Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Shuktara
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
শুকতারা।
শ্ৰীমতী চামেলীবালা মজুমদার।
মূল্য ১ টাকা।
বি, এন, পর কর্তৃক মুদ্রিত
ইকনমিক্যাল প্রেস,
৭নং পার্শিবাগান লেন,
কলিকাতা।
প্রকাশক
শ্রীস্নেহময় মজুমদার, বি, এ,
২০, ফরভাইস লেন,
কলিকাতা।
উৎসগ
কল্যাণীয়
শ্ৰীমান মৃণালকান্তি মজুমদার
দীর্ঘজীবেযু।
স্নেহের ননি, তুমি বহুদূরে আছি, সুতরাং তােমায় কিছু
প্রিয় বস্তু দিয়া তােমার মনকে প্রফুল্লিত করিতে পারিতেছি
, তুমি বিদ্যার্থী, বিদ্যার সাধনায় প্রিয় আত্মীয় জন
ও জননী জন্মভূমি ত্যাগ করিয়া কঠোর ধৈৰ্য্য সহকারে
তুমি মহাসমুদ্রের পারে গিয়া সুদীর্ঘ প্রবাস যাপন করিতেছ
এজন্য আমার এই সামান্য বিদ্যা হইতে উৎপন্ন ‘শুকতারা
নামক পুস্তিকাখানি স্নেহ উপহার দিলাম। ইতি
১৩৩৮ সাল ।
বর্ধমান
তােমার বড় বৌদি ।
No text on this page.
গ্রন্থকত্রীর নিবেদন।
আমি অতি সামান্য ও আমার আধুনিক যুগের শিক্ষা
দীক্ষার অভাব থাকা সত্ত্বেও আমি সাহিত্যের পথে অগ্রসর
হইতে প্রয়াস পাইয়াছি।
আমি এই বাংলার মাটীতে ভূমিষ্ট হইয়া এই জলবায়,
সেবনে দেহ পুষ্ট ও বর্ধিত হইয়াছি । পৃথিবীতে আসিয়া
যে মাটী প্রথম স্পর্শ করিয়াছি, মায়ের কোলে শুইয়া
যে ভাষা রসনা হইতে প্রথম বাহির হইয়াছে, সেই মাতৃভূমি
এবং মাতৃভাষা বড়ই প্রিয়, সেই ভাষার যাহাতে ক্রমশঃ
সম্পদ বৃদ্ধি হয় এবং আমাদের বাংলার শ্রদ্ধাস্পদ ও প্রিয়
নরনারীগণ অনুগ্রহপূৰ্ব্বক পাঠ করার জন্য বাংলার স্থানে
স্থানে এই সামান্য পুস্তকখানি বিস্তার হইয়া পড়ে ইহাই
আমার সানুনয় প্রার্থনা।
আমরা সকলেই বাংলা মায়ের সন্তান সুতরাং মাতৃভাষা
সকলের কাছে অতি সমাদরের বস্তু। যদিও আপনারা
জগদ্বিখ্যাত লেখক লেখিকার লেখা পড়িয়া যে মধুর রসের
আস্বাদ পাইতেছেন, সে স্থলে আমি পতঙ্গবৎ হইলেও
আমায় উৎসাহ দিবার জন্যও আপনারা পড়িলে আমি
বাধিত হইব ও শ্রম সার্থক জ্ঞান করিব এবং তাহা হইলে
( ২ )
এই প্রিয় মাতৃভাষার ধ্যান ও সাধনা করিতে করিতে
মাটীতে জন্মিয়াছি সেই মাটীতে লয় হইতে পারিব।
এই গ্রন্থে কিছু ভুল থাকিলে দ্বিতীয় সংস্করণে সংশোধন
করা যাইবে। ইতি
বদ্ধমান,
শ্ৰীমতী চামেলীবালা মজুমদার
১৯৫৩১
শুকতারা। প্রথম পরিচ্ছেদ। বাগদীর ঘরে পেমার বউয়ের মত এমন গুণের বউ কম দেখতে পাওয়া যায়। গ্রামের নাম চকদিঘি, জেলা বীরভূম, পৌষ মাসে শীতের সময় ধান কাটা, রাত্রে ধান আগলান, ধান পাচড়ান ইত্যাদি ক'রে, পেমার কেমন হটাৎ ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হ’লতারপর নিউমােনিয়া, পেমা সমস্ত রাত্রি প্রলাপ বকেছে, পেমার মা বুড়ো মানুষ, বউ আন্দাজ ১৮ ১৯ বৎসর বয়সের হবে ; আর একটি পুত্র দুই বৎসরের। পেমার মা বলে, বউ ! পেমা কেমন ভুল কথা বলছে ? গাও তাে পুড়ে যাচ্ছে ; কি ক’রব কিছুই বুঝতে পারছি না। না হয় বাবুদের বাড়ী যাই, তারা বড় লােক, তাদের বল্লে রােগের অবস্থা বুঝবে, তারা যা বলে তাই করি আর যা পারি দুটো পা করে ঝপ করে আসি, তুই খাবি, কঁচাছেলে খাবে, পাট করতে না গেলে তো-ভাতটা পাবনা! তুই বস, আমি আসি। পেমার বউ ভাঙ্গা পাথর আর দুটো ভাঙ্গা ফুটো এনামেলের বাটী ও ডিস, মেজে (বােধ হয় বাবুদের বাড়ীর ভাঙ্গা চোরা কুড়ােন বাসন) আর রাত্রে জ্বরের ঘােরে পেমা যে ছেড়া কঁাথা, ছেড়া মাদুর, অপরিষ্কার করেছিল-সে গুলো সম্মুখের ডােবা থেকে ফেচে এনে কু’তে দিয়ে এবং উঠানটি ঝাট দিয়ে ও নিকিয়ে রােগীর কাছে বসে বুড়ীকে বল্লে—“তুমি যাও”। পেমার মা এক গৃহস্থ বাড়ী কাজ করত। ঢাকা বোকা মানুষ দেখে গিন্নী তাকে ভালবাসতেন। কোন ভাল জিনিষ ঘরে এলেই তার হাতে দিতেন, কোন কাজ উৎসবাদিতে সকল লােক অপেক্ষা শুকতারা তাকে বেশী বগিস দিতেন। অন্যান্য ব্যবহারেও বুঝা যেতাে যে পেমার মা সকলের চেয়ে গিনির বেশী মেহের পাত্রী । পেমার মা সকালে এসে গিন্নীর কাছে কেঁদে কেটে বল্লে- মা! পেম বুঝি বাঁচে না শি। সে কি ? কাল কিছুতো বলি নি ? এর মধ্যে কি অসুখ হলাে ? ওমা দিনের ভাগে তাে বেশী হয় নি! তখনও তো বাহা তামাক খেলে-দুটি মুড়ি খেলে—আমি তােমর বাড়ী থেকে ভাত নিয়ে বউতে আমাতে খাচ্ছি তা দেখে বল্লে আমি দুটি খাব, আমি বল্লাম আজ থাক কাল খেও, বুকে ব্যাথা বলছ গায়েও ঝজ লাগছে, আজ আর ভাত খেয়ে কাজ নেই” তারপর সে তামাক খেয়ে তলে। -আমি তােমাদের বাড়ী আবার কাজ করতে এলাম। ফিরে গিয়ে দেখি সেই শুয়েই আছে, গায়ে হাত দিয়ে দেখি গ খুব গুপ্ত, গলা বড় বড় করছে, বুকের মধ্যে সাঁই সাঁই শব্দ হচ্ছে, বউকে জিজ্ঞাসা কল্লাম কতক্ষণ শুয়ে আছে ? বউ বল্লে তুমি পাট করতে যাওয়ার পর আর উঠেনি। তারপর সমস্ত রাত ভুল বকেছে আর জ্ঞান গমি। হয় নি, গায়ে খুব তাতও বাড়লো, কি করব মা? আমার কাঙ্গালেরধন। গি। তার আগে কিছু হয় নি ? বু। হাগা ছাপ ছাপিত কিছু হয় নি, ঐ একটু একটু সাজবেলা হলে ব’লও—আমার গাটায় সুখ নেই, আজ আর রাত্রে কিছু খাব না, কপ লেগেছে, একটু তেল গরম করে দে। তাই রাত করে কনি দিলাম ; তারপর সকাল হলে উঠে মাঠে যায়, ধান কাটে, ধান গরুরগাড়ী করে ঘরে আনে, ধান পাছরায়, সবইত করে মা। তারপর পান রে ভাত খায়, খাটতে হয় --দুটি না খেলে খাটতে পারবে কেন মা? আমাদের গরীবের ঘর, বসে থাকলে কি চলে? কি করব, মা। বল ? এক দিনের মধ্যেই ভেসে উঠল।
শুকতারা
৩
গি। :'তুমি মাে, একেবারে বিছানা না নিলে তোমরা আর
রােগ বল না, ঐ আহম্মকি করেই ত তোমরা মানুষ মার, এদিন
গায়ে সুখ নেই বলেছে, বুকে ব্যথা কম বলেছে, তার ওপর নওয়া
খাওয়া সব চছে তবে অর রোগ বাড়াবেন কেন। রোগের যে বুকম
বিবরণ শুনছি আর দিন সময়ও যেমন পড়েছে তাতে আমার মনে
হয় নিমোনিয়া হয়ে থাকবে ; অন্ততঃ উঃ ক্রম হয়েছে। ঐ রকম রােগ
ক’টা পাড়ায় হয়েছে । ভাল ডাক্তার দেখ, গরমে রাখ, আর এমন
তা বহেলা করিস নি।
পেমার মা হু হু করে কেঁদে এবং কালে কাঘাত করে বল্লে
তবে মা কি করব? আমার যে গরীব কাঙ্গালের ছেলে, মা পয়সা
কোথায় পাব ! যে ডাক্তার আনব ? ডাক্তার আনতে টাকা লাগবে
ঔষধের দাম লাগবে, আবার গরম বিছানার কথা বলছ এত পাই
কোথা ? যা কিছু ছি জমীদারে? ওজন দায়ে ফর বেচে দিয়েছি ।
তা জানত ? তোমার বাড়ী খেটে খুটে যা দুএক খান।
বাসন,
কাপােষ, কম্বল, চাষের বলদ, রূপার পৈচে, মাদুলি প্রভৃতি বউয়ের
* ছিল সবত গ্যাছে ; কবছর হাজ। শুকোয় উমীদারের খাজনা বাকি
হলাে, সেবার আমার ব্যায়ােয় ৫ গণ্ডা টাক: ব্যয় হল, সুদে আসলে তার
দেনা, ছেলের বিয়ের দেনা, এই সবেত, সুদে আসলে বিকিয়ে গেছে।
চট্ট চকের কাছীতে মােকদ্দমায় জিনিষ পত্র সব নিলামে উঠল, জিনিষ
পত্র চাষের বদ দুদ ওয়ালা গাইট জন িস আধা কড়ি বিকিয়ে
গল, আহা! কি যে গায়ের রূপ, গাইটাকে এতদিন পুষে পেলে মানুষ
কল্লাম আহা! • সের করে দুধ দিতে, ঘরে খেতাম আবার
বেচতাম, তাও. আমার নেই, আহা! বাছাকে যে দুধ দেন তাও
উপায় নেই।
গরুটাকে ঘর থেকে যখন নিয়ে যায়, আমার দিকে চেয়ে কত
৪ শুকতারা ডাকতে লাগলো কিছুতেই তাদের সঙ্গে যাবে না, জোর করে দড়ী টেনে নিয়ে গেল, আজ মনে কল্লে আমার চোখে জল আসে, গরুর ডাবা, খুঁটি চাল খানা শূন্য পড়ে আছে। সেদিকটায় তাকালে প্রাণটা কেঁদে ওঠে যাক মা সব স’য়ে ছিল, এখন এই উপস্থিত বিপদ থেকে কি করে রক্ষি পাব তাই বল মা ? সামান্য অসুখ থেকে যে আবার হুস করে এমন হয়ে উঠবে তাকি মা জানি ? আমরা ছােট জাত পাট করি আর খাই, আমি কিছুই জানি না। পেমার মায়ের এরূপ কান্না শুনে গৃহিনীর মনে দয়ার উদ্রেক হ’ল । গিন্নি বল্লেন –“ভয় কি ? রোগ কারুর হয় না? এই চার টাকা এখন নে পরে মাসে মাসে ২১ টাকা করে যখন হয় শোধ দিস। আর রােগীর পথ্য ও তােদর ভাত আমার বাটী থেকে নিয়ে যাস তোকে আজ আর কাজ কত্তে হবে না। আমার অপর ঝি চাকর অঙ্গকের মত কাজ সেরে নেবে। আজকে যা, ডাক্তার অন ঔষধ খাওয়া ছেলের যত্ন কর । যত্ন না করলে কি শুধু কাদলে রােগ ভাল হয় ?” বুড়ি তাড়াতাড়ি সেই টাকা নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তারের বাড়ী ছুটল এবং ডাক্তার নিয়ে বাড়ী ঢুকল। ডাক্তার রােগী দেখে বল্লে “এ অসুখ শক্ত, তুই ৪ টাকার ঔষধ আন্, এখন দুবেলা দেখার দরকার। আমায় তুই কত টাকা ভিজিট দিবি? আমায় কিছু দিতে হবে না, আমাকে যা দিবি সেই টাকায় অন্য ভাল তুলে এনে বুকে বাধতে হবে ৩৪ বার মালিশ কর, ঔষধ খাওয়া, গরম বালি দে, এ করেছিস কি? রােগ যে বেড়ে গ্যাছে রােগ বাচে ত তাের বহু ভাগ্য, বেশ গরম করলে গরম জামা ইত্যাদির দরকার।” এই বলে ডাক্তার চলে গেলেন। বুড়ি কাঁদতে কাঁদতে মনিব বাড়ী গিয়ে গিন্নির কাছে সব জানালে গিন্নি দুখানা পুরান কম্বল, একটা ছেড়া গরম জামা ও কতকটা বােরিক শুকতারা } তুলা বুকে বাধতে দিতে। আর বল্লে “বালি আর তোদের ভাত নিয়ে যাস। তাের বঁধবি কখন? খেয়ে মরবি ? কচি ছেলে আছে, নিজের দুজন আছিস, না খেয়ে রােগীর সেবা কি করে করবি? এখন তােদর শক্ত হওয়া দরকার”। বুড়ি গিন্নির প্রদত্ত জিনিষগুলি নিয়ে কাদতে কাদতে চলে গেল। ডাক্তার বাবু রােজ আনাগোনা ক'রে পেমাকে খুব যত্ন সহকারে দেখে নিজের দয়ার্ল চিত্তের, ও উচ্চ হৃদয়ের পরিচয় দিলেন এবং গৃহিণী ও যথাসাধ্য তত্ত্বাবধান ও সাহায্য করিতে লাগিলেন। পেমার বো নীরবে ডাক্তারের আদেশ মত সেবা করিতে লাগল। মুখে শব্দ নাই, আহার নেই নিদ্রা নেই, কেবল কলের পুতুলের মত হস্তপদ চালনা হচ্ছে মাত্র, আর পেমার মা কেবল পাগলের মত ছুটোছুটি করছে। একবার ডাক্তারের কাছে যাচ্ছে, একবার ঔষধ কিন্তে যাচ্ছে, একবার বাৰুদের বাড়ী থেকে পথ্য আনতে যাচ্ছে, আবার শিশুটি যখন কেঁদে গড়াগড়ি যাচ্ছে—তাকে কোলে করে দৌড়াচ্ছে, কখনও তার মুখে দুটো ভাত গুজে দিচ্ছে আবার শিশুটি কেঁদে কেঁদে হয়ত উঠানে ধূলায় পড়ে অর্ধ- ভুক্ত মুড়ির মােয়াটি হাতের মুটোর মধ্যে করে ঘুমিয়ে পড়েছে, শীতে কুঁড়ে কচ্ছপের মত ক্ৰমশঃ হাত পা পেটের মধ্যে গুটিয়ে দিচ্ছে। বুড়ি বাড়ী এসে শিশুর এই অবস্থা দেখে তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে কোলে করে একটা ছেড়া কাপড় ও পাট করে গলায় জড়িয়ে ছেড়া চাটাইটির উপর পিতার রােগ শষ্যার পাশে শুইয়ে দিয়ে নিজের ছেলের গায়ে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করছে, বাবা! “কেমন আছ ? একবার কথা কও! বুড়াে- মায়ের দিকে একবার চেয়ে দেখ !” এই প্রকার হা হুতাস করতে করতে আঁচল পেতে ছেলের পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে । এই রকম করেই দুঃখী পরিবারেরই দিন যেতে লাগলো; কিন্তু ইহাদের সকলের পরিশ্রম, সকলের যত্ন, সবই ব্যর্থ হল । .
ও পঞ্চম দিবস দ্বিপ্রহরে, রবির খরতর তীব্র তেজের সঙ্গে খরতর শ্রবণ দগ্ধ বাক্য, বুড়ির কর্ণে প্রবেশ করল । ডাক্তারকে বিমনা দেখে বুড়ি বার বার জিজ্ঞাসা করিতে লাগল “ডাক্তার বাবু! চুপ করে কেন ? কেমন দেখলেন ?” ডাক্তার বাবু ক্ষণকাল নিস্তব্ধ থেকে বল্লেন, “দেখ বুড়ি! তুই বার বার ছেলের কথা জিজ্ঞাসা করছিস, এখন না বলে ও নয়, কি আর বলব? এই মৰ্ম্মঘাতী বাক্য শােনবার মত লোক ত তাের এখানে কেউ নেই, তাই তােকেই বলতে হচ্ছে, কারণ রাত্রি ঘণীভূত অন্ধকারে এই বনপুরীতে তুই মুস্কিলে পড়বি, তাের ছেলের আর দেরী বেশী নেই—মৃত্যুর কাল ছায়া মুখে পড়েছে, রজনীর কালিমা ঘণীভূতের সঙ্গে কালের কাল ছায়াও ঘণীভূত হয়ে আসবে, এজন্যে তুই প্রস্তুত হ'। তাের কে কোথায় আছে খবর দে, না হয় অমিয় বল আমি জানিয়ে আসি।” এই কথা শুনে শাশুড়ী ও বধু শিরে করাঘাত করে কঁদিতে লাগলো, ডাক্তার বাবু বল্লেন “এখন কঁদিস নি, তাতে রােগীর যন্ত্রণা হবে, কাদবার ঢের সময় আছে,এই বলে তিনি নিজে অশ্রু বর্ষণ করতে ক’রতে ফিরে গেলেন এবং বুড়ির সেই রাত্রে যাহাতে দায় উদ্ধার হয় তাহারও ব্যবস্থা করলেন। ছেড়া চাটাই ভগ্ন কুঠির মধ্যে থেকে পেমার প্রাণ বায়ু মুক্ত হয়ে কালের শাসনে কাল সন্ধ্যায় আঁধারে মিশিয়ে গেল । শিয়রে বৃদ্ধ মাতা, পদতলে অষ্টাদশ বর্ষীয়া ভাৰ্যা, ও মৃতের বুকের উপরে দুই বৎসরের শিশু পড়ে কাদতে লাগল। এই দৃশ্য দেখে কঠিনেরও হৃদয় দ্রবীভূত হয়, কিন্তু দয়াময় বিধাতার খেলা কে বুঝবে ? গ্রামের ২৪ জন ভদ্রলোক, ডাক্তার বাবু ও বুড়ির মনিব মিলে পেমার যথাবিধি সৎকার করলে। কিছুদিন সকলে চাল, চাল, ভাল কখনও বা রাধা ভাত ইত্যাদি দিয়ে সাহায্য করতে লাগল। তারপর .
শুতার ৭ কে কার চিরদিন করে বল ? শােক ও মানুষের চিরস্থায়ী নয়। যিনি শোক দেন তিনিই সহ ক’রবার ক্ষমতা দেন। বিশেষ গরীবের কি শােক করিয়া পড়ে থাকলে চলে? আর আজীবন দুঃখ দারিদ্র্য সহ্য করে দুঃখের কঠোর পীড়নে তাহাদের হৃদয় ক্রমশঃ কঠিন হইয়া যায় ও দুঃখ সহিবার ক্ষমতাও হয়। আর পেট ও সকলের আগে, সব খায়, কিন্তু খাওয়া যায় না । আহার অন্বেষন করবার জন্যও আবার সব দুঃখ কষ্ট ঝেড়ে ফেলতে হয়। পেমার মা আবার বাবুদের বাড়ী কাজে গেল। পেমার বৌকে এবারে গিন্নিকে ধরে অন্য একটা লােককে জবাব দিয়ে তাকেও ঐ বাড়ীতে কাজে লাগিয়ে দিল। নতুবা আক্র। গণ্ডার সময় তিনটের পেট চলে না, কাপড় চোপড় জমিদারের খাজনা সবই আছে।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। শাশুড়ী বৌ দিনে কাজ করে খায় দায় ছেলেটিরে খাওয়ায়। সন্ধ্যার সময় ছেলেটীকে শুইয়ে ঝাপটা বন্ধ করে খানিক্ষণ পেমার-কথা বলে, কেঁদে কেটে ছেড়া চাটাইটী বিছিয়ে শোয়। এমনি দুঃখে কান্নায় তাদের দিন যেতে লাগল, পেমার শ্বশুরবাড়ী তাদের গ্রাম থেকে অল্পদূর। দেড় কুড়ি টাকা পণ দিয়ে পেমার বৌকে বিয়ে দিয়ে আনার পর আর বড় একটা সেখানে পাঠাত না। কোন কাজ কর্মে কিংবা বাড়ীতে কোন অসুখের কথা শুনলে পেমা সঙ্গে করে নিয়ে যেত আর সেই দিনই ফিরত। বাবুদের বাড়ী খেটেখুটে পেমার মা যা কিছু টাকা রােজগার করত তার মধ্যে কিছু টাকা পেমার বিয়ের জন্য গিন্নার কাছে জমা রাখতো, সেই টাকা থেকে দেড় কুড়ি টাকা পণ দিতে এবং রূপার পৈচা, মাদুলী, গােট, চেলী দিয়ে ও জাতি জ্ঞাতিকে তেলের লুচি, গুড় দিয়ে গুজির পায়েশ আর ছােলার ডাল করে খাওয়ালে। এই রকমে পেমার মা খুব দটাঘটি করে একটী মাত্র ছেলের বেতে খুব সাধ পূর্ণ করলে। তার পরে নয় বৎসরের বৌকে নিয়ে তেল হলুদ মাখিয়ে পুকুরে নাইয়ে আনে, সকালে উঠে ঘুড়ি গুড় দিয়ে ছোট ধামিটী হাতে দেয়। বাবুলের বাড়ী থেকে ভাতটী এনে আগে বৌকে খাওয়ায়। বলে তুই কাচা ছেলে থাকতে পারবিনি, পেমা মাঠ থেকে এলে তখন তাকে দিয়ে আমি খাব। কোন ভাল খাবার জিনিষ গিন্নী খেতে দিলে তাহা আঁচলে করে এনে বৌকে খাওয়ায়, মাথায় আটা হ'লে মাটী ঘসে পুকুর তারা থেকে নাইয়ে আনে, শীতকালে দুপুর বেলা রােদে বসে, খানিকটা নারিকেল তৈল মাথায় মাখিয়ে দিয়ে একটা কাঠের চিরুণী দিয়ে প্রাণ- পণে মাথা আঁচড়ে দেয়। পরে কতকগুলি চুলের গুচি, চুলের বিনুনীর গুচি, রূপার কাটা, কাচের পাখী, ময়ুর ফুল ফল দেওয়া কাটা, কাচকড়ার নানারঙ্গিন ফুল দেওয়া কাটা, খোঁপার উপর নানা বাহার করে - তেলের উপর এটে সুটে এক ঝোটন তুলে দিতে। স্কুটার টানে চুলের গােড়াগুলি অবধি টেনে খেচে উঠে থাকত, মধ্যে মধ্যে ঘামাচির মত ঝকা ঝকা হতো তবু পেমার মা’য় হাতে বউর নিস্তার নেই- পেমার মা বলতে। ঢল ঢল করে ঝু’টা খুলে পড়া দুচক্ষে দেখতে পারি না। চুল গােনা হয়ে যায়, নাকে মুখে চখে পড়ে, ঐ বাবুদের বাড়ীতে সব ফিতে বা চুল বাঁধার বাহার? খোপা উন্টে উল্টে সাতবার পড়ছে, চল্ চল্ করে খুলে যাচ্ছে, চোখে মুখে পড়ে বাবা! আমার অসন্ত লাগে। আমাদের কাঙ্গাল গরীবের যাব এমন সৌখীন ফুল গান খোঁপা পােষায় না। বেশ এটে সুটে চুল বাঁধবে কোমর বেঁধে কাপড় পড়ে চট চট করে কাজ করতে হবে এমন সাতবার চুলে হাত কাপড়ে হাত দিতে গেলে চলে ? বড় লােকেরা বা করবে তাই চলে। এই তত খোঁপার ব্যাপার গেল আর কোন পার্বণ হ'লে কি কাঞ্চনতলার শিবের গান, কালীপূজা, দুর্গাপূজা, দোল রাস প্রভৃতি পার্বন দিনে মেলা বসলে পেশায় না। তাড়াতাড়ি বাবুদের বাড়ী থেকে কাজ সেরে দু’চার পয়লা শিল্পীর কাছ থেকে বকশিস নিয়ে যৌকে সঙ্গে করে মেলা দেখতে যাবার উদ্যেগ করতে। কাপড়খানা সোনা দিয়ে কেচে পাত এবং আপনিও কেচে সেদিন পরত, তারপর তেল হলুদ মাখিয়ে পরে রূপার সেই গহনাগুলি পরিয়ে বৌকে নিয়ে মেলা দেখতে যেতাে। • মেলা থেকে হয়ত একটা কাঠাল নয়ত কতকগুলা তেলে মজা খাবার বেশী, পাপৰ ভাজা, কাচের চুড়ী, কানে ঝুটো পাথরের দুল ১০ শুকতারা কিনে নিয়ে বাড়ী ফিরত। এই রকমে পেমার মা একটু প্রাণে সুখ অনুভব করত। ক্রমশঃ বৌ বড় হল, পৌত্র হ’ল বুড়ির আর আনন্দের সীমা রহিল । বুড়ির আগে টের ছেলেপুলে হয়ে নষ্ট হয়, পরে এই পেম হয়, তারপর পেমার বাপ হারু বাগদী মরে গেল! সেই অবধি পেমার মা দুঃখে কষ্টে ছেলেটাকে মানুষ করে এখন সংসারী হ’ল। অবুঝ বুড়ি মনে করলে এবার তার দুঃখের অবসান হল। কিন্তু পিছনে যে দুঃখ বন্যার স্রোত তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার জন্য ভীম বেগে ছুটে আসছে তাহা সে দেখতে পায়নি। এই সুখ স্বপ্ন শয্যা হঠাৎ কালের ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে সব ছত্র ভঙ্গ করবে তা সে বােঝে নি। পেমা খুব বলবান গোয়ার গােবিন্দ ছিল। কারো বড় খাতির রাখতাে না, যার সঙ্গে বচসা হবে অমনি মেরে বসবে, যতবার হাজতে গ্যাছে, বুড়ি তার মনিবের কাছ থেকে কেঁদে কেটে টাকা নিয়ে জরিমানা দিয়ে পেমাকে খালাস করে আনে। এজন্য তাকে ছোট জাত হলেও ভয় করত। পেমার গুণের মধ্যে স্বভাবটী ভাল, মাকেও ভক্তি করতে, কোন রাগবশে মায়ের গায়ে হাত তুলত না। কিন্তু রাগ হলে মাঠ থেকে এসে সময়ে না খেতে পেলে বৌকে ঠেঙ্গিয়ে দিত। পেমার বৌকে বাপের বাড়ী পাঠানর পক্ষে পেমার ঘােরতর আপত্তি ছিল। সেই জন্য পেমার বৌ ভয়ে বাপের বাড়ী যাবার নামও করত না। পেমার শ্বশুর বাড়ীতে এতটা বিরূপ হবার কারণও ছিল। পেমার বৌ বীরপুর গ্রামের সােদো বাগদীর প্রথম পক্ষের মেয়ে। মেয়েটাকে অল্প বয়সে রেখে তার মা মধু মরে। তারপর তার বাপ বাগদী সমাজ অনুসারে ত্রিশ বত্রিশ বছরের একটা বিধবাকে বিবাহ করে, তারও আগেকার মেয়ে দু চারটী। এবারেও ৫৭টা হল, ভয়ের ব্যবসা হ’ল ক্রমান্বয়ে মেয়েদের বিবাহ দিয়ে পণ লওয়া। এই উপায়েই শুকতারা পেমার শ্বশুরের সংসার চলে। চৰি বাস থাকলে সব বছর ও সমান হয় না। অনাবৃষ্টি, অজন্মা, আক্র। গণ্ডার দিনে এতগুলি প্রাণ দােদো বাগদীর কি করে চলে ? বাগদীর ঘরে বিধবা মেয়েদের বা বিবাহ দেওয়া দোষের নয়। পেমার জ্ঞানে তাদের বংশে মেয়েদের মধ্যে এ কাজ করেনি এজন্য বাগদীদের মধ্যে তাদের বংশে একটু খ্যাতি ছিল। সেইজন্য পেমার ঐ ঘরে বিয়ে করবার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু পেমার বোটী বেশ সুশ্রী দেথে পেমার মায়ের একান্ত ইচ্ছা ঐ মেয়ের সঙ্গে পেমার বিবাহ হয়। পেমার মা বলে মেয়ে এমন সুন্দরী বাগদীর ঘরে হয় না, আর কণে বিবাহিতা স্ত্রীর মেয়ে, তা হলে আর দোষ কি? আমাদের হাড়ী বাগদীর ঘরে এত বাচলে কি চলে? ছেলে বলে “আরে জানিস না মা, মেয়েও যে ঐ রীত, শিখবে?” পেমার মা বলেছিল “মেয়ে না পাঠালে রীত, শিখতে পারবে না।” এইরূপে মা পুত্রে শেষ সাব্যস্থ করে সুন্দরী দেখে পেমার বৌকে ঘরে আনে। কিন্তু দুঃখী পরিবারের রূপই কাল, পেমার বৌকে শেষ কালে রূপের জ্বালায় দেশ ছাড়তে হল। পেমার মৃত্যুর খবর শুনে পেমার শ্বশুর কাঁদতে কাঁদতে মেয়ের বাড়ী এলাে। পেমার মা ও বো উভয়েই তাকে দেখে কেঁদে উঠলো। কান্না থামবার পর পেমার মা বেকে বল্লে -“তাের বাপকে খাওয়া, হাত মুখ ধােবার জল দে।” যা তাদের ঘরে ক্ষুদ কুঁড়ে ছিল পেমার বৌ তাই দিয়ে ভাত ও তরকারী রেধে বাপকে খেতে দিলে, হাত মুখ ধােবার জল দিলে, তামাক সেজে দিলে বৃদ্ধ ঠাণ্ডা হলো। তারপর বোনের সঙ্গে কথাবার্তা আরম্ভ করে, এ কথা ও কথার পর কল্লে-“দ্যাখো বোন আমি একবার বিটিকে নিয়ে যেতে চাই, ওর মা বড় ব্যাকুল হয়ে ওকে নিয়ে যেতে বলে দিয়েছে, কিছুদিন ওর সেখানে থাকা হলে মনটা একটু ভাল হয়, সেই বিয়ে হয়ে এই যে এসে ঢুকেছে,
১২
শুকতারা
আর তাে যায় না । এক রকম তাে সম্বন্ধ তুলে দেওয়ার মত,
জামাইতে পাঠাইতে ভালবাসতাে না, তুমিও পাঠাতে চাইতে না।
এক জায়গায় থেকে ওর মনটাও তাে খারাপ হয়, ওর বয়সই বা কি?”
বু-সেখানে গেলে ওর মন ভাল হবে কিসে ?
বুড়ােত পাঁচটী আপন জন দেখে।
বু—আমি কি আপন জন নই, আমি ৯ বছরের মেয়ে এনে মানুষ
করেছি, এতদিনের আমার হাতে গড়া জিনিষ, আমার পেটের মেয়ে নেই
আমি ওকে মেয়ে বলে মনে করি, আমার একমাত্র ছেলে তাও
বুড়াে বয়সে ফেলে চলে গেল, এখন আমার অদিনের আশ্রয় ঐ সবই
হয়েছে, আমায় ফেলে গেলে কে আমায় দেখবে? আমরা যেমন
উভয়ে উভয়ের সমদুঃখভাগী হ’ব এমন আর ওর কে হবে ?
জাল ও কোথায় জুড়োবে ? এখন আর কোন খানে গিয়ে শান্তি
পাবার আশা নাই, আর তুমি যদি জানই আমি বউ পাঠাতে কখনও
ইচ্ছুক ছিলাম না, তবে এখন ইচ্ছুক হব কি করে? আমি তো সেই
আছি, তবে আমার ছেলে নেই বলে তত জোর আছে কি না জানি না।
বুড়ো—দু-চার দিন গেলে আর চলে না ?
বুড়ি:-আমার ছেলে এই কুঁড়ে থেকে চলে গ্যাছে, এই শূন্য
কুঁড়েতে রাত্রে কি করে থাকব? আমি সমস্ত দিন কাজ কর্ম করি,
আর বাবার কথা একটু বলে একটু বুকটা হাল্কা করি, তারপর ছেলে
বউ নিয়ে খানিক ভুলে থাকি। দুচার দিন একা থাকাও আমার
পক্ষে অসম্ভব ও কষ্টকর।
বুড়ো মানুষ আমি, এক দণ্ডের কথা বলা
যায় না।
বুড়ােকেন দু'চার দিন মনিব বাড়ীতে থাকতে পারো না।
বুড়ী-না এ কুঁড়ে ছাড়তে কষ্ট থাকতেও কষ্ট, বিশেষ বুড়াে মানুষ
মনিৰ বাড়ীতে থাকব, হঠাৎ কোন অসময় হতে পারে ? রাত্রে বাহিরে
বেরুতে গিয়ে কোথায় পড়ে মরব, দৃষ্টি কমে গ্যাছে, রাত্রে ভাল দেখতে পাই না, এ সময় কার গলগ্রহ হব! অসময়ের জন্যই বউ ঝির বাসনা করে। আর এ কুঁড়েতে বাবার চিহ্ন আছে, ঐ জায়গায় বসে তার কথা বলি, কাঁদি তাহ’তেও কিছু শাস্তি আছে, অন্য স্থানে মনও টেকে না, রাত হলেই বাড়ী বাড়ী মন করে। বুড়ো-তােমার দেখছি এখনও সেই জেদ আছে। বুড়ী—আমি তাে তাই আছি, জেদ আর কোথা যাবে আমায়, ছেলে শেষ সময় ওদের দেখিয়ে বলে গ্যাছে, মা তােরা উভয়ে উভয়ের অবলম্বন হয়ে থাকবি, বউকে ছাড়িস নি, এই ছেলে রইলো, একে যত্ন করে রাখিস তবে পরকালে সকলে জলপিও পাবে। আর তােমার মেয়েকে বলে গ্যাছে, মা রইলো দেখিস। বুড়ো-এত যদি অবিশ্বাস হয়, না হয় নাতীকে কাছে রাখ না ? বুড়ি—আমায় তো বলছ নাতী রেখে বউ ছাড়তে, আচ্ছা তার কি মত দ্যাখ, এ বয়সে সোয়ামী গ্যাল, তা সইলো, কাঁচা ছেলে ফেলে, বুড়ো শাশুড়ী ছেড়ে, সোয়ামীর চেনা সব ছেড়ে যেতে ওর প্রাণ চায় যাক্, আজ আমার বেটা নেই আমার সব জোর কি খাটবে ? বুড়ো—আচ্ছা বাপু রাগ করবার কি আছে ? মেয়ে কি একেবারে বাপের ঘর জন্মের মত ছেড়ে চলে আসে ? আচ্ছা তাকে একবার জিজ্ঞাসা করি, এই বলে মেয়ের নিকট মতামত জিজ্ঞেস করায় মেয়ে বলে বাবা, দেখতে ত সবাইকে ইচ্ছে করে, কিন্তু প্রাণে শান্তির আশা কোথা ? আর শেষ সময় য বলেছে তাত আমার শাশুড়ীর কছে শুনেছ, অতএব সে সব কথা, সব বন্ধন ছিড়ে কোথায় যাব? বুড়ো মানুষ, আমি ছাড়া, ওর কেউ নেই যদি কোথাও পড়ে মরে তো সকলে আমার অষশ গা’বে। আর খাশুড়ী ছেলেটাকে নিয়ে তবু ভুলে থাকেন, ছেলে ছেড়ে যাওয়ায় ১৪ শুকতারা আমারই বা কি শান্তি ? সমস্ত বন্ধন ছেড়েও যদি যাই তো আমার বা মন ভাল থাকবে কিসে, এ তবু ওদের কাজে নিযুক্ত থেকে অনেক সময় নিজের দুঃখের কথা ভুলে থাকি। বরং তুমি মাঝে মাঝে এসো এবং সবাইকে এক একবার আসতে বােলাে, আপনার লােক দেখলেও মনটা অনেক ভাল থাকে। বৃদ্ধ কন্যা ও বেহান উভয়েরই যাওয়া সম্বন্ধে অমত দেখে রাগত ভাবেই চলে গ্যাল। যাই হােক বাপু, পেমার শ্বশুরের এ সময় কন্যাকে নিয়ে যাওয়ার একটা জেদ অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়। তারপর পরস্পরায় শােনা গেল যে বৃদ্ধ মেয়ের নূতন ঘর কন্নার ব্যবস্থা করেছিল। তবে এটা জনরব কি না বলতে পারি না। যাই হােক, বৃদ্ধ মেয়ের বাড়ী আর বড় আসতাে না, তারপর কিছুদিন পরে তারও ইহলীলা শেষ হয়। সুতাং পেমাদের আর আপনার বন্দুতে কেউ রইলাে না। শাশুড়ী বউ খাটে খেটে খায় দায়, এমনি করে দু’বৎসর গত হলো। বলা বাহুল্য যে এখন পেমার বউকে মাঝে মাঝে সর্বত্র বেরু’তে হয়। পেমা বেঁচে থাকতে, বউ বড় হবার পর কোথাও সচরাচর বেরুতে দিতো না, কেবল বাবুদের বাড়ীতে আবশ্যক হ'লে যেতো। আর তার বেরুবার দরকার ও হতাে না। মাতা পু বাহিরের কাজ করতো, বউ ঘরে ভাত রান্না, ঘর নিকান, ধান সিদ্ধ প্রভৃতি বা গরীবের ঘরের কাজ সবই করত। এখন বুড়ী হাট বাজার করে এনে দেয়, তবে বুড়ীর অসুখ হলে হাট বাজারেও বউকে যেতে হয়, পেটের দায়ে লোকের বাড়ী কাজ করতে হয়। জল সন্ধ্যা ঘাট থেকে আনে ওআনতে এখনও আনে। বাহিরে যাওয়া আসার জন্য পেমার বউকে এখন প্রায় অনেকের চোখে পড়ে। ইহাদেরই জমিদার, বাবু হরতারণ বাঁড়ুয্যের কাহারী পশ্চিম দিঘীর সম্মুখে এবং গ্রামের বাহিরে। ঐ দিঘী খুব সু- হলে দুয়ে - শুকতারা G গভীর, জল বড় ভাল, বার মাসও থাকে । তবে গ্রাম থেকে একটু দূর হয় বলে সচরাচর বড় কেহ আসে না, যখন গ্রীষ্মকালে নিকটস্থ পুকুরের জল শুকিয়ে যায় সেই সময় ঐ দিঘীতে লােক বেশী জলের জন্য যায়। গ্রীষ্মকালে ঐ কাছারী বাড়ীতেই কাছারী বসে, কারণ খুব বড় বাগান তারও পর দিঘীর জলের হাওয়া। দেহ বেশ ঠাণ্ডা হয় তত গরম বোধ হয় না। সমস্ত দিন ঐ খানে থাকেন, রাত্রে বাস ভবনে আসেন। এই রকমে গরম কয় মাস কাটে । সুখী জমিদার মানুষ কষ্ট সহ্য কখনও করেন নি, করতে পারেন না। বাবুর সঙ্গে চরণ বাবু গােমস্তা সর্বদা থাকেন। তিনি খুব চালাক চতুর লেক, বেশ নরম গরম ভাব ও বেশ প্রভুভক্ত, প্রভু যা বলেন তৎক্ষণাৎ তাহা সম্পন্ন করে ফেলেন, জমিদারী কাজ তার মত কেউ বুঝতে পারেন না এবং তার মত সুবিধে অসুবিধে বুঝে কেউ চলতে পারে না। মােটের ওপর কথা, চরণ বাবু নইলে কর্তার একদণ্ড চলে না। হরতারণ বাবু কাছারী বাড়ী এসে পুকুরের সম্মুখের বারাণ্ডায় বেশ হাওয়া বলে তথায় বসতে ভাল বাসেন, সেখানে কখনও বসে গড়গড়ার নল মুখে দিয়ে তামাক খান, কখনও মােঝমার কাগজ দেখেন। কখনও জমিদারী কাগজ দেখেন, কখনও কারাে সঙ্গে গল্প করেন, কখনও চুপচাপ বসে সকলের মান করা, জল আনা, নিয়ে যাওয়া দেখেন। পুকুর পারে সমস্ত দিন কত জন কত কাজে আসে যায়, তাহা নিৰ্মা লােকের পক্ষে বসে একটা দেখার জিনিস বটে। কোন আর বয়সী মেয়ে ছেলে জল নিয়ে গেলে, একবার তিনি কাগজ পত্র পতে পড়তে বাড়টা উচু করে দেখে নেন। কমে পেমার বউ তার তীক্ষ দৃষ্টির পথ এড়াতে পারেনি। পেমার বউকে দেখে চরণ বাবুকে বল্লেন—হ্যা হে ও অল্প বয়সী সুন্দরী স্ত্রীলোকটী কে ? ওকে তো কখনও দেখিনি। চ। হুজুর, আপনার অঙ্গ। পেমা বাগীর বউ। আগেতাে বড় বেরুতো না, পেমা মরে যাবার পর ঘাটে পথে মাঝে মাঝে দেখি। বউএর চেহারাটী ভাত, পেমাও বিষম গোয়ার ছিল, তার ভয়ে ওর কি সর্বদা বেরুবার উপায় ছিল ? তাহলে ওর কি হাড় থাকতে ঠেঙ্গিয়ে গুড়ো করে দিতে, একটু এদিক ওদিক হলে অমনি মার লাগাতে। আপিন এর আগে আর ওকে দেখবেন কি করে? হা দেখবার মত রূপ বটে! গোবরে পদ্ম ফুটেছে, হাড়। বাগদীর ঘরে এতরূপ দেখতে পাওয়া যায় না। সেই জন্য পেমা আরাে এত সাবধান করতো। এই অবধি কথা তখন আমরা শুনলুম। তারপর অন্য সময় কি কথাবার্তা হয়েছিল তাহা বলতে পারি না। পরদিন থেকে চরণ বাৰু বুড়ীর বাড়ী যান, খোজ খবর নে। চরণ বাবুকে হঠাৎ বুড়ীর উঠানে দেখেই বুড়ীর প্রাণ উড়ে গেল, কারণ খাজানা পত্র আদায় ও হুকুম জুলুম ছাড়া উনি তাে যান না। বুড়ীর আবার সেই ভয় উপস্থিত হলো। বুড়ী বয়ে “এ যে চরণ বাবু কেন ? চরণ বাবু কিন্তু কোন নির্দয়তার ভাব দেখালেন না। বরং বুড়ী যার ভয় করছিল, তিনি তার বিপরীত আচরণ কয়েন। বে: দয়া ও সহানুভূতির ভাব প্রকাশ করে বল্লেন “দ্যাখ বুড়ি, তাের কোন ভয় নেই। তাের বউকে ঘাটে দেখে আমায় জিজ্ঞাসা কল্লেন ? ওকে আমি তাের.দুঃখের কথা সেই সুরে তাঁর কাছে সমস্ত বর্ণনা করায় তিনি তন দুঃখিত হয়ে আমায় বল্লেন-আমার অনাথা স্ত্রীলোক প্রজা এত কষ্ট পাচ্ছে তাতে এতদিন বলনি? সে বুড়ো মানুষ, এখনও কি খেটে খেতে পারে। আহা! শােকা তালা মানুষ পেটের দায়ে এই বয়সে খেটে মঙ্গচে। তাকে টাকা দিয়ে এসে, আর যখন মা অজৰ পশুর হবে, -- শুকতারা ১৭ তার মােচন করবার চেষ্টা করবে। তাকে বােলো তার যখন যা কষ্ট হবে জানাতে। আর তুমি ও তার খোঁজ খবর নিও এই কথা আমায় বলেন আর আপাতত এই ১০ টাকা দিতে বল্লেন । তুই এই নে, আবার দরকার হলে জানাস আমি এখন প্রায় অসব, হুজুরের আদেশ তো ফেলতে পারব না। এই বলে ১০ টাকার একখানি নােট বুড়ীর হাতে চরণ বাবু দিলেন। বুড়ী হরিষে বিষাদ অবস্থায় আত্ম বিস্মৃত হলে, আবার পেমার শােক নব ভাবে প্রবল বেগে উথলে উঠলো। সে কিয়ৎক্ষণ আর কিছু কথা বতে পানে। পরে কিছু আত্মসম্বরণ করে বল্লে “কে আমার কাঙালের বাপ মা এমন অসময় আছেরে ? আজ পেমার মা বুড়ীর খোঁজ করতে আসে ? বেশ, ধৰ্ম্ম অবতারকে বােলে আমার যা দরকার হবে তাকে জানাব। তিনি আমাদের কাঙালের বাপ মা, তাকে না জানিয়ে আর কাকে জানাব? এখন সাহস দিলেন যখন, তখন আর আমাদের দুঃখী কাঙালের অভাব হলে চাইতে লজ্জা কি? আমরা তােমাদের পাঁচ জনের ভরসাই যে করি, তবে এখন এইতে ঢের হবে। এখন যতক্ষণ পা’রব খাটব খুটব, তিনটে প্রাণ, বারমাস কার গলায় পড়ব? জোয়ান বউ, কঁাচা ছেলে একটি, আমার গলায় দিয়ে পালা’ল, এ আমার কোথায় রেখে সােয়াপ্তি পাই ? জোয়ান মেয়ে আমরা কাজ করুতে দি অন্যমনস্ক থাকুক। আমি দৃষ্টিতে রাখি আর পেমার বউ তােমাদের জমীতে তোমাদের অধীনে বাস করছে তােমরাও রক্ষি করবে। মানুষ শান্তি বাড়ী, কেবা ভয় করে, কেবা রক্ষে করে ? আর বুড়ী যখন মরবে তখন তদারক করে একটু বুড়ীর গতি ক'রে দিও, তা হলেই হবে রোজ রােজ ভদ্দর লােককে কি বিরক্ত করব ?” চরণবাবু বনে—“ওরে বুড়ি, তোকে সে জন্য লজ্জা পেতে হবে না, তােক একটু কেবল কথা বলে যাই, তুই এসব কথা কাউকে প্রচার শুকতারা করিনি, গ্রামের লােকতো ভাল নয়, হিংসে করে নানা কথা তুলবে।” বুড়ী বল্লে –“সে কথা কি ব’তে ? প্রাণ গেলেও নয়, গায়ের লোককে আমি জানি না।” চরণবাবুর অদ্ভুত সহানুভূতিতে বুড়ি গলে গেল। কিন্তু একবার ভেবে দেখলে না যে পেমা মরে যাবার পরে এই এক বৎসরের মধ্যে জমিদার তরফ থেকে কোন সহানুভূতির অবকাশ বা সুযােগ ঘটেনি। বুড়ির দুঃখে দুঃখিত হয়ে এতদিন পরে এই দুঃখী পরিবারের ক্রন্দন ধ্বনিতে জমিদার বাবুর দয়াদ্র উচ্ছসিত প্রাণ জেগে উঠল কেন তাহা বলতে পারি না । বলা বাহুল্য যে চরণ বাবু যতক্ষণ ছিলেন বুড়ির বউ বেরােয় নি। চরণ বাবু চলে গেলে বুড়ির বউ ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বুড়ি বললে,-সব গুলি ত ? বউ বল্লো শুনলাম ত । তবে এতদিন পরে এত উপযাচক হয়ে এত নয়। প্রকাশের মানে কি ? বুড়ি একটু বিরক্তভাবে বল্লে “তা ত জানিনা, ওরা বড় লােক, কত সময়ে কত কাজে বেস্ত থাকেন। সব কথা কি স্মরণ থাকে? না সব কথা সকল সময়ে শুনতে পান ? বড় লােকের কি আমাদের মতন সামান্যই একটা কাজ ?” বুড়ির বউ চুপ করে আপন মনে কাজ করতে লাগল। এই রকম চরণ বাবু প্রায় বুড়ির বাড়ীর দিকে যায় । কোন দিন হাতে একটা বড় মাছ, কোন দিন কিছু কঁাচা তরকারী, কোন দিন এক ঠোঙ্গা খাবার প্রায়ই যা হােক কিছু হতে থাকে। কখনও বুড়ির নাতীর জন্য শীতের গরম জামা, বুড়ির জন্য কম্বল, বুড়ির বউয়ের জন্য ধুতি, এই রকম এক এক দিন এক এক জিনিষ হাতে থাকে। বুড়ি শীতে কাজ করে বাড়ী এসে সন্ধ্যার সময় কম্বলখানা গায়ে দিয়ে আগুনের কাছে বসে বাঁচে এবং জমিদারের উদ্দেশ্যে ভগবানের কাছে কত মঙ্গল কামনা করে। বুড়ি নাতীর গায়ে গরম জামা পরিয়ে দিয়ে বলে, জমিদারের দৌলতে ব:ছা এখন গরম জামা গায়ে দিয়ে ।
শুকতারা চল। আহা! বাপ, গিয়ে ত তার গা ঢাকতোপইনা, পেটে খেতে পাইনা ত জামা জুমি করব কোথা থেকে ? আবার দুর্ভিক্ষ সে বছর। দেখা দিলে সুতরাং বুড়ির আর কষ্টের সীমা ছিল না ; বাবুদের বাড়ীর কাজের সেরূপ সুখ ইদানী ছিল না। কতদিন থেকে গিন্নী অসুখে শষ্যাগত, ওঁকে নিয়ে সকলে ব্যস্ত। সেই কষ্টের সময় চরণবাবু উদয় হয়ে অনেক কষ্টের নিবারণ করতে লাগলেন। বুড়ির আবার কিছু অভাব মােচন হ’ল : কিন্তু গ্রামের লোকের চক্ষে এটা অসহ্য হল, তাদের সঙ্কীর্ণ মনে নানা প্রকার সনে উপস্থিত হল। অনেকেই আলোচনা করে, বুড়ি শেষ বয়সে টাকার লােভে ঘৃণিত বৃত্তি অবলম্বন করেছে । কেউ বলে, বাবা ঐ বউটিকে সােজা মনে করেনা। ঐ যে চুপি চুপি কথা কয়, এক গলা ঘােটা দিয়ে কায়েৎ বামুনের মেয়ের মত ঘাটে পথে চলে, ওর ভেতর ঢের খেলা খেলে। এই সব নানা অশ্রাব্য আলােচনা গ্রামের মধ্যে হতে লাগল। জমিদার বাবুর চরিত্রের সেরূপ সুনাম কখনও ছিল না তার পরে চরণবাবুব নিত্য নিত্য সন্ধ্যার ঘােরে আনাগােনা করা এটা মানুষের সন্দেহের স্থল বৈ কি। ক্রমে ক্রমে বুড়ীর মনিবের কাণে একথা পৌছিল। বুড়ীর মনিব তখন সামান্য কিছু ভাল আছেন । তিনি তখন বুড়ীকে ডাকিয়ে বল্লেন “হারে এসব কি কথা শােনা যায়না ?” ও রকম আচরণ করলে আমার বাড়ী কাজ করা পােষাবে না। আমি তোদের চিরদিন ভালবাসি, তোদের গুনে, যেটা নীচু জাতের পক্ষে দুর্লভ। তোদের যে গুণে ভালবাসি তা তােদের মত নীচু জাতের ধরে দেখতে পাওয়া যায় না। তাই বুড়ো হয়েছি, চোখে ভাল দেখতে পাস না, ভাল কাজ করতে পারিস না, বাসনে সড থাকে, পােড়ায় কালি থাকে, কাজ তাড়াতাড়ি করতে পারিস, না, তবু তাের ওপর দয়া করে ২০ শুকতারা ছাড়তে পারি না। মনে ভাবি, আহা! ছেলেটি মারা গেল, কি করে । চলবে ? যা পারে কিছু কিছু করুক, তােকে সাহায্য করবার জন্য আমায় অনেক কাজ সময় সময় সেরে নিতে হয়, ঝি চাকরের কাজ পরস্পর বিনা প্রত্যাশায় কেহ সেরে নিতে চায় না। কিন্তু তােমার এমন নীচ প্রবৃত্তি হলে আর আমার এমন অসুবিধা ভোগ করে তোমায় রাখবার দরকার কি? আমার বাড়ী কাজ না কল্লে তোমার তাে অভাব হবে না, আর আমরা ও নীচ জাতীয় ঝি, নীচ প্রকৃতির শক্ত পােক্ত লোক টের পাব। সেজন্য তােমার সহানুভুতি দেখাবার কোন দরকার দেখি না। বুড়ী মনিবের তিরস্কারে কেঁদে ও মাথায় হাত দিয়ে বল্লে—“ওমা কে আবাগী একথা সাতখানা করে তােমার কাছে লাগিয়েছে, যে গা, আমার সুখ দেখলে সকলের চোখ টাটায়, তুমি ভালবাস বলে কারো তা সহি হয় না, তাই তােমার কান ভারি করেছে, আমার এত কষ্ট দেখেও, কারো কি সাধ মেটেনি ? আমি তােমার পা ছুঁয়ে ভগবানের নাম করে বলতে পারি, আমি কোন খারাপ কাজের মধ্যে নই, পেমার লােকে আমার দেহ দগ্ধ হচ্ছে, আমি আর বেশী রােজগার করে কোন সুখ লাভ করূতে পাব ? পেটে না দিলে নয়, তাতে তোমাদের বাড়ী থেকে চলে যাচ্ছে, পেমার বউ, পাছে আমার বুকের মাঝে অধ্যায় কাজ করে সেইজন্য তার বাপের বাড়ী আমি পাঠাইনি, আর আমি সেই কাজ করব ? পেমাকে খেয়ে ও আমার পেট ভরেনি? এখনও টাকার লোভ করব? গি—তাতো বিশ্বাস হয় না, তবে ‘মন না মতিভ্রম,” ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট কথায় বলে, লােকেও বলে নানা কথা, চরণবাবু তাের বাড়ীতে যায় কেন? জমিদার বাবুর নামে তো ভাল কথা শোনা যায় না, আর চরণবাবু তার দক্ষিণ হস্ত, এরূপ এবার আছে।
শুকতারা বু-ওমা অন্নদাত, আশ্রয়দাতা দীক্ষা ও শিক্ষা গুরু বলে পিতার তুল্য, তােমরা বড়লােক, কোথায় কি কর না কর সে খবরে আমাদের দরকার কি? আমাদের দয়া করে দুটে! কথা কইলে বা সাহায্য কল্লেই আমরা জীবন ধন্য মনে করি। আমরা গরীব, ছােট জাত, তােমাদের চরণ দর্শন পাই, এই আমাদের ভাগ্যি, আমরা না খেতে পেলে কেউ ডেকে জিজ্ঞেস কি করে মা ? গরীবকে সবাই ঘেন্না করে, আমি তার জমীতে বাস করি, পেমার এত গুণ ছিল, তাকে সবাই স্নেহ করতে, তার বুড়ো ম', বউ ছেলের কষ্ট পাচ্ছে বলে জমিদার বাবু খোঁজ পেয়ে দয়া করে কিছু জিনিষ পাঠান, আমি মরা ছেলের নাম করে বলছি আমায় কোন মন্দ কথা বলেনি। গিন্নী বুড়ীর কথার কিছু আশ্বস্ত হলেন বটে, কারণ বুড়ীদের উপর তার ধারণা বরাবর ভালই ছিল, তবে চরণ সংশবের কথা শুনে চট’ গেছলেন এখনও তত সস্তুষ্ট হলেন না, কেবল বল্লেন “দেখি সাবধান, ওয়া তত সুবিধের লােক নয়” বুড়ী বল্লে 'সে কথা কি বতে। তারপর বুড়ীর মনিবের রােগ ক্রমশঃ বৃদ্ধির দিকে চলতে লাগল, এজন্য তাঁরা সপরিবারে দীর্ঘকালের জন্য পশ্চিমে গেলেন। বুড়ীর আরাে কষ্ট হলো, যদিও বাড়ীতে আরো লােক থাকায় বুড়ীকে কাজ করতে যেতে হতাে কিন্তু সে রকম দয়া করবার লােক রইল না। বুড়ীর মনিব যাহা অনুমান করেছিলেন তাহা ক্রমশ: কাৰ্যে পরিণত হলো।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
চরণবাবু একদিন সন্ধ্যার সময় এসে দাঁড়ালেন।
বুড়ী মনি।
চলে যাবার পর চরণ বাবুকে দেখে বুড়ী যেন আরাে হাতে চাদ পেলে।
বুড়ী বল্পে-“এই যে চরণবাবু তুমি, আপনি এসােনি কেন ? তাই
ভাবছিলাম, আমাদের কাঙ্গাল গরীবের খোজ নেবে কে এমন আছেন
বল ? মনিব হ্যালো, তাও চলে গালে। আমাদের বরাতে বেঁচে
ফিরবেন কিনা তাও জানিনা, আপনাকে দেখে কত সাহস হয়।”
এই বারে চরণবাবু সুযােগ পেয়ে বল্লেন—দ্যাখ, বুড়ি, আমরা
ভাবি তাের একটা আশ্রয় চাই, বুড়ো বয়সে যদি মরি, তােকে শিয়াল
কুকুরে ছিড়বে কি? ব্যাটা যখন গ্যাল, বউকে ভরসা কি ?
ও তাে মরতে পারে। তার চেয়ে তুই এক কাজ কর, তাহলে আমিও
নিষ্কৃতি পাই, তার ও দুঃখ ঘােচে।
বুকি করতে বল ?
চ—চারিদিক তাকিয়ে একটু স্বরটা খাটো করে এবং গলাট।
একটু ঝেড়ে নিয়ে বল্লেন, “দ্যাখ তাের ছােট জাত, তোদের ধর্মের
এবং সতীত্বের এত বাঁধা বাঁধি নিয়ম নেই, তবে আর মিছি মিছি কেন
কষ্ট করে ময়চিস, তাের বউ জমিদারের রাণীর মত থাকবে, তুইও
বসে বসে খাবি, কত সুখে থাকবি, একটা এত
অভিভাবক, লােকে সহজে কি ছাড়ে ?
বুড়ী সেই কথা শুনে একবার সুপ্ত সিংহিনীর ন্যায় গর্জে উঠে
বল্লে “কি বল্লি, আমরা ছােট জাত বলে আমাদের কি ধর্ম, কর্ম নেই ?
শুকতারা ধৰ্ম্ম কি কারো বাধা আছে নাকি ? এত বড় কথা! আমরা ধৰ্ম্মে জলাঞ্জলি দিয়ে তোমাদের সাহায্য চাই না। ভগবান তোমাদেরই ? আমাদের নয় ? যে ধর্ম পালন করে চলতে পারে সেই পরলােকের কাজ করে। বামুন হয়ে অনাচার কল্লেই বুঝি সে পরকালে তরে যায় ? আর নীচ জাতি বুঝি, সুকাজ কল্লেও সে শুদ্ধ ও সচ্চরিত্র হতে পারবে না ? ভগবান তাকে কোলে করে নেবেন না ? হাড়ী বাগদী তার ছেলে নয় ? তােমরা যত অশুচি ও অপবিত্র হও ভগবান তােমাদের কোলে নেবার জন্য হাত বাড়িয়ে বসে আছেন ? আমরা এত কাল দুঃখ কষ্টে দিন কাটালাম আর শেষ বয়সে তােমাদের প্রভুর পায়ে ধৰ্ম্ম কৰ্ম্ম সপে দিয়ে রাণীর মত সুখ ভােগ করতে হবে ? এইজন্য বুঝি তুমি আনা গােনা কর, আমরা তা আগে বুঝিনি, কিন্তু মা বলেছিল, “ওরা লােক সােজা নয় সাবধান থাকিস” শেষ তাই হলো। চরণবাবু একটু একটু হেসে বল্লেন—“বুড়ি তুই চটিস কেন? এই ৫০০ টাকা নে” এই বলে বুড়ীর হাতে ৫০ টাকার একখানি নােট দিলেন। মনে করেছিলেন সামান্য জিনিস নিয়ে বুড়ীর মন উঠেনি, লম্বা টাকা দিলে রাজী হবেনা, আজ চরণবাবু একটা হেস্তনেস্ত করে যাবেন তাহা প্রভুর কাছে স্বীকার হয়ে এসেছিলেন, আর বলেছিলেন—“হুজুর! টাকায় সব হয়, লম্বা টাকা আমার হাতে দিন, বুড়ী যদি প্রথমে অসম্মতি জানায়, তাকে টাকার তােড়া দিয়ে নিশ্চয় কার্য সমাধা করে আসব।” কিন্তু চরণবাবুর সে ধারণা মিথ্যা ও চেষ্টা ব্যর্থ হলো, বুড়ী নােট খানা চরণবাবুর পায়ের কাছে ছুঁড়ে ফেলে বলে—“তুমি এখান থেকে শীঘ্র যাও নতুবা ভালাে হবেনা, আমার জাত ভাই শুনলে জাতে ঠেলবে, খেতে পাইনা আবার জাতে উঠবার টাকা কোথায় পাব? চ—আরে বুড়ি, ক্ষেপিসনি, ক্ষেপিসনি একটু মন স্থির করে শােন্, আর একখানি ৫০০ টাকার নােট বুড়ীর হাতে দিয়ে বয়ে—“কত সুখে থাকবি, এত সুখ ছাড়িসনি, ব্রাহ্মণের কথা ঠেলিসনি, কথাটা শােন, তাের ভালর জন্য বলছি, পরে পস্তাবি। চরণবাবুর কথা শুনে বুড়ীর রাগের মাত্রা ক্রমশঃ বাড়তে লাগল, সে দ্বিতীয় নােটখানাও ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বল্লে –“এতো, বড় আলা ঘটালে দেখচি, এ যে নড়েনা, ও বউ!” বউ এইবার ঘোমটা তুলে রণ রঙ্গিনী মূর্তিতে এক বাঁশের লাঠি হাতে করে বেরিয়ে বলে-“পাপিষ্ট। এখান থেকে শীগগীর দূর হ, এমনি করে বুঝি তােরা লোকের সর্বনাশ করে বেড়াস ? টাকার লােভ দেখাতে এসেচি? ও লােভ থাকলে টের টাকা রােজগার করতে পারতাম। মনে করিচি আমাদের কেউ নেই, যা ইচ্ছা তাই করবি। এই বাঁশ বনের মধ্যে কুঁড়ে ঘরে চেঁচালে, কেউ শুনতে পাবে না। কিন্তু ওরে, নির্বোধ ! একজন সকলের ওপরে আছেন, তিনি এ বিপন্নের রােদন শুনতে পাবেন, আর আমরা হাড়ী বাগদী ঘরের মেয়ে, কষ্ট সহ্য করা অামাদের অভ্যাস আছে, আমরা পুরুষের মত বল ধরি, এ সময় সময় পুরুষের কাজও সমাধা করতে পারি, আমাদের দেহ এত দৃঢ় যে সামান্য ধাকায় কাতর হবার নয় । আমরা মাটী কাটতে পানি, বাঁশ কাঠ ইত্যাদি কাটতে পারি, মােট বইতে পারি, বেড়া বাঁধতে, গরু চরাতে, মাঠের কাজ করতে, কিছুই আমাদের আটকায় না, কোন বলের কাজ আমাদের অসাধ্য নেই, চিরদিন কষ্ট সহ করে, হাড় কঠিন হয়েছে, বড় লোকের মত ননীর দেহ নয় যে আতস লাগলে গলে যাবে। এই বাঁশের লাঠিই আমাদের হেতেল, এই আমাদের সম্বল, এর ভরসায় আমরা একা বাস করি, ভগবান আমাদের নিরাশয়ের বাহুতে আত্মরক্ষার বল দিয়েছেন, তােকে কিসের ভয়? এখনি যা নতুবা তাের সঙ্গে নেই।” চরণবাবু এতক্ষন পরে রেগে থর থর করে কাপতে কাপতে গেলেন। আর বলে গেলেন অ'জ রাত্তিরে যেমন করে পারি পলিম =
s, 339
শুকতারা
নেব।
দীঘির কাছারি বাড়ীতে তােকে হাজির করতে না পারি তাহলে আমি
অব্রাহ্মণ। আমাদের একশত লাঠিয়াল এমনিতেই নিযুক্ত থাকে
জানিস্ না? হুজুরের সব ঠিক আছে, আমি বললাম, ভাল করে বলে
দেখি এক বার, সে সব দয়ার এই ফল । আমায় অপমান, এরশাধ
অামাদের জমীতে বাস করে তুই কোথায় রক্ষা পাবি ?
ফিরে গিয়ে পরিশেষে হরতারণ বাবুকে এই ঘটনা জানালে পর
তিনি বললেন “কাজটা ভাল করনি, চটচট করলে কোন কাজ সমাপ।
হয় না। আজ ফিরে এসে আবার দু’চার দিন পরে গেলেই হত।”
তুতিয়ে পাতিয়ে এ কাজ করতে হয় । এ কাজে লাথি ঝাটা
খাওয়াই অঙ্গের আভরণ। ক্ৰমে মনট। নরম হ'ত। সবুরে মেওয়া
চ“হুজুর! আপনি যে উতলা হলেন ?
ই-আমি কি তােমায় ঝগড়া করতে বলেছিলুম ?
চ-আজ্ঞে, বড় ভুল হয়েছে। যেমন করে পারি বেটিকে আজ
আপনার কাছে হাজির করব, নতুবা আমি অব্রাহ্মণ, যার একশত
লাঠিয়াল অনবরত হাজির, তার আর ভাবনা কি ? ও বেঢ়ীদের আমি
ঢের দেখেছি, ওদের পেটে ক্ষিদে, মুখে লাজ । পাল্কি করে, আদর
করে রাণীর মত বরণ করে আনার বােধ হয় ইচ্ছা, যে লােকের কাছে
বড়াই করবে ‘মামাদের জোর করে নিয়ে গ্যাছে। এ ই বলে চরণবাবু
লাঠিয়াল আনার উদ্দেশ্যে গমন করলেন।
BAN
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। পৌষের ঘোর অন্ধকার রাত্রিরে শীতে জড়সড় হয়ে সমস্ত জীব গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত হয়েছে, কোন সাড়া শব্দ নেই। কেবল নিশির শিশির টুপ টাপ করে শুকনা পাতার উপরে পড়ে, শুকনা পাতার মড় মড় শব্দ হচ্ছে মাত্র ৩ মাঝে মাঝে দুটো চারটে পাতা ঝরে পড়ছে। জগৎ সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ, কেবল অসংখ্য যােজন দূর থেকে তারকা মণ্ডলী একবার চোখ তাকাচ্ছে আবার ঘুম ঘোরে চোখ যেন মুদিত করছে। ঐ তারাগুলি যেন নিদ্রিত পল্লী মাঝে প্রহরী স্বরূপ দাড়িয়ে, আর কেই বুড়ির কুঁড়ে ঘরে পাহারা দেবার লোক এ জগতে নেই। বুড়ি গভীর নিশীথে একবার উপর দিকে চেয়ে কার উদ্দেশ্যে দু’ ফোটা অশ্রুজল ফেলে চকু দুটা মুছে বললে-বো! সব বাধা হল’ ত? শীগগীর চ, বুড়ো মানুষ, চোখে ত দেখতে পাই না, তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারব না, আমায় নিয়ে বিপদে পড়বি । বই—সব ঠিক হয়েছে, এই বাঁশের লাঠির একদিক ঘুমি ধর আর একজিক আমি ধরি, আমি ত খুব চলতে পারি, লাঠির শেষভাগ ধরে তুমিও আমার পেছু পেছু জোরে চলতে পারবে। ভয় কি! বাবুদের বাড়ী বৈশাখ মাসে কৃষ্ণের শতনাম শুনি, ‘কাঙ্গালের ঠাকুর।' একজন কাঙালের ঠাকুর ত তাহলে আছেন, তিনি এই অদিনে কাঙালকে রক্ষা করবেন। আমায় যেন কে নতুন বল দিয়েছেন, প্রাণে ভয় ভীতি কিছুই নেই। আমার মনের কেমন একটা আশ্চৰ্য্য পরিবর্তন এসেছে, অদ্ভুত সাল হয়েছে, জীবনে এ রকম মনের ভাব কখনও হয়নি। তুমি শীম চল, আর দেরী করােনা। গােটা কতক ভাজা এইমিমের পাতা মাড়িবেন না শুকতারা ২৭ বাসন, আর ছেড়। কঁাথা দু'খানা, চারখানা ছেড়া কাপড়, কিছু চাল, একটু খেজুরে গুড়, দুটী মুড়ি, আর গােটা দু’চার পয়সা একটা কাপড়ের কোনে বাঁধলে । আর চরণবাবু কাপড় চোপড়, কম্বল যা দিয়েছিলেন ত। এই কুঁড়েতে পড়ে রইল। বউ পোটলাটা কাধে ঝোলালে ছেলেটাকে কোলে করলে। আয় সেই বংশ যষ্টির অগ্রভাগ বুড়িকে ব’ললে ধর, বুড়ি তুলসীতলা থেকে পেমার অস্থির তড়িটি খুঁড়ে বের করে নিয়ে, গঙ্গায় দিবার আগে দু ফোটা মাতৃস্নেহা ফেলে পবিত্র গঙ্গাধারায় ভাড়টি অভিষিক্ত করে নিয়ে হাতে ঝুলিয়ে বুড়ি বধুর হস্ত সংলগ্ন যষ্ঠি ভর করে চলল। সােত্তর বৎসরের বুড়ি আজ পঁয়ষট্টি বৎসর বাদে এই কুঁড়ে ত্যাগ করে চলল। পাঁচ বৎসর বয়সে এই কুঁড়েতে বুড়ি ঢুকেছিল। এই কুঁড়েতে ও এই উঠানে বুড়ি কত সুখ দুঃখ ভোগ করেছে। কতদিন চোখের জলে এই মাটা সিক্ত করেছে আবার পেমার বিয়ের দিন এই মাটীতে কত লােকের পদচালনার ধুলা পড়েছে। কত তেল হলুদ পড়ে কাদা হয়েছিল। কত কথা বুড়ির একে একে মনে পড়ে চোখের জলে অার পথও দেখতে পায় না। পেমার মৃত্যুর জায়গায় পেমার জন্য কেঁদে বুড়ি সেইখানেই আঁচল বিছিয়ে শুয়ে দেহ মন হাল্কা করত। আর মানুষের পীড়নে বুড়ির সে সাধনার স্থানটুকুও ছাড়তে হল। কালের শাসনে ছেলে হারাতে, জমিদারের তাড়নে দেশ ও পৈত্রিক ভিটে ছেড়ে দেশত্যাগিনী হয়ে যেখানে চক্ষু ৰায় চলতে আরম্ভ করতে। বুড়ির মর্মান্তিক রােদনে আর কে এ রাত্রিতে সমবেদনা প্রকাশ করবে? ঝি ঝি পােকাগুলি ঝি বি করে বুড়ির সঙ্গে সমবেদনা জানালে। গ্রামের জঙ্গল থেকে শিয়ালগুলি টা হয়া ট্যা হয়। করে ডেকে বুড়ির দুঃখ কাহিনীকে হঁ্যা বলে সম্মতি জানালে। আর এই গভীর অন্ধকার রাত্রে বুড়ির দেশত্যাগ কেউ খালে না দেখলেন ৬ পঞ্চম পরিচ্ছেদ। সে রাত্রে বুড়ির পলায়নের পর চরণবাবু দশ জন লাঠিয়াল ও এক পানি পাল্কী নিয়ে এসে দেখলে বুড়ির শূন্য ঘর পড়ে আছে, কেবল তার দেওয়া সেই কম্বল ও গাড়ী প্রভৃতি ঘরের কোনে জড় করা আছে। চরণবাবু একে একে তুলে সেগুলি দেখলেন। তার দেওয়া জিনিষগুলি সবই গুনে গুনে রেখে গ্যাছে। জমিদার বাবুকে খবর দিলে, জমিদার একেবারে দীর্ঘ নিঃশষ ফেলে শয্যায় শুয়ে পড়লেন এবং বল্লেন “তোমারই এই অকারণ ভয় দেখানর জন্য এই কাণ্ডটি ঘটল। হাতের শিকারটি পাল।” অতিবুদ্ধির গলায় দড়ি। মূখর দ্বারা কোন কাজ সুশৃঙ্খলে হয় । বিদ্বান্ শক্ত ভাল তবু মূর্খ বন্ধু ভালনা! চরণবাবু বাড়িয়ে মাথা চুলকাতে লাগলেন-এবং বললেন “বাব', বেটিদের কি সাহস এই অন্ধকার রাত্রিতে কোথায় পালাল ! ওদের চরণে দণ্ডবৎ। আপনার চিন্তা নেই আমি শীঘ্রই অপর শিকারের চেষ্টায় রইলাম।” যাহােক আমার জমিদার বাবুর কথা নিয়ে আলােচনা উদ্দেশ্য এখন নেই। এখন এই অনাথা নিরাশ্রয় স্ত্রীলােক দুটীর অনুসন্ধান করি । ইহারা দুই শাশুড়ী বউ অবিশ্রান্ত সমস্ত রাত্রি পথ হঠতে লাগল, কোন পথ ধরবে কোন দিকে যাবে, সে দেশের নাম কিছুই স্থির করে বেরােয় নি। হঠাৎ বজ্রাঘাতের ন্যায় বাক্য শুনে অবিমৃশ্যকারী ন্যায় বেরিয়ে পড়েছে ভাবার সময় পর্যন্ত পায়নি, তারা আরাম গতিতে, এই অচেনা, অজানা, উদ্দেশ্যবিহীন পথে ক্রমাগত চলে যান এ তাড়নার সাক্ষ্যমাত্র শুধু সেই ব্ৰহ্মাও ঈশ্বর।
শুকতারা ইহারা ক্রমাগত সমস্ত রাত্রি অবিশ্রান্ত কাটিয়া ১০ ক্রোশ পথ অতিক্রম করে মুর্শিদাবাদ সোজা গঙ্গাধারে এসে পৌছিল, রাত্রে ভয় হচ্ছিল, ঐ বুঝি আসে, ঐ বুঝি ধরে, এই ভেবে দ্রুত গতিতে এসে বৃড়ী হাফিয়ে পথের ধারে বসে পড়ল। তখন রাসূৰ্য্য গঙ্গাদেবীর গর্ভ থেকে ক্রমশঃ প্রকাশ হয়ে লাল টুকটুকে মুখখানি বাড়াছেন, তঁার হাসির রেখা সমস্ত শস্য ক্ষেত্রে এবং আম্র শাখায় শাখায়, পাতায় পাতায়, গঙ্গার স্বচ্ছ রির উপর যেন ছড়িয়ে পড়ে অপূর্ব শােভা ধারণ করেছে,-গঙ্গাদেবী যেন নব প্রসূততরুণ রবিকে বুকে করে সােহাগ ভরে চলে যাচ্ছেন। প্রত্যুষের শান্ত স্নিগ্ধ বায়ুতে জীবের দেহ মন শীতল হয়, উল্লাসে পক্ষী- কুল সমস্বরে বৃক্ষের উপর থেকে প্রভাতী গেয়ে উঠলো, গাভীগুলি মাঠে চছে, মাঝে মাঝে গরুর গাড়ী নিয়ে কৃষকরা ধান কাটতে দু’চার জন যেতে আরম্ভ করেছে মাত্র। পৌষের প্রথমে ধান কাটা প্রায় হয়ে গ্যাছে, সেই বিশাল, বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত্ৰ শুন্য বুকে পড়ে আছে। বৃক্ষপত্রগুলি ঝরে গিয়ে শুষ্ক কাষ্ঠবৎ বৃক্ষগুলি দাড়িয়ে রয়েছে। বুড়ীর সৈন্য, দুঃখ দেখে যেন অফ প্রাণে বঁাড়িয়ে বুড়ির ভরসার স্থল স্বরূপ। শূন্য মাঠ বলে, ‘বুড়ী তুই কি বলে কাদিস ? এই দ্যাখ আমিও শূন্য প্রাণে, শূন্য বুকে পড়ে রইহি। ছয়মাস যাবৎ যাদের বুকে করে কত কষ্ট সহ্য করেছি। বৃষঙের পদভর লাঙ্গলের সুতীক্ষ অস্ত্রধারের কর্ষণ সহ করেছি, মইএর চালনা সহ করেছি, রোদ বাতাস জল যাদের জন্যে বুক পেতে ধরে রেখেছি তারা, আজ আমায় বক্ষ ছিন্ন ভিন্ন করে আমায় একা ফেলে ছত্র অঙ্গ হয়ে সব নানা স্থানে চলে গ্যাছে। একবার আমার অবস্থা কেহই ভাবেনা। তাই বলি দ্যাখ, পৃথিবীর কিছুই স্থায়ী নয়।”
শুকতারা বুড়ি দুর্ভাবনায় জড়িত ও পথশ্রাতে ক্লান্ত ইয়ে বৃক্ষতলে ব'সে প্রভাতের ঠাণ্ডা বায়ুতে তার ক্লান্তি কত দূর হ’ল এবং প্রভাতের মনােরম প্রকৃতির শান্তিময়ী দৃশ্য দেখে কতক আশ্বস্ত হল। মােটর উপর কিছুক্ষণের জন্য নিজে দুঃখ কষ্টের কথা ভুলে গেল। মানুষ যতই প্রপীড়িত হােক কিছু পরিবর্তন দেখলে ক্ষণকাল তাহা দেখে কিছু অন্যমন হওয়া স্বভাবসিদ্ধ। যাহা প্রকৃতিগত বুড়ির সেই অবস্থা হ'ল। বুড়ি খানিক পরে অচেনা পথিক একজনকে জিজ্ঞাসা করলে-- এটা কোন গা? গঙ্গার ওপারেই বা কোন গা ? কোথায় যাবার রাস্তা গা ?” পথিক—তােমরা কোথায় যাবে তা ঠিক করে বেরােওনি ? গাঁয়ের নাম জাননা ত এলে কি কত্তে ? বুড়ী--ওগাে বড় ব্যস্ত হয়ে বেরিয়েছি, গাঁয়ের নাম ধাম কিছু জিজ্ঞাসা করে বেরোয়নি । করেছিলাম গঙ্গাপারে গিয়া মাটী কাটব, সেখানে আমাদের গার অনেকে যায়। প–ওগো এটা আজিমগঞ্জ, এপারে খাগড়া ঘাট, ওটা মুর্শিদাবাদ জেলা। মুর্শিদাবাদের চেয়ে রাজশাহী জেলায় মজুরী বেশী। বু -না বাবু বুড়ো বয়সে গঙ্গার ধারই ভাল, ঐখানেই কাজ করব, ম’লে গঙ্গাজল একটু মুখে দেবে ত, তবে বেশী দূর নয়, গঙ্গাপার হলেই গাঁ পাব ? হ্যা বলে পথিক গন্তব্য পথে চলে গেল। বুড়ি ও বউ গ) গর্তে নেমে গঙ্গাদেবীকে প্রণাম করে বল্পে মাগো সকল বালা যন্ত্রনা কবে জুড়োবে ? বুবুড়ী বলে “অনেক দিনের পাপ তাপ তােমার জলে ধুলাম। মা এ জন্মে ত আর কিছু পাপ করিনি। কেবল এক আধবার দায় হতে দু'চারটে মিথ্যে কথা কয়েছি। তাতে যদি আমার এই শারি বিধান করে থাকিস, কি পূর্ব জন্মে যদি কিছু উৎকট পাপের এই মনে ভকতার প্রতিফল দিয়ে থাকিস, তুই পতিতপাবনী আমার সব পাপ ধুয়ে নে, আর এই নে মা আমার পেমার অস্থি গুলি, বুকে করে রেখেছি তাের গর্ভে দেব বলে। তুই তাকে কেড়ে নিয়েছিল। তার অস্থিগুলিও তাের বুকে ফেলে দিয়ে নিশ্চিন্ত হব, তুই তার পরকালে সুখশান্তি দিবি : তাের শীতল পবিত্র জলে যে দেহ মন ঢালতে পারে, তার কি মুক্তির তাবনা? আমার নিকট অপেক্ষা তাের কাছে সে পরম সুখ ভােগ করবে, এই সানায় আমি ধৈৰ্য্য ধরে আছি। আমরা গরীব আমার কত সাধের পেমা, সে ভাল খায়নি, ভাল পয়েনি, কত দুঃখ প্রাণে হ'তে, তাের কোলের চেয়ে এত সুখ কোথায় পাবে?” এই বলতে বলতে বুড়ী যেন জড় পদার্থবৎ কিছুক্ষণ জলে নিস্তব্ধভাবে গঙ্গার স্রোতের গতি দেখতে লাগল। পেমার অস্থির হাড়ি ভাসতে ভাসতে নয়নের অগোচর হয়ে গেল। বুড়ীর বউ ছেলেকে স্নান করিয়ে নিজে স্নান করলে, শেষ দেখে বুড়ী তখনও ওঠ বার নাম করে না, একভাবে একদৃষ্টে বাড়িয়ে আছে। তখন বলে “ওগাে এসােনা। আর কতক্ষণ কাঠের পুতুলের মত বাড়িয়ে দেখবে, অমন করলে কি আর এ জন্মে পাবে ? বুড়ী নির্বাক অবস্থায় জল থেকে উঠে গা মাথা মুছে ভিজা কাপড়খানা রেখে শুকনা কাপড় পরে গাছতলায় বসে বল্লে—“ছেলে দে আর তুই সব ভিজে কাপড় বাসের ওপর শুকুতে দে।” বউ সেই দুর্বা ঘাসের ওপর আপনাদের চির মলিন বস্তুগুলি ছড়িয়ে দিলে পর বুড়ি বলছে, হারে ছেলেটাকে কিছু খেতে দে? বট-হা দিই বলে একটি পুঁটলি থেকে কতকটা গুড় ও মুড়ি বার করে একটি বামিতে করে ছেলের হাতে দিলে। ছেলে সমস্ত রাত্রি কুং পিপাসায় কাতর হয়েছিল কিন্তু মা ও পিতামহীর এরূপভাৰ দেখে সে শিকার হয়ে অনুভব করেছিল একটা কিছু অমঙ্গল ঘটে থাকে।
শুকতারা দিতে লাগল । এই ভেবে সে ভয়ে নিস্তব্ধ ছিল। কেবল টুক টুক করে একবার মার দিকে একবার বুড়ির দিকে চেয়ে দেখছিল। অন্য সময় কত আবদার বায়না করে, আজ তার মুখে কোন বুলি নেই, মার দেওয়া মুড়ি গুড়টি পেয়ে মার হাত থেকে ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে তার ওপর তার ওপর মুখে গ্রা তুলে তখন শিশু হয়ত মনে করলে মা যখন আবার দিচ্ছে তখন ভয় ভাবনা যা ছিল গ্যাছে । তারপর বুড়িকে এক বাটী মুড়ি ভিজিয়ে খানিকটা গুড় দিয়ে খেতে দিলে। বুড়ি বল্লোরে আমারও আছে ? কালত ঘরে কিছু ছিলনা, তারপর হঠাৎ পালিয়ে আসতে হলো কিছু কেনাও হয়নি। দোকান পসার ও কাছে কিছু দেখছিনা, কাজেই তােকে কিছু বলিনি। মাগো মেয়ে আর ত দাড়াতে পারিনা, শেষে গাছ তলায় বসে পড়লাম, সমস্ত রাত দেীড়েছে আর কিছু খাইওনি, এখন যেন মা, পা ভেঙ্গে পড়ছে, বুক ও জিব শুকোচ্ছে। শোকের জ্বালায় ও ক্ষুধার জ্বালায় এক হয়ে অসহ্য কষ্ট হচ্ছে, কাকে বঙ্গব মা? পেমা গেল কিন্তু ক্ষুধা তৃষ্ণা ত গেলনা, পেমা যদি এ গুলি আমার নিয়ে যেতো, তবে আমার এত কষ্ট হতােনা। এ যে মা ক্ষুধা তৃষ্ণার সময়, পেমার নাম করে কাঁদতেও পারিনা, মা সব শুকিয়ে যায়, সব ধুলার মত, বড়ি মত, সমস্ত নলিতে নলিতে, শিরায় শিরায়, ফরফর উঠে, সব এনে পুড়ে যায়। তপ্ত বালির ঘর্ষণের মত যাতনা দিয়ে ছেড়ে যায়, রক্ত পড়েনা ও ফেটে যায় না। ওমা মর্মান্তিক যাতনা বলবার ভাষা পাই না। কতদিন এমন করে কাটাব ? লােক লজ্জা, যম লজ্জা ক্ষু লজ্জা। উঃ এ মুখ দেখাতে ইচ্ছা করে না। কেউ ব্যঙ্গ করবে, কেউ হাসবে কেউ দুঃখ করবে, কেউ বলবে এত কষ্টে খাওয়াটি ত বেশ আহে শুকতারা বেশ সংসার করছে, সব সেরে গ্যাছে, বুড়ির আর কি কষ্ট ? আমার নানা আলােচনার জীবনে কি দরকার ? কিন্তু যাবার পথ কৈ ? আমার এ ব্যথা কে বুঝবে ? কেউ ত বুঝবে না যে সংসারে থাকলেই বাহিরে সব থাকে ” যথার্থই বুড় যাহা বলেছে তাহা ঠিক, সংসার ত্যাগিনী না হলে কিছুই ত্যাগ করিবার নয় । মানুষ থাকলেই কাজ থাকে, কায়। থাকলে ছায়া থাকে, কায়ার মধ্যে যাই থাক, দুঃখ থাক, শােক থাক ক্ষুধা তৃষ্ণা যাই থাক, কিছুরই ছবি ছায়ার বাহিরে দেখবে না। যেমন চিরদিন অন্তঃসর শূন্য অস্থিমজ্জার অতীত, অলীক ছায়া, অলে। দেখলেই ফুটে ওঠে, তেমনি চিরদিন ফুটবে, মানুষ গেলেই ছায়া যাবে। মানব জীবন ও অলীক, তবে মানুষের ছায়ার প্রভেদ এই, মানুষের ভােগ আছে, ছায়ার কোন ভােগ নেই। সূর্ঘ্যের কিরণ ছাড়া সূৰ্য নয়, চন্দ্রের আলাে ছাড়া চন্দ্র নয়, অগ্নির দাহিকা শক্তি ছাড়া অগ্নি নয়, আলাের জ্যোতি ছাড়া আলাে নয়। জলের শৈত্য ছাড়া জল নয় । আলাের জ্যোতি ছাড়া আলো নয়, ছায়া ও কায়া ছাড়া নয় সংসারী ত সংসার ছাড়া নয় । বউ-আর কেঁদে কি করবে ? এখন প্রাণ ঠাণ্ডা কর, বলে ভাঙ্গা কলাইকরা গেলাসে করে গঙ্গার জল এনে দিনে । বুড়ি তৎক্ষণাৎ এক নিঃশ্বাসে খেয়ে ফেলে বপ্নে বালাম আর একটু জল দে” বউ আরও জল এনে দিলে, বুড়ী তেষ্টা নিবারণ করে বলছে “হারে তোর নেই? বউ খানিক চুপ করে বল্লে “বেশী ত ছিলনা। ঐ নিত্য খাবার মুড়ি ও চাল থেকে এক মুঠা করে তুলে রাখতাম। তুমি কিনে আনলে ভাবতাম, এই ত সংসার। যেদিন জুটবে না সেদিন পেড়ে খাওয়া যাবে। তবু বুড় ও শিশুর প্রাণ ঠাণ্ডা হবে। তাই ঘরের চালের = শুকতারা বাতায় কাপড় বেঁধে গুজে রাখতাম । আসবার সময় চান থেকে পেড়ে নিয়ে পুটুলি করে এনেছি । বেশী ত নেই, তাতে আমার রাখলে তােমাদের হতােনা। তাই রাখিনি সামান্য গুরে গুড়ো পুটলির মধ্যে আছে, তাই পেড়ে একটু মুখে দিয়ে, মা গঙ্গার জল খেয়ে পিপাসা নিবারণ করব। আর ঐ যে গাছে গাছে নােনা, কুল কয়েদ বেল, খেজুর, নারিকেল, পেঁপে প্রভৃতি রয়েছে তার মধ্যে যা পারি পে’ড়ে নিয়ে, খেলেও আপাততঃ ক্ষুধা নিবারণ হবে, তারপর দু’টি ভাত সিদ্ধ করে সবাই মিলে কিছু কিছু খাওয়া যাবে। আমরা চাষা ভুষা মানুষ, বনের ফল খেয়েও এক বেলা কাটান যায়। তুমি ভেবােনা, তুমি বুড়ো মানুষ, দুটো ভিজে মুড়ীতেই তােমার চিরদিন তৃপ্তি, তুমি খাও।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। নীচ কুলস্তুবা, সম্ভবতঃ নিরক্ষরাও হতে পারে, এই বুড়ীর বউর প্রাণের মধ্য থেকে খাঁটি কথাই বেরিয়েছিল, মানুষ যতই নির্বোধ ও মুখ ও অশিক্ষিত হােক না কেন, দুঃখের তাড়নায় অন্তর থেকে জ্ঞানের কথা সময় সময় প্রকাশ পায়। কারণ মায্যের আয়োপরে আত্মা ( অর্থাৎ পরমাত্মা যিনি বাস করেন যিনি সকলের নাস্তায় সমানভাবে সমান অংশে বাস করেন । তিনিই সময় সময় মনুষ্যের জ্ঞান দ্বার খুলে দেন। এই জ্ঞানের জন্য মনুষ্য পশুর কাছ থেকে তফাৎ। নতুবা পশুর আহার, নিদ্রা, ক্ষুধা, তৃষ্ণা, স্পর্শ-সুখ, দুঃখ হ, শাক, বিষাদ প্রভৃতি অনুধ করবার শক্তি আছে, মানবেরও আছে, কেবল মানবের বিবেক আছে, পশুর নেই, কিন্তু বদ্ধ জীবের বিবেক বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় না, তা হলে মানব পরমানন্দ লাভ করতো। একবার বিহ্যতের আলােতে যেমন পথিক, পথের অনেকটা দূর অবধি চকিতের ন্যায় চোখ বুলিয়ে নেয় সেই অনুভূতি শক্তির দ্বারা পখের অনেকটা দূর বিবেক আলােয় থেকে থেকে অস্পষ্ট দেখে নিয়ে চলে যায়। তাই কখনও উখান, কখন পতন, কখন থাকা লাগে, কখনও কাটা ফোটে, কখনও বা পাঁকে বসে যায়, ইটে চোট লাগে এমনি করতে করতে চোট লাগতে লাগতে কত পথ যায়, কখনও ভাল, প্রশস্ত পথ পায় ও নিৰ্বিয়ে যায়, ক্ষণস্থায়ী আলােয় সামান্য বাধা বিপ্ন পথের কণ্টক দেখতে অবশ্য সামর্থ্য হয় না। কিন্তু ঐ আলো দেখে যে চোখ বােজে, সেই একেবারে ঠকে, বড় বড় নদ নদী দিঘী, দীঘি সরােবর, অস্ত্রধারী চোর দ্য প্রভৃতি কিছুই দেখতে ; পায় না। তাই অন্ধের মত একেবারে মহাসমুদ্রে পড়ে যায়, তথাপি তথায় নাবিক ও পারের যাত্রীরা থাকে, তারাও তুলতে চেষ্টা করে কিন্তু কাউকে সংজ্ঞা থাকতে, কাউকে আধ মরা তোলে, পরে তাকে মাথায় করে ঘুরিয়ে তবে জ্ঞানােদয় করায়। কেউ একেবারে অচৈতন্য হয়ে পড়ে তার জ্ঞান হয় না, তার আর এপারে সংজ্ঞার আশা নেই আবার নূতন পথের পথিক হয়ে যদি অভিজ্ঞতা হয় তবে শান্তি লাভ। এই তো দেখি, মনুষ্য চরিত্রের স্বাভাবিক ভাব, বুড়ীর বউ যাহা বলেছিল তাহা ঠিক ; আশ্রয়হীন, দীন দুঃখিনী, মৃত্যু অধীশ্বর ও গ্রাম অধীশ্বর কর্তৃক বিতাড়িতা, সস্তাপিতা, লাঞ্ছিতা, স্ত্রীলােকের পক্ষে আর আশ্রয় কি ? আর শান্তিলাভ, ক্ষুৎপিপাসা নিবাবণের উপায় কোথায় ? যেখানে যায় যমের ভয় হয়, যেন সর্বদাই বিভীষিকা দেখে, যেন কে হাহাবে মুখ ব্যাদন পূর্বক তাণ্ডব নৃত্য করুতে করূতে লােল জিহ্বা বের করে পিছে পিছে ছুটে আসে, প্রপীড়িত মানবের মানসিক ভয় সর্বত্র মনে হয়, ঐ আসে, ঐ ধরে, ঐ বাঁধে কে যেন বলে ঐ পালাল, ধ ধর, এই উন্মত্ততা অবস্থার মধ্যে কি ক্ষুধা তৃষ্ণা মনে থাকে ? যাই হোক, জীব বিপদ ছাড়া নয়, বিশেষ নব দেহে অনুভূতি শক্তি যেমন বেশী, তেমন তাদের সুখ দুঃখ চিরসঙ্গিনী, সদাই পাশাপাশি জীবনকে বেষ্টন করে ঘুরে বেড়ায়, এদের হাত থেকে মায়মুগ্ধ জীবের সম্পূর্ণ নিস্তার নেই। তবে এই বিশাল, অনন্ত অসীম ত্রৈলক্যের মধ্যে কি এই নিরাশ্রয়দের আশ্রয় ও শান্তির স্থান নেই ? আছে বৈ কি। মনের শূন্যতার সান্ত্বনার স্থল, শূন্যময় অনন্ত নীলিমা ব্যোমদেশ সমস্তই শুন্যতায় ভরা, অনন্ত আকাশ যদি অন্য হয়, সামান্য মনুষ্য হৃদয় আকাশ শুন্য হওয়ার আর বিচিত্র কি? চারিদিকে ।
শুকতারা বনরাজী নীলা, মা গঙ্গার স্নেহ বারিধারা, বাধাবিঘ্নময় অতিক্রম করে শ্নে? বিতরণ করতে করূতে মন্থর গতিতে যাচ্ছেন, তিনি ঠাণ্ডা করছেন, শান্তি দিচ্ছেন, পিপাসা দূর করছেন, সকলেই তার সন্তান, সকলেই তার কাছে শান্তির আশা রাখে। তিনিও কাহাকে বাধা দেন না। কেউ জল খেওনা নিওনা বলেননা, ধনী দরিদ্র সবাইকেই অযাচিতভাবে দান করেন। বিজন বনের গাছপালা, ফল, ফুল, পাতা, লতা সবই নিরাশ্রয় ক্ষুধিত ও তৃ ষত ব্যক্তির জন্য আপনাকে লুটিয়ে দিয়ে দাড়িয়ে থাকেন। কতক পথিক আসে যায়, ঐ গাছতলায় বসে বিশ্রাম করে, খায়, ঘুমায়, পরে যে যার গন্তব্য স্থানে চলে যায়। কারও তাড়না নেই, খাজনা নেই, লাঠির ভয় নেই। বুড়ির বউ এর তাই দেখে হঠাৎ ঈদয় ভেদ হয়ে মাতৃস্নেহের ভাষা ব্যক্ত হয়ে পড়ল। যথার্থই ত গঙ্গার জলে, বনের ফলে, ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবারণ করলে। যার কোন সান্ত্বনা নেই, কোথাও আশ্রয় নেই তারই পক্ষে প্রকৃতি সতী সান্তনা ও ভরসা ও আশ্রয় স্থল। প্রভাতে মধুর স্নিগ্ধতা, পাখীর মললিত গান, বালসূর্যের হাসি ভরা রাঙ্গা মুখখানি, তখন সে মুখে প্রখর- তার লেশমাত্র নেই মৃদু মধুর ভরে মন ভোলান হাসি, প্রভাতের মধুরতাই আপনা থেকেই মধুর সান্ত্বনাভাব আসে, পাখীদের সুললিত কলতানে ও কমনীয়ত। আছে । এ জগত হাসছে, কাছে, কত জীব আসছে, যাচ্ছে, কিন্তু পাখীরা এসবের কিছু ধার ধারে না, প্রত্যহ তারা নিয়মিতভাবে গেয়ে যায় । গঙ্গাদেবী পাপী তাপী, মুখী দুঃখী সকলকেই মেহদান করছেন, সকলের জন্য কোন পেতে দিয়েছেন, এবং সবাইকেই আদর ও স্নেহ আহ্বান করছেন। মার কাছে সব ছেলেই সমান। দুরন্ত, শান্ত, সকলের জন্য মার প্রাণ কাদে, নিবীড় অরণ্য পাতা লতা ফল পুপের শােভা সমস্তই জীবের উপকার ও সানাম ন্য, যার কেহ আশ্রয়ের নেই। গাছ পালা তাদের আতপ শুকতারা ও বৃষ্টি নিবারণ করে, লতা বিতান আবরণে সুন্দর ছত্রের কাজ করে ও দেহ শীতল হয়। ফলগুলিতে ক্ষুধা তৃষ্ণা নিবারণ করে। রজনীবাবু বলেছেন “আছ অনল অনিলে চির নভঃনিলে ভূধরে সলিলে গহনে আই, বিটপীলতায় জলদের ন্যায় শশী তারকায় তপনে। তাই ভাবি সর্বব্যাপি ভগবানই সর্বত্র বিরাজিত থেকে জীবকে বক্ষে করেন ও সান্তনা দেন। বিশেষ যার কেউ নেই, তারই পক্ষে সৰ্ব্ব শান্তি প্রসবিনী প্রকৃতিই ভরসা স্থল। একটু বিশ্রাম করার পর বনের শুকনা পাতা, ডাল, পালা, জড় কল্পে পরে কতকগুলি ভাঙ্গা ইট মুড়ি প্রভৃতি অড় করে তাহাতে গাছ তলায় একটা উনুনের মত তৈরী করে তাহাতে শুক্ ডাল পাতার জ্বাল দিয়ে দুটা ভাত ফুটিয়ে নিলে । ক্ষেত থেকে কাঁচা ঙ্কা তুলে আলে, পুদিনা, কুচা শাক, তেঁতুল প্রভৃতিও আলে । একটু নুন, ফোটা চার সরিষার তৈল একটি শিশিতে ছিল। শাক গুলাে কঁচা লঙ্কা ও লবণ, জল দিয়ে সিদ্ধ করে পরে একটু তেল ছড়িয়ে দিয়ে ঝােল ঝােল থাকতে নামালে, আর পুদিনা, পাকা তেতুল, কাচা লঙ্কা তেল মন মাযােগে বেশ চাটনি প্রস্তুত হ'লো, আর গরম ভাত সুন, লঙ্কা এই ক্ষুধার সময় অমৃত তুল্য হলো, তারা খাওয়া সাঙ্গ করে গাছতলায় একটু বিশ্রাম কল্লে পরে, সামান্য জিনিষ গুলিতে আপনাদের পূর্ববৎ তল্পি বেঁধে নিয়ে ও পারে যাবার উদ্যোগ কল্পে। খেয়া নৌকা ও মাঝি সৰ্ব্বদা ঘাটে বাঁধা থাকে, তাহারা পার হয়ে ওপারে খাগড়া ঘাটে উঠে ক্রমাগতঃ ডানপথ ধরে নগরের কোলাহল অনুসরণ করে ক্রমশ: জনতার মধ্যে অগ্রসর হতে লাগল এইরূপে নগয়ে প্রবেশ করে পথের ধারে একটা সরকারী আলোর নীচে, সে রাত্রের মত আশ্রয় নিলে, তাদের বসতে দেখে সহরের লােক তেড়ে আসে, কেউ বলে “এ অচেনা লােকগুলো কোথা থেকে এলাে?
শুকতারা । চোর নাকি ? কেউ বলে,-ওঠ, কেউ বলে-বেরাে’ অবশেষে পুলিশের লাল উষ্ণিষ ধারা ও রুল হস্তে পাহারাওলা গুলি মােড় থেকে এসে এদের প্রতি তর্জন, গর্জন, করতে লাগলো। এই নিম্ন কৰ্মচারী ঘাটীরক্ষক গুলি নিজেকে খুব উচ্চদরের মনে করে, কাজেই তাদের মেজাজ সদাই গরম, তাহারা রুক্ষ্মস্বরে বুড়ীকে বল্লে “এই বুড়ি হট যা কঁহাসে আয়া? ঘুসা দেগা ।” বুড়ী বলে-ও বউ এ কোথায় আলি? এত হৈ চৈ তো কখনও দেখিনি। জোয়ান জোয়ান মরগােনা যমের মত লাঠি নিয়ে তেড়ে এসে, বাবা এসব তো আমাদের গায়ে নেই! এখেনে ভগবানের ছিষ্টির মাটীতে বসতে ও কারো অধিকার নেই।” বউ শাশুড়ীকে বল্লে “ভয় পেওনা। পাহারাওয়ালাকে বল্লে, বাবা দোহাই ধৰ্ম্ম অবতার, আমাদের হতে কোন অনিষ্ট হবেনা। আমরা সামান্য দুঃখী গরীব মেয়ে মানুষ আমাদের আশ্রয় দিয়ে কোন ভয় নেই ; আমাদের যা কিছু আছে সব দ্যাথ। আমরা হরতারণবাবু জমিদারের প্রজা, বীরভূম জেলার চদীঘি গ্রামে আমাদের ঘর, খোজ করলে আমাদের বিষয় জানতে পারবে। দুঃখের জালায় ও রােজগাবের জন্যে ও অন্যনা বিপদে পড়ে দেশের বাহিরে এসেছি।” তখন কয়েকজন গৃহস্থ ভদ্রলোক বল্লেন—হ্যা ওরা খা থাক, দেখে বােধ হয় খুব দুঃখে প্রপীড়িত, ওদের রায় কোন ক্ষতি হবেনা। আর এক রাত্রে এই জনাকীর্ণ সহরের মাঝখানে বসে এই সামান্য স্ত্রীলােক দুটী কি অনিষ্ট করতে পারে ? ভয় একন ও বৃষ, এমন করে কুকুর বিড়ালের মত তাড়ায় না । পাহারাওয়ালা ও অন্যান্য লােক যারা লেগেছিল, সরে গেল। সেই সময় বুড়ি ভরসা পেয়ে ভলােকদের জিজ্ঞাসা করলে, খাগা বাপ সকল, এখানে কোন ঠিক রােজগার আছে?” অলােক বল্লেন- “হ্যা আর একটু সােজ চলে গিয়ে সহয় মাড়িয়ে একটা তেমাথা ও ৪o শুকতারা মাঠের মাঝখানে একটা বড় দীঘি কাটা হচ্ছে । গ্রামে জলকষ্ট হওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ও ঐ গ্রামের জমিদার দু’জনে চেষ্টা করে ও টাকা জোগাড় করে এই দীঘি কাটিয়ে দিচ্ছেন। সেখানে অনেক ঠিকে লােক কাজ করে ! তথায় যেতে পার, গেলেই তারা নেবেন। তাদের লোকের দরকার।” ইহারা শুনে আশ্বস্ত হল এবং পরদিন তথায় গিয়ে দিন মজুরীতে নিযুক্ত হ’ল। গ্রামের বাইরে একটা কুঁড়ে ঘর ভাড়া করলে। সমস্ত দিন খেটে নগদ যা পায় তাহাতে দিনান্তে চাল ভাল কিনে ঘরে গিয়ে বেঁধে বেড়ে যায়। আবার সকালে দুটি ভিজে পান্তা, কাঁচা লঙ্কা, খেয়ে এবং দুটি মুড়ি বেঁধে নিয়ে ছেলেটি কোলে করে কাজে যায়। দুপুরের ছুটীতে সেই মুড়ি গুলি তিনজনে বসে খায়। এইরূপে তাদের আবার সুখের দশা ফিরল তারা কাপড় কিনলে, রােজ তেল মাখে, দু'বেলা ভাত মুড়ি খায়, এই তাদের যথেষ্ট এর চেয়ে তারা কখনও সুখ ভােগ করেনি, তার আস্বাদও জানেনা এবং আশাও করে না। তারা মনে করলে ভগবান এইবারে তাদের দিন দিলেন।
সপ্তম পরিচ্ছেদ। বহু প্রকার ও বহু প্রকৃতির এবং নানা বর্ণের নানা জাতের অভাবী নারী এক সঙ্গে মাটী কাটে। একবার দ্বিপ্রহরে আধ ঘণ্টা বা সময় পায় সেই সময় গাছতলায় ভিন্ন ভিন্ন এক এক দল ব'সে মুড়ি খায়, তামাক খায়, গল্প করে, গান গায়, মনের আনন্দে যার মনে যে সুর উদয় হয়, যার মুখে যে সুর বেরােয়, সে সেই ভাবেই গায়, সে সুরের নাম নেই, শিক্ষা নেই, সে নিত্য নব নব সুরের আলাপন হত। আবার মাটী যখন কাটে, মেয়ের মাথা থেকে পুরুষ, পুরুষের মাথা থেকে মেয়ে আবার মেয়ের মাথা থেকে মেয়ে, পুরুষের মাথা থেকে পুরুষ—এমনি করে পরস্পরের মাটীর ঝড় বদল ক'রে বয়ে নিয়ে ফায় , এই রকমে নিধে নাম এক মজুর রােজ সুযােগ করে কোল বুড়ির বউ এর মাথা থেকে রোজ ঝুড়ি নিতে চেষ্টা করে। রোজই ঘুরতে ঠিক বুড়ির বউএর কাছে এসে পড়ে এবং তার মাথার ঝুড়ি বদলা বদলী করে। এমনি করে কিছুদিন কাটে। এর মধ্যে কার মনের ভাব কি, কে বুঝতে পারে? তারপর যখন দ্বিপ্রহরে দলবদ্ধ হয়ে সবাই গাছতলায় মড় খেতে বসে, ক্রমে ঐ নিধে ঘেসে ঘেসে খুঁজে খুঁজে ওদের দলের মধ্যে এসে বসে। মুড়ি খায়, নানা গল্প গল্পের ছলে নানান পরিচয়ও নেয় । আজ আমার না নেই, একটা লঙ্কা দে, কাল গুড় নিতে ভুলে গেছি, একটু দে এই কম করে পাড়ার লােকে বিরক্ত করে। এরাও সময় দুকথা নিয়ে দেয়, কিন্তু এ লােকটার রাগ নেই, বেশ নিরীহ হেসে হেসে বলে, হ্যা তাই ত, রােজ কি মানুষ নয়, কাল আর চাইব না। বার কল
৪২
শুকতারা
না। বউ
হয়ত জলপাত্র আনেনি, ও বউ একটু তিষ্টার জল খাব দে, আর চাইব
ও শ্বাশুড়ী বলে আজ তিষ্টার জল খাও কিন্তু কাল আর
চেওনা। নিধে বলে—হ্যা, তাই ত কি আর বলব। ঘরে ত কেউ
নেই, কে দেবে বল ? অনেক সময় তাড়াতাড়িতে ভুলে যাই।
তথাপি কেহই সহানুভূতি জানিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করে না। তখন
আপনা থেকেই বলে, বউ তিনবার মরে গেল, মনে মনে করেছিলুম
অার টাকা খরচ করে সেঙ্গা করব না। কিন্তু মা ও মরে গেল এখন
দুটি বেঁধে দেয় কে ? অসুখ হলেই বা কে দ্যাখে? মুড়ির গুড়ই
বা কে বেধে দেয় ? বাবা-রােজ রােজ আর কষ্ট করে পারিনা, এবারে
যা হয় একটা করে ফেলব।
বউ-ই। তাই একটা করগে । ত’হলে আমরা বাচি।
নি - আরে বাপু, দেবে কে ? টাকা কোথায় ?
বউ-কেন গো ? এখানে এত মেয়ে মানুষ খাটছে, তােমার
এটা জোটে না ? একটাকে বেচে নাও, না পার আমরা ঠিক
করে দি।
নি—সত্যি নাকি? আছে নাকি কেউ ? তােমরা ঠিক করে
দিতে পারবে?
বউ-তােমার মত অত বিয়ে পাগলা বিধবা খাটছে তাদের সেঙ্গা
করতে কি বেশী পয়সা লাগে ? সামান্য কিছু খরচ করে দু’চার
জনকে নিয়ে মাথায় সিন্দুর দিলেই হল।
কিন্তু বুড়ির বউ এইবারে বেশী করে বিপদকে আদরে নিমন্ত্রণ করে
ডেকে নিয়ে এল।
নিধে ত আর এদের সঙ্গ ছাড়ে না। নিখের জ্বালায় এরা লুকি
বসে।
তবু নিধে ঘুরে ঘূরে এদের বের করে কাছে এসে বসে।
কোন দিন বেগুনি, পেঁয়া বড়া, ডালপুরি, আলুর চপ, ঝাল বড়া,
শুকতারা ৪৩ । কাচা ছোলার গুড়ে নাড়, ছােলা ভাজা, মটর ভাজা, তেলের জিলাঞ্জি প্রভৃতি নানা রকম মুখরােচক খাদ্য দ্রব্য মুড়ির সঙ্গে বেঁধে আনে ও বুড়ির নাতির মুড়ির ডালায় ফেলে দেয়, এরা বারণ করলেও শোনেনা। বলে-“আহা ছােট ছেলে ধাক খাক।” এই রকম করতে করতে ছেলের মার মুড়ির ওপর ক্রমশঃ ঐ সকল খাদ্যাদি ফেলে তাহাতে বউ রেগে উঠে বলে ছেলেকে দিলে সেই ভাল, আবার আমায় দেওয়া কেন ? আর আজ ত পিয়াজ বড় নয় ? অামি পিঁয়াজের গন্ধ সইতে পারি না। নি—আহা, তুই যেন বামনি, বাগদিনীর আবার এত কেন ? ফোন বাগদিনীতে পিয়াজ খায় না তা’ত জানিনা। তাের সব বাড়াবাড়ি। বউ তুমি অত ফাজলামী করােনা, ও সব আমি সইতে পারি খাওয়। যে যার রুচি, বাগদিনী বামনী বুঝি না। নিধে-আহ রাগ করিসনি খা খা । আজ পিয়াজ বড়া নেই, ঝাল বড় বেশ খেতে লাগল, একলা ভাল জিনিষ খাওয়া যায় না। এসব সামগ্রী দোসর হলে খেতে বেশ সুখ লাগে। বউ-এতো কষ্ট যদি দোসর দেখে নাওনা ? নি—কি করব বল ? দোসর বল্লেই কি দোসর হয় ? চিরকালের জিনিষ, সে রকম মনের মত কোথা পাই ? তােরা কে বল্লি খুজে দিবি তা কৈ? কথা বলিস? বউ--আমরা এমনি কাউকে স্থির করে বলিনি, কত লােক খাটছে, এর মধ্যে নিশ্চয় একটা পাওয়া যাবে। কতলোক বিয়ের পণ্যে তোমার মত এরূপ খুঁজে বেড়াচ্ছে বৈ কি। আমাদের ছোট জাতের খয়ে ত সমাজে বাধে না, কাজেই যার মন যায়, করে বৈ কি? নিতুই করবি না। বউঃ মর, আমি আবার কি করব ? আমার ছেলে আছে, ৪ বুড় শাশুড়ীকে মরণকালে সপে দিয়ে গ্যাছে। আমার এ সব ইচ্ছে থাকলে সে সব টের আগে করতে পারতুম। তাহলে আমরা অনাথার মত দেশে দেশে ঘুরে বেড়াতাম না। নি—কেন আমাদের সমাজে যখন বাধে না, তখন আর দোষ কি ? সেঙ্গা করলে কি ছেলে শাশুড়ীকে দ্যাখা হয় না ! বুড়ীর বউ তখন রেগে দাঁড়িয়ে উঠে বললে “যাও তামাকে এত বিচার করতে হবেনা, যে যা ভাল বুঝবে করবে, তােমার এত ব্যবস্থা দেবার দরকার কি? এতো ভাল আপদ জুটলাে দেখছি, এতো বলি তবু নড়েনা, যেখানে যাব, সেখানে আমার জ্বালা, কোথাও শান্তি নেই। বুড়ী পরিশ্রমের পর গাছতলায় বস৫েই বুড়ো মানুষ, ঠাণ্ডা বাতাসে ঝিমােয়, মুড়ী জল খেয়ে তার উপর অারাে শরীর ঠাণ্ডা বোধ হয়, যেন স্বর্গের ঘুম আসে। বুড়ীও একে দেণে বিরক্ত হয় এবং সময় সময় দু'চার কথা শুনিয়েও দেয়, কিন্তু বেশীক্ষণ তার এ শক্তি থাকেনা। শােকা ভাপা বুড়ো মানুষ পরিশ্রমের পর শ্রান্ত হয়ে বললেই চুল আসে । নিবে সেই সময় কথার ভাব ক্রমশঃ অন্য পথে নিয়ে যেতে চেষ্টা করে। বউটা রেগে উঠলে, নরম হয়ে যায় এবং কথার তা আবার ঘুরিয়ে ফেলে, সময় সময় সরেও যায় আবার আসে, আবার বসে, আবার নিজের মত হাসে, কখনও ক্ষমা চায়, এ ব্যাটা যেন রাহ হয়েছে, এসের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, তাড়ালে ড়েনা, অপমানেলা নেই, রাগ নেই, কখন ও কঁদবে, কখনও হাসবে, কখনও মাপ চাইবে, কখনও নিজের ভুল স্বীকার করবে; কখনও জলের মত পাতলা, তেলের মত মলায়েম হয়ে পিছলে পড়ে, কঁাদ ভাবে শুটি বলবে আখ আমার কেউ নেই। তােদর কাছে এলে পাই। আপন জনের মত হে যত পাই ই আদি, মা মানুষ এলে কি দোষ হয় ?”
শুকতারা
।
যাই হোক ঐ দিনের কথায় বউ ঝঙ্কার করে ওঠায় বুড়ীর ।
ভেঙ্গে বলে করটি কি ? পেমার সঙ্গে ঝগড়া করচিস? অাহা মাটী
কেটে ছেরম হয়েছে একটু বসেছে, মুড়ী জল দে, রােদে পুড়ে ঘাম
ঝরছে এখন কি কিছু বলে ?”
বউ-হ্যাগো কি বলছ ?
বুবলিনি কিছু, জমিদারের অত্যাচারে পেলিয়ে এ্যালাম, তা
বাছা গরীব মানুষ, জমিদারের সঙ্গে কি করবে ?
বউ -কোথায় তােমার বাছা ।
বু--এ ঐ নিষেকে মীরবার জন্য বাঁশের লাঠি আনতে ঐ কুঁড়ের
মধ্যে ঢুকেচে ওর যে শিয়রে লাঠি থাকে । তখন বউ একটু শাশুড়ীর
গা’টী নাড়া দিয়ে বলে কি শুনতে কি শুন্চ’ ঐ নিধে আমার সঙ্গে,
লাগছে, তুমিও ঢুলছ, এক শুনতে আর এক কথা শুনচ
তখন বুড়ীর চমক ভেঙ্গে বল্লে ওমা তাইত, নিধে আবার কি বলছে ?
এই বলে নিধের উপর বুড়ী খুব তর্জন করে উঠল এবং দ্বিতীয় দিন
যাহাতে তাদের কাছে না আসে, আসিলে কর্মকর্তার কাছে তার
নামে অভিযোগ করিবে এই রুপ ভয় দেখালে।
নিধে তখন বলে --- যাচ্ছি, যাচ্ছি তােদের কাছে আর আসব না,
আমি খারাপ ভাবে কিছু বলিনি, আমি এক বলতে তার ভাব যদি
মহরূপ হয়ে থাকে, আমায় মাপ কর। তাের ক কর্তাকে
শাসনে, এখুনি যাচ্ছি এই বলে নিধে সে স্থান থেকে সরে গেল
তাপর আর ক’দিন এসে আর ওদের কাছে বসে না।
যন হোক একবার দেখা হবেই এবং জিজ্ঞাসা করে কি কাজ শেষ
চরি ইত্যাদি নানা প্রকার ছুতা ধরে এদের সঙ্গে কথা কইতে
}
অষ্টম পরিচ্ছেদ। } কয়েকদিন ভয়ানক বর্ষ। পড়েছে, পিছল, অনেক কুলীই আসে না, কেবল যাদের একবেলা না খাটলে একেবারেই উপবাস করতে হবে, এমন ধরণের দু’চার জন কুল আসে। তার মধ্যে বুড়ী ও বউ ও নিধে ত আছেই। লােক খুবই কম, ঠাই ঠাই দু’চার জন কাজ করছে, বেশী বৃষ্টির সময় গাছ তলায় কিম্বা ঝপে ঝাপের মধ্যেও লুকিয়ে বছে । বিন খাটাচ্ছেন তিনি। বৃষ্টির চোটে দাড়াতে পাচ্ছেন না, কোথাও ছায়াতল দেখে ছাতা মাথায় দিয়ে বাড়াচ্ছেন, তিনি আর কত লক্ষ্য করবেন কে বাটছে কে বসছে ? নিধে এক দিকে মাটী বইছে, তার পাঁচ সাত হাত তুফাতে বুড়ার শাশুড়ী বউ মাটী বইছে এমন সময় নিধে হঠাৎ মাটীর ঝোড়া মাথায় নিয়ে পা পিছলে উপর দিক থেকে s পড়ে গ্যাল, তখন দু'চার জন লােক ছিল, সেই সময় অগ্রসর হয়ে অনেক উঁচুতে উঠে গ্যাছে, কেহ বা দূরে দূরে, ফাক ফাক হয়ে মাটা কাটছে। সুতরাং বুড়ী অন্য লােক অপেক্ষা কাছে ছিল, ইহারাই তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে তাকে তোলবার চেষ্টা করলে, বিশেষ বুড়ির বৌ এসে পড়ল, শশুড়ী একটু পরে, কারণ সে বুড়ো মানুষ পিছলে রাস্তা মাটীর ঝোড়া মাথায় তার উপর বো দু'এক হাত আগে ছিল, শাশুড়ী একটু পিছনে ছিল। কালেই বৌ একটু আগে পৌছিতে পারলে, তারপর বুড়ীগণ ক্রমে ক্রমে কেহ কেহ এসে জুটলে। মানুষের এমন সময় একই আসে সে সময় শত্রু মিত্র চেনা, অচেনা ও মেয়ে পুরুষ বিদ্যায় করলে ৪৭ চলেনা। এক খননের গর্তে যে একটু জল জমেছে, নিধে বােড়। শুদ্ধ একেবারে তার মধ্যে পড়ে গিয়ে উঠতে পারে না, খোলা, কঁাকড়, কঁাটা খোঁচায় গা মুখ ছড়ে গেল, মাটী গুলো মুখের উপর পড়ে নিশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হ’ল, এমন বে কায়দায় পড়েছে যে, যত উঠবার চেষ্টা করছে পিছলে পিছলে আরও উলোট পালট খাচ্ছে, হাতি যেন হ্রদে পড়ে টাপট খাচ্ছে, সে সময় দেখলে অবশ্য মনে কষ্ট হয়। এবং তাকে মুক্ত করবার ইচ্ছ। সকলেরই হওয়া উচিত। কারণ সকলেই জগতপিতা পরমেশ্বরের প্রেরিত জীব, তিনিই যা বুঝবেন তাই করবেন। আমরা শাস্তি দেবার কর্তা নই, দেখবার স্পর্ধাও রাখি না । কারণ তঁার হিসাবের খাতায় কার কি ভাবে নাম উঠে গ্যাছে তা ত কেউ জানে না। যাক যাহা প্রকৃতি গত ইহারা তাহাই করলে, বিশেষ এরা দুঃখে প্রপীড়িত হয়ে এদের মনের গঠন অন্যরূপ হয়েছে। কাজেই আর্তের দুঃখে সাধারণ অপেক্ষা কিছু বেশী ব্যথিত হয়। ইহারা সকলের চেয়ে খুব যত্ন সহকারে পঙ্ক থেকে উদ্ধার করে মাটা ধুয়িয়ে মুছিয়ে দিলে। নিজেদের পুটলী থেকে ছােট্ট একটা শিশি, বের করে তা থেকে একটু তেল ঢেলে নিয়ে নিধের গায়ে মাখিয়ে দিলে গােটা কতক দুর্বা ঘাস চিবিয়ে পায়ে দিয়ে বেঁধে দিতে। পুটলী থেকে একটু চিরকুট টেনে বের কবে পরতে দিলে। এইরূপে তাকে একটু সুস্থ করলে। বুড়ীদের শুশ্রুষায় নিখে একটু সুস্থ হ’ল ঘণ্টা খানেক বাদে বেশই উতি অনুভব করলে। তবে আটবার মত অবস্থা আর সেদিন হল ...তাহা সততঃ না। যেমন যখম লেগেছে এতে দিন কয়েকের হয়ে লাগার অবস্থা নয়। তবে যে উপশম, টুকু যথার্থ হা কার করতে রাজী নয়, এদের এর নেবার ৪৮ শুকতারা শুয়ে শুয়ে আঃ উঃ গ্যালান বাবা গো, মংগাে মলম, কে দেখবে ? বাচব না ইত্যাদি যাতনা প্রকাশ করতে লাগল, এখন অকৃত্রিম যাতনা অতিক্রম করে কৃত্রিমতায় পরিণত হলো । তখন এর তার ভা। গতিক কতকটা বুঝতে পেরে বল্লে-আমরা আর কাজ কামাই করে কতক্ষণ বসে থাকব? শেষে আবার মজুরী কা সে? তুমি ত আগের চেয়ে সুস্থ হয়েছ দেখছি কিন্তু কাজ করতে আজ পারবে না, আস্তে আস্তে বাড়ী যাও। যাবার সময় একটু টারপিন তেল কিনে নিয়ে যেও, সন্ধ্যার সময় পাতা লতার আগুন করে একটু তাপ নিও আর তেলটা মালিস কোরো। আজ তো বঁাবত পারবে না, দুটী মুড়ি খেও। গরীব মানুষ, না খাটালে তো ক্ষতি হবে, যত শীগগির ভাল ও দরদ যায় ভাল। আহ! একি দৈব ঘটনা। ভাল মানুষ খাটতে এসে গতর চুর্ণ করে ফিরে যেতে হলাে। এখন কদনের ফেরে পড়লে কে জানে, আবার জল আসছে এখন শীগগির ঘরে যাও, আমরা উঠি । তখন নিধে বল্লে—“তাই যাচ্ছি গো, তোমরা খুব কল্পে। এটি কি পরে কি করে ? তাইতো ক্ষিদেও লেগেছে, চাষ। মানুষ দু’টো ভাত খাবারই ইচ্ছে করছে, কেই বা বেঁধে দেয়, তাতে কেউ উত্তর না দিয়ে উঠে যাওয়ায় নিধেও আস্তে আস্তে বাড়ী গ্যাস। নিধে বাড়ী গিয়ে শুয়ে ভাবছে তাইতো! এরা তাে খুব যত্ন কণে এত লোক ছিল কেউ তো এতো কল্লে না , ভালবাসা না থাকলেই কি এতটা বড় করতে পারে? এত লোক তো ছিল শুধু তো ফা। থেকে তোলা নয়, তেল মালিশ করে দেওয়া, কাপড় দেওয়া; এতটা কে করে? আমি যা মনে ভেবেছি, তাই বউটা খুব যতে পারে ঐ বড়টা কিছু না, কেবল বউটার সঙ্গে সঙ্গে হারে লেনে জেলে ভিলীর মত যায় আর এটা ওটা এগিয়ে দেয় মাত্র। ঐ তাই ডাইনি, কেবল বউটাকে আগলে আগলে বেড়ায়, সেই কার বউটা ভালাে করে দেখ.হয় মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না, শাড়ী কি মনে করবে স’লে মুখে রাগ দেখায়। গায়ে একটুখানি বল গাই, একদিন ভারি রাত্রে ওর বাড়ী গিয়ে বউটার মনের ভাব বুঝবে। দিনে গেলে সবাই দেখতে পাবে, কি ভাববে। রাত্রে কে দেখতে পাবে না, ভাইমি বুড়ীটাও ঘুমাে’বে তখন ভালো করে মনের ভাব বুঝ’ব, ও বুড়ীটা তো দিনেই ঢােলে, রেতে ওর কি পদার্থ থাকবে? এই ভাবতে ভাবতে নিধের রাত্রে নিদ্রা এলো। নিধে নিদ্রিত অবস্থায় স্বপ্ন দেখছে। নিদ্রা দেরে এদের স্মৃতি নিধের মাথার ভেতর নানা ভাবে খেলিয়ে বেড়াতে লাগল। নিধে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখচে বুড়ীর বউ এক থালা ভাত নিয়ে এসে নিধেকে খেতে দিলে। তারপর নিধের ছেড়া চাটাই থানার উপর বুড়ীর বউ বসে তেল গরম করে নিধেকে মালিশ করে দিচ্ছে। নিষের গায়ের দরদ বেন কত কমে গিয়ে আরাম বােধ হচ্ছে। গরম তেল ভলায় 'দৰ দম করে বাম ঝরছে, তখন নিপে বলছে এই তো ভাত বেঁধে দিলি, তেল মালিস কলি, এখন কেবল বাকি পাঁচ জনকে ডেকে মাথায় একটু সিদূর দেওয়া। আর তো কয়টা স্যাঙ্গা করিছি, হাঙ্গামাতে কিছু নেই আর বুড়ীর বউ যেন একটু হেসে মুখ হেট করে চুপ করে বসে রইল তার হাৰ, ভাব, ও হাসিতে সক্ষতির ভাব প্রকাশ হল, তখন নিবে খে গ গল্প করছে যে ঐ ডাইনি বুড়িটাই যত নৰে মূল, না এনে সব ঠিক হয়ে যেতে এই তাে বুড়িটা আজ নেই, এক কথায় ক।, আগে কাটা চুকে বাৰু তারপর ঐ বুড়িটাকে একবার লেএই অবস্থায় গত কিমিজ, করতে করতে হতে বুলাে বিধেয় গুখে দেখে নিবে এক গা মেয়ে সত্য ইতে এই.ওরে পড়ে আছে তখন গেয় দেয়
৫০
कडाया
ভাঙ্গেনি, মনে করছে ঘটনাটা সত্যই, চারিদিক হাত বুলিয়ে ভাল করে
ভেবে চিন্তে দেখে, এটা অলীক স্বপ্নই বঙেতবে পথের ভাবে তার
বুড়ীর বউর সম্মতি আছে ঠিক কল্পে ।
নবম পরিচ্ছেদ।
আষাঢ়ের প্রথমে, থেকে থেকে বৃষ্টিও হয় মাঝে মাঝে হয়ও না,
ভয়ানক শুখনাে গরম। বুড়ীরা গরমের সময় ওদের নীরেট কুঁড়েটির
মধ্যে 'তে পারেনা। ঘরের দাওয়ায় চেটাই পেতে তিন জনে
পােয়, ঝড় বৃষ্টি এলে কুঁড়ের মধ্যে ঢোকে, এটা তাদের ধারাবাহিকরূপে
চিরদিনের অভ্যাস, কেবল শীতের সময় দুটো পাতা লতার আগুন
কালিয়ে কুঁড়ের মধ্যে ছেড়া কাথা আশ্রয় করে পড়ে থাকে।
গরীবের শীত নিবারণের উপায় দিবসে সূর্যের মেহের অবারিত
গান, তাঁহার প্রখর দীপ্তি, পর্ণ কুটীরবাসী বস্ত্রহীন কিম্বা ছিন্ন বস্ত্র
পরিহিত, শয্যা ও খট্টাঙ্গবিহীন দরিদ্রের শীত নিবারণের একমাত্র
উপায়, আর অগ্নিদেবের করুণা, তাহার উত্তাপে দুঃখী তাপী যে
আরাম পায় এখন আর মূল্যবান উষ্ণস্ত্র, লোম, পদ
পোষাকে ও তুলার গদি লেপ কমল রাগ, প্রভৃতি শয্যায়
ও নিবারণ হয় না। উষ্ণ বস্ত্র, তুলার শয্যার মধ্যেও
শীতের সময় বুক গুর গুর করে।
গমদিনের কঠোর পরিশ্রমের পর ইহারা গাঢ় নি
নিদ্রাদেবীর চরিত্রের পণ কুটীরে, শয্যায় কেমন পশন
ধনীর রম অ র উপর দুগ্ধফেননি শয্যায় তেমনি ভাবে দান করেন। এই শান্তিময়ী নিদ্রাদেবীর দয়া সকলে সমান ভাবে লাভ করায় জীব কিছুক্ষণের জন্য অনেক যন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি পায়, এবং অনেক সময় তা দেরে দুঃখের রাজ্য থেকে মুখের রাতে গিয়ে সুখ শান্তিও উপভোগ করে আসে। রােগীর রােগের যন্ত্রণার কত উপশম হয় শােকাত্তের শােকের নিবৃত্তি হয়। এই শান্তিময়ী নিদ্রা- দেবীকে এই শত নমস্কার এবং এই প্রার্থনা, যেন চিরদিন তাহার দয়া সকলেই লাভ করে। ঘাের অন্ধকার রাত্রি, মাঝে মাঝে দু’চার ফোটা জল পড়ে মারে। মাটীর উত্তাপ বৃদ্ধি করছে, কৃষ্ণপক্ষের অন্ধকার রজনীতে-বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন আকাশে নীরবতা নিস্তব্ধতা ও মলিনতা ঘােরাকায়ে মাখিয়ে দিয়েছে, নিশাচর পশু পক্ষীর পর্যন্ত কোন শব্দ নেই, শিয়ালের ডাক নেই, আকাশ গম্ভীর, পৃথিবীও নিস্তব্ধ, গভীর, এমন সময় বুড়ীর বধুর কাহার করস্পর্শে ঘুম ভাঙ্গল, তাকিয়ে দেখে অন্ধকারের আবছায়ায় এক কালান্তক যমের মত চেহারা কে পদতলে দাড়িয়ে আছে। ভীতস্বরে বল্লে—কেও মনুষ্যের আওয়াজ হলাে—“চুপ চুপ, কথা অাছে বউ-কিসের কথারে ব্যাটা? একেবারে নিস্তব্ধ, কোন উত্তর নই, তখন বুড়ীর বধুর ঘুমের ঘাের ভালরূপ ভাঙ্গেনি, আর তখন ফের পিট থেকে চরণবাবুর অত্যাচার একেবারে কুছে যায়নি, এনে সদাই ভয় ঐ বুঝি সন্ধান পেলে ঐ বুঝি ধছে, সেই এই বিপদ উপস্থিত হলাে। বুড়ীর বউ, হিতাহিত জ্ঞান র যমের মাথায় সজোরে এক মােটা বাঁশের লাঠির আঘাত ই: বাঁশের লাঠিই তাদের সকল সময় সম্বল ছি, ঐ লাঠি চী শেষ দিন দেখিয়েছিল, এই লাঠি অবশ করে ইহারা
?
দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসে। এই লাঠী মাের হাতে ছিল, তার
মৃত্যুর পর ইহাদের রক্ষণকারী ভর্তাস্বরূপ হয়েছে। ঐ লাঠিতে
কুকুর শিয়াল গরু বাছুর ছাগল বিড়াল প্রভৃতি সমস্ত তাড়ায় এবং
রাত্রে মাথার শিয়রে থাকে, দিনে ও বগলে করে রাস্তা ঘাটে চলে।
কাজেই প্রাণে ভয় হওয়া মাত্রেই কাৰ্য্য সফল হতে আর বিলম্ব হলো
না। সেই লাঠির সজোরে এক ঘা খে’য়ে যম আর কোন শব্দ করতে
না পেয়ে একেবারে সােজা দৌড়ে খানিক পথ গিয়ে তেমাথার
রাস্তায় পড়েই অজ্ঞান। যত দূর গ্যাছে টস টস্ করে ফোটা ফোটা
রক্ত পড়তে পড়তে গ্যাছে।
এই ভয়ঙ্কর আওয়াজে বুড়ীর নিদ্রা ভঙ্গ হলো ও চমকিত হয়ে
বল্লে—“হ্যা রে কি কল্লি ? ও কে ছুটে পালাল
বউ—আমার বােধ হয় একজন বদমাইস্ লােক কু মতলবে
এসেছিল, তবে চোর চোর নয়, আর আমাদের কি নিতে আসবে?
নিধে কি চরণবাবুর লােক হতে পারে। এমন চোট, দিয়িছি
চিরদিন মনে থাকবে, আর আসতে সাহস হবে না।
বু-হারে, মরে টরে যাবে না তাে? সে আবার এক দায়।
দুঃখী গরীবকে কে বাঁচাবে? আমার যে ভয় করূছে। এই বলে
বুড়ী থর থর করে কাপতে লাগল।
বউ তুমি এমন কর কেন? ইহাতে বেশী ভয়ের কারণ নেই,
মরবে কেন? এমন মেয়েছি যে দু'এক দিনের জঙ্গ বেশ খম
পড়ে থাকবে আর দরদ অনেক দিন থাকবে, মনে যত দিন
ততদিন আয় এমন কাজ করবে না। এমন প্রবৃত্তির লোকে
শিক্ষা পাওয়ার অবক।
এই প্রকার বচসার সঙ্গে ইহাদের বাকী রাত্রি টুকু প্রভাত
দশম পরিচ্ছেদ। বলা বাহুল্য যে আহত ব্যক্তি নিধিরাম বাদীই বটে। বুড়ীর বধূর লাঠির আঘাত খেয়ে বেগে এসে তেমাথার রাস্তায় পড়ে অচৈতন্য অবস্থায় প্রায় ঘন্টা খানেক পরে প্রত্যুষের স্নিগ্ধ ধীর বায়ু সেবনে আস্তে আস্তে আপনা থেকেই জ্ঞানের সঞ্চার হলো, যন্ত্রণায় থেকে থেকে হাত পা নাড়ে, গোঁ গোঁ শব্দ করে। তখন প্রভাত প্রায় আগত। দু’চার জন পখিক সবেমাত্র পথ হাঠতে আরম্ভ করেছে। তাদেরই ঈদৃশ লােম হর্ষণ ব্যাপার নয়নে নিপতিত হওয়ায় তারা ভয়ে চীৎকার করে উঠল, বাবারে ওটা খুন নাকি রে ? বি-ঐ যে একটু নড়ে । তৃ—ঐ যে একটু একবার একবার গোয়ানি শােনা যাচ্ছে। যাহা হাে তাহাদের চীৎকারে পাঁচজনে জড় হ’ল এবং এমন অবস্থায় পুলিশে খবর দেওয়ায় শ্ৰেয় বিবেচনা করল। আত ব্যক্তিকে মুখে জল দিয়ে তাহাকে ঠাণ্ডা করার চেষ্টা করতে লাগল। পরে সকলে পরামর্শ করে হাসপাতালে দিয়ে এলাে। পুলিশের লােক এসে রােগীকে জেরা করে বিশেষ কিছু অবগত হতে পারলে না। কারণ রােগীর বলবার শক্তি ও স্থায়ীভাবে চৈতন্য ছিল না। অতএব তাহারা সেই বিন্দু পরম্পরা অনুসরণ পূর্বক ক্রমাগত অগ্রসর য়ে দেখলে প্রানের মধ্যে ঠিক তাহাদের দাম্বার নীচে সে রক্তবিন্দু - যায় ফিরে অপরাধী বিবেচনা করে হাতে নিয়ে চললো, । আর বিয় বুড়ো মানুষকে পরাধী সাব্যস্থ কালিমানের ঠিক বিচার হবে? এত বড় সাংঘাতিক আঘাত ৫৪ শুকতারা করবার ক্ষমতা কি থাকা সম্ভব ? আর ওর কাছে শক্ত কিসের লােভে আসিবে ? টাকার লােভে মা অন্য কোন কুমতলবে? সেইটে ভালরূপ বিবেচনা করে বুকে হাতকড়ি দিও। তখন পুলিশের লােক বুড়িকে ও শিশুকে ছেড়ে দিয়ে বউকে ধরে নিয়ে চলে গেল। তখন বুড়ি থর থর করে কেঁপে ও কেঁদে একবার নয়ােগার পায়ে পড়ে একবার কনবলের পায়ে পড়ে বলে- “দােহাই বাবা ধর্ম অবতার, আমার ঐ বউ ছাড়া আর কেউ নেই, ওকে বাচাও আমায় বাচাও, এই ছেলেটাকে একবার দ্যাখ, বাপ আমি কিছু জানিনা বাবা, আমি কিছু দেখিনি, বাবা আমি ঘুমিয়ে এলাম।” পুলিসের লােক বুড়ির করুণ চােদনে কেহই ফর্ণপাত করলে না। বধূর হাতে পায়ে বেড়ি দিয়ে নিয়ে গেল। ছেলেটা বুড়ির কোল থেকে চীৎকার করে কাঁদতে লাগল এবং হাত বাড়িয়ে বতে লাগলো- “মার কাছে যাব” “ঐ ধরে নিলে”, “ঐ বাধলে এই উচ্চৈঃস্বরে কাঁদতে লাগল। শিশুর দিকে কেহই ফিরে তাকালে না। বউ কোন বাক্য ব্যয় করা নিল বিবেচনা করে নীরবে ওদের বন্ধন নিলে ও সঙ্গে চলে। বাবার সময় শিশুর দিকে তাকিয়ে দু'ফোটা চোখের জল গড়িয়ে পড়লাে। কিন্তু মােহবার ক্ষমতা নাই, হাত পা ত বাঁধা। বুড়ি এই বিপদের পর আর মাটি কাটতে যেতে প্রায়ই পারে না। শিত গেলে দ্যা ও জাহান্নাদি দুটো যােগাড় করা এই সুবিৱ বুজি এক পারে? প্রথম দিন উপবাসই ছিল, তয়ে শােকে ছুয়ে ক্ষুধা তৃষ্ণা কিছুই অনুভব হয়নি। পেমার নাম করে একবার ভাৰু ছেড়ে বুকটা হালকা করেছে। তারপর কারও বা খেতে ছেলেটার কাছে কিছু গন্ত সামগ্রী চেয়ে এনে তাকাই কি শুকতারা আপনি সেই কুঁড়ের মধ্যে পড়ে রইল। সেই কুঁড়ে যেন বুড়ির কাছে সেদিন ভীষণ বলে মনে হতে লাগল। খাঁ খাঁ করে যেন ভীষণ মূর্তি ধরে বুড়িকে কে যেন গিলে ফেলতে যায়। বুড়ির মনে যত বিভীষিকা উপস্থিত হয় ছেলেটিকে ততই বুকের মধ্যে টেনে লয়। এমনি কতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল। বুড়ি তখন সমস্ত যন্ত্রণার হাত থেকে কিছু অণের আগে নিস্তার পেলে। তারপর বুড়ি ছেলে কোলে করে ভিক্ষা করাই শ্রেয় মনে করলে। সমস্তদিন প্রত্যেক দরজায় দরজায় ভিক্ষে করে এনে দুটি বেঁধে বেড়ে খায় দায় শুয়ে থাকে। দুপুর বেলা একবার হজতে যায়, সেই ভিক্ষার ঝুলি থেকে বউকে কিছু খেতে দেয়, ছেলেকে স্তন্যপান করায়, ছেলে মায়ের কোলে গিয়ে মায়ের আদর চুম্বন উপভােগ ক'রে সমস্ত দিনের হা হা করা প্রাণটা ঠাণ্ডা করে আসে।
একাদশ
পরিচ্ছেদ
নিধে হাসপাতালে ক্রমশঃ একটু একটু করে সেরে উঠলাে।
পুলিসে ক্রমশঃ সাক্ষী যােগাড় করে এবং নানা সন্ধানের দ্বারা বুড়ির
বউকে অপরাধী স্থির করিয়ে বেশ গুছিয়ে একটা ফৌজদারী মম।
দাড় করালে।
ফৌজদারী কেসে চাক্ষুস সাক্ষী প্রায়ই মেলা ভার। প্রায় ঢাকার
জোরে সাক্ষী তৈয়ার হয় এবং ভদ্রলােক সাক্ষাও খুব কম মেলে।
প্রায় নিম্নশ্রেণীর লােক গরীব এবং বিপক্ষ দলই আসামীর বিরুদ্ধে
সাক্ষ্য দেয়।
বুড়িদের মিত্রও বেশী দেখি না, অনিষ্টকারী বড় কেহ ছিল না,
তবে বিদেশিনী অপরিচিত স্ত্রীলােকের পক্ষে বড় কেহই নয়, বিশেষ
বউ যে একটা মহৎ উদ্দেশ্যে নিধেকে আঘাত করেছে অথচ খুন করবার
মতল নয় তাহা কেহ স্বীকার করতে রাজী নয়।
মাটা কাটার জায়গায় ও ইহাদের সমস্ত দলের নিকট এবং অন্য
উপায়ে পুলিশ অনেক অনুসন্ধান করলে। বুড়ির বউ যে এতটা উচ্চ
প্রকৃতির লােক তাহা নিশ্রেণীর কোন লােক বলতে চায় না। কারণ
সীতঃ বাঙ্গালীর শরীরে বিশেষতঃ স্ত্রীলোকের শরীরে হিংসা প্রবল,
যার নীচ জাতীদের মধ্যে কতটা উদারতা ও উচ্চতার আশা
কয়া বা তাহাদের জাতে যখন আমাদের চেয়ে সিম করে খান
পানি, প্রকৃতিতে ও অান্ত ব্যবহার পণের
সাণতঃ শ্রোতার সম্ভব নয়।
বিশেষতঃ নিয়শ্রেণীর লোকেরা আমাদের দেশে
দু'তিন বায় বিবাহ করা সমাজে পতি আছে তা
কলুৰ আচরণ করে থাকে, সুতরাং তাহাদের এত হােট ও সঙ্কীর্ণ মনের মধ্যে এত বড় উদার প্রশস্ত ভাব প্রবেশ করবার ও স্থাপিত এবার স্থান কই? বৃহতের মধ্যে পুরে প্রবেশ সহজ; কিন্তু ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহৎ সহজ নয় তৰে চর্মের কি রবারের ছােট থলের মধ্যে িবড় জিনিষ ঢোকে বটে তবে বেশী মাত্ৰা হ'লে ফেটে যায়। কি হয় ত চর্মের নয়, ক্ষুদ্রের ভিতর বৃহতের প্রবেশ কঠিন বলেই, অনন্ত ঈশ্বরকে মানবগণ ক্ষুদ্র হৃদয়ে ধারণ করতে পারে না বলেই, সাধনা ও ধ্যান জপের সুবিধার জন্য বিশ্বব্যাপী ভগবানের ছোট ছোট মূর্তি স্থানে স্থানে স্থাপিত ও সহজে বােধগমা নাম জপই প্রশস্ত। যাই হােক্ নীচশ্রেণীর লােকের পক্ষে ধারণা হয়, যে এই বিদেশীনি স্ত্রীলােক সতী লক্ষ্মীর পরাকাষ্ঠা, এটাও স্মৃতির অতীত, আবার হিংসা ও হয় যে আমাদের ঘরে জন্মে ওর এতটা উচ্চ নাম, আদালতে পর্যন্ত লিপিবদ্ধ হবে এটাও বড় অন্তঃদাহের কারণ আর এদের স্বভাবের পরিচয় ত এতদিন কেউ পায়নি। কোথায় ছিল, কেমন করে জীবন কাটিয়েছে কে জানে ? সুতরাং এদের সাপকে সাক্ষী ত ভাল মিল না বরং অনেকেই অন্যদিকে গাইলে, নিধে মাটী কাটার পর ওদের কাছে মুড়ি খায়, বসে, গল্প করে, নিবে পড়ে যাবার পর এর খুৰ যত্ন সেবা করেছে ইত্যাদি। বিশেষ জাজ্জল্য প্রমাণ নিষের পণে বুড়িদের দেওয়া ছেড়া কাপড় ইত্যাদি। কুলি মহল থেকেই সাক্ষীর যোগাড় হল, তদ্রলােক বিশেষ কে এদের চেনে, নিখে ভাল হয়ে পুলিশের লোকের কাছে বললে “বাবা আমি কিছু কুমৎসবে যাইনি। ভয়ানক দাতের যন্ত্রণা রাত্রে হওয়ায় আমি তখন জল হয়ে it বাবা। তােমাদের যদি এ রােগ থাকতাে তাহলে বুঝতে কি বলব? আমার যখন যন্ত্রণা হ'ত ওরা এটা এ হল, তা গিয়ে এলাম। বৌ ওমনি ভীমের মত এক গ সজোরে মারলে, বাবাঃ ও কি মেয়ে! এমন মেয়ে বেঁচে থাকলে আবার কাকে খুন করবে। মেয়ে মানুষ এমন হয়, ত ত কখনও জানিনা।” বুড়িদের ত সমস্ত জিজ্ঞাসা করায় সমস্ত ঘটনা তাহারা অবিকল বিবৃত করলে, কিন্তু তাদের সমস্ত কথা কাহারও বিশ্বাসযােগ্য হল না। পরে পাঁচ রকম সাক্ষীর দ্বারা স্থির হ’লবুড়ীর বাড়ী নিখে রাত্তিরে যেত, কিন্তু টাকা, পয়সা, নিয়মিত না দেওয়ায় বাধকি হ'য়ে বুড়ির বৌ নিষেকে মেরেছে। যদিও নিধে দাতের যন্ত্রণায় বুড়ির বাড়ী যাওয়া পুলিশের বিশ্বাস হয়নি, নিধের মতলব তাহারা বুঝেছিল, কারণ পুলিশের লােক বোকা নয়। তথাপি তাহারা ঐটের উপর জোর দিয়ে বুড়ির বৌকে দোষী প্রমাণ করে, ফৌজদারীতে পাঠালে।
দ্বাদশ পরিচ্ছে যথাবিহিত দিনে মোকদ্দমার দিন পড়ল, আসামী ফরিয়াদী সাক্ষী প্রভৃতি সকলে আদালতে উপস্থিত হল। স্থানীয় সবডিভিসানাল অফিসার আই, সি, এস, তিনি মােকদ্দমার জবান বন্দি নিয়ে জেলার জজের কাছে সেসনে পাঠাবেন। ইনি নুতন লণ্ডন থেকে এলেও বয়েস অল্প হলেও বেশ ধীর, নম্র ও চিন্তাশীল বিচার, চেহারাও বেশ প্রশান্ত। ফৌজদারী আদালতের বিপরীত প্রকৃতির লােক। একথা তাঁর সর্বদা স্মরণ থাক’ত যে প্রমাণ অভাবে ১০টা অপরাধীকে ছাড়তে পারা যায় তথাপি ভাল প্রমাণ না মিললে, একটা নির্দোষ দণ্ড বিধান নিষিদ্ধ। তিনি প্রমাণ সাক্ষী যাহাই পান এবং সাক্ষীর জবানবন্দি যাহাই নিন বিচারটা বিবেকের অনুশাসনেই খুব গভীর চিন্তা করে তবে শান্তির ব্যবস্থা করতেন। মােকদ্দমার দিন উপস্থিত হ'লে ম্যাজিষ্ট্রেট যথা সময়ে এসে বিচার আসনে বসলেন ও নিয়ম অনুসারে পরে পরে ফরিয়াদির ডাক পাড়তে লাগল। কাঠগড়ায় উঠে পরে বুড়ীর ডাক পড়ল। বুড়িকে পুলিশ পাঠায়নি, ম্যাজিষ্ট্রেট নিজেই কতকগুলি কথা জিজ্ঞাসা করবার জন্য ভালেন। বুড়ী কাপতে কাঁপতে কাঠগড়ায় উঠল। সাহেব জিজ্ঞাসা কিন—“তােমার বউ সে দিন নিধিরাম বাণীকে মেরেছিল ?” আজ্ঞে হুজুর, আমি ঘুমিয়েছালাম, শব্দে আমার ঘুম ভাংল, কে অন্ধকারে, বুড়ো মানুষ, কাউকে নজর হ’লােনা, কেবল মানুষ বল পেয়ে বউকে বল্লাম, কল্লি কি ? বউ বল্লে—“বদমাইস ছিল, তাকে মেরেছি, ১০ দিন গায়ে দরদ, থাকবে, এমন কবে না। আমি যা ভয় কলাম, তাই হলাে, এই
৩০
কথাই বলেলাম যে ওয়ে থানা পুলিশ হবে না তাে? বউও তখন
অামার কথা উড়িয়ে দিলে।
সা-তোমার বাড়ী নিধে রাত্রে আসেতো।
বুনা হুজুর, তােমার দিব্যি, সে কখনও আসতো না।
তোমার কাছে মিথ্যে করে বলেছে তার বাড়ী যাক, বাবা সাহেব,
আমি আর তোমার কাছে কি বলব? অামার অার কে অাহে বাবা,
আমার মরা ছেলের দিব্য, আমার বউ সে প্রকৃতির লােক নয়।
তবে ঐ-মতলবে মাটা কাটার জায়গায় আসতাে আমার সন্দেহ
হওয়ায় আমি ওকে আমাদের ধরে আসতে কড়াভাবে নিষেধ
করিছিলুম-কালে তাই শেষে দাড়াল। আমার ছেলে মনে যাবার
পর বউকে এতদিন বুকে করে রেখেছি ওকে দেব বলে? বউর বাপ
নিতে এলে তাকেও দিইনি, বউও যায়নি ।
সচ্ছা, তুমি যাও।
বুড়ির কাঠগড় থেকে নেবে সে যেন ধড়ে প্রাণ এলাে। বলে
বা? আমার চতুর্দশ পুরুষের মধ্যে কখনও ফৌজদারী আদালতের
মুখ দেখিনি। আমার বরাতে আরো কি আছে কে জানে ?
এরপর আসামী অর্থাৎ বউকে ম্যাজিস্ট্রেট যাহা জিজ্ঞাসা করলেন।
এবং সে যাহা উত্তর করলে তাহার ভাবার্থ কিছু শুরুভাবে নিয়ে উত্ত
করা হল।
বাবা! আমি বই দুঃখিনী, মামার যে শান্তি আপনার বিচার
দিলে তাই আমি মাথায় পেতে নেব। তবে আমার এই শিত
ও বৃদ্ধা শাশুড়ীর জন্যই আমার একটু জীবনে মায়া, নতুষ ঐ
আর এ নেই, এটা যা হয় কিছু হয়ে গেলেই নিফতি
সকালে তার বুড়ো মাকে দেখিয়ে বলে গ্যাছেন, আমার
দেখো। এই সকল কারনে আমার বাবার সাথ "
কোথাও স্থান নেই, এমন দুর্বহ জীবন না থাকাই মঙ্গল। আপনি মর্তে দেবতার প্রতিনিধি সমান, বিচার আসনে বসেছেন অাপনার অসীম ক্ষমতা, আমার শাশুড়ী ও শিশুপুত্রের ব্যবস্থা করে আমার শাস্তি বিধান করুন, এমন নিরাশ্রয় স্ত্রীলােকেরই পক্ষে কাজও ও মঙ্গল স্বরুপ, কারাবাসও একটা আশ্রয় এবং শত শত রাজ পুরুষের রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। সে দুষ্টের শান্তি বিধানের স্থান, দুষ্টের অত্যাচারের স্থান নয়। আমার সেও নিরাপদ। আমি ঈশ্বরের নাম নিয়ে শপথ করে বলতে পারি, আমি নীচ কুলভবা ও নিরাশ্রয়া, পতিহীন হলেও আমার মন নীচ নয় । আমার দেশে আমায় সকলেই জানে, এখানে অপরিচিতা বিদেশিনী, এখানে আমায় কে চেনে, কে জানে? বীরভূম জেলায় আমার বাড়ী, আমি জমিদারের অত্যাচারে সেখান থেকে পালিয়ে এসেছি আর সে মুখখা হ’বারও উপায় নেই নতুবা সেখান থেকে সাক্ষী জোগাড় করতুম। আমি পাঁচ বৎসর বয়সে এদের বাড়ী ঢুকেছি এখন বােধ হয় এক কুড়ি তিন বৎসর বয়স হবে। এতদিন যে গ্রামে, যে ঘরে, যে পাড়ায় বাল্যকাল থেকে খেলা ধুলা করে বাস করেছি—সে স্থান আমার ও গজাৰ সমান তীর্থ, দেব মন্দিরের ন্যায় পবিত্র ছিল, সেই স্থান আমার বিবির বিপাকে ত্যাগ করতে হয়েছে, মনে করেছিলাম সে মন্দির থেকে প্রতিমা বিসর্জন হবার পর শূন্য মন্দিরে তাঁর ধ্যান, তার স্মৃতি বুকে করে ফি কাটা’ব, কারণ শুনেছি বথায় বহুকাল দেব প্রতিষ্ঠা থাকে ও পূজা সা হয় তথায় তাহার কিছু মাহাত্ম থাকে ও দেবতাকে আকর্ষণ কি সে মাটী কে, সে মাটী তীর্থের কায় পবিত্র থাকে, ১ কত যুগ যুগান্তর দেবতার লীলা অবসানের পর ও তথায় রূপে অস্থিতি থাকে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ওয়ার কত » পরেও এখনও তথাকায় ধুলিকণা তুলে লোকে শিরে শুকতারা নিয়ে মস্তক পবিত্র মনে করে, কত মহাপুরুষ ও দেবতার পবিত্র পদরেণু, রক্ত মাংস ঐ ময়দানের ধুলার মধ্যে মিশ্রিত আছে, আমার সেই বিশ্বাসে কুঁড়েখানা আশ্রয় করে পড়েছিলাম কিন্তু তা আমার ভাগ্যে ঘটলো না। সা কেন ? বউ-জমিদাদের কদর্য অনুরােধ ও বল প্রকাশের ভয়ে আর থাকতে পারলাম না, রাত্রে বৃদ্ধার হাত ধরে আর শিশুটী কোলে করে পালিয়ে এসেছি। সা—এত জ্ঞানের কথা ও উচ্চবংশীয় স্ত্রীলোকের ন্যায় নম্র ব্যবহার শিখলে কোথায় ? বউ-বাবা, আমি বাল্যকাল থেকেই মহৎ লােকের আশ্রয়ে থাকতাম, তাহাদের গল্প শুনতে ভালবাসতাম, তাহাদের আচার ব্যবহার :-আমার ভাল লাগতো এমন কি তাদের বাড়ীতেই সর্বক্ষণ পড়ে থাকতাম তারাও আমাদের রীত চরিত্রের উপর সকলেই সদয় ছিলেন এবং আমাদের সপরিবারকে ভালবাসতে, তাঁদের ছেলে- মেয়েদের সঙ্গে খেলা করতাম, তাদের কাছে কিছু কিছু পড়’তেও শিখিছি, আমার আগ্রহ ও চেষ্টা দেখে তারাও যত্ন করে পড়তেন, তাদের পুরান বই, ভাঙ্গা সেলেট পেনসিল খাতা প্রভৃতি দিতেন। আমি তাঁদের খেলা ঘরের ঝি হতাম, কখনও তারা স্কুল করে মাষ্টার হতেন, আমরা কত কত জন ছাত্রী হতাম, আবার পড়া বলতে পাত্রে সময় সময় মার খেতাম, আর আমরা ছোট আ জায়গায় যাওয়ার ব্যাথা নেই। শাশুড়ী সাজিয়ে গুজিয়ে গান বক্তৃতা রামায়ণ, ভাগবত পাই যেখানে হবে শুনতেন, নিয়ে যে বাবা কত সুখে সেদিন কেটেছে সে এখন স্বপ্ন মুখ মত হয়েছে। সা-মহৎ লােকটি কে?
শুকতারা বউ-বাবা, তারা আমাদের মুনিব ছিলেন, তাদের বাড়ীতেই মরা এক রকম প্রতিপালন হয়েছি। অদৃষ্টমে তারাও এখন দেশ ছাড়া, তারা খুব জানেন,তাই বলে দেশের ঠাকুর। সা-সে জায়গায় তুমি থাকতে চাও? বউ—অামার শাশুড়ীর আর ইচ্ছা নেই, তিনি বলেন, সবাইকে গঙ্গায় দিলাম এখন আপনিও জীবনের শেষ কয়টা দিন গঙ্গাতীরে বাস করে গঙ্গার মধ্যে হাড় ক'খানা গেলে বাঁচি। তবে আমার ইচ্ছা করে, কিন্তু যাবার উপায় নেই। সা—যদি উপায় হয়। বউ---তাহ'লে কেন যাব না, বাবা? এ অপরিচিত স্থানে কেউ চেনে না, কেউ জানে না, সাপক্ষে একটা সাক্ষ্য অবধি কেউ দেয় না। এখানে কি সুখে আছি ? আমি বিদেশিনী, আমার অন্য সাক্ষা প্রমাণ কিছু নেই, আমি সম্পূর্ণ আপনার দয়ার ভিখারী, এ হতভাগিনীর প্রতি যদি আপনার কৃপাদৃষ্টি পড়ে থাকে, আপনি যদি দয়া করে আমাদের ব্যবস্থা করে দেন তাহা আমরা মাথা পেতে নিতে বাধ্য। বাবা, আপনি বিচার আসনে বসেছেন, আপনি মর্তের তো পাপ, ঈশ্বর স্বর্গে বিচার করেন, আপনাকে মর্তের বিচার ও সেয়া ফরেছেন, আপনি শাস্তি দেবেন তাও মাথায় পেতে ল’ৰ, দয়া কওে তত হাত পেতে সব, আপনি দণ্ড মুণ্ডের কর্তা, ফাঙ্গলের পিতা, দয়ার প্রতিমূর্তি সুবিচারক, আপনাকে বেশী আমি আর কি বল ? 'তারপর সাহেব নিধের বিষয় জিজ্ঞাসা করায় অকটে মূল বু সাহেবের কাছে বিবৃত করে বল্লে “বাবা সতীয় ও আন্ত- আমি এই কি কাজ করেছি, কোন কুমতাৰ আমাৰ হঠাৎ বিপনে কিংকর্তব্য বিমুঢ় অবস্থায় এ কা আমার ছে, এখন আপনার বিচারে যা হয় করুন।
পার্থিব সুখভােগ আমার কপালে ঘটল না, আলােকে চিরস্থায়ী অপার্থিব সুখ লাভের জন্য যতটুকু পারি সাধনা করে এখন জীবন যাপন করতে চেষ্টা করি, দেখি ঈশ্বরের দয়া হয় কি না? এ জন্মেতো কোন সুখ ভােগের আশা নেই, মনুষ্য জন্মটা বৃথায় কাটল, একে নীচ ঘরে জন্মেছি তার উপর নানা অপদ বিপদ, নানা কষ্ট, দারিদ্র দুঃখে প্রপীড়িত নানা ঝঞ্জায় উড়ে উড়ে বেড়াচ্চি, ভালকাজ কখনও করিনি, ঈশ্বরের নামটা যে করব তারও সময় পাই না, মনস্থির নেই, তারও নানাবি পদে পদে। তবে স্বামীর আশীর্বাদে সব সময়ই এক রকমে পরিত্রাণ পাচ্ছি, তিনি মৃত নন, তিনি আমার অন্তরে সদা সর্বদাই জাগ্রত রয়েছেন, সর্বদা মনে হয় পাশে পাশে ঘুরে বেড়িয়ে আমায় রক্ষা করছেন, আমি লােক চক্ষে বিধবা, কিন্তু অন্তরদৃষ্টে নই। তিনি দূরে নন, তিনি কাছে, তিনি অন্তরে, এই বলে পেমার বউ মনের আবেগে চদের জল মুছতে মুছতে সাহেবকে অভিবাদন নেবে গান। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব বুঝতে পারলেন পুলিস সত্য ঘটনা চাপা দিয়ে কিছু ঘুস দিয়ে মিথ্যা সাক্ষী যােগাড় করে গুরুতর আঘাতের চার্জে আসামীকে চালান দিয়েছে। তিনি আসামীকে সম্পূর্ণ নির্দোষী সাব্যস্থ করে তাকে একেবারে খালাস দিলেন। নিখেকে সকলের সমক্ষে আদালতে যথেষ্ট, তিরস্কার করলেন। আর তার চরণ উপর দৃষ্টি রাখুজে পুলিসের উপর আদেশ রইল ও পুলিশের খান তার নাম উঠলো- নিযেটা আগে গৰু গৰু, করে আপন মনে বাহিরে গিয়ে করতে লাগল “বাবা আমি ত ায় অল্প বয়সী ‘তিকে আমার প্রতি এমন, ক বিচার হবে না তো কি,? মাথ আমায়, যে ফাটিয়ে দিলে সে খালাস পেলে আর আমার - শুকতারা খাতায় নাম উঠলাে, আমিই ভৎসনা খেলাম। ও বেটা কি যাদু জানে, সাহেবকে কি করেছে। বাবা, সাহেবের সঙ্গে কি কথা, কি যে বক্তৃতে লাগিয়ে দিলে গাে, আমি দেখে অবাক, ভাল মেয়েদের কি আবার আদালতে বা স্বরে না কি? ও ভারি সতী সেয়েছে। এয়ােদশ পরিচ্ছেদ ভগবান বংসকারী ও দণ্ডধারী যমরাজকে সাবিত্রী যেমন জ্ঞানের কথার ধারা ভুলিয়ে সকাৰ্য্য সাধন করেছিলেন, মর্তের বিচারকদের এক অন দণ্ডমুণ্ডের অধিকারী, সেই বিচারপতি এই হীন জাতি রমণীর শিক্ষা ও জ্ঞানের এবং পাতিব্রতের সমাদর দেখে স্তম্ভিত ও সন্তুষ্ট হলেন এবং যাহাতে তাহার শ্রেষ্ঠতর উৎকর্ষ বৃদ্ধি হয় আর উপকার হয়, এবং ইহার দৃষ্টান্তে নিম্ন শ্রেণীর লোকের মনে পবিতার অন্ধুর ফোটে সেটার বিষয়ও সকলের সামনে কি বস্তৃত দিলেন। আর বল্লেন “নীচ হােক আর উচ্চ হােৰু যে স্ত্রীলােক নিজের অর্থ রক্ষার জন্য সকলের সাহায্য চাইবে তার এত সকালে তী রাখা উচিত এবং যে যা সাহায্য প্রার্থী তাকে সেপ সাহায্য * উচিত। চিত। ইহাতে অনেক নীচ শ্রেণীর নারীদের তো কান প্রাণে পবিত্রতার অন্তর সামান্যভাবে দেখা দিলেও ছু কি নার হওয়ার সম্ভব। অনর্থক বিবাহ নাম ডি কক শীঘণর মধ্যে পুত্র ফার উৎপর নিবারণ হতে পারে। সেন সত্যি সংখ্যা অনর্থক বৃষ্টি আর দেশে পত্রিকা কাৰৰ ৰূ হওয়ায়, প্রবৃত্তি নীচগাণীর চোখ কলহ হিংসা দ্বেষ মিথ্যা প্রবঞ্চনা প্রভৃতি নানা অশান্তি দেশে প্রবেশ করেছে, নীচকে নীচের দিকে ও উচ্চকে অনেক সময় নীচের দিকে কলুষিতের স্রোতে নাবিয়ে নিয়ে কালের গতি যেতে চায়। সকল দেশের সেরা শান্তিময়ী ‘এমন সােনার দেশ আমাদের এই যে- জন্মভূমির হীনতা দীনতায় ক্রমশঃ শান্তি হরণ করছে, পবিত্রতা হরণ করছে। এই মাতৃভূমি যদি কণামাত্র শান্তি লাভ কমে তাহাও আমাদের করা উচিত। আরো একটা কথা এই যে নীচ নারীকে রক্ষা করে সর্বসাধারণকে জ্বলন্ত প্রমাণ দেখান আবশ্যক, এই নীচ নারী কত আপদে, বিপদে, ঝড়ে ঝঙ্কায় নিরাশ্রয় অবস্থায় কেমন পবিত্রতা বজায় রেখে চলেছে, ঈশ্বর ও তাকে রক্ষে করেছেন সকল সময়ই। সকলেই দেখুন শুনুন এবং যারা উচ্চ, তারা উচ্চ থেকে আয়ো উচ্চ হােন, পবিত্র থেকে আরো পবিত্র হউন, আমাদের বঙ্গ নারীর চির আদর্শ চিরদিন বজায় থাকে ইহাই আমার ইচ্ছা, ইহাই আমাদের দেশের গৌরব। আমি বিলেত গেলেও বঙ্গনারীর ছেলে, দেশের গৌরব যাহাতে বজায় থাকে সেদিকে চেষ্টা ও লক্ষ্য থাকা আবক। আমি ওদের উপকার অর্থে উঠে পড়ে লেগে একটা বিহিত করে দেই এটা আমার খুব জেদ হয়েছে। নিয় শ্রেণীর লােকের শিক্ষা ও চৈতন্য হােক এ রকম উচ্চ স্বভাবের গুণে ৰে লােক সমাজে কত সমাদর লান্ত কল্লে এবং বিচারালয়ে ও জয়ী হলো। জমিদ্র কুটীরে যে উচ্চ গুণের আদর্শ সময় সময় দেখা যায় সেটা দেখে ও সমাজে তাহার আদর হওয়া উচিত। পরে সাহেব বুড়িদের সৃষ্টি করে বল্লেন-“তােমরা আমার কুঠীতে দাও। তােমাদের একটা সুব্যবস্থা করে দেব। আমার ব্যাগ অনেক বাজে ঘর আছে, তােমার কোন ব্যবস্থা না অনায়াসে যাতে পায়। তথায় নি এর ** শুকতারা তারপর সাহেব সৰ্ব্ব সমক্ষে নিম্নলিখিত বক্ত সমক্ষে নিম্নলিখিত বক্তৃতা কলেন “এই দরিদ্র নীচ বিধবার একটা স্থান সেই সৰ্ব্ব কৰ্ম্ম ফলদাতা বিশ্বনিয়ন্তাই আপাততঃ করে দিলেন। যিনি ভাসান তিনিই তুলেন, যিনি তাঙ্গেন তিনিই গড়েন। যথার্থই পূৰ্ব কৰ্ম্মফলে যেই কষ্টভােগ করুক সেই সময় স্থৈর্য ধৈৰ্যপূৰ্ব্বক চলে গেলে, কোন দিকে পদস্খলন না হলে তার দেওয়া দুঃণ অবিচলিত ভাবে তঁারই দেওয়া প্রাণে নীরবে সহ কলে অবশ্য তার দয়া হবেই। মানুষকে বিনয়, ভক্তি কল্লে প্রাণ ভরে ভালবাসলে মানুষের জন্য মানুষ কালে, মানুষের জন্য মানুষ উপকার কল্লে, মনুেষের হয়ে মানুষ দুটো কথা বল্লে, মানুষকে মানুষ একবেলা স্থান দিলে মানুষের মন টলে, আর ভগবান যিনি সর্বময়, সর্বান্তর্যামী সর্বজীবে সমভাব, সর্ব গুণের আধার, সর্ব জ্ঞানের আধার, দয়ার সাগর, পরম পবিত্র, পরম সুন্দর, সুন্দর অপেক্ষা সুন্দর, অতুলনীয়, মধুময়, শান্তিময়, অজয়, অমর, অক্ষয়, সৰ্ব্বব্যাপি, সর্বজীবের সৃষ্টিকর্তা জীবের জন্য হাসেন, জীবের জন্য কাঁদেন, জীবের মধ্যে থাকেন, জীবের উপকারে জন্মান, জীব শিক্ষার জন্য লীলা করেন। যিনি শ্যাতির্ময়, যিনি আলো, যিনি তেজ, যিনি বায়ু যিনি জল, যিনি অগ্নি, যিনি সূৰ্য্য যিনি চন্দ্র, যিনি দয়া, যিনি মায়া, যিনি স্নেহ, যিনি শ্রদ্ধা, যিনি ভক্তি, যিনি পাপ, যিনি পুণ্য, যিনি সত্য, যিনি মিথ্যা, যিনি বিদ্যা, যিনি অবিদ্যা, যিনি মৃত্যুর অধীশ্বর, যিনি চিন্তন, যিনি পুত, কন্যা, স্বামী, পিতা, মাত, শ্রাতা ভগ্নীর মধ্যে থেকে হৃদয়কে অংশরূপে কেড়ে নিতে চেষ্টা করে। তাদেরই মায়াজালে ফেলে মােহ প্রাপ্ত করে আবার ক্ষণে না দেখছেন, পুতুল খেলার মত খেলাচ্ছেন, সন্দেহ দোলায়, মজা দেখে পুতুল খেলা সাঙ্গ করছেন। যিনি কোমল, যিনি কােমল কঠিন, যিনি কোমল অপেক্ষাও 'ফেমিল ফি তাে, যিনি দয়াময়, যিনি পতিতপার্ব, যিনি দীনবন্ধু যিনি শুকতারা অনাথের নাথ, যার ছেলে মেয়ে আমরা, তার চরণে অপরাধ কল্পে, আমরা কষ্ট পেলে, তার শরণ নিলে তার মন কি গলবে না। মা বাপে কি ছেলের অপরাধ ক্ষমা করেন না ? বিধবা যদি সত্যই আপন ব্রত পালন করতে পারে সে নিশ্চয় দেবী পবিত্র অপেক্ষাও পবিত্র, নীচ হলেও উচ্চ। অস্পৃ হ'লেও স্পৃত ও পবিত্র, অচী হলে শুটা, মন যার অচী, তার বাহিরের শুচী অশুচীতে কিছু যায় আসে না। পানকৌড়া ও মাছ প্রলের মধ্যে থাকে, বাদুড় ফল খেয়ে গাছের ডালে থাকে, তাদের চী ও ভগবান সেবী বলে না। আমাদের হিন্দু বিধবার কী প্রকৃত কষ্ট নয়। সে কীর্তি, সে দুঃখ, সে দয়, তারা জগতের অনেক কাৰ্যে, অনেক উপকারে আসে, তাদের বাধা বিপ্ন হীন জীবনে অনেক স্বার্থ ত্যাগ করতে পারেন। শাকারকরা বৈধব্যের কঠোর ব্যবস্থা দিয়েছেন, এটা অবশ্য মনে হয় শান্তি, কিন্তু এটা শান্তি নয়, শান্তি, এটা তার গুণের প্রকাশ, পবিত্রতার প্রকাশ, সৎ গুণের আদর্শ, ভগবানের সেটা দেখান না। কতটা সই করতে পারে জগৎকে শেখাতে পারে, দৃষ্টান্ত দেখাতে পারে, নিজে না কলেলােক কে কি শেখাবে ? গৌঙ্গ মিজে গৃহ সুখ, ঐশ্বৰ্য্য মুখ সব ত্যাগ করে ধুলায় পড়ে জগতের শিক্ষার এ প্রেম, ভক্তি, বিতরণ অন্য নিতে কষ্ট করেছিলেন, তাঁর না, এর ত্তি, অমর হয়ে রয়েছে,তার চরিত্র গঠিত হইতেছে, এই ভগবান ॥ দেন। মহৎ কাজ করবার ধৈৰ্য্য চাই, এ হলে সহিষ্ণুতা চাই, কষ্ট সই না করে সতািয় পজি গী করে? আদর্শ হতে হলে, মহৎ হ'লে, কীত্তি রাখতে হলে চা ত্যাগ চাই, মা পরীক্ষা, কি হলো, বিলাসের ভি তিয় নিজে সেবা নিয়ে কি সে নাম হতে পারে। কিছু } শুকতারা প্রভৃতি আদর্শ মহােদয়গণ ত্যাগ স্বীকার করে দেশের জন্য সর্বত্যাগী হয়ে লােকের সেবা করে লোকের উপকার করেই চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, মানুষকেই ভগবান নানা ঝঙ্কায় ফেলে মনুষত্বের পরীক্ষা করেন, মানুষকেই মানুষ গড়েন, পশুকে নয়। মানব চরিত্র কষ্ট না ভােগ করে পর গুণের সৌরভ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে না, স্বভাবরূপ পুষ্প ভাল বিকশিত হয় བ། | পৃথক পৃথক মানুষকে পৃথক পৃথক ভাবে গড়বার জন্য, পৃথক গুণের প্রকাশের জন্য নানা জনকে নানাবিধ ঝঙ্কায় ফেলে নানা আদর্শ কীত্তি অমর রাখার পক্ষেই ভগবানের প্রধান বলেই আমার মনে হয়, তবে তৎসঙ্গে পার্জিত কৰ্ম্মফলও থাকে।” আমার মনে হচ্ছে পেমার বউকে ভগবানের পরীক্ষার বিশ্ববিদ্যালয়ে বার বার তাই দেখতে পাচ্ছি। কার বিপদে পড়ছে, পরীক্ষা হচ্ছে, জয়ী হচ্ছে, এই দেখছি ওর বশঃ চিরগাঁথা হয়ে থাকছে, ইহা কি ভগবানের উঙ্গে নয় ?” A দ্বিতীয় খণ্ড। প্রথম পরিচ্ছেদ ইরতারণ বাবুর ১৯ বৎসর বয়সে একটি সাত বৎসরের মেয়ের সঙ্গে বিবাহ হয়। এখন কনলে একটু অবাক হবার কথা, কারণ আধুনিক যুগে বিবাহ রীতি একবারে বদলে গ্যাছে কিন্তু এ বিবাহটা প্রায় ৫০ বৎসর পূর্বের কথা। তখন ঐ ধরণের বিবাহের প্রচলন ছিল, গৌরী দান, গঙ্গা দান, পৃথিবী দান, কন্যা দান প্রভৃতি কন্যার বয়সে পার্থক্যের সঙ্গে ফলের পার্থক্য ছিল, ১০১১ বৎসর পর্যন্ত কাল ছিল, এর উর্ধে বয়স কন্যার উঠলেই অরক্ষণীয়া কন্যা নামে অভিহিত হতাে। আত্মীয় স্বপন নিন্দা করতো এমন কি কন্যার পিতার চতুর্দশ পুরুষ নরক হয়েছে বলে অনেকে সে বাড়ীতে জলখ্রহণ করা দোষ মনে করতেন। বড় মেয়ে বিবাহ হলেও কন্যার শালয়েও অনেক লানা হতো। যাই হােক, ইরতারণ বাবুর পিতা, রামতারণ বাবু এই মেয়ের সঙ্গে ইচ্ছাপূর্বক পুত্রের বিবাহ দেন, কন্যা সুন্দরী নয় এবং দরিদ্র বিল কন, জাতি কুল উচ্চ ও সৎ দেখে পরিদ্র বিধৰার কন্যাদায় থেকে মুক্ত করা হয় এই ভেবে তিনি এখানে পুত্রের বিবাহ দেন, হার বেশ অলর এবং বধুর সঙ্গে বয়সের অনেক পার্থক সত্বেও, অনেকের অমতে এবং বিজয় অনিচ্ছায় এই বিষাক্ত শুকতারা ৭১ গিন্নীকে বােঝালেন- “দ্যাখ কন্যাদায় থেকে অনাখা বিধবাকে মুক্ত করা অপেক্ষা দান, যজ্ঞ, ঔপঃ ব্রত কিছু বড় নয়, কন্যাদায়ের তুল্য দায় নেই, এ দায় থেকে তাকে উদ্ধার কল্লে তোমার যশঃ চিরদিন ঘােষণ করবে, বিশেষতঃ জনিত অামাদের কুলীনের ঘরে বিয়ে করে না, না পছন্দ হয় পরে যা হয় দেখা যাবে।” এখন এই বলে শীকে স্তোক বাক্য দিলেন, গিন্নী এই ভবিষ্যতের আশায় এবং উপস্থিত যশােলাভের জন্য পুত্রের বিবাহে মত দান করেন। যথা দিনে খুব সমারোহের সহিত জমিদার পুত্রের বিবাহ হয়ে গেল। বউ কারো পছন্দ হলো না। পল্লীগ্রামে নিন্দা জটলাটীয় খুব বেশী সুবিধা। হাটে, ঘাটে, পথে, পাড়ায় একটা মস্ত সাড়া পড়ে গ্যাল যে রামতারণ বাবুর এমন কার্তিকের মত ছেলে, তার কপালে একটি পেত্নী জুটলো! আর কি ক’নে খুজে পেলে না, কেউ বলে দাড় কাক, কেউ বলে রামছাগল, কেউ বলে ঘােমটার কাপড়ের ভিতর এক ভালুক, কেউ বলে চেলীর কাপড় গহনাতে ঢাকা যেন মা কালী এসে না’বলো, কেউ বলে দেখিস ঐ মা-কালীকে এর পর শিবের মত সুন্দর ছেলে বুক পেতে দেবে, কেউ বলে বড় লোকে বউ সেজে গুজে উপরে বিবির মত বসে আছে, রাত দিন লাসী করিনীতে সেবা করছে তাতেই ঐরূপ। যেন সেওড়া গাছ থেকে নেবে এসেছে, আমরা যদি এত সুখে ভোগে থাকতাম আমাদের রূপ দেখে কে? যা আছে ওর চেয়ে ঢের ভাল। কেউ বলে বড় লােকের ৫, তায় দুরে, এবং খুব সৌখিন, ওর বোধ হয় পছন্দ হবে না। কে বলে রেখে গে—অতি বড় সুন্দরী না পায় বর, অতি বড় গয়নী কালাে কুৎসিতের ভাগ্যে বেশ সুখ হয়। বাবা তাহলে এই নিরীহ বালিকা ফনেটি কারো কিছু অনিষ্ট করেনি আয় কে পতলে । সাব্যস্থ হলেও সে বয়সও এখন আর ৭২ ও তা বহুদূরে পড়ে আছে তবু সকলে কনের ভাবী মুখের হিংসায় নানা তর্ক বিতর্ক আরম্ভ করে দিলেন, ধন্য আমাদের রমণী জাতির হিংসা শক্তি। বধুর চেহারা যাই হােক প্রকৃত অপেক্ষা সমালোচনা শ নেবে গিয়ে কুৎসিতের মধ্যে বিশেষণের তৃতীয় স্থান অধিকার কছে। পল্লীগ্রামে সেকালে বউ জীবনে বড় সমালোচনার মধ্যে পড়তে হত। সমালােচনা শুনতে শুনতে বউ জীবন বড় দুর্বহ ও অস্থির হয়ে উঠতে, এর ফল চিরস্থায়ী অশান্তিকর হয়ে কোন কোন সংসারে বড়ই অনিষ্টপাতও হতাে। কান স্বভাবতই পুত্রের মত। পিতা, পুত্র সম্বন্ধে একটু দাম্ভিক থাকেন, কলিতে এ সংক্রামক রােগট। অল্প বির সকলেরই শরীরে আছে, কারো বিকার আসে, কারো সামান্য ক্যাধিতেই কাটে তাহাতে তত ক্ষতি হয় না। কিন্তু এর উপর যদি ক্রমাগত ইজন কেহ যোগায় তাহাতে মন ক্রমশঃ টলে খায় ও বধূর দিকে বিদ্বেষ এসে পড়ে, মনে হয় তাইতো সকলে যখন বলছে তখন আমার ছেলের উপযুক্ত কিছুতেই তবে হয়নি। কিছুতেই তবে হয়নি। নতুবা লােকে বলবে "কেন? কি কেহ নাচা’বার ফন্য, কেহ তােষামােদ করে, কেহ অশান্তি ঘটাবার জন্য হে হিংসা করে যে বলে সেটা তখন তুলে যান। শনিক বা গতি কি প্রতিবেশীর সঙ্গে নেক কান 'অনেক বিষয় নিয়ে পরপর মনােমালিন্য ও প্রতিযোগিতার কারণ গমন হয়ে থাকে। এজন্য অনেকের মৌখিক ভাব থাকলেও যে আন্তরিক সব থাকে ও তার সুখ সম্পদে পরস্পর যে নয় স হন তা সকল সময় দেখা যায় না। তখন এটা দি মনে রে উচিত যে যাদের মধ্যে একটু বি ভাব চিরকাল হয়ে একে এ যায় গোশায় জল মন খুলে স হন নি বা প্রাণ খুলে এক আল বলতে মুখে কতটা টক গ্যাছে এমন যে কোন ৩ শুকতারা । প্রকৃত ভাল হলেও তার কিছু খুঁৎ ধরত না সেটা বােঝা ভুল। কাজেই পাঁচজনের কথায় নির্ভর করে বা নেচে উঠে ঘরে অশাতিকে নিমন্ত্রণ করা কারাে উচিত নয়। কারাে কথায় কর্ণপাত না করে যেমন সংসারের অন্য অশান্তি দুঃখ নীরবে সহ করে যাও তেমনি বধু খারাপ হও যদি প্রকন্তু একটা দুঃখের মধ্যে গন্য করাে সেটাও সেই ভাবেই সয়ে যাওয়া উ মনে করি। আর এটা সকল কর্তা গিল্পী মনে করে অচল থাকচিত যে আমার বধু, জামাই খারাপ হলে অন্যের ক্ষতি কি? আমার ক্ষতি হতে পারে, বউ খারাপ হলে ছেলের ও জামাই খারাপ হলে মেয়ের ক্ষতি হতে পারে, অপরের কি? আমাদের জন্য মনে প্রাণে যথার্থ ব্যৰিত কিবা দুঃখ বাড়ার জন্য বলে ? আরাে একটা কথা এই যে আমাদের বধুর নিন্দা লােকে কহে টলে ভাই, ছেলে মেয়ের সম্বন্ধে কিছু অপ্রীতিকর কথা বল্পে চটে যাই অহলেই ষােধ হয় যার বেলায় এমন ভাবান্ত হবার কারণ যে ভাঙ্গা জিনিষই তালে, আগু জিনিৰ সহজে ভাঙ্গে না। যাই হােক এখনকার কালে এমন অতৃপ্তিকর ও অমূলক আলোচনা অনেক উঠে গায়ে, অবশ্য সহরে বরাবরই কম ছিল, এখল বাজিয়ে সমাজের অনেকটা উন্নতি সাধন কহে, ইহা প্রার্থনীয় ও শান্তি, আ প সমাজের পর আরাে বদলাবে নানা করা যায়, তা হিতকর, কারণ গত অনুশােচনায় সমুদ্র মন্থনের ন্যায় গাল উৎপর । কোন না। এ-অমৃত বর্ধনের জন্য নাঙ্গ জাতিই যান, তাঁর শিক্ষা।
দ্বিতীয় পরিচ্ছে যাই হােক, একেই গিল্পীর বউ তত মনের মত হয়নি, তার ওপর এই সব সমালোচনায় বন্ধুর প্রতি তার সে রকম চিত্ত আকর্ষণ হলো না। মাঝে মাঝে কার কাছে ছেলের দ্বিতীয় বার বিবাহ দেবার কথা তােলেন এবং তার পূর্ব অঙ্গীকার স্মরণ করিয়ে দেন। কর্তা বলেন—“আহা! গরীবের মেয়েটি এনেছি, ওর একটা শব্দ এনে দেব? ওর তাে কিছু দোষ দেখি না, তবে রূপের জন্য তাে ও দায়ী নয় ” গিন্নী তেলে বেগুনে বলে উঠে তর্জন গর্জন করে বলেন “তুমি তবে আমায় মিথ্যা আশা দিয়েছিলে কেন ? এতে কি তােমার ভাল হবে? স্ত্রীকে ঠকান ? তুমি কম নও। আমি অাঙ্গিনী, সহধৰ্ম্মিনী, পতি, পত্নী এক আত্মা, এই কি তার পরিচয়? কর্তা একটু হেসে, গিন্নীর গর্তনের পর কর্তা বর্ষার শীতল ধারা বর্ষণ করে বলেন “আরে শিমি। রাগ কর কেন? তুমিত অর্ধাঙ্গিনী, সহধর্মিনী, এক যুগ, এক আত্মা, বটেই, তােমার মােহে আমি ত মুগ্ধ হয়ে সেই ত রয়েছি, তা না হলে এত কথা আর কাকে বলতে পার ? তােমার তন গান আমার সব মিষ্টি লাগে, মনে করি অধিক গন হলেই বর্ষণ অলষনীয় । বলেই প্রকৃতি, দেবী একেবারে শান্ত শীতলতা ধারণ করবেন। এইটাই বিধাতার নিয়ম। আর তুমি যখন শ, লক্ষ করতে করতে আমায় কাছে এসো, তখন কত সুন্দর দেখি এ প্রাণে কত সুখ পাই ও মনে পড়ে, এ অধিকার তো সকল স্ত্রীলােকের স্বামীর প্রতি আছে তার মধ্যে ঐ কুৎসিৎ বউটাকে ও রে যায় বুঝলে।”
শুকতারা
৭৫
গি—এ্যা ও বুড়ো ও তিন দিনের বউ, ওতে আমাতে তুলনা
আমাকে কত রকম সহ করতে হয় । কত জ্বলতে হয়, কত দেখতে
হয়, আমার রাগ ও রাগে তুলনা ? আমার ভালবাসা আর ভালবাসায়
তুলনা? তুমি তো বেশ বল্লে ?
ককে বলে তােমার ভালবাসা আর ভালবাসা সমান।
স্বামীর প্রতি ভবিষ্যতের দাবী সমান।
গি—তােমার মনে শেষ এই ছিল। মিথ্যা আশা তাহলে দিয়েছিলে
কেন ?
ক-না, না, তা সম্পূর্ণ ঠিক নয়, ক্রমশঃ মেহেতে বন্দী হয়েছি
আর আমার মেয়ে তারাকে সেই সঙ্গে মনে পড়ে যায়, আয় দেখ
গিয়ি রাগ কোরো না, ভাল কথাই বলি শােন, যদি গরীবের উপকারই
কল্লে, ভাল করেই কর, একটী সতীন করে দিয়ে আর উপকার করা
কি হবে? আর এতে যে শুধু ও ভুগবে তা নয়, এ অশান্তি সকলকেই
ভােগ করতে হবে।
হরতারণ বাবুর বিয়ের পর কর্তা গিন্নীর রাগারাগিটা একটু বেড়ে
ছিল, ছেলের বিয়ে নিয়ে প্রায় এমনি চলতাে।
বউ ঘরে এসে, সদাই ঘরে ঘরে ঘুরে ফিরে বেড়ায়, খেলা করে,
হলে, দৌড়ােয়, ঝি রাধুনীর কোলে বসে, গল্প শোনে, বামুন ঠাকুরাণীর
কাল রান্না দেখে, আবার বলে ঠানদি, একটা গল্প করনা আবার
সকলেই তেয় ভয়, হয় তখন ঝি বঁধুনীয় আঁচল ধরে ধরে বেড়ায়,
কল শাড়ীর আঁচল ধরে বলে “মা আমার ভয় করছে, তােমার
যা না” বলে শাশুড়ীর কখনও গলা জড়িয়ে ধরে, কখনও আঁচল
শাড়ী কখনও বলেন “এখন আমি ব্যস্ত, সন্ধ্যা বন্দনা করব
এল সি মার বউর আয় রে ঝি নিযুক্ত) কাছে যাও,” আবার
ফল নেয় ভিড় যখন বেশী হয় তখন বলেন এখন যাও বাহ,
৭::
রাত, দিন জড়ান ভাল লাগে না। আবার কখনও বেশ নরম হয়ে একটু কাছে নিয়ে বসেন। হাজার হােক, সন্তানের জননী, আর এই সরলা বালিকা তিরস্কার ও নিন্দার ধার তত ধারে না, যখন বকুনী খায় বা কোন অপ্রিয় ভাষা শশানে খানিকক্ষণ ফুলে ফুলে কাদে, তার কিছু পরে আবার সব ভুলে গিয়ে ছুটে এসে শাশুড়ীর কোমর জড়িয়ে ধরে ও আবার বায়না করে। শশুর বাড়ীর ভেতর এলেই ছুটে তার কাছে যায়, খাটে বসে, পাকা চুল তােলে, নানা গল্প করে ও শােনে। কর্তা খাবার সময় পাত থেকে খাদ্য সামগ্রী তুলে বউয়ের হাতে দেন, বউ টপ করে খেয়ে ফেলে, এ ছাড়া শ্বশুরের মুখের পান চিন চেয়ে খায়, গিন্নী দেখলে সময় সময় রেগে বলেন “বউকে এমন করে নাে’লা বাড়ান, বেহায়া করা, মজা টের পাবে, এর পর লজ্জা করতে পারবে না, খাওয়ার নিয়ম করতে পারবে না।” কর্তা বলেন “না না তা হবে কেন? বড় হলে এমন করে মুখে তুলে দেব কেন, ওই বা থাৰে কেন ?” গিন্নী বলেন “ হয় কর। আমার কথাতাে খাবে না।” বড় লােকের ঘর, বধূ অন্য কোন অসুবিধা ছিল না, তবে শাশুড়ী নিজে বিশেষ যত্ন যে কতেন তা নয়, দাসী চাণীর উপর বধূর যত্ন ও তত্ত্বাবধানের ভার ছিল, তারা যা করে তাই। বউ কিত তত পাক বুড়ি ছিল না, সে নিল, বেহায়া, বকে’ বকে, আর, কেনাে মত গায়ে জড়িয়ে ধরে। একে শাশুড়ী কিছুতে পারে না, রুমে গিলীর হৃদয়ের এক কোনে অনুমাত্র স্থান কতে এমনি কতে করতে বিয়ের কথাটা এক রকম চাপা পড়ে না।
তৃতীয় পরিচ্ছে বালিকা বধূ হরতারণ বাবুর সঙ্গে সম্বন্ধ হলাে দেখলে মাথায় কাপড়টি দেয়, বামুনদি শিখিয়ে দিয়েছে “ছিঃ বর যে, আমাদের সকলের সামনে দেখলে মাথায় কাপড় দেবে নতুবা নিলে হবে। আর তােমার শশুর শাশুড়ীর উপস্থিত কালে বর এলে সেখান থেকে একেবারে সরে সবে, আমরা ডাকলেও এসস না।” ইনি বহুকালের রাঁধুনী, হরতারণ বাবুকে এক রকম মানুষ করেছেন, গ্রাম সম্বন্ধে ঠাদি হয়। গিন্নীকে মা ও কর্তাকে কর্তা বলতেন। বউ রাধুনীর কথামতই চলে, হরতারণ বাবুকে কারো সামনে আসতে দেখলেই পালায়। নতুবা ১• হাত ঘােমটা এমনি টানে যে পিট অবধি ঘােষ্ট। টানার চোটে বেরিয়ে পড়ে, তথাপি বউগিরির চাল হাড়ে না, কলা বউ সেজে এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। একদিন কর্তা গিন্নী কাজ উপলক্ষে পথের সামনে দীর্ঘকাল বসে সুতরাং সে স্থানে হরতারণ বাবু এলে বধু ঘর থেকে বেরুলেই দেখা যায়, সুতরাং বধু একবারে সে মহল ছাড়া হয়েছে, নতুবা লােকে যে নিন্দা করবে। বয়কে ইচ্ছা করে দেখা দেয় বলবে যে, কামেই সে দিন হয়তরণ বাবু বজবাড়ী আসেন বউকে আর দেখতে পান না। চুপি চুপি ঠাদিকে বিলে ফরে—“কি গাে ঠাদি! তোমাদের সে ব পশুটি কই ? নকি একেবারেই বনের মধ্যে প্রবেশ কল্লেন নাকি?” কর্তা গিন্নী আছেন বলে সয়ে গ্যাছে। - লজ্জা! লজ্জায় খাতায় নাম উঠেছে। লজ্জাই রমনীর লা, কিন্তু এ অলঙ্কার দিয়ে, এ ভূষণ দিয়ে এ আবরণ দিয়ে দেহ এখন ঢের দেরিঠাদি ৭৮ শুকতারা ঠা-না, না, মেয়ে মানুষের বাড় কলাগাছের বাড়ি। ইহা বীরভূম জেলায় কলাগাছও ঠাদি হলুদগাহ হয়ে যায়, কলাগাছেরও বাড় থাকে না। বাবা যে কি বুঝলেন, জানি না, ঐ পাকা চুল তুলবে আর ন্যাকা ন্যাকা ছেলে মানুষ কথা কবে, বাবা হাত ধরে নিয়ে গিয়ে খিড়কীর পুকুর ধারে আমটি, জামটি, কুলটি, শশাটি তুলে হাতে দেবেন আর ও দৌড়ে দৌড়ে বেড়াবে, তার ঐ দেখতেই পরম সুখ, কি বল ঠাদি ? ঐ কোময়ে কাপড় বেঁধে ঝুরি কুরি চুল ঝুলছে আর ছুটে বেড়াচ্ছে, ঠিক যেন ঐ ক্ষেন্তির মায়ের ফেক্তির মত দেখায়, বউয়ের মত কিছু দেখায় না। ঠা-ছিঃ ঝিয়ের মেয়ের মত কেন হবে? এমন সময় গিন্নী আসতে অন্য কথা পেড়ে এক গ্যাস জল খেয়ে বাইরে গেলেন। এই রকম তাদের যুবক বালিকা মিলনে দাম্পত্য জীবন কাটতে লাগলো।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ হরতারণ বাবু জমিদারের একমাত্র দুলাল। বড় মানুষের আয়েশ পুত্র, বাইরে অনেক সময় বন্ধু বান্ধব নিয়ে আমােক, স্টুক্তি, গান, বাজনা, তাস, পাশা এই সব নিয়ে সময় কাটান। পড়াশুনায় তত মন ছিল না। মাষ্টার পণ্ডিত এসে এসে ফিরে যায়। আবার পড়ার সময়ও কোন ধমক দিবারও ক্ষমতা ছিল না। পড়তাে বলতে পারতাে না। আবার মাষ্টার পণ্ডিত একটু জোরে কথা কইলে গিন্নীর কাছে হেলে অভিযােগ করতেন, গিল্পী ছেলের অভিযােগে একেবারে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দাসীর দ্বারা কড়া কথা বলে পাঠাতেন। স্কুলেও এই পড়া না পাল্পে মাষ্টার পণ্ডিত কিছু বলে ছেলে তাে স্কুল যাওয়া বন্ধ করতাে এবং মায়ের কাছে ও নানা কথা শিক্ষকের বিরুদ্ধে যায় ঘিনী তাতেও ক্রুদ্ধ হয়ে পেয়া। কি দরবান গায় তলব পাঠাতেন এবং খিতীয় দিন এ রকম যেন না হয় এমন ইকুম চালাতেন। আবার ক্লাশে না উঠতে পাল্পেও শিক্ষকদের উপর নানা দোষারােপ করতেন। কামাই কয়ে জরিমানা করবার অধিকার ছিল না। এত বড় লােকে ছেলেকে জরিমানা করে অপমান করা, ক্লাশে না উঠতে পাল্লেও উঠয়ে দিতে হৰে নতুবা ছেলে কান্নাকাটী করবে, ছেলের কান্নায় না নিয়মের বহিত কাজ করতে মাষ্টারদের বলবেন, তারা সে কাজ না করে না বৈধ রাগ প্রকাশ করে মাষ্টারদের নানা কথা বলবেন। কর্তা এ বিষয় কিছু গিন্নীকে বঙে, গিন্নী কর্তার প্রতি রেগে গিয়ে যতে-তােমার ছেলেকে সামান্য অর্থ উপার্জনকারী মাষ্টায় অপমান মা তােমায় অপমান হয় না? নেই বা পারে, তুমি না পরে তোমার দিন কাটছে না? ওতাে তোমার চেয়ে ঢের পড়েছে’, ইংরাজী বাঙ্গালা পড়া হয়, কত ইংরাজী বলে, হাতে হাতে মুখে অঙ্ক বলে। তুমি তাে ইংরাজী জান না আর সেই তালপাতায় তো বড় বড় দেব অক্ষর লিখতে, তােমার চলছে আর ওর চলবে না। ওতো আর চা করবে না, জমিদারের ছেলে এত কষ্ট করে লেখা পড়া শেখার দরকার ? কর্তা বলেন যা ভাল বোঝ তাই কর। এই কম করে গিল্পী ছেলেকে মাইনরটাও পাশ করতে দিলেন না। লে ক্লাশে উঠতে না পাল্পে গৃহ শিক্ষকের পড়া’বার দোষ হতো, শিক্ষকরা অনেক সময় এসে ছাত্রের দেখা পেতেন না, বসে বসে ঘরে ফিরে যেতেন। ছাত্র তখন পশালায় কিম্বা বাগানে কি ঘুড়ি উড়াচ্ছেন। কিন্ধ কোনােও হুজুকে বেরিয়েছেন। ক্রমে শিক্ষকরা ও দেখেন মিছি মিছি দোষের ভাগী হওয়া, তারাও বিরক্ত হয়ে পড়ান ছেড়ে দিলেন, অন্য শিক্ষকও কেউ নিযুক্ত হতে চায় না। সুতরাং ছেলে একবায়ে মা সরস্বতীর সঙ্গে সম্বন্ধ ছেড়ে দিয়ে বিলাসী দুলাল বাংলা মার” হয়ে উঠলেন। ধনীর সন্তান, কোন চিন্তা ভাবনা নেই, নিৰ্মা জীবন, ও অলস- ভাবে দিন কাটে, সংযত শিক্ষা কখনও হয়নি, যা আবার ধরেছেন তাই পেয়েছেন, কাজেই মনের গতি রুদ্ধ করবার ধৈৰ্য্য কখনও হয়নি, মনের হইল যতদুয় বেড়েছে অবাধ গতিতে গভীর জলের মধ্যে তলদেশে অবলীলায় খেলিয়ে বেড়িয়েছে, মাছ পেলেই হইলটি করেছে। নানাতি চরের সঙ্গে বেড়িয়েছে, এখন এ হইলেরজে জলের মধ্যে খেলাচ্ছে, মাছ ইইলকে গিলে হইল টানলেই ছিড়ে যাবে। মনের বাধন একমায় খুলে কি গেয়ে দেওয়া শ মূলের কৃট একবার খুলে দিলে না দৃশ্যের ও বাতাসের স্বাদ পেয়ে সে কবাট যা যা ষে গতি ও বেগমানীয় গতি আর সুমন
৮১
অপ্রতিহত প্রভাবে ছুটলে তার প্রতিরোধ পরে দুরুহ।
করতে যায় সেই তলিয়ে যায়।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ।
বলা বাহুল্য জমিদার পুত্রের সুখের জীবনস্রোত অপ্রতিহত প্রভাবে
চলে।। এ রকম অবস্থায় অনেক মধুমক্ষিকা জোটে। পরের পয়সায়
বাবুগিরীটা, অন্য আমােদ ফুর্তি বেশ হয়ে যায় । মন্দ কি? কাজেই
এ রকম আমােদের পোষকতায় ও সহকারী অনেক জোটে। অলরে
খবর আসে, ‘দাদাবাবু' নৌকাযোগে অন্য গ্রামে দোলের আমােদে যাবেন।
পাঙ্গ ও বাগানে বনভোজনে যাবেন। কাল কাতায় বড়দিনের
ত্তি করতে বন্ধু বান্ধব নিয়ে গিয়ে ছুটী কাটিয়ে এলেন। আষাঢ়
মাসে রথের সময় হয়তো খড়দার মায়েশের মধ্যে এক দল নিয়ে মেলায়
আমােদ করতে ছুটতেন । এইরূপ একটি একটানা একটা হুজুগ
পেলেই হলো। না পেলেও হুজু খুঁজে নিতেন। দাদাবাবুর
দেখা ক্রমশঃ পাওয়া ভার হয়ে দাড়ালাে। গিন্নী মধ্যে মধ্যে অমত
করতেন, ছেলে বুঝিয়ে দিতেন, “মা! তোকে না গেলে তারা এতটা
রোজগার করে কি কান্ত মেলায় বা ভিড় হয় কি করে ? পাঁচ
দেশে থেকে পাচটী লােক যায়, পাচটা জিনিষ কেনে তাই ভিড় হয়।
শং দোকান পাট বসে। ব্যবসাদারের উপায় না হলে বা তারা
মেনে বসায় কেন? কলকাতার থিয়েটার পাটিয়া প্রতি
৮২ শুকতারা রাত্রে হাজার হাজার টাকা রোজগার করে, মানুষ না দেখলে তারা কি করে মা ? আর ভদ্রলােক ও বড় লােক মাই দেখে মা, নতুন। ১৬ টাকা ' ৪ টাকা দিয়ে টিকিট কেনা কি মা গরীবের ক্ষমতা ? পাঁচ জায়গায় যাওয়া, পাচটা দেখা মা বড় লােকেরই অঙ্গ, টাকা না থাকলে কোথা থেকে খরচ করবে বল। আর একঘেয়ে জীবনে মুখ থাকে না, একটু আমােদ কল্লে মন ও শরীর ভাল থাকে, সাহেবের। রকম করে বলে তাদের শরীর সবল ও অস্থায়। শর সাহেবের। এমন স্ফূৰ্ত্তিতে টাকা খরচ করাকে অপব্যয় বলে না।” গিন্নি ও ঠিক বুঝে যান। এই রকম করে মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিজের বাজে আমোদে দিন কাটিয়ে দেয়। কৰ্ত্তা সময় সময় রাগ করেন, কিন্তু গিন্নী ছেলের কথাগুলি ঠিক অবিকল নকল করে কর্তাকে বুঝিয়ে দেন। লেখা পড়ার বিষয়ও তাই, কৰ্ত্তা কিছু বল্লে গিন্নী বিরক্ত ভাবে যা বলেন পূর্বে তা বলা হয়েছে। কর্তা গিন্নীর বক্ততায় সময় সময় নীরব হতেন আবার কখনও বলতেন “যা ভাল বোঝ কর, এরপর টের পাবে।” অনর্থক বিবাদের আশঙ্কায় প্রায়ই কথা বলতেন না। তিনি এক রকম প্রকৃতির লােক, জমিদার হলেও নিৰ্বিবাদী খাটী এবং বৈষ্ণব ধরণের লােক ছিলেন। সরিকদের সঙ্গে অনর্থক অনর্থক প্রতিযোগ অনর্থক প্রজাদের ব্যাপার নিয়ে মামলা মোকদ্দমায় বৃথা সময় নষ্ট করা অর্থব্যয় করা বড় ভালবাসতেন না। গৃহের ব্যাপারও তাই, গিন্নী যাতে সন্তোষ থাকতেন তার কোন বিষয় বাধা দেওয়া বা তার সঙ্গে কোন রকম তর্ক বিতর্ক করা তার স্বভাব ছিল না। তার কাজ ছিল প্রজাদের সুবিধা অসুবিধা দেখা, গরব প্রজাদের অব নিজে তত্ত্বাবধান করে তার কাছ থেকে সময় খাজনা না নেওয়া চারীরা অর্থলােকে অন্যায় অত্যাচার না করে তাদের কাছ থেকে কৰ্তা গৃহে ।
কতারা খাজনা আদায় না করে। এই বিষয় তার বেশী দৃষ্টি ছিল, নিজে সময় মাহালে গিয়ে কার কি কৰ্তব্য জেনে এসে সাধ্যমত তাদের অভাব মেটাতেন। পৈত্রিক ক্রিয়াকলাপ, দেব সেবা, অতিথি অভ্যাগতের সৎকার এই সব নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, কখনও তীর্থ যাত্রা, পাৰ্বনে গঙ্গাস্নানে যাওয়া এই প্রকারেই বৎসরার্ধ কেটে যেতো। তা ছাড়া নিজেও খুব শুচী ও শুদ্ধাচারী ছিলেন। সন্ধ্যা বন্দনা, জপ তপ, গুণ স্বতিতেও দিবসাদ্ধ অতিবাহিত হতে । কাজেই গিন্নীর নথ নাড়া দেবার সুযােগ কমই হতাে। পিতা পুত্রের পরস্পর সাক্ষাৎও দুর্লভ ছিল। ক্রুমে কত্তা পরলােক গমন কল্লেন সুতরাং এবার পুত্রের বিঘ্নর পথ একেবারে বার আনা উন্মুক্তা।
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ। যাই হোক বালিকা বধু উপযুক্ত বয়স প্রাপ্ত হয়ে বুঝলেন, তাঁর সুখময় ভাণ্ডার অপূর্ণ। প্রাণ যারে চায় তার অভাব দিনে দিনে, দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে অনুভব করতে লাগলাে । আগে যাকে দেখে ছুটে পালাতে এখন তার জন্য প্রাণ লালায়িত, তার পদ ধ্বনি শােনার জন্য কান সদা খাড়া থাকে, তার স্বর শােনার জন্য মন উদগ্রীব। তার দর্শন লালসায় নঘন যে সদাই বাসনা পূর্ণ ভাবে তার অন্বেষণ করছে। নয়ন সদাই অতৃপ্ত, লােলুপ ও চঞ্চল। আহা! সেই তাে সে দিনের ছেলে মানুষ মেয়ে, তার এ অদ্ভুত পরিবর্তন কেন? তবে কি সেই বিশ্বনয়ার নিয়ম এই -তাই দেহিনােহনি যথা দেহে কৌমারং যৌবন জয়া তথা দেহান্তর প্রাপ্তি ধীর শুত্র ন মুহতি। ১৩ গীতা ২য় অঃ। কোন দিন গিন্নী বলতেন ওরে ক্ষেন্তির মা ; ক্ষের মা বধুর কাৰ্য্যে নিযুক্ত দাসী) আজ বউমাকে ছেলের ঘরে শুইয়ে আসিস, যতক্ষণ হরতায়ণ না আসে, বউ আগলে থাকিস, সে বাড়ীর মধ্যে এলে চলে আসিস। ফেন্তির মা তাই কয়ে, ‘দাদাবাবু’ ঘরে এলেন, ক্ষেতির মা উঠে এলাে, বউ ঘুম ভেঙ্গে দেখে কেতিয় মা কাছে নেই তার পরিবর্তে ‘বর শুয়ে, বউ অমনি লাফ দিয়ে এসেই বামনির বিছানায় আশ্রয়। সারা রাত্রি এক বিছানায় থেকে তের বেলা দাদাবাবু উঠে গেলেন, বাইরে যাবার সময় বামনিকে বলে গেলেন, “ঠাদি ও ফাস আর কেন ? ওর চেয়ে দীঘির পাড়ে কাছারী বাড়ী বেশ শুয়ে থাকি, কি ও ওয়া, খােলা বাড়ী, শরীয় জুড়িয়ে যায়।”
শুকতারা এ সব খবর গিন্নীর কিছু রাখা অভ্যাস ছিল না, মাথাও কখনও ঘামাতেন না। লােক জনের উপর ভর থাকতো, তারা যা কত তাই হ'তে। কোন দিন বামনি হয়ত বল্লে, “তােমার বউতাে সারা রাত্রি আমার বিছানায় শুয়েছিল।” গিন্নী হয়তো একটু হেসে চুপ করলেন নষত বল্লেন ‘তা হােক পরে হবে।” এই অবধি এর ব্যবস্থা। যাই হােক, ‘দাদাবাবুর’ অভড়া ক্রমশঃই চকদীঘির বাগান বাড়ীতে ঘনীভূত হ'য়ে বঁড়াল' কোন দিন বাড়ী ভিতর আসেন, কোন দিন আসেন না, রাত্রে খবর আসে, ‘দাদাবাবুর এত রাত্রে এত দূর থেকে আসতে আলস্য হচ্ছে, খাবার পাঠিয়ে দেবেন। মা তাই করেন। বধুর কিন্তু সব পরিবর্তন। আগে, যে বিছানা থেকে পালিয়ে আসতাে এখন সেই শয্যা শূন্য দেখে শূন্য প্রাণটা হা হা করে এখন যেন সেই দুগ্ধফেননি শয্যা, কন্ট ক শয্যা কিম্বা ভীমের শরশয্যার সমান দাড়িয়েছে বিছানায় শুয়ে আশে পাশে বুকে পিঠে পাজরে বানের ফলার ন্যায় সেই কমল শয্যা বিদ্ধ করছে, বিছানার উত্তাপে শরীর দগ্ধ করছে, নিশ্বাস যেন অগ্নি শিখার ন্যায় উষ্ণ ভাবে বহিতেছে, হৃদয় জ্বলে পুড়ে শেষে যেন নিস্তেজ অবস্থা ধারণ করছে, নিরস নিভন্ত ভয়াশি অগ্নি নির্বানের পর যেমন পড়ে থাকে দগ্ধ হৃদয়ও সেইরূপ দুঃখানলে দগ্ধ হয়ে অবসাদ প্রাপ্ত বিশুদ্ধ নিস্তেজ হয়ে অনাদৃত ভাবে এক পাশে পড়ে থাকে। “দাদাবাবু’ আজ আসবে না এটা যেন এ কথাটা বধুর কণে সকলের অগ্রে মেঘময়ে ন্যায় প্রবেশ করে। বিদ্যুতের শব্দে মানুষ যেমন চমকে উঠে, সমস্ত শিরা, অস্থি, মজা, কঁপিনে হয় আন্দোলিত করে দিয়ে যায়, ‘দাদাবাবু’ আসবে না যর পক্ষে সেই বয়নি স্বরূপ। বাপ্পির স লাগলে মায়.যেন মেহ প্রাপ্ত হয়ে ক্ষণিক নিজেকে হারিয়ে ফেলে, বধুরও বল : ময় তাই হয়। কখনও বা অজস্র অশ্রুধারা কিছুতেই শুকতারা } বাধা মানে না। ঝর ঝর, ক'রে ব'য়ে পড়ে, হৃদয়ের বেগ তখন অপ্রতিহত অশ্রুধারায় একবারে বালিশ ভিজে যায়। মা বিছানা তুলতে গিয়ে বলে “বাবা বউদি কি ঘেমেছে, বালিশ ভিজে ঢোল হয়েছে”-এই বলে রোদে ফেলে দেয় । কিন্তু শীতকালে বালিশ ভিজে দেখে একদিন সন্দেহ হ'লো এবং বল্লে “বউদি, শীতে সবাই কেঁপে ময়ূচি এখন কেন বালিশ ভেজে ? তুমি কি কঁাদ ? বউ উত্তর দিলে “তুই থাম, যেন জ্যেতিষী এসেছেন, হাত গুণে দেখেছেন।” ক্ষেন্তির না বল্লে তা যাই বল, আমি সব বুঝিছি, কদবারই কথা। দাদাবাবু প্রায় দেখি বাগানে রাত কাটান। আমরা দাসী বাদী আর কি বলব ?—বউ যেন শুনতে পেলেন। এমন ভাব দেখিয়ে চলে গ্যাল। এমনি করে ফেন্তির মা ও বামুনঠাকরুণের কাছে বউ ধরা প্রায় পড়তো। কিন্তু মাছ ধরা দিত না, জাল কেটে’ পালিয়ে যাবার চেষ্টা করতো। বউ মনের ব্যথা প্রকাশ কাউকে করতো না, সে সার বুঝেছিল এ জগতে ব্যথার ব্যথী মেলা ভার। মিথ্যা সহানুভূতি দেখিয়ে অনেক সময় প্রাণের কথা অনেকের বের করে নিয়ে তারপরচারিদিকে প্রচার করে আমােদ করে, নানাবিধ মতামত প্রকাশ করে, কেহ বা মূখতাবশতঃ ও ভাল করতে গিয়ে অনিষ্ট করে ফেলে। মূল কথা বিধাতা বৈমুখ হলে মানুষে বিশেষ কিছু করতে পারে না। এস্থলে প্রাণের ব্যথা ঢিল কঁাকরের মত চারিদিকে না মই মল, দেওয়া দুঃখ তঁার দেওয়া বহন করাই শ্রেয়” তার তার দেওয়া দেওয়া জিনিষের অভ্যন্তরে নিয়ে মূল্য থাকে। তা আমরা কি বুঝব? সে জিনিষের ধুলা মত অনাদর করে ছড়া’তে নেই। তিনি যা দেন তাই কুড়িয়ে নিয়ে ইয়ের মধ্যে রাখ। তাঁর দয়া পাবে। মা যদি তিনি শলম কয়ে আমরা নীরবে সহ্য করে তারই অত থাকি, তার মন যেন . ঈশ্বরের শুকতারা 87 নরম হয়ে তার আবার সন্তানের জন্য দুঃখ হয় ও আকর্ষণ বাড়ে দেখা আবার অনেক সময় অনেক বাপ মার মুখে এ কথাও শােনা যায়, “অমুক আমার কিছু চাইতে জানে না, বল্তে জানে না। যা দিই তাই নেয়, ভালমন্দ বিচার নেই, ওকে তােমরা একটু দেখে শুনে বাপু।” তাই মনে হয় আমাদের সাক্ষাৎ মাতৃপিতৃ মূর্তি দেখলে বা তাদের ব্যবহারে মনে হয় জগত পিতামাতার ঐরূপ মনের ভাব হয়। BANI.M, [! ::}, Esi! সপ্তম পরিচে: 53, যাই হোক, বধূর যাতনায় ফেটে যায় তবু মুখ বন্ধ, একেবারে মুকের ন্যায় বাহিকে নীরব কিন্তু অসহ অন্তর্জালায় অন্ধঃরহঃ হৃদয় দগ্ধ হতে লাগল। মাঝে মাঝে গিন্নী ভাব গতিক লক্ষ্য করে এবং ক্ষেন্তির মা ও বামুনঠাকরুণের কাছেও শুনে বলেন, কেন এমন করা আবার কি ? পুরুষ মানুষে কোথায় কি করেছে, তার খোঁজ করা কেন? সব বাড়াবাড়ি। কত লােকের কত জালা থাকে, কত ঘরে পাঁচ সাত সতীন থাকে, তার বেশীও হয়, কুলীনের ঘরে আমীর দেখা পালায়, মাসে সে একবার পেলে তার খুব ভাগ্যি, আবার কত পুরুষের কত কে, পরিবারের গায়ের গহনা কাকে দিয়ে আসে তার ঠিকানা নেই, কখন বিক্রয় করে আমাের করছে, স্ত্রীকে ধরে ধরে মারে, থাৰ কথা বলে গালি দেয়, আহা! ও পাড়ায় ঐ ফণী মিত্রের # কি কষ্ট। সব তত উড়িয়ে দিয়েছে, গলার মাল পরা হাটা শুকতারা ছিল, তাও সে দিন মেরে ধরে কেড়ে নিয়ে গ্যাছে। তা বউটির মুখে কথা নেই, সদাই হাস্যময়ী, কাউকে নিজের অশান্তির কথা জানতে দেয় না, এমন সােনার প্রতিমা বউ, তার কখনও মনে ধরেনি। চিরকালই বাইরে বাইরে বেড়ায়, একবার ফিরে চেয়ে দেখেনি তবু সে বাড়ী এলে কত সেবা যত্ন করে । হাতে হাতে যোগায় তবু অনুষ্টানে টী হলেই মার, এখন তো কিছু নেই, ছেলে গুলোর খাওয়ার অভাব তা বউ কাউকে জানতে দেয় না, আর সে এলে তার কিন্তু পঞ্চ ব্যঞ্জন চাই। মেয়ে মানুষের সব সইতে হয়, মেয়ে জন্মই সইবার জ। এত অধৈর্য হলে কি চলে? কত জনের সুন্দরী বউ কাচে তা তো আবার••••••এসব কথা শুনে ঝি বামনি সব চুপ থাকে; কথার প্রত্যুত্তর কল্পে একেবারে চিরদিনের মত এত বড় লােকের বাড়ীর অন্ন উঠবে। বধুর কথা তারা কিছু বল্পে বলে, “তােরা ত খুব দরদী লেখচি।” বধুর ব্যথায় শাশুড়ীর সহানুভূতি এইরূপ। আর ছেলের চরিত্র সম্বন্ধে অঞ্চ অসচ্চরিত্রের লােকের সঙ্গে তুলনা করে মনকে প্রবােধ দিতেন, তাদের চেয়ে আমার ছেলে কত ভালো, কিন্তু যদি কোন সৎ লােকের সঙ্গে গিন্নী ছেলের চরিত্রের তুলনা করে দেখতে তাহলে বুঝতেন যে লে কত নেবে যাচেন। আর পরিণামে এর ফল কত বিষময় অবধি হতে পারে, কিন্তু পুত্র দেহে অন্ধ হয়ে সে দূর দৃষ্টি বা অন্তুর দৃষ্টি তিনি করতেন না এবং ভাল করে বুঝেও দেখতেন না। ইহার প্রথম কারণ, তিনি দেবতার ন্যায় স্বামী গেছিলেন ও তাঁর প্রণয়ে তিনি একাধিপত্য স্থাপন করেছিলেন, কাজেই এক বুঝেন নি—“কি যাতনাবিষে বুঝিবে সে কিসে, কভু আশীবিষে দংশেনি, যারে। দ্বিতীয় কারণ, ব্যথার সামগ্রী কষ্ট পেলে তা এ এ। ব্যথা লাগেধুর প্রতি সহানুভূতির প্রকাশ আমরা এ ভার নে শুকতারা না, কাজেই ব্যথার ব্যথী হওয়ার আশা তাকে করাও ততটা সম্ভবপর নয়। তৃতীয় কারণ, পুত্রের প্রতি নির্ভরতার কারণ হলে তার কটাতে মায়ের ব্যথা বলার কারণ সময় সময় হয়ে পড়ে, এ তিনের কিছুই তার বাধাবিঘ্ন নেই, অতএব তার একমাত্র বংশধরের প্রতি রাগ দুঃখের সে রকম কারণ দেখি না। তিনি সেকেলে মানুষ এত বাহিক যশের ধারও ধারতেন না যে তাহাতে ছেলের বিশেষ নিন্দার কারণ হবে বলে একটু ভাববেন বরং তার ধারণা, পুরুষ পরেশ, পরশ রতন অরুপ পুরুষের জৌলস নষ্ট হয় না। মাটীর ভিতর থাকলেও সদাই বানীয় এবং জেলা প্রকাশ পায়, পরিষ্কার করলেই উজ্জলতা হয় এবং সর্বদা মুল্যবান্। তিনি মনে করেন “কেন সবাই এমন করে? আমোদের বয়স, দুদিন অমােদ কল্পে এমন কি দোষ, মাগাে, যে বউ”—আবার সময় রামায়ণ, মহাভারতের কথাও ভাবতেন-পুরাকালে কত রাজার কত রাণী ছিল, দুয়া রাণী, সুয়া রাণীর গল্প, কোন ঋষির কোন্ অষ্পরকে দেখে ধ্যান ভঙ্গ হলো ইত্যাদি ঘটনা তার একেবারে কণ্ঠ ছিল। অনেক অষ্টম পরিচ্ছেদ “তাই তো তোমার একা একা রাত্রে অনেক সময় কষ্ট হয় বুঝতে পারছি, কিন্তু কি করব? আস্ আস্ করি হতভাগাগুলাে একটু পরে একটু পরে করে ছাড়ে না। ক্রমশঃ রাত হয়ে যায়, ঘুমে অঙ্গ অবশ হয়ে পড়ে-মার আসতে ইচ্ছা হয় না। আমাদের বাঙ্গালী ঘরের মেয়েদের বেশী সময় কাটান অভাব হয়। ইংরাজ রমণীরা কত প্রকার কাজে নিয়ােজিত থাকে। রাত্রে বসে বসে কত বই লিখে ফেছে, কাজ উপলক্ষে তাহাদিগকে বাইরে অনেক সময় যেতে হয় তাদের এ সকল বিষয় ভাববার বা মন খারাপ করবার সময় থাকে না। তােমাকে কতক গুলো বই কিনে দেব, তুমি পেড়ো, তাহাতে তোমার বিদ্যাচর্চাও বৃদ্ধি হ'বে আর কত রকম শিক্ষা হবে ও কত রকম চরিত্র দেখে মনে সান্ত্বনা পাবে। তখন এ সকল বিষয় ক্ষেপ আসবে না। কেমন বুঝলে? কাল কতকগুলা বই কিনে দেব এই বলে হরতারণ বাবু কিছুক্ষণ পরে স্ত্রীর ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। যেন স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করা তার দুষ্ট ছেলের স্কুল থেকে প্রেজেন্ট স্যার’ বলে পালিয়ে বাঁচার ন্যায়, যেন বাপ মার ভয়ে মাষ্টারের কাছে উপস্থিত হয়ে দু’টো বইয়ের পাতা উল্টে কি মাথা মুণ্ড মাষ্টার পড়লে তা মাথায় প্রবেশ করে না, মন তখন ঘুড়াতে খেলাতে মাঠে মাঠে কি সহুরে ছেলের সহরের নানা দৃশ্য ও আমােদ কৌতুকের দিকে পড়ে থাকে, মাষ্টার চলে গেলে বই ফেলে পালাতে পাড়ে বাঁচে। হতারণ বাবুর মনের ভাবও সেইরূপ দাড়া’ণ, তিনি সেইরূপ ভাবেই স্ত্রীর ঘরে অল্প সময় মাত্র সে ফোন শুকতারা চুতা করে পালাতেন। নতুবা বিক্ত ভাব, কখনও অন্যমনস্ক ভাব, কখন চোখ বুজিয়ে ঘুম ঘােয়ে পড়ে থেকে পালালেন। এইরূপ ভাবে তারিণী দেবীর কখনও কখনও স্বামী দর্শন ঘটতে, সে পতি দর্শন যেন দেব দর্শনের ন্যায় দুলভ হয়ে দাড়িয়েছিল। ইনি প্রত্যক্ষ দেবতা হয়েও অপ্রত্যক্ষ দেবতা স্বরূপ হলেন । কাজেই তারিণী দেবীর দর্শন লালসা, সেবার খেন মিটতো না। পূর্ণচন্দ্রের সেবা রজনীর না হতেই নির্দয় রবি পূর্ণচন্দ্রকে ঢেকে আপনার বল প্রকাশ কল্লেন। হায়! যার প্রতীক্ষায় সারা নিশি জেগে বসে হয়তো তিনি এলেন কিন্তু শূন্য প্রাণে তাহাতে জীবন্ত প্রেমের মূৰ্ত্তি নেই, প্রণয় সরস ধারা বিহীন শুষ্ক ভাণ্ড মাত্র, তা না হলে হায় ! পূর্ণ বয়স্ক যুবক, মেহের ও প্রেমের এবং ভােগ লালসার অংশ সমস্তই ষােলকলায় পূর্ণ এবং পবিত্র দাম্পত্য প্রেম সুগন্ধি কুসুমের পূর্ণ বিকাশের সময়, বর্ষার ভরা সমুদ্রের ন্যায় দুই কুল ছাপিয়ে প্রেম সাগর আনন্দে হাসির ঢেউ তুলে এসে নদীতে আপনার দেহ মিলিয়ে দিয়ে গভীর আনন্দ ভরে সঙ্গম সুখের স্বাদ অনুভব পূৰ্ব্বক নৃত্য করতে করতে দিগদিগন্ত প্লাবিত করে আবার অতলে তুলিয়ে যাচ্ছে, সে গভীরতার সন্ধান অতি দুর্ভেদ্য। সেই ভরা সমুদ্র, সেই ভরা বরষায়, একেবারে শুষ্ক মরু! নদী কোথায় সাগর সঙ্গমে আনন্দে *ীত হয়ে উল্লাসে মাঠ, ঘাট ভাসিয়ে দিয়ে যাবে, তা না হয়ে প্রেম সাগর শুষ্ক মাটীর সরসত জন্য দুনী করে জল সিঞ্চন করতে হচ্ছে। কি ভাগ্য! কি কষ্ট! পতির পবিত্ত প্রেম আলাপনের স্থানে কৃত্রিমতা করে পূর্ণ করতে হবে ? তাণিীকে বিধাতা কেন বাঁচিয়ে রেখেছেন ? তার শিরে বাঘা পড়লে সে এর চেয়ে শান্তি অনুভব করতো, তার জন্য কে কঁদবে ? সে গরীবের মেয়ে ছিল, তবু মাতৃ মেহরত্ন ভাণ্ডারের অধিকারিণী ছিল, সেই ধনে শুকতারা ধনীর মেয়ে ছিল, মা দু’টা বেগুন তুলে এনে বাড়ী ঢুকতে আমার তাৰু ভালবাসে, দু’টো নারকোলের লড়, নিয়ে ধনীর গৃহে ঢুকতে আমার তাৰু ভালবাসে বলে, যা বিদুরে ফু সেই দরিদ্রা বিধবার জুটততা আঁচলে করে মেয়ের জন্য অন্তত, শত অপমান, শত বাধা বিষ্যতেও সে স্নেহের দান বাধা মানেনি। সেই কালো মেয়ের মুখ দেখলে আঁচলে চোখ মুছেছে, আজ যে কাঙ্গালিনী মাতা চিরদিনের তরে বিদেয় নিয়েছে। শ্বশুর যিনি পরম সুহৃদ ও মেহময় ছিলেন, তিনিও স্বর্গে, শাশুড়ী এ কুৎসিতার দুঃখে দুঃখী নন, তবে এ পতি প্রেমে বঞ্চিত ও সকলের লাহিতাকে বাঁচিয়ে যন্ত্রণা দেবার দরকার কি? হায় ! বিধি! তােমার উদ্দেশ্য তুমিই জান।
| E{:}, ?, BANER E: -- নবম পরিচ্ছেদ দাও প্রভু ! সেই পবিত্র প্রেম আমার হৃদয়ে জাগিয়ে, যে প্রেমের কোন আকাঙ্ক্ষা নেই, নিজেই অবাধ গতিতে বয়ে যাবে। কারো মঙ্গল চাইবে না, যেখানে কামনা, সেখানে দুঃখ, সেখানে দগ্ধ, আমি অহঃরহঃ কামানলে দগ্ধ হচ্ছি, আমার কামানলে প্রেমরূপ শান্তি সুধার ধারায় শীতল কর, শান্ত কর, আশ্বস্ত কর। হে পতি! হে মদন মােহন! রাধা গােবিন্দ। রাধা মাধব! ভক্তের ভগবান! পতিত পাবন । বা কল্পতরু ! হৃদয়ের ধন ! এস, আমার হৃদয়ে এসো, আমায় সানা দাও, পরমানন্দ দাও, আমি কিছু জানিনা, বুঝিনা, কেবল প্রট জীবনে তােমার নাম শুনি, গুণ শুনি, পৃথিবীময় সৌরভ পাই, জগতে তােমার লােভ দেখি, পতিতে তােমার রূপ দেখি, হে পতি! হে বিপতি, হে পতির পতি, হে জগত পতি-হে প্রাণপতি, প্রাণ প্রাণের প্রাণ, হৃদয় নাথ, হৃদয়ের, হৃদয়মি! আমার হৃদয় শীতল কর, পরিত্যক্ত স্থান পূর্ণ কর, হৃদয়ে বসো, আলো দেখাও, পথ দেখাও জ্ঞান দাও, বিবেক দাও, প্রভু! বুদ্ধি দাও, ভক্তি দাও, ধৈৰ্য্য দাও, ধৰ্ম্ম দাও, সবই চাইছি বটে, কিন্তু তােমার কাছে যাবার জ, তোমাতে লয় হকার জন্য, ভোগের জন্য নয়, দেখলুম আমি ভোগের অন্য আসিনি, আমায় তােমার যখন দরকার হয় না, দয়া হয় না, তখন তার দরকার হবে কাম, কার দয়া হবে? আমি ফুটে ঝরে গিয়ে এই যে বিশ্ব, এই যে তােমায় ভুবন, তুমি ময় মৃন্ময়ী ধরা তাহাতে মিলিয়ে যাই, একবারে নয়, এখয়ে ক্ষয়, তােমাতে মেশামিশি, তোমাতে কোলাকুলি, তুমি মা, আমি তোমার হ’ব প্রভু! কেউ আমার জন্য কাদে না, কেউ মায়া শোনে না, কেউ দুঃখ করে না, সবই স্বার্থপর, স্বার্থের শুকতারা ধরা, থাকতে ইচ্ছা হয় না। কি সুখে, কি আশায়, বেঁচে থাকা ? পঞ্চভূতের দেহ, পাঁচ দিকে মিশিয়ে যাক্, পাচ ভূতের মারামারি আর অন্দরের সংলগ্ন মদন মােহনের মনির বাহিরের দিকে যাবার পথ আছে, মেয়েদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য অলরের দিকেও দরজা আছে। ঠাকুর বাড়ীর পুরােহিত, চাকর, ঝি প্রভৃতি সন্ধ্যা আরতি, বৈকালী পূজা ভােগ, শয়ন, পুরােহিতের নিত্য নৈমিত্তিক কাজ সারেন । চাকর, ঝি পুজা ও ভােগের বাসন মাজা, ঠাকুর বাড়ী ধােয়া, পূজার আয়ােজন করা ইত্যাদি যে যার নিত্য কর্ম সেরে বাড়ী যায়। পুরোহিত রাত্রে মধুসূদনের শয়ন দিয়ে, ও দিনে পূজা ও ভােগাদির পর ঠাকুর বাড়ী বন্ধ করে চিরপ্রামত গিন্নীর ঘরের আলনায় চাবী রেখে যান। গভীর নিশীথ, জ্যোৎস্নায় পৃথিবী আলােকিত, একেবারে নিস্তব্ধ ধবলারজনী যেন ধরাময় হাসির সমুদ্রের ঢেউ তুলে চলেছেন। চারিদিকে কাশ ফুল ফুটে যেন আরো জ্যোৎস্নার রাত্রে শোভা বৃদ্ধি করূছে । মৃদু মৃদু বায়ু ভরে কাশ ফুলের দল যখন দুলে দুলে ঢেউ খেলে চলে যাচ্ছে তখন যথার্থই মনে হয় মেদিনী নিস্তব্ধ রাত্রে প্রিয়জনের মিলনে হেসে হেসে ঢলে পড়ছেন। নিদ্রা ভঙ্গের পর জানালা খুলে বধু ক্ষণিক নিস্তব্ধ জ্যোৎঙ্গা রাত্রে ধরণঃ শােভা নিস্তব্ধভাবে দেখলে, তারপর মন্দিরে গিয়ে খট, কয়ে চাবি খুলে, অমনি জ্যোৎস্নার আলো, নেটের মশারীর মধ্য দিয়ে মদন মােহনের মুখের উপর পড়ে যেন মনে হলো যেন তিনি চমকে যাড় তুলে গেলেন। বউ তখন মােহ প্রাপ্ত, বাহজ্ঞানহীন, জেগে, কি ঘুমিয়ে, কি স্বপ্ন দেখছে ? না ঘুমের ঘাের। সত্যই কি মন মােহন বিনী, পরিতা দুঃখিনীর দিকে তাকিয়ে দেখলেন, না এম। মা স্বপ্ন! তিনি গ'লে এ দুঃ কেন?
শুকতারা যাই হােক দুঃখিনী শূন্য শয্যায় পড়ে থেকে মন হু হু করে উঠলো, তখন ভাবলে এ শূন্য মনে শূন্য শয্যায় পড়ে থেকে আর কি করব ? জগত পতির কাছে নিস্তব্ধ রাত্রে নিস্তব্ধ মনে তঁার চরণ তলে পড়ে থাকি, তাহাতে ঢের শান্তি আছে, তাহাতে ঢের ফল আছে, তার মন কি গলবে না ? তিনি ত মানুষ নন, ভগবানকে ডাকলে মন গলে বৈকি? নইলে কত শত মহাপুরুষ সিদ্ধ হলেন কি করে ? বলে শয্যা ছেড়ে উঠে খানিক জানালা খুলে দাড়াল, তারপর কৌমুদী রাত্রের শােভা দেখে তন্ময় হ'লো। পরে গিন্নীর আনা থেকে চাবী নিয়ে মন্দিরে গেল, মন উদাস হলে বা রাত্রে নিদ্র। না হলে বউ প্রায়ই এ রকম করতো।
দশম পরিচ্ছেদ মালী মালা গেথে, ফুলের তােড়া বেঁধে প্রত্যহ চির নিয়মানুসারে বধুর ঘরে সাজি ভরে পাঠিয়ে দেয়। সেই সাজি ভরা ফুল যেমন দেয়, তেমনি থাকে, তাকে বউ স্পর্শও করে না। একালে ক্ষেন্তির মা কি জানালা দিয়ে ফেলে দেয় আর আপন মনে ব ব করে বলে “কেন যে মালী এ ফুলের কঁাড়ী পাঠিয়ে দেয় জানি না। যেখানকার যেমনই থাকে, রােজ এই ফুল ফেলা বেশীর ভাগ কাজ হয়েছে।” বউ বলে “তাের যদি অসৰু হয়, থাক, ফেলার দরকার কি? দেবতা পূজা নেন কি না নেন, তা কি কেউ দেখতে পায় ? না তাই ভেবে পূন্নার আয়োজন করে ? দেবতার উদ্দেশ্যে ভক্তেরা নানা উপচার দিয়ে রােজ পূজা অর্চনা করেই সুখ পায়, তাের বাপু সব তাতে ফোড়ন। সবেতেই গিন্নীপনা।” ক্ষেন্তির মা বল্পে—“এত শত জানি বাপু, জ্যান্ত মানুষ আবার দেবতা হয়, চাল কল দিয়ে পূজা হয়, আমি জানি সোয়ামীর জন্য পরিবার সব গুছিয়ে রাখে, সেয়ামী এলে খায় দায় শােয়, তােমাদের অন্দরের কথা বলতে পারি না।” এই কথা বলে টক টক করে সে চলে গ্যাল। বউ মনে মনে বঙ্গে- “প্রভু আমার শূন্য আসন রে সাজিয়েও সুখ আছে, এও কাজ, এও শান্তি, এও আশা। এতেও অন্য মন হওয়া যায়, আমি তোমার জন্য কুম শয্যা রচনা করে বিহ শয়নে পড়ে থাকব, তাতে আশা, তাতেও চিন্তা, চিন্তাতে সময় কাটালে ভেবে ভেবে স্বপ্ন গণি, ঐ এলেন, আমার প্রতি কুসুম উপহার সাদরে গ্রহণ করেন, তাতেও মুখ, সে যে আমার মুখ স্বপ্ন, সে স্বপ্ন যে আমার ক্ষণেকের তরে শান্তি রাজ্যে নিয়ে গিয়ে মণ মধু বায়ু সঞ্চালনে যেমন শরীর নিয়ে O শুকতারা নিদ্রা হয় তেমনি শান্তিপ্রদ ! আমি সাধনা যদি ভক্তিভরে পারি, এ নিস্ফল হবে না, বিধির ভাণ্ডারে সঞ্চিত হবে, আমার জীবন সঙ্গী, আমার দেবতা, ইহকাল, পরকাল, পরপারে তাে আমার সঞ্চিত পূজা গিয়ে নেবে, সত্য সাধনার কি ক্ষয় আছে ? ভগবান যদি সত্য হন, আমার পূজা ব্যর্থ হবে না, জীবনের প্রতিদিনের এই কুসুময়াশি পুঞ্জিভূত হয়ে সেই অনন্তধামে থাকবে, কেন আমি শূন্য ভাল রাখব? ছােট জাত, ক্ষেন্তির মা কি জানে? এ লালসা, এ আন্তরিক ভক্তি নিয়ে মরতে পারি তো পরজন্মে পূর্ণ হবে। এ জন্মেও এক একটি পূর্ণ হবে। যে দিন আসবেন সে দিন পূজা না পেলে, ভক্তি ধূপ দীপের সুগন্ধ না পেলে আরাে দুলভ হবেন, আরো অপ্রিয় হবে, আরো সুযােগ পাবেন, তাতে সুখ কি ? তবে ঐ ফুলের সাজি, আর ঐ কুসুম শষ্যা আরো আগুন জালিয়ে দেয়, কিন্তু যাহাতে অশান্তি, পরে তাহাতেই শান্তি লাভের আশা, পৃথিবীতে আশাতেই বাঁচে, আমিও আশায় জীবন কাটাব। এই বলে চক্ষের জল মুছলে। এইরূপে কত রজনীই বধুর চক্ষের জলের সঙ্গে কাটতাে তার সন্ধান কে রাখে ? একমাত্র চির জাগ্রত, সর্বত্র বিরাজমান, অন্তরে বাহিরে অধিষ্ঠিত, সেই জগত পতিই কেবল শোনেন।
একাদশ পরিচ্ছেদ। “নির্ভর নিতি ভুবনে, কে জাগে কে জাগে রাত্রি ২টা ঢং করে জেলের ঘড়িতে বাজল, বউ আর কণ্টক সদৃশ শুন্য শয্যায় থাকতে পাড়ে না, ঘড়ীর ঘা দু’টো বুকের কলিজার উপর যেন সজোরে বেজে উঠলাে, বউ শয্যা ত্যাগ করে মধুসূদনের দরজা খট্ করে খুলে মন্দিরে প্রবেশ করে। চক্ষে জলধারা, হাতে ফুলের সেই সাজি, নানাবিধ সুগন্ধি পুষ্প, পুপ, ফুলের মালা ফুলের তােড়া সৌরভে দিক আমােদিত করূছে, বলে প্রভু! এলাম তো কিন্তু পরা’ব কি করে? মশারী খাটান যে ব’লে সমস্ত জানালা গুলাে খুলে দিলে, বলে মুখ খানি একবার দর্শন করে সকল আলা জুড়াই, পতির অভাব তোমার মুখ, তােমার পতিকে বরণ করে সাধ মিটাই, হে জগপত। আমার পতির প্রতীক্ষায় রোজ পূজার আয়োজন করেই সুখ, পূজার ডালা প্রভু আমি শূণ্ঠ রাখি না, প্রভু! আমি ভাবি ভক্তরা দেবের উদ্দেশ্যে পূজার আয়োজন করেই সুখ কিন্তু চর্ম চক্ষেত দেব দর্শন ঘটে না। কিন্তু একমনে ভক্তি রাখলে তিনি হৃদয়ে আবির্ভাব হ'য়ে অমূল্য শাস্তি দান করেন, এই কথা শুনি ঋভু! তাই আশা করে ব'সে আছি যে আমার দেবতাকে এই ইষ্টক নির্মিত প্রাসাদে লাভ করতে পাচ্ছি না, সেবার আশা পূরণ হলাে না, ভােগ-লালসা মিটল না কিন্তু আমার রক্ত, মাংস, মেদ মজ্জায় গঠিত এই পৰু তেতিক হয় মলিয়ের মধ্যে অহরহ দেখচি বিরাজ করছেন, পতি কখনও স্বাধীন দেহ এ ছাড়া নন, এ আমীর অর্ধাঙ্গিনী বলে। পণ্ডিহর নিবেশ করেন, দেহী কখনও দেহ ছাড়া নয়, এ সম্বন্ধ হবার নয়, এপারেও নয়, ওপারেও নয়, স্ত্রীলােকের স্বামীই ইহকাল, পরকাল, তবে কেন শুকতারা ভেবে মরি, কেঁদে মরি প্রভু ! ওপারেও কি বাসনা পুরবে না ? কি দেখছ মদন মােহন! হে নিশ্চল নির্বাক পাষাণ। আমার কথায় কেন উত্তর দিচ্ছ না? বল, বল, নাথ আমায় একবার সান্তনা দাও, যে যাকে আমি হৃদয়ে সর্বক্ষণ দেখচি, চোখের জলে যার চরণ সর্বক্ষণ দোয়াচ্ছি,—ভক্তি পুস্প, মন, প্রাণ সবই যাকে অর্পণ করিছি—যাকে স্ত্রীলােকের অদেয় কিছুই নেই, যার দুখে দুঃখী, মানে মানী, ধনে ধনী, সেই জগতে সার বস্তু কখন ও আমার দিকে ফিরে চাইবেন কি না ? এ পারে কি ও পারে ? তাহলে আমি কর্ম জীবনে ক্রমে চক্ষের জলের সঙ্গে বাসনা ত্যাগপূর্বক কৰ্ম্ম করে যাই, চিত্তকে বশ কর্তে অভ্যাস করি, আশাকে জয় করতে চেষ্টা করি, বল অনাথের নাথ একবার আমায় বল? বধূ ক্রমশঃ তন্ময়, স্পন্দহীন, তখন বৈশাখী শুক্লা বৃজনী হু করে উদাস হাওয়া পাগােলের মত এলােমেলো ভাবে মশারী উড়িয়ে বয়ে যেতে লাগলো, জ্যোৎস্নার আলােকে সেই জ্যোতির্ময় দেবতার রূপ যেন জীবন্ত ভাবে ফুটে উঠলো। আর সেই সময় বৈশাখী পূর্ণিমায় যত গঙ্গাস্নানের যাত্রীরা গঙ্গাস্নান করে নৌকা করে পার হয়ে বাড়ী ফিরে যাচ্ছে, আর কতক কতক দল গাইতে গাইতে পথ হাঠছে “এ অমল ধবল কমল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া, দেখি নাই কভু, শুনি নাই কভু এমন তরনী বাওয়া- কোন সুদয়ের ধন তুমি•••••••••••” উদাস হাওয়া আয় পথিকের গান" আর মদন মােহনের সুন্দর মূর্তি সম্মুখে বউ কাঁদতে কাঁদতে নিজেকে সামলাতে না পেরে উন্মত্ত ভাবে সেই ফুলের মালা, তােড়া মন মোহনের গলায় ফেলে দিলে, পানের খিলি সৰ মদন মোহনের মুখের কাছে ফেলে দিলে, এইরূপে কত রাত্রি পর্যন্ত মদন মােহনের সরে খেলা করেছে, প্ৰতাত আগত প্রায় দেখে মন্দিরের রজা বন্ধ বা সিয়াম রে যথাস্থানে চাষী রেখে শুতে গেল’ } ১০০ শুকতারা এইরূপে মধুসূদনের ঘরে প্রায়ই উপদ্রব হতে লাগলো, ফেন্তির মা বলে “আর ফুল টুল দেখি না, কোথায় যায় ?” বউ বল্লে, “তাের সে খোঁজে দরকার কি ? তাের ফেলতে ভার বােধ হয় তো ?” ক্ষেন্তির মা বুদ্ধিমতী, সে আর কিছু বলে না, বুঝলে আমরা দেখলে লজ্জা হয় তাই কোথায় লুকায়। বাবা আমি ক্ষেন্তির মা, আমায় লুকান ?” এই অবধি। দ্বাদশ পরিচ্ছেদ। পুরােহিত প্রাতে, মধ্যাহ্নে, অপরাহ্নে, সায়াহ্নে চার বার আসেন পৈত্রিক ব্যবস্থা অনুসারে পূজা কাৰ্য্য সমাধা করে যান, বড়য্যে বাড়ী তার খুব প্রতিপত্তি, তিনি এই বাড়ী পূজা করতে করতে বৃদ্ধ হয়েছেন, তার পিতৃপিতামহও এদের নিস্কর জমীতে বাস করে এদের পৌরহিত্য করে গ্যাছেন। এখন পুরােহিত মশা’য় বাতের জন্য একটু একটু আফিন খান। প্রাতে এসে পুরুত ঠাকুর মধুসুদনকে গাত্রোত্থান করিয়ে আনান্তে পূদি করেন। তিনি মশায়ী তুলেই অবাক, দেখেন যে তাজা ফুলের মালা গোড়া ও ফুল বিছানায় এড়ান, তালা পানের খিলি বিছানায় এ সৰুৰুে সিলে? গিজীর ঘরে চাৰী থাকে, কার সাধ্য যে চাৰী পায়। তবে ১০১ কি মধুসূদন এতদিন বাড়য্যে পরিবারের পূজা খেয়ে এবং আমার সেবায় সন্তুষ্ট হয়েছেন, দেখাবার জন্য এরূপ খেলা খেচেন! মশারী ওলোট পালােট, একি ব্যাপার ? আরতির সময় মাল, তােড়া, পান কি বিছানায় রেখে গেছি, না এমন করেছি বলে মনে তাে হচ্ছে না। যাই হােক সে দিন পুরুত মশায় কিছু স্থির করতে পাল্লেন না, আফিমের ঝে কে কি করেছেন আবার সে দিন ব্রাহ্মণীর সঙ্গে ঝগড়া হওয়ায়, তাঁর মেজাজের সে দিনও তেমন ঠিক ছিল না, এজন্য সে দিনের অস্থিত্যের উপর নির্ভর কতে পাল্লেন না, ভাবলেন দু'দিন দেখা যাক, এখন প্রকাশ করা হবে না। এইরূপ উপদ্রপ মধুসূদনের ঘরে প্রায় হতে লাগল তখন আর বৃদ্ধের মনে দ্বিধার কোন কারণ রইল না,—তিনি ভাবলেন সত্যই মধুসূদন এইখানে সদয় হয়ে কলিতে মধু বৃন্দাবন স্থাপন করবার জন্য একটা পূৰ্ব্বে ইঙ্গিত দেখাচ্ছেন, রাধিকা ও অষ্ট গােপিনী এসে রাত্রে ওঁকে তাজা ফুল ও তােড়া দিয়ে সাজিয়ে রেখে যান, পান খাওয়ান, এই- রূপে রাত্রে ওঁরা আমােদ কৌতুক করেন, আশ্চর্য্য ত নয়, কলির প্রথমে নষীপে গৌরাঙ্গ মূর্তি ধরে কত কীর্তি রেখে গ্যাছেন, সে স্থান এখনও গুপ্ত বৃন্দাবন নামে অভিহিত, আর এই বীরভূমে বৈষ্ণব ধর্মের কেন্দ্র স্থান, চণ্ডীদাস, জয়দেব, জ্ঞানদাস প্রভৃতি এইখানে বসেই ওর প্রেমের মধুর হল বেঁধে গ্যাছেন, জয়দেবের সঙ্গে কত খেলা করেছেন, পদ্মবতীর দে কত হল করে তার হাতের রান্না খেয়ে গ্যাছেন, কেঁদুবিতে এখনও জাহেবের মেলা হয়, মকবাহিনী গঙ্গা এখনও জয়ে এসে ঐ দিনে ভক্তের বাঞ্ছা পূর্ণ করবার জন্য শ্রমুখের আদেশে কেইবি পৰিভ করেন। আমিও ব্রাহ্মণ, বহু দিন থেকে মধুসূদনের সেবা করি; আমাকেও ছলনা করা বা আবির্ভাবের পূর্ব লক্ষণ প্রকাশ যা আর বিচিত্র কি? ভক্তেরা ত ভক্তি ভরে সেবা করে শেষে ১০২ শুকতারা অনেকে সিদ্ধ হয়েছেন। কুমার ত সদাই অদৃশ্য, তার প্রতি দয়া হলো নাকি? আর কিছু দিন পরে সব বােঝা যাইবে, এখন একথা গিন্নীকে বলা আবশ্যক। একদিন ঠাকুর মশায় গিন্নিকে ডেকে নিয়ে দেখালেন এবং মাঝে মাঝে এরূপ হয় বল্লেন। গিন্নি বল্লেন-“আছ। আমিও কিছুদিন লক্ষ্য করে দেখি, পরে যা হয় করব।” গিন্নী মনে মনে ভাবলেন, ভগবানের যদি আমার প্রতি এত দয়, তাহলে আমার সংসারে এত অশান্তি, এত বিশৃঙ্খলা কেন? যদি মদন মোহনের যথার্থ মধু বৃন্দাবন স্থাপন করে এখানে তার লীলাস্থল কিম্বা আনন্দধাম করবার বাসনা হয়, সে রকম চিরান হাস্যময়, শান্তিময়, সংসার আমার কই ? বউ তাে গোপনে গোপনে চক্ষের জল ফেলে মনের আগুনে পুড়ে মরছে, একটা ছেলে, তাও সংসারী নয়, চরনার হাতে বিষয় পড়ে সব যেতে বসেছে, দেনা পত্র, মধুসূদনের পূজার আয়ােজম ও ভক্তি ক্রমশই সংক্ষেপে দাঁড়াচ্ছে। আমি যে কয়টা দিন আছি, এর পর হয়তাে তাও জুটবে না । মধুসূদনের উপর ওই ঢিপী হয়ে গাছ বেরুবে কি শিলাখণ্ড ইদুর গর্তে ঢুকবে আর মদন মােহনের বস্ত্র ইন্দুরে কাটবে, মুক্তির উপর আল্লার নাদী, ইন্দুরের বিষ্ঠাতে ভর্তি হয়ে থাকবে, ওর গায়ের উপর উঠবে এই তো দেখছি সংসারের পরিণাম, বংশ বৃদ্ধির ও সে রকম উপায় দেখচি না? একটা ছেলে, তারই বা দু’টা ছেলে কই? ছেলে হলে বউও কিছু ব্যস্ত ও আশ্বস্ত থাকে। বাড়ীর ও শােতা বৃদ্ধি হয়, তাহলে বুঝি, এক রকম আনন্দধন বাড়ীতে হচ্ছে, বালকের কলরবে গৃহের প্রফুল্লতা বৃদ্ধি করে। ব্যার আবার কিসের সংসার। যাই হােক গিন্নী কদিন খুৰ দৃষ্টি রাখলেন, গিন্নীর যেন ঝাধুনি শােয়, উনি খাটে শোন। বউ পাশের ঘরের খাটে শােয়, খাদেয় শুকতার ১০৩ দরজা খােলা থাকে, ক্ষেন্তির মার উপর গিন্নীর আদেশ-বউর ঘরের মেঝে শু’তে, কিন্তু ক্ষেক্তি রাত্রে উঠে, বউর ঘুম হয় না এজন্য বউ বলে—“তুই সামনের দালানে শশা, দরকার হলে অব।” দেরি মা তাই করে। বউর দরকার হয় না, ডাকেও না। এয়ােদশ পরিচ্ছেদ। P “বিশ্ব যখন নিদ্রা মগন গগন অন্ধকার কে দেয় আমার বীণার তারে এমন ঝর ।” রাত্রি ২টা, গভীর রজনী, সবাই নিদ্রিত, কেবল বাড়বে জমিদার বাড়ীর দ্বিতল অট্টালিকায় দুগ্ধফেননিত শষ্যাতলে তা ঘাের কখনও , কখনও শুচ্ছে, কখনও উঠছে, ঐ সময় ভীমবেগে রাত্রি ২টায় ট্রেনখানা পাঁচ মাইল অবধি কাপিয়ে হিসিল দিতে দিতে বেরিয়ে গেল, শষ্যা শায়িনীর মনটা ও দেহের সমস্ত মেদ, মজা, মাংস, শিয়া লি অবধি কঁপিয়ে ও দেহ মধ্যস্থিত রক্ত স্রোত গুলিকে উদ্বেলিত ক's গেল। ভগ্ন স্থানে আঘাত লাগলে আরো ফণা বৃদ্ধি হয়, ভাপ এ দেহে সামান্য উত্তপ্ত বায়ু লাগলে আরাে উত্তাপ বৃদ্ধি হয়। যাই হােক গভীর রাত্রে ট্রেনের গম্ভীর শব্দে বিরহিনীর বিরহ সাগরকে উদ্বেলিত করে দিয়ে গেল, তারপর তিনি ধীরে ধীরে উঠলেন, তোকে না যে ইনি হয়তারণ বাবুর পরিত্যক্তা ও সন্তপ্ত ভাৰ্য্যা এমী অনিী দেবী। শয়ন ঘরের সংলগ্ন স্নান ঘর, উনি উঠে দানের ১০৪ कटांना ঘরে প্রবেশ কল্লেন, পরে স্নান করে গরদ সাড়ী পরে হাতে ফুলের সাজি নিয়ে গিন্নীর ঘর থেকে চাবী নিলেন। এ করে চাবীর শব্দ হলো, অন্ধকারে হাত বােধ হয় ঠিক পড়েনি, যাই যােক, গিন্নীর ঘুম ভাঙ্গলো । গিন্নী ডাকলেন, “ৰামুন মেয়ে আলো জ্বালাে”, বামুন মেয়ে উঠে আলো জ্বলতেই দেখে সম্মুখে শ্যামাসুন্দরী রূপ, সদ্য স্নাতঃ এলো কেশ, লাল পাড় গরদের সাড়ী পরনে, সিমন্তে ও ললাটে সিন্দু, আর গায়ে গিনী সােণর গহনাগুলি ঝ ম করছে, অন্য সময় এত জৌলস হয় না, বৌ ফুলের সাজি হন্তে নিস্তকে দাড়িয়ে। প্রথমে ভাবলে পালাই, পরক্ষণে ভাবলে “কেন পালা’ব ? অন্য কিছু মনে করতে পারে। আমিত কুকায়ে আসিনি, চোর ত নই।” হঠাৎ আলো জ্বেলে এই বেশে বউকে দেখে বামনী ও গিন্নী অবাক হলেন, কি বলবেন কিছু ঠিক করতে পাল্লেন না, বামনীর মনে কষ্ট হলাে কিন্তু প্রকাশ করার শক্তি কার আছে? সে একবারে নীরব। গিন্নীরও সে দিনের দৃশ্যে হঠাৎ মনের অবস্থা বায়স্কোপের ছবির মত উল্টে গেল। কেমন চক্ষে জল এলো। একই মানুষ, এক অবস্থা, একই বাক্য রােজ শােনা যায়, কিন্তু সময় বিশেষে সে কথার দাম হয়, সময় বিশেষে হৃদয়ে ফটোগ্রাফের ছবির মত বাপ পড়ে যায়, বহু পুরাতন বহু পৰিচিত এমন একটা একটা বিষয় বা ক্য আছে যে যাহা সময় বিশেষে মানবের মর্ম স্পর্শ করে। নিত্রিত কালে জাবের সাবয়ব নিঃশষে আপন আপন কাজ করে তা প্রকৃতি পূর্ণ মাত্রায়, স্নিগ্ধ শান্ত ধীর ও সাম্য ভাবাপন্ন হয়। সেই অবস্থায় বউকে সন্তপ্ত ও দুঃখিনী বেশে দেখে গিন্নীর মন মৱ হ'লে। তিনি বল্লেন- “এখন পাগলের সমস্ত বাড়ী বিচরণ কেন? মধুসূদনের মন্দিরে এত রাত্রে এক ছেলে মানুষ বই যাওয়া নিত। তুমি কি ঠাকুর হাও?”
তারা ১৩৫ বউ-না। গি—কি করে মালা পরাও? মশারী খাটান থাকে। বউ-অনুকুল পবনে সমস্ত মশারী উড়িয়ে নিয়ে যায়, গিন্নী শুনে বলেন “এমনি দয়া করে উনি তোমার সমস্ত অশান্তি উড়িয়ে দেন তাে বুঝি, আমার একটি ছেলে, তার দু'চারটে ছেলে পুলে হলেও তাে হয়, আমি নাড়ি চাড়ি, তুমিও তাদের নিয়ে ব্যস্ত থাক, তাহলে এমন পাগলের মত সমস্ত রাত্রি বাড়ীর মধ্যে ছুটে বেড়ানর সময় হয় না। শাে’বে চলে।” গিন্নী ফুলের সাজি নাবিয়ে নিলেন, পরে ঘরে শুইয়ে চুলগুলি ঝুলিয়ে দিলেন, গায়ে হাত ললন। বউ এত দিনে শাশুড়ীর প্রকৃত আন্তরিক মেহ পেলে। বউ মেহ বারি ধারায় শীতলতা লাভ করে আবেশে নিত্রিত হয়ে পল্লো। পরদিন হরতারণ বাবুর সঙ্গে দেখা হলে মাতা সকল বৃত্তান্ত পুত্র জানিয়ে বল্লেন-“বউ যে এ রকম করে সমস্ত রাত্রি বেড়ায় ইহাতে লােক জানাজানি ঠাকুর, চাকর, পুরুত, সবাই অন্দোলন করে গ্রামে একটা সাড়া পড়ে যাবে, তুমি বাড়ী এসাে না কেন? থাক, বাড়ী এসো, রাত্রে বাড়ী না এলে লােকের ঘরে কত মন বিপদ ঘটতে পারে, মন না মত্রিম।” হরতারণ বাৰু হেঁট ৪ হ বলেন-“আচ্ছা।”
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ। এই ঘটনার কয় বৎসর পর তারিনী দেবীর কয়েকটী পুত্র কম। হয়। গিন্নী বধুর সন্তানের জন্য অনেক মানসিক করা, দেব আরাধনা, সন্ত্যান, শান্তি করান, কবচ, মাদুলীর রাশ বধূর গলায়, হাতে, কোমরে বাঁধা ছিল, এখন সে সকলের সার্থকতা লাভ হয়েছে। গিন্নী নাতী নাত্নী লাভ করে খুব আনন্দে দিন কাটাতে লাগলেন। তারিনী দেবীরও সংসারের বিশেষরূপে বন্ধন হ'লো, একটা দিন কাটিবার অবল হ'লে, সমস্ত দিন রাত, ব্যস্ত ও ছেলেদের চিন্তা, রােগের ভাবনা, তাদের পীড়ায় অনিদ্রা ও পরিচর্যা, এই সকল ব্যাপারে নৃতন নিয়জিত হলে, পূৰ্ব্বকার মনকষ্ট ও উন্মত্ততার প্রাবল্য কমে এসে বাৎসল্যের ভাণ্ডারে মন পবেশ কল্লে, এই চিন্তাতেই পতিবিরহ যন্ত্রণা কতকটা আচ্ছন্ন হলো। তবে একেবারে লয় হলাে না, ভগ্নাচ্ছাদিত বহির ন্যায় প্রচ্ছন্ন রইলো মাত্র, অবসরূপ বাতাস পেলেই এ. অনুল আলে উঠতো। হরতারণ বাবুর কিন্তু পূৰ্ব্বাপেক্ষা কিছু স্বভাবের পরিবর্তন হলো। বাড়ী থেকে অনেক সময় সন্তানাদি নিয়ে আদর ইত্যাদি করতেন। তারপর ক্রমে ক্রমে পুত্র কন্যা কেহ কেহ উপযুক্ত বয়স প্রাপ্ত হ'লাে । এমন সময় তারিনী দেবীর মৃত্যু হলো। কর্তার যে টুকু উন্নতি হচ্ছিল তার চতুগুণ বৃদ্ধি হলো। বাড়ী আসা এক রকম বন্ধ। কেবল দিনে মায়ের হাতের হবিষ্য রান্না খেতে এবার বাড়ী আসেন। চিরকালই তার এ অভ্যাসটি হিল, যত রান্না হােক, মায়ের ঘরের নিরামিষ তরকারী না খেলে, তৃপ্তি হতো না, মাও শান্তি পেতেন না।
শুকতারা ১০৭ গিন্নীও ক্রমে স্বর্গে গেলেন। সুতরাং তার কু-প্রবৃত্তিতে নিবৃত্তির লােক বা সামান্য বাধা দেবার লােক সংসারে কেহই রইলো না। বরং উত্তেজিত করবার লােক ও ইন্ধনকারীর সংখ্যাই বৃদ্ধি হলো। বিষয় সম্পত্তির আয় কমে গেল। দেনা কেবল বাড়তে লাগল। আদায় আর হয় না। অমল। বর্গ লুটতে লাগলাে। প্রজার অভাব, প্রজাপীড়ন প্রভৃতি বাড়লো। আলাদের তম্বি কল্লে তারা গরীব এঙ্গাদের উৎপীড়ন করে শােধ তোলে। নিজের। যা লুট করে প্রজাদের উপর উসুল করে। প্রজারা হা হা করতে লাগলাে। কিন্তু গরীব প্রজার কান্না কে শুবে ? যেন অরাজকতায় ঘিরেছে। জমিদারের সঙ্গে দেখাই হয় না । ঠাকুর সেবা প্রভৃতি সমস্তই সংক্ষেপে হতে লাগলো, পুরুত মশায় যদি দেখা পেয়ে জমিদার মহাশয়কে ঠাকুরের কথা বলেন, তা রেগে উত্তর দেন “আমায় ঠাকুর দেনায় ডােবাচ্ছেন, সব উড়ে যাচ্ছে, তা নিজে পূজা পাবেন কোথা থেকে ? আমায় ও সব বলে এখন বিরক্ত করো না।” পুত চুপে চুপে চলে যান। লক্ষীদেবী যেন জমিদার বাড়ীর শ্রী নিয়ে পালালেন। বাড়ী ঘর কোন স্থান ভেঙ্গে পড়ছে, সারাবার নাম নেই, কোন স্থান অজলে পূর্ণ, পুকুর সব বালি ও পানা পড়ে জল জব্যবহাৰ্য, কোন পুকুরে কলমির বাগানে আর ফল হয় না। গাছ পালা ময় শুকনা কাষ্ঠ বাড়িয়ে থাকে, ফুল বাগানে আর মনােরম পুষ্পোদ্যান নেই। কতক আগাহার জল হয়েছে। ঠাকুর মন্দিরের কোন স্থান ভেঙ্গে পড়ছে। কোন খানে অশ্বথ গাছ উঠেছে। ঠাকুর বাড়ীর উঠানে এত জঙ্গল যে দিনে যেতে ভয় করে। ঠাকুরের বিছানার গন্ধে ভুত পালাচ্ছে, ঠাকুরের হির বস্ত্র পরশে, কলা বাতাসা ও মােটা আতপের নৈবিদ্ধ ঘর দালান জোঞ্জালে পরিপূর্ণ। দালানের উপর Solo তীয় থামের মধ্যে কার্ণিসে সব পায়া ও চামচিকার বাসা, ও ইদুরের বিষ্ঠা, চামচিকের, আমুলার, পায়রার বিষ্ঠায় দুর্গন্ধে নাকে কাপড় দিতে হয়। ধুপ ধুনা চন্দনের সুগন্ধির পরিবর্তে এখন পশু পক্ষী ও পতঙ্গের মলমুত্রের গন্ধে মােদিত। সত্তনের পরিবর্তে, যাত্রা গানের পরিবর্তে, কুকুর শিয়ালের নৃত্য দেখা যায়। হরিনামের পরিবর্তে কাক চিলের কর্কশ ডাক শােনা যায়, এ রকম অবস্থা দেখলে চলে জল আসে। গিন্নী যথার্থই অনুমান করেছিলেন।
তৃতীয় খণ্ড। প্রথম পরিচ্ছেদ আজ প্রায় বৎসাবধি হ'তে গেল বুড়ী ম্যাজিস্ট্রেটের কুঠিতে বাস করতে লাগলো। সাহেবের প্রকাও বাগান, মনােরম বাংলাে। নিল সলিল ও বেশ অগভীর প্রশস্ত পুষ্করিণী। বাগানে মাতিয় খর আরো অনেক সারি সারি ইষ্টক নির্মিত বাজে ঘর আছে। তাহাতে সাহেবের বেহায়া, বাবুর্চি, মালী, চাপয়াসী, পাচক প্রভৃতি কর্মচারীগণ ও গরু, হাঁস, মুরগী, ছাগল কুকুর প্রভৃতি সাহেবের প্রয়ােজনীয় পপী সকের বস্তু থাকে। কোনটায় ঘােটর গ্যারেজ করেছেন। কতগুলো কুঠুরী পড়েছিল। তার মধ্যে একটাতে বুড়ীদের থাকতে দিলেন। বুড়ীর ক্রমশঃ ইহাদের বাগানের কাজে নিযুক্ত হলো। ইহার। নীচ পর লােক, এ সব কাজে বেশ অভ্যস্ত ছিল, কাজেই দিনের মধ্যে সাহেবকে কাজের দ্বারা বেশ সন্তুষ্ট করলে, ব্যবহায়েতেও পূর্ব ভালবাসার আরো বৃতি ও বিশ্বাস জন্মিল। তার ফল মূল ও নানাবিধ গাছ পালায় বাগান এদিনেই শােত হলো। ইহারা অব বাগানের কাজ করে সাহেবের হে কি মধুরী পেতে, আর বাগানের তরকায়ী ও সাহেবের এম রুমে নিতে, ইহা ব্যতীত মেম, বেৰীদের পুরাণ জান, একতারা পােষাক বিছানা ইত্যাদি দিতেন, চাল, ডাল, তেল, নুন প্রভৃতি অভাব হলেও মধ্যে মধ্যে দিতেন, পুকুরের মাছ ধরা হলে দিতেন। কোন ভাল খাদ্য সামগ্রী এলেও পেমার ছেলেকে ডেকে দিতেন। মেম সাহেব রান্না করা খাদ্যও সময় সময় বুড়ীকে ডেকে দিতে চাইতেন কিন্তু বুড়ী বলত “না মেম সাহেব, রান্না করা জিনিষ দরকার নেই, গরীব মানুষ, জাতিই সম্বল, মা! তুমি আমার নাত্নীর মত, কিছু মনে কোরো না, তােমার ঢের করে হোক, তুমি এমনি করে লােকের উপকার কর, সাহেব বাবু ও তুমি আমার যা উপকার করেছ তার ঋণ কখনও শােধ করতে পারব না । মা বপের মত আশ্রয় দিয়ে, কোল দিয়ে, অভয় দিয়ে, সাহস দিয়ে, বাঁচিয়ে রেখেছ মা! তােমার এ বিশাল পরীর মধ্যে কারো অত্যাচার ও প্রবেশের উপায় নেই। বাগানের চতুর্দিক উচ্চ প্রাচীর বেড়া, চতুর্দিকে শান্তি রক্ষক ঘুরছে দারােগা, ইন্সপেক্টর, পুলিশ সাহেব প্রভৃতির বাড়ী পাশে পাশে, থানা, ফৌজদারী আদালত জেল দারােগা, সর্বদাই পুরীটি বেষ্টিত করে আছে, তা ছাড়া সাহেবের চাপরাসীরা ত আছেই, বাৰা এর মধ্যে যমও ঢুকতে পারে না, পিঁপড়ে অবধি ফিরে যায়, এর মধ্যে আমরা যে কি নির্ভয়ে ও শান্তিতে আছি তা বলতে জানি না। ইদানীং নানা বিপদে পড়ে ও মানুষের তাড়নায় বুকের মধ্যে একটা ভয় সর্বদাই ছিল, তােমার শান্তিদায়িনী কোলে এসে আমরা শান্তি পেয়েছি, ঘুমিয়ে বেঁচেছি। মা লক্ষ্মী, বাবু সাহেবের এয় জয়ার হােক, আমার চুল যেমন পেকেছে তেমনি পাকুক, মা, গরীবের আশীর্বাদ ছাড়া আর কি আছে? এত উপকার ও বুরে চেয়ে আবার রাখা তাতে কি শান্তি বেশী পাৰ মা ? আর যা শে। কাল হয়েছে, এখন গঙ্গায় গেলেই বাঁচি।” অশ্য বুড়ীর কথার ভাৰ আমরা একটু সংশােধন করেই লিপিবদ্ধ কম, ফায় গ্রাম্য ও নিয় জে, শুকতারা ১১১ জাতির ভাষা বার বার পাঠক পাঠিকার ভাল না লাগতে পারে। মেম সাহেব হেসে ঢলে পড়ে বল্লেন-“ও বুড়ি, আমার যে বামুনে রাধে, আমি ত ক্রীশ্চান নই।” বুড়ী তখন ভয়ে বলে ‘হা বামুনে বাধবে বৈ কি তােমার ? তােমার অভাব কিসের ? তােমার চিরদিন বঁধুক” এই বলে বুড়ী তাড়াতাড়ি সেখান থেকে পালালাে। বুড়ীর ধারণ বাবা মুরগী না খেলে বড় লােক হয় না। বড় চাকরী কল্লেই ‘কিশ্চেন হয়, তাদের চাকর বামুন সবাই মুরগী খায়, না মুরগী খেলে বড় লােকের বাড়ী চাকরী হয় না, এক ঔয়ে বুড়ীর চিরদিনের মজ্জাগত দোষ ছিল, প্রথমে যা ধারণা করবে, সেটা কিছুতেই ছাড়বে না। মেম সাহেব সিনিয়র কেমব্রিজ পাশ, আধুনিক যুগের শিক্ষিত। ও অল্প বয়সী, সবে স্কুল ছেড়ে বিয়ের বৎসর চারেকের মধ্যে দুটী বেবী হলো। কোন অশান্তি, চিন্তা, ভাবনার ধার ধারতো না। প্রস্ফুট কুসুম আপনার আনন্দে আপনি বিভাের, কখনও ঢুলুঢুলু আপনার সৌরভ আপনিই প্রফুল্লিত হয়ে সেই লােক সমাগম বিরহিত কুঠিতে একা একা ছড়া'তে, যেমন পুষ্পরাজি প্রাত সমীরণে সম্মিত বনে ও স্নিগ্ধ শিশির মাখান গাত্রে, বাল সূর্যের দর্শনে আপনি আনলে অধীর হয়ে তার অভ্যর্থনায় স্বতঃ উদগ্রীব হয়, আবার আপনি আনন্দ উস সরণ করতে না পেরে আপনিই হেসে ঢলে পড়ে, আবার পণে তপে কুঞ্চিত হয়, কখনও শুষ্ক ভাব। মেষের অবস্থা ও সেই রকম। কখনও অধীর, কখনও গম্ভীর, কখনও স্ফীত, কখনও কুঞ্চিত, কখনও আনন্দ, কখন নিরানন্দ, কখন আশা কখনও নিরাশ, এই সুম ও সিন্ধু উদ্যান গৃহে তার ক্ষণে ক্ষণে নানা মানসিক অবস্থায় নানা পরিবর্তন। স্বভাবের ও মনের সবের হিরতা ১১২ শুকতারা সদাই ভরা নদীর তরঙ্গের মত উল্লাসে নেচে বেড়ায়, ও ফুলের মত ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়। সেই জন্যই কবিরা প্রকৃতির সঙ্গে মানবের মনের সাদৃশ্য আছে বর্ণনা করে গ্যাছেন । দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। মেমের প্রকৃত নাম কি তা আমরা জানি না। মিসেস মিটার নামে এখানে তিনি অভিহিত। তিনি একজন কলিকাতা নিবাসী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির ভা। পিতা ব্যারিষ্টার, এটী ভাই বােন। ইনি ব্যারিষ্টার সাহেবের দ্বিতীয় কন্যা, পূর্বে লরেটোর পড়তেন, স্বাস্থ্যের জন্য রে দািিলংএ' কয় বৎসর থেকে সেখানকার স্কুল থেকে সিনিয়র কেমব্রিক পাশ করেন তথায় বাের্ডিংএ থাকতে। পরে মিষ্টার মিটার আই সি এস, পাশ করে ফেরার পর ইহার সঙ্গে হিন্দুমতে বিবাহ হয়। মিষ্টার মিটার ও কলিকাতা নিবাসী উচ্চ কুল ও উচ্চ বংশীয়, পিতা উচ্চ পদস্থ কর্মচারী ও গোড়া হিন্দু, তার পুত্র ৭টি । এ ছেলে বেশ ফাঁৰ্ত্তিমান ছাত্র ছিল, বরাবর পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার এবং পুত্বের ও আই সি এস দেবার প্রবল বাসনা একশ করায় উকে বিলেত পাঠান। বিলাত হইতে প্রগমনের পর বিবাহ হয় এবং সেই অবধি মেম সাহেবের সঙ্গেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে কি ফোন করে উভয়ে দেশে আসেন।
শুকতারা ১১৩ মেমটি সাহেবের উপযুক্ত পত্নীই, বিধাতা যেন ইহাদের পূর্ব থেকে মিলিয়ে রেখেছিলেন। সদাই হাস্যময়ী ও শান্ত প্রকৃতির লোক সুন্দরীও বেশ, কিন্তু এর রূপের একটা অপূৰ্ব্ব মাধুৰ্য্য আছে । এ রূপ যেন পূর্ণ চন্দ্রের আলোর ন্যায় স্নিগ্ধ ও মধুর, নয়নের অতৃপ্তকর। এ বিদ্যুতের আলাের ন্যায় চঞ্চল নয় ও চোখ ঝলসে যায় না ! হৃদয় আলোড়ন করে। হৃদয় আকাশ ভেদ করে চমকে চমকে নয়নের অতৃপ্তি রেখে যায় না। এ রবির তীব্ৰ তেজের মত জগতকে আলোকিত ও উত্তপ্ত করে না। রবির দীপ্তির দিকে দৃষ্টির পর অন্য দিকে তাকালে যেমন জগতটাকে অন্ধকার দেখে এ, সে রূপের ছটা নয়। এ রূপ যেন চাদের স্নিগ্ধ আলো, দেখতে দেখতে আপনা আপনিই টলু ঢুলু ভাব আসে, শুক্লা রজনীতে অতৃপ্ত নয়নে ছাদের উপর শুয়ে শুয়ে চঁাদের শােভা দেখতে দেখতে আরামে ও শান্তিতে নিদ্রা এসে যেমন মনকে কোন সুখ স্বপ্ন রাজ্যে দিয়ে যায়, একে দেখেও মনভাব সেইরূপ শান্তি প্রদ হয় এবং এর পবিত্র মাতৃরূপা মূর্তি দেখে চোখ আপনা থেকে মুদ্রিত হয়ে অন্য পবিত্র ও শান্তি পথে মনের গতি চলে যায়। স্বামী যে পথে যান, ইনিও যেন জীবন সঙ্গিনীর ন্যায় স্বামীর পশ্চাৎ অনুকরণ করেন, কোন দ্বিধা নেই, প্রতিবাদ নেই, উভয়ে একমত, এক আত্মা, এক পরামর্শ, কি শান্তিময় সংসার! পবিত্র ও স্বর্গীয় দাম্পত্য প্রেম যেন ভগবান অযাচিত ভাবে দান করেছেন, ইহাদের রীতি নীতি দেখলে মনে হয় যথার্থ স্ত্রী পতির অর্ধাঙ্গিনী, শান্তিদায়িনী জীবন সজিনী, সহধর্মিনী সহচরী বলে যে শাস্ত্র কায়ক নির্দেশ ফরেছেন তা প্রকৃত । এ প্রণয় হরতারণ বাবুদের সঙ্গে সম্পূর্ণ পার্থক্য। থাকার কোন গরল মিশ্রিত হয়ে মৃত সঞ্জীবনী গুণ নষ্ট করেনি। এ ১১৪ শুকতারা নেই। བ། ་ লবণাক্ত ও বন্যার পঙ্কিল সলিল প্রবেশ করে জল দূষিত করেনি। এ জল স্রোতের মধ্যে মৃত্তিকার আল দিয়ে ছেদন করেনি, এ প্রেমরূপ কৌমুদী আলাের উপর নীল বসন ঢেকে আলাের জ্যোতি আচ্ছাদিত করেনি। এ অালাের মাঝে মাঝে সাদা ধোঁয়ার মত মেঘ এসে আলােটাকে ঝাপসা করেনি, ও ঝাপসা করেনি, ও হঠাৎ কাল মেব আকাশে উঠে আলােকে ঢেকে ফেলেনি ও বৈশাখী ঝঞ্চায় সমস্ত আলাে শান্তিময় রাজ্য ছত্রভঙ্গ করে যায়নি। এ বিপুল জগতের সঙ্গে পূর্ণ চন্দ্রের গালাের মিশনের মধ্যখানে সূক্ষ্ম আবরণখান দিয়ে জগতের সহিত ব্যবধান করেনি। একটী জলাশয়ের মধ্যখানে আল দিয়ে কেহই ভেদ করেনি—জল অতি নিকট অথচ উভয় জলে স্পর্শ মাত্রের সম্ভাবণা জলের ঘাত প্রতিঘাত, মাটীর অলে লেগে আবার বাধা পেয়ে-জলের সঙ্গে জলের ঢেউ মিশে যায় সমাবেশ তৃপ্তিকর ও দর্শন মধুর সদাই সংসারের শত বাধা বিঘ্ন বুকে করে বয়ে গিয়ে হেসে হেসে উভয়ে উভয়ের শরীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। মিগ্ধ স্বচ্ছ প্রেম নদী হছে, নাচছে, টলছে, দুলছে, চঁাদ বুকে করে কখনও পুর্ণিমা রাত্রে নানা খেলা বা শীলা করছে। লৌহ- পাত দিয়ে ধরনীকে ঘিরে সূর্যের প্রখর আলাে থেকে যেমন ধরণীকে বঞ্চিত করা আতপে মৃত্তিকা উত্তপ্ত হয় অথচ আলােয় পৃথিবী বঞ্চিত অন্ধকারে সাতানে হয়, ফসলাদির অভাব হয়, পুষ্পে, সৌরভ ছােটে না। সূর্য এত দূরে থেকেও মাটীর কিছু ক্ষতি করেনি, কিন্তু সামান্য লৌহ পাতের আবরণে এতটা ক্ষতি, এতটা ব্যবধান। কি আশ্চৰ্য? এ দম্পতি যুগল সেরূপ তৃষিত মরু নয়, এ মেহ তক্রি মিশ্রিত উর্বরা ও সরস শ্যামল শস্য ক্ষেত্র, মনােরম পুশােন! এ একটা দেখবার জিনিষ, বার বস্তু। কবির লিপিবদ্ধ করবার জিনিষ।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ বুড়ী ইহাদের ব্যবহার সর্বদা অবাক হয়ে দেখতো, তাহার যেন একটা নূতন জীবন এলাে। মিসেস মিটার ও বুড়ীর সঙ্গে ও বুড়ীর বধূর সঙ্গে সময় সময় অনেক রকম কথা কইতেন, হাসতেন তারও একটা যেন সময় কাটাবার বস্তু এরা হলো। ম্যাজিষ্ট্রেট পত্নীদের সচরাচর কারাে বাড়ী যাওয়া আসা, বা মেশা- মিশির রীতি কম্, কোনস্থানে এক বারেই কেউ যাওয়া আসা করে না। কোন স্থানে কদাচিত কৰ্ম্ম উপলক্ষে কি সভা সমিতি হলে একখানা আমন্ত্রণ পত্র গেল, তথায় দু’জন উপস্থিত হলেন এই অবধি, অনেক সময় ইংরঙ্গ ভাবাপন্ন লোকদের সঙ্গে ও উচ্চ পদস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে পল্লীবাসিনীরা মিশতে ভয় পায়—কেহ বা জাতির ভয় করে, আবার অনেক সময় এস ডি ও বা এস ডি ও পত্নীও গ্রামবাসীদের নানারূপ ধারণা শুনে তারাও মেশা পছন্দ করেন না, কেহ কেহ ভাবেন মান যাবে, লোকের ভয় যাবে বলেও ততটা মিশতেন না । এইরূপে, তার। প্রথমে সঙ্গীহীন প্রবাসীর মত থাকতেন। নিত্য মেশামিশি আড্ডা গল্প গুজব করার সুযোেগ তাহাদের ভাগ্যে কম ঘটতো। পূর্ববর্তী পদ মহােদয়গণ যে নিয়ম চলন করে যান সেটা বদলাতে সহজে পর পান্থ মহােদয়রা সাহস করেন না কারণ ইহাদেরও অনেক সময় মেশামিশিতে অনেক ব্যাঘাত জন্মে। যাই হোক, মিসেস মিটারকে সঙ্গীহীন একা একা বন্দিনী ভাবে এই মুরম্য বাগান বাটীতে বাস করায় যেন হৈম সদৃত শৈত ভাব ও আড়ত আনতে, তার মধ্যে মাঝে মাঝে এই ছোট লোকের পরিবার নি আকা বাকা ও নীচ জাতীয় গ্রাম্য ভাষা ও গ্রাম ব্যবহারে এবং ১১৩ শুকতারা নানা গল্প করে ক্ষণে ক্ষণে মেমের মনে বসন্তের সরসতা এনে দিত। মিসেস্ মিটারের জীবন, বায়োস্কোপের ছবির মত সম্পূর্ণ উল্টে গ্যাছে। ইনি বিদ্যালয়ে, ছাত্রী অবাসে, শিক্ষা দীক্ষায় নিয়ােজিতা, সদা হাস্যময়ী, সঙ্গিনী দল ভূক্তা ছিলেন, সদা কলহাস্যপুর্ণ ফুর্তির জীবন কাটিয়ে পরে নির্জনে, নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ এসে পড়ে, সংসার মত নিয়মাবলীতে আবদ্ধ জীবন, সেটাও তার মধ্যে মধ্যে মনে বিষন্নতা এনে দিত, বিশেষ সাহেব যখন মফঃস্বলে যেতেন তখন তিনি আরো একা পড়তেন ; যে সময় সুবিধে হ’তো সাহেবের সঙ্গেও যেতেন। প্রত্যহ ধড়ীর নিয়মের মত সমস্ত কাজ করা, কলের মত চলা, সময় মত স্নানাহার, নিদ্রা, গল্প, পড়া, গান, বাজনা, বৈকালে সাহেবের সঙ্গে বেড়ান, অবশ্য এ নিয়মের বশীভূত হয়ে বিদ্যালয়ে তার চলা অভ্যাস ছিল, তবে বেবীদের লালন পালন, আমার কেমন যত্ন করে কিনা তার প্রতি লক্ষ্য রাখা, সংসারের অন্যান্য তত্ত্বাবধান, আহারাদির ব্যবস্থা ও দেখা শুনা করা এ গুলা নূতন কাজ, এই গুলাই হাস্যময়ী, সংসার চিন্তা বিহীন জীবনে নূতন পড়ায় অল্প বয়সী যুবতীদের কিছু বিরক্ত ভাব আসে তাহাতে তিনি এ কাজ কখনও করেননি। যখন মিসেস মিটারের মনটায় বিরক্ত বােধ হতো সে সময় তিনি বুড়দের ডেকে নানা গল্প করে সময় কাটাতেন।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। মনে বুড়ী মাঝে মাঝে নিজেদের ব্যবস্থার কথা সেই সময় জিজ্ঞাসা করতো। একদিন বুড়ী মেমকে কথা প্রসঙ্গে বল্লে—“হামা! আমি কবে আছি, কবে নেই। বউটার কি ব্যবস্থা হচ্ছে ? বাবা, সাহেব যে বলেছিলেন দয়া করে আমাদের চিরদিনের উপায় করে দেবেন?” মে-হা বাছা তার চেষ্টা হচ্ছে, অনেক দূর এগিয়েছে, আমাদের ও আর বদলীর দেরি নেই, তার আগেই তােমাদের উপায় করে যাব। এই শুনে বুড়ি কেঁদে ফেলে, বল্লে “মা, তােনাদের ছাড়তে হবে কলেও প্রাণটা কেমন করে, তােমরা আমার পরজন্মে কে ছিলে মা ?” মে-কেন কাদ মা? আসা যাওয়া করবে, তার আর ভাবনা কি? আমাকে ত মধ্যে মধ্যে কলকাতায় যেতেই হয় সেখানে মা, বাপ, ভাই, বোন, শ্বশুর, শাশুড়ী, দেবর, ননদ, যা প্রভৃতি আপনার লোকেরা থাকেন, একবার করে বৎসরান্তর অন্ততঃ না, গেলে ল না। তার ওপর কোন কর্ম কাজে ও উৎসবাদি উপলক্যেও যেতে হয়, কোথাও না সন্ধান পাও, কলকাতায় আমার দেখা পাওয়া সোজা, তােমরা যখন দেখতে ইচ্ছা করবে এবং যখনি কোন কোন লে পড়বে আমাদের লিখো, নিশ্চয় আমরা তার যথাসাধ্য বিহিত করব। যাওয়ার খরচ পাঠাব। ঠিকানা দিয়ে যাব। বু-তুমি দয়া কল্লেই নিশ্চয় চরণ দর্শন পাব কিন্ত এমন আর হবে না। আপদে বিপদে তােমায় না জানালে আর কে আমাদের আছে ? তােমার চরণ ছাড় তে ত ইচ্ছে করে না, দেশে ফিরতেও ইচ্ছে নেই, তবে ওর বয়স আছে ছেলেটা আছে, ওদের একটা ব্যবস্থা হয়েছে
১১৮
শুনে যেন তােমার দোর থেকে গঙ্গায় যাই, আশীর্বাদ করো যেন
আর এ বয়সে সাত জায়গা ভেসে ভেসে বেড়াতে না হয়। সারা
জীবন এত কষ্ট ভােগ করে মানুষের দ্বারা এত কষ্ট পেয়ে যমের
জ্বালায় জ্বলে আরও কি বাঁচতে সাধ হয় ? বাছাকে বিদেয় দিয়ে
যখন সেখানে থাকতে পাল্লাম না তখন আর সেখানে যেতে না হয়
তাই বল মা ।
মে—দূর ক্ষেপি, তুমি যা বলছ তাকি মানুষের হাত ?
এখন যদি মর বউকে দেখবে কে ? অাবার ত বউ একা পড়ছে,
সন্তোষ একটু বড় হলে মৃত্যু চেও।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ এদিকে হরতারণ বাবুর কাছে বীরভূম জেলার মাজিষ্ট্রেটের এক গুপ্ত পত্র এলাে । তাহাতে হরতারণ বাবু বড়ই বিব্রত হয়ে পড়লেন। পত্রের ভাবার্থ এই —ার বন্দুকের পাশের খাজনা বৎসর বৎসর যা দেবার কথা তা দেওয়া হয়নি, এজন্য তার বাকী খাজনা ও জরিমানা স্বরূপ ১০,০০০ হাজার টাকা দিতে হবে, আর একটা বিষয় দিলেন, আপনি ত অনেক অন্যায় কার্যে চিরদিন প্রচুর অর্থ ব্যয় করেছেন, প্রজার প্রতি এবং অনেক স্ত্রীলোকের প্রতি অত্যাচার করেছেন শুনিছি কিন্তু সৎকাজের জন্য ও সাধারণ লােকের উপকার অর্থে কি ব্যয় করেছেন ? আমরা কিছু টাকা চাঁদা তুলিছি এবং আপনাকে অর্ধাংশ দেবার জন্য অনুরােধ করছি অবিলম্বে এই টাকাটা পাঠিয়ে দেবেন। তাহাতে একটী দাতব্য চিকিৎসালয় ও একটী উচ্চ ইংরাজী স্কুল স্থাপনা করব স্থির করিছি, দেরি কল্পে ক্ষতি হবে। আর একটা কথা এই যে স্কুল হবে, তাহাতে গরীব ছেলেরাও ফ্রি পড়বে। এই নিয়ম ধার্য্য বে ও স্কুল তােমার নামেই হবে। শুলাম আপনার পীড়নে একটী বাদীর মেয়ে, শিশু পুত্র নিয়ে দেশ ত্যাগিনী হয়েছিল ঐ ফলে তার ছেলেও বিনা বেতনে পড়বে। সেই স্ত্রীলোক আবার ফিরে এলে দেশে বাস করবে। তাহার প্রতি আর কেহ অন্যায় অত্যাচার কতে না পারে আর তার ছেলে বড় হলে রাজকীয় কোন কাজ পাবে। এ বিষয়ে রেকর্ড রেখে যাব। আর সম্প্রতি আপনাকে যা বল্লাম সেই মত কাজ করতে চেষ্টা করবেন। আপনি জানেন যে কাজ গুলি, এ পর্যন্ত হয়েছে তা প্রমাণ হলে রাজার আইনে তার প্রতিবিধান কি? মিছি নিহি আল কেন মামলা মোকদ্দমা করে কতক গুলো টাকা ব্যয় শুকতারা হবে অথচ তার ফল কি শেষে হবে তা বলা যায় না, কারণ সে অনাথ। স্ত্রীলােকের লােকের পক্ষে অনেক পদস্থ লােক সায় আছেন, কাজেই এ বিষয় আর কোন দ্বিরুক্তি না করে অবিলম্বে পত্র মত কাৰ্য্য করবেন। স্কুল ও ডিসপেন্সারী অব আপনার নামে হবে।” বলা বাহুল্য যে বুড়ার আশ্রয় দাতা মিষ্টার মিটারই ইহার মূল। তিনি গােপনে এই সব চেষ্টা করেছেন। বিলেতে বীরভূমের কালেক্টার মিষ্টার জনের সঙ্গে তার বিশেষ বন্ধুত্ব হয়েছিল, তঁাকে এ বিষয় লিখে এবং সমস্ত পন্থা বলে দিয়েছিলেন। বিলেতে তার সঙ্গে প্রথম আলাপ হয়, উনি এক বাসের তলায় হঠাৎ পড়ে গিয়ে প্রাণ হারাবার উপক্রম হয়েছিল, মিষ্টার মিটার পথে যাচ্ছিলেন তাকে এরূপ বিপম্ন দেখে তঁার প্রাণ রক্ষা করেন। সাহেব প্রাণ পেয়ে তাকে ধন্যবাদ দিলেন এবং ভারতবাসী বাঙ্গালী দেখে তার পরিচয় নিলেন এবং বল্লেন দরকার হ'লে জানাবেন আমি উপায় করব। সেই অবধি তার সঙ্গে বিলেতে যাতায়াত, খাওয়া দাওয়া, আমোদ প্রমােল চলতো। দেশে ফিরেও উভয়ে উভয়ের কাজ উপলক্ষ্যে ঘুরে বেড়ান। মধ্যে মধ্যে চিঠি পত্র চলে। কলকাতায় এলে দেখা শুনা ও হয়। বুড়াদের ভাগ্যদেবী এখন সুপ্রসন্ন। তাই এখন সুবর্ণ সুযোগ মিলল, বীরভূমেই তিনি উপস্থিত কালেটার। সুতরাং তাকে দিয়ে এই সকল কার্য সম্পন্ন করা সহজেই হলো: মিষ্টার জন ও স্বয়ং আরো অনেক চেষ্টা করেন তঁার প্রাণে ইহাদের দুঃখের কথা শুনে দয়ার উদ্রেক হয়েছিল। জমিদারের উপর তিনি অনেক কারণে চটা ছিলেন। তিনিও স্কুল ও ডিসপেন্সারী খোলার অনেক চেষ্টা করেছিলেন, ওখানে ঐ দুটির অভাব ছিল। তারপর মিষ্টার মিটার অবধি যোগদান করায় খুব সুযােগ হলাে। ভগবানের ইচ্ছে হলে এ রকম সকল বিষয়ই সুবিধে হয়ে যায়। তিনি বৈমুখ হ'লে বা BANI MANDIR. তার। ১২১ ঠার তখন ইচ্ছে না হলে যা ধরা যায় তাই ফস্কায়। কোনটা সম্পূর্ণ হয় না। তিনি সদয় হ'লে সব দিকে সুবিধে তিনি করিয়ে দেন। জমিদার বাবু পত্ৰ পড়ে কাহাকেও কিছু প্রকাশ কল্লেন না। 'তীত হয়ে নায়েব চরণ বাবুকে ডাকিয়ে বল্লেন শীঘ্র মাহালে গিয়ে যেমন করে পার হাজার ১০০০ টাকার যােগাড় কর, প্রকার নিকট থেকে না পাও কোন তালুক বলক দিয়ে টাকার যোগাড় করার উপায় কর, কোন মহাজনের চেষ্টা দেখ । ম্যাজিষ্ট্রেট, লিখেছে দিতেই হবে, আবার দেরি কল্লে চলবে না। আমার মাথার ঠিক নেই, আবার ছেলেদের বল্লেও রেগে যাবে, কোন কাজও তাদের দ্বারা হবে না। নায়েব ‘যে আজ্ঞে’ বলে টাকার উদ্দেশ্যে তালুকে গমন কল্লেন এবং তথায় গরীব প্রজাদের প্রতি জুলুম করে কত টাকা যােগাড় 'লো। পরে কতক গুলো তালুক বনক নেবার মহাজন ঠিক কল্লেন, পরে জমিদার সই করে মহাজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মােট ১•••• হাজার টাকা যােগাড় করে জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে লিখলেন—“স্কুল ও দাতব্য চিকিৎসালয় আমার নামে না করে আমার স্বর্গীয়া পত্নী শ্রীমতী তারিণী দেবীর নামে করবেন। এবং তার একটা তৈলচিত্র ও প্রস্তরের প্রতিমূৰ্ত্তি করে আমি শত্র পাঠাইতেছি। তন্মধ্যে একটী বিদ্যালয় গৃহে ও একটী ঔষধালয়ে রেখে দেবেন।” #s ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ পেমার মা আজ ৩ বৎসর দেশ ত্যাগিনী হয়েছে। কেউ আর তার কথা বড় বলে না খোজেও না। এদিকে জমিদার হরতারণ বাবুর আর্থিক অবস্থা দিন দিন অবনতি হতে লাগল। দেন। মামলা মােকদমার জালায় অস্থির, জমী তালুক লাট বাগান পুকুর ক্রমশঃ আধা কড়িতে ঋণের দায়ে নিলামে উঠতে লাগলাে। তার উপর ম্যাজিষ্ট্রেটের চাপে এবং তার ভয়ে দাতব্য চিকিৎসালয় ও স্কুলে টাকা দেওয়া এই সকল কারণে তিনি কিছু ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ছেলেরাও এই সকল ব্যাপারের জন্য পিতার উপর বিরক্ত। ঋণের আলা, মহাজনের তাড়না, সংসারে গৃহিনী অভাবে বিশৃঙ্খলা, পিত। উদাসী, ভালরূপ ছেলেদের দিকে কখন দৃষ্টি দেননি, লেখা পড়ার ভাল ব্যবস্থা করেন নি, কেবল সারা জীবন আপনার আমােণ শক্তি নিয়েই কাল কাটিয়েছেন, আধুনিক শিক্ষা দীক্ষাও বাহিরের অভিজ্ঞতাও ছেলেদের হয়নি। সিত। সেজন্য কখনও চেষ্টাও করেননি। সুতরাং গ্রামে বসে গ্রাম্য লােক ও প্রজা খাতক, কৃষক গােয়ালা এদের সঙ্গেই সারা জন বেড়িয়ে ও খেলিয়ে নেন। দেনা সেই রকমই কতকটা ভাবগতিকও বাড়িয়েছে। বাড়িয়েছে। তাহাদের তাহাদের কথনও বাধা দেবার লােক ছিলনা। সুতরাং তাহাদের অবাধ গতি। ছেলেদের নানাবিধ কারণে কতকল শিক্ষার অভাব এবং পিতার ও কর্তব্যের জটী কিছু থাকায় ছেলেরাও পিতার প্রতি ততটা শ্রা ভক্তি করতে শেখেনি। অভাব হলে বা কোন অনুবিধে হলেই বলতো, আমাদের পিতাই দায়ী সেই আমাদের কত কষ্ট, আমাদের লেখা পড়া শেখালেন না, আবার বিষয় সম্পত্তি সৰ খােয়’তে বলেছেন, আমদের আর চলবেই বা কি করে ? বুড়া শেষ কালটায় নানা অশান্তিতে নবদ্বীপে গঙ্গার ধারে বাস করে হরিনাম করেই শেষ জীবন কাটাবার ব্যবস্থা করতে লাগলেন। পুত্রদিগের হন্তে বিষয়ের ভার দিলেন। A পঃ পুত্রদিগের হস্তে বিষয় পড়তেই তারা চরণ বাবুকে বরখাস্ত করলে। চরণ বাবুর উপর ইহারা কোন কালেই সন্তুষ্ট ছিল না। কে সল পিতার খাতিরে কেহ কিছু বলতে সাহস করত না। চরণ বাবুই যেন হর্তা কৰ্ত্তা বিধাতা। সংসারে, মাহালে, আবাদে, গ্রামে গ্রামে, পাড়ায় পাড়ায়, সকলের কাছে হার আধিপত্য ও প্রবল প্রতাপ! ইনিই হরতারণ বাবুর দক্ষিণ হস্ত কিন্তু ইনি জমিদার বাবুর বহুল অর্থ চিরদিন শােষণ করেছেন। ইনিই একটী ক্ষুদ্র জমিদার, ইনি নিজের স্বার্থের জঙ্গ বড়য্যে পরিরের চিরদিন বিশেষ অনিষ্ট করে এসেছেন, বাহিরে অতি সুন্দর ব্যবহার, দেখলে বােঝা যায় না । অতি নম্র, ধৰ্ম্ম প্রাণ, নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ । কায়স্থ বাড়ী জল অবধি গ্রহণ করেন না। সন্ধ্যা না না করেও পানীয় জল খান । এমন কি কায়হেব নিকট দাস্যভাব বীকার করা, কায়স্থের দান গ্রহণ করা পৰ্যন্ত তিনি ব্রাহ্মণের গৌরবের হানি মনে করে কখনও সে কাজ করেননি। চরণ বাবুর পূর্বে বাসস্থান ও জন্মস্থান ছিল ঢাকা জেলার কোন পল্লী গ্রামে। তিনি চাকরীর জন্য দেশের বাহিরে আসেন কিন্তু আপনার সমাজের রীতি নীতির কখনও ব্যতিক্রম করেননি। লােক পরম্পরা হরতারণ বাবুর সরকারে চাকুরী খালি আছে শুনে তার ঐ গ্রামে যান এবং বাবুর সঙ্গে দেখা করতেই তার সুনজরে পড়লেন। জমিদায় তাঁর প্রভু হলেন, কাজেই চরণ বাবু যা চান তাই পেলেন সুতরাং তার আনন্দের সীমা রহিল না। ভাগ্যক্রমে চরণ বাবুর অবস্থা ক্রমশই ফিতে লাগল, এখানেই ১২ বাড়ী ঘর জমী বাগান পুকুর সমস্তই কল্পে। পরিবারবর্গও খালেন, ক্রমে ক্রমে বাড়ী যাওয়া বন্ধ হলাে কারণ চরণ বাবু ব্যতীত জমিদার বাবুর একদও চলেনা, এইরূপে তিনি ঐ গ্রামেই বসতি করলেন। সপ্তম পরিচ্ছেদ ইহার (চরণ বাবুর) প্রভুভক্তির গুণে সতীলক্ষী জমিদার পত্নী চিরদিন ফের জল ফেলেচেন, এবং মৃত্যুকালে ছেলেদের বলে যান, বাবা, চিরদিন এই চরণের নালায় জ্বলে মরলাম আমি কিছু প্রতীকার করতে পারিনি, তােমাদের গর্ভধারিণী বলে যদি আমার প্রতি তােমাদের কিছু ভক্তি শ্রদ্ধা পাকে এবং আমার দুঃখে দুঃখী হয়ে থাক তাহলে সারা জীবন যে আমার চক্ষের জলের স্রোত বয়ে নদীর ন্যায় গ্রামটা ভেসে গ্যাছে, সেই স্রোত মধ্যে ঐ চরণের গর্প চূর্ণকণা যদি নিক্ষেপ কর তাহাতেই আমার শ্রেষ্ঠ তর্পণ হবে, তাহাতেই আমি মুক্তি পাব, এই ভীষণ প্রতিহিংসা নিয়ে শান্তি পাব, এবং সংসারের প্রবল আশক্তি নিয়ে চল্লাম, এবং প্রতীকার না হলে আমার উদ্ধার নেই। চরণ বাবুর কর্তা সাধনা কর্তে গুপ্ত বৃন্দাবন বাস ব্যবস্থা কতে লাগলেন এখন সংসারত্যাগী হয়ে কেবল তীর্থে তীর্থে ফেরেন। ছেলেরা দিলে নবাব। চরণ বাবুর এইবার ভাগ্য সূর্য অস্ত গেল। অর্থের অভাবে প্রবল কষ্ট, ইহাতে যত অশান্তি, আজনের বিদ । অসন্তোষের কারণ হয় এত আর কিছুতে নয়।
শুকতা চরণ বাবুর দ্বিতীয় বারের পত্নীর গর্ভে ছোট ছােট ছেলে মেয়ে অনেক গুলি, প্রথম পক্ষেরও বড় বড় ছেলে মেয়ে অনেক গুলি সুতরাং তার সংসার বিশাল। কত্তার সংসারে কৰ্ম্ম, ক'রে এতদিন যা করেছিলেন চারী যাওয়াতে তাই বেচে কিনে দেন পত্র করে সংসার চলতে লাগল। কারণ তার উপর এত বড় সংসারের ব্যয় ভার সমস্তই ছিল, প্রথম পক্ষের ছেলেরা কিছুই কত না, বড় বড় ছেলে মেয়েরা পিতাকে দ্বিতীয়বার বিবাহ করা নিষেধ সত্ত্বেও বিবাহ করায় তাহার পিতার উপর বিরক্ত ছিল এবং পিতার ঘাড়ে বসে বসে খেতে, কেহ কোন উপার্জনের চেষ্টাও করত না ক্রমে পিতার চাকরী গেল, সংসারে আরাে অব এলে। সুতরাং সদাই ঝগড়া গণ্ডোগােল, অশান্তি ক্রুমে ক্রমে বৃদ্ধ হতে লাগল। ক্রমে সঞ্চিত অর্থ ও সম্পত্তি গিয়ে দেন হ'তে লাগলাে ! চরণ বাবুর সংসারে বড় কষ্ট, নানা অশান্তি, পুষ্টিকর থাকার অভাব, আবার বয়স হয়েছিল। এই সকল নানা কারণে তাহার মস্তিস্ক ও দুর্বল হতে লাগল । বৃদ্ধকালে শান্তি, বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাদ্যের জোরে দেহের ক্ষয় পূরণ ও বৃদ্ধকালে যার দরকার সেই গুলির তঁার পরামাত্রায় অতাব হলাে এজন্য তার মস্কি একটু বিকৃত ভাব ধারণ করে, কেউ বলে উল, কেউ বলে মস্তিস্কের দুর্বলতা, তার উপর নানারূপ অশান্তিতে ণ হচ্ছে। ভালরূপ যত্ন শুশ্রুষা কল্লে, সমােপযােগী পুষ্টিকর খাদ্য পেলে, মনে শান্তি থাকলে এ ভাব সেরে যাবে। কিন্তু সে নিয়ম বঙ্গ এখন আর কি করে হবে ? • চরণ বাবুর মানসিক অবস্থা ক্রমেই খারাপ হলাে। রাস্তায় রাস্তায় নানা এলোমেলাে কথা বলে ছুটে ছুটে বেড়াতেন, খাওয়া পাওয়া সব গ্যাল। তারপর কোথায় নিরুদ্দেশ হলেন কেউ খুজে পেলে না। কিছুদিন পর চরণ বাবুর স্ত্রী ছােট ছোট ছেলে মেয়েগুলি নিয়ে পুষ্টি হয়। } - পিত্রালয়ে গেল। তাহার পিতা ছিল না, মাতার অবস্থা ভাল ছিল না। তিনি দেবর, ভাই, কাকা, ও মামার বাড়ী মাঝে মাঝে গিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কন্যা যাওয়ায় ছেলে মেয়েগুলি নিয়ে আর কারো লড়ী থাকা অসম্ভব হলো। কাজেই নিজের ভিটেয় থেকে মাতা কন্যা জীবিকা নির্বাহের নুতন পন্থার ব্যবস্থা করলেন। নইলে চলেনা, বার মাস এতগুলি প্রাণ কে পােষে ? মাতা কন্যা পৈতা তােলে, চরকা কাটে, জামা, সেমিজ, পেনী, সায়া, মােজা, টুপী, গলাবন্ধ, পশমের জামা প্রভৃতি করে বিক্রয় করে। পুঁতির খেলনা বুনে বিক্রয় করে। ক্ষঞ্চিপােষ কার্পেটের আসন বুনে বিক্রয় করে তা ছাড়া নিজের বাড়ীতে নানাবিধ তরকারী দিয়ে নিজের যত্ন করে তরকারী অনেক হলে নিজেরা খায়, বাকী বিক্রয় করে । গুটি দুই বনা ছিল, মা তাকে পােষানি দিয়ে হেথা হােথা যেতো। মেয়ে গিয়ে তাদের বাড়ী নিয়ে যত্ন করতে লাগল, বনাগুলি ক্রমশঃ বড় হয়ে দুধ দিতে লাগল। তারা দুধ ঘরে খেতো এবং পাড়ায় বিক্রয় করতো, নানাবিধ খাবার করে ঘরেও খেতে পাড়ায় বিক্রয় করতাে। ব্রাহ্মণের মেয়ে কর্তৃক প্রস্তুত খাবার অনেকে ঠাকুর দেবতা বিধবা প্রভৃতির অন্য কিনিত। ঘুটে দিত, ঘরে চলিত বিক্রয় করিত। তা ছাড়া গ্রামে কারে বাড়ী পূজা পার্বনের সময় কয়দিন গিয়ে তারা ঠাকুর দেবতার কাজ করে আসতাে । ইহাতে কয়দিন তাহাদের আহারাদির জন্য সিদে পেত। ছেলেরা খেত, কৰ্ম্ম কাজ মিটে গেলে কাপড় চোপড় বকশিস, পেতো। এইরূপ নানাপ্রকারে মাতা কন্যা সংমিলিত হয়ে নিজেদের দিনপাতের উপায় করতো। মােটের উপর তাদের চলে যেতে মন্দ নয়। চরণ বাবুর ছেলেরাও অবশেষে নানারূপ কষ্টে পড়ে, অর্থের চেষ্টায় জমে ক্রমে গ্রাম ছেড়ে অত্র গেল। শেবে বাড়ী চাবী বা রইল।
শুবতারা
১২৭
তারপর জঙ্গলে পরিপূর্ণ হলো। বাড়ীর কোনদিক ভেঙ্গে পড়ছে,
বাটীর উপর অশ্বত্থ গাছ ও কত আগাছা কু-গাছায় বেরিয়ে বাড়ী
ক্রমশঃই ভূমিসাৎ হতে লাগলাে। তথায় যে কখনও কলহাস্যপূর্ণ
ইষ্টক নিশ্রিত গৃহ ছিল, এত লােকের বাস ছিল তাহা দেখে কেউ
অনুমান করতে পারতো না।
নিখের অবস্থা শেষ শােতে পাওয়া যায়। কখনও মাটী কাটে,
কখনও ধান কাটে, কখনও কারো গরুর কাজ করতো, কখনও কারো
বাগানের কাজ করতো। তারপর এক গৃহস্থ বাড়ী চুরি করার
অপরাধে ৩ মাস জেল হয় এবং জেলে আর অতিসারে মৃত্যু হয়।
BAN?
s; ii
{$t
অষ্টম পরিচ্ছেদ ম্যাজিষ্ট্রেট টাকা পেয়ে খুব সন্তুষ্ট হয়ে অবশ্য জমীদার মহাশয়কে ভদ্রোচিত ব্যবহার করে এবং ধ বাদ দিয়ে চিঠি লিখলেন। তার মৃতা পত্নীর নামে বিদ্যালয় ও ঔষধালয় হবে তাও জানালেন। ইংরাজের অদম্য পুরুষকার ও অধ্যবসায়, তারা যে কাজে লাগেন সে কাজ শেষ না করে ছাড়েন না, আবার শেষ করতে বেশী দিনও লাগে না। শীঘ্রই বিদ্যালয় ও ঔষধালয় স্থাপিত হয়ে গ্যাল এবং জমীদার বাবুর ইচ্ছানুক্রমে হাই স্কুলের নাম হলাে ‘তারিণ শিক্ষালয়, আর ঔষধালয়ের নাম হলো ‘তারিণী তেজ ভাণ্ডার’ অার যথাস্থানে জমীদার বাবুর প্রেরিত তার স্ত্রীর তৈলচিত্র ও প্রস্তর মূর্তি স্থাপনা করলেন। এটা ইংরাজ জাতি বেশ পারেন, স্ত্রীলোকের সমাদর ও মর্যাদা রক্ষা করতে চিরদিনই ইংরাজ সমাজ উন্নত। একটা দিন স্থির হলো, সেই নির্ধারিত দিনে গৃহদ্বয়ের দ্বার উদঘাটন 'বে এবং গৃহ উক্ত দিনে ঐ গৃহে সভায় ঐ জেলার ভদ্র মহােদয়- গণের অধিবেশন হবে, ম্যাজিষ্ট্রেটই সভাপতির আসন গ্রহণ করেছেন, তার নামে সমস্ত নিমন্ত্রণ পত্র ছাপান ও যথাস্থানে প্রেরণ করা হলাে। ম্যাজিষ্ট্রেট সাহেব তাহার অফিসের কর্মচারীবর্গ ও পিয়নের দল, ঝাড়দার, জমাদার, পাখা টানা প্রভৃতি নিয়ে কয়েক দিন খুৰ পরিশ্রম করতে লাগলেন। বাড়ী পরিষ্কার করা, ঝাটান, ঝড়, নানা প্রকার ফুল দিয়ে ফুলের তােড়া, ফুলের মালা কলকাতা থেকে ফাস দিয়ে জানিয়ে টেবিলে টেবিলে অসংখ্য ও নানারকম ফুলদানীতে সাজানো হলো । সুন্দর সুন্দর নানাপ্রকার আসবাব পত্র কত তারা কিনে, কতক জোগাড় করে, অতি মনােরম ভাবে গৃহ সুসজ্জিত করা হলো। আর স্বর্গীয়া জমীদার পত্নীর প্রতিমূৰ্ত্তি ও চিত্র খানিকে নানাপ্রকার ফুল ফলের নানা গহনা, ফুলের মুকুট, ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে ও বেশ লাল চওড়া পাড় বীরভূম সাড়ী পরান হলো। প্রস্তর মূৰ্ত্তিকে একটা পাথরের বেদী গেঁথে তার উপর ভেলভেট জরির কাজ করা চাদর পেতে তার উপর সেই মূৰ্ত্তিকে বসালে। নানা কুসুম পল্লব লতা পত্র প্রস্তুত এক ছত্র মশুকের উপর স্থাপিত। চিত্র খানিকে একটী কুসন চেয়ারে স্থাপিত করে তাকেও নানাপ্রকার ফুলের দ্বারা ও ফুলের মালা দ্বারা সাজান হলাে। আশে পাশে তে লাইটে যেন যথার্থ ই দিনের মত সভাস্থল অালোকিত হয়ে গিয়েছে। কলকাতা থেকে নানাপ্রকার ফল, কেক, ফার্পোর পাউরুটী, বিস্কুট, চা প্রভৃতি সান্ধ্য ভোজনের প্রচুর খাদ্যদ্রব্য আনিয়েছেন। বড়বাজারের নানা প্রকার মিষ্টান্ন আনা হয়েছে। ক্রমাগত কয়েক মিন কলকাতার পােৰু আনাগােনা করছে। আবার স্থানীয় মিষ্টান্নর কানে ও নানাপ্রকার খাদ্যের অডার হয়েছে। ব্যাচারী ময়রার ॥ল সমস্ত রাত্রি দিন ঘর্মাক্ত কলেবরে অবিশ্রান্ত ভেন চালাচ্ছে। ব্যাচারী ভাৰছে বড় বড় লােকের ও সভাসমিতির ব্যাপার একচোট খুব, দয়া লো যাবে। পাঁচ জনের পয়লা বৈত নয় ? আর সাহেব ও Hর আমাদের দেশী খাবারের নাম কি জানে? নিম কর্মচারী- দেয়াছেই পদস্থরা চলে, ওদের সন্তুষ্ট করতে পাৱেই আমাদের লাভ কা, ডবল দাম লুটৰ এখন যােগাতে পালেই হলাে। আহা! মন ব্যাচার সহনের মত এত বায়না রোজ পায় না। তারা মধ্যে মধ্যে এস ও খোলে বৈকি। নতুবা তাদের চলে কি করে? নানা প্রকার খাদ্য সামগ্রী ভারে ভারে আসছে সে স সামগ্রি ওজন করে নেওয়া, দাম লেখা, চাষী বন্ধ করা এ সব কার হেড, ক্লার্ক শুকতারা বাবুর উপর ছিল। কলকাতা থেকে আনা নেয়া, হিসাব করা এ সব একাউন্টেও বাবুর হাতে অন্য তত্ত্বাবধান পিয়নদের খাটান মােক্তার বাবু ও অন্যান্য কাজ এক এক কাজ এক এক মালা বাবুদের উপর ন্যস্ত ছিল। টেবিলের উপর সরায় সরায় কোন স্থানে ডিসে ডিসে নানা প্রকার খাত সামগ্রী সাজান হ'লাে। সােডা লেমনেড বােতল বােতল বরফ জল ঘোলের সরবৎ কেউ কেউ খাচ্ছে, কোন স্থানে চায়ের বিপুল আয়ােজন। কমপাউণ্ডে প্রকাও পাল খাটান, তার নীচে একটা মস্ত বড় গর্ত খনন করে বড় বড় গুড়ি জেলে তার উপর এক মণ জল ধরে একটা ডে চড়ান আছে। চুলীর নিকটে আর একট। ডেক রয়েছে আর প্রায় ৪ সেরি এ্যালিউমিনামের প্যানে করে কাটিয়ে কাটিয়ে নিয়ে নীচের ডেকে ঢালছে, আর তার মধ্যে এক পাউণ্ড আনাজ ‘চা আর এক পোটন চিনি (• সের) সের দুই দুধ সেই ডেকে অনবরত ঢালচে আর চা সেই অপর ডেকে তিনটি উপাদান একত্র হয়ে চা প্রস্তুত হলে এলোমেনের ১৫ সেরি মগে তুলে অনবরত চায়ের বাট গুলিতে কোন চাপরাশী চালছে, কেহ বড় বড় ট্রেতে করে বাটীগুলি সাজাচ্ছে, কেউ টে ধরে বহন করছে, আবার চা প্রস্তুতের জায়গাতে চাপরাগীগুলি মণ্ডলাকার হয়ে বসে দু-চার বাটী আপনারাও भान করে কাপগুলি বাবুদের অজ্ঞাতসারে কত প্রসাদৗ করেও ফেলছে, চাপরাসীদের বাটী কাড়াকাড়ি, তুই খেলি আমি খেলাম, : বেশত এই সৰ কোলাহল তাদের মধ্যে হতে লাগল। বাবুদের মধ্যে কেউ জিজ্ঞেস করে বলে “না না কিছু নয়।” এইতো চায়ের দাগর ব্যাপার! চায়ের সায়গায় পিয়নদের চিলের মত যে মারা দেখলে আর সভা সমিতি, চা খেতে রুচী হয় না তবে খেতে হয় যদি একজন চতুর লােক পাহারা দেওয়া ভাল। নতুৰ উহার শুকতারা এ মৌতাতের লােভ সম্বরণ কিছুতেই করতে পারে না, পরে আবার ও ধৈৰ্য্য থাকে না, মনে করে বাবা শেষে যদি না কুলায় এই গরীব লােকগুলির জন্য ওরা কি আবার চা আনাবেন। বাবুদের টান পল্পে আবার আসবে অতএব নে বাবা বাবুদের বাটীতেই ভাগ বসান ভাল । কলকাতা থেকে বায়না দিয়ে এক সুগায়িকা আনা হয়েছে, এদিকে অন্য স্থানে তার গান, বাজনা, আমােদ, স্ফৰ্ত্তি ও বক্তৃতার ব্যবস্থা, হাসির ফোয়ারা ছুটছে, গগনভেদী পুরুষের কথা বার্তায় আওয়াজে গৃহ এবং বনস্থলী শুধু কেঁপে উঠছে। একে আমন্ত্রিত ভদ্র মহোদয়- গণ ও উচ্চ পদস্থ নিম্ন পদস্থ কর্মচারী, গ্রামবাসী, ভিন্ন গ্রামবাসীগণের উপস্থিত হলেন, সাহেব বয়ং সকলের অভ্যর্থনা করে বসলে, মিষ্টার মিটারও এসেছিলেন, অবশ্য বলা বাহুল্য যে ঘর বন্ধ। গেটের সম্মুখের কমপাউণ্ডে ত্রিপল খাটিয়ে এই সব ফুর্তি চলছে। জমীদার বাবুকে ও সপরিবার আসার জন্য নিমন্ত্রণ পত্র দেওয়া হয়েছিল, এবং তার দ্বারা দুই গৃহের দ্বার উদ্ঘাটন হবে এবং সভার অধিবেশনে যোগদান করবার জন্য বিশেষ অনুরােধ করা হয়েছিল । জমীদার বাবু সপুত্র ও পৌত্র সহ যথাসময়ে সমবেত ভদ্রমণ্ডলীর সমক্ষে এসে উপস্থিত হলেন। ভদ্র মহােদয়গণ ও ম্যাজিষ্ট্রেটদ্বয় বয়ং তাকে অভ্যর্থনা করে এবং একটা সুন্দর মাল তার গলায় পরিয়ে তুলে আনলেন এবং রূপার চাবীটি তার হাতে দিলেন। মীদার বাবু রূপার তালাটি খুলে গৃহে প্রবেশ করতেই সম্মুখে তার স্ত্রীর প্রস্তাময়ী মুর্তি ফুল সাজে ভূষিতা ও পট্টবস্ত্র পরিহিতা সেই সুসজ্জিত ও উজ্জ্বল আলােকে আলােকিত গৃহ মধ্যে দেখে হঠাৎ কেমন ভাবান্তর এলো, সেই সময় গায়িকাও গানের সুর ধরেছে- আৰু অনীহা ভাগে পােহরিনু পেখিনু পিয়া মুখ চা” তিনি ক্ষণকাল স্তব্ধ থেকে আপনাকে সামলে নিয়ে বলেন “এই যে তারা সাজিয়েছেন তো বেশ ? ব'লে মূর্তির দিকে অগ্রসর হলেন, পরে খানিকক্ষণ স্থিরভাবে দাড়িয়ে নীরিক্ষণ করতে লাগলেন এবং মনে মনে পত্নীর উদ্দেশ্যে বলেন “তুমি বহুদিন স্বর্গে গ্যাছ কিন্তু তােমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তােমার নাম চলে যায়নি। তােমার পার্থিব এবং ক্ষণস্থায়ী নশ্বর মুখের বিঘ্ন হলেও তুমি সময় সময় নিজেকে অনুধী মনে কল্পে এবং অশাস্তির কারণ থাকলেও সেল অলীক, সেটা পার্থিব, তাহার স্থায়িত্ব অতি অল্প। তুমি নারী জীবনের মহত্ত্ব, পবিত্রতা, সহিষ্ণুতা, ও পতি ভক্তির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে গিয়েছ, সে পুণ্য রূপ রত্ন বিধির ভারে সঞ্চিত হয়ে গ্যাছে। তা ধবংস হবার নয়, ক্ষয় হবার নয়, তা চিরদিনের স্থায়ী ধন রত্ন, আর সৎ কাজের সৎ পরিণাম অাপনি করে নিয়ে অমর পুরীতে গ্যাছ, আবার তথা হতে বাকী টুকু যাহা তােমার সাধ হয়ত মনে ছিল তাহাও মাপনি অমর ধামে বসে করিয়ে নিলে। নতুবা এ কাৰ্য্যের এ উদ্যোগ কোথা থেকে এলো? আমার মনেই বা হঠাৎ এ বাসনা উদয় হলো কেন? তােমার গৌরব চির স্মরণীয় রাখবার জন্য এটা বিধির চক্রও হতে পারে। তুমি একবার সময় মুক্তিতে দেখ, তােমার নাম উজ্জল হ'তে উজ্জ্বলতর হয়ে দীর্ঘ দিনের পর সব সময়ে জ্বলে উঠলাে, এতগুলি মহৎ সদ্ব্যক্তির সমক্ষে তােমার সমাদর হবে, মৰ্যাদা হবে, তােমার গুণের আবৃত্তি হবে, তােমার পতি পুত্র বসে শুনবে এবং তারাও তােমার বিষয় বক্তৃতা বে, এর চেয়ে কি আর তােমার ভোগ বিলাস সুখ বেশী? যে ত্যাগী সেই সুখী, যার আকা আছে সেই দুখী। তােমার মত ভাগ্যবতী কয়জন? তােমার ছেলেরা লেখা পড়া না শেখায় তুমি দুঃখ কতে, আজ দেখ তােমার চির আকাকিত বন্তু এক দিক দিয়ে পূর্ণচ্ছ, তুমি আমাধ্যমে বসে দেখ, কত অভাবী, বিদ্যা, শত শত নারীসতনি শুকতারা শিক্ষালাভ করে তােমার অক্ষয় স্বর্গ কামনা করবে, আর এই ভেষজ ভাণ্ডারেও তুমি অমর মূর্তিতে বসে সর্ব রােগের ঔষধ করে মৃতসঞ্জিবনী দ্বারা মানুষের জীবন দান কর। তােমার নামের তাহলেই সার্থকতা হবে এবং আমার অর্থ ব্যয়টা সার্থক মনে করব।” এই বলে আপনার গলার মালাটি খুলে সেই মুক্তির গলায় দিয়ে নিজের নির্বাচিত আসনে বলেন। জমীদারের ভাবটা সমবেত সকলই লক্ষ্য করলেন। তন্মধ্যে কেহ হাসলেন, কেহ ব্যথিত হলেন। তারপর বক্ত তা আরম্ভ হলো। অরপর খাওয়া দাওয়া, তারপর আবার নানা প্রকার আমােদ কৌতুকে কয়েক ঘণ্টা অতীত হলে, পরে সভা ভঙ্গ করে সকলে আপন আপন ঘরে গেলেন। বলা বাহুল্য যে কয়েক ঘণ্টা মধ্যে গান বন্ধ ছিল।
নবম পরিচ্ছেদ এদিকে মুর্শিদাবাদের সব ডিভিসেনাল অফিসার মিষ্টার ডি, এন মিটার বুড়ীদের বাড়ীর ও তাদের গ্রাসাচ্ছাদনের এক ফণ্ড করিবার জন্য কিছু টাকা চাঁদা তুললে এবং তাহাদের পৈত্রিক ভিটায় ঘর তৈয়ার করতে লােক পাঠালেন। বাড়ী যথা সময়ে প্রস্তুত হয়ে গেল। পুয়ের ফণ্ড থেকে কিছু টাকা মাসিক পাবার এই ব্যবস্থা করলেন যে তার ছেলে যতদিন উপযুক্ত না হয় ততদিন অবধি ২ টাকা করে মাসিক পাবে আর চাঁদা তুলে যে টাকা জমা করেছিলেন তা বীরভূমে ম্যাজিষ্ট্রেটের কোটে পাঠালেন সেই টাকার সুদ থেকে কিছু পাবে। এই তো কোন রকম তাহাদের চলবে। ম্যাজিষ্ট্রেট পরম্পরা ঐ টাকার অভিভাবক হবেন ও তাহারা এদের প্রতি একটু লক্ষ্য রাখবেন, পুলিশদের দারোগা কনষ্টেবল প্রভৃতি এদের দিকে দৃষ্টি রাখেন, সে বিষয় যেন ম্যাজিষ্ট্রেট পুলিশে একটু আদেশ করেন, এবং পুলিশের পদস্থ কর্মচারী ও পুলিশ সাহেবকে এ বিষয় একটু অনুরােধ যেন, ইহাও লিখে দিলেন। গ্রাসাচ্ছাদনের উপায় এবং বাসস্থান ও পুলিশের লক্ষ্য এই অনাথাদের উপর না থাকলে আবার পদে পদে এরা বিপদে পড়বে এই এ সাহেব তাহাদের পাকা বন্দোবস্তের জন্য এত ব্যস্ত, এত উদ্যোগী হয়ে ইহাদের জীবন-যাপনের উপায় কনে। বুড়ীদের গ্রামের মধ্যে হাই ফুল হয়েছে এবং সেই স্কুলে পেমার এলে সন্তোষ কুমার বিনা বেতনে পড়বার ব্যবস্থা হয়েছে এবং ন্যায় ব্যবস্থাও বাহা হয়েছে তাহাও ম্যাজিস্ট্রেট, বুড়ীকে শুনিয়ে দিলেন, তনি বুড়ীর চকে আনন্দাশ্রু বইতে লাগলো ও সাহেব মেম এবং কয়েন বীরভূমের কালেক্টারের উদ্দেশ্যে হাত তুলে বলতে লাগলাে, ভগবান তােমাদের মঙ্গল করুন, আমার মত পাকা চুল হােক। ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লাভ হােক, এতদিনে ভগবান প্রকৃত উপকারী, কাঙালের বাপ মা মিলিয়ে দিয়েছেন। এইবারে আমি যদি মরি তাহলে শান্তিতে মরতে পারব। বুড়ী ২ বৎসরের সন্তোষ কুমারকে নিয়ে গ্রামে ছেড়েছিল তারপর মুর্শিদাবাদে ৩ বৎসর অতীত হলাে, তন্মধ্যে সাহেবের কুঠিতে ২০ বৎসর বাস করায় এদের মধ্যে পরস্পরের বেশ একটি মেহ আকর্ষণ পড়ে গেছ লো যে তাহা আর বলার আবশ্যক নেই। বুঢ়ীদের বাড়ী যাবার সমস্ত ব্যবস্থা হয়ে গ্যাছে। যেম বন এই ভাদ্র মাসটা থাক্, আশ্বিনে আমরা যাব, তোমরাও যেও, এতদিন রয়েছ তোমরা যাবে মনে কল্লে, মনটা খারাপ হয়, তােমাদের ঘরের দিকে তাকালেই মনে হয়, তোমরা গেলে তােমাদের ঘরের দিকে কি করে তা'ব ? বিশেষ তােমাদের এই ছেলেটি বড় নেটি পেটি হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, এর উপর বেশী মায়া পড়েছে।” এই কথা শুনে পেমার ছেলে বল্লে “আমি যাব না, আমি রাণীমার কাছে খাব, বেবী দাদা, বেবী দিদির সঙ্গে খেলা করব, এই বাড়ীটা বেশ, আমি আর কোথাও যাব না। সাহেব আমায় ডি থেকে কেক দে, বিস্কুট দেন, আমার নেই তােক বাড়ী থাকা বাঃ, রাষ্ট্রে ভয় করে, তােমর। মাটী কাটবে আর আমি বসে বসে কাঁদৰ, আবার রাত্রে মাধে, রক্ত পড়বে, বাবা ভয় কয়ে। -না, তােমায় যেতে হবে না, আর গেলেও ভয় নেই। ৰত-চক্ষু মুছে ৰত্নে--“তােমার চরণ ছাড়তে তাে আমার ইচ্ছে হয় না। তােদর কাছে থেকে স্বর্গ সু গে, কাম, তােমার ঋণ কি লােখ দিতে পারব ? তবে আমার উপায় নেই, আমাদের তিনটা এণীকে নিয়ে বিশেষ এই বৃদ্ধ মানুষকে নিয়ে কোথায় আপনি খুলে ঘুরে বেড়াবেন, পথে ঘাটে কখন কি বিপদ ঘটবে তাই ভাবি, সাহেব আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যে জীবনে কখনও কষ্ট পাব , আমাদের মতীন দুঃখিনীকে দেখে কষ্ট হয় এমন লােকও আছে, মামরা কুকুর বেড়ালের সমান, মা ! আমাদের স্থান থাকলে, আমরা এমন করে বেড়াই ? মা ! তােমার ঠিকানা দিও, যেমন করে পানি সেখানে যাব, একবার গিয়ে চরণ দর্শন করে আস।” ভাদ্র মাসের ভরা গঙ্গা, বেলা ৩টা আন্দাজ, সন্ধ্যা আগত প্রাম, লাল বর্ণ হয়ে রবি গঙ্গায় মেশে যাচ্ছেন, তখন গঙ্গাদেবী দু'কুল ছাপিয়ে কল কল রবে চলেছেন, গঙ্গার শােভা একেবারে কুঠির বায়াণ্ড থেকে দেখা যাচ্ছে, গঙ্গাব দিয়ে ছােট ছােট পাসি বয়ে যাচ্ছে আর মাঝির বেলা বয়ে যায় এই গানটি মনের উল্লাসে গাইতে গাইতে যাচ্ছে। বধান ঘাটে বসে যুবকরা সান্ধ্য বায়ু সেবন করলেন, আর গাইছেন “মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবেগো এইবার, সাক্ষ্য বায়ের কুসুম তুলে গাথতে হবে হার।...”আর বালকের দল গাইতে গাইতে গঙ্গার ধার দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। যে “ডুবলাে রবি সােণাৰ ছবি আরতো বেলা নাই ।”...গঙ্গা নৃত্য নৃত্য করতে করতে অবাধ গতিতে চলে যাচ্ছেন, তা’দেখে বুড়ীর মনটা যেন টলে গেল, সে বলে “আহা! কি গান শােভা! এমন গঙ্গার জল, আর মায়ের মত পবিত্র মেহ ফেলে কি আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে ? পেমা যখন নেই, তখন আমার সব জায়গা সমান। পেমার জন্মের মাটী বলেই এদিন মাটা কামড়ে পড়েছিলাম, অতি যন্ত্রণায় সে মাটী ছেড়ে আসার পর সে টান চলে গ্যাছে। এখন আর কোথাও যেতে ইচ্ছে নেই, সবাই মনে হয় আবার কি বিপদে পড়ৰ, আর বুড়ো হয়েছি কত দিনই বা বাচ? . এখন তোমার চর থেকে গঙ্গায় গেলেই বাঁচি।” এই কথা বলতে বলতে বুড়ীর চোখে জল এনে, মেমের চক্ষু জলে ভরে গেল।
দশম পরিচ্ছেদ ভদ্র গেল, আশ্বিন এলো, ম্যাজিষ্ট্রেটের বদলীর হুকুম এসেছে, তাহাদের সমস্ত জিনিষ পত্র বাঁধা গুছােন ইত্যাদি হচ্ছে, সর্বদা চাপরাসীরা আনা গােনা করছে, মাল পাঠাচ্ছে, চট, দিয়ে সেলাই হচ্ছে। স্কুপ, আঁটছে, সৰ্ব্বদাই হুলুস্থুল ব্যাপার, তার ওপর আবার বিদায় ভােজের ধূম। আরা, উকীলরা, অফিসাররা, রেলওয়ে কর্মচারীরা পৃথক পৃথক, পাটি দিচ্ছেন, ফটো নিচ্ছেন, সাহেবের গুণ বর্ণনা করে এবং বিদায় জনিত বেদনা প্রকাশ করে গান রচনা হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে যিনি সুগায়ক তাকে আসরে গাইতে নির্বাচন করা হচ্ছে। তা ছাড়া সভায় কি কি বক্ততা হবে এ সব বিষয় আপনারা স্থির করে লিখছেন। স্থানীয় রাজা ও জমীদার সম্প্রদায় থেকেও নিমন্ত্রণ করছেন, তাঁদের বাগান বাড়ীতেও বিদায় তােজের বিপুল আয়ােজন করে সুগায়িকার দ্বারা নৃত্য গীতের ব্যবস্থা করে সাহেবকে নিজেদের জরীর ঝাঁপা কা লাগান তেলভেটের পােষাক পরা বরকনা ও নিজের মটর পাঠিয়ে সম্বর্ধনা করে আনিয়ে আবার সখা ভঙ্গের পর সসম্মানে নিজেদের লােক দ্বারা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ম্যাজিষ্ট্রেটের বদলীতে যে শুধু তাহারা ব্যস্ত তা নয়, ওখান- কার মূৰ্ব সম্প্রদায় লােক ব্যস্ত, কারণ এ সাহেব লোক বেশ ভাল ছিলেন এবং ঐ স্থানের অনেক উন্নতি ও অনেক অভাব মােচন করেছেন, তা ছাড়া ব্যবহার ও খুব নম্র, সকলের প্রতি সমান। গরীবের প্রতি দয়া পাণ্যিও যথেষ্ট ছিল, এজন্য সর্ব সাধারণই তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট ছিল, তাই সকলের বদলীর জন্য এত বিরাট আয়ােজন পরিশ্রম বেশী । সুতরাং প্রত্যেকেই ম্যাজিস্ট্রেটের বদলীতে এক এক কাজের ভার ১৩৮ শুকতারা নিয়ে প্রায় এক মাস ব্যস্ত, ছােট, বড় সকলের কাছে চাঁদা তােলা ও লেখা, কারাে প্রতি ভার। এক এক জায়গায় বা গ্রামে একজন যায়, এইরূপে সর্বদাই বিদায় বিদায় করে সরগরম, সবডিভিসনে চলছে বিদায় সঙ্গীত, বিদায় আবৃত্তি, বিদায় ভােজ, বিদায় সভা, বিদায় উচ্ছাস, বিদায় বাজনা, বিদায় ঘােষণার ঢেউ অনবরত চলছে, বিদায় মালা, বিদায় তোড়!, সন্দেশে বিদায় ছাপ, সভার সাইনবাের্ডে বিদায় সভা বড় বড় অক্ষরে বড় বড় কাগজে কাল কালিতে লেখা, বিদায় গাছে পালায়, ডালে ডালে, রাজপথে, দোকানের মাথায়, ফৌজদারী আদালতের গেটে, কমপাউণ্ড, এজলাসে সর্ব স্থানে বিদায় বিদায় চারি দিকে বিদায়, বিদায়, অপরাহ্নে ৬ ঘটিকার সময় বিদায় সভার অধিবেশন এই কার্ড হাতে বিতরণ চলছে -বিদায় ভোজের দিনে কেবল বিদায় বিদায় । বিনয় বাজনা বাজে, বিদায় গান গায়, বিদায় বক্ত তা হয়, এদিকে বেলা ও যায়, আর সকলের মুখে কেবল বিদায় ধ্বনিতে ঐ দেশবাসীরা সকলেই মিমান, পাখী গুলি ও গাই বাছুর গুলি বেলাঞ্চে চরে বরে ফিরে যাচ্ছে, কৃষকেরা পাচনী হাতে গরু চরিয়ে ঘরে ফেলার মুখে বিদায় বিদায় মভেদী স্বর শুনে স্থির হয়ে দাড়াল, পশু পকী সব গৃহাভিমুখে যাবার সময় স্তব্ধ নেত্রে দাড়িয়ে যেন বিদায় বাজনা শোনে, বিদায় ঘোষনা শোনে, আর নিজ ভাষায় কি ব্যথা পরপরকে জানায়। মনুষ্যের রোমাঞ্চের ন্যায় তাদের যেন পক্ষ গুলি কুলে উঠতে লাগলো, গরু বাছুর গুলির লোম খাড়া হয়ে দাড়াল, তাই বল ম্যাজিষ্ট্রেট, পরিবারবর্গ নিজেরা শুধু ব্যয় নয়, ঐ অঞ্চলের সকল লোক ব্যস্ত ও ব্যথিত । সন্ধ্যা বায়ুও যেন সব জীবের ঈষদুষ্ণ দীর্ঘ নিশ্বাস বয়ে নিয়ে সঞ্চরণ করছে, সকালের ফুলগুলি হঠাৎ চোখ খুলে বিদায় ঘোষণা শুনতে লাগলো, বিদায় সভা নিরীক্ষণ করে মুখ নত করতে লাগলো । পৰু পত্র গুলি ৰখি শুকতারা বায়ভরে ঝরে পড়তে লাগলাে। উপর দিকে বিদায় বিদায় মৰ্ম্ম স্পর্শ ও গগনভেদী স্বরে নীলাকাশের ঘােষ্টা খুলে সন্ধ্যা তারা উঁকি দিয়ে টুক টুক করে দেখতে লাগলেন। যাই হােক্ সাহেব জল ব্যবহার করায় ও গ্রামের অনেক অভাব দূর করার জন্য বিদায় ভােজটা অন্যের অপেক্ষা বেশী জাকাল হয়েছিল । মেমের নামেও কার্ড এসেছিল, তিনিও সাহেবের তিনিও সাহেবের সঙ্গে নিমন্ত্রণে যেতেন। চাপরাশী, বেহারা, বাবুজ্জি, পাচক আয়া প্রভৃতি কুঠির লােকদের সবারই নিমন্ত্রণ, সকলেরই মুরশুম, তার মধ্যে প্রেমতােষের পুত্ত শ্ৰীমন সন্তোষ কুমারের বেশী, সাহেব মেম যেখানে যাবেন সে তার মধ্যে গাড়ীতে গিয়ে আশ্রয় নেবেই, স্থান না থাকলে গুটী শুট হয়ে নীচে অথবা ড্রাইভারের কাছে বসবেই। তাকে কেউ কিছু বলে না । সে যেন যুধিষ্ঠিরের স্বর্গের পথের সারমেয়র ন্যায় তাদের পিছন পিছন সর্বদাই থাকতো। সাহেব মেমের সঙ্গে গিয়ে সন্তোষ কুমার খুব খেয়ে এবং সন্দেশ, মােণ্ডা, মে ওয়া ও নানাপ্রকার ফল মূল বুড়ী ও নিজের মায়ের জন্য পকেটে করে নিয়ে আসে। সন্তোষের পেট সর্বদাই বুক ছাড়িয়ে উঠে থাকে। মেম বলে “বুড়ি, ভাদ্র আশ্বিন মাস, সময় ভাল নয়, সন্তোষের পেটের অসুখ যেন করে না, আমরা খাব না, তুমি বিপদে পড়বে।” বুড়ী বলে “না না রাণী মা ! ও বেশী খেতে পারে না ও সব পকেটে করে এনে আমাদের দেয় তাই বলি কত ভাগ্যে এত বড় লােকের আশ্রয় পেয়েছি-তাই পেট পুরে খাচ্ছে, তা ওর কি পেট আছে ? তা না হলে এমন দশা হয় ? ভাত খাত পাঁচ গণ্ডা।”
একাদশ পরিচ্ছেদ। আশ্বিন মাসে এক এক বৎসর এমন বালা হয় যে শ্রবণের ধারার হার মানায়, তাহা বােধ হয় কারাে অবিদিত নেই। শােনা যায় মা দুর্গা নাকি নৌকা করে ধরণীতে নেমে ভক্তদের পূজা গ্রহণ করেন সেইজন্য বাদল হয়, আমার বিশ্বাস যে সে বারে বালে হাকিম। বদলী হন, সে বার তাদের অভ্যর্থনার জন্য বরষা সুন্দরী মৰ্ত্তে পুনরাগমন পূর্বক তাঁহাদের বিছানা ও অন্যান্য মাল পত্রের উপর স্নেহবারি বর্ষণ করেন, কিন্তু তাহাতে দীর্ঘ প্রবাসী হাকিমরা মহা বিব্রত হয়ে, পড়েন সেইজন্য প্রকৃতি দেবীর নিকট আমার প্রার্থনা যে তার স্নেহধারাটা ও সময় না বর্ষণ করে যে সময় সঁহারা বহু জনতাপূর্ণ গৃহমধ্যে বিচার আসনে বসে সত্যাসত্য বিচারের জণ্য নিগুঢ় তত্ত্ব ভাবতে ভাবতে মস্তিষ্ক গরম হয়ে যায়, সেই সময় তাঁহাদের ললাট উদ্ভাসিত করে বিদ্যুতের ন্যায় মস্তিষ্ক উদীপ্ত করে ন্যায় বিচার যাহাতে শীঘ্র মস্তিস্ক থেকে বেরোয় সেই সময় ও জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপুর রোদ্রে ঐ স্নেহবার বর্ষণ কল্পে তাহার শীতলতা অনুভব করেন। মুর্শিদাবাদের ম্যালেরিয়া প্রসিদ্ধ, আশিনে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের সময়, তাহার উপর বালাই হলাে বুড়ীর কাল, সাহেব হুকুম দিয়েছেন আমরা যাব, তােদের যার যা ইচ্ছে এই সময় তরকারি পত্র ফল মূল তুলে নে, এবং তিনি নিজেও পাড়ার লোককে কতক পাঠালেন, মেমের অনুরােধে সঙ্গে নেবার জন্য কিছু বাঁধতে চাপরাশীদের হক দিলেন। মেম বলেছিলেন নিজের হাতের ও নিজের বাগানের জিনিষ আত্মীয় লােককে দুটো দিয়েও তৃপ্তি আছে। সাহেবের অনুমতিক্রমে লোক জন চাপরাসীবর্গ দেদার তরফারি ১৪১ পত্র আপন আপন গৃহে নিয়ে যায়, বুড়ীও ছাড় বার পাত্র নয়, সেও দিন রাত ভিজে ভিজে প্রচুর তরকারি শাক, সবজি, ফল, মূল, যা পাচ্ছে তাই তুলে সঞ্চয় করছে। কতক বিক্রয় করবে, কতক খাবে, কিন্তু বুড়ো হাড়ে চিরদিন কি এত অত্যাচার সহ্য হয় ? বুড়ীর হঠাৎ বুকে পিঠে ব্যথা হয়ে জ্বর হলো। সেই জ্বর রাত্রের মধ্যে ভীষণ হ’ দাড়াল। বুড়ী সমস্ত রাত্রি ছট ফট করছে, ভুল বকছে, বুড়ীর বউ প্রাতে উঠে কুঠিতে শাশুড়ীর ব্যারামের বিষয় জানালে, তাহাকে বুড়ার ঘরে গিয়ে দেখে এলেন এবং বুড়ীর জ্ঞানের বৈলক্ষণ তাহাদের মনে হলো, তৎক্ষণাৎ ডাক্তার আনালেন। ডাক্তার এসে রোগী দে, বল্লেন “এ খারাপ জাতের ম্যালেরিয়া, মস্তিস্ক আক্রমণ করেছে । হয়। যাই হােক, ডাক্তার দু’দিন দেখে ঔষধ পত্র দিলেন, সাহেব মেমও বুড়ীর খুব তত্ত্বাবধান ও বুড়ীর জন্য খরচ পত্র কল্লেন। বুড়ীর বউ ও শাশুড়ীর সাধ্য মত শেষ সেবা কল্লে, কিন্তু সমস্ত নিস্ফল হলে বুড়ী বিকারের ঘােরে, সমস্ত রাত্রি পেমা ‘পেমা’ করে বকেছে, “পেমা এলি, আয় আমি যাব, অনেক দিন দেখিনি। বড় উঁচু, কি করে উঠবো—আয় পেমা, ধর ধর, ধান বনে বড় জল পা পিছলে পড়বে। পেমা ধর, পেমা ধান কাটা হলো, এই নে ভাত এনেছি খা ইত্যাদি প্রলাপ বকছে আর বউ বুড়ীর মাথার শিয়রে বসে এই কথা শুনছে, আর চোখের জল মু’চ্ছে। তারপর বুড়ীর চির সন্তাপিত, নানা শােকে জর্জরিত আত্মা, জীর্ণ দেহ ত্যাগ করে পেমার উদ্দেশ্যে প্রস্থান কল্লে। এতদিনে পেয়ার মৃত্যু শেল বিদ্ধ দগ্ধ হৃদয়কে গঙ্গাজলে শীতল কল্লে, পরিত্র কলে, মলিনতা ধৌত কলে, এখন মাত পুত্র অবিচ্ছিন্ন মিলিত হতে গেল, এই মিলনে বিচ্ছেদ নেই, আশঙ্কা নেই, অশান্তি নেই, ক্ষয় নেই, এ নিন অক্ষয়, অমর, চির শান্তিময়!
১৪২ শুকতারা পেমার মা পুত্র হারা হয়ে হা হা করে সারা জীবনটা ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছিল, এখন পেমার মা পেমার কাছে অমর ধামে গেল, আমরাও নিশ্চিন্ত এখন হলুম। বলা বাহুল্য যে পেমার বউ শাশুড়ীর শেষ কাজ কল্লে। বুড়ীকে দাহ করবার পর তার চির আকাঙ্ক্ষিত বাসনা পূর্ণ কল্লে। শােকানলে দগ্ধ ঝাঝরা অস্থি ক’থানা ও নাভী কুণ্ডল ভরা গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে মা গঙ্গাকে প্রণাম করে পেমার উদ্দেশ্যে বল্লে যেমন করে মাকে ডেকে নিলে এমন করে আমার কাজ ফুরালে আমায় নিও। কিন্তু এখন নয়, তাহলে সন্তোষের ইহ সংসারে কেউ থাকবে না।” সেই সময় ভাদ্র মাসের উগলিত গঙ্গ। একেবারে চল, চল, করে বুড়ীর অস্থি ও নাভী কুগুলকে স্নেহের আহ্বান করে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন। বউ এক দৃষ্টে তাকিয়ে দেখলে চারিদিক শূন্থ, চারি দিক অন্ধকার, এ সংসারে সে এইবারে একা, বন্ধুহীন, সঙ্গীহীন, রক্ষকহীন, কেবল দেখছে বাহিরে সন্তোষ, অত্তরে প্রেমতােষ, আর উপরে অনন্ত অসীম গগন আর নীচে ভাদ্রের অগাধ সলিল রাশি চারিদিক প্লাবিত করে ছুটছে, তার মাঝে সে অনুমাত্র জীব দাড়িয়ে সম্পূর্ণ পরের দয়ার ভিখারী ও পরের উপর নির্ভরশীল। সে ভাবছে কত কি তা আমরা সব বলতে পারি না, এ অবস্থায় যে পড়েছে তার অনুভূতি হতে পারে, সেই সময় গঙ্গাদেবীও মহা প্রলয়ঙ্করী মূর্তি ধরে যেন সেই অতল, গভীর বরষার তরঙ্গ যেন কাকে ধ্বংশ করতে কল কল করে ডাকচেন, হুঙ্কার রবে ছুটছে, সঙ্গে সঙ্গে পেমার বউর মনও হু হু করে যেন গঙ্গার প্রবল স্রোতের সঙ্গে ভেসে, চল। উদ্বেলিত মনের, বেগ আর সম্বরণ করতে পাল্পে না । ভিতর থেকে ফুলে ফুকরে কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে গিয়দরী, তলের ন্যায় চলে এল উথলে উঠলো। ভাবলে গঙ্গাগছে আমিও পড়ব না কি ? বিযে শুকতারা ১৪৩ বলেন না, তখন দেখে বাহিরে সন্তোষ অন্তরে প্রেমতােষ, অন্তরে প্রেমতােষ আকর্ষণ করে, বাহিরে সন্তোষের মায়া আকর্ষণ করে, তখন ভাবে না না সন্তোষের কেউ নেই। সংসারের কাজ সেরে শুতে পালেই বিশ্রাম পাব, নতুবা উৎকণ্ঠায় সুখ নিদ্রা আসবে না। ছট ফট করে ঘুম ভেঙ্গে যাবে আবার কাজে লাগতে হবে । এখন পাক থাক, একদিন নিশ্চয় মৃত্যু আছে, কেহ অমর নয়। আবার বঁচবার সাধ হলো, ঘরে ফিরতে ইচ্ছে হলাে, তখন পেমার বউ সন্তোষের হাত ধরে বল্লে—“চলো সন্তোষ বাড়ী যাই। মাতৃস্নেহের আকর্ষণই জয়ী হ'লো বুড়ীর বউ হাতের দু’গাছ কাচের বাল গঙ্গায় ফেলে দিয়ে কাপড়ের সরু পাড়টা ছিড়ে গঙ্গায় ফেলে দিয়ে স্নান করে ঘরে গ্যাল। যথার্থ = ত মরিলেই সব চুকে গেল, মিটে গেল, বিধাতার দান না দেবেন তিনি, হাত পেতে লও। সুখ নাও, দুঃখ নাও, সম্পদ নাও, বিপদ নাও, শাসন নাও, আর নাও, নতুবা তুমি ভাল ছেলে হলে কি করে ? যে ছেলে মার দেওয়া মুড়ী গুড় হাত পেতে নয়, আবার লুচী, সন্দেশও লম্ব তাকেই মা বাধ্য ও শান্ত ছেলে বলে। সুখ দুঃখ তারই দান, তঁার এর মধ্যে মহৎ উদ্দেশ্য আছে, আমরা বধির, আমরা মূঢ়, আমরা অন্ধ, আমরা কিছুই জাতে পাচ্ছি না, দেখতে পাচ্ছি না, বুঝতে পাচ্ছি না। তাই সদাই সন্দেহ, সদাই ভয়, এই আলাদ, এই বিষাদ, এ সুখ অনুভব করি আবার পরেই দুঃখ, এই আকর্ষণ এই বিকর্ষণ, এই রাগ, এই শান্তি, এই মিলন, এই বিচ্ছে, এইরূপ সন্দেহ পূর্ণ জীবনকে ঘূর্ণমান চক্রের ভিতর দিয়ে নানা বাধা বিয় অতিক্রম করে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের,বিধার আর দোষ কি? সবই তার দেওয়া। তৰে অতি ক্ষুদ্র ও অতি সামান্য জ্ঞান বুদ্ধির দ্বারা এই টুকু মাত্র ১৪ একতারা বােধ হয়, যে আত্মহত্যা মহাপাপ, এটা থেকে নিবৃত্তি থাকাই ভাল, এক দিন তো মরতে হবে, কর্মময় জীবনে কর্মই বড়, কৰ্ম্ম পথ ধরে চলা যাক, পথের শেষ ত আছেই, চতে এসেছি চলেই যাব, ক্লান্ত হ'লে আপনিই পড়ব, মরি তো তাও কৰ্ম্মান্তে যেখানে যায় সবাই আমিও যাব, পথের শেষে যেখানে আ য়া যায় সেই বাসস্থানে আবার পুনরাগমন পূর্বক আপন স্থান অধিকার করবে। ভয় কি? যেখান থেকে এসেছি সেখানে যাব, জলের বিশ্ব জলে মিলবে, তখন নূতনে পুরাতনে অবশ্য মিলবে মিশবে সংযােগ হবে, তখন নূতন দেশের পুরান চিন্ময় মূর্তির সঙ্গে কোলাকুলী হবে, চিরপরিচিত অথচ অপ্রত্যক্ষ একজনকে দেখবে চিনবে বুঝবে। আপনার হইতে আপনার যিনি তাকেও দেখা যায় ভয় কি ? চিন্তা কি ? স্থির হও, সময় সাপেক্ষ কর ।
BA ,'.. ই 8. ৪. Esta x ... চতুর্থ খণ্ড। প্রথম পরিচ্ছেদ আজ সপ্তম বৎসরের বৈশাখ মাস, চকদীঘি গ্রামের নুতন হাই- স্কুলে প্রাইজ হ'য়ে গ্রীষ্মবকাশ হলো। একটী অষ্টমবর্ষীয় বালক একটি সুন্দর বাধাই একখানি বই এনে তার মা’র হাতে হাসতে হাসতে দিয়ে বল্লে- মা আমি প্রথম প্রাইজ পেয়েছি এই নে, আজ বুড়ো ম বেঁচে থাকলে আর রাণী মা দেখলে কি আনন্দ করতে মা? আজ রাণী মাকে একখানা চিঠি লিখি।” মাতা এই বইখানি উল্টে পাল্টে দেখে ও চক্ষের জল আঁচলে মুছে বল্লে, হ্যা রাণী মাকে লেখ, তাদের জন্যই আমাদের সব। তাকে না লিখে কাকে জানাব। আমাদের আর কে আছে ? তোমার বুড়ো মারা মাতা পুত্রে স্বর্গ থেকে দেখে আশীর্বাদ করছেন, তঁাদের আশীর্বাদের জোরেই আমরা সমস্ত বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে আসছি বাবা! তােমার স্বর্গীয় পিতার তীক্ষ কটাক্ষ যেন এখনও আমায় অপরূপ সাই আমার আশে পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাঁর সেই কৰ চকু যেন এখনও দেখি আমার দিকে ঘূর্ণমান, মাঠ থেকে খায় কাতর হয়ে এসে যখন তাত জল তামাক চাইতাে, আমার উড়ে যেতাে, একটু দেরী সইতো না, আবার তােমার বুড়ো মা সেই সঙ্গে চটে গিয়ে বললাে, মাঠ থেকে এসে আর দাঁড়াতে পারে ।
শুকতারা তুই গোচ, করে রাখিস না কেন? সেই সকল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার যেন আমার স্মরণ হয়ে এখনও হঠাৎ চমূরে উঠি আবার উপর পানে চেয়ে দেখি যেন যথার্থই ধান্য ক্ষেত্রের পশ্চিমে বৈকালে অস্তগামী লাল রবি লাল মেঘে মেশে যায় সেই উত্তপ্ত বালুকায় উড়ে গগন ছেয়ে যাচ্ছে, নাকে মুখে গায়ে লাগছে, সেই সময় পুকুর ঘাটে জল আনতে গিয়ে যেন উত্তপ্ত বালি গুলি তার ক্রোধ বর্ষণের মত গায়ে ছড়িয়ে যায়, পুকুরে কলসী ডুবিয়ে শস্য ক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে দেখি যে লাল রণির পাশ থেকে লাল চক্ষু আমার পানে রােষ গুরে তাকিয়ে ছুটে আসছে। আহা! এত রাগ, মাঠের এত খাটুনী তবু তােকে এসে বুকে তুলে নিয়ে চুমাে খেয়ে আদর করে তবে ভাত জল খেতো। শেষ সমরও বলে “আমার বুকের উপর দে।” মাকে বলে “মা। ছেলে ছাড়িনি, পরকালে জল পিণ্ডি পাব।” আজ সব কোথায়! আপনারা সকলেই বুঝেছেন, এই বালক সন্তোষ কুমার, স্ত্রীলোকটা তার মাতা। পেমার বউ এখন দেশে ফিরে এসে তার স্বামীর পৈত্রিক জমীর উপর বাদ কRে। গ্রামের বিশিষ্ট ভদ্র লোক তাকে দেখে সন্তুষ্ট হলেন ও গ্রাম ভাগের কারণ শুনে সকলেই দুঃখ প্রকাশ কলেন। বুড়ীর মনিব বাড়ীর আর কেহ নেই। গিন্নী বিদেশে গিয়ে অার ফেরেননি, তার মৃত্যুর পর তার বংশধরগণ ক্রমে ক্রমে ওখানকার বাস উঠিয়ে নানাস্থানে নানাজন বাস করছেন। বাড়ী বিক্রয় হয়েছে গত লোক বাস করছে। চরণ বাবুর ভদ্রাসন ভূমিসাৎ ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ। গ্রামের অনেকে ময়েছে, অনেকে পালিয়েছে, কতক নূতন এসেছে, অচেনা অজানা লােক বাস করছে। কত পুরান ব্যথার যী, এল আনার সাথী, না’বার সাথী, ধান ভানার সাথী, মাঠে যাবার সাথী, কে কোথায় গ্যাছে, কেহ মরেছে, কেহ এ গ্রামে গিয়ে কে বা শুকতারা ১৪৭ করছে, কেহ আগের চেয়ে দুঃখী, কেহ আছে,নেই, কেহ সুখ পেয়েছে, কেহ সুখ হারিয়েছে। কেহ ভাগ্য লক্ষ্মী গােলা ভরা ধান, গােয়াল ভরা গরু, ক্ষেত ভরা শস্য হারিয়ে ঋণে দৈন্যে ৪র্জরিত হয়ে অকাল বার্ধক্যে জরা ব্যাধি প্রপীড়িত হয়ে ভগ্ন গৃহে ছিন্ন মলিন বস্ত্রে লজ্জা নিবারণ করে, লজ্জায় মুখ লুকিয়ে বসে আছে । কারো ভাগ্য লক্ষ্মী সদয়া, কেহ বা ধনপতি সওদাগর হয়ে বন বিতরণ করছেন, হয়তো আগে কুটির ছিল, এখন তার সৌধ অট্টালিকায় সুখে আমােদ হাস্য কৌতুকে ধনে পুত্রেও মুখরিত। ভাগ্য লক্ষীর কথা কে বলতে পারে ? চঞ্চল কাল স্রোত বয়ে যায়, এর মধ্যে কত ভাঙ্গে কত গড়ে তার গতিরোধ সাধ্যাতীত। যেমনটি দেখে গ্যাছে তেমনটি আবার এসে দেখা ভাগ্যে ঘটে না। পরিবর্তনশীল জগতে সর্বদাই পরিবর্তন। পুকুর ঘাট দীঘি রাস্তা বাগান সেই দিগন্তব্যাপী ময়দান আপনাকে লুটিয়ে দিয়ে পড়ে আছে, কিন্তু তার মধ্যে খুজলে অনেক জিনিস নেই, সেই দোকান পরার, হাট, বাজার সবই আছে, কিন্তু তার মধ্যে যেন মনে হয় এবং যথার্থই অনেক জিনিস নেই, পুর্বের সঙ্গে অনেক পার্থক্য, যারা বাজারে আসতো, তারা অনেকেই আসেনা, সব নূতন নূতন, মুখ, নূতন নূতন চড়া চড়া কথার আমদানী, হাটও তাই, বাজারও তাই, হাটের আটচালা অন্তভাবে প্রস্তুত, দোকান সব নানা প্রকার ধরণের নির্মাণ এবং নূতন নূতন জিনিষের আমদানী, নুতন মানুষের আমদানী, হাট বাজারে পেমার বউকে অনেকে জানতে। স, তৰে ঘাটে পথে অনেকে চিনেছিল (১• ৫ এক পয়সার জিনিস পথে কিনলে বলতাে “আহা! পেমার বউ তা নে নে বলে, যারা, দু'টা বেগুনের জায়গায় ৪টে দিতো সে সব লােক, সে সব স্নেহ- মাথার লােক কোথায় অনন্তের কোলে মিলিয়ে গেছে। এখন সেই পাল দেশ পুরান স্মৃতি, কিন্তু অনেক মুতন আমদানী, সে স্নেহের ১৪৮ শুকতারা পরিচয় সকলের মুখে আর নেই। যারা আগে জানতেন তারাই সুখী হ’লেন, পেমার বউর মর্ম বুঝলেন, প্রশংসা কনে, পেমার বউকে অনেকে ভালবাসেন এবং অনেক কাজে ডাকেন, বিয়ে, পৈতে, অগ্ন- প্রাশন, দোল, দুর্গোৎসব, প্রভৃতি নানা উৎসবাদিতে ও পীড়াদিতে সেবার জন্য পেমার বউকে ডাকলেই যে’তো এবং নীরবে ও আনন্দ- মনে কাৰ্য্য সম্পাদন করে আসতো। এই সকল কারণে পেমার বউ সকলের নিকট আদরনীয় তবে জমিদার বাড়ীর দিকে কখনও যায়নি। দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ গ্রীষ্মকালে পল্লীগ্রাম অঞ্চলে প্রায় বিচিকা রােগের প্রাদুর্ভাব হয়। জমীদার বাবুকে হঠাৎ এই পীড়ায় আক্রমণ কল্লে, সে সময় বাড়তে বড় কেহ ছিল না, বউদের মধ্যে কেহ বাপের বাড়ী গ্যাছে, নাত্নীদের মধ্যে কেউ শ্বশুর বাড়ী গ্যাছে, ছেলেরা নিজ নিজ প্রয়ােজন বশতঃ প্রায়ই এক এক জন এক এক স্থানে গ্যাছে। নাতীরাও ঐখের ছুটীতে মামার বাড়ী কেউ আম খেতে গ্যাছে, কেউ পাহাড় দেখতে গ্যাছে, কেউ সমুদ্রের স্নিগ্ধ বায়ু সেবন করতে গ্যাছে, কেহ কলিতা মহানগরী দেখে চোখের সার্থক কমতে গ্যাছে, যাঁহারা বাড়ী আয়ের তাদের মধ্যে কেহ কেহ অসুস্থ, সূতরাং বুজের সেবা বসে বিকে অভাব হতে লাগলো। কলেরা রেখে বাহিরের লোক বেশী সে যত্বের এই আসেনা, অথচ এ রোগে লােকের পরকার বেশ শুকতারা ১৪৯ : জনকে খবর দিতে দেরিও সয় না। কি করে ? জমিদার পরিবারবর্গ সকলেই বড় বিপন্ন হয়ে পড়েছেন। কার অসুখ, বাড়ীতে একেবারে হুলুস্থুল পড়ে গ্যাছে। কল কাতা থেকে ডাক্তার আসছে, বরফ আসছে, ইজেকসা যন্ত্র আসছে, ঔষধ আসছে, ডাক্তারের ভিড় বাড়ীতে পড়ে গ্যাছে, টেলিগ্রাম চারিদিকে হচ্ছে, পেয়দা, পাক, বরকন্দাজ সর্বদাই আনাগােনা করছে। ছেলেরা ও নাতী নাত্নীরা যারা সময় মত খবর পাচ্ছে তারা এসে পড়ছে, স্থানীর ডাক্তার বৈদ্য যারা আছেন হারাও সাধ্যমত চিকিৎসা করছেন। গ্রামে এত বড় একটা হৈ চৈ পড়ে গ্যাছে, অনেকে জমিদার বাবুকে দেখতে যাচ্ছে, পেমার বউরও এ কথা শুতে বাকী রইল না, এখন বান্দিনী বিষম সমস্যায় পড়লাে শেষে ভেসে এই স্থির কল্লে, ধদি মরে যায়, তখন মনে হতে পারে আমার ছেলে ওঁরই সাহায্যে পড়ছে উপকাতে পাচ্ছি। আশ্রয়দাতা, পিতার সমান সকলে বলে, এখন এ বিপদে যেতে দোষ কি ? শুচি সেবার লোকের অভাব, আমিত সেবাব্রত নিয়েছি তখন আর ভাল মন লোকের বিচার কি ? জীবনে ঢের ভুগলুম এখন পরকালে যাতে শান্তি পাই তারই চেষ্টায় যে ব্ৰত গ্রহণ করেছি সেই কাই করব ? তার কর্মের ফল তিনি অনেক ভুগেছেন, আমার প্রতি অন্যায় আচরণের শােধ বিধাতা দেবেন, এখন আবার আমি গ্রামে স্থান পেয়েছি, স্বামীর আসনে স্থান পেয়েছি, আমার যার দয়ায় আমার দুঃখের দিন গ্যাছে তাঁর আদেশ এ খনও শুনিনি যে অনিষ্টকারীর উপকার করা দোষ অতএব যেতে মােৰ কি? তাঁর কাজ তিনি করেছেন, আমার কাজ আমি ঝাৰ, এন কাপ যদি হয়, তার সঙ্গে আমারও সেই রকম হতে হবে? তাতে আমি বাদিনীরই উপযােগী কাজ কলম, উচ্চ কুলের করা ও তাদের প্রদত্ত শিক্ষা দীক্ষায় যে সারা জীবন অনুকরণ O করব এই সঙ্কল্প করেছি এবং সেইমত কাজও করে আসছি, আজ কেন তার ব্যতিক্রম করি? পেমার বউ অবশ্য অনেকটা ভদ্র লােকের মেয়ের মত থাকতো, তার পরিচয় আগে পেয়েছেন, বিধবা হয়ে অবধি মাছ খেতে না, দু'বেলা ভাত খেতাে না, একাদশীতে ছাতু খেতাে। বুড়ী বউকে এজন্য বলতাে, তোর সব বাড়াবাড়ি, আমাদের ঘরে এত কল্পে চলে ? বাবুদের বাড়ী যা দেখবে তাই নকল করবে। পেমার মা অবশ্য মাছ, ছােট ছোট কাকড়া, গেঁড়ী বা গুগলী পিয়াজ দিয়ে, পিঁয়াজ পােন্ত, পিয়াজ মুড়ী, পচা মাছে পিঁয়াজ লঙ্কা বেটে চড়ী খুব ভালবাতাে, বউর জন্য অসুবিধে হতো, বউ শাশুড়ীকে আলাদা করে দিতে বটে, তবে শাশুড়ী তাতে সন্তুষ্ট হতো না। “বুড়ী বলতে। দু'টো মানুষের আবার দু’রকম।” বুড়ী প্রায়ই গেড়ী গুগলী, কাকড়া ধরে আনতে। আর বউ অশান্তি বাধাতে এ কথা রাণী মার কাছে বুড়ী প্রায় নালিশ করতো। পেমার বউ শেষ যাওয়াই সাব্যস্থ করে জমীদার বাবুর প্রকাণ্ড অট্টালিকার মধ্যে ধীরে ধীরে প্রবেশ কল্লে । আমিও বলি পেমার বউ ভাল কাজ করেছে “যদি কেহ করে চলন ছেদন, চন্দন সুবাস তারে করে বিতরণ। দেবতার মেঘ ও কষ্টক ক্ষেত্র দেখে বৃষ্টি সম্বরণ করেন না।” জমিদার বাবু রােগের অসহ যাতনায় ছট ফট করছেন, বাহে ও বমীর বিরাম নেই, এমন সময় পেমার বউকে দরজায় দাড়িয়ে যায় পরিচয় জিজ্ঞাসা করে পেমার বউ বুঝতে পারায় জমিদার বাবু কেঁদে ফেল্লেন এবং তাকে সম্বোধন করে বল্লেন হঁ্যা মা! এসেছিস? আয় মা! পেমার বউ আমার মা আয়, পেশা, স্বর্গ থেকে আমায় ক্ষমা কর, তাের জিনিসকে আমি নিতে গেছলুম, সন্তোষের মা, তুই আমারও শুকতারা • ১৫১ মা, আমায় ক্ষমা কর, আমি নিরাশ্রয় ও গরীবের উপর বল প্রয়ােগ করতে গেছলুল, আমি বাদিনী মনে করে ভেবেছিলুল নীচ লােকের মন সুখের কথায় ভুলে যাবে। কিন্তু দেখলুম ফণীর মধ্যে ও সময় সময় মনি থাকে। তা কুড়িয়ে লওয়া যায় না। তুই বাদিনী হয়ে যা কাজ কল্লি, বামনীতেও সকল সময় পারে না, তবে আমার ব্রাহ্মণী অতি সাধ্বী লক্ষীরূপা ছিলেন। আমি তারও মৰ্ম্ম কখনও বুঝিনি, তাকে প্রপীড়িত করেছি, তােকেও উৎপীড়িত করেছি, আমার পাপের কি প্রায়শ্চিত্ত আছে ? আমি মহাপাপ করেছি, না না, আমি এখন নিপাপ, আমি এখন হরিনাম করছি, অধম তারণ পতিত পাবন, এখন সব বুঝেছি, যদি ভাল হই এখানে আর থাকবনা, মা গঙ্গে! পতিতাব্ধারিনী, তােমার কুলে বসে তােমার নাম করে শেষ ক'টা দিন কাটা’ব মা ! পেমার বউ ধীরে ধীরে, প্রৌঢ়ের নিকট অগ্রসর হলো এবং সেবার লােকের অভাব দেখে একাসনে বসে নীরবে তাহার সেবা করতে লাগল, অনবরত দিন রাত্রি মল মূৰ বমী ইত্যাদি পরিষ্কার করতে লাগল। জমিদার বাবু ক্ৰমশঃ আরাম হয়ে উঠলেন কিন্তু আর দেশে রইলেন না। আগে থেকেই নবদ্বীপে যা’বার ব্যবস্থা করেছিলেন, বা এর তথায় প্রকৃত হচ্ছিল, তথাকার বাসস্থান হয়ে গেল, তিনি ভাল হয়ে ছেলেদের হাতে বিষয়ের ভার দিয়ে সম্পত্তির যা কিছু বুঝিয়ে দিয়ে তথায় গেলেন, যাবার আগে, একটা অমী সন্তোষের নামে নি পান করে গেলেন।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ। সন্তোষ ক্রমে ঐ বিদ্যালয়ে পড়ে ম্যাট্রিক পাশ কত্নে, তবে সে আর পড়তে চাইলে না। পূৰ্ব্বকার রেকর্ড দেখে উপস্থিত ম্যাজিষ্ট্রেট, সাহেব সন্তোষের খো করে ডাকিয়েছিলেন এবং আদালতে আমূলার পদে নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পেমার ব্যাট। তাহাতে সত হলাে না। সে আবার বাপের মত এক রােকা গােছের ছিল, সে বল্লে “এ কাজে আমার ইচ্ছে নেই, আমরা চাষ। বাগদীর ছেলে আমার নিজের ব্যবসাই আমার লক্ষ্মী, বাপ পিতামহ যা করে গ্যাছেন সেই ভাল, স্বাধীন কাজ করে যে দিন পারব খাব, দু’পয়সা উপার্জন করব, যে দিন না পারব খাব না, কিন্তু পরাধীনে গিয়ে সদাই ভয় তধ করে দিন কাটান, উপর অলর চোখ রাঙান, অপমান সহ্য করা দরকার নেই। চাষ। বাগদীর ঘরে জন্ম, কখনও সহ গুণ বা কাকে ভয়, কখনও আমাদের বংশগত ও জাতিগত স্বভাব নয়, কলিতে আমাদেরই প্রতাপ বেণী, ভদ্রের সে রকম একতা ও সহানুভূতি নেই, আমরা জাত জাতের মধ্যে মারধর মুখ খারাপও করি আবার দরকার হ'লে একত্রিত হয়ে হুকা, নাপিত, বােপা বন্ধ করি, নিমন্ত্রণ বাওয়া বন্ধ করি, মেয়ে ছেলের বিয়ে বন্ধ করি। আবার বাবুদের বাড়ী মাছ বন্ধ কতে পারি, সবাই দল বেঁধে বলি “যে এর নইলে দেব না।” বাবুদের বাড়ী মজুর খাট। জিনিস ৰিক্ৰয় যা করৰ আমরা সকলে একমত হ'য়ে করি। যদি আমরা • রােজে কাজ করি আমাদের জাতি তাই বলে • আনা নইলে করিস না, আমাদের সাধ্য নেই যে আর।• আনার কাজ করি, সে স্কুলে আমরা এমন একতা বা হারিয়ে এমন স্বাধীন ব্যবসা বেড়ে এর অধানতা স্বীকার তে সব নেই, অামরা জলে, বনে জঙ্গলে, মাঠে, চরে বেড়াই, কারাে বাঁধাবাঁধির খার খামিনা, এমন অবারিত দ্বার ছেড়ে আর শৃঙ্খল প'রে সৌখীন জীবনে বেশী সুখ প্রদ মনে করি না। আর এক নিবেদন সাহেব আপনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, আর একটি নিবেদন এই যে সবাই যদি চাকরী করবে তাহলে চাষ করবে কে? সবাই নিজ জাতি ব্যবসা ছেড়ে ঐ চাকরীর পথে গিয়েই দেশে.অভাব এসেছে। শুধু ইংরাজকে দোষ দিলে কি হবে ? তঁাদের দেখে বরং শেখা উচিত যে তারা নিজের দেশের উন্নতির জন্য কত কষ্ট স্বীকার করে এদেশে এসে কত মহামূল্য বস্তু দেশে কুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের দেশের মঙ্গলের জন্য কত কাজ করছেন, আর আমরা নিজের দেশের নিজের মুখের জিনিষের যত্ন জানি না। হেলায় হারাচ্ছি। আমরা শুদ্র, আমরা হীন জাতি, আমাদের বৃত্তি হলো গাে ব্রাহ্মণ সেবা আর চাষ করা, মাছ ধরা, গাে ব্রাহ্মণের পরিবর্তে ইংরেজের সেবা, আমাদের ধর্ম নয়, সে বাবুরা পারেন। আমি যা শিক্ষা কমিহি তার দ্বারা আমার নিজের কর্মের বেশ উন্নতি করতে পারব বলে বিশ্বাস, তবে আপনি যে আমাকে অনুগ্রহ করে ডেকেছেন ইহাতে আপনাকে শত ধন্যবাদ, সাহেব শুনে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন বেশ কােষার ব্যবসাই কর। একটা কাজ খালি হয়েছে, তাই তােমার পূর্বেকার রেকর্ড দেখে তোমায় ডাকিয়ে ছিলুম। তুমি যে কাজ নিলে না সেটাও লিখে রেখে যাও সন্তোষ তাই কঙ্গে, আর বলে ‘হ এ কালের প্রার্থী অজস্র আছেন। আপনি বিজ্ঞাপন দিলেই অসংখ্য মধুমক্ষিকা জুটবে।” সাহেব বল্লেন ‘নিশ্চয়। সন্তোষ সাহেবকে ভযান পূর্বক প্রস্থান করে । মতাে নিজের ব্যবসাই বলে এবং ক্রমশঃ বেশ অব ফিরিয়ে ফেলে, গােয়াল ভরা গরু, ধানের মাই, এমী বাড়ালে, চাষেয় -- ১৫৪ শুকতারা কঙ্গে। জমিদার বাবু যে জমা দিয়েছিলেন, তাহাতে একটা ডোবা ছিল সেইটা একটু কাটিয়ে ঝালিয়ে মাছের পোনা ফেলে প্রথমে মাছ বিক্রয় ব্যবসা আরম্ভ ফলে, তারপর ক্রমশঃই তাই থেকে উন্নতি হতে লাগলো, ক্ৰমে বড় বড় দীঘি পুষ্করিণী জমা নিয়ে মাছ ধরিয়ে বিক্রয় করতে লাগলাে। নিজে বরাবর যে সুখে মানুষ হয়েছে, সুতরাং নিজে আর স্বহস্তে পারে না, তােক রেখে কাজ করাতাে এবং নিজে তদারক করতো, জমিদার বাবুর দেওয়া জমীতে প্রথমে চাষ আরম্ভ কল্পে তারপর ক্রমশঃ এমী, মা, বাগান, পুকুর, বাড়াতে লাগলো। বিস্তর চাষ। খাটাতে লাগলো, বলদ, গৰু, গাড়ী সবই কিলে, এখন গ্রামের মধ্যে সন্তোষ কুমার একজন অবস্থাপন্ন লােকের মধ্যে গন্য হলো । বাড়ীটা কোঠা করে ফেল্লে, কেবল সন্তোষের মা পেমার মৃত্যুর স্থানট। কোন ঘর দেরি না করে বাধিয়ে দিতে বল্পে। তথায় সন্তোষের মা সন্ধ্যা পূজা করে ধূন। সন্ধ্যা গঙ্গাজল দেয় একটা তুলসী গাছ পুঁতে তাতে জল দেয়। ইতিপূর্বে সন্তোষের মা সন্তোষের বিবাহ দিয়েছিল। বাগদীর ঘরে যে ছােট বয়সে বিবাহ দেয় এটা বােধ হয় বাবার আবশ্যক হবে না । সন্তোষের কয়েকটা ছেলে মেরে হলো, তার মা সাধ মিটিয়ে নাতী নারী নিয়ে ঘর করতে লাগলাে। সন্তোষ এখন কাজ করবার লােক রেখেছে এবং বউকেও বলে, “আমার মা সংসারে অনেক কষ্ট পেয়েছে, তাকে কিছু করতে দিও না।” সন্তোষের মা আর কিছু করেও না। শুধু নাতী নাত্নী নিয়েই বেড়ায়।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। চরণ বাবুর ভগ্ন গৃহ ক্ৰমশঃ জঙ্গলে পরিপূর্ণ হয়েছিল। সন্তোষের মা বৈকালে নাতী নাত্নী নিয়ে পড়া বেড়াতে বেরিয়েছিল, চরণ বাবুর বাড়ীর সম্মুখ দিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় দেখলে চরণ বাবুর ভগ্ন গৃহের দ্বারে দাড়িয়ে একটি বয়স্থ ব্রাহ্মণ তার পেট একবারে চ্যাপটা হয়ে কুঁকড়ে গ্যাছে, কালসার অনুক্লীষ্ট চেহারা, শরীর ভেঙ্গে পড়েছে, হাতে লাঠি, চক্ষু কোটরে প্রবেশ করেছে, দেখলে মনে হয় বয়স অপেক্ষা দুঃখে কষ্টে অন্নাভাবে বাৰ্ধক্য লক্ষণ বেশী অগ্রসর ও দেহেতে প্রকাশ। সন্ধ্যার আবছায়ায় মুখ ভাল দেখা যাচ্ছে না, অথচ চেনা চেনা মনে হচ্ছে—সন্তোষের মা একটু খাল, দেখলে কথিত ব্যক্তি বাড়ীর দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে, ও চোখের জল মুচ্ছে আর বলছে, এই গৃহ আমি কত কষ্টেই করেছি তার পরিণাম এই যেমন আমার পরিণাম, তেমন আমার গৃহের পরিণাম, এই সম্পত্তির জন্য টের অন্যায় কাজ করেছি, তাই ভগ্ন অট্টালিকা জঙ্গলে পরিপূর্ণবয়ে শূন্য গৃহ আমার কর্মের সাক্ষ্য দিচ্ছে। যা হােক, তারা এখন কোথায় ? এখন কোথায় যাই। অনেক ভুগলুম ভগবান তােমার কি দয়া হয় না? বােধ হয় পাঠক পাঠিকা বুঝলেন ইনি চরণ বাবু' সন্তােনের মা অনুমানে বুঝে চরণ বাবুর কাছে অগ্রসর হয়ে দাঁড়াল। চাণ বাৰু জিজ্ঞেস কল্লেন বাহা তুমি কে ? পেমার বউ বয়ে—আমি বাগদিনী, বুড়ীর বউ, রাত্রে পালিয়েছিলুম। এখন গ্রামে ফিরে এসে বল ছি। ও ও তুই পেমার বউ গায়ে হা। চরণ বাবু একবারে বাগদিনীর পায়ে পড়ে আর "কি? পেমার বউ বলে, করেন কি ? আপনি ব্রাহ্মণ আমার পায়ে ?
শুকতারা
পড়া? আমার অপরাধ হবে।
তারপর চরণ বাবু সমস্ত ঘটনা বুড়ীর বউকে জিজ্ঞেস করে জানলেন
এবং তার খুব প্রশংসা কল্লেন ।
আপনার স্ত্রী পুত্রের কথা জিজ্ঞাসা করায় পেমার বউ বল্লে তারা
ত আপনি যাবার পর একে একে রােজগারের চেষ্টায় গেলেন, আর
এলেন না, শুনি আপনার স্ত্রীও খেতে না পেয়ে বাপের বাড়ী গিয়েছেন।
চ—তার বাপের বাড়ীর অবস্থা ভাল নয় জানি, তার কি করে চলে ?
খবর জান ?
বউ-হা শুনিছি, তিনি সেখানে বেশ জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা
করেছেন। চরকা কাটেন, সুতা তােলেন আরো অনেক উপায় করেন।
5—কে বলে ?
বউ-সন্তোষ ওদেশে পােনা কিতে গেছলো ।
ওর সঙ্গে নদীর
ঘাটে দেখা হয়েছে, তাদের বাড়ীও দু'দিন ছিল, গ্রামে তার খুব সুনাম
আছে, সকলে তার প্রশংসা করেছে। আগেকার ছেলেরাও বেঁচে
আছেন তিনি বলেছেন।
চ—একবার ছেলে পুলে মেয়েগুলােকে দেখতে ইচ্ছে হয় ।
বউ-যান না কেন?
চ-যে অবস্থায় তাকে ফেলে গেছি, সে কি আর এই অকর্মণ্য
বুড়ােকে স্থান দেবে ।
বউ-সাধ্বী স্ত্রীলোক কখনও স্বামীর সময় ফেলেন, তবে প্রকৃতি
সবার সমান নয়, রুক্ষ হলে খানিক ঝগড়া বা রাগ করতে পারে কিন্তু
কষ্ট দেয় না। পরিত্যাগ করে না।
চ :-কি শনি কি করবে? আমিত নানা জালায় গৃহ ছেড়ে
পালিয়েছিলুম, মন্তিক সত্যই বিকৃতি হয়েছিল, দেশে দেশে ফিল,
রাস্তায় পড়ে থাকি, কখনও উপােস থাকি, কখনও ভিক্ষা করা
৭
শুতা ১৫৭ কখনও অতিথিশালায় যাই, কখন ও দেবালয়ে খেয়ে পড়ে থাকি তঁার দুয়ারে কখনও গাছতলায় পড়ে থাকি, কখন গাছের ফল পেড়ে ও কুড়িয়ে খেয়েই দু’দিন কাটালুম, কখন ষ্টেশনে মাল গুদামের ধারে যেখানে পেয়েছি পড়ে থেকেছি, কখনও লােকের মার খেয়েছি, অনাহারেই দিন কেটে গ্যাছে। তারপর রােগ হয়ে অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকি, সবাই হাসপাতালে দেয়। তিন মাস পর ভাল হ'য়ে মনে কম দেশে ফিরি, বিকার আরামের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিস্কের রােগটাও ভাল মনে হয় তাই পদব্রজে কয় মাসে এসেছি, এখন মলেই বাঁচি। একবার মনে হতো সকলের খবর কি করে পাব? চিঠি লিখি আবার ভাবি কে কোথায় আছে, কাকে চিঠি দেব? আর আমার প্রতি সহানুভূতি কেউ করবে কিনা জানি না। যাই হােক একবার দেশের দিকে টান ধল্লো শেষ দশায়, তাই শেষ ভেবে চিন্তে অতি কষ্টে ১২ বছরের পর হাঁটতে হাঁটতে এলুম। এসে দেখি সব ছত্রভঙ্গ, কেবল আমার ভঙ্গ গৃহহাপরি অভ্রভেদী অশখ বৃক্ষ আমার কৰ্ম্ম ফলের স্তম্ভ স্বরূপ দাড়িয়ে আছে। স্তুপাকৃত ভগ্ন ইষ্টক আমার দুঃখের পাপের বোঝা জড় করে বসে আছে, তাই আমি দেখচি আর কিছু দেখচি না। বলে আর তিনি কথা কইতে পাল্লেন না, শুয়ে পড়লেন। সন্তোষের মা সম্মুখস্থ পুকুর থেকে জল এনে তার মুখে দিয়ে তাকে একটু ঠাণ্ডা কল্লে। তারপর তিনি সুস্থ হলে তার ঘরে নিয়ে গেল, তার রান্নার আয়ােজন করে দিলে তিনি বহু দিনের পর পেট ভরে ভাত খেলেন। অদৃষ্টলিপি কে খাতে পারে ? এত দিনে বাগীর ঘরে ভাত খেলেন, তার প্রতিজ্ঞা ভয় হলো। পেটের দায়ে বাগিনীর ঘরে গেলেন অবশ্য স্বপাকে খেলেন । আহাদির পর তাকে বেশ সুকোমল শয্যায় শুতে দিলে। সে রাত্রি বহুদিনের পর চরণ বাৰু মুখ নিদ্রায় পােহালেন। তারপর দু’দিন একটু শরীরে বল পেলে, কয়দিন সে যথের পর সন্তোষের মা ভাড়া দিয়ে তার স্ত্রীর শুকতারা কাছে পাঠিয়ে দিলেন, চরণ বাবু যাবার সময় তাকে প্রাণ ভরে ও হাত তুলে আশীর্বাদ করে গেলেন। চরণ চাবু পূর্ববঙ্গেরই লােক ছিলেন। শেষকালে নিজ জন্মভূমিতে গিয়ে স্ত্রী পুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে ঘর সংসার করতে লাগলেন, তার আর এ বয়সে কি শক্তি আছে ? তিনি নানা আলায় কেমন গুড় ভাবাপন্ন হয়েই দিন কাটাতে লাগলেন, তার স্ত্রীই পুরুষের ন্যায় তার প্রতিপালন করতে লাগলেন। রক্ষক হীনের জগ ক্রমশঃই তার সাহস ও কাৰ্য্য দক্ষতা বৃদ্ধি হয়েছিল, সুতরাং তিনি কোন অবস্থাতে আর ভয় পেতেন না । তার প্রথম স্ত্রীর পুত্রের জীবিত ছিলেন, তাদের কোন রকমে কষ্টে শ্রেষ্ঠ দিনপাত হতো, তারা আর পিতা মাতার সন্ধান রাখতেন না। এখন তার স্ত্রীই সকলের অভাব পুরণ করতে লাগলেন অনেক কষ্টের পর পেমার স্ত্রীর জীবনের শেষ ভাগে ‘শুকতারা ফুটলো, কিন্তু অতি শীঘ্রই প্রভাত হলো, বেশীক্ষণ আর ভোগ হ'লে। সন্তোষের মার হঠাৎ কার হলো, তারপর বিকার, তারপর সব নাবালক সন্তোষের জন্য তার মা’র চিন্তা ছিল, সেই সন্তোষকে সংসাৰ্ধ করে রেখে পতিহীনা আজ পতির উদ্দেশে অমরদেশে প্রস্থান কলে, এতদিনে তার তৃষিত প্রাণ শীতল হলো। পেমার মৃত্যুর মাটীর সঙ্গে তার মাটী মিশিয়ে দিয়ে অবিনাশ আত্মায় আত্মায় দম্পতী যুগলের অবিচ্ছিন্ন মিলন হলো। সুম দেহে দেহে কোলাকুলী হলো। নাময় তাদের জীবন কাহিনী লিপিবদ্ধ করে তার নামে অভিহিত কম। । না।
পঞ্চম পরিচ্ছেদ এখন মিষ্টার মিটার চিফ, সেক্রেটারী পদে প্রতিষ্ঠিত। তার সুখ সম্পদ ও ভােগের মাত্রা এখন উচ্চ থেকে উচ্চতর দিকে ধাবমান। সুরম্য অভ্রভেদী অট্টালিকা, মনোরম পুষ্পোদ্যানে বেষ্টিত সুখ সৌন্দর্য্যে, হাস্য কৌতুকে ও পুত্র কন্যার কলহান্তে মুখরিত । অবশ্য বেবীরা এখন বড় হ'য়ে পাঠাভ্যাসে নিযুক্ত। সেই ধনীর সৌধ শিখরে ও এই নীচ জাতির একত্রে বাসের কথা মধ্যে মধ্যে আন্দোলিত হতো। ভােগের চরম সীমায় উঠেও ইহাদের স্মৃতি একেবারে হৃদয় পট থেকে মুছে যায়নি। প্রকৃত আন্তরিক মেহের কাছে এবং উচ্চ ও উদার হৃদয়ের কাছে উচ্চ নীচ ভেদাভেদ থাকে না। উচ্চ প্রাসাদ কক্ষে মিষ্টার ও মিসেস মিটার সঙ্গীত স্রোতে ভাসমান। এমন সময় হাফপ্যান্ট ও পাঞ্জাবী পরা একটা বালক ভৃত্য সেলাম দিয়ে মিসেস মিটারকে বল্লে “একটা লােক খালি পা ও খালি গায়ে এসে বলছে “আমি আমার কাছে যাব।” • তখনি সুর থেমে গেল, গান বন্ধ হলো। বহুদিনের এবং মুগ্ধ বালকের কম্প্ৰকণ্ঠ উচ্চারিত রাণীম বুলী হৃদয় তন্ত্রে নব ভাবে বেজে উঠলাে। বলে “তাকে নিয়ে এসে!” তারপর ‘বয়’ গিয়ে সন্তোষকে সঙ্গে করে নিয়ে এলো। সন্তোষ ভাগ্যহীন বেশে এসে রাণীমার পায়ে লুটিয়ে পড়ে নিঃশব্দে অ বর্ষণ করতে লাগলো। রাণীমা সন্তোষের হাত ধরে উঠিয়ে বল্লেন “তুমি ভাগ্যহীন নও, তােমার মা বাগী কুলে আদর্শ মেখে গ্যাছে, তুমি ধন্য যে এমন মায়ের ছেলে হয়ে জন্মে। আমি তাে তােমার সেই রাণীগ আছি। তয় কি? যখনি মা বলে গরে তনি উত্তর পাৰে। এ তাকে উত্তর না দিয়ে কেউ থাকতে শুকতারা পারে না। এ বুলী ভূমিষ্টকালে আপনি যেখােয়, আবার প্রাণ যাবার সময় ‘মা’ বলতে বলতে চলে যায়। এর তুল্য স্নেহ নেই, এর তুল্য মধুর, শান্তিময়ী নাৰ নেই। তােমার মা কত ঝায়, কত বিপদে, তােমায় বুকে করে নিয়ে বয়েছে, সন্তোষ! সকল সময় মনে রেখো সম্পদে, বিপদে, সুখে, দুঃখে, জীবনে মায়ের বাড়া কেউ নেই, মায়ের মত মিষ্ট বুলী নেই, যে বুলীতে আমি মুগ্ধ হয়ে আছি এবং তােমায় দীন বেশে দেখে বাৎসল্য সাগর উথলে উঠলো এবং এখন তুমি বয়স প্রাপ্ত হলেও আমি দেখছি সেই বালক সন্তোষ । সমাপ্ত।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.