Makardah Saraswat Library, Howrah
Jatra Sahachari
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
যাত্রা-সহচরী
শ্ৰীচারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
শ্রীগুরু লাইব্রেরী
২০৪, কর্নওয়ালিস ষ্ট্রীট
কলিকাতা:
কাশক :- নীভূবনমো মজুমদ।
শ্রীগুরু লাইব্রেরী
১৫, কন ওয়ালিস্ ষ্ট্রীট, কলিকাতা
প্রকাশক কতক সমৃত্ব সংরক্ষিত
ফান, ১৩৪৪
দাম দুই টাকা
প্রিন্টার --শ্রীনলিনীরঞ্জন দে
জুবিলী প্রেস
৫১, সিমলা ঠাট • কলিকাতা
উৎসর্গ
সুবিখ্যাত লেখক
শ্ৰীযুক্ত সৌরীন্দ্রমােহন মুখােপাধ্যায়
বন্ধুবরের করকমলে
গভীর প্রীতির নিদর্শন-স্বরূপ
সাদর উপহার
সূচী • • • ১ ০ ০ ০ ০ ০ ০ ৪৯ যাত্রা-সহচরী অপরাজিতা চটির পাটি ফিনিক্স , চীনদেশে । স্নেহ-রহস্য ••• ৮e ০ ০ ০ ০০ ০ ৮৫ খুনে. স্ত্রী-চরিত্র (গী দে মােপাস) ৯২ t ০ ০ ০ কুড় নি । -~- ০ ০ ০ ১০৮ | ০ ০ ১১৬ ১২৭ জীবন-নাট্য ( আগষ্ট ষ্ট্ৰীণ্ডবার্গ ) নিষ্কৃতি (গী দে মােপাসা) নষ্টোদ্ধার ( ফ্রাঁসােয়া কল্পে ) নীলকুঠি ( এমানুয়েল-আরেন) গোপ-খেজুরে ( আলস্ দোদে ) । পূজার ঘণ্টা (জুল লেমে ) ১৮ যাত্রা-সহচরী ব্যাণ্ডেল ষ্টেশনে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। প্ল্যাটফর্মে পাইচারী করছি। একজন ব্রাহ্মণ ভদ্রলােক আমার কাছে এসে দাড়ালেন। তিনি বৃদ্ধ ; মাথার চুল কাশফুলের মতন শাদা ধবধব করছে। তার গায়ের রংও উজ্জ্বল গৌর। তার তীক্ষ্ণ উন্নত নাসিকা, উজ্জ্বল চক্ষু। তার প্রশস্ত কপালের উপর রূপালি ঝালরের মতন চুলগুলি পড়ে তার মুখে একটি ঐ দান ক্লরেছে। বৃদ্ধের বয়স ৬৫ বৎসরের কম নয়; কিন্তু এখনও তিনি বেশ সমর্থ ও সােজা আছেন। তার পরিধানে সুশুভ্র খদ্দরের ধােয়া ধুতি; গায়ে খদ্দরের সাদা ধবধবে মেজাই পাজরের পাশে ফিতের ফঁাশ দিয়ে বাঁধা, তার উপরে খদ্দরের সাদা চাদর ; মেজাইয়ের তলা দিয়ে শুভ্র পৈতার প্রান্ত ঈষং দেখা যাচ্ছে। তার পায়ে সাদা চামড়ার চটি। তার এক হাতে একটি ছাতা, তার কালাে কাপড়ের উপরে সাদা কাপড়ের ছাউনি চড়ানাে, সে কাপড়টাও সদ্য ধােপর বােয়া ; অপর হাতে একটি পুটুলি, লটকন রঙে-ছােবানাে পরিষ্কার একখানি গামছায় বাঁধা। গৌরবর্ণ বৃদ্ধের আপাদমস্তক শুভ্রতার মধ্যে একটু মাত্র রং লেগেছে গান গামছায়, তাও গেরুয়া। এই সব মিলে তার আকৃতিতে একটি সুন্দর সৌম্য সাত্ত্বিকভাব লেগেছে ; তাকে দেখলেই মনের মধ্যে কেমন একটি সম্ভ্রমের ভাব উদয় হয়। তিনি আমার কাছে এসে দাঁড়াতেই, আমি তার দিকে তাকিয়েই থমকে দাড়ালাম। ।
যাত্রা-সহচরী বৃদ্ধ একটু কুণ্ঠার সঙ্গে হেসে বললেন—বাবা, আমি বিশ্বেশ্বর দর্শনে কাশীতে যাব ; আমি আপনার কাছে কিছু পাথেয় সাহায্য চাই। বৃদ্ধকে দেখে আমার মনে যে সম্মানের ভাব জেগেছিল তা তার ভিক্ষা চাওয়া শুনে দূর হয়ে গেল। আমি মনে করলাম বৃদ্ধের এই যে সাত্বিক শুভ্র বেশ তা ভিক্ষা করবার ভড়ং। আমি রুক্ষ অসম্মানের স্বরে বাম—আপনাকে পাথেয় সাহায্য করতে গেলে আমার পাথেয় যে কম পড়ে যাবে । বৃদ্ধ শান্ত স্বরেই বললেন—কিঞ্চিৎ যা হয় দান করুন। মা অন্নপূর্ণ আপনার চিত্ত ও বিত্ত পূর্ণ করে রাখবেন। আমি ইকনমিকসের প্রফেসারী করি ; ভিক্ষার প্রশ্রয় অমি দিতে পারি না। তাই ব্যঙ্গের স্বরে বল্লাম—অন্নপূর্ণা তো দেখছি আমার বিও হরণ করে আপনার রিক্ততা পূরণ করবার ফন্দি ঠাওরেছেন ! কিন্তু কষ্টে-সৃষ্টে উপার্জন করব আমি, আর আপনি কেবল চেয়েই তার ভাগ পাবেন কোন অধিকারে ? বৃদ্ধের মুখ একটুও অপ্রসন্ন হলো না; শুভ্র হাস্য করে তিনি বললেন—প্রার্থীকে দান করার যে আনন্দ তার জন্যেই আপনি দান করবেন। আমি রূঢ় ভাবে বললাম –দানে দাত্রার চেয়ে গ্রহীতারই আনন্দ বেশী। সুতরাং আমার নিরানন্দ থাকাই বেশী বাঞ্ছনীয়। বুদ্ধ একটু ব্যস্ত হয়ে বললেন-না না বাবা, অমন কথা মুখে আতে নেই। মা আনন্দময়ী আপনাকে আনন্দে পরিপূর্ণ করে রাখুন। আনময়ের রাজ্যে কোথাও নিরানন্দ নেই—আনন্দাদ্ধ্যে খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে, আনন্দেন জানি জীবন্তি, আনন্দং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি। বৃদ্ধ চমৎকার বিশুদ্ধ উচ্চারণে উপনিষদের বাক্যে আমাকে আশীৰ্বাদ যাত্রা-সহচরী করে ধীরে ধীরে অপর লােকের কাছে ভিক্ষা চাইতে চলে গেলেন। তখন আমার মনে হতে লাগল ওঁকে কিছু দিলে হতো ! ওঁর চেহারাটা তো ভিক্ষুকের মতাে নয়! চেহারা সন্ত্রান্ত, আর বাক্য ও ব্যবহার সুশিক্ষিত ভদ্রলােকের মতন, অথচ ভিক্ষা চাইছেন; এরপনে কি ? ভিক্ষা করে তার্থদর্শনে যেতে হবে এমন কি গরজ ? তিনি আবার আমার কাছে এলেই তাকে কিছু দেবে। এই সঙ্কল্প মনের ভিতর দৃঢ় হয়ে উঠতে না উঠতে ট্রেন এসে • পড়ল, এবং তাড়াতাড়িতে তাকে আর কিছু দেওয়া হলো না। কিন্তু একজন ভদ্রলােকের প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করার গ্লানি, মনের মধ্যে কেমন একটু অস্বস্তি জাগিয়ে রইল। বাড়ী গিয়েও সেই ভদ্র, ভিক্ষুকের কথা ভুলতে পারলাম না। একদিন তার কথা মনে হতেই মনে হলাে, দীর্ঘ ছুটি তে আছে, একবার পশ্চিমে বেড়িয়ে এলে মন্দ হয় না। মাকে বাম—মা, একবার কাশী দর্শন করে আসি। মা হেসে বলেন-এর মধ্যে কাশীবাসে মতি হলাে কেন ? ঠাকুরমা বলেন—মতি হবে না? সােমখ ছেলে, তায় আবার রােজগেরে,----বিয়ে থা হলো না এখনাে ; সংসারে বৈরাগ্য হবারই তত কথা ! তা ভাই, চলো আমাকে নিয়ে কী বদল করে শ্রীবৃন্দাবনে বাস করবে। আমি হেসে বল্লাম-না ঠাকুরমা, রাধার কুঞ্জে কুজাসুন্দরী পা দিলে যে চুলােচুলি ব্যাপার হবে, Fা মােটেই সভ্য আর শােভন হবে না। অতএব আমার একা যাওয়াই নিরাপদ। মা বললেন—খামারপাড়ার বিজয় মুখুজে যে বার বার তার মেয়ে দেখতে যাবার কথা লিখছেন। যা না, একবার দেখেই আয় না। ০ । যাত্রা-সহচরী . কিন্তু কে আমি বল্লাম-সে দেখলেই হবে। আশ্বিন-কান্তিক মাসে তে। তার কন্যাদায় উদ্ধার হবে না, তবে আর তাড়াতাড়ি কি ? আর আমি এক নম্বরের ফাষ্ট ক্লাস সুপাত্র হলেও তো দেশে দু-তিন নম্বরের সুপাত্রের অভাব নেই, সুতরাং বিজয়-বাবুর কন্যাকে আমি বিয়ে না কলেও তার চির-কুমারী থাকতে হবে এমনও সম্ভাবনা নেই। মা বলেন--তা তো নেই, কিন্তু আমার যে ভারি ইচ্ছে যে ঐ মেয়েটির সঙ্গেই তাের বিয়ে হয়। এম-এ-পাশ-করা মেয়ে ; ববে যে কিছু লেখাপড়া জানে...... । আমি হেসে বল্লাম—সেটা তো খুব প্রশংসার কথা হলাে না মা। বিদ্যা অর্জন করলাম অথচ প্রকাশ করতে পারলাম না, তবে সে পণ্ডশ্রম করে লাভ কি। মূৰ্থেতে পণ্ডিতে তফাৎ তাে ঐ প্রকাশে । মা বলেন—আমি বছিলাম যে তার বিদ্যের দেমাক নেই। দেখতে অতি প্রিয়দর্শন, নম্র স্বভাব, সুস্থ দেহ ; কাজে কর্মে সেবায় পরিচর্যায় ভারি চটপটে আর তার মা-বাপ-তারাও বেশ অমায়িক লােক। তাদেরও খুব ইচ্ছে তাের সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেয়। আমি হেসে বল্লাম--তুমি যে রকম গুণ-বর্ণনা করছ, তাতে ঘটকীরা হার মেনে যায়। তাই সন্দেহ হচ্ছে যে তােমাকে ওরা কিছু ঘুষ কবুল করে উকীল বানিয়ে দিয়েছে। ঘুষের পরিমাণটা কি শুনতে পাই? -পাঁচ হাজার টাকা নগদ, রূপাের দানসামগ্রী, বাউটি-সুট গহনা, কলকাতায় একখানা বাড়ী আর একখানা মােটর গাড়ী অথবা একটা তালুক মুলুক মেয়েকে যৌতুক ? মা হেসে বললেন—আমরা বুঝি কেবল টাকাই চিনি, মানুষ চিনি ? দেনা-পাওনার কথা তাদের সঙ্গে কিছু হয় নি। এবার যখন কমলাকে নি: পুরীতে য়েছিলাম, বিজয়-বাবুরা আমাদের বাড়ীর
যাত্রা-সহচরী
পরের বাড়ীতেই থাকতেন ; সেখানে তাদের সঙ্গে চেনা-শােনা হয় ।
জবাই তে সেবা-শুশ্রুষা করে ,কমলাকে ভালাে করে তুলে। আমি
জবার গুণে মুগ্ধ হয়ে তার মায়ের হাত ধরে বলেছিলাম, তােমার মেয়ে
আমার মেয়ের প্রাণ বাঁচিয়েছে ; তােমার মেয়েটিকে, দিদি, আমায় দিয়ে
দিতে হবে। তারা রাজী হলেন।
আমি হেসে বল্লাম—কিন্তু মা, রাজী তো হলেন বর আর কনের
মায়ের ; বর-কনেরও তো রাজী-গাজী-ভরা এক একটা মেজাজ আছে।
বরটিও তােমার কচি খােকা নয়, আর যা শুনছি- তাতে কনেটিও খুকী
নয়—আমার ঠাকুরমার বয়সীই হবেন, বােধ হয়। অতএব এদিক্কার
পছন্দ অপছন্দ একটু দেখতে হবে বৈ কি। এ-এ-পাস-করা মেয়ে
যখন, তখন হয় তাে এতদিনে কাউকে হৃদয় সমর্পণ করে স্বর হয়ে
বসে আছেন, এর মধ্যে আমার অনধিকার প্রবেশের চেষ্টা করাটা কি
উচিত হবে?
মা হেসে বললেন—আঃ, তুই কী যে বলিস তার ঠিক নেই, জবা
তেমন মেয়েই নয়।
আনি বান—হতে পারে জবা তেমন মেয়ে নয়। কিন্তু তোমার
ছেলে তো তেমন হতে পারে।
মা একটু আশ্চর্য ও উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠলেন—তুই কি কোনও
মেয়েকে বিয়ে কবি ঠিক করেছি না কি ?
আমি হেসে বল্লাম, কাকে বিয়ে করব তা ঠিক করি নি ;
কিন্তু কাকে বিয়ে করব না! তা ঠিক করেছি।
তা ঠিক করেছি। যাকে আমি ঘনিষ্ঠ
পরিচয়ে ভালো না বাসব তাকে আমি বিয়ে করব না। তখন আমার
বন্ধ থাকূলে আমিও হয়তো তোমাদের সঙ্গে
হয়তো তোমাদের সঙ্গে পরীতে যেতাম, আর জবার
সঙ্গে পরিচয় হতে পারত, তাকে ভালো লাগতে পারত। কিন্তু
যাত্রা-সহচরী ত। যখন হয় নি, তখন ও-সম্বন্ধে আর কিছু আলােচনা না করাই ভালো। আমার যদি কাউকে কখনাে ভালাে লাগে তাে তােমরা জানতে পারবে । ছেলে-মেয়ের অনিচ্ছায় বিয়ে দিলে কেমন সদ্ভাব হয় তার দৃষ্টান্ত তাে তােমার অজানা নেই। মা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন—তবে কি আমি বিজয়-বাবুদের জবাব দিয়ে দেবাে? আমি মাকে ক্ষুস দেখে দুঃখিত হলেও দৃঢ় স্বরে বল্লাম-তাই দিয়ে দাও। তাদের মিথ্যা আশায় রেখে লাভ কি ? মেরে বয়স আর কম হয় নি ? মা আবার দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেন, আর কোনো কথা বললেন না । মায়ের এই দীর্ঘনিশ্বাসের মধ্যে আমাদের পরিবারের একটি ব্যথার ইতিহাস আছে। আমার ভগ্নীপতি অজয় অল্প বয়সে বিপত্নীক হয়েছিল, তাই তার বাপ-মা তার আপত্তি অগ্রাহ্য করে অল্পদিনের মধ্যেই তার আবার বিবাহ দিয়েছেন আমার বােন কমলার সঙ্গে। অজয় পিত-মা ভার অনুমতিতে বিবাহ করেছে, কিন্তু কমলাকে ভালােবাসতে পারে নি। শ্বশুর বাড়ীতে কমলার কোনো অভাব নেই এক স্বামীর প্রীতি ছাড়া ; কিন্তু সেই প্রধান অভাবের জন্য অ ভাগিনী কমলা সাই এমন নমরা হয়ে থাকে যে তার মুখে হাসি দেখা যায় না। জবার সঙ্গে পুরীতে কমলা যত দিন ছিল তত দিন নাকি কমলা হেসেছিল। এই জন্যে জবার প্রতি মায়ের এত টান। কিন্তু আমার মন তো অদেখা জবার দিকে একটুও টানে না। এ খবর জবার বাড়ীর (লাকদেরও অজানা নেই। কাশী যাত্রা করলাম। পূজার পর হলেও গাড়ীতে ভিড় কম ছিল । ট্রেন যখন বধ মানে .এল, সন্ধ্যা হয়েছে। একটি তরুir; এসে তযােদের কামরায় উঠল ; কুলী তার যাত্রা-সহচরী গাড়ীতে তুলে বাক্স বিছানা আর একট। টিফিন-ক্যারিন্নার দিয়ে গেল। প্রথমে মনে করেছিলাম মেয়েটির সঙ্গে কোনাে পুরুষ অভিভাবক আছে। কিন্তু মেয়েটিকে কেউ যখন কোথাও জায়গা করে বসিয়ে দিতে এল না, মেয়েটি দরজার কাছে দাড়িয়ে কোথায় ববে স্থির করবার জন্যে চারিদিকে চাইছে দেখলাম, এবং গাড়ীর আরােহী মাড়ােন্নরী আর হিন্দুস্থানীরা কেউ একটুকুও জায়গা ছেড়ে দেবার লক্ষণ দেখাল না, তখন আমি উঠে দাড়িয়ে তাকে উদ্দেশ্য করে বল্লাম--আপনি এখানে এসে বসুন । আর ডাক শুনে মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল ; তার পর, লজ্জিত স্মিতমুখ একটুখানি নত করে ইঙ্গিতে আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার পরিত্যক্ত জায়গায় এসে বল্ল। আমি তার সামনের বেঞ্চে জায়গা করে নিয়ে বসলাম । তরুণীর সামনে মুখােমুখী ব'সে দেখলাম তার মুখখানি তারুণ্যের লাবণ্যে ও একপাল পুরুষের মধ্যে একাকিনী বসে থাকার লজ্জার আভায় ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। সে আহামরি সুন্দরী নয় ; তার “নাক মুখ চক্ষু কান কুন্দে যেন নিরমাণ” নয় ; তার গায়ের রং চাদের জ্যোৎস্না-রস গেলে অমৃতের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি হয় নি ; তবু মােটের উপর তাকে সুশ্ৰীই বলতে হয়, অন্ততঃ তখন আমার মন তাই বল্ল সে ক্ষীর-রঙের শাড়ী আর ব্লাউজ পরে আছে ; তাকে দেখেই আমার কেমন মনে হলাে একটি যেন আপ-ফোটা হলদে গােলাপ! তরুণী ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মের দিকে চেয়ে রইল। 'আমিও প্ল্যাটফর্মের, ০ ; ।
যাত্রা-সহচরী দিকেই তাকিয়ে থাবার ইচ্ছা করছিলাম, কিন্তু আমার দৃষ্টি বড় ঘন ঘন সামনের বেঞ্চির কোণটার দিকেই ফিছিল, বােধ হয় অমন আরামের জায়গাটা থেকে বে-দখল হয়ে আসার ক্ষোভে। গাড়ী ছাড় বার ঘণ্টা পড়ল। তখনও তরুণীর সঙ্গী কোনও পু গাড়ীতে এ- উঠল না। তখন আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-- আপনার সঙ্গে কোনও লােক উঠলেন না তাে? তরুণী মুখ একটু ফিরিয়ে লজ্জায় রাঙা হয়ে মৃদু স্বরে বলে—আমার সঙ্গে আর কোনাে লােক নেই। মনে হলো তার কণ্ঠস্বর ভারি কোমল, বেশ মিষ্টি ! কথায় তার লজ্জার সঙ্কোচ! আমি বল্লাম-তা হ'লে আপনি মেয়ে-গাড়ীতে গেলেই তো পারতেন, এখানে তাে আপনার অসুবিধা হবে, কষ্ট হবে। তরুণী বলে-মেয়ে-গাড়ী দেখে এসেছি, তাতে প্যাসেঞ্জার কেউ নেই ; তাতে আবার রাত্রি । পুরুষ-মানুষকে মেয়েদের এতই অবিশ্বাস আর ভয়! একাকিনী অবল। আত্মরক্ষার জন্যে বহুপুরুষের শরণাপন্ন হয়েছে ; এক পুরুষ অপর পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভয়েই অন্ততঃ সভ্য শান্ত হয়ে থাকবে, পুরুষেরা dog in the manger policy অবলম্বন করে পরস্পরকে সংযত করে রাখবে, এই ধারণাতেই তো এই তরুণী মেয়েগাড়ীতে না গিয়ে পুরুষের গাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে ! এই কথা মনে হতেই আমার খুব কৌতুক বােধ হল। আমি চুপ করে গিয়ে প্রকাশে, উদ্যত একটুখানি হাসি ঠোঁটের কোণে চেপে ফেললাম। আসানসােল ষ্টেশনে গাড়ী এল। কয়েকজন মাড়ােয়ারী কলরব করতে করতে নেমে গে”।। পাতে জায়গা হল। তখম রাত্রি দশটা।
যাত্রা-সহচরী আমি এতক্ষণ চুপ করে থাকার দুস্কর তপস্যায় হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। এবার কথা বলবার সুযােগ পেয়ে তরুণীকে বললাম—এইবারে একটু জায়গা হয়েছে। আপনার বিছানাটা ছড়িয়ে পেতে দি। তরুণী ঈষং কুষ্ঠিত স্বরে বললে–থাক, আমার শােবার দরকার হরে না। আমি বললাম—বলেন কি : সারা রাত ঠায়, বসে কাটাবেন আর বসে কাটালেও একটু আরামে বসুন•••••• আমি তার অনুমতির অপেক্ষা না করেই দরজার কাছে রাখা বাসের উপর থেকে তার ছােট্ট বিছানার গাঁঠরী ও টিফিন-ক্যারিয়ার। তুলে আাম। টিফিন-ক্যারিয়ারট। দুই বেঞ্চির মাঝখানে মেঝেতে তরুণীর পায়ের কাছে রাখলাম, আর বিছানার কুণ্ডশীট বেঞ্চির উপরে রেখে তার দড়ির বাধন খুলতে খুলতে বললাম আপনি একটু উচুন, আমি এটা পেতে দি। তরুণী ব্যস্ত হয়ে উঠে দাড়িয়ে সঙ্কোচভরে বললে--আপনি কষ্ট করছেন কেন, আমি পেতে নিচ্ছি। আমি হেসে বল্লাম—এ আর কষ্ট !ি বিলক্ষণ । মনে বল্লাম-It's a privilege, it's a pleasure to serve you ! বিছানা পাতা হলে সে আমার দিকে ভারি মধুর করে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে একবার চাইলে, তার পর ঈষৎ একটু হেসে বসে পড়ল, একটি কথাও বলে না। কিন্তু কথায় বলার চেয়ে তার ঐ দৃষ্টি আর হাসি বললে অনেকখানি। আমি আবার বললাম-আপনি বর্ধমান থেকে উঠেছেন যখন, 'নিশ্চয়ই খাবার-দা শর উঠেছেন। h ০ তখন ১০ যাত্রা-সহচরী } থাকে তো কিছু কিনে আনি, আসানসােলের খাবার ও বেশ ভালাে। আমার সেবাপরায়ণতার আতিশয্যে মেয়েটি বিবক্ত হলে ন। সে একবার সেই রকম মিষ্টি করে হেসে বললে না, আমার খাবারের দকার নেই। আমি খেয়েই গাড়ীতে উঠেছি। আমি বললাম-বিলক্ষণ, তা কি হয় ! সেই সন্ধ্যাবেলা সারারাত কি থাকা যায় ! আচ্ছা, পানবাদে গিয়ে খাবার নিলেও হবে, সেখানকার খাবার মন্দ নয়। মেয়েটি আর কিছু বললে না, গাড়ীর জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলে। হয়তো আমাকে বেহারা রকমের ক্যাঙলা ভাবলে ! আমি চুপ করে গেলাম। কিন্তু খিদেতে নাড়ী জ'লে যাচ্ছিল। গাড়ীতে উঠলেই নাড়া লেগে আমার খিদে পায়, নাড়ী জতে থাকে। কিন্তু মুখের সামনে নারী অভুক্ত হয়ে বসে থাকবে, আর আমি হাঁউ-হাউ ক'রে গিলতে থাব, সেটা বড় অশােভন ব্যাপার হবে বলে খিদে চেপেই বসে রইলাম। কিন্তু তখন মনে হচ্ছিল কাব্য খুব ভালাে, কিন্তু বস্তুতন্ত্রটাও একেবারে অবহেলা কবুবার বস্তু নয়। গাড়ী ছাড়ল। বেঞ্চির আধখানা জুড়ে একজন মাড়ােয়ারী বিরাজ করছিল। বাকী আধখানায় আমার বিছানাটা ছড়িয়ে কীচকের মতন গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লাম। দূরের বেঞ্চি খালি ছিল, কিন্তু তরুণীর কাছ থেকে তফাতে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল না-একাকিনী অবলা, একজন রক্ষক কাছে থাকা ভালাে। মেয়ে জাতটা ভারি ভালাে! মমতায় তাদের মনট। ভরা ! শুয়ে পড়তে দেখেই তরুণী লজ্জিত স্বরে বলে—আপনি শুলেন, কিছুলেন না? আমায় শুরু যাত্রা-সহচরী আমি পরিতৃপ্ত হয়েও হতাশার ভাণ করে বল্লাম—আপনি hulger-strike করে থাকলে আমি আর কি করে খাই বলুন! তরুণী এবার বেশ মুখ ভরে হেসে বলে—আমার সঙ্গে বদনানের বাজার থেকে আনা ভালো সীতাভােগ আর মিহিদানা আছে, আপনি যদি কিছু মনে না করেন..••••••• আমি উঠে বসে বল্লাম —খাবার সম্বন্ধে অনুরােধে কিছু মনে না করতেই ব্রাহ্মণের পুরুষানুক্রমের তপস্যা চলে আসছে। আমি কলির ব্রাহ্মণ হলেও এতটা কুঙ্গার নই যে খাওয়ার অনুরােধে কিছু আপত্তি মনে করব। সকল রকম মিষ্ট দ্রব্যের উপরই আমার বিষম লােভ ! · তরুণী এক মুখ হেসে টিফিন-ক্যারিয়ার খুলার জন্য তাড়াতাড়ি নত হলো। আমি বললাম--কিন্তু Fuir exchange and no firouri আমার সঙ্গে আমার মায়ের হাতের তৈরী লুচি-তরকারী, সন্দেশ, রসগােল্লা, পান্তুয়া আছে ; আপনাকে একটু চেখে দেখতে হবে মা আমার কেমন কারিগর --আপনার ময়রা আমার মায়ের কাছে হার মেনে যাবে। মেয়েটি মুখ ঈষং কাত করে তেরছা দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে হেসে বলে—মায়ের স্নেহ আমার চাখ আছে। মায়ের সঙ্গে ময়রার তুলনা! তবে মায়ের নাম মুখন করলেন তখন আমাকে প্রসাদ কিছু নিতেই হবে, কিন্তু প্রসাদ কণিক। মাত্র দেবেন, নইলে আমার অসুখ করবে। আমি খুশী হয়ে টিফিন-ক্যারিয়ার খুলে ফেল্লাম। তার ভিতর থেকে কলা-পাতা নুন লা লুচী তরকারী মিষ্টান্ন বেরুল—একেবারে ‘তিমতী মায়ের মমতা আর করুণা ! দুজনে দুজনের খাবার ভাগাভাগি করে খেলাম—অমৃতের মতন লাগল-খুব খিদে লেগেছিল কিনা! Hunger is the best sauce! •
১২
যাত্রা-সহচরী
জল খেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে মা চিবােত চিবােতে আবার শুয়ে
পড়লাম।
আমার অধসনভাগী নাড়ােয়ারী মহাশয় হেসে বললেন—হানি
ধনবাদমে উৎরিয়ে যাবে, তব আপনি আরাম-সে ফয়লাকে শুত বেন !
তার হাসি। আমার কেমন অর্থভরা বলে মনে হলো। আমি
একটু রুক্ষ স্বরেই বল্লাম-সে আপনার মেহেরবানী।
রাত বারােটার সময় গাড়ী ধানবাদে এল। মাছােয়রী নেমে
গেল । একজন লােক গাড়ীতে উঠল ; সে অন্য বেঞ্চিতে গিয়ে বল্ল ।
পাশাপাশি দুটি বেঞ্চিতে আমরা দুজন --আমরা অর্থাৎ আমি আর
আমার যাত্রা-সহচরী !
যে লােকটি ধানবাদে গাড়ীতে চড়েছিল সে গেমােতে নেমে গেল।
গাড়ীর আরাে তিনজন আবােহা গোমোতে নামূল। আমরা দুজন ছাড়া
গাড়ীতে রইল মাত্র আর একজন, গাড়ার ঐ এক রে ।
ঘুম আর আসে না। ঘুমের জায়গা জুড়ে চোখের সানে বসে
আছে এই তরুণী।
মনের মধ্যে কেবলই গুঞ্জন করতে লাগল গানের
একটা কলি---
“রূপসী পল্লীবাসিনী,
শূন্য ঘাটে কেন একাকিনী !
যে লােকটি গাড়ীর এক টেরে লম্বা হয়ে ঘুমােচ্ছিল সেও নেমে গেল
হাজারিবাগ-রােড ষ্টেশনে। তখন রাত্রি দুটো। গাড়ীতে আর কেউ
উঠল না। গাড়ীতে একলা আমরা দুজনে—দুজনে একলা শুদ্ধ ভাষ
নয় যদিও।
অন্ধকারের মধ্যে আলাের রেখা কেটে কেটে টেন উধ্বশ্বাসে ছুটেছে
একটি সুশ তরুণীর সঙ্গে এক কামরায় একলা রয়েছি, কেমন অস্বস্তি বােধ
র
যাত্রা-সহচরী হচ্ছিল। আমিও উঠে বসলাম। ডেরাডুন-এক্সপ্ৰেস্ সব ষ্টেশনে থামে ন: ; একবার কোডার্মায় থামবে, তার পরে সেই গয়ায়—সে তাে ভাের- বেলায় একলা তরুণীর সামনে বসে থাকতে অস্বস্তি বােধ হচ্ছিল, অথচ কোডার্মায় কোনও intruder এই কারায় যদি উঠে পড়ে তার শঙ্কাতেও মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। ডােমায় গাড়ী এল। গাড়ী ছাড় বার ঘণ্টা পড়ল। তখন আমার বুকটা ধক্ করছে—হায় হায় এই মুহতে কেউ যদি হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে গাড়ীতে চড়ে বসে ! আমার ইচ্ছে করতে লাগল উঠে গিয়ে দরজায় চাবি লাগিয়ে দি। কিন্তু লজ্জায় আশঙ্কায় তাও পারলাম না। জানি তরুণী কি মনে করবে। গাড়ী ছেড়ে দিল। কেউ উঠল না। প্ল্যাটফর্ম না পেরুলে এখনাে বিশ্বাস নেই। যাক ! বুকের উপর থেকে প্রকাণ্ড বােঝা নেমে গেল, নিশ্বাস ফেলে বাচলাম। আমি বললাম—আপনি এইবার একটু শােন, আমি উঠে ঐ বেঞ্চিতে যাচ্ছি। তরুণী টুপ করে শুয়ে পড়ে বললে-আপনাকে সরে যেতে হবে না। আপনিও শুয়ে সুবােধ শিশুর মতাে বলুবা মাত্র আজ্ঞা পালন করলাম। শুয়ে যত- সব বাজে প্রশ্ন মনে হতে লাগল--আমার মুখের কাছ থেকে সুন্দরীর মুখের ব্যবধান কতখানিই বা আর হবে ? আজ এত নিকটে, কাল কে কোথায় চলে যাব তার ঠিকানাও কেউ জা না? কি নাম, কোথায় বাড়ী, কি জাত, সব অজানাই থেকে যাবে ? মায়ের পছন্দ-করা জব দেবীর সঙ্গে যদি এমনি অকস্মাৎ দেখা হয়ে যেত আর এমনি ভালাে তাকে লাগত তবে পড়ন। .
১৪
যাত্রা-সহচরী
মাকে সুখী
করে আমিও সুখী হতে একটুও
হতে একটুও ইতস্তত
কবুতাম না !
চোখ দুটো বুজে ছিলাম। কিন্তু চোখের পাতা খুলে পড় বার জন্য
ক্রমাগত পিটপিট করছিল। চোখ খুলতে বডড ইচ্ছা করছিল বলেই
চোখ খুতে সঙ্কাচ হচ্ছিল—চোখ চাইলেই তাে তরুণীর মুখের উপর
দৃষ্টি পড়বে !
অনেকক্ষণ কেটে গেল। অন্তত আমার মনে হলো অনেকক্ষণ,
বাস্তবিক হয়তো বেশীক্ষণ হয় নি। আমি চোখ মেলে চাই কি না চাই
ভাবতে ভাবতে চোখ গেলেই ফেললাম। দেখি তরুণী চেয়ে রয়েছে।
আমাকে চোখ মেলে চাইতে দেখেই সে একটু হাসলে।
আমি অপ্রস্তুত হয়ে আমার লজ্জা ঢাকবার জন্যে বললাম –অাপনি
যে-ভয়ের জন্যে মেয়ে-কামরায় যান নি, এখানেও সেই ভয়েই আপনার
ঘুম আসছে না।
তরুণী উঠে বসে সহজে স্বরে বললে-ভদ্রলােকের কাছে ভয় কি ?
মনটা প্রসন্ন হয়ে গেল--যাক, আমি তা হলে ভদ্রলোেক।
আমি বললাম—কিন্তু একলা রাত্রে চলেছেন, কাউকে সঙ্গে আনা
উচিত ছিল।
তরুণীত, মুখ একটু লজ্জিত হল , কথায় কথায় এই দ্বী তার মুখে
একটি শ্রী দান করে। সে বললে—আর কতকাল মেয়েরা পুরুষকে
অবলম্বন করে থাকবে? তাতে তারা নিজেরাও চলতে পারে না,
পুরুষদের চলাতেও বাধা দেয়। দেশের কত মেয়ে জেল খাটছে। এখন
আর একলা কোথাও যেতে আমাদের ভয় করলে চলবে কেন ? উয়
তাে জীবনের সঙ্গে লেগে আছে। ভয়ের সঙ্গেই জীবনযাত্রা। তবে
যতটা সাবধান হতে পারা যায়
যাত্রা-সহচরী আমিও উঠে বসলাম। অপরিচিতার পরিচয় জানবার জন্যে আমার মন উৎসুক হয়ে উঠেছিল। জিজ্ঞাসা করুলাম—আপনি কোথায় যাবেন ? তরুণী বললে ~~~ -ক্ষো। আর তো প্রশ্ন করা যায় না। কাজেই চুপ করলাম। এবার তরুণী আমায় জিজ্ঞাসা করলে—আপনি ? আমি বললাম—কাশী। আবার দুজনে চুপ। গাড়ী চলেইছে চলেইছে। ভােরবেলা সাড়ে চারটার সময় ট্রেন গয়াতে পৌছাল। কয়েকজন যাত্রী এসে আমাদের কাম্য় উঠল। তাদের মধ্যে উঠল সেই ব্যাণ্ডেল- ষ্টেশনে দেখা কাশযাত্রী ভিক্ষাকারী ব্রাহ্মণ ! তাকে ভিক্ষ! ন! দেওয়া থেকে আজ পর্ষন্ত আমার মনটা তাকে খুজে পাওয়ার জন্য উৎসুক ছিল। কিন্তু আজ এখন তাকে আমাদের গাড়ীতে উঠতে দেখে মনটা আবার বিরক্ত হয়ে উঠল। লােকটার চেহারা দেখে আর কথা শুনে তার প্রতি আমার যে শ্রদ্ধা হয়েছিল, এখন তাকে দেখে তা দূর হয়ে গেল । সে বলেছিল যে কাশী যাবার জন্যে ভিক্ষা করছে, কিন্তু এখন তাে উঠল গয়া থেকে। লােকটাকে আমার পেশাদার ভিক্ষুক বলেই মনে হলাে। ব্রাহ্মণ গাড়ীতে উঠে আমার পিছন দিকের যে বেঞ্চি তাতে গিয়ে বসল। কাজেই আমার সঙ্গে তার চোখােচোখি দেখা হ’ল না। আমি মনে মনে বললাম -- ভালােই ! 'ডহেরি-শােণে ট্রেন যখন এল তখন বেশ সকাল হয়ে গেছে। তখন সেই ব্রাহ্মণ আমার পিঠের দিকে দাড়িয়ে আমার যাত্রা-সহচরীকে সম্বােধন করে বললে—মা, আমাকে তুমি কিছু ভিক্ষা দাও—বাবা যাত্রা-সহচরী বিশ্বনাথ স্বপ্নে প্রত্যাদেশ করেছেন, তাই তার চরণ দর্শন করতে চলেছি। বিশ্বনাথের আদেশ পাথেয় আর ত্রি-রাত্রি কাশীবাসের খরচ আমাকে পথে ভিক্ষা করে সংগ্রহ করতে হবে । আমার যাত্রা-সহচরী তার একটি নীল খদ্দরের খলী থেকে একটি টাকা বাহির করে পরম শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সঙ্গে ব্রাহ্মণের হাতে দিলে। ব্রাহ্মণ প্রীত হয়ে আশীর্বাদ কলে--ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লাভ করে মা--অন্নপূর্ণা তােমার সকল অভাব পূর্ণ করুন ! ব্রাহ্মণ যখন ঝুকে হাত বাড়িয়ে আমার যাত্রা-সহচরীর দান গ্রহণ কছিল সেই সময় আমার সঙ্গে তার চোখােচাখি হয়ে গেল। ব্রাহ্মণ প্রার্থনা জানাব। মাত্র এই মেয়েটি কত সহজে তাকে দান করুলে দেখে আমার সেদিনকার রূঢ় ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত লজ্জা বােধ হল । আমি অপ্রতিভ হয়ে ব্রাহ্মণকে বললাম-নমস্কার পণ্ডিত মশায় । আমার চিতে পারছেন, সেদিন ব্যাণ্ডেল ষ্টেশনে আমি আপনাকে কিছু দিই নি। ব্রাহ্মণ নম্রস্বরে বললে--হ্যা হ্যা বাবা, চিনেছি। সেদিন তাে সঙ্গে মা অন্নপূর্ণা ছিলেন না, তাই আমার প্রার্থনা পূর্ণ হয় নি, আজ মায়ের কাছে প্রার্থনা করতেই তো আমার প্রার্থনা পূর্ণ হয়ে গেল। বৃদ্ধের কথা শুনে আমি যাত্রা-সহচরীর মুখের দিকে তাকালাম, দেখলাম তার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে—তাকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে। বৃদ্ধ যে ভুল করেছে তার জন্য বৃদ্ধের উপর আমার মন খুশী হয়ে উঠল। আমি চকিতে তরুণীর লজ্জাস্মিত মুখের শােভাটুকু দেখে নিয়ে ব্রাহ্মণকে বললাম সেদিন আমি আপনাকে অকারণ কতগুলো ওড়া কথা বলেছিলাম, আপনি আমার সেই বেয়াদবী মাপ করবেন। ব্রাহ্মণ ব্যস্ত হয়ে মিষ্ট স্বরে বললে-না না বাবা, তুমি তাে আমাকে যাত্রা-সহচরী ১৭ তেমন কিছু বলে নি ; ভিক্ষুককে সকলেই ভয় করে। চোর না-ব’লে নেয়, আর ভিক্ষুক বিরক্ত করে আদায় করে, এই তাে ফাং। সংস্কৃতে একটা শ্লোক আছে— তৃণা অপি লঘুস তুলঃ তুলা অপি চ যাচকা। বায়ুনা চ ন নীয়ন্তে অর্থ-প্রার্থন-শঙ্কয়া। তৃণের চেয়েও লঘু তুলা, তুলার চেয়েও লঘু যাচক ; তবে বাতাস তাদের উড়িয়ে নিয়ে যায় না, পাছে তার। তার কাছেও অর্থ প্রার্থনা করে বসে। এই বলে ব্রাহ্মণ বেশ সরল মনখখালা হাসি হেসে উঠলেন এবং বলতে লাগলেন এই জন্যেই তাে বিশ্বেশ্বর করুণা করে আমায় স্বপ্নাদেশ করেছেন ভিক্ষা করে তার চরণদর্শন করতে হবে। মানুষের মনের মধ্যে অহঙ্কার পলে পলে সঞ্চিত হয়, সেই অহঙ্কারের মলিনত। মার্জনা না করলে তাে বিশ্বেশ্বরের দর্শন পাওয়া যায় না। হঙ্কার মােচন তুমি আমাকে প্রত্যাখ্যান করে আমার উপকারই করেছ বাবা, তােমার উপর তাে আমার একটুও ক্ষোভ নেই। আমি মনি-ব্যাগ খুলে পাঁচটি টাকা বাহির ক'রে ব্রাহ্মণের হাতে দিতে গেলাম। তিনি নম্র স্বরে বললেন—অত কি করব বাবা? কাশী যাবার টিকিট কেনা হয়ে গেছে, সেখানে ত্রিরাত্রি বাসের খরচও আমার মা লক্ষ্মী পূর্ণ করে দিয়েছেন । মা অন্নপূর্ণার কৃপায় আমার আর্থিক অবস্থা সচ্ছল, ভাটপাড়ায় আমার চতুষ্পঠী আছে, নানা স্থানে সম্পন্ন শিষ্য আছেন ; পিতা বর্তমানে তিনি চতুষ্পঠী চালাতেন, আমি শ্রীরামপুর কলেজে সংস্কৃতের প্রফেসারী করতাম ; কাশীতে ত্রিরাত্রি বাস হয়ে গেলে বাড়ী থেকে আমার টাকা আবে। আমি লজ্জিত হয়ে বললাম—এ আপনাকে নিতে হবে, আমার সেদিনকার অবিনয়ের প্রায়শ্চিত্তের দক্ষিণ স্বরূপ। আপনার কাজে না লাগে অপমান অহঙ্কার করে। ; २ ১৮ যাত্রা-সহচরী কাশীতে অভাবগ্রস্তের তাে অভাব নেই, আপনি তাদের দান করে দেবেন। ব্রাহ্মণ টাকা কয়টি নিয়ে বললেন—আচ্ছা বাবা, তবে আমি নিলাম। বিশ্বেশ্বর তােমাদের আনন্দে রাখুন। ব্রাহ্মণের আশীর্বাদের এই তােমাদের কথার মধ্যে যে আমার যাত্রা-সহচরীও জড়িয়ে গেলেন তাতে তার মুখ আর-:কবার লাল হয়ে উঠল । ব্রাহ্মণের প্রতি প্রসন্নতায় ও কৃতজ্ঞতাঃ আমার মন এমন উপচে উঠল যে, তার পায়ের ধূলাে নিতে ইচ্ছা করছিল। বেলা সাড়ে নটার পর ট্রেন কাশী ষ্টেশনের সন্নিহিত হতে লাগল। আর যাত্রীরা প্রত্যেক কক্ষ থেকে জয় বাবা বিশ্বনাথ, বিশ্বেশ্বরী জয় ধ্বনিতে তীর্থ-দর্শনের উল্লাস ঘােষণা করতে লাগল। ব্রাহ্মণ দরে কাশী- তলবাহিনী গঙ্গা ও দেবমন্দিরের চূড়া দেখে ভক্তিভরে প্রণাম করলেন ট্রেন কাশী ষ্টেশনে এসে দাঁড়াল। ব্রাহ্মণ টেন থেকে নালেন না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম—কৈ আপনি কাশীতে নামলেন না? ব্রাহ্মণ বললেন—আমি বেনারস ষ্টেশনে না, সেইখানেই কোনে ধর্মশালায় থাকব। শহরের ধর্মশালায় বড় ভিড় আর ময়লা। আমি বল্লাম--আপনি বেরিয়েছেন তো অনেক দিন ; এতদিন কোথায় ছিলেন ? তিনি বললেন—ভিক্ষা করে তাে যাওয়া। ভিক্ষা করে সেদিন যা পেয়েছিলাম তাতে গয়া পর্যন্ত টিকিট কিতে পেরেছিলাম। তাই গয়াতে নেমে পিতৃকৃত্য কবে এলাম আবার পাথেয় ভিক্ষা করে বিশ্বেশ্বরের চরণ দর্শনে চলেছি। ব্রাহ্মণ বেনারসে নেমে গেলেন। এবারে আমার যাত্রাসহচরী আমাকে প্রশ্ন করলেন—কৈ আপনি নামলেন না? -
যাত্রা-সহচরী
১৯
আমি গম্ভীর হয়ে বললাম–ন।
সে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা কবুলে—আপনার না কাশীর টিকিট ছিল ?
আমি বললাম-~-তা তো ছিল।
-তবে?
—আর খানিক দূর over-curried হয়ে যাব।
-jerarried হয়ে যাবেন মানে ?
সাধু বাংলায় অনুবাদ করলে বলতে হয় উদবাহিত হয়ে লক্ষ্ণেী পর্যন্ত
৫.
হঠা, কাশী ছেড়ে লক্ষে যাওয়ার ইচ্ছা হল যে?
-এখন দেখছি কাশীর চেয়ে লক্ষে ঢের বড় তথ। আজ এতদিনে
বুঝেছি কবি দেবেন্দ্র সেন কেন বিশ্বের সব জিনিসের সেরা ঠাওরে-
ছিলেন লক্ষৌর আতা !
আমি উৎসাহের ঝোঁকে আবৃত্তি করে ফেললাম ---
চাহি না ‘আ’--যেন অভিমানে ঐ র
আরক্তিম • ওষ্ঠ ব্রজসুন্দরীর !
চাহি নাক ‘সেউ’—যেন বিরহ-বিধুর
জানকার চিরপ। বদন-রুচির ।
একটুকু রসে ভরা চাহি না ‘আঙ্গুর’
সলঙ্গ চুম্বন যেন নব-বধূটীর !
চাহি না ‘গন্নার স্বাদ,
—কঠিনে
মধুর
প্রগাঢ় আলাপ যেন প্রৌঢ়-দম্পতির ।
ও নােয়ে সে জাতি সুবৃহৎ আত।
থাকিত যা নবাবের উদ্যানে ঝুলিয়া ;
ঞ্চল। বেগম কোনাে হয়ে উল্লসিত।
२०
যাত্রা-সহচরী
৫
ভাঙিত ;-সে স্পর্শে হর্ষে যাইত ফাটিয়া !
অহহ কি বিচিত্র মৃত্যু ! আনন্দে গুমরি’
যেত মরি’ রসিকার রস:-উপরি ?
আমার যাত্রা-সহচরী হাসলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন--ত! লক্ষে
গিয়ে কোথায় থাকবেন ?
তার মুখে চোখে কৌতুকের হাসচ্ছটা ঝলমল করছিল ।
আমি বললাম-লক্ষ্ণৌ আমার বন্ধু পটু পটুয়; অসিত হালদার
আছেন, তার স্কন্ধেই চাপা যাবে।
এমন সময় সহচরী গাড়ীর বাইরে তাকিয়েই উচ্চকিত হয়ে
উঠল।
আমি তার দৃষ্টি অনুসরণ করে অনুসন্ধান করতে লাগলাম কি
বা কাকে দেখে আমার সহচরী সচঞ্চল হয়ে উঠেছেন। প্ল্যাটফর্মের
উপর চোখ বুলাতে বুলাতে দেখলাম সেই স্বপ্নাদিষ্ট কাশীযাত্রী
ব্রাহ্মণকে সঙ্গে করে তার পুটুলীটি হাতে নিয়ে একজন লোক
প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে যাবে বলে যাত্রীর ভিড়ের পিছনে দাড়িয়ে
আছে। সেই লােকটিকে আমি চিনি, আমরা একসঙ্গে বি-এ আর
এম-এ পড়েছিলাম। আমার নাম সমীরণ আর ওর নাম প্রভঞ্জন ;
তাই সে আমাকে মিতা বলত; , আমি ওর মাকে মাসিম।
বলতাম ; আমাদের দুজনের বন্ধুত্ব মাসিমার স্নেহের মধ্যস্থতা
অত্যন্ত প্রগাঢ় হয়ে গিয়েছিল।
গিয়েছিল। তারপর আমি গভর্মেন্ট সাভিস
নিয়ে কৃষ্ণনগর কলেজে প্রফেসার হয়ে যাই, আর প্রভঞ্জন লাহােরে
প্রফেসার হয়ে যায়। সেই থেকে আমাদের ছাড়াছাড়ি। ওথম
কিছুদিন চিঠিপত্র লেখা, চলেছিল, তারপর ক্রমে তাও বন্ধ হয়ে
গেছে। আজ পাঁচ ছ বছর পরে তাকে হঠাৎ দেখতে পেলাম ।
,
যাত্রা-সহচরী
২১
অমন আমি আমার সহচরীর দৃষ্টি উচ্চকিত হওয়ার কারণের সন্ধান
ভুলে, গাড়ীর দরজা খুলে তিন লাফে প্রভঞ্জনের কাছে গিয়ে তাকে
জড়িয়ে ধরলাম ।
হঠাৎ বাহুপাশে বদ্ধ হয়ে প্রভঞ্জন একটু চমকে উঠল। তারপর
আমার মুখের দিকে দেখেই বলে উঠল—আরে মিতা যে ! তুমি
কোথায় থেকে? কাশতে এসেছ, কোথায় আছ ?
আমি বল্লাম-কাশী আসর বলেই বেরিয়েছিলাম, কিন্তু এখন
মত পরিবর্তন করে লক্ষে চলেছি।
প্রভঞ্জন বলে—টেন তাে বিকেল সাড়ে পাচটার সময় লক্ষী
পৌছাবে সমস্ত দিন স্নানাহার হবে না। তুমি নেমে পড় ;
journey break করে কাল লক্ষে গেলেই হবে। মা এখানে
আছেন। তুমি জানো বােধ হয়, আমি এখন বেনারস ইউনিভার্সিটীতে
আছি ।
আমি বল্লাম—না, তা তে। জান্তাম না।
তা লক্ষৌ থেকে
ফিরে এসে মাসিমাকে প্রণাম কবুব ; আজ আর নামা চলবে না।
প্রভঞ্জন বলে—কেন ? এত কি বাবা?
আমি হেসে বল্লাম—গাড়ীতে একটি অবলা অসহায় রয়েছেন,
তাকে লক্ষে পর্যন্ত পৌছে দিতে হবে।
প্রভঞ্জন জিজ্ঞাসা করলে-কে ? বউ নাকি ? বিয়ে করেছিস ?
আমি বল্লাম-না, কিয়ে এখন তাে করি নি।
প্রভঞ্জন হেসে বলে—তবে কোর্টশিপ চছে বুঝি?
আমি বললাম—তাও ঠিক বলা যায় না। কি জাত, কি ধর্ম,
, সধবা বা বিধবা তাই নির্ণয় করতেই তাে লক্ষ্যে চলেছি।
স্বপ্নাদিষ্ট কাশীযাত্রী ব্রাহ্মণ বললেন—“আমি তাে মেয়েটিকে
২২
যাত্রা-সহচরী
তো কেউ
তােমার স্ত্রী বলেই ভুল করেছিলাম। কিন্তু তােমরা
তাতে কোনো আপত্তিও করে। নি, আমার ভুলও সংশােধন করে
দাও নি।” ব্রাহ্মণ দরাজ খােলা গলায় হেসে উঠলেন।
প্রভঞ্জনও হেসে বলে—আপনার ভুলটা দুজনেরই শ্রুতিরােচক
হয়েছিল বলে ওঁদের আপত্তি হয়নি। আপনি বুঝি ওঁদের সঙ্গে
এক কামরাতেই এলেন ? পরিচয় হয়নি বােধ হয় ? আপনাদের
পরিচয় করিয়ে দি......ইনি পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত কাশীপতি বিদ্যালঙ্কার ;
এর কাছে আমি শ্রীবামপুর কলেজে পড়েছিলাম ; আজ ষ্টেশনে এসে
গুরুর চরণ আর বন্ধুর বদন দর্শন ঘটে গেল । ইনি আমার বন্ধু
সতীর্থ মিতা শ্রীযুক্ত সমীরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
ট্রেন ছাড় বার প্রথম ঘণ্টা পড়ল।
প্রভঞ্জন বললে--পণ্ডিত মশা, আপনি একটু দাড়ান, আমি
অবলাবান্ধব বন্ধুর যাত্রা সহচরীটিকে একবার দেখে আসি। সমীরণ লক্ষে
থেকে এলে আপনার সঙ্গে ভালো করে পরিচয় হবে। আপনাদের
যখন পথে কুড়িয়ে পেয়েছি তখন শিগগির ছেড়ে দেবাে না
পণ্ডিত মশায়।
এই বলতে বলতে প্রভঞ্জন হাসিমুখে আমার সঙ্গে টেনের দিকে
এগিয়ে এল।
আমরা টেনের কাছে আসার আগেই আমার সহচরী গাড়ীর
জালা থেকে ঝুকে মুখ বাহির করে আগ্রহভয়া স্বরে ডাকলে—দাদা।
সেই ডাকে চমকিত হয়ে প্রভঞ্জন বলে উঠল-কে রে? জবা !
তুই কোথায় যাচ্ছিস?
জবা। আমার বুকটা আনন্দে দুলে উঠল । এই কি আমার মায়ের
পছন্দ-কর। জবা! নামটা তাে খুব সাধারণ নয়! তবে সেই জবাই হবে :
যাত্রা-সহচরী
প্রভঞ্জনের প্রশ্নের উত্তরে জবা বলে—আমি লক্ষৌ যাচ্ছি,
ছােড়দার কাছে।
প্রভঞ্জন গাড়ীতে উঠে জবার বাক্স বিছানা টেনে নামাতে নামাতে
বলে—লক্ষ্ণৌ পরে গেলেই হবে। এখন এখানেই নেমে পড়। আমি
শশধরকে এখনই টেলিগ্রাম করে দিচ্ছি। তার সঙ্গে কে আছে ?
জবা বলে—কেউ নেই, আমি একলাই যাচ্ছি।'
তখন প্রভঞ্জন আমার দিকে ফিরে হেসে বলে-ও! তুমি
বুঝি এই অবলার রক্ষক হয়ে লক্ষৌ চলেছ? এ আমার মাসতুতে
বােন জর। জবা তাে এখানে নামছে। এখন তােমারও জানি
ব্রেক করতে আপত্তি নেই বােধ হয় ? তােমার জিনিসপত্তর নামিয়ে
ফেল। আর তােমরা এইখানে একটু দাড়াও, আমি শশধরকে একটা
টেলিগ্রাম করে দিয়ে আসি।
প্রভঞ্জন
চলে। গেল। গাড়ীও ছেড়ে চলে গেল।
প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে রইলাম আমি আর জবা!",
মিনিট সুখের আবেশে আমি কথা কইতে পারলাম
তারপর আনন্দে বিস্ময়ে চোখ বিস্ফারিত করে হদে জবা-
ফুলের মতন তন্বী মনােহরা তরুণীর লজ্জাস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে
জিজ্ঞাসা করলাম-আপনি জবা!
আমার এই অর্ধেক প্রশ্ন ও অর্ধেক বিস্ময়ােক্তি শুনে কৌতুক
•অনুভব করে জবা ঘাড় নেড়ে বললো।
মাথাটি' ছন্দে দুল্ল, যেন মৃদু বাতাস এসে হলুদে
জবাফুলটিকে দুলিয়ে দিয়ে গেল।
আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম--আপনি খামারপাড়ার বিজয়
মুখুজ্জে মশায়ের কন্যা ?
কয়েক
২৪
যাত্রা-সহচরী
জবা আবার মাথা দুলিয়ে দুষ্টুমিভরা হাসি হেসে বললো।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম—পুরীতে গিয়ে কমলা আর তার মায়ের
সঙ্গে আপনার পরিচয় হয়েছিল ?
জবা আবার তেমনি মাথা দুলিয়ে বলে--হ্যা।
আমি তখন আনন্দে আপ্লুত হয়ে বললাম—আমার নাম শ্রীমান্ সমীরণ।
জবা হেসে বলে--তা আমি জানি।
আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কি করে জানলেন?
জবা হাসতে হাসতে বলে—কমলার কাছে আপনার
আপনার ছবি
দেখেছিলাম।
1.
আমি জিজ্ঞাসা করলাম—টেনে আপনি আমাকে চিতে
পেরেছিলেন?
জবা তেমনি সুন্দর ঘাড় দুলিয়ে বলে-হ্যা।
আমি একটু অভিমানক্ষুন স্বরে বললাম—তবে আপনি আমাকে
পরিচয় দেন নি কেন?
জবা তখন লজ্জানত মুখে বলে—কি পরিচয় দিতাম ?
বাস্তবিকই তাে, কি পরিচয় সে দিত। আমার কাছে প্রত্যাখ্যাত
সে, এই তাে তার প্রধান পরিচয় ! তার ঐ প্রশ্ন মৃদু ভৎসনা ও
ক্ষোভের মন শােনাল। আমি কুষ্ঠিত হচ্ছে বাম—কিন্তু মা তাে
আপনাকে নিতান্ত
আপনার জন মনে করেন, আপনাকে একবারে
নিজস্ব করে নিতে চান।
জবা হেসে বিপমিশ্রিত স্বরে বলে—কিন্তু তাতে
মায়ের ছেলের বিষম আপত্তি শুনেছি।
আমিও হাতে হাতে বল্লাম—এখন স্থির বুঝেছি মায়ের
কথার অবাধ্য হওয়া অত্যন্ত অন্যায়।
যাত্রা-সহচরী
জৰা হাসতে হাসতে বললে—সুবােধ বালকেরমতন এমন মাতৃভক্তি
হলে; যে হঠাৎ ?
আমি বল্লাম—আমার যাত্রাসহচরীর সঙ্গগুণে।
জবা গ্রীষ্মমধ্যাহ্নের তরুচ্ছায়াসমাবৃত শীতলসলিল পদ্ম-পুকুরের
মতন দুটি ঘন-পক্ষল স্নিগ্ধ চোখের দৃষ্টিতে আমার মু. র দিকে চেয়ে
একটু হালে ।
অপরাজিতা
তাহার নাম বসন্ত। সে কাশীর রাজার অন্তঃপুরের
মালাকার।
একদিন বসন্তপ্রভাতে অখ্যাত অজ্ঞাত তরুণ সুপুরুষ যখন
রাজার সভায় কর্মপ্রার্থী হইয়া আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, তখন তাহাকে
দৈখিয়া সভাসদদের ঈর্ষাকুটিল মনও প্রতিরসে অভিষিক্ত হইয়াছিল,
বৃদ্ধ মন্ত্রীর সন্দিগ্ধ গম্ভীর চিত্ত স্নেহস্পর্শে চঞ্চল হইয়া উঠিয়াছিল,
রাজার প্রশংসাপুলকে বিস্ফারিত হইয়াছিল, আর রাজসভার
গজদন্তের চকচকে চিকের আড়ালে
আড়ালে তরুণীদের চটুল
চোখের চাহনিতে পলক পড়ে নাই।
রাজা সাদর অভ্যর্থনায় তাহাকে সভায় বসাইয়া জিজ্ঞাসা
করিলেন--তুমি কে
যুবক, কোন্ দেশের কোন্ পরিবারকে সুখী
করিয়া তুমি জন্মিয়াছ ? কুসুম-সুকুমার তােমার কান্তি, তুমি
কোন্ কাজ করিবে ? তােমার কোনো কাজ করিতে হইবে
, তুমি আমার রাজসভা আনন্দে উজ্জ্বল কারয়া থাক।
বসন্ত মূর্তিমান বিনয়ের মতাে মাথা নত করিয়া রাজপ্রসাদ
গ্রহণ করিয়া দৃঢ়
বলিল- মহারাজ,
কর্মহীনের ক্লান্তি
হইতে আমায় রক্ষা করুন। আমার সামান্য শক্তি মহারাজের
সেবায় নিযুক্ত হােক।
দৃঢ় কয়ে
যাত্রা-সহচরী ২৭ ; স্মিত মুখে প্রীত রাজা বলিলেন—বেশ যুব বেশ ! কোন্ কর্ম তোমার প্রীতিকর ? মন্ত্রী, সেনাপতি, সভাকর্মি, যে-হে তােমায় সহকারী পাইলে সুখী হইবেন। বল, তােমার কোন্ কৰ্ম্ম রুচিকর ? বসন্ত হাত জোড় করিয়া বলিল—মহারাজ, আমি আনার উপর দিবেন না। আমি মহারাজের খাস বাগানের মালী হইব ; নিত্য নৃতন ফুলের মালার মহারাজের পূজা করিব; বীণার গানে সকাল সন্ধ্যা মহারাজের বন্দনা গাহিব। আর আমি কিছু চাহি না। সকলে মনে করিল এমন সুন্দর রূপ ইহার, কিন্তু এ পাগল। রাজা এই পাগলকে দয়া করিয়া তাহার প্রার্থনা মঞ্জুর করিলেন। সে সেইদিন হইতে রাজার খাস রাগানের মালী হইল। ফুলের-ফরাস-বিছানাে বাগানখানির একটি কোণে ফুলের-পাড়-বােনা পাতায়-ঘেরা কুটীরখানিতে তাহার বাসা। সেখানকার গাছগুলি সব ফুলের মােহন স্বপন দেখে, কোকিলকণ্ঠে কথা কয়। বসন্ত সকাল সন্ধ্যা বীণার তারে যে গান বাজায় তাহার সুরে আকাশ বাতাস মদির হইয়া উঠে; রাজপ্রাসাদের ঘরে ঘরে সে গান গিয়া প্রীতি আনন্দ বিলাইয়া ফিরে। সকাল বিকাল সে নানা ফুলে বিনাইয়া বিনাইয়া ফেসব বিনােদমােহন হার গাঁথে সে-সব মালা গলায় গলায় পুলক-পরশে হরষ জাগায়। দম্পতির মিলন মধুর হয়, দৃঢ় হয়। আর যাহারা তরুণ তরুণী অপরিণীত, তাহাদের প্রাণ অচেনা প্রিয়ের প্রণয়বেদনায় পীড়িত বিরহ-ব্যথায় ; হয়, ব্যাকুল হয়। e সকাল বিকাল নূতন মালীর ভক্তিদান পাইবার জন্য রাজকুমারীরা চুখন গােলপ-কেয়ারীর ফাকে ফাকে বকুলবীথির তলে তলে মণি- ২৮ 'অপরাজিতা শিলার পথে পথে অরুণরাঙা চরণ ফেলিয়া মালীর কুটীরের কাছে ভিড় করিয়া জমিত, তখন সমস্ত বাগান খুশী হইয়া উঠিত, গাছে গাছে রূপযৌবনের ঢেউ লাগিয়া ফুলের মুখে হাসি ফুটিত, কলহাস্যে কোকিল পাপিয়ার কণ্ঠ খুলিত। আর বসন্ত? পত্রপুটে তাজা ফুলের শিশিরভিজ। মালার ভেট আনিয়া সে আপনার সেবাবৃত্তি সার্থক করিত। সে কত ছনের কত ফুলের মালা ! কুমারী ইন্দিরার জন্য অম্লান ইন্দীবরের মালা ! কুমারী শুক্লার জন্য প্রফুল্ল গােলাপের গােড়। কুমারী আনন্দিতার জন্য বেলযু ইগন্ধরাজে? অনিন্দিত হার! পচনর, সাতনর, শতনর ইহাদের সকলের পশ্চাতে আসিত আর-একজন। কালাে কুৎসিত .সে। সে রাজকন্যা যমুন! চাদের বুকে কলঙ্কের মতাে সুন্দরীদের মাঝখানে তাহার রূপ-হীনতা বেশী করিয়া চোখে লাগিত । যমুনা নিজে আপনাকে সে লুকাইতে পারিলে বাচিত। গােলাপী মমলের কোমল শাড়ীর আঁচলখানিতে নিবিড় করিয়া আপনাকে সে ঢাকিতে চাহিত, সকলের দৃষ্টি এড়াইবার জন্য সকলের পশ্চাতে থাকিত। চক্ষের পলক তাহার লজ্জিত, চরণ তাহার কুন্ঠিত, কণ্ঠ তাহার মৃদু, হৃদয় তাহার ভীরু। পদে পদে সবার কাছে তাহার লজ্জা, সবার দৃষ্টি হাসি তাহার লজ্জার, সবার সঙ্গ তাহার লজ্জার। সে যে রূপহীনা। বিধাতা তাহার অঙ্গে অঙ্গে দারুণ পরাভব অকিয়া দিয়াছেন—তাহা আর লুকাইবার কিবার জো নাই। সবাই নিজের নিজের সবাই নিজের নিজের গবগৌরবে হাসে বকে নাচে ; অকুণ্ঠিত তাহাদের গতি, স্বাধীন তাহাদের ব্যবহার। তাহারা বসন্তর সম্মুখে রঙ্গ করে, মালা পরে, ফুল কাড়ে, তােড়া ছুড়িয়া লােফালুফি করে। প্রীত বসন্ত প্রীতির বিনিময়ে ফুলের অর্ঘ্য চরণ, বুঝিত ;
যাত্রা-সহচরী,
ঢালে, বীণার তারে গুঞ্জন তােলে, নূতন গাথার তরুণীদের রূপের
স্তুতি গাহে। আর যমুনা? যমুনা তখন লজ্জ
আর যমুনা ? যমুনা তখন লজ্জভয়ের একান্ত সঙ্কোচে
একটি ধারে চুপটি করিয়া আপনাকে গােপন করিতে চায়। কেহ
কিন্তু তাহার দিকে ফিরিয়াও চায় না।
এত লজ্জা তাহার, এত অবহেলা তাহাকে, তবুও সে আসে।
বসন্ত তাহার মালায় গানে, বীণায় গাথায়, কথায় হাসিতে, রূপে যৌবনে
মিলাইয়া যে বিচিত্র রাগিণী তাহার চারিদিকে বাজাইয়া তুলিয়াছিল,
তাহার অরূপ স্পর্শ এই রূপহীনার অন্তরেও এমন একটি মদির সুর
ধ্বনিয়া তুলিয়াছিল যাহার মাদকতা শুরু লজ্জায় দারুণ অবহেলাতেও
দমন করা যাইত না। সবাই হাসিতে গাহিতে খেলিতে আসে;
যমুনা আসে শুধু অতৃপ্ত আঁখি ভরিয়া দেখিয়া লইতে। সবাই
পাইতে আসে বসন্তর সেবা গান মালস্তুতি
তাহার যমুনার মতো কালাে সজল উজল চোখের স্বচ্ছ রল দৃষ্টি
ভরিয়া রূপহীনার রূপের পূজা, গুণহীনার গুণের প্রশংসা,
প্রশংসা, বঞ্চিতার
বিপুল বিস্ময়।
সবার সহিত সে একসুরে আপনার জীবন-বীণাটিকে বাজাইয়া
• পারিতেছিল না বলিয়াই বৈষম্যে সে যা-একটু বসন্তর
নজরে পড়িয়াছিল।
নতুবা
সেই রূপহীনা কুণ্ঠাকাতর মৌনমূক
আগন্তুকটিকে দৃষ্টিতে তুলিবার অবসর বসন্তর ছিল না--তখন তাহার
খর যৌবনের তপ্ত শােণিত রূপের নেশায় ভরপূর !
রূপহীনাকে রূপের হাট হইতে দূর করিবার যখন উপায় ছিল
না তখন শুধু ভদ্রতার খাতিরে বসন্ত সেরা সুন্দরীদের সেরা সেরা
মালা গাঁথিয়া শেষের যত বাছপড়া ঝরা ছেড়া বাসি ফুলে একগাছি
মালা যেমন-তেমন করিয়া গাঁথিয়া রাখিত ;-রাজদ্বারে ভিখারীর হাতে
; যমুনা দিতে আসে
অপরাজিতা ভিক্ষার মতন অবহেলা-ভরে সেই মালাগাছি যমুনার হাতে ফেলিয়া দিত। আর যমুনা? যমুনা সেই মালাগাছি দেবতার নিশ্মাল্যের মতো শ্রদ্ধার সহিত মাথায় পরিত। যেদিন কুমারী ইন্দিরা একটু বিশেষ রকমের গ্রীবাভঙ্গী করিয়া সলীল কটাক্ষে হাসিয়া যাইত, কুমারী শুক্ল যেদিন যাইতে যাইতে এক-আধবার দয়া করিয়া ফিরিয়া চাহিত, কুমারী আননিতা যেদিন মিষ্ট রকমের প্রাণমাননা পরিহাস করিত, সেইদিন আনন্দোৎসবে মুক্তহস্ত দাতার মতাে মালাকর বসন্ত যমুনার জন্যও বিশেষ করিয়া একগাছি মালা গাঁথিত নিগুণ নির্গন্ধ কালো রঙের অপরাজিতা ফুলে। এদি; বসন্তর এই অপূর্ব প্রসাদ পাইয়া যমুনার মন আনন্দে কৃতজ্ঞতায় ভরিয়া উঠিত, এদিন তাহার লজ্জা রাখিবার স্থান থাকিত না। বসন্তর বাগানখানি ঘরের ফুলে ও বনের ফুলে শােভিত, চাদের জ্যোৎস্নায় ও রূপের জ্যোৎস্নায় প্লাবিত, পাখীর কলকূজনে ও তরুণীর কলহাস্যকৌতুকে মুখর, ফোয়ারার অজস্র ধারায় ও হৃদয়ের অজস্র প্রীতিতে অভিষিক্ত, মণিদীপের আলােকে ও ডাগর চোখের পুলকে উজ্জ্বল। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, সকালের পর বিকাল, সন্ধ্যার পর প্রভাত, একটানা সুখস্রোতের মতো সময় ভার্সিয়া যায় । তাহার মধ্যে একটি তরুণকে ঘিরিয়া তরুণীদের মেলা আনন্দে জমাট, উল্লাসে ফেনিল, প্রণয়ে মদির । বসন্ত কুনফুলের গাঢ় রঙে তরুণীদের শাড়ী ওড়না রঙাইয়া দিত, সন্ধ্যামণির হৃদয় পিষিয়া চরণ রঙাইত, হেনার পাতার রস গালিয়া হাত রাঙাইত। আর, মধুর হাসি, প্রিয় বচন, চটুল চাহনি দিয়া হৃদয় রঙাইতে চেষ্টা করিত—রূপসীদের হৃদয় তাহাতে রঙিত কি না কে জানে। কিন্তু তরুণীদের আফিমফুলের মতো রাঙা মাদক ঠোট , দুখানি, ডালিমফুলের মতো গাল দুটি;
যাত্রা-সহচরী শিউলিরঙা বসন আর মেহেদিরঙা চরণ নিজেদের সকল লালিমা জড়ো করিয়া বসন্তর তরুণ কোমল হৃদয়খানি শােণিতরঙে রঙাইয়া তুলিতেছিল। তরুণীরা বসন্তর যত অন্তরঙ্গ হইতেছিল বসন্ত আপনার অন্তরের মধ্যে তত শূন্য অনুভব করিতেছিল। সকল শূন্য পূর্ণ করিয়া একজন কাহাকেও আপনার জীবনে আবাহন করিবার আকাঙ্ক্ষা তাহার প্রবল হইয়া উঠিতেছিল। এক দিন যখন সন্ধ্যাবেলায় গাছে গাছে ফুলের দেয়ালি সাজিতেছিল, যখন দক্ষিণা বাতাস বিরহছিতের নিশ্বাসের মতো থাকিয়া থাকিয়া ফুলের বনে শিহরণ হানিতেছিল, যখন ফুলের গন্ধে মাতাল হইয়া কোকিল পাপিয়া প্রলাপ বকিতেছিল, যখন হাজার দীপের শিখার মাঝে ফোয়ারার জল তরল হীরার ,মালার মতো গলিয়া পড়িতেছিল, যখন সানিবিড়-পল্লবচ্ছদ পথের উপর পরীরা সব হাল্কা হাতে চাঁদের আলাের আল্পনা দিতেছিল; তখন বসন্তর বীণাসঙ্গতের গ্রণয়সঙ্গীত বন্ধ করিয়া দিয়া লক্ষ্মীর মতাে রাজকুমারী ইন্দিরা তাহার কুটীরদ্বারে আসিয়। উপনীত হইল। বসন্ত তাড়াতাড়ি উঠিয়া ইন্দিরার পদ প্রান্তে তাহার ভরা সাজি উজাড় করিয়া ঢালিয়া দিয়া বলিল-ইন্দিরা, আমার বাহিরের ফুলই নিত্য তুমি লইয়া যাও, আমার অন্তরের অতুল ফুল তােমার চরণে কি স্থান পাইবে না? মিলন-উৎসবে ফুলের বন ফুল্লতর হইয়া উঠিবে না? কুমারী ইন্দিরা ভ্রুকুটি করিয়া ঘৃণাভরে ফুলগুলি সব পদাঘাতে ছড়াইয়া দিয়া উদ্যত অশনির মতো বলিল--কা! এত বড় স্পর্ধা তােমার নীচ মালাকার ! অনুগ্রহকে ভাব তুমি প্রণয় ! রাজকন্যাকে কুটীরে বরণ করার সাধ তােমার ! জানাে তুমি, কর্ণাটরাজ স্বয়ং আমার উপযাচক পাণিপ্রার্থী ! স্পর্ধা তােমার ঘুচিবে, কাল যখন রাজাদেশে তুমি শূলে চড়িবে ।
অপরাজিতা . অবহেলার যে বেদনা বসন্তর বুকে লাগিল, সে বেদনা শূলাঘাতের অপেক্ষা অল্প নয়। এ ইন্দিরার শ্রীচরণে সে তাহার অন্তরভাণ্ডারের শ্রেষ্ঠতম মহার্ঘ অর্ঘ্য দিনের পর দিন একে একে উজাড় করিয়া একেবারে রিক্ত হইয়া গিয়াছে, আজ তাহাকে নিঃস্ব করিয়া পদাঘাতে দূর করিল কিনা সেই ! বসন্ত ইন্দিরার পায়ে পড়িয়া বলিল—শূলে দিতে হয় দিয়ো। কিন্তু রাজকুমারী ভাবিয়া দেখ, বাহিরে দীন বলিয়া আমি অন্তরে দীন নই বিশ্বজোড়া ঐশ্বর্য আমি তােমার পায়ে উজাড় করিয়া দিয়াছি—সে ঐশ্বর্য তুমি কোনাে রাজার ভাণ্ডারে খুজিয়া পাইবে না। কাঙালকে সবরকমে কাঙাল করিয়া মারিয়াে না। ইন্দিরা হাসিয়া উঠিল। সেই উপহাস করাতের মতো করকর করিয়া বসন্তর অন্তর এপার ওপার চিরিয়া দিয়া চলিয়া গেল। তখন বসন্ত মিনতির স্বরে বলিল—আমার এত দিনের ব্যর্থ পূজার খাতিরে আমার একটি শেষ অনুরােধ রাখ। কাল প্রভাতের আগে একথা তুমি কাহারাে কাছে প্রকাশ করিয়াে না। আমি একবার কুমারী শুক্লা আর আনন্দিতার কাছে ভাগ্য যাচাই করিয়া দেখিব । ইন্দিরা দৃপ্তভাবে বলিল—বেশ, প্রার্থনা মঞ্জুর। আমিই তাহাদের ডাকিয়া দিতেছি। তােমার এ যে দুরাশা-কোনাে রাজকুমারী মালাকরকে মালা দিবে না, কালাে কুৎসিত যমুনাও না,সেই মালাকর যতই কেন মােহন হােক না। ইন্দিরা আসিয়া শুক্লাকে পাঠাইয়া দিল। শুক্লাও তেমনি রূঢ়ভাবে বসন্তর প্রণয়-নিবেদন প্রত্যাখ্যান করিয়া চলিয়া আসিয়া আনন্দিতাকে পাঠাইল। আনন্দিতাও ব্যথিত মালাকরকে জালাকর তাচ্ছীল্যে লাঞ্ছিত করিয়া ফিরিয়া আসিল। আনন্দিতা আসিয়া যমুনাকে হাসিয়া বলিল- ওলাে যমুনা, যা লে যা, তােকে বসন্ত ডাকিতেছে। -- যাত্রা-সহচরী (म বসন্ত ডাকিতেছে ! তাহাকে ! আনন্দে উদ সে লজ্জায় সঙ্কোচে আশায় আকাঙ্ক্ষায় যমুনার হৃদয় ছাপাইয়া পড়িবার উপক্রম হইল। ভগিনীদের দিকে চাহিতে পারিল না, তাহাদের ক্রর পরিহাস লক্ষ্য করিল না, সে তীর্থযাত্রী ভক্তের মতো পরম সম্বমে, প্রথমমিলনভীত নবােঢ়ার মতাে কম্পিত হৃদয়ে কুষ্ঠিত চরণে লজ্জিত সঙ্কোচে ধীরে ধীরে গিয়া নিৰ্বাক্ নতনেত্রে বসন্তর সম্মুখে দাড়াইল ! বসন্ত তখন ভূমিতে লুণ্ঠিত হইয়া কঁদিতেছিল, যমুনার দিকে ফিরিয়াও চাহিল না বসন্তকে ক্রন্দনে লুষ্ঠিত হইতে দেখিয়া যমুনার হৃদয় ফাটিয়া গিয়া শােণিত বর্ষণ করিতে লাগিল। না-জানি তাহার নির্মম ভগিনীরা ইহাকে কী দারুণ ব্যথাই দিয়া গিয়াছে। যমুনা তাহার ব্যথিত বন্ধুর দিকে সল করুণ দৃষ্টিতে দেখিতে দেখিতে কম্পিত কণ্ঠে সান্তনা ভরিয়া ভয়ে ভয়ে ডাকিল--বসন্ত ! বসন্ত মুখ তুলিয়া চাহিল না, মুখ ফুটিয়া কথা কহিল না, ক্রন্দনাবেগে ভূমিতে লুষ্ঠিত হতে লাগিল। লজ্জিতা ব্যর্থতা মিতবাক্ যমুনা সজল চক্ষে প্রাণভরা ব্যর্থ সান্ত্বনা তুলিয়া লইয়া ধীরে ধীরে সেখান হইতে চলিয়া গেল, তাহার কুষ্ঠিত প্রাণের উপর বসন্তর বেদনা লুষ্ঠিত হইতে লাগিল। সে তাহার সকল শক্তির, সকল শান্তির, সকল শুভের, সকল সুখের বিনিময়ে বিশ্ব ছানিয়া বসন্তকে সান্ত্বনা দিতে পারিতে দিত। কিন্তু সে সকলের অনাদৃতা কুরূপা, সে আপনার অক্ষমতায় আপনি শুধু পীড়িত হইতে লাগিল। রূপসী রাজকুমারীরা মুচকি হাসিয়া জিজ্ঞাসিল-ওলো যমুনা, মালাকর তােকে কি বলিল ? • একথার উত্তর সে এই হৃদয়হীনাদের কি দিবে ? সে নতমুখে শুধু বুলিল--কিছু না।
৩৪ অপরাজিতা সুন্দরীরা অট্টহা, গাছে গাছে পাখীগুলিকে ভীত করিয়া বলিল- সৌখীন মালাকর : কালো কুৎসিত মনে ধরে না ! যমুনা, তুই যে আমাদের বােন একথা মনে করিতেও লজ্জা হয়। সামান্য মালাকরও তােকে ঘৃণ করে। আমাদের ছায়ার মতন বেড়াইতে তাের লজ্জা করে না? এ অপমান যমুনাকে স্পর্শ করিল না, ইহা তাহার প্রতিদিনের প্রাপ্য, ইহাই তাহার আভরণ। স্বয়ং বিধাতা যে তাহার বাদী! কিন্তু বসন্তর পরাভবে তাহার ভগিনীদের উল্লাস, বসন্তকে উপহাস, তাহাকে পীড়। দিবার পরামর্শ, যমুনার বুকে সহস্ৰসূচী শস্ত্রের মতো বিঁধিতে লাগিল সে ভগিনীদের বব’র আনন্দে মরিয়! যাইতে চাহিতেছিল ; সে তাহার শােণিতশ্রুসিক্ত হৃদয়খানি মেলিয়া বসন্তকে এই রূঢ় নিষ্ঠুরতা হইতে ঢাকিয়া রাখিতে পারিলে রাখিত। অক্ষম সে : পুষ্পবনের জ্যোস্নামাখা হাল্কা হাওয়া আজ যমুনার হৃদয়খাতের ভাব স্রোতে যে লহর তুলিয়াছিল তাহাও বড় দুঃখময়, বড় ক্লেশাতুর। আজ এই বাগানের জীবনস্বরূপ মালাকরের বেদনার চারিদিকে এত ফুলের হাসি, এত পাখীর কলগান, এত ভ্রমরের গুঞ্জন, এত জ্যোৎস্নার ছড়াছড়ি এত হাওয়ার মাতামাতি বড় নিষ্ঠুর, বড় অসামঞ্জস্য বলিয়া মনে হইতেছিল দুই হাত দিয়া মুছিয়া ফেলিতে পারিলে সে ফেলিত, অন্ধকারের কালে পর্দা টানিয়া দিয়া বাগানের এই নির্লজ্জ ব্যবহার ঢাকিতে পারিলে সে ঢাকিত। আজ যেন তাহার ভগিনীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করিয়া সারা বাগান বসন্তর বেদনায় আনন্দ করিতেছে। অরি, তাহার লজ্জ। বাণের মতে বাজিতেছিল গিয়া যমুনার বেদনাহত হৃদয়ে । প্রভাতে রূপসী রাজকুমারীরা রাজার নিকট বসন্তর বেয়াদবি নিবেদন করিল। অনুরােধ করিল বেয়াদব বব রটাকে শূলে দিতে হইবে, অনেকদিন রাজকুমারীর শূলে হত্যার মজার দৃশ্য দেখিতে পান নাই। A যাত্রা-সহচরী রাজার আদেশে বসন্ত ধৃত হইয়া রাজসভায় নী'হইলে সে অকপটেই আপন অপরাধ স্বীকার করিল। সে মিথ্যা করিয়াও অস্বীকার করিলে রাজসভার সকলে সুখী হইত। কিন্তু না, বসন্ত মরিবেই, কিছুতেই সে অভিযােগ অস্বীকার করিল না। ধর্মাবৃত দ্বারীর চক্ষু ও সজল হইয়া আহা এমন সুকুমার রূপ ! এমন কোনা নধুর প্রকৃতি এই বসন্তর ! এ-কে কিনা শূলে মরিতে হইবে । ক্যাদিগকে রাজ। অনুনয়ের স্বরে বলিলেন- এট। পাগল ! ওকে ন হয় দূর করিয়া দি, আপদ চুকিয়া যাক। রাজকুমারীর অটল। সেবকের শােণিত দিয়া তাহারা চোখে আনন্দের অঞ্জন টানিবেই টানিবে, পায়ে তাহার হৃদয় দলিয়। রক্তের অলক্তক তাহাদের পরিতে হইবে। শেষে রাজা অনেক কষ্টে বৃফ করিলেন বসন্ত যাবজ্জীবন বন্দী থাকুক। বেশ! বন্দী যদি থাকে তবে সে অন্তঃপুরের অন্ধ করায় বন্দী থাকিবে ; . রাজকুমারীরা তাহাকে লইয়া একটু আনন্দ-উল্লাসে সময় কাটাইবেন। রাজা বলিলেন তথাস্তু । অন্তঃপুরের দয়াময়ীদের রােষে যাহারা অভিশপ্ত তাহাদিগকে শিক্ষা দিবার জন্য গঠিত এই অন্ধকার। পাষাণ-প্রাচীর লৌহ-কপাটের দন্ত মেলির। একবার যাহাকে গ্রাস করে তাহাকে জীর্ণ না করিয়া উরিণ আর করে -৪। কপাট হইর রন্ধ,শূন্য, প্রাচীর ইহার নিরেট পুরু। কেবল বাতাস যাইবার জন্য মেঝে ও ছাদের কাছাকাছি দেওয়ালে গুটিকয়েক ছিদ্র, আর বন্দীকে আহার দিবার জন্য এক দেওয়ালে ছােট একটি ঘুলঘুলি । মরণকে বিলম্বিত করিবার এই-সমস্ত ব্যবস্থা। আলো বাতাস খাদ্য যঅ পারে এই-সব সঙ্কীর্ণ পথে যাইতে পারে, দয়াময়ীদের হুকুম অপরাজিতা আছে। কিন্তু হুকুমসত্ত্বেও আলাে বাতাস অসঙ্কোচে ঢুকিতে পারে না, ঘুলঘুলির সামনে প্রকাণ্ড উচু ভারি পাথরের পুরু নে ওয়াল খাড়া ; আর ঘুলঘুলিতে একটি বাটি খাবার ছাড়া অধিক দিবার উপায় নাই। এখানে যে একবার প্রবেশ করে মরিয়া যাওয়া পর্যন্ত ধৈর্যের সহিত অপেক্ষা করা ছাড়া তাহার আর অন্য উপায় নাই। ঘুলঘুলিটি এমন উচুতে, যে, বাহিরের লােক ভিতরে বা ভিতরের লােক বাহিরে উকি মারিতে পারে না, শুধু হাত গলাইয়া খাবার দিতে ও লইতে পারে। প্রতিদিন আহারের পাত্র শূন্য হইয়া ঘুলঘুলির মুখের তাকের উপরে থাকে ; যেদিন পাত্র শূন্য না হয় সেদিন বুঝা যায় খন্দী পীড়িত। একাদিক্রমে সাত সপ্তাহ আহার অস্পৃষ্ট থাকিলে বুঝিতে হয় বন্দী ভবযন্ত্রণা হইতে মুক্তি পাইয়াছে। বসন্ত এই ভীষণ কারাগারে বন্দী। ধরণীর সহিত অধিক দিন পরিচয় না হইতেই ধরার সহিত সকল • সম্পর্ক তাহার ঘুচিয়া গেল। তাহার কত আশা-আকাঙ্ক্ষার এই ধরিত্রী, তাহার আনন্দ-ভালােবাসার সকল সুন্দর মুখ, তাহার চন্দ্রসূর্য আলাে ফুল বাতাস, সমস্ত, জন্মের মতাে লােহার কপাটের কঠিন আড়ালে লুপ্ত হইয়া গিয়াছে। বাহিরের হর্ষকোলাহল হয় তাে তাহার কানে ভাসিয়া আসিবে, সে তাহাতে যােগ, দিবে না। কিন্তু বসন্ত নিজের নিস্ফল প্রণয়ের হতাশ্বাসে এমন মগ্ন হইয়া গিয়াছিল যে তাহার এসব দিকে লক্ষ্য ছিল না। রূপসী রাজকুমারীরা আসিয়া বন্ধ পথে হাসিয়া হা!ি বসন্তকে বলিত—কিগগা বর, বাসরঘরের আনন্দ আজ কেমন লাগিতেছে ? আমর; তােমার বরমাল্য রচনা করিয়া আনিয়াছি, ওহে রসিক মালাকর, গ্রহণ কর, গ্রহণ কর ! রাজকুমারীরা কাটার মালা বসন্তর কাছে ফেলিয়া দিয়া রূঢ় হাসি l, যাত্রা-সহচরী হাসিত। আর সেই, কঁাটাগুলির চেয়েও তীক্ষ নিষ্ঠুর তাহাদের হাসি আর ব্যবহার তাহাদের পশ্চাতিনী যমুনার হৃদয়ে ফুটিয়া ফুটিয়া রক্তের অলকালিকায় তাহার হৃদয়খানিকে লজ্জিত ভীরু বধুর বেশে সাজাইয়া দিত। কিন্তু রাজকুমারীদের এই রূঢ় ব্যবহার বসন্তকে অধিক পীড়া দিতে পারিত না—তাহাদের প্রথম ব্যবহার এমন মর্মন্তুদ হইয়াছিল যে তাহার পর আর তাহার নৃতন বেদনার অনুভূতি ছিল না। বসন্ত অনেক অনুনয়ে আপনার বীণাটিকে কারাগারের সঙ্গী করিয়া ইয়াছিল। অন্ধকারে বসিয়া বসিয়া সে যখন একমাত্র অবশিষ্ট সঙ্গটিকে আবেগভরে বুকে চাপিয়া তাহার তারে তারে প্রাণের বেদনা বাক্ত করিয়া তুলিত, তখন সমস্ত রাজপুরী যেন বিষাদে আচ্ছন্ন অশ্রুতে পরিম্লান হইয়া উঠিত। কেবল রূপসী রাজকুমারীরা হাসিয়া হাসিয়া র- পথে বসন্তকে বলিত-বাহবা বর, বাসরঘরে গান করিতেছ ! রাজকুমারীদের আনন্দ উৎসাহ দুদিনেই ক্লান্ত হইয়া পড়িল। লইয়া একঘেয়ে আমােদ, নিরুত্তর পরিহাস তাহাদের আর ভালো লাগে না, তাহারা আমােদর সন্ধানে কর্ণাট-কলিঙ্গের রাজাদের দিকে মন দিল। রাজকুমারীদের অন্তধানে বসন্ত ক্রমশঃ নিজের অস্তিত্বের চারিদিকে সচেতন হইয়া উঠিতে লাগিল। সে দেখিল রাজকুমারীর আর আসে না, কিন্তু তাহার খাবারের বাটিটি সকাল সন্ধ্যা নিত্য নিয়মিত ঘুলঘুলিতে হাজির হয়। যে তাহার অাহার লইয়া আসে তাহার হাত দুখানি ক্ষুদ্র কোমল,—সে রমণী, এবং সে রমণী করুণাময়ী ! বরাদ্দ তাহার একবাটি ছাতু । এই ছাতু যে আনিত সে আনিত ইহা গােলাপজলে দুগ্ধক্ষীরে মাখিয়া ; ছাতুর তলায় চুরি করা পায়সপিষ্টক ফলমিষ্টান্ন গােপন করিয়া ; বাটিটিকে ফুল্ল ফুলের গন্ধবিধুর মালার পাকে বেড়িয়া। এই পাষাণহৃদয় বসন্তকে অপরাজিতা } রাজপ্রাসাদে ও কমলকোমল হৃদয় তবে এক-আধখানিও আছে। কে এই করুণাময়ী ? কে ? এই সেবিকার প্রতি বসন্ত ক্রমে ক্রমে আকৃষ্ট হইতে লাগিল। বসন্ত পরম আগ্রহে বন্ধ পথের দিকে তাকাইয়া থাকে কখন সেই করুণাময়ী তাহার হাত দুখানি বাড়াইয়া বাটিটিকে ধরিবে। দেখিতে দেখিতে বসন্তর জানা হইয়া গিয়াছিল কখন সে আসে ; যখন ঘরের অন্ধকার গাঢ়তায় বিশেষ একটি রকমে একটুখানি তরল হয়, যখন ঘুলঘুলির মুখে দেওয়ালের ছায়ায় বিশেষ একটি রন্ধ্রের কাছে৷ সূর্যালােকের তিলক পড়ে, তখন সেই করুণার আবির্ভাবের সময়। তখন ঘরের বাহিরের বাতাসের নিশ্বাস, টিকটিকির শব্দ, বিড়ালের সন্তর্পণ প্রস্থান বসন্তকে মুহুতে মুহতে সচকিত করিয়া তুলে তখন সে তাহার সমস্ত প্রাণের মনােযােগ কানে ও চোখে একীভূত করিয়া বসিয়া থাকে । তারপর যখন সেই সেবিক। অন্নপূর্ণার মতাে অঞ্জলিতে মমতা ভরিয়া ঘুলঘুলির পথে বাটিটি বাড়াইয়া ধরিয়া সান্তুনধুর মৃদুকণ্ঠে তাহাকে ডাকে --বসন্ত, বসন্ত তখন উৎফুল্ল হইয়া এক লাফে নিকটে গিয়া দুই হাতে বাটি ধরে, কিন্তু তাহার অচেনা অদেখা প্রিয় বন্ধুর হাত হইতে বাটি লইতে বড়ই বেশি দেরি হয়। সেই হাত দুখানিই তে। বসন্তর সম্বল ; বাহিরের প্রাণের, আনন্দের, সেবার, মমতার অতি ক্ষীণ নিদর্শন সেই অেিকামল ছােট্ট দুখানি হাত। বসন্ত সমস্ত প্রাণ মেলিয়া চক্ষু ভরিয়া শুধু তাহাই দেখে সেই হাত দুখানির বিশেষ আকার, আঙুলগুলির বিশেষ ভঙ্গী, নখগুলির বিশেষ গঠন, করতলের রেখাগুলির বিশেষ টানের বিচিত্র সমবায়, আর ডাহিন হাতের মণিবন্ধে কালাে কুচকুচে ছােট্ট একটি তিল নিত্য নিত্য দেখিতে দেখিতে সেগুলি বসন্তর অতি প্রিয় বন্ধুর মতাে সুপরিচিত হইয়া উঠিতে- ছিল। আঙুলে আঙুলে ঈষৎ স্পর্শেই বসন্তর বুকের মধ্যে রসপুলকের জোয়ার যাত্রা-সহচরী জাগিয়া স্পষ্ট করিয়া জানাইয়া দিত ঐ আঙুলের অধিকারিণী তারুণ্যে বিমণ্ডিত, মমতায় সে ভরপূর, লজ্জায় সে সঙ্কুচিত ! এই হাত দুখানি যে-শরীরকে অলঙ্কত করিয়াছে, অমন মনের মন্দির যে শরীর, অমন করুণাদ্র কণ্ঠস্বর যে শরীরের, সে শরীর না জানি কত সুন্দর! কী দিব্য ! কী অনিন্দ্য ! একদিন বসন্ত সেই হাত দুখানি চাপিয়া ধরিয়া বলিল—দেবী, আমার এই ঋণের বােঝা কাহার কাছে বাড়িয়া উঠিতেছে ? কে তুমি চিরবন্দী আমাকে কঠিনতর বন্ধনে চিরবন্দী করিয়া তুলিতেছ? শুধু আমি ঋণীই হইব, শােধ দিবার তো উপায় নাই। তরুণী স্নিগ্ধস্বরে বলিল ভয় নাই মালাকর, তােমার ভয় নাই। তােমার কাছে অশেষ ভাবে ঋণী সেই তার কৃতজ্ঞতার এক কণা প্রকাশ করিতে চেষ্টা করিতেছে । বসন্ত বিস্মিত হইয়া বলিল--আমার কাছে ঋণী? তুমি কে? তরুণী বলিল—আমায় তুমি সুভদ্রা বলিয়া জানিয়ে । বসন্ত তাহাকে করুণস্বরে বলিল—সুভদ্র, তুমি কে আমি জানি না। কিন্তু তােমার দয়া দেখিয়া আমার আবার আলােকে নরলােকে ফিরিয়া যাইতে সাধ হইতেছে ! তরুণী কাতরকণ্ঠে সমবেদনা ভরিয়া বলিল—আমার প্রাণ দিয়াও তােমায় মুক্তি দিতে পারিলে দিতাম । তরুণীর কথাগুলি অশ্রুতে ভিজা। বসন্ত তাহার কথার আদ্র কম্পমান স্পর্শ অন্তরে অনুভব করিল। বসন্ত মুগ্ধ হইয়া বলিল— রাজকুমারীরা কি এই হতভাগার কথা ভাবেন না একবার ? -না বসন্ত, তাহাদের এমন তুচ্ছ ভাবনার নিতান্ত সময়াভাব। কর্ণাট কলিঙ্গ মদ্রের রাজসিংহাসন উজ্জল করিবার জন্য ইন্দিরা শুক্লা আনন্দিতা ব্যস্ত ।
৪০
অপরাজিতা
-আর রাজকুমারী যমুনা ? তিনি
কোন্
দেশের রাজলক্ষ্মী
হইবেন?
—অক্ষমা কুৎসিত কুণ্ঠিতা সে। বাহির তাহার বিধাতা ঢাকিয়াছেন
অন্তর তাহার সে নিজে ঢাকিয়াছে। তাহার ভাগ্য তো অত সহজ
নয় বসন্ত ! আর যে বাড়ীতে একজন নিরপরাধ বন্দী পলে পলে মৃত্যু
মুখে অগ্রসর হইতেছে, সে-বাড়ী ছাড়িয়া তো সে অন্যত্র যাইতেও পারে
। তাহার ভগিনীদের কৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত যে তাহাকে করিতে হইবে।
বসন্ত বিস্মিত হইয়া বলিল—আঁ! 'যমুনা তাহা হইলে আমায়
স্মরণ করে ?
A
—স্মরণ করে বৈ কি বসন্ত, নিশিদিনই সে স্মরণ করে : তুমি
তাহাকে এতদিন মালা দিয়া গান দিয়া প্রীতি দিয়া পরিতুষ্ট করিয়াছ,
আর আজ সে তােমায় বিপদের মুখে ফেলিয়া যাইবে, এত বড় স্পর্ধার
যােগ্যতা তাে তাহার কিছুই নাই।
বসন্ত লজ্জিত হইয়া বলিল—আমি তাে তাহাকে কোনাে দিন
আদর করিয়া কিছু দিই নাই। তাহার ভগিনীদের উচ্ছিষ্ট, অবহেলা
করিয়া তাহাকে দিয়াছি।
সুভদ্রা কম্বরে বিনয় ভরিয়া লইয়া বলি—তাহাই সে সবহুমানে
মাথা পাতিয়া লইয়াছে। সে তাে জীবনে এত বেশি পায় না যে যাহা
পায় তাহা আবার বাছিয়া বাছিয়া লইবে ?
-সে যদি এমন, তবে সে আমার প্রণয়দান গ্রহণ করিল না কেন?
-হতভাগিনী সে। তাহাকে তাে তুমি কিছুই বল নাই। শুধু
তােমার বেদনায় ব্যথিত করিয়া তাহাকে অশ্রুজলে বিদায় করিয়া
দিয়াছিলে।
ম
.
যাত্রা-সহচরী ৪১ বসন্তর মন সুখে দুঃখে বিমথিত হইয়া উঠিল। সে উত্তেজিত কণ্ঠে বলিল -তবে সে এখন একবার আমায় দেখিতে আসে না কেন ? সুভদ্রা তাহার স্বচ্ছ সুন্দর দৃষ্টিটি র রূপথের দিকে উব্ধ করিয়া তুলিয়া এরিয়া বলিল--আসে, সে আসে। কুষ্ঠিত লজ্জিত অক্ষম সে, আপনাকে প্রকাশ করিতে পারে না। আমি তাহারই ইচ্ছায় তােমার সেবা করিতেছি। বসন্ত উৎফুল্ল হইয়া সুভদ্রার হাত দুখানি প্রাণপণ বলে চাপিয়া ধরিয়া বলিল—ভদ্রে, তােমার কথা শুনিয়া আমার আবার বাঁচিতে সাধ হইতেছে। জগতের সকল নারীই নারীই ইন্দিরা শুক্লা আনন্দিতা নহে । তার মধ্যে যমুনা আছে, সুভদ্রা আছে। ভদ্রা, আমি যমুনাকে দেখিয়াছি, কন্তু কখনো তাহাকে বুঝি নাই ; আমি তােমাকে দেখি নাই, কিন্তু তোমায় যেন বুঝিয়াছি। যমুনাকে কুরূপ দেখিয়া অবহেলা করিয়াছি, ইহার লজ্জা আজ তাহার দয়ায় দারুণ হইয়া উঠিয়াছে—তাহাকে এই রূপলােলুপের অবিনয় ক্ষমা করিতে বলিয়াে। ভদ্রা, তুমি যদি আমায় গ্রহণ কর, তবে আমি বাঁচিতে পারি, এই অন্ধ কারা হইতে বাহির হইতে পারি। সুভদ্রা বলিল—আমি যমুনার মতােই কুরূপ কুশ্রী । বসন্ত উত্তেজিত স্বরে বলিল—হােক তােমার রূপ বিশ্রী কালাে । এমন দুখানি বেদনাহর। হাত যাহার, এমন একখানি সদয়করুণ হৃদয় যাহার, এমন মধুর বিনয় নম্র স্বর বাহার, তাহার সৌন্দর্যের সীমা নাই, তাহার তুলনা জগতে নাই ! সুভদ্রা বলিল—তুমি তো আমার কোনাে পরিচয়ই জিজ্ঞাসা কর নাই। বসন্ত বলিল—আমি চাহি না কিছু পরিচয়। একবার বাহিরের পরিচয় খুজিতে গিয়া যমুনার কাছে অপরাধী হইয়াছি। তােমার ৪২ অপরাজিতা অন্তরের পরিচয়ই যথেষ্ট ; যথেষ্ট এই জানা যে তুমি সু, তুমি ভদ্রা, তুমি আমায় ভালােবাসো, আমি তােমায় ভালােবাসি ! এই চরম পরিচয়টি তুমি আমায় দাও। বল ভদ্রা, আমি যদি মুক্তি পাইয়া বাহির হইতে পারি তুমি কি রাজকুমারীদের সঙ্গ, রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য ত্যাগ করিয়া আমার কুটীরে যাইতে পারিবে ? একজন সামান্য মালাকরকে তুমি বরণ করিবে ? সুভদ্রার ভারি লজ্জা করিতে লাগিল কেমন করিয়া সে মুখ ফুটিয়া স্বীকার করিবে বসন্তকে সে প্রাণ ঢালিয়া ভালােবাসে। তাহার হৃদয় ফাটিয়া পড়িয়া বলিতে চাহিতেছিল ওগো বাসি বাসি তােমায় ভালাে- বাসি! আমি সকল কিছু তুচ্ছ করিয়া তােমার কুটীরে সুখে থাকিব। তােমায় সুখী করিতে পারাই আমার পরম সম্পদ, শ্রেষ্ঠ ঐশ্বর্য, চরম আকাঙ্ক্ষা !—কিন্তু লজ্জা তাহাকে বলিতে দিতেছিল না। সে এতক্ষণ এত কথা বলিতে পারিতেছিল শুধু সে বসন্তর না-জানার আড়ালে ছিল বলিয়া,-বসন্তর কাছে সে যে একেবারে অপরিচিত। কিন্তু সেই অপরিচিতা দৃষ্টির আড়ালে দড়াইয়াও মুখ ফুটিয়া নিজের প্রণয় নিবেদন করিতে কিছুতেই যে পারিতেছিল না। বসন্ত কোনো উত্তর না পাইয়া আবার বলিল-বল, ভদ্রা, তােমার কথায় হতভাগ্যের সুখদুঃখ জীবনমরণের নির্ভর। তুমি কি এই সামান্য মালাকরকে গ্রহণ করিতে পারিবে ? সুভদ্রা লজ্জায় সঙ্কুচিত হইয়া অনেক কষ্টে মৃদুস্বরে বলিল—বসন্ত, তুমি সামান্য, আমি তো অসামান্যা নই ! তুমি যদি আমাকে কুরূপ কুশ্রী জানিয়াও গ্রহণ কর তবে তােমার পর্ণশালা আমার অট্টালিকা হইবে। এই কথা কয়টি বলিয়া নিজের কাছে নিজের লজ্জায় সুভদ্রা যেন মরিয়া গেল। বসন্ত তাহার হাত দুখানি চাপিয়া ধরিয়া বলি—বাচিব ভদ্রা, বল। D যাত্রা-সহচরী ৪৩ তােমার জন্যই আমি বাঁচিব।—আমায় একটু লিখিবার উপকরণ আনিয়া দলে আমি বাঁচিবার উপায় করিতে পারি। রাত্রি হইলে আনিয়া দিব।-বলিয়া সুভদ্রা তাহার বন্দী, বন্ধুর ব্যগ্ৰ মুঠি শথিল করিয়া হাত ছাড়াইয়া চলিয়া গেল। আজ অকস্মাৎ রাজপ্রাসাদ চমকিত করিয়া বন্দীর বীণায় আনন্দ- রাগিণী উচ্ছসিত হইয়া বাজিয়া উঠিল। তাহ, শুনিয়া লুকাইয়া লুকাইয়া বড় কান্নাটাই কাদিল যমুন।। বসন্তর প্রাণ আজ প্রেমের প্রতিদানে আনন্দিত হইয়া গিয়াছে, প্রেয়সীর কোমলমদির স্পর্শখানি তাহার সমস্ত শরীর মন পুলকিত করিয়া তুলিয়াছে। সে ব্য গ্ৰহৃদরে রাত্রির প্রতীক্ষা করিয়া বসিয়া রহিল। তাহার মনে হইতে লাগিল সেই অন্ধকার ঘরের শক্ত লােহার কালো বিরাট কপাট একেবারে খুলিয়া গেছে—সে সুভদ্রাকে লইয়া জোস্নার আলােয় ফুলের বাগানে পুস্পপাগল চাপার তলে বসিয়া সুভদ্রাকে ফুলে ফুলে সাজাইতেছে। আজ তাহাদের ফুলশয্যা ! অন্ধকার কারাগারের অন্ধকার ঘনতর করিয়া রাত আসিল। তারপর অকম্মাং ঘন অন্ধকার খুশী করিয়া দীপ্ত দীপের স্বর্ণরশ্মি কালো রেশমে জরি বুনিল। বাহির হইতে সুভদ্রা ধীর কণ্ঠে ডাকিল--বসন্ত ! বসন্ত পুলকোদ্বেলিত বহু উত্তর দিল ভদ্র! সুভদ্রা লেখার উপকরণ অগ্রসর করিয়া ধরিয়া বলিল—এই লও ! আনন্দিত বসন্ত অন্ধকারক্লিষ্ট আলােকভীত চক্ষু ঘুলঘুলি-পথের আলাের নীচে বিস্ফারিত করিয়া একখানি চিঠি লিখিল। তারপর ‘বলিল ভদ্রা, প্রতিজ্ঞা কর এই চিঠি তুমি বা যমুনা পড়িবে না, অপর কাহাকেও দেখাইবে না। দয়া করিয়া চিঠিখানি অবন্তীর রাজমন্ত্রীকে পাঠাইয়া দিতে পারিলেই আমি মুক্তি পাইব।
৪৪
অপরাজিতা
।
সুভদ্রা বলিল—তােমার শপথ, তােমার আদেশ পালন করিতে
প্রাণপণ।
চিঠি লইয়া সেই রাত্রেই অবন্তীতে দূত গেল।
দূত গিয়া অবন্তী হইতে সংবাদ অসিবার সময় যতদিন লাগিতে
পারে বসন্ত তাহা মনে মনে আন্দাজ করিয়া লইল। তাহার ছাদতলে
রৌদ্ৰতিলকের ঘড়ীটি দেখিয়া দেখিয়া, সুভদ্রাকে জিজ্ঞাসা করিয়া করি।
সে দিবারাত্রির অভেদ-আঁধার ঘরে বসিয়া দিন গণিতে লাগিল।
একদিন সুদ্ৰা বলিল --বসন্ত, আজ অবন্তীর রাজমন্ত্রী সসৈন্যে
আসিয়া উপস্থিত ! কিন্তু তিনি তো তােমার উদ্ধারের কোনো চেষ্টা
করিতেছেন না।
বসন্ত হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল—তবে তিনি কোন্ উদ্দেশ্যে
আসিয়াছেন ?
—তিনি বিবাহের সম্বন্ধ লইয়া আসিয়াছে।
-কাহার ?
-~-রাজকুমারী যমুনার সহিত অবন্তীব সম্রাহােদরের, আর সম্রাটের
সহিত•••
সুভদ্রা আর বলিতে পারিল না, লজ্জায় তাহার মুখের কথা ওষ্ঠে বাধিল
সুভদ্রা লজ্জায় নীরব হইল দেখিয়া বন্ত হাসিয়া বলিল—অবন্তীর
রাজার সহিত বিবাহসম্বন্ধ কাহার ?
সুভদ্রা লজ্জারুণ হইয়া নতমুখে মৃদুস্বরে ' বলিল--এই পােড়ারমুখী,
সুভদ্রার।
বসন্ত উৎসাহ দেখাইয়া বলিল—বেশ বেশ সুসংবাদ !
সুভদ্রা বসন্তের উৎসাহে ক্ষুন্ন হইয়া ব্যথিত স্বরে বলিল—সুসংবাদ
নয় বসন্ত !
যাত্রা সহচরী ৪৫ বসন্ত সবিস্ময়ে বলিল—সে কি ? অবন্তীর রাজা যে সার্বভৌম যে কেহই সুভদ্রা দৃঢ়স্বরে বলিল—সাবভৌম হইতে পারেন, কিন্তু তিনি সাব- মানস রাজা নহেন। তবে কি সম্রাটের প্রার্থনা ব্যর্থ হইয়া ফিরিবে ? -ব্যর্থ তাে এমনিও হইত। যমুনাকে দেখিলে সম্রাট-সহােদরের আগ্রহ থাকিত না ; আর সুভদ্রা এ বাড়ীতে এতই হীনা তাহাকে চেনে না, সম্রাটের পরােয়ানাও তাহাকে খু জিয়া বাহির করিতে পারিবে না। কিন্তু এ রাড়ীতে রাজ্যলােলুপ রাজকুমারীর তাে অভাব ই। রূপসী রাজার-ঝিয়ারীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা লাগিয়া গেছে তাহারা সমাটের প্রার্থনা ব্যর্থ হইতে দিবে না। বসন্ত স্মিত প্রফুল্ল মুখে রলিল—ভদ্রা, এইবার আমার মুক্তি নিকট। আজ এই শেষ আমাদের এই অদেখা অন্ধকারের মিলন। কাল সহস্র নারীর মধ্য হইতে শুধু যে হাতদুখানি দেখিয়া তােমায় আমি চিনিয়া চুনিয়া বাহির করিতে পারিব সেই হাতদুখানি আজ আমাকে আলােকে যাইবার নিমন্ত্রণ করিয়া যাক। সুভদ্রা তাহার সরমকম্পিত হাত দুখানি ঘুলিঘুলি দিয়া বাড়াইয়া দিল। বসন্ত সেই লজ্জাহিম হাত দুখানি দুহাতে চাপিয়া ধরিল, আকুল ওষ্ঠ তাহার অতদূর পৌছিল না। পরদিন প্রত্যুষেই বসন্তর নিশ্চিন্ত নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটাইয়া কারাগারের ভারী কবাট আতনাদ করিয়া খুলিয়া গেল। কারাগারের মধ্যে প্রবেশ করিলেন স্বয়ং কাশীরাজ সঙ্গে তাঁহার অবন্তীর রাজমন্ত্রী। কাশীরাজ বসন্তর চরণে পতিত হইয়া করজোড়ে বলিলেন-মহারাজ, অজ্ঞানকৃত অপরাধ মার্জনা করুন। ;
৪৬ অপরাজিতা মন্ত্রী অভিবাদন করিয়া বলিলেন—মহারাজচক্রবর্তীর জয় হােক। বসন্ত রাজাকে আশ্বস্ত করিয়া কারাগার হইতে বাহির হইল । মানশুচি হইয়া নির্মল বেশবাস ধারণ করল। কাশীরাজ তাহার ভীত লজ্জিত কন্যাদের বসন্তর নিকট ডাকিয়: আনিলেন। তাহারা আসিয়া একে একে দূর হইতে সসম্রমে বসন্তকে প্রণাম করিয়া একপাশে নতমুখে দাড়াইল। সর্বশেষে লজ্জায় জড়সড় হইয়া নিকট গিয়া প্রণাম করিল যমুনা-তাহার সদ্যস্নানে সিক্ত কেশ- কলাপ বসন্তুর দুই পা ঢাকিয়া ছড়াইয়া পড়িল, কেশের মৃদু আর্দ্রত বসন্তর চিত্ত দ্রব-করিয়া তুলিল। বসন্ত তাহার মস্তক স্পর্শ করিয়া প্রাণের গভীর প্রীতি ঢালিয়া নিজের অতীত আচরণ যেন মুছিয়া দিতে চাহিল। কাশীরাজ বলিলেন—মহারাজ, অবােধ বালিকাদের অপরাধ আপনাকে ক্ষমা করিতে হইবে। বসন্ত হাসিয়া বলিল—আমি উহাদিগকে ক্ষমা করিয়াছি আপনার এই উপেক্ষিত। কন্যাটি গুণে। ইহার কাছে আমার ক্ষমা চাহিবার আছে । এই বলিয়া বসন্ত অন্য রাজকুমারীদিগকে লক্ষ্য না করিয়া যমুনাকে বলিল--যমুনা, আমার অতীত অবিনয় মার্জনা কর। যমুনা নতমুখে নখ খু টিতে লাগিল। তাহার গবিতা ভগিনীদের সম্মুখে, স্নেহহীন পিতার সমক্ষে তাহার এ কী লাঞ্ছন! কী লজ্জা! বসন্ত সকলের সহিত কথা কহিতেছিল, কিন্তু তাহার চক্ষু দুটি ব্যাকু হইয়া অন্তঃপুরের চতুদিকে প্রত্যেক কপাটের অন্তরালে জনতার অভ্যন্তরে খুজিয়া খুজিয়া ফিরিতেছিল, কোথায় তাহার সুভদ্রা, কোথায় তাহার দয়িতা, কোথায় তাহার প্রেয়সী ! সে তত তাহার মুখ চিনে না ! চিনে তাহার হাত, কণ্ঠস্বর, চিনে তাহার সদয় হৃদয় ! কথার উত্তর না পাইয়া বসন্তর চক্ষু যমুনার দিকে ফিরিয়া আসিল যাত্রা-সহচরী ৪৭ সে দেখিয়া চমকিত হইল যমুনার হাতদুখানিই সেই তাহার অন্ধকারের সান্ত্বনা সুভদ্রার হাত ! সেই তাহার দুঃখদিনের অতিপরিচিত আঙুল, নখগুলি, রেখাগুলি, আর সেই মণিবন্ধের অতি সুন্দর তিলটি যেন তাহাকে ডাকিয়া ডাকিয়া বলিতেছিল এই যে, এই সেই, এই সেই ! বসন্তর মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। এক মুহতে প্রণয়কৃতজ্ঞতার মােহন স্পর্শে যমুনা বসন্তর চক্ষে অতুলনা রূপসী হইয়া দেখা দিল। একটি অতি সুন্দর চিরকিশাের অশরীরী দেবতার বরে বসন্তর দৃষ্টিতে যে প্রেমের অঞ্জন লাগিয়া গেল, তাহার ভিতর দিয়া সে দেখিল যমুনা অতুলন রূপে যৌবনে আনন্দে কল্যাণে মাধুর্যে সৌন্দর্যে ঝলমল কতেছে! বসন্ত তখন কাশীরাজের দিকে ফিরিয়া বলিল—রাজ, আপনার কাছে আমার একটি ভিক্ষা আছে। -ভিক্ষা কি মহারাজ! অপরাধীর অপরাধ বাড়াইবেন না । আদেশ করুন। --আপনার দণ্ডস্বরূপ আপনার ভাণ্ডারের শ্রেষ্ঠ রত্নটি আমি লইব । -সে তো আপনার অনুগ্রহ, আমার সৌভাগ্য। (কোষাধ্যক্ষ আপনার আদেশের অপেক্ষা করিতেছে। বসন্ত হাসিয়া বলিল--আমি যে রত্নের কথা বলিতেছি, সে রত্ন আপ- নার কোষাধ্যক্ষ চেনেন না। সেটি আমি অনেক কষ্টে আবিষ্কার করিয়াছি, সেটি এই। এই বলিয়া বসন্ত অগ্রসর হইয়া দুই হাতে যমুনার হাতদুখানি চাপিয়া ধরিল। সকল লােকের বিনিগত অবিশ্বাস অগ্রাহ্য করিয়া বসন্ত যমুনাকে হাসিয়া বলিল—সুভদ্রা, যমুনা, রাজচক্রবর্তীর সহিত প্রবঞ্চনা! এর শাস্তি তােমাকে ভােগ করিতেই হইবে--কাশী হইতে অবন্তীর রাজপ্রাসাদে তোমার নিবাসন। কেমন, এ দণ্ড স্বীকার করিলে তো? আজ আর ৪৮ অপরাজিতা । বােধহয় অবস্তীর প্রার্থনা ব্যর্থ করিয়া ফিরাইতে পারিবে না। অবন্তীর রাজপ্রাসাদ যদি ভালাে না লাগে, অবন্তীতে ফুলের বনের অভাব নাই, অবন্তীর মহারাজ সেইখানেই তােমার বসন্ত মালাকরকে ধরিয়া রাখিবে । তাহার বীণা তােমার বন্দনা আনন্দে গাহিবে ! নিত্যই সে তােমার গলায় অম্লান পুষ্পের মালা পরাইবে ! তুমি ছুটি না দিলে ছুটি সে পাইবে না। যমুনা লজ্জায় সুখে গলি পড়িবার মতাে হইয়া কোনাে মতে দাড়াইয়া রহিল।. কাশীরাজ অবিশ্বাস্য ব্যাপারে বিস্মিত হইয়া বলিলেন—মহারাজ, আমার এই-সক্ষ, সুন্দরী কন্যারা এখনও অবিবাহিতা। বসন্ত হাসিয়া রূপসীদের লজ্জায় মাটি করিয়া দিয়া বলিল—না রাজন, উহারা কর্ণাট কলিঙ্গ উজ্জল করিবেন শুনিয়াছি। --কিন্তু মহারাজ, আপনার আচরণে স্থান পাইলে উহার আনন্দে কর্ণাট কলিঙ্গ, ত্যাগ করিতে প্রস্তুত আছে। বসন্ত হাসিয়া বলিল—রূপের নেশা আমার কাটিয়াছে। রাজার প্রাসাদে হৃদয় কিনিতে পাওয়া যায়, জয় করিয়া পাওয়া যায় না। জানিয়াই এই দীনবেশে হৃদয়জয়ে বাহির হইয়াছিলাম। একটি হৃদয় আমি পাইয়াছি যাহা হৃদয় চায়, রাজ্য চায় না। জয় করিতে আসিয়া বড় আনন্দে হারিয়া গেলাম। আমার এই কালো বধূটিই আমার রাজ উজ্জল করিবে। আমি বুঝিতে পারি নাই যমুনার হৃদয় গভীর শীতল বলিয়া তাহার রূপ কালাে ! যামিনী কালাে বলিয়াই তাহার বুকে অযুত জ্যোতিষ্কের মালা দোলে ! কালো কয়লার হৃদয় আলো করিয়াই সূর্যের কণা দীপ্ত হীরক লুকানাে থাকে ! যমুনা, আমি অবহেলা করিয়া তােমায় অপরাজিতার মালা দিতাম, দুঃখে পড়িয়া সুখে জানিলাম তুমি বাস্তবিকই অপরাজিতা! তুমি অতুলনা ।
চটির পাটি ; আমি পশ্চিমে চাকরি করি। বড়দিনের ছুটির আগেকয়েক দিনের তুটি লইয়া আমি বাড়ী আসিতেছিলাম। ট্রেনে দেখিলাম বিষম ভিড়। দিল্লীর দরবার তখন সদ্য সমাপ্ত হইয়াছে, এবং কলিকাতা রাজসমাগম, কংগ্রেস, কনফারেন্স প্রভৃতি আসন্ন হইয়া আসিয়াছে ; শীতকালে কলিকাতায় আমােদ আহাদ রদ তামাসারও আয়ােজন থাকে প্রচুর এবারে বিশেষ ভাবে গণ্ডা দেড়েক সার্কাস, দুদল সেক্সপীয়র অভিনেতা, চার-চারটে বায়োস্কোপ প্রভৃতি, দীপ্ত দীপের ধারে পতঙ্গের মতাে, দর্শক আকর্ষণ করিতেছিল বিস্তর। অধিকন্তু এই সময়ে রেল কোম্পানী এক- বারের পারাণি কড়ি লইয়া ডবল খেয়া পার করে বলিয়া দরকার না থাকিলেও অনেকে এক পাক ঘুরিয়া আসার প্রলােভন সালাইতে পারে না। সুতরাং ভিড়েরও অবধি থাকে না। ট্রেনে বগিগাড়ী দিয়া কুলাইতে না পারিয়া রেল-কোম্পানীর সেকেলে বকেয়া সম্পত্তি সরু-সরু-কামরা-ভাগ- করা গাড়ী জুড়িয়াও লােকের স্থান করা দুষ্কর হইয়া উঠিয়াছল । আমি অনেক কষ্টে একখানি শিকঘেরা সরু কারার মধ্যে উঠিয়া কোনাে মতে একটু স্থান করিয়া লইয়াছিলাম। সে কামরায় একজন পাঞ্জাবী বড় বড় বিছানার মােট ও বাক্স তােরঙ্গ ঝুড়ি প্রভৃতিতে উপকের বাঙ্ক দুটি বােঝাই করিয়া বসিয়া ছিল—তাহার যেমন দেহ, তেমন দাড়ি এবং তেমনি কি পাগড়ীর আয়তন ! নীচের বেঞ্চিতে পাঁচজন চটির পাটি চার পেশােয়ারী তাহাদের বিপুলায়তন শরীর, ঢিলাঢালা পােশাক ও শীতবস্ত্রের মােট লইয়া বিরাজমান। অপর সাতজনের মধ্যে তিনজন বাঙালী, জন হিন্দুস্থানী। এই তের জনের উপর আমি হইলাম চতুর্দশ। সুতরাং আমি যখন এই কায় প্রবেশের দুশ্চেষ্টা করিতেছিলাম, তখন পাঞ্জাবীর গর্জন, পেশােয়ারীর আস্ফালন, হিন্দুস্থানীর বকবকানি ও বাঙালীর দাত- খিচুনি যে কিরূপ ভীষণ প্রচণ্ড ভাব ধারণ করিয়াছিল তাহা বলিয়া বুঝানাে আমি কাহাকেও কিছুমাত্র গ্রাহ্য না করিয়া যখন গাড়ীতে চড়িতে আসিলাম তখন দুহজন পেশােয়রী দুই দিক হইতে গাড়ীর কপাট টানিয়া ধরিয়া গম্ভীর হইয়া বসিয়া রহিল। আমি তৎক্ষণাৎ রণে ভঙ্গ দিবার ভাণ করিয়া সেখান হইতে একটু সরিয়া এদিক ওদিক ছুটাছুটি করিতে লাগিলাম, লক্ষ্যটা যেন আশে-পাশের কার প্রতিই। তখন আমার সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হইয়া পেশােয়ারীরা সরিয়া বসিল। আর তৎক্ষণাৎ আমিও দরজার হাতল ঘুরাইয়া একেবারে গাড়ীর ভিতরে উঠিয়া গাড়ীর দরজা বন্ধ করিয়া দিলাম। আমার আকস্মিক আবির্ভাবে আরোহীর একবার কোলাহল করিয়া উঠয়া সকলেই হাসিতে লাগিল। সুতরাং শীঘ্রই সন্ধি হইয়া গেল। আমি গাড়ীর দরজার কাছেই এক পেশােয়রীর পাশে স্থান পাইলাম । এতৃষ্ণণ যে গাড়ীর দরজা ধরিয়া উভয় পক্ষে গজকচ্ছপের যুদ্ধ চলিতে- ছিল তাহা যেন মিথ্যা, স্বপ্ন মাত্র–বাস্তবিক পক্ষে আমরা পরম মিত্র, এমনি ভাবে সকলের সঙ্গে আলাপ জমিয়া উঠিল। আমাদের যাত্রীদের মধ্যে প্রায় সকলেই কলিকাতায় যাইবে ; কেবল হিন্দুস্থানীরা নামিবে পাটনায় এবং পাঞ্জাবী নামিবে আসানসােলে। গাড়ী নির্বিবাদে মােগলসরাই ষ্টেশনে আসিয়া পৌছিল। একটি যাত্রা-সহচরী ব্রাহ্মণপণ্ডিত ধরণের লােক চাদরের উপর একখানি লাল বনত গায়ে দিয়া একটি ভারি পুটুলি বগলে লইয়া, প্ল্যাটফর্মে ছুটাছুটি করিতেছিল। ব্রাহ্মণ যেখানে যায় সেখান হইতেই বিতাড়িত হইয়া ফিরিয়া আসে। সময় যতই যায় ব্রাহ্মণও তত ব্যস্ত হইয়া কলের-ভাতের মাকুর মতন, দক্ষ খেলােয়াড়ের র্যাকেটের মুখে লটেনিসের বলের মতন কেবলই এদিক ওদিক ছুটাছুটি করিতে থাকে, কোথাও বেচারা একটু স্থিতি পাইতেছে না। অবশেষে ব্রাহ্মণ হাঁপাতে হাঁপাইতে আমাদের কাম্রার সম্মুখে আসিয়া অতি মিনতির স্বরে বলিল-বার, একটু দরজাটা খুলে দাও বাবা। আমি বলিলাম-ঠাকুর মশায়, দেখছেন আমরা চোদ্দ জন আছি ; আর দেখছেন তাে চোদ্দ জন নয়, চোদ্দ জোয়ান! আপনি অন্যত্র চেষ্টা দেখুন। ব্রাহ্মণ নেড়া মাথায় টিকি নাড়িয়া বলিল—সব শালার খােসামােদ করে এসেছি বাবা, কোনাে বেটার যদি ব্রাহ্মণ বলে একটু ভক্তি শ্রদ্ধা হল। ঘাের কলি ! ঘাের কলি ! ঘাের কলি ! খুলে দাও বাবা ! আমি হাসিয়া বলিলাম—ঠাকুর মশায়, গাড়ীভরা আপনার শালা আর বেটারা যদি দয়া না করে থাকে তবে এ কার আরােহীদের যে ব্রাহ্মণের প্রতি বেশী রকম ভক্তি-শ্রদ্ধা আছে এরূপ সন্দেহ আপনি কেন করছেন? এই যে পেশােয়রী,ক’টি, এরা গােব্ৰাহ্মণহিতায় চ মােটেই নয়। -তােমরা তাে বাবা বাঙালী হিন্দু, ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের উপকরটি কর বাবা। একজন' পেশােয়ারী ব্রাহ্মণের বােচকায় ধাক্কা দিয়া গুরুগম্ভীর স্বরে বলিল—ভাগে ভাগাে, ইহা পর জাগা কাহা। ব্রাহ্মণ বােচ কার ভারে টলিয়া পড়িয়া গেল এবং ট্রেন ছাড়িবার ঘণ্টা পড়িল।
চটির পাটি আমি তাড়াতাড়ি দরজা খুলিয়া নামিয়া একহাতে ব্রাহ্মণের বােচকা ও অপর হাতে ব্রাহ্মণকে ধরিয়া টানিয়া গাড়িতে তুলিলাম। গাড়ী ছাড়িয়া দিল। পেশােয়ারীরা রুষ্ট হইয়া আমাকে ভৎসনা করিতে লাগিল এবং ব্রাহ্মণ আমার মাথার টেরিটিকে নাস্তানাবুদ করিয়া আমায় আশীর্বাদ করিতে লাগিল। আমি হাসিমুখে উভয় পক্ষেরই অত্যাচার সহ্য করিলাম। আমার জায়গাটিতে আমি ব্রাহ্মণকে বসাইয়া নিজে দাড়াইয়া রহিলাম। পেশােয়ারীরা কি জানি কেন আমার উপর ভারি খুশি হইয়া গিয়াছিল—তাহারা আমাকে তাহাদের কাপড়ের মােটের উপর বসিতে বলিল। ইহার পর হইতে আমাদের কাহাকেও আর লােক লড়াইবার কষ্ট স্বীকার করিতে হয় নাই। সে ভার লইয়াছিল সেই ঠাকুর মশায়। পশ্চিমে তীর্থ করিতে আসিয়া তাহার মেজাজটা এমনি রােখালো হইয়া গিয়াছিল যে হিন্দি ছাড়া সে আর কিছু বলিতে পারিতেছিল না। তাহার হিন্দি নাগরী-প্রচারিণী সভাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাইয়া নির্ভীক নিরঙ্কুশ- ভাবেই নির্গত হইতেছিল। কেহ গাড়ীর নিকটবর্তী হইলেই ঠাকুর চীংকার করিতেছিল--জায়গা নেই হায়, জায়গা নেই হায় ! দেখ, তা নেই পনর আদমি হায় ? আর কঁাহ বৈঠেগা ? গা পর বৈঠেগা, না মাথা পর বৈঠেগা ? আম হাসিয়া বলিলাম—ঠাকুর মশায়, আপনি তাে এইমাত্র গাড়ীতে ওঠবার জন্য আকুলি-বিকুলি করছিলেন ; এখন গাড়ীতে উঠে, সে কথাটা ভুলে গেলে চলবে কেন যে সকল যাত্রীরই গরজ সমান । ব্রাহ্মণ কুদ্ধ হইয়া নাকে এক টিপ নস্য ভরিয়া বলিল,—গরজ সমান হলে কি হয়, বসবে কোথা, জায়গা কৈ
যাত্রাসহচরী
আমি হাসিয়া বলিলাম—আপনি যখন উঠেছিলেন তখনও তাে জায়গা
ছিল না।
-আরে তার চেয়ে তাে এখন আরও কমে গেছে।
–হ্যা, কিন্তু সে বিচার আপনার আমার করা শােভা পায় না,
কারণ আমরা ভরা গাড়ীতে উঠেছি। বিচারের ভার থাকা উচিত
আগন্তুক আরােহীর উপর। তারা যদি এত লােক দেখেও ওঠেন
তবে বুঝতে হবে অন্যত্রও এই রকম অবস্থা।
ঠাকুর টিকি নাড়িয়া বলিল—হাঃ! তুমি তাে বলে ঐ রকম
অবস্থা! কিন্তু এর উপর লােক-বৃদ্ধি হলে আমাদের অবস্থাটা কী রকম
আমি নীরব হইয়া হাসিতে লাগিলাম। ব্রাহ্মণ খুব ঘন ঘন নস্য
লইতে লাগিল। শেষে বলিল—কাশীর নস্য, অতি উত্তম!. নেবে?
—আজ্ঞে না—বলিয়া আমি ব্রাহ্মণের রকম দেখিতে লাগিলাম।
ব্রাহ্মণকে দেখিয়া গাড়ীসুদ্ধ সকলেই স্মিতমুখে কৌতুক অনুভব
করিতেছিল।
গাড়ী বক্সারে পৌছিলে একজন বাঙালী ভদ্রলােক একটা তােরঙ্গ
ও একমােট বিছানা লইয়া আমাদের গাড়ী আক্রমণ করিলেন। ব্রাহ্মণ ।
তাে টিকি নাড়িয়া একেবারে মারমুখাে। আমি আগন্তুককে বলিলাম—
আমরা এখানে পনর জন আছি। অন্য
চেষ্টা
দেখলে
ভালাে হত।
—সব গাড়ীতেই এই রকম মশায়। আমি বেশি দূর যাব না, আমি
মোকামাতে নেবে যাব।
-আচ্ছা
আসুন।—বলিয়া আমি দরজা খুলিয়া
ধরিলাম।
৫৪ চটির পাটি ব্রাহ্মণ দরজা ধরিয়া বন্ধ করিবার জন্য টানাটানি আরম্ভ করিয়া দিল । আমি জোর করিয়া খুলিয়া রাখিয়া হাসিতে হাসিতে ব্রাহ্মণকে বলিলাম –ঠাকুরমশায়, মােগলসরাইয়ে নিজের অবস্থাটা একবার স্মরণ করুন। ব্রাহ্মণ চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল—তুমি তো বড় পাজি লােক হে ! আমায় গাড়ীতে উঠিয়ে নিয়েছ তাে একেবারে মাথা কিনেছ আর কি? এ গাড়ী কি তােমার কেনা ? কোম্পানীর গাড়ী। আমি পয়সা দিয়ে চড়েছি। তবে অত কথা কও কেন হা ? আমি হাসিয়া বলিলাম-এ ভদ্রলোকও কোম্পানীকে পয়সা দিয়ে এসেছেন, অমনি আসেন নি আপনার দয়া ভিক্ষে করতে। ব্রাহ্মণ অধিকতর ক্রুদ্ধ হইয়া বলিল--তুমি তাে বড় বেল্লিক হে। যত লােক পয়সা দিয়েছে সব লােক একই গাড়ীতে আসবে নাকি? আমি পূৰ্ব্ববৎ হাসিয়াই বলিলাম—আজ্ঞে, সেটা আমার একটু ভুল হয়ে গেছে। এক গাড়ীতে যে সকলের ঠাই হয় না সে বােধটা মােগল- সরাইয়ে হলেই ঠিক হত । ব্রাহ্মণ পরাস্ত হইয়া রাগিয়া গনগন করিতে লাগিল। আমার উপর ব্রাহ্মণের ক্রোধ দেখিয়া আর কেহই আমাকে কিছু বলিল না। কেব একজন পেশােয়রী হাসিয়া বলিল—বাবু, তুমি সবাইকেই যে নিমন্ত্রণ করে এই কামরাতে ভরছ ! আমি হাসিয়া বলিলাম-কি করি বল মিঞা সাহেব, সকলের যেতে হবে তাে? আর, পাটনায় এই কজন নেমে যাবে ; এ ভদ্রলোেক মােকামাতে নামবেন ; তখন খুব জায়গা হয়ে যাবে, তখন আমাদেরই রাজত্ব হবে। ব্রাহ্মণ বলিল-হাঃ, তুমি সেই ধাতের লােক কিনা ; বিশ্ব-বাংলা সকল লােককে ডেকে এই গাড়ীতে তুলবে তখন। * যাত্রা-সহচরী চরম লোক-বােঝাই হওয়াতে আর কোনাে ষ্টেশনে কেহ আমাদের প্রতি দৃকপাতও করিল না। এখন নামিবার পালা। পাটনায় হিন্দুস্থানীরা নামিবার জন্য উঠিল। ব্রাহ্মণ হুঙ্কার করিয়া বলিল—এই, আভি না কাহে, আভি কেত্তা লােক উঠেগা। বৈঠো বৈঠা। আমি হাসিয়া বলিলাম-ঠাকুর মশায়, আপনার অনুরােধে কি ওরা গন্তব্য স্থান ছেড়ে আপনার বাড়ী পর্যন্ত নিবিবাদে পৌছে দেবার জন্যে স্থির হয়ে বসে থাকবে ? ব্রাহ্মণ বলিল—তুমি তো বড় ব্যস্তবাগীশ হে ! লােককে তােলবার জন্যেও যেমন তাড়াতাড়ি, নামাবার জন্যেও তেমনি। আমি হাসিয়া বলিলাম—একটু ব্যস্তবাগীশ না হলে যে ঠাকুরমশায়কে এখনাে মােগলসরাইয়ের কাকরের ওপর গড়াগড়ি দিতে হত। হিন্দুস্থানীরা তাহাদের পোটলা-পাটুলি, লেপ লােটা, লাঠি সোটা, নাগরা জুতা প্রভৃতি ঘাড়ে পিঠে হাতে ঝুলাইয়া লইয়া একে একে নামিতে লাগিল ; কাহারাে লােটা ভুট্টাচার্যের নেড়া মাথায় ঠক ঠক করিয়া ঠুকিয়া গেল, কাহারাে নাগরা জুতার নাল ব্রাহ্মণের দীর্ঘ নাসিকায় ঘসিয়া গেল। ব্রাহ্মণ বসিয়া বসিয়া—উজ বুক ! ছাতুখাের কাহাকো ! এই সামালকে নামাে। ইত্যাদি বলিয়া গর্জন করিতে লাগিল। মােকামায় শেষাগত বাঙালীটি তাহার বাক্স বিছানা লইল্লা নামিয়া গেলেন। বাক্সের কোণ লাগিয়া ভট্টাচার্যের পুটলিটি বেংি হইতে নীচে গড়াইয়া পড়িল এবং বােচ কাবাঁধা কাপড়খানা একটু ছিড়িয়া গেল। আর যায় কোথায় ! ব্রাহ্মণ সপ্তমে চড়িয়া গালাগালি আরম্ভ করিল। রাগের শেষ তালটা আসিয়া পড়িল আমার ঘাড়ে-“তােমার জন্যেই তাে আমার কাপড় ছিড়ল। এর ভেতরে বাবা বিশ্বেশ্বরের ফুল
চটির পাটি
বেলপাত আছে, এতে যে পাঠেল তাতে কি তােমার ভালাে হবে? উচ্ছঃ
যাবে, উচ্ছন্ন যাবে।”—বলিয়া ব্রাহ্মণ হাত ও টিকি আন্দোলন করিতে
লাগিল।
আমি হাসিয়া বলিলাম-ঠাকুরমশায়, কোষ্টা ফলবে—গাড়ীতে
ওঠার আশীবাদটা, না অভিসম্পাতটা ?
একজন বাঙালী সহযাত্রী দূরের কোণ হইতে বলিল—কোনােটাই
ফলবে না; পজিটিভ নেগেটিভ দুটোতে কাটাকাটি হয়ে যাবে।
ব্রাহ্মণ আস্ফালন করিয়া বলিতে লাগিল-ফবে না? ফল্বে না ?
সাক্ষাৎ বাবা বিশ্বেশ্বরের টাটকা ফুল-বেলপাতের অপমান!
যাবে ! উচ্ছন্ন যাবে ।
আমি গম্ভীরভাবে জোড়হাত করিয়া বলিলাম-ঠাকুরমশায়, আপনার
ঠিকানাটা দিয়ে যাবেন ; আমি উচ্ছন্ন গেলে শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণটা আপনার
কেন ফস্কাবে ; আপনি অনুগ্রহ করে আমার শ্রাদ্ধের দিনে পায়ের
ধূলাে
দিলে আমি পরলােকে গিয়ে কৃতার্থ হব।
গাড়ীর সকল বাঙালী আরােহীরা উচ্চস্বরে হাসিতে লাগিল।
তাহাদের হাসি দেখিয়া পাঞ্জাবী পেশােয়ারী সকলেই হাসিল। হাসির
সংক্রামকতা ক্রমশঃ শিকের ফাকে ফাকে কারা হইতে কারান্তরে
ছড়াইয়া পড়িল। তখন সকল কার আরােহীর নজর পড়িল সেই
ভট্টাচার্যব্রাহ্মণর দিকে ।
ব্রাহ্মণ আমাকে রাগাইতে না পারিয়া এবং সকলের কৌতুকপাত
হইয়া গোঁজ হইয়া বসিয়া নস্য লইতে মনঃসংযােগ করিল।
এখন হইতে যেই গাড়ী ষ্টেশনে থামে আর অমনি ব্রাহ্মণ মুখ বিকৃত
করিয়া আমায় বলে—ডাক ডাক, সবাইকে ডাক, অনেক জায়গা রয়েছে,
ডাক।
যাত্রা-সহচরী । অন্যান্য কামরাও প্রায় খালি হইয়া আসিয়াছিল। সুতরাং আমাদের কায় মধ্যে মধ্যে অল্পদূরের যাত্রী দু একজন ছাড়া আর বড় বেশি 'কেহ উঠিল না। এইবার পাঞ্জাবীবরের নামিবার পালা। তাহার সেই বিপুলায়তনা দেহ ও পাগড়ী ইয়া সে ক্রমে ক্রমে তাহার অতিকায় বাক্স পেটরা মােটমাটরি নামাইতে লাগিল। মােটা মােটা মােট বাক্সগুলি কি সহজে দরজা দিয়া ফঁাশে ? অনেক টানাটানি অনেক ঠেলাঠেলি করিয়া এক একটি পার হইতে লাগিল। আমি দরজার মুখের কাছে ছিলাম । সুতরাং আমিই ধরিয়া ধরিয়া মােটগুলি বাহির করিয়া দিতে ছিলাম। ব্রাহ্মণও দরজার কাছেই ছিল। কিন্তু সে হাত পা গুটাইয়া বেঞ্চির উপর জগন্নাথের মতন বসিয়া অনবরত বকিয়া যাইতেছিল—যত সব হতভাগা লক্ষ্মীছাড়া এসে জুটেছে ! একটু স্থির নিশ্চিন্ত হয়ে বসার জো নেই। আর এই এক ফফরদালাল জুটেছে, সকল তাতেই আছে। কার মােট না - নাল তা ত তাের অত মাথাব্যথা কেন রে বাপু? পাঞ্জাবীর সমস্ত মােট নামাইবার পূবেই গাড়ী ছাড়িবার ঘণ্টা দিল। তাড়াহুড়া করিয়া সব মােট নামাইয়া পাঞ্জাবী যখন গাড়ী হইতে লাফাইয়া পড়িল তখন গাড়ী চলিতে আরম্ভ করিয়াছে। আমি দরজা বন্ধ করিয়া দিলাম । এতক্ষণে ব্রাহ্মণ পা নামাইয়া সােজা হইয়া বসিল। পা মাইয়াই বেঞ্চির তলে পা চালাইয়া কিছুক্ষণ সে ইতস্ততঃ পদচালনা করিল। তারপর ঝুকিয়া সে কি খুজিতে লাগিল। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম— ঠাকুরমশায়, কি খুঁজছেন ? ব্রাহ্মণ এক পায়ে চটি পরিয়া অপর নগ্নপদ উধ্বে উঠাইয়া ব্যগ্ৰস্বরে বলিল-আমার আর একপাটি চটি ?
৫৮ চটির পাটি বেঞ্চির তল, মােটের নীচে, আশপাশ সব খুজিলাম, কোথাও চটির পাটি মিলিল না। বুঝিলাম পাঞ্জাবীর মাল টানাটানি করিবার সময় চটির পাটি পরিপাটী চম্পট দিয়াছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম-ঠাকুরমশায়, আপনার চটির দু পাটিই ছিল ত ? ব্রাহ্মণ তাে তেলেবেগুনে জ্বলিয়া আমার উপরে খাপ্পা হইয়া মুখ খিচাইয়া বলিলনা, দুপাটি থাকবে কেন ? আমি এক পায়ে চটি পরে বেড়াই ? আমি কি একানডে ভূত? বেলিক আহাম্মক কোথাকার ! আমি হাসিয়া বলিলাম-না না, আমি সে কথা বছিনে যে আপনি এক পায়ে চটি দিয়ে বেড়ান। তবে এমনও তো হতে পারে যে তীর্থে লােকে এক একটা বস্তু ত্যাগ করে আসে, আপনি এক পাটি চটি ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয় পাণ্ডা গুণ্ডার পীড়াপীড়িতে ত্যাগ করে এসেছেন। ব্রাহ্মণ টিকি উৎক্ষিপ্ত করিয়া চক্ষু রক্তবর্ণ করিয়া বলিয়া উঠিল—কী! খৃষ্টান, অধার্মিক, বেলিক ! তীর্থের অপমান!•••আমি যদি ব্রাহ্মণ হই, যদি আমি ত্রিসন্ধ্যা করি... আমি তাহার মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া হাসিতে হাসিতে বলিলাম--- তবে তুমি গােল্লায় যাও ! কিন্তু ঠাকুর মশায়, গােল্লায় যাওয়াটা কেমন তা জানা নেই, গােল। খেতে কিন্তু ভারি মুখরােচক। আর, কলিকালে ব্রাহ্মণের শাপে কেউ মরে না, ব্রাহ্মণের লাঠিতে সাপ,থেকে মানুষ পর্যন্ত মরে বটে। ব্রাহ্মণ আমার সঙ্গে না পারিয়া গনগন করিতে করিতে পা হইতে চটির পাটি খুলিয়া লইয়া একদৃষ্টে দেখিতে লাগিল, দেখিতে দেখিতে ক্রোধ তিরােহিত হইয়া দৃষ্টি হইতে বাৎসল্য ক্ষরিত হইতে লাগিল। ব্রাহ্মণ দুই হাতে চটির পাটিটিকে মুখের সামনে উচু করিয়া ধরিয়া আপন মনে বলিতে লাগিল—আমার নতুন চটি । এই সবে কাশী আসবার আগে ঠঠনে থেকে দেড় টাকায় কিনেছি! আমার নতুন চটি - যাত্রা-সহচরী ব্রাহ্মণের স্বরে বেদনা মাখানাে। তাহার অবস্থা দেখিয়া আমার যেমন হাসি পাইতেছিল তেমনি দুঃখও হইতেছিল। আমি চারিদিকের হাসির হররার মধ্যে অতি কষ্টে হাসি চাপিয়া মুখভাব যথাসম্ভব গম্ভীর ও বিমর্ষ করিয়া বলিলাম—তাই তে ঠাকুরমশায়, আপনার নতুন চটির এক পাটি পড়ে গেল...... –পড়ে গেল ! বলতে লজ্জা করে না, মিথ্যাবাদী পাষণ্ড ! তুই-ই তাে বদমায়েসি ক'রে আমার চটির পাটি ফেলে দিয়েছিস। নইলে আমার পয়সা দিয়ে কেনা, হকের ধন, অনি খামখা পড়ে গেলেই হল। —আমার একেবার আকোরা নতুন চটি ! ব্রাহ্মণের স্বর তিরস্কারের তীব্রতা হইতে চটির স্নেহে করুণা হইয়া আসিল এবং দৃষ্টি তাহার আলা ভুলিয়া শীতল হইয়া গেল। সে দুই হাতে অবশিষ্ট পটিটিকে তুলিয়া ধরিয়া একবার আস্ফালন করিয়া আমাকে বলে—তুই ইচ্ছে করে, বদমায়েসি করে ফেলে দিয়েছিস!—আবার চটির শশাকে করুণাত্র হইয়া বারংবার বলিতে থাকে—আমার নতুন চটি ! আমার নতুন চটি ! আমি অতি মিনতির স্বরে বলিলাম-ঠাকুরমশায়, আপনি যদি মনে কিছু না করেন তাে আমি দাম দিচ্ছি, আপনি কতাে গিয়ে আর-এক- জোড়া নতুন চটি কিনে নেবেন। আপনার মতন ব্রাহ্মণকে জুতাে দান করলে আমার, অক্ষয় পুণ্য হবে। ব্রাহ্মণ চীৎকার করিয়া নাসারন্ধ ফুলাইয়া টিকি নাড়িয়া বলিল—অা বেটা পাজি নচ্ছার হতভাগা বেল্লিক অকালকুষ্মাণ্ড ! আমি তীর্থ করে ফিরে যাবার পথে তাের দান প্রতিগ্রহ করে পতিত হই আর কি ? তেমনি তাের মতলব বটে ! নইলে আর ইচ্ছে করে আমার নতুন চটি- পাটটে ফেলে দিস। আমার নতুন চটি ।
৬০ চটির পাটি ব্রাহ্মণকে আর অধিক ঘাটানাে নির্দয়ের কার্য হইবে বলিয়া আমি চুপ করিয়া বসিয়া রহিলাম। ব্রাহ্মণ কিন্তু কিছুতেই শান্ত হইতে পারিতেছিল না। সে একবার একপায়ে চটি পরিয়া বসে ; বা খালি পা, দেখে ; কখনাে বা পরম আগ্রহে দুই হাতে চাপিয়া ধরিয়া চটির পাটিটিকে চোখের সামনে তুলিয়া করুণ নেত্রে দেখে ; দেখিয়া দেখিয়া আবার নামাইয়া' রাখে। থাকিয়া থাকিয়া এক একবার আমার দিকে ক্রোধ দৃষ্টিতে চাহে। কলিকাল বলিয়া রক্ষা, নতুবা ব্রাহ্মণের রােষানলে আমি ভস্ম হইয়া যাইতাম । একএকবার 'ব্রাহ্মণ অস্ফুট ক্রোধমিশ্র করুণ স্বরে বলে—আমার নতুন চটি । আমার আনকো কোরা চটি । খানিকক্ষণ এইরূপ করিতে করিতে ব্রাহ্মণ চটির পাটিটি চোখের সম্মুখে ধরিয়া দেখিতে দেখিতে বলিয়া উঠিল—যাক, এ একপাটি থেকেই বা কি হবে, এ পাটিও যাক ! এই বলিয়াই গাড়ীর জানালা দিয়া চটির পাটিটি টান মারিয়া দূরে ফেলিয়া দিল। কিন্তু ফেলিয়া দিয়াই জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া সতৃষ্ণ নয়নে সেই চটির পাটিটিকে দেখিতে লাগিল। যখন আর দেখা গেল তখন দীর্ঘনিশ্বাস ফেলিয়া ব্রাহ্মণ দুঃখ ও ক্রোধমিশ্র বিকৃত স্বরে আমাকে বলিল—কেমন ? মনস্কামনা পূর্ণ হল তাে? আমি হাসিয়া বলিলাম—এ পাটি ফেলে দিয়ে আপনি আর তেমন বেশি কি করলেন। সঙ্গীহারা হয়েই বেচারা একেবারে নির্মা হয়ে পড়েছিল ; কারণ আপনি তো বলেইছেন বলেইছেন এই একটু আগে যে আপনি একানড়ে নন যে এক পায়ে জুতাে পরবেন! ব্রাহ্মণ মুখ খিচাইয়া বলিল-হা হা, ভারি আনন্দ হয়েছে ! বাক্য- বাগীশ ! কথার ধুকুড়ি ! বয়েস! পাজি ! হতভাগা!••• ব্রাহ্মণের গালির ‘টেম শেষ হইবার পূবে টেন রাণীগঞ্জে থামিল।
যাত্রা-সহচরী আমি গাড়ী হইতে নামিয়া প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করিতে করিতে দেখিতে পাইলাম ভট্টাচার্যের প্রথম পাটি চটি পাঞ্জাবীর মােটের টানে সরিয়া •ডিয়া গাড়ীর পাদানের নীচের ধাপে আটকাইয়া আছে। আমি ইহা দেখিয়া বলিয়া উঠিলাম—ঠাকুরমশায়, এই যে আপনার চটি এখানে আটকে আছে ! এবং তারপর সেই চটির ‘পাটিটিকে উদ্ধার করিয়া ভট্টাচার্যের হাতে দিলাম । ভট্টাচার্য হারানাে পুত্ৰ কিরিয়া পাওয়ার মতাে ব্যগ্র আগ্রহে সেই চটির পাটিটিকে দুই হাতে চাপিয়া ধরিয়া নিরীক্ষণ করিতে করিতে বলিল—দেখেছ দেখেছ একবার নষ্টামিটে ! চটির পাটিটে লুকিয়ে রেখে এতক্ষণ আমার সঙ্গে তামাসা করা ! আমি তাের বাপের বয়সী, আমার সঙ্গে তামাসা ! ওরে হতভাগা পাজি ! তামাসাই যদি করছিলি তবে যখন আমি ওপাটিটে ফেলে দিলাম, তখন আমায় বারণ কলিনে কেন ? আমি ফেলে ঠেলে দিলাম, এখন এসে বছেন ঠাকুর- মশায় আপনার চটি ! আমায় একেবারে নেহাল করে দিলেন আর কি । ॥ ভট্টাচার্যের চোখ ছলছল করিতেছিল। হার ভাব দেখিয়া আমার সন্দেহ হইতেছিল লােকলজ্জা অন্তরায় না হইলে ব্রাহ্মণ হয় তত হারাধন চটির পাটিটিকে চুম্বন করিয়া অশ্রুজলে স্নান করাইত। ব্রাহ্মণ চটির পাটিটিকে দেখিয়া দেখিয়া আপনার পাশের বৈঞ্চির উপর রাখিল। তারপর পোলাটি কোলের উপর তুলিয়া আস্তে আয়ে খুলিয়া চটির পাটিটিকে পোলায় বাঁধিয়া রাখিল। তাহার মনের মধ্যে একটু আশা জাগিতেছিল যে ফেলিয়া-দেওয়া পাটিটিও হয় তত এমনি করিয়া কোনাে আশ্চর্য
চটির পাটি
ফিরাইয়া দিতে পারি। কিংবা পণ্ডিত লােকে এক রকম ভূল
দুবার করে না বলিয়াই হয় তাে এপাটিটিকে ব্রাহ্মণ আর ফেলিয়া
দিতে পারিল না।
ফিনিক্স
মালতী।
আমার বয়স যখন চৌদ্দ তাহার বয়স তখন তের। তাহার নাম
সে আমার দিদির ননদ।
দিদির বিবাহের বছর দুই পরে যখন তাহার শ্বশুরবাড়া গেলাম
তখন তাহাকে দেখিলাম। তাহাকে দেখিতে বেশ ভালাে লাগিল
দেখিতে দেখিতে আমার মন কেমন এক অপূর্ব রসে রসিয়া উঠিল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই তাহার সহিত পরিচয় হইয়া গেল। পরিচয়ের
ঘনিষ্ঠতায় তাহার সঙ্গ-বৈচিত্র্য, তাহার বচন-মাধুর্য, তাহার সরস-প্রকৃতি
আমাকে বিমুগ্ধ করিয়া ফেলিল।
যখন বাড়ী ফিরিয়া আসিলাম তখন বুঝিলাম মালতীর অদর্শন
আমাকে ব্যথিত করিয়া তুলিতেছে।
তখন দিদির প্রতি আমার মমতা অকস্মাৎ অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিল।
আমি দিদির বাড়ী ঘন ঘন যাইতে আরম্ভ করিলাম।
প্রথম দিন মালতীর সঙ্গে যেমন সহজ ভাবে মিশিয়াছিলাম, দ্বিতীয়
দিন তেমন সহজে পারিলাম না। অল্পে অল্পে অনুভব করিতে লাগলাম
আমার অন্তরে এমন একটু সরস পরিবতন আসিয়াছে যাহা আনন্দ ও
বেদনা এক সঙ্গেই দান করে।
মালতীকে আমার কেবলি দেখিতে ইচ্ছা হয় বলিয়া তাহার দিকে
চোখ ভােলা দায় হইয়া উঠিল ; তাহার, সহিত কথা কহিবার জন্য
;
৬৪ ফিনিক্স , •• প্র ণ যতই ছটফট করে কণ্ঠ ততই রুদ্ধ হইযা আসে; মনে হয় আমার প্রত্যেক দৃষ্টি ও প্রত্যেক বাক্যের উপর পাহারা দিয়া যেন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ওত পাতিয়া বসিয়া আছে। চক্ষু যদি তাহার দিকে বিমুখ হইয়া বসিল, কর্ণ তবে সজাগ হইল মালতীর মৃদু কথা, চাপা হাসি, চরণধ্বনি পর্যন্ত আমার কানে ধরা পড়িতে লাগিল। সে আমার নিকটে আসিলে তাহার দিকে চাহিতে পারিতাম বলিয়া সবঙ্গ দিয়া তাহার আগমন অনুভব করিতাম। প্রকাশ যখন কঠিন হইল, ছলচুরি তখন সহজ হইয়া আসিল ; চোখ তখন কথা কাহবার ভার লইল, মন তখন বিরলের খোঁজে নিতান্ত ব্যস্ত হইয়া উঠিল। দিদির বাড়ী হয় তো দু'তিন দিন থাকিতাম। প্রতিদিন মালতীর সহিত মিলনের চোরা মুহূত গুলি মিলাইয়া বড়জোর পাঁচ মিনিট হইত। কিন্তু তাহাতেই কত সুখ! কিন্তু প্রণয়ধর্মটা এমনি অগােপ্য যে কিছুতেই তাহা অপ্রকাশ রাখা যায় না, লুকাইতে গিয়াই ধরা পড়িতে হয়। আমরাও ধরা পড়িলাম। দিদি টের পাইয়া একদিন হাসিতে হাসিতে মালতীকে জিজ্ঞাসা করিল–আচ্ছা ঠাকুরঝি, বল, তাে এখন যদি তাের স্বয়ম্বর হয় তবে তুই কার গলায় মালা দিস ?, মালতী লজ্জায় আনন্দে কৌতুকে অভিভূত হইয়া চাপা গলায় বলিল—যাঃ! কিন্তু তাহার বক্রদৃষ্টিখানি তাহার স্বকর-গ্রথিত বরমাল্যখানিরই মতো আমায় অভিনন্দন করিয়া গেল। ক্রমে এই কথা লইয়া দিদির বাড়ীর লােকেরা আমাকে ঠাট্টা বিদ্রুপে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল। দিদির বাড়ীতে যাওয়া আমার ভার হইয়া উঠিল। ৫ যাত্রা-সহচরী কথাটা ক্রমে আমাদের বাড়ীতেও পেীছিল। মা বাবাকে ধরিলেন যে মালতীর সঙ্গে আমার বিবাহ দেওয়া হােক্। আমাদের বিবাহসম্বন্ধ লিতে লাগিল। আমি আনন্দে বিভাের হইয়া যেন হাতে স্বর্গ পাইলাম। এই সময়ে দিদি আমাদের বাড়ীতে আসিল। বাবা আমার বিবাহের সম্বন্ধে দিদির সঙ্গে পরামর্শ করিতে বসিলেন। দিদি বলিল— সুরেশের সঙ্গে মালতীর বেশ স:জন্ত হবে না, মােটে এক বছরের ছােট বড়, তাতে আবার মালতীর বাড়ন্ত গড়ন, দুদিনেই সুরেশের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে। তার চেয়ে মালতীর ছোট বােন মল্লিকার সঙ্গে সুরেশের বিয়ে হলে বেশ সাজ হয়, সে মেয়েটিও বেশ । দিদির একটি কথায় আমার সমস্ত ভাগ্য ওলটপালট হইয়া গেল। 'দি বাহিরের সাজকে অন্তরের অপেক্ষা বড় করিয়া আমার বনাশ করিয়া দিলেন। মানুষের ভাগ্যের গতি এমনি একটি সামান্য আঘাতেই হারা হইয়া পড়ে। একই দিনে মালতী ও মল্লিকার বিবাহ। আমি লাল চেলি পরিয়া তোর মাথায় দিয়া সঙের মতো মালতীর বাড়ীতে গিয়াছি মল্লিকাকে ‘বাহ করিতে! আর একজন কোথাকার কে আমারই মতন সাজিয়া ববাহ করিতে আসিয়াছে মালতীকে ! আমি যখন মল্লিকার পিতাকে গৌরীদানের ফলাধিকারী করিতে ‘ম মালতীর ভাগ্যসুত্র তখন একজন ‘কোথাকার কে’র সঙ্গে জড়িত হয়! যাইতেছিল। প্রজাপতির পরিহাসে এমনি করিয়া আমাদের অদৃষ্ট সূত্রে বিষম ডট পিয়া গেল। মনটা যেন ভাঙিয়া গেল, দৃষ্টির সম্মুখ হইতে বিবাহবাড়ীর সমস্ত ‘ফিনিক্স আলােকমাল। যেন নিবিয়া আসিল, নহবতের সানাইয়ের সুর যেন আমারই অন্তরভেদী ক্রন্দনে বাজিয়া উঠিল । বাসরঘরের মেয়েদের উৎপাতে ও নিজের অন্তর বেদনায় অবসন্ন হইয়। ভ'রের দিকে একটু ঘুমাইয়া পড়িয়াছি। ললাটে কাহার কোমল কর পল্লবের মধুস্পর্শে আমি চমকিত হইয়া চেতনা পাইলাম । ঘরের প্রদীপ নিবিয়া গেছে। বাসরঘরের মেয়েরা প্রায় সকলেই চলিয়া গেছে ; দু একজন ফরাশের উপর বিশৃঙ্খল ভাবে পডিয়া ঘুমাইতেছে। প্রত্যুষের ক্ষীণ আলােকে দেখলাম আমার শিয়ারে বসিয়া একটি কিশােরী আমার কপালে ধীরে ধীরে হাত বুলাইতেছে-- তাহার পরণে লাল চেলি, হাতে হলুদরঙা সূতো বাধা, সীথিতে একরাশ দীপ্ত সি দূর ঢালা, কপালে চনবন্দু আঁকা। আমি প্রথমে মনে করিলাম সে বুঝি মল্লিক। ! অনুভবে বুঝিলাম মল্লিকা আমার পার্শ্বে নিদ্রিত।। তখন ভালো কর। চোখ মেলিয়া দেখিলাম সে আমার জন্মজন্মজিত পুণ্যফনের স্বপ্ন। বর মেহ, স্বর্গোদ্যানের নিষিদ্ধ ফল, ভাগ্যগগনের নষ্টচন্দ্র, মালতী আমার সবেন্দ্রয় অবশ হইয়া গেল, তেনা শিথিল হইয়া আসিল, আমি আবার চক্ষু মুদ্রিত করিলাম, কোনাে কথা বলতে পারলাম না। কিন্তু তারপর কত বৎসর কাটিয়া গিয়াছে, তবু আমি মালতীকে ভুলিতে পারি নাই, ইচ্ছাও করি নাই। তাহার প্রেম ক্রমে ক্রমে আমার নিকট ভাবগত হইয়া উঠিয়াছে। মালতীকে না পাইয়া যত ক্রোধ পড়িয়াছিল মল্লিকার উপর। আ: তাহার সহিত কোনাে কথা তো কহিতাই না, তাহার দিকে চাহিয়া যাত্রা-সহচরী ৬৭ দেখিতেও আমার ইচ্ছা হইত না ; আমার মনে হইত যেন তাহার জন্যই আমি মালতীকে হারাইয়াছি। কখনাে কখনাে আমার মা বা দি অনেক জেদাজেদি করিয়া মল্লিকাকে আমার ঘরে শয়ন করাইয়া যাইতেন, কিন্তু আমি তাহাকে আমার শয্যায় স্থান দিতাম না। ভয়ে লজ্জায় জড়ােসড়ো হইয়? আগাগােড়া কাপড় মুড়ি দিয়া দূরে পড়িয়া থাকিত ; আমার বিরাগ তাহাকে এমনি কুষ্ঠিত সঙ্কুচিত করিয়া রাখিয়াছিল । শ্রাবণ মাস। ঝুলনপূণিম। আজিকার রাতেও আমি মল্পিকার অস্তিত্ব ভুলিয়া দিব্য নিশ্চিন্ত হইয়। ঘুমাইতেছিলাম। অনেক রাত্রে প্রবল বৃষ্টিধারার ঝম ঝম শব্দে আমার ঘুম ভাঙিয়া গেল। এ যেন জ্যোৎস্না রাত্রির বিরহ-ক্রন্দন, এ যেন তাহার অভিসার-যাত্রার নূপুরধ্বনি ! প্রাণ আমার ভাবরসে ভরিয়া উঠিল। আমি আর শুইয়া থাকিতে পারিলাম তাড়াতাড়ি উঠিয়া কবিতা উঠিয় কবিতা লিখিতে মনে হইল = লাগিলাম। সেই কোন মান্নাময় -বৃন্দাবনে এমনি রাতে একদিন {য প্রেম- লীলার হিন্দোল লাগিয়াছিল তাহারই ঢেউ এই যুগযুগান্ত পারে আমারই হয়ার পরে আঘাত করিতে লাগিল। আমার চিত্তও আজ সেই সাহসিকা রাধিকার মতো কোনো ভাবমধুর কালিন্দীকূলের নীপশাখায় ঝুলনা বঁধিবার জন্য অভিসার করিতেছিল। “আজিকে এমন দিনে শুধু পড়ে মনে সেই প্রেম-অভিসার পাগলিনী রাধিকার, জানি সে কবেকার দূর বৃন্দাবনে!” রসে আনন্দে উচ্ছসিত অন্তরে কাগজের পর কাগজ এমনি সব ভাবললিত কবিতায় ভরিয়া তুলিতেছিলাম। আজিকার এই নিবিড় ফিনি, বর্ষার সরস হিল্লোল মল্লিকার বক্ষতটেও বােধ হয় আঘাত করিতেছিল। তাহারও চক্ষে ঘুম ছিল না, সে শয্যার উপর অস্থর হইয়া উঠিয়াছিল। আমার কিন্তু তাহার দিকে মন দিবার অবসর ছিল না। দমকা বাতাস ঘরে ঢুকিয়া প্রদীপ নিবাইয়া আমার কবিতার একখানা কাগজ উড়াইয়া লইয়া গেল, মেঘাবৃত স্নান জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ আলােক ঘরের মধ্যে উপচাইয়া পড়িল ! আলো জ্বলিয়া আলো জ্বলিয়া কবিতার কাগজ কুড়াইয়া আনিব মনে করিতেছি ; মল্লিকা তাড়াতাড়ি উঠিয়া সেখানি কুড়াইয়া অনিয়া আমার সম্মুখে হাত বাড়াইয়া ধরিল। বিবাহের পর এতকাল পরে, আজ মল্লিকার দিকে মুখ তুলিয়া চাহিলাম । একি! এ যে মালতী ! মল্লিকাকে আমি উপেক্ষা করিতেছিলাম বলিয়া যৌবন তাহাকে একটুও উপেক্ষা করে নাই। বরং সে আমার উপেক্ষার অবসর পাইয়াই মল্লিক'র প্রত্যেক অঙ্গ পরিপূর্ণ সৌন্দর্যে সাজাইয়া তুলিয়াছিল। তার উপর একখানি নীলাম্বরী শাড়ীর নিবিড় বেষ্টনে তাহাকে আজিকার মেঘময়ী পূর্ণিমার মতােই মনে হইতেছিল। আজিকার ঘনবর্ষার উতলা আনন্দে তাহারও অন্তরে প্রণয়-নিবেদনের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হইয়া থাকিবে। তাই সে আজ মালতীর পে সাজিয়া একখানি কবির তুচ্ছ কাগজ উপলক্ষ্য করিয়া প্রেমের প্রথম পরিচয় স্থাপনের জন্য আমার প্রাণের কপাটে ভীরুর মতন যে মৃদু আঘাত করিল তাহাতে তাহাকে আর প্রবেশের অধিকার বঞ্চিত রাখিতে পারিলাম না। তাহার অপ্রতিভ মুখখানি দুই হাতে ধরিয়া তাহার অধরপুটে প্রেমের চিহ্ন মুদ্রিত করিয়া উভয়েই দীর্ঘ বিরহের সকল গ্লানি হইতে মুক্ত হইলাম।
চীনদেশে চীনের বিরুদ্ধে পূর্বপশ্চিমের সভ্যতাভিমানী জাতিগণ যখন রণদুন্দুভি পিটিয়া দিয়াছিলেন, তখন ইংরেজ রাজার তরফ হইতে ভারতীয় সৈন্য প্রেরিত হইয়াছিল । তাহাদের আহাৰ্যসংস্থান লইয়া রণভীরু আমাকেও সেই অজ্ঞাত সুদূর দেশে যাইতে হইয়াছিল। কারণ আমি কমিশেরিরেটের বড়বাবু ছিলাম । আমাদের যাইবার সময় বৃদ্ধ পিতামাতার সজল নেত্রের শুভকামনা, তরুণী স্ত্রীর বিরহ-বেদনা, সাংঘাতিক অস্ত্রের সম্ভাষণ ভীতি আমার সঙ্গ লইয়াছিল। গৃহচত্বরের কীট বাঙালীর জীবনে এত 'লাঞ্ছনা সহ্য শুধু এক মুঠা অন্নের জন্যই, দেশের জন্য নয়। সৌভাগ্যের বিষয় রণস্থল হইতে আমাদিগকে দুই ‘তন মাইল তফাতে রাখা হইত। তবুও দেখিতে পাইতাম সন্ধ্যার মলিনিমা উজ্জল করিয়া “ছুটিল একটি গােলা লােহিত বরণ', সে “আলােক পাইয়া লোক পুলকিত মন” হইত না, বরং অস্ত্র-রঃরণিতে কর্ণ বধির হইয়া আসিত এবং হৃং- পিণ্ডের ক্রিয়াটা তখন স্বাভাবিক থাকিত ইহা মিথ্যা গব করিয়াও বলিতে পারি না। একজন চীনা ভদ্রলােককে ইংরেজেরা গােয়েন্দাপে পাইয়াছিলেন। লোকটার নাম লিয়াংফু। তাহাকে প্রথমাবধিই আমার চক্ষুশূল বলিয়া বােধ হইয়াছিল। কেন, কি জানি? হয় তো সে স্বদেশ স্বজাতিদ্রোহী বলিয়া।
৭৫ চীনদেশে লিয়াংফু আমার সঙ্গে মিশিবার জন্য কিন্তু খুব চেষ্টা করিত। প্রশ্ন- পরম্পরায় আমাকে উত্যক্ত করিয়া তুলিত। সে যত আমাকে বিরক্ত করিত, আমার মুখ তত বন্ধ হইয়া যাইত। তখন ভায়ার ছােট ছােট গােল গােল চোখ দুটি বনবিড়ালের চোখের মতাে জ্বলিয়া উঠিয়া আমাদের তাবুতে মধ্যে একটা বড় হলঘর ও দুপাশে দুটা কুঠরী ও ‘বাথরূম’ ছিল। একটা কুঠ রী অধিকার করিয়াছিলাম আমি, অপরটা ছিল লিয়াংফু ভায়ার অধিকারে। লিয়াংফু ভায়া মধ্যে মধ্যে আমার কারায় আসিয়া আমার কাগজপত্র ঘাটিয়া বাংলা শিখিবার জন্য পীড়া- পীড়ি করিয়া বড় উৎপাত করিত। আমি ভায়ার ঘরে কদাচিৎ যাইতাম। হলঘরটিতে আমার আপিস ও আশেপাশে নানাবিধ খাদ্য ও অখাদ্য দ্রব্য ছড়ানো থাকিত। তাবুতে দরজা আঁটি বার জো নাই। পা ফেলাই চরম আবরু । লিয়াংফু ভায়া প্রায় পা ফেলিয়া কি লেখাপড়া করিত। আমি বাঙালী- সুলভ কৌতূহলে মাঝে মাঝে উকি মারিয়া দেখিতাম। ভায়া লেখাপড়া শেষ করিয়া তুলি দিয়া চিত্রিত কতকগুলি পাতলা কাগজ ঘরের উনানের মধ্যে ফেলিয়া দিত এবং একখানা কাগজ চিঠির আকারে ভাজিয়া লইয়া বাহির হইয়া যাইত। আমি দূরে দূরে থাকিয়া তাহার পিছু লইতাম। ভায় বনবিড়ালের মতাে তিন লম্ফে বনান্তরালে অদৃশ্য হইয়া যাইত ; আমি 'অপ্রতিভের মতো পায়ের লতা, কাপড়ের কাটা ছাড়াইতে ছাড়াইতে ও পাথরে ঠোক্কর খাইতে খাইতে কোনােমতে শিবিরে ফিরিয়া আসিতাম। একদিন দেখিলাম লিয়াংফু কি লিখিতে লিখিতে লেখার উপর ব্লটিঃ- কাগজ চাপা দিয়া তাহার উপর মাথা রাখিয়া বড় কান্নাছাই কঁদিতেছে।
যাত্রা-সহচরী ৭১ ; এদিকে হাতের কালীমাখা তুলিট। তাহার কপালে গালে দিব্য চীনা অক্ষর রচনা করিতেছিল ; ভায়ার তখন সেদিকে খেয়াল ছিল না। ক্ষণেক পরে। মসিলিপ্ত কপালে সৈনিকদের বিদ্রুপহাস্য সংগ্রহ করিয়া ভায়া বাহির হইয়া গেল। আমি সেদিন সঙ্গে গেলাম না। ভায়ার কাম্রায় প্রবেশ করিয়া দেখিলাম ব্লটিং-কাগজের শুভ্র কলেবরকে উল্কিচিত্রিত করিয়া বহু চৈন অক্ষর সোজা কাত আড় হইয়া শুইয়া আছে। টেবিলের উপর ভায়ার একখানা ছােট আয়না ছিল । সেটাকে কাত করিয়া ব্লটিং- কাগজের উপর ধরিয়া কাগজখানা ঘুবাইয়া ফিরাইয়া উল্টা অক্ষরের সোজা প্রতিচ্ছায়া হইতে অনেক অক্ষর অনেক অসংলগ্ন কথা বাহির করিয়া ফেলিলাম। মন আহলাদে নৃত্য করিতে লাগিল। অহে! দারুণ বিধাতা, কোথায় আমাকে প্রত্নতত্ত্ব-বিভাগের শিলােংকীর্ণ অদ্ভুত সমস্ত লিপি পাঠ করিতে দিবে, কিংবা কোথায় আমাকে বঙ্গের প্রধান ডিটেটিভের পদ অলঙ্কৃত করিতে দিবে, না আমায় কমিশেরিরেটের বাবু করিয়: চীন- রাজ্যের দারুণ শীত ও বিকট যুদ্ধ সম্ভোগ করিতে পাঠাইয়াছ । ব্লটিং-কাগজ হইতে ‘প্রিয় টিশি’, ‘বসন্তোৎসবের সময়’, ‘কমিশেবিয়েট- বাবুর তাবুতে’, ‘আগুন’, ‘বরু’ প্রভূত কয়েক টি অসম্বদ্ধ কথা মাত্র আবিস্কার করিলাম। ভায়ার চিন্তা প্রণালীর একটা খেই ধরতে পারিলাম না। চীনপ্রবাসে তর্দেশীয় ভাষায় আমার যে অধিকার জন্মিয়া- ছিল তাহাতে অতিকষ্টে বুঝিলাম ‘টিশি’ অর্থে ‘সুন্দরী'। ভায়ার প্রাণেও প্রেম আছে দেখিতেছি; এই প্রেমের পশ্চাতে মস্ত একটা কিও আছে বােধ হয়।
१२ চীনদেশে রুষ্ট রুষ মাঞ্চুরিয়া দখল করে দেখিয়া অন্যান্য বলণ চীনের প্রতি অসীম দয়া প্রকাশ করিয়া শান্তি ঘােষণা করিলেন। বীরগণের অস্ত্র- সম্ভাষণ থামিয়া গিয়াছে। এখন ভীরু আমরা অবাধে প্রায় সব অই বিচরণ করিতে পারি। এখন গৃহে ফিরিবার জন্য প্রাণটা ভারি ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে। আমাদের ছাউনি বুয়েনলুন পর্বতের একটা অধিত্যকার মধ্যে! কী দারুণ শীত ! চারিদিকে শুধু পাথর, গাছপালা জঙ্গল । আমি এখানে একখানা নিঝরিণী দূত’ লিখিয়া ফেলিতে পারিতাম, কিন্তু আশেপাশে সাঙ্গনের খোচা কল্পনা করি। আমার কবিতা-বধূ বঙ্গের নিরাপদ আম্রমুকুলসুরভিত কুঞ্জবনে গিয়া আশ্রয় লইয়াছিল। এদিকে শান্তবাক্য উচ্চারণ হাতে সকলেই খুব নিশ্চিন্ত ও আনন্দিত। সেই সময়ে আমি বাড়ীর পত্রে সংবাদ পাইলাম আমার তরুণী ভার্যা প্লেগকবলিত হইয়াছেন। আমি বৃদ্ধ না হইলেও সে আমার প্রাণেভো- হপি গরীয়সী ছিল। সকলের আনন্দের মধ্যে আমার ক্রন্দনটা অশােন হইবে বলিয়া দরীমুখেচ্ছসিত উৎসমুখে আপাতত পাষাণ চাপা দিয়া রাখিলাম। এপাশ ওপাশ দিয়া জল যে একেবারে উদগলিত হইত না, তাহা বলিতে পারি না। আমি মনকে ব্যাপৃত রাখিবার জন্য পঞ্চামুনি প্রভৃতি দেবমন্দির ও লামা সন্দর্শনে যাইতাম। একদিন বৈকালে বেড়াইতে বাহির হইয়া বহুদূরে গিন্না পড়িয়াছিলাম মন যখন নিজেকে লইয়া ব্যস্ত থাকে তখন অপর ইন্দ্রিয় বা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কতদূর কি করিল তাহার বড় একটা হিসাব রাখে না। সহসা একটা কোলাহল আমার চমক ভাঙিয়া দিল। দেখিলাম, নির্জন হরি প্রান্তর। একটা চীনা রমণী ক্রন্দনরতা এবং কয়েকজন চীনা ও ইউরােপীয় যুদ্ধরত। যুদ্ধাবসানে মৃতাবশিষ্ট কয়েকজন চীনা প্রতিহিংসার লেলিহান, সঙ্গিন-জিহ্বা বিস্তার করিয়া আমার দিকে ; ।
যাত্রা-সহচরী ৭৩ ছুটিয়া আসিতে লাগিল। আমি ঠিক বুঝিতে পারি নাই যে উহারা আমাকেই লক্ষ্য করিয়া বন্দুক উদ্যত করিয়াছে। পশ্চাতে রমণীকণ্ঠে ধ্বনিত হইল, ‘বিদেশী পালাও।' আমি ফিরিলাম, রণী ইস্তসঙ্কেতে তাহার অনুবর্তী হইতে সঙ্কেত কলি। যে দিকটায় দৌড়লাম, সেদিকটায় বড় ঘন বন ; প্রাণের ভয় ব্যতীত সে পথে আমি এক পাও অগ্রসর হইতে পারিতাম । কিছুদূর যাইয়া একখানি কুটীর দেখলাম। রমণী আমাকে তন্মধ্যে প্রবেশ করাইয়া দ্বারের পাশে একখানি পাথরের উপর বসিয়া আশেপাশের লতাগুল্ম হইতে ফুল ছিড়িয়া ছি ডিয়া মাথায় কানে পরিতে লাগিল, আর মিষ্ট গলায় করুণ রাগিণীতে গান ধরিয়া দিল। কিছুক্ষণ পরে একজন চীনা আসিয়া তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল - টিশি, এদিকে একজন বিদেশীকে দেখেছ ? টিশি গান থামাইয়া বলিল—বিদেশী ? কৈ ? ‘তবে সেট। পলাইয়াছে বলিয়া পুরুষট। চলিয়া গেল ! টিশি আবার গান ধরিল। এই কি লিয়াংফু ভায়ার টিশ ? অনেকক্ষণ গৃহে আবদ্ধ রহিলাম। টিশির গান আর থামে না। আমাকে কি ভুলিয়া গেল নাকি? আমি আস্তে আস্তে কাঠের দেয়ালে টোকা দিয়া ডাকিলাম ‘টিশি। টিশি চাপা গলায় শুধু বলল ‘চুপ। আবার গান। খানিক পরে আর একটা লােক আসিয়া টিশির সহিত কি কথাবার্তা কহিতে লাগিল। আমি অখণ্ড মনােযােগ দিয়াও তাহাদের একটা কথাও বুঝিতে পারিলাম না। কপাটের ফাকে চোখ দিয়া অতি কষ্টে দেখিলাম সে স্বয়ং লিয়াংফু ভায়া। ভায়া যাইবার সময় অপেক্ষাকৃত শ্রবণক্ষম উচ্চস্বরে বলিয়া গেল—এই চিঠিতে শেষ উপদেশ দিলাম ; ধরা পড়ার ভয়ে মতলব নিত্য নূতন করিতে হইতেছে।' টিশি কিছু বলিল না।
৭৪ চীনদেশে টিশি গৃহদ্বার রুদ্ধ কলিয়া আমার নিকটে আসিল। আমি ধন্যবাদ জানাইলাম। আমি যে লিয়াংফুকে চিনিতে পারিয়াছি ইহা বলিবার জন্য আমার বাঙালীস্বভাব আকুলিব্যাকুলি করিতে লাগিল। কিন্তু আমি সংবৃত হই টিশকে জিজ্ঞাসা করিলাম—তুমি এখানে একলা থাক ? টিশি ঘাড় নাড়িয়া হাসিয়া বলিল না। আমি এ হাসিটুকু বাঙালী ভাবে অনুবাদ করিয়া বলিলাম—তােমার স্বামী তোমার সঙ্গে থাকেন বুঝি ? টিশি রজকিঙ্কিণির মতাে মধুর হাস্যে মুখর হইয়া বলিল, “আমি কুমারী।' আমি নিজের ভ্রম সংশােধন করিয়া তাড়াতাড়ি বলিলাম, যিনি এখন তােমার সহিত কথা কহিতেছিলেন, তিনি বােধ হয় তােমার প্রণয়ী, ভাবী স্বামী ? 'এবার টিশি আমাকে হাতরঙ্গে প্লাবিত নিমজ্জিত করিয়া দিল । অনেক কষ্টে একটু দম লইয়া বলিল— ‘সে আমার ভাই। হরি হরি। আমার সব রােমান্স মাটি হইয়া গেল? আমি অপ্রতিভ হইয়া প্রসঙ্গ চাপা দিবার জন্য বলিলাম- ‘টিশি, আমি তবে যাই। যতদিন বাঁচিব এই বুনবাসিনী টিশির পদ- প্রান্তে আমার কৃতজ্ঞতা-বঁচিয়া নিজেকে ব্যক্ত করিবার অবকাশ পাইয়াছে বলিয়াই-লুষ্ঠিত হইবে? টি শি বড় গম্ভীর হইয়া পড়িল। টিশি সকল অবস্থাতেই বড় মনােরম ; তাহার নাম' অর্থ হইয়াছে। টিশি বলিল—আজ তােমাকে চাইয়াছি, কাল হয় তাে আমিই তােমার মৃত্যু ঘটাইব। যতদিন না দেশে ফিরিয়া যাও আমায় কৃতজ্ঞতা জানাইয়ো না। টিশির প্রত্যেক কথায় এমন একটা মােহিনী ছিল যে আমি তাহার মাদকতায় বিহ্বল হইয়া পড়িলাম। আমি বলিলাম, “টিশি, তােমার মতাে কোমলহৃা কখনাে কাহারাে মৃত্যুর কারণ হইতে পারে না। গম্ভীরা টিশি এবার হাসিল। টিশি বলিল, ‘মৃত্যুর কারণ হইতে পারি কি না এখন সে তর্ক করিবার সময় নাই। ৫ যাত্রা-সহচরী ৭৫ চল তােমার জীবন লইয়া দেশে ফিরিবার ইচ্ছা থাকিলে বসন্তোৎসবের রাত্রে তুমি শিবিরে থাকিও না। আমি বললাম, কেন টিশি? টিশি আবার গম্ভীর হইয়া বলিল, ‘আমি ঐটুকু বলিয়াই আমার অধিকার- বহিভূত ও কত ব্যবিরুদ্ধ কার্য করিয়াছি। আর কিছু বলিব না। তােমায় বনের বাহিরে রাখিয়া আসি। শিবিরে ফিরিয়া সে রাত্রে আর ঘুম হইল না। নানা নানা অদ্ভুত জটিল অসংলগ্ন চিন্তায় রাত্রি কাটিয়া গেল। আমার প্রত্নতাত্ত্বিকগব খব হইয়া গেল। লিয়াংফু ভায়াকে অধিকতর রহস্যাবৃত বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। এখন কি কতব্য? আমাদের কাপেন সাহেবকে বলিব ? হাতে যদি আমার প্রাণদাত্রী টিশির কোনাে বিপদ হয় ? তাহার নাম বাদ দিয়া বলিলেও যদি ঘটনাসূত্রে সেও জড়িত হইয়া পড়ে ?, মহা বিপদ! টিশি উৎসবের রাত্রে বাহিরে থাকিতে বলিয়াছে। সেই রাতেই কোনো বিপদের সম্ভাবনা। দূর হােক, যাহা হইবার হইবে; শােক ক্লান্ত মনে আর ভাবিতে পারি না। উৎসবের দিন আসিল। সন্ধ্যা হইয়া গেল। আটটা বাজিল। কোনই সূত্র বাহির করিতে পারিলাম না। আর নিশ্চিন্ত থাকা উচিত নয়। অবশেষে কাপ্তেন সাহেবকে খবর দেওয়াই দেওয়াই ঠিক করিলাম। চিন্তা হইতে অবসর লইয়া যেমন মুখ তুললাম, সম্মুখে, একজন চীনাকে দেখিয়া চমকিত হইয়া উঠিলাম। পরে তাহাকে আমার ভায়া নিয়াংফু মনে করিয়া উপেক্ষাভরে বাহিরে চলিলাম। চীনা বলিল— ‘বিদেশী, তুমি শিবির ছাড়িয়া যাও নাই ? এমন মিষ্টস্বর ভায়ার চৌদ্দ পুরুষে কাহারও ছিল না। এ স্বর টিশির। টিশির পরিচ্ছদ পুরুষের ;
৭৬ চীনদেশে সে জননী হাতে ল গুড়ের মতো কি একটা ছিল। টিশিকে এস্থলে দেখিয়া আমি বিস্মিত হইলাম । জিজ্ঞাসা করিলাম, টিশি, তুমি এখানে কেমন করিয়া আসিলে? ‘লিয়াংফু আমার ভাই। সে তােমাদের গােয়েন্দা নহে; জন্মভূমির লাঞ্ছনার প্রতিশােধ হইবার জন্য ছদ্মপে তােমাদের সঙ্গ লইয়াছে। সেই তাহার ঘােড়র পেটের সঙ্গে আমায় বাঁধিয়া লইয়া সন্ধ্যার পর শিবিরে আনিয়াছে। সকল ক্ষিই আজ উৎসবে উন্মত্ত, দ্বিধাশূন্য, আমাদের আসিতে কোনো কষ্ট হয় নাই। ‘তুমি এখানে কেন আসিয়াছ?' ‘সকল অত্যাচারীকে ধ্বংস করিতে। আমি বিস্ফারিত লোচনে জিজ্ঞাসা করিলাম--‘মাত্র তােমরা দুটিতে এই বিপুল সৈন্য কিপে ধ্বংস করিবে ? টিশি এক্ষণে একটু হাসিল। বলিল,-“লিয়াংফু নিজের কামরার নীচে বারুদের ক্যানেস্ত্রা ও ডিনামাইট পুতিয়া রাখিয়াছে। আজ সন্ধ্যার সময় প্রত্যেক তাবুর কানাতের ধারে ধারে বারুদ ছড়াইয়া দিয়াছে। শিবিরের সর্বত্র তার অবাধ গতি ; সে আমাকে এই তাবুতে রাখিয়া অপর দিকে আগুন দিতে গিয়াছে। আমার হাতে এই দেখতেছ মশান। দেখিতে দেখিতে দিয়াশলাই জ্বলিয়া মশালকে চুম্বন করিল, মশাল মরণের জিহ্বা মেলিয়া লকলক করিয়া জ্বলিয়া উঠিল। আমার বাঙালীরক্ত একেবারে হিম হইয়া গেল আমি রুদ্ধকণ্ঠে কহিলাম,- ‘তুমি ডিনামাইটে আগুন দিলে তুমি সুদ্ধ মারা পড়িবে যে ! টিশি হাসিয়া বলিল, তাহাতে কি? আমার মৃত্যুতে কাহারও ক্ষতি নাই ; আমার মৃত্যুতে দেশের লাভ। তোমরা ইহা বলিতে পারিবে। । তােমাদের কৌলিকক্রিয়া পলায়নের শরণাপন্ন হও, আমার আগুন - দিবার সময় হইয়াছে।
যাত্রা-সহচরী ৭৭ আমি তাহার উদ্যত হস্ত চাপিয়া ধরিয়া বলিলাম, ‘সর্বনাশ! কর কি ? আমি তাহার হাত হইতে মশালটা . কাড়িয়া লইবার চেষ্টা করিলাম। টিশি তাহার কটিবন্ধে ছােরা ও রিভলভার দেখাইয়া বলিল, ‘দেখিতেছ! ছােরা নিঃশব্দে তােমার রক্ত পান করিবে। আমি হাসিয়া বলিলাম, তুমি যদি তাহা পারিতে 'তবে বাক্যের পূবেই কার্য হইয়া যাইত। তুমি পারিবে না বলিয়াই তাে আমার এত সাহস। তাহার হাত হইতে জ্বলন্ত মশালটা কাড়িয়া লইয়া ভালাে করিয়া নিবাইয়া দিলাম। ফেলিয়া দিতে সাহস হইল না, কোথায় কোন্ বারুদকণার সাক্ষাৎ পাইয়া কি অনর্থ ঘাইবে ! টিশির কোমর হইতে ছােরা ও পিস্তল খুলিয়া লইলাম। আমি বুঝিলাম টিশ আমায় ভালো- বাসিয়া ফেলিয়াছে ! ভগবান্ আমার চেহারাটা কালীঘাট বা আর্ট ডিয়ার আদর্শে বিদ্রুপের তুলিতে অঙ্কিত করেন নাই, টিশি তাহাতেই মুগ্ধ হইয়া হার মানিয়াছে ইহা মনে করিয়া একটু গবনুভব করিলাম, ভগবানের কৃপায় যে রক্ষা পাইয়াছি ইহা কিছুতেই তখন মনে পড়িল না। টিশি কঁাদিয়া ফেলিল। বড় অভিমানের স্বরে পাতলা ঠোঁট দুখানি উন্টাইয়া উল্টাইয়া বলিল,-“তােমার প্রাণরক্ষা করিয়াছিলাম, আজ বেশ ঋণশােধ করিলে। লিয়াংফু যখন জানিবে আমি অগ্নিসংযােগ করি নাই, মূঢ়া নারীর দুর্বলতায় একজন বিদেশীর নিকট পরাজিত হইয়াছি, তখন আমার মৃত্যু নিশ্চিত। কিন্তু সে মুত্যু শ্লাঘ্য নহে। আমি বলিলাম, তােমার কোনও বিপদ ঘটিত দিব না, তুমি নিশ্চিন্ত থাক। ঘরে একটা দামামা ছিল। তাহাতে ঘা দিয়া বিপদ ঘােষণ করিয়া ৭৮ চীনদেশে দিলাম। মুহূত-মধ্যে সমস্ত শিবি সজাগ হইয়া উঠিল। আমি তখনাে টিশির হাত বড় স্নেহের সহিত ধরিয়া ছিলাম। সে বলিল—ও কি, তুমি বিপদসঙ্কেত করিলে, আমায় ছাড়িয়া দাও; মরি তো ভায়ের হাতেই মরিব, শত্রুর হাতে নহে। আমি হাসিয়া বলিলাম, ‘মারবার জন্য অত ব্যস্ত কেন ? আমি তােমায় মরিতে দিব না। কাপ্তেন সাহেব দৌড়াইতে দৌড়াইতে আমার ঘরে আসিয়া পাইতে হাঁপাইতে বলিলেন, ‘বাবু, ব্যাপার কি ? আমি সেলাম করিয়া বলিলাম, ‘গুরুতরু। চীনারা আজ শিবিরে আগুন দিবে। সর্বত্র বারুদ ও 'ডিনামাইট ছড়ান আছে। একবার আগুন লাগিলে সর্বনাশ হইবে। সাহেব ছুটিয়া চলিয়া গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে বাহিরে আগুন আগুন শব্দ নৈশগগন পূর্ণ করিয়া ফেলিল। আমি ও টিশ নিৰ্বাক্ নিস্পন্দ । ঘণ্টাখানেক পরে সাহেব ফিরিয়া আসিয়া আমার কৱক করিয়া বলিলেন, ‘বাবু, আজ বড় উপকার করিয়াছ। মােটে চার পাঁচ তাবু আর বিশ পচিশজন লােক নষ্ট হইয়াছে। আর একটু গৌণ হইলে কি অনৎপাই না হইত। আমি বলিলাম—‘সাহেব আমাদের কৃতজ্ঞতা এই রমণীর প্রাপ্য। ইনি সংবাদ না দিলে আমি কিছুই জানিতাম না। তৎপরে টিশিকে বাঁচাইয়া সমস্ত ঘটনা সাহেবকে বলিলাম। সাহেব বড় খুশি।' বলিলেন-~- ‘বাবু, এবার কলিকাতায় গিয়া যাহাতে তুমি ডিটেকটিভ বিভাগে বড় কাজ পাও আমি তাহাই করিব। আমি হর্ষগদগদ হইয়া সেলাম করিলাম। আমি বলিলাম—‘সাহেব, আমাদের রক্ষাকর্তীতাহার স্বদেশীর কাছে ফিরিয়া যাইতে তো পারেন না।
যাত্রা সহচরী
৭৯
সাহেব সােৎসাহে বলিলেন--“না না, তা কি কখনও হয়। আমি
উহাকে কলিকাতায় লইয়া গিয়া মাসহারা বন্দোবস্ত করিয়া দিব। উনি
স্বাধীন ভাবে থাকিবেন।
আমি সেলাম করিয়া কহিলাম, ইহাকে আমাকে বক্শিশ করুন।
সাহেব হাসিয়া বলিলেন, ‘কেন? তুমি ইহাকে লইয়া কি করিবে ?
তােমরা হিন্দু, ভিন্ন জাতির সংস্পর্শ তো তােমাদের নিষিদ্ধ।
আমি বলিলাম—‘সাহেব, আমাদের যদি সেই ভাবই থাকিত তবে
এই চীনা মুলুকে তােমাদের গােমাংসের সবরাহ করিতে আসিতাম
আমি সম্প্রতি বিপত্নীক হইয়াছি, আমি ইহাকে বিবাহ
সাহেব খুব হাসিলেন। টিশি লজ্জায় মুখ নত করিল। আনন্দে
আমার চিত্ত ভরিয়া গেল। এবং আমার রুচি দেখিয় পাঠকের নাসিকা
নিশ্চয় কৃঞ্চিত হইয়া উঠিল।
স্নেহ-রহস্য কুমুদ-বাবু হাজারিবাগ হইতে তিন ক্রোশ দূরে একটি ক্ষুদ্র গ্রামে বাস করিয়া অভ্রের কারবার করিতেন। কুমুদ-বাবুর পাঁচ কন্যার পর একটি পুত্র হইয়াছে ; সুতরাং পুত্রটি বড় আদরের, বাপ-মা’র নয়নের মণি, দিনিদের অঞ্চলের নিধি। ফ! ন মাসের শেষে সেই গ্রামে গ্লেগ দেখা দিল। ছােট্ট একটু গ্রাম-হাহাকারে ভরিয়া উঠিল। কুমুদ-বাবু সপরিবারে শহরে পলায়ন করা যুক্তিসঙ্গত স্থির করিয়া আয়ােজন করিতে লাগিলেন ; যান, বাহন সকলই দুষ্প্রাপ্য, সকলের গৃহেই মৃত্যুর হাহাকার, গ্রামে গাড়ী মিলি না, পার্শ্ববর্তী গ্রামের কেহ ভয়ে সেই গ্রামে আসিতে চাহিল না। অবশেষে কুমুদ-ববুর একটি কন্যার প্লেগের লক্ষণ দেখা দিল। কুমুদ বাবু তৎক্ষণাৎ হাজারিবাগে ডাক্তার ডাকিতে চলিয়া গেলেন। বহু অর্থ-ব্যয়ে একজন ডাক্তার লইয়া আসিলেন। ডাক্তার রােগী দেখি। ঔষধ দিয়া চলিয়া গেলেন। এই সুদূর পল্লীতে দরিদ্র কুমুদ-বাবুর কন্যার যথােচিত চিকিৎসা হইতে পারিল না। অবস্থা ক্রমেই খারাপ হইয়া পড়িতে লাগিল। কখন কি হয় ভয়ে ভয়ে দিন যাইতেছে, বিকাল বেলা খােকারও জ্বর হইল। কুমুদ বাবু ও তাহার স্ত্রী ভীত হইয়া ডাক্তার ছাকিতে লোক পাঠাইলেন। রাত্রে কন্যাটির মৃত্যু হইল এবং খােকারও প্লেগ-লক্ষণ স্পষ্ট হইয়া উঠিল ।
যাত্রা-সহচরী ৮১ পাছে থােকা ভীত হয় এই ভয়ে উচ্ছ্বসিত শােক রুদ্ধ রাখিয়া পিতা কন্যার সৎকার করিতে গেলেন এবং জননী পুত্রকে বুকে করিয়া বসিয়া পুত্রকে লুকাইয়া লুকাইয়া নীরবে অশ্রু মার্জনা করিতে লাগিলেন। সমস্ত রাত্রি উৎকণ্ঠায় ও ডাক্তারের প্রতীক্ষায় কাটিয়া গেল—ডাক্তার আসিলেন না। তখন অনেক কষ্টে চতুগুণ ভাড়ায় একখানি ডুলি সংগ্রহ করিয়া কুমুদ-বাবু রুগ্ন পুত্রকে শহরের হাসপাতালে লইয়া চলিলেন। কুমুদ-বাবু কুমুদ বাবুর স্ত্রী ও কন্যাগণ পদব্রজেই চলিলেন। অনেক বেলায় তঁাহারা হাসপাতালে গিয়া পৌছিলেন। তাহাদের ভাগ্যক্রমে হঁাসপাতালের একটা ঘর খালি ছিল, তাহারা সেই ঘরটা ভাড়া লইয়া রহিলেন ; ডাক্তার আসি রােগী দেখিয়া ঔষধের ব্যবস্থা করলেন। কুমুদ বাবু বলিলেন—“ডাক্তারবাবু, সবে মাত্র কাল রাত্রে আমরা একটি কন্যা হারিয়ে আজ আপনার আশ্রয়ে এসে পড়েছি ; আপনি আমাদের রক্ষা করুন।” ডাক্তার বাবু কেবলমাত্র ভদ্রতার খাতিরে “কোনও ভয় নেই আপনাদের,” বলিয়া নিতান্ত উদাসীনভাবে চলিয়া গেলেন। হাসপাতালের ডাক্তার নিত্য নিত্য অসংখ্য রােগীর আতনা, রোগীর আত্মীয়দের বুক ভাঙা দীর্ঘনিশ্বাস, মর্মন্তুদ মৃত্যু দেখিতে দেখিতে অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন ; কাহারাে ক্লেশ, কাহারাে অনুনয় আর মর্ম স্পর্শ করতে পারে না। পরের কষ্ট, অন্যের মৃত্যু যাহার ব্যবসায়ের বিষয়, সে তাহাতে ক্রমশঃ অভ্যস্ত হইয়া আপনার ব্যবসায়টাকেই মুখ্য, করিয়া তােলে, পরের পীড়া তাহার নিকট গৌণ ও নগণ্য হইয়া উঠে। এইজন্য কুমুদ-বাবুর কাকুতি এই ডাক্তার-বাবুর কাছে অসাধারণ মনে হইল না, ডাক্তারবাবু অপর দশজন রােগীর সঙ্গে পর্যক্রমে বুমুদ- বাবুর পুত্রকেও পরম নিশ্চিন্ত মনে দেখিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। এই ৮২ স্নেহ:হস্য এমন যে একটি পরিবার সবেমাত্র কাল রাত্রে একটি স্নেহপুত্তলিকে বিসর্জন দিয়া আজ আর একটির প্রাণ তঁাহার হাতে সঁপিয়া দিয়াছে, সেজন্য যে একটা উদ্বেগ বা ব্যগ্রতা নরচিত্তে জাগিয়া উঠা উচিত তাহা ডাক্তারের সুপ্ত- অনুভূতি-চিত্তে কৈ দেখা গেল না। কুমুদ বাবুর স্ত্রী স্বামীকে বলিলেন-“ডাক্তার শুধু হাতে কখনাে আমার ছেলেকে দেখবে না, তাকে রােজ রীতিমত দর্শনী দিয়ে। যাও, ডাক্তারকে একবার ডেকে নিয়ে এস।” ডাক্তার বাবু নিজের বাংলার সম্মুখের ফুল-বাগানের মধ্যে শান বাঁধানো চোতারার উপর আরাম-চৌকীতে কাত হইয়া সমবেত বন্ধুজনের সঙ্গে শীঘ্র শীত কমিয়া যাওয়াই প্লেগের কারণ, কাবুলের আমিরের ভারত ভ্রমণ ইত্যাদি বহু বিষয়ের আলােচনা করিতেছিলেন। সময়ে কুমুদ বাবু সেই স্থানে আসিয়া নমস্কার করিয়া দাঁড়াইলেন। ডাক্তারবাবু অবােলার নল ওষ্ঠে চাপিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি ?” কুমুদ-বাবু বলিলেন, “খােকা বড় ছটফট করছে, আপনি একবার অনুগ্রহ করে এসে যদি দেখেন ?” ডাক্তারবাবু গম্ভীর ভাবে বলিলেন, “এখন রােগী দেখা আমার duty নয়, আপনি রেসিডেন্ট, এপথিকারীকে বলুন গে।” তখন কুমুদ-বাবু কাতর মিনতির স্বরে বলিলেন, “ডাক্তার-বাবু, আমাদের একটিমাত্র ছেলে, তাকে আপনি বাঁচান।” ডাক্তারবাবু মুচকি হাসিয়া বলিলেন, “আমারও একটিমাত্র প্রাণ, তাকে আপনি একটু বিশ্রাম নিতে দিন।” তখন কুমুদ বাবু চাদরে অশ্রু মুছিয়া বলিলেন, “আমি আপনাকে অনি ডাকছি নে ; আপনাকে পূরাে দর্শনী দেবো--যতবার আপনি দেখবেন, ততবারই দেবো, আপনি শুধু একটু দয়া করে দেখবেন আসুন।” , যাত্রা-সহচরী ডাক্তার-বাবু তখন একটু গম্ভীর হইয়া বলিলেন, “আমার দর্শনী দিনে দুটাকা, সন্ধ্যার পর চার টাকা, তা জানেন তাে ?” কুমুদ-বাবু বলিলেন, “আমরা আপনাকে তাই দেবো, আপনি আমাদের খােকাকে বাঁচিয়ে দিন্।” ডাক্তারবাবু আবােলার নল অন্য বন্ধুর হাতে দিয়া বলিলেন, “তােমরা পালিয়ো না যেন, আমি এই এলুম বলে।” তারপর কুমুদ- বাবুকে বলিলেন, “চলুন। ডাক্তার আসিয়া দেখিলেন, খােক অত্যন্ত ছটফট করিতেছে, আর তাহার জননী ও ভগ্নী ব্যাকুল হইয়া, আপনাদের সকল স্নেহ সকল যত্ন সকল স্বাস্থ্য যেন ঢালিয়া দিয়া তাহাকে সান্ত্বনা দিতে চাহিতেছে। সেই স্তিমিত-প্রদীপ ঘরে মুতুর অবস্থায় যেন রােগীটিকে পরিবেষ্টন করিয়া ধরিয়াছে! প্লেগের রোগী, বঁচবার আশা অল্প, ডাক্তার আলগোছে রােগীকে পরীক্ষা করিলেন। দেখিলেন, শিশুটির বয়স চার পাঁচ বৎসর, মুখখানি রােগ-স্ত্রণায় ম্লান হইলেও তাহার লাবণ্য নষ্ট হয় নাই। হঠাৎ তাহার মনে পড়িল, তাহারও গৃহে এমনি একটি শিশু আছে। কুমুদ-বাবুর স্ত্রী ডাক্তারের সহিত কথা কহিয়া বলিলেন, “ডাক্তারবাবু, আমার এই বই আর নেই। ডাক্তারের ও মনে পড়িল, তাহারও একটি বই পুত্র নাই। ডাক্তার কাগজ কলম লইয়া প্ৰেকৃপস লিখিতে প্রবৃত্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “খােকার নাম কি ?” কুমুদবাবুর স্ত্রী বলিলেন, “অসিতকুমার।” ডাক্তারবাবু চমকিয়া উঠিয়া আবার শিশুর মুখের দিকে চাহিলেন। ব্যাকুল মাতৃচক্ষু ডাক্তারের ভাববৈলক্ষণ্য লক্ষ্য করিল। অমঙ্গল-আশঙ্কায় ব্যাকুল হইয়া কুমুদ-বাবুর স্ত্রী জিজ্ঞাসা করিলেন, “ডাক্তার বাবু, আপনি অমন করে চমকে উঠলেন কেন? আমার খােক। ভাল হবে তত ?” ডাক্তার বলিলেন, “আমারও এমনি একটি ছেলে আছে, তারও নাম অসিতকুমার।
৮৪ যাত্রা সহচরী আর কোনও কথা হইল না। হইল না। ডাক্তার ঔষধের ব্যবস্থা করিয়া গমনোদ্যত হইলে কুমুদ বাবু চারিটি টাকা তঁাহার হাতে দিতে গেলেন। বলিলেন, “আপনাকে টাকা দিতে হবে না।” ডাক্তার কিছুতেই টাকা লইলেন না। তখন হইতে ডাক্তার অবসর পাইলেই অসিতকে দেখিয়া ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করিয়া প্রাণপণে তাহার চিকিৎসা করিতে লাগিলেন। প্লেগের রােগী বলিয়া আর ভয়, রহিল না। রাত্রে ঘুমাইতে ঘুমাইতে হঠাৎ বিছানায় উঠিয়া বসিয়া বলিতেন, “যাই, ছেলেটাকে দেখে আসি।” যে ডাক্তার পরের বেদনা অক্লেশে দেখিতে অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল, আজ তাহাকে আপনার পুত্রের স্নেহ-স্মৃতি কতব্যে উদ্বোধিত করিয়া দিল, তাহার সুপ্ত পৱক্লেশানুভূতি জাগ্রত করিয়া দিল, তাহার নষ্ট মনুষ্যত্ব পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করিল। আজ একটু চেহারার আদল, একটি নামসাদৃশ্য উপলক্ষ্য করিয়া নিখিল জগতের শিশুর মধ্যে পুত্রস্নেহ বণ্টন হইয়া গেল।
খুনে শহরের বাহিরে জেলখানার হাতায় জেল দারােগার বাসার খিড়কির বাগানে এক লাটি খেলা করিতেছিল জেল-দারােগার সাত বছরের ছোট্ট মেয়ে মিনু। একটা গােল পাথর পায়ের ঠেলায় ফুটবলের মতন বাগান- ময় গড়াইয়া লইয়া বেড়ানোই তার খেলা। জেলখানার মতো খিড়কির বাগানও উচু দেয়ালে ঘেরা। কিন্তু এক দেয়ালে আটক আছে কত লোকের স্বাধীনতা, কত লােকের নিরানন্দ পাপের বােঝা ; আর এ দেয়ালের অন্তরালে আছে শুধু ফুলের হাসি, সবুজ রঙের চোখজুড়ানাে বাহার, প্রজাপতির স্বাধীন নাচ, আর মিনুর সরল পবিত্র আনন্দ। মিনু খেলা করিতে করিতে শুনিল হঠাৎ কিসের শব্দ। চাহিয়া দেখিল একটা লােক খাটো জাঙিয়া ও ঢিলা কুতি পরা, গলায় পদক আঁটা, শিকারী বেরালের মতো ওত পাতিয়া কুঁজো হইয়া বাগানের ভিতর উঁকি মারিয়া দেখিতেছ। সে লােকটা এদিক ওদিক চাহিয়া যখন দেখিল সেখানে একটি ছােট্ট মেয়ে ছাড়া আর কেহ নাই, তখন সে ফস করিয়া বাগানে ঢু কয় পড়িল, আর ঢুকিয়াই তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করিয়া ভিতরদিকের খিল লাগাইয়া দিল। তখন সে সােজ। সটান হইয়া দাড়াইয়া হাঁপ ছাড়িল—সে নিশ্বাস আরামের, সে নিশ্বাস মুক্তির।
৮৬ খুনে মিনু আজন্ম কয়েদিদের সঙ্গে পরিচিত, তার একটুও ভয় হইল না। অনেকের সঙ্গে তাে তার খুব ভাব ভালােবাসা। এ লােকটাকে সে কিন্তু কখনাে দেখে নাই, কাজেই এর সঙ্গে আলাপও ছিল না। মিনি লােকটার দিকে চাহিয়া দেখিল—লােকটা বেয়াড়া লম্বা চৌড়া প্রকাণ্ড। হাতের থাবাগুলাে গুলতােল লােহার হাতলের মতে, মুখখানা চৌকো কঠিন অস্থিময়, চোখদুটো ছােট ছােট, বেরালের মতাে ভীষণ আর ধূর্ত। তাহাকে দেখিয়া মিনুর তত ভালাে লাগিল না। লােকটা পিজরাভাঙা হিংস্র পশুর মতাে' একবার খুব আড়ামােড়া ভাঙিল ; একবার মুক্তির সম্ভাবনায় দাত বাহির করিয়া হাসিল, তারপর মিনুর দিকে কটমট করিয়া চাহিয়া, অগ্রসর হইতে লাগিল। মিনুর আর তাহার দিকে নজর ছিল না। সে একবার তাহাকে দেখিয়া লইয়া আপনার খেলা শুরু করিয়াছিল। সে পাথর ঠেলতে ঠেলিতে টলমল করিয়া হেলিতে দুলিতে আসিতেছিল-সে দেখে নাই যে লােকট। তাহার কাছে আসিয়াছে। সে পাথরে ধাক্কা দিতে গিয়া টলিয়া পড়িতেছিল কিছু ধরিবার জন্য হাত বাড়াইয়া দেখিল সেই লােকটা দাড়াইয়া আছে, সে তখন অসঙ্কোচে তাহার কুত। ধরিয়া পতন সামলাইয়া লইল। লােকটা অমনি প্রকাণ্ড ঐতিকলের মতন হাত দুখানা মিনুর গলার দিকে বাড়াইয়া দিল। মিনু তার সরল চোখদুটি তাহার মুখের দিকে তুলিয়া আদরের স্বরে বলিল-তুমি সরে যাও। আমার পাথর ছিটকে গিয়ে তােমায় যদি লাগে । সরল বালিকার সােহাগবাণী তাহাকে যেন বাধা দিল। লােকটা হাত গুটাইয়া মিনুর নিকট হইতে সরিয়া গেল। *. ।
যাত্রা সহচরী ৮৭ ০ , মিনু লােকটার দিকে ফিরিয়া বলিল—ওগো এস না, আমরা দুজনে খেলি। তুমি হও ভাই মালী, আমি বাবু। এই বলিয়া সে ছুটিয়া গিয়া একখানা কোদাল আনিয়া লােকটার কাছে বাড়াইয়া ধরিল। লােকটা কোদাল লইতে ইতস্ততঃ করিতেছে দেখিয়া মিনু বলিল—নেও, তুমি কোদাল নেও—এস আমরা খেলি। কোদালের চচকে ধার দেখিয়া লােকটার গােল চোখ দুটা জলয়া উঠিল, চোখের পাতা মিটমিট করিল। সে আবার তখনি কেমন সঙ্কুচিত হইয়া কর্কশ কণ্ঠে বলল-না না, আমার ও চাইনে ! আমায় ও দিন ! মিনু কোদাল ফেলিয়া ঠোট ফুলাইয়া বলিল—না তুমি বড় দুষ্ট ! ঘিষ্ট, নানকুয়া, ওরা বেশ ! আমার সঙ্গে খেলা করে, বাবার কাজ করে। তুমিও এস। তুমি মাটী খুঁডবে না? তবে জল তােল, ডালের জল নালায় ঢেলে দাও, আমি তাতে নৌকো ভাসাব। এস— মিনু, কয়েদির কুত ধরিয়া টানিতে টানিতে কূপের ধারে লইয়া গেল। সেও যেন কোনও প্রবল টানে অসহায়ের মতাে একটি বালিকার আকর্ষণ মানিয়া চলিল। মিনু কূপের পাড়ে ঝুকিয়া পড়িয়া বলিল-দেখ দেখ, জলে আমার ছায়া পড়েছে ! আমি তােমায় দেখতে পাচ্ছি, তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ ? ওকি ! তােমার চোখ দুটো অমন কটমটে কেন? না, তুমি অমন করে চেয়াে না, আমার ভয় করে। এই কাতর কথাগুলি লােকটার কঠিন হৃদয়ে যেন ঘা দিল। প্রসারিত হাত দুখানা বুকের উপর মুষ্টিবদ্ধ করিয়া চাপিয়া ধরিয়া প্রণপণ বলে চোখ বুজিয়া অতি মিনতির স্বরে বলিল-ওরে অবােধ, তুই ঝুঁকিনে, চুয়াের কাছে আমায় ডাকিনে। ওসব দেখলে আমার গায়ে মরণের জ্বর আসে, আমার মাথায় খুন চাপে! সে ৮৮ খুনে মিনু সােজা হইয়া দাঁড়াইয়া অতবড় লােকটার ভয়কাতর ভাবভঙ্গি দেখিয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিল—দূর বােকা, তােমার ভয় কি, তুমি থাক্তে আমি পড় ব কেন ? সে লােকটা যেই দেখিল মিনু সােজা হইয়া দাঁড়াইয়াছে, অমনি তাহাকে এক ধাক্কায় কূপের ধার হইতে সরাইয়া দিল। তাহার রূঢ় ধাক্কায় মিনুর ভৎসনা ভরা দৃষ্টি অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। মিনু ক্রন্দনকম্পিত কণ্ঠে বলিল—যাও, তুমি ভারি দুষ্ট ! তুমি আমায় মারলে? লােকটা পঁাড়াইয়া দাড়াইয়া তাহার অভিমানের কান্না দেখিল। তাহার সকল কঠোরতাই যেন গলিয়া গলিয়া বালিকার অশ্রুপে তাহার প্রাণকে ধৌত নির্মল করিয়া দিতেছে। তাহার কণ্ঠ এবার কোমল হইয়া পড়িল, সে বলিল—নে নে, আর কাদিনে। তুই আমায় অমন ক'রে কোদাল দেখিয়ে, কূপ দেখিয়ে ক্ষেপানে, আমিও কিছু বলব না। চুপ কর, চুপ কর ! এই সান্ত্বনায় প্রীত হইয়া মিনু অশ্রুজলের ভিতর দিয়াই হাসিয়া উঠিল। বলিল—তবে আমায় একটা গােলাপ তুলে দেও। ছােট ছােট ঝােপ-গাছে টকটকে লাল গােলাপ ফুল গুচ্ছে গুচ্ছ ফুটিয়া ছিল। লােকটি বাধ্য শিশুর মতাে এক থােলাে বুড়ি ও ফুটন্ত গােলাপ তুলিয়া মিনুর হাতে দিল। মিনু সেই ফুলের তােড়াটি বুকের উপর জামার গায়ে গুজিয়া দিল ; মিনু হাসিয়া হাততালি দিয়া বলিল -দেখ দেখ কেমন সুন্দর! লােকটার মুখ পাঙাশ বিবর্ণ হইয়া গেল। সে ডােঙার মতো বড় দুখানা হাতে প্রকাণ্ড মুখ ঢাকিয়া আহত পশুর মতো কাপিতে কাপিতে বলিয়া উঠিল—ওরে ওরে তোর বুকের ওপর মতাে লাল-খুন ! খুন!
যাত্রা-সহচরী ফ্যাল, ফ্যাল, টেনে ফ্যাল, আমায় আর লােভ দেখিয়ে ক্ষেপানে। মিনু ভয় পাইয়া ফুলগুলি খুলিয়া ফেলিল। আবার তাহার চক্ষু অশ্রুসজল হইয়া উঠিল। লােকটা চোখ খুলিয়া বলিল—ছি ! তুই আবাব কাদচিস। চুপ কর, চুপ কর। আমায় তুই ক্ষেপানে, আমিও তােকে কঁাদাব না। সে তার হাতুড়ির মতন হাতখানা দিয়া মিনুর অশ্রু মুছাইয়া তাহার গালে টোকা মারিয়া আদর করিল । সে নত হইয়া মিনুকে চুমু খাইতে যাইতেছিল, এমন সময় * বাহিরে বাহিরে অনেক লােকের ব্যস্ত কোলাহল, দৌড়াদৌড়ি শুনা গেল । ছিলা ছেড়া ধনুকের মতন লােকটা তড়াক করিয়া সােজা হইয়া উঠিল । তারপর একলাফে বাগানের এক কোণে গিয়া লুক্কায়িত হইল। বাহির হইতে কে কপাটে ঘা দিয়া ব্যগ্র স্বরে জিজ্ঞাসা করিল --মিনু মিনু, তুই কোথায় ? -বাবা, আমি এখানে । -খােল খােল, দরজা খােল ? -দরজায় যে খিল দেওয়া। -আরে খিলই খােল মা। —খিল যে উচুতে, আমি নাগাল পাই না। -তবে দিলি কেমন করে ? -আমি দিয়েছি বুঝি—খিল তাে ও দিলে। বাহির হইতে ভীতকণ্ঠে প্রশ্ন হইল—ও কে রে ? মিনু বলিল—ও একজন কয়েদি, আমি ওর নাম জানিনে। বাগানের কোণ হইতে একটা দুঃখবিরক্তি-মিশ্রিত হতাশার শব্দ খুনে তরল মিনুর কানে গেল। ফিরিয়া দেখিল কয়েদি সামনের দিকে হেলিয়া গুতাইতে উদ্যত গােরুর ভঙ্গিতে কোদাল উচাইয়া দাড়াইয়া আছে । মিনু তাহার সেই ভাব দেখিয়া ব্যস্ত হইয়া বলিয়া উঠিল—না না, তুমি অমন ক'রে থেকো না—ওগো তুমি আবার ক্ষেপে উঠলে কেন? কোদাল ফেলে দাও! এতক্ষণে বাহির হইতে দরজা ভাঙিবার জন্য খুব চেষ্টা হইতেছিল। মিনু ছুটিয়া কয়েদির কাছে গিয়া তাহার কোত। ধরিয়া টানিতে টানিতে বলিল—এস লক্ষ্মী, দরজা খুলে দেও—ওয়া যে দরজা ভেঙে ফেললে ! তুমি কোদাল ফেলে দেও, নইলে আমি আবার কাদব ! কয়েদি মিনুর মিনতি ভরা চোখের দিকে চাহিয়া দেখিল—দুটি বিন্দু অশ্রু মুক্তার মতন চোখের পাতার দীর্ঘ বক্র পরাজির প্রান্তে টলটল করিতেছে। কয়েদি সটান হইয়া দাঁড়াইয়া মৃত্যুনিশ্চিত পশুর মতো কাতর শব্দে নিশ্বাস ফেলিয়া কোদাল ফেলিয়া দিল। তাহার প্রকাণ্ড হাপরের মতো সেই চৌড়া বুকখানার মধ্যে যে বিষয় তােলপাড় হইতেছিল তাহাতে যেন তাহার বুকখানা এখনি ফাটিয়া যাইবে। মিনু কিন্তু তাহাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতাে টানিয়া দরজার কাছে আনিয়া বলিল-দরজাটা খুলে দাও। কয়েদি একবার খিলের দিকে চাহিল, একবার মিনুর মিনতিভরা চোখের দিকে চাহিল, একমুহত মাত্ৰ ইতস্ততঃ করিল, তারপর সে দরজার থিল খসাইয়া দিয়া স্তভাবে মিনুর মুখের দিকে চাহিয়া দাড়াইয়া রহিল। দরজা খােলা পাইয়া তিনজন পাহারাওয়ালা বাঁধভাঙা জলের মতাে ছুটিয়া বাগানে ঢুকিয়া কয়েদিকে ধরিল। সেই কয়েদি, বন্দী বাঘের মতাে, আপনার বলের গবে দৃপ্ত ভাবে শুধু দাঁড়াইয়া রহিল, কোনে বাধাই দিল না !
যাত্রা-সহচরী জেল-দাবােগা তাড়াতাড়ি আসিয়া কন্যাকে বুকে তুলিয়া চাপিয়া ধরিল, যেন সে হয়রানাে রত্ন ফিরিয়া পাইল। পাহারাওয়ালারা কয়েদিকে লাথি কিল চড় ধাক্কা গুতা মারিতে মারিতে জেলখানায় লইয়া যাইতেছে দেখিয়া মিনু চীৎকার করিয়া কানিতে কাদিতে বলিল --বাবা, বাবা, ওকে মারতে বারণ কর। জেল-দারােগা কন্যাকে বুকে চাপিয়া বলিল—ওর জন্যে কঁদিনে, ও খুনে ডাকাত। এ কথায় মিনু কিন্তু কোনও সান্ত্বনা খুঁজিয়া পাইল না। সে কান্নার ভিতর দিন। করুণস্বরে কেবলই বলিতে লাগিল--ওকে মেরাে না, মেরো না; বাবা, ও যে বড় ভালাে!
স্ত্রীচরিত্র পূজ্যপাদ শ্ৰীশ্ৰী শ্ৰীসঙ্ঘপাল মুমুক্ষু মহাশয় শ্ৰী শুচরণকমলেষু। মতিমন, আমি বিপদে পড়িয়া আপনার শরণাপন্ন হইতেছি, কৃপা করিয়া রক্ষা করুন আপনি বােধহয় জানেন, ওদন্তপুরী রত্নাকর শ্ৰেষ্ঠীর কন্যা সুমিতার পাণিপ্রার্থী ছিলাম আমি। রাণীর জটিল মনস্তত্ত্বানভিজ্ঞ আমার সামান্য নিবুদ্ধি হয় আমি তৎকতৃক পরিত্যক্ত হইয়াছি। ওঃ কি মনস্তাপ ! আপনি সুমিতাকে বাল্যাবধি জানেন,-অর্থাৎ আপনি অন্ততঃ মনে কবেন যে আপনি তাহাকে জানেন। কিন্তু হায়, রমণীচরিত্র নিতান্তই দুয়ে। তাহাদের মতি, গতি, চিন্তাপ্রণালী, আচার ব্যবহার সবই পুরুষের পক্ষে দুজ্ঞেয়, চমৎকার, বিস্ময়কর। তাহাদের সন্তুষ্টি অসন্তুষ্টি কিসে যে হয়, তাহা বল দুঃসাধ্য। দুঃসাধ্য বলিয়াই আমার আজ এই বিপদ। হায় ! আমি সুমিতার শৈশবসঙ্গী। তাহার মনস্তত্ত্ব নিপুণতার সহিত অবগত হইয়াছি বলিয়া আমার বিশ্বাস ছিল; কিন্তু এখন আমার ভ্রান্ত উপলব্ধি করিতেছি। ওদন্তপুরীর ভিক্ষুসজের ধর্ম প্রভাবে সে আশৈশব পূতশীল, ধমিষ্টা। সে ধর্মের নামে ‘পাগল হয় ; প্রভু তথাগত বুদ্ধদেবের প্রসঙ্গ আলােচনায় তাহার চিত্ত বায়ুমুখে শুষ্কপত্রের মতাে লঘুভাবে নৃত্য করিতে থাকে। তাহার ৯ষ্টি তুষ্টি ক্ষণে ক্ষণে ; কত ;
স্ত্রীচরিত্র দিন তাহার নিগ্রহ ও পুরস্কার ভােগ করিয়াছি, কিন্তু এইবারকার মতো স্থায়ী ক্রোধ তাহার আর কখনাে দেখি নাই। হয় অদৃষ্ট ! আমি তাহাকে আমার প্রাণের মন ভালােবাসিতাম, এখনও বাসি। সেও যেন ভালােবাসিত বােধ হইত; কিন্তু কেন এমন হইল ! অত ভালােবাসা এক নিমেষে কেমন করিয়া নষ্ট হইয়া গেল । গত বৈশাখীপূণিমার দিন আমার কাব্যপনেশে শ্রাবস্তিপুরীতে যাওয়া আবশ্যক হয়। আমি বিদেশে যাত্রার পূবে সুমিতার সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলাম। আমার বিদেশ যাত্রার কথা শুনিয়া তাহার সেই আয়ত চক্ষুদুটি অশ্রু ভারে অবনত হইয়া পড়িল,সে নীরবে আমার হাতখানি ধরিল। আহা, সেস্পর্শ কী ব্যকুলতা, কী স্নেহ ব্যক্ত করিয়া দিল ; কি মোহ আমাকে আচ্ছন্ন করিল। অহে, সেই মদির ; স্পর্শ ! আমি সত্বর প্রত্যাবর্তনের আশা দিয়া তাহার চক্ষুজল মুছাইয়া দিলাম। তখন সে বলিল,-“তুমি নগরে যাইতেছ ; নগরে যাইতেছ ; নিদর্শনস্বপ আমার জন্য কিছু আনিও। আমি বলিলাম,—কি আনিব বল ? সে হাসিয়া বলিল,—‘আমি কি বলিব ? আমার মনােমত যাহা হয় কিছু আনিও। আমি তােমার বিচার-ক্ষমতা পরীক্ষা করিব। এই অনুরােধ আমার কাল হইয়াছে। আমি শ্রাবস্তিপুরীতে যাত্রা করিলাম । আমি কয়েকদিন কার্যে এমন ব্যস্ত ছিলাম যে সুমিতার অনুরােধ বিস্মৃত হইয়া গিয়াছিলাম। পথে সিয়া মনে পড়ল। নিরুপায় । দুঃখিতমনে চিন্তিত হইলাম। সহসা একটা মতলব । মনে পড়িল-কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হইলাম। হায় ভ্রান্ত আশ্বাস !
৯) যাত্রা-সহচরী গৃহে ফিরিয়া সুমিতাকে দেখিতে গেলাম। সুমিতা প্রভাতের শিশিরসিক্ত ফুলটির মতাে কাদিয়া হাসিয়া আমার হাত ধরিল। আগ্রহ- ভরে জিজ্ঞাসা করিল,-“দেখি কি আনিয়াছ? আমি মুখখানা নিতান্ত অপ্রতিভের মতাে করিয়া বলিলাম,ঐ যাঃ, ভুলিয়া গিয়াছি। সে একথা বিশ্বাস করিল না। সে হাসিয়া বলিল,-প্রেমিক প্রেমাস্পদের অনুরােধ স্মরণ রাখে না, ইহা অসম্ভব আমি মনে মনে লজ্জিত হইয়া আমার ত্রুটি স্বীকার করিলাম, তবু সে আমায় বিশ্বাস করি না। তাহার 'ব্যগ্র দৃষ্টি আমার উত্তরীয়- অন্তরালে যাহা হয় একটা কিছু আবিষ্কার করিবার জন্য উকিঝুকি মারিতে লাগিল। তাহার কৌতূহল ও আগ্রহ লইয়া আমি খেল। করিতে লাগিলাম—তাহার কাকুতি মিনতি, অনুনয় বিনয় পরম পরিতােষের সহিত উপভােগ করিতে লাগিলাম। যখন তাহার উচ্ছ্বসিত কৌতূহল অশ্রুবিন্দুরূপে পক্ষ্মপ্রান্তে কম্পমান দেখিলাম, তখন আমি একটি গজদন্তখচিত চন্দনকাষ্ঠের ক্ষুদ্র পেটিকা তাহার হস্তে দিলাম। সুমিতার কুতূহলী চক্ষু পেটিকার মধ্যে একটি ছিন্ন নখ দেখিয়া দীপ্ত হইয়া আমার মুখের দিকে চাহিয়া নীরব প্রশ্ন করিল—এ কি ? আমি মিথ্যাবাদী, তাহাকে প্রবঞ্চনা করিয়া বলিলাম,-“উহা ভগবান বুদ্ধদেবের পদনখকণা। দৃঢ়ভক্তিভরে পেটিকাটি মস্তকে স্পর্শ করিয়া বক্ষে চাপিয়া ধরিয়া সুখাবেশে সুমিতা বিহ্বল।। আমি আমার শঠতার জন্য লজ্জায় মরিয়া গেলাম। হায় ধর্মহীন নিষ্ঠুর প্রবঞ্চনা! আমার ক্লিষ্ট মুখভাব দেখিয়া বিশ্বাসপরায়ণা সরদারও বুঝি সন্দেহ হইয়াছিল, তাই সুমিতা আমার মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল,-- স্ত্রীচরিত্র ০ এ, কি যথার্থ ভগবানের পদনখ ? এ দুর্লভ সামগ্রী তুমি কেমন করিয়া পাইলে ? আমি ধূতের মতো এদিক ওদিক তাকাইয়া চুপিচুপি বলিলাম, --মহারজি বিম্বিসারের স্তুপ হইতে চুরি করিয়া আনিয়াছি। হায়, আমি অনাচারী, অধামিক ; শঠতা করিয়া আমারই পদনখ ভগবানের নামে চালাইয়া দিয়া, সরলা বালিকার ধর্মনিষ্ঠার প্রতি কৃতঘ্নতা করিয়াছি। সরলা সুমিতা তাহার আয়ত চক্ষু কৃতজ্ঞতায় ভরিয়া শুধু নীরবে আমার দিকে চাহিল ; আমার হাতখানি ধরিয়া তাহার অনাড়ম্বর স্নেহ সবটুকু নিঃশেষে যেন আমার পূজায় নিয়ােজিত করিয়া দিল। হায় অপাত্রে বিশ্বাস ! হার অজ্যের পূজা! ক্ষণেক পরে আদ-সংবৃত সুমিতা প্রশ্ন করিল,-“মহারাজের স্তুপ হইতে চুরি কবিলে কেমন করিয়া ? হায় মিথ্যা কথা ! একবার একটা বলিলে আর নিস্তার নাই; রক্তবীজ রাক্ষসের মতো তার উদ্ভব নিবারণ অসম্ভব হইয়া পড়ে। আমি মিথ্যাকে মিথ্যার আবরণ দিয়া বলিলাম,-“রাজরক্ষীদের সহস্ৰমুদ্রা ও বর্মপাল পুরোহিতকে দশ সহস্র সুবর্ণমুদ্রা উৎকোচ দিয়া, ভগবান বুদ্ধের দন্ত কে ও নখের মধ্যে ভগবানের পাদনখই তােমার অধিক প্রিয় হইবে বলিয়া, পাদনখ চুরি করারই প্রবৃত্তি আমার হইয়াছিল। আমার মিথ্যাবাণী শতদলের মতাে হাসিতে লাগিল ;--সে হাসিতে আমি দেখিলাম বিদ্রুপ, সুমিতা দেখিল প্রেমের প্রতিষ্ঠা ! সুমিত হর্ষগগদ হইয়া বলিল,-“তুমি যথার্থই আমাকে ভালােবাস, নতুবা এমন মনােমত দুর্লভ সামগ্রী তােমায় আনিতে প্রবৃত্তি দিল কে ? তােমার প্রেম মন্বিষ্ঠ মন্ময়। প্রেম অন্তর্যামী !' এই বলিয়া তাহার ক্ষুদ্র মস্তকটি আমার স্কন্ধে ন্যস্ত করিল। হায় সেই স্পর্শ, সেই ঘ্রাণ আজও যাত্রা-সহচরী তেমনি নূতন মনে হইতেছে ! কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার সেই প্রথম দিনই শেষ দিন হইয়া গেল ! আবেশেই তা টুটিয়া গেল ! আমি সূ মতাকে আমার এই মিথ্যা চুরির কথা গােপন রাখিতে অনুরােধ করিলাম ; প্রকাশ পাইলে আমার প্রাণসংশয় ইহাও তাহাকে বেশ করিয়া বুঝাইয়া দিলাম। আবার প্রতারণা! দুদিন পরেই রত্নাকর শ্রেষ্ঠী শ্রাবন্তিপুরীতে যাত্রা করিলেন। আমার অজ্ঞাতসারে সঙ্গে গেল সুমিতা। বলতে লজ্জা করিতেছে,-আমি ধর্মের বড় একটা ধার ধারিতাম না। শ্রাবস্তিপুরীতে গিয়াছিলাম কার্যের জন্য ; আমি মহারাজ বিম্বি- সারের রচিত স্থূপ চক্ষৈও দেখি নাই। আমি সেই সুপের একটা কাল্পনিক বর্ণনা দিয়া, আমারই পাদনখ ভগবানের নামে চালাইয়া দিয়াছিলাম। আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই যে সুমিতা কখনাে এত ক্লেশ স্বীকার করিয়া নগর দর্শনে যাইবে। প্রেমের জন্য যে মন্দিরে আমি পবিত্ৰ-পাপানুষ্ঠান করিয়াছিলাম বলিয়া তাহার যে ধারণা হইয়াছিল, তাহারই বলবৎ আকর্ষণ তাহাকে সেই স্থান দেখিবার জন্য উৎসাহিত করিয়াছিল বােধ হয় । সুমিতার নগরগমনসংবাদে আমি ভীত হইলাম। কয়েক দিন পরেই দেখিলাম আমার ভয় নিরর্থক নয় । সুমিতার পত্ৰ পাইলাম— আপনার সহিত আমার বিবাহবন্ধন ‘অসম্ভব। 'যেখানে শঠতা, প্রতারণা, সেখানে প্রেমের প্রবেশ নিষিদ্ধ। আপনার পেটিকা প্রত্যর্পণ করিলাম—শঠতার জয়চিহ্ন আপনারই থাক। আমার সাক্ষাৎ কামনা করিবেন না ; করিলেও সফলমনােরথ হইবেন না। তি— প্রতারিতা সুমিতা।
স্ত্রীচরিত্র ৯৭ ‘ভদ্র’ সম্বােধনে তাহার গৃঢ় তিরস্কার অনুভব করিয়া লজ্জিত হইলাম। হায় দুজ্ঞেয় রমণীর চরিত্র ! আমি সুমিতার আদর অনুরাগ অধিক পাইয়াছিলাম, যখন সে আমাকে পবিত্ৰমন্দির-অপবিত্রকারী চোর বলিয়া জানিয়াছিল ; আর, আজ আমি তাহার সঙ্গবঞ্চিত স্নেহচ্যুত, কারণ আমি চোর নহি,-বহুলােকের আরাধ্যবস্তু আমার নিজের স্বার্থের জন্য আমি চুরি করি নাই। হায়- ‘স্ত্রিয়াশ্চরিত্রং পুরুষ ভাগ্যং দেবা ন জানন্তি কুতে মনুষ্যাঃ। আমার অনুনয়, বিনয় ও কাতর প্রার্থনা সব ব্যর্থ হইল। ধনিষ্ঠার ক্ষুব্ধ চিত্ত আমার অনুনয়ে, কোমল আদ্র কিছুতেই হইল না। তাহার গৃহে আমার প্রবেশ পর্যন্ত নিষেধ। হায়, কি কারতে এ কী হইল। আমি ক্ষোভে, দুঃখে, লজ্জায়, বিরহে ক্লিষ্ট হইয়া শয্যাশায়ী হইয়াছি। বােধ হয় ইহা জ্ঞাত হইয়াই আনন্দমিত্রের কন্যা সুমিতার সখী সুজাতা আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন। যে স, সুমিতা আমাকে ক্ষমা করিয়া পুনগ্রহণ করিতে পারেন তাহা সুজাতা আমাকে বলিয়া গিয়াছেন। আমাকে ভগবান্ তথাগতের কোনাে চিহ্ন সংগ্রহ করিয়া দিতে হইবে, এবং সে চিহ্ন বৌদ্ধমহাসমিতির দ্বারা অকাট্য প্রমাণে প্রশংসিত করাইতে হইবে। যদি পারি তবেই আমার রক্ষা, নতুবা আমি গেছি। আমি চিন্তায় মনস্তাপে পাগল হইব বােধ হয়। আপনি কি আমাকে এ বিপদে সাহায্য করিয়া প্রাণদান করিতে পারেন না? আশা করি আপনি দয়া করিয়া চেষ্ট করিবেন। আমিও সিংহলে, চীনে, তিঝতে ভগবানের কোনও স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহের জন্য যাত্রা করিব। সুমিতাকে প্রসন্ন করিবার জন্য অর্থনাশ ও ক্লেশ আমি গ্রাহ্য করি না। অর্থ ব্যয় ও ক্লেশ সহ্য করিয়াও সুমিতাকে পাইব কি । ৭ ৯৮ যাত্রা-সহচরী আমার শঠতার অতিরিক্ত দণ্ড আমি ভােগ করিতেছি। আপনি আমায় মার্জনা করিয়া উপায় নির্দেশ করিবেন। মহারাজ বিম্বিসার নির্বাণ প্রাপ্ত হইয়াছেন। মহারাজ অজাতশত্রু তথাগত বুদ্ধপ্রচারিত ধর্মে আস্থাবান্ নহেন শুনিতেছি। তিনি নাকি স্তুপে পূজা নিষেধ করিয়াছেন। যদি স্তুপ নষ্ট করা হয়, আপনি কি ভগবানের পদ-নখ- কণা সংগ্রহ করিয়া আমাকে দিতে পারেন না ? আপনার উপদেশ- প্রতীক্ষায় জীবিত রহিলাম । সতত আপনার চরণধূলার প্রসাদাকাক্ষী। নিবেদন ইতি— প্রণত হতভাগ্য বজুসেন।”
কুড়নি d আমার বয়স যখন ত্রিশ বৎসর তখন আমার একটি বন্ধু লাভ হইয়াছিল, যাহার বয়স তখন চল্লিশ পার হইয়া গিয়াছে। এই বয়স- তারতম্যে আমাদের হৃদ্যতার ও আত্মীয়তার কোনাে ব্যাঘাত হয় নাই। আমরা বেশ সমবয়সী বাল্যবন্ধুর মতােই উভয়ের কাছে প্রাণের পৃষ্ঠা উন্মুক্ত করিয়া ধরিতে পারিতাম । আমরা উভয়ে উভয়কে কতকটা চিনিলেও উভয় পরিবারের অনেকেই আমাদের অপরিচিত ছিলেন। তাই যখন আমার বন্ধুর বাড়ীতে পৌষ-পার্বণে পিষ্টক ধ্বংসের নিমন্ত্রণ পাইয়াছিলাম, তখন আমার কেমন একটা সঙ্কোচ বােধ হইয়াছিল। বন্ধুর পরিবার-সংখ্যা বেশি ছিল না ! পুরুষের মধ্যে একমাত্র তিনি, এবং স্ত্রীলােকের সংখ্যা ৪৫ জনের অধিক নহে। আমি বন্ধুর বাড়ীতে যাইতেই তিনি আমাকে একেবারে বাড়ীর মধ্যে লইয়া গেলেন ; সেখানে পাঁচজন স্ত্রীলােক আমার অপেক্ষা করিতেছিলেন। বন্ধু একে তাহাদের সকলের পরিচয় দিতে লাগিলেন,—“ইনি আমার দিদি, ইনি ভগ্নী ; ইনি রসিকা শ্যালিকা, ইনি আমার দণ্ডমুণ্ডের কত্রী, প্রবল- প্রতাপান্বিতা পত্নী শ্ৰীমতী যােগমায়া ঠাকুরাণী।” তৎপরে পঞ্চমার দিকে ফিরিয়া বলিলেন-“কুড়ুনি, তােমার কি পরিচয় দিব?” কুড়ুনির শ্বেতশতদলের মতাে সরল সুন্দর মুখখানি লাল হইয়া উঠিল, যাত্রা-সহচরী তিনি মুখ নত করিলেন। ডাগর চোখ দুটি লজ্জা-সংববণের বৃথা চেষ্টা করিতেছিল। বন্ধু তখন আমার দিকে ফিরিয়া বলিলেন,-“ইনি শ্ৰীমতী কুড়নি, আমার গৃহের কত্রী, সংসারের সেবিকা, আমার গৃহিণীর দক্ষিণহস্ত, এক কথায় ইনি আমাদের কল্যাণী গৃহদেবী।” সকলে খুব হাসিলেন, আমি কিছু না বুঝিয়াই হাসিলাম , কুড়ুনি লজ্জায় কাতর হইয়া উঠিলেন। যখন আমরা দুই বন্ধু অন্য ঘরে গেলাম, তখন আমি কৌতূলাক্রান্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম,—“রাজীব ( আমার বন্ধুর নাম শ্রীমান্ রাজীব- লােচন লাহিড়ী), ঐ কুতুনি মেয়েটি বাস্তবিক কে ?” রাজীব বলিলেন,—“তােমার কি কুড়ুনি-কাহিনী বলি নাই ?” আমি আরাে কুতূহলী হইয়া বলিলাম, “না।” “তবে শােন” বলিয়া রাজীব বলিতে আরম্ভ করিলেন। “আমার পিতা ও নীলাম্বর রায় বড় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাহারা প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলেন যে উভয়ে বৈবাহিক সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া উভয় পরিবারকে বন্ধুপ্রীতিবন্ধনের সঙ্গে আরাে ঘনিষ্ঠতর বন্ধনে আবদ্ধ করিবেন। আমাদের বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণের মধ্যে গর্ভস্থ • জ্বণের ভবিষ্যৎ বিবাহ-সম্বন্ধ স্থির হইয়া থাকে ; কিন্তু আমার পিতার ও পিতৃবন্ধুর কোনও সন্তানসম্ভাবনার পূবেই তাহারা বৈবাহিক হইয়া বসিয়াছিলেন। যাহা বিলম্ব সন্তানের। কিছুদিন পরে আমার জন্ম হয় ; 'আমি পিতার জ্যেষ্ঠ পুত্র ; নীলাম্বর-বাবু তখনো নিঃসন্তান। অতএব ভাবীকালে আমিই নীলাম্বর-বাবুর জামাতৃপদে বৃত হইব স্থির হইয়া রহিল। “নীলাম্বর-বাবুর ক্রমাগত পুত্র জন্মিতে লাগিল, বন্যা আর হয় না। তখন অগত্যা আমার ভগ্নী নীলাম্বর-বাবুর পুত্রবধূরূপে চিহ্নিত হইল, • * কুড় নি ১০১ • • • জামাতৃবরণের টীকায় আমার ললাট উজ্জ্বল করিবার কোনো সম্ভাবনা ঘটিল না দেখিয়া নীলাম্বর-বাবু রিশেষ ক্ষুন্ন হইলেন। অবশেষে আমার বয়স যখন বারো বৎসর তখন তাহার এক কন্যা জন্মিল, তাহার নাম যােগমায়া। যােগমায়া যখন পাচ ছয় বৎসরের হইল, তখন হইতেই সে আমাদের গৃহে অধিকাংশ সময় যাপন করিত ; সে যেন তখন হইতেই আমাদের পরিবারের একজন হইয়া গেল ; স্থির হইয়াছিল তাহার নবম- বর্ষে আমার সঙ্গে তার বিবাহ হইবে, এবং ততদিনে আমি বি-এ পাশ করিয়া পাঠ সাঙ্গ করিতে পারি । “যােগমায়ার সহিত আমার বিবাহসম্বন্ধ স্থির ছিল বলিয়া যােগমায়ার প্রতি আমার কেমন একটা মমতা জন্মিয়াছিল ; কিন্তু তাহাকে দেখিলে আমার বড় লজ্জা বােধ হইত; অধিকন্তু সে যখন আমাকে ‘রাজীব দাদা। বলিয়া ডাকিয়া আমার ঘাড়ে পিঠে চড়িয়া, হাসিয়া বকিয়া ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিত, আর দুই বাড়ীর লােক তাহা লইয়া রঙ্গনাসা করিত, তখন আমার নাক মুখ চোখ দিয়া এমন আগুন ছুটিত যেন আর হইয়াছে। এইরূপে দিন কাটিতে লাগিল। “আমি এফ-এ পাস করার পর বাবা সপরিবারে শীক্ষেত্রে জগন্নাথ দর্শনে গিয়াছিলেন ; যােগমায়া সঙ্গেই ছিল। পথে এক চটিতে বাবা একটি মেয়ে দেখিতে পান ; রাঙালীর মেয়ে, বয়স সাত আট বৎসর মাত্র ; সে নিজের কোনই পরিচয় দিতে পারে নাই,—কেবল তীর্থপথে তাহার পিতামাতা উভয়েই গতাসু হইয়াছেন, সে এখন নিরাশ্রয় এবং সেব্রাহ্মণ- কন্যা, তাহার অসংলগ্ন কথা হইতে এইটুকু অতিকষ্টে আমরা সংগ্রহ করিতে পারিলাম। তাহার নাম সে বলিল ‘মলিনা। “বাবা তাহাকে সঙ্গে লইয়া পরিবারভুক্ত করিলেন ; আমাদের বাড়ীতে তাহার নাম হইল ‘কুড়ুনি’। কুড়ুনির আযযাচিত শ্ৰী, তাহার ১০২ যাত্রা-সহচরী নম্রতা, বাধ্যতা ও মিষ্টভাষিতা তাহাকে সংকুলােবা বলিয়াই প্রচার করিত। তাহার হরিণীর মতাে ডাগর চোখের সরল দৃষ্টি এবং সকলের প্রতি যত্ন ও প্রীতি তাহাকে অল্পদিনের মধ্যেই সকলের প্রিয় করিয়া তুলিল। আমার পড়িবার সময় যােগমায়া বিরক্ত করিত, কুড়ুনি চুপ করিয়া বসিয়া থাকিত। যােগমায়া কুড়ুনি অপেক্ষা তিন চার বৎসরের ছােট, তবু সে সেই ডাগর সরল মেয়েটিকে দিব্য অসঙ্কোচে হুকুম করিত, কুড়ুনি ভয়ে ভয়ে সকল হুকুম তামিল করিত এবং যােগমায়ার মনের মতন না হইলে সে মার খাইত, আর জলভরা চকিত চাহনিতে চারিদিকে চাহিয়া দেখিত কেহ সে নিগ্রহ দেখিল কি না। আম্ িকোনাে দিন অত্যাচারিতার পক্ষ হইয়া যােগমায়াকে কিছু বলিলে বালিকার আয়ত লােচনের দীর্ঘপক্ষ্মপংক্তি কম্পমান জলবিন্দুগুলি আর ধরিয়া রাখিতে পারিত না। বালিকা যেন অনুভব করিত সে পরের গলগ্রহ, সে পরের করুণাশ্রিত। তাই কাহারাে এতটুকু স্নেহ, একটি ভালাে কথা তাহার প্রগাঢ় কৃতজ্ঞতার কারণ হইত ; বৃষ্টির পরে গাছ যেমন জলকণাচ্ছন্ন হইয়া থাকে, একটু নাড়া পাইলেই ঝরঝর করিয়া অযুত বিন্দুতে ঝরিয়া পড়ে, তেমনি অভিমানিনী পিতৃমাতৃহীনার জলভারাবনত পক্ষ্মপংক্তি করুণার একটু আঘাতে অকস্মাৎ জলবর্ষণ করিত। যােগমায়া সময়ে সময়ে কুড়ুনির প্রতি দুর্ব্যবহার করিলেও তাহাকে যথেষ্ট ভালাে বাসিত, কুড়ুনিকে পাইলে তাহার খেলা জমিত না। “য়ােগমায়ার অষ্টমবর্ষে আমার পিতার মৃত্যু হইল। তাহার নবম- বর্ষে নীলাম্বর-বাবু গৌরীদানের ফলাধিকারী হইবার জন্য আমায় বিশেষ তাগাদা দিতে আরম্ভ করিলেন। কালাশৌচ ও বি-এল পরীক্ষার ওজব করিয়া বিবাহটা আরাে দু’বৎসর স্থগিত রাখিলাম।' যােগমায়া যখন একাদশবর্ষে উপনীত হইল তখন আমি ওকালতি আরম্ভ করিয়াছি।
কুড় নি ১০৩ উপার্জনক্ষম হওয়া প্রভৃতি যতগুলি মামুলি আপত্তি আছে তাহারা সকলেই যখন একে একে জবাব দিল তখন অগত্যা 'আমার বিবাহের দিনস্থির করিবার ধূম লাগিয়া গেল। “আমি একদিন কুড়ুনিকে বলিলাম, কুড়ুনি, তােমারও একটা বিবাহ হওয়া উচিত। বল তো জোগাড় দেখি। “কুড়ুনি লজ্জাবিনম্রস্বরে বলিল, যাকে কেউ চেনে না জানে না তাকে কে বিবাহ করবে ? “আমি অনেকক্ষণ কোনাে : উত্তর দিতে পারিলাম না। আমি ইজি- চেয়ারে শুইয়া তখন পড়িতেছিলাম, কোন পাড়ে ভিড়িবে তােমার সােনার তরী, হে সুন্দরী!' রবির কাব্যের একটা রহস্যময় আভাস সন্ধ্যার সুদূর মেঘমালা ও উদ্যানের পুষ্পগন্ধের মধ্য হইতে ক্ষরিত হইতেছিল, সেদিকে আমার শূন্যচিত্ত কিছুই লক্ষ্য করিতেছিল না। কাব্য গ্রন্থখানা নিজের বুকের মধ্যে আমার মােটা আঙুলটা চাপিয়া ধরিয়া আমার কোলে বিস্মৃতি ও উপেক্ষা ভােগ করিতেছিল। অনেকক্ষণ পরে আমি বলিলাম, “দেখ, যাহারা জাতিধর্মের মুখাপেক্ষী নহেন, যাঁহারা ব্যক্তিগত গুণের মর্যাদাই প্রধান বলিয়া মানেন, এমন সমাজ তােমায় আদর করিয়া গ্রহণ করিবেন। তুমি বল তাে আমি চেষ্টা করি।' কুড়ুনি তাহার চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া আমার মুখের উপর দৃষ্টিপাত করিয়া কহিল, “আমি কি আপনাদের ভার হয়েছি, দাদাবাবু?' আর আমি কথা কহিতে পারিলাম ; রজনীর অন্ধকার আমাদিগকে আবৃত করিয়া অসুখকর কথােপ- কথনের লজ্জা হইতে অব্যাহতি দিল। “যােগমায়ার সহিত আ’র বিবাহ হইল। আমার মাতার মৃত্যু হইলে যােগমায়া সংসারের কী হইল ; কুড়ুনি হইল তাহার সহচরী ও সহকারিণী। কুড়ুনি আমাদের সংসারের ভাণ্ডারী, সেবিকা, Guardian Angel.”
১০৪ যাত্রা-সহচরী রাজীবের গলা সহসা ভারী হইয়া গেল, রাজীবের বড় বিষম লাগিল, রাজীব এইখানেই গল্প শেষ করিল। আমি তখন বলিলাম,“তুমি এখনো কুড়ুনিকে এত ভালােবাস !” রাজীব বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিল, “ভালােবাসি ? কে বলিল? , তাকে আমি যথেষ্ট স্নেহ করি বটে ; তুমি তাহাকে চিনিলে তুমিও স্নেহ করিতে বাধ্য হইবে।” আমি হাসিয়া বলিলাম, “ইংরেজীতে যাহাকে love বলে এ স্নেহটা তাহাই—তুমি কি আমার কাছে গােপন করিতে পারিবে ? তুমি যদি কুড়ুনিকে খুব ভালাে না বাসিতে, যদি তাহাকেই বিবাহ করিবার বাসনা তােমার মনে প্রবল হইয়া না উঠিত, তবে তুমি যােগমায়াকে বিবাহ নিতে অৰ্থক অত বিলম্ব করিতে না ; কুড়ুনিকে ভিন্নসমাজভুক্ত হইয়া বিবাহের প্রলােভন দেখাইতে না। আবাল্য একত্রবাসের ফলে যৌবনে আসিয়া যােগমায়ার প্রীতি অনুরাগ তােমার নিকট বৈচিত্র্যবিহীন বলিয়া মনে হইয়াছিল বলিয়াই নবলব্ধ কুড়ুনির অনুরাগ তােমাকে অধিক আকর্ষণ করিয়াছিল। কুড়ুনি ভিন্নসমাজে বিবাহ করিতে স্বীকৃত হইলে হয় তুমি নিজে সেই সমাজভুক্ত হইয়া তাহাকে বিবাহ করিতে, নয় অন্য সুপাত্রের সহিত তাহার বিবাহ দিয়া তুমি অনেকটা মুক্ত হইতে পারিতে। আমি স্পষ্ট বুঝিতে পারিতেছি তুমি বহুবর্ষ কিরূপ যুদ্ধ একদিকে পিতৃপণবদ্ধ। যােগমায়ার প্রতি অনুরাগ, অপরদিকে কুড়ুনির প্রতি গাঢ় ভালােবাসা তােমাকে কোনো দিন বিশ্রাম দেয় নাই। তুমি প্রেয় ত্যাগ করিয়া শ্ৰেয় আশ্রয় করিয়াছ ; ইহা বীরের মতো কার্য হইয়াছে, কিন্তু সাংসারিক হিসাবে ঠিক করিয়াছ কি না ঠিক বুঝিতে পারিতেছি না।” রাজীব কাদিয়া ফেলিল। সে বলিল, “ভাই, আজ ছাব্বিশ সাতাশ করিয়াছ ; • যাত্রা-সহচরী বৎসর যে বেদনা কাহাকেও জানিতে দি নাই, আজ তুমি তাহা জানিয়া ফেলিলে ! রাজীবের রুদ্ধকে মুক্ত হইয়া উদ্দাম হইয়া উঠিল, আর শান্ত হইতে চাহে না। আমি রাজীবকে কথায় ব্যাপৃত রাখিবার জন্য জিজ্ঞাসা করিলাম, “তােমার স্ত্রী এ বৃত্তান্ত জানেন ?” রাজীব বলিল, “না ; তুমি আমি ও ভগবান্ ছাড়া আর কেহ আজও জানে নাই। আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম, “কুড় নিও না ?” রাজীব বলিল, “না ; দৃষ্টি, বাক্য ও ব্যবহারে আমার প্রাণের আবেগ কখনাে তাহার নিকট ধরা পড়িতে দি নাই ; কে সে আশায় জন্য অনর্থক কষ্ট পাইবে ? তাহার প্রাণটুকু সংসারের সুখদুঃখের আয়ত্তের বাহিরে, তাহার সুখও নাই, দুঃখও নাই ; সে আপনাকে লইয়া আপনি বেশ আছে।” আমি বলিলাম—“অ মূখ অজ্ঞ প্রেমিক ! না, সে বেশ নাই ; সেও তােমাকে খুব ভালােবাসে ; তুমি যখন তাহাকে বিবাহ করিতে বলিয়া- ছিলে, তখন সে যে গৃঢ় তিরস্কার করিয়াছিল তাহাই তাহার ত্বন্নিষ্ঠ প্রেমের পরিচায়ক, তুমি প্ৰেমান্ধ না হইলে বুঝিতে পারিতে সে তােমাকে ছাড়া আর কাহাকেও চাহে না। দুটি হৃদয় এত কাছাকাছি হইয়াও এমন আশ্চর্য রকমে অপরিচিত আছে, এমন ভাবে আত্মগােপন করিতে পারিয়াছে, ইহা মনে করিতে আমার হৃদয় আনন্দরসাপ্লুত হইয়া উঠিতেছে। আমি আজ দুটি হৃদয়ের পরিচয়সাধন করিয়া দিয়া ধন্য হইব ।” “না, না, অমন কাজ করিয়াে না,” বলিয়া রাজীব কাঁদিয়া আকুল হইল ; দুই হাতে মুখ ঢাকিয়া ক্রন্দনাবেগ বােধ করিবার চেষ্টা করিতে !
১০৬ কুড়নি লাগিল ; আঙলের ফাক দিয়া অশ্রুধারা গড়াইয়া পড়িতে লাগিল। এমন সময় রাজীবের দিদি ডাকিলেন, “রাজীব, তাের আয়, খাবার দেওয়া হয়েছে।” রাজীবকে চুপ করাইতে চেষ্টা করিতে লাগিলাম ; যত চোখ মুছাইয়া দি তত অশ্রুপ্রবাহ কপােল স্নান করিয়া ছুটিয়া চলে ! আমাদের বিলম্ব দেখিয়া রাজীবের দিদি ডাকিতে ডাকিতে আমাদের ঘরে আসিয়া উপস্থিত। রাজীবের মুখ চোখ ফুলিয়া লাল হইয়া উঠিয়াছে, আমি মহা বিপদেই পড়িলাম। তাড়াতাড়ি রাজীবের চোখে ফু দিতে লাগিলাম । কাপড়ের পুটুলি ফু দ্বারা গরম করিয়া চোখে সেক দিবার ছলে চোখ মুছাইয়া দিতে লাগিলাম। রাজীবের দিদি জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি হয়েছে ?” .. আমি তাড়াতাড়ি বলিলাম, “রাজীবের চোখে কি পড়েছে, ভয়ানক জ্বালা করছে। কি পড়েছে কিছু দেখা যাচ্ছে না।” ক্রমে ক্রমে বাড়ীর সকলে সেই ঘরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। সকলে পালাক্রমে চোখ দেখিতে লাগিলেন, রাজীব বেচারার চোখ লইয়া টানাটানি পড়িয়া গেল। রাজীবের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা দেখিয়া বড় দুঃখেও আমার হাসি আসিতেছিল। আমার বিকাশােন্মুখ হাসি নিভিয়া গেল, দ্বারােপান্তে ব্যগ্রতার স্থির প্রতিমূতি কুড়ুনিকে দেখিয়া। মরি মরি ! কোন্ নিপুণ ভাস্কর স্থির অচল পাষাণে এমন ব্যগ্রতার ভাব ফুটাইয়া তুলিয়াছে ! আমি আস্তে আস্তে কুড় নির পাশে গিয়া দাড়াইলাম, তিনি কিছুই টের পাইলেন না, তাহার ব্যাকুলদৃষ্টি রাজীবের দিকে। আমি কথা বলিবার উপক্রম করিয়া একটু শব্দ করিতেই কুড়ুনি চমকিয়া উঠিয়া অপ্রতিভ ভাবে আমার মুখের দিকে চাহিয়াই 'মুখ নত করিলেন। আমি তখন চুপিচুপি বলিলাম, “রাজীবের চোখে কিছু পড়েনি ; ও কাদছে।” কুড়ুনি ব্যস্ত হইয়া বলিলেন “কেন?”
যাত্রা-সহচরী
১০৭
আমি বলিলাম “আপনার জন্যে।”
কুড়ুনি অতিমাত্ৰ বিস্মিত হইয়া বলিলেন “আমার জন্যে ?”
আমি বলিলাম, “হাঁ, আপনারই জন্যে ; ছাব্বিশ সাতাশ
বংসর সে আপনাকে নীরবে যে ভালােবেসে এসেছে, তার আবরণ
আজ আমি খুলে ফেলেছি। তাকে এও বুঝিয়ে দিয়েছি যে তার
প্রেম ব্যর্থ হয় নি ;-আপনিও তার প্রণয়ে এই দীর্ঘজীবন তপস্বিনীর
মতো উৎসর্গ করে দিয়েছেন।”
কুড়ুনি ধীরে ধীরে বসিয়া পড়িলেন, বসিয়া আস্তে আস্তে শুইয়া
পড়িলেন। আমি বুঝিলাম নিষ্কামসাধিকা সুধীরার চিত্ত মিলনের
পরিচয়ের সাফল্যের আনন্দাঘাত সহ্য করিতে পারিতেছেন না। আমি
রাজীবকে লইয়া ব্যস্ত সকলকে ডাকিয়া বলিলাম, “এদিকে খুন, এর
বােধ হয় মূছ। হয়েছে।”
সকলে তখন কুড়ুনিকে লইয়া ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন, আমি সন্ধ্যার
অন্ধকারে গা ঢাকি সরিয়া পড়িলাম। পৌষপার্বণে পিষ্টক আস্বাদ
করতে না পারার যে দুঃখ, তাহা দুটি প্রেমিক হৃদয়ের পরিচয়সাধনের
সৌভাগ্যে আমার নিকট বড় ক্ষীণ হইয়া গিয়াছিল।
জীবন-নাট্য পাকা আমের সময়। সে তখন বালক মাত্র । গিয়াছিল সে মামার বাড়ী বেড়াইতে। বাগানে আম কুড়াইতে গিয়া পাড়ার একটি মেয়ের সঙ্গে দেখ{{ মেয়েটিও বালিকা। তাহাকে দেখিয়াই বালকের চিত্ত যেন বলিয়া উঠিল—এই এই, একেই আমি খুজিতেছিলাম, একেই আমি চাই,। কিন্তু সে বালক কিনা, মেয়েটিকে মুখ ফুটিয়া কিছু বলিতে পারিল না। শুধু অবাক হইয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল, মেয়েটি বালকটির রকম দেখিয়া একটু শুধু হাসিল । এবার এই পর্যন্ত। বালক মামার বাড়ী হইতে চলিয়া গেল, কিন্তু সেই একদিনের-দেখা মেয়েটির সেই হাসিটুকু সে ভুলিল না। আবার যখন সে মামার বাড়ীতে ফিরিল, তখন সে কলেজের ছেলে। তবু তখনাে বালক। এবারও সেই মেয়েটির সঙ্গে পুকুর-ঘাটে দেখা। তার বয়স এখন চৌদ্দ বছর। কিন্তু তখনি তার বুকখানি মাতৃত্বের জন্য উন্মুখ হইয়া উঠিয়াছিল। মেয়েটির আগেকার সেই চঞ্চল গতি মন্থর, ও স্থির দৃষ্টি বিচঞ্চল হইয়া উঠিয়াছে—সমস্ত দেহে একটি লাবণ্যময় লীলা পারদরাশির মতো টলটল করিতেছিল। সে এবার আরাে অবাক হইয়া মেয়েটিকে দেখিতে লাগিল; এবারও মেয়েটি তাহার রকম দেখিয়া হাসিল, কিন্তু তেমন সহজভাবে মুখের দিকে যাত্রা সহচরী ১০৯ তাকাইয়া নয়-ঘাড় অন্যদিকে বাঁকাইয়া কিন্তু দৃষ্টিখানি তারই দিকে হানিয়া। তাদের আলাপ হইতে দেরী হইল না, এবং আলাপ যদি হইল তাে তাহার মধ্যে এমন কথাও হইল যাহা শুধু সেই দুইটি মুখেরই বলিবার নতো আর সেই চারটি কানেরই শুনিবার—আর কারাে কাছে সে বলিবার নয়, আর কারো কানে সে শুনিবারও নয় । মেয়েটি বিধবা। তাকে বিয়ে করা অসাধ্যসাধন। কিন্তু সব স্ব যেখানে বাঁধা পড়িয়াছে, প্রাণপণ করিয়াই তাে সেই সব স্ব উদ্ধার করিতে হয়। ছেলেটি উপার্জন করিবার জন্য আপনাকে প্রাণপণ যত্নে তৈরী করিতে লাগিল। সে ইঞ্জিনিয়ার হইবে—তার জন্য অন্ততপক্ষে আট বছর দরকার। আট বচ্ছর !, ছেলেটি মাঝে মাঝে মামার বাড়ীতে আসে আর মেয়েটিকে দেখে সে দিনে দিনে নব নব শ্ৰতে পরিমণ্ডিত হইয়া উঠিতেছে ! এমনি আশায় আনন্দে বাধায় চুরিতে প্রণয় তাহাদের প্রগাঢ় হইতে লাগিল। এমনি করিয়া তিন বছর কাটিয়া গেল। চতুর্থ বছরে মেয়েটির জ্বর- বিকার হইল। তারপর ছেলেটি যখন তাহাকে দেখিল, তখন মেয়েটির রং বিবর্ণ, চোখ কোটরগত ও উদাস, মাথার চুল কাটা, সুগােল দেহের লাবণ্য কঙ্কালসার বিশ্রী। অমন রূপ হতশ্রী হওয়াতে ছেলেটির দুঃখ হইল, তবু তাহার অনুরাগের হাস হইল না। ক্রমে ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ার হইল। অর্থ প্রতিপত্তিও হইল। কত সুন্দরী কিশােরীর পিতা তাহাকে দুবেলা সাব্যসাধনা করিতে লাগিল— কিন্তু কন্তু সে সেই চৌদ্দ বছরের মেয়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করা ভুলিল না। বিধবাকেই বিয়ে করিল। ৩ সে ১১০ জীবন-নাট্য ছিল না ; ; মেয়েটির আবার চুল হইয়াছিল, কিন্তু তেমন ঘন লম্বা গােছ বাঁধে নাই ; তার চোখের কোল ভরিয়াছিল, কিন্তু দৃষ্টিতে সে চঞ্চল আবেশ রং ফিরিয়াছিল, কিন্তু আগেকার সেই চৌদ্দ বছরের মেয়ের উচ্ছল লাবণ্য ফিরে নাই ; হৃদয়ের অন্তরে প্রণয় জমাট বাঁধিয়াছিল, কিন্তু বাহিরের সেই উচ্ছ্বসিত চাঞ্চল্য এখন শিথিল হইয়া গিয়াছিল। চৌদ্দ বছরের মেয়েকে ভালো বাসিয়া ছেলেটি বাইশ বছরের মেয়েকে বিবাহ করিল—তবু তাহাকে ভালােবাসিত। ভালােবাসিত; কিন্তু আগেকার সেই ব্যগ্রতা আর ছিল না ; অনাবশ্যক বকুনি থামিয়া গিয়াছিল ; পলকে পলকে চাওয়াচাওয়ি ও চুরি করিয়া হাসাহাসি বিদায় লইয়াহিল , মুহূত অদর্শনে প্রলয়বােধ এখন ঘরকন্নার কাজের মাঝে ডুব দিয়াছিল, ক্রমে ক্রমে দুটি ছেলে আর একটি মেয়ে হইল। মেয়েটি বাপের প্রাণ, তার নয়নতারা, তার অনন্ত সান্ত্বনা। মেয়েটি যত বড় হইতে লাগিল তত তার মধ্যে তার মায়ের অতীত ছবি ফুটিয়া উঠিতে লাগিল; আর তত সে বাপের হৃদয় অধিকার করিতে লাগিল। মেয়ের দশ বৎসর বয়সে তার মায়ের সেই চৌদ্দ বৎসরের ছবি বাপের চোখে নূতন হইয়া দেখা দিল। বাপ সময় পাইলেই মেয়ের কাছটিতে লাগিয়া থাকিত ; মেয়েকে যতটা পারে চোখে চোখে সে রাখে। মেয়েকে লইয়াই বাপ ব্যস্ত, মেয়ের মায়ের খবর লওয়া বড় একটা ঘটিয়া উঠে না। দুর্বল শরীরে সন্তান প্রসব ও ঘরকন্নার খাটুনিতে মায়ের শরীর ভাঙিয়া গিয়াছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজে ব্যস্ত, দেখা সাক্ষাৎ বড় একটা ঘটে না। তবু ভালােবাসা ছিল। কিন্তু যেমনটি ছিল তেমন কি ?
যাত্রা-সহচরী ১১১ ; একদিন প্রভাতে মেয়েটি বিছানা হইতে উঠিল না। মা বলিল— স্কুলে না যাইবার ছুতো। বাবা কিন্তু তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডাকিল। মৃত্যুর দূত মেয়েটিকে ডাক দিয়াছে--মেয়েটির যক্ষ্মা হইয়াছে। মা ঘরকন্না লইয়া ব্যস্ত। বাবা তাহার শুশ্রুষার জন্য আহার নিদ্রা কাজকর্ম ত্যাগ করিল। অর্থে শ্রমে চেষ্টায় যত্নে যত রকম আরাম দিতে পারা যায় মেয়েটির কিছুরই অভাব রহিল না। বাপের সঙ্গে সে যখন কথা কহিত বাপের বুক দুঃখবেদনায় ভরিয়া উঠিত ; তবু সে নিজের কষ্ট চাপিয়া রাখিয়া মেয়েকে হাসাইতে চেষ্টা করিত। একদিন আর মেয়েটি হাসিল না, কথাও বলিল না। সব শেষ হইয়া গেল। সে শােকের দৃশ্য চিত্র করা অসম্ভব। যখন লােকে মৃতদেহ লইতে আসিল, তখন বাপ একেবারে ক্ষেপিয়া গেল—লােককে মারিতে যায়- অমন দুধের মেয়ে মরিয়া গেছে এ সে বিশ্বাসই করিতে পারে না, এখনো আশা থাকিতে পারে, সে বাঁচিলেও বাঁচিতে পারে। লােকেরা তাহার মিনতি শুনিল না, বাধা অগ্রাহ্য করিল, অমন সােনার মেয়েকে পুড়াইয়া ছাই করিয়া ফেলিল। পাগল পিতা এক মুঠি ছাইয়ের উপর সমাধি রচনা করিল। পাথরের সুন্দর সমাধি। রােজ সে একগাছি সাদা ফুলের সুগন্ধি মালা পরাইয়া সমাধির কাছে অশ্রু বিসর্জন করিয়া আসিত। এমনিভাবে বছরখানেক গেল। দ্বিতীয় বৎসরে কন্যার সমাধির কাছে নিত্য আর 'শােক করার সময় হয় না, কাজের বড় ঝঞ্চাট। মনে মনে এক একবার লজ্জা হয় যে মেয়ের প্রতি ঠিকমতাে স্নেহ প্রকাশ করা হইতেছে না। তবু সময় বড় চিকিৎসক,—সকল শােক, সকল লজ্জা, সকল স্মৃতি সে অল্পে অল্পে অলক্ষ্যে মুছিয়া ফেলিতে লাগিল।
১১২ জীবন-নাট্য আরো দুটি কন্যা জন্মিয়াছে—কিন্তু তারা তাহার মতাে নয়, এ কথা তার বাপের মনে জাগে। আর স্ত্রী ? যার তুল্য নারী এ জগতে আর ছিল না, এখন তার সে মােহিনী ঘুচিয়া গেছে, বিশুমঞ্জরী লতার মতাে একদিনের যাহা শ্ৰ৷ ছিল এখন নষ্ট হইয়া তাহাই তাহাকে অধিকতর কু করিয়া তুলিয়াছে। জীবনেরও স্মৃতিতে আনন্দে ভাটা পরিয়াছে। বার্ধক্য চুপিচুপি ঘাড় ধরিয়া পিঠ কুজা করিয়া দিতেছে, পা বাঁকা ও কম্পিত করিয়া তুলিতেছে । ঘরকন্নারও সে ঐ নাই। এক ক্ষিনি অনেকগুলি ছেলেপুলে সামলাইতে পারে না। তাহারা চেয়ারের ঠ্যাং ভাঙে, বালিসের তুলে বাহির করে, চুনকাম-করা দেয়ালে কালি ছড়ায়, গানের বদলে ছেলেদের কান্না গৃহখানিকে ভরিয়া রাখে। কাজেই কত-গিন্নির মেজাজ চটা, কথা কড়া, ব্যবহার :ঢ় হইয়া উঠিতেছে। কত-গিন্নিরও এখন ছাড়াছাড়ি, আগেকার সে সােহাগসম্ভাষণ এখন খুজিয়া মনে করিতে হয়। কতার বয়স যখন পঞ্চাশ, তখন গিন্নির মৃত্যু হইল। তখন বুড়াের মনে অতীত যৌবনের সকল স্মৃতি নূতন হইয়া উঠিল, চোখের সামনে সেই চৌদ্দ বছরের ফুটন্ত কলি মেয়েটিরই ছবি জাগিতে লাগিল। বুড়াে শশাকে বড় কাতর হইল—সে শােক, বুড়ীর মৃত্যুতে নয়,–এ শােক সেই চৌদ্দ বছরের কিশােরীর স্মৃতির জন্য,—সেই বাইশ বছরের বধূর ভালােবাসার জন্য, এবং বুড়ীর গিন্নিপনার জন্য অল্প স্বল্প । বুড়ো ছেলেমেয়েগুলিকে লইয়া থাকে। মেয়েগুলির বিয়ে হইল ; মেয়েরা শ্বশুরবাড়ী চলিয়া গেল ; ছেলে গুলিযে যার কাজে দেশ বিদেশে ছড়াইয়া পড়িল ; শ্মশান আগুলিয়া রহিল শুধু সেই বুড়ো। বছরখানেক ধরিয়া বুড়ীর এক-একটি গুণের কথা একশবার বলিয়া সে ; ;
যাত্রা-সহচরী ১১৩ আশ্চর্য --বুড়াে তার বন্ধুদের বিরক্ত করিয়া তুলিল। তারপর যা ঘটিল সে বড় চমৎকার। একটি আঠারাে বছরের সুন্দরীর সঙ্গে বুড়াের আলাপ হইল। তাহার আকৃতির মৃত পত্নীর চোদ্দ বছর বয়সের ছবিখানির চমৎকার সাদৃশ্য দেখিতে পাইল। সেই কোন সুদূর অতীতের আমবাগানের চোদ্দ বছরের মেয়েকে দেখিয়া যেমন সেদিন মনে হইয়াছিল এমনটি বুঝি আর জগতে নাই, আজ এই অষ্টাদশীকে দেখিয়াও তেমমি মনে হইল। আর মনে হইল এ প্রজাপতিরই নিবন্ধ ! এ বিধাতার লীলা ! শুধু যে বুড়ােই যুবতীকে দেখিয়া ক্ষেপিয়া উঠিল তাহা নয়, যুবতীও বুড়ােকে ভালােবাসে—বুডাের অনেক ঐশ্বর্য ! বুডাের শূন্য ভাঙা মন সুখে গবে ভরাট হইয়া উঠিল—এখনাে সে একেবারে অপদার্থ নয়, পঞ্চাশ বছরেও সে অষ্টাদশীর হৃদয়জয়ী বুড়াে আবার বিয়ে করিল, নইলে যে সংসার চলে না ; বুড়ো বয়সে তাহাকে দেখে কে? ছেলেমেয়েগুলােকে মাতৃহীন রাখাও তো বাপের প্রাণে সহ্য হয় না। কিন্তু ছেলেমেয়েগুলো এমনি অকৃতজ্ঞ, বাপের এতবড় মেহের নিদর্শনটাকে তারা তাদের মায়ের প্রতি অপমান মনে করিল, বুড়াে বয়সে বাপের কাণ্ড দেখিয়া তাদের মাথা হেঁট হইল, লজ্জায় তাদের নাকি লােকালয়ে মুখ দেখানাে ভার হইল। শােন একবার কথা ! এমন অকৃতজ্ঞতা কি বরদাস্ত হয় বুড়াে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সকল সম্পর্ক তুলিয়া দিল। নূতন উৎসহে নূতন গিন্নি লইয়া নূতন-পাতা ঘরকন্নায় বুড়াে মন দিল। বুডাের বুড়াে-বন্ধুরা বলাবলি করিল-বুড়াে-গাছে দোলা ফসল রকমারির বাহার বটে, কিন্তু সে না-মিষ্টি নাটক, পানসে ! , ৮ ১১৪ জীবন-নাট্য বছর ফিরিতে না ফিরিতে নববধূর সন্তান হইল। বুড়ােবয়সে একেই ঘুম কম হয়, তাহাতে আবার শিশুর কান্নায় বুড়াের ভারি ঘুমের ব্যাঘাত হইতে লাগিল। এ বয়সে কি এসব ঝঙ্কাট ভালাে লাগে? বুড়াে পৃথক্ ঘরে শয্যা রচনা করিল। বধু ইহাতে নারীভাগ্যকে ধিক্কার দিয়া কাদিল ; রমণীর জীবন কী দুঃখদুর্ভর ! বছরখানেক আগে বুড়ো তাহার কানে যেসব সৃষ্টিছাড়া মন- ভুলানাে কথা বলিয়াছিল এখন তাহার আগাগােড়া মিথ্যা প্রবঞ্চনা বলিয়া মনে হইতে লাগিল। তখন তাহার মনে তাহার ভাগ্যবতী সতীনের উপর হিংসা জাগিতে লাগিল। এটা যেন সম্পূর্ণ তার সতীনেরই দোষ যে, সে আগে জুটিয়া তার স্বামীর সকল মাধুর্য সকল সােহাগ নিঃশেষে উপভােগ করিয়া তবে মারিয়াছে এবং তাহার জন্য রাখিয়া গেছে শুধু অনাদর আর উপেক্ষা। সে মনে করিতে লাগিল তাহাকে বিবাহ করা সে কেবল তাহার সতীনের শূন্যস্থান পূর্ণ করিবার জন্য, তাহার যতটুকু আদর সে সতীনেরই স্মৃতির উদ্দেশে। তাহার নিজের কিছু নাই, মনে করিয়া সে ক্ষুন্ন ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল। এখন সে স্বামীর মনােহরণের জন্য বিশেষ যত্ন করিয়া যে-সব বিলাসকলা প্রণয়লীলার অনুষ্ঠান করিতে শুরু করিল তাহা বুড়াের কাছে বড় বাড়াবাড়ি ও ন্যাকামি বলিয়া ঠেকিতে লাগিল। বুড়াে মনে মনে বিরক্ত হইয়া উঠিল। এখন কথায় কথায় বুড়াের মনে তুলনায় সমালােচনা জাগে—মনে হয় আগেরটি যেমন সরল সােহাগী ছিল এটি তেমন নয়, এর মেজাজটা চটা, ঢংটা পাকামি, ব্যবহারটা অসঙ্গত। তখন বুড়াের মনে তার পূর্বপক্ষের ছেলেমেয়েগুলির প্রতি মম ফিরিয়া আসিল। গৃহ তার অতিরিক্ত অস্বস্তিকর মনে হইতে লাগিল। তার বুড়ে। বয়সের কাণ্ডখানা আগাগােড়া মুখতারই নামান্তর বলিয়া প্রতিভাত যাত্রা-সহচরী হইল। এমন ভুলটা না করিলেই ছিল ভালো। ভাবিতে ভাবিতে তাহার সমস্ত জীবন ভার হইয়া উঠিল। এতদিন তাহার মনের মধ্যে সেই আমবাগানের চোদ্দ বছরের মেয়েটির রূপই শুধু জাগিতেছিল—যাহার সাদৃশ্য সে দু-দুবার দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছিল এবং দুবারই সেজন্য বেদনা পাইয়াছে,-একবার তাহার কন্যার আকৃতিতে, আরবার এই দ্বিতীয় পত্নীর মধ্যে। কিন্তু এখন এই জীবনের অবসান-সময়ে, এই নিরানন্দ সংসারে, পত্নীর কর্কশ ভৎসনা পরিপাক করিতে করিতে,তাহার সম্মুখে জাগিয়া উঠিল সেই ধৈর্যশীল কর্মপটু গৃহিণীমূতি—যে নীরবে শুধু সংসার দেখিয়াছে, স্বামপুত্রের সেবা করিয়া গিয়াছে, যে কখনাে একটি অপ্রিয় বা রূঢ় কথা উচ্চারণ করে নাই। যে তুচ্ছ মােহে চোদ্দ বছরের কিশােরীর রূপে সে মজিয়াছিল, আজ বৃদ্ধ বয়সে ধাক্কা খাইয়া সে মােহ তাহার কাটিয়া গেল ; এখন বুড়াে বুঝিল চোদ্দ বছরের তরুণীরই প্রণয় পরিণতি পাইয়াছিল সেই সেবা-নিপুণ গৃহিণীতে ; বৃথাই সে তাহাকে তুচ্ছ করিয়া শুধু আকৃতির সন্ধানে ব্যাকুল হইয়া ভুগিয়াছে। এখন সে মৃত্যুর ভিতর দিয়া তাহারই সহিত মিলনের অপেক্ষা করিয়া দিন গণিতে লাগিল।
নিষ্কৃতি তাহারও অবস্থা একদিন ভালাে ছিল, এখন বটে সে দীনহীন বিশ্রী পঙ্গু তাহার দশ বৎসর বয়সের সময় যখন প্রথম তাহাদের গ্রামের পাশ দিয়া নূতন রেলগাড়ী চলে তখন সে সেই অপূর্ব দৃষ্ট অঘটনায় কৌতূহলাকৃষ্ট হইয়া গাড়ী দেখিতে গিয়া চাপা পড়িয়া মরিতে মরিতে বাঁচিয়া যায়। কিন্তু তাহার পা দুখানি, গাড়ীর চাকায় এমন র্থেতত হইয়া যায় যে তাহাকে হুগলির হাসপাতালে লইয়া দুখানা পাই কাটিয়া দিতে হয়। সেই অবধি সে অকর্মণ্য, বি, পরের গলগ্রহ ; 'তখন হইতেসে ভিক্ষাজীবী। তাহার নাম ছিল ফটিকচাদ। গ্রামের সবাই তাহাকে ফটকে সে অতি শৈশবেই পিতৃমাতৃহীন, অনাথ হইয়া ছিল। কিন্তু সেই শৈশবেই গৃহস্থের বাড়ীতে রাখালি করিয়া, ক্ষেত নিড়াইয়া, মজুরী করিয়া, সে আপনার গ্রাসাচ্ছাদন উপার্জন করিত, এবং যে গৃহস্থের কর্ম করিত তাহার গৃহে আশ্রয়ও পাই । কিন্তু যখন সে কাটা পা লইয়া দুইটা লাঠির উপর ভর করিয়া ঝুলিতে ঝুলিতে আপন গ্রামে ফিরিয়া আসিল, তখন সে একেবারে অকর্মণ্য, সুতরাং নিরাশ্রয় । তাহার তখন ভিক্ষার জন্য কুষ্ঠিত হস্ত প্রসারণ করা ছাড় আর গত্যন্তর রহিল না। লাঠির ভরে ঝুলিয়া ঝুলিয়া সে পথে পথে মাঠে মাঠে খামারে খামারে ঘুরিয়া বেড়াইত। দুই বগলে দুই লাঠির উপর ভর করাতে কঁধ দুইটা ঠেলিয়া উঠিয়া তাহার ছােট্ট মাথাটাকে একেবারে ঢাকিয়া হেলিত। তখন তাহার সেই চাচিকার মতাে দোদুল্য মূর্তি গ্রামিক- ལ། যাত্রাসহচরী ১১৭ দিগের করুণা অপেক্ষা হাস্যই অধিক উদ্রেক করিত। অকর্মণ্য বিকলাঙ্গ নিরাশ্রয় বালককে অশিক্ষিত চাষার বিজ্ৰপহাস্য ভিন্ন আর বড় কিছু দিত । বালকেরা তাহার দুই লাঠির মধ্যে দোদুল্য মূতির সহিত ঘণ্টার সাদৃশ্য দেখিয়া তাহার নাম রাখিল ‘ঘণ্টাকর্ণ’ এবং তাহাকে দেখিলেই ঘণ্টাকর্ণ বলিয়া খেপাইত। এই কৃষকপল্লীর মধ্যে মাত্র দুই ঘর ব্রাহ্মণের বাস ছিল। কিন্তু সংসর্গ ও শিক্ষার অভাবে তাহাদের ব্রাহ্মণত্বের অহঙ্কারটুকু ছাড়া আর বিশেষ কোনাে সদ্গুণ অবশিষ্ট ছিল না। তাহাদেরই এক ঘরে তারা- ঠাকরুণ ছিলেন বিধবা নিঃসন্তান। ফটিক যখন দ্বারে দ্বারে ফিরিয়া সকলের হাস্য বিদ্রুপ নীরবে পরিপাক করিয়া রিক্ত হস্তে শূন্য জঠরে ভারাক্রান্ত মনে তারা-ঠাকরুণের গৃহদ্বারে উপনীত হইত, তখন সেই নিঃস্ব বিধবা কি জানি কেন তাহাকে মুড়ি গুড় দিয়া জল খাওয়াইতেন, এবং প্রসাদ পাইবার জন্য অপেক্ষা করিতে বলিতেন। সেদিন বিধবার সামান্য হবিষ্যান্নের অধিকাংশই পাতে পড়িয়া থাকিত। ফটিক মাঠাকরুণের প্রসাদ পাইয়া ঠাকরুণের কাছে গেলেই যখন সহজে আহার জুটিতে লাগিল, তখন ফটিকচাদ অন্য চেষ্টা ছাড়িয়া দিয়া তাহার নিত্যকার নিমন্ত্রণ তারা- ঠাকরুণের কাছেই গছাইল। ক্রমে গােয়ালঘরের পাশে বিচালির মাচার উপর সে আপনার আশ্রয়ও রচনা করিয়া লইল। কিন্তু তাহার সে সুখের দশা অধিক দিন টিকিল না। তারা- ঠাকরুণের মৃত্যু হইল। ফটিকাদ পুনবার বিশ্বপরিবারের অন্তঃক্ত হইয়া পড়িল। কিন্তু ভাগের মা গঙ্গা পায় না ; ফটিকাদ বিশ্বের গল গ্রহ বলিয়া তাহার প্রতি কেহই করুণা করিত না। গ্রামে তাহার ভিক্ষালাভ দুর্ঘট হইয়া উঠিল। গেঁয়ে যােগী ভিখ পায় ;
১১৮ নিষ্কৃতি ; । যাহাকে নিত্য নিয়ত দেখিতেছে তাহাদের সেই আজন্মকালের পরিচিত ফটকে, তাহাকে গ্রামবাসিগণ ভিক্ষা দিতে চাহিত না। তাহারা তাহাদের গ্রামে নিত্য নিত্য সমাগত কত অপরিচিত ভিক্ষুককে ভিক্ষা দিত ; প্রত্যেক গৃহস্থ একাধিক অতিথির পরিচর্যা করিত ; কারণ ইহারা এই নূতন আসিয়াছে, আর কখনাে আসে নাই, আর কখনাে আসিবে কি না তাহারাে ঠিকানা নাই, সুতরাং মােটের উপর অধিক খরচ পড়িলেও একদিন বৈ নয় মনে করিয়া নিত্যই নৃতন বহু ভিখারীকে ভিক্ষা দিতে কখনােই কেহ আপত্তি করিত না। কিন্তু তাহাদের পরিচিত ফটকে কেন যে তাহাদের দয়ার উপর নিত্যকার দাবী লইয়া বসিয়া আছে তাহা তাহারা বুঝিতে পারিত না এবং বুঝিতে পারিত না বলিয়াই তাহাকে সহ্য করিতে পারিত না। তাহাকে দেখিলেই তাহারা বিরক্ত হইয়া উঠিত; তাহার পঙ্গুকদর্যতাও সুখদর্শন বলিয়া মনে হইত না। কিন্তু তথাপি ফটিকচাদ সে গ্রাম ছাড়িয়া নড়িবার নামটি করিত না । সে সেই বিস্তীর্ণ প্রান্তরের মধ্যে আপনার ক্ষুদ্র গ্রামখানি ছাড়া সংসারে অপর গ্রামের অস্তিত্ব সম্বন্ধেই অজ্ঞ ছিল। একবার গ্রামের বাহির হইয়া হুগলি গিয়াছিল, কিন্তু উঃ, সে কী অবস্থায় ! বাপরে! মনে করিলে এখনাে হৃৎকম্প হয় ! যে পুলিশকে সে আবাল্য যমদূতের অপেক্ষাও ডরাইত, ভূতের মতাে যাহার নাম করিলে শরীর শিহরিত, সেই পুলিশ কিনা তাহাকে টানিতে টানিতে হুগলি লইয়া গিয়া তাহার পা দুখানা কাটিয়া দিল। বাহিরের সহিত তাহার পরিচয় তাে এই ভয় ও বিপদের ভির দিয়া, সে বাহিরকে বিশ্বাস করিবে কেমন করিয়া? তারপর সেই অপয়া রেলের লাইনটা গণ্ডির মধ্যে কি একটা বিকট আশঙ্কা দিয়া তাহাকে ঘিরিয়া রাখিয়াছিল, সে উহা ডিঙাইয়া কোথায় গিয়া আবার কোন্ বিপদে পড়িবে? সুতরাং সে সমস্ত হৃদয়হীন বিদ্রুপ ও তিরস্কার { যাত্রাসহচরী ১১৯ ; ; সহ্য করিয়া, ক্ষুধা দমন করিয়া আপনার আবাল্যের পরিচিত গ্রামখানিকেই আঁড়াইয়া পড়িয়া ছিল। যখন বিরক্ত গৃহস্থ তাহার প্রতি পরিচিত উপেক্ষাভরে ভিক্ষার বদলে উপদেশ দিয়া বলিত “এখানে ট্যাঙস ট্যাঙস করে না বেড়িয়ে ভিগায়ে ভিক্ষেয় যেতে পারি না!” তখন ফটিক আশঙ্কাভরা মৌন দৃষ্টিতে একবার উপদেশদাতার মুখের দিকে তাকাইয়া মাটির দিকে চাহিয়া ভাবিত, সে কোথায় যাইবে, সে কোন গাঁয়ে, সে কাহাদের মাঝে ? সেখানে না জানি কত পুলিশ রক্তের মতাে লাল পাগড়ী বাধিয়া কত অত্যাচারের আয়ােজন লইয়া ফিরিতেছে ; সেখানে কত অজানা মুখে অপরিচিত তীক্ষ্ণদৃষ্টি তাহাকে বিদ্ধ করিবে ; কত অনভ্যস্ত বিদ্রুপ; অনাস্বাদিতপূর্ব অপমান তাহাকে উত্যক্ত করিয়া তুলিবে। সব দিন তাহার আহার জুটিত না, মাথা গুজিবার একটু আশ্রয়ও মিলিত না। গ্রীষ্মকালে সে যেখানে-সেখানে পড়িয়া থাকিত; শীতবৰ্ষায় চুরি করিয়া কাহারাে গােয়ালে কাহারাে খামারে রাত্রিযাপন করিত, আবার ভাের হইতে না হইতে চোরের মতো সরিয়া পড়িত। সে এই- রূপে সকল গৃহস্থের মধ্যে গৃহহারা, মানুষের মধ্যে বন্যপশুর মতাে তাড়িত লাঞ্ছিত। তথাপি সে আপনার দুর্বহ জীবনভার লইয়া আজন্মের পরিচিত গ্রামখানিকে আঁড়াইয়া ধরিয়া পড়িয়া ছিল। কাহারও সহিত তাহার সম্পর্ক ছিল না, কাহাকেও সে ভালােবাসিত না, ভালােবাসা না পাইয়া সে ভালােবাসিতেও শিখে নাই। করে একবার কিছুদিনের জন্য তারা- ঠাকরুণ তাহার অন্ধকারসমাচ্ছন্ন হৃদয়ে একটি ক্ষীণ প্রেম-বতির রশ্মিপাত করিয়াছিলেন, কিন্তু সেই আলােকে ভালাে করিয়া হৃদয়ের সন্ধান পাইবার পূর্বেই সে আলেকটুকুও অন্ধকার বাড়াইয়া নিভিয়া গেল, তাহার প্রাণ এখন যে-কে-সেই শূন্য অন্ধকার !
১২০ নিষ্কৃতি আজ দুই দিন তাহার কিছুই আহার জুটে নাই। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়াছে। তাহাকে ভিক্ষার জন্য আসিতে দেখিলেই শিশুকুল চীৎকার করিয়া উঠিত—ঘণ্টা বেজেছে রে, ঘণ্টা বেজেছে ! কোনাে পুরুষ তাহা শুনিয়া দারুণ অবজ্ঞার সহিত বিদ্রুপ মিশাইয়া বলিত, ‘আসুক ঘণ্টা, পাবেও ঘণ্টা। রমণীগণ তাহাকে গৃহদ্বারে উপনীত দেখিলে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠে—“পােড়াকপালে ঘণ্টা, আবার জ্বালাতে এসেছিস ? এত লােকের মরণ হয়, তাের কি মরণ নেই, যম কি তােকে ভুলে রয়েছে। আমার সােনার বাছাদের আমি খেতে দিতে পারিনে, তােকে কোখেকে ভিক্ষে দেবাে রে ছারকপালে !” এই মিষ্ট সম্ভাষণ নীরবে সহ করিয়া ক্ষুৎকাতর স্নান মুখে যখন সে এক দ্বার হইতে দ্বারান্তরে চলিয়া যাইত, তখন কোনাে ভামিনী নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া পার্শ্ববতিনীর উদ্দেশ্যে বলিত “ঘণ্টাকর্ণের ঠ্যাকার দেখেছিস, আর দাড়ানাে হল না, অমনি গােসাভরে বুক ফুলিয়ে গা দোলাতে দোলাতে চলে যাওয়া হ’ল। মরণ আর কি! তবু যদি চাল চুলাে থাকত!” তাহার নির্বাক বেদনা পল্লীরমণীদিগের নিকট অহঙ্কারের পরিচয় দিত, তাহার পঙ্গু ব্যাহত গতিভঙ্গি তাহাদের নিকট গবের আস্ফালন বলিয়া বােধ হইত। প্রায় সকল গৃহেই তাহার এইরূপ রূঢ় অভ্যর্থনা জুটিত। কোনাে রমণী নিতান্ত দয়া হইলে বলিত, “হরে ঘণ্টা, ভিন্ গাঁয়ে যানে কেন? বারােমাস ত্রিশ দিন কি একটা মানুষকে পোষা যায় ? বারাে মাস ত্রিশ দিন একটা মানুষকে পুষিতে তাহার নারাজ, কিন্তু ক্ষুধা রাক্ষসী তাহা বুঝিত না, সে বারাে মাস ত্রিশ দিন ফটিকচাদকে অতিরিক্ত ভাবেই পাইয়া থাকিত। প্রত্যাখ্যানের পর, বিদ্রুপের পর অপমান মাত্র ৰাভ করিয়া গােটা- গুটি দুটা দিন ফটিকের অনাহারেই কাটিয়া গেল। তখন ক্ষুধার তাড়নায় যাত্রা-সহচরী ১২১ • সে গ্রামান্তরে গিয়া আপনার অদৃষ্ট পরীক্ষা করিবে স্থির করিল। কিন্তু তাহাদের গ্রাম হইতে পূরা এক ক্রোশ পথ না হাঁটিলে অন্য গ্রাম পাইবার উপায় নাই। সে কেমন করিয়া তাহার ক্ষুৎকাতর দুর্বল দেহ বহন করিয়া এই দুস্তর পথ উত্তীর্ণ হইবে তাহাই সে ভাবিয়া আকুল হইল । কিন্তু তাহাকে যাইতেই তাে হইবে। নিরুপায় ফটিক গ্রামান্তরের উদ্দেশ্যে তাহার চিরপরিচিত গ্রামখানি ছাড়িয়া, ত্রাস সন্দেহ নিরাশা মাত্র সম্বল লইয়া যাত্রা করিল । আষাঢ় মাস। বর্ষার প্রারম্ভ। উতলা বাতাস ধান আর পাটের ক্ষেতের উপর দিয়া হাহা করিয়া ছুটাছুটি করিতেছিল, কালাে কালাে ফুলে ফুলাে মেঘগুলি দুঃখের প্রতিমূতির মতাে গম্ভীর নিস্তব্ধভাবে আকাশের ম্লান স্তব্ধ বুকের উপর দিয়া কে জানে কোথায় ভাসিয়া চলিয়াছিল। তাহারি মধ্যে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে ভিজিয়া ভিজিয়া ফটিকচাদ চলিতে লাগিল। সিক্ত পথের কদমে তাহার যষ্টি প্রােথিত হইয়া বসিয়া যায়, কষ্টে একবার এটা আবার ওটা উঠাইয়া দুই দিনের অনাহারক্লিষ্ট পঙ্গু তাহার জীবনােপায়ের সন্ধানে চলিতে লাগিল। পঙ্গুর স্বল্পাবশেষ শক্তি অনাহারে ক্ষীণতর হইয়াছিল, এক্ষণে কর্দমাক্ত পথে চলিতে গিয়া সে অল্পেই বিষম ক্লান্ত হইয়া পড়িতে লাগিল। মাঝে মাঝে আলের ধারে বসিয়া বিশ্রাম করে, আবার চলে। এই নিরুদ্দেশ যাত্রা ও ক্ষুধা তাহার মনকে এক অজ্ঞাত মােহে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিয়াছিল, তাহার মনে তখন একমাত্র চিন্তা জাগিতেছিল ‘খাইতে হইবে। কিন্তু হায়, কোথায়, কেমন করিয়া, তাহা সে জানিত না। তিন ঘণ্টা গুরু পরিশ্রমের পর সে আপনাকে টানিতে টানিতে এক গ্রামে আনিয়া ফেলিল। সেই গ্রামে প্রথম যাহাকে দেখিল তাহারই নিকট হাত পাতিয়া ভিক্ষা চাহিল। সে একবার রূঢ় কৌতূহলের দৃষ্টিতে ১২২ নিষ্কৃতি চাহিয়া “আরে মােলােতুই আবার আমাদের আলাতে এসেছিস?” বলিয়া প্রস্থান করিল। ফটিক একে একে সকল দ্বারে হাত পাতিয়া ঘুরিল, কেহ তাহাকে এক মুষ্টি খাদ্য বা একটা পয়সা দিল না, যেখানে যায় সেখানেই তাড়া খাইয়া ফিরে। দুর্ভিক্ষের দারুণ আশঙ্কায় সকলের করুণা যেন শুষ্ক হইয়া গিয়াছিল, হৃদয় রুদ্ধ হইয়াছিল, ক্রোধ মনের মধ্যে গুমরিয়া উঠিতেছিল, আজ ক্ষুধিতকে অন্ন দিতে কেহ প্রস্তুত নয় । ফটিক যখন একে একে সকল গৃহদ্বার, হইতে নিস্ফল হইয়া ফিরিল, তখন সে বগল হইতে লাঠি দুটা ফেলিয়া অছিমদ্দি মােড়লের বাড়ীর পাশে এক গাছতলায় লুটাইয়া পড়িল। এতক্ষণ আশা তাহার ক্ষুধায় অবসন্ন পঙ্গু দেহটাকে টানিয়া লইয়া ফিরিতেছিল। আশাই যদি বিদায় লইল, এখন আর তাহার ক্লান্ত দেহ বহন করিবে কে? সে মৃতকল্প হইয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িল, সে এইরূপে পড়িয়া পড়িয়া মােহ-অবসাদের মধ্যেও ক্ষীণ আশার কুহক রচনা করিতেছিল। অছিমদ্দি মােড়লের প্রাঙ্গণ হইতে একটা ধাড়ী মুরগী এক পাল ছানা লইয়া চরিতে চরিতে ফটিকের কাছে আসিয়া চঞ্চু ও পদনখ দিয়া মাটি খুড়িয়া চলা উটকাইয়া কীটের সন্ধান করিতে লাগিল। ক্ষুধা রাক্ষসী ফটিকের কানে কানে কুমন্ত্রণা দিল, একটা মুরগীর ছানাও যদি সে হস্তগত করিতে পারে তবে কোথাও পুড়াইয়া লইলেও কিঞ্চিৎ ক্ষুন্নিবৃত্তি হইবে। ক্ষুধার • কুমন্ত্রণায় হিন্দু ফটিক মুরগী , খাইবারও লােভ সংবরণ করিতে পারিল না। একটা আধলা কুড়াইয়া ফটিক এদিক ওদিক চাহিয়া ঝ। করিয়া মুরগীর ঝাকের মধ্যে ছুড়িয়া দিল। দুইটা ছানা আহত ও রক্তাক্ত হইয়া ভূমিতে লুণ্ঠিত হইতে লাগিল, ধাড়ী মুরগী শােকাত চীৎকার করিতে যাত্রা-সহচরী করিতে বাকি ছানাগুলিকে আপনার পক্ষপুটে ঢাকিয়া লইয়া পলায়ন করিল। ফটিকের চক্ষু দীপ্ত হইয়া উঠিল, উল্লাস জাগিয়া উঠিল, অবসন্ন দেহ আহারের আশায় স্মৃতিমান হইয়া উঠিল, সে হামাগুড়ি দিয়া অগ্রসর হইয়া ছানা দুটিকে লইতে গেল, আর ঠিক সেই মুহূর্তে সে ঘাড়ের উপর কাহারও বজ্রমুষ্টির প্রহার লাভ করিয়া মুখ থুবড়াইয়া মাটিতে পড়িয়া গেল। মাথা তুলিয়া দেখিবার পূৰ্বেই অছিমদ্দি মিঞার বজ্রমুষ্টি ও বিভীষণ লাথি সেই স্বল্পদেহ পঙ্গুকে বারংবার লুটাপুটি খাওয়াইতে লাগিল। ইট খােলামকুচি প্রভৃতি কঠিন ধারালাে জিনিসের সংঘর্ষে তাহার দেহ ক্ষত- বিক্ষত রক্তাক্ত হইয়া উঠিল । সে নির্বাক্ নিস্পন্দভাবেই সমস্ত প্রহার সবঙ্গে গ্রহণ করিল, তাহার বাধা দিবার বা আপত্তি করিবার কিছুমাত্র সামর্থ্য অবশিষ্ট ছিল না। অছিমদ্দি যখন ক্লান্ত হইয়া প্রহার হইতে বিরত হইল, তখনো ফটিক উঠিয়া বসিতে পারিল না, পড়িয়া থাকিয়াই মিটমিট করিয়া শুধু তাকাইতে লাগিল। অছিমদ্দি তাহার হাত ধরিয়া টানিয়া বসাইয়া দিল। এবং আপনার পুত্রকে থানায় পাঠাইয়া দিল । ফটিক অর্ধমৃত রক্তাক্ত কলেবরে পুলিশের অপেক্ষা করিয়া রহিল। সে যে তিন দিন কিছু খায় নাই, তাহার উপর এই দারুণ প্রহারে জর্জরিত হইয়াছে , সে কথা সে ভুলিয়া গেল, এখন পুলিশের আশঙ্কা তাহার হৃদয়- মনকে একেবারে আচ্ছন্ন অভিভূত করিয়া ফেলিয়াছিল। সকাল’গেল, মধ্যাহ্ন গেল, বৈকাল গেল, তাহার চোখের সামনে বসিয়া অছিমদ্দি সপরিবারে হাপুস হুপুস শব্দ করিয়া একরাশ ডাল ভাত ফটিকের দ্বারা আহত মুরগীর ছানা দুটা ছালম সহযােগে উদরসা করিল । বিকালে ছােট ঘােট ছেলেরা ছােট ঘােট ধামী ভরিয়া মুড়ি মুড়কি লইয়া ১২৪ নিষ্কৃতি ফটিককে ঘিরিয়া দাড়াইয়া জলযােগ করিল, কিন্তু ফটিকের আহার জুটিল না। অছিমদ্দির মাচায় শশা ফলিয়াছে, গাছে কলা পাকিয়াছে, কাকে হনুমানে খাইতেছে, আর নিরাহার ফটিক বসিয়া বসিয়া তাহাই দেখিতেছে। কত পসারী হাটে কত কি খাদ্য লইয়া গেল, কত লােক কত কি খাদ্য কিনিয়া লইয়া ঘরে ফিরিল, উপবাসী ফটিক বসিয়া বসিয়া কেবল দেখিতেছে ও পুলিশের প্রতীক্ষা করিতেছে। সন্ধ্যার প্রাক্কালে পুলিশের জমাদার কাদের বক্স খাঁ দুইজন কনেষ্টবল সঙ্গে করিয়া আসিয়া উপস্থিত হইল। অছিমদ্দি মােড়ল প্রচুর আহার- পুষ্ট ভুড়িওয়ালা জমাদার সাহেবকে এক কঁদি কলা, ১০টা পাকা শশা, এক কুড়ি আণ্ডা ও এক জোড়া মুরগী জেট দিয়া এজাহার দিল, ঐ ন্যাংড়া দুষ্টটা তাঁহার মুরগীর ছানা চুরি করিতেছিল, অছিমদ্দি তাহাকে বাধা দেওয়ায় অছিমদ্দিকে তাহার বগলের লাঠি লইয়া মারিতে আসে, অগত্যা আত্মরক্ষাৰ্থ অছিমদ্দি তাহাকে ধাক্কা দিয়া সরাইয়া দেয়, তাহাতেই সে খােলামকুচির উপর পরিয়া কাবু হইয়া পড়ে, অনেক ধস্তাধস্তির পর দুষ্টটাকে আয়ত্ত করা গিয়াছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন জমাদার সাহেব উপহৃত সামগ্রী কনেষ্টবলদ্বয়ের জিম্ম করিয়া ফটিককে বুট জুতার এক ভীম ঠোক্কর মারিয়া বজ্রনিনাদে হুকুম করিল, “উঠ, বে কবখ, চল্।” উপবাসী প্রহারজর্জরিত ফটিক তখন একেবারে উত্থানশক্তিরহিত, অনড়, তথাপি সে ভয়ে ভয়ে আপনার ক্লান্ত অবসন্ন দেইভার উঠাইতে চেষ্টা করিল কিন্তু পারিল না। জমাদার সাহেব তাহার এই অক্ষমতা দুষ্টের ছল মনে করিয়া কনেষ্টবলদের হুকুম দিল, “দুষ্টকে জোর করিয়া টানিয়া লইয়া চল।” কনেষ্টবলদ্বয়, তাহাকে হেঁচকা দিয়া উঠাইয়া তাহার লাঠির উপর যাত্রাসহচরী ১২৫ প্রতিষ্ঠিত করিল। শিকারীর সম্মুখে শিকারের মতে, বিড়ালের সম্মুখে ইদুরের মত ফটিকের সমস্ত বুদ্ধি লুপ্ত হইয়া কেবল ভয়ের আবছায়া তাহাকে বেষ্টন করিয়া রহিল। ফটিক সেই ভয়ের জোরেই কোনােমতে আপনাকে বহন করিয়া আকর্ষণ করিয়া লইয়া যাইতে লাগিল। প্রহরীবেষ্টিত হইয়া সে যখন ন্যাংচাইয়া দ্রুত গতিতে চলিতে আরম্ভ করিল, তখন শিশুরা করতালি দিয়া কলরব করিয়া উঠিল, রমণীগণ মুখে কাপড় চাপিয়া হাসিল, পুরুষেয় দন্তে দন্ত রাখিয়া অকথ্য কটু কহিল । সে-সকল অপমানের প্রতি ফটিকের লক্ষ্য ছিল না, সে চক্ষে ঝাপসা দেখিতেছিল, তাহার কর্ণে তালা লাগিয়াছিল, কর্ণে তালা লাগিয়াছিল, বােধশক্তি লুপ্ত হইয়াছিল, সে ভয়ে যন্ত্রের মতো আপনাকে কোনােমতে বহন করিয়া চলিয়াছিল মাত্র। পথে যাইতে যাইতে কত পথিক তাহাকে দেখিয়া চোর বা খুনে ভাবিতেছিল, আর স্বয়ং জমাদার ভাবিতেছিল কেমন করিয়া এই ব্যাপার- টাকে স্বদেশী মামলা করিয়া তুলিয়া প্রমােশনের উপায় করিয়া লইতে পারা যায়। প্রহরেক রাত্রির সময় তাহারা থানায় পৌছিল। ফটিক একটি কথাও বলিলনা। তারা ঠাকরুণ মরিয়া যাওয়ার পর তাহার সহিত কেহ করুণ ভাবে কথা কহে নাই, সেও সেই জন্য কখনও কাহারও সহিত কথা কহিবার বড় একটা আবশ্যক বােধ করে নাই। অব্যবহারে তাহার জিহ্বা জড় হইয়া গিয়াছিল, এখন ক্ষুধা ও ভয়ে তাহা ত পেটের দিকে টানিতেছিল। আর সে কিই বা বলিবে, বলিবারই বা আছে কি? ফটিককে হাজতে পূরিয়া চাবি দিল। তাহার যে আহারের আব- শ্যক হইতে পারে ইহা কাহারও খেয়াল হইল না। ফটিকের খােরাকীর পয়সা কয়টা জমাদার সাহেবের জেবে ঢুকিল।
১২৬ নিষ্কৃতি পরদিন প্রভাতে দাবােগা সাহেব যখন খােয়ারী ভাঙিয়া উঠিয়া তামাকু সেবা করিতে করিতে রাত্রের খুনেটাকে হাজির করিতে হুকুম দিলেন, তখন কনেষ্টবলগণ হাজতে গিয়া দেখিল ফটিক কুণ্ডলী পাকাইয়া পড়িয়া আছে। তাহারা তাহার নিদ্রা ভাঙাইবার জন্য প্রথমে জুতার ঠোক্কর, পরে লাঠির গুতা মারিয়া তাহার আর সাড়া পাইল না!
নষ্টোন্ধার ১ খৃষ্টমাসের আগের দিন সকালবেলা দুইটি অসাধারণ ঘটনা একই সঙ্গে ঘটিয়াছিল—সূর্যদেব আর ম্যসৃসিয়ে জা-বাপ্তিস্ত, গােয় সকালবেলাই উঠিয়াছিলেন। নিঃসন্দেহ, ভরা শীতের মাঝখানে,পনেরো দিনের কোয়াসা আর মেঘলা আকাশ ঝাটাইয়া যখন সৌভাগ্যক্রমে উত্তরে বাতাস বহিয়া দিনটাকে শুক্ননা ও স্বচ্ছ করিয়া তুলিয়াছিল তখন সূর্যদেবকে অকস্মাৎ তাহার তপ্ত রক্তরাগে পুরাতন বন্ধুর মতাে প্রাভাতিক পারীশহরকে আলিঙ্গন করিতে দেখিয়া সকলেই খুশী হইয়া উঠিয়াছিল। সূর্যদেব হাজার হােক বড় কেউ-কেটা তাে নহেন-তিনি নিয়াদী লােক,দেবতা বলিয়া বহুকাল হইতেই পূজা পাইয়া আসিতেছেন। এদিকে ম্যসিয় জ-বাপ্তিস্ত, গােয়, তিনিও বড় কেউ-কেটা লােক ছিলেন না তিনি ধনবান্ মহাজন, সরকারী সুদী কারবারের বড় সাহেব, অনেক কোম্পানির ডিরেক্টার, কত সভা- সমিত্রি মেম্বর, ইত্যাদি ইত্যাদি। ইনি বরং সূর্যদেবের চেয়েও একগুণ সেরা—সূর্যদেবকে তঁাহার উদয়কালের নির্দিষ্ট সময়ে আকাশে দেখা আশ্চর্য ব্যাপার নয়, কিন্তু এই ম্যসিয় গােফ্রয়ের প্রভাতিক জাগরণ নিতান্তই আশ্চর্য ব্যাপার। আমরা বিশ্বস্তসূত্রে অবগত আছি যে সেই দিন সকালবেলা পৌনে আটটার কাছাকাছি সময়ে শ্রীযুক্ত সূর্যদেব আর শ্রীযুক্ত গােদ এক সঙ্গেই উঠিয়াছিলেন। কিন্তু এই লক্ষ্মীর বরপুত্রটির জাগরণ সূর্যদেবের জাগরণ হইতে ভিন্ন ধরণের হইয়াছিল। সেই চিরন্তনকালের অতিপুরাতন তবু লােকপ্রিয় ১২৮ নষ্টোদ্ধার সূর্য উদয়মাত্রেই যাদুকরের মতাে চারিদিকে মায়ার খেলা জুড়িয়া দিল। সমস্ত রাত্রি ধরিয়া ঝুরাে চিনির মতাে চূর্ণ তুকার পল্লবহীন বৃক্ষগুলিতে ঢাকিয়া এক একটি চিনির খেলনার মতাে সাজাইয়া রাখিয়াছিল ; যাদুকর সূর্য উদয় হইবামাত্র সেগুলিকে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড গােলাপী প্রবালের তােড়া করিয়া তুলিল। এই ইন্দ্রজাল রচনা করিতে গিয়া সূর্য তাহার তৃপ্তিপ্রদ তপ্তকিরণ বন্ধুর হাসির মতন ভাতিক পথিকদের গায়ে অপক্ষপাতে ঢালিয়া ঢালিয়া দিতেছিল। তাহার হাসি জামাজোড়া-আঁটা আপিসযাত্রী বড় সাহেবের প্রতি, কম্পিতকলেবর কেরানীর প্রতি, ছিন্নচীর দিনমজুরের প্রতি, ট্রামগাড়ীর ক্লান্ত কণ্ডাক্টারের প্রতি, কিংবা নিজে শীতে কাপিয়া পরকে গরম করিতে অভিলাষী গরম গরম চীনেবাদাম- ওয়ালার প্রতি সমভাবেই বর্ষিত হইতেছিল। তাহার হাসিতে বিশ্বজগৎ খুশী হইয়া উঠিয়াছিল । অপরপক্ষে শ্রীযুক্ত গােয়ের যে জাগরণ, সে শুধু অসন্তোষ আর ফসাদে ভরা। রাত্রে তিনি কৃষিসচীবের প্রাসাদে ভােজের নিমন্ত্রণে সূপ হইতে পায়েস পিষ্টক পর্যন্ত চাখিয়া আসিয়াছেন, সেসব এখন সাতচল্লিশ বছরের পুরাতন পাকস্থলীতে হুলস্থূল বাধাইয়া তুলিয়াছে ; অম্বলে অম্বলে আর বুকজ্বলায় তঁাহার মেজাজটাও আলাতন হইয়া উঠিয়াছিল। শ্ৰীযুক্ত গােয় যে-ধরণে ডাকঘণ্টার দড়ি টানিলেন, তাহা শুনিয়াই তাহার খাস খামা শার্ল তাহার দাড়ি কামাইবার গরম জল তাড়াতাড়ি লইয়া যাইতে যাইতে রান্নাঘরের ঝিকে চোখ ঠারিয়া বলিয়া গেল— “হা হা!•••বাঁদরটা আজ সকালবেলাই মারু-মার করতে করতে উঠেছে... ওলাে গ্যাবৃত্ৰিদ, হাঁ করে আর ভাবছি কি, আজকে কপালে অনেক দুঃখু অনেক ভােগান্তি আছে !...” শাল ঘরের চৌকাঠের নিকট পৌছিয়া ভালাে মানুষটির মতাে পরম নম্রতায় দৃষ্টি নত করিল, সসম্রমে মুনিবের যাত্রা-সহচরী ১২৯ শয়নকক্ষে প্রবেশ করিয়া জানালার পাগুলি একে একে খুলিয়া দিল, আগুন জলিল এবং মুনিবের প্রসাধনের সকল আয়ােজন এমন শ্রদ্ধা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে করিতে লাগিল ঘেন ভক্ত পূজারী মন্দিরে ঠাকুরপূজার জো করতেছে। গোদয় কোটের বােতাম লাগাইতে গাইতে কড়া মেজাজে জিজ্ঞাসা করিলেন—“কটা বেজেছে রে ?” শাল উত্তর করিল—“আজ্ঞে আজ বড় শীত। ছ'টার সময় তো কনকনে ঠাণ্ডা ছিল, কিন্তু এখন হুজুর, আকাশ সাফ হয়ে রােদুর উঠেছে, আজকের দিনটা সুভালাভালি যাবে বােধ হয়।” গােদয় ক্ষুর শানাইতে শানাইত জানালার কাছে উঠিয়া গিয়া পদ। সরাইয়া দেখিলেন, পথচত্বর আলোয় স্নান করিয়া উঠিয়াছে, বরফের উপর মিঠে রৌদ্র তরুণীর অধরে স্মিত হাস্যের মতো দেখাইতেছে। হরি, সত্যই ত ! মানুষ যতই কেন দেমাকী আর চালদুরুস্ত হােক না, চাকর-বাকরের সামনে কোনাে রকম ভাবের আতিশয্য প্রকাশ করা যতই কেন বে- আদৰী লাগুক না, ডিসেম্বর মাসের শেষাশেষি সূর্যমুখ দেখি মনের আনন্দ চাপিয়া রাখিবার শক্তি খুব অল্প লােকেরই থাকে। গােদয় তাই অনুগ্রহ করিয়া আজ একটু হাসলেন। বদ্ধ জলে বায়ুম্পর্শে কুঞ্চনের মতো সেই হাসিটুকু আর কাহারাে মুখে দেখলে তিনি নিশ্চয়ই খুৰ স্তম্ভিত হইতেন। যাহােক তবু তিনি হাসিয়াছিলেন; এবং এক মিনিটের জন্যও তিনি তাহার আপিল আদালত কার-কারুবার সব ভুলিয়া বালকের ন্যায় অবাক্ প্রসন্ন মুখে দেখিতে লাগিলেন সকল পথচারী লােক ও গাড়ীঘোড়া সােনালী কোয়াসার ভিতর দিয়া কেমন আনন্দে আনাগােনা করিতেছে।
১৩০ নষ্টোদ্ধার কিন্তু আপনারা নিশ্চিন্ত থাকুন, এ ভাব তাহার এক মিনিটের বেশি টিকিতে পারে নাই। সূর্যের মতাে শুভ্র কিরণের দন্ত-বিকাশ করিয়া হাস! শােভা পার তাহাদের যাহারা নির্মা' ফাজিল,—শােভা পায় স্ত্রীলােকের, শিশুর, ছােটলােকের, আর কবির। শ্ৰীযুক্ত গােদ ফ্রয়ের কি হাসিবার অবসর আছে, বিশেষ তাে আজকার দিনে তাহার কাজের ভিড় বিস্তর আর গুরু। সাড়ে আটটা হইতে দশটা পর্যন্ত তাহাকে সমাগত বহু ভদ্রলোকের সঙ্গে বিশেষ জরুরি কাবারী পরামর্শ করিতে হইবে— যাহার; আসিবেন তঁাহারাও বড় কেউকেটা লােক নন, তঁহারাও হাসেন না, তাহাদেরও একমাত্র চিন্তা শুধু টাকা আর টাকা। আহারের পরই তাহাকে আবার গাড়ী, কর অনেক মহাশয় ব্যক্তির দ্বারে দ্বারে ঘুরিয়া অনেক কথা পাকা করিয়া আসিতে হইবে,-তাহারাও তাহারই মতন মহাজন, কাহারে সহিত সরস্বতীর সদ্ভাব নাই, সকলের সেই একই ধাদা লক্ষ্মী ঠাকরণের প্রসন্নতা। সেখান হইতে এক মিনিটও লােকসান করিবার জো নাই, শ্ৰীযুক্ত গােদয়কে আপিসে গিয়া সবুজ- বনাত-মােড়া বড়-বড়-দোয়াত-ভর টেবিলে গিয়া বিরাজ করিতে হইবে, সেখানে আবার আর-একদল নৃতন মহাজনের সঙ্গে পরামর্শ করিতে হইবে সেই একই গুরু বিষয়ে--টাকা রােজগার, অর্থসঞ্চয়, লক্ষ্মীলাভ। তাহার পর খুব সম্ভব তাহাকে তিন চারিটা কমিশনে বাহির হইয়া এমন সব লােকের সংসর্গে থাকিতে হইবে যাহারা অর্থ-উপার্জনের অতি তুচ্ছ সুযােগটিও ছাড়ে না অথচ ফ্রান্সের গবগৌরবের আলােচনায় অনুগ্রহ করিয়া ঘণ্টাখানেক সময় অপব্যয় করিবার উদারতা যাহাদের আছে। নিত্য ক্ষৌরী হইলেও গােদ য় বরাবর এমন দুচাগাছা দাড়ির খোঁচ ছাড়িয়া দেন যে দেখিলে মনে হয় যেন রাধা শিককাবাবের উপর নুন- যাত্রা-সহচরী ১৩১ ; মরিচের বুনি ছড়ানো ; তাহাতে ভঁহাকে চাষীড়ে মদ্দ বা বড় জাতের বানরের মতন দেখায়। ক্ষৌরী হইয়া জোয়ান বয়সীর ক্ষিপ্রগতিতে একট। প্রভাত-পরিচ্ছদ গায়ে টানিয়া তিনি আপনার আপিস-কারায় নামিরা গেলেন। সেখানে যাহারা সারবন্দি ভিড় করিয়া দাড়াইয়া ছিলেন তাহাদের সকলেরই এক ধান্দা, নিজের পজিটিকে পুঞ্জিত পুষ্ট করিয়া ভােলা। ইহারা টাকা রােজগারের কত রকমের ফন্দি আঁটির। গোদয়ের পরামর্শ লইতে আসিয়াছেন;—কেহ চাহেন জনমানবশূন্য মরুভূমির উপর দিয়া একটা নূতন রেলপথ খুলিতে, কেহ চাহেন পারী শহরের কাছাকাছি দেহাতে কোথাও একটা প্রকাণ্ড কারখানা খুলিতে, কেহ বা চাহেন দক্ষিণ- আমেরিকার কোনাে দেশে একটা খনি খনন করতে।... গােদহ গম্ভীর হইয়া সব শুনিলেন; কিন্তু তিনি এক মুহত ও ইহা জানিরার জন্য ব্যস্ত হইলেন না যে ভবিষ্য রেললাইনে বিশেষরকম প্যাসেঞ্জার বা মল বহনের সম্ভাবনা আছে কি না, কারখানায় চিনি না সূতি টুপি তৈরি হইবে, এবং খনি হইতে খাটি সোনা অথবা রদি তমা উঠিবে। না, এ-সব বিষয়ে উচ্চবাচ্য নয়। কারবারীদের সঙ্গে যুক্ত গােদফুয়ের যে কথাবার্তা হইল তাহা শুধু তাঁহার দক্ষিণার দরদস্তুর—তিনি যে এই-সব কঠিন প্রশ্নের মীমাংসার জন্য আটদিন ধরিয়া ভাবিয়া চিন্তিয়া ফন্দি ফিকির আবিষ্কার করিবেন তাহার জন্য তিনি এখন পাইবেন কি। এইসব অর্থলাভের নূতন পথের কল্পনা হয় তাে নক্সার কাগজচাপার তলে বা ফাইলের ফোড়ে চরম গতি লাভ করিবে, কিন্তু তাহা হইলে কি হয়, তাহার টাকা তোমার। যাইতে পারে না। ঠিক বেলা দশটা পর্যন্ত অঙ্কশাস্ত্রের আলােচনা চলিল ; দশটা বাজিব- মাত্র সুদী কারবারের ম্যানেজার সাহেব সকলকে নির্মম ভাবে বিদায় করিয়া দিয়া আপিসের দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন। তারপর খাবার-ঘরে ১৩২ নষ্টোদ্ধার প্রবেশ করিলেন। সমস্ত কাজই তাহার ঘড়ীধরা, এক মিনিটের নড়চড় হইবার জে কি। খাবার-ঘরখানি খুব জমকালো। টেবিলে দেরাজে যত সব রূপার বাসন সাজানো ছিল তাহা দিয়া একটা মন্দির প্রতিষ্ঠা সহজেই হইতে পারে। অনেকখানি সােডা গিলিয়াও গােদয়ের গলাজ্বালা কমে নাই, তাই তিনি অজীর্ণ রােগীর যােগ্য খাবার জোগাড় করিতে বলিয়াছিলেন। এই বাহুল্য আড়ম্বরের মধ্যে বসিয়া দুই শত টাকার মাহিনার বাবুর্চির পরিবেষণে তিনি আহার করিলেন বিরস বিষম মুখে দুটি ডিম সিদ্ধ আর একখানি কাটলেট। তারপর সেই লক্ষ্মীমন্ত লােকটি চাখিলেন দুতিন পয়সা দামের একটু পনির । এমন সময় ঘরের দরজা খুলিয়া হঠাৎ প্রবেশ করিল সুন্দর ও কৃশ, নীল-মকমলের পােষাকপরা, পালক-ওলা টুপির তলে হাসিমুখে ডিরেক্টার সাহেবের চার বৎসরের শিশু রাউল, আর তাহার সঙ্গে সঙ্গে তাহার জার্মানী আয়। ইহা প্রতিদিন পৌনে এগারটার সময়কার নিয়মিত ঘটনা। সাহেবের জুড়ি-জোতা হাম গাড়ী গাড়ী-বারান্দায় অপেক্ষা করে, আর অসহিষ্ণু জুড়ি ঘােড়া পথের উপর খুর ঠুকিয়া চঞ্চলতা প্রকাশ করিতে থাকে। মহামহিম লক্ষ্মীমন্ত মহাজন দশটা বাজিয়া পঁয়তাল্লিশ মিনিট হইতে ঠিক এগারটা পর্যন্ত পুত্রের সহিত আলাপ পরিচয় করিয়া থাকেন, এর এক মিনিট বেশিও নয়, কমও নয়। বাৎসল্যের পরিতুষ্টির জন্য তিনি চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পনেরােটি মিনিট নিদিষ্ট করিয়া ধুখিয়াছেন। কিন্তু ইহার কারণ ইহা নহে যে তিনি পুত্রকে ভালােবাসেন না। তাহার মতন লােকে যতদূর পারে তিনি পুত্রকে ততদূরই' ভালােবাসিতেন। কিন্তু ভালােবাসিলে কি হয়, কারবার !••• যাত্রা-সহচরী ; বিয়াল্লিশ বৎসর বয়সে যখন তিনি বেশ বৃদ্ধ এবং কতকটা জরাগ্রস্ত, তখন কেবলমাত্র ফ্যাশানের খাতিরে তিনি নিজেকে নিতান্তই প্রেমিক বলিয়া জাহির করিতে লাগিলেন এবং তাহাদেরই দলের লােক মাকু ইস ফন্তেনের কন্যার সহিত প্রেমে পড়িলেন। কন্যার পিত। ইহাতে অত্যন্ত বিরক্ত হইলেও, বিষয়বুদ্ধিতে পরিপক্ক বলি। আপনার বিরক্তি তিনি বেমালুম চাপিয়া গেলেন । তিনি এই লক্ষ্মীর বাহনটির শ্বশুর হইয়া উহাকে কৃতার্থ করিবেন এবং তাহার বিনিময়ে তাহাকে দিয়া নিজের ঋণ পরিশােধ করিয়া লইবেন ; তিনি যে বুড়াে জামাই করিতে রাজি হইবেন তাহার একটা প্রতিদান পাওয়া চাই তো। বিবাহের কয়েক ধংসর পরেই গােদষ্ক্রয় বিপত্নীক হইলেন এবং তাহার শিশুপুত্র কাউকে তিনি সসম্রমে সসম্মানে লালন করিতে লাগিলেন, কারণ সে যে বলে একদিন লক্ষ লক্ষ টাকার উত্তরাধিকারী হইবে! তাকে খাতির করিবে কে ? সােনার দোলনায় রাজপুত্রের হালে খােক। রাউল দিনে দিনে মানুষ হইতে লাগিল। কেবল তাহার বাবা কাজের ভিড়ে, তব্যের চাপে, লােকের জ্বালায় ছেলের চিন্তায় পনেরো মিনিটের বেশি ব্যয় করতে পারিতেন না; তারপর বাকি তেইশ ঘণ্ট। পয়তাল্লিশ মিনিট ছেলে থাকিত ঝি-চাকরের জিম্মায় । সুপ্রভাত রাউল। ছুপ, পভাত বাবা। শ্ৰীযুক্ত গােদয় তাড়াতাড়ি হাতের তােয়ালে ফেলিয়া পুত্রকে কোলে তুলিয়া বাম উরুর উপর বসাইলেন এবং আপনার প্রকাণ্ড থাবার মধ্যে শিশুর কচি ক্ষুদে হাতখানি ধরিয়া তাহাকে বারংবার চুম্বন করিতে লাগিলেন। আশ্চর্যের বিষয়, সত্যসত্যই তখন সেই সুদী কারবারের মহাজন ভুলিয়া গিয়াছিলেন যে শতকরা তিন টাকা সুদের কোম্পানির কাগজের দর ১৩৪ নষ্টোদ্ধার সেদিন পচিশ পয়সা চড়িয়াজে, কিংবা এখনি তাহাকে শহরিং টেবিলের উপর কোলাব্যাঙের মতাে বড় বড় দোয়াতের কালি ছড়াইয়া কোম্পানির সুদের হিসাব কষতে হইবে। -বাবা, কালকে তে বড়দিন ?--কালকে বড়দিন বুড়ো আমাকে কি খেলনা এনে দেবে বাবা? বুড়ো বাবা বুড়ো বড়দিনের বদলে একটু ভাবিয়া বলিলেন—হু দেবে বৈ কি...খেলনা•••আচ্ছা তুমি লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকলেই পাবে ! বুড়া আপনার হাজার-মহলা স্মৃতির একটা কোঠায় টুকিয়া রাখিলেন খােকার জন্য বাজার হইতে খেলনা কিনিতে হইবে। তারপর জার্মানী ধাইয়ের দিকে ঘুরিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—আচ্ছা মাদমােরাজে ব্যাবৃতা, রাউলের ওপর তুমি খুশি আছ তাে ? জার্মানী ঈষৎ হাসিয়া আপনার খুশি জানাইয়া খােকার বাপের কৌতূহল একেবারে শান্ত করিয়া দিল। মহাজন বলিলেন—আজকে বড় খাসা দিনটি, না? কিন্তু বড় শীত। যদি তুমি রাউলকে নিয়ে কোম্পানির বাগানে বেড়াতে যাও, তা হলে আজ বেশ হয়, না ব্যাবৃতা ? কিন্তু খবরদার, খুব ঢেকে-টুকে নিয়ে যেয়ো, বুঝলে ? আয় শুধু একবার ঘাড় নাড়িয়া মুনিবকে নিশ্চিন্ত করিয়া সকল উপদেশ পালন কবিবার অঙ্গীকার করিলে শ্ৰীযুক্ত গােদয় শেষবার পুত্রকে বুকে চাপিয়া ধরিয়া টেবিল হইতে উঠিলেন—অমনি তাকের উপর ঘড়ীতে এগারটা বাজিতে শুরু করিল—এবং তিনি ঘর হইতে বারান্দায় বাহির হইতেই খানসাম। শান্তাহার গায়ে ওভারকোট চাপাইয়া দিয়া তাহাকে গাড়ীতে উঠাইয়া গাড়ীর দরজা বন্ধ করিয়া দিল। তারপর সেই নিমকের চাকর মাতাল-পাড়ার গলিতে মদের দোকানে প্রস্থান করিল—সেখানে যাত্রা-সহচরী আজ দোকানের সামনের ব্যারনের বাড়ীর চাকর-বাকরদের আডডা জনবার কথা আছে। বাঁচিয়। সুস্থ থাকুক জরদা রঙের জুড়ি ঘােড়, তাহাদের প্রসাদে সুদী কারবারের কর্তার সকল কর্ম নির্বিঘ্নে যুণ সিনেই সম্পন্ন হইয়া গেল, কোথাও একটুও বিলম্ব ঘটিল না। মহাজনটোলা ঘুরিয়া তিনি দেশপতির নির্বাচনে ভােট দিয়া ফ্রান্স তথা য়ুরােপকে আশ্বস্ত করিয়া ঘরে ফিরিলেন । পথে তাহার মনে পড়িল, রাউলকে বলিয়া আসিয়াছেন, বড়দিন বুড়াে তাহাকে খেলনা উপহার দিবে ; তখন তিনি খেলনার দোকানে গাড়ী লইয়া যাইতে কোচগানকে আদেশ করিলেন। খেলনার দোকানে গিয়া তিনি দেখিয়া শুনিয়া পছন্দ করি.i ছেলের জন্য সওদ। করিলেন একটা কাঠের ঘােড় চাকার উপর চড়ানে; একবাক্স সীসার সৈন্য, সবগুলির চুল কালাে আর নাকগুলি উল্টানো, বেন সব যমজ ভাই কিংবা রুষ রেজিমেন্টের সৈন্য ; এমনি আরো বিশ রক,নর খেলনা, চকচকে আর চমৎকার। খেলনাগুলি গাড়ীতে তুলিয়া তিনি গাড়ীর গদিতে সুখাসীন হইয়া গতির তালে তালে নাচিতে নাচতে বাড়ীর দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন, পুত্রের ভাবী আনন্দের ছবি আঁকিয়া তাঁহার পিতৃহৃদয় বাৎসল্যের সুখে গবে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছিল। থােক। বড় হইবে, রাজার হালে তাহার শিক্ষা সহবৎ হইবে, এবং একদিন সে বিশ পঁচিশ, চাই কি ত্রিশ লক্ষ টাকার মালিক হইয়া গঁাট হইয়া পায়ের উপর পা দিয়া বসিয়া বসিয়া সুখে স্বচ্ছন্দে জীবন কাটাইবে।
নষ্টোদ্ধার ; । । রাষ্ট্রবিপ্লবের দৌলতে এখন টাকার সংখ্যাতেই খাতির, টাকার পরিমাণেই মানের মাপ, বংশের বড়াই একেবারে মাটি। রাউলের বাপ, সামান্য একজন মােক্তারের বেটা; রাউলের বাপ ছাত্রদের মেসে থাকিয়া এক- কালে সাড়ে পাঁচ আনা রােজ হিসাবে খােরাকী দিয়া মানুষ ; তাহার তখন না ছিল একটা ভালাে পােশাক, না ছিল কিছু মান সল্পন। সেই লােক যদি অগাধ সম্পত্তি সঞ্চয় করিয়া থাকিতে পারে, প্রজাতন্ত্রের দৌলতে যদি সে রাজশক্তির ভাগ পাইতে পারে, অবশেষে যদি বিবাহে বড় ঘরানার মেয়ে পর্যন্ত জোগাড় করিতে পারে, তবে তাহার ছেলে রাউল, সে না পারিবে কি? শিশুকাল হইতেই যে রাজার হালে মানুষ, মাতৃবংশের দিক্ দিয়া যাহার শরীরে আভিজাত্যের গর্বিত শোণিত প্রবাহিত, যাহার বুদ্ধি বিদ্য। দুষ্প্রাপ্য পুষ্পের মতাে চমৎকার হইবে, যে দোলনায় শুইয়াই বিদেশী ভাষায় তালিম হইতেছে, এক বৎসর পরেই যে পনি ঘােড়ায় সােয়ার হইবে, একদিন যে নিজের নামে মাতৃবংশের পদবী যােগ করিয়া হইবে শ্রীল শ্ৰীযুক্ত গােদয় ফন্তেন, গােদয়-বংশের নামে এমন উপাধি যােগ, আহা সে কী উপাধি, একেবারে রাজকীয়, অতি প্রাচীন, একেবারে ক্রুজেডের গন্ধযুক্ত উপাধি যে যােগ করিবে, সেই রাউল না পারিবে কি ? কী উজ্জ্বল তাহার ভবিষ্যৎ! কী আশাপ্রদ তাহার জীবনযাত্রা!... সাধারণতন্ত্র ভালাে বটে, কিন্তু ভবিষ্যতের কথা তাে বলা যায় না, আবার হয় তাে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইবে; তখন আমার রাউল, না না, রাউল কেন, আমার গােদয় ফন্তেন হয় তো রাজকন্যা বিবাহ করিবে, আর কে বলিতে পারে যে তখন আমার রাউল একেবারে রাজার সিংহাসন ঘে সিয়া না বসিবে, রাজপরিষদের উদি সোনালি রূপালি জরির কাজ- করা কিংখাবের পােশাক তাহার গায়ে ঝলমল না করিবে; নিশ্চয় তাহার ফেটিং গাড়ীর তল হইবে সােনার, পা-দান রূপার, আর থাকিবে ॥
যাত্রা-সহচরী ১৩৭ সাহস-কোচমানের পাগড়ীতে তকুন, বুকে চাপরাস, গাড়ীর গায়ে জমকালো মযাদাচিহ্ন! হার মৃঢ় টাকার যক্ষ ! আজ নিজের শশুর আনন্দের জন্য যে শিশুর জন্ম-উৎসব-উপলক্ষ্যে এত টাকার খেলন; কিনিয়া সী বােঝাই করিয়া লইয়া যাইতেছে, সেই শিশু একদিন দীনহীন জনকজননীর ক্রোড়ে আস্তা- বলের আবর্জনার মধ্যে জন্মলাভ করিয়া জগৎকে আজ জয় করিয়াছে, সে তো একবারও মনে পড়িল না ! শুধু অর্থের চিন্তা, সম্পদের স্বপ্ন ! চিন্তায় বাধা দিয়া গাড়ী বাড়ীর গাড়ীবারান্দায় সিড়ির সামনে আসিয়া থামিল। গােদয় সিড়িতে উঠিতে উঠিতে দেখিতে পাইলেন দালানে তাহার সমস্ত চাকর দাসী ভীতিপাংশুলমুখে তাহারই অপেক্ষায় দাড়াইয়া আছে, এবং এক কোণে জার্মানী আয়াটা জড়সড় হইয়া পড়িয়া আছে। জার্মানী তাহাকে দেখিব। মাত্র চীৎকার করিয়া দুই- হাতে তাহার মুখ ঢাকিল, আঙুলের ফাক দিয়! তাহার অশ্রুধারা গড়াইয়া পড়িতে লাগিল। এইসব দেখিয়া শুনিয়া অমঙ্গল-আশঙ্কায় গােদয়ের মুখ শুকাইয়া এতটুকু হইয়া গেল। 'কি রে,•••ব্যাপার কি ?...আঁ?... খাস খানসামা শাল চোখে বেদনা ও মুখভাবে ভয় ভরিয়া আত। আন্তা করিয়া বলিল—আজ্ঞে রাউল -খাে ? --আজ্ঞে হারিয়ে গেছে ! এই নচ্ছার জার্মানী মাগীই তাে যত নষ্টের মূল !•••হারিয়ে গেছে বিকেল চারটার সময় থেকে... সৈন্যের বুকে গুলি লাগিলে সে যেমন কঁাপিতে কাপিতে হটিয়া যায়, ব্যথিত পিতাও তেমনি দুই পা হটিরা স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইলেন এবং ১৩৮ নষ্টোদ্ধার জার্মানী তাহার পায়ের উপর আছাড় খাইয়া পড়িয়া কেবলি অত স্বরে বলিতে লাগিল—মাপ করুন ! আমায় মাপ করুন ! সকল চাকরেরা একসঙ্গে গােলমাল করিয়া বলিতে লাগিল—এই মাগী কোম্পানির বাগানে যায়নি হুজুর ! ও কি কোনো দিন রাউলকে আর কোথাও বেড়াতে নিয়ে যায় ? রােজ রােজ ঐ গুণ্ডাপাড়ায় যায় ; সেখানে একটা লােকের সঙ্গে ওর ভাব আছে।...কী সৰ্ব্বনাশ ! কচি ছেলে নিয়ে গুণ্ডাপাড়ায় যাওয়া ! সেখানে ছেলে হারাবে না তাে হারাবে কোথায় ? ও নাগীর কি ছেলের দিকে নজর থাকে, একেবারে গল্পে মেতে যান গিয়ে। এখন ছেলে কোথায় চলেই গেল, না, গুণ্ডারাই চুরি করলে, তা কে জানে?•••আমরা ঢের তল্লাস করেছি হুজুর, কোথাও তো কিছুর কিনারা পাওয়া গেল না। খােকা! হারাইয়া গিয়াছে ! গােদয়ের কানে শুধু এই দুইটি কথা প্রলয়ের মূছর বিষাণ বাজাইতেছিল। তিনি লাফাইয়া জার্মানীর ঘাড়ের উপর গিয়া পড়িলেন, কিল উচাইয়া তাহাকে. মারিতে গেলেন, তারপর দুই হাতে তাহার দুই বাহু পরির! জোরে ঝকানি দিতে দিতে দাঁত কড়মড় করিয়া ক্রুদ্ধ-গর্জনে বলিতে লাগিলেন—বল মাগী বল, কোথায় থােকাকে হারালি ? বল হারামজাদী, নইলে তােকে মেরে গুঁড়াে করে ফে।••••••কোথায় ?••••••কোথায় ?••••••আমার খােকা কোথায় ?::: কিন্তু সেই ঝি বেচারী শুধু কঁপিতে কঁপিতে ক্ষমাই চাহিতে লাগিল, আর কিছুই বলিতে পারিল না। খােকা! তাহার খােকা! সে হারাইয়া যাইবে, চুরি যাইবে । ইহা অসম্ভব। যা যা সকলে মিলিয়া খোঁজ। খােকাই যদি না থাকিল তো টাকা কাহার জন্য ? মুঠা মুঠ। টাকা ছড়াইয়া গলিতে গলিতে যাত্রা-সহচরী আর বাড়তে বাড়ীতে জনে জনের পিছু পুলিশ লাগাইয়া দিতে হইবে । এক মুহতও বিলম্ব কর! নয় । —শার্ল, দেখ, তাের। এই মাগীকে পাহারা দিবি। আমি পুলিশে খবর দিতে চান•••••• গোদয়ের বুক ন ভাঙি পড়িবার মতন ধড়াস ধড়াস করিতে লাগিল, ভয়ে ভাবনায় সর্বাঙ্গে রােমাঞ্চ হইতে লাগিল। তিনি পুনরায় গাড়ীতে চড়িয়া বসিলেন, ঘােড়া ক্রুদ্ধ পাগলের মতো পুলিশের থানার দিকে ছুটিয়া চলিল। অষ্টের, পরিহাস! পড়ার গদি ভরিয়া চকচকে সব খেলনা পড়িয়া আছে ; পথের পারে সারবন্দি গ্যাসের আলো, দোকানে দোকানে আলাের রােশনাই, ছুটন্ত জালনা দিয়া বার বার সেই সব চকচকে খেলনার উপর পড়ুয়া! হ! জার চোখে যেন আগুন নিতেছে। আজ এক দেবশিশুর জন্মদিন, আজ বিশেষ করিয়া শিশুদেরই আনন্দ- উৎসব, তাহার শিশু কিন্তু আজ তাহার ঘরে নাই, একথা চারিদিকের পুলক-আয়ােজন কিছুতেই তাহাকে ভুলিতে দিতেছিল না। এই উৎসব-প্রমত্ত শহরের পথে 'পাগলের মতাে ছুটিতে ছুটিতে দুঃখে ত্রিয়মাণ পিত। আপন মনে বার বার বলিতেছিলেন—“আনার রাউল । আমার খােকা !..বাবা আমার ! তুই কোথায় গেলি...কোথায় আছিস ?” আর অধৈর্যে উত্তেজিত হইয়া গাড়ীর গদির উপর আঙল- গুল চাপিয়া চাপিয়া মটকাইতেছিলেন। আজ এখন তাহার কাছে পদমযাদা, কোম্পানির কাগজ, টাকার সিন্দুক, সুদ আসল সমস্তই মিথ্যা বােধ হইতেছিল। একমাত্র চিন্তা আগুনের শিখার মতে তাহার উত্তাল মস্তিষ্কের মধ্যে জাগিতেছিল—আমার থােকা, কোথায় আর খােকা ! ঐ ঐ পুলিশের থানা। জোরসে জোরসে গাড়ী হাঁকো...রােকো খেতাব সম্মান, ।
১৪০ নষ্টোদ্ধার রােকা, গাড়ী রােকো !...যা, থানায় কেহই নাই, উৎসব-আনলে সকলে যে-যার দিকে ছড়াইয়া পড়িয়াছে।••••••কোই হয়, কোই হ্যায়?...এই কনেষ্টবল, এই এই, শােন...আমি জ"।-বাপ্তিস্ত, গােদফয়, সরকারী সুদী কারবারের কত ,...আমার ছেলে, খােকা, শহরের রাস্তায় হারাইয়া হিয়াছে... চার বছরের খােকা আমার, •••দারােগা সাহেব কঁাহা, দারােগ। সাহেব কাহা•••••• গােদফ্রন্থ তাড়াতাড়ি কনেষ্টবলের হাতে একট; মােহর গুজিয়া দিলেন। সেই কনেষ্টবলটি বৃদ্ধ, প্রকাণ্ড-পাকা-গোঁফ-ওয়ালা ভদ্রলােক ; সে গিনির সুপারিশে যত না হােক, বিপন্ন পিতার কাতরতা দেখিয়া তাহাকে দারােগা সাহেবের খাস কামরায় লইয়া গেল। সে ঘরে দারোগ- সাহেব এক চোখে চশমা দিয়া পেঁচার মতাে গম্ভীর হইয়া বসিয়া ছিলেন । গােদয় আবেগকম্পিত চরণে ঘরে প্রবেশ করিয়া একখানা চেয়ারে বসিয়া পড়িয়া দিয়া ফেলিলেন, এবং ফোপাইতে ফেঁাপাইতে নিজের দুঃখকাহিনী বিবৃত করিতে লাগিলেন। দারােগা সাহেবও ছেলের বাপ'; এই করুণ দৃশ্যে তাহার মন গলিয়া গেল। কিন্তু তিনি পুলিশের বড় সাহেব, কোমলতা প্রকাশ করা তাহার শােভা পায় না, এইজন্য কষ্টে মনােভাব দমন করিয়া পূর্ব বং গম্ভীর হইয়াই বসিয়া রহিলেন। -আচ্ছা, মশায়, আপনি বলছেন চারটের সময় ছেলে হারিয়েছে, ? -হঁা, দারােগা সাহেব। —হু', তারপরই অন্ধকার হয়ে গেছে..বয়সও তো তেমন বেশি নয় যে পথ চিনে বাড়ী ফিবে ; লােককেও জিজ্ঞেস করতে পারবে না, কেউ জিজ্ঞেস করলেও জবাব দিতে পারবে না...এখনো ভালাে করে হয় যাত্রা-সহচরী ১১১ তাে কথাই ফোটে নি, বাপ-পিতার নাম ও তাে সে জানে না, কেমন কিনা ? —হ্য। হ্যা, দাবােগা সাহেব, হ্যা !... ---হু, হারিয়েছে মেছােবাজারের দিকে ?..., পাড়াটা বদ বটে, ••• গুণ্ডা চোর বাটপাড়ের আডড। ঐ মহল্লায়।...তা আপনি ভাব- বেন না, ওপাড়ার খুব হুসিয়ার দারােগা আছে... আমি তাকে এক্ষুনি টেলিফেঁ ক'রে বছি"... হতভাগ্য পুত্রহারা পিতা পাঁচ মিনিট একলা বসিয়া। কী সে ভয়ানক দুঃসহ সুদীর্ঘ সময় ! পাগল হৃদয়ের তখন কী ব্যাকুল আতনাদ ! দারােগা সাহেব তাড়াতাড়ি হাসিমুখে ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন- ছেলে পাওয়া গেছে! আশ্বস্ত পিতার উদ্দাম আনন্দের কী ব্যগ্র প্রকাশ ! তিনি দারোগার হাত ধরিয়া আবেগভরে ভান্নিা ফেলিবার উপক্রম করিলেন। -আপনার ছেলে পাতলা রকমের ফস। ফুটফুটে, কেমন কি না? একটু রােগাটে রকম চেহারা, না?•••নীল মকলমের পােশাক-পরা ? টুপির, উপর সাদা পালক দেওয়া, কেমন ?... -হুঁ হুঁ। দারোগা সাহেব, ঐ আনার ছেলে, ঐ ঐ আমার খােকা !...সেই ওই...সেই আমার রাউল —বেশ বেশ! ত'সে ছেলে ঐ পাড়ার একজন গরিব লোেকর বাড়ীতে আছে। সে থানায় এসে এজাহার দিয়ে গেছে।•••", এই তার ঠিকানা—পিয়েরো, পাথুরে গাল, বাজার বাগান। গাড়ীতে গেলে । এক ঘণ্টার মধ্যেই আপনি আপনার ছেলেকে দেখতে পাবেন। তবে আপনি কি সে কদর্য জায়গায়, নােংরা গলির কুঁড়ে ঘরে যেতে পারবেন?
১৪২ নষ্টোদ্ধার সে লােকটা তরিতরকারীর ফেরিওয়ালা ! কিন্তু হলে কি হয়, লােক ভালো, নয় ? অ ! সে লােক নিশ্চয় খুব ভালাে! গােদয় উচ্ছ্বসিত আবেগে দারােগ। সাহেবকে ধন্যবাদ জানাইয়া চার-চারটা করিয়া সিঁড়ি ডিঙাইয়া গাড়ীতে গিয়া উঠিলেন ; সেই সময় সেই তরকারীর ফেরিওয়াল। সেখানে থাকিলে সরকারী সুদী কারবারের বড় সাহেব তাহার গলা ধরিয়া তাহাকে প্রাণ ভরিয়া আলিঙ্গন করতেন। সত্যসতাই শ্ৰীযুক্ত গােদয়, সরকারী সুদী কারবারের বড় কত, সেই চাষাটার দেখা পাইলে তাহাকে আলিঙ্গন করিতেন। তবে এই লক্ষ্মীর দাস দাম্ভিক ধনীর অন্তরে টাকার মমতা ছাড়া অন্য ভাবও আছে। এই মুহূর্তে তিনি অনুভব করিতে- ছিলেন যে তিনি পুত্রকে কি পরিমাণ ভালােবাসেন ! কোচমান কোচমান, জোরসে হাঁকো, চাবুক লাগাও ! এখন আর তাহার অর্থ সঞ্চয়ের চিন্তা ছিল না, পুত্রকে রাজপুত্রের ধরণে মানুষ করিয়া তুলিবার কল্পনাও আসিতেছিল না; তিনি ভাবিতে ছিলেন বেতনভােগী চাকরদাসীর মিথ্য। মমতার কথা। ভবিষ্যতে তিনি সুদের হিসাবে জবাব দিয়া নিজেই ছেলের খবরদারি করিবেন ; করিবেন ; তাহার বুড়ী পিসির খোজ খবর এতদিন কিছুই লইতে পারিতেন , এখন তাহাকে আনিয়া বাড়ীতে রাখিবেন-ত। হােক সে পাড়াগেঁয়ে। পিসির পাড়াগেঁয়ে কথার টান আর সেকেলে ধরণের জন্য তাহাকে সৌখীন মহলে লজ্জা পাইতে হইবে, তা হােক, বুড়ী মানুষ একলাটি পড়িয়া আছে, কষ্ট পাইতেছে, তাহাকে দেখাও তাে কতব্য। আর সে এবাড়ীতে আসিয়া থাকিলে আদর যত্ন করিয়াই তাহার নাতিটিকে প্রাণের টানে মানুষ করিয়া তুলিছে। চাবুক লাগাও • কোচমান, চাবুক লাগাও! এই মহাজনের সময়ের টানাটানি রােজই, যাত্রা-সহচরী ১১৩ আর দেনাদার খাতকদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করিবার জন্য তাহাকে রােজই তাড়াতাড়ি গাড়ী হাঁকাইতে হয়। কিন্তু আজ টাকা রােজগারের ধান্দা একেবারে ঠাণ্ডা হইয়া গেলেও আজ ত্বরার অবধি ছিল -আজ জীবনে প্রথম তাহার সহিত তাহার সহিত তাহার পুত্রের প্রকৃত বাৎসল্যের পরিচয় ঘটিবে । চাবুক লাগাও কোচমান ! জোরসে হাকাও ! এই কনকনে শীতের রাত্রে সেই গাড়ী সমস্ত পরিী শহরের বুকের উপর দিয়া অতি বেগে দীর্ঘপথ পান করিতে করিতে উদ্বেগের মতে। ছুটিয়া চলিতেছিল, এবং সরকারী আপিস আদালত, সওদাগরী কুঠি কারখানা, হােটেল সরাই পিছে ফেলিয়া অন্ধকার সরু গলির গোলক- ধাঁধায় গিয়া পড়িল। একটা নােংরা পাড়ার নােংরা গলিতে গাড়ী থামিল, নাম কিন্তু তাহার রাজার বাগান ! শ্ৰীযুক্ত গােদর গাড়ীর লণ্ঠনের আলােকে পথ দেখিয়া গাড়ী হইতে নামিলেন ; দেখিলেন সেখানে এক চত্বর খোলার বাড়ী, ভাঙাচোরা ঝুপসী ছাপ্পর। এই তো সেই নম্বর যে-বাড়ীতে সেই তরকারী-ফিরিওলা থাকে। আবেগ-কম্পিত হস্তে তিনি দরজার কড়া নাড়লেন। বাড়ীর দরজা খুলিয়া একজন লােক বাহির হইয়া আসিল, সে প্রকাণ্ড লম্বাচৌড়া জোয়ান, তেওঁটে তালের মতাে তাহার মাথা, আর চৌকো মুখের মাঝে একজোড়া প্রকাণ্ড কটা গোঁফ। সে নুলােতাহার ডুরে কাপড়ের পশমী জামার বাঁ-হাতটা এক পাশে ঝলঝল করিয়া ঝুলিতেছিল। সে সেই চকচকে গাড়ী আর সুন্দর ওভারকোট-পরা গাড়ীর অধিকারীকে দেখিরা সানন্দ সম্রমে বলিল—“আসুন, মশায়, আসুন। আপনি বুঝি ছেলের বাবা?•••কিছু ভয় নেই.••খােকার কিচ্ছু হয়নি•••সে বেশ আছে।” সে দরজার এক পাশে সরিয়া দাড়াইয়া আগন্তুককে বাড়ীতে প্রবেশের ১৪৪ নষ্টোদ্ধার পথ ছাড়িয়া দিল এবং নিজের মুখের উপর একটি আঙুল রাখিয়া বলিল- “আস্তে মশায় আস্তে ! খােকা ঘুমুচ্ছে।” ৩ কুঁড়ে ঘর। সত্যই কুঁড়ে । ঘরের এক কোণে একটা কেরােমিনের কুপি জ্বলিতেছিল—তাহাতে আলাে হইতেছিল অল্প, গন্ধ উঠিতেছিল বিষম, এবং ধোঁয়া হইতেছিল প্রচুর। সেই ধূসর আলােয় গােদয় দেখিলেন ঘরের আস্ব একটা পায়-ভাঙা দেরাজ, খানকতক হাতভাঙা চেয়ার, একখানা ময়লা গােল টেবিল আর তার উপর রাত্রের সামান্য আহারের উচ্ছিষ্ট বাসন পড়িয়া আছে ; দেয়ালের গায়ে দুখানা সস্তা ছাপ। ছবি টাঙানো। কিন্তু সেই তুলে ফেরিওলা তাহাকে অধিক কিছু দেখিবার অবসর দিয়া কুপিটা উঠাইয়া লইয়া ঘরের এক পাশে গেল ; সেখানটা একটু আলো হইয়া ওঠাতে দেখা গেল একটি বিছানার উপর দুটি ছেলে গাঢ় নিদ্রায় অভিভূত রহিয়াছে। উহারই মধ্যে বড় ছেলেটি ছােটটিকে আদর করিয়া জড়াইয়া ধরিয়া বুকের কাছে টানিয়া লইয়া ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। গােয় চিনিলেন সেই ছােট ছেলেটি তাহারই থােকা রাউল। ফেরিওল তাহার চাষাড়ে কথা যথাসাধ্য মােলায়েম করিয়া বলিল— “দুই ছেড়াই ঘুমে যেন মরে রয়েছে ! আমি তাে জান্তাম না যে এই ছােট রাজাকে কে কখন খুজতে আসবে, তাই আমি ওদের খাইয়ে-দাইয়ে আমার বিছানায় ঘুম পাড়িয়েছি ; আর ওর চোখ বুজতেই পুলিশে গিয়ে খবর দিয়ে এসেছি।•••অন্য দিনে জিদোর তার আলাদা ছােট বিছানায় শোয়, আজকে ওদের আমার বিছানায় শুইয়ে আমি জেগে রয়েছি—আমাকে তত ভােরে উঠে গঞ্জের হাটে যেতেই হবে... ; .
যাত্রা-সহচরী ১১৫ এত কথা গােয়ের কানে গেল কি না সন্দেহ। তিনি সেই দুমন্ত ছেলে দুটিকে দেখিতেছিলেন। উয়ার। একটা ভাঙা খাটিয়ায় ময়লা বিছানায় তাহার ঘােড়ার গায়ের কম্বলের চেয়েও অপম একখান মােটা কম্বল মুড়ি দিয়া পড়িয়া আছে! কিন্তু তবু এই দৃশ্য কী সুন্দর, কী 'চমৎকার । রাউল তাহার নূতন চকচকে মকমলের পােশাক পরিয়া ছেড়া-কাপড়-পর। তাহার সঙ্গীর কোলের কাছে কেমন স্বচ্ছন্দ নিরের সহিত শুইয়া আছে! রাউলের রক্তহীন ফ্যাকাশে ছােট মুখখানির পাশে এই ছােটলোকের ছেলেটির স্বাস্থ্যসুন্দর কালো কুৎসিত মুখখানিও দর্শনীয় বলিয়া মনে হইতেছিল । গােয় দেখিয়া দেখিয়া মুগ্ধ হইয়া ফেরিওয়ালাকে জিজ্ঞাসা করিলেন—এটি তােমার ছেলে ?.••••• —না, মশায়। আমি বিয়ে করি নি, বিয়ে হবারও আর সম্ভাবনা দুবৎসর হবে আমার একজন পড়শী মজুরনি মারা গেল ; আহা নাগী বড় গরীব ছিল, খেটে খেটে প্রাণ বা’র কবুত তবু তার নিজের আর তার ছেলের পেট ভরা খাবার একবেলাও জুটত না। এমনি করে পাঁচ বৎসর চল্ল, কিন্তু তার পর তার প্রাণে আর সইল না, সে মারা গেল। মাওড়া ছেলেটি ভগবান্ আমার হাতেই ফেলে দিলেন,-মায়েদের নিজের নিজের বাছারাই খেতে পায় না তা পরের ছেলেকে কি খাওয়াবে, তাই মায়েরাও এই মাওড়া ছেলের ভার নিতে পারলে না, তখন ভগবান এই হতভাগার ওপর ভার দিলেন। এ ভার আমার লাঠির ভারের মতন হয়েছে,-এ আমার অবলম্বন, আমার সহায়, আমার বল ভরসা। এমনি করেই ভগবান্ তার দেওয়া বােঝা সােজা করে তােলেন। রােজ ইস্কুল থৈকে এসে সে তুলদাড়ি আর ওজন বাটখারা মাথায় নিয়ে ঠেলাগাড়ীতে তরকারি সাজিয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে ঠেলে নিয়ে বেড়ায়—আমি এই নুলাে ১৪৬ নষ্টোদ্ধার } হাত দিয়ে যা পারি না, জিদোর তা সহজেই করে দেয়। সাত বছরের ছেলে, কিন্তু এর মধ্যে ও এমনি চালাক ! ও-ই তো খােকাকে কুড়িয়ে পেয়েছিল । -কি রকম ? এই বালক ?... —ওর বড় বুদ্ধি মশায়। ও ইস্কুল থেকে আসার সময় দেখলে যে খােকা রাস্তায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে ফাকামুখো হয়ে হাপুস নয়নে কাদছে । ও থােকার সঙ্গে ভাব করে চুপ করিয়ে ভুলিয়ে আমার কাছে নিয়ে এল আমি সেখান থেকে নিকটেই আমার তরকারি ফেরি করে ফিরছিলাম। দেখতে দেখতে আমাদের ঘিরে লােক জমে গেল, আর সবাই কত কি জিজ্ঞাসা করে ক'রে থােকাকে ডরিয়ে তুলতে লাগল। খােকার কথা আমরা কেউ বুঝতে পারলাম না,ভালাে করে একে কথা বলতেই শেখেনি, যা দু একটা বলে তারও কতক ইংরিজি কতক জামান। তখন কেউ কেউ বলে খােকাকে থানায় দিয়ে আসতে। কিন্তু জিদোর রাজী হল না, সে বলে পুলিশ দেখে থােকা ভয় পাবে। আরে, আপনার খােকা জিদোরকে ছেড়ে কোথাও যেতেও চাচ্ছিল না। তখন আমি গাড়ীর বেসাত বাড়ীতে এনে থুয়ে, খােকাকে জিদোরের কাছে রেখে থানায় খবর দিতে গেলাম । রাত্রে ওরা একসঙ্গে কতকালের চেনা বন্ধুর মতো আননে খাবার খেয়ে ঘুমুচ্ছে ;•••খােকাকে কে কখন খুজতে আবে বলে আমি জেগে আছি। আশ্চর্য ! শ্ৰীযুক্ত গােদয়ের মনে যাহা হইতেছিল তাহা তাহার অন্তরাত্মাই জানে। গাড়ীতে আসিতে আসিতে তিনি সঙ্কল্প করিয়! আসিয়াছিলেন যে তঁাহার খােকার রক্ষাকর্তাকে বকশিস দিয়া বেশ খুশি করিয়া দিবেন—খাতকদের রক্তশােষা সুদের আমদানি হইতে এক মুঠে সােনার মােহর ! কিন্তু আজ তাহার দৃষ্টির সম্মুখ হইতে যে যবনিক যাত্রা-সহচরী S৭ সরিয়া গেল তাহার অন্তরালে দরিদ্রের এ কী জীবন লুক্কায়িত ছিল :- দারিদ্র্যের মধ্যে সততা, দুঃখের মধ্যে আনন্দ, অভাবের মধ্যে আতিথ্য ! সেই মজুরনি তার সন্তানপালনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা, এই লো লােক- টির স্বাবলম্ব ও অনাথের প্রতি বাংসল্য, আর এই ছােটলােকের ছােট ছেলের এতখানি দয়া আর বুদ্ধি সেই ধনকুবেরকে অচিন্তিতপূর্ব ভাবনার ভাবাইয়া তুলিল। এই যে বালক তার খােকাকে ছােট ভাইটির মতন বুকে করিয়া নিশ্চিন্ত আরানে গুন পড়াইয়াছে, অচেনাকে চির- পরিচিত বন্ধুর মতো নিজের খাবারের ভাগ দিয়া নিজের ঘরে রাখিয়াছে, পুলিশের নির্মম হেপাজতে ছাড়িয়া দিতে রাজি হয় নাই, এ তো ব- শিসের লােভে মােটেই নয়। তবে শুধু মানিব্যাগের বন্ধ খুললেই তাহার কতব্য শেষ হইবার নহে—তিনি জিদের আর তাহার পালক পিতা নুলো ফেরিওয়ালার ভবিষ্যৎ একেবারে নিশ্চিন্ত করিয়া দিবেন, তাহার কৃতজ্ঞ সামর্থ্য চিরদিন তাহাদিগের অনুসরণ করিলে তবেই তিনি সন্তোষ লাভ করিবেন। সরকারী সুদী কারবাবের বড় সাহেবের মজলিসে যেসব ভাবুকতাহীন মহাজনদের দহরম মহরম, তাহারা তাহাদের আদর্শ- স্বরূপ এই বড়সাহেবের মনের এখনকার অবস্থা জানিতে পারিলে নিশ্চয় খুব আশ্চর্য হইয়া যাইত। বাস্তবিক সুদী কারবারের বড়কত। আজ তাহার জীবনের এক নূতন অধ্যায়ের পরিচয় দিলেন, তিনি সদাশয় আন্তরিকতা মুক্ত করিয়া ধরতে উদ্যত ! সত্যই তিনি এই দরিদ্র ছােটলােককে বকশিস দিতে গিয়া টাকার খলির বন্ধ না খুলিয়া একেবারে হৃদয়ের বন্ধ খুলিয়া দিতে প্রস্তুত ! এই মুহূর্তে তাহার মনে হইল এই ফেরিওল। ছাড়া জগতে আরাে অনেক দরিদ্র পঙ্গু আছে, জিদোর ভিন্ন অনেক অনাথ শিশু আছে, অনেক মাতা সন্তানপালন করিবার সংগ্রামে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতেছে। আরাে আশ্চর্য যে, তাহার মনে হইল অর্থ যদি ১১৮ নষ্টোদ্ধার অভাবই মােচন না করিল তবে তো সে অর্থ নয়, ব্যর্থ,-সে ধাতু, খনির মধ্যে থাকিলেও যা, সিন্দুকে পড়িয়া পচাও তা। এই-সব চিন্তা তাহাকে উতলা করিয়া তুলিতে লাগিল। ঘুমন্ত দুটি শিশুর সম্মুখে দাড়াইয়া দাঁড়াইয়া পুত্রহারা পিত। এইরূপ চিন্তায় ডুবিয়া গিয়াছিলেন। অবশেষে যখন চমক ভাঙিয়া ফেরিওলার মুখের দিকে তাকাইলেন তখন তাহার বিনয়ন স্বাধীন ভাব আর আনন্দে উজ্জ্বল চক্ষু দেখিয়া তিনি মুগ্ধ হইয়া গেলেন। গােয় বলিলেন—ভাই, আজ থেকে তােমরা আমার বন্ধু । তুমি আর তােমার পােষ্যপুত্র আমায় উপকার দিয়ে কিনে নিয়েছ...আমিও দেখাব যে আমি অকৃতজ্ঞ নই:•••••বন্ধু, আজ থেকেই.•••••বন্ধু, আমি দেখতে পাচ্ছি যে তােমার অবস্থা সচ্ছল নয়,......আমি তােমায় আমার কৃতজ্ঞতার প্রথম নমুনা দেখাতে চাই... ফেরিওলা তাহার একখানি হাত দিয়া বড়সাহেবের নােটের তাড়া ভর। হাত ঠেলিয়া ধরিয়া বলিল—না, মা, মশায়, না, ওসব হবে না। আমরা পাবার প্রত্যাশা করে কিছু করি নি ; আপনি কিছু মনে করবেন না, আমরা কিছু নিতে পারব না। আমরা সােনাদানার মুখ দেখিনি বটে, কিন্তু এমন দিন আমার চিরকাল ছিল না। আমি সৈন্য ছিলাম, আমার এখনাে মেডাল আছে ; তারপর আমি কারিগর মিস্ত্রি ছিলাম ; হাতের উপর দিয়ে একদিন গাড়ী চলে গিয়ে আমায় অকর্মণ্য নুলাে করে দিয়ে গেছে, কিন্তু তবু এখনাে আমি নিজের রােজগারই খাচ্ছি, কারু এক পয়সা ধার ধারিনে। —তবু . সেই নুলো ফেরিওলা গােদয়ের কথার আরম্ভেই সরল হাস্যে তাহার যাত্রা-সহচরী ১১৯ মুখের কথা কাড়িয়া লইয়া বলিল—তবু যদি আপনি আমায় দয়া করবেনই তবে এই গরীবকে স্মরণ রাখবেন, তা হলেই যথেষ্ট হবে। অর্থপিশাচ কুচক্রীর কাছে আর্জ এসব কী বিস্ময়কর ব্যাপার ! সুদী কারবারের বড়সাহেব আজ একটা কালো ফেরিওয়ালার কাছে একেবারে হতভম্ব এতটুকু ! গােদয় আমতা আমতা করিয়া বলিলেন—আচ্ছা আচ্ছা, কিন্তু জিদোর, জিদোরের জন্যে আমায় কিছু করতে দাও। ফেরিওল আনন্দে উত্তর করিল—ওর জন্যে ? আই। ও বড় অনাথ। আমি অনেক সময় ভাবি যে আমি ছাড়া জগতে ওর কেউ নেই; তখনই আবার ভাবি, ভাবনা কি, আমাকে যিনি জুটিয়ে দিয়েছেন, তিনিই আবার কাউকে জুটিয়ে দেবেন। ইস্কুলের মাষ্টারের তো ওকে বড়ই তারিক করেন, ভালােবাসেন।••• সে হঠাৎ থামিয়! গেল। তারপর বলিল- আপনি অনেকক্ষণ এসে দাড়িয়ে আছেন-খােকাকে গাড়ীতে নিয়ে চলুন••••••ও অঘােরে ঘুমুচ্ছে এখন কোলে নিলে জাগবে না••••• দাড়ান, আগে ওর পায়ে জুতে। জোড়া পরিয়ে দি, ঠাণ্ডা লাগবে.••• ফেরিওলার দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া গােয় দেখিলেন যে অগ্নিকুণ্ডের করে দুজোড়া ছােট ছেলের জুতো রহিয়াছে—চকচকে নূতন জোড়া রাউলের, আর নালৰাধান ছেড়া নাগর জোড়া জিদোরের, আর কি জুতার মধ্যে দু-পয়সানে এক একটা পুতুল ও এক এক মােক মেঠাই আছে। ফেরিওল। লজ্জিত হইয়া বলিল—ওদিকে দেবেন না। এশার ; ওসব জিদারের কাণ্ড! শােবার আগে নিজের জুতােয় আর আপনার খােকার জুতােয় ঐসব বড়দিনের সওগাত রেখে তবে, ঘুমুতে গেছে...
নষ্টোদ্ধার আমি থানায় খবর দিয়ে ফেরবার পথে ঐসব ছাইপাঁশ কিনে এনেছিলাম ছেলে ভুলােতে•••• বড়সাহেব ভাবমুগ্ধ হইয়া দাড়াইয়া রহিলেন, তাহার স্তাবকের। তখন দেখিলে তাহাকে চিনিতে পারিত কি না সন্দেহ । গােদফ্রয়ের চক্ষুতে আজ জুল! হঠাৎ তিনি সেই খােলর ঘরের গলি হইতে বাহির হইয়া গেলেন এবং মিনিট খানেক পরে আবার ফিরিয়া আসিলেন, তাহার দুই হাত তখন নানা খেলনায় ভরা—এগুলি তিনি নিজের খােকার জন্য কিনিয়াছিলেন, এতক্ষণ গাড়ীতেই অযত্নে গড়াগড়ি যাইতেছিল। তিনি সেইসব সােনালি- বানিশ-করা চকচকে খেলনা সেই ছােট দুজোড়া জুততার মধ্যে ভাগ করিয়া রাখিয়া দিলেন। ফেরিওলা অবাক্ হইয়া তাহার কাণ্ড দেখিতে লাগিল। দেয় ফেরিওলার হাতখানি নিজের আবেগব্যগ্র হাতের মধ্যে দৃঢ় করিয়া ধরিয়া ভাবগদগদ কম্পিত কণ্ঠে বলিলেন-বন্ধু, আমার বন্ধু, এইসব খেলনা বড়দিন-বুড়ো খােকাদের জন্যে নিয়ে এসেছে। আমার ইচ্ছা যে রাউল জিদারের সঙ্গে জেগে তার বন্ধুর সঙ্গে একত্র খেলনা পাও- য়ার আনন্দ ভাগ করে নেবে।...রাউল আজ তােমার বাড়ীতেই থাক... আজ থেকে বন্ধু, তােমরা আমার আপনার, তােমাদের ভার সে আমার । আজ তােমরা আমায় শুধু আমার হারানাে ছেলে ফিরে দিলে না, আমার হারানাে মনুষ্যত্বও ফিরে দিলে। আমি এই দুটি ঘুমন্ত শিশুর শপথ করে বছি একথা আমি জন্মে ভুলব না !..•••• নীলকুঠী আমার কাকা জ। তাহার জীবনের এই কাহিনীটি আমাদের কাছে বলিয়াছিলেন— তােমরা তো জানােই টাকার ধান্দায় আমাকে ফ্রান্সের চারিদিকেই ঘুরে বেড়াতে হত। একবারকার যাত্রায় দিজে। এলাকার কাছাকাছি একটা নেহাত পথের বাহির জায়গায় একটা ছােট ষ্টেশনের পারে একখানি অদ্ভুত ধরণের ছােটখাটো বাড়ী দেখেছিলাম। সেই বাড়ীখানির রং ফিকে নীল ; বৃষ্টিবাদল ঝড়ঝাপট খেয়ে খেয়ে ফিকে রং আরো ফিকে হয়ে ছাদের ধূসর রঙের সঙ্গে প্রায় একাকার হবার উপক্রম হয়েছে। প্রথমবারে যখন আমি সেই বাড়ীখানি দেখি—সে আজ প্রায় চল্লিশ বছরের কথা—সে রেলগাড়ীর কামরা থেকে ব’সেই ; গাড়ী তখন সেই ছােট্ট ব্লেজি-বা ষ্টেশনে এসে দাড়িয়েছিল। সেই নীল কুঠীর সামনের ছােট্ট বাগানটিতে একটি বালিকা লাটিম ঘুরিয়ে খেলা করছিল--তার বয়েস দশ বছরের কাছাকাছি, ফুটফুটে গােলাপী তার রং, পােশাকটি তার বসন্তের সজ্জার মতাে, আর তার রেশমী চুলগুলি একটা নীল রেশমী ফিতার ফঁাশে বাধা, সবঙ্গে তার উচ্ছল আনন্দের ঢেউ,--আনন্দেরই প্রতিমা 'সে !...সেদিন সকালবেলাটায় আমার মেজাজটা খুশি ছিল না ; আমার কারবারটা ঠিক চলছিল না, তাই আমি বদমেজাজে চিন্তার বােঝাই নিয়ে পরী শহরে ফিরে যাচ্ছিলাম। ......এই ক্ষণিকের ছবি- খানি আনন্দের প্রলেপ দিয়ে আমার মনের সকল গ্লানি মুছে দিলে। আজ নীলকুঠী প্রভাতে নয়ন মেলেই এই প্রকৃতিসুন্দর কুণে। দেশের সাজানো বাগানে সুন্দরী বালিকার মাধুরী দেখেই মনে হল, আজকের দিনটা আমার ভালােয় ভালােয় যাবে। আমি ভাবলাম—“এমন জায়গায় যারা বাস করে তারা নিশ্চয় খুব সুখী ।••••••না আছে তাদের চিন্তা, না আছে তাদের বিরক্তির কোনো কারণ।” আর সেই আনন্দ প্রতিমা মেয়েটির সরলত দেখে আমার হিংসে হতে লাগল । যদি আনি তারই মতো আমার ভাবনার বােঝা নামিয়ে ফেলে বিশ্বসৌন্দর্যের লীলার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেল্তে পারতাম ! গাড়ী ছেড়ে দিলে। ঠিক সেই সময়ে নীলকুঠীর একটা জানালা খুলে একজন কে ডালে-“লােরি !”..••••আর অমনি ছােট্ট মেয়েটি বাড়ীর ভিতর চলে গেল। লােরন্ !এই নামটিও আমার কাছে বড় মিঠা লাগল। এবং গাড়ীতে নিষ্কর্মা বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আমি কল্পনার চক্ষে দেখতে লাগলাম সেই লােরিন, সেই লাটিম, সেই বাগান, আর সেই নীলকুঠী। ক্রমে ক্রমে সব ঘােলা হয়ে ঝাপসা হয়ে এল, কুঠি বাগান লাটিম লােরিন সব আমরা ভাবনার মধ্যে একশ হয়ে গেল। তারপর অনেক দিন ওমুখাে আর হইনি। ফ্রান্সের উত্তর থেকে পূর্ব, কখনাে লীল, কখনো বা ন্যান্সি, অনুচেষ্টায় ছুটোছুটি করে ফিরছিলাম, মাথায় আমার দোস্ত্র। চিন্তার অবসর আর ছিল না। প্রায় দশ বৎসর পরে একদিন শুভদিনে আমি মাসে ঈ যাত্রা করলাম। সেখানকার কাজ সেরে ফেরবার মুখে আমার পুরােনাে স্মৃতি জেগে উঠল। আমি বুঝে শুনে সন্ধ্যার গাড়ীতে রওনা হলাম, যেন ব্লেজি-বা ষ্টেশনে গিয়ে আমার সুপ্রভাত হয় !••••••সেই নীলকুঠী ঠিক তেমনি আছে, বরং মনে হল যেন আরাে ফিকে হয়ে গেছে, আর যেন কুঠার দিকে কারাে বেশি নজর যাত্রা-সহচরী নেই।... কিন্তু সেই বাগানে একটি তরুণী বসে ছিল, সুন্দরী গৌরী, তার চুল গুলি আজ তার মনেরই মতন গােলাপী ফিতায় বাঁধা ...•••এই তো সেই লােরি, আমি তো তাকে চিনি ! তার পাশে একজন তরুণ ব'সে ছিল—সমস্ত প্রাণ দিয়ে যেন সে লােরিনকে দেখছিল, লােরিনের তুষ্টির জন্যে সে যেন আপনাকে পলকে পলকে নিবেদন করে দিচ্ছিল, আর তাদের দুজনকে ঘিরে সেই সরল হাসি আর মনের শান্তি তেমনি ভাবেই বিরাজ করছিল। তাদের সেই তরুণ হৃদয়ের ভাববিগলিত মিলনদৃশ্য দেখে আমার মন আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। যখন ট্রেন ছাড় বার সঙ্কেতদণ্টা বেজে উঠল আমি তাড়াতড়ি জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হাত দুলিয়ে মাথা নেড়ে অভিবাদন করে চেঁচিয়ে বল্লাম-নমস্কার, নমস্কার কুমারী লােরিন !...আজকে তবে আসি... তরুণী আমার দিকে বিস্ময়ে-বিকশিত কুরঙ্গ-নয়ন তুলে চাইলে, সঙ্গে সঙ্গে সেই তরুণ ও। তারপর তারা দুজনে হাসিতে যেন গলে করে পড়তে লাগল ; তারাও নমস্কার করে তাদের রুমাল দুলিয়ে আমায় প্রত্যভিবাদন করলে।......আমি গাড়ীর জানালায় মুখ বাড়িয়ে ঝুঁকে ঝুকে সব দেখলাম ।••••• আমার মন খুশি হয়ে গেল । তারপর অনেক বছর কেটে গেছে ; মাসে ঈ লাইনে অনেকবাব যাওয়া-আসা করেছি বটে কিন্তু কাজের তাড়ায় এমন গাড়ীতে যেতে আতে হয়েছে যে-ট্রেন গভীর রাত্রে ব্লেজি-বা ষ্টেশনে না থেমেই পেরিয়ে যায় : একবার সুবিধামতো সন্ধ্যার গাড়ীতেই যাওয়া ঘটল, সেই যে গাড়ী ঠিক সকালবেলায় ব্লেজি বা ষ্টেশনে পৌছয়। সে আজ কতদিন যেদিন সেই বাগানে লােরিনকে তার প্রণয়ীর পাশে দেখিয়াছিলাম ? বারাে বচ্ছর, পনর বচ্ছরই বা ; আমার ঠিক মনেও নেই।......
১৫৪ নীলকুঠী এবার ট্রেন যখন সেই ছােট্ট ষ্টেসনে এসে থামল, দেখলাম সেই বাগানে কেবলমাত্র একটি ছােট ছেলে ঘাসের উপর শয়ান একটা প্রকাণ্ড কুকুরকে ধরে টানাটানি করে খেলা করছে।...তবে কি আমি লােরিনকে একবার দেখতে পাব না ?...... আমি বড়ই ক্ষুন্ন মনে হতাশ হয়ে পড় ছিলাম। হঠাৎ ছেলেটি চেঁচাতে লাগল-মা!••••••মা !••••••রেল- গাড়ী !•••••কলের গাড়ী !... তখন একজন মহিলা বাড়ী থেকে বেরিয়ে এল।...এই সেই, নিশ্চয়। একটু মােটা, একটু কালো, কিন্তু তবু আমি তাকে দেখ বামাত্র চিনেছি। তাকে দেখবামাত্র আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে সম্রমের সহিত আনি টুপি তুলে তাকে অভিবাদন করলাম ।...সেও আমার অভিবাদন প্রত্যর্পণ কলে, কিন্তু একটু বিস্ময়ের ভাবে।...সে চিরদিনই সেই একই রকম আছে, তেমনি প্রিয়দর্শন, তেননি সরল, তেমনি ঠিক তারই মতন !... গাড়ী যখন ছাড়ল, তখন আমার এই আগমনটিকে চিহ্নিত করে রাখবার জন্যে একটা কমল!-লেবু নিয়ে ছেলেটির উদ্দেশ্যে বাগানের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দিলাম, কমলালেবু ঘাসের উপর গড়িয়ে গেল আর তার পিছনে ছেলেটি আর কুকুরটি দৌড়াতে লাগল ।... এর পরে আমার জীবনে এমন সব বিচিত্র ঘটনা ঘটেছিল, যে, আজ এত বৎসর পরে সে-সমস্ত যেন স্বপ্ন বলে মনে হয়। তােমরা জানো, ব্যবসা উপলক্ষ্যে তুর্কে গিয়ে কালাপানিতে আমার জাহাজ ডুবি হয়েছিল । তখন সেই দুরবস্থায় পড়ে সেই ব্লেজি-বা ষ্টেশনের ধারের সেই নীলকুঠির কথা আমার মনে পড়েছিল কি না তােমরা ভাবছ?••••••মনে পড়েছিল বৈ কি! সেই জাহাজডুবির পর মৃত্যু আর আমার মধ্যে যখন একখানি তক্তামাত্র ব্যবধান, তখন ঠিক সেই প্রথম দিনের মতনই হুবহু সমস্ত চিন্তা আমার মনের উপর দিয়ে বুলিয়ে বুলিয়ে যাচ্ছিল।......আমি তখন যাত্রা-সহচরী ১৫৫ নিজেকে ধিক্কার দিয়ে বছিলাম—হায়রে হতভাগা জা! পৃথিবী ঘুটে দৌড়ে বেড়ানাের মজাটা তাে এবার টের পেলি। যদি তুই অল্পে সন্তুষ্ট হতে জাতিস তা হলে হয়তাে তুইও তাের অচেনা বন্ধু লােরিনের মতো শান্তিতে থাকতে পারতিস, চাইকি বুরগঞর রৌদ্রতপ্ত সেই নীলকুঠীর কোলেই ঠাই পেতি। আজ আর সে-সব সুখের সম্ভাবনাও তুই রাখিস নি । ভাগ্যে ভাগ্যে আমি সেবার বেঁচে গেলাম । সে যেন বৈ ঘটনা। আমি যখন অবসন্ন মৃতপ্রায় তখন এক ওলন্দাজ জাহাজ দুদিন পরে অনায় জল থেকে তুলে নিলে ।...পনেরো কি কুড়ি দিন পরে, ঠিক মনে নেই, আমি আবার ফান্সে ফিরে এলাম। দেশে ফিরেই আমি মাসে ঈ থেকে পারী শহরের ট্রেনের যাত্রা হলাম। এই আমার শেষ যাত্রা। এই বুড়াে বয়সে এত নাকালের পর টো টো করে ঘুরে বেড়াবার সাধ আর আমার ছিল না। সকালবেলা গাড়ী সেই ব্লেজি-বা ষ্টেশনে পৌছল। আমার হৃদয় যেন আনন্দে উদ্বেগে ফেটে পড় বার মতন হয়ে উঠল, হৃদয় যেন বক্ষপঞ্জর ভেঙে চুরে লােরিনকে একবার দেখ বার জন্যে ছুটে বেরিয়ে পড়তে চাচ্ছিল। এখুনি গাড়ী থামবে আর ছেড়ে চলে যাবে, একটি মুহূর্তের মাত্র সুযোগ, হয়তো তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা হবে না ! বাড়িয়ে দূর হতেই দেখতে পেলাম ষ্টেশনের পাশেই সেই নীলকুঠী রৌদ্র মেখে তেমনি দাঁড়িয়ে আছে ! হঠাৎ রৌদ্র-মাখা নীলকুঠি’দেখে আমার কেমন কালাপানিতে নৌকাডুবির কথা মনে এল। সে আজও এই বাড়ীতে আছে, হয়তো তেমনি শান্ত উদাসীন, আমার ভরাডুবির খবরও সে রাখে না। গাড়ী এসে ঠিক কুঠীরসােমনেই থাম্ । আমি দেখলাম সেই বাগানের একটি লতাবিতানের নীচে একজন গাড়ী থেকে মুখ •• নীলকুঠী বর্ষীয়সী রমণী বসে রয়েছে—তার রূপালি চুলগুলি সাথিতে দুভাগ হয়ে ছড়িয়ে গেছে, আর তার চারিদিকে ঘিরে ছােট ছােট ছেলেমেরো। কলরব করছে। এই লােরিন ! তাকে আর কেউ চিনতে পারত না ; আমি কিন্তু তাকে চিনি ! এক মুহুর্তেরও দ্বিধা আমার হয় নি—সেই বালিকাবয়সে লাটিম নিয়ে তার খেলা ; তার পর তারুণ্যের লীলাচপল সেই সাক্ষাৎ ; তারপর সে গৃহিণী, সে মাতা ; আর আজ সে ঠাকুর-মা, দিদিম, নাতি- নাতিনী-পরিবৃতা; বার বার বিভিন্ন মূতি, কিন্তু সকল মূতিই সেই এক অভিন্নের ! এবারকার এই ক্ষণিক সাক্ষাতের আসন্ন অবসান আমার চিত্ত দুঃখ- বেদনায় ভরে তুলতে লাগল। আর আমি এ পথে কখনো আস্ না, এই আমার এজন্মের শেষ সাক্ষাৎ! আমার বড়ই সাপ হতে লাগল আমি একটিবার অল্পক্ষণের জন্য কথা কয়ে আমার চল্লিশ বছরের পুরাতন অচেনা বন্ধুটির কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে যাই। দৈব আমার সহায় হ’ল ; এঞ্জিনটা অল্প বিগড়ে গেল ; অন্তত পক্ষে ঘণ্টাখানেক লাগবে কল সারাতে। ততক্ষণ সেই ষ্টেসনেই থাকতে হবে। আর আমায় পায় কে ? সাব আমি মেটাব। আমাদের এই বৃদ্ধ বয়সে সঙ্কোচের তো কোনাে কারণ নেই। আমি কুঠীর ফটকের দিকে চল্লাম ; আমার পা কিন্তু তখন থরথর করে কঁপছিল। ভাবের আতিশয্যে এমন অভিভূত আমি কস্মিন্ কালেও হই নি। আর, আমি যা হই তা হই ভীরু নই, এটাও ঠিক, তার উপর তুর্কীর দেশে বিষম রকম তুর্কী নাচন নেচে এই সদ্য আছি। যাক !••• আমি ডাক-ঘণ্টার দড়ি তাে টেনে দিয়েছি !...মালী এসে দরজা খুলে আমি তাকে বল্লাম—“ঐ যে লতাঘরে বুড়ীগিন্নি বসে রয়েছেন দিলে ;
যাত্রা সহচরী ১৫৭ আমি একবার তার সঙ্গে কথা কইতে চাই।” মালী আমাকে বাগানে ঢুকিয়ে গিন্নিমাকে ডাকতে গেল। সে এল ।:-: এতদিন পরে লােরি আজ আমার সম্মুখে এসে দাড়িয়েছে। কিন্তু আমি তাকে বার মতন কোনো কথাই এখন খুজে পাচ্ছি না। সেই তখন আমায় জিজ্ঞাসা করলে—“আপনার সাক্ষাতের সৌভাগ্য আমার কিসে হ’ল মশার ?” ভয়ে ভয়ে আমি জিজ্ঞাসা করলাম-“তুমি আমায় চিনতে পাচ্ছি না ?” —কৈ না তো••• -আ! আমি, আমি কিন্তু তােমায় খুব চিনি !••••••ভেবে দেখ !.. আমি যে তােমায় চিনেছি সে কি আজকের কথা ?•••আমি তােমাকে এই বাগানে এতটুকু বেলায় লাটিন নিয়ে খেলা করতে দেখেছি ; আমি সেই লােক, তােমার নিশ্চয় মনে আছে, যে গাড়ীর জাল থেকে তােমায়. একদিন নমস্কার করে গিয়েছিল—তখনাে তােমার বিয়ে হয়নি ; আর তারপর, অনেক দিন পরে যে লােক একটা কমলা লেবু একটি ছােট ... সেই মহিলাটি কেমনতর ভয় পেয়ে আমার দিকে চেয়ে রইল । প্রথমটা কয়েক পা পিছিয়ে হটে গিয়ে দাড়াল; আমায় হয় তাে পাগল কি মাতাল ঠাউরে থাকবে ; কিন্তু তারপর আমার বৃদ্ধ বয়সের শান্ত মূতি দেখে ভরসা করে খুব কোমল শান্ত স্বরে বলে—“আপনার নিশ্চয় কোনাে রকম ভুল হয়ে থাকবে। আমরা সবে এই এক বচ্ছর এই নীল- কুঠীতে আছি।” আমি অবাক হয়ে গেলাম।-আমতা আন্তা করে জিজ্ঞাসা করলাম—“আপনি••••••তবে••••••লাে••••••রি••••••••••••নন ?”
লেগেছে। ১৫৮ নীলকুঠী --লাের ?•••••• আপনি মশায় কার কথা কচ্ছেন আমি তো ঠিক বুঝতে পারছিনে। আমাদের এখানে তো সে নামের কেউ নেই। আমার মনে হতে লাগল যেন আমার চারিদিকে স্বপ্নের ঘাের যখন সেই মহিলা চলে যাবার উপক্রম কবুলেন তখন আমি বললাম- যা করবেন•••••• আর একটি প্রশ্নের জবাব দিয়ে যান।•••••• আপনাদের আগে এ বাড়ীতে কারা থাকতেন ? -আমাদের আগে ?••••••একজন বৃদ্ধ ভদ্রলােক, চিরকুমার তিনি । দশ বচ্ছর হ’ল তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি খুব ঘটা করে নমস্কার করে আমাকে ফটকের ব’র পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফটক বন্ধ করে দিলেন। আমি একেবারে আস্ত একটি বােক। ব’নে গিয়ে ব্লেজি-বা গায়ের গলি দিয়ে চছিলাম, বিষন দুর্ঘটনার দুঃখে আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল।...আমাকে তল্লাস করে জানতেই ভুবে...নিশ্চয় আশ্চর্য রকম একটা ভুল এর মধ্যে জড়িয়ে আছে, সে জট সন্ধান করে খুলতেই হবে। আমি ষ্টেসন-মাষ্টারকে জিজ্ঞাসা কবুলাম। সে ভদ্রলােক কিছুই জানেন না, এ ষ্টেসনে তিনি নবাগত। কিন্তু তিনি সন্ধান বলে দিলেন যে এই গারের সবার চেয়ে বুড়ো একটি লােক ষ্টেশনের কাছেই নীলকুঠীর সামনেই থাকে, তার কাছে খবর মিতে পারে। বুদ্ধ চিন্তাসূত্র গুছিয়ে নিতে নিতে বলে-ললারিন•••া, লােরিন•••আমার তাে স্মরণ হয় না••• —কিন্তু বছর পনর মােল আগে ঐ বাগানে যে একজন মহিলাকে দেখেছিলাম একটু মােটা কালো, একটি ছােট ছেলে আর একটা প্রকাণ্ড কুকুরের সঙ্গে সে তবে কে ?••• -ও ! একটা বড় কুকুর, অ্য, একটা খুব বড় কুকুর...হা হা,
যাত্রা-সহচরী
সে যে দারােগা-গিন্নি মাদাম জিলামে। কিন্তু তার নাম
লােরিন ছিল না, এ তো আমি খুব জানি, আমি যে বরাবর তাদের
বাড়ীতেই থাক্তাম।
তার নাম ছিল * সােয়াজ।
আমি তো একেবারে মূঢ়ের । হয়ে গেলাম।
-আচ্ছা, মশায়, ভালো করে নে করে দেখুন তো•••আচ্ছা,
তারে। আগে, প্রায় বছর বারো আগে, একজন যুবতী মেয়ে, খুব
ফরসা, বেশ লম্বা, মাথার চুলে গোলাপী ফিতে বাস, আর এক
কালো-মতে। যুবা পুরুষ, খুব সম্ভব সেই মেয়েটির বাদও স্বা, এই
বাগান-বাড়ীতে কি থাক্ত ?..
বৃদ্ধ ভাবলে, ভাবতে, কতক্ষণ ধরে ভাবলে।•••অবশেষে সে তার
বুড়ীকে ডাকলে। বুড়ী, মানুষটি ছােটখাটো, চোখ দুটি উজ্জ্বল, জীবন্ত,
চটপটে ধরণের, দেখলেই মনে হয় যে তার স্মরণশক্তি বেশ তেলে।।
বুড়ো তাকে সব কথা বলে।
—ও ! সে যে মাদমােয়জেল হেফানি, কন্টাক্টার সাহেবের
মেয়ে, সেই তো লম্বা মতন, চুলে ফিতে বঁাথা•••এ সে বৈ আর কেউ
নয় !...দিজে। শহরের এক সওদাগরের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল, আহ।
বেচারা ! তাদের বিয়ে সুখের হয়নি, তারা আলাদা হয়ে আছে। আহা,
মেয়েটা এখন, ঐ যে কি বলে ভালো। ওর নামটা, ঐ সােম্ব্যারনে। শহরে
তার বাপের বাড়ীতেই আছে, আহা বড় দুঃখ তার••••••
আমি যাবার জন্য নমস্কার করুলাম।•••আর সময় নেই, টেন এইবার
ছাড়বে..,
—লােরি ! লােরি সে তো একেবারে ভ্রান্তি নয়, আমি
যে তাকে এতটুকু বেলায় দেখেছি, আমি যে তার নাম শুনেছি•••
আজও যেন তাকে চোখের সামনে দেখছি সে বসন্তের প্রজা-
!
ক
নীলকুঠী পূতিটির মতন হাওয়ার গানে আলাের তালে পুষ্প গন্ধের সুরে লাটিম ঘরিয়ে নেচে খেলে বেড়াচ্ছে : •• এই কথা না শুনে বুড়ী বলে উঠল—ও ! এ কথা আগে বলতে হয়, মশায়।... আপনি আগে বললেন একজন গিন্নির কথা, তারপর বললেন একজন সােমখ মেয়ের কথা, •••এখন বলছেন একটি ছােট মেয়ের কথা !... ঘঁ, হ্যা, তাকে তো আমার বেশ মনে আছে,•••লােরিন,•••া, লােরিনই ! তার নাম বটে।...উঃ, সে কি আজকের কথা গো, নেই কম তো দুকুড়ি বচ্ছর হবে '...সেই ছােট্ট ফুটফুটে মেয়েটি তো•••সে ডাক্তার সাহেবের মেয়ে, আমাদেরই তারা আপনার লােক।••• আহা মেয়েটা দশ বচ্ছর বয়সেই মারা গেল !... দশ বৎসর বয়সে, আমি তাকে দেখার কয়েক দিন পরেই, সে মারা গেছে। আর আমি ? আমি তার পর এই চল্লিশ বৎসর ধরে তাকে অনুসরণ কবে আসছি !...
গোপ-খেজুরে কুডেমির বাথান আর আরাম-আয়েসের আডডা ছিল সেই ব্লিদা শহরটি। সেখানে একজন মূর ভদ্রলােকের বাস ছিল,-বাপে মায়ে মায়ে। তাহার নাম রাখিয়াছিল সিদি লাকদার, আর শহরের সবাই তাহার নাম রাখিয়াছিল ‘আলসে কুড়ে'। পৃথিবীর মধ্যে অজেরিয়া কুড়েমির জন্য নামজাদা ; তাহার মধ্যে ব্লিদা শহরটি বিশেষ ; আর 'তাহার • মধ্যে সিদি, লাকদার সবিশেষ। এই মহামহিমান্বিত ব্যক্তিটি আলস্যকেই নিজের আসল পেশা করিয়া তুলিয়াছিল ;-অন্য লােকেরা কেউ দরজি, কেউ বা ভিস্তি, কেউ বা সরাইখানার বাবচি, কিন্তু সে, সিদি লাকদার, আলসে কুড়ে ;—এতেই তাহার গৌরব পিতার মৃত্যুর পর সিদি লাকদার ওয়ারিস-সূত্রে একখানি বাগান-বাড়ীর মালিক হইল। সংসার অসার অনিত্য, এখানে, মেহনত করা মিথ্যা—এই মহাতত্ত্বটি সিদি লাকদারের বেশ মালুম হইয়াছিল। সে হাত পা এলাইয়া বাড়ীর মধ্যে পড়িয়া থাকাটাই উপযুক্ত মনে করিল। তাহার কুড়েমির তাড়সে অল্পদিনের মধ্যেই অতি সহজে বাড়ীটির দেহ মাটিতে মিশাইল ; বাগানের চুমকামকরা নীচু প্রাচীরটিও খসিয়া এলাইয়া পড়িতে লাগিল ; বাগানের দরজা আগাছার আক্রমণে আটক হইয়া অচল হইয়াই রহিল ; কুড়েমির এমনি ছোঁয়াচে মহিমা ! বাগানে বাঁচিয়া রহিল এত অযত্নেও গােটাকত আঞ্জীর আর খেজুর গাছ, আর ঘাসের মাঝে গােটা দুই ১১ ১৬২ গোপ-খেজুরে তিন ঠাণ্ডা জলের নহর। বাড়ী যখন দেহত্যাগ করিল, তখন নির্বিকারচিত্তে সিদি লাকদার আসমানের সামিয়ানার তলে ঘাসের ফরাশের উপর হাত পা ছড়াইয়া অনড় অচল নিবক জড় পড়িয়া পড়িয়া জীবনের মেয়াদ কাটাইয়া দিবে সঙ্কল্প করিল। ক্ষুধা লাগিলে সিদি লাকদার হাতড়াইয়া এক আধটা পাকিয়া-পড়া আঞ্জীর কি খেজুর মুখে তুলিয়া অতি কষ্টে নাচার ভাবে গিলিয়া ফেলিত, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মরিবার মতন হইলেও গা তুলিয়া আপনার এত কষ্টের অজিত সুনাম নষ্ট করিত না। বাগানে আঞ্জীর আর খেজুর, গাছে পাকিয়া গাছেই শুকায় ; ছােট ছােট পাখীর ঝাক ফললােভে গাছে কলরব করে, ঝাপটি করে, তাহাতেই যে দুই চারটা পাকা ফল খসিয়া ঝরিয়া পড়ে তাহাই সিদি লাকদারের ভােগে লাগে ; আর লাল ক্ষুদি পৗপড়ে মিষ্ট রসে আকৃষ্ট হইয়া তাহার বিপুল দাড়ির কাদির ভিতর গাধি লাগায়। এই অপূর্ব রকমের বাদশাহী কুড়েমি লাকদারকে দেশবাসীর কাছে সমাদৃত সম্মানিত করিয়া তুলিয়াছিল। দেশে তাহার খ্যাতি আর খাতির সাধু সন্ত নবী পয়গম্বরের চেয়ে কম ছিল না। তাহার আস্তানার সম্মুখ দিয়া কেহ ঘােড়ায় চড়িয়া যাইত না, তাহার আস্তানার কাছাকাছি আসিয়া ঘােড়া হইতে নামিয়া পথিক পদব্রজে ঘােড়ার লাগাম ধরিয়া চলিত; এমন কি তাহার আস্তানার কাছে শহুরে মেয়েরাও ঘােমটা টানিয়া চাপা গলায় ঝগড়া করিত ; মক্তব মদসার পড়ুয়ার পাঠশালার ছুটির পর ক্ষুধা খেলা বাড়ীঘর সব ভুলিয়া ডুরে ছিটের চাপকান আর লাল লাল টুপি পরিয়া উৎসুক কৌতুকে তীর্থযাত্রীর মতাে দলে দলে আসিয়া পাঁচিলের উপর চড়িয়া এই মহাপুরুষকে দর্শন করিত। ছোড়ারা কিন্তু এই মহাপুরুষের মর্যাদা অধিকক্ষণ রক্ষা করিতে পারিত যাত্রা সহচরী ০ না ; তাহারা তাহার নিশ্চল শয়ন লক্ষ্য করিয়া হাসিত, নাচিত, কলরব করিয়া হাততালি দিত, লাকদারের আটপৌরে ডাকনাম ধরিয়া ডাকিত, নেবু খাইয়া তাহার খােসা ছুড়িয়া তাহাকে মারিত। পণ্ডশ্রয় ! আলসে কুড়ের নড়নও নাই চড়নও নাই। মাঝে মাঝে সে ঘাসের ভিতর হইতে অতি কষ্টে গোইয়া শাসাইত বটে “রােস ত ছােড়ারা, আমি যদি উঠি তো...” কিন্তু ওঠা তাহার কখনাে ঘটিয়া উঠিত না। ভবিতব্যের লিখন আর খােদাতালার মজি, পূব জন্মের পুণ্যফলে একটা ছোড়ার উপর আল্লার, নেকনজর পড়িল,-তাহার মনে হঠাৎ খেয়াল হইল যে সিদি লাকদারের মতন সেও সটান শুইয়া জীবনটাকে ফাকি দিয়া ফু কিয়া দিবে। সকাল বেলা উঠিয়া সে বাপের কাছে এত্তেলা করিল যে সে অতঃপর আর পাঠশালের চৌহদ্দি মাড়াইবে না, সে আলসে কুড়ে হইবে। তাঁহার পিতা পরিশ্রমী শিল্পী, গুলি গাজা খাইবার হুকার নল তৈরি তাহার ব্যবসা। সে মােরগের সঙ্গে জাগিয়া আপনার খরাদকলে নলের গায়ে নক্সা কেঁদে। সে বেটার বায়না শুনিয়া তো অবাক ! সে বলিল,- ইয়া আল্লা ! আলসে কুড়ে হবি, তুই!•••ততাফা মতলব ! বহুত আচ্ছা বাচ্চা জিতা রহ! -হাঁ বাবা, আমি সিদি লাকদারের মতন নাম করব । —আরে তােবা তােবা! এও কি একটা কথা! তুই হলি আমার বেটা, বাপের ব্যবসা শিখে খরাদ কবি, গুলিগাঁজার নল কুঁদবি ! আমরা দুনিয়ার লােককে আলসে কুড়ে বানাই, আর তাের সাধ গেল কিনা নিজে আলসে কুড়ে হতে ? পৈত্রিক ব্যবসা তাের ভালো না লাগে তুই তাের আলি চাচার মতন কাজির দপ্তরখানায় দস্তুরমতাে দপ্তরী হবি ! কিন্তু আলসে কুড়ে, সে কখনাে না।...যা যা, মক্তবে যা, নুইলে '। ১৬৪ গোপ-খেজুরে দেখেছিস এই আনকোরা কোড়া, এই দিয়ে তােকে বিতিয়ে লাল করে দেবো। কোড়ার কড়াকড়িতে পড়িতে যাওয়ার কড়ার করা ছাড়া তাহার আর গত্যন্তর রহিল না। সে পড়িতে গেল মকতবে নহে, বাজারের এক রাস্তায় ;-একটা গালিচার দোকানের গাটরির আড়ালে সটান চিতপাত হইয়া। চিতপাত পড়িয়া পড়িয়া মূর-বাজারের লণ্ঠনের গায়ে রােদের ঝলকানি, নীল রঙের টাকার তােড়ার ঝনঝনানি, বুকের উপর জরির কাজ-করা জামা জোব্বার ঝকমকানি দেখিয়া শুনিয়া, আর গােলাপজলের কাবার আর ভেড়ার লােমের বস্তার মিঠে কড়া গন্ধ শুকিয়া দিনের পর দিন সে ফুকিয়া দিতে লাগিল। কয়েক দিন পরেই পুত্রের কীতিকাহিনী পিতার নিকট পৌছিল। সে চীৎকার করিয়া আস্ফালন করিয়া আল্লার নামে গালাগালি করিয়া দোকানের পুজিপাটা নল কঞ্চি সমস্ত একে একে ছেলের পিঠে পিটিয়া পিটিয়া ভাঙিল। পণ্ডশ্রম ! মহাজনের সঙ্কল্পের দৃঢ়তা অসাধারণ । বালক পিতাকে বেদনাকাতর তারস্বরে বলিতে লাগিল---আমি আলসে কুড়ে হব...আমি আলসে কুড়ে হব ! এত সাজার পরেও হররােজ সে আপনার কুড়েমির কোণটিতে হাজিরি দিতে লাগিল। নাচার হইয়া পিতা পুত্রকে বলিল—চল, নেহাতই যখন আলসে কুড়েই হবি, তখন চল তােকে সিদি লাকদারের সাগরেদ করে দিয়ে আসি । সে তােকে কুড়েমিতে তালিম করে দেবে। যতদিন তুই শিক্ষানবিশ থাকৃবি ততদিন আমিই তাের ধােরপােষ চালাব। পুত্র আনন্দে লম্ফ দিয়া বলিল—সাবাস! বাহবা ! তােফা ! এই তাে আমার বাবার মতন কথা! ভ্যালা মাের বাপ রে !
যাত্রা-সহচরী ১৬৫ ক করিল। পরদিন প্রভাতেই দুজনে সেই মহাপুরুষ দর্শনে যাত্রা করিবার উদ্যােগ করিতে লাগিল; ক্ষুর দিয়া আচ্ছা করিয়া টাটকা সদ্য মাথা চাচিয়া, একটু নেবুর তেলে তুলা ভিজাইয়া কানে শু জিয়া, আঙুলে আতর মাখাইয়া মধ্যছাটা দীর্ঘ প্রান্ত গোঁপে চাড়া লাগাইয়া, দীর্ঘ দাড়িতে মেহেদি পাতার রং মাখাইয়া দুইজনে ফিটফাট হইয়া যাত্রা করিল। বাগানের দ্বার অবারিত। অভ্যাগত পিতাপুত্ৰ সবাধে ঝােপঝাড় কাটাখােচা ডিঙাইয়া বাগানে অগ্রসর হইতে লাগিল, কিন্তু বাগানে মালিকের সন্ধান লম্বা ঘাসের জঙ্গলের মধ্যে অনেক চেষ্টা। তবে মিলিল : তাহারা দেখিল আঞ্জীর গাছের তলে, উপরে পাখীর নীচে পীপড়ের ঝকের মাঝে, আগাছার বিছানায় একটা জদা রঙের ছেড়া-কাপড়ের পুলিন্দা পড়িয়া আছে—সেটা তাহাদিগের আগমনে গেঙাইয়া অভ্যর্থনা যেখান হইতে আওয়াজ আসিল সেখানটা লালচে কালো কি কালচে লাল, সূক্ষ্ম দর্শনে জানা গেল সেটা সিদি লাকদারের বিপুল দাড়ি আর পীপড়ের সঁধি। খরাদগর মাজা দুমড়াইয়া কপালে করতল ঠেকাইয়া সসম্ভ্রম সেলাম করিয়া বলিল—হুজুর মেহেরবান ও কদরদান : এই আমার বেটা, খেয়াল ধরেছে আলসে কুড়ে হবে ; এ-কে কত ক'রে বুঝিয়ে বল্লাম আলসে কুড়ে হওয়া কেবলমাত্র সিদি লাকদার আপনাকেই সাজে, গরীবের ছেলের পক্ষে এমন দুরাশা ঘােড়ায়ােগের চেয়েও সব নেশে ! কিন্তু এ একেবারে নাছােড়বান্দা! তাই হুজুরের দরবারে নিয়ে এসেছি, আপনি মেহেরবানি করে পরীক্ষা করে দেখুন এর আলসে কুড়ে হবার মতন হিম্মত ও হুনর আছে কি না। সিদি লাকদার কোনাে কথা না বলিয়া তাহাদিগকে ঘাসাসনে বসিতে ইসার। করিল । পিতা বসিল, পুত্ৰ ঘাসের উপর একেবারে শুইয়া ১৬৬ গোপ-খেজুরে পড়িল ! বাঃ! কি চমৎকার সিদ্ধির সঙ্কেত ! ইহাই তাহার সফলতার প্রথম প্রধান ও প্রবল লক্ষণ ! বায়নার নমুনাতেই সিদি লাকদার সাগরেদের উপর খুশী হইয়া গেল । তিনজনেই নির্বাক্ নিস্পন্দ। ঠিক দুপুর বেলা । রােদ, আর কাঠফাটা গরম। কমলা আর বাতাবি লেবুর ফুলের গন্ধ ক্ষণে ক্ষণে তন্দ্রার মতাে বহিয়া আসিতেছিল। আগাছার ডগায়। ডগায় শুষ্ক সূটীগুলি বাতাসে নাড়া পাইয়া ঝম ঝম ঝুমুর ঝুমুর করিয়া বাজিতেছিল, আর মাঝে মাঝে এক একটা ফট ফট করিয়া ফাটিয়া বীজগুলি ঝর ঝর করিয়া চারিদিকে ছড়াইয়া পড়িতেছিল। গাছে গাছে পাখী পাখা মেলিতেছিল আর বুজিতেছিল। পাকা পাকা আঞ্জীর আর খেজুর ডালে ডালে ঠেকিয়া ঠেকিয়া গড়াইয়া গড়াইয়া ছড়াইয়া পড়িতেছিল । জলের নহর ঘাসের বনে কুলকুল করিয়া বহিতেছিল। চারিদিকে ঘুমের আলস্যের আরামের বিশ্রামের যেন একটা ঘাের লাগিয়াছিল । খরাদগর বসিয়া বসিয়া ঢুলিতেছিল। সিদি লাকদার হাত বাড়াইয়া যে ফলটার নাগাল পাইতেছিল তুলিয়া তুলিয়া মুখে পূরিতেছিল। ছোড়া কিন্তু নির্বিকার উদাসীন নিশ্চল নিস্পন্দ। একটা গাছপাকা উগড়গে আঞ্জীর ছােড়ার কানের কাছে পড়িল, মুখ ফিরাইলেই তাহা মুখে যায়, কিন্তু সে তবু নিশ্চল। ওস্তাদ শুইয়া শুইয়া মুগ্ধ নেত্রে সাগরেদের এই নবাবী ধরণের আশ্চর্য মধুর কুড়েমি উপভােগ করিতে লাগিল। এক ঘণ্টা, দু ঘণ্টা এমনি ভাবেই চুপচাপ কাটিয়া গেল। কর্মকুশল খরাদগরের নিকট এই “বৈঠক” (?) নিতান্তই দীর্ঘ বলিয়া বােধ হইতে লাগিল। তবু সে নীরব নিশ্চল, আসনপীড়ি হইয়া বসিয়া বসিয়া ঢুলিতে ঢুলিতে পড়িতে পড়িতে এক একবার জাগিয়া উঠিয়া চাহিয়া যাত্রা-সহচরী ১৬৭ : দেখে ওস্তাদ-সাগরেদের লীল। আর মহাভাব । ওস্তাদের আস্তানার গরম বাতাস পাকা ফলের গন্ধভারে অলস মন্থর, আপনার চারিদিকে আলস্য ছড়াইতেছিল। হঠাৎ একটা মস্ত বড় খুব পাকা আঞ্জীর টপ করিয়া ছােকরার ঠোটের উপর পড়িয়া চেপ্টা হইয়া গেল ! ইয়া আল্লা ! এক গণ্ড ষ মধুর মতাে আঞ্জীরটির কিবা রং, কিবা স্বাদ, আর কিবা চমৎকার গন্ধ ! জিভ বাহির করিয়া মুখের মধ্যে টানিয়া লওয়ার ওয়াস্তা ! কিন্তু ছােকরার ঠোটের উপর মধুর প্রলেপের মতাে আঞ্জীরটি লাগিয়াই রহিল, জিভ দিয়া টানিয়া লইতেও তাহার ক্লেশ ৰােধ হইতেছিল। থাকিতে থাকিতে লােভ যখন প্রবল হইয়া উঠিল তখন সে পিতাকে চোখের ইসারা করিয়া গেঙাইয়া গেঙাইয়া বলিল—“বাবা, এগাপের ওপর আঞ্জীরটি নামিয়ে দাও তাে খাই !” এই কথা শুনিবামাত্র সিদি লাকদার মুখের গ্রাস হাতের মুঠার পাকা আঞ্জীরটি টানিয়া ফেলিয়া দিয়া এক লাফে উঠিয়া দাড়াইয়া বালকের পিতাকে সক্রোধে তর্জন করিয়া বলিল-“বে-আক্কেল আহাম্মক। এই ছেলেকে এনেছিস আমার সাগরেদ করে দিতে।” তারপর ছােকরার সম্মুখে জানু পাতিয়া বসিয়া তাহার চরণতলের মাটিতে মাথা ঠেকাইয়া সবিনয়সম্ভমে বলিল-“প্রভু, গুরু, তুমি কুড়ের বাদশা, আলসের ওস্তাদ, এই সাগরেদের প্রণাম গ্রহণ কর!.. ১ • পূজার ঘণ্টা ছােট গাঁখানিতে একটি পুরাণাে মন্দির আর একজন পুরাণে। পূজারী ছিল। মন্দিরের পূজা-আরতির ঘণ্টাটি ছিল ফাটা ; তাহাতে শব্দ হইত ঠিক যেন বুড়ির কাশির মতন । সেই শ্রুতিকটু শব্দ শুনিলে ক্ষেতের কাজে কৃষাণের আর উৎসাহ থাকিত না ; অকারণ দুঃখের ভারে মন দমিয়া যাইত। পূজারীর বয়স হইলেও চেহারাটি ছিল 'বেশ আঁটোসাঁটো গােলমাল হৃষ্টপুষ্ট । শিশুর মতো • সদানন্দ তাহার চেহারাটি ; বুড়াে থুরথুরাে, তবু মুখখালিতে দেহ-মনের স্বাস্থ্যের লালিমা মাখানাে ; গাঁয়ের মেয়েদের হাতের-যত্নে পাকানো সূতার মুটিগুলির মতাে কোকড়া কোকড়া শাদা ধবধবে চুলে'র গুচ্ছে তাহার মুখখানি ঘেরা। তাহার অমায়িক ব্যবহার আর দয়াযত্নের জন্য যজমানেরা তাহাকে বড় ভালো বাসিত, ভক্তি করিত। পূজারীর দীক্ষা লওয়ার বাৎসরিক দিন। পঞ্চাশ বৎসর আগে বৃদ্ধ তাহার ভরা যৌবনে এই ত্যাগের ব্রত স্বীকার করিয়া দীক্ষা লইয়াছিলেন। যজমানেরা স্থির করিল এই বিশেষ দিনে তাহাদের পূজারীকে বিশেষ কিছু উপহার দিবে। গােপনে বাড়ী বাড়ী চাদা তুলিয়া একশ টাকা জোগাড় করিয়া তাহার। পূজারীকে আনিয়া দিয়া কহিলবাবাঠাকুর, শহরে গিয়ে আপনি নিজে দেখে পছন্দ করে একটা নতুন ঘণ্টা কিনে নিয়ে আসুন। পূজারী বলিলেন-বাবা, তােমাদের কল্যাণ••• ভগবানের আশীর্বাদে । • • • নতুন ঘণ্টা.••••• যাত্রা-সহচরী ১৬৯ বৃদ্ধ গুছাইয়া কিছুই বলিতে পারিলেন না, তাহার চিত্ত আনন্দে ভাবে ভক্তিতে গদ হইয়া উঠিয়াছিল। তিনি শুধু আপন মনে বলিতে লাগিলেন—দয়াল ঠাকুর, তােমার সেবা করতে দিয়ে আমাকে ধন্য করেছ, ধন্য করেছ!• • • পরদিন প্রভাতে পূজারী ঘণ্টা কিনিতে যাত্ৰা কঢ়িলেন। তাহার আনন্দের সীমা নাই। পথের দুধারে বিচিত্র বৃক্ষলতাগুল্ম,ও পশুপক্ষীর প্রাণহিল্লোল রবিকিরণে ঝলমল করিতেছিল—চারিদিকে শুধু প্রাণের, আনন্দের, বর্ণগন্ধগানের মেলা লাগিয়া গিয়াছে-পথের ধূলি পর্যন্ত প্রাণে স্পন্দিত আর তাহার মধ্যে সেই বৃদ্ধ পূজারীর কানে নৃতন ঘণ্টার ভবিষ্যৎ মধুর সঙ্গীত থাকিয়া থাকিয়া উচ্ছসিত হইয়া বাজিয়া উঠিতেছিল। ভগবানের সৃষ্টি-বৈচিত্র্যের আনন্দে মুগ্ধমনে ভজন গাহিতে গাহিতে বৃদ্ধ পথ হাঁটিতেছিলেন। শহরে পৌছিবার মাঝামাঝি পথে পূজারী দেখিলেন একটা ঘােড় মরিয়া পড়িয়া আছে, আর তাহার কাছে বসিয়া একজন বুড়া ও একজন বুড়ী হাপুস-নয়নে ঘােড়ায় শশাকে কঁদিতেছে । তাহায়া বেদে। তাহাদের কাপড় ময়লা, আগাগােড়া তালি আর রিফুর নক্সা কাটা। পাশের পগার হইতে একটি তরুণী বেদিনী, পাতাল হইতে নাগ- কন্যার মতাে, হঠাৎ বাহির হইয়া পূজারীর নিকট আসিতে আসিতে ১৭০ পূজার ঘণ্টা বলিতে লাগিল-বাবাঠাকুর বাবাঠাকুর, দান কর বাবা, কিছু দান কর, পুণ্যি হবে, পুণ্যি হবে ! তরুণীর কণ্ঠের স্বর বড় মধুর, বড় মােলায়েম ; বলার ভঙ্গিটি গানের মতে তালে তালে। বেদিনীর গায়ের রং টাটকা-মাজা তামার পুষ্প- পাত্রের মতো। পােষাক পরিচ্ছদ বুড়াবুড়ীর চেয়ে কিছু ভালাে নয়, কিন্তু তবু তাহার ঐশ্বর্যের কমি ছিল না—চোখের তারা দুটি তার কালাে মকমলের টুকরা, গাল দুটি তার ননীর ডেলা, আর ঠোঠ দুখানি পাকা পিচ ; হার যৌবননিটোল বুকের উপর নীল উল্কির পত্রলেখা, তামার তারে " কালাে চুলের রাশি পেখম তুলিয়া চূড়া করিয়া বাঁধা পাপড়ির বেষ্টনে পদ্মকোষের মতন আতা মুখখানি তাহার মধ্যে.টুলটুল করিতেছে। পূজারী গতি স্থগিত করিয়া টাকার গেঁজে বাহির করিলেন। হাতড়াইয়া একটা ডবল পয়সা তুলিয়া তরুণীকে দিতে গেলেন। তাহার মুখ দেখিয়া আর তাহাকে পয়সা দেওয়া হইল না। না। বুড়। তরুণীর পরিচয় লইতে লাগিলেন। তরুণী বেদিনী বলিল—বাবাঠাকুর, আমরা বড় গরিব গাে বড় গরিব। পেট ভরে খেতে পাই না, শীতে কাপড় পাই না। আমার এক ভাই ছিল, তাকে ধরে কয়েদ করেছে, সে নাকি একটা মুরগী চুরি করেছিল। সেই আমাদের রােজগার করে খাওয়াত। সে নেই– আমাদের দুদিন খাবার জোটেনি। পূজারী ডবল পয়সাটি সেঁজেতে রাখিয়া একটা টাকা তুলিলেন। বেদিনী বলিয়াই যাইতেছিল--আমি বাজি করতে আমার মা হাত গুণতে পারে। কিন্তু চৌকিদার গায়ে কিংবা শহরে কোথাও আমাদের খেলা দেখাতে দেয় না, আমাদের কষ্টের একশেষ হয়েছে। জানি ;
যাত্রাসহচরী ১৭১ তারপর আবার আমাদের ঘােড়াটা মরে গেল—আমরা যে কি করে কি করব ? পূজারী জিজ্ঞাসা করিলেন—আচ্ছা, তা তােমরা কোথাও চাকরি বাকরি কর না কেন ? —লােকেরা যে আমাদের বিশ্বাস করে না আমাদের ঘরে ঠাই দিতে ভয় পায় ; ঢেলা ছুড়ে তাড়া করে । আর আমরাও তাে কোনাে কাজ জানিনে ; ভবঘুরে আমরা, জানি শুধু এ গ৷ ও গা করে ঘুরে বেড়াতে। যদি আমাদের একটা ঘােড়া থাকত আর কাপড় চোপড় কেন্বার কিছু টাকা থাকত, তা হলে আমরা বাঁচবার একটা পথ করতে পাবৃতাম। এখন মরা ছাড়া আর উপায় নেই। পূজারী টাকাটি গেঁজেয় রাখিয়া দিলেন। জিজ্ঞাসা করিলেন- তুমি ভগবাকে ধন্যবাদ জানাও ? বেদিনী বলিল—কেন জানাব না ? সে ভদ্রলােক যদি আমাদের সাহায্য করে অবিশ্যি তাকে ধন্যবাদ জানাব। পূজারী জামার বুকের মধ্যে হাত ভরিয়া অতি সঙ্গোপনে রক্ষিত তঁাহার যজমানের দেওয়া একশ টাকার তােড়াটি হাতে তুলিয়া তাহার ভার, আন্দাজ করিতে লাগিলেন। বেদিনী তাহার কোমল চোখের তরল দৃষ্টি পূজারীর মুখ হইতে একবারও নামায় নাই, সেই নাগিনীর মতাে যাদুকরা তাহার দৃষ্টি ! পূজারী প্রশ্ন করিলেন—তুমি ধর্মশীলা তাে? —ধর্ম ?—বলিয়া বেদিনী অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল। পূজারী বলিলেন—আচ্ছা বল—“ভগবান, তােমায় আমি ভালাে বাসি।” তরুণী দুই চোখে জল ভরিয়া লইয়া বলিল-না না, বুড়াে বাবাঠাকুর, :१२ পূজার ঘণ্টা আমি তােমায় ভালাে বাসতে পারব না, আমি আর-একজনকে যে ভালাে বাসি। পূজারী মের্জাইয়ের বন্ধ খুলিয়া বুকের ভিতর হইতে টাকার তােড়াটি বাহির করিলেন। বেদিনী চিলের মতাে ছো মারিয়া তােড়াটি ছিনাইয়া লইয়া ছুটিয়া পলাইতে পুলাইতে বলিয়া গেল-বুড়াে ঠাকুর, তােমায় ভালাে বাসব গাে খুব ভালাে বাসব ! তুমি খাসা লােক ! বুড়া বুড়ি তখনাে পগারের আলের উপর বসিয়া ঘােড়ার শােকে হাপুস-নয়নে কঁদিতেছিল। * পূজারী শহরের দিকেই চলিতে লাগিলেন। কোথায় কেন যাইতেছেন সে হুশ তাহার ছিল না; তিনি তখন ভাবিতেছিলেন যে ভগবানের এ কী নিয়ম, তঁাহারই সৃষ্ট কত প্রাণী কী বিষম দুঃখে কষ্টে নিমজ্জিত হইয়া আছে। পূজারী ভগবানের কাছে মনে মনে এই প্রার্থনা করিতেছিলেন— এই যে ধর্মজ্ঞানহীনা বেদিনী, ইহার অন্তর, হে ঈশ্বর, তােমার প্রকাশে উজ্জ্বল আলােকিত করিয়া তােলে। যে তােমারে ডাকে না হে তারে তুমি ডাক ডাক ! আহা অমন সুন্দর মেয়েটি ! হঠাং পথের মাঝে তাহার হুশ হইল যে তঁাহার শহরে যাওয়ার কষ্ট বেদিনী টাকার ভার হরণ করিয়াই লাঘব করিয়া দিয়া গিয়াছে—তাহার শহরে যাইবার আর প্রয়ােজন নাই। ধুলা পায়েই বৃদ্ধ আবার গৃহের দিকে ফিরিলেন।
যাত্রা-সহচরী ১৭৩ -- এখন তঁাহার ভাবনা হইল, একটা বেদিনী ভিখারিণীকে কেমন করিয়া তিনি একেবারে অত টাকা দিয়া ফেলিলেন। সে টাকা তাে তাহার নিজেরও নয়। তিনি পা চালাইয়া তাড়াতাড়ি ফিরিতে লাগিলেন; বেদিনীর দেখা পাইলে টাকা ফিরাইয়া লইবেন। সেই জায়গায় ফিরিয়া দেখিলেন শুধু সেই মরা ঘােড়াটা ঠ্যাং উচু করিয়া পড়িয়া আছে—বেদেরা একে- বারে অন্তর্ধান । এখন করা যায় কি। তিনি যে ভয়ানক পাপ করিয়াছেন তাহাতে আর কোনাে সন্দেহ নাই । যজমানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা, গচ্ছিত ধন অপহরণ, দেবতার ধন অপব্যয় ! এই ব্যাপারের পরিণাম চিন্তা করিয়া ভয়ে তাহার শরীর মন শিহরিয়া উঠিতেছিল। ব্যাপারটা এখন ঢাকা যায় কেমন করিয়া ? কি উপায়ে এই অন্যায়ের প্রতিকারই বা করা যায় ? একশ একশ টাকা কেমন করিয়াই বা জোগাড় হইবে ? লােকে যখন জিজ্ঞাসা করিবে তখনই বা কি বলা যাইবে ? আর নিজের আচরণই বা কেমন করিয়া লােকের কাছে প্রকাশ করা যাইবে ? মেঘে আকাশ ছাইয়া গেল। কালো মেঘের গায়ে ঝাপসা গাছগুলো দানবের মতাে দাড়াইয়া আছে । বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামিল। জগতের দুঃখচিন্তায় পূজারীর প্রাণ কাতর হইয়া উঠিল। পূজারী • গাঁয়ে ফিরিয়া গেলেন, ভাগ্যে ভাগ্যে কেহ তাহাকে দেখিল না। মন্দিরের বুড়ী ঝি জিজ্ঞাসা করিল—কি বাবাঠাকুর, এর মধ্যে ফিরে এলে ? শহরে গেলে না? পূজারী মিথ্যা বলিলেন ।-না, যাবার গাড়ী পেলাম না, আর ১৭৪ পূজার ঘণ্টা একদিন যাব এখন।•••কিন্তু, একটা কথা, আমি যে ফিরে এসেছি একথা এখন কাউকে বােলো না, বুঝলে? পরদিন প্রভাতে পূজারী মন্দিরে পূজা করিলেন না। নিজের ঘর- টিতে বন্ধ হইয়া রহিলেন। পরদিন ভিন্ গাঁয়ের যজমান আসিল, মুমূযুর প্রায়শ্চিত্ত করাইতে পূজারীকে যাইতে হইবে। # ভিন্ গাঁয়ের যজমানকে বলিল—বাবাঠাকুর শহরে গেছেন, এখনাে তাে তিনি ফেরেন নি। —ঝি জানে না; এই যে আমি ফিরে এসেছি।-পূজারী দ্বার খুলিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া আসিলেন। ভিন্ গাঁয়ে যাইবার পথে দু-একজন যজমানের সঙ্গে পূজারীর দেখা হইতে লাগিল। -বাবাঠাকুর যে ! আজ্ঞে প্রাতঃপ্রণাম হই । শহরে যেতে আসূতে কোনাে ক্লেশ হয়নি তাে ? পূজারী আবার মিথ্যা বলিলেন-ক্লেশ? না বাবা, পথে কোনাে ক্লেশই হয়নি । —আর সেই ঘণ্টাটা? সে কেমন হল? পূজারী আবার মিথ্যা বলিলেন ; তখন তাহার আর দিগবিদিক্ জ্ঞান ছিল না। —ঘণ্টা? সে আর কি বলব বাবা, সে চমৎকার ! আওয়াজ,
যাত্রা-সহচরী
১৭৫
সে আর কি বলব, যেন রূপাের বাদ্য। একটি টুকি মারলে অনেকক্ষণ
তার আওয়াজ বাজে, শিগগির থাম্তে চায় না, আর সে আওয়াজ
তেমনি মিঠে ।
—কবে আমরা দেখতে পাব ?
—শিগগিরই দেখতে পাবে বাবা, শিগগিরই দেখতে পাবে। কিন্তু
ঘণ্টার গায়ে ঠাকুরের একশ আট নাম খুদতে হবে, পঞ্চগব্য দিয়ে শােধন
করে, ভূতশুদ্ধি আসনশুদ্ধি করে তবে তো টাঙানাে হবে, অমনি
টাঙালে তো আর হল না।
ক
পূজারী মন্দিরে ফিরিয়া আসিয়াই ঝিকে ডাকিয়া বলিলেন—আচ্ছ।
ঝি, আমার এই আসন বাসন, চৌকি টোকি যা-কিছু আসবাবপত্তর আছে
সব যদি বেচে ফেলি, তাহলে কি একশ টাকা হয় না?
—হ্যাঃ একশ টাকা ! তােমার তাে ভারি ঐশ্বযি, বেচলে একশ
পয়সাও দাম হবে না।
-তবে ঝি, আজ থেকে আমি আর হবিষ্যিতে ঘি দুধ খাব না ;
পেটে সহ্য হয় না।
বুড়ী ঝি, আশ্চর্য হইয়া বলিয়া উঠিল-বাবাঠাকুর, তুমি কি বলছ ?
দিনান্তে এক মুঠো হবিষ্যি, তাতে ঘি দুধ খাবে না? এও কি একটা
কথা হল ?
•••তােমার ব্যাপারখানা কি খুলে বল দেখি? হয়েছে কি ?
সেই যে দিন থেকে শহরে যেতে যেতে ফিরে এসেছ, সেদিন থেকে
কি হয়েছে তােমার?•••
১৭৬ পূজার ঘণ্টা ন ঝি প্রশ্ন করিয়া পূজারীকে এমন ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল যে বৃদ্ধ তাহার নিকট হইতে আর কিছু গােপন রাখিতে পারিলেন না। —আ! এ আর আশ্চর্য কি ? তােমার যে দয়ার শরীর, তাইতেই তােমায় খে4 তা এর জন্যে ভেব না বাবাঠাকুর। যতদিন না টাকার জোগাড় হয় লােককে ঠেকিয়ে রাখ বার বােকা বােঝাবার ভার আমার রইল। তুমি নিশ্চিন্ত থাক। শীঘ্রই গ্রামময় রটিয়া গেল—-ঘণ্টার গায় একশ আট ঠাকুরের নাম খোদাই করতে গিয়া ঘণ্টা ফাটিয়া গিয়াছে ; এজন্য তাহা গলাইয়া আবার ঢালাই করিতে হইবে। তারপর নূতন করিয়া ঢালা খােদা হইলে প্রধান মােহান্তকে দিয়া শােধন করাইতে হইবে ; নূতন ঘণ্টা প্রতিষ্ঠা, সে তাে আর অমনি মুখের কথা খসাইলেই হয় না। ঝিয়ের রটনায় পূজারী বাধা দিলেন না, কিন্তু অন্তরে তাহার বেদনা জমিতেছিল। একে তো নিজের মিথ্যা কথার বােঝ। তাহার মনকে অহরহ পীড়া দিতেছিল, তাহার উপর ঝিয়ের এইসব মিথ্যা রটনা। তিনি নিজেকেই দায়ী বলিয়া বোধ করিতেছিলেন । যজমানের ব্যস্ত ধন নষ্ট করার সঙ্গে এইসব মিথ্যা প্রবঞ্চনা পাপের পবতের মতো তাহাকে চারিদিক হইতে চাপিয়া ধরিতে লাগিল । বৃদ্ধ এতদিনে জরার ভারে ঝুকিয়া পড়িতে লাগিলেন ; স্বাস্থ্য ও আনন্দের লালিমা হারাইয়া গাল দুটি বসিয়া গেল, চোখের দৃষ্টি নিষ্প্রভ কুণ্ঠিত হইয়া উঠিল । ; পূজারীর দীক্ষাদিন নিরুৎসবেই কাটিয়া গেল ; বণ্টা প্রতিষ্ঠাও কৈ হইল না। যজমানেরা সকলেই আশ্চর্য হইতেছিল। হরিধন কামার চুপি- যাত্রা-সহচরী ১৭৭ । চুপি সকলকে বলিয়া বেড়াইতে লাগিল—আমি শহরের শড়কে পূজারী ঠাকুরকে এক বেদেনী চুড়ির সঙ্গে রঙ্গরস করতে স্বচক্ষে দেখেছি। আমি যা বলি তা তােমরা কান পেতে শােন, পূজারী ঠাকুর ঘণ্টার টাকাটা একেবারে নষ্ট করেছেন, একেবারে নিয্যস ! ক্রমে ক্রমে কামারের পাের দল পুরু হইয়া উঠিতে লাগিল! পথে পূজারীর সহিত সাক্ষাৎ হইলে তাহারা আর তাহাকে প্রণাম করে না। পূজারীকে শুনাইয়া শুনাইয়া তাহারা ফিসফিস করিয়া তাহারই আচরণ আলােচনা করে। বৃদ্ধ পূজারী অসাধ্য ভাবনায় ভাঙিয়া পড়িতেছিলেন । তাহার সমস্ত অপরাধ শুরু হইয়া তাহার মন একেবারে পিষিয়া ফেলিতে লাগিল, কিন্তু যাহা করিয়াছেন তাহার জন্যও বিশেষ পরিতাপ অনুভব করিতে তাহার ইচ্ছা হইতেছিল না। তিনি দরিদ্রকে ভিক্ষা দিয়াছেন, ইহাতে তাহার এমন কি অপরাধ -ছে ? সেই দান হয় তত সমুচিত পাত্রে হয় নাই। সে টাকাও ছিল পরের গচ্ছিত সম্পত্তি। তা তখন তাহার বিচার করিবার কি অবসর ছিল ? আরেক কথাও তাে ভাবিবার আছে--এই অপ্রত্যাশিত লাভ সেই ধর্মজ্ঞানহীনা বেদিনীর অন্তরে হয় তত ভগবানের বােধ অঙ্কুরিত করিয়া তুলিতে পারে ; ভগবান্ তাহার অন্তর উদ্ভাসিত করিয়া তুলিতে পারেন। ভাবিতে ভাবিতে পূজারীর মনে পড়িয়া যাইত তরুণী বেদিনীর সেই পাকা জামের মতাে কালাে ডাগর চোখের অশ্রুভর মুগ্ধকরী স্নিগ্ধ দৃষ্টি। মন কিন্তু কিছুতেই অবােধ মানে না, অন্তরাত্মার ধিক্কার অবশেষে অসহ্ন হইয়া উঠিতে লাগিল। একদিন পূজারী বহুক্ষণ ধরিয়া পূজা প্রার্থনা শেষ করিয়া যখন উঠিলেন তখন তাহার সঙ্কল্প দৃঢ় হইয়া গিয়াছে— ۵۹۲ পূজার ঘণ্টা যজমানদের কাছে।বজের সমস্ত পাপ অকপটে প্রকাশ করিয়া ধরিতে হইবে--চুরি প্রবঞ্চনা আর নয়, যজমানের ভক্তি কুড়ানো আর নয় । গ নৃতন ঘণ্টা। পরদিন, পূজারী মন্দিরে গিয়া পূজার আসনে বসিলেন। বৃদ্ধ তখন বিবর্ণ র আড়ষ্ট, খাড়ার সম্মুখে যেন বলি। তিনি দৃঢ় অকম্প কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন—বৎস, তােমরা সকলে শােন••• এমন সময় তরল মধুর উচ্চস্বরে পূজাৰ ঘণ্টা বাজিয়া উঠিল, ঘণ্টা ধ্বনির মধুর মূছনায় পূজার মন্দির একেবারে ভরিয়া গেল।•••সকল পূজার্থী সবিস্ময়ে উৎকর্ণ হইয়া বলিয়া উঠিল নূতন ঘণ্টা ! নূতন পূজারী ভক্তিগদগদ চিত্তে চক্ষু মুদ্রিত করিয়া ভাবিতে লাগিলেন- ভক্তবৎসল, তােমার এ কী অসম্ভব অতিপ্রাকৃত লীলা। হে ভগবান্ ! তােমার দীন হীন দাসের কলঙ্কমােচনের জন্য এ কী আশ্চর্য আয়ােজন। সকল যজমানের পশ্চাতে এক পাশে দাঁড়াইয়া বুড়ী ঝি আনন্দদীপ্ত অপলক নেত্রে পূজারীর উপাসনা দেখিতেছিল। সে যে তাহার জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দিয়া পূজারীর অতিদয়াজনিত অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করিয়াছে। ইহার পর লাশীর আর আত্ম-অপরাধ প্রকাশ করা আবশ্যক হইল না।
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.