Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Lenin O Soviet
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
লেনিন ও সােভিয়েত
“বিপ্লব ও ছাত্রসমাজ” প্রভা
শ্রীপ্রিয়নাথ গাঙ্গুলী প্রণীত
সরস্বতী লাইব্রেরী
৯, রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট, কলিকাতা
পলিকা
গ্রন্থকার কর্তৃক
১, রমানাথ মজুমদার স্ট্রীট,
কলিকাতা হইতে প্রকাশিত
স্বত্ব সংস্কৃতি
প্ৰিভাৱ
শ্ৰীমহেন্দ্র নাথ দত্ত
সরস্বতী প্রেস
১নং রমানা মজুমদার স্ট্রীট,
কলিকাতা।
পিতার পুণ্য-স্মৃতিতে
No text on this page.
নিবেদন লেনিনের কৰ্ম্মসাধনার ইতিহাস বাঙ্গলাভাষায় এখনও বাহির হয় নাই। তাহার সাধনার অন্তগুঢ় কাহিনীটুকু Albert Rhys Williams কৃত Lenin নামক গ্রন্থ হইতে যতটুকু বুঝিতে পারিয়াছি এই পুস্তকে তাহাই বিবৃত করিতে চেষ্টা করিয়াছি। বল- শেভিক মতবাদকে লেনিন কি ভাবে বাস্তবক্ষেত্রে ফুটাইয়া তুলিয়াছিলেন, বলশেভিজমের প্রকৃত স্বরূপ কি তাহা পাঠক ইহাতে পাইবেন। আমার এই চেষ্টা সফল হইয়াছে কিনা বাঙ্গলার তরুণ সম্প্রদায় তাহার বিচার করিবেন। অলমিতি বিস্তরণ কলিকাতা বিনীত ১লা মাঘ, ১৩৩৩ গ্রন্থকারস্য
No text on this page.
সূচীপত্র ১ ৮ ০ ০ * ক + ৪০০ * ম ১৪ ৫০০ ১৮ ps ০ ০ ০ ২৪ প্রস্তাবনা শৈশব ও শিক্ষা লেনিনের ভ্রাতার প্রাণদণ্ড নির্বাসনে লেনিন ইউরােপে প্রচারকার্যে লেনিন বলশেভিক নেতা লেনিন গ্রন্থ রচনায় লেনিন জাৰ্মাণীর পথে লেনিনের রুশিয়ায় প্রত্যাবর্তন লেনিন ও রুশীয় যুবক গণতন্ত্র সভায় লেনিন রাষ্ট্র ব্যাপারে কঠোর শৃঙ্খলার প্রবর্তন লেনিনের ব্যক্তিগত জীবনে কঠোর সংযম কম্যুনিজমই সােভিয়েটতন্ত্রের প্রবর্তক সােভিয়েটের প্রবর্তন ও জনসাধারণের মনােভাব বক্তৃতামঞ্চে লেনিন লেনিনের বিপদ-পূর্ণ জীবন সশস্ত্র জনস ও লেনিন লেনিনের অসাধারণ আত্মস্থিরতা ৪ ০ ৪৩ ৪৫ ৪ ৫১ ৪০ ৫৯ ০ ০ ০ ৬২ ০ ০ ০ ৬৪ ৫০ ৪ ৬৭ ০৪০ ৭৫ ০৪ ০৪ ০ ৭৭ p gp ৮৩ ব্যক্তিগত সাক্ষাতে লেনিনের ব্যবস্থা লেনিনের আন্তরিকতা ও অবাস্তবে ঘৃণা দুর্যোগে লেনিন লেনিনের রাজনৈতিক পারদর্শিতা লেনিন ও বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায় অর্থতান্ত্রিক ও আমেরিকানদের সম্বন্ধে লেনিনের মতামত শ্রমিকদের উপর লেনিনের অগাধ বিশ্বাস রুশীয় শ্রমিক কৃষকদের অপ্রত্যাশিত কৰ্ম্ম সফলতা রুশিয়ার বিপ্লব সফলতা সােভিয়েটতন্ত্র ও আমেরিকা লেনিনের কর্মপদ্ধতি আইন ও শৃঙ্খলারক্ষণে লেনিন লেনিনের নামপ্রভাব ইংলণ্ডে বিপ্লব সম্ভাবনা সম্বন্ধে লেনিনের মতামত তৃতীয় আন্তর্জাতিক বৈঠক বিপ্লবের কারণ অবস্থাপন্ন ও গরীব কৃষকদের সম্বন্ধে মতামত লেনিনের তিরােভাব ৮৩ . . . E = ৫ ৯ ৮০০ ০ ০ ০ ০ ০ ১০১ ১০৪ . . ১০৭ ১০৯ ১১২ ১১৭ ০ ০ ০ লেনিন ও সোভিয়েট প্রস্তাবনা যতদিন জারতন্ত্রের স্বেচ্ছাচার-শাসন অব্যাহত ছিল ততদিন রুশিয়ার আভ্যন্তরীণ কোন বিষয়ই বিদেশী সভ্য জাতিদের নিকট ঠিক ঠিক প্রকাশিত হয় নাই। অবশ্য তৎকালীন জার সরকারই তজ্জন্য দায়ী ছিলেন ; বিগত মহাযুদ্ধের শেষ ভাগে যখন রুশিয়াময় শ্রমিক- কৃষক আন্দোলন চরমে উঠিয়া মহা বিপ্লবে পরিণত হইল, দেখিতে দেখিতে জার-সিংহাসন ধ্বসিয়া পড়িল, তখনও জগতের লােক রুশিয়ার সংবাদ ঠিক ঠিক পান নাই। অনেক সংবাদ ত অবরােধের জন্য বন্ধই ছিল, যাহাও আসিত তাহার অনেকই রূপান্তরিত। এজন্য ব্রিটিশ সেন্সর” (Censor) অফিসই অনেকটা দায়ী। পাছে রুশীয় শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন ও আন্দোলন- কর্তা লেনিনের কৰ্ম্ম-ধারা প্রকাশিত হইয়া তাহা ব্রিটিশ শ্রমিকদের ভিতর সংক্রামিত হইয়া পড়ে, সেই লেনিন ও সােভিয়েট উঠিতেন ; MA=Alam * ৬-১ + used আশঙ্কাই তাহাদিগকে অনেক সময় সত্য তথ্য প্রকাশিত করিতে বিরত করিত। এদিকে জগতের লােক রুশিয়ার মত বিরাট দেশে বিপ্লব সম্ভব করিয়া তুলিতে পারেন যে জন, সেই লেনিনকে কত ভাবেই না কল্পনা করিত। অনেক ইংরাজের কল্পনায়, তিনি লাল-জামা, উচু-বুট পরা দস্যসর্দার রূপেও ফুটিয়া তবে লেনিনের সম্বন্ধে প্রকৃত সংবাদ জগতে প্রচারিত না হইবার একটী কারণ যে, তিনি নিজকে অঞ্জকাশিত রাখিয়া চলিতে ভাল বাসিতেন এবং পারিতেন। লেনিন সম্বন্ধে অদ্ভুত অদ্ভুত কত কথাই না জগতে রাষ্ট্র হইয়াছে। সকাল বেলার তারের খবরে হয়ত প্রকাশ, সাইবেরিয়ার একখানি সশস্ত্র ট্রেন হইতে লাফাইয়া পড়িয়া লেনিন মরিতে মরিতে বাঁচিয়া গিয়াছেন। অপরাহ্নেই খবর আসিল, ট্রটিস্কি লেনিনকে বন্দী করিয়া মস্কোর কারাকক্ষে আবদ্ধ করিয়াছেন, আর লেনিন সেই লৌহকবাটের ভিতর দিয়া বাহিরে চাহিয়া রহিয়াছেন। তাহার পরেই আবার হয়ত খবর আসিল, এক গাদা কাগজ বগলে করিয়া লেনিন এক- খানি স্পেনগামী ষ্টীমারে পায়চারী করিতেছেন। লেনিন * ।
প্রস্তাবনা সৈন্যের মনে সম্বন্ধে একই দিনে এরূপ কত অসংলগ্ন সংবাদই না প্রচারিত হইয়াছে। শুধু ইহাই নহে। অনেকে বলিত, লেনিনই, তাহার অদ্ভুত শক্তি দ্বারা ১৫,০০০, ০০০ বিষ ঢালিয়া দিয়া ভেদবুদ্ধি ঘটাইয়া ছিলেন। তাঁহার অসাধারণ শক্তি দ্বারাই তিনি তিনি অস্থায়ী রুশ গভর্ণমেন্টকে বিতাড়িত করিয়া ব্রেষ্টলীটভস্কের সন্ধি সন্দ্রে ১৮ কোটি লােকের সম্মতি লইয়াছিলেন। ইহাও শুনা যাইত যে শত শত গুলি বিদ্ধ হইয়াও লেনিন বাঁচিয়া রহিয়াছেন। অনেকে আবার বিশ্বাস করিতেন, তিনি কাইজারের চরমাত্র। অনেক গল্পে প্রকাশিত হইত, লেলিন অতি নৃশংস, অভিজাত সম্প্রদায়ের রক্তেই তাঁহার পরিতৃপ্তি ;• একদিকে দুর্ভিক্ষপীড়িত রুশবাসী প্রকাশ্যে রাস্তার উপর কুকুর- অশ্ব নিহত করিয়া তাহাদের অর্ধদগ্ধ মাংস লইয়া কাড়াকাড়ি করিতেছে, অপরদিকে লেনিন ক্রেমলিন প্রাসাদে বসিয়া চীন সম্রাটের আরামে নাকি দিন যাপন করিতেছেন, তাহার ফলের জন্যই নাকি রােজ ২০০০ রুবল খরচ হইতেছে। এরূপ কত ছবিই না সে সব গল্পে ফুঠিয়া উঠিত।
লেনিন ও সােভিয়েট ; কিন্তু যেদিন হইতে প্রকৃত তথ্যের কিছু কিছু প্রকাশিত হইতে লাগিল, সেইদিন হইতেই এই সব ঘটনার অনেক কিছুই অতিরঞ্জিত বলিয়া সাধারণের মনে বিশ্বাস জন্মিতে লাগিল। লেনিন সম্বন্ধে অন্যে যাহাই বলুন না কেন, আমরা একজনের কথা খুবই বিশ্বাস করিতে পারি। রুশ- বিপ্লবের সময়েই জারতন্ত্র ধ্বংস হইয়াছিল ; অধিকাংশ রাজকর্মচারীই বন্দী হইয়া পিটার ও পল দুর্গে আবদ্ধ ছিলেন। বন্দীদের ভিতর ভূতপূৰ্ব জারের গুপ্ত পুলিশ বিভাগের সর্বেসর্বা বেলেটৎস্কি (Beletzky)ও ছিলেন একজন। ১৯১৭ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে পেট্রোগ্রাড সহর সমিতি হইতে যে তিনজন নিরপেক্ষ আমেরিকা- বাসী বিপ্লব সম্বন্ধে অনুসন্ধান কমিটীর পক্ষ হইতে বেলেটৎস্কির সহিত সাক্ষাৎ করিতে যান, তাঁহাদের নিকট তিনি রুশীয় বিপ্লবপন্থীদের সম্পর্কে -নাসিকা কুঞ্চিত করিয়া অনেক কথাই বলিয়াছিলেন। যেমন, বিপ্লবপন্থীদের একজন জাৰ্মাণদের নিকট হইতে অর্থ লইয়াছে, অপর একজন প্রকৃত বিপ্লবের সময় কাপুরুষের মত সড়িযা পড়িয়াছে, এরূপ কত কথাই তিনি বলিলেন। কিন্তু যখনই তাহারা লেনিনের ৪
প্রস্তাবনা
নাম উত্থাপন করিলেন, তখনই তাঁহার মুখমণ্ডলে যেন
এক পরিবর্তনের ছায়াপাত হইল। অতি ধীরভাবে
তিনি বলিলেন,
লেনিন! একজন প্রকৃত বিপ্লবী! একজন সৎ
লােক।”
যে পুস্তক অবলম্বন করিয়া সােভিয়েট-রুশিয়া
ও লেনিন সম্বন্ধে যৎকিঞ্চিৎ লেখা হইতেছে তাহার
গ্রন্থকর্তা আলবার্ট রাইস্ উইলিয়ম দশমাসাধিককাল
লেনিনের সহিত রুশ-বিপ্লবের সময়েই রুশিয়ায়
অবস্থান করিয়াছিলেন ; এক সময়ে একই বক্তৃতামঞ্চ
হইতে বক্তৃতাও দিয়াছিলেন। তিনি যে অপর দুইজন
লেখকের লেখা সংগ্রহ করিয়া স্বীয় গ্রন্থে লিপিবদ্ধ
করিয়াছেন, তাহারাও লেনিনের সহিত, পরিচিত ।
একজন আমেরিকান রেডক্রস মিশনের পরিচালক
কর্ণেল রেমণ্ড রবিন্স ; তিনি রাজনৈতিক মতলব লইয়া
রুশিয়ায় গিয়াছিলেন। অপরজন, একজন সংবাদপত্র
প্রতিনিধি। তাঁহার রুশ ভাষায় বিশেষ অভিজ্ঞতা
ছিল; তিনি লেনিনের যাবতীয় লেখাই পাঠ করিয়া-
ছিলেন। মিঃ উইলিয়ম নিজে সমাজতান্ত্রিকরূপেই
আমেরিকা হইতে রুশিয়ায় গিয়াছিলেন। রুশিয়া,
•
•
লেনিন ও সােভিয়েট
রুশিয়ার বিপ্লব ও লেনিন সম্বন্ধে তাঁহার গ্রন্থের
অধিকাংশ তথ্যই জারের
জারের গুপ্ত
গুপ্ত পুলিশ বিভাগের
কাগজপত্র হইতে সংগৃহীত। সুতরাং লেনিন সম্বন্ধে
এই ক্ষুদ্র পুস্তিকা অসম্পূর্ণ হইলেও, অসত্য নহে।
লেনিন ও সােভিয়েট
শৈশব ও শিক্ষা
।
রুশিয়ার ভাগ্যনিয়ন্তা লেনিনের প্রকৃত নাম
নিকোলাই লেনিন নহে। ভ্রাডিমির ইলিয়িচ্চ
ইউলিয়ানভ ছিল তাঁহার প্রকৃত নাম। পূতসলিলা
বগ্রা বিধৌত সিমবাস্ক প্রদেশে ১৮৭০ খৃষ্টাব্দের ১০ই
এপ্রিল তাহার জন্ম হয়।
এক হিসাবে তিনি “কৃষক সন্তান” ; অন্যদিক দিয়া
দেখিতে গেলে তাহাকে “সম্রাপ্ত লােকেরই সন্তান”
বলিতে হয়। তাহার সম্বন্ধে এই দুইটি কথাই
প্রযােজ্য।
প্রাচীন রুশিয়ায় যিনি নৌ-বিভাগের উচ্চতন
কাপ্তেন হইতেন, সৈন্যবিভাগে কর্ণেল হইতেন, অথবা
সিভিল সার্ভিসের ষ্টেটকাউন্সিলার হইতেন, তিনি
স্বভাবতঃই সম্রান্তশ্রেণীর একজন বলিয়া পরিগণিত
হইতেন। লেনিনের পিতা সামান্য কৃষক পরিবার
হইতেই ষ্টেটকাউন্সিলারের পদে উন্নীত হইয়াছিলেন।
তাই আমরা লেনিনকে “কৃষক সন্তান” বা “সাত
লেনিন ও সােভিয়েট এক লােকের সন্তান” এই দুই কথাই বলিতে পারি। লেনিনের মাতা মেরিয়া এলেক্স এনড্রোন অতিশয় বুদ্ধিমতী নারী ছিলেন। কাজান প্রদেশে তাঁহার একটী ক্ষুদ্র সম্পত্তি ছিল এবং তাঁহার স্বামীর মৃত্যুর পরেই তিনি একটী বৃত্তি পাইয়াছিলেন। লেনিনের পিতা প্রথমতঃ ব্যায়ামাগারে শিক্ষকতা করিতেন; পরে তিনি স্কুল পরিদর্শকের পদে উন্নীত হন। শিক্ষার জন্য তাহার অতীব উৎসাহ ছিল। সর্বক্ষণই তিনি শিক্ষার প্রসার ও উন্নতির ব্যবস্থা করিয়া বেড়াইতেন। তাহার তিনটী পুত্র ও দুইটি কন্যা ছিল। তাহাদের সকলেই অতিশয় শিক্ষানুরাগী ছিলেন। তাহাদের এই পরিবার একটী ক্ষুদ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হইয়াছিল। কেহ কলা বিদ্যায়, কেহ শিল্পে, কেহ বিজ্ঞানে, কেহ বা সঙ্গীত- কলায় আত্মনিয়োেগ করিয়াছিলেন। তাহাদের ভিতর একানুবর্তিতা ভাব খুবই প্রবল ছিল। ভ্রাতাভগ্নী, পিতামাতা সকলেই পরস্পর অনুরক্ত ছিলেন। তাহাদের কোমল প্রাণ সেই বিরাট রুশ জনসাধা- রণের দুঃখ দেখিয়া ধীরে ধীরে অভিভূত হইতে লাগিল। জারতন্ত্রের অত্যাচারে নিষ্পেষিত লক্ষ লক্ষ
৫
শৈশব ও শিক্ষা
নরনারীর দুর্বিসহ জীবনের দুঃখ দৈন্যের মধ্যে তাহা-
দের নিজ ক্ষুদ্র পারিবারিক জীবনের শান্তি তাহাদের
নিকট অতি বিষদৃশ বােধ হইত। জনসাধা-
রণের দাসত্ব প্রতিনিয়ত চক্ষে দেখিয়া তাহারা নিজে
দের পারিবারিক স্বাধীনতার আনন্দেও আনন্দ
পাইতেন না। জ্ঞানার্জন স্পৃহার সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের
জনসাধারণের প্রীতিও দিন দিনই বাড়িতে লাগিল।
শ্রমিক ও কৃষকদের স্বাধীনতা ও শিক্ষার জন্য তাহারা
একে একে আত্মনিয়ােগ করিতে লাগিলেন।
লেনিনেৱ ভ্রাভার প্রাণদণ্ড
১৮৮৬ খৃষ্টাব্দের ২০শে মে যে শােচনীয় কাণ্ড
সংঘঠিত হইল, লেনিন জীবনে তাহা ভুলিতে পারেন
নাই। সেলবার্গ ব্যাষ্টাইল প্রাঙ্গনে, তাহার ভ্রাতা
আলেকজেণ্ডারের ফঁাসী হইল।
তাহার এই ভ্রাতার মন যেমন উদার ছিল, চরিত্রও
তেমনই উন্নত ছিল। তিনি কল্পনা ও সঙ্গীত প্রিয়
ছিলেন। সময়ে তিনি বনপথে বিচরণ করিতেন,
সময়ে বলগা বক্ষে নৌকা বাহিয়া চলিতেন। তিনি
যেমন কর্মঠ ছিলেন, ছাত্রজীবনেও তেমনই কৃতিত্ব
লেনিন ও সােভিয়েট দেখাইয়াছিলেন। চিরদিন তিনি নিজ শ্রেণীতে প্রথম থাকিতেন এবং ব্যায়াম চর্চার জন্য প্রদঃ স্বর্ণ পদক তিনিই লাভ করিতেন। ভগ্নী আনার সহিত তিনি সেন্টপিটার্সবার্গ বিশ্ব- বিদ্যালয়ে ভর্তি হইলেন। তথায় তিনি অসাধারণ পরিশ্রম করিতে লাগিলেন। ক্লাসে বক্তৃতা শুনিতেন, ল্যাবরেটরীতে কাজ করিতেন, কীটের দর্শনেন্দ্রিয় সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখিতেন, সেজন্য তিনি প্রাণিতত্ত্বের পুরস্কারও পাইয়াছিলেন। তিনি সমাজ বিজ্ঞান সম্বন্ধে অসংখ্য পুস্তক পড়িতেন। তিনি একটা দলের কাৰ্যপদ্ধতি নিয়ন্ত্রিত করিলেন, মার্কসের একখানি দর্শনের অনুবাদ করিলেন, সমিতি গঠন করিলেন, ডকের শ্রমিকদের ভিতর আন্দোলন চালাইলেন এবং দরিদ্র ছাত্রদের সাহায্যও করিতেন। তজ্জন্য তাহাকে সময়ে স্বর্ণপদক গচ্ছিত রাখিয়ও অর্থ সংগ্রহ করিতে হইত। তাঁহার বড়ই দুঃখ ছিল যে তিনি প্রত্যহ ১৬ ঘণ্টা মাত্র পরিশ্রম করিতে পারিতেন জারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাহার বিদ্রোহভাব সর্বক্ষণই বাড়িয়া চলিয়াছিল। অত্যাচার দেখিয়া দেখিয়া তিনি ধীরে ধীরে বিপ্লবপন্থী দলে মিলিয়া
লেনিনের ভ্রাতার প্রাণদণ্ড
গেলেন। কবি ডব্রোলিউবভের সমাধিস্থলে সম্মান
প্রদর্শন করিবার জন্য তিনি একটী শােভাযাত্রা গঠন
করিলেন। কিন্তু জারের কসাক সৈন্যবাহিনী সেই
নিরীহ শােভাযাত্রা বিধ্বস্ত করিয়া দিল এবং অসংখ্য
ছাত্রকে বন্দী করিল। এই ব্যাপারের পর হইতেই
আলেকজেণ্ডার “জন সাধারণের ইচ্ছা” (The peoples
will) নামক টেররিষ্ট দলে যােগদান করিলেন।
জারের বিরুদ্ধে তাহারা যে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন,
গুপ্ত পুলিশ তাহা ধরিয়া ফেলিল। সমিতির ১৫ জন
সভ্যের বিচার আরম্ভ হইল।
বিচারকালে আলেকজেণ্ডার কোন উকিল ব্যারি-
ষ্টারেরই সাহায্য লইতে চাহিলেন না এবং তাহার
বিরুদ্ধে যাহা বলা হইয়াছিল, তিনি তাহার কিছুই
অস্বীকার করিলেন না। সহকর্মীদের রক্ষা করাই যে
তাহার একমাত্র ইচ্ছা ছিল, তাহার আচরণে সকলেই
তাহা বেশ বুঝিতে পারিলেন। সরকার পক্ষীয় উকিল
তাহার সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন, “তিনি হয়ত যে সব
অপরাধ করেন নাই, এবং যে সব অপরাধ করিয়াছেন,
তার সবটার জন্যই নিজকে দোষী বলিয়া স্বীকার
করিতেছেন।” প্রকাশ, আগরের অপরাধ নিজের স্কন্ধে
লেনিন ও সােভিয়েট লইয়া তিনি তাহার জনৈক সহ-ষড়যন্ত্রকারীর প্রাণ রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। বিচারালয়ে তাহার নিজের কথা বলিতে যাইয়া তিনি তাহার স্থিরীকৃত বিশ্বাস সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন যে, রুশিয়ার তৎকালীন অবস্থানুযায়ী ভীতি-প্রদর্শনই ( Terrorism ) রাজ- নৈতিক সংগ্রামের একমাত্র সম্ভবযােগ্য উপায়। প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত যে পাঁচ জনের নাম পঠিত হইল, আলেকজেণ্ডার ইলিয়িচ্চ ইউলিয়ানভও তাহাদের ভিতর একজন ছিলেন। যখন তিনি প্রতিনিয়ত ফঁাসীর প্রতীক্ষায় ছিলেন, তখন তঁাহার মাতাকে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিবার অনুমতি দেওয়া হইয়াছিল। প্রথমবার মাতা যখন পুত্রকে দেখিতে আসিলেন, তখন তিনি মাতার পদতলে লুটাইয়া পড়িয়া কঁদিয়া বুক ভাসাইলেন এবং নিজেই মায়ের বুকে দুঃখ দিলেন বলিয়া ক্ষমাভিক্ষা চাহিলেন। তখনও তিনি মাতাকে বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন যে পিতামাতার প্রতি কর্তব্যের অপেক্ষাও মানুষের গুরুতর কৰ্ত্তব্য আছে এবং রুশিয়ার সমগ্র জাতির স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করা সে কর্তব্যেরই একটী। তাঁহার নীতি ভয়ঙ্কর বলিয়া যখন মাতা প্রতিবাদ করিলেন,
লেনিনের ভ্রাতার প্রাণদণ্ড
তখন প্রত্যুত্তরে তিনি বলিয়াছিলেন, “কিন্তু অন্য কিছু
যখন করিবার না থাকে, তখন লােকে করিবে কি?”
মাতা পুত্রকে অনুগ্রহ প্রার্থনা করিয়া প্রাণরক্ষা করিতে
বলিলেন। তিনি সে অনুরােধ প্রত্যাখ্যান করিয়া
বলিলেন যে, তাহা করিলে কপটতাচরণ করা হয়।
তিনি আরও বলিলেন, “আমি একজন মানুষকে
মারিবার চেষ্টা করিয়া ছিলাম, অতএব তাহারা আমাকে
অবশ্যই মারিবে।”
মৃত্যুর পূর্বে তঁাহার অপরিশােধিত দেনার জন্য
তিনি বড়ই উৎকণ্ঠিত হইয়া পড়িয়াছিলেন। একটি
সামান্য কড়ি পর্যন্ত যাহাতে তাহার জীবনাবসানের
পূৰ্বে শোধ হয়, তিনি তাহাই প্রত্যাশা করিয়াছিলেন।
তাহার জনৈক পরিচিত ব্যক্তির নিকট তিনি ৫০ রুবল
ঋণ করিয়াছিলেন। একথা স্মরণ হওয়ায়, তঁাহার
স্বর্ণপদক বিক্রয় করিয়াও যাহাতে সে ঋণ শােধ হয়,
তজ্জন্য মাতাকে বারংবার বলিয়া গেলেন। তাহার
নিকট অন্য বন্ধুদের কয়েকখানি পুস্তক ছিল তাহাও
তাহাদিগকে ফিরাইয়া দিবার জন্য মাতাকে পুনঃ পুনঃ
অনুরােধ করিলেন। মাতাকে সান্ত্বনা করিতে যাইয়া
তাহাকে স্মরণ করাইয়া দিলেন যে তাঁহার আরও
লেনিন ও সােভিয়েট
ঠিক পরের
সন্তান জীবিত
জীবিত রহিল। তাহার
ছােট ভাইবােন দুইটীর কথা বিশেষ করিয়া বলিলেন।
তাহারাও তাহারই মত কৃতিত্বের সহিত সবে মাত্র
স্কুলের পড়া শেষ করিয়াছিলেন। এইরূপ মহান
আদর্শ লইয়াই যুবক আলেকজেণ্ডার সেলবার্গের
ফসীমঞ্চে আত্মত্যাগ করিলেন।
আলেকজেণ্ডার যে ভ্রাতাকে মায়ের সান্তনার জন্য
রাখিয়া গিয়াছিলেন, তিনিই কালে জগতে লেনিন
নামে সুপরিচিত হইয়াছিলে। তখন লেনিনের বয়স
মাত্র সতের বৎসর।
নির্বাসনে লেনিন
লেলিন সিমবা ব্যায়ামাগারে ভর্তি হইলেন।
উহার শিক্ষক কিওডর কেরেলকিই অস্থায়ী রুশ
গভর্ণমেন্টের মন্ত্রণা সভার সভাপতি আলেকজেণ্ডার
69697fac (Alexander Kerensky) foror
ছিলেন। ভ্রমেও কখন সেই শিক্ষক মহাশয় মনে
করিতে পারেন নাই যে, একদিন তাহারই পুত্র
আলেকজেণ্ডার কেরেলকি রুশিয়ার সর্বোচ্চ পদে
প্রতিষ্ঠিত হইবেন। আর ইহাও তাহার স্বপ্নের অগােচর
নির্বাসনে লেনিন ছিল যে, ইউলিয়ানভ পরিবারের এই ধীর-প্রকৃতি, গম্ভীর-স্বভাব, তরুণ যুবকই কালে লেনিন হইবেন, আর সেই দৃঢ়মনা লেনিনই শক্তিশালী হইয়া উঠিয়া তাহার পুত্রের হস্ত হইতে শাসনক্ষমতা কাড়িয়া লইয়া অদম্য তেজে পৃথিবীময় শত্রুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে রুশিয়ার ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত করিবেন। সিমবাস্ক ব্যায়ামাগারের উপাধি লাভ করিয়া লেনিন কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করিলেন। তাহার নাতিদীর্ঘ পাঠ্যজীবন অল্পতেই শেষ হইয়াছিল। সমাজতন্ত্রবাদ প্রচারের জন্য এবং ছাত্রদের বিদ্রোহাত্মক আন্দোলনে যােগদান করিবার অপরাধে, তাহাকে সেস্থান হইতে বিতাড়িত হইতে হইয়াছিল। পরে কিছুদিন তিনি ব্যারিষ্টারী করিলেন কিন্তু একটি মোকদ্দমা মাত্র পরিচালনা করিয়াই তাহার আইন- ব্যবসায়ী জীবন সমাপ্ত হইল। ১৮৯১ খৃষ্টাব্দে তিনি সেই প্রদেশ পরিত্যাগ করিয়া নেভার মহানগরীতে আগমন করিলেন। পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন এবং অর্থনীতি পড়িবার কালেই তিনি মার্ক্সের মতবাদের উপর যে অত্যাশ্চর্য্য প্রবন্ধ রচনা করিয়াছিলেন, তাহা অচিরকাল মধ্যেই সকলের লেনিন ও সােভিয়েট দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। প্লেখানভ রুশীয় সমাজতন্ত্রবাদের প্ৰবৰ্ত্তক, তিনিও তাহার সেই প্রবন্ধ পড়িয়া বলিয়া- ছিলেন, “কালে এই যুবক অতি ভয়ঙ্কর হইয়া উঠিবে।” তাঁহার ভবিষ্যদ্বাণী সফল হইয়াছিল। পনর বৎসর অতীত হইতে না হইতে, এই লেনিনই সেই অভিজ্ঞ বৃদ্ধের হস্ত হইতে সমাজতান্ত্রিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং পঁচিশ বৎসর পরে তাহাকেই আবার বিরাট সােভিয়েট মহাসভা হইতে বিতাড়িত করিয়াছিলেন। রুশীয় সরকার ১৮৯১ খৃষ্টাব্দ হইতেই তাহাকে অতি ভয়ঙ্কর প্রকৃতির লােক বলিয়া মনে করিতেন। বরাবরই তিনি সমাজতন্ত্রীয় মতবাদগুলি প্রাণ ভরিয়া ভাল বাসিতেন এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সকল কৰ্ম্মে নিজকে বিলাইয়া দিয়াই পরম তৃপ্তি লাভ করিতেন। তিনি শিল্পীদের এক স্বাধীনতা সম্মিলনী , (The union for the Liberation of the Arti aan class) সংগঠন করিয়াছিলেন। তাহারা সকলেই তাহাকে দলপতি বলিয়া মান্য করিত। ভ্রাতা আলেকজেণ্ডারের মত তিনি “টেররিষ্ট” ষড়যন্ত্রে প্রথমে যােগদান করেন নাই। তিনি শ্রমিক- নির্বাসনে লেনিন দের মধ্যে রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্বন্ধে বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন। সরকারের দৃষ্টি তাহার উপর পতিত হইল; কারণ, জনসাধারণের ভিতর যিনি এতটুকুও প্রতিষ্ঠা স্থাপন করিতেন, তিনিই সরকারবিরােধী পরম শত্ৰু বলিয়া জারতন্ত্রের নিকট বিবেচিত হইতেন। অবশেষে একদিন গুরুদণ্ড লেনিনের উপরই পতিত হইল। লেনিন বন্দী হইলেন এবং রুশীয় রাজদরবারের বিচারে ১৮৯৭ খৃষ্টাব্দের ২৯শে জানুয়ারী তিনি পূর্ব সাইকেরিয়ায় নির্বাসিত হন। রুশিয়ার যাহারা বীর, রুশিয়ার যাহারা শ্রেষ্ঠ সন্তান, তাহারা সকলেই আজ বন্দী। সেই শত সহস্র বন্দীর সহিত, লেনিনও এশিয়ার বিস্তীর্ণ পতিত প্রদেশের দীর্ঘ সুকঠিন পথ বাহিয়া চলিলেন। তাহার নিকট সাইবেরিয়া শুধু নির্জন, কর্মকোলাহল-শূন্য বরফ- ময় প্রদেশ বলিয়াই মনে হয় নাই। সাইবেরিয়ায় বাস করিয়া তিনি চিন্তা করিবার ও পড়িবার অপূর্ব সুযােগ পাইলেন। সুসেস্কয়ের ক্ষুদ্র পল্লীতে বসিয়া তিনি অবিরাম মস্তিষ্ক পরিচালনা করিতেন ও লিখিতেন। কালে তাহার সেই সব লেখাই “ইলিয়িচ,” “ইলিন,” “টাইলিন” এবং “লেনিন” প্রভৃতি নামধেয় পুস্তকাকারে ২ লেনিন ও সােভিয়েট প্রকাশিত হইয়াছিল। সে সব গ্রন্থ জগতের এক অতুল সম্পদ বলিয়া লােক সমাজে অদৃত। ইউক্কোপে প্রচারকার্যে লেনিন নিৰ্বাসন হইতে মুক্তির পরই লেনিনের উপর আদেশ জারী হইল, তিনি রুশিয়ার কোন মহানগরীতে, কল- কারখানা-কেন্দ্রে অথবা বিশ্ববিদ্যালয়-সহরে থাকিতে পারিবেন না। কাজেই তিনি রুশিয়া হইতে সরিয়া পড়িতে বাধ্য হইলেন এবং পশ্চিম ইউরােপে তাঁহার নূতন কর্মজীবনের পত্তন গাড়িলেন। প্লেখানভ, মারটভ, এক্সেল রড এবং জসুলিচ্চের সাহচর্যে তিনি ‘ইস্ক্রা’ ( Iscra) সংবাদপত্রখানি প্রতিষ্ঠিত করিলেন। অচিরেই তাহা রুশিয়ার নির্বাসিত সমাজতন্ত্রবাদীদের প্রচারকেন্দ্র হইয়া উঠিল। ধীরে ধীরে তাহার চতুর্দিকে উৎসাহী বিপ্লববাদী আসিয়া জুটিল। এই উৎসাহী বিপ্লবপন্থী দলের ভিতরেই লেনিনের সংগঠন ক্ষমতা বিশেষভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছিল। যে সব যুবক স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের উপযুক্ত করিয়া গড়িয়া তুলিবার জন্য অধ্যয়ন করিতে অভিলাষী ছিলেন,তাহারা সকলেই এই কেন্দ্রে সমবেত হইতে লাগিলেন। বিপ্লবপথে
বলশেভিক নেতা লেনিন
রুশিয়াকে রূপান্তরিত করিবার জন্য এই কেন্দ্র হইতেই
যত প্রকার প্রচার কার্য্যের সূত্রপাত হইয়াছিল।
ইউরােপীয় সকল রাষ্ট্রের পুলিশ লেনিনকে নিয়ত
অনুসরণ করিয়া অতিষ্ঠ করিয়া তুলিল। কাজেই তিনি
মিউনিক, ব্রুসেল, প্যারী, লণ্ডনে ঘুরিয়া বেড়াইতে
লাগিলেন। অবশেষে জেনেভাতেই স্থায়ীভাবে অবস্থান
করিতে লাগিলেন। লেনিনপত্নী নেডেজডা ক্রুপস্কায়া
( Nadezhda Krupskaya) সেই দলের কর্মকত্রী
ছিলেন। অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করিয়া তিনি তাহার স্বাস্থ্য
একরূপ নষ্ট করিয়াই ফেলিয়াছিলেন। যত সংবাদ
আসিত, তাঁহাকে সর্বক্ষণই সে সব অদৃশ্য রাসায়নিক
কালি দ্বারা সাঙ্কেতিক চিহ্নতে লিখিয়া রাখিতে হইত।
বলশেভিক নেতা লেনিন
রুশিয় সমাজতান্ত্রিক দল প্রথম গঠিত হয় ১৮৯৮
খৃষ্টাব্দে।
১৯০৩ খৃষ্টাব্দে ব্রুসেলস্ এবং লণ্ডননগরে
মহাসভার দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনেই, সেই দলে মহা
বিবােধ উপস্থিত হয়। লেনিন কতিপয় বিশিষ্ট কৰ্মীর
সমবায়ে কেন্দ্রশক্তিসম্পন্ন দল গঠনেরই পক্ষপাতী
ছিলেন। সেস্থান হইতেই যাবতীয় কৰ্ম্ম ধারা নিয়ন্ত্রিত
লেনিন ও সােভিয়েট
হউক, ইহাই তাহার ইচ্ছা ছিল। দৃঢ়মনা কতিপয় ব্যক্তি
এই বিষয়ে ও অন্যান্য বিষয়ে অতি তীব্রভাবে লেনিনের
প্রতিবাদ করিলেন। মিলন সম্ভব হইল না ; কংগ্রেসও
দুই দলে বিভক্ত হইল। একদল “মেনশিভিকি”
(Menshcviki), মানে ক্ষুদ্রতর দলের সভ্য ; অন্য দল
“বলশেভিকি” (Bolseviki ), মানে বৃহত্তর দলের
সভ্য। এক্ষেত্রে সকলকেই একথা মনে রাখিতে হইবে
যে বর্তমানে রুশিয়ায় “বলশেভিক” বলিয়া কোন দল
নাই। ১৯১৮ সালে সেই দলেরই নাম কম্যুনিষ্ঠুবলিয়া
পরিবর্তিত হইয়াছিল।
লেনিনই বলশেভিকদের নেতৃত্ব গ্রহণ করিলেন।
প্রথমে প্লেখানভ প্রভৃতি বিশিষ্ট প্রাচীনগণ সকলেই
তাহার স্বপক্ষে ছিলেন, কিন্তু কিছুদিন পরেই তাহারা
মেনশেভিক দলে যােগদান করিলেন এবং লেনিনের
তীব্ৰ বিরুদ্ধাচরণ করিতে লাগিলেন। সেই বিদেশে
লেনিন একাকী, তাহার একখানি সংবাদপত্র নাই,
কাজ করিবার কোন কিছু সম্বল নাই; ইহাতেও তিনি
কিছুমাত্র নিরুৎসাহ হইলেন না। তিনি অর্থনৈতিক
পাঠ” (Economics studies ) atat 99stfa
পুস্তক প্রকাশিত করিলেন; তাহা রুশিয়ায় খুবই কাজ
;
বলশেভিক নেতা লেনিন করিয়াছিল। এই পুস্তক হইতে যে অর্থ পাইয়াছিলেন তদ্বারা এবং লুনাচাস্কী, বগডানভ ভরভ স্কীর সাহায্যে তিনি একখানি নূতন সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠা করিলেন, তাহারই নাম “ফরওয়ার্ড” (Forward.) ১৯০৪ খৃষ্টাব্দে রুশিয়ায় আবার বৈপ্লবিক আন্দো- লনের সারা পড়িল। সেই বৎসরের কংগ্রেসেই লেনিন শাসনব্যাপারে শ্রমিকদলের প্রাধান্য, অর্থ-তান্ত্রিকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, বৈপ্লবিক কর্মধারার চরম অবস্থায় উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মুখপাত্র- রূপে রুশীয় বিপ্লবের আয়ােজন ইত্যাদি প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছিলেন। পরবর্তী জীবনে লেনিনকেই সােভিয়েট গভর্ণমেন্টের শীর্ষস্থানে বসিয়া এই সব প্রশ্নের সমাধান করিতে হইয়াছিল। ১৯০৫ খৃষ্টাব্দে যখন রুশীয় বিপ্লবের সূত্রপাত হয়, তখন নিৰ্বাসিতগণ সকলেই সরকারের অনুগ্রহে মুক্তি পাইলেন। লেনিনও সেইবারই স্বদেশে ফিরিলেন। কিন্তু পুনরায় জারশক্তির বিরুদ্ধাচরণের সম্ভাবনা দেখিয়াই তিনি ১৯০৬ খৃষ্টাব্দে ফিনল্যাণ্ডে পলায়ন করিলেন। তথা হইতে ১৯০৮ খৃষ্টাব্দে সুইজারল্যাণ্ডে এবং তথা হইতে ১৯০৭ খৃষ্টাব্দে প্যারী নগরীতে লেনিন ও সােভিয়েট উপস্থিত হন। তখন তিনি “সােসিয়েল ডিমক্রেট” ও “দি প্রােলেটারিয়েট” নামক দুইখানি সংবাদপত্র বাহির করিয়াছিলেন। তারপর তিনি রুশ-সীমান্তের নিকট বৰ্ত্তী ক্ৰেকো সহরে কতিপয় কর্মীর সহিত অবস্থান করিতে লাগিলেন। এস্থান হইতে তিনি বিপ্লবীদের সংশবে থাকিয়া তাহাদের গতিিবধি নিয়ন্ত্রিত করিবার যথেষ্ট সুযােগ পাইয়াছিলেন। প্রহৱচনায় লেনিন এসব প্রচারকার্য ছাড়াও লেনিন অন্যান্য কর্ম- ক্ষেত্রেও মানুষের মতই কাজ করিয়া গিয়াছেন। উইলকক্স তঁাহার সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন, “কার্ল মাক্সের মত তিনিও ব্রিটিশ-মিউজিয়মের রত্নরাজি মন্থন করিয়া যত সুখী হইতেন তত আর কিছুতেই হইতেন না।” তিনি বাস্তবিকই এই প্রতিষ্ঠানটীকে বড়ই সম্মানের চক্ষে দেখিতেন। যখনই তিনি এই বিষয়ে কথা কহিতেন তখনই তাহার নয়ন দুটী উজ্জ্বল হইয়া উঠিত। তিনি ইহার নিকটে থাকেন—ইহাই তঁাহার সুখস্বপ্ন ছিল। আর জীবনে কখনও যদি তিনি বিশ্রাম করিয়া থাকেন, তাহা এই ব্রিটিশ-মিউজিয়মেই করিয়াছিলেন।
গ্রন্থরচনায় লেনিন fofa Sidney e Beatrice Webbgg Industrial Democracy গ্ৰন্থখানির অতি সুন্দর অনুবাদ করিয়াছিলেন। তাহার স্বরচিত গ্রন্থ অসংখ্য। কয়েকখানি বিশেষ গ্রন্থের নাম নিম্নে উল্লেখিত হইল। “Development of Capitalism in Russia," "Economic sketches and Essays,” “What is to be done ? The painful problems of our movem«nt,” “One step forward, Two steps Backward: The Crisis in our party," "Twelve years: Two Trends in Russian Marxism; the Agrarian problem," "Materialism and Empiro-criticism: Critical Remarks to a Reactionary Philosophy," "Imperialism as the last stage of Capitalism", "The State and Revolution". দুঃখের বিষয় আজ পর্যন্ত লেনিনের খুব কম গ্রন্থেরই ইংরাজী অনুবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। নিউ- ইয়র্কের কমুনিষ্ট প্রেস সম্প্রতি তাহার কতিপয় বক্তৃতা 36724 "The proleteriat and Revolution" লেনিন ও সােভিয়েট নামক পুস্তকাকারে প্রকাশিত করিয়াছে। নিউইয়র্কের র্যাণ্ড স্কুলের প্রকাশিত “The Soviet at Work” পুস্তিকাখানি পড়িলে বাস্তবিকই লেনিনের সংগঠন প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। জাৰ্মাণীৱ পথে লেনিনেৱ রুশিয়ায় প্রত্যাবর্তন বিগত মহাযুদ্ধ আরম্ভের সঙ্গে সঙ্গেই লেনিন অষ্ট্রিয়ার কৰ্মীদিগকে বিদ্রোহের জন্য উত্তেজিত করিতে লাগিলেন। ফলে তিনি বন্দী হইলেন। ফরাসী সমাজতান্ত্রিকদের চেষ্টায় শীঘ্রই তাহার বন্ধন মােচন হইল। তখন তিনি সুইজারল্যাণ্ডে প্রত্যাবর্তন করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। জিমারওয়াল্ড কনফারেন্সের সংগঠন ব্যাপারে তিনি বিশেষভাবেই খাটিয়াছিলেন। ১৯১৭ খৃষ্টাব্দের এপ্রিলে জার- তন্ত্রের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি রুশিয়ায় প্রত্যা- বৰ্ত্তন করিতে ইচ্ছা করিলেন। সম্মিলিত মিত্রশক্তি ইহার প্রতিবাদ করিলেন। তখন তাহাকে সুইজার- ল্যাণ্ডের সমাজতান্ত্রিকদলের প্রস্তাবেই সম্মত হইতে হইল। সঙ্-কাউন্সিলার (Federal Councillor)
লেনিন ও রুশীয় যুবক
প্লেটন এবং অন্যান্য সকলে মিলিয়া কর্মধারা নিয়ন্ত্রিত
করিলেন। তখন লেনিনকে সকল দলের মাত্র একশত
বিপ্লবী সঙ্গে লইয়া জাৰ্মাণীর ভিতর দিয়া যাইবার
সম্মতি দেওয়া হইল। এই ঘটনা হইতে অনেকে
হয়ত মনে করিয়াছেন বলশেভিকগণ জাৰ্মাণীরই নিযুক্ত
চর মাত্র। ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হইয়াই লােকে
এরূপ মনে করিত। এইক্ষেত্রে সকলেরই স্মরণ রাখা
উচিত, যে সেই একই ট্রেণে শত শত সমাজতান্ত্রিক
বিপ্লবী এবং মেনশেভিকগণও গিয়াছিলেন। তাহাদের
ভিতর লেনিন এবং বলশেভিকদের পরমশত্রু খ্যাতনামা
এক্সেল রড, এবং মারটভও উপস্থিত ছিলেন। লেনিন
পেট্রোগ্রেডে উপস্থিত হইলে জনসাধারণ, সেনাদল এবং
নৌ-সেনাবাহিনী তাহাকে অতি সমাদরে গ্রহণ
করিল।
সেদিন হইতে লেনিনের জীবনকথা রুশিয়
বিপ্লবের সহিত অতি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হইয়া
আসিয়াছে।
লেনিন ও রুশীয় যুবক
এবার লেনিনের শিষ্য পাঁচজন রুশীয় যুবকের
সম্বন্ধে কিছু বলা হইবে। তাহাদের চিন্তার ধারা,
লেনিন ও সােভিয়েট
কৰ্ম্মকুশলতা ও সংগঠননৈপুণ্য দেখিয়া লেনিনের
সম্বন্ধে উচ্চধারণা হওয়া লােকের স্বাভাবিক। তাহাদের
পাঁচজনই সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হইয়াছিলেন এবং
১৯১৭ খৃষ্টাব্দে অন্যান্য নির্বাসন-প্রত্যাগতদের সহিত
পেট্রোগ্রেডে ফিরিয়া আসেন।
পেট্রোগ্রেডস্থ কতিপয় আমেরিকান একদা তাঁহাদের
সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইয়া তাহাদের বিদ্যাবুদ্ধি,
কর্মশক্তি ও ইংরাজীভাষা জ্ঞান দেখিয়া মুগ্ধ হইলেন।
তঁাহারা নিজেদের বলশেভিক বলিয়া পরিচয় প্রদান
করিলেন। লােকে বলশেভিকদের সম্বন্ধে যেরূপ একটা
অদ্ভুত কল্পনা করিতেন, তাহাদিগকে দেখিয়া কিন্তু
আমেরিকানদের সে ধারণা একেবারেই দূরীভূত হইল।
তাহারা দেখিলেন, যুবকগণ সকলেই পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন,
বিনয়ী, রসিক, অমায়িক এবং তদুপরি খুবই সতর্ক।
কোনপ্রকার দায়ীত্ব গ্রহণ করিতেই তাহারা কুষ্ঠিত
হইতেন না, এমন কি প্রয়ােজন হইলে তাহারা সহাস্যে
মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিতে পারিতেন। কৰ্ম্মে কখনও
তাহাদের বিরক্তি আসিত না, তাই ত এই সব
কৰ্ম্মবীর তরুণ রুশিয়ার মুখ উজ্জ্বল করিয়াছিলেন।
তাঁহারাই ছিলেন বলশেভিক।
লেনিন ও রুশীয় যুবক
: ওয়াচকভ নিউইয়র্ক হইতে আসিয়াছিলেন। তথায়
তিনি সূত্রধরদের এক সম্মিলনী সংগঠন করিয়াছিলেন।
ওয়েনিসেভ ছিলেন গ্রাম্য পুরােহিতের সন্তান। তিনি
কলকজার কাজ করিতেন। পৃথিবীময় ঘুড়িয়া ঘুড়িয়া কত
কারখানায়, কত খনিতেই না তিনি কাজ করিয়াছিলেন।
নিবাট ছিলেন মিস্ত্রী। অথচ সর্বক্ষণ একগাদা পুস্তক
লইয়াই তিনি ব্যস্ত থাকিতেন এবং মন্ত্রের সাধনই
তাহার একমাত্র ব্রত ছিল।- ভােলােডারস্কি ঘড়ির
কাটার মঙ দিবারাত্রি অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করিতেন।
নিহত হইবার কয়েকদিন পূর্বে, একদিন তিনি বলিয়া-
ছিলেন, “মনে করুণ, তাহারা আমাকে ধরিলই বা।
তাহাতে আর কি হইবে ! পাঁচজন লােক আজীবন
কৰ্ম্ম করিয়া যে আনন্দ না পাইয়াছেন, বিগত ছয়মাস
অক্লান্ত পরিশ্রম করিয়া আমি তদপেক্ষা অধিক আনন্দ
লাভ করিয়াছি।” আর পিটার—তিনি ছিলেন একজন
ফোরম্যান। কিছুদিন পরে প্রতি সংবাদপত্ৰস্তম্ভে
প্রকাশিত হইতে লাগিল, পিটার ভয়ঙ্কর প্রকৃতির
লােক; তাহার বিরুদ্ধে মৃত্যু-পরােয়ানা জারী হইয়াছে।
যাহাতে ভবিষ্যতে তিনি আর কলম ধরিতে না পারেন,
তার জন্যই এ ব্যবস্থা। তখনও দেখা যাইত, সময়ে
.
২৭
লেনিন ও সােভিয়েট
••
পিটার তার বিলাতী গােলাপের বাগান আর নেকরা-
সভের কবিতার জন্য দুঃখ করিতেন।
লেনিনের উপর এই সব যুবকের এতই বিশ্বাস ছিল
যে তঁাহারা মনে করিতেন, লেনিন তঁাহার মস্তিষ্ক ও
চরিত্রবলে শুধু যে বলশেভিকদেরই পরিচালিত
করিতেছেন এমন নহে, রুশিয়া, ইউরােপ এবং জগতের
জনগণ সকলেই তাহাদ্বারা পরিচালিত হইবে।
কেরেলকি গভর্ণমেন্ট তখনও লেনিনকে দস্যুর
পৰ্য্যায়ে ফেলিতে কিছুমাত্র সঙ্কোচ বােধ করিতেন না;
বরং তাহাকে গ্রেপ্তার করিবার জন্য সর্বক্ষণ চর নিযুক্ত
করিয়া রাখিয়াছিলেন। সরকারী কাগজগুলি কোনদিন
লেনিনকে জাৰ্মাণদের নিযুক্ত চর বলিয়া গালি দিত,
কোনদিন তাহাকে বিশ্বাসঘাতক দেশদ্রোহী বলিতেও
কুষ্ঠিত হইত না। রুশীয়-জনসাধারণ কিন্তু নিকলাই
লেলিনকেই রুশিয়ার একমাত্র চিন্তাশীল, বুদ্ধিমান
পরিচালক বলিয়া গণ্য করিতে লাগিলেন।
আমেরিকানগণ রুশিয়ার সেই অদ্ভুত শক্তিসম্পন্ন
জননায়ক লেনিনকে দেখিবার জন্য ঔৎসুক্য প্রকাশ
করিলে, লেনিনের তরুণ শিষ্যগণ বলিয়াছিলেন,“কিছুদিন
অপেক্ষা করুণ, অবশ্যই তাহাকে দেখিতে পাইবেন।”
গণতন্ত্রসভায় লেনিন ১৯১৭ খৃষ্টাব্দের গ্রীষ্মবসানের সঙ্গে সঙ্গে কেরেলকি গভর্ণমেন্ট দুৰ্বলতর হইতে লাগিল। তারপর ৭ই নভেম্বর বলশেভিকগণ ঘােষণা করিলেন যে রুশিয়ায় কেরেলকি গভর্ণমেন্ট আর নাই এবং তৎপরিবর্তে লেনিনের মন্ত্রিত্বে (Premier) সােভিয়েট গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইল। গণতন্ত্রসভায় লেনিন বিপ্লব-বিজয়ােল্লাসে কৃষক ও সৈন্যগণ পেট্রোগ্রেডের রাজপথ স্বাধীনতার গানে সজীব করিয়া তুলিল। সেই উন্মত্ত জনবাহিনী দলে দলে সম্মিলনীর বিস্তীর্ণ সভা-প্রাঙ্গনে সমবেত হইতে লাগিল। পূৰ্ব্ব শাসন- ধারার ধ্বংস ও নূতনের প্রবর্তণ-বার্তা ঘােষণা করিয়া যখন ভীষণ কামান গর্জিয়া উঠিল, তখন লেনিন সভাস্থলে ধীর পাদবিক্ষেপে প্রবেশ করিলেন। অমনি সভাপতি উঠিয়া বলিলেন, “কমরেড লেনিনই অদ্যকার মহাসভায় বক্তৃতা করিবেন।” কি উল্লাস, কি আনন্দধ্বনি, কি করতালি, কি চীৎকার! তাহার ভিতর লেনিন বক্তমঞ্চে পদার্পণ করিলেন। শত শত সােৎসুক নয়ন সেই বিজয়ী- ১৯ •
লেনিন ও সােভিয়েট
বীরের দর্শনলাভেচ্ছায় উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। লেনিন
ক্ষণকাল দাড়াইয়া রহিলেন, সকলে তাহাকে নয়ন
ভরিয়া দেখিয়া লইল।
ধীরে হর্ষধ্বনি থামিয়া গেল। চতুর্দিক নিস্তব্ধ
হইল। সভার কাৰ্য্য আরম্ভ হইলে তিনি বলিলেন,
“সহকর্মিগণ, এখন আমরা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সংগঠন
করিব।” ইহার পর তিনি অতি স্বাভাবিকভাবে ঠিক
ঠিক যাহা করিতে হইবে সেই সব কথারই আলােচনা
করিলেন মাত্র। তঁাহার কথায় উত্তেজনা-ছিল না,
ভাষায় জটিলতা ছিল না, এদিক ওদিক ঘুরিয়া ফিরিয়া
তিনি এক ঘণ্টা কাল শুধু কাজের কথাই বলিলেন।
তাহার কথায় বক্তৃতা মাধুৰ্য্য মােটেই ছিল না, তাই
তাহ। সভায় উপস্থিত বিদেশীয়দের নিকট বিশেষ
প্রীতিকর বােধ হইল না। তাহারা বুঝিতে পারিলেন
যে যে সব অক্লান্ত কৰ্ম্মী যুবকদের দেখিয়া তাহারা
মুগ্ধ হইয়াছিলেন, তাঁহারা কিরূপে এই লােকটীর দ্বারা
মন্ত্রচালিত হইয়া কাজ করিয়েছিলেন। যুবকগণ কিন্তু
সকলেই একবাক্যে বলিতেন যে নিকোলাই লেনিনই
ইউরােপের শ্রেষ্ঠ মানব, শ্রেষ্ঠ রাজনীতিজ্ঞ।
রাষ্ট্র ব্যাপারে লেনিন ক্লষ্ট ব্যাপারে কঠোর শৃঙ্খলার প্রবণ সােভিয়েট গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই লেনিন শাসন সংক্রান্ত যাবতীয় বিভাগে কঠোর শৃঙ্খলার প্রবর্তণ করিলেন। সদ্য স্বাধীনতা পাইয়া শ্রমিক-কৃষকগণ আনন্দে আত্মহারা হইয়া উঠিয়াছিল। তাহারা নিজ নিজ কর্তব্যকর্মে শিথিলতা প্রদর্শন করিতে লাগিল। ইহা নূতন প্রবর্তিত সােভিয়েট শাসনতন্ত্রের স্থায়ীত্ব ও বিকাশের পক্ষে প্রতিকূল বিবেচনা করিয়াই লেনিন তাহার সুশৃঙ্খলার দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিলেন। রুশিয়া- ময় ভীষণ দুর্ভিক্ষ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ, তদুপরি বিপ্লবের প্রতিঘাত-সকল অন্তরায়ই একসঙ্গে আসিয়া জুটিল। বিপ্লব স্থায়ী হয় কি না হয়, এরূপ অবস্থা। তাই তিনি বিপ্লব সফল করিয়া তুলিবার জন্য একমাত্র কঠোর নীতি অবলম্বন করাই শ্রেয় মনে করিলেন। বল- শেভিকদের রুদ্রনীতি পূর্ণ উদ্যমে চলিতে লাগিল। তাহাতে এমন হইল যে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় প্রত্যই মনে মনে লেনিনের মুণ্ডপাত না করিয়া জল গ্রহণ করিত না। তাহারা তাহাকে অত্যাচারী, রক্তপিপাসু, আর কত কি আখ্যা দিতেও ছাড়িত না। লেনিন "Our ends will justify our means," stata লেনিন ও সােভিয়েট উদ্দেশ্যই আমাদের উপায়ের দোষ খণ্ডন করিবে এই বিশ্বাস নিয়া রুশিয়াময় এমন শিক্ষাই দিলেন যাহাতে ভবিষ্যতে আর কোন দিন পরপীড়ক ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও অর্থতান্ত্রিক দল অন্যের বিরুদ্ধে দাড়াইবার সাহস করে নাই। অভিজাত সম্প্রদায়ের গাত্রদাহ উপস্থিত হইল। তাহারা লেনিনকে কত অভিসম্পাত করিত, কত গালি দিত তাহার সীমা নাই। কেহ বলিত, ভূতপূৰ্ব্ব জার দ্বিতীয় নিকলাস ‘নব্য জার’ লেনিনকেই সিংহাসন ছাড়িয়া দিয়াছেন। আবার কেহ বা ব্যঙ্গোক্তি করিত, “আমাদের নব্য জার তৃতীয় নিকলাস দীর্ঘজীবি হউন !” এদিকে রুশিয়ার নানা অঞ্চল হইতে কৃষক- প্রতিনিধিগণ নব্যসসাভিয়েট শাসন প্রতিষ্ঠা উৎসবের প্রীতিভােজে স্মনী হলে সমবেত হইলেন। বুদ্ধি- জীবিগণও উপস্থিত হইলেন। তাহারা পল্লী সম্বন্ধে নানা কথা বলিলেন। তখন কথা উঠিল, পল্লীবাসী- রাই পল্লীর কথা বলিবেন। তখন একজন বৃদ্ধ বক্তৃতা- মঞ্চে উঠিলেন। তাহার পরণে গ্রাম্য কৃষকের পােষাক। সরলমতি সে বৃদ্ধ তখন গ্রাম্যভাষায় বলিতে লাগিলেন, রাষ্ট্র ব্যাপারে লেনিন “মহাশয়গণ, আজ নিশান উড়াইয়া গান গাহিয়া আমরা এখানে আসিয়াছি। এই রাত্রিতে কি-ই না আমার আনন্দ। আমার পদদ্বয় মৃত্তিকা স্পর্শ করে নাই। আমি যেন বায়ুভরে উড়িয়া আসিয়াছি। আমি একজন অতি অজ্ঞ লােক, আমি বাস করি এক আধার পল্লীতে। আপনারাই আমাদিগকে আলাে দিয়াছেন। আমরা সে আলোর সবখানি অনুভব করিতে পারি নাই। তাই তাহারা আমাকে বিষয়টা সম্যগ অবগত হওয়ার জন্য পাঠাইয়াছেন। এই আশ্চৰ্য্য পরিবর্তনে বাস্তবিকই আমরা খুব খুসী হই- য়াছি। পূৰ্বে চিনভনিকির। ( The Chinovniki ) আমাদের প্রতি বড়ই নিষ্ঠুর আচরণ করিত, আম- দিগকে প্রহার করিত। কিন্তু আজ তাহারা কতই ভদ্র হইয়াছেন। পূৰ্বে আমরা রাজপ্রাসাদের বহির্দেশই দেখিতে পাইতাম, আর আজ আমরা প্রাসাদের ভিতরেও বিচরণ করিতে পারি। পূর্বে আমরা কেবল জারের বিষয়ে কথাই বলিতে পারিতাম, আর আজ যদি আপনারা বলেন, তবে কালই আমি আমাদের জার লেনিনের সহিত হস্তমর্দন করিয়া আসিতে পারি।”
লেনিন ও সােভিয়েট শ্রোতাগণ হাসিয়া ফেলিলেন, হাসি ও আনন্দ- ধ্বনিতে হতভম্ব হইয়া বৃদ্ধ বসিয়া পড়িলেন। পরদিন সকালে তাহাকে লেনিনের নিকট উপস্থিত করা হইল। এই বৃদ্ধই কালে ব্রেষ্টলীটভস্কের সন্ধিসভায় কৃষক-প্রতিনিধিরূপে উপস্থিত ছিলেন। ধীর বুদ্ধি লেনিন কঠোর শৃঙ্খলার প্রবর্তন করিলেন সত্য, কিন্তু সকল বিষয়ে এক সঙ্গে হস্তক্ষেপ করিলেন । তাই তাহাকে কোন কোন বিষয়ে ধীর নীতিও অবলম্বন করিতে হইয়াছিল। একদিন কলের শ্রমিকদের একদল প্রতিনিধি লেনিনের নিকট উপস্থিত ইয়া জানিতে চাহিলেন যে তিনি কল কারখানা জাতীয় সম্পত্তি বলিয়া ঘােষণা করিতে রাজী আছেন কি না। লেনিন একখণ্ড সাদা কাগজ লইয়া তখনই বলিলেন, “হাঁ, আমার পক্ষে ইহা খুবই সহজ কাজ। কাগজের এই অপূর্ণ স্থানে প্রথমতঃ আমাকে আপনাদের ফাক্টরীর নাম লিখিতে হইবে, পরে এইস্থানে আমার নামের স্বাক্ষর দিব, এবং এখানে দলপতিদের নাম থাকিবে।” শ্রমিকগণ এই সম্মতিতে খুবই প্রীত হইলেন। লেনিন আবার বলিলেন, “কিন্তু এখানে রাষ্ট্র ব্যাপারে লেনিন সহি করিবার পূর্বে আমি আপনাদিগকে কতিপয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিব। প্রথমতঃ আপনারা কি জানেন, কোথা হইতে আপনাদের কারখানার মালমশলা আসে ?” তাহারা সকলেই অনিচ্ছার সহিত স্বীকার করিলেন যে তাহারা জানেন না। “আপনারা কি হিসাবে রাখিতে জানেন ? আপ- নারা কি কাৰখানা-জাত দ্রব্য মজুত রাখিবার কোন উপায় উদ্ভাবন করিয়াছেন?” লেনিনের এই সব প্রশ্নের উত্তরে শ্রমিকগণ বলিলেন যে তাহারা এই সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে বিশেষ কিছুই অবগত নন। লেনিন আরও বলিলেন, “অবশেষে আপনাদিগকে কি জিজ্ঞাসা করিতে পাবি, কোন্ বাজারে আপনাদের উৎপন্ন দ্রব্য বিক্রয় করিবেন বলিয়া ঠিক করিয়াছেন?” এবার তাহারা এমন কি উত্তরও করিলেন না। তখন লেনিন বলিতে লাগিলেন, “বন্ধুগণ, আপনারা কি ভাবিয়া দেখেন না যে এখনও আপনারা কারখানা নিজেদের হস্তে তুলিয়া নিতে প্রস্তুত হন নাই? এখন গৃহে ফিরিয়া যান এবং এই বিষয় সম্বন্ধে সম্যগ অবগত হউন। প্রথমতঃ এইগুলি কঠিন ঠেকিবে, হয়ত অনেক sং
•
লেনিন ও সােভিয়েট
ভুলচুকও হইবে; কিন্তু এইভাবেই শিখিতে হইবে।
কয়েকমাস পরে আবার আসিবেন, তখন আমরা
সকল কারখানাই জাতীয় সম্পত্তি বলিয়া গ্রহণ
করিব।”
গঠন-নীতির দিক দিয়া, লেনিন এরূপ সতর্ক,
সুচিন্তিত, ধীর পন্থাই অবলম্বন করিতেন।
লেনিনের ব্যক্তিগত জীবনে
কটোৱ সংঘম
লেনিন সমাজ ও শাসন ব্যাপারে যেমন কঠোর
নীতির প্রবর্তন করিয়াছিলেন, তদ্রুপ তাহার ব্যক্তিগত
জীবনও কঠোর সংযমের আবর্তে ঘেরিয়া রাখিয়া-
ছিলেন। Shchi ও Boirashch নামক রুশীয় খাদ্য,
কাল রুটীর টুকরা, চা আর পরিজ্জ ইহাই স্মলনীর
অগণিত লােকের প্রধান খাদ্য ছিল। লেনিনের
নিজের, তাহার স্ত্রী ও ভগ্নীরও ঐ একই খাদ্যের ব্যবস্থা
ছিল। বিপ্লবীদের প্রত্যেককেই রােজ বার হইতে
পর ঘণ্টা পর্যন্ত নির্ধারিত কার্য সম্পাদনের জন্য
খাটিতে হইত। আর লেনিন খাটিতেন বােজ আঠার
কি বিশ ঘণ্টা করিয়া। প্রত্যহ তিনি স্বহস্তে শত শত
লেনিনের কঠোর সংযম
চিঠি লিখিতেন। কাজে তিনি এতই তন্ময় হইয়া
যাইতেন যে অন্য সব কিছুই ভুলিয়া যাইতেন, এমন কি
খাওয়ার কথাও মনে থাকিত না। লেনিনকে যখন
অপরের সহিত আলাপ করিতে দেখিতেন, তখনই
তাহার স্ত্রী এক পেয়ালা চা-হস্তে উপস্থিত হইয়া
বলিতেন, “এই নাও, তুমি চা পান করিতে ভুলিয়া
যাইও না।” অনেক সময়েই তিনি চিনিশূন্য চা পান
করিতেন। কারণ, তখন রুশিয়ার আর্থিক অবস্থা
এতই শোচনীয় ছিল যে সকল দিন সর্বসাধারণের
চায়ে চিনি জুটিত না, তাই তিনিও সেই সব দিন বিনা
চিনিতেই চা পান করিতেন। আহাৰ্য্য
সৰ্বসাধারণের যাহা জুটিত, তিনি ও তাহার স্ত্রী তাহাই
গ্রহণ করিতেন মাত্র। সেনানিবাসের মত অতি প্রশস্ত,
অনাবৃত প্রকোষ্ঠসমূহে লােহার খাটিয়ায় সৈন্য ও
দূতগণ নিদ্রা যাইত, লেনিন এবং তাঁহার স্ত্রীও সেই
ভাবেই পরম তৃপ্তিতে ঘুমাইতেন। তাহারা তাহাদের
কৰ্ম্মক্লান্ত দেহ অধিকাংশ সময়েই পরিচ্ছদ মুক্ত না
করিয়া খাটিয়ার উপর এলাইয়া দিতেন ; কোন বিশেষ
জরুরী কার্য্যের ডাক পড়িলে অমনি উঠিবার জন্য
তাহারা নিয়ত সতর্ক থাকিতেন। কোন সন্ন্যাসীসুলভ
সম্বন্ধেও
৩৭
লেনিন ও সােভিয়েট
ভাবের বশবর্তী হইয়াই লেনিন এই সব কঠোরতা
বরণ করিয়া লন নাই। এতদ্বারা তিনি কমুনিজিমের
প্রথম নীতিটী কাৰ্যে প্রতিফলিত করিতেছিলেন
মাত্র।
কোন কমুনিষ্ট সভ্যই কোন শ্রমিকের অপেক্ষা
অধিক বেতন পাইতেন না—ইহাও তাহাদের নীতিরই
অন্তর্ভুক্ত ছিল। মাসিক ৬০০ রুবলই বেতনের সর্বোচ্চ
হার নির্ধারিত হইয়াছিল। তবে আজকাল হয়ত
সে হার সামান্য বর্ধিত হইয়া থাকিবে। শিয়ার
প্রধানমন্ত্রীও মাসিক ২০০ ডলারের কমই পারিশ্রমিক
পাইতেন।
তৎকালে রুশিয়ায় এতই খাদ্যাভাব হইয়াছিল যে
সকলে যাহাতে সমভাগে আহাৰ্য পায় তাহার ব্যবস্থা
করিতে হইয়াছিল। সময়ে একখানি পূর্ণ ডিস্ দুই জনকে
ভাগ করিয়া দেওয়া হইত। একজন হয় ঝােল মাংস,
আর না হয় বােল কাসা (Kosha) পাইতেন। কি
প্রধান সেনাপতি, কি পাকশালার ভৃত্য সকলের জন্য
একই ব্যবস্থা ছিল। কমুনিষ্টদের কথাই ছিল,
( No one shall have cake, until everybody
has bread) যতদিন না সকলের রুটী জুটে, ততদিন
লেনিনের কঠোর সংযম
কেহই কে পাইবেন না।
একদিন সকলের
উপযােগী আহাৰ্য্য ছিল না। সেদিন অন্যে যতটা
পাইয়াছিলেন, লেনিনও ততটাই গ্রহণ করিয়াছিলেন।
কাহারও রুট জুটে নাই, এমন দিনও তাহাদের
গিয়াছে। সেইদিন লেনিনেরও রুটী জুটিত না।
বহুবার তাহার জীবন লইবার প্রচেষ্টা হইয়াছিল।
একবার তিনি ভীষণভাবে আহত হইয়া শয্যাশায়ী
হইয়াছিলেন। চিকিৎসক তাহার জন্য কিছু পুষ্টিকর
খাদ্যের ব্যবস্থা করিলেন। লেনিন কিন্তু সৰ্বসাধারণের
জন্য নির্ধারিত খাদ্য তালিকার অতিরিক্ত কিছুই গ্রহণ
করিলেন না; ইহাই ছিল লেনিন চরিত্রের বিশেষত্ব ।
ইউরােপ ও আমেরিকার কর্মীদের নিকট এক
পত্রে তিনি লিখিয়াছিলেন, “ইংরাজ-মিত্র-শক্তিদের
সামরিক বাধার জন্য আজ রুশীয় জনসাধারণকে যে
নিদারুণ দুঃখ ও ক্ষুধার জ্বালা ভােগ করিতে হইতেছে,
তাহারা আর কখনও এরূপ ভােগ করেন নাই।”
লেনিনকেও জনসাধারণের সহিত সেই একই দুঃখ কষ্ট
সহ করিতে হইত।
কম্যুনিজিম সম্ভব কিন' পরীক্ষা করিয়া দেখিবার
জন্য তিনি একটা জাতর জীবন লইয়া খেলা
;
লেনিন ও সােভিয়েট করিতেছেন বলিয়া অনেকে তাহার নিন্দাবাদ করিত। তিনি কিন্তু তাহার কমুনিষ্টিক ভাব কেবল রুশিয়ার উপরই প্রয়ােগ করেন নাই, নিজের উপর প্রয়ােগ করিয়াই সে সব প্রত্যক্ষ করিয়া দেখিয়াছিলেন। লেনিনের পরম শত্রুও স্বীকার করিতেন যে তাঁহার ভিতর কিছুমাত্র স্বার্থপরতা ছিল না। লেনিন এমন করিয়াই তাহার জীবনখানি গড়িয়া তুলিয়াছিলেন। কমুনিজিমই সােভিয়েট ভন্ত্রের প্রবর্তক মূলধনীদের পরিচালিত সংবাদপত্র সমূহে লেনিনের সম্বন্ধে অনেক বিরুদ্ধ কথাই প্রকাশিত হইত। কিন্তু যতই লেনিন ও তঁাহার সহকৰ্মীদের সম্বন্ধে প্রকৃত তথ্য প্রকাশিত হইতে লাগিল, ততই রুশীয় জন- সাধারণ তাহাদিগের দিকে ঝুকিয়া পড়িল। একবার উরল পর্বতের খনির লােকেরা আহার্যের অল্পতার জন্য কিন্তু উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু তাহারা যখন দেখিল যে রুশিয়ার ছােট বড় সকলের জন্য একই ব্যবস্থা, তখন তাহাদের অসন্তুষ্টির আর কোনই কারণ রহিল না। সত্য বলিতে কি, সােভিয়েট শাসনে রুশীয়দিগকে ক্ষুধার পীড়ন সহ্য করিতে
কম্যুনিজিমই সােভিয়েট
হইয়াছে সত্য, কিন্তু অবিচার-পীড়ন সহ্য করিতে হয়
নাই।
তুহিণ-পাতে জড়সড়, বগা অঞ্চলের কৃষকরমণী
লেনিনের সম্বন্ধে হয়ত খুব কমই জানিতেন, তবে তিনি
এতটুকু শুনিতেন যে, তিনি ও তাহাদেরই মত অগ্নিহীন
গৃহেই রাত্রি যাপন করিয়া থাকেন। সােভিয়েট শাসনে
রুশীয়দিগকে শীত সহ্য করিতে হইয়াছে সত্য, কিন্তু
তাহাদিগকে অসমান জীবন যাপনের দুঃখ ভােগ করিতে
হয় নাই।
নিজহনীর ইঞ্জিনিয়রের পরিবার প্রতিপালন পক্ষে
৬০০ রুবল যথেষ্ট ছিল না; তিনি মনে মনে খুবই
অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। কিন্তু যখন তিনি মনে করিলেন
যে ক্রেমলিন প্রাসাদে বসিয়া লেনিনও ইহার অধিক
কিছু পান না, তখনই তাহার সকল ক্ষোভ দূরীভূত
হইল।
যদি ও লেনিন পশ্চাদ্দেশ হইতেই সৈন্য পরিচালনা
করিতেন, তবু ও সােভিয়েট সৈন্যদল সম্মিলীত শক্তির
উন্মুক্ত কামানের সম্মুখে যুদ্ধ করিতে করিতে মনে
করিত যে, লেনিন তাহাদের সম্মুখেই রহিয়াছেন।
তাহারা জানিত যে, সকল দ্রব্যের মত বিপদও
লেনিন ও সােভিয়েট
রুশিয়ায় সকলকে সমভাবেই বরণ করিয়া লইতে
হইত। ইহাতে কাহাকেও বাদ পড়িলে চলিত না।
যুদ্ধে যেই হারে সােভিয়েট সৈন্য মরিয়াছিল, সেই
হারে সােভিয়েট নেতারাও মরিয়াছিলেন। ইউরিটস্কি,
ভলার্ডস্কি প্রভৃতি বহু জননায়ক যুদ্ধে নিহত হইয়া-
ছিলেন ; লেনিন ও দুই দুই বার ঘাতকের গুলিতে
বিদ্ধ হইয়া মরিতে মরিতে বাঁচিয়া গিয়াছিলেন।
সােভিয়েটের লাল পল্টন বাহিনী জানিত যে লেনিন
যুদ্ধ বিগ্রহের বিপদ দুঃখ তাহাদিগের সহিত সমভাবেই
বরণ করিয়া লইতেছিলেন।
রুশীয়গণ লেনিনকে খুবই ভক্তি করিত। কাল
মাক্সের ছবির পাশ্বে ই আজ রুশিয়ার ঘরে ঘরে
লেনিনের ছবি শােভা পায়। তার যথেষ্ট কারণ আছে।
লেনিন বিদেশী দর্শন-প্রত্যাশীদিগকেও বসাইয়া
রাখিয়া, প্রথমে কৃষকদের সহিতই সাক্ষাৎ করিতেন।
তিনি যেমনই প্রাণ ভরিয়া কৃষকদের ভালবাসিতেন,
তাহারাও তাহাকে তেমনই বাসিত।
একদিন একে একে দুই দল কৃষক-প্রতিনিধি
ক্রেমলিন প্রাসাদে উপস্থিত হইলেন। একদল সঙ্গে
আনিয়াছিলেন, গ্রাম্য কৃষকদের উপহার, মণ কয়েক
ર
সােভিয়েটের প্রবর্তন আটা। আর এক দলের সঙ্গে ছিল, একটি ষ্টোভ, আর তিন মাসের উপযােগী জালানী কাষ্ঠ। তাহারা লােকমুখে শুনিয়াছিলেন, লেনিন ক্ষুধার্ত, তাহার শয়ন কক্ষ অনুত্তপ্ত। সেই কৃষকদের দান লেনিন পরম আদরে গ্রহণ করিলেন এবং সে সব সাধারণ ভাণ্ডারে পাঠাইয়া দিলেন। এই সম-সুখ, সম-দুঃখ ভাবই রুশিয়ার প্রধান মন্ত্রী ও দরিদ্রতম কৃষকের ভিতর এক প্রীতি ও সহানুভূতির বন্ধন সৃষ্টি করিয়াছিল। আর তাহাই রুশীয় জন- সাধারণকে দিন দিন সােভিয়েট জননায়কদের পক্ষপাতী করিয়া তুলিল। সােভিয়েটের প্রবর্তন ও জনসাধারণের মনােভাব লেনিন নিজ দেশবাসীর ক্ষুধা-তৃষ্ণা, শীত-কষ্ট সহ্য করিয়াছিলেন বলিয়া, তাহাদের মনােভাবই অনুভব করিতেন, তাহাদের চিন্তাই চিন্তা করিতেন এবং তাহাদের প্রাণের ইচ্ছাই ব্যক্ত করিতেন। কমুনিষ্টদের কর্মধারা কি ভাবে সোভিয়েটের ভিত্তি স্থাপন করিল, কমুনিষ্টদের নিলেন কথায়ই তাহা স্পষ্ট ব্যক্ত হইয়াছে। তাহারা বলেন, লেনিন ও সােভিয়েট “আমরাই সােভিয়েটদের সৃষ্টি করি নাই। জন- সাধারণের প্রাণের স্পন্দন হইতেই তাহাদের উৎপত্তি। আমরা আমাদের নিজ মস্তিষ্ক হইতে কোন কর্মধারার প্রবর্তন করি নাই, বা তাহা জনসাধারণের উপর চাপাইয়া দিই নাই। বরং জনসাধারণের নিকট হইতেই আমরা আমাদের কর্মধারা গ্রহণ করিয়াছিলাম। তাহারাই “জমি কৃষকদের,” “কারখানা শ্রমিকদের,” এবং “শান্তি সমগ্র জগতের” (“Land to the Peasants," "Tactories to the workers” and “Peace to all the world” ) জন্য দাবী করিয়া- ছিলেন। এই সব সমর-ধ্বনি আমরা প্রতি নিশানে অঙ্কিত করিয়াছিলাম এবং ইহাই আমাদের শক্তি- শালী করিয়া তুলিয়াছিল। আমরা যে জনসাধারণকে বুঝিয়াছিলাম, তাহাই আমাদের সকল শক্তির আধার। বস্তুতঃ জনসাধারণকে বুঝান আমাদের আবশ্যক হয় , কারণ আমরা নিজেরাই জনসাধারণ।” এখন কথা আসে, লেনিনের মত বুদ্ধিজীবিগণ কি প্রকারে জনসাধারণের হইয়া বলেন এবং তাহাদের প্রাণের ব্যথা বুঝেন। প্রথমতঃ ইহা অসম্ভব বলিয়া মনে হইতে পারে, কিন্তু ইহা তেমন অস্বাভাবিক
বক্তৃতামঞ্চে লেনিন
কিছু নহে। টলষ্টয় যেমন আদর্শকে জীবনে প্রতিফলিত
করিয়া দেখাইয়াছিলেন, লেনিনও তেমনই নিজ
জীবনে জনসাধারণের দুঃখকষ্ট বরণ করিয়া লইয়াই
তাহাদের হইয়া ভাবিতে শিখিয়াছিলেন এবং ভাবিতে
পারিতেনও। কম্যুনিজিমের কাৰ্য্যে পরিণতিই যে
শ্রমিক রাজনীতিজ্ঞদের একমাত্র পথ তাহা তিনি
তঁাহার “State and Revolution” গ্রন্থে অতি
স্পষ্টভাবে লিখিয়া গিয়াছেন।
বক্তভামঞ্চে লেনিন
দিন নাই, রাত্রি নাই লেনিনের অবিশ্রান্ত পরিশ্রম।
তথাপিও, তাহাকে অনবরত বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়াইয়া
বক্তৃতা করিতে হইত। তবে, তাহার কথা ছিল অতি
সংক্ষিপ্ত, সতর্ক ও সুচিন্তিত। তিনি প্রকৃত অবস্থা
নির্ণয় করিয়া, তাহার প্রতীকারােপায় নির্ধারণ করিতেন
এবং তজ্জন্য সকলকে সত্য সত্য কাজে নামিতে
বলিতেন ; তাহার কাজের কথা শুনিয়া অশিক্ষিত
জনসাধারণের প্রাণেও স্বাদেশিকতার ভাব জাগিয়া
উঠিত। তবে কেরেন্সকির মত তাহার বক্তার চেহারা
অথবা প্রাঞ্জল বক্তৃতা মাধুৰ্য্য না থাকিলেও, লেনিন
৪৫
লেনিন ও সােভিয়েট তাহার শিক্ষা, সুচিন্তা, তর্কনিপুণতা এবং তদুপরি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হইতে সে সকল সার কথার অবতারণা করিতেন, তাহা শুনিয়া কেরেলকির বক্তৃতা- মুগ্ধ জনসাধারণও আপনা হইতেই তাহার পক্ষপাতী হইয়া উঠিয়াছিলেন। তর্কে লেনিনের সমকক্ষ বড় মিলিত না। তর্কের সময়ও তিনি আত্মস্থ থাকিতেন। কখনও উত্তেজিত হইয়া তিনি তাহার বিরুদ্ধ মতবাদীর কথার জবাব দিতেন না। যুক্তির ক্ষুরধারে তিনি তাহার কথা কাটিতেন আর তাহার কথায় কোথায় গলদ থাকে বাহির করিবার জন্য সর্বদা তর্ক থাকিতেন। তিনি তাহার যুক্তি ত স্বীকার করিয়া লইতেনই না, পক্ষান্তরে তাহার কথা ধরিয়াই তাহার মতবিরুদ্ধ এমন অসম্ভব সীদ্ধান্তে তাহাকে লইয়া যাইতেন যে, বেচারীকে সকলের সম্মুখে নাকাল হইতে হইত। তর্কের সময় মাঝে মাঝে তিনি যেমন রহস্যোদ্দীপক কথার অবতারণা করিতেন, তেমন আবশ্যক হইলে লােককে মুখের উপর দুই কথা শুনাইয়া দিতেও দ্বিধা বােধ করিতেন না। একদিন বলশেভিক সংবাদপত্র- সেবী রেড লেনিনকে বলিয়াছিলেন, “পেট্রোগ্রেডে
বক্তৃতামঞ্চে লেনিন্ম
যদি আমরা ৫০০ শত সাহসী লােক পাইতাম, তবে
আপনাকে জেলে পাঠাইতে
পারিতাম।” তদুত্তরে
লেনিন অতি ধীরভাবে বলিয়াছিলেন, কোন কোন
সেনাপতি বাস্তবিকই জেলে যাইতে পারেন; কিন্তু
আপনারা যদি ইহার সম্ভাবনা সম্বন্ধে কিছু অনুমান
করিয়া থাকেন, তবে দেখিবেন যে আমাকে জেলে
পাঠান অপেক্ষা, আমিই যে অপনাদিগকে পাঠাতে
পারি, তাহার সম্ভাবনাই অধিক।”
বক্তৃতা করিবার সময় লেনিন এক পা, দুই পা
অগ্রে পশ্চাতে পায়চারী করিতেন ; চিন্তার রেখা
তাঁহার ললাটে ফুটিয়া উনিত ; মুখের ভাব দেখিয়া মনে
হইত যেন অন্তরে তাহার বুদ্ধির তােলপাড় চলিয়াছে।
তাহার কোন কথায়ই উত্তেজনার লেশ ছিল না, ছিল
কৰ্ম্মপথের একটা সুনিয়ন্ত্রিত নির্দেশ মাত্র।
সেইবার ডিসেম্বর মাসে লাল-পল্টন বাহিনীর
প্রথম দল সীমান্তে যাইবে। মিখাইলভস্কি ম্যানেজে
তাহাদের বিদায় অভিনন্দন সভা হইল। লেনিন
তাহাদিগকে কিছু বলিবেন। বিপ্লবী সেনাবাহিনীর
উপযুক্ত পােষাক, যথেষ্ট অস্ত্রশস্ত্র ছিল না সত্য, কিন্তু
তাহাদের তরুণ-বক্ষ যুদ্ধের নামে ফুলিয়া উঠিয়াছিল।
লেনিন ও সােভিয়েট বিপ্লবের গান গাহিতে গাহিতে তাহারা সমবােল্লাসে মাতিয়া উঠিল। লেনিন প্রবেশ করিলেন। আকাশ বাতাস কম্পিত করিয়া বিপুল জয়ধ্বনি তাহাকে অভ্যর্থনা করিল। লেনিন একখানি বড় মােটরকারের উপর দাড়াইয়া বক্তৃতা করিলেন, সকলে নিস্পদভাবে শুনিতে লাগিল। সেইদিন সেই মৃত্যু-পথ-যাত্রী যুদ্ধার্থীদের নিকটও লেনিন উত্তেজনা পূর্ণ কোন কথাই বলিলেন না। অতি স্বাভাবিকভাবেই তিনি বক্তৃতা শেষ করিলেন, 'লাল- পল্টন বাহিনী বিজয়ধ্বনি করিল, সভাও ভঙ্গ হইল। সেই সভায় আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক আলবার্ট রাইজ, উইলিয়ম ও আধ আধ রুশীয় ভাষায় বক্তৃতা করিয়াছিলেন। লেনিন তাহার এই প্রচেষ্টার সবিশেষ প্রশংসা করিলেন এবং তাহাকে রুশ ভাষা শিখিবার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহিত করিয়াছিলেন। লেনিনের বিপদ-পুর্ণ জীবন পূর্বোক্ত বক্তৃতা স্থান হইতে যেমন লেনিন বাহিরে আসিলেন, অমনই তিনটী অগ্নি-গুলি বে বেঁ করিয়া তাহার মােটরকার ভেদ করিয়া চলিয়া গেল। ৪৮ লেনিনের বিপদপূর্ণ জীবন সঙ্গী সুইস্ প্রতিনিধি প্লেটন আহত হইলেন। পাশ্ববর্তী রাস্তা হইতে জনৈক আততায়ী লেনিনকে মারিবার জন্যই এই চেষ্টা করিয়াছিল ; কিন্তু কৃতকাৰ্য্য হইতে পারিল না। বলশেভিক নেতাদের জীবন কখনও নিরাপদ ছিল । “ক্যাপিটালিষ্ট” ষড়যন্ত্রকারীদের প্রধান লক্ষ্যই ছিল, লেনিন। তাহারা মনে করিতেন, তাহাদিগকে শেষ করিবার যত মতলব, সকলই উদ্ভাবন হইত ঐ লেনিনের মস্তিষ্ক হইতে। তাই, বিপ্লব-বিরােধীদের লেনিনের উপর এত আক্রোশ। মূলধনীরা ( Capitalist) যুদ্ধের সুযােগে অপরিমিত অর্থ সঞ্চয় করিয়াছিলেন। বেশ আরামেই তাহাদের দিন অতিবাহিত হইতেছিল। হঠাং বল- শেভিকদের আবির্ভাবে সকল সুখ পণ্ড হইতে বসিল দেখিয়া, তাঁহারা তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া কত কি-ই বলিতে লাগিলেন। অসভ্য, উন্মাদের দল তাহাদের সকল লাভের পথ রুদ্ধ করিয়াছে। তাহাদিগকে শেষ করিতে হইবেই। তাহাদিগকে ফাসীকাষ্ঠে ঝুলাও! তাহাদিগকে গুলি করিয়া নিহত কর । লেনিনকে দিয়াই লাগিয়া যাও ! ৪৯ লেনিন ও সােভিয়েট { মস্কোর জনৈক সমৃদ্ধশালী তরুণ ব্যবসায়ী একদিন আলবার্ট রাইজ উইলিয়মের নিকট গম্ভীরভাবে প্রস্তাব করিলেন, “যে লেনিনকে হত্যা করিবে, আমি এই মুহূর্তে তাহাকে একলক্ষ রুবল দিব এবং এই উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য এইরূপ আরও ১৯ জন লােকের প্রত্যেককে এক এক লক্ষ রুবল দিতে পারি।” উই- লিয়ম সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন। লেনিন কিন্তু এসব বিপদের কথা জানিয়া শুনিয়াও ভ্রুক্ষেপ করিতেন না। বৈদেশিক সাম্রাজ্যবাদীগণ ও বিপ্লব- বিরােধীরা লেনিনকে মারিবার যাবতীয় ষড়যন্ত্রেই একটা না একটা ভুল করিয়া বসিতেন । তবে ১৯১৮ খৃষ্টাব্দের আগষ্টের শেষ ভাগে ভঁহারা প্রায় কৃতকাৰ্য হইয়াছিলেন। মিখেলসন কারখানার ১৫,০০০ শ্রমিকের মধ্যে বক্তৃতা শেষ করিয়া লেনিন যেমন গাড়'তে ফিরিতে ছিলেন, অমনি একটী বালিকা একখানি কাগজ-হস্তে যেন তাহাকে আবেদন পত্র দিবে বলিয়া, তাহার দিকে দৌড়াইয়া আসিল। যেমন তিনি উহা লইবার জন্য বাহিরে আসিলেন, অমনি ডােকাপলান নামক অপর বালিকা তাহাকে লক্ষ্য করিয়া তিন তিনটী গুলি ছুড়িল।
লেনিনের বিপদপূর্ণ জীবন
দুইটী গুলিতে বিদ্ধ হইয়া লেনিন পথিপাশ্বে লুটাইয়া
পড়িলেন। অতঃপর তাহাকে গাড়ীতে তুলিয়া ক্রেমলিন
প্রাসাদে লইয়া যাওয়া হয়। ক্ষতস্থান হইতে অসম্ভব
রক্ত গড়াইতেছিল ; তবুও লেনিন নিজেই সিড়ি
বাহিয়া উপরে যাইবার ইচ্ছা জ্ঞাপন করিলেন। এবার
লেনিনকে কতিপয় সপ্তাহ সত্য সত্যই মৃত্যুর সাথে
বুঝাপড়া করিতে হইয়াছিল।
এই অভাবনীয় কাণ্ডে, লেনিনের অনর্থক রক্তপাতে
জনসাধারণ একেবারে ক্ষেপিয়া উঠিল। তাহারা
রক্ত-বিভীষিকার অবতারণা করিয়াই অভিজাত ও
রাজতান্ত্রিকদের প্রতিশােধ লইবে বলিয়া সংকল্প করিল।
ফলে, অভিজাতবর্গের ও রাজতান্ত্রিকদের অনেকেরই
জীবনান্ত হইল। লেনিন নিজে যদি সেই ক্রোধােন্মত্ত
জনসাধারণকে শান্ত না করিতেন, তবে দুৰ্যোগ যে
কতদূর গড়াইত, তাহা বলা যায় না।
সশস্ত্র জনসঙঘ ও লেনিন
তখন জার্মানরা রুশিয়ার দিকে অগ্রসর হইতেছিল।
সেই সময় একদিন দেখা গেল, এক বিপুল জনতা
রাস্তায় ভীড় করিয়া বড় বড় হরফে লেখা, দেওয়াল
লেনিন ও সােভিয়েট সংলগ্ন একখানি বিজ্ঞাপন পড়িতেছিল, আর পড়িতে পড়িতে তাহাদের চোখে মুখে যেন এক তীব্র উত্তেজনার ভাব ফুটিয়া উঠিতেছিল। বিজ্ঞাপন টী এই-- “ষ্টেট-ব্যাঙ্ক হইতে তিনকোটি রুবলের স্বর্ণ মুদ্রা লইয়া লেনিন ফিনল্যাণ্ডে সরিয়া পড়িয়াছেন। কৃত্রিম নেতাদ্বারা রুশীয় বিপ্লব বিপথে পরিচালিত হইয়াছে। কিন্তু এই পবিত্র রুশিয়ার এখনও আশা আছে। ভূতপূর্ব জার ফিরিয়া আসিতেছেন। গ্রাণ্ড ডিউক নিকোলাই নিকোলিওভিচ, দুইলক্ষ প্রকৃত সাহসী রুশীয় সৈন্যসহ ক্রিমিয়া হইতে অভিযান করিয়াছেন। তাহারাই এই বলশেভিক বিশ্বাস- ঘাতকদের হস্ত হইতে রুশিয়াকে রক্ষা করিবে।” আমেরিকার রেডক্রস্ সােসাইটীর রেমণ্ড রবিন্স এই সব দেখিয়া শুনিয়া ভীষণ বিপদের আশঙ্কা করিলেন। তিনি তাড়াতাড়ি স্মলনীতে উপস্থিত হইয়া বরাবর উপরে উঠিয়া দেখিলেন-কমিশনার, কেরাণী ও প্রহরীর দল সকলেই যেন কোন আসন্ন বিপদের আশঙ্কা করিয়া এদিক ওদিক ছুটাছুটি ও চীৎকার করিতেছে। মেশিনগানে গােলাগুলি ইতেছে।
সশস্ত্র জনসঘ ও লেনিন
এদিকে সেই সশস্ত্র জনতা সারিবদ্ধ হইয়া
দালানের এক পাশ্বে প্রবেশ করিতে লাগিল, তাহাদের
সকলেরই হস্তে গুলি-বােঝাই বন্দুক, জনতার ভিতর
হইতে প্রতিনিয়ত শুনা যাইতেছিল যে তাহারা সকলে
স্মলনীতে সমবেত হইবে এবং জার্মানীর বিরুদ্ধে
সীমান্তের দিকে অভিযান করিবে।
লেনিন তখন একসঙ্গে টেলিফোন সাহায্যে
সীমান্তের সংবাদ অবগত হইতেছিলেন, দূতমুখে খবর
শুনিতেছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে আদেশ লিখিয়া তাহা
পাঠাইবার ব্যবস্থা করিতেছিলেন। তিনি নিরবচ্ছিন্ন
ভাবে রীতিমত কাজ করিয়া যাইতেছিলেন। কোন
ক্ষিপ্রতার লক্ষণই তাহাতে প্রকাশ পাইতেছিল না।
এমন সময় রেমণ্ড রবিন্স উন্মত্ত জনতার প্রবল
ধাক্কায় প্রকোষ্ঠ মধ্যে নিক্ষিপ্ত হইয়া লেনিনকে বলিয়া
উঠিলেন, “গুলি করিবার আদেশ দিন!”
লেনিন “না, না” বলিয়াই আসিয়া পড়িলেন এবং
রূঢ় কণ্ঠে বলিলেন, “তাহাদিগকে গুলি করা? আমরা
তাহাদের সহিত কথা বলিব। তাহাদের নেতাদিগকে
ভিতরে আসিতে দিন।”
একজন তাহাদিগকে ডাকিতে গেল। লেনিন,
লেনিন ও সােভিয়েট
পুনরায় কৰ্ম্মে মনােনিবেশ করিলেন। জনতার
দলপতিগণ একে একে ভিতরে আসিতে লাগিলেন।
লেনিনের আফিস গৃহ ভরিয়া গেল। তাহারা সকলেই
শ্রমিক, প্রত্যেকেরই পরিধানে শ্রমিকের পােক,
প্রত্যেকেরই হস্তে সঙ্গীন-আঁটা বন্দুক আর কোমরে
এক একটী ম্যাগাজিন পিস্তল। এই শ্রমিকদের
উপরই লেনিনকে বিশ্বাস করিতে হইত। তাহারাই
ছিল শ্রমিকদের সশস্ত্র বিপ্লবী-সেনা, লেনিন রুশিয়ার
লাল-পল্টনবাহিনী তাহারাই গঠন করিয়াছিল।
তাহারা সকলেই মাটিতে বন্দুক রক্ষা করিয়া দাঁড়াইল।
অমনি তাহাদের পিছনে দ্বার রুদ্ধ হইল।
এবার লেনিন উঠিয়া দাড়াইলেন, এবং আগন্তুকদের
সম্মুখীন হইয়া বলিতে লাগিলেন, “সহকর্মি-ভ্রাতাগণ,
আপনারা দেখিতেছেন, আমি পলায়ন করি নাই।
আপনাদের অনেকে হয়ত যখন জন্মগ্রহণও করেন নাই,
তাহার বহু পূৰ্ব্ব হইতেই আমি বিপ্লবের জন্য যুদ্ধ
করিয়া আসিতেছি। আপনাদের অনেকের মৃত্যুর পরেও
আমি সেই বিপ্লবের জন্য যুদ্ধ করিয়া যাইব। আমার
সর্বক্ষণ বিপদ। আপনাদের বিপদ তদপেক্ষা অধিক।
আসুন, আমরা সরল ভাবে কথা বলি।”
সশস্ত্র জনসঘ ও লেনিন পকেটে হস্ত স্থাপন করিয়া লেনিন তখন তন্ময় ভাবে এদিক ওদিক পায়চারী করিয়া বলিতে লাগিলেন “সহকর্মিগণ, সকল সময়ে নেতাদের বিশ্বাস না করার জন্য আমি আপনাদিগকে দোষ দিই না; রুশিয়ায় আজ কত মতই দেখিতে পাই। ইহাই আশ্চর্যের যে আপনারা আমাদিগকে যথাসম্ভব বিশ্বাস করিয়াছেন।” “রুশিয়ার প্রকৃত বিপ্লবীদের ভিতরও আজ দুই মত দেখা যায়। তাহাদের একদল ঠিক বুঝিয়াছেন, অপর দল ভুল বুঝিয়াছেন।” “অনেক সহকর্মি বলিয়া থাকেন- “তােমরা সীমান্তে যাও, জাৰ্মাণদের সহিত যুদ্ধ কর এবং যুদ্ধ করিয়া মর-বিপ্লবের জন্য যুদ্ধ করিয়া মর। “সহকর্মিগণ, বিপ্লব ভিন্ন অন্য কিছুর জন্য আপনারা যুদ্ধ করিতে ইচ্ছুক বলিয়া তাহারা ভাণ করেন না। কিন্তু তাহারা সত্যই বলেন যে জাৰ্মাণগণ বিপ্লবের বিরােধী। এজন্য তাহারা বলেন, যাও এবং জাৰ্মাণদের সহিত যুদ্ধ কর । “আমি এরূপ বলি না। আমি বলি--আপনারা নূতন সৈন্যদল। আপনারাই বিপ্লবের একমাত্র সেনা-
লেনিন ও সােভিয়েট
বাহিনী। আপনারা ইহার সূচয়িতা। জার্মানদের
সহিত যুদ্ধ করিলে কি হইবে? পুরাতন সেনাবাহিনী
যুদ্ধ করিতে পারে না, তাহারা একেবারে ক্লান্ত।
আপনারাই কেবল বিপ্লবের প্রেরণা লইয়া যুদ্ধ
করিতে চান। আপনারাই জানেন, কি হইবে।
আপনারাই যুদ্ধ করিবেন। আপনারাই মরিবেন এবং
বৈপ্লবিক সেনাবাহিনী মরিবে, জার আবার ফিরিয়া
আসিবে।
“তাহাই কি বিপ্লবের জন্য মরা হইবে ? ‘সহকর্মি-
গণ, যখন আমরা মরিব, তখন আমাদিগকে সত্য
সত্যই বিপ্লবের জন্য মরিতে হইবে। মরিয়া যখন
আমরা বিপ্লবকে জয়যুক্ত করিয়া তুলিতে পারি,
তখনই আমরা মরিব ।
“সহকর্মিগণ, আমার কথাই ঠিক। তাহারা
আপনাদিগকে বলেন, আমি লজ্জাকর সন্ধিই করিব।
হাঁ, আমি লজ্জাকর সন্ধিই করিব। তাহারা আপনা-
দিগকে বলেন, আমি রাজধানী পেট্রোগ্রেড, শক্তহস্তে
সমৰ্পণ করিব। হা, আমি পেট্রোগেডই সমর্পণ
করিব। তাহারা আপনাদিগকে বলেন, আমি পুণ্যনগরী
মস্কো শহস্তে সমৰ্পণ করিব। আমি অবশ্যই
সশস্ত্র জনসঘ ও লেনিন করিব। আমি বলগাতীরে ফিরিয়া যাইব এবং বলগা ছাড়াইয়া ইয়েকেটারিনবার্গেও যাইব। কিন্তু আমি বৈপ্লবিক সেনাদল রক্ষা করিবই এবং আমি বিপ্লবকে রক্ষা করিবই।” “সহকম্মিগণ, আপনাদের ইচ্ছা কি?” “আমি এখনই আপনাদিগকে সীমান্তের জন্য এক- খানি স্পেশাল ট্রেন দিতেছি। আমি আপনাদিগকে বিরত করিব না। আপনারা যাইতে পারেন। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই আমার পদত্যাগপত্রও আপনাদিগকে গ্রহণ করিতে হইবে। আমি বিপ্লব চালাইয়া আসিয়াছি। আমি আমার নিজ সন্তানের হত্যাকাণ্ডে নিজেকে বিজড়িত করিতে পারিব না। “সহকম্মিগণ, আপনাদের ইচ্ছা কি?” অমনি সেই প্রকোষ্ঠ প্রতিধ্বনিত করিয়া সমস্বরে তাহারা বলিয়া উঠিলেন, “লেনিন! লেনিন! লেনিন ?” শ্রমিকগণ যাহার যাহার বন্দুক তুলিয়া লইলেন, প্রকোষ্ঠ পরিত্যাগ করিলেন এবং জনতার সম্মুখে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “কমরেড, লেনিন ! লেনিন !” এই ভাবেই লেনিনকে তঁাহার অনুগামীদে- কমরেড, লেনিন ও সােভিয়েট সম্মুখীন হইতে হইত। এইরূপ ব্যক্তিত্বের প্রভাবেই লেনিন রুশিয়ার জননায়ক হইতে পারিয়াছিলেন। থাকিত। কেহ উত্তেজিত লেনিনেৱ অসাৱণ আত্মহিৱভা সকল অবস্থাতেই লেনিনের আত্মসংযম অটুট যে সব ঘটনায় অন্য হইয়া উঠিতেন, লেনিন তাহার ভিতরও ধীর থাকিতেন। কষ্টিটুয়েন্ট এসেম্বলীর বৈঠকে দুইদলে ভীষণ দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়। প্রতিনিধিগণ যুদ্ধ-কোলাহল জুড়িয়া দিলেন, টেবিল চাপড়াইতে লাগিলেন, বক্তাগণ তার- স্বরে বাদ, প্রতিবাদ, ভয় প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। এরূপ দ্বিসহস্র কণ্ঠে আন্তজাতিক ও বৈপ্লবিক কথােপ- কথন চলিতেছিল । সেই উত্তেজিত জনতার ভীষণ কোলাহলের ভিতর সম্মুখে একখানি আসনাপরি লেনিন তঁাহার কৰ্ম্ম-ক্লান্ত দেহখানি রক্ষা করিয়া- ছিলেন। কিছু কালপরে তিনি সেস্থান পরিত্যাগ করিয়া বিচার-মঞ্চে উঠিবার লাল গালিচাবৃত সােপানাে- পরি শয়ন করিলেন এবং বাহুর উপর মস্তক রক্ষা করিয়াই তিনি গাঢ় নিদ্রাভিভূত হইলেন। দুই,
লেনিনের আত্মস্থিরতা
একবার চক্ষু উন্মীলিত করিয়া এদিক ওদিক চাহিলেন,
আবার চক্ষু নিমীলিত করিলেন ।
সভায় লেনিনের উপর কত বাক্যবাণ বর্ষিত হইল,
কিছুই তাহাকে বিচলিত করিতে পারিল না। তিনি
সৰ্ব্বদা নীরব, নির্বিকার ছিলেন।
চতুর্থ মহাসভায় বক্তৃতা শেষ করিয়া লেনিন
আসন পরিগ্রহ করিলেন। তখন তাহার পাঁচজন
বিরুদ্ধ-মতবাদী তাহাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করিলেন।
যখন তাহাদের কথার কোন অংশ স্বপক্ষে হইতেছে
বলিয়া বিবেচনা করিতেন, তখন লেনিন সকলের সঙ্গে
সমস্বরে উচ্চহাসি হাসিতেন, যখন দেখিতেন তাহাদের
বাক্য নিন্দামূলক, তখনও তিনি হাসিতেন—তবে তাহা
ছিল লােকদেখান প্রচ্ছন্ন মৃদুহাসি মাত্র। এক কথায়
কোন প্রকার অবস্থা-বিপর্যয়েও লেনিনের চিত্তস্থিরতা
নষ্ট হইত না।
ব্যক্তিগত সাক্ষাতে লেনিনের ব্যবস্থা।
ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য লইয়া সকল সময় লেনিনের
সহিত সাক্ষাত করা সম্ভব হইত না। সকল সময়েই
তাহাকে দেশের কাজে ব্যস্ত থাকিতে হইত। কিন্তু
লেনিন ও সােভিয়েট যাহারা তাহার দর্শনপ্রার্থী হইয়া, তাহার কৰ্ম্ম ব্যস্ততার জন্য সেইদিনকার মত তাহার সহিত কথােপকথনের সুযােগ পাইতেন না, লেনিন তাহাদিগকে অতি শিষ্টভাবে, মিষ্ট কথায় বলিতেন, “আপনারা অনুগ্রহ করিয়া আমাকে এই সময়ের জন্য যাইতে দিবেন কি?” তারপর আগন্তুকদের করমর্দন করিয়া তিনি পুনৰ্ব্বার কৰ্ম্মে আত্মনিয়োেগ করিতেন। অনর্থক সময় নষ্ট করা তাহার সম্ভবপর ছিল না, বলিয়া তাহার প্রকোষ্ঠদ্বারে সকল সময়ের জন্য এই বিজ্ঞাপনটী রক্ষিত ছিল, ‘‘দর্শকগণ বিবেচনা করিয়া দেখিবেন যে তাহারা যে লােকের সহিত কথা বলিতে চান, তাহার কাজ অপরিমিত। তাহাদের যাহা বলিবার আছে তাহারা যেন অতি সংক্ষেপে পরিস্কার করিয়া বলেন—ইহাই তঁাহার অনুরােধ।” যখনই তাহার সম্ভব হইত, তখনই তিনি সুদূর আমেরিকা প্রভৃতি অঞ্চল হইতে আগত সংবাদপত্র- প্রতিনিধি, অন্যান্য দেশী বিদেশী আগন্তুকদের সহিত সাক্ষাৎ করিতেন এবং নানা বিষয়ে আলাপ করিতেন। কাহারও কথায় কোন বিশেষত্ব না থাকিলে, তিনি "তাহাকে অতি কৌশলে সত্বরই বিদায় দিতেন।
লেনিনের ব্যবস্থা অভিজাত সম্প্রদায়ের পরিচালিত সংবাদপত্র সেবীদের লেনিন বৃথা কালক্ষেপণকারী বলিয়া মনে করিতেন। প্লেখানভের ইয়েডিষ্টভাে পত্রের জনৈক সংবাদদাতা, তাহার বিগত বিপ্লব-জীবনের সুযােগ লইয়া লেনিনের সাক্ষাৎ লাভে সমর্থ হন। বিশেষ উৎফুল্ল হইয়াই তিনি তাহার প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করিলেন কিন্তু শীঘ্রই তাহাকে অতি বিমর্ষভাবে ফিরিয়া আসিতে দেখা গেল। এই বিমর্ষতার কারণ সম্বন্ধে তিনি নিজেই বলিয়াছিলেন যে ১৯০৫ খৃষ্টাব্দের বিপ্লবে তাহার কৰ্ম্ম- তৎপরতার কথা উল্লেখ করিতেই লেনিন তাহার দিকে ঝুকিয়া পড়িয়া তাহাকে “হা সহকর্মি, বর্তমানে আপনি বিপ্লবের জন্য কি করিতেছেন?” কথাটী এত গম্ভীরভাবেই জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন যে সংবাদদাতা মহাশয় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িয়াছিলেন। কিং- কর্তব্যবিমূঢ় আগন্তুককে একই প্রশ্ন পুনরায় জিজ্ঞাসা করিতে, তিনি কথা বলিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন সত্য, কিন্তু অকৃতকার্য হইয়া তাহাকে এক মিনিটের মধ্যেই লেনিনের সহিত আলাপ-পরিচয়ের সাধ মিটাইয়া বিদায় লইতে হইয়াছিল। লেনিনের বুদ্ধি কৌশল সর্বত্রই এরূপ সুন্দর খেলিত।
লেনিন ও সােভিয়েট
লেনিনের আন্তরিকতা ও বাস্তবে ঘৃণা
লেলিনের বিশ্বগ্রাসী শক্তির পিছনে নিহিত ছিল,
তাহার তীব্র আন্তরিকতা। তাহার সকল বন্ধুই সে
আন্তরিকতায় মুগ্ধ ছিলেন। তিনি কিন্তু কাহাকেও
দলভুক্ত করিতে যাইয়া ভবিষ্যৎ উন্নতির রঙ্গীন
আশায় তাহার চিত্ত মুগ্ধ করিতেন না। বরং তিনি
যাবতীয় অবস্থার সম্ভাবিত মন্দের দিকগুলিই তাহাদের
সম্মুখে অঙ্কিত করিতেন। লেনিনের অধিকাংশ বক্ততার
প্রধান ভাবই ছিল—
“বলশেভিকগণ যে উদ্দেশ্য লক্ষ্য করিয়া ছুটিয়া
চলিয়াছে তাহা আপনাদের স্বপ্নের বহিভূত, অতিদূরে।
আমরা রুশিয়াকে বন্ধুর পথেই পরিচালিত করিয়াছি,
কিন্তু আমরা যে পথেই চলিয়াছি তাহা কেবল
আমাদের শত্ৰুসংখ্যা ও ক্ষুধার মাত্রাই বৃদ্ধি করিবে ।
অতীত যে দুঃখ কষ্টে গিয়াছে, তদপেক্ষা কঠোরতর
কল্পনাতীত অবস্থা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য সাজিয়া
রহিয়াছে।”
কোন মন ভুলান কথা নয়। কোন যুদ্ধের আহ্বানও
নয়। ইতালীয়গণ যেমন অস্ত্রাঘাত, কারাবন্ধন ও
মৃত্যুর কথা জানিয়া শুনিয়াই গ্যারিবীর পাশ্বে
;
লেনিনের ঘৃণা •
সমবেত হইয়াছিলেন, তদ্রুপ রুশীয়গণও ‘লেনিনের
পতাকাতলে সম্মিলিত হইয়াছিলেন। নিজের উদ্দেশ্যের
উপর রং ফলাইয়া দলবৃদ্ধি করা লেনিন মােটেই পছন্দ
করিতেন না; তিনি চাহিতেন, যাহারা আসিবেন,
তাহারা নিজ নিজ অনুপ্রেরণা লইয়াই আসুন।
শত্রুকেও লেনিন সরলভাবে এইরূপ
বলিতেন, “ব্যক্তিগতভাবে আপনার বিরুদ্ধে আমার
করিবার কিছুই নাই। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আপনি
আমার শত্রু ;'আপনার ধ্বংসের জন্য আমি সকল অস্ত্রই
প্রয়ােগ করিব। আপনাদের গভর্ণমেন্টও আমার
বিরুদ্ধে এরূপই করেন। এখন দেখি, আমরা কতদূর
একসঙ্গে যাইতে পারি।”
লেনিনের কৰ্ম্ম-পথ-নির্ণয়-পদ্ধতি বড়ই সুন্দর ছিল।
ঠিক অঙ্কের মত প্রতি কৰ্ম্মের ভিতর, তাহার বিবেচনায়
যতগুলি স্বপক্ষে থাকিত, তাহা এক দুই তিন করিয়া
লিখিতেন, ঠিক পাশ্বে ই তাহার বিরুদ্ধে অন্তরায়গুলিও
এক দুই তিন করিয়া লিখিয়া লইতেন।
তারপর
অনুকূল, প্রতিকূল
সংখ্যাগুলি গণিয়া দেখিতেন এবং
তদনুসারেই কর্মে হস্তক্ষেপ করিতেন। প্রতিকর্মের
বাস্তব দিকটা দেখাইয়া দেওয়াই ছিল তাহার বিশেষত্ব।
লেনিন ও সােভিয়েট
তিনি যেমন কথার আড়ম্বর ঘৃণা করিতেন, তদ্রুপ
যাহারা বৈপ্লবিক ব্যাপারে বাস্তব হইতে দূরে সরিয়া
রহিতেন, তাহাদিগকে মােটেই পাত্তা দিতেন না।
যখন জাৰ্মাণগণ সােভিয়েট রাজধানী লেনিনগ্রেড
আক্রমণ করিতে আসিতেছিলেন, তখন রুশিয়ার
চতুর্দিক হইতে রাশি রাশি তার আসিতে লাগিল,
“রুশীয় শ্রমিকতন্ত্র দুর্ভেদ্য হইয়া বজায় থাকুক!”
“সাম্রাজ্যতান্ত্রিক দস্যদের মৃত্যু হউক !” “আমাদের
শেষ রক্তবিন্দু, দিয়াও
দিয়াও আমরা বিপ্লব রাজধানী
রক্ষা করিব।”
অবিকৃতভাবেই লেনিন তারগুলির পাঠ সমাপন
করিলেন। তারপর, রুশিয়াময় যাবতীয় সােভিয়েট
শাখাতে একই বার্তা প্রেরণ করিলেন। তাহারা
যাহাতে বৈপ্লবিক বাক্য প্রেরণ না করিয়া, সৈন্য প্রেরণ
করেন, বিশেষতঃ দলভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যা, অস্ত্রশস্ত্র
ও খাদ্যের পরিমাণ-তালিকা পাঠান,—তারে তারে
ইহাই তিনি অনুরােধ করিয়াছিলেন মাত্র।
দুর্যোগে লেনিন
জাৰ্মাণদের অভিযান দেখিয়া বিদেশীর দল পলায়ন
করিতে লাগিল। একদিন যাহারা “হুনদের হত্যা কর”
দুর্যোগে লেনিন
বলিয়া কত চীৎকার করিয়াছে, আজ সেই হুনদিগকে
হাতের ভিতর পাইয়াও তাহাদিগকে পলায়ন করিতে
দেখিয়া রুশীয়গণ খুবই বিস্মিত হইল। কিন্তু একমাত্র
বিদেশী, আমেরিকান সমাজতান্ত্রিক রাইজ উইলিয়ম
লাল-পল্টনে যােগদান করিবার জন্য অতিশয় উৎসুক
হইয়া উঠিলেন। বলশেভিক বুখারিনের কথায় তিনি
লেনিনের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন।
তাহাকে দেখিয়াই লেনিন উৎসাহ ও সদিচ্ছা।
জ্ঞাপন করিয়া বলিলেন, “আমাদের অবস্থা বড়ই
শশাচনীয়।
পুরাতন সেনাবাহিনী যুদ্ধ করিবে না।
নূতন বাহিনী কেবল কাগজে পত্রে। এই মাত্র পিস্কভ
বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করিয়াছে। সেই পাপের জন্য
সােভিয়েট প্রেসিডেন্টকে গুলি করা উচিত। আমাদের
কর্মীদের খুবই স্বার্থত্যাগ ও বীরত্ব আছে, কিন্তু
সামরিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা নাই।”
এই কয়টী কথায় লেনিন তৎকালীন অবস্থার
বর্ণনা করিয়াছিলেন। অবশেষে তাহাকে বলিলেন যে
একজন বিদেশীর পক্ষে একা যুদ্ধ করা সম্ভবপর
নয়। একথা শুনিয়া উইলিয়ম বিদেশীদের এক সেনা-
বাহিনী গঠন করিতে চেষ্টা করিবেন বলিয়া বলিয়া
লেনিন ও সােভিয়েট আসিলেন। ক্ষিপ্র-কৰ্মী লেনিন অমনি এক কৰ্ম্ম- তালিকা নির্ধারণ করিলেন। তৎক্ষণাৎ তিনি সােভিয়েট কমাণ্ডার ক্রাইলেঙ্কোকে টেলিফোনে কি বলিলেন। কিন্তু সাড়া না পাইয়া, এক টুকরা কাগজ লইয়া তাহাকে একখানি চিঠি লিখিলেন। সেই রাত্রিতেই আন্তর্জাতিক সেনাদল গঠিত হইল। এখানেই লেনিন বিরত হইলেন না। দুইবার ‘প্রাভডা’ অফিসে টেলিফোন করিয়া এই সংবাদ রুশীয় ও ইংরেজী দুই ভাষায়ই ছাপাইবার জন্য বলিয়া দিলেন। তারপর তিনি সেনাদলে যােগদান করিবার এই আহ্বান রুশিয়ার সর্বত্র তারে তারে প্রেরণ করিলেন। রুশিয়ারই একদল যখন এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাড়াইয়াছিলেন এবং অনেকেই কেবল মুখে মুখেই বিপ্লবের বাগাড়ম্বর করিতেছিলেন, তখনও লেনিনই সেই যুদ্ধ ও বিপ্লব সফল করিয়া তুলিবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছিলেন। লেনিন তখনই পিটার-পল দুর্গে একখানি গাড়ী পাঠাইয়া বিপ্লব-বিরােধী বন্দী কর্মচারীদের আনাইলেন তাহাদিগকে বলিলেন, ভদ্রমহােদয়গণ, আপনাদের কাছে সুচিন্তিত উপদেশ পাইব বলিয়াই এবং
লেনিনের রাজনৈতিক পারদর্শিতা .
আপনাদিগকে এখানে আনয়ন করিয়াছি। পেট্রোগ্রেড,
আজ বিপদগ্রস্ত । আপনারা কি ইহার রক্ষার জন্য
দয়া করিয়া কোন সামরিক চাল উদ্ভাবন করিবেন ?”
তাহারা সকলেই তাহাতে স্বীকৃত হইলেন।
মানচিত্রে তিনি তাহাদিগকে লাল-পল্টন, গােলা-
বারুদ এবং স্থায়ী সৈন্যের অবস্থান দেখাইয়া দিয়া
বলিলেন, “এই আমাদের সৈন্য সংখ্যার শেষ বিবরণী
এবং এই এই স্থানে শত্রু সৈন্য সন্নিবেশিত হইয়াছে।
জেনারেগণ ' আর যাহাই জানিতে চান তজ্জন্যই
বলিয়া পাঠাইতে পারেন।”
কিন্তু সন্ধ্যার প্রাক্কালে সে কৃত'ন্ন জেনারেলগণ
জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইলেন যে প্রধান মন্ত্রী তাহাদের
সুষ্ঠুতর বাসস্থানের ব্যবস্থা করিবেন কিনা। এখনও
নয়” বলিয়া সুচতুর লেনিন আবার তাহাদিগকে
পিটার-পল দুর্গে পাঠাইয়া দিলেন।
লেনিনেল প্লাজনৈতিক পারদর্শিতা
লেনিনের রাজনৈতিক পারদর্শিতার মূলে কোনই
রহস্যাত্মক দৈবশক্তি বর্তমান ছিল না। সকল তথ্য
সংগ্রহ করিয়া সুদক্ষ সূক্ষ্ম দৃষ্টি দ্বারাই তিনি সকল
লেনিন ও সােভিয়েট
বিষয়ের ফলাফল নির্ণয় করিতেন। তঁাহার “The
Development of Capitalism” 9867 fofa
এই দক্ষতারই বিশেষ পরিচয় দিয়াছিলেন। তদ্বারা
তিনি তৎকালীন অর্থনৈতিক চিন্তাধারায় এক বিপর্যয়
উপস্থিত করিয়াছিলেন। তাহাতে তিনি দেখাইয়া-
ছিলেন যে, রুশীয় কৃষকদের অর্ধাংশই শ্রমিকে
পরিণত হইয়াছিল। যদিও তাহাদের কিছু কিছু জমি
ছিল, তবুও তাহারা “এক এক খণ্ড জমি থাকা সত্ত্বেও
মজুর মাত্র।” তঁাহার এই কথা পরবর্তীকালে সত্য
বলিয়াই গৃহীত হইয়াছিল। অনুমানের উপর নির্ভর না
করিয়া, রীতিমত সংখ্যা-তালিকা নির্ণয় করিয়াই তিনি
একথা লিখিয়াছিলেন।
লেনিনের ব্যক্তিত্বের কারণ সম্বন্ধে একদিন কথা-
প্রসঙ্গে পিটাস বলিয়াছিলেন, “প্রায়ই আমাদের দলের
অধিবেশনের শেষভাগে, লেনিন তাহার অবস্থা-বিশ্লেষণ
দ্বারা নির্ধারিত, কতিপয় প্রস্তাব উপস্থিত করিতেন।
আমরা তাহা ভােটে অগ্রাহ্য করিতাম। পরে দেখা
যাইত যে লেনিনই ঠিক বলিয়াছিলেন, আর আমরাই
ভুল করিয়াছিলাম।” এরূপ ব্যাপার অহরহ
ঘটিত।
লেনিনের রাজনৈতিক পারদর্শিতা
যেমন কেমেনেভ, জিনভিয়েফ, প্রভৃতি বলশেভিক
নেতাগণ বলিয়াছিলেন যে নভেম্বরের বিপ্লবে পরাজয়
সুনিশ্চিত। লেনিন বলিয়াছিলেন, “পরাজয় অসম্ভব।”
লেনিনের বাণীই অব্যর্থ হইয়াছিল। অন্যান্য বলশেভিক
দলপতিগণ বলিয়াছিলেন যে তাহার শাসন ছিনাইয়া
লইতে পারিলেও রক্ষা করিতে পারিবেন না। তদুত্তরে
লেনিন বলিয়াছিলেন, “দিন দিন আমাদের নূতন শক্তি
আসিবে।” এবারও লেনিনের কথাই সফল হইয়াছিল।
তাহারা ক্রমাগত দুই বৎসর যুদ্ধ চালাইয়াছিলেন এবং
সীমান্ত পর্যন্ত বলশেভিক আধিপত্য বিস্তার করিতে
সমর্থ হইয়াছিলেন। তারপর ট্রটিস্কি জাৰ্মাণদিগকে
ভরসা দিলেন, অথচ তাহাদের সন্ধি-সৰ্তে স্বাক্ষর না
করিয়া এক চলি চালিলেন। তৎসম্পর্কে লেনিন
বলিয়াছিলেন, “তাহাদের সহিত খেলা করিবেন না।
যতই কেন মন্দ হউক না, প্রথম সন্ধি-সত্তেই স্বাক্ষর
করুণ, নতুবা আমাদিগকে আরও খারাপ সৰ্ত্তে স্বাক্ষর
দিতে হইবে।”
এদিকে ট্রটিস্কির এই বিশ্বাস ছিল যে, জাৰ্মাণগণ
সসৈন্যে রুশিয়ায় প্রবেশ করিবে না। লেনিন সে কথার
প্রতিবাদ করিয়া বলিয়াছিলেন, “করিবে।” ফলে তাহাই
লেনিন ও সােভিয়েট
হইয়াছিল।
রুশীয় সেনাবাহিনী
যুদ্ধ
করিয়া তাহাদের
গতিরােধ করিবে সকলেরই এই বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও
লেনিন অতি ধীরভাবে বলিয়াছিলেন, “করিবে না।”
তানে’পলে হারা যুদ্ধ করে নাই। কেরেলকির
হাতেই তখন শক্তি ছিল। তিনি তাহাদিগকে যুদ্ধে
নিয়ােজিত করিবার জন্য সকল শক্তি প্রয়ােগ
করিয়াছিলেন এবং বক্তৃতাদ্বারাও যথাসম্ভব চেষ্টা
করিয়াছিলেন। তিনি তাহাদিগকে মিত্রশক্তিদের
সহিত অগ্রসর হইবার জন্য আদেশ করিলেন, কিন্তু
রুশীয় সৈন্য অগ্রসরও হইল না, যুদ্ধও করিল না,
তাহারা ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল, তাহা ছাড়া তাহাদের
গত্যন্তর ছিল না। আজ আর তাহারা সৈন্য নহে,
রুটী ও জমির প্রত্যাশী কৃষক মাত্র। আজ তাহারা বাড়ী
চলিয়াছে। যতদিন না তাহাদিগকে নূতন বৈপ্লবিক
সেনারূপে সংগঠিত করা যায়, ততদিন এই রুশীয়
সৈন্য আবার কখনও যুদ্ধ করিবে না। বৰ্ত্তমান
সেনাদলও যুদ্ধ
করিবে না।
এবারও লেনিনের কথাই ফলবতী হইয়াছিল।
তিনি সংক্ষেপে বলিয়াছিলেন যে জাৰ্মাণগণ অগ্রসর
হইবেই, আর রুশীয় সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রকে
৭০
লেনিনের রাজনৈতিক পারদর্শিতা
বাঁচাইতে হইলে সন্ধি-সৰ্তে অবশ্যই স্বাক্ষর করিতে
হইবে।
ট্রটিস্কি সে সভায় অতি দৃঢ়তার সহিতই বলিয়া-
ছিলেন যে, জাৰ্মাণীতে বিপ্লব ঘনাইয়া আসিতেছে।
কমরেড লেনিন ভুল বুঝিতেছিলেন। জাৰ্মাণ কমরেড
গণ এত নীচ নয় যে তাহারা ব্রেষ্টলীটভস্কের সন্ধি-সৰ্ত্তের
জন্যই যুদ্ধ করিবে। পক্ষান্তরে পােলাণ্ড, লিথুয়ানিয়া
এবং লেটভিয়াই তাহাদের লক্ষ্যস্থল। এগুলি
জাৰ্ম্মণদের নিকট ছাড়িয়া দেওয়া হইবে না, সে সব
দেশের সেনাপতিদিগকে কিছুতেই পরিত্যাগ করা
যাইতে পারে না। বিপ্লবের জন্য তাহাদিগকে হাতে
রাখিতে হইবেই। তদুত্তরে লেনিন বলিয়াছিলেন,
“বৈপ্লবিক বাগাড়ম্বরে আমরা অবশ্যই উত্তেজিত হইব
না।” তবুও ট্রটিস্কি জিদ করিতে থাকে। অগত্যা
লেনিনকে ট্রটিস্কির কথায়ই সম্মতি দিতে হইয়াছিল।
এই সম্পর্কে লেনিন তাহার জনৈক পরিচিতের নিকট
বলিয়াছিলেন, “আমি ট্রটিস্কিকে দেখিতে দিতে চাহি
যে তিনি এই সন্ধি উপেক্ষা করিয়া পারেন কি না।
আমি আরও দেখিতে চাহি যে তিনি আমাদিগকে ইহার
হস্ত হইতে রক্ষা করিতে পারেন কি না। তিনি
লেনিন ও সােভিয়েট
পারিলে, আমার খুবই আনন্দ হইবে। আমি সহকর্মীকে
আমার মনের ভাব জ্ঞাপন করিতে চাহিয়াছিলাম।
যাহাতে তাহারা কিছুদিন পরেও ইহা স্মরণ করিতে
পারেন আমি সেজন্যই তাহাদিগকে ইহা জানিতে দিতে
চাহিয়াছিলাম। আমাকে তাঁহাদের বিশ্বাস বজায়
রাখিতে হইবেই।”
এই ব্যাপারে লেনিন লােকের খুবই অপ্রিয় হইয়া
উঠিলেন। অধিকাংশ সােভিয়েট নেতাই ট্রটিস্কির দিকে
ঝুকিয়া পড়িলেন। লেনিন বলিলেন যে নিখিল রুশীয়
সােভিয়েট মহাসভার চতুর্থ বার্ষিক অধিবেশন মস্কোতেই
সকলে তাহার তীব্র প্রতিবাদ করিয়া
বলিনেন যে তখন রুশিয়ায় সােভিয়েট মহাসভার
অধিবেশন অসম্ভব।
একে রুশিয়া তখন প্রতিনিধি
প্রেরণ করিতে অসমর্থ। তারপর, মস্কোতে—মস্কোর মত
বিপ্লব-বিরােধী সহরে—সসাভিয়েট মহাসভার বৈঠক
বিড়ম্বনা মাত্র।
কিন্তু কাৰ্যতঃ লেনিনের কথাই ফলিতে লাগিল।
চতুর্থ বার্ষিক সােভিয়েট মহাসভার বৈঠকও মস্কোতেই
বসিল, জাৰ্মাণগণও অভিযান করিল, রুশিয়গণও
ব্রেষ্টলিটভস্কের সন্ধি-সর্তেই স্বাক্ষর প্রদান করিল। তখন
হইবে।
৭২
লেনিনের রাজনৈতিক পারদর্শিতা
লেনিনের কত আদর। এবার জনসাধারণ তাহার
রাজনীতি বিচার বুদ্ধিতে সত্য সত্যই মুগ্ধ হইল।
তাহারা সকলেই লেনিনের পতাকা তলে সমবেত
হইল।
১৯১৮ খৃষ্টাব্দে যখন কাইজারের দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী
সম্মিলিত মিত্রশক্তিগুলিকে ফরাসী-সীমান্তে বিধ্বস্ত
করিতেছিল তখন কেহই মনে করিতে পারে নাই যে
জাৰ্মাণীতে আবার বিপ্লবের ঘনঘটা বাজিয়া উঠিবে।
তখনই একদিন লেনিন বলিয়াছিলেন, “এক বৎসরের
ভিতর কাইজারের পতন হইবে। ইহা সুনিশ্চিত।”
বৎসরও অতিবাহিত হইল না, নয়মাস যাইতে না যাইতেই
জাৰ্মাণীতে বিপ্লবের আগুণ জ্বলিয়া উঠিল। কাইজারকে
দেশত্যাগ করিতে হইল। এদিকে প্রশান্ত মহা-
সাগরােপকূলে বিজন সাইবেরিয়ায় আধিপত্য বিস্তার
লাভজনক বলিয়া আমেরিকানদের যে সেদিকে দৃষ্টি
ছিল, তাহাও লেনিনের দৃষ্টি এড়াইতে পারে
নাই। ১৯১৮ সালের জুনমাসে আমেরিকান নাবিকগণ
ব্লাডিভােষ্টকে অবতরণ করিতেছিল। তাহাই তাহার
ভবিষদ্বাণীর সত্যতা সম্বন্ধে জ্বলন্ত প্রমাণ।
তৎকালীন পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করিয়া
৭৩
লেনিন ও সােভিয়েট জগতের ভবিষৎ সম্বন্ধে লেনিন বলিয়াছিলেন, “জগতের ভবিষ্যৎ ? আমি ভবিষ্যৎ বক্ত নহি। কিন্তু যতটা বলিব তাহা সুনিশ্চিত। অভিজাত-তান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি, যেমন ইংলণ্ড, ধীরে ধীরে নির্জীব হইয়া পড়িতেছে। পূৰ্ব্বতনের ধ্বংস অনিবার্য। যুদ্ধের ফলে যে অর্থ- নৈতিক অবস্থা দাড়াইয়াছে, তাহাতে নূতনেরই প্রবর্তন হইবে। মানব জাতির ক্রমবিকাশ সমাজতন্ত্রবাদের দিকেই নিশ্চিতভাবে চলিয়াছে। “কতিপয় বৎসর পূর্বেও বা কে বিশ্বাস করি যে যুক্তরাষ্ট্রের রেলওয়ে জাতীয় সম্পত্তিতে পরিণত হইবে? আর আমরা দেখিয়াছি, তথাকার সাধারণতন্ত্র রাষ্ট্রের সুবিধাজনক ব্যবহারের জন্য সমস্ত খাদ্য ক্রয় করিতেছে।” সকল দেশই যে এরূপ সমাজতন্ত্রবাদের দিকে ধাবিত হইতেছে ও হইবে, ইহাই তাহার কথার মৰ্ম্ম ছিল। তবে সমাজতন্ত্রবাদ ফরাসী ও জাৰ্মাণীতে একবার প্রতিষ্ঠিত হইলে যে অধিকতর কার্যকরী হইবে, এ বিশ্বাস তাঁহার ছিল। ইহার কারণ সম্বন্ধে তিনি বলিয়াছিলেন, “কারণ পাশ্চাত্যে সমাজতন্ত্রবাদ রুশিয়ায় দুর্ঘট, এরূপ অনেক কর্মক্ষেত্র, প্রতিষ্ঠান এবং বুদ্ধির সর্বপ্রকার সাহায্য ও সরঞ্জাম পাইবে।” এত ৭৪ লেনিন ও বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায় বড় তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন লােক জগতে জন্মিয়াছিলেন কিনা সন্দেহ। ইংলণ্ডের বর্তমান কয়লার খনির ধর্মঘট আমরা লেনিনের ভবিষদ্বাণীর প্রতিধ্বনি বলিয়াই গ্রহণ করিতে পারি । লেনিন ও বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায় লেনিন বলশেভিকদের খুবই ভালবাসিতেন। তবে, তাহাদের ভিতর বুদ্ধিজীবিদের সংখ্যা যে নিতান্ত কম ছিল, একথা স্বীকার করিতেও তিনি কুষ্ঠিত হইতেন না। শ্রমিকগণ অবশ্য নিজেরাই নিজেদের ভিতর ট্রেডইউ- নিয়ন-বােধ জাগ্রত করিয়াছিলেন ; তাহাদের চিন্তাধারা কেবল প্রতিষ্ঠান সংগঠন, ধর্মঘট আর আট ঘণ্টা কাজের আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ ছিল। সমাজতন্ত্রবাদ্ধের ভাব তাহারা বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়ের নিকট হইতেই পাইয়া- ছিলেন। লেনিন ও সােভিয়েট গভর্ণমেন্টের যাবতীয় বিশিষ্ট কাৰ্যই বুদ্ধিজীবিদের চিন্তার ফল। সকল ব্যাপারেই লেনিন সুদক্ষ বুদ্ধিজীবিদের পরামর্শ গ্রহণ করিতেন। সামরিক ব্যাপারে তিনি ভূতপূৰ্ব জারের সেনাপতি- গণের মতামত গ্রহণ করিতেও দ্বিধাবােধ করিতেন
লেনিন ও সােভিয়েট
। বৈপ্লবিক ব্যাপারে তিনি যেমন মাক্স মতবাদই
গ্রহণ করিয়াছিলেন, তদ্রুপ অর্থ নৈতিক ব্যাপারে তিনি
আমেরিকার সুপ্রসিদ্ধ টেলারের মতবাদই অনুসরণ
করিতেন। তিনি বড়বড় একাউন্টটেন্ট, ইঞ্জিনিয়ার
এবং যে কোন বিশেষজ্ঞদের খুবই মূল্য দিতেন।
তিনি বিশ্বাস করিতেন যে সােভিয়েটই জগতের আদর্শ
শাসনতন্ত্র হইবে। এবং নিজনিজ দক্ষতার পরিচয়
দিবার বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্র উন্মুক্ত পাইবে বলিয়া সকল
বিশেষজ্ঞই রুশিয়ায় ছুটিয়া আসিবেন।
সােভিয়েট শাসনে অর্থনৈতিক ক্ষমতা প্রধান
শাসকের উপরই ন্যস্ত থাকিত। তাহাকেই রুশিয়ার
অপরিমিত ধনসম্পদ কাৰ্য্যে নিয়ােগ করিতে হইত।
সােভিয়েট শাসনে ইঞ্জিনিয়ার অথবা শ্রমিকদের হস্তে
যে কেবল প্রচুর অর্থই দেওয়া হইত তাহা নহে, কাৰ্য্য
ক্ষিপ্রতার সহিত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করিবার জন্য
তাহারা দলে দলে উৎসাহী কৰ্মীও পাইতেন।
অভিজাততান্ত্রিক আমলে শ্রমিকগণ কখনও প্রাণ
দিয়া কাজ করিত না। তাহারও অনেক কারণ ছিল।
প্রথমত তখন তাহাদের বেতনের হার বৃদ্ধি ছাড়া
অন্য কোনরূপ লাভের মােটেই সম্ভাবনা ছিল না।
৭৬
আমেরিকানদের সম্বন্ধে লেনিনের মত কিন্তু সােভিয়েট শাসনে তাহারা বুঝিল যে তাহাদের কাজের উপরই কারখানার আয়ের মাত্রা নির্ভর করে এবং আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাহাদেরও লভ্যাংশের পরিমাণ বাড়িয়া যাইবে। তাই সােভিয়েট শাসনে ঝগড়া বিবাদ কমিয়া আসিল, শ্ৰমােৎপন্ন দ্রব্যের পরিমাণ বাড়িয়া চলিল। তারপর পরিচালন ক্ষমতা সােভিয়েট বুদ্ধিজীবিদের উপর ন্যস্ত হওয়ায় কারখানার কাৰ্য্য অতি সুচারুরূপে সম্পন্ন হইতে লাগিল। এই বুদ্ধিজীবিদের সম্বন্ধে লেনিন বলিয়াছিলেন যে বিপ্লবের পূর্বাপর সকল অবস্থায়ই তাহাদের স্থান অব্যাহত থাকিবে। তাহারাই আন্দোলন করিয়া বিপ্লব সম্ভব করিয়াছিলেন, আবার তাহারাই বুদ্ধি- কৌশল প্রয়ােগ করিয়া বিপ্লৰ স্থায়ী করিতে পারিয়া- ছিলেন। অর্থভান্ত্রিক ও আমেরিকানদের সম্বন্ধে লেনিনের মতামত বিদেশী অভিজাততান্ত্রিক দেশসমূহ সােভিয়েট- তন্ত্রের বিরােধী ছিল। আমেরিকাও তাহাদেরই একজন। তবুও, লেনিন আমিেরকান ইঞ্জিনিয়ার, ৭৭ লেনিন ও সােভিয়েট কলকজা-নির্মাতা শাসক-সম্প্রদায়কে বিশেষ শ্রদ্ধার চক্ষে দেখিতেন । সােভিয়টতন্ত্রের উন্নতির জন্য, সম্ভব হইলে, তিনি তাহাদের পাঁচ হাজার জনকেও উচ্চ বেতনে নিযুক্ত করিতেন। এবম্বিধ ভাব পােষণের জন্য, অনেকে হয়ত তাঁহার নিন্দাবাদ করিতেও পশ্চাদপদ হইতেন না। নিতান্ত ভুল ধারণার বশবর্তী হইয়াই তাহারা এরূপ করিতেন। যে কোন দেশের অর্থতন্ত্রকেই লেনিন পছন্দ করিতেন না। আমেরিকান অর্থনীতিও তিনি অনিষ্ট- কর বলিয়াই মনে করিতেন। তবুও যে তিনি আমেরিকার বিশেষজ্ঞদের কাৰ্যে লাগাইয়া সােভিয়েট শাসনতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত, সুনিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছল করিতে চাহিয়াছিলেন, তাহার একমাত্র কারণ, তিনি জানিতেন যে আমেরিকা এত দূর দেশ যে কখনও সােভিয়েট শাসনকে হুমকী দেখান বা অর্থতান্ত্রিক ভাব সােভিয়েট ফশিয়ায় প্রচার করা তাহার পক্ষে সম্ভব হইয়া উঠিবে না। তিনি মনে করিতেন, এই দুইটী শাসনতন্ত্রের একটা পরস্পর সম্বন্ধ স্থাপিত হইলে, তাহা উভয়ের পক্ষেই কল্যাণকর হয়। সাম্যবাদ-পরতন্ত্র ও অর্থ- তান্ত্রিক দুইটী বিরুদ্ধ-পন্থী রাষ্ট্রের ভিতর কি প্রকারে ৭৮
আমেরিকানদের সম্বন্ধে লেনিনের মত
কৰ্ম্ম-বিনিময় চলিতে পারে, তৎসম্বন্ধে লেনিনের এই
অভিমত ছিল যে আমেরিকান বৈজ্ঞানিকদের দ্বারা
তিনি রুশিয়ার অপরিমিত জাত দ্রব্যের উন্নতি সাধন
করিবেন; তজ্জন্য প্রয়ােজন হইলে বিদেশীদের নিকট
হইতে উপযুক্ত সূদে টাকা কর্জ করিবেন; এবং অর্থ
দ্বারা ঋণ পরিশােধ সম্ভব না হইলে, রুশিয়াজাত
অপরিমিত শস্য দ্বারাই তাহা পরিশােধ করিবেন। শুধু
ইহাই নহে, প্রয়ােজন হইলে
প্রয়ােজন হইলে তাহারা সম্মত
বিদেশী শক্তির নাগরিকদের নিকট, অবশ্য যদি তাহারা
রুশীয় সােভিয়েটের অত্যাবশ্যক নীতি সমূহ পালন
করিতে স্বীকৃত হন, তবে রুশিয়ার বিস্তীর্ণ বন ও খনি
সমূহ
বিনা করেও দিতে পারিতেন। এমন কি লােলুপ
ইংরাজ, আমেরিকান ও জাপানী অর্থ-তান্ত্রিকদের নিকটও
তাহার প্রয়ােজনবােধে পূর্বতন রুশীয় সাম্রাজ্যের
কোন কোন অংশ ছাড়িয়া দিতে রাজী ছিলেন।
ইতিপূৰ্বেই সােভিয়েটগণ একটী আন্তর্জাতিক
596597 fapt the Great Northern Railways
এর বিস্তীর্ণ রেলপথ নির্মাণের ভার প্রদান করিয়া-
ছিলেন। সেই রেলপথ নির্মাণ পথে রুশিয়ার বিস্তীর্ণ
বন ও বহু অমস্থিত খনিও পড়িয়াছিল। মাত্র ৮০ বৎসরের
লেনিন ও সােভিয়েট
সত্তেই সেই সঘকে এই সব স্থানের অধিকার দেওয়া
হইয়াছিল। সেই সঘের বিশেষ কোনই বাধ্যবাধকতা
ছিল না। তবে তাহাকে সােভিয়েট শাসন-নীতি ও
সেই প্রতিষ্ঠানের উপর সােভিয়েট অনুমােদিত শ্রমিক
প্রাধান্য মান্য করিয়া চলিতে হইত মাত্র। যদিও
ইহা সাম্যবাদ বা সােভিয়েট নীতির মত-পুষ্ট
পন্থা ছিল না, তবুও যে লেনিন-রুশিয়াকে উহার
আশ্রয় লইতে হইয়াছিল, শাসনান্তরিত সময়ের অবস্থা
নুরূপ আবশ্যকতাই উহার একমাত্র কারণ বলিতে
হইবে।
সাম্যবাদ-পরতন্ত্র সােভিয়েট রুশিয়ায় মূলধন
নিয়ােজিত করিয়া অর্থতান্ত্রিকদের প্রাণে ভরসা থাকিতে
পারে না। এরূপ কথার অবতারণা করিয়া একজন
বলিয়াছিলেন যে নিজ নিজ দেশের সশস্ত্র সামরিক
শক্তির পাহাড়া না রাখিয়া কোন অর্থতান্ত্রিকই এরূপ
অবিমৃষ্যতার কাৰ্যে হস্তক্ষেপ করিবেন না। তদুত্তরে
লেনিন বলিয়াছিলেন, “ইহা একেবারেই অনাবশ্যক।
কারণ, সােভিয়েট গভর্ণমেন্ট যাহা নিজেদের মানিয়া
লইতে বাধ্য করিয়াছেন তাহা তাঁহারা বিশ্বস্ততার
সহিতই পালন করিবেন।”
শ্রমিকদের উপর লেনিনের বিশ্বাস
১৯১৯ সালে মস্কোর অর্থনৈতিক পরিষদের বৈঠকে
লেনিন আমেরিকার সহিত অর্থনৈতিক সম্বন্ধ স্থাপনের
বিশেষ পক্ষে ছিলেন এবং তজ্জন্য তিনি ইঞ্জিনিয়ার
কেসিনের বিরুদ্ধে যথেষ্ট লড়িয়াছিলেন। জেসিন
জাৰ্মাণীর সহিত অর্থনৈতিক সম্বন্ধ স্থাপনের বিশেষ
পক্ষপাতী ছিলেন।
শ্রমিকদের উপর লেনিনেৱ অগাধ বিশ্বাস
শ্রমিকগণই বিপ্লবের একমাত্র শক্তি ও উপাদান
বলিয়া লেনিনের তীব্র বিশ্বাস ছিল। জনসাধারণের
ভিতরেই তিনি একটানব সমাজ-সৃষ্টির বনিয়াদ দেখিতে
পাইয়াছিলেন। শ্রমিকদের দৃঢ় সংকল্প, কর্মে আসক্তি,
স্বার্থত্যাগ, কষ্টসহিষ্ণুতা, রাজনৈতিক জ্ঞান এবং
তাহাদের অন্তর্নিহিত সৃজন-শক্তি বাস্তবিকই লেনিনকে
মুগ্ধ করিয়াছিল।
রুশীয় শ্রমিকদের অকৰ্ম্মণ্য, আল-পরত,
মদ্যপায়ী, নিরক্ষর ও আদর্শহীন বলিয়া যাহারা নিন্দা-
বাদ করিতেন, পরে তাহাদেরও সে ভুল ভাঙ্গিয়াছিল।
আমেরিকার Y. M. c. A.এর যে সব শিক্ষিত যুবক
এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান হইতে যে সব চর প্রচারকার্যে
লেনিন ও সােভিয়েট রুশিয়ায় গিয়াছিলেন, রুশীয় জনসাধারণ তাহাদের রাজনৈতিক অজ্ঞতা দেখিয়া অবাক হইয়া যাইতেন। রুশীয় শ্রমিকদের নিকট যাহা ক, খ, গ, সেই সমাজ- তন্ত্রবাদ, অরাজক-তন্ত্রবাদ, ও সমবায়-তন্তুবাদের Socialism, Anarchism and Syndicalism ) ভিতর কি যে পার্থক্য, আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সব উচ্চশিক্ষিত যুবক তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারিতেন । প্রেসিডেন্ট উইলসনের Fourteen Points Speech সম্বন্ধে রুশীয় খমিকগণ অতি বিজ্ঞের মত মতামত প্রকাশ করিতেন। সে সম্বন্ধে তাহারা বলিয়া- ছিলেন, “যতদিন না শাসন ব্যাপার শ্রমিকদের করায়ত্ত্ব হয়, ততদিন প্রেসিডেন্ট উইলসনের মাথায় এই সব আদর্শ থাকিতে পারে; কিন্তু শান্তিসর্তের বৈঠকে উপস্থিত, সেরূপ আদর্শবাদী মিলিবে না।” ব্রিটিশগণ রুশীয় শ্রমিকদের অন্নবস্ত্রের দুর্দশার সুযােগ লইয়া এক চাল চালিতে গিয়াছিলেন, মনে করিয়াছিলেন বাজী মাৎ করিবেন। কিন্তু অতি বুদ্ধিমানের চাল ব্যর্থ হইল। তাঁহারা ভাল ভাল জাম, মদ, ময়দা লইয়া আৰ্চিনজেলে উপস্থিত হইয়া একজনও রুশীয় শ্রমিকদের কর্মসফলতা মনে করিলেন, রুশীয় জনসাধারণ তাহাদের এই অযাচিত সখ্যে ভুলিয়া যাইবে; কিন্তু যখনই তাহারা বুঝিলেন যে ইহার প্রতিদানে রুশ-স্বাধীনতার উপর আঘাত আসিতে পারে, সেদিনই তাঁহারা ফিরিয়া দাড়াইলেন এবং ব্রিটিশদিগকে রুশিয়া হইতোবহিষ্কৃত করিয়া দিলেন। যাবতীয় ব্যাপারে শ্রমিকদের বুদ্ধি ও বিচার- তাৎপৰ্য দেখিয়া, শ্রমিকদের উপর লেনিনের অগাধ বিশ্বাস যে ভ্রমাত্মক নয়, তাহা সকলেই একবাক্যে স্বীকার করিতে লাগিলেন। যাহারা মনে করিয়া- ছিলেন, সােভিয়েট তিনদিনের জন্য, তাহারাও ধীরে ধীরে বুঝিতে লাগিলেন যে, এ তিন দিন নয়, তিন মাস নয়, তিন বৎসর নয়, কত যুগের জন্য জগতে স্থাপিত হইল, কে জানে। রুশীয় শ্রমিক-কৃষকদের অপ্রত্যাশিত কখসকসভা আইনের বাঁধন ছিন্ন করাই সােভিয়েট শাসনতন্ত্রের শক্তির পরিচয় বলিয়া অনেকে বলেন। আর লেনিন বলিতেন, ইহার প্রতিষ্ঠা শ্রমিক-কৃষকদের স্থায়ী কর্ম- সফলতার উপর।
লেনিন ও সোভিয়েট
এই শ্রমিক-কৃষকগণই রুশীয় অর্থনৈতিক জগতে
এক বিপুল পরিবর্তন আনয়ন করিয়াছিলেন। তাঁহার
রাশি রাশি কাপড় ও দিয়াসেলাই প্রস্তুত করিতে
লাগিলেন, নূতন নূতন বৈদ্যুতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা
করিলেন এবং তাহারাই শতশত মাইলব্যাপী রেলপথ
বিস্তার করিয়াছিলেন। শুধু ইহাই নহে, তাহারা
সুনিয়ন্ত্রিত সামরিক শিক্ষা লাভ করিয়া দলে দলে
সেনাদলে ভর্তি হইতে লাগিলেন। কালে শ্রমিক-কৃষক
দলই রুশিয়ার দোর্দণ্ড প্রতাপ লাল-পল্টন-বাহিনী
সংগঠন করিয়াছিলেন। পূৰ্ব্বে যাহারা যুদ্ধ করিতেন
অন্যের জন্য, আজ তাহারাই যুদ্ধ করিতে করিতে বুঝিতে
লাগিলেন যে, নিজেদের এবং জগতের হৃত-সৰ্বস্ব
মজুরদের স্বার্থরক্ষার জন্যই তাহাদের এই যুদ্ধ।
মানুষ স্বাধীন হইলেই তাহার উদ্ভাবনী শক্তি
জাগ্রত হয়। স্বাধীনতার নূতন হাওয়ায় দেখিতে
দেখিতে রুশিয়ায় দশচী নূতন বিশ্ববিদ্যালয়, শত শত
নাট্য-মন্দির, এবং বহু সহস্র লাইব্রেরী ও সাধারণ
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইল।
সােভিয়েটদের নির্মম ধ্বংসলীলা দেখিয়া একদিন
যে ম্যাক্সিম গৰ্কী শিহরিয়া উঠিতেন, একদিন যিনি
প
রুশিয় শ্রমিকদের কর্মসফলতা সােভিয়েটদের পরম শত্রু ছিলেন, আজ আবার সেই ধ্বংসলীলাবসানে তাহাদের সৃজনের বিপুল উদ্যম দেখিয়া, তাহাদের এই সব সত্যিকার কৰ্ম্ম দেখিয়া তিনি মুগ্ধ হইলেন, সাদরে সােভিয়েট নীতিকে নিজ জীবনে বরণ করিয়া লইলেন। তাহারই লেখার অংশবিশেষ, “গত বৎসর রুশীয় শ্রমিকগণ অনুশীলন জগতে যাহা দেখাইয়াছিলেন, ভবিষ্যৎ ঐতিহাসিকগণও তাহার উচ্চ প্রশংসা না করিয়া পারিবেন না।” শতাব্দীর নিষ্পেষিত, নিপীড়িত একটা অতি দরিদ্র জাতিকে লইয়া সােভিয়েটের পত্তন। বিগত যুদ্ধে তাহাদের ২০০০০০ লােক মারা পড়িল। লােক আহত ও অঙ্গহীন হইল এবং লক্ষ লক্ষ লােক বিপন্ন, অসহায়, বধির, মূক ও অন্ধ হইয়া দুর্বিসহ জীবন- ভার বহন করিতেছিল। যুদ্ধের ফলে, দেশের রেলপথ সব চূর্ণীকৃত, খাদ্য-ভাণ্ডার নিঃশেষিত, তদুপরি বিপ্লবের দুর্যোগ আসিয়া অর্থনৈতিক অবস্থা আরও শােচনীয় করিয়া তুলিল। এদিকে ১২০০০০০০ সৈন্যের গৃহে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করিতে হইবে। অগত্যা তাঁহারা ক্ষেতে ফসল ফলাইলেন। তাহাও ভাগ্যে রহিল না। শেকগণ (the Czechs ) জাপানী, ফরাসী, ব্রিটিশ ও র ৮৫
লেনিন ও সােভিয়েট
আমেরিকানদের সহায়তায় সাইবেরিয়ার সকল ক্ষেত
হইতে ফসল কাটিয়া লইলেন। বিপ্লব-বিরােধীরা
আইনের ( Ukrain) শস্য-শ্যামল ক্ষেতগুলি নির্মূল
করিলেন। আর সকলে মিলিয়া বলিতে লাগিলেন, “এবার
ক্ষুধার তাড়নায় এদের জ্ঞানােদয় হইবে।” সােভিয়েট
গণ চোখে পথ দেখিতে পাইতেছিলেন না। আজ তাহা-
দের চতুর্দিকেই বিপদের বিভীষিকা। সােভিয়েট-তন্ত্র
শেষ করিবার জন্য সম্মিলিত শক্তিগুলি উঠিয়া পড়িয়া
লাগিয়াছিল। ভয় প্রদর্শন, ঘুষ, গুপ্তহত্যা কোন পন্থা
অবলম্বন করিতেই তাহারা কসুর করিল না। ব্রিটিশ
চরগণ সােভিয়েটদের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করিবার জন্য
কত রেলওয়ে পুল উড়াইয়া দিল ; ফরাসী দূতগণ কত
ফন্দী আটিল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না।
এই সব বিরুদ্ধ শক্তির সহিত বুঝাপড়া করিয়াই
লেনিন বলিয়াছিলেন, “আমাদের শত্রুরা যেমন শক্তি-
শালী, তেমন তাহাদের সহিত লড়িবার জন্য আমাদের
সুদৃঢ় শ্রমিক-সৈন্যও রহিয়াছে। তাহাদের অধিকাংশের
এখনও সত্য সত্য প্রেরণা আসে নাই, তাই তাহারা
অত কৰ্ম্মঠ নয়। স্পষ্ট কারণ
এই যে, তাহারা
সকলেই রণক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও হৃতশক্তি। বিপ্লব ত এখনও
রুশিয়ার বিপ্লব-সফলতা মাত্র উপর-উপর। এই বিশ্রামের সঙ্গে সঙ্গেই একটা বিপুল মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আসিবে। যদি ইহা কেবল সময় মত আসে, তবেই সােভিয়েট সাধারণ- তন্ত্র পঁচিয়া গেল।” জনসাধারণ যে তাহাদের উদ্দেশ্য, কৰ্ম্ম-শৃঙ্খলা এবং নিজেদের কার্যকরী শক্তির বিষয় বুঝিতে পারিতেছিলেন, ইহাই প্রকৃত বিপ্লব বলিয়া লেনিন মনে করিতেন। প্যারীর সাম্যবাদী বিদ্রোহীদের মাত্র ৭ দিন লড়িতে হইয়াছিল, আর আর এই বিরাট রুশীয় সােভিয়েটকে সম্পূর্ণ নিরাপদ করিতে এক জগত শত্রুর সহিত কত ৭০ ছিল যে লড়িতে হইয়াছিল, তার ঠিক নাই। এই রুশীয় শ্রমিক-কৃষক বাহিনীর বিপুল কর্মশক্তি দেখিয়া লেনিন সময়ে অবাক হইয়া যাইতেন। রুশিল্প বিপ্লব-সফলতা লেনিনকে শুধু রুশীয় শ্রমিক-কৃষকগণই মানিয়া চলিত এমত নহে, জগতের লােক লেনিনের অভ্যুত্থানের সহিত রুশিয়ার দিকে তাকাইয়া রহিল। লেনিন আসিতেই যেন অর্থ-তান্ত্রিকদের উপর বিনা মেঘে বজ্রপাত হইল।
লেনিন ও সােভিয়েট বিগত মহাযুদ্ধের পূর্বে ইহার স্থান, কারণ এবং সময় সম্বন্ধে যখন ভবিষ্যৎ গণনা করিয়া বলা হইয়াছিল, তাহাতে লেনিন সম্পর্কেও কিছু উল্লেখ ছিল,-“আমি ইউরােপ- ব্যাপী অনলশিখা ও রক্তধারা দেখিতেছি। আমি বিপুল রণক্ষেত্রের করুণ আর্তনাদ শ্রবণ করিতেছি। কিন্তু ১৯১৫ খৃষ্টাব্দে উত্তরাঞ্চল হইতে বিশেষ এক ব্যক্তি—এক নূতন নেপােলিয়ন—সে রক্তাক্ত রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করিবেন। তাহার সামরিক শিক্ষা খুব কমই। তবে তিনি সুলেখক বা সংবাদপত্রসেবী, কিন্তু ১৯২৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত ইউরােপের অধিকাংশই তঁাহার কবলে থাকিবে।” পুরােহিতগণ লেনিনকে যিশু-বিরােধী বলিয়া বলিতে লাগিলেন জনগণকে লাল-পল্টনের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করিতে লাগিলেন। তদুত্তরে কৃষকগণ বলিয়াছিলেন, “তিনি যিশু-বিরােধী হইতে পারেন, কিন্তু তিনিই আমাদিগকে জমি ও স্বাধীনতা আনিয়া দিয়াছেন। তবে, কেন আমরা তাঁহার বিরুদ্ধে লড়িব?” রুশিয়ায় কি কি সােভিয়েট শাসন, এক কথায় বর্তমান রুশিয়ার সমস্তই লেনিনের প্রবর্তন। বিপ্লব-বিরােধীদের কথাই এবং বিপ্লব,
রুশিয়ার বিপ্লব-সফলতা •
ইহা সমর্থন করিবে, “লেনিনকে এবং ট্রটিস্কিকে
হত্যা কর, তবেই তােমরা বিপ্লব ও সােভিয়েটকে হত্যা
করিতে পারিবে।”
রুশিয়ার প্রকৃত বিপ্লব উঠিয়াছিল, শত শত
নিপীড়িত নরনারীর ক্ষুব্ধ প্রাণের মর্মন্তুদ বেদনা হইতে।
অর্থনৈতিক চাপই তাহাদের অধিকতর সজাগ
করিয়াছিল। তাহারা শতাব্দীব্যাপী রুশিয়ার প্রান্তরে
হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করিয়াছে, খনিতে দিবারাত্র অশ্রান্ত
কাজ করিয়াছে, আর তৎপরিবর্তে পাইয়াছে কি, না
অর্ধ-অনশন, শীতকষ্ট, দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, তদুপরি
সরকারী কসাই ব্যবহার। তাহারা খুবই সহ
করিয়াছিল, কিন্তু কষ্টেরও একটা সীমা থাকে, তাহাদের
তাহাও ছিল না।
১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে কোটি কোটি নরনারীর ক্ষুব্ধ প্রাণের
ধূমায়িত বিপ্লব-বহ্নি জ্বলিয়া উঠিল। তাহাদের শতাব্দীর
চরণ-শৃঙ্খল খসিয়া পড়িল । দলে দলে সৈন্যদল সে
মহা বিপ্লবে যােগদান করিল, তাহার বিদ্রোহী হইয়া
উঠিল। নগরে, সহরে, পল্লীতে পল্লীতে বিপ্লব ছড়াইয়া
পড়িল, সে বিপ্লবের বিপুলভাবে ১৮ কোটি লােকের
একটা জাতি আগুন হইয়া উঠিল। একটা বিরাট
1
লেনিন ও সােভিয়েট জাতি, যাহাকে চলচ্ছক্তিরহিত বলিয়া সকলে মনে করিত, সে আজ জাগিয়া উঠিল, শত বিঘ্ন তুচ্ছ করিয়া সাম্য-স্বাধীনতার পথে ছুটিয়া চলিল। তাহাদের মত-বাহী নেতাদের নির্দেশানুযায়ী তাহারা কর্তব্যের ভিতর ঝাপাইয়া পড়িল। মত-বিরােধী নেতাদের সসম্ভ্রমে দূরে সরিয়া দাড়াইতে হইয়াছিল। আজ রুশিয়া স্বাধীনতার আলােকে ধনধান্যে হাসিয়া উঠিয়াছে। সাম্যের গানে তার আকাশ বাতাস আজ মুখরিত। আর লেনিনের মত আদর্শ নেতার হাতে পড়িয়া আজ রুশিয়ায় ধনবল, জনবল, যুদ্ধ বল, সকলই নিয়ত বাড়িয়া চলিয়াছে। সত্যই স্বাধীনতা পরশমণি। তার পরশে দেশ স্বদেশ হয়, স্বদেশ স্বর্গ হয়, দেশবাসী ধন্য হয়। সােভিয়েটতন্ত্র ও আমেরিকা একদিন আমেরিকার রেড ক্রশ সােসাইটীর কর্ণেল রবিন্স লেনিনের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছিলেন। কথা প্রসঙ্গে লেনিন আমেরিকার উপর সােভিয়েট- তন্ত্রের প্রভাব সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন, “হইতে পারে আমরা রুশীয় জনসাধারণের অজ্ঞতার জন্য অথবা কোন সােভিয়েটতন্ত্র ও আমেরিকা বিদেশী শক্তি দ্বারা, রুশিয়া হইতে বিতাড়িতে হইতে পারি; কিন্তু রুশীয় বিপ্লবের ভাবে জগতের প্রতি রাজনৈতিক সমাজতান্ত্রিক শাসনতন্ত্র ভাঙ্গিয়া পড়িবে এবং চূর্ণীকৃত হইবে। আমাদের সমাজতান্ত্রিক শাসন- পদ্ধতিই ভবিষ্যতে প্রবলতম হইবে। রাজনৈতিক সমাজতান্ত্রিক শাসন ভবিষ্যতে থাকিবে না। রুশীয় বিপ্লব সর্বত্রই ইহাকে ধ্বংস করিবে।” কর্ণেল রবিন্স প্রতিবাদ করিয়া বলিলেন, “আমাদের সরকার গণতান্ত্রিক। আপনি কি মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এই গণতান্ত্রিক ভাব রুশীয় বিপ্লবের ভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে ?” লেনিন উত্তরে বলিলেন, ‘‘আমেরিকান গভর্নমেন্ট ব্যভিচার-দুষ্ট।” রবিন্স বলিলেন, “তাহা নহে। আমাদের জাতীয় গভর্ণমেন্ট ও স্থানীয় গভর্ণমেন্ট জনগণদ্বারাই নির্বাচিত হয়। অধিকাংশ নির্বাচনই সততার উপর প্রতিষ্ঠিত। ভােটদাতাদের প্রকৃত মনােনয়নের উপরই লােক নিৰ্বাচিত হয়। আমেরিকা গভর্ণমেন্টকে আপনি অর্থকীত গভর্ণমেন্ট বলিয়া বলিতে পারেন না।” উত্তরে লেনিন বলিলেন, “কর্ণেল রবিল, আপনি লেনিন ও সােভিয়েট বুঝিতে পারিতেছেন না, ইহা আমারই দোষ। ব্যভিচার- দুষ্ট শব্দ প্রয়ােগ করা আমার উচিত হয় নাই। আমি মনে করি নাই যে আপনাদের সরকার অর্থ দ্বারা ব্যভিচার-দুষ্ট। চিন্তার খর্বতার জন্যই আমি ইহাকে দোষ-যুক্ত মনে করি। অতীত রাজনৈতিক যুগের রাজনৈতিক চিন্তা লইয়াই ইহা বঁচিয়া আছে। আজও ইহা Thomas Jafferson এর যুগেই রহিয়াছে। বর্তমান অর্থনৈতিক যুগে ইহার প্রাণের স্পন্দন নাই। বুদ্ধিনৈতিক পূর্ণতায় ইহার অভাব আছে। কেমন করিয়া আপনাকে ইহা স্পষ্ট করিয়া দেখাইব ? “আপনাদের নিউইয়র্ক ও পেনসিলভেনিয়া রাষ্ট্র দুইটিই ধরুণ। নিউইয়র্ক আপনাদের ব্যাঙ্কিংএর কেন্দ্র। আর পেনসিলভেনিয়া আপনাদের লৌহ শিল্পের কেন্দ্র। ব্যাঙ্কিং ও লৌহ দুই-ই আপনাদের অতি প্রয়ােজনীয়। ইহারাই আপনাদের জীবনের তিত্তি। আপনারা আজ যাহা হইয়াছেন, তাহা ইহাদেরই জন্য। যদি আপনার ব্যাঙ্কিংএ সত্য সত্যই বিশ্বাস করেন এবং ইহাকে শ্রদ্ধা করেন, তবে কেন আপনারা মিষ্টার মর্গানকে যুক্তরাষ্ট্র পরিষদে পাঠান না? আর যদি বর্তমানের লৌ শিল্পেই আপনাদের সত্য
সােভিয়েটতন্ত্র ও আমেরিকা
সত্য বিশ্বাস থাকিয়া থাকে, তবে কেন আপনারা মিঃ
সবকে (Mr. Schwab) তথায় পাঠান না? তবে কেন
আপনারা সেই সব ব্যাঙ্কিং-অনভিজ্ঞ ও ততােধিক লৌহ
শিল্প-অনভিজ্ঞদের—যাহারা ব্যাঙ্কার এবং লৌহকারদের
পােষণ করে মাত্র অথচ তাহাদের হইতে নিজেদের
স্বাধীন বলিয়া ভান করে-তাহাদিগকে পাঠান ? ইহা
দক্ষতা বা আন্তরিকতার পরিচায়ক নহে।
শাসন যে আর শুধু রাজনৈতিক নহে, ইহা মানিয়া লইতে
আপনারা নারাজ। তজ্জন্যই বলি যে আপনাদের
শাসনতন্ত্রে পূর্ণতার অভাব আছে। তাই আমাদের
শাসনতন্ত্র আপনাদের হইতে ভাল। তজ্জন্যই ইহা
আপনাদেরটা ধ্বংস করিবে।”
কথা প্রসঙ্গে রুশীয় নির্বাচনের বিশিষ্টতা দেখায়
লেনিন বলিলেন, “বাকু জিলা, তৈলের দেশ। তৈলের
জন্যই বাকু। তথায় তৈলেরই প্রভুত্ব। আমাদের বকু-
প্রতিনিধি তৈল শিল্প হইতে নির্বাচিত হইবেন। তাহারা
তৈল কারখানার শ্রমিকগণ দ্বারাই নিৰ্বাচিত হইনে।
আপনি বলিবেন, শ্রমিক কাহারা? আমি বলিব,
যাহারা পরিচালনা করে, যাহারা কর্মকর্তার আদেশ
মান্য করে, সুপারিন্টেণ্ডেন্ট, ইঞ্জিনিয়ার, মিস্ত্রী এবং
লেনিন ও সােভিয়েট কায়িক শ্রমিকগণ -সকল লােকই যাহারা প্রকৃত উৎপাদন কাৰ্য্যে সত্য সত্য মস্তিষ্ক কি হস্ত খাটাইয়া থাকেন—তাহারাই শ্রমিক। যে সব লােক এরূপ কর্মে নিযুক্ত নহে—যাহারা তৈল শিল্পে শ্রম করে না, কিন্তু শুধু বাজার দেখিয়া, এককালীন অর্থ নিয়ােগ করিয়া অথবা দৈহিক শ্রমের পরিবর্তে শুধু অর্থ দিয়া শ্ৰম হইতে দূরে থাকিতে চেষ্টা করে, তাহারা শ্রমিক নহে। তাহারা তৈল সম্বন্ধে কিছু জানিতে পারে অথবা নাও পারে। সাধারণত তাহারা জানে না। কোথাও তাহারা তৈল উৎপাদনে কাৰ্যতঃ নিযুক্ত নাই। আমাদের সাধারণ- তন্ত্র উৎপাদনকারীদের সাধারণ-তন্ত্র। “আপনি হয়ত বলিবেন যে, আপনাদের সাধারণ- তন্ত্র নাগরিকদের সাধারণতন্ত্র। বেশ ভাল। আমি বলি, উৎপাদনকারী হিসাবে মানুষ, নাগরিক হিসাবে মানুষের অপেক্ষা অধিকতর কাজের। আপনাদের তৈলের জিলাগুলির শ্রেষ্ট নাগরিকগণ—তাহারা কাহারা ? তাহারা কি তৈলের লােক (oil men) নহে? তৈলের দিক দিয়া বাকুকেই আমরা প্রতিনিধি নির্বাচন করিব। “সেই রকম ডনেটেজ কয়লার প্রদেশকেই আমরা সােভিয়েটতন্ত্র ও আমেরিকা কয়লার প্রতিনিধি নির্বাচন করিব। ডনেটেজের প্রতিনিধিগণই কয়লা-শিল্পের প্রতিনিধি হইবে। সেইরূপ পল্লী-বহুল জিলার প্রতিনিধিগণই শস্যোৎ- পাদনকারী কৃষকদের মনােনীত প্রতিনিধি হইবে। পল্লীবহুল জিলার প্রকৃত স্বার্থ কি ? গােলা বােঝাই নহে। টাকা লাগান নহে। ইহা কৃষি। আমাদের পল্লী-বহুল জিলা হইতে কৃষির জন্য বলিতে কৃষক- সােভিয়েট, কৃষির্ধারা মনােনীত প্রতিনিধিই প্রেরণ করিবে। “আমাদের এই শাসন প্রণালী আপনাদের হইতে দৃঢ়তর। কারণ, ইহার বাস্তবের সহিত মিল আছে। ইহা লােকের দৈনন্দিন শ্রম-মূল্য নির্ধারণের পথগুলি খুজিয়া বাহির করে এবং সেই সব পথের সন্ধানদ্বারাই ইহা রাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক শাসন সৃষ্টি করে। আমাদের সরকার হইবে অর্থনৈতিক যুগের এক অর্থনৈতিক সমাজতান্ত্রিক শাসন। ইহাই বিজয়ী হইবে, কারণ ইহা বর্তমান যুগের ভাবকে ব্যক্ত করে, মুক্ত করে ও ব্যবহার করে। “কর্ণেল রবিল, আমরা; ভবিষ্যতের দিকে খুবই বিশ্বাসের সহিত চাহিয়া আছি। আপনারা রুশিয়ায়
লেনিন ও সােভিয়েট
আমাদিগকে ধ্বংস করিতে পারেন। আপনারা কুশিয়ায়
রুশীয় বিপ্লবকে ধ্বংস করিতে পারেন। আপনারা
আমাকে বিতাড়িত করিতে পারেন। ইহাতে কিছুই
আসে যায় না। শতবর্ষ পূৰ্বে ব্রিটেন, প্রাশিয়া, অষ্ট্রিয়া
ও রুশিয়ার রাজতন্ত্র বৈপ্লবিক ফরাসী গভর্নমেন্টকে
বিতাড়িত করিয়াছিলেন, তাহারা প্যারীতে রাজশক্তির
পুনঃ প্রতিষ্ঠা করিলেন; কিন্তু ১৭৮৯ খ্ৰীষ্টাব্দে ফরাসী
বিপ্লবীদের দ্বারা প্যারীতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে যে
রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সূচনা হইয়াছিল,
তাহা তাহারা রুদ্ধ করিতে পারে নাই, বা রুদ্ধ
করে নাই। তাহারা এই
Feudalismকে রক্ষা
করিতে পারে নাই।
“ফরাসী বিপ্লবের ফলে যে রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক
সমাজতান্ত্রিক (Political Democratic Social)
শাসনের প্রতিষ্ঠা হয়, তদ্বারা ইউরােপের সামন্ত
আভিজাতিক (Feudal Aristocratic) সমাজতান্ত্রিক
শাসন ধ্বংস হইতে বসিয়াছিল। আজ জগতের প্রতি
রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক শাসনপদ্ধতিই
রুশীয় বিপ্লবের ফলে অর্থনৈতিক উৎপাদনকারীদের যে
সমাজতান্ত্রিক শাসন (Economic Producers Social
সােভিয়েটতন্ত্র ও আমেরিকা Control) প্রবর্তিত হইয়াছে, তদ্বারা ধ্বংস হইতে চলিয়াছে। “কর্ণেল রবিন্স, আপনি ইহা বিশ্বাস করেন না। আপনাকে বিশ্বাস করাইবার জন্য আমাকে প্রকৃত ঘটনার জন্য অপেক্ষা করিতে হইবে। আপনি হয়ত দেখিবেন বিদেশীর দল সঙ্গীন লইয়া রুশিয়ার ভিতর অভিযান করিয়াছে। আপনি হয়ত দেখিনে সােভিয়েট ও সােভিয়েট নেতাগণ সকলেই হত। আপনি হয়ত দেখিবেন রুশিয়া পূর্বের মতই ঘনতমসাচ্ছন্ন। কিন্তু সেই আধার হইতেই বিদ্যুৎ রেখা ফুরিত হইয়া সৰ্ব্ব- স্থানের রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে ধ্বংস করিয়াছে। দৈহিক আঘাতে নহে, ভবিষ্যৎ প্রকাশের একটা আলােক- রেখাদ্বারাই ইহা ইহাকে ধ্বংস করিয়াছে।” লেনিনের কর্মপদ্ধতি রুশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াই লেনিন নিখিল রুশীয় সােভিয়েট মহাসভায় জ্ঞাপন করিলেন যে, কৃষকদের মনােভাৱের প্রতি শ্রদ্ধা রাখিয়াই তাহাকে জমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করিতে হইবে। কিন্তু কয়েক মাস অতিবাহিত হইল, তখনও সকল প্রতিষ্ঠানাদির দ্রুত
লেনিন ও সােভিয়েট
জাতীয়করণ সম্ভব হইল না দেখিয়া, কেহ কেহ
তাঁহার তীব্র সমালােচনা করিল। তখন লেনিন তাহা-
দিগকে বলিয়াছিলেম,
“আমি বিপ্লবকে বিপ্লব বই কিছু করিতে পারি না।
কয়েক মাস পূর্বে আমাদের কাৰ্য ছিল, বিপ্লব আনয়ন
করা ; আর আজ আমাদিগকে সেই বিপ্লব কাৰ্য্যে
লাগাইতে হইবে। তখন মূ-নীতি ছিল, “সােভিয়েটকে
সকল
দাত্ত।” আর আজ, “শ্রমিক
শৃঙ্খলা।”
লেনিন চাহিয়াছিলেন যাহারা কোনরূপ কাজ
করিতেছিল না, তাহাদিগ :; কাজ করিতে হইবে।
তজ্জন্য তিনি সােভিয়েট য়ার কারখানার উৎপন্ন
দ্রব্যের পরিমাণ বৃদ্ধির এই স বিদেশীয় বিশেষজ্ঞদের
উচ্চবেতনে নিয়ােগ করিবার পক্ষপাতী ছিলেন।
এম-শৃঙ্খলা সুনিয়ন্ত্রিত করিবার পক্ষে একবার
তিনি বলিয়াছিলেন, “আমাকে এমন করিতে হইবে
যাহাতে রুশিয়ার আবশ্যক দ্রব্য উৎপন্ন করিবার জন্য
অধিক সংখ্যক লোেককে দৈনন্দিন অধিকতর ঘণ্টা অতি
দ্রুতভাবে কার্য করিতে হইবে।” অবশ্য তিনি
রুশবাসীর মতই কথাটী বলিয়াছিলেন।
।
লেনিনের কর্মপদ্ধতি।
একদিন জনৈক আমেরিকান ব্যবসায়ী আসিয়া
জানাইলেন যে লেনিনের সােভিয়েট শাসনে তাহার
কারখানায় উৎপন্ন দ্রব্য শতকরা ১০ হইতে ২০ ভাগ
বাড়িয়াছে সত্য, কিন্তু শ্ৰমিক-শাসন এবার কারখানা
ছাড়াইয়া ক্রয়-বিক্রয়, এমন কি, অফিস সংক্রান্ত
ব্যাপারেও ছড়াইয়া পড়িতেছে। ইহাতে সকলই নষ্ট
হওয়ার সম্ভাবনা। বিষয়টী লেনিনের কর্ণগােচর হইলে
তিনি যে সব আমেরিকান রুশিয়ায় থাকিয়া কারখানা
চালাইতেছিলেন, তাহাদেৱ অফিস সংক্রান্ত ব্যাপারে
শ্রমিকগণ হস্তক্ষেপ করবেন না বলিয়া আশ্বাস
দিলেন। এই ভাবেই তিঙ্গি রুশীয়দিগকে আমেরিকান
ব্যবসায়ীদের কার্যপ্রণালী শিক্ষা করিবার সুযােগ
দিয়াছিলেন।
কিছু দিন পরে রলিন্স তাহার পরিচিত সেই
আমেরিকান ব্যবসায়ীর নিকট অনুসন্ধান করিয়া
জানিলেন যে তাহার ব্যবসা বেশ ভালই চলিতেছিল।
তখন কথা প্রসঙ্গে তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন,
“রুশিয়ায় থাকুন। লাগিয়া থাকুন। রুশিয়ায়
বিপ্লব আসিয়াছে। লেনিন ইহা করেন নাই। তিনি
ইহা পরিচালিত করিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি ইহা করেন
s
লেনিন ও সােভিয়েট নাই। তথাপি তিনিই ইহা পরিচালিত করিতেছেন। প্রতিনিয়ত তিনি ইহাকে যথাসম্ভব বাস্তবতার দিকে পরিচালিত করিতেছেন, যাহাতে জীবজগতে সকলেরই জীবিকার্জনের বিধান হয়। আজ কাল তিনি ফ্যাক্টরী ম্যানেজারের জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং উপদেষ্টাদের আনয়ন করিতেছেন। তজ্জন্য তিনি আজ অন্যান্য রাষ্ট্রের সহিত সন্ধি করিতে ইচ্ছুক, এবং অভিজাত- প্রধান সরকারদের সহিত বিশেষতঃ আমেরিকার সহিত, সন্ধি করিতে চেষ্টা করিয়াছেন! তাহাদিগকে পাইবার জন্য তিনি আমাদের আনে?কান ব্যবসায়ীদের সহিত যেমন একটা মীমাংসা করিয়াছেন, তেমন তাহাদের সহিত করিতেও রাজী আছেন। আজ যদি আমরা তাহার সহিত বিচ্ছেদ ঘটাই তবে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের সহিত সােভিয়েট সরকারের মিলন স্থাপন করা তাহার পক্ষে বিশেষ কষ্টকর হইবে। আর আজ যদি আমরা রুশিয়া পরিত্যাগ করিয়া একেবারে চলিয়া যাই, তবে তিনি মীমাংসা করিয়া যেখান হইতে সম্ভব সেখান হইতেই ফাক্টরী ম্যানেজারদের আনয়ন করিবেন এবং তাহা অতি সহজে ও অতি শী জাৰ্মাণী হইতেই সম্ভব হইবে । লেনিনের সহিত ১০০
আইন রক্ষণে লেনিন
বুঝাপড়া করা
মানে, জাৰ্মাণদের মতে চাল
চালা।”
জগতের লােক মনে করিত, লেনিন বুঝি ধ্বংসের
একটা মূর্তিমান বিগ্রহ ; কিন্তু তাহার রুশীয় জাতীয়তার
বনিয়াদ সৃষ্টির কৰ্ম্মপ্রাণালী দেখিয়া মানুষ মাত্রই
বিস্মিত হইত। পরবিদ্যা শিক্ষা করিবার জন্য প্রয়ােজন
হইলে কতটা দীনতা স্বীকার করিয়া আত্মকর্মসিদ্ধি
করিতে হয়, লেনিনের কৰ্ম্ম-ধারায় তাহা বিশেষভাবে
ফুটিয়া উঠিয়াছে। বিষয়টী দেশহিতৈষী মাত্রেরই
প্রণিধানযােগ্য।
আইনও শৃঙ্খলা বক্ষণে লেনিন
১৯১৮ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে লেনিনের সম্মুখে
দুইটী উদ্দেশ্য ছিল—কাজ ও শৃঙ্খলা।
এপ্রিলের
মাঝামাঝি রবিন্স লেনিনের সহিত সাক্ষাৎ করিতে
গেলেন, এবং তাহাকে জানাইলেন যে ১লা মে-র
শােভাযাত্রা বন্ধ রাখাই সঙ্গত; তাহাতে অনর্থক
অর্থব্যয় মাত্র। এদিকে রুশিয়া তখন ক্ষুধার তাড়নায়
অস্থির, তদুপরি গােলাগুলি চলিতে পারে, খুনেরও
যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।
লেনিন ও সােভিয়েট
লেনিন তাহার উপর বিস্মিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া
বলিলেন যে “মে দিন” তাহাদিগকে অবশ্যই পালন
করিতে হইবে। বিগত প্রতিবৎসর তাহারা আসন্ন
বিপ্লবের সম্মানের জন্য শশাভাযাত্রা করিয়াছেন, আর
এবার এই সিদ্ধ বিপ্লবের সম্মানার্থে অবশ্যই তাহারা
মে-র প্রথম দিবসে সর্বপ্রথম শােভাযাত্রা বাহির
করিবেন। হয়ত অনেকের পায়ে জুতা নাও থাকিতে
পারে, তবুও তাহারা অভিযান করিবেনই।
কিছুদিন পরে রবিন্স পুনরায় লেনিনের নিকট
গমন করিলেন এবং তাহাকে জানাইলেন যে শােভাযাত্রা
অনর্থক অনর্থ সৃষ্টি করিবে। তাঁহার পরিচিত কতিপয়
লােক একটা বাড়ীর ভিতর পরপর সাতটা
শববাহী বাক্স প্রবেশ করিতে দেখিয়াছিল কিন্তু পরে
তাহারা অনুসন্ধান করিয়া জানিল যে সেইগুলি
শববাহী বাক্স নহে, সেইগুলি কলের কামান ।
লেনিন তখনই এক টুকরা কাগজ লইয়া কি
লিখিলেন, রবিন্স মনে করিলেন, তিনি হয়ত সেই সব
কামান ধরিয়া বাজেয়াপ্ত করিবার অর্ডার দিলেন।
ব্যাপার কিন্তু আরও বেশী দূর গড়াইল।
৩০শে এপ্রিল শােভাভা যাইবার রাস্তার উভয়
আইন রক্ষণে লেনিন
পাশ্বের সকল গৃহের দরজা জানালা বন্ধ করিয়া, সিল
মােহর করিয়া দিয়া একদল লােক চলিয়া গেল। প্রতি
গৃহস্বামীর নিকট বিজ্ঞাপন দেওয়া হইল যে যদি কেহ
কোন গৃহ হইতে শশাভাযাত্রার জনতার উপর গুলি
নিক্ষেপ করে, তবে সেই গৃহের সকল লােককে গ্রেপ্তার
করিয়া বিচারার্থ প্রেরণ করা হইবে।
পরদিন ৪২০০০ হাজার বিপ্লবপন্থী ও জনসাধারণ
একযােগে সহরের নয় মাইল পথ শশাভাযাত্রা করিয়া
আসিল। একটীও গুলি ছুটিল না, একটীও নরনারী
আহত হইল না।
সেদিন ছিল ছুটি।
ছুটি। একেবারে কর্ম বিরাম।
সকলেই উৎসব-কোলাহলে মাতােয়ারা। লেনিন
কিন্তু নিষ্কৰ্ম্মা থাকিতে পারেন নাই।
মস্কোর সর্বত্রই
সেদিন অর্থতান্ত্রিকদের বিতাড়নের আনন্দ-রােল শ্রুত
হইতেছিল। আমেরিকান
রেশ সােসাইটীর
কমাণ্ডান্ট কর্ণেল রবিন্স ত্যক্ষ করিলেন, লেনিনের
এম-শৃঙ্খলা কি সুন্দর। ই ভাবেই লেনিন তাঁহার
অর্থনৈতিক সমাজতান্ত্রিক শাসন-পরিচালিত রাষ্ট্রের
যাবতীয় ব্যাপারে শৃঙ্খলা
ও করিয়া চলিতেন।
লেনিন ও সােভিয়েট
লেনিনের নাম প্রভাব
সােভিয়েট শক্তির
মূলে
লেনিনের নামের প্রভাব
যথেষ্টই কাৰ্য করিত। কর্ণেল রবিন্স রুশিয়া পরিত্যাগ
পথে মস্কো হইতে সুদূর ব্লাডিভষ্টক পৰ্যন্ত লেনিনের
হাতের লেখা শুধু একখানি পত্র লইয়া যেরূপ নিরাপদে
পথপৰ্যটন করিয়াছিলেন, তাহা হইতেই লেনিনের
নাম লােক মনের উপর কতটা প্রভাব বিস্তার
করিয়াছিল, সহজে অনুমান করা যায়।
রবিন্সের পথযাত্রা কি ভাবে সুসম্পন্ন হইল তাহাই
দেখিবার বিষয়। ১৯১৮ খৃষ্টাব্দের ১৪ই মে রবিন্স মস্কো
হইতে ব্লাড়িতষ্টকের পথে আমেরিকা যাত্রা করিলেন।
তাহার সঙ্গে ছিল, একখানি বলশেভিক ছাড়-পত্র,
পাঁচটী বন্দুক ও ১৫০ টী গুলি।' বন্দুক ও গুলি ছিল
সােভিয়েট ‘ভির্ণমেন্টের। এসব সঙ্গে লইবার জন্য
তাহাকে এখানি বিশেষ অনুমতি পত্র সঙ্গে লইতে
হইয়াছিল। ব্লাডিভষ্টকের পথে প্রত্যাবর্তনের কথা
শুনিয়া তাহার সকল বন্ধুই বিস্মিত হইলেন। তঁাহারা
সাইবেরিয়া পথের কত বিভীষিকার কথা বলিলেন।
তৎসত্ত্বেও তিনি সেই পথেই যাত্রা
করিলেন ।
কেরেলকি ভর্ণমেন্টের আমল হইতে বলশেভিক,
। লেনিনের নাম প্রভাব গভর্ণমেন্টের শাসনে সাইবেরিয়ায় যথেষ্ট রেল- বস্তার হইয়াছিল। তাই তাহাকে ব্লডিভষ্টক পেঁছিতে অধিক কালক্ষেপন করিতে হইল না। রাস্তায় প্রায় প্রতিষ্টেশনেই খাবার মিলিত। স্থানীয় গভর্ণমে গুলি কেহই লেনিনের বিরূদ্ধে মাথা তুলিত না। কেবলকি গভর্ণমেন্টের আমলে অবশ্য এরূপ ছিল না ১৯১৭ খৃষ্টাব্দে রবিন্স এই পথেই রুশিয়ায় আসিয়াছিলেন। তখন সাইবেরিয়ার ভিতর তাহাকে কত বিপদেরই না সম্মুখীন হইতে হইয়াছিল । চীটার স্থানীয় গভর্নমেন্ট তাহার পথরােধ পথরােধ করিয়াছিল। ক্রাসনয়ারস্কের ভিতর দিয়া পলায়ন করিয়া তাহাকে সে যাত্রা অব্যাহতি পাইতে হইয়াছিল। কিন্তু ১৯১৮ খৃষ্টাব্দে সেই পথে কেহই তঁাহার পথরােধ করিল না, জিনিষ পত্রাদি অনুসন্ধান করিল না, কোনই উচ্চ- বাচ্য করিল না , কারণ সেবার তাহার সঙ্গে ছিল- লেনিনের স্বাক্ষরিত একখানি পত্র। তাহাতে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করিয়াছিলেন যে স্থানীয় গভর্ণমে টগুলি যেন কর্ণেল রবিন্সকে পর্যটন সম্পর্কে যথাসম্ভব সাহায্য করেন। প্রতি স্থানীয় গভর্ণমেন্টের সীমান্ত-সহরে সৈন্য .
লেনিন ও সােভিয়েট মােতায়ন ছিল। তাহারা যাত্রীকে অস্ত্র শস্ত্রাদি সঙ্গে লইতে দিত না। কিন্তু রবিন্সের সঙ্গে পাঁচ পাঁচটা বন্দুক ছিল। অবশ্য তাহার একটা ও ব্যবহার করিতে হয় নাই। ব্লাডিভষ্টকে সর্বশেষ সরকারে নিকট তিনি বন্দুক পাঁচটী সমৰ্পণ করিলেন। রাস্তায় কোন সরকারই তাহার বাধা উৎপাদন করিল না। লেনিনের স্বাক্ষরিত চিঠি পডিয়া সকলেই তাহাকে ধন্যবাদ প্রদান করিয়া সসম্মানে বিদায় দিলেন। ইহা লেনিনের নাম প্রভাবই বলিতে হইবে। মস্কো হইতে চারি সহস্র মাইল দূরবর্তী অঞ্চলের সােভিয়েট শাসনকর্তারা লেনিন নামটীর এতই সম্মান করিতেন । বিপ্লব, সােভিয়েট ভাব ও সােভিয়েট শাসন প্রণালীর প্রভাবেই এসব সম্ভব হইয়াছিল। সাইবেরিয়া তখন ছিল বলশেভিক শাসনে। আর আজিকার সাইবেরিয়ার শেভিক-বিরােধী শাসক কলকচ, সাইবেরিয়াবাসীর মােটেই সম্মান পান না। একটী দিনও তিনি সাইবেরিয়ার রেলপথ বিদেশী মিত্র শক্তিদের সৈন্য-সাহায' ব্যতিরেকে লুণ্ঠনপ্রিয়দের হস্ত হইতে রক্ষা করিতে । রেন না। আর ১৯১৮ টাকা ন মাল লেলি, ন, এখানি চিঠি সাই- লেনিনের মতামত বেরিয়ার এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পৰ্যন্ত একজনের নিরাপদ ভ্রমণের পক্ষে যথেষ্ট ছিল। ইংলণ্ডে বিপ্লব সম্ভাবনা সম্বন্ধে লেনিনের মতামত রুশিয়ায় বিপ্লব সফল হইয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে ইংলণ্ডেও বিপ্লব ঘনাইয়া উঠিবে বলিয়া লেনিনের পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। তিনি মনে করিয়াছিলেন, ১৯১৯ খৃষ্টাব্দে জগতের সর্বত্র বিপ্লব সংক্রামিত হইয়া পড়িবে ; এবং যদি আবশ্যক হয়, সােভিয়েট-রুশিয়াকে বিপ্লব- বিরােধী রক্ষণশীলদের প্রধান কেন্দ্র ইংলণ্ডের বিরুদ্ধেও হয়ত দাড়াইতে হইতে পারে; কিন্তু ইংলণ্ডের ধৰ্ম্ম- ঘটের কথা শুনিয়া ইংলণ্ড সম্বন্ধে লেনিনের সে ধারণার কথঞ্চিৎ পরিবর্তন হইয়াছিল। ইংলণ্ডের চিরন্তন মিটমাট পদ্ধতিই কল্যাণকর সংবাদপত্রসেবী মিষ্টার র্যানসমের মুখে একথা শুনিয়া লেনিন বলিয়াছিলেন, “ইহা সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু যদিও রামসে ম্যাকডােনাল্ড শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করিয়া দেখিতে পারেন, তবুও আপনারা বিপ্লবের আগমন বন্ধ করিতে পারিবেন না। ধৰ্মঘট মার সােভিয়েট—এই দুইল
লেনিন ও সােভিয়েট
যদি একবার তাহাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে তবে
কিছুই শ্রমিকদিগকে ইহা হইতে বিরত করিতে পারিবে
। সােভিয়েট শাসনতন্ত্র একবার আরম্ভ হইল,
আজ না হয় দুইদিন পরে, অবশ্যই ইহা প্রবলতম হয়া
উঠিবে।”
“কিন্তু ইহার জন্য ইংলণ্ডে খুবই বেগ পাইতে হই।
যতদিন না শ্রমিকগণ আপনাদের বড় বড় মধ্যা ও
সম্প্রদায়কে বিধ্বস্ত করিয়া ফেলিবে, ততদিন তাই রা
বাধা প্রদান করিবেই।” সােভিয়েট প্রভাব সহ ন্ধ
তিনি ইহাও বলিয়াছিলেন, “প্রথমে আমি মনে করি ।
ছিলাম, সােভিয়েট শাসন ঠিক রুশীয় আকারে এল
এবং থাকিবেও। কিন্তু এখন সুস্পষ্ট দেখা যাইতেছে
যে ইহা সর্বত্রই বিভিন্ন নামে বিপ্লবের যন্ত্ররূপে বৰ্ত্তমান
থাকিবে।”
জাৰ্মাণী রুশিয়ার সংলগ্ন দেশ। ইংলণ্ডের মত
তাহাদেরও বিপ্লব-সংক্রামণ আশঙ্কা ও সােভিয়েট-ভীতি
কম ছিল না। তাহাদের যথেষ্ট শক্তি ছিল, তাহার।
রুশিয়াকে বিধ্বস্ত করিতে পারিত। সম্মিলিত শক্তিগণও
আবশ্যক হইলে জাৰ্ম্মাণদের সহিত সন্ধি করিয়া
এক যােগে সােভিয়েটর ধ্বংস সাধন করিতে পারিত।
তৃতীয় বৈঠক
কিন্তু দারুণ বিপ্লব-সংক্রামণ আশঙ্কাই তাহাদিগকে
সে কাৰ্য্য হইতে বিরত করিয়াছিল। ভাব-প্রচার কত
শক্তিশালী, রুশিয়াকে দেখিয়া, ইউরােপ তাহা টের
পাইয়াছিল।
তৃতীয় আন্তজাতিক বৈক
ক্রেমলিন প্রাসাদের পুবাতন বিচার গৃহের এক
প্রকোষ্ঠে ৩রা মার্চ তৃতীয় আন্তর্জাতিক সভার অধিবেশন
হইল। লাল-পল্টনের (The Real Army) দুইজন দক্ষ
সৈন্য দ্বার রক্ষা করিতেছিল। সমস্ত প্রকোষ্ঠ, এমন কি
তার মেঝে ও রক্ত বর্ণে রঞ্জি ছিল। সর্বত্র গর্বভরে
সােভিয়েট পতাকা উড়তেছিল,---তাহাতে জ্বলন্ত
অক্ষরে লেখা ছিল,“তৃতীয় অতর্জাতিক দীর্ঘজীবি হউক”
(Long Live The Third Internationl ), od
রক্ত ।স্ত্রাবৃত দীর্ঘ টেবিলের এক পার্শে লেনিন উপবিষ্ট
ছি, নি। তঁাহার দক্ষিণ দিকে বসিয়াছিলেন, জনৈক
তরুণ জাৰ্ম্মাণ স্পার্টাসিষ্ট অলব্রেক্ট, আর বামপার্শ্বে
বুসিয়াছিলেন, সুইজারলণ্ডের প্লেটেন। সকল দিকেই
চেয় র সাজান ছিল, বক্তৃ-মঞ্চের দিকে সে সব
ক্রঃ নগ্ন হইয়া আসিয়াছিল। প্রথম চার পাঁচ শ্রেণীর
লেনিন ও সােভিয়েট
সম্মুখে লিখিবার জন্য ছােট ঘােট টেবিল রক্ষিত
হইয়াছিল। বিশেষজ্ঞ সকলেই উপস্থিত ছিলেন।
ট্রটিস্কিকে খুবই সুন্দর দেখাইতেছিল। তাহার
পরিধানে ছিল, চর্মের কোট, পায়ে সৈনিকের মােজা,
শিরে সীমান্ত প্রদেশের লাল-পল্টনদের শিরস্ত্রাণ।
যাহারা তাহাকে সমর বিরােধী বলিয়া মনে করিতেন,
ট্রটিস্কির এই বেশ-ভূষা দেখিয়া, অবশ্যই তাহাদের সে
ধারণা দূরীভূত হইয়াছিল। লেনিন ধীরভাবে বসিয়া
সবই শুনিতে ছিলেন, এবং যখনই আবশ্যক হইত তখনই
তিনি ইউরােপীয় যে কোন ভাষায় অনর্গল বক্তৃতা
দিতেছিলেন। বলবেনােভা ইতালী সম্বন্ধে বলিলেন।
পুনৰ্ব্বার সােভিয়েট রুশিয়ার গােপন বৈঠকে বসিবার
এই সুযােগকে তিনি পরম সৌভাগ্য বলিয়া মনে
করিয়াছিলেন।
৬ই মার্চ রীতিমত সঙ্গীতাদির পর উপস্থিত সকলের
ফটো গৃহীত হইলে ক্রেমলিন প্রাসাদের বৈঠক শেষ
হইল। সকাল বেলার প্রতি সংবাদপত্র-স্তম্ভে তৃতীয়
আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠার কথা ঘােষিত হইল এবং সন্ধ্যা-
কালে গ্রেট থিয়েটার হলে সভা হইবে বলিয়া সংবাদ
প্রকাশিত হইল।
তৃতীয় বৈঠক অপরাহ্নেই নাট্যমন্দির দ্বারে কি ভীড়! সংবাদ- পত্র প্রতিনিধির বিশেষ পত্র সঙ্গে থাকা সত্ত্বে ও মিষ্টার র্যানসমকে ভিতরে প্রবেশ করিতে বিশেষ বেগ পাইতে হইয়াছিল। মস্কো সােভিয়েট, তার কার্যকরী সমিতি, ট্রেডইউনিয়নের প্রতিনিধি বগ এবং কারখানা সমিতির সকলেই তথায় উপস্থত ছিলেন। নাট্যমন্দির এতই জনাকীর্ণ হইল যে 'তল ধারণের স্থান রহিল । কেমেনফই সর্ব .. ম আন্তর্জাতিক বৈঠক প্রতিষ্ঠার কথা বললেন। যমনি সহস্র কণ্ঠে জয়ধ্বনি উঠিল, সকলে সমবেত কর, আন্তর্জাতিক ‘রক্ত-সঙ্গীত (The Luternational ও হিল। ব্রেষ্ট সন্ধির সময় যেদিন জাৰ্মাণ ধর্মঘটের হদি আসিয়াছিল, সেদিনও এরূপ আনন্দ ধ্বনি রুশি;"; শত হয় নাই। তারপর কেমেনফ যারা মহা বিপ্লবে জীবন বিসৰ্জন করিয়াছিলেন, তাহাদের কথা বলিলেন। মৃত বীরদের প্রতি সম্মান দেখাইবার জন্য সকলে উঠিয়া দাড়াইলেন। সর্বশেষে লেনিন উঠিলেন। তখন যেন সেই সভা গৃহে একটা সারা পড়িয়া গেল। সকলেই তাহাকে দেখিবার জন্য উৎগ্রীব, সকলেই তাঁহার মুখের দুইটা কথা শুনিবার জন্য লালায়িত। জনতা শান্ত ১১১
লেনিন ও সােভিয়েট
হইল। তখন লেনিন ধীর কণ্ঠে সােভিয়েট সম্বন্ধে
কয়েকটী মাত্র কথা বলিলেন। অলব্ৰেক্ট সুদীর্ঘ বক্তৃতা
দিলেন, ট্রটিস্কিকে তাহা ভাষান্তরিত করিয়া বলিতে
হইল। যুবা গুলিবো সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা
বলিলেন। ষ্টেকলভ তাহা অনুবাদ করিয়া বলিলেন।
পরদিন সভার কার্য শেষ হইল। সেদিন রুশিয়াময়
কৰ্ম্ম-বিরাম।
বিপ্লবের কারণ।
তৎপরদিন মিষ্টার র্যানসম লেনিনের সহিত সাক্ষাৎ
করিতে গেলেন। লেনিন প্রথমতঃই বলিলেন,
“আত্মরি ইংরেজ আমাদের কল্যকার কাৰ্য্য আমাদের
বিরুদ্ধে লাগিবার উপলক্ষ্য স্বরূপই গ্রহণ করিবে।
তাহার বলিবে, যখন বােলশেভিকেরা জগতে আগুন
লাগাইতেই আরম্ভ করিয়াছে, তখন আমরা তাহা-
দিগকে কি প্রকারে শান্তিতে রাখিতে পারি ? তাঁহাদের
এই ক র প্রত্যুত্তরে আমি বলিব, মহাশয়গণ, আমরা
যুদ্ধেই নামিয়াছি। বিগত যুদ্ধে আপনারা জাৰ্মাণীতে
যে প্রকার বিপ্লব ঘটাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন এবং
জ স্মার্ণীও আয়লণ্ড এবং ভারতবর্ষে অশান্তি সৃষ্টি
করিতে যেরূপ যত্ন করিয়াছিলেন, ঠিক সেইরূপই
১১২
বিপ্লবের কারণ
আমরা আজ আপনাদের সহিত যুদ্ধে নামিয়াছি এবং
তজ্জন্য আমাদের সম্মুখে উন্মুক্ত সকল পন্থাই আমরা
অবলম্বন করিব। আমরা আপনাদিগকে জানাইয়াছি
যে আমরা সন্ধি করিতে রাজী আছি।”
ক্ষণকাল থামিয়া তিনি আবার বলিতে লাগিলেন,
“তাহারা যদি কথা মানিতেন,আমরাও মানিয়া লইতাম,
এবিষয়ে আমি নিশ্চিত। যদি ফরাসীদেরদ্বারা তাহাদের
হস্তপদ বদ্ধ না হইত, তবে ইংলণ্ড ও আমেরিকা
সম্ভবত রাজী হইতেন কিন্তু বর্তমানে মধ্যস্থতা সম্ভবপর
বলিয়া মনে হয় না। তাহারা অবশ্যই জানেন যে
রুশিয়াকে ভারতবর্ষের মত শাসন করা যাইবে না।
পক্ষান্তরে এখানে সৈন্য প্রেরণ করা, বা একটা
কম্যুনিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেরণ করা, একই কথা।”
র্যানসম সােভিয়েট প্রচার কার্যের বিরুদ্ধে বিদেশী
শক্তিদের বিরুদ্ধাচরণের কথা উল্লেখ করিলে তিনি
বলিলেন,
“তাঁহাদের প্রতি দেশের চতুর্দিক চীনের প্রাচীর
তুলিয়া দিন। তাহাদের শুল্ক কর্মচারী আছে, তাহাদের
সীমান্ত ও উপকূল রক্ষী আছে। তাহারা ইচ্ছানুরূপ
যে কোন বলশেভিককে বাহির করিয়া দিতে পারেন।
১১৩
৮
লেনিন ও সােভিয়েট
বিপ্লব প্রচার কার্য্যের উপর নির্ভর করে না। যদি
বিপ্লবের কারণ সমূহ বৰ্তমান না থাকে, তবে কোন
প্রকার প্রচারকাৰ্যই উহা শীঘ্র শীঘ্র ঘটাইতে পারিবে
। বিগত যুদ্ধ সকল দেশেই ঐ সকল অবস্থা আনয়ন
করিয়াছিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে যদি রুশিয়াকে
সমুদ্র গ্রাস করে, রুশিয়া আর নাও থাকে, তবুও
অবশিষ্ট ইউরােপে বিপ্লব আসিবেই। রুশিয়াকে বিশ
বৎসর জলমগ্ন করিয়া রাখুন, দেখিবেন, আপনারা
ইংলণ্ডের দোকান কর্মচারীদের দাবী সপ্তাহে এক
শিলিং বা এক ঘণ্টাও ব্যতিক্রম করিতে পারিবেন না।”
র্যানসম ইংলণ্ডে বিপ্লবের কথা বিশ্বাস করিতে
পারিলেন না দেখিয়া তিনি আবার বলিতে লাগিলেন,
“আমাদের একটা কথা আছে যে লােকের চলিবার
শক্তি থাকিলেও পক্ষাঘাত হইতে পারে। বিশ, কি
ত্রিশ বৎসর পূর্বে আমারও একবার অসাময়িক
পক্ষাঘাত হয়। ;
আমি ইহার সহিতই একরূপ
চলিয়াছিলাম। যদি ইহা কিছুদিন পূর্বে আসিত,
তবে আমাকে শেষ করিত। ইংলণ্ড, ফরাসী এবং
ইতালীরও পূর্ব
হইতেই এই ব্যারাম হইয়াছে।
আপনার মনে হইতে পারে ইংলণ্ডে ছোঁয়া লাগে
১১৪
বিপ্লবের কারণ নাই, কিন্তু ধ্বংস-বীজাণু পূৰ্ব্ব হইতেই ইংলণ্ডে প্রবেশ করিয়াছে।” র্যানসম তাহাকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন যে ইংলণ্ডের ধর্মঘট সেরূপ সুশৃঙ্খল নহে। পক্ষান্তরে সে আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক মত অপেক্ষা লিবারেল মতই প্রবলতর ; মােটের উপর ইহা রাজনৈতিক আন্দোলন। উত্তরে লেনিন বলিলেন, “হাঁ, তাহা সম্ভব। এই যুগে ইংরাজ শ্রমিকগণ তাহাদের রাজনৈতিক অভাব- গুলি উপলব্ধি করিবে এবং লিবারেলিজম হইতে সােসিয়ালিজমের দিকেই তাহারা অগ্রসর হইবে। ইংলণ্ডে সমাজতন্ত্রবাদ একবারেই শক্তিহীন। যখন আমি ইংলণ্ডে ছিলাম, তখন আমি আপনাদের সমাজ- তান্ত্রিক আন্দোলন ও সমাজতান্ত্রিক দলে যথাসম্ভব যােগদান করিয়াছি এবং এত বড় শিল্পীজনবহুল দেশের পক্ষে ইহা বড়ই দুংখের কথা যে রাস্তার পার্শ্বে, অতি ক্ষুদ্র বৈঠকখানায় বা স্কুল প্রকোষ্ঠে তাহার সভা হয়। কিন্তু আপনি অবশ্য মনে রাখিবেন যে ১৯০৫ সালের রুশিয়া আর অদ্যকার ইংলণ্ডের ভিতর এক বিরাট পার্থক্য। আপনাদের দোকান কর্মচারী সমিতি (Shop 1.
লেনিন ও সােভিয়েট
লেনিন আদর্শবাদী লেনিন-সমাজের বাস্তব সংস্কারক
লেনিন—যে যুগে কর্মের প্রাধান্য ছিল সেই যুগে
লেনিন ইউরােগে ‘ঋষি” বলিয়া গণ্য হইতেন ;
লেনিন ও গান্ধী উৎ: ২ আদৰ্শকৰ্ম্মী।”
সেই বিশ্বপূজ্য লেনিন ১৯২৪ খৃষ্টাব্দের ২১শে
জানুয়ারী দারুণ পক্ষাঘাত রােগে মানবলীলা সম্বরণ
করেন। বিশ্বদূত রয়টার সেই দারুণ শােকসংবাদ
সকল দেশে বহন করিল। জগতময় একটা গভীর,
মর্মন্তুদ দীর্ঘনিঃশ্বাস বহিয়া গেল। বিশ্বের প্রাণে
অলক্ষিতে যেন একটা তীব্র হাহাকার বাজিয়া উঠিল।
অত সহানুভূতি, অত অভাববােধ জগতবাসী অন্য
কাহারও জন্য আজ পর্যন্ত করিয়াছে বলিয়া কেহ
শুনে নাই বা করিবে কিনা তাহাও বলা যায় না।
লেনিনের অভাবে শুধু রুশিয়াই ক্ষতিগ্রস্ত হয়
নাই, জগতও বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে। তাহার
অতুল দানের জন্য মানবসমাজ তাহার নিকট চিরঋণী
থাকিবে। যে ভাব রুশীয় সােভিয়েটের ভিতর দিয়া
তিনি জগতের সম্মুখে রাখিয়া গিয়াছেন, তাহা আজ
হয়, শতাব্দী পরে জগতে সংক্রামিত হইয়া পড়িবে
এ আশঙ্কা আপাত সত্য বলিয়া যদিও বা আমরা ধারণা
১১
লেনিনের তিরােভাব করিতে না পারি, তবুও ইহা সম্ভব হওয়া অস্বাভাবিক নহে—একথা ঠিক। লেনিনকে রুশীয়গণ কত ক্ত করিত, কতই শ্রদ্ধা করিত! করিবে না কেন? যুগ যুগান্তরের নির্মম রাজপীড়ন হইতে, তিনিই ত রুশীয়দিগকে মুক্ত করিয়াছিলেন, স্বাধীনতার আনন্দ তিনিই তাহাদের প্রাণে ঢালিয়া দিয়াছিলেন। তারপর কোটি কোটি শ্রমিক-কৃষক, অর্থতান্ত্রিকদের নিষ্পেষিত শশাষণে যাহাদের প্রাণ ওষ্ঠাগত হইয়াছিল, তাহারা আজ যে তাহাদের দারুণ কবলমুক্ত হইয়াছে, তাহাও ঐ কৰ্ম্মবীর লেনিনেরই কীর্তি। রুশিয়ার ঐ যে লাল-পল্টন- বাহিনী—যাহাদের নামে বর্তমানের রাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও সাধারণতন্ত্রের, যাহারা অর্থতান্ত্রিক শাসনের পরি- পােষকরূপে জগতের উপর স্বৈরাধিপত্য বিস্তার করিয়া আছেন, বুক দুরু দুরু কাপিয়া উঠে,—তাহারাও নিপীড়িতের মুক্তিদাতা লেনিনেরই সৃষ্টি। তাই ত আজ রুশিয়ার ঘরে ঘরে লেনিনের প্রতিকৃতি শােভা পায়। কত যত্নে রুশিয়ার অগণিত নরনারী সেই বীরের পুণ্যস্মৃতিতে ভক্তিভরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করে। পেট্রো- গ্রেড, সহরের ব্লাঙ্কির (Blanqui) প্রস্তরমূর্তির গায়ে }
লেনিন ও সােভিয়েট
আজও অঙ্কিত রহিয়াছে-“Ni Dieu, Ni Maitre”
“নাই বিভু, নাই প্রভু”। কি গভীর অভাব-অনুভূতির
কথা !
যাহাদের লেনিন-ভীতি ছিল, তাহাদের সেই ভয়
পূৰ্বেও যেমন ছিল, আজও তেমন আছে, আর যতদিন
জগতের নিপীড়িত, নিষ্পেষিত শ্রমিক-কৃষকগণ পূর্ণ
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক স্বাধীনতা পায়, ততদিন
থাকিবেও। তাই বলি লেনিন মরিয়াছেন সত্য, কিন্তু
তিনি মরিয়াও মরেন নাই। তিনিই প্রকৃত মরণজয়ী
মহাপুরুষ।
সমাপ্ত
১২
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.