Belgaria Sudha Smriti Pathagar

Rama Ed.7

Chattopadhayay, Sharatchandra · 2010/03/22

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

রমা
পল্লী-সমাজ
আর্ট থিয়েটার কর্তৃক ষ্টার রঙ্গমঞ্চে অভিনীত
প্রথম অভিনয়রজনীশনিবার ১৯ শ্রাবণ, ১৩৩
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স
২০৩৯১,কর্ণওয়ালিশ ফুট • কনিকতা
১৩৪১

দুই টাকা সপ্তম সংস্করণ নাট্রোল্লিখিত ব্যক্তিগণ বেণী ঘােষাল রমেশ ঘােষাল ১ । । মধু পাল জমিদার ঐ খুল্লতাত পুত্র মুদী হেডমাষ্টার যদুনাথ মুখুয্যের ••• বনমালী পাড়ুই যতীন ••• কনিষ্ঠ পুত্র, রমার ভাই •• গােবিন্দ গাঙলী ধর্মদাস চাটুয্যে ভৈরব আচাৰ্য্য গ্রামবাসিগণ দীননাথ ভট্টাচাৰ্য্য যষ্ঠিচরণ পরাণ হালদার ভজুয়া রমেশের হিন্দুস্থানী দবােয়ান গােপাল সরকার ঐ সরকার দী ভট্টাচার্যের ছেলে-মেয়েরা, ময়রা, ভৃত্য, খরিদ্দারগণ, বাঁড়ুয্যে, নাপিত, যাত্রী, কর্মচারী ভিখারিগণ, কুলদা, কৃষকগণ আকবর, গহর, ওমান, বৈষ্ণব, সরকার, সনাতন হাজরা, জগন্নাথ, নবােত্তম, দরােয়ান ইত্যাদি বিশ্বেশ্বরী বেণীর মা রমা যদু মুখুয্যের কন্যা রমার মাসী, সুকুমারী, ক্ষান্ত, খেদী, নন্দর মা, ভিখারিণীগণ বৈষ্ণবী, লক্ষ্মী ইত্যাদি

No text on this page.

মা
পল্লী-সমাজ
প্রথম অঙ্ক
প্রথম দৃশ্য
যদুনাথ মুখুয্যে মশায়ের বাটীর পিছনের দিক। খিড়কীর আর খােলা, সম্মুখে প্রশ
পথ। চারিদিকে আম কাঁঠালের বাগান। এবং অদূরে পুষ্করিণীর বাধানাে ঘাটের
কিয়দংশ দেখা যাইতেছে। সকাল বেলায় মা ও তাহার মাসি স্নানের জয় বাহির হইয়া
আসিল এবং ঠিক সময়েই বেণী ঘােষাল আর একদিক দিয়া প্রবেশ করিলেন। মার
বয়স বাইশ তেইশের বেশি নয়। অল্প বয়সে বিধবা হইয়াছিল বলি হাতে কয়েক গাছি
চুড়ি ছিল, এবং খানের পরিবর্তে সরু পাড়ের কাপড় পরিত। বেণীর বয়সও পয়ত্রিশ
ছেিশর অধিক হইবে না
বেণী। তােমার কাছেই যাচ্ছিলেম রমা।
মাসি।
তা’ খিড়কীর দোর দিয়ে কেন বাছা ?
রুমা।
তােমার এক কথা মাসি। বড়দা ঘরের লােক, ওর আবায়
সদর-খিড়কী কি? কিছু দরকার আছে বুঝি? তা ভেতরে গিয়ে
একটু বসুন না, আমি চট করে ডুবটা দিয়ে আসি।
বেণী। বসবার ঘষা নেই দিদি, ঢের কাজ। কিন্তু কি করবে স্থির
করলে?
রমা। কিসের বড়া ?
যেণী। আমার ঘােট খুডাের খাদ্ধের কথাটা বােন। রমেশ ত কাল

২
রমা
প্রথম অঙ্ক
এসে পৌছেছে। বাপের শ্রাদ্ধ নাকি খুব ঘটা করেই করবে। যাবে।
মাকি ?
রমা।
রম। আমি বাবাে তারিণী ঘােষালের বাড়ী।
বেণী। সে ত জানি দিদি, আর যেই কেন না যাক, তােরা
কিছুতেই সে বাড়ীতে পা দিবি নে। তবে শুনতে পেলাম ছোড়া নিজে
গিয়ে সমস্ত বাড়ী বলে আসবে। বজ্জাতি বুদ্ধিতে সে তার বাপের ওপরে
ৰায়। যদি সত্যই আসে কি বলবে?
আমি কিছুই বােলব না বড়দা,বাইরের দরওয়ান তার
জবাব দেবে।
মাসি। দরওয়ান কেন না, আমি বলতে জানি নে ? নচ্ছার
ব্যাটাকে এনি বলাই বােব যে, বাছাধন জমে কখনাে আর মুখুয্যে-
বাড়ীতে মাথা গলাবে না। তারিণী ঘােষালের ছেলে ঢুকবে নেমতন্ন
করতে আমার বাড়ীতে! আমি কিছুই ভুলি নি বেণীমাধব । তারিণী
এই ছেলের সঙ্গেই আমার রমার বিয়ে দিতে চেয়েছিল। তখনাে ত
যতীন জন্মায় নি, ভেবেছিল যদু মুখুয্যের সমস্ত বিষয়টা তা হলে মুঠো
মধ্যে আসবে। বুঝলে না বাবা বেণী !
বেণী। বুঝি বই কি মাসি, সব বুঝি।
মাসি। বুঝবে বই কি বাবা, এ ত পড়েই রয়েছে। আর তা
যখন হল না তখন ঐ ভৈরব আচায্যিকে দিয়ে কি সব জপ-তপ,তুক-তাক
করিয়ে মায়ের কপালে আমার এমনি আগুন জ্বেলে দিলে যে ছমাস
পেরুল না বাছার হাতের নােয়া মাথার সিদুর ঘুচে গেল। ছােট জাত
হয়ে চায় কিনা যদুমুখুয্যের মেয়েকে বৌ করতে। তেমনি হারামজাদার
মরণও হয়েছে। সদরে গেল মকদ্দমা করতে আর ঘরে ফিতে হল না।
এক ব্যাটা, তার হাতের আগুনটুকু পর্যন্ত পেলে না। ছােট জাতের
মুখে আগুন।

প্রথম দৃশ্য
রমা
কেন মাসি, তুমি লােকের জাত তুলে কথা কও ? তারিণী
ঘােষাল বড়দারই ত আপনার খু:1। বামুন মানুষকে ছোট জাত বল কি
করে ? তােমার মুখে যেন কিছু বাধে না।
বেণী। (সলজ্জে ) না রমা, মাসি সত্যি কথাই বলেছেন। তুমি
বড় কুলীনের মেয়ে, তােমাকে কি আমরা ঘরে আনতে পারি বােন ?
ছােট খুড়াের এ কথা মুখে আনাই বেয়াদপি। আর তুক-তাকের কথা
যদি বলত সে সত্যি। দুনিয়া ছােট খুড়ো আর ভৈরবের অসাধ্য
কাজ কিছু নেই। রমেশ আসতে না আসতে ঐ ব্যাটাই ত জুটে গিয়ে
হয়েছে তার মুরুব্বি।
মাসি।
সে ত জানা কথা বেণী। ছােড়া বছর দশ বারাে ত দেশে
আসে নি -সেই যে মামারা এসে কাশী না কোথায় নিয়ে গেল
আর কখনাে এ মুখো হাত দিলে না। এতকাল ছিল কোথায় ?
কছিল কি ?
বেণী। কি করে জান্বাে মাসি। ছোট খুড়াের সঙ্গে তােমাদেরও
যে ভাব আমাদেরও তাই। শুচি, এতদিন বােম্বাই না কোথায় ছিল।
বলচে ডাক্তারি পাশ করেছে, কেউ চে উকিল হয়েছে,আবার
কেউ বলচে সব ফাকি। ছোড়া নাকি পাড় মাতাল। যখন বাড়ী এসে
পৌছল, তখন চোখ দুটো ছিল নাকি জবা ফুলের মত রাঙা।
মাসি। বটে? তাহলে ত তাকে বাড়ী ঢুকতে দেওয়াই যায় না।
বেণী। কিছুতে না। হ রমা, তােমার রশেকে মনে পড়ে ?
রমা।
( সলজ্জ মৃদু হাসিয়া) এ ত সেদিনের কথা বড়দা। তিনি
আমার চেয়ে বছর চারেকের বড়। এক পাঠশালায় পড়েচি, এক সঙ্গে
খেলা করেচি, ওঁদের বাড়ীতেই ত থাকতাম। খুড়িমা আমাকে মেয়ের
মত ভালবাসতেন।
মাসি। তার ভালবাসার মুখে আগুন। ভালবাসা ছিল কেবল
से

রুমা
প্রথম অঞ্চ
কাজ হাসিল করবার জন্যে। তাদের ফন্দিই ছিল কোন মতে তােকে
হাত করা। কম ধড়িবাজ ছিল রমেশের মা !
বেণী। তাতে আর সন্দেহ কি। ছােটখুড়িও যে-
রমা। দেখে মাসি, তােমাদের আর যা ইচ্ছে বল, কিন্তু খুড়িমা আমার
স্বর্গে গেছেন, তাঁর নিন্দে আমি কারও মুখ থেকেই সইতে পারবাে না।
মাসি। বলিস্ কি লো? একেবারে এতাে ?
বেণী। তা বটে, তা
তা বটে। ছােটখুড়ি ভাল-মানুষের মেয়ে
ছিলেন। তার কথা উঠলে মা আজও চোখের জল ফেলেন।
যাক, কিন্তু এই ত স্থির রইল দিদি, নড়চড় হবে না ত !
রমা। ( হাসিয়া ) না । বড়দা, বাবা বলতেন আগুনের শেষ, ঋণের
শেষ, আর শত্রুর শেষ কখনাে রাখিস্ নে রমা। তারিণী ঘােষাল জ্যান্তে
আমাদের কম জ্বালা দেয় নি,বাবাকে পর্যন্ত জেলে দিতে গিয়েছিল।
আমি কিছুই ভুলি নি, বড়দা, যতদিন বেঁচে থাকূবব ভুলব না। রমেশ
সেই শত্রুরই ছেলে। আমরা ত নয়ই—আমাদের সংস্রবে যারা আছে
তাদের পর্যন্ত যেতে দেব না।
বেণী। এই ত চাই। এই ত তােমার যােগ্য কথা।
রমা। আচ্ছা বড়দা, এমন করা যায় না যে কোন ব্রাহ্মণ না তার
বাড়ী যায় ?
তা হলে-
বেণী। আরে, সেই চেষ্টাই ত কচি বােন্। তুই শুধু আমার সহায়
থাকিস আর আমি কোন চিন্তা করিনে। রমেশকে এই কুঁয়াপুর থেকে
না তাড়াতে পারি ত আমার নামই বেণী ঘােষাল নয়। তার পরে রইলাম
আমি আর ঐ আচায্যি ব্যাটা। ছােটখুড়ো আর বেঁচে নেই, দেখি
কে কে রক্ষা করে।
রমা। (হাসিয়া) রক্ষে করবেন বােধকরি রমেশ ঘােষাল। কিন্তু আমি
বলে রাখ লেম বড়দা, আমাদের শত্রুতা করতে ইনিও কম করবেন না।
।

প্রথম পৃষ্ঠ রম উঠিল। বেণী । ( এদিক ওদিক চাহিয়া এবং কণ্ঠস্বর আরও মৃহ করিয়া) মা, আসল কথা হচ্ছে বিষয় সম্পত্তির ব্যাপার সে আজও কিছুই বােঝে । বাঁশ নুইয়ে ফেলতে চাও ত এই সময় । পেকে উঠলে আর হবে তা তোমাকে নিশ্চয় বলে দিচ্চি। দিন রাত মনে রাখতে হবে এ তারিণী ঘােষালের ছেলে আর কেউ নয় । চেপে বসলে আর অন্তরাল হইতে গম্ভীর কণ্ঠের ডাক আসিল-গণী কইরে?” মা চকিত হইয়া এবং পরক্ষণেই দ্বারের ভিতর দিয়া রমেশ এবেশ করিল। তাহার রুক্ষ মাখা, খালি পা, উত্তরীয়টা মাথায় জড়ান। বেণীর প্রতি দৃষ্টি পড়িতেই রমেশ। এই যে বড়দা এখানে ? বেশ, চলুন। আপনি নইলে করবে কে? আমি সারা গ! আপনাকে খুজে বেড়াচ্চি। রাণী কৈ ? বাড়ীর মধ্যে দেখি কেউ নেই। ঝি বললে এই দিকে গেছে বম নতমুখে দাড়াইয়া ছিল সহসা তাহাকে দেখিতে পাইয়া রমেশ। আরে এই যে! ইস! কত বড় হয়েছে ? ভালো আছে। ত? আমাকে চিনতে পারছো না বুঝি? আমি তােমাদের রমেশ। রমা। (মুখ তুলিয়া চাহিল না, কিন্তু অত্যন্ত মৃদুকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল) আপনি ভাল আছেন ? রমেশ। হাঁ ভাই ভাল আছি। কিন্তু আমাকে ‘আপনি কেন রাণি ? (বেণীর দিকে চাহিয়া ) রমার একটা কথা আমি কোন দিন ভুলতে পারি নি বড়দা। মা যখন মারা গেলেন তখন ত ও ছােট; কিন্তু তখনি আমার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলেছিল,তুমি কেঁদো না রমেশদা,আমার মাকে আমরা দুজনে ভাগ করে নেব। তােমার বােধ হয় মনে পড়ে না ? ? আমার মাকে মনে পড়ে ত ? রমা নিরুত্তর। লজ্জায় যেন তার মাথা আরও হেঁট হইয়া গেল রমেশ। কিন্তু আর ত সময় নেই ভাই। যা করবার করে দাও,- যাকে বলে একান্ত নিরাশ্রয় আমি তাই হয়েই আবার তােমাদের দোর

রমা
প্রথম অঞ্চ
গােড়ায় ফিরে এসে দাড়িয়েছি। তােমরা না গেলে এতটুকু ব্যবস্থা পর্যন্ত
হয়ত হবে না।
মাসি। ( কাছে আসিয়া রমেশের মুখের দিকে চাহিয়) তুমি বাপু,
তারিণী ঘােষালের ছেলে না ?
রমেশ নিঃশব্দে বিস্ময়ে চাহিয়া রহিল
মাসি। আগে ত দেখ নি, চিতে পার না বাছা,-আমি রমার
আপনার মাসি। কিন্তু এমন বেহায়া পুরুষ মানুষ তােমার মত আর ত
দেখি নি।
যেমন বাপ তেনিই কি ব্যাটা? বলা নেই কহ নেই, একটা
গেরস্তর বাড়ীর খিড়কীতে ঢুকে উৎপাত করতে সরম হয় না তােমার ?
রমা। কি বােচ মাসি, নাইতে যাও না।
বেণীর নিঃশব্দে প্রদান
মাসি।
নে রমা বকিদনে। যে কাজ করতেই হবে তাতে তােদের
মত আমার চক্ষু-লজ্জা হয় না। বলি, বেণীর অমন কোরে পালানাের কি
দরকার ছিল? বলে গেলেই ত হােত আমরা বাপু তােমার গােমস্তাও
নই, খাসতালুকের প্রজাও নই যে তােমার কৰ্ম্মবাড়ীতে জল তুলতে ময়দা
মাখতে যাবাে। তারিণী মরেছে লােকের হাড় জুড়িয়েছে।
এ কথাটা
বলবার বরাত আমাদের মত দুজন মেয়েমানুষের ওপর না দিয়ে নিজে বলে
গেলেই ত পুরুষের মত কাজ হােতাে।
রমেশ নির্বাক পাথরের মূর্তির মত সঁাড়াইয়া রহিল
মাসি। যাই হােক, বামুনের ছেলেকে আমি চাকর-বাকর দিয়ে
অপমান করতে চাই নে, একটু হু করে কাজ কোরাে। কচি খােকাটি
নও যে লােকের বাড়ীতে ঢুকে আবদার করে বেড়াবে। রাণী কি? রাণী
ওর নাম নাকি? তােমার বাড়ীতে আমার মা কখনাে পা ধুতে যেতেও
পারবে না। এই তােমাকে আমি বলে দিলাম।
রমেশ। তােমাকে মা বলতেন রাণী, ছেলেবেলার সেই ডাটাই মনে

প্রথম দৃশ্য রমা ছিল রমা। আমি ত জানতাম না যে আমাদের বাড়ীতে তুমি যেতেই পারে না। না জেনে বে উপদ্রব করে গেলাম সে আমাকে তুমি ক্ষমা কোরাে রমা। রমেশের প্রান ও বেণীর আবির্ভাব বেণী। (তাহার সমস্ত মুখ খুসিতে ভরিয়া গিয়াছে) , শােনালে বটে মাসি। আমাদের সাধ্যিই ছিল না অমন করে বলা। একি চাকর- বাকরদের কাজ রম? আমি আড়ালে দাড়িয়ে দেখলাম কিনা, ছোড়া মুখখানা যেন আষাঢ়ের মেঘের মত করে বেরিয়ে গেল। এই ত ঠিক হল। মাসি। হ’ল ত জানি, কিন্তু মেয়ে মানুষের ওপর ভার না দিয়ে, না সরে গিয়ে নিজে বললেই ত আরােও ভাল হােততা। আর না-ই যদি বলতে পারতে, আমি কি বলাম দাড়িয়ে থেকে শুনে গেলে না কেন বাছা ? রমা। দুঃখ কোরাে না মাসি, উনি না শুনুন আমরা শুনেছি। যতই বলুক না কেন, এতখানি বিষ জিভ দিয়ে ছড়াতে তোমার মত আর কেউ পেরে উঠত না। মাসি। কি বললি ল ? রমা। কিছু না। বলি, রান্না-বান্না কি আজ হবে না? যাও না ডুবটা দিয়ে এসো না। পুষ্করিণীর উদ্দেশে রমার দ্রুতপদে প্রান বেণী। ব্যাপার কি মাসি ? মাসি। কি করে জান্ধব বাছা ? ও রাজ-রাণীর মেজাজ বােঝা কি আমাদের মত দাসী-বাদীর কৰ্ম্ম ? গােবিন্দ গাঙলীর প্রবেশ গােবিন্দ। ভ্যালা যা হােক। সকাল থেকে সারা গাঁটা খুজে বেড়াচ্চি বেণীবাবু গেল কোথায়! বলি শুনেছ খবরটা? বাবাজী কাল ঘরে পা দিয়েই ছুটেছিলেন নন্দীদের ওখানে। এ যদি না দুদিনে উচ্ছন্ন যায় ত আমার গােবিন্দ গাঙলী নাম তােমরা বদলে রেখাে। নবাবী কাণ্ড-কার- ৮ রম প্রথম অঙ্ক খানার ফর্দ শােন ত অবাক হয়ে যাবে। তারিণী ঘােষাল সিকি পয়সা রেখে মরেনি তা জানি, তবে এত কেন ? হাতে থাকে কর না থাকে, বিষয় বন্ধক দিয়ে কে কবে ঘটা কোরে বাপের শ্রাদ্ধ করে তা ত কখনাে শুনি নি বাবা। আমি তােমাকে নিশ্চয় বলচি বেণিমাধব বাবু, এ ছোড়া নন্দীদের গদী থেকে অন্তত পাঁচটি হাজার টাকা দেনা করেছে। বেণী। বল কি! ল হলে কথাটা ত বার করে নিতে হচ্ছে গােবিন্দ- খুড়ে ? গােবিন্দ। ( মৃদু হাস্য করিয়া) সবুর করােনা বাবাজী, একবার ভাল করে ঢুকতেই দাওনা। তার পরে নাড়ীর খবর ফেড়ে বার করে আবাে —তখন বুঝবে গােবিন্দ গাঙলীকে। এর মধ্যে অনেক কথাই শুতে পাবে বাবাজী, অনেক শালই লাগিয়ে যাবে,—কিন্তু চেনাে ত খুড়ােকে ? সেইটুকু মনে মনে বুঝে, এখন আর কিছু ফাস কচিনে। বেণী। রমার কাছে গিয়েছিলাম। গােবিন্দ। তা জানি। কি বলে সে ? বেণী। তারা ত নয়ই, তাদের সম্পর্কে যে-যেখানে আছে তারা পর্যন্ত নয়। গােবিন্দ। ব্যস! ব্যস ! ব্যস! আর দেখতে হবে না। বেণী। কিন্তু তােমরা যে- গােবিন্দ। উতলা হও কেন বাবাজী, আগে ঢুকি। উদ্যোগ আয়াে- জনটা একটু ভাল করে করাই, তখন না,-ছাদ্দ গড়ানাে কাকে বলে একবার বাইরে দাড়িয়ে দেখাে । তবে যে শুনি-- গগাবিন্দ। অমন ঢের শুনবে বাবাজী, অনেক ব্যাটা এসে অনেক রকম করে লাগাবে। কিন্তু গােবিন্দ খুড়োকে চেনাে ত? ব্যস! ব্যস! উভয়ের এখান বেণী।

দ্বিতীয় দৃশ্য রমেশের বহির্বাচী। চণ্ডীমণ্ডপের বাশার একধারে ভৈরব বাচাৰ্য্য থান কাড়িয়া কাপড় পাট করিয়া গাদা দিতেছে। চণ্ডীমণ্ডপের অভ্যন্তরে বসিয়া গােবিন্দ গাঙলী ধুম পান করিতেছে এবং আড়চোখে চাহিয়া বস্ত্রশির মনে মনে সংখ্যা নিরূপণ করিতেছে। কর্মবাড়ী। আসন্ন শ্রাদ্ধকৃত্যের বহুবিধ আয়ােন চারিদিকে বিক্ষিপ্ত। নানা লােক নানা কাযে ব্যস্ত। সময় অপরাহ্ রমেশের প্রবেশ রমেশ। (গােবিন্দ গাঙলীর প্রতি সবিনয়ে) এই যে আপনি এসেছেন। গােবিন্দ। আসব বই কি বাবা, আসবাে বই কি! এ যে আমার আপনার কাজ রমেশ। নেপথ্যে কাশির শব্দ। কাশিতে কাশতে ৪,৫টা ছেলে মেয়ে লইয়া ধর্মদাস চাটুয্যের প্রবেশ। তাহার কাঁধের উপর মলিন উত্তরীয়, নাকের উপর এক জোড়া ভাটার মত মন্ত চসমা পিছনে দড়ি দিয়া বাধা। সাদা চুল, সাদা গোঁফ তামাকের ধুয়ায় তাম্রবর্ণ। অগ্রসর হইয়া রমেশের মুখের প্রতি ক্ষণকাল চাহিয়া কোন কথা না কহিয়া কাঁদিয়া ফেলিলেন। রমেশ চিনিল না ইনি কে। কিন্তু যেই হােন, ব্যস্ত হইয়া হাত ধরিতেই ধর্মদাস। (কঁদিয়া) না বাবা রমেশ, তারিণী যে এমন কোরে ফাকি দিয়ে পালাবে তা স্বপ্নেও জানিনে। কিন্তু আমারও এমন চাটুয্যে বংশে জন্ম নয় যে কাৰু ভয়ে মুখ দিয়ে মিথ্যে কথা বেরুবে। আসবার সময় তােমার আপন জাটতুতাে ভাই বেণী ঘােষালের মুখের উপর কি বলে এলাম জানাে ? বল্লাম, রমেশ যেমন শ্রাদ্ধের আয়ােজন করছে, এমন করা চুলােয় যাক, এ অঞ্চলে কেউ চোখেও দেখেনি। আমার নামে অনেক শালা অনেক রকম তােমার কাছে লাগিয়ে যাবে বাবা, কিন্তু এটা নিশ্চয় জেনাে এই ধৰ্ম্মদাস শুধু ধৰ্ম্মেরই দাস আর কারও নয়। এই বলিয়া গােবিন্দর হস্ত হইতে হুকোটা ছিনিয়া লইয়া এক টান দিয়াই প্রবল বেগে কাশিয়া ফেলিলেন রমা প্রথম অঙ্ক = রমেশ। না, বলেন কি, বলেন কি- প্রত্যুত্তরে ধর্মদাস ঘড় ঘড় করিয়া কত কি বলিলেন, কিন্তু কাশির ধমকে তাহার একটা বর্ণও বুঝা গেল না। গােবিন্দ সর্বাগ্রে আসিয়াছিলেন, সুতরাং এই নবীন জমিদার- টিকে ভাল ভাল কথা বলিবার সুযােগ তাহারই ছিল, অথচ নষ্ট হইতেছে বুঝিয়া তিনি তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাড়াইলেন গােবিন্দ। কাল সকালে, বুঝলে ধৰ্ম্মদাসদা, এখানে আসবে বলে বেরিয়ে আসা হল না। বেণীর ডাকাডাকি-গােবিন্দখুড়াে তামাক খেয়ে যাও। একবার ভাবলেম কাজ নেই,—তার পরে মনে হল ভাবখানা বেণীর দেখেই যাইনে। বেণী কি বলে জাননা বাবা রমেশ, বলে খুড়ো, তােমরা ত দেখচি হয়েছ রমেশের মুরুব্বি, বলি লােকজন খাবে টাবে ত? আমিই বা ছাড়ি কেন,তুমি বড়লােক আছে। না আছে, আমার রমেশও কারাে চেয়ে খাটো নয়। তোমার ঘরে ত একমুঠো চিড়ের পিত্যেশ কারু নেই। বাম, বেণীবাবু, এই ত পথ—দাড়িয়ে একবার কাঙ্গালী বিদেয়ের ঘটাটা দেখাে। কালকের ছেলে রমেশ, কিন্তু বুকের পাটা ত বলি একে। কিন্তু তাও বলি ধর্মদাসদা, আমাদের সাধ্যই বা কি! যার কাজ তিনিই ওপর থেকে করাচ্ছেন। তারিণীদা শাপভ্রষ্ট দিকপাল ছিলেন বই ত নয়। ধৰ্ম্মদাসের কিছুতেই কাশি থামেনা, আর তাহারই সম্মুখে গােবিন বেশ বেশ কথাগুলি এই অপরিপক তরুণ জমিদারটিকে বলিয়া যাইতেছে দেখিয়া আরও ভাল বলি- বার চেষ্টায় ধৰ্ম্মদাস যেন আকুলি বিকুলি করিতে লাগিল গােবিন্দ। তুমি ত আমার পর নও বাবা, নিতান্ত আপনার। তােমার মা ছিলেন আমার সাক্ষাৎ পিসতুত বােনের আপনার ভগ্নী। রাধানগরের বাঁড়ুয্যেবাড়ী, সে সব তারিণীদা জানতেন। তাই যে কোন কাজ-কর্ম -মামলা-মােকদ্দমা করতে, সাক্ষী দিতে-ডাক গােবিন্দকে-- ধর্মদাস। কেন বাজে বকিস্ গগাবিন্দ ? খক খক খকখ—আমি দ্বিতীয় দৃশ্য রম ১১ আজকের নই, না জানি কি ? সে বছর সাক্ষী দেবার কথায় বললি, আমার জুততা নেই খালি-পায়ে যাই কি করে ? খক খক-তারিণী অমনি আড়াই টাকা দিয়ে জুতাে কিনে দিলে। তুই তাই পায়ে দিয়ে সাক্ষী দিয়ে এলি কি না বেণীর হয়ে ! খক্‌ খক খক্‌-থ- গগাবিন্দ। (চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া) এলুম ? ধর্মদাস। এলিনে ? গােবিন্দ। দূর মিথ্যেবাদী। ধর্মদাস। মিথ্যেবাদী তাের বাবা ! গােবিন্দ। ( ভাঙা ছাতি লইয়া লাফাইয়া উঠিল) তবে রে শালা ! ধর্মদাস। (বাঁশের লাঠি উচাইয়া) ও শালার আমি-খক খক খক্‌ -খ-ও শালার আমি সম্পর্কে বড় ভাই হই কি না, তাই শালার আক্কেল দেখ! (কাশি) গগাবিন্দ। ও—শালা আমার বড় ভাই । চারিদিকের লােক ছুটিয়া আসিল, ছেলে-মেয়েরা হঁ করিয়া চাহিয়া রহিল, এবং রমেশ দ্রুতপদে তাহাদের মাঝখানে আসিয়া দাড়াইল রমেশ। এ কি এ! আপনারা উভয়েই প্রাচীন—ব্রাহ্মণ-এ কি কাণ্ড? ভৈরব। (উঠিয়া আসিয়া রমেশের প্রতি প্রায় শ’ চারেক কাপড়ত হ’ল, আরও চাই কি ? রমেশ নিরুত্তর ভৈরব। ছিঃ গাঙলীমশাই, বাবু একেবারে অবাক হয়ে গেছেন। আপনি কিছু মনে করবেন না বাবু, এমন ঢের হয়। বৃহৎ কাজ-কর্মের বাড়ীতে কত ঠ্যাঙা-ঠেঙ রক্তারক্তি পর্যন্ত হয়ে যায়, আবার যে কে সেই হয়। নিন্ চাটুয্যেমশাই, দেখুন দিকি আরও থান ফাড়বে কি না? গগাবিন্দ। হয়ই ত! হয়ই ত! ঢের হয়। নইলে বিরদ কৰ্ম্ম বলেছে কেন। সে বছর তােমার মনে আছে ভৈরব, যদু মুখুয্যে মশাইয়ের কণ্ঠ।

রমা এখন অঙ্ক রমার গাছ পিতিষ্ঠের দিন সিধে নিয়ে, রাঘব ভট্টচায্যে আর হারান চাটুয্যেতে মাথা ফাটাফাটি হয়ে গেল। কিন্তু আমি বলি ভৈরব ভায়া, বাবাজীর এ কাজটা ভাল হচ্ছে না। ছােটলােকদের কাপড় দেওয়া আর ভস্মে ঘী ঢালা এক কথা। তার চেয়ে বামুনদের একজোড়া আর ছেলেদের একখানা করে দিলে নাম হােতো। আমি বলি বাবাজী সেই যুক্তিই করুন। কি বল ধর্মদাসদা? ধৰ্ম্মদাস। গােবিন্দ মন্দ যুক্তি বলে নি বাবাজী। ওদের মিছে দেওয়া। নইলে আর শান্তরে ব্যাটাদের ছােটলােক বলেছে কেন! বুঝলে বাবা রমেশ ? রমেশ। হাঁ, বুঝেছি বই কি। ভৈরব। তা হলে কি এই কাপড়েই হবে ? রমেশ। বােধ হয় হবে না। বলা যায় না। কত কাঙ্গালী আসবে, আপনি বরঞ্চ আরও দু’শ কাপড় ঠিক করে রাখুন। গগাবিন্দ। তা নইলে কি হয় ? তুমি একা আর কত পারবে ভায়া, চল আমিও যাই। বলিতে বলিতে গােবিন বস্ত্রশির কাছে অগ্রসর হইয়া গেল, এবং উপবেশন করিয়া কাপড় গুছাইতে লাগিল। ধর্মদাস এই অবকাশে মেশকে একবারে টানিয়া লইয়া গিয়া কানে কানে বলিতে লাগিল। ওদিকে গােবিন্দ উদগ্রীব হইয়া আড়চোখে চাহিয়া দেখিতে লাগিল ধর্মদাস। এ দেশ বড় খারাপ বাবা, ভাড়ার টড়ার কাউকে দিয়ে বিশ্বেস কোরাে না। তেল, নুন, ধী, ময়দা অর্ধেক সরিরে ফেলবে। আমি এখুনি গিয়ে তােমার পিসিমাকে পাঠিয়ে দিচ্চি বাবা, একটি কুটো তােমার নষ্ট হবে না। রমেশ। যে-আক্তে-

দ্বিতীয় দৃশ্য
রমা
মুতি-ক্ষ শীর্ণকায় ও প্রাচীন দীননাথ ভট্টাচাৰ্য প্রবেশ করিলেন। ইহার সঙ্গেও
দুই তিনটি ছেলে মেয়ে। মেয়েটী সকলের বড়, পরনে একখানি শতচ্ছিন্ন ভূরে কাপড়
দীননাথ। কৈ গাে বাবাজী কোথায় গো ?
গােবিন। ( উঠিয়া দাড়াইয়া) এস দীনুদা, বােস।
বড় ভাগ্যি
আমাদের যে আজ তােমার পায়ের ধূলাে পড়লাে। ছেলেটা একা সারা
হয়ে যায় । তােমরা ত
--
ধর্মদাস কটমট করিয়া তাহার প্রতি চাহিল
গােবিন্দু।
তা তােমরা ত কেউ এদিক মাড়াবে না দাদা।
দী। আমি ত ছিলাম না ভায়া,তােমার বৌঠাকরুণকে আনতে তার
বাপের বাড়ী গিয়েছিলাম। বাবাজী কোথায় ? শুনুচি নাকি ভারি
আয়ােজন হচ্ছে। পথে ও-গাঁয়ের হাটে শুনে এলাম খাইয়ে দাইয়ে
ছেলে-বুড়াের হাতে নাকি যােল পাত লুচি আর চার জোড়া করে
সন্দেশ দেওয়া হবে।
গােবিন্দ। (গলা খাটো করিয়া) তাছাড়া হয় ত একখানা করে
কাপড়ও
রমেশের প্রবেশ
দীমুলা, এই আমার রমেশ। তা তােমাদের পাঁচজনের বাপ-মায়ের
আশীর্বাদে যােগাড়-সােগাড় ত একরকম করছি, কিন্তু বেণী একেবারে
উঠে পড়ে লেগেছে। এই আমার কাছেই দুবার লােক পাঠিয়েছে।
তা আমার কথা না হয় ছেড়েই দিলে, রমেশের সঙ্গে আমার নাড়ীর
টান রয়েছে, কিন্তু এই যে দীনুদা, ধর্মদাসদ এরাই কি বাবা
তােমাকে ফেলতে পারবেন? দীদাত পথ থেকে শুনতে পেয়ে ছুটে
আসছেন। ওরে, ও ষষ্ঠিচরণ, তামাক দে না রে। বাবা রমেশ, একবার
এদিকে এসাে দিকি একটা কথা বলে নিই।
০

১৪ রমা প্রথম অঙ্ক ভৃত্য আসিয়া দীনুর হাতে কা দিয়া গেল এবং গােবিন্দ রমেশকে আর একদিকে সরাইয়া লইয়া গিয়া চাপা গলায় গােবিন্দ। ভেতরে বুঝি ধর্মদাস-গিন্নি আসচে ? খবরদার বাবা, খবরদার-বিলে বামুন যতই ফোসলাক কখনাে তার হাতে ভঁড়ার- টার দিওনা, মাগ অর্ধেক ফাক করে দেবে। বলি, তােমার ভাবনা কি বাবা? তােমার যে আপনার মামী রয়েছে। আমি গিয়েই তাকে পাঠিয়ে দিচ্চি, নাড়ীর টানে সে যেমন করবে আর কি কেউ তেমন পারবে ? না, কখনাে পারে ? শিশু দু’টা ছুটিয়া আসিয়া দীনুর কাঁধের উপর ঝুলিয়া পড়িল শিশুরা। বাবা, সন্দেশ খাবাে। দী। (একবার রমেশ ও একবার গােবিন্দর প্রতি চাহিয়া) সন্দেশ কোথায় পাব রে? সন্দেশ কই ? দীনুর মেয়ে অন্তরালে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া কেন, ঐ যে হচ্চে বাবা- দীনুর মেয়ে। বাকি ছেলে মেয়েরা নাকে কঁদিতে কাঁদিতে আসিয়া ধর্মদাসকে ঘিরিয়া ধরিল ছেলেমেয়েরা। আমরাও দাদামশাই- রমেশ। (অগ্রসর হইয়া) বেশ ত, বেশ ত, ও আচায্যিমশাই, বিকেল বেলায় ছেলেরা সব বাড়ী থেকে বেরিয়েছে খেয়ে ত আসেনি। (অন্তরাল বর্তী ময়রার উদ্দেশে) ওহে, ও কি নাম তােমার ? নিয়ে এস ত ঐ থালাটা এদিকে। আচায্যিমশাই, দেখুন ত যেন দেরি না হয়। ভৈরব আচাৰ্য্য ভিতরে চলিয়া গেল এবং ক্ষণকাল পরেই ময়রা সন্দেশের খালা আনিতেই হেলের উপুড় হইয়া পড়িল। বাটিয়া দিবার অবকাশ দেয় না এমনি ব্যস্ত করিয়া তুলিল। ছেলেদের খাওয়া দেখিতে দেখিতে দীননাথের শুষ্কদৃষ্টি সজল ও তী ইয়া উঠিল i দ্বিতীয় দৃশ্য রমা দীনু। ওরে ও খেদি, খাচ্চিস ত খুব, সন্দেশ হয়েচে কেমন বল দিকি ? খেদী। বেশ বাবা- এই বলিয়া সে চিবাইতে লাগল দী। ( মৃদু হাসিয়া ঘাড় নাড়িয়া) হাঁঃ—ততাদের আর পছন্দ। মিষ্টি হলেই হ'ল। হ হে কারিকর, এ কড়াটা কেমন নাবালে ? কি বল গােবিন্দ ভায়া, এখনাে রােদ একটু আছে বলে মনে হচ্ছে না? ময়রা। আজ্ঞে, আছে বই কি। এখনাে ঢের বেলা আছে, এখনো সন্ধ্যে আহ্নিকের- দীনু। তবে কই দাও দিকি গােবিন্দ ভায়াকে একটা চেখে দেখুক, কেমন কলকাতার কারিকর তােমরা ময়রা গােবিন্দ ও দীনু উভয়কেই সন্দেশ দিতে গেল দীনু। না না, আমাকে আবার কেন? তবে, আধখানা-আধখানার বেশি নয়! ( হুকা রাখিয়া দিয়া) ওরে ও যষ্ঠিচরণ, একটু জল আন্ দিকি বাল, হাতটা ধুয়ে ফেলি। রমেশ। (ভিতরের দিকে চাহিয়া) ওরে, অনি ভিতর থেকে গােটা চারেক রেকাবি নিয়ে আসিস যষ্ঠি। গােবিন্দ। সন্দেশের চেহারা দেখেই বােধ হচ্চে হয়েছে ভাল। কি হে, ময়রার পাে, পাটা একটু নরমই রাখলে বুঝি ? ময়র। আজ্ঞে হ, এ কড়াটা একটু নরমই রেখেচি। গােবিন্দ। (হাস্য করিয়া ) আমরা বুঝি কিনা। তাকালেই ধরে দিতে পারি কোটা কেমন। ময়রা। আজ্ঞে, আপনারা বুঝবেন না ত বুঝবে কারা! যষ্ঠিচরণ ও আর একজন ভৃত্য নোবি, জলের গ্লাস প্রভৃতি আনিয়া উপস্থিত করিল, ময়র সন্দেশের থালাটা সম্মুখে আনিয়া রাখিল, এবং ব্রাহ্মণদিগের পাত্রে তুলিয়া দিতে

রমা
থম অ
লাগিল। কাহারও মুখে কথা নাই, ছেলেমেয়েরা এবং ধর্মদাস, গােবিন্দ ও দীপু
গােগ্রাসে গিলিতেছে এবং দেখিতে দেখিতে সমস্ত থালাটাই নিঃশেষিত হইয়া গেল
দীনু। হাঁ, কলকাতার কারিকর বটে। কি বল ধর্মদাসদা?
ধর্মদাসের কণ্ঠস্বর সন্দেশের তাল ভেদ করিয়া বেশ স্পষ্ট বাহির
হইল না, কিন্তু বুঝা গেল মতের অনৈক্য নাই
গােবিন্দ। ( নিশ্বাস ফেলিয়া) হাঁ ওস্তাদি হত বটে!
ময়রা। যদি কষ্টই করলেন ঠাকুরমশাই, তাহলে মিহিদানাটাও
অমনি পরখ করে দিন।
দী। মিহিদানা ? কই আননা দিকি বাপু।
ময়রা—এই যে আনি।
এই বলিয়া সে চক্ষের পলকে একখালা মিহিদানা আনিয়া হাজির করিল, এবং
ব্রাহ্মণদিগের পাত্রে উজাড় করিয়া দিল। মিহিদানা শেষ হইয়া আসিতে বিলম্ব হইল না
দী। ( হাত বাড়াইয়া মেয়ের প্রতি) ওরে ও খেদি, ধ, দিকি মা,
এই দুটো মিহিদানা।
খেদি। আমি আর খেতে পারবােনা বাবা।
দী। পারবি পারবি। এক টোক জল খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নে।
দিকি, মুখ মেরে গেছে বই ত না। পারি আঁচলে একটা গেরো
দিয়ে রাখ, কাল সকালে উঠে খাস।
এই বলিয়া মেয়ের হাতে জিয়া দিল
দী। (ময়রার প্রতি) হ বাপু, খাওয়ালে বটে। যেন অমৃত।
তা বেশ হয়েছে, মিষ্টি বুঝি দু’রকম করলে বাবাজী ?
ময়রা। আজ্ঞে, না, রসগােল্লা, ক্ষীরমােহন
দী। আঁা, কীরমােহন? কই, সে তাে বার করলেন বাপু?

দ্বিতীয় দৃশ্য,
রমা
১৭
( বিস্মিত রমেশের মুখের প্রতি চাহিয়া ) হ খেয়েছিলাম বটে রাধানগরের
বােসেদের বাড়ী, আজও যেন মুখে লেগে রয়েছে। বললে বিশ্বাস করবে না
বাবাজী, ক্ষীরমােহন খেতে আমি বড় ভালবাসি।
রমেশ। (হাসিয়া) আজ্ঞে না, অবিশ্বাস করবার কোন কারণ নেই।
ওরে ষষ্ঠি, ভেতরে বােধ করি আচায্যিমশাই আছেন, যা ত কিছু
ক্ষীরমােহন তাকে আনুতে বলে আয় দিকি।
বৃষ্টিচরণের এখান
গােবিন্দ। ( উদ্বিগ্নকণ্ঠে) আঁ? মিষ্টি কি সব বাইরে পড়ে নাকি ?
না, এতাে ভাল না।
ধর্মদাস। চাবি? চাবি? ভাড়ারের চাবি কার কাছে ?
গােবিন্দ। বলি, ভৈরাে আচায্যির হাতে নয় ত ?
যষ্ঠিচরণের প্রবেশ
এখন আর ভাড়ার ঘর খােলা হবে না বাবু, ক্ষীরমােহন বার
হবে না।
রমেশ। আঃ বাগে যা আমি আনতে বলুচি।
গােবিদ। দেখলে ধর্মদাসদা, আচায্যির আক্কেল? এ যে দেখি
মায়ের চেয়ে মাসির বেশি দরদ। সেই জন্যেই আমি বলি-
যষ্ঠি। আচায্যিমশায়ের দোষ কি? ও-বাড়ী থেকে গিন্নি-মা এসে
ভাড়ার বন্ধ করে ফেলেচেন। এ তারই হুকুম।
ধর্মদাস ও গােবিন্দ । কে ? বেণীবাবুর মা ? ও-বাড়ীর বড়-গিন্নি
ঠাকরুণ?
রমেশ। জ্যাঠাইমা-এসেছেন না কি ?
ষষ্ঠি। হাঁ বাবু। তিনি এসেই ছােট বড় দুটো ভাড়ারই তালা বন্ধ
করে ফেলেচেন।
চাবি তারই আঁচলে।
গগাবিন্দ। দেখলে ধর্মদাসদা ব্যাপারখানা ? বলি মৎলবটা বুঝলে ত?

১৮
রমা
প্রথম এক
দীনু।
এ মৎসব বােঝা আর শক্ত কি ভায়া! তালা বন্ধ করে
চাবি নিজের কাছে রেখেছেন তার মানে ভাড়ার আর কারাে না হাতে
পড়ে। তিনি সমস্তই ত জানেন।
গােবিন্দ। বোঝনা সােঝনা তুমি কথা কও কেন বল ত? তুমি
এসব ব্যাপারের কি জানাে যে হঠাৎ মানে করতে এসেচ ?
দী। অরে, এতে, বােঝা-বুঝিটা আছে কোন্‌খানে? শুচো না
গিন্নিমা স্বয়ং এসে তালা বন্ধ করেছেন। এতে কথা কইবে আবার কে?
গােবিন্দ। ঘরে যাওনা ভট্টচার্য। যে জন্যে ছুটে এলে, গুষ্টিবর্গ মিলে
খেলে, বঁধলে,—আর কেন? ক্ষীরমােহন পরশু খেয়াে, আজ বাড়ী
যাও আমাদের ঢের কাজ।
রমেশ। আপনার হ’ল কি গাঙলীমশাই? যাকে-তাকে এমন
খামােক অপমান করচেন কেন?
ধমক খাইয়া গােবিন্দ লজ্জিত হইল। পরে শুষ্ক হাগ করিয়া
গােবিন্দ। অপমান আবার কাকে করলাম বাবাজী ? ভাল, ওকেই
জিজ্ঞেস করে দেখ না ঠিক সত্যি কথাটা বলেটি কি না? ও ডালে-
ডালে বেড়ায় যদি, আমি পাতায়-পাতায় ঘুরি যে। দেখলে ধর্মদাসদা,
দীনে ৰামনার আস্পর্ধা? আচ্ছা
রমেশ। আচ্ছা কি?
দী। .( রমেশের প্রতি) না বাবা, গােবিন্দ সত্য কথাই বলেছেন।
আমি বড় গরীব সে এদিকে সবাই জানে। ওঁদের মত আমার জমি-জমা
চাষ-বাস কিছুই নেই, একরকম চেয়ে-চিন্তে ভিক্ষে-শিক্ষে করেই আমাদের
দিন চলে।—ভাল জিনিস ছেলেপিলেদের কিনে খাওয়াবার ক্ষমতা ত
ভগবান দেন নি, তাই বড় ঘরে কাজকৰ্ম্ম হলে ওরা খেয়ে বাঁচে। কিছু
মনে কোরাে না বাবা, তারিণীদাদা বেঁচে থাকতে আমাদের তিনি
খাওয়াতে বড় ভালবাসতেন।

দ্বিতীয় দৃশ্য রমা বী দুচকুলে ভৰিয়া টপ টপ করিয়া দু'টো আৰু সকলের সম্মুখেই করিয়া পড়িল। দীপু মলিন ও ছিন উত্তরীয়-প্রান্তে তাহা মুছিয়া ফেলিল গােবিন্দ। আহা! তারিণীদাদা শুধু তােমাকে খাওয়াতেই ভাল- বাসতেন! শুনলে ধর্মদাসদা, শুলে কথা ? দী। আমি কি তাই বচি গােবিন্দ ? আমার মত গরীব দুঃখী কেউ কখনো তারিণীদা’র কাছ থেকে খালি হাতে ফেরে নি। রমেশ। ভায্যিমশাই, এই দুটো দিন আমার ওপরে একটু দয়া রাখবেন। আর যদি খাদুর মা এ বাড়ীতে একবার পায়ের ধুলাে দিতে পারেন ত ভাগ্য বলে মানব। দী। আমি বড় গরীব বাবা, আমি বড় দুঃখী। আমাকে এমন করে বলে যে আমি লজ্জায় মরে যাই হত্যের প্রবেশ ভৃত্য। বাবু, গিন্নিমা একবার বাড়ীর ভেতরে ডাকচেন। রমেশ। যাই। দী। বাবা, আমরা তাহলে এখন আসি। রমেশ। আসুন। কিন্তু আমার প্রার্থনা যেন ভুলে যাবেন না। দীনু। না বাবা, প্রার্থনা বোলচ কেন এ তােমার দয়া। ছেলেদের লইয়া দীনুর এন গোবিন্দ। বাবা রমেশ, আমিও এখন তাহলে আসি। সন্ধ্যে- আহ্নিক ঠাকুরের শিতল দেওয়া মেণ। কিন্তু গাঙলীমশাই- গােবিন্দ। কিছু বলতে হবে না বাবা, এ আমার আপনার কাজ। তুমি না ডাকলেও আমাকে নিজে এসে সমস্ত করতে হতো। কাল সকালেই তােমার মামীকে পাঠিয়ে দিয়ে তবে নিশ্চিন্ত হতে পারব।

রমা
প্রথম অঞ্চ
ধৰ্ম্মদাস। তুই বড় বাজে বকিস গােবিন্দ।
গােবিন্দ। কোন ভাবনা নেই রমেশ, ভাড়ার-টাড়ার যা কিছু
ধৰ্ম্মাস। ভাড়ারের জন্যে তাের এত মাথা ব্যথা কেন বল্ ত ?
গােবিন্দ।
এ আমাদের নিজের কাজ বাবা। আমি আর ধর্মদাসদা
—আমরা দুভাই তােমার ডাকার অপেক্ষা রাখি নি,আপনারাই এসে
উপস্থিত হয়েছি। হয়েছি কি না?
ধর্মদাস। বলি শােন রমেশ, আমরা বেণী ঘােষাল নই, আমাদের
জন্মের ঠিক আছে।
রমেশ। আঃ—কি বছেন আপনারা?
জ্যাঠাইমা অন্তরাল হইতে একটুখানি মুখ বাহির করিয়া
জ্যাঠাইমা। ওরা অমনিই বলে রমেশ ! শিক্ষা আর সঙ্গদোষে
জানেও না যে কি ওরা বলে ।
গােবিন ও ধর্মদাসের দ্রুতপদে এস্থান
রমেশ। জ্যাঠাইমা!
জ্যাঠাইমা। হরে আমিই। বলি চিনতে পারি ত ?
বলিতে বলিতে তিনি সম্মুখে আসিয়া দাড়াইলেন। তাহার বয়স পঞ্চাশের কম নয়,
কিন্তু কিছুতেই চল্লিশের বেশি বলিয়া মনে হয় না। মাথার চুলগুলি ছোট করিয়া ২টা,
দুই এক গাছি কুঞ্চিত হইয়া কপােলের উপর পড়িয়াছে। একদিন যে রূপের খ্যাতি এ
অঞ্চলে প্রসিদ্ধি ছিল, আজিও সেই আনন্দ-সৌন্দৰ্য্য তাহার নিটোল পরিপূর্ণ দেহটিকে
বর্জন করিয়া দূরে যাইতে পারে নাই দেখিয়া আজও মনে হয় তাহার সকল অবয়ব যেন
শিল্পীর সাধনার ধন
রমেশ। একদিন যে ছেলেকে তুমি মানুষ করেছিলে, আর একদিন
বড় হয়ে ফিরে এসে সে-ই তােমাকে চিনতে পারবে না এই কি তােমার
রমেশের কাছে আশা কর জ্যাঠাইমা ?
জ্যাঠাইমা। না, সে আশঙ্কা করিনি রমেশ! তবুও ত তােরই মুখ
থেকে না শুনে পারি নে বাবা, জ্যাঠাইমাকে তাের মনে আছে।

দ্বিতীয় দৃশ্য
রমা
রমেশ। মনে আছে মা, খুব বড় করেই তােমাকে মনে আছে।
কিন্তু যা পারতাম নিজেই করতাম, তুমি কেন আবার এ বাড়ীতে এলে ?
জ্যাঠাইমা। তুই ত আমাকে ডেকে আনিনি বাবা, যে, তোর
কাছে তার কৈফিয়ৎ দেব ।
রমেশ।
ডেকে আনব কি মা, মা বলে যে তােমার কোলেই
সকলের আগে ছুটে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাড়ী নেই বলে ত তুমি দেখা
কর নি জ্যাঠাইমা?
জ্যাঠাইমা। সেই অভিমানেই বুঝি নিজের বাড়ী থেকে আজ
আমাকে বিদায় করতে চাস রমেশ ?
রমেশ। অভিমান ? যার মা নেই, বাপ নেই, নিজের জন্মভূমিতে
যে নিরাশয়, বিদেশী,—বিনাদোষে যাকে প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন বাড়ী
থেকে দূর করে দেয় তার অভিমানের দাম কি জ্যাঠাইমা ?
ক্যাঠাইমা। আমার কাছেও তার দাম নেই রমেশ ?
রমেশ নেই। আজ নিজের ছেলেকেই শুধু ছেলে বলে জেনে
রেখেচ। কিন্তু আর একটা মা-মর ছেলেকে যে একদিন ঠিক তেমনি
কোরেই মানুষ করতে হয়েছিল সে কথা আজ ভুলে গেছ।
জ্যাঠাইমা। এম্‌নি কোরে শূল বিধে তুই কথা বলবি রমেশ ? ঘরে-
বাইরে এই শান্তি পাব বলেই কি তােদর দুজনকে মানুষ করেছিলাম রে?
রমেশ। ঘরে-বাইরে ! তাই ত বটে! ( হঠাৎ পায়ের কাছে হাঁটু
গাড়িয়া বসিয়া) আমাকে ক্ষমা করাে জ্যাঠাইমা, আমি প্রাণের জ্বালায়
তােমার এই দিকটার পানে চেয়ে দেখি নি।
এ্যাঠাইমা রমেশকে তুলিয়া ডান হাত দিয়া তাহার চিবুক স্পর্শ করিলেন
জ্যাঠাইমা। জানি বাবা।
রমেশ। কিন্তু আর তুমি এ বাড়ীতে এসো না। আমার সব সইবে,
কিন্তু আমার জন্যে দুঃখ পাবে এ আমার সইবে না জ্যাঠাইমা ।

२२
রম।
প্রথম অঞ্চ
জ্যাঠাইমা। এ তাের অন্যায় রমেশ। দুঃখ সওয়াই যদি দরকার
হয় ও তােরও সইবে, আমারও সইবে। ফাকি দিয়ে আরামের চেষ্টা
করলে তার ফাক দিয়ে শুধু আরামই বার হয়ে যায় না বাবা, ঢের বেশি
দুঃখ হুড়মুড়, কোরে ঢুকে পড়ে। আমাকে বারণ করবার মৎলব তুই
করিস্ নে। তাছাড়া তাের নিষেধ শুবােই বা কেন?
তােমাকে ভুলে ছিলাম জ্যাঠাইমা, তাই নিষেধ করবার
স্পর্ধা করেছি। আমার কথা তুমি শুনন না—যা তােমার ভাল মনে
হবে তাই করাে।
• জ্যাঠাইমা। তাই ত কোরবো।
রমেশ। কোরাে। কত ঝড়-বাদল, কত দুর্যোগ তােমার মাথার
ওপর দিয়ে বয়ে গেছে-দূর থেকে মাঝে মাঝে আমি তার খবর পেয়েছি।
কিন্তু কিছুতেই তোমাকে বদলাতে পারে নি তেমনি অনির্বাণ তেজের
আগুন তােমার বুকের মধ্যে তেমনিই দপ দপ করে জলচে।
জ্যাঠাইমা। তুই থা, ছেলে-মুখে বুড়ো কথা বলিস নে।তা
শােন্। তাের বড়দার কাছে একবার গিয়েছিলি?
রমেশ অধােমুখে নীৰ
জ্যাঠাইমা। বাড়ী নেই বলে দেখা করে নি বুঝি?
রমেশ তেমনি নিরুত্তর
জ্যাঠাইমা। না-ই করুক, আর একবার যা। ( ক্ষণকাল মোন
থাকিয়া) আমি জানি রে, সে তােদের ওপর প্রসন্ন নয়, কিন্তু তোের কাজ
ত তােকে করা চাই। সে বড় ভাই-তার কাছে হেঁট হতে তাের
লজ্জা নেই। তাছাড়া এটা মানুষের এমনি দুঃসময় বাবা, যে-কোন
লােকের হাতে-পায়ে ধরে মিটমাট করে নেওয়াই মনুষ্যত্ব। লক্ষ্মী মাণিক
আমার—যা আর একবার। এখন হয় ত সে বাড়তেই আছে ।
রমেশ। তুমি আদেশ করলেই যাব জ্যাঠাইমা।

দ্বিতীয় দৃশ্য
রমা
জ্যাঠাইম। আর দ্যাখ, রমাদের ওখানেও একবার যা।
রমেশ। গিয়েছিলাম।
জ্যাঠাইমা। গিয়েছিলি? তােকে সে চিনতে পেরেছিল ত ?
রমেশ। বােধ হয় পেয়েছিল। নইলে অপমান করে বাড়ী থেকে দূর
করে দেবে কেন ?
জ্যাঠাইমা। অপমান করে দূর করে দিলে ? রমা ?
রমেশ। অপমানটা বােধ করি তার তেমন মনঃপুত হয় নি। তাই
বলে দিয়েছে এবার এলে দরওয়ান দিয়ে বার করে দেবে।
জ্যাঠাইমা। রমা বলেছে ? এ যে নিজের কানে শুনলেও বিশ্বাস
হয় না রমেশ।
রমেশ। বড়দা ছিলেন, তাকে জিজ্ঞাসা করে দেখাে জ্যাঠাইমা ।
জ্যাঠাইমা। বেণী ছিল। তবে, হবেও বা। ( এক মুহূর্ত পরে)
কিন্তু, ঠিক বলচিস রমেশ, রমা বললে বাড়ী ঢুকলে দরওয়ান
দিয়ে বার করে দেবাে ? আমাকে ভঁাড়াস নে বাবা, लिंक
করে বল।
রমেশ। হাঁ, জ্যাঠাইমা তাই তবে, নিজে না বলে কে তার মাসী
আছে তার মুখ দিয়েই বলিয়েছে।
জ্যাঠাইমা। (নিশ্বাস ফেলিয়া ) তাই বনইলে রাতও
মিথ্যে দিনও মিথ্যে রমেশ, এতবড় গতি কথা তার গলায় ছুরি দিলেও
সে তােকে বলতে পারত না। এ সেই মাগীর কথা,-তার নয়।
রমেশ। তবে কি তাদের বাড়ীতেও আমাকে যেতে হুকুম করাে
জ্যাঠাইমা ? রমাকে কি তুমি এমনি করেই জান ?
জ্যাঠাইমা। জানি। কিন্তু যেতে আর বলি নে। তাের বাপের সঙ্গে
তাদের চিরদিন মামলা-মকদ্দমা চলেছে, তাদের শত্রু বললেও মিথ্যে বলা
হয় না, তবুও আমি জানি ওকথা রমা বলে নি। অমন মেয়ে বাবা, লক্ষ

২৪ রমা প্রথম অঙ্ক কোটীর মধ্যেও সহজে খুজে পাওয়া যায় না। ও আছে বলে তবুও এই গ্রামের মধ্যে একটুখানি ধৰ্ম্ম বেঁচে আছে। রমেশ। তাকে দেখে ত সে কথা মনেও হ’ল না জ্যাঠাইমা। জ্যাঠাইমা। হঠাৎ হয়ও না তবুও এ কথা সত্যি রমেশ। তা সে যাই হোক, সেখানে যখন যাওয়াই হতে পারে না তখন তা নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। কিন্তু এতক্ষণ যারা এখানে ছিলেন ও আমি আসা মাত্রই যারা সরে গেলেন তাদের তুই বিশ্বেস করিস্ নে বাবা, তাদের আমি চিনি। রমেশ। কিন্তু তারাই ত এ বিপদে আমার সব চেয়ে আপনার লােক জ্যাঠাইমা। তাদের বিশ্বাস না করলে কাদের করবাে ? জ্যাঠাইমা। তাই ত ভাবচি বাবা, এ কথার জবাব দেবই বা কি! হাঁ রে, তাের নেমন্তন্ন ফর্দ তৈরি হয়ে গেছে ? রমেশ। না এখনো হয় নি ; জ্যাঠাইমা। সেইটে একটু বুঝে সুঝে করিস রমেশ। এ গ্রামে, আর এই গ্রামেই বা বলি কেন, সব গ্রামেই এই। এ ওর সঙ্গে খায় না, ও তার সঙ্গে কথা কয় না,-একটা কাজ-কর্ম পড়ে গেলে মানুষের আর দুশ্চিন্তার অন্ত থাকে না। কাকে বাদ দিয়ে কাকে রাখা যায় এর চেয়ে শক্ত কাজ আর নেই। রমেশ। কেন এ রকম হয় জ্যাঠাইমা ? জ্যাঠাইমা। সে অনেক কথা বাবা। যদি থাকিস এখানে, আপনিই সব জানতে পারবি। কারুর সত্যিকার দোষ-অপরাধ আছে, কারুর মিথ্যে অপবাদ আছে, তাছাড়া মামলা মােকর্দমা, মিথ্যে সাক্ষী দেওয়া নিয়েও মস্ত দলাদলি। আমি যদি তাের এখানে দুদিন আগে আসতাম রমেশ, এত উদ্যোগ-আয়ােজন কিছুই করতে দিতাম না। কি যে সেদিন হবে আমি তাই শুধু ভাবছি। এই বলিয়া তিনি নিখাদ মোচন করিলেন

দ্বিতীয় দৃশ্য
রমা
--
রমেশ। তােমার দীর্ঘশ্বাসের মর্ম বােঝা কঠিন জ্যাঠাইমা, কিন্তু
আমার সঙ্গে ত এর কোন যােগ নেই। আমাকে বিদেশী বললেই হয়,
কারাে সঙ্গে শত্রুতাও নেই, দলাদলিও নেই,আমি কাউকে অপমান
করতে পারব না; সকলকেই সসম্রমে আহ্বান করে আম্ব।
জ্যাঠাইমা। উচিত ত তাই। কিন্তু—যাই হােক, সকলের মত নিয়ে
এ কাজটা করিস বাবা, নইলে ভারি গণ্ডগোল হবে। মা, বিপদ-তারিণী ।
রমেশ। তুমি কি এখুনি চলে যাচ্ছ ?
জ্যাঠাইমা না এখ,খুনি নয়। দু একটা কাজ পড়ে আছে
সেগুলাে সেরে ফেলেই যাবো। কিন্তু চাবি আমার সঙ্গে রইলো রমেশ,
কাল সকালেই আমি নিজে এসে ভাড়ার খুলব!
এvান
ধর্মদাস, গােবিশ ও পরাণ হালদারের প্রবেশ
এলাম।
গােবিদ। ( রমেশের প্রতি) বাবা, এই পরাণ মামাকে ধরে নিয়ে
আসতে কি চায়? কিন্তু আমিও ছাড়নে-বালা নই। বলি,
বেণীই জমিদার আর আমার ভাগ্নে রমেশ নয় ? (উপরের দিকে মুখ
তুলিয়া) তারিণীদা, স্বর্গে বসে সমস্তই দেখচো চো, কিন্তু এই তােমার
কাছে প্রতিঙ্কে কচি আমি, এই উঠোনের ওপর বেণীর যদি না এমনি
করে না রগড়াতে পারি ত আমার নামই গােবিন্দ গাঙলী নয়।
ধর্মদাস। আহা, তুই থামনা গােবিন্দ ! ( কাশিতে কাশিতে ) সে
আমি ঠিক করে নেব।
অকস্মাৎ বেণী ঘােষাল প্রবেশ করিল
বেণী। এই যে রমেশ, একবার এলাম-বড় জরুরি কাজ-মা
এসেছেন নাকি ?
গােবিল। আসবে বই কি বাবা, একশ’বার আসবে।
তােমারই বাড়ী। তাই ত আমি রমেশ বাবাজীকে সকাল থেকে বচি

রমা প্রথম অঙ্ক রমেশ, ঝগড়া-বিবাদ তারিণীদার সঙ্গেই যাক—আর কেন? তােমরা দুভাই এক হও আমরা দেখে চোখ জুড়ােই! তাছাড়া বড়-গিন্নি ঠাকরুণ যখন স্বয়ং এসে উপস্থিত হয়েছেন, তখন বেণী মা এসেছেন ? গােবিন্দ। শুধু আসা কেন, ভাড়ার টাঁড়ার, করা-কৰ্ম্ম যা কিছু তিনিই ত করছেন। আর তিনি না করলে করবেই বা কে ? সকলেই নীরব হইয়া রহিল গােবিন্দ। (নিশ্বাস ফেলিয়া) নাঃ-গাঁয়ের মধ্যে বড়-গিন্নি ঠাকরুণের মত মানুষ কি আর আছে ? না হবে ? না বেণীবাবু, সামনে বলে থােষামােদ করা হবে, কিন্তু যে যাই বলুক গাঁয়ে যদি লক্ষ্মী থাকেন ত সে তােমার মা। এমন মা কি কারু হয় ? এই বলিয়া পুনশ্চ একটা নিখাস ত্যাগ করিলেন বেণী। আচ্ছ- গােবিল। শুধু আচ্ছা নয়: বণীবাবু। আসতে হবে, করতে হবে, সমস্ত ভার তােমার ওপর। ভাল কথা, সবাই আপনারা তাে উপস্থিত আছেন, নেমন্তন্নটা কি রকম হবে একটা ফর্দ করে ফেলা হােক। কি বল রমেশ বাবাজী ? ঠিক কি না হালদার মামা? ধর্মদাসদা চুপ, করে থাকলে হবে না,-কাকে বলতে হবে, কাকে বাদ দিতে হবে জান ত সব। রমেশ। বড়দা, একবার পায়ের ধূলাে যদি দিতে পারেন- বেণী। মা যখন এসেছেন তখন আমার আশা না-আসা—কি বল = গগাবিন্দ খুড়ো? রমেশ। আপনাকে আমি পীড়াপীড়ি করতে চাই নে বড়দা, যদি অসুবিধে না হয় ত একবার দেখে শুনে যাবেন। বেণী। সে ত ঠিক। আমার মা যখন এসেছেন তখন আমার দ্বিতীয় দৃশ্য রমা আসা-না-আসা—কি বল হালদার মামা ? তা মাকে একটু শিগগির যেতে বােলাে রমেশ, বিশেষ দরকারী কাজ, আমারও এখন দাড়াবার যাে নেই: -প্রজারা সব বলিতে বলিতে বেণীর দ্রুতপদে এস্থান গােবিল। ( নেপথ্যে গলা বাড়াইয়া দেখিয়া লইয়া) আরে, বেণী : ঘােষাল ! তুই পাতায় পাতায় বেড়াস ত আমি তার শিরে শিরে ফিরি। আমার নাম গােবিন্দ গাঙলী ! নিজের চোখে দেখতে এসেছে মা এসেছে- কি না। বুঝি না বটে! (রমেশের প্রতি) আর দেখলে বাবা রমেশ, কেমন তােফা মিষ্টি মােলায়েম কথাগুলি শুনিয়ে দিলাম? যেন মিছরির ছুরি! আর ববার যাে নেই যে কৰ্ম্মবাড়িতে গিয়ে খাতির পাইনি। লােকের কাছে যে বলে বেড়াবে রমেশ না হয় ছেলে মানুষ, কিন্তু তার মামা গােবিন্দ গাঙলী ত উপস্থিত ছিল। বৃহৎ কাজে-কর্মে কৰ্ম্ম-কর্তা হয়ে থাকা সহজ ব্যাপার নয় বাবা, এক একটা চাল ভাবতে মাথা ঘুরে যায়! ধর্মদাস। তুই বড় বাজে বকি গােবিন্দ ! থানা ? একদিক দিয়া সুকুমারী ও তাহার মা ক্ষান্ত প্রবেশ করিয়া বাটার অন্তঃপুরে চলিয়া গেল। পরাণ হালদার কঠিন চক্ষে তাহাদের নিরীক্ষণ করিলেন। মুহূর্তে ভৃত্য সচিব প্রবেশ করিল পরাণ। ওরা বাড়ীর মধ্যে গেল করা? যষ্ঠি। ক্ষান্ত বামুন ঠাকরুণ আর তার মেয়ে। পরাণ। যা ভেবেছি তাই। ওদের বাড়ী ঢুকতে দিলে কে ? ষষ্ঠি । আচায্যিমশাই ডেকে এনেছেন। দুদিন ধরে সমস্ত কাজ-কল্প করছেন। পরাণ। ওরা যদি খাদ্যদ্রব্য স্পর্শ করে থাকে ত কোন ব্রাহ্মণই এখানে জন্মগ্রহণ করতে পারবে না। কার আড়ালে দাড়াইয়া বােধ হয় নিতে িতৎক্ষণাৎ বাহির হইয়া আসিল ২৮ রমা এম অঙ্ক ক্ষান্ত। কেন শুনি হালদার ঠাকুরপাে (রমেশের প্রতি) হাঁ বাবা, তুমিও ত গায়ের একজন জমিদার, বলি সমস্ত দোষই কি এই ক্ষেন্তি বানির মেয়ের ? মাথার ওপর আমাদের কেউ নেই বলে কি যতবার ইচ্ছে শাস্তি দেবে? (গগাবিন্দকে দেখাইয়া) ঐ উনি মুখুজ্যে বাড়ীর গাছ পিতিষ্ঠের সময় জরিমানা বলে দশ টাকা আদায় করেন নি ? গাঁয়ের যােল-আনা মনসা পূজোর নামে দুজোড়া পাঁঠার দাম ধরে নেন নি ? তবে কতবার ঐ এক কথা নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে চায় শুনি ? গােবিন্দ । যদি আমার নামটাই করলে ক্ষান্তমাসী, তবে সত্যি কথা বলি বাছা। খাতিরে কথা কইবার লােক গােবিন্দ গাঙলী নয় সে দেশসুদ্ধ লােকে জানে। তােমার মেয়ের প্রায়শ্চিত্তও হয়েছে, সামাজিক দণ্ডও করেছি,-সব মানি। কিন্তু যজ্ঞিতে কাঠি দিতে ত আমরা হুকুম দিই নি ? মরলে ওকে পােড়াতে আমরা কঁধ দেব, কিন্তু ক্ষান্ত। মলে তােমার নিজের মেয়েকে কাঁধে করে পোড়াতে যেয়ে বাছা, আমার মেয়ের ভাবনা তােমাকে ভাবতে হবে না। বলি, হাঁ গগাবিন্দ, নিজের গায়ে হাত দিয়ে কি কথা কওনা ? তােমার ঘােট ভাজের কাশীবাসের কথা মনে পড়ে না। হালদার ঠাকুরপাের বেয়ানের তাঁতি অপবাদ ছিল না ? সে সব বড় লোকের বড় কথা বুঝি ? গােবিন্দ। তবে রে হারামজাদা মাগী-- ক্ষান্ত। ( অগ্রসর হইয়া) মারবি নাকি রে? ক্ষেন্তি বানিকে ঘটালে ঠগ বাছতে গা উজোড় হয়ে যাবে। বলি, এতেই হবে, না আরও বােল্ববা? ভৈরব আচাৰ্য দ্রুতপদে প্রবেশ করিয়া ভৈরব। এতেই হবে মাসী, আর কাজ নেই। ( ভিতরের দিকে চাহিয়া ) সুকুমারী, চল দিদি, এসো মাসী আমার সঙ্গে বাড়ীর ভেতরে গিয়ে বসৰে চল। ভৈরব ও ক্ষার গান बिछौन पूछ রমা গােবিন্দ। দেখলে পরাণ মামা, আমাদের অপমান করে ওদের বাড়ীর ভেতরে বসাতে নিয়ে চলল। দেখলে ভৈরবের আস্পর্ধা? আচ্ছা পরাণ। আমাদের বিনা হুকুমে ঐ দুটো ভ্রষ্ট মাগীদের কেন বাড়ীতে ঢুকতে দেওয়া হল, রমেশ তার কৈফিয়ৎ দিক। নইলে কেউ আমরা এখানে জলস্পর্শ করব না। জ্যাঠাইমা। (দ্বারের নিকট হইতে) রমেশ ! রমেশ। তুমি কি এখনাে আছ জ্যাঠাইমা ? জ্যাঠাইমা। আছি বই কি। গােবিন গাঙুলীকে বল্ যে ক্ষান্ত ঠাকুরঝি আর সুকুমারীকে আদর করে আমি ডেকে আনিয়েছি আচাষি- মশায় নয়। তাদের খামােক অপমান করবার কোন দরকার ছিল না। পরাণ। কিন্তু ওদের দূর করে না দিলে আমরা কেউ জল গ্রহণ করতে পারব না। জ্যাঠাইমা। সে পরর কথা। আজ আমার কৰ্ম্ম-বাড়ীতে চেঁচাচেঁচি হাঁকাহাঁকি করতে আমি নিষেধ করছি। আমি সকলকেই নিমন্ত্রণ কোরব, কাউকে বাদ দিতে পারব না। পরাণ। কিন্তু আমরা কেউ এখানে জলটুকু পর্যন্ত মুখে দিতে পারব না। জ্যাঠাইমা। আমাকে ভয় দেখাতে বারণ কর রমেশ। দেশে অনাথ আতুর কাঙালের অভাব নেই। আয়ােজন আমার ব্যর্থ হবে না, বরঞ্চ সার্থক হবে। রমেশ। (ব্যাকুলকণ্ঠে) কিন্তু সমস্ত এরা পণ্ড কোরে দিতে চান। এর সকল দায় যে তােমার মাথায় পড়বে জ্যাঠাইমা! জ্যাঠাইমা। এ তের অন্যায় রমেশ। আমার বাড়ীর কাজের দায়িত্ব আমার মাথায় পড়বে না ত কি. পরের মাথায় পড়বে ? এখন ওঁদের এ যতে বলে দে। ঢের কাজ পড়ে আছে, নষ্ট করবার সময় নেই।

রমা প্রথম অফ জ্যাঠাইম অন্তঃপুরে চলিয়া গেলেন। সরকার দিয়া গােবিন্দ দাস হালদার ধীরে ধীরে এন করিল রমেশ। ভেবেছিলাম বুঝি আমার কেউ নেই, কিন্তু সবাই আছে যার তুমি আছ জ্যাঠাইমা। তৃভীম্ন দৃশ্য গ্রাম্যপথ জীনু ভটচাষ শ্রাবাটী হইতে নিমন্ত্রণ পাইয়া ঘরে ফিরিতেছে। সঙ্গে পটল, পাড়া, বুড়ী প্রভৃতি বালক বালিকা। সকলেই হাতে ছােট বড় পুটুলি, হাতে খুরিতে করিয়া ধি ক্ষীর প্রভৃতি খেনি। (সভয়ে) বাবা, ভােজো আসছে- শুনিয়া সকলে চকিত হইয়া উঠিল রমেশের ভৃত্য জুয়া প্রবেশ করিল দী। এই যে ভজুবাবু, কোথায় যাওয়া হচ্ছে। ভজুয়া। আরে ই সব কি লিয়ে যাচ্চে ভট্টচাষ মােশা— দী। কিছুই নয় বাবা,—এই দুটো এটো কাটা,পাড়ার ছােট- লােক গরীব দুঃখীর ছেলে-মেয়ে আছে ত, গেলেই সব হাত পেতে দাড়াবে—তাদেরই দেবার জন্যে ভজুয়া। আরে, কমতি কি আছে। পুরি মিঠাই কেতনা গরীব দুঃখী উহই বএঠকে থা রহে- দী। খাচ্চে বই কি বাবা, খাচ্চে বই কি। রাজার ভাণ্ডার অভাক কি। তবে সবাই কি আসতে পারবে? তাদের জন্যেই দুটো একটা ভজুয়া। হাঁ, হাঁ, ঠিক ঠিক। বড়ি খারাব গাঁও ভায। কিতনা গুলমাল। ই উঠে তাে উ বােসে, ই ভাগে তো উ খিচুকে লাবে—হাঃ ঃ হাঃ হাঃ- দী। হয় বাবা হয়, বিরহ কাজে-কর্মে,মুড়ী, পলার হাতটা

इौच मृय
द्रमा
একবার বদলে নে মা,আমাদের গোঁত তবু পদে আছে বাবা-হােরে,
পথ পানে চেয়ে চল না। হোঁচট খেয়ে দইয়ের ভাড়টা ফেলে দিবি যে।
যে কাণ্ড দেখে এলাম খেদির মামার বাড়ীতে,—বিশ ঘর বামন কায়েতের
বাস নেই বাবা-দশটা দলাদলি। পটুলা, হ কোরে অগগ পানে
তাকিয়ে যাচ্ছি যে? তবে একটা কথা বলতে পারি বাবা, ভিক্ষে-শিক্ষে
করতে অনেক যায়গাতেই তাে যাই, অনেকে অনুগ্রহও করেন, আমি
দেখেছি তােমার বাবুর মত ছেলে-ছােকরাদেরই যা কিছু দয়া মায়া আছে।
নেই কেবল বুড়ো ব্যাটাদের। বাগে পেলেই একজন আর একজনের
গলায় পা দিয়ে জিভ, বার কোরে তবে ছাড়ে।
এই বলিয়া নিজের জিত বাহির করিয়া দেখাইল
ভজুয়া। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ।
দী। এই গােবিন্দ গাঙ্গুলী-এ ব্যাটার পাপের কথা মুখে আনলে
প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।
জাল করতে, মিথ্যে সাক্ষী দিতে, মিথ্যে মকদ্দমা
সাজাতে ওর জুড়ি নেই—সবাই ওকে ভয় করে। বেণীবাবু হাতধর
কাজেই কেউ একটা কথা কইতে সাহস করে না। ওই পাঁচজনের জাত
মেরে বেড়াচ্ছে।
ভজুয়া। সব দেশে এমনি আছে ভট্টচার্য, হমার গায়ে ভি বহুত
গুলমা। আরে জিলা তাে-মগর, হমার বাবুজীসে কোই সকবে নহি।
দী। না বাবা কেউ পারবে না তা আমিও বলে দিচ্ছি। খোদ,
একটু পা চালিয়ে চল না। তুই যে-
ভজুযা। হমার বাবু কি মানুষ আছে,-দেওয়া আছে।
দীনু। হাঁ বাবা রমেশ আমার দেব,তাই বটে। পটুলা, আবার হাঁ
কোরে দাড়ায়। তা ভজুবাবু কোথায় যাচ্ছে?
। আচাৰ্য ঠাকুরকে বাড়ী।

রমা এখন অঙ্ক দীনু। তা যাও যাও, একটু তরন্ত যাও। আমরাও আসি বাবা। সকলের এন চতুর্থ দৃশ্য মধু পালের মুদির দোকান। কেনা বেচা চলিতেছে প্রথম খরিদ্দার। এক পয়সার তেল দিতে কি বেলা কাটিয়ে দেবে নাকি ? মধু। এই যে দিই। ২য় খরিদ্দার। এক পয়সার হলুদ দিতে কি বুড়াে হয়ে যাবে পালা? মধু। এই যে রে ভাই দিচ্ছি। একলা মানুষ- ৩য় খরিদ্দার। দু পয়সার মুগুর ডালের জন্যে দেখ চি এবেলা আর রান্না চড়ানাে হবে না। মধু। হবে গাে খুড়ো হবে, এই নাও না! রমেশের প্রবেশ মধু। (গলা বাড়াইয়া দেখিয়া) আঁ!—এ যে আমাদের ছােটবাবু। প্রাতঃপেন্নাম হই। (এই বলিয়া সে একটা মােড়া হতে বাহির হইয়া আসিল) আমার সাত পুৰুষের ভাগ্যি যে দোকানে আপনার পায়ের ধূলাে পড়লল। বসুন। রমেশ। শ্রাদ্ধের দরুণ দশটা টাকা বাকি পড়ে আছে, তুমিও যাও , আমারও পাঠাননা হয় না। আজ ভাবলেম নিজেই গিয়ে দিয়ে আসি। এই নাও। মধু। (হাত পাতিয়া গ্রহণ করিয়া) এ ত আমাদের বাপ দাদারাও কখনাে শশানেনি বাবু, মানুষে বাড়ী বয়ে এসে টাকা দিয়ে যায় । রমেশ। ( মােড়ায় উপবেশন করিয়া) দোকান কেমন চ মধু ?

চতুর্থ দৃশ্য রমা মধু। কেমন করে আর ভাল চলবে বাৰু? দু আনা চার আনা এক টাকা পাঁচ সিকে করে প্রায় ষাট সত্তর টাকা বিলেত পড়ে গেছে। এই ও-বেলায় দিয়ে যাচ্ছি বলে আর ছমাসেও আদায় হবার যাে নেই-এ কি, বতুযয্যমশাই যে ! কবে এলেন ? প্রাতঃপেন্নাম হই। বাড়যােমশায়ের বাঁ হাতে একটা গাড়, পায়ের নখে গােড়ালিতে কার নাগ, কানে পৈতা জড়ানাে, ডানহাতে কচুপাতায় মােড়া চারটি কুচো চিংড়ী বাড়য্যে। কাল রাত্তিরে এলাম। তামাক খা দিকি মধু। এই বলিয়া গাড়, রাখিয়া হাতের কুচো চিংড়ী মেলিয়া ধরিলেন বড়য্যে। সৈরুবী জেলেনীর আক্কেল দেখলি মধু, খপ, করে হাতটা আমার ধরে ফেলে হে ? কালে কালে কি হ’ল বস্ দিকি রে, এই কি এক পয়সার চিংড়ী ? বামুনকে ঠকিয়ে ক’কাল খাবি মাগী, উচ্ছন্ন যেতে হবে না ? মধু। হাত ধরে ফেললে আপনার ? বড়য্যে। আড়াইটি পয়সা শুধু বাকি, তাই বলে খামকা হাটসুদ্ধ লােকের সামনে হাত ধরবে আমার? কে না দেখলে বল। মাঠ থেকে বসে এসে গাড়ী মেজে, নদীতে হাত-পা ধুয়ে মনে করলাম হাটটা একবার ঘুরে যাই। মাগী এক চুবড়ি মাছ নিয়ে বসে,-স্বচ্ছন্দে বলে কি না কিছু নেই ঠাকুর, যা ছিল সব উঠে গেছে। আরে, আমার চোখে ধূলাে দিতে পারিস? ডালাটা ফস্ কোরে তুলে ফেলতেই দেখি না,অমনি খপ, করে হাতটা চেপে ধরে ফেললে ! তাের সাবেক আড়াইটা আর আজকের একটা—এই সাড়ে তিনটে পয়সা নিয়ে আমি গা ছেড়ে পালাব? কি বলিস মধু? মধু। তাও কি হয়। য্যে। তবে তাই বল না। গাঁয়ে কি শাসন আছে ? নইলে যষ্ঠে রা এম এ জেলের ধােপ নাপতে বন্ধ করে চাল কেটে তুলে দেওয়া যায় না । ( হঠাৎ রমেশের প্রতি চাহিয়া) বাবুটি কে মধু? মধু। আমাদের ছােটবাবু যে! শ্রাদ্ধের দরুণ দশটি টাকা বাকি ছিল বলে বাড়ী বয়ে দিতে এসেছেন। বড়য্যে। আঁা, রমেশ বাবাজী ? বেঁচে থাকো বাবা, হ, এসে শুলাম একটা কাজের মত কাজ করেছ বটে। এমন খাওয়া-দাওয়া এ অঞ্চলে কখনাে হয়নি। কিন্তু বড় দুঃখ রইল চোখে দেখতে পেলাম না। পাঁচ শালার ধাপ্লায় পড়ে কলকাতায় চাকরি করতে গিয়ে হাড়ীর হাল। আরে ছি, সেখানে মানুষ থাকতে পারে। মধু। (তামাক সাজিয়া হু কা তাহার হাতে দিল। তার পরে। একটু চাকরি-বাকরি হয়েছিল ত ? বড়য্যে। হবে না। এ কি ধান দিয়ে লেখাপড়া শেখা আমার ? কিন্তু হলে কি হবে। যেমন ধোয়া, তেমনি কাদা। বাইরে গাড়ী চাপা পড়ে যদি ঘরে ফিতে পারিস ত জাবি তাের বাপের পুণ্যি। কখনাে গিয়েছিলি সেখানে। মধু। আজ্ঞে না। মেদিনীপুর সহরটা একবার দেখেচি। বাড়ুয্যে। আরে দূর ব্যাটা পাড়াগেঁয়ে ভূত। কিসে আর কিসে! তাের রমেশবাবুকে জিজ্ঞেসা কর না সত্যি না মিছে। না মধু, খেতে না পাই ছেলে-পুলের হাত ধরে ভিক্ষে কোরব,বামুনের ছেলের তাতে কিছু আর লজ্জা নেই, কিন্তু বিদেশ যাবার নামটি যেন না কেউ আমার কাছে করে। বলে বিশ্বেস করবি নে সেখানে শুষনি কমি, চাতা, আমড়া ঘােড় মােচা পৰ্যন্ত কিনে খেতে হয়। পারবি খেতে?—এই একটি মাস খেয়ে খেয়ে যেন রােগা ইদুরটী হয়ে গেছি। এই বলিয়া তিনি হুকাটা মধুর হাতে দিয়া উঠিয়া গিয়া মধুর তেলে ভাড় হইতে খানিকটা তেল বা হাতের তেলোয় লইয়া অর্ধেকটা দুই নাক ও দুই কানে গর্তে ঢালিয়া দিয়া বাকিটা মাথায় মাখিয়া ফেলিলেন

চতুর্থ দৃশ্য
মমা
বাঁড়ুয্যে। বেলা হ’লঅনি ডুব টা দিয়ে একেবারে ঘরে যাই।
এক পয়সার মুন দে দিকি মধু, বিকেলবেলা দিয়ে যাব।
মধু। আবার বিকেলবেলা।
মধু অগ্রসর মুখে দােকানে উঠিয়া ঠোঙায় করিয়া নুন দিল
বড়য্যে। (মুন হাতে লইয়া) তােরা সব হলি কি মধু।
গালে চড় মেরে পয়সা নিস্ দেখি। ( এই বলিয়া নিজেই এক খামচা মুন
ঠোঙায় দিয়া রমেশের প্রতি মৃদু হাসিয়া) ঐ ত একই পথ,—চল না
বাবাজী গল্প করতে করতে যাই।
রমেশ। আমার একটু দেরি আছে।
বড়য্যে। তবে থাক।
এই বলিয়া গাড় লইয়া গমনােত হইলেন
মধু। বড়য্যেমশাই, সেই ময়দার পয়সা পাচ আনা কি অনি-
বড়য্যে। হাঁ রে মধু, তােদের কি লজ্জা সরম চোখের চামড়া পৰ্যন্ত
নেই? পাঁচ ব্যাটা বেটির মতলবে কলকাতা যাওয়া-আসা করতে পাঁচ
পাঁচটা টাকা আমার গলে গেলাে, আর, এই কি তােদের তাগাদা করবার
সময় হ’ল ? কারাে সর্বনাশ, আর কারাে পৌষ মাস, বটে? দেখলে
বাবা রমেশ, এদের ব্যাপারটা একবার দেখলে ?
মধু। ( লজ্জিত হইয়া) অনেক দিনের
বড়য্যে। হ’লই বা অনেক দিনের। এমন কোরে সবাই মিলে
লাগলে ত আর গাঁয়ে বাস করা যায় না।
এই বলিয়া তিনি এক রকম রাগ করিয়াই নিজের জিনিস পত্র লইয়া চলিয়া গেলেন।
এবং পরক্ষণে বনমালী পাড়ই ধীরে ধীরে প্রবেশ করিয়া রমেশের পায়ের কাছে তুমি
এণাম করিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন
করিয়া
মৈশ। আপনি কে?

मा
প্রথম অ
বনমালী। আপনাদের ভৃত্য বনমালী পাড়ই।
পাড়ই। গ্রামের মাইনার
ইস্কুলের প্রধান শিক্ষক।
রমেশ। (সসমে উঠিয়া দাড়াইয়া) আপনি ইস্কুলের হেড মাষ্টার ?
বনমালী। আপনার ভৃত্য। দুদিন আপনাকে প্রণাম জানাতে
গিয়েও দেখা হয় নি।
রমেশ। আপনার ইস্কুলের ছাত্রসংখ্যা কত?
বনমালী। বিয়াল্লিশ জন। গছে দুজন পাস হয়। একবার নারাণ
বড়য্যের সেজছেলে জলপানি পেয়েছিল।
রমেশ। বটে ?
বনমালী। আজ্ঞে হাঁ। কিন্তু এ বছর চাল ছাওয়া না হলে বর্ষার
জল আর বাইরে পড়বে না।
রমেশ। সমস্তই আপনাদের মাথায় পড়বে?
বনমালী। আজ্ঞে, হাঁ। কিন্তু সে এখনাে দেরি আছে। কিন্তু সম্প্রতি
আমরা কেউ তিন মাসের মাইনে পাইনি। মাষ্টাররা বলছেন ঘরের খেয়ে
বনের মশা আর বেশি দিন তাড়ানাে যাবে না।
রমেশ। আপনার মাইনে কত ?
বনমালী। ছাব্বিশ। পাই তেরাে টাকা পােনের আনা।
রমেশ। ছাব্বিশ টাকা মাইনে, আর পান তেরাে টাকা পােনের
আনা এর মানে ?
বনমালী। গভর্ণমেন্টের হুকুম কি না। তাই ছাব্বিশ টাকার রসিদ
লিখে সব ইনস্পেক্টারকে দেখাতে হয়। নইলে সরকারী সাহায্য বন্ধ
হয়ে যায়।
রমেশ। এতে ছেলেদের কাছে আপনার সম্মান গনি হয় না ।
বনমাণী। না, এই দেশাচার। তাছাড়া ছেলেরা আমাকে বাঘের
মত ভয় করে। বেতিয়ে পিঠ লাল করে দিই।

চতুর্থ দৃশ্য
রম
রমেশ। দেবার কথাই। আর সব মাষ্টারের মাইনে কত ?
বনমালী। তেইশ টাকা।
রমেশ। তেইশ ? একজনের না। তিনজনের ?
বনমালী। তিনজনের। ন’টাকা, আটটাকা আর ছটাকা। এও
বেণীবাবু দিতে নারাজ। তিনি বলেন আট টাকাটা সাত টাকা হলেই
হয় ভাল।
রমেশ। সে ঠিক। কর্তা বুঝি তিনিই ?
বনমালী। হাঁ, তিনিই সেক্রেটারি। কিন্তু কখনাে একটি পয়সাও
দেন না। যদু মুখুয্যে মশায়ের কন্যা রমা,সতীলক্ষ্মী তিনিঠার দয়া না
থাকলে ইস্কুল অনেক দিন পূর্বেই বন্ধ হয়ে যেত।
রমেশ। বলেন কি? এ ত শুনিনি।
বনমালী। হাঁ, শুধু তঁার দয়াতেই ইস্কুল চলে ছােটবাবু, আর কারাে
নয়। একটি ভাইও তার এই ইস্কুলে পড়ে। এবছর তিনিই চাল ছাইয়ে
দেবেন বলেছিলেন, কিন্তু কেন যে দিলেন না বলতে পারিনে। হয়ত কেউ
ভাঙ চি দিয়েছে।
রমেশ। তাও হয় নাকি? আচ্ছা, আজ আপনি যান, আপনাদের
বেলা হয়ে যাচ্চে, কাল আপনাদের ইস্কুল আমি দেখতে যাব।
বনলালী। যে আজ্ঞে। আপনার দয়া হলে আর আমাদের ভাবনা কি?
এই বলিয়া সে আর একবার হেঁট হইয়া এণাম করিয়া এস্থান করিল, এবং আপ
দিয়া গােপাল সরকার ও ভজুয়া দ্রুতপদে প্রবেশ করিল
রমেশ। হঠাৎ আপনি এমন ব্যস্ত হয়ে যে সরকারমশাই?
গােপাল। বেণীবাবু ত অত্যন্ত অত্যাচার সুরু করে দিলেন।
প্রভএ ৫ সহ যায় না ছােটবাবু।
রমেশ। ব্যাপার কি ?

এথম অঞ্চ
গোপাল।
কাপাসডাঙার বাইশ-বিঘের বন্দটা এখনাে ভাগ
হয় নি, মুখুয্যেদের সঙ্গে যৌথ আছে। এক অংশ তাদের, এক অংশ
বেণীবাবুর আর এক অংশ আমাদের। সেদিন পাড়ের অতবড় তেঁতুল
গাছটা কাটিয়ে তাঁরা দু অংশে ভাগ কোরে নিলেন, আমাদের একটা
টুকরাে পৰ্যন্ত দিলেন না। আপনাকে জানালাম, আপনি বললেন তুচ্ছ
একটু কাঠের জন্যে ত আর ঝগড়া করা যায় না!
রমেশ। বাস্তবিক, এত সামান্য জিনিসের জন্যে কি বড়দার সঙ্গে
ঝগড়া করা যায় সরকারমশাই ?
গােপাল। সেই জোরে আজ বেণীবাবু জোর কোরে গড়-পুকুরের মাছ
ধরে নিয়ে গেছেন। বােধকরি মুখুয্যে বাড়ীতে এতক্ষণ তার অংশ ভাগহচ্চে।
রমেশ। কিন্তু ঠিক জানেন এতে আমাদের অংশ আছে ?
গােপাল। তবে কি মিছে এ কা জ মাথারচুল-পাকালাম ছােটবাবু?
রমেশ। কিন্তু সবাই যে বলে রমা বড় ধৰ্ম্ম-নিষ্ট মেয়ে। তাকে
একবার জিজ্ঞেস করে পাঠালেন না কেন ?
গােপাল। শুনলাম তিনি নাকি হেসে বলেছেন, ছােটবাবুকে বােলদা
বিষয় র হাতে দিয়ে একটা মাস-হারা নিয়ে যেখানকার মানুষ
সেখানে চলে যেতে। জমিদারী রক্ষে করা ভীতু লােকের কাজ নয়।
রমেশ। তবে বুঝি চুরি করাটাই সে মন্ত সাহসের কাজ বলে
ঠাউরেচে? ভজুয়া, সঙ্গে তাের লাঠি আছে ?
ভজুয়া। (লাঠি আস্ফালন করিয়া) হুজুর।
এই বলিয়া এনাে হইল
রমেশ। সমস্ত মাছ গিয়ে কেড়ে নিয়ে আয়। একা পাবি ত?
ভজুয়া। (মাথা নত করিয়া) সিফ হুকুম নােকর হুজুর!
গােপাল। (অকস্মাৎ অত্যন্ত ভয় পাইয়া) এ যে সত্যি-সত্যিই
ফৌজদারী বেধে যাবে ছােটবাবু।

পঞ্চম পৃষ্ঠ
অমা
রমেশ। উপায় কি?
গােপাল। হঠাৎ একটা কাজ করে ফেলা কি ভাল হবে ছােটবাবু?
রমেশ। তবে কি আপনি করতে বলেন ?
গােপাল। আমি বলি,-আমি বলি,-থানায় একটা ডাইরি
করে,না হয়, ভাল কোরে একবার জিজ্ঞেস কোরে-
রমেশ। তবে সেই ভাল সরকারমশাই। আমার
মত ভীতু
লােকের এর বেশি কিছু করা উচিতও নয়। ও-বাড়ীর মাইজীকে
চিনিস ত ভজুয? চিনিস! বেশ, তঁাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আয়
গড়পুকুরের মাছে আমার অংশ আছে কি না। যদি বলেন আছে, নিয়ে
আসিস। যদি বলেন নেই, শুধু চলে আসবি। আমার নিশ্চয় বিশ্বাস
সরকারমশাই, সামান্য দুটো মাছের জন্যে রমা মিছে কথা বলবে না।
জুমার পদে এ
পঞ্চম দৃশ্য
বেণী ঘােষালের বাটীর অন্তঃপুরে বিয়েরীর গৃহ। মা প্রবেশ করিয়া
সম্মুখে দাসীকে দেখিতে পাইল
বুমা। জ্যাঠাইমা কোথায় নন্দর মা?
দাসী। পূজোর ঘর থেকে এখনাে বার হয় নি। ডেকে দেব দিদি ?
রমা। তার পূজোর ব্যাঘাত করে ? না না, আমি আচি। তিনি
বেরুলে তাঁকে খবর দিয়ে যে আমি এসেছি।
সী। আচ্ছা দিদি।
সী এন করিল, এবং পরক্ষণে অতি সন্তর্প: পা টিপিয়া যতীন এবেশ কলি
যতী)। দিদি ?
রমা। ( চমকিয়া মুখ ফিরাইয়া) আঁা, তুই কোথা থেকে রে?

৪০ রমা প্রথম গল্প যতীন । তােমার পেছুনে পেছুনে এসেছি তুমি দেখতে পাওনি ! এই বলিয়া সে মাকে এড়াইয়া ধরিল রম। কি দুষ্ট ছেলে রে তুই ? বেলা হ’ল ইস্কুলে যাবিনে। যতীন। আমাদের যে আজ ছুটি দিদি। রমা। ছুটি কিসের রে? আজ ত সবে বুধবার। যতীন। হ’লই বা বুধবার ! বুধ, বেস্পতি, শুককুর, শনি, রবি একেবারে পাঁচ দিন ছুটি। রমা। কেন রে যতীন ? যতীন। আমাদের ইস্কুলের চাল ছাওয়া হচ্চে যে। তার পর চূণকাম হবে, কত বই আসবে,—চার পাঁচটা চেয়ার টেবিল এসেছে একটা আলমারি, একটা বড় ঘড়ী এসেছে,-একদিন তুমি গিয়ে দেখে এসােনা দিদি। রমা। বলিস কিরে ? যতীন। সত্যি দিদি। রমেশবাবু এসেছে না,—তিনি সব করে দিচ্চেন। আরও কত কি তিনি করে দেবেন বলেছেন। রােজ দু’ঘণ্টা করে এসে আমােদর পড়িয়ে যান। রমা। রে যতীন তােক তিনি চিনতে পারেন? যতীন। হ- রমা। কি বলে তাকে তুই ডাকিস ? যতীন। ডাকি। আমরা ছােটবাবু বলি। রমা। (ভাইটিকে বুকের কাছে টানিয়া লইয়া) ছােটবাবু কি রে? তিনি যে তাের দান হন। যতীন। যা- রমা। যা কি রে? বেণীবাবুকে যেমন বড়দা বলে ডাকি, একে তেমনি ছােড়দা বলে ডাকতে পারিসনে ? -

পঞ্চম দৃশ্য
রমা
১১
যতীন।
যতীন। আমার দাদা হন্ তিনি? সত্যি বােলচ দিদি।
রমা। সত্যি বলচি রে তাের ছােড়দা হন তিনি।
যতীন। বাড়ী যাবাে দিদি? নরু, হার, সন্তা,-এদের সব গিয়ে
বলে আসবে?
মা ঘাড় নাড়িয়া নিষেধ করিল
যতীন। এতদিন তিনি কোথায় ছিলেন দিদি ?
এতদিন লেখাপড়া শিখতে বিদেশে ছিলেন। তুই বড় হলে
তােকেও এমনি কোরে বিদেশে গিয়ে থাকতে হবে যতীন, আমাকে ছেড়ে
পারবি ত থাকতে ?
( বার দুই-তিন অনিশ্চিত ভাবে মাথা নাড়িল) ছােড়দার
সমস্ত পড়া শেষ হয়ে গেছে দিদি ?
রমা। ই ভাই তার সব পড়া সাঙ্গ হয়ে গেছে।
যতীন। কি করে তুমি জালে ?
রমা।
( ক্ষণকাল শুব্ধ থাকিয়া) নিজের পড়া শেষ না হলে কি
কেউ পরের ছেলের জন্যে এত দিতে পারে? এটুকু বুঝি তুই বুঝতে
পারিসনে ?
যতীন। ( মাথা নাড়িয়া জানাইল সে পারে) আচ্ছা, ছােড়া কেন
আমাদের বাড়ী আসে না দিদি, বড়দা ত রােজ রােজ যা।
রম। তুই তাকে ডেকে আন্‌তে পারিসূনে?
যতীন। এখুনি যাব দিদি?
রমা। (ভয়-ব্যাকুল দুই হাতে তাহাকে বুকে জড়াইয়া) ওরে, কি
পাগলা ছেলে রে তুই। খবরদার যতীন, কখনাে এমন কাজ করিস নে
ভাই, কথখনাে করিস্ নে ।
যতীন। তােমার চোখে জল এলাে কেন দিদি? তুমি বারণ করলে
ত আমি কখখনাে কিছু করি নে।

মা
প্রথম ৩
রমা। (চোখ মুছিয়া ফেলিয়া) তা ত কর না জানি। তুমি
আমার লক্ষ্মী মাণিক ছােট্ট ভাই কি না, তাই ।
যতীন। বাড়ী চলনা দিদি।
মা। তুই এখন যা, আমি একটুখানি পরে যাবে। ভাই।
যতীন প্রস্থান করিল
বিধেনী প্রবেশ করিলেন
রমা। আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন জ্যাঠাইমা ?
বিশ্বেশ্বরী। এ সব তােরা কি করেছিস মা ? বেণীর চুরি-করার
কাজে তুই কি কোরে সাহায্য করলি রমা ?
রমা। আমি ত এ কাজ করতে তাকে বলিনি জ্যাঠাইমা ?
বিশ্বেশ্বরী। স্পষ্ট বলনি বটে, তবুও অপরাধ তােমার কম হয়
নি রমা।
রমা। কিন্তু তখন যে আর উপায় ছিল না জ্যাঠাইমা। ভজু লাঠি
হাতে বাড়ীর মধ্যে গিয়ে যখন দাড়ালাে তখন মাছ ভাগ হয়ে গিয়েছিল।
বড়দা তার ভাগ নিয়ে চলে আসছিলেন, পাড়ার পাঁচজনেও দুটো একটা
নিয়ে ঘরে ফিছিলেন।
বিশ্বেশ্বরী। কিন্তু আসলে মাছ আদায় করতে সে যায়নি রমা।
রমেশ মাছ-মাংস ছোয়না, এতে তার প্রয়ােজন নেই। সে শুধু তােমারই
কাছে জানতে পাঠিয়েছিল কাপাসডাঙার গড়-পুকুরের তার অংশ আছে
কি না। নেই, এ কথা তুই বলি কি কোরে মা?
মা অধােমুখে নিরুত্তয়
বিশ্বেশ্বরী। তােমার পরে যে তার কত শ্রদ্ধা, কত বিশ্বাস, সে তুমি
জাননা বটে, কিন্তু আমি জানি। সেদিন তেঁতুল গাছটা কাৰ্টয়ে তােদর
দু’ঘরে ভাগ কোরে মিলে ; গােপাল সরকারের কথাতেও রমেশ কান

পঞ্চম দৃষ্ণ
রমা
দিলে না, বলে, আমার ভাগ থাকলে আমি পাবই। রমা কথননা
আমাকে ঠকিয়ে নেবে না। কিন্তু কাল যা কোরেছ মা,
একটা কথা তােমাকে আজ বলে রাখি মা। বিষয় সম্পত্তির দাম যত
বেশিই হােক এই মানুষটীর প্রাণের দাম তার অনেক বেশি। কারও
কথায়, কোন বস্তুর ললাভেই রমা, চারিদিকের আঘাত দিয়ে এ জিনিসটি
নষ্ট কোরাে না। যা হারাবে তা আর কোনদিন পূর্ণ হবে না।
রমেশ। (নেপথ্যে ) জ্যাঠাইমা।
বিশ্বেশ্বরী।
কে, রমেশ ? আয় বাবা এই ঘরে আয়।
রমেশ প্রবেশ করিতেই রমা আনতমূখে ঈষৎ আড় হইয়া বসিল
বিশ্বেশ্বরী । হঠাৎ এমন দুপুরবেলা যে রে ?
রমেশ। দুপুরবেলা না এলে যে তােমার কাছে একটু বসতে পাইনে
জ্যাঠাইমা? তােমার কত কাজ। হাসলে যে? আচ্ছা, তােমার মনে
পড়ে জ্যাঠাইমা, ঠিক এম্‌নি দুপুরবেলায় ছেলেবেলায় একদিন চোখের
জলে তােমার কাছে বিদায় নিয়েছিলাম। আজও তেমনি নিতে এলাম।
কিন্তু এই বােধ হয় শেষ নেওয়া জ্যাঠাইমা ।
জ্যাঠাইমা। বালাই, ষাট! ও কি কথা বাবা? আয় আমার কাছে
এসে বােস।
রমেশ তাহার কাছে গিয়া বসিয়া একটুখানি হাসিল, কিন্তু নবাব দিল না। বিশ্বেশ্বরী
পরম স্নেহে তাহার মাথায় গায়ে হাত বুলাইয়া দিয়া কহিলেন—
বিশ্বেশ্বরী। শরীরটা কি এখানে ভাল থাকছে না বাবা?
রমেশ। এ যে খােটার দেশের ডাল-রুটির শরীর জ্যাঠাইমা, এ কি
শীঘ্র খারাপ হয় ? তা নয়। তবে, এখানে আমি আর একদিনও
টিকতে পারছিনে। আমার সমস্ত প্রাণ যেন কেবলই খাবি খেয়ে
উঠছে।

৪৪ রমা প্রথম স্ক বিশ্বেশ্বরী। শুনে বাঁচলাম বাবা, তাের শরীর খারাপ হয় নি। কিন্তু এই যে তাের জন্মস্থান, এখানে টিকতে পারছিস না কেন বল দেখি? রমেশ। সে আমি যােব না। আমি নিশ্চয় জানি, তুমি সমস্তই জন। বিশ্বেশ্বরী। সব না জানলেও কতক জানি বটে কিন্তু ঠিক সেই জন্যেই তােকে আমি কোথাও যেতে দেব না রমেশ। রমেশ। কিন্তু এখানে কেউ আমাকে চায় না জ্যাঠাইমা ? বিশ্বেশ্বরী। চায় না বলেই তাের পালান চলবে না। রমেশ। এই যে ডাল-রুটা খাওয়া দেহের বড়াই করছিলি সে কি শুধু পালানর জন্যে। হাঁ রে, গােপাল সরকার বলছিল কি একটা রাস্তা মেরামতের জন্যে তুই চাঁদা তুলছিলি। তার কি হােলােব রমেশ। আচ্ছা, এই একটা কথাই তােমাকে বলি। কোন পথটা জান? যেটা পােষ্টাফিসের সুমুখ দিয়ে বরাবর ষ্টেশনে গেছে। পাঁচেক পূৰ্বে বৃষ্টিতে ভেঙ্গে এখন একটা প্রকাণ্ড গর্ত হয়ে আছে। লােক পা পিছলে হাত-পা ভেঙ্গে পার হয় কিন্তু মেরামত করে না। গােটা কুড়ি টাকা মাত্র খরচ, কিন্তু এর জন্যে আজ আট দশ দিন ঘুরে ঘুরেও আট দশটা পয়সা পাই নি। কাল মধুর দোকানের সামনে দিয়ে রাত্রে আচ, কানে গেল কে একজন আর সকলকে বারণ করে দিয়ে বলছে, তােরা কেউ একটা পয়সাও দিস নে। জুতাে পায়ে মসমসিয়ে হাঁটা, দুচাকার গাড়ীতে ঘুরে বেড়ান,—ওরই ত গরজ। কেউ কিছু না দিলে ও আপনিই সারাবে। না করে বাবু-বাবু’ বলে একটুখানি পিঠে হাত বােলানাে। ব্যস! বিশ্বেশ্বরী। (হাসিয়া) ওরা অমন বলে।তাই দে না বাপু সারিয়ে। তাের দাদামশায়ের ত ঢের টাকা পেয়েছি। রমেশ। (রাগিয়া উঠিয়া) কিন্তু কেন দেবে? আমার ভারি দুঃখ

পঞ্চম দৃশ্য
রমা
৪৫
হচ্ছে যে না বুঝে অনেকগুলাে টাকা এদের ইস্কুলের জন্যে খরচ করে
ফেলেচি। এ গাঁযের কারও জন্যে কিছু করুতে নেই। এরা এত নীচ
যে এদের দান করলে এরা বােকা মনে করে। ভাল করলে গরজ
ঠাওরায়। এদের ক্ষমা করাও অপরাধ। ভাবে ভয়ে ছেড়ে দিলে ।
শুনিয়া বিষেধী হাসিতে লাগিলেন
=
রমেশ। হাসচ যে জ্যাঠাইমা?
বিশ্বেশ্বরী। না হেসে কি করি বল্ ত বাছা? হাঁ রে, রাগ করে
তুই এই লােকগুলােকেই ছেড়ে যেতে চাস? আহা, এরা যে কত দুঃখী,
কত দুৰ্বল, কত অবােধ তা যদি জান্তস্ মেশ, এদের ওপর অভিমান
করতে তাের আপনিই লজ্জা হােতো। (রমার প্রতি) তুমি যে সেই
থেকে ঘাড় হেঁট করে বসে আছ মা,- রমেশ, তােরা দুই ভাই-বােনে
কি কথা কোসনে।
রমা । ( তেমনি অধােমুখে) আমি ত বিরােধ রাখতে চাইনে
জ্যাঠাইমা। রমেশদা-
রমেশ। ( চমকিয়া) এ কে, রমা নাকি? একলা এসেছেন, না
সঙ্গে মাসিটিকেও এনেছেন ?
বিশ্বেশ্বরী। এ তাের কি কথা রমেশ ? তােদের ভাল কোরে
চেনা-শােনা নেই বলেই
রমেশ। রক্ষে কর জ্যাঠাইমা, এর বেশি চেনা-শােনার আশীর্বাদ
আর করো না। বাড়ী গিয়ে মাসিটিকে যদি পাঠিয়ে দেন ত তােমাকে
আমাকে দুজনকেই চিবিয়ে খেয়ে তিনি ঘরে ফিরবেন। বাপরে পালাই
বিশ্বেশ্বরী। যাস্ নে রমেশ, শুনে যা।
রমেশ। (থংকিয়া দাড়াইয়া) না জ্যাঠাইমা, আমি সমস্ত শুনেছি।
যারা অহঙ্কারের স্পর্ধায় তােমাকে পৰ্য্যন্ত মাড়িয়ে চলতে চায় তাদের

রমা
প্রথম অধ
তােমাকে অপমান করা আমার
হয়ে তুমি একটা কথাও বােলল না।
সইবে না।
এসে এখন
রমা । ( বিশ্বেশ্বরীর মুখের প্রতি চাহিয়া সহসা কাঁদিয়া ফেলিল)
তােমাকে অপমান করতে আমি মাসিকে পাঠিয়ে দিই, এ কলঙ্ক আমার
কেন জ্যাঠাইমা ?
বিশ্বেশ্বরী। (রমাকে কাছে টানিয়া লইয়া) তােমাকে ও ভুল
বুঝেছে মা। যা সত্যি সে ও একদিন জানবেই জানবে।

দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম দ্য
তারকেনের আম পথ। এভাত বেলায় এইমাত্র সূর্যোদয় হইয়াছে। রমা নিকট
কোন একটা পুষ্করিণী হইতে স্নান সামিয়া আর্জ-বন্ত্রে গৃহে ফিরিতেছিল, রমেশের সহিত
তাহার একেবারে মুখােমুখি দেখা হইয়া গেল। একবার সে মাথায় আঁচল টানিয়া দিবার
চেষ্টা করিল, কিন্তু ভিজা কাপড় টানা গেল না। তখন সে তাড়াতাড়ি হাতের জলপূর্ণ
বটিটি নামাইয়া রাখিয়া সিক্ত সন তলে দুই বাহু বুকের উপর জড়াে করিয়া হেঁট হইয়া
বাড়াইল
রমা। আপনি এখানে যে ?
রমেশ। (একপাশে সরিয়া দাড়াইয়া) আপনি কি আমাকে চেনেন?
রমা। চিনি। আপনি কখন্ তারকেশ্বরে এলেন?
রমেশ। এই মাত্র গাড়ী থেকে নেমেছি। আমার মামার বাড়ীর
মেয়েদের আসবার কথা ছিল, কিন্তু তারা কেউ আসেন নি।
রমা।
এখানে কোথায় আছেন ?
রমেশ। কোথাও না। পূর্বে কখনাে আসিনি, আজকের দিনটা
কোন মতে কোথাও কাটাতে হবে। যাহােক একটা আশ্রয় খুজে নেবে।
রমা।
সঙ্গে ভজুয়া আছে ত?
রমেশ।
একাই এসেছি।
রমা।
বেশ যা হােক। (এই বলিয়া রমা হাসিয়া
( এই বলিয়া রমা হাসিয়া হঠাৎ মুখ
তুলিতেই আবার দুজনের চোখােচাখি হইল। সে মুখ নীচু করিয়া মনে
মনে একটু দ্বিধা করিয়া শেষে বলিল) তবে আমার সঙ্গেই আসুন।
( এই বলিয়া সে ঘটিটা তুলিয়া লইয়া অগ্রসর হইতে উদ্যত হইল)

৪৮
রমা
প্রথম অঞ্চ
রমেশ। আমি যেতে পারি, কারণ এতে দোষ থাকলে আপনি
কখনই ডাকতেন না। আপনাকে যে আমি চিনি নে তাও নয়। কিন্তু
কিছুতেই স্মরণ করতে পারছি নে। মনে হচ্চে কখনাে স্বপ্নে দেখে
থাকব। আপনার পরিচয় দিন।
রমা। আসুন। পথে যেতে যেতে আমার পরিচয় দেব। স্বপ্ন
কবেকার দেখা মনে পড়ে ?
রমেশ। । সঙ্গে আপনার আত্মীয় কেউ নেই ?
রমা। না, দাদী আছে, সে বাসায় কাজ করছে, চাকরটা গেছে
বাজারে। তাছাড়া আমি ত প্রায়ই এখানে আসি,-সমস্তই চিনি।
রমেশ। কিন্তু আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন কেন ?
রমা। নইলে আপনার খাওয়া-দাওয়ার ভারি কষ্ট হবে।
রমেশ। হ’লই বা। তাতে আপনার কি ?
রম। পুরুষ মানুষকে সব বুঝােন যায়, যায় না শুধু এই কথাটি।
আমি রমা।
রমেশ।
রমা ?
রমা। হাঁ। যার সঙ্গে পরিচয় থাকাও আপনার ঘৃণার বস্তু,-সেই।
রমেশ। কিন্তু আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?
রমা। আমার বাসায়। সেখানে মাসি নেই, ভয় নেই, আসুন।
উভয়ের প্রান। পরক্ষণে নিম্নলিখিত ব্যক্তিগণের প্রবেশ। নাপিত ও তাহাকে
দ্রুতপদে অনুসরণ করিয়া অপর এক ব্যক্তি। মুখে প্রচুর দাড়ি-গোফ ও মাথায় সুদীর্ঘ
কেশ। খানিকটা ক্ষুর দিয়া কামানো। এই লােকটি মানােত করিয়া ঠাকুরের কাছে
চুল-দাড়ি দিতে আসিয়াছিল
যাত্রী। ( ব্যস্ত ভাবে) নাপিত, নাপিত, তুমি নাপিত নাকি হে?
দাও ত দাদা এইটুকু কামিয়ে। খপ, কোরে একটা ডুব দিয়ে বাবার
পূজোটুকু সেরে দিয়ে আসি। বাবার খান, নইলে দুটো পয়সার মজুরি

প্রথম দৃশ্য ৪৯ যাত্রী। নয়,–এই সিকিটি নিয়ে দাও দাদা খপ করে। সাড়ে বারটার গাড়ী ধরতে হবে; -ঘরে ছেলেটার আবার দুদিন জয়। দাও দাও, এখানেই বসে যাবাে না কি ? নাপিত। ( সিকিটি হাতে লইয়া বেশ করিয়া পরীক্ষা করিয়া পরে ট্যাকে গুজিয়া বার দুই তাহার আপাদ মস্তক নিরীক্ষণ করিয়া) এই যে! দাড়ি-চুল কে এটো করে দিয়েছে দেখচি । যাত্রী। এটো ? এটা কি রকম? দেখ,চো বাবার দাড়ি চুল, এ কি আমার ? এটা কি রকম ? নাপিত। ( হাত দিয়া দেখাইয়া) এই ত খাবলে দুইই এটা করে দিয়েছে। এটো হয়ে গেল? এক ব্যাটা নাপতে সিকিটি হাতে নিয়ে এইটুকু ক্ষুর বুলিয়ে দিয়ে বলে কর্তার সিকিটি অনি দাও। বলুম কৰ্ত্তা আবার কে? এই ত গদিতে পাঁচ সিকে জমা দিয়ে হুকুম নিয়ে আচি। বলে, দেখগে তবে আর কোথাও। সিকি ত গেছেই, রাগ করে উঠে এলুম। দাও দাদা, তোমার বাপ-মায়ের কল্যাণে। নাপিত। আর গণ্ডাআষ্টেক পয়সা বার কর দিকি। তার চার আনা, কর্তার চার আনা। যাত্রী। আবার ভার চার আনা, কৰ্ত্তার চার আনা ? মানুষ জনকে কি পাগল করে দেবে না কি? দাও তবে আমার সিকি ফিরিয়ে, আমি তার কাছে গিয়েই কামাব। নাপিত। যাবে যাওনা। আমি কি তােমাকে ধরে রেখেচি নাকি? যাত্রী। (রাগত ভাবে) সিকি ফিরিয়ে দাও বচ। নাপিত। কিসের সিকি শুনি? এতক্ষণ দর-দস্তুর কলি মাগনা নাকি যাত্রী। আবার তুই-তােকারি। ৪

রমা
দ্বিতীয় অঙ্ক
নাপিত। ওঃ—গুরুঠাকুর এসেছেন। এ তারকেশ্বর থান, মনে
রাখি! চোখ রাঙাবি ত গল-ধাক্কা খাবি। কোন বাবা তোকে
কামিয়ে দেয় যা না।
ছেলের হাত ধরি একটি প্রৌঢ়। গােছর স্ত্রীলােক ও তাহার আঁচল
এরিয়া মন্দিরের দুইজন কর্মচারীর দ্রুতপদে প্রবেশ
১ম কর্মচারী। আঁ! বাবাকে ঠকানাে ! ঠকানাের আর যায়গা
পাসনি মাগী ? মােটে পাঁচ সিকে মানােত ?
প্রৌঢ়া। (কাতর কঠে) না বাবা ঠকাইনি। যা মানােত করেছিলুম
তাই জমা দিয়েছি
১ম কর্মচারী। কবে মানােত করেছিলি, বল, ব শুনি?
বছর তিনেক আগে, সেই বানের সময়। সত্যি বলচি
বাবা-
২য় কৰ্ম্মচারী। সত্যি বােচ? মিথ্যেবাদী কোথাকার। বছর
তিনের মধ্যে ঘর আর ব্যায়াম স্যারাম হয় নি ? আর মানােত করবার
দরকার হয় নি? কথখনাে না। দে মাগী বুকে হাত দে। মনে করে
দ্যাখ। ছেলে পুলে নিয়ে ঘর করি-এ যে-সে দেবতা নয়, স্বয়ং
তারকনাথ।
প্রৌঢ়া। (অত্যন্ত ভয় পাইয়া) শাপ মম্ব দিওনা বাবা, এই আর
একটি টাকা নিয়ে-
১ম কর্মচারী। (হাত পাতিয়া গ্রহণ করিয়া) একটি টাকা।
অন্ততঃ আরাে পাঁচটি টাকা মানেত করেছিলি। দ্যাখ, ভেবে। বাবার
কৃপায় আমরা সব জাতে পারি আমাদের ঠকান যায় না।
২য় কর্মচারী। দে না মা টাকা কটা ফেলে! ছেলে-পুলে নিয়ে ঘর
করি, কেন আর বাবার কোপে পড়বি? তাের ব্যাটার কল্যাণে দে,
দিয়ে দে ফেলে।

প্রথম পৃ
মা
প্রৌঢ়া। (কা কঁাদ হইয়া) টাকা যে আর নেই বাবা। কোথায়
পাব টাকা ।
১ম কর্মচারী। কেন ঐ ত তাের গলায় সােনার কবচ রয়েছে।
ওটা পােদ্দারের দোকানে রেখে কি আর পাঁচটা টাকা পাবি নে? সঙ্গে
হয় তােক দিচ্ছি, দোকান দেখিয়ে দেবে,-তারপরে একদিন ফিরে
এসে খালাস করে নিয়ে যাবি।
একজন স্ত্রীলােককে ঘিরিয়া ৫ ৭ জন ভিখারিণীয় বেশ
১ম ভিখারিণী। দে মা তাের ব্যাটা-বেটির কল্যাণে
২য় ভিখারিণী। দে মা একটি পয়সা তাের মেয়ে-জামাইয়ের কল্যাণে
৩য় ভিখারিণী। দে মা তাের বাপ-মায়ের
৪র্থ ভিখারিণী। দে মা তাের স্বামী-পুত্তরের
সকলে মহা ঠেলাঠেলি টানাটানি করিতে লাগিল
চুল-ওয়ালা যাত্রী। চাইনে দাড়ি-চুল দিতে। চাইনে মানােত শােধ
করতে।
মানত-ওয়ালা প্রৌঢ়া। এ যে আমার ইষ্টি কবজ বাবা। বাধা
দেব কি করে?
ভিখারীতাড়িত স্ত্রীলােক। ওগাে কি সর্বনাশ! কে আমার
আঁচল কেটে নিলে ?
ভিখারীর দল।
তাের স্বামী-পুতুরের কল্যাণে দে একটা পয়সা।
দে একটা আধলা-
১ম কর্মচারী। ব্যাটা-বেটি নিয়ে ঘর করি বাছা! বাবার খান।
নাপিত। কামাবে যে গাে?
যাত্রী। কামাবাে? রইল তারকনাথ মাথায়। চললুম ঘরে ফিরে।

রমা
দ্বিতীয় অৰু
কে আঁচল
ভিখারীতাড়িত স্ত্রীলােক। ঘরে ফিরব কি করে গাে।
কেটে নিলে।
ভিখারীর দল। দে মা একটা আধলা।
বলিতে বলিতে ঠেলিয়া লইয়া গেল
মানতওয়াল প্রৌঢ়া। দোহাই বাবা তারকনাথ, আমার ইষ্টি কবজটি
আর নিয়ে না।
ছেলের হাত ধরিয়া দ্রুতপদে এখান
১ম কর্মচারী। এক টাকার বেশি হােল না আদায়।
২য় কৰ্মচারী। নেই মাগীর আর কিছু।
এস্থান
নাপিত। যাক চারগণ্ডা পয়সাই কোন্ মাথা খুলে মেলে ?
এন
দ্বিতীয় দৃশ্য
তারকেশ্বরের বাসা। সামান্য রকমের একটা বিছানা পাতা,
তাহাতে বসিয়া রমেশ। রমা ব্যস্ত হইয়া প্রবেশ করিল
রমা। বেশ আপনি। রান্নাঘরে যেই গেছি আর একটু তরকারি
আতে, অনি উঠে হাত-মুখ ধুয়ে দিব্বি ভালমানুষটীর মত বিছানায়
এসে বসেছেন। কেন উঠলেন বলুন ত ?
রমেশ।
রমা। ভয়ে ? কার ভয়ে ? আমার ।
এই বলিয়, সে অদূরে উপবেশন করিল
রমেশ। সে ভয় ত ছিলই, তা ছাড়া আর একটা আছে। আজ
জ্বরের মত ঠেকছে।

র রমা। জ্বরের মত ঠেকছে ? এ কথা আগে বললেন না কেন? মান করে ভাত খেতে বসলেনই বা কোন বুদ্ধিতে ? রমেশ। খুব সহজ বুদ্ধিতে। যে-আয়ােজন, এবং যে-যত্ন করে খেতে দিলে তাকে না বলে ফেরাবােই বা কোন সুবিবেচনায় ? ভাবলাম, হােক্‌গে জ্বর,—ওষুধ খেলেই সারবে। কিন্তু এ অনু না খেয়ে যদি ফাকে পড়ি, এ ফাক এ জীবনে আর ভরবে না। রম। যা। এই বিদেশে সত্যিই যদি জ্বর হয়ে পড়ে, বলুন ত সে কত বড় অন্যায় ? রমেশ। অন্যায় ত আছেই। কিন্তু যে-রাণীকে এতটুকু দেখে গেছি তার স্বহস্তের রান্না ত্যাগ করাটাই কি কম অন্যায় হােতো ? রমা। তবু ঐ কথা। এ বিদেশে ত কোন আয়ােজনই করতে পারি নি। রমেশ। আয়ােজনের কথা কে ভাবচে ? ভাবচি শুধু যত্নের কথাটুকু। এ আমি কোথায় পেতাম? রমা। (সলজ্জে) কেন, আপনার যত্ন করবার লােকের কি অভাব আছে না কি? রমেশ। কোথায় পাব বল ত ? ছেলেবেলায় মা মারা গেছেন, তার পরে জ্যাঠাইমার হাতকে গিয়ে পােড়লাম বহুদূরে মামার বাড়ীতে। মামীমা বেঁচে নেই, সমস্ত বাড়ীটাই যেন হােটেল। সেখান থেকে পড়তে গেলাম এলাহাবাদে-সেও হােটেল। তারপরে গেলাম ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে। সেখানে বহুকাল কাটুল, কিন্তু ছেলেবেলার সেই হোটেল- বাসের দুঃখ আর ঘুল না । খেতে হয় খাও,বাধা দেবারও শত্রু নেই, এগিয়ে দেবারও মিত্র নেই। রমা নীরব শরীর • অসুস্থ, সাধ মিটিয়ে আজ খেতে পারলাম না, তবু মনে হচ্ছে ৫৪ রমা দ্বিতীয় অঙ্ক রমা। যেন জীবনের এই প্রথম সুপ্রভাত, এ জীবনের সমস্ত ধারাটা যেন এই একটা বেলার মধ্যেই একেবারে বদলে গেল। রমা। (অধােমুখে) কি সমস্ত বাড়িয়ে বলছেন বলুন ত ? রমেশ। বাড়ানাের শক্তি থাকলে বাড়াতাম, কিন্তু সে সাধ্য নেই। ভাগ্যে নেই, নইলে এর বেশি শক্তি থাকলে আমাকে ছুটে পালাতে হতো। আমারও ভাগ্য ভাল যে ঘরে ফিরে গিয়ে নিলে করবেন না, বলে বেড়াবেন না যে ওদের রমা এম্‌নি যে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে পেট ভরে দুটো খেতেও দেয় নি। রমেশ। , রাণী, নিন্দে করব না, সুখ্যাতি করেও বেড়াব না। আজকের দিনটা আমার নিদে সুখ্যাতির বাইরে। বাস্তবিক, খাওয়া জিনিসটার মধ্যে যে পেট-ভরানাের অতিরিক্ত আরও কিছু আছে, আজকের পূর্বে এ কথা যেন আমি জানতামই না। রমা।' আজই বুঝি প্রথম জানলেন । রমেশ। তাই ত জানলাম। রমা। কিন্তু এরও ঢের বেশি জানার আছে। সেদিনটায় আমাকে কিন্তু একটা খবর পাঠিয়ে দেবেন। রমেশ। এ কথার মানে রমা। সব কথার মানে যে জানতেই হবে, তারই বা কি মানে আছে রমেশদা? আচ্ছা, সত্যি বলুন ত, আমাকে কি একেবারে চিন্‌তেই পারেন নি ? রমেশ। কি করেই বা পারব বল ত? সেই ছেলেবেলায় দেখা। ফিরে এসে ত তােমার মুখ দেখতে পাই নি। যখনি চেষ্টা করেছি তখনি হয় ত মুখ ফিরিয়ে নিয়েছ, না হয় ত অন্যদিকে চেয়ে আছ। তাই আজ হঠাৎ মনে হয়েছিল, এ মুখ বােধ হয় কখনাে প্নে দেখে থাকব। এমন স্বপ্ন ত— • -

দ্বিতীয় দৃশ্য
রমা
রমা। আচ্ছা, আপনি রাত্রে কি পান?
রমেশ। যা জোটে তাই।
রমা। আচ্ছা, আপনি এত অগােছাল কেন বলুন ত ? শুনি
জিনিস-পত্র কোথায় থাকে কোথায় যায় কোন ঠিকানা নেই। কিছুর
ওপরেই যেন একটা মায়া-মমতা নেই। সমস্তই যেন শূন্যে ভেসে বেড়ায়।
রমেশ।
এত নিন্দে কার কাছে শুলে?
রমা।
সে শুনেই বা আপনার হবে কি? ফিরে গিয়ে তার সঙ্গে
ঝগড়া করবেন কি ?
রমেশ। আমি কেবল ঝগড়া করেই বেড়াই ?
রমা। তাই ত করেন। এসে পর্যন্ত আমার সঙ্গে ত কেবল
ঝগড়া করেই বেড়াচ্ছেন। মাসিই কি বাড়ীর মালিক নাকি, না, আমি
তঁাকে শিখিয়ে দিই, যে, তিনি বারণ করেছেন বলেই আমাদের মুখ-দেখা
পৰ্য্যন্ত বন্ধ করেছেন ? পুকুরের মাছ কি আমি চুরি করেছিলাম যে
আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন তার কৈফিয়ৎ চাইতে ?
রমেশ। কৈফিয়ৎ ত নয়, একটা জবাব। কিন্তু সে-জবাবের ত
কোনাে অমৰ্য্যাদা হয় নি রাণী।
রমা। হয় নি। কিন্তু, হয় নি বলেই ত তার সমস্ত অমৰ্য্যাদার
বােঝা গিয়ে চেপেছে আজ আমার মাথায় ! এর ভার কি আমি জাননে,
, এ শাস্তি আমি বুঝিনে? গ্রামে যে যা করবে আপনার বিরুদ্ধে
আমিই কি হব তার দায়ী? আপনার সমস্ত বিতৃষ্ণা কি গিয়ে পড়বে
শুধু আমারই ওপরে? এই ন্যায় বুঝি শিখে এসেছেন বিদেশ থেকে ?
দাসীর প্রবেশ
দাসী। দিদি নটবর কি জিনিস-পত্র সব বাঁধবে? নইলে ছটার
গাড়ী ধরা যাবে না।

রমা
দ্বিতীয় অঙ্ক
দাসী।
দাসী ।
রমা। তার তাড়াতাড়ি কি কুমুদা।
যে মেঘ করেছে দিদি, রাত্তিরে হয়ত ভয়ানক জল হবে।
রমা। হলই বা। মাঠে বসে ত আর তােরা নেই।
, তাই বচি।
मामौद्रपान
রমেশ। তােমাদের বুঝি সন্ধ্যার গাড়ীতে যাবার কথা ?
রম। হা। আর আপনার ?
রমেশ। অামার ? অামার ত কোনমতে কালকের দিনটা এখানে
থাকতেই হবে।
রমা। একে শরীর ভাল নয়, তাতে বর্ষাকাল, থাকবেন কোথায় ?
রমেশ। যেখানে থােক। যারা সব পূজো দিতে আসে তারা থাকে
কোথায় ?
রমা। তাদের যায়গা আছে। আপনি ত পূজো দেবেন না,
আপনাকে থাকতে দেবে কেন ?
রমেশ। ( হাসিয়া) তাদের গায়ে কি নাম লেখা থাকে নাকি ?
রমা। (হাসিয়া) থাকে। ভক্ত-লােকেরা বাবার কৃপায় পড়তে
পারে। অভক্তদের দূর করে দেয়। বিছানা-টিছানা কিছুই সঙ্গে
আনেননি ত ?
রমেশ। । বিছানা তাদের আবার কথা।
রমা।
খাসা ব্যবস্থা। দেহ অসুস্থ, আকাশে জল এলো বােলে, সঙ্গে
চাকর নেই, একটা বিছানা নেই, খাবার বন্দোবস্ত নেই, অথচ চিন্তার
বালাইটুকু পর্যন্ত নেই। কারা কোথা থেকে কবে আসবেন, তার প্রতি
নির্ভর। একেবারে পরমহংস অবস্থা। এমন হােল কি করে ?
রমেশ। যাদের কেউ কোথাও নেই, তাদের আপনিই হয়।
রমা। তাই ত দেখচি। হয় আজ এই বাড়ীতেই থাকুন।

দ্বিতীয় পৃষ্ঠ
মা
রমেশ। কিন্তু যার বাড়ী-
রমা। তাঁর আপত্তি নেই। অপদার্থ মানুষগুলােকে তিনি দয়া
করেন। থাকতেও দেন।
রমেশ। তােমাকে কিন্তু এই বিছানাটা রেখে যেতে হবে রমা।
রমা। তা যাব। কিন্তু ফিরিয়ে দেবেন,-হারিয়ে ফেলবেন না যেন।
রমেশ। বিছানা' হারাব কি রকম? আমাকে তুমি কি যে ভাব তার
ঠিকানা নেই, কে আমার সম্বন্ধে তােমার মন একেবারে বিগড়ে দিয়েছে।
রমা। (হাসিয়া) কে আর দেবে, হয়ত মাসিই দিয়েছে। কিন্তু
তিনি এখানে নেই, আপনি নির্ভয়ে বিশ্রাম করুন। আমি ততক্ষণ
কাজকৰ্ম্ম একটু সেরে নিই।
এই বলিয়া সে যাইবার জষ্ঠ উঠিয়া দাড়াইল
রমেশ। যার বাড়ী তঁার সঙ্গে একটা পরিচয় না হলে
রম। তাঁর সঙ্গে আপনার এই এতটুকু বয়স থেকে পরিচয় আছে।
ভাবনার কারণ নেই, ছেলেবেলায় যাকে রাণী বলে ডাকতেন-এ
তারই বাড়ী।
রমেশ। বাড়ী তােমার ? এখানে বাড়ী কিসের জন্যে ?
রম। বােল্লম ত। জায়গাটা আমার বড় ভাল লাগে, প্রায়
আসি,—তাই।
রমেশ। ঠাকুর-দেবতার প্রতি তােমার খুব ভক্তি, না ?
রমা। একে আর ভক্তি বলে না। তবু যতদিন বেঁচে আছি চেষ্টা
করতে হবে ত ?
দাসীৰ এবেশ
দাসী। টিপ, টিপ করে বৃষ্টি শুরু হােলো দিদি,যেতে আজ কষ্ট হবে।
• বুমা। তবে না-ই গেলি আজ। নটবরকে বােলে দে,কাল যাওয়া হবে।

৮
রমা
দ্বিতীয় অঙ্ক
দাসী। বাচি তা হলে।
কিন্তু যাবার কথা, বাড়ীতে যে না
ভাববেন ?
রম।
মাঝে মাঝে একটু ভাবা ভাল কুমুদা। তুই যা আমি যাচ্চি।
দাসীর প্রস্থান
মুখ দেখে
রমেশ। কেবল আমার জন্যেই তােমাদের যাওয়া হল না।
রমা। আপনার জন্যে নয়, আপনার অসুখের জন্যে।
বেশ বােঝা যাচ্চে, হয়ত জ্বর হবে। এ অবস্থায় ফেলেই বা যাই
কি করে ?
রমেশ। আমি ত তােমার কেউ নই রমা, বরঞ্চ পথের কাঁটা ।
তবু এক গ্রামের লােক বলে যে যত্ন আজ তােমার কাছে পেলাম তা
মুখে বার নয়।
রমা। তা হলে না-ই বা বলেন। আর দু’দিন বাদে ভুলে গেলেও
অভিযােগ করব না।
এই বলিয়া সে চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল
রমেশ। তােমাকে আশীর্বাদ করি রমা, তুমি সুখী হও,
দীর্ঘজীবী হও
মা। ( সহসা ফিরিয়া দাড়াইয়া) এইবার কিন্তু সত্যিই রাগ করব
রমেশদা। আমি হিন্দু বিধবা,আমাকে দীর্ঘজীবী হ’তে বলা শুধু
অভিশাপ দেওয়া। আমাদের কোন শুভাকাঙ্ক্ষাই কোনদিন এ
আশীৰ্বাদ আমাদের করে না। এখন আমি চললাম।
দ্রুতপদে এন

তৃতীন্ন দৃশ্য এম পথ। সময় অপরাহু। তিন দিন উপপরি ও অবিশ্রাম বাপাতে পুস্কৰণ খাল-বিল-নালা সমস্তই জলে পরিপূর্ণ হইয়া গেছে। পথ অতিশয় কর্দমাক্ত। ক্ষণকাল মাত্র বৃষ্টির বিরাম পড়িয়াছে। লাঠি ও ছাত হাতে বেণী ও গােবিন্দ প্রবেশ করিল। দুর্গম পথের চিহ্ন তাহাদের সর্বাঙ্গে বিদ্যমান বেণী। গগাবিন্দ। ( অন্তরাল হইতেই উচ্চকণ্ঠে ) বলি, কিসের এত খাতির হে! কুটুমের দল এসেছেন আবদার নিয়ে বাঁধ কাটিয়ে জল নিকেশ করে দাও, মাঠ ছেড়ে যাব! গেল, গেলই! ছােটলােক ব্যাটাদের আস্পর্ধার কথা শুনে হাসব কি কঁাদব ভেবে পাইনে বড়বাবু ! বল ত খুড়ো! চাষা ব্যাটারে একশাে বিঘের মাঠ হেজে যাবে জল বার করে দাও। সুমুখের বিষ্টার যে বছর সালিয়ান দুশাে টাকার জলকর বিলি হয়। একটা মাছও কি তাহলে থাকবে ? গােবিন্দ। তাও কি কখনাে থাকে ? ছোটলােক ব্যাটারা, দুটো টাকার মুখ কখনাে একসঙ্গে দেখিস নে তােরা,-জানিস, দু-দুশো টাকার লােকসান কাকে বলে? বলি, লােক-জন সব মােতায়েন রেখেচ ত ? লুকিয়ে-চুরিয়ে ব্যাটারা কোথাও কেটেকুটে দেবে না ত ? বলা যায় না বড়বাবু। প্রাণের দায়ে শালারা সব পারে। বেণী। দরওয়ান আর গােপাল নস্ককে পাঠিয়েছি পাহারা দিতে। আর খবর পাঠিয়েছি রমার পিরপুরের প্রজা আকবর লেঠেল আর তার দুই ব্যাটাকে। একশো জনের মােয়াড়া আটকাতে পারে তারা। গােবিন। ঠিক করেছ বাবা। ককেটি সেজে ফু দিচ্ছি, আর তােমার চাকর গিয়ে হাজির। বলি ভিজতে ভিজতে কেন রে হরি ? বলে, বড়বাবু তােমাকে ডাকচে। মিথ্যে বেলবনা বাব', হাতের হুকো হাতে.কইল, একবার টানবার সময় হল না। ছাতি আর ছড়িটি হাতে

রমা
দ্বিতীয় অঙ্ক
বেণী।
নিয়ে বেরিয়ে পােড়লাম। তােমার খুড়ি বলে এ দুর্যোগে যাও কোথা ?
বললুম, থাম মাগী, আবার পেছু ডাকে। দেখছি বড়বাবু ডাকতে
পাঠিয়েছে না? তার আবার সুযোেগ দুর্যোগ কি?
জান ত খুড়ো তােমার পরামর্শ ছাড়া আমি এক-পা কোথাও
চলি নে। আমার কাছে কান্নাকাটি কোরে যখন হ’ল না, তখন ব্যাটারা
গেল ছােটবাবুর কাছে দরবার করতে। হোঁৎকা-গোয়ার, ওর কি ! হয়ত
বলে বসবে, হােগে লােকসান আমাদের দে তােরা বাঁধ কেটে।
গােবিন্দ। পারে, ও হারামজাদা সব পারে বড়বাবু।
(গলা ছোট
করিয়া) বলি রমাকে একটু খবর দিয়ে রেখেচ ত? সে ছুড়ীরও সব
সময়ে মেজাজের ঠিক থাকে না। গরীব-দুঃখীর কান্না দেখলে হয়ত বা সায়
দিয়েই বসবে।
বেণী।
নাঃ—সে ভয় নেই খুড়ো, তাকে আমি সকালবেলাতেই টিপে
দিয়ে রেখেচি। কাল রাত্তির থেকেই একটা কাণা-ঘুষা শুন্চ কি না!
ঐ যে! আবার ক’ বেটা এই দিকেই আসছে।
কৃষকেরা। (সমস্বরে) দোহাই বড়বাবু, গরীবদের বাচান। এ আবাদ
পচে গেলে আমরা ছেলে-পুলে নিয়ে অনাহারে মরব।
গােবিন্দ। কেন হে সনাতন, মুর ব্বিরা ছুটে গেলেন যে ছােটবাবুর
কাছে। এখন বাঁচান না তিনি।
সনাতন। যে গেছে সে গেছে গাঙলীমশাই, আমরা এই পা দুটিই
জানি, এই পা ধরেই পড়ে থাকব। (বেণীর পদতলে পড়িয়া ক্রন্দন )
২য় কৃষক। ( বেণীর পদতলে পড়িয়া) আমাদের রাখতে হয় রাখুন,
মারতে হয় মারুন,-পা আমরা ছাড়ব না।
বেণী। জোর করিয়া পা ছাড়াইয়া লইয়া) যা-যা—আমি দু’দুশাে
টাকার জলকর নষ্ট করতে পারব না। চল খুড়ে আমরা যাই, আমাদের
আরও কাজ আছে।

রমা
৬১
বের্ণ ও গােবিন্দ যাইতে উত হইল
কৃষকেরা। বড়বাবু—গাঙলীমশাই, তবে কি সত্যিসত্যিই আমরা
মারা যাব?
গগাবিন্দ। ( ফিরিয়া দাড়াইয়া মুখ বিকৃত করিয়া) মারা যাবি কি
যাবি নে তার আমরা কি জানি ?
কৃষকেরা। হা ভগবান! দুঃখীদের কি তবে সত্যিই মারবে ?
ওপরে বসে সব দেখচ, তবু কোন উপায় করে দেবে না ?
সকলের দ্রুতবেগে প্রান
চতুর্থ দৃশ্য
রমার বহির্বাটী। কাল সন্ধ্যা। প্রাণের একদিকে চণ্ডীমণ্ডপের কিয়দংশ দেখা
যাইতেছে এবং অন্যদিকে ছােট একটা তুলসী মঞ্চ। রমা সন্ধ্যাদীপ হাতে ধীরে ধীরে
প্রবেশ করিয়া মঞ্চমুলে প্রদীপ রাখিয়া গলায় আঁচল দিয়া প্রণাম করিল। এমনি সময়ে
তাহার আনত মাথার কাছে নিঃশব্দ পদক্ষেপে রমেশ আসিয়া দাঁড়াইল
রমা। (মুখ তুলিয়া অকস্মাৎ রমেশকে দেখিয়া বিস্ময়ে ) এ কি,
আপনি যে !
রমেশ। অত্যন্ত প্রয়োজনে আসতে থােল রমা।
রমা। (ঈষৎ হাসিয়া) বেশ আসা। কিন্তু হঠাৎ কেউ যদি দেখে ত
ভাববে আমি বুঝি প্রদীপ জ্বেলে এতক্ষণ আপনাকেই নমস্কার করছিলাম।
এমনি কোরে বুঝি দাড়ায় ?
রমেশ।
শুধু
তােমার কাছেই এসেছি।
রমা। (হাসিমুখে) সে আমি জানি। নইলে কি মাসির কাছে
এসেছেন, আমি বলছি।
এই বলিয়া সে প্রদীপ হাতে লইয়া উঠিয়া বাড়াইল
কি আদেশ বলুন?
রমা, আমি

রমা
দ্বিতীয় অল্প
রমা।
রমেশ। তুমি নিশ্চয়ই সব শুনে। জল বার করে দেবার জন্যে
তােমার মত নিতে এসেছি।
রমা। আমার মত ?
রমেশ। হ্যা, তােমার মত নিতেই ছুটে এসেছি রমা। আমি নিশ্চয়
জানি দুঃখীদের এতবড় বিপদে তুমি কখনােই না বলতে পারবে না।
জল বার কোরে দেওয়াই উচিত বটে, কিন্তু কি কোরে হবে
রমেশদা, বড়দার যে মত নেই।
বেণী ও গােবিন্দর প্রবেশ
বেণী। না, আমার মত নেই। কেন থাকবে? দু’তিনশাে টাকার
মাছ বেরিয়ে যাবে সে খবরটা রেখেছ কি? এ টাকাটা কি চাষারা দেবে?
রমেশ। চাষারা গরীব,টাকা তারা কোথায় পাবে? কথাটা একবার
বুঝে দেখুন বড়দা।
তা দেখেছি। কিন্তু নাকে এত টাকা আমরাই বা কেন
লােকসান করতে যাব এ কথাটাও ত বুঝে উঠতে পারিনে রমেশ।
(গােবিন্দের প্রতি) খুড়াে, এমনি করে ভায়া আমার জমিদারী রাখবেন।
ওহে রমেশ, হারামজাদারা সকাল থেকে এতক্ষণ আমার ওখানে পড়েই
মড়া-কান্না কাদছিল,-আমি জানি সব। বলি, তোমার সদরে কি
ওয়ান নেই? তার পাশের নাগরা জুতো নেই ? যাও ঘরে গিয়ে সেই
ব্যবস্থা করগে, জল আপনি নিকেশ হয়ে যাবে।
এই বলিয়া নিয়ে রসিকতায় গােবিন্দর সহিত একযােগে হিঃ হিঃ হাঃ হাঃ-
করিয়া হাসিতে লাগিল
রমেশ। কিন্তু ভেবে দেখুন বড়দা, আমাদের তিনঘরের দুশাে টাকা
মাত্র লােকসান বাঁচাতে গিয়ে গরীবদের সারা বছরে অন্ন ম রা যাবে।
যেমন ক'রে থােক তাদের পাঁচ সাত হাজার টাকা ক্ষতি হবেই।
বেণী। হ’ল হ’লই। তাদের পাঁচ হাজারই যাক আর পঞ্চাশ
বেণী।

ৰা
চতুর্থ দৃশ্য
রমা
হাজারই যাক এই গােটা সদরটা খুঁড়ে ফেললেও ত পাঁচটা পয়সা
বার হবে না, ভায়া,যে ও-শালাদের জন্যে দু’দুশ টাকা উড়িয়ে দিতে হবে ?
রমেশ। এরা সারা বছর খাবে কি?
বেণী । ( হাসিয়া, মাথা নাড়িয়া, থুথু ফেলিয়া, অবশেষে স্থির হইয়া)
খাবে? দেখবে ব্যাটারা যে যার জমি বন্ধক রেখে আমাদের কাছেই টাকা
ধার করতে ছুটে আসবে। ভায়া, মাথাটা একটু ঠাণ্ডা কোরে চল।
কর্তারা এম্‌নি কোরেই বাড়িয়ে গুছিয়ে এই যে এক-আধ টুকরাে উচ্ছিষ্ট
ফেলে রেখে গেছেন, এই আমাদের নেড়ে-চেড়ে, গুছিয়ে-গাছিয়ে, খেয়ে-
দেয়ে আবার ছেলেদের জন্যে রেখে যেতে হবে। ওরা খাবে কি ? ধার
কর্জ করে খাবে। নইলে আর ব্যাটাদের ছােটলােক বলেছে কেন?
গােবিন্দ। এ যে মুনি-ঋষিদের শাস্ত্রবাক্য বাবাজী, এ ত আর
তােমার আমার কথা নয়।
রমেশ। বড়দা, আপনি যখন কিছুই করবেন না স্থির করেছেন তখন
তর্ক কোরে আর লাভ নেই।
নেই। ( রমার প্রতি ) তোমার পিরপুরের আকবর আলি
আর তার ব্যাটাদের খবর পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে রমা। (গােবিন্দের প্রতি)
চল খুড়ো আমরা ও-দিকটা একবার দেখে-শুনে আসিগে। সন্ধ্যাও হ’ল।
গােবিন্দ। চল বাবা, চল।
উভয়ের স্থান
রমেশ। হুকুম দাও রমা, ওঁর একার অমতেই এতবড় অন্যায় হতে
পারে না। আমি এখুনি গিয়ে বাঁধ কাটিয়ে দেব।
রমা। কিন্তু মাছ আটকে রাখার কি বন্দোবস্ত করবেন ?
রমেশ। অত জলে কোন বন্দোবস্ত হওয়াই সম্ভবপর নয়।
আমাদের স্বীকার করতেই হবে। হলে গ্রাম মারা যায়।
বেণী।
মম নীরব

৩০ রমা দ্বিতীয় অঙ্ক রমেশ। তাহলে অনুমতি দিলে? রমা। । এত টাকা আমি লােকসান করতে পারব না। তাছাড়া বিষয় আমার ভাইয়ের। আমি অভিভাবক মাত্র। রমেশ। , আমি জানি অর্ধেক তােমার। রমা। শুধু নামে। বাবা নিশ্চয় জাতেন সমস্ত বিষয় যতীনই পাবে। তাই অর্ধেক আমার নামে দিয়ে গেছেন। রমেশ। ( মিনতির কণ্ঠে ) রমা, এ ক’টা টাকা? এ দিকে তােমাদের অবস্থা সকলের চেয়ে ভাল। তােমার কাছে এ ক্ষতি ক্ষতিই নয়। আমি মিনতি জানাচ্চি এর জন্যে এত লােককে অন্নহীন কোরো । যথার্থ বলচি, তুমি যে এত নিষ্ঠুর হতে পার আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। রমা। নিজের ক্ষতি করতে পারি নে বলে যদি নিষ্ঠুর হই, না হয় তাই। ভাল, আপনার যদি এতই দয়া, নিজেই না হয় ক্ষতি পূরণ করে দিন না। রমেশ। রম, মানুষ খাঁটি কি না চেনা যায় শুধু টাকার সম্পর্কে। এই জায়গাটায় নাকি ফঁাকি চলে না, তাই এইখানেই মানুষের যথার্থ রূপ ধরা পড়ে। তােমারও আজ তাই পড়েছে। কিন্তু তােমাকে আমি কখনাে এমন করে ভাবি নি। ভেবেচি, তুমি এর চেয়ে অনেক -অনেক ওপরে। কিন্তু তুমি তা নও। তােমাকে নিষ্ঠুর বলাও ভুল। তুমি অতি নীচ, অতি ছােটো। রমা। কি আমি? কি বললেন ? রমেশ। তুমি অত্যন্ত হীন এবং নীচ। আমি যে কত ব্যাকুল হয়ে উঠেচি সে তুমি টের পেয়েছ বলেই আমার কাছে দুঃখীর মুখের গ্রাসের দাম আদায়ের দাবী করলে। কিন্তু বড়দাও মুখ ফুটে এ কথা বলতে পারেন নি। পুরুষ হয়েও তার মুখে যা বেধেছে, নারী হয়ে তােমার মুখে তা বাধেনি।-একটা কথা তােমাকে আজ বলে যাই রমা। আমি এর চেয়েও চতুর্থ দৃশ্য রমা ঢের বেশি ক্ষতি পূরণ করতে পারি, কিন্তু সংসারে যত পাপ আছে, মানুষের দয়ার ওপর জুলুম করাটাই সব চেয়ে বড়। আজ তুমি তাই করে আমার কাছে টাকা আদায়ের ফন্দি করে রমা বিহ্বল হতবুদ্ধির ন্যায় নিঃশব্দে চাহিয়া রহিল রমেশ। আমার দুর্বলতা কোথায় সে তােমাদের অগােচর নেই বটে, কিন্তু সেখানে পাক দিয়ে আজ একবিন্দু রস পাবে না। কিন্তু কি আমি কোরব তাও তােমাকে জানিয়ে দিয়ে যাই। এখুনি নিজে জোর করে বাধ কাটিয়ে দেব,—তােমরা পার আটকাবার চেষ্টা কর গে। এই বলিয়া রমেশ চলিয়া যাইতেছিল, রমা ফিরিয়া ডাকিল- রমা। শুনুন। আমার বাড়ীতে দাড়িয়ে আমাকে যত অপমান করলেন আমি তার একটারও জবাব দেব না। কিন্তু এ-কাজ আপনি কিছুতেই করবার চেষ্টা করবেন না। রমেশ। কেন? রমা। কারণ, এত অপমানের পরেও আমার আপনার সঙ্গে বিবাদ করতে ইচ্ছে করে না। আর রমেশ। আর কি ? রমা। আর, আর,হয়ত, আকবর-সর্দারের দল এসে পড়েছে। রমেশ। কারা তােমার আকবর সর্দারের দল আমি জানি নে- জানতেও চাই নে। কলহ-বিবাদের অভিরুচি আমারও নেই, কিন্তু তােমার সদ্ভাবের মূল্যও আর আমার কাছে কিছুমাত্র নেই। পদে এমন মাসির প্রবেশ মাসি। কে অমন কোরে হাঁকা-কি করছিল রে রমা, যেন চেনা-গলা ?

রমা
দ্বিতীয় অঙ্ক
রমা। কেউ না।
মাসি।
না বললেই ন্ব? সন্ধ্যেটি দিয়ে আহিক কতে বসেছি,
যেন ষাঁড় চেঁচানাে চেঁচাচ্চে। আহিক ফেলে রেখে উঠে আসতে হােল।
রমা সে চলে গেছে। তুমি ফিরে গিয়ে আবার আত্নিকে বােসগে।
মাসি। কুমুদা ?
দাসীর প্রবেশ
কুমুদা। কেন দিদি।
রমা।
একবার জ্যাঠাইমার ওখানে যাব আমার সঙ্গে চল।
মাসি। সেখানে আবার কিসের জন্যে ?
রমা।
দেখ মাসি, সব কথাই তােমাকে জানাতে হবে তার মানে
নেই। চল কুমুদা।
কুমুদা। চল দিদি।
উভয়ে এখান
মাসি। বাপরে! যেন মারমুখী! তবু যদি না লােকে তারকেশ্বরের
কথা শুনত । আমি তাই লােকের সঙ্গে ঝগড়া করে মরি।
बशन
বেণী, গােবিন্দ, আহত আকবর ও তাহার দুই পুত্র গহর ও ওসমানের প্রবেশ
আকবর। (খুটি ঠেস দিয়া বসিয়া পড়িল। তাহার সমস্ত মুখ
রক্তে ভাসিতেছে) আল্লা।
গহর। (নিজের রক্তধারা হাত দিয়া মুছিয়া ফেলিয়া) বাপজা,
দরদ কি বেশি মালুম হচ্চে?
আকবর। আল্লা!
বেণী। কথা শশান্ আকবর। থানায় চল। সাত বছর যদি না তাকে
দিতে পারি ত ঘােষাল বংশের ছেলে নই আমি।

চতুর্থ দৃশ্য রমা রুমার এলে রমা। রমা। রমা। আঁ! এমন ধারা কে করলে তােমাদের আকবর ? (এই বলিয়া সে অদূরে বসিয়া পড়িল ) আকবর। (আকাশের প্রতি হাত তুলিয়া) আল্লা! বেণী। আল্লা! আল্লা! এখানে বসে আল্লা আল্লা করলে হবে কি? বচি থানায় চল। যদি না এর শােধ দশবছর ঠেলতে পারি ত,রমা, তুমি চুপ করে রইলে কেন? বল না একবার থানায় যেতে। কে তােমাকে এমন কোরে জখম কমূলে আকবর ? আকবর। ছােটবাবু, দিদিঠাকুরাণ। এ কি কখনাে হতে পারে আকবর ? ছছাটবাবু একলা তােমাদের তিন বাপ ব্যাটাকে জখম কোরে দিলে ? এ যে তিন শশা জনে পারে না। আকবর। তাই ত হােলো দিদিঠাকুরাণ ! সাবাস! মায়ের দুধ খেয়েছিল বটে! লাঠি ধরলে বটে। গােবিন্দ। সেই কথাই ত থানায় গিয়ে বলতে বলচি রে ব্যাটা! কার লাঠিতে তুই জখম হলি ? ছোটবাবুর না সেই হারামজাদা ভােজোর ? আকবর। সেই বেঁটে হিন্দুস্থানিটার। লাঠির সে জানে কি ? কি বলিস রে গহর, তাের পয়লা চোটেই সে বসেছিল না রে ? গই কথা কহিল না, মাথা নাড়িয়া সায় দিল আকবর। মাের হাতের চোট পেলে সে বীচত না। গহরের লাঠিতেই বাপ, কোরে সে বসে পড়লো দিদিঠাকুরাণ। আকবর। তখন ছােটবাবু তার লাঠি তুলে নিয়ে বাঁধ এটকে পড়ল দিদিঠাকুরাণ, তিন বাপ-ব্যাটায় মােরা হটাতে নারলাম। আঁধারে বাঘের মত তেনার চোখ জ্বলতে লাগল। কইলেন, আকবর, বুড়ােমানুষ রমা দ্বিতীয় অঙ্ক তুই সরে যা। বাধ কেটে না দিলে সারা গায়ের লােক মারা পড়বে, তাই কেতেই হবে। তুইও ত রে চাষী, তাের আপন গায়েও ত জমী-জমা অছে, সম্ঝে দেখ, রে, সব বরবাদ হয়ে গেলে তাের ক্যামন লাগে? মুই সেলাম কোরে কইলাম, আল্লার কিরে ছােটবাবু, তুমি একটাবার পথ ছাড়। দিদিঠাকুরাণ পাঠিয়েছে মােদের, মােরা জান কবুল দিইচি। তিনি চমকে উঠে কইলেন, তােদর রমা পেঠিয়েছে আকবর, আমারে মারতে ? মুই কইলাম, তবে {ধ এটকোনা ছােটবাবু, ঘরকে যাও। তােমার আড়ালে দাড়িয়ে ঐ যে কয সুনি মুয়ে কাপড় জড়ায়ে ঝপাঝপ কোদাল মারচে ওদের শিরগুলো ফাক কোরে দিয়ে যাই। বেণী। বেইম্যান ব্যাটারা,-তাকে সেলাম বাজিয়ে এসে এখানে চালাকি মারা হচ্ছে! আকবর। ( তিন বাপ-ব্যাটায় প্রতিবাদের ভঙ্গিতে হাত তুলিয়া) খবরদার বড়বাবু! বেইমান কোয়য় না। মােরা মােছলমানের ; ছালে,সব সইতে পারি, ও পারিনা।-(হাত দিয়া কতকটা রক্ত মুছিয়া ফেলিয়া) আরে বেইমান কয় দিদি? ঘরের মধ্যে বসে বেইমান কইচো, বড়বাবু, চোখে দেখলে জানতে পারতে ছােটবাবু কি ! বেণী। (মুখ বিকৃত করিয়া) ছােটবাবু কি! তাই থানায় গিয়ে জানিয়ে আয় না? ববি, তুই বাঁধ পাহারা দিচ্ছিলি ছোটবাবু চড়াও হয়ে তােরে মেরেছে। আকবর। ( জিভ কাটিয়া) তােবা, তােবা! দিনকে রাত করতে বল বড়বাবু। বেণী। না হয় আর কিছু বলবি। আজ রাত্তিরে গিয়ে যখম দেখিয়ে আয় না,-কাল ওয়ারেন্ট বার কোরে একেবারে হাজতে পুরব। রমা, তুমি ভাল করে একবার বুঝিয়ে বল না? এমন সুবিধা যে আর কখনাে পাওয়া যাবে না।

চতুর্থ দৃশ্য
রমা
মা নীরবে একবার আকবরের মুখের প্রতি চাহিল
আকবর। ( মাথা নাড়িয়া) না দিদিঠাকুরাণ, ও পারব না।
বেণী। (ধমক দিয়া) পারবি নে কেন শুনি?
আকবর। ( ক্রুক কণ্ঠে) কি কও বড়বাবু, সরম নেই মাের?
পাঁচখানা গায়ের লােকে মােরে সর্দার কয় না? দিদিঠাকুরাণ, তুমি
হুকুম দিলে আসামী হয়ে জ্যাল যেতে পারি, ফৈরিদি হব কোন্
কালামুয়ে ?
রমা। সত্যিই পারবে না আকবর ?
আকবর। না, দিদিঠাকুরাণ, আর সব পারি, সদরে গিয়ে গায়ের
চোট দেখাতে না পারি। ওঠরে গহর, এইবার ঘরকে যাই। মাের।
লালিস করতি পারবাে না !
এই বলিয়া তারা উঠিয়া দাঁড়াল ও চলিয়া যাইতে লাগিল
গােবিন্দ। সত্যিই যে চলে যায় বড়বাবু? কিছুই হলাে না।
বেণী। বারণ কর না মা, এমন সুযােগ ফস্কালে যে আর কখনাে
মিলবে না !
রমা অধােমুখে নির্বাক হইয়া রহিল ; আকবর ও তাহার দুই
পুত্র লাঠিতে ভর দিয়া কোন মতে বাহির হইয়া গেল
বেণী। ও-বােঝা গেছে সমস্ত ।
গােবিন্দ। হু, যা শােনা গেল তা মিথ্যে নয় দেখছি।
উভয়ের দ্রুতপদে এখান
রমা। রমেশদা, এ যে তুমি পারাে, এত শক্তি যে তােমার ছিল এ
কথা ত আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

পঞ্চম দৃশ্য
গ্রামের একাংশ। কয়েকটা ভাঙা মন্দিরের কিছু কিছু দেখা যাইতেছে। বৃক্ষলতা-গুল্মে
সমস্ত স্থান সমাকীর্ণ। মনে হয় এদিকে কদাচিৎ কখনাে কেহ আসে মাত্র
বেণী ও গােবিন্দর এবেশ
গােবিন্দ। ( সচকিতে ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিয়া) কে জানে কোন
শালা আবার কোথা দিয়ে শুনবে। যে জাল বিস্তার করে দড়িটি ধরে
বসে আছি বাবা, একটুখানি টা দিয়েছি অমনি ঝুপ, করে পড়েছে।
বেণী। কাজ হাসিল ত ?
গােবিন্দ। নইলে কি আর তােমাকে এই বনের মধ্যে না হােক
ডেকে এনেছি বাবা? তুই শাল ভৈরব আচায্যি—তাের নেই এক
কড়ার মুরােদ, তুই যা আমাদের বিপক্ষে ? তুই যাস্পরকে আগলাতে?
এখন বাস্তু-ভিটেটা বাচা! কি করে মেয়ের বিয়ে দি তা একবার
দেখি!
গােবিদ। (দুই হাতের দশ আঙুল তুলিয়া ধরিয়া) একটি হাজার!
কিন্তু শুধু কথায় চিড়ে ভিজবে না বাবা,-আধাআধি !
বেণী। (অত্যন্ত খুসী হইয়া) আধা-আধি কেন খুড়াে, দশআনা-
ছ’আনা।
গােবিন্দ। ভ্যালা মাের বাপরে! শুধু এই নয় বাবা। সুমুখে
পূজো। যদু মুখুয্যের কন্যা এবার মা’কে কি করে আনেন তা দেখতে
হবে। আসচে ফাত্তনে ঘটা করে ভাইয়ের পৈতেটি কি করে দেন
তাও একবার নেড়ে চেড়ে পাঁচজনকে দেখাব,—তবে আমার নাম
গগাবিন্দ গাঙলী !
বেণী। তারকেশ্বরের কাণ্ডটা তা হলে সত্যি বল ?
গগাবিন্দ। সত্যি নয় ? শালা নটবর কি কিছু বলতে চায়?

পঞ্চম দৃশ্য ৭১ বসি কোবলে, পিঠে হাত বুলিয়ে কিছুতেই কিছু হয় না। ব্যাটা আর ভাঙে না। তখন ফস্ করে পায়ের ধূলাে মাথায় দিয়ে বললাম, বাবা, মার চাকরই হও আর যাই হও,-শুদ্র ছাড়া আর কিছু নও, ছেলেপুলে নিয়ে ঘর কর, বামুনের পায়ের ধুলাে মাথায় করে যদি মিথ্যে বল, তে-রাত্তির পােয়াবে না সর্পাঘাত হবে । গগাবিন্দ। ব্যাটা যেন কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল। সাহস দিয়ে বললাম, নটবর, চাকরি গেলে আবার ঢের হয়ে, কিন্তু প্রাণ গেলে আর হবে না। তখন ফড়, ফড় করে আগাগােড়া ব্যাপারটা বলে ফেলে। ঠাকরুণের ছ’টার গাড়ীতে আর বাড়ী আসা হলাে না। বাবু রাত্তিরে বাসায় রইলেন, খাওয়া-দাওয়া, হাসি-গল্প—যা পরচর্চায় কাজ নেই, ঘটনাটা সত্যি। বেণী। দেখলে না খুড়ো কিছুতে আকবরকে থানায় যেতে দিলে না ! গগাবিন্দ। দেবে কি করে ? দেওয়া কি যায় বাবা ? যায় না। বেণী। হু। অন্ধকার হয়ে আচে, যাওয়া যা চল। গােবিন্দ। চল। চল। (হঠাৎ বেণীর হাতটা ধরিয়া ফেলিয়া) কিন্তু বাবা, ভাইপােটা যে অর্ধেক বিষয় টেনে নেবে তা চলবে না বলে রাখচি। সামলাতে হবে। বেণী। নির্ভয়ে থাকো খুড়াে, আমি বেঁচে থাকতে তা হবে না। গােবিন্দ। হাটের অংশটা এবার ছেড়ে দিতে রমা পথ পাবে না তাও তােমাকে বলে রাখলাম বড়বাবু। কিন্তু চেপে। ব্যাপারটা হঠাৎ চাউর করে ফেলল না। বেণী। ( ঈষৎ হাসিয়া ) দেখা যাক। উভয়ের এনি

রমেশের বাটীর অন্তঃপুর। তাহার শয়ন কক্ষে বসিয়া ৰমেশ গভীর রাত্ৰি পৰ্য্য
লেখাপড়া কৰিতেছিল। অকস্মাৎ নেপথ্যে কাহার ক্রন্দনের শব্দ শুনা গেল, এবং পরক্ষণে
ভৈরব আচাৰ্য্য গােপাল সরকারের গলা জড়াইয়া মড়া-কান্না কাদিতে কাদিতে প্রবেশ
করিল ।
রমেশ ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া দাড়াইল
ভৈরব। ( সবরাদনে) বাবু, আমি ধনে প্রাণে মারা গেছি।
রমেশ। ব্যাপার কি সরকারমশাই ?
গােপাল সরকার। কাজ সেরে শুতে যাচ্ছিলেম বাবু, হঠাৎ কোথা
থেকে ছুটে এসে আচায্যিমশাই গলা জড়িয়ে ধরেছে। গলাও ছাড়ে না,
কান্না থামায় না।
রমেশ। কি হ’লল আচায্যিমশাই ?
ভৈরব। বাবু গাে, আমি একেবারে গেছি। ছেলেপুলের হাত ধরে
এবার গাছতলায় শুতে হবে।
রমেশ। গাছতলায় কেন? ঘর কি হল?
ভৈরব। আর নেই,নিলেম করে নিয়েছে।
রমেশ। এই ত সকালেও ছিল। এরই মধ্যে কেনিলেম করে নিলে ?
কে এক সনৎ মুখুয্যে বাবু, গােবিন্দ গাঙলীর খুড়শ্বশুর।
গােপাল। আরে, আমার গলা ছাড়ুন না। বাবুকে সমস্ত বুঝিয়ে
বলুন,-কে নিলে, কেন নিলে, আমােক আমাকে জড়িয়ে ধরে
থাকলে কি হবে? ছাড়ুন।
ভৈরব। (গলা ছাড়িয়া) এক হাজার সাতশ টাকা পাঁচ আনা
ছ পাই,বাবু গাে, ধনে প্রাণে গেলাম।

যষ্ঠ দৃশ্য রমা গােপাল। টাকা কর্জ নিয়েছিলেন ? ভৈরব। না, একপয়সা না সরকারমশাই। দেনা মিথ্যে, পত মিথ্যে-কবে নালিস হলো, কবে শমন হ’লল, কবে ডিক্রি হয়ে বাড়ী ঘর-দোর নিলাম হয়ে গেল—কিছুই জানি নে বাবু। কাল কানাঘুষাে খবর পেয়ে সরে গিয়ে টের পেলাম-ছেলেপুলে নিয়ে আমাকে গাছতলায় খতে হবে। এক হাজার সাতাশ টাকা পাচ আনা ছ’ পাই- রমেশ। এমন ভয়ানক কথা ত কখনাে শুনিনি সরকারমশাই ? গােপাল। পাড়াগাঁয়ে এমন অনেক হয় বাবু। যারা গরীব, বড়লােকের কোপে পড়ে তারা সত্যিই ধনে-প্রাণে মারা যায়। এ সমস্তই বেণী কাবু আর গাঙলীমশায়ের কাজ। আচায্যিমশাই বরাবর আমাদের দিকে আছেন বলেই তার এই বিপদ। ভৈরব হাঁ বাবু ভাই। তাই আমার এই বিপদ। রমেশ। কিন্তু এর উপায় সরকারমশাই ? গােপাল। অনেক টাকার ব্যাপার। এর ঋণ মিথ্যে, দলিল মিথ্যে, সাক্ষী. মিথ্যে,কে হয়ত ওর নাম লিখে শমন নিয়েছে, কে হয়ত আদালতে গিয়ে কবুল জবাব দিয়েছে, সদরে গিয়ে সমস্ত তদন্ত করে ত কিছুই বলবার যো নেই। রমেশ। তাই আপনি যান। সমস্ত খবর নিয়ে যত টাকা লাগে এর প্রতিকার করুন। এমন করুন যেন এতবড় অত্যাচার কতে আর কেউ না সাহস করে। ভৈরব। (অকস্মাৎ রমেশের পা জড়াইয়া ধরিয়া) বাবু গো, আপনি চিরজীবী হােন। ধনে-পুত্রে লক্ষ্মী লাভ করে আপনি রাজা হােন্। ভগবান আপনাকে যেন রমেশ। (পা ছাড়াইয়া লইয়া) আপনি বাড়ী যান আচায্যিমশাই, যা করা উচিত আমি করব।

৭৪ মমা দ্বিতীয় অঙ্ক ভৈরব। ভগবান যেন আপনাকে-- রমেশ। রাত অনেক হল আচায্যিমশাই, আজ আমি বড় শ্রান্ত। ভৈরব। ভগবান যেন আপনাকে দীর্ঘজীবী করেন, ভগবান যেন আপনাকে রাজা করেন- ইত্যাদি বলিতে বলিতে ভৈরবের এহান রমেশ। (দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া) সরকারমশাই, এই আমাদের গর্বের ধন! এই আমাদের শুদ্ধশান্ত ন্যায়নিষ্ঠ বাঙলার পল্লীসমাজ ! গােপাল। হ, এই। সবাই জানবে এ কাজ বেণীবাবুর, সবাই গােপনে জল্পনা করে বেড়াবে, কিন্তু মুখ ফুটে কেউ এ অত্যাচারের প্রতিবাদ করবে না। সেবার গাঙলীমশাই বিধবা বড়ভাজকে মেরে বাড়ী থেকে বার করে দিলে, কিন্তু বেণীবাবু সহায় বলে সবাই চুপ করে রইলাে। সে কেঁদে সকলকে জানালে, সকলেই বলে, আমরা কি কোরব। ভগবানকে জানাও তিনিই এর বিচার করবেন। রমেশ। তার পরে ? গােপাল। তার পরে সেই গাঙলীমশাই-ই সকলের জাত মেরে বেড়াচ্ছেন। মৃত পল্লীসমাজ কথাটি বলার সাহস রাখে না। অথচ, আমিই ছেলেবেলায় দেখেচি বাবু, এমন ধার ছিল না। বিধবা বড়জের গায়ে হাত দিয়ে কেউ সহজে নিস্তার পেত না। তখন সমাজ দণ্ড দিত, এবং সে দণ্ড অপরাধীকে মাথা পেতে নিতে হােত। রমেশ। তবে কি পল্লীসমাজ বলে কিছুই আর নেই। গােপাল। যা আছে সে ত এসে পর্যন্ত স্বচক্ষেই দেখছেন। যা আর্তকে রক্ষে করে না, দুঃখীকে পথেই ঠেলে দেয়, তাকেই সমাজ বলে কল্পনা করার মহাপাপ আমাদের নিয়ত রসাতলের দিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে।

वई मुज
রমা
রমেশ। (আশ্চর্য হইয়া) সরকারমশাই, এ সকল কথা আপনি
জানলেন কার কাছে?
গােপাল। আমার স্বর্গীয় মনিবের কাছে। এইমাত্র যে ভৈরবকে
উদ্ধার করতে চাইলেন, এ শক্তি আপনি পেলেন কোথায় ?
তাই দয়া। এনি কোরে বিপন্নকে উদ্ধার করতে তাকে যে আমি
বহুবার দেখেচি ছােটবাবু।
রমেশ। ( দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া ) বাবা-
গােপাল। রাত প্রায় শেষ হয়ে এল বাবু, আপনি একটু শােন্।
রমেশ। হাঁ শুই। আপনি বাড়ী যান সরকারমশাই।
=
গােপাল সরকার প্রস্থান করিলেন। রমেশ শরনের আয়ােজন করিতেছিল সহসা
বারের কাছে কি একটা দেখিতে পাইয়া চকিয়া প্রশ্ন করিল
রমেশ।
কে দাড়িয়ে ?
যতীন বারের কাছে মুখ বাড়াইয়া
যতীন। ছােড়দা, আমি।
রমেশ। ( কাছে গিয়া) যতীন? এত রাত্রে ? আমায় ডাকচ
যতীন। হাঁ, আপনাকে।
রমেশ। আমাকে ছােড়া বলতে তােমাকে কে বলে দিলে?
যতীন। দিদি।
রমেশ। রমা ? তিনি কি তােমাকে কিছু বলতে পাঠিয়েছেন
। দিদি বললেন, আমাকে সঙ্গে কোরে তাের ছােড়দার
বাড়ীতে নিয়ে চল। ঐ যে ওখানে দাড়িয়ে আছেন।
?
যতীন।
এই বলিয়া সে দরজার বাহিরে চাহিল
( ব্যস্ত হইয়া সরিয়া আসিয়া ) আজ আমার এ কি

রমা দ্বিতীয় অঙ্ক সৌভাগ্য। কিন্তু আমাকে ডেকে না পাঠিয়ে এত রাত্রে নিজে এলে কেন? এস ঘরে এস। রমা অত্যন্ত দ্বিধাভরে ভিতরে প্রবেশ করিয়া দ্বারের অনতিদূরে মেঝের উপর বসিয়া পড়িল। যতীন দিদির কাছে আসিয়া বসিতে যাইতেছিল কিন্তু রমেশ তাহাকে একটী আরাম কেদারায় আনিয়া শােয়াইয়া দিল রমা। রাত আর নেই,-ভাের হয়ে এসেছে, ( অধােমুখে ) শুধু একটি জিনিস আপনার কাছে ভিক্ষে চেয়ে নেবাে বলে আপনার বাড়ীতে এসেছি। দেবেন বলুন? রমেশ। আমার কাছে ভিক্ষে চাইতে? আশ্চর্য! কি চাই বল ? রমা। (মুখ তুলিয়া ক্ষণকাল অপলক চক্ষে রমেশের মুখের প্রতি চাহিয়া রহিল) আগে কথা দিন। রমেশ। (মাথা নাড়িয়া) তা পারি নে। তােমাকে কোন প্রশ্ন না কোরেই কথা দেবার শক্তি যে তুমি নিজের হাতেই ভেঙে দিয়েছ রমা। রমা। আমি ভেঙে দিয়েছি ? রমেশ। তুমিই। তুমি ছাড়া এ শক্তি সংসারে আর কারু ছিল না। রমা, আজ তােমাকে একটা সত্য কথা বলব।-ইচ্ছে হয় বিশ্বাস কোরাে, ইচ্ছে না হয় কোরনা। কিন্তু জিনিসটা যদি না ম'রে একেবারে নিঃশেষ হয়ে যেতে, হয়ত এ কথা তােমাকে কোন দিন শােনাতে পারতাম না। কিন্তু, আজ নাকি আর কোন পক্ষেই লেশমাত্র ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, তাই আজ জানাচ্চি সেদিন পর্যন্তও তােমাকে অদেয় আমার কিছুই ছিল না। কিন্তু কেন জানাে? রমা। ( মাথা নাড়িয়া জানাইল) না । রমেশ। কিন্তু শুনে রাগ কোরাে না। লজ্জাও পেয়াে না। মনে কোনাে এ কোন পুরাকালের একটা গল্প ও মাত্র। তােমাকে

যষ্ঠ দৃশ্য,
৭।
ভালবাসতাম রমা। মনে হয়, তেমন ভালবাসা বােধহয় কেউ কখনাে
বাসেনি। ছেলেবেলায় মার মুখে শুনেছিলাম আমাদের বিয়ে হবে।
তার পরে, যেদিন সমস্ত ভেঙে গেল, সেদিন,—কত বছর কেটে গেল,
তবুও মনে হয় সেদিন বুঝি কালকের কথা।
রমা তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া পলকের এ শিহরিয়া
আবার স্তব্ধ অধােমুখে নিশ্চল হইয়া রহিল
তুমি ভাবচ তােমাকে এসব কাহিনী শােনানাে অন্যায়। আমার মনেও
এ সন্দেহ ছিল বােলেই সেদিন তারকেশ্বরে যখন একটা দিনের
সমাদরে আমার সমস্ত জীবনের ধারা বদলে দিয়ে গেল, সেদিনও
চুপ করেই ছিলাম। চুপ করেই ছিলাম, কিন্তু সে নীরবতার ব্যথা
মাপবার মানদণ্ড হয়ত শুধু অন্তর্যামীর হাতেই আছে।
রমা। (কিছুতেই যেন আর সহিতে পারিল না) যা তার হাতে
আছে তা তার হাতেই থাক না রমেশদা।
রমেশ। তাই ত আছে রমা।
রমা। তবে—তবে, আজকেই বা বাড়ীতে পেয়ে আমাকে অপমান
করছেন কেন ?
রমেশ। অপমান? কিছুমাত্র না। এর মধ্যে মান-অপমানের
কথাই নেই। এ যাদের কাহিনী শুচো সে রমাও তুমি কোন দিন
ছিলে না, সে রমেশ ও আর আমি নেই।
রমা। রমেশদা, আপনার নিজের কথাই বলুন। রমার কথা আমি
আপনার চেয়ে বেশি জানি।
রমেশ। যাই হােক শােন। কেন জানি নে, সেদিন আমার
অংশয়ে বিশ্বাস হয়েছিল তুমি যা ইচ্ছে বল, যা খুশী কর, কিন্তু আমার
অকল্যাণ তুমি কিছুতেই সইতে পারবে না। বােধ করি ভেবেছিলাম

৭৮
রমা
দ্বিতীয় অঙ্ক
সেই যে ছেলেবেলায় একদিন ভালবেসেছিলে, সেই যে হাতে কোরে চোখ
মুছিয়ে দিয়েছিলে, হয়ত তা আজও একেবারে ভুলতে পারনি। তাই
মনে করেছিলাম কোন কথা তােমাকে না জানিয়ে তােমারি ছাওয়ায়
বসে সমস্ত জীবনের কাজগুলাে আমার ধীরে ধীরে কোরে যাব। কিন্তু
সে রাত্রে আকবরের নিজের মুখে যখন শুনতে পেলাম তুমি নিজেও
কি? বাইরে এত গােলমাল কিসের ?
দ্রুতবেগে গোপাল সরকারের প্রবেশ
গােপাল। ছােটবাবু? ( অকস্মাৎ রমাকে দেখিয়া স্তব্ধ হইয়া
থামিল)
রমেশ। কি হয়েছে সরকারমশাই?
গােপাল। পুলিশের লােক ভজুয়াকে গ্রেপ্তার করেছে।
রমেশ। ভজুয়াকে ? কেন ?
গােপাল। সেদিন রাধাপুরের ডাকাতিতে সে নাকি ছিল।
রমেশ। আচ্ছা আমি যাচ্ছি। আপনি বাইরে যান।
পােপাল সরকার প্রস্থান করিল
রমেশ। যতীন ঘুমিয়ে পড়েছে, সে যাক্। কিন্তু তুমি আর একমুহূর্ত
থেকো না রমা, খিড়কী দিয়ে বেরিয়ে যাও। পুলিস খানাতল্লাশি
করতে ছাড়বে না।
রমা।. (উঠিয়া দাঁড়াইয়া ভীতক) তােমার নিজের ত কোন
ভয় নেই ?
রমেশ। বলতে পারি নে রমা। কতদূর কি দাড়িয়েছে সে ত
এখনাে জানি নে।
রমা। তােমাকেও ত গ্রেপ্তার করতে পারে ?
রমেশ। তা পারে।

রমা
৭৯
রমা। পীড়ন করতেও ত পারে ?
রমেশ। অসম্ভব নয়।
রমা। (সহসা কাঁদিয়া উঠিয়া) আমি যাব না রমেশদা।
রমেশ। (সভয়ে ) যাবে না কি রকম?
রমা। তােমাকে অপমান করবে, তােমাকে পীড়ন করবে-আমি
কিছুতেই যাব না রমেশদা।
রমেশ। (ব্যাকুল কণ্ঠে) ছি ছি, এখানে থাকতে নেই। তুমি কি
পাগল হয়ে গেলে রাণী ?
এই বলিয়া দুই হাত ধরিয়া জোর করিয়া তাহাকে বাহির করিয়া দিল। ওদিকে
বহ লােকের পদশৰ পতর হইয়া উঠিতে লাগিল

তৃতীয় অঙ্ক প্রথম দু বিশ্বেশ্বরীর কক্ষ জ্যাঠাইমা ও রমেশ জ্যাঠাইমা। হরে রমেশ, তুই নাকি তাের পীরপুরের নতুন ইস্কুল নিয়েই মেতে রয়েচি, আমাদের ইস্কুলে আর পড়াতে যাস্ নে ? রমেশ। । যেখানে পরিশ্রম শুধু পণ্ডশ্রম, যেখানে কেউ কারাে ভাল দেখতে পারে না, সেখানে খেটে মরায় কোন লাভ নেই। শুধু মাঝে থেকে নিজেরই শক্ত বেড়ে ওঠে। বরঞ্চ, যাদের মঙ্গলের চেষ্টায় দেশের সত্যকার মঙ্গল হবে, সেই সব মুসলমান, আর হিন্দুর ছোেট জাতেদের মধ্যেই পরিশ্রম করব। জ্যাঠাইমা। এ কথা ত নতুন নয় রমেশ। পৃথিবীতে ভাল করবার ভার যে-কেউ নিজের ওপরে নিয়েছে চিরদিনই তার শত্রু সংখ্যা বেড়ে উঠেছে। সেই ভয়ে যারা পেছিয়ে দাঁড়ায়, তুইও যদি তাদের দলে গিয়ে মিশিস্ তা হলে ত চলবে না বাবা। এ গুরুভার ভগবান তোকেই বইতে দিয়েছেন, তােকই বয়ে বেড়াতে হবে। কিন্তু হারে, তুই নাকি ওদের হাতে জল খাস? রমেশ। (হাসিয়া) এই ওখ, এরই মধ্যে তােমার কানে উঠেছে। কিন্তু আমি ত তোমাদের জাত-ভেদ মানি নে জ্যাঠাইমা। জ্যাঠাইমা। মানিস্ নে কি রে? এ কি মিছে কথা, না, জাত-ভেদ নেই যে তুই মানিস নে ?

প্রথম দৃ রমা রমেশ। আছে তা মানি, কিন্তু ভাল বলে মানি নে। এর থেকে কত মনােমালিন্য, কত হানাহানি—মানুষকে ছোট কোরে অপমান করবার ফল কি তুমি দেখতে পাও না জ্যাঠাইমা? সে দিন অর্থাভাবে দ্বারিক ঠাকুরের প্রায়শ্চিত্ত হয় নি বলে তার মৃতদেহ কেউ স্পর্শ করতে চায় নি এ কথা কি তুমি জান না ? জ্যাঠাইমা। জানি বাবা, সব জানি। কিন্তু এর আসল কারণ জাত-ভেদ নয়। যা সব চেয়ে বড় কারণ তা এই যে যাকে যথার্থ ধৰ্ম্ম বলে, একদিন যা এখানে ছিল, আজ তা পল্লী গ্রাম থেকে একেবারে লােপ পেয়েছে। আছে শুধু কতকগুলাে অর্থহীন আচারের কুসংস্কার, আর তার থেকে নিরর্থক দলাদলি। রমেশ। এর কি কোন প্রতীকার নেই জ্যাঠাইমা ? জ্যাঠাইমা। আছে বই কি বাবা। প্রতীকার আছে শুধু জ্ঞানে। যে পথে তুই পা দিয়েছিস, শুধু সেই পথে। তাই ত তােকে বার বার বলি বাবা, তুই যেন তাের জন্মভূমিকে ত্যাগ কোরে কিছুতে যাস্ নে । তাের মত বাইরে থেকে যারা বড় হতে পেরেছে, তারা যদি তােরই মত গ্রামে ফিরে আসত, সমস্ত সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন কোরে চলে মা যেত, পল্লী গ্রামের এত বড় দুর্গতি হােত না। তারা কখনাে গােবিন্দকে মাথায় নিয়ে তােরে দূরে সরাত না। রমেশ। দূরে যেতে ত আর আমার দুঃখ নেই জ্যাঠাইমা। জ্যাঠাইমা। কিন্তু এই দুঃখই যে সবচেয়ে বড় দুঃখ রমেশ। কিন্তু আজ যদি কাজের মাঝখানেই সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাস বাবা, তাের জন্মভূমি তােক ক্ষমা করবে না। রমেশ। জন্মভূমি ত শুধু একা আমার নয় জ্যাঠাইমা । জ্যাঠাইমা। তাের একার বই কি বাবা, শুধু তােরই মা! দেখতে পাস্ লে মা মুখ ফুটে সন্তানের কাছে কোন দিন কিছুই দাবি করেন না।

৮২ রমা তৃতীয় অঙ্ক তাই এত লােক থাকতে কারাে কানেই তাঁর কান্না গিয়ে পৌছয়নি, কিন্তু তুই আসামাত্রই শুনতে পেয়েছি। রমেশ। ( ক্ষণকাল নতমুখে নীরবে থাকিয়া) একটা কথা তােমাকে জিজ্ঞেসা কোরব জ্যাঠাইমা ? জ্যাঠাইমা। কি কথা রমেশ ? রমেশ। আমি ত তােমাদের জাত-ভেদ মানি নে,কিন্তু তুমি ত মান ? জ্যাঠাইমা। তুই মানিস নে বলে আমি মা না রে ? রমেশ। কিন্তু আমি ত সকলের ছোঁয়া খাই,আমার হাতে ত তুমি খেতে পারবে না জ্যাঠাইমা ? জ্যাঠাইমা। পারব না কিরে? তুই আমার বাবা-তাই কি ছােট- খাটো ? মস্ত বড় বাবা । মেয়ে হয়ে এত বড় আস্পর্ধার কথা কি আমি মুখে আনতে পারি রে ? রমেশ। (তৎক্ষণাৎ হেঁট হইয়া তাহার পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া) এই আশীৰ্বাদ আমাকে তুমি কর ‘জ্যাঠাইমা, তােমাকে যেন আমি চিতে পারি। জ্যাঠাইমা। (তাহার চিবুক স্পর্শ করিয়া চুম্বন করিয়া হয়েছে, হয়েছে। কিন্তু আমার যে এখনাে আহ্নিক সারা হয় নি বাবা, একটুখানি ববি ? রমেশ। জ্যাঠাইমা, আমার ইস্কুলের বেলা হয়ে যাচ্ছে। জ্যাঠাইমা। তাহলে যখনি সময় পাবি আসিস রমেশ। রমেশ ও জ্যাঠাইমার এখন একদিক্‌ দিয়া রমা ও অপর দিক দিয়া দাসীর প্রবেশ রমা। জ্যাঠাইমা কোথায় রাধা ? দাসী। এই মাত্র পূজো করতে গেলেন। দেরি হবে না দিতি একই বােস না?

প্রথম পৃষ্ঠ র বেণী। বেণী প্রবেশ করিল, এবং তাহাকেই দেখিয়াই দাসী সমিয়া গেল তােমাকে আসতে দেখেই এলাম রমা। অনেক কথা আছে। মা বুঝি পূজো করতে গেলেন ? রমা। তাই ত রাধা বলে। বেণী। অনেক চাল ভেবে কাজ করতে হয় দিদি, নইলে শত্রুকে জব্দ করা যায় না। সেদিন মনিবের হুকুমে যে ভজুয়া লাঠি-হাতে বাড়ী চড়াও হয়ে মাছ আদায় করতে এসেছিল সে কথা তুমি যদি না থানায় লিখিয়ে দিতে, আজ কি ব্যাটাকে এমন হাজতে পােরা যেত? অনি ঐ সঙ্গে রমেশের নামটাও যদি দুকথা বাড়িয়ে গুছয়ে লিখিয়ে দিতি বােন। আমার কথাটায় তখন তােরা ত কেউ কান দিলি নে।-না না না, তােমাকে সাক্ষী দিতে যেতে হবে না। আর তাই যদি হয়, তাতেই বা কি। জমিদারী রাখতে গেলে কিছুতে হলে চলে না। কিন্তু রমেশও কষ্ট দিতে আমাদের ছাড়বেনা দাদামশায়ের লাখাে টাকা মেরেছে, পীরপুরে খুলেছে ইস্কুল। এনিই ত মুসলমান প্রজারা জমিদার বলে মানতে চায় না, তার উপর লেখাপড়া শিখলে জমিদারী রাখা না রাখা আমাদের সমান হবে, তা এখন থেকে বলে রাখচি। রমা। আচ্ছা বড়দা, বিষয়-সম্পত্তি যদি নষ্ট হয়েই যায় তাতে রমেশদার নিজের ক্ষতিও ত কম নয় ? বেণী। ( ঈষৎ চিন্তা করিয়া) হু। কি জান রমা, এতে নিজের ক্ষতি ভাববার বিষয়ই নয়। আমরা দুজনে জব্দ হইলেই ও খুসী। দেখ না, এসে পর্যন্ত কি রকম টাকা ছড়াচ্ছে ? ছছাটলোকদের মধ্যে ছােটবাবু ‘ছোটবাবু একটা সাড়া পড়ে গেছে। যেন ওই একটা মানুষ আর আমরা দু’বর কিছুই নয়। কিন্তু বেশিদিন এ চলবে না। এই যে তাকে পুলিশের নজরে তুমি খাড়া কোরে দিয়েছ বাে, এতেই তাকে শেষ হতে হবে। মা। আমি লিখিয়ে দিয়েছিলাম রমেশদা জানতে পেরেছেন।

৮৫ রমা তৃতীয় অঙ্ক বেণী। ঠিক জানি নে। কিন্তু জানতে পারবেই। ভজুয়ার মামলায় সব কথাই উঠবে কিনা? রমা। (ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থাকিয়া) আচ্ছা বড়দা, আজকাল ওঁর নামই বুঝি সকলের মুখে মুখে ? বেণী। হু। তা একরকম বটে। কিন্তু আমিও অল্পে ছাড়ব রমা । সে লেখাপড়া শিখিয়ে সমস্ত প্রজা বি গড়ে তুলবে আর জমিদার হয়ে আমি মুখবুজে সইব তা যেন কেউ স্বপ্নেও না ভাবে। এই ব্যাটা ভৈরব আচায্যি ভজুয়ার হয়ে সাক্ষী দিয়ে কি কোরে মেয়ের বিয়ে দেয়, তা একবার দেখতে হবে। রমা। বল কি বড়দা ? বেণী। তা একবার নেড়ে-চেড়ে দেখতে হবে না? আমার বিপক্ষে আদালতে দাড়িয়ে কি কোরে ছেলে-পুলে নিয়ে গায়ে বাস করে তারখবর নিতে হবে না?—আর আচায্যি তাে চুনাে-পুটী ; রুই-কাতলাও আছে। দেখি গােবিন্দ খুড়ে কি বলে। দেশে ডাকাতি ত লেগেই আছে, এবার চাকরকে যদি জেলে পুরতে পারি ত মনিবকে পুরতেও বেশি বেগ পেতে হবে না। রমা। ( অতি বিস্ময়ে তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া ) বল কি বড়দা, রমেশদাকে দেবে তুমি জেলে ? বেণী। কেন, সে কি পীর প্যাগম্বর? বাগে পেলে তাকে ছাড়তে হবে নাকি? তুই বলিস্ কি ? রমা। ( মৃদুকণ্ঠে) রমেশদা যদি জেলেই যান, সে কি আমাদেরই ক নয় ? বেণী। কেন ? কেন? কেন শুনি? রমা । আমাদেরই আত্মীয়, আমরা না বাঁচালে লােকে ত আমাদেরই ছি ছি করবে। + =

প্রথম দৃশ্য
বেণী ।
যে যেমন কাজ করবে সে তার তেমন ফল ভুগবে।
আমাদের কি ?
রমা। রমেশদা ত সত্যিই আর চুরি-ডাকাতি কোরে বেড়ান না।
বরঞ্চ, পরের ভালর জন্যেই নিজের সর্বস্ব দিচ্ছেন সে কথা ত কারো
কাছে চাপা নেই। তাও পরে আমাদেরও ত গাঁয়ে মুখ দেখাতে হবে।
বেণী। তাের হ’ল কি বল ত বােন্?
রমা। গাঁয়ের লােক ভয়ে মুখের সামনে কিছু না বলুক আড়ালে
বলবেই। তুমি বলবে আড়ালে রাজার মাকেও ডাইনি বলে। কিন্তু ভগবান
ত আছেন ? নিরপরাধীকে মিছে কোরে শাস্তি দেওয়ালে তিনি ত
রেহাই দেবেন না।
বেণী । হা রে কপাল ! সে ছাড়া বুঝি ঠাকুর-দেবতা কিছু মানে?
শিবের মন্দিরটা ভেঙে পড়চে মেরামত করবার জঙ্গে তার কাছে লােক
পাঠাতে সে হাঁকিয়ে দিয়ে বলেছে, যারা তােমাদের পাঠিয়েছে তাদের
বল গে বাজে খরচ করবার টাকা নেই আমার। শােন কথা! এটা
হলাে বাজে খরচ, আর কাজের খরচ হচ্চে ছােটলােকদের ইস্কুল করে
দেওয়া! তাছাড়া বামুনের ছেলে সন্ধ্যা-আহ্নিক কিছুই করে না, শুনি
মােছলমানের হাতে পর্যন্ত জল খায় ! দুপাতা ইংরাজী পােড়ে আর কি
তার জাত-জন্ম আছে দিদি, কিছুই নেই। শাস্তি তার গেছে কোথা?
সমস্তই ভােলা আছে, তা একদিন সবাই দেখবে।
রমা নীরব
বেণী। এখন যাই, সময় মত আর একবার দেখা করব। বাইরে
বােধ করি এতক্ষণে গােবিন্দ খুড়ো এসে বসে আছে।
রমা। আমিও এখন যাই বড়দা।
উভয়ে এখন

রমা
তৃতীয় অঙ্ক
মশেশে এবে
রমেশ। রাধা, রাধা !
দীর প্রবেশ
রাধা।
কেন ছােটবাবু?
রমেশ। জ্যাঠাইমা কি পূজে র ঘর থেকে বেরিয়েছেন? তখন
একটা কথা তাকে বলতে ভুলেছিলাম।
রাধা। এখনাে বেরােন নি।
ডেকে দেব ?
রমেশ। না, থাক। বিকেলে আসবাে তাকে বলল।
বাধা। আচ্ছা।
দাসীর প্রস্থান
তপনে গােপাল সরকারের প্রবেশ
রমেশ। আপনি এখানে যে ?
গােপাল। অপেক্ষা করবার সময় নেই ছােটবাবু, আপনাকে চতুর্দিকে
খুজে বেড়াচ্চি। শুনেছেন ভৈরব আচায্যির কাণ্ড? শুনেছেন, কি
সর্বনাশ আমাদের সে করেছে ?
রমেশ। কই না ?
গােপাল। কর্তা স্বর্গীয় হলেন, শােকে দুঃখে ভাবলাম আর না,
এবারে শান্ত হব। কিন্তু হােতে দিলেনা। আপনি কিন্তু আমাকে
বাধা দিতে পারবেন না ছােটবাবু, আচায্যিকে আমি শান্তি দেবাে,
দেবে, দেবব! এর প্রতিশােধ নেবব, নেবব, নেবব! আমি আজই
যাচিচ সদরে।
রমেশ। ব্যাপার কি সরকারমশাই ? আপনার মত শান্তমানুষে
এতখানি উতলা হয়ে উঠচে, কি করলেন আচায্যিমশাই ?
গােপাল। কি করলেন ? নেমকহারাম, শয়তান। তখনি
মনে হয়েছিল যাক ওর ভিটে মাটি বিক্রী হয়ে আমরা এতে মাথা

প্রথম পৃষ্ঠ
রমা
৮৭
দেব না। কিন্তু তখনি ভয় হােনাে কর্তা হয়ত স্বর্গে থেকে দুঃখ পাবেন ।
জানি ত তার স্বভাব। তাই আপনাকে নিষেধ করতে পারলাম না।
রমেশ। তবুও যে কিছুই বুঝলাম না সরকারমশাই ?
গােপাল। সেদিন আপনার আদেশ মত সদরে গিয়ে ওর ডিক্রীর
টাকাটা জমা দিয়ে মকদ্দমার সমস্ত ব্যবস্থা স্থির কোরে এলাম, আর আজ
এই মাত্র খবর পেলাম পরশু ভৈরব আচায্যি নিজে গিয়ে দরখাস্ত কোরে
মামলা তুলে নিয়েছে। দেনা স্বীকার করেছে।
রমেশ। তার মানে ?
গােপাল। তার মানে জমা দেওয়া অতগুলাে টাকা আমাদের গেল।
আমাদের মাথায় কাটাল ভেঙে তিন জনে এখন বখরা করে খাবে।
গগাবিন্দ গাঙলী, বড়বাবু, আর ও নিজে। শশানেন নি সকাল থেকে
আচায্যি বাড়ীতে রসুন-চৌকির সানাইয়ের বাদ্যি ? ঘটা কোরে হবে
দৌহিত্রের অন্নপ্রাশন,--ওই টাকায় দেশশুদ্ধ বামুনের দল ফলার কোরে
বাঁচবে। অথচ আপনার স্থান নেই,স্থান হয়েছে গােবিন্দ গাঙলীদের।
আপনাকে করেছে তারা একঘরে'।
রমেশ। ভৈরব আচায্যি ? পারলে করতে সে ?
গােপাল। পারলে বৈ কি। পাড়াগাঁয়ের লােকে পারে না যে কি
তাই শুধু আমার জানতে বাকি। আমি চোলাম।
রমেশ। যা। আমি শুধু ভাবি এ মহাপাতকের প্রায়শ্চিত্ত হবে
কিসে?
গােপাল। আমার সাক্ষী আছে, আদালতােলা আছে, আমি
তাকে সহজে ছাড়ব না ছােটবাবু।
রমেশ। জানিনে আইনে কি বলে। জানিনে কৃতঘ্নতার দণ্ড আদালতে
হয় কি না। কিন্তু থাক সে। আমি নিলাম আজ নিজের হাতে এই ভার!
কেবুল সহ করে যাওয়াই জগতে পরম ধর্ম নয়।

দ্বিতীয় দৃশ্য
ভৈরব আচার্যের বহির্বাটী। দৌহিত্রের অন্নপ্রাশন উপলক্ষে আরে মঙ্গল-বট
স্থাপিত হইয়াছে। আম্রপল্লবের মালা গাঁথিয়া সম্মুখে ঝুলাইয়া দেওয়া হইয়াছে। প্রাঙ্গণের
একপ্রান্তে রসনচৌকি বাদ্যকরের দল উপবিষ্ট। সম্মুখের বারান্দায় বসিয়া গােবিন্দ গাঙলী,
বেণী ঘােষাল প্রভৃতি ভদ্রলােক। কেহ হাসিতেছে, কেহ ধূমপান করিতেছে। একজন
বৈষ্ণব ও তাহার বৈষ্ণবী কীৰ্ত্তন গাহিতেছিল, এবং তাহাই সকলে পরমানন্দে শ্রবণ
করিতেছে। গান শেষ হইলে দীনু ভট্টাচাৰ্য কা রাশিয়া বাহিরে যাইতেছিল, এমনি
সময়ে রমেশ আসিয়া প্রবেশ করিল। দেখিলেই বুঝা যায় সে অতিশয় উত্তেজিত হইয়া
আসিয়াছে। তাহা অপ্রত্যাশিত আবির্ভাবে উপস্থিত সকলেই চঞ্চল হইয়া উঠিল
গান
শ্ৰীমতী কৰিছে বেশ।
ভুলাতে নাগর
শ্যাম নটবর
নানা দে বাধে কেশ।
( আহা) শ্ৰীমতী করিছে বেশ।
হেরিয়া মুকুরে
চার চিকুরে
বিয়ে বিয়ে বিনােদ গােখুরে
রাধ বাধিল কবরী কত
কেহ হ’ল না মনোমত ( হায়রে)
ফণি-গঞ্জিত বেণী বিনােদিনী
দুলাইয়া দিক শেষ
( আহা) শ্রীমতী করিছে বেশ।
বেণী গেল ছুটী
লজিরা কটি
পরশি মেখলা নিয়ে লুটি
চুৰিয় পাদদেশ !
..

দ্বিতীয় দৃশ্য
রমা
উল দুটি নয়ন প্রান্তে কল নিল টানি
ফুলধনু জিনি যুগ মাঝে দীপ সম টিপ খানি!
ভরিয়া দু’করে স্বর্ণ বিন্দু
মার্জিল ধনী বদন ইন্দু
নমিতে মসুর হৃদি-বলিতে কমলেশ।
রমেশ। আচায্যি মশাই কই ?
দী। ( কাছে আসিয়া ) চল, বাবা চল, বাড়ী ফিরে চল। তুমি যে
উপকার আচাষির করেছে। সে ওর বাবা কোরত না। কিন্তু উপায় নেই।
কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে সকলকেই ঘর করতে হয়, তােমাকে নেমতন্ন করতে
গেলে,-বুঝলেনা বাবা,ভৈরবকে নেহাৎ দোষ দেওয়াও যায়না। তােমরা
সব আজকালকার সহরের ছেলে,জাত-টাত ত তেমন মানােনা—তাতেই
বুঝলেনা বাবা,দুদিন পরে ওর ছােট মেয়েটা বছর বারাের হ’লােত,
পার করতেও ত হবে,—আমাদের সমাজের ব্যাপার বুঝলেনা বাবা-
রমেশ। আজ্ঞে হ বুঝেচি। তিনি কই!
দী। আছে আছে বাড়ীতেই আছে। কিন্তু বামুনকেই বা দোষ
দিই কি কোরে? (সকলের দিকে চাহিয়া ) আমাদের বুড়ো মানুষের
পরকালের ভয়ও ত একটা
রমেশ। সে ত ঠিক কথা। কিন্তু ভৈরব কোথায়?
ভৈরবের এবেশ
ভৈরব। ( সবিনয়ে বেণীবাবুর উদ্দেশে) দেখুন বড়বাবু, আপনার
পাছে কষ্ট হয়
অকস্মাৎ সম্মুখে রমেশকে দেখিয়া সে বজ্রাহতের দায় স্তব্ধ হইয়া গেল
রমেশ। (দ্রুতপদে অগ্রসর হইয়া তাহার একটা হাত সবলে চাপিয়া
ধরিয়া) কেন এমন করলেন ? আজ আমি
ভৈরব। বড়বাবুগগাবিন্দ গাঙ্গুলীমশাই—দেখুন না একবার

রমা
তৃতীয় অঙ্ক
রমেশ। (ভৈরবকে সজোরে একটা ঝাকুনি দিয়া) বড়বাবু,
গগাবিন্দ—আজ আমি সবাইকে দেখাবো ! বলুন কেন এ কাজ করলেন?
বেণী প্রভৃতি সকলের দ্রুতবেগে পলায়ন
ভৈরব। ( কাঁদিয়া উঠিয়া) লক্ষ্মীরে, পুলিশে খবর দেরে ! মেরে
ফেললে রে-
রমেশ। চুপ। বলুন, কিসের জন্যে এ কাজ কলেন !
ভৈরব।
মেরে ফেলে রে! বাবারে!
রমেশ। মেয়েই ফেলবাে। আজ তােমাকে খুন করে তবে
বাড়ী যাব।
=
এই বলিয়া সে পুনঃ পুনঃ ঝাঁকুনি দিতে লাগিল। লক্ষ্মী আসিয়া পড়িয়া আর্তনাদ
করিতে লাগিল। ইতিমধ্যে বহু লােক সমবেত হইয়া চারিদিক হইতে উকি ঝুকি মারিতে
লাগিল
তবেগে বুমায় প্রবেশ
রমা।
রমা। (রমেশের হাত চাপিয়া ধরিয়া ) হয়েছে,-এবার ছেড়ে দাও।
রমেশ।
কেন শুনি?
রমা। এই লােকটার গায়ে তুমি হাত দেবে?
রমেশ। একে আমি কিছুতেই ছাড়বনা।
( জোর করিয়া হাত ছাড়াইয়া দিয়া) এত লোকের মাঝখানে
তােমার লজ্জা করেনা, কিন্তু আমি যে লজ্জায় মরে যাই রমেশদা।
বাড়ী যাও।
রমেশ। (মুহূর্তকাল বিহবল চক্ষে তাহার প্রতি চাহিয়া থাকিয়া)
আচ্ছ। আমি চললাম।
রমেশ ধীরে ধীরে প্রস্থান করিতে বেণ, গােবিন্দ, প্রভৃতি সকলে ভিড় করিয়া আসিয়া
পড়ি। ভৈর বসিয়া পড়িয়া দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ জিয়া কাদিতে লাগিল

দ্বিতীয় দৃশ্য
রমা
as
গােবিন্দ। বাড়ী চড়াও হয়ে যে আধমরা করে গেল, এর কি করবে
এখন সেই পরামর্শ করাে।
বেণী। আমিও ত তাই বলি।
রমা। কিন্তু এ পক্ষের দোষও ত কম নয় বড়দা? তাছাড়া হয়েছেই
বা কি যে এই নিয়ে হৈ চৈ করতে হবে।
বেণী। বল কি রমা, এ কি সােজা ব্যাপার হহলাে? আমরা সবাই
থাকলে ত সে খুন কোরে যেতে।
রমা। করলে ত আমরা আটকাতে পারতামনা বড়দা।
লক্ষ্মী। তুমি ত ওর হয়ে বলবেই রমাদিদি। তােমার বাপকে
কেউ ঘরে ঢুকে মেরে ফেলে গেলে কি কযুতে বল ত?
রমা। আমার বাপ ও তােমার বাপে অনেক তফাৎ লক্ষ্মী, তুমি সে
তুলনা কোরােনা। কিন্তু আমি কারও হয়েই কথা বলিনি, ভালাের
জন্যেই বলেচি।
লক্ষ্মী। বটে ওর হয়ে কোদল করতে তােমার লজ্জা করেনা?
বড়লােকের মেয়ে বােলে কেউ ভয়ে কথা বলেনা,নইলে কে না শুনেছে?
তুমি বলে তাই মুখ দেখাও, আর কেউ হলে গলায় দড়ি দিতো।
বেণী। (লক্ষ্মীকে তাড়া দিয়া) তুই থামনা লক্ষ্মী-কাজ কি ওসব
কথায় ?
লক্ষ্মী। কাজ নেই ? যার জন্যে বাবাকে এত দুঃখ পেতে হােলদা
তার হয়েই উনি কেঁাল করবেন ? বাবা যদি আজ মারা যেতেন ?
রমা। (লক্ষ্মীর প্রতি ) লক্ষ্মী, ওর মত লােকের হাতে মরতে পাওয়া
ভাগ্যের কথা। আজ মারা পড়লে তােমার বাবা স্বর্গে যেতে পারতাে।
লক্ষ্মী। তাইতেই বুঝি তুমি মরেছে। রমাদিদি?
মা। (ক্ষণকাল নীরবে তাহার প্রতি চাহিয়া থাকিয়া মুখ ফিরাইয়া
লইল) কিন্তু কথাটা কি তুমিই বল ত বড়দা।

রমা
বেণী। কি কোরে জাম্ববা বােন্। লােকে কত কথা বলে—তাতে
কান দিলে ত চলে না।
রমা। লােকে কি বলে ?
বেণী। বলেই বা রমা। লােকের কথাতে ত গায়ে ফোস্কা পড়ে
। বলুক না !
রমা। তােমার গায়ে হয়ত কিছুতেই ফোস্কা পড়ে না, কিন্তু সকলের
গায়ে ত গণ্ডারের চামড়া নেই ? কিন্তু লােককে এ কথা বলাচ্চে কে ?
তুমি !
বেণী। আমি ?
রমা। তুমি ছাড়া আর কেউ নয়। পৃথিবীতে কোন দুষ্কৰ্ম্মই ত
তােমার বাকি নেই,জাল, জোছুরি, চুরি, ঘরে আগুন দেওয়া সবই
হয়ে গেছে, এটাই বা বাকি থাকে কেন? মেয়ে মানুষের এত বড়
সৰ্ব্বনাশ যে আর নেই সে বােঝ বার তােমার শক্তি নেই। কিন্তু
জিজ্ঞেস করি কিসের জন্য এ শত্রুতা তুমি করে বেড়াচ্চো? এ কলঙ্ক
রটিয়ে তােমার লাভ কি ?
বেণী। আমার লাভ কি হবে ? লােকে যদি তােমাকে রাত্রে রমেশের
বাড়ী থেকে বার হতে দেখে,—আমি কোরব কি ?
রমা। এত লােকের সামনে আর সব কথা আমি বলতে চাই নে,
কিন্তু তুমি মনে কোরাে না, বড়দা, তােমার মনের ভাব আমি টের পাই
নি। কিন্তু তুমি নিশ্চয় জেনাে,আমি রমা। যদি মরি, তােমাকেও
জ্যান্ত রেখে যাবে না।
দ্রুতবেগে এমন
গােবিন্দ। আঁ ? এ হােলে কি বড়বাবু? তােমাকেও চোখ
রাঙিয়ে যায়,-মেয়েমানুষ হয়ে ? আমি বেঁচে থেকে এও চোখে
দেখতে হবে ?

তৃতীয় দৃশ্য
রমা
বেণী। (নিজের ললাট স্পর্শ করিয়া) কারও দোষ নয় খুড়ো,
দোষ এর। কালিকাল,-এরই নাম কাল-মাহাত্ম। ভালাে ছাড়া
কখনাে কারাে মন্দ করি নে, মন করার কথা ভাবতে পারি নে। জগতে
আমার এমন হবে না ত হবে কার ? বিদ্যাসাগরের কি হয়েছিল? গল্প
নেচে ত!
গগাবিন্দ।
তা আর শুনিনি ?
বেণী। তবে তাই। দোষ দেবব আর কাকে ? (ভৈরবকে
দেখাইয়া) একে রক্ষে করতে না যেতাম ত কোন কথাই হােতত না।
কিন্তু সে ত আর আমি প্রাণ থাকতে পারি নে !
তৃতীয় দৃশ্য
বনাকীর্ণ নির্জন গ্রাম্য পথ
রমেশ দ্রুতপদে প্রবেশ করিল। রমা অন্তরাল হইতে ডাকিল-মেশা?
এবং পরক্ষণেই সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল
রমেশ। রমা ? এতদূরে এই নির্জন পথে তুমি ?
রমা। আমি জানি পীরপুরের স্কুলের কাজ সেরে এই পথে তুমি
নিত্য যাও।
রমেশ। তা যাই। কিন্তু তুমি কেন ?
রমা। শুনেছিলাম এখানে আর তােমার শরীর ভাল থাকছে না।
এখন কেমন আছাে ?
রমেশ। ভালাে নয়। মনে হয় রােজ রাত্রেই যেন জ্বর হয়।
রমা। তাহলে কিছুদিন বাইরে ঘুরে এলে ভাল হয়।
রমেশ। (হাসি) ভাল ত হয় জানি, কিন্তু যাই কি কোরে? ..)

১৪
রমা
তৃতীয় অঙ্ক
রমা। হাসলেন যে বড় ? আপনি বলবেন আপনার অনেক কাজ,
কিন্তু এমন কাজ কি আছে যা নিজের শরীরের চেয়েও বড় ?
রমেশ। নিজের শরীরটা যে ছোট জিনিস তা আমি বলি নে। কিন্তু
এমন কাজ মানুষের আছে যা এই দেহটার চেয়েও বড়। কিন্তু সে ত
তুমি বুঝবে না রমা।
রমা। আমি বুঝতেও চাই নে। কিন্তু আপনাকে আর কোথাও
যেতেই হবে। সরকারমশায়কে বলে দিয়ে যান আমি তাঁর কাজ-কর্ম
দেখবাে।
রমেশ। তুমি দেখবে আমার কাজ-কর্ম ?
রমা। কেন, পারবাে না ?
রমেশ। পারবে। হয়ত, আমার নিজের চেয়েও ভাল পারবে,
কিন্তু পেরে কাজ নেই। আমি তােমাকে বিশ্বাস কোরবাে কি
কোরে ?
রমা। রমেশদা, ইতরে বিশ্বাস করতে পারে না। কিন্তু তুমি
পাবে। তুমি না পারলে সংসারে বিশ্বাস করার কথাটা উঠে যাবে।
আমাকে এই ভারটুকু তোমার দিয়ে যাও।
রমেশ। (ক্ষণকাল নীরবে তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া) আচ্ছা,
ভেবে দেখি।
রমা। কিন্তু ভাববার ত সময় নেই। আজই তােমাকে আর
কোথাও যেতে হবে। না গেলে
রমেশ। (পুনশ্চ তাহার মুখের প্রতি
একদৃষ্টে চাহিয়া) তােমার
কথার ভাবে মনে হয় না গেলে আমার বিপদের সম্ভাবনা। ভালাে, যাই-ই
যদি তাতে তােমার লাভ কি ? আমাকে বিপদে ফেলতে তুমি নিজেও ত
কম চেষ্টা করাে নি যে, আজ আর একটা বিপদে সতর্ক করতে এসেছে।
সে সৰ কাও এত পুরােনো হয়নি যে তােমার মনে নেই। বরঞ্চ খুলে

তৃতীয় দৃঙ্গ
রশা
বলল আমি চলে গেলে তােমার নিজের কি সুবিধে হয়,হয়ত, তােমার
জন্যে আমি রাজি হতেও পারি।
রমা। ( এই কঠিন আঘাতে রমার মুখ বিবর্ণ হইয়া উঠিল, কিন্তু
আপনাকে সে সালাইয়া লইল) আচ্ছা, খুলেই বচি। তুমি গেলে
আমার ভাল কিছুই নেই, কিন্তু না গেলে অনেক ক্ষতি। আমাকে সাক্ষী
দিতে হবে।
রমেশ। এই ? মাত্র এইটুকু ? কিন্তু সাক্ষী না দিলে ?
রম।। না দিলে আমার মহামায়ার পূজোয় কেউ আসবেনা, আমার
যতীনের উপনয়নে কেউ খাবেন, আমার বার-ব্ৰত, ধৰ্ম্ম-কর্ম,-না
রমেশদা, তুমি যাও তােমাকে আমি মিনতি করচি। থেকে, সব দিক
দিয়ে আমাকে নষ্ট কোরােনা। তুমি যাও–যাও এদেশ থেকে।
রমেশ। (একমুহূৰ্ত মৌন থাকিয়া) বেশ,আমিযাবাে। আমার আর
কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই যাবে-কন্তু নিজের কাছে নিজেকে কি জবাব দেব?
রমা। জবাব নেই। আর কেউ হলে জবাবের অভাব ছিলনা, কিন্তু
এক অতিক্ষুদ্র নারীর অখণ্ড-স্বার্থপরতার উত্তর তুমি কোথায় খুজে পাবে
রমেশদা? তােমাকে নিরুত্তরে যেতে হবে।
রমেশ। বেশ, তাই হবে। কিন্তু আজ আমার সাধ্য নেই।
রম।। সত্যিই সাধ্য নেই ?
রমেশ। না। তােমার সঙ্গে কে আছে তাকে ডাকো।
রমা। সঙ্গে আমার কেউ নেই। আমি একাই এসেছি।
রমেশ। একা এসেছে? সে কি কথা রাণি,-একলা এলে কোন
সাহসে?
রমা। সাহস এই ছিল যে, আমি নিশ্চয় জানতাম এই পথে তােমার
দেখা পাবে। তারপরে আর আমার ভয় কিসের?
রমেশ। ভালাে কােনি রমা, অন্তত তােমার দাসীকেও আনা

রমা
তৃতীয় অঙ্ক
উচিত ছিল। এই নিস্তব্ধ জনহীন পথে আমাকেও ত তােমার ভয়
করা কর্তব্য।
রমা। তােমাকে ? ভয় কোরব আমি তােমাকে ?
রমেশ। নয় কেন ?
রমা। ( মাথা নাড়িয়া) না, কোন মতেই না। আর যা খুসী
উপদেশ দাও রমেশদা, সে আমি শুনব। কিন্তু তােমাকে ভয় করবার
ভয় আমাকে দেখিয়ােনা।
রমেশ।
আমাকে তােমার এতই অবহেলা ?
রমা। হ্যা, এতই অবহেলা। বলছিলে, দাসীকে সঙ্গে না-এনে
ভালাে করিনি। কিন্তু কিসের জন্যে শুনি? ভেবেচো তােমার হাত
থেকে বাঁচবার জন্যে দাসীর শরণাপন্ন হবে ? রমার চেয়ে তােমার কাছে
সে-ই হবে বড় ?
রমেশ নিঃশব্দে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল
মনে নেই সকালের কথা? সেখানে লােকের অভাব ছিল না। তবু
সেই মূর্তি দেখে সবাই যখন পালিয়ে গেল, তথন কে রক্ষে করেছিল
ভৈরব আচায্যিকে ? সে রমা। দাসী-চাকরের তখন প্রয়ােজন হয়নি,
এখনও হবেনা। বরঞ্চ, আজ থেকে তুমিই রমাকে ভয় কোরাে। আর
এই কথাটাই বলবার জন্যে আজ এসেছিলাম।
রমেশ। তাহলে নিরর্থক এসেছে রমা। ভেবেছিলাম তােমার
নিজের কল্যাণের জন্যই আমাকে চলে যেতে বলচে। কিন্তু তা যখন নয়,
তখন আমাকে সতর্ক করবার প্রয়ােজন দেখতে পাইনে।
রমা।
সমস্ত প্রয়ােজনই কি সংসারের চোখে দেখা যায় রমেশান।
;; রমেশ। যায়না । আমি স্বীকার করিনে। চোলাম।
রমা। (অকস্মাং কাদিয়া ফেলিয়া) যে আজ তাকে আমি দেখাবে
কি দিয়ে। ...............

চতুর্থ অঙ্ক প্রথম দৃশ্য মার পূজার দালানের একাংশ। দুর্গা প্রতিমা স্পষ্ট দেখা যায় না বটে, কিন্তু পূজার যাবতীয় আয়ােজন বিদ্যমান। দময় অপরাহু-এয়। এ বেলার মত পূজার কার্য সম্পন্ন হইয়া গেছে। একধারে রমা স্থির হইয়া বসিয়া ছিল, তাহার বাটীর সরকার প্রবেশ করিয়া কহিল সরকার। মা, বেলা যায়, কিন্তু শুদ্ররা তাে কেউ এলােনা। একবার ঘুরে দেখে আসবাে কি ? রমা। কেউ এলােনা ? সরকার। কই না। ইক হাতে করিয়া বেণী ঘােষালের প্রবেশ বেণী। ইস্। এত খাবার-দাবার নষ্ট কোরে দিতে বসেছে দেশের ছােট-লােকের দল! এত বড় আম্পর্ধা! কিন্তু ব্যাটাদের শেখাবে, শেখাবাে, শেখাববা! চাল কেটে যদি না তুলে দিই তাে আমি- রমা তাহার মুখের পানে চাহিয়া একটুখানি হাসিল। কিছু বলিল না বেণী—না না, এ হাসির কথা নয় রমা, বড় সর্বনেশে কথা! একবার যখন জানবাে এর মূলে কে, তখন এই এমনি কোরে ছিড়ে ফে। —আরে হারামজাদা ব্যাটারা এ বুঝিসনে যে যার জোরে তাের জোর করিস, সে রমেশ বাবু যে নিজে জেলের ঘানি টেনে ময়ূচেন! লেদের মারতে কতটুকু সময় লাগে?-ভৈরব আচায্যিকে ছুরি মারতে ঢুকেছিল,-হাতে এভােব ভােলি স্পষ্ট প্রমাণ করে দিলাম। কই, কোন শালা আটকাতে পারলে না? আরে মনে করি যদি তাে রাতকে ৯৮ রম চতুর্থ অঙ্ক দিন, দিনকে রাত করে দিতে পারি যে! আচ্ছা—আরো খানিকটা দেখি, তার পরে—শাস্তরে বলেছে যথা ধর্ম তথা জয়। শুন্দর হয়ে বামুনবাড়ীর ধর্ম-কর্মের ওপর আড়ি ? আচ্ছা- ধীরে ধীরে বিশ্বেশ্বরীর প্রবেশ । বিশ্বেশ্বরী। রমা ? রমা। কেন মা ? বিশ্বেশ্বরী। চুপটি কোরে বসে আছিস মা, কে বলবে মানুষ। ঠিক যেন কে মাটির মূৰ্ত্তি গড়ে রেখেচে। ( ধীরে ধীরে তাহার পাশে বসিয়া ) সে হাসি নেই, সে উল্লাস নেই,-যেন কোথায় কোন্ বহুদূরে চলে গেছি। ( ঈষৎ হাসিয়া) বাড়ীর ভেতর এতক্ষণ কি করছিলে জ্যাঠাইমা ? বিশ্বেশ্বরী। তােমার যজ্ঞি-বাড়ীতে তাে কাজ কম নেই মা। অন্ন- ব্যঞ্জনের যেন পাহাড় জমিয়ে তুলেছ। এবারে কিন্তু সমস্ত নিষ্ফল। বােধ করি একজন চাষাও আমার বাড়ীতে মায়ের প্রসাদ পেতে আসবে না। কিন্তু অন্যান্য বারের কথা জানােত জ্যাঠাইমা, এই সপ্তমীর দিনে প্রজাদের ভিড় ঠেলে বাড়ীতে ঢুকতে পারা যেত না। বিশ্বেশ্বরী। এখনাে বলা যায় না রমা। হয়ত সন্ধ্যের পরে সবাই আসবে। রমা। না, আসবে না জ্যাঠাইমা । জ্যাঠাইমা। সবাই ওই কথাই বলছে।' বেণী, গােবিন্দঠাকুরপাে রাগে দাপাদাপি করে বেড়াচ্চে, ভেতরে তাের মাসির গালাগালির জ্বালায় কান পাতবার যাে নেই, কেবল তাের মুখেই, নালিস নেই। সে রাগ রমা।

প্রথম দৃশ্য রম ৯৯ { নেই, অভিমান নেই,—তাের চোখের পানে চাইলে মনে হয় যেন ওর নিচে কান্নার সমুদ্র চাপ আছে। কেমন কোরে এমন বদলে গেলি মা? রমা। রাগ কোরব কাদের ওপর জ্যাঠাইমা ? প্রজাদের ওপরে ? গরীব বলে কি তাদের সম্ভ্রম বােধ নেই ? তারা আমার মত পাপিষ্ঠার অন্ন গ্রহণ করবে কেন ? বিশ্বেশ্বরী। তােমাকে পাপিষ্ঠা বলে কার সাধ্য মা? রমা। বলেও তো অন্যায় হয় না। তারা জানে আমরা তাদের ভালবাসিনে, আমরা তাদের আপনার জন নই। আমরা তাে আদর কোরে আহ্বান করিনে মা, আমরা জোর কোরে হুকুম করি দুটো খেয়ে যাবার জন্যে। তাই তাদের না আসায় আমরা রাগে ক্ষেপে উঠি -কিন্তু আদর যে কি সে স্বাদ তারা পেয়েছে, ভালবাসা যে কি সে তারা রমেশদার কাছে জেনেছে। তাদের সেই বন্ধুকেই আমরা যখন মিথ্যে মামলায় মিথ্যে সাক্ষী দিয়ে জেলে পুরে এলাম, এ দুঃখ তারা ভুলবে কি কোরে জ্যাঠাইমা ? বিশ্বেশ্বরী। কিন্তু তুমি তো মিথ্যে সাক্ষী দাও নি মা ? রমা। দিই নি আমি ? তাদের বড় আশা ছিল, আর যেই কেন না মিথ্যে বলুক, আমি বলতে পারব না। কিন্তু বলতে ত পারলাম। মুখে ত বাধল না! আচায্যি মশায়ের কতবড় অপরাধ, কতবড় কৃতগ্নতা যে রমেশদাকে আত্মবিস্মৃত করেছিল, সে ত আমি জানি। আমি ত ত জানি তার হাতে একটা তৃণ পর্যন্ত ছিল না, তবু আদালতে দাড়িয়ে স্মরণ করতেই পারলাম না, হাতে তার ছুরি ছােরা ছিল কি না! বিশ্বেশ্বরী। রমা মা। জ্যাঠাইমা, তুমি বলছিলে মিথ্যে তাে আমি বলিনি। এখান- কার আদালতে হলফ কোরে মিথ্যে হয়ত আমি বলিনি, কিন্তু যে- রমা চতুর্থ অঙ্ক আদালতে হলফ করার বিধি নেই, সেখানে আমি কি জবাব দেবে ? উঃ-ভগবান! সত্য-গােপনের যে এত বড় বােঝ এ আমাকে তুমি আগে জাতে দাওনি কেন? বিশ্বেশ্বরী। কিন্তু আমি তােমাকে বল্‌চি মা, শাস্তি তার হয়েছে সত্যি, কিন্তু অকল্যাণ তার কখনাে হবে না। রমা। হবে কি কোরে জ্যাঠাইমা, আজ সমস্ত অকল্যাণের ভার এসে পড়েছে যে আমার মাথার ওপর। বিশ্বেশ্বরী। একলা তােমার মাথায় পড়েনি মা, আমরা সবাই মিলে তাকে ভাগ কোরে নিয়েছি। অত্যাচারী সমাজের যে-কাপুরুষের দল মিথ্যে দুর্নামের ভয় দেখিয়ে তােমাকে ছােট করেছে, এ পাপের ভারে তাদের মাথা আজ পথের ধূলােয়। বেণীর মা আমি, আমার মাথা মাটিতে লুটোচ্চে রমা, কখনাে আর তুলতে পারব না। রমা। অমন কথা তুমি বােল না জ্যাঠাইমা। কিন্তু আমি কি করে ছিলাম জাননা? জনশূন্য অন্ধকার পথে একলা দেখা কোরে সেধে- ছিলাম, রমেশদা, তুমি যাও,যাও এখান থেকে। বিশ্বাস করলেন না, বলেন, আমি চলে গেলে তােমার লাভ কি? আমার লাভ? হঠাৎ ব্যথার ভারে যেন পাগল হয়ে গেলাম। বােল্লম, লাভ কিছুই নেই, কিন্তু না গেলে আমার অনেক ক্ষতি। আমার মহামায়ার পূজোয় কেউ আসবে না, আমার যতীনের উপনয়নে কেউ খাবে না, তুমি দেশে থেকে আমাকে সকল দিক দিয়ে নষ্ট কোরাে না। কিন্তু এত বড় মিথ্যে আমি কোথায় পেলাম জ্যাঠাইমা? রাগ কোরে বলেন, এই ? এই মাত্র? না, এর জন্যে আমার কাজ ছেড়ে আমি কোন মতেই যাব না। অভিমানে ভাবলাম, তবে তােক একটা শিক্ষা। বিশ্বাস ছিল, সামান্য কিছু একটা জরিমানা হবে ! কিন্তু সে শান্তি যে এম্‌নি কোরে আসবে তার রােগ শীর্ণ মুখের পানে চেয়েও বিচারকের দয়া হবে না,তাকে

প্রথম দৃশ্য
রমা
জেলে দেবে এ কথা আমার অতি বড় দুঃস্বপ্নও ভাবতে পারিনি
জ্যাঠাইমা।
বিশ্বেশ্বরী। সে জানি মা।
রমা। শুলাম, আদালতে তিনি কেবল আমার পানেই চেয়ে ছিলেন।
র গােপাল সরকার চাইলেন আপিল করতে, তিনি বললেন, না। সারা
জীবন যদি জেলের মধ্যে বাস করতে হয় সেও ঢের ভাল, কিন্তু
আপিল করে খালাস পেতে চাইনে। এ শাস্তি আমার কত বড় বল ত
জ্যাঠাইমা ?
বিশ্বেশ্বরী। কিন্তু তার মিয়াদের কালও পূর্ণ হয়ে এলাে। মুক্তি পেতে
আর বেশি দিন নেই।
রমা। তার মুক্তি হবে, কিন্তু তার সেই নিবিড় ঘৃণা থেকে ইহজীবনে
আমার ত মুক্তি নেই মা।
বৃদ্ধ সনাতন হাজরাকে লইয়া বেণীর প্রবেশ
বেণী। এই আমাদের তিনপুরুষের প্রজা। সুমুখ দিয়ে যাচ্ছিলেন,
ডাকতে তবে বাড়ী ঢুকলেন! হাঁরে সনাতন, এত অহঙ্কার কবে থেকে হােল
রে? বলি, তােদের ঘাড়ে কি আর একটা কোরে মাথা গজিয়েছে রে ?
সনাতন। দুটো করে মাথা আর কার থাকে বড়বাবু ? আপনাদেরই
থাকে না ত আমাদের মত গরীবের ।
বেণী। কি বলি রে হারামজাদা।
সনাতন। দুটো মাথা কারা থাকে না, বড়বাবু, সেই কথাই বলেছি,
-আর কিছু নয়।
গাৰি গাঙলীর প্রবেশ
গগাবিন্দ। তােদর বুকের পাটা শুধু দেখছি আমরা! মায়ের প্রসাদ
পেতেও কেউ তােরা এলিনে, বলি, কেন বল্ ত রে?

১০২ রমা চতুর্থ অঙ্ক রমা। সনাতন। (হাসিয়া) আর বুকের পাটা। যা করবার সে ত আমার করেছেন। সে যাক। কিন্তু মায়ের প্রসাদই বলুন, আর যাই বলুন, কোন কৈবর্তই আর বামুন-বাড়ীতে পাত পাতবে না। এত পাপ যে' মা বসুমাতা কেমন করে সইছেন, তাই আমরা কেবল বলাবলি করি। (নিশ্বাস ফেলিয়া রমার প্রতি চাহিয়া ) একটু সাবধানে থেকে দিদিঠাকরুণ, পীরপুরের ছেড়ার দলটা একেবারে ক্ষেপে রয়েছে। এর মধ্যেই দুতিনবার তার বড়বাবুর বাড়ীর চারপাশে ঘুরে গেছে—সামনে পায়নি তাই রক্ষে। (বেণীর প্রতি)একটু সামলে-সুমলে থাকবেন বড়বাবু,রাতবিরেতে আরবারহবেন না। বেণী কি একটা বলিতে গেল কিন্তু ভয়ে তাহার মুখ দিয়া কথা বাহির হইল না ( স্নেহার্জ কণ্ঠে) সনাতন, ছােটবাবুর জন্যেই বুঝি তােমাদের সব রাগ এত ? সনাতন। মিথ্যে বলে আর নরকে যাব না দিদিঠাকৃরুণ, তাই বটে। তবে, পীরপুরের লােকগুলাের রাগটাই সব চেয়ে বেশি। তারা ছােটবাবুকে দেবতা মনে করে। মা। (আননন্দাজ্জল মুখে ) তাই না কি সনাতন ? বেণী। (সনাতনের হাত চাপিয়া ধরিয়া ) তােকে একবার দারােগার কাছে গিয়ে বলতে হবে সনাতন। তুই যা চাইবি তাই দেব! তাের সেই সাবেক দুবিঘে জমি ছাড়িয়ে নিতে চাস ত তাই পাবি। ঠাকুরঘরে বসে দিব্বি করচি সনাতন, বামুনের কথাটা রাখ। সনাতন। সে দিন কাল আর নেই বড়বাবু,—সে দিন কাল আর নেই। ছােটবাবু সব উল্টে দিয়ে গেছেন। গগাবিন্দ। বামুনের কথা তাহলে রাখবিনে বল? সনাতন। ( মাথা নাড়িয়া) না। বললে তুমি রাগ করবে গাড়ি- মশাই, কিন্তু সেদিন পীরপুরের নুতন ইস্কুলঘরে ছােটবাবু বলেছিলেন, গলায় গাছকতক তত ঝােলানাে থাকলেই বামুন হয় না! আমি আর ১০৩ প্রথম দৃ রম আজকের নই ঠাকুর, সব জানি। যা কোরে তােমর বেড়াও সে কি বামুনের কাজ ? তােমাকেই জিজ্ঞাসা কচি দিদি ঠাকরুণ, তুমিই বল দিকি ? রমা নিরুত্তরে মাথা হেঁট করিল সনাতন। (মনের আক্রোশ মিটাইয়া বলিতে লাগিল) বিশেষ কোরে ছোঁড়াদের দল। এই দুটো গাঁয়ের যত ছাের সন্ধ্যের পরে সবাই গিয়ে জোটে মােড়লের বাড়ীতে। তারা ত স্পষ্ট বলে বেড়াচ্চে জমিদার ত ছােট- বাবু। আর সব চোর ডাকাত। তাছাড়া খাজনা দিয়ে বাস কোরব, ভয় কারুকে কোরব না। আর বামুনের মত থাকে ত বামুন, নইলে, আমরাও যা’ তারাও তাই। বেণী। ( আতঙ্কে পরিপূর্ণ হইয়া) সনাতন, আমার ওপরেই কেন এত রাগ বলতে পারি? সনাতন। তা আর পারিনে বড়বাবু ? আপনিই যে সকল নষ্টের গােড়া তা কারও জানতে বাকি নেই। বেণী চুপ করিয়া রহিল, ভয়ে বুকের ভিতর তাহার ঢিপ ঢিপ করিতেছিল বিশ্বেশ্বরী। গাঙলি ঠাকুরপাে, ছােটলােকের মুখে এত আস্পর্ধার কথা শুনেও যে বড় চুপ করে আছ ? বেণী বচক্ষে মায়ের প্রতি ক্রুদ্ধ দৃষ্টিপাত করিয়াও নীরব হইয়া রহিল গােবিন্দ। । সনাতন, বিপিন মােড়লের বাড়ীতেই তাহলে আড্ডা ব? সেখানে কি করে তারা বলতে পারিস? সনাতন। কি করে তা জানিনে। কিন্তু ভাল চাও ত কু-মৎলব 'কারাে না ঠাকুর। তারা ছােট-বড় সবাই ভাই সম্পর্ক পাতিয়েছে। এক মন, এক-প্রাণ। ছােটবাবুর জেল হওয়া থেকে সব রাগে বারুদ হয়ে

১০৪
চতুর্থ অঙ্ক
আছে, তার মধ্যে গিয়ে চকমকি ঠুকে আগুন জ্বালতে যেয়ো না গাঙ্গুলি
মশাই। এই তোমাদের সাবধান করে দিয়ে গেলাম।
প্রদান
সনাতন প্রস্থান করিলে সকলেই কিছুক্ষণ নিঃশব্দে থাকিয়া
বেণী। ব্যাপার শুনলে রমা ?
মা মুচকি হাসিল, কথা কহিল না। হাসি দেখিয়া বেণীর গা জ্বলিয়া গেল
বেণী। শালা ভৈরবের জন্যেই এত কাণ্ড। আর তুমি না যাবে
সেখানে, না তাকে ছাড়িয়ে দেবে তাে এসব কিছুই হয় না খেতাে শালা
মার,-তােমার কি!
রমা পুনরায় একটু হাসিল, জবাব দিল না
বেণী। তুমি ত হাসবেই রমা। মেয়ে মানুষ, বাড়ীর বার হতে ত
হয় না, কিন্তু আমাদের উপায় কি হবে বল ত? সত্যি সত্যিই যদি
একদিন মাথা ফাটিয়ে দেয় ? মেয়ে মানুষদের সঙ্গে কাজ করতে গেলেই
এই দশা হয়।
মা বিস্মিত মুখে শুধু তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল
বেণী। গােবিন্দ খুড়ো, চুপ করে বসে থাকলে কি হবে? আমার
দারােয়ান আর চাকর দুজনকে একবার ডেকে পাঠাও না ? গােটা দুই
আললা যেন সঙ্গে কোরে আনে।
গগাবিন। এস না, বাইরে গিয়ে ডাকতে পাঠাই। আর ভয়টা
কিসের? না হয়, আমি নিজে গিয়ে তােমাকে বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে
আদব
উভয়ের প্রস্থান

দ্বিতীয় দৃশ্য
পথ
জগন্নাথ ও নরােত্তমের প্রবেশ।
জগন্নাথের হাতে একগাছা মােটা লাঠি ।
নরােত্তম। এই পথ, এইখান দিয়েই যাবে। জগ, এখনো বল
সাহস হবে ত?
জগন্নাথ। সাহস হবে না কি রে! শাস্তি নিতে রাজী হয়েই তাে শাস্তি
দিতে দাড়িয়েছি। অনেক দুঃখু দিয়েছে। মা দুর্গা ! শুধু এই কোরে আজ
যেন একটা কাজের মত কাজ করে যেতে পারি। যেন হাত না কাপে।
নরােত্তম। হাত কাঁপবে কি রে ?
জগন্নাথ। তা পারে। বাপ-পিতামাের কাল থেকে মার খাওয়াটাই
অভ্যাস হয়ে আছে কি না! তাই শেষ পর্যন্ত হাত যদি না ওঠে ত জাবি
হাতের দোষ, আমার নয়।
নরােত্তম। তবে লাঠি গাছটা আমার হাতে দিয়ে তুই সরে দাড়া।
দেখি আমি কি করতে পারি।
জগন্নাথ। অমন কথা তুই বলিসনে নরু। তাের ছেলে-পুলে আছে,
কিন্তু আমার নেই। এই আমার সময়। ছােটবাবু ফিরে এলে আর
হবে না, তিনি হাত চেপে ধরবেন। তাই তার জেল থেকে বেরােবার
আগেই তার শােধ নিয়ে আমি জেলে গিয়ে ঢুকব। তুই ঘরে যা।
নরােত্তম। ঘরে যাব না,-কাছেই থাকব জগা।
নরােমের স্থান। অপর দিক দিয়া গােবিন্দ, বেণী ও
দারােয়ানের প্রবেশ। হাতে তাহার লন
বেণী। (চমকিয়া) দাড়িয়ে কেরে ?
জগন্নাথ। আমি জগন্নাথ।

১০৬
রম
চতুর্থ অঙ্ক
গােবিন্দ। পথে দাড়িয়ে লােক ভাঙান হচ্চে,—কেউ না খেতে
যায়। না রে হারামজাদা ?
জগন্নাথ। গাল দিয়াে না বচি গাঙলী মশাই।
বেণী। গাল দেবে না হারামজাদা—শাল! কাল চাল কেটে ভিটেয়
সরষে বুনে দেব জানিস?
জগন্নাথ। অনেকের দিয়েছ জানি, কিন্তু আর না দিতে পার
আমি তার ব্যবস্থা কোরে যাব।
বেণী। কি ব্যবস্থা করবি রে হারামজাদা ? শুনি?
এই বলিয়া সে অগ্রসর হইয়া গেল।
জগন্নথ। এই যে ব্যবস্থা।
এই বলিয়া সে বেণীর মাথায় সজোরে লাঠির আঘাত করিল
বেণী। ( বসিয়া পড়িল) বাবা রে! গেছি রে বাবা!
গােবিন্দ ও দারােয়ান চীৎকার করিয়া দ্রুতপদে পলায়ন করিল
বেণী।
বেণী। তাের পায়ে পড়ি বাবা, জগন্নাথ, ব্রহ্মহত্যা করিসূনে। দোহাই
বাবা, তােকে দশবিঘে জমি দেব।
জগন্নাথ। জমি তােমার চাইনে,-সে তােমারি থাক। ব্ৰহ্মহত্যাও
কোরব না।
আজ থেকে তাের সঙ্গে বাপ-ব্যাটা সম্পর্ক জগন্নাথ
চাইবি তুই
জগন্নাথ। কিছুই চাইব না। কিন্তু বাপ-ব্যাটা সম্পর্ক তােমার সঙ্গে।
ছি! আর সাবধান করে দিচ্চি বড়বাবু, এই মারই তােমার শেষ মার নয়।
বাবু বলে, বামুন বােলে যতই সয়েছি, ততই অত্যাচার বেড়ে গেছে
আর আমরা সইব না। দেখি তােমরা সিধে হও কি না।
यशन
গেছে
-

দ্বিতীয় দৃশ্য রমা ১০৭ বেণী। বাবা রে, মরে গেছি রে! সব শালা পালাল রে ! গবিম ও দারােয়ানের প্রবেশ গােবিন্দ। ( হাঁপাইতে পাইতে) পালাবে কেন বাবা পালাইনি। ছুটে লােক ডাকতে গিয়েছিলাম। জগা শালা কি রকম গুণ্ডা জান ত? শালাকে ডাকাতির চার্জে পাঁচ বচ্ছর ঠেলে দেব-তবে আমার নাম গগাবিন্দ গাঙলী ! দয়ােয়ান। ( হাঁপাইতে হাঁপাইতে ) হাথ মে একঠো হাথিয়ার বহতা ! বেণী। দূর হ শালা সুমুখ থেকে। মেরে তক্তা বানিয়ে দিলে ( মাথায় হাত দিয়া দেখিয়া) বাবা গাে ! কি রক্ত পড়চে গাে,-আর আমি বাঁচব না বেণী শুইয়া পড়িল গগাবিন্দ। (ধরিয়া তুলিবার চেষ্টা করিয়া) বাঁচবে বাঁচবে। আমি নিজে তােমাকে কলকাতার হাসপাতালে নিয়ে যাব ( দরােয়ানের প্রতি) ধরুনা শালা ছাতুখাের। শালা ভয়ে শিয়ালের মত ছুটে পালাল। দরােয়ান। কেয়া রে বাবুজি, বি হাথিয়ার- উভয়ে বেণীকে তুলিয়া লইয়া এন্থন করিল

তৃতীয় দৃশ্য
রমার শয়নকক্ষ। পীড়িত মা শয্যায় শায়িত। সম্মুখে প্রাতঃসূর্যালােক খােল।
নালার ভিতর দিয়া মেঝের উপর ছড়াইয়া পড়িয়াছে। বিশ্বেশ্বরী প্রবেশ করিলেন
বিশ্বেশ্বরী। (অশ্রুভরা কণ্ঠে) আজ কেমন আছিস্ মা, রমা ?
রমা। (একটুখানি হাসিয়া ) ভাল আছি জ্যাঠাইমা ।
বিশ্বেশ্বরী। রাত্রে জ্বরটা কি ছেড়েছিল ?
রমা। না। কিন্তু বােধহয় শীগগির একদিন ছেড়ে যাবে।
বিশ্বেশ্বরী। কাশিটা ?
রমা। কাশিটা বােধ করি তেমনি আছে।
বিশ্বেশ্বরী। তবু বলিস ভাল আছিস মা !
রমা নিঃশব্দে হাসিল, বিশ্বেশ্বরী তাহার শিয়রে গিয়া বসিলেন, এবং মাথায় হাত
বুলাইয়া দিতে দিতে কহিলেন
বিশ্বেশ্বরী। তাের হাসি দেখলে মনে হয় মা, যেন গাছ থেকে ছেড়া
ফুল দেবতার পায়ের কাছে হাসচে! রমা ?
রমা।
কেন জ্যাঠাইমা ?
বিশ্বেশ্বরী। আমি ত তাের মায়ের মত রমা-
রমা। মত কেন জ্যাঠাইমা, তুমিই ত আমার মা।
বিশ্বেশ্বরী। (হেঁট হইয়া রমার ললাটে চুম্বন করিলেন। তবে সত্যি
করে বল্ দেখি মা, তাের কি হয়েছে ?
রমা। অসুখ করেছে জ্যাঠাইমা।
বিশ্বেশ্বরী। ( রমার রুক্ষ চুলগুলিতে হাত বুলাইয়া কহিলেন) সে ত
এই দুটো চামড়ার চোখেই দেখতে পাই না। যা এতে ধরা যায় না তেমন
যদি কিছু থাকে মায়ের কাছে লুকোসনে রমা। লুকোলে তাে অসুখ
সাবে না মা।

তৃতীয় দৃশ্য রমা রমা। (কিছুক্ষণ জানালার বাহিরে নিঃশব্দে চাহিয়া থাকিয়া) বড়দা কেমন আছেন জ্যাঠাইমা? বিশ্বেশ্বরী। মাথার ঘা সারতে দেরি হবে বটে, কিন্তু হাসপাতাল থেকে পাঁচ ছয় দিনেই বাড়ী আসতে পারবে।দুঃখ কোরনা মা,এই তার প্রয়ােজন ছিল। এতে তার ভালই হবে। ভাবচো, মা হয়ে সন্তানের এত- বড় দুর্ঘটনায় এ কথা বলচি কি কোরে ? কিন্তু তােমাকে সত্যি বলচি রমা, এতে আমি ব্যথা বেশি পেয়েছি কি আনন্দ বেশি পেয়েছি বলতে পারি নে। অধৰ্ম্মকে যারা ভয় করে না, লজ্জ। যাদের নেই, প্রাণের ভয়টা যদি তাদের তেমনি বেশি থাকে মা, সংসার ছারখার হয়ে যায়। তাই কেবলই মনে হয় রমা, এই চাষার ছেলে বেণীর যে মঙ্গল করে দিয়ে গেল পৃথিবীতে কোন আত্মীয় বন্ধুই তার সে ভাল করতে পারত না। কয়লাকে ধুয়ে তার রং বান যায় না মা, তাকে আগুনে পােড়াতে হয়। রমা। কিন্তু এমন ধারা ত আগে ছিল না জ্যাঠাইমা। কে দেশের চাষাদের এ রকম কোরে দিলে? জ্যাঠাইমা। সে কি তুই নিজেই বুঝি নি মা, কে এদের বুক এমন কোরে ভরে দিয়ে গেছে। ওরা ভাবলে তাকে যেমন কোরে হোক জেলে বন্ধ করলেই আপদ চুকল। কিন্তু এ কথা তারা ভাবলে না যে আগুন জ্বলে উঠে শুধু শুধু নেবে না। জোর করে নেলেও সে আশে-পাশের জিনিস তাতিয়ে দিয়ে যায়। রমা। কিন্তু এই কি ভাল জ্যাঠাইমা ? বিশ্বেশ্বরী। ভাল বই কি মা। একদিকে প্রবলের অত্যাচার করবার অখণ্ড স্পর্ধা, অন্য দিকে নিরুপায়ের সহ করবার তেমনি অবিচ্ছিন্ন ভীরুতা,—এ দুইই যদি সে খর্ব করে থাকে না, বেণীর কথা মনে করে আমি কোন দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলব না। বরঞ্চ এই প্রার্থনাই কোরব, সে আমায় ফিরে এসে দীর্ঘজীবী হয়ে যেন এমনি কোয়েই কাজ করতে পারে।

১১০ রমা। রমা চতুর্থ অঙ্ক রমা, একসন্তান যে কি সে শুধু মায়েই জানে। বেণীকে যখন তারা রক্ত-মাখা অবস্থায় পাল্কিতে করে হাসপাতালে নিয়ে গেল, তখন ৪ে আমার কি হয়েছিল তােমাকে বােঝাতে পারব না। কিন্তু তবুও কারুকে আমি অভিশাপ দিতে পারি নি। এ কথা ত ভুলতে পারি নি মা, যে ধৰ্ম্মের শাসন মায়ের মুখ চেয়ে থাকে না। তােমার সঙ্গে তর্ক করছি নে জ্যাঠাইমা, কিন্তু এই যদি সত্য হয়, তবে রমেশদা কোন পাপে এ দুঃখ ভােগ কচেন? আমরা যা কোরে তাকে জেলে দিয়েছি এ কথা ত কারও অপােচর নেই। বিশ্বেশ্বরী। নেই বলেই ত বেণী আজ হাসপাতালে। আর তােমার কি জানিস্ মা, কোন কাজই কোন দিন শুধু শুধু শূন্যে মিলিয়ে যায় না। তার শক্তি কোথাও-না-কোথাও গিয়ে কাজ করেই। কিন্তু কি কোরে করে তা সকল সময় ধরা পড়ে না বলেই আজ পর্যন্ত এ সমস্যার মীমাংসা হােলল না, কেন একের পাপে অন্তে প্রায়শ্চিত্ত করে। কিন্তু করতে যে হয় রমা, তাতে ত সংশয় নেই। রমা নীরবে দীর্ঘনিশাস মােচন করিল বিশ্বেশ্বরী। এর থেকে আমারও চোখ ফুটেছে মা, ভাল কোরব বলেই সংসারে ভাল করা যায় না। গােড়ার ছােট-বড় অনেকগুলাে সিড়ি উত্তীর্ণ হবার ধৈৰ্য্য থাকা চাই। একদিন রমেশ হতাশ হয়ে যখন চলে যেতে চেয়েছিল তখন আমিই তাকে যেতে দিই নি। তাই তার জেলের খবর শুনে মনে হয়েছিল আমিই যেন তাকে জেলে পাঠালাম। তখন ত জানি নি মা, বাইরে থেকে ছুটে এসে ভাল করতে যাওয়ার বিড়না এত। সে কাজ এত কঠিন। রণা । কেন জ্যাঠাইমা ? বিশ্বেশ্বরী। আগে যে দশের সঙ্গে এক হয়ে েিত হয়, সে / তৃতীয় দৃশ্য রমা ১১১ কথা ত তখন মনে ভাবি নি। প্রথম থেকেই সে তার মস্ত জোর, মস্ত প্রাণ নিয়ে এতই উচুতে এসে দাড়াল যে কেউ তার নাগালই পেলে না। কিন্তু এখন ভাবি তাকে নাবিয়ে এনে ভগবান মঙ্গল করেছেন। রমা। ভগবান নয় জ্যাঠাইমা-আমরা। কিন্তু আমাদের অধৰ্ম্ম তাকে কেন বিয়ে আনবে ? বিশ্বেশ্বরী। আবে বই কি মা, নইলে পাপ আর এত ভয়ঙ্কর, কেন? উপকারের প্রত্যুপকার কেউ যদি না-ই করে, এমন কি উল্টে অপকার করে তাতেই বা কি আসে যায় না, মানুষের কৃতঘ্নতায় যদি না দাতাকে নাবিয়ে আনে। তুই বচি রমা, কিন্তু তােদর গ্রাম কি আর রমেশকে ঠিক তেমনিটি ফিরে পাবে ? তােরা স্পষ্ট দেখতে পাবি সে যে হাত দিয়ে দশের কল্যাণ করে বেড়াত, তার সেই হাতটাই ভৈরব আচায্যি—আর একা ভৈরব কেন, তােদর সবাই মিলে মুচড়ে ভেঙে দিয়েছে। কে জানে, হয় ত, ভালই হয়েছে। তার বলিষ্ঠ সমগ্র হাতের অপৰ্যাপ্ত দান গ্রহণ করবার শক্তি যখন লােকের ছিল না, তখন এই ভাঙা হাতটাই তাদের সত্যিকার কাজে লাগবে। এই বলিয়া তিনি গভীর নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন। তাহার হাতখানি রমা নীরবে কিছুক্ষণ নাড়া চাড়া করিয়া নিজের দীর্ঘশ্বাস মোচন করিল রমা। জ্যাঠাইমা? বিশ্বেশ্বরী। কেন মা ? রমা। লাঞ্ছনা-গঞ্জনা আর আমার গায়ে লাগে না,মা। মিথ্যে সাক্ষী দিয়ে যেদিন তাকে জেলে দিয়েছি, সেদিন থেকে জগতের সমস্ত ব্যথা কেবল পরিহাস হয়ে গেছে। বিশ্বেশ্বরী। এমনিই হয় না। রমা। সকলে বলতে লাগলেন শত্রুকে যেমন কোরে হােতূ নিপাত

১১২
রমা
চতুর্থ অঙ্ক
করতে দোষ নেই। তারা তাই করেছেন। কিন্তু, আমার ত সে
কৈফিয়ৎনেই জ্যাঠাইমা !
বিশ্বেশ্বরী। তােমারই বা নেই কেন ?
রমা। না মা, নেই।একটা কথা আজ তােমার কাছে স্বীকার
কোরব জ্যাঠাইমা। মােড়লদের বাড়ীতে ছেলেরা জড় হয়ে রমেশদার
কথা মত সৎ আলােচনাই কোরত। বইসের দল বলে তাদের পুলিসে
ধরিয়ে দেবার একটা মৎলব চলছিল। আমি লােক পাঠিয়ে তাদের
সাবধান করে দিই। কারণ,
কারণ, পুলিস ত এই চায়। একবার তাদের
হাতে পেলে ত আর রক্ষে রাখত না।
বিশ্বেশ্বরী। (শিহরিয়া) বলিস কিরে? নিজের গ্রামের মধ্যে
পুলিসের উৎপাত বেণী মিথ্যে কোরে ডেকে আনূতে চেয়েছিল?
রমা।
মনে হয় বড়দার এই শাস্তি তারই ফল। আমাকে মাপ করতে
পারবে, জ্যাঠাইমা ?
বিশ্বেশ্বরী। তার মা হয়ে এ যদি না ক্ষমা করতে পারি, কে পারবে
রমা ? আমি আশীর্বাদ করি এর পুরস্কার ভগবান তােমাকে যেন দেন।
রমা । ( হাত দিয়া অশ্রু মুছিয়া ফেলিল। আমার এই একটা সান্ত্বনা
তিনি ফিরে এসে দেখবেন তার আনন্দের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে আছে। যা
তিনি চেয়েছিলেন, তার সেই দেশের দীন-দুঃখীরা এবার ঘুম ভেঙে উঠে
বসেছে। তাকে চিনেছে, তাকে ভালবেসেছে। এই ভালবাসার
আননে আমার অপরাধ কি তিনি ভুলতে পারবেন না?—জ্যাঠাইমা, শুধু
একটি জায়গায় আমরা দুরে যেতে পারি নি। তােমাকে আমরা দুজনেই
ভালবেসেছিলাম।
ৰিখেরী নিঃশব্দে তাহার চিবুক স্পর্শ করিয় চুম্বন করিলেন
রমা। সেই জোরে একটি দাবি তােমার কাছে আজ রেখে যাব।
যখন আমি আর খাব না, তখনও যদি আমাকে তিনি ক্ষমা করতে না

১১৬ চতুর্থ দৃশ্য রমা পারেন, শুধু এই কথাটি আমার হয়ে তাকে বােলাে, যত মন্দ বলে আমাকে তিনি জানতেন, তত মন্দ আমি ছিলাম না। আর যত টুখ তাঁকে দিয়েছি, তার অনেক বেশি দুঃখ যে আমি নিজেও সয়েছি, তােমার মুখের এই কথাটি হয় ত তিনি অবিশ্বাস করবেন না। বিশ্বেশ্বরী। তবে, চল মা আমরা কোন তীর্থ স্থানে গিয়ে থাকি। যেখানে রমেশ নেই, বেণী নেই, যেখানে চোখ তুলেই ভগবানের মন্দিরের চুড়াে চোখে পড়ে, সেইখানে যাই। আমি সমস্ত বুঝতে পেরেছি রমা। যদি যাবার দিনই তাের এগিয়ে এসে থাকে, মা, তবে এ বিষ বুকের মধ্যে নিয়ে আর যাব না,—সমস্ত এইখানেই নিঃশেষ করে ফেলে রেখে যাব। কেমন, পারবি ত মা ? রমা। ( বিশ্বেশ্বরীর জামুর উপর মুখ লুকাইয়া আকুল হইয়া কাদিয়া ফেলিল, কহিল) আমি আর পারি নে জ্যাঠাইমা, আমাকে এখান থেকে তুমি নিয়ে চল। চতুর্থ দৃশ্য কারা প্রাচীরের সম্মুখের পথ এক দিক্ দিয়া রমেশ প্রবেশ করিল ও অপর দিক্ দিয়া বেণী--তাহার মাথায় ব্যাণ্ডেজ বাঁধা-স্কুলের হেড মাষ্টার বনমালী ও কয়েকজন ছাত্র। পশ্চাতে বেণীর অনুগত আরও দুই চারিন লোক বেণী। (রমেশকে আলিঙ্গন করিয়া) রমেশ, ভাই রে, নাড়ীর টান যে এমন টান এবার তা টের পেয়েছি। রমা যে আচায্যি হারামজাদাকে হাত কোরে এত শত্রুতা কবে, লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে নিজে এসে মিথ্যে সাক্ষী দিয়ে এত দুঃখ দেবে, সে কথা জেনেও যে জানি নি, ১১৪ বেণী। । রমা চতুর্থ অঙ্ক ভগবান তার শাস্তি আমাকে দিয়েছেন। জেলের মধ্যে তুই বরং ছিলি ভাল ভাই, বাইরে থেকে এই ক’টামাস আমি যে তুষের আগুনে জ্বলে- পুড়ে গেছি। রমেশ হতবুদ্ধির মত কি যে করিবে ভাবিয়া পাইল না। বনমালী ও ছেলের অগ্রসর হইয়া পায়ের ধূলা লইল বেণী। (কাদিয়া ফেলিয়া) দাদার ওপর অভিমান রাখিনে ভাই, বাড়ী চল্। মা কেঁদে কেঁদে দু-চক্ষু অন্ধ করবার জোগাড় করেছেন। আমরা শুধু প্রাণে বেঁচে আছি রমেশ। রমেশ। (বেণীর মাথার ব্যাণ্ডেজটা হাত দিয়া দেখাইয়া) এ কি বড়দা মাথা ভাঙলে কি করে ? শুনে আর কি হবে ভাই, আমি কাউকে দোষ দিইনে। এ আমার নিজেরই কৰ্ম্মফল,—আমারই পাপের শাস্তি।-জানিস্ ত রমেশ, এই আমার জন্মগত দোষ যে মনে এক, মুখে আর কিছুতে করতে পারিনে। মনের ভাব আর পাঁচ জনের মত ঢেকে রাখতে পারিনে বলে কত শান্তিই যে ভােগ করতে হয়, কিন্তু তবু ত আমার চৈতন্য হয় না। দোষের মধ্যে সেদিন কঁদতে কাঁদতে বলে ফেলেছিলাম, রমা, আমরা তাের কি অপরাধ করেছি যে ভাইকে আমার জেলে দিলি ! জেল হয়েছে শুলে মা যে একেবারে প্রাণ বিসর্জন করবেন। আমরা ভয়ে ভয়ে সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়া করি, যা করি, তবু ত সে আমার ভাই। তুই একটি আঘাতে আমার ভাইকে মারলি,-আমার মাকে মারলি !-রমেশ, সেদিন রমার সে উগ্ৰ মূৰ্ত্তি মনে হলে আজও হৃদকম্প হয়। বলে, রমেশের বাপ আমার বাপকে জেলে দিতে যায়নি? পারলে ছেড়ে দিত বুঝি ? রমেশ। হাঁ, রমার মাসির মুখেও একথা শুনেছিলাম। বেণী। এই হােলল তার জাতক্রোধ। কিন্তু মেয়েমানুষের এত দর্প আমারও সহ হ’ল না। আমিও রেগে বলে ফেল্লাম, আচ্ছা, ফিরে আসুক

চতুর্থ দৃশ্য,
রমা
সে, তারপরে এর বিচার হবে। কিন্তু খুন করা যে তার অভ্যেস ভাই।
তোমাকে খুন করতে আকবর লেঠেলকে পাঠিয়েছিল মনে নেই ? কিন্তু
তােমার কাছে ত চালাকি খাটেনি,তুমিই উন্টে শিখিয়ে দিয়েছিলে!
কিন্তু আমাকে খুন করা আর শক্ত কি?
রমেশ। তার পরে ?
বেণী। তার পরে কি আর মনে আছে ভাই ? কে কিসে করে যে
আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল, সেখানে কি হ'ল, কে দেখলে কিছুই
জানিনে। এ যাত্রা যে রক্ষে পেয়েছি সে কেবল মায়ের পুণ্যে। এমন মা
কি আর আছে রমেশ !
রমেশের মুখে ও মনের মধ্যে কত কি যে হইতে লাগিল তাহার
নির্দেশ নাই,কিন্তু সে একটা কথাও কহিল না
বেণী। গাড়ী তৈরী ভাই। আর দেরি নয়,বাড়ী চল্। মায়ের
কাছে তােরে একবার পৌছে দিয়ে আমি বাঁচি।
রমেশ। চলুন। জেলের মধ্যেই শুনেছিলাম রমা না কি বড় পীড়িত ?
বেণী। ভগবানের দণ্ড রমেশ,--এ যে তঁারই রাজ্য এ কি সবাই
মনে রাখে ? জগদীশ্বর ! চল ভাই, ঘরে চল।
সকলের প্রস্থান

পঞ্চম দৃশ্য
রমার কক্ষ
রমেশ প্রবেশ করিয়া রমাকে দেখিয়া চমকিয়া গেল
রমেশ।
তােমার এত অসুখ করেছে তা ত আমি ভাবিনি।
মা শয্যা হইতে কোনমতে উঠিয়া রমেশের পায়ের কাছে প্রণাম করিল
রমেশ। এখন কেমন আছ রাণি ?
রমা। আমাকে আপনি রমা বলেই ডাকবেন।
রমেশ। বেশ তাই। শুনেছিলাম তুমি অসুস্থ ছিলে। এখন কেমন
আছ এই খবরটাই জাতে চাচ্ছিলাম। নইলে, নাম তােমার যাই হােক,
সে ধরে ডাক্বার আমার ইচ্ছেও নেই, আবশ্যকও নেই।
রমা। এখন আমি ভাল আছি। আমি ডেকে পাঠিয়েছি বলে
আপনি হয়ত খুব আশ্চর্য হয়েছেন, কিন্তু
রমেশ। না, হইনি। তােমার কোন কাজে আশ্চর্য হবার দিন
আমার কেটে গেছে। কিন্তু ডেকে পাঠিয়েছ কেন শুনি?
রমা। ( ক্ষণকাল অধােমুখে নিরুত্তর হইয়া থাকিয়া) রমেশদা, আজ
দুটি কাজের জন্যে তােমাকে কষ্ট দিয়ে ডেকে এনেছি। কত যে অপরাধ
করেছি সে ত জানি, তবুও আমি নিশ্চয় জানতাম তুমি আসবেই। আর
আমার এই শেষ অনুবােধ দুটিও অস্বীকার করবে না।
বলিতে বলিতে অশ্রুভারে গলা তাহার ভাঙিয়া আসিল
রমেশ। কি তােমার অনুরােধ ?
রমা। (চকিতের ন্যায় মুখ তুলিয়াই পুনরায় আনত করিল) পীরপুরের
যে বিষয়টা বড়দা তােমার সাহায্যে দখল করতে চাচ্ছেন সেটা আমার
নিজের। বাবা বিশেষ করে আমাকেই সেটা দিয়ে গেছেন। তার পােনর

পঞ্চম দৃশ্য
রমা
১১৭
আনা আমার, এক আনা তােমাদের। সেইটেই
সেইটেই তােমাকে আমি
দিয়ে যেতে চাই।
রমেশ। তােমার ভয় নেই, বড়দা যাই কেন না আমাকে বলুন, আমি
চুরি করতে পূর্বেও কখনাে কাউকে সাহায্য করিনি, এখনাে কোরব না।
আর যদি দান করতেই চাও, তার জন্যে অন্য লােক আছে। আমি দান
গ্রহণ করিনে।
রমা । আমি জানি রমেশদা, তুমি চুরি করতে সাহায্য করবে না। আর
নিলেও যে তুমি নিজের জন্যে নেবে না সেও আমি জানি। কিন্তু তা ত
নয়। দোষ করলে শাস্তি হয়। আমি যত অপরাধ করেছি, এটা তারই
দণ্ড বলে কেন গ্রহণ কর না ?
রমেশ। তােমার দ্বিতীয় অনুরােধ ?
রমা। আমার যতীনকে আমি তােমার হাতে দিয়ে গেলাম।
রমেশ। দিয়ে গেলাম মানে ?
রমা । ( রমেশের মুখের প্রতি চাহিয়া ) একদিন কোন মানেই তােমার
কাছে গােপন থাকবে না রমেশদা,—তাই, আমার যতীনকে আমি
তােমাকেই দিয়ে যাব। তাকে ভােমার মত করেই মানুষ কোনাে ।
বড় হয়ে সে যেন তােমারি মত স্বার্থত্যাগ করতে পারে। (আঁচলে চোখ
মুছিয়া ) এ আমার চোখে দেখে যাবার সময় হবে না। কিন্তু আমার
নিশ্চয় বিশ্বাস, যতীনের দেহে তার পূর্বপুরুষদের রক্ত আছে। ত্যাগের
যে শক্তি তাদের অস্থি-মজ্জায় মিশে ছিল-শেখালে হয়ত সেও একদিন
তােমারি মত মাথা উচু কোরে দাড়াবে।
রমেশ চুপ করিয়া রহিল
রমা। চুপ কোরে থাকলে ত আজ তােমাকে ছাড়ব না রমেশদা।
রমেশ। দেখ, এ সকলের মধ্যে আর আমাকে টেনে না। আমি

১১৮ রমা চতুর্থ অঙ্ক অনেক দুঃখের পরে একটুখানি আলাের শিখা জ্বালতে পেরেছি, তাই কেবলই ভয় হয়, পাছে একটুতেই তা নিবে যায়। রমা। তােমার ভয় নেই রমেশদা, এ আলাে আর নিববে না। জ্যাঠাইমা বলছিলেন, তুমি দূর থেকে এসে বড় উচুতে বসে কাজ করতে চেয়েছিলে বলেই এত বাধা পেয়েছ। তখন পরের মত তুমি গ্রাম্য- সমাজের অতীত ছিলে, এখন হয়েছ তাদেরই একজন। তখন তােমার দেওয়া ছিল বিদেশীর দান, আজ হয়েছে তা আত্মীয়ের স্নেহের উপহার। দুঃখ পেয়ে দুঃখ সয়ে সে তুমি আর নেই। তাই এ আলাে আর স্নান হবে না;এখন প্রতিদিনই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। রমেশ। ঠিক জান রমা, আমার এই দীপের শিখাটুকু আর নিববে না? রমা। ঠিক জানি। যিনি সব জানেন, এ সেই জ্যাঠাইমার কথা। এ কাজ তােমারি। আমার যতীনকে তুমি হাতে তুলে নিয়ে, আমার সকল অপরাধ ক্ষমা কোরে আজ আশীৰ্বাদ কর যেন নিশ্চিন্ত হয়ে আমি, যেতে পারি। রমেশ। কিন্তু যাবার কথাই বা তুমি কেন ভাবচ রমা,আমি বচি তুমি আবার ভাল হয়ে যাবে। রমা। ভাল হবার কথা ত ভাবচিনে রমেশদা, শুধু ভাবচি আমার যাবার কথা। কিন্তু আরও একটি অনুবােধ তােমাকে রাখতে হবে। আমার কথা নিয়ে বড়দার সঙ্গে তুমি কোনদিন বিবাদ কোরো না। রমেশ। এ কথার মানে ? রমা। মানে যদি কখনাে শুতে পাও, সেদিন কেবল এই কথাটি মনে কোরাে, আমি কেমন কোরে নিঃশব্দে সহ্য করে চলে গেছি-একটি কথারও প্রতিবাদ করিনি। একদিন যখন অসহ্য মনে হয়েছিল, সেদিন জ্যাঠাইমা এসে বলেছিলেন,—মা, মিথেকে ঘাঁটাঘাঁটি করে জাগিয়ে তুললেই তার পরমায়ু বেড়ে ওঠে। নিজের অসহিষ্ণুতায় তার আয়ু বাড়িয়ে,

পঞ্চম দৃশ্য
রমা।
ভােলার মত পাপ অল্পই আছে। তার এই উপদেশটি স্মরণ রেখে সকল
দুঃখ-দুর্ভাগ্যই আমি কাটিয়ে উঠেছি। এটি
এটি তুমিও কখনাে ভুলােনা
রমেশদা।
রমেশ নীরবে তাহার মুখের প্রতি চাহিয়া রহিল
রমা। আজ আমাকে তুমি ক্ষমা করতে পারচ না ভেবে দুঃখ পেয়ে
রমেশদা। আমি ঠিক জানি আজ যা কঠিন হচ্ছে, একদিন তাই
সােজা হয়ে যাবে। সেদিন আমার সকল অপরাধ তুমি সহজেই ক্ষমা
কোরবে জেনে মনের মধ্যে আর আমার ক্লেশ নাই।--কাল সকালেই
আমি যাচ্ছি।
রমেশ। কাল সকালেই ? কোথায় যাবে কাল ?
রমা। জ্যাঠাইমা যেখানে নিয়ে যাবেন আমি সেইখানেই যাব।
রমেশ। কিন্তু তিনি ত আর আসবেন না শুচি।
রমা। আমিও না। আমিও তােমার পায়ে আজ জন্মের মতই
বিদায় নিলাম
এই বলিয়া রমা মাটিতে মাথা ঠেকাইয়া প্রণাম করিল
রমেশ। আচ্ছা যাও। কিন্তু অকস্মাৎ কেন বিদায় নিলে তাও কি
জাতে পারব না ?
রমা মৌন হইয়া রহিল
রমেশ। কেন যে তােমার সমস্ত কথাই লুকিয়ে রেখে চলে গেলে সে
তুমিই জান। কিন্তু আমিও কায়মনে প্রার্থনা করি, একদিন যেন
তােমাকে সর্বান্তঃকরণে ক্ষমা করতে পারি। তােমাকে ক্ষমা করতে
পারায় যে আমার কি ব্যথা সে শুধু আমার অন্তর্যামীই জানেন।
(এই সময়ে বিশ্বেশ্বরী এবেশ করিয়া ডাকিলেন-মা?)
রমেশ। জ্যাঠাইমা ! কি অপরাধে আমাদের এত শীঘ্র ত্যাগ
করে চলে ?

১২e রমা চতুর্থ অঙ্ক বিশ্বেশ্বরী। অপরাধ? অপরাধের কথা বলতে গেলে ত শেষ হবে বাবা। তাতে কাজ নেই। কিন্তু আমার নিজের কথাটা তুই জেনে রাখ। এখানে যদি মরি রমেশ, বেণী আমার মুখে আগুন দেবে। সে হলে ত কোনমতেই মুক্তি পাব না রমেশ। ইহকালটা ত জলে-জলেই গেল, পাছে পরকালটাও এম্‌নি জ্বলে-পুড়ে মরি,আমি সেই ভয়েই পালাচ্চি রমেশ। রমেশ। জ্যাঠাইমা, ছেলের অপরাধ যে তােমার বুকে এমন কোরে বেজেছিল সে ত কোনদিন জাতে দাও নি? কিন্তু সমস্ত ছেড়ে রমা কেন বিদায় নিতে চায়? তাকে তুমি কোথায় নিয়ে যাবে ? রমা। আমি আসছি জ্যাঠাইমা। প্রস্থান বিশ্বেশ্বরী। জিজ্ঞেসা করছিলি রমা কেন বিদায় নিতে চায়? কোথায় তাকে আমি নিয়ে যেতে চাই? সংসারে আর তার স্থান হােল না রমেশ, তাই তাকে এবার ভগবানের পায়ের নিচে নিয়ে যাব। সেখানে গিয়েও সে বাঁচে কি না জানি নে, কিন্তু যদি বাঁচে, বাকি জীবনটা এই অতি-কঠিন প্রশ্নের মীমাংসা করতে বােলব, কেন ভগবান তাকে এত রূপ, এত গুণ, এত বড় একটা মহাপ্রাণ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন, আর কেনই বা বিনা দোষে দুঃখের বােঝা মাথায় দিয়ে আবার সংসারের বাইরে ফেলে দিলেন। এ কি তাঁরই অভিপ্রায়, না, এ শুধু আমাদের সমাজের খেয়ালের খেলা। ওরে রমেশ, তার মত দুঃখিনী বুঝি আর পৃথিবীতে নেই। বলিতে বলিতে তাহার গলা ভাঙিয়া পড়িল। রমেশ নীরবে তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল । বিশ্বেশ্বরী। কিন্তু তাের ওপর আমার এই আদেশ রমেশ, তাকে যেন তুই ভুল বুঝিস নে। যাবার সময় আমি কারও বিরুদ্ধে কোন নালিশ

পঞ্চম দৃশ্য
রমা
১২১
করে যেতে চাই নে, শুধু এই কথাটা আমার তুই ভুলেও কখনো অবিশ্বাস
করিসনে যে তার বড় মঙ্গলাকাক্ষিণী তাের আর নেই।
রমেশ। কিন্তু জ্যাঠাইমা-
বিশ্বেশ্বরী। এর মধ্যে কোন ‘কিন্তু’ নেই রমেশ। তুই যা শুনেছি
সব মিথ্যে, যা জেনেছিস সব ভুল । কিন্তু এ অভিযােগের এইখানেই যেন
সমাপ্তি হয়। তাের কল্যাণের কাজ যেন বন্যার মত সমস্ত দ্বেষ হিংসা
ভাসিয়ে নিয়ে বয়ে যেতে পারে তাের ওপর এই তার শেষ প্রার্থনা। এই
জন্যেই সে মুখ বুজে সমস্ত সহ্য করেছে। প্রাণ দিতে বসেছে রমেশ, তবু
কথা কয় নি।
রমেশ। তাকে বােললা জ্যাঠাইমা
বিশ্বেশ্বরী। পারি ত নিজেই তাকে বলিস্ রমেশ, আমার আর
সময় নেই।
এস্থান
যতীনকে সঙ্গে লইয়া রমা এরেশ করিল। তাহার পরিধানে
দূরে বাহিরে যাইবার পরিচ্ছদ
রমেশ। (সবিস্ময়ে) এ কি! এত রাত্রে এ বেশ কেন ?
রমা। যাত্রা করে বেরিয়ে এলাম রমেশদা, রাত আর নেই। যাবার
আগে ছুটি কাজ বাকি ছিল। এক তােমার শেষ পায়ের ধূলাে নেওয়া,
আর যতীনকে তােমার হাতে তুলে দেওয়া !
রমেশ।
এ ভার আমাকেই দিয়ে যাবে রমা ?
রমা। রমা ত নয়, রাণী। তার সব চেয়ে আদরের ধন এই ঘােট
ভাইটি। তাকে তুমি ছাড়া আর কে নিতে পারে রমেশদা?
রজেশ। কিন্তু এর কত বড় দায়িত্ব ;-এ অনুবােধ রমা
রমা। এখনাে রমা? কিন্তু এ ত অনুবােধ নয়, এ তার দাবি।

রমা।
চতুর্থ অঙ্ক
এই দাবি নিয়েই সে সংসারে একদিন এসেছিল, এই দাবি নিয়েই সে
সংসার থেকে যাবে। এ দাবির ত অন্ত নেই রমেশদা,—একে তুমি
ফাকি দেবে কি কোরে ? এই নাও।
এই বলিয়া সে যতীনকে তাহার হাতে দিয়া পায়ের
নীচে গড় হইয়া প্রণাম করিল
যবনিকা পতন
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এও সন্স-এর পক্ষে
প্রকাশক ও মুদ্রাকর-শ্রীগােবিপদ ভট্টাচাৰ্য, ভারতবর্ষ প্রিন্টিং ওয়ার্কস
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস জট কলিকাতা-৬

No text on this page.

১২২
রমা।
চতুর্থ অঙ্ক
এই দাবি নিয়েই সে সংসারে একদিন এসেছিল, এই দাবি নিয়েই সে
সংসার থেকে যাবে। এ দাবির ত’ অন্ত নেই রমেশদা,-একে তুমি
ফাকি দেবে কি কোরে ? এই নাও।
এই বলিয়া সে যতীনকে তাহার হাতে দিয়া পায়ের
নীচে গড় হইয়া প্রণাম করিল
যবনিকা পতন
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় এণ্ড সন্স-এর পক্ষে
প্রকাশক ও মুদ্রাকর-শ্রীগােবিন্দপদ ভট্টাচাৰ্য, ভারতবর্ষ বিন্টিং ওয়ার্কস
২০৩১১, কর্ণওয়ালিস টি কলিকাতা-৬

No text on this page.

Rama Ed.7

Author
Chattopadhayay, Sharatchandra
Title
Rama Ed.7
File name
Rama Ed.7
Text
OCR done
Citation
1934
Published
2010/03/22
Publisher
Gurudas Chatterjee And Sons, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
132
Library
Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Classification
Bengali Drama
Keywords
Chattopadhayay, Sharatchandra
DLI number
511304
Barcode
4990010018464.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
U4tiP2V1vHz
Download PDF

Rama Ed.7