Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Farashe-beerangana Ed.1st

Guha,nagendrakumar · 2010/01/8

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

নারী-গৌরব-গ্রন্থাবলী—প্রথম ভাগ। (ঐতিহাসিক),
ফরাসী-বীরাঙ্গনা
( জোয়ান্ দার্কের জীবন-চরিত ও কাৰ্যকলাপ)।
শ্রীনগেন্দ্রকুমার গুহ রায়-
প্রণীত।
কলিকাতা
১৫ নং কলেজ স্কোয়ার
চক্রবর্ত্তী-চাটার্জী কোং হইতে
অহীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এ, এস, সি,,
কর্তৃক প্রকাশিত।
সৰ্বস্বত্ব সংরক্ষিত ]
মূল্য ১১ এক টা

প্রিন্টার
শ্রীআশুতােষ বন্দ্যোপাধ্যায়
=====
প্রথম সংস্করণ।
“মোফ, প্রিন্টিং ওয়ার্কস্”
৩৪ নং মেছুয়াবাজার ঐট, কলিকাতা।

উৎসর্গ।
যে মহাপুরুষ সনাতন ধর্মের উদ্ধার মাসে
ধন-সম্পদ, প্রিয় পরিজন ও যশঃ প্রতিপত্তি
ত্যাগ করিয়া স্বেচ্ছায় দুঃখ-দারিদ্র্যক
বরণ করিয়া লইয়াছেন,
যিনি ভোগৈশ্বর্যের পরিবর্ত্তে বৈরাগ্যকে
অঙ্গভরশ করিয়াছেন,
শনি বিশ্ব-জননীর চরণতলে আত্মনিবেদন করিয়া
ত্যাগের মাহাত্ম্য প্রচার করিয়াছেন,
যার মধুর-মূরতি-চিন্তনে এ পাপ-প্রবণ
পবিত্রহার অনাবিল ধারায় অভিষিঞ্চিত হয়,
সাহার কর্মের দুতি ও প্রতিভার প্রভা স্মরণ করিলে
এ দুর্বল দেহে অপূর্ব শক্তির ক্ষরণ হয়
সঁহাকে গুরুভাবে অর্চনা করিয়া
নিজকে কৃতার্থ জ্ঞান করি,
সেই সত্যব্রত, জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী, মহামন্ত্রের একনিষ্ঠ সাধক
আমার পরমারাধ্য
আচার্য্য দেবের
পবিত্র নামে এই পুণ্যকাহিনী
উৎসর্গ করিলাম।
১৪১৯ বঙ্গাব্দ।
}
শ্রীচরণাশ্রিত অকৃতী শিয়া
গ্রন্থকার।

No text on this page.

গ্রন্থকার-প্রণীত।
নারী-গৌরব-গ্রন্থাবলী
দ্বিতীয় ভাগ- পৌরাণিক )
চন্দ্রহাস-বিষয়।
( যন্ত্রস্থ )
( পণ্ডিত সখারাম গণেশ দেউস্কর লিখিত ভূমিকা সহ )
তৃতীয় ভাগ-( পৌরাণিক )
বারমাতা জনা
( প্রস্তুত হইতেছে )
{ অধ্যাপক কালীপ্রসন্ন দাস গুপ্ত এম,এ, লিখিত ভূমিকা সহ)

No text on this page.

সূচীপত্র
ভূমিকা যুক্তাকুমুদিনী মিজ, বিএ, সরস্বতী লিখিত)
* * ॥
ত
০ ০ ০
মায়ের কোলে
মন্ত্রে দীক্ষা
সমর-প্রাঙ্গণে
মন্ত্রের সাধন
কারাগারে
৪৮
৮০০
.
অনল-কুণ্ডে
উপসংহার
। ।
০ ০ ০

চিত্র-সূচী।
০ ০ ০
ne
৩৭
স্বর্গীয় দূতের সাক্ষাৎ লাভ-গ্রন্থারম্ভে।
বীরাঙ্গনা রণ-রঙ্গিনী-বেশে নিদ্রিতা
শত্রু-হস্তে বীরাঙ্গনা
রােয়ে নগরের দুর্গ
বধ্যভূমিতে বীরাঙ্গনা
অনল-কুণ্ডে বীরাঙ্গনা
::
৬৪
০ ০ ০
১০১

গ্রন্থকারের নিবেদন। = arm বর্তমান গ্রন্থের “উপসংহার” ব্যতীত আর সমুদয় অংশই তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের সুপ্রভাতে ধারাবাহিক সন্দৰ্ভাকারে প্রকাশিত হইয়াছিল। স্থানে স্থানে যৎসামান্য পরিবর্তন ও মূতন কথা সংযােগ করিয়া উহা গ্রন্থাকারে মুদ্রিত হইল। উপসংহার সম্পূর্ণ নূতন করিয়া লিখিত হইয়াছে। সুপ্রভাত-সম্পাদিকা শ্রদ্ধেয়া শ্ৰীযুক্ত। কুমুদিনী মিত্র বি-এ, সরস্বতী মহােদয়া সর্বপ্রথম আমার এই অকিঞ্চিৎকর সন্দর্ভ পাঠ করিয়া আমাকে উৎসাহ-দান করেন এবং উহা তাহার পত্রিকায় প্রকাশ করিয়া অনুগৃহীত করেন। বলা বাহুল্য যে, তাহার ন্যায় একজন বিদুষীর উৎসাহ না পাইলে আমি এ কার্যে এতদুর অগ্রসর হইতে পারিতাম কিনা সন্দেহ। তিনি ক্ষুদ্র এহেন দূমিকা লিখি দিয়া জামাক—আরও উপকৃত করিলেন। এই নিঃস্বার্থ স্নেহানুগ্রহের জন্য আমি তাহার নিকট চিরকৃতজ্ঞতা- পাশে বদ্ধ রহিলাম। আমার পূজনীয় শিক্ষা-গুরু, বঙ্গ-বিশ্রত ঐতিহাসিক লেখক পণ্ডিত সখারাম গণেশ দেউঙ্কর ও আনারী প্রণেতা খ্যাতনামা সাহিত্যিক, অধ্যাপক কালীপ্রসন্ন দাস গুপ্ত এম, এ দয়া করিয়া গ্রন্থখানি দেখিয়া দিয়াছেন। এজন্য তাহাদিগকে সভক্তি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করিতেছি। চক্রবর্তী চাটার্জী কোম্পানীর পরিচালক বিদ্যোৎসাহী শ্ৰীযুক্ত অহীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, এম, এস, সি ও তদীয় বন্ধুদ্বয় আমাকে উৎসাহ-দান করিয়াছে এবং এ গ্রন্থ প্রকাশের ভার গ্রহণ করিয়া আমাকে উপকৃত করিয়াছেন। তরুণ তাঁহাদের নিকট আমি চিরঋণী রহিলাম। এতদ্ব্যতীত যে সমুদয় বন্ধু বান্ধবের নিকট হইতে আমি এ বিষয়ে নানা প্রকারে সহায়তা ও উৎসাহ পাইয়াছি, তাহাদিগকেও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। যে গরীয়সী মহিলার অলৌকিক বীরত্ব কাহিনী ও কাৰ্যকলাপ এ গ্রন্থে বিবৃত হইয়াছে, তিনি বিদেশিনী হইলেও জননী-জাতির গৌরব। এই বিশ্ব-বিশ্রুত বীরাঙ্গনার কর্মময় জীবনে একাধারে ভগবৎ-প্রেম, স্বদেশানুরাগ, স্বজাতি-প্রীতি ও রাজভক্তির অপূর্ব সমাবেশ দৃষ্ট হইবে। এ গ্রন্থ পাঠে যদি জননী-জাতির একজনও উপকৃত হন এবং যাহারা শক্তি-স্বরূপিণী জননী-জাতিকে পুরুষা- পেক্ষা হীন-শক্তি জ্ঞান করিয়া উপেক্ষা করিয়া থাকেন, তাহাদের মধ্যে একজনও যদি এই গ্রন্থালােচনা দ্বারা জননী-জাতির প্রতি শ্রদ্ধবান্ হইয়া উপেক্ষার ভাব পরিহার করেন, তবে শ্রম সফল জ্ঞান করিব। আশ্বিন-- বিনয়াবনত - ১৩১৯ বঙ্গাব্দ। গ্রন্থকার।

No text on this page.

স্বর্গীয় দূতের সাক্ষাৎ লাভ। “স্বর্গীয় দূত দিব্য পরিচ্ছদে ভূষিত হইয়া তাহাকে

মায়ের কোলে
“ভাঙ্গা আশা উঠিবে যুড়িয়া,
দীপ-শিখা উঠিবে ফুরিয়া,
দুটি দিন মা’র কোলে আয় ।
কামিনী রায়
স্বর্গীল্লা তরল; রা বসুর
স্মৃতি সমর্থ
পুস্তক সহ
বঙ্গীয় সাহিত্য পঞ্জি
জিন্দ্রে নাথ বসু।
}

No text on this page.

ফরাসী বীরাঙ্গনা। মায়ের কোলে। (১) জন্ম। • ও ; পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে ফ্রান্স, দেশে যে ষােড়শ- বর্ষীয়া বীর বালিকা দাসত্ব-নিগড়-বদ্ধ স্বদেশের প্রনষ্ট স্বাধী- নতা-রত্নের পুনরুদ্ধার-মানসে পল্লী-জননীর স্নিগ্ধ বক্ষ হইতে চির বিদায় লইয়া শােণিত-রাগ-রঞ্জিত, ভৈরব-হুঙ্কার-মুখ- রিত সমর-প্রাঙ্গণে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন; যিনি নিপীড়িত স্বদেশবাসীর দারিদ্র্য ও অত্যাচার-জনিত করুণ মৰ্ম্মো- চ্ছাসে ব্যথিত হইয়া তদবিমােচন-প্রয়াসে সর্বত্যাগিনী হইয়াছিলেন ; যিনি একাধারে ভগবৎ-প্রেম ও স্বদেশ- প্রেমের জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি ছিলেন ; যাঁহাকে সভ্যতাভিমানী বৰ্তমান খ্রীষ্টান জাতির পূর্ব পুরুষগণ জীয়ন্ত দগ্ধ করিয়া পশু-প্রকৃতির পরিচয় দিয়াছেন; সেই বীরাঙ্গনার অলৌ- কিক চরিত্রের পরিচয় নানা প্রকারেই শিক্ষাপ্রদ। এই বীরাঙ্গনার কৰ্ম্মপূত জীবনে একদিকে যেমন ভগবৎ-প্রেম ও স্বদেশপ্রেমের মধুর সমাবেশে অভাবনীয় ও অভূতপূর্ব শক্তির ক্রীড়া পরিলক্ষিত হয় ; অপরদিকে তেমনই রমণী- ৪ ফরাসী বীরাঙ্গনা। হৃদয়ে পুরুষােচিত দৃঢ়তা, সংকল্প সাধনে তৎপরতা, বিপৎ- কালে ধৈৰ্য্য ও সহিষ্ণুতা ও সর্বোপরি সুখ-দুঃখে, সম্পদ- বিপদে ও হর্ষ-বিষাদে নিয়ত ভগবানে অটল বিশ্বাস ও দৃঢ় নির্ভর পরিলক্ষিত হয়। যৎকালে ক্যালে হইতে বাের্দো অবধি ফ্রান্স, দেশের উত্তর ও পশ্চিম প্রদেশ সমূহে এবং পৈরী ও রােয়ে নগরীতে ইংরাজের বিজয়-বৈজয়ন্তী সগর্বেব ইংলণ্ডাধিপতি পঞ্চম হেীর আধিপত্য ঘােষণা করিতে- ছিল, নিরীহ ফরাসী প্রজাকুল উদ্ধত ইংরাজ সৈন্যের অযথা অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া উঠিয়াছিল, দুর্বিষহ অত্যাচার- সহনে অক্ষমতাহেতু ফরাসীরা হিংস্র-জন্তুসমাকুল বন্ধুর পর্বতারণ্যে আশ্রয় লইতেছিল, পরাধীনতার নির্মম নিষ্পেষণে ধ্বংসােম্মুখ ফরাসী প্রজাকুলে মৃত্যুর পূর্বাভাস সূচিত হইতেছিল, তৎকালে লােরে প্রদেশের প্রান্তভাগ- স্থিত দুমরিমি গ্রামে ১৪১২ খ্রীষ্টাব্দে জনৈক কৃষকের গৃহে জোয়ান্ দার্কের জন্ম * হয়। (২) বংশ পরিচয়। জোয়ান্ দার্কের পিতা জেকোয়েস্ দার্ক সামান্য একজন কৃষিজীবী ছিলেন। তদীয়া মাতা ইসাবেলা রােমী সাতিশয় * জোয়ার্কের কোন্ খ্রীষ্টাব্দে জন্ম হয় এ বিষয়ে বিভিন্ন লেখকের বিভিন্ন মত দৃষ্ট হয়। কাহারও মতে ১৪১০ খ্রষ্টাব্দে তাঁহার জন্ম হয় ; আবার • কাহারও মতে ১৪১২ খ্ৰীষ্টাব্দই ঠিক। আমরা এই শেযােক্ত মতেরই পোষকতা

মায়ের কোলে।
৫
ধৰ্ম্মপরায়ণা ও কর্তব্যনিষ্ঠা রমণী ছিলেন। তিনি পুণ্যভূমি
রােম্ দর্শন করিয়া “রােমী” উপাধিতে ভূষিত হইয়াছিলেন।
সেকালে রােম্ খ্ৰীষ্টানদিগের প্রধান তীর্থক্ষেত্র বলিয়া পরি-
গণিত ও বহুসংখ্যক ধৰ্ম্ম-বীরের পুণ্য সমাধি-ভূমি ছিল
বলিয়া যাঁহারা রােমের তীর্থক্ষেত্র পরিভ্রমণ করিয়া আসি-
তেন, তাহারা পুণ্যাত্মা বলিয়া সম্মানিত হইতেন এবং
“রােমী” এই ধার্মিকতা-সূচক উপাধিতে ভূষিত হইতেন।
জোয়ানের তিনটি ভ্রাতা ও একটি ভগিনী ছিল। তন্মধ্যে
জোয়াই সর্বকনিষ্ঠা। জিয়া ফিদেজা, জিয়া গার্সন,
জিয়া পেতীৎ, জিয়া কেভী প্রভৃতি কতিপয় ব্যক্তি
সেকালে ফ্রান্ধু, দেশে খ্ৰীষ্টধর্মাবলম্বী সাধু পুরুষ বলিয়া
পূজিত ও বিখ্যাত ছিলেন। জোয়ানের ধর্মপ্রাণ পিতা-
মাতা এই সাধু পুরুষদিগের পবিত্র নামানুসারে কন্যাকে
“জোয়ান্” নামে অভিহিত করিয়াছিলেন। জোয়ান্ (Joan)
শব্দটি জিয়া (Jean) পদেরই অপভ্রংশ। জোয়ানের
গ্রামের লােকেরা তাঁহাকে জেহানেৎ (Jehanette) এবং
ফ্রান্সের জন সাধারণ জিহান্ (Jehanne) বলিয়া ডাকিত।
তাহার অপর নাম ছিল “কুমারী লা পুসে”।
অনেকে
করি। কারণ ১৪৩১ খ্রীষ্টাব্দে বিচারালয়ে তাঁহার বিচার আরম্ভ হয়।
কালে তিনি বিচারকদিগের প্রশ্নের উত্তরে একস্থলে বলিয়াছিলেন যে তাহার
বয়স ঊনবিংশতি বৎসর। সুতরাং তদনুযায়ী ইহা প্রতিপন্ন হয় যে তিনি
১৪১২ খ্ৰীষ্টাব্দেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন।

ফরাসী বীরঙ্গনা। তাহাকে “জোয়ান্ তাব, আর্ক” এবং জিয়া দার্কও বলিয়া থাকেন। বাল্যকাল। -রিত্র গঠন। যে পরিবারে জোয়ানের জন্ম হয়, তাহা “দার্ক” নামে পরিচিত ছিল। এই দার্ক পরিবারে ধর্মপ্রাণ ও পুণ্যশীল পিতা-মাতার ক্রোড়ে লালিত-পালিত হইয়া ও তাহাদের ভগবৎ-প্রেম-নিষিক্ত, সরল, সরস পূত জীবনের পুণ্য সংস্পর্শে থাকিয়া জোয়ান্ শৈশব হইতেই ভগবচ্চরণে আত্ম- সমৰ্পণ করিতে শিখিয়াছিলেন। তিনি কখনও কখনও পিতার সহিত কৃষিক্ষেত্রে যাইতেন, কখনও বা রন্ধনশালায় রন্ধনকার্যে মাতার সহাৱত করিতেন, আবার কদাচিৎ মাতার পার্শ্বে উপবেশন করিয়া শিল্প-কৰ্ম্ম-শিক্ষায় মনাে- যােগী হইতেন। মাতার নিকট হইতে বাইবেলের ধৰ্ম্মোপ- দেশ এবং পুরাকালীন বীরপুরুষগণের স্বদেশ ও স্বধৰ্ম্ম- সেবায় আত্মােৎসর্গের বিস্ময়ােদ্দীপক কাহিনী শুনিয়া তাহার হৃদয়ে স্বার্থত্যাগের আদর্শ বদ্ধমূল হইয়াছিল। বিশেষতঃ বয়ােবৃদ্ধির সহিতু স্বদেশবাসী দুঃস্থ নরনারীর মৰ্ম্মন্তুদ আৰ্তনাদ-শ্রবণে এবং বিদেশীয় উদ্ধত-প্রকৃতি * The family name was Darc, and the name of the Maid of Orleans was therefore Jeanne Darc, not Jeanne d, Arc as coinmonly written ; but the latter has the sanction of general usage. ("Historian's history of the world" by Henry Smith Williams. Vol. XI, Page 194.)

মায়ের কোলে।
৭
অত্যাচারী সৈন্যগণের হস্তে তাহাদের অযথা নিপীড়ন
দর্শনে তঁাহার করুণ হৃদয়ে ব্যাকুলতার সঞ্চার হইতে
লাগিল।
ধৰ্ম্মনিষ্ঠা ।
পরসেবা
সশস্ত্র ও উদ্ধত ইংরাজ সৈন্যগণের অত্যাচারভয়ে
ভীত হইয়া পার্শ্ববর্তী গ্রামবাসী অসহায় নরনারী যখন
তাহাদের গৃহে আশ্রয়প্রার্থী হইত, তখন জোয়ান্ তাহা-
দিগকে সযত্নে আশ্রয়দান করিয়া বিপদ হইতে রক্ষা করি-
তেন। এক সময়ে তাহার বাসভূমি দুরিমি গ্রামও মদোন্মত্ত,
উচ্ছঙ্খল সৈন্যগণ দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিল।
অাত্মরক্ষার্থে তঁাহাদেরও গ্রাম পরিত্যাগ পূর্বক অরণ্যে
অাশ্রয় লইতে হইয়াছিল। পরে যখন সৈন্যগণ গ্রাম
পরিত্যাগ করিয়া চলিয়া গেল, তখন তাহারা গ্রামে
প্রত্যাবর্তন করিয়া দেখিলেন গ্রামের ধর্মমন্দির ও অধি-
কাংশ গৃহ ভস্মীভূত এবং গ্রাম খানি বিধ্বস্ত ও জনশূন্য
হইয়াছে। এই শশাচনীয় দৃশ্যে জোয়ানের হৃদয় অধিকতর
অভিভূত হইল।
তিনি স্বভাবতঃই দয়াবতী ও কোমল-হৃদয়া ছিলেন
এবং পরসেবা করিতে ভাল বাসিতেন। যখনই তিনি
গ্রামবাসী কাহার উৎকট পীড়ার সংবাদ পাইতেন, তখনই
রােগীর শয্যাপাশ্বে উপস্থিত হইয়া তাঁহার যথােচিত সেবা
শুশ্রষা করিতেন। ভগবানে তাহার অচলা ভক্তি এবং
স্বধর্মে প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ছিল। পাশ্চাত্য দেশে সাধারণতঃ এই,

ফরাসী বীরাঙ্গনা।
শ্রদ্ধার অভাব। তিনি ঈশ্বরােপাসনাকে প্রধান কর্তব্য
বলিয়া জ্ঞান করিতেন। তাই ধৰ্ম্মমন্দিরের উপাসনাদি
ও অন্যান্য ধর্মবিষয়ক অনুষ্ঠানাদিতে সাগ্রহে যােগদান
করিতেন। তৎকালে গ্রামে বিদ্যালয় ছিল না বলিয়া
তিনি বিদ্যাশিক্ষা করিতে পারেন নাই। কিন্তু যে ভক্তিতে
ঈশ্বর লাভ হয় এবং পূত-চরিত্রা হইয়া আদর্শ-জীবন যাপন
করা যায়, সেই ভক্তিতত্ত্ব তিনি শৈশবে মাতার নিকটে
যথেষ্ট প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।
তিনি নির্জনতা ভালবাসিতেন। গৃহসংলগ্ন শ্যামল
প্রাঙ্গণে উপবিষ্ট হইয়া তিনি উন্মুক্ত, বিশাল নীলাম্বর,
দুৱস্থিত অভ্রভেদী পর্বতমালা এবং তরুলতা-পরিশােভিত
নির্জন বনভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দৰ্য্য সন্দর্শন-পূর্বক
সাতিশয় আনন্দানুভব করিতেন। তাঁহার পিতামাতা তরুণ
বয়সে তাহার এই প্রকার নির্জনবাসে অস্বাভাবিক অনুরাগ
ও সাংসারিক বিষয়ে ঔদাসীন্যের জন্য তাহাকে তিরস্কার
করিতেন; এবং তিনি যাহাতে বিবাহ করিয়া সাংসারিক
সুখের অধিকারিণী হন তজ্জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিতেন।
জোয়ানের অসামান্য রূপ-লাবণ্য এবং অপরদিকে তাহার
সংকল্পে
দৃঢ়ত।
* In her own family she encountered not only resistance
but temptation ; for they attempted to marry her, in hope of
winning her back to more rational notions as they considered.
(History of France by M. Michelet, Translated by G. H.
• Smith. Vol. II. Page 123.).

মায়ের কোলে।
পূতচরিত্রের বিমল প্রভা ও বিনয়-নম্র স্বভাব গ্রামবাসী
যুবকগণের হৃদয় স্বভাবতঃই আকর্ষণ করিল। অনেক
যুবক তাহার সহিত পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হইবার প্রস্তাব
করিলেন।
জোয়ান্ সে সকল প্রস্তাবে প্রত্যাখ্যান
করিয়া পুণ্যবতী ভার্জিন-মেরীর (Virgin Mary)
ন্যায় আজীবন কেমার-ব্রত পালন করিবার ইচ্ছা জ্ঞাপন
করিলেন। কিন্তু ইহাতেও তিনি নিস্তার লাভ করিতে
পারিলেন না। জনৈক যুবক তাঁহাকে লাভ করিবার
বাসনায় অন্ধ হইয়া তাউলের (Toul ) ধৰ্ম্মবিচারালয়ে
তাঁহার বিরুদ্ধে এই মর্মে এক অভিযােগ আনয়ন করিলেন,
যে জোয়ান্ তাহাকে বিবাহ করিবেন বলিয়া ধৰ্ম্মতঃ
প্রতিশ্রত হইয়াও এখন সে প্রতিশ্রুতি-পালনে অসম্মতি
জ্ঞাপন করিতেছেন। এই অভিযােগ উত্থাপিত হওয়ায়
সকলে ভাবিলেন জোয়ানের ন্যায় মৃদু-প্রকৃতি, শান্তিপ্রিয়া
ও সুশীলা বালিকা কিছুতেই ইহার প্রতিবাদ করিতে
অগ্রসর হইবে না। সুতরাং এবার তাহাকে সংসারধৰ্ম্ম
অবলম্বন করিতেই হইবে; ফলে তাহার ঔদাসীন্য দূর
হইবে, সংসারে আসক্তি জন্মিরে। কিন্তু জোয়ান্ বিচারা-
লয়ে উপস্থিত হইয়া দৃঢ়তার সহিত বিচারককে বলিলেন—
“আমার বিরুদ্ধে আরােপিত অভিযােগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও
কল্পনাপ্রসূত। আমি কাহাকেও বিবাহ করিবার জন্য
কখনও প্রতিশ্রুত হই নাই।” বিচারক তাঁহার সরল
;

ফরাসী বীরাঙ্গনা। উক্তির সত্যতা উপলদ্ধি করিলেন এবং আরােপিত অভি- যােগ হইতে তাহাকে মুক্তি প্রদান করিলেন। জোয়ানের জীবন-স্রোত সম্পূর্ণ বিপরীত গতি অবলম্বন করিল, সংকল্প অধিকতর দৃঢ় হইল এবং পতিত স্বদেশবাসীর উদ্ধার সাধ- নের মহতী আকাঙক্ষা তাহার হৃদয়ে দুর্দমনীয় হইয়া উঠিল ; কিন্তু শ্রেয়াংসি বহুবিনি’। মহদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত হইয়া মানুষ যখন সিদ্ধিলাভশায় কঠোর সাধনায় প্রবৃত্ত হয়, তখন দুর্লঙ্ঘ্য বিপদরাশি তাহার পথ রুদ্ধ করিয়া দাঁড়ায়। দুর্বল-চিত্ত ব্যক্তিরা তদ্দর্শনে ভীত ও শঙ্কিত হইয়া প্রত্যাবর্তন করে ; আর যাহারা সংযমী, দৃঢ়চিত্ত ও ঈশ্বর-নিষ্ঠ, তাহারা সব প্রকার বিপজ্জাল ভেদ করিয়া লক্ষ্যপথে অগ্রসর হয় এবং মেঘ-মুক্ত সূর্যের ন্যায় দ্বিগুণ প্রভায় মণ্ডিত হইয়া জগৎকে উদ্ভাসিত করে। (৩) ফান্সদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক ৫ অবস্থা। ১৪১৫ খ্রীষ্টাব্দে ইংলণ্ডের রাজা পঞ্চম হেন্ত্রী আজী- কোর্তের যুদ্ধে ফরাসীদিগকে পরাস্ত করিলেন। ইহার দুই বৎসর পরে তিনি পুনরায় ফরাসীদিগের রাজ্য আক্রমণ করিয়া নৰ্মান্দি জয় করিলেন। ফরাসী ভূপতিদিগের মধ্যে মায়ের কোলে। ; তখন আত্মবিদ্রোহ উপস্থিত হইয়াছিল। এই অত্মবিদ্রোহে aistrano garfo Gq (John, Duke of Burgundy ) এক পক্ষের নেতা ছিলেন। তিনি রাজপুত্র চার্লস্ দফি ও অন্যান্য ফরাসী নেতৃবর্গের সম্মুখে নিহত হইলেন। তাঁহার পুত্র ফিলিফ ইহাতে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ লইবার জন্য তিনি স্বদেশ ও স্বজাতির স্বার্থে পদাঘাত করিয়া ইংরাজের সহিত মিত্রতা করিলেন। ইহার ফলে একদিকে ফরাসীদিগের শক্তির হ্রাস হইল ; পক্ষান্তরে ইংরাজদিগের শক্তি বৃদ্ধি পাইল। ফরাসীদিগের তদানীন্তন রাজা ষষ্ঠ চার্লস ইংরাজ- দিগের এই বর্ধিত ও মিলিত শক্তি দমন করিতে অক্ষম হইয়া ১৪২০ খ্রীষ্টাব্দে ইংলণ্ডাধিপতি পঞ্চম হেরীর সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হইলেন। ইংলণ্ডাধিপতি সন্ধির সৰ্ত্তানুসারে ফরাসীরাজের কন্যা কেথারীকে বিবাহ করিলেন এবং তাঁহার অবর্তমানে ফ্রান্সের ভাবী উত্তরা- ধিকারী মনােনীত হইলেন। ইহার ফলে উত্তর ফ্রান্সের অধিকাংশ প্রদেশই ইংলণ্ডাধিপতির আধিপত্য স্বীকার করিল। কিন্তু রাজপুত্র দফিন্ দক্ষিণ ফ্রান্সে ইংরাজ- দিগের বিরুদ্ধে উত্থিত হইলেন এবং পিতৃসিংহাসন দাবী করিলেন। সুতরাং দফিকে দমন করিবার মানসে ইংলণ্ডাধিপতি পুনরায় ফরাসীদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিলেন। কিন্তু ইতিমধ্যেই ১৪২২ খ্রীষ্টাব্দে পঞ্চ-.

১২ ফরাসী বীরাঙ্গনা। সিংহাসন আরােহণ। ত্রিংশৎ বৎসর বয়সে তাঁহার মৃত্যু হইল। ফরাসী রাজা চার্লস্ও জামাতার মৃত্যুর পর দুইমাসের মধ্যে ষষ্ঠ হেনরীর ইহলােক পরিত্যাগ করিলেন। ইহার পর ইংলণ্ডাধি- পতির শিশু পুত্র হেরী (ষষ্ঠ হেল্পী ) ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইলেন। এই শিশু পুত্রের খুল্লতাত •বেদফোর্দের ভূপতি ( Duke of Bedford ) তাহার অভিভাবক স্বরূপ রাজ্য শাসনের ভার গ্রহণ করিলেন। দফিনের ন্যায় দুর্বল নৃপতি চতুর ও দক্ষ শাসনকর্তা বেদূফোর্দের শক্তি খর্ব করিতে পারিলেন না। এদিকে ফরাসীরাও অন্তরের সহিত তাঁহার পক্ষ সমর্থন করিল । কারণ তাঁহার মাতা ইসাবেলার, (lsabella ) চরিত্রে জনসাধারণ সন্দিহান ছিল। সুতরাং দফি চার্লসের পুত্র নহে, তাহাদের এইরূপ ধারণা জন্মিল। এই জন্যই ফরাসীরা দফিনের প্রতি ঔদাসীন্য প্রদর্শন ফ্রান্সরাজ্যের করিলেন। এই প্রকার অরিও নানাবিধ কারণে রাজ্যের অবস্থা অতীব শশাচনীয় হইয়া পড়িল। ভূস্বামীদিগের মধ্যে আত্মবিদ্রোহ উপস্থিত হইল, উদ্ধত সৈন্যগণ গ্রামের পর গ্রাম লুণ্ঠন-পূর্বক জনশূন্য করিতে লাগিল, অধিকাংশ প্রদেশ ইংরাজের দাসত্ব স্বীকার করিল। ফরাসী ঐতি- হাসিক লামার্তাই (Lamartine) ফ্রান্সের তৎকালীন অবস্থা বর্ণনা করিতে গিয়া একস্থলে বলিয়াছেন— Thus the king seeking in vain his sub- শােচনীয় অব।

মায়ের কোলে। jects amongst his people, the people vainly seeking their king in the monarchy; the Frenchman fruitlessly looking for his country in France ; such was the state of the nation.* অর্থাৎ রাজা দেখিলেন জনসাধারণের ভিতর হার প্রজা বলিতে কেহ নাই; জনসাধারণ দেখিল যথেচ্ছ শাসনের বাহুল্যে দেশে রাজা বলিতে কেহ নাই এবং ফরাসীরা দেখিল ফ্রান্সে তাহাদের স্বদেশ বলিবার কিছুই ; নাই। (৪) দৈববাণী শ্রবণ ও স্বর্গীয় দূতের সাক্ষাৎ লাভ। স্বদেশের এই প্রকার হেয় ‘বন্ধন-দশা এবং দৈন্য- পীড়িত ও পতিত স্বদেশবাসীর যন্ত্রণা জোয়ানের অসহ হইয়া উঠিল। জন্মভূমির এই হীন চিত্র তাহার হৃদয়ে নিয়ত প্রতিফলিত হইতে লাগিল। কি উপায়ে স্বদেশের দাসত্ব মোচিত হইতে পারে এবং কি উপায়েই বা বিদেশীর অত্যাচার হইতে স্বদেশবাসী নিষ্কৃতি পাইতে পারে, ইহাই তাঁহার একমাত্র চিন্তার বিষয় হইয়া দাঁড়াইল। তিনি নির্জনে বসিয়া ভগবানের নিকট ব্যাকুল হৃদয়ে করুণ * See Lamartine's "Memoirs of celebrated characters," Vol II, Page 59.

১৪ ফরাসী বীরাঙ্গনা। প্রার্থনা জানাইতেন এবং মনে মনে চিন্তা করিতেন-“ভগবান কি এই পতিত দেশকে উদ্ধার করিবেন না ? তিনি কি নিপীড়িত স্বদেশবাসীর দুঃখ-দৈন্য মােচন করিবেন না ? নিরীহ স্বদেশবাসী কি চিরদিনই এই পূতিগন্ধময় দাসত্ব- নরকে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকিবে ? ভগবান কি তাহাদের জন্য মুক্তিদাতা প্রেরণ করিবেন না ?” অবশেষে একদিন গ্রীষ্মকালে সন্ধ্যার প্রাক্কালে ধৰ্ম্ম- মন্দিরের প্রাঙ্গণের প্রান্তদেশে দিব্য-আভা-বিশিষ্ট আলােকরশ্মি অকস্মাৎ তাহার নয়নগােচর হইল। মুহূর্তৃেক পরেই সে দিক হইতে দৈববাণী শুনিতে পাইলেন— “জোয়ান্, পূতচরিত্রা হও; ভগবানে আত্মনির্ভর কর।” ইহা শুনিয়া তিনি সাতিশয় বিস্ময়াপন্ন হইলেন। ইহার পরেও অপর এক সময়ে আর একবার তিনি ঐ প্রকার দৈববাণী শুনিতে পাইয়াছিলেন। এই সময়ে তিনি চতুর্দশ কি পঞ্চদশ বৎসরে পদার্পণ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই ঘট- নার পরেও পুনরায় দুইজন স্বর্গীয় দূত দিব্য-পরিচ্ছদে ভূষিত হইয়া তঁাহাকে সশরীরে দেখা দিলেন। তাঁহারা বলিলেন “জোয়ানু, দফিনের সাহায্যার্থ যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও; পতিত আদেশ-বাণী। স্বদেশকে উদ্ধার কর।” জোয়ান্ বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে তাহাদিগের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া ভীতি-বিজড়িত অর্ধস্ফুট স্বরে কহিলেন—“আমি রমণী ; কি করিয়া যুদ্ধ করিতে হয় জানি না।” • তাহারা প্রত্যুত্তর করিলেন—“কেথারি স্বর্গীয় দূতের মায়ের কোলে। ও মার্গারেৎ স্বয়ং তােমার সাহায্য করিবেন।” জোয়ান তগতচিত্তে এই সকল শুনিলেন। কথিত আছে, ইহার পর প্রায়ই তিনি স্বর্গীয় দূতের সাক্ষাৎ পাইতেন। তাহারা যখন অন্তর্ধান করিতেন, তখন তিনি সাশ্রনয়নে ও আবেগ- পূরিত-কণ্ঠে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিতেন—“আম- কেও তােমাদের সঙ্গিনী করিয়া লইয়া যাও।” জোয়ান্ যে দৈববাণী শুনিয়াছিলেন তাহা ভগবদ্বাণী ; যে স্বর্গ-দূতের সাক্ষাৎ পাইয়াছিলেন তাহা ভগবদ্দর্শন। পাশ্চাত্য জগতে ইহা বিশ্বাসযােগ্য বলিয়া লােকে মনে করিতে না পারে ; কিন্তু প্রাচ্য জগতে ইহা সহজেই বিশ্বাসযােগ্য বলিয়া গৃহীত হইবে। মানুষের পক্ষে যে ভগবদ্দর্শন সম্ভবপর এ কথা জড়বাদী পাশ্চাত্যেরা সহজে বিশ্বাস করিতে না পারেন; কিন্তু আমাদের ভারতবর্ষের একজন সাধারণ ব্যক্তিও ইহা অভ্রান্ত সত্য বলিয়া জানে যে—ব্যাকুলচিত্তে ভগবানকে ডাকিলে তাহার দর্শন লাভ হয় ; ভােগ-বাসনা ত্যাগ করিয়া সমাহিত-চিত্তে সাধনা করিলে মানবের অবিদ্যা দূরীভূত হয়, তাহার অন্তর্নিহিত ব্ৰহ্ম জাগ্রত হয় ; সে নিজ আত্মাতেই ভগ- বদ্দর্শন পায়। অনেকে অনেকে জোয়ানের স্বর্গ-দূত-দর্শন ও দৈববাণী-শ্রবণের কথা একেবারে ভিত্তিহীন বলিয়া মনে করেন এবং উহা তাহার বিকারগ্রস্ত মস্তিষ্কের কল্পনা-প্রসূত কাহিনী বলিয়া তুচ্ছ করেন। • কিন্তু জনৈক ভগবদ্দশন সম্ভবপর। ;

ফরাসী বীরাঙ্গনা।
was
eve
ইংরাজ লেখক “The Patriot martyr” নামক গ্রন্থের
একস্থলে লিখিয়াছেন –
Socrates never ceased to profess himself
guided by an internal voice, to which he paid
implicit obedience, and on which he relied for
counsel in cases of difficulty. When this
Silent monitor left him he felt that his career
ended. Even
the great Napoleon,
whom no one will accuse of superstitious
weakness, was subject to this mysterious
influence. On the
of his celebrated
invasion of Russia, when the tension of his
mind must have been extreme, he frequently
thought he heard a voice calling him by
name, and so audibly that he would leave his
apartment inquiring, "who called me p»
Why should less credit be given to the
avowals in this respect of a young and
unsophisticated village maiden, whose whole
life was an exemplification of sincerity and
truth, who never ceased to appeal to "the
voices," and who died attesting their reality,

মায়ের কোলে। than has been given to more exalted personages ? অর্থাৎ সক্রেতীশের বিশ্বাস ছিল, তিনি একটা অন্ত- র্নিহিত বাণী দ্বারা চালিত হইতেন। এই জন্য কখনও তিনি এই বাণী অবহেলা করিতেন না। অনেক সময়ে গুরু- তর বিষয় উপস্থিত হইলে তিনি অন্তর্নিহিত প্রেরণার উপর নির্ভর করিতেন। যখন হাতে অার এই প্রেরণা অনুভূত হইত না, তখন তিনি বুঝিলেন তঁাহার মৃত্যু নিকটবর্তী। এমন কি, নেপােলিয়ানের ন্যায় কুসংস্কার- শূন্য বিশ্ববিজয়ী বীরপুরুষ—তিনিও এই প্রকার রহস্যময় প্রেরণা দ্বারা চালিত হইতেন। রুষিয়া আক্রমণের পূর্বে, তাঁহার মনােবৃত্তি সমুহ, যখন অত্যন্ত উত্তেজিত ছিল, তখন তিনি অনেক সময় শুনিতেন, কে যেন তাঁহাকে নাম ধরিয়া ডাকিতেছে। এই আহ্বান তিনি এত সুস্পষ্ট- রূপে শুনিতেন যে, তিনি তাঁহার প্রকোষ্ঠ হইতে বাহির হইয়া আসিতেন এবং ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিতেন, “কে আমায় ডাকিল ?” সক্রেতীশের ন্যায় মনস্বী ব্যক্তির ও নেপােলিয়ানের ন্যায় বীরপুরুষের পক্ষে যদি এই সব কথা সত্য হইতে পারে, তবে জোয়ানের ন্যায় একজন সরল-প্রকৃতি গ্রাম্য বালিকার কথা কেন বিশ্বাসযােগ্য বলিয়া গৃহীত হইতে পারিবে না ? কারণ তাঁহার সমস্ত জীবনে তিনি সরলতা ও সত্যবাদিতার পরিচয় দিয়াছেন

১৮
ফরাসী বীরাঙ্গনা
এবং মৃত্যুর পূর্বেও তাহার দৈববাণী সত্য বলিয়া ঘােষণা
করিয়াছেন।

মন্ত্রে দীক্ষা “লইলাম প্রিয় কৰ্ম্ম, মাতৃ-সেবা মহাধর্ম, সার্থক করিব জন্ম দৃঢ় এ প্রতিজ্ঞা মনে।” চণ্ডীচরণ-

No text on this page.

মন্ত্রে দীক্ষা। কুল মত ও ( ১ ) সাধন-পথের অন্তরায় ও তৎসমুদায় দূরীকরণ। জোয়ানের স্বর্গীয় দূতের সহিত সাক্ষাৎ লাভের কথা অধিক দিন লুকায়িত রহিল না। ক্রমে ক্রমে সে কথা তাঁহার পিতামাতারও কর্ণগােচর হইল। সরল ও অশুি- প্রত্যয়-প্রবণ মাতৃ-হৃদয়ে এ কথা সহজেই মুদ্রিত হইল বটে; কিন্তু পিতার হাতে প্রতীতি জন্মিল না। তিনি পিতার প্রতি সাতিশয় “ধৰ্ম্মপরায়ণ হইয়াও এবং এইরূপ ঘটনা ধৰ্ম্ম- উপায় গ্রন্থানুসারে সম্ভবপর জানিয়াও কন্যার কথায় অস্থা স্থাপন নির্ধারণ । করিতে পারিলেন না। তিনি কন্যাকে শাসাইলেন এবং রুক্ষস্বরে বলিলেন-“আর যদি তাের মুখে কখনও যুদ্ধে যাওয়ার কথা শুনিতে পাই, তবে তাের প্রাণ বধ করিব।” পিতার এই প্রকার রুদ্র-মুর্তি-দর্শনে ও প্রতিকূল-মত-শ্রবণে জোয়ানের কোমল হৃদয় চিন্তাভারাক্রান্ত হইয়া পড়িল। একদিকে পিতার কঠোর আদেশ ও অপরদিকে পরাধীনা স্বদেশ-জননীর আকুল আহ্বান—এই পরস্পর-বিরােধী ভাবদ্বয়ের অবিশ্রান্ত ঘাত-প্রতিঘাতে তাঁহার তরুণ হৃদয় আললাড়িত ও মথিত হইতে লাগিল। তিনি দেখিলেন

২২
ফরাসী বীরাঙ্গনা ।
পিত্রাদেশ-পালন তাঁহার পক্ষে যেরূপ কৰ্ত্তব্য কৰ্ম্ম, লক্ষ লক্ষ
স্বদেশবাসীর দুর্দশা-মোচনে আত্মোৎসর্গ তদপেক্ষ কোনও
অংশে অল্প পুণ্যজনক নহে। বরং শেষোক্ত কৰ্তব্যই তাহার
নিকট অধিকতর গুরুতর বলিয়া বিবেচিত হইতে লাগিল।
অনেক চিন্তার পর তিনি এই চরম সিদ্ধান্তে উপনীত
হইলেন যে, পিতৃ-অজ্ঞা পালন অপেক্ষা
প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অধিক ; সুতরাং স্বদেশ-জননীর
আকুল আহবানে কর্ণপাত করাই তিনি শ্রেয়স্কর বলিয়া
স্থির করিলেন।
কিন্তু পিতার আদেশে উপেক্ষাপূর্বক প্রকাশ্যভাবে
যুদ্ধে গমন করা অসম্ভব জানিয়া, তিনি কৌশলে
গৃহ ত্যাগ
করিবার সংকল্প করিলেন। এলার লাক্সার্ড (Andre
গৃহ ত্যাগ ও
1 axart) নামক তাঁহার এক পিতৃব্যের পত্নী রােগ-শয্যায়
পিতৃব্যের
শায়িত ছিলেন। তাঁহার সেবা-শুশ্রষা করিবার ইচ্ছা
জ্ঞাপন করিয়া তিনি পিতার অনুমতিক্রমে পিতৃব্যের গৃহে
গমন করিলেন। তাঁহার পিতৃব্যের হৃদয় অসামান্য
উদারতায় পরিপূর্ণ ছিল জানিয়া, তাঁহার নিকট স্বীয় মহা
সংকল্পের বিষয় জ্ঞাপন করিলেন। এরূপ সরলতা ও
আবেগের সহিত তিনি পিতৃব্যের নিকট স্বীয় মনােভাব
ব্যক্ত করিলেন যে, তাঁহার হৃদয় মুগ্ধ হইল। জোয়ানের
ন্যায় তরুণ-বয়স্কা বালিকাকে এই প্রকার বিদ্য-সঙ্কুল মহান্
ও পবিত্র ব্রত অবলম্বনে অগ্রবর্তিনী দেখিয়া তিনি সাতিশয়
আশ্রয় গ্রহণ।

মন্ত্রে দীক্ষা । পক্ষে অনুকূল মুগ্ধ হইলেন এবং তাঁহাকে যথাসাধ্য সহায়তা করিতে প্রতিশ্রুত হইলেন। এই প্রকার একজন বহুদশী, বুদ্ধিমান্ ও প্রৌঢ়-বয়স্ক আত্মীয়ের অশ্ৰয়লাভে জোয়ানের অশা ও উৎসাহ শতগুণ বর্ধিত হইল। জোয়ান্ তাহার পিতৃব্যকে ভকুলিয়ার্সের (Valucouleurs) শাসনকর্তা TTCFCGT (Baudricourt) নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে এই শুভ সংকল্পের বিষয় জ্ঞাপন করিবার অনুরােধ করিলেন। কিন্তু সে অনুরােধের ফল জোয়ানের হইল না। গর্বিত শাসনকর্তা কৃষক-বালি- কার পবিত্র আকাঙ্ক্ষাকে উন্মত্তের প্রলাপ বলিয়া উপেক্ষা করিলেন এবং লাক্সার্তকে বলিলেন-“আপনার ভ্রাতু- পুত্রীকে বিশেষরূপে শাসন করিয়া পিতার নিকট প্রেরণ করুন।লাকসাৰ্ত্ত (জোয়ানের পিতৃব্য ) ইহাতে ভগ্ন- মনােরথ হইয়া গৃহে প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং জোয়ানের নিকট সমুদায় বিবৃত করিলেন। পিতৃব্যের মুখে গর্বিত শাসনকর্তার প্রতিকূল মতের কথা শ্রবণ করিয়া, জোয়ান্ একটু চিন্তান্বিতা হইলেন। কিন্তু মুহূর্তের জন্যও নিরাশ হইলেন না। তিনি সংকল্প করিলেন, শাসনকর্তার নিকট স্বয়ং উপস্থিত হইয়া তাহাকে ভকুলিয়াস স্বীয় অভিপ্রায় পুনরায় জ্ঞাপন করিয়া তাহার মত পরিবর্ত- নের চেষ্টা করিবেন। অতঃপর পিতৃব্যকে সমভিব্যাহারে লইয়া তিনি পদব্রজে ভকুলিয়ার্স নগরে যাত্রা করিলেন। যাত্রা।

২৪ ফরাসী বীরাঙ্গনা। } পথিমধ্যে কখনও স্নেহময়ী মাতার স্নেহ-সম্ভাষণ, কখনও করুণাময় পিতার নিঃস্বার্থ করুণ ব্যবহার, কদাচিৎ ভ্রাতা ভগিনীর মধুময় প্রীতিবাক্য এবং আবার কখনও বা শৈশব-স্মৃতি-বিজড়িত শান্তিময়ী পল্লীভূমির ছায়াময় চিত্র- খানি তাহার স্মৃতি-পথে উদিত হইয়া তাহাকে আকুল করিয়া তুলিতেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই বন্দিনী স্বদেশ- জননীর অশ্রুসিক্ত, বিষাদময় মুখচ্ছবি হৃদয় মধ্যে উদিত হইয়া সে সকলের মােহকে বিনষ্ট ও হৃদয়ে অভিনব উৎ- সাহবেগ সঞ্চারিত করিত। যথা সময়ে তিনি নগরে পৌছিয়া জনৈক আত্মীয়ের গৃহে আশ্রয় লইলেন এবং পিতৃব্যকে শাসনকর্তার নিকট প্রেরণ করিয়া স্বীয় আগমন- বার্তা জানাইলেন। শাসনকৰ্ত্তা বালিকার এই প্রকার অধ্যবসায়-দর্শনে সাতিশয় বিস্মিত হইলেন এবং তাহার সহিত সাক্ষাৎকারের বাসনা প্রকাশ করিলেন। জোয়ান শাসনকৰ্ত্তার সমীপে উপস্থিত হইলেন এবং যথাবিহিত শিষ্টাচার-প্রদর্শনপূর্বক তাহাকে অভিবাদন করিলেন। সেই নিরক্ষর কৃষক-বালিকার বিনয়-নম্র শিষ্টাচার ও অনিন্দ্যসুন্দর, দিব্য দেহ-কান্তি-দর্শনে শাসনকর্তার হৃদয়ে সহিত সাক্ষাৎ,ভাবান্তর উপস্থিত হইল। তিনি জোয়াকে জিজ্ঞাসা করিলেন ঃ- “তুমি কি জন্য আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে চাহিয়া- ছিলে ?” শাসনকর্তার কথােপকথন।

মন্ত্রে দীক্ষা। ন “আমি ভগবানের নামে রাজাকে এই সংবাদ জানাইতে আসিয়াছি যে, তিনি যেন এই ধৰ্ম্ম-যুদ্ধে পশ্চাৎপদ না হন।” তদুত্তরে শাসনকর্তা বলিলেন - “রাজার কাৰ্যাকার্য্যের উপর আমার কোন হাত নাই। আমার মতামতের উপর তিনি নির্ভর করেন না।” “এ রাজ্য দফিনের নিজস্ব নহে। ভগবানই ইহার অধিকারী। কিন্তু তাঁহার ইচ্ছা যে তিনি রাজপদে অধি- ষ্ঠিত হন এবং সুশৃঙ্খলার সহিত রাজ্য শাসন করেন। শত্রুপক্ষের অপরিমেয় বাধা-বিপ্ন সত্ত্বেও তিনি রাজ-সিংহা- সন প্রাপ্ত হইবেন এবং রেইমস্ (Rheims) নগরে ভঁহার রাজ্যাভিষেক উৎসব সম্পাদন করিবার জন্য আমি ঈশ্বর কর্তৃক আদিষ্ট হইয়াছি।” শাসনকর্তা বালিকার এই সমুদায় তেজোগর্ভ উক্তি শ্রবণ করিয়া বিস্মিত হইলেন এবং বিষয়টী অত্যন্ত গুরু- তর মনে করিয়া প্রধান ধর্মযাজকের সহিত পরামর্শ করি লেন। তৎপর তিনি ধর্মযাজককে সঙ্গে লইয়া জোয়ান্ যে অত্মীয়ের গৃহে অবস্থিতি করিতেছিলেন তথায় উপস্থিত হইলেন এবং ধৰ্ম্মশাস্ত্রানুমােদিত উপায়াবলম্বনে যথারীতি তাহার পরীক্ষা করিলেন। পরীক্ষান্তে তাহাকে “ঈশ্বরানু- গৃহী” বলিয়া ধৰ্ম্মযাজকের বিশ্বাস হইল। এই ঘটনা অচিরাৎ নগরময় রাষ্ট্র হইয়া পড়িল এবং তত্রত্য আবাল- ফরাসী বীরাঙ্গনা বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই জোয়ানকে দেখিবার জন্য সমবেত হইতে লাগিল। শাসনকৰ্ত্তা জোয়ান্-সংক্রান্ত অনুি- পূর্বিক সমুদয় ঘটনা তঁাহার উর্দ্ধতন কর্মচারী ডিউক- বলােরেনকে (Duke of Lorraine) জানাইলন এবং জোয়াকে ভৎসমীপে প্রেরণ করিয়া নিজে দায়িত্ব হইতে যুক্ত হইলেন। জোয়ান্ যখন ডিউকের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গমন করিলেন, সে সময় ডিউক অত্যন্ত পীড়িত ছিলেন। তিনি জোয়ানের বালিকা-সুলভ সরলতা ও পুণ্য-প্রদীপ্ত বদন- মণ্ডল নিরীক্ষণ করিয়া পরন সন্তোষ লাভ করিলেন এবং ডিউক । সাত জোয়ান্ প্রকৃতই ঈশ্বর দেশে দেশোদ্ধার-কাৰ্যে প্রবৃত্ত হই- য়াছেন কিনা তাহা বিশেষাপে পরীক্ষা করিলেন। তাহার সহিত কথোপকথন কালে তাহার লৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পাইয়া ডিউক্ তাহার প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাবান্ হই- লেন এবং তিনি যে “ঈশ্বরানুগৃহ।” তাহা অসন্দিগ্ধচিত্তে বিশ্বাস করিলেন। অতঃপর জোয়ান্ ডিউকের নিকট হইতে বিদায় লইয়া পুনরায় ভকুলিয়াস নগরে প্রত্যাবর্তন করিলেন। ইতিমধ্যে এই সমুদায় ঘটনা রাজা দফিনের কর্ণগোচর হইল এবং জোয়ানের উক্তির সমর্থন করিয়া কতিপয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও পদস্থা মহিলা রাজার নিকট আবেদন পত্র প্রেরণ করিলেন। সুতরাং এ বিষয়ে রাজার মনোযােগ সাক্ষাৎ।

মন্ত্রে দীক্ষা । २१ অনুরোধে বিশেষরূপে আকৃষ্ট হইল। তৎকালে চীন নগরে রাজ- সভার অধিবেশন হইত। তথায় উপস্থিত হইয়া রাজার সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য জোয়াকে আহ্বান করা হইল। এই সমস্ত কথা যখন তাহার নিজ গ্রামে পৌছিল, তখন তাহার পরিবারস্থ লােকেরা ভকুলিয়াস নগরে ছুটিয়া কর্তব্যজ্ঞান ও আসিলেন এবং তাঁহাকে যুদ্ধে গমনের সংকল্প হইতে বিরত ৩াশ্মীয় স্বজনের করিবার জন্য নানাপ্রকারে চেষ্টা করিলেন। কিন্তু জোয়ান্ উপেক্ষা। কিছুতেই সংকল্প-চ্যুত হইলেন না। তিনি তাহাদিগকে বিনয় নম্র-বচনে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন – “জন্মভূমির সেবা করাই আমার সর্বপ্রধান কর্তব্য। সে মহান্ কর্তব্যের নিকট আপনাদের স্নেহ-মমতা অতি তুচ্ছ। সুতরাং আমি কৰ্তব্য-ভ্রষ্ট হইতে পারিব না।” তাহার এই প্রকার উক্তি শুনিয়া আত্মীয়-স্বজন যারপর নাই ক্ষুন্ন হইলেন। এইরূপে মাতৃভূমির কল্যাণ-কামনায় আত্মীয়-স্বজনের প্রাণে দারুণ শেলাঘাত করিয়া, তাহাদের আজন্ম-পােষিত স্নেহ-মমতার মধুর বন্ধন জন্মের মত ছিন্ন করিয়া এবং পার্থিব সুখ-শান্তির আশায় জলাঞ্জলি দিয়া জোয়ান্ নির্ভীকচিত্তে মৃত্যুকে আপনার ক্রীড়া-সহচর-রূপে বরণ করিয়া লইলেন। সৈনিক-জনােচিত বেশ-ভূষায় সজ্জিত হইয়া, কটিতটে শাণিত কৃপাণ লম্বিত করিয়া জোয়ান্ অশ্বারােহণে চীন ২৮ ফরাসী বীরাঙ্গনা। নগরে যাত্রা করিলেন। তাহাকে চীন পর্যন্ত পৌছাইয়া দিবার জন্য কয়েকজন অশ্বারােহী তাঁহার সঙ্গে চলিল। ভকুলিয়াস হইতে চীন প্রায় ৪৫০ মাইল দূরবর্তী এবং সমগ্র পথটি অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল। তথায় পৌছিতে হইলে ইংরেজাধিকৃত প্রদেশ এবং দুর্গম পার্বত্য ভূমি অতিক্রম কষ্মিতে হয়। তিনি এই সমুদায় বিঘ্ন-বিপদসঙ্কুল দুর্গম পথ অতিক্রম করিয়াও প্রায় দুই সপ্তাহ পরে চীন নগরে পৌছিলেন। তথায় নির্দিষ্ট সময়ে তিনি রাজ-দরবারে উপস্থিত হইলেন। অতুলৈশ্বৰ্য্য-মণ্ডিত রাজকীয় দরবার-গৃহের বৈচিত্র্যময় সৌন্দৰ্য-দর্শনে তিনি স্তম্ভিত হইলেন। তাহাকে পরীক্ষা করিবার মানসে রাজ পূর্ব হইতেই রাজসভায় আত্ম-গোপন-পূৰ্ব্বক ছদ্মবেশে অমাত্য ও অনুচরবর্গের মধ্যে অবস্থিতি করিতেছিলেন। কারণ তিনি মনে করিয়া- ছিলেন যে, জোয়ান্ যদি সত্য সত্যই ভগবদ্দর্শন লাভ করিয়া থাকেন, তবে নিশ্চয়ই তাঁহাকে চিনিয়া লইতে পারিবেন। রাজসভার বিপুল ঐশ্বৰ্য-শশাভিত রাজপুরুষ- গণের মধ্য হইতে জোয়ান্ রাঙ্গাকে চিনিয়া বাহির করি- লেন এবং তাঁহার সমীপবর্তী হইবামাত্র নতজানু হইয়া তাহাকে অভিবাদন পূর্বক ‘রাজা’ বলিয়া সম্বােধন করিলেন। ছদ্মবেশী রাজা ইহাতে বাধা দিয়া বলিলেন- “আমি ত রাজা নই।” জোয়ান্ ইহাতে বিচলিত না হইয়া বলিলেন - চীননের রাজদরবারে।

মন্ত্রে দীক্ষা । ২৯ “মহামহিমান্বিত দফি! বিশ্ব-সম্রাট পরমেশ্বরের এই দৈব- বাণী আপনার নিকট প্রচার করিতে আসিয়াছি যে, আপনি নির্ভীকচিত্তে বীরের ন্যায় রেইমস নগরে (Rheims ) অগ্রসর হউন। তথায় আপনার রাজ্যাভিষেক উৎসব নির্বিবাদে সমাধা হইবে।” জোয়ান্ সম্পূর্ণরূপে অপরিচিত হইয়াও বহু জনাকীর্ণ রাজসভার মধ্য হইতে তাহাকে কি প্রকারে চিনিয়া লই- লেন, ইহা ভাবিয়া রাজার অত্যন্ত বিস্ময় বােধ হইল। এই ঘটনায় জোয়ানের প্রতি তাঁহার শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের সঞ্চার হইল। তিনি জোয়াকে “ঐশীশক্তিসম্পন্না” বলিয়া স্থির করিলেন। কিন্তু রাজ্যের হিতৈষী, ধাৰ্মিক ও শিক্ষিত ব্যক্তিগণের মতামত গ্রহণ না করিয়া তিনি জোয়া- মকে যুদ্ধে প্রেরণ করিতে সাহসী হইলেন না। এই জন্য তিনি জোয়াকে পােয়েতিয়াস নগরে (Poitiers ) প্রেরণ করিলেন। তথায় মহা সভার ( Parliament) এক অধিবেশন হইল। রাজ্যের বহুদর্শী, শাস্ত্রজ্ঞ ধৰ্ম্মযাজক, খ্যাতনামা পোয়েতিয়ার্সের মহাসভায়। রাজনীতিবিৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিভাশালী অধ্যাপক ও অন্যান্য সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ সে অধিবেশনে যােগদান করি- লেন। জোয়ান্ সে মহাসভায় সম্মিলিত মনীষিগণের সম্মুখে উপস্থিত হইলেন। সভাস্থ সুধীমণ্ডলী তাঁহাকে নানাপ্রকার প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। একজন জিজ্ঞাসা করিলেন - ফরাসী বীরাঙ্গনা। “জোয়ান্ তুমি না বলিয়াছ পরমেশ্বর ফ্রান্সকে দাসত্ব- মুক্ত করিবেন। যদি তাহাই হয় তবে আর সৈন্য-সামন্তের প্রয়ােজন কি ? বিনা যুদ্ধেই ত দেশােদ্ধার হইতে পারে।” ইহাতে জোয়ান্ বিন্দুমাত্র অপ্রতিভ না হইয়া তেজঃপূর্ণ স্বরে প্রাজ্ঞের ন্যায় প্রত্যুত্তর করিলেন :—“মানব কৰ্ম্ম- কৰ্ত্তা; পরমেশ্বর-ফলদাতা। আমরা সশস্ত্র সৈন্য-সামন্ত লইয়া যুদ্ধ করিব। পরমেশ্বর আমাদিগকে বিজয়-গৌরবে গৌরবান্বিত করিবেন।” জোয়ানের এই প্রকার যুক্তিপূর্ণ ও ওজস্বিনী বাণী শুনিয়া সভাস্থ সুধীমণ্ডলী অত্যন্ত প্রীত হইলেন। কিন্তু সিগুইন্ (Seguin) নামক পােয়েতিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক জোয়ানের “ভগবদ্দর্শনের” কথায় প্রত্যয় স্থাপন করিতে পারিলেন না। তিনি জোয়াকে জিজ্ঞাসা করিলেন :- “তুমি যে স্বর্গীয় বাণী শুনিতে পাইয়াছিলে, তাহা কিরূপ স্বরে উচ্চারিত হইয়াছিল ?” জোয়ান্ এই প্রশ্ন শুনিয়া একটু বিরক্তি অনুভব করিলেন এবং তীব্ৰস্বরে উত্তর করিলেন—“সে স্বর আপনার কণ্ঠস্বর অপেক্ষা অধিকতর সুললিত ছিল। জোয়ানের নিকট হইতে এই প্রকার প্রত্যুত্তর পাইয়া অধ্যাপকের ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিল।. তিনি পুনরায় বলিলেন “তুমি যদি সত্য সত্যই ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত হইয়া থাক, তবে তােমার অলৌকিক

মন্ত্রে দীক্ষা।
মহাসভার
সভ্যগণের
প্রকাশ।
কাৰ্যকলাপ দ্বারা আমাদিগকে তাহার নিদর্শন দেখাও।”
তদুত্তরে জোয়ান্ দৃঢ়তাব্যঞ্জক স্বরে বলিলেন ঃ —“অলৌ-
কিক কাৰ্যকলাপ দ্বারা কোন নিদর্শন দেখাইতে আমি
এখানে আসি নাই। আমাকে সসৈন্যে অরলিন্স, নগরে
প্রেরণ করুন। অরলিন্সের উদ্ধারই আমার “ঐশীশক্তির
একমাত্র নিদর্শন হইবে।”
এইরূপ তর্ক-বিতর্ক ও আলােচনার পর সভ্যগণ
জোয়ানের প্রতি অনুকূল হইলেন। তাঁহার পক্ষে যে
ভগবানের সাক্ষাৎ লাভ করা অসম্ভব নয়, তাহা মুক্তকণ্ঠে অনুকুল মন্তব্য
স্বীকার করিলেন এবং তাঁহাকে যুদ্ধে প্রেরণ করিতে সম্মত
হইলেন। তঁাহারা জোয়ান্ সম্বন্ধে রাজাকে এই তিনটি
মন্তব্য লিখিয়া পাঠাইলেন --
(১) খৃষ্টধৰ্ম্মে জোয়ানের প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও অচলা ভক্তি
পরিলক্ষিত হইয়াছে।
(২) তিনি যে ঈশ্বরাদিষ্ট হইয়া দেশােদ্ধারে প্রবৃত্ত
হইয়াছেন, ইহাতে অবিশ্বাস করিবার কিছুই নাই।
কারণ বিধাতার কৃপায় সবই সম্ভবপর।
(৩) জন্মভূমির উদ্ধার্থে রমণীও পুরুষ-বেশে যুদ্ধ
করিবার অধিকারিণী। বাইবেলে এই প্রকার দৃষ্টান্তের
উল্লেখ আছে।
০

ফরাসী বীরাঙ্গনা।
(২)
রাজ-আজ্ঞা ও যুদ্ধ-যাত্রা।
পােয়েতিয়ার্সের সুধী-মণ্ডলীর নিকট হইতে এই
প্রকার অনুকূল মন্তব্য প্রাপ্ত হইয়া রাজা অত্যন্ত আনন্দিত
রাজা দফিনের
ঘােষণাপত্র হইলেন এবং রাজ্যের সর্বত্র এই মর্মে এক ঘােষণা-পত্র
প্রচার করিলেন যে “ফ্রান্সদেশকে বৈদেশিকের দাসত্ব
শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিয়া রাজাকে ফ্রান্সের সিংহাসনে
অধিষ্ঠিত করাইবার জন্য কুমারী জোয়াদার্ক ঈশ্বর কর্তৃক
আদিষ্ট হইয়াছেন বলিয়া নিজকে প্রকাশ করিতেছেন।
রাজা স্বয়ং এই কুমারীকে বিবিধ উপায়ে পরীক্ষা করিয়া
দেখিয়াছেন এবং তাহার চরিত্র ও কার্যকলাপ সম্বন্ধে
প্রকাশ্যে ও গােপনে অনুসন্ধান করিয়া বিশেষরূপে অবগত
হইয়াছেন যে, তিনি সম্পূর্ণ পূত-চরিত্রা, ধৰ্ম্মপরায়ণা, ঈশ্বরে
নিষ্ঠাসম্পন্না, সরল-হৃদয়া ও সত্যবাদিনী। অধিকন্তু
রাজ্যের প্রসিদ্ধ ও খ্যাতনামা ধর্মশাস্ত্রবিৎ, রাজনীতিবিৎ ও
প্রতিভাশালী অধ্যাপকগণ সম্মিলিত হইয়া এই কুমারীকে
পরীক্ষা করিয়াছেন এবং তাঁহার সম্বন্ধে অনুকূল মন্তব্য
প্রকাশ করিয়া তাহাকে যুদ্ধে প্রেরণ করিতে অভিমত
প্রদান করিয়াছেন। বিশেষতঃ এই কুমারীর জন্ম-বৃত্তান্ত
ও জীবনের কার্যকলাপ সম্বন্ধে নানা প্রকার অলৌকিক
ও আশ্চৰ্য ঘটনার কথা শুনিতে পাওয়া যায়। সুতরাং
তাঁহাকে যুদ্ধে প্রেরণ করা রাজা সম্পূর্ণরূপেই যুক্তিযুক্ত

মন্ত্রে দীক্ষা। মনে করেন এবং তদ্বারা রাজ্যের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হইবে বলিয়া বিশ্বাস করেন।” আপামর জনসাধারণ রাজার এই ঘােষণাপত্র পাঠ করিয়া পরম সন্তোষ প্রকাশ করিল। কয়েকজন উচ্চপদস্থ সমর-তত্ত্ববিৎ বীরপুরুষ জোয়াকে প্রত্যহ যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা দিতে লাগিলেন। অল্প- কালের মধ্যেই অসি-যুদ্ধ, ভল্ল-চালনা, বৃহ-রচনা ও সমর- নীতি সংক্রান্ত যাবতীয় কাৰ্যে জোয়ান্ বিশেষ পারদর্শিতা ও নৈপুণ্য লাভ করিলেন। অতঃপর তিনি যুদ্ধে গমনের জন্য প্রস্তুত হইলেন। সৰ্বাঙ্গ শুভ্রোজ্জ্বল বৰ্ম্ম-চৰ্ম্মে আবৃত করিলেন। তাঁহার কটিদেশের এক পার্শ্বে পাঁচটী “কুশ”—চিহ্নাঙ্কিত শাণিত কৃপাণ * ও অপর পার্শ্বে লৌহ- বিনির্মিত সুতীক্ষ কুঠার বিলম্বিত হইল। তিনি করতলে ইষ্টদেবতা যীশু খ্রীষ্টের নামাঙ্কিত ও শ্বেত-পদ্ম-লাঞ্ছিত উন্নত পতাকা ধারণ করিলেন। এইরূপে বিচিত্র রণ- রঙ্গিণী-বেশে সজ্জিত হইয়া, কৃষ্ণবর্ণ অশে আরােহণপূর্বক রণ-রঙ্গিণী-বেশে বহুসংখ্যক সৈন্যসামন্ত সমভিব্যাহারে তিনি ব্লোয়া (Blois) যুদ্ধ যাত্রা। নগরে যাত্রা করিলেন। তথায় সহস্র সহস্র নরনারী তাহাকে সাদরে অভ্যর্থনা করিল। ভগবচ্চরণ-স্পর্শ-পূত * এই তরবারী সম্বন্ধে এইরূপ আখ্যায়িকা প্রচলিত আছে যে, জোয়ানের নির্দেশানুসারে নিকটবর্তী কোন একটা ধৰ্ম্ম-মন্দিরে বেদীর পশ্চাতে মৃত্তিকা-গর্ভে এই তরবারী পাওয়া গিয়াছিল। জোয়ান্ বলিয়াছিলেন যে তিনি “দৈববাণী সাহায্যে উক্ত তরবারীর অস্তিত্বের কথা অবগত হইয়াছিলেন।

-৩৪ ফরাসী বীরাঙ্গনা। বীরাঙ্গনার শুভ আগমনে পরাধীনতা-লাঞ্ছিত প্ৰজাগণের নৈরাশ্য-মগ্ন হৃদয় আশার নবীনালােকে উদ্ভাসিত হইল, পরাভব-খি, অবসাদগ্রস্ত সেনাদলের মধ্যে নব জীবনের স্পন্দন অনুভূত হইল। সৰ্বত্ৰ অপূৰ্ব উৎসাহ-তরঙ্গ হিল্লোলিত হইতে লাগিল। জোয়ান্ প্রথমতঃ সৈনিকদিগের চরিত্রসংশােধনে মনাে- সৈনিকদিগের নিবেশ করিলেন। তাঁহার আদেশক্রমে সৈনিকদিগের চরিত্রসংশােধন মধ্যে দ্যুত-ক্রীড়া বন্ধ হইল, অশ্লীল আমােদ-প্রমােদ ও হাস্য-পরিহাস নিষিদ্ধ হইল। সৈন্যগণ যাহাতে ঈশ্বনােপা- সনায় নিয়মিতরূপে যােগদান করিয়া ধৰ্ম্মভাবে অনুপ্রাণিত হইতে পারে, তিনি তজ্জন্য বিশেষ নিয়ম বিধিবদ্ধ করাই- লেন। এইরূপে জোয়ান্ স্বর্গীয় মাধুৰ্য্য-মণ্ডিত পবিত্র চরিত্রের পুণ্য প্রভাবে সৈন্যদিগের মধ্যে যুগান্তর উপস্থিত করিলেন। তাঁহাদের নিদ্রিত আত্মাকে পুনরুদ্বুদ্ধ করিয়া তাঁহাদিগকে মাতৃ-যজ্ঞে আত্মাহুতি প্রদান করিবার জন্য দীক্ষিত করিলেন এবং বহু-বর্ষ-ব্যাপিনী সুষুপ্তি ও জড়তা দূরীভূত করিয়া সেখানকার শিথিল কৰ্ম্মপ্রবাহকে বেগবান করিলেন।

সমর-প্রাঙ্গণে। “পীড়িতের আর্তনাদ, দুঃখীর রােদন, কোমল কিশাের প্রাণ সহিল না আর। নবীনচন্দ্র-

No text on this page.

No text on this page.

বীরাঙ্গনা রণ-রঙ্গিণী:বেশে নিদ্রিত।।

সমর-প্রাঙ্গণে।
(১)
অলিন্স-নগর উদ্ধারের আয়ােজন।
১৪২৮ খ্রীষ্টাব্দের
অক্টোবর মাসের প্রথম ভাগে
ইংরাজেরা অরলিন্স, নগর অবরােধ করিলেন। এই
নগরটি লয়ের নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত এবং একটা
সুরক্ষিত সেতু দ্বারা নদীর অপুর তীরের সহিত সংযুক্ত।
সেতুর এক পার্শ্বে একটী সুরক্ষিত ক্ষুদ্র দুর্গ। নগরবাসী-
দিগকে এই দুর্গের পার্শ্ব দিয়া যাতায়াত করিতে হইত।
কারণ ইহাই নগরের প্রবেশদ্বার ছিল।
ফারাসীদিগের অপরিমেয় বাধা-বিপ্ন সত্ত্বেও ইংরাজের ইংরাজ-কর্তৃক
বহু চেষ্টার পর অক্টোবর মাসের শেষ ভাগে এই ক্ষুদ্র অরলিনগরের
দুর্গ অধিকার করিলেন। অল্পকালের মধ্যেই নগরের তথায় তাহাদের
নিকটস্থ কয়েকটি স্থানেও তাহাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত শক্তির দৃঢ়
অবরােধ এবং
প্রতিষ্ঠা।
হইল।
এই প্রকার প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও অরলিন্স, নগরের
উদ্ধার্থ জোয়ান্ ১৪২৯ খ্রীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের শেষ

ফরাসী বীরাঙ্গনা। যাত্রা। অরলিন্স নগরে সপ্তাহে ব্লয় নগর হইতে অরুলিন্স, নগরে যাত্রা করিলেন। যাত্রাকালে তিনি ফরাসী সৈন্যাধ্যক্ষ দুনিয়স্-প্রেরিত সৈন্য- গণকে বলিলেন –“যে পথে অল্প সময়ের মধ্যে অলিন্স, নগরে উপস্থিত হওয়া যায়, সেই পথ দিয়া আমাকে লইয়া যাও।” কিন্তু সৈন্যগণ তাহাদের অধ্যক্ষের নির্ধারিত পথ দিয়া তাহাকে লইয়া গেল। জোয়ান্ নগরের সমীপবর্তী হইয়া দেখিতে পাইলেন, তাঁহাকে ইংরাজ-অধিকৃত সেতু অতিক্রম করিয়া নগরে প্রবেশ করিতে হইবে। তিনি বুঝিলেন, সৈন্যগণ তাঁহাকে প্রতারিত করিয়া এই পথে আনয়ন করিয়াছে। ইহাতে সৈন্যগণের প্রতি তিনি অত্যন্ত রুষ্ট হইলেন। কিন্তু অনুসন্ধানে যখন তিনি জানিতে পারিলেন যে, দুনিয়সের আদেশানুসারেই সৈন্যগণ তাঁহাকে বিপরীত পথে লইয়া আসিয়াছে, তখন দুনিয়সের প্রতি তাঁহার অত্যন্ত ক্রোধ জন্মিল। দুনিয়স্ পূর্ব হইতেই নিকটবর্তী দুর্গের প্রাচীরে আরােহণ পূর্বক জোয়ানের আগমনের প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। জোয়ান্ সসৈন্যে নদী-তীরে পৌছিতেছেন দেখিয়া দুনিয়স দুর্গ-প্রাচীর হইতে অবতরণ করিলেন এবং তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার মানসে একখানি ক্ষুদ্র তরণীসংযােগে নদীর অপর তীরে গমন করিলেন। জোয়ানের সমীপবর্তী হইয়া নিয়সের সহিত দুনিয়স্ তাহাকে সসম্মানে অভিবাদন করিলে জোয়ান বাদানুবাদ। বিরক্তি-সহকারে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন -“আপনি সমর-প্রাঙ্গণে। জোয়ানের অরলিন্স নগরে প্রবেশ। কেন আমাকে এই পথে আনিবার জন্য আপনার সৈন্যগণকে আদেশ দিয়াছিলেন ?” তদুত্তরে দুনিয়স্ বিনীতভাবে . বলিলেন –“এ পথ সর্বাপেক্ষা নিরাপদ বলিয়াই অপরা- পর সেনানায়কের পরামর্শে ঐরূপ আদেশ দিয়াছিলাম। জোয়ান্ অধিকতর অসন্তোষ-প্রকাশ-পূৰ্ব্বক বলিলেন “তবে ভগবানের আদেশ অপেক্ষা আপনাদের আদেশেরই কি গুরুত্ব অধিক ?” তৎপর দিবস ২৯শে এপ্রিল, জোয়ান্ সসৈন্যে নিরাপদে নগরে প্রবেশ করিলেন। ইংরাজেরা উপেক্ষা বশতঃ তাহাকে কোন প্রকার বাধা প্রদান করিলেন না। নগরে প্রবেশ করিয়া তিনি প্রথমেই ধৰ্ম্ম-মন্দিরে গমন করিলেন এবং তথায় ঈশ্বনােপাসনায় প্রকৃত্ত হইলেন। উপাসনান্তে তিনি সমস্ত নগর পরিভ্রমণ করিলেন। তাঁহার আগমনে নগরবাসীদিগের হৃদয়ে আশা ও উদ্দীপনার সঞ্চার হইল। বহু লােক তাঁহার দর্শন লাভের আশায় এবং তাহার অমৃতময়ী উপদেশ বাণী শ্রবণের মানসে মহােল্লাসে সমবেত হইতে লাগিল। সহস্র সহস্র নরনারী উচ্ছসিত-কণ্ঠে জয়ধ্বনি করিয়া নগরের নির্জীব দূরীভূত করিল। অযথা রক্তপাতে বসুন্ধরা কলুষিত করা এবং অনর্থক নরহত্যায় অশান্তির সৃষ্টি করা জোয়ানের সম্পূর্ণ প্রকৃতি- বিরুদ্ধ ছিল। এই কারণে ইংরাজেরা যাহাতে বিনা রক্ত- পাতে ফ্রান্স, পরিত্যাগ করেন, তজ্জন্য তিনি যথােচিত

৪০
ফরাসী বীরাঙ্গনা
পত্র-প্রেরণ
।।
উপায় অবলম্বনে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি ইংরাজদিগের
শিবিরে এই মর্মে একখানি পত্র প্রেরণ করিলেন
“ইংলণ্ডের অধীশ্বর, তদধীন ভূস্বামী ও সৈন্যাধ্যক্ষগণ !
ইংরাজ শিবিরে
আমি ভগবানের আদেশে স্বদেশােদ্ধারে প্রবৃত্ত হইয়াছি।
অতএব আপনাদিগের নিকট সনির্বন্ধ অনুরােধ যে, আপনারা
কোন প্রকার গােলযােগ উপস্থিত না করিয়া ফ্রান্স, পরি-
ত্যাগ করুন। আর সৈনিকগণ ! তােমাদিগকেও সৃষ্টি-
স্থিতি-প্রলয়-কৰ্ত্তা বিশ্ব-বিধাতার নামে বলিতেছি যে, তােমরা
কোন প্রকার অশান্তির সৃষ্টি না করিয়া স্বদেশে প্রত্যাবর্তন
হে রাজন্ ! আমি আপনাকে পুনরায় বিশেষরূপে
বলিতেছি যে, যদি ইহার ব্যতিক্রম হয়, তবে নিশ্চিত
জানিবেন, আপনাদিগকে ইহার উপযুক্ত প্রতিফল ভােগ
করিতে হইবে। পক্ষান্তরে আপনারা যদি শান্তি স্থাপন
করিতে প্রয়াসী হন, তবে আমরা আপনাদিগের সহিত
পরমানন্দে সন্ধি-সূত্রে আবদ্ধ হইব এবং আপনাদিগকে
সাদরে অভ্যর্থিত করিব।”
ইংৰাজ-শিবিরে যখন এই পত্র পঠিত হইল, তখন
ইংরাজ কর্মচারীদিগের মধ্যে বিষম উত্তেজনার সঞ্চার
ইংরাজদিগের
উত্তেজনা ও হইল। তাহারা জোয়ানের পত্রখানিকে অবমাননা সূচক
নীতিবিগহিত
কাৰ্য্য।
জ্ঞান করিলেন। যে পত্র-বাহক ইংরাজ-শিবিরে পত্র
লইয়া গিয়াছিলেন, ইংরাজেরা তাঁহার প্রতি নানাপ্রকারে
দুর্ব্যবহার করিলেন এবং তাঁহাকে শৃঙ্খলিত করিয়া

সমর-প্রাঙ্গনে।
৪১
কারাগারে আবদ্ধ করিলেন। ইংরাজদিগের এই প্রকার
ব্যবহারে জোয়ান্ যার-পর-নাই ক্ষুন্ন হইলেন। কিন্তু
তথাপি তাহার ধৈৰ্য্যচ্যুতি ঘটিল না। ফরাসীদিগের
দুর্গের নিকটেই ইংরাজদের একটি শিবির সন্নিবিষ্ট ছিল।
ইহা দেখিয়া জোয়ান্ দুর্গ-শিখরে আরােহণ-পূৰ্ব্বক তাহার
পত্রাল্লিখিত প্রস্তাবটি স্বয়ং উচ্চৈঃস্বরে ইংরাজদিগকে
জ্ঞাপন করিলেন। ইহাতে ইংরাজ কর্মচারীদিগের
ভাবান্তর হওয়া দূরে থাকুক, তাঁহাদের উত্তেজনা অধিকতর
বৃদ্ধি পাইল। সার উইলিয়ম্ গ্লদেল ( Sir Wiliam
ইংরাজ সেনা
Glasdale) নামক একজন ইংরাজ সেনানায়ক তদুত্তরে
পতির অভদ্র
জোয়াকে নিতান্ত হীন-জনােচিত অভদ্র-ভাষায় ভৎসনা ভাষা-প্রয়ােগ।
করিলেম। ৫ ইহাতে জোয়ান্ ইংরাজ কর্মচারীদিগের
* (a) Laughter, ridicule, and sneering jibes, were the only
answer this letter produced from the besiegers. They called
her a jade and a cow-keeper. They dishonourably kept her
herald a prisoner. (Lamartine's "Memoirs of celebrated
characters' Vol II. Page 83).
(১) ইংরাজ সেনাপতি সাফো (Suffolk} ফরাসী-দুতকে লক্ষ্য করিয়া
বলিয়াছিলেন -
.......................Plant a stake ! for by my God
He shall be kalendeted of this new faith
First martyr, (Robert Soushey's " Joan of Arc " Book
VI, Page 95).
+ Here Glasdale overwhelmed her with abuse, calling her
cowherd and prostitute. (Michelet's History of France,
Tranzlated by G. H. Smith. Vol. II; Page 127).

82
ফরাসী বীরাঙ্গনা।
ব্যবহারে দুঃখ প্রকাশ করিলেন। সে যাহা হউক, এই
ঘটনায় যুদ্ধ অনিবাৰ্য্য হইয়া উঠিল ; জোয়ান্ অনন্যোপায়
হইয়া সমরায়ােজনে প্রবৃত্ত হইলেন।
(২)
অরলিন্স, উদ্ধারের সূচনা—যুদ্ধারম্ভ
৬ই মে (১৪২৯ খ্ৰীঃ অঃ) তারিখে জোয়ানের
নিকট এইরূপ সংবাদ আসিল যে, ইংরাজদিগের
নূতন একদল সৈন্য নগরাভিমুখে অগ্রসর হইতেছে।
এই সংবাদ প্রাপ্ত হইয়া তিনি সেনাপতি দুনিয়সকে
বিশেষরূপে সাবধান করিয়া দিলেন যে, বিপক্ষীয়
সৈন্যগণ নগরের সমীপবর্তী হইলেই যেন তাঁহাকে সংবাদ
দেওয়া হয়। ইহার পূর্বে সমরায়ােজনব্যাপারে কয়েকদিন
অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করিয়া তিনি ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিলেন।
এই কারণে কিঞ্চিৎ বিশ্রাম নিতান্ত আবশ্যক মনে করিয়া
স্বীয় বিশ্রামভবনে গমন করিলেন এবং অল্পকাল মধ্যেই
নিদ্রাভিভূত হইয়া পড়িলেন। এ সুযােগে দুনিয়স্ অপরাপর
সেনানায়কগণকে সমভিব্যাহারে লইয়া সসৈন্যে ইংরাজ
অধিকৃত সেলুপ, নামক একটা gf ( Bastile dest.
I.oup) আক্রমণ করিলেন। কিন্তু এদিকে অকস্মাৎ
জোয়ানের নিদ্রাভঙ্গ হইল। তৎক্ষণাৎ তিনি শয্যা পরি-
ত্যাগ করিলেন এবং তাহার অনুচরকে বলিলেন :-

সমর-প্রাঙ্গণে। ৪৩ “শীঘ্র অস্ত্র-শস্ত্র দাও। মনে হইতেছে যেন যুদ্ধক্ষেত্রে আমার উপস্থিতি নিতান্ত প্রয়ােজন হইয়াছে।” এইরূপে তিনি যখন অত্যন্ত ব্যস্ততার সহিত সমর-সাজে সজ্জিত হইতেছিলেন,তখন হঠাৎনগরের তােরণ-দ্বারের নিকট হইতে ভীষণ কোলাহল শ্রুত হইল। তৎক্ষণাৎ তিনি অশ্বারােহণে সেদিকে বিদ্যুদ্বেগে ছুটিয়া গেলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া দেখিলেন, ইংরাজেরা প্রবল-পরাক্রমে যুদ্ধ করিতেছে—আর ফরাসীরা তাঁহাদিগের আক্রমণ-বেগ সহ্য করিতে অক্ষম হইয়া রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিতেছে। ফরাসী সৈন্যের এই দুর্দশা-দর্শনে জোয়ানের কোমল হৃদয়ে শেলবিদ্ধ হইল, প্রদীপ্ত মুখমণ্ডলে কালিমার সঞ্চার হইল। কিন্তু ইহাতে তিনি স্বল্পমাত্র বিচলিত না হইয়া ছত্রভঙ্গ সৈন্য- গণকে সম্নদ্ধ করিতে লাগিলেন এবং উৎসাহ-বাক্যে তাহ- দিগকে অনুপ্রাণিত করিলেন। তাঁহার উদ্দীপনাময়ী বাণী শ্রবণে ফরাসী সৈনিকদিগের হৃদয় রণােম্মদে উন্মত্ত হইয়া উঠিল। তাহারা পুনরায় অমিত-তেজে ইংরাজদিগকে আক্র- মণ করিল। জোয়ান্ বিপুল বাহিনীর অগ্রবর্তিনী হইয়া সমরপথে পরিচালিত হইতে লাগিলেন। তরঙ্গ-তাড়িত তৃণ- গুচ্ছের ন্যায় ইংরাজ-চমু পর্যুদস্ত হইতে লাগিল। বীৰ্য- যুদ্ধে জয়লাভ বতী বীরাঙ্গনার অপ্রতিহত আক্রমণে ইংরাজেরা পরাজিত • দুর্গ-অধিকার। হইল। অচিরে ফরাসীরা ইংরাজাধিকৃত দুর্গ অধিকার করিল।

৪৪ ফরাসী বীরাঙ্গনা। গণের মধ্যে জোয়ানের অসামান্য রণ-নৈপুণ্য ও অলৌকিক সৈনা- পত্যের পরিচয় পাইয়া ফরাসী যােদ্ধগণ সকলেই স্তম্ভিত ও বিস্মিত হইলেন। কিন্তু তাহার এই প্রকার অপ্রত্যাশিত জয়-লাভে তাহাদের মধ্যে কতিপয় যশোলি ও স্বার্থ- ন্বেষী ব্যক্তির হৃদয়ে জোয়ানের প্রতি ঈর্ষার সঞ্চার হইল। জোয়াকে পুনর্বার যুদ্ধ করিবার সুযােগ দান করিলে তাহাদের যশােহানি হইতে পারে, এই আশঙ্কায় সেনাপতি ফরাসী যােন্ধ, দুনিয়স্ জোয়ানের নিকট সন্ধির প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন এবং ইহাও জ্ঞাপন করিলেন যে, সম্প্রতি ইংরাজদিগের ঈর্ষার সঞ্চার। বিরুদ্ধে আর কোন অভিযান প্রেরণ করা সমর-পরিষদের (Council of War) সভ্যগণের অভিপ্রেত নহে। জোয়ান্ তদুত্তরে বলিলেন –“আপনারা পরিষৎ লইয়াই থাকুন। আমি আমার কর্তব্য করিয়া যাইব। কল্যকার যুদ্ধের জন্য সৈন্যগণ প্রস্তুত হউক। আমার আরও অনেক কাজ করিবার আছে।” পরদিন ৭ই মে তারিখে জোয়ান্ প্রত্যুষে গাত্রোখান ভীষণ রক্তপাত, করিয়াই সমরায়ােজনে প্রবৃত্ত হইলেন এবং বহুসংখ্যক জোয়ান্ আহত, ইংরাজদিগের সৈন্য লইয়া ইংরাজদিগের অপর একটী সুরক্ষিত দুর্গ আক্র- সৈন্তক্ষয়, মণ করিলেন। পূর্বদিনের সংগ্রামে জোয়ান্ যে অদ্ভুত বীরত্ব ফরাসীদিগের ও অলৌকিক সাহসের পরিচয় প্রদান করিয়াছিলেন, তাহাতে হীনশক্তি, হতােছম ফরাসী সৈন্যগণের হৃদয়ে এক অপূর্ব বলের সঞ্চার হইয়াছিল। তাই ৭ই মের যুদ্ধে দ্বিতীয় যুদ্ধ- জয়লাভ।

সরপ্রাণে ৪৫ তাহারা বিক্ষ দলকে পরাহত করিবার মানসে অতুল বিক্রম প্রকাশ করিয়াছিল। কিন্তু ইংরাজেরা বীরের জাতি, রণে নিপুণ, সাহসে দুর্জয় ও অধ্যবসায়ে অটল। তাঁহারাও ফরাসীদিগের আক্রমণ প্রতিহত করিবার জন্য প্রাণপণে যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। ইংরাজ সেনাপতি গ্লেসদে বীরােচিত পরাক্রমের সহিত সৈন্যচালনা করিতে লাগিলেন। অসিতে অসিতে ঝণৎকার, বল্লমে বল্লমে সংঘর্ষ, যুযুৎসুগণের মুহু- মুহুঃ কোদও টঙ্কার, নিক্ষিপ্ত শরসমুহের শন্ শন্ শব্দ, অশের হ্রেষা-ধ্বনি, আহতের মর্মভেদী-আর্তনাদ ও উন্মত্ত- প্রায় সৈন্যেগণের বিকট চীৎকারে সমরাঙ্গণের দৃশ্য ভয়াবহ হইয়া উঠিল। পরস্পরের জিঘাংসা প্রবল হইতে প্রবলতর হইতে লালি।

No text on this page.

মন্ত্রের সাধন
*শরীরং বা পায়েয়ং
কাৰ্যং বা সাধমেয়ং।

ফরাসী বীরাঙ্গনা। পূর্বক স্বহস্তে বিদ্ধ-শর উৎপাটিত করিয়া ক্ষত স্থানে ঔষধ প্রয়ােগ করিলেন। অতঃপর কিয়ৎক্ষণের জন্য নির্জনে বসিয়া ঈশ্বনােপাসনা করিলেন। উপাসনান্তে পুনরায় যুদ্ধ করিতে উদ্যত হইলেন। সেনাপতি দুনিয় দুর্গজয়ের কোন আশা নাই দেখিয়া, রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করিবার পরামর্শ করিতে লাগিলেন। জোয়ান্ সেই কাপুরুষােচিত পরামর্শ অগ্রাহ্য করিয়া পুন- রায় সৈন্য সমাবেশ-পূর্বক ইংরাজদিগকে দ্বিগুণ উৎসাহে আক্রমণ করিলেন। এবার ইংরাজেরা অধিকক্ষণ যুঝিতে পারিলেন না। অচিরে ফরাসীরা তাহাদিগকে পরাভূত করিয়া দুর্গ অধিকার করিয়া লইল। ইংরাজ সেনাপতি গ্লেসূদে ও তাঁহার কতিপয় অনুচর প্রাণভয়ে ভীত হইয়া লয়ের নদীর (I.oire) সেতুর উপর দিয়া পলায়ন করিতেছিলেন। অকস্মাৎ একটা গােলার আঘাতে সেতুর এক পার্শ্ব ভাঙ্গিয়া পড়িল। হতভাগ্য সেনাপতি সামুচরে নদীগর্ভে প্রাণত্যাগ করিলেন। এই শশাচনীয় দৃশ্য দেখিয়া কোমল-হৃদয় বীরাঙ্গনা অশ্রু-সম্বরণ করিতে পারিলেন না। এই যুদ্ধে ইংরাজ পক্ষের প্রায় আট সহস্র এবং ফরাসীদিগের শতাধিক সৈন্য নিহত হইয়াছিল। * * An ancient chronicler says :- The English lost sooo or 9000 men, the French only to or 120, which shows clearly that it was the work of the Most High," (The Patriot Martyr Page 38) মন্ত্রের সাধন। পূর্ব দিনের যুদ্ধে পরাভূত হওয়ায় ইংরাজেরা উপায়- স্তর না দেখিয়া ৮ই মে তারিখে সদলবলে অরলিন্স, নগর পরিত্যাগ করিলেন। এইরূপে মহাপ্রাণ বীরাঙ্গনার দুর্দমনীয় ই মে তারিখে সাহসে, অতুলনীয় বীরত্বে ও অসামান্য রণ-কৌশলে ইংরাজ ৰক্ষনমুক্ত হইল, কর্তৃক অবরুদ্ধ নগরের পুনরুদ্ধার হইল। অলিন্স নগরের মুক্তির পর নগরবাসী নর-নারী আনন্দে বিহ্বল হইল এবং একবাক্যে জোয়াকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতে লাগিল। কিন্তু তিনি ভগবানের কৃপাকেই তাহার সাফ- ল্যের সর্বপ্রকার নিদান বলিয়া নির্দেশ করিতেন। জোয়ানের সর্বাবস্থায়ই ভগবানে দৃঢ় নির্ভর ছিল। আনন্দে অধীর হইয়া কখনও তিনি ভগবানের দয়ার কথা বিস্মৃত হন নাই। অলিন্স, নগরের মুক্তির পর জোয়ানের উপ- দেশানুসারে ঈশ্বরােপাসনার এক বিশেষ বন্দোবস্ত হইল। বহুসংখ্যক নরনারী সে উপাসনায় কৃতজ্ঞচিত্তে যােগদান করিল। উপাসনান্তে এক বিরাট উৎসব-যাত্রা সমস্ত নগর প্রদক্ষিণ করিল। অলিন্স, উদ্ধারের পর হইতে বীরাঙ্গনা “অলিন্সের কুমারী” (Maid of Orleans) নামে খ্যাত হইলেন।

ফরাসী বীরাঙ্গনা। (২) পরবর্তী যুদ্ধ ও চার্লসের রাজ্যাভিষেক। বৃথা কালক্ষেপ করা অনুচিত মনে করিয়া জোয়ান্ সসৈন্যে পুনরায় রয় ( Blois ) নগরে যাত্রা করিলেন এবং তথা হইতে তুরস্ (Tours ) নগরাভিমুখে অগ্রসর হই- লেন। সম্রাট দফি তৎকালে উক্ত নগরে অবস্থান করিতেছিলেন। তথায় জোয়ান্ সম্রাট কর্তৃক সাদরে ও সসম্মানে অভ্যর্থিত হইলেন। তিনি দফিকে ইংরাজ- দিগের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযানে সহায়তা করিতে বলিলেন এবং রেস্ নগরাভিমুখে অগ্রসর হইয়া তথায় তাহাকে রাজপদে অভিষিক্ত হইবার জন্য অনুরােধ করি- লেন। কাপুরুষ দফিস্ অমিত-তেজ বীরাঙ্গনার অপ্রমেয় বীরত্বের সম্যক পরিচয় পাইয়াও প্রথমতঃ তাঁহার প্রস্তাবে অসম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। পরিশেষে জোয়ানের নানা প্রকার অনুনয়-বিনয় ও যুক্তিবাদে তাহার মত-পরিবর্তন হইল। তদনুসারে তিনি এলেন্কনের ডিউকের ( Duke of Alencon) নেতৃত্বে একদল সৈন্য জোয়ানের সাহায্যার্থ প্রদান করিলেন। জোয়ান্ সম্রাট প্রদত্ত নূতন সৈন্যদল লইয়া অলিন্স, নগরে প্রত্যাবৃত্ত হইলেন। অতঃপর তথা হইতে দশ মাইল দূরবর্তী জার্গে! (Jargeau) নামক স্থানে ইংরাজদিগকে আক্রমণ করেন। উভয় পক্ষে তুমুল মন্ত্রের সাধন। ফরাসীদের জয়লাভ। ইংরাজদিগের পরাজয় ও অধিকার। সংগ্রাম বাধিয়া উঠিল। ইংরাজ সৈন্য সাফোকের (Duke “জাগোতে” of Suffolk ) আজ্ঞাধীনে থাকিয়া প্রাণপণে যুদ্ধ করিতে যুদ্ধ=ইংরাজ লাগিল। কিন্তু পূত-চরিত্রা বীরাঙ্গনার অব্যাহত শক্তির নিকট ইংরাজেরা পুণ্যসলিলা ভাগীরথীর প্রবহমান খর- স্রোতমুখে ঐরাবতের ন্যায় ভাসিয়া গেল। সাফোকের ন্যায় তেজস্বী সেনাপতিও জোয়ানের হস্তে বন্দী হইলেন। জাগোতে (Jargeau) ইংরাজদিগকে পরাজিত বোগেীতে করিয়া জোয়ান্ সসৈন্যে বােগেন্সী (Beaugency) নামক স্থানে অগ্রসর হইলেন এবং তথাকার দুর্গ বিনা ক্লেশেই তাহাদের দুর্গ অধিকার করিয়া লইলেন। অতঃপর ১৮ই জুন (১৪২৯ খ্রঃ) তারিখে প্যাতে নামক (Patay) গ্রামে উভয় পক্ষের আর এক ভীষণ সংঘর্ষ হইল। তপস্বিনী বীর-ললনার দুর্জয় পৌরুষ ও করাসীগণের দীপ্ত তেজে ইংরাজের বীৰ্য-বহ্নি নিষ্প্রভ হইয়া পড়িল। ফরাসীদের হস্তে এবারও তাহাদের পরাজয় ঘটিল। তে- বতের ন্যায় রণ-নিপুণ ও সপ্রতিভ সেনাপতিও বন্দী হইলেন এবং ফাষ্ট লফের ( Fastolfe) ন্যায় সাহসী ও পরাক্রম- শালী যােদ্ধাও রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিলেন। যে কয়টী যুদ্ধের চিত্র অঙ্কিত করা হইল তাহাতে রণ- জেত্রী বীরাঙ্গনার অলৌকিক শক্তির পরিচয় সম্যক্ পরি- লক্ষিত হইবে। কিন্তু পরাজিত ও আশ্রিত শত্রুর প্রতি তিনি কি প্রকার ব্যবহার করিতেন, আহত ও বিপন্নের প্যাতের যুদ্ধ- যুদ্ধজয়।

৫৪ ফরাসী বীরাঙ্গনা। প্রতি কিরূপ সহানুভূতি দেখাইতেন এ স্থলে তাহারও অভাস প্রদত্ত হইতেছে। অরলিন্স, উদ্ধারকল্পে প্রথম যে যুদ্ধ হইল তাহাতে বহুসংখ্যক ইংরাজ ফরাসী-সৈন্যের হস্ত হইতে প্রাণরক্ষার মানসে ধৰ্ম্মযাজকের পরিচ্ছদ পরিধান-পূৰ্ব্বক আত্মগােপন করিয়াছিলেন। উন্নত-হৃদয় বীরাঙ্গনা তাহাদিগকে সাদরে অাশ্রয় দান করিলেন এবং পাছে তাহার অধীন দুবৃত্ত সৈন্য- গণ তাহাদিগের প্রতি কোন প্রকারের অত্যাচার করে, এই ভয়ে তিনি তাহাদিগকে স্বীয় বাসভবনে যত্ন-পূর্বক রাখিলেন। দ্বিতীয় যুদ্ধে ইংরাজ সেনাপতি গ্লেসূদে ও তঁাহার কতিপয় অনুচর প্রাণভয়ে ভীত হইয়া পলায়ন-কালে যখন নদীগর্ভে নিমজ্জিত হইতেছিলেন, তখনকার শোচনীয় দৃশ্য পরাজিত শত্রুর দেখিয়া জোয়ান্ বিপন্ন শত্রুগণের জন্য শােক প্রকাশ প্রতি সদ্ব্যবহার বিপন্নের প্রতি করিয়াছিলেন। এতদ্ব্যতীত যখনই যুদ্ধাবসান হইত, তখনই সহানুভূতি। দেখা যাইত জোয়ান্ নিহত ব্যক্তিদিগের জন্য শােকাকুল- চিত্তে অশ্রু-বিসৰ্জ্জন করিতেছেন। আহতদিগের পরিচৰ্যায় জোয়ানের হৃদয়ের মহত্ত্ব, আশ্রিত ও * Many of the English who had put on the priestly habit by way of protection was brought in by the Pucelle, li e. Joan) and placed in her own house to ensure their safety ; she knew the ferocity of her followers. (Michelet's History of France, Translated by G, H $ nith ; Vol II. Page 127.)

মন্ত্রের সাধন। তিনি স্বয়ং নিযুক্ত হইয়া স্বহস্তে তাঁহাদের ক্ষতস্থান বাঁধিয়া দিতেন এবং মরণােম্মুখ ব্যক্তিকে সান্ত্বনা প্রদান করিয়া তাহার আত্মাকে শীতল করিতেন। আশ্রিত ও পরাজিত শক্রর প্রতি এ প্রকার সদ্ব্যবহার, বিপন্নের প্রতি এহেন সমবেদনা, আহতের পরিচর্যায় এরূপ যত্ন ও চেষ্টা- প্রকৃত বীরধৰ্ম্মের কি সুন্দর দৃষ্টান্ত, মহত্ত্বের কি মনােরম নিদর্শন এবং স্বভাৰ-কোমল ও সেবাপরায়ণ রমণী-হৃদয়ের কি অনুপম আলেখ্য। প্যাতে নামক গ্রামে যে যুদ্ধ হইয়া গেল, তাহার প্রায় চারি সপ্তাহ পরেই দফিনের রাজ্যাভিষেকের আয়ােজন করা হইল। রেমস্ নগর রাজ্যাভিষেকের জন্য নির্দিষ্ট হইল। কিন্তু তখনও ঐ নগর শত্ৰুদিগের হস্তগত ছিল। রেমসের প্রধান ধর্মযাজক (Archbishop of Rheims), রাজ- মন্ত্রী, সভাসদ্বর্গ ও কয়েক সহস্র সৈন্য সমভিব্যাহারে লইয়া দফিন্ মহাসমারােহে রেমস্ নগরের অভিমুখে অগ্রসর হইতে লাগিলেন। বীরাঙ্গনার অপূৰ্ব্ব যুদ্ধ-জয় ও বীরত্বের কাহিনী পূর্ব হইতেই দেশময় রাষ্ট্র হইয়া পড়িয়াছিল। সুতরাং পথিমধ্যে যে সমুদয় স্থান শত্ৰুদিগের অধিকৃত ছিল, তাহার সমস্তই একে একে বশ্যতা স্বীকার করিল। mke She dismounted, gave her briddle to her page, raised the wounded from the ground, and dressed their wounds with her own hands. (Lamartine's" Memoirs of Celebrated characters." Vol II. Page 92).

ফরাসী বীরাঙ্গনা। অভিষেক- উৎসবের উদ্বোধন। ১৬ই জুলাই (১৪২৯ খ্রঃ) রাজা পাত্র-মিত্র-সহ নির্বিঘ্নে রেমস্ নগরে প্রবেশ করিলেন। পরদিবস ১৭ই জুলাই রবিবার রেসের প্রাচীন ধৰ্ম্ম-মন্দিরে রাজ্যাভিষেকোৎসব আরম্ভ হইল। দফিন্ রাজকীয় পরিচ্ছদ-পরিধান-পূর্বক বেদীর নিকট গমন করিলেন এবং নতজানু হইয়া এই মৰ্ম্মে শপথ করিলেন যে—রাজ্য-মধ্যে যাহাতে সুবিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করে, খ্রীষ্টধর্মের মর্যাদা রক্ষিত হয় এবং প্রজাকুলের সুখ-শান্তি বৃদ্ধি পায়, তৎপ্রতি তিনি দৃষ্টি রাখিবেন। এই প্রতিজ্ঞা গ্রহণের পর সম্মিলিত জন- সম্বের বিপুল জয়ধ্বনি ও আনন্দোচ্ছাসের কোলাহলে তাঁহাকে রাজমুকুটে ভূষিত করা হইল। এইরূপে দফিন্ “সপ্তম চার্লস্” নামে অভিহিত হইয়া ফ্রান্সের সিংহাসনে আরূঢ় হইলেন। অভিষেক-কালে জোয়ান্ তাঁহার খ্রীষ্ট- নামাঙ্কিত ও শ্বেত-পদ্ম-লাঞ্ছিত পতাকাখানি হস্তে ধারণ- পূর্বক রাজার পার্শ্বে দণ্ডায়মান ছিলেন। উৎসব-ক্রিয়া সমাধা হইলে পর, তিনি রাজার সম্মানার্থ হস্তস্থিত পতাকা উৎসবক্রিয়ার অবনমিত করিয়া তাঁহার সম্মুখে নতজানু হইলেন। তখন পরিসমাপ্তি উপস্থিত জন-মণ্ডলীর দৃষ্টি তৎপ্রতি আকৃষ্ট হইল এবং সকলেই তাঁহার পূত-কণ্ঠ-বিনিঃসৃত বাক্য শ্রবণ করিবার প্রদর্শন। অভিলাষে উদ্গ্রীব হইয়া পড়িল। জোয়ান্, ভাব-বিচলিত কণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে বলিলেন –“রাজন্ ! যাঁহার অলঙ্ঘনীয় আদেশে রেস্ নগরে আপনার রাজ্যাভিষেকের আয়ােজন রাজার প্রতি জোয়ানের সম্মান- মন্ত্রের সাধন। ৫৭ করিয়াছি, আজ সেই মঙ্গলময় বিধাতার শুভ ইচ্ছা পূর্ণ হইল। অদ্য হইতে আপনি যথারীতি রাজ-পদে অধিষ্ঠিত হই- ‘লেন ; ফরাসী জাতি সর্ববিষয়ে আপনার আজ্ঞাধীন হইবে।” (৩) প্যারী-নগরের যুদ্ধ ও পতনের পূর্বাভাস। উপযুপরি কয়েকটি যুদ্ধে জয়লাভ করাতে, জোয়ানের যশােরাশি দেশময় ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। সৈন্যগণ তাহার ইঙ্গিতে পরিচালিত হইতে লাগিল এবং রাজাও তাঁহার প্রতি সবিশেষ শ্রদ্ধা প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিলেন। এ অবস্থায় জোয়ান্ ইচ্ছা করিলে বিনা ক্লেশেই সম্মান- সূচক, উচ্চ রাজ-পদে অধিষ্ঠিত হইয়া অপরিমেয় প্রভুত্ব বিস্তার করিতে পারিতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রণাে- দনায় তিনি দেশােদ্ধারের পবিত্ৰ-ব্রত উদযাপনে প্রবৃত্ত হন নাই। তাই তিনি প্রভুত্ব ও সম্মান লাভের আকাঙ্ক্ষাকে কখনও হৃদয়ে স্থান পাইতে দেন নাই। তথাপি রাজা কৃত- জ্ঞতার নিদর্শন-স্বরূপ জোয়াকে সম্মানসূচক সনদ প্রদান করিলেন এবং তাঁহার জন্মস্থান দুরীমি গ্রামকে যাবতীয় রাজ-কর হইতে অব্যাহতি দিলেন। অলিন্স, নগরকে দাসত্বের নাগ-পাশ হইতে মুক্ত করা এবং রাজাকে ফ্রান্সের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করা—এই ব্রত নিষ্কাম কৰ্ম্ম।

৫৮ ফরাসী বীরাঙ্গনা। অবসরগ্রহণের ও তাহাতে রাজার অসম্মতি জ্ঞাপন। গ্রহণ করিয়া জোয়ান্ কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। এইক্ষণ তাঁহার ব্রত সম্পূর্ণরূপে উদযাপিত হইয়াছে দেখিয়া তিনি রাজার নিকট স্বীয় পল্লী-ভবনে প্রতিগমন-পূর্বক মাতা পিতা ও আত্মীয়-স্বজনের সহিত গার্হস্থ্য-সুখে কাল-যাপন করিবার অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। অনুমতি প্রার্থনা কিন্তু রাজা সে প্রস্তাবে কিছুতেই সম্মত হইলেন না। কারণ তিনি জানিতেন জোয়ানের অনুপস্থিতিতে সৈন্য- দিগের মধ্যে নিরুৎসাহ ও শৈথিল্যের সঞ্চার হইবে। বিশে ষতঃ সম্প্রতি তিনি প্যারী-নগর আক্রমণ-পূর্বক ইংরাজ- দিগকে তথা হইতে বিতাড়িত করিবার সংকল্প করিয়া- ছিলেন। জোয়ানের অভাবে তাঁহার সে সংকল্প সিদ্ধ হইবার সম্ভাবনা একেবারে বিলুপ্ত হইবে। সুতরাং জোয়া- নের নানা প্রকার অনুরােধ সত্ত্বেও রাজা তাঁহাকে যাইতে দিলেন না। কিন্তু জোয়ান্ ইহা অন্তরে অন্তরে উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন যে, তাহার প্রতি ভগবান্ যে কর্তব্য- ভার ন্যস্ত করিয়াছিলেন, তাহা সমাধা হইয়াছে। বিশেষতঃ আর কোন নূতন কার্যে ব্রতী হইবার জন্য তিনি ভগবৎ- প্রেরণা অনুভব করেন নাই। তথাপি একান্ত অনিচ্ছা- সত্ত্বেও, রাজার অনুরােধে তাঁহাকে পুনরায় যুদ্ধযাত্রা করিতে হইল। ৮ই সেপ্টেম্বর (১৪২৯ খ্ৰীঃ অঃ) জোয়ান্ প্যারী- নগর আক্রমণ করিলেন। এই তারিখে খ্রীষ্টানদিগের মন্ত্রের সাধন। যুদ্ধ ও একটি পৰ্বদিন ছিল। তথাপি রাজাদেশ অনতিক্ৰমণীয় মনে করিয়া নিজের একান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি এই কাৰ্য্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। ইংরাজের পূর্ব হইতেই প্যারী- নগরকে ফরাসীদিগের আক্রমণ হইতে রক্ষা করিবার সবি- শেষ বন্দোবস্ত করিয়াছিলেন। জোয়ান্ বীরােচিত পরাক্রমের • প্যারীনগরের সহিত যুদ্ধ করিয়াও জয়-লাভ করিতে পারিলেন না। ইংরাজদিগের আক্রমণ-বেগ সহ্য করিতে না পারিয়া তাঁহার জোয়ানের পরাজয়। অধিকাংশ সৈন্য পৃষ্ঠ-প্রদর্শন করল। তথাপি জোয়ান্ শত্রু-হস্তে পরাজিত হইয়া প্রত্যাগমন করা অপেক্ষা রণ- ক্ষেত্রে প্রাণ-বিসর্জন দেওয়া শ্রেয়স্কর মনে করিয়া অল্প- সংখ্যক সৈন্য লইয়াই অবিচলিত-ভাবে যুদ্ধ করিতে লাগি- লেন। এদিকে ফরাসীদিগের অন্যতম সেনা-নায়ক ডিউক- অব-এলেঙ্ক যুদ্ধ-জয়ের কোন সম্ভাবনা না দেখিয়া এবং জোয়ান্ অচিরে শত্রু-হস্তে পতিত হইবেন জানিয়া তাহাকে বল-পূৰ্ব্বক যুদ্ধক্ষেত্র হইতে অপসারিত করিলেন। এই যুদ্ধে প্রায় পনর শত সৈন্য আহত হইয়াছিল। এই ভীষণ নর-শােণিত-পাতের অপরাধ ও জাতীয় পর্ব- দিনে প্যারী-নগর আক্রমণ-পূর্বক খ্রীষ্টধৰ্ম্মের অবমাননা করার জন্য জোয়ানের প্রতি অন্যায়রূপে দোষারােপ করা হইয়াছিল। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ন্যায়ত ও ধৰ্ম্মতঃ * This was contrary to the advice of Pucellc; her voice warned her to go no further than St. Denys. Fifteen hundred men were wounded in this attack, which ফরাসী বীরাঙ্গনা। তিনি যে এজন্য দায়ী নহেন, তাহা পূর্বেই বলা হইয়াছে। জোয়ান্ এতাবৎকাল কোন যুদ্ধেই পরাজিত হন নাই। তাঁহার জীবনের এই প্রথম পরাজয়ে তিনি মর্মে মর্মে : মরিয়া গেলেন এবং ভাৰী অমঙ্গলের পূর্বাভাস হৃদয়ে অনু- ভব করিয়া যার-পর-নাই ক্ষুন্ন হইলেন। ( ৪ ) শেষ যুদ্ধ ও শত্রু-হস্তে পতন। প্যারী-নগরের যুদ্ধে পরাজিত হওয়ায় জোয়ানের হৃদয়ে যে নিদারুণ আঘাত লাগিয়াছিল, তাহা তিনি মুহূর্তের জন্যও বিস্মৃত হইতে পারেন নাই। আত্মাবমাননার সে জঘন্য স্মৃতি প্রতিমুহূর্তে তাহার কোমল হৃদয়কে ক্ষত- বিক্ষত করিতে লাগিল। প্যারী হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া তিনি বর্গেস (Bourges) নামক স্থানে গমন করিলেন এবং তথায় শীত-ঋতু যাপন করিলেন। রাজাও চীন নগরে ফিরিয়া গেলেন। জোয়ান্ বসন্ত-ঋতুর প্রারম্ভে, পুনরায় সৈন্য-সমাবেশ করিলেন এবং শত্রু-কর্তৃক অবরুদ্ধ কম্পিয়েন্ (Comshe was wrongfully accused of having advised...... (Michelet's History of France Translated by Smith. Vol. II Page 1321.

শত্রু হস্তে বীরাঙ্গনা।
“শত্রু পক্ষীয় একজন সৈনিক তঁাকে অশ্ব হইতে বলপূর্বক আকর্ষণ কবিয়।
ভূতলে পাতিত কৰিল ।”

No text on this page.

মন্ত্রের সাধন।
৬১
শেষ যুদ্ধ,
জোয়ানের
পরাজয়
piegne) নামক অপর একটি নগরের উদ্ধার্থ যাত্রা
করিলেন। ১৪৩০ খ্রীষ্টাব্দের ২৩ মে তারিখে তিনি
সসৈন্যে নগরে প্রবেশ করিলেন। তদনন্তর তিনি তাহার
স্বাভাবিক বল-বীৰ্য্য ও পরাক্রমের সহিত শত্রুপক্ষের দুর্গ
আক্রমণ করিলেন। কিয়ৎকাল সংগ্রামের পরই জোয়ানের
সৈন্যগণ শত্রুপক্ষের আক্রমণ-বেগ সহ করিতে অক্ষম
হইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। জোয়ান্ পলায়মান কম্পিয়েনের
সৈন্যগণকে ফিরাইয়া আনিলেন এবং তাহাদিগকে পুনরায়
শ্রেণীবদ্ধ করিয়া যুদ্ধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু ফরাসী-
সৈন্যগণ প্রাণভয়ে ভীত হইয়া এবারও পৃষ্ঠ প্রদর্শন শহন্তে পতন।
করিল।
জোয়ান্ দ্বিতীয়বার তাহাদিগকে উৎসাহবাক্যে ফিরাইয়া
আনিলেন। পরিশেষে জয়লাভের কোন সম্ভাবনা না
দেখিয়া তিনি তাহার সৈন্যগণকে যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ
করিবার আদেশ দিলেন। সৈন্যগণ এই আদেশ প্রাপ্তি-
মাত্রই ক্ষিপ্রগতিতে রণক্ষেত্র পরিত্যাগ করিল। জোয়াও
কতিপয় শরীর-রক্ষক সৈন্যসহ যুদ্ধক্ষেত্র পরিত্যাগ করিতে
উদ্যত হইলেন। এমন সময় সহসা শত্রু-সৈন্য তাহাকে
বেষ্টন করিয়া ফেলিল। জোয়ান্ ও তদীয় অনুচরবর্গ
অসীম পৌরুষের সহিত শত্রুর আক্রমণ ব্যর্থ করিতে
লাগিলেন। অকস্মাৎ শত্রুপক্ষীয় একজন সৈনিক তাঁহাকে
অশ্ব হইতে বলপূর্বক আকর্ষণ করিয়া ভূতলে পাতিত

ফরাসী বীরাঙ্গনা।
করিল। জোয়ান তৎক্ষণাৎ উঠিয়া দাড়াইলেন এবং
আত্মরক্ষার্থ নির্ভীক-চিত্তে অস্ত্র-চালনা করিতে লাগিলেন।
* এদিকে শত্রুপক্ষীয় সৈন্যগণ দলে দলে আসিয়া তাঁহার
উপর পতিত হইল।
জোয়ান্ আর আত্মরক্ষা করা
সম্ভবপর নহে, দেখিয়া শত্রুপক্ষের সাহায্যকারী জনৈক
দেশদ্রোহী ফরাসীর (Bastard of Vendome) হস্তে
আত্মসমর্পণ করিলেন। এই দেশদ্রোহী তাহাকে
ডিউক-অব-বাগান্দির প্রধান সেনাপতি কাউন্ত-লিগনীর
হস্তে অৰ্পণ করিল।
বলা বাহুল্য, ইহারা উভয়েই
জোয়ানের স্বজাতীয় ও স্বদেশবাসী। অনেকে অনুমান
করেন জোয়ানের পক্ষীয় কয়েকজন নীচাশয় সেনানায়ক
তাঁহার বিমল কীৰ্ত্তি-সঞ্চয়ে ঈর্ষান্বিত হইয়া শত্ৰুদিগের
নিকট হইতে উৎকোচ-গ্ৰহণ-পূর্বক কৃতম্বের ন্যায় তাহাকে
ধরাইয়া দিয়াছিল।
স্বজাতির
কৃতঘ্নতা।

কারাগারে।
“তোমার অশ্রুতে অশ্রু করিব বর্ষণ।
হৃদয়ের রক্ত দিয়া পারি যদি মুছাইতে
একবিন্দু, হবে মম সার্থক জীবন।”
নবীন চন্দ্র

No text on this page.

No text on this page.

বােয়েন নগরের দুর্গ।
{ এই দুর্গে বীরাঙ্গনা অবরুদ্ধ ছিলেন ।

কারাগারে। (১) কারা-কাহিনী। জোয়ান্ বন্দিনী হইলেন। পাষাণ-প্রাচীরবেষ্টিত কারা- গৃহে তাঁহার স্থূল-দেহ শৃঙ্খলিত হইল বটে; কিন্তু তাহার, হৃদয় কিছুতেই অবনমিত হইল না। সে অতি-মানুষ তেজ ও অলৌকিক বল-বীৰ্য মুহূর্তের জন্যও হ্রাস পাইল না। প্রকৃত বীর-ধৰ্ম্মানুসারে জোয়ানের প্রতি সদ্ব্যবহার করাই তাঁহার শত্ৰু-গণের পক্ষে বিধেয় ছিল। কিন্তু তাহার শত্রু- গণ এস্থলে সেই চিরন্তন নীতি উল্লঙ্ঘন করত তাহাকে সাধারণ বন্দীদিগের শ্রেণীভুক্ত করিয়াছিল। কারাগারে বন্ধন-দশায় জোয়ানের প্রতি যেরূপ ব্যবহার করা হইয়াছে, তাঁহাকে ছলে, বলে, কৌশলে যে প্রকার নির্যাতন করা হইয়াছে, তাহা নিতান্ত নীতিহীনতা, নৃশংসতা ও কাপুরুষ- বীর-ধর্মের বহিত কাৰ্য- তার পরিচায়ক। ১৭৩০ খ্রীষ্টাব্দের ২৩ মে জোয়ান্ জোয়ানকে শত্রু-হস্তে বন্দিনী হন; পরবর্তী বৎসরের (১৭৩১ খ্রীঃ অঃ) সাধারণ বন্দিরূপে গণনা ও তাঁহার জানুয়ারী মাসে তাঁহার বিচার আরম্ভ এবং ৩০ মে তাহা প্রতি দুর্ব্যবহার। * There was no possible reason, why Joan should not be regarded as a prisoner of war, and be entitled to all the ourtesy and good usage, which civilized nations practise owards enemies on these occasions. She had never in her military capacity, forfeited, by any act of treachery or cruelty, her claim to that treatment. She was unstained by any civil crime. ( David Hume's History of England, Vol III. Page 155).

ফরাসী বীরাঙ্গনা। সমাপ্ত হয়। সুতরাং তাঁহাকে পূর্ণ এক বৎসর কাল কারা- যন্ত্রণা ভােগ করিতে হয়। কম্পিয়েনের (Compiegne) যুদ্ধে পরাজিত হইয়া বন্দিনী হওয়ার পর হইতে জোয়ান্ সেনাপতি কাউন্তু- লিগনীর (Count de Ligny) তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এই সেনাপতি লাসেম্বর্গের (Luxemburg) সামন্ত- ভূপতির অধীন একজন ভূস্বামী ছিলেন। সুতরাং তাঁহার ইংরাজ-প্রভুর মনস্তুষ্টির জন্য তিনি জোয়াকে উক্ত ভূপতির হস্তে সমৰ্পণ করিবার সংকল্প করিলেন। লিগনীর পত্নী তাঁহার এই ঘৃণিত সংকল্পের বিষয় অবগত হইয়া ফরাসী রমণীর তাঁহাকে সে পাপ পথ পরিত্যাগ করিবার জন্য নানা জ্বলন্ত চিত্র-- প্রকারে অনুনয়-বিনয় করিলেন। এমন কি তিনি স্বামীর স্বামীকে দেশ- চরণতলে পতিত হইয়া নিতান্ত কাতর ভাবে জোয়ানের দ্রোহিতার পাপ হইতে রক্ষার মুক্তি ভিক্ষা করিলেন। কিন্তু এই অন্তঃপুর-চারিণী ললনার হৃদয়ে যে মহাব স্থান-লাভ করিয়াছিল, পাপিষ্ঠ লিগনীর জোয়ানের মুক্তি হৃদয়কে তাহা স্পর্শও করিতে পারিল না। লিগনীবিজাতির নিকট আত্ম-বিক্রয় করিয়া স্বদেশ ও স্বজাতিকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছেন। তাহার স্বার্থ-বধির কর্ণকুহরে পত্নীর এ করুণ প্রার্থনা স্থান পাইল না। তিনি তাহার প্রভু ডিউক-অব-লাকসেস্বর্গের হস্তে জেয়াকে সমর্পণ করি- লেন। এই সহৃদয় ইংরাজ-সামন্ত বন্দিনী শত্রু-রমণীর প্রতি কোন প্রকার দুর্ব্যবহার করেন নাই। তিনি জোয়াকে মহত্ত্ব ও স্বদেশপ্রেমের চেষ্টা এবং ভিক্ষা।

কারাগারে। ৬৭ জোয়ানের আপনার বরিভয়ের ( Beaurevoir) নগরস্থ প্রাসাদে ইংরাজ সামন্তের ভদ্র ব্যবহার লইয়া গেলেন। তথায় তাঁহার পরিবার-ভুক্ত মহিলাগণ তাহার প্রতি সাতিশয় সম্মান ও সৌজন্য প্রকাশ করিতেন। ইংরাজ মহিলা- গণের সহৃদয়তা। তাঁহাদের অনুরােধে জোয়ান্ সৈনিক-বেশ পরিত্যাগ-পূর্বক ভদ্রমহিলার যোগ্য পরিচ্ছদ ধারণ করিলেন। দুবৃত্ত সৈনিকগণের হস্ত হইতে আত্মসম্মান-রক্ষাকল্পেই তিনি ঐরূপ পুরুষ-জনােচিত বেশ-ভূষায় সজ্জিত হইয়াছিলেন। পলায়ন-চেষ্টা কিছুদিন এইভাবে কালাতিপাত করার পর, জোয়ানের এবং বরিভয়ের হৃদয় তাহার স্বদেশবাসীর জন্য অতীব চঞ্চল হইয়া উঠিল। নগর হইতে স্থানান্তরিত। তিনি হৃদয়াবেগ সংবরণ করিতে না পারিয়া একদিন গোপনে প্রাসাদ-প্রাচীর হইতে লাফাইয়া পড়িয়া পলায়নের চেষ্টা করিলেন। কিন্তু ভূমিতলে নিপতিত হইয়া গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হওয়ায় তাঁহার সে চেষ্টা ব্যর্থ হইল। তিনি পুনরায় প্রাসাদে নীত হইলেন। অল্পকাল মধ্যেই লাক্‌সেম্- বর্গের অাত্মীয়াগণের আন্তরিক যত্নে ও পরিচর্যায় তিনি আরােগ্যলাভ করিলেন। এই ঘটনার পর লাসের্গ জোয়কে তঁাহার নিকট রাখা নিরাপদ মনে না করিয়া ডিউক-অর-বার্গান্দির নিকট প্রেরণ করিলেন। অতঃপর ডিউকের আদেশক্রমে জোয়ান্ স্কার্প (Scarpe) নদীর তটস্থ আরা { Arras) নগরের সুরক্ষিত, কারাগৃহে অবরুদ্ধ হইলেন। কিয়দ্দিন পরে তাহাকে অরা নগর হইতে ক্রতয় (Crotoy) নামক স্থানে স্থানান্তরিত করা হইল।

ফরাসী বীরাঙ্গনা। অতঃপর জোয়ান্ জনাকীর্ণ রাজ-পথের মধ্য দিয়া প্রহরি- পরিবেষ্টিত হইয়া সাধারণ বন্দীর ন্যায় শৃঙ্খলিত-অবস্থায় রােয়েন্ নগরের দুর্গে নীত হইলেন। অশিক্ষিত ও চরিত্র- হীন সৈনিকগণের ক্ষমতাধীনে তাঁহাকে কাল-যাপন করিতে ? হইবে দেখিয়া, তিনি পুনরায় পুরুষ-জনােচিত পরিচ্ছদ এ ধারণ করিলেন। এই স্থানে কারাবাস-কালে কাউন্ত, falstatt (Count de Ligny), poh-ofka (Earl of Warwick) ও অপর একজন সম্রান্ত ইংরাজকে সমভি ব্যাহারে লইয়া জোয়ানের সহিত সাক্ষাৎ করতে গিয়া- ছিলেন। জোয়ানের বন্ধন-দশা দর্শনে লিগনী পরিহাস- পূর্বক বলিলেন :“জোয়ান্ আমি তোমায় কারামুক্ত করিতে আসিয়াছি। কিন্তু তুমি প্রতিজ্ঞা কর যে, আমাদের বিরুদ্ধে আর কখনও অস্ত্রধারণ করিবে না।” বন্দিনী কারাগারে বীরাঙ্গনা এই পরিহাস বাক্য সহ্য করতে না পারিয়া জোয়ানের প্রতি তিরস্কার-ব্যঞ্জক-স্বরে নির্ভীক-চিত্তে উত্তর করিলেন :- পরিহাস। “আপনি অামায় উপহাস করিতেছেন। আমায় কারামুক্ত করিবার আপনার কোন অধিকার নাই; সেরূপ ইচ্ছাও বীরােচিত উত্তর নাই। আমি বেশ জানি ইংরাজেরা আমার প্রাণনাশ ও তাহাতে করিবেন। তাহাদের ধারণা, আমার মৃত্যুতে ফ্রান্স, তাহাদের ইংরাজ-প্রভুর ধৈষ্যচ্যুতি হস্তগত হইবে। কিন্তু সে আশা তাঁহাদের বৃথা হইবে। ইংরাজেরা যদি সংখ্যায় লক্ষ গুণেও বৃদ্ধি পান, তথাপি চেষ্টা। ফান্স তাহাদের অধীনতা স্বীকার করিবে না। জোয়ানের বন্ধনদশা সত্ত্বেও জোয়ানের প্রাণনাশের

কারাগারে।
এই বীরােচিত বাক্য লিগনীর সহচর ইংরাজটির অসহ্য
হইয়া উঠিল। বীর-চূড়ামণি ইংরাজ-ভূপতি ক্রোধােন্মত্ত
হইয়া সৰ্বাঙ্গ-শৃঙ্খলিত, নিরাশ্রয় জোয়ানের বুকে শাণিত
ছুরিকা বিদ্ধ করিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু আল-বার্বিক
তাঁহার এই কাপুরুষােচিত কার্যে বাধা দান করিলেন।
এতদ্ব্যতীত কারাগারের সামান্য প্রহরীরা পৰ্যন্তও তাঁহার
সহিত দুর্ব্যবহার করিত।
প্রসিদ্ধ ইংরাজ-ঐতিহাসিক তাণার সাহেব (Turner)
যেরূপ মৰ্ম্মস্পর্শিনী ভাষায় জোয়ানের কারা-যন্ত্রণার বিবরণ
লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাহাও এস্থলে উদ্ধত হইল। তিনি
বলেন ঃ-
"Her feet and legs were fetiered to a
strong chain, which traversed the end of her
bed, and was locked to a large piece of wood,
five feet long Another chain was fastened
around the middle of her thin and spare body,
so that she could not move from her place.
A cage of iron was sworn to have been made
for her, in which she was fastened 'hy the
neck, feet and hands, from the time of her
(* See Michelel's History of France Translated by Smith.,
vol il, Page 145)

ফরাসী বীরাঙ্গনা। arrival at Rouen to the first day of her trial" অর্থাৎ তাঁহার পদদ্বয় সুদৃঢ় লৌহ-শৃঙ্খলে বদ্ধ করা হইয়াছিল। পাঁচ ফুট দীর্ঘ একটা প্রকাণ্ড কাষ্ঠ-খণ্ডের সহিত সেই শৃঙ্খল সংযুক্ত হইয়াছিল। এই শৃঙ্খলের দৈর্ঘ্য এতদূর ছিল যে,ইহা তাঁহার (জোয়ানের) শয্যা-প্রান্ত অতিক্রম করিয়াছিল। অপর একটা শৃঙ্খল দ্বারা তাহার ক্ষীণদেহের মধ্যদেশ এরূপ ভাবে বেষ্টন করা হইয়াছিল, যেন তিনি স্থানচ্যুত হইতে না পারেন। একটি লৌহ-পিঞ্জরও তাহার জন্য নির্মিত হইয়াছিল। রােয়েন্ নগরে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় হইতে বিচার কাৰ্য্য আরব্ধ হওয়ার প্রথম দিবস পর্যন্ত, তাহাকে ইহার ভিতরে গ্রীবাদেশ ও হস্ত- পদাদি বদ্ধ অবস্থায় রাখা হইয়াছিল । জোয়ান্ যখন শত্রু-হুস্তে এই প্রকার অসহনীয় কারা- যন্ত্রণা ভোগ করিয়া প্রাণ-শক্তি হারাইতেছিলেন, তখন অকৃতজ্ঞ ও অপদার্থ রাজা চার্লস নিশ্চেষ্ট ভাবে কালাতি- পাত করিতেছিলেন। যাহার কঠোর সাধনা-বলে ও বিজয়িনী শক্তির প্রভাবে চার্লস্ পর-হস্তগত রাজ্য পুনরধিকার করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন এবং যাহার অলৌকিক বীরত্বে ও জীবনব্যাপী সংগ্রামের ফলে, তিনি রাজ-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন, সেই বীরাঙ্গনার .See Turner's History of England, Vol. II, Page 593.

কারাগারে।
৭১
উদ্ধারকল্পে তিনি কোন প্রকার যত্নই করেন নাই। তাঁহার
এই অমার্জনীয় অকৃতজ্ঞতার দরুণ ইতিহাস তাঁহাকে
চিরদিনের তরে কৃষ্ণবর্ণে চিত্রিত করিয়া রাখিয়াছে
বিচারের
পূৰ্বায়ােজন।
(২)
বিচার-প্রহসন।
জোয়ান্ যখন রােয়েন্ নগরের কারা-গৃহে শারীরিক ও
মানসিক যন্ত্রণা ভােগ করিয়া দিনের পর দিন, শরীর ক্ষয়
করিতেছিলেন, তখন শত্রুগণ তাঁহার ধ্বংসের পথ অন্বেষণে
প্রবৃত্ত হইয়াছিল। তাহারা জোয়ানের বিচারায়ােজনে মনাে-
নিবেশ করিল। সামরিক বিচারালয়ে তাঁহার বিচার হইলে
তিনি প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হইতেন না। কারণ যুদ্ধ করিতে
যাইয়া যাহারা শত্রু-হস্তে ধৃত হন, তাঁহারা বীর-ধৰ্ম্মানুসারে
সকল সভ্য জাতির নিকটই অবধ্য। কিন্তু জোয়ানের
অপূর্ব রণ-নৈপুণ্য ও অলৌকিক শক্তির পরিচয় পাইয়া
ইংরাজেরা যার-পর-নাই শঙ্কিত হইয়াছিলেন। তাঁহার ন্যায়
একজন অসাধারণ প্রতিপত্তিশালিনী শত্ৰু-পক্ষীয় রমণীকে
জীবিত রাখা কোন প্রকারেই নিরাপদ মনে করিলেন না।
এই কারণে তাঁহার অস্তিত্ব-লেপের বাসনায়, তাহ'কে
‘শয়তানের শিয়া’ ও ‘প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধ-চারিণী
বলিয়া বিচারার্থ ধর্মযাজকদিগের হস্তে অৰ্পণ করিলেন।

१२ কচনের দেশদ্রোহিতা। ফরাসী বীরাঙ্গনা। তৎকালে কচ (Cauchon) নামক জনৈক ফরাসী, বােভেয়(Beauvais) নগরস্থ ধৰ্ম্মমন্দিরের অধ্যক্ষ(bishop) ছিলেন। ইনি স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিদেশীর নিকট আত্মবিক্রয়- পূর্বক স্বদেশ ও স্বজাতিকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হইয়াছিলেন। এক্ষণে জোয়ানের বিরুদ্ধে ডাকিনী-বৃত্তির (witchcraft) অভিযােগ আনয়ন করাই তিনি ইংরাজদিগের অনুগ্রহ লাভের একটি প্রধান উপায় বলিয়া মনে করিলেন। কচ- নের আনুকূল্য লাভ করায় ইংরাজদিগের সঙ্কল্প-সিদ্ধির পথ সরল হইয়া গেল। জোয়ান্ তখনও বার্গান্দির ডিউকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। এই কারণে ফ্রান্সের ধৰ্ম্ম-সংক্রান্ত বিচারালয়ের প্রধান প্রতিনিধি’ (Vicar General of- Inquisition) ২৬এ মে (অর্থাৎ জোয়ানের ধৃত হওয়ার তিন দিন পরে ডিউকে এই মর্মে এক পত্র লিখিয়া পাঠাইলেন যে “জোয়ান নাম্নী যে রমণী আপনার নিকট বন্দিনী হইয়া আছে, আমাদের বিশ্বাস, সে প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধ-চারিণী। সুতরাং ধর্ম ও ন্যায়ের নামে আমরা পবিত্র ধর্মাধিকরণের ( Holy Inquisition) পক্ষ হইতে তাঁহাকে বিচারার্থ এখানে প্রেরণ করিতে আপনাকে অনুরােধ করিতেছি।” বলা বাহুল্য যে, ইংলণ্ডের কার্দিনালের (Cardinal of Winchester) আদেশ-ক্রমেই ভাইকা ঐরূপ পত্র লিখিয়া পাঠাইয়াছিলেন। কিন্তু fute ( Duke of ১

কারাগারে।
}
Burgundy) ভাইকারের প্রেরিত পত্রানুসারে কাৰ্য
করিতে সম্মত হইলেন না। তখন প্যারীর বিশ্ববিদ্যালয়ের
কর্তৃপক্ষীয়গণ জোয়াকে বিচারার্থ ধর্মাধিকরণের হস্তে
অৰ্পণ করিবার জন্য ডিউকের নিকট পৃথক্ পত্র লিখিয়া
পাঠাইলেন। প্যারী নগর তখন ইংরাজদিগের শাসনাধীন
ছিল। সুতরাং সেখানকার শ্রেষ্ঠ লােকেরা তাঁহাদিগের
মুখাপেক্ষী হইয়া কাৰ্য্য করিতে বাধ্য হইতেন। ডিউক
ইংরাজদিগের সহিত নানা প্রকার স্বার্থ-সূত্রে জড়িত ছিলেন
বলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষীয়গণের আদেশ উপেক্ষা
করিতে পারিলেন না। এদিকে দেশদ্রোহী কচও
ইংলণ্ডাধিপতি ষষ্ঠু হেল্পীর নিকট এইরূপ অভিপ্রায়
জ্ঞাপন করিলেন যে, জোয়ান্ তাহার অধিকারভুক্ত সীমার
মধ্যে ধৃত হওয়ায়, তিনি জোয়ানের বিচারভার স্বয়ং গ্রহণ
করিতে ইচ্ছুক আছেন।
হেরী এই পত্র পাঠে আনন্দিত হইয়া ১২ই জুন
(১৪৩০ খ্রঃ) তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়কে লিখিয়া জানাইলেন
যে ;—“জোয়ানের বিচারকার্য্যের ভার বোভেয় নগরের
রাজাদেশ-কচন
ধর্মাধ্যক্ষ কচ ও পবিত্র ধর্মাধিকরণের প্রতিনিধির উপর
ও ভাইকারের
অর্পিত হইল।” যে সময়ে জোয়ানের বিচার-সম্বন্ধে এই- হন্তে বিচার-ভার
রূপ আদেশ প্রচারিত হইতেছিল, সেই সময়ে ইংরাজদিগের
অধিকৃত আরও দুইটী নগর ফরাসীদিগের হস্তগত হয়।
ইংলণ্ডের কার্দিনাল (Cardinal of Winchester} এই
অর্পণ।

৭৪ ফরাসী বীরাঙ্গনা। অশুভ লক্ষণ দর্শনে অত্যন্ত চিন্তান্বিত হইলেন; এবং ফরাসী-রাজ চার্লস্ একটি প্রেত-বিদ্যা-সম্পন্ন নারীর সহায়তায় রাজপদে অভিষিক্ত হইয়াছেন—ইহা প্রমাণ পূর্বক তঁাহাকে সভ্য-জগতের নিকট হীন করিবার অভি- প্রায়ে, অতিরিক্ত আড়ম্বরের সহিত ইংলণ্ডাধীশ্বর ষষ্ঠ হেরীর রাজ্যাভিষেকের অয়ােজন করিলেন। ২রা ডিসেম্বর (১৪৩০ খ্রীঃ) ইংলণ্ডাধিপ হেরী প্যারী নগরে প্রবেশ করিলেন। তথায় তাঁহার রাজ্যাভিষেক উৎসব সমাধা হইল। জোয়ানের বিচার-কাৰ্য্য আরম্ভে বিলম্ব হইতেছিল দেখিয়া রাজা হেরী ঐ বিষয়ে ত্বরা করিবার জন্য পুনরাদেশ করিলেন। এই আদেশ পাইয়া বিসপ (Cauchon) দ্বিগুণ উৎসাহে বিচারায়ােজনে নিবিষ্ট-চিত্ত হইলেন। জোয়ানের নিষ্কলঙ্ক চরিত্রসম্বন্ধে যাহাতে দূষণীয় প্রমাণ সংগৃহীত হইতে পারে, তজ্জন্য তাহার জন্মস্থান দুশ্রীমি গ্রামে গুপ্তচর প্রেরিত হইল। কোন কোনও ঐতিহাসিক বলেন, তাহার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য সংগ্ৰহাৰ্থ অপরাপর স্থানেও গুপ্তচরেরা গমন করিয়া- ছিল। ক্ষুধিত গৃধ্র যেমন গলিত, শবের অন্বেষণে সর্বত্র * But, as in the greatest judicial investigation in History, it was necessary to obtain false witnesses, in order to accomplish the object in view, so the enemies of the maid were in some difficulty to procure such evidence as would incriminate her. (The Patriot martyr. Page 85,) কারাগারে। ঘুরিয়া বেড়ায়, ইহারাও তেমনি নানা স্থান পরিভ্রমণ করিল। কিন্তু কোথাও জোয়ানের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করিতে পারিল না। যেখানেই এই সকল গুপ্তচরেরা জোয়ানের প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়াছিল, সেখানেই জনসাধারণ তাঁহার এই বিপদে সহানুভূতি জ্ঞাপন করিয়াছিল—কেহ, কেহ বা তাঁহার সদ্গুণাবলীর কথা বলিতে বলিতে অশ্রু পাত করিয়াছিল এবং কেহ বা তাহার নানা প্রশংসাবাদ করিয়াছিল। (৩) বিচার-কাৰ্য্য আরম্ভ। ১৪৩১ খ্রীষ্টাব্দের ৯ই জানুয়ারী জোয়ানের বিচার আরম্ভ হইল। ধর্মাধ্যক্ষ কচন্ ও ধর্মাধিকরণের প্রতিনিধি বিচারাসনে উপবেশন করিলেন। আটজন বহুদর্শী ব্যবহার- বিশারদ (Lawyers) ও অন্যান্য কতিপয় সম্রান্ত ব্যক্তি বিচারকার্য্যের সহায়তা করিবার জন্য বিচারালয়ে উপস্থিত হইলেন। জোয়াকে ‘ডাকিনী’ ও ‘প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধ- চারিণী” বলিয়া অভিযুক্ত করিবার জন্য প্রধান বিচারপতি কচন্ যে সমুদয় প্রমাণ সংগ্রহ করিয়াছিলেন, উপস্থিত ব্যক্তিদিগের মধ্যে অধিকাংশের মতানুসারে তাহা নিতান্ত ৭৮ ফরাসী বীরাঙ্গনা। অপৰ্যাপ্ত বলিয়া প্রতিপন্ন হইল। ইহাতে কচন্ অনন্যো- পায় হইয়া পরবর্তী অধিবেশনের জন্য স্বেচ্ছানুসারে কয়েক জনকে বিচারকার্যের সাহায্যকারী রূপে মনােনীত করিয়া , লইলেন এবং যাহাদের সহিত তঁাহার মতের অনৈক্য হইয়া- ছিল ও যে সমুদয় স্বাধীন-চিত্ত ব্যক্তি তাঁহার স্বেচ্ছাচার বিচার-প্রণালীতে বাধা দিবার চেষ্টা করিতেছিলেন, তাহা- দিগকে অপসারিত করিলেন। এইরূপে সিদ্ধিপথের কণ্টক দূরীভূত ও বিচারের যাবতীয় উপকরণ সুচারুরূপে সজ্জিত হইলে পর, ২১এ ফেব্রুয়ারী জোয়ানকে বিচারালয়ে উপস্থিত করা হইল। সেইদিনকার অধিবেশনে কচন্ জোয়াকে বিচারকদের জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিবার জন্য অনুরােধ করি- লেন। এস্থলে বলা আবশ্যক, যে, সেকালের বিচার- পদ্ধতি বর্তমানকালের মত ছিল না। অভিযুক্তকে জেরা দোষাবহ বলিয়া গণ্য হইত না। এই কারণে কচন্ প্রমুখ বিচারকগণ জোয়াকে জেরা করিতে উদ্যত হইয়াছিলেন। তদুত্তরে জোয়ান্ বলিলেন –“আপনারা আমায় কি প্রশ্ন করিবেন তাহা আমি জানি না। এমন কোন প্রশ্ন করিতে পারেন যে, আমি তাহার উত্তর দিতে পারিব না।” তিনি তাহার দৈববাণী-সংক্রান্ত ঘটনা ভিন্ন আর সমুদয় বিষয়েই সরলভাবে উত্তর দিতে স্বীকৃত হইলেন। কিন্তু বিচারকগণকে জানাইলেন যে, কারাগারে। ৭৭ যদি তঁাহার শিরচ্ছেদও করা হয়, তথাপি তিনি দৈববাণীর বিষয় কিছুই বলিবেন না। জোয়ানের এই প্রকার দৃঢ়তাব্যঞ্জক উত্তরসত্ত্বেও কচন্ তাহাকে দৈববাণীর বিষয়ে সত্য প্রকাশ করিবার জন্য পীড়াপীড়ি করিতে লাগিলেন। পরবর্তী ২২এ ও ২৪এ তারিখের অধিবেশনেও তাহাকে ঐ বিষয়েই পুনরায় পীড়াপীড়ি করা হইল। কিন্তু তিনি পূর্বের ন্যায় অটল রহিলেন। বিচারকগণ তাঁহার বয়সের কথা জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলিলেন যে, তাঁহার বয়স প্রায় উনবিংশ বৎসর। তৎপর জোয়ান্ বিচারক- গণসমীপে তাহার শৃঙ্খল-বন্ধন-জনিত যন্ত্রণার অভিযােগ করিলে, কচম্প্রত্যুত্তরে বলিলেন-“তুমি পলায়নের চেষ্টা করিয়াছ বলিয়াই তােমাকে বাধ্য হইয়া শৃঙ্খলাবদ্ধ করিয়া রাখিতে হইয়াছে।” উত্তরে জোয়ান্ নির্ভীকভাবে বলিলেন আমি যে পলায়নের চেষ্টা করিয়াছি, সে কথা সত্য। এরূপ চেষ্টা কোন বন্দীর পক্ষে দূষণীয় নহে।” চতুর্থ দিবসের অধিবেশনে জোয়ান্ সমস্ত সঙ্কোচ পরিহার করিলেন এবং তিনি যথার্থই যে দৈববাণী শ্রবণ করিয়াছিলেন, সে কথাও স্বীকার করিলেন, কিন্তু দৈববাণী তাঁহাকে কি আদেশ করিয়াছিল, তা প্রকাশ করিয়া বলিবার জন্য বিচারকগণ তাঁহাকে পীড়ন করায়, জোয়ান্ প্রত্যুত্তরে বলিলেন –“আমি তাহা সমুদয় প্রকাশ করিতে ৭৮ ফরাসী বীরাঙ্গনা জোয়ানের (তজস্বিতা। পারি না। আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অপেক্ষা স্বর্গ-দূতকে অসন্তুষ্ট করিতে আমি অধিক ভয় করি। আমার প্রার্থনা, এবিষয়ে আমায় কিছু জিজ্ঞাসা করিবেন ।” একথা শুনিয়া কচন্ বলিলেন –“সত্য কথা বলা কি পাপ?” জোয়ান্ দৃঢ়তার সহিত প্রত্যুত্তর করিলেন “স্বর্গ-দূত আমায় যে আদেশ দিয়াছেন, তাহা আপনাদের জন্য নয় ; রাজার জন্য।” উচ্ছলিত হৃদয়াবেগ সম্বরণ করিতে না পারিয়া তিনি আরও বলিতে লাগিলেন :- “আমি ঈশ্বরের নিকট হইতে আসিয়াছি; এখানে আমার কোন প্রয়ােজন নাই। যাহার নিকট হইতে আসিয়াছি, আমাকে তাহার নিকট প্রেরণ করুন। আপনারা বলি- তেছেন আপনারাই আমার বিচার-কৰ্ত্তা। ভাবিয়া দেখুন আপনারা কি করিতেছেন। সত্যই আমি দেব-প্রেরিত ; তবে জানিয়া রাখুন, আপনারা স্বেচ্ছায়ই বিপন্ন হইতে- ছেন।” জোয়ানের এই তেজস্বিতাপূর্ণ বাক্যে গর্বিত বিচারকগণ যার-পর-নাই উত্তেজিত হইলেন এবং নিতান্ত হীন-প্রকৃতি লােকের ন্যায় জোয়াকে অন্যায় ও জটিল প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। তাহারা জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন -“জোয়ান্ তােমার কি বিশ্বাস হয় যে, তুমি দেবানুগ্রহ প্রাপ্ত হইয়াছ ?” বলা বাহুল্য যে, এ প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে “হ” কিম্বা “না” বলা উভয়ই বিপজ্জনক। বিচারকগণের অন্যায় প্রশ্ন ও জোয়ানের প্রাজ্ঞােচিত উত্তর।

কারাগারে।
কারণ “না” বলিলে প্রতিপন্ন হইত যে জোয়ান্ দেবানুগ্রহ
হইতে বঞ্চিত। সুতরাং তিনি কি করিয়া দেব-প্রেরিত
বলিয়া আপনাকে প্রচার করিতে পারেন ? পক্ষান্তরে
“হ” বলিবার পথও জোয়ানের পক্ষে রুদ্ধ ছিল। কারণ
এই পাপ-প্রলােভন-পূর্ণ জগতে নিতান্ত দাম্ভিক ভিন্ন
কেহই দৃঢ়তা সহকারে বলিতে পারেন না যে, “আমি
দেবানুগ্রহ প্রাপ্ত হইয়াছি।” বিশেষতঃ খ্রীষ্টান সমাজে
আপনাকে দেবানুগৃহীত বলিয়া প্রচারিত করা নিতান্ত
দোষাবহ বলিয়া বিবেচিত হইয়া থাকে। কিন্তু জোয়ান্
ইহাতে কিঞ্চিত্র অপ্রতিভ না হইয়া প্রকৃত খ্রীষ্ট-ভক্তের
ন্যায় উত্তর করিলেন “যদি আমি দেবানুগ্রহ না পাইয়া
থাকি, তবে প্রার্থনা করি তিনি যেন আমায় তঁাহার অনু-
গ্রহ প্রদান করেন। আর যদি পাইয়া থাকি, তবে প্রার্থনা
তিনি যেন আমায় তাহা হইতে কখনও বঞ্চিত না করেন।”
তিনি আরও বলিলেন –“অহা। আমি যদি সত্য সত্যই দেবা-
নুগ্রহ হইতে বঞ্চিত হইয়া থাকি, তবে আমার ন্যায় ঘােরতর
পাপীয়সী এ জগতে আর কে আছে ? কিন্তু আমাতে যদি
কোন প্রকারের পাপ থাকিত, তবে নিশ্চয় আমি দৈববাণী
শুনিতে পাইতাম না। আমার একান্ত ইচ্ছা--যেন আমার
ন্যায় প্রত্যেকেরই উহা শ্রবণ-গোচর হয়।” জোয়ানের এই
Michelet's History of France, Translated by Smith.
vol. ll. Page i4i.

ফরাসী বীরাঙ্গনা। প্রাজ্ঞােচিত উত্তরে বিচারকগণের উত্তেজনা ওবিদ্বেষ শতগুণ বৃদ্ধি পাইল। তাহারা হতবুদ্ধি হইয়া অনেকক্ষণ পর্যন্ত বিচার-কাৰ্য স্থগিত রাখিলেন। অতঃপর পুনরায় দ্বিগুণ তেজের সহিত তাহারা বিচার- কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন এবং জোয়ানের সর্বনাশ সাধনের অভিপ্রায়ে তাহাকে প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করিতে লাগিলেন। বিচারকগণের এইরূপে চতুর্থ দিবসের অধিবেশন সমাপ্ত হইয়া গেল। নীতিহীনতার পঞ্চম দিবসের অধিবেশনে বিচারকগণ জোয়াকে নিদর্শন-- জোয়ানের প্রতি নিতান্ত নীচভাবের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। তৎপরে হীন প্রশ্ন। জোয়াকে “শয়তানের শিষ্যা” বলিয়া প্রতিপন্ন করিবার উদ্দেশ্যে তঁাহার প্রতি কতকগুলি অন্যায় ও অবান্তর প্রশ্ন করা হইল। বিচারকগণ জিজ্ঞাসা করিলেন – “তুমি কি নিশ্চয় করিয়া বলিতে পার, তুমি যে মূর্তি দেখিতে পাইয়াছিলে, তাহা যথার্থই স্বর্গ-দূতের ?” জোয়ান্ প্রত্যুত্তরে নির্ভয়ে বলিলেন :“হাঁ, আমি এইরূপ বিশ্বাস করি। ঈশ্বরে আমার বিশ্বাস যতটা স্থির, এ বিষয়ও ততটা দৃঢ়।” তৎপর তাহার পতাকা সম্বন্ধে ও অপরাপর বিষয়ে তাহাকে প্রশ্ন করা হইল। প্রশ্ন। তুমি কি সৈন্যগণকে বল নাই যে, তুমি যে রকমের পতাকা ব্যবহার কর, তাহা শুভফল প্রদান করিবে ? উত্তর। না, আমি এইমাত্র বলিয়াছি যে, বীরের

কারাগারে।
ন্যায় ইংরাজদিগের সম্মুখীন হও; আমি তােমাদের অনু-
সরণ করিব।
প্রশ্ন। আচ্ছা, যে সব লােক তােমার হস্তপদ ও
পরিচ্ছদাদি চুম্বন করিত, তাহারা কোন্ উদ্দেশ্যে চালিত
হইয়া আসিত ?
উত্তর। তাহারা আপনা হইতেই আসিত। কারণ
আমি কখনও তাহাদের কোন অনিষ্ট করি নাই।
তাহাদের সেবায় নিজকে যথাসাধ্য নিয়ােজিত করিতাম।
বলা বাহুল্য, কচনের মনােনীত এসেসরগণের (বিচার
কাৰ্যের সাহায্যকারী) মধ্যেও কেহ কেহ এইরূপ অবান্তর
প্রশ্নের প্রতিবাদ করিয়াছিলেন। কিন্তু এই প্রতিবাদে
কোন সুফল ফলিল না। পক্ষান্তরে এই সকল বিরুদ্ধ
বাদিগণকে বিচারালয়ে উপস্থিত থাকিয়া, জোয়ানের
অনুকূলে মন্তব্য প্রকাশ করিবার সুযােগ প্রদান করা
কচ সমীচীন মনে করিলেন না। তিনি অচিরে তাহা-
দিগকে
পদচ্যুত
করিলেন। অতঃপর ১০ই হইতে ১৭ই
মার্চ তারিখের মধ্যে যে কয়েকটি অধিবেশন হইল,
তাহাতে, কচ অত্যল্প সংখ্যক এসেসর লইয়া সম্পূর্ণ
গােপনে বিচার কার্য পরিচালিত করিলেন। এতদ্ব্যতীত
বিচারের স্থানও পরিবর্তিত করা হইল। প্রথমতঃ
রােয়েনের রাজকীয় প্রাসাদেই বিচারকার্য সম্পন্ন হইত।
কিন্তু পরে কচনের আদেশানুসারে তত্রত কারাগারের

৮২ ফরাসী বীরাঙ্গনা। অভ্যন্তরে বিচারের স্থান নির্দিষ্ট হইল। তথায় জন- সাধারণের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ ছিল। বিচারকক্ষের দ্বার রুদ্ধ করিয়া জোয়াকে নানাপ্রকার সঙ্গত ও অসঙ্গত প্রশ্ন করা হইত। ১৭ই মার্চের পর প্রথম যে অধিবেশন হইল তাহাতে বিচারকগণ জোয়াকে জিজ্ঞাসা করিলেন ঃ—“পিতা মাতার বিনানুমতিতে গৃহত্যাগ করা কি তােমার উচিত হইয়াছে ?” “তাহারা আমায় ক্ষমা করিয়াছেন। আমি ভগবানের আদেশ পালন করিয়াছি। সুতরাং যদি শত সহস্র পিতা মাতাও আপত্তি করিতেন, তথাপি গৃহত্যাগ করা আমার পক্ষে অন্যায় হইত না। কারণ ভগবানের আদেশ পাইয়াছিলাম।” —“জাতীয় পর্বদিনে প্যারী নগর আক্রমণ করা কি উচিত হইয়াছে ?” “অবশ্য জাতীয় পর্বদিন পালন করা প্রত্যেকেরই কৰ্ত্তব্য।” —“বরিভয়ের নগরের প্রাসাদ হইতে তুমি লাফাইয়া পড়িয়াছিলে কেন?” “আমি শুনিতে পাইয়াছিলাম কম্পিয়েগনির আবাল- বৃদ্ধ-বনিতা সকলকে নির্বিচারে হত্যা করা হইবে এবং আরও জানিয়াছিলাম যে, আমাকেও ইংরাজদিগের , কারাগারে। নিকট বিক্রয় করা হইবে। সুতরাং তাঁহাদের অধীন হওয়া অপেক্ষা আমি মৃত্যুই শ্রেয়স্কর মনে করিয়াছিলাম। -“তুমি যে অঙ্গুরীয় ধারণ করিতে তাহাতে কি কোন ঐন্দ্রজালিক শক্তি ছিল ? যুদ্ধক্ষেত্রে তুমি বারংবার তৎপ্রতি দৃষ্টিপাত করিতে কেন ? “কারণ তাহাতে প্রভু যীশু খ্রীষ্টের নাম অঙ্কিত ছিল।” এইরূপে নানা প্রকার প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়াও বিচারক- গণ জোয়াকে অপরাধিনী বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে পারিলেন না। অতঃপর জোয়ান্ ধৰ্ম্মমন্দিরের কর্তৃপক্ষের নিকট আত্মসমর্পণ করিতে সম্মত আছেন কি না, বিচারক গণ তাঁহাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। জোয়ান্ তদুত্তরে বলিলেন -“আমি ভগবৎ-প্রেরিত হইয়া কাৰ্য্য করিয়াছি। সুতরাং আমায় সমুদয় কার্যের জন্য আমি একমাত্র তাহারই নিকট আত্মসমর্পণ করিতেছি।” বিচারকগণ পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন :“আর এই ধৰ্ম্ম-মন্দিরের কর্তৃপক্ষের নিকট ?”- তিনি প্রত্যুত্তরে বলিলেন –“আমি আর কোনও উত্তর দিব না।” জোয়ানের এই প্রকার প্রত্যুত্তরে বিচারালয়ে বিষম খােলযােগের সঞ্চার হইল। বিচারক ও এসেসরগণের মধ্যে মতভেদ উপস্থিত হইল। একজন এসেসর এইরূপ অভিমত জ্ঞাপন করিলেন যে, জোয়ান্ ৮৪ ফরাসী বীরাঙ্গনা। এসেসরগণের মধ্যে মতভেদ। শুধু এক ঈশ্বর ভিন্ন পােপ, বিস” প্রভৃতি ধৰ্ম্ম-যাজক- ইহাদের কাহাকেও মানে না। অপর একজন ব্যবহার- বিশারদ ব্যক্তি বলিলেন যে, এই প্রকারে অভিযুক্ত বালি- কাকে কোন ব্যবহারাজীবের পরামর্শ গ্রহণের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা নিতান্ত ন্যায়-বিরুদ্ধ কাৰ্য্য হইয়াছে। আর দুইজন ধৰ্ম্ম-যাজক এইরূপ সিদ্ধান্ত প্রকাশ করিলেন যে, জোয়ানের বিচার ধৰ্ম্ম-গুরু স্বয়ং পােপের তত্ত্বাবধানে হওয়াই সমুচিত। জোয়ানের ভগবানে আত্মসমর্পণ করার উক্তি হইতে তাহারা সিদ্ধান্ত করিয়াছেন যে, জোয়ান্ প্রকৃতপক্ষে পােপের নিকটই আত্মসমর্পণ করি- য়াছে। জোয়ান্ যে প্রকৃত-প্রস্তাবে পােপের নিকট বিচার- প্রার্থনা করিতে পারেন তাহা তাহাকে সুস্পষ্টরূপে বুঝা- ইয়া দেওয়া তাঁহারা কৰ্ত্তব্য বলিয়া মনে করিলেন। যদিও আসামীর সহিত গােপনে সাক্ষাৎ করা কিম্বা আসামীকে কোন প্রকারের উপদেশ প্রদান করা সেকালে বিধি-সঙ্গত ছিল না, তথাপি কচনের অন্যায় বিচার-প্রণালীর মূলে কুঠারাঘাত করা একান্ত কর্তব্য বিবেচনা করিয়া তাহারা এস্থলে সে বিধির উল্লঙ্ঘন-পূর্বক কারাগৃহে প্রবেশ করি- লেন এবং জোয়াকে পােপের নিকট বিচার প্রার্থনা করিতে উপদেশ দিলেন। তদনুসারে পরদিবস অধি- বেশনের প্রারম্ভেই জোয়ান্ পােপের নিকট যথাবিধি বিচার প্রার্থনা করিলেন। বলা বাহুল্য যে, এই প্রার্থনায়

কারাগারে।
৮৫
এসেসরের
সৎসাহস
ও কচনের
ধৈৰ্য্যচ্যুতি।
কচন্ যার-পর-নাই ক্রোধান্বিত হইলেন এবং তৎক্ষণাৎ
কারাগারের প্রহরিগণকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন,
জোয়ানের সহিত কেহ সাক্ষাৎ করিয়াছিল কি না ?
কচনের ক্রোধ দেখিয়া, তদবধি এই ধৰ্ম্ম-যাজক-দ্বয় এবং
পূর্বোক্ত ব্যবহার-বিশারদ ব্যক্তি বিচারালয়ে উপস্থিত
হওয়া বন্ধ করিলেন এবং এসেসরের পদও পরিত্যাগ
করিলেন। তাঁহাদের পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে সুবিচারের
যে সামান্য একটু আশা ছিল, তাহাও লােপ পাইল।
এদিকে কচন্ জিহা-লােহিয়ার নামক রােয়েনের
একজন বিখ্যাত ও বিজ্ঞ ব্যবহারাজীবকে বিচার-সংক্রান্ত
কাগজ-পত্র দেখাইলেন। ঐ ব্যক্তি সমস্ত কাগজ-পত্র
পাঠ করিয়া কচনের সম্পূর্ণ প্রতিকূলে মন্তব্য প্রকাশ
করিলেন এবং তাঁহার, বিচারপদ্ধতিতেও দোষারােপ
করিলেন। একজন প্রসিদ্ধ ব্যবহারাজীবের এই প্রকার
প্রতিকূল মত-সত্ত্বেও কচন্ নিরস্ত হইলেন না। জোয়ান্
এযাবৎ বিচারকদিগের জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তরে যাহা
যাহা বলিয়াছেন, কচন্ তৎসমুদয় হইতে একজন কূটবুদ্ধি-
সম্পন্ন ব্যবহারাজীবের সহায়তায় কতকগুলি অভিযােগ
প্রস্তুত করিয়া লইলেন। অধিকন্তু কচনের মনােনীত
নূতন এসেসরগণও জোয়ানের বিরুদ্ধে অভিমত প্রকাশ
করিলেন। সুতরাং তাহার সংকল্পসিদ্ধির বিশেষ ব্যাঘাত
ঘটিল না।

ফরাসী বীরাঙ্গনা। অতঃপর “ইষ্টার” পর্বের পূর্ব সপ্তাহে জোয়ান্ পীড়িত হইলেন। এই সপ্তাহের রবিবার দিন ধৰ্ম্ম- মন্দিরের উপাসনায় যােগদান করিবার জন্য তাঁহার হৃদয় অত্যধিক ব্যাকুল হইয়া উঠিল। কিন্তু তিনি সেই পর্ব- দিনেও পাষাণ-প্রাচীরবেষ্টিত অন্ধকারময় কারা-গৃহের নির্জন কক্ষে অবরুদ্ধ থাকিতে বাধ্য হইলেন। রবিবার অতীত হইল ; সােমবারও গত হইল। তথাপি কারা- কক্ষের দ্বার উন্মুক্ত হইল না। তৎপর মঙ্গলবার দিবস তিনি পুনরায় বিচারালয়ে নীত হইলেন। এই দিনকার অধিবেশনে কচন্ তাহাকে অভিযােগের বিস্তারিত বিবরণ পাঠ করিয়া শুনাইলেন। তখন বিচারকগণ তাহার পুরুষ-বেশ সম্বন্ধে বলিলেন যে—যাহারা জাতিগত বেশ- ভূষা ও আচার-ব্যবহার পরিত্যাগ করে, তাহারা ধৰ্ম্ম- শাস্ত্রানুসারে দোষী এবং ঈশ্বরের দৃষ্টিতেও নিতান্ত ঘৃণাহ। জোয়ান্ রমণী হইয়াও তাঁহার জাতিগত পরিচ্ছদ পরিত্যাগ- পূৰ্ব্বক পুরুষ-জনােচিত বেশ-ভূষায় সজ্জিত হইয়াছেন— ইহাই বিচারকদিগের নিকট সর্বাপেক্ষা অধিক গুরুতর অপরাধ বলিয়া বিবেচিত হইল। বিচারকগণের এই সিদ্ধান্ত হইতে তৎকালীন সামাজিক অবস্থা, শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের সংকীর্ণতা এবং ধর্মশাস্ত্রের মুল তত্ত্বের প্রতি ঔদাসীন্য প্রতিপন্ন হয়। জোয়ান্ বিচারকগণের এই উক্তির প্রত্যুত্তরে প্রথমতঃ কিছুই বলিলেন না। পরে কারাগারে। ৮৭ তিনি ইহার যথার্থ উত্তর দিবার জন্য একদিনের সময় প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু সে প্রার্থনা অগ্রাহ্য হইল। তখন জোয়ান্ বলিলেন :—“আমি ঠিক বলিতে পারি না, কখন আমি এ বেশ পরিত্যাগ করিব।” জোয়ান্ কেন পুরুষ-বেশ পরিত্যাগ করিতে সম্মত ছিলেন না, তাহা তিনি রমণী-সুলভ লজ্জা বশতঃ বিচারক- দিগের নিকট প্রকাশ করিতে পারেন নাই। প্রকৃত কথা এই যে, কারাগারে তাঁহার প্রতি নানাপ্রকারের নৃশংস অত্যাচার অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। সে সমুদয় বিবরণ কারা- কাহিনীতে বিশদরূপে বিবৃত করা হইয়াছে। এতদ্ব্যতীত তিনজন অসভ্য সৈনিক-পুরুষ তাহার উপর পাহারা দিবার জন্য দিবারাত্রি তাঁহার প্রকোষ্ঠে অবস্থান করিত। এদিকে ক্রমে তাঁহার পীড়া বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। পরবর্তী রবিবারইষ্টার-পদিনে জোয়ান্ অত্যন্ত পীড়িত হইয়া পড়িলেন। কথিত আছে, ঐদিন তিনি অন্যান্য আহাৰ্য- দ্রব্যের সহিত বিশপের প্রেরিত একখণ্ড মৎস্য উদরস্থ করিয়াছিলেন। ইহাতে তাহার রুগ্ন দেহের দৌর্বল্য ভয়ানকরূপে বর্ধিত হইল এবং তিনি মুমুর্ষ দশায় পতিত হইলেন। অনেকে অনুমান করেন বিসপ এই ক্লেশ-দায়ক বিচার-ভার হইতে অব্যাহতি লাভের আশায় জোয়ানকে মৎস্যের সহিত বিষ প্রয়োেগ করিয়াছিলেন। কিন্তু আল বাৰ্বি (Earl of warwick) এই সংবাদ শুনিয়া বিশ-প্রয়ােগে জোয়ানের প্রাণনাশের ফরাসী বীরাঙ্গনা বলিলেন যে, তাহাকে কিছুতেই এভাবে মরিতে দেওয়া হইবে না। যে প্রকারেই হউক তাহাকে রােগ-মুক্ত করিতেই হইবে। তাহার বহু চেষ্টার ফলে ও বিজ্ঞ চিকিৎসকের সহায়তায় জোয়াকে মৃত্যুর হস্ত হইতে রক্ষা করা হইল। জোয়ান্ ধীরে ধীরে আরােগ্য-লাভ করিতেছিলেন। কিন্তু তিনি এতদূর দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, শয্যা হইতে মাথা তুলিতেও কষ্ট অনুভব করিতেন। এ অবস্থায় ১৮ই এপ্রিল (১৪৩১ খ্ৰীঃ ) তারিখে জোয়ান্ যখন রােগ- ক্লিষ্ট-দেহে, অবসন্ন-মনে নির্জন কারা-কক্ষের এক কোণে শায়িত ছিলেন, তখন হৃদয়হীন বিচারকেরা তথায় প্রবেশ করিয়া তাহাকে অপরাধ স্বীকার-পূর্বক আত্মসমর্পণ করি- বার জন্য পুনরায় পীড়াপীড়ি করিলেন। কারণ ধর্মদ্বেষিণী বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে পারিলে, তাঁহাকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা সহজসাধ্য হইত। কিন্তু জোয়ানের দৃঢ়তা পূর্ববৎ বলবতী রহিল। তিনি কিছুতেই তাহাদের কথায় আপনাকে ধর্মদ্বেষিণী বলিয়া স্বীকার করিতে সম্মত হইলেন না। তখন তাহারা ক্রোধান্বিত হইয়া জোয়াকে ভীতি-প্রদর্শন- পূর্বক বলিলেন –“যদি তুমি আমাদের আদেশানুসারে কাৰ্য্য করিতে স্বীকৃত না হও, তবে তােমার উপর নানা প্রকার নির্যাতন করা হইবে এবং ধর্মদ্বেষিণী বলিয়া তােমাকে আমরা পরিত্যাগ করিব।” রুগ্ন বালিকা ক্ষীণ কণ্ঠে দৃঢ়তার সহিত উত্তর করিলেন -“আমি প্রকৃত বিচারকগণের অধ্যায় চেষ্টা ও ভীতি- প্রদর্শন। .

কারাগারে। ৮৯ খ্রীষ্টান। যথাবিহিতরূপে খ্রীষ্ট-ধর্মে দীক্ষিত হইয়াছি এবং প্রকৃত খ্রীষ্ট-ভক্তের ন্যায়ই মৃত্যুকে আমি সানন্দে আলিঙ্গন করিব।” তৎপর ২রা মে একজন ধর্মযাজক পুনরায় তাহাকে ধৰ্ম্ম-মন্দিরের কর্তৃপক্ষের নিকট আত্মসমর্পণ করিবার জন্য, অনুরােধ করিলেন। জোয়ান্ এবারও দৃঢ়তার সহিত • প্রত্যুত্তর করিলেন --“যিনি স্বর্গ মর্ত্তের বিধান-কৰ্ত্তা, আমি একমাত্র তাঁহারই নিকট আত্মসমর্পণ করিয়াছি।” ধর্মযাজকটি ইহাতে ধৈৰ্য্যচ্যুত হইয়া কহিলেন—“তবে আমরাও তােমাকে জায়ন্ত দগ্ধ করিয়া মারি। তােমার শরীরিক শাস্তির ব্যবস্থা না করিলে, তুমি আমাদের কথা- সারে কাৰ্য্য করিবে না।” অতঃপর ১১ই মে তাঁহার পুনরায় কারা-কক্ষে প্রবেশ করিলেন এবং পূর্ববৎ ভীতি- প্রদর্শনপূর্বক কহিলেন –“জোয়ান এখনও পথে আইস, ঘাতককে ডাকিয়া পাঠান হইয়াছে। এবার তোমায় নির্যাতন করা হইবে।” জোয়ান্ ইহাতে কিঞ্চিত্র ভীত না হইয়া বীরোচিত ওজস্বিতার সহিত কহিলেন -“ভগবানই আমার জীবনের একমাত্র নিয়ন্তা। আমি তাহারই উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিতেছি। আপনারা যদি আমার দেহ খণ্ড- বিখণ্ড করিয়া ফেলেন, তবু আমি কিছু বলিব না।” নির্ভীকতা। জোয়ানের এই প্রকার বীরােচিত উত্তরে কচনের সমুদয় চেষ্টা ব্যর্থ হইল। শত্রুপক্ষের ভীতি প্রদর্শন জোয়ানের ফরাসী বীরাঙ্গনা। এদিকে প্যারী নগরস্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষীয়েরা এই বিচারের প্রাথমিক বিবরণ পাঠ করিয়া জোয়ানের প্রতিকূলে মন্তব্য প্রকাশ করিলেন ও কচনের বিচার- পদ্ধতির সাধুবাদ করিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষীয়গণের নিকট হইতে এই প্রকার অনুকূল মন্তব্য প্রাপ্ত হইয়া কুটিল-মতি বিচারক ও এসেসরগণ জোয়ানকে জীয়ন্তে দগ্ধ করিবেন সিদ্ধান্ত করিলেন। কিন্তু ইহাতেও তাহাদিগের প্রভু ইংরেজেরা সবিশেষ সন্তুষ্ট হইলেন না। কারণ জোয়া- নের নিকট হইতে একটা স্বীকারােক্তি লিখাইয়া লইয়া তদ্দারা তাহাকে ধর্মদ্বেষিণী বলিয়া প্রমাণ-পূৰ্ব্বক প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা এবং ফরাসী-রাজ চার্লস্ এইরূপ একটি ধর্মদ্বেষিণী বালিকা দ্বারা পরিচালিত হইয়াছেন বলিয়া, তাঁহাকে সভ্যজগতের নিকট হীন করাই ভঁহাদিগের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। সুতরাং ইংরাজেরা জোয়ানের নিকট হইতে স্বীকারােক্তি করাইয়া লইবার জন্য অপর একজন সুচতুর ধর্মযাজককে তাহার নিকট প্রেরণ করিলেন। কিন্তু জোয়ান ভঁহাকেও কহিলেন —“যদি আমি অনল-কুণ্ডেও নিক্ষিপ্ত হই, তথাপি যাহা বলিয়াছি তাহা প্রত্যাহার করিব না।” এইরূপে জোয়ানের বিষয় কোন শেষ মীমাংসা হইতেছে না দেখিয়া কার্দিনাল অস্থির হইয়া উঠিলেন। বিশেষতঃ জনসাধারণের সাহানুভূতি ক্রমে ক্রমে জোয়া- কারাগারে। নের প্রতি আকৃষ্ট হইতেছিল। এই কারণে কার্দিনাল প্রকাশ্য স্থানে সর্বসাধারণের সমক্ষে বিচারের পরিসমাপ্তি করিবার সংকল্প করিলেন। তদনুসারে ২৩শে মে রােয়ে নগরের কোন এক প্রসিদ্ধ ধৰ্ম্ম-মন্দিরের সমীপবর্তী বিস্তৃত প্রাঙ্গণে বিচারের স্থান নির্দিষ্ট হইল। কার্দিনান্ স্বয়ং তথায় উপস্থিত ছিলেন। বিচারক, ধর্মযাজক, এসেসর ও ব্যবহারাজীব ব্যতীত আরও বহু সংখ্যক লােক বিচার- কাৰ্য নিরীক্ষণ করিবার জন্য সমবেত হইয়াছিল। বিচার- রস্তের পূর্বে কচনের পক্ষীয় একজন লােক জোয়ানের সমীপবর্তী হইয়া তাহাকে বলিলেন -“জোয়ান্ ! এখনও বলিতেছি সময় আছে। তুমি শুধু আমাদের উপদেশানু- সারে একটা স্বীকারােক্তি “মূলক দলিলে স্বাক্ষর কর। তাহা হইলে তােমাকে নিশ্চয়ই ইংরাজদিগের হস্ত হইতে মুক্ত করিয়া ধৰ্ম্ম-মন্দিরের তত্ত্বাবধানে রাখিব।” ধৰ্ম্ম-মন্দিরে থাকিতে পাইবার কথা শুনিয়া জোয়ান্ তাহাতে স্বীকৃত হইলেন। কিন্তু তিনি লিখিতে জানিতেন না। সুতরাং তাঁহাদের প্রদত্ত দলিলে তিনি সম্মতিজ্ঞাপনৰ্থি স্বহস্তে স্বীকারোক্তি একটি ক্রুশ চিহ্ন অঙ্কিত করিয়া দিলেন। ইংরাজদিগের অভীষ্ট সিদ্ধ হইল। সুতরাং জোয়ান্ যে আশার বশবৰ্ত্তিনী বিচারদিগের হইয়া “স্বীকারােক্তি” করিয়াছিলেন, তাহা অচিরাৎ স্বপ্নে পরিণত হইল। প্রধান বিচারপতি কচন্ দণ্ডাজ্ঞা পাঠ করিতে উঠিয়া বলিলেন –“জোয়ান্! যে কারাগৃহ প্রত্যাহার। জোয়ানের প্রতারণা ও জোয়ানের স্বীকারােক্তি ৯২ ফরাসী বীরাঙ্গনা। হইতে আসিয়াছ পুনরায় তথায় প্রতিগমন কর এবং তােমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত-স্বরূপ মৃত্যুকাল পর্যন্ত অনু- তাপ করিয়া কালাতিপাত কর।” এই প্রতারণামূলক দণ্ডাজ্ঞা শুনিয়া জোয়ান্ নিরতিশয় ক্ষুন্ন হইলেন। যে পশু- প্রকৃতি সামরিক কর্মচারিগণের হস্ত হইতে আত্মসম্মান রক্ষাকল্পে তিনিনিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও এই প্রকার “স্বীকা- রােক্তি” করিলেন, পুনরায় তাহাদেরই তত্ত্বাবধানে কালাতি- পাত করিতে হইবে জানিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ “স্বীকারােক্তি” প্রত্যাহার করিলেন। ইহাতে সৈনিকদিগের মধ্যে ভয়ানক উত্তেজনার উদ্ভব হইল এবং বিচারকগণও বিষম সমস্যায় পতিত হইলেন। সে দিনকার জন্য বিচার-কাৰ্য্য স্থগিত রহিল এবং জোয়াকে কারাগারে স্থানান্তরিত করা হইল। ঐদিন রজনীতে জোয়ান্ যখন পুরুষ-বেশ পরিত্যাগ করত নৈশ-পরিচ্ছদ পরিধান-পূর্বক শয্যায় গমন করি- লেন, তখন ইংরাজ-পক্ষীয় কর্মচারিগণ চক্রান্ত করিয়া তাহার অজ্ঞাতুয়ারে ঐ পুরুষ-বেশ অপসারিত করিলেন এবং তৎস্থানে রমণীজনােচিত পরিচ্ছদ রাখিয়া দিলেন। সুতরাং পরদিবস তাঁহাকে বাধ্য হইয়া রমণীর বেশ গ্রহণ করিতে হইল। পরদিন কারাধ্যক্ষের তাহার রমণীর পরিচ্ছদ অপসৃত করিয়া তৎস্থানে পুরুষ-পরিচ্ছদ রাখিয়া দিলেন। তিনি প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করিয়া দেখিলেন তাঁহার রমণী- বেশ অপসৃত হইয়াছে। সুতরাং তিনি পুনরায় পুরুষ- শক্তদিগের নূতন

কারাগারে।
বেশই পরিধান করিলেন। ইহাতে অভীষ্ট-সিদ্ধির পথ
সরল হইয়া গেল। কারণ খ্ৰীষ্টীয় শাস্ত্রানুসারে এরূপ
ব্যবহার অত্যন্ত দোষবহ ও প্রাণদণ্ডের যােগ্য। এই
কারণ পরদিবস ধৰ্ম্মাধ্যক্ষ কচ, ধৰ্ম্মাধিকরণের প্রতিনিধি
ও অপরাপর এসেসরগণকে সমভিব্যাহারে লইয়া কারা-
গারে জোয়ানের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। তখন জোয়ান্
বলিলেন -“অন্য পরিচ্ছদ না পাওয়ায় আমি পুনরায়
পুরুষ-বেশ গ্রহণ করিয়াছি। আমি এখনও এ বেশ পরি-
ত্যাগ করিতে প্রস্তুত আছি। আমায় এ কারাগার হইতে
ধৰ্ম্ম-মন্দিরে প্রেরণ করুন।” কিন্তু তাহার এই সমুদয়
কথায় বিচারকগণ কর্ণপাত করিলেন না।

No text on this page.

No text on this page.

বধ্যভূমিতে বীরাঙ্গনা।
“একটি দীর্ঘ কাষ্ঠখণ্ডের সহিত সৰ্বাঙ্গ শৃঙ্খলিত অবস্থায় বীর-বালিকা
জোয়ানকে দণ্ডায়মান করান হইয়াছিল।”

অনল-কুণ্ডে।
“মরণের সাথে খেলিতে খেলিতে,
এসেছি মা এত দূরে,
ডাকিছে আবার সাধের মরণ,
সুনীল মেঘের পুরে।”
মনকুমারী

No text on this page.

অনল-কুণ্ডে। New (১) বিচার কার্যের পরিসমাপ্তি প্রাণদণ্ডের আদেশ। ২৯ শে মে তারিখে কচ এই আদেশ প্রচার করিলেন যে, আগামী কল্য ধর্মদ্বেষিতার অপরাধে জোয়ানের জীবন্ত দেহ অনল-কুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হইবে। রোয়েন্ নগরের একটি পুরাতন বাজারে বধ্যভূমি নির্দিষ্ট হইল। ৩০শে মে প্রাতে ৯ ঘটিকার সময় জোয়ান্ রমণী-বেশে সজ্জিত হইয়া বধ্য- ভূমিতে নীত হইলেন। তথায় তিনটি মঞ্চ প্রস্তুত হইয়া- ছিল। একটির উপরে ইংলণ্ডের রাজকীয় সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল ; অপরটিতে ধৰ্ম্মাধ্যক্ষ কচ, ধৰ্ম্মাধিকরণের প্রধান প্রতিনিধি, এসেসর ও ধৰ্ম্মযাজকগণ সমাসীন ছিলেন। তৃতীয়টি স্তুপীকৃত সমিধূ-রাশিতে প্রস্তুত; তদুপরি একটি দীর্ঘ কাষ্ঠখণ্ডের সহিত সর্বাঙ্গ শৃঙ্খলিত অবস্থায় বীর- বালিকা জোয়াকে দণ্ডায়মান করান হইয়াছিল। তঁাহার মস্তকের উপরে একখানি কাষ্ঠ-ফলক স্থাপিত করিয়া তাহাতে “স্বধৰ্ম্মত্যাগিনী, ধৰ্ম্মদ্বেষিণী, মুর্তিপূজক” এই কয়টি কথা খােদিত করা হইয়াছিল।

ফরাসী বীরাঙ্গনা। ; প্রথমতঃ একজন পুরােহিত যথারীতি উপাসনা-কাৰ্য সমাধা করত " েিনর প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিলেন :- “যাও জোয়ান্, “ন্তিতে ইহধাম ত্যাগ কর। তুমি স্বধৰ্ম্ম- ত্যাগিনী; সুতরাং আমরা তােমায় আর রক্ষা করিতে পারি না।” অতঃপর জোয়ান্ নতজানু হইয়া কৃতাঞ্জলি-পুটে কিয়ৎক্ষণ ভগবদারাধনা করিলেন এবং তদন্তে উপস্থিত জন-মণ্ডলীকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন--“আপনারা সকলে আমার আত্মার কল্যাণ-কামনায় ভগবানের নিকট প্রার্থনা করিবেন।” তিনি এরূপ আবেগের সহিত এই বাক্যগুলি উচ্চারণ করিয়াছিলেন যে তাহার শত্রুগণের মধ্যেও অনেকে অশ্রু-সংবরণ করিতে পারিলেন না। দেশদ্রোহী কচনের চক্ষু হইতেও কয়েক বিন্দু অশ্রু ঝরিয়া পড়িল। কচ চক্ষু মুছিয়া দণ্ডাজ্ঞা পাঠ করিয়া শুনাইলেন --“তুমি শয়তান দ্বারা পরিচালিত হইয়া অপকৰ্ম্ম করিয়াছ। সুতরাং আমরা তােমায় স্বধৰ্ম্মত্যাগিনী বলিয়া প্রাণদণ্ডের আদেশ দিলাম।” ০;

(২) শেষ দৃশ্য বীরাঙ্গনার আত্মত্যাগ বীর-বালিকা মৃত্যু অনিবার্য জানিয়া ভগবানের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করিলেন এবং একটি “কুশ-দণ্ডের” প্রার্থনা করিলেন। একজন ইংরাজ তাহার হস্তস্থিত যষ্টিদ্বারা একটি “কুশ” প্রস্তুত করিয়া জোয়াকে প্রদান করিলেন। জোয়ান্ উহা আশীর্বাদ-নিৰ্ম্মালাের ন্যায় ভক্তিভরে বক্ষে ধারণ করিয়া মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হইলেন। এদিকে বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর হইল। রৌদ্র-দীপ্ত গগনাঙ্গন হইতে মধ্যাহ্ন-মাৰ্ত্তণ্ডের প্রচণ্ড তাপ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় বিচ্ছুরিত হইয়া বসুধা-তল উত্তপ্ত করিয়া তুলিতেছিল । তখ জোয়ান্ যে কাষ্ঠরাশির উপর দণ্ডায়মান ছিলেন, সৈনিক- গণের আদেশক্রমে ঘাতক 'তাহাতে অগ্নিসংযোগ করিয়া দিল । দেখিতে দেখিতে অনল-শিখা সংহার-মূৰ্ত্তি পরিগ্রহণ-পূর্বক লেলিহান রসনা বিস্তার করিয়া বীরাঙ্গ- নার গাত্র স্পর্শ করিল। জোয়ান্ প্রথমে শঙ্কিত হইয়া ‘জল’ বলিয়া একবার চীৎকার করিয়া উঠিয়াছিলেন । কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি সে দৌর্বল্য পরিহার করিলেন।

ফরাসী বীরাঙ্গনা।
তাঁহার হৃদয়ে এক অভিনব বলের সঞ্চার হইল। মানবী
তখন দেবীর ন্যায় বলিয়া উঠিলেন :“আমি নিশ্চয়ই
প্রতারিত হই নাই। যে বাণী আমার শ্রবণ-গােচর হইয়া-
ছিল, তাহা সত্যই ভগবদ্বাণী।” মুহুৰ্ত্ত মধ্যে বিশ্ব-বিধ্বংসী
অনল-শিখায় ক্ষণজন্মা দেব-বালার পুণ্য-পূত দেহ ভস্মী-
ত হইয়া গেল।

No text on this page.

No text on this page.

উপসংহার
‘কলঙ্ক-কর্দম-কালি,
ধুয়ে দিলে রক্ত ঢালি,
হােমানলে হুতি দিলে ও দেব-হৃদয়,
নিৰারিতে মাতৃ-অশ্রু প্রাণ-বিনিময়।”
মানকুমারী
-

No text on this page.

ফরাসা বীরাঙ্গনা বীরাঙ্গনার চরিত্র : আলােচনা। (১) আত্মােৎসর্গের ফল। তপস্বিনী বীরাঙ্গনা জন্মভূমিকে “স্বর্গাদপি গরীয়সী” জ্ঞানে পূজা করিতেন, স্বজাতিকে প্রাণাপেক্ষা অধিক ভাল বাসিতেন এবং রাজাকে দেবতা-জ্ঞানে ভক্তি করি- স্বদেশ, জাতি ও সম্রাটের হিত-কামনায় জীবনের প্রথম উষায় স্বাধীনতা-দেবীর মঙ্গল-মন্দিরে তিনি হাসিমুখে আত্ম-দান করিলেন। সেই আজন্ম- পবিত্ৰ বীর-ললনার অপাপবিদ্ধ দেহের অনাবিল রুধির- ধারায় দেবী-মন্দির রঞ্জিত হইল, বহু দিবসের পুঞ্জীকৃত পাপ-কালিমা বিধৌত হইল, পরাধীনতার পঙ্কিলতা দূরীভূত হইল। বিধাতার ইঙ্গিতে তিনি যে মহাব্রত গ্রহণ করিয়াছিলেন, ভােগ-বাসনা ত্যাগ করিয়া, পার্থিব বন্ধন ছিন্ন করিয়া, জীবন পর্যন্ত পণ করিয়া তাহ উদযাপন করিয়া গেলেন। অরলিন্স, নগরকে বৈদেশিকের দাসত্ব শৃঙ্খল হইতে মুক্ত এবং সম্রাটকে রাজ-সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়া জন্মভূমির সর্বাঙ্গীণ স্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত করিয়া দেওয়াই ভঁহার জীবনের ব্ৰত ছিল। ইহাই তাহার নিকট বিধাতার আদেশ-বাণী- ১০৪ ফরাসী বীরাঙ্গনা। রূপে প্রেরিত হইয়াছিল। তিনি নিষ্কাম ও নিঃস্বার্থভাবে সে স্বর্গীয় আদেশ-বাণী পালন করিয়াছেন। তাঁহার জীবদ্দশায়ই তিনি জন্মভূমিকে অনেক পরিমাণে শৃঙ্খল- মুক্ত দেখিয়া গেলেন। ডি-ফাভি নামক একজন অর্থ-পিশাচ দেশ-দ্রোহীর বিশ্বাসঘাতকতায় ও ষড়যন্ত্রে জোয়ান্ শক্ৰহস্তে নিপতিত হইয়াছিলেন। দীর্ঘকাল নানা প্রকার পৈশাচিক অত্যাচারে জর্জরিত হইয়া পরিশেষে তিনি অনল-কুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হইলেন। তাঁহার নশ্বর দেহ অনল-কুণ্ডের স্মৃতি-পূজায় জ্বালাময়ী শিখায় ভস্মীভূত হইল। পাছে বীরাঙ্গনার বাধা, চিতা স্মৃতি-পূজা করিয়া পুনরায় ফরাসীজাতি স্বদেশ-প্রেমে তন্ম নদীগর্ভে অনুপ্রাণিত হইয়া উঠে, এই ভয়ে ইংলণ্ডের একজন atestat TCI ( Cardinal of Winchester ) আদেশক্রমে জোয়ানের চিতাভস্ম নদীগর্ভে নিক্ষিপ্ত = যে অমিত-তেজা বীর-ললনার অলৌকিক বীর্যবত্তায় ইংরাজের বীৰ্য-বহ্নি নিষ্প্রভ হইল, যাহার অনুপ্রাণতায় ফরাসী জাতি সঞ্জীবিত হইয়া উঠিল, যাহার আত্মত্যাগের মহিমা-মণ্ডিত দৃষ্টান্তে বিশ্বজগৎ স্তম্ভিত Winchester haelghe embers of her py're swept into the Seine that there might remain upon the soil of France no vestige of the body of soul at the peasant girl who fought for its liberty. ( Lamartine's "Mentirs of celebrated characters." Vol il, Page 128 ). নিক্ষেপ। হইল।

আত্মােৎসর্গের ফল লােপ পায় না। হইল, সেই শত্রু-রমণীর স্মৃতির শেষ নিদর্শন পৰ্যন্ত ধরাপৃষ্ঠ হইতে বিলুপ্ত করাই ইংরাজগণ সমীচীন মনে করিলেন। এই কারণে বীরাঙ্গনার পবিত্র শ্মশান- ক্ষেত্রের ভস্মরাশি—পুণ্য স্মৃতির অন্তিম নিদর্শনটুকুও তাঁহারা রক্ষিত হইতে দিলেন না। কিন্তু চিতা-ভম্মের সঙ্গে সঙ্গে যদি আদর্শ জীবনের স্মৃতি লােপ পাইত, তবে • আদর্শ জগতে আত্মত্যাগের ফল বৃথা হইত। ইংলণ্ডেরই জীবনের স্মৃতি একজন চিন্তাশীল মনীষী আত্মত্যাগের মহিমা কীর্তন করিতে যাইয়া একস্থলে বলিয়া গিয়াছেন ঃ- The Martyr may perish at the stake, but the truith for which he dies may gather new lustre from his sacrifice. The patriot may lay his head upon the block, and hasten the, triumph of the cause for which he suffers. The memory of a great life does not perish with the life itself but lives in other minds. অর্থাৎ ধৰ্ম্ম-প্রাণ সাধু দাহন-দণ্ডে বিধ্বস্ত হইতে পারেন কিন্তু যে সত্যের জন্য তিনি প্রাণত্যাগ করেন, তাহা এই আত্মােৎসর্গের প্রভু নব-প্রভায় মণ্ডিত হয়। দেশভক্ত বীর বধ্য-কাছে পাষ্ট করিতে পারেন ; * Sec Duty by Smiles, chapter V. Page 94.

ফরাসী বীরাঙ্গনা।
কিন্তু যে উদ্দেশ্য-সাধনে তিনি যন্ত্রণা ভােগ করেন, তাহা
অনতিবিলম্বে সিদ্ধ হয়।
মহাপুরুষের স্মৃতি
তাহার জীবনাবসানের সঙ্গে সঙ্গে কদাপি বিলুপ্ত হয় না ;
বরং পরকীয় হৃদয়ে তাহা জাগরূক থাকে।

(২) সমগ্র ফান্সের স্বাধীনতালাভ। ফ্রান্সের পরবর্তী ২২ বৎসরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। ফরাসী জাতির পরবর্তী ২২ বৎসরের ইতিহাস পর্যা- লােচনা করিলে পাশ্চাত্য মনীষীর এই জ্ঞানগর্ভ উক্তির সত্যতা প্রমাণিত হইবে। জোয়ান্ ফ্রান্সের বিভিন্ন নগর- সমূহ শত্রুর কবল হইতে উদ্ধার করিয়া এবং ইংরাজদিগের প্রধান প্রধান সেনাপতিগণকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া জন্মভূমির পবিত্র অঙ্গ হইতে দাসত্ব-শৃঙ্খল অনেকাংশে উন্মােচন করিয়াছিলেন সত্য, কিন্তু বৈদেশিকদিগকে সম্পূর্ণরূপে দেশ হইতে বহিষ্কৃত করিয়া যাইতে পারেন নাই। কারণ সমগ্র দেশের দাসত্ব মােচন করা তাহার বিধাতৃ-নির্দিষ্ট ব্রতের অঙ্গীভূত ছিল না। তিনি শুধু স্বাধীনতা-দেবীর মঙ্গল-মন্দিরের প্রাণ-প্রতিষ্ঠা করিয়া স্বজাতির বন্ধন-মােচনের পথ নিষ্কণ্টক করিয়া যাইবার জন্যই ঈশ্বরাদিষ্ট হইয়া কৰ্ম্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। সুতরাং ফ্রান্স হইতে তখনও ইংরাজাধিকার লুপ্ত হয় নাই। নৰ্মান্দি, প্যারী ও পন্তয়েজ প্রভৃতি প্রদ স্নান জনপদ সমুহে তখনও ইংরাজগণ আর্গি #রিতেছিলেন। এতদ্ব্যতীত তঁহারা স্থানে স্থানে নিৰ্মাণ করিয়া লুপ্তাবশিষ্ট অধিকার দৃঢ়-প্রতিষ্ঠ খিতে প্রয়াস পাইয়াছিলেন। কিন্তু বি এনে তাহাদের সে চেষ্টা (৩) বীরাঙ্গনার স্মৃতি-পূজা। ১৯২৯ খ্রীষ্টাব্দে বীরাঙ্গনা যখন শত্রু-হস্তে বন্দিনী হইয়া কারাগারে অবরুদ্ধ হইলেন, তখন ফ্রান্সের রাজা ও অধিবাসিগণ এতদূর মােহাবিষ্ট ছিলেন যে, তাঁহারা বীরাঙ্গ- নার মুক্তির জন্য কোনও প্রকার চেষ্টাই করেন নাই। পতিত জাতির এপ্রকার মােহাবেশ ও রাজন্যবৃন্দের এরূপ ঔদাসীন্যের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে নিতান্ত বিরল নহে। যাহা হউক, এইক্ষণ ফ্রান্সের অধিবাসিবৃন্দ এবং রাজা চার্লস্ স্বাধীনতা-লাভের সঙ্গে সঙ্গে স্বৰ্গগত বীরাঙ্গনার স্মৃতি-পূজার নানাবিধ আয়ােজন ও ব্যবস্থা করিয়া পূর্ববকৃত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতে যত্নবান হইলেন। বীর-ললনার স্বর্গারােহণের ১৯ বৎসর পরে অর্থাৎ ১৪৪৯ খ্রীষ্টাব্দে চার্লস্ যখন রােয়েন্ নগরকে ইংরাজদিগের দাসত্ব-বন্ধন করিয়া একপ্রকার নিরাপদ হই- লেন, তখ-ক্ষনি সর্বাগ্রে সেই নৃশংস বিচারকদিগের পাপানুষ্ঠানে বৃত্তান্ত সংগ্রহ করিবার জন্য একজন কর্তব্যপরায়ণতা, প্রতিনিধি নিযুক্ত হন। তৎকালে যাঁহারা ঐ বিচার- বীরাঙ্গনারা কাৰ্য্যে সহক নিযুক্ত ছিলেন, তাঁহাদিগের সাক্ষ্য নির্দোষিত গ্রহণ করিয়া তুসমুদয় লিপিবদ্ধ করিলেন। হইতেমুক্ত রাজার প্রমাণ।

বীরাঙ্গনার স্মৃতি-পূজা রাজা এই অনুসন্ধানের লিখিত বিবরণ অনেকানেক প্রাজ্ঞ মনীষী ও বহুদশী ব্যবহারাজীবের নিকট মতামতের জন্য উপস্থিত করিলেন। বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ উহা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পরীক্ষা করিয়া বীরাঙ্গনা-সংক্রান্ত বিচার-পদ্ধতির দোষা- বােপ করিলেন এবং সেই নৃশংস দণ্ডাজ্ঞাকে ন্যায়বিগহিত ও নিয়ম-বিরুদ্ধ বলিয়া অভিমত দিলেন। রাজা চার্লস এই প্রকার অনুকূল অভিমত পাইয়াই নিরস্ত হইলেন না। তিনি সর্বসমক্ষে পূত-চরিত্র বীরাঙ্গনার নির্দোষিতা প্রতি, পন্ন করা আবশ্যক মনে করিলেন এবং তদ্দরুণ প্রধান প্রধান ধর্মযাজকগণের মনােযােগ এ বিষয়ে আকর্ষণ করি- লেন। ইহার ফলে তাহারা পূর্বোক্ত রাজ-প্রতিনিধির অনুসন্ধানের বিবরণ পরীক্ষা করিলেন এবং তৎকালীন বিচারের নানাবিধ প্রয়ােজনীয় তথ্য সংগ্রহ করিলেন। অবশেষে ১৪৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ৭ই জুলাই তারিখে রাজ্যের প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ ধৰ্ম্মনিষ্ঠ যাজকগণ ও মন্দিরের অধ্যক্ষগণ রােয়ে নগরের ধৰ্ম্ম-মন্দিরে মিলিত হইয়া এইরূপ ঘােষণা করিলেন যে জোয়ানের বিরুদ্ধে আরােপিত ধৰ্ম্মদ্বেষিতা ও ডাকিনী-বৃত্তির অভিযােগ মিথ্যা, বিচার-পদ্ধতি ভ্রান্তি ও শঠতামূলক এবং দণ্ডাজ্ঞা ন্যায়-বিরুদ্ধ দ্ব্যতীত স্বদেশীয়গণের মধ্যে যাহারা gan কে,শত্রু-হস্তে সমৰ্পণ করিয়া দেশদ্রোহিতার দিয়াছিল, আর যাহারা ঐ নৃশংস বিচারকার্যে সরুe শীরতর প্রসিদ্ধ ধৰ্ম্ম- যাজকগণের ঘােষণা জোয়ানের বিচারকাস স্যাবিরুদ্ধ বলিয়াপ্রচার।

১১২ ফরাসী বীরাঙ্গনা। পাপানুষ্ঠান করিয়াছিল, তাহাদিগকেও দেশ-বৈরী বলিয়া ঘােষণা করা হইল। রােয়ে নগরের যেই ধৰ্ম্ম-মন্দিরে বসিয়া কয়েক বৎসর পূৰ্বে অরাতি-কুল বীরাঙ্গনার প্রতি দণ্ডাজ্ঞা প্রচার করিয়া ছিল, আজ ২৬ বৎসর পরে সেই মন্দিরেই মিলিত হইয়া ফ্রান্সের প্রসিদ্ধ ধর্মযাজকগণ উহা ন্যায়-বিরুদ্ধ বলিয়া ঘােষণা করিলেন। ইহা পূর্বেই বিবৃত হইয়াছে যে, বীৰ্যবতী বীরাঙ্গনা অলৌকিক সাধনার বলে অলি নগরকে পরাধীনতার নাগ-পাশ হইতে মুক্ত করিয়া সমগ্র ফ্রান্স্ রাজ্যের স্বাধীন- তার পথ নিষ্কণ্টক করিয়া দিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য যে, তদ্দেশবাসিগণ কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ তাঁহার বৃদ্ধা জননীকে ভরণপােষণার্থ একটি বৃত্তি প্রদান করিয়াছিলেন। ১৪৩৮ খ্রীষ্টাব্দে এই বৃত্তি-দানের বন্দোবস্ত হয়। তিনি আমরণ উহা সুখ-স্বচ্ছন্দে ভােগ করিয়া যান। অতঃপর ১৪৫৮ খ্রীষ্টাব্দে জরাগ্রস্ত মাতা পরলােক গমন করিলে মাতকে বৃত্তিদান পর, তদবধি এই বৃত্তি রহিত করা হয়। এতদ্ব্যতীত মৰ্ম-মুর্তি ফ্রান্সের অধিবাসিগণ নানাস্থানে বীরাঙ্গনার মর্মর মূর্তি প্রতিষ্ঠা। প্রতিষ্ঠিত ক অর স্মৃতি-পূজা করিয়াছেন। রােয়ে নগরের যেই অনল-কুণ্ডের জ্বালাময়ী শিখায় স্মীভূত হইয়াছি বালার পদ-রজঃ-পূত সেই পবিত্র আত্মার সম্মানার্থ ১৪৫৬ বীরাঙ্গনার

বীরাঙ্গনার স্মৃতি-পূজা।
থায়
খ্রীষ্টাব্দে একটি প্রস্তর-নিৰ্ম্মিত “ক্রুশদণ্ড” স্থাপিত হইয়া-
ছিল। অধুনা উহা স্থানান্তরিত করিয়া তৎস্থানে দেবীর
মৰ্ম্মর-ময়ী মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করা হইয়াছে। অদ্যাবধি ঐ
পবিত্র শ্মশান-ভূমি বীরাঙ্গনার নামে আখ্যাত হইয়া থাকে।
১৪২৯ খ্রীষ্টাব্দের ৮ই মে তারিখে বীরাঙ্গনা অরলিন্স
নগরকে বৈদেশিকগণের দাসত্ব শৃঙ্খল হইতে মুক্ত করিয়া-
ছিলেন। নগরবাসিগণ পরলোকগত বীরললনার স্মরণার্থ
প্রতিবৎসর ঐ দিন উৎসবের অনুষ্ঠান করেন এবং
তদুপলক্ষে ধৰ্ম্ম-মন্দিরে বিশেষ উপাসনা হয় ।
প্রসিদ্ধ প্রসিদ্ধ বক্তা সুললিত ভাষায় বক্তৃতা করিয়া
বীরাঙ্গনার মাহাত্ম্য কীৰ্তন করিয়া থাকেন ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ফ্রান্সের ধৰ্ম্ম-মন্দিরের
অধ্যক্ষ ও যাজকগণের মধ্যে, এই বীর মহিলাকে ‘সাধু,
গণের’ ( Saints ) শ্রেণীভুক্ত করিয়া লওয়া সম্বন্ধে
মতের প্রাবল্য দেখা দিয়াছিল। এতদর্থে ১৯০৩ খ্রীস্টাব্দে
একটি প্রস্তাব যথারীতি উত্থাপিত হয়। পরবর্তী বৎসরের
৬ই জানুয়ারী বীরাঙ্গনাকে প্রকাশ্য ঘােষণা দ্বারা ‘সাধু
আখ্যায় অভিহিত করা হইল। • এহদ্ব্যতীত ফ্রান্সের
समत
* On the eighth of May, the ana
an annual fete is held at Orlea
been erected there and at Rouen
(Southey's Joan of Arc, Prefacey
+ See Encyclopaedia Britani
of its deliverance,
monuments hiva
ory of the mid
V, wenth edition).

১১৪
ফরাসী বীরাঙ্গনা।
ফরাসীসেনা-
দলের মধ্যে
বীরাঙ্গনার
স্মৃতি-পূজা।
সেনাদলের মধ্যে বীরাঙ্গনার পবিত্র স্মৃতি আজও পর্যন্ত
পূজিত হইয়া আসিতেছে। শুনিলে বিস্মিত হইতে হয়
যে, সশস্ত্র সৈন্য-দল জোয়ানের স্বগ্রামের পার্শ্ব দিয়া
যাতায়াতকালে সসম্মানে অভিবাদন করিয়া তেজস্বিনী
বীরললনার স্বর্গ-গত আত্মার অভিনন্দন করিয়া থাকে।
বীর-পূজার কি সুন্দর পদ্ধতি! মহতের স্মৃতি-অর্চনার
কি মনােজ্ঞ নিদর্শন।
* The French people have not forgotten Joan d'Arc,
Many statues have been erected to her memory. She has
been an object of veneration to generation after geheration
of French Sol When a regiment marches through
Domremny the
lways halt and present arms in
honour of her birken It is touching to hear of the
custom having survive long, and the memory of the
maida heroine bo kept green by the country she
se C
ম
(Smiles's Duty Chap
•৪),

(৪) বীরাঙ্গনা-সম্বন্ধে মনীষিগণের মতামত। এই ক্ষণ আমরা চিন্তাশীল মনীষিগণের মতামত আলাে- চনা করিয়া বর্তমান প্রবন্ধের পরিসমাপ্তি করিব। যদিও জোয়ান্ ইংলণ্ডের পক্ষে শত্রু-রমণী ছিলেন এবং ইংরাজ- দিগকে যুদ্ধের পর যুদ্ধে পরাজিত করিয়া ইংলণ্ডের শক্তিকে বিধ্বস্ত করিয়াছিলেন, তথাপি অনেকানেক চিন্তাশীল ও লব্ধপ্রতিষ্ঠ ইংরাজ-লেখক এই শত্রু-রমণীর প্রসঙ্গ নিরপেক্ষভাবে আলােচনা করিয়া সত্যপ্রিয়তা ও ইংরাজ লেখক , উদারতার পরিচয় দিয়াছেন। আমরা যে সমুদয় ব্যক্তির গণের সহৃদয়তা। মতামত আলােচনা করিয়াছি, তন্মধ্যে বিশ্ব-বিশ্রত কবি সেক্ষপিয়র ভিন্ন ইংলণ্ডের আর সমুদয় লেখকই বীরাঙ্গনার প্রতি উপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন করিয়াছেন। তার্ণার ( Turner ) fama (Green) efs afegiforesta ‘নিরপেক্ষভাবে তৎকালীন বিবরণাদি লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। চিন্তাশীল মনীষী স্মাইলস্ (Smilesঙ্গনার প্রসঙ্গ শ্রদ্ধার সহিত অবতারণা করি য়তার পরিচয় * Duty hy Smiles, Chapter

ফরাসী বীরাঙ্গনা
প্রসিদ্ধ
ইংৰাজ কৰি
সানির উক্তি।
দিয়াছেন। ইংলণ্ডের প্রসিদ্ধ কবি সাদি (Southey )
এই বীর-ললনার সহনীয় গুণগ্রামে মুগ্ধ হইয়া নিরপেক্ষ ও
উদার ভাবে তঁাহার মহিমা কাৰ্তন করিয়া গিয়াছেন।
তিনি তাহার “জোয়ান-অ-আর্ক” নামক কাব্য গ্রন্থের
ভূমিকায় লিখিয়াছেন :-
It has been established as a necessary
rule for the epic that subject should be national.
To this rule I have acted in direct opposition,
and chosen for the subject of my poem the
deſcat of the English. If there he
there he any readers
who can wish success to an unjust cause I
desire not their approbation.
অর্থাৎ মহাকাব্য রচনা-সম্বন্ধে এইরূপ একটি নিয়ম
সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া দাঁড়াইয়াছে যে, কাব্যের বর্ণিত বিষয়
জাতীয়ভাবের পরিপােষক হওয়া কৰ্ত্তব্য। আমি এই
নিয়মের সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচরণ করিয়াছি এবং “ইংরাজের
পরাজয়ই” আমার কাব্যের বর্ণনীয় বিষয় বলিয়া মনােনীত
করিয়া লইয়া পাঠকগণের মধ্যে যদি এমন কেহ
থাকেন যে,
র স্বদেশ কোন ন্যায়-বিরুদ্ধ কাৰ্য্যে
লিপ্ত ছিল বলিয়া ন ঐ অন্যায় উদ্দেশ্যেরও সফলতা
-বা
তবে আমি তাহার মতের অনু-
লা। ইংরাজ-কবির এই উক্তি

বীরাঙ্গনা সম্বন্ধে মনীষিগণের মতামত
১১৭
প্রকৃত মহানুভবতার পরিচায়ক, সন্দেহ নাই। এতদ্ব্যতীত
তিনি উক্ত কাব্যগ্রন্থের অনেকানেক স্থলে বীরাঙ্গনার
ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন এবং তাঁহাকে ঈশ্বর-প্রেরিত
(Mission'd Maid) ও ভগবৎ-প্রতিনিধি বলিয়া স্বীকার
করিয়া গিয়াছেন। অপর একজন লেখক বিলাতের
একখানি শ্রেষ্ঠ মাসিক পত্রে বীরাঙ্গনার চরিত্র আলোচনা
প্রসঙ্গে একস্থলে বলিয়া গিয়াছেন যে, জোয়ান্ যে প্রকার
অলৌকিক বীরত্ব ও তেজস্বিতার পরিচয় দিয়া স্বদেশের
দাসত্ব মােচন করিয়াছেন, ইতিহাসে ঐ প্রকার দৃষ্টান্ত ইংলণ্ডের
বিরল। অদ্যাবধি পৃথিবীতে কি পুরুষ কি নারী কোন সাময়িক পত্রের
মানবই ঐরূপ কাৰ্য্য সাধন করিয়া যাইতে পারেন নাই। জ্ঞানগর্ভ উক্তি।
আজ যে ফরাসীরা জাতীয় ভাবে
জাতীয় ভাবে উদ্বুদ্ধ হইয়া
একটি পরাক্রান্ত জাতি-রূপে গঠিত হইয়া উঠিয়াছে,
ইহার মূলে এই গরীয়সী মহিলার তেজঃ-পুঞ্জ জীবনের
একজন লেখকের
* (১) কবি একস্থলে নায়কের মুখ দিয়া জোয়াকে Prophetes
বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। (See Robert Southcy's Joan of Arr.,
look II, Page 38. )
(২) অপর একস্থলে Priest এর মুখ দিয়া কrি
“Thou art indeed the Delegate of
What thou hast said surely thou
We ratify thy mission Gio in

১১৮ ফরাসী বীরাঙ্গনা। পবিত্র স্মৃতি নিহিত আছে। জার্মানীর একজন প্রসিদ্ধ কবি বীরাঙ্গনার প্রসঙ্গ আলােচনা করিয়া একস্থলে বলিয়াছিলেন : "Who thirst now for thy blood will worsluip thee.” to অর্থাৎ আজ যাহারা তােমার রক্ত পান করিবার জন্য লালায়িত হইয়া উঠিয়াছে, তাহারাই একদিন তােমার পূজা করিবে। সত্যই কবির ভবিষ্যদ্বাণী সফল হইয়াছে। তাই, যে ইংরাজ জাতির পূর্বপুরুষগণ এককালে বীরাঙ্গনার শশাণিত-ধারায় বসুধা কলঙ্কিত করিবার জন্য লালায়িত হইয়াছিলেন, আজ তাহাদেরই ভবিষ্যদ্বংশীয়গণ তাহার পবিত্র জীবন-কাহিনী আলােচনা করিয়া বীর-ললনার স্মৃতি-পূজা করিলেন। কিন্তু পূর্বেই বলিয়াছি যে, মহাকবি সেক্ষপিয়র এই জগত-পূজ্যা দেব-বালার অবমাননা করিয়াছেন। তিনি তাঁহার একখানি নাট্য-কাব্যের অনেক স্থলে বীরাঙ্গনাকে সেক্ষপিয়রের গ্লানি সূচক ভাষা-প্ৰয়ােগ। *"Never in the history of the world, has such a task been accomplish any other mortal being, man or woman. It was and the me nemory of her life that animated her courftry created a nation" ( Joan of Arc by oscar. Parker, 1. English Illustrated Magazine of cleans, Translated by Bethune.

বীরাঙ্গনা সম্বন্ধে মনীষিগণের মতামত। ১১৯ “ভ্রষ্টা”, “পিশাচ-সিদ্ধা” প্রভৃতি জঘন্য আখ্যায় অভিহিত করিয়াছেন। জোয়ানের ন্যায় পূত-চরিত্রা, ধর্মপ্রাণা ও সাধ্বী বীরাঙ্গনার প্রতি এপ্রকার ভাষা-প্ৰয়ােগ করা কবির পক্ষে সংকীর্ণতা কি উদারতার পরিচায়ক হইয়াছে তাহা সুধীগণ বিচার করিবেন। বলা বাহুল্য যে, এপ্রকার বিদ্বেষ- প্রসূত বাক্যে আদর্শ জীবনের স্মৃতি ম্লান হওয়া ত দূরের কথা বরং অধিকতর উজ্জ্বল হইয়াই উঠে। ফরাসী মনীষিগণের মধ্যে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক লামার্তা- ইন্ ন ও মিসেলে গ বীরাঙ্গনার পবিত্র জীবন-কাহিনী শ্রদ্ধার সহিত বিবৃত করিয়া প্রকৃত স্বদেশানুরাগের পরিচয় ঐতিহাসিকের দিয়াছেন। মিসেলেটু একস্থলে লিখিয়াছেন “Yes, whether considered religiously or patriotically, Jeanne Darc was a Saint, tefte ফরান * কবি একস্থলে সেনাপতি Talbot এর মুখ দিয়া বলিয়াছেন "Foul fiend of France, and hag of all despite". "Pucelle, that witch, that damned sorceressie অপর একস্থলে Burgandy এর মুখ দিয়া বলিতেছে;;' "Vile fiend and shameless courtezana. ( See Shakespear's King Henry ini, sceric 11) + See Lamartine's "Memoirs of cele de characters † Michelet's History of France Tr II, Reign of Charles Vir. 4 ফরাসী বীরাঙ্গনা। বঙ্গীয় লেখকগণের উদারতা। । কি ধৰ্ম্ম কি স্বদেশ-হিতৈষণা—যে কোন দিক হইতে বিচার কর না কেন, জোয়ান্দার্ক ‘সাধু’ (Saint) আখ্যায় ভূষিত হইবার যােগ্য।। অামাদের স্বদেশীয় লেখকগণের মধ্যেও যাঁহারা বীরাঙ্গ- নার প্রসঙ্গ অবতারণা করিয়াছেন, তাহারা নিরপেক্ষ বিচার দ্বারা প্রকৃত উদারতার পরিচয় দিয়াছেন। একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক এই মহীয়সী রমণীকে “ফ্রান্সের দেবী” নামে অভিহিত করিয়াছেন। * অপর একজন চিন্তাশীল, অজ্ঞাতনামা লেখক বীরললনার স্বদেশানুরাগকে বুদ্ধদেবের বিশ্ব-প্রেমের সহিত তুলনা করিয়া গিয়াছেন। • বাস্তবিকই আদর্শ জীবনের স্মৃতি কখনও লোপ পায় । তাই, দেশ-বিদেশে পৃথিবীর প্রত্যেক সভ্য জাতির । • ১৩১৬ সনের আষাঢ় মাসের নব্যভারতে শ্রদ্ধেয় শ্ৰীযুক্ত দেবীপ্রসন্ন রায় চৌধুরী লিখিত “ফ্রান্সের দেবী” শীর্ষক প্রবন্ধ দ্রষ্টব্য। ."China in Asia and France in Europe, are the two countries that have best known how to make the public spirit into religion. This is the fact". that made Joan of Arcapossibility. A pleasamt girl in a remote village could brood over the sorrows of her country till she was possessed by the feeling that, there was much piy "in Heaven for the fair lm of France. idea Iniso was like the compassion *dha, and there but in France could it have been count" (Nation making-in Karmagogin o 6} বীরাঙ্গনা সম্বন্ধে মনীষিগণের মতামত। মধ্যেই বীরাঙ্গনার পবিত্র স্মৃতি পূজিত হইয়া আসিয়াছে। ধন্য দেৰী । ধন্য তোমার স্বদেশানুরাগ! ধন্য তােমার রাজ-ভক্তি। ধন্য তােমার ভগবৎ-প্রেম । তােমার সাধনা সফল হইয়াছে। কৈশােরে তুমি যে মহাব্ৰত গ্ৰহণ করিয়া কর্মক্ষেত্রে নামিয়াছিলে, যৌবনের প্রথমেই তাহা উদযা- পিত করিয়া অমর-লােকে চলিয়া গেলে। ভাগ্যবতী সে জননী—যিনি তােমায় তােমায় গর্ভে ধারণ করিয়া পবিত্র হইয়াছেন; মহান্ সে জাতি-যে তােমায় আপনার বলিয়া গৌরব গৌরব করিবার সুযোেগ পাইয়াছে ; ধন্য সে শ্মশান-ভূমি—যেস্থানের ধূলিকণার সহিত তােমার পুণ্য স্মৃতি জড়িত হইয়া রহিয়াছে ; পবিত্র সে নদী-সলিল- যাহার সহিত তোমার চিতাভষ্ম চিরতরে মিশাইয়া গিয়াছে। সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Farashe-beerangana Ed.1st

Author
Guha,nagendrakumar
Title
Farashe-beerangana Ed.1st
File name
Farashe-beerangana Ed.1st
Text
OCR done
Citation
1912
Published
2010/01/8
Publisher
Ahindranath Chattopadhyay,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
146
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Biography
Keywords
History
DLI number
511044
Barcode
4990010018229.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
Urkl97214Gu
Download PDF

Farashe-beerangana Ed.1st