Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Saptamir Balidan
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
সপ্তমীর বলিদান।
কবিকৃষ্ণামৃত
শ্রীচণ্ডীচরণ মুখােপাধ্যায়।
প্রকাশক--
শ্রহেরম্বজীবন চট্টোপাধ্যায়
বাঁশবেড়িয়া (হুগলী)।
প্রিন্টার-- শ্রীরাজেন্দ্রলাল সরকার
কাত্যায়নী মেসিপ্রেস্
১১ নং শিবনারায়ণ দাস লেন, কলিকাত।
মূল্য ১১ টাকা।
No text on this page.
সপ্তমীর বলিদান
}
গ্রন্থকার (১৩১২ বঙ্গাব্দ)
No text on this page.
উৎসর্গ।
পরম শ্রদ্ধাস্পদ, সাধু-হৃদয়
শ্রীল শ্রীযুক্ত মন্মথনাথ মুখােপাধ্যায়,
মহাশয়।
কাশীপুর (কলিকাতা)।
মুগ্ধ আমি আপনার সৌজন্যে পরম
সুহৃদ্ সত্তম! সুদুর্লভ লােকে আজি
অমল হৃদয় হেন উন্নত উদার,
ঐশ্বর্যে অতুল, আধিপত্যে অনিরোধ,
নবীন-যৌবনে আর, আশঙ্কার স্থল।
কুলােজ্জ্বল গুণমণি, সুপুত্র পিতার
দেবতার অনুকল্প !-কি বলিব আমি?
কি মহত্তে সুরাচিত, কি ঋণে অশেষ,
কি প্ৰীতি-বন্ধনে অহো, চিরদিন তরে
বেঁধেছে,-বলিতে ভাষা নাহি ত আ র !
দীন আমি। অন্তরের আবেগে প্রবল
লইয়া কেবল এই দীন উপচার,
দেবত্বে সে আপনার করিতে অর্চনা
আকিঞ্চন ;-নিজগুণে লহ ক্ষুদ্র দান ;
ছেলেখেলা মাের সপ্তমীর বলিদান।
ভৰদীয়
শ্রীচণ্ডীচরণ দেবশর্মা।
No text on this page.
গ্রন্থ-পরিচয়। ' . • গ্রন্থের প্রারম্ভে তাহার কিঞ্চিৎ তাহার কিঞ্চিৎ পরিচয় আবশ্যক। স্বাদনেই তাহার গুণপরিচয় পাওয়া যায় ; সে-পরিচয় দেওয়া কথায় ক হয় না। তবে তদ্বিষয়ে অপর জ্ঞাতব্য বিষয় অনেক সময় বলিতে বলিলে আস্বাদ্য বা উপভোগ্য বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান লাভ ও নন্দ বদ্ধিত হয়। পুত্রের হাতে একটি আম দিয়া বাবা যদি বলেন ‘ওরে, তাের মত ছেলেবেলায় আমি একটি ভাল দাম আমাদেব গাপীবল্লভের প্রসাদ পেয়ে তারই আঁটিটে পুতে দিয়ে ছিলাম ; তেই গাছটা হয় ; এ তারই ফল। গােপীবল্লভেব প্রসাদ।” তাহা 'লে, ঐ আমের উপভােগে পুত্রের আনন্দ দ্বিগুণ বাড়ে। তাই, [মিও এই গ্রন্থের কথা কিছু বলিতে বসিয়াছি । এই গ্রন্থখানি বচিত হইয়াছে আজ প্রায় পূর্ণ বিশ বৎসর। ইং ১০৫ অব্দে। এই সুদীর্ঘকাল ইনি কাগজপত্রের মাঝেই, পতিসঙ্গপ্রাপ্ত তীর পেটকাবদ্ধ পুত্তলিকাবৎ নিদ্রিত ছিলেন। আমার জামাত মান্ হেরম্ব বাবাজীবন আজ তাহাকে টানিয়া এই বিংশতি বৎসরের -নিদ্রা হইতে হঠাৎ জাগাইয়া, একবারে গঙ্গাপারে কলিকাতার রা-যন্ত্রাগারে আনিয়া ফেলিয়াছে। আমিও কাল-চক্ৰে কলিকাতায়। iর কলি ; মহাবলশালী ; সেই কলির কাতায় আজ কে না বদ্ধ ? 1 কাত কাটে এমন কাতান গড়িতে পারিয়াছে বা সংগ্রহ করিয়াছে য় জন ? সেই কাতানের জন্যই সৰ্বস্বমূল্যে মহাজনের নিকট লােহা ইস্পাত সংগ্রহ করিয়া কামার ঘরে পড়িয়া আছি আমি। সহসা বাদ পাইলাম—‘সপ্তমীর বলিদান’ ছাপা আরম্ভ হইয়াছে। সে কি
;
কং! রত্নসদৃশ কত গ্রন্থ অপ্রকাশিত থাকিতে, সেই কবে ।
লিখিয়াছি,-সাপ-বেঙ, কি আছে তাহাতে,তাহাই হঠাৎ ছাপ
অক্ষরে গ্রন্থাকারে বাজারে বাহির হইতে চলিল ? ভাবিতেছি
নানারূপ চিন্তা হইতেছে ;-অমনি প্রুফ,ও আসিয়া গেল ; তৎ
হেরম্বের পত্র। তাহার বইখানি বড় মনে লাগিয়াছে। কালােচি
কি না! শীঘ্রই ইহা বাহির হয়, ইহাই তাহার একান্ত অভি প্রা
অ ব করিব কি ? প্রুফ, দেখার মুখেই তখন সেই নূতন যৌবনে
উচ্ছাসময়ী অসংযতা ভাষাকে স্থানে স্থানে সামান্যরূপ সংযত করি
এইরূপে লােকের মাঝে বাহির করিলাম। কিন্তু একদিন যা
কত আদর করিয়া লিখিয়াছি, যাহাতে কত না গৌবর অনু
করিয়াছি, আজ
তাহার অনেক স্থলে আমারই বিষম বিব
আসিতেছে ; কত অনর্থ দর্শন হইতেছে। তাহা হইলেও, গ্রন্থখ
প্রধানতঃ সদ্ভাব-মূলক ও ধর্মভাব-উদবােধক বলিয়াই, আজ তাই
প্রকাশে প্রশ্রয় দিলাম।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার
“দেহিনােহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবন জরা।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তি:..
। (১১৩)।”
এই ভগবদবাক্য-অনুসারে এই গ্রন্থের প্রণেতাকে এখন বি
বলিলেও ভুল বলা হয় না। সুতরাং, আমি, বৰ্তমান সময়ে—যৌবং
শেষার্ধে-যদি এই গ্রন্থের একটু আলােচনা করি, তবে তাহা দোষ
হইবে না।
গ্রন্থখানি স্বর্গীয় কবি নবীন বাবুর পলাশীর যুদ্ধের অনুক
রচিত। অবলম্বন-শাস্ত্রী মহাশয়ের “ছত্রপতি শিবাজী”। গ্রন্থখানি
বিশেষ মনােযােগ দিলে, সৰ্ব্বত্রই যে একটি অপ্রাকৃত বস্তুর অতি ।
। । ।
| ০ ০
• ; ন্দি আঘ্রাণ পাওয়া যায়, তাহার আভাস মাত্ৰও “পলাশীর যুদ্ধের কোথাও নাই। আবার প্রাকৃত সম্পদের বিচার করিলে, পলাশী” তেও এমন জিনিষ আছে, যাহা ইহাতে কোথাও নাই। তবে, “পলাশীতে পাঠককে যাহা মত্ত করে তাহা বােতলে ভরা বিলাতী ব্ৰাণ্ডী; আর ইহাতে বাহ দৃষ্টিতে ঐরূপই যাহা আছে, তাহা যজ্ঞ- শিষ্টামৃত' সােম-রস ( শ্রীগীতা ৪।৩); ৯৩০) বলিয়া মনে হয় । কিশাের কবি কৌশলে কৃষ্ণ নাম করিয়া গ্রন্থ আরম্ভ করিয়াছেন ; আর হরিধ্বনি দিয়া, ‘গােবিন্দ স্মরণ করিয়া গ্রন্থ শেষ করিয়াছেন। অপর সকলের ভিতর দিয়াও সকল স্থলে সেই সৰ্ব্বকারণ-কারণ মুলতত্ত্বেই লক্ষ্য প্রত্যক্ষ হয়। কয়েকটি উদাহরণ দেখাইতেছি। প্রথম সর্গে, তৃতীয় পৃষ্ঠায় ; “শােভে ‘মুরবাদ' সমুন্নত শির মুরহর-করে যেন গিরিবর।” দ্বিতীয় সর্গে পঞ্চদশ পৃষ্ঠায় ; *পুত্রের কল্যাণে মাতা জপিছে তন্ময় হরিনাম-মহামন্ত্র মঙ্গল-আলয়।” তৃতীয় সর্গে নবম ও দশম স্তম্ভে কবি মহাদেবী দুর্গার সম্মুখে প্রার্থনা করিতেছেন ;- “হায় মা আমার, এ মােহ-স্বপনে আকাশ-কুসুমে ভুলাইয়ে আর কতদিন হেন রাখিবি বন্ধনে ? পা’ব পরমার্থে কবে মুক্তার ? মুক্তপথে সেই ছুটিয়া কখ মুক্তিপদে পা’ব মূল প্রয়ােজন? - তারপর বলিতেছেন ;- “বাড়ে দিন দিন হের দৈত্যবল ; দানবারি হরি কোথা মা আজিকে? উঠেছে অধৰ্ম্ম-ঝটিকা ভীষণ রাখ ধৰ্ম্ম-বলে জীর্ণ এ ভবন।” অতি সুন্দর প্রার্থনা ! প্রতি শব্দ গূঢ়ার্থ-ব্যঞ্জক। বিশেষজ্ঞ জন তাহা পাঠ মাত্রই বুঝিবেন। সাধারণের জন্য ইহা একটু খুলিয়া দেখাইতেছি। ‘মােহের স্বপন’, ‘আকাশ কুসুম কি ? দেহাত্মবুদ্ধি-রূপ মােহ ; অর্থ-কামাদি কৈতব। ইহাতে আত্মহারা হইয়াই, জীব মুলে লক্ষ্যহারা হয়; এবং কেবল স্থলে মজিয়া, কাল-বিপ্লুত বিষয়ে মুগ্ধ হইয়া, সহস্র অনর্থ-পূৰ্ণ কৰ্ম্ম-বন্ধনে জন্ম জন্ম তাপ ভােগ করে। তাহাতে কেহই অনর্থ ও অর্থ হইতে পরমার্থে প্রবেশ করিবার মুক্ত-দ্বার, অবাধ পথ, প্রাপ্ত হইতে পারে না। মুক্তিপদে মুল-প্রয়ােজন সিদ্ধিও হয় না। তাহা কিরূপে সম্ভব, তাহা স্বয়ং শ্রীভগবানই বলিয়াছেন,-যথা ;- “অনিত্যমসুখং লােকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্।” ( শ্ৰগীত ৩৯.২০) অর্থাৎ-এই অনর্থময় অনিত্য সংসারে যদি মঙ্গল চাও, তবে আমার ভজনা কর। এই যে ভজনা, এই যে অব্যভিচারিণী ভক্তি, ইহাই ঐ ‘পরমার্থে মুক্তদ্বার’-একমাত্র অবাধ পথ। কেবল এই পথেই মুক্তিপদে ‘মূল- প্রয়ােজন’ সিদ্ধ হয়। এই ভজনা, এই ভক্তি সাধনা সর্বত্র, ও ৰ্ব্বদ। সকলের দ্বারাই হইতে পারে। শ্ৰীগ্রন্থে মহিমা বর্ণনায় বেদব্যাস, যুদ্ধে অর্জুন, সেবায় বিদুর এবং স্তুতিতে কুন্তি এই ভজনাই করিয়াছিলেন।
ভগবৎ সেবা বুদ্ধিতে অকপট কৰ্ম্মানুষ্ঠান মাত্রই এই ভজনা।
তাহাতেই অখিল জীবজগতের পরম মঙ্গল হয়
এখন ‘মুক্তিপদ’ আর ‘মূল প্রয়ােজন কি, তাহা দেখ । শ্রীমদ্ভাগবতে
উক্ত হইয়াছে ;-
“তভেইনুকম্পাং সুসমীক্ষণে
ভূঞ্জান এবাত্মকৃতং বিপাকস্।
হৃদ্বাবপু ভি বিদধন্ নমস্তে
জীবেত যে মুক্তিপদে স দায়ভাক্ ॥” {:}১৪১৮
শ্রীকৃষ্ণকে ব্রহ্মা বলিতেছেন,-“প্রভাে, যে
জন তােমার অনুকম্পা লাভের আশায়, জন্ম
জন্মজিত স্বকর্মের ফল ভােগ করিতে
করিতে, মন, বাক্য ও শরীর দ্বারা সকল
সময় তােমাতে আত্মসমর্পণ করিয়া, জীবন
যাপন করেন, তিনিই মুক্তিপদ প্রাপ্ত হন।”
অভিন্নকৃষ্ণ শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দর সাৰ্বভৌমের নিকট স্বয়ং এই মুক্তিপদ’
শব্দের অর্থ করিয়াছেন। বলিয়াছেন,-
“মুক্তিপদ শব্দে সাক্ষাৎ ঈশ্বর কহয় ।
মুক্তি পদে যার সেই মুক্তিপদ হয়।
( শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ২৬২৭২)।
ব্রহ্মেরও প্রতিষ্ঠা (গীতা ১৪২৭), পরমাত্মা হইতেও পর (১৫১৮)
পরাৎপর শ্রীকৃষ্ণই মুক্তিপদ । দনুজদলনী দুর্গা তাহারই একাতমা শক্তি।
তিনি তাহারই ইচ্ছায়, তাহারই আজ্ঞায়, নানারূপে প্রকটিত হইয়া
কাৰ্য করেন। মার্কণ্ডেয় চণ্ডীতে স্থানে স্থানে ইহার ইঙ্গিত
?
স্বরূপ ; আছে। এই গ্রন্থেও কবি তাহা ১০৬ পৃষ্ঠার পাদটীকায় প্রকাশ করিয়া- ছেন। ইহাতে অনেক নিগূঢ় তত্ত্ব আছে। একটু বলিতেছি। শ্রী ভগবানের পরাশক্তি প্রধানতঃ তিনরূপে লীলা করেন। শক্তি, তটস্থা শক্তি ও মায়াশক্তি। প্রাকৃত জগতে, অনিত্য লােকে মায়াশক্তি ; অপ্রাকৃত নিত্যধামে বা চিজ্জগতে স্বরূপা শক্তি; এবং এই চিদচিৎ বা প্রাকৃতাপ্রাকৃত উভয় স্থলের মধ্যে তটস্থ শক্তি। ভগবদ্- বিমুখ মায়িক জন সকৈতব সাধনায় ব্রহ্মাণ্ড-প্রসবিনী মায়ারই পূজা অরাধনা করিয়া, অন্তবৎ ফল লাভ করে ; উচ্চাবচ পদে মায়া-রাজ্যেই ভ্রমণ করে। কিন্তু, মায়াতীত ভাগবতগণ সাক্ষাৎ কৃষ্ণ সেবিকা স্বরূপা-শক্তি ও তদধীন সখীদের আরাধনা করিয়া সৰ্বত্ৰ কৃষ সেবাই করেন। ইহা অনেক দূরের কথা। পঞ্চম সর্গে, ২১শ স্তন্তে অজেয় ভারত কবে অবাধ আবাসে পরানন্দময়ী মূর্তি পূজিবে আবার ?” এই বাক্যে কবি ‘পরানন্দময়ী” বলিয়া সেই স্বরূপ শক্তিকেই লক্ষ করিয়াছেন মনে হয়। কৃষ্ণভক্তি, কৃষ্ণপ্রেমই জীবের মূল প্রয়ােজন। তাহারই শর তাহারই চরণে অকৈতব ভাগবতগণের সেই প্রয়ােজন সিদ্ধি হয়। মায় বদ্ধজীব সময়ে সাধু-গুরু-কৃপায় মায়াতীত, কালাতীত হইয়া, সেই মূ প্রয়ােজন-কৃষ্ণপ্রেম,শ্রীকৃষ্ণের নিত্য সেবায় পরমানন্দ লাভ করেন চতুর্থ সর্গে ১৪শ ও ১৫শ স্তম্ভে, কবি স্বল্প কথায় ইহারও আভা দিয়াছেন। দেখ, নাহি হয় যদবধি কালাতীত নর কাল-ভয়-হারী কৃষ্ণ-চরণ-কমল ॥ লইয়া শরণ আহা, দৃঢ় তব কর এই লীলা-চক্রে তারে ঘুরায় কেবল। : কি আছে প্রাণের বস্তু তার অধিকারে ? বিন্দু সত্য সুখ সেই, পারে কি সে দিতে? == আনন্দ সকলে এক গােবিন্দ শরণে!” অন্যত্রও, তৃতীয় সর্গ ১৭শ স্তম্ভে, শিবাজীর বাক্যে যেন ইহারি ইঙ্গিত ফুটিয়া উঠিতেছে। মহারাষ্ট্র কেশরী তাহার সহকারী বীরবৃন্দকে উদববাধিত করিতেছেন ; “জাগ বীরগণ ! চাহ একবার কি দুদ্দিন হের এসেছে হেথায় ; চারিদিকে শুধু অনর্থ মিথ্যার ; অমৃত সত্যের গােপনে কোথায় !” অতি চমৎকার কথা! “সত্যের অমৃত” ! এই সত্যই শ্রীমদ্ভাগ- বতের প্রথম শ্লোকে “সত্যংপরং ধীমহি" -- বাক্যে চিরােজ্জ্বল হইয়া শােভা পাইতেছেন! এই নিরস্তকুহক পরম সত্যকেই এই বাক্যে সৰ্ববিং শ্ৰীশ্ৰীধরমী বন্দনা করিয়াছেন— “ওঁ নমো ভগবতে পরমহংসাস্বাদিত-চরণকমল-চিন্মকরন্দায় ভক্ত- জন-মানস-নিবাসায় শ্রী কৃষ্ণায়।” আ-মরি মরি!—এই কৃষ্ণ-চরণ-কমল-চিন্মকরন্দই কিশাের কবির ভাষায় সত্যামূত! এ অমৃত ভাগবত মধুকরেরই নিজস্ব ধন ; ইহা তাহাদের মধ্যেই অতি যতনে অতি গােপনে থাকে এবং তাহা তদনুগত সৰ্ব্ববাধামুক্ত সজ্জনেই লাভ করিয়া কৃতার্থ হন (শ্রীগীতা
১৪২০)। অপরে ঐ “মিথ্যার অনর্থেই, মায়ার প্রলােভন-বস্তুতেই
মুগ্ধ হইয়া, সুধা বােধ বিষ খাইয়া মরে। উক্ত ১৭শ স্তম্ভের শেষার্ধে,
ও ১৮শ স্তম্ভে, কবি তাহাদের কথাই বলিয়াছেন।
শেষে উভয়ের
পরিণাম প্রদর্শন করিতেছেন,
প্রতিষ্ঠা পুণ্যের-পর-শান্তিধাম।
চির-তাপময় পাপ-পরিণাম।”
পঞ্চম সর্গে, ২৭শ স্তম্ভে, বৈষ্ণব-বর ‘কৃষ্ণজীভাস্কর’ যে বাক্যে
রাজা শিবাজীকে আশীর্বাদ করিতেছেন, তাহাও অতি সুন্দর। ব্রাহ্মণ
বলিতেছেন ;
“হও সিদ্ধ সাধুব্রতে বীর-কুলােম !
প্রজ্জ্বলিত যজ্ঞে এই যে অগ্নি তােমার,
হবে না নির্বাণ বৃথা ; বীরেন্দ্র-শােণিতে
সুপবিত্র হবিঃপাতে পরম মঙ্গল
দিবে সে সুফল সত্য; সবল অসিতে
অচিরে হইবে ধ্বংস অনর্থ সকল।”
এ স্থলে সবল অসি” কাহাকে লক্ষ্য করিয়া উক্ত হইয়াছে ?
নিশ্চয়ই ইহা ভারত-বিজয়ী ইংরাজ অসিকেই লক্ষ্য কবিয়া উক্ত
হইয়াছে। তাহাদের অসিতেই এখন ভারতে ধর্ম নিরাপদ হইয়াছে
অধৰ্ম্মের অনর্থও একদিকে দূর হইয়াছে। অন্ততঃ, আফজ বা
কালাপাহাড়ের মত কেহ হটাৎ আসিয়া খেয়ালের বশে আমাদের
দেবমূৰ্ত্তি দেবমন্দির ধ্বংস করিতে, অথবা কেহ অনধিকারে কোনও
ধৰ্ম্মে হস্তক্ষেপ করিতে, বা কাহারও সাধন পথে বাধা দিতে পারে না।
অতঃপর সাধু-হৃদয় শিবাজী সৰ্ব্বকারণ-কারণ শ্রীভগবানে দৃঢ়বিশ্বাস
লইয়া পঞ্চমে, ২৯শ স্তম্ভে বলিতেছেন ;-
‘নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব এই বিভুর ইচ্ছায় ;
অতি ক্ষুদ্র জীবগণ নিমিত্ত কেবল,
করে কর্ম ভবে নিত্য তঁাহারি মায়ায় ;
পরম কারণ সেই ভুবন মঙ্গল।
কে আমি ? কে তুমি? এক তিনি সর্বময়
তাহারি প্রভাবে ভবে প্ৰভব প্রলয়।”
পরে-
“ভাবে কৰ্ত্তা অন্ধ নর ‘আমি’ই কেবল ;
জানে না অলক্ষ্যে কেবা ঘুরাতেছে কল।”
বেশ কথা। কিন্তু, ইহাতেও গূঢ় তত্ত্ব আছে। শ্রীভগবানই সর্বত্র
মূল কৰ্ত্তা হইলেও, এই প্রপঞ্চে বা প্রাকৃত জগতে তিনি স্বয়ং যে
‘অকৰ্ত্তা’ তাহা ইহা হইতেই সাধারণের বােধগম্য হইবে না। ভূল
হইবে। এই ভুল হইতেই অনেক সময় দুক্ৰিয়াসক্ত ব্যক্তি আপনার
দোষ ভগবানে চাপাইয়া আপনি দোষমুক্ত হইতে চাহে। তাহা
বিষম ভ্রান্তি। তাই, এ-স্থলে এই গূঢ় বাক্যের মৰ্ম্ম একটু খুলিয়া
দেওয়া আবশ্যক।
শ্ৰভগবান্ প্রপঞ্চে কর্তা হইয়াও অকর্তা,
“স্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকৰ্ত্তারমব্যয়ম্।”
(শ্রীগীতা ৪|১০)।
অন্যত্রও তিনি স্বয়ং বলিয়াছেন ;-
“ন কর্তৃত্বং ন কৰ্ম্মাণি লােস্য সৃজতি প্রভু।
ন কৰ্ম্ম-ফল-সংযােগং স্বভাবস্তু প্ৰবৰ্ততে ॥” (১৫১)।
তিনি এই মায়িক জগতে ভগৰবিমুখ বদ্ধ জীবের কাহারও কর্তৃত্ব,
কৰ্ম্ম বা কৰ্ম্মফল কিছুই সংযােগ করেন না। তাহা মায়িক জীবের
• অনাদি অবিদ্যারূপ স্বভাব হইতেই হয়। অর্থাৎ অবিদ্যা মায়া বা ত্রিগুণা প্রকৃতির বশেই ঐ বদ্ধজীব এই জগতে নানারঙ্গে নৃত্য করে, উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ ভােগ করে। ঐ মায়াশক্তিই এখানকার অধী- শ্বরী। তাই কবি বলিয়াছেন,জীব করে কৰ্ম্ম ভবে নিত্য তাহারি মায়ায়।” ইহাই শ্ৰীশ্ৰীচৈতন্যচরিতামৃতে এইরূপে অতি চমৎকার উক্ত হইয়াছে, “কৃষ্ণ ভুলি সেই জীব অনাদি বহির্মুখ । অতএব মায়া তারে দেয় সংসার দুঃখ ॥ কভু স্বর্গে উঠায় কভু নরকে ডুবায়। দণ্ড্য জনে রাজা যেন নদীতে চুবায় ॥ সাধু শাস্ত্র কৃপায় যদি কষ্ণোন্মুখ হয়। সে জীব নিস্তারে, মায়া তাহারে ছাড়য়।” (২২১১৭) এখন, এখানে একটি প্রশ্ন হইতে পারে। কেহ বলিতে পারেন, ‘কৃষ্ণাজী ভাস্কর’ও ত কৃষ্ণোন্মুখ ছিলেন, বৈষ্ণব ছিলেন, তবে তাহার প্রতি এরূপ বাক্য প্রয়ােগে সার্থকতা কোথায় ? এ প্রশ্ন হইতে পারে; কিন্তু, দেখিতে হইবে, কৃষ্ণাজী তখন ' অসৎ সঙ্গে অসাধু ব্যাপারে থাকিয়া এবং সাধু-সঙ্গের সম্পূর্ণ অভাবে পড়িয়া মলিন ও মায়ার অধিকারভুক্তই হইয়া ছিলেন। তাহ না হইলে তিনি, সাধু-শাস্ত্র-বাক্য অবহেলা করিয়া, পাপিষ্ঠের এমন পাপকর্মে সাহায্য করিতে, কদাচ প্রস্তুতও হইতেন না। সুতরাং, এ স্থলে ঐরূপ বাক্যের অযথা প্রয়ােগ হয় নাই। এ বিষয়ে এখানে আর অধিক আলােচনা বাহুল্য। পঞ্চমে, ৩০শ স্তম্ভের ঐ শেষ কথাটি হইতে স্মরণ হয় শ্রীগীতায় শ্রমুখ বাক্য এই কথাটি :-
“প্রতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কৰ্ম্মাণি সর্বশঃ
অহঙ্কার-বিমূঢ়াত্মা কৰ্ত্তাহমিতি মন্যতে ॥” (৩২)।
পঞ্চম সর্গের সর্বশেষে আর একটি বড় অমুল্য কথা আছে।
শিবাজীর মুখে কবি বলিয়াছেন,
ধৰ্ম্ম, সেই ধ্রুব,
জীবের যাহাতে সত্য ইহামুত্র শুভ!”
যে ধৰ্ম্মে জীবের—জগৎ সংসারের “সত্য ইহামুত্র শুভ” হয়, তাহাই
প্রকৃত ধৰ্ম্ম। তাহা কি ? তাহা নিশ্চয়ই সেই ধৰ্ম্ম, যাহা শ্ৰীব্যাসদে
বাক্যে শ্রীমদ্ভাগবতে দ্বিতীয় শ্লোকেই ব্যক্ত হইয়াছে। যথা-
“ধৰ্ম্ম প্রােঙ্খিতকৈতবােহ পরমে
নিম্মৎসরাণাং সতাং
বেদ্যং বাস্তবমত্র বস্তু শিবদং
তাপত্ৰয়ােন্মলন।
শ্রীমদ্ভাগবতে মহামুনিকৃতে
কিং বা পরৈরীশ্বরঃ
সছো হৃদ্যবরুধ্যতেই কৃতিভিঃ
শুক্রযুভিস্তৎক্ষণাৎ ”
ইহাই ভাগবত ধর্ম ; ইহাই জীবমাত্রের স্বধর্ম। ইহা কেমন ?
(১) 'প্ৰােজ্জিতকৈতব-সৰ্ববিধ কপটতা, স্বেন্দ্রিয়পরতা বা
বণিগৃবৃত্তি হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত; এমন কি যাহাতে মােক্ষাভিসন্ধিও নাই।
(২) পরম-সৰ্বোত্তম।
(৩) সাক্ষাৎ ভগবদবাক্যই যাহার মূল সূত্র সেই শ্রীমদ্ভাগবতে
ইহাই বিশ্বহিত সজ্জন সমূহের অবলম্বিত ও নিত্য আচরিত ধৰ্ম্ম বলিয়া
নিরূপিত।
(৪) বাস্তব,-সনাতন; যাহা চিরদিন আছে চিরদিন থাকিবে।
(৫) শিবদ,ইহপর সর্বত্র পরম-মঙ্গলপ্রদ।
(৬) বেদ্য,-একমাত্র জানিবার বিষয়। একমাত্র যাহাতেই
জ্ঞানের সার্থকতা।
(৭) তাপত্ৰয়ােলন,-যাহা আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ।
আধিদৈবিক—এই ত্রিবিধ জীব-দুঃখ ও সেই দুঃখের মূল (কৃষ্ণ-বিমুখত
বা মায়াবশ্যতা) উচ্ছেদ করে।
৮। বস্তু-পরমার্থ তত্ত্ব।
আরও বলিতেছেন—শ্ৰীগ্রন্থে এই পরমধর্মতত্ত্ব শ্রদ্ধা সহকারে শ্রব
করিতে করিতেই, এমন কি তাহার প্রতি লালসাজনিত শ্রবণ-ইচ্ছ
হইতেও, জীব তৎক্ষণ হইতেই সচ্চিদানন্দ-ঘন শ্রীভগবানকে অন্ত
অনুভব করিয়া পরানন্দ লাভ করে। এই ধৰ্ম্মানুশীলনই সকলে
একমাত্র শ্রেয়ঃ সাধক।
ইহাই জীবের সর্বথা, সৰ্ব্বদা ও সৰ্ব্বত্র শুভপ্রদ। এই ধর্মের
আশ্রয়ে শাহা অনুষ্ঠিত না হয় তাহাই অন
অসুখ-পরিণাম।
সপ্তম সর্গে, সপ্তমী পূজার পূর্বানুষ্ঠান বর্ণনায়, কিশাের কবির আ
একটি বাক্যেও মূলতত্ত্বে’ লক্ষ্যের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। যথা-
“তুলসী চন্দনে কেহ পূজি শালগ্রামে।
রাখিতেছে মা’র অগ্রে মূল তত্ত্ব জ্ঞানে।”
এই স্থলে পাদটীকায় এ বিষয়ের সামান্য প্রমাণও প্রদর্শিত হইয়াছে
নিখিল শাস্ত্রে এই পরম সত্যের শত শত প্রমাণ সর্বত্র আছে। (
সকল সবিস্তার আলােচনার ক্ষেত্র ইহা নহে।
।
শিবাজীর মুখের প্রার্থনা বাক্যেও, সপ্তমে ১২শ ও ১৩শ শুভে, কয়েকটি নিগূঢ় বাক্য সেই বেদগুহ মূল-তত্ত্বকে লক্ষ্য করিয়াই উক্ত ইয়াছে বলিয়া মনে হয়। যথা- “ধন্য এ ভবন পুণ্য প্রেমসাধনের। হয়েছে প্রমােদ-পুর পাপ পিশাচের ॥ দে মা, সে পরমবল পরম আশ্রয়, একান্তঅভ এই অসুখ সংসারে ; কঁদে ওই কোটি কোটি কাতর হৃদয় সভয় ভূলিয়া সত্য বিপদ পাথারে। মন্দ কথা নহে। সত্যই এই পরম প্রেম সাধনের ক্ষেত্ৰ-পুণ্যভূমি ভাবুত, আজ “পাপ-পিশাচের প্রমােদ পুর”ই হইয়াছে! কি সাহিত্যে, কি সংসারে,-সর্বত্রই ‘পাপ-পিশাচের’-কাম-কৈতবেরইন্দ্রিয়- তর্পণের অবাধ বিহার-ভূমি হইয়াছে! সেই পরম বল” “পরম আশ্রয় একান্ত অভয়” পদ বিস্মৃত হইয়া, “সত্য ভুলিয়া, কুহকময়ী মিথ্যার মােহে মজিয়া, সকলেই মরিতেছে। বিষম “বিপদ পাথারে পড়িয়া সভয়ে হাহাকার করিতেছে! এই ভয়ের কথা শ্রীমদ্ভাগবতে এইরূপ উক্ত হইয়াছে :- “ভয়ং দ্বিতীয়াভিনিবেশতঃ স্যাদীশাদপেত বিপৰ্যায়ােহস্মৃতি। তষয়াতে বুধ আভজেত্তং ভকৈয়েশং গুরুদেবতাত্মা।”(১১২৩৭} জীব যখনই তাহার জীবন-জীবন, পরম কারণ কৃষ্ণধনকে ভুলিয়া, তাদের বিষয়ে-মায়ার বৈভবে মুগ্ধ এবং তাহাতেই রত হয়, তখনই তাহার ভয়, নানাবিধ অমঙ্গল-আশঙ্কা, উপস্থিত হয় ; কৃষ্ণ-বিমুখ
১y•
হওয়ায়, আত্ম-বিবৃতিও ঘটে। এই জন্যই, সাধু-শাস্ত্র-জ্ঞান-সম্প
পণ্ডিতগণ, সদগুরুর চরণাশ্রয়ে, তঁাহাকেই সাক্ষাৎ ঈশ্বর-জ্ঞান করি
পরমেশ্বর হরির আরাধনা করেন। সেই অভয়চরণে শুষ লই
আর ভয়ের কারণ থাকে না। হরিপাদপদ্মই জীবের একান্ত অভ
স্থল। তাহাই সর্বত্র সফল প্রদ কল্পতরু।
আর বলিবার বিশেষ কিছু নাই। এই প্রসঙ্গে আমরা গ্রন্থখানি
মাত্ৰ মুখ্যাংশেরই সংক্ষেপ পরিচয় দিলাম। অন্য বিষয়ের আলােচনা
উপলব্ধি সহজ। আর দোষদর্শনে দক্ষতা ত অনেকেরই আছে। সুতর
সে সকল বিষয় লইয়া আর অযথা কালক্ষেপ কেন? ইতি—
৩০শে কার্তিক ১৩৩২
শ্রীকৃষ্ণামৃত।
কৃষ্ণপুর (বর্ধমান)।
কলিকাতা।
শুদ্ধিপত্র । পৃষ্ঠা বিলম্বে ৯ বিলম্বে সুখাসনা সুখাসনা প্রকৃতির প্রকৃতির ও ৩ হাম ৭৪ ১৭ ১০৮ বিজয়নী বিন্দু হায় বিজয়িনী বিন্দু ফুলি যেই ১১৫ ১১৬ ফুলি সেই ১৮ ১৭ # টাকা আল্ফালন বৃশ্চিকাকতি বিশ্বকোষ ১৫ ছুটিয়া আস্ফালন বৃশ্চিকাকৃতি বিশ্বকোষ ছুটিয়া ১৪ ০
No text on this page.
সপ্তমীর বলিদান
প্রথম সর্গ
কৃষ্ণ-পক্ষ-নিশা ; সুপ্ত ধরাতল ;
সুনীল নিৰ্ম্মল শারদ গগন ;
রত্ন-পুষ্প কোটি তারকা উজ্জ্বল
শােভিছে সুন্দর নয়ন মােহন ;-
নীলাম্বরে চারু প্রকৃতি সতীর
মণি-মুক্তা-হীরা যেন অগণন।
বহিছে মন্থরে মলয়-সমীর
হাসিছে পরশে কুসুম-কানন।
কঁদে শৈল-সূতা পাষাণ-বন্ধনে,
নাহি পাই’ পথ প্রিয়-সমাগমে।
•
তােষে মধুভাষে আসিয়া পবন ;
ধরি শৈলজারে সরমকুঞ্চিত,
( ১ )
সপ্তমীর বলিদান
তরঙ্গের মালা করিয়া গ্রন্থন
দিয়া কণ্ঠে তার, কহে সুললিত ;-
“সুদূর সাগরে বিষের আকর
বরিতে কি গুণে চাহ গরবিনি ?
মলয়জ বায়ু আমি স্নিগ্ধকর
যােগ্য বর, মাের হও প্রণয়িণী।”
ক্রোধে কাপে ধনী শুনি কথা তার,
ভাঙ্গি অবরােধ চলে পিরবার।
ভেদি নখায়ুধে হৃদয়-কমল :
মৃগ-দম্পতীর, কোথা পশুরাজ
প্রণয়িণী-সহ গিরি-গুহাতল
রত নৈশভােজে করিছে বিরাজ।
কোথা নিশাচর কালচর সম
প্রমে ভুজঙ্গম ভক্ষ্য-আহরণে,
লক্ষ্য তরু-শাখে লােলুপ নয়ন ;
সুপ্ত বিহঙ্গম জাগিছে মরণে।
নিভৃত কাননে সাধকপ্রবর
সাধে মহামন্ত্র, একান্ত-অন্তর।
তুলি নৈশাকাশে বিশাল শরীর
ভেদি গুল্ম-বন শমল-সুন্দর,
( ২ )
প্রথম পাগ
শােভে ‘মুরবাদ * সমুন্নত-শির
মুরহর-করে যেন গিরিবর।
গঠিত পাষাণে, পাষাণে বেষ্ঠিত,
দুর্গ মহাকায় দৃঢ় বক্ষে তার,
নাম ‘রাজগড়; অধে প্রবাহিত,
চুম্বি পাদ, নীরা’-শ্বেত পুষ্পহার।
নিগুঢ় কৌশলে আগম নির্গম ;
পরাহত বলে বৈরী-পরাক্রম।
শৃঙ্গে শৃঙ্গে, শত মহা-সিংহ সম
জাগিছে সতর্ক মহারাষ্ট্র-গণ ;
মেলিয়া বদন বিরাট বিষম,
সজ্জিত চৌদিকে কামান ভীষণ।
হেরি দূর হ’তে দুর্গম সে স্থল,
দেখে পথ নিজ দুৰ্জ্জন শঙ্কিত।
ভয়ে সমীরণ সম্বরি স্ববল
বহে ধীরে যেন, ফিরে যম জিত।
* পুণার দক্ষিণ পশ্চিম নয় ক্রোশ দূরবর্তী ‘তাের দুর্গের
এক ক্রোশ অন্তরে এই ‘মুরাবাদ’ পৰ্বত। ইহারই উপরে
শিবাজীর ইতিহাস-প্রসিদ্ধ ‘
রাজগড় দুর্গ। ইহার পাদদেশ
হইয়া ‘নীরা নদী প্রবাহিত। এই স্কুলে শিবাজী সপরিবার
অধিকাংশ সময় অতিবাহিত করিতেন।
সপ্তমীর বলিদান
তুলি প্রতিধ্বনি কন্দরে কাননে
বীর-সিংহনাদ উঠে ক্ষণে ক্ষণে।
মন্ত্রকক্ষে বসি মহারাষ্ট্র রবি
শিবাজী, সাক্ষাৎ শিব-অবতার ;
বদন গম্ভীর ; যেন রবি-ছবি
নয়ন উজ্জ্বল, সাক্ষ্য প্রতিভার ।
সৌভাগ্য-দর্পণ প্রশস্ত ললাট,
শান্ত সুনির্মল প্রভাত-আকাশ ;
আজানুলম্বিত সুবাহু বিরাট,
বক্ষঃ সুবিশাল, শমন-তরাস।
বদ্ধ যােদ্ধবেশে সুদৃঢ় শরীর ;
শৈল-শৃঙ্গ-সম উপবিষ্ট বীর ।
;
পঁড়ায়ে সম্মুখে, বিনম্র-বদন
গুপ্তচর এক বীর-বেশ বলী,
পাইয়া আদেশ করে নিবেদন
সংবাদ আপন, হয়ে বদ্ধাঞ্জলি।
“বহি শিরে তব অনুতা রাজ,
করিয়া ভ্রমণ বহু স্থান, শেষে
পশি বিজাপুরে, করিনু শ্রবণ
সংবাদ নূতন, থাকি ছদ্মবেশে।
( ৪ )
প্রখম অল
মহারাষ্ট্র-ভীতি ঝটিকা বিষম
তুলেছে হৃদয়ে, শঙ্কিত বেগম। *
“প্রকাশ্য সভায়, সম্বােধি স্বজনে,
বীরাঙ্গনা সেই চতুরা কামিনী,
কহিল সে দিন সগর্বব-বচনে,
তুলি শির, ফণা যেন ভুজঙ্গিনী ;-
‘ছি, ছি, বীরগণ, ভীরু ফেৰু সম
আজও কি নিদ্রিত রহিবে সকলে ?
বনচর হীন দ্য এক জন
দলিৰে সতত চরণের তলে ?
সহিবে কি আজও হেন অপমান
নীরব পিধানে রােধিয়া কৃপাণ ?
‘নিত্য পরাজয় এ ঘৃণা লাঞ্ছনা
লুণ্ঠন পীড়ন যাের অত্যাচার,
‘মহম্মদসার’ মৃত্যুর পর তাহার অপ্রাপ্তবয়স্ক পুত্র ‘আলি
আদিল সা’ বিজাপুর সিংহাসনে অধিরােহণ করেন। ইনি
বালক বলিয়া, ইহার মাতা বেগম সাহেবাই সমস্ত রাজকাৰ্য্য
পৰ্যালােচনা করিতেন। মহারাষ্ট্র শক্তির প্রাবল্যে ইনি অত্যন্ত
শঙ্কিতা এবং ঈর্ষান্বিত হন।
( ৫ )
সপ্তমীর বলিদান
শিরােধার্য করি, আর্জও কি বাসনা
বহিতে জঘন্য এ জীবন-ভার ?
কি দেখ বসিয়া ? নহে দূর আর,
এ’ সুখ-তন্দ্রায় থাকিলে মগন,
ডুবিবে অচিরে অতল-পাথার
এ’ নাম-গৌরব স্বাধীনতা-ধন!
অরণ্যে যেমন ভীম দাবানল,
বাড়ে দিন দিন মহারাষ্ট্রবল।
১০
““কহ কি উপায় ? কি করিবে সবে ?
জানি, বীরশূন্য নহে বিজাপুর ;
কে পশ্চাৎপদ পশিতে আহবে
বীর-নামে ঢালি কালিমা প্রচুর ?
কর প্রতিকার ;-খােল তরবার ;
বন্য পশু তারা কত ধরে বল ?
দেখাও বীরত্ব, সাহস দুর্বার ;
জ্বাল’ মহাতেজে সমর-অনল ।
দেখি, সে অনলে পতঙ্গের মত
হয় দগ্ধ কিনা বন্য পশু যত!'
;
“নীরবল ; ক্ষণে, অনল সমান
এ উৎসাহ-বাণী সজীব ভঁহার,
সুখ সাগ
শুষ্ক তৃণে অগ্নি করিল প্রদান,
দেহে নব-প্রাণ করিল সঞ্চার।
গর্বে ‘আফজল # হয়ে অগ্রসর,.
বিকট-দর্শন, বিশাল শরীর,
কাল-সর্প-সম কুটিল-অন্তর,
করিল উত্তর উচ্চ করি শির।
'অপদার্থ অতি বনের বানরে
হেরি বিভীষিকা কেন এ অন্তরে ?
১২
“হেরি রঞ্জু, অহি অজগর ভ্রমে,
কেন অকারণ হতেছ অধীর ?
ধর ধৈৰ্য মাতঃ ; এ বীৰ্য-বিক্রমে
ধিক্ শত মম, বৃথা এ শরীর,-
বৃথা অস্ত্র শস্ত্র ধরি এই করে,
অচিরে যদ্যপি না হই সক্ষম,
জীবিত বা মৃত সে বন-বৰ্বরে
পাদপদ্মে তব করিতে অর্পণ।
টলিবে হিমাদ্রি মহেন্দ্র অচল,
এ প্রতিজ্ঞা মম রহিবে অটল
পাঠান আফজল খ। বিজাপুরের প্রধান সেনাপতি।
ইহার হৃদয় যেমন ফুর, মূৰ্ত্তিও সেইরূপ ভীষণ ছিল। বিজাপুর
দরবারে ইহার প্রতিপত্তির পরিসীমা ছিল না।
( ৭ );
সপ্তমীৰ বলিদান
“যায় ভূমণ্ডল যদি রসাতলে,
খসে শশী সূৰ্য্য গ্রহ-তারা-গণ ;
প্রেরিতে মুহুর্তে কালের কবলে
চাহে যদি মােরে সমগ্র ভুবন
তথাপি এ পণ, জীবন থাকিতে
মারি এ অরি কৌশলে বা বলে,
না ডুবায়ে অসি শিবাজি-শােণিতে,
ফিরিব না তার এই সভাতলে।
কর অনুমতি বি; লম্বে কি ফল ?
দেখি মহারাষ্ট্রভুজে কত বল !”
“সাবাস্ সাহসী !—সংবাদ উত্তম!”
দিয়া বাধা ভূপ, আরক্ত আননে
কহিল গম্ভীরে, করিয়া স্থাপন
নয়ন উজ্জ্বল দূতের বদনে ;-
“বহু পূর্বে তব এই সমাচার
অঙ্গে মাহাটার শােণিত-প্রবাহ
করিয়াছে উষ্ণ, ক্রোধানলে আর
তুলেছে হৃদয়ে দারুণ প্রদাহ।
জানি, সে আফজল সেনাপতি-পদে
হইয়া বরিত, মত্ত বণমদে,
( ৮ )
প্রথম সগ
“আসিছে ইচ্ছায় শমন-ভবন।
কহ অতঃপর জান কিবা আর,
কি ভাবে সে পথে করে আগমন,
ল’য়ে কিবা বল, কি রণ সম্ভার।”
বিরত বীরেশ। পুনঃ দূতবর
লাগিল কহিতে ;-“হে নৃপ-সত্তম,
কি বলিব আর ? ব্যথিত অন্তর,
কহিতে সে সব না সরে বচন ।
আগমন-পথে তুলি হাহাকার
ঝক্ষাবাত-সম আসে দুরাচার।
;
“যে দৃশ্য নিম্মম, নিরয়াভিনয়,
লীলা পৈশাচিক, এ নয়নে প্রভু,
দেখেছি, স্মরণে বিদরে হৃদয়,
এ জীবনে আর দেখি নাই কভু।
নিষ্ঠুরতা হেন মানবে সম্ভবে !
মানব-হৃদয় এত বজ্রময়
ভাবি নাই কভু আছে এই ভবে ;
ভাবিতে এখনও হৃৎকম্প হয় !
কে বলে কঠোর কঠিন পাষাণ ?
ততােধিক অহহ, এ যে নর-প্রাণ।
( 9 ) :
সমীৱ বলিদান
১৭
“কি রক্ত-প্লাবন, করুণ ক্রন্দন,
মরণ-বেদন, পাশব-নিনাদ,
কিবা ব্যাকুলতা, সজল নয়ন,
হত-আহতের ঘাের আর্তনাদ !
দেখেছে, শুনেছে ক্ষণেক যে জন,
দগ্ধ শলাকায় হৃদয়ে তাহার,
দহি মৰ্ম্মস্থান, সে চিত্র নির্মম
হয়েছে অঙ্কিত, নহে মুছিবার।
জীবন্ত নরক, অধৰ্ম্ম-নিশান,
দুষ্ট ‘আফজ’ পাপ মূর্তিমান্ ।
১৮
“অসংখ্য নিষাদী, সাদী, পদাতিক,
বজ্রনাদী বহু বন্দুক-কামান,
লয়ে সাথে দুষ্ট, আঁধারিয়া দিক
ধূলি-জালে, আসে ল’য়ে অভিযান। গ
“আফজল খ। সেনাপতি পদে প্রতিষ্ঠিত হইয়া, ৫০০০
অশ্বারােহী, ৭০০০ পদাতিক এবং বহুসংখ্যক ধনুর্ধারী, উষ্ট্র ও
হস্তী আরােহী সৈন্য এবং কামান সমভিব্যাহারে বিজাপুর হইতে
শিবাজী বিজয়ের জন্য বহির্গত হন।” ১৫৮১ শক।
শাস্ত্রী-শিবাজী।
( ১ )
১৬৫৯ খৃঃ
গগাহত্যা, নৃহত্যা, নারী-নিৰ্যাতন,
লুণ্ঠন, পীড়ন, ঘাের অত্যাচার,
প্রতি পদক্ষেপে সেই নরাধম
সাধিছে অবাধে, নাহি সংখ্যা তার।
খণ্ডিত প্রতিমা, চুর্ণ দেবালয়,
অপবিত্র কত তীর্থ পুণ্যময় !
“করি বজ্ৰাধিক হৃদয় কঠিন,
স্তব্ধ স্তম্ভ সম থাকি গুপ্ত স্থলে,
তুলজা-নগরে * যে দৃশ্য সে দিন
হেরেছি, কহিতে ক্রোধে অঙ্গ জ্বলে ।
একাকী, তথাপি এই খড়গ করে
প্রতি পলে মােরে দিল প্রলােভন,
পশু একটিও মায়ের পরে
দিয়া বলিদান, সপিতে জীবন ।
দমি প্রলােভন সেই ক্লেশে অতি,
দেখেছি স্বচক্ষে মায়ের দুর্গতি।
“অন্ধ অহঙ্কারে পাপিষ্ট যবন
করি মুক্ত পথ নিশিত কৃপাণে,
তুলজাপুর দাক্ষিণাত্যের একটি প্রধান তীর্থ, এ স্থানের
ভবানীর মন্দির বিশেষ বিখ্যাত, ইহা দর্শন করিতে শত শত
( ১১. )
সপ্তমীর বলিদান বিনাশি অসংখ্য পবিত্র জীবন, করি শোেত হিন্দুর পরাণে ;- সমন্দির মা’র মূর্তি মনােহর করিয়াছে চূর্ণ কলুষিত করে । কি বলিব আর, হায়, নৃপবর, পরিণত পুরী শ্মশান-প্রান্তরে ! নৃমুণ্ড, কঙ্কাল, অস্ক, অঙ্গার, করেছে আবৃত পুণ্যভূমি তার ! ২১ “পশি তার পর পশুর-নগরে তীর্থ অনুপম, ধূৰ্ত্ত আজ, হিন্দু-দেবালয় ভাঙ্গি অকাতরে, করেছে সমান শ্রীহীন সে স্থল ! বিনা দোষে হায়, অস্ত্রে যবনের বাল-বৃদ্ধ-যুবা কত নর নারী করিয়াছে সাঙ্গ লীলা জীবনের, ক্ষম’ প্রভাে, আর কহিতে না পারি । ‘ভীমা অতিক্রমি, ওয়াই নগর’ ন করিছে বিশ্রাম এবে সে পামর।” লােক প্রত্যহ আগমন করেন। ভগবতী ভবানী শিবাজীর কুল- দেবতা। শাস্ত্রী-শিবাজী। + ‘কৃষ্ণা’ ও ‘ভীমা নদীর তটবর্তী এই স্থান স্বভাব
প্রথম সগ
২২
কাপে থর থর
ক্রোধে কলেবর,
শুনি সমাচার,
করিয়া হুঙ্কার,
কহে বীরবর—
“সিংহের বিবর
আসে ফেরুপাল, পূর্ণ আয়ুষ্কাল,
কি ক্ষতি তাহাতে ?—যাও বীরবর!
“করগে বিশ্রাম।
মা’র অপমান
সহিবে না সুত,
সতত প্রস্তুত
প্রতিকারে তার ;
হবে ছারখার
আততায়ি দল,
পাবে প্রতিফল,
পড়ি অগ্নিমুখে পতঙ্গ সমান !
‘ক্ষুদ্র আজ
কত ধরে বল ?
সৌন্দর্যে অতি পবিত্র ও মনােমুগ্ধকর। পূৰ্বে আফজল এই
স্থলের প্রধান কর্মচারী ছিলেন বলিয়া, এই স্থল তাহার বিশেষ
পরিচিত ও প্রিয় ছিল। শিবাজীর বিখ্যাত গিরিদুর্গ ‘প্রতাপগড়’
হইতে ইহা অধিক দূরবর্তী নহে।
( ১ )
সপ্তমীর বলিদান
সমরে শমন
মহারাষ্ট্র-গণ
মা'র নামে জয়
ঘােষিয়া নির্ভয়,
অধৰ্ম সংহার
ধৰ্ম্মের নিস্তারে
উপাড়ি ব্রহ্মাণ্ড দিবে রসাতল !”
ত্যজিল সত্বর
কক্ষ শূরবর,
বদন গম্ভীর,
দেহে স্বেদ-নীর,
লােহিত লােচন
নিদাঘ-তপন,
দৃঢ় মুষ্টি করে
প্রতিজ্ঞা অন্তরে,
সৃষ্টিনাশে যেন সজ্জিত শঙ্কর ;
গাহি দূতবর
“জয় শিবাজীর
মহারাষ্ট্র-বীর!”
হইল অন্তর।
“জয়,শিবাজীর
মহারাষ্ট্র-বীর!”
ভূধর কন্দরে
তুলি প্রতিধ্বনি, ঘােষিল সমীর।
বিশ্ব চরাচরে
( ১৪০ )
দ্বিতীয় সর্গ
শারদ-প্রভাত। কিবা শান্তির প্রতিমা
ভক্তিময়ী প্রেমময়ী !-- সাক্ষাৎ সাধনা;
মূর্তিমতী কিম্বা, আহা, ত্রিদশ-মহিমা!
উজ্জ্বল-লােহিত-প্রান্ত বিশদ-বসনা,
ধ্যানমগ্না, সুখাসনা পবিত্র আসনে,
রাজমাতা জীজাবাই ; প্রশান্ত বদন ;
মুদ্রিত নয়ন-পদ্ম। পূজা-সমাপনে,
অভীষ্ট-চরণে করি আত্ম-নিবেদন
পুত্রের কল্যাণে, মাতা জপিছে তন্ময়
হরিনাম-মহামন্ত্র মঙ্গল-আলয়।
কাঁপিছে মধুরে রক্ত-অধর-পল্লব,
লােলিত লােহিত যেন নব কিশলয়
মলয়-হিল্লোলে মৃদু ! ত্রিদিব-বিভব
আবরি কপােল-অৰ্দ্ধ, মুক্ত কেশচয়।
সীমন্তে সিন্দুর,-সন্ধ্যা-তারকা উজ্জ্বল।
পতিত দক্ষিণে বামে পূজা-আয়ােজন;
( ১৫)
সপ্তমীর বলিদান
স্বর্ণ-পাত্রে গঙ্গোদক করে ঢল ঢল্ ;
সুরভিত গৃহ স্নিগ্ধ সৌরভে মােহন।
উৎসর্গিত পত্র-পুষ্প চন্দনচর্চিত
শােভিছে কাঞ্চন-পাত্রে সম্মুখে স্থাপিত।
মুক্ত দ্বারে যুক্তকর অদূরে তঁাহার
প্রাণপুত্র প্রিয়তম, নীরব, নিশ্চল,
নিরখিছে অনিমেষে আনন মাতার,
‘প্রভাত-তপন যথা চাহি সিন্ধুজল।
চাহিয়া চাহিয়া, মরি, মেই মুখপানে,
কি শক্তি সাহস আশা উৎসাহ অতল
উথলিছে কুমারের কায়-মনঃপ্রাণে।
খেলিছে হৃদয়ে কিবা আনন্দ বিমল ।
হেন সাধ্বী সিদ্ধি-রূপা জননী যাহার
করগত ত্রিভুবন,—কি অভাব তার ?
৪
সজল-নয়ন পুত্র ভকতি-বিহ্বল
ভাবিছে পুলকে—“ধন্য জীবন-জনম,
সপি প্রাণ মন ওই শ্রীপদ-কমল--
সর্বার্থ আমার ভবে, আরাধ্য পরম !
করি ধ্যান হৃৎপদ্মে পাদপদ্ম ওই,
মাখি পদরজঃ আর সর্বাঙ্গে যখন
(১৬ )
দ্বিতীয় পর্গ
জীবন-সঙ্কটে শত অগ্রসর হই,
দিই বক্ষঃ বজ্র-মুখে আসন্ন-পতন,
দেয় দেহে বিশ্ব-বল যেন কেহ তবে,
মৃত্যুও স্বধৰ্ম্ম ত্যজে সম্মুখ-আহবে।
“মরি মরি, মা আমার,—বিজয়দায়িনী
ভবানী সাক্ষাৎ যেন!--সদা দুই করে
বিতরে অভয়-বর, মৃতসঞ্জীবনী
বরষে অমিয়-বাণী অমল অধরে।
ওই মূর্তি একবার দেখিয়া নয়নে,
ও-মুখের আশীর্বাদ-কবচ অক্ষয়
করিয়া ধারণ সুখে, অম্লানবদনে
জিনে রণে শমনেও মহারাষ্ট্র-চয়।
ওই মুখে, ওই চেখে, চরণ-যুগলে
জানি না কি আছে শক্তি অতুল ভূতলে।
‘দেখেছি প্রত্যক্ষ অহে, কত শত বার ।
সাক্ষাৎ শমন-রূপী শত্রু-অস্ত্র যবে,
সম্মুখে দক্ষিণে বামে, সর্বত্র আমার,
হয়েছে উদ্যত দ্রুত ; ভীষণ আহবে
হয়েছে বিপন্ন প্রাণ-মূহূৰ্ত্ত ভিতরে
হবে সাঙ্গ জীব-লীলা, ফুরাবে সকল ;
( ১৭ )
সপ্তমীর বলিদান
ফুটিয়াছে ওই মূর্তি অমনি অন্তরে,
আসিয়াছে শ্লথ ভুজে বজ্ৰাধিক বল ;
একাকী করেছি ব্যর্থ অস্ত্র শতশত
জিনি রণ হাসিমুখে ফিরেছি অক্ষত!
‘হ অভাগ্য আফজল ! কত বল তব ?
বসে যদি ভুঙ্গে তব আপনি শঙ্কর
ধরিয়া প্রলয়-শূল ; কিম্বা, শ্রীমাধব
ধরি চক্র-সুদর্শন রক্ষে নিরন্তর
তথাপি-তথাপি বীর, জানিও নিশ্চয়,
পরশি বারেক ওই জননী-চরণ,
লয়ে আশীর্বাদ ার-কবচ অক্ষয়,
পশির নির্ভয় প্রাণে সংগ্রামে যখন,
-ভঙ্গে ভুবন-ত্রয় দিবে ভঙ্গ রণে
কি দেব দানব নর হবে জিত ক্ষণে।
“তিষ্ঠ ক্ষণ রে পপিষ্ঠ, আশার স্বপনে ;
পূর্ণ আয়ুষ্কাল তব, নাহিক সংশয়!”
থামিল চিন্তার স্রোত। চাহি’ কতক্ষণে,
হেরিলা সমীপে মাতা, জীবন-তনয় ।
ধীর-পদে অগ্রসর হইয়ে কুমার,
বন্দিলা জননী-পদ চুম্বিয়া ভূতল।
( ১৮ )
দ্বিতীয় সর্গ
করি আশীর্বাদ, শিরঃ পরশি তাহার,
ভাষিলা সস্নেহে মাতা-কি কণ্ঠ কোমল !
“কি রে শিববা, চা’ কিবা ? প্রভাতে এমন
রণ-সজ্জা আজি পুনঃ হেরি কি কারণ ?”
=
“নহে রণ-সজ্জা; শক্তি-পূজা-আয়ােজন।”
কহিল কুমার—“মাগাে, ভারত-ভবনে
আসিছে ভবানী, ত্যজি কৈলাস-কানন ;
শারদ-উৎসবে হের মত্ত জনে-জনে।
তাই মা, তনয় তব, এ আনন্দ-দিনে,
পূজিতে আনন্দময়ী-চরণ রাতুল
করিয়া সঙ্কল্প, তব শ্রীপদ-নলিনে
যাচে অনুমতি এবে। বিধি অনুকূল,
আসিয়াছে ইচ্ছা-বলি হইবার তরে
মহাপশু এক মাগাে, দেবীর খপরে।”
১৮
“পবিত্র সংকল্প বাপ!—সাধু তব মতি !
চঁাদ-মুখে হাে’ বৃষ্টি কুসুম-চন্দন ;
লভিনু কি সুখ শুনি এ শুভ ভারতী ?
হও সিদ্ধকাম, কর সঙ্কল্প সাধন।”
বুঝিয়া দ্বিভাব বাক্য পুত্রের বদনে,
উত্তরিলা বীরতা, আনন্দে:অপার ;
( ১৯ )
সপ্তমীৱ বলিদান
“অনুমতি কিবা আর ? কৰ্তব্য-পালনে
সেবিতে শ্রীপদ মা’র যাইবে কুমার,
কে রােধে গমন তার ? অতি শুভক্ষণ,
যােড়শাঙ্গে পূজ’ মাতা ভবনী-চরণ ?
•
“কে সে মহাপশু কিন্তু, কহ প্রাণাধিক ;
কাহার শােণিতে আজি পিপাসা মাতার ?”
“ধূৰ্ত্ত আল্ সেই !–ধিক, শত ধিক্ !
রােধে কণ্ঠ কহিতে মা, কাহিনী তাহার।”
কহিলা বীরেন্দ্র ক্রোধে-“হইয়া বরিত
সেনাপতি-পদে দুষ্ট, বিজাপুর হতে,
বিপুল রণ-সম্ভার সৈন্যাদি সহিত
আসিছে ত্বরিত! হায়, কি অনর্থ পথে
ঘটা’য়েছে দুরাচার ! হইয়া পাষাণ
সুন্দর নগর কত করেছে শ্মশান!
“ “ততােধিক,-ফাটে বক্ষঃ কহিতে জননি,
সসৈন্যে পশিয়া পাপী তুলজা নগরে
করেছে মা, সর্বনাশ; ভুজঙ্গের মণি
করেছে সাহসে চূর্ণ অহঙ্কার-ভরে !
কুল-দেবী ভবানীর মূৰ্ত্তি মনােহর,
মন্দির সুন্দর—সেই তীর্থ পুণ্যধাম, ।
( ২০ )
দ্বিতীয় সর্গ
করেছে সমূলে ধ্বংস বিধৰ্ম্মী পামর !
অতিক্রমি ভীমা’, এবে করিছে বিশ্রাম।
আসে দুষ্ট অতি দর্পে বদ্ধ হয়ে পণে
আনি শির শিবাজীর তুষিতে বেগমে।”
“হায়, মা ভবানি!”—দুঃখে মুছি অশ্রুজল,
থাকিয়া নীরব ক্ষণ, নারী-শিরােমণি,
কহিলা বিষাদে—“আরে দর্পী আফজ,
ঢালিতে গরল শুধু, যথা কাল-ফণী,
তাের কি জনম ? ওরে শােণিত-পিপাসু,
চিরশত্রু,-তােরি অস্ত্রে সম্ভাজী * আমার
ত্যজি স্নেহ-অঙ্ক হায়, অকালে গতাসু !
(হা পুত্র ! প্রণাধিক, জীবন কুমার !)
তােরি সে কুচক্রে আর, প্রভু ধৰ্ম্ম-প্রাণ
আছে মনঃক্লেশে সহি ঘাের অপমান !
সম্ভাজী, পিতা শাহাজী সহ, বিজাপুররাজের অধীনে
কাৰ্য্য করিতেন। ইনি কণকগিরি নামক দুর্গ জয়ের জন্য প্রেরিত
হন এবং তথায় কুচকিগণের ষড়যন্ত্রে নিহত হন। তাহাদের
মধ্যে আফজল খাই প্রধান ছিল।
+ ‘কল্যাণ’ পরাজয়ের পর, বিজাপুর-রাজ, শিবাজীর প্রবল
প্রতাপে অত্যন্ত ভীত ও বিস্মিত হন। এবং শাহাজীর ইঙ্গিতানু ,
সারে শিবাজী এই দুঃসাহসিক কাৰ্যে রত হইয়াছে বিবেচনা
( ২১ )
সপ্তমীর বলিদান
১৪
“কি শুনি আবার! আরে পিশাচ পামর,
কুল-কীৰ্তি করি লােপ, দেব-প্রতিমার
করিলি দুর্গতি হেন! হা মােহান্ধ নর,
নশ্বর শরীরে হেন এত অহঙ্কার ?
কিন্তু, বৃথা তিরস্কার। ওমা হর-রাণি,
তােমারি ইচ্ছায় জানি ঘটে মা সকল ;
অতি উচ্চে তােল অগ্রে তুমিই ভবানি,
অধৰ্ম্মে, চূর্ণিতে বেগে ফেলি ধরাতল !
বিফল সে গত-অনুশােচনা এখন ;
সঙ্কল্প সাধনে পুত্র, হও প্রাণ-পণ।
“খুব সাবধান কিন্তু ; হয় ক্ষুদ্র যদি,
তথাপি শত্রুরে তুচ্ছ না করিও জ্ঞান।
মহাপশু আল্ কুট-বুদ্ধি অতি ;
সাবধানে দেবস্থানে দিও বলিদান।
করিয়া, তিনি শাহাজীর উপর যারপর নাই ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত হ
তাহার ফলে, ১৫৭১ শকে (১৬৪৯ খৃঃ), শাহাজী কারারুদ্ধ হই
যবনগণের হন্তে অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করেন। আফ,
খাই এই পাপানুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোগী ছিলেন। শিবা
বুদ্ধিবলে শাহাজী শীঘ্রই কারামুক্ত হন।
( ২২ )
দ্বিতীয় সপ
ধর অর্ঘ্য ভবানীর, শুভ-আশীর্বাদ ;
জয়-দাত্রী দুঃখ-হরা জপি দুর্গানাম,
কর যাত্রা শুভক্ষণে। তােক পূর্ণ সাধ,
অধৰ্ম্মে বিনাশি তােল’ ধৰ্ম্মের নিশান।
নাহি ভয় বিন্দু শিব বা, জানিও নিশ্চয়
বিজয় ধৰ্ম্মের সদা অধৰ্ম্মের ক্ষয় !”
“ভয় ?--ভয়’ বলি কোন বস্তু এ জগতে
মাতা, দেখিনে তাে কোথা কভু ! আশৈশব
হয়ে ব্ৰতী কায়মনে মাতৃ-সেবা-ব্রতে,
ধবিয়া মস্তকে পূত পদরজঃ তব,
রণে বনে ভয়ঙ্কর শমন-সদন
পশেছি মা, অনায়াসে প্রফুল্ল-হৃদয় ;
রক্ষিবারে গাে-ব্রাহ্মণ ধৰ্ম্ম বর্ণাশ্রম,
ঢালি রক্ত, জিনিয়াছি সমর দুর্জয় ;
কেশা গ্রও কোন দিন হয়নি কম্পিত,
কটাক্ষে বিপক্ষকুল হয়েছে স্তম্ভীত।
‘দিল্লীপতি মহাবল মােগল সম্রাট
সসাগরা ভারতের এক অধীশ্বর,
সাগর-তরঙ্গ সম বিশাল বিরাট
বিপুল বাহিনী যার, সমর-তৎপর,
( ২৩ )
সপ্তমীর বলিদান
শঙ্কিত সতত সেও দিল্লী-সিংহাসনে ।
মহারাষ্ট্রশক্তি-স্রোতে হয়ে প্রতিহত,
হের চারিদিকে মাতঃ, উম্মুখ পতনে
বিজাপুর আদি আর ক্ষুদ্র শক্তি যত,
টলিছে ক্ষয়িত-মূল পাদপের প্রায়।
‘জয় মহারাষ্ট্র!-ধ্বনি যথায় তথায়।
১৮
“জয়সিংহ রাজা রাজপুত কুলাঙ্গার
মােগল বাশার শক্তি-সহায় প্রধান,
ছলে বা কৌশলে সদা প্রয়াস যাহার
বিলুপ্ত করিতে বিশ্বে শিবাজীর নাম,
যুদ্ধ অভিযান তার ব্যর্থ বারবার !
ভীরু ফেরু সম মহাসিংহের সম্মুখে,
বিফল-প্রয়াস সেও হতাশ এবার
‘অজেয় শিবাজী! বলি বড় মনােদুঃখে
সন্ধির প্রস্তাবে বাধ্য করেছে সম্রাটে
কে শক্ত ভারতে আজি তব পুত্রে আঁটে?
=
“দাও পদ-ধূলি মাতঃ, আশীর্বাদ শিরে—
ভবানীর পাদ-পদ্ম-পূত বিশ্বদল,
বুলাইয়ে পদ্ম-হস্ত দাও মা, শরীরে,
সঞ্চারিত করি অঙ্গে শত বজ-বল।
( ২৪ )
দ্বিতীয় সর্গ
তুচ্ছ নর, মহাপথে-মহাব্রতে মম
হয় মা, বিরােধী যদি বিশ্ব-ভূমণ্ডল ;
কি কথা অন্যের ?-কিম্বা, ধরি প্রহরণ
আপনি ভবানী যদি আসে রণ-স্থল,
রক্ষিতে রাক্ষসে যথা রাঘবেন্দ্র-রণে,
পুত্রের সমরে হবে পরাজিত ক্ষণে।”
২০
কহি এত, লুঠি পুনঃ চরণে মাতার,
লইলা মস্তকে বীর মাতৃ-পদ-ধূলি ।
দিল শিরে রক্ষা-পুষ্প বাঁধিরা তাহার
জননী, যুগল-করে পুত্রবরে তুলি।
কি দৃশ্য—কি মহাভাব ! হে ভাবুকবর,
কল্পনা-নয়ন মেলি দেখ একবার!
নলিন-নয়নে অশ্রু লইয়া সুন্দর
বীরাঙ্গনা স্থিরমূৰ্ত্তি কে রমণী আর,
হের পুনঃ অনিমেষে বীরের বদন
চাহি, অন্তরালে ওই পঁাড়া’য়ে এখন ।
চিত্র, কি সজীব মূর্তি, পার কি বলিতে ?
জান কি রে কেবা ওই রমণী-রতন ?
উদিয়া কি ভাব-ঘন সুকোমল চিতে
করিয়াছে আজি তার সজল নয়ন ?
( ২৫
সপ্তমীর বলিদান
মরি, মরি, কিবা রূপ! কি মােহন ঠাম !
সুন্দর সীমন্তে কিবা সিন্দুর উজ্জ্বল।
উপেক্ষিয়া অশ্রু আহা, কিবা অভিরাম
ভাসিছে ঈষৎ হাসি অধরে বিমল ।
নীলাভ অঞ্চল খানি লুঠিছে ভূতলে ;
স্বর্ণ-সরােজিনী যেন নীল-সিন্ধু-জলে।
২২
কে মা তুমি সীমন্তিনি! ভুবন-মােহিনী,
বন্ধন-রূপিনী মায়া, মহা-মােহ-পাশে
করি বদ্ধ বীর-হিয়া, লইবারে জিনি,
এসেছ গােপনে কি মা, বীরসিংহ-বাসে ?
করি ছিন্ন মমতার কঠিন বন্ধন
তুচ্ছ বীরেন্দ্রের কাছে—সংকল্প-সাধনে
চলিয়াছে বীরবর প্রাণ করি পণ;
চাহ কি বারিতে তারে অয়ি বরাননে ?
থাকে যদি তাই মনে বিফল প্রয়াস ;
ব্যর্থ হেথা চিরদিন তব মােহপাশ।
বীর-পত্নী সইবই, বীর-সধৰ্ম্মিণী,
মহাব্রতে শিবাজীর সহায় পরম,
পতি-যােগ্য। সতী সেই, বজে সৌদামিনী,
আসে নাই সজিবারে মােহের স্বপন।
( ২৬ )
দ্বিতীয় পর্গ
শক্তি-স্বরূপিনী নারী, পতির হৃদয়ে
ঢালি স্বীয় শক্তি দিয়া পূর্ণ হয়,
বন্দিয়া চরণ-পদ্ম, এ শুভ সময়ে
এসেছে প্রসন্ন-মনে দিতে যে বিদায়।
লতি অবসর ক্ষণে, সতী ভক্তিমতী
প্রণমিল। মাতা-পুত্রে আসি মন্দগতি।
২৪
“চিরায়তী ভব?”—মাতা আশিষি আদরে ;
পরশিলা শির তার। অবিচল চিতে
অপাঙ্গে বরাঙ্গ সেই হেরি ক্ষণতরে,
ভাষিলা গম্ভীরে শিব-“অয়ি সুচরিতে,
হও সিদ্ধকাম সদা থাকি সত্য-পথে ;
সঁপিয়া সর্বস্ব তব ধন-জন-প্রাণ
সুখ-দুঃখ, এই মহা মাতৃ-সেবা-ব্রতে,
কর দিন অবসান, লভ’ শান্তিধাম।”
কি মহা মুহূর্ত! মূর্তি কিবা দৃঢ়তার
নিরখিয়া পরস্পর বদন সবার !
,
নীরব ভবন। ক্ষণে হলো ভাবান্তর ;
অপূর্ব ঘটন! চিত্র যেন রে সচল,
বীর-বেশ শিশু এক অতীব সুন্দর
সহসা পশিল বেগে আসি কক্ষতল।
( ২৭
সপ্তমীর বলিদান
“দেখ মা,-দেখ মা, আমি করেছি শিকার।”
দারুময় মৃগ এক বামকক্ষে ধরি,
অন্য করে দারুময় চারু করবাল,
ধরিল মায়েরে শিশু উচ্চনাদ করি।
হাসিল জননী-পুত্র দেখিয়া কৌতুক ;
শিশু কোলে, লাজে বধূ লুকাইল মুখ ।
“একি রঙ্গ সইবাই ?”—সুস্মিত অধরে
কহিল জননী চাহি পুত্রবধূ পানে,
“সজীও * তাের আজি যাবে কি সমরে ?”
‘কর আশীর্বাদ মাতা, বাঁচে যদি প্রাণে,
তব পৌত্র রণে যেতে হবে না কাতর।”
কহিলা মধুরে মৃদু বীর-প্রণয়িনী।
ত্যজিয়া মাতায় শিশু ধরি-পিতৃ-কর
কহিল--“আসিলে বাবা, সমর কি জিনি ?
দুরন্ত বড়ই না কি হয়েছে যবন ?
মরেছে সমরে বাবা, তারা তাে এখন ?”
“না বৎস!—জীবন্ত আজো দুরন্ত যবন ;
সেজেছি বিহিত তারি প্রতিকার তরে।”
এই সময় এই শিশুর বয়স প্রায় ৪ বৎসর।
( ২৮ )
দ্বিতীয় সপ
কহিলা শূরেশ চুম্বি শিশুর বদন,
“তুমিও কি মাের সাথে যাইবে সমরে ?”
“হাঁ বাবা, আমিও যাব !” -অনন্দে কুমার
ত্যজি
ভূমে দারু-মৃগ, হাসা’য়ে সকলে,
পিধানে করিয়া রক্ষা কৃপাণ তাহার,
ফিরিয়া কহিল মা’য়ে—“যাব মা, সমরে!
“যাবে বৎস, একদিন।”—সজল-নয়নে
কহি, পিতামহী পৌত্রে বােধিল:যতনে।
“আর এক কথা বৎস ;”-উম্মুখ গমনে
চাহিয়া নন্দনে, তবে ভাষিলা আবার,
কুঞ্চিত-ললাটে, মাতা, চিন্তাকুল মনে ;
“কুচক্রী যবন অতি, সমরে দুর্বার ;
চাহি সুধাইতে তাই, কহ, কোন্ স্থান
ভাবিয়াছ উপযুক্ত আক্ৰমিতে অরি?”
“কেন মা, ‘প্রতাপগড়।”-পুত্র মতিমা
উত্তরিলা। বীর-বক্ষ কি উৎসাহে, মরি,
* শত্রুকে যুদ্ধ দান করিবাব পক্ষে, শিবাজী ইহাকেই সৰ্ব।
পেক্ষা উপযুক্ত স্থান বিবেচনা করেন। ইহা পার্বত্য প্রদেশে
অবস্থিত হওয়াতে, এখানে অল্প সংখ্যক সৈন্য লইয়া শত্রুপক্ষের
বিপুল বাহিনীকে অনায়াসে পরাজয় করিতে পারা যায়।
অধিকন্তু, অধিক সংখ্যক সৈন্যাদি লইয়া এ প্রদেশে যাতায়াত
সপ্তমীর বলিদান
পূর্ণ আজি ! সদুত্তর লভি, পুনর্বার
কহিলা জননী—“তবে, বিলম্ব কি আর ?
“কর যাত্রা শুভক্ষণে; স্বামী’র চরণে
লইয়া প্রসাদ রজঃ গমনের পথে,
হইও রত বিধি-মতে সংঙ্কল্প সাধনে,
যথাযােগ্য আয়ােজনে দৃঢ় মহাব্রতে।
দিয়া সাধু-উপদেশ দুষ্টের দমনে,
উৎসাহ-বচনে সবে দিয়া নব বল,
উপযুক্ত স্থানে রক্ষা কর বীরগণে;
সুরক্ষিত, দৃঢ় যেন থাকে সর্বস্থল।
রে শিববা, অধিক তােরে কি বলিব আর ?
যােগ্য করে জানি ন্যস্ত গুৰু কাৰ্য ভার ।
Co
।
বহি শিরে মাতৃআজ্ঞা, এবে পুত্রবর
হইল অন্তর , ফিরে চাহিল না আর।
কি বজ্রে অজেয় গড়া বীরের অন্তর ।
কি ব্রত কঠোর, মহা-সাধনা তাহার ।
হেন নারী সুকুমারী, কুমার-কমল,
স্নেহসিন্ধু সুশীতল এ হেন মাতার,
করা ও রসদাদি সংগ্রহ করা শত্রুগণের পক্ষে নিতান্ত কঠিন।
প্রদেশ অরণ্যময় ও অত্যন্ত পৰ্বত-সমাকীর্ণ।”
( ৩০)
দ্বিতীয় সগ অসীম সম্পদ-পদ, ধন-জন-বল, ত্যজি, বীর দিল ঝম্প অকূল পাথার। রক্ষিবারে স্বদেশের গৌরব-রতন, সঁপিল জীবন কিবা সাধনে ভীষণ। বীরপত্নী, বীরপ্রসূ, এদিকে আবার, দেখ চাহি, অবিচল হৃদয়ে তেমন, কৰ্ত্তব্য-পাষাণে রােধি মমতার দ্বার, পাঠাইল মৃত্যুমুখে পতি-পুত্র-ধন। হা বিধাতঃ, হেন দৃশ্য এ ভারত-ভূমে পাব কি দেখিতে আর ? এই দীন হীন বিলাসী ভারতবাসী, মগ্ন ঘাের ঘুমে, জাগিবে কি কভু আর ? যাবে কি এ দিন ? কুশিক্ষা-কুহকময় ভেদি অন্ধকার, সে ক্ষত্র-প্রতিভা-সূর্য উদিবে কি আর ? ** সে দিন শত্রুর প্রতিকূলে ইংরাজ-পতাকামূলে দণ্ডায়মান হইয়া অনেক বীর হৃদয় ভারতসন্তান বহুকাল পরে এই ক্ষত্ৰ- প্রতিভার আংশিক বিকাশ পরিচয় প্রদান করিয়াছেন। ( সম্পাদক। ইং১৯২৫)। ( ৩১ )
তৃতীয় সর্গ।
৪
ত্যজি শৈলাবাস জনক-আলয়
চলিয়াছে ‘কৃষ্ণা’ তরঙ্গ-মালিনী।
পাইয়া সংবাদ, প্রফুল্ল-হৃদয়
‘নীরা’ ‘ভীমা আর যুগল ভগিনী,
হয়েছে বাহির ত্যজিয়া ভবন।
সহােদরা তিন---সপত্নী ত্রিতয়--
ছুটেছে, প্রাণেশে সপিয়া জীবন,
নাম-রূপ তাহে করিবারে লয় ।
‘ভদ্রা’ ‘বেদবতী’—আরো দু’ভগিনী
মিলি অর্ধ পথে, ধায় উন্মাদিনী ।
পরিহরি প্রিয়-অঙ্ক জননীর,
যেই গুপ্ত পথে, পতি-পাগলিনী,
নবীন যৌবনে হইয়া অধীর,
হইয়াছে ‘কৃষ্ণা’ সাগর-গামিনী ;
অদূরে তাহার, তুঙ্গ শৃঙ্গোপরি,
অভ্রভেদী শির করি সমুন্নত
( ৩২ )
তৃতায় সর্গ বিরাজে প্রতাপগড় গর্বভরে ; অভেদ্য চৌদিকে অরণ্য পর্বত। অপূর্ব-নিৰ্মাণ, জগত-বিস্ময়, দুর্গ দৃঢ়তম, দুর্গম, দুর্জয়। প্রাচী দিকে তার অতি মনােহর মন্দির সুন্দর ভবানী মাতার, করিয়া উন্নত শূল ভয়ঙ্কর কুচিত্তে আতঙ্ক করিছে সঞ্চার। দেবী দশভুজা ধরি দশ-করে দশ প্রহরণ, খড়গ খরধার, দাড়াইয়ে ক্রুদ্ধ মহাসিংহােপরে দানবে দুরন্ত করিছে সংহার। শােনিত-আপ্লত পতিত আতুর, চরণে ভীষণ মহিষ-অসুর। এই দুর্গ আওলী প্রদেশের অন্তর্গত এবং কৃষ্ণা নদীর উৎপত্তি স্থানের অনতিদূরে অবস্থিত। সমুদ্র হইতে ইহা ৩৫ ৪৮ বিট উচ্চ। ইহা অত্যন্ত দুর্গম; ইহাতে যাইবার দুইটি পথ এৱং একমাত্র প্রবেশ দ্বার আছে। পৰ্বতের উপরে ভূভাগ প্রায় এ মাইল বিস্তৃত ; ইহা দুই ভাগে বিভক্ত। ইহার মধ্যে প্রচুর জলপূর্ণ দুইটি উত্তম জলাশয় আছে। ইহাতে জল সর্বদা বৰ্ত- মান থাকে। এই গিরিদুর্গের উপর হইতে, চতুষ্পর্শের অরণ্যানী ও শৈলশ্রেণী এবং দূরবর্তী নীল সিন্ধু অতি সুন্দর দেখায়। ৩৩ )
সপ্তমীৱ বলিদান
৪
বসি বীরশ্রেষ্ঠ মহারাষ্ট্রপতি
মৰ্ম্মর-আসনে মন্দির-প্রাঙ্গন ;
বামে ও দক্ষিণে প্রভুগতমতি
উপবিষ্ট বীর সেনাপতি-গণ।
বন্দি ভক্তিভরে ভবানী-চরণ,
বদ্ধাঞ্জলি সবে, সুপবিত অতি,
রণমূৰ্তি মা’র করিছে দর্শন,
কোমলে কঠোর,মােহিনী মূরতি।
অবসান দিবা ; দূর সিন্ধু-জলে
ডুবিছে দিনেশ,—যায় অস্তাচলে।
;
লভি রাজাদেশ, সেনাপতিগণ,
ল’য়ে সৈন্যবল, নানাদিক হতে,
করিয়াছে আজি দুর্গে আগমন,
প্রাণপণ সবে দৃঢ় মহাব্রতে।
উৎসাহে অপার, আনন্দে সকলে
করিছে মন্ত্রণা, হেথা বীরগণ
পবিত্ৰ-হৃদয়ে পবিত্র এ স্থলে
পুরােভাগে মা’র করি আগমন,
সমাহিত এবে, সন্ধ্যা সমাগমে,
ইষ্টপদ-ধ্যান করে একমনে।
( ৩৪ )
;
তৃতীয় সর্গ
জুলিল প্রদীপ বিনাশি তিমির
আলােকিত করি মন্দির, প্রাঙ্গন।
উঠিল বাজিয়া মধুর-গম্ভীর
বাদ্যভাণ্ড, প্লাবি পৰ্বত কানন।
মিশ্রিত সে ধ্বনি প্রতিধ্বনি-সহ
শৃঙ্গে শৃঙ্গে শত উঠিল বাজিয়া ;
বহি সে শবদ সুখে শব্দবহ
দূর-দূরান্তর চলিল নাচিয়া ।
বাজে নহবত উচ্চ গিরি-চূড়ে,
অমর-সঙ্গীত যেন সুরপুরে।
৭
উঠিছে পঞ্চমে মুরলীর স্বম্ ;
প্রাণ-মন তাহে হইতেছে লয়।
ভাসা’য়ে ভূতল, পরশে গগন
কি স্বর মধুর, কি মদিরাময় ।
ধূপ-ধূনা-রাশি পুড়িয়া অনলে,
নিঃস্বার্থ-হৃদয় মহাত্মা যেমন,
বিতরি পবিত্র সুরভি ভূতলে
সত্ত্ব-ভাবে চিত্ত করিছে মগন।
নিরখি প্রতিমা, ভকতি-বিহ্বল
স্থির ভক্তগণ, নেত্র ছল ছল।
পঞ্চমীর বলিদান
কাপাইয়ে গিরি কানন প্রান্তর
দুর্গের ভিতর সহসা গভীর
হ’লল তােপধ্বনি, করিয়া জ্ঞাপন
শুভক্ষণ মা’র সন্ধ্যা-আরতির।
জটাজুট-শির গৈরিক-বসন
উঠি পুরােহিত, স্বর্ণ-দীপ করে,
আরম্ভিলা ধীরে আরতি তখন
শঙ্খ-ঘণ্টা আদি বাদিত্রের স্বরে।
শ্রেণীবদ্ধ সবে চাহি মা’র পানে
দাড়াইল স্থির দক্ষিণে ও বামে ।
রে মুগ্ধ হৃদয়, তুইও এ-সময়
ভাবনা কামনা ত্যজিয়ে অসার,
যােড় করি কর, হইয়ে তন্ময়,
সম্মুখে মায়ের পঁাড়া একবার।
হায় মা আমার, এ মােহ-স্বপনে,
আকাশ-কুসুমে ভুলাইয়ে আর,
কত দিন হেন রাখিবি বন্ধনে।
পা’ব পরমার্থে কবে মুক্ত-দ্বার ?
মুক্তপথে সেই ছুটিয়া কখন,
মুক্তিপদে পা’ব মূল-প্রয়েজন ।
১,
তৃতী সগ
বাড়ে দিন দিন হের দৈত্যবল;
দানবারি হরি কোথা মা আজিকে ?
ক্রমে দৃঢ়তর মােহের শৃঙ্খল ;
পাপ-স্রোত বেগে বহে চারিদিকে।
হয় শূন্য ক্রমে লক্ষমীর ভাণ্ডার ;
অস্থি-চৰ্ম্ম-সার শক্তির তনয় !
ওই শুন সদা উঠে হাহাকার
আর্তের রােদন,মথিয়া হৃদয় ।
উঠেছে অধৰ্ম্ম-ঝটিকা, ভীষণ ;
রাখ ধৰ্ম্মবলে জীর্ণ এ ভবন।
;
গত কতক্ষণ! সমাপ্ত আরতি।
“জয় মা ভবানী” গাহি সমস্বরে,
লুটিয়া ধরণী করিল প্রণতি
যতেক সন্তান একান্ত-অন্তরে।
থামিল বাদি, নহবত-গান ;
অনন্তের পথে সে স্বর-লহরী
হলাে প্রবাহিত চির-বহমান।
সন্ধ্যা কোলে করি আপিল শর্বরী।
বসিল স্বস্থানে পুনঃ বীরগণ ;
নীরব মন্দির ; স্তব্ধ গিরি বন।
( ৩৭ )
সপ্তমীর বলিদান
“শুন অতঃপর কহি কিছু আর,
কহিতে অধিক নাহি প্রয়ােজন।”-
চাহি স্থির-নেত্রে বদন সবার
ভাষে ভূপ তবে গম্ভীর বদন।
“আগত সম্মুখে পরীক্ষা কঠিন ;
যে দীক্ষা, যে শিক্ষা লভেছ সকলে,
কঠোর সাধনা সাধি এত দিন
পাতি বজে বুক, পুড়িয়া অনলে,
অদুরে তাহার পরীক্ষা ভীষণ
প্রস্তুত অচিরে হও বীর-গণ ।
•
“ধন-জন-মন জীবন শরীর
দিয়াছ সপিয়া সবে অকাতরে,
স্বর্গাদপি গরীয়সী জননীর
ঘুচা’তে সন্তাপ দুরন্তের করে।
গাে-ব্রাহ্মণ, মহা ধৰ্ম্ম সনাতন,
করিতে রক্ষণ, সতীর সম্মান,
দৃঢ় চিত্ত জানি আছ প্রাণ-পণ
তােমরা সকলে মা’র সুসন্তান।
স্বজাতি স্বধর্ম স্বদেশের তরে
কি অদেয় তব বিশ্ব চরাচরে ?
৩
তৃতীয় প
১৪
“তুচ্ছ দেহ এই মায়ার সৃজন,
সদ্যপাতী ক্ষুদ্র জলবিম্ব প্রায়,
প্রতি শ্বাসে ক্ষয় হয় প্রতি ক্ষণ,
আঁখি পালটিতে কোথায় মিশায়।
মল-বাহী হেন অসার শরীরে
অনিত্য সত্তায় নিশার স্বপন,
বহি দেবাদেশ সদা নত শিরে
নাহি করে যেবা স্বধর্ম সাধন,
বৃথা সে জীবন ; মরণ মঙ্গল ;
প্রায়শ্চিত্ত তার তীব্র তুষানল।
-
s
“ভব মনে পিতৃ-পিতামহ-গণে,
আৰ্যকুলমণি সেই মহাপ্রাণ
ভীমার্জুন আদি চিরজয়ী রণে
বীরােত্তম বীর ভারত-সন্তান।
করিয়া উচ্ছেদ অধৰ্ম প্রবল
ধৰ্ম্মরাজ্য এক করিতে স্থাপন,
দিয়া বিসর্জন তাহারা সকল
মহাব্ৰত কিবা করিল সাধন।
ভাব মনে সেই বীরেন্দ্র প্রতাপ,
দেব-কীৰ্ত্তি তাঁর, অমিত প্রতাপ।
( ৩৯
শনীর বলিদান
এই সে মাটিতে, এই মা’র কোলে
গঠিত মােরাও সম-উপাদানে ;
তারি স্তন্যে, তারি অগ্নি-বায়ু-জলে
পালিত বৰ্ধিত এই পুণ্য-ধামে।
কেন, তবে কেন, ওহে ভ্রাতৃগণ,
অনুসরি পদচিহ্ন তাঁহাদের,
সেবি পদ মা’র তঁাদেরি মতন
করি সাধন ব্রত জীবনের ?
অবশ্য সাধিব, সপিব জীবন,
দেবাদেশ নাহি হইবে লঙ্ঘন ।
১৭
“জাগ বীরগণ! চাহ একবার,
কি দুর্দিন হের এসেছে হেথায় ;
চারিদিকে শুধু অনর্থ মিথ্যার ;
অমৃত সত্যের গোপনে কোথায় !
কেহ নাহি চাহে কারো মুখ-পানে ;
ােেদর পূরণে সবাই তৎপর ;
দিয়া জলাঞ্জলি হিতাহিত-জ্ঞানে
ইন্দ্রিয়-তর্পণে মত্ত নারী-নর।
বিভাের সকলে বিলাস-ব্যসনে,
মরে মরীচিকা-মাঝে জল-ভ্রমে।
( ৪ )
তৃতা সস
১৮
“কাটি খণ্ডে শত, স্বর্ণ অঙ্গ মা’র,
করি অধিকার হের জনে জনে,
দৃপ্ত অস্কারে করে স্বেচ্ছাচার,
দলে ধৰ্ম্ম-কর্ম, দর্পিত চরণে।
ভাবে ভ্রমেও, নাহিরে স্মরণ,
আছে একজন উর্ধে সবাকার ;
ন্যায়-দণ্ডে তার এ বিশ্ব-ভুবন
পাপ-পুণ্যে সবে লভে সুবিচার।
প্রতিষ্ঠা পুণ্যের পরা শান্তি ধাম,
চির-তাপ-ময় পাপ-পরিণাম।
“গিয়াছে সে দিন ; এই সে যবন
লভি সিংহাসন ভারত-ভিতরে,
থাকি ন্যায়-পথে করেছে শাসন
প্রজা একদিন পবিত্র-অন্তরে।
গুরু-অপরাধে যবন-ভূপতি,
কঠোর কর্তব্য করিয়া পালন,
একমাত্র পুত্রধরে প্রিয় অতি
মােগলশক্তির আসন্ন অবস্থা দেখিয়া, এই সময় অনেক
গুলি শক্তি এক এক খণ্ড-রাজত্বের উপর আধিপত্য বিস্তার
করিয়া স্ব স্ব স্বাধীনতা ঘােষণায় তৎপর ছিল।
( ৪১ )
সঙনীর বলিদান দিয়া'প্রাণদণ্ড করেছে নিধন। # কি হিন্দু অহিন্দু না করি বিচার, দিয়াছে প্রজায় পুত্র-অধিকার। এলভেছে ভারত প্রাধান্য অতুল, নহে বহুদিন, তাদের শাসনে ; নাহি ছিল তারা কভু প্রতিকূল শিল্প-বাণিজ্যাদি উন্নতি-সাধনে। (১) প্রখ্যাতনামা নবাব মুর্শিদকুলীখা, কোনও কুল- স্ত্রীর ধর্মনাশ করা অপরাধে অভিযুক্ত স্বীয় একমাত্র পুত্রকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করেন। নিখিল বাবুর “মুর্শিদাবাদের ইতিহাস ১ খণ্ড ৪৭০ পৃঃ দ্রষ্টব্য। (২) মােগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র একদা অশ্বারােহণে মৃগয়া হইতে প্রত্যাগমন করিতেছিলেন। পথিমধ্যে তাহার অশ্ব-পদাঘাতে এক বৃদ্ধার একমাত্র পুত্রের প্রাণ বিনষ্ট হয় । বৃদ্ধা পুত্রের শবদেহ-সহ রাজ-দরবারে উপস্থিত হইয়া সম্রাটের নিকট বিচার প্রার্থনা করেন। সম্রাট অনুসন্ধান করিয়া, আপন পুত্রকেই সেই শিশুহস্তা জানিয়া, তৎক্ষণাৎ তাহাকে বৃদ্ধার হস্তে সমর্পণ করেন এবং বৃদ্ধাকে সম্বােধন করিয়া বলেন-“তুমি তােমার এই পুত্রহস্তাকে যাহা ইচ্ছা করিতে পার।” বৃদ্ধা ইচ্ছ করিলে সম্রাট-পুত্রেরও প্রাণ বিনাশ ইচ্ছা করিতে পারিত। কিন্তু, সেই দয়াবতী তাহা করেন নাই। মৃত্যুঞ্জয় শর্মা কত রাজাবলী” দ্রষ্টব্য। ( ৪২ ) ।
পা
তৃতীয়
রাশি রাশি অর্থ ঢালি অকাতরে
দেশ-হিত বহু করেছে সাধন ;
কত কীৰ্ত্তি আজো দেশ-দেশান্তরে
সুনাম তাদের করি’ছে ঘােষণ।
ছিল না তাহারা পিশাচ সকলে ;
ফেলেনি ভারতে এ-দীপ্ত-অনলে।
‘ভাগ্যদোষে হায়, সে দিন এখন
হয়েছে অতীত; বিপরীত তার,
প্রতিস্থানে আজি কর দরশন,
কি দৃশ্য ভীষণ,«ঘাের অত্যাচার ।
মতিচ্ছন্ন এই, জানিও নিশ্চয়,
আশু পতনের সূচনা তাহার ;
বিশ্ব-পতি সেই নহে নিরদয়,
ন্যায়রাজ্যে তার নাহি অবিচার।
বৃদ্ধি অধৰ্ম্মের নহে চিরকাল ;
নামে কাল-দণ্ড মস্তক করল
২২
“হও বীরগণ, বদ্ধপরিকর।
প্রকৃাতর কাৰ্য্যে সহায় কেবল
আমরা সকলে। দেখিবে সত্বর,
পাবে অত্যাচারী কম্মোচিত ফল।
( ৪৩
সপ্তমীর বলিদান
ধৰ্ম্মে অবিচল রাখি সবে মতি,
হীন স্বার্থ করি সর্বণ বর্জন,
হও অগ্রসর, বীর-ব্রতে ব্ৰতী,
প্রাণপণে কর কর্ত্তব্য পালন।
তুচ্ছ আজ বিশ্ব ভূমণ্ডল
হইবে লুণ্ঠিত ক্ষণে পদতল।
“কি বলিব আর?-~খােল তরবার,
‘জয় মা ভবানী । গাহি সমস্বর ;
এই অত্যাচার কর প্রতিকার,
মনস্তাপ মা’র ঘুচাও সত্বর।
কর মহা-শক্তি-পূজা আয়ােজন ;
ইচ্ছা বলি ওই হইবার তরে
আসিয়াছে হেথা হের শুভক্ষণ
মহাপশু এক মায়ের খপরে।
রক্তজবা -- রক্তমাখা * 'ক্রশির
দাও পুস্পাঞ্জলি পদে ভবানীর !
৫
থামিল বীরেন্দ্র, মেঘমন্দ্র-স্বরে
কহিয়া এতেক উৎসাহ-বচন ;
বহে ঘৰ্ম্ম বেগে, কম্প কলেবরে,
ছুটে অগ্নি-শিখা যুগল-নয়ন।
( 54 )
S গল্প
‘জয় মা ভবানী । গাহি তারস্বরে
নিষ্কোষিত করে তুলিয়া কৃপাণ,
রাজাজ্ঞা মস্তকে ধরি ভক্তিভরে,
করিল সকলে সম্মতি প্রদান।
খেলিয়া বিদ্যুৎ তীক্ষ্ণ অসি শত
করি ঝনৎকার হলাে কোষগত।
২৫
উঠি ‘মেরােপন্ত পিঙ্গলে তখন
বীরকুলােম সেনানী প্রধান,
বিনম্র-বদনে করে নিবেদন
“কর মহারাজ, আদেশ প্রদান।
রাজ-আজ্ঞা শিরে করিয়া বহন
গাহিয়া সঘনে ভবানীর নাম,
সসৈন্যে এখনি ভেটিব যবন,
দিব দুষ্টে ক্ষণে যােগ্য প্রতিদান।
শুনি পাপিষ্ঠের ঘাের অত্যাচার
তিলমাত্র ব্যাজ নাহি সহে আর।
“চিরশত্রু ধূৰ্ত্ত এই আজ
দিয়াছে মােদেরে দাগা বহুবার ;
উপযুক্ত তার দিব প্রতিফল,.
একটি যুবন ফিরিবে না আর।
সনীর বলিদান
মহামূখ সেই, অন্ধ অহঙ্কারে,
সিংহের বিবরে করিয়া প্রবেশ,
কেশরি-কেশর ছিন্ন করিবারে
আসে ল’য়ে উচ্চ আকাঙক্ষা অশেষ ।
ক্ষুদ্র সে পতঙ্গ, পশিছে ইচ্ছায়
কালের আহ্বানে অনল শিখায়।
২৭
“হও সত্যবাক, হে শূর-সত্তম;”
কহিলা সস্নেহে মহারাষ্ট্রপতি
উঠি বীরবরে করি আলিঙ্গন,
“এ সাহস তব উপযুক্ত অতি ।
কিন্তু, কিবা ফল লভি সে প্রয়াস ?
উপদেশ-মত, থাকি স্বীয় স্থলে
রাখ দৃঢ় সবে আপন আবাল ;
প্রতি বন্ধু-পথ রক্ষ সুকৌশলে ।
অরক্ষিত নাহি রাখ বিন্দু স্থান ;
থাক সুসজ্জিত, সদা সাবধান।
“প্রতি শৃঙ্গে সৈন্য কর সংস্থাপিত
প্রস্তুত সতত শত্রুআক্রমণে ;
ইঙ্গিতে যেমন হয়ে নিপতিত
দলিতে মুহূর্তে পারে দস্য-গণে।
( ৪৬ )
তৃতীয় সর্গ
বজ্রনাদী যত কামান ভীষণ
কর রক্ষা যত্নে যথাযযাগ্য স্থলে ;
জভঙ্গে আদেশ না দিতে তৎক্ষণ
প্রলয়-অনল যেন উঠে জ্বলে।
ভ্যজ বাক্য, কাৰ্য কর ভ্রাতৃগণ ;
কর ত্বরা মা’র পূজা-আয়ােজন।”
দৃঢ় ব্ৰত সবে, তুলি উচ্চরবে
“জয় মা ভবানী !” গভীর তান,
ত্যজিল আসন, আরক্ত-বদন
পশিতে আহবে অধীর-প্রাণ।
হয়ে অগ্রসর পুরােহিত-বর,
“ও রে বিজয়ী”, মধুর-স্বরে,
করি.আশীৰ্বাদ, দেবীর প্রসাদ
দিল দিল সবার করে।
করি পরস্পর আলিঙ্গন তবে
প্রস্থান স্বস্থানে করিল সবে।
প্রথম প্রহর ; পুনঃ ভয়ঙ্কর
গরজিল তােপ গভীর স্বরে।
টলিল প্রকার পর্বত কাতার ;
নিদ্রিত বিহঙ্গ জাগিল নীড়ে।
( ৪৭ )
মীর বলিদান
ছুটিল শার্দল সভয়ে ব্যাকুল
ত্যজি অর্ধমৃত মুখের গ্রাস।
করি ঝনৎকার, রুদ্ধ হ’লাে দ্বার,
বজের কপাট যমের ত্রাস।
তিমির-বসনে ঢাকি কলেবর
লভিল বিশ্রাম এবে চরাচর।
চতুর্থ সর্গ।
সুনিতম্বে ভারতের ভুবন-মােহিনী
ভূষণ-রূপিনী ‘ভীমা’, মলয়-হিল্লোলে
ল’য়ে ঊর্মিমালা গলে, কল-নিনাদিনী,
গাহিছে ভারত-গাথা মধুর কল্লোলে।
সচলা তটিনী, তীরে অচলের শ্রেণী
অরণ্যানী শ্যাম-শােভা করিয়া ধারণ,
শােভিছে কেমন! নীরে করি মুক্ত বেণী
করিতেছে জল-ক্রীড়া প্রকৃতি যেমন,
করিয়া আবৃত নীর শীতল ছায়ায়
প্রতিবিম্বে গিরি-বন তরঙ্গে খেলায়
কেহ ফলে কেহ ফুল, পল্লবে মুকুলে
হইয়া ভূষিত চারু তরু-লতা-চয়,
স্বভাব-উদ্যান রচি শৈলজার কূলে
কি রূপে মােহন মরি, হরিছে হৃদয় ।
আহিছে বিহ-কুল তরু-শাখে বসি
আকরি শ্যামল পত্রে সুন্দর শরীর ;
( ৪৯
৪৯ )
৪
সপ্তনীর বলিদান
আচম্বিতে, কোপা হতে, অরণ্য ভিতর
কে যেন অপূর্ব পুরী করেছে স্থাপিত।
কেহ গানে, কেহ পানে, বিবিধ ব্যসনে
মগ্ন যােদ্ধ গণ সবে অপরাহ্ন ক্ষণে।
4
মানস-মােহন মরি, কিবা মধুময়,
তুলি প্রতি মুচ্ছণায় সুর-লহরী,
চারু কক্ষ মাঝে এক এমন সময়,
বাজিতেছে ওই শুন একটি বাঁশরী ।
বিলাসের স্রোতে অঙ্গ ঢালি অকাতরে
সুন্দর পৰ্যঙ্কে হের করিয়া শয়ন,
সেনাপতি আজ কক্ষের ভিতরে
বিরাজিছে মােহ-মক্ত কলুষিত-মন।
পান-বিলসিত চিত্ত বাঁশরীর তানে
ভ্ৰমিছে ভুবন কিবা কল্পনা-বিমানে।
সজ্জিত কুসুম-দামে বসন-ভূষণে
মণি-মুক্তা-বিখচিত চিত্ত-বিনােদন,
মোহিনী কামিনী এক বসি একাসনে
করিছে মুখ-মারুতে অমিয় বর্ষণ।
করিয়া চুম্বন আহা, চারু-বিম্বাধরে
মুরলী-বদন, বামা, করালে কম
( ৫২ )
চতুর্থ পর্গ চম্পক-কলিকা-সম, বংশী-কলেবরে চাপি ছিদ্রাবলী, সুর সাধিছে কেমন। তরঙ্গে তরঙ্গে রঙ্গে ক্রমশঃ উত্থিত, উঠিছে সপ্তমে কিবা স্বর সুললিত । ল’য়ে ‘ফরসী’র নল সুকোমল করে, দক্ষিণে কামিনী অন্য, অধেকক্ষতলে জানু পাতি, আছে স্থির চাহি বীরবরে ; ঢুলু ঢুলু মদালস নয়ন-কমলে, স্মিতামনে, মরি, মরি, কি মােহন ঠামে, বাম করে ক্ষীণ কটী করিয়া ধারণ, সুকুমারী বালা আর দাড়াইয়ে বামে রজত-আধারে সুরা করিছে বহন। স্বরগের সুখৈশ্বৰ্য্য সজ্জিত ভূদেশে, সুরবালাগণ যেন সেবে অসুরেশে। । একান্তে অন্তিকে বসি সুবর্ণ-পিঞ্জরে নীলকান্তি খগ এক—কি জানি কি নাম- লােহিত-চরণ-চঞ্চু, উৰ্দ্ধমুখ করে নীরবে সঙ্গীত-সুধা করিতেছে পান। মারুত-হিল্লোলে মন্দ মৃদু আন্দোলিত ক্ষুদ্র পুষ্প-তরু চয়, রক্ষিত আধারে, শমীৱ বলিদান অপূৰ্ব বিবিধ পুষ্প স্নিগ্ধ সুরভিত বহি বক্ষে, শােভিতেছে কক্ষ-চারিধারে। কামিনী-কুসুম-কান্তি করি দরশন, সরমে কুসুম পত্রে ঢাকিছে বদন। পরিহরি কুলবধূ-বনফুল-বাস, উদ্যান-কুসুমে নব—বিলাসিনী-পাশে, অভিনব-প্রেম-রসে, প্রণয়-পিয়াস- ভঞ্জনে, গুঞ্জনে ভ্রমে ভ্রমর উল্লাসে। কুশলী শিল্পীর দক্ষ শিল্প-কলা-ময় কৃত্রিম কুসুমে নারী-কক-বসনে, লােলুপ মধুপ কোন হতাশ-হৃদয় করিছে বিফল যত্ন মধু-আহরণে। অদূরে তুষার-শুভ্র একটি শশক খেলিছে ; দুলিছে গলে সুবর্ণ পদক। “ফিরােজা!—ফিরােজা।”—অর্ধ-মুদ্রিত নয়নে নিরখি হৃভঙ্গে বীণা-বাদিনী-বদন, কহিলা বাহিনী-পতি এবে কতক্ষণে ; * “নহে মিথ্যা, এটি তব ঔষধ উত্তম। কিন্তু, যে বিষম ব্যাধি দন্তে বিষময় করিছে দংশন আজি অন্তরে আমার, ( ৫৪ )
লৈ ব্যাধি করিতে সত্য পারে নিরাময়
ধরে কিছুই হেন এ বিশ্ব-সংসার।
নিবার সঙ্গীত শুভে; করহ বিশ্রাম ;
তিক্তময় আজি সব হইতেছে জ্ঞান।”
নীরবিল অর্ধ-তানে অমনি বাঁশরী,
ছিন্ন-তার তন্ত্রী যথা; সুধা-প্রস্রবণে
কে যেন সহসা বাধা দিল গাে, আমরি ;
ঢাকিল আনন্দ-রবি নিরানন্দ-ঘনে।
‘আবরে বারিদ যবে বিধুর বদন
মলিনা তিমিরে যথা বিধু-বিনােদিনী’,
বিষঃ প্রভুরে আহা, করি দরশন
হলো ম্লানমুখী ক্ষণে যত সুহাসিনী।
স্মিতাননে শােক-ছায়া সহসা আসিয়া
অভিনব শােভা আর উঠিল ফুটিয়া।
নীরব ভবন ; ক্ষণে কিবা ভাবান্তর।
ধন্য কাল কি অসীম মহিমা তােমার।
কি লীলা বিচিত্র বিশ্বে কর নিরন্তর ।
লঙ্ঘিতে শকতি তব সাধ্য ভবে কার ?
নাহি হয় কালাতীত যদবধি নর,
কাল-ভয়-হারী কৃষ্ণ-চরণ-কমল
( ৫৫ )
পর বলিদান লইয়া শরণ আহা, দৃঢ় তব কর এই লীলা-চক্রে তারে ঘুরায় কেবল ; আলােকে আঁধারে উর্ধে অধে উঠি পড়ি, কি তাপ সহে সে সদা কত জন্ম ধরি। হায় রে, অবােধ চিত্ত, কেন নিত্য আর কাল-চক্রে এ কঠোর হয়ে কবলিত, সহিস্ নিয়ত তার এই স্বেচ্ছাচার- এই হাসি এই কান্না অতীব ঘৃণিত ? কি আছে প্রাণের বস্তু তার অধিকারে ? বিন্দু সত্য সুখ সেই, পারে কি সে দিতে ? ' ওই দেখ, সাক্ষী তার গুরু চিন্তাভারে বিহবল যবন-বীর ; কি অনল চিতে। আছে তাে সকলি তার ; কই সুখ মনে ? আনন্দ সকলে এক গােবিন্দ-শরণে। ; কর-পদ্মে সুকোমল, চিন্তিত-অন্তরে, সাদরে প্রভুর কর করিয়া ধারণ, কহিলা ফিয়ােজা তবে অতি সকাতরে ; “বীরবর, ভাবান্তর হেরি কি কারণ ? বিষাদের গাঢ়তম ছায়া তমােময়, করিতে মলিন হেন ও-মুখ-কমল ( ৫৬ )
চতুর্থ পর্গ
দেখি নাই কখনো তো! কি চিন্তা উদয় ?
কহ প্রভাে, কেন আজি হৃদয় বিকল?
ক্ষুদ্র তরু ঝটিকায় হয় উৎপাটিত ;
মহাদ্রি-শিখর কভু নহে তাে কম্পিত !”
১)
“ফিরােজারে, অতি লঘু অবল-হৃদয় ;
থাকি সমভাবে বীর করিলা উত্তর,
“বাতাসে চঞ্চল যথা কুসুম-নিচয়,
বিতরি সৌরভ মধু জুড়ায় অন্তর ;
একটু আতপে কিন্তু, একটু পরশে,
হয়ে যায় বিমলিন দল গুলি তার,
খসি বৃন্ত হতে ধীরে ভূতল পরশে ; ।
লুকায় সে শােভা তার হয় বৃন্তসার।
যেই চিন্তা-গুরুভার এ হৃদয়ে মম,
পারিবে না সুকোমলে, করিতে গ্রহণ।”
১ম
“ভাবিয়া কি ভবিষ্যৎ জয়-পরাজয়,*--
কহিলা সুমুখী পুনঃ—“হে শূর-সত্তম,
হয়েছে চঞ্চল তব এ বীর-হৃদয়,
মেঘের গর্জনে ভীত শিশুর মতন ?
অসম্ভব!-কর-তলে জ্বলন্ত অশনি
হাসিতে হাসিতে পারে রােধিতে যে জন,
( ৫৭ )
সনীর বলিদান
শঙ্কিত কবে সে, চিত্তে পরমাদ গণি,
উদগত খদ্যোত-দ্যুতি করি দরশন ?
দুর্জয় পাঠান বীর, দুর্বার সমরে ;
শঙ্কিত কবে সে ক্ষুদ্র কাফেরের ডরে?”
“বালিকার মুখে মিষ্ট এ সব বচন
সত্যই মধুরতম।”—হাসিয়া গম্ভীর,
ভাষিলা যবন-বীর ত্যজিয়া শয়ন,
“রণ-নীতি, প্রেম-গীতি নহে যুবতীর।
জান না ললনা, এই আর্য-বীর-গণ
ধরে শক্তি কি বিষম।
যুদ্ধে যত বার
বহিঃশত্রু সনে তার ঘটেছে মিলন,
টুটিয়াছে ন্যায়-রণে কে গর্ব তাহার ?
শঠতা চাতুরী কূট-কৌশল ব্যতীত
অন্য অস্ত্রে নহে কভু আৰ্য পরাজিত।
১০
“বীরশ্রেষ্ঠ সেকন্দর করি দিগ্বিজয়,
জিনি রণে অনায়াসে বহু রাজ্য-দেশ,
অতি হেয় শঠতার না ল’য়ে আশ্রয়
পারে নাই পুৰু-বীরে জিনিবারে শেষ।
দুৰ্ম্মদ মামুদ ঘােরী ভারত-সংগ্রামে
মরিতে মরিতে ত্রাণ লভি বারম্বার,
( ৫৮ )
চতুর্থ সর্গ
লভেছিল রাজদণ্ড এই হিন্দুস্থানে
লইয়া আশ্রয় শেষ এই শঠতার।
মােগল পাঠান আদি যত শক্তি আর,
শঠতাশঠতা এক অস্ত্র সবাকার।
“পারি যদি জিনিবারে এ বন-শার্পলে,
আমারাে শঠতা এই ভরসা কেবল ;
ভাবিতেছি তাই শুভে, কি ছল-কৌশলে
করিব আয়ত্ত মহাশত্রু মহাবল।
শিবাজী কৌশলী অতি, সমর-তৎপর,
উৎসর্গিত-প্রাণ সদা স্বদেশের তরে ;
একেক শিবাজী, তার প্রতি পার্শ্বচর,
ধৰ্ম্মে
দৃঢ় মহাপ্রাণ অজেয় সমরে।
দুর্জয় দুর্গম তাহে গিরি-দুর্গ-চয়।
ন্যায়-যুদ্ধে নহে সাধ্য শিবাজী-বিজয়।”
“কি বলিলে সেনাপতে ।”—দলিতা ফণিনী,
পলকে পালঙ্ক হ’তে নামিয়া, নির্ভয়,
কুটি-নয়না সেই কহে গরবিনী,--
“ন্যায়-যুদ্ধে নহে সাধ্য শিবাজী-বিজয় ?
হা ধিক্ !-~তবে কি এই শঠতা-সহায়ে
জিনিতে তুমিও অরি করেছ মনন?
| ( ৫৯ )
সনীর বলিদান
কাপুরুষ-যােগ্য অতি জঘন্য উপায়ে
স্বর্গীয় ‘বিজয়ী’ নাম করিবে অর্জন ?
বাসনা ধরিতে অঙ্গে পুরীষ-পঙ্কিল,
শিরশােভা শূরেন্দ্রের অর্ঘ্য অনাবিল ?
“হা ধিক্, হা ধিক্, হেয় এ ব্যাধ-আচার
বীরাচার হ’তে তবে কি প্রভেদ ধরে ?
বীরের সম্মুখ যুদ্ধ, মুক্ত তরবার ;
ব্যাধের কুটিল গতি, গুপ্ত অস্ত্র করে ।
একি মতি-বিপৰ্যয় হায়, আঞ্জ ?
‘বীর’ বলি খ্যাতি তব আছে চিরদিন ;
রাজ্যের প্রধান শক্তি তব বাহুবল ;
কি কারণ হেরি তবে এ দুৰ্ম্মতি হীন ?
কি হেতু অন্তরে আজি এ দুশ্চিন্তা-ভার
মৃত্যু-ভয় হৃদয়ে কি হয়েছে সঞ্চার ?
“কেন তবে, হা অভাগ্য, আপন ইচ্ছায়,
করি বীর-গর্ব বৃথা, তুলি নিজ করে
নিলে মৃত্যু-ফাসী গলে, প্রকাশ্য সভায় ?
আনিলে বিপদ ডাকি কেন সাধ করে ?
বুঝি আপন শক্তি ভাবী পরিণাম,
ক্ষণ-উত্তেজনা-বশে, দুঃসাহস হেন
( ৬০ )
চতুর্থ পর্গ
করিলে গ্রহণ হয়, কি হেতু অজ্ঞান ?
পর্বের আকাঙক্ষা চন্দ্র-পরশনে কেন ?
প্রাণের মমতা যদি এতই অন্তরে,
ত্যজি সুখ-শয্যা কেন সাজিলে সমরে ?
“কেন বা পিশাচ-প্রায় হইয়ে নির্মম,
ভীষণ অনর্থ এই ঘটাইলে পথে,
সহসা উখিত ভীম ঝটিকা যেমন
করে ধ্বংস-অভিনয় প্রশান্ত জগতে ?
করি হত্যাকাণ্ড এই, ঘাের অত্যাচার,
কি হেতু করিলে হস্ত রক্ত-কলুষিত ?
লুণ্ঠন, পীড়ন, এই জীবন-সংহার,
দুৰ্বল-দলন হেন, রাক্ষস-উচিত,
করিলে সাধিত তুমি আদেশে বা কার
পার কি উত্তর বীর, দিতে পরিষ্কার ?
“কাটিতে কদলী তৰু বালক যেমন,
দলিতে দুৰ্ব্বলে বল কে নহে তৎপর ?
নাশে দীপ-কলিকায় নিশ্বাস-পবন ;
কিন্তু, সেই অগ্নি যবে গ্রাসে চরাচর,
পদানত হয় জানি সেই বায়ু তার।
কি পৌরুষ বীরবর, দলি শক্তি-হীনে ?
( ৬১ )
নী বলিদান
বীরত্ব এই কি তব পাঠান-সর্দার
ডুবাইলে যশঃকীৰ্ত্তি হয়, এতদিনে।
সকল ভরসা আশা সেই সনে আর
ডুবাইলে চিরতরে অকূল পাথার।
“আশার মােহিনী বাণী করিয়া শ্রবণ,
ভাবিয়াছ শঠতার লইয়া আশ্রয়
হবে সিদ্ধকাম ;-হায়, মােহের স্বপন
হইয়াছ মহাভ্রমে পতিত নিশ্চয়।
মূখ তুমি ; যশাে-লােভে হয়ে আত্মহারা,
ভাবিতে মুহূৰ্ত্ত তব নাহি অবকাশ,
তােমা হতে শতগুণ সুচতুর তার,
ফুৎকারে উড়াবে লঘু তব মায়াপাশ
এখনও সাবধান হও শূরবর«
মৃত্যুর করাল মূর্তি ওই ভয়ঙ্কর।”
২৮
নীরবিলা বীরবালা। কমল-নয়নে
খেলিছে অনল-বিভা, বিরূপ কন,
বিজলি-বিকাশ মরি, যেন নব-ধন ;
উঠেছে বঙ্কিম ভুরু ললাটে কেমন
প্লাবিয়া নিতম্ব-বিষ, অধােদেশে তার,
দুলিছে লম্বিত বেণী, কাল কী সম ;
( ৬২ )
চতুর্থ পর্গ
প্রকাশি ঈষৎ, গুরু চারু বক্ষোভার,
পড়েছে উড়িয়া অর্ধ-হৃদয়-বসন ;
বহিছে সঘনে শ্বাস কি মূর্তি সুন্দর!
মােহিত, চকিত, ক্রুদ্ধ, চাহি বীরবর।
“অবলা রমণী, তাহে প্রিয়-সহচরী
সম্পদে বিপদে মম তুমি সুবদনি,
প্রাণের অধিক তােরে সদা গণ্য করি ;
কহিলা সরােষে তবে শঠ-চূড়ামণি ;-
“সহিলাম তাই আজি এ দুৰ্বাক্য তব ;
মিলাম দোষ শত ; জীবনে, প্রথম
ক্ষমা দান এই মম, অতি অসম্ভব।
দয়া-মায়া-ধৰ্ম্ম-কৰ্ম্ম জনমে কখন
নাহি জানে আফজ; মূল মন্ত্র তার
‘যেন তেন প্রকারেণ স্বকাৰ্য উদ্ধার।
“এই যমদাড় * মম, যমের সােদর,
করিয়া সহায় শুধু, নিঃশঙ্ক-হৃদয়ে,
কালেমাে সম্মুখে হইয়াছি অগ্রসর;
ত্যজি পথ নিজে মৃত্যু পলায়েছে ভয়ে।”
* “সমাড় যমদংষ্টুঃ স্যা। রা, ব্য কোষ, বৃহৎ বৰারি
বিশেষ। উদ্ভূত।
( ৬৩ )
সনীৰ বলিদান
লইয়া ভয়াল খড়গ শয্যা-পাৰ্শ হতে
লাগিলা কহিতে পুনঃ সগর্বে যৰন,--
“না দেখি অদ্যাপি বীর একটি ভারতে,
থাকে যে অটল সহি এই প্রহরণ।
নহে কোলম্বক ইহা কামিনীর করে,
অসাধ্য সাধনে সদা বজ-শক্তি ধরে।
“রমণী-হৃভঙ্গে কভু, থাকিতে জীবন,
নাগি ভুলে আফজ সঙ্কল্প তাহার।
ছলে বা কৌশলে বলে স্বার্থ-সম্পাদন
মা জানে সে ধৰ্ম্ম-তত্ত্ব ইহা হতে আর ।
অনুসরি সেই পথ যেই চক্রজাল
অভেদ্য ভীষণ, যত্নে করেছি নির্মাণ,
হউক সে বন্য-পশু যতই ভয়াল,
নিশ্চয় এ হতে তার নাহি পরিত্রাণ ।
হা ধিক্ ! মরণ-ভয়ে আজ ভীত,
মরণ আপনি যার তরাসে কম্পিত?”
ছড়া’য়ে তণ্ডুল-কণা নয়ন-লােভন,
ধরিতে বিহঙ্গে, ব্যাধ অরণ্যে যেমতি
পাতে ফঁাদ,, সেই মত দুরন্ত যবন
রচিয়া কুচক্র চিত্তে হরষিত অতি।
( ৬৪ )
চতুর্থ পর্গ
ত্যজি কক্ষ দ্রুতগতি গম্ভীর-বদন
করিল প্রস্থান বীর। ভীত কুরঙ্গিনী,
কিঙ্করী যুগল আহা, মুদিয়া নয়ন,
কাঁপিছে এখনাে। শ্বাস ত্যজি উন্মাদিনী
কহিলা ফিরােজা দুঃখে-“অভাগ্য অপার !
হায়, মাতঃ বিজাপুর, অদৃষ্ট তােমার !”
এসেছিল বীরবালা, উল্লাসে পরম
গাহিতে বিজয়-গাথা বাঁশরীর তানে,
হেরিতে সমর-রঙ্গ প্রিয়-পরাক্রম,
বহিতে বিজয়-বাৰ্তা বেগমের স্থানে।
গােপন-সঙ্কল্প আর ছিল এক মনে,
শত্রু-রক্ত-সুরঞ্জিত কণ্ঠে বিজয়ীর
দিয়া জয়-মাল্য পূত সেই শুভক্ষণে,
লভিবে গৌরব উচ্চ বীর-রমণীর।
ভাবি ভবিষ্যৎ এবে, হেরি কুলক্ষণ,
হতাশ-হৃদয়ে বাম মুছিল নয়ন।
( ৬৫
}
৫
পঞ্চম
সর্গ।
দ্বিতীয় প্রহর দিবা ; দেব দিনমণি,
মেলিয়া সহস্র কর, গাঢ় আলিঙ্গনে
বান্ধিয়া দিবায় সুখে সুবর্ণর্বরণী,
শােভিছে নিৰ্মলাকাশে হৈম-সিংহাসন
পতি-অঙ্কে প্রাণাধিক নিরখি সতীনী,
শ্যামাঙ্গিণী ছায়া-সতী মরিয়া মরমে
লুঠিছে চরণে; অভিমানিনী কামিনী
জানাইছে মনােদুঃখ হের জনে জনে।
নাহি জানে অভিমান সরলা নলিনী
হাসিতেছে পতি-সুখে সদা আলাদি
অগ্নিময় গিরিশৃঙ্গ প্রখর কিরণে,
ত্যজিছে অনল-শ্বাস ।
তপত ভুবন,
সন্তাপিতা তরু-লতা, তৃষিত-নয়নে
আছে চাহি শান্তিময়ী সন্ধ্যা-আগমন
বনজ কুসুম-কুল হইয়া কাতর
না পারি সহিতে তাপ কোমল শরীর
(
পঞ্চম পর্গ
হয়ে বৃন্ত-চ্যুত আহা, সহিত ভ্রমর
চুম্বিতেছে ভূমিতল চঞ্চল সমীরে।
লুকায়ে নিঝর-বালা কাননের কোলে
তপনে দিতেছে গালি কল কল বােলে।
লতাকুঞ্জে, বনতলে, পর্বত-গুহায়,
অগ্নি-বাণে অরুণের হইয়া অধীর,
পশিতেছে পশু-পক্ষী। তপন-সহায়
বহিয়া অনলরাশি ছুটিছে সমীর।
অনাহারে এখনও, নাহিক বিশ্রাম,
হের বীরশ্রেষ্ঠ ওই মহারাষ্ট্রপতি
সেনাপতিগণ সহ, ভ্রমি প্রতি স্থান,
করিছে সমর-সজ্জা সাবধানে অতি ;
সাত স্বেদ-নীরে অঙ্গ ; আরক্ত বদন;
অধে তপ্ত শিলাতল, মস্তকে তপন।
কোন্ বন্ধ পথে, দুর্গে, অরণ্য ভিতর,
পর্বত-উপর কোথা, উপকা পরে,
কি রণ-সম্ভার সহ কোন্ বীরবর
রহিবে কি ভাবে সদা প্রস্তুত সমরে ;
কোন্ স্থলে কোন্ মুখে বসিবে কামান ;
কি সঙ্কেতে পরস্পর সংবাদ জ্ঞাপন
( ৬৭ )
;
সম্ভনী বলিদান
করিবে বিভিন্ন স্থলে করি অবস্থান ;
কিরূপে কোথায় হবে শত্রু-আক্রমণ ;
হ’তেছে ব্যবস্থা সব, সুদৃঢ় যুকতি ;
করে কৰ্ম্ম কায়মনে সবে ঐক্যমতি।
রসদ, অস্ত্রাদি নানা দ্রুঘন, তােমর
বন্দুক, কামান, কুন্ত, ভল্ল, ভিন্দিপা
নারচ, কবচ, করপালিকা প্রখর,
পরশু, বিশিখ, শঙ্কু, কৃপাণ করাল,-
শকটে শকটে শত, নানা দিক হতে,
আসিতেছে সংখ্যাতীত ; উপযুক্ত স্থ
হতেছে সঞ্চিত দুর্গে, রাজ-আজ্ঞা-মতে
পদাতি নিষাদি সাদি আসি দলে দলে
হইতেছে সম্মিলিত। বিহিত আদে
হতেছে সজ্জিত সৈন্য বিভিন্ন প্রদেশে
প্রহরে প্রহরে দক্ষ গুপ্তচর-গণ,
যবন-শিবির হ’তে অতি সাবধানে
বহিছে সংবাদ ; প্রতি অঙ্গ-সঞ্চালন
করিতেছে বিজ্ঞাপন রাত্ত-সন্নিধানে।
কি সুন্দর শৃঙ্খলায় কার্যাবলী সব
হ’তেছে সাধিত, যন্ত্রে যেন নিয়ন্ত্রিত
( ৬৮
পঞ্চম সদ
পালিছে কর্তব্য সবে নিবিষ্ট নীরব
অভীষ্ট-চরণে আত্মা কৰি উৎসর্গিত।
নাহি লক্ষ্য কোন দিকে, কায়মনঃপ্রাণে
ব্ৰতী বাল-বৃদ্ধ-যুবা জগত-কল্যাণে।
ব্যস্ত আজি সকলেই। উৎসাহে পরম
স্ফীত বীরব ; মত্ত-করী-আস্ফালনে
গহন কাননে মাতে মৃগেন্দ্র যেমন,
মত্ত রণমদে বীর বৈরী-আগমনে।
ভুলিয়া আহার-নিদ্রা, কি মহা উদ্যমে
হতেছে প্রস্তুত রণে মহারাষ্ট্রগণ ;
দৃঢ়তা চিত্তের ব্যক্ত নয়ন-দর্পণে ;
‘সঙ্কল্প সাধন কি জীবন অর্পণ”-
একবাক্য সকলের ; এক মনঃপ্রাণ
বিভিন্ন শরীরে মরি, যেন বহমান্ ।
দুর্গ-বহির্ভাগে, অধে, অতিথি-আশ্রমে,
সুন্দর প্রকোষ্ঠে এক এ-হেন সময়,
করিছে বিশ্রাম আহারান্তে সুখাসনে
বীরমূৰ্ত্তি প্রৌঢ় এক ব্যথিত-হৃদয় ;
বিশদ বসন মাত্র বদ্ধ কটিদেশে ;
মুক্তগাত্র ; গৌরকান্তি অমুল উজ্জ্বল ;
শঙনীর বলিদান
বদন গম্ভীর ঘন দীর্ঘ শ্মশ্রু-কেশে;
আয়ত নয়ন; সুবিশাল বক্ষঃস্থল।
শােভিছে উরসে ব্রহ্ম-যজ্ঞ-উপবীত ;
সুকণ্ঠে তুলসী-মাল্য বৈষ্ণব-উচিত।
“ধন্য বীরগণ এই, সার্থক-জনম !”,
চাহিয়া চাহিয়া মুক্ত-বাতায়ন-পথে
অদূর শ্যামল শৈলে নয়ন-মােহন,
ভাবিছে সে আগন্তুক-“ব্ৰতী মহাব্রতে,
মহাযজ্ঞে, ওই যােগী পুরুষ সকল,
ত্যাগের দৃষ্টান্ত মহা করি প্রদর্শন,
কৰ্ম্মযােগে কি মহান্ ধৰ্ম্মে অবিচল
করিছে সফল ভবে মানব জনম !
ক্ষণজন্মা ধন্য বীর শাহাজী-কুমার !
বন্য মহারাষ্ট্রগণ সুপুত্র মাতার ।
“ধিক জন্ম আমাদের !তুলনার তার,
আকাশ পাতাল ভেদ ।--বিকা’য়ে শরী
ঘৃণিত দাসত্বে, হয়ে ব্রাহ্মণ-কুমার,
যবনের দ্বারে সদা আছি নত-শির।
ল’য়ে পত্নী-পুত্র, ক্ষুদ্র সংসার-বিবরে
বনচর পশুসম বদ্ধ অনুক্ষণ;
( ৭০ )
করি ছুটাছুটি শুধু আত্মতৃপ্তি-তরে ;
একটু স্বার্থের হানি হলেই মরণ!
আত্ম-সেবা একমাত্র সাধনা মােদের ;
বিশ্ব-সেবা মহাযজ্ঞ এ বীরগণের।
“হায় মা ভারতভূমি ! কি অশুভ ক্ষণে,
পবিত্র ভবনে এই, মােদের মতন
প্রসবিলি কামপর এ পাষণ্ডগণে ;
দিয়া দুগ্ধ পােষিলি গাে, কাল-ভুজঙ্গম!
মেলিয়া নয়ন আজি দেখ একবার,
পুত্র কুলাঙ্গার এই, কি কাজে ঘৃণিত
হয়ে বৃত, আসি হেথা, আদেশে, কাহার,
পাপ-স্পর্শে পুণ্য-ক্ষেত্র করে কলুষিত !
লইয়া কুচক্র, এই পবিত্র আবাস
এসেছে মা, সাধিতে সে তােরি সর্বনাশ।
১২
‘বহিয়া ব্যাধের পাশ, কৃতদাস তার,
বান্ধিতে মৃগেন্দ্রে যথা করে বিস্তারিত
বীতংস সুদৃঢ় সেই, গভীর কান্তার ;
অদূরে সশস্ত্র শত্রু থাকে লুক্কাইত।
তেমতি, বরুিত আজি হয়ে দূত-পদে,
কুমন্ত্রণা পাপিষ্ঠের করিতে সফল,
( ৭১)
সমীরবলিদান
জীবন-কুমারে তাের ফেলিতে বিপদে,
এসেছে এ দ্বিজাধম এই পুণ্যস্থল !
বজবজ,—কোথা বজ,—বিদারি আকা
এ কুল-কলঙ্কে ত্বরা করহ বিনাশ।”
অনুতাপানলে তীব্র দহি দ্বিজবর,
ব্যাকুল-অন্তর অতি চাহি দূরাকাশে,
ভাসিয়া নয়ন-নীরে,-ভগ্ন কণ্ঠস্বর
শেষ কথা ক’টি আহা, কহিল উচ্ছ্বাসে ;
বসিল উঠিয়া দ্রুত ; ভুজঙ্গ যেমন
দংশিল সহসা অঙ্গে, অন্তরে, বাহিরে,
বিষজ্বালা নিদারুণ করিয়া সৃজন।
লাগিলা ভাবিতে পুনঃ প্লত নেত্ৰ-নীরে
“হা কৃষ্ণ, বিপাকে একি ফেলিলে আমায়
দাও, শ্রেয়ঃ পথ সত্য, সাধু সদুপায় ।
;
“ওদিকে বিশ্বাসঘাত-পাতক অপার,
এদিকে স্বদেশ-দ্রোহ ততােধিক হায় ;
কালসর্প একদিকে গরজে দুর্বার,
অন্য দিকে বভুক্ষিত ব্যাঘ্র ভীমকায়!
একদিকে অধর্মের প্রচণ্ড অনল ;
অশ্রুজল জননীর-উষ্ণ প্রস্রবন
( ৭২ )
পঞ্চম সর্গ
প্রবাহিত অন্য দিকে। একাংশে কেবল,
পৈশাচিক অভিনয়, ইন্দ্রিয়-তর্পণ ;
অন্যত্র হৃদয়-রক্ত ভ্রাতা-ভগিনীর
বহিছে প্লাবিয়া বেগে বক্ষঃ ধরনীর।
“কি উপায়, হা কেশৰ ? এ মহা সঙ্কটে
তরিবে কিঙ্কর তব কোন্ পথ ধরি ?
এস হে বিপদবন্ধু, উরি হৃদি-পটে,
তরাও বিপদসিন্ধু দিয়া পদতরী।”
বিচঞ্চল হৃদয়ের ঘাের আন্দোলনে
হইয়া অধীর দ্বিজ, ত্যজিয়া শয়ন,
লাগিল। প্রমিত কক্ষে চিন্তাকুল-মনে ;
কুঞ্চিত ললাট দীর্ঘ ; গম্ভীর বদন।
দিবা অবসান ক্রমে, রবি স্নানকর,
বার্ধক্যে যেমন বলহীন কলেবর।
•
-
করি রণ বহুক্ষণ হৃদয়ের সনে
করিল সঙ্কল্প স্থির শেষে দ্বিজবর
উঠিল কহিয়া উচ্চে উচ্ছ্বসিত মনে,
“কি ভয় ?-পশিব ঘাের নরকে দুস্তর !
পচিব পুরীষ কুণ্ডে কোটিকল্পকাল,
করি প্রায়শ্চিত্ত পাপ বিশ্বাস-ঘাতের ;
সঙনর কলিদান
জীবন থাকিতে তবু এ খড়গ ভয়াল
নারিব হানিতে কভু হৃদয়ে মায়ের!
স্বর্গ মর্ত্ত একদিকে বিশ্বভূমণ্ডল,
অন্যদিকে জননীর বিন্দু অশ্রুজল !
“হাম মা, জনমভূমি, জননী আমার,
অকৃতী সন্তান তাের যাচে শ্রীচরণে,
দুৰ্বল হৃদয়ে বল দে মা, একবার,
দিই শুভাশুভ সব সত্যের সাধনে।
মর’, বাঁচ’, ‘রসাতলে যাও আফজল্ ।
যা থাকে অদৃষ্টে, আজি নির্ভয় পরাণে
করিব প্রকাশ আমি নিশ্চয় সকল
কূট অভিসন্ধি তব, শিবাজীর স্থানে।
লঙ্ঘিতে বিধির বিধি সাধ্য ভবে কার ?
সকৰ্ম্মের ফলভােগ কর দুরাচার !
১৮
পড়িল সহসা ছায়া দ্বার-দেশে কার।
চমকি চাহিল দ্বিজ । ভৃত্য একজন
পশি কক্ষে, করি নতি চরণে তঁাহার,
নিবেদিল,-“আহারাদি করি সমাপন,
করিছে বিশ্রাম প্রভু নিভৃত ভবনে।
আদেশ এ দাসে তঁার, লইতে তথায়
( ২৪ )
পঞ্চম পর্গ
বাৰ্তাবহে আফজলের অতীব যতনে।”
“হও অগ্রসর ভ্রাতঃ!”-মধুর ভাষায়
কহিয়া, আবরি অঙ্গ উপযুক্ত বাসে,
চলিল সত্বর দ্বিজ শিবাজী-সকাশে।
ওকি দৃশ্য ?-মরি, মরি, দেখ একবার !
প্রশস্ত প্রকোষ্ঠে এক অতীব সুন্দর,
উনেত্রে চাহি শিব চিত্রিত-আকার
নিরখিছে চিত্র এক, কিবা মনােহর ?
নিশুন্তের মহারণ চিত্রের বিষয় ;
মুক্ত কেশ-পাশে দৃঢ় করিয়া ধারণ,
করিছে ভ্রামিত শূন্যে দেবীরে দুর্জয়
কুটিভীষণ দৈত্য বিকট-দর্শন।
শােভিছে গগন-পটে ভুবনমােহিনী,
নবীন-নীরদ-াদে যেন সৌদামিনী।
ঢাহিয়া সে-চিত্র ভূপ সজল-নয়নে
কহিছে আপন মনে—“হায় মা জননি,
এ দৃশ্য আবার আজি হেরি যে ভুবনে।
মরিয়া বাঁচে কি দৈত্য দানব-দলনি ?
নিরখি নয়নে হেন দশা জননীর,
অতি হেয় দানবের এত অহঙ্কার,
৭৫ )
(
সপ্তমীর বলিদান
কোন্ প্রাণে পুত্র তব রহিবে মা স্থির ?
কেমনে দেখিবে চাহি এই অত্যাচার ?
ত্যজ লীলা লীলাময়ি, না দাও প্রশ্রয়,
অধর্মের বৃদ্ধি হেন কর গাে সংক্ষয় !
“পণে বদ্ধ আছ যে মা, সন্তানের পাশে।
রাখিবে আপন বাক্য কবে মা, আবার ?
অজিত ভারত কবে, অবাধ আবাসে,
পরানন্দময়ী মূর্তি পূজিবে তােমার ?
পরম পদের তত্ত্ব পাইয়া বিপদে,
স্বজন-বঞ্চিত ওই ‘সমাধির মত
পা’বে পূর্ণ-জ্ঞানালােক-পথ সেই পদে,
‘সুরথ’ও হইবে স্বার্থে পূর্ণমনােরথ ?”
ফিরিল অন্যত্র নেত্র ; চাৰু চিত্রে রত
দেবযজ্ঞে দুই ভাবে সমাধি সুরথ ।
২২
=
বিচিত্র বিবিধ চিত্র, মানচিত্রাবলী
দুর্গম প্রদেশ নানা, ভূধর, সাগর,
ইখং যদা যদা বাধা দানবােখা ভবিষ্যতি ।
তদা তদাবীৰ্যাহং করিষ্যাম্যরি সংক্ষং |
১১শ মা: ৫০। মার্কণ্ডেয় চণ্ডী
৭৬ )
পঞ্চম সর্গ
নদ নদী, শষ্যক্ষেত্র, শুষ্ক মরুস্থলী,
গিরিদুর্গ, পথঘাট, অরণ্য, প্রান্তর
শােভিছে প্রাচীর-গাত্রে কিবা সুদর্শন ।
ত্যজি চিত্রাবলী ক্রমে, ধীরে বীরবর
মানচিত্র-পাশে এক করিয়া গমন,
লাগিল হেরিতে দৃশ্য একান্ত-অন্তর।
মন্থর-গমনে আসি পশি কক্ষতল
দাড়াইল দ্বারদেশে মুরতি যুগল।
বুঝিলা সঞ্চার নৃপ অপর প্রাণীর।
সসমে শশব্যস্তে আসি সন্নিধানে
বন্দিলা ব্রাহ্মণে ভূমে নত করি শির।
আশিষিল দ্বিজ স্নেহ-উথলিত প্রাণে
“ও রে বিজয়ী শিব, সিদ্ধ-মনস্কাম।”
লইয়া যতনে তবে ভক্তিভরে অতি
পবিত্র আসনে তারে করিয়া সংস্থান,
বসিলা আসনে অন্য মহারাষ্ট্রপতি।
নীরব ভবন ; ক্ষণ নীরব উভয়
ভাষিল শূরেশ তবে প্রশান্ত-হৃদয় :-
২৪
“সুপ্রভাত আজি মম! করি পদার্পণ
বেষ্ণব পরম সাধু ‘কৃষ্ণাজী ভাস্কর’ *
ইহার উপাবি *পান্ত”। ইনি বিজাপুর-রাজ্যের একজন
{: ৭৭ )
;
সনীর বলিদান
করিলা পবিত্র ধন্য এ দীন ভবন ;
সার্থক জীবন মাের!কহ দ্বিজবর,
কি আদেশ দাস-প্ৰতি ?” বিনত-বদনে
বাক্যহীন কতক্ষণ করি অবস্থান,
করিলা উত্তর দ্বিজ দহিয়া মরমে ;-
“অযােগ্য অতীব মম এ উচ্চ সম্মান।
হায়, শিব, সুরভিত এ পুষ্পে সুন্দর,
নাহি জান, বসে কিবা কীট বিষধর।
“দিতেছ কাহারে শিৰ, ‘সাধু’ অভিধান ?
অসাধুর শিরােমণি এই দ্বিজাধম !
নাহিক পাতকী বিশ্বে আমার সমান ;
নরকেও গতি মাের হবে না কখন।”
থামিল ব্রাহ্মণ, মরি, বাষ্পরুদ্ধ স্বর ।
কহিল বিস্ময়ে অতি, বীরকুলােম,
“একি প্রভাে!-কেন চিত্ত এমন কাতর ?
কি হেতু অন্তরে এই সন্তাপ বিষম ?
কহ কৃপা করি, কেন হেন দুঃখভার ;
হবে না কি দাস হতে বিন্দু প্রতিকার ?
সুবিখ্যাত, বিশ্বাসী, সৎসাহসী, সুবিজ্ঞ ও স্বধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ
কর্মচারী। ইনি একনিষ্ঠ বৈষ্ণব ছিলেন।
( ৭৮ )
পনসর্গ
“গাে-ব্রাহ্মণ বিশ্বহিত ধৰ্ম্ম সনাতন
সত্য-পথ মহাজন-সেবিত জগতে,
নির্বিঘ্ন করিতে সদা সপিয়া জীবন
মহারাষ্ট্রগণ এই দৃঢ় মহাব্রতে !
বিসর্জন দিয়া সব বিলাস ব্যসন,
ধরিয়াছে প্রহরণ তাহারা কেবল,
করিতে সর্বস্ব-পণে সঙ্কল্প সাধন ;
শেষ বিন্দু শােগ্নিতের থাকিতে সম্বল,
হবে না বিচল তা’র ব্রত উদযাপনে ;
কহ প্রভো, কি ব্যথায় ব্যথিত মরমে।”
২৭
আরক্ত হইল ক্ষণে বীরের বদন।
রােধি বাস্পবেগ ৰিপ্ৰ কহিলা এবার,-
“হও সিদ্ধ সাধু-ব্রতে বীরকুলােত্তম !
প্রজ্জ্বলিত যজ্ঞে এই অগ্নি যে তােমার
হবে না নির্বাণ বৃথা, বীরেন্দ্র শােণিতে
সুপবিত্র হবিঃপাতে পরম মঙ্গল,
দিবে সে সুফল সত্য ; সবল অসিতে
অচিরে হইবে ধ্বংস অনর্থ সকল।
মূখ আজ মুগ্ধ আশার ছলনে,
আঁকিছে সুখের চিত্র মােহের স্বপনে !
( ৭৯
পলীর বলিদান
“পাঠায়েছে তাই দুষ্ট এই দ্বিজাধমে,
সন্ধির প্রস্তাবে মিথ্যা, করি প্রলােভিত
প্রতারিত, বীরশ্রেষ্ঠ সাহাজী-নন্দনে
করিতে কুচক্রে কাল শত্রু-কবলিত।
পাপ-অভিসন্ধি সেই করিয়া বহন,
করিতে বিপন্ন মা’র জীবন কুমারে,
শেষ আশালােক আর এ গৃহে পরম
এসেছে এ নরাধম, নিবা’তে ফুৎকারে।
হায় শিব, মাের সম কে পাতকী আর ?
অধৰ্ম্মের সহকারী এই কুলাঙ্গার !”
ভাসিল নয়ন-নীরে পুনঃ দূত-বর
লজ্জায় ঘৃণায় মুখ করি অবনত।
হাসি মনে মনে শিব করিল উত্তর
“ত্যজ অনুতাপ প্রভাে, আত্ম-গ্লানি এত ।
নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব এই বিভুর ইচ্ছায় ;
অতি ক্ষুদ্র জীবগণ, নিমিত্ত কেবল,
করে কৰ্ম্ম ভবে নিত্য তাহারি মায়ায় ;
পরম-কারণ সেই ভুবন-মঙ্গল।
কে আমি ? কে তুমি? এক তিনি সর্বময় ;
হারি প্রভাবে ভবে প্ৰভব প্রলয়।
( ৮০ )
পৰম সর্গ
সর্ব মূলাধার সেই ; মায়া-যন্ত্রে তাঁর
খেলি মােরা, খেলে সেই যে ভাবে যখন।
উত্থান পতন কালে জন্ম মৃত্যু আর,
তঁাহারি মঙ্গলনীতি ভবে চিরন্তন।
দুঃখের কারণ তাহে কিবা মতিমান ?
কাল-চক্র-গতি সেই হের, মহাবল।
হের, চক্র-জালে স্বীয় সেই হীনপ্রাণ
আবদ্ধ অজ্ঞাতে কিবা ;—নিয়তি সকল ।
!
ভাবে কৰ্ত্তা অন্ধ নর ‘আমি’ই কেবল ;
জানে না অলক্ষ্যে কেবা ঘুরাতেছে কল।
“ধিক শত আফজ ! বুঝেছি নিশ্চয়,
ভাবি অক্ষমতা স্বীয় সম্মুখ সমরে,
হয়ে ভীত প্রাণভয়ে, চিন্তিত-হৃদয়,
কৌশলে সাধিবে কাৰ্য ভেবেছ অন্তরে।
হা রে মূখ ! চিরদিন এই ব্যাধাচারে
বাসনা কি জয়-ডঙ্কা বাজাতে ভারতে ?
কূট-চক্র-জালে চির-অন্ধকারাগারে
রাখিবে আবদ্ধ পরে যথা ইচ্ছা মতে ?
আশার স্বপন, মূঢ়, মােহের বিকার !
হের ইচ্ছা অন্যরূপ এবে বিধাতার।
( ৮১ )
সময় বলিদান
“বলী গুরু-বলে, বুঝি গুরুত্ব কাৰ্য্যের,
করেছে গ্রহণ ব্ৰত এ দাস অধম।
একটি নয়ন যদি থাকে বিপক্ষের,
শানিও, শিবাজী এই সহস্র-নয়ন।
সাধু-গুরু-জননীর শুভ আশীর্বাদ
কৃপাদৃষ্টি, যদি প্রভাে, থাকে এ কিঙ্করে,
কি সাধ্য দুষ্টের, কহ, ঘটায় প্রমাদ,
প্রকাশি পাশব-বল দৈব-শক্তি হরে ?
নাহি ভয় নরােত্তম, ত্যজ পরিতাপ ;
পড়েছে আপন ফাদে সেই মহাপাপ।
“শুনেছি যখনি, সেই ধূর্ত আজ
সন্ধির প্রস্তাবে দূত করেছে প্রেরণ,
হইয়াছে উদঘাটিত রহস্য সকল,
নখর-দর্পণে সব করেছি দর্শন।
হইয়াছে বহুপূর্বে কৰ্ত্তব্য নির্ণয় ;
হও ত্বরান্বিত দেব ; দিব তব সাথে
দূত মম সুচতুর সাহসী নির্ভয় ;
বহিবে সে বার্তা মাের যবন সাক্ষাতে।
সন্ধির প্রস্তাবে নাহি অসম্মতি মম,
কপটী যবনে সেই বুঝাবে উত্তম।
( ৮২ )
•
পঞ্চম পদ
“ধরহ সাহস ; চিত্ত করহ সবল;
হীন স্বার্থ দাও বলি ইষ্টদেব-পদে ;
হও বদ্ধপরিকর সাধিতে কেবল
পরম আত্মার প্রীতি সম্পদে বিপদে।
চেয়ে দেখ, কি অনর্থ উপস্থিত দেশে ;
উঠিয়াছে চারিদিকে কিবা হাহাকার ;
রক্ত-শ্রোতে-অশ্রু-স্রোতে যাইতেছে ভেসে
মাতৃবক্ষঃ; স্বর্ণ অঙ্গ, অসিত মাতার!
কি বিষম স্বেচ্ছাচার ! কোন্ নরাধম
সহিবে নীরবে এই অধৰ্ম্ম ভীষণ ?”
“সহিবে না—-সহিবে না থাকিতে জীবন।”
কুটি-নয়ন দ্বিজ কহিয়া উচ্ছাসে,
করিতে নির্বিঘ্ন ধৰ্ম্ম-পথ সনাতন
অধৰ্ম্ম-বিনাশে বদ্ধ হলাে সত্য-পাশে।
“সাধু !- সাধু!” কহি শিব আনন্দে অতুল,
দ্বিপদরজঃ শিরে করিয়া গ্রহণ,
কহিলা মধুরে পুনঃ—“বিধি অনুকূল,
লভিলাম সখ্য আজি তব অনুপম !
গােপীনাথ!”—ফুকারিলা মহারাষ্ট্রপতি ;
পশিল তৃতীয় ব্যক্তি কক্ষে ত্বরাগতি।
( ৮৩ )
গনীর বলিদান
৪০
“বদ্ধ সখ্য-সূত্রে এবে এই দ্বিজোত্তম
উন্নত-হৃদয় সাধু স্বধৰ্ম্মে নিৰ্ম্মল ;
আত্মজন বলি এরে করিবে দর্শন;
লভিবে ইহার পাশে সাহায্য সকল।
বিলম্ব অধিক আর না হয় উচিত;
যাও ত্বরাগতি দোহে দ্রুত তুরঙ্গমে।
হবে না কহিতে আর, তুমি সুপণ্ডিত,
জান' সত্য, হে ব্রাহ্মণ,-জীবনে মরণে,
জননী জনমভূমি আরাধ্য সবার,
সার ধৰ্ম্ম সদা রক্ষা গৌরব তাহার ।
৪১
“আর এক কথা, প্রভো,—প্রাণরক্ষা তরে
দুষ্ট ব্ৰণে সুনিপুণ অস্ত্র সঞ্চালনে,
নহে হিংসাধৰ্ম্ম যথা ভিষক-প্রবরে,
প্রাণ-রক্ষা-ধৰ্ম্ম কিন্তু ; তেমতি ভুবনে
দুঃখের কারণ যাহা, কলঙ্ক মানবে,
মূল-উৎপাটনে তার, প্রয়ােজনমত
আয়ােজন, অনুষ্ঠান, যথা-বিধি ভবে,
হলেও কাহারও ক্লেশ-হেতু আপাততঃ,
অধৰ্ম্ম নহে সে কভু। ধৰ্ম্ম সেই ধ্রুব,
জীবের যাহাতে সত্য ইহামুত্র-শুভ ?”
( ৮৬ )
যষ্ঠ সর্গ।
শুক্লষষ্ঠী ; শুভাশ্বিন ; সন্ধ্যা শারদীয় ;
শােভিছে শশাঙ্ক শুভ্র সুনীল গগনে ;
কি সৌন্দর্য প্রকৃতির, নহে তুলনীয় ;
উথলিছে সুখ-সিন্ধু ভবনে কাননে।
বসিয়াছে গৃহে গৃহে দুর্গার বােধন ;
শুভলগ্ন, শুভক্ষণ; বেদমন্ত্র-ধ্বনি
ধ্বংস করি মায়া-মল মানসে, পরম
সত্ত্বভাবে পরিপূর্ণ করিছে অবনী।
জাগ্রত নবীন-প্রাণে কি জড় চেতন ;
দ্বিতীয় অমরাবতী আজি এ ভুবন।
আনন্দের অনাবিল বহিছে তুফান ;
উথলিয়া মন্দাকিনী সুর-শৈবলিনী,
হয়ে শতধার মরি, হয় যেন জ্ঞান,
পশেছে ভূলােকে আসি, আনন্দ-রূপিণী ।
জানি শুভ আগমন আনন্দময়ীর
ত্যজিয়া ভবের গৃহ ভবে শুভক্ষণে,
( ৮৭
লঙনীর বলিদান
সুখেশ্বৰ্য স্বরগের অগ্রে জননীর
এসেছে আনন্দে বন্দ্য ভারত-ভবনে।
আসিয়াছে বড়-ঋতু ত্যজি সুর-বন
সাজা’তে নবীন বেশে ভারত-কানন।
নন্দনকানন-শােভা মােহন মন্দার
দেবেন্দ্র-হৃদয়ানন্দ, আসিয়া মরতে,
খুলিয়াছে কি অপূৰ্ব্ব শােভার ভাণ্ডার
কামিনী-কমল-মুখে অতুল জগতে।
তরুণ-অরুণালােকে যথা কমলিনী,
লোহিত অধরে মধু হাসি ঢল-টল,
পাইয়া প্রব' সাগত পতি, সীমন্তিনী
মধুমতী, হইয়াছে আনন্দে বিহবল।
সুধা-কুম্ভ স্বরগের করি অধিকার
তুষিতেছে প্রণয়িনী প্রাণেশে তাহার ।
৪
শ ঘণ্টা. বাদিত্রের মধুর নিনাদ,
বালক-বালিকা-কণ্ঠে উচ্চ হাস্যয়ােল
উঠিতেছে অবিরত ; নাহি অবসাদ ;
হয়েছে সবাই শিশু পেয়ে মা’র কোল
দশভুজা দশদিক ঢাকি দশ করে,
দিব্য রূপে আলো করি জগৎ সংসার,
( ৮৮ )
শত পর্গ
লইয়া সন্তানগণে সমান আদরে
মুছাইছে বৎসরের বিষাদ-সম্ভার।
ভূতল গগন কিবা করিয়া প্লাবিত,
পুত্ৰমুখে ‘মা’ ‘মা’ শব্দ হতেছে উখিত।
প্রফুল্ল ‘প্রতাপগড়’ আনন্দ-উৎসবে ;
কি নব উৎসাহে মগ্ন স্থাবর জঙ্গম,
নানাভাবে মনােভাব জানাইছে সবে,
পাইয়া মায়ের অঙ্ক কুমার যেমন।
ভবানী-মন্দিরে, চারু বিম্ব-তরু-মূলে,
আমন্ত্রণ-অধিবাস হতেছে মাতার ;
বিবিধ নৈবেদ্য গন্ধ পত্র-ফল-ফুলে
হইতেছে যথাশাস্ত্র পূজা অম্বিকার।
শুদ্ধাসনে সৌম্যমুর্তি বসিয়া ব্রাহ্মণ
দিতেছে কুসুমাঞ্জলি ভবানীচরণ।
পিন্ধিয়া লােহিত পট্ট-বস্ত্র-উত্তরীয়,
ল’য়ে প্রিয় পারিষদ, পৃথক আসনে,
অদূরে শিবাজী রাজা বীর-বন্দনীয়
ৰদ্ধাঞ্জলি-কর, বসি এক ধ্যান মনে।
সমাধিস্থ বুঝি সাধু; প্রেমা বয়ানে ;
আসঙ্গে বিষয়-রঙ্গে হইয়া অন্তর,
( ৮৯ )
সমীর বলিদান
ভাব-রাজ্যে নিরন্তর ভকতি-বিমানে
পশিতেছে চিত্ত তার দূর দূরতর।
মজি পদ-কোকনদে নন্দ-দুহিতার
কি আনন্দবসে মগ্ন মনােভৃঙ্গ তাঁর।
ভকতি-বিহ্বল চিত্ত, নেত্র ছল ছল,
রােমাঞ্চিত বীরবপু,-বীরেন্দ্র-নিচয়,
বসিয়া তাহার পাশে নীরব নিশ্চল,
শুনিতেছে বেদমন্ত্র, তন্ময়-হৃদয়।
মৃতসঞ্জীবনী কিবা অমৃত-লহরী,
মন্ত্র-স্বরে প্রত্যেকের বহিছে শিরায় ;
সুললিত সেই স্বরে দেহ পরিহরি,
উদাস মানস-হংস কি জানি কোথায়
উধাও অনন্ত-পথে যেতেছে চলিয়া ;
কমলে মধুপ যেন, সৌরভে মাতিয়া ।
কি ভাব গভীর ! ভীম ভূধর-শিখর
অভ্রভেদী, পদানত দীন দুৰ্ব্বাদল,
চলাচল, জীব, জড়, কানন, প্রান্তর,
চাপল্যের চিহ্ন বিন্দু নাহি কোন স্থল।
সজ্জিত সকল দিকে শ্রেষ্ঠ সৈন্যগণ,
বরিষ্ঠ বারণ সম, মন্থরে ভমিয়া
( ৯০ )
শত সর্গ
নীরবে রক্ষিছে পুরী; সীমা অতিক্রম
করিয়া, তৃণটি ক্ষুদ্র না পড়ে উড়িয়া।
বন্ধ পথে অন্ধকারে কামান ভীষণ,
প্রস্তুত প্রলয়-অগ্নি করিতে বমন।
দুরারােহ গিরিদুর্গ ; উৰ্দ্ধদেশে তার
মাতৃযজ্ঞ-মহােৎসবে মহারাষ্ট্রগণ
আছে যুক্ত যবে মুক্ত আনন্দে অপার,
সদ্ভাবে পরম হেন হইয়া মগন ;
হের, অধােদেশে তবে কিবা দৃশ্য আর ।
জিনিতে প্রবল বৈরী কুচক্র-কৌশলে
হইয়া মোহিত মােহ-মন্ত্রে দুরাশার
পশেছে সে দুরাচার পবিত্র এ স্থলে।
দূত-মুখে শিবাজীর পাইয়া সম্মতি,
এসেছে সন্ধির ছলে সদলে দুৰ্ম্মতি।
ওই দেখ অভিনয়:অভিনব তার।
দুর্গ পাদদেশে ওই বিচিত্র শিবির,
রচিত সুন্দর কিব। অপূর্ব আগার,
বিলাস-ভবন নব যেন নৃপতির।
ঝুলিছে ঝালরে মুক্তা নানারত্নমণি,
যেনরে শারদ-াদে করিয়া শ্রীহীন,
৯১. )
সপ্তমীৱ বলিদান
;
কি দিব্য বিভায় করি উজ্জ্বল অবনী ;
আলােক-আধারে চিত্র বিচিত্র সৌখীন,
জুলিছে বৰ্ত্তিকা শত কিবা সুরভিত ।
ইন্দ্রালয় যেন ভূমে হয়েছে উদিত।
স্তবকে স্তবকে ফুল্ল কুসুম-নিকর
চিত্র-পত্র সনে চারু যতনে গ্রথিত
সজ্জিত বিচিত্র শত তােরণে সুন্দর ;
শােভিছে পতাকা মন্দ-বাত-আন্দোলিত
কেন্দ্রদেশে, স্বরচিত সুদৃশ্য সভায়,
ভীষণ-মূরতি হের ওই সে যবন,
বসি উচ্চাসনে, মজি গভীর চিন্তায়,
‘অদৃষ্ট-তিমিরগর্ভ করে আলােড়ন।
বসি পার্শ্বদেশে তার প্রশান্ত-বদনে
‘কৃষ্ণাজী জপিছে ইষ্ট ‘কৃষ্ণনাম মনে ।
যবন-সৈনিক সপ্ত পদস্থ প্রধান
রচি অর্ধ-চক্র করি উভয়ে বেষ্ঠন,
বসি স্থিরভাবে সবে নিজ নিজ স্থান
অতল ভাবনা-নীরে রয়েছে নগন।
কুভাব-বাতাসে চিত্ত হইয়া চঞ্চল,
সলিলে তরঙ্গ সম, বদনে সবার
( ৯২ )
ষষ্ঠ সর্গ
উঠিছে বিবিধ ভঙ্গী ; কারাে যুগল
উখিত ললাটে, নেত্র ঘুরে চক্রাকার ;
দশন-দংশনে কারাে আরক্ত অধর,
সঘন-নিশ্বাসে স্ফীত নাসিকা-বিবর।
কি জানি কি শােক-মেঘ হৃদয়ে উদিয়া,
উঠিছে ফুটিয়া অশ্রু কাহারাে নয়নে ;
অমনি সে অশ্রুজল ফেলিছে মুছিয়া
লুকায়ে বদন ছলে অতি সংগােপনে।
উদাস-নয়নে কেহ নিরখি আকাশ
বসি চিত্র সম, নেত্রে না পড়ে নিমেষ,
গাঢ় মসী বিষাদের বদনে বিকাশ ;
রাখি শিরঃ করে কেহ চাহিয়া ভূদেশ।
কি যেন আশঙ্কা-মেঘে অলক্ষ্যে সবার
হয়েছে মানসাকাশ ঘাের অন্ধকার।
১৪
শিবির বাহিরে সৈন্য সুসজ্জিত সবে
ধরি অস্ত্র অন্ধকারে সতর্ক সভয়
করিছে শিবির রক্ষা, ভ্রমছে নীরবে ;
দুশ্চিন্তা তাদেরাে বক্ষে লয়েছে আশ্রয়।
বিরাট বদন মেলি বহুল কামান
শ্রেণীবদ্ধ সংস্থাপিত দুর্গ-অভিমুখে,
সঙনীর বলিদান আছে গুপ্ত, জাগাইয়ে ক্ষণে সুপ্ত প্রাণ জ্বালিতে কালাগ্নি স্নিগ্ধ ধরণীর বুকে। ল’য়ে নিই আয়ােজন গােলন্দাজগণ প্রস্তুত পালিতে আজ্ঞা আছে সর্বক্ষণ। পত্রের মর্মর ধ্বনি করিয়া শ্রবণ নিশাচর পশ্বাদির পাদ-সঞ্চরণে, ভাবিয়া বিপদগম ভীত সৈন্যগণ নিরখিছে চারিদিক চাহি ক্ষণে ক্ষণে। পলে পলে অগ্রসর ক্রমে গাঢ়তর হতেছে রজনী যত, দ্বিগুণ দ্বিগুণ, করি দগ্ধ দুষ্টের সে দুরিত-অন্তর, বাড়িতেছে নিরন্তর উদ্বেগ-আগুন। উঠে এই দুরাশার উন্নত-শিখরে, ডুবে ক্ষণে নিরাশার সুতল সাগরে। আকাশ-কুসুমে সুগ্ধ, আশার ছলনে, স্বর্ণ-সিংহাসনে এই বসিছে উঠিয়া ; চূর্ণবক্ষঃ বজ্ৰাধিক নৈরাশ্য-তাড়ণে, কাদি উচ্চে ভূমে পুনঃ পড়িছে লুটিয়া। জাগিয়া দেখিছে স্বপ্ন হতভাগ্যগণ ; প্রণয়িনী-চন্দ্রানন—পীয়ুষ-নিঝর- ( ৯৪ )
ষষ্ঠ সপ্ন
কল্পনা-শয়নে কেহ করিয়া চুম্বন
ভাসিছে সুখের সরে, মােহিত-অন্তর ;
চুম্বে প্রাণপুত্র-মুখ কেহ কুতুহলে,
ভাঙ্গিয়া চমকু ক্ষণে পশে রসাতলে।
•
বৃক্ষকাণ্ডে রাখি শিরঃ কেইবা আবার
করিছে মানস-যুদ্ধ শত্রু-সৈন্য-সনে;
একাকী প্রবল বৈরী করিয়া সংহার
লয়ে ধন-রত্ন-রাশি ফিরিছে ভবনে।
জামে না-জানে না মূঢ়, অলঙ্খ্য নিয়তি,
ধৰ্ম্মের বিচারে সূক্ষ, অদৃষ্টে তাহার,
লিখেছে ললাটে লিপি নিদারুণ অতি
নাচিছে অলক্ষ্যে অহো, অনর্থ অপার ।
জানে না,—তথাপি হায়, কেমন-কেমন
ভারভূত যেন আজি সবাকার মন।
১৮
“কৃষ্ণাজি, বাড়ছে ক্রমে সন্দেহ প্রবল !”
ত্যজি দীর্ঘশ্বাস তবে তুলিয়া বদন,
চাহি পার্শ্বগত জনে, কহে আজ ;-
“কাটি পাশ উড়িল কি বন-বিহঙ্গম ?
কুলক্ষণ এ যে সব ? হলে কি বিফল
সকল ভরসা-আশা, এত পরিশ্রম ?
( ৯৫. )
সপ্তমীৱ বলিদান চতুর সে দরাজ গানে নানা ছল- করিল কি উদঘাটন রহস্য বিষম? সঙ্কল্প নূতন কিছু করিল কি আর? আছে গুপ্ত কিম্বা, কোন অভিসন্ধি তার । ? “কি হেতু বিলম্ব ? আজি, না বুঝি কারণ, নাহি দিল দরশন কি হেতু বর্বর ? রুদ্ধদ্বার দুর্গে বসি করিছে সাধন গুপ্ত মহামন্ত্র কোন্ কুটিল-অন্তর ? এই নীরবতা মহা, শান্তু-ভাব তার, ভীম ঝটিকার পূর্ব-লক্ষণ নিশ্চয় ; আছে অপেক্ষায় দুষ্ট, সুযােগে নিশার আক্ৰমিতে অলক্ষিতে অরি-সৈন্যচয় । আসে কালরাত্রি ওই ক্রমে ভয়ঙ্করী, পাপের প্রশয়-দাত্রী মৃত্যু-সহােদরী! “উপস্থিত সৰ্ব্বনাশ! মহামুখ আমি, করেছি কুঠারাঘাত আপনার পায় ; কুহকিনী দুরাশার হয়ে অনুগামী, মিত্র ভ্রমে, ডাকি মৃত্যু এনেছি ইচ্ছায় ! কি ভ্রান্তি—কি ভ্রান্তি অহাে ! নাহি রক্ষা আর ; ঊর্ণনাভ চক্রজালে পতঙ্গের মত, ( ৯৬ )
মই সর্গ
এ মহা সঙ্কটস্থলে অভেদ্য অপার
হয়েছি আবদ্ধ ; রুদ্ধ পলায়ন-পথ ।
সংকীর্ণ কুটিল অতি আগম নিগম ;
রচি ব্যুহ শৈল-শৃঙ্গ চৌদিকে ভীষণ।
;
“অবিদিত পথ-ঘাট ; বিপুল বাহিনী
অসম্ভব সঞ্চালন সঙ্কীর্ণ এ স্থলে ;
হয়ে পক্ষ বিপক্ষের কাল-নিশীথিনী
অবতীর্ণা তাহে পুনঃ হয়েছে ভূতলে।
এ মহা মহেন্দ্র-যােগে মহারাষ্ট্রগণ
করে প্রজ্জ্বলিত যদি সমর-অনল,
নিশ্চয় নিশ্চয় তবে, তৃণকাষ্ঠ সম
নিশ্চেষ্ট দাড়ায়ে মােরা নিজ নিজ স্থল,
হইব মুহূর্তে হায়, ভস্ম-অবশেষ ;
ফিরিবে না প্রাণী মাত্র বহিতে সন্দেশ।
২২
“কি দেখ কৃষ্ণাজি, আর, হে সামগণ ?
চতুরে চাতুরী তারা খেলেছে নিশ্চয় ;
নিশ্চয় কুচক্র কোন করিয়া সৃজন,
সুযােগের অপেক্ষায় আছে, শুক্ৰচয় ।
কি মহা বিশ্বাসঘাত! প্রতারণা ঘাের !
কি শঠতা !হায় হায়, হঠকারিতায়,
( ৯৭ )
বীৱ বলিদান
মুখতায় মুহূর্তের একমাত্র মাের,
রিয়া পাথার তরী ডুবিল কাণায় !
হস্তগতপ্রায় রত্ন জন্মের মতন
অতল জলধি মাঝে হইল মগন ।
!
‘ডুবিল তা” সহ আশা ভরসা সকল ;
গেল প্রাণ ; গেল মান, চূর্ণ অহঙ্কার ;
এতদিনে বিজাপুর হ’লল৷ হতবল ;
হইল দক্ষিণ বাহু অবচ্ছিন্ন তার!
হা ধিক, হা ধিক, হায়, ফাটে দুঃখে প্রাণ,
এই কি অদৃষ্ট-লিপি !—দুঃসহ সমরে
শত্ৰুশিরঃ লক্ষ লক্ষ দিয়া বলিদান,
জিনি যুদ্ধ, জয়-ধ্বজা তুলিয়া অম্বরে
দেশ-দেশান্তরে কত, আজি এই স্থলে
বদ্ধ বীরসিংহ এই ব্যাধের শৃঙ্খলে !
২৪
“যমজয়ী আজ জগতের ত্রাস,
কঁপে নাম মাত্রে যার বিশ্বভূমণ্ডল,
জভঙ্গে দুর্জয় শত্ৰু ক্ষণে হয় নাশ,
বীর দস্তে বসুন্ধরা যায় রসাতল,-
অতি ক্ষুদ্র কৃমি-কীট পতঙ্গের মত,
মরীচিকা-মায়া-মুগ্ধ কিম্বা মৃগ- প্রায়
( ৯৮ )
-
ষই প
হইবে কি এ কুস্থলে আজি সে নিহত ?
হবে কবরিত এই পৰ্বত-গুহায় ?
হা অভাগ্য।-কাল-চক্রে বীর-কুল-মণি
অতি হেয় দস্যু-হস্তে লুঠিবে ধরণী ?
इल
“দ্দিয়া নিয়তি অহে! পাইয়া সময়,
বুঝেছি নিশ্চয়, বাদ সাধিতে বাসনা;
নহে ভীত কিন্তু, তাহে এ বীর-হৃদয় ;
করিতে বিপন্ন মােরে বিফল কল্পনা।
দেখিবে ত্রিলােক আজ--অমর-অক্ষরে
লিখিব কালের বক্ষে চিত্র ভয়ঙ্কর,
কেমনে জীবন ত্যজে বিধাের সমরে-
শত্রুর শােণিতে উষ্ণ স্নাত বীরবর!
মরিবে বীরের মত বীর আজ
নাশি শত্রু, দহি বন যথা দাবানল!
“উঠাও প্রলয় ঝড় হে:সামগণ,
কঁপাইয়ে গিরিবন বারিধি-অম্বর ;
জ্বাল’ বহি ভীম-তেজে দহিতে ভুবন ;
হও বুদ্ধ বীর-মদে, বদ্ধপরিকর।
এস সবে ; একযােগে কর আক্রমণ ;
জ্বলিত জীমূত-মন্দ্রে, চমকি দুর্জনে,
( ৯৯ )
মা বলিদান
রক্ষিতে পরম সত্য ধৰ্ম্ম সনাতন
কিরূপে সংহার-অস্ত্র ধরিয়াছে বুকে ?
শিশু সুকুমার,-সেও সহাস্য-বদন
ত্যজেছে জীবন, সত্য করেনি লঙ্ঘন ।
“বৃথা এ দুশ্চিন্তা তব প্রলাপ এ সব ?
নহে কাপুরুষ এত শাহাজী-নন্দন ;
অন্যায় আচার তাহে অতি অসম্ভব ;
বীরের হৃদয় নহে কপটী কখন।
এসেছে আনন্দময়ী বঙ্গের ভবনে ;
সায়ং-বােধনে আজি ব্যস্ত হিন্দুগণ ;
আসে নাই আজি শিব তাহারি কারণে,
পাঠা’য়েছে বার্তা,-কালি দিবে দরশন।
কর সন্দেহ আরও দৃঢ়ব্রত,
হবে সিদ্ধিলাভ শীঘ্র সাধনা যেমত।
৩২
বিরত ব্রাহ্মণ। বৃথা পাইয়া আশ্বাস,
ত্যজিয়া গভীর শ্বাস, যবন-প্রধান
লইল আসন পুনঃ; মনে মহাত্রাস
হইল কিঞ্চিৎ যেন ক্রমে তিরােধান।
আশার আলােক ক্ষীণ, আলেয়ার মত,
চমকিল চিত্তাকাশে ঘনঘটাময় ;
( ১০২ )
;
এখনি আলােক, ক্ষণে তম ঘনীভূত,
নহে চিন্তা-মেঘ-মুক্ত কভু কু-হৃদয়।
পশিয়া শয়নকক্ষে কন্টক-শয্যায়
যাপিল যবন নিশা মহা উৎকণ্ঠায়।
দেখিল ঊষার শেষে, তন্দ্রাবেশে ক্ষণ,
স্বপন ভীষণ কিবা,-শ্মশান-চারিণী
উলঙ্গিনী বামা এক, অসিত-বরণ,
বদন বিমুক্ত, জিহ্বা রক্ত-প্রবাহিনী ;
রঞ্জিত শোণিতে শিত অসি বাম-করে,
অন্য করে ছিন্নশিরঃ রুধির-ক্ষরিত,
করে নৃত্য দিগম্বরী, তুলিয়া অম্বরে
মেঘনাদ ভয়ঙ্কর ! ভুবন কম্পিত !
তীত প্রাণভয়ে পাপী উঠিল কঁদিয়া ।
সভয়ে জাগিল সবে প্রমাদ গণিয়া ।
23
.
হয় নাই নি। আহা, দারুণ চিন্তায়,
অমঙ্গল আশঙ্কায় আসন্ন আমরি,
ফিরােজা সুন্দরী বসি অপর শয্যায়
চাহি কাল-চিত্র ভীত-বদন-উপরি ;
সভয়-চীৎকার শুনি এবে অভাগার,
বিকার-প্রলাপ শেষ বুঝিয়া নিশ্চয়,
( ১০৩ )
সমীর বলিদান
ক্ষোভে দুঃখে দিয়া তারে সহস্র ধিক্কার,
গেল চলি বীরবাল ত্যজিয়া আলয়।
ভুজ-সঞ্চালনে ছিন্ন গজ-মুক্তাহার
পড়িল রজত-পাত্রে তুলি ঝনৎকার।
৩৫
স্বপ্নময়ী সেই মেঘনাদিনী ভামিনী
ভাবিয়া তাহারে, মহাভয়ে বীরবর
চাহিয়া ক্ষণে সে ক্রুদ্ধ কালভুজঙ্গিনী,
শঙ্কায় বিষম নেত্র মুদিল সত্ত্বর ;
স্বেদসিক্ত কলেবর সঘন-কম্পনে
সংজ্ঞাহারা-প্রায় ক্ষণে, লুঠিল ধরনী
পালঙ্ক হইতে ; পাপ-কলঙ্ক বদনে
কাল-চিত্ৰ কিবা পুনঃ আঁকিল অমনি ।
সত্ৰাসে সকাশে আসি অনুচরগণ
দেখে দেহ পরশিয়া আছে কি জীবন।
( ১০৪ )
সপ্তম সর্গ।
*
পোহাইল বিভাবরী ; প্রকৃতি সুন্দরী
ল’য়ে কোলে উষা-কন্যা প্রভাত-কুমার,
স্বর্ণকান্তি, সুবিমল, রূপে আলাে করি
লোক-নেত্রে নবভাবে ভাতিল আবার।
আসিল সপ্তাশ্ব-রথে দেব দিনকর
মনােহর প্রকৃতির ; সুবর্ণ ভূষণ
রতন-কাঞ্চন কত কুসুম-নিকর
প্রফুল্ল, পরমানন্দে ভরিয়া ভুবন,
দিল উপহার সতী প্রকৃতি-চরণে;
হাসিল জগত হেরি যুগল রতনে।
প্রাতঃক্রিয়া প্রাতঃসন্ধ্যা করি সমাপন,
বিশুদ্ধ-বসন ভক্ত ভারত-সন্তান
পূত করে পুস্পপাত্র করিয়া গ্রহণ
কুসুম চয়নে সবে করিল প্রয়াণ।
আনে কেহ বিল্বদল, তুলসী নিৰ্ম্মল,
শেফালী, অপরাজিতা, যূথিকা কাঞ্চন,
১৫)
{
সপ্তমীর বলিদান
কৃষ্ণকলি, কৃষ্ণচূড়া, শ্বেত শতদল,
রক্তজবা, করবীর, চম্পক, রঙ্গন।
বসিয়া বিরলে কেহ ফুল ফুলদলে
গাঁথিছে মালিকা মা’র দিতে পদতলে।
নদ নদী সােবরে, শিখরী-নিঝরে
করি পূর্ণ কমণ্ডলু, কুম্ভ নানামত,
আনিয়া বিমল বারি কেহ ক্ষি করে
মন্দির মার্জনে মা’র হইয়াছে রত।
সুপাত্রে, সুপত্রে কিম্বা, পবিত্র হইয়া
রচিছে নৈবেদ্য কেহ নানা ফলমূলে
সুরস সুস্বাদু অতি; আনন্দে ডুবিয়া
ঘষিছে চন্দন চারু কেহ শিলাতলে।
তুলসী চন্দনে কেহ পৃজি শালগ্রামে,
রাখিতেছে মা’র অগ্রে মূল-তত্ত্ব-জ্ঞানে। *
* ইহা ভুলিয়াই জীব মায়াপাশে বদ্ধ হইয়া দুঃখ পায় ।
অসুর-মােহনের জন্য অন্যত্র যে অপর কথা তাহাতে মুগ্ধ না
হইলে, চণ্ডীতেও এই মুলতত্ত্বের সুস্পষ্ট সন্ধান মিলে, মােহ
দূর হয়।” “মহামায়া হরে” এবং “যােগনি। জগৎপতে।”
প্রভৃতি বাক্য তাহাতে লক্ষ্যস্থলে। তাহা সাধুসঙ্গে আলোচ।
তাহার ক্ষেত্র ইহা নহে।
( ১০৬ )
সপ্তম পর্গ 3 না হ’তে অতীত দিবা প্রহর প্রথম, হইল আরম্ভ পূজা শুভ সপ্তমীর। * শুদ্ধচিত্ত শাস্ত্রবিদ্ ব্রাহ্মণ- সম সমাপিলা যথাক্রমে পূজা জননীর। বীরাসনে স্থিরমূৰ্ত্তি বসি বীরগণ, ল’য়ে পত্র-পুষ্পাঞ্জলি শত শত করে দিল ভক্তিভরে মা’র যুগল-চরণ, গাহিয়া পরম বেদমন্ত্র সমস্বরে। রাশি রাশি পত্র-পুষ্প চন্দনচর্চিত পাদপদ্ম বরদার করিল আবৃত। “জয় মা ভবাণী জয়।” --জলদ-নিস্বনে শূরেশ-বদনে শত হইয়া ধ্বনিত, করিল প্লাবিত দুর্গ-পৰ্বত-কাননে, রণবাদ্যে দিগ্বিদিক হলো মুখরিত। শ্রেণীবদ্ধ বীরবৃন্দ উৎসাহে মাতিয়া, হয়ে বদ্ধাঞ্জলি-কর মায়ের সম্মুখে মাগিল বিজয়-বর, বিপক্ষে মথিয়া তুলিতে বিজয়-ধ্বজা ধরণীর বুকে। অদ্য ১৫৮১ শক ১৬১৯ খৃঃ) বিকারী নামক সম্বৎসর আশ্বিনমাস শুক্লপক্ষ সপ্তমী, শুক্রবার।” ছত্রপতি শিবাজী। ( ১০৭ )
সপ্তমীর বলিদান
কাপা’য়ে কৃপাণ-কর কালের কামিনী
দিল বরাভয় ভবে ভূভারহারিণী।
=
জয়-নাদে ঘন ঘন কাপিল মেদিনী ;-
মন্ত্রে মৃত-সঞ্জীবন যেনরে আমরি,
মহাশক্তি কিবা এক বিশ্ব-বিজয়নী
প্রকাশিল স্বপ্রভাব সবার উপরি ।
অশীতি-উত্তর বৃদ্ধ, শিশু সুকুমার,
সাধিতে সর্বস্ব-পণে পরম কল্যাণ,
ধরি অসি বজ্রমু®ে, সাহসে অপার,
করিল প্রতিজ্ঞা দৃঢ় জননীর স্থান ।
নীরব হইল ক্ষণে দুর্গ চারিভিত ;
নমিত দেবীর পদে শিরঃ সংখ্যাতীত।
;
;
নীরব ভবন ক্ষণ ; নীরব প্রাঙ্গন ;
নীরব ভুবন জন সজীব নির্জীব ;
চাহি মুখপানে মা’র, সজল-নয়ন
কহিল তখন ধীরে যােড়-করে শিব :-
“যাই তবে মা আমার,-দে বিদায় রণে !
রচিয়া কুচক্র মনে পাপের কিঙ্কর
শবর পামর প্রবঞ্চনা- আবরণে
আছে গুপ্ত মহাসিংহে বধিতে সত্বর।
( ১০৮ )
সপ্তম:সর্গ
কুহক কুটিল অতি অভেদ্য অপার,
উদ্যত গ্রাসিতে আজি তনয়ে তােমার।
“যাই তবে মা আমার । দ্য দুরাচার,
মােহ-মন্ত্রে দুরাশার হইয়া মােহিত,
কি শক্তি সাহসে এত, দেখি একবার,
জিনিতে তনয়ে তব হয়েছে ধাবিত !
কি বলে প্রবল এত অধৰ্ম্ম মহীতে,
উঠিতে চাহে সে দপে ধৰ্ম্মের আসনে।
চাহে দৈত্য দেবগণে চরণে দলিতে,
বসিতে পাশব-বলে সুর-সিংহাসনে।
দেখি মা, দেবের বাস এই আৰ্যস্থান
কি কুহকে এ কলঙ্কে হেন মজ্জমান !
*
“কেন বা শ্মশান হেন সােনার ভারত
সে বীৰ্য ঐশ্বৰ্য্য মরি, সৌন্দর্য অপার
কেন হীন প্রতিদিন হ’তেছে নিয়ত ;
কেন এ সন্তাপ শত সন্তানে তােমার ?
পশিয়াছে কোন্ ছিদ্রে কি ব্যাধি বিষম
শ্ৰীঅঙ্গে এ ভারতের সদা নিরাময়,,
সুপুষ্পে সুন্দর কীট যেমতি:নির্মম,
নলের শরীরে কলি কিম্বা নিরদয় !-~-
( ১০৯ )
লঙনীর বলিদান
দে বিদায় মা আমার,--দেখি একবার
কি সে ব্যাধি, কি বা যােগ্য ভেষজ তাহার।
;
“জননী গাে,-কি জ্বলন্ বিষের অধিক
জ্বলে নিত্য হু-হু করি অন্তর বাহিরে,
নিরখি নয়নে যবে-ধিক্, শত ধিক্ !-
কলঙ্ক-কলুষ এই ভারত-শরীরে
ততােধিক মাগাে, আর নিরখি যখন,-
শ্ৰীঅঙ্গে সে সুপবিত, ধর্মের নিবাস,
অধৰ্ম্মের এ পীড়ন, অনর্থ বিষম,
নন্দনকানন কাম-পিশাচের বাস!
কি বলিব মা আমার ? বলিবার আর
কি-ই বা আছে গো মা তা চরণে তােমার ?
“দিয়েছ যদ্যপি ভার ইচ্ছায় জননি,
এ গুরু কার্য্যের, অতি অযােগ্য এ করে ;
দে মা শক্তি ভুজ-দণ্ডে দৈত্যনিসূদনি,
ঘােষি তব নাম নাশি অধৰ্ম্ম সমরে।
দেখাই, দেবের বীর্য—আৰ্য্যের সন্তান
নহে অপদার্থ কভু, অণুতে প্রত্যেক
অপ্রমেয় মহা-শক্তি সদা বহমান্ ;
ভ্ৰমান্ধ নয়ন মাগো, ফুটাই বারেক ;
( ১১০ )
A
সপ্তম নগ্ন
ফুৎকারে উড়াই লঘু এ মায়া-বন্ধন,
'বীর-রক্তে এ কলঙ্ক করি মা ক্ষালন।
অত্যাচার কি বিষম, স্বেচ্ছাচার অতি!
নশ্বর শরীরে এই এত অহঙ্কার।
কি ভ্রান্তি, মত্ততা, অহে, দারুণ দুৰ্ম্মতি !
হায়, মা, সহিবি কত এই পাপভার ?
কি বাকী ভারতে আর? পাপের চরম--
নারীনিৰ্যাতন হতে, শােষণ, সংহার,
শঠতা, চাতুরী, চৌর, লুণ্ঠন, পীড়ন,
অবাধে করিছে কেলি কে না বক্ষে তার ?
ধন্য এ ভবন পুণ্য প্রেম সাধনের,
হয়েছে প্রমােদ পুর পাপ-পিশাচের !
“আর না, আর না, মাগাে,-পরিপূর্ণ কাল।
দি না বাড়িতে আর এ পাপ-প্লাবন ;
ডুবিল, ডুবিল সব ; তরঙ্গে উত্তাল
চূর্ণ হলে এ পবিত্ৰ পৰ্ণ-নিকেতন !
দে মা, সে পরম বল পরম আশ্রয়,
একান্ত অভয় এই অসুথ সংসারে ;
কঁদে ওই কোটি কোটি কাতর হৃদয়,
সভয় ভুলিয়া সত্য বিপদ পাথারে।
(১১)
সপ্তমীর বলিদান
বধির হইয়ে মাগাে, থাকিস্ না আর ।
নাশিয়া অধৰ্ম্মে, ক ধর্মের উদ্ধার।”
১৪
বহিল প্রেমাঞ-ধার আয়ত নয়নে ;
ভক্তি-গদ গদ-কণ্ঠে কহিয়া এতেক
লুটিল ভুতলে শিব, মায়ের চরণে;
স্তব্ধ চারিদিক পুনঃ নীরব ক্ষণেক।
তুলিয়া বদন, তবে বীর-শিরােমণি
মহারাষ্ট্র-কুলকেতু, সম্বােধি স্বগণে
শূরশ্রেষ্ঠ, পাপিষ্ঠের সাক্ষাৎ অশনি,
ভাষিল গম্ভীরে পুনঃ মধুর বচনে :-
ভ্রাতৃগণ,-ভারতের সুযোগ্য সন্তান,
কহি কিছু এবে শেষ কর অবধান।
“মহা সন্ধিক্ষণ আজি ভারতেতিহাসে ;
অলস্য নিয়তি, নিত্য বিধির বিধান,
ধৰ্ম, কি অধৰ্ম্ম, কা’র এই পুণ্যবাসে
রচিয়াছে সিংহাসনে সুদৃঢ় সংস্থান,
হইবে প্রত্যক্ষ আজি। দুষ্টা. শক্তি চয়
মহারাষ্ট্র-সিংহ-বলে হয়েছে বিকল
'আছে এখনও যারা অধৰ্ম্মে দুর্জয়
অঙ্গে দুষ্ট ব্রণ সম ভারতে নির্মল,
(১১২)
সপ্তম সর্গ
দর্পী বিজাপুর এই অন্যতম তা’র ;
হবে চূর্ণ-দর্প আজি অস্ত্রে মারাঠার।
“ক্রর আজ ওই কালসর্প জিনি,
বিজাপুর হ’তে সেই লয়ে চক্ৰজাল -
আগত আবাসে, সাথে মত্ত অনীকিনী
রক্তপায়ী পশুসম নিষ্ঠুর ভয়াল ।
ক্ষুব্ধ ব্যাঘ্র সম ওই, সুযােগ চাহিয়া
রয়েছে বসিয়া পাপী, বাসনা প্রবল
মুহূর্তে এ মহাশক্তি ফেলিতে গিলিয়া,
নিবইতে বিশ্বগ্রাসী জঠর-অনল ।
জান সব ভ্রাতৃগণ ; কালক্ষেপে আর
নাহি প্রয়ােজন, করি প্রবন্ধ বিস্তার।
১৭
“হও এবে দৃঢ়তর, ক্ষিপ্রতর সবে ,
রাখি তিলেক দ্বিধা সন্দেহ অন্তরে,
হইয়া নিশ্চয় জয় লভিতে আহবে,
দিতে পাপ-প্রতিফল পাপিষ্ঠ-নিকরে,-
হও অগ্রসর দ্রুত ; উপদেশ মত
কর অধিকৃত ত্বরা নিজ নিজ স্থান ;
দলিতে দুৰ্জ্জনে রণে প্রস্তুত সতত
থাক সবে, স্থির-লক্ষ্য অবিচল-প্রাণ।
( ১১৩ )
সপ্তমীর বলিদান
তিলেক বিলম্ব যেন না হয় কখন,
অবস্থা বুঝিয়া কাৰ্য্য করিতে সাধন।
১৮
“ভেটিব যবনে আজি অপরাহুকালে
ল’য়ে সাথে অনুচর মাত্র দুইজন ;
রাখিব পশ্চাতে আর বন-অন্তরালে
ধারকরী সৈন্যগণে *, যদি প্রয়ােজন।
উৎকর্ণ সতর্ক সদা থাকিবে সকলে ;
জানিলে আভাসে মাত্র বিপদ-সঞ্চার,
বজবেগে অচিরাৎ পড়ি শত্ৰুদলে
চক্ষের পলকে অরি করিবে সংহার।
না হবে পশ্চাৎ কেহ থাকিতে জীবন।
পায় শিক্ষা সমুচিত যেন দুষ্টগণ !
১৯
“কিন্তু সাবধান, ভ্রাতঃ! রাখিও স্মরণ,
যে জন ত্যজিয়া অস্ত্র ভীত প্রাণভয়ে
করিবে চরণে তব আত্ম সমর্পণ,
যাচিবে জীবন-ভিক্ষা ব্যাকুল-হৃদয়ে ;
বিকলাঙ্গ কিম্বা, যেবা বিমুখ সমরে,
কদাপি তাহারে অস্ত্র না কর প্রহার।
* কোকন দেশীয় সৈন্য । ইহার বিশেষ সুশিক্ষিত ও র
দক্ষ ছিল।
( ১১৪ )
সপ্তম সর্গ
যায় প্রাণ-প্রাণাধিক যদি চিরতরে,
গাে-মাতা, বৈষ্ণব, বিপ্র, নারীজাতি আর,
নাহি পায় ব্যথা যেন বিন্দু-পরিমাণ ;-
বীর-ধৰ্ম্ম ভারতের এই ধৰ্ম্মপ্রাণ ।
“ আর এক কথা ভাই ;-যাদি দৈব-বশে
হয় আজি অবসান জীব-লীলা মম ;
হবে বিচল কেহ ; দ্বিগুণ সাহসে,
ধরি ধ্রুব-পন্থা এই, প্রাণ করি পণ,
সমবেগে মহালক্ষ্যে হবে অগ্রসর ;
যােগ্য করে রাজদণ্ড করিয়া অর্পণ,
প্রতিজ্ঞা-পালনে সদা থাকিবে তৎপর
সম্পদে, বিপদে, ভাবি ভবানীচরণ।
ভুলােনা, ভুলােনা ভাই, জাগে যেন মনে
কৰ্ত্তব্য পরম তব জীবনে মরণে।” ;
বিরত হইল বীর। নির্বাক সকল
সজল উজ্জ্বল নেত্রে চাহি তঁার পানে।
অভয়-চরণে পুনঃ ভরসা কেবল,
নমি ভক্তিভরে তবে কায়মনঃ প্রাণে,
হইল উথিত সবে। কি ভাবে মহান
আমরি, নগন আজি হৃদয় সবার !
( ১১৫ )
সমীর বলিদান
কি মূৰ্ত্তি মাতার!-মরি, হয় যেন জ্ঞান,
মহিষমর্দিনী আজি আনন্দে অপার,
দিয়া বরাভয় সুতে সমর-তৎপর,
মাভৈৰ্মাভৈঃ রবে রণে অগ্রসর।
২২
তৃতীয় প্রহর বেলা। দেখিতে দেখিতে,
ক্লান্তদেহ দিনদেব দিবসের শ্রমে,
সুশীতল অস্তাচল আশ্রয় লভিতে
চলিল প্রতীচী-পথে চঞ্চল-গমনে।
গরবিনী ছায়া-সতী ফুলি অভিমানে
প্রতীচী-প্রণয়কামী প্রাণেশে হেরিয়া,
ছুটিল পূরবে, প্রাচী-সুন্দরীর স্থানে,
সমদুঃখে দুঃখী দেহে কাঁদিতে বসিয়া।
প্রকৃতি আপন মনে বসি অবিরত,
কলাইছে বিশ্ব-পটে রঙ্গ, অভিমত।
যবন-শিবিরে হেথা দুর্গ-পাদ-দেশে,
সুদৃশ্য সভার মাঝে, বিচিত্র আসনে,
বসি বীর আফজ সজ্জিত সুবেশে
রত আলাপনে সাধু কৃষ্ণাজীর সনে।
উৎফুল্ল হৃদয় আজি আনন্দে পরম ;
আশার ছলনে মূঢ় কল্পনা-নয়নে
( ১১৬ )
সপ্তম সর্গ
ইষ্ট-সিদ্ধি সন্নিকট করি দরশন,
আঁকিতেছে সুখ-চিত্র কত মনে মনে।
উঠিছে, বসিছে কভু, উদ্বেগে অপার ;
চাহি পথ শিবাজীর আছে দুরাচার।
২৪
ধন্য, ‘আশা’, ধন্য শক্তি, মহিমা তােমার ?
কর রঙ্গ রঙ্গময়ি, কতই ভুবনে!
শিয়রে শমন, মৃত্যু আসন্ন যাহার,
তােমার কুহকময় মধুর বচনে
ভুলে সেও; ভাবে, সুখে করিবে যাপন
কামিনী-কাঞ্চমে মজি আরাে কতদিন।
তােমারি প্রভাবে, তিক্ত বহে গাে জীবন
ভাবী সুখ-আশে ক্লেশে অতি দীন হীন।
তুমিই জীবন-গ্রন্থী জগতে সবার,
ধরি আলাে চাল’ নরে পথে অন্ধকার।
চাহি কৃষ্ণাজীর পানে, নয়নে বিশাল,
হাসিয়া কুটিল হাসি কপিশ অধরে,
করি বস্ত্রাবৃত যত্নে কৃপাণ করাল
কহে বীর আফজ ;-“এতদিন পরে,
সেই বিষ-বল্লী মহা বেষ্টনে বিষম
করি বদ্ধ বিজাপুর-শক্তি-তরুবরে,
( ১১৭ ).
সপ্তমীর বলিদান
বিশুদ্ধ করিতেছিল পেষণে ভীষণ
ঢালিয়া গরল তীব্র অন্তরে অন্তরে,
হয়েছে অদূরবর্তী ধ্বংসকাল তার
ব্যর্থ কবে আফ জলের তীক্ষ্ণ তরবার ?
-
“কৃষ্ণাজি, নিশ্চয় আজি দেখিবে সাক্ষাৎ,
যমের অধিক এই ‘যমাড়, মম
বিশ্রম্ভ-আলাপ-মাঝে উঠি অকস্মাৎ
মাটি কাটি কাল সর্প যেমতি ভীষণ,
কেমনে করিবে খণ্ড ক্ষণে শত্ৰুশির !
হাসি দিয়ে হৃদয়ের ঢাকি হলাহল
বাড়ব-অনলে যথা ঢাকে শীত নীর,
দেখিবে কেমনে করি সঙ্কল্প সফল !
ফিরিবে না আজ আজি কদাচন,
কবােষ্ণ শােণিতে তৃষ্ণা না করি বারণ !”
উল্লাসে আপনহারা, অজ্ঞাতে পামর
গুপ্ত অস্ত্র বস্ত্ৰ হ’তে করিয়া প্রকাশ,
করি আস্ফালন, ভ্রম বুঝিয়া সত্বর
ঢাকিল আবার যত্নে ;-মনে মহা ত্রাস ;--
চাহিল চৌদি ক্ষণে চকিত নয়নে ;
দুরু দুরু করি বক্ষঃ উঠিল কাপিয়া ;
( ১১৮০ )
সপ্তম সগ
হায়রে, অভয় কোথা পাপিষ্ঠের মনে?
লভে শান্তি কোথা পাপ-কলুষিত হিয়া ?
কতক্ষণে, হ’লাে দূর হৃদয়-কম্পন,
লাগিল কহিতে পুনঃ মােহান্ধ যবন :-
২৮
“করেছি যা আয়ােজন, অপূর্ব কৌশলে
যেই মহা মায়াজাল করেছি সৃজন,
হােক সে দুর্জয় দত্যু বলে কিম্বা ছলে,
থাকুক সে পাপিষ্ঠের সহস্র নয়ন,
নিস্তার এ হ’তে আর নাহি কোন ক্রমে।
করিতে পদার্পণ এ-অরি-মণ্ডলে,
ভগ্ন মহীরুহ যথা মত্ত প্রভঞ্জনে
ছিন্নশির দেহ তা'র লুটিবে ভূতলে !
কিন্তু, এ বিলম্ব কেন ?-তৃতীয় প্রহর
নাহি আসে এখনও কি হেতু বর্বর ?”
ধরে ধৈরজ প্রাণ, উঠিয়া আবার
লাগিল দেখিতে পথ যবন-সেনানী :
প্রফুল্ল বদন কভু আনন্দে অপার,
বিবর্ণ সভয়ে ক্ষণে, কি হবে না জানি।
হাসে অট্টহাসি এই বিকাশি দশন ;
ভাবান্তর তখনই,-নয়নে উদাস,
( ১১৯ )
সনীর বলিদান
চিত্র-পুত্তলিকা সম বিচিত্র-অঙ্কন,
শূন্যমনে হতভাগ্য নিরখে আকাশ।
সহকারী সৈন্যগণ যথা-উপদেশ
প্রস্তুত আপন স্থানে পালিতে আদেশ।
Co
“সৈয়দ—সৈয়দ”—ত্যজি সহসা আসন,
ডাকিয়া অনেক যােধে যমদূতাকার,
কহে পাপী আর বার,-“করিয়া ভ্রমণ,
সাবধানে প্রতিস্থান দেখ ত আবার ;
বিন্দু বিসর্গও এক আদেশের মম
করে অতিক্রম কেহ, বিনা বাকাব্যয়ে
কর খণ্ড শির তার! যেন প্রতি জন,
সপি দেহ প্রাণ মন, একান্ত হৃদয়ে,
থাকে অবিচল, করে আদেশ পালন,
মুহূৰ্ত্ত অবধি শেষ, প্রাণ যতক্ষণ।
“প্রচ্ছন্ন কানন-মাঝে, গিরি-গুহা-তলে,
নিকোষ নিশিত অস্ত্র লইয়া উদ্যত,
বীরশ্রেষ্ঠ যােদ্ধা যত তােমরা সকলে
থাক সন্নিকটে মম দৃষ্টিপথ-গত।
নড়ে পাতাটি যেন নিশ্বাস-পবনে,
না পড়ে পলক যেন নয়নে প্রজ্জ্বল,
.
সনসর্গ
••
রাখি স্থির দৃষ্টি লক্ষ্যে, চাহি শুভক্ষণে,
থাক সদা স্বীয় স্থলে অচল অটল
হয় যদি ব্যর্থ মম অর্থ অশনি,
বিষম বিপৎপাত বুঝিবে তখনি ।
“অবিলম্বে ভেদি বন, যমদণ্ড যথা,
লক্ষ্য করি শত্ৰুশির পড়িবে অমনি ;
তুৰ্য্যনাদে সর্বস্থলে ঘােষিয়া বারতা,
দ্বিখণ্ড করিবে দস্যু কঁপায়ে অবনী।
আর এ অশনি যদি না হয় নিস্ফল,
ক্রোধ-বনুি মারাঠার বিশ্ব-গ্রাসকারী,
মিশি তাহে প্রতিহিংসা-অগ্নি মহাবল,
আসিবে পলকে সবে গ্রাসিতে হুঙ্কারি।
কিন্তু সে প্রলয়-দৃশ্যে না হও বিহবল ;
নিবিবে অচিরে শুষ্কপত্রের অনল।
“পতিত পতিরে হেরি, জীবন-বন্ধন,
হৃদয়ে সাহস, শক্তি দেহে মারাঠার,
ভরসা সম্বল এক, আশ্রয় পরম,
হতাশে বিপক্ষকুল হইবে সংহার ;
হলে ছিন্ন মূলদেশ যথা তরুবরে
হয় শুষ্ক ক্ষণে শাখা-পল্লব-নিচয় ;
( ১২১ )
সনীর বলিদান
অথবা গ্রাসিলে রাহু যথা দিনকরে,
হয় বিশ্ব-চরাচর অন্ধকারময়।
যাও ত্বরা, নাহি ভয়, নাহি চিন্তা আর,
শেষদিন সৌভাগ্যের আজি মারাঠার।”
৩৪
কুটি ভীষণ মূর্তি, নেত্রে হলাহল,
কহিয়া এতেক বীর, ব্যস্তভাবে অতি
লইতে আসন পুনঃ, সহসা চঞ্চল
দেখিল পশ্চাৎ চাহি;-আসি ত্বরা-গতি,
দাড়াল ‘কুর্নিস্ করি দূত একজন ;
করিল জ্ঞাপন-“হের, হে বাহিনীপতি,
অদূরে শিবাজী রাজা করে আগমন !
ভেদি শূন্য-পথ দীপ্ত দম্ভোলি যেমতি,
সারােহী তুরঙ্গ-ত্রয় তুঙ্গ শৃঙ্গ সম
আসিছে এদিকে ওই, ভীম-পরাক্রম!”
;
৩৫
মহা ব্যস্ততার স্রোত বহিল চৌদিকে ;
“আসিছে শিবাজী রাজা ?”—অতি অল্পক্ষণে
প্রচারিত প্রতিস্থানে হ’লল মুখে মুখে,
তুলি’ বিভীষিকা-চিত্র সবার বদনে।
নিশা-জাগরণে শ্লথ-ভুজ সৈন্যগণ,
চমকি সহসা, আঁখি মেলি নিদ্রাল,
সপ্তম পর্গ
সাপটি ধরিল দৃঢ় করে প্রহরণ ;
জাগিল স্তিমিত বীৰ্য্য শরীরে অবশ।
দেখাইয়ে শান্তভাব সবে নত শিরে,
চাহিয়া সুযােগ স্থির শিবির-বাহিরে।
সতর্ক অদূরে থাকি, সেনানী-আদেশে,
লক্ষ্য করি সভাতল সামন্ত-মণ্ডলী
হইল প্রস্তুত ত্বরা ; অরণ্য-প্রদেশে
গুপ্ত কে কোথায়, যেন সুপ্ত বনস্থলী।
শূন্য সভাতল, মাত্র দুই চারি জন
‘কৃষ্ণজীভাস্কর’ আদি, বসি মধ্যস্থলে,
আছে আফজলের পাশে চকিত:নয়ন।
শুনিয়া সংবাদ ব্যস্ত উঠিল সকলে।
বজমুষ্টে বস্ত্রাবৃত অটিয়া কৃপাণ
দাড়াল সম্মুখে ব্যগ্র যবন-প্রধান।
তুলি উচ্চ প্রতিধ্বনি কাননে করে
উঠিল সঘনে গুরু অশ্ব-পদ-ধ্বনি ;
কাপায়ে কান্তার-ভূমি আসিয়া সত্ত্বরে
মিলিল তােরণ-দ্বারে আর্য-বীরু-মণি;
‘সম্ভাজী কাবাজী’ ‘জীউমহল’-যুগল
বীরসিংহ মহাবল, প্রিয় পার্শ্বচর,
( ১২৩ )
সঙনীর বলিদান
উতরিল আসি দ্রুত ; উরি’ ভূমিতল,
লইয়া প্রভুরে অগ্রে হ’লাে অগ্রসর।
নিস্তব্ধ, নীরব সব, প্রান্তর, শিবির,
ভীম ঝটিকার পূর্বে যথা সিন্ধুনীর।
৩৮
পড়িল ত্রিশূল-ছায়া সহসা ভূতলে
ভয়ঙ্করী ; আমােদিত করিল কানন
স্বর্গীয় সুরভি কোন্ !-নয়ন-কমলে
চাহি উর্দ্ধে নৃপবর করিল দর্শন
ভুবন-মােহন দৃশ্য ! দৈত্য-নিসূদনী
জগতজননী জয়া মুক্তকেশ করি,
বাঁধি কটী রক্তাম্বরে, বিদ্যুৎ-বরণী,
শােভিছে, অম্বর-পটে মহাসিংহহাপরি ;
করে শূল ভীমতম করি সঞ্চালন
মাভৈৰ্মাভৈঃ শব্দে ভরিছে ভুবন !
রােমাঞ্চিত কলেবরে, ভক্তিভরে অতি
বন্দি পদ যুক্তকরে অভয়া মাতার,
পশিল নির্ভয়ে সভাতলে নরপতি ;
মােহিত যবন, ভাবি সম্মান তাহার।
উল্লাসে অপার, শত্রু হেরি করত,
পারি সহিতে আর তিলমাত্র ব্যাজ,
( ১২৪ )
সপ্তম সর্গ
চাহি বনেত্রে, দূর হেরি পারাবত,
ধাইল আজ, শূন্যে উড়ে যথা বাজ ;
“স্বাগত শিবাজী রাজা!”-কহি অকস্মাৎ,
'আলিঙ্গন-ছলে খড়গ হানিল নির্ঘাত ।
৪o
বন্মে প্রতিহত অস্ত্র ফিরিল নিস্ফল
জালিয়া অনল শুধু; স্ফুলিঙ্গ যেমন
উঠে লৌহ-দণ্ডাঘাতে পাষাণে শীতল।
গজ্জিল নৃপেন্দ্র ক্রুদ্ধ আরক্ত-বদন :-
“ধিক ধূর্ত আজ, বিশ্বাসঘাতক।
উপযুক্ত প্রতিফল লহ এইবার।”
পড়িতে পরক্ষণে চক্ষের পলক,
চমকি দুরন্তে, দুই করে তীক্ষ্ণধার
‘বিচরিয়া’ ‘বাঘনখ’ + ধরি ভয়ঙ্কর
করিল বিদীর্ণ তার হৃদয়-উদর !
৪১
করিল চীৎকার ঘাের যবন-রাক্ষস
“রক্ষা কর, রক্ষা কর, কে আছ কোথায় ?”
ধরি শেষ অস্ত্র পুনঃ শরীরে অবশ
করিল প্রহার বেগে বিপক্ষের কায়।
বৃশ্চিকাকতি কৰ্ত্তরিকা ( ছুরিকা)।
* ব্যাঘ্ৰনখাকৃতি অস্ত্র বিশেষ।
( ১২৫ )
সপ্তমীর বলিদান কাটিয়া কিঞ্চিৎ বৰ্ম্ম সে প্রহারে এবে হলাে অস্ত্র করচ্যুতবিফল-প্রয়াস। তুলিয়া “ভবাণী” # ভীম কোষমুক্ত তবে মুহূর্তে শিবাজী ধূৰ্তে করিল বিনাশ ! পড়িতে ছিন্ন শির ভুতল চুম্বিয়া, ধরিল ‘কাবাজী কেশে উল্লাসে গড্ডিয়া । ৪২ ‘জয়, মা ভবানী জয়!”—সিন্ধু-গরজনে শৃঙ্গে শৃঙ্গে শত কণ্ঠে হইল ধ্বনিত। ০ * ‘ভবাণী’—শিবাজীর বিখ্যাত তরবারীর নাম। যবন- সেনাপতির দুরভিসন্ধি বিশেষরূপ অবগত হইয়া, কূট রাজনীতি বিশারদ সূক্ষ্মদর্শী সুচতুর শিবাজী, আত্মরক্ষার জন্য, গুপ্ত ভাবে এই অস্ত্র গুলি ধারণ করিয়া এবং দৃঢ় বর্মে আবৃত হইয়া যবন- শিবিরে আগমন করিয়াছিলেন। * আফজল খ শিবাজীকে আলিঙ্গন করিতে অগ্রসর হন এবং গুপ্ত অস্ত্র দ্বারা তাঁহার বধসাধনের চেষ্টা করেন। সুচতুর শিবাজী মুহূর্ত মধ্যে হস্তস্থিত বাঘনখদ্বারা তাহার উদর এবং কত্তরিকা দ্বারা বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া সেই অবস্থায় তাহাকে সংহার করিলেন। * তিনি প্রতাপগড়ে তাহার মৃতদেহ সমাধি করিয়াছিলেন। সে সমাধি এখনও আছে , ( বিশ্বকোষ ১৫)। ( ১২৬ )
সপ্তম সর্গ
•
ছুটিল সৈয়দপগু’ ‘গােবিন্দের’ ৭ সনে
নিরখি নিহত পতি ভূমি-বিলুষ্ঠিত।
লক্ষ্য শির শিবাজীর ;-কালান্তক প্রায়
তুলিল ‘সৈয়দ’ অস্ত্র বিকট-আকার ;
অমনি পড়িয়া লক্ষে পলকে তথায়
একাঘাতে ‘জীউ তারে করিল সংহার।
তুলিতে তীক্ষ্ণ অসি ‘গােবিন্দ’ তখন,
ধরিল শিবাজী তারে ব্যাঘ্রের মতন ;
কহিলা গম্ভীরে—“বীর,হে দ্বিজসত্তম,
অদণ্ড্য অবধ্য তুমি, শিরােধার্য্য-ধন ;
যাও গৃহে। কর সদা স্বধর্ম পালন।
পরধর্ম ভয়াবহ ; বৃথা পরিশ্রম?”
ইনি বিজাপুরের জনৈক পাঠান।
+ ইনি জনৈক ব্রাহ্মণ যােদ্ধা। উভয়েই সমরকুশল মহাবীর।
পুরাকাল হইতে দেখা যায় অনেক ব্রাহ্মণও ক্ষত্ৰ-ব্ৰত গ্রহণ
করিয়াছিলেন। প্রবল পূৰ্ব্বসংস্কারই ইহার কারণ। জগতে
জীবের বিভিন্ন গতি এইরূপেই সম্ভবে। স্বভাব-বশেই জীব
কর্মপর; সেই স্বভাবই সংস্কার ! জন্মমৃত্যুপথে, এক হইতে অন্য
ক্ষেত্রে জীব ইহাই লইয়া যায়। “গৃহীতৃৈতানি সংযাতি বায়ুর্গন্ধ।
নিবাশয়াৎ। শ্রীগীতা ১৫৮ “কারণং গুণসঙ্গেহস্য সদস
যােনিজন্ম ।* শ্রীগীতা ১৩২১
( ১২৭ )
সপ্তমীর বলিদান
বাহিরিল বীর-ত্রয় ত্যজিয়া শিবির
তড়িৎগমনে; ক্ষণে, স্বপনে যেমন,
সাধি কাৰ্য, মহােল্লাসে লয়ে শত্ৰুশির,
আরােহি তুরঙ্গে বেগে হলাে অদর্শন।
কৃষ্ণাজী গােবিন্দসহ গাহি কৃষ্ণনাম,
সুযােগ বুঝিয়া বনে হলো অন্তর্ধান ।
১২৮ )
অষ্টম সর্গ।
সফল সঙ্কল্প এবে, পূর্ণ মনস্কাম ;
পবিত্র-হৃদয়ে শিব, আনন্দে পরম,
ল’য়ে ছিন্ন শত্ৰুশিরঃ, রক্তে করি স্নান,
পশি দুর্গে দ্রুতগতি, সবার প্রথম
পাদপদ্মে ভবানীর করিলা প্রণাম।
ধন্য আফ, জল, ! হের, বিধি বিধাতার ।
পাপ-জন্ম হতে পাপী পাইল রে ত্রাণ ;
বীরাচারে আজি মহা নৈবেদ্য, তাহার
পাপাঙ্গ, গঙ্গার জলে করাইয়ে স্নান ;
দেবী-পদে পুরােহিত দিল বলিদান।
শঙ্খ ঘণ্টা ঘাের রােলে উঠিল বাজিয়া,
মিশি বাদ্যভাণ্ড-সহ, ভেদিয়া গগন।
লভি’ আজ্ঞা অমনিই, সময় বুঝিয়া,
কামানে পলিতা দিল দুর্গ-বাসি-গণ।
কাপাইয়ে গিরি-দুর্গ, কপায়ে কানন,
একবারে শত শত ভীষণ কামান
( ১২৯
)
সমীর বলিদান
জ্বালিল প্রলয়-অগ্নি দহিতে ভুবন ;
ভূকম্পে যেমন, ভূমি হ’লল কম্পমান।
উঠিল যবন-সৈন্যে ঘাের হাহাকার ;
মৃত্যুর ভীষণ মূৰ্ত্তি সম্মুখে সবার।
“জয় মা ভবানী জয় ! - জয় শিবাজীর!”
গরজি বিকট রবে,
পাইয়া সঙ্কেত তবে,
হইল ধাবিত যত মহারাষ্ট্র-বীর।
“জয় মা ভবানী জয়-জয় শিবাজীর !”
শুনিল যবন কাণে,
বজাধিক বাজে প্রাণে,
কি করিবে এখনও নাহি হয় স্থির।
বিল সকল বীর চিত্রের মতন,
চাহি মুখ পরস্পর,
কাপে ভয়ে থর থর,
নাহিক উপায় আর,—নিকট শমন।
( ১৩০ )
অষ্টম সর্গ
সাগর-তরঙ্গ সম প্লাবিয়া মথিয়া
পর্বত প্রান্তর বন,
প্রবল বিপক্ষ-গণ,
প্রলয়-প্লাবন-বেগে আসিছে ছুটিয়া।
হুঙ্কারে বধির কর্ণ, পূর্ণ দিকচয় ;
পশু পক্ষি জীবকুল
ভেদি বন ভয়াকুল,
হতেছে ধাৰিত দ্রুত ত্যজিয়া আলয়।
কি হয়, কি হয়,—আজি হয় সর্বনাশ।
ভাবিয়া না কূল পায়,
অকূলে আকুল হায়,
নিশ্চল যবন-সৈন্য হইয়া হতাশ।
যাই পলাইয়া'—ভয়ে ভাবে একবার,
চমকি চৌদিকে চায়,
কই পথ ?– ভীম-কায়
আসে শত্রু-সৈন্য, করে মুক্ত তরবার।
( ১৩১ )
সপ্তমীর বলিদান
সহে বিলম্ব আর ; বিপক্ষ-কৃপাণ
এখনি পশিবে অঙ্গে ;
শােণিত-তরঙ্গে রঙ্গে
প্রাণশূন্য শব-দেহ হবে ভাসমান।
১১
ফুরাবে-ফুরাবে হায়, এখনি সকল,
আশা তৃষা অহঙ্কার ;
হবে বিশ্ব অন্ধকার !
স্বরােপিত বিষবৃক্ষে ফলেছে গরল।
সম্মুখে সংহার মূর্তি নাচিছে ভীষণ।
নহে তুল্য ক্ষুদ্র পল
এবে বিশ্ব ভূমণ্ডল,
পাদ মাত্র ব্যবধান জীবন মরণ।
“কি করিস্-কি করিস, আরে মূখগণ !”-
কোমলে কঠোর ধ্বনি,
নূতন প্রমাদ গণি,
শুনিল সমীপে ভীত সহসা যবন ।
( ১৩২ )
অষ্টম সর্গ
চমকি চাহিল সবে চকিত নয়নে,
বিস্ময়ে ডুবিল মন,
দৃশ্য বিশ্ব-বিমােহন,
জাগিল নবীন আশা হতাশ জীবনে।
১৫
বীর-বেশ বাম এক অনল-বরণী
শিবির বাহিরে বেগে
আসি সৈন্য-পুয়ােভাগে
কহিল মধুরে উগ্র মৃতসঞ্জীবনী :-
“কি করি—কি করিস্, আরে মূখগণ ?
কাপুরুষ কুলাঙ্গার,
ধরনীর পাপ-ভার
বাড়াইতে শুধু কিরে তােদর জনম ?
“কি করি—কি করিস, আরে মুখগণ !
এখনাে দাড়ায়ে স্থির
অবনত করি শির,
প্রস্তর-গঠিত জড় মুরতি মতন ?
সপ্তমীর বলিদান
১৮
“কি ভাবিছ এখনও নীরবে এমন ?
আসন্ন মরণ-কাল,
শত্রুসৈন্য সুবিশাল
আসিছে হুঙ্কারি, তবু এত অন্যমন?
“বিপদে বিহ্বল ওরে, হলি কি সকল ?
সিংহ-নাদে ফেরু-সম
করি পুচ্ছ আকুঞ্চন,
ইচ্ছা আত্মদানে কিম্বা শত্রু-পদতল ?
২০
“ভুলি বীৰ্য বাহুবল গৌরব সম্মান,
কৰ্ত্তব্য চরণে দলি,
দিয়া ধৰ্ম্মে জলাঞ্জলি,-
ধিক শত-চাই কিরে রাখিবারে প্রাণ?
“রাখি হেন প্রাণ ওরে, কি পৌরুষ ব ?
সে প্রাণে বাঁচিয়া আর
ফিরিতে কি নিজাগার
হয়েছে বাসনা আজি এতই প্রবল ?
( ১৩৪ )
অষ্টম লগ
২২
“নিশ্চয় বুঝেছ ভুল ;-বৃথা আকিঞ্চন,-
জীবন থাকিতে দেহে
না পাবে ফিরিতে গেহে,
পাবে করিতে কেহ আত্মসমর্পণ।
“থাকিতে শশাণিত বিন্দু এ দেহে আমার,
করতলে এই অসি,
এ গাঢ় কলঙ্ক-মসি
দিব না দিব না দিতে বদনে মাতার!
“কি হয়েছে ?কেন এত হতেছ বিহবল ?
কিসের অভাব তব ?
আছে তাে প্রস্তুত সৰ,
প্রচুর রণ-সম্ভার-ধন
২৫
“মরিয়াছে আফজল ?-হয়েছে উত্তম।
কাপুরুষ কুলাঙ্গার,
মৃত্যুই মঙ্গল তার ;
শত-আফজল-শক্তি ধরে বাহু মম !
১৩৫ )
সনীর বলিদান
“লইলাম আমি তব সেনানীর ভার ।
নিশ্চয় জিনিব রণ,
দেখিবে জগত-জন
পাঠান-রমণী নহে পুতুল ক্রীড়ার ।
“কি চিন্তা, কি ভয়, বীর, বীরের সন্তান,
বিশ্ব-জয়ী তব বল ;
চূর্ণ হবে চলাচল,
বারেক উঠিয়া সবে ধর রে কৃপাণ ।
২৮
সজ্জিত সংহারে হের অসংখ্য কামান,
রহিয়াছে ওই স্থির,
সমরে অজেয় বীর
অসংখ্য নিষাদি সাদি পদাতিক-গ্রাম।
“উঠ, উঠ, উঠ ত্বরা,—পল মাত্র আর
কর অযথা ক্ষয়,
এখনাে অাছে সময়,
ও বৃহবদ্ধ, কর মুক্ত তরবার।
১৩৬ )
অষ্টম সর্গ
‘জালহ কামান-যাও গােলন্দাজ-গণ,
কর সব সমতল
গিরি দুর্গ জল স্থল,
শত্রুর চিহ্নটি মাত্র না থাকে যেমন ।
“দীপ্ত গােল রাশি রাশি, উল্কপিও প্রায়,
শ্রাবণের ধারা সম
কর বেগে বরিষণ,
চূর্ণ করি গিরিদুর্গ মিশাও ধরায় !
“দীন’ ‘দীন রবে সবে বিদারি অম্বর,
কর অস্ত্র সঞ্চালন ;
আছে তারা কয় জন ?
ফুৎকারে তুলার রাশি উড়াও সত্বর।”
নীরবিল বীর-বাল। ; নয়ন-কমল
অনল উদগার করি
সবার জড়তা হরি,
নির্বাপিত তেজঙ্গুি জ্বলিল প্রবল।
( ১৩৭ )
সঙনীৱ বলিদান
৩৪
ধন্য রে পাঠান-নারী ফিরােজা সুন্দরী।
রাজপুত-প্রিয়া সম
তাের এই পরাক্রম,
গাহিবে জগত-জন দিবস-শর্বরী।
ঝন্ ঝন্ ঝন্ রবে উঠিল তখনি
নিকোষ কৃপাণ শত
খেলিয়া বিজলী দ্রুত
মেলি ফণা পদাহত যথ। কালফুণী।
অকাল-প্রলয়ে যেন ডুবাতে ধরণী,
তা সহ, ভীষণাকার
ধূমে করি অন্ধকার
গঞ্জিল কামান-শ্রেণী তুলি প্রতিধ্বনি।
সাজিল ধবন পুনঃ সমরে দুর্বার ;
রােহিঙ্গা পাঠান বীর
আবব সমরে স্থির,
উৎসাহে দ্বিগুণ রণে মাতিল আবার।
( ১৩৮
অষ্টম সর্গ
“জয় মা ভবানী জয়।”—ভেদি গিরি-বন,
চমকিয়া চরাচর,
তুলিয়া গভীর স্বর,
ছুটিল চোদিক হ’তে মহারাষ্ট্রগণ।
নাদিল আবার দুর্গে ভীষণ কামান ;
;
দুঃসহ গােলার দায়
ভূমে গড়াগড়ি যায়
অসংখ্য যবন বীর ত্যজিয়া পরাণ।
ao
করি-কুম্ভে পড়ে লক্ষে কেশরী যেমন,
ধরি শূল শেল অসি,
বেগে বৃহ-মধ্যে পশি
নাশে শত্রু ক্ষণে শত আৰ্য্য বীরগণ।
গর্জে ‘দীন’ ‘দীন রবে যবন-মগুলী,
করে রণ প্রাণপণে,
না পারে আঁটিতে রণে
ধর্মপ্রাণ বীরগণে সমর-কুশলী।
( ১৩৯
)
সপ্তমীর বলিদান
8
নাচিছে অসংখ্য অসি বিকাশি বিদ্যুৎ,
ধাইছে শাণিত শূল,
তরু যথা ছিন্নমূল
পড়ে সৈন্য, রণরঙ্গ দেখায়ে অদ্ভুত।
ছুটিছে শায়ক পুঞ্জ রবি-রশ্মি-প্রায় ;
যবন ধামুকী যত
স্থির-লক্ষ্য, অবিরত
হানে বাণ,—শক্ৰবৰ্ম্মে গুড়া হয়ে যায় ।
শত চেষ্টা যবনের হতেছে নিষ্ফল ;
শতেক যবন যবে
ত্যজিছে জীবন, তৰে
একটি মারাঠা কোথা লুটিছে ভূতল।
35
বাজিল দ্বিগুণ পুনঃ প্রলয়-বিষাণ ;
চূর্ণ করি চরাচর
আরশিল ভয়ঙ্কর
অগ্নিবৃষ্টি যবনের বিরাট কামান।
( ১৪০ )
অষ্টম পর্গ মারাঠা ত্রিংশৎ তাহে হ’লল ভূপতিত ; হেরি, ক্রোধে কম্পমান, করে খড়গ খরসান, ‘নেতাজী’ কাটিয়া শত্রু হইল ধাবিত। ৪৭ “সাবধান নরাধম!”-অশনি-গর্জন- বামাকণ্ঠে ভীম রব সহসা শুনিল সব, চমকি চাহিল,—চিত্র অপূর্ব-দর্শন ! ৪৮ যবন-কামান শ্রেণী করি অধিকার দাড়ায়ে নেতাজী স্থির দুর্জয়-মারাঠা-বীর ; রক্ত আঁখি বীরাঙ্গনা সম্মুখে তাহার, ৪৯ অসি আস্ফালিয়া, শূরে করিয়া আহ্বান, গজ্জিতেছে ঘন ঘন-- “সাবধান নরাধম ! ত্যহ কামান কিম্বা ত্যজহ পরাণ।” ( ১৪১
সপ্তমীর বলিদান
co
রাজ-আজ্ঞা,-নারী-অঙ্গে নিষেধ প্রহার ;
নিরুপায় বীরবর,
সাবধানে তুলি কর
রােধিছে অস্ত্রেতে শুধু অস্ত্রটি তাহার ।
উড়ে কেশ বেশ তার মরি, কি সুন্দর।
নিতম্বের কি কম্পন,
করে খেলা কি নয়ন ।
হৃদয়ে বসিয়া মার নিজে হানে শর।
রণরঙ্গ রমণীর
ভুবন-মোহন ;
কে পুরুষ বলবান্
তাহে না হারায় জ্ঞান,
নাহি করে আত্মদান সে রাঙ্গাচরণ ?
কঠোর অতীব কিন্তু মারাঠার প্রাণ ;
স্বধৰ্ম্মের সেবা তরে
ধরে অস্ত্র যেবা করে
রমণী-ভঙ্গে কভু না হারায় জ্ঞান।
( ১৪২ )
অষ্টম সর্গ
58
চক্ষের পলকে বীর লভি অবসর,
নিরস্ত্র করি বামারে
দিয়া রক্ষি-করে তারে,
হুঙ্কারে বিজয়-বাৰ্তা ঘােষিল সত্ত্বর।
ছত্রভঙ্গ হ’লাে ক্ষণে হতাশ যবন ;
নাহি আশ ক্ষুদ্র আর,
অবরুদ্ধ চারি ধার,
অবাধ কেবল দ্বার শমন-সদন।
“জয় মা ভবাণী জয়।”—সঘনে আবার
গজ্জিল ভকত-সবে ;
ডাকিল গভীর-রবে
‘মেরােপ মহাবীর সম্মুখে সবার।
৫৭
“শােরে যবন, শােন্,—বৃথা চেষ্টা আর,
বৃথা এ জীবন-ক্ষয়,
দিব। রাত্র আজো হয়,
অধৰ্ম্মে প্রতিষ্ঠা লাভ স্বপন নিশার ।
১৪৩ )
সপ্তমীর বলিদান
৫৮
“এখনো জীবিত যারা, চাহ যদি প্রাণ,
ত্যঙ্গ অস্ত্র, নাহি ভয়,
দিব ত্রাণ সুনিশ্চয় ;
মারাঠা বিজিত জনে করে বন্ধু আন।”
বীরের সন্তান যারা তথাপি অটল,
এখনো মাগিছে রণ,
করিয়াছে প্রাণ-পণ
কি করিবে কিন্তু, আর, ক্রমে হীনবল।
•
তুলিতে অস্ত্র এবে, মারাঠা-নিচয়
হশেষ শত্রুগণে
করি বন্দী অল্পক্ষণে,
তুলিল আনন্দ-ধ্বনি লভিয়া বিজয়।
অতীত প্রহর নিশা; শশাঙ্ক-কিরণে
হাসিতেছে গিরি-বন;
প্রবাহিত সুপবন
জয়বাৰ্তা ভারতের ঘােযিল ভুবনে।
( ১৪৪ )
সপ্তম পর্গ
হরিধ্বনি দিয়া ক্ষণে ‘কৃষ্ণাজী-ভাস্কর’
আসিল গােবিন্দ’ সনে ;
নিল রাজা সযতনে ;
মলমুক্ত মহানিধি শােভিল ভাস্বর ।
সম্পূর্ণ।
( ১৪৫ )
No text on this page.
বিজ্ঞাপন। গ্রন্থকার কবি-কৃষ্ণামৃতের প্রকাশিত গ্রন্থ ও তাহার সংক্ষেপ পরিচয়। ১। শ্ৰীসচ্চিদানন্দ গীতা। নানাবিধ মধুর মিছন্দে পরমার্থ-পথারূঢ় পরম ভক্তের আত্মকথা। প্রায় সমস্ত সংবাদ পত্র ও পত্রিকায় প্রশংসিত। মূল্য ।। ২। পাপের প্রায়শ্চিত্ত। গদ্য কাব্য। পরম ভাগবত মহারাজ অম্বরীষের উপাখ্যান অবলম্বনে ভাগবত-ধৰ্ম্মানুশীলন। ইহাও সন-তােষিণী, ভক্তি, শ্রীগৌরাঙ্গ সেবক প্রভৃতি পত্রিকায় এবং বঙ্গ- বাসী, বসুমতী ও হিতবাদী প্রমুখ সংবাদ পত্র সমূহে উচ্চ প্রশংসা প্রাপ্ত হইয়াছে। ভক্তগণ ইহা পাঠ করিয়া পরমানন্দ লাভ করিয়াছেন। ইহার ভাষা ভক্তিরসে মাখান। মূল্য - স্থলে ।। ৩। কাব্যকলাপ। ইহার উচ্চ প্রশংসাপূর্ণ সমালােচনা কেবল মাত্র 'আদি সংবাদ পত্র বঙ্গবাসীতেই বাহির হইয়াছিল। ইহাতে ‘ভক্তিতে প্রকাশিত “কুরুক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ”; ‘ঐতিহাসিক চিত্রে প্রকাশিত “স্নেহালিঙ্গন” (শক্তসিংহ ও প্রতাপ সিংহের মিলন কাহিনী) প্রভৃতি কয়েকটি চমৎকার খণ্ড কাব্য ছিল। ইহা এখন আর ছাপা নাই। শীঘ্র পরিবর্ধিত আকারে প্রকাশিত হইবে। ৪। শ্রীকৃষ্ণকুসুমাঞ্জলি। শ্রীমদ্ভাগবতের পঞ্চাশটি প্রাণস্পর্শী শ্লোক অবলম্বনে ভক্তিপূর্ণ কবিতাবলী। পাঠ করিতে করিতে ভক্ত-হৃদয় আনন্দে নৃত্য করিবে। সুন্দর বাঁধান। হাফ টো চিত্র সম্বলিত । মূল্য ১া।
( ২ ) ৫। সপ্তমীর বলিদান। মহারাষ্ট্রকেশরী রাজা শিবাজী ও আফজল খায়ের যুদ্ধ। “পলাশীর যুদ্ধের পর এমন কাব্য আর হয় নাই। সুন্দর বাধান ও হাফটোন চিত্রযুক্ত। মূল্য ১১। এবং জেলবাইণ্ডিং প্রতি খণ্ড মূল্য ১। (৬। ভবের খেলা। অভিনব উপন্যাস। শীঘ্র প্রকাশিত হইবে।) ' প্রধান প্রধান পুস্তকালয়ে প্রাপ্তব্য। প্রাপ্তিস্থান- বরেন্দ্র লাইব্রেরী, ২• ৪ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা। ইণ্ডিয়ান পবলিশিং হাউস, ২২-১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা। ছাত্র-পুস্তকালয়, নিবেদিতা লেন, বাগবাজার, কলিকাতা। সংস্কৃত-বুক-ডিপাে, ২৮১ নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা। সাধনা লাইব্রেরী, ২৩১৩ নং ক্যানিং স্ট্রীট, কলিকাতা। অল-ইণ্ডিয়ান পলিশিং কোং, লিমিটেড, ৩• নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট, কলিকা। জ্ঞাতব্য বিষয় নিম্ন ঠিকানায় জানিতে পারিবেন। এই নভেলখানি কাত্যায়নী মেসিন যন্ত্রে মুদ্রিত হইতেছে । ‘সপ্তমীর বলিদান’ প্রকাশক- শ্রহেরম্ব জীবন চট্টোপাধ্যায় (গােস্বামী) বাঁশবেড়িয়া (হুগলী)। ই
No text on this page.