Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah

Prithibibyapi Mahasamar

Frezer, J. Nelson · 2010/05/5

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

পৃথিবীব্যাপী মহাসষর
ঝেই উঁখি কলেজের অধ্যক্ষ ও সম্পাদক
জে. নেলস ফ্রেজা প্রণীত
।
রায় সহ আমনচন্দ্র ঘােষ কর্তৃক
শাকারে অনুদিত
THE WORLD AT WAR
(BENGALI TRANSLATION)
ZWARD UNIVERSITY PRESS
Old
Y AND MADRAS
.
য়ুনিভারসিটি প্রেস
বােই এক মাত্রা
১৯১৯

PRINTED BY B. K. DASS AT THE "WELLINGTON PRINTING WORKS."
ie, HALADHAR HARDHAN LANE, CALCUTTA.
AND SOLD BY
5. C. AUDDY & Co.,
BOOKSELLERS AND PUBLISHERS
58 & 12 WELLINGTON STKLET, CALCUTTA.
কলিকাতা।
৫৮ ও ১২ নং ওয়েলিংটন ষ্ট্রীট,
এ সি. আচ্য এ কোম্পানি কর্তৃক মুদ্রিত এবং বিক্রীত।

। সূচীপত্র পৃষ্ঠা , . . প্রথম খণ্ড—অতীত কথা : প্রথম অধ্যায়-জার্মাণি ও অষ্ট্রিয়া দ্বিতীয় (ক) ফ্রান্স, (খ) বেলজিয়াম (গ) ইটালি তৃতীয় (খ) পােল্যাণ্ড, + E । (ক) রুশিয়া ৫০০ । এ । ৫০০ ১২ . ৪৪ (খ) বান রাজ্যসমূহ (ঙ) গ্রীস চতুর্থ , ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দ্বিতীয় খণ্ড—বর্তমান কথা :- পঞ্চম অধ্যায়—সঙ্কট बई (ক) যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধকৌশল (খ) সেনা ও সেনাপতিগণ সপ্তম জলযুদ্ধ অষ্টম স্থলযুদ্ধ-(ক। পশ্চিম প্রান্তে (খ) পূর্ব প্রান্তে (গ) বলকান্ উপদ্বীপে । এ এ এ ৭ (খ) তুঙ্কে । ১১ ৪০০ s (ঙ) ইটালিতে (চ) পট গালে (ছ) আফ্রিকায় (জ) দূর প্রাচ্যে (ক) প্রশান্ত মহাসাগরে ০ ০ ০ ক ps , ০ ৭ । । এ :: । নবম অধ্যায় যুদ্ধনীতি-(ক) জার্মাণিতে (খ) ইংল্যান্ডে ইংরাজজাতির যুদ্ধামােজন ••• উদাসীন রাজ্যসমূহ মীমাংসার বিষয় বর্তমান যুদ্ধে ভারতবর্ষ ত্রয়ােদশ আশা ও সাফল্য একাদশ • ১০৮ . • ••• ৫৮ ৫৯ ৪০০ ১ ৪০ t. । . . এ ৫ . . চিত্র-সূচী। বালিনের দৃশ••• টসেপলিন তলােপস্থাপিত বিমান লর্ড কিচ নার বর্তমান কালের রণতরী হাউইটুর কামান ফ্রান্সে ভারতবর্ষীয় সেনা বিক্টোরিয়া ক্রুশ-লাঞ্ছিত ছত্ৰসিংহ মানচিত্র-সূচী। যুরােপের মানচিত্র প্রতীচ্য যুদ্ধক্ষেত্র প্রাচ্য যুদ্ধক্ষেত্র রুমানিয়া *মেসসাপটেমিয়া ৪ . ০ । ১১৪ ০৫ মুখপত্র ৮. - ০৮০ ৮৮ ৯২ ০ ০ ০ ** । ? বিজ্ঞাপন। প্রায় তিন বৎসর হইল য়ুরােপে যে সমানল জ্বলিয়া উঠিয়াছে, এখনও তাহা নিৰ্বাপিত হয় নাই। ইহাতে যে কেবল য়ুরােপবাসীরাই দগ্ধ হইতেছেন তাহা নহে; এত দূরে থাকিয়াও আমরা পর্যন্ত ইহার প্রখর জ্বালা অনুভব করিতেছি। বর্তমান সময়ে এই মহাহবে ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইটালি, সার্বিয়া, রুমানিয়া ও কশিয়া একপক্ষ, এবং জার্মানি, অস্ট্রিয়া, বুলগারিয়া ও তুরুক অন্যপক্ষ। পৃথিবীতে আর কখনও এরুপ যুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই ; কি আয়ােজন প্রাচুৰ্য্যে, কি ব্যয়বাহুল্যে, কি যােদ্ধাদিগের সংখ্যায়, কি লােকক্ষয়ে, মহাভারতবর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধও ইহার নিকট পরাজয় মানে। জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে, ভূগর্ভে ও সাগরগর্ভে- সর্বত্র ইহার সংহার-ক্রিয়া চলিতেছে, পূর্বে যাহা কবিকল্পনার বিষয় ছিল, এখন তাহা কাৰ্য্যে পরিণত হইতেছে। এই আকস্মিক বিপ্লবের কারণ কি, ইহার কোন্ পক্ষে ধৰ্ম্ম, কোন্ পক্ষে অধর্ম ইহার পরিণামই বা কি হইবে, সকলেরই তাহা জানিতে ইচ্ছা হয়। এই ইচ্ছা পূরণ করিবার অভিপ্রায়ে শ্রীযুক্ত নেলস ফুেজার “পৃথিবীব্যাপী মহাসমর” নাম দিয়া ইংরাজী ভাষায় একখানি পুস্তক প্রণয়ন করিয়াছেন। ইহাতে তিনি অতি নিরপেক্ষ ভাবে উভয়পক্ষের উদ্দেশ্য, রাজনীতি ও সমরনীতি আলােচনা করিয়াছেন এবং তৎসমস্ত বিশদ করিবার জন্য অতি সংক্ষেপে যুধামান রাজ্যগুলির প্রাচীন ইতিবৃত্তের আভাস দিয়াছেন, কারণ বর্তমানের সহিত অতীতের জন্যজনকত্ব-সম্বন্ধ, অতীত না বুৰিলে বর্তমানের প্রকৃতি বুঝা অসম্ভব। ইংৰাজ আমাদিগের রাজা, ইংরাজের ইটানিষ্টের সহিত আমাদের ইষ্টানিষ্টের নিঠ সংস্রব। এই নিমিত্ত এদেশের সর্বসম্প্রদায়ের সর্ববিধ লােকে একমনে ইংরাজের বিজয়কামনা করিতেছে, ইংরাজের সাহায্যার্থ কঠোর সৈনিকবৃত্তি অবলম্বন পূৰ্ব্বক সমরানলে প্রাণ আহুতি দিতেছে। কিন্তু যাহারা ইংরাজী ভাষায় অনভিজ্ঞ, তাহাদের অনেকে হয়ত যুদ্ধের প্রকৃত কারণ এবং কোন্ পক্ষের এখন কি অবস্থা তাহা সুন্দররূপে হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই। তাহাদের, বিশেষতঃ বঙ্গদেশীয় বালকদিগের অবগতির নিমিত্ত শ্ৰীযুক্ত নেলসন জোরের গ্রন্থাবলম্বনে এই পুস্তক সঙ্কলিত হইল। শ্ৰীযুক্ত নেলসন ফ্রেজা প্রণীত পুস্তকের বর্তমান সংস্করণে ১৯১৬ অব্দের বিজ্ঞাপন। ১২ই ডিসেম্বর পর্যন্ত যে সকল ঘটনা ঘটিয়াছে সেই সমস্ত বিবৃত আছে। কিন্তু ততঃপর উভয়পক্ষের বিস্তর অবস্থাপরিবর্তন হইয়াছে। ইংরাজের ও কাসীর ভীষণ আক্রমণে জার্মাণেরা পশ্চিম প্রান্তে পরাবর্তন আরম্ভ করিয়াছেন; ইংরাজের। এশিয়াখণ্ডে সুপ্রসিদ্ধ বাগদাদ নগর অধিকার করিয়াছেন; কুশিয়ার সমাটু মুখে না হউক, কাৰ্যে জাৰ্মাণদিগের পক্ষপাতী ছিলেন এই সন্দেহে তত্ৰত্য অধিবাসীরা তাহাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া সাধারণতন্ত্র শাসন প্রবর্তিত করিয়াছে; জার্মাণির দুর্ব্যবহারে ধৈৰ্য্যচ্যুত হইয়া য়ুনাইটেড, ষ্টেটসের লােকে ও ইংরাজপক্ষে যােগ দিয়াছেন। বলা বাহুল্য যে বর্তমান গ্রন্থে এই সমস্তও পাঠকদিগের বােধ-সৌকৰ্য্যার্থে যথাস্থানে সন্নিবেশিত হইয়াছে।

পৃথিবীব্যাপী মহাসমর। প্রথম খণ্ড—অতীত কথা। প্রথম অধ্যায়। জার্মানি ও অস্ট্রিয়া। এখন জাৰ্ম্মাণি শব্দের অর্থ জাৰ্ম্মাণজাতির বাসভূমি।* কিন্তু জাৰ্মাণজাতি বলিলে এখন যাহা বুঝায় পূর্বে তাহা অপেক্ষা অনেক অধিক বুঝাইত, কারণ অস্ট্রিয়া, হল্যাণ্ড, প্রভৃতি আরও কতকগুলি দেশের অনেক লােক মুলত জাৰ্মাণ- জাতিরই অন্তভূত। য়ুরােপের দক্ষিণখণ্ডস্থ গ্রীক ও রােমকজাতি যেমন যীশুখ্রীষ্টের বহু পূর্বেই সভ্যতার উচ্চ সােপানে অধিরােহণ করিয়াছিলেন, জার্মাণের সেরূপ পারেন নাই। এই নিমিত্ত রােমকগ্রন্থকারেরা তাহাদিগকে ‘বর্বর বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহারা অত্যন্ত মদ্যাসক্ত ও যুদ্ধপ্রিয় ছিলেন ; তাহারা শিল্পসাহিত্যাদি সভ্য- জনােচিত বিদ্যার অনুশীলন করিতেন না; তাহাদের দেশে তখন বড় বড় বিল ও বন ছিল, কুলাপি কোন বৃহৎ নগর দেখা যাইত না। কিন্তু জাৰ্মাণদিগের গুণও অনেক ছিল এবং রােমকগ্রন্থকারের শত্রু হইলেও সেগুলি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। তাদের প্রভুভক্তি, সাহস ও বিক্রম দেখিয়া রােমকেরা বিস্মিত হইয়াছিলেন। সঙ্গীতে তাঁহাদের অসামান্য নৈপুণ্য জন্মিয়াছিল। তাহাদের রমণীরা সচ্চরিত্রা ও লজ্জাশীলা ছিলেন, অথচ সমাজে পুরুষদিগের তুলকক্ষ হইয়া বিচরণ করিতেন। পৃথিবীর অন্যত্র নানা জাতির সংমিশ্রণে লােকচরিত্রের যেরূপ পরিবর্তন ঘটিয়াছে, জার্মাণিতে সেরূপ হইতে পারে নাই; কাজেই দ্বিসহস্রবর্ষ পূৰ্ব্বে জাৰ্মাণজাতির প্রকৃতিতে যে সকল দোষগুণ পরিলক্ষিত হইত, অদ্যাপি অল্পাধিক মাত্রায় সেগুলি বর্তমান রহিয়াছে। } * বর্তমান জাৰ্মাণেরা আপনাদিগকে ‘ডয়ে’ এবং আপনাদিগের দেশকে ‘ডয়েচূল্যাও’ বলেন। আমরা কিন্তু ‘ডয়েচ শব্দে হল্যাও দেশের অধিবাসীদিগকেই বুঝিয়া থাকি। হল্যান্ডের লােকে আপনাদিগকে ‘হল্যাসি’ বলেন। ইহা হইতে আমাদিগের ‘ওলন্দাজ' শব্দের উৎপত্তি। ফরাসী- দেশে জাৰ্মাণদিগের নাম ‘আলম।।

প্রথম অধ্যায় খ্রষ্টের শতাধিকবর্ষ পূর্বেই জাৰ্মাণদিগের সহিত মােমকদিগের সঘৰ ঘটে এবং তাহাদিগের ভীষণ আক্রমণস্রোত হইতে আত্মরক্ষার নিমিত্ত মােমকদিগকে সবিশেষ কষ্ট পাইতে হয়। অতঃপর সুপ্রসিদ্ধ রােমক সেনানী মহাবীর জুলিয়াস সীজার যখন গল দেশ (বর্তমান ফুল) জয় করেন, তখন তিনি রাইন নদী পার হইয়া জাৰ্মাণদিগের বাসভূমি আক্ৰমণ করিয়াছিলেন। তাঁহার প্রতিভাবলে জার্মাণের তখন পরাভূত হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু বশীভূত হন নাই। হারা যখনই সুবিধা পাইতেন, তখনই রােমের বিরুদ্ধাচরণ করিতেন। এই নিমিত্ত গল দেশে সর্বতােমুখী ক্ষমতা লাভ করিলেও রেমিকেরা রাইন নদীর পূর্বপারে দীর্ঘকালস্থায়ী আধিপত্য বিস্তার করিতে পারেন নাই; কাজেই জাৰ্ম্মাণির স্বাধীনতা অক্ষুন্ন ছিল। খ্রষ্টীয় প্রথম দুইশত বৎসর রােমকজাতির চরম উন্নতির সময়। পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর, পূৰ্ব্বে যুছে টিশ নদী, উত্তরে ডানিয়ুব নদী, দক্ষিণে সাহারা মরুভূমি, এই চতুঃসীমান্তৰ্বৰ্ত্তী সুবিশাল অঞ্চলে মােমের তথন একচ্ছত্ৰাধিপত্য। ইহার সর্বত্রই তখন রােমের সভ্যতা বিরাজ করিত, এবং রােমের বিধিব্যবস্থানুসারে শাসনকার্য নির্বাহিত হইত। কিন্তু কালবশে রােমের অবনতির সূত্রপাত হইল ; রােমক সাম্রাজ্য দুইখণ্ডে বিভক্ত হইয়া দুর্বল হইয়া পড়িল। পশ্চিখণ্ডের রাজধানী রহিল রােম ; পূৰ্বখণ্ডের রাজধানী হইল কষ্টান্টিনােপল (বা স্তখুল) জার্মাণেরাও তখন সুযােগ পাইলেন এবং পুনঃ পুনঃ আক্রমণ করিয়া প্রতীচ্য নােম সাম্রাজ্য চুর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া ফেলিলেন। এই ধ্বংসের কাৰ্য শেষ হইতে বহুকাল লাগিয়াছিল (খ্রঃ ২০০-৬••)। যে সকল জাৰ্মাণ সম্প্রদায় ইহার প্রধান নায়ক, ফুষ্ণেরা তাহাদের অন্যতম। ইহা গল দেশ জয় করিয়া সেখানে বাস করেন এবং ইহাদেরই নামানুসারে গলের নাম “ফ্রান্স’ হয়। ফ্রাঙ্ক জাতীয় রাজাদিগের মধ্যে সালামে সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ। তাহার সিংহাসনপ্রাপ্তির পূর্বেই ফ্রাঙ্কের রােমকদিগের ধর্ম, ভাষা ও আচার-ব্যবহার অবলম্বনপূর্বক পূর্বাপেক্ষা অনেক সভ্য হইয়াছিলেন। সালামে মােমক সভ্যতার এতই পক্ষপাতী ছিলেন যে মােমকেরা যে নিয়মে শাসন করিয়া গিয়াছেন, সেই আদর্শ চালাইতে পারিলেই তিনি আপনাকে কৃতার্থ ভান করিতেন। তিনি নিজের সাম্রাজ্যকে পবিত্র রােমক সাম্রাজ্য’ এই আখ্যা দিয়াছিলেন এবং পবিত্র বিশেষণটা সার্থক করিবার অভিপ্রায়ে প্রধান যাজক পােপকর্তৃক নিজের অভিষেক-জিয়া পুর্বকালে য়ুরােপখণ্ডে খ্রীষ্টাদিগের দুইজন প্রধান গুরু ছিলেন—প্রতীচ্যখণ্ডে নামের পােপ এবং প্রাচ্যর্থওৈ কষ্টান্টিনােপলের ‘পেছি মার্ক বা গােষ্ঠীপতি। রােমের পােপ আপনাকে যীশুখ্রষ্টের প্রিয় শিষ্য পিটার নামক সাধুপুরুষের স্থানীয় বলিয়া মনে করেন। তাঁহার পদ নির্বাচনাধীন।

জার্মাণি ও আফ্রিকা। সম্পাদন করাইয়াছিলেন। য়ুরােপের ইতিবৃত্তে সালাৰেনের, য় সর্বগুণান্বিত ভূপতি অতি অল্পই দেখা যায়। তিনি ধর্মের সংস্থাপন এবং প্রজার শিকাধানের জন্য নিয়ত যত্নশীল ছিলেন এবং তাঁহার শাসনগুণে সর্বত্র শান্তি বিরাজ করিত। সালামেন যুবােপখণ্ডে সৈনিক ভূম্যধিকার-প্রথার প্রথম প্রবর্তক। এই প্রথানুসারে রাজা নিজের বিশ্বাসভাজন সেনানীদিগকে জায়গীর দিতেন এবং জায়গীরদারেরা যুদ্ধকালে স্ব স্ব জায়গীরের পরিমাণানুসারে নির্দিষ্টসংখ্যক যােঙ্ক লইয়া রাজার সাহায্য করিতেন। উত্তরকালে ইহা হইতে নানারূপ অনর্থের উৎপত্তি হইয়াছিল সন্দেহ নাই, কারণ সৈনিক ভূম্যধিকারীরা সচরাচর বড় অত্যাচারী ছিলেন; তাহার রক্ষকবেশে ভক্ষক হইয়া প্রজার সব্বস্ব লুণ্ঠন করিতেন ; তাহারা একে অপরের সম্পত্তি গ্রাস করিবার উদ্দেশ্যে নিয়ত বিবাদবিসংবাদে রত থাকিতেন তাঁহাদের উপদ্রবে স্বয়ং রাজা পর্যন্ত সময়ে সময়ে বিব্রত হইয়া পড়িতেন। কিন্তু সার্লামেনের রাজত্বকালে সমাজের যেরূপ অবস্থা ছিল তাহাতে, বােধ হয়, সৈনিক ভূম্যধিকার-প্রথা অবলম্বন না করিলে শান্তিলাভের সম্ভাবনা ছিল না। খ্রষ্টীয় ৮১৪ অব্দে সালামেনের মৃত্যু হয়। অতঃপর তাঁহার বিশাল সাম্রাজ্য ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়; দ্রুান্স, স্বাধীনতা অবলম্বন করে, জাৰ্ম্মাণিও কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডরাজ্যে বিভক্ত হইয়া পড়ে। কিন্তু কাৰ্যতঃ স্বাধীন হইলেও এই সকল জাৰ্মাণ ভূপাল আপনাদিগের মধ্যে একজনকে সম্রাটের পদে নির্বাচিত করিয়া লইতেন। নিৰ্ব্বাচিত সম্রাটদিগের মধ্যে কেহ কেহ প্রসিদ্ধ যােদ্ধা ছিলেন এবং তাঁহারা সময়ে সময়ে আল্পস পর্বত লঙ্ঘন পূৰ্ব্বক ইটালিদেশে অখণ্ড আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা করিতেন (খ্রীঃ ৮০০-১০০৪)। কিন্তু ইটালিতে তখন জেনােয়া, বিনি ও ফুরেন্স, নগর বাণিজ্যের কল্যাণে প্রভূত ক্ষমতাশালী হইয়াছিল। জাৰ্ম্মাণ সম্রাটেরা কখনও ইহাদিগকে বশীভূত করিতে পারেন নাই; রােমের পােপও সুবিধা পাইলে তাঁহাদিগের প্রতিকূলচরণ করিতে বিরত হইতেন না। কাজেই মধ্যযুগে তথাকথিত জাৰ্ম্মাণ সাম্রাজ্য তদানীন্তন জাৰ্ম্মাণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সম্রাটু যদি খ্ৰীষ্টীয় ষােড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে প্রতীচ্যখণ্ডের অনেক খ্রীষ্টান ধর্মসম্বন্ধে পােপের একাধিপত্য অস্বীকার করেন এবং তদুপলক্ষ্যে নানা দেশে অনেক রক্তারক্তি হয়। পােপের বিরুদ্ধবাদীরা ‘প্রটেষ্টান্ট, পােপের পক্ষপাতীরা ‘রােমান কাথলি বা কাথলি নামে অভিহিত। হইতে •• অব্দ পর্যন্ত প্রায় তিন শত বৎসর যুপেয় ইতিবৃত্তে ‘তামস বা ‘অজ্ঞানযুগ' নামে বিদিত, কারণ এই সুদীর্ঘকালে ঝুলােপখণ্ডে বিদ্যালােচনায় সাতিশয় অবনতি ঘটিয়াছিল। সার্লামেনের সময় হইতে প্রায় •• বৎসর ‘মধ্যযুগ' নামে অিিহত। তাহার পর মুদ্রান্ত্রে আবির্ভাব, এী সাহিত্যের আলোচনা, আমেরিকার আবিষ্কার প্রভৃতি নানা কারণে বর্তমান যুগের প্রবর্তন হয়।

দুর্বল হইতেন তাহা হইলে জাৰ্ম্মাণির অন্তরেও তাঁহার প্রকৃত কোন ক্ষমতা কিত না। অতঃপর খ্ৰীষ্টীয় ওয়ােজশ শতাব্দীর শেষভাগে হাবার্ণ, বংশের অভূদয়েব সঙ্গে সঙ্গে জাৰ্মাণ সাম্রাজ্যে নববলের সঞ্চার হয়। এই বংশের পূর্বপুরুষেরা সুইজারুল্যাণ্ডের অন্তঃপাতী হাপবাগ নামক এক পল্লীগ্রামে বাস করিতেন; কিন্তু কালক্রমে ক্ষমতাশালী হইয়া ইবা জাৰ্ম্মাণভূপতিদিসের মধ্যে শীর্ষস্থান লাভ করিয়াছিলেন। অদৃষ্টবলে ইহাদের কারও কাহারও এমন বিবাহসম্বন্ধ ঘটিত যে তন্নিবন্ধন ইহারা নূতন নূতন রাজ্য লাভ কবিতেন। বর্তমান হল্যান্ড ও বেলজিয়াম দেশ এইরূপেই এক সময়ে হাপর্গ, বংশের অধিকারভুক্ত হইয়াছিল। জাৰ্ম্মাণ সম্রাটের পদ নির্বাচনাধীন ছিল; কিন্তু ইহাতেও ক্রমে হাপসবার্গ বংশেরই একাধিকার জন্মে এবং তাঁহাদের রাজধানী যিনা নগৰী ধনে জনে সাতিশয় সমৃদ্ধিশালিনী হইয়া উঠে। হাপসবার্গদিগের একজন বংশধর স্পেনবাজ ফার্ডনাণ্ডের কন্যা জোয়ানাকে বিবাহ করিয়াছিলেন এবং সেই সুত্রে তাঁহার পুত্র স্পেনদেশ, ইটালির দক্ষিণাঞ্চল এবং নবাবিষ্কৃত মেক্সিকো ও পেরু প্রভৃতি দেশের অধীশ্বর হইয়াছিলেন। এই ভাগ্যবান পুত্রের নাম চার্লস। ইনি শেষে জাৰ্মাণসাম্রাজ্য লাভ করিয়া পঞ্চম স নামে অভিহিত হইয়াছিলেন। পঞ্চম চার্লসের মৃত্যুর পর স্পে, হল্যাণ্ড, ও বেলজিয়াম জাৰ্মাণসাম্রাজ্য হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায় ; জার্মাণিতেও সম্রাটের ক্ষমতা পূৰ্ব্বাপেক্ষা ক্ষীণ হইয়া পিড়। চালসের জীবদ্দশাতেই মার্টিন লুথা নামক এক ব্যক্তি পােপের বিরুদ্ধে অ্যুত্থান করিয়া ধর্মসংস্কারে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন এবং জাম্মণ ভূপালদিগের কেহ কেহ পােপের পক্ষ, কেহ কেহ বা সংস্কারকদিগের পক্ষ অবম্বন করিয়াছিলেন। এৰকারে যে তােক ক্ষয়কর যুদ্ধ ঘটে, ইতিহাসে তাহা ত্রিংশবর্ষব্যাপী সমর নামে অভিহিত ( ১৬১৮ ১৬৪৮ খ্ৰীঃ অঃ)। ইহাতে উভয় পক্ষেই নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত দেখাইয়াছিলেন ; কাজেই যুদ্ধের যথন অবসান হইল তখন জাৰ্মাণজাতি নিতান্ত অবসন্ন ও দুর্দশাপন্ন হইয়া পড়িল। জাৰ্ম্মাণ সম্রাটের পদ কাপসবার্গ বংশগতই রহিল, কিন্তু সম্রাট এখন সাক্ষিগােপাল- মাত্র হইলেন, কারণ অস্ট্রিয়ার বাহিরে কেহই তাহার প্রভুত্ব স্বীকার করিত না এবং জার্মাণির উত্তরখণ্ডস্থ রাজারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে চলিতেন। অস্ট্রিয়ার মধ্যেও শাস্তি ছিল না। তুর্কজাতি যুবরাপের প্রাচ্যখণ্ডে সমধিক প্রবল হইয়াছিল। তাহারা পূর্বেই কনষ্টান্টিনোপল অধিকার করিয়াছিল এবং তথা হইতে ডানিয়ুব নদী পর্যন্ত গ্রসর হইয়াছিল। এক দিকে তুর্কদিগকে নিরন্ত রাখা, অন্যদিকে পূর্ব প্রান্তবর্তী • জার্মাণি ও অস্ট্রিয়া। পােল্যাণ্ড রাজের আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষা করা, এই উভয় কাৰ্য্যে সম্রাটকে নিয়ত ব্যতিব্যস্ত থাকিতে হইত; তিনি জার্মাণির রাজ্যগুলির কথা ভাবিবার অবসর পাইতেন না। এই সকল খণ্ডরাজ্যের মধ্যে প্রশিয়া শনৈঃ শনৈঃ বলসঞ্চয় করিতেছি। মধ্যযুগে প্রশিয়াব কিছুমাত্র খ্যাতি প্রতিপত্তি ছিল না। ইহার ভূমি অনুরা, খনিজ সম্পত্তি অকিঞ্চিৎকর, অবস্থান সমুদ্র হইতে দূরে। কাজেই কৃষি বা বাণিজ্য কিছুতেই ইহার উপর কমলার কৃপাদৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু ইহার রাজায় পুরুষপরম্পরায় এমনই উদ্যমশীল ও অধ্যবসায়ী ছিলেন যে, সেই নগণ্য প্রশিয়া এখন জাৰ্মাণ-সাম্রাজ্য-লক্ষ্মীর অধিষ্ঠানভূমি হইয়াছে। প্রশি-রাজবংশের আদিপুরুষ হােহেন্টসলার নামক একটা ক্ষুদ্র পল্লীতে বাস করিছেন ; তজ্জন্য এই বংশ হােকেন্টসলারণ, আখ্যা পাইয়াছে। হােহেন্টসলাবণ, বংশের কয়েকজন রাজার নাম ফ্রেডরি ; তন্মধ্যে যিনি খ্ৰীষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে রাজত্ব করিয়াছিলেন, তিনিই সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ এবং তন্নিমিত্ত ইতিহাসে ফ্রেন্ড রিকু দি গ্রেট অর্থাৎ মহাসত্ব ভেরি নামে অভিহিত। তঁাহার চেষ্টাতেই প্রশিয়াবাসীরা রাজ্যবিস্তারে প্রবৃত্ত হন, এবং যুরে খণ্ডে প্রুশিয়ার রাজশক্তিও যে নগণ্য নহে সর্বপ্রথম ইহা প্রতিপাদন করেন। ১৭৪০ অব্দে অষ্ট্রিয়ার সম্রাট দেহত্যাগ করিলে তাহার কন্যা মেরায়া টেরিস সিংহাসনে অধিরােহণ করেন এবং এই সুযােগে ফ্রেডরিক কিছুমাত্র দ্বিধা বােধ না করিয়া তদীয় অধিকারভুক্ত সিলিসিয়া নামক সমৃদ্ধ জনপদটী গ্রাস করিয়া ফেলেন। তেজস্বিনী মেরায় ফ্রান্সের সাহায্যে প্রুশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ করিলেন, এদিকে ফ্রান্সের সহিত শত্রুতাবশতঃ ইংরাজেরা ফ্রেডরিকের সহায় হইলেন। ফ্রেডরিক অনেকবার পরাস্ত হইলেন। কিন্তু তাহার এমনই রণনৈপুণ্য ছিল যে, পরাস্ত হইলেও তাহার বলয় হইত না। কাজেই পরিণামে তাঁহারই জয় হইল, সিলিসিয়া প্রদেশ প্রশিয়ার অধিকারে রহিয়া গেল। রাজ্যশাসনেও ফুেরিক সাতিশয় কৃতিত্ব দেখাইয়াছিলেন। তিনি পরিশ্রমী, ন্যায়পরায়ণ, মিতব্যয়ী ও পরিণামদর্শী ছিলেন, শিল্প ও সাহিত্যের উৎসাহ দিতেন এবং অবকাশকালে পণ্ডিতগণের সংসর্গে থাকিতে ভাল বাসিতেন। যুদ্ধক্ষেত্রে ফরাসীরা তাহার শত্রু ছিলেন ; কিন্তু রাজভবনে তিনি ফরাসীপণ্ডিতদিগকে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যাইতেন। ফলতঃ, ফ্রেডরিকের বুদ্ধি, ইংল্যাণ্ডের ধন ও ফরাসী- জাতির সভ্যতা এই তিনের সম্মেলনে প্রুশিয়াবাসীদিগের সৌভাগ্যলােপান গঠিত হইয়াছিল। এতক্ষণ প্রায় দুই হাজার বৎসরের কথা বলা হইল। এই দীর্ঘকালে য়ুরােপের এম খায়। প্রধান প্রধান জাতিদিগের মধ্যে নানা বিষয়ে যেরূপ উন্নতি হইয়াছিল, জাৰ্মাণদিগের ভাগ্যে সেরূপ ঘটে নাই। সত্য বটে তাহারা পঞ্চদশ শতাব্দীতে মুদ্রান্ত্রের আবিস্কার যারা আপনাদের উদ্ভাবনীশক্তির পরিচয় দিয়াছিলেন, সত্য বটে বাণ্টি ও উত্তর সাগরের তীরবর্তী কয়েকটা জাৰ্মাণ নগর বাণিজ্যের প্রসাদে ঐশ্বর্যশালী হইয়াছিল, সত্য বটে অষ্টাদশ শতাব্দীতে কয়েকজন প্রতিভাবান্ সঙ্গীতাচাৰ্য আবিভূত হইয়া জার্মাণিকে সঙ্গীতবিদ্যায় মুরােপখণ্ডে সর্বপ্রধান করিয়াছিলেন; কিন্তু এইরূপ দুই চারিটী বিষয় ব্যতীত আমরা এই বিসহস্রবর্ষে জাৰ্ম্মাণজাতির অন্য কোন কৃতিত্বের পরিচয় পাই না। তাহারা যুদ্ধই ভাল বাসিতেন এবং বিষয়ারে মনােনিবেশ করিবার তত অবসর পাইতেন না। কিন্তু যুদ্ধেও যে মানব চরিত্রের উৎকর্ষ সাধিত হইতে না পারে এমন নহে। মানব বিবেকবান্ ; নিয়ত যুদ্ধে রত থাকিলে সে স্বতঃই দেখিতে পায় যে, কেবল দুর্বলের পীড়নের জন্য নহে; সত্যের সমর্থনে, দুষ্টের দমনে, শিষ্টের পালনে ও আন্তের সংরক্ষণেই ইহার প্রকৃত মাহাত্ম্য। বিশেষতঃ যাহাৱা তদ্রবংশজাত তাহাদের পক্ষে ত এই সকল পবিত্র ধর্মের পালন নিতান্ত আবশ্যক। এবারে জার্মাণিতে ও য়ুরােপের অন্যান্য দেশে মধ্যযুগে নাইট উপাধিধারী কতকগুলি যােদ্ধার উদ্ভব হয়। নাইট' কথাটার অর্থ এক। যাহার প্রভুর সেবক, সত্যের সেবক, সমাজের সেবক, এরূপ যােদ্ধারাই নাইট নামে অভিহিত হইতেন। ভদ্রসন্তানেরা বয়ঃপ্রাপ্তির পর উল্লিখিত মহাব্ৰতগুলি পালন করিবেন বলিয়া শপথ করিতেন এবং সাধারণত: অতি বিশ্বস্তভাবে আজীবন সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করিয়া চলিতেন। শেষে সভ্যতার বিস্তার, খ্ৰীষ্টীয় ধৰ্ম্মের সংস্কার, আগ্নেয়াস্ত্রের প্রচলন প্রভৃতি নানা কারণে নাইটদিগের পূৰ্বরূপ উপযােগিতা ছিল না বটে, কিন্তু লােকে তাঁহাদের উচ্চ আদর্শ ভুলে নাই; তাহারা রাজনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি নব নব বিষয়ে মনঃসংযােগ করিয়া স্ব স্ব হৃদয়ের উদারবৃত্তিসমূহ চরিতার্থ করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয় জার্মাণিতে তখন ভয়ঙ্কর গৃহ-বিবাদ চলিতেছিল কাজেই জার্মাণের এরূপ কোন নুতন ক্ষেত্রে বিচরণ করিতে পারেন নাই, বরং জাতিবিরােধে তাঁহাদের নীচবৃত্তিগুলিই প্রবল হইয়া উঠে। তাহাদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটে নাই ;. কৃষকেরা দারিদ্র্যের পীড়নে নিষ্পেষিত হইত; রাজারা স্বার্থপর ও তোষামােদপ্রিয় ছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত জার্মাণির মােটামুটি এইরূপ দুর্দশাই ছিল। ঐ শতাব্দীর মধ্যভাগে উন্নতির যে সূত্রপাত হয়, তাহ পূর্বে বলা হইয়াছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে ফরাসীদেশে রাষ্ট্রবিপ্লব ঘটে। ফরাসীরা রাজার ও জমিদারদিগের বহুশতাব্দীব্যাপী অত্যাচারে বালাতন হইয়াছিলেন, শেষে যখন ;

জার্মাণি ও অষ্ট্রিয়া। আর সই করিতে পারিলেন না, তখন তাহাদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করিলেন। পূর্বে সকলেই সমান ছিল, এখনও চেষ্টা করিলে আবার সকলেই সমান হইতে পারে, রাজশাসন কেবল প্রজার মঙ্গলের নিমিত্ত, অমঙ্গল হইলে শাসন-পরিবর্তন কায়সঙ্গত, তাহারা এই সকল বিপ্লবমন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া রাজপদ ও জমিদারীপ্রথা উঠাইয়া দিলেন, রাজা ও রাণীর প্রাণদণ্ড করিলেন এবং সকলেই স্বাধীন, সকলেই সমান, এই মত ঘােষণা করিলেন। পাছে এই বিদ্রোহ-বহ্নি অন্যত্র পরিব্যাপ্ত হয় এই আশঙ্কায় য়ুরােপের অনেক রাজাই ফরাসী সাধারণতন্ত্রের শত্রু হইলেন। এইরূপে জাৰ্মাণদিগের সহিত ফরাসীদিগের যুদ্ধ আরম্ভ হইল। এই যুদ্ধে ফরাসীরা প্রথমে তত সুবিধা করতে পারেন নাই ; কিন্তু যখন সুপ্রসিদ্ধ নেপাে- লিয়ন তাঁহাদের অধিনেতা হইলেন, তখন তাহারা দুর্জয় হইয়া উঠিলেন। অস্ট্রিয়ার সম্রাট তখনও সিলিসিয়ার কথা ভুলিতে পারেন নাই; তিনি নেপােলিয়কে বাধা দিবার সময় প্রথমে প্রুশিয়ারাজের সহিত যােগ দেন নাই। কাজেই তাঁহারা উভয়েই একে একে পরাস্ত হইলেন এবং ফরাসীরা রাইন নদীর পূর্বপারেও আপনাদের আধিপত্য বিস্তার করিলেন। নেপােলিয়ন প্রশিয়ারাজ্যের সৈন্যসংখ্যা কমাইয়া দিলেন এবং যত দুর পারিলেন সেখান হইতে অর্থশােষণ করিতে লাগিলেন। অষ্ট্রিয়ার সম্রাটও পরাজয় মানিয়া নেপােলিয়কে নিজের ক দান করিলেন। কিন্তু প্রুশিয়ারাজ ভগ্নোদ্যম হইলেন না। তিনি নিজের সেনার উৎকর্ষসাধনে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনি দেখিলেন যখন নেপােলিয়নের আদেশানুসারে তাহার নির্দিষ্ট সংখ্যার অতিরিক্ত সৈন্য রাখিবার ক্ষমতা নাই, তখন ঐ নির্দিষ্টসংখ্যক সৈনিকপুরুষদিগকে রীতিমত সামরিক শিক্ষা দিয়া ছাড়িয়া দিলে এবং তাহাদের পরিবর্তে সেই পরিমাণে নূতন নূতন লোক আনিয়া সৈনিক শ্রেণীভুক্ত করিলে সন্ধির নিয়মও লঙ্ঘন করা হইবে না, অথচ কতিপয় বৎসরের মধ্যে রাজ্যের অনেক লােকে সমরনৈপুণ্য লাভ করিতে পারিবে। এই প্রথার আরও একটা গুণ এই যে ইহাতে এক সময়ে অধিক লােক সৈনিক বিভাগে রাখিতে হয় না। কাজেই ব্যয়ের লাঘব হয় এবং সামরিক শিক্ষা সমাপ্ত হইলে সকলেই গৃহে ফিরিয়া স্ব স্ব ব্যবসায় অবলম্বনপূর্বক দেশের ধনবৃদ্ধি করিতে পারে। সামরিক শিক্ষাপ্রাপ্ত, কিন্তু কৃষিশিল্পবাণিজ্যাদিতে নিরত এইরূপ ব্যক্তিদিগকে দেশের “সঞ্চিত সৈন্য” বলা যাইতে পারে, কারণ যখনই প্রয়োজন হয়, তখনই রাজা ইহাদিগকে আহ্বান করিয়া সামরিক কার্যে নিযুক্ত করিতে পারেন। উত্তরকালে যুরােপের প্রায় সমস্ত দেশেই সেনা প্রস্তুত করিবার জন্য এশিয়ারাজের এই উৎকৃষ্ট পন্থা অবলম্বিত হইয়াছে।

এদিকে নেপােলিয়নের পতনকাল আসল্প হইল। তাহার সর্বগ্রাসিনী নীতির বিভীষিকায় ইংল্যাণ্ড, শিয়া, অষ্ট্রিয়া, রুশিয়া প্রভৃতি প্রায় সকল দেশের রাজাই তাঁহার শত্রু হইয়াছিলেন। রুশিয়া আক্রমণ করিতে গিয়া তাহার এক বিপুল বাহিনী বিনষ্ট হইল অস্ট্রিয়ার সম্রাট প্রুশিয়ারাজের সহিত যােগ দিলেন ইংল্যান্ডের ও প্রুশিয়ার সমবেত চেষ্টায় ওয়াটার যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁহার মহাপতন ঘটিল। যুদ্ধান্তে য়ুরােপবাসীরা বিয়েনা নগরীতে এক মহাসমিতি গঠন করিয়া শান্তিস্থাপনে মন দিলেন। যুদ্ধের পূর্বে যে যে রাজার অধিকারে যে যে অঞ্চল ছিল, তাঁহার প্রায় সকলেই যথাসম্ভব সেগুলি ফিরিয়া পাইলেন ; ইহাতে এক জাতীয় লােক যে পুনবার অন্য জাতীয় লােকের অধিকারভুক্ত হইল, সমিতির সত্যেরা তাহা বিবেচনা করিয়া দেখিলেন না। তাঁহারা অস্ট্রিয়াপতিকে ইটালির কিয়দংশ দান করিলেন। হতভাগ্য পােল্যাণ্ডের সম্বন্ধেও সুবিচার করিলেন না। অষ্ট্রিয়া, প্রুশিয়া ও কুশিয়ার রাজারা অষ্টাদশ শতাব্দীতে পােল্যাণ্ড রাজ্যটাকে আপনাদের মধ্যে যেমন ভাগ করিয়া লইয়াছিলেন, বিয়েনার সমিতি তাহাই অব্যাহত রাখিলেন। সবিশেষ লাভবান হইলেন প্রুশিয়ার রাজা, কারণ তিনি জার্মানির উত্তরখণ্ড হাম্বার্গ, প্রভৃতি কতকগুলি উৎকৃষ্ট স্থান প্রাপ্ত হইলেন। এরূপ ব্যবস্থায় রাজারা সন্তুষ্ট হইলেন বটে, কিন্তু তাহাদের প্রজার, সর্বত্র সুখী হইতে পারিল না। ফরাসীরাষ্ট্রবিপ্লবে লােকে স্বায়ত্ত শাসনের মর্ম বুঝিয়াছিল । কিন্তু প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া প্রভৃতি দেশের রাজারা স্বায়ত্তশাসনের বিরােধী এবং যথেচ্ছাচারের পক্ষপাতী ছিলেন। প্রজাদিগকে শাসনসংক্রান্ত কোন ক্ষমতা দেওয়া দূরে থাকুক, তাহারা বয়ং পূর্বাপেক্ষাও স্বেচ্ছাচারী হইলেন। বিস্ময়ের বিষয় এই যে রাজার স্বেচ্ছাচারী হইলেও জাম্মাণিতে এ সময়ে কোন অশান্তির লক্ষণ দেখা যায় নাই। পরন্তু কোন কোন জাৰ্মাণরাজ্যে লোকে যেন পূৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক শান্তিপ্রিয় হইয়াছিল। তাহারা মদ্যপান এবং নৃত্যগীতাদি আমােদ-প্রমােদ ভােগ করিতে পারিলেই সন্তুষ্ট থাকিত, রাজা ও রাজকর্মচারীরা নিতান্ত অত্যাচারী না হইলে দেশের শাসনপ্রণালী-সম্বন্ধে মস্তিষ্ক আলােড়ন করিত না, কাহারও সহিত বিবাদ করিতেও চাহিত না। বেরিয়া প্রভৃতি দক্ষিণাঞ্চলবাসী জাৰ্মাণদিগের মধ্যেই এইরূপ শান্তিপ্রিয়তা অধিক দেখা যাইত। যখন,নেপােলিয়ন প্রশিয়া ও অস্ট্রিয়াকে হতশ্রী করেন, তখনও ইহঁদের স্বজাতিবাৎসল্য উদ্দীপিত হয় নাই; স্বজাতির মর্যাদা রক্ষা করা দূরের কথা, ইহারা বরং নেপােলয়নেরই সাহায্য করিয়াছিলেন। তবে প্রত্যেক জাৰ্মাণের হৃদয়েই যে যুদ্ধবাসনা দীর্ঘকাল সুষুপ্ত ছিল তাহা নহে। প্রুশিয়া দেশের বিস্মাৰ্ক প্রমুখ অনেক ব্যক্তি প্রশিয়াকে জাৰ্মাণজাতির অগ্রণা জার্শ্বাণি ও অস্ট্রিয়া। করিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন। এই বিস্মার্ক, একজন অসাধারণ লােক। তিনি শিয়াদেশের কোন সন্ত্রান্তবংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং পঠন্দশাতেই বীৰ্য্য ও চরিত্রবলে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিলেন। দেহের বল, মনের দৃঢ়তা, লােকচরিত্র বুঝিবার ক্ষমতা, উপায়কুশ তা প্রভৃতি যে সমস্ত গুণ থাকিলে সমাজে প্রাধান্য লাভ করা যায়, বিস্মার্কের তাহার প্রায় কোনটীরই অভাব ছিল না। তিনি শত বাধা পাইলেও লক্ষ্যভ্রষ্ট হইতেন না,—ছলে বলে, যে কোন প্রকারে নিজের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করিয়া লইতেন। তাহার প্রতিজ্ঞা ছিল, জাৰ্ম্মাণরাজ্যগুলির মধ্যে প্রুশিয়াকে সর্বপ্রধান করিতে হইবে,-প্রুশিয়ার রাজাকে জার্মাণির সার্বভৌমপদে বসাইতে হইবে। তাহার প্রতীতি হইয়াছিল যে, প্রজাতন্ত্রশাসনে জাতীয় শক্তির অপচয় ঘটে, কিন্তু সুষােগ্য রাজার হস্তে সৰ্ব্ববিধ ক্ষমতা কেন্দ্রগত হইলে, এবং ঠাহর সাহায্যার্থ বিশ্বস্তা ও পরাক্রমশালিনী সেনা থাকিলে জাতীয় শক্তির সম্যক ক ৰ্ত্তি জন্মে। ১৮৪৭ অকে য়ুরােপের নানাস্থানে যখন আবার রাষ্ট্রবিপ্লব আরম্ভ হয়, সেই সময় হইতে বিস্মার্কের অ্যুদয়। তখন হাজারির সহিত অষ্ট্রিয়ার বিবাদ ঘটে এবং অষ্ট্রিয়ার সম্রাট হাজারিবাসীদিগকে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দিতে বাধ্য হন। বিস্মর্কতখন প্রুশিয়ারাজের মন্ত্রী। তিনি দেখিলেন অষ্ট্রিয়ার আর পূর্বের মত ক্ষমতা নাই ; অতএব তিনি জাৰ্মাণজাতির মধ্যে অষ্ট্রিয়ার পরিবর্তে প্রশিয়ার প্রাধান্য প্রতিপন্ন করিবার জন্য ব্যগ্র হইলেন। অচিরে সেজুই-হলষ্টি নামক একটা প্রদেশের অধিকার লইয়া তিনি অষ্ট্রিয়ার সহিত বিবাদের মূল পাইলেন। এই প্রদেশ পূর্বে দিনামাররাজের অধীন ছিল কিন্তু ১৮৬৪ অষে বিস্মার্ক ইহা গ্রহণ করিলেন। জার্মাণির উত্তরখণ্ডে দুই একটা প্রদেশ তখনও অস্ট্রিয়ার শাসনাধীন ছিল ; কাজেই অষ্ট্রিয়াপতি আপত্তি করিলেন যে, তাহার সম্মতি } * অষ্ট্রিয়ার পূর্ব প্রান্তবর্তী বিস্তীর্ণ সমতল প্রদেশের নাম হাঙ্গারি। খ্রীষ্টীয় দশম শতাব্দীতে এশিয়া মহাদেশ হইতে তুর্কজাতির এক সম্প্রদায় এই অঞ্চলে গিয়া বাস করে এবং দীর্ঘকাল বিবাদের পর অষ্ট্রিয়ার অধীন হয়। ইহাদের জাতীয় নাম ম্যাগেয়ার। ইহাদিগের বা জাৰ্মাণদিগের সহিত হণ নাম প্রাচীন সভ্যজাতির কোন বক্তসম্বন্ধ নাই। আজকাল সংবাদপত্রাদিতে কেহ কেহ জাৰ্মাণদিগকে তুণ বলেন বটে, কিন্তু সে অপপ্রয়ােগের জন্য স্বয়ং জাৰ্মাণসম্রাটই কয়েক বৎসর পূর্বে তিনি যখন চীনদিগকে দমন করিবার জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন তখন বলিয়া দিয়াছিলেন, তােমরা এমন কঠোর ভাবে শত্রু দমন করিবে যে লােকে যেন তােমাদিগকে হণ মনে করে। বর্তমান যুদ্ধেও জার্মাণের। অনেক বিষয়ে হণদিগের মতই নৃশংসাচরণ করিতেছেন। + সেজুইকু-হলষ্টিনের ভিতর দিয়া সুপ্রসিদ্ধ ‘কিয়েল, খাল প্রস্তুত হইয়াছে। ইহা উত্তয় সাগরকে বাল্টিক সাগরের সহিত সংযুক্ত করিয়াছে। যায়ী। ২ প্রথম অধ্যায়। ব্যতিরেকে জার্মাণের সেজুইক গ্রহণ করিতে পারেন না। কিন্তু বিম্মা ইহাতে কর্ণপাত করিলেন না এবং যুদ্ধ ঘােষণা করিয়া কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আঁয়ার সম্রাটকে এরূপ পরাস্ত করিলেন যে, তিনি জার্মাণির উত্তরখণ্ড হইতে সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত হইলেন। দূরদর্শী বিস্মক এই পর্যন্ত করিয়াই ক্ষান্ত হইলেন, অষ্ট্রিয়ার আর কোন অনিষ্ট করিলেন না, কারণ তিনি বুঝিলেন অচিরে ফ্রান্সের সহিত প্রশিয়ার যুদ্ধ ঘটিতে পারে; এরূপ অবস্থায় মর্মান্তিক যাতনা দ্বারা অষ্ট্রিয়াকে চিরশত্রু করিয়া তুলিলে প্রুশিয়ার পক্ষে অসুবিধা হইবে। ফরাসীরা তখন নবশক্তি সঞ্চয় করিয়া- ছিলেন। বিস্মার্ক জানিতে পারিলেন ফরাসী সম্রাট তৃতীয় নেপােলিয় প্রশিয়া আক্ৰমণ করিতে অভিলাষ করিয়াছেন; কিন্তু ইহাতে তিনি ভীত না হইয়া বরং আনন্দিত হইলেন এবং নানা কৌশলে নেপােলিয়কে যুদ্ধে প্রবর্তিত করিলেন, কারণ তিনি বিলক্ষণ জানিতেন যে, ফরাসী সেনা অপেক্ষা প্রুশিয়ার সেনা সমধিক বলবতী, বিশেষতঃ প্রশিয়ার রাজা অগ্রণী হইয়া ফরাসীদিগের দর্পচূর্ণ করিতে পারিলে জার্মাণিতে তাহার প্রভুত্ব অপ্রতিহত হইবে, সমগ্ৰ জাৰ্মাণজাতি তাঁহাকে অধিনেতার পদে বরণ করিবে। ফরাসীরা অদ্ভুত বীরত্ব দেখাইলেন বটে, কিন্তু সেনাপতিদিগের দোষে অচিরে পরাস্ত হইলেন। সেভানের যুদ্ধক্ষেত্রে নেপােলিয়ন আত্মসমর্পণ করিলেন, জার্মাণের ফ্রান্সের রাজধানী পারিশ অবরােধ ও অধিকার করিলেন; ফরাসীরা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণস্বরূপ তিনশত কোটি টাকা এবং আল্স ও লােরে নামক দুইটা প্রদেশ সমৰ্পণ করিয়া সে যাত্রা নিষ্কৃতি লাভ করিলেন। জাৰ্মাণ-হস্তে আস্ ও লােরেণপ্রদেশের পতন বর্তমান যুদ্ধের অন্যতম কারণ, এজন্য ইহাদের সম্বন্ধে দুই একটা কথা জানিয়া রাখা ভাল। প্রাচীন কালে এই প্রদেশ কখনও ফরাসীদিগের, কখনও জাৰ্মাণদিগের অধিকারভুক্ত ছিল। ফ্রান্সের ও জার্মানির প্রাচীন সাধারণসীমা রাইন নদী; কিন্তু মধ্যযুগে জার্মাণের আইনের পশ্চিমপারেও অধিকার বিস্তার করেন। তাহার পর সপ্তদশ শতাব্দীতে ফরাসীরা আবার উক্ত প্রদেশ দুইটা জয় করিয়া লন। তদবধি নুনাধিক দুই শত বৎসরের মধ্যে আস্ ও লােরেণের অধিবাসীরা ভাষায় ও আচার-ব্যবহারে সম্পূর্ণরূপে ফরাসীভাবাপন্ন হইয়া পড়েন ; কাজেই তৃতীয় নেপােলিয়নের পরাভবের পর জাৰ্ম্মাণি যখন এই অঞ্চলের আধিপত্য লাভ করিলেন, তখন তাহাদের মনে বড় আঘাত লাগিল। জার্মাণের প্রায় চল্লিশ বৎসর আস্ ও লােৱেণ, শাসন করিতেছেন, কিন্তু অদ্যাপি তত্ৰত্য অধিবাসীদিগের প্রীতিভাজন হইতে পারেন নাই। কিন্তু জার্মাণের সেজন্য দুঃখিত নহেন; তাহারা অতি কঠোরভাবেই এই প্রদেশ দুইটা শাসন করিয়া আসিতেছেন। ; • ;

} ফরাসীদিগের ভবের পর জার্মাণের তদানীন্তন প্রুশিয়ারাজ প্রথম উইলিয়মকে জাৰ্মাণসম্রাটের পদে অভিষিক্ত করিলেন। নিয়ম হইল যে সম্রাটের সাহায্যার্থ খরাজ্যগুলি হইতে কতিপয় প্রতিনিধি লইয়া একটী সভা গঠিত হইবে পররাষ্ট্রের সহিত সম্ব, আমদানি-রপ্তানির উপর শুল্কগ্রহণ প্রভৃতি যে সকল বিষয়ের উপর সমগ্র জাণির মঙ্গলমঙ্গল নির্ভর করে তৎসংক্রান্ত বিধি-ব্যবস্থা এই সভার পরামর্শ লইয়া মিষ্টি হইবে পন্ধিবিগ্রহের ক্ষমতা সম্রাট, স্বহস্তে রাখিবেন ; সামন্তরাজ্যগুলিতেও এক একটা স্থানীয় প্রতিনিধি-সভা থাকিবে ; শান্তিরক্ষা, শিক্ষাদানের ব্যবস্থা প্রভৃতি যে সকল বিষয়ের সহিত স্থানীয় সম্বন্ধ, সামন্তরাজদিগের ক্ষমতা কেবল সেইগুলিতেই সীমাবদ্ধ রহিবে। জার্মাণিতে সম্রাট ও সামন্তরাজদিগকে পরামর্শ দিবার জন্য প্রতিনিধি-সভা আছে বটে, কিন্তু ইংল্যাণ্ডেব পালেমেন্ট সভার যেরূপ ক্ষমতা, ইহাদের সেরূপ নাই। অষ্ট্রিয়ার ন্যায় জার্মাণিতেও শাসনসংক্রান্ত সর্ববিধ বিষয়ে রাজকর্মচারী- দিগেরই সৰ্ব্বতােমুখী ক্ষমতা; প্রজারা বা তাহাদের প্রতিনিধিগণ কোন কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিতে পারে না। সুখের বিষয় এই যে জার্মাণির কর্মচারিগণ সাধারণতঃ ন্যায়নিষ্ঠ ও কার্যক্ষম এই মিত্ত শাসনকার্য সুচারুরূপে সম্পাদিত হয়। জার্মাণির রেলওয়ে ও তাড়িত- বার্তাবহ রাজকীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। কিন্তু ইহাদের কুত্রাপি কোনরূপ বিশৃঙ্খলতা দেখা যায় না। জাৰ্ম্মাণির নগরগুলি অতি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন, প্রত্যেক নগরে বড় বড় বাগান ও যাদুঘর আছে , যেখানে যাও মনে হইবে এমন একটা দেশে আসিয়াছি যেখানে সকল লােকেই কাজ বুঝে এবং কিরূপে কাজ করিতে হয় তাহা জানে। পূৰ্বে কিন্তু জাৰ্মাণচরিত্রে এ গুণটী তত দেখা যাইত না। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদ পৰ্যন্তও অনেকেরই ধারণা ছিল, জার্মাণের কবিত্বে ও গীতবাদ্যে সুনিপুণ হইলেও বিষয়কৰ্ম্মে তত পটু নহেন, এবং রাজনীতি ও সমাজতত্বে তাহারা অন্যান্য যুবােপৰাসী অপেক্ষা অনেক অপকৃষ্ট। কিন্তু ফ্রান্সকে পরাভূত করিবার পর জার্মাণের বৈষয়িক অবস্থার উন্নতিসাধনে প্রাণপণে যত্ন করিয়াছেন। তাহারা অনেক দিন হইতেই খেলনা প্রস্তুত করিতে সিদ্ধহস্ত , সেদিন পর্যন্ত এবিষয়ে সমস্ত সভ্যজনপদেই তাহাদিগের একচেটিয়া ছিল; কিন্তু কতকগুলি নব্যশিল্পেও তাঁহাদের কারখানাগুলি পৃথিবীর মধ্যে শ্রেষ্ঠস্থান লাভ করিয়াছে। ইহাদের মধ্যে কুপ প্রভৃতির লৌহ ও ইস্পাতের কারখানা এবং আল্কাতা হইতে নানাবিধ সুং ও ঔষধ প্রস্তুত করিবার রাসায়নিক কারখানাগুলি সবিশেষ উল্লেখযােগ্য।

নার্লি নগণের দৃশ্য -তত্ৰত্য প্রধান উপাসনামন্দির।

জার্মাণি ও অস্ট্রিয়া। যে যে কারণে জার্মাণেরা এই সকল নব্যশিল্পে এত উন্নতিলাভ করিয়াছেন, সেগুলি নিয়ে বলা যাইতেছে। (১) অর্থাগমের জন্য নবনব-উপায়-নির্ধারণে জার্মাণের অদ্বিতীয়। প্রুশিয়ার ভূমি অনুর্বরা, কিন্তু এখানে বিট পালং ও গােল আলুর চাষ করা যায়। জাৰ্মাণের। তাহাই করিতেছেন, এবং বিট হইতে এত চিনি ও গােল আলু হইতে এত সুরাসার প্রস্তুত করিতে শিখিয়াছেন যে এই দুইটা দ্রব্যের জন্য তাঁহাদিগকে বিদেশের মুখাপেক্ষী হইতে হয় না, বরং তাহারাই অন্যান্য দেশে চিনি ও সুরাসার বিক্রয় করিয়া প্রচুর অর্থলাভ করেন। (২) বৈজ্ঞানিক আবিক্রিয়া দ্বারা শিল্পের উন্নতিসাধনে জাৰ্মাণদিগের ক্ষমতা। তাহাদের রসায়নবেত্তারা আকাতরার উপাদান বিশ্লেষ করিয়া তাহা হইতে নানারূপ ঔষধ ও রং প্রস্তুত করিয়াছেন এবং এই সকল রঙের সঙ্গে প্রতিযােগিতা করিতে না পারায় ভারতবর্ষজাত নীল প্রভৃতি একরূপ অন্তর্হিত হইয়াছে বলিলেই হয়। (৩) যন্ত্রাদির, বিশেষতঃ বৈদ্যুতিক যন্ত্রসমূহের উন্নতিসাধনে জাৰ্মাণের অসামান্য কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন। ৪) কিরূপে লােকজনকে কাজ শিখাইতে হয়, কিরূপে যে ব্যক্তি যে কাজের উপযুক্ত তাহাকে সেই কাজে নিযুক্ত করিয়া সকলের নিকট হইতেই সুশৃঙ্খলভাবে কাজ আদায় করিতে হয়, তাহা জাৰ্মাণেরা যেমন বুঝেন, অনেকে সেরূপ বুঝে না। এই সকল উপায়প্রয়ােগের ফলে ইদানীন্তনকালে জার্মাণের প্রায় সকল বিষয়েই প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছেন। কেবল বৈষয়িক ব্যাপারে নহে, অপর অনেক ক্ষেত্রেও অনেক জাৰ্মাণ অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়াছেন। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে রাজনীতিসম্বন্ধে জনসাধারণের কোন স্বাধীনতা ছিল না বটে, কিন্তু তাহাদের বুদ্ধিবৃত্তির যথেষ্ট স্মৃৰ্ত্তি হইয়াছিল। তখন জার্মাণির বিশ্ববিদ্যালয়- সমূহে যত পণ্ডিত অধ্যাপনায় ও গবেষণায় নিরত ছিলেন, অন্য কোন দেশে তত দেখা যায় নাই। কাব্যে গেটে, মনস্তত্ত্বে কান্ট, পুরাবৃত্তে মসে, রসায়নে লাইবি, গণিতে ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে হেলমহােলটজ, প্রভৃতি জাৰ্মাণ মনীষিগণ মানব- সমাজে চিরপূজ্য। শিক্ষাদান-পদ্ধতিতেও ফ্রোবেলের নাম সুবিখ্যাত। আমেরিকার বিদ্যালয়গুলি জাৰ্মাণ আদর্শেই গঠিত। জাৰ্মাণদিগের মধ্যে যে বৈষয়িক ও মানসিক উন্নতি যথেষ্ট হইয়াছে তাহা বেশ বুঝা গেল। এই উন্নতির সুত্রপাত হইয়াছিল ফরাসীযুদ্ধের পূর্ব হইতে; পূর্ণতা সাধিত হইয়াছে তাহার পর। কিন্তু ইহার সঙ্গে সঙ্গে আধ্যাত্মিক অবনতি দেখা দিয়াছে। জার্মাণিতে পূর্বে যেমন অনেক ধৰ্মৰীরের আবির্ভাব হইয়াছিল, এখন এখন স্যার। = আর তেমন দেখা যায় না। আজ প্রটেষ্টান্ট, সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা মার্টিন লুথারের জন্মভূমিতে খ্ৰীষ্টধর্মই অনাদৃত, লােকে ঈশ্বরচিন্তা ভুলিয়া ধনার্জনে ব্যস্ত, যীশু খ্রীকে ত্যাগ করিয়া নব নব গুরুর নব্যমন্ত্রে দীক্ষিত। ইহার প্রধান কারণ বােধ হয় প্রভূত ধনাগম, যেহেতু কাঞ্চনের ভারে আত্মার পথােগতি অপরিহার্য। জাৰ্মাণজাতির যে সকল অভিনব উপদেষ্টার কথা বলা হইল, আঁহাদের একজনের নাম নিটুসে (১৮৪৪-১৯০০)। তিনি বলেন, “যীশু খ্ৰীষ্ট একজন নীচকুলজাত ভণ্ড; তাঁহার কুহকে ভুলিয়া মানুষ অধঃপাতে যাইতেছে। জিনি মানবপ্রকৃতি বুঝিতেন না, উপদেশ দিতেন ‘ক্রীতদাসের ন্যায় সহিষ্ণু ও ক্ষমাশীল হও, তাহা হইলেই তুমি আদর্শ মানব হইবে ! কিন্তু আদর্শ মানব বলিব কাহাকে ? যে দর্পী, প্রতাপশালী ও বলবান, যাহাকে সকলে ভয় করে, যে ইচ্ছা করিলেই অন্যের যথাসর্বস্ব আত্মসাৎ করিতে পারে, সেই প্রকৃত আদর্শ মানব।” নিটসের মতে তুমি যাহা অধিকার করিতে পার তাহাই তােমার নিজস্ব, কারণ মুখে যে যাহাই বলুক না কেন, বসুন্ধরা চিরদিনই বীরভােগ্যা । নিসের মত যে নূতন তাহা নহে; কিন্তু তিনি এমন ভাবে এই বিষ উদগিরণ করিতে পারিতেন যে, জার্মাণেরা এখনও তাহা সুধামে পান করিতেছেন। করিবারই কথা, কারণ ইহার সহিত তাহাদের অন্তর্নিহিত বৃত্তিগুলির বিলক্ষ ধৰ্ম্ম আছে। ফরাসীদিগকে পরাস্ত করিয়া এবং শিল্প-বিজ্ঞান-বাণিজ্যে উন্নতির পরাকাষ্ঠা লাভ করিয়া নব্যতন্ত্র জাৰ্মাণদিগের প্রতীতি হইয়াছে যে, য়ুরােপের মধ্যে তাঁহারাই সৰ্বশ্রেষ্ঠ ; সকলকেই তাঁহাদের প্রাধান্য স্বীকার করিতে হইবে। জার্মাণির আরও অনেক প্রধান লেখক এই অদ্ভুত বিশ্বাসের সমর্থক। ইহাদের মধ্যে একজনের নাম টাইটসকে। ইনি ১৮৭৪ অফ হইতে ১৮৯৬ অব্দ পৰ্যন্ত বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরাবৃত্ত শাস্ত্রের অধ্যাপনা করিতেন। যদি ব্যক্তি- বিশেষের দোষে বর্তমান যুদ্ধের উদ্ভব হইয়াছে মনে করা যায়, তাহা হইলে টুইটসকেই তাহার জন্য প্রধানতঃ দায়ী বলিতে হইবে, কারণ তাঁহার গ্রন্থগুলি পাঠ করিলে দেখা যায়, তিনি কি অদ্ভুত যুক্তিপরম্পরা প্রয়ােগ করিয়া পূর্ব হইতেই জাৰ্মাণদিগকে এইরূপ একটী মহাযুদ্ধের উপযযাগিতা বুঝাইয়া দিয়াছেন। তবে সকল জাৰ্মাণই যে পরস্পহরণের জন্য যুদ্ধ করিতেছেন তাহা নহে। তাহাদের অনেকে ভাবিতেছেন যে তাঁহারা আত্মরক্ষার্থই অস্ত্রধারণ করিয়াছেন। আত্মরক্ষা ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে বুঝিলে সস্তবতঃ তাহারা যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইতেন না। পূর্বে যখন ফ্রান্সের সহিত যুদ্ধ ঘটিয়াছিল, তখনও তাহারা ভাবিয়া ছিলেন যুদ্ধ না করিলে আত্মরক্ষার উপায় নাই, কারণ বিস্মাৰ্ক, তাহাদিগকে বুঝাইয়া- ছিলেন যে, নেপােলিয়ন জার্মাণি আক্রমণ করিতে আসিতেছেন। এই শ্রেণীর জার্মাণি ও অস্ট্রিয়া। লােকে এখনও বুঝিয়াছেন যে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রুশিয়া তাহাদের সর্বনাশা সম্মিলিত হইয়াছে। এখন দেখা যাউক নতন্ত্র জাৰ্মাণদিগের অভিপ্রায় কি ? তাহারা ভাবেন জাৰ্মাণজাতির যেরূপ বংশবৃদ্ধি হইয়াছে তাহাতে আর কূপমণ্ডুকের ন্যায় জার্মা%ি দেশের মধ্যে আবদ্ধ থাকিলে চলিবে না; তাঁহাদের এখন হাত-পা বাড়াইবার সময় আসিয়াছে, শক্তিও জন্মিয়াছে। পৃথিবীতে যখন নানাস্থানে এত অসভ্য বা অর্ধসভ্য জাতির দেশ রহিয়াছে, তখন সুসভ্য জার্মাণেরা কেন সেগুলি আত্মসাৎ করিয়া নিজেদের সুবিধা করিয়া লইবেন না ? এই সুবিধা করিতে গেলে যদি যু ঘটে, তাহাতেই বা ক্ষতি কি? জাতীয় জীবনরক্ষার জন্য, জাতীয় শক্তির উপচয় সাধনার্থ যুদ্ধ একটা অমােঘ ঔষধ। ইহাতে মানুষকে বলবান্ করে, স্বজাতির হিতার্থ আত্মবিসৰ্জন করিতে শিক্ষা দেয়। যাহারা যুদ্ধে রক্তপাত হইবে এই আশঙ্কায় শিহরিয়া উঠে তাহারা অতি অপদার্থ। ভীক ও দুর্বল লােকেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে এইরূপ কুযুক্তি প্রয়ােগ করিয়া থাকে। যাহাদের পুরুষত্ব আছে তাহারা যুদ্ধকে শ্রীবৃদ্ধির সহায় বলিয়াই মনে করেন। বিস্মার্ক, কিন্তু এ তন্ত্রের লােক ছিলেন না। ফ্রান্সের পরাবের পরেই তিনি বিয়াছিলেন, আমার জীবনের কর্তব্য সমাপ্ত হইয়াছে। জাৰ্মাণেরা যে য়ুরোপের একটা প্রধান জাতি বলিয়া পরিগণিত হইলেন ইহাই তিনি যথেষ্ট মনে করিলেন। তিনি বুঝিতেন ফরাসীদিগের প্রতিহিংসাবৃত্তি চিরদিন সুষুপ্ত থাকিবে না; তাঁহারা সুবিধা পাইলেই অন্যান্য জাতির সহিত মিত্ৰতা স্থাপন করিবেন, কাজেই জাৰ্ম্মাণির পক্ষেও অন্যান্য জাতির সহিত সৌহার্দ রক্ষা করিয়া চল। আবশ্যক। তিনি কখনও ঔপনিবেশিক আধিপত্যলাভের জন্য লােলুপ হন নাই, কাজেই ইংল্যাণ্ডের সহিতও বিবাদ করেন নাই। ফলতঃ তাহার পরামর্শমত চলিলে জার্মাণের কখনও রাজ্যবিস্তারের চেষ্টা করিতেন না, বর্তমান যুদ্ধও ঘটিত । কিন্তু নব্যতন্ত্রগণ তাঁহাকে আর গুরু বলিয়া মানিলেন না; তিনি যে পথ ভয় করিতেন, তাহারা সেই পথেই অগ্রসর হইলেন। উন্মার্গগামী জাৰ্মাণদিগের অগ্রণী বর্তমান জাৰ্মাণ সম্রাট। সিংহাসনারােহণের পরেই তিনি বিস্মর্ককে পদচ্যুত করিয়াছিলেন এবং তদবধি নিজের ইচ্ছামত চলিয়া আসিতেছেন। অল্প কথায় তাহার চরিত্র বর্ণন করা অসম্ভব, কারণ ইহার অধিকাংশ দুঞ্জে। বিশেষত এমন বিষয়ু নাই যাহাতে তিনি লিপ্ত না আছেন। তিনি সাহসী, আত্মনির্ভরশীল ও অসাধারণ পরিশ্রমী। কিন্তু তিনি কিছু কল্পনা- প্রবণ,-স্বদেশহিতৈষণাই তাহার কল্পনার প্রধান উপাদান। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে তিনি কল্পনা নেত্রে কেবল জাৰ্মাণভাগ্যলক্ষ্মীরই অলীক চিত্র দেখিয়া প্রথম অধ্যায়। মুগ্ধ হন, অন্য কিছু দেখিতে পান না। অথচ তাঁহার এমনই মােহিনী শক্তি যে সমগ্ৰ জাৰ্মাণাতি আজ তাহার সহিত একমত। বর্তমান সম্রাটের প্রধান কীর্তি জার্মাণির রণপােতবাহিনীর গঠন। পূর্বে জার্মাণির দুই একটা বন্দর ছিল বটে, কিন্তু যুদ্ধের জাহাজ ছিল না। প্রাচীন এশিয়া রাজ্য ত সমুদ্র হইতে দূরেই অবস্থিত ছিল; শেষে হাম্বার্গ, প্রভৃতি ঘর অধিকৃত হইলেও বিক, রণপােতের দিকে মন দেন নাই। কিন্তু বর্তমান সম্রাট ভাবিলেন সামুদ্রিক বলই ইংল্যান্ডের শ্রীবৃদ্ধির কারণ এবং সামুদ্রিক বল না থাকিলে ইংল্যাণ্ডের সহিত প্রতিযােগিতা করা কঠিন, উপনিবেশ রক্ষা করাও অসম্ভব। এই সংস্কারের বশবর্তী হইয়া তিনি ১৮৯৮ সঙ্গে রণপােত- সম্বন্ধে এক আইন বিধিবদ্ধ করাইলেন। তদনুসারে রণপােতনির্মাণের জন্য রাজত্ব ইতে প্রতি বৎসর প্রচুর ব্যয়ের ব্যবস্থা হইয়াছে। যখন ইংরাজের নেট ( অকুতােভয়) নামক এক প্রকার অতি বৃহৎ রণপােত নির্মাণ আরম্ভ করিলেন, তখন সকল দেশেই তাহাদের তুল্যকক্ষ পােতগঠনের প্রয়ােজন হইল; জার্মাণের ইহাতেও পশ্চাৎপদ হইলেন না। তাঁহারা পােতগঠনে ইংল্যাণ্ডের সহিত প্রায় সমানভাবে চলিতে লাগিলেন; শিক্ষার গুণে তাহাদের নাবিকেরাও নৌযুদ্ধে নৈপুণ্য লাভ করিল। এক দেশের লােকে অন্য দেশে গিয়া বংশানুক্রমে বাস আরম্ভ করিলে শেযযক্ত দেশকে প্রথমােক্ত দেশের উপনিবেশ বলা যায়। এ অর্থে জাৰ্মাণ- দিগের কোন উপনিবেশ নাই। কিন্তু তাহাদের তথাকথিত উপনিবেশগুলি গ্ৰীষ্ম- মণ্ডলে অবস্থিত বলিয়া শিল্প ও বাণিজ্যের সুবিধা হইয়াছে, কারণ রৰার প্রভৃতি কতক গুলি দ্রব্য কেবল গ্রীষ্মমণ্ডলেই পাওয়া যায় এবং এ সকল দ্রব্য নিজের অধিকারে না জন্মিলে অন্যের মুখাপেক্ষী হইতে হয়। এই কারণে য়ুরােপের অনেক প্রধান জাতিরই ধারণা গ্রীষ্মমণ্ডলস্থ কোন না কোন প্রদেশের আধিপত্যলাভ গৌরবের ও সৌভাগ্যের বিষয়, এবং এই কারণেই নব্য জার্মাণের ‘উপনিবেশ পাইবার জন্য ব্যগ্র হইয়াছিলেন। তখন ইংরাজদিগের সহিত তাহাদের বিরােধ ছিল না, কাজেই তাহারা যখন প্রশান্তমহাসাগরস্থ সামােয়া দ্বীপ এবং আফ্রিকা- খণ্ডের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলবর্তী কোন কোন অঞ্চল অধিকার করিলেন, তখন ইংরাজেরা তাহাদিগকে বাধা দিলেন না, বরং সাহায্যই করিলেন। ক্রমে তাঁহাদের দুরাকাঙ্কা বৃদ্ধি হইল এবং তাহারা আরও দুইটা নূতন ক্ষেত্রে ইহা চরিতার্থ করিবার সুবিধা পাইলেন। প্রথম ক্ষেত্র চীন দেশ। পৃথিবীর প্রায় সকল প্রধান রাজাই অঙ্গীকার করিয়াছিলেন যে তাহারা কেহ চীনসাম্রাজ্যের কোন অংশ ধীয় অধিকারভুক্ত জার্মাণি ও অষ্ট্রিয়া। করিবেন না। কিন্তু ১৮৯৭ অব্দে চীনেরা দুইজন জাৰ্মাণ পাদরির প্রাণনাশ করিয়াছিল বলিয়া জাৰ্মাণ সম্রাট সেই প্রতিজ্ঞা ভুলিয়া গেলেন এবং ক্ষতিপূরণস্বরূপ সান্টাং প্রদেশটী একপ্রকার গ্রাস করিয়া ফেলিলেন। অতঃপর চীনেরা যখন সমস্ত বৈদেশিকের নিগ্রহ আরম্ভ করে এবং তাহাদিগকে শাস্তি দিবার নিমিত্ত নানাদেশ হইতে সৈন্য প্রেরিত হয়, তখন জাৰ্মাণ সৈন্য চীনের সঙ্গে অতি নিষ্ঠুর ব্যবহার করে। সান্টাং প্রদেশেও জাৰ্মাণে লােকের প্রতিভাজন হইতে পারেন নাই ; যেমন আসাসে, সেইরূপ এখানেও তঁাহারা অধিবাসীদিগের রীতিনীতি বা জাতীয় সংস্কারের দিকে ক্ৰক্ষেপ করিতেন না; এই প্রদেশ অধিকার করাতে জাপান যে জাতক্রোধ হইতেছে ইহাও বুঝিতে পারেন নাই, অথবা বুঝিয়া থাকিলেও জাপানকে তখন দুর্বল মনে করিয়া সেদিকে দৃকপাত করেন নাই। ফলতঃ অন্য বিষয়ে বুদ্ধির পরিচয় দিলেও ভিন্ন জাতীয় প্রজার শাসনে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে জার্মাণের পদে পদে ভুল করিয়াছেন। জাৰ্মাণদিগের দুরাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করিবার দ্বিতীয় ক্ষেত্র তুরুফসাম্রাজ্য। এই বিশাল অঞ্চল কষ্টান্টিনােপল হইতে যুফ্রেটিস নদী পর্যন্ত বিস্তৃত। য়ুরােপের পূর্বে অবস্থিত অথচ অধিক দূরবর্ত্তীনহে বলিয়া ইংরাজের। ইহাকে “আসন্ন প্রাচ্যখণ্ড” বলিয়া নির্দেশ করেন। জাৰ্মাণদিগের অভিসন্ধি ছিল বলপ্রয়ােগ না করিয়া কৌশলসহকারে তুরুফ জাৰ্ম্মাণির সামন্তরাজ্যে পরিণত করিবেন এবং জাৰ্মাণ কৰ্মচারীরা ইহার শাসনকার্য চালাইবেন। তাহারা ভাবিয়াছিলেন কেহ ইহাতে আপত্তি করিলে বলিবেন, “প্রাচীনকালে তুরুষ্কে অনেক সমৃদ্ধিশালী জনপদ ছিল; কিন্তু তুর্কদিগের কুশাসনে এক্ষণ সেই সকল অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হইয়াছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হইলে পুনৰ্ব্বার ইহাদের শ্রবৃদ্ধি হইতে পারে, এই জন্যই আমরা এই দুর্বহ ভার গ্রহণ করিয়াছি।” কেহ কেহ বলেন জার্মাণেরা দক্ষিণ আমেরিকার দিকেও সম্পৃহ দৃষ্টিপাত করিয়াছিলেন। জার্মাণির লােকসংখ্যা এত অধিক যে প্রতি বৎসর সহস্র সহস্র কাৰ্মাণ বিদেশে গিয়া স্থায়িভাবে বাস করিতেছে। জাৰ্মাণসাম্রাজ্যের পক্ষে এক হিসাবে ইহা বড়ই ক্ষতির কারণ, কেননা যাহারা বিদেশে গিয়া বাস করে, তাহারা রাজ্যান্তরের প্রজাশ্রেণীভুক্ত হয়। ইহার প্রতীকারার্থ ব্রাজিলের কিয়দংশ জার্মানির শাসনে আনিয়া সেখানে রীতিমত একটী উপনিবেশ স্থাপনের সঙ্কল্প জাৰ্মাণ মন্ত্রীদিগের পক্ষে নিতান্ত অস্বাভাবিক নহে। কিন্তু এরূপ করিলে মুনাইটেড স্টেটসের সহিত বিবাদ অবশ্যম্ভাবী। এইজন্য বােধ হয় সঙ্কল্পটা স্বপ্নাকারেই বিদ্যমান ছিল; বিশেষত ইহা কার্যে পরিণত করিবারও অবসর ছিল না, কারণ জাৰ্মাণেরা অন্য যে সকল ব্যাপারে হাত দিয়াছিলেন, সেইগুলির জন্যই নানাজাতির সহিত তাহাদের মনােমালিন্য খটিয়াছিল।

. মনােমালি সম্বন্ধে প্রথমেই ইংল্যাণ্ডের কথা তুলিতে হয়। ইংরাজের। পুরুষপরম্পরায় জার্মাশির হিতকামনা করিয়া আসিতেছিলেন। জার্মাণের। যখন আফ্রিকাখণ্ডে প্রবেশ করেন, তখন তাহারা কোন বাধা দেন নাই ; জাৰ্মাণদিগের সহিত প্রতিযােগিতায় ইংরাজ বণিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছিলেন এবং অসন্তোষ প্রকাশ করিতেছিলেন, তথাপি ইংরাজরাজপুরুষেরা বিচলিত হন নাই। কিন্তু এতাদৃশ ইংরাজকে শেষে জার্মাণেরাই স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া শক্ত করিয়া তুলিলেন। ১৮৯৯ অব্দে যখন আফ্রিকার দক্ষিণখণ্ডে বােয়ায়জাতির সহিত ইংরাজের যুদ্ধ উপস্থিত হইল, তখন জাৰ্মাণসম্রাট অযাচিতভাবে তাড়িতবার্তাবহের সাহায্যে বােয়ারদিগের প্রতি নিজের সহানুভূতি জ্ঞাপন করিলেন। যতদিন এই যুদ্ধ চলিয়াছিল, ততদিন জার্মাণির সংবাদপত্রসমূহেও ইংরাজের প্রতিকুলে অজস্র প্রবন্ধ মুদ্রিত হইত। জাৰ্মাণসম্রাট স্বয়ং এই সকল ইংরাজদ্বেষী লেখকদিগকে প্রশ্রয় দিতেন কি না বলা যায় না; কিন্তু না দিলেও বুঝিতে হইবে যে নব্যতন্ত্র জাৰ্মাণের। ক্রমে তাহার শাসনের বাহিরে গিয়া দাড়াইয়াছিলেন। নব্যতন্ত্র জাৰ্মাণদিগের মতে জার্মাণির রাজ্যবিস্তার-চেষ্টা ন্যায়সঙ্গত ; ইংল্যাণ্ডই সে পথের প্রধান কণ্টক। যখন জাৰ্মাণজাতি দুর্বল ছিল এবং জাৰ্মাণদিগের একতা জন্মে নাই, সেই সময়ে ইংরাজেরা পৃথিবীর উৎকৃষ্ট দেশগুলি আত্মসাৎ করিয়া বসিয়াছেন। জাৰ্মাণেরা যেখানে যাইতে চান সেখানেই ইংরাজ। তাহারা তুরুষ গ্রাস করিতে চান, কিন্তু তাহাতে বাধা দেন ইংরাজ ; সমুদ্রে অবাধ গতিবিধি চান, তাহাতেও বাধা দেয় ইংরাজের রণপােত। যে সকল জার্মাণের মনােভাব এইরূপ, তাঁহারা ইংরাজকে ভয় করেন, চক্ষুশূল মনে করেন বা তুচ্ছজ্ঞান করেন তাহা বলা কঠিন। তাহারা ইংরাজের প্রকৃতি সম্বন্ধেও নানারূপ ঘৃণার চিহ্ন প্রদর্শন করিয়া থাকেন। তাহাদের বিশ্বাস ইংরাজসেনা যুদ্ধে অপটু ; তাহার ইংল্যাণ্ডের ইতিহাস তন্ন তন্ন করিয়া দেখাইতে চান যে ইংরাজের। অতি স্থূলবুদ্ধি ; কেবল অদৃষ্টবলে পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্য লাভ করিয়াছেন। জাৰ্মাণসম্রাট কিন্তু মুখে অনেক সময়ে ইংরাজদিগের সম্বন্ধে প্রীতির ভাবই প্রকাশ করিতেন; তিনি যে শান্তির একান্ত পক্ষপাতী ইহা প্রতিপন্ন করিবার জন্যও তাহার ব্যগ্রতার অভাব ছিল না। হয়ত তিনি মুখে যাহা বলিতেন, মনেও তাহা বিশ্বাস করিতেন, কিন্তু শান্তি বলিলে কি বুঝায় তাহা তিনি ভাল বুঝিতেন না। জার্মাণে যাহা ইচ্ছা করিবেন, এবং অপর সকলে নীরবে তাহা সহ কৰিৰে, তাহার মতে শান্তির অর্থ এই। শেষে জাৰ্মাণেরা বুঝিতে পারিলেন তাহাদের দুর্ব্যবহারে অনেকেই অসন্তুষ্ট হইয়াছে। আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে মােরক্কো নামে একটা রাজ্য আছে। •• এ জার্মাণি ও অষ্ট্রিয়া। নামে স্বাধীন হইলেও ইহার শাসনকার্য ফরাসীদিগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত। কিন্তু জাৰ্মাণসম্রাট একদা হঠাৎ মােরক্কোতে গিয়া তত্য সুলতানকে বলিলেন, অতঃপর তথাকার শাসনসংক্রান্ত প্রধান প্রধান বিষয় একটী সমিতির বিবেচনাধীন থাকিবে এবং ঐ সমিতিতে জার্মাণির একজন প্রতিনিধি গ্রহণ করিতে হইবে। বলা বাহুল্য যে এই অসঙ্গত প্রস্তাবের উদ্দেশ্য কেবল ফ্রান্সকে অপদস্থ করা ; কারণ মােরক্কাব রাজকার্য্যে জাৰ্মাণসম্রাটের কিছুমাত্র স্বার্থ ছিল না। কিন্তু ফরাসীরা যখন ইহার প্রতিবাদ করিলেন , তখন ইরাজেরাও নীরব রহিলেন। কাজেই ১৯০৫ অব্দে স্পেনের অন্তঃপাতী আজিসিরা নগরে প্রস্তাবিত সমিতির অধিবেশন হইল। ইহার কিছুকাল পরে ফরাসীদিগকে আবার অপদস্থ করিবার অভিপ্রায়ে জাৰ্মাণসম্রাট বলিয়া বসিলেন, মােরক্কোর সম্বন্ধে ফরাসীরা যেরূপ অঙ্গীকার করিয়াছিলেন সর্বথা তাহা পালন করেন নাই, অতএব তিনি মােরক্কোর পশ্চিম প্রান্তবর্তী আগাডির নামক বন্দরটী স্বাধিকারভুক্ত করিবেন। এই সময়ে ইংরাজ- দিগের সহিত ফরাসীদিগের গাঢ়তর সখ্য জন্মিয়াছিল, তথাপি এবারও ফরাসীরা যথেষ্ট আত্মসংযম দেখাইলেন। তাঁহারা জাৰ্ম্মাণিকে বন্দরটা দিলেন না বটে, কিন্তু তৎপরিবর্তে আফ্রিকার অন্য অংশ হইতে বিস্তর ভূমি দিলেন। কিন্তু ইহাতেও জার্ম দিগের শন উঠিল না। এতকাল জার্মাণি যাহা চাহিয়াছে তাহাই পাইয়া আসিয়াছে , কাজেই তাহারা সিদ্ধান্ত করিলেন, ইংরাজেরাই এবার ফরাসীদিগের বন্ধু সাজিয়া তাহাদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করিয়াছেন। প্রুশিয়ার সহিত যুদ্ধে পরাজিত হইবার পর অষ্ট্রিয়া ৰড মাথা তুলিতে পারে নাই। অষ্ট্ৰিয়াসাম্রাজ্যের অধিবাসীরা নানাজাতীয় ; যে অংশ অষ্ট্রিয়া, তাহার অধিকাংশ লােক জাৰ্মাণ; হাজারিতে ম্যাগেরদিগের বাস এবং বােহিমিয়া প্রভৃতি কয়েকটা প্রদেশে শ্লাবজাতি। ইহাদের একের স্বার্থের সহিত অন্যের স্বার্থের মিল নাই ; কিন্তু তন্নিবন্ধন এতদিন কোন গৃহযুদ্ধ ঘটে নাই ; মােটের উপর শিল্পের ও বাণিজ্যের কল্যাণে বরং সাম্রাজ্যের শবৃদ্ধিই হইয়াছে। এড্রিয়াটিক সাগরের পূৰ্বোপকুল অস্ট্রিয়ার অধীন হইবে, ঈজিয়ান সাগরেও অস্ট্রিয়ার আধিপত্য থাকিবে অস্ট্রিয়ার রাজপুরুষের অনেক দিন হইতে এই স্বপ্ন দেখিতেছিলেন। কিন্তু মধ্যভাগে সার্বিয়া থাকিয়া এই উভয় সঙ্কল্পসিদ্ধির পক্ষেই বিষম অন্তরায় হইয়াছে। এজন্য সার্বিয়ারাজ্য অস্ট্রিয়ার চক্ষুশূল। জাম্মণেরা গােপনে গােপনে অষ্ট্রিয়াকে উৎসাহ দিতেন এবং যদি সার্বিয়াকে আত্মসাৎ করিবার জন্ধ শিরার সহিত যুদ্ধ ঘটে, তাহা হইলে অষ্ট্রিয়াকে সাহায্য করবেন বলিয়াও অঙ্গীকার করিয়াছিলেন। == ২৫ দ্বিতীয় অধ্যায়। ফ্রান্স, বেলজিয়াম্ ও ইটালি। (ক) ফ্রান্স। ফ্রান্সের প্রাচীন নাম গল দেশ এবং প্রাচীন অধিবাসীরা গজাতীয়। গলে এক সময়ে বিলক্ষণ প্রবল ছিলেন এবং খ্রষ্টের প্রায় চারশত বৎসর পূর্বে একবার ইটালি আক্ৰমণপূর্বক রােমনগর পর্যন্ত অধিকার করিয়াছিলেন। শেষে রােমকেরা যখন প্রবল হইলেন, তখন তাঁহারাই গল দেশ জয় করিলেন (খ্রঃ পূঃ ৫৮)। প্রাচীন গলেরাও প্রাচীন জাৰ্মাণদিগের ন্যায় অসভ্য ও যুদ্ধপ্রিয় ছিলেন; কিন্তু রােমের সুশাসনে তাহারা ক্ৰমে বিজেদিগেব রীতি নীতি, আচার ব্যবহাব, ভাষা ও ধৰ্ম্ম পর্যন্ত অবলম্বন করিয়াছিলেন। এই কারণে প্রাচীন সময়েই জাম্মাণদিগের সহিত গলদিগের প্রকৃতিবৈষম্য জন্মে। রােমের অবনতির সময়ে জাৰ্মাণদিগের ফ্রাঙ্ক নামক শাখা রাইন নদ পার হইয়া গলে বসতি করেন এবং তাহাদেরই নামানুসারে ইহার নাম ফ্রান্স, হয়। কিন্তু ফ্রাঙ্কেরাও ক্রমে গলদিগের সহিত মিশিয়া যান এবং তাহাদের ন্যায় সভ্য হইয়া উঠেন। এই কারণে রাইনের পূর্বপারস্থ জাৰ্মাণদিগের সহিত ফ্রাঙ্কদিগের সম্বন্ধ বিলুপ্ত হয়, এবং খ্ৰীষ্টীয় ৮৪৬ অব্দে ফরাসীরা জাৰ্ম্মাণজাতির অধীনতাপাশ হইতে সর্বতােভাবে মুক্তিলাভ করেন। যুবরাপের অন্যান্য দেশের ন্যায় ফ্রান্সেও সৈনিকভূম্যধিকার-প্রথা প্রবর্তিত হইয়াছিল এবং এই প্রথার আনুষঙ্গিক বিবাদবিসংবাদ ও অশান্তি দেখা দিয়াছিল। বার্গাণ্ডির ‘ডিউক’ উপাধিধারী ভূম্যধিকারীর সহিত স্বয়ং ফ্রান্সরাজেরই দীর্ঘকাল কলহ চলিয়াছিল এবং ইংরাজেরা কখনও স্বতন্ত্রভাবে, কখনও বার্গাণ্ডিপতির সহিত যােগ দিয়া ফ্রান্স, জয় করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। ইংরাজসেনার বীরত্বে ফরাসীরা অনেকবার পরাস্ত হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু পরিণামে ফরাসীদেরই জয় হইয়াছিল ইংরাজের শতবর্ষব্যাপী চেষ্টার পর ফ্রান্সের আশা ত্যাগ করিয়াছিলেন। ইংরাজের প্রস্থান করিলে ফ্রান্সে আর তত অশান্তি রহিল না ; রাজার কৌশলে ভূম্যধিকারীরা তাহার একান্ত অনুগত হইয়া চলিতে লাগিলেন, রাজকীয় ক্ষমত। উত্তরােত্তর বর্ধিত হইতে লাগিল এবং শিল্পসাহিত্যাদি নানা বিষয়ে ফরাদীজাতির বিলক্ষণ উন্নতি দেখা দিল। সুবিখ্যাত চতুর্দশ লুইএর রাজত্বকাল • ফ্রান্স। (১৩৩৮-১৭১০) ফরাসী ইতিহাসে সবিশেষ গৌরবের সময়। তৎকালে য়ুরােপের অন্য কোন দেশই সভ্যতায় ফ্রান্সের তুল্যকক্ষ ছিল না। চতুর্দশ লুই যদি শান্তিপ্রিয় হইতেন, তাহা হইলে ফরাসীরা বোধ হয় আরও উন্নতি লাভ করিতে পারিতেন। কিন্তু তাহার গোঁড়ামি ও দুরাকাঙ্ক্ষাবশতঃ ফ্রান্সের অনেক অনিষ্ট ঘটিয়াছিল। তিনি নিজে ঝােমাণ কাথলিক ছিলেন, এই নিমিত্ত সংস্কারক সম্প্রদায়কে (প্রটেষ্টান্টদিগকে) রাজ্য হইতে নির্বাসিত করেন। সংস্কারক- দিগের অনেকেই উদ্যোগী, বুদ্ধিমান, কৃতকর্মা ও শিল্পকুশল পুরুষ ছিলেন ; কাজেই তাহারা বিতাড়িত হইলে ফরাসীজাতির শক্তিক্ষয় হইল, পরন্তু তাহাদের অনেকে ইংল্যাণ্ডে গিয়া বাস করিলেন বলিয়া ইংরাজেরাই লাভবান হইলেন। দ্বিতীয়ত: লুইএর রাজ্যবিস্তার-চেষ্টায় ফ্রান্সকে দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকিতে হইয়াছিল। প্রথম কিছুদিন লুই জয়ী হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু ইংরাজেরা যখন তাহার বিরােধী হইলেন, তখন তাহার পরাজয় আরম্ভ হইল (১৭৪-১৭১৩)। ইংরাজের সহিত বিবাদের কারণ এই যে লুই হল্যাণ্ড আক্রমণ করিয়াছিলেন এবং ওলন্দাজবংশীয় তৃতীয় উইলিয়ম্ তখন ইংল্যাণ্ডের রাজা ছিলেন। অতঃপর মধ্যে মধ্যে ক্ষণস্থায়ী সন্ধি হইলেও ফ্রান্সের সহিত ইংল্যাণ্ডের আরও প্রায় পঞ্চাশ বৎসর যুদ্ধ চলে এবং তাহ অবসানে ফরাসীরা আমেরিকা ও ভারতবর্ষ হইতে বিতাড়িত হন। এই সকল কারণে ফ্রান্সের বিস্তর লােকক্ষয়, অর্থব্যয় ও রাজ্যনাশ হয়। ইহার উপর আবার শাসন প্রণালীর অনেক দোষ ছিল । রাজা অমিতব্যয়ী, যাজক ও ভূস্বামীরা উচ্ছজ্বল এবং প্রজাপীড়নে রাজারই পৃষ্ঠপােষক ছিলেন। করভার ক্রমেই বৃদ্ধি হইত, অত্যাচারের মাত্রাও বাড়িয়া যাইত। শেষে যখন আর সহিতে পারিল না, তখন জনসাধারণে বিদ্রোহী হইল, রাজা ও রাণীকে বন্দী করিল, রাজপদ উঠাইয়া দিল, সাধারণতন্ত্র প্রবর্তিত করিল, রাজার ও রাণীর শিরচ্ছেদ করিল। ইহারই নাম প্রথম ফরাসী রাষ্ট্রবিপ্লব। বিপ্লবকারীদিগের মূলমন্ত্র ছিল দুই টী :-(১) শাসনকর্তাদিগের স্বেচ্ছাচারী হইবার অধিকার নাই ; দেশের বিধি ব্যবস্থা, আইন কানুন জনসাধারণের মত ইয়া স্থির করিতে হয়। ফলতঃ কাহার হস্তে শাসনের ভার থাকিবে এবং কি প্রণালীতে শাসন চলিবে ইহা নির্দেশ করিবার ক্ষমতা ব্যক্তিবিশেষের বা সম্প্রদায়- বিশেষের ভােগ্য নহে; এই সত্ত্বন্ধে সৰ্বসাধারণেই তুল্যাধিকারী। (২) প্রত্যেক জাতির শাসনক্ষমতা সেই জাতিরই হস্তে থাকিবে, অন্যজাতীয় লােকে তাহা পরিচালন করিতে পারিবে না। একটু বিবেচনা করিয়া দেখিলি বুঝা যাইবে দ্বিতীয় মন্ত্রটা প্রথম মন্ত্রেরই শাখাস্বরূপ, কারণ কোন জাতিই আপনাদের শাসনকর্তা নির্বাচন করিবার সময় ভিন্নজাতীয় লােককে ঐ পদে বরণ করে না। ;

দ্বিতীয় অধ্যায়। ; সকলেই যদি দ্বিতীয় মন্ত্রটী গ্রহণ করে তাহা হইলে পৃথিবী বড় সুখের স্থান হয়, কারণ এক জাতি অন্য জাতির উপর আধিপত্য করিতে গেলেই যুদ্ধ ঘটে, নচেৎ শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা থাকে না বলিলেই হয়। দুঃখের বিষয় ফ্রান্সের বিপ্লববাদীরাও এই মতানুসারে চলেন নাই। যখন সুবিধা পাইয়াছিলেন, তখন তাহাদেরও কেহ কেহ অন্য জাতিকে পদদলিত করিতে কুণ্ঠিত হন নাই। ফরাসীরা যখন রাজাকে বন্দী করিলেন, তখন য়ুরােপের অন্যান্য রাজা ভীত হইয়া ফরাসীরাজের সাহায্যার্থ অস্ত্রধারণ করিলেন। ফরাসীরাও পশ্চাৎপদ হইলেন ; তাহাদের সেনাপতি নেপােলিয় অদ্ভুত রণপাণ্ডিত্য দেখাইয়া শত্রুপক্ষকে পদে পদে পরাস্ত করিতে লাগিলেন। কিন্তু ভাগ্যচক্রের এমনই বিচিত্ৰগতি! এই জয়লাভই ফরাসীজাতির অমঙ্গলের কারণ হইল তাহারা রাজতন্ত্রশাসনের বিরুদ্ধে অত্যুত্থান করিয়াছিলেন ; শেষে আবার সেই প্রথারই দাস হইলেন, কারণ নেপােলিয় সাধারণতন্ত্র উঠাইয়া দিয়া নিজেই তাহাদের সম্রাট হইলেন। ইংরাজেরা দেখিলেন নেপােলিয়কে বাধা না দিলে তিনি সমস্ত যুরােপ গ্রাস করিয়া ফেলিবেন, ফরাসীদিগের উচ্ছঙ্খলতা আরও বৃদ্ধি হইবে। কাজেই তাহারা নেপােলিয়নের সহিত যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন ফরাসীদিগের তুলনায় সংখ্যায় অল্প হইলেও ইংরাজেরা জয়লাভ করিতে লাগিলেন। সমুদ্রে একাধিপত ছিল বলিয়া তাহারা ফ্রান্সের বাণিজ্য বন্ধ করিলেন; তাঁহাদের সাহসী সৈন্যগণ ওয়েলিংটন-প্রমুখ সেনানীগণের প্রতিভাবলে ফরাসীদিগকে স্পেন্ দেশ হইতে বিদূরিত করিল; তাঁহাদের ও জাৰ্মাণদিগের সম্মিলিত চেষ্টায় ওয়াটালুর যুদ্ধক্ষেত্রে নেপােলিয়নের সর্বনাশ হইল (১৮১৫)। অতঃপর শতবর্ষকাল ফ্রান্সের সহিত ইংল্যাণ্ডের কোন মুদ্ধ হয় নাই। কিন্তু এই দীর্ঘসময়ে কখনও যে কোনরূপ মনােমালিন্য দেখা দেয় নাই ইহা বলা যায় না। ফরাসীরা বহুকাল হইতে ভূমধ্যসাগরে আপনাদের অখণ্ড আধিপত্যস্থাপনে প্রয়াসী। জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধে পরাভূত হইবার পর তাঁহারা যখন আবার বলসঞ্চয় করিলেন, তখন তাহারা ভূমধ্যসাগরের দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূলস্থ জনপদসমূহের আধিপত্য- লাতে প্রবৃত্ত হইলেন। আলজিরিয়া ত পূৰ্ব্ব হইতেই তাহাদের অধিকারভুক্ত ছিল। এখন তুরুস্কের সুলতান তাহাদের বন্ধু হইলেন ; তাহারা মিশর ও সিরিয়া প্রভৃতি স্থানেও প্রতিষ্ঠালাভ করিলেন। কাজেই ইংরাজেরা আত্মরক্ষাৰ্থ তাহাদিগকে বাধা দিতে অগ্রসর হইলেন। ফরাসীরা ১৮৬৯ অব্দে ইংরাজদিগের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সুয়েজ খাল খনন করিয়াছিলেন। অতঃপর তাহারা যদি মিশরেও আধিপত্য লাভ করিতে পারিতেন, তাহা হইলে ঐ খাল দিয়া ইংরাজদিগের যাতায়াত কঠিন হইত। কাজেই ইংরাজের ইহার প্রতিক্রিয়ার জন্য, যেমন সুযােগ পাইলেন অমনি মিশর দেশটী • } বেলজিয়া। করায়ত্ত করিলেন। ইহাতে ফরাসীরা এত ক্রুদ্ধ হইলেন যে, অনেকে আশঙ্কা করিলেন উভয়জাতির মধ্যে যুদ্ধ ঘটিবে। কিন্তু সৌভাগ্যবশতঃ জার্মাণির অবিমৃশ্য- কারিতায় ইংরাজের সহিত ফরাসীর যুদ্ধ হইল না ; উভয়জাতিই বুঝিতে পারিলেন যে, জাৰ্ম্মাণি তাহাদের সাধারণ শত্রু; অতএব জাৰ্ম্মাণিকে দমন করিবার জন্য উভয় জাতিরই সখ্যসূত্রে আবদ্ধ হওয়া উচিত। আসা ও লােরেণ, হস্তভ্রষ্ট হওয়াতে ফ্রান্সের হৃদয়ে যে দারুণ ব্যথা জন্মিয়াছিল, কখনও তাহার উপশম হয় নাই। শেষে জাৰ্মাণদিগের ষড়যন্ত্রে তুরুস্করাজ্যেও ফরাসীদিগের প্রতিপত্তি খর্ব হইতে লাগিল। ফরাসীরা দেখিতে পাইলেন, সিরিয়া প্রভৃতি অঞ্চলে আধিপত্যবিস্তার-সম্বন্ধে জার্মাণেরাই তাহাদের প্রধান পরিপন্থী। জাৰ্মাণের ইংরাজদিগকেও বিষদৃষ্টিতে দেখিতেন এবং ইংরাজের বিপদে হর্ষ প্রকাশ করিতেন। ইংল্যাণ্ডের সহিত জাৰ্ম্মাণির যে কিছু মৌখিক সম্ভাব ছিল, মহারাণী বিক্টোরিয়ার মৃত্যুর পর তাহাও বিলুপ্ত হইল। সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড ফরাসীদিগের গুণগ্রাহী ও পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁহার চেষ্টায় ইংরাজ ও ফরাসী পূর্বতন বৈরভাব ভুলিয়া গেলেন এবং সখ্যসূত্রে বন্ধ হইলেন। ইংরাজের মিশর ত্যাগ করিলেন না বটে, কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে ফরাসীদিগের এমন সুবিধা করি দিলেন যে, তাহারা মিশর-সম্বন্ধে আর কোন কথা তুলিলেন না (১৯০৪)। এই সময়ে উভয়জাতির মধ্যে যে অঙ্গীকারপত্র লিপিবদ্ধ হয়, এপর্যন্ত জনসাধারণে তাহা দেখিতে পায় নাই ; তবে এমন কোন ব্যবস্থা নিশ্চিত হইয়াছিল, যে জাৰ্ম্মাণির সহিত বিবাদ উপস্থিত হইলে একে অপরের সাহায্য করিবেন। এইরূপ কোন অঙ্গীকারবলেই তদবধি ফরাসীরণপোতসমূহ ভূমধ্যসাগরে এবং ইংরাজরণপােতসমূহ উত্তরসাগরে সমবেত হইয়া তত্তৎ অঞ্চলে উভয় জাতিরই স্বার্থরক্ষা করিতেছে। (খ) বেলজিয়া। বেলজিয়ামের অধিবাসীরা পূৰ্ব্বতন গদিগের একটা শাখা । গলদিগের ন্যায় ইহারাও প্রথমে রােমাণদিগের এবং পরে সার্লামেনের সাম্রাজ্যভুক্ত হইয়াছিলেন। সালামেনের সাম্রাজ্য বিনষ্ট হইল, কিন্তু বেলজিয়াম ফ্রান্সের সহিত সংযুক্ত রহিল , জাৰ্ম্মাণির অংশরূপে পরিণত হইল এবং সেই সূত্রে কালে অষ্ট্রিয়ার অধিকারে গেল। শেষে নেপােলিয় ইহা জয় করিয়া ফ্রান্সের অধীন করিলেন। নেপােলিয়নের পতন হইলে য়ুরােপীয় রাজারা জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে একটা প্রবল রাজ্য স্থাপনের অভিপ্রায়ে বেজিয়াকে হল্যাণ্ডের সহিত যুক্ত করিয়া দিলেন; কিন্তু ওলন্দাজদিগের সহিত বেজিয়ামের লােকের ভাষাগত এত পার্থক্য, দ্বিতীয় অধ্যায়। এবং ধর্ম ও স্বার্থসম্বন্ধে এত বৈষম্য ছিল যে, উভয়ের পক্ষে পরস্পর সম্মিলিত থাক। অসম্ভব হইল; কাজেই ১৮৩০ অব্দে বেলজিয়াম স্বাধীনতা অবলম্বন করিল। ঝুলােপের সকল রাজাই ইহা অনুমােদন করিলেন এবং ১৮৩৯ অব্দে স্থির হইল যে তদবধি বেলজিয়াম্ একটা উদাসীন রাজ্য বলিয়া পরিগণিত হইবে, অর্থাৎ অন্যান্য রাজাদিগের মধ্যে যুদ্ধ উপস্থিত হইলেও বেলজিয়াম্-বাসীরা কোন পক্ষ অবলম্বন করিতে পারিবেন না। এ ব্যবস্থা যে কেবল বেলজিয়ামের হিতার্থেই হইয়াছিল তাহা নহে; সকলে ভাবিয়াছিলেন যে ইহাদ্বারা ফ্রান্স, ইংল্যাও ও জার্মাণিরও মঙ্গল হইবে, কারণ বেলজিয়ামের অধিকার লইয়া ফরাসী ও জাৰ্মাণজাতি বহুকাল বিবাদ করিয়া আসিতেছিলেন, কিন্তু উভয়ই যদি বেলজিয়ামকে উদাসীন রাজ্য বলিয়া গ্রহণ করা হয় তাহা হইলে এতদুপলক্ষে য়ুরােপে অতঃপর আর যুদ্ধের সম্ভাবনা থাকিবে না। বেলজিয়ামের সহিত তখন ইংল্যাণ্ডের ইষ্টানিষ্টের কোন ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ ছিল না বটে, কিন্তু এখন দেখা যাইতেছে এই রাজ্যে জার্মাণির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হইলে ইংরাজদিগেরও ক্ষতির আশঙ্কা, কারণ ইহার উপকূলভাগ হইতে ইংল্যাণ্ডের দূরত্ব এত অল্প যে জার্মাণেরা সেখান হইতে ইচ্ছা করিলেই ইংল্যাণ্ড, আক্রমণ করিতে পারেন। বর্তমান যুদ্ধের পূর্বে দেশের আয়তনের তুলনায় বেলজিয়ামে যত লে বাস করিত, পৃথিবীর অন্য কোন দেশে সেরূপ দেখা যায় নাই। এখান কার শত শত কারখানা হইতে প্রচুর পরিমাণে পশমী কাপড়, লােহার কড়ি, বরগা ও কাচ প্রভৃতি বিদেশে রপ্তানি হইত; এখানকার ঈপ প্রভৃতি নগরের হৰ্ম গুলি প্রাচীন স্থাপত্য- বিদ্যার উৎকৃষ্ট নিদর্শন বলিয়া পরিগণিত হইত। কিন্তু জাৰ্মাণদিগের অত্যাচারে বেলজিয়ামের আর সে শ্ৰী নাই ; হৰ্মগুলি এখন প্রায় ধূলিসাৎ হইয়াছে। ইহাদের দুই একটী পুনর্নির্মিত হইতে পারে বটে; কিন্তু বহুপুৰুষ-পরম্পরায় চেষ্টা না করিলে, যাহা নষ্ট হইয়াছে, তাহার সমস্ত ফিরিয়া পাওয়া যাইবে না। (গ) ইটালি। পূৰ্বে বলা হইয়াছে, জাৰ্মাণদিগের সহিত অন্য কোন দেশের লােকের সংমিশ্রণ হয় নাই ; কিন্তু ইটালিতে তাহার বিপরীত ঘটিয়াছে, কারণ ইটালির বর্তমান অধিবাসীরা বহুজাতির সম্মেলনসম্ভ,ত। প্রাগৈতিহাসিক সময়ে ইটালির টাকা- জাতি সভ্যতার উচ্চসােপানে অধিরােহণ করিয়াছিল ; ইতিহাসবর্ণিত কালের প্রারম্ভে দেখিতে পাওয়া যায় ইহার উত্তরভাগে গ, মধ্যভাগে লাটিন এবং দক্ষিণভাগে গ্রীকেরা বাস করিতেছিলেন। এই জাতিত্রয়ের সংমিশ্রণেই ভুবনবিখ্যাত রােমকজাতির উৎপত্তি (৭৫৩ খ্রীঃ পূঃ) ও পরিপুষ্টি।

ইটালি। রোমকদিগের ন্যায় কৃতকর্মা লােক পৃথিবীতে প্রায় দেখা যায় নাই। যাহাতে স্বজাতির এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ হয় তাহা নােমকেরা যেমন বুঝিতেন ও করিতেন, তৎকালে অন্য কোন জাতিই সেরূপ পারিত না। তাহারা কৃষি ও বাণিজ্য অমৰ্য্যাদাকর মনে করিতেন না, তঁ হারা প্রজার স্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে দৃষ্টি রাখিতেন। দ্বিসহস্রবর্ষ পূর্বে তাহাবা যে সকল রাজব, পয়ঃপণালী ও সেতু নির্মাণ কবিয়াছিলেন, তাহাদের অনেক গুলি অদ্যাপি অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান আছে। অতি প্রাচীন সময়েই তাহারা ব্যবহাবশাস্ত্রের অনুশীলন প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন এবং একমনে ইহার পূঙ্গিত-সাধনে প্রয়াসী ছিনে। অপিচ তাহারা এমনই তেজস্বী ও অকুতােভয় ছিলেন যে, সহস্রাধিক বর্ষকাল (খ্রীঃ পূঃ ৭৫৩খ্রঃ ৪০ • প্রায় কোন যুদ্ধেই জয়লাভ না করিয়া নিরস্থ হন নাই। তাহাদের শত্রুর অভাব ছিল না, কিন্তু একে একে সকলেই পরাজয় মানিয়া তাঁহাদের প্রজা- শ্রেণীভুক্ত হইয়াছিল। উত্তবে রাইন ও ডানিয়ুব নদী হইতে দক্ষিণে সাহারা মরুভূশি, পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগব হইতে পূঝে যুফ্রেটিস নদী এই বিশাল ভূখও এক সময়ে রােমের প্রভুত্ব স্বীকার করিত, ইহার সর্বত্রই রােমের সভ্যতা বিবাজ করিত, রােমের বিধিব্যবস্থা ? চণিত ছিল, এবং ইহার পশ্চিমখণ্ডে রােমের ভাষা পয্যন্ত ব্যবহৃত হইত। বর্তমান স্পেন, ফ্রান্স ও ইটালির ভাষা লাটিন ভাষারই রূপান্তর। রােমক সাম্রাজ্যের প্রাচ্যখণ্ডের ভাষা ছিল একি। এই খণ্ড শেষে প্রতীচ্যখণ্ড হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া স্বতন্ত্র সাজ্যে পরিণত হয় (খ্রীঃ • ৩০)। অত:পর জাৰ্মাণ- দিগের অবিরাম আক্রমণে প্রতীচ্যখণ্ডের পতন ঘটে এবং বহু দিনের জন্য এ অঞ্চল হইতে সভ্যতাব অন্তদ্ধনি হয়। এই দীর্ঘকা। তামস বুগ বলিয়া বর্ণিত হইতে পারে। এই যুগে ইটালিতে সাধারণতঃ জাৰ্মাণ দগেই আধিপত্য ছিল। অতঃপর বাণিজ্যের কল্যাণে জেনােয়া, বিনিস প্রভৃতি দুই একটা নগ«েব অভু দয় হয়। ইহারা স্বস্ব প্রধান ছিল এবং মধ: সাগবের চতুষ্প শ্ব ন'নাহানে দুর্গ ও বাণিজাগার স্থাপন করিয়া বিলক্ষণ অর্থোপান কবি ৩। হতাদের মধ্যে বিনিস এতই পরাক্রান্ত হইয়া ছিল যে, অস্ট্রিয়াপতি পুনঃপুনঃ চেষ্টা কবিয়াও হহাকে ওয় করিতে পাবেন নাই। ফলতঃ বিনিম্বাসার' ১৭৯৭ খ্রীঃ অব্দ পর্য ও একাদিক্রমে স্বাধীনতা ভােগ করিয়া ছিল। কিন্তু ঐ বৎর ফরাসী বার নেপোলিয়নের আক্রমণে বিনিসের পতন হয়। ইটালির জনপদসমূহ যে পুনব্বার একতাবদ্ধ ও স্বাধীন হইতে পারে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত কাহারও মনে এ আশার সঞ্চার হয় নাই। কিন্তু প্রথম ফরাসীরাষ্ট্রবিপ্লবের মাহাত্মে লােকে যখন জাতিগত স্বতন্ত্র শাসনের মর্ম বুঝিতে পারিল, তখন ইটালির অধিবাসীদিগেরও এদিকে দৃষ্টি পড়িল। তবে প্রথমে দ্বিতীয় অধ্যায়। ; তাহাদের উদ্দেশ্যসিদ্ধির অনেক অন্তরায় ছিল। অষ্ট্রিয়ার তথন দোর্দণ্ড প্রতাপ ; পক্ষান্তরে ইটালিতে তখনও কোন সুযােগ্য অধিনেতার আবির্ভাব হয় নাই। কিন্তু কালে অধিনেতা দেখা দিলেন ; পাইড় মন্টের রাজা বিক্টর ইমানুয়েল নেতৃত্ব গ্রহণ করিলে ইটালিবাসীদিগের ভাগ্য ফিরিল। তথাপি কেবল নিজের চেষ্টায় ইটালি কখনও অস্ট্রিয়ার গ্রাস হইতে মুক্তি লাভ করিতে পারিত কি না সন্দেহ। সৌভাগ্যের বিষয় এই সময়ে ফুন্সি, তাহার সাহায্য করিতে লাগিল ; ফান্সের ও ইটালির সম্মিলিত সেনা অস্ট্রিয়াবাসীদিগকে দুর করিয়া দিল এবং ইটালি স্বাধীনরাজ্যে। পরিণত হইল (১৮৫৯)। ইটালি স্বাধীন হইল বটে, কিন্তু জনসাধারণের দারিদ্র্যনিবন্ধন প্রবল হইতে পারিল না। য়ুরােপের অন্যান্য জাতিও ইটালির প্রকৃত বন্ধু কি না বুঝা গেল । ফরাসীরা সহায় হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু তাহার বিনিময়ে পশ্চিমপ্রান্ত হইতে একটা জনপদ ও আত্মসাৎ করিয়াছিলেন। এইজন্য ও অন্যান্য কারণে ফরাসীদিগের নিকট কৃতজ্ঞ হওয়া দূরে থাকুক, আফ্রিকার উত্তরখণ্ডে ফরাসীপ্রাধান্যের প্রসর দেখিয়া ইটালিবাসীরা বরং ঈর্ষান্বিত হইয়াছিলেন। অষ্ট্রিয়ার সম্বন্ধেও তঁাহারা পূর্বতন বৈরভাব ভুলিতে পারেন নাই। টিয়েষ্ট, এখনও অষ্ট্রিয়ার অধিকারভুক্ত, অথচ এখানকার অধিবাসীরা ইটালিয়ান্, তাহাদের ভাষাও ইটালিয়ান্। এই নমিত্ত ইটালির লােকে টিয়েষ্টকে “অপরিমুক্ত ইটালি’ আখ্যা দিয়া থাকেন। বিস্ময়ের বিষয় এই যে অস্ট্রিয়ার সহিত শত্রুতার যথেষ্ট কারণ থাকিলেও ফরাসী-বিজিগীষার ভয়ে ইটালিবাসীর। কতিপয় বৎসর হইল আত্মরক্ষার জন্য জার্মাণি ও অষ্ট্রিয়ার সঙ্গেই সখ্য স্থাপন করিয়াছিলেন। ইহাই ভূতপূর্ব বলয়- সম্মেলন। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ উপস্থিত হইলে রাজনীতিক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন ঘটিল ; ইটালি দেখিল আলবানিয়াতে জাৰ্মাণবংশীয় রাজা; জার্মাণি জয়ী হইলে এড্রিয়াটিক উপসাগরের উপকূলভাগে জাৰ্মাণজাতিরই একাধিপত্য জন্মিবে এবং টিয়েষ্ট, পুনরুদ্ধার করিবার আশা চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হইবে। কাজেই, অর্থবল না থাকিলেও জনসাধারণে জাৰ্মাণদিগের বিরুদ্ধপক্ষে যােগ দিবার জন্য ব্যগ্র হইল। অষ্ট্রিয়াপতি ইটালির অনেক সুবিধা করিয়া দিতে চাহিলেন; কিন্তু ইটালির লােকে তাহার কথা বিশ্বাস করিলেন না; তাহারা অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন। Italia Irredenta, তৃতীয় অধ্যায়। য়ুরােপের পূখণ্ড। (ক) রুশিয়া। রুশিয়া, পােল্যাণ্ড, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া এবং বােহিমিয়া প্রভৃতি কতকগুলি দেশে যে সকল ভাষা ব্যবহৃত হয়, তাহাদের সাধারণ নাম “শ্লাব নিক” বা “শ্লাব-জাতীয়, কারণ এই সকল স্থানের অধিবাসীরা প্রধানতঃ “শ্লাব” নামক জাতির ভিন্ন ভিন্ন শাখা। ফরাসী, ইংরাজী ফরাসী, ইংরাজী প্রভৃতি ভাষার ন্যায় শ্রাবনিক ভাষাগুলি ও প্রাচীন আর্যভাষার রূপান্তর ; কিন্তু যাহারা এই সকল ভাষা ব্যবহার করে তাহারা সকলেই আৰ্যজাতীয় নহে। আচারব্যবহারে, রীতিনীতিতে তাহারা যুরােপের অন্যান্য জাতি হইতে কোন কোন অংশে স্বতন্ত্র ; তাহাদের পরস্পরের মধ্যেও বিলক্ষণ পার্থক্য দেখা যায়। প্রাচীন কালে শ্লাবদিগের সহিত পার্শ্ববর্তী জাৰ্ম্মাণ প্রভৃতি জাতির প্রায় সৰ্ব্বদাই বিবাদ চলিত এবং তাহাতে শ্লাবের প্রায় সর্বদাই পরাস্ত হইত। ভাষাতত্ববিৎ পণ্ডিতেরা মনে করেন যে এই কারণেই শেষে ‘শ্লাব' নামটা পৰ্যন্ত ঈষৎ পরিবর্তিত আকারে যুবরাপের পশ্চিমখণ্ডে ‘বন্দী’ বা ‘দাস’ অর্থে ব্যবহৃত হইতেছে। সে যাহাই হউক, এখনও পােল্যাণ্ডের ও বােহিমিয়ার শ্লাবের। পরাধীন ; সার্বিয়া, বুলগেরিয়া প্রভৃতি দেশের শ্লাবেরাও সেদিনমাত্র স্বাধীনতা লাভ করিয়াছে। স্বাধীন শ্লাদিগের মধ্যে রুশেরা সর্ব প্রধান। প্রজার সংখ্যায় ও রাজ্যের আয়তনে এক ইংরাজ ভিন্ন যুবােপখণ্ডের অন্য কোন জাতিই ইহাদের তুল্যক নহেন। কিন্তু কুশিয়ার প্রাচীন ইতিহাস অপরিজ্ঞাত। কেহ কেহ বলেন, গ্রীক ও রােমকদিগের গ্রন্থে কৃষ্ণসাগরের পূর্বপারবাসী যে শক’ জাতীয় লােকের উল্লেখ দেখা যায়, বর্তমান রুশেরা তাহাদেরই বংশধর। সে যাহাই হউক, খ্ৰীষ্টীয় দশম শতাব্দী পর্যন্ত যুরােপের ইতিবৃত্তে রুশজাতির কোন পরিচয় পাওয়া যায় না। অতঃপর নৰ্মাণ জাতি যখন রুশিয়ার কিয়দংশ জয় করিয়া সেখানে রাজ্য স্থাপন করে, সেই সময় হইতেই রুশেরা উন্নতির পথে অগ্রসর হয়। এই নৰ্মাণদিগের সম্বন্ধে দুই একটা কথা জানিয়া রাখা ভাল। ইহার পূৰ্ব্বে ডেন্মার্ক, ও স্কালিনেভিয়া উপদ্বীপে বাস করিতেন এবং সেখান হইতে বহির্গত হইয়া নানাদেশে উপদ্রব করিতেন। উত্তরদেশীয় বলিয়া ইহারা নর্থম্যান্ বা নৰ্মাণ নামে • তৃতীয় অধ্যায়। অভিহিত হইতেন। কালক্রমে ইহারা খ্ৰীষ্টধর্মে দীক্ষিত হন, বলবীর্যে ও সভ্যতায় য়ুরােপখণ্ডে শ্রেষ্ঠ পদ লাভ করেন এবং ফ্রান্স, ইংল্যাণ্ড, প্রভৃতি দেশে রীতিমত রাজ্য স্থাপন করিয়া বাস করিতে থাকেন। নৰ্ম্মাণ বিজয়ীরা রুশিয়াতেও বাস করিতে লাগিলেন ও খ্ৰীষ্টান হইলেন। য়ুরােপের পাশ্চাত্য খ্ৰীষ্টানদিগের প্রধান ধৰ্ম্ম গুরু ছিলেন রােমের পােপ; রুশিয়ার ধৰ্ম্ম গুক হইলেন তদানীন্তন কষ্টান্টিনােপলনগরের ‘পেটি মার্ক বা গােষ্ঠীপতি। খ্ৰীষ্টধর্মের মাহাত্মে রুশদগের হৃদয়ে দয়া দাক্ষিণ্য প্রভৃতি কোমল বৃত্তিসমূহের বিকাশ হইল ; সাংসারিক অবস্থাও ফিরিল, কৃষির উন্নতি ঘটিল এবং স্থানে স্থানে নগর প্রতিষ্ঠিত হইল। নগরগুলির মধ্যে কিয়েফ, শীর্ষস্থান অধিকার করিল। দুর্ভাগ্যক্রমে ইহার ন্যূনাধিক দুইশত বর্ষ পরে এশিয়াখণ্ডের মঙ্গোলীয় জাতি রুশিয়ায় প্রবেশ করিয়া ভয়ানক উপদ্রব করিতে লাগিল। ইহাদের অত্যাচার কেবল রুশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না ; অন্যান্য শ্লাব রাজ্যও ইহাতে বিব্রত হইয়া পড়িয়াছিল। মঙ্গোলীয়দিগের উপদ্রব প্রায় দুইশত বৎসর চলিয়াছিল এবং তন্নিবন্ধন শ্লাবের নিতান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিল। অবশেষে প্রথমে পােল্যাণ্ডের, পরে মঙ্কো প্রদেশের অধিবাসীরা মঙ্গোলীয়দিগের আধিপত্য হইতে নিস্কৃতি লাভ করে। রুশিয়ার প্রথম প্রসিদ্ধ রাজা এভান্ দা টেরিবল অর্থাৎ কৃতান্ত কল্প’ এভান্। ইংল্যাণ্ডের রাণী এলিজাবেথ, জাৰ্ম্মাণ সম্রাট পঞ্চম চার্লস্, তুরস্কের সুলতান সুলেমান এবং হিন্দুস্তানের পাৎসাহ আকবর প্রভৃতি বিখ্যাত ভূপালগণ তাহার সমসাময়িক ; কিন্তু তাহার প্রকৃতি এমনই কঠোর ছিল যে, ইতিহাসপ্রদত্ত ‘কৃতান্তকল্প’ আখ্যাটা তাঁহার পক্ষে সৰ্বাংশেই সার্থক হইয়াছিল। এভাও সমগ্র রুশদেশে অখণ্ড আধিপত্য স্থাপন করিতে পারেন নাই ; অস্তবিপ্লবে কুশিয়ায় তখন শান্তি ছিল না, য়ুরােপের পশ্চিমখণ্ডের সঙ্গেও তখন ইহার সংস্পর্শ ঘটে নাই। রুশিয়ার প্রকৃত উদ্ধারকর্তা মহাসত্ব পিটার। এই প্রতিভাবান পুরুষ খ্ৰীষ্টীয় ১৮৮৯ অব্দে মস্কো এর সিংহাসনে অধিরােহণ করেন। তাহার ঐন্দ্রজালিক স্পর্শে সুপ্ত রুশিয়া যেন জাগিয়া উঠিল, সমগ্র দেশ একতাবদ্ধ হইল এবং উন্নতির দিকে ছুটিয়া চলিল। তিনি সামান্য শ্রমজীবার ন্যায় স্বহস্তে পােত নির্মাণ করিতে শিখিলেন এবং প্রজাদিগকে উহা শিক্ষা দিলেন। তিনি বাণিজ্যের সৌকর্থে নেবানদীর মােহানায় নূতন রাজধানী স্থাপন করলেন * ; তিনি প্রজাদিগের শিক্ষাবিধানাথ : পিটার্সবার্গ, বা পিটার প্রতিষ্ঠি ও নগর। ইংরাজের ইহাকে সেন্ট পিটার্সবার্গ, বলিতেন, কিন্তু তাহা ভুল, কারণ ‘সেন্ট (সাধু) শব্দের সহিত রুশ সম্রাট, পিটারের কোন সম্পর্ক ছিল না।

ফশিয়া। নানাস্থানে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করিলেন। ফলতঃ তিনি বুঝিয়াছিলেন, য়ুরােপের অন্যান্য জাতির তুলনায় কশেরা তখন অসভ্য ; অতএব যাহাতে তাহার বাণিজ্যর্থ বিদেশে গিয়া সভ্যজাতির সংসর্গলাভ করিতে পারেন এবং বিদেশের লােকেও রুশিয়ায় গিয়া সভাতাবিস্তারের সুবিধা পায় তাহাই তাহার প্রধান যত্নের বিষয় ছিল। রণশাস্ত্রেও পিটারের অসামান্য নৈপুণ্য ছিল। পােল্যাণ্ড ও সুইডেনের লােকে এতকাল রুশদিগের সঙ্গে শত্রুতা করিয়া আসিতেছিল; কিন্তু পিটার এই উভয় জাতিকেই সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করিলেন; তাহার শাসনকাঠিন্যে দক্ষিণাঞ্চলের উচ্ছল মঙ্গোলীয় প্রজারাও শান্তশিষ্ট হইয়া চলিতে লাগিল। পিটারের উত্তরাধিকারিগণ অষ্ট্রিয়া ও জাৰ্ম্মাণির সঙ্গে যােগ দিয়া পােল্যাণ্ড- রাজ্যের বিলােপসাধন করেন (১৭৭২-১৭৯৫)। এই হতভাগ্য দেশ তিন অংশে ভাগ করিয়া এক এক অংশ জার্মাণি ও অষ্ট্রিয়া এবং যে অংশটী সৰ্ব্বাপেক্ষা বৃহৎ তাহা রুশিয়া গ্রাস করিল। প্রতীচ্য য়ুরােপের রাজনীতিতে রুশের এই প্রথম হস্তক্ষেপ অতঃপর উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগে নেপােলিয়ন্ রুশিয়া আক্রমণ করিতে গিয়া কিরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিলেন, পুরাবৃত্তপাঠকেরা তাহা সকলেই জানেন। রুশেরা তখন নিজেরাই মস্কোনগর অগ্নিসাৎ করিয়া নেপােলিয়কে বিপকেরিয়াছিলেন। ফ্রান্সে প্রতিগমনের সময় দারুণ শীতে, অনাহারে ও শক্রর অস্ত্রাঘাতে তাহার প্রায় সমস্ত সেনা বিনষ্ট হইয়াছিল, কিন্তু রুশের কিছুমাত্র অবসন্ন হন নাই। নেপােলিয়নের পতনের পর কশের প্রাচ্যখণ্ডে রাজ্যবিস্তারে প্রবৃত্ত হইলেন। তাঁহার ধীরে ধীরে তুরুক্ষ ও পারস্যের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন, ককেশন্স পৰ্বত লঙ্ঘনপূর্বক তাহার দক্ষিণ পার্শ্বেও আধিপত্য স্থাপন করিলেন—বােধ হইল যেন অচিরে তুরুষ্ক সাম্রাজ্যও তাঁহাদিগের কুক্ষিগত হইবে। কিন্তু এই সময়ে ইংরাজ ও ফরাসীরা তাহাদের পরিপন্থী হইলেন। তজ্জন্য ক্রিমিয়া উপদ্বীপে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ হইল (১৮৫২-৫৫); রুশেরা পরাস্ত হইয়া তুরুস্ক অধিকার করিবার সঙ্কল্প হইতে নিরস্ত হইলেন এবং এশিয়ার মধ্যখণ্ডের দিকে মনােনিবেশ করিলেন। এখানে তাহারা আশাতীত ফললাভ করিলেন, জঙ্গি খাঁ ও তৈমুরলঙ্গের জন্মভূমি রুশ সম্রাটকে প্রভু বলিয়া স্বীকার করিল, বােখারা, সমরকন্দ প্রভৃতি প্রসিদ্ধ নগরগুলি একে একে তাহার অধিকারভুক্ত হইল। এদিকে সাইবিরিয়ারও উন্নতি-বিধানের নিমিত্ত যথেষ্ট চেষ্টা হইতেছিল। == পিটার্সবার্গ, শব্দটী জাৰ্মাণ ভাষাজাত ; এইজন্য, বর্তমান যুদ্ধ সংঘটিত হইলে রুশের। ইহার নাম পরিবর্তন করিয়াছেন। ইহার বর্তমান নাম ‘পেট্রোগ্রাড়, খাটি রুশ শব্দ।

তৃতীয় অধ্যায়। রুশজাতি প্রায় তিন শত বৎসর হইল যুরাল পৰ্বত পার হইয়া সাইবিরিয়ায় প্রবেশ করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু এতদিন সেখানে রীতিমত বসতি করেন নাই। তখন এই বিশাল অঞ্চল কেবল উৎকট রাজদণ্ডগ্রস্ত ব্যক্তিদিগের নির্বাসনক্ষেত্ররূপে ব্যবহৃত হইত। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে রুশেরা ইহাকে প্রকৃত উপনিবেশে পরিণত করিলেন; তঁাহারা বন কাটিয়া নগর বসাইলেন, কৃষির বিস্তার করিলেন এবং খনিজ সম্পত্তির উত্তোলনে প্রবৃত্ত হইলেন। রুশিয়ার প্রধান অভাব উন্মুক্ত সমুদ্র পথ। উত্তর মহাসাগর প্রায় সমস্ত বৎসর বরফে আবৃত, কাজেই সামুদ্রিক বাণিজ্যের অনুকুল নহে। বান্টিক ও কৃষ্ণসাগর দিয়াও কুশিয়ার রণতরীর ও বাণিজ্যতরীর বাহির হইবার সুবিধা নাই, কারণ ইহাদের সঙ্কীর্ণ মুখ গুলি রাজ্যান্তরের শাসনাধীন। এই নিমিত্ত রুশদিগের পক্ষে হয় ভূমধ্যসাগরের, নয় পারস্য উপসাগরের, নয়, নিতান্ত পক্ষে, পীতসাগরের তীরে একটা না একটা বন্দর নিতান্ত আবশ্যক, এবং এইরূপ বন্দর পাইবার চেষ্টা করাতেই তাহাদিগের সহিত অন্য জাতির বিবাদ ঘটিয়াছে। ভূমধ্যসাগরের দিকে তঁাহারা ইংরাজ ও তুর্কদিগের নিকট বাধা পাইলেন, পারস্য উপসাগরের দিকেও ইংরাজ তাহাদের অন্তরায় হইলেন। তখন তাঁহারা পীতসাগরের দিকে অগ্রসর হইলেন। ইতঃপূৰ্ব্বে তাহারা প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে ব্লাডি বষ্ট নামে একটা বন্দর নির্মাণ করিয়াছিলেন, কিন্তু উহাও শীতকালে সমুদ্রপথে অগম্য। সাইবিরিয়ার ভিতর দিয়া সুবৃহৎ রেলওয়ে নির্মিত হইল এবং রুশেরা পীতসাগরের তীরে পাের্ট, আর্থার ও ড্যানি নামক দুইটা বন্দর অধিকার করিলেন। আবার এই সূত্রে জাপানের সহিত তাহাদের বিবােধ ঘটিল। জাপানীরা বিক্রমশালী ; পক্ষান্তরে রুশদিগকে য়ুরােপ হইতে বহুদূরে গিয়া যুদ্ধ করিতে হইয়াছিল। কাজেই রুশদিগের পরাজয় হইল (১৯০৫); তাহারা পীতসাগরের তীরেও সফলকাম হইতে পারিলেন না। এশিয়াখণ্ডে রুশের রাজ্যবিস্তারে ইংরাজদিগের সহিত মনােমালিন্য হইবারই কথা। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এই হেতু উভয় জাতির মধ্যে যুদ্ধ ঘটিবারও আশঙ্কা ছিল। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে জার্মাণির আকস্মিক অভ্যুদয়ে এবং জাৰ্মাণ- দিগের দুরাকাঙ্ক্ষাবশতঃ রুশের সহিত ইংরাজের যুদ্ধ ঘটিল না, বরং উভয় জাতির মধ্যে সৌহার্দ স্থাপিত হইল। জার্মাণেরা বলুকা উপদ্বীপে ও তুরুস্কে অপ্রতিহত ক্ষমতালাভের জন্য ষড়যন্ত্র করিতে লাগিলেন। রুশেরা দেখিলেন এরূপ অবস্থায় অগ্রে হউক, পশ্চাতে হউক এশিয়া মাইনরে তাহাদের সহিত জাৰ্মাণদিগের সঘর্ষ হইবে। য়ুরােপেও উভয় জাতির মধ্যে বিবাদের কারণ দেখা দিয়াছিল। বান্ উপদ্বীপে জাৰ্মাণ আধিপত্য অনন্তর পােল্যাও। জন্মিলে সার্বিয়া প্রভৃতি শ্লাব, রাজ্যগুলির স্বাধীনতা থাকে না, অথচ রুশিয়া যখন শ্লাব, সমাজের অগ্রণী, তখন ভাতিজনের এরূপ বিপত্তির সময় উদাসীন ভাবেও থাকিতে পারে না। কিন্তু আয়তনে অতিবৃহৎ হইলেও রুশিয়ার জনসাধারণ দরিদ্র ; কি শিল্পে ও বিজ্ঞানে, কি রণশাস্ত্রে রুশেরা একাকী কখনও জাৰ্ম্মাণির সহিত পারিয়া উঠেন না। সত্য বটে, ফ্রান্সের সহিত তাহাদের সথ্য ছিল; কিন্তু তাহাও পর্যাপ্ত নহে। এইরূপ চিন্তা করিয়াই রুশ, রাজপুরুষেরা ইংল্যাণ্ডের সহিত যোগ দিবার সঙ্কল্প করিলেন। এই সম্মেলন সহজেই সম্পাদিত হইল, কারণ উভয় জাতিই বুঝিতে পারিলেন, জার্মাণি তাহাদের সাধারণ শত্রু। এশিয়া খণ্ডে রুশের সহিত ইংরাজের প্রতিযােগিতা ছিল বটে, কিন্তু তাহা এত গুরুতর নহে যে বিনা বিবাদে মিটাইতে পারা যায় না। সাইবিরিয়া এত বিস্তীর্ণ যে সেখানেই দীর্ঘকাল পৰ্য্যন্ত রুশজাতির সমস্ত অভাব পূরণ হইতে পারে ; সেদিকে ইংরাজদিগের লক্ষ্য করিবার কিছুমাত্র হেতু নাই। কাজেই ব্যবস্থার প্রয়ােজন হইল কেবল পারস্যসম্বন্ধে। স্থির হইল রুশ, ও ইংরাজ কেহই পারস্যের স্বাধীনতা হরণ করিবেন ; তবে তত্য বাণিজ্যসম্বন্ধে রুশদিগের অধিকার উত্তরাদ্ধে এবং ইংরাজদিগের অধিকার দক্ষিণার্ধে নিবন্ধ থাকিবে (১৯০৭)। ইহারই কিয়ৎকাল পরে বর্তমান যুদ্ধের আরম্ভ। অষ্ট্রিয়ার সম্রাট, সার্বিয়া আক্ৰমণ করিলেন (১৯১৪) ; রুশেরা দেখিলেন তাহারা সাহায্য না করিলে সার্বিয়ার ধ্বংস অপৰিহাৰ্য ; পৃথিবীসুদ্ধ লোকেও বুঝিবে যে শ্লাব, প্রতিবেশীদিগকে রক্ষা করিতে পারেন, তাহাদের এ শক্তি পর্যন্ত নাই। ফলতঃ সার্বিয়ার বিপদে সমগ্র রুশজাতির আত্মমর্যাদায় আঘাত লাগিল। তঁাহারা একবাক্যে অস্ট্রিয়ার এবং অষ্ট্রিয়ার বন্ধু জার্মাণির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন।* (খ) পােল্যাণ্ড,। পােল্যাণ্ড, রাজ্যের উৎপত্তি মধ্যযুগে। ইহার একদিকে জার্মাণি ও অন্যদিকে রুশিয়া। পােল্যাণ্ডের অনেক গুলি নগর সমৃদ্ধিশালী; তন্মধ্যে ড্যান্টজিগু, ওয়াস ও ক্রাকো প্রধান; ইহারা এখন যথাক্রমে জার্মাণি, রুশিয়া ও অষ্ট্রিয়ার অধীন। কুশিয়ার অভ্যুদয়ের কিছু পূর্বেই পােল্যাণ্ড রাজ্য সবিশেষ পরাক্রমশালী হইয়াছিল। শেষে কুশিয়ায় সর্ববিধ শাসনক্ষমতা রাজার হস্তে কেন্দ্রগত হয় ; ইহাতে রাজা যথেচ্ছাচারী হইলেও জাতীয় শক্তির উপচয় ঘটে। কিন্তু পােল্যাণ্ডে ইহার বিপরীত অবস্থা দাঁড়াইল। সেখানে উচ্ছল ভূম্যধিকারিগণ পরস্পর বিবাদে প্রবৃত্ত হইলেন, * সম্প্রতি কুশিয়ায় যে রাষ্ট্রবিগ্ন হইয়াছে তাহার কথা পরে বলা যাইবে।

A তৃতীয় অধ্যায়। কাজেই পােল জাতি ক্রমশঃ দুৰ্বল হইয়া পড়িল এবং অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে প্রুশিয়া, অস্ট্রিয়া ও রুশিয়া তাহাদের রাজ্যটা ভাগ করিয়া লইল । পপালেরা শতাধিকবর্ষ স্বাধীনতা হারাইয়াছেন, কিন্তু অদ্যাপি বর্তমান শাসনকর্তা- দিগের প্রতি অনুরক্ত হন নাই। জাৰ্ম্মাণি তাহাদিগকে জাৰ্ম্মাণ ভাবাপন্ন এবং রুশিয়া তাঁহাদিগকে রুশভাবাপন্ন করিতে চেষ্টা করিয়াছে, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারে নাই। না পারিবারই কথা, কারণ তাহাদের সহিত উক্ত উভয় জাতিরই অনেক বিষয়ে পার্থক্য আছে। তাহাদের ভাষা না জাৰ্ম্মাণ, না রুশ,; তাহার রােমাণ, কাথলিক, কিন্তু জাৰ্মাণেরা প্রধানতঃ প্রটেষ্টান্ট, এবং রুশের প্রাচসমাজভুক্ত খ্রীষ্টান্। পপালেরা এই সকল কারণে এই শতবর্ষকালে অনেকবার বিদ্রোহী হইয়াছেন ; বিজেতারাও সাতিশয় কঠোরতার সহিত সেই সকল বিদ্রোহ দমন করিয়াছেন। বর্তমান যুদ্ধেও কোন পক্ষেরই জয়-পরাজয়ের সহিত পােলদিগের ইষ্টানিষ্টের কোন সম্বন্ধ দেখা যায় না; তাহারা যে অংশে যে রাজার প্রজা, সে অংশে সেই রাজারই সৈনিকশ্রেণীভুক্ত হইয়াছেন। কিন্তু অধুনা রুশ সাম্রাজ্যে প্রজাতন্ত্র শাসনের প্রবর্তন হইয়াছে ; ইহাতে আশা করা যায়, রুশের জয় হইলে পােলদিগেরও ভাগ্য ফিরিবে। ; (গ) তুরুদ্ধ। য়ুরােপীয় তুরুস্কের বর্তমান অধিবাসীরা দেহের বর্ণে ও মুখের গঠনে অন্যান্য য়ুরােপীয়দিগের সদৃশ। অনেকে অনুমান করেন যে, ইহাদের এবং হাঙ্গারীরাজের ম্যাগেয়ারদিগের পূর্বপুরুষগণ একই মূলােদ্ভূত; কিন্তু ম্যাগেয়ারের য়ুরোপে গিয়া খ্রষ্টান হন; তুর্কেরা য়ুরােপে প্রবেশ করিষার পূর্বেই মুসলমান হইয়াছিলেন । তুর্কজাতির আদি বাসভূমি এশিখণ্ডে আমু-নদী তীরে। তাহারা এখন হইতে বাহির হইয়া দিগ্বিজয়ে প্রবৃত্ত হন এবং এশিয়া মাইনর প্রভৃতি নানা দেশে আধিপত্য লাভ করেন। অতঃপর খ্ৰীষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে তাহারা বসফরাস প্রণালী পার হইয়া কষ্টান্টিনােপল্ নগর জয় করেন এবং সেখান হইতে অল্প দিনের মধ্যে ডানিয়ুব নদীর দক্ষিণস্থ সমন্ত বলকান উপদ্বীপটা আত্মসাৎ করিয়া লন। তুরুফের সুলতানদিগের মধ্যে মহামহিম সুলেমান (১৫২০-১৫৬৬) সর্বাপেক্ষ। প্রসিদ্ধ। তাঁহার রাজত্বকালে তুর্কেরা জলে-স্থলে দুর্জয় হইয়া উঠিয়াছিলেন। জার্মাণেরাও তাহাদিগকে ভয় করিয়া চলিতেন। তাঁহারা একবার বিয়েনা নগরী পর্যন্ত আক্রমণ করিয়াছিলেন, কিন্তু পােল্যাণ্ড রাজের নিকট বাধা পাইয়া উহ গ্রহণ করিতে সমর্থ হন নাই।

তুরুক। ৪১ ; ইহার পর তুরুষ্কের অবনতির সূত্রপাত হয়। তুর্কদিগকে পার্শ্ববর্তী জাতিদিগের সহিত প্রায় নিয়ত যুদ্ধ করিতে হইত ; সময়ে সময়ে জয়লাভ করিলেও ইহাতে তাহাদের বহু লােকক্ষয় ও অর্থনাশ হইত। কাজেই তাহাদের বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যের অনেক অংশে তাহাদের প্রভুত্ব বদ্ধমূল হইতে পারে নাই। তুরুস্কের প্রধান শত্রু ছিল প্রথমে অষ্ট্রিয়া, শেষে রুশিয়া। গ্রীদের স্বাধীনতা লাভ হইতে তুরুঙ্গের রাজ্যক্ষয় আরম্ভ হয়। অতঃপর অনেকে ভাবিয়াছিল তুর্কেরা অচিরে য়ুরােপখণ্ড হইতে বিতাড়িত হইবেন, কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কুশিয়ার রাজ্যবিস্তারে শঙ্কিত হইয়া ইংরাজ ও ফরাসীরা তুষ্কের সহায় হইলেন ; রুশ সম্রাট পরাস্ত হইয়া তুরুষ্কের কোন অনিষ্ট করিতে পারিলেন না। এই সময়ে সভ্যদেশসমূহের আদর্শে শাসনপ্রণালী সংশােধন করিলে তুর্কদিগের পক্ষে বুদ্ধিমানের কাৰ্য্য হইত। কিন্তু তাহারা সে দিকে দৃপাত করিলেন না; তাহাদের উৎপীড়নে শাবজাতীয় প্রজারা জ্বালাতন হইতে লাগিল; কাজেই কুশিয়া শাদিগের সাহায্যার্থ অগ্রসর হইল (১৮৭৭)। যুদ্ধে তুর্কেরা বেশ বীরত্ব দেখাইলেন বটে, কিন্তু শেষে পরাভব স্বীকার করিলেন এবং সার্বিয়া ও বুলগেরিয়া তুর সাম্রাজ্য হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়! এক এক টী স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হইল। রুমানিয়া ইহার বহুপূর্বেই তুরুষ্কেৰ অধীনতাপাশ হইতে মুক্ত হইয়াছিল। রুশরাজের কৃপায় ইহাও এক্ষণে একটী স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হইল। কিন্তু ইহাতেও সুলতানের মােহাপনােদন হইল মােহাপনােদন হইল না; তিনি পূর্ববৎ যথেচ্ছাচার করিতে লাগিলেন। অনন্তর তুরুক্ষে কৃতবিদ্য এক নব্যসম্প্রদায় দেখা দিল। এই সম্প্রদায়ের লোকে শাসনসংস্কারে বদ্ধপরিকর হইলেন এবং ইহাদিগের চেষ্টায় ১৯০৮ অব্দে সুলতান আবদুল হামিদ প্রজাতন্ত্র শাসন প্রবর্তিত করিলেন। নব্যতন্ত্র তুর্কেরা প্রথমে সদুদ্দেশ্য প্রণােদিত হইয়াই শাসনসংস্কারে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহাদের মধ্যে ঐক্য ছিল না; অধিকন্তু সৈনিক কর্মচারীদিগের সঙ্গেও তাহাদের বিবাদ ঘটিল ; কাজেই প্রজাতন্ত্রশাসনেও তুরুষ্কের কোন উন্নতি দেখা দিল না। মাসিডনিয়ার অধিবাসীরা অনেকে গ্রীজাতীয় ও খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী ; তুর্কেরা এখানে ভয়ানক অত্যাচার করিতেন। এইজন্য উক্ত অঞ্চলে রাজায় প্রজায় প্রায় নিয়ত বিবাদ চলিত। অবশেষে বুলগেরিয়া ও সার্বিয়া মাসিডনিয়ার দুঃখ- মােচনার্থ তুরুষের সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ করিল (১৯১২)। তুর্কেরা সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হইলেন এবং কেবল কষ্টান্টিনােপল ও তন্নিকটবর্তী সামান্য ভূখণ্ড ব্যতীত যুবরাপের অন্তঃপাতী সমস্ত রাজ্য ত্যাগ করিয়া নিষ্কৃতি লাভ করিলেন। ইহার কিছুদিন পূৰ্ব্ব হইতেই জাৰ্মাণ সম্রাট সুলতানের বন্ধু সাজিয়াছিলেন।

৪২ তৃতীয় অধ্যায়। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সুলতানের প্রকৃত হিতৈষী ছিলেন ইংরাজ ; কিন্তু ইংরাজেরা যখন মিশর অধিকার করিলেন (১৮৮২}, তখন তুর্কেরা পূৰ্বল উপকার ভুলিয়া গেলেন ; জাম্মণরাও সুযােগ বুঝিয়া তাহাদিগকে আশা দিতে লাগিলেন যে একদিন না একদিন ইহার প্রতিশােধ লইবার নিমিত্ত তাহারা সুলতানের সাহায্য করিবেন। সেই সময় হইতে জাৰ্ম্মাণকৰ্মচারীরা তুর্কদিগের সামরিক শিক্ষা বিধানে নিযুক্ত হইলেন ; জাৰ্ম্মাণির অর্থে তুরুফসাম্রাজ্যে রেলওয়ে নির্মাণ আরম্ভ ইল। তুর্ক-জাৰ্ম্মাণ সম্মেলনে জার্মাণির অভিসন্ধি বেশ বুঝিতে পারা যায়; কিন্তু তুর্কের যে ইহাতে কি সুবিধা পাইবার আশা করিয়াছিলেন, তাহা বলা কঠিন। তুর্কদিগের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য ছিল অভ্যন্তরীণ সংস্কারসাধন। তাহাতে জাত্যন্তরে সাহায্য নিষ্প্রয়ােজন। কিন্তু তাহারা এদিকে মন দিলেন না এবং বর্তমান যুদ্ধ আরব্ধ হইবামাত্র অগ্র পশ্চাৎ না ভাবিয়া জাৰ্ম্মাণির পক্ষ অবলম্বন করিলেন। (ঘ) বল্কান্ রাজ্যসমুহ। বল্কান্রাজ্যগুলির মধ্যে প্রথমে সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার কথা বলা যাইতেছে ইহারা একে অপরের প্রতিবেশী, অথচ শত শত বর্ষকাল উভয়ের মধ্যে বিদ্বেষভাব চলিয়া আসিতেছে। উভয় অঞ্চলই পুরাকালে নােমক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুত ছিল ; রােমের পতন হইলে উভয়ই বৰ্ব্বর জাতিৰু উপদ্রব ঘটে, এবং উভয়েই সময়বিশেষে রণজয়ী হইয়া কিয়ৎকালের জন্য প্রবল হয়। খ্ৰীষ্টীয় দশম শতাব্দী বুলগেরিয়ার এবং চতুর্দশ শতাব্দী সার্বিয়ার চরম উন্নতির সময়। কিন্তু শেষে তুর্কদিগের আক্রমণে উভয় রাজ্যেরই স্বাধীনতা নষ্ট হয়। সার্বিয়া ও বুলগেরিয়া প্রায় চারিশত বৎসর তুর্কদিগের অধীন ছিল। অতঃপর ১৮৭৭ অকে রুশের সহিত তুরুষ্কের যে যুদ্ধ হয় তাহার অবসান হইলে সুলতান ইহাদিগকে স্বাধীন বলিয়া স্বীকার করেন। কিন্তু রুশিয়াকর্তৃক এইরূপে উপকৃত হইলেও সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার ললাকে রুশের আধিপত্য ভালবাসেন না। এজন্য রুশের সঙ্গে সময়ে সময়ে তাঁহাদের মনােমালিন্যও ঘটিয়াছে। মাসিডনিয়ার সাহায্যার্থ সার্বিয়া ও বুলগেরিয়া সমবেত হইয়া তুষ্কের সহিত যে যুদ্ধ করে তাহা পূৰ্বে বলা হইয়াছে। কিন্তু যুদ্ধান্তে তাঁহাদের মধ্যে পূর্বতন বিদ্বেষবহ্নি সহসা পুনঃ প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল এবং বুলগারেরা পরাস্ত হইয়া বিস্তর ক্ষতিস্বীকারপূর্বক সার্বিয়ার সহিত সন্ধি করিলেন (১৮১৩)। ইহাতে বুলগারেরা ৪৩ বান্ রাজ্যসমূহ। যে সার্বিয়ার উপর জাতক্রোধ হইবেন এবং প্রতিফল দিবার অবসর প্রতীক্ষা করিবেন তাহা সহজেই বুঝা যায়। এদিকে সার্বিয়ানেরাও লাভবান হইতে পারিলেন না; তাহাদের পশ্চিমে আলবানিয়া নামে যে অঞ্চল আছে, অষ্ট্রিয়ার সম্রাট জিদ ধরিলেন তাহাকেও একটী স্বাধীন রাজ্য বলিয়া মানিতে হইবে এবং জাৰ্ম্মাণ-রাজবংশীয় কোন ব্যক্তিকে উহার সিংহাসনে বসাইতে হইবে। সার্বিয়ানেরা এই অসঙ্গত প্রস্তাবে বাধা দিতে পারিলেন না; কাজেই আল্বানিয়া তাঁহাদের হস্থলিত হইল; তাঁহারা সমুদ্র হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িলেন; আলবানিয়াতে তাঁহাদের স্বজাতীয় যে বহুলােক বাস করে এবং শাসনসম্বন্ধে তাহাদেরই সহিত যুক্ত হইতে চায়, তাহাদিগেরও উদ্ধার করিতে পারিলেন না। এই কারণে সার্বিয়ার লােকে অষ্ট্রিয়ার প্রতি বড় বিরক্ত হইলেন এবং তাহাদেরই স্বজাতীয় এক ব্যক্তি অষ্ট্রিয়ার যুবরাজের ও তাহার পত্নীর প্রাণসংহার করিল। এ লােকটা যদিও অষ্ট্রিয়ারই প্রজা, তথাপি এই নৃশংস কাণ্ড হইতেই বর্তমান যুদ্ধের উদ্ভব হইল। বুলগারেরা যখন সাবিয়াদিগের নিকট পরাস্ত হন, তখন জার্মাণের সাহায্যের আশা দিয়া তাঁহাদিগের প্রতিহিংসাবৃত্তি উত্তেজিত রাখিয়াছিলেন এবং বর্তমান যুদ্ধ আরব্ধ হইলে তাঁহাদিগকে সার্বিয়া আক্রমণ করিতে আহ্বান করিয়াছিলেন। বুলগারেরা প্রথমে অনেক দিন ইতস্ততঃ করিয়াছিলেন ; কিন্তু যখন দেখিলেন রুশেরা পুনঃ পুনঃ পরাস্ত হইতেছেন (১৯১৫), তখন ভাবিলেন উত্তম সুযােগ দেখ দিয়াছে। তাহারা তখন অষ্ট্রিয়ার সঙ্গে যােগ দিয়া সার্বিয়াদিগকে বিপন্ন করিয়া তুলিলেন। রুমানিয়া দেশটী ১৮২৮ অব্দে অর্থাৎ সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পূর্বে তুর্কদিগের অধীনতাপাশ হইতে একরূপ মুক্তিলাভ করে। অতঃপর রুমানিয়ানেরা দীর্ঘকাল পর্যন্ত বিবাদবিসংবাদে নিলিপ্ত থাকিয়া উন্নতির পথে অগ্রসর হন। তাহাদের অসন্তোষের একমাত্র কারণ এই যে টানসিলভানিয়া অঞ্চলের অধিবাসীরা প্রধানতঃ রুমানিয়া জাতীয় হইলেও হাঙ্গারি রাজ্যের অন্তভূতি। বর্তমান যুদ্ধ আরব্ধ হইলে তাহারা বুঝিলেন যে, উসিলভানিয়া অধিকারের সুযােগ দেখা দিয়াছে। তথাপি তাহারা অনেকদিন পর্যন্ত এই ভীষণসমরানলে ঝম্প দিতে সাহস করিলেন না। কিন্তু গত বর্ষে গ্রীষ্মবসানে তাহার সিদ্ধান্ত করিলেন যে, আর উদাসীনভাবে থাকা অসঙ্গত। অতএব তাহারা অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন।

৪৪ চতুর্থ অধ্যায়। গ্রীস্। (ঙ) পাশ্চাত্য সভ্যতার সূতিকাক্ষেত্র গ্রীসের ইতিবৃত্ত পুরাবৃত্ত পাঠকের সুপরিজ্ঞাত। এজন্য এখানে সে কথা বলা অনাবশ্যক। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইংল্যাণ্ডের ও ফ্রান্সের সাহায্যে গ্রীকেরা তুরস্কের অধীনতাপাশ হইতে মুক্তিলাভ করেন। ইংরাজ ও ফরাসীরা গ্ৰীকৃদিগকে স্বাধীনতা দিয়াছেন, তাহাদের রক্ষণাবেক্ষণও করিয়া আসিতেছেন। গ্রীকেরা য়ুরােপের যে কোন রাজবংশ হইতে আপনাদের রাজা নির্বাচন করতে পারেন। তাহাদের বর্তমান রাজা দিনামারবংশীয়, কিন্তু রাজপত্নী জাৰ্মাণ সম্রাটের সােদরা। বর্তমান যুদ্ধে রাজা জাৰ্মাণদিগকে সাহায্য করিবার জণ্ঠ যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছেন; কিন্তু বেনিজেল প্রমুখ কতিপয় প্রবীণ- নীতিবিশারদের বাধায় তাহাতে সম্পূর্ণরূপে কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। গ্রীকেরা এ সম্বন্ধে দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত হইয়াছেন—এক সম্প্রদায় বাজার পক্ষ, অন্য সম্প্রদায় বেনিজেলাসের পক্ষ এবং ইংরাজ ও ফরাসীদিগের সহিত যােগ দিতে শেষােক্ত সম্প্রদায়ের কেহ কেহ স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়াই ইংরাজ ও ফরাসীসেনায় প্রবিষ্ট হইয়াছেন; কিন্তু গ্রীসে তাহাদের অনেক শত্রু আছে। তাহাদের রক্ষা- বিধানর্থ ইংরাজ ও ফরাসীরা এথেন্স নগরে একদল সৈন্য রাখিয়া দিয়াছেন। এখন, চতুর্থ অধ্যায়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। জার্মানেরা যুদ্ধপ্রিয়। ইংরাজেরাও যুদ্ধবিমুখ নহেন। প্রাচীন সাত্ম, ডেন ও নৰ্ম্মাণ, প্রধানতঃ এই তিন জাতির সংমিশ্রণে বর্তমান ইংরাজদিগের উৎপত্তি। এই তিন জাতিই সাতিশয় যুদ্ধপ্রিয় ছিলেন। ইহারা পূর্বে পরস্পর বিবাদ করিয়াছিলেন, শেষে যখন একজাতিতে পরিণত হইয়াছিলেন, তখন প্রতিবেশী দিগের রাজ্য গ্রহণের চেষ্টা করিয়াছিলেন। খ্রষ্টীয় চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইংরাজ ও ফরাসীতে যে শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধ হয়, ইংরাজের পররাজ্যলিপাই তাহার মূল। ইংল্যাণ্ডের রাজা বলিতেন বটে যে ন্যায়ানুসারে ফরাসী সিংহাসন তাহারই প্রাপ্য ; কিন্তু এ কেবল মুখের কথা; ইংরাজেরা ভাবিতেন জোর যার মুলুক তার, এবং সেই জন্যই তাঁহারা ফ্রান্স, জয় করিবার জন্য এই এত চেষ্টা করিয়াছিলেন। * ইনি সম্প্রতি সিংহাসন ত্যাগ করিয়াছেন।

বৃটিশ সাম্রাজ্য। ৪৫ সময়বিশেষে বিজয়ী হইলেও ইংরাজেরা ফ্রান্স দেশে স্থায়ী আধিপত্য লাভ করিতে পারেন নাই। অতঃপর পঞ্চদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইংল্যাণ্ডে তুমুল গৃহ- ধুদ্ধ ঘটে এবং তন্নিবন্ধন ইংরাজের কিয়ৎকালের জন্য অবসন্ন হইয়া পড়েন। এই সময়ে পটুগীজজাতি বাণিজ্যে প্রবল হইয়াছিল এবং স্পেনের অধিবাসীরা আমেরিকা মহাদ্বীপ অধিকার পূর্বক প্রচুর ঐশ্বৰ্য্যলাভ করিয়াছিলেন। ইংরাজের। যখন আবার বলসঞ্চয় করেন, তখন এই দুই জাতির সঙ্গে তাহাদের প্রতিযােগিতা আরম্ভ হয়। আমেরিকার মধ্য ও দক্ষিণ খণ্ড হইতে যে সকল সুবৰ্ণরজতপূর্ণ অর্ণবপােত স্পেনে যাইত, ইংরাজের সুবিধা পাইলেই সেগুলি আক্ৰমণ করিতেন এবং কিয়ৎকাল পরে নিজেরাই আমেরিকাতে উপনিবেশ স্থাপনে প্রবৃত্ত হন (১৬০৭)। ইংল্যাণ্ডের প্রথম উপনিবেশ বৰ্তমান য়ুনাইটেড ষ্টেটসের অন্তঃপাতী বার্জিনিয়া প্রদেশ। ইংরাজের যে ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য আজ পৃথিবীব্যাপ, এইরূপে তাহার সূত্রপাত হইল। স্পেনবাসীরা আমেরিকায় যাইতেন লুণ্ঠন করিতে ; তঁাহারা যতদুর পারিতেন স্বর্ণরৌপ্য সংগ্রহ করিয়া স্বদেশে ফিরিতেন, কিন্তু ইংরাজে. গেলেন 'সৈখানে বাস করিতে । ইহাতেও আমেরিকার আদিমনিবাসীদিগের স্বত্বহানি হইয়াছিল সন্দেহ নাই; কিন্তু য়ুরােপের কোন জাতিরই অনিষ্টের কোন সম্ভাবনা ছিল না। স্বদেশ ছাড়িয়া আমেরিকার শ্বাপদসঙ্কুল বনভূমিতে গিয়া বাস, এবং সেখানে কৃষি ও সভ্যতার বিস্তার সামান্য সাহস, উদ্যম ও অধ্যবসায়ের কাজ নহে। ইংরাজদিগের পর অন্য যে সকল য়ুরােপীয় জাতি আমেরিকায় উপনিবেশ- স্থাপনে প্রবৃত্ত হন, তন্মধ্যে ফরাসীরা প্রধান। ইহাদের পথম উপনিবেশ সেন্ট লরেন্স, নদের উত্তর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর ফরাসীরা ক্রমশঃ দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হইতে চেষ্টা করেন; কিন্তু সেই সময়ে যুরােপে ফ্রান্সের সহিত ইংল্যাণ্ডের যুদ্ধ উপস্থিত হইল এবং সেই সূত্রে ইংরাজেবা ফরাসীদিগের প্রায় সমস্ত উপনিবেশ অধিকার করিয়া লইলেন (১৭৬ ৩। উপনিবেশ রক্ষা করিতে পারিল যে কি উপকার হয় তাহা ইংরাজের যেমন বুঝিতেন, ফরাসীরা তেমন বুঝিতেন না। ইংরাজেরা এশিয়খণ্ডে কোন উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করেন নাই। পটুগীজজাতি ভারতবর্ষে বাস করিবার সংকল্প করিয়াছিলেন । কিন্তু ইংরাজেরা বুঝিয়াছিলেন যে, গ্রীষ্মমণ্ডলস্থ দেশ তঁাহাদের বাসের অনুপযুক্ত। তাঁরা বাণিজ্যের জন্য যাতায়াত করিতেন, নানা স্থানে কুঠি বসাইতেন, তত্তং স্থানের অধিপতিদিগকে উপঢৌকনাদি দিয়া বাণিজ্যের সুবিধা করিয়া লইতেন। এই বাণিজ্যের জন্য ওলন্দাজ ও ফরাসী উভয় জাতির সঙ্গেই তাহাদের বিবাদ হয়। তখন ভারতসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে ওলন্দাজদিগের একাধিপত্য ছিল ; ইংরাজেরা সেখানে তাঁহাদের সঙ্গে প্রতিযােগিতায় .

} । চতুর্থ অধ্যায়। অসমর্থ হইয়া ভারতবর্ষের দিকেই মনােনিবেশ করিলেন; কিন্তু এখানেও তাহারা প্রথমে তত সুবিধা করিতে পারেন নাই। তাহাদের কুঠিগুলি দূরে দূরে অবস্থিত ছিল ; মােগল সাম্রাজ্যের অবনতিবশতঃ সমগ্র দেশ একরূপ অরাজক হইয়াছিল। ফরাসী রাজকর্মচারী সুপ্রসিদ্ধ ডুপ্লে এই সুযােগে ইংরাজদিগকে বিদূরিত করিয়া ভারতবর্ষে ফরাসী সাম্রাজ্যস্থাপনের সঙ্কল্প করিলেন। যদি ফরাসীরাজ তাহাকে যথাসময়ে সাহায্য করিতেন তাহা হইলে এই স্বপ্ন বােধ হয় সফল হইত। কিন্তু ডুপ্লে রাজকীয় সাহায্য পাইলেন না, কাজেই সিদ্ধকাম হইতে পারিলেন না। পক্ষান্তরে ইংরাজবীর ক্লাইব তাঁহারই পদাঙ্কামুসরণ করিয়া ইংল্যারাজের সহায়তায় ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করিলেন। কিন্তু এশিয়ায় রাজ্যলাভের পরেই আমেরিকায় রাজ্যক্ষয় হইল ; বার্জিনিয়া প্রভৃতি ত্রয়ােদশটী উপনিবেশ স্বাধীনতা অবলম্বন করিল। ইংরাজেরা উপনিবেশ- স্থাপনে সিদ্ধহস্ত হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু কিরূপে ঔপনিবেশিকদিগকে সন্তুষ্ট রাখিতে হয় তাহা তখনও শিখিতে পারেন নাই। তাঁহারা ঔপনিবেশিকদিগকে নিতান্ত অধীন বিবেচনা করিতেন এবং এই সংস্কারের বশবর্তী হইয়া তাঁহাদিগের সম্মতি ব্যতিরেকেই তাহাদিগের নিকট হইতে করগ্রহণের চেষ্টা করিয়াছিলেন। কিন্তু ঔপনিবেশিকেরাও ইংরাজ; এবং ইংরাজ রাজনীতির চিরন্তন ধৰ্ম্ম এই যে, কি উপায়ে ও কি পরিমাণে কর আদায় করিতে হইবে, কিরূপেই বা উহার ব্যয় হইবে তাহা নির্ধারণের ক্ষমতা প্রজার। কাজেই ইংল্যান্ডের এই রীতিবিরুদ্ধ চেষ্টায় বার্জিনিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের ঔপনিবেশিকেরা বিদ্রোহী হইলেন এবং দশবর্ষব্যাপী যুদ্ধের পর স্বাধীনতা লাভ করিলেন। এই ত্রয়ােদশটা উপনিবেশই ক্রমে আধিপত্য বিস্তার- পূৰ্ব্বক বর্তমান যুনাইটেড ষ্টেট নামক বিশাল দেশে পরিণত হইয়াছে। রাজ্যক্ষয় হইল বটে, কিন্তু তাহাতে লাভও হইল; ইংল্যাণ্ডের রাজপুরুষের। শিক্ষা পাইলেন যে, উপনিবেশগুলিকে বশে রাখিতে হইলে তাহাদিগকে স্বায়ত্ত শাসন দেওয়া আবশ্যক। উপনিবেশ-রক্ষাসম্বন্ধে বর্তমানকালে ইংরাজের এই উদারনীতিই অবলম্বন করিয়াছেন। রুনাইটেড, ষ্টেটস হস্তলিত হইবার অল্পদিন পরেই ইংরাজের। অষ্ট্রেলিয়ায় উপস্থিত হইলেন (১৭৮৭)। অষ্ট্রেলিয়া তখন কোন সভ্যজাতির অধিকারভুক্ত ছি ; ফরাসীরা উহাকে আপনাদের করায়ত্ত করিবার মানস করিয়াছিলেন বটে ; কিন্তু ইংরাজের ক্ষিপ্ৰকারিতায় তাহারা সে সুযােগ পাইলেন না। ইংরাজেরা ইহার পর নিয়ুজিল্যান্ড দ্বীপেও উপনিবেশ স্থাপন করিলেন। আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তবর্তী কেপ, কলােনি (অন্তরীপ উপনিবেশ) পূর্বে ওলন্দাজদিগের ছিল; কিন্তু তাহারা ইংরাজশ নেপােলিয়নের পক্ষাবলম্বন • বৃটিশ সাম্রাজ্য। ৪৭ • ছিলেন বলিয়া ইংরাজেরা উহা অধিকার কয়েন (১৮১৪ )। মিশর দেশও ১৮৮২ অফে ইংরাজদিগের রক্ষণাবেক্ষণে আনীত হয়। আফ্রিকার আরও অনেক অংশ তখন পর্যন্ত অসভ্য জাতির অধিকারেই ছিল ; কোন কোন য়ুরােপীয় জাতি সেগুলি বিনা বিবাদে আপনাদের মধ্যে ভাগ করিয়া লইলেন। এই সময়ে ইংরাজের জাৰ্মাণদিগের সহিত অতি উদার ব্যবহার করিয়াছিলেন। কারণ আফ্রিকার মানচিত্রে যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলন্বয় জাৰ্মাণদিগের অধিকারভুক্ত বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়া থাকে, ইংরাজের আনুকুল্য বিনা তাহারা তথায় প্রবেশ করিতে পারিতেন কি না সন্দেহ। উপরে যাহা বলা হইল তাহা হইতে বুঝা যাইতেছে যে, ইংরাজেরাও সময়ে সময়ে পররাজ্য গ্রহণ করিয়াছেন। কেহ কেহ হয়ত বলিবেন ইংরাজেরা ফরাসী- দিগের আমেরিকাস্থ উপনিবেশগুলি এবং ওলন্দাজদিগের কেপ, কলােনি আত্মসাৎ করিয়া কঠোরতার পরিচয় দিয়াছেন। কিন্তু তদানীন্তন ফরাসী ও ওলন্দাজ রাজপুরুষদিগের আচরণ স্মরণ করিলে দেখা যাইবে যে, ন্যায়ানায়জ্ঞানে ইংরাজের তাঁহাদের উচ্চকক্ষ না হউন, নীচকক্ষ ছিলেন না; তবে তাহার সিদ্ধিলাভ করিতে পারেন নাই, কিন্তু ইংরাজের সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন এই মাত্র প্রভেদ। অধিকন্তু জয়লকরিয়াও ইংরাজ যেমন অল্পে তুষ্ট, অন্যে সেরূপ নহেন। বিজিতরাজ্য পুনরর্পণ করিতে ইংরাজ মুক্তহস্ত। উদাহরণস্বরূপ যবদ্বীপের কথা বলা যাইতে পারে। ইংরাজেরা ইহা জয় করিয়াও ১৮১৮ অকে ওলন্দাজদিগকে ফিরাইয়া দিয়াছিলেন। যবদ্বীপ এখন ওলন্দাজজাতির সর্বোৎকৃষ্ট বৈদেশিক অধিকার। যাহা হউক, ইংরাজেরা কি উপায়ে তাহাদের বিশাল সাম্রাজ্য অর্জন করিয়া- ছেন, এখন তাহার বিচার নিপ্রয়ােজন। এখন দেখিতে হইবে কি রূপে তাহারা প্রজাপালন করিয়াছেন, কি রূপে তাহাদের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়ােগ করিতেছেন। রাজা প্রাহিতপর ও প্রজাপালক না হইলে উহার রাজা নাম সার্থক হয় না। ইংরাজ একদা প্রজারঞ্জনে অসমর্থ হইয়াছিলেন বলিয়াই বার্জিনিয়া প্রভৃতি ত্রয়ােদশটী দেশের আধিপত্য হইতে বঞ্চিত হইয়াছিলেন । কিন্তু তাহার পর হইতে ইংরাজ প্রজারঞ্জক হইয়াছেন। ইংরাজের আশ্রয়ে সুখে আছে বলিয়াই কি কানাডায়, কি আফ্রিকায়, কি অষ্ট্রেলিয়ায়, কি ভারতবর্ষে—আজ সকলে প্রাণপণে ইংরাজের দোসর হইয়া শত্রুদমনে প্রবৃত্ত হইয়াছে। বস্তুতঃ ইংরাজসাম্রাজ্য তরবারির সাহায্যে অর্জিত হইলেও এখন আর তরবারির সাহায্যে শাসিত নহে। রাজ্যশাসনে দণ্ডনীতির রাজ্যশাসনে দণ্ডনীতির সম্পূর্ণ পরিহার অসম্ভব ; তথাপি ইংরাজরাজপুরুষেরা ভীতি অপেক্ষা প্রীতিরই অধিক উপযােগিতা উপলব্ধি করেন এবং যতদূর সম্ভব প্রজার সন্তোষসাধনে যত্নশীল থাকেন। তাঁহাদের বিশাল ৪৮ চতুর্থ অধ্যায়। সাম্রাজ্যে বহুজাতির ও বহুসম্প্রদায়ের বাস ; ইহাদের মধ্যে সময়ে সময়ে স্বার্থসঙ্ঘর্ষ অনিবাৰ্য, কাজেই সকলকে তুষ্ট রাখিয়া শাসনদণ্ড পরিচালন দুষ্কর। কিন্তু ইংরাজ অদ্ভুত ধীরতার সহিত এই কঠোর কর্তব্যে ব্রতী হইয়াছেন,—যতদূর সম্ভব কোন সম্প্রদায়ের, কোন জাতিরই ধৰ্ম্মে বা আচারে অনুষ্ঠানে হস্তক্ষেপ করিতেছেন না। অধিকন্তু ইংরাজের সাম্রাজ্য যে কেবল ইংরাজেরই ইষ্টসিদ্ধির জন্য তাহাও নহে। উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ হইতে ইহার সর্বত্র অবাধ বাণিজ্য চলিয়া অবাধ বাণিজ্য জাতীয় ঐশ্বর্যের অনুকূল বা প্রতিকুল তাহা এখানে বিচাৰ্য্য নহে, কিন্তু ইহা যে ইংরাজদিগের ঔদার্যের পরিচায়ক তাহাতে সন্দেহ নাই। অবাধ বাণিজ্য প্রতিযােগিতার প্রশস্ত ক্ষেত্র ; যে ভাল জিনিস সস্তায় বেচিবে সেই এ ক্ষেত্রে বিজয়ী হইবে। কিন্তু রাজকীয় সাহায্য পাইলে লােকে অবাধ বাণিজ্যেও অসাধু ব্যবহার করিতে পারে। জাৰ্ম্মাণির বণিকেরা রাজার নিকট অর্থসাহায্য পাইয়া অনেক দ্রব্য এত অল্পমূল্যে বিক্রয় করিয়াছেন যে, তাহাতে ইংরাজের কোন কোন ব্যবসায় মাটি হইয়াছে। কিন্তু ইংরাজদিগের স্বাবলম্বনবৃত্তি এতই প্রবল যে, তাহারা রাজকীয় সাহায্য জয় লাভ করিতে চান না, পরাভূত হইলেও ক্ষুন্ন হন না-বুঝিতে পারেন নিজের দোষেই হারিয়াছেন। অবাধ বাণিজ্য শান্তির নিত্যসহচর। শান্তির সময় শিল্পী হউক, বণিক হউক, সকল দেশের লােকেই ইংরাজরাজ্যে প্রবেশ করিয়া স্বস্ব ব্যবসায় চালাইতে পারে, তজ্জন্য কাহাকেও অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হয় না, কোন বিশিষ্ট নিয়মেও নিবন্ধ হইতে হয় না। এই উদারনীতির মাহাত্ম্যে আজ পৃথিবীর অধিকাংশ লোক ইংরাজের হিতৈষী; নচেৎ এখন যে মন জাৰ্মাণদিগকে দমন করিবার জন্য বহু শক্তির সম্মেলন হইয়াছে, এতদিন ইংরাজের বিরুদ্ধেও সেইরূপ চেষ্টা হইত। জাৰ্মাণসাম্রাজ্যে কিন্তু ইহার বিপরীত ভাব। সেখানে বিদেশী লােকের স্থান নাই বললেই চলে। কাজেই জার্মাণির পক্ষে অধিক সেনাবল আবশ্যক । পক্ষান্তরে ইংরাজসাম্রাজ্য শান্তিরূপ ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত বলিয়া এখানে ইতঃপূৰ্বে সেনা ও সমরপােত, উভয়েরই পরিমাণ কমাইয়া দেওয়া হইয়াছিল । অনেকে এরূপ ভাবিয়াছিলেন, কালে এ সমস্ত যুদ্ধোপকরণের কিছুমাত্র প্রয়ােজন থাকিবে না। কিন্তু কালের কুটিগতিতে তাঁহাদের এ সুখস্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। কবিবর টেনিসন বাণিজ্যলক্ষ্মীকে শ্বেতাম্বরা ও শাস্তিদায়িনী বলিয়া বর্ণনা করিয়া গিয়াছেন; কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এখন আর তাহাকে এই বিশেষণদ্বয়ে বিভূষিত করা যায় না। Free Trade.

বৃটিশ সাম্রাজ্য। ইংরাজের বিরুদ্ধে অন্য জাতীয় লােকে হয় ত কিছু বলিলেও বলিতে পারে কিন্তু ন্যায়ানুসারে জার্মাণের কিছুই বলতে পারেন না। ইংরাজের সহিত ফ্রান্সের বহুবার সঘর্ষ হইয়াছে ; ইংরাজের প্রতিকূলচরণে বহুবার ফ্রান্সের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইয়াছে; কিন্তু জাৰ্ম্মাণির সম্বন্ধে ইংরাজ চিরদিনই উদার ব্যবহার করিয়াছেন জাৰ্মাণ বণিদিগের অসাধু ব্যবহারে ইংরাজের বাণিজ্যের ব্যাঘাত ঘটিয়াছে; ইংরাজ- বণিকেরা সেজন্য সময়ে সময়ে অসন্তোষ প্রকাশ করিয়াছিলেন; কিন্তু ইংরাজ- রাজপুরুষেরা জাৰ্মাণদিগের রাজ্যবিস্তার-চেষ্টায় প্রায় কখনও বাধা দেন নাই। জার্মাণেরা কেবল পারস্য উপসাগরের উপকূলভাগ ব্যতীত আর কোন স্থান দেখাইতে পারেন না, যেখানে ইংরাজ তাহাদিগকে প্রবেশ করিতে দেন নাই।

দ্বিতীয় খণ্ড। বর্তমান কথা। পঞ্চম অধ্যায়। সঙ্কট। বর্তমান শতাব্দীর প্রথম বার তের বৎসর য়ুরােপীয় জাতিবৃন্দের মধ্যে যে ঈর্ষানল ধূমায়মান হইতেছিল, এখন দেখা যাউক কিরূপে তাহা অকস্মাৎ সঙ্কুক্ষিত হইল। অনেকে মনে করেন এই মহাসমর মানবসমাজের কল্যাণার্থই উপস্থিত হইয়াছে। যুদ্ধ নাই, অথচ সকলেই যুদ্ধায়ােজনে ব্যস্ত ; সকল দেশেই অবিরাম উদবেগ, সকল দেশেই সমরােপকরণ-সংগ্রহে ও সমরপােত-নির্মাণে অসংখ্যকের নিয়ােগ ও প্রভূত অর্থব্যয় ; সকল দেশেই যুবক, বলিষ্ঠ ও কর্মক্ষম ব্যক্তিমাত্রেই কৃষিশিলাদি সমাজহিতকর ব্যবসায় ত্যাগ করিয়া কোথাও দুই, কোথাও তিন বৎসরের জন্য সামরিক শিক্ষালাভে নিহত এবং সৈনিকজীবনের সর্ববিধ ক্লেশ ভােগ করিতে বাধ্য—এরূপ কল্পিত শান্তি অপেক্ষা প্রকৃত যুদ্ধ বহুগুণে বাঞ্ছনীয়। অগ্নি জ্বলিয়াছে বলিয়াই আশা হয় ইহা শীঘ্র হউক, বিলম্বে হউক, পূর্ণনিৰ্বাণ প্রাপ্ত হইবে। তখন আবার শান্তি-সমীর বহিতে থাকিবে এবং তাহার সুশীতল স্পর্শে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা নব জীবন লাভ করিবে। নানা কারণে প্রায় প্রত্যেক জাতিরই বিশ্বাস জন্মিয়াছিল যে যুদ্ধ যখন অপরিহার্য্য, তখন ইহা যত শীঘ্র সংঘটিত হইবে, তাহাদের পক্ষে ততই সুবিধা। ইংরাজেরা দেখিলেন, জার্মাণেরা অবিরত নূতন নুতন রণপােত নিৰ্মাণ করিতেছেন এবং তাহাদিগকে অতিক্রম করিতে গিয়া ইংরাজজাতির কভার দুর্ববহ হইতেছে ; অপিচ জার্মাণির মুখ্য উদ্দেশ্য যখন ইংল্যাণ্ড আক্রমণ করা, তখন আত্মরক্ষার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক ইংরাজমাত্রকেই সামরিক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করিতে হইবে। এরূপ অপ্রীতিকর ফলভােগ অপেক্ষা সময় থাকিতে যুদ্ধ করিলেই মঙ্গল। ফরাসীরা দেখিলেন, ক্রমশঃ তাহাদের লােকসংখ্যা হ্রাস হইতেছে, কিন্তু জার্মাণির লােকসংখ্যা বৃদ্ধি হইতেছে, কাজেই যুদ্ধ ঘটিতে যত বিলম্ব হইবে, তাহাদের পরাজয়-সম্ভাবনাও সঙ্কট। তত অধিক হইবে। জাৰ্মাণেরা দেখিলেন, ইংল্যাণ্ড, ফ্রান্স, ও রুশিয়ার মধ্যে সৌহার্দসূত্র প্রতিদিন দৃঢ়তর হইতেছে ; ইহাদের যদি পূর্ণসম্মেলন হয়, তাহা হইলে কাৰ্মাণির লােকবল ও ধনবল যতই থাকুক না কেন, তাহাকে বিধ্বস্ত হইতেই হইবে। জাৰ্মাণসেনাকে সংখ্যায় অতিক্রম করা ফরাসীদিগের পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব। এই জন্য ১৯১৪ অব্দে ফরাসীরা বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষার কাল পূৰ্ব্বাপেক্ষা কিছু বৃদ্ধি করিলেন, কারণ তাহারা ভাবিলেন ইহাতে যােদ্ধাদিগের অধিকতর নৈপুণ্য জন্মিবে, যােগ্যতাধারা সংখ্যার হীনতাজনিত অভাবের পূরণ হইবে। ইহা দেখিয়া জন্মাণেরা তাহাদের স্থায়ী সেনায় আরও আড়াই লক্ষ নূতন লােক নিযুক্ত করিলেন এবং নূতন একটী শুল্ক বসাইয়া যুদ্ধের জন্য স্বতন্ত্র ধনভাণ্ডার প্রতিষ্ঠিত করিলেন। কলতঃ ফরাসী ও জাৰ্ম্মাণ উভয় জাতিই যথাসাধ্য সসজ্জ হইতেছিলেন। জার্মাণেরা যে ১৯১৪ অকেই যুদ্ধান্তের সঙ্কল্প করিয়াছিলেন ইহা নিশ্চিত বলা যায় না; তবে তাহারা সমস্ত আয়ােজন করিয়া রাখিয়াছিলেন, ভাবিয়াছিলেন, যখন সুযােগ পাইব, তখনই যুদ্ধ ঘােষণা করিব। সুযােগ শীঘ্রই উপস্থিত হইল। ১৯১৪ অব্দের ২৮শে জুন সারায়েবে নগরে এক যুবক অস্ট্রিয়ার যুবরাজের প্রাণসংহার করিল। এই লােকটা জাতিতে সার্বিয়ান হইতে অষ্ট্রিয়ারাজ্যেরই প্রজা; কাজেই সার্বিয়ার রাজপুরুষেরা যে ইহাকে উক্ত নৃশংসকাৰ্যে প্রবর্তিত করিয়াছিলেন, কেহই ইহা নিঃশংসয়ে বলিতে পারেন না। কিন্তু অষ্ট্রিয়ার সম্রাট, সার্বিয়াকেই দোষী স্থির করিলেন এবং সমগ্ৰ জাৰ্ম্মাণজাতি তাহার এই সিদ্ধান্ত অভ্রান্ত বলিয়া গ্রহণ করিলেন। তিনি ২৩শে জুলাই সার্বিয়া- রাজকে পত্র লিখিলেন : আমি জানিতে পারিয়াছি আপনার কতিপয় কর্মচারী এই উপাংশুহত্যার প্রবর্তক। অতএব ইহাদিগকে সমুচিত দণ্ড দেওয়া আবশ্যক। আপনার রাজ্যে আমার অনেক শত্রু আছে; ইহারা কায়মনােবাক্যে আমার অনিষ্টের চেষ্টা করিতেছে ; ইহাদিগের অনুসন্ধানার্থ আমার কয়েকজন কর্মচারী সার্বিয়ায় যাইবেন, এবং যাহাকে অপরাধী বলিয়া স্থির করিবেন, তাহাকে দণ্ড দিতে পারিবেন। আপনি পত্র প্রাপ্তিমাত্ৰ উত্তর দিবেন; বিলম্ব করিলে কিংবা কোন অংশে অসম্মতি প্রকাশ করিলে আমি আপনার সহিত যুদ্ধ করিব।” এই পত্র প্রকাশিত হইবামাত্ৰ সকলেই বুঝিল ইহার উদ্দেশ্য অপরাধীর বিধান নহে, সার্বিয়ার বিলােপসাধন। রুশরাজ বিষম সঙ্কটে পড়িলেন ; তিনি দেখিলেন সার্বিয়াকে রক্ষা করিতে না পারিলে তাহার পক্ষে বড় কলঙ্কের কথা; অন্যের কথা দূরে থাকুক, জাৰ্মাণেরাও তাঁহাকে কাপুরুষ বলিয়া ঘৃণা করিবেন। অথচ ফরাসী ও জাৰ্মাণেরা যুদ্ধার্থ যেরূপ প্রত, রুশেরা সেরূপ নহেন। জাপানের পঞ্চম অধ্যায়। ; সহিত যুদ্ধ করিয়া তাহাদের যে ক্ষতি হইয়াছিল, এখনও তাহার পূরণ হয় নাই। দেশে'কামান অতি অল্প, বড় কামান নাই বলিলেই হয়। এরূপ অবস্থায় জার্মাণি ও অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলে রুশিয়ার ভয়ানক অনিষ্ট হইবে। কিন্তু এ সমস্ত বুঝিয়াও তিনি আত্মমর্যাদা হারাইলেন না; অবিলম্বে জানাইলেন যে তিনি সার্বিয়ার সর্বনাশ হইতে দিবেন না। তবে, সার্বিয়াকে বলিলেন, “অষ্ট্রিয়া যাহা চাহিতেছেন তােমরা সবই স্বীকার করিতে পার; কিন্তু প্রাণ থাকিতে অষ্ট্রিয়ার কর্মচারীদিগকে সার্বিয়ায় প্রবেশ করিতে দিবে না। ইহাতেও যদি যুদ্ধ হয়, তাহা হইলে আমি তােমাদের সহায় হইব।” সার্বিয়ারাজ এই আশ্বাস পাইয়া অষ্ট্রিয়ার সম্রাটের পত্রের উত্তর দিলেন, বলিলেন, “অপরাধীদিগকে দণ্ড দিতে হয় ত আমিই দিব ; কিন্তু আপনার কর্মচারীরা যে আমার রাজ্যে আসিয়া বিচারকের ভার গ্রহণ করিবেন ইহা হইতে পারে না।” অস্ট্রিয়ার সম্রাট, আবার লিখিলেন, “তাহা না হইলে চলিবে কেন? আমার কৰ্ম্মচারীরা গিয়া দোষীর অনুসন্ধান ও দণ্ডবিধান করিবেন ইহাই ত প্রধান কথা।” অনন্তর তিনি আর কালক্ষেপ না করিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন। যুবরাপের সমস্ত জাতিই বুঝিতে পারিলেন, মহারণভেরী বাজিয়া উঠিয়াছে। জার্মাণেরা কি করিবেন এই প্রশ্নই প্রথম উপস্থিত হইল। কিন্তু জাৰ্মাণেরা নীর রহিলেন। ইংল্যাণ্ডের পররাষ্ট্রসচিব সা এডওয়ার্ড, গ্রে প্রস্তাব করিলেন, “আসুন, আমরা সকলে মিলিয়া এই বিবাদ মিটাইয়া দি”; কিন্তু জাৰ্মাণেরা ইহাতে সম্মতি দিলেন না। তাহাদের সহিত অষ্ট্রিয়ার রাজপুরুষদিগের এ সম্বন্ধে কি কথাবার্তা চলিতেছিল, অদ্যাপি তাহা জানা যায় নাই ; তবে ইহা নিশ্চয় যে তাঁহারা অস্ট্রিয়ার সম্রাটকে যুদ্ধ হইতে নিরস্ত করিবার চেষ্টা করেন নাই। সার্বিয়ারাজ যে উত্তর দিয়াছিলেন তাহা অত্যন্ত বিনয়সূচক ; উহাতে সন্তুষ্ট থাকিলে অস্ট্রিয়ার মৰ্যাদাহানি হইত না। জাৰ্মাণের। যদি অস্ট্রিয়ার সম্রাটকে এরূপ বুঝাইতেন, তাহা হইলে তিনি বােধ হয় ক্রোধ সংবরণ করিতেন। কিন্তু জাৰ্মাণেরা তাহা করিলেন না ; তাহারা বাহিরে মৌনভাব দেখাইলেন, কিন্তু মনে মনে ভাবিলেন, নরহাদিগের দমনচ্ছলে অস্ট্রিয়ার লােকে সার্বিয়া আক্রমণ করুক না কেন? রুশরাজ যদি সাবিয়ার সাহায্য করেন তাহা হইলে লােকে বুঝিবে যে তিনি নরহন্তারই পৃষ্ঠপােষক ; পরন্তু আমরা যদি অস্ট্রিয়ার সাহায্য করি তাহা হইলে যাহারা আমাদের নিতান্ত শক্ত, তাহারা ভিন্ন অন্য সকলেই মনে করিবে আমরা ন্যায়ের মর্যাদারক্ষাৰ্থ অস্ত্রধারণ করিয়াছি। কিন্তু জাৰ্মাণেরা যেরূপ আশা করিয়াছিলেন, অন্য সকলে সেরূপ বুয়ে নাই। তাহারা দেখিল অস্ট্রিয়ার সম্রাট একটা ছলমাত্র পাইয়া সার্বিয়া রাজ্য গ্রাস করিতে বসিয়াছেন এবং জার্মাণেরা তাঁহার এই অনাৰ্যসঙ্কল্পসিদ্ধির সহায় হইয়াছেন। তিনি সার্বিয়ারাজকে প্রথমে যে পত্র লেখেন, সম্ভবতঃ তাহা অগ্রে জাৰ্মাণ সম্রাটকে দেখাইয়াছিলেন। জাৰ্মাণেরা কিন্তু একথা স্বীকার করেন না। সে যাহা হউক, ইহা স্পষ্টই বুঝা গেল যে জাৰ্মাণজাতি বল্কান উপদ্বীপে এবং আসন্ন প্রতীচ্যখণ্ডে আধিপত্য স্থাপনার্থ বদ্ধপরিকর হইয়াছে। জার্মাণি ও রুশিয়ার মধ্যে কে প্রথমে সেনা-পরিচালন করিয়াছিলেন ইহা নিশ্চিত বলা যায় না। এ সম্বন্ধে প্রত্যেকেই অপরকে দোষী বলিয়া প্রতিপক্ষ করিতে চাচ্ছেন। কিন্তু ইহা জানা গিয়াছে যে, জাৰ্মাণেরা যুদ্ধান্তের অনেক দিন পূৰ্ব্ব হইতেই দূরদেশ হইতে আপনাদের সঞ্চিত সৈদিগকে স্বদেশে ফিরিতে আহ্বান করিয়াছিলেন এবং সর্বাপেক্ষা অধিক আয়ােজন করিয়া রাখিয়াছিলেন। সেনা-পরিচালন সম্বন্ধে যাহাই হউক, অপ্রয়ােগে তাঁহারাই অগ্রণীরূপে অবতীর্ণ হইলেন, কারণ যে মুহূর্তে অষ্ট্রিয়ার সেনা সার্বিয়া আক্রমণ করিল, প্রায় সেই মুহূর্তেই জার্মাণির সেনাও বেলজিয়ামে প্রবেশ করিল। ফরাসীদিগকে যে এই যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইতে হইবে ইহা পূর্ব হইতেই স্থির ছিল, কারণ সুন্ধির নিয়মানুসারে ফ্রান্স, রুশিয়ার সাহায্য করিতে বাধ্য। কিন্তু ইংল্যাও কোন পক্ষে যােগ দিবেন কি না তাহা নিশ্চিত ছিল না। সার্বিয়ার সম্বন্ধে ইংরাজ দিগের কোন ইষ্টানিষ্ট ছিল না; জার্মাণেরা ফরাসীদিগকে আক্রমণ না করিলে তাহাদিগকে ফরাসীদিগেরও কোন সহায়তা করিতে হইত না। জাৰ্মাণেরাও প্রথমে ফ্রান্স, আক্রমণ করেন নাই ; বরং ফরাসীরাই কুশিয়ার সাহায্যার্থে জাৰ্ম্মাণি আক্রমণ করিয়াছিলেন। এরূপ অবস্থায় ইংল্যাণ্ড উদাসীন থাকিলে কেহ তাহার দোষ দিতে পারিত না। তাহা বুদ্ধির কাৰ্য্য হইত কি না বলা যায় না; হয়ত ফ্রান্সের পক্ষে অবিচায়ের কাৰ্য্য হইত; কিন্তু ইংরাজেরা যে অঙ্গীকার-ভঙ্গ করিলেন এ কথা কেহ বলিতে পারিত না। ইংল্যাণ্ডের তদানীন্তন উদারনীতিক মন্ত্রীরাও যুদ্ধের পক্ষপাতী ছিলেন না। এদিকে জার্মাণেরা বলিয়া পাঠাইলেন, ইংল্যাণ্ড নির্লিপ্ত থাকিলে তাহারা ফরাসীদিগের পােতবাহিনী আক্রমণ করিবেন না, য়ুরােপখণ্ডস্থ কোন ফরাসীরাজ্যও অধিকার করিবেন না। কিন্তু তাহারা বেলজিয়ামের ঔদাসীন্যরক্ষা সম্বন্ধে কোন অভয় দিতে চাহিলেন না। অথচ ইহাই হইল ইংল্যান্ড ও জার্মাণির মধ্যে প্রধান তর্কের বিষয়। বেলজিয়ামের ঔদাসীন্য বলিতে কি বুঝায় তাহা পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে। ১৮৩৯ অব্দ হইতে যুগােপের সমস্ত প্রধান জাতিই স্বীকার করিয়া আসিতেছিলেন যে, বেলজিয়া কখনও ভিন্নদেশীয় লােকের যুদ্ধক্ষেত্র রূপে ব্যবহৃত হইবে না; সেখানে গিয়া যুদ্ধ করা দূরে থাকুক, কেহ ঐ দেশ আক্রমণ করিলেও অপর সকলে সমবেত ৬ ৫৪ পঞ্চম অধ্যায়। ; হইয়া উহার রক্ষা করিবেন। জার্মাণেরাও ঐ অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করিয়াছি লেন এবং অধুনাতনকালেও বেলজিয়ামকে এই আশ্বাসই দিয়াছিলেন। কিন্তু এখন তাহারা ইহা ফুৎকারে উড়াইয়া দিলেন, বলিলেন যে ফ্রান্স, আক্রমণ করিবার জন্য তাঁহারা বেলজিয়মের ভিতর দিয়া সেনা প্রেরণ করিবেন, বেলজিয়ামের রেলওয়েগুলিকে জাৰ্ম্মাণির সেনা ও যুদ্ধোপকরণ বহন করিতে হইবে এবং বেলজিয়ামের রাজপুরুষদিগকে খাদ্যাদি-সংগ্ৰহ-সম্বন্ধে প্রয়ােজনমত জাৰ্মাণির সহায়তা করিতে হইবে। এই অসম্ভাবিত প্রস্তাবে বেলজিয়ামবাসীরা বিষম সঙ্কটে পড়িলেন। ফরাসী- দিগের সহিত তাঁহাদের রক্তের সম্বন্ধ, অথচ হয় তাহারা সেই ফরাসীজাতির উচ্ছেদ- সাধনের সহায় হইবেন, নয় তাহাদের আপনাদের সর্বনাশ হইবে !—যে জাৰ্ম্মাণির নামে য়ুরােপ কম্পমান, তাহার বিপুল শক্তি প্রথমে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধেই প্রমুক্ত হইবে—হয়ত কালে আসাসের ন্যায় বেলজিয়ামও জার্মানির একটী পরাজিত প্রদেশ বলিয়া গণ্য হইবে! জার্মাণেরা তাহাদিগকে ভাবিবার সময় দিলেন না, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তর চাহিলেন। তখন পর্যন্ত ফ্রান্স, নিজেরই উদ্যোগ- পর্ব সমাপ্ত করিতে পারেন নাই; ইংল্যাণ্ড ত অপেক্ষাকৃত দূরেই অবস্থিত । এরূপ অবস্থায় কেহ যে যথাসময়ে বেলজিয়ামের সাহায্য করিতে পারিবেন রূপ সম্ভাবনাও ছিল না। কিন্তু বেলজিয়ামবাসীরা মনুষ্যত্ব হারাইলেন না ; তাহারা মুহূর্ত-মধ্যেই কর্তব্য স্থির করিয়া লইলেন, অস্ত্রগ্রহণপূর্বক জার্মাণির গতিরােধার্থ দণ্ডায়মান হইলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে বেলজিয়ামের এই অপূৰ্ব্ব স্বার্থত্যাগের কথা চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকিবে। বেলজিয়ামের ভাগ্যে কি ঘটিল তাহা পূর্বে বলা হইয়াছে। জার্মানির অন্যায়াচরণে ইংল্যাণ্ডের গন্তব্যপথ নির্ণীত হইল। ইংরাজ-রাজপুরুষেরা দেখিলেন তাহারা স্যায়তঃ ধর্মতঃ বেলজিয়ামের সাহায্য করিতে বাধ্য ; সমস্ত ইংরাজজাতি তাহাদের এই সিদ্ধান্তের অনুমােদন করিলেন—স্থির হইল বেলজিয়াকে আপাতত রক্ষা করিতে না পারিলেও যে ভাবেই হউক তাহার উদ্ধারসাধন করিতে হইবে এবং তাহার উপর যে অত্যাচার হইল তাহার প্রতিশােধ লইতে হইবে। মুলােপের এই দুঃসময়ে জার্মাণেরা যে অন্যায় ব্যবহার করিয়াছিলেন এবং যে সকল ভ্রমে পতিত হইয়াছিলেন, সম্ভবতঃ এখন তাহারা সেজন্য অনুতপ্ত। তাহারা ইটালিকে জিজ্ঞাসা না করিয়াই যুদ্ধাৰম্ভ করিয়াছিলেন, কাজেই ইটালির অসন্তোষ ভাজন হইয়াছিলেন। ইংরাজেরা যে উদাসীন থাকিবেন ইহা মনে করাও বুদ্ধিমানের কাজ হয় নাই। তাহাদের বুঝা উচিত ছিল যে, ৰেজিয়া আক্রমণ করিলে বর্তমানকালের যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধকৌশল। প্রকারান্তরে ইংল্যাণ্ডকেই যুদ্ধে আহ্বান করা হইবে। তাহারা ভাবিয়াছিলেন যে যুদ্ধাৰম্ভ হইলে ব্রিটিশসাম্রাজ্যের নানা অংশে বিদ্রোহ দেখা দিবে, কারণ মুষ্টিমেয় কতিপয় অসন্তুষ্ট ইংরাজ প্রজা এতদিন তাহাদিগকে এইরূপ আশ্বাস দিয়াছিল। অপিচ তাহারা স্বপ্নেও ভাবেন নাই যে বেলজিয়ামের ন্যায় একটা নগণ্যদেশের অধিবাসীরা তাহাদের বিপুলবাহিনীর পরিপন্থী হইতে প্রতিজ্ঞারূঢ় হইবে। জার্মাণেরা যে এরূপ ভ্রমপ্রমাদে পতিত হইয়াছিলেন ইহা বড়ই বিস্ময়ের কথা, কারণ অন্যান্য বিষয়ে তাহারা অতি দূরদর্শিতারই পরিচয় দিয়াছিলেন। যুদ্ধের জন্য যাহা আবশ্যক তাহারা পূর্ব হইতেই তাহা পৰ্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করিয়াছিলেন বিপক্ষের শক্তিসামর্থ্য সম্বন্ধে যাহা জানিতে হয় তাহারা তন্ন তন্ন করিয়া তাহার সন্ধান লইয়াছিলেন ; কোন দেশে কত যােদ্ধা, তাহাদের অস্ত্রশস্ত্র কিরূপ এ সমস্ত তাহাদের নখদর্পণে ছিল। কিন্তু মানবচরিত্র ও মানবহৃদয় সম্বন্ধে তাহারা অতি অপসিদ্ধান্তেই উপনীত হইয়াছিলেন। } ষষ্ঠ অধ্যায়। (ক) বর্তমানকালের যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধকৌশল। যুদ্ধকৌশল প্রধানতঃ দ্বিবিধ। প্রথমতঃ, শক্রর সহিত সঘর্ষ হইবার পূর্বে সেনাপতিকে এমন সুদক্ষভাবে সেনা পরিচালন করিতে হইবে যে তিনি যেন অপেক্ষাকৃত সুবিধাকর স্থানটীতে অবস্থিতি করিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, শত্রুর সহিত যখন প্রকৃত সঘর্ষ ঘটিবে, তখন এমন ভাবে বহগঠন, আক্রমণ ও আত্মরক্ষা করিতে হইবে যে, স্বপক্ষের যেন যতদূর সম্ভব অল্প এবং বিপক্ষের যেন যতদূর সম্ভব অধিক ক্ষতি হয়। প্রথম কৌশলটা চিরদিনই প্রায় একরূপ রহিয়াছে। সেনাপতিরা ক্ষিপ্রতার সহিত এবং শত্রুপক্ষের অগােচরে সেনা-পরিচালন করেন এবং যেখানে শক্রর বল অল্প আছে বুঝিতে পারেন সেখানে আত্মবল বৃদ্ধি করিতে যত্নশীল হন। পূৰ্ব্বে সৈন্যগণ পদব্রজে যাতায়াত করিত; এখন রেলওয়ের সাহায্যে যাতায়াত করিতেছে। যুলকাপের অনেকগুলি রেলওয়ে কেবল সেনা-পরিচালনার্থই নিৰ্ম্মিত। জার্মাণের যুদ্ধান্তের পূর্বেই বেলজিয়ামের সীমান্ত পৰ্যন্ত অনেক রেলওয়ে নির্মাণ করিয়া রাখিয়াছিলেন বলিয়া এত শীঘ্র ঐ রাজ্য আক্রমণ করিতে পারিয়াছিলেন। কখনও না কখনও কাজে লাগিবে বলিয়া তাহার পুরাতন এঞ্জিনগুলি পৰ্যন্ত সযত্নে রক্ষা করিছিলেন। অধুনা ক্ষিপ্রগতির আর একটী সহায় হইয়াছে মােটর গাড়ী। রেলগাড়ী যষ্ঠ অধ্যায়। চালাইবার জন্য পৃথক রেলপথ নির্মাণ করা আবশ্যক, কিন্তু তাহা সময়সাপেক্ষ। পক্ষান্তরে মােটর গাড়ী সাধারণ রাজপথ দিয়াই যাতায়াত করিতে পারে। বর্তমান যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই বহুসৈন্য ও তাহাদের খাদ্যাদি উপকরণ মােটর গাড়ীতে প্রেরিত কানের যুদ্ধান্ত্রের পরিবর্তনবশতঃ যুদ্ধসংক্রান্ত দ্বিতীয় শ্রেণীর কৌশলেরও অনেক পরিবর্তন ঘটিয়াছে। প্রাচীন কালের কথা ছাড়িয়া দাও, কারণ তখন ত লােকে ইট পাটকেল ছুড়িয়া যুদ্ধ করিত বা ধনুর্বাণ ব্যবহার করিত। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগেও যােদ্ধাদিগের হাতে যে বন্দুক থাকিত, তাহাতে সীসের গুলি ও বারুদ পূরিতে হইত এবং তাহার পাল্লা ছিল বড় জোর দেড় শ হাত। কাজেই দুই দলে খুব কাছাকাছি না হইলে কেহই কাহারও বেশি ক্ষতি করিতে পারিত না। খুব কাছাকাছি হইলে যােদ্ধারা বন্দুকের পরিবর্তে সঙ্গীন চালাইত। এখন আক্রান্তপক্ষ সুদৃঢ় স্থানে অবস্থান করিলে আক্রমণকারীদিগের বড়ই বিপত্তির কথা। কিন্তু বন্দুকের পাল্লা এত অল্প ছিল বলিয়া আক্রমণকারীদিগকে তখন এরূপ অসুবিধা ভােগ করিতে হইত না। তখনকার কামানগুলিও বর্তমান সময়ের কামানের তুলনায় অতি নিকৃষ্ট ছিল। তখন এক একটা নিরেট লৌহপিণ্ড গােলারূপে ব্যবহৃত হইত এবং কামানের মুখ দিয়া উহা পূরিতে হইত। পালাও তখন অনেক অল্প ছিল । ফলতঃ তখন কামানের নাম যত ভয়াবহ ছিল কাজ তত ভয়াবহ ছিল না। কিন্তু এখন আগ্নেয়াস্ত্রের কি বিস্ময়কর পরিবর্তনই ঘটিয়াছে। পুরাতন বন্দুকের পরিবর্তে প্রথমে রাইফল বন্দুক দেখা দিল ; উহার চুঙ্গির ভিতর পেঁচ কাটা; গুলি চুড়িলে তাহা ঘুরিতে ঘূরিতে বাহির হইয়া যায়, কাজেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হইবার সম্ভাবনা কম ক্রমে রাইলেরও উন্নতি হইল, টোটা মুখের দিক হইতে না দিয়া পশ্চান্দি হইতে পূরিবার কৌশল বাহির হইল*, এবং তাহার পর টোটা রাখিবার জন্য উহার সহিত একটী ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ এমন ভাবে সংযােজিত হইল যে কল টিপিবামাত্র একটা গুলি যেমন বাহির হইয়া যায়, অমনি প্রকোষ্ঠ হইতে আর একটা টোটা আসি চুঙ্গির মধ্যে প্রবেশ করে। আবিক্রিয়াশীল শিল্পীরা ইহাতেও নিরস্ত হইলেন ; তাহারা পরিশেষে যান্ত্রিক বন্দুক প্রস্তুত করিলেন। যেমন নলের মুখ দিয় জলধারা বাহির হয়, যান্ত্রিক বন্দুকের মুখ দিয়াও সেইরূপ নিরন্তর গুটিকাস্রোত নিঃসারণ করা যায়। • এই বন্দুকের নাম Breechloader. + এই বন্দুকের নাম Magazine ride. Machine-gun.

বর্তমানকালের যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধকৌশল। সেকালে অঙ্গারচুর্ণ ও যবক্ষারের সংঘােগে বারুদ প্রস্তুত হইত; একালে তাহার পরিবর্তে নবাবিষ্কৃত নানারূপ এস্ফোটন ব্যবহৃত হইতেছে। অধিকাংশ প্রটেনের প্রধান উপাদান বিশুদ্ধ বলা ও যবক্ষা। + প্রস্ফোটন মাত্রেই দহনকালে ধুমহীন এবং বারুণ অপেক্ষা শতগুণে শক্তিমান্। আগ্নেয়াস্ত্রের এবংবিধ উন্নতিবশতঃ এখন লােকে বিপক্ষের দৃষ্টিগােচর শ হইয়াও অজস্ব অখিবৰ্ষণ করিতে পারে। কোন পক্ষেই শত্রুর মুখ পর্যন্ত দেখে নাই, অথচ ভীষণ যুদ্ধ হইয়া গিয়াছে, বর্তমান কালে এরূপ ঘটনা বিরল নহে। ইহাতে আক্রান্তপক্ষেরই অধিক সুবিধা হইয়াছে। যাহারা আক্রমণ করে তাহাদিগকে বহুক্ষণ শত্রুপক্ষের অগ্নিবৃষ্টি ভােগ করিতে হয়। তাহারা অগ্রসর হইবার সময় দৃষ্টিগােচর না হইয়া পারে না; পক্ষান্তরে আক্রান্তপক্ষ লুক্কায়িত থাকিয়াই তাহাদের সংহার করিতে পারে। এই নিমিত্ত এখন আক্রমণার্থ রাত্রিকালই প্রশস্ত। কিন্তু দিবাযুদ্ধও যে না হয় তাহা নহে। বর্তমান সময়েই দেখা গিয়াছে বিপক্ষকে অবসক্স করিবার মানসে সেনাপতিরা বহু ক্ষতি স্বীকার করিয়াও দিবাভাগেই আক্রমণ করিয়াছেন। এখন সেনারক্ষার প্রধান সাধন কুল্যা । বন্দুকের সন্ধান এখন এমন অব্যর্থ এবং হারিণীশক্তি এত অধিক যে, শত্রুর লক্ষীভূত হইলে মৃত্যু অপরিহার্য। কাজেই যুদ্ধক্ষেত্রে লােকে যখন আক্রমণবিরত থাকে, তখন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কুল্যা খনন করিয়া তাহার মধ্যে প্রবেশ করে। কোন পক্ষ ক্ষীণবল হইয়াও যদি কোন স্থান কিয়ৎকালের জন্য স্বাধিকারে রাখিতে চায় তাহা হইলেও কুলার আশ্রয় লয় । তাহারা কুল্যার পুরােভাগে লৌহকপ্টকযুক্ত তারের বৃতি নির্মাণ করে এবং উপরিভাগ ঢাকা দেয়। এরূপ স্থান অধিকার করিবার জন্য পদাতিপ্রেরণ আবশ্যক হইলে পূর্ব হইতে কামান দাগিয়া পথ পরিষ্কার করিতে হয়। কুল্যার এতাদৃশী উপযােগিতা আছে বলিয়া এখন প্রত্যেক যােদ্ধার সঙ্গে একখানা ছােট কোদালি থাকে। পূর্বে বন্দুকের উন্নতির কথা বলা গিয়াছে। কামানেরও এখন যথেষ্ট উন্নতি হইয়াছে। এখন কামানের পশ্চাদ্ভাগ হইতে গােল পূরা যায় ; এখন কামানের পাল্লা অন্তত তিন মাইল এবং সন্ধান অব্যর্থ। কামানের গােলা পূর্বে ছিল নিরেট, এখন হইয়াছে ফাঁপা। ফাঁপা গােলার ভিতর প্রস্ফোটন থাকে ; উহা কোন পদার্থের উপর পড়িবামাত্র মহাশব্দে বিদীর্ণ হয় এবং নিকটে যাহা পায় চূর্ণ-বিচূর্ণ এক প্রকায় গােল আবার এমন সুকৌশলে নির্মিত যে দাগিবার পর করে। * Explosive. Trench. + Glycerine and nitric acid. ৪ ফোটনপুর্ণ ফাঁপা গােলর ইংরাজি নাম Shell.

৫৮ যষ্ঠ অধ্যায়। । শূন্তেই থাকুক বা ভূতলেই পড়ক, নির্দিষ্ট কয়েক বিপলের মধ্যে ফাটিবেই কাটবে। ইহাদের অভ্যন্তরভাগ ছােট ঘােট গুটিকায় পূর্ণ; বড় গােলটা ফাটিয়া গেলে গুটিকাগুলি মহাবেগে চতুর্দিকে প্রক্ষিপ্ত হয় এবং তাহাদের আঘাতে অনেক লোেক মারা যায়। কুল্যা বিধ্বস্ত করিবার জন্য এইরূপ কামানই বেশী কাজে লাগে। দুর্গ বিধ্বস্ত করিবার নিমিত্ত আবার অন্যরূপ গােলা আবশ্যক। আক্রান্ত দেশের অধিবাসী সংখ্যায় দুর্বল হইলে দুর্গের মধ্যে আশ্রয় লয় ; কাজেই আক্রমণ কারীদিগকে দুর্গগুলি অধিকার করিতে হয়, নচেৎ তাহারা যেমন অগ্রসর হইবে, অমনি দুর্গন্থ শত্রুগণ তাহাদিগকে পশ্চাদ্ভাগ হইতে আক্রমণ করিবে, রসদ-সংগ্রহেও বাধা দিবে। ১৮৭০ অব্দে ফরাসীরা যখন জাৰ্মাণদিগের সহিত যুদ্ধে পরাস্ত হন, তখনই তঁাহারা নিজেদের দুর্বলতা বুঝিয়া সীমান্ত প্রদেশে সুদৃঢ় দুর্গরাজি নির্মাণ করিয়াছিলেন। বেলজিয়ামেও অনেক দুর্গ ছিল। এই নিমিত্ত অনেকে মনে করিয়া- ছিলেন, বেলজিয়ামের ভিতর দিয়া অগ্রসর হইবার সময়ে জাৰ্মাণদিগকে তত্রত্য দুর্গগুলি ও হস্তগত করিতে হইবে,কাজেই ফ্রান্স, আক্রমণ করিতে কালক্ষেপ ঘটবে। টসেলিন্। কিন্তু জাৰ্মাণের। পূৰ্ব্ব হইতেই ইহার ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছিলেন। তাঁহার হাউইজার নামক প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কামান দ্বারা বেলজিয়ামের দুর্গ ধ্বংস করিলেন। এই সকল কামান হইতে বড় বড় গােলা বহু উর্ধে নিক্ষেপ করা যায়। গােল যখন দুর্গোপরি পতিত হইয়া মহাবেগে ফাটিয়া যায়, তখন ইটই বল, পাথরই বল, যাহা কিছু নিকটে পায়, সমস্ত চুরমার করিয়া ফেলে। জাৰ্মাণদিগের নিকট বেলজিয়ামের মানচিত্র ছিল। তাহারা উহার সাহায্যে লক্ষ্য স্থির করিয়া প্রায় দশ মাইল দুর হইতে হাউইটজার দাগিয়াছিলেন। এরূপ কামানের সহিত প্রতিযােগিতা করিতে পারে, ফ্রান্সের ও বেলজিয়ামের তখন এত সাধ্য ছিল না। কিন্তু তখন দুর্গে অধিক সেনা ছিল না বলিয়া এই দুই রাজ্যের তত লােকয় হয় নাই। সকল দেশেই স্থলসেনা কতকগুলি অঙ্গে বিভক্ত। প্রাচীন ভারতবর্ষে সেনার * এইরূপ গােলার ইংরাজী নাম Shrapnel shell.

বর্তমানকালের যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধকৌশল। ছিল চারিটা অঙ্গ। ইদানীন্তন কালে যুবােপীয় সেনার ছিল তিনটা অঙ্গ-জন্ম, পদাতি ও গােলন্দাজ। অধুনা বিমান ইহার চতুর্থ অঙ্গ হইয়াছে। বিমান প্রধানতঃ দুই প্রকার--তলােপস্থাপিত বিমান এবং টসেপলিন বা বৃহদবিমানী। টসেপলিন কেবল জাৰ্ম্মাণিতেই ব্যবহৃত হয়। তত্য একজন সন্ত্রান্ত ভূম্যধিকারী সর্বপ্রথম এই যন্ত্র প্রস্তুত করেন এবং তাঁহারই নামানুসারে ইহার নামকরণ হইয়াছে। ইহার নির্মাণকৌশল এই একটা প্রকাণ্ড ধাতু নির্মিত কোষের মধ্যে কতকগুলি বেলুন থাকে এবং উহার অপােদেশে একখানি বা দুইখানি শকট প্রলম্বিত হয়। বেলুনগুলি বিমানখানিকে আকাশে তুলে এবং যন্ত্রচালিত ব্যজনের সাহায্যে বিমানখানি নানাদিকে যাইতে পারে। টসেপলিনের গতি প্রতিদিন প্রায় হাজার মাইল। ইহার ভারবহন ক্ষমতাও যথেষ্ট। জার্মাণিরা এই সকল বিশাল বিমান হইতে প্রস্ফোটন বর্ষণ পূর্বক লণ্ডন ও পারিশ ধ্বংস করিবেন ভাবিয়াছিলেন, কিন্তু এপর্যন্ত কৃতকাৰ্য হইতে পারেন নাই। টসেপলিনের বিশাল আয়তনই অনেক সময়ে ইহার বিনাশের কারণ। তলােপস্থাপিত বিমান ইহার প্রধান শত্রু। ফলতঃ আকাশমার্গে টসেপলিন অপেক্ষা তলােপস্থাপিত বিমানগুলিই অধিক কৃতিত্ব দেখাইয়াছে। li; তলােপস্থাপিত বিমান। বিমানবিহারী যোদ্ধারা উভয়পক্ষেই অসামান্য সাহস ও নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়াছেন। তবে ইংরাজের এপর্যন্ত বিমানবাহিনীর কোন অপপ্রয়ােগ করেন নাই। তাহার জাৰ্মাণদিগের কোন গ্রাম নষ্ট করেন নাই, নিরীহ নাগরিকদিগেরও প্রাণসংহার করেন নাই। তাহারা শত্রুপক্ষের দুর্গরক্ষিত স্থানের উপর প্রস্ফোটন বর্ষণ করিয়াছেন বটে; কিন্তু ইহা বৈধ ; দুর্গলােকে গুলি ছুড়িয়া বিমানবিহারী- দিগকে নষ্ট করিতে পারে। পক্ষান্তরে গ্রামবাসীদিগের পক্ষে এরূপ আততায়ীকে নিরস্ত করিবার কোন উপায় নাই। অথচ জার্মাণের। টসেপলিনের সাহায্যে ইংল্যাণ্ডের অনেক গ্রাম নষ্ট করিয়া কলঙ্ক অর্জন করিয়াছেন। ; the Aeroplane. + Zeppelin.

যষ্ঠ অধ্যায়। বিমানবিহারীরা এমনই নিপুণ যে, তাহারা শত শত মাইল দূরন্থ জাৰ্মাণ দুর্গ নষ্ট করিয়া প্রায় প্রতিবারই নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। আকাশে যখন বিমানে বিমানে যুদ্ধ ঘটে, তখন পুরাণবর্ণিত যুদ্ধকাহিনী মনে পড়ে। ব্যক্তিগত বিক্রম দেখাইবার এমন সুবিধা আর কোথাও নাই। বর্তমান কালে নৌযুদ্ধেও অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। ইহার তুলনায় নেলসন প্রভৃতি নৌসেনাপতিদিগের কাজ যেন অতি সহজ ছিল বলিয়া মনে হয়। তাঁহাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিপক্ষের বাহিনী কোথায় আছে তাহা জানা, এবং বিপক্ষবাহিনীর প্রতিবাত স্থানে আপনাদের বাহিনীর সংস্থান করা। সেনাপতির কাৰ্য্য ইহাতেই পরিসমাপ্ত হইত। অতঃপর নাবিকেরা বিপক্ষবাহিনীর নিকটে গিয়া গােল পূরিতে ও কামান দাগিতে প্রবৃত্ত হইত। যতক্ষণ না একপক্ষ বিধ্বস্ত হইত ততক্ষণ এই কাণ্ড চলিত। এখন যন্ত্রের যুগ ; এখন রণপাধ্যক্ষকে প্রায় প্রতিপদে যন্ত্রের সাহায্যে চলিতে হয়। তাঁহার উৰ্দ্ধদেশে, অধােদেশে, চারিদিকে, সর্বত্রই বিপ। সেকালের রণপােত ছিল কাষ্ঠ'নর্মিত ; এখনকার রণপােত লৌহনিৰ্ম্মিত এবং আয়তনে বহু গুণ বৃহত্তর,-যেন একটা বিশাল প্লবমান দুর্গ। রণপােতের কামানগুলিও প্রকাণ্ড এক একটার মুখের ব্যাস তের হইতে ষােল ইঞ্চি এবং পাল্লা প্রায় শইল ইহাদের সাহায্যে যে সকল প্রস্ফোটনপূর্ণ গােল। নিক্ষিপ্ত হয় তাহাদের এক একটার ওজন পাঁচ ছয় মােণ। সমস্ত কামানই এখন যন্ত্রদ্বারা চালিত এবং এই সকল যন্ত্রের কোন কোন অংশ ঘটিকাযন্ত্রের ন্যায় সূক্ষ্ম, অথচ এমন দৃঢ় যে সহজে নষ্ট হয় না। সর্বাপেক্ষা বৃহৎ রণপােতগুলির নাম ‘ড্রেডনট’ অর্থাৎ অকুতােভয়। ড্রেড নটের সমস্ত কামানই বড় ; একটাও ছােট কামান নাই। ভেনট অপেক্ষা একটু ছােট রণপােতগুলি যুদ্ধ কুজার নামে অভিহিত। ইহার অতি দ্রুতগামী-ঘন্টায় প্রায় ত্রিশ মাইল বেগে ছুটিতে পারে। নৌসেনাবৃত্তিতে নৈপুণ্যলাভ করিতে হইলে দীর্ঘকালব্যাপী শিক্ষালাভ কতে হয়। পূর্বে নাবিকমাত্রেই নৌসেনায় প্রবেশ করিতে পারিত; কিন্তু এখন তাহা অসম্ভব। এখন লােকে বাল্যাবস্থাতেই নৌসেনায় গৃহীত হয়, কারণ বহুদিন শিক্ষা পাইলে তাহারা কাৰ্যকুশল হইতে পারে না। রণপােত জলমগ্ন হইলে যদি তাহার সঙ্গে তত্ৰত্য সৈন্যও বিনষ্ট হয়, তাহা হইলে রাজ্যের বিষম ক্ষতি, কারণ সহজে ইহাদের স্থান পূরণ করা যায় না। তারহীন তাড়িতবার্তাহের প্রচলনেও নৌযুদ্ধে এখন নব নব পন্থা অবলম্বিত * Wireless telegraphy.

বর্তমানকালের যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধকৌশল। হইতেছে। নৌসেনাপতিরা ইহার সাহায্যে মুহূৰ্তমধ্যে শক্রর সন্ধান পাইতেছেন, স্বপক্ষের অনতিদুর পােতসমূহ একস্থানে আনয়ন করিয়া বিপক্ষকে আক্রমণ করিতে পারিতেছেন এবং যখন যাহা ঘটিতেছে, তখনই তাহা রাজা ও রাজমন্ত্রী- দিগের গােচর করিতেছেন। জাৰ্মাণপক্ষে তারহীন তাড়িতবার্তাবহের সহিত আবার টসেপলিন যােগ দিয়াছে ; ইহারা অতি উর্ধে উঠিয়া বহুদূর পর্যন্ত শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করিতেছে। বিপক্ষের কামান ব্যতীত রণপােতগুলির আরও কোন কোন শত্রু আছে। কয়েক বৎসর হইল টর্পেডাে নামক এক প্রকার যন্ত্র প্রস্তুত হইয়াছে। ইহার আকার চুরুটের আকারের ন্যায়। টর্পেডাের ভিতরে প্রচুর পরিমাণে প্রস্ফোটন রাখা হয়। ইহার একপ্রান্তে একটা স্কু, থাকে ; উহার আবর্তনে যন্ত্রটা জলের ভিতর দিয়া ধাবিত হয়। টর্পেভােবাহী পােতের পার্শ্বে যে বড় চোঙ্গ থাকে তাহা হইতে টর্পেডাে দাগা হয়। ইহার আঘাতে নেটেরও নিস্তার নাই; বিস্ফোটনের ৰেগে ঢেড়নটের তলদেশ বিদীর্ণ হয় এবং এরূপ প্রকাণ্ড পােতও দশ-বিশ মিনিটের মধ্যে ডুবিয়া যায়। এইজন্য রণপােতগুলি টর্পেডােবাহী পােতকে বড় ভয় করে। আয়তনে ক্ষুদ্র এবং অতিদ্রুতগামী বলিয়া তাহাদিগকে গুলি করিয়া নষ্ট কঠিন। টর্পেডােবাহী পােত বিদূরিত করিবার জন্য ডেস্ট্রয়ার (বিনাশক) নামক এক প্রকার পােত ব্যবহৃত হয়। ইহারা টর্পেডােবাহী পােত অপেক্ষা কিছু বড় এবং ঘন্টায় প্রায় ৪০ মাইল চলে। প্রত্যেক ডেস্ট্রয়ারে একটা বা দুইটা বড় কামান থাকে। যখন রণপােতবাহিনী অগ্রসর হইতে থাকে, তখন ডেস্ট্রয়ারগুলি তাহাদের অগ্ৰে অগ্রে ছুটিয়া গন্তব্য পথটা নিরাপদ রাখে। কিন্তু ডেয়ারদ্বারা বিমানের বা সাগরগর্ভচর পােতের উপদ্রব নিবারণ করা যায় না। সাগরগর্ভচর পােত কয়েক বৎসরমাত্র দেখা দিয়াছে। এরূপ পােত যে নির্মাণ করা যাইতে পারে, তাহা পূর্বেও অনেকে অনুমান করিয়াছিলেন । কিন্তু ইহা কোন কাজে লাগিতে পারে কি না তাহা সন্দেহের বিষয় ছিল। ইহা একপ্রকার নাকিবৃহৎ নৌকা এবং এরূপে গঠিত যে, জলের মধ্যে প্রবেশ করিলেও ইহার ভিতরে জল যাইতে পারে না। জলমধ্যে প্রবেশ করিবার জন্য নাবিকেরা ইচ্ছা করিলেই ইহার কিয়দংশ জলে পূর্ণ করিয়া লয় এবং শেষে যন্ত্রের সাহায্যে ভুৰিয়া যায়। সাগরগর্ভেও ইহা যন্ত্রের সাহায্যে চলে। যন্ত্র চালাইবার জন্য এক- প্রকার কেরােশিন তৈল ব্যবহৃত হয়। + Submarine.

যষ্ঠ অধ্যায়। সাগরগর্ভচর পােতের উদ্দেশ্য অদৃশ্যভাবে বিপক্ষপােতের নিকট গিয়া টর্পেডে প্রয়োগে উহার বিনাশ করা। তবে ইহার প্রধান অসুবিধা এই যে, উপরে কোথায় কি আছে পােতারোহীরা তাহা দেখিতে পায় না। এই অসুবিধার নিবারণাথ পরিবীক্ষণ নামে একপ্রকার যন্ত্র আছে। পরিবীক্ষণে যে বহুপৃষ্ঠ কাচফলক থাকে, তাহাতে প্রতিবিম্বিত হইয়া উপরিস্থ সমস্ত বস্তু পােতারােহীদিগের নয়নগােচর হয়। তথাচ এই সকল পােতকে মধ্যে মধ্যে উপরে দেখা দিতে হয় ; পরিবীক্ষণটাত বার বার সাগরপৃষ্ঠের উপর না তুলিলেই চলেনা। রণতরীর অধ্যক্ষেরা যদি পরিবীক্ষণটা দেখিতে পান তাহা হইলে বুঝিতে পারেন উহার নিম্নভাগে সাগগভচর পােত রহিয়াছে। রণপােতের আর একটা শক্ত প্রস্ফোটনপূর্ণ পাত্র। এগুলি লৌহনির্মিত। লােকে কখনও এই পাত্রগুলি সমুদ্রে ভাসাইয়া দেয়, কখনও বা সাগরের অংশ বিশেষে নঙ্গর দ্বারা স্থির করিয়া রাখে। কোন জাহাজের সহিত সত্য হইলেই প্রস্ফোটনে অগ্নির উদ্ভব হয় এবং পাত্রগুলি বিদীর্ণ হইয়া যায়। একটামাত্র পাত্র বিদীর্ণ হইলেই তাহার আঘাতে অতি বৃহৎ রণতরীও বিনষ্ট হইতে পারে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পােত প্রেরণ করিয়া এই সকল পাত্র সযত্নে তুলিয়া ফেলা আবশ্যক ; অন্য কোন উপায়ে ইহাদের উপদ্রব নিবারণ অসম্ভব। উপরে যাহা বলা হইল তাহা হইতে বুঝা যাইবে বর্তমানকালে রণপােতাধ্যক্ষ- দিগকে কত সাবধানে চলিতে হয় । তাঁহাদের সাবধানতার ও নৈপুণ্যের গুণেই, লােকে প্রথমে যেরূপ আশঙ্কা করিয়াছিল, সাগরগর্ভচর পােত বা প্রস্ফোটনপূর্ণ পাত্ৰদ্বারা এ পর্যন্ত তত অনিষ্ট ঘটিতে পারে নাই। চিকিৎসা ও শুশ্রুষা। প্রত্যেক পক্ষেই রােগী ও আহতদিগের জন্য চিকিৎসক ও শুশ্ৰষাকারিণী আছেন। ইহারা রক্তবর্ণ শচিহ্ন ধারণ করেন। জাতিসাধারণের বিধানে, এই চিহ্ন দেখিলেই বুঝা যায়, ইহারা সংহারক নহেন, রক্ষক।' ইহাদের কাৰ্য অতি কঠিন। যুদ্ধক্ষেত্রে অবিরত অগ্নিবৃষ্টি হইতেছে ; তাহার মধ্যেই ইহারা অগ্রসর হইয়া আহত দিগকে লইয়া যাইতেছেন। যখন কোথাও কোন সংক্রামক ব্যাধি দেখা দেয়, তখনও ইহাদিগকে দিবারাত্র পরিশ্রম করিতে হয়। ১৯১৫ অব্দে সার্বিয়াতে যখন সান্নিপাতিক আরের প্রাদুর্ভাব হইয়াছিল, তথন চিকিৎসক ও শুক্ৰষাকারিণীরা যে বিপত্তির সম্মুখীন হইয়াছিলেন, মনুষরূপী শয় সহিত যুদ্ধ তাহার তুলনায় কিছুই নহে। # Periscope. S Mine.

সেনা ও সেনাপতিগণ। ৬ (খ) সেনা ও সেনাপতিগণ। ইংরাজ সেনা। ইংল্যাণ্ডে যখন সৈনিকভূম্যধিকার-প্রথা প্রচলিত ছিল, তখন সেখানে স্থায়িভাবে সেনা রাখিবার প্রয়ােজন হইত না; যুদ্ধ উপস্থিত হইলে ভূম্যধিকারীরা স্ব স্ব প্রজা ইয়া রাজার সাহায্য করিতেন। অতঃপর যখন স্থায়ী সৈন্ত রাখিবার প্রয়ােজন হইল, তখন তর্ক উঠিল, উহার কর্তৃত্ব রাজার হাতে থাকিবে, না পার্লেমেন্টের হাতে থাকিবে। এই তর্কের জন্যই ইয়াবংশীয় রাজাদিগের সহিত প্রজার বিরােধ ঘটে এবং তাহাদের পতন ও নির্বাসন হয়। এখন স্থায়ী সৈন্ত রাখিবার ভার পার্লেমেন্টের সাধারণ সভ্যসমিতির উপর । ১৯১৪ অক পৰ্যন্ত ইংল্যাণ্ডে যে স্থায়ী সৈন্য ছিল, তাহার নাতিদীর্ঘকালের জন্য নিযুক্ত হইত। পদাতিদিগকে সাত বৎসর কাজ করিতে হইত ; তাহার পর তাহারা ইচ্ছা করিলে সামরিক কার্য্য ত্যাগ করিয়া ব্যবসায়ান্তর অবলম্বন করিতে পারিত। কিন্তু সামরিক কাৰ্য ত্যাগ করিবার পরেও তাহাদিগকে আরও চারি বৎসর রাজ্যের সখি সেনাবলের মধ্যে গণ্য করা হইত, অর্থাৎ যদি প্রয়ােজন হইত তাহা হইলে রাজপুরুষেরা ঐ সময়ের মধ্যে তাহাদিগকে যুদ্ধে যােগ দিবার জন্য আহ্বান করিতে পারিতেন। এই চারি বৎসর কাটিয়া গেলে কাহাকেও আর কোনরূপ বান্ধাবান্ধির মধ্যে থাকিতে হইত না। কোন ব্যক্তি যদি প্রথম সাত বৎসর পরে সমর বিভাগেই থাকিতে চাহিত, তাহা হইলে সে আরও এগার বৎসর খাটিয়া বৃত্তিসহ অবসর পাইত। পদাতিরা রাজভাণ্ডার হইতে খাদ্য, পরিচ্ছদ এবং দৈনিক প্রায় বার আনা হিসাবে বেতন পাইত। ইংল্যাণ্ডের সাধারণ সৈন্য প্রধানতঃ শ্রমজীবিসম্প্রদায়ের লােক। ইহারা বার তের বৎসর বয়স পর্যন্ত প্রাইমারী বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করিত এবং তাহার পর কোন না কোন ব্যবসায় শিখিত। সামরিক কাৰ্য্য হইতে অবসর পাইবার পরে তাহারা ঐ সকল ব্যবসায় অবলম্বন করিত। সেনানীগণ ভদ্রবংশীয়। তাহারা ইটন, হারে, উইঞ্চেষ্টার প্রভৃতি বিখ্যাত বিদ্যালয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত হইতেন এবং সতের আঠার বৎসর বয়সে কোন সামরিক বিদ্যালয়ে প্রবেশ করিতেন। সামরিকপদ লাভ করিলে ইহারা প্রথমে হইতেন লেপ্টেনান্ট ; পরে ক্রমশঃ উন্নতিলাভ করিয়া কাপ্তান, মেজর, কর্ণেলু, জেনার প্রভৃতি উচ্চ পদবী প্রাপ্ত হইতেন। চল্লিশ বৎসরের উৰ্দ্ধবয়স্ক না হইলে সেনানীরা অবসর গ্রহণ করিতে পারিতেন না।

নষ্ঠ অধ্যায়। সেনা প্রধানতঃ তিন তিন অংশে বিভক্ত—পদাতি, অশ্ব ও গােলন্দাজ। ইঞ্জিনিয়ারগণও সেনার একটা প্রধান অঙ্গ। ইহারা দুর্গ, রেলওয়ে ও সেতু নির্মাণ করেন এবং বিপক্ষের সেতু ধ্বংস করেন। ফলত ইঞ্জিনিয়ার ব্যতীত যুদ্ধ চলে না, এবং যােদ্ধাদিগের ন্যায় ইঞ্জিনিয়াদিগেরও পদে পদে বিপদ ঘটিতে পারে। চিকিৎসার, রসদ সরবরাহের এবং গমনাগমনের সুবিধাও বিশিষ্ট কর্মচারীর প্রয়ােজন। অসামান্য দূরদর্শিতা না থাকিলে রসদ সরবরাহ করা যায় না। ভাবিয়া দেখ দেখি, এক লক্ষ ইংরাজসৈন্য যখন মােল, হইতে পরাবর্তনের সময় চারিদিনে সত্তর মাইল চলিয়াছিল, তখন যােদ্ধা ও অশ্বগুলির দৈনিক আহারের জন্য কিরূপ আয়ােজন আবশ্যক হইয়াছিল। পদাতিক সৈন্য কতকগুলি বেজিমেন্টে বিভক্ত। এক এক রেজিমেন্টে সাধারণতঃ দুইটী ব্যাটালিয়ন এবং এক এক ব্যাটালিয়নে প্রায় এক হাজার যােদ্ধা থাকে। সচরাচর এক ব্যাটালিয়ন্ যখন বিদেশে নিযুক্ত থাকে, তখন অপর ব্যাটালিয়ট স্বদেশে রহে। নির্দিষ্টসংখ্যক পদাতি, অশ্ব ও গােলন্দাজ লইয়া যুদ্ধকালে এক একটা বিগেড, গঠিত হয়। ব্রিগেডে সাধারণতঃ চারি ব্যাটালিয়ন পদাতি, তিন রেজিমেন্ট, অশ্ব এবং তিন দল গােলন্দাজ থাকে। দুই বা ততােধিক ব্রিগেড়ে এক ডিভিসন বা বিভাগ এবং দুই বা ততােধিক বিভাগে এক একটা বাহিনী। বর্তমান যুদ্ধের পূর্বে ইংরাজদিগের সৰ্ব্বশুদ্ধ দশহাজার সেনানী ও দুই লক্ষ সাধারণ যােদ্ধা ছিল। ইহাদের মধ্যে প্রায় এক লক্ষ ছিল সঞ্চিত সৈন্যের অন্তত এবং অবশিষ্ট ছিল যুদ্ধার্থে সদাপ্রস্তুত। ১৯১৪ অব্দের জুলাই মাসে এই শেষােক্ত দল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুসজ্জিত হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে ফ্রান্সে গিয়া যুদ্ধারম্ভ করে। স্থায়ী সৈন্য ভিন্ন ইংরাজদিগের আরও কতকগুলি যােদ্ধা ছিল। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে যখন একবার ফরাসীদিগের সহিত যুদ্ধ উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা হয়, তখন ইংল্যাণ্ডের অনেক লােক স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষা করে। তখন ফরাসীদিগের সহিত যুদ্ধ ঘটে নাই , তথাপি রাজপুরুষের এই স্বেচ্ছাপ্রণােদিত সেনা রাখিবার উপযােগিতা বুঝিতে পারেন। কিছুদিন হইল ইহাদের ব্যবহারের জন্য উৎকৃষ্ট অস্ত্রশস্ত্র দেওয়া হইয়াছে, এবং ইহাদের শিক্ষাবিধানের জন্য ও রীতিমত যত্ন হইতেছে। এই সৈন্য ‘টেরিটরিয়েল’ অর্থাৎ প্রাদেশিক নামে অভিহিত। বর্তমান যুদ্ধ আরব্ধ হইলেই ইংল্যাণ্ডের সমস্ত স্থায়ী সৈঙ্গ ফ্রান্সে গমন করে। ভারতবর্ষ হইতেও অনেক সৈন্য প্রেরিত হয়। ইহাদের স্থান পুরণার্থ ইংল্যাণ্ড হইতে এদেশে টেরিটরিয়েল সৈন্য আনা হইয়াছিল। ক্রমে টেরিটরিয়েলেরাও ফ্রান্সে সেনাপতি। ৪ অন্যান্য সুদ্ধক্ষেত্রে গমন করিয়াছে এবং ইংল্যাণ্ডে অনেক নূতন নূতন লােককে সৈনিককার্যে নিযুক্ত করা হইয়াছে। যােদ্ধাদিগের সংখ্যাবৃদ্ধিবশতঃ এখন প্রতি রেজিমেন্টের ব্যাটালিয় সংখ্যাও অনেক বৃদ্ধি হইয়াছে। এখন কোন কোন " রেজিমেন্টে ত্রিশটা পর্যন্ত ব্যাটালিয়ন্ দেখা যায়। সশুদ্ধ এখন পায় পঞ্চাশল ইংরাজসেনা পৃথিবীর নানাস্থানে যুদ্ধে নিয়ােজিত হইয়াছে। ( য়ুরােপের সেনা ) জাৰ্মাণসেনার গঠন অনেক পরিমাণে ইংরাজসেনারই অনুরূপ। কিন্তু ইংল্যাণ্ডে সৈনিকবৃত্তি পূৰ্ব্বে লােকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করিত; জাৰ্ম্মাণিতে সকলকে বাধ। হইয়া প্রথমে দুই বৎসর সৈনিককাজ করিতে হইত এবং পরে ২২ বৎসর সঞ্চিত সৈন্যভুক্ত থাকিতে হইত। অপিচ প্রথম দুই বৎসরেও সাধারণ সৈন্যেরা কোন বেতন পাইত না। জাৰ্মাণদিগের সেনানীগণ প্রধানতঃ সম্রান্ত ভূম্যধিকারীদিগের বংশজাত বর্তমান যুদ্ধান্তের সময় জাৰ্মাণদিগের প্রায় ৬০ লক্ষ সুশিক্ষিত যােদ্ধা ছিল। সেনারক্ষার বার্ষিক ব্যয় জার্মাণিতে ছিল ৯ কোটি এবং ইংল্যাণ্ডে ছিল ৪২ কোটি - টাকা। ফ্রান্সেও সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকেই সৈনিকশ্রেণীভুক্ত করিবার প্রথা ছিল এখানে সামরিক শিক্ষালাভের কাল হইয়াছিল তিন বৎসর। বর্তমান যুদ্ধান্তে ফ্রান্সের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৪০ লক্ষ, অস্ট্রিয়ার ৪৫ লক্ষ এবং রুশিয়ার ৫০ ল কিন্তু এখন কোন্ জাতির কত লােক যুদ্ধ কমিছে তাহা নিশ্চিত বলা যায় না । সঞ্চিত সৈন্তভুক্ত অনেকে স্ত্রীলােকের হস্তে স্ব স্ব ব্যবসায় সমৰ্পণ করিয়া ”দ্ধক্ষেত্রে গমন করিয়াছে ; সৈনিকশ্রেণীভুক্ত করিবার জন্য এখন বয়সের পরিমাণও পূর্বাপেক্ষ। কম করা হইয়াছে। এখন যাহাদের বয়স বােল বৎসর মাত্র তাহাদিগকে ও সৈন্যরূপে নিযুক্ত করা হইতেছে। সেনাপতিগণ। যুর্গ আর হইবামাত্র ইংরাজের লর্ড, কি চুনারকে সমরসচিব নিযুক্ত করিয়া তাহার হস্তে যুদ্ধসংক্রান্ত সর্ববিধ ক্ষমতা সমর্পণ করেন। লর্ড, কিচনার একজন অসাধারণ শক্তিমান্ পুরুষ ছিলেন। তিনি পৃথিবীর নানাস্থানে সামরিককাৰ্য্যে নিযুক্ত থাকিয়া যুদ্ধসংক্রান্ত সৰ্ববিধ অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছিলেন। তিনি যেমন দূরদশী, তেমনি লােকচরিত্রাভিজ্ঞ ছিলেন এবং কোথায় কি আবশ্যক তাহা তন্ন তন্ন করিয়া জানিতেন। কিরূপে সামরিক শিক্ষা দিতে হয়, কিরূপে যুদ্ধায়ােজন করিতে **** = - | . == - ------ === ক , | --- ১, ==== = --- . = ক্ষ । = - | - ~ ক 3) কিচনার লর্ড, \\\ . ---- = - == , . { | - ক --- T |E - . * * * .\ \ ' - -----\\ . . . । Ser । - সেনাপতিগণ। হয়, এ সমস্ত তিনি যেমন বুঝিতেন, অন্য কেহ সেরূপ বুঝিতেন না। এই নিমিত্ত তাহার কাৰ্যকুশলতা সম্বন্ধে সকলেরই অটলা আস্থা ছিল। লর্ড, কিচনার প্রথম হইতেই বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে এই যুদ্ধ দীর্ঘকাল চলিবে ; অতএব আপাততঃ অন্ততঃ তিন বৎসরের জন্য আয়ােজন আবশ্যক। তিনি কালবিলম্ব না করিয়া এই বৃহৎ ব্যাপারে হাত দিলেন এবং অচিরে দশলক্ষ সৈন্য সংগ্রহ করিয়া তাহাদিগকে সুশিক্ষিত ও সুসজ্জিত করিয়া তুলিলেন। ইহাতে তিনি যে ক্লেশভােগ করিয়াছিলেন, সে জন্য ইংরাজজাতি তাহার নিকট চিরঋণী। তিনি যে নিয়ত ইংল্যাণ্ডে থাকিয়াই যুদ্ধের ব্যবস্থা করিতেন তাহা নহে; সময়ে সময়ে ফ্রান্স, প্রভৃতি দেশে রণক্ষেত্রে গিয়াও স্বচক্ষে সমস্ত দেখিয়া যাইতেন। তাঁহার এমনই সুব্যবস্থা ছিল যে এই দীর্ঘকালস্থায়ী যুদ্ধে একদিনের জন্যও ফ্রান্সের বা অপর কোন মিত্ররাজ্যের সহিত ইংল্যাণ্ডের কোনরূপ মতভেদ ঘটে নাই। লর্ড, কিচ নারের অকালমৃত্যুতে আজ আমরা সকলেই শােকসন্তপ্ত। তিনি যখন একখানি ক্রুজারে আরােহণ করিয়া রুশিয়ায় যাইতেছিলেন, তখন অর্ক নি দ্বীপের অনতিদূরে প্রস্ফোটনপূর্ণ পাত্রের সঙ্ঘর্ষে পােতখানি সমস্ত আরােহিসহ জলমগ্ন হয় ( ৫ই জুন, ১৯১৬)। ইহাতে ইংরাজজাতির যে ক্ষতি হইয়াছে তাহা সহজে পূরণ হইবার নহে। তবে সান্ত্বনার বিষয় এই যে কিচনার নিঃশেষরূপে তাহার কর্তব্য সম্পাদন করিয়া গিয়াছেন। তাঁহারই প্রতিভাবলে ব্রিটেনের নুতন সেনার সৃষ্টি হইয়াছে এবং সেই সেনা আজ ব্রিটেনের গৌরব রক্ষা করিতেছে। তিনি যে ভিত্তিস্থাপন করিয়া গিয়াছেন, নব্য সমরসচিব তাহারই উপর ব্রিটেনের গৌরবস্তম্ভ নিৰ্মাণ করিতেছেন। জীবদ্দশায় যে তিনি নিজের কৃতকার্যের ফল ভােগ করিয়া যাইতে পারিলেন না ইহা বড়ই পরিতাপের বিষয়। মৃত্যুর সময় লর্ড, কিচনাবের বয়স্ হইয়াছিল ৬৫ বৎসর। যুদ্ধক্ষেত্রে ইংরাজপক্ষের প্রধান সেনাপতি ছিলেন প্রথমে সার জন্ ফ্রেঞ্চ। ইনি বােয়ার যুদ্ধে যে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন, মােন্স, হইতে পরাবর্তনের সময় এবং ইপ্রের যুদ্ধক্ষেত্রে তাহা সৰ্ব্বতােভাবে অক্ষুন্ন রাখিয়াছিলেন। এক বৎসর অবিরাম পরিশ্রম করিয়া সার জন্ ফ্রেঞ্চ, ইংল্যাণ্ডে প্রতিগমন করেন এবং বর্তমান প্রধান সেনাপতি সা ডগ্লাস্ হেগ, তাঁহার পদে নিযুক্ত হন। ফরাসীপক্ষের প্রধান সেনাপতি ছিলেন প্রথমে জফ্রে। তঁাহার বয়স, ৬৫ বৎসর। তিনি প্রভিভাবলে অতি সামান্য অবস্থা হইতে উন্নতিলাভ করিয়া এই উচ্চপদে অধিরােহণ করিয়াছিলেন। তিনি প্রথমে সৈনিক ইঞ্জিনিয়ারের কাজ করিতেন ; এইজন্য কুল্যাযুদ্ধে তাঁহার অসামান্য নৈপুণ্য। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বি- পক্ষয়ের অবস্থান পরীক্ষা করিয়া কোথায় কিরূপে সেনা সন্নিবেশিত করিতে হয়, ;

ষষ্ঠ অধ্যায়। তাহা বুঝিতেও তিনি অদ্বিতীয় এবং কাহার হাতে কি কাজ দিলে উহা সুচারুরূপে সম্পাদিত হইবে ইহাও তিনি বিলক্ষণ জানেন। তাঁহার সুব্যবস্থায় এই সুদীর্ঘ কাল জাৰ্ম্মাণদিগের প্রায় সমস্ত আক্রমণই ব্যর্থ হইয়াছে। জফ্রে সম্প্রতি কাৰ্যান্তরের ভার গ্রহণ করিয়াছেন এবং অন্য এক ব্যক্তি এখন ফরাসীদিগের প্রধান সৈনাপত্য গ্রহণ করিয়াছেন। জাৰ্মাণ সেনার প্রধান অধিনায়ক স্বয়ং কাইসার। কিন্তু ইহা নামে মাত্র। তিনি নিজে যে কখনও সেনা পরিচালন করিয়াছেন এমন বােধ হয় না। জাৰ্মাণদিগের দুইজন সেনাপতি যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন-একজনের নাম হিণ্ডেবার্গ, এবং অপর জনের নাম ম্যাকেসে! ইহারা উভয়েই প্রাচ্য সীমান্তে সৈনাপত্য করিয়াছেন। কিন্তু প্রতীচ্য যুদ্ধক্ষেত্রে কোন জাৰ্মাণ সেনানী এপৰ্য্যন্ত প্রসিদ্ধিলাভ করিতে পারেন নাই। জাৰ্ম্মাণির যুবরাজ স্বয়ং উপস্থিত থাকিয়া কোন কোন যুদ্ধে যােগ দিয়াছিলেন বটে, কিন্তু যশ লাভ করিতে পারেন নাই। এখন হিণ্ডেবার্গই পশ্চিম প্রান্তে জাৰ্ম্মাণ সেনার অধিনায়ক হইয়াছেন। যুধ্যমান শক্তিসমূহের নৌবল । যুদ্ধারম্ভে ইংল্যাণ্ডের নৌসেনা ছিল দেড় লক্ষ ; ফরাসীদিগের ষাট হাজার এবং জাৰ্মাণদিগের আশি হাজার। ইংরাজপক্ষের প্রধান নৌসেনাধ্যক্ষ্য প্রথমে ছিলেন সা জন্ জেলিকে। ইনি প্রায় দুই বৎসর অতি দক্ষতার সহিত কৰ্ত্তব্য সম্পাদন করিয়া কাৰ্যান্তরের ভারপ্রাপ্ত হইয়াছেন এবং সা ডেবিড়, বিয়েটি এখন পােত- বাহিনীর প্রধান সেনানী হইয়াছেন। যুদ্ধান্তে প্রধান প্রধান পক্ষের নোবল কিরূপ ছিল তাহা নিম্নে প্রদর্শিত হইল। रेश्मा ফ্রান্স, জার্মানি ড্রেড নট ৪ ৭৪ ৩ ৪৩ (নুতন রণপােত ) যুদ্ধ ক্রুজার প্রাচীন রণপােত ২৯ ক্রুজার ডেস্ট্রয়ার টর্পোেেবাহী পােত কিন্তু এই আড়াই বৎসরে পূর্বের কোন কোন পােত বিনষ্ট হইয়াছে এবং অনেক নূতন পােত নির্মিত হইয়াছে। ২২৫ ৮ ৪ ১৩০ সপ্তম অধ্যায়। জলযুদ্ধ। মানুষ আপনাকে যতই দূরদর্শী বলিয়া গব্ব করুক না কেন, তাহার বুদ্ধি ও ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। বর্তমান যুদ্ধে উভয় পক্ষেই কত সময়ে কত আশা করিয়াছিলেন এবং তাহা সফল করিবার জন্য কত আয়ােজন করিয়াছিলেন—ভাবিয়াছিলেন সিদ্ধি তাহাদের করতলগত। কিন্তু ভবিতব্যেব দুণক্ষ্য প্রভাবে কত আশা ভগ্ন হইয়াছে, কত আয়ােজন ব্যর্থ হইয়াছে। জাৰ্মাণ রণতরীর প্রধান আড্ডা কিয়েল ও উইলেমছে। এই দুইটা বন্দর এমন সুরক্ষিত যে বিপক্ষের রণতরীর পক্ষে দুরধিগম্য। উইলেহেবনের পুরােভাগে দুর্গদৃঢ়ীকৃত হেলিগােল্যাণ্ড দ্বীপ। যে উত্তৰসাগরের তীরে ইহা অবস্থিত, উপকূল- সন্নিধানে তাহা অগভীর, কাজেই তত্য অবস্থানভিজ্ঞ পােতের পক্ষে বিপজ্জনক। ইহা ছাড়া বহুদূর পর্যন্ত সমুদ্রের মধ্যে এত প্রস্ফোটনপূর্ণ পাত্র বিকীর্ণ রহিয়াছে যোহার সাধ্য এই সকল বাধা অতিক্রম করিয়া উইলেমকেবৃনের নিকট যাইতে পারে ? উল্লিখিত আডডা দুইটী হইতে এক দিকে ইংল্যাণ্ডের, অন্য দিকে রুশিয়ার বিরুদ্ধে রণতরী পাঠাইবার বেশ সুবিধা। ইহারা কাইজার উইল খাল দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত; উক্ত খাল দিয়া জাম্মাণ রণতরীগুলি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাল্টিক সাগর হইতে উত্তর সাগরে কিংবা উত্তর সাগর হইতে বাল্টিক সাগরে প্রবেশ করিতে কাজেই তারা কখন কোথায় আছে, হংবাজ রণতরীর পক্ষে তাহা জানা সহজ নহে। আয়তনে, যুদ্ধ-নৈপুণ্যে ও কামানের উৎকর্ষে জাৰ্মাণ রণতরী ইংরাজ রণতরীর সমকক্ষ ; কিন্তু সংখ্যায় ক্ষীণতর। এই নিমিত্তই তাহারা বন্দরের বাহির হইতে সাহস পায় না। জাৰ্মাণ পোহবাহিনীর উদ্দেশ্য এই যে— (১) প্রস্ফোটনপূণ পত্র এবং টর্পেডো সাহায্যে একে একে ইংরাজদিগের রণ-পাতলি বিনষ্ট করিতে হইবে। এতদর্থে জাৰ্মাণের কেবল দেশের উপকুল- সন্নিধানে নহে, আয়ল্যাণ্ডের পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগরেও প্রস্ফোটনপূর্ণ পাত্র রাখিয়া দিয়াছেন এবং তাহাদের সাগরগর্ভচর পােতগুলি দিবারাত্র বিপক্ষের পাতধ্বংসের চেষ্টা করিতেছে। সাগরগর্ভচর পােতারা এ পর্যন্ত ইংরাজ রণতরীর তত ক্ষতি হয় নাই ; কেবল একবার ইহাদের একখানা ইংরাজদিগের তিন খান। ক্রুজার ডুবাইয়া দিয়াছিল। ইহাদের উপদ্রবে ইংরাজদিগের অনেক বাণিজ্য-পােতও সপ্তম অধ্যায়। বিনষ্ট হইতেছে বটে, কিন্তু নূতন নূতন পােত নিৰ্মাণ করিয়া ইংরাজেরা সে অভাব পূরণ করিতেছেন। (২) ইংল্যাণ্ডের উপকূলভাগস্থ কোন না কোন স্থান অকস্মাৎ আক্রমণ করিয়া তত্ৰত্য অধিবাসীদিগকে ক্ষতিগ্রস্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত করিতে হইবে। জাৰ্মাণেরা বহুবার এই চেষ্টা করিয়াছেন; তাহারা নৈশ অন্ধকারে অতিদ্রুতগামী পােত লইয়া ইংল্যাণ্ডের উপকূলস্থ কোন কোন স্থানে গােল বর্ষণ করিয়াছেন এবং সূর্যোদয়ের পূৰ্বেই জাৰ্ম্মাণিতে ফিরিয়া গিয়াছেন। (৩) মহাসমুদ্রে কুজার রাখিয়া ইংরাজদিগের বাণিজ্যলােপ করিতে হইবে। সভ্যজাতিদিগের মধ্যে যুদ্ধ উপস্থিত হইলে স্থলভাগে জনসাধারণের সম্পত্তিনাশ নীতিবিগর্হিত। কিন্তু জলপথে, রাজার হউক, প্রজার হউক, সকলেরই সম্পত্তি নষ্ট বা হস্তগত করিবার রীতি আছে। কোন পােত বিপক্ষের পতাকা উড়াইয়া যাইতেছে দেখিলেই উহা ধরা যাইতে পারে। অতএব এই রীতির বলে জাৰ্মাণেরা ইংরাজ- দিগের বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটাইবার চেষ্টা করিলে তাহা দোষাবহ বলা যায় না। এরূপ ব্যাঘাত ঘটাইবার জন্য যত রণতরী থাকা আবশ্যক, ইংরাজদিগের সৌভাগ্যক্রমে যুদ্ধান্তকালে জাৰ্ম্মাণদিগের তত ছিল না। তাঁহাদের এমডেন্ নামক একখানা ক্রুজার সিংটাও হইতে পলায়ন করিয়া ভারত মহাসাগরে ইংরাজদিগের প্রায় কুড়ি খানা বাণিজ্য-পােত ডুবাইয়া দিয়াছিল বটে; কিন্তু এই উপদ্রব দীর্ঘকালস্থায়ী হয় নাই । এডেন্রে নাবিকেরা একদা কোকদ্বীপ তারহীন তাড়িতবার্তাবহের কাৰ্যালয়টা আক্রমণ করিলে তথাকার কর্মচারীরা চারিদিকে আপনাদের বিপত্তির সংবাদ পাঠাইলেন এবং সংবাদ পাইয়া অস্ট্রেলিয়ার সিডনি নামক একখানা বৃহৎ ক্রুজার সেখানে গিয়া উপস্থিত হইল। এমৃডেন্ পলায়ন করিবার অবসর পাইল না ; সিডনি তাহাকে আক্রমণ পূৰ্ব্বক চূর্ণ বিচূর্ণ করিল। ইহার পর জাৰ্মাণদিগের আর একখানা রণতরী কোন উদাসীনরাজ্যের পতাকা উড়াইয়া আটলান্টিক মহাসাগরে বাহির হইয়াছিল এবং ইংরাজদিগের অনেকগুলি বাণিজ্যপােত নষ্ট করিয়াছিল। উত্তরসাগরে ইংরাজদিগের যে পােত উদাসীন৷াজ্যের পােত মনে করিয়া তাহা ইহাকে ধরিবার চেষ্টা করে নাই। কিন্তু শেষে কয়লার অভাবে এই ক্রুজার খানি য়ুনাইটেড, ষ্টেটসের একটা বন্দরে প্রবেশ করে এবং এখন পর্যন্ত সেখানেই আবদ্ধ রহিয়াছে। ইংল্যাণ্ডের বাণিজ্যনাশ অপেক্ষাও জাৰ্মাণদিগের আর একটা গুরুতর উদ্দেশ্য ছিল। তাহারা অনেক দিন হইতেই ইংল্যাণ্ড আক্রমণ করিবার ইচ্ছা করিয়া ছিলেন, কিন্তু কি উপায়ে যে সে ইচ্ছা পূরণ করিবেন ভাবিয়াছিলেন তাহা নিশ্চিত বলা যায় না। ইংরাজের রণতুরী যতদিন সমুদ্রে একাধিপত্য ভােগ করিবে, ততদিন বাহিনী আছে, বর্তমানকালে এ রণতরী সপ্তম অধ্যায়। • ইংল্যাণ্ড আক্রমণ করা অসম্ভব। উত্তরসাগরে ইংরাজের দুর্জয় পােতবাহিনী। বিদ্যমান থাকিলে জাৰ্মাণ-পােতবাহিনী কখনও কিয়েল খালের বাহির হইতে সাহস পায় না। তবে, জাৰ্ম্মণেরা যদি এমন কোন কৌশল করিতে পারেন যে ইংরাজ পােতবাহিনী দুই অংশে বিভক্ত হইয়া সমুদ্রের ভিন্ন ভিন্ন অংশে পরস্পরের দূরে দূরে অবস্থান করিবে এবং যে অংশ তাহাদের নিজের পােতবাহিনী হইতে ক্ষীণতর তাহা আক্রমণ করিবার সুবিধা পাইবেন, তাহা হইলে স্বতন্ত্র কথা। ১৯১৫ অব্দের মে মাসে একবার তাঁহাদের এই দুরাশা ফলবতী হইবে বলিয়া বােধ হইয়াছিল। একদা কি অভিপ্রায়ে বলা যায় না, সমস্ত জাৰ্মাণ রণতরী ডেন্মার্কের উপকুলভাগ পর্যন্ত অগ্রসর হয় এবং সেখানে ইংরাজদিগের কয়েকখানা ক্রুজার দেখিতে পাই। তৎক্ষণাৎ তাহাদিগকে আক্রমণ করে। সংখ্যায় অল্প হইলেও ইংরাজ ক্রুজারগুলি পলায়ন করিল না ; তাহারা যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইল। জাৰ্মাণ রণতরীগুলি বৃহদায়তন এবং সংখ্যাতেও অধিক ছিল বলিয়া এই ভীষণ যুদ্ধে ইংরাজদিগের প্রথমে বড় ক্ষতি হইল ; কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যে তাহাদের সাহায্যার্থ অন্যান্য ইংরাজ রণতরী আসিয়া উপস্থিত হইল বলিয়া শেষে জাৰ্মাণেরাই পরাভূত হইলেন। এই নৌযুদ্ধ । জল্যাণ্ডের যুদ্ধ নামে বিদিত। ইহাতে ইংরাজদিগের চারিখানা বৃহৎ রণপােত এবং কয়েকখানি ক্ষুদ্র রণপােত বিনষ্ট হয় ; জাৰ্মাণদিগেরও সম্ভবতঃখানা বৃহৎ রণপােত এবং অনেক গুলি ক্ষুদ্র ঋণপােত মারা যায়; কিন্তু জাৰ্মাণের স্বপক্ষের কি ক্ষতি হইয়াছে, অদ্যাপি তাহা প্রকাশ করেন নাই। বর্তমান মহাসমরে যে কয়েকটী নৌযুদ্ধ হইয়াছে তন্মধ্যে জার্টল্যাণ্ডের যুদ্ধই সর্বাপেক্ষা ভীষণ ; ইহাতে ইংরাজের সর্ববাদিসম্মত সামুদ্রিক প্রাধান্য অক্ষুন্নই রহিয়াছে। এখন দেখা যাউক ইংরাজপােতবাহিনীর উদ্দেশ্য কি কি ? প্রথমতঃ উত্তর- সাগর দিয়া জাৰ্ম্মাণ রণতরীর ও জাৰ্মাণ বাণিজ্যপােতের যাতায়াত বন্ধ করিতে হইবে; দ্বিতীয়তঃ জাৰ্মাণপােতবাহিনীর আক্রমণ হইতে ইংল্যান্ডকে রক্ষা করিতে হইবে। পূৰ্বে দেখা গিয়াছে যে শেষােক্ত উদ্দেশ্যটী প্রায় সৰ্বাংশেই সিদ্ধ হইয়াছে, কারণ এ পর্যন্ত ইংল্যাণ্ডের উপকূলসান্নধানে গােপনে গােপনে যে দুই চারিখানা জাৰ্মাণ- রণপােত দেখা দিয়াছে, তাহারা এমন কিছু করিতে পারে নাই যাহা জাৰ্মাণে হর্ষের কারণ বলিয়া ভাবিতে পারেন। একবার শীতকালে নৈশ অন্ধকার.ও কুম্ফটিকার সাহায্যে তিন চারিখানি অতিদ্রুতগামী জাৰ্মাণ রণতরী উত্তরসাগর পার হইয়া হার্ট-পুল, স্কেয়ারবারো ও হুইটুবি নামক তিনটী নগরের উপর কিয়ৎক্ষণের জন্য গােলাবৃষ্টি করে। ইহাদের মধ্যে হার্টলপুল নগরটীমাত্র দুর্গদ্বারা রক্ষিত। জাৰ্মাণ- দিগের আক্রমণে তিনটী নগরেরই কিছু কিছু ক্ষতি হয় এবং অনেকগুলি নাগরিক মারা যায়।

জলযুদ্ধ ; ইহার পর আরও একবার কয়েক খানি জাৰ্ম্মাণ রণপােত ইংল্যাণ্ডের উপকুল- সন্নিধানে দেখা দেয় ; কিন্তু ইরাজ রণপােত গুলি ইহাদিগকে দেখিতে পায় এবং তৎক্ষণাৎ আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে জাৰ্মাণদিগের ব্লকার নামক একখানি ক্রুজার বিনষ্ট হয় ; আরও দুইখানি অর্ধভগ্ন অবস্থায় হেলিগােল্যাণ্ডে ফিরিয়া যায়। ফ্রান্সের ও অন্যান্য দেশের যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য সৈন্য ও যুদ্ধোপকরণ লইয়া অবিরত যে সকল জাহাজ যাইতেছে, তাহাদের রক্ষাবিধান ইংরাজ পােতবাহিনীর তৃতীয় উদ্দেশ্য। এই কাৰ্যটা অতি সুচারুরূপে সম্পাদিত হইতেছে। প্রায় তিন বৎসরকাল লক্ষ লক্ষ ইংরাজসৈন্য সমুদ্র পার হইয়া নানাদেশে যাইতেছে, অনেক সময়ে তাহাদের জাহাজ- গুলি জাৰ্মাণ পােতবাহিনীর নিকট দিয়াই গমনাগমন করিতেছে, অথচ এপর্যন্ত প্রায় কাহারও কোন বিপদ ঘটে নাই। প্রবল পিেতবাহিনী থাকিলে যে কি লাভ তাহা হহ হইতে বেশ বুঝা যায় । ইহাই গুণে ইংল্যাণ্ড আজ বহিঃশত্রুর আক্রমণ হইতে সুরক্ষিত ; ইহারই বলে ইংরাজ সৈন্ত আজ ফ্রান্স, ফুণ্ডাস্ প্রভৃতি দূর দেশে গিয়া স্বজাতির গৌরব রক্ষা করিতেছে ; ইহারই প্রভাবে জাৰ্মাণের। ক্রমশঃ ক্ষীণবল হইতেছেন। ইংরাজ নৌসেনার একান্ত ইচ্ছা যে একবার সমগ্র জাৰ্মাণপােতবাহিনীর সহিত সাগরে যুদ্ধ করিয়া আপনাদিগের বীৰ্য্য দেখায়। কিন্তু জাটল্যাণ্ডের যুদ্ধ ব্যতীত অন্য কুত্রাপি তাহার এই অভিলাষপূরণের সুবিধা পায় নাই। ছােট খাট আরও যে দুই একটা নৌযুদ্ধ না হইয়াছে তাহা নহে; কিন্তু সেরূপ ব্যাপারে সমরনৈপুণ্যের প্রকৃত পরীক্ষা হয় না। যুদ্ধারম্ভের অল্পদিন পরেই জাৰ্ম্মাণদিগের এক প্রবল পােত বাহিনী প্রশান্তমহাসাগরের দক্ষিণাংশে ব্যালপ্যারাইজো নগরের অবি- দূরে ইংরাজদিগের চারিখানি রণতরী পরাভূত করে। কিন্তু শেষে ফক্‌ল্যাণ্ড দ্বীপের নিকট ইংরাজদিগের অপর এক পােতবাহিনী উক্ত জাৰ্মাণ পােতবাহিনীকে আক্ৰমণপূৰ্ব্বক একখানি পােত ভিন্ন অন্য সমস্ত ডুবাইয়া দেয়। ক্ষুদ্র, বৃহৎ সমস্ত নৌযুদ্ধেই দেখা গিয়াছে জার্মাণির নৌসেনা বিলক্ষণ সাহসী কিন্তু কামান দাগিতে ইংরাজ নৌসেনাই অধিকতর নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়াছে । জার্মাণেরা এপর্যন্ত ইংরাজদিগের কয়েক-খানি রণপােত নষ্ট করিয়াছেন বটে, কিন্তু তাহা হয় প্রস্ফোটনপূর্ণ পাত্রের সাহায্যে, নয় টর্পেডো চালাইয়া। পােতবাহিনীর আর একটা কাৰ্য্য শত্রুপক্ষের আগমনিগম রােধ করা। উভয় পক্ষেই পরস্পরের সম্বন্ধে এই উপায়-প্রয়ােগের চেষ্টা করে। কোন বন্দর বা দেশ উল্লিখিত উদ্দেশ্যে রণতরীদ্বারা অবরুদ্ধ হইলে উদাসীনরাজ্যের পােতও সেখানে যাইতে পারে না। যুদ্ধান্তে ইংরাজের। জাৰ্ম্মাণ বন্দরগুলির সম্বন্ধে এরূপ কোন ব্যবস্থা করেন নাই ; তবে ঐ সকল স্থানে যুদ্ধোপকরণের রপ্তানি নিষেধ করিয়া- ; • ৭৪ সপ্তম অধ্যায়। ছিলেন। যুদ্ধে ব্যবহৃত হইতে পারে এরূপ কতকগুলি দ্রব্যের একটা তালিকা। প্রস্তুত করিয়া তাহারা ঐ সমস্ত নিষিদ্ধদ্রব্য বলিয়া নির্দেশ করেন। যদি উদাসীন- রাজ্যের কোন পােত জার্মাণিতে ইহার কোন দ্রব্য রপ্তানির চেষ্টা করিত, তাহা হইলে ইংরাজের উহা আটক করিতেন। খাদ্যসামগ্রী এবং তুলা প্রভৃতি কয়েকটা দ্রব্য প্রথমে নিষিদ্ধ বলিয়া পরিগণিত হয় নাই। কাজেই জাৰ্মাণেরা এগুলি আমদানি করিতে পারিতেন। ১১ কিন্তু জাৰ্ম্মাণির আচরণে ইংরাজদিগকে ক্রমে নিষিদ্ধ দ্রব্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করিতে হইল। জার্মাণেরা যখন তাহাদের দেশস্থ সমস্ত খাদ্য সামগ্রী সৈনিককৰ্মচারীদিগের তত্ত্বাবধানে রাখিলেন, তখন ইংরাজেরা বলিলেন, খাদ্যদ্রব্যও তবে যুদ্ধোপকরণের মধ্যে গণ্য হইল। অতঃপর হারা জাৰ্ম্মাণিতে সৰ্বাবিধ দ্রব্যের রপ্তানিই নিষেধ করিলেন। জার্মাণের বলিলেন, আমরাও ইংল্যাণ্ডে কোন দ্রব্য রপ্তানি হইতে দিব না। কিন্তু তাহাদের রণপােত অল্প ; যাহা আছে তাও কিয়েল খালের বাহিরে যায় না, কাজেই কেহ তাহাদের নিষেধাজ্ঞা না মানিলে জাৰ্মাণেরা কি করিতে পারেন ? তাহারা উপায়ান্তর না দেখিয়া সাগরগর্ভচর পােত ব্যবহার করিতে লাগিলেন। এই সকল পােতের দৌরাত্মে অনেক রণনীতি আজ পদদলিত হইতেছে। বাণিজ্যপােত ডুবাইতে হইলে আরােহীদিগকে যথাসময়ে সক কৰ্তব্য ; তাহাদের প্রাণরক্ষারও ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু জাৰ্মাণেরা কিছুমাত্র জানাইয়া টর্পেডােপ্রয়ােগে বাণিজ্যপােত ধ্বংস করিতেছেন, আরােহীদিগের প্রাণরক্ষার জন্যও কোন চেষ্টা করিতেছেন না। ইংরাজদিগের রাজকীয় পােতবাহিনী ভিন্ন অন্যান্য অসংখ্য পােতও উত্তরসাগরে সামরিক কাৰ্যে রত রহিয়াছে। ইহারা সৈন্য ও খাদ্যাদি লইয়া যাইতেছে, প্রস্ফোটনপূর্ণ পাত্রগুলি তুলিয়া নষ্ট করিতেছে এবং আরও অনেক প্রকারে পােতবাহিনীর সহায়তা করিতেছে। ইহাদের নাবিকেরা সামরিক শিক্ষালাভ করে নাই; অনেকে জালজীবী; অথচ ইহার অসামান্য সাহস, নৈপুণ্য ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দিতেছে। এপর্যন্ত জাৰ্মাণের ইংরাজপক্ষের শত শত বাণিজ্যপােত নষ্ট করিয়াছেন ; সহস্র সহস্র নাবিক সাগরগর্ভে নিমগ্ন হইয়াছে ; কিন্তু ইহাতে ও ইহারা ভয় পায় নাই ; জীবিতেরা প্রফুল্লচিত্তে মৃতদিগের স্থান লইতেছে। যে সকল বাণিজ্যপােত আমদানি রপ্তানির জন্য সাগর পার হইতেছে তাহাদেরও ধন্য সাহস। এক ১৯১৫ অব্দেই জাৰ্মাণেরা ইংরাজদিগের প্রায় ছয় শত পণ্যপূর্ণ পােত ধ্বংস করিয়াছেন; এই সকল পােতের শত শত নাবিকও বিনষ্ট হইয়াছে ; যাহারা রক্ষা পাইয়াছে তাহারাও অশ্রুতপূৰ্ব্ব কষ্টভােগ করিয়াছে। তথাপি বণিকেরা পােত পরিচালনার্থ কখনও নাবিকের অভাব ভােগ করেন নাই। ; ;

জলযুদ্ধ। জাৰ্ম্মাণদিগের মধ্যেও যে সাহস, বীৰ্য্য ও উদ্যমশীলতার অভাব আছে তা বলা যায় না। তাহারা ক্রমাগত বৃহৎ হইতে বৃহত্তর সাগরগর্ভচর পােত নির্মাণ করিতেছেন। এই সকল পােতের পরিচালন নিতান্ত কঠিন ও বিপজ্জনক ; কিন্তু অধ্যবসায়ের বলে তাহারা ইহাতে অসামান্য নৈপুণ্য লাভ করিয়াছেন। ইংরাজ- পােতবাহিনী জাৰ্মাণদিগের অনেকগুলি সাগরগর্ভচর পােত নষ্ট করিয়াছে বটে, কিন্তু তাহাতেও ইহাদের উপদ্রব কমে নাই। ইহার প্রতিদিন ইংরাজের পােত ধ্বংসে নিরত রহিয়াছে ; উদাসীনরাজ্যের বাণিজ্যপোতও ইংল্যাণ্ডের নিকটবর্তী হইলে নিস্তার পাইতেছে না। ইহারা সাগরগর্ভে অদৃশ্য হইয়া ইরাজপােতবাহিনীর তলদেশ দিয়া যাতায়াত করিতেছে, কখনও কখনও দুস্তর আটলান্টিক মহাসাগরও পার হইতেছে। ইহার বর্তমান যুদ্ধান্তের অল্পদিন পরেই ভূমধ্যসাগরেও দেখা দিয়াছে। জাৰ্মাণেরা ইহাদিগকে স্থলপথে বহন করিয়া অস্ট্রিয়ার উপকূলস্থ পােল নামক বন্দরে বন্দরে এবং তুরুকের রাজধানী কনষ্টান্টিনােপলে লইয়া গিয়াছিলেন। ভূমধ্যসাগরে যে সাগরগৰ্ভচর পেতে প্রয়ােজন হইবে জার্মাণের তাহা অনেক দিন হইতেই বুঝিয়াছিলেন। কফু দ্বীপে জাৰ্ম্মাণ সম্রাটের একটা প্রমােদাবাস ছিল ; তাহারা এখানে প্রচুর তৈল সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছিলেন ; ঈজিয়া উপসাগরস্থ শৈলাকী। দ্বীপসমূহেও তাহার অনেক গহনস্থান নির্দিষ্ট রাখিয়াছিলেন । সমস্তই সাগরগর্ভচর পােতের ব্যবহারার্থ । ভূমধ্যসাগরে ইংরাজ ও ফরাসী পােতবাহিনীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ডার্ডানেলশের পথটী উন্মুক্ত করা। এই প্রণালীটা অতি সঙ্কীর্ণ। জাৰ্মাণের। ইহার উভয় পার্শ্বে দুর্গ নির্মাণ করিয়া এবং জলের মধ্যে অসংখ্য পস্ফোটনপূর্ণ পাত্র স্থাপন করিয়া ইহাকে সুরক্ষিত করিয়া রাখিয়াছিলেন। তাহারা বুঝিয়াছিলেন যে ইংরাজপক্ষ এই পথে প্রবেশ করিয়া কষ্টান্টিনােল আক্রমণ করিলে তুর্কেরা নিরুদ্যম হইয়া পড়িবেন। অধিকন্তু ডার্ডানে রুদ্ধ থাকিলে রুশিয়ার বাণিজ্যও বন্ধ হইবে । ইংরাজেরাও ইহাই বুঝিয়া বল প্রয়ােগে ডাঙানেলস উন্মুক্ত করতে অগ্রসর হইলেন কিন্তু তাহারা যথাসময়ে সমস্ত আয়ােজন করিতে পারেন নাই; অপিচ এই দুঃসাধ্যকাৰ্য-নির্বাহের জন্য কেবল পােতবাহিনীর উপরই নির্ভর করিয়াছিলেন। কিন্তু তুর্কেরা জাৰ্মাণদিগের পরামর্শে গ্যালিপলির পৰ্ব্বতে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কামান লুকাইয়া রাখিয়াছিলেন ; ইংরাজ রণপােত হইতে সেগুলি দেখা যাইত না ; নষ্ট করিবারও উপায় ছিল না। প্রস্ফোটনপূর্ণ পাত্রের সর্ষেও ইংরাজদিগের কয়েক খানি বড় বড় পােত বিনষ্ট হইল। অবশেষে স্থলভাগে যুদ্ধ করিবার জন্য ইংরাজ ও ফরাসী গ্যালিপলিতে সেনা পাঠাইলেন; কিন্তু এই উপদ্বীপটা একে পৰ্বতাকীর্ণ, তাহার উপর আবার কামান ও দুর্গদ্বারা সুরক্ষিত ছিল বলিয়া তাহারা অষ্টম অধ্যায়। কোন সুবিধা করিতে পারিলেন না। কয়েক মাসের মধ্যে তাহাদের প্রায় একলক্ষ সৈন্য হতাহত হইল এবং ১৯১৫ অব্দের শরৎকালে তাহারা এখান হইতে সেনা তুলিয়া সালােনিকাতে লইয়া গেলেন। অষ্টম অধ্যায়। স্থলযুদ্ধ। (ক) পশ্চিম প্রান্তে। সেনাপতিগণ কি অভিপ্রায়ে কোথায় সেনাসমাবেশ করেন তাহা অপরের জানিবার সুবিধা নাই ; শেষে ফল দেখিয়া তাহাদের উদ্দেশ্য অনুমান করিয়া লইতে অতএব বৰ্তমান অধ্যায়ে যাহা বলা যাইতেছে, তাহা প্রধানতঃ অনুমানমূলক বলিয়া ধরিতে হইবে। এইরূপ অনুমান যে সকল সময়ে অভ্রান্ত তাহা মনে করা যায় না। জার্মাণেরা বােপ হয় প্রথমে ফ্রান্সের সর্বনাশসাধনেই কৃতসঙ্কল্প হইলেন। তাহার ভাবিয়াছিলেন, রুশিয়ার পক্ষে সমস্ত সেনাবল সুসজ্জিত করিতে অনেক সময় লাগিবে ; বিশেষতঃ জাৰ্ম্মাণির পূর্ব প্রান্ত যখন সুরক্ষিত, তথন রুশেরা হঠাৎ সেখানে কোন অনিষ্ট করিতে পারিবেন না; অতএব ফ্রান্স, জম করিবার জন্যই জার্মাণির অধিকাংশ সৈন্য নিয়ােজিত হইতে পারে। সুইজারল্যাণ্ডের নিকটস্থ রাইননদীর তারবত্তী একটা স্থান হইতে ফান্স, ও জার্মাণির সাধারণ সীমার আরম্ভ। সেখান হইতে ইহা উত্তর পশ্চিমাভিমুখী হইয়া বোঝ নামক পার্বত্য অঞ্চলের ভিতর দিয়া গিয়াছে। এখানে প্রকৃতিই অনেক পরিমাণে ফ্রান্সের রক্ষা করিতেছেন, কারণ পৰ্বত থাকায় সহসা কোন আততায়ী আসিয়া এ অংশ আক্রমণ করিতে পারে না। বােঝের বাহিরে সাধারণ সীমাটী আবার সমতল প্রদেশে প্রবেশ করিয়াছে; এই প্রদেশের প্রধান নদী যােজেল রাইনের একটা উপনদী। তাহার পর আবার পার্বত্য ও বনাকীর্ণ ভূমি ; এই অঞ্চলের নাম আর্ডেন। অতঃপর ফ্রান্সের ঈশানকোণে বেলজিয়ামের সীমান্তে ফ্রান্স ও জার্মাণির সাধারণ সীমা শেষ হইয়াছে। এই সুদীর্ঘ সাধারণসীমার নানা অংশে ফুন্সের অনেকগুলি দুর্গ আছে :- সর্বদক্ষিণে বেলফোর; মধ্যভাগে বার্ডান; বেলজিয়াম-সীমান্তে মােঝ, জাৰ্মাণসেনার অধিকাংশ বেলজিয়ামের ভিতর দিয়া মােবাঝের অভিমুখে এবং

স্থলযুদ্ধ-পশ্চিম প্রান্তে।
কিয়দংশ লাক্‌সেম্বর্গের ভিতর দিয়া বাড়ানের অভিমুখে যাত্রা করে। উত্তরে
একস লা-সাপেল এবং দক্ষিণে মেটস নগর হইতে তাহারা সেনা পরিচালনের ব্যবস্থা
করিয়াছিলেন। এক্স ও মােবাঝের মধ্যভাগে উদাসীনরাজ্য বেলজিয়ামের কিয়দংশ
অবস্থিত। জাৰ্মাণেরা ভাবিলেন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা এই অংশ অতিক্রম
করিয়া মােবাঝে উপস্থিত হইতে পারিবেন।
'। !!
V
aulaura
• fr
হাউইটজার।
জার্মাণের সেনা-পরিচালনার্থ এমন সুব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছিলেন পূৰ্ব্ব
হইতে এমন আয়ােজন করিয়াছিলেন এবং এত শীঘ্র শীঘ্ন অগ্রসর হইলেন যে
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাহারা বেলজিয়ামের সীমান্তে গিয়া পৌছিলেন। কিন্তু এই

৭৮ অষ্টম অধ্যায়। • কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বেলজিয়ামের বাহিনী তাহাদিগকে বাধা দিবার জন্য অগ্রসর হইল । জার্মাণের দেখিলেন এ অবস্থায় লিয়েঝ, নগর অধিকার না করিয়া অগ্রসর হওয়া অকৰ্তব্য, কারণ তত্ৰত্য দুর্গগুলি বেলজিয়ানদিগের হাতে থাকিলে তাহারা জাৰ্মাণদিগকে পশ্চাদভাগ হইতে আক্রমণ করিতে পারেন। কিন্তু তখন তাহাদের সঙ্গে সুদৃঢ়-দুর্গধ্বংসােপযােগী কামান ছিল না। তখন কালক্ষেপ করাও বিপজ্জনক। এই নিমিত্ত তাহারা পদাতিক সৈন্য দ্বারাই লিয়েঝ, আক্রমণ করিলেন। ইহাতে তাহাদের বহু লােকক্ষয় হইল বটে; কিন্তু তাহারা দুর্গগুলি অধিকার করিলেন। লিয়েঝের পর নেমুর। এই দুর্গ অধিকারার্থ জাৰ্মাণেরা হাউইটজা নামক কামান আনয়ন করিলেন; কাজেই কয়েকদিন বিলম্ব হইল । কামান আনীত হইলে তাঁহারা তারা বড় বড় গোলা নিক্ষেপ করিয়া নেমুর বিধ্বস্ত করিলেন, এবং অতঃপর বেজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলও হস্তগত করিলেন। ব্রাসেলসের অধিবাসীরা বার কোটি টাকা দিল বলিয়া জাম্মাণের নগরটা ধ্বংস করিলেন না ; কিন্তু বেলজিয়ামের মধ্যখণ্ডস্থ অন্য সমস্ত নগর ও গ্রামই তাহারা অগ্নিসংযােগে ভস্মীভূত করিলেন। বেলজিয়ামের ক্ষুদ্র সেনা জাৰ্মাণদিগের গতিরােধ করিতে পারিল না; কিন্তু পরাজয়ও স্বীকার করিল না। তাহারা যুদ্ধ করিতে করিতে উত্তরাভিমুখে এন্টোয়ার্প নগরের দিকে হঠিয়া চলিল। এদিকে ফরাসীরাও সেনা সমবেত করিতেছিলেন এবং ইংরাজসেনা বুলে নগরে অবতরণ করিয়াছিল। বেজিয়ামে অক্লেশে জয়লাভ করিলেও জাৰ্মাণের এখন অধিকতর বাধা পাইতে লাগিলেন ; তথাপি তাহারা অগ্রসর হইতে ক্ষান্ত হইলেন না এবং মােঝ, হইতে বাডান্ পৰ্য্যন্ত সমগ্ৰ ইংরাজ ও ফরাসীসেনা। তাহাদের আক্রমণনিবারণে অক্ষম হইয়া পশ্চাতে হঠিতে আরম্ভ করিল। তখন ইংরাজদিগের প্রধান সেনানী ছিলেন সাৰু জন ফ্রেঞ্চ,। তাঁহার অধীন ইংরাজসেনার পরিমাণ বােধ হয় এক লক্ষের অধিক ছিল না। ইংরাজসেনাই তাহাদিগকে অধিক বাধা দিতেছেন দেখিয়া জাৰ্মাণেরা ইহার সম্পূর্ণ বিলােপসাধনার্থ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইলেন। ইংরাজসেন। তখন বহুদূর হঠিয়া গিয়া বেলজিয়ামের অন্তঃপাতী মােন নামক স্থানে পৌছিয়াছিল (২২শে আগষ্ট, ১৯১৪)। ইহার পর দিনই সেনাপতি ফ্রেঞ্চ, সেনাপতি জোফ্রের নিকট হইতে সংবাদ পাইলেন যে উত্তর দিক হইতে প্রায় দুইলক্ষ জাৰ্মাণ সৈন্য তাঁহাকে বামপার্শ্বে আক্রমণ করিবার জন্য যাত্রা করিয়াছে এবং তাহার দক্ষিণপার্শ্বস্থ ফরাসী সৈন্য পরাভূত হইয়া পরাবর্তন করিতেছে। কাজেই ফ্রেঞ্চ দেখিলেন তাঁহাকেও হঠিতে হইবে, নচেৎ পরিত্রাণ নাই। তিনি ২৪শে আগষ্ট সূর্যোদয়ের পর হঠিতে আরম্ভ করিলেন এবং মােবাঝের দুর্গের নিকট উপস্থিত স্থলযুদ্ধ-পশ্চিম প্রান্তে। ইলেন। জাৰ্মাণের তাহাকে এখানে আবদ্ধ করিবার জন্য চেষ্টা করিলেন এবং তন্সন্য ২৫শে আগষ্ট উভয়পক্ষে ভীষণ যুদ্ধ হইল। ইংরাজের ছত্রভঙ্গ হইলেন না তাঁহারা সুশৃঙ্খলভাবে পশ্চিমাভিমুখে হঠিতে হঠিতে ঐ দিন সন্ধ্যার সময় কঁব্রে নামক স্থানে উপনীত হইলেন। কিন্তু এখানেও তাঁহারা বিশ্রাম পাইলেন না। তাহারা ২৬শে সমস্ত দিবারাত্র হঠিয়া গেলেন এবং ২৭ ও ২৮ তারিখে ফরাসীদিগের নিকট হইতে কিছু সাহায্য পাইলেন। তখন তাহারা কঁপেয়েন নামক স্থানে গিয়া পোঁছিয়াছিলেন। মােন হইতে কঁপেয়েনের দূরত্ব প্রায় ৭০ মাইল। প্রবল শক্রর আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষা করিতে করিতে সুশৃঙ্খলভাবে এতদূর হঠিয়া যাওয়া অতি কঠিন ব্যাপার। ইহাতে ইংরাজদিগের বহু সৈন্য বিনষ্ট হইয়াছিল বটে, কিন্তু যুদ্ধোপকরণাদির কিছুমাত্র শক্তহস্তে পতিত হয় নাই। জাৰ্মাণপক্ষেও যে লােকয় কম হইয়াছিল তাহা নহে। তাহারা ইংরাজদিগের বৃহভেদ করবার জন্য কতবার চেষ্টা করিয়াছিলেন, কত সাহস ও উৎসাহ দেখাইয়া- ছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। অপিচ সপ্তাহ কাল অবিরত যুদ্ধ করিতে করতে এত দূর অগ্রসর হইয়াছিলেন বলিয়া শেষে তাহারাও নিতান্ত অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন। পেয়েনে পৌছিয়া ইংরাজেরা নিরাপদ হইলেন; ফরাসীরা আমিয়াঁ হইতে একদল সৈন্য আনিয়া তাহাদের বামভাগে রাখিলেন এবং সকলে মিলিয়া দক্ষিণাভি- মুখে চলিতে চলিতে ক্রমান্বয়ে এ ও মাণ নদী পার হইয়া গেলেন। এদিকে জার্মাণের রমিজ নগর অধিকার করিলেন। পাছে পারিশও জাৰ্মাণ- হস্তে পতিত হয় এই আশঙ্কায় ফরাসী গবর্ণমেণ্ট তাহাদের সমস্ত কাগজপ এ, এবং ফরাসী ব্যাঙ্ক তাহাদের সমস্ত স্বর্ণ রৌপ্য সুদূরবর্তী বর্ভে নগরে প্রেরণ করিলেন স্থির হইল যে প্রয়ােজন হইলে ঐ নগরই অস্থায়িভাবে ফ্রান্সের রাজধানীরূপে গণ্য হইবে। এই সময়ে জার্মাণেরা পারিশের প্রায় দশমাইল মাত্র দূবে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছিলেন। অতএব তাহারা অবিলম্বেই যে অগ্নিবৃষ্টি করিয়া পারিশ ছারখার করিবেন এ আশঙ্কা নিতান্ত অমূলক ছিল না ; সৌভাগ্যক্রমে জাৰ্মাণেরাও এখন নিতান্ত অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাহারা প্রায় একমাস কাল অবিশ্রান্তভাবে যুদ্ধ করিয়াছেন ; তাহারা এত দ্রুতবেগে অগ্রসর হইয়াছিলেন যে পর্যাপ্ত পরিমাণে রসদ ও যুদ্ধোপকরণ সঙ্গে আনিতে পারেন কাজেই পারিশ অবরােধ করিতে পারেন এমন শক্তি আর তখন তাহাদের ছিল না। সম্ভবত এই কারণে আর অগ্রসর হওয়া দুরে থাকুক, তাহাদের দক্ষিণপার্শ্ব বামদিকে পরাবর্তন পূৰ্ব্বক পারিশ হইতে দূরে সরিয়া গেল। জাৰ্ম্মাণদিগের পরাবর্তন ৩রা সেপ্টেম্বর আরম্ভ হইল। অমনি পারিশের নিকটে ; নাই ।

নবার, Ced স্টোর মতে, ই- বলে ঈg স। বসসেসীল ব্রাসেলুন স্টুডের কলেন, গেম, বােস, এবার বাগােম; পেরােণ মােনম, কিশজি माह -লা-মাগো কৰে মৌৱৰ এমিমন, কাপয়েন, গােজো, নৗসেমবার্ণ রীম, ২। প্যারিশ, ভর্ডিান, ফ । • বেলফোর প্রতীচ্য যুদ্ধ ক্ষেত্র জার্মানরা প্রথমে মত তাসের ইয়াহিনে-- যেখা।ে হঠিয়া , (১৯১৪৩১ ডিশের মাইলের ফেম ১০ -g, স্থলযুদ্ধ-পশ্চিম প্রান্তে। ; যে ফরাসীসেনা ছিল তাহা অগ্রসর হইয়া তাহাদিগকে পশ্চাদ্ভাগে আক্রমণ করিল। জার্মাণেরা তখন মারুণ নদীর তীরে ছিলেন ; কাজেই এই যুদ্ধ ‘মাণের যুদ্ধ নামে অভিহিত। এখানে জার্মাণের সম্পূর্ণরূপে পরাভূত হইলেন এবং অতঃপর উত্তরা- ভিমুখে হঠিতে লাগিলেন। ফলতঃ যে জাৰ্মাণ আক্রমণস্রোত এতদিন প্রবলবেগে অগ্রসর হইতেছিল, মায়ণের যুদ্ধে তাহা প্রতিহত হইল; তাঁহারা এ যাত্রা পারিশের আশা ত্যাগ করিয়া আত্মরক্ষার জন্যই ব্যগ্র হইলেন। জার্মাণেরাও অতি সুকৌশলে পরাবন করিতে লাগিলেন। এই সেপ্টেম্বর হইতে কয়েকদিন পৰ্য্যন্ত ক্রমাগত তাঁহাদের সহিত ফরাসীসেনার ভীষণ যুদ্ধ চলিতে লাগিল ; কিন্তু তাহাদের বৃহভঙ্গ হইল না। তাহার শেষে এ নদী অতিক্রমপূর্বক উহার উত্তর পারে একটা সুরক্ষিত স্থানে চলিয়া গেলেন। জাৰ্মাণজাতির অসাধারণ দূরদর্শিতার প্রশংসা না করিয়া পারা যায় না। পারিশ আক্রমণ করিতে গিয়া যদি পরাবর্তন করিতে হয় তবে এনের উত্তরস্থ এই স্থানে অবস্থিতি করিলেই যে সবিশেষ সুবিধা হইবে ইহা তাহারা পূর্ব হইতেই স্থির করিয়াছিলেন এবং তজ্জন্য ইহাকে সুরক্ষিত করিয়া রাখিয়াছিলেন। এখন আঁহারা ইহার পুরােভাগে কুল্যা খনন করিয়া স্থানটীকে দুর্জয় করিয়া তুলিলেন ; কাহারও সাধ হল না যে সম্মুখভাগ হইতে আক্রমণপূর্বক ইহা অধিকার করিতে পারে। ইহার কিছুদিন পরে জার্মাণের বেলজিয়ামের অন্তঃপাতী সুপ্রসিদ্ধ এন্টোয়াপ, নগরটাও হস্তগত করিলেন। অতঃপর উত্তরে সমুদ্র এবং দক্ষিণে বােঝ, পৰ্যন্ত শত শত মাইল ব্যাপিয়া অসংখ্য কুল্যা খনন করা হইল । এদিকে শীত কাল দেখা দিল ; তখন উভয়পক্ষই কুল্যাযুদ্ধ নিরত হইল। ইতিহাসে যে সকল প্রসিদ্ধ দুর্গাবরােধের বর্ণনা দেখা যায়, কুল্যাযুদ্ধও কতকটা তাহারই অনুরূপ ; প্রভেদ এই যে ইহাতে যােজারা অধিকাংশ সময় কুল্যার মধ্যে অবস্থিতি করে। যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় পক্ষেই সহস্র সহস্র কুল্যা ও গভীর অহা খনন করিয়াছেন; প্রত্যেক কুল্যার সহিত অনেকগুলি গুহার সযোেগ আছে। সৈনিকেরা এই সকল গুহায় বাস করে ও নিদ্রা যায়, খাদ্যাদি রাখে ও যুদ্ধসংক্রান্ত মন্ত্রণা করে। কুল্যা ও গুহাগুলি বিদ্যুতের সাহায্যে আলােকিত ; দূরবণ বন্ত্রের সাহায্যে এক কুল্যার সহিত কুল্যান্তরের কথাবার্তাও চলিতে পারে। কোন কোন কুল্যা এমন সুকৌশলে নির্মিত যে, তাহার মধ্যে বাস করিতে কোন কষ্ট হয় ; কিন্তু অধিকাংশ কুল্যা অতি জঘন্য-কমে, জলে বা হিমে পূর্ণ। কিন্তু কষ্টভােগ করিলেও সৈনিকেরা কুল্যাত্যাগ করিতে পারে না। উভয়পক্ষের কুল্যাগুলি কোন কোন স্থানে পরস্পরের এত নিকটে অবস্থিত যে, এক পক্ষে কোন কথা বলিলে অন্য পক্ষে তাহা শুনিতে পায়। অপিচ বর্তমানকালের আগ্নেয়াস্ত্রগুলির ৩ • অষ্টম অধ্যায়। এমন অব্যর্থ সন্ধান যে কেহ কুল্যার বাহিরে গিয়া বিপক্ষের দৃষ্টিগােচর হইলে তাহার আর নিস্তার নাই। অনেকে জিজ্ঞাসা করিবেন, এরূপ অবস্থায় যুদ্ধ চলে কিরূপে? নিম্নে তাহা বলা যাইতেছে - প্রথমত, কুল্যার মধ্যে পরিবীক্ষণ নামে একপ্রকার যন্ত্র আছে। তাহার সাহায্যে কুল্যাবাসিগণ ভূপৃষ্ঠে কি হইতেছে দেখিতে পায়। কুল্যার পুরােবত্তা বগুলির মধ্যে শত শত বন্ধ পথে রাইফল বন্দুক ও যান্ত্রিক বন্দুক থাকে । পরি- বীক্ষণের সাহায্যে শত্রুপক্ষকে লক্ষ্য করিয়া তাহা দ্বারা গুলি করা হয়। দ্বিতীয়ত, প্রস্ফোটনপূর্ণ বােমার ব্যবহারও খুব চলিতেছে ; লােকে কুল্যার ভিতর হইতে এই সমস্ত নিক্ষেপ করিয়া বিপক্ষের কুল্যাবিধ্বংসে নিরত রহিয়াছে। তৃতীয়তঃ, একপক্ষের লােকে অপর পক্ষের কুল্যার নিম্নভাগ পর্যন্ত কুল্যান্তর খনন করিতেছে এবং তাহাতে বারুদ পূরিয়া উপরিস্থ কুল্যা উড়াইয়া দিতেছে। ইহাতে পুনরাবর্তী যে স্থান উন্মুক্ত হইতেছে, তাহারা গিয়া উহা গয়া উহা অধিকার করিতেছে চতুর্থত, প্রত্যেক পক্ষের পশ্চাদভাগে দূরে দূরে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড কামান রহিয়াছে। সেই সকল কামান হইতে অব্যর্থ সন্ধানে বিপক্ষের কুল্যার উপর প্রস্ফোটনপূর্ণ গােল। নিক্ষিপ্ত হইতেছে। গােলা গুলি বিদীর্ণ হইয়া কুল্যা ভাঙ্গিতেছে, তত্ৰত্য যােদ্ধাদিগেরও প্রাণনাশ করিতেছে। পঞ্চমত, যান্ত্রিক বন্দুকের সম্মুখে অগ্রসর হওয়া একরূপ অসম্ভব দেখিয়া ইংরাজেরা ‘ট্যাঙ্ক' নামক এক প্রকার প্রকাণ্ড শকট প্রস্তুত করিয়াছেন। এই শকটগুলির বহির্ভাগ স্কুল লৌহফলকে মণ্ডিত। ইহাদের অভ্যন্তরে যে বড় বড় যন্ত্র আছে, তাহাদের সাহায্যে ইহারা সমান অসমান সর্বপ্রকার ভূমির উপর দিয়া চলিতে পারে। এইগুলি লইয়া ইংরাজেরা শত্রুপক্ষের কুল্যার নিকট যাইতেছেন যান্ত্রিক বন্দুক দ্বারা অবিরত অগ্নিবৃষ্টি করিতেছেন এবং যখন শকটস্থ ঘােন্ধারা কুল্যাবাসী জাৰ্মাণদিগের সহিত যুদ্ধ করিতেছে, তখন ইংরাজ পদাতিকেরা তাহাদের সাহায্যার্থ অগ্রসর হইতেছে। নৈশষুদ্ধ এখন নিত্যঘটনা হইয়াছে। কিন্তু এসকল খণ্ডযুদ্ধমাত্র. শত্রুকে হঠাইয়া দিবার জন্য উভয়পক্ষে বহু সৈন্য লইয়াও বড় বড় যুদ্ধ করিতেছেন। তন্মধ্যে নিম্নলিখিত কয়েকটী প্রধান :- (১) জাৰ্ম্মাণকর্তৃক ঈপৰু অধিকার করিবার চেষ্টা। মারূণের যুদ্ধের পর ইংরাজ- সেনা এ নদীতীর হইতে ফুাঙাসে চলিয়া যায় এবং ঈপনামক স্থানে অবস্থিতি করে। ইংরাজসেনার বামপার্শ্বে বেলজিয়ামের সেনা ছিল। জাৰ্মাণের এই ব্যুহ ভেদ •• স্থলযুজ-পশ্চিম প্রান্তে। ; করিয়া কালে নগরে যাইবার অভিপ্রায়ে ঈপর আক্রমণ করেন ঈপর আক্রমণ করেন এবং প্রায় একপক্ষকাল তুমুল যুদ্ধ চলে। উভয়পক্ষেই বহুলােক হতাহত হয়; কিন্তু জার্মাণে ইংরাজদিগের ব্যুহ ভেদ করিতে পারেন নাই। (২) ১৯১৫ অব্দে ইংরাজকর্তৃক নিয়ুবসাপেল ও লােস অধিকার করিবার চেষ্টা। এই যুদ্ধও বহুদিন চলিয়াছিল। বহুদিন চলিয়াছিল। কুল্যার পুরোভাগে কন্টকযুক্ত লোহতারের বৃতি এবং পশ্চাদ্ভাগে বড় বড় কামান থাকিলে তাহা যে কেবল লােকবলে অধিকার করা অসাধ্য, এ যুদ্ধেও তাহা প্রতিপন্ন হইয়াছিল। (৩) সঁপং অঞ্চলে ফরাসীকর্তৃক জাৰ্মাণদিগের কুল্যা অধিকার করিবার চেষ্টা ১৯১৫ অব্দে যে সকল বড় যুদ্ধ হয় তন্মধ্যে এইটীতেই আক্রমণকারীরা সর্বাপেক্ষা অধিক ফললাভ করেন। জাৰ্মাণদিগের অনেকে বন্দী হয় ; জাৰ্মাণসেনা কিয়দ্র হঠিয়াও যায় ; কিন্তু জাৰ্মাণব্যুহ ভগ্ন হয় নাই। (৪) জাৰ্মাণ কর্তৃক বার্তা অধিকার করিবার চেষ্টা। ১৯১৫-১৬ অব্দের শীতকালেই জাৰ্মাণেরা এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হইয়াছিলেন এবং ১৯১৬ অব্দের বসন্তকালে ভূপৃষ্ঠস্থ তুষার দ্রবীভূত হইবার পূর্বেই তাহারা ইহা আরম্ভ করেন। চতুর্দিকে মণ্ডলাকারে অনেক গুলি সুদৃঢ় দুর্গ আছে বলিয়া বাৰ্ডা অতি সুরক্ষিত কিন্তু যে অঞ্চলে ইহা অবস্থিত তাহা পৰ্বতাকীর্ণ ও বনাবৃত বলিয়া আক্রমণ- কারীদিগের পক্ষেও সুবিধাজনক। জাৰ্মাণেরা এই স্থানটা অধিকার করিবার জন্য অশ্রুতপূৰ্ব আয়ােজন করিয়াছিলেন। তাঁহার শত শত প্রকাণ্ড কামান আনিয়া তাহা হইতে ফরাসীদুর্গ গুলির উপর অবিরত প্রস্ফোটনপূর্ণ গােল নিক্ষেপ করিয়া- ছিলেন, এবং যখনই ভাবিয়াছিলেন, দুর্গস্থ সেনা বিনষ্ট হইয়াছে, তখনই সহস্র সহস্র পদাতি লইয়া দুর্গাধিকারার্থ ধাবিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তাহারা কৃতকার্য হইতে পারেন নাই ; ফরাসীরা আগ্নেয়াস্ত্রের প্রয়ােগে তাহাদের তুল্যকক্ষ ছিলেন । জার্মাণেরা যখন কামান দাগিতেন, তখন তাহারা গুহার মধ্যে লুকাইয়া রহিতেন। জাৰ্মাণ পদাতির যখন অগ্রসর হইত তখন তাঁহারা যান্ত্রিক বন্দুকের সাহায্যে তাহা- দিগের সংহার করিতেন। এই নিমিত্ত বার্ডানে যত জাৰ্মাণসৈন্য বিনষ্ট হইয়াছিল, অন্য কোথাও তত হয় নাই। জার্মাণেরা ক্রমশঃ অগ্রসর হইয়া বার্ডানের তিন মাইল ব্যবধানে গিয়া গে ছিলেন; কিন্তু তখন সােম্ নদীর ধারে ইংরাজেরা অপর একদল আক্রমণ করিয়া তাহাদিগকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিলেন । সাহায্য করিবার জন্য বার্তা হইতে সেনা ভুলিয়া লইবার প্রয়ােত ফরাসীদিগের অদ্ভুত আত্মরক্ষাক্ষমতা দেখিয়াও জাৰ্ম্মাণে ভগ্নোৎসাহ ও কাজেই তাহারা বার্জনের আশা ত্যাগ করিলেন। ইহার কসে- ৪ অষ্টম অধ্যায়। •• অর্থাৎ ১৯১৬ অব্দে শরৎকালে ফরাসীরা জাৰ্ম্মাণদিগকে বার্ডানের নিকট হইতে দূর করিয়া দিলেন। আরা নগরের দক্ষিণে সােম্ নদীর ধারে অতি অল্প দিন হইল ভীষণ যুদ্ধ হইয়া গিয়াছে। জাৰ্মাণের এই অঞ্চলে ভূগর্ভে কুল্যা খনন করিয়া যে সকল সুদৃঢ় দুর্গ নির্মাণ করিয়াছিলেন, পূৰ্ব্বে কে কখনও সেরূপ দেখে নাই। তাহাদের প্রকোষ্ঠ গুলি এত বড় যে, এক একটীতে সহস্র সহস্র লােক থাকিতে পারে। প্রত্যেক প্রকোষ্ঠে বৈদ্যুতিক উত্তোলন-যন্ত্র ছিল ; তাহার সাহায্যে যযাদ্ধারা ইচ্ছা করিলেই উঠিতে নামিতে পারিত। ইংরাজ ও ফরাসীসেনা যখন এই দুর্গগুলি আক্রমণ করিল, তখন জার্মাণের প্রাণপণে তাহাদিগকে বাধা দিতে লাগিলেন। কিন্তু আক্রমণকারীরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ মুষলধারে প্রস্ফোটনপূর্ণ গােল নিক্ষেপ করিয়া দুর্গগুলি চূর্ণ-বিচূর্ণ করিলেন; তাঁহাদের পদাতিগণ পুনঃ পুনঃ অগ্রসর হইয়া শত্রুপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া ফেলিল, নিজেদের যে সহস্র সহস্র লােক মারা গেল তাহাতেও নিরুদ্যম হইল না। কাজেই জাৰ্মাণেরা পরাস্ত হইলেন। ইহার পর হিণ্ডেবার্গ, এ অঞ্চলে জাৰ্মাণসেনার অধিনায়ক হইয়াছেন। তাহার পরামর্শে জাৰ্মাণেরা এখন অনেকদূর হঠিয়া গিয়াছেন; এ দিকে ইংরাজ ও ফরাসী সেনা ভীমপরাক্রমে তাহাদিগকে আক্রমণ আরম্ভ করিতে করিতে অগ্রসর হইতেছে। এই ভীষণ যুদ্ধের এখনও শেষ হয় নাই ; কিন্তু জাৰ্মাণেরা যেরূপ পরাজিত হইতেছেন তাহাতে মনে হয় তাহাদের আর সে তেজ নাই এবং অচিয়ে এ অঞ্চলে তাঁহাদের সম্পূর্ণ বল ভঙ্গ হইবে। ১৯১৫ অব্দের শেষ পর্যন্ত ইংরাজপক্ষের প্রধান অসুবিধা ছিল গােলাগুলি প্রভৃতি যুদ্ধোপকরণের অভাব। এ সম্বন্ধে রাজপুরুষেরা প্রথমে কিছু অদূর- দর্শিতার পরিচয় দিয়াছিলেন। তাহারা বিপুল সেনা সংগ্রহ করিয়াছিলেন । কিন্তু সেনার যাহা অত্যাবশ্যক তাহা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেন নাই। পক্ষান্তরে জাৰ্মাণ- পক্ষে এ সমস্ত দ্রব্যের কিছুমাত্র অভাব ছিল না। জাৰ্মাণেরা জানিতেন আগ্নেয়া- ন্ত্রের উৎকর্ষের উপরই জয় নির্ভর করিবে। তাঁহারা যে সকল বড় বড় কামান প্রস্তুত করিয়াছেন এবং যেরূপ সহজে সেগুলি একস্থান হইতে স্থানান্তরে লইয়া যাইতেছেন, তাহা দেখিয়া সকলেই বিস্মিত হইয়াছেন। এসে নগরে কুপের যে কারখানা আছে, কেবল সেখানেই প্রায় আড়াই লক্ষ শিল্পী নিযুক্ত রহিয়াছে। আগ্নেয়াস্ত্রনির্মাণে ইহারা সকলেই সিদ্ধহস্ত। সৌভাগ্যের বিষয় শ্রীযুক্ত লয়েড, জর্জের চেষ্টায় ইংরাজেরাও শেষে এদিকে মনােনিবেশ করিয়াছেন এবং ইংল্যাণ্ডের কারখানাগুলি হইতে এখন প্রচুর পরিমাণে যুদ্ধোপকরণ প্রস্তুত ;

৮৫ হলযুদ্ধ-পূর্ব প্রান্তে। (খ) পূর্ব প্রান্তে। য়ুরােপীয় সমরাঙ্গণের পূর্বপ্রান্তে কি হইতেছে তাহা বুঝিবার জয় একবায় মানচিত্রে বিষ্টুলা নদীর দিকে দৃষ্টিপাত কর। ইহার তীরবর্তী টর, ওয়াস ও ক্রাকো এই নগরত্ৰয় যথাক্রমে জাৰ্ম্মাণি, রুশিয়া ও অষ্ট্রিয়ার অধিকারভুক্ত। যে অঞ্চল দিয়া বিষ্টুলা গিয়াছে তাহা সমতল ; কাজেই তাহার প্রায় সর্বত্র সেনা- পরিচালনের বেশ সুবিধা। কেবল প্রুশিয়ার ঈশানকোণে কতকগুলি হ্রদ ও বিল থাকায় যাতায়াতের কিছু ব্যাঘাত হয়। কিন্তু এখানেও জাৰ্মাণেরা এত রেলওয়ে নির্মাণ করিয়াছেন যে সহজেই একস্থান হইতে স্থানান্তরে সেনা ও যুদ্ধোপকরণ প্রেরণ করা যায় । এইজন্য তাঁহারা ইহার যেখানে ইচ্ছা অনায়াসে সমধিক শক্তি বিনিবেশিত করিতে পারেন। পােল্যাণ্ডে রেলওয়ে অল্প ; যাহা ছিল তাহাও বােধ হয় বর্তমান যুদ্ধে বিধ্বস্ত হইয়াছে। কিন্তু ইহাতে রুশিয়ার লাভ ভিন্ন অলাভ নাই ; কারণ রেলওয়ের অভাবে জাৰ্মাণদিগের পক্ষে বড় বড় কামান ও অন্যান্য যন্ত্র বহন করা কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ। পক্ষান্তরে রুশদিগের যখন যন্ত্র ও বড় কামান একরূপ নাই বলিলেই হখন রেলওয়ের অভাবেই বা বেশি কি ক্ষতি ? পূর্ব প্রান্তের যুদ্ধক্ষেত্র মাৈটামুটি তিন অংশে বিভাগ করা যাইতে পারে। বর্তমান প্রকরণে আমরা তাহাদের প্রত্যেক অংশের প্রধান প্রধান ঘটনাগুলি আলােচনা করিব। পূর্ব প্রান্তে প্রশিয়ার পূর্বখণ্ডেই প্রথম যুদ্ধান্ত হয়। অনেকে ভাবিয়া- ছিলেন রুশেরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হন নাই; তাহারা শীঘ্র প্রুশিয়া আক্রমণ করিতে পারিবেন না। কিন্তু জাৰ্মাণেরা যখন ফ্রান্স, আক্রমণ করিলেন, তখন রুশেরা তাঁহাদিগকে পশ্চিম হইতে পূর্ব প্রান্তে আকর্ষণ করিবার উদ্দেশ্যে আশাতীত ক্ষিপ্ৰকারিতার সহিত প্রুশিয়ার পূর্বখণ্ডে সেনা পাঠাইলেন। সম্ভবতঃ তাহারা জাৰ্মাণজাতির প্রকৃত বল বুঝিতে পারেন নাই বলিয়াই এই দুঃসাহসের কার্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। তাহারা প্রথম কয়েকদিন বিজয়ী হইয়াছিলেন বটে, কিন্তু শেষে ট্যানেনবার্গ নামক স্থানে জাৰ্মাণ সেনাপতি হিণ্ডেবার্গ, তাহাদিগকে এমন- ভাবে পরাস্ত করিলেন যে, তাঁহাদের বহু সহস্র লােক নিহত হইল এবং বহু সহস্র শক্তহস্তে পড়িয়া জার্মাণিতে অবরুদ্ধ রহিল । ইহার পর জার্মাণেরা পােল্যাণ্ড আক্রমণ করিলেন এবং অতি দ্রুতবেগে ওয়াস নগরের দিকে ছুটিয়া চলিলেন। তখন গ্রাণ্ড ভিউ নিকোলাস্ এই অঞ্চলে রুশসেনার অধিনেতা ছিলেন। তাহার সুকৌশলে হিনেবার্গ এ যাত্রা কিছু রিণা উপ- সাগর; প্রাযুদ্ধক্ষেত্র Lokant ডুইন সাগর ডুইন কবনে কনিসবার্গ, ড্যাজিগ विलना ग्रा নি cট্যানেবার্গ, গ্রডমন্য मिन টরণ, শি ওয়ার্সঃ পিনস্ক লােড়জ, ব্রে-লিটোবন্ধু লিপেট নদী পাে देश नमो সুলিন, কোবেল, লেম্বার্গ +ve, । জেমিসল, স্পােমি a loks & %% স!! viki/% টার্ণেপল, ??' কা" থি মাষ্টার নদী ! রি যুদ্ধ-পূর্ব প্রান্তে। করিতে পারিলেন না। ইহার পর ১৯১৪ অব্দের শীতকালে জাৰ্মাণে আবার পােল্যাণ্ড আক্রমণ করিলেন এবং আবার ব্যর্থমনােরথ হইয়া প্রত্যাবর্তন করিলেন। শেষে ১৯১৫ অব্দের গ্রীষ্মকালে যখন তাহারা তৃতীয় বার পােলাও আক্রমণ করিলেন, তখন তাঁহারা কৃতকার্য হইলেন। কিন্তু এই ঘটনা বর্ণনা করিবার পূর্বে দেখা যাউক অষ্ট্রিয়ার অধিকারভুক্ত গ্যালিসিয়া প্রদেশে কি কাণ্ড হইতেছিল। ১৯১৪ অব্দে কুশেরা যখন প্রশিয়া আক্রমণ করেন, সেই সময় গ্যালিসিয়াও আক্রমণ করিয়াছিলেন। এখানেও তাহারা প্রথমে বেশ কৃতিত্ব দেখাইয়াছিলেন। লেমবার্গ, নামক একটা বৃহৎ নগর তাহাদের পদানত হইল, এবং অনেকে মনে করিলেন, অচিরে কাকোরও সেই দশা ঘটিবে। তাহারা পূজেমিস নামক স্থানের সুদৃঢ় দুর্গ জয় করিলেন, প্রায় এক লক্ষ অষ্ট্রিয়ান সৈন্য বন্দী করিলেন এবং কার্পেথিয়ান পর্বতমালার শিধরদেশ পর্যন্ত অগ্রসর হইলেন। ইহাতে মনে হইল ১৯১৫ অব্দের বসন্তাগমে তাঁহারা হাঙ্গারি রাজ্যেও অবতীর্ণ হইবেন। কিন্তু বিধাতা অন্যরূপ ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছিলেন। ১৯১৫ অব্দের বসন্ত দেখা দিল বটে, কিন্তু শেরা তখন স্বরাজ্যরক্ষার জনাই বিব্রত। অষ্ট্রিয়ার সেনা সুপরিচালকের অভাবে এত দিন বীৰ্যবিকাশের সুবিধা পায় নাই। কিন্তু যখন জার্মাণেরা গিয়া ইহাদের উন্নতিবিধানে হাত দিলেন তখন এই সেনাই অদ্ভুত বীরত্ব দেখাইতে লাগিল। ইহারা অল্পদিনের মধ্যে রুশদিগকে গ্যালিসিয়া হইতে তাড়াইয়া দিল ; এদিকে উত্তর দক্ষিণ উভয় দিক হইতে দুই- দল জাৰ্মাণ সেনা ওয়াসার অভিমুখে যাত্রা করিয়া ঐ স্থানটী অধিকার করিয়া লইল। অতঃপর পূর্ব প্রান্ত সমস্ত জাৰ্মাণ সৈন্য যুগপৎ অগ্রসর হইতে লাগিল, দুর্গের পর দুর্গ অধিকার করিতে করিতে চলিল, বোধ হইল যেন শীতের পূৰ্বেই রিগানগর জাৰ্ম্মাণদিগের হস্তগত হইবে। পুনঃ পুনঃ পরাভবে রুশেরা ক্ষীণবল হইয়া পড়িলেন বটে, কিন্তু তাহাদের সেনা ছত্রভঙ্গ হইল না। জাৰ্মাণেরা অনেকবার তাহাদিগকে বেষ্টন করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু কৃতকাৰ্য্য হইতে পারেন নাই। শেষে রুশেরা যখন ডুইনা নদীর তীরে গিয়া পৌছিলেন, তখন জাৰ্মাণদিগকে রীতিমত বাধা দিতে আরম্ভ করিলেন। এখানেও জাৰ্মাণেরা যথাসাধ্য বল প্রয়ােগপূর্বক তাঁহাদের বৃহভেদ করিবার চেষ্টা করিলেন, কিন্তু সে চেষ্টা দীর্ঘকাল স্থায়ী হইল না, কারণ এতদিন অবিরত ভীষণযুদ্ধে নিরত ছিলেন বলিয়া জাৰ্মাণদিগেরও উদ্যমশীলতা মন্দীভূত হইয়াছিল। প্রাচ্য রণক্ষেত্রের দক্ষিণপ্রান্তেও ঠিক এই দশা ঘটিল। জার্মাণের ওয়ার্স অষ্টম অধ্যায়। হইতে পূৰ্বাভিমুখে প্রায় ১০০ মাইল অগ্রসর হইয়াছিলেন । কিন্তু সেখানে । প্রিপেট নদীর পার্শ্বস্থ বিলগুলি তাঁহাদের গতিরােধ করিল। এদিকে শীতকাল আসিল, কাজেই যুদ্ধ করা একরূপ অসম্ভব হইল। উভয়পক্ষেই শীতকালটা (১৯১৪-১৬) উন্মুক্ত প্রান্তরে অবস্থিতি করিল। রুশেরা একবার দক্ষিণাভিমুখে অগ্রসর হইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু শেষে বুঝিতে পারিলেন গ্রীষ্মকালে ভূমি শুষ্ক না হইলে সেনা পরিচালনের সুবিধা পাওয়া যাইবে না। অনন্তর তঁাহার সেনার উৎকর্ষবিধানে যত্নবান হইলেন। তাহারা বুঝিলেন পৰ্যাপ্ত যুদ্ধোপকরণের অভাবই তাহাদের পরাজয়ের প্রধান কারণ। ঐ রুমানিয়া }{{{{\"/ কে বি রি নীফার নদী জ মাসী) সেরেট নদী ট্রা ন, সি দ্যা নি য় ৪ ব্রাসে 7,211 ব্যানষ্টাই शनि ~ নিৰি পথ কিপােলং গালাটস, বুজি যেষ্টি চার্শার্বোডা কনস্ট্যাঞ্জা বাে * বুকারেষ্ট গ যােব * ডানিয়ুব নদী সিষ্টো মাই ২০ ৪৮ রি কুশেরা প্রধানতঃ কৃষিজীবী ; কাজেই তাঁহারা শীঘ্র শীঘ্র যুদ্ধোপকরণ প্রস্তুত করিতে পারেন না; বিদেশ হইতেও এ সমস্ত সংগ্রহ করা সহজ নহে, কারণ ভার্ডেনেশ, তুর্কদিগের হাতে বলিয়া তাহারা ভূমধ্যসাগরে প্রবেশ করিতে পারেন সুলযুদ্ধ-পূৰ্ব্বপ্রান্তে। না; আর্কেঞ্জেলের বন্দরটা শীতকালে বরফে অবরুদ্ধ হয় ; প্রশান্ত মহাসাগরের তীরবর্তী ব্লভিষ্টকেরও সেই দশা, বিশেষতঃ ইহা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে বহুদূরে। এই সমস্ত কারণে কেবল জাপান ভিন্ন রুশিয়ার অন্য কোন বন্ধু উপকরণ-সম্বন্ধে তাহার সাহায্য করিতে পারে না। জার্মাণেরা ভাবিয়াছিলেন, পূৰ্ব্বোক পরাভবের পর রুশেরা শীঘ্ন মস্তক উত্তোলন করিতে পারিবেন না। কাজেই তাহার নিশ্চিন্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁহার ভুল বুঝিয়াছিলেন। ১৯১৬ অব্দের গ্রীষ্মকালে রুশেরা বুকোভিনা আক্রমণ করিলেন, চালােবিটস, অধিকার করিলেন এবং লেমবার্গ, অধিকারার্থ অগ্রসর হইলেন। আশা হইল তাহারা পুনৰ্ব্বার কার্পেথিয়ান পর্বতের শিখরদেশ অধিকার করিবেন। কিন্তু এবারও জার্মাণের অস্ট্রিয়ার সাহায্যার্থ সেনা পাঠাইলেন ; রুশদিগের অগ্রগতি বন্ধ হইল”; তাহারা প্রাণপণে যুদ্ধ করিলেন বটে, কিন্তু হাঙ্গারিতে প্রবেশ করিতে পারিলেন না। এদিকে রুমানিয়ার সর্বনাশ হইল। যখন রুশের গ্যালিসিয়া আক্রমণ করিয়াছিলেন, তখন যদি রুমানিয়ার লােকে তাদের সঙ্গে যােগ দিতেন তাহা হইলে বিচক্ষণতার কাৰ্য্য হইত। কিন্তু তখন তাঁহারা উদাসীন ছিলেন ; পরে রুশে যখন হঠিয়া গেলেন, সেই সময়ে তাহারা অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইলেন। জার্মাণের বিদ্যুদবেগে ধাবিত হইয়া রুমানিয়াকে বাধা দিলেন । রুশের রুমানিয়ার সাহায্যার্থ গিয়াছিলেন, কিন্তু জাৰ্ম্মাণ সেনাপতি ম্যাকেসেন একদল বুলগ্না সেনা লইয়া ডােব্ৰুজার ভিতর দিয়া উত্তরাভিমুখে যাত্রা করিলেন। কুশেরা হঠিয়া গেলেন এবং জার্মাণেরা কনষ্টাঞ্জা ও চার্ণবােড়া নগর জয় করিলেন। অতঃপর ম্যাকেসে ডানিয়ুবনদী অতিক্রম পূৰ্ব্বক রুমানিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশ করিলেন ; রাজধানী বুকারেই নগরও তাঁহার হস্তগত হইল। ফলতঃ রুমানিয়া জয় করিবার সময় জার্মাণের যে অসাধারণ শক্তি ও ক্ষিপ্ৰকারিতা প্রদর্শন করিয়াছেন তাহা অতি বিস্ময়কর। এখন যেরূপ অবস্থা দাঁড়াইয়াছে তাহাতে রুমানিয়ার সেনা উত্তরে হঠিয়া গিয়া রুশদিগের সঙ্গে যােগ দিতে পারিলেই যথেষ্ট। তাহা হইলে কিয়ৎকাল পরে হয়ত তাহারা পুনৰ্বার রুমানিয়া অধিকার করিতে পারে। রুমানিয়ার পরাভবে ইংরাজপক্ষের যে ক্ষতি হইয়াছে তাহা স্বীকার করিতে হইবে। জাৰ্মাণেরা এখান হইতে সঞ্চিত শস্য লইয়া গিয়াছেন; তজ্জন্য রুমানিয়াবাসীরাও অনেকে অনাহারে মারা যাইতেছে। এদিকে রুশজাতির সন্দেহ জন্মিল যে, শাসনকর্তাদিগের ত্রুটিবশতঃই পুনঃ পুনঃ তাহাদের পরাজয় ঘটিতেছে এবং দেশের ভয়ানক দুর্দশা হইয়াছে। রাজমহিষী যে জাৰ্মাণদিগের হিতাকাক্ষিণী তাহা কাহারও অবিদিত ছিল না ; রাজা নিজেও অষ্টম অধ্যায়। সম্ভবত মহিষার পরামর্শে, মুখে না হউক কাৰ্য্যে, যুদ্ধসম্বন্ধে শৈথিল্য দেখাইয়াছেন এ সন্দেহেরও যথেষ্ট কারণ ছিল। এই নিমিত্ত জনসাধারণে রাজকীয় শক্তির বিকদ্ধে দণ্ডায়মান হইল ; রাজাকে পদচ্যুত করিয়া দেশে সাধারণতন্ত্র শাসনপ্রণালী প্রতিষ্ঠিত করিল, বহু শতাব্দীর যথেচ্ছাচার একদিনে উঠাইয়া দিল। কুশেরা স্বদেশে সুব্যবস্থা স্থাপনের জন্যই ব্যস্ত ; কাজেই ইংরাজপক্ষকে আশানুরূপ সাহায্য করিতে পারিতেছেন না; কিন্তু তাহারা প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন অচিয়ে জার্মাণির দর্প চূর্ণ করিবার জন্য আবার প্রাণপণে চেষ্টা করিবেন এবং কখনও স্বতন্ত্রভাবে শত্রুপক্ষের সহিত সন্ধিস্থাপন করিবেন না। (গ) বল্কান্ উপদ্বীপে। অস্ট্রিয়ার মতে বর্তমান যুদ্ধের প্রধান কারণ সার্বিয়ার অসাধু আচরণ ; সার্বিয়ার দণ্ডবিধানই ইহার মুখ্য উদ্দেশ্য। এই নিমিত্ত যুদ্ধারম্ভেই সার্বিয়ার দমনাৰ্থ অষ্ট্রিয়া হইতে সেনা প্রেরিত হইয়াছিল। কিন্তু সার্বিয়ার লােকে এরূপ বীরত্বসহকারে যুদ্ধ করিয়াছিল যে, অষ্ট্রিয়ার সেনা অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া ফিরিয়া গিয়াছিল। ইহার পর অষ্ট্রিয়া হইতে আবার স্নেনা গেল ; কিন্তু সে নাও পবাভূত হইল। শেষে জাহ্মণেরা অস্ট্রিয়ার সাহায্য করিতে লাগিলেন; এবং বুলগেরিয়াও সার্বিয়ার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিল। সার্বিয়ার লােকের ন্যায় বুল গারেরাও শাবজাতার; অথচ তাহারা সার্বিয়ার বিপক্ষ হইলেন। যখন জার্মাণের উত্তর হইতে সার্বিয়া আক্রমণ করিলেন, তখন বুলগারেরা তাহাদের সঙ্গে যােগ দিবার মানসে দক্ষিণ হইতে যাত্রা করিলেন। এই সময়ে সালো- নিকাতে ইংরাজ ও ফরাসী সৈন্য অবস্থিত ছিল; কিন্তু যুদ্ধোপকরণের অভাবশতঃ ইহারা সাবিয়ার কোন সাহায্য করিতে পারিল না। ফলতঃ সার্বিয়ার সম্বন্ধে ইংরা ও ফরাসীরা কিছু অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়াছিলেন। তাহারা কয় স্থির করিয়া- ছিলেন যে, বুলগারেরা কোন পক্ষেই যােগ দিবেন না, কিংবা পূৰ্ককৃত সন্ধির নিয়মানুসারে গ্রীকেরা সাবিয়ার সহায় হইবেন। কিন্তু বুলগারের সার্বিয়ার বিপক্ষ হইলেন, গ্রীকেরাও বাঙ নিষ্পত্তি করিলেন না। কাজেই সার্বিয়ার সর্বনাশ হইল। সাবিয়ার সেনা যতদিন পারিল যুদ্ধ করিল , শেষে আবানিয়ার পার্বত্য অঞ্চলের ভিতর দিয়া এড্রিয়াটিক উপসাগরের উপকূলভাগে হঠিয়া গেল। ইংরাজপক্ষের জাহাজে তাহারা শেষে কফু দ্বীপে নীত হইল। (১৯১৫ অব ; শরৎকাল)। বুগারের সার্বিয়ার চিরশত্রু। তাহারা তত্ৰত্য অধিবাসীদিগকে অতি নিষ্ঠুরভাবে কষ্ট দিতে লাগিলেন।

স্থলযুদ্ধ-তুরুকে। গ্রীদিগের আচরণ ও যে অতি ঘৃণাই হইয়াছিল তাহাতে সন্দেহ নাই। বলকানযুদ্ধের অবসানে গ্রীসের সহিত সার্বিয়ার যখন সন্ধি হয়, তখন গ্রীকের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন, বুলগারের সার্বিয়া আক্রমণ করিলে তাহারা সার্বিয়ার পক্ষ অবলম্বন করিবেন। ইংরাজ ও ফরাসীরা যখন তাহাদিগকে এই অঙ্গীকার পালন করিতে বলিলেন, তখন কিন্তু তাঁহারা অম্লানবদনে অসম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। ইহার প্রধান কারণ এই যে, বর্তমান গ্রীকরাজ জাৰ্ম্মাণির মিত্র। তাঁহার চক্রান্তে গ্রীসের আরও অনেক লােকে জার্মানির পক্ষপাতী হইয়াছে কারণ তাহারা বুঝিয়াছে যে এ যুদ্ধে জাৰ্ম্মাণির জয় অবশ্যম্ভাবী। বুলগারের গ্রীস ও সার্বিয়া উভয় রাজ্যেরই সাধারণ শত্রু। তাহাদিগকে দমন করিবার এমন সুন্দর সুযােগ পাইয়াও কেবল জাৰ্ম্মাণির ভয়েই গ্রীকের অঙ্গীকারভঙ্গ করিলেন, তাহাদের কাপুরুষতা দেখিয়া পৃথিবীশুদ্ধ লােক ধিক্কার দিতে লাগিল। সুখের বিষয় এই গ্ৰীদিগের মধ্যেও অনেকে ইহার জন্য লজ্জিত হইয়াছেন, এবং তাহারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া ইংরাজ ও ফরাসীদিগের সহিত যােগ দিয়াছেন। গ্রী যে পরিণামে কোন্ পক্ষভুক্ত হইবে তাহা এখনও ভাল বুঝা যায় নাই। এই জন্যই সালােনিকায় অবস্থিত ইংরাজ ও ফরাসী সৈন্য এখনও কিছু করিতে পারিতেছেন না। তাহারা সার্বিয়ার সাহায্যার্থ অগ্রসর হইলে গ্রীকের যে তাহাদিগকে পশ্চাদভাগ হইতে আক্রমণ করিবেন না তাহা কে বলতে পারে ? তথাপি ইংরাজ ও ফরাসীরা সার্বিয়ার হতাবশিষ্ট সৈন্যদিগকে কফুৰীপ হইতে তুলিয়া আনিয়াছেন এবং এই মুষ্টিমেয় সৈন্যই অল্পদিন হইল বুগারদিগকে পরাস্ত করিয়া মােনাষ্টির নগর পুনরধিকার করিয়াছে (ঙ) তুরুষ্কে। এখন জানা গিয়াছে তুর্কের প্রথম হইতেই জাৰ্মাণদিগের সহিত যােগ দিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন ; তবে সম্ভবতঃ আয়ােজনের অভাববশতঃ প্রথম কয়েক মাস ইহার কোন লক্ষণ প্রকাশ করেন নাই। তুর্কদিগের প্রধান উদ্দেশ্য মিশর পুনরুদ্ধার করা। জাৰ্মাণেরা তাহাদিগকে আশা দিয়াছিলেন, শীঘ্রই তাহারা এই উদ্দেশ্যসিদ্ধির নিমিত্ত পৰ্যাপ্ত পরিমাণে সেনা ঘােগাইবেন। কিন্তু ইংরাজেরা যখন মেসােপটেমিয়া এবং গ্যালিপলিতে সেনা পাঠাইলেন, তখন তাহাদিগকে বাধা দিবার জন্য তুর্কদিগকে উৎকৃষ্ট সৈন্য নিয়ােজিত করিতে হইল ; জাৰ্ম্মাণিও * ইনি সম্প্রতি রাজপদত্যাগ করিয়াছেন। (জুন, ১৯১৭)। । গ্রীসের নবভুপতি ইংরাজ পক্ষভুক্ত হইয়াছেন।

নিসিবিন, সি সীগ্রর টিফ্লিশ # ট্রেবিজণ্ড, বৈবুরি কর্ম, এজিগ্যান, এর্জ কোকেই এরিতাদ মেলাজমেরি জলফা এরপুট, মূষ কাস্পিয়ান ডায়ার বেকার বিটুলিস বন मनि তাব্রিজ সাগর এঞ্জেলি উরুমিয়া হ্রদ রেসি মােসান, কাবিন, তেহ্রাণo সর-ইসিরিণ, ৩ হামাদান আরাস ন টাইগ্রিস নদী রস যে °ाभीनमा সুলতানাবাদ টেসিফন, কুট-এ-মামার সেমাদ = ৫ দিজফুল ক্রাটিন শ র মোপটেমিয়া রেনে.. সীমান্ত নদী- আহআজ, মােহামেরা ঐ ব, ••• । N Pisan সল মাইল রহস্য উপসাগর ১০ স্থলযুদ্ধ তুষ্ণে। • তাঁহাদিগকে শুদ্ধ সেনানী, অর্থ ও যুদ্ধোপকরণ দিয়া নিশ্চিন্ত হইলেন, সেনা দ্বারা সাহায্য করিতে পারিলেন না। কাজেই মিশর আক্রমণ করিবার উপযুক্ত শক্তি- সঞ্চয় হইল না। তুর্কেরা সুয়েজ খাল পৰ্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিলেন সত্য, কিন্তু ইংরাজেরা ভারতবর্ষ হইতে এই অঞ্চলে সেনা লইয়া গিয়া তাহাদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করিলেন। এখন ইংরাজের। ঐ খালটাকে এমন সুন্দররূপে রক্ষিত করিয়াছেন যে সেখানে আর কোন আশঙ্কার কারণ নাই। মেসােপটেমিয়া জয় করিবার জন্যও ভারতবর্ষ হইতে সৈন্য গিয়াছিল (নবেম্বর, ১৯১৪) : প্রথমে ইহারা বেশ কৃতকার্য হইয়াছিল। ইহার বা অধিকার পূৰ্ব্বক জয়লাভ করিতে করিতে বাগদাদের নিকট গিয়া পৌছিয়াছিল; কিন্তু তখন রােগে ও যুদ্ধে ইহাদের সংখ্যা ক্ষীণ হইয়াছিল, পক্ষান্তরে তুর্কদিগের ক্রমশঃ দল- পুষ্টি হইতেছিল। কাজেই ১৯১৫ অব্দের নবেম্বর মাসে টেসিফনে যে যুদ্ধ হইল তাহার পর ইংরাজেরা পরাবর্তন আরম্ভ করিলেন এবং টাইগ্রীসের তটবর্তী কুট এল আম্রা নামক স্থানে শিবিরসন্নিবেশ করিলেন। অনন্তর তুর্কেরা এই স্থান অবরােধ করিলেন; ইংরাজের অসাধারণ বীরত্বসহকারে আত্মরক্ষা করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাদের সাহায্যার্থ দক্ষিণ হইতে যে সৈন্য প্রেরিত হইল, তুর্কেরা তাহাদিগকে অগ্রসরত দিলেন না। এদিকে ইংরাজশিবিরে খাদ্যাভাব ঘটিল; কাজেই অবরুদ্ধ ইংরাজেরা ছয়মাস কাল অশ্রুতপূৰ্ব কষ্ট সহ্য করিয়া অবশেষে আত্মসমর্পণ করলেন (১৯১৬; এপ্রিল)। এই সময়ে তাহাদের সংখ্যা কমিয়া মাত্র নয় হাজারে দাড়াইয়াছিল। এশিয়াখণ্ডের তুরুষ্কে গ্রীষ্মের প্রখ্য অসহ; কাজেই ইংরাজের শীঘ্র ইহার প্রতিশােধ লইতে পারিলেন না। কিন্তু তুর্কেরাও দক্ষিণাভিমুখে আর অগ্রসর হইতে পারিলেন না। ইংরাজেরা তাহাদিগকে সমুচিত শিক্ষা দিবার জন্য আবার আয়ােজন করিতে লাগিলেন। এই ভাবে ১৯১৬ অব্দ কাটিয়া গেল। অতঃপর বর্তমান বর্ষে ইংরাজসেন এই পরাভবকলঙ্ক অপনােদন করিয়াছেন; তাহারা কুটু অধিকার করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, খলিফাদিগের প্রাচীন রাজধানী সুপ্রসিদ্ধ বাগদাদ নগর পৰ্য্যন্ত হস্তগত করিয়াছেন। জার্মাণের বালিন হইতে বাগদাদ পৰ্য্যন্ত রেলপথে সেন পরিচালন করিবেন বলিয়া স্বপ্ন দেখিতেছিলেন; তাহা এখন ভাঙ্গিয়া গিয়াছে। এশিয়া মাইনরে তুর্কদিগের সহিত রুশদিগের যুদ্ধ চলিতেছিল ; ইহাতে কখনও তুর্কেরা, কখনও রুশেরা বিজয়ী হইতেছিলেন। অতঃপর ১৯১৫ অকে গ্রাণ্ড, ডিউক নিকোলাশ, গিয়া রুশ সেনার নেতৃত্ব গ্রহণ করিলেন। তিনি সমস্ত শরৎ ও শীতকাল যুদ্ধায়ােজনে অতিবাহিত করিলেন এবং পর বৎসর ফেব্রুয়ারি মাসে আর্জ, রুম্ নগর অধিকার করিলেন। এই স্থানটা পার্বত্য প্রদেশে, সমুদ্রপৃষ্ঠ হইতে বহু উচ্চে ১৪ অষ্টম অধ্যায়। ; ; অবস্থিত। অত্ৰত্য দুর্গ দুর্জয় বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিল। কিন্তু দৃঢ়তাই ইহার পতনের কারণ হইয়াছিল ; কারণ দুর্গের চতুষ্পশ্বস্থ ভূভাগ তখন পর্যন্ত তুষারে আবৃত ছিল ; কাজেই এরূপ অবস্থায় কেহ উহা আক্রমণ করিতে সাহস করিবে না ভাবিয়া তুর্কের নিশ্চিন্ত ছিলেন। কিন্তু রুশের সঙ্গোপনে তুষারের ভিতর দিয়া দুর্গের সমীপে উপস্থিত হইলেন ; তুর্কেরা হঠাৎ আক্রান্ত হইয়া রীতিমত বাধা দিতে পারিলেন না। অতঃপর রুশের কৃষ্ণসাগরের তীরস্থ ট্রেবিজাণ্ড, নামক প্রসিদ্ধ নগরটাও অধিকার করিলেন। আর্জ রুম্ ও ট্রেবিজণ্ড, আর্মিনিয়া প্রদেশে অবস্থিত। আমিনিয়ার অধি- বাসীরা খ্রীষ্টান ; তাহারা শত শত বৎসর তুর্কদিগের অত্যাচারে নিপীড়িত হইতেছে। বর্তমান যুদ্ধেও তুর্কের তাহাদিগের ধনসম্পত্তি লুণ্ঠন করিয়াছেন এবং যাহাকে পারিয়াছেন নিহত করিয়াছেন। দীর্ঘকাল এরূপ চলিলে আৰ্মানী জাতি যে নিমূল হইবে তাহাতে সন্দেহ নাই। সৌভাগ্যের বিষয় এই যে রুশেরা এখন তাহাদের উদ্ধারসাধনের উপায় করিয়াছেন। আৰ্মাণীদিগের উৎপীড়ন ভাবিলে মনে হয় তুর্কজাতি অতি নিষ্ঠুর। কিন্তু সম্প্রতি ইংরাজবন্দীদিগের সহিত তাহারা যেরূপ ব্যবহার করিয়াছেন, তাহাতে তাহাদের সৌজন্যেরও বিলক্ষণ পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। (ঙ) ইটালিতে। ইটালির লােকে যখন অষ্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন, তখন তাহারা উত্তর-পূর্ব ও উত্তর উভয়দিকেই সেনা পাঠাইলেন। কিন্তু এই দুই অঞ্চল উন্নত পৰ্বতাকীর্ণ ; অষ্ট্রিয়ানেরা জাৰ্ম্মাণদিগের পরামর্শে প্রতি গিরিপথে দুর্গ নির্মাণ করিয়াছিলেন এবং বড় বড় কামান রাখিয়া ছলেন; কাজেই ইটালিয়ানের কোন- দিকেই এ পর্যন্ত আশানুরূপ ফল লাভ করিতে পারেন নাই। বিশেষতঃ উত্তরাঞ্চলে অষ্ট্রিয়ানেরা এরূপ বিপুল আয়ােজন করিয়াছিলেন যে, ১৯১৬ অব্দে তাহারা সেখান হইতে ইটালির সেনা দূর করিয়া দিয়াছিলেন এবং নিজেরাই ইটালি আক্রমণ করিয়াছিলেন। কিন্তু অতঃপর ইটালিয়ানেরা আবার বলসঞ্চয় করিয়া- ছেন, অষ্ট্রিয়ানদিগকে পৰ্ব্বতের অপর পার্শ্বে হঠাইয়া দিয়াছেন এবং উত্তরপূর্ব প্রান্তে গরিটজ নামক একটী নগর অধিকার করিয়াছেন। তঁাহারা এখনও টিয়েষ্টি জয় করিতে পারেন নাই বটে, কিন্তু বর্তমান বর্ষে সফলকাম হইবেন এরূপ আশা করা যায়। তাহার এড্রিয়াটি উপসাগরের পূর্বতীরবর্তী বালােনা নামক একটা বন্দরও অধিকার করিয়াছেন এবং সেখান হইতে অগ্রসর হইয়া সার্বিয়াদিগের সহায়তা করিতেছেন।

স্থলযুদ্ধ-আফ্রিকায়। • (চ) পর্টগালে । পটুগাল একটা ক্ষুদ্রােজ্য ; বর্তমান যুদ্ধে ইহার কোন স্বার্থ নাই, বিশেষের জয় পরাজয়ের সঙ্গে ইহার মর্যাদাহানিরও সম্ভাবনা দেখা যায় না, কিন্তু পট গীজজাতি বহুকাল হইতে ইংরাজদিগেব মিত্র ; এইজন্ম তঁাহারা উদাসীন থাকিতে পারেন নাই। যখন যুদ্ধাৰম্ভ হয় তখন কতকগুলি জাৰ্ম্মাণ পােত লিসবনে আশ্রয় লইয়াছিল। পট গীজ গবর্ণমেন্ট ফাঙ্ণদগকে জানাইলেন, আমরা দীর্ঘকাল আপনাদের পােতরক্ষার ভার লইতে পারিব না ; অতএব সেগুলি লইয়া যাইবার ব্যবস্থা করুন। কিন্তু সেগুলি লইবার চেষ্টা করিলে পথে ইংরাজ বা ফরাসীদিগের হাতে ধরা পড়িবেন বলিয়া জাম্মাণে পৰ্ট গালের কথায় বিষক্ত হইতেন এবং পট গী দিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করলেন (মাচ্চ, ১৯১৫)। পর্ট গীজাতিব সেনাবল অকিঞ্চিৎকর ; কিন্তু আফ্রিকা খণ্ডে ইহাদের কয়েকটা সমৃদ্ধিশালী উপনিবেশ আছে। জাাণের ভাবিয়াছিলেন, যুদ্ধে যদি জয়ী হতে পারেন, তাহা হইলে পটগানকে শত্রুপক্ষ করিতে পারিলেই উক্ত উপনিবেশগুলি আত্মসাৎ করিবার সুবিধা হইবে। পট,গাজদিগের সহিত খুঁব্লোপখণ্ডে এ পয্যন্ত জাম্মাণির কোন সদ্ধ কয় নাই ; তবে আফ্রিকার পূখণ্ডে জায়ণ রাজ্য জয় করিবাব সময় ইহার। হংরাজদিগের যথাসাধ্য সাহায্য করিয়াছেন। (ছ) আফ্রিকায়। যুদ্ধা রঙের সময় আফ্রিকা মহাদশে জাস্মাণদিগের নিম্নলিখিত রাজ্যগুলি ছিল : (১ ক্যামেরুণ পৰ্বত-পার্শ্ববর্তী প্রদেশ; (২) দক্ষিণ পশ্চিম-আফ্রিকা (৩) জাৰ্ম্মাণ-পূর্ধ্ব-আফ্রিকা। ইহাদের মধ্যে প্রথমটী ইংরাজ ও ফরাসী সেনাকর্তৃক এবং দ্বিতীয়টা অন্তরীপ উপনিরেশের সেনাকর্তৃক অধিকৃত হইয়াছে। পূর্ব আফ্রিকায় ইরান্সের প্রথম কিছু বাধা পাইয়াছিলেন ; তাহারা টঙ্গ, নামক একটা বন্দর আক্রমণ করিতে গিয়া অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছিলেন; কি ১৯১৬ অব্দের বসন্তকালে অন্তরীপ উপ- নিবেশ হইতে একদল সেনা আসিয়া ব্রিটিশ সেনার সহিত যােগ দেয় এবং জাৰ্মাণ- দিগের পরাভব আরম্ভ হয়। জার্মাণের চতুর্দিক হইতে আক্রান্ত হইয়া এখন এই অঞ্চলের মধ্যভাগে হঠিয়া গিয়াছেন।

অষ্টম অধ্যায় । ( জ ) দূর প্রাচ্যে। জার্মাণের সঙ্কল্প করিয়াছিলেন যে কিয়াওচৌ বন্দরে সেনা ও রণপােত রাখিয়া চীনদেশেও আধিপত্য করিবেন। এই স্থানটী সান্টাং প্রদেশে অবস্থিত। জার্মাণেরা সান্টাং প্রদেশ এক শত বৎসরের জন্য জমা ইয়াছিলেন বটে; কিন্তু এখানে দুর্গাদি নির্মাণের জন্য তাহারা যেরূপ মুক্তহস্তে অর্থব্যয় করিয়াছিলেন, তাহাতে বােধ হইয়াছিল যে, তাহারা কখনও এ স্থান পরিত্যাগ করিবেন না। বর্তমান যুদ্ধারম্ভে জাৰ্মাণের। যদি ঐ স্থানটী চীনদিগকে প্রত্যর্পণ করিতেন তাহা হইলে তাহ'দের পক্ষে দূরদর্শিতার কাৰ্য্য হইত, কারণ তাহা হইলে চীনেরাও সন্তুষ্ট হইতেন এবং জাপেরা ইহা অধিকার করিতে পারিতেন না। জাৰ্মাণ ও জাপ- দিগের মধ্যে অনেকদিন হইতেই মনােমালিন্য চলিতেছিল। কাজেই য়ুরােপে যখন অনর্থ ঘটিল, তখন জাপেরা কালবিলম্ব না করিয়া জাৰ্ম্মাণির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘােষণা করিলেন এবং সান্টাং প্রদেশটী অধিকার করিবার জন্য সেনা ও রণপােত পাঠাইলেন। যে বীরের জাতি কতিপয় বর্ষ পূর্বে পাের্ট, আর্থার জয় করিয়াছিল, তাহার পক্ষে সান্টা জয় করা তুচ্ছ কথা। নিকটে যে ইংরাজসেনা ছিল তাহারাও জাপদিগের সাহায্য করিল এবং অল্পদিনের মধ্যেই জাণিদিগের প্রাচ্যসাম্রাজ্য স্থাপনের স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেল। (ঝ) প্রশান্ত মহাসাগরে। প্রশান্ত মহাসাগরে জাৰ্মাণদিগের যে রাজ্য ছিল তন্মধ্যে সামােয়া দ্বীপ প্রধান। এতদ্ভিন্ন আরও কয়েকটী দ্বীপে তাঁহারা তারহীন তাড়িতবার্তাবহের কাৰ্যালয় স্থাপন করিয়াছিলেন। অষ্ট্রেলিয়াবাসীরা এই সমস্ত স্থান জয় করিয়া লইয়াছেন।

নবম অধ্যায়। যুদ্ধনীতি। (ক) জার্মাণিতে। সভ্যতার তারতম্যানুসারে রণনীতির পার্থক্য ঘটে। মানুষ যখন অসত্য, তখন যুদ্ধের উদ্দেশ্য ধ্বংস। তাহার বিপক্ষের গৃহ ও শস্যক্ষেত্র অগ্নিসাৎ করে, সম্পত্তি লুণ্ঠন করিয়া লয়, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা যাহাকে পায়, মারিয়া ফেলে। কিন্তু সভজাতিদিগের মধ্যে সর্বদেশেই যুদ্ধের সময়েও কতকগুলি উদার বিধি প্রতিপালিত হইয়া থাকে। এই ঔদার্যের মূলে কারুণ্য ত আছেই, স্বার্থও যে একেবারে নাই তাহা বলা যায় না। অত্যধিক নিষ্ঠুরতায় পরাজিত জাতির প্রতিহিংসাবৃত্তি দ্বিগুণীকৃত হয় ; ভাগ্যচক্রের আবর্তনে তাহারাও যদি আবার বলসঞ্চয়পুৰ্ব্বক বিজয়ী হয়, তাহা হইলে পূৰ্ব্বকৃত অত্যাচার স্মরণ করিয়া শতগুণে প্রতিশােধ পৃয়। এরূপ ঘাতপ্রতিঘাত নিয়ত চলিলে, জেতা বিজিত উভয়েই নির্মূল হইবার সম্ভাবনা। উদার ক্ষাত্রধৰ্ম্মের প্রতিস্থায় হিন্দুরাই বােধ হয় প্রথম পথপ্রদর্শক। মনুসংহিতা প্রভৃতি প্রাচীন গ্রন্থসমূহেও দেখা যায়, বিষাক্ত অন্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল এবং রােগী, বালক, নারী, পলায়নপর শত্রু প্রভৃতির উপর অস্ত্র- প্রয়ােগ অনাৰ্যজনােচিত বলিয়া গণ্য হইত। এই পুস্তকের প্রথম খণ্ডের প্রথম অধ্যায়ে ‘নাইট’ উপাধিধারী যে সকল য়ুরােপীয় যােদ্ধার কথা বলা হইয়াছে, তাঁহাদের মধ্যেও এরূপ ঔদার্য্য দেখা যাইত। য়ুরােপ তখনও সুসভ্য হয় নাই ; কিন্তু নাইটদিগের মহিমায় সেই অসভ্যযুগেও যুদ্ধের পাশবভাব অনেক পরিমাণে হাস হইয়াছিল। শেষে জাৰ্ম্মাণির লােকে যখন ধৰ্ম্মোপলক্ষ্যে দুই দলে বিভক্ত হইয়া পরস্পর বিবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, তখন তাহারা পবিত্র ক্ষাতধৰ্ম্মে জলাঞ্জলি দিয়াছিল। বিংশবর্ষব্যাপী যুদ্ধে উভয় পক্ষে যে নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করে, পৃথিবীর আর কোন যুদ্ধেই বােধ হয় সেরূপ দেখা যায় নাই। ইদানীন্তন কালে য়ুরােপীয়দিগের হৃদয়ে বিবেক যখন পুনর্বার প্রবুদ্ধ হইল, তখন কেহ কেহ রণনীতির সংস্কারসাধনে মনােনিবেশ করিলেন। এ সম্বন্ধে প্রথম গ্রন্থপ্রণেতা একজন ওলন্দাজ পণ্ডিত। তিনি যুদ্ধের ও শান্তির সময় জনসাধারণের অধিকার” নাম দিয়া যে পুস্তক রচনা করেন, তাহাই বর্তমান জাতিসাধারণ-প্রতিপাল্য বিধির অঙ্কুর বলিয়া মনে করা যাইতে পারে। অতঃপর এই = ৭ ১৮ নবম অধ্যায়। সকল বিধির অনেক সম্প্রসারণ হইয়াছে ; তৎসম্বন্ধে অনেকে অনেক পুস্তকও রচনা করিয়াছেন। কিন্তু বিধি কেবল পুস্তকে লিপিবদ্ধ থাকিলে চলে না ; সকলেই সেগুলি পালন করিবেন বলিয়া জাতি-সাধারণের অঙ্গীকার আবশ্যক। এইরূপ অঙ্গীকারলাভের জন্য ১৯০৭ অব্দে সমস্ত সভ্যজাতির প্রতিনিধিগণ হল্যাণ্ডের রাজধানী হেগ, নগরে এক মহাসভা করেন। যুদ্ধের সময় সকলকেই কি কি নিয়ম পালন করিয়া চলিতে হইবে তাহা এই সভায় নির্ধারিত হয় এবং জার্মাণি প্রভৃতি সমস্ত প্রধান প্রধান রাজ্যের প্রতিনিধিই অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমান যুদ্ধে সেই জার্মাণিই উক্ত অঙ্গীকারপত্রের প্রায় সকল নিয়মই ভঙ্গ করিয়াছেন। জার্মাণি হেগের অঙ্গীকারপত্র লঙ্ঘন করিতেছেন, যখন এই কথা প্রথম উঠে, তখন তাহার যাথার্থ্য নির্ণয় করিবার জন্য ইংরাজ ও ফরাসীরা কতকগুলি কর্মচারী নিযুক্ত করিয়াছিলেন। ইহাদের সকলেই গণ্যমাণ্য, বিচক্ষণ ও ধর্মভীরু লােক, কাজেই ইহারা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন তাহা অবিশ্বাস করা যায় না। ইহারা দেখাইয়াছেন যে (১) জার্মাণের বহুবার শ্বেতপতাকা ও রক্তক্ৰশের অপব্যবহার করিয়াছেন। শ্বেতপতাকা আত্মসমর্পণের চিহ্ন; কিন্তু জাৰ্মাণের। উহা দেখাইয়া বিপক্ষের যােদ্ধাদিগকে আপনাদের লক্ষ্যের মধ্যে লইয়া গিয়াছেন এবং শেষে তাহাদের প্রাণসংহার করিয়াছেন। তঁাহারা শকট প্রভৃতিও রক্তশে চিহ্নিত করিয়া তাহার সাহায্যে যুদ্ধোপকরণ প্রেরণ করিয়াছেন। ২। তাহারা নগর আক্রমণ করিবার সময় চিকিৎসালয়ের উপর গােলা নিক্ষেপ করিয়াছেন, চিকিৎসাৰ্থ যে সকল পােত নিয়ােজিত হইয়াছে, তাহাদেরও অনেকগুলি ডুবাইয়া দিয়াছেন। (৩) তাহার বন্দীদিগের প্রতি অতি নিষ্ঠুর ব্যবহার করিয়াছেন। তাহারা আহত যােদ্ধাদিগের পরিধেয় বস্ত্র কাড়িয়া লইয়াছেন, তাহাদিগকে যথাসময়ে ঔষধ ও পথ্য দেন নাই ; একবার বন্দীদিগের শিবিরে যখন সংক্রামকভাবে সান্নিপাতিক জ্বর প্রাদুর্ভূত হইয়াছিল, তখন প্ৰতীকারের ব্যবস্থা করেন নাই। কাজেই তত্ৰত্য সমস্ত বন্দীই অনাহারে ও বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়াছিল। যুদ্ধক্ষেত্রেও জাৰ্মাণেরা অনেক নৃশংস উপায় প্রয়ােগ করিয়াছেন। তাহারা বিষাক্ত বাষ্প ছাড়িয়া ও তরল অগ্নিপ্রবাহ চালাইয়া শসংহার করিয়াছেন, দক্ষিণ পশ্চিম আফ্রিকার কুপসমূহে বিষ নিক্ষেপ করিয়াছেন। সৰ্বসাধারণগম্য সমুদ্র পথেও তাহার প্রস্ফোটনপূর্ণ পাত্র বিকীর্ণ করিয়াছেন; সে গুলির সঙ্গে সঙ্ঘর্ষণ হইবা- মাত্র উদাসীনরাজ্যসমূহেরও বাণিজ্যপােত বিনষ্ট হইতেছে ; তাহারা গােপনে গােপনে । ;

যুদ্ধনীতি–জার্মাণিতে। রণতরী প্রেরণ করিয়া উপকূলবর্তী অরক্ষিত নগরগুলির উপর গােলাবৃষ্টি করিতে- ছেন; তাহাদের টসেপলিন নামধেয় বিশাল বিমানসমূহ নৈশ অন্ধকারে অগ্নিবৃষ্টি করিয়া শত শত নিরীহ নরনারী ও শিশুর সংহারে নিরত রহিয়াছে। তাহারা সংহারেই ব্যস্ত ; তাহাদের নিকট নারীর নিস্তার নাই, শিশু ও স্থবিরের নিস্তার নাই। তাহারা লুসিটানিয়া, আলবানিয়া প্রভৃতি যাত্রীর জাহাজ পৰ্য্যন্ত অকস্মাৎ ডুবাইয়া দিয়াছেন, নিরীহ আরােহীদিগের প্রাণরক্ষাৰ্থ কিছুমাত্র চেষ্টা করেন নাই। ফলতঃ জাৰ্মাণের। পুরাতন অসভ্যজনােচিত নিষ্ঠুর রণনীতিরই সৰ্ব্বথা অনুসরণ করিতেছেন ; তাহাদের আসুরিক ব্যবহারে পৃথিবীশুদ্ধ লােক স্তম্ভিত হইয়াছে। যুদ্ধের সময় সকল দেশের লােকই প্রধানতঃ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত হয়— এক শ্রেণী যােদ্ধা, অন্য শ্রেণী যুদ্ধেতর কাৰ্য্যে নিবত, যেমন বণিক, শিক্ষক, চিকিৎসক ইত্যাদি। শেষােক্ত শ্রেণীর লােকে যদি বিজেদিগের বিরুদ্ধাচরণ না করে, তাহা হইলে তাহাদের প্রাণনাশ সভ্যসমাজের রীতিবিরুদ্ধ। কোন নগরের সমস্ত অধিবাসী একসঙ্গে মিলিয়া বাধা না দিলে নগর দাহ করাও যুক্তিসঙ্গত নহে । কিন্তু জাৰ্মণেরা বেলজিয়ামে গিয়া এই দুইটা নিয়ম পদে পদে লঘন করিয়াছেন। হয়ত কোয়াও একটামাত্র লােক জাৰ্মাণদিগকে লক্ষ্য করিয়া গুলি ছুড়িয়াছে। অমনি হারা পাশব-প্রতিহিংসাপরবশ হইয়া সেই স্থানকে অগ্নিসাৎ করিয়াছেন এবং সমস্ত অধিবাসীকে মারিয়া ফেলিয়াছেন। বেলজিয়ামের অন্তঃপাতী লুবে নগরের বিশ্ববিদ্যালয় বহু প্রাচীন ও অতিপ্রসিদ্ধ। কিন্তু এতাদৃশ পবিত্র স্থানও জাৰ্ম্মাণদিগের অত্যাচার হইতে অব্যাহতি পায় নাই। জার্মাণের আপনাদিগকে প্রতিভাবান্ ও কাৰ্যনিপুণ বলিয়া গৰ্ব্ব করিয়া থাকেন। পরাজিত জনপদগুলির সর্বনাশসাধনে তাঁহারা এই প্রতিভা ও নৈপুণ্যের যথেষ্ট পরিচয় দিয়াছেন। বিষয়ান্তরে যাহাই হউক, এ সম্বন্ধে অন্য কোন জাতিই তাহাদের সমকক্ষ হইতে পারে না। তাঁহারা ফ্রান্স, ও বেলজিয়ামের বন জঙ্গল পৰ্য্যন্ত কাটিয়া ফেলিয়াছেন, লিল ও লােভজের কারখানাগুলি হইতে সমস্ত যন্ত্র তুলিয়া লইয়া গিয়াছেন, সার্বিয়াদেশের পুস্তকাগার পর্যন্ত লুণ্ঠন করিয়াছেন। বন্দী ও হতাবশিষ্ট ব্যক্তিগণ এখন জার্মাণির দাসত্বে নিয়ােজিত। যেরূপ ব্যবস্থা হইয়াছে তাহাতে হতৃভাগ্যদিগকে হয় জাৰ্ম্মণজাতির ক্ষেত্ৰকৰ্ষণাদি কাৰ্য্য করিতে হইবে, নয় অনাহারে মরিতে হইবে। জার্মাণেরা পূর্ব হইতেই যে সকল অনাৰ্য্য উপায় অবলম্বনপূর্বক বর্তমান যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইয়াছিলেন, এই প্রসঙ্গে তাহাও বলা আবশ্যক। যুদ্ধের জন্য স্বাধীনজাতিমাত্ৰকেই প্রস্তুত থাকিতে হয় ; দূতই হউন, বা অন্য কেহই হউন, রাজ্যান্তরে অবস্থিতি করিবার সময় তত্ৰত্য সেনাবল, শাসনপ্রণালী, দুর্গাদির অবস্থান নবম অধ্যায়। ইত্যাদি জানিতে চেষ্টা করেন, যদি এই রাজ্যের সহিত তাঁহাদের রাজ্যের বিবাদ ঘটে তবে কিরূপ আয়ােজন আবশ্যক হইবে তাহা স্থির করিয়া লন। এরূপ চেষ্টায় কোন দোষ দেখা যায় না। কিন্তু জাম্মাণেরা কেবল ইহা করিয়াই নিরস্ত হন নাই; তাঁহাদের বৃত্তিভােগী গুপ্তচরের শিক্ষক, যাজক প্রভৃতির ভাবেশে কিংবা বাণিজ্যের ব্যপদেশে পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র অবস্থান করিত, উৎকোচের সাহায্যে দুর্গাদির মানচিত্র সংগ্রহ করি এবং রাজার প্রতি প্রজার বিরাগ জন্মাইত। জাৰ্ম্মাণজাতির চরিত্র যে এরূপ অধঃপাতে গিয়াছে তাহা পূৰ্ব্বে কেহ স্বপ্নেও ভাবে নাই, কাজেই সতর্কও হয় নাই। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধে এই সমস্ত রহস্যের উদঘাটন হইয়াছে। অতঃপর কেহ জাম্মাণদিগকে ত স্বরাজ্যে স্থান দিতেই চাহিবে না, অপরের সঙ্গেও পূর্বের মত সরল ব্যবহার করিবে কি না সন্দেহ। (খ) ইংল্যাণ্ডে। এখন দেখা যাউক ইংরাজসেনাই বা কিরূপে ক্ষাত্রধর্ম পালন করিতেছে ইংরাজ সৈন্যের সাহসের কথা বলা অনাবশ্যক, কারণ প্রতিদিনই ইহার ভূরি ভূরি । প্রমাণ পাওয়া যাইতেছে ; অপিচ অন্যান্য জাতিও যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিতেছে। কিন্তু ইংরাজসৈন্যের অদম্য উৎসাহ, সদা প্রফুল্লভাব, অদ্ভুত স্বার্থত্যাগ এ 'শত্রুর সম্বন্ধেও উদাব ব্যবহার বিশিষ্টরূপে প্রশংসাৰ্হ। সামুদ্রিক যুদ্ধে দেখা গিয়াছে বিপক্ষের কোন রণপােত বিধ্বস্ত হইলে ইংরাজ নাবিকেরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরণী লইয়া হতাবশিষ্ট জাম্মাণদিগের প্রাণরক্ষা করিয়াছে ; তখন অন্যান্য জাৰ্ম্মাণপােত হইতে তাহাদের চতুর্দিকে অগ্নিবৃষ্টি হইয়াছে, তথাপি তাহারা আওঁত্রাণ করিতে পরায়ুখ হয় নাই। ইহারই ফলে আজ জাৰ্ম্মাণ নৌ-সেনার প্রায় তিন হাজার লােক বন্দিভাবে ইংল্যাণ্ডে অবস্থিতি করিতেছে। সাময়িক উত্তেজনাবশতঃ যােদ্ধারা যে নিষ্ঠুরাচরণে আনন্দভােগ করে, কেবল তাহা নহে, তাহাদের আরও নানারূপ প্রলােভন জন্মিতে পারে। ইহার প্রতি লক্ষ্য করিয়াই, যুদ্ধারম্ভে যখন ফ্রান্সে সেনা প্রেরিত হয়, তখন লর্ড, কিচনা এই কথাগুলি বলিয়াছিলেন- “তােমরা মহারাজের আদেশে আমাদের ফরাসীবন্ধুদিগের সাহায্যার্থ যাত্রা করিতেছ। তােমরা যে কাজের ভার সইলে তাহাতে সাহস, উদ্যমশীলতা ও ধৈৰ্য্য আবশ্যক। ইহা যেন মনে থাকে যে আজ হইতে তােমাদের ব্যক্তিগত চরিত্রের, তােমাদের প্রত্যেকের আচরণের উপর ব্রিটিশসেনার গৌরব নির্ভর করিতেছে। সুশৃঙ্খলভাবে সৈনিক-কৰ্তব্যপালন করিলেই যে তােমাদের পক্ষে যথেষ্ট হইল ইহা মনে করিও না। এই ভীষণ যুদ্ধে তােমরা যাহাদের সহায় যুদ্ধনীতি-ইংল্যাণ্ডে। হইবে তাহারা যেন তােমাদিগকে অকৃত্রিম বন্ধু বলিয়া মনে করিতে পারে। তােমাদের অনেকে ফ্রান্সে, অনেকে বেলজিয়ামে থাকিবে। এই উভয় দেশই ইংল্যাণ্ডের মিত্র। তােমরা যদি ইংরাজনামের গৌরব রক্ষা করিতে পার তাহা হইলেই প্রকৃত মিত্রতার কাৰ্য্য হইবে। বাক্যে ও আচরণে কদাপি অশিষ্টতার ভাব দেখাইও না, কাহারও সঙ্গে নিষ্ঠুব ব্যবহার করিও না, নিজের সুবিধার জন্য পরের অসুবিধা ঘটাইও না, মে ও লােকের ম্পত্তিনাশে হাত দিও না। নিয়ত স্মরণ রাখিও যে পরস্বলুণ্ঠন প্রকৃতু যােদ্ধর পক্ষে বড়ই কলঙ্কের কারণ। ফ্রান্সের ও বেলজিয়ামের লােকে যে তােমাদিগকে সাদরে দোসর বলিয়া গ্রহণ করিবেন তাহাতে সন্দেহ নাই। তাহারা তােমাদিগকে বিশ্বাস করিবেন সাবধান, যেন তােমাদের কোন কার্গে সেই বিশ্বাস বিচলিত না হয়। আরােগ্যই কৰ্তব্যসাধনের মূল ইহা মনে করিয়া পানাহারে সতত মিতাচার থাকিও।” ইংরাজেরা শত্রুর গুণ গ্রহণে পরায়ুখ নহেন। রবার্ট ব্রুশ, তাহাদিগকে স্কটল্যাণ্ড হইতে, জোয়ান্ অব আর্ক, তাহাদিগকে ফ্রান্স, হইতে, জর্জ ওয়াশিংটন তাহাদিগকে য়ুনাইটেড, ষ্টেটস হইতে বিদূরিত করিয়াছিলেন । কিন্তু এ পৰ্য্য কোন ইংরাজ লেখক এই উচ্চাশয় শত্ৰুত্রয়ের বিরুদ্ধে কোন কথা লিপিবদ্ধ করেন নাইস দিনও বােয়ার সেনাপতি বােথা ইংরাজজাতির কতই না ক্ষতি করিয়াছিলন; কিন্তু বােয়ার যুদ্ধের অবসান হইলে এই বােথা যখন লণ্ডনে যান, তখন ইংরাজেরা সসম্মানে তাহার অভ্যর্থনা করিয়াছিলেন। এডেন্ নামক জাৰ্ম্মাণ রণতরীর অধ্যক্ষ মূলর বর্তমান যুদ্ধের প্রথম বর্ষে ইংরাজদিগের কতিপয় বাণিজ্যপােত নষ্ট করিবার সময় আরােহীদিগের প্রাণরক্ষাৰ্থ যে যত্ন করিছিলেন- তাহাতে মুগ্ধ হইয়া সমগ্র ইংরাজজাতি একবাক্যে তঁাহার প্রশংসা করিয়াছিলেন। ফলতঃ ইংরাজের গুণের আদর করিতে জানেন, শত্রুই হউন, মিত্রই হউন, যিনি প্রকৃত বীর, তিনি চিরদিনই ইংরাজদিগের শ্রদ্ধা কৰ্ষণ করিয়াছেন। এখানে একটামাত্র ঘটনার উল্লেখ করিয়া এই প্রকরণ শেষ করা যাইতেছে। একদা ইংরাজ ও জাৰ্মাণ কুল্যাপঙক্তির মধ্য ভাগে একজন আহত জাৰ্মাণ পড়িয়াছিল। কয়েকটী ইংরাজ যােদ্ধা না বুঝতে পারিয়া অকস্মাৎ তাহাকে লক্ষ্য করিয়া গুলি করে। জনৈক ইংরাজ সেনানায়ক ইহা দেখিতে পাইয়া তাহাদিগকে আর গুলি করিতে নিষেধ করিলেন এবং আহত লােকটীর উদ্ধার্থ নিজেই কুল্যা হইতে বহির্গত হইলেন। এদিকে জার্মাণের। তাহার উদ্দেশ্য বুঝিতে না পারিয়া গুলি চালাইতে লাগিল; কিন্তু তিনি নিরস্ত না হইয়া আহত লােকটীকে স্কন্ধে তুলিলেন এবং জাৰ্মাণ কুল্যার দিকে লইয়া চলিলেন। তখন জার্মাণের প্রকৃত ব্যাপার বুঝিল ; তাহাদের একজন নায়ক অগ্রসর হইয়া নিজের লৌহ, দশম অধ্যায়। শটা তাহার বুকে আটিয়া দিলেন এবং যখন তিনি ফিরিলেন, তখন তত্ৰত্য জাৰ্মাণসেনা তাহার জয়ধ্বনি করিতে লাগিল। ইংরাজ সেনানায়কটী আহত হইয়াছিলেন, কুল্যায় প্রতিগমনের পরদিনই তিনি স্বর্গপ্রাপ্ত হইলেন। এই ঘটনায় রণক্ষেত্রের উক্ত অংশে ইংরাজ ও জাৰ্ম্মাণ সৈনিকেরা পরস্পরের গুণে এত মুগ্ধ হইয়াছিল যে, কিয়ৎকালের জন্য তাহাদের মধ্যে কোনরূপ বৈরভাব দেখা যায় নাই। যুদ্ধ অতি ভীষণ ব্যাপার; কিন্তু ইহাতেও সময়ে সময়ে মানবহৃদয়ের উচ্চবৃত্তিসমূহের বিকাশ হয়। ভগবানের কৃপায় ইংরাজসেনা যেন চিরদিনই এইরূপ মহত্ত্ব প্রদর্শন করিয়া ইংরাজনামের গৌরব রক্ষা করে, শত্রুর গুণগ্রহণেও পৰাম্মুখ না হয়। দশম অধ্যায়। ইংরাজজাতির যুদ্ধাহােজন। জার্মাণির দুরাকাঙ্ক্ষাবশতঃ য়ুরােপে যে একটা মহাবিপ্লব ঘটিবে ইহা অনেকেই বুঝিয়াছিলেন, কিন্তু ইহা যে এত শীঘ্র দেখা দিবে তাহা কেহ মন করেন নাই। অতি অল্পদিন পূর্বে বকানে যুদ্ধ হইয়া গিয়াছে ; ইংরাজ, জাৰ্মাণ প্রভৃতি জাতি একবাক্যে যেরূপ ব্যবস্থা করিয়াছেন, তদনুসারে সেখানে শান্তি স্থাপিত হইয়াছে ; কাজেই, ইংরাজের সহিত জাৰ্ম্মাণদিগের বিবাদ হইতে পারে, ১৯১৪ অব্দের জুলাই মাস পর্যন্ত এমন কোন কারণ বিদ্যমান ছিল না। বিশেষত ইংল্যাণ্ডের মন্ত্রিগণ তখন উদারনীতিক ; তাহাদের অনেকেই শান্তিপ্রিয়, কেহ কেহ কাৰ্মাণজাতির পক্ষপাতী। এ অবস্থায় হঠাৎ যে এই বিষম অনর্থের উৎপত্তি হইবে তাহা স্বপ্নেরও অগােচর ছিল। এখন দেখা যাউক এই আকস্মিক বিপদের প্রতীকারার্থ ইংরাজেরা কি কি উপায় অবলম্বন করিয়াছিলেন। প্রথম উপায় ব্যাঙ্কগুলির রক্ষা । অনেক সভ্যদেশেই লােকে উদ্ব ও অর্থ ব্যাঙ্কে আমানত রাখে । ইহাতে সুবিধা এই যে কিছু কিছু সুদ পাওয়া যায়, অথচ অর্থরক্ষার জন্য কোন উদবেগ ভােগ করিতে হয় না। আমানত দুই প্রকার স্থায়ী ও অস্থায়ী। স্থায়ী আমানতে নির্দিষ্ট কালের জন্য অর্থ রাখা হয়, অস্থায়ী আমানতে উহা যখন ইচ্ছা ফেরত লওয়া যায়। ব্যাঙ্কের পরিচালকেরা আপনাদের মূলধন ও আমানতের টাকার অধিকাংশ নামাবিধ ব্যবসায়ে খাটাইয়া থাকেন, এবং * লৌহশ জাৰ্মাণ সৈনিকদিগের অতি গৌরবের সামগ্রী, কারণ ইহা রাজদত্ত পুরস্কার এবং অসামান্য বীরত্বসূচক।

ইংরাজজাতির যুদ্ধায়ােজন। আমানতকারীদিগের প্রয়ােজনানুসারে ফেরত দিবার নিমিত্ত কিছু নগদ টাকা হাতে রাখেন। ছােট বড় কোন ব্যাঙ্কেরই এমন সাধ্য নাই যে সমস্ত আমানতের টাকা একসঙ্গে ফেরত দিতে পারে। পূর্বে অনেকবার দেখা গিয়াছে হঠাৎ কোন তীষণ যুদ্ধের সূচনা হইলে লােকে ভাবে তাহাদের টাকা বােধ হয় মারা যাইবে। এই আতঙ্কে তাহারা ব্যাঙ্ক হইতে টাকা তুলিয়া লইবার জন্য ব্যর্থ হয়। কিন্তু সকলেই এক সঙ্গে টাকা ফেরত চাহিলে ব্যাঙ্ক, দেউলিয়া হয়, দেশের কারবার বন্ধ হইয়া যায়। যাহাতে এরূপ বিভ্রাট না ঘটে সেই উদ্দেশ্যে বর্তমান যুদ্ধ আরম্ভ হইবামাত্র রাজপুরুষেরা স্থির করিলেন, কেহই সমস্ত আমানতি টাকা একসঙ্গে ফেরত পাইবে না; সাংসারিক ব্যনিৰ্বাহাৰ্থ যাহা নিতান্ত আবশ্যক, কেবল তাহাই তুলিতে পারিবে। এই ব্যবস্থা দুই মাস চলিয়াছিল। দুই মাস পরে লােকে বুঝিল, ইংল্যাণ্ডের ধনবল এত অধিক যে যুদ্ধের ব্যয়নিৰ্বাহাৰ্থ অর্থের অনটন হইবে না। তাহারা দেখিল দেশের শিল্প ও বাণিজ্য পূর্বের মতই চলিতেছে ; ব্যাঙ্ক, ; ব্যাঙ্ক হইতেও প্রয়ােজন মত অর্থ পাওয়া যাইতেছে। যাইতেছে। কাজেই তাহারা আশ্বস্ত হইল ; ব্যাঙ্ক- শুলিরও সাহকারী অব্যাহত রহিল। দ্বিতীয়ত, খাদ্যসংগ্রহ। ইংরাজদিগকে অধিকাংশ খাদ্য বিদেশ হইতে সংগ্রহ হয়। যুদ্ধের সময় আমদানি রপ্তানির অসুবিধা ঘটে; এইজন্য রাজ- পুরুষেরা যুদ্ধান্ত হইবামাত্র যাহাতে খাদ্যাভাব না জন্ম তাহার ব্যবস্থা করিলেন। তাহারা যবদ্বীপজাত সমস্ত চিনি কিনিয়া লইলেন; কিছুদিন হইল, নরওয়ের জালজীবীরা যত মাছ ধরে তাহাও কিনিবার ব্যবস্থা করিয়াছেন। তৃতীয়ত, পােতবণিদিগের সাহায্য ও উৎসাহবৰ্ধন। জাহাজে মাল পাঠাইবার সময় লােকে তাহা বিমা করে ; কোন কারণে জাহাজ নষ্ট হইলে বিমা- কোম্পানির নিকট হইতে তাহার মূল্য পাওয়া যায়। বর্তমান যুদ্ধে জাহাজ নষ্ট হইবার একটা নুতন কারণ উপস্থিত হইল, কারণ জাৰ্মাণের সুবিধা পাইলেই সাগরগর্ভচর পােতের সাহায্যে বিপক্ষের জাহাজ ডুবাইতে লাগিলেন। কাজেই বিমার হারও অত্যন্ত বৃদ্ধি হইল। ইংরাজ গবর্নমেন্ট ইহার অর্ধপরিমাণ নিজে বহন করিতেছেন। ইহাতে বণিক ও বিমা কোম্পানি সকলেরই সুবিধা হইয়াছে। এত .শী ও এত সুকৌশলে এই সকল ব্যবস্থা হইল যে লােকের মনে রাজ- পুরুষদিগের যােগ্যতা-সম্বন্ধে কোন সন্দেহ রহিল না। শান্তির সময় পালেমেন্ট সভায় মন্ত্রিপক্ষের একটা প্রতিপক্ষ থাকে এবং অভ্যন্তরীণ শাসনসম্বন্ধে উভয় পক্ষে অনেক তর্কবিতর্ক ও বাগবিতণ্ডা হয়। কিন্তু এখন উভয় পক্ষেই স্থির করিলেন, যতদিন যুদ্ধ চলিবে ততদিন অভ্যন্তরীণ ব্যাপারসম্বন্ধে কোন নূতন প্রস্তাব উপ- স্থাপিত হইবে না; সকলেই অনন্যমনে শত্রুদমনের উপায় দেখিবেন।

১০৪ দশম অধ্যায়। এই তিন বৎসরে মন্ত্রিসভার অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। মন্ত্রীদিগের সংখ্যা অধিক হইলে মন্ত্রণায় মতভেদ জন্মে এবং ক্ষিপ্ৰকারিতার ব্যাঘাত ঘটে। এই জন্য ক্রমে মন্ত্রীর সংখ্যা কমাইয়া দেওয়া হইয়াছে। এখন সমর-সমিতিতে কেবল পাচ জন সদস্য। ইহাদের হস্তেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সর্ববিধ শাসনক্ষমতা অর্পিত হইয়াছে। প্রধান মন্ত্রী পূৰ্ব্বে ছিলেন শ্রীযুক্ত এস্কিথ, এখন হইয়াছেন শ্রীযুক্ত লয়েড জর্জ,। লম্নেড় জর্জ, একজন অসামান্য দূরদর্শী ও কৃতকৰ্ম্মাপুরুষ। যুদ্ধারম্ভে ইংরাজপক্ষে গােলাগুলি প্রভৃতি যুদ্ধোপকরণের অভাব হইয়াছিল, কিন্তু তাঁহার সুব্যবস্থায় এখন ইংরাজেরা এত উপকরণ প্রস্তুত করিতেছেন যে, তদ্বারা তাহাদের নিজেদের ও মিত্রশক্তিদের সমস্ত অভাব পূরণ হইতেছে। লয়েড, জর্জের প্রতিজ্ঞা যে প্রকারেই হউক জাৰ্মাণদিগের সামরিক শক্তি এরূপে বিনষ্ট করিতে হইবে যে পরিণামে য়ুরােপে আর অশান্তি না ঘটিতে পারে এবং ছছাট বড় সকল জাতিই স্বাধীনভাবে স্ব স্ব উন্নতিবিধানে সমর্থ হয়। বিলাসীদিগের অমিতাচারবশতঃ যাহাতে খাদ্যদ্রব্যের অপচয় না ঘটে তিনি সে দিকেও দৃষ্টি রাখিয়াছেন। দীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধে সকল দেশেই খাদ্যাদির মূল্য বৃদ্ধি হয়, কাজেই সাধারণ লােকের কিছু কষ্ট হয়। কিন্তু প্রথমে যেমন আশঙ্কা করা গিয়াছিল, বর্তমান যুদ্ধে ইংল্যাণ্ডে তত অসুবিধা হয় নাই। প্রথম কয়েক মাস বাণিজ্যের কি কোচ হইয়াছিল বটে, কিন্তু তাহার পরে ইহার বিলক্ষণ প্রসর হইয়াছে। যুদ্ধোপকরণ প্রস্তুত করিবার জন্য এত লােক নিযুক্ত হইয়াছে যে, কেহই এখন নিৰ্ম্মা নাই । শ্রমজীবীদিগের বেতনও বৃদ্ধি হইয়াছে এবং যাহার যুদ্ধে গিয়াছে তাহাদের স্ত্রী- পুত্রাদির জন্য পর্যাপ্ত বৃত্তি প্রদত্ত হইতেছে। তবে দ্রব্যাদির মূল্যবৃদ্ধিবশতঃ শিক্ষক, কেরাণী প্রভৃতি যে সকল মধ্যবিত্ত ভদ্রলােকের ‘বান্ধা আয়’, তাহাদিগকে কিছু অসুবিধা ভােগ করিতে হইতেছে। যুদ্ধে যে লােকক্ষয় হইতেছে তাহা ভাবিলে শরীর শিহরিয়া উঠে। আজ ব্রিটেনের প্রায় প্রত্যেক পরিবার শােকসন্তপ্ত । কেবল সম্ৰান্তবংশীয়দিগের মধ্যেই, যাহারা উত্তরকালে স্ব স্ব কুলসম্পত্তির অধিকারী হইতেন এবংবিধ অন্ততঃ পঞ্চাশ জন নিহত হইয়াছেন। সাধারণ লােকের ত কথাই নাই ; তাহাদের সহস্র সহস্র বীর স্বদেশের রক্ষাৰ্থ ফ্রান্স, ফুণ্ডা, মিশর, মেসসাপটেমিয়া প্রভৃতি দুরদেশের রণক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন দিয়াছে । ফলত, ব্রিটেনের ইতর ভদ্র সকল শ্রেণীর লােকেই আজ তুল্যরূপে ক্ষতি স্বীকার করিতেছেন; তবে, বিষের মধ্যেও অমৃত দেখা দিয়াছে ; আজ সাধারণ বিপদে তাহাদের সাম্প্রদায়িক ঈর্ষার বিলােপ হইয়াছে। তাহাদের পরস্পরের মধ্যে সমবেদনার বন্ধন দৃঢ়তর হইয়াছে। ইংলণ্ডের উপনিবেশগুলিও সর্বস্ব পণ করিয়া ইংল্যাণ্ডের সাহায্য করিতেছে।

ইংরাজজাতির ধুদ্ধায়ােজন। যুদ্ধান্তে দক্ষিণ-আফিকার কতিপয় ওলন্দাজ অধিবাসী জার্মাণির কুহকে পড়িয়া কিছুদিনের জন্য বিদ্রোহী হইয়াছিল বটে; কিন্তু বােথাপ্রমুখ ওলন্দাজ সেনানীরাই ওলন্দাজ সৈন্যের সাহায্যে তাহাদিগকে দমন করিয়াছেন। আয়ল্যাণ্ডেও জার্মানির ষড়যন্ত্রে কিছুদিনের জন্য অশান্তি দেখা দিয়াছিল। সেখানে কয়েকজন তরলমতি লােক আয়লাণ্ডে সাধারণতন্ত্রশাসন প্রবর্তিত হইল বলিয়া ঘােষণা করে, কিন্তু জনসাধারণে তাহাদের পক্ষাবলম্বন করে নাই। বিদ্রোহীরা পরাজিত হইলে তাহাদের কয়েকজনের প্রাণদণ্ড এবং কয়েক জনের কারাদণ্ড হয়। কারাদণ্ড ব্যক্তিদিগের মধ্যে একজন সন্ত্রাক্তবংশীয় রমণী। তিনি পুরুষের বেশ পরিধান করিয়া বিদ্রোহীদিগকে যুদ্ধার্থ উত্তেজিত করিয়াছিলেন। ইহার লঘুদণ্ডের সহিত কুমারী কাভেলের প্রাণদণ্ড তুলনা করিলে বুঝিবে হংরাজে ও জার্মাণে কি প্রভেদ ! কুমারী কালে একজন স্বেচ্ছাসেবিকা ; তিনি রােগী ও আহতদিগের শুশ্রুষার্থ বেলজিয়ামে অবস্থিতি করিতেছিলেন। সেখানে তিনি কয়েকজন বন্দীকে পলায়নের সময় সাহায্য করিয়াছিলেন বলিয়া জাৰ্মাণেরা তাহার প্রাণদণ্ড করেন। এরূপ কঠোর বিধান সামরিক বিধিসঙ্গত হইলেও হইতে পারে; কিন্তু বিধির সঙ্গে কি দয়ার ও ক্ষমার অহিনকুলভাব ? ইংরাজেরা দয়ারই পক্ষপাতী। কিন্তু সকল স দয়ার অবতার হলে চলে না। চলে না। আয়লাণ্ডের বিদ্রোহীদিগের মধ্যে এক ব্যক্তি বােয়ার যুদ্ধের সময়েও ইংরাজদিগের বিপক্ষে যুদ্ধ করিয়াছিল এবং তখন একজন ইংরাজের কৃপাতেই তাহার প্রাণরক্ষা হইয়াছিল। কিন্তু সেই পাষণ্ডই আবার যথন আয়লাওেও বিদ্রোহী হইল, তখন ইংরাজেরা তাহার প্রাণদণ্ড না করিয়া পারিলেন না। আয়লাণ্ডের যে কয়েকটা বিদ্রোহীর কথা বলা হইল তাহারা মুষ্টিমেয় ; তত্ৰত্য অধিকাংশ লােকই ইংরাজের হিতৈষী এবং সহস্র সহস্র আইরিশ ইংরাজের সাহায্যার্থ ফান্সপ্রভৃতি দেশে প্রাণপণে যুদ্ধ করিতেছে। ইহাদের একদল গ্যালিপলি উপদ্বীপে অবতরণ করিবার সময় অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করিয়াছিল। প্রাগুক্ত ক্ষুদ্র দুইটী বিদ্রোহ ব্যতীত ব্রিটিশসাম্রাজ্যের অন্য কোথাও ইংরাজ- জাতির প্রতি কোন বিদ্বেষের চিহ্ন দেখা যায় নাই। কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যাণ্ডের লােকে ইংরাজের হিতার্থ অন্তত পাঁচলক্ষ সৈন্য প্রেরণ করিয়াছেন। গ্যালিপলিতে অষ্ট্রেলিয়ার সেনা এবং বেলজিয়ামে কানাডার সেনা যে বীৰ্য্য দেখাইয়াছে তাহাতে সকলেই মুক্তকণ্ঠে ইহাদের প্রশংসা করিয়াছেন।

দশম অধ্যায়। । উদাসীন রাজ্যসমূহ। উদাসীন রাজ্যসমূহের মধ্যে যুবােপখণ্ডে সুইডেন, হল্যাণ্ড ও স্পেন্ প্রধান। সুইডেনের সহিত রুশিয়ার বহুদিনের অসম্ভাব; কাজেই বর্তমান যুদ্ধে উদাসীন থাকিলেও সম্ভবতঃ তত্ৰত্য অধিবাসীরা ইংরাজপক্ষের হিতাকাঙ্ক্ষী নহেন। বেল- জিয়ামের দুর্দশা দেখিয়া হল্যাণ্ড,ও জার্মাণির ভয়ে কম্পমান। অতএব কেবল স্পেকেই এখন পর্যন্ত প্রকৃত উদাসীন বলা যাইতে পারে। কিন্তু স্পেনের এভাবও যে আর দীর্ঘকাল স্থায়ী হইবে তাহা বলা যায় না। জার্মাণের স্পেনিয়ার্ড দিগেরও অনেক জাহাজ ডুবাইতেছেন ; কাজেই তাঁহাদের অনেকে ইংরাজপক্ষে যােগ দিবার ইচ্ছা করিতেছেন। আমেরিকাখণ্ডের সমস্ত স্বাধীন রাজ্যই এতদিন উদাসীন ছিল। য়ুনাইটেড, টেস্ ইহাদের অগ্রণী । য়ুনাইটেড, ষ্টেটসের লক্ষ লক্ষ লােক জাৰ্মাণজাতীয় । ইহারা সকলেই উদ্যমশীল, ধনী ও ক্ষমতাবান্। যখন বর্তমান যুদ্ধ আরব্ধ হইল, তখন ইহারা য়ুনাইটেড, ষ্টেটুকে জাৰ্ম্মাণির হিতাকাঙ্ক্ষী করিবার জন্য সচেষ্ট হইলেন। ইহাদের সাহায্যার্থ জাৰ্ম্মাণি হইতে অনেক প্রসিদ্ধ বক্তাও আমেরিকায় গিয়া লােকের নিকট ইংরাজপক্ষের অন্যায়াচরণ প্রতিপাদন করিবার পাইলেন; জার্মাণির অনুকুলে অজস্র পুস্তিকা ও পত্রিকা বিতরিত হইতে লাগিল। ইংরাজেরা আমেরিকায় যুদ্ধোপকরণ ক্রয় করিতেছিলেন; নিজের নৌবল অল্প বলিঃ জাম্মাণির ইহাতে বাধা দিবাৰ সাধ্য ছিল না। কাজেই জাৰ্ম্মাণ-বন্ধুরা বলিতে লাগিলেন, য়ুনাইটেড, ষ্টেটসের লােকে যদি ইংরাজদিগের নিকট উপকরণ বিক্রয় করেন, তাহা হইলে পরােক্ষভাবে জাৰ্ম্মাণির বিপক্ষতাচরণ করা হইল—তাহারা উদাসীনধৰ্ম্মের মর্যাদা রাখিলেন না। ফলতঃ যাহাতে ইংরাজেরা আমেরিকায় যুদ্ধোপকরণ না পান, তাহার জন্য ইহরা চেষ্টার ত্রুটি করিলেন না। য়ুনাইটেড ষ্টেটসের সভাপতি উইলস কিন্তু ইহাদের যুক্তিতে ভুলিলেন না। তখন ইহারা আমেরিকার বড় বড় কারখানাগুলি নষ্ট করিবার জন্য নানারূপ চক্রান্ত আরম্ভ করিলেন। জার্মাণির অনেক প্রধান কর্মচারী এবং অষ্ট্রিয়ার রাজদূত এই নিমিত্ত যুনাইটেড, ষ্টেটস, হইতে বিতাড়িত হইলেন। যুনাইটেড-ষ্টেটসের সভাপতি উই অত্যধিক শান্তিপ্রিয় ; তাঁহার আদৌ ইচ্ছা ছিল না যে জাৰ্ম্মাণির সঙ্গে কোনরূপ বিবাদ ঘটে। জাৰ্মাণের যখন বেলজিয়াম বিধ্বস্ত করেন এবং পদে পদে সভ্যসমাজের রণনীতি উল্লঙ্ঘন করিতে প্রবৃত্ত হন, তখনও তিনি কোন প্রতিবাদ করেন নাই। তাহার বােধ হয় আশা ছিল যে যখন যুধ্যমান শক্তিনিচয়ের মধ্যে সন্ধির কথা উঠিবে, তখন তিনি মধ্যস্থতা করিয়া কাহারও ;

উদাসীন রাজ্যসমূহ। প্রতি অন্যায় হইতে দিবেন না, কারণ তিনি যুদ্ধে লিপ্ত না হইলে তাহার সমদর্শিতা সম্বন্ধে কাহারও কোন সন্দেহ থাকিবে না। কিন্তু তাঁহার সে আশা ফলবতী হয় নাই। জার্মাণেরা যখন য়ুনাইটেড, ষ্টেটসে ষড়যন্ত্র আরম্ভ করিলেন এবং যাত্রিবাহক পােত প্রভৃতি ডুবাইয়া য়ুনাইটেড, ষ্টেটসের লােকেরও প্রাণনাশে প্রবৃত্ত হইলেন, তখন উই আর নীরব থাকিতে পারিলেন না। লুসিটানিয়া নামক একখানা সুবৃহৎ যাত্রীর জাহাজ সতর শ আরােহী লইয়া আমেরিকা হইতে ইংল্যাণ্ড যাইতে- ছিল ; জাৰ্মাণেরা ইহা ডুবাইয়া দিলেন এবং উহাতে আমেরিকার অনেক লােক মারা গেল। তাহার পর জার্মাণের আরও অনেকবার এইরূপ নৃশংস কাণ্ড করিলেন ; কাজেই উইন্ জাৰ্ম্মাণিকে তিরস্কার করিয়া পত্র লিখিলেন। কিন্তু জার্মাণের স্পষ্ট কোন অঙ্গীকার না করিয়া চিঠি লেখালেখি দ্বারা সময়ক্ষেপ করিতে লাগিলেন; যাত্রীর জাহাজ ডুবাইতেও ক্ষান্ত হইলেন না। এই কারণে ক্রমে য়ুনাইটেড, ষ্টেটসের ধৈৰ্য্যচ্যুতি হইল। উইলসন্ স্পষ্ট বলিলেন, যদি জাৰ্ম্মাণদিগের ত্রুটিবশতঃ আমেরিকার কোন সমুদ্রযাত্রীর প্রাণনাশ হয়, তাহা হইলে আমরা আত্মরক্ষাৰ্থ অস্ত্রধারণ করিব । তখন জার্মাণের অঙ্গীকার করিলেন, যাত্রিপােত ও বাণিজ্যপােত নষ্ট করিতে হইলে তাহারা আগে ডিঙ্গীর সাহায্যে আদিগের প্রাণরক্ষার ব্যবস্থা করিবেন। কিন্তু শেষে জাৰ্মাণেরা এ অঙ্গীকারও পালন করিলেন না। তাঁহার বর্তমান বর্ষে ইংল্যাণ্ডে খাদ্যাভাব ঘটাইবার জন্য যেখানে সেখানে যে সে যাত্রীর জাহাজ সাগরগর্ভচর পােতের সাহায্যে ডুবাইতে প্রবৃত্ত হইলেন ; আরােহীদিগের রক্ষার জন্যও কোন ব্যবস্থা করিলেন না। উইস ইহার প্রতিবাদ করিলে তাহারা অতি অবজ্ঞার সহিত তাহা উড়াইয়া কাজেই গত মার্চমাসে রুনাইটেড, ষ্টেটসকে অগত্যা জাৰ্ম্মাণির বিরুদ্ধে যুদ্ধঘােষণা করিতে হইল। অতঃপর য়ুনাইটেড, ষ্টেটসের দেখাদেখি আমেরিকার আরও কয়েকটা রাজ্য জাৰ্ম্মাণদিগের বিপক্ষভুক্ত হইয়াছে। য়ুনাইটেড, ষ্টেটসের ধনবল ও জনবল উভয়ই প্রচুর। যতদিন যুদ্ধে নির্লিপ্ত ছিলেন ততদিনও এখানকার লােকে পরােক্ষভাবে ইংরাজদিগের অনেক সহায়তা করিয়াছিলেন। তাঁহারা ইংরাজদিগের নিকট যুদ্ধোপকরণ বিক্রয় করিতেন ; জার্মাণিতে, যে সকল ইংরাজ বন্দী আছে, তাঁহাদের যত্নে তাহার অপেক্ষাকৃত অধিক সুখস্বাচ্ছন্দ্য ভােগ করিত; বেলজিয়ামের অসহায় লােকদিগের সাহায্যার্থ ইংল্যাণ্ডে ও অন্যান্য দেশে যে অর্থ সংগৃহীত হইত, তাহারাই তাহার বণ্টনভার গ্রহণ করিয়াছিলেন। এখন যুদ্ধে প্রবৃত্ত হইয়া তাঁহারা অন্তরূপে ইংরাজপক্ষের সহায়তা করিতেছেন। তাহারা ফন্সিকে অকাতরে অর্থ দিতেছেন, জাৰ্ম্মাণদিগের সাগরগর্ভচর পােতসমূহের উপদ্রব-নিবারণাৰ্থ আপনাদের রণতরীসমুহ নিয়ােজিত দিলেন।

একাদশ অধ্যায় । করিয়াছেন ; যাহাতে বাণিজ্যের ব্যাঘাত না ঘটে, সেইজন্য বহুসংখ্যক নূতন পােত নিৰ্মাণ করিতেছেন এবং ফরাসীদেশে সেনা পাঠাইতেছেন। ইংরাজদিগের পক্ষে এ বড় কম লাভ নহে। কিন্তু ইহা অপেক্ষাও আর একটা বড় লাভ হইয়াছে। জার্মাণির পরাভবে ইংল্যাণ্ড, ফুল, প্রভৃতি দেশের স্বার্থ আছে ; কিন্তু য়ুনাইটেড, ষ্টেটসের কোন স্বার্থ নাই। অথচ এই দেশও যখন জাৰ্ম্মাণির শত্রু হইয়া দাড়াইল, তখন জাৰ্ম্মাণজাতির আচরণ যে সথ সাধুজনবিগতি, এবং তাদিগকে দমন না করিতে পারিলে, সভ্যতার যে বিলোপ সাধিত হইবে, এ সম্বন্ধে কাহারও মনে অণুমাত্র সন্দেহ রহিল না। একাদশ অধ্যায়। বর্তমান যুদ্ধে কি কি বিষয়ের মীমাংসা হইবে । বর্তমান যুদ্ধের কারণগুলি পূর্বে বলা হইয়াছে। এখন দেখা যাউক ইহার অবসানে কি কি প্রশ্নের মীমাংসা হইবে বলিয়া আশা করা যায়। প্রথমতঃ, ইহাতে প্রতিপন্ন হইবে যে রাজতন্ত্র শাসন ও প্রজাতন্ত্র এতদুভয়ের মধ্যে কোটী জাতীয় শক্তির পরিবদ্ধক। ইংল্যাণ্ডে রাজকীয় ক্ষমতা প্রজাদিগের সম্মতিজাত ; কিন্তু জাৰ্ম্মাণ সম্রাট ভাবেন যে তাহার ক্ষমতা ভগবৎ-প্রদত্ত। ইংল্যাণ্ডের রাজা স্বহস্তে কোন ক্ষমতা পরিচালন করেন না; তাহার মন্ত্রীরা প্রজার প্রতিনিধিভাবে শাসনকাৰ্য্য নৰ্বাহ করেন। কিন্তু জাম্মাণিতে সম্রাটের হন্তেই সমস্ত ক্ষমতা; মন্ত্রীরাও তাহারই মনােনীত ব্যক্তি। জার্মাণিতে প্রজারা অনেক অনেক বিষয়েই রাজকর্মচারীদিগের দ্বারা পরিচালিত ; তাহারা যেরূপ নিয়ম করিয়া দেন তদনুসারে লােকের শিল্প চলে, বাণিজ্য চলে, বিদ্যালয় চলে, ডাকঘর চলে, রেলওয়ে চলে। শ্রমজীবীরা কাজ না পাইলে তাহারা তাহা পর্যন্ত যােগাড় করিয়া দেন; তাহারা যখন বৃদ্ধ হয় তখন তাহাদিগকে বৃত্তি দিয়া থাকেন। এই সকল কর্মচারী সাধারণতঃ সুযােগ্য ও কর্তব্যনিষ্ঠ বলিয়া আশু অনেক সুফল পাওয়া গিয়াছে বটে, কিন্তু ইহাতে দোষও য়ে না আছে তাহা নহে। ইহাতে ব্যক্তিগত উদ্যমের স্ফুর্তি জন্মে না, ব্যক্তিগত বিচারশক্তির বিকাশ হইতে পারে না। ইহাতে লােকে প্রায় প্রতিপদে রাজকর্মচারীদিগের মুখাপেক্ষী হইয়া চলে। কিন্তু জাৰ্মাণেরা ইহাতে কোন অসুবিধা বােধ করেন না, বরং রাজা তাঁহাদের যে উপকার করিতেছেন, নিয়ত তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাইয়া তাহারা এই প্রথারই পক্ষপাতী হইয়াছেন। ;

। বর্তমান যুদ্ধে কি কি বিষয়ের মীমাংসা হইবে। রাজার প্রতি তাহার এত অনুরক্ত হইয়াছেন যে, তাঁহার মৰ্যাদারহ্মার্থ তাহার সর্বস্ব ত্যাগ করিতেও কুণ্ঠিত হন হন না। তাহারা নীরবে গুরুতর করভার বহন করিতেছেন এবং অম্লানবদনে সৈনিকবৃত্তির কঠোরতা সহ্য করিতেছেন। সম্রাটকে ভক্তিশ্রদ্ধা করা এবং সতত তাহার আজ্ঞানুবর্তী হইয়া চলা জাৰ্মাণ- চরিত্রের বিশিষ্ট অঙ্গ। সম্রাটের বেতনভােগী শিক্ষকেরা জার্মানির বিদ্যালয়- সমূহে এই উপদেশ দিয়া আসিতেছেন, যাজকেরাও ধৰ্ম্মাসন হইতে এই নীতিই প্রচার করিতেছেন। পক্ষান্তরে ইংরাজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাই ভাল বাসেন। রাজ্যের শাসন সম্বন্ধেই হউক, কিংবা দৈনন্দিন কৰ্তবোই হউক তাহার জনসাধারণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে চান না। এ প্রথাও যে নির্দোষ তাহা নহে। ইহাতে অলস ও স্বার্থপর লােকেরা প্রশ্রয় পায় । কেহ কেহ বলেন এই জন্যই ইংল্যান্ডে যত কুকর্মরত লোক দেখা যায়, জার্মানিতে তত দেখা যায় না। অতএব ইংল্যাণ্ডেও এখন অনেকের বিশ্বাস যে জনসাধারণের স্বাধীনতা একটু খৰ্ব্ব করিতে পারিতেই যেন ভাল হয়। কিন্তু তাহা করিলেও রাজমন্ত্রীরা প্রজাককই নির্বাচিত হইবেন ; ইংবাজজাতি কখনও রাজাকে জাৰ্মাণ সম্রাটের ন্যায় স্বেচ্ছাচারী বেন না। ফলত ইংরাজ ও জাৰ্ম্মাণ উভয় জাতির পক্ষেই রাজনীতির ও সমাজনীতির সম্বন্ধে পরস্পরের নিকট কিছু শিখিবার আছে। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধে সেই শিক্ষার পথ রুদ্ধ হইয়াছে। এই যুদ্ধের ফল দেখিয়া বুঝা যাইবে.কোন্ দেশের শাসন- প্রণালী ভাল,-ইংল্যাণ্ডের না জাৰ্ম্মাণির। যদি ইংরাজ জয়ী হন তাহা হইলে পৃথিবীতে প্রজাতন্ত্র শাসনের এবং যদি জাৰ্মাণ জয়ী হন তাহা হইলে রাজতন্ত্র শাসনের আদর বৃদ্ধি হইবে । দ্বিতীয়তঃ, সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়ােগ সম্বন্ধে ইংরাজ ভাল না জাৰ্ম্মাণ ভাল ? ইংরাজেরা প্রজার ধর্ম, ভাষা ও আচার ব্যবহারে হস্তক্ষেপ করেন না; কিন্তু জার্মাণের সমস্ত প্রজাকেই জাৰ্মাণ ভাবাপন্ন করতে চান। ইংরাজের এখন মুখ্য উদ্দেশ্য যে তাহাদের এই পৃথিবীব্যাপী সাম্রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন জাতি স্ব স্ব জাতীয় প্রথার অনুসরণ করিয়া উন্নতির পথে অগ্রসর হইতে পারে। এই উদ্দেশ্য যে সহজে সিদ্ধ হইতে পারে না, ইহা সকলেই বুঝেন। তৃতীয়ত, যুদ্ধপ্রিয় ও শান্তিপ্রিয় জাতির মধ্যে কে লাভবান ? জার্মাণের যুদ্ধপ্রিয়, কাজেই বিস্তর সৈন্য রাখেন এবং সৈনিক পুরুষদিগকে অনেক সময়ে অযথা প্রশ্রয় দেন। এমন কি তাঁহাদের সেনানীর আইন কানুনের বড় ধার ধারেন না, কেহ তাহাদের অবমাননা করিলে নিজেরাই তাহার দণ্ডবিধান করেন।

একাদশ অধ্যায়। সৈনিকপুরুষদিগের এতাদৃশী ক্ষমতা ইংল্যাণ্ডে সম্ভব না। জার্মাণির শাসন- কাৰ্যেও সৈনিকেরই প্রাধান্য, কারণ সম্রাটের পার্শ্বচরগণ প্রায় সকলেই সেনানী এবং সম্রাট অনেক সময়েই তাঁহাদের পরামর্শমত কার্য করেন। অপিচ জার্মাণিতে প্রত্যেক কর্মক্ষম ব্যক্তিকেই জীবনের কিছুকাল সৈনিকবৃত্তি অবলম্বন করিতে হয়, কিন্তু ইংল্যাণ্ডে পূর্বে এরূপ নিয়ম ছিল না। বর্তমান যুদ্ধের প্রথম দেড় বৎসরে ইংরাজের লােকের ইচ্ছার উপর নির্ভর করিয়াই প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ সৈন্য সংগ্রহ করিয়াছিলেন। কিন্তু শেষে যখন যুদ্ধক্ষেত্রের আয়তন বৃদ্ধি হইল এবং বিস্তর লােকক্ষয় হইতে লাগিল, তখন ইংরাজেরাও কর্মক্ষম ব্যক্তিমাত্ৰকেই সৈনিক বৃত্তি অবলম্বন করিতে বাধ্য করিলেন। কিন্তু ইংল্যাণ্ডে এ প্রথা নুতন ; জাৰ্ম্মাণিতে এবং জাৰ্ম্মাণির সহিত প্রতিযােগিতা করিয়া ফ্রান্স, প্রভৃতি দেশে ইহা পুরাতন। অনেকের বিশ্বাস বৰ্তমান যুদ্ধ সমাপ্ত হইলে ইংরাজেরা বাধ্যতামূলক নিয়মটী উঠাইয়া দিবেন। তখন ইংল্যাণ্ডে এক দল নাতিবৃহৎ সেনা থাকিবে এবং যাহারা ইচ্ছা করিবে কেবল তাহাদিগকেই ইহার অন্তনিবিষ্ট করা হইবে। প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষে সৈনিকবৃত্তি শিক্ষা করা দেশের অতি দুভাগ্যের কথা ; ইহাতে লোকে পশুবলেরই পক্ষপাতী হয় ; তাহাদের যুদ্ধ বাসনাও উদ্দীপিত হয়। ইংরাজজাতি এরূপ কু প্রথার বিরােধী ; ইহত্যু সমাজের কলঙ্ক। চতুর্থত, কোন জাতি সৰ্বসাধারণ-প্রতিপাল্য বিধান উল্লম্বন করিলে তাহার কি দণ্ড হইতে পারে ? ব্যক্তিবিশেষে কোন বিধি লঙ্ঘন করিলে রাজা তাহাকে দণ্ড দেন; কিন্তু জাতিবিশেষে কোন বিধি লঙ্ঘন করিলে তাহার প্রতীকারের উপায় কি? এখন এক জাতি অন্য জাতির সঙ্গে সন্ধিসূত্রে বদ্ধ হইয়া কতকগুলি নিয়ম পালন করিয়া চলিৰেন, এই অঙ্গীকার করিলেন; কিন্তু ইহা যে চিরদিন প্রতিপালিত হইবে তাহাতে বিশ্বাস কি ? এক পক্ষ হয়ত বলিতে পারেন, কালভেদে অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়াছে, অতএব আমরা পূৰ্ব্বপ্রতিশ্রুতি পালন করিতে পারিব না। এরূপ বলা সভ্য সমাজের পক্ষে শােভা পায় না ; ইহাতে শান্তিরও বিঘ্ন ঘটে। জাৰ্মাণের। যখন বেলজিয়ামের ভিতর দিয়া সেনা পাঠাইবার সঙ্কল্প করিলেন, তথন ইংরাজ রাজদূত তাঁহাদিগকে পূৰ্ব্বকৃত সন্ধির কথা স্মরণ করাইয়া ইহার প্রতিবাদ করিলেন; কিন্তু ইহার উত্তরে জাৰ্ম্মাণির প্রধান মন্ত্রী বলিলেন, “একখানা পুরাতন চোতা কাগজের কথা তুলিতেছেন কেন? উহা কি সব সময়ে মানিয়া চলিতে পারা যায় ? অতঃপর জাৰ্মাণের। যদি আবার কোন সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন, তাহা হইলে ললাকে উহাকেও কি একখানা ‘চোতা কাগজ’ বলিয়া মনে করিবে না ? তাহারা লিখিয়া- ছিলেন ইংরাজেরা যদি উদাসীন থাকেন তাহা হইলে যুদ্ধাবসানে তাঁহারা বেলজিয়াম ;

বর্তমান যুদ্ধে কি কি বিষয়ের মীমাংসা হইবে। হইতে সেনা তুলিয়া লইবেন। যদি দৈবাৎ তাহারা জয়ী হইতেন, তাহা হইলে এই আশ্বাসপত্রও কি ‘চোতা কাগজ’ ভিন্ন আর কিছু হইত ? জার্মাণের যে প্রতিজ্ঞাভঙ্গে সুনিপুণ, চীনদেশেও তাহার পরিচয় পাওয়া গিয়াছে। কিন্তু ইংরাজেরা প্রতিপালক। ফলতঃ ইংরাজের চরিত্রে ও জার্মাণের চরিত্রে, ইংরাজের সভ্যতায় ও জার্মাণের সভ্যতায়, ইংরাজের শাসনপ্রণালীতে ও জাৰ্মাণের শাসন প্রণালীতে অনেক প্রভেদ। আশা করা যায় ইংরাজই জয়ী হইবেন এবং সকলে মুক্তকণ্ঠে ইংরাজের উদার নীতির প্রশংসা কীৰ্ত্তন করিবে। দ্বাদশ অধ্যায়। বর্তমান যুদ্ধে ভারতবর্ষের কার্য্য। যুবােপে পূর্বে যে সকল যুদ্ধ হইয়াছে তাহার কোনটীতেই ভারতবর্ষের লােক যােগ দেয় নাই। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধে তাহারাও ইংরাজের সহায় হইয়া রণাঙ্গণে দেখা দিয়াছে এবং আপনাদের অর্থ-সামর্থ্য সমস্তই ইরাজের হিতা নিয়ােজিত কুরিয়াছে। এরূপ করিবারই কথা। ভারতবর্ষের লােক কৃতজ্ঞ ও রাজভক্ত ; ভারতবর্ষের লােক ন্যায়ের সমর্থক। তাহারা দেখিতেছে ইংরাজশাসনে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে ; এবং লােকে নানা বিষয়ে উন্নতিলাভ করিতেছে। তাহারা জানে ইংরাজের রাজ্যে অবিচার ও পক্ষপাত নাই, এবং ইংরাজ কাহারও ধৰ্ম্মে হস্তক্ষেপ করেন না। তাহারা বুঝে যে ভারতবর্ষের ন্যায় একটা সুবৃহৎ দেশকে এমন নিঃস্বার্থভাবে, এমন সুচারুরূপে শাসন করিতে ইংরাজ ভিন্ন অন্য কোন জাতির সাধ্য নাই। তাহারা এ সমস্ত দেখে, জানে ও বুঝে বলিয়া ইংরাজের নিকট কৃতজ্ঞ এবং এইজন্য ইংরাজের বিপদে উদাসীন থাকিতে পারে না। রাজভক্তি ত তাহাদের প্রকৃতিগত, কারণ তাহাদের শাস্ত্রে রাজা ‘মহতী দেবতা বলিয়া বর্ণিত। একে রাজা, তাহাতে আবার তিনি বর্তমান যুদ্ধে ন্যায়ের সমর্থক ও অসহায়ের সহায় ; তিনি অত্যাচারীর—প্রতিজ্ঞাভঙ্গকারীর দণ্ডবিধানের জন্য অস্ত্র ধারণ করিয়াছেন। যে দেশ উদার ক্ষাত্রধৰ্ম্মের জন্য চিরপ্রসিদ্ধ, যে দেশে লােকে সুতিকাগৃহেই শুনিতে আরম্ভ করে “যতত ধৰ্ম্মস্ততে। জয়, সে দেশের লােকে যে রাজার কার্য্যে প্রাণ পৰ্য্যন্ত পণ করিয়াছে ইহা আর বিস্ময়ের বিষয় কি ? পূৰ্ব্বে বলা হইয়াছে যুদ্ধারম্ভে ইংল্যাণ্ডে লক্ষাধিক স্থায়ী সৈন্য ছিল না ; অথচ জাৰ্মাণেরা ইহা অপেক্ষা বহুগুণে বৃহত্তর সেনা লইয়া বেলজিয়ামে প্রবেশ

***
১ ২ ১০
ফালে ভাতিষী সেনা।

বর্তমান যুদ্ধে ভারতবর্ষের কার্য্য। করিয়াছিলেন। ইহা দেখিয়া আমাদের ভূতপূর্ব ভাইসরয় লর্ড হার্ডিং ভারতবর্ষ হইতে সেনা প্রেরণ করিবার প্রস্তাব করিলেন; ভারতবর্ষের লােকে একবাক্যে ইহা মােন করিল। ভারতবর্ষের সেনা প্রথমে ঈপরের যুদ্ধে যােগ দেয়। তাহাদের পক্ষে তখন সেখানে সমস্তই অপরিচিত। তাহারা গ্রীষ্মমণ্ডলের লােক, অথচ সেখানে তখন এমন শীত যে তাহা য়ুরােপবাসীদিগের পক্ষেও দুঃসহ। একে শীত, তাহার উপর আবার অবিরাম বৃষ্টি ও তুষারপাত ; অথচ আশ্রয়ের স্থান নাই। দিনের পর দিন অনাবৃত, কর্দমপূর্ণ কুল্যার ভিতর থাকিতে হইত। কুল্যার ভিতর থাকিতে হইত। এরূপ যুদ্ধ তাহারা কখনও দেখে নাই। তাহারা বীরের জাতি; তারা সম্মুখ সমরই জানিত। কিন্তু এত অনুধা ভােগ করিয়া তাহারা সব্বতোভাবে আপনাদের জাতীয় গৌরব রক্ষা কৰিছে—ইংরাজনার সহিত ও ক্লেশ ভােগ করিয়া, ইংরাজসেনার সহিত তুল্য বীরত্ব দেখাইয়া সুশ অর্জন ক' রয়াছে। ইংরাজ সৈন্যের পক্ষে ‘বিকৃটোরিয়া ক্র শ’ নামক পুরস্কার প্রাপ্তি বড়ই গৌরবের বিষয়, কারণ ইহা অসামান্য শসের নিদর্শন। যাহার এই পুরস্কার লাভ করেন, তাহার যাবজ্জীবন রাজভাণ্ডার হইতে বার্ষিক দেড় শত টাকা বৃত্তি পাইয়া থাকেন। বর্ষের লােকে অসাধারণ শৌর্যবীৰ্য্য দেখাইয়া বীরজনবাঞ্চিত এই মহা পুরস্কারও লাভ করিয়াছেন। এই সকল ভাগ্যবান, যােদ্ধাদিগের মধ্যে একজনের নাম খুদাদাদ খাঁ। খুদাদাদ ১২৯-সংখ্যক বালুচি সেনাভুক্ত। ইনি একদা কয়েকজন যােদ্ধার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের একস্থানে যান্ত্রিক বন্দুক দাগিবার জন্য নিযুক্ত ছিলেন । শত্রুপক্ষের অগ্নিবর্ষণে খুদাদাদ ব্যতীত অন্য সকলেই নিহত হন; কিন্তু খুদাদা একাই এমন সুকৌশলে গুলি চালাইতে থাকেন যে তাহাতে শত্রুপক্ষের উদ্দে ব্যর্থ হয়। এই নিমিত্ত গুণগ্রাহী ইংল্যাগুরাজ তাহাকে বিক্টোরিয়া ক্রুশে বিভূষিত করিয়াছেন। ৯-সংখ্যক ভূপাল পদাতিদলভুক্ত ছত্ৰসিংহ নামক আর একজন যােদ্ধাও এই গৌরবজনক ভূষণে অলঙ্কৃত হইয়াছেন। ইনি একদা কুল্যার ভিতর হইতে দেখিতে পাইলেন ঐ দলের সেনানী বাহিরে গিয়া আহত হইয়া ভূতলে পতিত হইয়াছেন। তখন শত্রুপক্ষের লােকে অজস্র অগ্নিবর্ষণ করিতেছিল; কাজেই কুকার বাহিরে গেলেই আহত হইবার কথা। কিন্তু ছসিংহ ইহাতে ভয় পাইলেন না। তিনি তৎক্ষণাৎ কুল্যা হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া আহত সেনানীর উদ্ধার করিলেন। ভারতবর্ষের লােকের সাহস ও নিঃস্বার্থ রাজভক্তির উদাহরণস্বরূপ এখানে একজন শিখ বীরের কথাও উল্লেখযােগ্য। ইনি পূর্বে সৈনিক বিভাগে কাজ করিতেন; কিন্তু পরে অবসর গ্রহণ করিয়া দক্ষিণ আমেরিকায় গিয়াছিলেন এবং সেখানে ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইয়া বিলক্ষণ অর্থোপার্জন করিতেছিলেন। যখন যুদ্ধ • • ১১১ দ্বাদশ অধ্যায়। আর কইল, তখন ইনি ব্যবসায় ত্যাগ করিয়া নিজের ব্যয়ে লণ্ডনে গিয়া উপদিত হইলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে যাইবার জন্য প্রার্থনা জানাইলেন। ভাবিয়া দেখ দেখি এরূপ লােকের সাহস, স্বার্থত্যাগ ও রাজভক্তি কত প্রশংসাহ! । বিক্টোরিয়া ক্রশলাঞ্ছিত ছসিংহ। যুদ্ধের প্রথম বর্ষ অতীত হইলে ইংরাজরাজপুরুষেবা স্থির করিলেন ভারতীয় সৈন্যদিগকে আবার যুবরাপের দারুণ শীত সহ করিতে বলা নিষ্ঠুরতার কাৰ্য্য হইবে। এইজন্য তাহাদিগকে ফ্রান্স, হইতে তুলিয়া লইয়া মিশরে ও মেসসাপটেমিয়ায় প্রেরণ করা হইল। এ দুইটা অঞ্চলও যে সুখের স্থান তাহা নহে, কারণ গ্রীষ্মকালে উত্তাপ দুঃসহ, তাহাতে আবার জলের অভাব। কিন্তু ভারতবর্ষের লােকে এই দুই দেশেও অসাধারণ সাহস ও কষ্টসহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়া প্রশংসাভাজন হইয়াছে।

বর্তমান যুদ্ধে ভারতবর্ষের কাৰ্য্য। ~ ভারতবর্ষীয় করদ ও মিত্ররাজগণ সেনা যােগাইয়া, অর্থ দিয়া, কেহ কেহ বা বয়ং যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়া ইংরাজদিগের সাহায্য করিতেছেন। জনসাধারণেও যুদ্ধের ব্যয়-নিৰ্বাহাৰ্থ, যােদ্ধাদিগের চিকিৎসাৰ্থ কিংবা তাহাদের পরিজনের ভরণপােষণার্থ অকাতরে অর্থসংগ্রহ করিতেছেন, বেলজিয়মের হতভাগ্য অধিবাসীদিগের জন্যও চাদা তুলিতেছেন। এই সকল চাদার তালিকায় দেখা যায় কেবল ধনী লোকে নহেন, মুটে মজুর এবং বালকেরা পর্যন্ত, যাহার যেরূপ সাধ্য, অর্থ দান করিতেছে। দিনও বােম্বাই প্রদেশের বালকেরা বেলজিয়ামের বালকদিগের জন্য ষাট হাজার টাকা চাদা পাঠাইয়াছে। ইহারা যে অর্থ দিয়া নাম কিনিবে কেহই এমন ভাবে নাই; অনেকে সামান্য আয় হইতে চাদা দিতে গিয়া হয়ত নিজেরাই অসুবি, ভােগ করিয়াছে; তথাপি কেহ দিতে কুণ্ঠিত হয় নাই। যুদ্ধে অন্যান্য দেশে যেমন কভার বৃদ্ধি হইয়াছে এবং খাদ্যাৰ্পৰ মূল্য চড়িয়াছে, ভারতবর্ষে এখনও তেমন হয় নাই। কিন্তু যুদ্ধ যদি দীর্ঘকাল চলে, তাহা হইলে পৃথিবীর ধনাগম হ্রাস হইবেই হইবে এবং ভারতবর্ষকে নানারূপ অসুবিধায় পড়িতে হইবে। কিন্তু ভারতবর্ষের লােক যেরূপ সহিষ্ণু, তাতে, আশা করা যায় তাহারা সে অসুবিধায় কাতর হইবে না। কদিকে যেমন অসুবিধা হইবে বলিয়া আশঙ্কা হয়, অনুদিকে তেমনি উপ- কারও হইবে আশা করা যায়। ভারতবর্ষীয় লােকে এখন পৃথিবীর মধ্যে একটা প্রধান জাতি বলিয়া পরিগণিত হইবে; তাহারা আত্মমর্যাদা শিখিবে ; তাহাদের উন্নতির পথও প্রশস্ত হইবে। অধিকন্তু ইংরাজের সহিত তাহাদের সৌহার্দবন্ধন আরও দৃঢ়তর হইবে, উভয়ে উভয়ের গুণ গ্রহণ করিতে শিখিবে এবং একসঙ্গে মিলিয়া মিশিয়া দেশের হিতসাধন করিতে পারিবে। ভারতবর্ষের লােকের অকৃত্রিম রাজভক্তি দেখিয়া মহামতি পঞ্চম জর্জ অত্ৰত্য ভাইপ্রয়কে যে পত্র লিখিয়াছিলেন তাহা হইতে এই শুভদিনের আভাস পাওয়া যায়। নিম্নে তাহার কতিপয় পঙক্তি উড়ত হইল। “আমাৰ মৰ্যাদারক্ষার জন্য অন্যান্য স্থানের প্রজার ন্যায় ভারতবর্ষীয় করদ ও মিত্ররাজগণ ও জনসাধারণ একবাক্যে যে সৰ্বস্বপণ করিয়াছেন তাহাতে আমি বড়ই মুগ্ধ হইয়াছি। ভারতবর্ষের লােককে আজ আমার শত্রুদমনে অগ্রসর দেখিয়া তাহাদের প্রতি আমার অনুরাগ গাঢ়তর হইয়াছে। ১৯১২ অব্দে আমি ভারতবর্ষ হইতে যখন ইংল্যাণ্ডে প্রত্যাগমন করি, তখন তত্ৰত্য লােকে আমাকে ভক্তিসূচক এক অভিনন্দনপত্র প্রেরণ করিয়া যে যে আশ্বাস দিয়াছিলেন, নিরতিশয় আহলাদের বিষয় এই যে বর্তমান বিপত্তির সময় তাহারা সে সমুদয় পূরণ করিয়াছেন। তাহারা তখনই বলিয়াছিলেন যে ইংল্যাণ্ডের ও ভারতবর্ষের ভাগ্য একসুত্রে গ্রথিত।

১১) ত্রয়োদশ অধ্যায়। এতদিনে এই কথা সার্থক হইল।” ভগবান্ করুন সম্রাটের এই সিদ্ধান্ত যেন অভ্রান্ত হয়। এই প্রসঙ্গে, আফগানিস্তানের অধিপতি ইংরাজদিগের প্রতি যে অকৃত্রিম বন্ধুত্বের পরিচয় দিয়াছেন তাহাও উল্লেখ করা আবশ্যক। জার্মাণেরা তাঁহাকে ইংরাজদিগের বিরােধী হইবার জন্য অনুরােধ করিয়াছিলেন; কিন্তু তিনি তাহাতে কর্ণপাত করেন নাই। তাহার ধ্রুববিশ্বাস ইংরাজেরাই জয়ী হইবেন; তিনি নিজের প্রজাদিগকেও তাহাই বুঝাইয়াছেন। এই নিমিত্ত আফগানিস্তানে এপৰ্য্যন্ত ইংরাজদিগের অনিষ্টকর কিছু ঘটিতে পারে নাই। ত্রয়ােদশ অধ্যায়। আশা ও সাফল্য। তিন বৎসর যুদ্ধ চলিতেছে, অথচ আমরা এপর্যন্ত আশানুরূপ কোন ফললাভ করি নাই। ইহাতে কেহ কেহ একটু নৈরাশ্যের ভাব প্রকাশ করেন। তাহারা বলেন ফ্রান্সের কিয়দংশ এবং বেলজিয়াম্ এখনও জাৰ্মাণদিগের হস্তগত ; পােল্যাণ্ড, সার্বিয়া এবং রুমানিয়ারও সেই দশা। ইটালি টিয়েষ্টের দিনে অগ্রসর হইতে পারে নাই ; উত্তরাঞ্চল হইতে ত সম্পূর্ণরূপেই বিতাড়িত হইয়াছে। অথচ জাৰ্ম্মাণি এক রূপ অক্ষত রহিয়াছে-আমরা অধ্যাপি জার্মাণির সীমা পৰ্য্য স্পর্শ করিতে পারি নাই। এ সব কথা সত্য সন্দেহ নাই; কিন্তু দেখিতে হইবে জার্মাণির উদ্দেই বা কতদূর সিদ্ধ হইয়াছে। জার্মাণের পারিশ অধিকার করিতে পারেন নাই, রিগাও অধিকার করিতে পারেন নাই। তাহারা ইংল্যাণ্ড ও মিশর আক্রমণ করিবেন বলিয়া সঙ্কল্প করিয়াছিলেন; কিন্তু সে আশায় এখন জলাঞ্জলি দিয়াছেন। তাহারা ভাবিয়াছিলেন আয়ল্যাণ্ডে বিদ্রোহ ঘটাইয়া ইংরাজদিগকে বিব্রত করিবেন; কিন্তু সে চক্রান্ত ব্যর্থ হইয়াছে। তাহারা বাগদাদ পর্যন্ত রেল নির্মাণ করিতেছিলেন। আশা করিয়াছিলেন যে তাহার সাহায্যে এশিয়াটিক তুরুষ্কে অখণ্ড আধিপত্য স্থাপন করিবেন; কিন্তু আজ সেই বাগদাদ--সেই তুর্কশক্তির কেন্দ্রভূমি ইংরাজসেনার পদানত। জাৰ্মাণদিগের রাজ্যক্ষয়, অক্ষয় এবং লােকক্ষয়ও কম হয় নাই। আফ্রিকার পূর্বপ্রান্তে যৎসামান্য ভূখণ্ড ব্যতীত তাহাদিগের সমস্ত উপনিবেশই এখন শক্তহস্তগত ; পূৰ্ব-আফ্রিকাও যায় যায় হইয়াছে। তাহাদের বাণিজ্যও বিলুপ্ত হইয়াছে। কিন্তু ইংরাজের এ পর্যন্ত সূচ্যগ্ৰপ্ৰমাণ ভূমি নষ্ট হয় নাই। ইংরাজের বাণিজ্যের বরং উপচয়ই হইতেছে।

আশা ও সাফল্য। কঠিন। কোন্ পক্ষে কত লােক নষ্ট হইয়াছে তাহা নিশ্চিত বলা যায় না। কিন্তু শাৰ্মাণেরা নিজেই বলিতেছেন যে এ পর্যন্ত তাহাদের দেশের প্রায় ৪০ লক্ষ লােক হতাহত হইয়াছে। এতভিন্ন অস্ট্রিয়ারও বহু লােক বিনষ্ট হইয়াছে। ইহার তুলনায় ইংরাজদিগের সাত আট লক্ষ লােকের বিনাশ কিছুই নয় বলিতে হইবে। জাৰ্মাণদিগের কত সৈন্য এখন যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ােজিত আছে তাহা নির্ণয় কর। সম্ভবতঃ এখনও তাহাদের সেনাবল যথেষ্ট আছে। একা তুই তাহাদিগকে প্রায় দশ লক্ষ সৈন্ত দিয়াছে। জাৰ্ম্মাণদিগের কুল্যা ও দুর্গগুলি সুদৃঢ় ; তাহাদের রেলওয়েরও এমন সুব্যবস্থা যে তারা অল্পসময়ের মধ্যে সৈন্যদিগকে ঝুণক্ষেত্রের এক প্রান্ত হইতে অন্য প্রান্তে প্রেরণ করা যাইতে পারে। অনেকে মনে করিয়াছিলেন, ইংরাজপক্ষ অংশবিশেষে প্রভূত সৈন্য সমাবেশ করিয়া অগ্রসর হইলে জাৰ্মাণদিগের বৃহতভদ সুসাধ্য হইবে। অধ্যাপি তাহা করিতে পারা যায় নাই বটে কিন্তু জাৰ্মাণের যেরূপ হঠিতে এবং ইংরাজ ও ফরাসীরা যেরূপ অগ্রসর হইতে আরম্ভ করিয়াছেন, তাহাতে আশা হয় অচিরে জাৰ্মাণসেনা সম্পূর্ণরূপে পরাভূত হইবে। ইংরাজ রণপােতে জাৰ্ম্মাণির আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করিয়াছে বটে, কিন্তু তাহাতে অদ্যপি জাৰ্মাণদিগের মধ্যে অবসাদের লক্ষণ দেখা যায় নাই। জার্মাণির বুনত্তোরা নব নব উপায় প্রয়ােগ করিয়া আমদানির অভাব পূরণ করিতেছেন। তাহারা তূলার পরিবর্তে কাঠচূর্ণ দ্বারা প্রস্ফোটন প্রস্তুত করিয়াছেন; কেরােসিন ও রবারের অনুরূপ কোন কোন দ্রব্যও নাকি আবিষ্কার করিয়াছেন। তথাপি তাঁহাদের যে কোন প্রয়োেজনীয় দ্রব্যেরই অভাব হইতেছে না, ইহা মনে করা যায় । পশম, চর্ম ও তাম্র যুদ্ধাৰ্থ নিতান্ত আবশ্যক; কিন্তু জাৰ্ম্মাণিতে এখন এ সকল বস্তু দুলভ হইয়াছে। খাদ্যাভাবও নিশ্চয় ঘটিয়াছে এবং তন্নিবন্ধন ক্রমেই লােকের কষ্ট বাড়িতেছে। ফলতঃ, জার্মাণেরা অনতিবিলম্বে শত্রুপক্ষের বলত করিতে না পারিলে তাহাদিগকে অনাহারে আত্মসমর্পণ করিতে হইবে। ইংরাজপক্ষেও ভাবিবার অনেক কথা আছে। ইহাদেরও ভীষণ লােকর হইতেছে, রাশি রাশি অর্থ নষ্ট হইতেছে। একা ইংল্যাণ্ডই যুদ্ধের জন্য প্রতিদিন প্রায় বার কোটি টাকা ব্যয় করিতেছেন। ফ্রান্সের শিল্প-প্রধান স্থানগুলি এখন জাৰ্মদিগের হাতে ; কাজেই ইংল্যাণ্ডের নিকট অর্থ ও খাদ্য না পাইলে ফ্রান্স, এত দিন নিতান্ত অবসন্ন হইত। তবে অবিরত অজস্র ব্যয় হইলে কুবেরের ভাণ্ডারও ফুরাইয়া যায়। ইংরাজেরা এতদিন অর্থের অভাব বোধ করেন নাই সত্য, কিন্তু দীর্ঘকাল এই অতিবৃহদব্যয়ের প্রয়োজন থাকিলে কভার যে দুর্বহ হইতে তাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু দুর্বহ হইলেও ইংরাজেরা উহা বহন করিবেন, কারণ তাহারা প্রতিজ্ঞা করিয়াছেন সম্পূর্ণরূপে জয়লাভ না করিলে নিরস্ত হইবেন না।

১১ ত্রয়ােদশ অধ্যায়। জার্মাণে একাধিকবার সন্ধির কথা তুলিয়াছেন; কিন্তু তাহারা যে সকল প্রস্তাব উত্থাপিত করেন তাহা বিজয়ীর পক্ষেই শােভা পায়। তাঁহাদের মনের ভাব যে বেলজিয়াম, পােল্যাণ্ড, ও সার্বিয়া জার্মাণির আশ্রিতরাজ্য বলিয়া গণ্য হইবে, তুফও জাৰ্মাণজাতির কর্তৃত্বাধীন থাকিবে এবং ইংরাজদিগকে অঙ্গীকার করিতে হইবে যে উত্তরকালীন কোন যুদ্ধে তাহারা শত্রুপক্ষের বাণিজ্য রােধ করিতে পারিবেন না। জাৰ্ম্মণেরা যখন এখনও জয়লাভ করিতে পারেন নাই, তখন এই সমস্ত অসঙ্গত প্রস্তাব করা ধৃষ্টতামাত্র। যুদ্ধাবসানে ইংরাজপক্ষ কি চান এখনও তাহা স্পষ্টরূপে নির্দিষ্ট হয় নাই। তবে ইংল্যাণ্ডের প্রতিজ্ঞ যে বেলজিয়ামের স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখিতে হইবে, এই রাজ্যের যে ক্ষতি হইয়াছে জার্মাণিকে তাহা পূরণ করিতে হইবে এবং প্রুশিয়ার সেনাবল কমাইতে হইবে। জাৰ্ম্মাণির প্রস্তাবমত সন্ধি করিলে তাহা কখনও স্থায়ী হইবে না; সমগ্র য়ুরােপখণ্ড আবার এক বৃহৎ সেনাকটকে পরিণত হইবে, সকলকেই সৈনিক বৃত্তি শিখিতে হইবে, রাজস্বের অর্ধাংশ সামরিক আয়ােজনে উড়িয়া যাইবে। যখন প্রকৃত সন্ধির কথা উঠিবে তখন অনেক জটিল প্রশ্নের মীমাংসা করিতে হইবে। বর্তমান যুদ্ধের মুখ্য উদ্দেশ্য জাতিগত স্বাধীনতা-রক্ষা; কাস্ত্রে ইহার অবসানে য়ুরােপীয় কোন জাতিকেই পরাধীন রাখা সঙ্গত হইবে না। য়ুরােপের দক্ষিণ-পূর্বখণ্ডে এক একটা অঞ্চলে বহুজাতির বাস বলিয়া এখানে জাতিগত স্বাতন্ত্র রক্ষা করা বড় কঠিন ; কাজেই এখানে রাজ্যসমূহের সনির্ধারণ করিবার সময় ধীরভাবে বিচার করিতে হইবে। জাৰ্ম্মাণজাতির সম্বন্ধেও বেশী কঠোর হইলে চলিবে না। জাৰ্মাণের সভ্যসমাজের একটা প্রধান অঙ্গ ; কি লােকসংখ্যায়, কি প্রতিভায় তাহারা পৃথিবীর একটা প্রধান জাতি। জার্মাণেরা শিল্পে, বিজ্ঞানে ও সমাজতত্বে যে উচ্চাসন অধিকার করিয়াছেন, তাহা হইত তাহারা বিচ্যুত হইলে সমস্ত পৃথিবীরই ক্ষতি। কিন্তু তাহাদের দর্পচূর্ণ হওয়া আবশ্যক ; তাহাদিগকে শিক্ষা দিতে হইবে যে পশুবলই একমাত্র বল নহে এবং পৃথিবীটা কেবল তাহাদেরই জন্য কষ্ট হয় নাই এ পর্যন্ত যাহা ঘটিয়াছে তাহাতে আমাদের হতাশ হইবার কারণ নাই, বরং আশা করা যায় যে ইংরাজপক্ষ যদি কৰ্তব্যঙ্খলিত না হন, তাহা হইলে সিদ্ধিলাভপূর্বক নিজেদের এবং অপর সকলের কল্যাণ সাধন করিতে পারিবেন।

অফোর্ড প্রকাশিত য়ুরােপীয়
মহাযুদ্ধ-সংক্রান্ত
পুস্তকাবলী
১। রণভেরী—(সার আর্থার কোন ডয়েল লিখিত “To Arms”
নামক পুস্তিকার বঙ্গানুবাদ)। প্রসিদ্ধ লেখক শ্রী সুরেশচন্দ্র সমাজপতি কর্তৃক
সম্পাদিত এবং শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক অনূদিত। মূল্য /• আনা।
২। য়ুরোপের মহাসমর-ডব্লিউ. এ. কোর্টনি ও জে. এস
কেনিডি প্রণীত “How the War Began” নামক পুস্তকের বঙ্গানুবাদ।
ক্রাউন ২১১ পৃষ্ঠে সম্পূর্ণ। শ্রীযুক্ত সুরেশচন্দ্র সমাজপতি কর্তৃক সম্পাদিত
মূল্য ৮০ আনা।
৩। পৃথিবীব্যাপী মহাসমর—Nelson Fraser প্রণীত “The
World at War” নামক পুস্তকের বঙ্গানুবাদ। শ্ৰীযুক্ত রায় সাহেব ঈশানচত্র
ঘােষ এ. এ. কর্তৃক অনুদত ও সম্পাদিত এবং বহুবিধ চিত্র ও মানচিত্র সংবলিত।
ভবল ক্রাউন ১১৮ পৃষ্ঠ। মূল্য। জানা।
ক্সফোর্ড প্রকাশিত বাঙ্গালা উপাখ্যান
৪। আলে কোয়ার্টারমেন—সুপ্রাসব্ধ লেখক Sir Rider
daggard প্রণীত এবং স্বনামখ্যাত শ্ৰীযুক্ত জলধর সেন কর্তৃক অনুদিত। মূল্য
• আনা।
অক্সফোর্ড প্রকাশিত বালক-পাঠ্য বাঙ্গালা
উপাখ্যান
৫। প্রেমিক সন্ন্যাসী-চার্লস রডেব সুপ্রসিদ্ধ “The Cloister
and the Hearth”এর বঙ্গানুবাদ। মূল্য • আনা।
- অন্যান্য পুস্তক ক্ৰমশঃ প্রকাশিত হইবে।
১, ২, ৪, ৫ সংখ্যক পুস্তকের বিক্রেতা যু ৯ দাস গুপ
কোম্পানি, ৫৪৩ কলেজ স্ট্রীট, কলিকাতা এবং ৩ সংপাক পাকব 'রুত।
শ্ৰীযুক্ত এ সি. আঢ্য এণ্ড কোম্পানি, ৫৮ ও ১২ নং ওয়েলিংটন স্ত্রী,
কলিকাতা।
এ

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Prithibibyapi Mahasamar

Author
Frezer, J. Nelson
Title
Prithibibyapi Mahasamar
File name
Prithibibyapi Mahasamar
Text
OCR done
Citation
1919
Published
2010/05/5
Publisher
S.c Auddy And Company, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
126
Library
Garh Bhawanipur R.p. Institute, Howrah
Classification
World History
Keywords
Portugal
DLI number
515177
Barcode
4990010016810.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
UxkhaN4915E
Download PDF

Prithibibyapi Mahasamar