচর বড় বড় বাঁশের লাঠি। ইহাদিগকে রাখার উদ্দেশ্য প্রজাদিগকে ধমূকাইয়া ভয় দেখাইয়া খাজনা আদায় করা। উৎপীড়নও যে হয় না তাহা নয়। বাঙ্গালার থানার কষ্টবলেরাও পশ্চিমা, অল্পবেতন-ভােগী নিরক্ষর এই সকল লােক পল্লীবাসীর উপর যথেষ্ট অত্যাচার করে। গ্রামের সহিত যাহাদের সম্পর্ক আছে তাহারাই দেখিবেন নিরীহ গ্রামবাসীরা এই সকল পশ্চিমা লােকদিগকে ভয় করে এই ভয়ের কারণ জমিদার ও গবর্নমেন্টের পৃষ্ঠপােষিত এই সকল লােকের অত্যাচার। অত্যাচার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঘুষ আদায়ের উপায়। এই অত্যাচারের প্রতিকার সহজে হয় না। এই ভীতি বাঙ্গালার পক্ষে অত্যন্ত অহিতকর বলিয়া মনে করি। এই সমস্ত কাজের জন্য যত শীঘ্র বঙ্গদেশীয় লােক নিযুক্ত হয় ততই মঙ্গল।

মােকদ্দমা সমস্যা ইংরেজ-রাজ বিচারালয় স্থাপন করিয়াছেন ন্যায় বিচারের জন্য। লােকের বিশ্বাস ন্যায় বিচারের উপরই ইংরেজ রাজত্বের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু বাঙ্গালা দেশে ইহার কয়েকটি কুফলের কথাই এখানে আলােচনা করিব। কুফলগুলির প্রতিকার প্রয়ােজন। চৌর্য্য অপরাধ, কলহবিবাদ, ছােট-বড় সম্পত্তির স্বাস্বত্ব এবং ব্যবসাবাণিজ্যে ন্যায় অন্যায় বিচারের জন্য বিচারালয়। বিচারপতি প্রমাণ, সাক্ষীসাবুদ দেখিয়া শুনিয়া সত্যমিথ্যা স্থির করেন এবং এই সত্যমিথ্যা নির্ধারণের উপবই বিচার। আইনকানুনের এত জটিলতা যে, সাধারণ বুদ্ধিমান লােকের পক্ষেও বুঝা দুঃসাধ্য। জার্মণীর বালিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডিবেলিয়স ইংলণ্ড সম্বন্ধে একখানি অতি জ্ঞানগর্ভ পুস্তক লিখিয়াছেন। ইহাতে তিনি দেখাইয়াছেন যে, ইংলণ্ডের আইনকানুন কত জটিল এবং এই জটিলতা ইংলণ্ডের আইন-ব্যবসায়ীদের আয়ের এক প্রধান কারণ, আর তাই আইন-ব্যবসায়ীরা এই জটিলতা দুরীকরণের বিরােধী। এই রােগ আমাদের দেশেও আসিয়াছে এবং আমাদিগকে পাইয়া বসিয়াছে। আমাদের বর্তমান শিক্ষার অভাবের অবস্থায় এত জটিল আইনের প্রয়ােজন আছে কি-না ইহাই বিচাৰ্য। আইনের আশ্রয় লইতে হইলেই উকিল-মােক্তাররূপী দালালের প্রয়ােজন। এই দালালীই উকিল-মােক্তারের জীবিকা। জীবিকার জন্য মফঃস্বলের উকিল-মােক্তারেরা কত সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য করিয়া চালাইতে বাধ্য হন তাহা আদালতে যাহারা গিয়াছেন তাহারাই জানেন। তাই সাধ্যপক্ষে কোন ভদ্রসন্তান আদালতের বাঙ্গালার সমস্যা সীমানার ভিতর পদার্পণ করিতে রাজী হন না; অথচ লােকে দায়ে পড়িয়া উকিল-মােক্তারকে দক্ষিণ। এত বেশী দিতে বাধ্য হয় যে, বাঙ্গালীদের বর্তমান অবস্থায় কেবল উকিল-মােক্তারেরাই ধনী, কিন্তু এই ধনাৰ্জন আমাদেরই দেশের রক্ত শশাষণ ব্যতীত আর কিছুই নয়। বাঙ্গালা দেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জন্য জমিজমা ও জমিদারীর স্বাস্বত্ব লইয়া এত মােকদ্দমা হয় যে উকিল-মােক্তারের দক্ষিণার আয় খুব বেশী। কিন্তু তলাইয়া দেখিলে দেখা যাইবে যে, এই দক্ষিণা আসে মূলে জমির উপস্বত্ব হইতে, অর্থাৎকৃষকদের নিকট হইতে। ফল এই দাড়াইয়াছে যে, কৃষক ও জমিদার গরীব হইয়া পড়িয়াছে। অনেক উকিল-মোক্তাব এখন তাহাদের স্থানে জমিদার হইয়াছেন। তাহাদের অবস্থাও যে আবার একদিন একই হইবে তাহাতে সন্দেহ নাই। যে ভাবে চলিয়াছে এই ভাবে চলিলে সমস্ত দেশই মাড়ােয়ারীদের হাতে যাইবে। অবস্থাটা চিন্তা করিলেই বুঝিতে পারিবেন। উকিল-মােক্তারশ্রেণী ইংরেজ-রাজের সৃষ্টি। উপার্জন বেশী হওয়ায় এই শ্রেণীর মধ্যেই আমাদের বুদ্ধিমান ব্যক্তি অধিক আছেন। ইহাদের সম্বন্ধে কোনরূপ দোষারােপ করা আমার উদ্দেশ্য নয়। ইহারা এক নিয়মে বাঁধা পড়িয়াছেন এবং এই বন্ধনীর মধ্যে তাহাদের শক্তি সামর্থ্য নিয়ােগ করিতেছেন। তঁাহারা যদি শিল্পবাণিজ্যে তঁাহাদের শক্তি নিয়ােগ করিবার, সুবিধা পাইতেন তাহা হইলে তাহারা উহার কর্ণধার হইতে পারিতেন। চিন্তা বা পরামর্শ করিয়া যাহাতে ইহার উপায় হয় তাহার ব্যবস্থা করা এখনই কর্তব্য। আমাদের বিচারালয়ের অবস্থা কি? পেয়ারা, আদালি, কেরাণী, আমলা মােক্তার উকিল-সকলেই ছে পাতিয়া আছে, কাহার নিকট মােকদ্দমা-সমস্যা কি উপায়ে দু-পয়সা আদায় করিতে পারে। যাহারা আদালতে যাইতে বাধ্য হন তাহাদের এবং বিশেষ করিয়া অজ্ঞ কৃষকদিগের, কি অবস্থা হয় তাহা বর্ণনা করিবার প্রয়ােজন নাই। চলিত কথায় ইহার বর্ণনা হইতেছে যে, আদালতের টিকটিকিটাও চোর। বিচারপতি হয়ত দু-হাজার টাকা বেতন পান। কিন্তু তাহার কেরাণী যিনি কাগজ- পত্র তঁাহার নিকট পেস করিবেন এবং যিনি ইচ্ছা করিলে মােকদ্দমা আগাইয়া বা পিছাইয়া দিবার এবং অপর নানাদিকে কল নাড়িতে পারেন তাহার বেতন হয়ত পঞ্চাশ টাকা। তিনি কোনরূপ সুবিধা করিয়া দিবার জন্য ঘুষের লােভ সংবরণ করিতে পারেন কি ? তারপর কোন ঘটনা হয়ত ঘটিয়াছে গ্রামে এবং বিচার হইবে জেলার সদরে। সঙ্গিগণ সহ সদরে আসা, পেয়াদ। আমল। উকিল মােক্তারের দক্ষিণা দেওয়া এবং ঘটনাস্থল হইতে এত দূরে সত্য মিথ্যা প্রমাণ করা অশিক্ষিত লােকদের উপর ন্যায় বিচারের নামে কত দূর অবিচার হয় তাহা যাহারা নিজে দেখিয়াছেন তাহারাই জানেন। এক গ্রামের এক রেষারেষী ও মারামারি আমি প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম। নালিশ মােকদ্দমা হইল। বিচারে যাহা সত্য তাহা মিথ্যা এবং যাহা মিথ্যা তাহা সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইল। বিচারপতি এক এম-এ উপাধিধারী ডেপুটী এবং উভয় পক্ষেই বি-এ, বি-এল উকিল ও মােক্তার। এই ত বিচার! পয়সা খরচ করিলে আদালতে সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য প্রতিপন্ন করান যায়। এবং প্রতিপন্ন করাও নিত্যই হইতেছে। দুরভিসন্ধিযুক্ত লােকের পক্ষে আদালত এখন অত্যাচার-উৎপীড়নের এক যন্ত্র হইয়া পড়িয়াছে। এইরূপ এক ব্যক্তিকে গর্ব করিতে শুনিয়াছিলাম যে, ইংরেজের রাজত্বে মােকদ্দমাই লড়াই। আর লড়াইয়ের লক্ষ্য কোনরূপে জিত, ৪০ বাঙ্গালার সমস্যা সত্যমিথ্যা, ন্যায়অন্যায়—যে-কোন উপায়েই জমিদার প্রজাকে এইরূপ লড়াই দ্বারা হয়রান করেন। প্রকৃত শিক্ষা মনের প্রশস্ততা এবং নানা বিষয়ের জ্ঞানার্জনজনিত উচ্চ চিন্তার অভাবে বাঙ্গালার শহরে ও পল্লীতে, এমন কি শিক্ষিত উপার্জনশীল বিদেশাগত বাঙ্গালীদের মধ্যেও, দলাদলি খুব প্রবল। আর এই দলাদলিতে আক্রোশ মিটাইবার জন্যও আদালত এক ঘৃণিত যন্ত্ররূপে ব্যবহৃত হয়। ফৌজদারী মােকদ্দমার বিচার শীঘ্র শেষ হয়। কিন্তু দেওয়ানী মােকদ্দমা একবার আরম্ভ হইলে বলিতে গেলে পুত্র-পৌত্রাদিক্রমে চলিতে থাকে। ন্যায়বিচার যেখানে হয় তাহাও অতি ব্যয়সাপেক্ষ। মােকদ্দমায় অবশেষে জয়লাভ হইলেও জয়ী পক্ষও হৃতসৰ্বস্ব এবং দরিদ্র হইয়া পড়িয়াছেন এইরূপ প্রায়ই দেখা যায়। আমাদের দরিদ্র দেশে এই সকলের প্রতিকার বিশেষ প্রয়ােজনীয় হইয়া পড়িয়াছে। আমাদিগকেই চিন্তা করিয়া প্রতিকার নির্ধারণ ও গ্রহণ করিতে হইবে। এক উপায় হইতেছে জনসাধারণের প্রকৃত ও উন্নত শিক্ষা। আমাদের নামজাদ। উকিল-ব্যারিষ্টার মহাশয়েরা প্রত্যহ হাজার দেড় হাজার টাকা ফি আদায় করেন। অনেক মােকদ্দমা বহু দিন ধরিয়া চলে। জেদবশত জমিদার ও ধনীরা এই ব্যয়ভার বহন করেন, কিন্তু অধিকাংশ স্থলেই ঋণগ্রস্ত হইয়া নিঃস্ব হইয়া পড়েন। মালামােকদ্দমার এই ক্ষতিকর মােহ হইতে দেশকে রক্ষা করা এখন বিশেষ প্রয়ােজন হইয়া পড়িয়াছে।

পল্লী-সমস্যা পল্লী লইয়াই বাঙ্গালা। পল্লীর উন্নতিতেই বাঙ্গালার উন্নতি ও জাতীয় মঙ্গল। পল্লী-সংগঠন প্রস্তাব অনেক হইয়াছে, প্রকৃতপক্ষে কাজ এখনও কিছুই হয় নাই বলিলেই হয়। সমাজ বলিতে যাহা বুঝায় তাহা পল্লীতে যেমন, শহরে তেমন নয়। পল্লীতে সকলেই আপন। যাহাদিগকে ছুইলে স্নান করি তাহাদেরও সহিত খুড়া জ্যেঠ। সম্পর্ক পাতাই। শহরে আপন জনও তেমন আপন নহে। কাজেকাজেই শহরে নৈতিক অধঃপতন বেশী হয়। বাঙ্গালার পল্লীতে সকল শ্রেণীই উচ্চনৈতিক স্তরে অবস্থিত। পল্লী ছাড়িয়া এবং পরিবার হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া কলকারখানার এবং শহরে নানা স্থানে লােক জীবিকার জন্য যখন একত্রিত হয় তখন তাহাদের নৈতিক অবনতির সম্ভাবনা হয়। পল্লীতে সুস্থ শরীরে এবং মনের সুখে জীবন কাটান যায়। কলকারখানার দেশ বিলাত আমেরিকাতেও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা পল্লীসংস্থাপনের প্রয়াস করিতেছেন। ইহাদের মধ্যে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক স্যর রাইডার হ্যাগার্ড, আমেরিকার যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট, বিখ্যাত মােটর প্রস্তুতকারক ক্রোরপতি হেনরী ফোর্ড প্রভৃতির নাম উল্লেখযােগ্য। এই হইল পল্লীর উৎকৃষ্ট দিক। শিক্ষার অভাবে বাঙ্গালার পলীর অপরদিকের আলোচনা করাই আমার উদ্দেশ্য। ইহার মধ্যে প্রধান কূপমণ্ডুকত্ব, যাহা উন্নতির অন্তরায় এবং অবনতির সহায়ক। ইহাতে আমাদের যাহা আছে তাহাই ভাল, আর সবই মন্দ, এই ভাব সৃষ্টি করে, মন ক্ষুদ্র হইয়া যায়, এবং অনেক ভ্রান্ত ধারণা জন্মে। জগতের খবরাখবর না রাখিলে সকলেই কুপ- মণ্ডুকত্ব প্রাপ্ত হইতে বাধ্য। ইহা দূর করিবার বা নিবারণ করিবার একমাত্র উপায় শিক্ষা, সার্বজনীন শিক্ষা। যদি পৃথিবীর খবরাখবর 82 বাঙ্গালার সমস্যা জানা যায়, অন্যান্য দেশবাসীর উন্নতি কি করিয়া হইতেছে বুঝিতে পারা যায়, তাহা হইলে মনে আপনা হইতেই নিজেদের উন্নতির চেষ্টা জাগরিত হয়। তাহার উপর অপরের সহিত যদি স্বার্থহানি বা লাভের সম্বন্ধ দাড়ায় তাহা হইলে এই চেষ্টা বলবতী হয়। ইংরেজের বাসস্থান সমুদ্রমধ্যে ক্ষুদ্র দ্বীপে। অপর দেশের সংশ্রব খুজিতে তাহারা বাধ্য হইয়াছিল ; তাহা না হইলে তাহারা বাচিতে পারিত না। বর্হিজগতের সহিত এই আদান-প্রদানই ইহাদের এত উন্নতির কারণ। জগতের ইতিহাসে দেখা যায়, যে-সকল জাতি সমুদ্র- কুলের বাসিন্দা, যেমন স্পেন, পর্ভ গাল, ভেনিস ইত্যাদি দেশের লােক, তাহারাই কোন-না-কোন কালে বড় হইয়াছে। এমন কি, আমাদের অধুনা পরাধীন এই ভারতবর্ষও। জাপান ইচ্ছা করিয়া প্রায় তিন শত বংসর বাহিরের সকল দেশের সহিত সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করিয়াছিল। কিন্তু যে দিন এই সম্পর্ক পুনঃ স্থাপিত হইল সেই দিন হইতেই জাপানের উন্ন- তির সূচনা হইল। চীন ও ভারতবর্ষ বিদ্যা, বুদ্ধি, ও সামর্থ্যে অনেকের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর হইলেও কূপমণ্ডুকত্বের জন্যই পশ্চাতে হটিয়া গিয়াছে। মাকিণ ইংরেজের বংশধর হইলেও ইংরেজকেও ছাড়াইয়া গিয়াছে। অষ্ট্রেলিয়াবাসীরাও বােধ হয় শীঘ্রই ছাড়াইয়া যাইবে। ইহারা নূতন দেশে গিয়া নূতন পারিপার্শ্বিকের ফলে এইরূপ উন্নতি করিতে সমর্থ হইয়াছে। আমাদের প্রাচীন ইতিহাস পাঠ করিলে দেখা যায় যে, যে- নরপতির হয়ত সামান্য একটি জেলা পরিমাণ রাজ্য তাহারও সম্বন্ধে কিছু বলিতে গেলে বর্ণনা প্রসঙ্গে বলা হইত যে, তিনি সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর। ইহা অপেক্ষা কূপমণ্ডুকত্ব আর কি হইতে পারে? এইরূপ বর্ণনা ছাড়িয়া আমরা যদি আধুনিক অনুন্নত দেশের ইতিহাস দেখি সেখানেও সেই একই ভাব। ব্ৰহ্মদেশের রাজা মাত্র দু-চল্লিশ বৎসর পল্লী-সমস্যা রাজ্যচ্যুত হইয়াছেন এবং সমগ্ৰ ব্ৰহ্মদেশ ইংরেজের দখলে আসিয়াছে। রাজ্যচ্যুতির প্রধান কারণও এই কুপমণ্ডুকত্ব। তিনি এবং তাহার দেশবাসিগণ মনে করিতেন যে, ব্ৰহ্মদেশের রাজাই পৃথিবীর রাজাদের মধ্যে বলবান, কারণ ব্ৰহ্মদেশীয়েরা এক সময় প্রতিবেশী শ্যাম ও আসাম জয় করিয়া লুটপাট করিয়াছিল। ব্রহ্মরাজ ভারতের বড়লাটের চিঠির উত্তর পর্যন্ত দেওয়া মর্যাদার হানিকর মনে করিয়াছিলেন । ই’লণ্ডের রাণী নিজে লিখিলে উত্তর দেওয়া চলিত। যখন ইংরেজের সহিত শেষ যুদ্ধের আয়ােজন চলিতেছে তখন মন্ত্রীর পত্নী বলিলেন যে, ইংরেজরা নাকি বেশ ভাল চাকর হয়, তঁাহার জন্য যেন কয়েকটা চাকর ধরিয়া আনা হয়। এইরূপ কাহারও মালী, কাহারও শকট- চালকের বরাদ্দ হইল। ব্ৰহ্মদেশবাসীরা যদি বাহিরের সহিত আদান- প্রদান ও বাহিরের খবর রাখিত তাহা হইলে ব্ৰহ্মদেশও শামদেশের মতই স্বাধীন থাকিত। বাঙ্গালার পল্লীবাসীরা প্রায়ই বাহিরে কোথাও যাওয়া আসা করে না, এবং করিলেও খুব কমই করে। জেলার সদর পর্যন্তও বােধ হয় অনেকেই যায় না। বাহিরের সহিত সম্পর্কহীনতার জন্য তাহাদের একটা আড়ষ্ট ভাব আছে, অর্থাৎ চলিত কথায় তাহারা চালাক নয় । এক পক্ষে বাঙ্গালার ইহা এক প্রকাণ্ড ক্ষতি। বিহার, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ, পঞ্জাব, উড়িষ্যা, মাদ্রাজ ইত্যাদি প্রদেশের কৃষকশ্রেণীর বহুলোক অন্নসংস্থানের জন্য বাঙ্গালা ও ব্রহ্মদেশে আসিয়াছে। অনেকেই কুলী মজুর, দারােয়ান, চাপরাশীর কাজ করে এবং বেশ দু-পয়সা সঞ্চয়ও করে। ইহাদের মধ্যে কেহ কেহ ভবিষ্যতে বড় ব্যবসাদার হইয়া উঠে। এইরূপ একজন লােক এখন অনেকগুলি কেরােসিন তেলের খনির মালিক, এবং বড় ব্যবসায়ী। আর একজন এখন প্রায় দশলক্ষ টাকার ০ ৪৪ বাঙ্গালার সমস্যা মালিক। এই হেতু একদিন বম্মা গবর্ণমেন্টের ফ্ল্যাসিষ্টান্ট সেক্রেটারী রায় বাহাদুর ক্ষেত্রমােহন বসু বলেন, তিনি রেঙ্গুনে যাহার বাড়ী ভাড়া করিয়াছিলেন সে-ব্যক্তি ঘেসেড়া হইয়া আসে এবং মৃত্যু সময়ে পঁচ-সাত লক্ষ টাকা রাখিয়া যায়। অনুসন্ধান করিলে এইরূপ কত দৃষ্টান্ত পাওয়া যাইবে। বাঙ্গালার পল্লীবাসীদের অধিকাংশই কৃষক এবং বৃষ্টির অভাব না হইলে তাহাদের প্রায়ই অবস্ত্রের অভাব হয় না। এই জন্যই রােজগারের সন্ধানে বাহিরে যাওয়ার অনেকেরই প্রয়ােজন হয় নাই। কিন্তু পৈত্রিক জমির ভাগবাটোয়ারা পুত্রপৌত্রাদিক্রমে চলিয়াছে। অনেকের অন্নসংস্থানের উপায় নাই; তাহা হইলেও তাহার বাহিরে যাইতে চায় না, কেননা, রেওয়াজ নাই। কিন্তু এখন বাহিরে যাওয়ার দরকার হইয়া পড়িয়াছে। শিক্ষার অভাবে এবং কূপমণ্ডুকত্বের প্রভাবে জাতিভেদের দোষ বাড়িয়া গিয়াছে। সমাজের নিম্নশ্রেণীর লােকেরা উচ্চ শ্রেণীর লােকের দ্বারা নীচ বিবেচিত হয় ও আপনাদিগকে নীচ মনে করে এবং এই অবস্থাতেই সন্তুষ্ট থাকে। এই ভাব দূর হইবে তখনই যখন শিক্ষাদ্বারা এবং বাহিরের সহিত আদান-প্রদানে তাহাদের জ্ঞানচক্ষু ফুটিবে । পল্লীর, অতএব জাতির, উন্নতির আর এক অন্তরায় কলিযুগবাদ। আমাদের পল্লীর শিক্ষার ভাব কি ?-এই সংসার মিথ্যা ও কয়েকদিনের জন্য। দুলভ মনুষ্য জন্ম লাভ করিয়াছ, বৃথায় কাটাইও না, অর্থাৎ ঈশ্বরচিন্তা কর। এখন কলিযুগ, সবই নিকৃষ্ট ও মন্দ ; কলিযুগে ইহার বেশী আর কি হইতে পারে ? ভিখারী যে গান গাহিয়া ভিক্ষা চাহিতেছে তাহারও এই মর্ম। এই ভাবই দিবারাত্র সকলের মনের উপর কাৰ্য্য করিতেছে এবং ইহার ফলস্বরূপ মনের জড়তা দেশের যে পল্লী-সমস্যা ৪৫ কি সর্বনাশ করিতেছে তাহার ইয়ত্তা নাই। বিশেষ করিয়া সংস্কার- সর্বস্ব অশিক্ষিত লােকের উপর ইহার প্রভাব বড় মারাত্মক রকম প্রকট হইয়া পড়িয়াছে। ইহার প্রতিকারের একমাত্র উপায় শিক্ষা, পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির ইতিহাস, আধুনিক নানা উন্নতির ইতিহাস সম্বন্ধে শিক্ষা, এমন শিক্ষা যাহা মনে গাঁথিয়া দিবে যে, সত্যযুগ সম্মুখে, পশ্চাতে নয়। আর সত্যযুগে পঁহুছিতে হইলে আপ্রাণ চেষ্টা আবশ্যক। যে যেরূপ চেষ্টা করিবে, সে সেইরূপ ফল লাভ করিবে। বাঙ্গালার অনেক স্থানের পল্লীর স্বাস্থ্যের কথা বিশেষ করিয়া বলিবার প্রয়ােজন নাই, পল্লী ছাড়িয়া শহরে গিয়া বাস করিতে পারিলেই লােকে যেন হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচে। গণনা করিয়া দেখা গিয়াছে যে, বাঙ্গালার নরনারী গড়পড়তা হিসাবে মাত্র একুশ বৎসর বাঁচে। মান্দ্রাজ প্রদেশের পুরুষ বাঁচে ছাব্বিশ বৎসর এবং স্ত্রীলােক সাড়ে-সাতাইশ বৎসর। ব্ৰহ্মদেশবাসী পুরুষ বাঁচে সাড়ে-একত্রিশ বৎসর এবং স্ত্রীলােক সাড়ে-বত্রিশ বৎসর। জাপানীরা বঁচে বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ বৎসর। খাদ্যের সহিত স্বাস্থ্যের সম্পর্ক কি, তাহা খাদ্য-সমস্যা আলােচনা করিবার সময় বলিয়াছি। খাদ্যের উন্নতির সহিত স্বাস্থ্যেরও যে উন্নতি হইবে তাহা নিঃসন্দেহ। স্বাস্থ্য ভাল হইলে অনেক রােগ কাছে ঘেষিতে পারে না। কতক রােগ আছে যাহার বিষ শরীরে প্রবেশ না করিলে সে রােগ হয় না। ম্যালেরিয়া রােগীকে কামড়াইয়া মশক রােগীর দেহ হইতে বিষ লইয়া সুস্থ লােককে কামড়াইলে সুস্থ লােকের ম্যালেরিয়া হয়। কলেরা রােগীর ভেদবমিতে মাছি বসিয়া তারপর যদি কোন খাদ্যে বসে এবং সেই খাদ্য যদি কেহ খায় তবে নিশ্চয়ই তাহার কলেরা হয়। কলেরা রােগীর ভেদবমি, দুষিত কাপড়-চোপড় কাচিয়া জল দূষিত করিলে এই জল ৪৬ বাঙ্গালার সমস্যা ব্যবহারেও কলেরা হয়। এইরূপ নানা রােগের তথ্য অবগত হইয়া এবং নিবারণের উপায় অবলম্বন করিয়া অতি অস্বাস্থ্যকর স্থানও স্বাস্থ্যকর বাসযােগ্য স্থানে পরিণত হইতেছে। এই সকল তথ্য প্রয়ােগ করিয়া কাৰ্য্য করিবার শিক্ষার বিশেষ প্রয়ােজন। কলেরা, বসন্ত, টাইফয়েড রােগে সময়ে সময়ে গ্রামকে গ্রাম উজাড় হইয়া যায়। এই সমস্ত রােগের প্রতিষেধক উপায়গুলি আজকাল হাতে হাতে ফল দেয়। কয়েক বৎসর পূৰ্বে সমস্তিপুর (দ্বারভাঙ্গা জেলা) মহকুমায় কলেরায় দুই মাসে প্রায় চল্লিশ হাজার লােকের মৃত্যু হয়। পুষা এই সকল পল্লীর মধ্যে অবস্থিত। এখানে প্রায় পাঁচশতেরও অধিক অধিবাসীর মধ্যে এক জনেরও কলেরা হয় নাই। এই সমস্ত রােগের প্রতিষেধক অতি সহজ উপায় গুলি পল্লীবাসীদিকে শিক্ষা দিতে পারিলে পল্লীর স্বাস্থ্য ফিরিয়া যায়। রায় বাহাদুর ডাক্তার গােপালচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মহাশয়ের ম্যালেরিয়া-নিবারণী সভা প্রত্যক্ষ ফল দিতেছে। বাঙ্গালায় হুকওয়াম ক্রিমিঘটিত রােগের প্রাবল্য অত্যন্ত বেশী। এই ক্রিমি স্বাস্থ্যের অত্যন্ত অনিষ্টকারী। রােগীর বিষ্ঠার সহিত ইহার ডিম বাহির হয় এবং মাঠে এই ডিম হইতে যে ক্রিমি ফোটে, যাহারা খালি পায়ে চলাফেরা করে, তাহাদের পায়ের চামড়ার ভিতর ঢুকিয়া ক্রমে শরীবে প্রবেশ করে। বাঙ্গালা দেশের পল্লীবাসী নরনারী মাঠে যেখানে সেখানে বিষ্ঠা ত্যাগ করে বলিয়া এই ক্রিমি সর্বত্রই ছড়াইয়া থাকে। এই কারণে এই ক্রিমিঘটিত রােগ বাঙ্গালার প্রায় সকলকেই আক্রমণ করে। ইহার প্রতিকার হইতেছে পায়খানার প্রচলন। বাড়ীর সীমানায় চার পাঁচ হাত গর্ত করিয়া দম্মা ঘেরিয়া পায়খানা করিলে খােলা মাঠে নরনারী সকলের নির্লজ্জভাবে মলমূত্র ত্যাগ নিবারিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে এই কৃমিরােগও কমে। এই পায়খানা কোন প্রকারে পল্লী-সমস্যা ৪৭ ছাইয়া দিলে বর্ষার সময় দূরে মলত্যাগের অসুবিধা দূর হয়। আর যদি এই পায়খানায় মলত্যাগের পর ধূলি বালি বা ছাই ফেলিয়া মল ঢাকা দেওয়া যায় তাহা হইলে দুর্গন্ধ ও নিবারিত হয় এবং মাছিতে নানা রােগের বীজাণু ছড়াইতে পারে না। মলত্যাগের পর জলশৌচ, স্নান, কাপড় ধােয়া এমন কি মূত্র ত্যাগ করিয়া সেই পুকুরের জলেই রন্ধন এবং সেই জলই পান করা হয়। ছেলেবেলা হইতে সকলেই দেখে যে, এই- রূপই চলিয়া আসিতেছে। অতএব ইহার ঘৃণ্যতা ও অনিষ্টকারিতা সম্বন্ধে কোন ধারণাই হয় না। অতএব প্রতিকারের চিন্তাও কেহ করে না। এখন শিক্ষিত অতএব চাকুরিজীবী বাঙ্গালী পল্লী একপ্রকার ত্যাগ করিয়াছে ; বড়জোর পূজা বা পিতৃমাতৃ শ্রাদ্ধের সময় বা বিবাহ উপলক্ষ্যে গিয়া মাত্র দিন কতক পল্লীতে কাটায়। শিক্ষিত বুদ্ধিমান ব্যক্তিরাই সমাজের মস্তকস্বরূপ, অধ্য তাহার পল্লী ত্যাগ করিয়াছে। তাই পল্লীবাসীরা একপ্রকার মস্তকহীন হইয়াছে। বাল্যকালে দেখিয়াছি আমাদের গ্রামে আমাদের এক বৈঠকখানা, আর সেইরূপ প্রায় অর্ধক্রোশ দূরবর্তী আর এক গ্রামে গোসাইদের বৈঠকখানা, পুনরায় অর্ধক্রোশ দূরবর্তী সরকারদের এক বৈঠকখানা। এই রূপ ক্ষুদ্র-বৃহং সকল গ্রামেই অবস্থাপন্ন লােকদের একাধিক বৈঠকখানা ছিল। বিশেষত বৈকাল বেলায় এই সকল বৈঠকখানা সরগরম থাকিত। তাস, পাসা, দাবা, প্রভৃতি খেলার সঙ্গে হাস্যোদ্দীপক বাক্য এবং উচ্চহান্য ছোট ছােট বালক-বালিকাদিগকেও আকৃষ্ট করিত, অবসরমত গ্রামবাসীদের ও ভিড় হইত বিশেষত তাহাদের মধ্যে যাহারা বৃদ্ধ তাহার খেলার পর রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি পাঠ করিত। কোন কোন দিন সন্ধ্যার সময় কীৰ্ত্তনও হইত। এই সকল কীর্তনে খােল, করতাল বাজাইত এবং কীর্তন গানও করিত অনেক সময় ৪৮ বাঙ্গালার সমস্যা কৃষিজীবী যুবক ও বৃদ্ধের।। কোন কোন দিন হয়ত গ্রামবাসী কাহাদের ঝগড়া বিবাদ হইয়াছে, দুই দলই আসিয়া বৈঠকখানায় নালিশ করিল। অর্ধঘণ্টার মধ্যে সাক্ষীসাবুদ শুনিয়া কাহারও আট আনা, চারি আনা জরিমানা হইয়া বিচার হইয়া গেল। দুই দলই বিনা বাক্যব্যয়ে বিচার শিরােধার্য্য করিয়া বাড়ী ফিরিল। কাহারও সন্তান জন্মিয়াছে, সে আসিয়া খবর দিল। অমনি পঞ্জিকা খুলিয়া তিথি আদি বিচার করা হইল। পঞ্জিকার পাতাতেই জন্ম-বিবরণ লিখিয়া রাখা হইল, কেহ বিবাহ বা দ্বিরাগমনের জন্য শুভদিন শুভক্ষণ দেখিয়া দিবার প্রার্থনা করিল। গ্রামে কাহারও অসুখ বেশী হইয়াছে তাহার জন্য কর্তব্যাকৰ্তব্য নির্ধারিত হইল। গ্রামে কেহ দুষ্কর্ম করিয়াছে তাহার সম্বন্ধে নালিশ না হইলেও গ্রামের মঙ্গলের জন্য তাহার কার্যের বিচার-আলােচনা হইল। এখন গ্রামে পঞ্চায়েত-প্রথার প্রবর্তন করিয়া এই সকল কার্য করিবার প্রয়াস হইতেছে বটে, কিন্তু ইহাতে এবং পূর্বের যে অবস্থা বর্ণনা করিলাম তাহাতে তফাৎ কত, বিচার করিয়া দেখিবার বিষয়। পিতাঠাকুর ও খুড়ামহাশয় গ্রামেই ছিলেন ; গ্রামবাসীদের সহিত সকল বিষয়ে তাহাদের সহানুভূতি ছিল এবং কাজেকাজেই তাঁহাদের প্রতিপত্তিও ছিল । কাজেই তঁহারাই ছিলেন গ্রামের স্বাভাবিক নেতা। পল্লীর শিক্ষার উপায় রামায়ণ, কথকতা, যাত্রার বিষয়ও এখানে উল্লেখ করা প্রয়ােজন। গ্রামের কেহ পুণ্যের জন্য কথকঠাকুর আনাইয়া কয়েক দিন হইতে কয়েক মাস পর্যন্ত কথকতা করাইতেছেন। প্রতি সন্ধ্যায় হয়। কথকঠাকুরের জন্য বৈঠকখানায় আসন। শ্রোতার। রাস্তা, ময়দান গাছতলা, যে যেখানে পারে বসে। মনে আছে নিম্ন প্রাথমিক স্কুলে পড়িতাম, কিন্তু প্রতিদিনই কথকঠাকুরের কথা শুনিতে যাইতাম এবং ধ্রুব-চরিত্রের কথার সময় কতই না কাদিয়াছি। সেই পল্লী-সমস্যা ৪৯ রূপ কতদিন ধরিয়া কেহ হয়ত রামায়ণ গাওয়াইতেছেন। খালি গায়ে পাকান চাদর স্কন্ধে জড়াইয়া শামলা মাথায় দিয়া, হাতে চাময় লইয়া এবং পায়ে নূপুর পরিয়া মূল গায়ক, মন্দিরা হাতে ও পায়ে নূপুর- পরা দলের সঙ্গে গান করেন। গান ও নাচের ভঙ্গী ছােট ছােট বালক বালিকাদেরও চিত্তাকর্ষক। লােকের ভিড় কত। গায়কদিগকে কত রকমের উপহার দেওয়া হয়। একদিন মূলগায়ককে কেহ মস্ত লম্বা বড় বড় ফুলুরীর মালা পরাইয়া দিল। এই রূপ কোনদিন কদমা, কোন দিন বাতাসার, কোনদিন ফুলের, আরও কত কি প্রতিযােগিতা। যাত্রা বেশী ব্যয়সাপেক্ষ বলিয়া মধ্যে মধ্যে হইত। চারিদিকের পাঁচ-সাত ক্রোশ দূর হইতে লােক আসিয়া যাত্রা শুনিত। আমার মনে আছে গ্রামে যাত্রার দল আসিলে তাহাদের আগমন হইতে প্রস্থানের সময়ের মধ্যে তাহাদের এবং তাহাদের কার্যকলাপের সমস্ত খবর আমার নিকট থাকিত। বৎসরের মধ্যে একবার দুইবার অষ্ট প্রহর, চব্বিশ প্রহর, নয় দিন নয়রাত্রি ধরিয়া কীৰ্ত্তন হইত। দিবারাত্র নাচগান আনন্দ। এই সকলের তিরােধানের জন্য অনেকেই আক্ষেপ করেন; কিন্তু এ সকল আর ফিরিয়া আসিবে কি-না সন্দেহ। এখন ইহাদের বদলে সময়ােপযােগী লােকশিক্ষার এবং গ্রামবাসীদের আমােদ-প্রমােদের প্রবর্তন আবশ্যক। আমােদ-প্রমােদ, হাসিতামাসা স্বাস্থ্যের সহায়ক। যাহারা প্রাণ ভরিয়া হাসিতে পারে এবং আমােদ-প্রমােণ উপভােগ করিতে পারে তাহারা দীর্ঘজীবী হয়। কৃষিসম্বন্ধে আলােচনা করিবার সময় দেশের মেরুদণ্ডস্বরূপ কৃষক- পরিবারের বংশলােপের কথার উল্লেখ করিয়াছি। বাঙ্গালা দেশে ব্রাহ্মণ কায়সের দেখাদেখি অপর শ্রেণীর লােকেরাও বিধবা বিবাহ ।

বাঙ্গালার সমস্যা করে না। ইহাদের বংশলােপের ইহাই প্রধান কারণ বলিয়া মনে হয়। কৃষকশ্রেণীর মধ্যে কন্যার অল্পতাহেতুই বােধ হয় অনেক কালে পণ দিয়া কন্যা ক্রয় করিতে হয়। আমি দেখিয়াছি কয়েকজন কন্যা সংগ্রহ করিতে পারিল না। কেহ কেহ জমিজমা বিক্রয় করিয়া প্রায় অর্ধবয়সে বা চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বৎসর বয়সে চার-পাঁচ বৎসর বয়স্ক কন্যা বিবাহ করিল, অধিকাংশ স্থলেই ফল কি হইল বর্ণনা নিষ্প্রয়ােজন। পল্লী এবং কৃষির কল্যাণের জন্য এই সকল লােকের মধ্যে বিধবা বিবাহ প্রচলন এবং ভিন্ন ভিন্ন অথচ সমশ্রেণীর মধ্যে বিবাহ-প্রথা প্রচলন বিশেষ প্রয়ােজনীয় হইয়া উঠিয়াছে। উপদেশ ও শিক্ষার দ্বারাই ইহা সম্ভব। ইহারা নিজেরাই করিবে এই রূপ আশায় বসিয়া থাকিলে কখনও হইবে বলিয়া মনে হয় না। পল্লীর উন্নতির জন্য এখন বুদ্ধিমান নেতৃস্থানীয় লােকের একান্ত প্রয়ােজন হইয়া পড়িয়াছে। কেমন করিয়া এইরূপ নেতা পাওয়া যাইতে পারে পরে বলিতেছি। পল্লীর এখন প্রয়ােজন নিম্নলিখিত বিষয়গুলি ১। কৃষির উন্নতি। ২। কৃষিজাত দ্রব্য বিক্রয়ের এবং পল্লীবাসীর প্রয়ােজনীয় জিনিষগুলির ক্রয়ের সুবিধা। ৩। অল্প সুদে পল্লীবাসীর বিশেষ করিয়া কৃষকদের অর্থ-সাহায্যের সুবিধা। ৪। উপযােগী শিল্প ও উপশিল্প সৃজন ও প্রচলন। ৫। গমনাগমনের জন্য রাস্তা, ট্রাম ও রেলের সুবিধা এবং ভাবের আদান-প্রদান, শীঘ্র শীঘ্র ব্যবসাবাণিজ্য প্রভৃতি যাহাতে করা যায় তাহার জন্য ডাক, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের সুবিধা।

কৃষি-সমস্যা
৩। বালক-বালিকা যুবা প্রৌঢ়, এমন কি, বৃদ্ধদেরও শিক্ষার
সুবিধা।
৭। পল্লীর স্বাস্থ্যের উন্নতি।
৮। পল্লীবাসীর আমােদ-প্রমােদের সুবিধা।
৯। পল্লীর বাসস্থানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি।
১০। পল্লীবাসী সকলের মধ্যে প্রতি বর্ধম এবং সহযােগ প্রতিষ্ঠা।
সমগ্র সমাজের দোষ দূরীকরণ, সমাজের কল্যাণকর রীতি-
নীতির প্রচলন এবং সমাজের উন্নতি। সমাজ বলিতে দেশবাসী
সৰ্ব্বধৰ্মাবলম্বী সকলকেই ধরিতেছি।
প্রস্তাবিত জননী প্রতিষ্ঠান এই উদ্দেশ্য লইয়া কাৰ্যে অবতীর্ণ
১১।
কৃষি-সমস্যা
দেশের ধনাগমের উপায় কৃষি, শিল্প ও ব্যবসা। বাঙ্গালী ব্যবসা
বাণিজ্য ও শিল্প হইতে হটিয়া গিয়াছে। আমাদের দেশে শতকরা
সত্তর-পঁচাত্তর জন, অর্থাৎ প্রত্যেক চারিজনের মধ্যে তিন জন
কৃষিজীবী।
বাঙ্গালা দেশে খনিজ পদার্থ বা বন জঙ্গল প্রায় নাই বলিলেই হয়।
বাঙ্গালার কৃষিই লক্ষ্মী। কৃষির উন্নতির সঙ্গে বাঙ্গালার উন্নতি এবং
কৃষির অবনতির সঙ্গে বাঙ্গালার অবনতি। পল্লীগ্রামের প্রায় সকলেই
কৃষির উপর নির্ভর করে। পল্লী-সমস্যা বলিতে প্রধানতঃ
কৃষি সমস্যা। কৃষির উন্নতি হইলে সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজীবীরও উন্নতি
হয়। সে ভাল খাবার পাইতে পারে, ভাল পরিতে পারে, স্বাস্থ্যকর
বাসস্থানের বন্দোবস্ত করিতে পারে, পুত্রকন্যার শিক্ষার ব্যবস্থা করিতে

বাঙ্গালার সমস্যা পারে; সর্ববিষয়ে গ্রামকে উন্নত করিতে পারে। অতএব কৃষির উন্নতি অবনতি বাঙ্গালার পল্লীতে কিসে হয় তাহার যথাযােগ্য উপায় বা প্রতিকার করিতে হইবে। ভারতবর্ষের কৃষির উন্নতির জন্য বহুব্যয়ে রয়েল কমিশন বসিয়াছিল। কমিশন না বসিলেও কৃষির উন্নতি অবনতির কারণগুলি প্রায় সকলেরই জানা আছে। অপর অনেক দেশের কৃষির ও কৃষিজীবীর উন্নতি কেমন করিয়া হইল তাহারও প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে। আসল কথা হইতেছে, প্রকৃত কাৰ্য দ্বারা উন্নতির চেষ্টা করা এবং অবনতির প্রতিকার চেষ্টা নিতান্ত আবশ্যক হইয়া পড়িয়াছে। কোন কমিশনের অপেক্ষায় থাকিবার প্রয়ােজন নাই। বাঁকুড়া জেলার গ্রামের অবস্থা বাল্যকাল হইতেই দেখিয়া আসিতেছি। অবস্থা ক্রমেই খারাপ হইয়া যাইতেছে। বাঙ্গালার প্রায় সকল গ্রাম সম্বন্ধেই বােধ হয় এ কথা খাটে। বড় বড় কৃষক- পরিবার প্রায় লােপ পাইতেছে। আমাদের গ্রামের অধিকাংশ কৃষকই ঘােষ উপাধিধারী সদগােপ জাতীয়। বাল্যকালে দেখিয়াছি, গৌর ঘােষের বৃহৎ পরিবার, বড় বড় ধানের গােল। আক, কলাই, প্রভৃতির বৃহৎ চাষ। আক মাড়িবার সময় কতদিন ধরিয়া কল বসিত এবং কত গুড় তৈয়ারী হইত। সেইরূপ নন্দ ঘােষ এবং জীবন ঘােষেরও বৃহৎ পরিবার দেখিয়াছি। শুনিয়াছি কল্যাদের ইহাদের সকলের অপেক্ষাও বৃহৎ পরিবার এবং বিস্তৃত চাষ ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, গ্রামে এখন একটিও এরূপ বৃহৎ কৃষক-পরিবার আর নাই। নন্দ ঘােষ, গৌর ঘােষ এবং কল্যাদের গোষ্ঠী গত ত্রিশ-বত্রিশ বৎসরের মধ্যে প্রায় শােপ পাইতে বসিয়াছে। অথচ অধিকাংশ স্থলে যে-জমি চাষ করিয়া ইহারা সঙ্গতিপয় ছিল সেই সকল জমি আজও রহিয়াছে।

কৃষি-সমস্যা যখনই কোন কৃষকের তিন চাৰি পুত্ৰ কৰ্মঠ হইয়া উঠিল তাহার অবস্থাও ফিরিল। কৃষকের মৃত্যুর পর তাহার পুত্রের যতদিন একান্নবর্তী থাকে ততদিন তাহাদের অবস্থা বেশ ভাল থাকে। তাহার পর যখনই পৃথক হইল, পৈত্রিক জমি ভাগ করিয়া নিজে নিজে মজুরের সাহায্যে চাষ করিতে আরম্ভ করিল, অমনই পতন আরম্ভ হইল। এইরূপে গত পঁচিশ-ত্রিশ বৎসরের মধ্যে কয়েক পরিবারের উত্থান ও পতন দেখিলাম। আমাদের দেশের কৃষকদের দশ-বিশ বা ত্রিশ বিঘা জমি লইয়া চাষ। এই চাষের উপস্বত্ব বা খরচ বাদে আয় কম। যতদিন কৃষক-পরিবার নিজ পরিশ্রম দ্বারা চাষ করে এবং পরিশ্রমের ফল স্বরূপ উৎপন্ন দ্রব্য ভােগ করে ততদিন তাহাদের অবস্থা সচ্ছল বা • solvent; যখন কুলীমজুর খাটাইয়া এই সকল কুলী মজুরদের সহিত উৎপন্ন ভাগ করিতে হয়, তখনই অবস্থা অসচ্ছল বা insolvent. তাহার উপর নিজে নিজের জমি চাষ এবং অপরের দ্বারা চাষের মধ্যে পার্থক্যও অনেক। আমাদের দেশের কৃষকদের অল্প জমি লইয়া চাষের প্রকৃত ভিত্তি কো-অপারেশন বা সহযােগ, বা সমবায়। আপন জন বা ভ্রাতাদের সহিত যতদিন সহযােগ থাকে ততদিন ভিত্তি পাকা থাকে, তাহা না হইলেই ভিত্তি ভাঙ্গিয়া যায়। জমির মাঝামাঝি আল দিয়া যে পৈত্রিক জমি ভাগ করা হয় ইহার মত ক্ষতিকর প্রথা আর নাই। টুকরা টুকরা জমি আবার গ্রামের চারিধারে ছড়ান। একত্রে দশ বিঘা জমির চাষ টুকরা টুকরা এবং নানা স্থানে ছড়ান বিশ-ত্রিশ বিঘা জমির সমান। একত্রে দশ-পনর বিঘা জমি পাইলেই কৃষকের কূপ খননাদি দ্বারা নানা উপায়ে জমির উন্নতি করে, এবং ইহার উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি করে। নানা স্থানে টুকরা টু ছড়ান জমি আপােষে বদল করিয়া যদি, কৃষকেরা নিজ নিজ ৫৪ বাঙ্গালার সমস্যা চাষের জমি একত্র করে তাহা হইলে কৃষকেরা উপকৃত হয়। ইহার জন্য প্রয়ােজন বুদ্ধিমান এবং স্বার্থহীন নেতা; তারপর প্রয়ােজন হইলে আইন করিয়া সুযােগ সুবিধা করিয়া দেওয়া। উপরন্তু এইরূপ কৃষিজীবীদের সঞ্চিত অর্থ নাই। তাহাদের মূলধন হইল জমিটুকু এবং বলদ ও নিজের পরিশ্রম। অতিবৃষ্টি, বন্যা, অনাবৃষ্টি, গােমড়ক এবং নিজের অসুখ, এই সকল কারণে তাহার মূলধন হইতে সকল বৎসর সমান বা নিশ্চিত আয় হয় না। এই সকল কারণে, কতক সামাজিক রীতির জন্য, যেমন শ্রাদ্ধ, বিবাহ ইত্যাদির খরচের জন্য কৃষিজীবীমাত্রেরই ঋণের প্রয়ােজন হয়। ঋণ- দাতার লােলুপদৃষ্টি প্রায় অধিকাংশ স্থলেই তাহার জমিটুকুর উপর পড়ে। অধিকাংশ স্থলেই হয়ত সেই জমির উপরেই পূৰ্ব্ব ঋণ আছে । কাজে-কাজেই সুদের হার উচ্চ। কৃষিজীবী মাত্রেরই ঋণ গ্রহণ প্রয়ােজন হইবেই। কম সুদে এই ঋণ পাইবার ব্যবস্থা সমবায় ছাড়া হইতে পারে না। সমবায়ের কথা পরে বলিব। জমিদারের সহিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হওয়ায় যে অপকার হইয়াছে তাহার কিছু কিছু জমিদারী’র বিষয় আলােচনার সময় বলিয়াছি। ইহার আর এক বিশেষ অনিষ্টকর ফল এই হইয়াছে যে, গবর্ণমেন্টের সহিত জমির সম্পর্ক লােপ পাইয়াছে, খাল কাটিয়া বা অন্য প্রকারে জল সেচনের ব্যবস্থা করিয়া জমির উৎকর্ষসাধন করিবার গবর্ণমেন্টের কোন স্বার্থ ও প্রয়াস নাই। অনেক স্থলেই জল পাইলে কৃষকেরা জমিতে সােনা ফলাইতে পারে। সমবায় দ্বারা জলসেচনের বন্দোবস্ত হইতে পারে। সকল দেশেই কৃষিজীবীরা ঘােড়া, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগী, রেশমকীট, লাক্ষাকীট ও মৌমাছি পালন করিয়া চাষের আয় 4 কৃষি-সমস্যা বৃদ্ধি করে। এই সকল হইল কৃষিজীবীর উপযুক্ত উপশিল্প। কৃষক- পরিবারে বৎসরের সকল সময় কাজ থাকে না। এই সময়ে উপশিল্প দ্বারা কিছু আয় হইলে উহাদের আর্থিক মঙ্গল হয়। নানারূপ শিল্পও ইহাদের উপযােগী, যেমন সুতাকাটা ও বস্ত্রবয়ন। এই রকমের নানা কাজ শিক্ষা দিবার প্রয়ােজন। জাপান যে সস্তাদরে কত রকমের জিনিষ, রেশম ও সুতার কাপড় হইতে আরম্ভ করিয়া খেলনা পৰ্য্যন্ত কত কি দিয়া বাজার ছাইয়া ফেলিয়াছে, ইহার অধিকাংশই কুটীরশিল্প দ্বারা উৎপন্ন। চাষের প্রধান সহায় গরুর সম্বন্ধে আমরা নিতান্ত উদাসীন। আমাদের দেশের গরু আধ সের বা একসের দুধ দেয়, বিলাতে দেয় আধ মণ। আমরা এক পাল গরু রাখি, কিন্তু তাহাদের খাদ্যের অভাব। বাঙ্গালার কোথাও গরু ইত্যাদির খাদ্যের জন্য কোনও রূপ ফসল জন্মান হয় না। ভাল গরু পালন করিতে হইলে তাহার ভাল খাদ্যের প্রয়ােজন। অল্প পরিমাণ স্থানের মধ্যেই বেসিম ইত্যাদি অতি পুষ্টিকর খাদ্য জন্মাইতে পারা যায়। গরুর সম্বন্ধে এই উদাসীনতার কারণ হইতেছে অজ্ঞতা, যাহা কেবল শিক্ষা দ্বারাই দুর হইতে পারে। কেবল বাঙ্গালা দেশেই গরুর অত্যন্ত অনাদর। বিহার, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ, বােম্বাই এবং ব্রহ্মদেশে গরুর জন্য জওয়ার (দেব) ও মক্কা জন্মান হয়। প্রায় তিন মাসের মধ্যেই ফসল তৈয়ারি হয়। ডাটা পাতা ইত্যাদি সমস্ত ছােট ছােট করিয়া কাটিয়া মাটির ভিতর গর্তে রাথিয়া দিলে ইহা অতি উত্তম পুষ্টিকর খাদ্যে পরিণত হয়। দরকার মত অল্প অল্প বাহির করিয়া খাওয়া যায়। এইরূপ খাদ্যের প্রচলন বিশেষ আবশ্যক। ধানের খড়ে বা বিচালীতে পুষ্টিকর অংশ অতি কম।

বাঙ্গালার সমস্যা উন্নত প্রণালী, উন্নত বীজ, উয়ত সারেরও প্রয়োজন। মূল ভিত্তি হইতেছে সমবায় বা সহযােগ। শিক্ষা দ্বারা ইহা গড়িয়া তুলিতে পারিলে অপর প্রয়ােজনগুলি আয়ত্ত করা অতীব সহজ- সাধ্য হইবে। সমবায় ফরিদপুর জেলার সেটলমেন্টের সময় শ্রীযুক্ত জ্যাক সাহেব সমস্ত জেলার লােকের আর্থিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করেন। তিনি “The Economic Life of a Bengal District” নাম দিয়া এই সংগৃহীত তথ্য সম্বন্ধে এক উপাদেয় পুস্তিকা লিখিয়াছেন। তাহা হইতে জানা যায় যে, এই জেলার সমস্ত অধিবাসীর প্রত্যেক একশতের মধ্যে সাতাত্তর জন কৃষিজীবী এবং মাত্র তেইশ জন অন্য উপায়ে জীবিকা অর্জন করে। অধিবাসীদের প্রায় অর্ধেকের মােটা ভাতকাপড়ে সচ্ছল অবস্থা, ঋণ না করিয়া চলে। অপর অর্ধেকের অবস্থা অসচ্ছল, ঋণ না করিয়া চলে না। ঋণের সুদের পরিমাণ একশত টাকার উপর বৎসরে ছত্রিশ টাকা হইতে আটচল্লিশ টাকা। এই সুদ বৎসরের শেষে এবং কোন কোন স্থলে ছয় মাসের পর আসলে পরিণত হয়। অতএব সামান্য মাত্র ধার করিতে বাধ্য হইলে এবং অসচ্ছলতা হেতু সময়মত আসল ও সুদ শােধ দিতে না পারিলে অল্পদিনেই ঋণের পরিমাণ বাড়িয়া যায় এবং ঋণজাল হইতে মুক্ত হওয়া একরূপ অসম্ভব হইয়া দাড়ায়। বাঙ্গালার সকল স্থানেই এই অবস্থা। কৃষির বিষয় আলােচনা করিবার সময় দেখাইয়াছি যে, অধিকাংশ লােকেরই কখনও-না-কখনও ঋণের প্রয়ােজন হইবেই হইবে। চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়া কৃষককুল ধ্বংসের মুখে চলিয়াছে।

সমবায় এই ঋণসমস্যা সমাধানের জন্য গবর্ণমেণ্ট সমবায় সমিতি স্থাপন করিতেছেন এবং আইন করিয়া সমবায় সমিতি গঠনের সুবিধা করিয়া দিয়াছেন। কিন্তু সমবায়নীতি শিক্ষা দিবার জন্য লােকের অভাব। এই সম্বন্ধে জ্যাক সাহেব যাহা বলিয়াছেন তাহা দেশের লােকের বিশেষ করিয়া ভাবিবার বিষয়। মােটামুটি তঁাহার কথা এই—এক ফরিদপুর জেলাতেই সমবায়-প্রচেষ্টাকে কার্যকরী করিতে হইলে এমন দুইশত কুশলী কর্মচারীর প্রয়ােজন যাহারা লােকের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস অর্জন করিতে পারে। নিরক্ষর লােকদিগকে সমবায়নীতি শিক্ষা দিবার জন্য গ্রামে গ্রামে সমবায় সমিতি গঠন করিয়া ইহার কাৰ্য দেখান প্রয়ােজন। শুধু উপদেশ দ্বারা হইবে না। এখন গবর্ণমেন্ট প্রতি জেলায় মাত্র একটি কি দুইটি কর্মচারী নিয়ােগ করিয়াছেন। কখনও যে যথেষ্ট সংখ্যক কর্মচারী নিযুক্ত করিতে পারিবেন তাহা মনে হয় । অতএব কতশত বৎসরে যে ঋণ-সমস্যার সমাধান হইবে তাহা বলা যায় না। দেশবাসিগণ এই অতীব হিতকর কাধের ভার গ্রহণ করিলে অতি অল্পদিনেই ইহা কার্যকর হইতে পারে। বক্তৃতা দিয়া বা পুস্তিকা ছাপাইয়া এ-কাজ হয় না। যাহার নিকট হইতে আদায় হইবার আশা কম তাহাকে কেহ টাকা ধারে দিতে চায় না। তাহার জন্য অবস্থাপন্ন কেহ যদি জামিন হয় তবেই তাহার পক্ষে ধার পাওয়া সম্ভব হয়। সমবায়-ঋণ-সমিতিতেও এই জামিনের ব্যবস্থা। দশজন মিলিয়া দশজনই যদি সকলের ঋণের জন্য সমান দায়ী হয় তাহা হইলেই লােকে সাহস করিয়া কম সুদেই টাকা ধার দেয়। এইরূপ অনেকে মিলিয়া যদি সমিতি গঠন করে এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ স্বল্প সঞ্চয় এই সমিতিতে গচ্ছিত রাখে, তাহা হইলে এই গচ্ছিত সঞ্চয় হইতেই ঋণ পরিশােধের ব্যবস্থা বাঙ্গালার সমস্যা হইয়া যায়। যতদিন গচ্ছিত সঞ্চয় ঋণদানের পক্ষে যথেষ্ট না হয়, আইন দ্বারা এমন ব্যবস্থা হইয়াছে যে, এই সমিতি অল্প সুদে ঋণ পাইতে পারে। ইটালি প্রভৃতি দেশে কৃষকদেরই গচ্ছিত টাকা হইতে প্রয়ােজনীয় এই সমস্ত ঋণের টাকা সংগৃহীত হয়। কৃষকেরা গচ্ছিত টাকার সুদ ত পাই এবং দরকার হইলে অল্প সুদে ধারও পায়। কেবল ঋণ পাইবার জন্যই যে সমবায়নীতি অবলম্বন করা হয় তাহা নহে। কোন জিনিষ যদি আমার আধসের, একপােয়া দরকার হয় তাহার জন্য আমাকে যে দাম দিতে হয়, যদি অনেকে মিলিয়া একেবারে এক মণ দুই মণ কিনিয়া যাহার যেরূপ প্রয়ােজন ভাগ করিয়া লই তাহা হইলে দাম সস্তা হয়। অতএব যাহাতে সমবায়ে ক্রয়সমিতি করা যায় সেইরূপ সমবায়ে উৎপন্ন দ্রব্য-বিক্রয় সমিতি করা যায় । যদি অনেকে মিলিয়া একবারে প্রচুর পরিমাণ জিনিষ বিক্রয় করা যায়, বড় ব্যবসাদার তাহা ক্রয় করিবে। এই রূপ সমবায়ে ক্রয়বিক্রয়ে ছোট ছােট পাইকারী দোকানদার যে-লাভ করে সে-লাভের পরিমাণ ক্রেতা- বিক্রেতার হাতেই থাকে। সমবায়নীতি শিক্ষা করিয়া কাৰ্য করিতে পারিলে ক্রমেই নানা হিতকর পন্থা বাহির হইয়া পড়ে। কৃষির উন্নতির জন্য যন্ত্রপাতি, সার, বীজ ইত্যাদি সমবায়ে খরিদ করা যায় । কৃষির স্তম্ভ যে বলদ তাহার : জীবন বীমা করা যায়। বলদ মরিয়া গেলে কৃষক অল্প খরচেই পুনরায় বলদ পাইতে পারে। সমবায়ে বাড়ীঘর, রাস্তাঘাট, পুষ্করিণী, স্কুল, হাসপাতাল, সমস্ত কিছুরই সুবিধামত বন্দোবস্ত করা যায়। সমবায়নীতি দ্বারা কি উপকার হয় তাহার বর্ণনায় এক ফরাসী কৃষক যাহা বলিয়াছেন তাহা এখানে উদ্ধৃত করিতেছি।

সমবায় ১৯০০ ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দে আমি দরিদ্র ছিলাম এবং ঋণ পাওয়া আমার পক্ষে কষ্টকর ছিল। তার পর এক সমবায় সমিতিতে যােগদান করিয়া নানা বিষয়ে অনেক লাভ করিতে সমর্থ হই। ১৮৯৮ খৃষ্টাকে ছেষট্টি টাকা ঋণ গ্রহণ করিয়া দুইটা বাছুর কিনিয়া পালন করিয়া দুইশত টাকায় বিক্রয় করি। ১৮৯৯ খৃষ্টাব্দে একশত টাকা ঋণ গ্রহণ করিয়া এক শূকরী কিনি এবং তাহার বাচ্ছা বিক্রয় করিয়া একশত চৌত্রিশ টাকা পাই ; শূকরী আমারই থাকে। খৃষ্টাব্দে চাষের জন্য এক ঘােটকী ভাড়া করিতে হয় (বিলাতে ঘােড় দ্বারা লাঙ্গল চালান হয়) তখন আমার মাত্র দুই শত টাকা ছিল। তাহাতে এক বৃদ্ধ ঘােটক পাইতাম। ঋণ গ্রহণ করিয়া তিনশত পঁচাত্তর টাকায় এক বাচ্ছা ঘােটকী কিনি এবং দুই বৎসর ব্যবহার করিয়া তাহাকে ছয়শত টাকায় বিক্রয় করি। ১৯০১ খৃষ্টাব্দে সােয়শত টাকা ঋণ লইয়া এক গাভী কিনি। দুইটি বাচ্ছা পাই এবং গর্ভাবস্থায় ঐ গাভী বিক্রয় করিয়া দুইশত বিশ টাকা পাই। ১৯০২ খৃষ্টাব্দে আমার এক গাভীর গর্ভস্রাব হওয়ায় অতি অল্প দুধ দিতে থাকে। দুইশত টাকা ঋণ করিয়া অপর এক গাভী কিনিয়া সারা শীতকাল তাহার দুধ বিক্রয় করিয়া বেশ লাভ হয়। ১৯০৩ খৃষ্টাব্দে একশত ত্রিশ টাকা ধার করিয়া জমিতে উত্তমরূপে সার দিই এবং অতি উত্তম ফসল পাই। ১৯০৪ খৃষ্টাব্দে খাজনা দিবার জন্য দুইশত টাকা ঋণ গ্রহণ করি, তাহা না হইলে আমার ঘােটকটি বিক্রয় করিতে হইত। ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে সেপ্টেম্বর মাসে একশত ষাট টাকা ছয় মাসের জন্য কর্জ লইয়া বারটি ভেড়া কিনি এবং ১৯০৬ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারী মাসে সেইগুলি বিক্রয় করিয়া দুইশ সত্তর টাকা পাই। তাহাদিগকে চারিমাস রাখিতে আমার পঞ্চাশত টাকা খরচ হয় ;

৬০ বাঙ্গালার সমস্যা অতএব চারিমাসে আমার ষাট টাকা লাভ হয়। তা ছাড়া ঐ ঋণের টাকা আরও দুই মাস খাটাই।” কিছুদিন পূর্বে টেভয় হইতে জাহাজে চড়িয়া রেঙ্গুনে আসিতে- ছিলাম। রেঙ্গুনের বিখ্যাত কণ্টাক্টার মিষ্টার এ, সি, মার্টিও আসিতেছিলেন। তিনি শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হইতে ওভারসিয়ারী পাশ করিয়া ব্ৰহ্মদেশে চাকুরী লইয়া আসেন। পরে কোন অসুবিধাবশতঃ চাকুরি ছাড়িতে বাধ্য হন। এখন তিনি নিজের বুদ্ধি ও চেষ্টার দ্বারা ধনী হইয়াছেন। তিনি নানারূপ খনির প্রতিষ্ঠাতা ও অংশীদার ; তাহা ছাড়া ব্ৰহ্মদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ কন্টাক্টার। তিনি ইহুদী জাতীয় এবং তাহার নিবাস পারস্য দেশে। আমার সহিত আলাপের সময় তিনি বলিলেন, “আমি বাঙ্গালা দেশকে বিশেষ জানি। পল্লীগ্রামের অতি শােচনীয় হীন কুটারগুলি দেখিয়া মনে বড় কষ্ট হয়। সকলে মিলিয়া যদি ঘর বানায়, কয়েক বৎসরের মধ্যেই সকলের পাকা বাড়ী হইয়া যাইতে পারে।” মনে মনে বলিলাম যদি দেশ এরূপ সুবুদ্ধি চালিতই হইত তাহা হইলে এমন দুর্দিন কেন উপস্থিত হইবে। আরও মনে মনে বলিলাম, আপনি পর হইলেও আপনার মনে কষ্ট হয়, কিন্তু আমি বাঙ্গালী এবং বাঙ্গালী আমার আত্মীয় ; আমার মন যে কত কঁাদে তাহা কাহাকে বলিব। আমাদের দরিদ্রে ও ভদ্রে তফাৎ বড় বেশী নাই। ব্ৰহ্মদেশে কুলী রমণীরা মাঠে ঘাস নিড়ায় ; তাহাদের কত রঙ্গীন কাপড় ও সাদা ধব ধবে জামা। সকলেই রঙ্গীন বস্ত্রের নীচে আর একটি নিকৃষ্ট বস্ত্র এবং সাদা জামার নীচে আর একটি নিকৃষ্ট জামা পরে ; একসঙ্গে দুইটি জামা, দুইটি বস্ত্র ব্যবহার করে। দিনে জল কাদা ঘাটিয়া কাজ করিতেছে ময়লা কাপড় পরিয়া ; কাজের শেষে খাদ্য-সমস্যা ৬১ সন্ধ্যাবেলায় হাত পা ধুইয়া, মুখে পাউডার মাখিয়া, ভাল কাপড় পরিয়া, পায়ে জুতা দিয়া গান গাহিতে গাহিতে বাড়ী যায় । সর্বত্রই এইরূপ। আর কাহাকেও সন্ধ্যার সময় কলিকাতার 'হাওড়ার পুলের উপর দাড়াইয়া থাকিতে অনুরােধ করি, যে-স্থান দিয়া আমাদের ভদ্রসন্তানেরা শেষে বাড়ী ফিরেন। তিনি কি দেখিবেন—বিষাদের জীবন্ত প্রতিমূর্তি। তিনি যদি মফঃস্বলের কোন পল্লী গ্রামে যান, কি দেখিবেন? ভদ্রসন্তানেরও পরিধানে এক মলিন বস্ত্র, এবং চাদর নামক তদনুরূপ এক দ্বিতীয় বস্ত্র কঁাধে লম্বমান বা কোমরে জড়ান। গায়ে জামা নাই, পায়ে জুতা নাই। তারপর দরিদ্রের অবস্থার ত কথাই নাই। শ্রাদ্ধাদি উপলক্ষে কাঙ্গালী বিদায় দিনে বা এইরূপ কোন দিনে দরিদ্রদের একসঙ্গে মিলন যাহারা দেখিয়াছেন তাহাদের আর কিছু বলিয়া পরিচয় দিতে হইবে না। লােহার, বাউরী, প্রভৃতি দিনমজুরেরাই কাঙ্গালী বিদায় ইতে আসে। পৌষ মাসের রাত্রি, কনকনে শীত; শিশু- সন্তানদের, যাহাদের লজ্জা নিবারণের জন্য কোনরূপ আবরণের প্রয়ােজন নাই, সম্পূর্ণ নগ্নদেহ, হয়ত সমস্ত রাত্রিই খােল মাঠে কাটাইয়াছে। ব্ৰহ্মদেশে যে-কোন উৎসব উপলক্ষে লােকসমাগম একটি দেখিবার জিনিষ। সকলেরই রঙ্গীন বস্ত্র, এই সব বস্ত্র প্রায়ই রেশমী, সাদা ধবধবে জামা, স্ত্রীলােক ও বালক-বালিকাদের মুখে পাউডার লাগান, চুল পরিষ্কাররূপে ছাটা বা বাঁধা এবং অধিকাংশ স্থলেই ফুল দিয়া সাজান ও পায়ে জুতা। ছােটবড় সকল সমাগমেই, এমন কি সুদুর পল্লীগ্রামেও, পূৰ্ব্ব হইতেই চা চুট ও খাবারের দোকান বসে। দেশের অবস্থা মনে হইলে প্রাণ হু হু করে।

খাদ্য-সমস্যা
যথােপযুক্ত খাদ্যই দৈহিক উন্নতির ভিত্তি এবং রােগের প্রতিষেধক।
খাদ্য দ্বারা শরীর গঠিত ও পুষ্ট হয়। খাদ্য যদি বলকারক ও
পুষ্টিকারক না হয় তাহা দ্বারা পেট বােঝাই করিলেও কোনই
ফল হয় না। আবার শরীর সবল ও সুস্থ না হইলে মনও সবল
এবং সুস্থ হইতে পারে না। মনের সুস্থতা ও সবলতার উপর
সমস্ত উন্নতি নির্ভর করে। অতএব খাদ্যই উন্নতির প্রথম
ভিত্তি।
বিদেশে থাকিবার সময় ব্রেজিলের এক ভদ্রলােকের সহিত
আলাপ হয়। উত্তর আমেরিকার ভাকুভার প্রদেশে অনেক শিখ
গিয়া কাজকর্ম করে। ভারতের এই প্রসিদ্ধ যােদ্ধৃজাতীয় বলবান
শিখ কুলীদের সম্পর্কে তিনি বলেন যে, ইহারা পয়সা সঞ্চয়ের
দিকে লক্ষ্য রাখিয়া যথােপযুক্ত খাদ্য খায় না বলিয়া অন্যান্য অনেক
কুলীর সমান কাজ করিতে পারে না। তাহার অভিজ্ঞতায় যে-
সকল কুলীকে তিনি শুকর-মাংস ও ভাত নিয়মিত জোগাইতেন
তাহার শিখদিগের অপেক্ষা বেশী কাজ করিতে পারিত। মােটর
গাড়ী হইতে একটা উদাহরণ দিতেছি। যে-গাড়ীর ইঞ্জিনের জোর
বেশী, দ্রুত চলিতে পারে বা পাহাড়ে উঠিতে পারে, তাহার খাদ্য,
অর্থাৎ পেট্রল, বেশ আবশ্যক হয়।
পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন দেশের লােকের খাদ্য সম্বন্ধে অনুসন্ধান
করিলে দেখিতে পাই যে, প্রায় সকল জাতিরই কোন-না-কোন
একটি জিনিষ প্রধান খাদ্য, যেমন আমাদের চাল (ভাত)।
সম্ভবত সহজলভ্য বলিয়াই প্রধান খাদ্যরূপে নির্ধারিত হইয়াছে।
।

খাদ্য-সমস্যা ব্ৰহ্মদেশ, বাঙ্গালা, উড়িষ্যা, ও মাদ্রাজে ধান জন্মে বলিয়া লােকের প্রধান খাদ্য চাল। উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে ও পাবে গম জন্মে বলিয়া লােকের প্রধান খাদ্য আটা। গুজরাট প্রভৃতি পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের লােকের প্রধান খাদ্য দেব (জোয়ার), বাজরা ইত্যাদি। বিহারের অনেক স্থলের প্রধান খাদ্য মকাই এবং আলুয়া ( মিষ্টি আলু) ও সুথনী। প্রধান খাদ্যের সহিত কতকগুলি জিনিষ আনুষঙ্গিক রূপে খাই, যথা-তরকারী, ডাল, শাকসজী, ফলমূল, লবণ, দুগ্ধ, দই, ছানা, ঘৃত, সন্দেশ, মাংস, মৎস্য। আনুষঙ্গিক খাদ্যেরও বিশেষ প্রয়ােজনীয়তা ও উপকারিতা আছে। তাহারা যে-সকল উপাদান শরীরের জন্য সরবরাহ করে তাহা হয়ত অতি কিন্তু এই অতি অল্প পরিমাণ উপাদানের অভাবে পুষ্টির ব্যাঘাত হয়, এবং নানা রােগের উৎপত্তি হয়। দেখা গিয়াছে, বহুদিন ধরিয়া কেবল মাংস ও রুটি খাইলে নাবিকদের এবং যুদ্ধের সময় সৈন্যদের চর্মরােগ হয়। আবার শাকসজী বা লেবুর রস খাইলে সারিয়া যায়। আমাদের দেশে যে আজকাল বেরী বেরী রােগ প্রবল হইয়াছে ইহাও এইরূপ খাদ্যের কোন কোন উপাদানের অভাবে। জাপানে ও চীনে এক রকম শেওলা জাতীয় সামুদ্রিক উদ্ভিদ আনুষঙ্গিক খাদ্যরূপে ব্যবহার করা হয়। অভিজ্ঞদের মত এই যে, ইহার ফলে দাত ও চুল বেশ ভাল থাকে। সহজে দাত পড়িয়া যায় না ও মাথায় টাক পড়ে না। আজকাল খাদ্যদ্রব্যের গুণাগুণ সম্বন্ধে অনেক অনুসন্ধান হইতেছে। ভারতবাসীর প্রধান খাদ্য চাল, গম, জনার এবং বাইরা লইয়া যে পরীক্ষা হইয়াছে তাহার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে দিতেছি। ইদুরকে খাওয়াইয়া পরীক্ষা করা হয়। দেড় মাস বয়স্ক বাচ্চা ইদুর

৬৪
বাঙ্গালার সমস্যা
৮
০ ০ ০
ইয়া ছয়টি ছয়টি করিয়া এমন ভাবে দল গঠন করা হয় যে, সব দলের
ওজন? সমান। সব দলকে একই ঘরে, একই অবস্থায়, এবং
সমান যত্নে রাখা হয়। সব দলেরই ইদুরই যত পারিল নিম্নলিখিত
রূপে তৈয়ারী খাদ্য খাইল। এই খাদ্যটিকে সকল দলের সাধারণ
খাদ্য বলিব।
মাংসের পরিত্যক্ত অংশ, যথা, চর্বি, চামড়ার
টুকরা, ইত্যাদি কিন্তু মাংস নয় ২০ ভাগ
রিফাইন করা শর্করা জাতীয় খাদ্য (অনেকটা
ধােয়া ভাত বা সাদ। ময়দার মত)
তৈল (জলপাই )
লবণ
যত খাইতে পারিল।
একদলকে কেবল এই সাধারণ খাদ্য ছাড়া আর কিছু দেওয়া হইল
না। তাহাদের ওজন এবং আহার করিবার শক্তি কমিয়া গেল।
বিয়াল্লিশ দিনের ভিতর ছয়টির মধ্যে পাঁচটি বেরী বেরী রােগে
মারা গেল।
অপর এক দলকে সাধারণ খাদ্যের উপর চাউল দেওয়া হইল।
হাতে ধানের খােসা ছাড়াইয়া, হামান দিস্তায় পিষিয়া জল মিশাইয়া
গুলি পাকাইয়া প্রত্যেককে প্রত্যহ খাওয়াইয়া তবে সাধারণ খাদ্য দেওয়া
হইত। বিয়াল্লিশ দিনে এই দলেরও ওজন বাড়িল শতকরা প্রায়
সওর ভাগ।
যে দলকে সাধারণ খাদ্যের উপর অনার বাজরা দেওয়া হইল
তাহাদের ওজন বাড়িল এই সময়ে শতকরা প্রায় একশত হয়

যে-লকে সাধারণ খাদ্যের উপর গম দেওয়া হইল (চালের মই প্রস্তুত করিয়) তাহাদের ওজন বাড়িল এই সময়ে শতকরা একশত এজি ভাগ। পরীক্ষাতে সকলকেই সমান ওজনের চাল, আনার, বাজরা ও গম দেওয়া হইয়াছিল। ইহা হইতে প্রমাণ হয়, গম চাল অপেক্ষ দ্বিগুণ পুষ্টিকর। চাল সর্ব নিকৃষ্ট এবং অনার-ৰাজ ৰা চাল ও গমের মাঝামাঝি। এই ইদুরগুলিকে হাত দিয়া খােসা ছাড়াইয়া যে-চাল দেওয়া হইয়াছিল তাহার কোন অংশ নষ্ট হয় নাই। আমরা কি চায় খাই। প্রথমে একদফা ধানকে সি করিলাম। তাহার পর ভাত বাঁধিয়া সমস্ত ফেন ফেলিয়া দিলাম। এই ফেন ফেলিবার এর বরুণ ভাত এত বেশি জলের সহিত বাধা হয় যে, ভাতের অধিকাংশ সারভাগই থােয়া যায়। প্রায় ছিড়েমাত্র যাহা বাকী থাকে তাহাই উদসাৎ করি। পল্লীগ্রামে এখনও ঢেকীতে ধান ভানা হয় । ইহাতে চালের সমস্ত পুষ্টিকর অংশ বাদ যায় না। শহরবাসীরা খান করে তৈয়ারি ঘাট। ধবধবে চাল যাহার অধিকাংশ সারভাগ এইরূপে তৈয়ারির সময় বাদ যায় এবং যাহার কেন ফেলিবার পর যাহা থাকে তাহ উপরােক্ত সাধারণ খাদ্যেরই প্রায় সমান। এই পরীক্ষার সঙ্গে সঙ্গে অপর এক দল ইহুরকে নিম্নলিখিত খাদ্য দেওয়া হইয়াছিল, তাভজা আটার রুটি, যাহাতে গমের সাৰভাগ প্রায় কিছুই নষ্ট হয় না। এই কটিতে মাখন মাখাইয়া দেওয়া হইত। আর বাহির হইয়াছে এমন ছােলা, কলাই, দুধ, কাচা শাকস, এবং মাসে দুইবার মাংস দেওয়া হইত। বিয়াল্লিশ দিনে ইহাদের ওজন বাড়িল শতকরা দুইশত ভাগ। এই পরীক্ষা হইতে উৎকৃষ্ট (good diet) এবং নিক (bad or বালার সমস্যা } low diet) খাদ্য কি তাহা বেশ বােঝা যায়। উকষ্ট ও নিক খাদ্য, থা, মনােবৃত্তি এবং সন্তানােৎপাদিকা শক্তির উপর কিরূপ কাৰ্য করে তাহা আর একটি পরীক্ষার দ্বারা অতি সুন্দররূপে দেখা যায়। কতকগুলি প্রায় অর্ধৰষৰু ইদুর লইয়া দুইটি দল গঠন করা হয়। প্রত্যেক দলে বারটি পুরুষ এবং আটটি স্ত্রীইদুর রাখা হয়। দুইটি দলেরই ওজন সমান এবং দুই দলকেই একই অবস্থায় ও সমান যত্নে রাখা হয়। প্রথম দলের খাদ্য নির্দিষ্ট হয়,মাখন মাখান যাঁতাভাঙ্গা আটার রুটি, অফুর হইয়াছে এমন ছােলা, কলাই, টাটকা দুধ, কঁচা শাকসী, কাঁচা ফল, (টমেটো ৰা বিলাতী বেন) এবং সপ্তাহে একবার তাকা মাংস। পঁচাত্তর দিনে ইহাদের ওজন শতকরা পঁয়ত্রিশ ভাগ বাড়ি। সকলেই বেশ ক ও খুব চটপটে হইল। সকলেরই দেহ পুষ্ট ও লােম মুক্র ও মসৃণ হইল। ছয়মাসের মধ্যে মাত্র তিনটির মৃত্যু হইল। একটি গর্ভাবস্থায় পেটে আঘাত পাইয়া, একটি নিউমােনিয়া হইয়া, এবং তৃতীয়টির বাহিক কোন পীড়ার লক্ষণ দেখা যায় নাই। অতএব মৃত্যুসংখ্যা শতকরা পনের হইলেও প্রকৃতপক্ষে দশ। শব- ব্যবচ্ছেদ করিয়া দেখা গেল তাহাদের শারীর গঠনের কোন ব্যতিক্রম হয় নাই। ছয় মাসের মধ্যে এই দলের একশত পঁয়ত্রিশটি বাচ্চা হইল, বাচ্চাগুলি সবই নীরােগ, এবং বাচিয়া রহিল। অপর জলের খাদ্য নির্দিষ্ট হইন সাদা ময়দার পাউরুটি, বােরাসিক এসিড মিশ্রিত নারিকেল তৈল এই কটিতে মাখাইয়া তাহার উপর বার বাজার বানপতি ইত্যাদি মার্কা দেওয়া বেসল যত বিক্রয় হয় তা এবং সন্তানের গান, সবই নারিকেলতৈল জাতীয় এবং যাহাতে এই সকল এব্য নষ্ট না হয় সেই জাহাজের সহিত বােরাসি এসিড ইত্যাদি শােধ মিশাইয়া এওয়া হয়।

খাদ্য-সমস্যা যথেষ্ট পরিমাণ বাজারে জীত টিনের ন্যাম দেওয়া হইল। দুধ ও চিনি দিয়া সাধারণ প্রণালীতে প্রস্তুত চা, টিনে আমদানী করা মাংস এবং লবণ ও সামান্য সােডা দিয়া সিদ্ধ বাধাকপি গাজর আলু ইত্যাদি। এই দলের ওজন কতগতিতে কমিয়া গেল। সকলেই নিস্তেজ ও দূর্তিহীন হইল; দেহ শীর্ণ ও লােম বিঞ্জ হইয়া গেল। সত্তর দিনের মধ্যেই ছয়টির এবং ছয়মাসের মধ্যে সর্বত, নয়টির মৃত্যু হইল। অতএব মৃত্যুর হার শতকরা পঁয়তাল্লিশ। মৃত্যুর কারণ-তিনটিকে অপর সকলে মিলিয়া মারিয়া খাইয়া ফেলিল। অন্যান্য গুলিকেও এইরূপে মারিয়া খাইয়া ফেলিতে পারে এই ভয়ে কয়েকদিন রাত্রে সকলকে আলাদা আলাদা চায় রাখা হইল; এবং তাজা শাকসজী খাওয়ার পর হিংসার ভাৰ নিৰারিত করিয়া পুনরায় রাত্রে একসঙ্গে রাখা হইল। অপর ছয়টির মৃত্যুর কারণ ব্রঙ্কো নিউমােনিয়া। ইহাদের ফুসফুস এত দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল যে, অতি সামান্য কারণেই রােগগ্রস্ত হইয়াছিল। এই সময় আরও বহু ইহুর ছিল, কিন্তু তাহাদের মধ্যে এই রােগ ছিল । শৰ্যৰচ্ছে করিয়া দেখা গেল যে, সকলেরই পাকস্থলী এত বিকৃত হইয়াছে যে, খাদ্য হজম করিবার শক্তি প্রায় সােপ পাইয়াছে। পরিপাকনালীর কোন স্থান ফুলিয়া উঠিয়াছে, কোন স্থান অতি হইয়াছে। বিষ্ঠা ওলী আকারে নালী ৰন্ধ করিয়া ফেলিয়াছে, শুটুলী- গুলি মালার আকারে নালীর মধ্যে সাজান রহিয়াছে। পরীক্ষার প্রথম সময়ে এই দলের মাত্র দুইটি এগারটি বাচ্চা হয়; বাচ্চাদের মধ্যে দুইটি মরিয়া যায় এবং নয়টিকে ইদুরেরা খাইয়া ফেলে। টিনের মাছ, মাংস, মাখন ইত্যাদিতে যে শােধ ব্যবহার করা হয় তাহ পাকস্থলীর বেশি অনিষ্ট করে বলিয়া বােধ হয়। এই ত গেল পরীক্ষার ফল। এ স্থলে মনে রাখা উচিত যে, ক্ষুদ্র বাঙ্গালার প্যা ইহুরে খাদ্যের গুণাগুণের ফল অতি শীঘ্র দেখা যায় এবং মানুষে এই ফল দেখা দিতে সময় লাগে। এখন আমাদেরই দেশে যাহারা ভিন্ন ভিন্ন এপ খাদ্য পায় তাহাদের সম্বন্ধে আলােচনা করিলে কি দেখিতে পাই। আমি ভাব জেলায় পনর বৎসর ছিলাম। এখানে সাধারণ কুলীমজুর- শ্রেণীর প্রধান খাদ্য আলুয়া, সুনী, যাহাতে শরীর গঠন এবং স্বাস্থ্যের প্রয়ােজনীয় উপাদান অরই আছে। আমার আনিত ছয় জন এই শ্রেণীর যুবক পাকস্থলীর ক্রিয়ার ব্যতীক্রমে জীর্ণ, ডিসপেপসিয়া দেখা দিবার কয়েক মাসের মধ্যেই মারা যায়। এখানে এই অসুখ অতি সাধারণ। যথােপযুক্ত খাদ্যের অভাৰ বা low diet-ই ইহার মুখ্য কারণ। আমাদের, বিশেষ করিয়া শহরবাসীদের, অজীর্ণ, আম, ডিসপেপসিয়া এবং ফুসফুসের রােগাধিক্যের প্রধান কারণও ইহাই। উপরােক্ত পরীক্ষার মা যে খাদ্য উৎকৃষ্ট বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে তাহা শিখাতির খাদ্য। শিখদিগের উন্নত, পু ও সবল দেহ এবং শক্তি ও সাহসের কথা সকলেই জানেন। ভারতবর্ষের অণহাওয়াতে এই খাদ্য যে সকলের পক্ষেই উপযােগ তাহা বিশেষজেরা সকলেই বীকার করিয়াছেন। ম্যাকফারসন সাহেব বলেন পৃথিবীর সকল জাতির পক্ষেই ইহা উপযােগ। বাঁকুড়া জেলার এক ক্ষুদ্র পরীতে আমার জন্ম। এই গ্রামের বাসিন্দা মাত্র দুইঘর ব্রাহ্মণ, ঘর চারি-পাঁচ কায়, বহঘর কৃষিজীবী সগােপ, কয়েক ঘর লােহার এবং বহুঘর বাউরী। সমাজের শুর- হিসাবে এই বিভাগ হইল উপর হইতে নীচে। কি যদি শারীরিক পুষ্টি ও সবলতা ধরিয়া বিভাগ করা যায় তাহা হইলে প্রথমে বাউরী, লােহার, তার নীচে সগােপ ও সর্বনিয়ে ব্রাহ্মণ এবং কায়স্থের স্থান। ৰালার সবই এইরূপ। আমি সমস্ত শ্রেণীকে ধরিয়া সাধারণ

.
তাৰে এই কথা বলিতেছি। কোন শ্রেণীতে কেহ কেহ পালােয়ান হইতে
পারে, তাহা ধরিতেছি না। এইরূপ হওয়ার কারণ হইতেছে বাউরী
লােহারের গৰৰ ভাতের ফেন ফেলিতে পারে না, কেনও
যায়। ইহা এয়ই ভাতের সঙ্গে ভাল পায় না, কি মাছ, শামুক
গদি এবং নানা শাকস মােগাড় করিয়া যায়-
উচ্চ বেণীর লােকে কী বা অসত্য গদ্য বলি না করে।
ইহা ছাড়া মাঠে কাজ করিতে করিতে কাচা কেন, সে ও অন্যায়
কাচা-পাকা ফল দুই-একটা প্রত্যহই খায়। চীন জাপানীরা তা
খাইয়াই এত বলবান। তাহারা কখনও ভাতের ফেন ফেলে না।
উচ্চ শেণীর নােকে যে ভাতের ছিড়া খায় তাহা পূর্বেই বলিয়ছি।
'ভাল পুষ্টিকর খাদ্য কিন্তু সাধারণ বাঙ্গালী ভাল খায় কতটুকু। ভালো
লেরিয়া নেই এল তাতে মাখে যাহাতে অত সহজে গলা পার
হয়। সাদা ময়দায় তো লুচি, বেগুন ভাজা, সাদা শারই গত
তৃতি সসেজ এ বইতে পারে কিন্তু শরীমে ইহাদের
উপকাৰিত অতি অল্প। ভারতবর্ষে যাহাৱাই জল রুটি খায়
তাহারেই নেই গু ও মিঠ। বাঙ্গালীর কচি এতই বিষ্ট হইয়াছে
যে, যদিও কখনও ৰাণী, বিশেষতঃ শহর এ সত্য বাণী,
গম খায় তাহা সাদা ধবধবে ময়া, যাহা হইতে গরে যাহা-কি
সাৰৰ ৰাহি করিয়া লওয়া হইয়াছে। কেবল বালা দেশেই এই
সাদা মদ্য বন। গম যাহাদের এখান খাল তাহাদের নিকট
মম পরিভ, দুই চোখের বিষ।
খাদ্যের প্রয়ােজনীয় পানির যে কোন কোনটি
এলে মায়ে শরীর গঠন ও কাল এবং বায়ে কিরণ যাত
হয় আজিকা কেনিয় এদেশের দুটি জাতির বিবরণ হইতে তাহা

বাংলার সমস্যা বেশ বুঝা যায়। ইংলণ্ডের খাদ্যানুসনসমিতি বিশেষ এহসান করিয়া এই বিবরণ প্রকাশ করিয়াছেন। ফিফুফু জাতির খাদ্য প্রধানতঃ অনার, বুট, কলাই, কল (মিিষ্ট আলু, মূলা প্রভৃতি) ও কলা। ইহার উপর প্রায় সকল শ্ৰীলােকই পদিনা, ভাই, লেটুস প্রভৃতির ন্যায় কাঁচা পাতা এবং একার মাটি খায়। শিশুরাও প্রায় পাঁচ বৎসর পর্যন্ত মাটি খায়। মাসাই জাতির প্রধান খাদ্য মাংস, দুধ ও রক্ত এবং সামান্য ফল ও জনার ভুট্টা। ইহাদের স্ত্রীলােকেরা ফি সীলােকদিগের মত কাচা পাতা ইত্যাদিও খায়। মাপিয়া দেখা গিয়াছে মাসাই পুরুষেরা কিছু পুরুষ অপেন রায় পাঁচ ইঞ্চি বেশি লম্বা এবং ওজনে প্রায় বার সেই বেশি ভারি। মাসাই যীলােকেয়া ফিকুয়ু স্ত্রীলােক অপেক্ষা প্রায় তিন ইঞ্চি বেশি না এবং ওজনে প্রায় চৌদশের বেশি ভারি। মাইলের কল চওড়া এবং কোমর সরু। হাতের কার মাপ করিয়া দেখা গিছে মালাই পুরুষেরা কিন্তু পু অপেক্ষা ছিল পাউও বেশি জোর দিতে পারে। মাসাই স্ত্রীলােকদিগের হাতের জোর ফি পুরুষদিগের হাতের জোরের সমান এবং কিছু সীলােকদিগের হাতের জের ইহা অপেক্ষা শ পাউ কম। দুই জাতির, মধ্যে বিক্সি নােগের এখায় দেখা যায়। কিছু শিশু ও বালকবালিকাদের হাড় তেমন গু নয়। ইহারা এই কারণে নিকেট নামক লােগ এবং দীতের পুটতা ও শরীরে রক্তহীনতা (anemia) হইতে পায়। মালাই শিশু ও বালিকার এই সকল রােগ এই যে আ না। বয়স্ক কিছুদিগে যে কাণ, মা, নিদানিয়া প্রভৃতি গঞ্জে লেগ এ বা ফোড়া পূৰ নে এবং য় লাইলির মধ্যে

তোতা এবং গেটে বাত বেশি। ফি বীতােকদিগের স্বাস্থ্য,
পুরুষদের স্থ অপেক্ষা ভাল এবং তাহারে রােগও কম হয়।
হাসপাতালে প্রভৃতিতে এই দুই জঙ্গির খাদ্য লইয়া নানাবিধ
পরীক্ষা করা হইয়াছে। বিশেষত্রে রি কৰিছেন, দুই জাতির
বেশি চা পাতা খাওয়া এবং ফিফুফু জাতির দুধ খাওয়া দরকার।
দুধ শিশু ও নাবালিকাদের শরীরের গঠন ও বানে সাহস
করে। ঝাখের সাতটি বড় শহরে শ্রমিকশ্রেণীর লােকদিগে
খষ্য সমান ও পরীক্ষা করিয়া খাে গিয়াছে যে, সাত মাসের মধ্যে
যে সকল বালকবালিকাকে দুধ দেওয়া হইয়াছিল তাহাদের শরীরে
ৰাড়ন যাহাদিগকে দুধ দেয়া হয় নাই এমন বালক বালিকাদের বাড়ন
'অপেক্ষা বুড়ি ৩৭ বেশি হয়। টুলসীদের সাধারণ খাদ্য মাসে
ন্যাতে কোন এক স্থানে এক সময়ে যদি গৃহপালিত
এ এল্য অত্যু হার খুব বেশি দেখা দেয়। ইহার
চারণমাঠ পরীক্ষা করিয়া যে উপাদান কম দেখা গেল তা
পূরণ করিবার ও কতকগুলি যেকে, তাহাদের সাধ্য জ্যের
উপর দুটা, লবণ (calcium sales) এবং কডলিভার তেল খাওয়ার
দেখা গেল, বৎসরের মধ্যে ইয়ে মৃত্যুর হার শতকরা করি
কমিয়া মিয়া গিয়াছে এবং ইহার শরশটি করিয়া বেশি বাড়া
হইয়াছে। কি আমি এক গো-মাহিৰে চার
আসে তাৰ পূৰণ করিয়া এইরুপ ফল পাওয়া গিয়াছে।
" বিশেলে মনে করেন, উড়িষ্যার রাংশে, বাঙ্গালায় দক্ষিক
किमान, पापिता या पावोरा प शान खान
এধান্তের কারণ হইতেছে এই সকল আর লেখাই

২ বাস চালের কোন-না-কোন উপাদানের অভাৰ। খান গাই মাটি হতে নানাবিধ পর্ব টানিয়া লইয়া বয়ে ও বাড়ে। এবং সকল স্থানে পর পর কোল খানই উৎপা হয়। ইহার কি কোন কোন উপাদানের তাৰ ঘটিয়াছে। মাটিতে উপযুক্ত সার দিয়া এই অভাব পূরণ করা এয়ােরন। আনুষঙ্গিক খাদ্য যারা এই অভাব পূরণ করা যাইতে পারে। ইহার মৃত উগলে ওয়া হইয়াছে। মাটি এবং নানাবিধ খায়ের টান 'এই পরীক্ষা হইতেছে। এই পরীক্ষার ফলে কমে এতিকার না করা যখােপযুক্ত থাকে তাৰেই যে বাঙ্গালীর শমী উ সবল, ৩ হইতে পারিতেছে না এবং এই দুর্বলতার ক্ষণ ম্যালেরিয়া , কাশ প্রভৃতি নােগের প্রকোপ যে বাঙ্গালা দেশে বাড়িয়ে পর হেই এবীকার করিতে পারিবেন না। সতিপয় লােকেরাও তা হেতু এমন সব খাদ্য খান যা শরীরের গঠন ও পুর খে ন্য মনে এই সাধারণ অলি সকলেই নানা কার- এখন ও আলি সৰ খালের মতই আমাদের শরীফে এমােহনীয় যে উপান কছে সেদিকে না না করি না আবশ্যক। এই উপাদানগুলিকে তাকায়েরী ভিষি (wami) কৰে। তেলে গড়ে তালি, নে পোড়াইলে এই উপাদা গুলি নষ্ট হয়। যাহা নাৰখিও খাওয়া যায়, কেমন ফলমূইজাতি তা না খাই ভাল। আখ জলে সিদ্ধ করিয়া নেই কসমেত ইলে সমস্ত উপাদান শরীরে যায়। মেয়ে তা কি নাে, এই ইউল।

সাধারণ বাঙ্গালীৰ পৰুে খাদ্য সম্বনে বিশেষ পরিবর্তন না করি কোন খাদ্য শরীগঠনের ও স্বাস্থ্যের পক্ষে উপােেগ তাহই এখন জল খাবার সাদা ময়দার লুচী কচুরী অপেক্ষা ভিজাইয়া আর হইয়াছে এরূপ হােলা কলাই ও গুড় দিয়া মুড়ী ভাল। চালের প্রয়ােজনীয় উপাদান সমস্তই প্রায় মুড়ীতে নষ্ট হয়, কিন্তু কলাই তাহা পূরণ করিয়া দেয়। ৮ অপেক্ষা দুধ ও গুড় বা চিনি মিয়া পরমান্ন অথবা ফেনসমেত জাত ভাল। না জাফটি খােস বা ক্ষুদ্র ক্ষুষ চোল সমেত আটা টি ৩০ বা তরকারি ভাল আল খান। তার মতে সামর্থে বাইলে, মাখন, দুধের সর, বাদই হইলে উত্তম। ী খাইতে ইচ্ছা হইলে ঐরুপ এটারই লুচী থাকা উচিত। চালিয়া মুদ্র ক্ষুদ্র সেন বাদ দিলে লুচী আরও ভাল হইবে কিন্তু উপকারিতা কমি যাইবে। ময়দা একেবারেই পরিত্যজ্য, আজকাল নম্পতি ইত্যাদি মার্কা যে সৰ উজি ঘৃত বাজারে ঘৃত' বলিয়া গিয়াছে তাহাতে দুগ্ধ স্বতে উপকারিতা তাহার অংশ মাত্রও নাই ইহা পরীক্ষা বাহিত ইয়াহে। এইরূপ ত কি লুচী ভাবিয়া খাইলে মনকে বৃথা এৰােখ নেয়া হয় যে, পৰু লুলী খাইতেছি। উপকারিতা কিছুমাত্র নাই, উপর পয়সা । ইহা অপেক্ষা সামান্য দু ভূত কি আউশকারি অনেক বেশী। ইহা হা পৰু সুচী অপে কটি সং হজম হয় এবং পূর্বেই বলিয়াছি মুতে জিলে আটা এয়ােজনীয় উপাদান অনেক না হয়। আকাল কাহারও কাহারও, বিশেষত ভিী ভাগ শহর- বাঙ্গালাম সত্য বাসীদের জল খাবার হয় পাঁউরুটি, মাখন ও জ্যাম। এলে তাহাদিগকে ইদুরের উপর উপরােক্ত পরীক্ষার কথা স্মরণ করিতে বলি। সাদা ময়দার পাউরুটি অপেক্ষা আটার রুটির উপকারিতা বহুগুণ বেণ। সস্তা দরের মাখন প্রায় সমস্তই উদ্ভিজ্জ এবং দুগ্ধ মাখনের তুলনায় তাহার উপকারিতা নাই বলিলেই হয়। সামর্থ্য থাকিলে বিশুদ্ধ ভ্যানিশ মাখন ব্যবহার করা উচিত। না হয় দুধের সর বা তাহা হইতে বাড়ীতে এত ননী, মাখন ব্যবহার করা উচিত। বাজারের বেশী তাজা মাখনও প্রায় সমস্তই উনি মারগারিন এভৃতির সহিত ভেজাল দেওয়া। নাম অপেক্ষা ঘরে গুড় ফুটাইয়া পুৰু চিটা ৰ্যৰহৃত হইলে ঢের বেশ উপকারী। চিনির পুৰু সিরাপ করিয়া ব্যবহার করা যায়। কি গুড় ইহাপেক্ষা বেশী উপকারী। উপরে বলিয়াছি বাজাকে মাখন জ্যাম ইত্যাদিতে ব্যবহৃত শােধক ঔষধ পাকস্থলীর পক্ষে অপকার, এই সকল ব্যবহার না করাই ভাল ; কি। যত কম ব্যবহার করা যায় ততই ভাল। মধ্যাহ্নের আহার ফেন না ফেলিয়া ফেনসমেত আতপ চালের ভাত, তাহার সঙ্গে কেবল তালে ঝােল নয়, যতটা সব ভাল, কোন-কোন শাকৰ তৰায়ী; কি মাছ এবং কোন কিার একটা অল। ভাল খাওয়া চাই ও মাইও খাওয়া চাই; হােট-বড় যেন হউক। আমাদের দেশে সপ্তাহে একবার কি দুইবারের বেশি না খাওয়া উচিত নয়। আলআমরা মাছ অপেক্ষা বেশি পরিমাণে খাই, মাছের গত দুই এক টুকরা খাইনে রােজ খাইলেও কোন দোষ নাই। কালীৰ সি চলে । এই অভ্যাসটি ত্যাগ করিতে

রাত্রের সাহার
হইবে। আর ফেন কেলির প্রথা এখনই ত্যাগ করিতে হইবে। ভাত
অল্প জলে এমন ভাবে রাখা উচিত যে, ফেন না ফেলিতে । ইহার
অন্তর মত প্রচারকার্য শাবক।
অনেক ডাক্তারের মত এই যে, খামাত চলে এৰু এর
রােগ হয় এবং এই কল্প চাল ব্যবহার বেরি বেরি রােগের এক
কারণ। যাহা হউক তাজা চাল যে বহুদিন পূর্বে প্রস্তুত ও ওজা
জাত পুরাণ চাল অপেক্ষা উপকারী যে সয়ে কোন সন্দেহ নাই।
রাতের আহার
রায়ের হায়ের মত বা দেশে আটার রুটি প্রচলিত হয়
বিশেষ দরকার। ইহার জন্য বিশেষ চেষ্টার মাষক এবং যেখানে
স গমের চাষ হওয়াও প্রমােন। রুটির সহিত , যাহা-হেৰু
একটা তরকারী এবং একটা চাটনী হইলেই শরীরের পকেটে।
ইহার উপর মাছ মাংস হইলে ত খুবই ভাল। যতদিন না এটা
হয় ততদিন ফেনসমেত ভাত ও ডাল খাওয়া এত কষ্য। খিচুড়ী
ভাত অপেক্ষা ভা, উবে উত্তেজক মশলা যত দূর সব কম ব্যবহার
করা উচিত।
এইরূপে আহারের বন্দোবস্তের উপর নিলিখিত জিনিষগুলি
এয়ােজন। সমােপযােগ কাঁচাপাকা ফল ব্যবহার নিৰিকা
কোন-না-কোন ফল প্রত্যহ ব্যবহার থ্যের পক্ষে বিশেষ উস।
অতি সহজে এবং বিশেষ করিয়া পল্লীগ্রামে কি ওর চেষ্টায়
এমন একটি ফল পাওয়া যাইতে ঋরে, এইটি হইতেছে টমাটো
বিলাতি বেগুন। বাড়ীর পানে অতি সহজেই উপ কর না।
আটটি গাছ হইলেই গৃহস্থের প্রয়ােজনীয় যথেষ্ট কথা -

सानाबजयी
পাকা ফল নূন দিয়া না রাখিয়াই খায়া যায়। প্রত্যহ একটি
কৰি খাইলেই খে। কাচা শাকসী সামা পরিমাণে ব্যবহারের
বিশেষ উপকারিতা আছে। পুদিনা শাক কাচা ব্যবহার করা যায়।
পৰিবাসীরা রাই শাক খুব ব্যবহার করে। সাহেবের সালা,লেটুস
ব্যবহার করে। আমেরিকায় এই সকল বহু পরিমাণে ব্যবহৃত হইতে
লেখিয়াছি। কোথাও কোথাও অনেকে মনে শাক খায়। বাড়ীর
পাশে, বিশেষতঃ পীগ্রামে এই সমই অতি সহজে উৎপন্ন করা
যাইতে পারে।
অতএব মােটামুটি খাদ্য হইল তা আতপ চালের ফেন সমেত
ভ, কাল, পাৰুলীর তরকামী, মাছ, কাঁচা ফল, ও কাচাশাক।
গরু মহিষের দুধের মি আটার রুটি। ইহা হইলেই শরীরের
গকে ঋণই ইল। উপরন্তু যদি এতাহ কি দুই, ৰা যেন
ব্যবহার করা যায় রাতের পক্ষে আর কিই বাকি থাকে না এবং
এমনি হয় না।
আবার যদি এইরূপে কলাইয়া ফেলিতে পারা যায়, তখন দেখা
যাইবে নাম পে রাণীত সত খাই তাহা প্রমােজন হইবে না।
সাৰৰ ফেলিয়া ছিড়া খাই বলিয়াই রাশীকৃত খাইতে হয়। চীন,
আন ও শশী খার পরিমাণ দেখিয়াছি। আমার
ঢ বিশাল যে, খাল এখন যত ভাত খায় চীন, জাপান ও
এরা তাহার কে বেশ খায় না।
পান করে #ধ্যে যৰ এবং চাল এক সঙ্গে লিভ নিয়া
খিচুরীর মত হয় হয়। উ রে মধ্যে তেই চান।
কোন গাইফেলা না। খালের সনে মাছ, শামুক, মূল
এতি এক-এক টু বাত হয়। কিন্তু অতি উই পুরি

রাতের আহার ৭৭ খাদ্য হইতেছে সরবিন নামক ডাল জাতীয় শস্যের দান ভাঙ্গিয়া সিদ্ধ করিয়া এক রকম নরম মােলায়েম পিঠার মত জিনিষ, ইহা ঘরে ঘরে তৈয়ার করা হয় না, প্রত্যহ ব্যবসাদারের প্রস্তুত করিয়া বিক্রয় করে এবং সকলেই কিছু কিছু আহারের সময় ব্যবহার করে। জাপানী সৈনিকদের প্রধান খাদ্য হইতেছে প্রায় দুই ভাগ চাল এবং এক ভাগ গম এক সঙ্গে সিদ্ধ করা এবং ইহার সঙ্গে মাছ মাংস ইত্যাদি, তরকারী অল্প পরিমাণ, যেমন সকলে খায়। ফরাসীদেশে একদিন এক কৃষি-পরীক্ষাকেন্ত্রের বিশেষজ্ঞ ও কর্মচারিবৃন্দের সহিত মধ্যাহ্নভােজন করিয়াছিলাম। আহার হইল এক প্লেট গােটা মন সিদ্ধ এবং তাহার সঙ্গে এক টুকরা মাংস এবং একটু পনীর। ফরাসী জাতির মধ্যে মসুর কলাই খাদ্যৰূপে বই ব্যবহৃত হয়। ইতালীতে ফেনসমেত ভাতের প্রচলনের জন্য প্রচার চলিতেছে এৰু ইহার সঙ্গে এক টুকরা মাংস।

s: সামাত্ত্বিক সমস্যা , YY Hari । আমাদের নারী গার্হস্থ্য জীবনে ভারতের নারী জগতে অতুলনীয়। ভারতবর্ষের লােক দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যেও গার্হস্থ্য সুখশান্তিতে ভাগ্যবান। অন্য তাহা খুব কমই এরূপ দেখা যায়। বিলাতে এক বন্ধু পরিচয় দিলেন যে, তিনি যে গৃহস্থের বাড়ীতে আছেন, এক দিন ঐ গৃহস্থের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তাকে খাম লইয়া তর্কবিতর্ক হইতে হইতে স্বামী স্ত্রীকে খামখানির দাম দিলেন। বন্ধু তাহাদিগকে বলিলেন, ভারতবাসীর চক্ষে ইহা অতীব বিসদৃশ; কারণ তাহারা মনে করে, স্বামী ও স্ত্রী অভিন্ন। উত্তরে গৃহিণী বলিলেন যে, তাঁহার স্বামী যে-কোন দিন তাহাকে ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে পারেন, অতএব আপন আপন বুঝিয়া রাখাই বিবেচনার কাজ। এই চিত্তের সহিত আমাদের দেশের ছােট-বড় যে-কোন গৃহস্থের তুলনা করুন। আমতী সরােজিনী নাইডু, লেডী অবলা বসু, পরােলােকগতা কৃষ্ণভামিনী দাস, সােজনলিনী দত্ত প্রভৃতি মনস্বিনীরা আমাদেরই সময়ের গৃহঘরের নারী শিক্ষার দ্বারা কি হইতে পারেন তাহারই উজল দৃষ্টান্ত। এপ বলিতে গেলে আমাদের নারীমত্রেই অশিক্ষিত। শিক্ষিতার সংখ্যা নিতান্ত অল্প। শিক্ষার অভাবে আমাদের নারীর গুণাবলীর সম্যক বিকাশ না হইলেও স্বাভাবিক বুদ্ধি বারাই তাহারা বড় বড় গৃহস্থালী কিরূপ সুন্দর ভাবে পরিচালনা করেন তাহা কাহাকেও বলিয়া বুঝাইতে হইবে না। নিজ নিজ জীবন গঠনে ।

৭১ সামাজিক-সমস্যা নারীর হাত কতদূর তাহা প্রত্যেককেই অনুধাবন করিয়া দেখিতে বলি। সমাজ বলিতে যাহা বুঝায় তাহাতে পুরুষ অপেক্ষা নারীরই কাৰ্য্য বেশি। নারীই সমাজের প্রধান অঙ্গ। শিক্ষার সাহায্যে এই অৰু যদি.কালের ও উন্নতির গতির সঙ্গে তাল রাখিতে না পারে এবং পশ্চাতে পড়িয়া থাকে, তাহা হইলে সমাজও পশ্চাতে পড়িয়া থাকিতে বাধ্য ; তা পুরুষ যতই উন্নত হােক না কেন। কিন্তু এহেন নারীর শিক্ষার জন্য আমরা কি করি?—কিছুই না। সঙ্গতিপয় গৃহস্থকেও কন্যার শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা অনুভব করিতে দেখা যায় না। অথচ আমরা প্রত্যেক নারীতে যেরূপ চরিত্রের উচ্চতা ও মহত্ব আশা করি তা পৃথিবীর অপর কোথাও দেখা যায় না। ভারতনারীর চারিত্রিক মহত্ব ভারতের গৌরব। উপযুক্ত শিক্ষা ব্যতিরেকেও এই উচ্চ আদর্শ চরিত্ররার ক্ষমতা বহু শতাব্দী এবং বহু জীবনে অর্জিত। আমাদের নারীগণ অসহায় কেন? উত্তর—যেহেতু আমরা তাহাদিগকে অসহায় করিয়া রাখিয়াছি। সকল দেশেই স্ত্রীলােকদিগকে পুরুষ অপেক্ষা . দুৰ্বল (weaker sex) বলিয়া স্বীকার করা হয়। প্রকৃতপক্ষে শক্তি, সামর্থ্যে, বুদ্ধিতে, কাৰ্যপটুতায় কোন বিষয়েই নারী পুরুষ অপেক্ষা হীন নয়। সুবিধা পাইয়া ইউরােপ ও আমেরিকার নারীগণ সকল বিষয়েই কাৰ্য্য দ্বারা ইহা প্রমাণ করিতেছে। আমাদের দেশের স্ত্রীলােক যত দুর্বল ও সম্পূর্ণরূপে পুরুষের উপর নির্ভরশীল এবং অসহায়, এমন আর কোথাও নয়। আজকাল আধুনিক সভ্য দেশে শ্রীলােকেরা সকল কাজই করিতেছে। কেরাণীগিরি হইতে আরম্ভ করিয়া মােটরচালক ও রাস্তার পাহারাওয়ালার কাজ পৰ্যন্ত। ব্ৰহ্মদেশে স্ত্রীলােকেরা পুরুষের সহিত সমানে কোদাল পাড়ে, গাড়ী বাঙ্গালায় সমস্যা চালায়, জমি চবে এবং পুরুষ অপেক্ষা উত্তম ব্যবসা করে। অধিকাংশ বৰ্মা-পুরুষ অমিতব্যয়ী ও উচ্ছল। বৰ্মা-স্ত্রীলােকেরাই জাতির মেরুদণ্ডস্বরূপ। ব্ৰহ্মদেশে তখন প্রথম আসিয়াছি; মেমিওতে তুতের ক্ষেতে অনেক পুরুষ ও স্ত্রী-কুলী কাজ করে। আমি অধিকতর পরিশ্রমের কাজে পুরুষদিগকে নিয়ােগ করিতে বলায় স্ত্রীলােকেরা হাসিয়া উঠিল। বা স্ত্রীলােকেরা সকল বিষয়েই আপনাদিগকে পুরুষের সমকক্ষ বিবেচনা করে। ইহা কেবল সামাজিক প্রথা ও শিক্ষার গুণে। আমাদের স্ত্রীলােকদিগকে আমরা দুর্বল করিয়া রাখিতেই সতত যত্নবান। কাজেই তাহারা অসহায়। অপর দেশীয় স্ত্রীলােকেরা শিক্ষার গুণে নানা হিতকর কাৰ্য্য করিতেছে। এইরূপ একটি কার্যের কিছু পরিচয় দেওয়া যাইতেছে। ব্ৰহ্মদেশে লেকতে পাহাড়ের উপর কারেণদিগের বাস। এই প্রদেশ জঙ্গলময় এবং এখানে যাওয়া-আসা কষ্টসাধ্য। কোন সুদূর ইটালী হইতে মিশনারীরা আসিয়া এখানে মিশন ও কনভেন্ট খুলিয়াছেন। একবার কোন কাৰ্যোপলক্ষ্যে আমাকে সেখানে যাইতে হয়। প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে এক যুবক মিশনারী আসিয়া এই মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। তখন লােকের অতি অসভ্য ছিল এবং তাহাদের কোন লিখিত ভাষাও ছিল না। যাতায়াত তখন অপেক্ষাকৃত বৰণ কষ্টকর ছিল। তিনি ইংরেজী অক্ষর প্রচলন করিয়া লিখিত ভাষার সৃষ্টি করেন। এখন বালকদের জন্য নানা স্থানে স্কুল হইয়াছে। এই মিশনও এক বৃহৎ ভূল চালাইতেছে। মিশনের সঙ্গে এক ভেন্ট আছে, সেখানে বালিকা- দের শিক্ষা দেওয়া হয়। যিনি প্রথম মিশন খােলেন তিনি এইখানেই দেহত্যাগ করিয়াছেন। এখন মিশনের পরিচালক তিন জন পুরুষ। তাহারাও ইটালী হইতে আসিয়াছেন, সামাজিক-সমস্যা ৮) নিলাম তাঁহারাও এই কাৰ্যেই জীবনপাত করিবেন। তাহাদের আহার দুই বেলা অতি মােটা চালের ভাত। বর্ষাকাল, কয়েক দিন ধরিয়া বাদলা হইয়া আছে, মধ্যে মধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছে। বার মাইল দূরবর্তী এক গ্রাম হইতে খবর আসিল একজনের গুরুতর অসুখ হইয়াছে। পাত্রিদের একজন তাহার জন্য ঔষধপত্র লইয়া ঘােড়ায় চড়িয়া বৃষ্টিতে ভিজিতে ভিজিতে বাহির হইয়া গেলেন। তিন দিন পরে ফিরিবেন। একদিন একজন তিন মাসের এক পীড়িত শিশু ও পচিশটি টাকা লইয়া উপস্থিত। শিশুর মাতাপিতা পরলােক গমন করিয়াছে ; মৃত্যুকালে তাহাদের যথাসর্বস্ব এই পঁচিশটি টাকা ও শিশুটিকে পাদ্রিদের হাতে দিয়া গিয়াছে। পাদ্রিরা শিশুটিকে । গ্ৰহণ করিলেন, তাহাকে মানুষ করিবেন। এইরূপ শিশু মানুষ হইবে কনভেন্টে। কনভেন্টে এখন তিন জন নান (nun বা sister) বা সেবিকা আছেন। তাহারাও ইটালী হইতে আসিয়াছেন। একজন কনভেন্টের কী মঠধারিণী (mother superior), তাহার বয়স এখন প্রায় পঁয়ষষ্ঠ বৎসর। তিনি প্রায় চল্লিশ বৎসর হইল আসিয়াছেন; এইখানেই দেহপাত করিবেন। তিনি নিকটবর্তী সমস্ত লােকের মাতৃস্বরূপিনী। অপর দুই জনের বয়স ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ। তঁাহাদেরও সেই একই ব্রত। কনভেন্টে বালিকাদের এক বৃহৎ স্কুল আছে এবং অনেকগুলি নিঃসহায় বালিকা প্রতিপালিত হইতেছে। নিঃসহায় বালকদিগকে বড় হইলে মিশনে রাখা হয়। কভেন্ট মিশনের তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়। মিশন সর্বদাই লােকদিগের হিতচিন্তা করে এবং নানা বিষয়ে সাহায্যের চেষ্টা করে। রেশম কীট প্রচলন উপলক্ষ্যে আমাকে এইস্থানে যাইতে হয়। প্রথমে কনভেন্টের সেবিকারাই এই কাৰ্য্য গ্রহণ করেন। নারীদের কাৰ্যে দৃষ্টি আকর্ষণ করিবার জন্যই এই কনভেন্টের বাঙ্গালার সমস্যা পরিচয় দিলাম। এইরূপ কত কভেন্ট ব্ৰহ্মদেশের নানাস্থানে আছে। আমার বলা উদ্দেশ্য যে, আমাদের নারীরাও শিক্ষা পাইলে এইরূপ কত কাজ করিতে পারেন। চাই শিক্ষা। বালিকাদের শিক্ষার অভাবের অপকারিতার একটি দৃষ্টান্ত এখানে দিতেছি। ১৯২৬ খৃষ্টাব্দের ১১ই নবেম্বর তারিখের ‘সঞ্জীবনী’পত্রে নিম্নলিখিত সংবাদটি প্রকাশিত হইয়াছে— “বর্ধমান হইতে জনৈক উকীল তাহার কন্যা ও স্ত্রীসহ ভুবনেশ্বরে বেড়াইতে গিয়াছিলেন। তিনি সেখানে অসুস্থ হইয়া পড়েন। সেই সময় তাহার পাণ্ডা ঠাকুর দেখাইবার অজুহাতে তঁাহার কন্যাকে বাড়ী হইতে লইয়া যায়। তারপর সেই দুৰ্বত্তের ও সেই কন্যার আর কোন সন্ধান পাওয়া যায় না। অতঃপর ব্যাপারটা পুলিশের গােচরীভূত করা হয়। তাহারা এই সম্পর্কে জোর তদন্ত আরম্ভ করে, ফলে সম্বলপুর হইতে তাহারা বালিকাকে উদ্ধার করে। বালিকাটির বয়স পর যােত বৎসর, দেখিতে অতি সুশ্রী। পুলিশ তাকে উদ্ধার করিলেও তাহার পিতামাতা তাহাকে ভুবনেশ্বরে রাখিয়াই চলিয়া আসেন। তখন বালিকার স্বামীকে সংবাদ দেওয়া হয়। তিনিও এই সম্পর্কে তাহার কিছু করণীয় আছে বলিয়া মনে করেন না। তারপর এই বালিকায় সমস্যা একটা বড় রকমের সমস্যায় পরিণত হয়। সেই সময় স্থানীয় জনৈক মাদ্ৰাজী ব্রাহ্মণ দয়াপরবশ হইয়া বালিকার সম্মতি লইয়া তাহাকে আৰ্যসমাজের মতানুসারে বিবাহ করেন। বিধির এমনই বিধান যে, সম্প্রতি তিনিও নিতান্ত অতর্কিত ভাবে পরলােক গমন করিয়াছেন। তাহার আত্মীয়স্বজন কেহই উহার ভরণপােষণের ভার গ্রহণ করিতে সম্মত নহেন, এমতাবস্থায় সে কোথায় দাড়ায়, তাহাই বিষম সমস্যার বিষয় হইয়া পড়িয়াছে। ভুবনেশ্বরের জনৈক সাব-ইনস্পেক্টরের তত্ত্বাবধানে সামাজিক-সমস্যা বালিকা অবস্থান করিতেছে। আমরা আশা করি হিন্দুসমাজের কোন প্রতিষ্ঠান এই অসহায় আশ্রয়হীনা কন্যাকে গ্রহণ করিবেন।” পূৰ্বে পল্লীগ্রামে রামায়ণ, কথকতা, কীর্তন ইত্যাদি দ্বারা যে শিক্ষা দৈওয়া হইত তাহা এখন প্রায় উঠিয়া গিয়াছে ; তাহা হইলেও পল্লীসমাজের বাধন এখনও আছে। যাহারা কাৰ্যোপলক্ষে পল্লীসমাজ ছাড়িয়া শহরবাসী হইয়াছে তাহাদের উপর সমাজের বাঁধন অনেকটা ঢিলা হইয়া পড়িয়াছে। শহরে প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে চিনে না। কন্যার শিক্ষার বিষয়ে শিক্ষিতেরাও উদাসীন; কিন্তু ঘরে ঘরে আট আনা চারি আনা সংস্করণের নাটক-নভেলের ছড়াছড়ি। উপরােক্ত ঘটনা এই অবস্থার কুফলের দৃষ্টান্ত। পিতা উকীল, অতএব আধুনিক হিসাবে শিক্ষিত, পতির কোন পরিচয় নাই। মাতাপিতার ও পতির বিবেচনার তারিফ, না করিয়া থাকা যায় না। ইংরেজ-রাজের চালিত যন্ত্রে তৈয়ারি হইয়া পিতা উকীল হইয়াছেন; পয়সা রােজগার করিতেছেন ; ভুবনেশ্বরে হাওয়া পাইতে গিয়াছিলেন। পতিও নিশ্চয় আজকালকার হিসাবে শিক্ষিত। আজকাল ইমেজ-চালিত যন্ত্রে তৈয়ারি ‘মানব’ নামক জীব বা পদার্থই বেশি দেখা যায় ; ‘মানুষ খুব কম। তাহা না হইলে আমাদের এমন অধােগতি হইবে কেন ? পিতামাতা পতি তাহাকে গ্রহণ না করুন, তাহার একটা আশ্রয়ের বন্দোবস্ত ত করিয়া দিতে পারিতেন। কালও যাহাকে বুকে করিয়া রাখিয়াছিলেন, বিড়াল কুকুরের অপেক্ষাও আজ সে পরিত্যজ্য। নারীর মধ্যকার যে পশুপ্রবৃত্তি তাহাকে কুপথে লইয়া গিয়াছে, পিতা, মাতা, পতির ব্যবহারও তদনুরূপ পশুপ্রবৃত্তির পরিচায়ক। কন্যাটির ব্যবহার অতীব দোষণীয়, কোন সমাজই মার্জনা করে না। বিবাহিত ভারতনারী, হিন্দুনারী ৫ ৮৪ বাঙ্গালার সমস্যা পদ লােকের কন্যা-এরূপ ব্যবহার কেন করে? তাহার কারণ উপযুক্ত শিক্ষার অভাব। শিক্ষা পাইলে এই নারীই সমাজের মঙ্গলকারিণী এবং পূজনীয়া হইবে। মান্দ্রাজী ব্রাহ্মণের সংসাহসের প্রশংসা না করিয়া থাকা যায় না; এখন যদি কোন মুসলমান যুবক এই সুশ্রী কন্যাকে সাদরে পত্নীরূপে গ্রহণ করে তাহা হইলে তাহার বিরুদ্ধে চীৎকার করিবার লােক অনেক জুটিবে। বাঙ্গালার হিন্দুসমাজ প্রকৃত শিক্ষার অভাবে কত ক্ষুদ্রচিত্ত ও পঙ্গু হইয়া পড়িয়াছে এই ঘটনা তাহারও পরিচায়ক। সমাজ যদি সমাজের প্রধান অঙ্গ নারীর মূল্য না বােঝে এবং নারীরা সমাজ ত্যাগ করে, তবে সমাজেরই ক্ষতি এবং এই ক্ষতির জন্য সমাজ নিজেই দায়ী। ফলে হিন্দু কমিতেছে, মুসলমান বাড়িতেছে । বিধবা আজকাল প্রায়ই শুনা যায়, হিন্দুবিধবার অবস্থা অতি শােচনীয়। সকল হিন্দুবিধবার পক্ষে এ কথা সত্য নয় ; অধিকাংশ স্কুলে বিধবারাই প্রকৃতপক্ষে সংসারের কী এবং আজীবন সকলের পূজনীয়া । তাহাদের স্বার্থত্যাগের তুলনা হয় না। একবেলা আহার এবং বৎসরে চারিখানি কি ছয়খানি কাপড় তাহাদের যাবতীয় প্রয়ােজন সাধন করে। কিন্তু তাঁহারা গৃহস্থের সকলের আহারপ্রদায়িনী ; কেহ পীড়িত হইলে শুক্ৰষাকারিণী এবং সকলের উপর হিন্দুধর্মের স্তম্ভম্বরূপিনী। আত্মীয়স্বজন থাকিলে তাহাদের সামান্য ভাত- কাপড়ের অভাব হয় না। আত্মীয়স্বজনের অভাবেও অনেকেই নিজের অন্নসংস্থান করিয়া লন। পল্লীগ্রামে কত অসহায় বিধবাকে বিধবা ৮৫ ধান ভানিয়া প্রফুজ্ঞচিত্তে জীবন যাপন করিতে দেখিয়াছি। অতি অল্প স্থলেই অল্পবন্ত্রের অভাব চরিত্রস্থলনের কারণ হয়। আর্থিক দুরবস্থার দরুণ স্থানে স্থানে যে বিধবাদের দুরবস্থা। উপস্থিত হইয়াছে তাহা স্বীকার করিতেই হইবে। ইহার প্রতিকার প্রয়ােজন। বিধবা বিবাহের প্রচলন ইহার আংশিক প্রতিকার করিতে পারে। এই স্ব স্বগীয়া সরােজনলিনী দেবীর উক্তি উল্লেখ করিতেছি “যে সকল বিধবা পুনরায় বিবাহ করিতে চাহেন, তাঁহারা বিবাহ করুন; কিন্তু হিন্দুনারী বিবাহ-বন্ধনকে যেরূপ পবিত্র আদর্শে দেখিয়া থাকে তাহাতে আমার বিশ্বস, যে সকল হিন্দু বিধবা স্বামীকে একবার ভালবাসিবার সুযােগ পাইয়াছে তাহারা কখনই আবার বিবাহ করিতে রাজী হইবে না বা চাহিবে না।” আমারও এই মত। আমাদের বিধবাদের অনেকেই বিধবাই থাকিবেন। ব্রাহ্মণ কায়স্থ প্রভৃতির দেখাদেখি সমাজের অপর জাতিরাও নিজেদের মধ্যে বিধবাবিবাহ রহিত করিয়াছে। পশ্চিম বঙ্গে বাউরী, হাড়ি প্রভৃতি ছাড়া আর কোন জাতির মধ্যে বিধবাবিবাহ-প্রথার প্রচলন নাই। আমি জানি সদোপদের কোন কোন শ্রেণীর মধ্যে কন্যার অল্পতা হেতু পণ দিয়া কন্যা সংগ্রহ করিতে হয়। দেখিয়াছি আমারই গ্রামের কয়েকজন ত্রিশ-চল্লিশ বৎসর বয়স্ক পুরুষ চার-পাঁচ বৎসরের বালিকা কন্যা বিবাহ করিল। কয়েক পরিবার লােপ পাইল। বঙ্গের প্রায় সর্বত্রই এইরূপ দেখা যায়। বিধবাবিবাহ-প্রথার প্রচলন যে সমাজের মঙ্গলের জন্য নিতান্ত প্রয়ােজন তাহা অনেকেই মনে করেন। কিন্তু সমাজে চলন নাই, অতএব সমাজের ভয়। ইহার প্রকৃত উপায় হইতেছে সাহস করিয়া ৮৬ বাঙ্গালার সমস্যা যেখানে প্রয়ােজন বিধবা বিবাহ দেওয়া এবং সকলের মত না হয় বিধবাবিবাহ-প্রচলনকারীদিগকে লইয়া নূন সমাজ গঠন করা। সকল বিধবাই যে বিবাহ করিতে ইচ্ছুক হইবেন তাহা নহে। কিন্তু বাল-বিধবার বিবাহ দেওয়া কৰ্তব্য কি-না সে বিষয়ে পিতামাতার নিজদিগকেই প্রশ্ন করিবেন, এবং নিজের মনে যে-উত্তর পান সেইমত কাৰ্য্য করিবার সাহস করিলেই বিধবাবিবাহ-সমস্যার সমাধান হইবে । একজন কায়স্থ পল্লীগ্রাম হইতে কলিকাতায় আসিয়া ইংরেজী অনভিজ্ঞ হইলেও স্বাধীন কোন কাৰ্য্যদ্বারা সচ্ছল অবস্থাপন্ন হন এবং কিছু সঞ্চয় করেন। তাহার একমাত্র সন্তান এক কন্যা। কলিকাতাতেই কন্যার বিবাহ দেন। বিপত্নীক হইয়া কন্যা-জামাতা লইয়া মুখেই থাকেন। কন্যার দুইটি পুত্রসন্তান হইবার পর জামাতার মৃত্যু হয়। কন্যার বয়স তখন আঠার উনিশ বৎসর। একদিন বিধবা কন্যা দুই শিশুপুত্রের এবং বৃদ্ধ পিতার স্নেহবন্ধন ছিন্ন করিয়া পল্লীস্থ এক অশিক্ষিত মুসলমান যুবকের সহিত গৃহত্যাগ করে এবং পিতা সন্ধান করিয়া কন্যাকে বাহির করিলেও সে পিতৃগৃহে ফিরিয়া আসিতে অস্বীকার করে। এ ঘটনাটি অবশ্য খবরের কাগজে প্রকাশিত হয় নাই। এরূপ কয়টা ঘটনা প্রকাশিত হয়? একটা দুইটা হইলেই হৈচৈ পড়িয়া যায় । কিন্তু প্রকৃত প্রতিকারের চিন্তা করেন কয়জন? যদি ঐ ব্যক্তি তাহার কন্যার পুনরায় বিবাহ দিতে পারিতেন তাহা হইলে এই দুঃখের পরিবর্তে সুখেই জীবনটা কাটিত। সুদূর কোন পল্লীগ্রামের আর একটি ঘটনার উল্লেখ করি। গােয়ালা স্ত্রী-পুত্র ও এক কন্যা লইয়া সুখেই ছিল। কন্যাটি অল্প বয়সে বিধবা হয়। কলেরা হইয়া হঠাৎ এই ষােল সতের বিধবা ৮৭ বৎসর বয়স্ক বিধবা কন্যা ছাড়া সংসারের অপর সকলেরই মৃত্যু হয়। গরু, মহিষ, জমী, বাড়ী, ইত্যাদি সকলই এই কন্যার হইল। কন্যাও পিতার ন্যায় দধি দুগ্ধ বিক্রয় করিত। একদিন শুনিলাম সমস্ত ত্যাগ করিয়া সে এক গােয় যুবকের সহিত পলায়ন করিয়াছে। এইরূপ ঘটনা যে নিত্য কত ঘটিতেছে তাহার খবর কে রাখে ? হিন্দুসমাজে এখন কড়া পড়িয়া গিয়াছে। এ সমন্তের গুরুত্ব অনুভব করিবার ক্ষমতা লােপ পাইয়াছে। এইরূপ কুল ও সমাজ ত্যাগ করা ছাড়া কত অবৈধ প্রণয় জানিয়া শুনিয়া ও না-জানার ভাণ করিয়া সমাজ প্রতিকারের চেষ্টা না করিয়া নীরব আছে। সমাজের অবস্থা এরূপ যে, পুরুষ হাজার হীনচরিত্র হােক না কেন, সে সমাজে অচল নহে। কিন্তু নারীর কলঙ্কের কথামাত্রেই এবং কলঙ্ক সত্য না হইলেও সে পরিত্যজ্য। অতি হীনচরিত্র পুরুষই ঢাক পিটাইয়া নারী-চরিত্রের কলঙ্ক জাহির করে। অনেকের মুখেই শুনা যায় যে, স্ত্রীলােককে গণ্ডীর মধ্যে না রাখিলেই তাহার চরিত্রস্থলনের সম্ভাবনা। যুক্তি দেখান হয় যে, তাহারা বেশ্যাবৃত্তি করে। কিন্তু মুখ তাহারা, বুঝে না যে, নারীর বেশ্যাবৃত্তি পুরুষেরই চরিত্রহীনতা প্রমাণ করে। তাহা না হইলে পুরুষই নারীর জন্য বেশ্যাবৃত্তি করিত, নারী পুরুষের জন্য নয়। সতী শব্দের প্রকৃত অর্থ সচ্চরিত্রা। পুরুষ একাধিকবার বিবাহ করিলেও এবং স্ত্রী বর্তমানে বিবাহ করিলেও আমাদের সমাজ তাহাকে সচ্চরিত্র বলে, যতদিন না সে পরস্ত্রীগমন করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ইহা সচ্চরিত্রতা নষ। একীত্ব এবং একপতিত্বই বিবাহের পবিত্রতা রক্ষা করে। বিপত্নীক পুরুষ পুনরায় বিবাহ করিলেও যেমন তিনি সচ্চরিত্র, সেইরূপ বিধবার পুনরায় বিবাহ হইলেও যতদিন সে স্বামীরতা ততদিন সে সতী।

bobo বাঙ্গালার সমস্যা বিধবার একাদশী ইত্যাদির বিধান রহিয়াছে এবং ধরিয়া লই যে, বিধবা রক্তমাংসের শরীরধারিণী হইয়াও স্বাভাবিক সমস্ত বৃত্তি দমন করিয়া রাখিবে। অনেকেই রাখেন এবং রাখিতে পারিলেই ভাল। আমাদের সমাজে কন্যা হইয়া জন্মাইলেই তাহার এমনভাবে শিক্ষা আরম্ভ হয় যে, আট-দশ বৎসরের হইতে না হইতেই স্ত্রীপুরুষের সম্বন্ধ- জানে সে পাকা হইয়া উঠে। অথচ চরিত্র-গঠনে সাহায্য করে, এমন শিক্ষার একেবারেই অভাব। এ অবস্থায় বালবিধবার যদি পদন হয় তাহার জন্য সে তত দায়ী নয় যত দামী তাহার পিতামাতা ও সমাজ। কন্যার ভাল শিক্ষা হওয়ার প্রয়ােজন এবং ভালমন্দ জ্ঞান হওয়ার পূর্বে, অন্ততঃ আঠার বৎসর বয়সের কম, বিবাহ হওয়াই উচিত নয়। স্বাভাবিক নিয়ম হইতেছে যে, পুরুষ স্ত্রী সঙ্গ এবং স্ত্রী পুরুষ-সঙ্গ কামনা করে। ইহা ঈশ্বরের বিধান এবং যাবতীয় প্রাণীর পক্ষেই সমান। মানব বিবাহ-প্রথার প্রচলন করিয়া এই বিধান পবিত্র করিয়াছে। পুরুষ ও স্ত্রীর ভালবাসা সম্পূর্ণরূপে না হইলেও অনেকটা যৌনসম্বন্ধের উপর স্থাপিত। এই জন্যই বােধ হয় ঈম মানবের যৌনসম্বন্ধ চিরজীবনব্যাপী করিয়া দিয়াছেন। পশুপক্ষী কীটপতঙ্গ প্রভৃতি প্রায় অপর সকল প্রাণীর স্ত্রী-পুরুষসম্বন্ধ ক্ষণস্থায়ী। ইহা দ্বারাই মানবকে পৃথক করিয়া দিয়াছেন। উপরােক্ত যুবতী, বৃদ্ধ পিতা, এবং দুই শিশু পুত্রের ভালবাসা অপেক্ষা মুসলমান যুবকের ভালবাসা বেশি মনে করিয়াছে। হয়ত চিরজীবন এক প্রকার সুখেই কাটাইবে। কাজেই দেখা যাইতেছে, বিধবা বিবাহ অপ্রচলন ঈশ্বরের বিধিবিরুদ্ধ। ইহার প্রচলন নিতান্ত আবশ্যক। বিধবাদিগের জন্য যে বিবাহপ্রচলন অতীব প্রয়ােজনীয় ইহা ।

বিধবা সকলেই স্বীকার করেন। সামাজিক নীতির জন্যও যে ইহা প্রয়ােজনীয় তাহাও অস্বীকার করা যায় না। ইহা ছাড়া এই প্রথার অপ্রচলন হেতু আমাদের জাতির শক্তি আড়ষ্ট হইয়া গিয়াছে। ভাবনা, আমার অভাবে আমার স্ত্রীর কি হইবে। জীবনের উন্নতির জন্য যে অসমসাহসিকতার প্রয়ােজন তাহা কাহাকেও বলিয়া বুঝাইতে হইবে না। এখন আমরা যাহা নিশ্চিত তাহাই আঁকড়িয়া ধরিয়া থাকিতে চাই। অনিশ্চিত উৎকৃষ্ট হইলেও তাহার চেষ্টায় বিরত থাকি। ইহার প্রতিকার হইতেছে বিধবাবিবাহপ্রচলন এবং নারীদেরও এমন শিক্ষা দেওয়া যে, তাহারা নিজের উপর নির্ভরশীল হয়। ১৯২৭ সালের ২৭শে জানুয়ারীর ‘সঞ্জীবনী’তে বাঙ্গালী ও হিন্দু- বিধবাগণ সম্বন্ধে ইহা প্রকাশিত হয়- "বাঙ্গালা দেশে বিধবা বিবাহ কচিৎ হয়, কিন্তু পঞ্জাবে এই আন্দোলন আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক বিধবাবিবাহ আরম্ভ হয়। পঞ্জাবে স্ত্রীলােকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। এদিকে বঙ্গদেশে হিন্দু-বিধবার সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। তাহার মধ্যে বাঙ্গালী হিন্দুরা বিধবাবিবাহ করবে না। ইহার ফলে এই হইয়াছে যে, দলে দলে পঞ্জাবীগণ বাঙ্গালী বিধবাদের বিবাহ করিতেছে। বাঙ্গালী হিন্দু ধ্বংসেম্মুখ জাতি, ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বাঙ্গালী বিধবাবিবাহ করিতে নারাজ, তাই বিধবারা বঙ্গদেশ ছাড়িয়া বিদেশে বিবাহ করিতে আরম্ভ করিয়াছে। বাঙ্গালী জাতির প্রতি বিধাতার ইঙ্গিত নানারূপে দেখা যাইতেছে। বাঙ্গালী তথাপি .নিদ্রিত। ইহার পর ছয়টি বিধবার পঞ্জাববাসীর সহিত বিবাহের বিবরণ দিয়া পনর হইতে একুশ বৎসর বয়স্কা আঠার জন বিবাহপ্রার্থিনী বাঙ্গালার সমস্যা । বিধবার তালিকা দেওয়া হয়। ইহারা সকলেই ইংরেজী শিক্ষিতা এবং কেহ কেহ ম্যাটিকও পাশ। লাহােরের বিধবাবিবাহসহায়ক-সভাও ইহাদের বিবাহের বন্দোবস্ত করিতেছেন। এতদিনে আরও কত বিধবা জানি বিদেশগামিনী হইয়াছে। প্রথম প্রথম যখন এইরূপ সংবাদ পড়িতাম আত্মীয়বিয়ােগজনিত দুঃখের ন্যায় দুঃখ অনুভূত হইত। বর্তমান অবস্থায় ইহার ভাল-মন্দ দুই দিকই আছে। প্রবাসী' প্রভৃতি পত্রিকাতেও বহু আলােচনা হইয়াছে। বঙ্গনারী বাঙ্গালীর গৃহস্বামিনী থাকিলেই সুশােভন হয়। সেইরূপ শিক্ষিত বাঙ্গালী যদি বিদেশিনী বিবাহ করেন তাহাও আমি অশােভন মনে করা ছাড়া বঙ্গনারীর প্রতি অন্যায় ব্যবহার বলিয়াই বিবেচনা করি। শিক্ষিতা বঙ্গনারী যদি বিদেশীর গৃহে যাইতে বাধ্য হন তাহা অপেক্ষা দুঃখের বিষয় আর কি হইতে পারে। আমরা চেষ্টা করিলেই ইহা নিবারণ করিতে পারি। আজকাল নারীহরণ, বিশেষতঃ বিধবা নারীহরণ, নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হইয়াছে। ইহা নিবারণের প্রকৃত উপায় হইতেছে কতক পরিমাণে বিধবাবিবাহপ্রচলন এবং বিশেমলবে শিক্ষাদ্বারা স্বাবলম্বন ও আপন শক্তিতে বিশ্বাস সৃষ্টি। কুমারী অনেকে বলেন, কুমারী কন্যারই বিবাহ দেওয়া এক প্রকার দায় হইয়া উঠিয়াছে। বিধবা কন্যার বিবাহের বন্দোবস্ত করা এক প্রকার অসম্ভব কথাটা একেবারে অসত্য নহে, কিন্তু সমস্ত সমাজ সম্বন্ধে সত্য নহে। ইহার মূলে কতকটা আছে বিবাহে পণপ্রথা। পণপ্রথা সম্বন্ধে পূর্বে আলােচনা করিয়াছি। কিন্তু অধিক বয়স্ক লােকদের সহিত অল্প বয়স্কা কুমারীদের বিবাহ বাঞ্ছনীয় নহে। আবার কুমারী ৯১ এমন অনেক জাতি আছে যাহাদের মধ্যে বিবাহযােগ্যা কুমারী কন্যা কম ; পণ দিয়া কন্যা ক্রয় করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের বিবাহ হয় না বা অধিক বয়সে হয়। এমন অবস্থায় বিধবাদের বিবাহ প্রচলন • নিতান্ত আবশ্যক। একদিকে পণপ্রথার জন্য মেয়ের বিবাহ দেওয়া কষ্টকর। অপর দিকে অনেক স্থলে যৌতুক প্রদানে সক্ষমতা-সত্বেও উপযুক্ত অর্থাৎ উপার্জনক্ষম পাত্র পাওয়া কঠিন হইতেছে। শিক্ষিত ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৈদ্যের বাড়ীতে আজকাল অনেক বয়স্ক! অবিবাহিতা কন্যা রহিয়াছে উপযুক্ত পাত্রের অভাবে বিবাহ হইতেছে না। এক উচ্চ পদস্থ ভদ্রলােক সেদিন বলিলেন যে, তিনি তাহার কন্যাদের বিবাহ দিবেন না স্থির করিয়াছেন, কারণ পাত্র পাইতেছেন না; পঞ্চাশ-ষাট টাকা বেতনভােগী পাত্রের সহিত বিবাহ দিয়া কন্যার ভবিষ্যৎ জীবন কষ্টকর করা অপেক্ষ। বিবাহ না দেওয়া ভাল। ইহা বুঝিলাম, কিন্তু এই কুমারীদের জীবনে ত একটি কাজ চাই। বিধবা সমস্যার ন্যায় কুমারী-সমস্যাও ক্রমেই কঠিনতর হইবে। বিধবাদের বিবাহ প্রচলন হইলেও অনেক বিধ বা অবিবাহিতাই থাকিবে এবং সমাজের যেরূপ অবস্থা দাড়াইতেছে তাহাতে অনেক কুমারীকেও অববাহিতা থাকিতে হইবে। ইহাদের মধ্যে যাহারা ভাগ্যক্রমে সংসারের গৃহিণী হইয়া থাকিবে তাহাদের কথা ছাড়িয়া দিয়া যাহারা অসহায় তাহাদের কি হইবে? সকলের পক্ষেই এমন শিক্ষার প্রয়ােজন যাহা দ্বারা, যদি আবশ্যক হয়, জীবিকা-অৰ্জন করিতে পারিবে এবং সর্বোপরি আপন চরিত্র দৃঢ় করিতে পারিবে। এইরূপ বিধবা ও কুমারীদের দ্বারা সমাজের ও দেশের কি মহদুপকার সাধিত হইতে পারে এই পুস্তিকার শেষে তাহা বলিতেছি।

বাল্যবিবাহ অল্প বয়সে পুত্রকন্যার জনকজননী হওয়া সমাজে অনেকের মতে আনন্দের কারণ বিবেচিত হয়। কিন্তু স্বাস্থ্যের পক্ষে ইহা অত্যন্ত অনিষ্টকর। তাহা ছাড়া সমাজে যখন বিধবাবিবাহ নাই, তখন স্ত্রীর ভবিষ্যৎ চিন্তায় অথবা স্ত্রীপুত্রের ভরণপােষণের চিন্তায় যুবকের সাহসিকতা হারাইয়া ফেলে। যাহা হউক একটা নিশ্চিত কিছু আঁকড়াইয়া ধরিতে চেষ্টা করে এবং যাহা-কিছু একটা পাইলে তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকিয়া যায়। এই কারণে বাল্যবিবাহপ্রথা জাতির বহু অকল্যাণ করিতেছে। সাহসিকতা বা অসাহসিকতা উন্নতির বিশেষ সাহায্য করে। বিধবাবিবাহপ্রচলন যেমন আবশ্যক হইয়াছে, বাল্যবিবাহ নিবারণও সেইরূপ প্রয়ােজনীয়। অবরােধপ্রথা বাঙ্গালা, বিহার, উড়িষ্যা, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ, পঞ্জাব, রাজপুতানা ও সিন্ধুপ্রদেশেই অবরােধ প্রথা আছে। বােম্বাই, মাদ্রাস ও মধ্যপ্রদেশে নাই। আসামের বাঙ্গালী অধিষ্ঠিত অংশে, অর্থাৎ, শ্রীহট্ট, কাছাড়, ধুবড়ী প্রভৃতি জেলায় আছে, আসামীদের মধ্যে নাই। কাশ্মীর, গাঢ়োয়াল, নেপাল, ভুটান, খাসিয়া ও অন্যান্য পার্বত্য প্রদেশে নাই। ব্ৰহ্মদেশে অবরােধপ্রথার গন্ধ পর্যন্ত নাই। এখানে স্ত্রীলােকেরা যত স্বাধীন জাপানেও তত নহে। তুরস্ক ও ঈজিপ্ট পর্দা ফেলিয়া দিয়াছে। আফগানিস্তানেও শুনিতে পাইব কোন্ দিন পর্দাথা উঠিয়া গিয়াছে। মুসলমান ধর্মাবলম্বীদিগের মধ্যেই পর্দার প্রথম সৃষ্টি ও বিস্তার। তাহা ছাড়া পৃথিবীর অপর কোন দেশে পর্দা নাই। ভারতবর্ষে যে-সকল অবরোধপ্রথা স্থানে মুসলমানদিগের প্রভাব বেশ ছিল সেই সকল স্থানেই পর্দা আসিয়াছে, অপর সকল স্থানে নয়। অবরােধপ্রথাই আমাদের নারীদিগকে বেশী দুর্বল ও অসহায় 'করিয়াছে। পর্দ। শহরে যত বেশী, পল্লীগ্রামে তত নয়। পল্লীগ্রামে পর্দানশীন নারীরা পুকুরে স্নান করিতে যায়, মাঠে বেড়াইতে যায়। শিক্ষিত ভদ্রলােকেরাই কাৰ্যোপলক্ষে শহরবাসী হইয়াছে। পর্দা এই শ্রেণীর নারীদিগকেই পাইয়া বসিয়াছে। স্ত্রীলােকদিগকে অত্যাচার হইতে রক্ষা করার জন্যই হয় ত পর্দা- প্রথার উৎপত্তি। পঞ্জাবে আফগানিস্তানের দিক হইতে আক্রমণ, লুণ্ঠন ও অত্যাচার বেশি হইত। স্ত্রীলােকেরা ঘরের বাহির হইতে পারিত না। এই কারণে এখনও পঞ্জাবে বাড়ীর ছাদে মলমূত্র ত্যাগ করিবার প্রথা চলিয়া আসিয়াছে। বৃষ্টি কম হওয়ার জন্য মাটির দেওয়ালের উপর মাটির ছাদ পাকা ছাদের মতই করা হয়। শহরেও পাকা বাড়ীর ছাদ মাটির তৈয়ারি। পাকা ছাদ রৌদ্রের তেজে ফাটিয়া যায়। ছাদে মলমূত্র ত্যাগ প্রথার ন্যায় পর্দাপ্রথাও বর্জনীয়। পর্দার উৎপত্তি যে কারণেই হউক, এখনও পর্দার সমর্থন করা হয় পুরুষের ক্ষুদ্র স্বার্থ ও ঈর্ষার জন্য। ভয়, পাছে পর্দার বাহির হইলে স্ত্রীর সতীত্বের হানি হয়। ইহা অপেক্ষা নারীর অপমান আর বেশি কি হইতে পারে ? বাড়ীর ভিতর তালাচাবি বন্ধ করিয়া রাখিয়া বাহিরে ঢাক পিটাই আমাদের নারীর তুল্য সতীনারী জগতে দুর্লভ। তালাচাবির কথা যে বলিলাম ইহা অতিশয়ােক্তি নহে। এই ব্ৰহ্মদেশেই আমি জানি দুইজন উচ্চ উপাধিধারী, উচ্চ বেতনভােগী বাঙ্গালী নিজেদের কাৰ্যোপলক্ষে বাড়ীর বাহির হইলেই, তাহাদের স্ত্রীদের তালাচাবি দিয়া বন্ধ করিয়া রাখিয়া যাইতেন।

৯৪ বাঙ্গালার সমস্যা এই অবরােধপ্রথার প্রভাব জাতীয় চরিত্রের উপর কতখানি তাহা বিশেষ করিয়া ভাবিবার বিষয়। অবরােধ প্রথার দরুণ আমাদের স্ত্রীজাতির সহিত মেলামেশা নাই। বিলাতে একেবারেই উল্টা, অবাধ মেলামেশা, এইখানেই চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রকৃত পরীক্ষা। বিলাত প্রবাসী বাঙ্গালী যুবকদের মধ্যে ব্রাহ্ম যুবকদের চারিত্রিক দৃঢ়তা বেশি দৃষ্ট হয় বলিয়া অনেকেই স্বীকার করিয়াছেন। ইহার একমাত্র কারণ ব্রাহ্মসমাজে নরনারীর মেলামেশা বেশি। অপরদিকে ব্ৰহ্মদেশে সম্পূর্ণ স্ত্রীস্বাধীনতা সত্ত্বেও ব্ৰহ্মদেশীয় যুবকেরা চারিত্রিক দৃঢ়তাহীন। ইহার কারণ, ইহারা স্বদেশেও যেমন বাহিরেও তেমন। নরনারীর সম্পর্কের ধারণা ইহাদের সমাজে আমাদের মত উচ্চ বা কঠিন নয়, অতএব আদর্শও অন্যরূপ। আমাদের সমাজে চরিত্রের যে আদর্শ, ঘরে বন্ধ রাখিয়া নারীর যে আদর্শ চরিত্র বজায় রাখিতে চেষ্টা করি, আমরা নিজের পরীক্ষাক্ষেত্রে সেই আদর্শ চরিত্র রক্ষা করিতে পারি না কেন ? সকলেই পারেন না একথা বলিতেছি না। শিক্ষিত যুবক একজন পারিলেও বিদেশে সমগ্র সমাজের নিন্দা হয়। এইরূপ ব্যবহার সমাজের ব্যাধিসূচক বলিয়াই বিবেচনা করি। ইহার একমাত্র কারণে আমাদেব সমাজে নরনারীর মেলামেশা নাই। দেখাশুনা কথাবার্তা চলিলে নরনারীর আলাপ পরিচয় মিলন সাধারণ হইয়া যাইবে; নরনারী উভয়েরই চারিত্রিক দৃঢ়তা বাড়বে। যে কারণ আমাদের যুবকের চারিত্রিক দৃঢ়তার পরীক্ষায় অপর অপেক্ষা হটিয়া যায় ভুবনেশ্বরে উকীলের পনর-ষোল বৎসর বয়স্কা বালিকা কন্যার বিপথগমনের এক কারণও তাহাই। এখন বালক বালিকা নয়-দশ বৎসর বয়স হইতেই পৃথক, যুবাবস্থার ত কথাই নাই। এমন কি আমাদের ভগ্নী ও মাতৃস্থানীয় বয়ােধিকা অপর অবরােধপ্রথা গৃহস্থের স্ত্রীলােকদিগের সহিত পর্যন্ত আলাপ-পরিচয়ের সুবিধা নাই। পর্দানশীন স্ত্রীলােকেরা বাহির হইলেই লােকে, আমাদেরই লােকে, তাহাদের কে কৌতুহলের দৃষ্টিতে তাকায় কেন ? ইহার জন্য মহাত্মা গান্ধীর নিকট পৰ্যন্ত আমাদের নারীরাই নালিশ করে এবং কত হৈ চৈ পড়িয়া যায়। আমাদের পর্দানশীন স্ত্রীলােকদের ইজ্জত কিরূপে রক্ষিত হয় তাহা শ্ৰীযুক্ত গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় তাহার চিত্রাবলীতে চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন। সাহেব ফিরিঙ্গীদের মেয়েরা এবং যে-সব প্রদেশে অবরােধ প্রথা নাই সেই প্রদেশের নারীরা ত এরূপে লাঞ্ছিত হয় না। ইহার কারণ পর্দানশীন নারীরা বাহির হয় না, লােকে তাহাদিগকে দেখিতে পায় না, বাহির হইলে এইরূপে লুক্কায়িত বস্তুটা কি দেখিবার ঔৎসুক্য হয়। নারীদের স্বাস্থ্যের জন্যও অবরােধপ্রথা বর্জনীয়। মুক্ত বায়ুতে ভ্রমণ স্বাস্থ্যরক্ষার এক প্রধান উপায়। নানা কারণে অবরােধপ্রথা যত শীঘ্র উঠিয়া যায় জাতির পক্ষে ততই মঙ্গল। অবশ্য বলা বাহুল্য আমাদের বর্তমান অবস্থায় একদিনে এককথায় ইহা উঠিয়া যাইবে না। ইহার জন্যও শিক্ষার প্রয়ােজন।

রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিক (political ) সমস্যা সম্বন্ধে আলােচনা করিবার মত জ্ঞান আমার নাই বলিলেই হয়। তবে সাধারণভাবে দুই-একটি কথা বলিতেছি। পুরুষ হােক স্ত্রী হােক সামাজিক জীবহিসাবে প্রত্যেক ব্যক্তির জীবন চারিভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম তাহার নিজত্ব বা ব্যক্তিত্ব ( individuality)। বুদ্ধি ও স্বাভাবিক কতকগুলি ক্ষমতা লইয়া সে জন্মিয়াছে। শিক্ষা দ্বারা বুদ্ধি বিকশিত হয় এবং অনুশীলন দ্বারা ক্ষমতা কার্যকরী হয় ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। সে যদি পুণ্য কাজ করে বা পাপ করে নিজেই তার ফলভােগ করিবে। ধৰ্ম্মও তার নিজস্ব জিনিষ। বাহাড়ম্বর ধর্ম নয়, ধৰ্ম্ম আন্তরিক। আমরা না বুঝিয়া কোন জিনিষ খাওয়া-না-খাওয়া, স্নান করিয়া বা স্নান না করিয়া খাওয়া, ছোঁয়া, বসা প্রভৃতি অবান্তর জিনিষকে ধৰ্ম্ম বলিয়া মনে করি এবং অজ্ঞানতাবশতঃ এই কর তুচ্ছ ব্যবহার লুইয়া ধর্মের নামে যাহা অধর্মের চূড়ান্ত,-লুণ্ঠন, নরহত্যা পর্যন্ত—করি। কেঁদুলীতে ( বীরভূম জেলার কেন্দুবি গ্রাম) এক সন্ন্যাসী অর্ধদগ্ধ মড়ার মাংস টানিয়া লইয়া ভক্ষণ করিতেন। অথচ প্রত্যেক হিন্দু তীর্থযাত্রী তাহার পদে মাথা লুটাইত। পরলােকগত প্রসিদ্ধ ব্যারিষ্টার ও দেশনায়ক উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় নিতে হিন্দু হইলেও তাঁহার সহধর্মিনীকে খ্ৰীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করিতে অনুমতি দিয়াছিলেন। ইউরােপীয়দিগের মধ্যে অনেক স্কুলেই স্বামী প্রােটেষ্টান্ট এবং স্ত্রী রােমান ক্যাথলিক এমন কি বৌদ্ধ, হিন্দু বা মুসলমানও রাজনৈতিক সমস্যা ৩ হইতে পারে। জাপানের একই পরিবারে পিতা বোক, মাতা খৃষ্টান, পুত্র হয়ত শিন্তো এবং কন্যা খৃষ্টান। ধর্মের প্রকৃত রূপ যখন আমরা বুঝিতে পারিব তখনই ধর্মের নামে আজকাল যে অধর্ম অনুষ্ঠিত হয় তাহার অবসান হইবে। ধর্ম প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব জিনিষ, ইহা লইয়া তর্কবিতর্ক কলহ বিবাদ করাই অধর্ম। দ্বিতীয়পারিবারিক সম্বন্ধ। মাতা, পিতা, ভ্রাতা, ভগিনী, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং দাস দাসী লইয়া যে পরিবার, এই পরিবারের লােক- দিগের প্রতি তাহার কর্তব্য আছে এবং তাহার প্রতিও পরিবারের লােকদিগের কর্তব্য আছে। পরিবার তাহাকে খাওয়াইয়া পরাইয়া ও শিক্ষা দান করিয়া মানুষ করে এবং তাহাকেও পরিবারের লােক- দিগকে প্রতিপালন করিতে হয়। পরিবারের প্রতি কর্তব্য পালন করিলে পরিবারও নিজের কর্তব্য পালন করিতে সমর্থ হয়। তৃতীয়বহু পরিবার লইয়া সে সমাজ সেই সমাজের সহিত সম্বন্ধ। সমাজের প্রতি তাহার কর্তব্য আছে এবং সমাজেরও তাহার প্রতি কর্তব্য আছে। ব্যক্তি লইয়াই সমাজ। প্রত্যেক ব্যক্তি সমাজের প্রতি নিজ কর্তব্য পালন করিলে সমাজও সকলের প্রতি কর্তব্য পালন করিতে সমর্থ হয়। চতুর্থ—দেশ বা রাষ্ট্রের সহিত সম্ব। পরিবার ও সমাজের মত ব্যক্তি সকল লইয়াই দেশ। যে-দেশের লোক দেশের প্রতি কর্তব্য বুঝিয়াছে এবং পালন করিয়াছে সেই দেশও ব্যক্তিসকলের প্রতি কর্তব্য পালন করতে সমর্থ হইয়াছে। জাপানে এমন দরিদ্র কেহই নাই যে পেট ভরিয়া দুই বেলা খায় না, যথেষ্ট বস্তু দ্বারা শরীর আবৃত করে না এবং পায়ে জুতা পরে না। ইংলও সমস্ত বৃবৃদ্ধাকে পেন্সন দেয় এবং এমিকদের কাজ না থাকিলে তাহাদিগকে ১ বাঙ্গালায় সমস্যা খাদ্য দেয়। দেশের সকলেই যাহাতে সুখে থাকে, কেহ কাহারও উপর অত্যাচার না করে, অত্যাচারীর দমন হয়, দেশের সকল লােকেরই শিক্ষার দ্বারা যাহাতে ব্যক্তিত্ব বা নিজের বিকাশ হয় এই সকলের জন্য দেশের সকলের সমবেত চেষ্টার আবশ্যক এবং এই উদ্দেশ্যেই আইনকানুন প্রয়ােজন হয় এবং এই সকল আইনকানুন প্রবর্তনের জন্য বিচারক, শিক্ষক, শাসক, পুলিশ প্রভৃতির দরকার হয়। এই সকল লইয়া রাষ্ট্রনীতি বা রাজনীতি। আমাদের দেশের লােকের প্রকৃত শিক্ষার অভাবে দেশের প্রতি কর্তব্যজ্ঞানের বিকাশ হয় নাই। এই কারণে বাহিরের লােক আসিয়া আমাদের দেশ লুণ্ঠন করিয়াছে এবং আমাদিগকে নিজের দেশেই পরের অধীন হইতে হইয়াছে। যাহারা দেশ জয় করিয়াছে তাহাদের সুখসুবিধার বন্দোবস্ত অবশ্যই তাহারা করিবে। ইহাতে আমাদের অনেক ক্ষতি হইয়াছে। আমাদের রাষ্ট্রনীতি এখন জটিল হইয়া পড়িয়াছে। রাষ্ট্রনীতি চালাইবার জন্য দেশের অন্নে অপর দেশীয়েরা প্রতিপালিত হইতেছে অথচ দেশের লােকেরই অন্নাভাব। রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্যজ্ঞানের শিক্ষার অভাবে যাহা প্রকৃত ধর্ম নয়, যাহা মাত্র লােকাচার তাহাকেই দেশেরও উপরে স্থান দিয়া আসিতেছি। ইংরেজ, ফরাসী, জৰ্মান, ইতালীয়, আমেরিকান প্রভৃতি খৃষ্টান হইলেও যীশুর জন্মস্থান প্যালেস্তাইনের অধীন হইতে কেহই চায় না। সকলেই দেশের পূর্ব ও বর্তমান গৌরবে গরীয়ান। কিন্তু এ দেশের মুসলমানেরা খলিফার অধীন হইতে চান, কিন্তু প্রকৃতশী কামাল পাশা খলিফার দেশেই খলিফার অস্তিত্ব লােপ করিয়া দিয়াছেন এবং ধর্মকে রাষ্ট্র হইতে পৃথক করিয়াছেন। দেশের প্রতি কর্তব্যজ্ঞান থাকাতেই ইংরেজ যােদ্ধা, নাবিক, ব্যবসাদারেরা নানা দেশ জয় করিয়া ইংলণ্ডের সঙ্গে যােজনা ৰাজনৈতিক সমস্যা করিয়াছে। এমনি করিয়াই ইংলণ্ড বড় হইয়াছে। মুসলমান দেশ জয় করিয়া নিজেই বড় হইতে চাহিয়াছিল, তাই কৃতকাৰ্য্য হয় নাই। ভারতীয় মুসলমানগণ যাহারা ভারতকে স্বভূমি বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন এবং কয়েকশত বৎসরে যাহাদের জীবন ও দেহের অণুপরমাণু ভারতীয় হইয়া গিয়াছে এবং তাঁহাদের মধ্যে যাঁহাদের পূর্বপুরুষ সকলেই ভারতীয় এবং সম্ভবত হিন্দু, তাহারা সকলেই ভারতের পূর্বগৌরবে হিন্দুদের মতই অধিকারী। কিন্তু এখনও তাঁহারা তাঁহাদের অধিকার ত্যাগ করিয়া আরবের গৌরবে জাের করিয়া গৌরব বােধ করেন। প্রকৃত দেশাত্মবােধ জাগরিত হইলে এরূপ থাকিবে না। যে-দেশের লােক শিক্ষার দ্বারা পরিবার, সমাজ ও দেশের প্রতি কর্তব্য বুঝিতে পারিয়াছে এবং এই সকল কর্তব্য পালন করিতে চেষ্টা ও যত্ন করে সেই দেশই উন্নত। আর যে-দেশের সমাজের মধ্যে কলহ বিদ্যমান এবং দেশাত্মবােধ নাই সেই দেশই পরপদলেহী অথবা অনগ্রসর। পরিবার, সমাজ ও দেশের প্রতি কর্তব্যজ্ঞান এবং এই কর্তব্যপালনই মানুষকে পশু হইতে পৃথক করে। যে-ব্যক্তি স্বার্থপর, কেবল নিজের সুখসুবিধাই দেখে তাহার ও বনের পশুর মধ্যে পার্থক্য কতটুকু। যে ব্যক্তি পরিবারের প্রতি কর্তব্যপালন করে সে তদপেক্ষা উন্নত, যে ব্যক্তি পরিবার ও সমাজকে দেখে সে আরও উন্নত এবং যে-পরিবার, সমাজ ও দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করে সে-ই প্রকৃত মানুষ। শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে এই সকল কর্তব্য প্রত্যেককে বুঝাইয়া দেওয়া আবশ্যক। প্রত্যেক জাপানী বালকবালিকাকে এই সকল কর্তব্যের কথা বুঝাইয়া শিক্ষা দেওয়া হয় এবং পাঠ্যাবস্থায় প্রতি দিন এই সকল কর্তব্যের কথা স্মরণ করাইয়া দেওয়া হয়। ইংলণ্ড, ফরাসী, ইতালী, জৰ্মানী প্রভৃতি সকল দেশেই এইরূপ ব্যবস্থা আছে। ০ ১০০ বাঙ্গালার সমস্যা নিজের উন্নতিসাধন এবং পরিবার ও সমাজের প্রতি কর্তব্য পালন দেশেরই কাৰ্য। যে-দেশ ও সমাজ এক এবং যে দেশে সমাজ বিভক্ত নয়, (যেমন জাপান, ইংলণ্ড প্রভৃতি দেশ) সেই দেশই অগ্রসর। আমাদের দেশে এমন শিক্ষার প্রচার আবশ্যক হইয়াছে যাহাতে সকলেই বুঝিবে যে ধৰ্ম আলাদা হউক, বিবাহ পান ভােনাদি আলাদা হউক, আমরা যখন একদেশবাসী তখন এক সমাজভুক্ত। এখনকার নানা জাতি সমাজের বিভিন্ন অঙ্গ। ভবিষ্যতে হয়ত জাতিভেদের সমস্যা বা ধৰ্ম্মভেদের সমস্যা থাকিবে না। কিন্তু সেই সত্য যুগ কখন আসিবে তাহ। আমাদের চেষ্টা ও শিক্ষার উপর নির্ভর করে। পূর্বেই বলিয়াছি পরাধীন হওয়ায় আমাদের রাজনীতি জটিল হইয়া পড়িয়াছে। আমাদের প্রায় সকল স্বাভাবিক প্রচেষ্টাই এখন রাষ্ট্রনীতির আন্দোলনে চাপা পড়িয়া গিয়াছে। কিন্তু ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনই রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালন নয়। অনেকেরই বিশ্বাস রাষ্ট্রনীতির সমাধান হইলেই, অর্থাৎ স্বরাজ পাইলেই, অপর সমস্ত সমস্যার সমাধান সহজেই হইবে। কিন্তু স্বরাজশাভ ও তারপর তাহ। পরিচালনাই যে বিষম সমস্যা। এটি যে কত জটিল তাহ। হিন্দু-মুসলমানের কলহ বিবাদ দাঙ্গা হইতেই অনুমেয়। স্বরাজ লাভ করিব এই আশাতে প্যাক্ট ইত্যাদি কত কি দ্বারা কিরূপে চাকুরি ইত্যাদির ভাগবাটোয়ারা করিব তাহার তর্ক মাত্র লইয়াই নিজেদের মধ্যে গলা কাটাকাটি আরম্ভ হইয়াছে। ইহার মুলে রহিয়াছে অর্থনৈতিক সমস্যা। এই কথা পূর্বেই উল্লেখ করিয়াছি। স্বরাজলাতের পর অপর সকল সমস্যার সমাধানে হস্তক্ষেপ করিব এইরূপ মনে করিয়া থাকা অবিবেচনার কাৰ্য্য। চিন্তা করিয়া দেখিলে সহজেই বুঝা যাইবে অপর সমস্যাগুলি রাজনৈতিক সমস্যাসমাধানের সহায়ক রাজনৈতিক সমস্যা ১০১ অতএব ঐ সকল সমস্যা সমাধানের যথেষ্ট পরিমাণ চেষ্টা সর্বাগ্রেই প্রয়ােজন। দেশবাসীদিগের মুসলমান ও অমুসলমান বলিয়া বিভাগ, দলাদলি ও বিরােধই দেশবাসী সকলেরই বহু অমঙ্গলের কারণ হইয়াছে। প্রকৃত পক্ষে বাঙ্গালায়, শুধু বাঙ্গালায় কেন, সমস্ত ভারতবর্ষে কত জাতি আছে। এমন জাতি আছে যাহাদের সামাজিক রীতি, আহারাদি মুসলমানদের বা হিন্দুদের মত নয় ; তাহা ছাড়া এমন খাদ্য ও তাহারা খায় যাহা হিন্দু-মুসলমান উভয়েই অস্পৃশ্য মনে করে। ইহারাও হিন্দু বা প্রকৃত পক্ষে হিন্দুস্থানের সমাজভুক্ত বলিয়া বিবেচিত হয়। বাল্যকালে গ্রামে অন্যান্য জাতির ন্যায় মুসলমানদিগকেও সমাজের এক জাতি বলিয়াই জানিতাম। এখনও হিন্দু ও মুসলমান পরিবারের সঙ্গে খুড়া জ্যেঠা সম্পর্ক পাতান আছে। ভারতবর্ষের বাহিরে বা অন্যত্র যাহাই হউক, বাঙ্গালীর পল্লীতে মুসলমান সমাজের এক জাতি বলিয়াই বিবেচিত হইত। মুসলমানদের ন্যায় বা তদপেক্ষা শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে পশ্চাৰী জাতিসকলের এই মুসলমান-অমুসলমান নীতি দ্বারা বহু ক্ষতি হইয়াছে। মুসলমানদিগকে সমাজের একজাতি বলিয়া বিবেচনা করিলে অনেক অযথা বিরােধের সৃষ্টি হইত না। ইহাতে হিন্দু মুসলমান উভয়েরই অমঙ্গল। গভর্ণমেন্টও যদি ভেদনীতি অনুসরণ করিয়া এইরূপ বিভাগ প্রবর্তন করেন, দেশের কল্যাণের জন্য দেশবাসীর ইচ্ছা হইলে ইহা শােধরাইতে দেরী হইবে না। মুসলমান যেমন সমাজের এক অঙ্গ, অন্যান্য জাতিও সেইরূপ সমাজের অঙ্গ। ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্যও সেইরূপ সমাজের অঙ্গ হইলেও কেবল তাহাদের উন্নতিতে সমগ্র সমাজের উন্নতি হয় নাই, হইতে পারে না। কতকগুলি মুসলমান শিক্ষায় উন্নত হইয়া চাকুরি পাইলেও ১২ বাঙ্গালার সমস্যা সমাজের অবশিষ্টাংশের অবস্থা এখন যেমন সেইরূপই থাকিবে। জাতি বা সমাজের অনির্বিশেষে সকলেরই যতদিন না উন্নতি হইতেছে ততদিন সমস্ত দেশ পশ্চাতে পড়িয়া থাকিতে বাধ্য। দুইটা, পাঁচটা উকীল, ডেপুটী, জজে কিছুই হইবে না। শিল্পে উন্নত কলকারখানাপ্রধান বিলাত ও আমেরিকার দেখাদেখি আর এক অনিষ্টকর বিভাগের প্রচলন এদেশেও শুরু হইয়াছে। ইহা শ্রমিক ও ধনিক। জাতিসরে (League of Nations) ইহা এক প্রধান আলােচনার বিষয়। ইহার জন্য বড় বড় আপিস হইয়াছে ; বহু পণ্ডিত গবেষণা ও অনুসন্ধান করিতেছেন। আমাদের দেশেও ইহার এক শাখা বসিয়াছে। কিন্তু এই সকল শ্রমিক অপেক্ষাও দরিদ্র এবং সংখ্যায় বহুগুণে অধিক কৃষিজীবীর জন্য কি হইতেছে? শ্রমিকের পরের কাজ করে। একত্রীভূত হইয়া ধর্মঘট করিয়া ধনিক এবং নিজেদের ও সমুহ আর্থিক ক্ষতি করিতে পারে। তাই তাহাদের এত আদর আব্দার। শ্রমিকেরা দরিদ্র, তাদের অবস্থার উন্নতি সুখের বিষয়। তুলনায় কৃষিজীবীদের জন্য চেষ্টা কম হইতেছে ইহা বলাই আমার উদ্দেশ্য। ইহার প্রতিকার আবশ্যক। আমাদের দেশে প্রত্যেক চারিজনের মধ্যে তিনজন কৃষিজীবী, অতএব প্রকৃত বিভাগ হওয়া উচিত কৃষিজীবী ও অকৃষিজীবী, কিন্তু কৃষিজীবীরাই এখন প্রকৃতপক্ষে অন্তরালে পড়িয়াছে। আইনসভা প্রভৃতিতে অকৃষিজীবী উকীল, মােক্তার, জমিদার ও চাকুরিয়াদিগেরই প্রাধান্য। আমাদের বিলাতী প্রভুরা শ্রমিকদিগের অন্য চিন্তা করেন এবং তাহাদের জন্য বিশেষ প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। এখন হইতে সাবধান না হইলে ভবিষ্যতে নূতন এক বিবাদের উৎপত্তি নিশ্চয়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সকল প্রচেষ্টার সাফল্যের জন্য আমাদের প্রধান, রাজনৈতিক সমস্যা প্রয়ােজন হইতেছে সহযােগে কাজ করিবার ক্ষমতা অর্জন। এই সহযােগ শিক্ষাসাপেক্ষ, মুখের কথায় হয় না। অল্প বয়স হইতে সহযােগ এবং সহযােগে কৰ্ম্ম করিতে শিক্ষা করিতে হয়, যে কাই হউক, এমন কি খেলা, খেলাতেও হারজিত আছে। হারজিত মানিয়া লওয়ার শিক্ষা একটি মস্ত শিক্ষা। আমাদের এই শিক্ষা নাই বলিয়াই রাজনীতিক্ষেত্রে এখন কি কেলেঙ্কারিই না হইতেছে। একই কৰ্ম্ম করিয়া জীবনপাত করিতে উদ্যত, কিন্তু তােমার সহিত আমার মত মিলিল না, হয়ত সামান্য করণেই, অমনি আলাদা দল গড়িয়া লইলাম। সরকারের সহিত যুদ্ধ করিতে নামিলাম, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ হইতে লাগিল নিজেদের মধ্যে। শত্রুরূপে সরকার যদি যােদ্ধাদের কাহাকেও স্বার্থসিদ্ধির জন্য সাহায্য করেন তখন কিন্তু সরকারের উপর চোখ রাঙাই এবং সরকারকে পক্ষপাতিত্ব দোষে দোষী করিয়া চীৎকারে গগন বিদীর্ণ করি। সহযােগে সহানুভূতি আসে। সুহানুভূতি ভ্ৰাতৃভাব জন্মায়। কিন্তু আমাদের শিক্ষা কি? আমরা হিন্দু, মুসলমান, ব্রাহ্মণ, বৈদ্য, কায়স্থ প্রভৃতি হাজার জাতিতে বিভক্ত হইয়া প্রথম হইতেই অসহযােগ শুরু করিয়া দিয়াছি। জ্ঞান হইৰা মাত্র বালক- বালিকার প্রথম শিক্ষা—আমি ব্রাহ্মণ, আমি কায়স্থ, আমি হাড়ি, আমি হিন্দু, আমি মুসলমান। কেহ কাহারও ছোঁয়া অন্নজল খাইবে না, এমন কি চুইলে স্নান করিয়া তবে শুদ্ধ। অসহযােগ আমাদের মজ্জাগত। পরস্পরের সহিত সহানুভূতি ও ভ্রাতৃভাব আসিবে কোথা হইতে। ভ্ৰাতৃভাব ও সহানুভূতি ব্যতীত মিলিয়া এক হইব কিরূপে? এই যে বিভিন্নতার ভাব ইহা একদিনে জন্মে নাই এবং একদিনেই দূর হইবারও নয়। পরস্পর পরস্পরকে ঘৃণা এবং অবিশ্বাসের ভাব কেবল শিক্ষা এবং মেলামেশার দ্বারাই দুর হওয়া সম্ভব। শিক্ষা এমন হওয়া

১৪
বাঙ্গালার সমস্যা
উচিত যাহাতে দেশাত্মবােধ জাগরিত হয়। এইরূপ শিক্ষার
বিশেষ প্রয়ােজন এবং এই প্রয়ােজনের কথা অনেকেই জানেন,
বলিয়াছেন ও বলিতেছেন। ইহার ব্যবস্থা কিরূপে হইতে পারে পরে
বলিতেছি।

শিক্ষা-সমস্যা এই পর্যন্ত যে সকল সমস্যার আলােচনা করিয়াছি সে সকলেরই সমাধানের উপায় উপযুক্ত শিক্ষা। অতএব উপযুক্ত শিক্ষানির্ধারণ এবং তাহার প্রচলনই সকল সমস্যার প্রধান। শিক্ষার উদ্দেশ্য ঈশ্বর মানুষকে বুদ্ধির দ্বারা অপর জীবজন্তু হইতে পৃথক করিয়া দিয়াছেন। এই বুদ্ধিবৃত্তি দ্বারা ভালমন্দ, ভূতভবিষৎবৰ্ত্তমান এবং অগ্রপশ্চাৎ চিন্তা করিয়া কাৰ্য করা যায়। ঈশ্বরই যদি খাদ্য ইত্যাদি মানুষের সমস্ত প্রয়ােজনীয় জোগাড় করিয়া দিবেন তাহা হইলে মানুষের হাত, পা, মন, বুদ্ধি দিতেন না। আমরা যদি এই বুদ্ধির সদ্ব্যবহার না করিয়া বসিয়া থাকি, বুদ্ধি কাজে লাগাইবার চেষ্টা না করি তাহা হইবে ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাৰ্য্য করি। শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হইতেছে এই বুদ্ধিবৃত্তির এবং সকল নরনারীর ভিতর যে অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আছে তাহার বিকাশ দ্বারা যাহা-কিছু প্রয়ােজনীয় কাৰ্য্য সাধন অতএব যে শিক্ষা স্বাধীন চিন্তাশক্তি এবং কার্যকারিণী শক্তির চালনা শিক্ষা না দেয় তাহা শিক্ষাই নহে। স্বাধীন চিন্ত। অর্থে যথেচ্ছাচার নহে। আমি যাহা বুঝি তাহা হয়ত ভুল। অপরেরও এই সম্বন্ধে বলিবার কি আছে তাহা শুনিয়া বিচার 1 করিয়া যাহা ঠিক তাহা গ্রহণের নামই স্বাধীন চিন্তা। শিক্ষা এই বিচার- বুদ্ধি জন্মাইবে এবং স্বাধীন ইচ্ছা প্ৰয়ােগ করিয়া কাৰ্য করিবার ক্ষমতা দিবে। দুই হাজার তিন হাজার বৎসর বা আরও বেশী পূর্বে যাহা ১০৬ বাঙ্গালার সমস্যা শাস্ত্রে লিখিত আছে তাহাই এখনও জীবনযাত্রার অপরিহার্য বিধান হইতে পারে না। মূলনীতি যাহা সত্য তাহা চিরকালই সত্য। কিন্তু কতকগুলি নীতি সাময়িক। দুই তিন হাজার বৎসর পূর্বে ভারতের যে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা ছিল তাহার সম্পূর্ণ পরিবর্তন হইয়াছে। সুতরাং শাস্ত্রের লিখিত নীতিও এখন পরিবর্তন করিতে হইবে। স্বাধীন চিন্তা দ্বারা যাহারা ইহা না করিবে তাহারাই পশ্চাতে পড়িতে বাধ্য। ইউরােপীয়েরাও এক সময় প্রাচীন শাস্ত্রের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ ছিল। এই গণ্ডী ছাড়াইয়া যখন তাহারা স্বাধীন চিন্তার দ্বারা পন্থা ঠিক করিয়া লইল এবং তদনুসারে চলিতে আরম্ভ করিল তখন হইতেই তাহাদের দ্রুত উন্নতি হইতে লাগিল। একবার ব্রহ্মদেশের এক শহর হইতে আমেরিকাবাসী এক মিশনারী-দম্পতির সহিত জাহাজে যাইতেছিলাম। তাহারা কোন একটি স্কুলের পরিচালক। মিশনারী-পত্নী, আমি হিন্দু এবং বাঙ্গালী জানিয়া কথাচ্ছলে বলিলেন, “দেখুন আমাদের স্কুলে একজন বাঙ্গালী শিক্ষক আছেন, তিনি বিএ পাশ করিয়াছেন। কিন্তু বােধ হয় আপনাদের দেশের শিক্ষারই দোষ, তিনি practical নন মােটেই (অর্থাৎ কাৰ্য উদ্ধার করিবার ক্ষমতা তাহার নাই)। আমাদের দেশে এমন ভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় যে, যে-কাজই হােক না কেন আমরা উদ্ধার করিতে সক্ষম হই।” আমাদের শিক্ষার দোষেই যে আমরা সকল কাৰ্য্য হইতে হটিয়া যাইতেছি তাহা অনেক সুলেই বলিয়াছি, পুনরুক্তি নিপ্রয়ােজন। এখন এই কুশিক্ষার প্রতিকার এবং প্রকৃত শিক্ষার প্রচলন নিতান্ত আবশ্যক। হতাশ হইবার কোন কারণ নাই; চেষ্টা দ্বারা অল্পদিনের মধ্যেই অবস্থা ফিরাইতে পারা যাইবে। চেষ্টার আবশ্যক, বসিয়া ভাবিবার সময় নাই।

শিক্ষার প্রথম সােপান দুই পাতা পড়িতে পারিলেই শিক্ষা হয় না। পড়িতে পরিবার ক্ষমতার প্রধান উদ্দেশ্যই এই হইতেছে যে, নানা বিষয়ের জ্ঞান পুস্তক হইতে অর্জন করিতে পারা যাইবে। কতকাল ধরিয়া পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞগণ কত বিষয়ের জ্ঞান ও তত্ত্ব পুস্তকে লিখিয়া রাখিয়া গিয়াছেন ভবিষ্যৎ বংশীয়দের উপকারের জন্য। পুস্তক পড়িয়া এই সকল পুঞ্জীত তত্ব সহজেই আয়ত্ত করতে এবং এই সকলকে ভিত্তিস্বরূপ করিয়া নূতন তত্ত্ব আবিষ্কার করিতে পারা যায়; মুদ্রাযন্ত্র এবং লিখনপঠন- ক্ষমতাই পৃথিবীর এত দ্রুত উন্নতি সাধন করিতেছে। লিখন পঠন- ক্ষমতাই শিক্ষা নয়, ইহা শিক্ষার সােপানস্বরূপ এবং প্রধান সােপান। এই জন্যই ইংরেজ, জৰ্মাণ, আমেরিকান জাপানী প্রভৃতি জাতি—যাহারা সাৰ্বজনিক প্রাথমিক শিক্ষার প্রচলন করিয়াছে তাহারাই—আজ পৃথিবীর জাতিসকলের মধ্যে উন্নত। দেশের সকলে লিখিতে পড়িতে পারিলে সকল বিষয়ের নূতন নূতন প্রয়ােজনীয় তত্ত্ব সকলের মধ্যে প্রচার করিতে পারা যায় ; ইহাই উন্নতির প্রধান বা একমাত্র উপায়। লিখন- পঠনে অক্ষমতা জাতীয় উন্নতির অন্তরায়। আমাদের ভিতর একশত জনের মধ্যে নব্বই জনই নিরক্ষর। এই নিরক্ষরতা দূর করিতে না পারিলে উন্নতির কোন আশা মাই। উন্নতির পরিবর্তে এখন আমরা অবনতির মুখে সবেগে চলিয়াছি। শিক্ষার বিষয়ে প্রথম সমস্যা হইতেছে সার্বজনিক লিখনপঠন- প্রথার প্রচলন। প্রাথমিক শিক্ষা সর্বসাধারণের শিক্ষনীয় করিবার জন্য এতদিন কল্পনা-কল্পনাই চলিয়া আসিতেছে। ইংরেজরা •• বাঙ্গালার সমস্যা বলিতেছেন পয়সা কোথায় ? নূতন কর ধার্য্য করিয়া পয়সা জোগাড় করিবার প্রস্তাব হইতেছে। তা-না-না-না করিতে করিতেই যে কতকাল কাটিবে তাহার ইয়ত্তা নাই। তাহার উপর সরকারী বন্দোবন্তে যে কত পয়সার অপচয় হয় তাহার ঠিকানা রাখে বা প্রতিকারের চিন্তা করে কয়জন? আল সাহেব যখন বাঙ্গালার শিক্ষা বিভাগের ডিরেক্টার তখন প্রাথমিক শিক্ষার জন্য কিছু টাকা ব্যয়ের বন্দোবস্ত হয়। এই শিক্ষা পরিচালনার জন্য প্রথমেই ইনস্পেক্টর, যাসিষ্টান্ট ইনস্পেক্টর, ডেপুটী ইনস্পেক্টর, ফ্যাসিষ্টান্ট ডেপুটা ইনস্পেক্টর, ইনস্পেক্টীং পণ্ডিত এবং তাহার নীচেও ফ্যাসিষ্টান্ট নিযুক্ত হইলেন। গ্রাম্য শিক্ষকের আয় কিন্তু সেই পূৰ্ব্ববৎ পাঁচ, সাত, আট দশ টাকা। কোথাও কোথাও পেটের ভাত ও মাত্র দুই তিন টাকা। পরিদর্শনের জ্বালায় এই সকল শিক্ষকের প্রাণান্ত। মাসের মধ্যে হয় ত পাঁচ সাত দিন পরিদর্শনই হইতেছে। কর বসাইয়া যে প্রাথমিক শিক্ষার আয়ােজন হইতেছে তাহা হইতে সকল বালক বালিকাই যে শিক্ষা পাইবে তাহা আশা করা যায় না। তা ছাড়া যেরূপ শিক্ষার এখন প্রয়ােজন আমাদের প্রাথমিক শিক্ষকশ্রেণী হইতে সেরূপ শিক্ষা দান আশা করা যায় না। শিক্ষকদেরই শিক্ষার প্রয়ােজন। আরও বিশেষ প্রয়ােজন বালক- বালিকাদের মাতাপিতাদেরও শিক্ষার। ইহার বন্দোবস্ত হইবে কিরূপে এবং কতদিনে? দেশবাসীরা সরকারের মুখাপেক্ষী না হইয়া নিজেরা উঠিয়া পড়িয়া না লাগিলে কখনও হইবে কি-না কে জানে।

শিক্ষার বিভাগ e মােটামুটি শিক্ষার্থীর বয়স অনুসারে শিক্ষার নিম্নলিখিতরূপ ভাগ করা যায়। শিশুদিগের প্রায় তের-চৌদ্দ বৎসর বয়স পর্যন্ত প্রাথমিক বা প্রথম স্তরের শিক্ষা। আমাদের পাঠশালা বা প্রাইমারী স্কুলে যে শিক্ষা দিবার চেষ্টা করা হয় জাপান প্রভৃতি দেশের প্রাথমিক শিক্ষার সহিত তাহার তুলনাই হয় না। তারপর প্রায় আঠার-উনিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত বালকবালিকাদের মধ্যশিক্ষা যাহাকে এখন secondary education বা দ্বিতীয় স্তরের শিক্ষা বলা হয়। অপর অনেক দেশে ইহ। মাটিকুলেশন পাশ করিয়াই শেষ হয়। আমাদের দেশে এখন প্রকৃতপক্ষে ইহা আই-এ, ও আই- এসসি পাশ করিয়া শেষ হয়। তারপর উচ্চশিক্ষা, সাহিত্য, অঙ্কশাস্ত্র, বিজ্ঞান, প্রভৃতি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বি-এ, এম-এ, পাশ করতে যাহা বুঝি এবং শেষ শিক্ষ। যেমন ডাক্তারী ওকালতী প্রভৃতি। সাধারণ জ্ঞানের জন্য শিক্ষা দ্বিতীয় স্তরেই শেষ হওয়া উচিত এবং ইহাকে ভিত্তি করিয়া ইহার পর ক্ষমতা, রুচি ও বুদ্ধি অনুসারে জীবিকার জন্য বিশেষ বিশেষ পথ—যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারীং, আইন, শিল্প, ব্যবসা ইত্যাদি অবলম্বন করা উচিত। সকল উন্নত দেশেই সেইরূপ বন্দোবস্ত আছে। কোন কোন দেশে, যেমন জাপানে, দ্বিতীয় স্তরের শিক্ষার আবার দুইটি ভাগ করা হয়। যাহার শিল্পবিদ্যালয় ও ব্যবসায়ে যােগ দেয় বা কলকারখানায় শিক্ষানবিশী আরম্ভ করিতে যায় ১১০ বাঙ্গালার সমস্যা তাহারা দ্বিতীয় স্তরের মধ্যভাগ (আমাদের ম্যাটিকুলেশনের সমান ) শেষ করিয়াই তাহা করিতে পারে। যাহার উচ্চশিক্ষার পথে যাইতে চায় তাহারা দ্বিতীয় স্তরের উপর ভাগ ( আমাদের আই-এ ও আই- এসসি-র সমান) শেষ করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। উপরে যে তিন স্তরের শিক্ষার কথা বলিলাম তাহার প্রথম দুই তরকে, অর্থাৎ শিশু ও বালকবালিকাদের শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষা বলিব। সাধারণ শিক্ষাই পরবর্তী বিশেষ ও উচ্চশিক্ষার ভিত্তি। সাধারণ শিক্ষা যত উৎকৃষ্ট হইবে ততই মঙ্গল। কিন্তু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ইহা এত নিম্নস্তরের করিয়া ফেলিয়াছে এবং ইহাতে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান এত অল্প হইতেছে যে, বহু চাকুরি হইতে বাঙ্গালীর হেলে হটিয়া যাইতেছে এবং বিশেষ শিক্ষাক্ষেত্রেও বাঙ্গালীর ছেলের বিস্ত হইতেছে। পাশের সার্টিফিকেটের মােহ এত বেশী যে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ভুল শােধরাইতে বহু বেগ পাইতে হইবে। আমাদের দেশেই পূর্বে এন্টন্সি পাশ করিয়াই ওকালতী, ডাক্তারী এবং নানাবিধ চাকুরির পথ অবলম্বন করা সম্ভব হইত, তাহার জন্য এখন বি-এ পাশ করিতে হয়। সাধারণ শিক্ষা শেষ করিয়াই যাহা সম্ভব তাহার জন্য বেশী সময় নষ্ট করাতে সময়ের অপব্যবহার ত হয়ই, ইহা ছাড়া জীবনগঠনের উপযােগী কালের যথােপযুক্ত সদ্ব্যবহার না হওয়াতে ভবিষ্যৎ জীবনের ক্ষতি হয়। ইহার একমাত্র প্রতিকার হইতেছে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করিবার পরই সকল দ্বার উন্মুক্ত হওয়া উচিত এবং প্রবেশ- প্রার্থীদের পাশের সার্টিফিকেটের উপর নির্ভর না করিয়া বিশেষ পরীক্ষার দ্বারা নির্বাচন হওয়া উচিত। প্রাথমিক শিক্ষা জাপান, ইংলণ্ড, অৰ্মানী, আমেরিকা প্রভৃতি শিক্ষার বিভাগ ১১১ অগ্রসর দেশে বাধ্যতামূলক এবং বিনাবেতনে সাধিত হয়। আমাদের দেশে নব্বই জন নিরক্ষর, কিন্তু এই সকল দেশে নব্বই জনেরও অধিক লিখনপঠনম। তাহা ছাড়া আমাদের দেশে পাশ করিয়া বাহির হইলেই অধিকাংশের পক্ষে শিক্ষা শেষ হয়। কিন্তু ঐ সকল দেশে শিক্ষার কাল সীমাবদ্ধ নহে। সারা জীবন ধরিয়া যাহাতে শিক্ষা চলে তাহার সমূহ চেষ্টা চলিতেছে। কারণ পূর্ণবয়স্ক নরনারী শিক্ষিত হইলেও পৃথিবীর ক্রমেই উন্নত হইতে উন্নততর গতির সমসাময়িক জ্ঞানের প্রয়ােজন ও উপকারিতা তাহারা বুঝিয়াছে। পৃথিবীর মধ্যে যে-সকল দেশ উন্নততম-যেমন জাপান, ইংলণ্ড, জৰ্ম্মানী, আমেরিকা তাহাদের মধ্যে ‘ফ্রি ইউনিভারসিটি প্রভৃতি নাম দিয়া নূতন নূতন পাঠাগার স্থাপন করিয়া, এই সকলকে কেন্দ্র করিয়া, নানারূপ বক্তৃতার আয়ােজন করিয়া, সঘবদ্ধভাবে পাঠের উৎসাহ দিয়া, নানারূপ সভা- সমিতি করিয়া, মিউজিয়াম ইত্যাদিতেও বক্তৃতাদির বন্দোবস্ত করিয়া জাতির সমস্ত পূর্ণবয়স্ক নরনারীই যাহাতে আধুনিক জ্ঞানে অগ্রসর হইতে পারে তাহার কেবল চেষ্টা নয়, যথােপযুক্ত ব্যাবস্থাও করা হইতেছে। শিশু, হইতে আরম্ভ করিয়া পূর্ণবয়স্ক নরনারী পৰ্যন্ত সকলেরই এইরূপ শিক্ষা দ্বারাই ঐ সকল জাতি উন্নত। এখন স্কুলকলেজে পড়ে এমন বাঙ্গালীর ছেলেরও সাধারণ বিষয়ে গান, যাহাকে “general knowledge” বলা হয়, বড় কম। নিজের পড়ার বই ছাড়া নানা বিষয়ের সাময়িক পত্ৰ (journals এবং magazines) এবং পুস্তক পড়া নিতান্ত দরকার। ইহা দ্বারা জ্ঞান ও মন প্রশস্ত হয় এবং চলিত কথায় যাহাকে চালাক, কর্মক্ষম, (efficient) বলে, এইরূপ চালাক হইতে বহু সাহায্য করে। ইহার জন্য পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার এবং সদ্যবদ্ধভাবে পাঠ (study ১১২ বাঙ্গালার সমস্যা circles) দরকার। সকলেই সকল রকম বই পত্রিকা ইত্যাদি কিনিতে পারে না। এই সকল পাঠাগারে কেবল মাত্র ইংলণ্ডের পত্ৰিকাদি না রাখিয়া জাপান, অষ্ট্রেলিয়া কানাডা, আমেরিকা, জর্মানী, ফ্রান্স প্রভৃতি অপর উন্নতিশীল দেশের পত্রিকাদিও রাখা উচিত। শিক্ষার মােটামুটি ভাগ হওয়া উচিত এইরূপ- প্রথম প্রাথমিক শিক্ষা, যাহা দেশের প্রত্যেক বালকবালিকার হওয়া উচিত। জাপান কিরূপ উন্নত প্রাথমিক শিক্ষার বন্দোবস্ত করিয়াছে অত্র বিস্তারিতরূপে বলিয়াছি। দ্বিতীয়, মধ্যশিক্ষা। ইহা ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করিয়াই শেষ হওয়া উচিত এবং সাধারণ জ্ঞানের জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত। জাপান কিরূপ মধ্যশিক্ষার বন্দোবস্ত করিয়াছে অন্যত্র তাহারও আভাস দিয়াছি। তৃতীয়, উচ্চশিক্ষা ও বিশেষ শিক্ষা, ডাক্তারী, ওকালতী ইত্যাদি, মধ্যশিক্ষার পরেই এই সকলের পথ খােলা থাকা উচিত। চতুর্থ, পূর্ণ বয়স্ক নরনারীর শিক্ষা। জাপান, এবং বিশেষ করিয়া ইংলণ্ডে, ইহার কিরূপ বন্দোবস্ত আছে তাহার আভাস পরে দিতেছি। শিক্ষার পদ্ধতি গ্রাম্য পাঠশালার জ্ঞান যাহাদের আছে তাহাই লক্ষ্য করিয়াছেন যে, ছোট ছেলেমেয়ে সমস্ত দিন ধরিয়া এক কোণে দাগ বুলাইতেছে, শিক্ষক মাত্র দু-পাঁচ মিনিটও দেখেন কি না সন্দেহ। ইহাদের সঙ্গে শিক্ষকের সম্বন্ধ শিক্ষাদাতারূপে কম হইলে ও দণ্ডদাতা- রূপে যথেষ্ট পরিমাণে বর্তমান। শিক্ষার সহিত প্রথম পরিচয়েই * মৎএণীত জাপানের উন্নতি হইল কিরূপে' নামক পুস্তিকা দেখুন।

শিক্ষার পদ্ধতি ১১৩ এইভাবে পাঠ এবং জ্ঞানার্জনের পক্ষে বিশেষ ক্ষতিকর হয় এবং প্রাণে একটা ভীতি জন্মাইয়া দেয়। যদি আধুনিক কিণ্ডার গার্টেন ইত্যাদি প্রথায় খেলাধূলা ও আমােদর সঙ্গে আমাদের শিক্ষা আরম্ভ হয় তাহা হইলে অল্প বয়স হইতেই শিক্ষার উপর আগ্রহ জন্মে এবং মনের ঘূর্তিরও বিকাশ হয়। আমাদের ছেলেমেয়েদের প্রথম ভাগ শেষ করিতেই বৎসরাধিক কাল কাটিয়া যায়। কিন্তু দেখিয়াছি আমার পাঁচ বৎসর বয়স্কা কন্যা তিন মাসের মধ্যেই যে-কোন বাঙ্গালা পুস্তক পড়িতে পারিত। শিক্ষার পদ্ধতি অনুসারে বালক বালিকা, যুব প্রৌঢ় সকলেই অতি অল্প সময়েই লিখনপঠনক্ষমতা অর্জন করিতে পারে। স্কুলেও যাহাতে বালক বালিকাদের প্রকৃত জ্ঞান হয় এরূপ ভাবে পাঠ বুঝাইয়া পড়ান খুব কম হয়। বহিতে পাঠের পরিমাণ না পড়াইয়াই নির্দেশ করিয়া দেওয়া হয়। পাঠাৰ্থী যেমন করিয়া হউক আয়ত্ত করিতে চেষ্টা করে। না পারুক পাঠ বলিতে থাকে। ইহার দরুণ জ্ঞান অরই হয়, তা ছাড়া বহু সময়ও বৃখা ব্যয়িত হয়। সময়ের এইরূপ অপচয়ের কুফল সম্বন্ধে শিক্ষার বিভাগের বর্ণন প্রসঙ্গে আলােচনা করিয়াছি। এই প্রসঙ্গে কলিকাতা ইয়ুনিভার্সিটি সম্বন্ধে দুই-একটা কথা বলার লােভ সংবরণ করিতে পারিতেছি না। আজকাল এই ইয়ুনিভার্সিটি নিকৃষ্ট ইয়ুনিভার্সিটির উপমাস্বরূপ হইয়া দাড়াইয়াছে। বি-এ পাশ করিয়াও একটি দরখাস্ত লিখিতে গলদঘর্ম। অপরাপর ইয়ুনিভার্সিটির অনেক ম্যাটি কুলেশন পাশ করা ছাত্রেরও ইহাদের অপেক্ষা কী আন বেশী। শুধু ইংরেজী ওনি কেন, পরলােকগত শশধর যায় মহাশয় আমাদের বি-এর মাতৃভাষা ও সাহিত্য সয়ে জ্ঞানের যাহা পরিচয় দিয়াছেন তাহা হইতে সহজেই অনুমেয় যে, সকল বিয়েই আমাদের ছাভেরা অতি ভাসা-ভাসা জ্ঞান মাত্র অর্জন করে। দেশের . ৮ ১১৪ বাঙ্গালার সমস্যা এক এখন অনেক বড় বড় চাকুরির পথ উন্মুক্ত হইতেছে। এই সকলের জন্য প্রতিযােগিতায় বাঙ্গালী ছাত্রেরা যে পশ্চাৎপদ হইতেছে তাহাতে আর আশ্চৰ্য্য কি? কিছুদিন পূর্বে ভারত-বর্ণমেন্টের রাজ-মন্ত্রী সার ক্লড, হিল পুষায় বলিয়াছিলেন, কলিকাতা ইয়ুনিভাসিটির ছেলেরা ইংরেজীতে কথা কহিতে ও ইংরেজী লিখিতে অপর ইয়ুনিভার্সিটির ছেলে অপেক্ষা নিকৃষ্ট। আমরা লজ্জায় অধােমুখ হইলাম। বিশেষ মান্দ্রাজের ছেলেরা যে অনর্গল ইংরেজীতে কথা কহিতে পারে, বাঙ্গালীর ছেলে অপেক্ষা অনেক ভাল, তাহা স্বীকার করিতেই হইবে। বিবেকানন্দ, সুরেন্দ্রনাথ, কেশব সেন প্রভৃতির স্বজাতীয়ের পক্ষে ইহা নিশ্চয়ই লজ্জার কথা। ইয়ুনিভার্সিটির কর্ণধারের ইহার প্রতিকারের উপায়স্বরূপ ইংরেজীতে ‘ডিগ্রীর প্রস্তাব করিলেন। হায় রে কপাল! ডিগ্রীর মােহই বাঙ্গালীর সর্বনাশ করিয়াছে। এই অতিসাধারণ সত্যট। কাহারও মনে উদয় হইল না যে, কথা কহিলেই কথা কহা শিখা যায়। বাঙ্গালীর ছেলে ঘরে, স্কুল, কলেজে কোথাও ইংরেজীতে কথা কয় না, কাজেই ভাল কহিতে পারে না। নিয়ম কর যে অন্তত যে কয়ঘণ্টা স্কুলকলেজে থাকিবে ততক্ষণ ইংরেজীতে কথা কহিতে হইবে। অল্প দিনের মধ্যেই সমস্ত ঠিক হইয়া যাইবে। স্কুলকলেজের কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়ে লক্ষ্য রাখিতে হইবে। তাহার না করেন, মৌখিক পরীক্ষার বন্দোবস্ত কর। যে কথা কহিতে পারিবে, ফেন্স হইবে। এই সহজ উপায় না করিয়া কথা কহার ‘ডিগ্রীর প্রয়ােজন। ইহার পর বােধ হয় বাঙ্গালীর উঠা, বসা, চলা, খাওয়ারও ডিগ্রীর প্রয়ােজন হইবে। হাঁচি-টিকটিকির বিধানে ত আমাদের সমাজ আড়ষ্ট হইয়াই রহিয়াছে ; তাহার উপর আবার এমন ডিগ্রীর দৌরাত্ম।

শিক্ষার পদ্ধতি প্রথম পরিচয়ে কথাবার্তায় এবং চালচনেই লােকের সম্বন্ধে একটা ধারণা হয় এবং এই প্রথম ধারণাই বহু কাৰ্য্য করে। অধিকাংশ বাঙ্গালীর ছেলের উপর প্রথম তাহাদের ‘গুড মনিং’এ এবং সাধারণ আড়ষ্ট ভাবে ধারণা বেশ ভাল হয় না। তাহার উপর বি-এ, বি-এসসি, পাশ করিয়াও অধিকাংশেরই নির্ভুল ইংরেজী লিখিবার অক্ষমতার দরুণ চাকুরিজীবী বাঙ্গালী বহু চাকুরি হইতে পিছাইয়া পড়িতেছে। নিভুল ইংরেজী লেখা এবং ইংরেজীতে কথা বলার প্রয়ােজন ততদিন যতদিন বাঙ্গালী চাকুরির উপর নির্ভর করিবে। জাপানের বড় বড় বৈজ্ঞানিক রথীদের ইংরেজীতে লিখিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ ও পুস্তকের ভাষা বিশুদ্ধ প্রায়ই হয় না। কিন্তু তাহাতে কি আসে যায়। পৃথিবীর সমস্ত বৈজ্ঞানিক ঐ সকল গবেষণা আগ্রহের সহিত পাঠ করে। কারণ বৈজ্ঞানিক তথ্যই গ্রহণীয়, প্রকাশ করিবার ভাষা নহে। অধিকাংশ মাড়ােয়ারী ইংরেজী জানে না। ইংরেজ প্রভৃতি ব্যবসায়ীরা তাহাদেরই ভাষা শিক্ষা করিয়া তাহাদের সহিত ভাবের আদানপ্রদান করে। তাই বলিয়া বাঙ্গালীর ছেলের পাশ করিয়াও ইংরেজীতে কথা কহিবার বা কাজ চালাইবার মত নির্ভুল ইংরেজী লিখিবার অক্ষতার ত্রুটি মার্জনীয় নহে। ছেলেরা নিজে, এবং শিক্ষা প্রণালী উভয়ই, বিশেষ করিয়া শিক্ষার প্রণালীই, ইহার জন্য দায়ী। বিদেশে ভ্রমণের সময় আমাদের ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সম্বন্ধে একটা কথা মনে হইয়াছিল। এস্থলে তাহার উল্লেখ করিতেছি। আমাদের দেশীয় কার্যে লােক নিয়ােগ করিবার সময় বিদেশীয় ডিগ্রীর প্রাধান্য স্বীকার করিয়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সমূহ ক্ষতি করিতেছি, এইগুলিকে হেয় করিতেছি। ইহার আর এক কুফল ১১৬ বাঙ্গালার সমস্যা হইতেছে যে, বহু যুবক শিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ায় বিলাতের হাই কমিশনারের আপিস হইতে শুনিয়াছি যে, বৎসরে এই জন্য ভারতের প্রায় এক কোটি টাকা বিদেশে যায়। নূতন জ্ঞানলাভের জন্য বিদেশে যাওয়া আবশ্যক বটে, কিন্তু আমাদের যুবকেরা প্রায়ই কেবল চাকুরির দিকে লক্ষ্য রাখিয়া চিরাচরিত পন্থাই অবলম্বন করে। জাপান যেমন করে সেইরূপ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদিগকেই নিযুক্ত করা উচিত এবং জ্ঞানােঙ্গতির বা উচ্চতর শিক্ষার জন্যই তাহাদিগকে বিদেশে পাঠান উচিত, বিদেশের ডিগ্রীর জন্য নয়। শিক্ষায় তাড়না ও আদর কোন কোন পরিবারে ভাল বন্দোবস্ত আছে সন্দেহ নাই, কিন্তু অধিকাংশ স্কুলেই শিশুদিগের তাড়নাই নিয়ম। ইহাতে তাহাদের মনের বিকাশ হয় না। বাপমাকে, বিশেষতঃ বাপকে, যমের মত ভয় করে। তারপর পাঠশালার গুরুমহাশয়ের শাসন। পাঠশালায় এই তাড়নায় উৎপত্তির কারণ অনেকটা শিক্ষণীয় বিষয়ের দোষে এবং বিশেষ করিয়া শিক্ষাপদ্ধতির দোষে। শিশুকে, বুঝুক না বুঝুক, কেবল মুখস্থই করান হয়। অনেক ভ্রান্ত ধারণার দরুণ আমরা বহু অনিষ্ট সাধন করি। যে ছেলের মুখে কথা নাই; শান্ত, শিষ্ট, গােবেচারীটি, যেখানে রাখিবে সজীব মাংসপিণ্ডবৎ সেখানেই বসিয়া থাকিবে, চোখে রাখিলে চোখ জুড়ায় এই শিশুই হইল দেশের আদর্শ। মনের বিকাশের আদর্শ ত এইরূপ। আবার কোন কোন গৃহস্থের গৃহিণীর মুখে শুনা যায়, আমার এই ছেলেটি লক্ষ্মী, এতটুকু খায়, অমুকটা রাক্ষস, এতগুলাে খায়। বলিষ্ঠ সন্তান গড়িবার ধারণা কিরূপ দেখুন। তার উপর স্কুলকলেজের শিক্ষায় তাড়না ও আদর ১১৭ শিক্ষা ক্রমাগত বই, নােটবুক, গৃহশিক্ষকের বুলি, শিক্ষকের নােট গলাধঃকরণ এবং পরীক্ষাগৃহে উদগীরণ, যে যত করিতে পারিবে তাহারই তত বাহাদুরী। ফল যে unpractical বি-এ, এম-এ তাহাতে আর আশ্চর্য কি? শিক্ষার অভাবে এবং দোযে বাঙ্গালীর স্বাভাবিক মনােবৃত্তির যে বিকাশ হয় না, এই কথা বলিতে আরও অনেক কথা মনে উদয় হয়। নানাদিকের চাপে বাঙ্গালা দেশের সমস্ত লােক যেন পঙ্গু হইয়া যাইতেছে। জন্মাবধি পিতামাতার ভীতি, গুরুমহাশয়ের ও শিক্ষকের ভীতি, জমিদারদের পশ্চিমা দরােয়ান এবং পুলিশের পশ্চিমা কনষ্টেবলের ভীতি, চাকুরিজীবীর আপিসের সাহেবের ভীতি, এইরূপ নানা ভীতির জন্য এবং শিক্ষার অভাবে বাঙ্গালীর এবং এমন কি যে কয়জন শিক্ষা পায় শিক্ষার দোষে তাহাদেরও জীবনের ঘূর্তি হইতে পাইতেছে না। তাহার উপর অল্পসমস্যা কি ভীষণ অবস্থায়ই উপস্থিত হইয়াছে। বালকবালিকাদের শিক্ষা এরুপ হওয়া উচিত যাহাতে তাহার কোমলমতি না হয়।• লেখাপড়ার জন্য তাড়নাই নিয়ম, কিন্তু অপর দিকে বালকবালিকাদিগকে এরূপে মানুষ করি যে, তাহারা বড় বয়স পর্যন্ত মায়ের আঁচল ধরিয়াই থাকে, ইংরেজীতে যাহাকে spoon feeding কহে। শিক্ষার সময়ে যত কষ্টসহিষ্ণু, নিজের উপর নির্ভরশীল হয় ততই ভাল। তাহারা নিজেরা কাপড় কাচিবে, দূতা বুরুশ করিবে, বিছানা করিবে, কাপড়চোপড় বই ইত্যাদি গুছাইয়া রাখিবে। হাজার অবস্থাপন্ন হইলেও চাকরের উপর নির্ভরতা শেখান উচিত নয়। আমি দৈখিয়াছি বি-এ পড়ে এমন বয়ষ্ণপুত্র গজাপার হইয়া শিবপুর যাইবে, ইহার জন্য তাহার পিতামাতা ভাবিয়া অস্থির। এরূপ ছেলে ১১৮ বাঙ্গালার সমস্যা শিক্ষিত হইলেও তাহার দ্বারা কেরাণীগীরি বা নিয়মবধা চাকুরি ছাড়া আর কিছুই হওয়া সম্ভব নয়। ছেলে ‘ডাংপিটে হওয়া ভাল, ‘ভালমানুষ’ হওয়া ভাল নয়। আজকাল যে বাঙ্গালীর ছেলে পায়ে হাটিয়া বা সাইকেলে চড়িয়া সাহসিকতার পরিচয় দিতেছে ইহা সুলক্ষণ। শিক্ষার সময়ে দল বাঁধিয়া excursion করা, অন্যত্র গিয়া নানা জিনিষ দেখিয়া শুনিয়া, দিন কয়েক কাটাইয়া আসা ভাল। এইরূপ শিক্ষার হার। বাঙ্গালীর ছেলের ঘর-কুনােমী দূর হইবে। ঘ-কুমনামীর জন্য বাঙ্গালী প্রায় সুবিধা হইলেও অন্যত্র যাইতে নারাজ। পূর্বেই সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত বলিয়াছি লিখনপঠনক্ষমতা অর্জন শিক্ষার সােপান মাত্র। বি-এ, এম-এ পাশ করিলেও শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকিতে পারে এবং আমাদের আধুনিক প্রণালীতে ত থাকেই। নিয়লিখিত সকল বিষয়গুলিই যে শিক্ষা দ্বারা হয় না সে শিক্ষা অসম্পূর্ণ। প্রথম, ভব্যতা—সমাজে এবং সকল লােকের সহিত, এমন কি, পৃথিবীর সকল লােকের সহিত স্পষ্ট ও খােলাখুলি ভাবে কোন বিষয়েই কাহারও মনে অসন্তোষের সৃষ্টি না করিয়া মিশিবার এবং একযােগে কাজ করিবার ক্ষমতার নাম ভদ্রত।। জ্ঞানােন্মেষের পর হইতেই বালক- বালিকাদের অনেকে মিলিয়া খেলাধুলা, কাজ ও পাঠ এই ক্ষমতা সৃষ্টি করিতে সাহায্য করে। অনেকের সঙ্গে মেলামেশা না করিলে মিশিবার ক্ষমতা হয় না। মেলামেশা হইতেই সহানুভূতি হয়, সহানুভূতি বারাই সহযােগে কাজ করিবার সুবিধা হয়। সমবায়ে এবং যৌথভাবে কাজ করিবার ইহাই ভিত্তি।

সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত ১১১ অষ্ট্রেলিয়াবাসী এক বৈজ্ঞানিক জাপানে এক বৈজ্ঞানিক সভায় যােগদান করিতে গিয়াছিলেন। তিনি সভার কার্যের বিবরণ লিখিবার পূৰ্বে অপ্রাসঙ্গিক হইলেও জাপানী বালকবালিকাদের ভব্যতা জ্ঞানের ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন। ইহা যে অত্যুক্তি নয় তাহা আমি জাপানে পাঁচ মাস থাকিয়া দেখিয়া আসিয়াছি। যখনই যে-কোন জাপানীর বাড়ী গিয়াছি গৃহস্বামী, গৃহিণী, বালক বালিকা সকলেই আমাকে অল্পক্ষণের মধ্যেই আপন করিয়া লইয়াছে। এমন ভাব আর কোথাও দেখি নাই। ইহা বালক বালিকাকে শিক্ষা দেওয়া হয়। Peers বা অভিজাত বংশে এই বিষয়ে শিক্ষার এমন বন্দোবস্ত যে, যে-কোন সভাসমিতিতে মাত্র দুইটি কথা এবং চাল চলনে কাউন্ট, ভাইকাউন্টের ভব্যতা প্রকাশ পায়। আর বাঙ্গালায় সেদিন সিটি কলেজ-সংক্রান্ত ব্যাপারে কলেজের, অতএব বয়স্ক ছাত্রদের, তাহাদেরই শ্রদ্ধেয় বৃদ্ধ পণ্ডিত অধ্যাপক মৈত্রর প্রতি ব্যবহার কি পরিচয় দেয় ? মতের মিল হইল না বলিয়া ভব্যতা রক্ষাও নিষ্প্রয়ােজন ? রেলগাড়ীতে ভ্রমণকালে বাঙ্গালীদের মধ্যে যাহারা উচ্চশিক্ষিত বলিয়া বিবেচিত তাঁহাদেরও ব্যবহার দেখিয়া লজ্জিত হইতে হয়। যিনি উঠিয়া বসিয়াছেন গাড়ী যেন তারই নিজস্ব সম্পত্তি, অপরকে উঠিতে দিবেন না। রুগ্ন বৃদ্ধ বা স্ত্রীলােককেও, এমন কি, দুগ্ধপােষ্য শিশুকেও স্থান দিবেন না। শিক্ষিত বাঙ্গালীরাও সামান্য ক্লাব করিয়া একসঙ্গে খেলা ও গল্প করিতে পারে না, নূতন নূতন দল গড়িয়া বসে। ক্লাব সম্বন্ধে আর একটা কথাও এখানে বলা প্রয়ােজন। ক্লাব করিয়া নিয়মিত চাঁদা না দিলে যে ক্লাব চলিতে পারে না একথা অনেকেই বুঝেন না। অতএব বাঙ্গালীর ক্লাব বাঙ্গালীর শৈথিল্যের নিদর্শনস্বরূপ চলিতে থাকে কি ভাঙ্গিয়া যায়।

১২০ বাঙ্গালার সমস্যা । উপরে যে দলাদলির কথা বললাম দেশের সর্বত্রই ইহা বিদ্যমান। বাঙ্গালী দূরদেশে গেলেও দলাদলির ভাব ত্যাগ করিতে পারে না। এই দলাদলি অধিকাংশ স্কুলে ব্যক্তিবিশেষের কলহপ্রিয়তা ও তজ্জনিত আক্রোশ হইতে উৎপন্ন হয়। কতক একদিকে এবং কতক অপর দিকে । যােগ দিয়া দল পাকাইয়া তােলে এবং কলহকারী ব্যক্তিদের আক্রোশ মিটাইবার যন্ত্রস্বরূপ হয়। এরূপ ক্ষেত্রে এমন অভদ্র ব্যবহার ও কাৰ্য্য ঘটে যে, বিদেশে সমস্ত বাঙ্গালীজাতির কলঙ্ক হয়। শিক্ষাপ্রাপ্ত চাকুরিয়া বাঙ্গালীদের মধ্যেই এই ব্যাপার বেশী ঘটে। ইহা স্বাধীন চিন্তা, সৎসাহস ও ভব্যতা জ্ঞানের অভাব এবং ক্ষুদ্রচিত্ততার পরিচায়ক। ইহার কুফল হইয়াছে এই যে, বাঙ্গালী সঙ্গতিপন্ন হইলেও অতি অল্প স্থলেই সমাজের হিতকর কোন প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে পারে এবং তাহাও আবার পরে দলাদলির জন্ম হয় পঙ্গু হইয়া থাকে, না হয় ভাঙ্গিয়া যায়। যেখানেই শিখে যায় ছােটবড় সব স্থানেই গুরুদ্বারা স্থাপন করে। এদেশের বহুস্থানে গুরুদ্বারা আছে। হংকঙে পাঁচ জন শিখ পুরুষ ও রমণী ভ্যানকুভার যাইবার পথে জাহাজ হইতে নামিল। এক বৃহৎ নৌকা গুরুরার পতাকা উড়াইয়া আসিয়া তাহাদিকে লইয়া চলিল। আর্যসমাজীরা যেখানে যায় স্কুল ও মন্দির স্থাপন করে। অপর প্রদেশীয় মুসলমান মাত্র কয়েকজন হইলেও মসজিদ ও স্কুল গড়িয়া তুলে। দলাদলির আর এক কুফল এই যে, বাঙ্গালী কোথাও সঙ্ঘবদ্ধভাবে থাকে না বলিয়া নানা ভােগ করে। যখন এই কথা লিখিতেছি তখন ব্ৰহ্মদেশে নানা কারণে বাঙ্গালীদের অত্যন্ত বদনাম হইয়াছে। ইত্যাদি হইতে বেশীর ভাগ বাঙ্গালীই বিতাড়িত হইতেছে। কিন্তু ইহাদের জন্য একটা কথা বলি কোন প্রতিষ্ঠান নাই। সমগ্র ভারতীয়দের পক্ষে একমাত্র বােয়াইয়ে সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত (১২১ ব্যবসাদারদের দ্বারা গঠিত Indian Chamber of Commerce যাহা কিছু করে। অথচ ব্ৰহ্মদেশের প্রতিষ্ঠাবান এবং সঙ্গতিপন্ন উকিলদের মধ্যে বাঙ্গালীর সংখ্যাই বেশী। ইংলণ্ডের কেম্বুিজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা অনেকেই জানেন। এই দুইটি প্রায় সাত শত বৎসরের পুরাতন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরে ইংলণ্ডে অনেক নূতন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হইয়াছে; কিন্তু এখনও এই দুইটিই প্রধান। ইহাদের শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হইতেছে, ভদ্রলােক (gentleman) গঠন, আর উপায় হইতেছে প্রথম সম্মিলিত ক্রীড়া, দ্বিতীয় একপ্রবাস এবং তৃতীয় অর্থাৎ সর্বনিম্ন পাঠ। অন্ততঃ কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত যে সকল যুবক ইহাদের পাশ ডিগ্রি লইয়া বাহির হইত, তাহাদের গানের প্রশস্ততা বেশ নয় ; কিন্তু এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষিত সকলেরই সুচিত্ততা, ক্ষুদ্র স্বার্থপরতা ইত্যাদি দূর হয় ইত্যাদি দূর হয় এবং সকলেই ভদ্র হইয়া বাহির হয়, নিজের চিন্তাশক্তি চালনা দ্বারা কাৰ্য্য করিবার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়, যাহার সামর্থ্য আছে সে দল গঠন ও পরিচালনার ক্ষমতা হারা দলপতি হয় আর যাহারা তাহার উপযুক্ত নয়, তাহার দলপতির আজ্ঞানুবর্তিতা শিক্ষা করে। ইটন, হনাে ইত্যাদি ইংলণ্ডের পাবলিক স্কুলেও শিক্ষার এই লক্ষ্য। এইরূপে শিক্ষিত ব্যক্তিদের যারাই ইংলণ্ড শাসিত হইয়াছে ও হইতেছে এবং ইংরেজের রাজত্ব সর্বত্র বিস্তৃত হইয়াছে। ডিউক অব, ওয়েলিংটন বলিয়াছিলেন যে, ওয়াটাণু যুদ্ধজয়ের প্রধান অস্ত্র ইটনের খেলার মাঠ, অর্থাৎ ইটন স্কুলের খেলার মাঠে যােদ্ধরা বা সৈন্নধ্যক্ষরা যে-শিক্ষা পাইয়াছিল সেই শিক্ষার জোরেই বীর নেপােলিয়নকে পরাস্ত করা সম্ভব হইয়াছিল। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ও উপরােক্ত শিক্ষার তুলনা করিলে ১২২ বাঙ্গালার সমস্যা। সহজেই বুঝা যাইবে আমাদের দলাদলির মুল কোথায়। এখন দেশের কল্যাণের অন্য সকল শ্রেণীর বালক বালিকাদের একত্রে শিক্ষার ব্যবস্থা প্রয়ােজন। হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, তেলি, ডোম প্রভৃতি সকল শ্রেণীর মধ্যে সম্ভাব, সহানুভূতি ও একসামাজিকত্ব সৃষ্টি করিতে হইবে। একসামাজিকত্ব বলিতে পরস্পরের সহিত বিবাহ প্রচলন বলিতেছি না, ঘৃণা ও বেষের অভাব এবং পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি এবং পরস্পরের সম্ভাবকেই একসামাজিকত্ব বলিতেছি। মানুষ মানুষকে অপবিত্র বা নীচ বলিয়া ঘৃণা করিবে না। দৈহিক ও চারিত্রিক অপবিত্রতাই ঘৃণার্থ। একসঙ্গে দলবদ্ধ হইয়া খেলা বা কোন কাজ করায় মানুষের মন উদার হইতে সাহায্য করে। এমন খেলা যাহা তাহা একা একার নয়, অনেকের সাহচর্যের উপর উহার হারজিত নির্ভর করে; যেমন ফুটবল, ক্রিকেট। খেলাতে হারজিত মানিয়া লইবার শিক্ষা মন্ত বড় শিক্ষা। উপরে কেজি, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইটন ইত্যাদি পাবলিক স্কুলের যে সম্মিলিত ক্রীড়ার কথা বলিয়াছি তাহাতে কি দেখিতে পাই কাহারও নিজের হারজিতে ততটা দুঃখ বা আনন্দ নাই যতটা দলের, কলেজের, স্কুলের, ইয়ুনিভার্সিটির বা দেশের হারজিতে হয়। অক্সফোর্ড, কেম্বিজের নৌকাচালন-প্রতিঘােগিতা যেরূপ সমস্ত সাম্রাজ্যের ব্যাপার, সেইরূপ কালিফর্নিয়ায় ষ্টানফোর্ড ও কালিফর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বলখেলা এবং জাপানেও ওয়াসেডা এবং কেইও বিশ্ববিদ্যালয়ের বলখেলা দেশব্যাপী ব্যাপার। ইহাতে সমাজত্মবােধ এবং দেশাত্মবােধ জন্মে এবং বাড়ে। এখন শিক্ষিত বাঙ্গালীরও মনােগত ভাব কি ? আমার এবং আমার পরিবারের হইলেই হইল, অপরে এবং সমাজ দেশ সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত গােল্লায় যাক, সে বিষয়ে চিন্তা করিয়া আমার কি লাভ? এই কারণেই ঐ সকল দেশ উন্নত, আর আমাদের দেশের অধােগতি। যতদিন না আমাদের সমাজাত্মবােধ ও দেশাত্মবােধ জন্মিতেছে ততদিন আমাদের উন্নতি নাই। ড্রিল এবং ড্রিলের প্রতিযােগিতা, সকলে কিম্বা দলে দলে ড্রিল করিয়া গ্রাম ভ্রমণ কি। গ্রাম হইতে গ্রামান্তর ভ্রমণ। পূজা- পার্বণ উৎসবের সময় বাদ্যসহ ড্রিল। এইরূপ কত রকমে মেলামেশা ও ঘনিষ্ঠ ভাব হইতে পারে। বাগান, অল্প জমীতে চাষ, পল্পী সাধন, রাস্তাঘাট, বেড়াইবার ও খেলিবার স্থান তৈয়ারী, বেড়া লাগান, কচুরী পানা উঠান ইত্যাদি কাজ ঘূর্তির সহিত সাহচর্যে করা যায়। ইহাতে সহযােগ, সহানুভূতি ও আত্মীয়তা হয় এবং সহযােগে কাজ উদ্ধার করিবার ক্ষমতা জন্মে। জাপানে দলাদলির পরিবর্তে সহযােগে কাজ করিবার রীতিই প্রবর্তিত আছে। যাহারা মাছ ধরে তাহাদের সমিতি, যাহারা চাষ করে তাহাদের সমিতি, যাহারা শিক্ষক তাহাদের সমিতি, যাহারা তীর্থে যায় তাহাদের সমিতি, এইরূপ নানা সমিতি গঠনের খা আছে। সমিতির কার্য হয়ত কেবল আলােচনা। কাজেকাজেই জাহা যাহাতে হাত দেয় তাহাতেই সাফল্য লাভ করে। আমােদ-প্রমােণ সামাজিকত্ব সৃষ্টির একটি উপায়। সকল গ্রামেই এমন আমােদ-প্রমোেদ গীতবাদ্যের প্রচলন প্রয়ােজন যাহাতে সকলেই যােগদান করিতে পারে। আমােদ-প্রমােদ, হাসি-খুশী স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ প্রয়ােজন ত বটেই, তাহা ছাড়া সহানুভূতি সৃজনের ইহা এক প্রকৃষ্ট উপায়। অতএব ইহাকে শিক্ষার একটি প্রধান অঙ্গ বলিয়া ধরা যাইতে পারে। দ্বিতীয়, আত্মশক্তিতে বিশাস ও সৎসাহস সৃষ্টি এবং উচ্চাকাঙ্গা জাগরণ—নিজের ক্ষমতার উপর এমন বিশ্বাস জন্মাইতে হইবে যে, ১২৪ বাঙ্গালার সমস্যা জগতের সকল কাজই চেষ্টা করিতে করিতে পারি, যেন কেবল নিজ পল্লী, জেলা বা দেশকেই আঁকড়াইয়া থাকিবার প্রবৃত্তি না থাকে, পৃথিবীর কোন স্থানই দূর বা অগম্য মনে না হয়, যেখানেই হউক গিয়া বসবাস ও কাজ করিবার প্রবৃত্তি যেন হয়। ইংরেজ এই গুণেই আজ পৃথিবীর চতুর্থাংশ দখল করিতে সক্ষম হইয়াছে। পৃথিবীতে এখনও এমন স্থান আছে যেখানে আমাদের বসবাসের উপায় হয় ; যেমন এই সেদিন তেজিল আহ্বান করিতেছিল। বহু জাপানী গিয়া সেখানে বসবাস আরম্ভ করিয়াছে এবং এখনও যাইতেছে। মেক্সিকো, পেরু, চিলি ইত্যাদি দেশেও জাপানীরা যাইতেছে। চীনারাও কত স্থানে গিয়া ঘরবাড়ী করিয়া বসিতেছে। এক ঘরে সঙ্কীর্ণ স্থানে অধিক লােক বাস করিলে যেমন সকলেরই স্বাস্থ্যহানি হয়, সেইরূপ প্রকৃতির নিয়ম হইতেছে, যদি কোন স্থান যত লােক পােষণ করিতে পারে, সেখানে যদি তাহার অপেক্ষা বেশী জনতা হয় তাহা হইলে খাদ্যাদির অভাবে ও রােগের বিস্তারে কতক মরিবে এবং কতক মরণােন্মুখ, হইয়া থাকিবে। ইংরেজ এবং অপরাপর পাশ্চাত্য জাতীয়ের পরে , গিয়া বৃদ্ধির সুবিধা পাইতেছে। অতএব আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকায় তাহাদের সংখ্যা দ্রুতগতিতে দয়া চলিয়াছে। আমাদের বাহিরে যাইবার ইচ্ছাও নাই এবং সুবিধাও অর, কিন্তু চেষ্টা ও ইচ্ছ। থাকিলে নিশ্চয়ই স্থান পাওয়া যাইতে পারে। দুনিয়ার খবর এবং মন প্রশস্ত হয় এমন শিক্ষা পাইলে এই ইচ্ছা ও চেষ্টা সহজেই হইবে। এখনও শিক্ষাপ্রাপ্ত বাঙ্গালী ঘর হইতে বাহির হইয়া উন্নতির চেষ্টা না করিয়া আত্মীয়ের গলগ্রহ থাকিতে না বােধ করে না। এই প্রসঙ্গে বলিয়া রাখি কোন কোন শ্রেণীর লােক বিদেশে আদরিত হয় এবং হইৰে। কেরাণী, উকিল, এমন কি শ্রমিকও গৃহীত হইবে সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত २० না। সকল দেশই চায় কৃষকশ্রেণীর লােক যাহারা কৃষির উন্নতি করিতে পারে। জাপানী কৃষকশ্রেণীর স্থায় শিক্ষাপ্রাপ্ত, এরূপ শ্রম- সহিষ্ণু এবং নির্দোষ কৃষক বােধ হয় খুব কম দেশেই আছে। ভারতীয় কৃষকও মসহিষ্ণু, নির্দোষ ও নৈতিক চরিত্রে উন্নত এবং কপটুতায়ও জাপানীদের সমান হইতে পারে, কিন্তু শিক্ষার অভাবে, এমন কি, মুসলমান ধর্মাবলম্বী ভারতীয় কৃষকও অন্যদেশে গিয়া সেই দেশের লােকের সহিত মিশিতে পারিবে কি না সন্দেহ, কৃষকশ্রেণী প্রথমে আদৰিত হইলে ও তাহারা গিয়া বসবাস করিলে পরে অন্যান্য শ্রেণীর আগমনের পথ উন্মুক্ত হয়। শারীরিক পরিশ্রমের কাৰ্যে কাতর বলিয়া বাঙ্গালীর বিশেষ অখ্যাতি আছে। বনজঙ্গলে, মাঠেঘাটে, রোদ্ৰবৃষ্টিতে করিতে হয় এমন অনেক বড় বড় উচ্চ বেতনের চাকুরির পথ বাঙ্গালীর জন্য খোলা নয়। রাজপুরুষদের ধারণা বাঙ্গালী ইহার উপযুক্ত নয়। কয়েক বৎসর পূর্বে ব্ৰহ্মদেশে ইরাবতী ফ্লোটিলা কোম্পানীর খালাসীরা ধর্মঘট করে। -ব্র এই কোম্পানীর বহু জাহাজ চলে। সারেঙ ও খালাসীগণ সকলেই চট্টগ্রামবাসী মুসলমান। ধর্মঘটের সময় অনেক নৃতন লােক নিযুক্ত করিয়া জাহাজ চালাইবার চেষ্টা করা হয়। সেই সময় আমি কাৰ্যোপলক্ষে প্রােম শহরে ছিলাম। দেখিলাম কয়েকজন বাঙালী যুবকও এই কার্যে নিযুক্ত হইয়াছে। ইরাবতীর কূলে সন্ধ্যার সময় তাহাদের সহিত আলাপ হয়। আমার সঙ্গে এক ইংরেজ বণিক ছিলেন। তিনি, ‘বেঙ্গলী বাবু’রা এই কাৰ্যে অগ্রসর হইয়াছে দেখিয়া হাে হাে করিয়া প্রায় পাঁচ মিনিট ধরিয়া বিদ্রুপের হাসি হাসিলেন। মেকলে হইতে আরম্ভ করিয়া কিপলিং প্রভৃতি লেখকগণ বাঙ্গালীর বাকপটুতা, পরিশ্রমে কাতরতা, প্রকৃত কাল্পনিক বহু দোষের বাঙ্গালার সমস্যা শ্লেষাত্মক বর্ণনা তাঁহাদের পুস্তকে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। এই সকল পুস্তক পৃথিবীর যাহারা ইংরেজী জানে তাহারা, বিশেষ করিয়া ইংরেজ ও আমেরিকানরা পড়ে এবং ইহা হইতেই ‘বেঙ্গলী বাবুর ধারণা করিয়া লয়। উক্ত ইংরেজ বণিকের সহিত আলাপে বুঝিলাম ইহার ‘বেঙ্গলী বাবু’র ধারণার ভিত্তিও ইহাই। বাঙ্গালীর ভীরুতা ও সাহসিকতার অভাব কি ভাবে জগতে রাষ্ট্র হইয়াছে তাহা হয়ত সাধারণ বাঙ্গালী অনেকেই খোঁজ রাখেন না। মিস মোের ‘মাদার ইণ্ডিয়া’ নামক পুস্তক বােধ হয় পৃথিবীর এমন জাতি নাই যে পড়ে নাই। এই পুস্তক নানা ভাষায় ভাষান্তরিত হইয়াছে। ইহাতে কোন এক দেশীয় রাজার মুখ দিয়া বলা হইয়াছে--যে-দিন ইংরেজ এদেশ ছাড়িবে, সেই দিনই বাঙ্গালা দেশে একটি পয়সাও থাকিবে না এবং কোন বাঙ্গালী রমণীর সতীত্বও থাকিবে না। অপর প্রদেশীয়েরা বাঙ্গালার সমস্ত লুট করিবে, এমন কি, তাহাদের নারীদিগকেও; বাঙ্গালীরা হাঁ করিয়া দাড়াইয়া দেখিবে। পঞ্জাবের ভূতপূৰ্ব্ব লাটসাহ্নে। স্যর মাইকেল ওডায়ার ভারতবর্ষ সম্বন্ধে তাহার রচিত’ বলিয়াছেন যে, গত মহাযুদ্ধের সময় পাবের অতি ক্ষুদ্রতম জেলা হইতে যত সৈন্ত পাওয়া গিয়াছিল সমস্ত বৰদেশ হইতে তত পাওয়া যায় নাই। প্রকৃতপক্ষে বাঙ্গালী কি এতই শ্রমকাতর ও ভীরু? রৌদ্রে, বৃষ্টিতে দিবারাত্র খাটিয়া বাঙ্গালার মাটিতে সােনা ফলায় কাহারা? আমি দেখিয়াছি, বর্ষাকাল, অন্ধকার রাত্রি, দ্বারকেশ্বর নদীতে ভরাবন্ত, কিন্তু রাত্রিতেই অপর পারের গােয়ালাদের গ্রাম হইতে ঘৃত দধির প্রয়ােজন। বলিৰামাত্রই দুইজন কৃষিজীবীশ্রেণীর লােক সাঁতার কাটিয়া নদী পার হইয়া গেল ও দধি ঘৃত লইয়া পুনরায় ফিরিয়া আসিল। রূপনারায়ণের সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত ১২৭ উপরিভাগের নাম দ্বারকেশর ; নদী ক্ষুদ্র নয়। ইহাতে কেহই মনে করিল না যে, একটা কিছু বাহাদুরীর কাজ হইল। আবার এই শ্রেণীরই এক ব্যক্তিকে কোন কাৰ্যোপলক্ষে পুষায় লইয়া গিয়াছিলাম। কে তাহাকে বলিয়াছিল যে, চাষের ক্ষেতে মলত্যাগ করিলে পাহারাওয়ালা ধরিবে; অতএব যেন পায়খানা ব্যবহার করে, কিন্তু পায়খানা দেখাইয়া দেয় নাই। পরদিন সকালে উঠিয়া দেখি সে কেহ উঠিবার আগে বাড়ীর উঠানেই মলত্যাগ করিয়াছে অথচ উঠানের কোণেই পায়খানা ছিল। গ্রামে সে একজন চালাক লােক বলিয়াই খ্যাত। কিন্তু বাহিরের শিক্ষার অভাবে একেবারে জড়ভরত। কলকারখানায় এবং মােটর চালনা ইত্যাদি নানাকাৰ্য্যে কলিকাতা এবং বাঙ্গালার অন্যান্য শহরে ভিন্ন প্রদেশীয়দিগকে দেখিয়া হা-হুতাশ করি, কিন্তু যে-সব শ্রেণীর লােক এই কাজ করে বাঙ্গালার সেই শ্রেণীর লােক প্রায় পঞ্জীর বাহির হয় না। স্যর মাইকেল ওডায়ারের উপরােক্ত অভিযােগের উত্তরেও এই কথা বলা যাঁহতে পারে। পঞ্জাব, আগ্রা, অযােধ্যা, রাজপুতানা প্রভৃতির যে সক শ্রেণীর লােক সৈনিকের কাজ করে বাঙ্গালার সেই সকল শ্রেণীর লােক পাওয়া গেলে সৈন্ত কম হইবে না এবং শিক্ষিত হইলে তাহারা সাহস ও বলবীর্ষে অন্যান্য সৈনিকের অপেক্ষা হীন বিবেচিত হইবে না। ইহা নিঃসন্দেহ। আসল কথা হইতেছে যে, শিক্ষা নাই, এবং চলন নাই, ইংরেজীতে যাহাকে tradition বলে। বাঙ্গালা দেশেরই চট্টগ্রামবাসী মুসলমানগণ উৎকৃষ্ট খালাসীলঙ্কররূপে প্রসিদ্ধ। শিক্ষার অভাবে ও দােষে এবং চাকুরির আয়াসভাবের দরুণ যে শিক্ষিত এবং ভদ্ৰশ্রেণীর অধিকাংশই প্রমকাতর তাহা অস্বীকার করিবার নয়। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা পাইলে এই দোষ শীঘ্রই দূর হইবে। হইতে পারে ওভায়ার ও কিপ লিং উচ্চমন। ইংরেজশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ১২৮ বাঙ্গালার সমস্যা নয় এবং ক্ষুদ্রমন। ভারত প্রত্যাগত ইংরেজগণই জগতের সমক্ষে ভারতীয়, বিশেষতঃ বাঙ্গালীদিগকে, হীন করিবার জন্য মিস মেয়ােকে এইরূপ পুস্তক লিখিবার প্ররোচনা দিয়াছে ও সাহায্য করিয়াছে এবং যদিও উচ্চমনা ইংরেজগণ বুঝিয়াছেন মিস্ মেয়াের পুস্তক আর যাহাই করুক ইংরেজ-শাসনপ্রথার দোষই জগতের সমক্ষে স্পষ্ট করিয়া দিয়াছে। এই সকল নিন্দাবাদের প্রতিকার সম্ভাবনা কম, এমন কি নাই বলিলেও অত্যুক্তি হয় না, কাজেই বাঙ্গালীর ইহাতে বহু ক্ষতি হইয়াছে। বাঙ্গালী ফৌজের সাহায্যেই একদা ইংরেজ রাজত্বের ভিত্তি আপিত হয়। বাঙ্গালীই প্রথম রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করিয়া ইংরেজ শাসকদের অপ্রিয় হইয়া উঠে। কিপলিং প্রভৃতির বাঙ্গালী- বিদ্বেষের এই অপ্রিয়তা ও বাঙ্গালী-ভীতি। এইরূপ নানা কারণে বাঙ্গালীর এখন যুদ্ধবিভাগে স্থান নাই। বাঙ্গালার পুলিশ কনষ্টেবল পৰ্য্যন্ত ভিন্ন দেশীয়। শাসনের কড়াকড়িতে বাঙ্গালার জমিদারদের সিপাই, শড়কি, লাঠিয়াল দমিত হইয়াছে। এমন কি, এখন পল্লীগ্রামে কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণীর লােক লাঠিখেলা ইত্যাদি করিলে পাশের উৎপীড়ন হয়। এই সকল কারণে বাঙ্গালা নির্বীৰ্য্য হইয়া পড়িয়াছে। তার উপর বাঙ্গালী-ভীতি বা বাঙ্গালীর প্রতি আক্রোশবশত অপর প্রদেশের লােক বাঙ্গালীর ঈর্ষা করে এবং সর্বত্রই এখন বাঙ্গালীদের প্রতি অপ্রীতি দেখা যায়। অনেক সময়ে নানা কাজে বাঙ্গালীদিগকে বাদ দেওয়া হয়। বাঙ্গালী যদি ইহা না বুঝিয়া আত্মবিস্মৃত হয়, বাঙ্গালী, হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, সকলেই দলাদলি কলহ ভুলিয়া এক হইয়া সহযােগে বাঙ্গালার উন্নতির চেষ্টা না করে, তাহা হইলে বাঙ্গালীর আর কোন আশা নাই । অপর প্রদেশীয়ের পক্ষে বাঙ্গালীর মনই এখন বাঞ্ছনীয় হইয়া উঠিয়াছে বলিয়া মনে হয়, কিন্তু ইহার সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত প্রতিকারের জন্য এখন এরূপ শিক্ষার প্রয়ােজন হইয়াছে যাহাতে বাঙ্গালী নিজের শক্তিতে বিশ্বাস না হারায় এবং কাৰ্য্য দ্বারা জগতের সমক্ষে ঐ সকল নিকদের কথা মিথ্যা বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে পারে। অল্প বয়স হইতে সকলেই যাহাকে সব রকম কাজে হাত চালাইতে পারে এরূপ বন্দোবস্তের প্রয়ােজন। এই রকমের খেলাধূলা, দুতারের কাজ, ছােটখাট বাগান ইত্যাদি সহজেই করা যায়। এইরূপে মনে ধারণা ও বিশাস জন্মে যে সব কাজই করিতে পারি। মনের উপর কাৰ্য্য করে এরূপ অনেক বিষয় বলিয়া বুঝাইয়া দেখাইয়া শিক্ষা দেওয়া সব। বালকবালিকাদিগকে জগতের ইতিহাসের বিবরণ, উন্নতির কারণ ইত্যাদি এমনভাবে বুঝাইতে হইবে যে, তাহাদের মনে কিছু-না-কিছু করিবার অদম্যম্পৃহা জাগরিত হইয়া উঠে। বড় বড় সম্রাট, যােদ্ধা, নাবিক, পৰ্যটক, দেশ-আবিষ্কারক, বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উদ্ভাবক প্রভৃতির কাৰ্য্যের যতদূর সম্ভব নিদর্শন চিত্রে দেখাইয়া ও বিবরণ দিয়া মনে বিচাওয়া উচিত যে, তাহারাও আমাদেরই মত মানুষ এবং আমরাও এইরূপ কাজ করিতে পারি। পৃথিবীর নানাদেশের শহর, বন্দর, বড় বড় ইমারত ও পৰ্বত, জলপ্রপাত ইত্যাদি নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের চিত্র দেখাইয়া তাহাদের পরিচয় ;-নানাজাতীয় লােকের এবং তাহাদের পােষাকপরিচ্ছদ, পরিবার-পরিজন, আচাৰব্যবহারের পরিচয়সূচক চিত্র দেখাইয়া বিবরণ ;-বৃক্ষলতাদি, চা, কফি, কোকো, রবার, ইক্ষু, সিঙ্কোনা, নারিকেল ইত্যাদির চাষ—এই সকল হইতে উৎপন্ন এবং এই সকল উৎপন্নের যৌথকাবারমূলক ব্যবসায় বিবরণ; ধান, কার্পাস গম, ইক্ষু ইত্যাদি শস্যের এবং নানাবিধ ফলের নির্বাচন ইত্যাদির দ্বার উন্নতির বিবরণ, নানাদেশের এই সকল জামদানি বাঙ্গালার সমস্যা রপ্তানীর ব্যবসার বিবরণ ;-নানাদেশের জীবজন্তুর বিবরণ এবং জীবজন্তু হইতে উৎপন্ত্রের ব্যবসা যেমন অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যাণ্ডের উল, জাপানের রেশম, নানাদেশের মাংস, ডিম, দুধ, মাখনের ব্যবসা, গরুঘােড়া প্রভৃতির নির্বাচন দ্বারা উন্নতির বিবরণ, মানবের উন্নতির ইতিহাসের বিবরণ, অনুন্নত ও উন্নতজাতি সকলের তুলনা; অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আমেরিকা, আফ্রিকার জলপূর্ণ স্থান এখন কিরূপ ইন্দ্রপুরীতুল্য স্থানে পরিণত হইয়াছে তাহার ইতিহাস, পৃথিবীর অস্বাস্থ্যকর নরকতুল্য স্থান সকল কিরূপে স্বাস্থ্যকর স্বর্গে পরিণত হইতেছে তাহার চিত্র সহ বিবরণ, বড় বড় সেতু, সামুদ্রিক সংবাদবাহী তার, টানেল, জাহাজ, উড়ােজাহাজ, ডুবােজাহাজ, মােটর, বেতার এবং তাহাদের কারখানা ও নির্মাণের চিত্র সহ বিবরণ ইত্যাদি দ্বারা মন প্রশস্ত করিয়া দেওয়া এবং পৃথিবী কি ভাবে চলিতেছে তাহা বুঝাইয়া দেওয়া আবশ্যক। কোন স্থানে একেবারে না গেলেও আজকাল ছায়াচিত্র ও চলচ্চিত্রের সাহায্যে এই সকল বাস্তব বলিয়া অনুভূত হয়। এ সমস্তই আমার মৃত মানুষের কাজ। কোটী কোটী টাকার বড় বড় কারবার সরণ লােকের নিকট দশ বিশ টাকা করিয়া সংগ্রহ করিয়া চলে। পৃথিবীর সৌন্দৰ্য-সৌষ্ঠব ও উন্নতির ধারণা হইলে মনের সঙ্কীর্ণতা দূর হয় ; মনে উচ্চাশা জন্মে ; উচ্চাশাই উন্নতির মূল। শত বাধাবি ঝড়ের মুখে এক তৃণের মত উড়িয়া যায়। সামান্য কুলীমজুরের অবস্থা হইতে বড় বড় ব্যবসায়ী, ধনী, কর্মবীর ও দানবীর বাহির হইয়াছে। এইরূপ উচ্চ আদর্শই মানুষকে উন্নত করে। মানুষেরই ছেলেকে যদি অঙ্গলে পর, মধ্যে রাখ তাহা হইলে সেও পশুতুল্য হইবে। নিম্ন শ্রেণীর মধ্যে রাখ মনের ভাব আর ব্যবহার তাহাদেরই মত হইবে।

সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত ১৩১ ভদ্ৰশ্রেণীর মধ্যে রাখ ভদ্র হইবে। উন্নত জাতিসকলের মধ্যেই আমাদেরও স্থান, এই ভাব শৈশবকাল হইতে সকলের মনে গাথিয়া দেওয়া আবশ্যক। এই রূপেই কলিযুগবাদ, অদৃষ্টবাদ ও কূপমণ্ডুকত্ব দূর হওয়া সম্ভব। জগৎ কি এবং কি ভাবে চলিতেছে এবং আমরাও জগতের এক অঙ্গ ইহা ধারণা হইলে অপর অঙ্গের ন্যায় কাৰ্য্য করিবার এবং তাহাদের সমকক্ষতা লাভ করিবার প্রবৃত্তি হইবে। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রানসিস্কো হইতে নিউ ইয়র্কের পথে রেলে কয়েকজন আমেরিকান ব্যবসাদারের সহিত ভ্রমণ করিয়াছিলাম। তাঁহারা বলিলেন, আমেরিকায় আমরা ‘আমি কে এবং কি এই বিষয় চিন্তা করিয়া নিজদিগকে উন্নত করিতে চেষ্টা করি। আমার বাবা বা ঠাকুরদাদা বড় ছিলেন বলিয়া নিজেকে বড় মনে করি না। যে সকল দেশ উন্নত সে সকল দেশে নানা রকম কলকজা নির্মাণ, রেল,, রেলগাড়ী, মােটর গাড়ী প্রস্তুত, জাহাজনির্মাণ, কলকারখানা চালনা; জাহাজ চালনা, মােটর ও উড়ােজাহাজ চালনা ইত্যাদি অর্থোপার্জনের বহু পথ প্রশস্ত। আমাদের দেশে সে পথ এখনও অতি অপ্রশস্ত হইলেও ক্রমেই তাহা প্রশস্ততর হইবে। এই সকল কাৰ্য্যে তাহারাই পারদর্শী হয়, যাহারা শৈশবকাল হইতেই যে-কোন কাৰ্য্যে হাত চালাইবার কৌশল জানে। অতএব শৈশবকাল হইতেই নিজ হাতে সকল কাজ করিবার প্রবৃত্তি ও সাহস সৃষ্টি করা একান্ত আবশ্যক। তৃতীয়, জীবনের সকল কাজেই শৃঙ্খলা ও দায়িত্বজ্ঞান জন্মান। বাঙ্গালীদের সকল কাজেই ‘গহংস’ বা ‘হচ্ছে-হবে’ ভাব। কোন কাজেই শৃঙ্খলা নাই। কোনও কাজই সময়মত করিবার .

বাঙ্গালার সমস্যা আগ্রহ বা চেষ্টা নাই। কাজেকাজেই কোন কাজই আমরা সময়মত ও শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে করিতে পারি না। হচ্ছে-হবে’ ভাবের দরুণ দায়িত্বজ্ঞানও কম হয়। এই কারণে আমরা কোন ব্যাপারই বেশ ভাল করিয়া গড়িয়া তুলিতে পারি না। শৃঙ্খলার ভাব ছেলেবেলা হইতেই শিক্ষা করিতে হয় অভ্যাসের দ্বারা ইহা চরিত্রে এবং কাৰ্যে বদ্ধমূল হয়। জীবনের প্রত্যেক সাধারণ ব্যাপার,-খাওয়া, খেলা, নিদ্রা, পাঠ ও অন্যান্য আবশ্যকীয় কাজ সময়মত করিবার অভ্যাস রাখা নিতান্ত দরকার। এই অভ্যাসের দরুণ সকল কাজেই আপনা আপনিই শৃঙ্খলা আসিয়া পড়ে এবং কাজট। সময়মত হাসিল করিবার প্রবৃত্তি জন্মে। পাশ্চাত্য দেশীয়দের খাওয়া- শশাওয়াও যন্ত্রের মত চলে। জাপানও ইহা করিতেছে। দেশশুদ্ধ সকলেই এক সময়ে খায়, এক সময়ে কাজ করে এবং এক সময়ে খেলে। ইহাতে কাহারও কিছুমাত্র অসুবিধা হয় না এবং কাহাকেও অপরের জন্য অপেক্ষা করিতে হয় না। বাড়ীর চাকর পৰ্যন্ত সময়মত কাজ করিয়া দিয়া খালাস। অসময়ে প্রভু চাকরকে ডাকিবে না; কাজেই চাকরেরাও বাধ্য হইয়া সময়মত নিজের নিজের কাজ হাসিল করে। আর আমাদের চাকরেরা হচ্ছে-হবে করিয়া গড়িমসি করিয়া দিন কাটায়। আপিসের বাবুরা বাধ্য হইয়া সকাল বেলা সপ্তাহের কয়দিন সময়মত খান; রাত্রে খান বারটায় এবং ছুটির দিনে বেলা তিনটায় ও রাত্রি বারটায়। আমরা সভা-সমিতিরও সময় ঠিক রাখিতে পারি না। ‘নেটিভ টাই’ বলিয়া বিদ্রুপাত্মক কথা আমরা নিজেরাই ব্যবহার করি। মূলে এই ভাবের দরুণ আমরা অনেকেই কথায় ও কাজে কোন সামঞ্জস্য রাখিবার চেষ্টা করি না। আমাদের প্রতিদিনকার সকল কাজেই বিশৃঙ্খলা। দৈনিক বিলাতে আমেরিকায় এবং এখন জাপানেও ;

সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত থিয়েটারে বা বড় বড় বক্তৃতায় ভিড় হইবার সম্ভাবনা থাকিলে লােকে জায়গা না পাইবার আশঙ্কায় আগে হইতেই গিয়া রাস্তায় দাড়াইয়া থাকে। রেলে ট্রামে টিকিট কিনিবার সময়ও সেইরূপ সকলে পশ্চাতে পশ্চাতে দাড়াইয়া থাকে। যে পশ্চাতে আসিয়াছে সে পশ্চাতে দাড়াইবে এবং পশ্চাতে প্রবেশ করিবে। ঠেলাঠেলি নাই, ভিড় নাই। অভ্যাসের দরুণ সকল কাজেই ইহাদের শৃঙ্খলা। শৃঙ্খলা ও দায়িত্ব- জ্ঞানের জোরেই মুষ্টিমেয় ইংরেজ এত বড় হইয়াছে ও এত বড় দেশ শাসন করিতেছে এবং বড় বড় ব্যবসা কারখানা ইত্যাদিও চালাইতেছে। জাপানীরা সকল কাজই বেশ শৃঙ্খলা ও পারিপাট্যের সহিত সম্পন্ন করে। কাজেকাজেই ইহারা সকল বিষয়েই শীব্র শীঘ্র উন্নতি করে। আমি যে সকল দেশ ভ্রমণ করিয়াছি তাহাদের মধ্যে জাপানেই ক্ষেরকাৰ্য্য সর্বোৎকৃষ্ট। অপর কোন দেশের নাপিত এমন সুশৃঙ্খলার সহিত ও সুন্দরভাবে এই কাৰ্য্য করে না। এস্থলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, ঘর দ্বার পরিষ্কার করিয়া শৃঙ্খলার সহিত সাজাইয়া গুছাইয়া রাখার কথা কিছু বলা প্রয়ােজন বােধ করি। ভারতীয়েরা নোংরা বলিয়াই খ্যাত। যে-ঘরে থাকেন অনেকেই সেই ঘরে যেখানে সেখানে থুতু ফেলেন। আমাদের অবস্থাপন্ন গৃহস্থের ঘরেও শৃঙ্খলার বিশেষ অভাব। যদি ছােট ছােট ছেলেমেয়েটিকে পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন থাকিতে, সব জিনিষই সাজাইয়া গুছাইয়া রাখিতে শিক্ষা দেওয়া হয়, তাহাদের মনও সুন্দর হয়। অভ্যাস করিলেই ইহা অতীব সহজসাধ্য হইয়া যায়। আর আমার বিশ্বাস, ইহাতে সৌন্দৰ্যজ্ঞান বাড়ে। জাপানীদের ঘর ছােট এবং আসবাবপত্র নাই বলিলেই হয়। কিন্তু ইহার মধ্যে যথাস্থানে একটি চিত্র এবং টবের উপর একটি ক্ষুদ্র গাছ ১৩৪ বাঙ্গালার সমস্যা ( dwarfed plant) বা বাঁশের চোঙ্গায় সাজান কয়েকটি স্কুলের ভালই ঘরটিকে কত সুশ্ৰী করে। কোন একটি উচ্চশ্রেণীর বালিকা বিদ্যালয়ে এইরূপ ফুলের ডাল সাজান এবং এমন কি, দোয়াত কলম কাগজটি পর্যন্ত কিরূপে সাজাইয়া রাখিতে হইবে তাহার শিক্ষাপ্রণালী দেখিয়াছিলাম। কত অভিনিবেশ সহকারে এবং মনকে একাগ্র করিয়া এই কাজ করা হয় তাহা যাহারা না দেখিয়াছেন তাহাদিগকে বুঝাইতে সক্ষম হইব না। সকল কাৰ্য্যেই শৃঙ্খলার বিষয়ে জাপানীদের মনের একাগ্রতা ইহাদের সাফল্যের প্রধান উপায়। বিলাতে পার্কে বাগানে ছিন্ন কাগজপত্র, লেবুর ছাল ইত্যাদি ফেলিবার জন্য বাক্স বা খাচা রাখা আছে এবং নােটিশ দিয়া অনুরােধ করা আছে যে,যেন কেহ এখানে ওখানে কাগজ ইত্যাদি ফেলিয়া সকলের আনন্দের স্থান বাগানের সৌন্দর্যহানি না করেন। জাপানে হয়ত জলের নালার ধারে কয়েকটি মাত্র এবড়ােথেবড়াে পাথর সাজান আছে, কিন্তু তাহা এমন ভাবে যে, এই জাতির শৃঙ্খলা ও সৌন্দৰ্যজ্ঞান কত ইহা হইতেই বুঝা যায়। চতুর্থ, নৈতিক জীবন গঠন-ব্যবহারিক জীবনে নীতির সহিত ধর্ম জড়িত। হিন্দু ব্যতীত অপর তিন প্রধান ধর্মাবলম্বীমধ্যে, অর্থাৎ খৃষ্টান, মুসলমান ও বৌদ্ধদিগের মধ্যে ধর্মের তত্ত্বগুলি বাল্যকাল হইতেই শিক্ষা দেওয়া হয়। পূর্বে যাহাই হউক এখন কোনরূপ ধর্মশিক্ষ। বাঙ্গালী হিন্দুকে দেওয়া হয় না এবং ইহার বন্দোবস্তের প্রয়ােজনীয়তাও খুব কম লােকেই অনুভব করেন। দেখিয়া শুনিয়া যে যাহা শিখে তাহাই তাহার ধর্মশিক্ষা। কাজেকাজেই আদর্শ অতি উচ্চ হইলেও শিক্ষার অভাবে হিন্দুদের অধিকাংশের পক্ষেই ধর্ম এখন মাত্র আচাৰ্যবহারেই আবদ্ধ হইয়া পড়িয়াছে। খৃষ্টান ও মুসলমানেরা সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত ১০৫ } একত্রে মিলিত হইয়া ঈশ্বরর্চনা করে। ইহা পরস্পরের মধ্যে একতা ও সহানুভূতি বৃদ্ধির সহায়তা করে। হিন্দুদের দুর্গা, কালী ও অপরাপর দেবদেবীর পূজা উপলক্ষ্যে বহু লােক একত্রিত হইলেও, মাত্র জনতাই হয়; সকলেই ঈশৱাৰ্চনার ভাব লইয়া উপস্থিত হয় না। প্রায় সকলেই দর্শন করিবার উদ্দেশ্যেই যায়। ঈশ্বরাধনায় পুরােহিতরূপী দালালের বন্দোবস্ত ইহার প্রধান কারণ। সময় ও নিয়মমত একসঙ্গে বহুজনের একত্রে পুস্পাঞ্জলি দিবার বন্দোবস্ত হিন্দুগণ করিতে পারে। তবে ইহাও মাত্র সাময়িক। দেবদেবী বা অব্যক্ত ঈশ্বর, যে-যাহারই আরাধনা করুক, নিয়ম ও সময়মত প্রাত্যহিক অৰ্চনার বন্দোবস্ত বিশেষ আবশ্যক। ইহা অনেকে মিলিত হইয়া একত্রে করিতে পারিলে সর্বোৎকৃষ্ট হয় ; হিন্দুদিগের জাতিবিভাগ, শৃশ্য-অস্পৃষ্ঠের ভাৰ ইত্যাদি বহু বাধা আছে ; কেবল শিক্ষার দ্বারাই ক্রমে এই সকল দূর হইতে পারে। এখন যাহারা মিলিত হইয়। এইরূপ অর্চনা করিতে পারে, তাহাদেরই মধ্যেই ইহার ব্যবস্থা প্রচলিত উচিত। মক্তব, মসজিদের ধর্মশিক্ষায় এবং সাধারণ পাত্রীদের বাইবেল শিক্ষায় অনেকটা গোড়ামী এবং অপর ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বিশেষভাৰ সৃষ্টি করে। আবার ব্যবহারের পার্থক্যের দরুণ, এবং সাধারণ্যে প্রচলিত হিন্দুধর্ষ যখন আচার-ব্যবহারেই আবদ্ধ তখন হিন্দুদের মধ্যেও প্রচুর গোঁড়ামী রহিয়াছে স্বীকার করিতে হইবে। তাহা হইলেও বাঙ্গালা দেশে হিন্দু-মুসলমান প্রায় সর্বত্রই বেশ মেলামেশা করিয়াই বাস করে। এখন যে কোথাও কোথাও বিদ্বেষ ভাব দেখা যায় তাহা অপর প্রদেশ হইতে আনীত অথবা স্বার্থান্বেষী লােক বিশেষের প্ররােচনাজনিত। সাধারণ বিদ্যালয়ে সকল ধর্মাবলম্বী বালকৰালিকাদের একত্রে শিক্ষা বাঞ্ছনীয় এবং কিছুদিন পরে তাহা বাঙ্গালার সমস্যা হইবেই হইবে। এই সকল বিদ্যালয়ে কোন এক বিশেষ ধৰ্ম ধর্মশিক্ষারূপে শিক্ষা না দিয়া হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টীয়, বৌদ্ধ প্রভৃতি সকল ধর্মের মহান নীতিগুলি ও পুরাণাদির শিক্ষার ন্যায় রূপকভাবে শিক্ষা দেওয়া উচিত। হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, বৌদ্ধ প্রভৃতি ধর্মাবলম্বীদের অগ্রণী ও শিক্ষিত ব্যক্তিগণের মিলিত চেষ্টায় এরূপ নীতিশিক্ষার ব্যবস্থা সহজেই সম্ভব। ইহা দ্বারা ধর্মবিদ্বেষ দূর হইবে ও দেশবাসী সাধারণের মঙ্গল হইবে। প্রত্যেক বালকবালিকাকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। কোন জাতি আজ নৈতিক চরিত্রে উন্নত থাকিলেও নূতন নূতন বংশকে যদি প্রকৃত নীতি সকল শিক্ষা দেওয়া না হয়, তাহা হইলে সে জাতির নৈতিক পতন অবশ্যম্ভাবী। আমাদের হইয়াছেও তাহাই, ফলে দলাদলি কলহবিবাদ বাড়িয়া গিয়াছে। শিক্ষার অভাবে ধর্মের নামে যে অযথা কলহবিবাদ বর্তমান তাহাতে মনে হয় ধর্মশিক্ষার প্রচলনেও এখন ব্যাঘাত আসিবে। কিন্তু নীতিশিক্ষা বিষয়ে দ্বিমত হইতে পারে না এবং হওয়াও উচিত নয়। পিতামাতার প্রতি ভক্তি ও কর্তব্য, আত্মীয়স্বজনের প্রতি, সমাজের লােকদিগের প্রতি এবং ভিন্নদেশীয়দের প্রতি ব্যবহার ও কর্তব্য, সদ্ব্যবহার, সচ্চরিত্রতা, ক্ষুদ্রতা পরিহার ও উচ্চচিন্তা, মিতব্যয়িতা, বন্ধুত্ব, পারিবারিক জীবনে বিশুদ্ধতা ইত্যাদি জীবনের, সমাজের এবং দেশের হিতকর গুণাবলির সৃজন ও বিকাশকে লক্ষ্য করিয়া নীশিক্ষার বিশেষ প্রয়ােজন। পঞ্চম, স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের মােটামূটি তত্ত্বগুলির জ্ঞানার্জন-খাদ্য নির্বাচন ও ব্যবহার ইহার মধ্যে ধরিতেছি। রােগের প্রতিষেধক সাধারণ নিয়মগুলি এমন ভাবে মনে গাঁথিয়া দেওয়া প্রয়ােজন যে, সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত ১৩৭ তাহাদের নিয়মিত পালন অভ্যাস হইয়া যায়, যথা, ভাল করিয়া হাত না ধুইয়া খাদ্যদ্রব্যে হাত না দেওয়া ; খাদ্যে ধূলা পড়িতে বা মাছি ইত্যাদি বসিতে না দেওয়া। কলেরা, বসন্ত ইত্যাদি রােগের জন্য সাধারণ সতর্কতা এবং নিজেদের ও শিশুদিগের স্বাস্থ্যরক্ষা সম্বন্ধে সাধারণ নিয়মগুলিরও জ্ঞান এইরূপ প্রয়ােজনীয়। শীতের সময় গরম জলে রােজ স্নান করিলে যে সর্দি লাগিয়াই থাকে এবং শিশুদিগকে রােজ স্নান না করাইলে যে তাহাদের অসুখ বেশী হয় ইহা অনেকেরই রণার অতীত। বৈজ্ঞানিকদের মতে যাহাদের পিতামাতা দীর্ঘজীবী এবং সুস্থ, যাহারা আপন আপন দোষে শরীরে রােগের বীজ বপন না করে, যাহাদের মানসিক স্মৃতি থাকে, যাহারা পান, আহার, নিদ্রা, ইন্দ্রিয়- ভােগ প্রবৃত্তি, সকল বিষয়েই মিতাচারী; যাহারা নিয়মিত রূপে পরিমিত মানসিক ও দৈহিক ব্যায়াম করে, যাহারা যথেষ্ট পরিমাণ মুক্ত বায়ুতে জীবনযাপন করে, যাহারা ধীর ও শান্ত এবং যাহারা সকলকেই ভালবাসিতে পারে তাহারাই দীর্ঘজীবন লাভ করে। শিক্ষার দ্বারা সকলের মনে এই সকল গাথিয়া দেওয়া আবশ্যক। যষ্ঠ, ব্যায়াম—জাপান প্রভৃতি সকল দেশেই স্কুল কলেজের শিক্ষণীয় বিষয়ের মধ্যে ব্যায়ামও একটি বিষয়। জাপানে ইহা ভাল করিয়া প্রত্যক্ষ করিবার সুবিধা হইয়াছিল। প্রত্যেক স্কুলের সংলগ্ন ক্রীড়া, ড্রিল ইত্যাদির জন্য মাঠ ছাড়া, বৃষ্টি বা বরফপাতের সময় যাহাতে ব্যায়ামের ব্যাঘাত না হয় তাহার জন্য বড় বড় ব্যায়াম-হল আছে। দিনের মধ্যে অঙ্ক, সাহিত্য ইত্যাদি শিক্ষার যেমন সময় নির্দিষ্ট আছে ব্যায়ামের ও সেইরূপ সময় নির্দিষ্ট আছে। বিভিন্ন ক্লাসের শিক্ষার্থীরা তাহাদের নির্দিষ্ট সময়ে এই হলে আসিয়া ব্যায়াম-শিক্ষকের উপদেশমত ১৩৮ বাঙ্গালার সমস্যা ব্যায়াম করে। বালিকাদের স্কুলেও এই নিয়ম। টোকিওর এক উচ্চ শ্রেণীর বালিকা বিদ্যালয়ে বেলা দুইটার সময় ব্যায়াম-হলে ড্রিলের মতই বেশ দ্রুত অঙ্গচালনা, লম্ফঝম্ফপূর্বক ব্যায়াম হইতেছিল। এই স্কুলের মাঠে প্রায় এক সহষেরও উপর ছাত্রী আমার সম্মুখে তাহাদের ড্রিলের কসরৎ দেখাইয়াছিল। এক বৃহৎ নাল স্কুলে বেলা নয়টার সময় ব্যায়াম-হলে এক শ্রেণীর যুবকদের ব্যায়াম দেখিয়াছিলাম। জাপানের প্রত্যেক যুবককে দুই বৎসর সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে থাকিয়া যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করিতে হয়। নানা কষ্ট সহ্য করিতে হইলেও এই শিক্ষা সকল লােকেরই মহৎ উপকার সমস্ত শরীর শরীরগঠনের জন্য যেমন পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়ােজন, নিয়মিত ব্যায়ামেরও তেমনি প্রয়ােজন। দুই চারি দিন চলাফেরা না করিয়া যদি কেবল এইয়া থাকা যায় তারপর চলা অত্যন্ত কষ্টকর হয় ও গা টলমল করে। কোন হাত যদি না নাড়িয়া কেবল ঝুলাইয়া রাখা যায় তবে সেই হাতখানা সরু হইয়া যায়। যদি রীতিমত চালনা না হয় তাহা হইলে তাহা পুষ্ট হইতে পারে না। শরীরগঠন এবং সুস্থ রাখিবার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম নিতান্ত প্রয়ােজন। বিশেষ করিয়া বালকবালিকার যখন শরীর বৰ্দ্ধিত ও গঠিত হইতেছে তখন ব্যায়ামের প্রয়ােজনীয়তা বুঝিয়াই সকল উন্নত দেশেই শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষণীয় বিষয়গুলির মধ্যে ব্যায়ামের স্থান নির্দিষ্ট হইয়াছে। ভারতের বাহিরে গেলেই আমাদের বালক বালিকা, যুবকযুবতী, প্রৌঢ়প্রৌঢ়া সকলের দেহের গঠনের সম্পূর্ণ পুষ্টতার অভাব স্পষ্টই লক্ষ্য করা যায়। আমাদের দেশেই পর্দানশীন শ্রীমােক সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত এবং যাহারা বাহিরে চলিয়া ফিরিয়া শ্রমের কাজ করিয়া বেড়ায় এমন লােহার, ডােম, সাঁওতাল প্রভৃতি জাতির স্ত্রীলােকের দেহের গঠনের পার্থক্য সকলেরই নজরে পড়ে। বাঙ্গালা দেশের জলহাওয়ায় নিয়মিত ব্যায়ামের বিশেষ প্রয়ােজন। যেখানে অতি শীত বা বনজঙ্গল ও পাহাড়ের সহিত লােকদিগকে লড়াই করিতে হয়, বাধ্য হইয়া তাহাদের মসহিষ্ণুতা ও গড়াই করিবার ক্ষমতা বাড়ে, যেমন—খা। জাপানে প্রত্যেক শিশুর ও বালকের, এমন কি যুবকেরও অতি ছােট করিয়া চুল ছাঁটা। শিক্ষিত ভদ্রলােকদিগকে কারণ জিজ্ঞাসা করায় বলেন যে, ইহাতে ঠাণ্ডা ও রােদ লাগিয়া শিশুদের কষ্টসহিষ্ণুতা বাড়ে এবং এই জন্যই ইচ্ছা করিয়াই এইপ ছােট চুল রাখা হয়। বাঙ্গালা দেশের আবহাওয়ায় নিয়মিত ব্যায়াম দ্বারা, পরিশ্রমের কাজ দ্বারা বিশেষ করিয়া ভদ্ৰশ্রেণীর সকলেরই শরীর গঠন করা প্রয়ােজন। ব্যায়াম শিক্ষণীয় বিষয় হওয়া উচিত। সপ্তম,,সঙ্গীত-সকল উন্নত দেশেই সঙ্গীতও বিদ্যালয়ে শিক্ষণীয় বিষয় এবং আমাদের দেশেও ইহা হওয়া উচিত। সঙ্গীতের উপকারিতা সম্বন্ধে কোন আলােচনা নিয়ােজন। এমকাতরতা দূর করিতে, মনের স্মৃর্তি সম্পাদন করিতে এরূপ দ্বিতীয় উপায় নাই। ইহা ছাড়া আত্মীয়তা সৃজন এবং পরস্পরের প্রতি প্রতিবন্ধনেরও ইহা এক উত্তম উপায়। শিক্ষা করিতে পারিলে সকলের পক্ষেই সঙ্গীত জীবনের সম্পদ। শিক্ষার সময় প্রত্যেকের অন্যতঃ সীতের অ আর সহিত পরিচয় হয় এমন শিক্ষার আয়ােজনের দরকার। অষ্টম, সাধারণ জ্ঞানার্জন—ইহার অন্ত নিম্নলিখিত বিষয়গুলির শিক্ষা অতীব প্রয়ােজনীয়।

১৪০ বাঙ্গালার স্যা ( ১ ভাষা ও সাহিত্য। বঙ্গভাষার ভিতর দিয়াই ইংরেজী ব্যতীত পরীবিষয়গুলি শিক্ষা দিতে হইবে। (২) ভূগােল বা ভূপরিচয়পল্লী হইতে আরম্ভ করিয়া জেলার, বাঙ্গালার, ভারতবর্ষের এবং পৃথিবীর পরিচয়। (৩) ইতিহাস-পল্লী হইতে আরম্ভ করিয়া জেলার, বাঙ্গালার ভারতবর্ষের এবং সমস্ত পৃথিবীর সমস্ত জাতির উন্নতি-অবনতি মােটামুটি ইতিহাস। (৪) রাষ্ট্রনীতি-প্রধানতঃ দেশের শাসনযন্ত্র কিরূপে চালিত হয় এবং অন্য উন্নত দেশ সকলের শাসনযন্ত্রের সহিত মােটামুটি তুলনা। (৫) অর্থশাস্ত্র ( Economics ) ও ব্যবসায়িক ভূপরিচয়-কোন্ দেশের কি কি প্রধান উৎপন্ন এবং ঐ সকল উৎপরে ব্যবসার মােটামুটি বিবরণ এবং সাধারণ ভাবে অর্থশাস্ত্রের মােটামুটি জ্ঞান যাহাতে নানা দেশের সহিত অর্থনৈতিক সম্বন্ধে বিশেষ ধারণা হয়। (৬) অঙ্ক-পাটিগণিত, শুভঙ্করী, বীজগণিত ও জ্যামিতির প্রয়ােজনীয় স্থান। (1) জীবজন্তু ও বৃক্ষলতাদির জীবনেতিহাসের সাধারণ জ্ঞান- $1909 ( Zoology) এবং উদ্ভিদতত্ত্ব ( Botany)-বিজ্ঞানের মধ্যেই ধরা হয় এবং আমাদের দেশে এক ভুল ধারণা আছে যে, বিজ্ঞান অতি কঠিন ও সাধারণ লােকের ধারণার অতীত। এই কারণে আমাদের ম্যাটি কুলেশনে পৰ্যন্ত জীবতত্ত্ব ও উদ্ভিদতত্ত্ব শিক্ষার বন্দোবস্ত নাই। জাপানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উচ্চাঙ্গের উদ্ভিদতত্ত্ব ও জীবতত্ত্ব শিক্ষার প্রচলন হইয়াছে। উদ্ভিদ ও জীবজন্তু দ্বারা আমরা পরিবেষ্টিত রহিয়াছি এবং ইহাদের জীবনেতিহাসের জ্ঞান দ্বারা আমরা কত শিক্ষা ও আনন্দ পাইতে পারি। এই শিক্ষার সহজেই বন্দোবস্ত সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত ১৪১ করা যায়। এইরূপ শিক্ষার দরুণ জাপানীদের পারিপার্শিকের সাধারণ বস্তুর সহিত সম্বন্ধ কত ঘনিষ্ঠ এবং ইহা হইতে কত আনন্দ জাপানীরা উপভােগ করে সেই সম্বন্ধে কিছু পরিচয় দিতেছি। আমাদের দেশে কত রকমের বৃক্ষলতা, ফলফুল, জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ আমাদের চারি ধারে রহিয়াছে, কিন্তু আমরা ইহাদের প্রতি মােটেই তাকাই না। এই সকল বিষয়ে আমরা একেবারেই অন্ধ। এই সকল হইতে শিক্ষা ও আনন্দ লাভে আমরা বঞ্চিত রহিয়াছি। অপর দিকে ইহাদের সম্বন্ধে জ্ঞান আমাদের ন্যায় কৃষিপ্রধান দেশে উপকারীও বটে। অতএব এই সকলের জ্ঞানালােচনা শিক্ষণীয় বিষয়ের অঙ্গীভূত হওয়া একান্ত আবশ্যক। জাপানে প্রায় সকলেই টবের উপর নানা রকম গাছ, এমন কি, ঘাস পৰ্যন্ত জন্মাইয়া ঘরে রাখে। জাপানী পাইন গাছকে (দেবদারু জাতীয় একপ্রকার গাছ) ছােট করিয়া টবে জন্মান একটি আর্ট। এই সকলের প্রদর্শনী হয়। দুই হাত উচু গাছ হয়ত শতবর্ষের উপর এক টবে জীবিত আছে। শীতকালে অত্যন্ত ঠাণ্ডা এবং তুষার ও বরফপাতের জন্য গাছে পাতা থাকে না এবং কীটপতঙ্গ সবই নিদ্রিত থাকে। धौध পুড়িলে পুনরায় কীটপতঙ্গের বাহির হয়। তখন নানা রকমের পােকা ছােট ছােট খাঁচায় বিক্রয় করা হয়। ইহাদের মধ্যে উইচিংড়ি একটি। ছােট ছােট খাচায় উইচিংড়ি বিক্রয় হয় ও লােকে ক্রয় করিয়া বসিবার ঘরে রাখে এবং ইহারা যে চিরিক চিরিক চিরিরবংশষ করে জাপানীরা এই শব্দকে সঙ্গীত আখ্যা দিয়া এই সঙ্গীত উপভােগ করে। ইহাদিগকে রাখিবার জন্য একটি ছােট খাঁচার মূল্য কয়েক আনা হইতে চৌদ্দ পনর টাকা। কোন একটি উচ্চশ্রেণীর বালিকা বিদ্যালয় পরিদর্শন করিবার সময় গ্যাসের চুলায় রন্ধন-শিক্ষাপ্রণালী দেখিয়াছিলাম। নানা রকম খাদ্য প্রস্তুত করিয়া ইহারা আমাকে খাওয়াইয়াছিলেন। একটি মিষ্টারের ১৪২ বাঙ্গালার সমস্যা নাম ‘সূৰ্য্য এবং পাইন গাছ', একটির নাম 'শরতের চন্দ্র’, অপর একটির নাম ‘পাহাড়ের শীর্যে বরফ। ব্যবসাদার নিজের জিনিষের মার্কা দেয় পাইন গাছ’, ‘কুল গাছ’, ‘ফুজি পাহাড় ইত্যাদি। কীটপতঙ্গের জীবনেতিহাসের পরিচয়ের দরুণ যে-সকল কীট ফসল নষ্ট করে তাহাদিগের উপদ্রব হইতে ফসল রক্ষা করিবার উপায় অবলম্বন করে। ইহার অন্ত পল্লী বিদ্যালয়ের ছুটি দেওয়া হয় এবং কৃষকশ্রেণীর বালক বালিকার ক্ষেতে গিয়া পােক নাশ করে। (৮) বৈজ্ঞানিক তত্ব—ইহার মধ্যে পদার্থবিদ্যা (Physics), রাসায়নিক বিদ্যা (chemistry) এবং এই সকলের ভিত্তির উপর আধুনিক যত প্রকার বড় বড় আবিষ্কার-যেমন রেল, টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, বেতারবার্তা, মােটর গাড়ী, উড়ােজাহাজ ইত্যাদি হইয়াছে, সেই সকল বুঝিবার মােটামুটি জ্ঞান। জাপানে প্রাথমিক বিদ্যালয়েও পদার্থবিদ্যা ও রাসায়নিক বিদ্যার মােটামুটি জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়। মধ্যবিদ্যালয়ে (আমাদের ম্যাটি কুলেশনের সমান ) ত এই সকল শিক্ষার উত্তম ব্যবস্থাই আছে। (৯) ইংরেজী ভাষাজ্ঞান-ঐ গুলির উপর লিখিয়া পড়িয়া বুঝিয়া কাজ চালাইবার মত ইংরেজী জ্ঞান বর্তমানে প্রয়ােজন। ইংরেজী ভাষা এখন প্রায় সার্বজনীন ভাষায় পরিণত হইয়াছে। ইংরেজীর সাহায্যে সমস্ত সভ্যদেশের সহিত কাজক, ব্যবসা ইত্যাদি চালান যাইতে পারে। জাপান, ইতালী প্রভৃতি দেশে ইংরেজী ভাষা বাধ্যতামূলক শিক্ষণীয় বিষয় সকলের তালিকাভুক্ত। ভারতবর্ষেই ভিন্ন প্রদেশীয় অনেকের সহিত ইংয়ে ব্যতীত ভাবের আদান প্রদান সম্ভব নহে এবং যাহা কিছু আধুনিক উন্নতি বা আবিষ্কার তাহা সহজেই ইংরেজীতে লিখিত পুস্তক হইতে পাওয়া যাইতে পারে।

সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত ১৪৩ এইগুলিই হইল সাধারণ শিক্ষার অঙ্গ। ইহাদের কোনটির অভাব হইলে শিক্ষা অসম্পূর্ণ। আমাদের আধুনিক শিক্ষিতদের শিক্ষা যে কত অসম্পূর্ণ তাহা সহজে বুঝা যাইবে এবং এই সব শিক্ষার বন্দোবস্ত যত ভালরূপে হইবে শিক্ষা ততই উৎকৃষ্টতর হইবে। কেবল পুস্তক হইতে সাধারণ শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয়, এমন কি, বলিতে গেলে ইহার অল্প অংশই সম্ভব। শিক্ষার্থীর বয়স অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন অংশ উপযােগী করিয়া ধাপে ধাপে শিক্ষার বন্দোবস্ত করিতে হইবে। উদ্দেশ্য হইবে জ্ঞানার্জন ও চরিত্রগঠন মাত্ৰ-পাশ করা নয়। ইতিহাস ইত্যাদির গল্প বক্তৃতার দ্বারা মনে গাঁথিয়া দিতে হইবে, কেবল পাঠ্য পুস্তক মুখস্থ করিলে ইতিহাসে জ্ঞান পূর্ণমাত্রায় অর্জিত হইতে পারে । অনুসন্ধিৎসা জাগিলে বালকবালিকারা নিজেই পুস্তক হইতে বেশি শিখিবে। উচ্চশিক্ষা সম্বন্ধে কিছু বলা প্রয়ােজন মনে করি না। উচ্চশিক্ষা জাতীয় জীবনে বিশেষ প্রয়ােজন। উচ্চশিক্ষার ভিত্তি আমাদের রহিয়াছে। উল্লিখিতরূপ সাধারণ শিক্ষার জন্য শিক্ষানুষ্ঠান গঠন কথিতে পারিলে, এমন সামঞ্জস্য ও ব্যবস্থা সহজেই হইতে পারে যাহা যারা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চশিক্ষার পথে অগ্রসর হইতে পারে। সকল বালক বালিকারই উচ্চশিক্ষার পথে অগ্রসর হওয়া নিতান্ত ভুল। দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা পাঠ বয়স্ক এবং সাধারণ লােকদিগের শিক্ষা বহু পরিমাণে সাধিত হয়। কিন্তু আমাদের নিরক্ষ- রতা যতদিন দূর, না হইবে ততদিন আমাদের দেশে ইহা আশা করা যায় না। পত্রিকাদি ছাড়া বিলাত ও জাপানে সাধারণ বয়ষ্ণদিগের শিক্ষার নানাপ্রকার বন্দোবস্তের মধ্যে কয়েকটির কিছু কিছু বিবরণ দিতেছি।

১৪৪ বাঙ্গালার সমস্যা সাধারণ লােকের এবং বয়স্কদের (এবং সেই সঙ্গে শিশু, বালক বালিকা, সকল শিক্ষার্থীরও) আধুনিক সাধারণ জ্ঞান অর্জন করিবার সুব্যবস্থা যেমন ইংলণ্ডে আছে এমন আর কোথাও দেখি নাই। ইংলণ্ডের সকল স্থানের সহিত পরিচয়ের সুবিধা আমার হয় নাই। লণ্ডন শহরের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কথাই এখানে বলিব। এখানে অনেক মিউজিয়াম ( যাহাকে আমরা যাদুঘর বলি) আছে। ইণ্ডিয়া মিউজিয়ামে ভারতবর্ষের দ্রব্যসামগ্রী যাহা সংগ্রহ আছে ভারতবর্ষে কোথাও তেমন দেখি নাই। বিজ্ঞান মিউজিয়ামে এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে যত কলকজা, যন্ত্র, ঘড়ি, তাত, মুদ্রাযন্ত্র, জাহাজ, নৌকা, বাইসাইকেল, মােটর গাড়ী, উড়ােজাহাজ, টাইপরাইটার, অঙ্ক কষিবার যন্ত্র, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ইত্যাদির এবং বেতার, টেলিফোন, টেলিগ্রাফ ইত্যাদির বৈজ্ঞানিক যন্ত্র আবিষ্কৃত হইয়াছে—সমস্তই পর পর সাজান আছে। এই সকল বিষয়ে এত্যহ বক্তৃতা দেওয়া হয়। বক্তৃতার বিষয় পূর্ব হইতে বিজ্ঞাপিত হয়। কয়েকজন মিলিয়া কোন বিষয়ের জ্ঞানের জন্য বক্তৃতার আবেদন করিলে তাহার ও বন্দোবস্ত করা হয়। বৃটিশ মিউজিয়ামেও এইরূপ করা হয়। Imperial Institute নামে যে প্রতিষ্ঠান আছে তাহাতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের নানা দেশীয় দ্রব্যের উৎপাদন-প্রণালী বুঝাইবার জন্য কঁাচা মাল হইতে পূর্ণগঠিত যন্ত্রপাতি সকলই পর পর সাজান অাছে, যেমন-ভারতের লাক্ষার চাষ ও লক্ষ। তৈয়ারি, কার্পাস চাষ, অষ্ট্রেলিয়ায় উলের চাষ ইত্যাদি। এই প্রদর্শনী ছাড়া নানা বিষয়ের বক্তৃতার আয়ােজন করিয়া পূর্ব হইতে বিজ্ঞাপন দিয়া জানাইয়া দেওয়া হয় এবং এইরূপ বক্তৃতা ছাড়া দিনে প্রত্যহ চারিষার চলচ্চিত্রের সাহায্য সবকিছু দেখান হয়।

সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত ১৪৫ এই সমস্ত দেখিতে কাহারও অর্থব্যয় করিতে হয় না। যখন দরকার বােধ হয়, বিশেষতঃ স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য, বক্তৃতা দিয়া চলচ্চিত্রের বিষয় চিত্র বুঝাইয়া দেওয়া হয়। চলচ্চিত্রের সম্বন্ধেও সময় নির্দেশ করি। পূৰ্ব্ব হইতে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় এবং বিশেষ বিশেষ স্থলে, যেমন নেলসনের জীবনচরিত দেখাইবার সময়, স্কুলগুলির সহিত বন্দোবস্ত করিয়া ছাত্রছাত্রীদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া আনা হয়। ১৯৩০ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারী মাসে যে সকল বিষয়ে সিনেমা দেখান হইয়াছিল তাহার তালিকা নিম্নে দিতেছি । । ইহার কোন কোনটি দিনে চারবার করিয়া কয়েক দিন ধরিয়া দেখান হয়। নেলসনের জীবনী সাতদিন দেখান হইয়াছিল। আবার কোনটি কেবল একদিন দেখাইয়াই বন্ধ করা হয়। With Captain Scott in the Antarctic ( 1177 স্কটের সহিত উত্তরমেরু ভ্রমণ ) ২। Palavar-আফ্রিকার নিগেরিয়া প্রদেশে একজন ইংরেজ ম্যাজিষ্ট্রেটের কার্যপ্রণালীর চিত্র। চর্মকৌপীন পরা আউরা ও আগস জাতীয় অসভ্যদের রাজামহারাজারা মাত্র খাকি হাপপ্যাট এবং হাতকাটা কামিজ পরিহিত ইংরেজকর্মচারীর পায়ে লুটাইতেছে। আবার যুদ্ধের সময় মা রিভলভার লইয়া এই কর্মচারী একাই হাজার হাজার বর্শ। নিক্ষেপকারী অসভ্য যােদ্ধাদিগকে ভেড়ার পালের মত তাড়াইয়া দিতেছে। ইহার উদ্দেশ্য হইতেছে শৈশবকাল হইতেই ইংরেজ বালকের মনে আফ্রিকান, ভারতীয় প্রভৃতি জাতি সকল হইতে ইংরেজের প্রাধান্ত এবং সাম্রাজ্য শাসন ভাব জাগাইয়া দেওয়া। ৩! Nelson-আমেরিকানদের যেমন ওয়াসিংটন্ (Washington) বীর (hero), ফরাসীদের যেমন নেপােলিয়ন, ইংরেজদের সেইরূপ

১৪৬
বাঙ্গালার সমস্যা
নেস। দেশের জন্য ইহার জীবনপাত এবং আহত হইয়া
জাহাজের এক অন্ধকার কক্ষে দেশের কথা ভাবিতে ভাবিতে
ইহার মৃত্যু। বিদ্যালয়ের বালকবালিকাদিগকে আনিয়া বক্তৃতা দিয়া
বুঝাই দেওয়া হয়।
4. History of Electricity ( বিদুৎ বা বিজলীর ইতিহাস।
5. Making of a lead Pencil (লেড, পেন্সিল প্রস্তুত।
প্রণালী)
6. Denizens of the Garden (কীটপতঙ্গের জীবনী)
7. Cyprus ( সাইপ্রাস দ্বীপের উৎপন্নাদির বিবরণ)
8. Eagles of the Sea ( সামুদ্রিক ঈগলপক্ষী)
9. Australia and Tasinania (অষ্ট্রেলিয়া ও টাম্যানিয়ার
বিবরণ)
Birth of a Motor (Car ( মোটরগাড়ীর উৎপত্তি )
i. Making of a cigarette ( সিগারেট উৎপাদন।
12. Packing Eggs ( ডিম পাক করার প্রণালী )
13
New Zealand (নিউজিল্যাণ্ডের বিবরণ)
14. The cheese Industry ( পনির উৎপাদন)
1. Gollen Eagle ( সোনার ঈগল )
16. With Cobham Round Africa ( in Aeroplane )
উড়োজাহাজে কবহামের সহিত আফ্রিকা ভ্রমণ—ইহাতে আফ্রিকা-
বাসাঁদের চিত্রসহ কিছু পরিচয় আছে।
17. The Potter's Art ( চীনামাটির বাসন নির্মাণ )
18, Mav ing of Lead সীস। উংপাদন)
19. Manufacture of Tin Plate ( করগেট ইত্যাদি নির্মাণ
iO,

সাধারণ শিক্ষা কিরূপ হওয়া উচিত
১৪৭
22.
20. Road Transport ( মালপত্রাদি বহনের জন্য মানাদি )
21. Herring Fishery ( হেরিং মৎস্যের চাষ ও ব্যবসা)
Bee Master (মৌমাছি-পালন-প্রণালী)
23. Production of Rice । ধানের চাষ এবং চাল প্রস্তুত
প্রণালী)
24. Food for brillions (লক্ষ লক্ষ নরনারীর আহাৰ্য্য সংস্থান)
25. Canada's Fur Trade
and Timber Industry
(কানাভার লােম ও কাষ্ঠ শিল্প ও ব্যবসা)
ইহার সকল গুলি আমার দেখিবার সুযােগ হয় নাই।
মিউজিয়মগুলির মধ্যে দুই-একটির সম্বন্ধ কোন কোন বিষয়ের
উল্লেখ করিতেছি। National Portrait Gallery তে বিখ্যাত
লােকদিগের প্রতিকৃতি আছে, কোন কোন লোকের মাত্র একটি পের
রেখাকৃতি আছে, কাহারও কাহারও ছোট Plaster of Paris নামক
মাটির মূর্তি আছে। একবার গালা'র ঘুরিয়া গেলেই কত লােকের
কত কাৰ্য্যকলাপের কথা মনে উদয় হয়।
কিউ বাগানে সকল দেশের সকল প্রকার বৃক্ষলতাদি, ফলমূল ও
বীজে প্রদর্শনী আছে ও নানাপ্রকার গাছ লাগাইয়া রাখা হইয়াছে,
লােকে যাহাতে জীবন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। গরম দেশের গাছগাছড়ার
জন্য কাচের বড় বড় ঘর গরম করিয়া রাখা হইয়াছে। এইরুপ এক প্রকাণ্ড
ঘরে আমাদের দেশের প্রকও তালগাছ আছে। এই বাগানের এক
ছোট মিউজিয়মে আমাদের দেশের নীলকুঠীর এক নমুনা আছে।
ইহাতে লেখা আছে নদীয়া জেলার নীলকুঠী। কলিকাতা মিউজিয়মে
কৃষ্ণনগরে গড়া ছোট ছোট পুতুল দিয়া যেমন কালীপূজা ইত্যাদি
দেখান আছে ইহাও সেরুপ। কৌপীনপরা গ চুনাল মাখন

১৪৮ বাঙ্গালার সমস্যা . কালো কালো কারিগরদিগকে বারের মত বােধ হইতেছে। কুঠীর মধ্যে একজন জুতা দ্বারা প্রহৃত হইতেছে, আর একজন গলাধাকা খাইয়া বহিষ্কৃত হইতেছে। ইণ্ডিয়া মিউজিয়মে বাঙ্গালী কামার ও স্যাকরার নমূনা আছে। কোথাও চাষী লাঙ্গল দিতেছে। এই সকল দেগিয়াই ইংরেজ বালক বালিকার ভারতীয়দের সম্বন্ধে ধারণা জন্মে। কোথাও ভারতীয়দের ভাল চিত্র বা নমুনা দেখি নাই। কাজেকাজেই লণ্ডনে ছােট ছোট বালক বালিকা ভারতীয় দেখিলে ব্লাকি, ব্লাকি ( Blacky, Blacky ) বলিয়া বিদ্রুপ করে। শুশালা এবং জলজন্তুশালায়ও লােকের শিক্ষার বহু সুযোগ রহিয়াছে। লণ্ডনের লণ্ডনের পশুশালা ও জলজন্তুশালা যেমন সেরূপ আর কোথাও দেখি নাই। এখানেও বক্তৃতাদির বন্দোবস্ত আছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ইত্যাদি বহু উচ্চ শিক্ষায়তনে নানা বিষয়ে উচ্চাঙ্গের জ্ঞানবিস্তারের জন্য বক্তৃতাদির বহু আয়ােজন আছে এবং নিয়মিতরূপে তাহার ব্যবস্থা করা হয়। আজকাল টোকিও শহরে যেরূপ রেডিওর সাহায্যে সাধারণ শিক্ষা প্রবর্তিত হইয়াছে সেরূপ আর কোথাও দেখি নাই। মাত্র ত্রিশটি মুদ্র। হইলেই রেডিও যন্ত্র পাওয়া যায়। দোকানে, লােকের বাড়ীতে, যেখানে- সেখানে রেডিও আছে। রেডিও-কেন্দ্র হইতে সঙ্গীত ও বক্তৃতাদি প্রতিদিনই হয়। এই সকল শনিবার জন্য নিজেদের বাড়ীতে না থাকিলেও বড় বড় দোকানে বা অন্য স্থানে রেডিওর নিকট প্রায়ই জনতা হয়। সাধারণ গৃহস্থের ব্যায়ামের সুবিধার জন্য টোকিও শহরে এক জিমনাষ্টিক লীগ খােলা হইয়াছে, প্রত্যহ সকালে রেডিও-সাহায্যে এমন সঙ্গীত বা ছড়া দেওয়া হয় যে, ইহার তালে তালে ব্যায়াম করা যায়। চিত্রসহ এই ব্যায়াম প্রণালী মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়াছে।

পিতামাতা ও অভিভাবক প্রভৃতির কর্তব্য ১৪১ জাতিগঠন, জাতিকে উন্নত রাখিবার এবং উন্নততর করিবার জ কিরূপ শিক্ষার প্রয়ােজন তাহা এখন বােধ হয় কিছু বুঝাইতে সক্ষম হইয়াছি। প্রাথমিক এবং বয়স্কদিগের সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থার জন্য পরের বা গবর্ণমেন্টের মুখাপেক্ষী না থাকিয়া আমরা কিরূপে তাহার আয়ােজন করিতে পারি, জননী-প্রতিষ্ঠানের বিবরণে তাহা বলিব। যদি এই প্রতিষ্ঠান গঠন দ্বারা আমাদের বিধবা এবং যাহারা কুমারী থাকিবেন তাহাদিগকে শিক্ষা দ্বারা এই কার্যে সক্ষম ও ব্ৰতী করিতে পারি, আমার দৃঢ় ধারণা এই মহৎ কাৰ্য্য সহজেই সাধিত হইতে পারিবে। শিশুদের শিক্ষার আদর্শ এবং পিতামাতা ও অভিভাবক প্রভৃতির কর্তব্য শৈশবের ধর্ম হইতেছে দেখিয়-শুনিয়া শিক্ষা। শিশুরা বয়স্কৃদিগকে যাহা করিতে দেখে তাহাই তাহারা আদশ বলিয়া ধরিয়া লয় এবং এই আদর্শ তাহাদের জীবনে বহু কাজ করে। দেখিয়া-শুনিয়া অজ্ঞাতসারে তাহাদের যে ধারণা জন্মে তাহা পরে বাচনিক বা পুথিগত নীতিশিক্ষা দ্বারা পরিবর্তন ও দূর করা কঠিন, এমন কি, অসম্ভব বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। অতএব ভবিষ্যৎ বংশের চরিত্র গঠনে পিতামাতা, অভিভাবক ও প্রতিবেশী প্রভৃতি যে-সকল ব্যক্তির মধ্যে শিশুরা বন্ধিত হয় শিশুদিগের শিক্ষায় তাহাদের কর্তব্য কি তাহ। বিশেষ করিয়া বুঝিয়া সকলেরই সেই কর্তব্যপালনে যত্নবান হওয়া উচিত। এক পণ্ডিত বলিয়াছিলেন, ‘যদি চরিত্রবান লােক গড়িতে চাও তবে শিশুদিগকে সাত বৎসর বয়স পর্যন্ত আমার নিকটে দাও, তারপর তাহাদিগকে যেখানে ইচ্ছা রাখ। এই সাত বৎসরে চরিত্রের যে-ভিত্তি গঠিত হইবে তাহা বাঙ্গালার সমস্যা আর কখনও বদলাইবে না। সকল পিতামাতাই আপন সন্তানেরা ভদ্র, সৎ ও চরিত্রবান হয় সেই কামনাই করেন। অতএব পিতামাতার কৰ্তব্য কেবল নিজ বাড়ীতে নয়, সর্বত্র প্রতিবেশীদের সহিত, চাকর- বাকরদের সহিত, পরিচিত-অপরিচিত সকল লােকের সহিত সকল বিষয়ে ভদ্র ব্যবহার করা। শিশুকে পুস্তক হইতে পাঠ মুখস্থ করাইতেছি ‘মিথ্যা কথা বলা মহা পাপ, কিন্তু কোন অবাঞ্ছনীয় আগন্তুক আসিলে শিখাইয়া দিতেছি, বলিয়া দাও বাবা বাড়ী নাই। নিজ বাড়ীতে, প্রতিবেশীদের সহিত, পরিচিত-অপরিচিত কোন লােকের সহিত অভদ্র ব্যবহার কর', কলহ করা, উচ্চ, অপ্রিয় বা ভদ্রসমাজে অব্যবহার্য কথা পর্যন্ত ব্যবহার করা উচিত নয়। এমন বিবেচক পিতা দেখিয়াছি যিনি শিশু পুত্রকে হুঁকায় মুখ দিতে দেখিয়া নিজে তা নাক খাওয়া পরিত্যাগ করিয়াছেন এবং শিশুদিগের সঙ্গে ত নয়ই চাকর-বাকরদিগের সঙ্গও তুইতুকারি করিয়া কথা পরিত্যাগ করিয়াছেন। আবার এমন অবিবেচক পিতাও বহু দেখিয়াছি যাহারা উচ্চ বংশের গর্বে, উচ্চপদের গর্বে, অনেক স্কুলে হয়ত অসং এবং ভদ্রনের অনুচিত উপায়ে অর্জিত অর্থের গর্বে প্রতিবেশীদের প্রতি, জ্ঞাতকুটুম্বদের প্রতি, নিজেদের মনের অবজ্ঞার ভাব এমন ভাবে প্রকাশ করেন যে, সন্তানসন্ততিরাও এইভাবে সংক্রামিত হইয়া বর্ধিত হয়। এইরূপ সন্তান হয়ত অনুকূল অবস্থার জোরে উচ্চ চাকুরি পাইতে পারে, কিন্তু খুব অল্প সুলেই ভদ্র হয়। তাহারা প্রায়ই সকলের সহিত সহযােগে কাজ করিবার অযােগ্য হয় এবং দেশের ও সমাজের উপকারে প্রায়ই লাগে না। এমন কয়েকটি পরিবার দেখিয়াছি যেখানে কোন কারণে অবস্থা সচ্ছল হইলেও গার্হস্থ্য শান্তির অভাব ছিল এবং এই অশান্তির মধ্যে লালিত-পালিত সন্তানগণ শিক্ষিত হইয়াও পিতামাতা ও অভিভাবক প্রভৃতির কর্তব্য ভবিষ্যতে পিতামাতা, ভ্রাতাভগ্নী কাহারও সহিত ভদ্র ব্যবহার করে নাই। কলহপূর্ণ কিম্বা বিদ্বেষভাবপূর্ণ আবহাওয়া শিশু বালক- বালিকাদের সংশিক্ষার অনুকুল নহে। এক উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চপদাকঢ় পশ্চিম প্রদেশীয় ব্রাহ্মণের পাঁচ বৎসর বয়স্ক পুত্রকে আমার বাড়ীতে বেড়াইতে আসিয়া ‘বাঙ্গালী লােক মছলী খাতা হ্যায়, ছ্য বলিয়া থুথু ফেলিতে দেখিয়াছি । ইহার পিতার বাঙ্গালীদের প্রতি বিদ্বেষভাব বেশ প্রকাশ হইয়া পড়িত এবং শিশুপুত্রটিও সেই বিদ্বেষভাব ইয়াই বর্ধিত হইতেছে। ভাই-ভাই ঠাই ঠাই’ হইলে যে বিরােধ হয় তাহা বংশানুক্রমে চেিত থাকে। কারণ সন্তানের বিরােধপূর্ণ অবস্থার মধ্যে বর্ধিত হয় বলিয়া অন্ধবিশ্বাসের মত এই বিরােধভাৰ গ্রহণ করে। তাহাদের মধ্যে হয় ত বিরােধের কোন কারণ থাকে না। এই ভাব শৈশবাবস্থায় অজ্ঞাতসারেই সৃজিত হইয়া জীবনব্যাপী হইয়া থাকে। আমাদের মধ্যে বংশে বংশে, পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে, পূৰ্ব্ববঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গে এবং হিন্দুতে মুসলমানে বর্তমান দলাদলি ও বিরােধভাবের ইহাই হইল মুখ্য কারণ। কাহারও সহিত কাহারও দেখাসাক্ষাৎ নাই অথচ বিরােধভাব বর্তমান। ষাট বৎসরেরও অধিক বয়স্ক পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গবাসী দুই শিক্ষিত ও অবস্থাপন্ন ভদ্রলােককে প্রথম সাক্ষাৎ ও আলাপের মাত্র পনর মিনিটের মধ্যে বিনা কারণে বিরােধ ও শত্রুভাবাপন্ন হইতে দেখিয়াছি। ইহা শ্লেষপূর্ণ গালগল্প শ্রবণ বা পুস্তক পাঠ দ্বারা অজ্ঞাতসারে অর্জিত বিরােধভাবের ফক্স ছাড়া আর কিছুই নয়। দেশের কল্যাণের জন্স, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী দেশবাসীর কল্যাণের জঙ্ক, সমাজের বিভিন্ন স্তরের সকল লােকের কল্যাণের জন্য বয়স্ক নরনারী সকলের পরস্পরের প্রতি ব্যবহার এরূপ ভদ্র, কলহ, বিষেশূন্য, সহযােগ

১৫২
বাঙ্গালার সমস্যা
ও সহানুভূতিপূর্ণ হওয়া উচিত যাহা আমাদের সকল শিশুর
সম্মুখে কেবল এইরূপ আদর্শই প্রদান করিবে। ইহাই দেশবাসিগণের
সহযােগে কাজ করিবার প্রধান ভিত্তি হইবে। সহযােগ ব্যতীত
দেশের উন্নতি একেবারে অসম্ভব।

জনন-প্রতিষ্ঠান পুস্তিকার অনেক স্থলে অপর দেশের নারীদিগের ন্যায় আমাদের দেশের নারীগণও নানারূপ মহৎকাৰ্য্য সাধন করিতে পারেন বলিয়া আমার বিশ্বাসের আভাস কিছু কিছু দিয়াছি। এখনই কত নারী সমাজ ও দেশহিতকর কত কাৰ্য্য করিতেছেন তাহ। লােকে জানে । মধ্যে মধ্যে কাহারও কাহারও কথা মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এই সম্পর্কে আমার মনে হয় এখন আমাদের সমাজবিধানে বিধবা হওয়ার দরুণ যাহারা কৃপার পাত্র বলিয়া বিবেচিত হন তাহারা আমাদের দেশের জন্যই বিধাতাব দান, তাহাদিগকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়া তাহাদের স্বাভাবিক নিঃস্বার্থপরতা ও সেবাধর্মপরতা, দেশের ও দশের কাৰ্যে যদি নিয়ােজিত হয় তখন জগৎ ইহাদের কাৰ্য্যে চমৎকৃত হইয়া যাইবে এবং দেশের মহদুপকার সাধিত হইবে। ইহাদের শিক্ষা এবং সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে কার্যগ্রহণের কাৰ্যগ্রহণের বন্দোবস্ত করিবার জন্য আমি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্কল্প কবিয়াছি। আমাদের জননীদের দ্বারা এই প্রতিষ্ঠান গঠিত হইবে বলিয়া ইহার নাম জননী-প্রতিষ্ঠান রাখিতেছি। প্রতিষ্ঠানের প্রথম কায্য হইবে জননীদের শিক্ষা, এমন শিক্ষা, যেন তাহারা বালকবালিকাদের প্রাথমিক এবং গৃহস্থ বয়স্ক নর- নারীদের যে সাধারণ শিক্ষার প্রয়ােজন দেখাইয়াছি তাহার ভার গ্রহণ করিতে পারেন। তাহার উপর ধাত্রীবিদ্যা, সামান্য চিকিৎসা, বিদ্যা, স্বাস্থ্যবিদ্যা, কৃষি ও সমবায়ের জ্ঞান, গো-পালন, লাক্ষা ও রেশমকীট পালন এবং সকল ধর্মের যতদূর সম্ভব তুলনামূলক জ্ঞান ১৫৪ বাঙ্গালার সমস্যা ইত্যাদি তাহাদের শিক্ষার অন্তর্গত হইবে। কাহাকেও কাহাকেও জাপান ইত্যাদি অন্য দেশে পাঠাইয়া সহজ গৃহশিল্প ইত্যাদি শিখাইয়া আনা হইবে। সকলকে না হােক, কতকগুলিকে বয়ন ইত্যাদি শিল্পও শেখান হইবে। প্রতিষ্ঠানে একত্রে থাকিয়া শিক্ষা সাধিত হইবে। শিক্ষার পর তাঁহাদের কার্ধক্ষেত্র হইবে পল্লী। বাঙ্গালার পল্লীকে আমি যেরূপ জানি তাহাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে, গ্রামের ভদ্র গৃহস্থের আশ্রয়ে থাকিয়া তাহার অতি সমাদরে কাজ আন্ত করিতে পারিবেন। তারপর গ্রামবাসীরা যখন দেখিবে যে, ইহার। সকলের শিক্ষয়িত্রী, মঙ্গলকাক্ষিণী সুখেদুঃখে সুখেদুঃখে পরামর্শণার্থী ও সাহায্যকারিণী তখন সকলেই ইহাদিগকে জননীর ন্যায় ভক্তি ও শ্রদ্ধা করিবে। তখন জননী-প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আর চিন্তা করিতে হইবে না। গ্রামবাসীরাই জননীদের খাদ্যবস্ত্রাদির অন্য সাহায্য করিবে। গ্রামের প্রথানুসারে বিবাহ, জন্মােৎসব ও শ্রাদ্ধ উপলক্ষে জননী-প্রতিষ্ঠানও সাহায্য পাইবে। জননীদের কর্তব্য হইবে প্রতিষ্ঠানের আদর্শ বজায় রাখা এবং নিজদিগকে এমন ভাবে গঠিত করা যেন তঁাহারা তাহাদের কঠোর ব্রত প্রফুল্লচিত্তে সম্পাদন করিতে সমর্থ হন। একদিকে তঁাহারা হইবেন গ্রামবাসী সকলের জননী, সকল ধর্মাবলম্বী এবং সকল জাতিরই অননী ও নেত্রী এবং অপর দিকে সেবাধর্ম-সেবিকা। গ্রামে গ্ৰ'মে তাঁহাদের কারে সহায়ক হইবে প্রতিষ্ঠান পরি- চালিত ‘অননী’ পত্রিকা। পবিকার উদ্দেশ্য হইবে সমসাময়িক আন- বিস্তার এবং সমাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসমবায়-শিক্ষা ও ব্যবসা ক্ষে তব্য তথ্য প্রচার এবং জননী প্রতিষ্ঠানের কাৰ্য্যের পরিচয়। প্রতিষ্ঠান বা পত্রিকা রাজনৈতিক ব্যাপারে হস্থক্ষেপ করিবে না। ।

জননী-প্রতিষ্ঠান গ্রামে যাহাতে সকল জাতির বালকবালিকার একত্রে শিক্ষা হয় নীরা তার বন্দোবস্ত করবেন এবং যাহাতে সকলে মিলিয়া খেলাধূলা করে, ড্রিল করে বা কোনরূপ হিতকর কার্য সম্পাদন করে তাহাও দেখিবেন। সেইরূপ গ্রামবাসী বয়স্ক নরনারীদেরও একত্রে মিলনের ও শিক্ষার বন্দোবস্ত থাকিবে। মিলন, জননী’ পত্রিকা পাঠ, বক্তৃতা, আলােচনা ইত্যাদি দ্বারা শিক্ষা চলিতে থাকিবে। সমবায়-শিল্প ইত্যাদি গঠন ও জননীদের লক্ষ্য হইবে। জননীরা সারাজীবন জননী-প্রতিষ্ঠানেই থাকিবেন। অসুস্থ অবস্থায় ও বৃদ্ধ বয়সে জননী-প্রতিষ্ঠানই তাহাদিগকে আশ্রয়ে রাখিয়া তত্বাবধারণ করিবে এবং ইহার জন্য কার্সিং কিংবা অপর কোন উপযুক্ত স্থানে উপযুক্ত বন্দোবস্ত থাকিবে। দেশের নানা স্থানে, জেলায় জেলায় এবং কোন কোন জেলায় একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকিবে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের কী হইবেন তাহাদেরই একজন যাহাকে ‘মা-জননী বলা হইবে। সকলগুলিই এক বৃহৎ দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠানের অন্তর্গত থাকিবে যাহার কীও হইবেন ইহাদেরই একজন যাহাকে ‘মহাজনী’ আখ্যা দেওয়া হইবে। সমস্ত প্রতিষ্ঠান এই মহাজননীর কর্তৃত্বাধীনে এক পরিবার রূপে গণ্য হইবে। প্রতিষ্ঠানের সমস্ত কাৰ্যই জননীদের দ্বারা সম্পাদিত হইবে। ত্রিশ বৎসর বয়সের পূর্বে কোন জননী গ্রামে গিয়া কাৰ্য্য করিবেন না এবং কোন স্থানে দুই জনের কম জননী থাকিবেন না। কাৰ্য্যের অবিশেষে কোন গ্রামে দুই জনের বেশীও থাকিতে পারেন। জননী-প্রতিষ্ঠানের এই কাঠামাের পরিচয় ব্যতীত আর বেশী কিছু এখানে বলিবার প্রয়ােজন বিবেচনা করি না। এখন প্রথম প্রয়ােজন হইতেছে এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি স্থাপন করা ১৫৬ বাঙ্গালার সমস্যা এবং কলিকাতার নিকটবর্তী কোন স্থানে প্রথম প্রতিষ্ঠানের বন্দোবস্ত করা, যেখানে এখনই প্রথম জননীদের শিক্ষাকার্য আরম্ভ করা যাইতে পারে। শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কাৰ্য্যও চলিবে। বাঙ্গালার শিক্ষিত। নারীদিগকেই এই কাৰ্য্য গ্রহণ করিতে হইবে। এই কর্তব্যের অনুরােধে তাহাদিগকে সাদরে আহ্বান করিতেছি। তাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ জননী-ব্রত গ্রহণ করিয়া এই কার্যে হস্তক্ষেপ করিলে অল্প- বয়স্ক। বহু বিধবাকে পাওয়া যাইবে যাহাদের পিতামাতা ও অভিভাবকগণ তাহাদিগকে প্রতিষ্ঠানে পাঠাইতে দ্বিরুক্তি করিবেন না। শিক্ষিত। নারীরা জননী-ৰত গ্রহণ না করিয়াও এই ভার গ্রহণ করিলে কাৰ্যারম্ভ করা যাইতে পারে। স্বর্গীয়া কৃষ্ণভামিনী, গৌরীমাতা প্রভৃতি দেশে প্রথম জননীদের অভাব হইবে বলিয়া আমার মনে হয় না। যদি তাহাই হইত তাহা হইলে এইরূপ প্রস্তাব করিতাম না। সকল কার্যের মূল অর্থ। অর্থের কথা সৰ্বশেষে বলিতেছি, কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস এরূপ কার্য্যে অর্থের অভাব হয় না এবং হইবেও না। একবার প্রতিষ্ঠান খাড়া হইয়া উঠিলে জননীরা গ্রাম হইতে অতি সহজে কিরূপে অর্থ সংগ্রহ করিতে পারিবেন তাহা বলিয়াছি। খাড। হওয়া পর্যন্ত দেশবাসীদের বদান্যতার উপর নির্ভর করিতে হইবে। দেশবাসীদের নিকট এই প্রস্তাব উপস্থিত করিতেছি। তাহারা একবার ইহার সম্বন্ধে চিন্তা করিয়া দেখিবেন। ইহার উপকারিতা হৃদয়ঙ্গম করিলেই আর কিছুর অভাব হইবে না। এই বিষয়ে শিক্ষিত, কৃতী, সঙ্গতিপন্ন স্বাদশবাসিগণের সহানুভূতি প্রার্থনা করিতেছি। তাহাদের সহায়তা ব্যতীত কাৰ্য্য আরম্ভ করা সম্ভব হইতে পারে না। প্রতিষ্ঠানের যে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়াছি তথা হইতে জানা যাইবে জননী-প্রতিষ্ঠান যে, এই প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণরূপে জননীদের দ্বারাই পরিচালিত হইবে। 'তবে প্রথমে পুরুষের সাহায্য প্রয়ােজন। নারীর বুদ্ধি, শক্তি ও নিঃস্বার্থপরতাতে আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। এই বিশ্বাসেই আমি দৃঢ়তার সহিত এই প্রস্তাব করিতেছি। প্রতিষ্ঠান খাড়া হউক, তখন আমার ন্যায় সকলেই নারীর শক্তিতে আস্থাবান হইবেন। বাঙ্গালী পুরুষের শক্তিতেও আমার খুব বিশ্বাস আছে। প্রকৃত শিক্ষা পাইলে তাহারা সব কিছু করিতে পারেন। তবে পুরুষের দ্বারা এইরূপ প্রতিষ্ঠান গড়িবার প্রস্তাব করি নাই, কারণ পুরুষের দ্বারা বালক বালিকা এবং পল্লীর বয়স্ক স্ত্রী-পুরুষ, বিশেষ করিয়া স্ত্রীলােকগণের, শিক্ষা সেরূপ হইবার আশা নাই যেমন নারীর দ্বারা হওয়া সম্ভব। আমরা দেখিয়াছি যে, সমাজের সকল শ্রেণীর মধ্যে বিধবাবিবাহ প্রচলন হইলেও বহু বঙ্গ বিধবা পুনরায় বিবাহ করিবেন কি-না সন্দেহ। ক্রমে চির-কৌমার্য ব্ৰতাবলম্বিনীদিগের সংখ্যাও বাড়িবে। এইরূপ বিধবা ও কুমারীদের দ্বারা জননী-প্রতিষ্ঠান বলীয়ান হইবে এবং দেশের মহং উপকার সাধিত হইবে। যদি এই অননী-প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিতে পারি, তাহা হইলে দেবি জননীরা অতি অল্পদিনের মধ্যেই সকল বিষয়ে উন্নতি সাধন করিতে পারিবেন। ষে বাল্যবিবাহ, পণপ্রথা, অবরােধ-প্রথা নিবারণ এবং বিধবাবিবাহের প্রচলন জন্য বৈঠক, সভা, বক্তৃতা ইত্যাদি কত কি করিয়াও কিছু প্রতিকার হয় নাই, জননীরা যে অল্পদিনের মধ্যেই এই সকলের প্রতিকার সাধন করিবেন তাতে সন্দেহ নাই। অপর পক্ষে জননী প্রতিষ্ঠান দ্বারা বিধবা ও যাহারা চিরকুমারী থাকিবেন তাহাদের সমস্যার সমাধান কিরূপ মৎভাবে সাধিত হইতে পারে তাহা একবার স্বদেশবাসিগণকে চিন্তা করিয়া দেখিতে অনুরােধ করি।

নিজের কথা শেষে আমার নিজের কথা কিছু বলা প্রয়ােজন বিবেচনা করি। আমি গবন্মেন্টের কার্যে নিযুক্ত আছি। আর কয়েক বৎসর পরেই পেন্সন লইয়া আমি এবং আমার স্ত্রী এই কার্যে ব্রতী হইৰ এইরুপ সঙ্কল ছিল। এখন আমি মৃতদার। অতএব জননী-প্রতিষ্ঠানের কাব্যের অনেক সুবিধা হইতে বঞ্চিত হইয়াছি। প্রতিষ্ঠানের কার্যভার জননীরা গ্রহণ করিবেন। প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তুলিবার প্রচেষ্টায় আমি আমার সমস্ত সময় নিয়ােগ করিব। কাধে অবতরণ করিবার পূর্বে কয়েকজন শিক্ষিত বন্ধুর সহিত আলােচনার ফলে এবং তঁাহাদের উৎসাহে এই বিষয় স্বদেশবাসীগণের গােছর করিবার জন্ত এই পুস্তিকা প্ৰকাশ কৰিম। সহানুভূতি পাহলে এখনই কাৰ্যাপ্ত করিবার অবসর পাইব।

ভ্রম-সংশােধন পৃষ্ঠা পংক্তি সুট একটা সুবাটী একটি ২ ১৮ ব্রহ্ম 'দশের ব্রহ্মদেশে ২৩,২১ পশম পানামা ২৮ এত খাইয়ের এই কথার ৩৪ ২১ পত্তনিদারই 28 ঋণ পরিশােধের ঋণ দানের ৫৮ पाएमा সময়ে ২০ পঞ্চাশত পঞ্চাশ ২ প্রধান ইং প্রধান ৬৪ দলেও পসের ৩ এ মাকসন রিটেন ফিফুধু ম্যাককারিসন রিকে টুস কিকুয়ু • ১১ অপেক্ষা অপেক্ষা শত করা তা ভালা রুটি জাতা ভা। উপকারী যে সম্বন্ধে উপায়ী সে সম্বন্ধে সরনি স অসহাসক। অসমসাহসিকতা পৃষ্ঠা পংক্তি ১০ কারণে কারণ কারণে কারণ বাঙ্গালীর ১০৮ এবং শেষ বলিতে বাঙ্গালার এবং বিশেষ চলিতে ১১৫ ১৭ অক্ষতার অক্ষমতার ১৪ তাড়নায় তাড়নার ৯ এক প্রবাস একত্ৰবাস ১২২ যাহ। তাহা যাহ। ১২৯ ৪ ১৩৫ ১৪ যাহাকে প্রচলিত পাঠ যাহাতে প্রচলিত হওয়া পাঠে ১৪৩ ১৪ ও সাহাব। সাহায্যে

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Banglar Samasya

Author
Ghosh,charuchandra
Title
Banglar Samasya
File name
Banglar Samasya
Text
OCR done
Citation
1929
Published
2010/03/26
Publisher
Prabasi Karjalaya,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
174
Library
Amta Public Library,howrah
Classification
Bengali Essays
Keywords
Ghosh,Charuchandra
DLI number
510884
Barcode
4990010018083.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
VMLT id
TR8lZMycU2x
Download PDF

Banglar Samasya