Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Duryadhan

Nag,upendranath · 2009/11/25

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

দুৰ্য্যোধন।
উপেন্দ্রনাথ নাগ
প্রণীত।
noi
সন ১৩১৫ সাল।
কালনা
বিশ্বম্ভর যন্ত্রে মুদ্রিত।
মুলা, অনি।।

No text on this page.

ভূমিকা। প্রায় বিংশতি বৎসর পূর্বে আমার পঠদ্দশায় যখন মিন্টনের স্যামসন অগনিসৃষ্টিস পড়ি তখনই এইরূপ একখানি কাব্য লিখিতে প্রবল ইচ্ছা হইয়া- ছিল। কয়েক বৎসর পরে পঠদশাতেই এই পুস্তক লিখিতে আরম্ভ করি। সাংগরিক নানা কারণে এতদিন সম্পূর্ণ হয় নাই। প্রায় দুই বৎসর পূৰ্ব্বে লেখ। শেষ হইলেও মুদ্রিত হইয়া উঠে নাই। এবার আমার কোন বন্ধু বিশেষ অনু- রােধ করায় প্রকাশিত হইল। এরূপ কাব্যের বিশেষত্ব এই যে ইহা দুইটি মাত্র রস অবলম্বনে লিখিত। ইংরাজিতে উহাকে Sublime ও Pathetic বলে। দুঃখের বিষয় বঙ্গভাষায় Sublims এর প্রতিশব্দ কিছু নাই এবং তাহা রস মধ্যেও পরিগণিত নহে। গাম্ভীষ্য মিশ্রিত করুণা বলিলে যাহা বুঝায় Sublime এবং Pathitic এর অর্থ কতকটা ভাই। গ্রীক নাটকের গাম্ভীর্য ও মাধুৰ্য অক্ষুন্ন রাশিয়া ইংরাজিতে অনুবাদ করি- বার জন্য টন্ স্যাম্প অগিনিষ্টিস্ লেখেন। অামরা গ্রীক ভাষা জানি না সুতরাং মিণ্টন কত দুর কৃতকাৰ্য্য হইয়াছেন বলিতে পারি না। হিনি বে.Sublime ও Pathibic সুন্দররূপে মিশাইয়াছেন তাহাতে আর সন্দেহ নাই। তাহার লেখার সৌন্দর্য্য ও গাম্ভীয্যে মুগ্ধ হইয়া আমি বঙ্গভাষায় এই রূপ খণ্ডকাব্য লিখিত প্রবৃত্ত হই। কিন্তু মিন্টনের ন্যায় অনুবাদের চেষ্টা কার নাই। মিল্টনের ভাব ভাষা বা গল্পাংশের কিছুই অনুকৃত হয় নাই। যাহা বঙ্গবাসীর নিজস্ব নহে সেরূপ বিজাতীয় ভাৰ পরিত্যক্ত হইয়াছে। এক্ষণে ইহার দোষ গুণ বিচারের ভার কাব্যপ্রিয় সুধীবর্গের হস্তেই ন্যস্ত রহিল। গ্রন্থকার।

No text on this page.

দুৰ্য্যোধন।
প্রথম
প্রথম দৃশ্য।
* - *
~
}
( দ্বৈপায়ণ হৃদে পতিত দুর্যোধন এবং তীরে অধােবদনে
কৃপাচাৰ্য্য দণ্ডায়মান।)
দুৰ্য্যোধন। কৃপাচার্য্য ! আজি মােরে তোল করে ধরে,
দ্বৈপায়ণ হদ হ’তে,-দেখি একবার :
অন্তিমে অনন্ত বিশ্বে, বিশ্বের সুষমা।
অস্তে যায় দিনমণি ; আঁধার আসিছে
চির অবরিতে মাের নয়নের মণি...
আহ্বান-সঙ্গীত মৃদু পশিছে শ্রবণে
অজ্ঞাত রাজ্যের-যথা যাইব অচিরে।
তেল করে ধরি মােরে অন্ধকূপ হ'তে।
কি ফল বিলম্বে ? যায় সময় বহিয়া ।

২
দুৰ্য্যোধন।
শয়ৈর দিন আজ, সংসারের পাশে
মাগিব বিদায়, সাধ জাগিয়াছে চিতে।
এসেছিনু বহুদিন সংসার অাবাসে ।
ঘর বাঁধি খেলিলাম কত শত খেলা ;
আজি পড়ে রবে ঘর—এখনি যাইব
দূর দেশে চির তরে-কেমনে না কয়ে
একটি প্রাণের কথা ; কেমনে না দেখে
একবার শেষ দেখা-বুঝাইব চিতে?
এক রজনীর জন্য যদি সমাদরে,
গৃহস্থ, পথিকে রাখে অাপন অলিয়ে,
যায় যবে সে পথিক পুন: নিজ পথে
গৃহচ্ছে জানায়ে যায় “আসি তবে বলি।
দীর্ঘপরিতি এই সংসার তেয়াগি
যাব যদি বলে যাই--“আসি তবে বলি ।
বিলম্ব করিতে নারি, ডাকিছে আমারে
পুত্র, পৌত্র, মিত্র, ভ্রাতা-তোল শীঘ্রগতি।
( কৃপাচার্যের হস্ত ধরিয়া উত্তোলন করণ এবং দুর্যোধনের
ভূমিতলে উপবেশন।)
কৃপাচা। হেরি এ দশা কাজি ধরার শয়নে
তোমায়, কি হয় মনে কহিতে না পারি ।
খসিয়া পড়েছে মরি! রত্ন আভরণ,
হারাবলী, মুক্তামালা, বলয় কুণ্ডল,
কোটা মণি-খণ্ড ময় কনক কীরিট ।

দুৰ্য্যোধন। অবসন্ন দেহ, দীন মলিন বদন- ভানু যেন রাহু-গ্রাসে, কিংম্বা ভষ্মমাঝে হুতাশন—আতান তেজোহীন মরি । হায় , বিপি ! এই কি হে ছিল তব মনে? কৌরব-গৌরব-রবি যান অস্তাচলে অকালে, কি বলে বল বুঝাইব মনে? নয়নের জল কেবা পারে নিবারিতে তােমারে নেহারি ভূপ! এ দশায় আজি ? চির-অরি যদি, তবু কঁদে সে বিষাদে। রক্ষরিপু-শরে যবে রক্ষ-কুলপতি রাবণ, পড়িল ভূমে, সে দৃশ্য দেখিয়া কাদিল বিষাদে হায়! রাঙ্গব আপনি। আজ্ঞা দেহ, আমি চিন্ধুি আন্তরণ বসিতে হে নরনাথ! 'পৃথীনাথ তুমি ; ধুলার শয়ন কভু সালে কি তােমারে ? (কৃপাচাৰ্য গমনােদ্যত, তঁার হস্ত ধরিয়া নিবারণ করত) কি কাজ হে দ্বিজোত্তম! ও তব অায়াসে সাজে কি হে, রাজ সাজ অজি দুৰ্যোধনে ? আর কেন অভিমান? যাইব এখনি অভিমানহীন দেশে চিরদিন তরে। এই যে দেখিছ দেহ—যাবে ভষ্ম হয়ে ; তবে আর কাজ কিহে চারু আস্তরণে? আসিলাম যেই দিন এতব আলয়ে, দুর্যোধন।

৪ দুৰ্য্যোধন। ; ইলেন কোলে কৰি জননী ধরণী ;- শ্যাম দুৰ্ব্বাদলাঞ্চল পাতিয়া যতনে ; কঁদিতে দেখিয়া মােরে কত ভুলাইলা তরু, লতা, ফুল, ফল ছবি নানা মত- ধরিয়া নয়নে,—্যথা যবে গৃহ ছাড়ি অসি দূর-দেশে তার মন না বসিলে, কাদে বােধহীন শিশু, অশেষ সােহগে লয়ে কোলে যদুমণি ভুলান জননী, তরু, ল, ফুল, ফল দেখায়ে যতনে ;- দেখ পুন আজি মাের বিদায়ের কালে দিয়াছেন বিছাইয়া শ্যামল অঞ্চল নিজ তোলে মা জননী, কোল পাতি আজি নিয়ান দীন সন্তানে অন্তিমে। কিবা মনোরম ভবে মার কোল চেয়ে ? কি সুখ যে এ শয়নে-কহিব কেমনে? যথা ইচ্ছা তব দেব! ইঙ্গিতে তােমার কত রাজা-বিপর্যয় ঘটিত জগতে। হে কৌরব-কুল-সূর্য।। তব বীৰ্যতেজে হীনবীর্য। রাজ-দল, তারা-দল যথা। আসমুদ্রক্ষিতীশ্বর, ঐশ্বর্য অতুল, অসীম মহিমান্বিত ছিলে ভবতলে অসামান্য-সামান্যের সদা ভয়াস্পদ। যদিও মুম্বষু, তবু মহিমা বিকাশে ভাসিছে ও রাজ দেই, কার সাধ্য হেন কপ।

দুর্য্যোধন। ৫ এখনও লঙ্ঘিতে তব আজ্ঞা, কুমণি ! হেরে যদি পান্থ পথে পতিত ভুলে মৃগেন্দ্রে-বিগত প্রাণ, তবু দুরু দুরু কঁপে ভয়ে প্রাণ তার,শিহরে মরমে। কিন্তু অনুগত জন সদা বাঞ্ছে মনে হেরিতে মহতে, যথা হেরিত নিয়ত সে মহতে, সুমহৎ ঐশ্বর্যের দিনে। তাই বাঞ্ছা পুনঃ রাজা সাজাই তােমারে, ! বাই সুরাজাসনে, দেখি পুনৰ্ব্বার- কমলিনী-প্রাণকান্তে নিশা-অন্তে যথা- গৌরব-শিখর-শিরে উদিত আবার সৌভাগ্যের সুপ্রভাতে, উদ্ভাসি পুলকে তিন লােক, যশোরূপ বি কিল-কিরণে চেয়ে দেখ দ্বিজোত্তম! উদিছে আকাশে চন্দ্রমা, আঁধার-বাস সরায়ে যতনে যামিনীর মুখ হ’তে—যথা প্রাণপতি যােমটা টানিয়া ধীরে দেখেন পুলকে নীলাম্বর-পরিহিতা প্রিয়া মুখখানি। হাসে সে যুবতী যথা প্রেম কুতূহলে; হাসিল যামিনী দেখ রতির সাধে, সাজিয়া সীমন্ত রত্নে, কৌমুদীর বাসে। হের দেখ, চন্দ্র কর হেলায় হেলায়ে কি কহে সঙ্কেতে ওই, আমারে হেরিয়া উপহাস-হাসি-রাশি ভাসিছে বদনে। দুর্যোধন। t

৬
দুৰ্য্যোধন।
गंग
দুঃখে বড় সুখী, কে গণে উহারে ?
পরতেজে যার তেজ নীচ সে দুর্মতি।
কেমন জানিবে নীচ সৃজিলা বিধাতা,
মহা দুঃখ মহতের তরে এ সংসারে।
স্বর্ণের স্বর্ণত্ব ভাতে অগ্নি
সহযোগে।
ধরে রে! কানন-গৰ্ব্ব, দীর্ঘ দ্রুম শিরে
কুলিশে, সন্থে কি কভু তাহে বলত ?
দেখিয়া চাঁদের হাসি উঠিল হাসিয়া
সরসী, তরঙ্গ-রঙ্গ তুলিয়া কৌতুকে ;
যৌবন-তরঙ্গ-রঙ্গে যথা বরাঙ্গিনী
ষোড়শী, বয়ষ দোষে হাসে আচম্বিতে
পরমুখে হাসি দেখি-না জানি কারণ।
তরল জীবন তাের এ ভব ভবনে
সরসী লো! তাই গণ্য নও মান্যজনে।
ভরণ জীবন যার এ ভব ভবনে
তোর সম, তার মূখে তুল্য নিন্দস্তুতি।
হীন, ক্ষুদ্র-চেতা-মুখে সুখ্যাতির গীতি
দুর্যোধন নাহি চায়,-নিন্দা যদি করে
সাধারণে সাধারণ জ্ঞান করে তায়।
আমার চরিত্র সদা রহিবে দুজ্ঞেয়,
অবিও, অল্পধী পক্ষে--এই মাত্র চাহি।
স্মরিলে আমার নাম সদা শিরিবে
মানব বিষ্ময়ে ভয়ে, এ বাসনা চিতে।
বিগত জীবন তবু শিহরে স্মরিতে

দুৰ্য্যোধন।
৭
রাবণে, ত্রিদিবে দেব, মানব-এ ভবে।
কি তার মহত্ব, কিবা কীৰ্ত্তি এ ভূতলে,
কতউচ্চ কীর্তি-শৈলে স্মৃতি স্থিতি করে
সামান্যে কি পরিমাণ পারে তা করিতে ?
কত উচ্চ চূড়া ধরে গিরি-কূল-চূড়া
হিমালয়, বালকে কি সে ধারণা ধরে ?
ওই দেখা যায় দ্বিজ । অশ্বথ বিশাল
অদূরে, কাতরে শির নােয়াইয়া যেন
নীরবে কঁদিছে আজি দুখী মোর দুখে:
বিষাদ আঁধার ঘোর উহার অন্তরে।
কত যে সাধিছে ওর করে কর দিয়া
চন্দ্রমা, এমাের দশা দেশি উপেক্ষিতে,
হাসিতে অবজ্ঞা-হাস অবিজ্ঞের মত ;
কিন্তু ও কি পারে তাহাও যে তরুকুলে,
মহারাজ, রত সদা পরহিত ব্ৰতে।
ছায়াদানে কত জনে তুষেছে দিবসে
আতপে, অতপ তাপ সহি নিজ শিরে ।
নিশিথে নিয়ত নিজ কর সঞ্চালিয়া
দূরি শ্রান্তি তুষিয়াছে শ্রান্ত পান্থজনে।
হৃদয় বিদারি রাখে পরম আদরে
তরুবর, বিহঙ্গেরে, অতি সঙ্গোপনে
সজয়ে শরণ যবে নয় তার পদে।
ধন্য! তুমি, ধন্য! তব মহিমা এ ভবে,
হে পাদপকূল রাজা! শরণাগতেরে

দুৰ্য্যোধন।
এ হেন করুণাময় কেবল জগতে ?
ওই দেখা যায় দূরে চন্দ্রের কিরণে
কুরুক্ষেত্র রণক্ষেত্র,-চারিভিতে
ধুধু করে সুবিশাল ভীষণ শ্মশান।
অগণ্য অনন্ত চিতা জ্বলে নিরন্তর,
পুঞ্জীকৃত হস্তী-অশ্ব-নর-মৃতদেহ
আবরিছে ধরাপৃষ্ঠ-কোথাও বহিছে
ঘােরা রক্ত-স্রোতস্বিনী খরতর বেগে ;
উড়িছে শকুনি পাখা নাড়িয়া সঘনে ;
শৃগাল, কুকুর-রবে বধিৰিছে শ্রুতি।
দুদর্শ ভীষণ দৃশ্য পড়ে দৃষ্টিপথে
যতদূর যায় দৃষ্টি, ঘাের অট্টহাসে
হাসিছে ডাকি নাচে পিশাচ পিশাচী-
গলিত দুর্গন্ধ মাংস চিবায়ে বদনে।
রােরব-ভৈরব-রব উঠিছে চৌদিকে।
রক্তস্রোতে ভাসে কত শিরহীন দেহ,
কবন্ধ বিবন্ধে যেন উঠিছে পড়িছে।
উৎকট প্রলয় কাণ্ড! বিকট তাণ্ডবে
ভীষণ রসনা ওই বিভীষিকা নাচে।
ভীষণ শ্মশান এই নিশ্বাসে ত্রাসিছে
বিশ্ববাসী জনগনে, দেখাইছে সবে
সংসারের নশ্বরতা—মৃত্যুর অক্ষরে।
কত যে হয়েছে ভষ্ম এ ভীম শ্মশানে
বীৰ্য্য, শৌর্য, ঐশ্বর্যের আধার দুর্লভ ;

দুৰ্য্যোধন।
৯
গুণী, জ্ঞানী, ধনী, মানী,-কে পারে বর্ণিতে।
কত অপরূপ রূপ, কত কোমলতা,
জগৎ নয়নানন্দ আনল মুরতি,
পুড়িয়া হয়েছে ছাই এ কাল অনলে।
ভীম দাবানল যবে বেড়ে চারিদিকে
অটবীরে, বিটপেরে শুধু কি সে নাশে?
পোড়ে মুঞ্জরিত। লতা-কুসুম-কুন্তলা।
কত পিতা মাতা আজি আঁধার হেরিছে
ভুবন, নয়ন মণি, হায় হারাইয়া।
নয়ন অসারে মরি! যাইছে ভাসিয়া
কত কান্তা, প্রাণকান্ত বিয়োগ-বিষাদে।
ক্ষৱ-কুল-কাল-রাত্রি যেন গ্রাসিয়াছে
এ ক্ষেত্রে, ক্ষত্রিয় কুল নিৰ্ম্মল সমূলে।
কৃপাচার্য! অশ্রু আরনারি নিবারিতে
হেরি এ করাল দৃশ্য ;-পাষাণ সদৃশ
এ হৃদয়, তবু আজ ফাটিছে বিষাদে।
সত্য, কুরুনাথ ! আজি পড়ে দৃষ্টিপথে
মহা ভয়ঙ্করী এই মহারণস্থলী ;
কিন্তু এ রােদনে দেব ! কিবা ফলোদয়
এখন, গতানুশােক দুঃখের কারণ।
নিজে জ্বালিয়াছ তুমি এ কাল অনলে ;
রােপিয়াছ মৃত্যুবৃক্ষ, স্বহস্তে, ভূপতি।
যার ফলে ক্ষত্ৰকুল নির্মূল এ রূপে।
ত্যজি ক্ষত্রগণে, হায় ! বুঝি চিরতরে
কৃপ।
-

দুৰ্য্যোধন।
দুর্যোধন।
গেল। চলি রাজলক্ষ্মী-লক্ষ্মীছাড়া করি।
সদা সদাচার, সত্য, স্বধৰ্ম্মনিরতি,
বিবেক, বীরত্ব, যুক্তি প্রিয় অতিশয়
কমলার,-সদাচার গুণে বাঁধা তিনি।
রত যে অধৰ্ম্মকৰ্ম্মে, ঘূণেন তাহারে
চঞ্চলা, চঞ্চলা তিনি তাহারে ত্যজিতে।
হের গুণহীন, যত ক্ষত্রিয় সন্তান,
ধর্মহীন, কর্মহীন, কপট আচারী।
বীর-ধৰ্ম্ম ত্যজি তারা ছলে বা কৌশলে
বিনাশিতে চায় বীরে, অরি সে যদ্যপি।
বীরত্বের অপমান দেখ পদে পদে
ভারতে; ক্ষুদ্রত্ব, স্বার্থপরতা তঙ্কর
পশিয়াছেমহত্বের শান্ত তপোবনে ।
এই কি ক্ষত্রিয় ধৰ্ম্ম ? কহ মহামতি ।
বীর অরি সদা পূজ্য বীরেন্দ্র সমাজে ;
সে পূজা কি বীর আর পায় হে ভারতে ?
চির বীর-ধাত্রী, কিন্তু, হায় ! ভাগ্যদোষে
বিগত সে শুভদিন। না হলে কভু
মরিত কি পিতামহ বীরেন্দ্র কেশরী
অন্যায় সমরে? মরি । কপট আচারে
হেন বীরবরে যারা পারে বিনাশিতে,
তারা কি ক্ষত্রিয় পুত্র?— কুল গ্লানি।
গুণ গ্রাম-রূপ-পদ্মে পাতেন আসন
পদ্মাসনা, দয়াহীনা, অতি গুণধীনে ।

দুৰ্য্যোধন।
গুণহীন জন জন শ্রীহীন সত।
রাজশ্রী, জয়শ্রী ত্যজি নিশ্চয় যাইবে
ক্ষসূতে ভবিষ্যতে ; ভবিষ্যৎ কথা
শুন মহামতি। আমি কহিনু ভােমারে।
অচিরে আসিবে নিশ চির তমোময়ী
ভারতে গ্রাসিতে, হায়! অচিরে ডুবিবে
ভারত গৌরব-রবি অযশ-সাগরে।
মেহ হেতু পিতামহ প্রাণে না মারিল।
পাণ্ডবে। গাণ্ডিবী যবে পাণ্ডুগ ব্রান্সে
ভীষ্মের ভীষণ রণে,-চরণে ধরিয়া
পিতামহ পাশে আসি কহিলা কাতরে
যুধিষ্ঠির-“নহে স্থির পার্থবীর তব
মহারণে ; মহাবীর েআছে ভূতলে
সম্মুখ সমরে তােম পায়ে গো জিনিতে ?
গাওবের আশা-রবি গেল অস্তাচলে।
কিব। কাজ লােকক্ষয়ে ? বিপক্ষ তোমার
গঙুত, উপস্থিত তব বিদ্যমানে।
বিনাশ তাহারে আগু, ভাসুক সকলে
শাস্তিজলে ; কৃতাঞ্জলি কহি গাে পদে।
সিঞ্চ বারিধারা দেব? এ কাল অনলে।
নহে দেহ আজ্ঞা দেব। পুনঃ যাই বনে
পঞ্চভাই, বাঁধিয়া কুটির তরুতলে,
হয়ে ফলমূলহারী, কিংবা ভিক্ষাজীবি,
চীরবাসে চিরবাস করিব কান্তারে।
;

১২
দুৰ্য্যোধন।
হীনবীৰ্য্য ধনঞ্জয়, অশক্ত ধরিতে
পুনঃ ধনু তব রণে, শুন মহামতি
নাহি রণজয় আশা কিবা কাজ ব্যঙ্গে।
লহ পঞ্চভ্রাতৃপ্রাণ বাঞ্ছা তবু যদি।
শিশুকালে মহাশয় পালিয়াছ সরে-
পিতৃহীন দীন এই ভাই পঞ্চজনে ;
তব স্নেহ-গুণে ভুলেছিনু পিতৃশােক,
এবে তব বাঞ্ছা যদি তাদের বধিতে ;-
কাজ কি গাে রণে? দাসে দেহ অনুমতি,
পঞ্চ পাণ্ডবের মুণ্ড এই দণ্ডে কাটি
দিব উপহার পদে ; করযােড়ে মাগি
চির পরিহার রণে ;
কেন অকারণ
নর-রক্তে-শ্রোতে আর ভাসিবে মেদিনী।
ইচ্ছা মৃত্যু হাশয়, নহে বাঞ্ছা যদি
মরিতে ;—কি শক্তি কার সুরাসুর নরে
হে আৰ্য্য! সে কাৰ্য্য সাধে নিজ ভুবলে ?
পিতৃহীন, দীন অতি এ ভব মণ্ডলে
পাণ্ডব, হে পভুনাথ ! রাজ—দও-আশা
বৃথা তার, দৃঢ়তর জানে সেই মনে।”
শুনি সে মিনতি ভীষ্ম হাসি উত্তরিলা
“জরাজীর্ণ, শীর্ণ তনু, অনুমাত্র নাহি
জীবনে বাসনা মম; ধরি নরদেহ
কাটাইনু বহুকাল-কাল পূর্ণ এবে।
ধৰ্ম্মক্ষেত্রে ধর্ম যুদ্ধে শরশযয্যাপরি

দুৰ্য্যোধন।
১৩
অন্তিম শয়নে বৎস! করিব শয়ন
হও চির রণজয়ী—আশীৰ্বাদ করি।
পূর্ণ হােক বাঞ্ছা, বাঞ্ছাকল্পতরু-বরে।”
ভাবি দেখ, অরিন্দম ! পাণ্ডব, কৌরব
তুল্য তঁার চক্ষে,
দুই
পক্ষ সমতুণ।
মেহ ধারা বহে তঁার সদা দুই মুখে ;-
যে পক্ষে হউক জয় নাহি তাহে ক্ষতি।
তেঁই পিতামহ যুদ্ধে স্বেচ্ছায় হারিলা,
চিন্তিলা মরণ নিজ –অর্জিয়া রোদনে।
কিন্তু যবে আক্রমিবে বিপুল বিক্রমে
বিদেশী বিপক্ষ, রক্ষা কেমল করিবে
স্বদেশ, স্বজন, ধন, মান, গণে?
স্নেহের কৌশল-জালে বল কে ধরিণে
বিদেশী বিধর্মী অরি --মত্ত রণমদে?
মলিন বদন দেখি দিবে কি সে কয়ে
মরণ সন্ধান নিজ দীন বৈরীদলে?
এই কি হে সদুপায় উদিয়াছে চিতে
করিবারে রণজয় ? ধিক ক্ষত্রগণে।
বুঝেছ কি মহামতি। ণ-তত্ব-কথা,-
কেন জালিয়াছি আমি এ কাল অনল?
দণিতে দুরাত্মাদলে; সবংশে নাশিতে
ক্ষত্রিয়-কুল-কঙ্ক, কলুষিত যত
ক্ষত্ৰসূতে; পাপ-স্রোত কােধি চিরতরে
হরিতে ধরার ভার ; উপাড়ি ফেলিতে

১৪
দুৰ্য্যোধন।
ক্ষত্রিয়-কণ্টক-বৃক্ষ শিকড় সহিত
এ ভারত ক্ষেত্র হতে,—যথা কৃষিবল
বিকট কণ্টক-জড়—যতনে উপাড়ি
ফেলি দূরে ক্ষেত্ৰ হ’তে রক্ষে শস্যদলে।
কিন্তু, মহারাজ ! কই, এ কাল সময়ে
পড়িল কেবল কি হে, কাপুরুষদল?
মরেনি বীরেন্দ্র-বৃন্দ ? হয় নাই হত
ধৰ্ম্মবীর, কৰ্ম্মবীর, মানব-গৌরব?
হায়! নরপতি! ভ্রম তব, ভেবে দেখ
চোরে দণ্ড দিতে রাজা দণ্ডিলে সাধুরে ;
বিনাশিলে জিরাজে চণ্ডাল ভ্রমেতে।
বীরহীনা রসুন্ধরা, দেখ অরিন্দম !
কি আর কহিব আমি; রাজকূলে নাশি
কি ফল লভিলে বল ? বীর চূড়ামণি!
ফল, ফললাভ কথা কেন অকারণ
জিজ্ঞাসিছ ? বিজ্ঞতম তুমি মহামতি ।
সুবিদিত তব পাশে শাস্ত্র তত্ত্বকথা।
কর্মক্ষেত্রে, কৰ্ম্মতরু কবে ফল ধরে
ইচ্ছামত ? কহ কৰ্ম্মফলে অধিকার
আছে কি জীবের? আৰ্য্য! সুধাই তোমারে
কত মহাশয়, হায়! আশার কুহকে
রােপি বৃক্ষ কর্মক্ষেত্রে, চিন্তিলা অন্তরে-
অবশ্য ফলিবে তাহে সুফল সময়ে ;
কিন্তু বৃথা আশা, কালে ফলিল কুফল
দুৰ্য্যেধন।
,

দুর্য্যোধন।
১৫
বিষময়, - ভ্রমময়, নরের ধারণা।
ফললাভ লােভে নহে কাৰ্যারম্ভ মম ;
রাজ্যভােগ অশা, আৰ্য্য! নাহি ছিল চিতে
সে কালে, যে কালে আমি জালি এ অনল।
তা হলে কহ, হে জি! নিজ ভাগ হতে
পঞ্চগ্রাম মা যদি দিতাম পাণ্ডবে
কত ক্ষতি হত তাহে? কিছু মাত্র নহে।
আরাে দেখ, ভোগসুখে বাসনা যাহার,
পুল, পৌল, মিত্র, ভ্রাতা, আত্মীয়স্বজনে
নিয়োগে কি যুদ্ধ কাৰ্যে কভু স্বেচ্ছাক্রমে
সে জন? স্বজনহীন হয়ে এ জগতে
সুখ কিবা রাজ্যভােগ‘কৰ্ম্মভােগ হেন
লয় মনে-জীবন ধারণ দুঃখময়।
এক পুত্র-ভ্রাতৃ-শোকে আকুল জগতে
জনগণ:; কিন্তু কহ, কে পারে গণিতে-
কত শত পূজ-মিত্র-শোক মম প্রাণে?
সুখদুঃখ, লাভালাভ তুল্য জ্ঞান করি
জালিনু সমরনা ; উদ্দেশ্য আমার,
অপদার্থ, অনর্থের মূল এ ভুতলে,
নাম মাত্র ক্ষত্রফলে ক্ষত্ৰকুলগ্নানি,
ভীরু, কাপুরুষদল দিবে প্রাণাহুতি
এ অনলে,-ভারহীন হইবে ধরণী।
রবে মাত্র এ ভারতে মুধাৰ্মিক যারা
সদাচারী, সত্যনিষ্ঠ, বীরেন্দ্রমণ্ডলী।

১৬
দুৰ্য্যোধন।
ভেবেছ ভাবিনি আমি ভাবিফল-কথা
যুদ্ধান্তে ? অসম্ভব কথা, শূরমণি !
তবে যে অগায় রণে হবে রণজয়ী
পাণ্ডুপুত্র, এই মাত্র ভ্ৰম গণনাতে
অামার। স মরে মারি কাপরু দলে,
সহ পাণ্ডুপুত্র মৃত্যু শয্যায় ইব
অন্তিমে, নিতান্ত মম সাধ ছিল মনে।
নিয়তির গতি বল কে বুঝে জগতে?
মরিল অধ্যায়ে কত বীর-কুল-পতি
রথীশ্রেষ্ঠ ; অন্যায় আচরি রণজয়ী
পা গুবের,-বঁচি গেল এ কাল সমরে।
হয় বিধি ! এ কুবিধি কেন তব ভবে ?
দয়াময় । হরে লয় কাল কি নিয়মে
ধরা-তালঙ্কার রূপ নরােত্তমলে
সৰ্ব্ব-অগ্রা? গ্রহরাজ প্রাতঃকালে যথা
কাড়ি লয় ফুলমালা কবরী হইতে
ধরার ; শিশির-রূপ-রত্ন-পালঙ্কার
কেড়ে লয় মহারাষে, প্রথম প্রকাশে।
যা কিছু উত্তম যায় 'প্রথম আহ্বানে
কালের-এ কাল রীতি বিধি প্রচলিত।
যথাধৰ্ম্ম-তথা জয়-শানীতি কথা,
মহারাজ! ধৰ্ম্ম আচরিয়া রণজয়ী
যুধিষ্ঠির, স্থির ইহা লয় মম চিতে।
সদা সত বাদী, ধীর, ধৰ্ম্মরাজ বলী ;-
কৃপ!

দুর্য্যোধন।
সাধন।
উত্তুঙ্গ হিমাদ্রী-শৃঙ্গ যেই অপষ্ঠিত,
বল, তার কি বা ভয় প্লাবনপ্রবাহে ?
মৰ্ত্তা মরতের বেগে ভাঙ্গে কি কখন
সুরতরু? সংসারের মরীচিকা কভু
শারে কি ভুলাতে, ভূপ! অমর শিশুরে?
ধৰ্ম্ম-বৰ্ম্ম-সুরক্ষিত ধৰ্ম্মরাজ ধীর,
অধিষ্ঠিত সত্য-শৈলে; নররূপ ধরি
অবতীর্ণ দেবশিশু এ মহী-মণ্ডলে ;-
সংসারের বজ্র গর্জি কি তার করিবে ?
অাচার্য্য ! বিচার কার্যে রত নিরন্তর
তোমরা, বিচারি কহকেমনে কহিছ
“ধৰ্ম্ম অচরিয়া রণজয়ী যুধিষ্ঠির” ?
কিবা ধৰ্মকৰ্ম্ম তার দেখিলে আপনি?
ভীষ্ম-দ্রোণ-বর্ণ-রূপ ধর্ম-কর্ম বুঝি ?
সুধী বুধ তুমি, দেব ! না জানি কেমনে
নিতান্ত হইলে ভ্রান্ত,—মিথ্যা অন্তরালে
গুপ্ত সত্য হেরে মাত্র সুধীজনগণ ;-
লৌকিক সিদ্ধান্তে ভ্রান্ত হইলে কেমনে ?
কে তব জ্ঞানের চক্ষু দিল আঁধারিয়া?
কহ দেখি, কারে কহ ধৰ্ম্ম অচরণ ?
কিবা পুণ্য-পাপ কি ? সংসার কাননে
কহ কিবা কল্পতরু, সফলদাতা?
শুন কহি সুধীবর নাহি জান বদি।
এক মাত্র মহাধর্ম আছে কৰ্ম্মভূমে

১৮
দুৰ্য্যোধন।
;
কৃপ।
মহাপ্রাণজনতরে, দেখাতে তাহার
মহত্ব দেবত্ব এই বিশ্ববাসী জনে ।
পরের মঙ্গল তরে আত্মশলিদান,
সেই মহা ধৰ্মকৰ্ম্ম। সমর্থ যে জন
বিসর্জিতে সর্ব স্বার্থ, দিতে বলিদশন
অাপনারে জগতের মঙ্গল মন্দিরে ;-
সেই সে ধাম্মিক, ধীর, প্রাত:স্মরণীয়।
ছিল কি এ মহালক্ষ। পাণ্ডব পক্ষে
মহাশয় ! অাত্মবিসর্জনে অভিপ্রায় ?
আত্ম প্রতিষ্ঠার জঙ্গ কাৰ্য্য অনুষ্ঠান
তাদের স্বার্থে তরে বৈরনিৰ্যাতন।
সত্য বটে ভীষ্ম-দ্রোণে অণ্ঠায় অহবে
বধেছে পাব,কিন্তু, কহ, কি কারণে,
( অন্যায় অাচারে এত ঘৃণা তব যদি )
কোন্ ধৰ্ম্মনীতি মতে, কোন্ পুণ্য হেতু
অষ্টায় সমরে অভিমনুরে বপিলে ?
বী-তেনে দৃপ্ত যুৰ। দিবাকর সম,
ভীম-কান্ত গুণেপেত, কাস্তি মনােহর,
বীরের আদর্শ বীর, কুলগৰ্ব তব,
বংশের উজ্জ্বল দীপ, ভরসার স্থল,
শত্রঃ মোহিত হয় যার রূপে, গুণে ;
কহ রাজা! কেন তুমি বপিলে তাহারে
অন্যায় সমরে, মরি! সে কূপঙ্কজে ?
সত্য, কিন্তু কহ দেখি, বুঝিয়াছ যদি,
দুর্যোধন।

দুৰ্য্যোধন।
কি কারণে অভিমন্যু নিহত অন৷ারে ?
সম্মুখ সমরে হারি পিতামহ রণে
গাঞ্জীবী,--শিখণ্ডী বীর রাখি অগ্রভাগে,
তার অন্তরাল হ'তে তীক্ষ্ম শরজালে
ভরাধম, অাঘাতিল বীরেন্দ্র শরীর
অবিরত—অস্ত্রহীন সেই বীর সবে।
কহ বীরবর! একি বীর-কুল-প্রথা ?
লােকে বলে নরোত্তম, বীরোত্তম বীর
অর্জুন,--দুজ্জন তবে কেবা আর ভবে ?
বীর-কুল-সদা-বন্দ, ধৰ্ম্মব্রত, বলী
দেববত ; হেন ৰীরে যে পারে বধিতে
এ হেন অন্যায়, ঘোর ক্রুর আচরণে,
নির্দয় হৃদয়ে তার তীব্র চিতানল
জালাইতে, বধিলাম তাহার তনয়ে।
নিজ ব্যবহার তার প্রতিশোধিকারে;
স্বীয় কৰ্ম্ম-বৃক্ষ-ফল তারে ভুগ্নাইতে।
কিন্তু অর্স ! এই এক অপকাৰ্য হেতু
অনুতপ্ত চিত্ত মম চিরদিন তরে।
দারুণ ক্রোধাগ্নি-ক্ষিপ্ত, উদ্ভান্ত মানসে
জ্বেলেছি যে চিতা, তাহা অাজিও দহিছে।
ক্ষম মহারাজ য'দ কহি সত্য হেতু
অয়ি—দ্রৌপদী দেবী, তব ভাতৃবধু;
রাজসভামাঝে আনি বলে উলঙ্গিলে
অঙ্গ তার, কহ রাজা কোন নীতি মতে ?
কৃপ।

দুৰ্য্যোধন।
ফুৰ্য্যোধন।
মরমে মরিয়া যাই স্মরিলে তাহার
কাতরতা; আর্তনাদ -অতি মৰ্ম্মভেদী।
কুলবধু তিনি, তঁার তপ্ত অশ্রুরাশি
রাক্ষসের রূপে অসি গ্রাসিল তোমারে।
ধর্ষ-কৰ্ম্ম নীতি তব সুবিদিত যদি
রাজে! এ মন্দ কাৰ্য কেমনে করিলে ?
বুঝিবে এ কথা যদি জগৎ, কি হেতু
নিন্দিত এ ভাবে তবে কুরু কুলপতি ?
বাঞ্ছা যদি নিবারে শােন মহাবলি।
ক্ষত্রিয়ের শৌর্য-বীৰ্য-পরীক্ষা প্রথম
এই কাৰ্যে, হে অাচার্য! লইলাম আমি।
ভেবেছ কি দ্বিজোত্তম! স্মর-শর-জ্বরে
জরিয়া, ধরিয়া অনিলাম সভামঝে
দ্রৌপদীরে? ভ্রম তব নিশ্চয় সুমতি !
সে বাঞ্ছা আমার যদি থাকি ত অন্তরে
একান্ত, গৃ-আরে আনিতাম তবে
গোপনে, লোক লােচন হতে অন্তরালে ;
অনঙ্গের রঙ্গস্থল নহে রাজসভা।
কহ দেখি, পতি কভু পারে কি থাকিতে
অচল, অটল, স্থির, স্থানুর সমান ,
হেরি পত্নী অপমান; সচক্ষে নোরি
উলঙ্গিত অঙ্গ তার রাজসভমাঝে ?
সিংহিনীরে হেরে যদি ব্যধের কবলে
কেশরী, মুহুর্তে তারে দেম যমালয়ে ;
।
.

দুৰ্য্যোধন।
অন্য কোন চিন্তা তার জাগে কিহে চিত্তে ?
মহাবীর বলি যারা বলায় জগতে,
হেন *ঞ্চ ীর পতি কেমনে বলি
অচল, অটল, স্থিৰ,—হেয়িা সাক্ষাতে ,
পত্নী-অপমান ? ধৰ্ম্ম অবতার
জেষ্ঠ ভ্রাতা-তার অনুগােধে? শুন বীর
এ কথা শুনিয়া মম হাসি আসে মুখে।
দুর্বলের ছল ইহা আত্ম-প্রবঞ্চনা।
ক্ষত্রিয় শােণিত যার ধমনীতে বহে,
কোন অনুরোধ হেতু না পারে সহিতে
সে জন এ অপমান ; বৃফিতে মাকে
চির কলঙ্কের ভয়, চির ঘৃণারাশি।
আজ যাহা সহ হ'ল ভ্রাতৃ-অনুরােধে,
কাল তাহা সহ হবে স্বার্থসিদ্ধি হেতু
পরখ হইবে সহ্য শক্তির অভাবে।
অধ: পতনের সূত্র নিয়ত এ রূপে
নিম্ন হতে নিম্নস্তরে হয় নিপতি।
এই কাৰ্য্যে বুঝিলাম -বীৰ্য্য-দিন
গত, ক্ষত্রিয় শােণিত হয়েছে শীতল
ভারতের গরীয়সী বীরভূমি মাঝে
কাপুরুষতায় বীজ উপ্ত অলক্ষিতে।
তাই ভাবি জালিলাম এ কাল অনল
কুরুক্ষেত্রে, ক্ষত্ৰকুলগ্লানি ক্ষলকুলে
পােড়াইতে–বিনাশিতে যত কাপুরুষে।

দুৰ্য্যোধন।
-বীজ,
খামা
*
এই
যে ক্ষুদ্রত্ব ক্ষুদ্র,
অলক্ষিত,
কালে তাহা মহাবৃক্ষে হবে পরিণত।
ক্ষত্রিয়-বীরত্বগাঁথা, মহত্ব অতুল,
ভুলে যাবে ক্ষত্রগণ, আত্ম-বিসর্জন।
স্বার্থপরতার বিষে হবে জর্জরিত,
ভুঞ্জিবে তাহার ফল-ঘৃণা, নিন্দা: গ্লানি।
(সহসা অশ্বত্থামার প্রবেশ )
দরিদ্র দ্বিষের পুত্র এক ভিক্ষাম!গে
মরনাথ! বর তারে সেনাপতি পদে।
পিতৃহন্তা দুরাচার পাণ্ডব দুৰ্ম্মতি,
নিতান্ত কৃতান্ত পুরে পাঠাইব তারে।
পার্থের শােণিতে করি পিতার তর্পণ
নিভাইব এ অনল জ্বলে যা হৃদয়ে ।
ধনঞ্জয়! পাপাশয় কেবা তোর চেয়ে ?
প্রিয়তর শিষ্য তুই আছিলি পিতার
আমা হতে, সুনিভৃতে শাস্ত্র নানামত
শিখানে তােরে পিতা অামারে বঞ্চিয় ।
সে অতুল স্নেহের কি এই প্রতিদান?
অাচার্যের প্রতি কেন অনাৰ্য, আচার ?
পামর। গুরুদক্ষিণা দিলি এইরূপে?
এর প্রতিফল অাজি দিব ভাল মতে।
দাও নাজা অনুমতি, গুরুপু তব
আগে এই শেষ ভিক্ষা জনমের তরে।
বিলম্ব সহে না আর; তিজ্ঞ আমার

দুর্যোধন।
২৩
দুর্যোধন।
পঞ্চ পাণ্ডবেরে অাজি দিব যমে ডালি।
দ্বিজোত্তম! জানি আমি মহাবীর তুমি
দ্রোণপুত্র, ভৃগুপুত্র সম মহাবলী।
তােমায় সাজে এ কাজ, যাও ত্বরা করি,
বরিলাম বীরবর! সেনাপতি পদে ;
পঞ্চ পাণ্ডবের মুণ্ড দেহ আনি মােরে
অবিলম্বে, এ অস্তিমে তবুও কিঞ্চিৎ
তৃপ্ত হবে এ হৃদয়। পদ।ঘাতে ভাদি
ভীমের সে চণ্ড মুণ্ড জুড়াই জ্বালা।
হবে কি সে দিন দ্বিজ ! পারিবে কি তুমি
দুৰ্য্যোধনে প্ৰদানিতে সে সুখ-সন্দেশ
আজি এই শেষ দিনে দেখ পার যদি।
চিন্তা নাহি কর রাজা! অচিরে ফিরি
পঞ্চ পাণ্ডবের মুণ্ড আনি দিব ডালি ।
অশ্বত্থামা।
প্রহর।

দ্বিতীয়
অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য।
পাণ্ডব-শিবির।
;
অর্জুন। (স্বগত) নীরব, নিস্তব্ধ নিশা! তমোময় বাসে
সাজিয়া কাদিতে আজি এসেছে এ স্থলে !
খুলিয়া ফেলেছে তাই চন্দ্রকান্তমণি
বিরাগে সীমন্ত হতে—শিয়াের তার
চির-যত্ন ; শোকের আঁধার বুকে ল'য়ে
ভাসিতেছে অশ্রুজলে নিশ্বাসি বিষাদে।
সব স্থির ! অধীর সকলে মহা দুখে।
নাচেনা পল্লবদল তরুবরশিরে
বহেনা মলয় বহি কুম-আমোদে ।
প্রলয়ের কালে যথা স্তব্ধ অন্ধকারে
গণহীন প্রাণীগণ, প্রাণহীন তথা
আজি এ জগৎ যেন স্পন্দন রহিত।
।
"

দুৰ্য্যোধন।
কে গায় বিষাদ-গান আজি এ নিশীথে ?
কেনরে কঁদিছে প্রাণ। মান মৃত্যুছায়া
সংসারের মুখে যেন পড়েছে ছড়ায়ে ।
মহা মরণের ক্রোড়ে যেন ওয়ে অাছে
চরাচর ; ঘোর হাহাকারে বিলাপিছে
মহাশােক মুৰ্ত্তিমান হয়ে ! চতুর্দিকে ,
জড়েরও মরম ভেদি উঠে অার্তনাদ ।
কে কবে দেখেছে হেন ভয়ঙ্কর সুল;
হেন তমােময়ী নিশা মহা ভয়ঙ্করী।
হেন শােকাবহ দৃশ্য এ বিশ্ব সংসারে ?
বীরত্ব, ধীরত্ব, ভবে মহত্ত্ব অতুল
ছিল যাহা, পুড়িয়াছে এ ভীম শ্মশানে!
বিপুল ক্ষত্রিয়কুল নির্মূল সমূলে
ইঙ্গিতে কহিছে যেন সবে মম প্রতি
ক্ষকুলান্তক-যম তুই রে পামর
অর্জুন! দুর্জন তুই কুলক্ষয়কারী।
নির্দয় শার্দল সেও না হিংসে কখন
স্বজাতি-স্বজ্ঞাতি, বন্ধু হিংসিলি কেমনে ?
বৰ্ব্বর! নির্দয় তুই শাৰ্দল অধিক ;
নিজকুলক্ষয়কারী, পাষ গু, দুর্মতি।
ঘঘাষিবে কুযশঃ তোর যতদিন রবে
রবিশশী ; পরকালে নিয়েতে পশি
ভুঞ্জিবি রে ধনঞ্জয় !
এ কার্যের ফল।
ইহ পরকাল দুই হারালি, দুৰ্ম্মতি!
৩

দুৰ্য্যোধন।
ওই শোনা যায় মৃদু রোদনের ধ্বনি।
পুরু-কুমারের দল কঁদিছে কাতরে !
মরণের পরপার হইতে বহিয়া
অাসিয়া পশিছে স্বর মরম মাঝারে।
তটিনীর পরপর হইতে যেমতি
করুণ বাঁশী-রব পশে শ্রবণেতে।
শুনিছ কি কহিতেছে—“কুরুকুলাশয়ে
পাঠাইলা বিধি, হায় ! আমা সবাকারে
ভুঞ্জিতে জীবনভোগ নরদেহ ধরি।
জীবনে যৌবন আসি যেই জাগাইল
শত আশা, ভালবাসা, সুখের বাসনা ;
না পূবিতে কিছুমাত্র জীবন-পিপাসা
কেন বিনাশিলে সবে,-হায় গাে, কেমনে
স্বহস্তসিঞ্চিত বৃক্ষ অক্লেশে নাশিলে?
কেমনে ছিড়িলে বা সেই গেহল ?
ভবিষ্যৎ অশাস্থল আমরা সকলে
তােমাদের—আশার্দীপ নিবালে কেমনে?
সাধে কে নিবায় বল সুখের দীপ ?
স্বকুল-নিৰ্ম্মলকারী নির্দয়ের গৃহে
কেন পাঠাইলা বিধি এ অভাগা গণ?
বাসনা হলোনা পূর্ণ ; ত্যজিতে হইল
ভববাস ; প্রেমাস ছিড়িল অকালে।
প্রাণের অধিক প্রিয় পরিজনে স্মরি
আকুল এ ললাকে মাের,-কেমনে জানিনে

দুর্যোধন।
২৭
পুলকে ভূলােকে আছ তোমরা সকলে ?
তোমাদের মায়া মােরা পারিনি ভুলিতে
এখনও ;
নিশিদিন অলক্ষ্যে থাকিয়া
তাই গো দেখিতে অাসি ; তােমাদের সুখে
তাই সে অামরা সুখী এখনও এ লোকে ;-
আমাদের মায়া বল ভুলিলে কেমনে ?”।
অ র ত সহে না প্রাণে ; ফাটিছে হৃদয় ;
শিরায় শিরায় বহে মৰ্ম্মঘাতী ব্যথা।
মহারাজ দুর্যোধন! ভাগ।বান তুমি
শতগুণে, পরাজয়ে জয়ী তুমি গাজি।
শান্তির সুরথ লয়ে অন্তক আপনি
দাড়ায়ে শিয়রে তব, পরম আদরে
লইয়া যাবেন তােমা শান্তিময় দেশে ;-
এ চির হৃদয়াল, ঘোর মর্মব্যথা,
স্বার্থপরতার স্রোত: নাহিক যে স্থলে।
সুশীতল করতল স্নেহে বুলাইয়া
ভুলাবেন সব জালা, জুড়াইবে দেহ।
ক্ষণেক দাড়াও রাজা, জালি শেষ দিনে
একবার নেহাবিব ; কৃতাঞ্জলি পুটে,
অর্জুন মার্জনা চাবে সর্ব অপরাধে।
• (এন)

তৃতীয়
অঙ্ক।
প্রথম দৃশ্য
(দ্বৈপায়ণ তীর)
-
দুৰ্য্যোধন। (স্বগত) দ্রোণপুত্র অশ্ব খামা খ্যাত বীর বলি ;
আছে কি সামর্থ তার পার্থে বিনাশিতে ?
সাপি সেনাপতিপদে অভিষিক্ত হয়ে
ছুটিয়াছে কুরুক্ষেত্রে ; প্রতিজ্ঞা করেছে,
বধিবে সমরে আজি পাণ্ডুপুত্রগণে।
কিন্তু ইহা কি সম্ভব? নারি বিশ্বাসিতে
বাসববিজয়ী বীরে বধিবে মানব?
মৃগ কবে বধে মৃগেেের? দিবাকরে
কভু আচ্ছাদিতে পারে খদ্যেতিকা-দ্যুতি?
কি এক অজ্ঞাত ভয় উদিছে হৃদয়ে।
অপ্রসন্ন মনপ্রাণ-আতঙ্কে, সন্দেহে
বিহ্বল। চঞ্চলমতি অতি অশ্বত্থামা ;

দুৰ্য্যোধন।
;
ভাল করি নাই আমি তাহারে বরিরা
সেনাপতিপদে,-সে পদের যোগ্য নহে।
হুটকারীজনগণ ঘটায় সহ
অঘটন ; নাহি জানি কি ঘটিবে আজি ।
ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ গেল অশ্বথামা রথী।
বামন হইয়া কেবা ধরে শশধরে?
খঞ্জ কবে লঘ্যে হিমগিরি ? এ আসন্ন
কালে, বিপরীত বুদ্ধি ঘটিল আমারে।
(সহসা অর্জুনের প্রবেশ)
কেও আসিতেছে দ্রুত আমার সম্মুখে।
(নিরীক্ষণ করত)
ধনঞ্জয়! পরঞ্জয় তুমি, মহাবলী
কিন্তু এ দুৰ্ম্মতি কেন? আমার দুর্গতি .
দেখিতে এসেছ হেথা : লভিবে প্রসাদ
শত্রুর দুর্দশা দেখি? শুন, দুষ্টমতি ।
পতিত যে অরি তারে সম্মানে সতত
বীরকুল ;-বীরকুলে এই চিরপ্রথা।
পশুরাজ নাহি বণে মৃতপ্রায় পশু।
কেন অশ্রুজল তোমার নয়নে ?
বুঝিয়াছি—অনুতাপ জানলে গলিয়া
ফেলিছ শোকা, কিন্তু বৃখা এ রোদন।
অন্যায় সময়ে মারি অাৰ্য ভীষ্মদ্রোণে
করিয়াছ যে কুকৰ্ম্ম, ভুজ ফল তার
যাবৎ জীবন ভবে। কি হবে কঁদিলে ?
একি ।

দুর্য্যোধন। । দুষ্কৃতকারীর এই দণ্ড ভূমণ্ডলে। এখনই যাইব আমি এ সংসার ছাড়ি ; জুড়াইবে সব জালা, শােক, তাপ যত ; কিন্তু তুমি বৰ্তমান থাকি এ জগতে, ভুল দুঃখময় ফল দুঃখের সংসারে। তাের : মহাপাপী সদা পীড়াস্থল ধরার,-বর্বর তুই-শৃগালের মত উচিত বধিতে তােরে কট সংগ্রামে ;- তাের প্রদর্শিত পথে তােরে পাঠাইতে যমালয়, নীচাশয়! এই লয় মনে। পতিত যে আমি জি, দুর্গতি যে মম, সে কেবল তোদেরই সে কাপট্যের ফলে। নজেকে সহিত বল ন্যায়ের সময়ে দুর্যোধন ভুজবীৰ্য্য ? ধৰ্ম্ম যুদ্ধ যদি- শত ভীম হইলেও নারিত জিনিতে। ইচ্ছা হয় এই দওে গদার প্রহারে পাঠাই রে ধনঞ্জয় ! শমন-ভবনে ; ঘুচাই ধরার ভার পাপীরে বিনাশি। (গঙ্গা উত্তোলন} ( বক্ষস্থল পাতিয়া ) প্রহার ও ভীম গদা দিয়াছি পাতিয়া হৃদয় ; যে ঘােৰ দাহ দহে নিরন্তর, তার চেয়ে না! :: শ্রেয়ঃ শত গুণে। ক্ষা মাগে ;- অর্জুন-

দুৰ্য্যোধন।
কম, মহারাজ! তারে, ভুলি পূৰ্ব্বকথা।
কৌরব-গৌরব-রবি মহারাজ তুমি
দুর্যোধন, সুযোধন বিখ্যাত ভূতলে।
কি ব্যথা যে বাজে প্রাণে এ দশায় আজি
নেহারি তােমারে ভূপ! ক’ব তা কেমনে?
তক এ পতন রাজা নহে ও কেবল
তোমারই পতন,—তব সঙ্গে যায় চলি
কুরুকুলরাজলক্ষ্মী ; হয় অন্তগত
ভারত-গৌরব-রবি চিরদিন তরে।
অসমূদক্ষিতীশ্বর, স্ববলে শাসিলে
ভূভারত, ভূভারতে তােমার প্রভাব
নভস্পর্শী নগ প্রায় প্রভাতি অতি ।
চন্দ্রবংশ-যশচুড়া পড়িল ভাঙ্গিয়া
তব ভঙ্গে,—আর কেব
রক্ষ-বংশ-যশঃ যথা রক্ষে নিপাতে।
যা কিছু করেছি দোষ ক্ষম নিজ গুণে
মহাশয়, মহাশয়, সদাশয় তুমি।
যত দিন রৰ ভবে, নয়নের জলে
ভাসি দিবানিশি, স্মরি তােমা সবাকায়ে,
করিব হে প্রায়শ্চিত্ত-এই বাঞ্ছা চিতে;
এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত যদি কিছু থাকে।
মারিতে বাসনা যদি ? আনন্দে মরিব
তৈমার সম্মুখে, দেব। কিন্তু তার আগে
ক্ষমা কর নরনাথ ! এই ভিক্ষা মাগি।
গড়িবে তাহারে ?
,

দুর্যোধন
•
দুৰ্য্যোধন।
তুই কি অর্জুন সেই চির রণজয়ী
বীরত্ব-গৌরব-মত্ত ঘোর অহঙ্কারী?
এ বিনীত ব্যক্তি কি হে পার্থ মহাবলী
বুঝিয়াছি, টুটিয়াছে বীৰ্য-অহঙ্কার ;
পাষাণ! পাষাণ অাজি গলেছে অনলে।
মরুতে ফুটেছে ফুল ; নির্দয় হৃদয়ে
ছুটেছে দয়ার উৎস, প্রেমবন্যাবেগে
ধুয়ে গেছে হৃদয়ের যত আবর্জনা ।
ত্রিদিব-সৌন্দর্য্য আজি ফুটেছে বদনে
তোমার, হে ধনঞ্জয়। ধর্থ অজি তুমি ।
আয় ভাই বঁধি তোরে প্রেম কালিঙ্গনে
আজি এ বিদায় দিনে । এত দিন যদি
এ প্তেম-মুরর্তি ধরি আসিতিস, কাছে,
তবে আৰু কে করিত কুরুক্ষেত্র রণ?
মরিত না পুত্র; মিত্র, অমাত্য অকালে।
যাও ভাই হস্তিনায় ; রাজশূন্য আজ
এজাকুল, ভয়কুল রাজেন্দ্র বিহনে ; --
কর রাজ্য, পাল প্রজা, রাখ ধৰ্ম্মে মতি।
সবাকার অমঙ্গলভার শিরে লয়ে
চলিলাম আমি সবে থাকহ কুশলে।
পড়ক শান্তির জল; থাক সর্বজন
সদানন্দে,-মহানন্দে অশী
মহানন্দে আশীর্বাদ করি।
ফেলো না হে অশ্রুজল; বেঁধাে না হে আর
মায়াডোরে ;-কাদাওনা আর শেষ দিনে।
;

দুৰ্য্যোধন।
ওই দেখ ডাকে মােরে কর সঞ্চালি
পুত্র, পৌল, মিত্র, ভ্রাত; পশিছে শ্রবণে
মেহের আহ্বানবাণী সে দেশ হইতে।
মরণ-সাগর-তীরে দাঁড়াইয়া আমি ;
সম্মুখে ডাকিছে ওরা, চাই ছুটে যেতে ;
পিছনে ডেকোনা অার-যেতে দাও মােরে।
স্নেহের বন্ধন যত টুটেছে সকলি,
জীবন-আকাশ হতে তাই যাই ছুটে
নভচ্ছিন্ন তারা প্রায়-অনন্তে মিশিতে।
পেওনা মরমে ব্যথা অামারে স্মরিয়া।
যাও ভাই হস্তিনায় কহি করে ধরি।
কাণ্ডারীবিহীন অজি এ ভুব-সাগরে
কুরু-কুলরূপ-তরী-হও হে কাণ্ডারী
পালহ বিপুল রাজা, পুত্র হেন মানি।
এ কাৰ্য্যের উপযুক্ত তুমিই ভূতলে
থাকিলে,-অতুল তুমি ভুজবীর্যে বলি।
কদাচার, পাপাচার, ক্ষত্ৰকুলকালা
ছিল যারা—মরিয়াছে এ কাল অনলে।
মহাপ্রাণ! মহারাজ্য করহ স্থাপিত
ভারতে, সামন্তরাজ করি বশীভূত।
হও একছত্রী রাজা, দূর করে দিয়ে
হিংসা-দ্বেষ-বিষে ভরা ক্ষুদ্র রাজদলে ;-
অকর্মণ্য, অপদার্থ, ক্ষুদ্রশ্বার্থে রত।
যে সকল অন্তরায় অছিল এ পথে

৩৪ দুৰ্য্যোধন। দুরন্তর-অন্তরিত এতদিন পরে। কুরুক্ষেত্ৰ-দাবানলে গেছে ভষ্ম হয়ে যতেক কণ্টকবৃক্ষ; নিষ্কণ্টক এবে রাজপথ, সেই পথে যাও চলি, বলি ! সাম্রাজ্য-শিখন-শিরে, রাজরাজেশ্বর। মহামীরুহয় মহামহীপাক্ত সুশীতল ছায়াদনে তুষিবে সতত আশ্রিতরে, প্রজাকুল হবে চিরসুখী। দর্শন-বিজ্ঞান-শিল্প-রূপ-পান্থ কত আসিবে সে ছায়াতলে ; সে রাজ-প্রসাদে ঋদ্ধিসিদ্ধি বৃদ্ধি হবে দূরে যাবে দুঃখ। এইরূপ মহারাজ্য স্থাপনের তরে আরম্ভিনু এসমর,—উদ্দেশ্য আমার- এক মহারাজ মাত্র রবে এভারতে এক মাত্র সুরক্ষক রক্ষিবে সকলে। দুই কিংবা বহু প্রতিদ্বন্দ্বী যদি রহে দেশে – প্রাধান্যের তরে নিত্য দ্বন্দ্ব ঘটে ; পরস্পর বলহীন অন্তর বিগ্রহে। বহি: শর্জ যদি দেশ আক্ৰমে সেকালে ভীম পরাক্রমে কেছ নারে কোনক্রমে ক্ষিতে স্বদেশ। যদি সব দেশবাসী- একপ্রাণে. একমনে, একধ্যান ধরি পশে কার্যক্ষেত্রে,-হয় কাৰ্য উদ্ধার। সে কাৰ্য্য, নন। কিন্তু, সদা অসম্ভব ।

দুৰ্য্যোধন।
বছরভিযুক্ত দেশে-ভেদযুক্ত সদা।
ঐকতান না শিখলে সর্ব প্রজাকুলে
বাজেনা জাতীয় বাদ্য,
উঠে না নাচিয়া
এক দিনে সব প্রাণ একই উদ্দেশে
এক ধ্রুবতারা রাখি নয়ন সম্মুখে
ছোটো সবার প্রাণ, এক আশা লয়ে
ভাসেনা কখন তার কর্মের সাগরে।
একটি ইঙ্গিতে মাত্র পারেনা ত্যজিতে
সব প্রাণ-নাহি বুঝে একতার ভাষা।
এই ভাবি, মহাভাব ! এ মহা আহবে
আঘানি অনিনু সবে। ঘোর রক্তস্রোতে
ভাসিল এ ধরাতল; নির্বীরাসহইলা
ধরণী ; পুড়িল দেশ ঘাের দাবানলে।
কই, পার্থ ! কৃপা করি, ভ্রঙ কি হে আমি ?
নহ পূর্ণ ভ্রান্ত, যুক্তিযুক্ত এ কল্পনা,
অত্যুত্তম অভিয়, লক্ষ। উচ্চ অতি ।
কিন্তু হে পার্থিব ! তুমি যে পন্থা ধরিয়া
যাইতে চাহিয়াছিলে সেই লক্ষ্য স্থলে,
কুপথ সে-এ কুফল তেঁই সে ফলিল।
বঁধিতে একতাসূত্রে বাঞ্ছা তব যদি,
গৃহভঙ্গে সেই কৰ্ম্ম কেন আরম্ভিলে?
চাহিলে পশিতে স্বর্গে নরকের পথে,
রাজেন্দ্র ! এ ভ্রান্তি হেতু ঘটিল এ গ্রন্থ
ভ্রাতৃ-বিরোধের সূত্র ধরিয়া চলিলে,
অর্জুন।
}

দুৰ্য্যোধম
কে বল, পুশিতে পারে একতার দ্বারে ?
ভাতায় ভ্রাতায় যদি সুদৃঢ় বন্ধনে
(সহজন্ম শত বন্ধ যদি, ও তথায় )
বাঁধিল পরস্পরে-কোন্ মন্ত্রবলে
বাঁধিবে অপরে তারা? কহ মহারাজ
এ সরল সত্য কেন চিত্তে নাউদিল ?
হের রাজা! শক্তিহীন ভ্রাতৃ-রক্ত-পাতে
ভারত -মহাপাতকে পাতকী সকলে।
মহামহীরুহচয় প্রলয়ের ঝড়ে
ভূপতিত; বীরহীন:প্রায় বীরস্থলী।
যা কিছু দেথিছ সবই ক্ষুদ্র তরুরাজি,
আছে যারা দাঁড়াইয়া এখনও এদেশে।
অাবার ঝটিকা যৰে আসিবে গরজি ;
গর্জিবে বিপদ-বর্জ প্রলয়ের রবে ;-
বল কে সহিবে সবে ? বিগত সকলি।
হায়রে, অদৃষ্ট বশে প্রমােদ উদ্যান
এ শ্মশানে পরিণত ; চিররাহুগ্রাসে
অন্তগত সুখশশী ভারত আঁধারি ।
কিন্তু বাকেমনে আমি দিব উপদেশ
তোমায়, হে সুধীবর! সুধীশ্রেষ্ঠ তুমি।
রাজকার্যে পারদর্শী ;—চির বনচারী
এদাস, বিবশ তাহে এ বিষম শােকে।
বিষাদের তথশ্বাসে গেছে ভষ্ম হয়ে
জ্ঞান-পুষ্প, বুদ্ধি-বৃক্ষ হৃদয়-উদ্যানে :

দুর্যোধন।
৩৭
দুর্যোধন।
যুধিষ্ঠির।
৭।
কোথা আছি, কেন আছি, বুঝিতে না পারি।
( নেপথ্যে দৃষ্টি করত)
আবার কিসের ধ্বনি ? প্রাণের মােন
কার আসি পশে কাণে এ ঘোর নিশীথে ?
( যুধিষ্ঠিরের প্রবেশ )
একি ভাই সুযোধন! ধুলার শয়নে
পতিত কি হেতু তুমি? অভিমানভরে
শুয়েছ কি এ শয়নে ? ত্যজ অভিমান,
উঠ উঠ প্রাণাধিক, এস বুকে ধরি
জুড়াই প্রাণের জ্বালা। যা ছিল কপালে
ফলেছে তা-পূরিয়াছে বিধির বাসনা।
কুরুরাজসনে পুনঃ তোরে ঝুলাইয়া
যাব বনে, ছার রাজ্যে নাহি প্রয়ােজন।
প্রাণান্ত প্রতিজ্ঞা করি, প্রচণ্ড সংগ্রামে
বধিলাম কোন রিপু? বিপুল অয়াসে
লভিলাম কোন ফল ? হায় ! মরি! মরি!
প্রাণাধিক প্রিয়তম, আত্মীয়, স্বজনে
বধিলাম রিপুজ্ঞানে; যাদের বিরহে,
জীবন-মরণাধিক, সংসার-শ্মশান ;
যাদের কারণে লােক বাছে এ জগতে
ভােগনুখ, রাজৈশ্বৰ্য্য; যাহারা এভবে
জীবনে স্নেহের গ্রন্থি, কৰ্ম্মেতে প্রেরণা ;
হায় ! ভ্রান্তিমদে মাতি বনুি সে সবে।
লােভে পাপ, পাপে মৃত্যু, সত্য এই কথা।
•

দুৰ্য্যোধন।
দুর্যোধন।
কেমনে করিব বাস আর এ সংসারে ?
কোন সুখে, কোন লােভে, কোন ধর্ম ধরি।
কে পারে করিতে বাস ভীষণ শ্মশানে,
স্বজন-শোণিত-সিক্ত, চিতাভষ্মাবৃত।
প্রাণান্ত পৰ্য্যস্ত থাকি অরণ্যে প্রান্তরে
কাটাইব, মগ্ন রহি সাপসাগরে।
আয় ভাই, রাখ কথা, শত্রু বলি আর
ভাবিও না-এ মিনতি করি করে ধরি।
অহো ! বুঝিয়াছি ভ্রম অামি এতদিনে ;
ধৰ্ম্মরাজ! ধৰ্ম্মরাজ নরদেহে তুমি।
পদে ধরি দয়া করি দাও পদধুলি
অন্তিমে, চরণ প্রান্তে পতিত অধমে।
মহতের পদধূলি মহৌযুধিরূপ
ভবরােগে, সেই রোগে জর্জরিত অামি
কি আর কবি অৰ্য্য! অশেষপ্রকারে
দোষী দাস ৷৷পদেতে ভুল’ সে সকলি।
হিংসা, দ্বেষ, অভিমান আজি ভুলে গিছি
কেহ শত্রু নাই মম এ মহীমণ্ডলে।
কেন দয়াময়। মা জ্ঞানের প্রদীপ
জ্বলিল এতদিন; কেন না বুঝি
ধৰ্ম্মরাজ-ধৰ্ম্মরাজ, মহারাজ তিনি।
মহারাজ্য সংস্থাপিতে শক্তি আছে কার
তিনি বিনা। সিংহাসনে এতদিন যদি
: তোমারে বৃসায়ে, পঞ্চোত্তর শত ভূত

দুৰ্য্যোধন।
মিলে সাধিতম কাজ মিলিত সঙ্গে
সুখময় সিদ্ধিফল সাধন পাদপে ;
এ ঘোর রক্তের স্রোত বহিত না কভু ;
মরিত না কুল ; হত না নিম্মুল
বীরকুল ; এ বিপুল শোকে কাদিত না
এ হৃদয় -শেষদিনে মরিম সুখে।
হয় বিধি কেন মোরে তাপিলে এরূপে ?
(ভীরে প্রবেশ )
বৃকোদর! আসিয়াছ অামারে দেখিতে ?
কিন্তু, কেন ম্লানমুখে, আনত অাননে ?
বীরবর মুখে কেন নাহি সরে বাণী ?
হের ভগ্নউরূ আমি, ধরার শয়নে,
তব ভীম গদাঘাতে -অন্যায় সমরে ;
কিন্তু ত্যজ লজ্জা-লজ্জা দিব না তোমারে
আজি এ বিদায় দিনে ; চাহ মুখ তুলি।
পরে ব্যথা দিতে ব্যথা বাজিতেছে প্রাণে
বিষম, সেহেতু অজি প্রেম বিনিময়ে
তুষিব সারে, এস বাপি আলিঙ্গনে।
এত দিন জ্বলেছি ত বিদ্বেষ-অমলে ।
শিশাচের প্রায় পরস্পর করেছি ত
কত মৰ্ম্মত ; কত শত স্নেহলতা
উপাড়িয়া ফেলিয়াছি হৃদয় হইতে।
রীরঙ্গালয়ে হত্যাকাণ্ড-অভিনয়
করিয়াছ কত-দাও যবনিকা ফেলে।

৪০
দুৰ্য্যোধন।
যাও ভুলে বৃকোদর সে সব কাহিনী।
এস আজ নবরঙ্গে নবরঙ্গালয়ে
নব নাট্য অভিনয়, করিব কৌতুকে ।
গেমদৃশ্য দেখাইৰ প্রেম সাজে সাজি,
প্রেম আলিঙ্গনে মিলি হৃদয়ে হৃদয়ে।
কেন ভাই! অধােমুখে দায়ে এখনাে;
পেতেছ কি ব্যথা মনে স্মরি পূর্বকথা?
ভুলে যাও, ভুলে যাও করি হে মিনতি।
অন্তরের অন্ত হতে করিতেছি ক্ষমা
তুমি কর ক্ষমা মােয়ে, এস’তে নিকটে।
দাড়ায়ে এ জীবনের সাগর-সঙ্গমে,
হেথাকার যা কিছু সে সব ফেলে দিয়ে
ভবনদী অবর্জনা—যেতে চাই ভেসে
আজি এ.সাগরপারে ;-দাও ত্বরা ফেলে
প্রাণের যতেক ভার ; বিদিত জগতে
যত ভারীন তত সুখ সন্তরণে।
আসিবার কালে ভাই ওপার হইতে
যা কিছু আনিয়াছিনু-ভেলা বাঁধি তাহে
এ পারের কিছু ভাই না যায় সে পারে।
ভেবে দেখ ভ্রাতা মােরা ভীম দুর্যোধন
শৈশবে, কৈশোরে পরস্পর সহ চর ;
এক ভেজেন পান-কত্র শয়ন ;
এক সঙ্গে হাসি খেলা, প্রসােদ বিনোদ;
কিন্তু ছার সংসারের মোহমদে ভুলি

দুর্যোধন
৪১
হিংসা, দ্বেষ, বৈরিতায় জর্জরিত দেহ
উভয়ে, দোহার বাঞ্ছা দোহারে বধিতে।
ছলে বলে কি কৌশলে বৈর নির্যাতন
সাধিতে দোহার সাধ-যত্ন ঐকান্তিক।
ছি ছি ! সে মােহের বশে ভ্রাতৃপ্রেম ভুলি,
ভুলি সে অজন্ম সখ্য, বিপক্ষতা করি
তুলিয়া দিয়াছি বিষ তাের এই মুখে
অলক্ষে ; পাণ্ডবপক্ষে পোড়াবার তরে
নিশাযােগে অগ্নিযোগ করি জতুগৃহে।
অজি কেঁদে উঠে প্রাণ স্মরি সেই কথা।
হায়! ভাগ্যদোষে মম, কোথা হতে ছার
পিশাচের দল অাসি বেড়িল জামারে
চৌদিকে, শৈবাল দল কমলেরে যথা।
দুষ্টবুদ্ধি রাহু আবরিল জ্ঞানরনি ।
স্নেহ, প্রেম, সরলতা -কুসুম সকল
কাইল ;-পৈশুন্যের নিদাঘ-নিশ্বাসে।
প্রমােদউদ্যান নাশি বসাইনু সাধে
মরুভূমি হৃদরাজ্যে ; মারের মালা
দূরে ফেলি লােভিলাম জুর কাল ফণি !
চাটুকার চাটুবাণী প্রথম বয়সে
ঘটায় কি কুঘটন; কি যে সর্বনাশী
বুদ্ধি আসি অসময়ে বিনাশে কিশােরে
সঙ্গদোষে,—সেই জানে, পতিত যেজন
মম সমসর্বনাশ ঘটে অনায়াসে।
w

৪২
দুৰ্য্যোধন।
( বাহু প্রসারিত করিয়া )
আজি ভ্রাত! ভূত কথা হও হে বিস্মৃত ;
অয় ভাই রাখি তোরে হৃদয়-মাঝারে
ক্ষণকাল ; ক্ষণকাল মাত্র অবশেষ
আমার, প্রাণের ভার রাখ নামাইয়া।
বাল্যকাল, বাল্যসখা! পড়িতেছে মনে ;
সুখময়ী সেই স্মৃতি আনিছে বহিয়া
মায়াবলে, পুণ্যময় ত্রিদিব হইতে
মধুর মন্দার গন্ধ, মন্দাকিনী ধারা,
চিরানন্দ নন্দনের মন্দ সমীরণ;
অমৃত আসারে তাই যায় জুড়াইয়া
হিংসা বিষে জর্জরিত এ নশ্বর দেহ।
শৈশবে অথবা বাল্যে যেমন অগ্রহে
মিলায়ে দুইটি গণ স্নেহের পুলকে
করিতাম মালিঙ্গন-অায় সেইরূপে
বদ্ধ হই বাহুপাশে ; দেখুক জগতে
এ মধুর প্রেমদৃশ্য ; শিখুক সকলে
হিংসায় নাহিক সুখ এ বিশ্বসংসারে।
(আলিঙ্গন করিয়া)
সুচিরসন্তপ্ত দেহ পরিতৃপ্ত অজি ;
নিদাঘে পাদপ যথা তৃপ্ত বারিপাতে।
( নকুল ও সহদেবের প্রবেশ )
মাদ্রীসুত ভ্রাতৃগয়! তােমরাও হেথা
আসিয়াছ--এস তবে দাও আলিঙ্গন

দুৰ্য্যোধন। ৪৩ পরম সৌভাগ্য মম এ চরম কালে পাইলাম অবসর ক্ষমা মাগিবার তাে সবার পাশে এস, এস শীঘ্রগতি। ; ( আলিঙ্গন করত। আজি ভাই কর ক্ষমা—অশেষ প্রকারে অাছি অপরাধী অামি তােমাদের পাশে। দিয়াছি অশেষ ক্লেশ কপট কৌশলে ; বধিয়াছি পুত্র মিত্রে অন্যায় সমরে ; যতেক করেছি দোষ ভুলে যারে আজি- এই ভিক্ষা, দুৰ্য্যোধন মাগে করপুটে। সহদেব। সকলই অদৃষ্ট-খেলা নহে দোষ তব রাজেন্দ্র-বীরেন্দ্রকুলা হত দৈববলে দুঃখ যে পেয়েছি মােরা সেও দৈববশে ; এ আসন্ন কালে কেন অসুন্ন কর চিত্তেরোশান্ত-চিত্তেচিন্ত পরমেশ- পদাম্বুজগদম্বুজধারী মুর-অরি; হে নরেশ-পরমেশ শেষের ঔষধি। দুৰ্য্যোধন। (সচকিতে ) মেহের উচ্ছাসে ভাসি ছিনু অন্যমনে এতক্ষণ,-এইক্ষণে আসন্ন বিপদ! একে একে পঞ্চ ভাই শিবির ত্যজিয়া আসিয়াছ—এ নিশীথে কে রক্ষিছে বল অরক্ষিত শিবিরেতে সুখ নিদ্রাগত শিশুগণে, আর কুল-মহিলামগুলে?

৪৪
দুৰ্য্যোধন
।
যাও ত্বরা বৃকোদর, যাও ধনঞ্জয়,
যাও সবে ত্বরা করি শিবির উদ্দেশে।
এইমাত্র অশ্বথামা দৃপ্ত মহারােষে
ছুটিয়াছে ধূমকেতু প্রায় রণস্থলে ;
জ্ঞানহীন দ্রোণপত্র অতি হটকারী,
কি জানি কি ঘটাইবে যাও শীঘ্রগতি।
হতভাগ। অতি গই কুরুকুলপতি,
তাই ভয় মনে, এই মরণের কালে
পুন: কি বিপদরাশি ঘেরিবে সহসা !
দুর্দৈব-নীরদদলে বুঝিবা ঢাকিবে
ক্ষীণ আশা চন্দ্রকলা; জ্বালায় উপরে
বাড়িবে দ্বিগুণ জ্বালা -যাও মনোগতি।
( সকলের প্রস্থান)
{ অত) প্রাণের ভিতর হ'তে থাকিয়া থাকিয়া
কাঁদিয়া উঠিছে কেন ? বিধাতার মনে
এখনও কি আছে সাধ মোরে কঁাদাইতে
?
পুনঃ কি বিপদ-বজ্র গর্জিকে মশুকে ?
পুনঃ কি নয়ন জলে ভাসিতে হইবে ?
কিন্তু, বিধি । আশা তব আর পূরিবে না ;
কি আর রেখেছ বল অামার এ ভবে ?
কার তরে বল আর করিবে রোদন
দুর্যোধন-প্রাণাধিক ধন সবই গেছে।
বজ্রাহত শালতরুপ্রয় এ শ্মশানে
আছি মাত্ৰ দাড়াইয়া-মুকুল, পল্লব

দুৰ্য্যোধন।
৪৫
সকলি পুড়িয়া গেছে; আমিও এখনি
যাই সংসার ছাড়ি; সর্বঅঙ্গ ব্যাপি
মরণের শীতস্পর্শ হয় অনুভূত।
তবুও অকূলচিত্ত কি জানি কি লাগি ।
জীব দিবা-অবসানে মরণের পথে
চলেছি ছুটিয়া ; ছিল যে সব বন্ধন
সংসারের সনে -তাহা টুটেছে সকলি ;
তবে কেন কাদে 'পাণ এ আসন্নকালে?
কার এ মেহের সূত্র রাখে তবু বেঁধে ?
বুঝিয়াছি, জন্মভূমি ! তব সনে আছে
মেহের বন্ধন শতশত জনমের।
অসিবার কালে যথা সয়েছিলে কোলে
মহানন্দে ; নিরানন্দে যাইবার দিনে
লইয়াছ কোলে পুনঃ তখম-সন্তানে!
আসন্নমরণ সূতে নেহারি যেমতি
নীরবে নয়ন-জল ঝরে জননীর
সেইরূপ তব অশ্রু উত্তপ্ত পশে
আকূল হতেছে প্রাণ ; তোমারি জননি!
সকরুণ লােদনের ধ্বনি পশে গণে।
এ জড় প্রকৃতি মাগাে তােমারই মূরতি,
কত চাবে, কতরূপে আকর্ষণ করে।
চরমে বুঝিনু মাগাে পরম করুণা-
তোমার, এ শেষবার নমি তব পদে।
বিদিত আছ মাতঃ! 'হৰ হিতব্রতে,
।

দুৰ্য্যোধন।
দিছি আহুতি সব -পুত্র মিত্ৰ আদি ।
আমার বলিয়া কিছু রাখিনি লুকায়ে ।
এ অন্তিমে কহি পুনঃ ধৰ্ম-সাক্ষী করি
তব হিত জন্য যত কৰ্ম্ম অয়ােজন
আমার --স্বজন-ধন মান-সূত আদি
উৎসর্গিনু তব শুভ-উদ্দেশে সংসারে।
সতত ভারতলস্নী চির লক্ষাগত
অাছিল—এ কথা সত্য কহিনু জননি!
কিন্তু মা জানি না কিবা তার পরিণাম ;-
রোপি বা কোনবৃক্ষ, কি ফল ফলিবে,
তব সুখ, দুঃখ কিংবা বাড়ানু, জননি।
হয় ত ভ্রমের বশে বিফ সাধনা
সাধিন ; রোপিলাম কল্পবৃক্ষ ভাবি
বিষবৃক্ষ ; দুঃখমাল দিনু বাড়াইয়া।
জ্ঞানকৃত অপরাধে নহে কিন্তু দোষী
এ দাস; অজ্ঞানকৃত অপরাধ মত
মিজ গুণে, দয়াময়ি, ক্ষম সে সকলি ।
দৈবাধীন কৰ্ম্মফল জান তাহা তুমি
কি করিতে কি হইল বলিতে না পারি।
( পঞ্চমুণ্ড লইয়া অশ্বত্থামার প্রবেশ),
প্রতিহিংসা-রূপ-ব্ৰত পূর্ণ এতদিনে,
দুষ্কর্যের ফল আজি ফলেছে পাবে।
যার জন্য এত কষ্ট,‘মষ্ট কুরুকুল,
বহু কষ্টার্জিত বিত্ত ধর রাজা সেই
অশ্বত্থামা।

দুৰ্য্যোধন। ৪৭ পঞ্চ পাণ্ডবের মুণ্ড-শেষ উপহার। সন্তপ্ত হৃদয়ে ভব এ অন্তিমকাল এ বলি, হে বলি, স্নিগ্ধ শান্তিবারিধারা নরষিবে—সুনিশ্চয় জানে অশ্বত্থামা। (একটি মুঙ তুলিয়া লইয়া ) অসম্ভব হইল সম্ভব? পরাভব পাইল পাওব দ্রোণি হস্তে ? চিত্তে কিন্তু হয় প্রত্যয়। একি তবে ভ্রান্তিলীলা ? কিংবা এ কুহক ? দেখি পরীক্ষা করিয়া ( নিরীক্ষণ করত) অহে! ঘুচিয়াছে ভ্ৰম, এ নহে কুহক ; বীরত্ব-অর্জিত নহে এই উপার। কি কৰ্ম্ম করিলে বিপ্র । এই উপহারে, তুষিতে চাহিলে মােরে? রে হত বিধাত! কি পাপে এ ননস্তাপ দিলি এ অন্তিমে । কি করিলে অশ্বথামা ! এ কুরুকুলের জলপিণ্ডস্থল মাত্র এ পঞ্চ কুমার ; চরমের একমাত্র অাশা, ভ্রান্তিশে বিলোপিলে বংশলােপ হ’ল কুরুকুলে। দুষ্টবুদ্ধি দুৰ্য্যোধন! সৰ্ব্বনাশী যম- রূপে তুই এসেছিলি কুরুকুলে ; হায় ! বংশনাশ করিলি এরূপে । মরি! মরি । নিশীথে নিঃশঙ্কচিত্তে সুখ নিদ্রাগত ছিল বৎসগণ -গুপ্ত তস্করের করে

B
দুৰ্য্যোধন।
।
লতেছে অন্যায়, মৃত্যু। অজ্ঞাতে পশিয়া
তরুর কোটর মাঝে কিরাত যেমতি
নাশে পক্ষী শাবকেরে-নির্দয়-হৃদয়-
নির্দয়-হৃদয় দ্রোণি সেইরূপে পশি
নাশিয়াছে শিশুগণে, অরক্ষিত যবে
শিবির ; দেখালে ভাল বীরক্ত জগতে।
ঘােষিবে কুযশ তব চিরদিন তরে-
সংসার, চিরকলঙ্কে করি কলঙ্কিত।
কেশরী-বিবরে পশি নিশার আঁধারে
বধেছ শাবক তার, সে কেশরী যবে
ছিল স্থানান্তরে; কিন্তু চিন্ত সদুপায়-
কেমনে রক্ষিবে প্রাণ, অাক্রমিবে যবে
রোষে, ক্ষোভে, পুত্রশােকে উন্মত্ত কেশল্পী।
কি আর কহিৰ অমি,-এ শেষ বিষাদে
আঁধার দু’তেছে মম নয়নের মণি ;
জীবনের শেষ গ্রন্থি ছিড়িল এরূপে।
অন্তিমে অনন্তময় এ মিনতি পদে
সবাকার অমঙ্গল যাক্ মম সনে।
কুশলে থাকুক সবে আনন্দে, উল্লাসে।
.
সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Duryadhan

Author
Nag,upendranath
Title
Duryadhan
File name
Duryadhan
Text
OCR done
Citation
1908
Published
2009/11/25
Publisher
N.a
Language
Sanskrit
Pages
62
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Duryadhan
DLI number
512621
Barcode
4990010019678.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
TS2cUhQlVnz
Download PDF

Duryadhan