Makardah Saraswat Library, Howrah

Gantchora Ed. 5th

Bhattacharya,narayanchandra · 2009/08/12

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

এক টাকা সংস্করণ
গাঁটছড়া
৫ে
পঞ্চম সংস্করণ
বৈশাখ-১৩৩৮
শ্ৰীনারায়ণচন্দ্র ভট্টাচার্য্য
বি-সাহিত্য-কুটীর,
ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা
}

প্রকাশক-শ্ৰীসুবােধচন্দ্র মজুমদার
দেব-সাহিত্য-কুটীর
২১১, ঝামাপুকুর লেন, কলিকাতা
প্রিন্টার-আশুতােষ মজুমদার
বি, পি, এম প্রেস
২২ বি, ঝামাপুকুর লেন কলিকাল।

「幣。
我們的事
TF_F州中第一
掌”表
相片
A.

No text on this page.

উৎসর্গ।
শ্রদ্ধাস্পদ
শ্ৰীযুক্ত বাবু যামিনীমােহন মুখােপাধ্যায়
মহাশয় করকমলেষু-
যামিনী বাবু, “গাঁটছড়ার বাঁধন অচ্ছেদ্দ্য বাঁধন।
তাই আপনার সহিত সৌহৃদ্যবন্ধন কখনও ছিন্ন হইবে
এই উদ্দেশ্যে “গাঁটছড়া”র সহিত আপনার নাম
সংযােজিত করিয়া দিলাম।
গুণমুগ্ধ
গ্রন্থকার।

No text on this page.

গাছ'। এবং “উলু উলু উলু-পো-ও-ও।” ই বাস্তব বিবাহের প্রকৃত শঙ্খধ্বনি বা উলুধ্বনি নহে, সকাল- বেলা এক পাল ছেলে-মেয়ে বােসেদের বাড়ীর সম্মুখবর্তী বড় বকুলগাছটার তলায় সমবেত হইয়া ক্রীড়াচ্ছলে বিবাহের অনুকরণ করিতেছিল। কয়েকটি ছেলে বর কয়েকটি মেয়ে কনে। হইয়াছিল ; কতকগুলি ছেলে বরযাত্রী সাজিয়াছিল, কতকগুলি কন্যা- যাত্রী সাজিয়া বর ও বরযাত্রীদের আদর-অভ্যর্থনায় নিযুক্ত হইয়াছিল। তাহাদের মধ্যে যেটি বয়ঃপ্রধান, সেই এগারাে বারাে বছরের মেয়েটি একাধারে বরকর্তা, কন্যাকর্তা, ও পুরােহিত সাজিয়া বৈবাহিক অনুষ্ঠান সকল সম্পন্ন করিতেছিল । বকুলপাতার লুচি, কাদার তরকারি ও ইটের টুকরার সন্দেশ বরযাত্রীদের ভোজনের জন্য প্রস্তুত হইয়াছিল। এক এক জন বরের পাশে এক এক কনে দাঁড়াইয়াছিল। সেই বয়ঃপ্রধান মেয়েটি তাহাদিগকে বকুলফুলের মালায় সুসজ্জিত করিয়া, তাহাদের গাঁটছড়া সম্মুখে দাড়াইয়া প্রবীণা গৃহিণীর মত একেবারে চারিটি বরের বরণকাৰ্য্য সম্পন্ন করিতেছিল। অন্যান্য ছেলে-মেয়েরা, এমন কি, বর কনেরা পৰ্য্যন্ত উলুধ্বনি দিয়া, মুষ্টিবদ্ধ হস্তমধ্যে ফুৎকার প্রদান পূর্বক শঙ্খ- ধ্বনির অনুকরণ করিয়া বােসেদের বকুলতলাকে যেন উৎসবময় করিয়া তুলিয়াছি। “তােদের এ সব কি হচ্ছে রে?” কথাটা যে বলিল, তাহার মত ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ভীতিস্থল গ্রামে আর কেহ ছিল কি না বলা যায় না। স্নিগ্ধোজ্জল শারদ প্রভাতে সহসা গুরু-গম্ভীর মেঘগর্জনের ন্যায় সেই ভীতিকর কণ্ঠধ্বনি শ্রবণে বালকদল চমকিয়া উঠিল এবং আকস্মিক ভীতির ছায়ায় তাহাদের আনন্দ- প্রফুল্ল মুখমণ্ডল মেঘচ্ছায়া-বিমলিন কমলের ন্যায় স্নান বিশুষ্ক হইয়া আসিল। শুধু একজনের মুখে ভয়ের চিহ্ন দেখা গেল না; সে সেই বড় মেয়েটি। সে নির্ভীকভাবে প্রশ্নকর্তা যুবকের দিকে চাহিয়া সহাস্যমুখে বলিল, “আমাদের সব বিয়ে হচ্চে ; তুমি বিয়ে করবে উপীনদা ?” এই কথা শুনিয়া উপেনের গম্ভীর মুখে হাসির রেখা দেখা দিল। সে হাসিতে হাসিতে মেয়েটির সম্মুখবর্তী হইয়া বলিল, “কাকে বিয়ে করবাে গৌরী ? তােকে?” গৌরী ঘাড় বাঁকাইয়া উপহাসের হাসি হাসিয়া উত্তর করিল, “ই, আমাকে! এস, তুমি যেমন বর, তেমনি কনে জুটিয়ে দিই।” বলিয়াই সে খপ করিয়া উপেনের কেঁচার খুঁটটা ধরিয়া ফেলিল। তাহার হাতের কাছেই একটি কালাে মেয়ে দাড়াইয়াছিল। মেয়েটা শুধু কালাে নয় ; যেমন কালাে, তেমনি রােগা, মুখখানা অস্বাভাবিক লম্বা, সামনের দাঁতগুলাে উঁচু, নাকটা বসা, কপালটা প্রশস্ত ময়দানের গাঁটছড়া মত লম্বা-চওড়া, চোখ দুইটা কটা। গৌরী এক হাতে উপেনের কেঁচার খুঁট, অপর হাতে সেই মেয়েটার আঁচল ধরিয়া গ্রন্থি দিতে দিতে বলিল, “এই নাও উপীনদা, তােমার কনে। আমি মেনীর সঙ্গে তােমার বিয়ে দিয়ে তােমাদের গাঁটছড়া বেঁধে দিলুম। উলু উলু উলু, পোঁ—ও—ও।” যে উপেন বালকবালিকাগণের ভীতিস্থল, সেই উপেনকে গৌরীর নিকট এইরূপে অপদস্থ হইতে দেখিয়া অন্যান্য ছেলেমেয়েদেরও আনন্দের সীমা রহিল না। তাহারাও মহােৎসাহে গৌরীর সহিত যােগ দিয়া উচ্চকণ্ঠে ধ্বনি তুলিল, “উলু উলু উলু, পোঁও-ও।” গৌরী এমনই ক্ষিপ্রতার সহিত আরব্ধ কাৰ্য্য সম্পন্ন করিল যে, উপেন হাতে বাধা দিবার অবসরমাত্র পাইল না ; সে যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া গৌরীর এই দুঃসাহসিক কাৰ্য্য সন্দর্শন করিতে লাগিল। তার পর গৌরীর সঙ্গে অন্যান্য ছেলেরাও যখন উলুধ্বনির উচ্চতরাল তুলিয়া দিল, তখন রাগে তাহার চোখ দুইটা যেন কপালে উঠিল, এবং দন্তে অধর নিষ্পেষিত করিয়া দুঃসাহসিকা গৌরীকে শাস্তিপ্রদানে উদ্যত হইল। গৌরী কিন্তু পূৰ্ব্ব হইতেই সাবধান হইয়া পড়িয়াছিল। উপেন তাহাকে ধরিবার জন্য হস্ত প্রসারণ করিবার পূর্বেই সে গ্রন্থিবন্ধন কার্য শেষ করিয়া চঞ্চল হরিণীর ন্যায় উপেনের আয়ত্তের বাহিরে গিয়া দাঁড়াইল। উপেন তাহাকে ধরিবার জন্য অগ্রসর হইল। কিন্তু সে গৌরীকে ধরিতে পারিল না ; মেনীর কাপড়ের সঙ্গে তাহার কেঁচার খুঁট আবদ্ধ ছিল, সুতরাং ছুটিতে যাইতেই পশ্চাতে টান পড়িল ; কাজেই তাহাকে দাড়াইয়া পড়িতে হইল। গৌরী তাহার দুরবস্থা দেখিয়া, হাততালি দিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল, “দুও, দুও, উলু উলু উলু, পোঁও-ও।” ৭

গাঁটছড়া
উলুধ্বনি দিতে দিতে গৌরী ছুটিয়া পলাইল । ছেলেমেয়ে
‘
পেও’ শব্দ করিতে করিতে তাহার অনুসরণ করিল।
উ
যথাস্থানে দাড়াইয়া নিষ্ফল আক্রোশে গর্জন করিতে লাগিল ।
সকলেই পলাইল, শুধু পলাইতে পারিল না মেনী। উপে
কেঁচার খুঁটের সঙ্গে তাহার আঁচল বাঁধা।
সুতরাং সে উপে,
সম্মুখে চোরের মত ভীতিবিবর্ণ মুখে নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল।
অপর সকলে আয়ত্তের বাহিরে চলিয়া গেলে উপেনের ।
আক্রোশ পড়িল মেনীর উপর। সে রাগে চোখ দুইটাকে ল।
করিয়া কঠোর দৃষ্টিতে মেনীর দিকে চাহিয়া গর্জন সহকারে বলি
“তুই দাড়িয়ে রইলি যে?”
মেনী নিরুত্তর। তাহার আঁচলের গেরাে খুলিয়া না দিলে ,
তাহার যাইবার উপায় নাই, এই সহজ উত্তরটাও সে ভয়ে দিতে পারি
না। উপেন তাহার ভীতিবিবর্ণ বিশ্রী মুখখানার দিকে চাহিয়া ঘৃণা
সূচক মুখভঙ্গী করিয়া বলিল, “মরণ আর কি!
একবার দেখ!”
মেনী কিছু বলিল না ; সে ভয়ে মুখখানাকে আরও নীচু করিল
উপেন তখন নিজের কেঁাচার খুট হইতে তাহার আঁচলের গেরাে
খুলিয়া দিল ; তার পর তার পৃষ্ঠে এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত করিয়া
বলিল, “বেয়রা এখান থেকে।”
মেনী কঁদিয়া উঠিল । চীৎকার করিয়া দিল না,
নীরবে
ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল। উপেন তাহার দিকে আর একবার
ঘণাপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া সম্মুখের পথে অগ্রসর হইল।
কিছু দূর গিয়াই উপেন দাঁড়াইয়া পড়িল, এবং পশ্চাতে ফিরিয়া
দেখিল, মেনী যায় নাই, সেই স্থানেই দাড়াইয়া ফুলিয়া ফুলিয়া
মুখের ভঙ্গীখান

No text on this page.

No text on this page.

টছড়া
।
জা
==
• I

No text on this page.

গাঁটছড়া কঁদিতেছে। বাঃ রে, মেয়েটা এখনও যায় নাই! ওঃ, ভারী কান্না উপেনের ইচ্ছা হইল, ফিরিয়া গিয়া তাহাকে আরও দুই এক ঘা বসাইয়া দেয়। কিন্তু তখনই মনে হইল, না, মেনীর দোষ কি? যত পাজীর মূল গৌরী। তাহাকে দুই এক ঘা দিতে পারিলে তবে রাগ যাইত। মেনীকে চাপড়টা মারা ঠিক হয় নাই। ও বেচারী তাে আমার মতই বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছিল । উপেন ফিরিয়া মেনীর কাছে আসিল, এবং গম্ভীর কণ্ঠে তাহাকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “এখানে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কাঁদছি যে?” মেনী নিরুত্তরে দুই হাতে চোখ রগড়াইতে লাগিল। উপেন তখন স্বীয় কার্যের অন্যায্যতা তাহাকে বুঝাইয়া দিবার অভিপ্রায়ে অপেক্ষাকৃত নরম সুরে বলিল, “দেখ, রাগের মাথায় তােক এক ঘা বসিয়ে দিয়েছি। তা কেঁদে আর কি হবে, ঘরে যা। আর দেখ, কক্ষনাে যেন গৌরী ছুড়ীর সঙ্গে খেলা করি না। ও ছুড়ী বড় ঠাটা। এখন যা।” মেনী ভয়প্রযুক্তই হউক, বা এখানে দাড়াইয়া থাকা নিরর্থক বিবেচনাতেই হউক, চোখ রগড়াইতে রগড়াইতে ধীরে ধীরে চলিয়া গেল। উপেন তাহার দিকে চাহিয়া চাহিয়া ঘৃণা-কুঞ্চিত মুখে আপন মনে বলিল, “আহা, ভগবান্ কি মেয়েই গড়েছেন ! মুখের গড়নটাও যদি ভাল হতাে।” তা শুধু উপেন বলিয়া নয়, পরেশ মিত্তিরের এই মেয়েটিকে যে দেখিত, সে-ই ঘৃণায় নাসা কুঞ্চিত না করিয়া থাকিতে পারিত না। মা গাে মা, এমন মেয়েও পেটে ধরিতে হয়। পেটে ধরিবার পক্ষে মায়ের কোন হাত না থাকিলেও অনেকে মেনীর মাকে রত্নগর্ভা বলিয়া উপহাস করিতে ছাড়িত না। জগতে কালে অনেক আছে, গাঁটছড়া কিন্তু এমন বিশ্রী কালাে, আর সেই কালাের উপর এমন বিশ্রী চেহারা পৃথিবীতে বােধ হয় আর একটিও নাই। লােককে কুৎসিত আকৃতির আদর্শ দেখাইবার জন্যই যেন ভগবান্ নির্জনে বসিয়া ইহাকে মনােমত কুৎসিত করিয়া গড়িয়াছেন। অপরে মেনীর সম্বন্ধে এইরূপ তীব্র মন্তব্য প্রকাশ করিলেও মেনীর মা কিন্তু মেয়ের উপর একটুও ঘৃণা পােষণ করিতে পারিতেন না। এই মেয়েই যে তাহার সর্বস্ব-সংসারের একমাত্র বন্ধন। স্বামী গিয়েছেন, তাহার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রাজপুত্রের মত দশ বছরের ছেলে, ফুটন্ত ফুলের মত চার বছরের মেয়ে ফাকি দিয়া চলিয়া গিয়াছে ; শুধু কালাে কুৎসিত বলিয়াই যম বুঝি মেনীকে উপেক্ষা করিয়া ফেলিয়া রাখিয়াছে। তা হউক কালাে কুৎসিত; কুৎসিত হইয়াও তত সে মায়ের তপ্ত বুকখানা জুড়িয়া রহিয়াছে ! দেখিতে বিশ্রী হইলেও তাহার মুখের মাতৃ-সম্বােধন তাে বিশ্রী নয় ? সে সম্বােধন শুনিলে মায়ের শােকদগ্ধ বুকখানা যে বৃষ্টি-ধারাস্পর্শে নিদাঘতপ্ত ধরণীর মত মুহূর্তে শীতল হইয়া যায়। কালাে কুৎসিত হইয়াই মেনী বাচিয়া থাক ! আহা, সে দু’টাও সুন্দর না হইয়া যদি ইহার অপেক্ষাও কুৎসিত হইয়া বাঁচিয়া থাকিত ? বিবাহ-ভাগ্যে থাকে হইবে, না হয় আইবুড়াে হইয়াই চিরদিন তাহার বুক জুড়িয়া থাকিবে। লােকের নিন্দায় তাহার মাতৃহৃদয় তাে স্নেহাস্বাদে বঞ্চিত হইবে না। কিন্তু পাঁচজনে এত কথা বুঝিত না, বুঝিবার প্রয়ােজনও তাহাদের ছিল না। সুতরাং তাহারা মায়ের কাছেই মেয়ের রূপের কঠোর সমালােচনা করিয়া আপনাদের সৌন্দৰ্য-বােধশক্তির পরিচয় দিতে কুণ্ঠিত হইত না। তাহাদের সেই কঠোর সমালােচনা শ্রবণে মায়ের প্রাণ যে কি শেলাঘাতের বেদনা অনুভব করিত, তাগ গাঁটছড়া কেহই ভাবিয়া দেখিবার অবসর পাইত না। মেয়ের নিন্দায় মায়ের চোখ জলে ভরিয়া উঠিত, বুকের পাঁজরাগুলাকে যেন ভাঙ্গিয়া দিয়া বেদনার গভীর দীর্ঘশ্বাস বাহির হইবার উপক্রম করিত। কিন্তু সে দীর্ঘশ্বাস, সে অঞ চাপিয়া রাখিয়া তাহাকে বলিতে হইত, “কি করবাে মা, মেয়ের দোষ নাই, আমার পােড় কপালের দোষ ; নইলে এমন মেয়ে পেটে জন্মাবে কেন? ওর আগে একটা, পরেও ততা একটা জন্মেছিল, তারা তাে অমন হয় নি। কিন্তু যম কি তাদের রাখলে!” মাতার এই কাতরােক্তিতে যাহাদের প্রাণে সহানুভূতির উদ্রেক হইত, তাহারা তাহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিত, “তা হাে, তা হােক্, কালাে কুচ্ছিত হয়েই বেঁচে থাক্ ! তবু তাে কোল জুড়ে রয়েছে।” কিন্তু পরিণামের দিকে যাহাদের দৃষ্টিটা তীক্ষ্ণ, তাহারা এরূপ ব্যর্থ সান্ত্বনায় সন্তুষ্ট হইতে না পারিয়া চিন্তিতভাবে মন্তব্য প্রকাশ করিতেন যে, মায়ের কোল-জোড়া হইয়া বাঁচিয়া থাকায় তাঁহাদের কোনও আপত্তি নাই, বরং ইহাই সকলের প্রার্থনীয়। কিন্তু মেয়ে শুধু বাঁচিয়া থাকিলে তাে হইবে না, তাহার বিবাহ দিতে হইবে, এবং সেই বিবাহ দেওয়াই বিষম বিপদের কাৰ্য্য। একে তাে আজকাল মেয়ের বিবাহ দেওয়া দায় হইয়া উঠিয়াছে, তাহার উপর মেয়ে কালে কুচ্ছিত হইলে তাহাকে পার করা একেবারে দুঃসাধ্য হইবে। মেনীর মায়ের তেমন পয়সার জোর নাই যে, দুই চারি হাজার ঢালিয়া দিতে পারিবে। সুতরাং মেয়ের বিবাহ লইয়া মেনীর মাকে বিষম বিপদেই পড়িতে হইবে । পাঁচজনের কাছে এইরূপ পাঁচরকম কথা শুনিয়া মাও সময়ে ১১ গাঁটছড় সময়ে চিন্তিত হইয়া পড়িতেন। সত্য কথা,- বেটাছেলে নয় যে, বিবাহ না হইলেও ক্ষতি নাই, মেয়েছেলেকে কত দিন আইবুড়াে রাখা যাইবে ? বড় জোর বারাে তেরাে বছর ; তারপর বিবাহ না দিলে লােক নিন্দা, দুনাম, অপবাদ—নানা বিভ্রাট। কিন্তু মেনীর বিবাহ দেওয়া তাে দুইচারি শত টাকার কৰ্ম্ম নয়, হাজার টাকা দিলেও কেহ উহাকে ঘরে লয় কি না সন্দেহ। হ ভগবা, যাহার দশ টাকার সংস্থান নাই, একরূপ পরের দাসীবৃত্তি করিয়া কোনরূপে পেট চলিতেছে, তাহার পক্ষে হাজার টাকার কথা বােবার স্বপ্নদর্শনমাত্র । মেয়েও তাে নয় ছাড়াইয়া দশে পা দিয়েছে ; আর বড় জোর দুইটা বৎসর। এই দুই বৎসর পরে কি হইবে? অনেক ভাবিয়াও মেনীর মা এই চিন্তাসমুদ্রের কুলকিনারা দেখিতে পাইয়া হতাশ হইয়া পড়িতেন । ওঃ, ভগবান তাহার শােকদগ্ধ বুকে এ কি চিন্তার বােঝা চাপাইয়া দিয়াছেন। মা যখন এই ভারী বােঝা নামাইবার কোন উপায়ই খুঁজিয়া পাইতেন না, তখন তাহার চিত্তটা দুঃখে নৈরাশ্যে অধীর হইয়া উঠিত। পরিশেষে সেই দুঃখটা ক্রোধের আকারে পরিণত হইয়া মেয়ের উপর গিয়া পড়িত। হায়, হতভাগা মেয়েটা যদি এই পােড়াকপালীর পেটে আসিয়া জন্মিল, তবে একটু রূপ লইয়া আসিল না কেন? তাহা হইলে তাে তাহাকে মড়ার উপর এই খাড়ার ঘা সহিতে হইত । মেনী যেন ইচ্ছা করিয়াই রূপ লইয়া আসে নাই, ইহাই স্থির করিয়া লইয়া মা মধ্যে মধ্যে মেয়েকে বেশ পাঁচ কথা শুনাইয়া দিতেন। মেয়ে কিন্তু চুপ করিয়াই মায়ের কথা শুনিত। মেনীর রূপ না থাকিলেও একটা গুণ ছিল –সহিষ্ণুতা। কত ছেলে-মেয়ে, এমন কি গাঁটছড়া বুড়ারা পৰ্যন্ত রূপহীনতার জন্য তাহার মুখের উপর ঘৃণা বা উপহাস করিতে থাকিত, মেনী কিন্তু তাহার উত্তরে একটি কথাও বলিত , একটুও রাগ দেখাইত না, শুধু ছলছল চোখে উপহাসকারীদের মুখের দিকে চাহিয়া থাকিত। তাহার সেই সজল দৃষ্টি যেন সকলের দয়া প্রার্থনা করিয়া নীরব ভাষায় ব্যক্ত করিত--ওগাে, এই রূপ- হীনতার জন্য আমি দায়ী নহি, যিনি আমার স্রষ্টা তিনি এজন্য দায়ী ; তবে রূপের অভাবের জন্য আমাকে তিরস্কার করিয়া কেন বৃথা আমার মৰ্ম্মে আঘাত দিতেছ ? রূপহীনতার জন্য আমি নিজে যে কতটা দুঃখিত, তাহা কি তােমরা বুঝ না ? কিন্তু তাহার এই নীরব ভাষা বুঝিবার শক্তি কাহারও ছিল না ; সুতরাং সে মৌন সজল দৃষ্টি দ্বারা কাহারও দয়া আকর্ষণ করিতে পারিয়া তাহাদের তীব্র তিরস্কার নীরবে শুনিয়া যাইত। মা কিন্তু কতকটা বুঝিতেন। তিরস্কার করিতে করিতে মেয়ের জলভরা চোখের উপর চোখ পড়িলেই তাহাকে থামিয়া যাইতে হইত। শুধু থামিয়াই তিনি নিস্কৃতি পাইতেন না; তাহার অহেতুক তিরস্কারে মেয়ে অন্তরে কতকটা ব্যথা পাইয়াছে তাহা অনুভব করিয়া লইয়া স্বীয় অবিমৃষ্যকারিতার জন্য অনুতপ্ত হইয়া পড়িতেন, এবং মেয়ের বেদনাকাতর মুখের দিকে চাহিয়া কঁদিয়া ফেলিতেন। মাকে কঁদিতে দেখিয়া মেনী তাহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিত, “কাদিস্ কেন মা, আমি কালাে কুচ্ছিত হয়েছি বলেই তাে তাের এত কষ্ট। আমি যদি সুন্দর হতাম!” মা মেয়েকে বুকে জড়াইয়া ধরিয়া অশ্রুধারায় তাহার মস্তক অভিষিক্ত করিতে করিতে বলিতেন, “না মেনী, তাের সুন্দর হয়ে কাজ নাই ; তুই আমার কালাে কুচ্ছিত হয়েই বেঁচে থাক।”

গাঁটছড়া মায়ের কথায় মেনীর বেদনা-মলিন মুখে হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিত, এবং সে হাসিটুকু মায়ের চিন্তাতমসাচ্ছন্ন হৃদয়কে তৃপ্তি ও সান্ত্বনার আবেগে আলােকিত করিয়া দিত। গােড়ায় নামটা মৃণালিনী রাখা হইয়াছিল, কিন্তু এত বড় নামটা সর্বদা উচ্চারণ করা যায় না, কাজেই মৃণালিনী সংক্ষিপ্ত সংস্করণে মেনী হইয়া দাঁড়াইয়াছিল, এবং মৃণালিনীর পরিবর্তে মেনী নামটাই সেই কুৎসিত মেয়েটিকে যেন বেশ মানাইয়া গিয়াছিল। পরেশ মিত্তির স্থানীয় জমিদারের অধীনে গােমস্তাগিরি করিতেন, এবং পাৰ্বণী ও সেলামীর আয়ে কিছু জমী-জায়গাও করিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার জমী-জায়গার এই ক্রমিক উন্নতি প্রতিবেশীদের মধ্যে কাহারও কাহারও অসহ্ন হইয়া উঠিল। এই অসহিষ্ণুতার ফলে শীঘ্রই জমিদারের কানে উঠিল যে, পরেশ মিত্তির জমিদার বাবুকে ফতুর করিয়া নিজে জমিদার হইয়া বসিবার সঙ্কল্প করিয়াছে, এবং অচিরেই বােধ হয় তাহার এই সঙ্কল্প সিদ্ধ হইবে। শুনিয়া জমিদার বাবু শিহরিয়া উঠিলেন এবং পরেশ মিত্তিরকে শীঘ্র তাহার সদরে হিসাব দাখিল করিবার জন্য কড়া হুকুম প্রচার করিলেন। মনিবের কাছে নিকাশ দিবার জন্য পরেশ হিসাবপত্র দোরস্ত করিতে ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তিনি নিকাশ দিবার অবসর পাইলেন না; তাহার পূৰ্বেই চিত্রগুপ্তের নিকট নিকাশ দিবার জন্য জোর তলব আসিল। অগত্যা পরেশ জমিদারের হিসাব নিকাশ ফেলিয়া চিত্রগুপ্ত মহাশয়ের নিকট স্বীয় কৃত কাৰ্য্যের হিসাব দিবার জন্য সত্বর চলিয়া যাইতে বাধ্য হইলেন। তিনি চলিয়া গেলেও জমিদার কিন্তু ছাড়িলেন না। তিনি দুই হাজার টাকা তহবিল তছরুপাতের দাবী করিয়া বসিলেন, এবং ১৪ গাঁটছড়া আদালতের বিচারে পরেশ মিত্তিরের সম্পত্তি হইতে এই টাকা আদায় করিয়া লইবার অধিকার প্রাপ্ত হইলেন। সেই অধিকারের বলে জমিদার বাবু পরেশ মিত্তিরের জমী-জায়গা একে একে নীলামে চড়াইয়া ডাকিয়া লইতে লাগিলেন। শেষে বাস্তুভিটায় পর্যন্ত টান ধরিল। বাসচ্যুতির-ভয়ে পরেশের বিধবা স্ত্রী নিস্তারিণী কাতর হইয়া পড়িলেন, এবং বাস্তুটুকু রাখার জন্য প্রতিবেশীদের পায়ে হাতে ধরিতে লাগিলেন। এই সময়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে একটি লােক তাঁহার যথেষ্ট উপকার করিল ; বিধবার কাতরক্রন্দনে আর্দ্র হইয়া দয়ারাম ঘােষ তাহাকে রক্ষা করিতে চেষ্টিত হইলেন, এবং জমিদারের পায়ে হাতে ধরিয়া বাকী এক হাজার টাকার দাবী সাত শত টাকায় রফা করিয়া ফেলিলেন। তার পর নিস্তারিণীর সঞ্চিত অর্থ ও অলঙ্কারপত্র যাহা কিছু ছিল, সে সমস্ত দিয়া জমিদারের দাবী মিটাইয়া দিলেন। নিস্তারিণী এজন্য দয়ারামের নিকট কৃতজ্ঞ হইয়া থাকিলেও লােকে কিন্তু এই উপকারী ব্যক্তিটির এরূপ পােপকারপ্রবৃত্তির কারণ অনুসন্ধান পূর্বক প্রচার করিল যে, এই সাত শত টাকার মধ্যে পাঁচ শত টাকা জমিদার এবং দুই শত টাকা দয়ারাম নিজে লইয়াছেন। উপকারকের এইরূপ মিথ্যা দুনামে নিস্তারিণী কিন্তু কর্ণপাত করিলেন না ; দয়ারামের কৃপায় তাহার বাস্তুভিটা ও নিষ্কর সাড়ে সাত বিঘা জমী যে জমিদারের গ্রাস হইতে রক্ষা পাইল, ইহাই যথেষ্ট সৌভাগ্য জ্ঞান করিয়া তিনি দয়ারাম ঘােষের নিকট কৃতজ্ঞতা-ঋণে আবদ্ধ হইয়া রহিলেন। তা যদি এই সাত বিঘা জমীর পূরা ফসল পাওয়া যাইত, তাহা হইলেও দুইটা পেট চলিবার পক্ষে কিছুমাত্র কষ্ট হইত না। কিন্তু পূরা ফসল দূরের কথা, সিকিও পাওয়া যাইত কি না সন্দেহ।

গাঁটছড়া সাড়ে সাত বিঘার মধ্যে তিন বিঘা জমী ক্রোশ দুই দূরে ভিন্ন গ্রামে অল্প খাজনায় বিলি ছিল। সে অল্প খাজনাও মেয়েমানুষ সব সময়ে আদায় করিতে পারিত না। গ্রামের মাঠে যে সাড়ে চারি বিঘা জমী ভাগজোতে বিলি ছিল, নামে তাহার অর্ধেক ফসল পাইবার কথা থাকিলেও সিকি পরিমাণ ফসলমাত্র ঘরে আসিত, এবং তাহাতে মা ও মেয়ের তিন চারি মাসের বেশী চলিত । বাকী কয়মাস কাহারও বাড়ীতে রাঁধিয়া দিয়া, কাহারও মুড়ী ভাজিয়া, কাহারও কথা শেলাই করিয়া, কখন বা ঘটিটা বাটিটা বেচিয়া বা বাঁধা দিয়া কষ্টেসৃষ্টে চালাইতে হইত। যদি প্রতি মাসে হিন্দু বিধবার একাদশী, আমাবস্যা, পূর্ণিমা প্রভৃতির উপবাস না থাকিত, তাহা হইলে দিন চালান নিস্তারিণীর পক্ষে আরও কষ্টকর হইয়া উঠিত । এই কষ্টটা নিস্তারিণীর কাছে তেমন দুঃসহ হইয়া উঠিত না যদি পাঁচজনে মেয়ের বিবাহের দুঃসাধ্যতা বুঝাইয়া দিয়া তাহার ক্লেশনিপীড়িত চিত্তে চিন্তার দুঃস্বপ্ন জাগাইয়া না তুলিত। উদারগ্নের চিন্তার সঙ্গে এই ভীষণ চিন্তা-সমুদ্রে নিপতিত হইয়া নিস্তারিণী যেন হাবুডুবু খাইতে লাগিলেন, কোন দিকেই কিছু কূল-কিনারা দেখিতে পাইলেন না। প্রতিবেশীদের মধ্যে যাহারা মেনীর বিবাহের জন্য অতিশয় চিন্তিত, তাহারাও মেনীর মাকে এই অপার চিন্তা- সমুদ্রের কোন দিকেই কূল দেখাইতে সমর্থ হইলেন না। শুধু একজন কূলের একটু রেখা যেন দেখাইয়া দিল ; তিনি দয়ারাম ঘােষ। দয়ারাম নিস্তারিণীর দুর্ভাবনা শ্রবণে তাঁহাকে আশ্বাস দিয়া বলিলেন, “ভয় কি জমী কবিঘে তাে আছে।” অকূলে কূল দেখিতে পাইয়া নিস্তারিণী কতকটা আশ্বস্ত হইলেন। •

গাঁটছড়া
“মেনীর বর, ও মেনীর বর!”
উপেন যাইতে যাইতে থমকিয়া দাড়াইল, এবং ইতস্ততঃ দৃষ্টি
সঞ্চালন পূৰ্ব্বক অদূরে বৃক্ষান্তরালে লুক্কায়িত
দেখিতে
রাইয়া, বলিল “কে, গৌরি ? শােন্।”
“আমি শুনতে পাচ্ছি, তুমি বল না।”
“এত দূর থেকে কি বলবে? কাছে আয় না”
ঘাড় দোলাইয়া চোখ টিপিয়া গৌরী বলিল, “হু, আমি কাছে যাই,
আর তুমি আমাকে মারাে।”
মারিবার ইচ্ছা থাকিলেও তাহা গােপন করিয়া সহাস্যমুখে উপেন
বলিল “না না, মারবাে না, তাের ভয় নাই।”
মাথা নাড়িয়া গৌরী বলিল, “ভয় নাই বৈ কি, তুমি নিশ্চয়
মারবে।”
“নিশ্চয় মারবাে না।”
“মা কালীর দিব্যি ?”
“মা কালীর দিব্যি ?”
“যদি মারাে ?”
“দিব্যি করলুম, আর কি মাত্তে পারি?"
“আচ্ছা, তবে কি বলবে বল।”
গৌরী বৃক্ষান্তরাল ত্যাগ করিয়া ধীরে ধীরে উপেনের সম্মুখে আসিয়া
দাড়াইল। দাড়াইবামাত্র উপেন তাহার হাতখানা ধাঁ করিয়া ধরিয়া
ফেলিল এবং রােষগম্ভীর কণ্ঠে বলিল, “এইবার।”
২
১৭

গাঁটছড়া
গৌরী মনে মনে ভয় পাইলেও মুখে সাহস দেখাইয়া জিজ্ঞাসা
করিল, “এইবার কি?”
“এইবার যদি মারি?”
“মা কালীর নামে দিব্যি করলে যে।”
“দিব্যি আমি মানি না।”
“না মানলে মা কালী তােমাকে শাপ দেবে তা জান ?”
“কি শাপ দেবে ?”
গৌরী কোন্ শাপের উল্লেখ করিয়া উপেনকে ভয়, দেখাইবে,
তাহা সহসা ভাবিয়া পাইল না। একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিল,
“তা হ'লে—তা হলে ঐ মেনীর মত মেয়ের সঙ্গে তােমার বিয়ে
ঈষৎ হাসিয়া উপেন জিজ্ঞাসা করিল, “আর যদি না মারি ?”
প্রফুল্লমুখে গৌরী বলিল, “তা হলে ভাল বৌ হবে।”
উপেন তাহার মুখের উপর হাস্যোজ্জ্বল দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া বলিল,
“কি রকম ভাল ? তাের মতন ?”
লজ্জারক্ত মুখখানা নীচু করিয়া গৌরী বলিল, “দূর, তা কেন, খুব
সুন্দর টুকটুকে বৌ।”
“তুই তাে সুন্দর টুকটুকে।”
হাস্যরঞ্জিত মুখখানাকে ভারী করিয়া গৌরী উত্তর করিল,
“তােমাকে বলেছে, আমি টুটুকে! যাও।”
উপেনের মুষ্টি হইতে আপনার হাতখানাকে মুক্ত করিবার জন্য
গৌরী স্বীয় হস্ত আকর্ষণ করিল। উপেন কিন্তু তাহাকে ছাড়িল না ;
বরং মুষ্টিটা আরও দৃঢ় করিয়া গম্ভীর মুখে বলিল, “আমি তাে চলে
যাচ্ছিলাম, তুই ডালি কেন?”
১৮

গাঁটছড়া
উপেন।
যেন অতিমাত্র আশ্চৰ্য্যান্বিতভাবে গৌরী বলিল, “ও মা, তােমাকে
আবার ডাকলুম কখ?”
উপেন বলিল, “তবে ‘মেনীর বর, মেনীর বর, ব'লে কে আমাকে
ডালে?”
সপ্রতিভভাবে গৌরী বলিল, “ওঃ, মেনীর বর বলে ডেকেছি।
তা ডাকলেই বা, তুমি তাে আর সত্যি সত্যি মেনীর বর নও।”
। তবে মেনীর বর বলে ডাকলি কেন ?
গৌরী। আমি তাে তােমাকে ডাকি নাই।
উপেন।
তবে কাকে ডেকেছিলি ?
গৌরী। কাকে ?—ভূতকে।
“আচ্ছা, তােমার ঘাড়ের ভূতটা ছাড়িয়ে দিচ্চি।” বলিয়া উপেন
সজোরে গৌরীর হস্ত আকর্ষণ করিল। সে আকর্ষণে ব্যথা পাইয়া
গৌরী বলিয়া উঠিল, “উহু, হাতে লাগছে, ছেড়ে দাও।”
উপেন সঁতে ঠোট চাপিয়া বলিল, “ছাড়বাে বৈ কি।”
গৌরী এবার গ্রীবা উদ্যত করিয়া সতেজকণ্ঠে বলিল, “কি করবে ?
মারবে?”
মুখভঙ্গী করিয়া উপেন বলিল, “না, মারবাে কেন, আদর করবাে।”
রাগে মুখখানা লাল করিয়া গৌরী বলিল, “কেন মারবে বল
তো, আমি কি করেছি ?”
ধীরে ধীরে মাথাটা নাড়িতে নাড়িতে উপেন উত্তর করিল, “কি আর
করবে, সে দিন শুধু ছেলেগুলাের সামনে আমাকে অপমান করেছ।”
যেন নিতান্ত নিরপরাধের মত কঁদ-কঁাদ মুখে গৌরী বলিল,
“ও মা, অপমান আবার করলুম কখন ? আমরা বিয়ে বিয়ে খেলা
কচ্ছিলুম-”

গাঁটছড়া
গম্ভীর কণ্ঠে উপেন বলিল, “আর আমি গিয়ে পড়তেই মেনীর
সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়ে ফেললে।”
উপনের রাগের কারণ বুঝতে পারিয়া গৌরীর হাসি আসিল।
কিন্তু সে হাসি চাপিয়া গম্ভীর মুখে বলিল, “তা দিলেই বা বিয়ে।
সে তো আর সত্যিকার বিয়ে নয়, খেলাঘরের বিয়ে ।”
তর্জন সহকারে উপেন বলিল, “হলেই বা খেলাঘরের বিয়ে।
কেন,
ঐ মেয়েটা ছাড়া সেখানে কি আর মেয়ে ছিল না ?”
গৌরী আর হাসি চাপিতে পারিল না, ফিক্‌ করিয়া হাসিয়া
ফেলিল ; বলিল, “ওঃ, এই জন্যেই তােমার এত রাগ ? তা মেনী
এমন কি মন্দ মেয়ে উপীনদা ?”
উপেন বলিল, “না, খুব চমৎকার মেয়ে। চমৎকার বলেই
আজ ভালরকম ঘটক-বিদায় দেব।”
গৌরী কিন্তু ঘটকের প্রাপ্যের দিকে লক্ষ্য না করিয়াই সহাস্যে
বলিল, “আচ্ছা উপীনদা, সত্যিই যদি মেনীর সঙ্গে তােমার বিয়ে
হয় ?”
উপেন বলিল, “তা হলে সে বিয়ের ঘটক এর চাইতেও ভাল
বিদায় পাবে।”
গৌরী বলিল, “তা পাক্, কিন্তু নিশ্চয়ই মেনীর সঙ্গে তােমার বিয়ে
হবে।”
উপেন। তুই খড়ি পেতেছি না কি ?
গৌরী। খড়ি পাতবাে কেন, আমি মামীর কাছে শুনেছি। তােমার
দিদি মামীমাকে বলেছে।”
“দিদি তাের মাথা খেয়েছে।” বলিয়া উপেন গৌরীর হাতটা
যেন ঘৃণার সহিত ছুড়িয়া দিল। গৌরী আপনার হাতখানাকে

গাঁটছড়া ঘুরাইয়া ফিরাইয়া দেখিতে দেখিতে সদুঃখে বলিল, “উঃ, তােমার চাষার মত কি কড়া হাত উপীনদা, দেখ দেখি আমার হাতটা লাল হয়ে উঠেছে। উপেন বরাষ-কঠোর দৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া বলিল, “তাের দাঁতগুলাে যে এখনাে ঠিক জায়গায় আছে, সেই ঢের। কিন্তু ফের বদি এই রকম তামাসা করবি- গৌরী বলিয়া উঠিল, “তামাসা নয় উপীনদা, সত্যিই তুমি মেনীর বর হবে, দেখে নিও, দেখে নিও, দেখে নিও, “আচ্ছা, দাড়া তােকে দেখে নিচ্চি।” বলিয়া উপেন পুনরায় তাহাকে ধরিতে উদ্যত হইলে গৌরী চঞ্চলপদে ধাবিত হইল, এবং ছুটিতে ছুটিতে বলিল, “ধতে পারলে না, দুও, ধতে পারলে ।” খস্ খস্ হাস্য ধ্বনিতে নির্জন পথ প্রতিধ্বনিত করিতে করিতে গৌরী ছুটিয়া পলাইল। উপেন কিয়ৎক্ষণ স্তব্ধভাবে সেইখানে দাঁড়াইয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে গন্তব্য পথে অগ্রসর হইল । এ স্থলে উপেনের কিঞ্চিৎ পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। এগারাে বছর বয়সে মা-বাপ দুই মারা গেলে মহাজন যখন দেনার দায়ে বাপের ঘর- ভিটা পর্যন্ত বেচিয়া লইল, তখন উপেনকে লেখা-পড়ার সঙ্গে সকল সম্বন্ধ বিচ্ছিন্ন করিতে তাে হইলই, অধিকন্তু দুই বেলা দুই মুঠা ভাতের জন্য তাহাকে লালায়িত হইয়া পড়িতে হইল। দিন কতক এ-বাড়ী সে-বাড়ী খাইয়া বেড়াইয়া অপরের অনাদর-প্রদত্ত অন্নে যখন অরুচি গাঁটছড়া জন্মিয়া আসিল, তখন হঠাৎ একদিন বাবােয়ারীতলায় যাত্রা শুনিতে শুনিতে সেই যাত্রার দলের সঙ্গে কোথায় চলিয়া গেল। পাঁচ ছয় বৎসর তাহার আর কোন সন্ধানই রহিল না। ভগ্নী কুসুম স্বামী-গৃহে আসিয়াই ভ্রাতার এই নিরুদ্দেশ-সংবাদ পাইল এবং এই সংবাদ পাইয়া সে চিন্তিত ও কাতর হইয়া পড়িল । সে স্বামী, দয়ারামকে অনুরােধ করিয়া যতটুকু সম্ভব ভ্রাতার খোঁজ করিল, কিন্তু তাহার কোন খোঁজখবরই পাওয়া গেল না। বছর পাঁচেক পরে হঠাৎ একদিন উপেন ছােট-বড় করিয়া ছাটা চুলে টেড়ী কাটিয়া, আদ্ধির পাঞ্জাবীর আবরণে দেহের কৃশতা ও প্লীহাবৰ্দ্ধিত উদরের অস্বাভাবিক স্ফীতি আবৃত করিয়া, সিগারেটের ধূম উদিগরণ করিতে করিতে কুঁড়ােজালি গ্রামে দেখা দিল। নিরুদ্দিষ্ট ভ্রাতার এরূপ আকস্মিক আগমনে কুসুম আনন্দে বিহ্বল হইল, কিন্তু তাহার পাঞ্জাবীর আবরণ হইতে বিমুক্ত দেহের অবস্থা দেখিয়া কঁদিয়া ফেলিল।—“এ কি তাের চেহারা হয়েছে রে উপেন?” সদুঃখে উপেন বলিল, “চেহারার কথা আর বল না দিদি। ফেন-মেশানাে কলায়ের দাল আর আধসিদ্ধ ভাত খেয়ে হাড় ক’খানা যে এখনাে বজায় আছে, সেই ঢের। আগে মনে করেছিলাম, যাত্রার দলের মত মজা আর দুনিয়ায় নাই, কিন্তু এখন দেখছি, তার চাইতে লােকের গরু চরিয়ে ভাত খেলেও সুখ আছে। রােজ বিকেল হলে জ্বর হয়, আর ভােরবেলা সেই জ্বর ছাড়ে। আজ এক বছর এই জ্বর নিয়ে দলের সঙ্গে সঙ্গে এ গাঁ সে গাঁ করে ঘুরে বেড়াচ্চি। কুসুম বলিল, “তা দল ছেড়ে পালিয়ে এলি না কেন ? উপেন বলিল, “উপায় থাকলে পালিয়ে আসতাম।-শা-অধিকারী দাদনের খাতার সই করিয়ে নিয়েছিল। যেখানে পালাব, পেয়াদা গাঁটছড়া দিয়ে টেনে নিয়ে যাবে। অধিকারী ব্যাটা যদি মারা না যেতাে, তা হলে এই হাড় ক’খানাও ফিরে আসতে না বােধ হয়।” শুনিয়া কুসুম চোখের জল মুছিতে মুছিতে বলিল, “আর তুই কিন্তু যাত্রার দলে যেতে পাবি না উপেন।” দৃঢ় সঙ্কল্পের স্বরে উপেন বলিল, “আবার ?” ডাক্তারের ঔষধে এবং সুসিদ্ধ ভাত ও ফেনবর্জিত ডাইলের গুণে দুই তিন মাসের মধ্যেই উপেনের চেহারার অনেক পরিবর্তন হইয়া গেল। তাহার অস্থি-চৰ্ম্মসার দেহে মাংস দেখা দিল, প্লীহার আয়তন কমিয়া যাওয়ায় উদরের অস্বাভাবিক আয়তনও হ্রাস পাইল। সেই সঙ্গে টেড়ীর বাহার অন্তর্হিত হইল, ছােট বড় চুল ক্রমে সমান হইয়া আসিল। আদ্ধির পাঞ্জাবীটা কোথায় যে রহিল, তাহা উপেন আর খুঁজিয়াও দেখিল না, সে কেঁচার খুঁট গায়ে দিয়া দয়ারামের গরু বাঁধিতে ও বাজার করিতে কিছুমাত্র সঙ্কুচিত হইল না। ক্ৰমে গ্রামের মধ্যেও উপেনের একটা পরিচয় হইয়া গেল। সে কাহারও উপীনদা, কাহারও উপীনখুড়াে, কাহারও মামা হইয়া পড়িল। শুধু পুরুষমহলে নয়, মেয়েমহলেও এক একটা সম্পর্ক পাতাইয়া লইয়া সে অল্পদিনের মধ্যেই সকলের স্নেহ ও প্রতি আকর্ষণ করিয়া লইল। শুধু ছেলের দলই কারণে অকারণে প্রহারকারী এই ক্রোধনস্বভাব যুবকটিকে ভীতির চক্ষে দর্শন করিতে লাগিল। ছেলে- মেয়েদের মধ্যে শুধু একটি মেয়ে উপেনকে ভয় করিত না; সে রামজয় বােসের দৌহিত্রী গৌরী । ছেলেবেলায় মা মারা যাওয়ায় মাতামহী কাছে রাখিয়া গৌরীকে মানুষ করিয়াছিলেন। তার পর মাতামহী মারা গেলে মাতুলানী মাতার ন্যায় মেহে ও আদরে গৌরীকে প্রতিপালন করিয়া আসিতে- ;

গাঁটছড়া
ছিলেন। মা নাই বলিয়া পাছে গৌরী কোন আবদার রক্ষিত না
হইলে মনােবেদনা অনুভব করে, এই আশঙ্কায় মাতুলানীকে অনেক
সময় মাতার অধিক স্নেহত্ন প্রদর্শন করিতে এবং গৌরীর অন্যায়
আবদারও রক্ষা করিতে হইত। ইহার ফলে গৌরী একটু বেশী
আবদারে, একটু বেশী প্রখরা হইয়া উঠিয়াছিল। ভয় বা সঙ্কোচ কাহাকে
বলে, ইহা সে যেন জানিতই না ।
রামজয় বােসর সঙ্গে দয়ারামের একটু দূর-আত্মীয় সম্পর্ক থাকায়
উভয় পরিবারের মধ্যে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা ও যাতায়াত ছিল। কুসুম
মধ্যে মধ্যে গৌরীদের বাড়ীতে যাইত, গৌরীর মামীও কুসুমের
কাছে আসিত। গৌরীর তাে যাওয়া আসার ধরা-বাঁধা ছিল না,
যখন ইচ্ছা হইত, তখনই বৌদির কাছে উপস্থিত হইত। গৌরী
কুসুমকে বৌদি বলিত, এবং সেই সম্পর্কে উপেনকে উপীনদা বলিয়া
ডাকিত।
এগারাে বছরে পড়িলেই গৌরীর বিবাহের কথাবার্তা চলিতেছিল।
একদিন এই কথাপ্রসঙ্গে কুসুম গৌরীর সম্মুখেই তাহার মামীকে
বলিয়াছিল, “এত খোঁজাখুজির দরকার কি মামী, উপেনের সঙ্গে
গৌরীর বিয়ে দিয়ে দাও। কি বলিস্ গৌরী ?”
গৌরী ঘাড় বাঁকাইয়া সলজ্জ হাস্যসহকারে বলিয়াছিল, “দূর!”
কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “দূর কেন, উপেন কি মন্দ বর ?”
গৌরী লজ্জার মুখে উত্তর দিল, “ও যে উপীনদা।”
উপহাসের সহিত কুসুম বলিল, “হলােই বা দাদা। বেশ তাে,
দাদাকে নিয়ে ঘর করবি।”
চট্ করিয়া গৌরী উত্তর করিল, “বাবাকে দাদাকে নিয়ে ঘর
করবাে বল।”
২৪

গাঁটছড়া
প্রবীণার ন্যায় এই পাকা উত্তরে পরাজিত হইয়াও কুসুম হাসিয়া
উঠিল।
তা উপেনের বিবাহ দিবার জন্য কুসুমের যে বিশেষ কিছু
আগ্রহ ছিল, তাহা নহে। বরং দয়ারাম সময়ে সময়ে এ বিষয়ে
একটু আগ্রহ প্রদর্শন করিয়া বলিত, “তাই তাে, ছোঁড়াটা ডাগর
হয়ে উঠেছে, ওর একটা বিয়ে দেওয়া দরকার হয়েছে।”
কুসুম ইহার অসম্মতি প্রকাশ করিরা উত্তর দিত, “হাঁ, আপনি
থাকতে ঠাই পায় না, শঙ্করাকে ডাকে!” নিজে পরের ভাতে রয়েছে,
বিয়ে দিলে তাকে খাওয়াবে কি ?”
দয়া। খাওয়াবে কি ব’লে বিয়ে দেবে না ?
কুসু। না। পরের মেয়ে একটা গলায় গেঁথে দিলেই হলাে।
ওর বিয়ের ভাবনার চাইতে তুমি গিরির বিয়ের ভাবনা ভাব দেখি।
দয়া। সে ভাবনা তাে আছেই। তবে কি জান, লােকে বলবে,
ছোঁড়াটাকে চাকরের মতন খাটিয়ে এক মুঠো ভাত দিচ্ছে, কিন্তু ওর
হিল্লে কিছু করলে না।
কুসুম রাগিয়া ঝঙ্কার দিয়া বলিত, “তা বলু। যার নিজের
পেটের ভাত করে খাবার ক্ষমতা নাই, সে চাকরের
সে চাকরের মত খেটে
খাবে না তাে কি করবে ? ও পারে, নিজের হিল্লে নিজে করবে,
পারে, আইবুড়াে হয়ে থাকবে। তােমাকে ওর ভাবনা ভাবতে
হবে না।”
স্ত্রীকে রাগিতে দেখিয়া দয়ারাম চুপ করিয়া যাইত।
তা দয়ারাম কুসুম অপেক্ষা উপেনকে বেশী ভালবাসিত বলিয়াই
যে তাহার বিবাহ দিবার জন্য আগ্রহান্বিত ছিল, তাহা নহে,
ইহাতে তাহার একটু স্বার্থসিদ্ধির আশা ছিল । উপেন তাে সেই

গাঁটছড়া পােষ্য হইয়া রহিয়াছে, এবং সম্ভবতঃ বরাবর থাকিবেও। বাপের ঘর-ভিটা নাই যে, সেখানে যাইবে, লেখাপড়াও এমন কিছু জানে যে, চাকরী-বাকরী করিয়া নিজের আশ্রয় নিজে করিয়া লইবে । সুতরাং কুপােষ্যের ন্যায় তাহাকে প্রতিপালন করিতেই হইবে; স্ত্রীর ভাই—তাহাকে তত তাড়াইয়া দিতে পারিবে না। অথচ এই প্রতিপালনের বিনিময়ে তাহার নিকট হইতে আর্থিক বিষয়ে কিছু সাহায্যলাভের আশাও নাই। সাহায্যের মধ্যে গরু বাঁধা, বাজার করা, তামাক সাজা, ছেলেটা ধরা, এই পর্যন্ত। এ দিকে গিরির বিবাহে কিছু থােক টাকার দরকার । বড় কম টাকা নয়, ছয় সাত শত। ঝিঙেখালির উমেশ সরকার চারি শত নগদের কমে কিছুতেই রাজি হইবে না। কেনই বা রাজি হইবে ? পাশ করা ছেলে, সকলই পছন্দমত। নগদ চারি শত, আর দু’একখানা গহনা ও ঘরখরচেও কোন্ না আড়াই শত তিন শত পড়িবে । মােটের উপর সাত শত টাকা চাই। এই সাতশাে টাকা ঘর হইতে বাহির করিতে গেলে টাকাগুলার সঙ্গে প্রাণটাও যে বাহির হইয়া যাইবে, এ কথা তাে কুসুম বােঝে ; সে শুধু ভাল ঘর-বরের দাবী করিয়াই নিশ্চিন্ত। ভাল ঘর-বরই জুটিতে পারে, অথচ ঘর হইতে দুই এক শত টাকা বাহির করিলেই চলে, যদি পরেশ মিত্তিরের মেয়েটার সঙ্গে উপেনের বিবাহ দেওয়া যায়। মেনীর মা চার বিঘা জমি বেচিয়া নগদ ছয় শত টাকা দিতে প্রস্তুত। উহার এক শশা খরচের অঙ্কে ধরিলে থােক পাঁচশাে মজুদ থাকে। তাহা হইলে আর দুইশাে টাকা বাহির করিলেই গিরির বিবাহ হইয়া যায়। কিন্তু কুসুম তাে এত কথা বুঝে না; সে শুধু ওর বৌ কি খাইবে, এই ভাবনাতেই অস্থির। ;

গাঁটছড়া তাহার কপালে যাহা আছে, তাহাই সে খাইবে, সে ভাবনা আমি এখন হইতে ভাবিতে যাই কেন? কিন্তু মেয়েমানুষের মাথায় এত বুদ্ধি তত আসে না! নাঃ, ইহাকেই বলে—‘স্ত্রীবুদ্ধি প্রলয়ঙ্করী। তা কুসুমের মাথায় বুদ্ধি যে ছিল না, তাহা নহে, এবং ঘর হইতে টাকা বাহির করা অপেক্ষা বাহিরের টাকায় মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন হইবার পক্ষে তাহার আপত্তিও কিছুমাত্র ছিল না; শুধু আপত্তি ছিল, উপেনের এরূপ পরের ভাতে থাকায় । তাহার ভাই যে একমুঠা পেটের ভাতের জন্য পরের ঘরে চাকরের মত হীনভাবে থাকিয়া দিন কাটাইবে, ইহা কুসুমের তেমন ভাল লাগিত না। দয়ারাম তাহার স্বামী, কিন্তু উপেনের পর -কুটুম্ব ছাড়া আর কেহ নয় । কুটুমের ঘরে এমনভাবে বারমাস থাকা ভাল কি? দয়ারাম ইহাতে আপত্তি বা বিরক্তি প্রকাশ না করিলেও লােকের কাছে কুসুমের মাথা হেঁট হয় যে! আর দয়ারামও মুখে বিরক্তি প্রকাশ না করিলেও মনে মনে যে বেশ সন্তুষ্ট নহে, দয়ারামের কথায় বা কার্যে কুসুম এটুকু বেশ অনুভব করিয়া লইতে পারিত। হয় তাে গাইটাকে খাবার দিতে বিলম্ব হইতেছে। দয়ারাম গম্ভীরভাবে নিজেই গিয়া বিচালি কাটিতে বসিত। কুসুম আসিয়া যদি জিজ্ঞাসা করিত, “তুমি আবার বিচালি কাটতে বসলে কেন?” তাহা হইলে দয়ারাম গম্ভীর মুখে উত্তর করিত, ‘বিচালি কেটে না দিলে গরুটা যে খেতে পায় না।” কুসু। খেতে পায় না, উপনে এসে খেতে দেবে । দয়া। তার ক্ষিদে না পেলে তো ঘরে ফিরবে না! ততক্ষণ গরুটা হাঁ করে দাড়িয়ে থাকবে ? উপেন যদি একদিন না পারে, আমার গরু—আমাকে খেতে দিতেই হবে। না দিলে আমারি ক্ষতি। কথাটা বেশ সহজ স্বরে স্বভাবগম্ভীরভাবে বলিলেও কুসুম কিন্তু २१ এই সহজ গাঁটছড়া স্বরের মধ্যেই ক্রোধের উষ্মতা বেশ দেখিতে পাইত ; দেখিয়া নীরবে মাথা হেঁট করিয়া সরিয়া যাইত। তার পর উপেন যথাসময়ে ঘরে ফিরিলে কুসুম তাহাকে তিরস্কার করিয়া জিজ্ঞাসা করিত, “এতক্ষণ কোন্ চুলােয় ছিলি ?” উপেন দিদির রাগটাকে উপেক্ষা করিয়া উত্তর দিত, “কোথায় পাকবাে ! রায়েদের ওখানে বসে তাস খেলা দেখছিলুম।” ক্রোধে কুটী করিয়া কুসুম বলিল, “সেখানে বসে তা খেলা দেখছিলি, কিন্তু এখানে তাের গরু দেখে কে ?” সপ্রতিভভাবে উপেন বলিল, “বটে বটে, গরুর কথাটা মনেই ছিল না।” বলিয়া সে ব্যস্তভাবে গরুকে খাবার দিতে যাইতেছিল, কুসুম তাহাকে ডাকিয়া বােষতীব্র কণ্ঠে বলিল, “তােমাকে আর কষ্ট কত্তে হবে না, গরুকে খাবার দেওয়া হয়েছে।” উপে। কে খাবার দিলে? কুসু। যার গরু, সে-ই দিয়েছে। সে ছাড়া বাড়ীতে ক’টা চাকর- নফর আছে ? শঙ্কিতভাবে উপেন বলিল, “ঘােষজা মশাই খাবার দিয়েছেন? তুমি বারণ করলে না কেন? কুসুম বলিল, “গাইটা হাঁ করে দাড়িয়ে থাকবে, আর আমি তাকে খাবার দিতে বারণ করবাে ?” উপেন মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে জিজ্ঞাসা করিল, “বড় ভুল হয়ে গিয়েছে বটে। ঘােষজা মশাই কিছু বল্লেন না কি ? তীব্ৰস্বরে কুসুম বলিল, “এ বেলা তােমাকে বেশী করে একথালা ভাত বেড়ে দিতে বলে।”

গাঁটছড়া উপেন এবার ঈষৎ হাসিল'; বলিল, “এটা দিদি, তােমার মনগড়া কথা। ঘােষজা মশাই এমন কথা বলবেন না।” ঘােষজা মশায়ের প্রতি তাহার এই অতিরিক্ত শ্রদ্ধা দর্শনে কুসুম বিরক্ত হইয়া বলিল, “বলেন না বলেই তাের আস্পর্ধা এত বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু তাের এ কাজ কি ভাল হয়েছে ?” কাজটা যে ভাল হয় নাই, ইহা উপেনও মনে মনে বেশ বুঝিয়া ছিল সুতরাং সে দিদির তিরস্কারের কোন উত্তর দিতে পারি না। শুধু শঙ্কিতভাবে ঘোজা মহাশয়ের গম্ভীর দৃষ্টি এড়াইয়া চলিতে চেষ্টা করিত। কোন দিন বা দয়ারাম পরিশ্রান্ত হইয়া ধূমপানের অভিপ্রায়ে তামাক সাজিয়া দিবার জন্য উপেনকে ডাকিলেন। কিন্তু তাহার সাড়া না পাইয়া গম্ভীরভাবে কুসুমকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “উপেন বাবু গেলেন কোথায় ?” কুসুম উত্তর দিল, “কি জানি, এই যে বসেছিল।” গম্ভীর মুখে দয়ারাম বলিল, “কিন্তু দরকারের সময় চলে গিয়েছে।” বলিয়া সে মুখে একটা তীব্র বিরক্তির ভাব আনিয়া নিজে যখন তামাক সাজিতে বসিত, তখন তাহার সেই বিরক্তি-কুঞ্চিত মুখের দিকে দৃষ্টি পড়িলে কুসুম লজ্জায় যেন মরমে মরিয়া যাইত ; তাহার মনে হইত, হতভাগা উপেনকে এখান হতে তাড়িয়ে তবে আমার অন্য কাজ।” কিন্তু তাড়াইবার উপায়ও ছিল না। কথাপ্রসঙ্গে সে যদি কখন দয়ারামের কাছে বলিত, “উপনে মিছে ব'সে ব'সে অন্ন ধ্বংস করে কেন? তার চাইতে ও চলে গিয়ে নিজের পেটের ভাত নিজে করে খা।” ২৯

গাঁটছড়া
, আমি
তাহা হইলে দয়ারাম দুঃখীতভাবে উত্তর করিত, “তা যেতে
পারে যাক্, কিন্তু আমি ওকে তােমার ভাই বলে মনে করি না
কুসুম, নিজের ভাই মনে করেই সময়ে সময়ে রাগের মাথায় দু’এক
কথা বলে ফেলি। তাতে যদি তােমার রাগ হয়-
বাধা দিয়া কুসুম অপ্রতিভভাবে বলিত, “না
তাে রাগের কথা বলছি না ; ও ছোড়া যে বসে বসে কুড়ে হয়ে
গেল।”
গম্ভীরভাবে মস্তক সঞ্চালন পূর্বক দয়ারাম বলিত, “ও বসে
আছেই বা কোখানটায়? সংসারের কোন্ কাজটা ওর দ্বারায়
না হচ্ছে ? গরু-বাছুর দেখা, হাটবাজার, দোকান, সকল কাজই
তাে উপেন কচ্চে। সত্যি বলতে গেলে কুড়ে হয়ে যাচ্চি বরং
আমি। এক ছিলিম তামাক সেজে খেতে হলে ওকে ডাকতে
হয়।”
উপেনের উপর এই মেহসূচক উক্তির উত্তরে কুসুম আর কিছু
বলিতে পারিত না। দয়ারাম তাহাকে উপদেশ দিয়া বলিত, “তােমার
সাতটা নয়, পাঁচটা নয়, একটা ভাই, ও বাঁচলে তােমার বাপের
বংশরক্ষা হবে। এখন ওর যদি ভাল চাও, তবে ওকে ফাকে
ছেড়ে দিও না । ওকে কাছে রেখে মানুষ করে বিয়ে-থা দিয়ে
সংসারী করে দাও।”
অগত্যা কুসুম উপেনকে তাড়াইবার ইচ্ছাকে মনে স্থান দিতে
পারত না। দয়ারামও দুই বেলা দুই মুঠা ভাতের পরিবর্তে উপেনের
দ্বারা একটা পাঁচ টাকার মাহিনার চাকরের কাজ পাওয়াকে
ক্ষতিজনক মনে করিত না।
৩০

গাঁটছড়া
“উপেন!”
“কেন দিদি ?”
“বিয়ে করবি?”
“হু। তুমি বিয়ে দেবে না কি ?”
সহাস্যে কুসুম বলিল, “আমি দিতে যাব কেন ? যে দের মালিক,
সেই দেবে।”
উপেন জিজ্ঞাসা করিল, “কে, ঘােষজা মশাই ?”
‘।”
“বেশ তাে, আমারাে বিয়ে কত্তে সাধ হয়।”
‘সাধ তত হয়, কিন্তু বিয়ে করা কি অমনি মুখের কথা ?”
“তবে কি ওটা দাঁতের কথা দিদি ?”
“দেতো কথাও নয়। অনেক দিক ভেবে
তবে বিয়ে
হয়।”
“কোন্ কোন্ দিক্‌ ভাবতে হয়, শুনি।”
“যাকে বিয়ে করবি, তাকে খাওয়াবি কি ?”
“আমি যা খাচ্চি, সেও তাই খাবে।”
“তুই তাে তাের ঘােষজা মশায়ের ভাত খাচিস।”
“তাকেও ঘােষজা মশায়ের ভাত খেতে হবে।”
ঈষৎ হাসিয়া কুসুম বলিল, “কিন্তু সে তত তাের মত ওর
বাঁধতে, তামাক সাজতে, বাজারে যেতে পারবে না ?”
মাথা নাড়িয়া উপেন বলিল, “ঘর ঝাঁট দিতে, বাসন মাজতে,
রাঁধতে বাড়তে পারবে তাে ?”

গাঁটছড়া কু। সহাস্য মুখে কুসুম বলিল, “তা হলে সে তাের ঘােষজা মশায়ের ঘরে চাকরাণী হয়ে থাকবে বল।” উপেন বলিল, “থাকলেই বা। চাকরের স্ত্রী চাকরাণীই হয়, রাজরাণী হয় না।” উপেনের কথায় কুসুম হাসিয়া উঠিল ; বলিল, “মন্দ যুক্তি নয়। কিন্তু তাের ঘােষজা মশায়ের যেমন চাকরের দরকার, আমার যদি তেমন চাকরাণীর দরকার না থাকে ?” উপে। দরকার না থাকে, বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবে। বয়ে গেছে আমার খাওয়াতে। আমি কেন শুধু শুধু তাকে খাওয়াতে যাবাে ? উপে। তবে ‘উপেন, বিয়ে করবি’ বলতে এসেছ কেন ? কুসু। বিয়ে কত্তে বলেই বুঝি খেতে দিতে হয় ? তুই আর একটা মেয়েমানুষকে খাওয়াতে পারবি না? মাথা নাড়িয়া উপেন উত্তর করিল, “উহু।” ঈষৎ রাগতভাবে কুসুম বলিল, “তবে তাের বিয়ে করেও কাজ নাই।” হাসিতে হাসিতে উপেন বলিল, “এর চাইতে ভাল কথাও আর কিছুই নাই দিদি।” ক্রোধে কুটী করিয়া কুসুম বলিল, “ভাল কথা বৈ কি। বিয়ে করবি না, বাপের বংশলােপ হবে, বাপ-পিতামহের নাম ডুবে যাবে, এর চাইতে ভালকথা আর আছে কি ?” দিদির রাগকে উপেক্ষার হাসিতে উড়াইয়া দিয়া উপেন বলিল, “বাপ- পিতামহের নাম অনেক দিন ডুবে গিয়েছে দিদি, যে দিন থেকে গােপাল রায়ের ছেলে নাম ডুবে গিয়ে দয়ারাম ঘােষের শালা নাম পেয়েছি।” ৩২ 2) গাঁটছড়া রােষক্ষুব্ধ-কণ্ঠে কুসুম বলিল, “তবু তত বােনায়ের ভাত খেয়ে পড়ে আছি।” উপেন বলিল, “না থেকে কি করবাে দিদি? শা—অধিকারীর ভাতের চেয়ে এ ভাত অনেক মিষ্টি।” রাগে তৰ্জন করিয়া কুসুম বলিল, “তাের মিষ্টি ভাতে ছাই পভুক! দেখ উপেন, তুই নির্ভাবনার ভাত খেয়ে খেয়ে একেবারে অধঃপাতে গিয়েছি।” মাথা চুলকাইয়া উপেন বলিল, “তুমি আজ বড়ই রেগে উঠেছ দিদি। রাগ হলে তােমার জ্ঞান থাকে না।” ক্রোধকম্পিত-কণ্ঠে কুসুম বলিল, “আমার জ্ঞান খুব আছে উপনে, তােরি জ্ঞান বুদ্ধি সব লােপ পেয়েছে। তাই তুই “তাই আজ উপেন্দ্রনাথ তােমার মনােমত বাজার আনতে পারে নি, কুসুম?” দয়ারামকে দেখিয়া কুসুম তাড়াতাড়ি কঁাধের আঁচলটা মাথায় তুলিয়া দিল, এবং ক্রোধে জাতঙ্গী করিয়া বলিল, “হ, আমার ছাদ ভাল রকমে কত্তে পারে নি। দেখ, তুমিই আস্কারা দিয়ে ওকে মাথায় তুলেছ।” ঈষৎ হাস্য সহকারে দয়ারাম বলিল, “কিন্তু তুমি তাে দিন রাত তর্জন-গর্জন করে ওকে পায়ে নামাবার চেষ্টায় আছ, তবে আর ভয় ও বেচারী কোনকালেই মাথায় উঠতে পারবে না, পায়েও নামবে না, ত্রিশঙ্কুর মত যেখানকার মানুষ, সেইখানেই থেকে যাবে। কি বল হে উপেন্দ্রনাথ ?” বলিয়া দয়ারাম উচ্চ হাসি হাসিয়া উঠিল । উপেনও নতমস্তকে দাঁড়াইয়া মৃদুমন্দ হাসিতে লাগিল। তাহাদিগকে হাসিতে দেখিয়া কুসুম আরও রাগিয়া উঠিল ; রাগে হাত-মুখ নাড়িয়া বলিল, “হ, কি কুসুম !

গাঁটছড়া
আমি ওকে রাতদিনই গাল-বকুনি দিচ্চি, তুমি দেখতে পাচ্ছে। ও
আমার বড় পর কি না, আমার সততা ভাই যে।”
কুসুমকে আরও বেশ রাগাইবার অভিপ্রায়ে দয়ারাম হাসিতে
হাসিতে বলিল, “আপন ভাই হয়েই এই, সততা ভাই হ'লে কি যে
হতাে—
তর্জন সহকারে কুসুম বলিল, “হ, হ'ত, মারামারি কাটাকাটি
হত! আমার ভাইকে আমি যা খুসী তাই বলবাে, তােমার তাতে
কি বল তাে ?”
মুখখানাকে একটু গম্ভীর করিয়া দয়ারাম বলিল, “আমার কিছুই
নয়, তবে লােকে বলে কি জান, ওদের বৌটা পাড়া-কুঁদুলী ; নিজের
ভাইকেই যা মুখে আসে, তাই বলে ।
রাগে মুখ লাল করিয়া ক্রোধরুদ্ধস্বরে কুসুম বলিল, “হাঁ, বলে,
বেশ করবে, বলবাে, লােকের তাতে এত মাথাব্যথা কিসের ? তারা
ভায়ের দোষ দেখতে পায় না?”
হাসি চাপিয়া দয়ারাম বলিল, “তা আর কৈ দেখতে পায় কুসুম,
তারা তােমারি শুধু নিন্দে করে।”
কুসুম বলিল, “করুক আমার নিচ্ছে, তাতে তােমার কি ?”
সহাস্যে দয়ারাম বলিল, “আমার কি, তবে তােমার নিন্দে শুনলে
আমার একটু কষ্ট হয়। কি বল হে উপেন, কষ্ট হয় না কি?
উপেন উত্তর করিল, “তা হয় বৈ কি ঘােষজা মশাই।”
মুখভঙ্গী সহকারে কুসুম বলিল “আহা হা, তাের ঘােষজা মশায়ের
কষ্ট হাে না হােক, তাের খুবই কষ্ট হয় বটে। দেখ উপনে,
উপনে, আমার
কষ্ট তুই যদি বুঝতে পারতিস্, তা হলে আজ আমার ভাবনা কি ?
মস্তকসঞ্চালন সহকারে দয়ারাম বলিল, “সে কথা সত্যি উপেন।
বলে,
৩৪

গাঁটছড়া তুমি যদি তােমার দিদির কষ্ট বুঝে চলতে, তা হলে আজ তােমা দিদির কোটা-বালাখানা না হয়েই থাকতাে না। কিন্তু তুমি তাে তা পারুলে না, কাজেই এখন যা পারবে—তামাক এক ছিলিম তৈরী কর দেখি।” উপেন তামাক সাজিতে চলিয়া গেল। দয়ারাম তখন কুসুমকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “আজ এমন উগ্রচণ্ডা মূর্তিতে উপেনের ওপর পড়েছিলে কেন ? ও বেচারী করেছে কি ?” ঝঙ্কার দিয়া কুসুম বলিল, “করেছে আমার মাথা আর মুণ্ডু! হতভাগা আবার আমার করবে কি ? বােনায়ের অন্নদাস হয়ে পড়ে রয়েছে—ক্ষ্যাম তাে এই।” সন্ত্রস্তভাবে দয়ারাম বলিয়া উঠিল, “ছি কুসুম, এমন সব কথা বতে আছে ? শুনলে ওর মনে কত কষ্ট হবে।” ক্রোধগম্ভীর স্বরে কুসুম বলিল, “কষ্ট হবে না ছাই হবে। মনে আবার দুখ কষ্ট ঘেন্না লজ্জা আছে না কি?” স্থিরগম্ভীর কণ্ঠে দয়ারাম বলিল, “সব আছে কুসুম, সব আছে। আমার এক মুঠো ভাত খাচ্চে ব’লে ওর লজ্জা-ঘেন্না চলে যায় নি।” কুসুম নীরবে দাঁড়াইয়া রাগে যেন ফুলিতে লাগিল। দয়ারাম তাহাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিল, “আচ্ছা কুসুম, উপেন কি শুধু আমার ভাতেই আছে ? আমার ভাতে আমার যেমন অধিকার, তােমারাে তেমনি অধিকার নাই কি? সে অধিকার যখন তােমার আছে, তখন তােমার ভাত তােমার ভাই খাবে, তাতে ওর অপমান কিসের?” গর্জন সহকারে কুসুম বলিল, “না, অপমান আর কিসের, চার পাে মান! ব্যাটাছেলে, হাত-পা রয়েছে, ও কেনই বা বসে বসে বােনের ভাত খাবে ?”

গাঁটছড়া দয়ারাম ইহার উত্তর দিতে যাইতেছিল, এমন সময় উপেন আসিয়া তাহার হাতে হুকা দিয়া বলিল, “আপনি তামাক খান ঘােষজা মশাই দিদি আজ বড্ডই রেগে উঠেছে, বােঝালেও বুঝবে না। মিছে কেন নিজেও ববেন, দিদিকেও বকাবেন?” বলিয়া সে একবার দিদির ক্রোধগম্ভীর মুখের দিকে চাহিল এবং দিদির এই রাগটাকে সে যেন আদৌ গ্রাহ করে না, এমনই মুখের ভাব দেখাইয়া ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল। দয়ারাম পত্নীকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “দেখলে, নেহাৎ গােবেচারী, মনে একটুও রাগ নাই। এর ওপরেও তােমার রাগ হয়?” রােষস্ফীত কণ্ঠে কুসুম বলিল, “ হয়—রাগ নাই বলেই তাে এর ওপর বেশী রাগ হয়। তা নইলে সাতটা নয়, পাঁচটা নয়, একটা ভাই, এক মুঠো ভাতের তরে কি ওকে এমন সব কথা কুসুম কথা শেষ করিতে পারিল না, চোখ দিয়া দুই বিন্দু অশ্রু গড়াইয়া পড়িল। আঁচলে চোখ মুছিতে মুছিতে সে তাড়াতাড়ি সেখান হইতে সরিয়া গেল। দয়ারাম বসিয়া গম্ভীরভাবে হুকায় টান দিতে লাগিল। “এখানে বসে কেন উপীনদা ?” বােসদের পড়াে বাগানের ভিতর জঙ্গলভরা পুকুরের পাড়ে একটা বড় আমগাছের শিকড়ের উপর গাছের কাণ্ড ঠেস্ দিয়া উপেন চুপ করিয়া বসিয়াছিল। পুকুরের জল শৈবালদলে ও পানায় ঢাকিয়া গিয়াছিল, শুধু মাঝখানে খানিকটা ফাঁকা জায়গায় কালাে জল সূৰ্য্যকিরণে চক্ চক্ করিতেছিল। একটা পানকৌড়ী সেইখানে ডুব দিয়া

গাঁটছড়া
আহারের অন্বেষণ করিতেছিল। কয়েকটা কাদাখোঁচা অব্যক্ত শব্দ
করিতে করিতে পুকুরের ধারে ধারে চরিয়া বেড়াইতেছিল। উপেন
চুপ করিয়া বসিয়া পাখীগুলার স্বচ্ছন্দ বিচরণ লক্ষ্য করিতেছিল।
এমন সময় গৌরী সম্মুখে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “এখানে বসে
কেন উপীনদা?”
উপেন দৃষ্টি না ফিরাইয়াই যেন নিতান্ত উপেক্ষার স্বরে উত্তর
দিল, “বসে আছি।”
গৌরী কিছুক্ষণ উপেনের মুখের দিকে চাহিয়া চাহিয়া বলিল,
“তােমার মনটা যেন ভার ভার।”
কুঞ্চিত মুখে উপেন উত্তর করিল, “হ।”
তাহার দিকে আর একটু সরিয়া আসিয়া গৌরী জিজ্ঞাসা করিল,
“কেন উপীনদা, কি হয়েছে?”
“কিছুই না।”
“তবে?”
উপেন একটা ইটের টুকরা লইয়া শিকড়ের গায়ে ঠুকিতে ঠুকিতে
গম্ভীরমুখে জিজ্ঞাসা করিল, “তােরও মা নাই, না গৌরী ?
গৌরী বলিল, “না, আমার মামী আছে।”
“তা বটে” বলিয়া উপেন ইটের টুকরাটা পুকুরের দিকে ছুড়িয়া
দিল। কাদাখোঁচাগুলা ভয় পাইয়া উড়িয়া খানিক দূরে গিয়া বসিল
গৌরী বলিল, “কেন, তােমারও তত দিদি আছে, উপীনদা ?”
জ কুঞ্চিত করিয়া উপেন উত্তর করিল, “তা আছে।”
গৌরী বলিল, “কেন, দিদি কি তােমায় ভালবাসে না?”
উপেন বলিল, “বাসে বৈ কি।”
মৃদু হাসিয়া গৌরী বলিল, “তবে তােমার এত দুখ কেন?”
৩৭

গাঁটছড়া
চমকিত দৃষ্টিতে গৌরীর মুখের দিকে চাহিয়া রুক্ষকণ্ঠে উপেন
জিজ্ঞাসা করিল, “দুখটা আমার কিসের দেখলি তুই ?”
গৌরী সহাস্যমুখেই উত্তর দিল, “কিসের দুখু, তা কেমন করে
জানবাে বল। মােদ্দা দুখ একটু হয়েছে তােমার।”
“কে বলে তােকে দুখু হয়েছে ?”
ঘাড় দোলাইয়া গৌরী বলিল, “কে বলবে আবার? আমি
বুঝতে পেরেছি।”
কুটী করিয়া উপেন বলিল, “খুব বুদ্ধি তাের দেখছি! তুই
এখানে কেন এসেছিস্?”
গৌরী। আমি বেলপাতা তুলতে এসেছি।
উপেন। বেলপাতা কি হবে ?
গৌরী। শিবপূজো হবে।
উপেন। কে শিবপূজো করবে? তুই ?
সলজ্জ হাস্যসহকারে গৌরী বলিল, “দূর, আমি শিবপূজো কত্তে
যাব কেন ? মামীমা করবে ?”
সহাস্যে উপেন বলিল, “ওঃ, আমি ভেবেছিলাম, ভাল বর পাবার
তরে তুই শিবপূজো করবি।”
লজ্জার মুখে গৌরী বলিল, “ই, আমি শিব পূজো করব।
আমি শুধু বােশেখ মাসে শিবপূজো করি।”
“শিবের মন্ত্র জানিস্ তুই?”
“হু।”
“কৈ, বল দেখি।”
“পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে বুঝি মন্ত্র বলে ? তুমি কি উপীনদা ?”
“আমি উপীনদা।”

গাঁটছড়া • “আর- “আর কি ?” “আর মেনীর বর।” “বেয়াে আবাগী” বলিয়া উপেন তাহাকে মারিবার জন্য উঠিতে উদ্যত হইলে গৌরী খিল্ খিল্ করিয়া হাসিতে হাসিতে একদিকে ছুটিয়া পলাইল। উপেন পুনরায় বৃক্ষকাণ্ডে ঠেস্ দিয়া বসিল। সূৰ্য্য তখন অনেকটা উপরে উঠিয়াছিল। গাছের পাতার ফাক দিয়া খানিকটা রােদ আসিয়া মাথার উপর পড়িল। গাছের ডালে বসিয়া একটা ঘুঘু উচ্চকণ্ঠে কাহাকে ডাকিতেছিল; যাহাকে ডাকিতেছিল, সে বুঝি বাগানের অপর প্রান্ত হইতে থাকিয়া থাকিয়া তাহার আকুল আহ্বানের প্রতিধ্বনিরূপে উত্তর দিতেছিল । উপেন হাত দুইটা গাছের গায়ে রাখিয়া তাহার উপর মস্তক স্থাপন করিয়া নীরবে বসিয়া রহিল। বসিয়া বসিয়া যাত্রার দলের অধিকারীর রূঢ় কথাগুলা হইতে দিদির কথার রূঢ়তা কত বেশী, তাহাই ভাবিয়া স্থির করিতে লাগিল। পাখীটা ডাকিয়া ডাকিয়া শ্রান্ত হইয়া নীরব হইল, গৌরী বেলপাতা তুলিয়া চলিয়া গেল, রােদটা ক্রমে চড়া হইয়া মাথা হইতে মুখে বুকে আসিয়া পড়িল। তখনও সেই একই ভাবে বসিয়া উপেন দিদির কড়া কথাগুলার মধ্যে স্নেহের কতটুকু আভাস আছে তাহাই খুঁজিয়া বেড়াইতে লাগিল। কিন্তু বহুক্ষণের অনুসন্ধানেও সে যখন স্নেহের বিন্দুমাত্র কোমলতা খুঁজিয়া পাইল না, বরং দিদির প্রত্যেক উক্তিই অক্ষম অন্নদাসের প্রতি তীব্র তিরস্কাররূপে তাহার চিত্তে নিদারুণ দুঃখের বেদনা জানাইয়া দিতে লাগিল, তখন সে নিতান্ত বিরক্তভাবে উঠিয়া গৃহাভিমুখে অগ্রসর হইল । ৩৯ গাঁটছড়া যে রাস্তা দিয়া উপেন যাইতেছিল, সেই রাস্তার ধারেই মেনীদের বাড়ী। উপেন যখন মেনীদের বাড়ীর দরজার সম্মুখবর্তী হইয়াছে, তখন হঠাৎ মেনী মুখে খুব একটা শঙ্কাজনিত ব্যাকুলতার ভাব লইয়া ছুটিয়া বাড়ীর বাহির হইল, এবং বাহির হইয়াই উপেনকে সম্মুখে দেখিয়া থমকিয়া দাঁড়াইল। উপেনও তাহার ভাবভঙ্গী দেখিয়া আশ্চর্যান্বিতভাবে দাঁড়াইয়া পড়িল। দাড়াইবামাত্র মেনী ব্যাকুল- নেত্রে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া শঙ্কাকম্পিত কণ্ঠে বলিয়া উঠিল, “একবার আমাদের বাড়ীতে আসবে না?” কৌতূহলান্বিতভাবে উপেন জিজ্ঞাসা করিল, “কেন, কি হয়েছে?” “ওগাে, আমার মা কেমন কচ্চে। একবার এস না গা!” বলিয়াই মেনী উপেনের একখান হাত ধরিয়া ফেলিল। তাহার কথাগুলার মধ্যে এতটা কাতরটা ছিল যে, তাহাতে উপেন মেনীর এই স্পর্ধার জন্য কিছুমাত্র বিরক্ত হইতে বা যাইতে অস্বীকার করিতে পারিল । সে মেনীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ একপ্রকার ছুটিয়াই বাটীর মধ্যে প্রবিষ্ট হইল। গিয়া দেখিল, মেনীর মা জ্বরে বেহুস হইয়া পড়িয়া রহিয়াছেন ডাকিলে সাড়া পর্যন্ত পাওয়া যায় না। দেখিয়া উপেন মেনীকে জিজ্ঞাসা করিল, “কদিন জ্বর হয়েছে ?” ‘‘আজ তিন চার দিন।” “ডাক্তার দেখান হচ্চে?” “না” “কেন হয় নি?” “মা বলে, ডাক্তারকে টাকা দিতে হবে, টাকা কোথায় ?” উপেন একটু ভাবিয়া বলিল, “আচ্ছা, আমি এক্ষুণি ডাক্তার নিয়ে আসছি।” ;

গাঁটছড়া
বলিয়াই সে দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল, এবং অল্পক্ষণ পরেই
ডাক্তার সঙ্গে পুনরায় উপস্থিত হইল।
ডাক্তার রােগী দেখিয়া বলিলেন, “ভয় নাই, ম্যালেরিয়া জ্বর,
শিশি দুই তিন মিশ্চার খেলেই সেরে যাবে।”
কিন্তু ঔষধের দাম,—ভিজিটের টাকা ? উপেন একটু ইতস্ততঃ
করিয়া বলিল, “ওষুধ দিন ডাক্তারবাবু; আমি আপনার সব টাকা
মিটিয়ে দেব।”
উপেনের টাকা দিবার ক্ষমতা কত দূর, তাহা জানিতে ডাক্তারের
বাকী ছিল না; তথাপি ভদ্রতার অনুরােধে তাঁহাকে স্বীকৃত হইতে
ও ঔষধ দিতে হইল। উপেন ঔষধ আনিয়া দিয়া আহারাদির জন্য
প্রস্থান করিল।
“রান্না হয়েছে দিদি, ভাত দেবে?”
“হঁ দেব, খেতে ব’স না। সকাল থেকে কত কাজ করে এলে,
তাড়াতাড়ি খেতে না দিলে ভাল দেখায় কি ?”
দিদির রূঢ় উত্তর শ্রবণে শঙ্কিতভাবে ঘাড়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে
উপেন বলিল, “কাজ আর আমি কি কচ্চি দিদি? কাজ না করলেও
তত খেতে দিয়ে আসছে।
ঝঙ্কার দিয়া কুসুম বলিল, “ঝমারি করেছি ; আমিই তাে এই
করে তাের আস্পর্ধা বাড়িয়ে দিয়েছি।”
যেন একটু ভয়ে ভয়ে উপেন জিজ্ঞাসা করিল, “কেন কি হয়েছে
দিদি?”
৪১

গাঁটছড়া
তর্জন সহকারে কুসুম বলিল, “হয়েছে আমার মাথা মুণ্ডু ছাদ্দ
পিণ্ডি। আর কিছু বাকী আছে?”
দিদির রাগের প্রকৃত কারণ বুঝিতে না পারিয়া উপেন চুপ করিয়া
দাড়াইয়া রহিল। অদুরে গিরি ছােট থােকাকে লইয়া খেলা
করিতেছিল। সে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে মামা ?”
উপেন একটু ইতস্ততঃ করিয়া উত্তর দিল, “কোথায় থাকবাে
আবার? এই ছিলুম”
গিরি বলিল, “কোথায় ছিলে ? আমি তােত ডেকে ডেকে হাল্লা
হয়ে গেলুম। মা রান্না চাপিয়ে বসে,-কে দোকান যায়, তার ঠিক
নাই। বাবা এতক্ষণে এসে—
ব্যস্ততা সহকারে উপেন বলিয়া উঠিল, “এ্যা, ঘােষজা মশাই
দোকানে গেলেন ?”
গিরি বলিল, “যাবে না তাে কি করবে? মুণ না আলে তাে
রান্না হবে না।”
তর্জন সহকারে কুসুম বলিল, “তুই বছি কেন গিরি ? রান্না
হলে ওর তত বড়ই ক্ষতি। ওর জগন্নাথের আটকে বাঁধা রয়েছে,
আসবে আর খাবে।”
ক্ষুঃ স্বরে উপেন বলিল, “তা আমি কি করবাে? আমাকে তাে
বলেই হ’তে, দোকানে যেতে হবে।”
কুসুম বলিল, “পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে তােমাকে বলতে ভুলে
গিয়েছি। তােমার যে আপিসের চাকরী রয়েছে, তা তাে আমি
জানি না।”
কুণ্ঠিতভাবে উপেন বলিল, “চাকরী নয় দিদি, মেনীর মার বড়
৪২

গাঁটছড়া
বাধা দিয়া কুসুম বলিল, “মেনীর মার অসুখ, তাতে তাের কি
বন্তত ? দিদি মরে পড়ে থাকলেও ফিরে চেয়ে দেখি না, আর
মেনীর মা’র অসুকে তাের এত মাথা ব্যাথা হ’লল কেন?”
ঈষৎ হাসিয়া উপেন বলিল, “তােমার অসুখে তােমাকে দেখার
লােক আছে দিদি, কিন্তু ওদের যে কেউ দেখতে নাই।”
কুদ্ধভাবে কুসুম বলিল, “তাই তুই ছুটে দেখতে গিয়েছিলি। গিয়ে
করলি কি ?”
উপেন বলিল, “ডাক্তার ডেকে এনে ওষুধের বন্দোবস্ত করে দিয়ে
এলাম।”
কুসুম বলিল, “বলিস্ কি, এত কাজ করে এলি? তুই তাে তা
হলে মস্ত কাজের লােক হয়ে উঠলি দেখছি।”
সহাস্যে উপেন বলিল, “কেন দিদি, তুমি কি আমাকে এতই
অকেজো মনে কর ?”
গিরি বলিল, “হ মামা, মেনীর মা’র জন্যে এত খেটে এলে কেন ?
মেনীর মা কি তােমার শাশুড়ী ?
উপেন। তুই থাকতে আর কেউ আমার শাশুড়ী হতে পারে
গিরি ?”
ঘাড় দোলাইয়া গিরি বলিল, “হু, পারে না বৈ কি। আমি তাে
তােমার মিথ্যের শাশুড়ী, কিন্তু মেনীর মা সত্যিকার শাশুড়ী
হবে।”
হাসিতে হাসিতে উপেন বলিল, “তা হয় হবে।”
গিরি বলিল, “হবে নয়, সত্যিই হবে। আমি কিন্তু মামা,
মেনীকে মামী বলতে পারবাে না।”
কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “কি ববি তবে?”
৪৩

গাঁটছড়া
গিরি বলিল, “কালী ঠাকরুণ বলবাে। তাতে কিন্তু মামা তুমি
রাগ কতে পারবে না।”
মেয়েকে তিরস্কার করিয়া কুসুম বলিল, “না, রাগ করবে কেন?
কালী ঠাকরুণ না বলে পেত্নী ঠাকরুণ বলবি, আর ভালাে শশানাবে।
আহা, তবু যদি মেয়ের নিজের রূপ থাকতাে।”
উপেন বলিল, “কেন দিদি, গিরির রূপের অভাব তুমি কোন্
খানটায় দেখলে ?”
কুসুম বলিল, “কোত্থানটায় নয়? কি রূপসী মেয়ে। তাই
আজ এক বছর খুঁজেও বর পাওয়া যাচ্চে না।”
উপেন। সেটা মেয়ের রূপের অভাবে নয় দিদি, পয়সার অভাবে।
পয়সা থাকলে পেত্নীর মত মেয়েরও একদিনে বর জুটে যায়।
কুসুম! হু, তা আর জুটতে হয় না। আচ্ছা, কিছু পয়সা পেলে
তুই মেনীকে বিয়ে কত্তে পারি?
উপেন। হাজারখানেক টাকা পেলে খুব পারি।
কুসুম। বলিস্ কি রে উপেন?
উপেন। কি আর মন্দ বলছি। কথাতেই আছে, কড়ির কাছে
বুড়াের বিয়ে !
কুসুম। তা হলেও ওরকম কালাে-কুচ্ছিত মেয়ে।
উপেন। টাকা তাে কালাে কুচ্ছিত নয় দিদি !
কুসুম। তা হলে তুই টাকাকেই বিয়ে করবি বল্।
উপেন। তা নয় তাে কি ?
গিরি জিজ্ঞাসা করিল, আচ্ছা মামা, হাজার টাকা নিয়ে তুমি কি
করবে ?”
উপেন বলিল, “একটা কারবার করবাে।”
৪৪

গাঁটছড়া
গিরি। আমাকে কিছু দেবে না ?
উপেন। তােকে ? তােকে একটা গয়না গড়িয়ে দেব ।
গিরি। কি গয়না দেবে ?
উপেন। তুই যা চাইবি।
গিরি। আমি যা চাইবে, তাই দেবে?
উপেন। হু।
একটু ভাবিয়া গিরি বলিল, “আমাকে এক ছড়া গিনির মালা দিতে
হবে।”
তুই উঠে
উপেন বলিল, “গিনির মালা—আচ্ছা, তাই দেব।”
কুসুম হাসিয়া বলিল, “তবে আর কি, মেনীর সঙ্গে উপেনের
বিয়ে হয়ে গেল, উপেন হাজার টাকা পেলে, আর তােকেও এক ছড়া
গিনির মালা গড়িয়ে দিলে। আর ভাবনা কি? এখন
খােকাকে দুধ খাইয়ে দে, আর উপেনও নেয়ে আয়।”
রাগের সহিত যে কথাবার্তা আরব্ধ হইয়াছিল, হাসিতে তাহার
সমাপ্তি হইল দেখিয়া উপেন আনন্দে স্নান করিতে গেল। গিরিও
উঠিয়া থােকাকে দুধ খাওয়াইতে চলিল।
“এক, দুই, তিন।”
রাশীকৃত বকুলফুল কুড়াইয়া বকুলগাছের ছায়ায় বসিয়া গৌরী
মালা গাঁথিতেছিল, আর এক একবার মুখ ফিরাইয়া আগ্রহ-চঞ্চল
নেত্রে পার্শ্ববর্তী
পথের দিকে চাহিয়া দেখিতেছিল। কিন্তু যাহার
আগমন প্রতীক্ষা করিতেছিল, সে আসিতেছিল না ; সুতরাং বিরক্ত
ভাবে মুখ ফিরাইয়া লইয়া পুনরায় মাল্যগ্রন্থনে মনােনিবেশ করিতেছিল।
৪৫

গাঁটছড়া প্রভাতের সােনালী রৌদ্র পত্রান্তরাল ভেদ করিয়া, তাহার মুখের উপর পড়িয়া মুখখানাকে সূৰ্য্যালােকশৃষ্ট পদ্মটির মত উজ্জ্বল করিয়া তুলিয়াছিল ; মৃদুবাতাসে বৃন্তচ্যুত ফুলগুলা টুপ টুপ করিয়া তাহার আশে পাশে গায়ে মাথায় পড়িতেছিল ; মাথার উপর একটা কোকিল ডানা গুটাইয়া চুপ করিয়া বসিয়াছিল ; সম্মুখের পথ দিয়া কৃষকেরা মেটো সুরে গাহিতে গাহিতে যাইতেছিল, “আয় রে ভাই কানাই বলাই যাই গােচারণে।” গৌরী এক এক ছড়া মালা শেষ করিয়া সূতার দুই মুখে গ্রন্থি দিয়া পাশে রাখিয়া দিতেছিল। এক এক করিয়া তিন ছড়া মালা গাঁথা হইল, তথাপি গৌরী যাহার প্রতীক্ষা করিতেছিল, সে আসিল না। গৌরী মালাগুলা গণিয়া দেখিল, এক দুই তিন। তিন ছড়া মালা গাঁথা হইল, তবু সে আসিল না! দূর, আর তার মালা গাঁথবাে না। মালা গাঁথবাে না। রাগে গৌরী সংগৃহীত ফুলগুলাকে ছড়াইয়া ফেলিয়া চুপ করিয়া রহিল। কিন্তু বেশীক্ষণ চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না। একটু পরেই উঠিয়া বিক্ষিপ্ত ফুল গুলাকে পুনরায় একটি একটি করিয়া কুড়াইয়া জড় করিল। জড় করা ফুলের সঙ্গে একটী ফুটন্ত গােলাপ রহিয়াছে যে। এতক্ষণ গৌরী ত সেটা লক্ষ্য করে নাই। ক্ষিপ্রহস্তে তাড়াতাড়ি সেই ফুলটি তুলিয়া লইয়া শুকিতে শুকিতে বলিয়া উঠিল, “আঃ, গােলাপের কি মিঠে খােসবাই রে!” তার পর পুনরায় সুচ সূতা লইয়া আর এক ছড়া মালা গাঁথিতে বসিল । “এখনাে কেন এলাে না? ঠিক এই সময়ে আসবার কথা। এসে সে ঠাকুর গড়ে দেবে, গৌরী ফুলমালা দিয়ে সেই ঠাকুরের পূজো করবে। কিন্তু মালা তত গাঁথা হয়ে গেল, কোথায় বা সে, কোথায় ৪৬

গাটছড়া
বা তার ঠাকুর। ভুলে গেছে কি? না, ভুলবার লােক সে নয়।
হয় তাে কি কাজ পড়েছে। কাজ তাে অনেক,-গরু বাঁধা, বাজার
করা, দোকানে যাওয়া। ছেলে বওয়াও একটা কাজ আছে। সকালে
বাজারও নাই, দোকানও নাই, গরু বাঁধতেও এতক্ষণ যায় না। তা
হলে ছেলে বইতে হচ্চে নিশ্চয়। নাঃ, কি গােলামি! ঠিক যেন
মাইনে-খেকো চাকর। তা মাইনের মধ্যে তা শুধু ভাত-কাপড়।
তাও মিষ্টি মুখে নয়। লােকটার কি সহ গুণ! আমি হলে তাে
এত হেনস্তা কক্ষনাে সইতে পারতাম না। ব্যাটাছেলে—কেমন করে
যে সয়, তা সে-ই জানে।”
গাছের ডালে কোকিলটা এবার ডাকিয়া উঠিল, কু-উ।
গৌরী একবার মাথা তুলিয়া কোকিলটার দিকে চাহিল ; তার পর
একটা ইটের টুকরা কুড়াইয়া লইয়া উপর দিকে ছুড়িয়া দিল। সে
ইটের টুকরা কোকিলটার অঙ্গস্পর্শ না করিলেও সে ডাকিতে ডাকিতে
উড়িয়া গেল ; গৌরী আপন মনে খিল খিল করিয়া হাসিয়া
উঠিল
হাসিতে হাসিতে গৌরী পুনরায় এক মুঠা ফুল লইয়া একটি
একটি করিয়া সূচের আগায় পরাইতে আরম্ভ করিল। এমন সময়
পশ্চাৎ হইতে কে ডাকিল, “গৌরী।”
গৌরী চমকিত হইয়া আগ্রহান্বিতভাবে পশ্চাতে ফিরিয়া চাহিল
চাহিয়াই বলিয়া উঠিল, “কে, উপীনদা না কি?”
উপেন ধীরে ধীরে আসিয়া তাহার পাশে দাঁড়াইল।
“এই বুঝি তােমার সকাল উপীনদা ?”
“সকাল নয় তত দু’পুর না কি?”
“দুপুর হ’তে আর বেশী দেরী নাই।”
৪৭

গাঁটছড়া
“ঢের দেরী এখনও। ততক্ষণে তাের বােধ হয়
মালা গাঁথা হয়ে যাবে।”
“আমার পঞ্চাশ ছড়া মালায় দরকার নাই, দু’ছড়া হলেই যথেষ্ট।”
“দুছড়ার বেশী যেগুলাে হয়েছে, সেগুলাে কি হবে ?
“তােমার দরকার থাকে, নিতে পার।”
‘ফুলের মালায় আমার দরকার নাই। মালা নিয়ে আমি কি
ক’রবাে ?”
“তােমার কনের গলায় পরিয়ে দেবে।”
“আমার ক’নে আমার মালা পরতে চায় না।”
“কেন চায় না ?”
“কেন চায় না, তা সে-ই জানে। বােধ হয়, আমি পয়সা রােজগার
কত্তে পারি না বলে।”
উপেনের মুখের উপর সহাস্য কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া গৌরী
বলিল, “তা হলে তােমার বড়ই দুখ উপীনদা।”
উপেন একটা ক্ষুদ্র নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া বিষাদ-গম্ভীর স্বরে বলিল,
“সেই দুঃখেই তাে বিবাগী হয়ে চলে যাচ্ছি।”
আশ্চার্যের ভাব দেখাইয়া গৌরী ব্যস্ততার সহিত বলিয়া উঠিল,
“বল কি উপীনদা, একেবারে বিবাগী হয়ে যাচ্চো?”
“হাঁ, আজই আমি এ দেশ ছেড়ে চলে যাব।”
“সত্যি?”
“সত্যি।”
“কোথায় যাবে ?”
“যে দেশে পয়সা আছে।”
“সেখানে গিয়ে কি করবে?”
৪৮

গাঁটছড়া
“পয়সা রােজগারের চেষ্টা করবাে।”
“তােমার এত পয়সার দরকার হ’লাে কেন?”
“মানুষ মাত্রেরই পয়সার দরকার হয়।”
“কৈ, আমার তাে পয়সার দরকার হয় না।”
“কখনও দু’একটা পয়সারও দরকার হয় না ?”
একটু ভারিয়া গৌরী বলিল, “তা হয় বটে, দরকার হলে মামীমা
সে পয়সা দেয়।”
উপেন বলিল, “তােকে তাের মামীমা দেয়, কিন্তু আমাকে কে
দেবে ?”
“কেন, তোমার দিদি।
“দিদির হাতে পয়সা নাই। থাকলেও আমাকে দেবে কেন?”
“কেন দেবে না ?
‘আমি ব্যাটাছেলে, আমার পয়সা রােজগার করবার কথা। মেয়ে
নানুষ আমাকে পয়সা কেন দেবে ?
চিন্তিতভাবে গৌরী বলিল, “তােমার কত পয়সার দরকার
উপীনদা?”
ঈষৎ হাসিয়া উপেন বলিল, “তুই কত দিতে পারি?”
“তিনটে পয়সা দিতে পারি। আমার কাছে তিন পয়সা আছে।”
‘তিন পয়সায়
আমার কিছু হবে না। আমার তিনটা টাকার
দরকার।”
“টাকা? টাকা তােত আমার কাছে নাই, উপীনদা!”
ম্লান হাস্যসহকারে উপেন বলিল, “টাকা যে তাের নাই, তা আমি
জানি। কাজেই টাকার চেষ্টায় আমাকে যেতে হবে।”
নতমুখে গৌরী জিজ্ঞাসা করিল, “যেতেই হবে ?”
৪
৪৯

গাঁটছড়া
উপেন। হাঁ, যেতেই হবে।
গৌরী। টাকার তােমার কি এত দরকার, উপীনদা ?”
উপেন। ডাক্তারকে ওষুদের দাম দিতে হবে।
গৌরী। কে ওষুদ খেয়েছিল? তুমি ?
উপেন। না, মেনীর মা।
গৌরী। মেনীর মা ওষুদ খেয়েছিল, তুমি তার টাকা দিতে যাবে
কেন?
উপেন। মেনীর মা’র টাকা দেবার ক্ষমতা নাই! ওরা যে বড়
গরীব, গৌরী।
গৌরী। টাকা দিতে পারবে না, তবে ওষুদ খেলে কেন?
উপেন। ওষুদ না খেলে মারা যেত।
গৌরী নীরবে কিছুক্ষণ ভাবিয়া বলিল, “আচ্ছা উপীনদা, এক
কাজ করলে হয় না?”
উপেন। কি কাজ?
গৌরী। আমার কানের মাকড়ী একটা যদি খুলে দিই, সেটা
বেচলে তিন টাকা হবে না ?
উপেন। তা হবে । কিন্তু তাের মাকড়ী-
গৌরী। হলােই বা আমার মাকড়ী। আমার জিনিস কি তােমার
নিতে নাই ?
উপেন। নিতে আছে, কিন্তু তাের মামী যখন মাকড়ীর খোঁজ
করবে ?
গৌরী। বলবে, হারিয়ে গিয়েছে।
তিরস্কারের স্বরে উপেন বলিল, “ছিঃ গৌরী, এরই মধ্যে এত মিথ্যা
বলতে শিখেছি।”

গাঁটছড়া
•
গৌরী লজ্জিতভাবে ঘাড় হেঁট করিয়া বসিয়া রহিল ; . উপেন একটা
বকুল ডাল ভাঙ্গিয়া তাহার পাতা ছিড়িতে ছিড়িতে বলিল, “আমি
চলে গেলে তাের খুব আমােদ হবে, না গৌরী?”
তাহার দিকে সকোপ কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া ভারী গলায় গৌরী
উত্তর করিল, “হাঁ, হবে।”
উপেন বলিল, “বেশ! তা হলে আয়, তাের ঠাকুরটা গড়ে দিয়ে
যাই। আমাকে আজই যেতে হবে।”
গৌরী উঠিয়া দাড়াইল ; বলিল, “তুমি ঠাকুর গড়, আমি এক্ষুণি
আসছি।”
গৌরী দ্রুতপদে বাড়ীর দিকে চলিয়া গেল। সে আগে হইতেই
কাদা সংগ্রহ করিয়া রাখিয়াছিল। উপেন সেই কাদা লইয়া কৃষ্ণঠাকুর
গড়িতে বসিল।
ঠাকুর গড়া প্রায় শেষ হইয়াছে, এমন সময় গৌরী তথায় উপস্থিত
হইল এবং কাপড়ের ভিতর হইতে এক ছড়া গিনির মাল বাহির
করিয়া উপেনের সম্মুখে ধরিল। উপেন তাহা দেখিয়াই চমকিতভাবে
বলিয়া উঠিল, “এ কি গৌরী?”
গৌরী বলিল, “এ আমার গিনির মালা। আমার মায়ের ছিল,
মা আমাকে দিয়ে গিয়েছে।”
উপেন। এটাকে কেন নিয়ে এলি ?
গৌরী। তােমার যে টাকার দরকার।
উপেন! সৰ্ব্বনাশ, এটা বেচে টাকার যােগাড় করবাে না কি ?
গৌরী নিরুত্তরে দাড়াইয়া রহিল। উপেন বলিল, “এটার দাম
কত জানি?”
“কত?”

গাঁটছড়া ।
“চার পাঁচ শশার কম নয়। এর এক একখানা গিনির দামই বি
পঁচিশ টাকা।
সঙ্কুচিতভাবে গৌরী বলিল, “তা হলে একখানা গিনি খুলে নিয়ে
তাহাকে ধমক দিয়া উপেন বলিল, “আমি তাে তাের মত পাগ
নই। যদি ভাল চা তাে ঘরে রেখে আয়।”
ভীতিবিনম্র স্বরে গৌরী জিজ্ঞাসা করিল, “নেবে না তুমি ?
দৃঢ়স্বরে উপেন বলিল, “না। এই নে তাের ঠাকুর।
ঠাকুর গড়ে দেবার জন্যই এসেছি। নয় তাে এতক্ষণ
“এতক্ষণ করে চলে যেতে, না ?”
“নিশ্চয়।
“তবে এলে কেন ?”
“তােকে ঠাকুর গ'ড়ে দেব বলেছিলাম।”
গৌরী নীরবে তীক্ষ দৃষ্টিতে উপেনের দিকে চাহিয়া রহিল ।
উপেন ঠাকুর গড়া শেষ করিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল, এবং গৌরীকে লক্ষ্য
করিয়া সহাস্যমুখে বলিল, “এই নে তাের ঠাকুর। দেখ দেখি, কেমন
ঠাকুর হয়েছে ?,
গৌরী সদর্পে ঘাড় দোলাইয়া বােষগম্ভীর মুখে ‘বলিল, “আমি ঠাকুর
চাই না।” বলিয়াই সে ঠাকুরকে তুলিয়া লইয়া দূরে আছড়াইয়া
ফেলিল, তার পর অবজ্ঞাভরে হাতখানা ঘুরাইয়া বলিল, “আহা, কি
ঠাকুরই গড়েছ, আমি অমন ঠাকুর চাই না।”
উপেন বলিল, “আরে ম’লল, এত কষ্টে ঠাকুর গড়লাম, আর তুই
ভেঙ্গে ফেললি ?”
গৌরী তাহার কথায় কর্ণপাত করিল না; সে রাগে ফুলিতে
ফুলিতে ফুলের মালাগুলা খণ্ড খণ্ড করিয়া ছিড়িয়া ফেলিল। তারপর

গাঁটছড়া সেই ছেড়া মালাগুলা উপেনের গায়ে হুঁড়িয়া দিয়া কাদিতে দিতে ছুটিয়া পলাইল। উপেন কিছুক্ষণ হতবুদ্ধির মত সেই স্থানে দাঁড়াইয়া রহিল, তার পর ক্ষুন্নমনে ধীরে ধীরে সে স্থান ত্যাগ করিল। যাইতে বাইতে টাকা তিনটা কিরূপে সংগ্রহ করিবে, তাহাই ভাবিতে লাগিল। দিদির কাছে চাহিতে সাহস হয় না; চাহিলেও দিবে বলিয়া বােধ হয় না। ঘােষজা মশায়ের কাছে কোন্ লজ্জায় টাকা চাহিবে? ভাবিতে ভাবিতে হঠাৎ বড়দির কথা মনে পড়িল। বড়দির কাছে চাহিলে তিনি কি দিবেন না? দিক, না দি, চাহিয়া দেখিতে দোষ কি? দোষ কিছুই নাই, বড়দির কাছে লজ্জাও নাই। উপেন দ্রুতপদে বড়দির নাটীর অভিমুখে চলিল । দয়ারামের জ্ঞাতি নীলু ঘােষের স্ত্রী কাদম্বিনীকে উপেন বড়দি বলিয়া ডাকিত। জ্ঞাতি হইলে ও দয়ারামের সহিত নীলু ঘােষের তেমন সম্প্রীতি ছিল না, সামান্য খুঁটিনাটি লইয়া মধ্যে মধ্যে ঝগড়া- বিবাদ বাধিত, এবং সে বিবাদ তেমন প্রবল আকার ধারণ না করিলেও পরস্পরের মধ্যে বেশ মনের মিল ছিল না। নীলু ঘােষ দুধে-ভাতে থাকে, দয়ারামের ইহা সহ্য হইত না, নীলু ঘােষও দয়ারামের উন্নতি ঈর্ষার চক্ষে নিরীক্ষণ করিত। কেবল পুরুষমহলে নয়, মেয়েদের মধ্যেও এই ভাবটা সংক্রামিত হইয়াছিল। কাদম্বিনী বা কুসুম পরস্পরের ছিদ্রান্বেষণে রত থাকিত, এবং সুযােগ পাইলেই নিন্দায় শতমুখ হইয়া পড়িত। উপেনের কিন্তু এ সকল বালাই ছিল না, জ্ঞাতিসুলভ ঈর্ষা তাহার ধ্যে সংক্রামিত হইতে পারে নাই। কাজেই দিদি বা ঘােষজা- গাঁটছড়া মশায়ের সহিত মনােমালিন্য সত্ত্বেও সে কাদম্বিনীর সহিত বেশ মনের মিল করিয়া লইয়াছিল। কাদম্বিনী সম্পর্কে কুসুমের বড় জা, সুতরাং কুসুম তাহাকে বড়দিদি বলিয়া বড়দিদি বলিয়া ডাকিত। সেই সম্পর্কে উপেনও কাদম্বিনীকে বড়দি বলিয়া ডাকিত ; শুধু বড়দি বলিয়া ডাকিত না, বড়দির ন্যায় শ্রদ্ধাভক্তিও প্রদর্শন করিত। কাদম্বিনীও তাহাকে ঠিক ছােট ভায়ের মত স্নেহত্ন মত স্নেহত্ন করিতে পরাজুখ হইত না। দিদির কাছে তিরস্কৃত হইয়া উপেন দুঃখে অভিমানে অধীর হইয়া যখন কাদম্বিনীর কাছে যাইত, কাদম্বিনী তখন স্নেহপূর্ণ সানায় তাহার অভিমানক্ষুব্ধ হৃদয়কে মুহূর্তে শান্ত করিয়া দিত। কতদিন উপেন দিদির উপর রাগ করিয়া অনাহারে পাকিবার সঙ্কল্প করিয়াছে, কিন্তু কাদম্বিনী তাহা জানিতে পারিলেই তাহার সে সঙ্কল্পকে ব্যর্থ করিয়া দিয়াছে। সে ভাত বাড়িয়া লক্ষ্মী ভাই আমার বলিয়া উপেনের হাত ধরিয়া যখন ভাতের কাছে বসাইয়া দিত, তখন উপেন তাহার সেই সস্নেহ অনুরােধ রক্ষা করিয়া থাকিতে পারিত না । এইরূপ স্নেহে যত্নে উপেন কাদম্বিনীর এতই বশীভূত হইয়া পড়িয়াছিল যে, তাহাকে জ্যেষ্ঠা সহােদরা ভিন্ন অন্য কিছুই ভাবিতে পারিত না, এবং কুসুমের নিষেধ সত্ত্বেও সে এক একবার কাদম্বিনীর কাছে না গিয়া থাকিতে পারিত না। এই বড়দিকে যদি না পাইত, তাহা হইলে উপেন বােধ হয়, এত দিন দিদির ঘরে থাকিতে সমর্থ হইত না। কাদম্বিনীর সহিত উপেনের এই সম্প্রীতিটুকু কুসুম কিন্তু আদৌ পছন্দ করিত না। “জ্ঞাতি শত্রু—একটু ছুতা পাইলেই যে পাঁচ কথা শুনাইয়া দেয়, সামান্য ত্রুটি দেখিলেই নিন্দায় শতমুখ হইয়া পড়ে, তাহার সহিত এত ঘনিষ্ঠতা কেন? দয়ারামও কত দিন ৫৪ গাঁটছড়া এইরূপ অবৈধ ঘনিষ্ঠাতার প্রতিকূলে মত প্রকাশ করিয়াছে। কেন, ঘরে কি বসিবার জায়গা নাই, না গল্প করিবার লােক গ্রামে নাই ? উপেন কি বাড়ীতে খাইতে পায় না? কিন্তু হতভাগার কেমন স্বভাব, বড়দির কাছে না গেলে যেন উহার প্রাণ বাঁচে না, বড়দির ঘরের ফেন-ভাত একাঠা না খাইলে হতভাগার পেট যেন ভরে । প্রত্যহ না হউক, মাসের মধ্যে অন্ততঃ পাচটা দিনও ঐখানে গিয়া উহাকে ফেন-চাটিতে হইবে। কুসুম ভাইকে নিষেধ করিত, গালাগালি দিত, নির্বোধ উপেন কিন্তু তাহার নিষেধ বা তিরস্কারকে কিছুমাত্র গ্রাহ্য করিত না। কুসুম ইহাতে এক এক সময় রাগিয়া উপেনকে যাহা মুখে আসিত, তাহাই বলিয়া তিরস্কার করিত, উপেন সে সকল তিরস্কার হাসিয়াই উড়াইয়া দিত। তা কুসুমকে এজন্য দোষ দেওয়া যায় না, কেন না, অল্প দুঃখে সে উপেনকে নিষেধ বা তিরস্কার করিত না। উপেনের একটা স্বভাব ছিল, সে কোন কথাই গােপনে রাখিতে পারিত না ; বিশেষতঃ নিজের সুখ- দুঃখের কথাগুলা বড়দিকে না বলিয়া কিছুতেই থাকিতে পারিত না। দিদি কবে তাহাক কি রূঢ় কথা বলিয়াছে, পরের ভাতে থাকার জন্য কবে কি তিরস্কার করিয়াছে, সাংসারিক কাৰ্য্যে সামান্য ত্রুটি হইলেই ঘােষজা মশাই পৰ্যন্ত তাহাকে কত কথা শুনাইয়া দিয়াছে, বড়দির কাছে সেই সকল কথা ব্যক্ত করিয়া নিজের নিরাশ্রয় অবস্থার জন্য দুঃখ প্রকাশ করিত। কাদম্বিনী তাহার দুঃখে যথেষ্ট সহানুভূতি প্রকাশ করিত বটে, কিন্তু কথাচ্ছলে কুসুমের আছে সেই সকল প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়া উপেনের উপর এইরূপ রূঢ় ব্যবহারের কুসুমকে তিরস্কার না করিয়া ছাড়িত না। কখন বা এই সকল কথা লইয়া পাড়ার পাচ জনের কাছেও গল্প করিত। তাহারা আবার গাঁটছড়া সময়ে সময়ে উপদেশচ্ছলে কুসুমকে বেশ পাঁচকথা শুনাইয়া দিত। তাহা শুনিয়া রাগে কুসুমের আপাদমস্তক জ্বলিয়া যাইত। হতভাগা ভাইটাকে লইয়া সে যে কি করিবে, তাহা ভাবিয়া পাইত না। এক এক সময়ে সে উপেনকে বাড়ী হইতে দূর করিয়া দিবার জন্য দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ হইত, কিন্তু তাহাতে অধিকতর লােকনিন্দাভাজন হইতে হইবে, বা নিরাশ্রয় উপেন কোথায় গিয়া আশ্রয় লইবে ইত্যাদি বুঝাইয়া দিয়া দয়ারাম স্ত্রীকে শান্ত করিত। অবস্থা বুঝিয়া কুসুম শান্ত হইত বটে, কিন্তু কাদম্বিনী উপেনের সম্বন্ধে কোন কথা বলিতে আসিলেই তাহার মর্মস্থল পর্যন্ত যেন অলিতে থাকিত। উপেন কুসুমের ভাই—কিন্তু কাদম্বিনীর কে? কুসুম অপেক্ষা উপেনের উপর টান কি তাহার বেশী ? তবে সে পর হইয়া এত দরদ দেখাইতে আসে কেন? ইহাতে কুসুমকে ভ্রাতৃস্নেহশূন্ত নিষ্ঠুর প্রতিপন্ন করাই কি কাদম্বিনীর উদ্দেশ্য নয় ? কুসুমকে লজ্জা দিবার জন্যই এইরূপ অস্বাভাবিক দরদ দেখাইতে আইসে। রাগে কুসুম উপেনের উপর দৃঢ় আজ্ঞা প্রচার করিত, যেন কাদম্বিনীর বাড়ীর ত্রিসীমানায় না যায়। তাহার এই নিষেধের ফলে উপেন দুই চারি দিন যাতায়াত বন্ধ রাখিত। কিন্তু তার পর আবার যেমন যাওয়া-আসা ছিল, তেমনই করিত। দুই চারি দিনের বেশী কুসুমের আদেশ সে প্রতিপালন করিতে পারিত না; বড়দির কাছে না গেলে তাহার যেন আহার-নিদ্রা কিছুতেই তৃপ্তি হইত না, দিনগুলা পৰ্য্যন্ত যেন নিতান্তই অচল হইয়া পড়িত। শুধু উপেন একা নয়, দুই চারিদিন তাহার দেখা না পাইলে কাদম্বিনীও একটু ব্যস্ত হইয়া পড়িত, এবং উপেন কেন যায় নাই,

গাঁটছড়া
জানিবার জন্য কুসুমের কাছে ছুটিয়া যাইত।
ছুটিয়া যাইত। তাহার এই ব্যস্ততা
দেখিয়া কুসুম মুখ মচকাইয়া হাসিত, এবং নিতান্ত উপেক্ষা সহকারেই
উপেনের অনুপস্থিতি জন্য যে কৈফিয়ৎ দিত, তাহা কাদম্বিনীর তেমন
সন্তোষজনক হইত না। হইলেও এবং কুসুমের তাচ্ছীল্য বা
উপহাসটুকু বুঝিতে পারিলেও কাদম্বিনী উপেনের তত্ত্ব না লইয়া
থাকিতে পারি না।
“বড়দি!”
“কে রে, উপেন না কি ? ক’দিন কোথায় ছিলি রে উপেন?”
“কোথায় আবার থাকবে বড়দি, বরাবর যেখানে আছি,
সেইখানেই ছিলাম।”
“তবে ক’দিন তােক দেখতে পাই না কেন ? তাের দিদি বুঝি
আসতে মানা করেছিল ?”
ঈষৎ হাসিয়া উপেন বলিল, “দিদি মানা করে নাই, আমিই একটু
কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম।”
সহাস্যে কাদম্বিনী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুই তাে তা হলে মস্ত
কাজের লােক হয়ে উঠলি দেখছি। কি এমন কাজ রে উপেন?”
উপেন উত্তর করিল, “একটা রুগী নিয়ে পড়েছিলাম।”
কাদ। রুগী কে রে? ধনা হাড়ি নাকি ?
উপে। না বড়দি, এবারে হাড়ি-বাদী নয়, ভদ্রলোেক রুগী ।
কাদ। তবু ভাল। আমি তাে জানতাম, হাড়ি-ডােম-বাদীদের
রােগ হলেই তাের মাথাব্যথা হয়।

গাঁটছড়া
উপে। তাদের তরে
তরে তােমারও তত
তাে মাথাব্যথা হয় বড়দি।
তারা খেতে না পেলে তুমি চাল, ধান, পয়সা বার করে দাও।
কুঞ্চিতমুখে কাদম্বিনী বলিল, “ই, চাল-ধান তত আমি রােজই
দিচ্চি। দৈবাৎ কালে ভদ্রে-
হাসিতে হাসিতে উপেন বলিল, “আর আমিই বা কোন্ তিরিশ
দিন তাদের সেবা করে বেড়াচ্চি ! বরং তারা খেতে পায় না মাসে
দশ দিন, কিন্তু তাদের রােগ হয় বছরে বড় জোর দু’দিন।”
কথাটাকে চাপা দিবার অভিপ্রায়ে কাদম্বিনী যেন একটু বিরক্তির
সহিত বলিল, “আচ্ছা, আচ্ছা, তােরি জিৎ, আমারি হার। এখন
তাের ভদ্রলােক রুগীটি কে শুনি।”
মাথা চুলকাইয়া উপেন বলিল, “ও পাড়ার মেনীকে জান?”
কাদ। কে, হিরু সরকারের মেয়ে মেনী ?
উপে। হাঁ হাঁ, সেই যে খুব কালাে-কুচ্ছিত মেয়েটা গাে।
কাদ। ঠাকুরপাে যার সঙ্গে তাের বিয়ের কথা কইছে তাে ?
ভঙ্গী করিয়া মস্তক আন্দোলন সহকারে উপেন বলিল, “এত
খবর আমি রাখি না।”
সহাস্যে কাদম্বিনী বলিল, “তাের বিয়ের খবর তুই রাখবি না
তাে কে রাখবে রে ?”
বিরক্তভাবে উপেন বলিল, “যার বেশী মাথাব্যথা, সে-ই রাখবে।”
হাসিয়া কাদম্বিনী বলিল, “আচ্ছা, তারাই না হয় রাখবে। এখন
মেনীর কি অসুখ হয়েছিল শুনি।”
উপে। মেনীর অসুখ কে বলে ! তার মায়ের অসুখ।
কাদ। তার মায়ের অসুখ! অসুখটা কি ?
উপে। বর, কাস, মাথার যন্ত্রণা।

গাঁটছড়া কাদ। তােকে খবর দিলে কে ? উপে। খবর আবার কে দিতে যাবে? একদিন ওদের বাড়ীর সামনে দিয়ে আসছি, মেয়েটা কঁদতে কাঁদতে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে আমার হাতখানা ধরে ফেলে । কাদ। মেয়েটা তা হলে তােকে চেনে বল। উপে। চেনে না আবার ? বেশ চেনে। সে দিন আমার হাতে বেশ দু’চার ঘা খেয়েছে। কাদ। মার খেলে কেন? উপে। মার খেয়েছে ওর নিজের দোষে নয়, গৌরীর দোষে। সে পােড়ারমুখী যদি ওর আঁচল টেনে নিয়ে আমার কেঁাচার খুঁটের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে না দিত- খিল খিল্ করিয়া হাসিতে হাসিতে কাদম্বিনী বলিল, “এর মধ্যে তা হলে তােদর গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে গিয়েছে ? ও হরি, আমি বলি, এই শুধু বিয়ের কথাবার্তা হচ্ছে।” রাগে মুখ ভারী করিয়া উপেন বলিল, “যাও ! আমি চললুম তবে।” ব্যস্ততার সহিত কাদম্বিনী বলিল, “না না, তােকে চলে যেতে হবে না। আমি তামাসা করে বলছি। যাক্, মেনীর মা বেশ সেরে উঠেছে ?” উপে। হাঁ, আজ পথ্য পাবে। কাদ। তােকে বুঝি ক’দিন ওখানে থেকে সেবা-শুশ্রুষা কত্তে হয়েছিল ? উপে। সেবা এমন কিছু কত্তে হয় নি। শুধু ডাক্তার ডাকা, ওষুদ এনে দেওয়া। কা। কোন্ ডাক্তার দেখলে?

গাঁটছড়া
কাদ।
উপে। অতুল ডাক্তার।
কাদ।
কত নিলে ?
উপে। | গরীব ব’লে ভিজিট এক পয়সাও নেয়ে নি। শুধু ওষুদের
দাম তিন টাকা দিতে হবে।
কাদ। দিতে হবে ? দেওয়া হয় নি এখনও?
উপে। না, এখনও টাকাটার যােগাড় করে উঠতে পারি নাই।
কে যােগাড় করবে, তুই ?
উপে। হাঁ, আমিই দেব বলে স্বীকার হয়েছি।
কাদ। কেন, ওরা দেবে না ?
উপে। দেবার শক্তি ওদের নাই ।
কাদ। বলিস্ কি রে, এত গরীব হয়ে পড়েছে ?
উপে। একটা ঘটী বাধা দিয়ে সাবু-মিছরী এনে দিয়েছি।
মেনীর মা’র দুরবস্থা শ্রবণে কাদম্বিনীর হাস্যপ্রফুল্ল মুখমণ্ডল গভীর
বেদনায় মলিন হইয়া আসিল। সে কিয়ৎক্ষণ নীরবে থাকিয়া ব্যথিত
স্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “এত গরীব ! মাগী তা হলে মেয়ের বিয়ে
দেবে কেমন করে ?”
উপেন বলিল, “বােধ হয়, ঘর-ভিটে বেচে। জমী নাকি দু'চার
বিঘে আছে। চুলােয় যাক, তার মেয়ের ভাবনা সে ভাববে, আমি
এখন ডাক্তারের টাকা মিটিয়ে দিতে পারলে হয়।”
কাদ। তুই টাকা কোথায় পাবি?
* উপে। তাই ভাবচি। কেউ কি ধার দেবে না ?
কাদ। ধার দিতে পারে, কিন্তু ধার তুই শােধ করবি কিসে?
মাথা নাড়িয়া উপেন বলিল, “সে যুক্তি আমি ঠিক করে ফেলেছি
বড়দি, চাকরী করে ধার শােধ করবাে।”

গাঁটছড়া
কাদম্বিনী জিজ্ঞাসা করিল, “চাকরী করবি তা হলে ?”
দৃঢ়স্বরে উপেন বলিল, “নিশ্চয়। এ রকমে বসে বসে আর খাচ্চি
।”
কাদ। কি চাকরী করবি ?
উপে। যা পাই। অবশেষে মুটেগিরি।
কাদ। সত্যি ?
উপে।
তােমার পায়ে হাত দিয়ে বলতে পারি বড়দি, চাকরী
এবার করবােই করবাে। আমার এবার ভয়ানক ঘেন্না হয়েছে ।
কাদ। কিসে এত ঘেন্না হ’লল শুনি ।
উপে। দিদি কাল বড় কথা শুনিয়ে দিয়েছে।
কাদ। সে তাে এমন চিরকালই কথা শােনায়।
দুঃখগম্ভীর মুখে উপেন বলিল, “শােনায় বটে, কিন্তু এমনতর
কড়া কথা,-না বড়দি, ব্যাটাছেলে, হাত-পা আছে, কেন বল তাে
এত কথা শুনবাে ?”
ঈষৎ হাসিয়া কাদম্বনী বলিল, “সে তো ঠিক কথা। আমিও
তাে তােকে কতদিন বলেছি, একটা কাজকর্ম কর উপেন।”
জোরে মাথা নাড়িয়া উপেন বলিল, “বলেছ তাে, কিন্তু কি কাজ
করবো ?"
কাদম্বিনী বলিল, “এখনই বা কি কাজ করবি ?”
উপেন বলিল, “এখন যা পাই। মােট বইতে হয়, তাও স্বীকার।”
কাদম্বিনী বলিল, “মােট বইতে পারবি?”
দৃঢ়স্বরে উপেন বলিল, “খুব পিরবাে। কেন, আমার গায়ে কি
জোর নাই ?”
সহাস্যে কাদম্বিনী বলিল, “তা আছে। তা হলে যাচ্ছি কবে ?”
৬১

গাঁটছড়া
উপেন বলিল, “কবে কি? ডাক্তারের টাকা আর রেলভাড়াটার
যােগাড় হলেই চলে যাই। তুমি গােটা চার টাকা ধার দেবে বড়দি?”
কাদম্বিনী বলিল, “ধার দিতে পারি, কিন্তু চার টাকা তাে দিতে
পারবাে না, তিন টাকা হাতে আছে।”
“বেশ, তাই দাও।”
“কিন্তু দিবি তাে?”
“দেব না? মাইনে পেলে আগে তােমার টাকা পাঠিয়ে দিয়ে তবে
অন্য কথা।”
“আমাকে মনে থাকবে তাে?”
বিস্ময়-বিস্ফারিত দৃষ্টিতে কাদম্বিনীর মুখের দিকে চাহিয়া উপেন
বলিল, “বল কি বড়দি, তােমাকে মনে থাকবে না?”
ঈষৎ হাসিয়া কাদম্বিনী বলিল, “কি জানি।”
“কি জানি?” উপেন বসিয়াছিল, যেন লাফাইয়া উঠিয়া দাড়াইল,
জোর গলায় বলিল, “কি জানি ! তােমার কথা আমি ভুলতে পারবাে?
তুমি আচ্ছা লােক তত বড়দি।”
উপেনের স্বরটা যেন ভারী হইয়া আসিল। কাদম্বিনী স্নেহ-সজল
দৃষ্টিতে তাহার আবেগস্ফীত মুখের দিকে চাহিয়া আঁচলে চোখ মুছিল।
“হঁ মা।”
"কেন মেনী?”
“আজ না ডাক্তার তােমায় ভাত খেতে বলেছে ?”
কুঞ্চিতমুখে নিস্তারিণী উত্তর করিলেন, “বলেছে খেতে।”
মেনী জিজ্ঞাসা করিল, “কিন্তু কি দিয়ে ভাত খাবে?”

গাঁটছড়া
যেন নিতান্ত উপেক্ষায় মুখ মচকাইয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “যা
দিয়ে হয়,চুলাের ছাই দিয়ে !”
মায়ের এই উত্তরে দুঃখ অনুভব করিয়া মেনী বলিল, “তােমার
মা ঐ এক কেমন কথা। ছাই দিয়েও মানুষে ভাত খায় ?”
নিস্তারিণী বলিল, “আমার মত মানুষে সব খায়।”
ঝঙ্কার দিয়া মেনী বলিল, “হাঁ, তােমাকে বলেছে খায় ! এই তরেই
কোন কথা তােমাকে বল্‌তে চাই না।”
ঈষৎ কষ্টস্বরে নিস্তারিণী বলিলেন, “তবে আমাকে বলতে আসি
কেন?”
ভারী মুখে মেনী বলিল, “ঝমারি করেছি বলতে এসেছি।
তােমাকে বলবাে না তাে বলতে যাব কাকে? ওপাড়ার দুলে-
বৌকে ?”
গম্ভীরমুখে নিস্তারিণী বলিলেন, “তাই দুলে-বৌকেই বলতে যাবি
এবার থেকে। খবরদার বছি, আমাকে কোন কথা জিগ্যে করি না।”
মেনী বলিল, “আচ্ছা আচ্ছা, কোন কথাই জিগ্যেস্ করবাে না,
এখন কি রাঁধবাে, তাই বল দেখি।”
নিস্তারিণী গম্ভীরভাবে নীরবে বসিয়া রহিল। মেনী জিজ্ঞাসা
করিল, “আলু-বেগুণের ঝােল একটু করে দেব ?”
নিস্তা। আলু বেগুণ। পাইবি কোথায় ?
মেনী। আলু গােটা চার ঘরে আছে।
নিস্তা। আর বেগুণ?
মেনী। বেগুণ দুটো না হয় কারাে ঘর থেকে চেয়ে আছি
নিস্তা। কার ঘরে চাইতে যাবি। কে তাের তরে বেগুণ
কিনে রেখে দিয়েছে ?

গাঁটছড়া
মেনী। গৌরীদের বাড়ীতে দেখি । ওদের বােজ বাজার
আসে।
ক্রোধগম্ভীরমুখে নিস্তারিণী বলিল, “রােজ বাজার আসে, তাতে
তাের কি বল্ তাে ? তােকে দেবার তরে কি রােজ বাজার করে
নিয়ে আসে ?
মেনী বলিল, “আমাকে দেবার তরে আনবে কেন? আমি কি
আর রােজই চাইতে যাচ্ছি ?”
নিস্তা। রােজ না হলেও মাঝে মাঝে তাে চাইতে যা।
মেনী। কি করবাে বল, ঘরে না থাকলেই চাইতে যেতে হয়।
নিস্তা। তাের মত বেহায়া মেয়ে যারা, তারাই চাইতে যায় । আমি
তাে সাত দিন সাত রাত উপােস দিতে হলেও কারও দোরে
চাইতে যাই না।
ঘাড় দোলাইয়া মেনী বলিল, “ওগাে, তুমি খুব বড়মানুষের
মেয়ে, তাই উপােস দিতে হ'লেও কারও দোরে যাও না। উপােস
দিতে তুমি
যে খুব মজবুত, তা আমি বেশ জানি। কিন্তু আমি
কাছে থাকতে সেটি হচ্ছে না মা! তাতে তুমি আমাকে ভালই বল
আর মন্দই বল।
মেয়ের এই তিরস্কারের মধ্যে মাতৃস্নেহের মধুরতা অনুভব করিয়া
মনে মনে পুলকিত হইলেও নিস্তারিণী মুখে তাহা প্রকাশ না করিয়া
বরং একটু রাগের ভাব দেখাইয়া বলিল, “তুই আর কদ্দিন কাছে
থাবি শুনি?”
“যদ্দিন হয়।”
“যদ্দিন কি, বড় জোর আর ছ'টা মাস। আছে মাঘ ফাগুনে
তাের গতি যা হয় কত্তেই হবে।”
৬৪

গাঁটছড়া “আচ্ছা, আমার গতি এর পর যা হয় করাে, এখন আমি আজ তােমার গতি তত করি।” বলিয়াই মেনী বাড়ীর বাহিরে চলিয়া গেল। নিস্তারিণী ডাকিলেন, “ফিরে আয় মেনী, শােন্।” মেনী কিন্তু ফিরিল না, উত্তরও দিল না। “বড় অবাধ্য মেয়ে” বলিয়া নিস্তারিণী ধীরে ধীরে রন্ধনশালায় প্রবিষ্ট হইয়া উনান ধরাইতে প্রবৃত্ত হইলেন। নিস্তারিণী উনান ধরাইয়া উনানে ভাতের হাড়ী চাপাইয়াছেন, এমন সময় মেনী দুইটা বেগুণ আঁচলে বাঁধিয়া ফিরিয়া আসিল, এবং মাকে রান্না চাপাইতে দেখিয়া রাগিয়া বলিল, “তুমি যে বড় রাঁধতে এসেছ ?” নিস্তারিণী বলিলেন, “রাঁধতে আসি নাই, তাের উনান ধরাতে কষ্ট হয়, তাই উনানটা ধরিয়ে দিতে এসেছি।” মেনী রাগে মুখ ভার করিয়া বলিল, “হাঁ, আমার কষ্ট হয় ! এই যে কদিন তুমি বিছানায় পড়ে ছিলে। তখন কে উনান ধরাতাে?” ঈষৎ হাসিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “যখন উঠবার ক্ষমতা ছিল না, তখন কষ্টই হােক, যাই হােক, তােকেই সব কাজ কত্তে হয়েছে। এখন আমি উঠতে পেরেছি— তর্জন সহকারে মেনী বলিল, “বেশ, উঠতে পেরেছ, তবে নিজে বেঁধে খাও। আমি তাে কিছু করবে না।” বলিয়া সে আঁচলের বেগুণ দুইটা খুলিয়া মায়ের সম্মুখে ফেলিয়া দিল, এবং রান্নাঘরের দাবায় আসিয়া পা ছড়াইয়া বসিল। তাহার রাগ দেখিয়া নিস্তারিণী হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “ধন্যি মেয়ে যা হােক্, কথায় কথায় রাগ। আচ্ছা মেনী, এর পর শ্বশুরবাড়ী গিয়ে তুই করবি কি ? এমনি তুচ্ছ কথায় রেগে তালপাতার আগুন হয়ে যাবি?”

গাঁটছড়া ক্রোধগম্ভীর কণ্ঠে মেনী উত্তর দিল, “হাঁ, হয়ে যাব।” নিস্তারিণী বলিলেন, “তা হলে তােকে কত কথা শুনতে হবে, তা জানি? আমি মা, সব স’য়ে যাচ্ছি, কিন্তু শাশুড়ী ননদ-তারা তাে এ সব সহ্য করবে না।” রাগে গোঁ গোঁ করিতে করিতে মেনী বলিল, “না করে, না করবে ; তােমাকে তাে সে সব সইতে হবে না।” নিস্তারিণী কন্যাকে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, “আমাকে সইতে হবে না বটে, কিন্তু তােকে যে অনেক দুর্গতি ভােগ কত্তে হবে। তা ছাড়া যদি বিধাতার ভবিতবি থাকে, উপেনের সঙ্গেই তাের বিয়ে হয়, তা হলে ঐ ননদ নিয়ে কি করে ঘর করবি, বল্ দেখি ?” মায়ের মুখের উপর সরােষ কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া মেনী উঠিয়া দাড়াইল, এবং মাকে ঠেলিয়া দিয়া বলিল, “সে যুক্তি এর পর তােমার কাছে নেবাে এখন তুমি ভাল মাষের মেয়ের মত ঐ দিকে গিয়ে চুপটি করে বসাে দেখি।” নিস্তারিণী হাসিতে হাসিতে বলিলেন, “তা ওখানে না হয়, এই- খানেই চুপটি করে বসে তরকারীটা কুটে দিই, তুই বঁধ।” “না, তােমাকে এখানে আগুনতে থাকতে হবে না।” বলিয়া মেনী মায়ের হাত ধরিয়া টানিতে টানিতে তাহাকে রন্ধনশালার বাহিরে লইয়া আসিল। এমন সময় উপেনকে ব্যস্তভাবে বাটীর মধ্যে প্রবিষ্ট হইতে দেখিয়া মেনী যেন সঙ্কুচিত হইয়া পড়িল ; সে তাড়াতাড়ি মায়ের হাত ছাড়িয়া দিয়া ক্ষিপ্রপদে রান্নাঘরের দিকে চলিয়া গেল। উপেন কিন্তু তাহার এই সঙ্কোচটুকু লক্ষ্য করিল না, সে নিস্তারিণীর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া ট্যাক হইতে দুইটা টাকা বাহির করিয়া ব্যস্ততার সহিত বলিল, গাঁটছড়া “ডাক্তারের তিন টাকা পাওনা। আমি অনেক কষ্টে এই দুটো টাকার যােগাড় করেছি। ডাক্তারকে এই দু’টাকা দিয়ে বলবেন, আমি ফিরে এসে তার বাকী এক টাকা মিটিয়ে দেব। আশ্চর্যান্বিতভাবে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া নিস্তারিণী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তুমি কোথায় যাবে বাবা?” উপেন বলিল, “কোথায় যাব, তা এখন ঠিক বলতে পারি না, তবে যেখানেই হােক গিয়ে একটা চাকরী-বাকরীর যােগাড় কত্তে হবে।” “কেন?” “কেন কি ? ব্যাটাছেলে, চিরকাল বসে বােনের ভাত খাব, লােকে বলবে কি ?” উপেনের কথায় নিস্তারিণীর মুখে যেন একটু নিরাশার ছায়া পড়িল । উপেন যদি চলিয়া যায়, তাহা হইলে মেনীর বিবাহের কি হইবে? অথচ উপেন যাহা বলিতেছে, তাহাও নিতান্ত অসঙ্গত নয়, ব্যাটাছেলে এমন পরাধীন হইয়াই বা থাকিবে কেন ? কিন্তু তাহার মেনীর উপায় ? একটু ইতস্ততঃ করিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “তা বটে বাবা, ব্যাটা- ছেলে-পয়সা রােজগার করা দরকার। তবে” তঁাহার বক্তব্যে বাধা দিয়া উপেন জোর গলায় বলিল, “তবেই বুঝে দেখুন দেখি, এমন করে বসে থাকলে তাে পয়সা রােজগার হবে না ! এক পয়সার ভিখিরী। এই দেখুন না, ডাক্তারকে তিনটে টাকা দিতে হবে, তা কত কষ্টে দুটি টাকার যােগাড় করেছি, তাও ভাগ্যে বড়দি ধার দিলে। তাও তিন টাকা দিলে না, বলে, আর নাই।” লজ্জামলিন মুখে নিস্তারিণী বলিলেন, “তা তুমি কেন এত কষ্ট ক'রে টাকার যােগাড় কত্তে গেলে বাবা? আমিই না হয় কোন রকমে যােগড় করে দিতুম।” ৬৭

গাঁটছড়া
;
উপেন হাসিয়া উঠিল ; বলিল, “আপনি আর কোথা থেকে যােগাড়
কত্তেন ? ঘরের ঘটী-বাটি বেচতে হ’তে তাে ? তার চেয়ে আমিই
না হয় ধার করে দিলুম। ব্যাটাছেলে, দুটো টাকা ধার আর শুতে
পারবাে না ?”
নিস্তারিণী বলিলেন, “তা আর পারবে না বাবা, খুব পারবে।
তবে—”
মাথাটা জোরে একবার নাড়িয়া উপেন বলিল, “তবে আর কি,
একটা মাসের মাইনে পেলেই বড়দিকে মনি-অর্ডার করে পাঠিয়ে
দেব। আপনি সে জন্যে কিছু ভাববেন না। আমি তবে চলুন
এখন।”
উদ্বেগ-ব্যাকুল কণ্ঠে নিস্তারিণী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কবে যাবে?”
উপেন বলিল, “কবে কি ? আজই যাচ্চি। শুধু এক মুঠো খেতে
যা দেরী। খেয়েই বেরিয়ে যাব, দেরী আর কচ্চি না।”
উপেন ব্যস্তভাবে প্রস্থানােত হইল। উদ্বিগ্নভাবে নিস্তারিণী
জিজ্ঞাসা করিলেন, “আবার আসবে তাে বাবা ?”
ফিরিয়া দাঁড়াইয়া মাথা নাড়িতে নাড়িতে উপেন বলিল, “আসবে
বই কি। মাঝে মাঝে এসে দিদিকে দেখে যাব, আপনাদের দেখে
যাব। কেন আসবাে না? আমি কি কারও ধার করে খেয়ে যাচ্ছি ?
ধারের মধ্যে যা বড়দির দু’টাকা।”
বলিয়া উপেন হাসিতে হাসিতে বাহির হইয়া গেল। নিস্তারিণী
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া স্তব্ধ নিস্পন্দভাবে দাড়াইয়া রহিলেন ।
মেনী ডাকিল, “মা!”
মায়ের কোন সাড়াশব্দ নাই। তিনি তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অন্ধকার
দেখিতেছিলেন। দুপুরের চক্চকে বােদের উপর কে যেন একটা ঘন
৬৮

গাঁটছড়া ! কালাে ছায়া টানিয়া দিয়াছিল। উপেনের প্রস্থানের সঙ্গে কে যেন তাহার আশামুগ্ধ হৃদয়টাকে পায়ের তলায় ফেলিয়া নির্মমভাবে পেষণ করিয়া দিতে- ছিল। হায়, যদিও বহুকষ্টে একটি পাত্র মিলিল, বিধাতার অভিশাপে সেও হাতছাড়া হইয়া যাইতেছে! আর কি উপেন ফিরিবে ? আর কি মেনীর পাত্র পাওয়া যাইবে? হ ভগবান, দুঃখীর উপর তুমি এত নির্দয় কেন? মায়ের সাড়া না পাইয়া মেনী পুনরায় একটু চড়া গলায় ডাকিল, “মা, ও মা, বলি শুনতে পাচ্ছো ?” বিরক্তির সহিত নিস্তারিণী উত্তর করিলেন, “কি শুনতে হবে বল।” মেনী বলিল, “শুনতে কিছুই হবে না। কিন্তু তুমি অমন করে দাড়িয়ে রইলে কেন ?” বিষাদগাঢ়কণ্ঠে নিস্তারিণী উত্তর দিলেন, “আমি কেন দাড়িয়ে রয়েছি, তুই আর কি বুঝবি বল ? তুই আবাগী যদি তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডাতে না যাবি” তর্জন সহকারে মেনী বলিল, “আমি ডাক্তার ডাকতে না গেলে তােমাকে আজ উঠে দাঁড়াতে হতাে না।” নিস্তা। উঠে না দাঁড়াতে হতাে, আমি পড়েই থাকতাম, কিন্তু উপেনকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হতাে না। মেনী। তােমার জন্যে ডাক্তার ডেকে এনেছে বলেই বুঝি চলে যাচ্ছে? নিস্তা। নিশ্চয় তাই। বেচারী ডাক্তারকে টাকা দেব বলেছে, অথচ টাকার যােগাড় কত্তে পারে না। তাই মনে ধিক্কার জন্মেছে। মেনী। হাঁ, তােমাকে বলেছে, ধিক্কার জন্মেছে। ওর মনে সে রাগ থাকলে বােনের ঝাঁটা খেয়ে পড়ে থাকে না। মেয়েকে ধমক দিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “চুপ ক আবাগী, ওর বােন ওকে ঝাঁটা মারে, তুই দেখেছিস্?” ৬৯

গাঁটছড়া
জোর গলায় মেনী বলিল, “দেখেছিই তাে। এই সে দিন বাজার
যেতে দেরী হয়েছিল বলে কত কথা শুনিয়ে দিলে, আর ও দাড়িয়ে
দাঁড়িয়ে হাসতে লাগলাে।”
ঝঙ্কার দিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “হ, হাসতে লাগলাে ! আচ্ছা
মেনী, তুই তাে ঘর ছেড়ে প্রায় কোথাও যাস্ না, তবে এত খবর
রাখি কোথা থেকে ?”
মেনী বলিল, “এই ঘরে বসেই সব খবর রাখি। এখন তুমি এসে
ঝােলে কতটুকু নুণ দেব, দেখিয়ে দিয়ে যাও দেখি।”
নিস্তারিণী বলিলেন, “আমি আবার দেখিয়ে দিতে যাব কেন, এই
তাে তুই আমায় রান্নাঘর থেকে বার করে দিলি।”
যােড়হাত করিয়া ক্রোধসমুচ্চকণ্ঠে মেনী বলিল, “ঝারি করেছি
গাে, ঝকমারি করেছি। এখন এসে মুণটা দেখিয়ে দাও, শেষে মুণ
কম-বেশী হয়েছে বলে খেতে পারবে না যে।”
মেয়ের কথায় মায়ের হাসি আসিল। হাসি চাপিয়া নিস্তারিণী
কৃত্রিম গম্ভীর কণ্ঠে বলিলেন, “আমি খেতে পারি না পারি, তাের
তাতে কি বল্ তাে?”
মেনী বলিল, “আমার আর কি? তুমি মা, আমি মেয়ে, দু’জনে
তাে এমন নিকট সম্বন্ধ নয় যে, তােমার ভালয় মন্দয় আমার ক্ষতি
বুদ্ধি আছে।”
নিস্তারিণী এবার হাসিয়া উঠিলেন ; বলিলেন, “আচ্ছা মেনী, এই
বয়সে এত কথা তুই শিখলি কোথা থেকে ?”
মেনী উত্তর করিল, “তােমার কাছ থেকে।”
‘আমার বাপ-চোদ্দপুরুষেও এত কথা জানে না বাছা।” বলিয়া
নিস্তারিণী হাসিতে হাসিতে রন্ধনশালায় প্রবেশ করিলেন।
৭০

গাঁটছড়া
মেনীদের বাড়ী হইতে ফিরিয়া উপেন তাড়াতাড়ি স্নান করিয়া
আসিল, এবং কুসুমের নিকট গিয়া বলিল, “শীগগীর ভাত একমুঠো
দাও তত দিদি।”
কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “ভাতের এত তাড়া কেন রে ?”
উপেন বলিল, “আমাকে কলকাতা যেতে হবে।”
কুসু। কলকাতায় গিয়ে কি হবে ?
উপে। কি আবার হবে। একটা চাকরী-বাকরী দেখতে হবে ।
কুসু। কি চাকরী দেখবি ? টো টো কোম্পানীর চাকরী ?
ভারীমুখে উপেন বলিল, “কেন, টো টো কোম্পানীর চাকরী ছাড়া
কি আর কিছু চাকরী নাই ?”
সহাস্যে কুসুম বলিল, “যাত্রার দলের চাকরী আছে।”
ঘাড় নাড়িয়া উপেন বলিল, “যাত্রার দল! রাম, যাত্রার দলে
আর যাচ্ছি না।”
ঈষৎ শ্লেষের স্বরে কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “সত্যি ?”
রােষগম্ভীর মুখে উপেন বলিল,-“সত্যি নয় তাে মিছে? কেন,
তােমরা কি মনে কর, যাত্রার দলের চাকরী ছাড়া আর কোন চাকরী
আমি কত্তে পারি না?”
মৃদু হাস্য সহকারে কুসুম বলিল, “না না, এমন কথা মনে করবে
কেন ? তা হলে সত্যিই তুই চাকরী কত্তে যাবি ?”
উপেন বলিল, “সত্যি মিথ্যে এখনই দেখতে পাবে। আগে ভাত
একমুঠো দাও দেখি।”
কুসুম ভাত বাড়িয়া দিল। খাইতে বসিয়া উপেন জিজ্ঞাসা করিল,
৭১

গাঁটছড়া
“আচ্ছা দিদি, আমি চাকরী কত্তে যাব শুনে তােমার মনে
কষ্ট হচ্চে?”
কুসুম বলিল, 'না আহলাদ হচ্ছে।”
‘আলাদ! সত্যি ?”
“সত্যি।”
‘‘আহলাদ হচ্ছে কেন?”
“পুরুষমানুষ-পয়সা রােজগার করবি, শুনে আলাদ হবে না ?”
“তা বটে” বলিয়া উপেন আহারে মনােনিবেশ করিল। কয়েক
গ্রাস ভাত উদরস্থ করিয়া মুখ তুলিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “ঘােষজা মশাই
কোথায় ?”
কুসুম বলিল, “কোথায় খাজনা সাধতে গিয়েছে ?”
চিন্তিতভাবে উপেন বলিল, “তাই ত, তা হলে যাবার সময়
তার সঙ্গে দেখাটা হলাে না। তিনি কি মনে করবেন।”
ব্যস্ততার সহিত কুসুম বলিল, “কিছু মনে করবেন না। আমি
তাকে বুঝিয়ে বলবাে।”
মাথা নাড়িয়া উপেন বলিল, “তুমি তাে বলবে, কিন্তু আমার দেখা
করে যাওয়াটা—তা যাক্, কলকাতায় গিয়েই তাকে একখানা চিঠি
লিখবো।”
“তাই লিখে দিস্” বলিয়া কুসুম ঘাটে হাত ধুইতে চলিয়া গেল ।
উপেন আহার শেষ করিয়া উঠিয়া নিজের কাপড়-চোপড় বাঁধিয়া
লইল। গিরি জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি আবার
আসবে
মামা ?”
উপেন বলিল, “কবে আসবাে, সে কথা এখন কি ঠিক বলা যায় ?
তবে দু’চার মাস পরে একবার আসবাে।”
৭২

গাঁটছড়া
এই দুই চারি মাসকে অতি দীর্ঘকাল জ্ঞান করিয়া গিরি বলিল,
“ও হরি, দু’চার মাস! আমি বলি বা কাল-পরশু আসবে।”
হাসিতে হাসিতে উপেন বলিল, “আজ গিয়ে কাল-পরশু আসবাে,
তবে যাচ্ছি কেন ?”
গিরি বলিল, “কেন যাচ্চো, তা আমি কি জানি? তা কাল-পরশু
হয়, তিন চার দিন পরেও তে আসতে পার।”
উপেন বলিল, “পারি তাে আসবে। নয় ত তাের বিয়ের সময়
এসে লুচি খাব।”
বিবাহের কথায় গিরি লজ্জায় ঘাড় হেঁট করিল। উপেন তখন
কুসুমকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “গিরির বিয়ের সময় আমাকে খবর
দিও দিদি।”
গম্ভীর মুখে কুসুম বলিল, “মনে থাকে তাে খবর দেব।”
সহাস্যে উপেন বলিল, “মনে থাকলে খবর দেবে? তা হলে
মনে না থাকতেও পারে বােধ হয়।”
কুসুম বলিল, “সে কথা এখন কি করে বলবো?”
উপেন বলিল, “তা নাই বলতে পার। তােমাদের মনে পড়ে, খবর
দিও, না হয়, খবর দিও না। কিন্তু একটা কথা বলি দিদি, রাগ
করাে না।”
কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “কি এমন কথা বলবি ?
উপেন বলিল, “অপর কিছু কথা নয়, আমি এই যে আজ চলে
যাচ্ছি, তুমি তাে কৈ একবারও বারণ করলে না?”
কুসুম বলিল, “তুই চাকরী কত্তে যাচ্ছি, আমি বারণ করবে
কেন?”
ঘাড় দোলাইয়া উপেন বলিল, “গেলুম বা চাকরী কত্তে। এই

গাঁটছড়া যে শিবে আজ দশ দিন কলকাতা যাব যাব কচ্চে, কিন্তু তার মা যেতে দেয় না। আজ নয় কাল, দিন ভাল নয়, মঘাতেরস্পর্শ, এই রকম করে বাধা দিচ্ছে।” একটু ভারী গলায় কুসুম বলিল, “তােরও মা থাকলে তােকে বাধা দিতাে।” দিদির মুখের উপর আগ্রহপূর্ণ দৃষ্টি স্থাপন করিয়া উপেন বলিল, “আমার মা নাই, কিন্তু তুমি তাে আছ। তুমি তাে একবারও বললে না যে, আজ নয়—কাল যা।” কুসুমের চোখের পাতাগুলি ভারী হইয়া আসিল। সে উপেনের সকরুণ দৃষ্টির সম্মুখ হইতে মুখ ফিরাইয়া লইয়া ধরা গলায় উত্তর দিল, “তা বল্‌তে পারতাম, কিন্তু বারণ করলে তুই যদি না যাস্ ?” উপেনের আগ্রহ-প্রফুল্ল মুখখানা হঠাৎ মলিন হইয়া আসিল। একটু বেদনাকাতর কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “আমি যদি না যাই, হ'লে আমি চলে যাই এই কি তােমার ইচ্ছা দিদি ?” স্বরে একটা অস্বাভাবিক জোর দিয়া কুসুম বলিল, “হ।” বলিয়াই কুসুম ব্যস্তভাবে তাহার সম্মুখ হইতে সরিয়া গেল। উপেন কাপড়ের পুঁটুলীটা হাতে লইয়া বিস্ময়স্তব্ধভাবে বসিয়া রহিল। যাত্রাকালে উপেন দিদিকে প্রণাম করিয়া পায়ের ধূলা লইতে গিয়া দেখিল, কুসুমের চোখের কোণে জল টন্ টন্ করিতেছে। দেখিয়া উপেন বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কঁাদচো কঁচো নাকি দিদি ?” ধরা গলায় তর্জন করিয়া কুসুম উত্তর দিল, “হাঁ, কঁদছি আমি। কঁদতে যাব আমি কেন রে?” কথার সঙ্গে সঙ্গেই দুই ফোটা জল চোখের কোণ বহিয়া গড়াইয়া ৭৪ গাঁটছড়া তাহার স্নেহ-হীনতা-সূচক তর্জনকে সম্পূর্ণ নিস্ফল করিয়া দিল দেখিয়া উপেন হাসিতে হাসিতে বাহির হইয়া গেল। তাহার প্রস্থানের কিয়ৎক্ষণ পরে দয়ারাম বাড়ীতে ফিরিয়া যখন শুনিতে পাইল যে, উপেন হঠাৎ চাকরী করিতে কলিকাতা যাত্রা করিয়াছে, তখনই তিনি মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন, এবং কুসুম তাহাকে বাধা দিয়া ধরিয়া রাখে নাই বলিয়া কুসুমকে নিৰ্ব্বোধ বলিয়া তিরস্কার করিতে লাগিলেন ; আর কোন দিন কুসুম স্বামীর এরূপ তিরস্কার নীরবে সহ্য করিত কি না সন্দেহ, আজ কিন্তু সে বিনা প্রতিবাদেই আপনার নির্বুদ্ধিতা স্বীকার করিয়া লইল। উপেন চলিয়া যাওয়ায় সে মনের ভিতর খুব কষ্টই অনুভব করিতেছিল বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে উপেনের প্রস্থানে উপেনও যে নিজে একটা বিষম লজ্জা ও লাঞ্ছনার হাত হইতে অব্যাহতি লাভ করিয়াছে, এই আনন্দে তাহার হৃদয়টা ভরপূর হইয়া উঠিতেছিল । সুতরাং স্বামীর তিরস্কারের তীব্রতা তাহাকে তেমন কঠোরভাবে আঘাত করিতে পারিল না। কুসুনের এই নীরব সহিষ্ণুতায় দয়ারামকেও অগত্যা চুপ করিতে হইল। অতঃপর তিনি মেয়েটাকে কিরূপে পার করিবেন, এই চিন্তা লইয়াই ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। “জনমেরি মত বুঝি শ্যামৰ্চাদ ছেড়ে যায় । তােরা যানে যমুনাকূলে সই লাে ফিরিয়ে আয়।” অর্থোপার্জনের প্রয়ােজনীয়তা হৃদয়ঙ্গম করিয়া উপেন অর্থার্জনের আশায় উৎসাহিত চিত্তে বাহির হইল বটে, কিন্তু বাটী হইতে যাইবার পরই তাহার সে উৎসাহ ক্রমেই যেন ম্লান হইয়া আসিতে লাগিল • ৭৫ গাঁটছড়া তাহার হলে স্বজনবিয়ােগজনিত একটা বেদনা আসিয়া তাহার মনটাকে নিতান্ত চঞ্চল করিয়া তুলিল। তাহার ধারণা ছিল, সংসারে সে একা, তাহার আপন বলিতে কেহ নাই, কাহারও জন্য তাহার পিছনে চাহিবার প্রয়ােজন নাই। আজ কিন্তু তাহার সে ভুল ভাঙ্গিল ; উপেন বুঝিতে পারিল, এই কয় বৎসর দিদির বাড়ীতে থাকিবার ফলে অনেকগুলা লােক তাহার আপন হইয়া উঠিয়াছে,—শুধু ভগ্নী ভগ্নীপতি বা ভাগিনেয়ী বলিয়া নয়, সমগ্র গ্রামখানাই যেন তাহার নিতান্ত আপন হইয়া গিয়াছে, এবং আজ হঠাৎ তাহাদিগকে ছাড়িয়া যাওয়া তাহার পক্ষে বড়ই কষ্টকর হইয়া উঠিয়াছে। ইহাদিগকে ছাড়িয়া সে কি থাকিতে পারিবে ? বার বার পশ্চাতে দৃষ্টিপাত করিতে করিতে উপেন যতই অগ্রসর হইতেছিল, ততই তাহার পা দুইটা সম্মুখ অপেক্ষা পিছনের দিকেই ফিরিতে যেন ব্যগ্র হইয়া উঠিতেছিল। কিন্তু ফিরিলে চলিবে না, পয়সার জন্য বিদেশে যাইতেই হইবে। উঃ পয়সার জন্য কি লাঞ্ছনা! দিদি-এক মায়ের পেটের বােন, পয়সা উপায় করিতে পারি নাই বলিয়া সেও কত কথাই শুনাইয়া দিয়াছে। ভগ্নীপতির অন্ন ধ্বংস করে বলিয়া গ্রামের কত লােক কত উপহাস করিয়াছে। না, পয়সা উপায় করিতেই হইবে। দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় হৃদয় বাঁধিয়া উপেন ফিরিয়া যাইবার আগ্রহটাকে দমন করিয়া দ্রুতপদে অগ্রসর হইল, এবং গ্রাম ছাড়াইয়া ক্রমে যখন মাঠে গিয়া পড়িল, তখন মনের চাঞ্চল্যকে দূর করিবার জন্য গলা ছাড়িয়া গান ধরিল,- “জনমেরি মত বুঝি শ্যামচাদ ছেড়ে যায়।” মাঠের পরেই একটী ঘােট নদী। গ্রীষ্মকাল বলিয়া নদীতে জল ছিল না, উপেন হাঁটিয়া নদী পার হইয়া পাকা রাস্তা ধরিল। সেখান হইতে রেল-ষ্টেশন দেড় ক্রোশ মাত্র দূরে। উপেন একবার ৭৬ == গাঁটছড়া = পশ্চিম আকাশের দিকে চাহিল। তখনও অনেক বেলা বাকী, গাড়ী সেই সন্ধ্যার সময়। রাস্তার পাশেই একটা বৃহৎ বটগাছ শাখাপ্রশাখা বিস্তার করিয়া ক্লান্ত পথিকদিগের বিশ্রামাগারস্বরূপে দণ্ডায়মান ছিল। উপেন গিয়া সেই বটগাছের ছায়ায় বসিল, এবং পকেট হইতে বিড়ী দেশালাই বাহির করিয়া একটা বিড়ী ধরাইল। বিড়ী টানিতে টানিতে গুন্ গুন্ করিয়া গাহিতে লাগিল,- “ যানে যমুনাকূলে সই লো ফিরিয়ে আয়।” হঠাৎ খক্‌ খক্ কাসির শব্দে চমকিত হইয়া উপেন গান বন্ধ করিয়া পিছনে ফিরিয়া চাহিতেই দেখিল, একটা মানুষ মােটা চাদরে পা হইতে মাথা পর্যন্ত ঢাকা দিয়া শুইয়া রহিয়াছে। মানুষটাকে উপেন এতক্ষণ লক্ষ্য করে নাই, নিজের চিন্তাতেই নিমগ্ন ছিল। এক্ষণে মাঠের মাঝে গাছতলায় মানুষটাকে এইরূপে শুইয়া থাকিতে দেখিয়া সে বিস্মিত হইল, এবং একটু ইতস্ততঃ করিয়া ডাকিল, “কে ওখানে শুয়ে গা ?” প্রথম ডাকে কোনরূপ সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না ; দ্বিতীয় ডাকে মানুষটা একটু নড়িল, এবং ধীরে ধীরে মুখের আবরণ উন্মােচন করিল। তখন উপেনের বিস্ময় আরও বর্ধিত হইল ; দেখিল, চাদর-ঢাকা লােকটা পুরুষ নহে, একজন মেয়েমানুষ এবং তাহার মুখখানা দেখিয়াই বােধ হইল, ভদ্রঘরের মেয়ে, বয়স বােধ হয় ত্রিশের অধিক হইবে না। উপেন কৌতূহলবিস্ফারিত দৃষ্টিতে স্ত্রীলােকটির মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। স্ত্রীলােকটি ধীরে ধীরে যেন একটু কষ্টে উঠিয়া বসিল এবং সকরুণ- ভাবে উপেনের মুখের উপর দৃষ্টিপাত করিয়া ক্ষণস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে বাবা ?” উপেন উত্তর করিল, “আমি এক জন রাহী।” ৭৭ গাঁটছড়া “কোথায় যাবে ?” ‘ক’লকাতায়।” ‘আমিও কলকাতায় যাব। আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে বাবা ?” তােমার বাড়ী কোথায় ? “কলকাতায়।” “কলকাতায় বাড়ী ? তুমি এখানে এসেছ কেন?” স্ত্রীলােকটি তখন এখানে আসিবার যে কারণ ব্যক্ত করিল, তাহার মৰ্ম্ম এই,—সে কোন পরিচিত আত্মীয়ের সহিত নন্দীগ্রামে গােপীনাথের দোলযাত্রা দেখিতে আসিয়াছিল। সেখানে আসিয়া সে পথের পরিশ্রমেই হউক বা পল্লী গ্রামের জলবায়ুর দোষেই হউক, প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হইয়া পড়ে। সেই অবস্থায় একদিন রাত্রে সে যখন জ্বরে অজ্ঞান হইয়া পড়িয়া ছিল, তখন তাহার সঙ্গী আত্মীয়টি তাহার সঙ্গের অর্থ ও গাত্রস্থিত দুই একখানি অলঙ্কার লইয়া কোথায় চলিয়া গিয়াছে। স্ত্রীলােকটির কানে দুইটি সােনার ফুল ছিল। সঙ্গীটী বােধ হয় তা লক্ষ্য করে নাই, বা লইবার অবসর পায় নাই। সেই ফুল দুইটি আট টাকায় বিক্রয় করিয়া সে নিজের চিকিৎসা ও পথ্যের খরচ চালাইয়াছে । তার পর একটু সুস্থ হইয়া কলিকাতায় যাইতেছে। তাহার হাতে এমন পয়সা আর নাই যে, গরুর গাড়ী ভাড়া করিয়া ষ্টেশন পর্যন্ত যায়, মাত্র রেল-ভাড়াটি রহিয়াছে। কাজেই তাহাকে নন্দীগ্রাম হইতে হাঁটিয়া আসিতে হইতেছে, এবং হাঁটিতে হাঁটিতে ক্লান্ত ও চলচ্ছক্তিরহিত হইয়া সে এই গাছতলায় শুইয়া পড়িয়াছে। তাহার এই দুঃখের কাহিনী শুনিয়া উপেন একটু ব্যথিত হইল। সে কুটী করিয়া বলিল, “তােমার আত্মীয়টি তা হলে তাে চমৎকার আত্মীয়!” ৭৮

গাঁটছড়া
*ীলােকটি বলিল, “তেমন আপনার লােক হ'লে কি এই রকম করে
পালায় বাবা?”
উপেন বলিল, “কিন্তু এ-রকম লােকের সঙ্গে তােমার আসাও উচিত
হয় নি।”
০
স্ত্রীলোেকটি নিজের নাক-কান মলিয়া বলিল, “এই নাকে কানে খৎ
বাবা, আর যদি কারও সঙ্গে ঘরের বাইরে পা দিই। এখন একবার
কোন রকমে ঘরে পৌঁছুতে পারলে হয়।”
উপেন জিজ্ঞাসা করিল, “ষ্টেশন পর্যন্ত হাঁটতে পারবে তাে?”
স্ত্রী। আর কতটুকু রাস্তা যেতে হবে ?
উপেন। প্রায় ক্রোশ-খানেক।
স্ত্রী। হাঁটবার ক্ষমতা আমার নাই, কিন্তু মাঠের মাঝেও তাে পড়ে
থাকতে পারবে না। মরি বাচি—যেতেই হবে।
মুখে যেতেই হবে’ বলিলেও সে যাইতে পারিবে কি না, সে
বিষয়ে উপেনের সন্দেহ জন্মিল ; এবং কিরূপে এই বিপন্ন স্ত্রীলােকটিকে
ষ্টেশনে লইয়া যাইবে, তাহাই ভাবিয়া একটু ব্যাকুল হইয়া
পড়িল।
ভগবান উপায় করিয়া দিলেন । একখানা খালি গরুর গাড়ী মাল
আনিবার জন্য ষ্টেশনের দিকে যাইতেছিল। উপেন গাড়ােয়ানের কাছে
গিয়া অনেক অনুনয়-বিনয় করিয়া, শেষে নিজ হইতে দুই আনা জলপানি
দিতে স্বীকৃত হইয়া এই স্ত্রীলােকটিকে ষ্টেশনে পৌছাইয়া দিতে
গাডােয়ানকে সম্মত করাইল । তার পর স্ত্রীলােকটিকে গাড়ীতে উঠাইয়া
দিয়া নিজে গাড়ীর পিছনে পিছনে চলিল।
৭৯

গাঁটছড়া কয়েকদিন পরে উপেনের পত্র আসিল। সে লিখিয়াছে, “ঘােষজা মশাহ, আমি কলকাতায় এসে পৌছেছি। রাস্তায় এক বিপন্ন স্ত্রীলােককে নিয়ে ভারী ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, অনেক কষ্টে তাকে তার ঘরে এনে দিয়েছি। আমি এখন তাদের বাড়ীতেই আছি, খাওয়া দাওয়ার খরচ তারাই সব দিচ্চেন। চাকরীর যােগাড় এখনও হয়ে ওঠে নি। থিয়েটারে চাকরী করলে আজই চাকরী হয়, কিন্তু ও-সব কাজ আর করবাে না। অন্য কাজের চেষ্টা দেখচি। গিরি, থােকা ও আপনারা কেমন আছেন লিখবেন। বড়দিকে বলবেন, আমি বেশ ভাল আছি, এখানে আমার কোনই কষ্ট হচ্ছে না। ইতি।” দয়ারাম স্ত্রীকে ডাকিয়া বলিল, “শুচো গা, উপেন বাবুর পত্র এসেছে।” কুসুম একটু আগ্রহের সহিত জিজ্ঞাসা করিল ‘কি লিখেছে ?” দয়ারাম বলিল, “লিখেছে ভাল—কোথাকার কাদের বাড়ীতে খাচ্চে দাচ্চে রয়েছে। চাকরী এখনও হয় নি, চেষ্টা দেখছে।” কুসুম বলিল, “তা চেষ্টা দেখতে হবে বৈ কি। চাকরী কি অমি পড়ে রয়েছে।” একটু উপহাসের হাসি হাসিয়া দয়ারাম বলিল, “চাকরী পড়েও নাই, আর চাকরী ও কত্তেও পারবে না। তুমি দেখে নিও।” কুসুম বলিল, “কত্তে পারবে না তাে গেল কেন?” গম্ভীর মুখে দয়ারাম বলিল, “গিয়েছে দায়ে পড়ে ; স্বেচ্ছায় তাে যায় নি।” স্বামীর এই উক্তির মধ্যে কুসুমের উপর যে একটু তিরস্কারের ৮ গাঁটছড়া আঘাত আছে, তাহা অনুভব করিয়া কুসুম ঈষৎ রাগতভাবে বলিল, “স্বেচ্ছায় যায় নি তাে কে তাকে অনিচ্ছায় ধরে বেঁধে পাঠিয়ে দিয়েছে ?” গম্ভীরভাবে মস্তকসঞ্চালন পূৰ্ব্বক দয়ারাম বলিল, “ধরে বেঁধে কেউ পাঠায় নি, তবে উপেন এখানে থাকে বা তার দ্বারায় আমার কোন উপকার হয়, এ ইচ্ছা অনেকেরই নাই।” কুসুম ভারীমুখে নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল। দয়ারাম তাহার দিকে তীব্র দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া যেন একটু তাচ্ছীল্যের সুরেই বলিল, “চুলােয় যাক্, সে এখানে থেকে আমাকে রাজা করেনি, চলে গিয়ে কাঙালও করবে না। তবে অনাথ অসহায়—তাই যত্ন-আত্তি করে রেখেছিলাম, তাতে যদি কারও আপত্তি থাকে, আমার টানাটানিতে দরকার কি? আমার মেয়ের বিয়ে—উপেনের জন্যে সে কাজ আটকাবে না, এক রকমে মেয়ে পার হয়েই যাবে।” স্বামীর এই আক্ষেপােক্তিতে ক্রুদ্ধ হইয়া কুসুম বলিল, “তা হলে তুমি কি মনে কর, উপেনকে আমিই তাড়িয়েছি ?” – কুঞ্চিত করিয়া দয়ারাম বলিল, “তুমি তাড়িয়েছ, এমন কথা আমি বলি না। তবে তােমার ভাই, তার ভাল মন্দ তুমি যতটা বুঝবে, অপরে কি তত বােঝে ? সে দু’পয়সা রােজগার করবে, বিয়ে-থা করে সংসারী হবে, এ ইচ্ছা তােমার হতেই পারে তাে।” রােষক্ষুব্ধ-কণ্ঠে কুসুম বলিল, “যদিই আমার সে ইচ্ছা হয়ে থাকে, তবে সেটা কি খুব অন্যায় হয়েছে ? তােমারও কি সে ইচ্ছা নাই ?” দুঃখ-মলিনম্বরে দয়ারাম বলিল, “আমার ইচ্ছা ছিল কি না, সে কথা ভগবানই জানেন। কিন্তু থাকলে কি হবে, হাজার হােক আমি পর; আমি যেটা ভালাের জন্যে করবাে, অপরের কাছে সেটা মন্দ হয়ে দাড়াবে।” ৮১ গাঁটছড়া । দয়ারাম আক্ষেপে একটা ক্ষুদ্র নিশ্বাস ত্যাগ করিল। কুসুম আর মুখে জোর গলায় বলিল, “দেখ, তুমি যাই মনে কর, আমি কিন্তু উপেনকে যাবার কথা একবারও বলি নাই। সে নিজেই তাহার কথায় বাধা দিয়া দয়ারাম বলিল, “সে নিজে যায়নি তাে তুমি কি তাকে জোর করে পাঠিয়েছে? সে নিজেই গিয়েছে, তবে তুমি তাকে মানা করনি। আর রাহাখরচ —” কুসুম বলিল, “রাহাখরচ কে দিয়েছে জান ? ও বাড়ীর বড়দি দিয়েছে।” উৎসুকভাবে দয়ারাম জিজ্ঞাসা করিল, “কে দিয়েছে ? নীলু- দার স্ত্রী ?” “হ।” “ওঃ, ভিতরে তা হলে আরও গলদ আছে ।” কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “গলদ আবার কি ?” “পরে জানতে পারবে” বলিয়া দয়ারাম উপেনের চিঠিখানা চালের বাতায় জিয়া রাখিয়া চটীজুতাটা পায়ে দিয়া বাহির হইয়া গেল। দয়ারাম রাগে রাগেই মেনীর মা’র নিকট উপস্থিত হইল, এবং নিতান্ত দুঃখের সহিত তাহাকে জানাইল যে, উপেনের সহিত মেনীর বিবাহ দিয়া তাহাকে কন্যাদায় হইতে উদ্ধার করিয়া দেওয়া দয়ারামের অভিপ্রেত ছিল বটে, কিন্তু তাহা এক্ষণে ঘটিয়া উঠা অসম্ভব। কারণ, উপেন কলিকাতা চলিয়া গিয়াছে ; সে আর ফিরিবে কি না সন্দেহ। ফিরিলেও চাকরী করিয়া দুই পয়সা উপার্জন করিলে সে মেনীকে বিবাহ করিতে সম্মত হইবে না। সুতরাং তাহার অপেক্ষায় মেয়ে রাখা যায় না। উপস্থিত মেনীর মা যদি দ্বিতীয় পক্ষে মেয়ে দিতে সম্মত হয়, তাহা হইলে দয়ারাম চেষ্টা দেখিতে পারে। দ্বিতীয় পক্ষের পাত্র একটি ৮২ গাঁটছড়া সন্ধানে আছে বয়স যে খুব বেশী, তা নয়, চল্লিশের মধ্যে। এ দিকে অবস্থা খুব ভাল, এবং অল্প-স্বল্প কিছু দিলেই কাৰ্য্য সম্পন্ন হইয়া যাইবে। নিস্তারিণী অগত্যা ইহাতেই সম্মতি দিতে বাধ্য হইলেন; বলিলেন, দ্বিতীয় পক্ষই হােক, আর তৃতীয় পক্ষই হােক, কোন রকমে মেয়েটাকে পার করে দাও ঠাকুরপাে, আমি তাে আর পাঁচজনের পাঁচ কথা শুতে পারি না।” দয়ারাম তাঁহাকে আশ্বাস দিয়া বলিল, “তৃতীয় পক্ষ চতুর্থ পক্ষ দেখতে হবে না, দ্বিতীয় পক্ষই যােগাড় করে দিচ্ছি। লােকের কথা ছেড়ে দাও, তারা ভাল কারও দেখতে পারে না। নইলে উপেনকে যুক্তি দিয়ে, রাহাখরচ দিয়ে কলকাতা পাঠিয়ে দেবে কেন ? তা হােক, উপেন ছাড়া দেশে ঢের পাত্র আছে। মেয়েও তত বুড়াে হয়ে যায় নি, তেরাে বছরে পা দিয়েছে মাত্র। আজকাল বড় বড় ঘরে যােল আঠার বছরের আইবুড়ো মেয়ে থাকে।” নিস্তারিণী বলিলেন, “বড় ঘরের বড় কথা ছেড়ে দাও ঠাকুরপাে, আমাদের গরীবের ঘরে গরীবের মতই চলতে হবে।” দয়ারাম বলিল, “আচ্ছা আচ্ছা, সে জন্যে তােমাকে ব্যস্ত হতে হবে না, আমি যত শীগগীর পারি, কাজ সেরে দিচ্ছি। আগে মেনীর বিয়ে দিয়ে তবে আমি গিরির বিয়ের চেষ্টা করবাে।” নিস্তারিণীকে অভয় দিয়া দয়ারাম সেই দিনই মেনীর জন্য পাত্র অন্বেষণে বাহির হইলেন। পাত্র একপ্রকার দেখাই ছিল । যাদববাটীর মধুসূদন ঘােষ পঞ্চাশ বৎসরে বিপত্নীক হইয়া বংশরক্ষার্থে দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহে ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। দয়ারাম সে সংবাদ রাখিতেন। সুতরাং সে গিয়া ৮৩ গাঁটছড়া প্রস্তাব করিবামাত্র মধুসূদন স্বীকৃত হইলেন এবং পাত্রী বয়স্থা ও মনােনীত হইলে এক পয়সাও গ্রহণ করিবেন না, ইহা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করিলেন। তবে তিনি পাত্রী দেখিতে চাহিলেন। দয়ারাম একটু বিপন্ন হইয়া পড়িল। বিপন্ন হইলেও তাহাকে ইহাতে স্বীকৃত হইতে হইল। তবে সে কৌশলে কাৰ্যোদ্ধারের অভিপ্রায়ে মধুসূদনকে বুঝাইয়া দিল যে, তিনি নিজে পাত্রী দেখিতে গেলে নানা কথা উঠিতে পারে, সুতরাং এক সময়ে গােপনে গিয়া মেয়েটিকে দেখিয়া আসিবেন । মধুসূদনের ইহাতে আপত্তি রহিল না, বরং দয়ারামের যুক্তিই তিনি শ্রেয়ঃ বলিয়া মানিয়া লইলেন। তার পর একদিন মধুসূদন পাত্রী দেখিতে উপস্থিত হইলেন। দয়ারামের সৌভাগ্যক্রমে মেনী সে দিন গৌরীদের বাগানে গৌরীর সহিত খেলা করিতেছিল। দয়ারাম দূর হইতে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া দেখাইয়া দিলেন, “ঐ মেয়েটি।” কোন মেয়েটি, তাহা স্পষ্ট না বলিলেও মধুসূদন গৌরীকে দেখিয়াই সন্তুষ্ট হইলেন, এবং পাত্রী পছন্দ হইয়াছে বলিয়া স্বীকার করিয়া গেলেন। দয়ারাম তথন নিস্তারিণীকে মেয়ের বিবাহের উদ্যোগ করিতে বলিলেন, এবং জমী বন্ধক দিয়া তিন শত টাকার যােগাড় করিতে উপদেশ দিলেন। দ্বিতীয় পক্ষ বলিয়াই এত অল্প টাকায় হইয়াছে, নতুবা যেরূপ অবস্থাপন্ন পাত্র, তাহাতে হাজার টাকা দিলেও এমন পাত্র পাওয়া যায় কি না সন্দেহ। নিস্তারিণী দয়ারামের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়া জমীর ক্রেতার অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। এ দিকে দয়ারামও স্বীয় কন্যার জন্য পাঁচ শত টাকায় একটি এন্টান্স-পাশ পাত্র স্থির করিয়া ফেলিলেন। ৮৪ গাঁটছড়া “কেমন ছবি একেছি, দেখ দেখি উপীনদা!” ছবিখানিতে তেমন বৈচিত্র্য কিছু ছিল না; গ্রামের পাশ দিয়া একটী নদী বহিয়া যাইতেছে, আর নদীর জলে পদ্ম, কুমুদ, কলার ফুটিয়া রহিয়াছে। বাতাসে নদীর জলে মৃদু তরঙ্গ উত্থিত হইতেছে, ফুলগুলি দুলিয়া দুলিয়া জলের দিকে ঝুকিয়া পড়িতেছে ; কয়েকটা ভ্রমর আসিয়া ফুলের উপর উড়িয়া বেড়াইতেছে, কিন্তু ফুলগুলি বায়ুবশে দোদুল্যমান হওয়ায় তাহাদের উপর বসিতে পারিতেছে না। নদীর তীরে শ্রেণীবদ্ধ বৃক্ষরাজির হরিৎপল্লবে অস্তোন্মুখ সূর্যের সুবর্ণরশ্মি পতিত হইয়া বৃক্ষপত্রগুলিকে রঞ্জিত করিয়া দিয়াছে। উপেন ছবিখানি হাতে লইয়া, ছবির সৌন্দৰ্য্য অপেক্ষা এমন সুন্দর ছবিখানি যে আঁকি- য়াছে, তাহার সৌন্দৰ্যজ্ঞান ও নৈপুণ্য কতদুর, মুগ্ধচিত্তে তাহাই ভাবিতে লাগিল। ছবিখানি আঁকিয়াছিল, বাড়ীওয়ালীর মেয়ে নলিনী কলিকাতা আসিবার সময় পথে যে বিপন্না রমণীকে দেখিয়া, সঙ্গে লইয়া কলিকাতায় আসিয়াছিল, তিনিই এই বাটীর অধিকারিণী । তিনি যে কোন্ শ্রেণীর রমণী ইহা উপেন পূৰ্বে বুঝিতে পারে নাই বুঝিতে পারিলেও সে যে সাহায্য দানে পরায়ুখ হইত তাহা নহে; কেন পতিতা রমণীকে সাহায্য প্রদান নীতিশাস্ত্র-বিরুদ্ধ, এতটা নীতিজ্ঞান উপেনের ছিল না। তবে এখানে আসিবার পর যখন রমণীর পরিচয় জানিতে পারিল, তখন এই স্থানে থাকিতে তাহার মনটা যেন কেমন কেমন করিতে লাগিল। করিলেও সে কিন্তু এ স্থান ত্যাগ করিয়া যাইতে পারিল না। এই পতিতা রমণীর মাতৃবৎ মেহব্যাকুলতায় । উপেন ৮৫ গাঁটছড়া মুগ্ধ হইয়া এই স্থান ত্যাগ করিয়া যাইবার প্রবৃত্তি বা শক্তি তাহার রহিল না। বেশ্যা হইলেও বাড়ীতে বেশ্যার ন্যায় আচার ব্যবহার কিছুই ছিল , ঠিক যেন ভদ্র গৃহস্থের বাড়ী। বাড়ীতে মা, মেয়ে, একটি ঝি, একজন বেহারী চাকর। মা থিয়েটারে কাজ করিত, মােটা মাহিনা পাইত। মেয়ে নলিনী বেথুন স্কুলে পড়িতে যাইত। একজন উড়ে বামুন আসিয়া দুই বেলা রাঁধিয়া দিয়া যাইত। উপেন যে কয়দিন এখানে আসিয়াছিল, সেই কয়দিনের মধ্যে একদিনও এই উড়ে বামুন ছাড়া আর কোন পুরুষ মানুষকে বাটীর মধ্যে প্রবেশ করিতে দেখে নাই। শুধু শনি রবিবারে একজন বাবু থিয়েটারের গাড়ী লইয়া আসিয়া দরজায় দাড়াইত। হাবড়া হইতে গাড়ী করিয়া রমণীকে বাড়ীর দরজায় পৌছাইয়া দিয়া উপেন চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলে রমণী তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কোথায় যাবে বাবা?” উপেন একটু ইতস্তত করিয়া উত্তর করিল, “কোথায় যাব তার ঠিক নাই। তবে বৌবাজারে আমাদের দেশের একজন লােক থাকে, আজ সেইখানেই যাব মনে কচ্ছি।” “তার ঠিকানা কি ?” “ঠিকানা –ঠিকানা বৌবাজার।” রমণী ঈষৎ হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি এর আগে কতবার কলকাতায় এসেছ ?” উপেন বলিল, “বার দুই।” রমণী বলিল, “তা হলে আজ আর তােমার দেশের লােকের কাছে গিয়ে কাজ নাই, গেলে বিপদে পড়বে। আজ এইখানেই থাক, কাল তখন যা হয় করবে।”

গাঁটছড়া বলিয়া সে উপেনের উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই তাহার হাত ধরিয়া বাড়ীর মধ্যে প্রবিষ্ট হইল ; উপেন ঠিক যন্ত্রচালিতের ন্যায় নিশ্চষ্টেভাবে তাহার অনুসরণ করিল । সিড়ি বহিয়া উপরে উঠিয়াই রমণী ডাকিল, “নলি, নলি !” সম্মুখের ঘরের ভিতর একটী চোদ্দ পনেরাে বছরের মেয়ে টেবিলের পাশে বসিয়া ছবি আঁকিতেছিল। উপেন বিস্ময়চকিত দৃষ্টিটা বিস্ফারিত করিয়া চাহিয়া দেখিল, যেন একরাশ টাটকা গােলাপফুল দিয়া গড়া একটা সজীব মূৰ্ত্তি ! চোদ্দ পনেরাে বছরের সুন্দরী মেয়ে উপেন অনেক দেখিয়াছে, কিন্তু এমন অসাধারণ সৌন্দৰ্য্য তাহার চোখে কোন দিনই পড়ে নাই। এ সৌন্দর্য যেন কোন্ এক নূতন বিধাতার হাতের অপূৰ্ব্ব সৃষ্টি ! উপেন মুগ্ধ অপলক নেত্রে মেয়েটির দিকে চাহিয়া রহিল। মেয়েটি টেবিলের উপর কনুইএর ভর দিয়া, বাম করতলের উপর । গণ্ডদেশ স্থাপন করিয়া নিবিষ্টচিত্তে ছবি আঁকিতেছিল, মায়ের ডাক শুনিয়া চমকিত ভাবে মুখ তুলিয়া চাহিল, এবং “মা মা” বলিতে বলিতে আলুথালু বেশে উদ্ধশ্বাসে ছুটিয়া আসিয়া মায়ের সম্মুখে দাড়াইল, কিন্তু সম্মুখবর্তী হইয়াই উপেনকে দেখিয়া যেন একটু সঙ্কুচিত হইয়া পড়িল। তখন রমণী তাহাকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “আমার সঙ্গে কে আছে দেখেছিস্ নলি? এ কে বল্ দেখি ?” নলিনী আশ্চর্যান্বিত ভাবে উপেনের মুখের দিকে চাহিল। মা তখন মেয়ের বিস্ময় অপনােদন করিবার অভিপ্রায়ে বলিল, “এ আমার একটা কুড়ানাে ছেলে,রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি।” হর্ষপ্রফুল্ল মুখে নলিনী জিজ্ঞাসা করিল, “সত্যি মা ?” মা হাসিয়া বলিল, “সত্যি নয় তত তাের কাছে কি মিছে বলছি ৮৭ গাঁটছড়া একে ঘরে নিয়ে যা। জুম্মন কোথায় গেল? তাকে শীগগীর খাবার আতে বল্। আমি কলে পা হাত ধুয়ে আসি।” বলিয়াই সে পুনরায় নীচে নামিয়া গেল। উপেন তাহার সঙ্গে নীচে নামিয়া যাইবে, অথবা সেইখানেই দাঁড়াইয়া থাকিবে ইহা স্থির করিবার পূর্বেই নলিনী আসিয়া খপ করিয়া তাহার হাতখানা ধরিয়া ফেলিল। ইহার জন্য উপেন কিছুমাত্র প্রস্তুত ছিল না, সুতরাং এই আকস্মিক স্পর্শে উপেন যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িল। লজ্জা সঙ্কোচে তাহার চোখ মুখ লাল হইয়া উঠিল, নলিনী সেই অবস্থাতেই তাহাকে ঘরের ভিতর টানিয়া আনিয়া একখানা সােফার উপর বসাইয়া দিল। তারপর মা আসিয়া উপেনের সম্মুখেই মেয়ের কাছে নিজের বিপবৃত্তান্ত এবং উপেনের সাহায্যের কথা বর্ণনা করিলে, তখন নলিনী কঁদিতে কঁদিতে উপেনের হাত দুইটা জড়াইয়া ধরিয়া গদগদকণ্ঠে বলিল, “তুমি আমাদের যে উপকার করেছ উপীনদা, তার প্রত্যুপকার আমার জীবন দিলেও হবে না।” উপেন লজ্জারক্তমুখে নিঃশব্দে বসিয়া এই মাতাপুত্রীর অপূৰ্ব্ব কৃতজ্ঞ ব্যবহারের কথা ভাবিতে লাগিল । পরদিন সকালে উপেন চলিয়া যাইবার উপক্ৰম করিলে নলিনী আসিয়া বাধা দিয়া বলিল, “তা হবে না উপীনদা, আজ তােমাকে কক্ষনাে যেতে দেব না, অন্ততঃ দশটা দিনও এখানে থাকতে হবে।” নলিনীর এই সাগ্রহ অনুরােধের উত্তরে উপেন কি বলিবে ভাবিয়া পাইল না। এই সরলা বালিকার এরূপ সস্নেহ অনুবােধ ঠেলিয়াও যাওয়া যায় না, অথচ এখানে থাকাই হয় বা কিরূপে? কর্তব্য কি স্থির করিতে না পারিয়া উপেন যেন ব্যাকুল হইয়া পড়িল। নলিনীর মা আসিয়া তাহাকে এই ব্যাকুলতা হইতে মুক্তি দিল ; সে বলিল, ৮৮ গাঁটছড়া “তােমাকে ছেড়ে দিতে ইচ্ছা হয় না বাবা, তােমাকে দেখে পৰ্য্যন্ত তােমার উপর কেমন একটা মায়া জন্মে গিয়েছে। অথচ তােমাকে থাকতেও বলতে পারি না, বলবার অধিকার আমার নাই। কেন না, বুঝতে পেরেছ বােধ হয়, আমি বেশ্যা।” শ্রদ্ধাগদগদ কণ্ঠে উপেন বলিল, “তুমি যেই হও, আমার মা।” স্নেহপ্রােজ্জ্বল নেত্রে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া নলিনীর মা বলিল, “তাই যদি যথার্থ মনে কর বাবা, তা হলে কক্ষনাে তুমি যেতে পাবে । মা পতিতা হলেও মা, মায়ের অন্ন খেয়ে ছেলে কখন পতিত হয় না।” উপেন ইহার আর প্রতিবাদ করিতে পারিল না। তখন নলিনীর মা বলিল, “তােমার চাকরীর ভার আমার রইলাে। থিয়েটারে চাকরী, আজই করে দিতে পারি, কিন্তু না, থিয়েটারে কাজ নাই, আমি তােমাকে ভাল চাকরীই করে দেব।” উপেন আপাততঃ সেইখানেই রহিয়া গেল। নলিনীর মা তাহার জন্য একখানি স্বতন্ত্র ঘর ছাড়িয়া দিল। উপেন বামুন রাধা ভাত খাইয়া নলিনীর সহিত গল্প করিয়া ও তাহার গল্প শুনিয়া, স্বচ্ছন্দচিত্তে দিনতিপাত করিতে লাগিল। চাকরীর কথা তাহার মনেও রহিল ; নলিনীর মাতার পুত্ৰাধিক স্নেহত্ন, নলিনীর সােদরবৎ ব্যবহার তাহাকে এমনই মুগ্ধ করিয়া ফেলিল যে, ইহাদিগকে ছাড়িয়া অন্যত্র যাইবার কথা সে ভাবিতে পারিল না। উপেনকে সৰ্ব্বাপেক্ষা অধিক মুগ্ধ করিল, নলিনীর ব্যবহার। সে চোদ্দ পনেরাে বছরের মেয়ে অনেক দেখিয়াছে, এবং তাহাদের অস্বাভাবিক লজ্জাজনিত জড়তা দেখিয়া নিজেও অনেক সময় সঙ্কুচিত হইয়া ভাবিয়া লইয়াছে, এত বড় মেয়ের সঙ্গে কথা কহিতে বা তাহার ৮৯ গাঁটছড়া সম্মুখীন হইতে নাই। কিন্তু নলিনীকে দেখিয়া তাহার সে ভ্রম দূর হইল। এই তাে চোদ্দ পনেরাে বছরের মেয়ে, ইহারও লজ্জা আছে, কিন্তু তাহাতে অস্বাভাবিকতা নাই, সঙ্কোচ আছে, কিন্তু তাহাতে সে জড়তা নাই। ইহার সহিত মুখামুখী হইয়া কথা কহিতে কিছুমাত্র সঙ্কোচ হয় না, হাসিয়া কথা কহিলে ভয়ে ছুটিয়া পায় না। এত বড় মেয়ে—কাছে বসিয়া কেমন অসঙ্কুচিতচিত্তে গল্প করে, হাম্মোনিয়ম বাজাইয়া গান শােনায়, সহােদরার মত স্নেহত্ন দেখাইয়া অপ্রফুল্ল চিত্তকে প্রফুল্ল করিয়া তােলে। এইটুকু মেয়ের মনে কি উদারতা, কি গভীর স্নেহ ! অকালপক্ক বালিকাদের মত গৃহিণীপণা প্রদর্শন না করিলেও অপরের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য বিষয়ে কি অসাধারণ নৈপুণ্য প্রদর্শন করে। বাস্তবিক, নলিনীর মত মেয়ে যেখানে আছে, সেখানে সুখশান্তির একাধিপত্য। কিন্তু হায়, এই নলিনী যদি গৃহস্থের উদ্যান-সরােবরে প্রস্ফুটিত হইত। নলিনীর সরল মধুর ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া পড়িলেও উপেন তাহার পরিণাম স্মরণে দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ না করিয়া থাকিতে পারিত না। অপরাহ্নে নিজের ঘরখানিতে বসিয়া উপেন অন্যান্য কথার সঙ্গে নলিনীর পরিণামের কথাই ভাবিতেছিল, এমন সময় নলিনী চঞ্চলা হরিণীর ন্যায় অস্থিরপদে তথায় উপস্থিত হইল, এবং ছবির খাতাখানা খুলিয়া উপেনের সম্মুখে রাখিয়া বলিল, “কেমন ছবি একেছি, দেখ দেখি উপীনদা!” উপেন অনেকক্ষণ পর্যন্ত নিবিষ্টচিত্তে ছবিখানি দেখিয়া দেখিয়া প্রশংসা-প্রফুল্ল কণ্ঠে বলিল,-“সুন্দর হয়েছে।”

গাঁটছড়া এই প্রশংসায় নলিনীর মুখমণ্ডল সার্থকতার আনন্দে উজ্জল হইয়া উঠিল। সে ছবিখানির উপর আগ্রহপূর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া, ঘাড়টা একটু হেলাইয়া ঈষৎ আবদারের সুরে বলিল, “শুধু সুন্দর হয়েছে বললেই চলবে না।” সহাস্য দৃষ্টিতে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া উপেন বলিল, “তবে কি খারাপ হয়েছে বলবাে ?” মাথা দোলাইয়া নলিনী বলিল, “তা কেন, কোনখানে কিছু খুঁৎ হয়েছে কিনা তাই বল।” ঈষৎ হাসিয়া উপেন বলিল, “এতখানি সুন্দরের মধ্যে কোথায় একটু খুঁং আছে, সেটা ধরবার শক্তি আমার তাে নাই নলিনী।” অভিমানে ঠোট ফুলাইয়া নলিনী বলিল, “শক্তি নাই বৈকি, বলবে না তাই বল ?” বলিয়া নলিনী অভিমানে মুখখানা ঘুরাইয়া লইল দেখিয়া উপেন • বলিল, “আচ্ছা থাম, ভাল করে দেখি।” উপেন পুনরায় কিয়ৎক্ষণ ছবিখানির সর্বত্র দৃষ্টি সঞ্চালিত করিয়া বলিল, “দোষ এবার ধরেছি নলিনী।” উৎসুক ভাবে নলিনী জিজ্ঞাসা করিল, “কি দোষ হয়েছে ?” উপেন বলিল, “তুমি নদীতে পদ্মফুল একেছ, কিন্তু বাস্তবিক নদীতে পদ্মগাছ জন্মে না।” বিস্ময়ের সহিত নলিনী বলিল, “জন্মে না? কেন, অনেক বইএ তাে পড়েছি।” উপেন হাসিয়া বলিল, “বইএ পড়তে পার, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে নদীতে পদ্ম বা শালুক গাছ জন্মে না, জন্মাতে পারে না। পুকুর খাল বিল এই সকলেই জন্মে থাকে।”

গাঁটছড়া । নলিনী বলিল, “পুকুরের জলে জন্মাতে পারে, আর নদীর জলেই বা পারে না কেন ?” উপেন তখন নদীতে পঙ্কের অভাব ও স্রোতের জন্য পদ্ম বা কুমুদ- কলারাদির উৎপত্তির অসম্ভাব্যতা বুঝাইয়া দিয়া নলিনীর ভ্রমসংশােধন করিল । নলিনী বুঝিতে পারিয়া ঈষৎ লজ্জিতভাবে বলিল, “এত তত্ত্ব কে জানে বল, বইএ যেমন পড়েছি তেমনি একেছি। তা হলে দেখছি, প্রাকটিক্যাল নলেজ (বাস্তব জ্ঞান ) না থাকলে শুধু বই পড়ে ছবি আঁকা ঠিক হয় না।” উপেন বলিল, “সে কথা ঠিক। ছবির সম্বন্ধে আমার তেমন জ্ঞান নাই, তবে এটুকু বলতে পারি যে, যে জিনিষটা আঁকতে হবে, সেটাকে চোখে দেখা চাই।” একটু ভাবিয়া নলিনী বলিল, “কোথায় গেলে এ সব চোখে দেখা যায় উপীনদা ?” উপে। পাড়াগাঁয়ে গেলেই দেখতে পাবে । নলি । তােমাদের দেশ তত পাড়াগাঁ ? উপে। হাঁ, পাড়াগাঁ বৈ কি। নলি। তা হলে তােমাদের দেশে পুকুর বিল আছে ? উপে। বিস্তর। নলি। পুকুরে পদ্ম শালুক ফোটে? উপে। কোন কোন পুকুরে ফোটে বৈকি। নলি। গেলে দেখতে পাওয়া যায় ? উপে। খু-উ-ব । নলি। তবে আমাকে তােমাদের দেশে নিয়ে যাবে উপীনদা উপেন হাসিয়া বলিল, “তুমি যাবে ?” । ?

গাঁটছড়া
মাথা নাড়িয়া সাগ্রহে নলিনী বলিল, “হু', যাব । আমার ছবি
আঁকতে বড় সাধ উপীন দা, কিন্তু দেখছি, পাড়াগায়ে না গেলে সে
ঠিকমত ছবি আঁকা হবে না।”
উপেন বলিল, “তা তাে হবে না, কিন্তু পাড়াগাঁয়ে তুমি যেতে পারবে?”
নলি। কেন পারবাে না ?
উপে। না পিরবার প্রধান কারণ, সেখানে যেতে ভাল রাস্তা
নাই, গাড়ী ঘােড়া নাই, পায়ে হেঁটে যেতে হবে।
নলি। হাঁটতে আমি খুব পারি । এই যে এক-একদিন আমি
মায়ের সঙ্গে গঙ্গা নাইতে যাই।
উপেন হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল। নলিনী সলজ্জভাবে জিজ্ঞাসা
করিল, “হাসলে যে?”
উপেন বলিল, “তােমার হাঁটবার দৃষ্টান্ত শুনে ; কল্কাতার পাকা
রাস্তায় আধ মাইল হেঁটে গঙ্গা নাইতে যাও বলে পাড়াগাঁয়ের পাঁচ সাত
নাইল মেঠো রাস্তায় হাঁটতে পার কি ?”
জোরে মাথা নাড়িয়া নলিনী বলিল, “খুব পারবাে। তুমি নিয়ে
যাবে কি না তাই বল।”
উপেন বলিল, “তুমি যদি যাও, আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে আপত্তি কি?”
সহর্ষে নলিনী বলিল, “বেশ, তুমি কদ্দিনে দেশে যাবে ?”
উপে। তিন চার মাস পরে।
নলি। এত দেরী ! কেন, মাসখানেকের মধ্যে যেতে পার না?
উপে। এই তত সবে পাঁচ সাত দিন চাকরীতে ভর্তি হয়েছি,
এখন কি করে যাই।
নলি। কেন, আফিসে ছুটী নাও না।
উপে। দু’এক মাস না গেলে ছুটী দেবে কেন?

গাঁটছড়া
হতাশভাবে নলিনী বলিল, “দু'মাস পরে ছুটী নিয়ে যাবে তাে?”
উপেন বলিল, “তা যেতে পারি।”
নলিনী বলিল, “আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে ?”
‘যাব।”
হর্ষ-প্রফুল্ল মুখে নলিনী বলিল, “আমি ছবি আঁকবার সব সরঞ্জাম
নিয়ে যাব। পুকুরের ধারে বসে ছবি আঁকবাে। আচ্ছা, পুকুর ধারে
গাছ আছে ?”
“আছে বৈ কি।”
“কি গাছ ?”
“অশ্বথ, বট, তেঁতুল, আম, জাম।”
‘ফুল গাছ ?”
“পুকুর ধারে প্রায় ফুলগাছ হয় না, বাগানে হয়?”
“আচ্ছা, যা আছে তাই আঁকা যাবে। এর মধ্যে আমি কিন্তু আর
ছবি আঁকবাে না।”
“কেন, আঁকতে দোষ কি?”
“নাঃ, বড় ভুল হয়।
এ ছবিখানা আমি ছিড়ে ফেলবাে।”
খাতাখানা উপেনের সম্মুখ হইতে তুলিয়া লইয়া নলিনী জিজ্ঞাসা
করিল, “তুমি এখন কি করবে উপীনদা? বেড়াতে যাবে কি?”
মুখ মচকাইয়া উপেন বলিল, “না, আজ আর যাব না।”
“তবে এস, হাম্মোনিয়ম শিখবে।”
হাম্মোনিয়ম শিক্ষার প্রতি উপেনের তেমন অনুরাগ না থাকিলেও
নলিনী এক প্রকার জোর করিয়াই তাহাকে হাম্মোনিয়ম শিখিতে বাধ্য
করিয়াছিল। উপেন তাহার ঐকান্তিক অনুবােধ উপেক্ষা করা অসঙ্গত
জ্ঞানে, এবং শিখিতে পারি ভালই এইরূপ ভাবিয়া শিক্ষা বিষয়ে একটু
৯৪

গাঁটছড়া যত্নবান হইয়াছিল। সুতরাং নলিনীর আহ্বানে সে তাহার সঙ্গে গিয়া হাৰ্ম্মোনিয়ম শিখিতে বসিল। প্রথমে খানিকক্ষণ সা রে গা মা সাধিবার পর দিন দুই আগে নলিনী যে গৎটা শিখাইয়া দিয়াছিল, উপেন সেটা আয়ত্ত করিতে চেষ্টিত হইল । যেখানে যেখানে ভুল হইতে থাকিল, নলিনী সেই সেই স্থান দেখাইয়া দিতে লাগিল। কিন্তু নলিনীর মত বালিকার শিক্ষকোচিত ধৈৰ্য্য সম্ভব হইতে পারে না। সুতরাং দুই তিনবার দেখাইয়া দিবার পরেও উপেন ভুল করিলে সে উপেনের অক্ষমতা দর্শনে না হাসিয়া থাকিতে পারিল । তাহার এই উপহাসের হাসিতে লজ্জিত হইয়া উপেন বাজাইতে অনিচ্ছুক হইলে নলিনী অনুনয়-বিনয় করিয়া তাহাকে পুনরায় শিক্ষায় আসক্ত করিয়া দিল। এইরূপে কিছুক্ষণ গুরু-শিষ্যের মধ্যে অনুরাগ-বিরাগ চলিবার পর উপেন বিরক্তভাবে হাম্মোনিয়মটা নলিনীর দিকে ঠেলিয়া দিয়া বলিল, “আর ভাল লাগে না, তুমি একটা গাও ।” নলিনী হাৰ্ম্মোনিয়ম টানিয়া লইয়া তাহার বেলাের উপর দ্রুত বিলম্বিত চাপ দিয়া আলাপ আরম্ভ করিল। তাহার কোমল অঙ্গুলির মধুর স্পর্শে হার্ক্সোনিয়মের পর্দাগুলা যেন এক নূতন সুরে বাজিয়া উঠিল। সেই সুরে গলা মিশাইয়া নলিনী মৃদু-কোমল-কণ্ঠে গান ধরিল,- “আমার মনটী করিয়া চুরি, আমার প্রাণটী করিয়া চুরি, এই আসি বলে গিয়াছিলে চলে এতদিনে এলে ফিরে গাে।” সুরের সঙ্গে সঙ্গে নলিনীর কণ্ঠ ক্রমে রেখাব হইতে মধ্যমে, মধ্যম হইতে পঞ্চমে উঠিল; ঝঙ্কারে মূচ্ছনায় কক্ষ মধ্যে যেন সুধাবৃষ্টি হইতে লাগিল। নলিনী অমৃতস্রাবী কণ্ঠ পঞ্চমে তুলিয়া, আবেগ-বিহবল হইয়া গাহিতে লাগিল,- গাঁটছড়া যেন উঠিতে “কত নিশি গেছে কতদিন, কত সকাল সন্ধ্যা বেলি, কত বার মাস কত যুগ যুগান্তর অতীতে পড়িছে ঢলি, কত মঞ্চ গেছে কত সাগরে, কত সাগরে শুখাল বারি, কত নদী গেছে পথ ভুলি, গলে গেছে কত গিরি গাে।” সুরের উত্থানে-পতনে উপেনের সঙ্গীত-মুগ্ধ হৃদয়ও পড়িতে লাগিল । পশ্চিমগগন-বিলম্বী অস্তমান সূর্যের সুবর্ণচ্ছটা বাতায়ন পথে আসিয়া নলিনীর আরক্ত কপােলদেশে উজ্জ্বল রক্তরাগ ঢালিয়া দিতেছিল। উপেন মুগ্ধ নিস্পন্দ হৃদয়ে বসিয়া, সেই সূৰ্য- কিরণােজ্জল রক্তরাগলাঞ্ছিত মুখের দিকে চাহিয়া সঙ্গীতসুধা পান করিতে লাগিল। নলিনী উদ্ধে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া, অঙ্গুলি সঞ্চালনে সুরের মােহিনী ঝঙ্কার তুলিয়া বিভাের প্রাণে গাহিতে লাগিল,- “সারা জীবনের সাধে রচেছি ডাের, কোথা যাবে মাের নয়ন চোর ; ধরেছি যখন বেঁধেছি তখন আর কি ছাড়িতে পারি গাে ।” সুর তান-ঝঙ্কত কক্ষের প্রতির হইতে ঝঙ্কত হইতে থাকিল—আর কি ছাড়িতে পারি গাে। আকাশে বাতাসে প্রতিধ্বনি উঠিতে লাগিল—“আর কি ছাড়িতে পারি গাে। উপেনের বুকের ভিতর কে যেন লুটোপুটি খাইয়া চীৎকার করিতে থাকিল—“আর কি ছাড়িতে পারি গাে ! গান থামিল, সুর থামিল, সুরের রেশ, বাতাসে মিলাইয়া গেল, কিন্তু গানের প্রতিধ্বনি থামিল না ; আকাশ, বাতাস, জলস্থল, ব্যোম প্রতিধ্বনিত করিয়া উপেনের কানের কাছে কে যেন আকুল কণ্ঠে গাহিতে থাকিল—“আর কি ছাড়িতে পারি গাে।

গাঁটছড়া মাসখানেক পরে কাদম্বিনী উপেনের এক পত্র পাইল। উপেন লিখিয়াছে, “বড়দি, এখানে এসে অবধি আমি তােমাকে একখানিও চিঠি দিই নাই। এতে তুমি হয় তাে আমার উপর খুব রাগ করেছ। কিন্তু সত্যি বড়দি, রােজই মনে করি, তােমাকে চিঠি লিখবাে, কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি। কেন হয় নি জান, নলিনীর জন্যে। এদ্দিন নলিনীর ইস্কুলে গরমের ছুটী ছিল, দিনরাত সে বাড়ীতে থাকত, আর সে দিনরাত আমাকে যেন ব্যস্ত করে রাখতাে। কাল থেকে তার ইস্কুল খুলেছে, তাই আজ চিঠি লেখবার ফুরসৎ পেয়েছি। তুমি মনে কচ্চো, নলিনী আবার কে ? সে কে জান, আমি যার আশ্রয়ে আছি, যিনি আমাকে ছেলের মত ভালবাসেন, তঁারি মেয়ে, বছর পনেরাে বয়স। শুধু বয়সের কথা বললে তুমি তাকে ঠিক বুঝতে পারবে না বড়দি, অথচ আমিও যে কি বলে নলিনী কেমন মেয়ে তােমাকে বুঝিয়ে দেব তা ভেবে পাই নি। সে খুব লেখাপড়া জানে, ছবি আঁকে, গান গাইতে, হাম্মোনিয়ম বাজাতে পারে, আমার মত একজন পরকে ভাই ভাই করে হাসিতে, গল্পে, গানে, রহস্যে, ভালবাসায় জগৎ সংসার সব ভুলিয়ে দিতে পারে। শুধু আমাকে বলে নয়, সে যেন বসন্তকালের মিষ্টি বাতাসের মত সারা বাড়ীখানাকে কি এক আমােদে মাতিয়ে রেখেছে। এবার বুঝতে পারলে তাে, নলিনী কেমন মেয়ে ? এতেও যদি না বুঝতে পার, তবে আর আমি তােমাকে বােঝাতে পারবাে না। যাক, আমার যে জন্যে এখানে আসা, তাই বলি। আমার চাকরী ৭ ৯৭

গাঁটছড়া
বে
হয়েছে একটা খুব বড় আফিসে। কাজ কিছুই শক্ত নয়, শুধু কুলীর।
জাহাজ থেকে কত মাল নামাচ্চে তারি হিসাব রাখা। এখন পনেরে
টাকা করে পাব। বাবু বলেছেন, দু’তিন মাস পরেই কুড়ি টাকা
করে দেবেন। তােমার আশীর্বাদে আমার বেশ চাকরী হয়েছে ।
তা ছাড়া এখানে থাকার বা খাওয়া দাওয়ারও কোন কষ্ট নাই, যেন
রাজার হালে আছি। আমার জন্যে তুমি ভেবাে না। দাদামশাইকে
আমার প্রণাম জানিও। ইতি-উপেন।”
পত্র শুনিয়া কাদম্বিনী এক চোট খুব হাসিয়া লইল। তারপর
স্বামীকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “ গা, উপনে ওই মেয়েটাকে বিয়ে
করবে নাকি?”
নীলমণি বলিল, “নিশ্চয়ই করবে। দেখ না কোন্ দিন সে
নিয়ে হাজির হয়। তােমরা বৌভাতের যােগাড় করে রাখ।”
কাদম্বিনী বলিল, “বৌভাতের যােগাড় আমি কত্তে যাব কেন ?
সে যােগাড় করবে তার দিদি।”
নীলমণি হাসিয়া বলিল, “তুমি তাে তার বড়দিদি।”
ভারী মুখে কাদম্বিনী বলিল, “আমি হচ্চি নকল দিদি, আসল দিদি
হচ্চে ছােটবৌ।”
নীলমণি বলিল, “উপেন কিন্তু আসল ছেড়ে নকলের খোঁজই তো
আগে নিয়েছে।”
হাস্য-প্রফুল্ল মুখে কাদম্বিনী বলিল, “তা নেয় বটে উপনে।
পেটের কথা যা কিছু সব আমার কাছে। এইজন্যে সে ছােট বােয়ের
কাছে কতবার কত গাল বকুনি খেয়েছে। হতভাগার তবু লজ্জা
নাই, বড়দি, বড়দি। তাই তাে ছােটবৌ বলতে, আমি তাকে যাদু
করেছি।”
৯৮

গাঁটছড়া
ঈষৎ হাসিয়া নীলু বলিল, “তা ছােট বৌমা তাে মিথ্যা বলে নি,
ওটা যে তােমার পেশা।”
বিস্ময়ের সহিত কাদম্বিনী জিজ্ঞাসা করিল, “কোল্টা আমার
পেশা গাে ?”
নীলু উত্তর করিল, “ঐ যাদু করা।”
বিস্ময়চমকিত ভাবে গালে হাত দিয়া কাদম্বিনী বলিল, “কও কথা
মা, কা’কে আমি যাদু করলাম গাে ?”
নীল। এই আমাকে।
কাদ। তােমাকে আমি যাদু করেছি ?
নীল। আমি তাে তাই মনে করি, বড়বো।
কাদ।
ধন্যি তােমার মনে করা। মা গাে মা, লােকে শুনলে কি বলবে।
হাসিতে হাসিতে নীলু বলিল, “লোকে না শুনেই তাে বলছে,
আমাকে তুমি যাদু করে ভেড়া বানিয়ে রেখেছ। শুনলে এর বেশী
কি বলবে, তা তাে জানি না।
কাদম্বিনী এবার হাসিয়া উঠিল ; বলিল, “আচ্ছা, আচ্ছা, তােমার
আর তা জানতে হবে না। তুমি এমনি সােজা পুরুষটী বটে, তােমাকে
আমি ভেড়া বানিয়ে রাখবে। তুমিই আমাকে পােষা পাখীটা বানিয়ে
রেখেছ কিনা তাই ভেবে দেখ।”
মস্তক সঞ্চালন পূৰ্ব্বক গম্ভীর হাস্য সহকারে নীলমণি বলিল, “তুমি
পােষা পাখী বটে, কিন্তু শিলী-কাটা পাখী ; পায়ের শিকল কাটতে
পারলে আর পােষা নও।”
স্বামীর মুখের কাছে হাতখানা নাড়িয়া সহাস্য অর্জনের সহিত
কাদম্বিনী বলিল, “তা বলবে বৈ কি, তবু নিজে যদি মাঝে মাঝে শিল্পী
কাটবার চেষ্টা না কত্তে।”

গাঁটছড়া নীলমণির মুখের উপর কৃত্রিম কোপপূর্ণ কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া কাদম্বিনী মুখ টিপিয়া হাসিতে হাসিতে প্রস্থান করিল। অতঃপর কাদম্বিনী কুসুমের নিকট গিয়া উপেনের পত্রের কথা ব্যক্ত করিলে কুসুম অপ্রসন্নমুখেই উত্তর করিল, “বেশ হয়েছে। তবে বাপ রাজা তাে রাজার ঝি, ভাই রাজা তাে বােনের কি ?” তাহার এই উত্তরে বিরক্ত হইয়া তিরস্কার করিয়া কাদম্বিনী বলিল, ‘আ মরণ, বােনের আবার কি লাে? ভায়ের সুখেই বােনের সুখ। সে এখানে থেকে হেনস্তায় দিন কাটাতাে; এখন দশ টাকা রােজগার করে যদি সুখী হয়, সেটা ভাল নয় কি ?” মুখ বাঁকাইয়া কুসুম বলিল, “ভাল নয় তাে আমি কি বলছি মন্দ ? তবে আমার ঘরে থেকে তাকে হেনস্তা ভােগ কত্তেও আমি তাকে বলি নাই, সে নিজেই এসেছিল।” জভঙ্গী সহকারে কাদম্বিনী বলিল, “মুখে আগুন। তুই তাকে হেনস্তা করেছি এমন কথা কি আমি বলছি ? পাঁচজনের কাছে তাে সে হীন হয়ে ছিল। হাজার সুখে থাকলেও লােকে বলতাে, বােনায়ের ভাতে রয়েছে।” ভারী মুখে কুসুম উত্তর করিল, “বােনায়ের ভাতে ছিল, তাই লােকে ও কথা বলতে। সে ছিল কেন ? তার যেমন পােড়া কপাল!” রাগতভাবে কাদম্বিনী বলিল, “তুই বড় উল্টা বুঝি ছােটবে, তােকে চিঠি শােনাতে আসাই আমার ঝকমারি হয়েছে।” তীব্র কণ্ঠে কুসুম বলিল, “শােনাতে এলে কেন দিদি ? আমি তাে শুনতে চাই নাই। শােনবারই আমার দরকার কি?” যেন খুব আশ্চর্যান্বিতভাবে কাদম্বিনী বলিল, “তাের শােনবার দরকার নাই ?”

গাঁটছড়া
কুসুম বলিল, “দরকার থাকলে সে নিজেই আমাকে শােনাতাে।
তা তাে নয়, যারা তার দরদের লােক, তাদেরি সে শুনিয়েছে।”
দ্রুকুটি করিয়া কাদম্বিনী বলিল, “তুই তার মা’র পেটের বােন,
তাের চেয়ে কি আমি দেশী দরদের লােক ?”
মুখভঙ্গী করিয়া কুসুম বলিল, “তা নইলে তােমাকেই বা চিঠি
লিখতে যাবে কেন ?”
তীব্র দৃষ্টিতে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া চাহিয়া ক্ষুব্ধকণ্ঠে কাদম্বিনী
বলিল, “ধন্যি তাের কথা ছােটবৌ! তাের চেয়ে আমি হলাম উপনের
বেশী দরদী ? সে আমার কে ?”
রােষগম্ভীরভাবে কুসুম বলিল, “কে, তা তুমিই বলতে পার।
কথা বাড়াও কেন দিদি, জাতে আমার কিছু বাকী নাই। উপনে
এখানে ছিল, তাতে কত লােক কত কথাই কয়েচে,—তাকে চাকরের
মত খাটিয়ে মেরেছি, মুখ চেয়ে খেতে দিই নাই, ভাগ্যে তার সব
দরদীরা ছিল, তাই কোন রকমে দিন কাটিয়েছে। কিন্তু একটা কথা
বলে রাখি দিদি, মা’র চেয়ে যে দরদী, তারে বলি ডান।”
বলিয়া কুসুম মুখখানা যেন ঘৃণার সহিত ঘুরাইয়া লইল। কাদম্বিনী
দেখিল, কথার উত্তর দিতে গেলে ঝগড়ার সম্ভাবনা। কাজেই সে
আর কিছু না বলিয়া ক্ষুব্ধচিত্তে প্রস্থান করিল।
বাড়ী ফিরিয়া কাদম্বিনী স্বামীকে বলিল, “উপেনকে লিখে দাও
তাে, সে যেন আমাকে আর চিঠিপত্র না লেখে !”
ঈষৎ হাসিয়া নীলমণি জিজ্ঞাসা করিল, “সে বেচারীর উপর এত
রাগ কেন ?”
ঝঙ্কারের সহিত কাদম্বিনী বলিল, “রাগ আবার কোনটায়
দেখলে ?”
১০১

গাঁটছড়া
নীলমণি বলিল, “ঐ চিঠি লিখতে বারণ করাটায়।”
ঘাড়-মুখ নাড়িয়া কাদম্বিনী বলিল, “সে কেন আমাকে চিঠি
লিখতে যাবে বল তাে? আমি তার কে ? তার বােন রয়েছে,
বােনাই রয়েছে, চিঠি লিখতে হয়, তাদের লিখবে!”
নীলনণি বলিল, “আচ্ছা, তাই লিখতে বলে দেব।”
ক্রোধ-গম্ভীর মুখে কাদম্বিনী বলিল, “তােমাকে এত কথা লিখতে
কে বলছে ?”
নীলমণি বলিল, “তবে কি শুধু লিখে দেব, তােমার বড়দি চোরের
উপর রাগ করে মাটীতে ভাত খাচ্চে?”
“যাও, তােমাকে কিছু লিখতে হবে না,” বলিয়া কাদম্বিনী সবেগে
মুখটা ঘুরাইয়া লইল। নীলমণি হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল।
দয়ারাম বাড়ীতে আসিলে কুসুম তাহাকে সম্বােধন করিয়া বলিল,
“শুনেছ গা, উপনের চাকরী হয়েছে, আর তােমার ভাবনা নাই।”
গম্ভীরভাবে দয়ারাম উত্তর করিল, “আমার ভাবনা থাক্ না থাক্‌,
তােমার ভাবনা ঘুচেছে তাে?”
মুখ মচকাইয়া কুসুম বলিল, “হা, আমার ভাবনা ঘুচেছে বৈ কি।
আমার কি কম ভাবনা ছিল ? উপনের ভাবনায় আমার খেয়ে পেট
ভরতাে না, শুয়ে ঘুম হতাে না।”
একটু উপহাসের হাসি হাসিয়া দয়ারাম বলিল, “যাক্, এখন ঘুমিয়ে
বাঁচবে। আমিও বিয়ে দু’টো সেরে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত হয়ে
ঘুমুতে পাই।”
কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “দু’টো বিয়ে আবার কার
১০২
গাে ?

গাঁটছড়া
একটা তো গিরির বিয়ে ; আর একটা—নিজে আবার বিয়ে করবে
দয়া।
মনে তাে তাই কচ্চি ।
মনে যা কচ্চো, কাজে সেইটা করে ফেল না ।
দয়া। এদ্দিন করে ফেলতুম, শুধু একটা বাধা
কুসু। বাধাটা কি ? আমি না কি ?
গম্ভীরভাবে মাথাটা নাড়িয়া দয়ারাম উত্তর করিল, “তুমিও একটা
কম বাধা নও।”
কুসুম বলিল, “আচ্ছা, তুমি বিয়ে কর, আমি তােমাকে বাধা
দেব না।”
দয়ারাম বলিল, “বাধা দিলেও সে বাধাটাকে খুব সহজেই উড়িয়ে
দিতে পারি, কিন্তু বয়সের বাধাটাকে তাে তত সহজে উড়াতে
পারবাে না।”
সপ্রতিভভাবে কুসুম বলিল, “ওঃ, তা হলে বয়স হয়েছে বলেই
বিয়ে কত্তে পাচ্চো না ? তা এমনই কি বয়স হয়েছে তাের ?
বড় জোর চল্লিশ ।”
দয়।
চল্লিশ অনেক দিন চলে গিয়েছে, পঞ্চাশের কাছাকাছি
এসে পড়েছি।
কুসু। তা পুরুষমানুষের পঞ্চাশ বছর বয়স, কি এমন বেশী বয়স?
দয়া । তােমার বিবেচনায় বেশী নয়, কিন্তু মেয়ের মা তত তােমার
মত বিবেচক নয় ?
মেয়ের মা কে ? মেনীর মা বুঝি ?
দয়া। হাঁ, চুয়াল্লিশ বছরের পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে হবে,
তাতেই কত কদাকাটা কচ্চে।

গাঁটছড়া । কুসু। তা করবে বৈ কি। তবু যদি মেয়ে একটু সুশ্রী হ’তাে। মায়ের চোখে সুশ্ৰী কুশ্রী প্রভেদ নাই ছােটবো। মায়ের কাছে কাণা ছেলেও পদ্মলােচন হয়। গম্ভীর মুখে কুসুম বলিল, “মায়ের কাছে পদ্মলােচন হয় বলে অপরের কাছে তো তা হবে না।” দয়ারাম বলিল, “তা হয় না বলেই তাে মেয়েটার পাত্র জুটচে না। কত কষ্টে এই পাত্রটি যােগাড় করেছি। তাও নগদ আড়াই শশা চাই।” কুসুম বলিল, “মােটে আড়াই শশা ! এ আর এমন বেশী কি হলো ? আমাদের গিরির তরে যে ছেলে দেখেছ, তাকে তত সাত শশা দিতে হবে।” ঈষৎ হাসিয়া দয়ারাম বলিল, “তা হবে ! কিন্তু সে হচ্চে ছেলে, আর এ হচ্চে বুড়াে।” গম্ভীর মুখখানা ঘুরাইয়া লইয়া কুসুম বলিল, “হাঁ, বুড়াে! চুয়াল্লিশ বছরে মানুষ বুঝি বুড়াে হয়? তা হলে তুমিও বুড়াে হয়েছ বল।” দয়ারাম বলিল, ”সম্পূর্ণ বুড়াে না হলেও ছােকরা নই, বিয়ের বয়সও নাই।” ঝঙ্কারের সহিত কুসুম বলিল, “তােমাকে বলেছে বয়স নাই। আমার মামা যে ষাট বছর বয়সে বিয়ে করেছিল।” সহাস্যে দয়ারাম বলিল, “তিনি বিয়ের জন্যে বিয়ে করেন নি, অনেক জাল-জুয়াচুরির পয়সাগুলাে পাছে পাঁচভূতে খায়, তাই সেগুলাে একটা বিধবার হাতে গচ্ছিত করে দেবার জন্যে এই কাজ করেছিলেন।” কুসু। যে জন্যেই হােক, বিয়ে তাে করেছিলেন। আর এমন ততা অনেকেই করে থাকে। ১০৪

গাঁটছড়া
দয়া। তা করে বৈ কি। কিন্তু তাই বলে বুড়াে বরের হাতে কেউ
কি সহজে মেয়ে দিতে চায় ?
কুসু।
দায়ে পড়লে দিতে হয় বৈ কি।
দয়া। দায়ে পড়ে দিতে হয় বটে, কিন্তু তাতে কি মনে সুখ-শান্তি
হতে পারে?
ঘাড় নাড়িয়া কুসুম বলিল, “তাও কি হয় ? তবে মেয়ের যেমন
কপাল।”
দয়ারাম বলিল, “এখন মেয়ের কপালই বলতে হবে। নইলে
উপনে ছেড়াটা—যা, উপেনের চাকরী হয়েছে, কে তােমাকে
বলে ?”
কুসু।
ও বাড়ীর বড়দি।
দয়া। মাইনে কত হয়েছে ?
এত কথা আমি জিজ্ঞাসা করি নাই।
দয়া। জিজ্ঞাসা করাটা দরকার ছিল।
কুসু। দরকারটা কি শুনি? সে কি মাইনের টাকা তােমাকে
দেবে ?
হাসিতে হাসিতে দয়ারাম বলিল, “এই শােন পাগলের কথা।
তার মাইনের টাকা আমাকে দিতে যাবে কেন?”
কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “তবে সে কথা জানতেই বা যাব কেন ?”
গাম্ভীৰ্যসূচক মস্তকসঞ্চালন সহকারে দয়ারাম বলিল, “জাতে
হয় বৈ কি। যতই হােক, আপনার লোেক,-বিদেশে গিয়েছে, চাকরী
কচ্চে কিন্তু কি চাকরী, কত মাইনে, তা জানবে না ?”
বিরক্তি-কুঞ্চিতমুখে কুসুম বলিল, “জানতে হয়, নিজে জেনে এস।
আমার এত কথা জানার জন্যে মাথাব্যথা হয়নি।”
;
১০৫

গাঁটছড়া দয়ারাম বলিল, “তােমার ভাই,—মাথাব্যথা হলে তােমারি হবে। যাক, আমি নিজেই জেনে আসছি।” উপেনের বেতনের পরিমাণ জানিবার জন্য দয়ারাম নিজেই নীলু ঘােষের বাড়ীতে গেল, এবং খানিক পরে ফিরিয়া আসিয়া কুসুমকে সম্বােধন করিয়া বলিল, “শুনচো ছােটবোঁ, নেহাৎ মন্দ নয়, পনেরাে টাকা মাইনে হয়েছে, শীগগীর কুড়ি টাকা হবে।” শ্লেষ-পূৰ্ণ-স্বরে কুসুম বলিল, “সেই জন্যেই তাে বলছিলাম, তােনার আর ভাবনা নাই।” দয়ারাম বলিল, “আমার ভাবনা থাক বা না থাক, তার বিয়েটা মােন্দা শীগগীর দিতে হবে। তা নইলে সে কলকাতাতেই বিয়ে করে ফেবে।” কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “কে বলে ?” দয়ারাম বলিল, “বলবে আবার কে? তার চিঠির ভাবেই সেটা বােঝা গিয়েছে। এই শােন না তার চিঠি।” দয়ারাম ট্যাক হইতে চিঠিখানা বাহির করিয়া আদ্যোপান্ত পাঠ করিল। তার পর স্ত্রীর মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “এবার বুঝতে পেরেছ কি ?” কুসুম উত্তর করিল, “বুঝেছি, ঐ নলিনী বলে যে মেয়েটা—” দয়ারাম বলিল, “হঁ যঁা, ঐ মেয়েটাকে ঘাড়ে চাপাবার জন্যে তাকে এত আদর করে বাড়ীতে রেখেছে। নইলে ধর না, উপেন তাদের কে, কোন্ জন্মে তাদের সঙ্গে পরিচয় ছিল যে, তাকে এমন ছেলের মত যত্ন করে রাখবে।” সন্দিগ্ধস্বরে কুসুম বলিল, “তাও কি সম্ভব? উপনে এমন কি সুপাত্র যে, তাকে মেয়ে দেবার জন্যে তারা এতটা করবে ?” ১০৬ গাঁটছড়া মাথা নাড়িয়া দয়ারাম বলিল, “ওগাে, সুপাত্র কুপাত্র ছেড়ে দাও। কলকাতা সহরের মেয়ের বিয়ের ব্যাপার তো জান না। এখানকার মত সেখানে পাঁচ সাত শাে টাকায় মেয়ের বিয়ে হয় না, পাঁচ সাত হাজার চাই। আর উপেন এমনি কি কুপাত্র। কুড়ি টাকা মাইনের চাকরী কচ্চে, দেখতে শুনতে মন্দ নয়, অথচ দিতে কিছুই হবে না। এমন সুযোেগ কি ছেড়ে দেয় ? তুমি দেখে নিও, উপেন যদি আর দু'চার মাস সেখানে থাকে, নিশ্চয় ঐ মেয়েটাকে বিয়ে করে বসবে।” কুসুম বলিল, “যদিই বিয়ে করে, তাতে দোষ কি?” স্ত্রীর এই অজ্ঞতায় বিরক্তি প্রকাশ করিরা দয়ারাম বলিল, “দোষ কি, মেয়েমানুষ তুমি—কি বুঝবে বল, ইস্কুলে যায়, হারমােনিয়ম বাজায়, গান গায়, ঐ মেয়েকে কোন ভদ্রলোকের ছেলে বিয়ে করে? তারপর কি জাত, তার ঠিকানা নাই।” কুসুম বলিল, “কও কথা, জাত আবার কি হাড়ীমুচি হবে ? কায়েত না হলে কি কায়েতের ছেলেকে মেয়ে দেয় ? ঘাড় দোলাইয়া দয়ারাম বলিল, “কলকাতা সহরের কাণ্ডকারখানা তুমি তাে কিছুই জান না; কলকাতায় সবাই কায়েত। এখানে যেমন জাত হারালেই বােষ্টন, কলকাতায় তেমনি জাত হারালেই কায়েত। কত ধোবা, কলু কায়েত সেজে ভদ্রলােকের ঘর মজিয়েছে।” শঙ্কিতভাবে কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “তা হলে উপায়?” দয়ারাম বলিল, “উপায় আছে, কোন রকমে উপেনকে একবার এখানে আনিয়ে তার বিয়ে দিয়ে ফেলা।” উদ্বিগ্নভাবে কুসুম বলিল, “তবে বিয়েই দিয়ে দাও। কিন্তু দয়ারাম জিজ্ঞাসা করিল, “কিন্তু বলে থেমে গেলে যে ?” কুসুম বলিল, “থামবে কেন ? তবে এত শীগগীর মেয়ে পাওয়া—” ১০৭

গাঁটছড়া
দয়া। মেয়ের ভাবনা কি ? বল তাে কালই মেয়ের যােগাড় করে
দিতে পারি।
কুসু।
মেয়ে ঐ মেনী তাে ?
ঈষৎ কুদ্ধভাবে দয়ারাম বলিল, “কেন, মেনী ছাড়া কি মেয়ে
আর নাই ?”
কুসুম চুপ করিয়া রহিল । দয়ারাম বলিল, “মেয়ে ঢের আছে,
তবে এটা হলে থােক্থা কিছু পাওয়া যেতাে।”
কুসু। আর সেই থােথা দিয়ে তােমার মেয়ের বিয়েটা হয়ে
যেতাে !
দয়া। কেন, তােমার ভায়ের বিয়ের টাকা না হলে আমার মেয়ের
বিয়ে হবে না বুঝি?
ঈষৎ অপ্রতিভভাবে কুসুম বলিল, “বিয়ে হবে না, এমন কথা কি
আমি বলছি। যাক্, তা হলে একটা মেয়ে চেষ্টা দেখ।”
দয়ারাম বলিল, “তা দেখছি, আর তাকে বাড়ী আসবার জন্যে
কালই একখানা চিঠি লিখে দেব।”
দয়ারাম তামাক সাজিয়া লইয়া বাহিরে আসিল, এবং ধীরে ধীরে
তামাক টানিতে টানিতে কোথায় মেয়ে দেখিবে, তাহাই ভাবিতে লাগিল।
“মা, কি ভাবচো মা?”
নিস্তারিণী একা বসিয়া আকাশ পাতাল ভাবিতেছিলেন। ভগবান
কবে কি করিয়া তাহাকে এই বিষম কন্যাদায় হইতে উদ্ধার করিবেন ?
দয়ারাম তাে সকলই এক প্রকার স্থির করিয়াছে, কিন্তু যতক্ষণ না দুই
হাত এক হয়, ততক্ষণ বিশ্বাস নাই। যে ভাঙ্গা কপাল তাহার ।
১০৮

গাঁটছড়া বিবাহের কথাবার্তা স্থির হইয়াছে বটে, কিন্তু সে বিবাহের কথা মনে করিলেও চোখে জল আসে। এই বারাে তেরাে বছরের মেয়ে, তাহাকে কি না পঞ্চাশ বছরের বুড়ার হাতে ধরিয়া দিতে হইবে। পঞ্চাশ বৈ কি ; দয়ারাম নিজে যখন বলিতেছে চুয়াল্লিশ, তখন পৃঞ্চাশের কম তাে কিছুতেই নয়, তাহারও বেশী না হয়। কিন্তু নিরুপায়, জানিয়া শুনিয়া হাত-পা বাঁধিয়া মেয়েটাকে জলে ফেলিয়া দিতে হইবে । পয়সা থাক্ না থাক্, মেয়েটা যদি একটু সুশ্রী হইত? সুশ্রী হউক না হউক, এত দিন তিনি যদি বাঁচিয়া থাকিতেন ? এখনও বেশ মনে পড়ে, মেয়েটার বয়স তখন আড়াই বছর ; একদিন তিনি এই মেয়েকে বুকে লইয়া মা মা বলিয়া আদর করিতেছিলেন ; তদ্দর্শনে নিস্তারিণী পরিহাস করিয়া বলিয়াছিলেন, “হাঁ, কালাে-কুচ্ছিত মেয়ে, তার আবার এত আদর ! ও মেয়েকে পার করবে কি করে, তাই এখন থেকে ভাব।” ইহা শুনিয়া তিনি হাসিতে হাসিতে উত্তর করিয়াছিলেন, “কিছুই ভাবনা নাই তােমার, দেখবে, এই কালাে মেয়ের চঁাদের মত বর এনে দেব।” হয়, আজ তিনি কোথায় ? চাঁদের মত বরের পরিবর্তে নিস্তারিণী যে আজ তঁাহার আদরের মেয়েকে বুড়া বরের হাতে তুলিয়া দিতেছে ! হায়, তিনি বঁচিয়া থাকিলে কি এমন হইত ? অতীতের স্মৃতির তাড়নায় নিস্তারিণীর চোখ দুইটা জলে ভরিয়া আসিল ; বুকের হাড়গুলাকে যেন ভাঙ্গিয়া দিয়া একটা গভীর দীর্ঘ- নিশ্বাস বাহির হইল । মেনী বেড়াইতে গিয়াছিল। সে বাড়ী ফিরিয়া মায়ের কাছে আসিয়া দাড়াইল, এবং মাতার চিন্তা-কাতর মুখের দিকে চাহিয়া করুণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল, “মা, কি ভাবছো মা?” নিস্তারিণী উদগত অশ্রুপ্রবাহ সালাইয়া লইয়া, কন্যার মুখের উপর ১০৯

গাঁটছড়া
সজল দৃষ্টি স্থাপন করিয়া উত্তর করিলেন, “তুই কোথায় গিয়েছিলি
মেনি ?”
মেনী বলিল, “গৌরীদের বাড়ীতে বেড়াতে গিয়েছিলুম। দেখ মা,
গৌরীকে আজ দেখতে আসবে। তাই গোরীর মামী গৌরীকে এমন
সাজাচ্চে ।”
মুখ ফিরাইয়া লইয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “তা সাজা। তুই এতক্ষণ
সেখানে কি কচ্ছিলি ?”
মেনী বলিল, “গৌরীর সাজগোজ দেখছিলুম। দেখ না, খুব বড়
লােকের বাড়ীতে, গােরীর বিয়ে হবে। শান্ত দিদি বলে, খুব
ধূমধাম করে বর আসবে, সােনাদানায় গৌরীকে না কি মুড়ে
দেবে।”
ঈষৎ কুদ্ধভাবে নিস্তারিণী বলিলেন, “তবে আর কি, আমাদের
সব দুখু ঘুচে যাবে। এই সব দেখতে, এই সব গল্প শুনতেই তুই
বুঝি পাড়া-বেড়াতে যা ?”
মায়ের রাগ দেখিয়া সঙ্কুচিতভাবে মেনী উত্তর করিল, “তা এ সকল
শুনতেও কি দোষ আছে না?”
সতর্জনে নিস্তারিণী বলিলেন, “খুব দোষ আছে। আমরা গরীব,
আমাদের এ সব বড় লােকের কথায় থাকতে নাই।”
মেনী অপরাধীর মত ম্লানমুখে নীরবে দাড়াইয়া রহিল। নিস্তারিণী
তাহার ভীতিমলিন মুখের উপর সরােষ কটাক্ষ নিক্ষেপ করিয়া গম্ভীর
কণ্ঠে বলিলেন, “আমি তােকে কি বলেছিলাম ?”
শক্ষিতস্বরে মেনী উত্তর করিল, “কি বলেছিলে ?
নিতা। আমি না তােকে পাড়া-বেড়াতে বারণ করেছিলাম?”
মেনী। আমিও তত তাই আর কোথাও বেড়াতে যাই না।
।

গাঁটছড়া নিস্তা। তবে আজ গিয়েছিলি কেন ? মেনী। আজ নাইতে গিয়ে শুনলুম, গৌরীকে দেখতে আসবে। তাই একবার শান্ত দিদির সঙ্গে ওদের ওখানে গিয়েছিলুম। নিস্তা। আমাকে বলে গেলি না কেন? মেনী। বলে হয়তাে তুমি যেতে দিতে না। নিস্তা। হয় তাে কেন, কক্ষনাে যেতে দিতাম না। মেনী শক্ষাকাতর দৃষ্টিতে একবার মাতার বােষকঠিন মুখের দিকে চাহিয়াই দৃষ্টি নত করিল। নিস্তারিণী বলিলেন, “কেন আমি যেতে বারণ করি, তা জানিস্ ?” “না।” “গরীব লােক বড়মানুষের বাড়ীতে গেলে তারা বিরক্ত হয়, ঘুণায় গরীবের সঙ্গে মুখ তুলে কথা কয় না।” ছাৎ করিয়া একটা কথা মেনীর মনে পড়িল । সে শান্তদিদির সঙ্গে কয়েকবার গৌরীদের বাড়ীতে বেড়াইতে গিয়া দেখিয়াছে বটে, গৌরীর মামী শান্তদিদিকে কেন যত্ন করিয়া বসায়, হাসিয়া হাসিয়া তাহার সঙ্গে কথা কয়, কিন্তু মেনীকে বসিতেও বলে না, তাহার দিকে মুখ ফিরাইয়া একবারও তাকায় না। তাহা হইলে মায়ের কথা তাে সত্য, বড়লােকেরা সত্যই তাে গবীবকে ঘৃণা করে ; মাতার নিষেধ উপেক্ষা করিয়া মেণী তাে সত্যই এই ঘৃণা কুড়াইতে গিয়াছে। ছি ছি, সে করিয়াছে কি ? আপনার অপমান জন্য বেদনার গুরুত্ব অনুভব করিয়া মেনী একটু কাতর হইয়া পড়িল ; সে মায়ের পায়ের কাছে বসিয়া পড়িয়া অকাতর কণ্ঠে বলিল, “আমি না জেনে গিয়েছি মা, আর কখনাে যাব না।” নিস্তারিণী কিয়ৎক্ষণ স্থিরদৃষ্টিতে কন্যার বেদনা-মলিন মুখের দিকে গাঁটছড়া চাহিয়া রহিলেন ; তার পর ধীরে ধীরে তাহার মাথাটা আপনার কোলের উপর টানিয়া লইয়া তাহার গায়ে মাথায় হাত বুলাইতে লাগিলেন। মায়ের কোলে মাথা রাখিয়া মেনী ছলছল চোখে জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কি ভাবছিলে মা ?” মৃদু হাসিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “কে তােকে বললে, আমি ভাবছিলাম ?” মেনী বলিল, “কে আবার বলবে। আমি তােমার মুখ দেখেই বুঝেছি, তুমি খুব ভাবছিলে।” মেয়ের অনুমানশক্তি দেখিয়া না ঈষৎ হাসিলেন ; বলিলেন, “ব দেখি, কি ভাবছিলাম ?” ঘাড়টা একটু কাত করিয়া সহাস্যমুখে মেনী বলিল, “তা আমি কি করে বলবাে ?” মেয়ের মুখের দিকে চাহিয়া না একটু হাসিলেন। মেনী বলিল, “সত্যি মা, কি ভাবছিলে বল না।” নিস্তারিণী বলিলেন, “ভাবছিলাম, আমি মরবাে কবে !” ঠোট ফুলাইয়া ভারী মুখে মেনী বলিল, “হাঁ, সে কথা বুঝি আবার কেউ ভাবে ?” নিস্তা। কেউ না ভাবলেও আমি ভাবি । মেনী। কেন ভাব ? নিস্তা। মলে আর কোন জ্বালাযন্ত্রণা থাকবে না বলে । মায়ের কোল হইতে সবেগে মাথাটা তুলিয়া লইয়া অভিমান- গম্ভীর কণ্ঠে মেনী জিজ্ঞাসা করিল, “তােমার কি এত জ্বালা-যন্ত্রণা শুনি।” ১১২

No text on this page.

No text on this page.

,ssܘܺܢ
.ܕ
ܢܝ

No text on this page.

গাঁটছড়া
নিস্তা। আলা-যন্ত্রণার কনটাই বা কি আছে মেনী ?
মেনী। হু, ভারী তােমার স্বালা যন্ত্রণা।
বলিয়া মেনী মায়ের মুখের উপর রােষগম্ভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল ।
মেয়ের রাগ দেখিয়া মা একটু হাসিলেন, বলিলেন, “আচ্ছা মেনী, আমি
রবাে বলে তুই এত রাগ করিস্ কেন?”
জোরে ঘাড়টা দোলাইয়া ভারী গলায় মেনী বলিল, “সাপে রাগ
করি! কেন তুমি এমন সব কথা বলবে ?’
সহাহমুখে নিস্তারিণী বলিলেন, “বলেই বা। মুখে বলেই কি
ত্যি সত্যিই মরে যাব ?”
মেনী বলিল, “যাও আর নাই যাও, এমন সব কথা তুমি বলতে
'বে না।”
হাসিতে হাসিতে নিস্তারিণী বলিলেন, “আচ্ছা, তা না হয় বলবো
। কিন্তু মরণ যখন আসবে, তখন তুই কি আমাকে ধরে রাখতে
'রবি ?”
মেনী বলিল, “সে তখন দেখা যাবে। কিন্তু এখন থেকে দিনরাত
রবাে মরবাে, এ সব কথা ভাল লাগে না।”
নিস্তারিণী বলিলেন, “তাের ভাল লাগবে না, তা জানি, কিন্তু অনেক
দুঃখেই মুখ দিয়ে এ সব কথা বেরিয়ে যায় । নইলে মত্তে কি কারাে
সাধ ?”
মেনী বলিল, “আর কারাে সাধ না হলেও তােমার খুব সাধ।”
ম্লান হাসি হাসিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “একটুও সাধ নাই মেনী।
সত্যি বলতে কি, এই তাে মরবো মরবাে বলছি, কিন্তু আজ যদি মরণ
এসে সামনে দাড়ায়, তা হলে আমি তাকে মিনতি করে ‘লবে, হে
মরণ, এখন তুমি সরে যাও, আমার মেনীর একটা গতি না করে আল

গাঁটছড়া
-~-
মত্তে পারবাে না। এত দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও তুই যে আমার একটু
সুখের ক্ষীণ আলাে মেনী।”
নিস্তারিণীর বিষাদগম্ভীর মুখমণ্ডল অপত্যস্নেহে সমুজ্জ্বল হইয়া উঠিল ।
মেনী মাতার স্নেহ-প্রদীপ্ত মুখের দিকে চাহিয়া চাহিয়া ধীরে ধীরে
জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা মা, আমিই কি তােমার যত দুঃখের—যত
ভাবনার মূল নয়?”
ক্ষীণ দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “তুই যেমন
দুঃখের মূল, তেমনি সুখেরও মূল মেনী। এই যে এত দুঃখ-কষ্ট স’য়েও
বেঁচে আছি, সেটা শুধু তােরই মুখ চেয়ে। তাই ভাবি, বিয়ে দিয়ে
তােক পরের ঘরে পাঠিয়ে কি নিয়ে সংসারে থাকবাে ?”
মেনী নতমুখে কিয়ৎক্ষণ নীরবে থাকিয়া মৃদু কণ্ঠে বলিল, “আচ্ছ।
মা, তাই যদি ভাব, তবে বিয়ে দিচ্চো কেন?”
নিস্তারিণী একটু বিস্ময় প্রকাশ করিয়া বলিলেন, “ও মা, বিয়ে দেব
? চিরকাল আইবুড়াে থাকবি?”
ঘাড় দোলাইয়া মেনী বলিল, “থাকলেই বা ; তা হলে তাে
তােমাকে ছেড়ে আর কোথাও যেতে হবে না। আর আমার বিয়ের
তরে তােমাকে এত ভাবতেও হবে না।”
মেয়ের পাগলের মত কথায় নিস্তারিণীর হাসি আসিল। হাসিতে
হাসিতে বলিলেন, “পাগল মেয়ে ! চিরকাল আমাকে আগলে থাকবি ?
সংসারধর্ম করবি না?”
মেনী বলিল, “পরের ঘরে না গেলে বুঝি সংসারধর্ম হয় না?”
নিস্তা। কি করে তা হবে মেনী?
মেনী। কেন, ঐ যে পদ্ম পিসী বিধবা হয়ে মায়ের কাছে রয়েছে,
তার কি সংসার-ধৰ্ম্ম হচ্ছে না?
১১৪

গাঁটছড়া ; ব্যস্ততা সহকারে বাধা দিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “বালাই, ষাটু। ও কি অলক্ষুণে কথা মেনী? ও রকম অদৃষ্ট যেন অতি বড় শত্রুরও না হয়। ভগবানের কাছে প্রার্থনা কর, পরের ঘর কত্তে কত্তেই এই মাটীর দেহ যেন মাটীর সঙ্গে মিশে যায়।” মেনী বসিয়া ছিল, যেন বিরক্তভাবে উঠিয়া দাড়াইল ; গম্ভীরমুখে বলিল, “আচ্ছা আচ্ছা, সেই প্রার্থনাই করবাে, আগে ঘরের কাজ- কৰ্ম্ম সারি।” বলিয়া সে ঝাঁটাগাছটা হাতে লইয়া ব্যস্তহস্তে ঘর ঝাঁট দিতে প্রবৃত্ত হইল। নিস্তারিণী একটা দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া উঠিবার উপক্ৰম করিতেছিলেন, এমন সময় পদ্মঠাকরুণ “কি কচি লাে মেনীর মা'' বলিয়া বাটীর মধ্যে প্রবেশ করিলেন। পদ্মঠাকরুণকে চিনিত না, গ্রামে এমন লােক নাই বলিলেই হয়। খুব বাল্যকালেই পদ্মঠাকরুণের বিবাহ হইয়াছিল, এবং বিবাহের অল্পকাল পরেই বিধবা হইয়া পিতৃগৃহে বাস করিতেছিলেন। চিরদিন পিতৃগৃহে বাস করায়, গ্রামের কোন লােকই তঁাহার অপরিচিত ছিল না। কাহারও দিদি, কাহারও পিসী, কাহারও মাসী সম্পর্ক লইয়া তিনি গ্রামের ইতর-ভদ্র সকলের গৃহেই ঘুরিয়া বেড়াইতেন, এবং পাঁচ বাড়ীর পাঁচ কথার আন্দোলনে দিন কাটাইতেন। শ্বশুরবাড়ীর সহিত তাহার কোন সম্পর্কই ছিল না ; বাপ গােবর্ধন চক্রবর্তী জামাতার জমজমা এমন কি, ঘর-ভিটা পর্যন্ত বেচিয়া আনিয়া সে স্থানের সহিত পদ্ম- ঠাকরুণের সকল সম্পর্ক ঘুচাইয়া দিয়াছিলেন। সেখানকার স্মৃতি ১১৫ গাঁটছড়া মন হইতে সম্পূর্ণরূপে মুছিয়া ফেলিয়া, বাপ, মা, ভাই, ভাইপাে এই সকল লইয়াই পদ্মঠাকরুণ আপনার জীবনের জীবনের সাধ আশা পূর্ণ করিতেছিলেন। সাধারণতঃ যেমন দেখা যায়, বিধবাদিগকে পিত্রালয়ে নিতান্ত পরাধীনভাবেই বাস করিতে হয়, পদ্মঠাকরুণকে কিন্তু সেরূপ পরাধীনতার কষ্ট ভােগ করিতে হয় নাই। সংসারে তিনিই একরূপ কত্রী ছিলেন ; ভ্রাতা, ভ্রাতৃবধূ, এমন কি, মা-বাপ পর্যন্ত তাহার কর্তৃত্ব শিরােধার্য্য করিয়া লইতেন। শুধু নিজের বাড়ীতে নয়, গ্রামের অন্যান্য পাচ বাড়ীতেও তাহার কর্তৃত্ব অপ্রতিহত ছিল । গ্রামের কাহারও বাটীতে শ্রাদ্ধ-বিবাহাদি কাজকৰ্ম্ম হইলে পদ্মঠাকরুণ ছাড়া ভাড়ারীর ভার গ্রহণ করিবার আর কেহ ছিল না, করিলেও কাৰ্য বেশ সুশৃস্থলে নিৰ্বাহিত হইত দশজন লােক খাওয়াইতে হইলে কি ভাবে খাওয়ান আবশ্যক, সে সম্বন্ধে লোকে আগে পদ্ম - ঠাকরুণের পরামর্শ গ্রহণ করিত, এবং সেই ন্যায্য পরামর্শ অনুসারে কাজ করিতে সকলেই বাধ্য হইত। তা ছাড়া সময়ে অসময়ে হাত পাতিলে পদ্মঠাকরুণের কাছে দুই-দশ টাকা পাওয়াও যাইত। এই কারণেও অনেকে তাহাকে ভয় ও ভক্তি করিয়া চলিত। পদ্মঠাকরুণকে দেখিয়া নিস্তারিণী ব্যস্তভাবে উঠিয়া তাহাকে বসিতে আসন দিলেন। আসন গ্রহণ করিয়া পদ্মঠাকরুণ সহাস্যমুখে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেমন আছিস্ লাে মেনীর মা !” নিস্তারিণী বলিলেন, “আর দিদি, আমার আর থাকাথাকি কি, যেতে পারলেই বাঁচি। সহাস্য তিরস্কারের স্বরে পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “আ মরণ, যাবার জন্যে এত তাড়াতাড়ি কেন ? যেতে তাে হবেই একদিন। এখন যে ১১৬ গাঁটছড়া ক'দিন পারি থেকে যাই। গেলে আমিও তােকে ‘মেনীর মা' ব'লে पादर আসবাে , তুই ও অাশাকে বামুন দিদি বলে ডাকবি না।” বিষাদগম্ভীর-মুখে নিস্তারিণী উত্তর করিলেন, “তা বটে, কিন্তু যেতে রলে এই সব জ্বালা-যন্ত্রণার হাত এড়ান যায় দিদি।” ঠোট ফুলাইয়া পদ্মঠাক্‌রুণ বলিলেন, “ইস্, ভারী তো তাের জালা- যন্ত্রণা দেখছি ! দে« মেনীর মা, তাের মত যদি আমার একটা মেয়ে ও থাকতো, তা হলে আমি হাজার বচ্ছর বেঁচে থাক্‌তে চাইতুম ।” ঈষং হাসিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “কিন্তু সেই মেয়ের বিয়ে দিতে হ'লে একদণ্ড ও বাঁচতে চাইতে না।” নিতান্ত তাচ্ছল্যের স্বরে পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “ও: ভাবী তত মেয়ের বিয়ে ! ভাল কথা, তুই কি না কি একটা ষাট বছয়ের ঘাটের নড়ার সঙ্গে মেয়েটার বিয়ে দিবি?” লজ্জানত মুখে নিস্তারিণী বলিলেন, “ষাট বছরের নয়, তবে চলিশ- পঞ্চাশ বটে।” ঘাড় নাড়িয়া পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “ও পঞ্চাশ আর ষাট একই কথা। কেন, তাের ঘরে কি একগাছা দড়ী আর একটা কলসী নাই ? মেয়েটার গলায় কলসী বেঁধে তােদের খিড়কী-পুকুরের জলে ফেলে দিলি না কেন ?” গভীর দীর্ঘনিশ্বাস ত্যাগ করিয়া নিস্তারিণী বলিলেন, “কি করবাে দিদি, যেমন কপাল ! পয়সা থাকলে তাে ভাল ছেলে পাব।” কণ্ঠে পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “সেই জন্যই তাে বলছি, মেয়েটার গলায় কলসী বেঁধে পুকুরের জলে ফেলে দে, তাতে এক পয়সাও খরচ হবে না।” ১১৭ গাঁটছড়া নিস্তারিণী নতমুখে নিরুত্তরে বসিয়া রহিলেন। পদ্মঠাকরুন জিজ্ঞাসা করিলেন, “তােকে এমন যুক্তি কে দিলে শুনি?” নিস্তারিণী বলিলেন, “যুক্তি আর কে দেবে দিদি, যুক্তি দেবার লােকই বা কে আছে ? তবে ঘােষেদের গিরির বাপের একটু নেক- নজর আছে, সে-ই অনেক চেষ্টার পর এই পাত্রটির যােগাড় করেছে।” ভঙ্গী সহকারে পদ্মঠাকৃরুণ বলিলেন, “চমৎকার সু-পাত্র যােগা করেছে। কেন, তার শালার সঙ্গে কথাবার্তা হয়েছিল না?” নিস্তারিণী বলিলেন, “হয়েছিল, কিন্তু সেটা ঘটে উঠলাে কৈ ? উপেন হঠাৎ কলকাতা চলে গেল।” পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “গেলেই বা কলকাতায়। কলকাতায় কি কেউ যায় না, না সেখান থেকে এসে বিয়ে করে না ? বিষাদ-মলিন স্বরে নিস্তারিণী বলিলেন, “কি জানি দিদি, ওঁর: তত জবাব দিয়ে গেলেন । পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “জবাব দিলেন, মেয়ে কালাে বলে । তা মেয়ে কালাে বলে কি বিয়ে হবে না? জগতে সবাই কি সুন্দরী হয় ? গিন্নী নিজেই কি অপ্সরী না বিদ্যাধরী ?” নিস্তারিণী বলিলেন, “নিজে মন্দ হলেও কেউ কি মন্দ জিনিস ঘরে আন্‌তে চায় ? পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “তা হলেও যে যেমন দরের, সে তেমন জিনিস খুঁজলেই ভাল হয়। ছেড়া কঁাথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপন দেখলে লােকে বলবে কি ?” নিস্তারিণী বিষমুখে নীরবে রহিলেন। পদ্মঠারুণ একটু ভাবিয়া বলিলেন, “আচ্ছা মেনীর মা, আমি একটু চেষ্টা করে দেখি; কতদূর ১১৮ গাঁটছড়া কি কত্তে পারি। আমি শুনেছি, উপেনের চাকরী হয়েছে, নীলমণির বৌকে সে চিঠি লিখেছে । হেঁড়াটা তার নাকি খুব বাধ্য।” নিস্তারিণী বলিলেন, “খুব বাধ্য যে, তা জানি, কিন্তু নিজের বােনের অমতে” তাহাকে ধমক দিয়া পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “আচ্ছা আচ্ছা, সে জন্যে তােকে ভাবতে হবে না, তুই মােদ্দা যেমন কথাবার্তা হয়েছে, তেমনি বিয়ের যােগাড় কর।” উদ্বিগ্নভাবে নিস্তারিণী জিজ্ঞাসা করিলেন, “তার পর ?” পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “তার পর কি হয়, দেখতে পাবি। তবে ভাই, বিধাতার ভবিতব্যি। তঁার ভবিতব্যি যদি থাকে, তবে এক রকম যােটাযােট হয়েই যাবে। তুই ভাবি না, আমি এখন নীলমণির বােয়ের কাছে চললুম।” নিস্তারিণী তাহার পায়ের ধূলা লইয়া গল্পকণ্ঠে বলিলেন, “তা, যদি পার দিদি” হাসিতে হাসিতে পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “আ মরণ, যদি পারি কি, নিশ্চয়ই পিরবাে বল্।” হাসিতে হাসিতেই পদ্মঠাক্রশ চলিয়া গেলেন। নিস্তারিণী মনে মনে দেবতাকে স্মরণ করিয়া বলিলেন, “হে ঠাকুর, তাই যেন হয়।” “কি ভাবচ উপীনদা ?” “ভাবচি এখনাে কেন নলিনী এসে বলে নি, কি ভাবছো?” বামে-দক্ষিণে ঘাড় হেলাইয়া হাস্য-তরল-কণ্ঠে নলিনী বলিল, “তাই কি, তুমি তা হলে বসে বসে আমার কথাই ভাবচো বল ?” ১১৯

গাঁটছড়া
তাহার মুখের উপর সহাস্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া উপেন বলিল, “ত
ছাড়া আমার আর কি ভাবনা আছে, বলতে পার ?”
মুখে খানিকটা বিস্ময়ের ভাব আনিয়া নলিনী বলিল, “ও মা,
আমার ভাবনা ছাড়া তােমার আর কিছু ভাবনা নাই ?”
মাথা নাড়িয়া উপেন বলিল, “কিচ্ছু নাই।”
“চাকরীর ভাবনা?”
“সে ভাবনা যতক্ষণ আফিসে থাকি, ততক্ষণ।”
“বাড়ীর ভাবনা?”
“বাড়ী-ঘর থাকলে তাে সে ভাবনা থাকবে।”
“কেন, বােনের বাড়ী তে আছে ?”
“সে পরের বাড়ী।”
“বােনও কি পর ?”
“আপন হলে, বােনের বাড়ী ছেড়ে চলে আসবাে কেন?”
একটু ভাবিয়া নলিনী যেন ঈষৎ ব্যথিতকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করিল,
“তা হলে তােমার আপন বলে কেউ নাই বল উপীনদা ?”
উপেন বলিল, “থাকলে তাদের ভাবনা ভাবতাম বৈ কি।”
“তা হলে আমার ভাবনাই বা কেন ভাব ?”
“তােমরা আমাকে আপন ভাব বলে।”
হর্ষ-প্রফুল্ল-মুখে নলিনী বলিল, “আমরা কি তােমাকে এতই আপন
ভাবি উপীনদা ?”
সহাস্যে উপেন বলিল, “আমার তাে তাই মনে হয়।”
“সত্যি ?”
“সত্যি।”
“আচ্ছা, কেন এমন মনে হয় বল দেখি ?”
১২০

গাঁটছড়া
ঈষৎ হাসিয়া উপেন উত্তর করিল, “কি জানি।”
নলিনী দাড়াইয়াছিল, ধপ করিয়া উপেনের বিছানার একপাশে
বসিয়া পড়িল, এবং উপেনের মুখের উপর হাস্যোজ্জ্বল দৃষ্টি নিক্ষেপ
করিয়া বলিল, “তুমি জান না, আমি কিন্তু জানি।”
একটু আগ্রহের সহিত উপেন জিজ্ঞাসা করিল, “কি জান
তুমি ?”
নলিনী বলিল, “মা বলেন, আর জন্মে তুমি আমাদের কেউ ছিলে,
তাই তােমার উপর এত ভালবাসা পড়েছে।”
উপেন যেন একটু শিহরিয়া উঠিল ; বলিল, “আর জন্মে ছিলাম,
তা এ জন্মে ভালবাসা হবে কেন ?”
মাথাটা একটু হেলাইয়া, হৃদ্বয় ঈষৎ কুঞ্চিত করিয়া নলিনী বলিল,
“তাই তাে হয় গাে ! আমি পড়েছি—মনােহি জন্মান্তরসঙ্গতিজ্ঞ।”
উপেন জিজ্ঞাসা করিল, “তার মানে ?
নলিনী বলিল, “তার মানে হচ্ছে, পূৰ্বজন্মে যার সঙ্গে ভালবাসার
সম্পর্ক থাকে, এ জন্মে তাকে দেখলেই মন তার দিকে অনুরক্ত হয়ে
পড়ে।”
হাসিতে হাসিতে উপেন বলিল, “তা হলে পূৰ্বজন্মে আমার সঙ্গে
কি রকম সম্পর্ক ছিল, বল দেখি পণ্ডিত মশায় ”
একটু লজ্জার হাসি হাসিয়া নলিনী বলিল, “এই তাে! আমি ভাল
কথা বললেই তুমি আমাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ কর।”
হাস্য-তরল-কণ্ঠে উপেন বলিল, “আর তােমারও ঐ এক দোষ,
আমি কিছু বলেই তুমি সেটাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ মনে কর। কাল
বিয়ের কথা কইলুম, তুমি ঠাট্টা মনে করে রেগে উঠলে।”
চক্ষু বিস্ফারিত করিয়া যেন খুব আশ্চর্যান্বিতভাবে নলিনী বলিল,
১২১

গাঁটছড়া
“বাঃ, রেগে উঠলাম আবার কখন? আমি তাে বললাম, ও-কথা
শুনতে আমার ভাল লাগে না।”
উপে। ভাল লাগে না কেন?
নলি। কেন, তা কি জানি।
উপে। বিয়ের কথা শুনলে লজ্জা হয় বুঝি ?
নলি। লজ্জা! না না, লজ্জা হবে কেন ?
এমন লজ্জার কথাটাই
বা কি ।
উপে। তবে ভাল লাগে না কেন? বিয়ে করবে না ?
নলি। যদি না-ই করি ?
উপে। তাও কি হতে পারে?
নলি। হতে পারে না কেন, সেইটাই আগে আমাকে বুঝিয়ে
দাও দেখি ?
উপেন একটু মুস্কিলে পড়িল। বিবাহ যে করিতেই হয়, না করিলে
চলে না, ইহা বুঝাইয়া দিবার মত বিজ্ঞতা তাহার ছিল না। সুতরাং
খানিক ইতস্ততঃ করিয়া সে বলিল, “এই তাে সকলেই বিয়ে করে।”
নলিনী বলিল, “অনেকেই করে না।”
উপে। পুরুষ কেউ কেউ অবিবাহিত থাকে বটে।
নলি। মেয়েমানুষও অনেক থাকে। এই
আমাদের
কলেজের হেড-মিষ্ট্রে মিস্ এলিস্ বিবাহ করেন নি।
উপে। ও সাহেবদের মেয়েদের কথা ছেড়ে দাও।
নলি। সাহেবদের মেয়েরা কি মেয়েমানুষ নয় উপীনদা ?
উপেন ইহার উত্তরে বলিবার মত কিছু খুঁজিয়া পাইল না ; অগত্যা
বলিল, “ওদের মেয়ে-পুরুষ চেনা দায়। ওরা পুরুষদের সঙ্গে এক
টেবিলে বসে খানা খায়, চাকরী করে, গাড়ী হাঁকিয়ে বেড়াতে যায়।”
১২২

গাঁটছড়া ; নলিনী খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল ; হাসিতে হাসিতে বলিল, “চাকরী করে, খানা খায় বলে ওদের বিয়ের দরকার নাই উপীনদা ?” তাহার এই উচ্চ হাসিতে লজ্জিত হইয়া উপেন মাথা নীচু করিল। নলিনী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে ডাকিল, “আচ্ছা উপীনদা!” উপেন মুখ তুলিয়া চাহিল। নলিনী একটু ইতস্ততঃ করিয়া নত- মুখে জিজ্ঞাসা করিল, “বিয়ে কেন উপীনদা ?” উপেন মৃদু হাসিয়া বলিল, “এটা মন্দ প্রশ্ন নয় নলিনী!” গম্ভীরভাবে মাথা নাড়িয়া নলিনী বলিল, “মই হােক্, আর ভালই হােক, তুমি আমাকে বুঝিয়ে দাও।” উপেন বলিল, “এর আর বােঝাবার কি আছে ? সংসারে থাকতে হলে বিয়ে করা দরকার। নলি। বিয়ে না করলে কি সংসারে থাকা যায় না ? উপে। থাকা যাবে না কেন, সে যেন উদাসীনের মত থাকতে হয়। নলি। উদাসীনের মত কেন ? উপে। উদাসীনের মতই বৈ কি। মানুষ ভালবাসার বঁধনেই সংসারে আবদ্ধ হয়ে থাকে। যার সে বাধন নাই, তাকে উদাসীন ছাড়া আর কি বলা যায় ? নলিনী। তা বিয়ে না হলে কি ভালবাসা যায় না? এই যে আমি মাকে ভালবাসি, তােমাকে ভালবাসি। নলিনীর কথায় উপেনের মুখখানা আরক্ত হইয়া উঠিল। সে একটা ঢােক গিলিয়া বলিল, “এ ভালবাসায় আর স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসায় অনেক তফাৎ নলিনী! স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন ভালবাসা জন্মে যে, স্বামী বা স্ত্রী পরস্পর অর্ধাঙ্গ হয়ে যায়।” ১২৩ গাঁটছড়া ঈষৎ হাসিয়া নলিনী বলিল, “বল কি, একেবারে আধখানা অঙ্গ!” উপেন বলিল, “হাঁ, আধখানা অঙ্গ। এই জন্যেই স্ত্রীকে অর্ধাঙ্গিনী বলে।” হাসিতে হাসিতে নলিনী বলিল, “আমাদের পণ্ডিত মশায় কিন্তু বলে দিয়েছেন, অর্ধাঙ্গিনী কথাটা ব্যাকরণের মতে অশুদ্ধ।” উপেন বলিল, “আমি ব্যাকরণও পড়ি নাই, এত শুদ্ধ অশুদ্ধ ও জানি না। লােকে বলে, তাই শুনেছি।” ঘাড় বাঁকাইয়া একটু উপহাসের হাসি হাসিয়া নলিনী বলিল, “ওঃ, এ সব তা হলে তােমার শােনা কথা ?” ঈষৎ অপ্রতিভভাবে উপেন বলিল, “শােনা কথা বৈ কি। আমার তাে এখনও বিয়ে হয় নি যে, পরখ করে দেখেছি।” “তবে তুমি আগে বিয়ে কর উপীনদা, তার পর তােমার উপদেশ • শুনবাে।” বলিয়া নলিনী হাসিতে হাসিতে ঘরের বাহির হইয়া গেল। উপেন একটা ক্ষুদ্র নিশ্বাস ত্যাগ করিয়া নীরবে বসিয়া ভাবিতে লাগিল। “ছ নলি, উপেনকে বলেছি, তুই নাকি বিয়ে করবি না?” নলিনী নতমুখে দাড়াইয়া নখ খুঁটিতে লাগিল। মা যেন একটু তিরস্কারের স্বরে বলিলেন, “কেন বিয়ে করবি না বল্ তাে?” নলিনী নীরব ! তাহার চোখে মুখে লজ্জার রক্তরাগ ফুটিয়া উঠিল। মা এবার মেয়ের লজ্জার মুখের উপর রােষকঠিন দৃষ্টি স্থাপন করিয়া তীব্র কণ্ঠে বলিলেন, “এর তরেই বুঝি তােকে লেখাপড়া শিখিয়েছি ?” ১২৪ গাঁটছড়া। মৃদুস্বরে নলিনী উত্তর করিল, “বিয়ে দেবার তরেই কি লেখাপড়া শিখিয়েছ মা?” তর্জন সহকারে মা বলিলেন, “তা নয় তত চাকরী ক'রে পয়সা আবার তরে কি তাের পেছনে এত পয়সা খরচ করেছি ?" নলিনী বলিল, “চাকরী করবাে, এ কথা তাে বলি নাই মা।” বলিলেন, “কিন্তু বিয়ে করবাে না বলেছি তাে ?” নলিনী চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল। গম্ভীরভাবে মা বলিলেন, “তোকে কেন লেখাপড়া শিখিয়েছি, তা জানি?” নলিনী জিজ্ঞাসা করিল, “কেন শিখিয়েছ মা?” মা বলিলেন, “তাের রূপ যা হােক একটু আছে, তার উপর একটু লেখাপড়া শিখে চালাক চতুর হতে পারলে, কোন না কোন ভদ্র- লােকের ছেলে তােকে বিয়ে কত্তে পারবে।” “তা নইলে ?” “তা নইলে বেশ্যার মেয়ে তুই,“কোন্ ভদ্রলােক তােকে ঘরে ঠাই দেবে বল্ তাে?” নলিনীর আরক্ত মুখখানা হঠাৎ যেন ঘাের লাল হইয়া উঠিল । তীব্র কণ্ঠে ডাকিল, “মা !” মা মেয়ের এই সক্রোধ আহ্বানের মর্ম বুঝিতে পারিলেন। বুঝিয়া বলিলেন, “তা রাগ করলে কি হবে বাছা, যতই গেরস্তর মত সাবধানে থাকি, আমি বেশ্যা ছাড়া আর কিছু তাে নই ?” ক্রোধগম্ভীর মুখে নলিনী বলিল, “তুমি বেশ্যাই হও, আর যাই হও, আমি ও সব কথা শুনতে চাই না।” মা একটু হাসিলেন ; বলিলেন, “শুনলে তাের খুব লজ্জা হয়, ?” ছলছল চোখে নলিনী উত্তর করিল, “আমার মাথা যেন কাটা যায়।” ;

গাঁটছড়া শান্ত কোমল কণ্ঠে মা বলিলেন, “তা আমি জানি নলি। জানি ব’লেই যখন হ’তে তাের একটু জ্ঞানবুদ্ধি হয়েছে, তখন হতেই এ পিপ ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে পল্লীতে বাস কচ্চি। পাছে তাের মনে আঘাত লাগে, পাছে আমাকে ‘মা’ বলে ডাকতেও তাের মনে একটু ঘৃণা আসে, এই আশঙ্কায় কত হাজার হাজার টাকার লােভ সংবরণ করেছি, কত রাজা ও জমিদারকে এই বাড়ীর দরজা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছি, তা বােধ হয় তুই জানি না। আজ আমি এই ভাড়াটে বাড়ীতে বাস কচ্চি, কিন্তু ইচ্ছা করলে এর চেয়ে ভাল ভাল বাড়ী কিনে ফেলতে পারতাম। কিন্তু শুধু তাের তরেই নলি, আমি সে লােভ সংবরণ করে আসছি।” স্নেহের উচ্ছ্বাসে মাতার চোখ দুইটা সজল হইয়া আসিল। মেয়ের মুখের উপর স্নেহপ্রদীপ্ত দৃষ্টি স্থাপন করিয়া মা বলিতে লাগিলেন, “তবে বলতে পারি, থিয়েটার কচ্চো কেন তবে ? থিয়েটার কচ্চি কেন জানিস্ ? এটা হচ্চে মােটা মাইনের চাকরী, দশ বিশ হাজার তাে জমা নাই যে, তাই ভেঙে খাব । কাজেই এই চাকরী কত্তে হচ্ছে।” নলিনী জিজ্ঞাসা করিল, “এ চাকরীতেও কি দোষ নাই মা ?” মা বলিলেন, “দোষ আছে বলেই আছে, নাই বলে নাই। কিন্তু দোষ থাক আর নাই থাক্‌ দিন চালাবার একটা উপায় তােত চাই।” নলি। এ ছাড়া কি অন্য উপায় নাই ? এ ছাড়া আমাদের আর কি উপায় আছে নলি ? উপায় ভিক্ষা করা। কিন্তু ভিক্ষা করে খাব, এ কথা বলা যত সহজ, কাজে ততটা সহজ নয়। আর ততটা কষ্ট আমিও সইতে পারবাে না, তুইও সইতে পারবি না। তার চাইতে গতর খাটিয়ে খাচ্চি, এতে লােকনিন্দা একটু থাকলেও ধর্মের কাছে পতিত হব না নলি।” মা। এক ১২৬ গাঁটছড়া নলিনী নীরবে নতমুখে দাড়াইয়া রহিল। মা বলিতে লাগিলেন, “তা পাপই হােক আর পুণ্যই হােক, আমার যা হয় হবে নলি, এখন তােকে সুখী কত্তে পারলেই আমার জীবন সার্থক । তাের বিয়ে দেব, তুই ভদ্র গেরস্ত ঘরের মেয়ের মত স্বামী-পুত্র নিয়ে সুখে ঘর- কন্না করবি, নরকে থেকেও যদি আমি তাের এই সুখটুকু দেখতে পাই, তা হলে তাের সে সুখের কাছে আমার নরক-যন্ত্রণাও তুচ্ছ হয়ে যাবে। তুই আমার এ সাধে বাদ সাধিস্ না নলি।” মাতার স্নেহকরুণ উক্তিতে নলিনীর প্রাণটা যেন কেমন করিয়া উঠিল।...মা, মা! স্নেহময়ী—মঙ্গলময়ী মা ! কন্যার সুখের জন্য তােমার এত ব্যাকুলতা! তােমার এই ব্যাকুলতা কি দূর হইতে পারে না না? গাঢ় কণ্ঠে নলিনী বলিল, “কিন্তু মা, মা জিজ্ঞাসা করিলেন, “কি বলছিস্ নলি?” নলিনী একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিল, “কিন্তু বিয়ে হলে তােমার কাছে তত থাকতে পারবাে না!” নলিনীর বিবাহে অনিচ্ছার কারণ শুনিয়া মা হাসিয়া উঠিলেন বলিলেন, “আ পাগলী মেয়ে, এই জন্যে তুই বিয়ে কত্তে চাস্ না?” ঘাড় দোলাইয়া ভারী মুখে নলিনী বলিল, “না মা, তােমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারবাে না।” সহাস্য মুখে মা বলিলেন, “তুই আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবি না, আর আমিই কি তােকে ছেড়ে থাকতে পারবাে মনে করি?” বিবাহ হইলেই মেয়েমানুষকে স্বামীর ঘরে যাইতে হয়, নলিনী ইহা জানিত, সুতরাং মায়ের কথায় সে একটু আশ্চৰ্য্য বােধ করিল, এবং বিস্ময়পূর্ণ নেত্রে মাতার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। মা বলিলেন, “তার উপায় আমি আগেই করে রেখেছি নলি। ১২৭ গাঁটছড়া এ ভাবনাটা আমার বড়ই ছিল, কিন্তু ভগবান্ সে ভাবনা ঘুচিয়ে দিয়েছেন ; তঁার কৃপায়, বিপদের মধ্যে উপেনকে রাস্তায় কুড়িয়ে পেয়েছি।” তবে কি উপেনের সঙ্গেই তাহার বিবাহ হইবে ? উপীনদা তাহার স্বামী ? লজ্জা-জড়িত আনন্দে নলিনীর মুখমণ্ডল আরক্ত হইয়া উঠিল। মা, মেয়ের মুখভাব লক্ষ্য করিয়া হর্ষ প্রফুল্লকণ্ঠে বলিলেন, “আমি যেমনটি চাই, তেমনটাই পেয়েছি। তিন কুলে কেউ নাই, ঘরজামাই হয়ে থাকতে একটুও আপত্তি করবে না।” আনতমুখে, লজ্জাজড়িতস্বরে নলিনী বলিল, “আপত্তি যে করবে না, তাই বা তুমি কেমন করে জানলে মা?” মা বলিলেন “ওর কথাবার্তার আঁচে বুঝে নিয়েছি। একদিন উপেনের কাছে তাের বিয়ের কথা পেড়েছিলুম। অবশ্য, ওকেই যে পাত্র মনােনীত করেছি, সে কথা বলি নাই, তবে তেমন ভাল ছেলে কোথায় পাওয়া যায়, কি করে নলিকে পার করবাে, এই রকম ভাবের কথা পেড়েছিলুম। তাতে উপেন বলে কি জানিস্ ?-নলিনীর বিয়ের জন্যে ভাবনা কি ? যার অনেক সৌভাগ্য, সে-ই, নলিনীকে লাভ কতে পারবে।” নলিনী বুকের ভিতর দ্রুত স্পন্দন অনুভব করিতে লাগিল । মা বলিলেন, “তুই না জানতে পারি নলি, আমি কিন্তু বেশ বুঝেছি, উপেন তাের রূপে-গুণে মুগ্ধ।” কুঞ্চন সহকারে নলিনী বলিল, “রূপে-গুণে মুগ্ধ বলেই যে বিয়ে কত্তে যাবে, তার কোন মানে নাই।” মা। খুব মনে আছে। দেখ, ব্যবসা। ছেড়ে দিয়েছি বটে, কিন্তু লােকের মনের ভাব এখনাে এক কথায় বুঝতে পারি। উপেন ১২৮

গাঁটছড়া
তােকে প্রাণের সঙ্গে ভালবাসে। ও যদি তােকে পায়, তবে মনে
করবে, হাত বাড়িয়ে স্বর্গ পেয়েছি।
মায়ের কথায় নলিনীর মুখখানা গম্ভীর হইয়া আসিল। কুটি
করিয়া বলিল, “কিন্তু ছি মা, লােককে ভুলিয়ে স্বার্থসিদ্ধি করা—আমি
তাে বেশ ভাল বলি না।”
মায়ের হর্ষ প্রফুল্ল মুখে এবার যেন একটু রাগের ভাব দেখা দিল
তিনি মেয়েকে ধমক দিয়া বলিলেন, “একরত্তি মেয়ে তুই, তাের এত
ভাল-মন্দ বিচার কেন বল্ তাে? এ রকমে ভুলিয়ে কাজ হাসিল না
করলে কোন্ ভদ্র ঘরের ছেলে বেশ্যার মেয়েকে বিয়ে কওে আসবে
বতে পারি?”
নলিনীও একটু রাগতভাবে বলিল, “না এলেই ক্ষতি কি?”
মা বলিলেন, “তাের ক্ষতি না থাকলেও আমার ক্ষতি আছে।
দেখ নলি, আমি ব্যাগক্তা করে বলছি, তুই যদি এতে অমত করিস,
তা হলে আমি গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে মরবাে।”
মাতার এই আক্ষেপােক্তির উত্তরে নলিনী আর কিছু বলিতে
পাবিল না।
সে নিরুত্তরে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে
পড়িবার ঘরের দিকে চলিয়া গেল। •
সেইদিন উপেন অফিস হইতে ফিরিয়া আহারে বসিয়াছিল।
নলিনীর মা তাহার সম্মুখে বসিয়া গল্প করিতে করিতে তাহার
আহারের তত্ত্বাবধান করিতেছিলেন। কত কষ্টে তিনি নলিনীকে
মানুষ করিয়াছেন, কঠিন রােগে আক্রান্ত হইয়া তাহার এই শিবরাত্রির
১২৯

গাঁটছড়া সলিতাটুকু কতবার মরণাপন্ন হইয়াছে, জীবন পর্যন্ত পণ করিয়া কত কষ্টে তিনি নলিনীকে যমের মুখ হইতে টানিয়া আনিয়াছেন, এখন মেয়েটাকে কোন সৎপাত্রের হস্তে অৰ্পণ করিতে পারিলেই তিনি নিশ্চিন্ত হইয়া কাশীবাস করেন, ইত্যাদি সুখদুঃখের কথা আক্ষেপ সহকারে ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। তারপর উপেনকে আর খান দুই রুটী এবং দুধের বাটি দিয়া যাইবার জন্য বামুন ঠাকুরকে আদেশ দিয়া উপেনকে সম্বােধন করিয়া বলিলেন, “তা বাবা, মেয়েটার বিয়ের কি করি বল দেখি? বৌ-বাজারে তােত একটি ছেলের সন্ধান পেয়েছি। ছেলেটি লেখাপড়া একটু জানে বটে, কিন্তু স্বভাবচরিত্র তেমন ভাল নয়।” উপেন ততক্ষণ নতমুখেই নলিনীর মাতার কাহিনী শুনিয়া যাইতেছিল ; এক্ষণে মুখ তুলিয়া বলিয়া উঠিল, “যার স্বভাবচরিত্র ভাল নর, তেন ছেলের হাতে কখনও মেয়ে দেওয়া যেতে পারে না।” চিন্তাগম্ভীর মুখে নলিনীর মা বলিলেন, “সে কথা আমিও বুকিং উপেন, কিন্তু তেমন ছেলে পাওয়া যাচ্চে কোথায় ? লেখাপড়া জানলে, স্বভাবচরিত্র ভাল হবে, অথচ ঘরজামাই হয়ে থাকবে, এমন ছেলে তাে চোখে ঠেকে না। ঘটকী মাগী তাে আজ এক রকম জবাব-ই দিয়ে গেল।” উত্তেজিত কণ্ঠে উপেন বলিল, “দি জবাব । সে জবাব দিচ্চে ব'লে কি লম্পট মাতালের হাতে মেয়ে দিতে হবে ?” তাহার কুটিপূর্ণ মুখের দিকে চাহিয়া মৃদুহাস্যসহকারে নলিনীর মা বলিলেন, “তা বাবা, এই কলকাতা সহরে ক’টা লােক মাতাল ক’টা ছেলে নেশাখাের নয় ? এক তুমি ছাড়া তেমন ছেলে তাে দেখতেই পাই না।”

গাঁটছড়া
উপেন মাথাটা নীচু করিয়া নীরবে আহারকার্য সম্পন্ন করিতে
গিল। নলিনীর মা বলিলেন, “কিন্তু তােমার মত ছেলের হাতে
বে, তেমন কপাল ক'রে আমি এসেছি কি ?”
উপেনের গাম্ভীৰ্যপূর্ণ মুখের উপর দিয়া যেন একটা শিহরণের
‘দ্যুৎ চমকিয়া গেল। তাহা লক্ষ্য করিয়া ঈষৎ উৎফুল্ল কণ্ঠে নলিনীর
: বলিলেন, “যে দিন থেকে তােমাকে কুড়িয়ে পেয়েছি, সে দিন
থেকেই বড় সাধ, তােনাকে যেমন আপন ভেবে আসছি, তেমনি খুব
আপনার করে ফেলি। কিন্তু সেটা মুখ ফুটে বলতে তাে সাহস
মুখ না
তুলিয়াই যেন নিতান্ত ব্যগ্রকণ্ঠে উপেন জিজ্ঞাসা করিল,
:কন সাহস হয় নি ?”
নলিনীর মা বলিলেন, “কি জানি বাবা, পরের ছেলে, কি মনে
কনবে। হয়তাে ভাববে, নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যেই এরা এতটা
যত্ন দেখাচ্ছে।”
উপেন বলিল, “মনে মনে পর ভেবে রাখলে এ ভয়টা আসতেই
পারে।”
একটু লজ্জার হাসি হাসিয়া নলিনীর মা বলিলেন, “আমাকে
১কিয়েছ বাবা, কিন্তু শুধু যে পর ভাবি বলেই কথাটা বলতে পারি নাই,
তা নয়।”
উপেন জিজ্ঞাসা করিল, “তা ছাড়া বার আর কি বাধা আছে ?”
নলিনীর মা মাথাটা নীচু করিলেন এবং নিতান্ত বেদনাজড়িত
কতে বলিলেন, “বাধা একটু আছে বৈ কি বাবা, নলি আমার
ফুটন্ত পারিজাতফুল। কিন্তু কপালদোষে সে ফুল কাটা
ফুল কঁাটা গাছে
জন্মেছে।”

গাঁটছড়া তাঁহার বক্তব্যটুকু বুঝিয়া লইতে উপেনের বিলম্ব হইল বুঝিবামাত্র তার হর্ষ প্রফুল্ল মুখমণ্ডল মুহুর্তের জন্য বিষাদের অন্ধকারে মলিন হইয়া আসিল। কিন্তু মুহূর্ত পরেই তাহা প্রফুল্লতায় প্রােজ্জ্ব হইয়া উঠিল। প্রদীপ্তমুখে উপেন বলিল, “ভাল ফুল প্রায় কাটাগাছে জন্মে থাকে, আর তাকে পেতে হলেই কাটার আঘাত সহ্য কতে হয়।” আশাপ্রফুস্বরে নলিনীর মাতা বলিলেন, “তা হলে কি বাৰ, এ কাঁটার আঘাত তুচ্ছ জ্ঞান করে আমার নলিকে গ্রহণ কত্তে প্রস্তুত আছ ?” এই প্রশ্নের উত্তর উপেন সহসা দিতে পারিল না। দরিদ্র ভিক্ষুকে সহসা লক্ষপতি হইবার সম্ভাবনা হইলে, অতিশায়িত আনন্দের আবেশে যেমন তাহার বাক্শক্তি রুদ্ধ হইয়া যায়, বামন সহসা পূর্ণিমার চঁাদকে কাছে পাইলে হর্ষে বিস্ময়ে যেমন তাহার ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়াশক্তি র-৭, হইয়া আইসে, উপেন্দ্রের অবস্থাও অনেকটা সেইরূপ হইয়া আসিল বিস্ময়-বিজড়িত আনন্দে তাহার বর্গের স্পন্দন এত দ্রুততর হই আসিল যে, তাহার মনে হইল, বক্ষের সে দ্রুত স্পন্দনশব্দ বু” নলিনীর মাতার কাছেও গোপন থাকিতেছে না। অভূতপূৰ্ব্ব বিস্ময়াননা বিমূঢ় হইয়া উপেন যেন স্পন্দনহীনের ন্যায় রুদ্ধশ্বাসে বসিয়া রহিল। নলিনীর মাতা তাহার স্তব্ধ মুখের উপর তীক্ষ্ণদৃষ্টি স্থাপন করিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “তা হ'লে উপেন, নলিনীকে তুমি পারে রাখবে, এমন আশা কি আমি কত্তে পারি?” উপেন বহুকষ্টে হৃদয়ের আবেগটাকে চাপিয়া, ধরা গলায় উত্তর দিল, “কিন্তু মা, আমি কি নলিনীর যােগ্য পাত্র ?” ১৩২ গাঁটছড়া নলিনীর মা হাসিয়া উঠিলেন ; বলিলেন, 'ক্ষ্যাপা ছেলের কথা শােন। যাক্, কাল তা হলে পুরুত ঠাকুরকে ডাকিয়ে দিন ঠিক করে কেলি। শুভকাজে বিলম্ব করা ভাল নয়।” নলিনীর মা একটা আরামের নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন। উপেন একচুমুকে দুধের বাটিটা খালি করিয়া উঠিয়া পড়িল । সে দিন উপেন আর নলিনীর ঘরে গিয়া গল্প করিতে বসিল না ; হারান্তে নিজের ঘরে আসিয়া শুইয়া পড়িল । কি আশ্চৰ্য, যে নলিনীকে সে কত দূরে দেখিয়াছিল, সেই নলিনী হ'র এত কাছে ? যাহাকে পাইবার আশা সে একদিন মনের ভতরে আনিতেও সাহস করে নাই, কোন দিন স্বপ্নেও ভাবিতে পারে •ই, সেই নলিনী তাহার হস্তগত! নলিনীকে লাভ করিবার সৌভাগ্য শুধু তাহার একটা ইঙ্গিতের অপেক্ষা করিতেছিল মাত্র ! ইহা সত্য না স্বপ্ন ? সত্য হইলেও ঠিক যেন স্বপ্নের মতই মনে হয়। এই * গুণশালিনী সদানন্দময়ী নলিনী তাহার স্ত্রী হইবে, এমন সৌভাগ্যের শণ সে যে ভাবিতেই পারে না। একদিন তাহারই সহিত মেনীর সেই কুৎসিত মেয়েটার বিবাহের কথা হইয়াছিল, আর তাহা লইয়া গৌরী কতই না উপহাস করিয়াছিল, গাঁটছড়া পর্যন্ত বাঁধিয়া দিয়াছিল। আজ গৌরী কোথায় ? উপেনের ইচ্ছা হইল, সে ছুটিয়া গিয়া গৌরীকে ডাকিয়া আনে, এবং নলিনীকে দেখাইয়া, গৌরীর উপহাসের প্রত্যুত্তরে কঠোর উপহাসের হাসি হাসিয়া বলে, “দেখ, গৌরি, আমার ক’নে পথ ! তুই বলেছিলি, মেনীই আমার উপযুক্ত ক’নে। কিন্তু দেখ, আমার উপযুক্ত ক’নে কে তার সামনে তুইও দাড়াতে পারবি না।” গৌরীকে যেন সম্মুখে রাখিয়া, তাহাকে আপনার ভাবী পত্নীর সৌন্দৰ্য্য দেখাইতে দেখাইতে উপেন প্রাণের ভিতর একটা অস্বাভাবিক গাঁটছড়া ; উল্লাস উপভােগ করিতে লাগিল, এবং গৌরীর লজ্জাবিলি মুখখানা তাহার সেই কল্পিত আনন্দের মাত্রাকে আরও বর্জিত করিয়া দিল। নলিনী তখন নিজের ঘরে বসিয়া গাহিতেছিল,- “বঁধূয়া, কি আর কহিব আমি । জনমে জনমে জীবনে মরণে প্রাণনাথ হ’য়াে তুমি।” উপেন কান খাড়া করিয়া, মৃদুশ্বাসে শুনিতে থাকিল, নলিন যেন তাহাকে উদ্দেশ্য করিয়া প্রার্থনাকাতর কণ্ঠে গাহিতেছে- তােমার চরণে আমারি পরাণে লাগিল প্রেমের ফঁাসি, কুল-লাজ-ভয় সকলি তেয়াগি হইনু তােমারি দাসী।” উপেনের হৃদয়ে সপ্ত সমুদ্রের তরঙ্গ উঠিতে পড়িতে থাকি, এবং সেই তরঙ্গে আপনাকে ভাসাইয়া দিয়া সে স্বপ্নরাজ্যে বিচর করিতে লাগিল। পরদিন উপেন আপিসে বসিয়া গৌরীকে একখানা চিঠি লিখিল- “গৌরি, আছে রবিবারে আমার বিয়ে ; তােমার গাঁটছড় বাঁধবার নিমন্ত্রণ রইলাে। একদিন তুমি মেনীর সঙ্গে মিথ্যা গাঁটছড়া বেঁধে দিয়েছিলে, কিন্তু এবার যার সঙ্গে আমার সত্যিকার গাঁটছড়। বাধা হবে, তাকে দেখলে লজ্জায় তুমি গলায় দড়ী দেবে কি না, । তা তুমি লজ্জায় গলায় দড়ীই দাও, আর রাগে ঘরের ভাত বেশীই খাও, অবশ্য অবশ্য এসে নিমন্ত্রণ রক্ষা —তােমার উপীনা। পত্রখানা ডাকে ফেলিয়া দিয়া উপেন মনে মনে যথেষ্ট আমােদ উপ- ভােগ করিতে লাগিল। জানি করবে। ইতি ১৩৪

গাঁটছড়া
“তােমার চিঠি এয়েচে উপীনদা!”
উপেন ব্যস্ততা সহকারে নলিনীর হাত হইতে চিঠিখানা লইয়া
খাম ছিড়িয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। পড়িতে পড়িতে তাহার
মুখখানা তরল হাস্যে প্রোজ্জ্বল হইয়া উঠিল। নলিনী জিজ্ঞাসা করিল,
“কার চিঠি উপীনদা ?”
চিঠির উপর হইতে মুখ না তুলিয়াই উপেন উত্তর দিল,
“গৌরীর চিঠি।”
“গৌরী কে ?”
পত্রপাঠ শেষ করিয়া উপেন সংক্ষেপে গােরীর পরিচয় দিল।
নলিনী জিজ্ঞাসা করিল, “সে এমন কি লিখেছে যে, তাই প'ড়ে তুমি
এত হাসচো ?”
উপেন বলিল, “হাসির কথাই লিখেছে, তাই হাসচি। পড়ে দেখ না।”
উপেন চিঠিখানা নলিনীর হাতে দিল। মােটা মােটা আঁকা-
বাঁকা অক্ষরে লেখা চিঠিখানার উপর কৌতুহলপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ
করিয়া নলিনী পড়িতে লাগিল,-
“আড়ি, আড়ি, আড়ি! আমার ঘটকালি বুঝি তােমার পছন্দ
হ’লল না উপীনদা, তাই তুমি নিজে সুন্দরী কনে পছন্দ করে আমাকে
গাঁটছড়া বাঁধবার নেমন্তন্ন করেছ ? বােয়ে গেছে আমার গাঁটছড়া
বাঁধতে, আমি তােমার নেমন্তন্ন ফিরিয়ে দিলুম। যাকে দেখলে
লজ্জায় আমার গলায় দড়ী দিতে ইচ্ছা হবে, আমি যাব তার গাঁটছড়া
বাঁধতে! তুমি তােমার সুন্দরী ক’নে নিয়ে থাক, আমি আমার
গাঁটছড়ার সরঞ্জাম শিকেয় তুলে রাখলুম।
১৩৫

গাঁটছড়া “কি এমন সুন্দরী গা; যার রূপ দেখে তুমি আমাকে গলায় দড়ী দিতে বলেছ ? আরে আমার সুন্দরী রে! শুতে পাই, মানুষ কামরূপে গেলে সেখানকার ডাকিনীরা তাকে ভেড়া করে রাখে। কলকাতাতেও না কি ঐ রকম ডাকিনী অনেক আছে। তুমি তাদের পাল্লায় পড়েছ নাকি? তা যদি পড়ে থাক, তা হলে তাে তুমি তাকে স্বর্গের বিদ্যাধরীই দেখবে। তা স্বচ্ছন্দে দেখ, আমার তাতে একটুও ক্ষতি নাই। “বৌদিকে তােমার চিঠি শােনাতে, তিনি তত ভেবেই আকুল। বলেন, উপনে নিশ্চয় ডাকিনীর পাল্লায় পড়েছে। ও-বাড়ীর বড়বৌদি অনেক বুঝিয়ে শুঝিয়ে তাকে শান্ত করেছেন। বড়বৌদি কালীঘাটে পূজা দেবার জন্যে কাল কলকাতা যাবেন। আমি তাকেই তােমার গাঁটছড়া বাঁধবার ভার দিয়েছি। আর একটা খবর তােমায় দিই। মেনী নর-মর, বােধ হয় দু’পাচ দিনের মধ্যেই বেচারী মারা যাবে । তাকে মারলে কে জান ? তার মা। তা মরুক পােড়ারমুখী ; যে এমন কালাে কুচ্ছিত চেহারা নিয়ে জন্মেছে, তার মরাই ভাল কি না, বল দেখি? তুমি না বললেও আমি কিন্তু বলছি, সেমেরুক, মরুক, মরুক। তুমি বােধ হয় আমাকে খুব নিষ্ঠুর মনে কচ্চো উপীনদা ? তা মনে কর তুমি, তবু আমি তাকে মত্তে হুকুম দিচ্চি। সংসারে ঘৃণা ভিন্ন যার আর কিছু পাওনা নাই, তার মরণে দুঃখ কি? তােমার দুঃখ হচ্ছে না কি? তবু ভাল, তােমাদেরও তা হলে মেয়েমানূষের বিশেষ মেনীর মত মেয়ের দুঃখেও দুঃখ হতে পারে ? ‘মাছ মরেছে বেরাল কঁাদে শান্ত করলে বকে। আমি তােমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছি উপীনদা, দুঃখ করাে না, মেনীর জন্যে চোখের জল ফেলল না। তার জন্যে আমার চোখে তাে জল নাই-ই। ইতি শ্ৰীমতী গৌরী।”

গাঁটছড়া
उतू मा
পাঠ শেষ করিয়া নলিনী পত্রখানা উপেনকে ফিরাইয়া দিল। উপেন
জিজ্ঞাসা করিল, “কেমন পড়লে ?”
সহাস্যমুখে নলিনী উত্তর দিল, “চমৎকার !”
উপেন বলিল, “মেয়েটা বড় জ্যাঠা। ওর এই রকম জ্যাঠামী
আমার আদৌ সহ্য হয় না। এর জন্যে কত দিন আমার হাতে মার
খেয়েছে।”
ঈষৎ হাসিয়া নলিনী বলিল, “ভালই হয়েছে। কিন্তু এই মেনী
মেয়েটি কে ?”
উপে।
ও পাড়ার একটা মেয়ে। মেয়েটার বাপ নাই,
'ছে। দেখতে অতি বিশ্রী ।
নলি। এর সঙ্গে বুঝি তােমার বিয়ের কথাবার্তা হয়েছিল ?
উপে। কথাবার্তা এমন কিছু হয়নি। তবে ঐ গৌরী একদিন
খেতে খেতে দুষ্টমী করে তার কাপড়ে আমার কাপড়ে গাটছড়া
বেঁধে দিয়েছিল।
মুখ টিপিয়া হাসিতে হাসিতে নলিনী বলিল, “একেবারে গাঁটছড়া !
তা হলে তাে এক প্রকম বিয়ে হয়েই গিয়েছে।”
উপেনও ঈষৎ হাসিয়া বলিল, “গাঁটছড়া বেঁধে দিলেই যদি বিয়ে
হয়ে যায়,
তবে বিয়ে হয়েছে বৈ কি। শুনে তােমার ভয় হচ্চে
বুঝি?”
নলি। কিসের ভয় ?
উপে। সতীনের!
লজ্জারক্ত মুখে তৰ্জন করিয়া নলিনী বলিল, “যাও, তুমি বড় দুষ্ট !
তােমার সঙ্গে কথা কইবাে না।”
উপে। একটিও কথা কইবে না?
১৩৭

গাঁটছড়া
নলি। না ।
উপে। এই তাে একটা কথা কইলে।
নলি। ভুল হয়ে গিয়েছে।
উপে। প্রতিজ্ঞার প্রথমেই যখন এত ভুল, তখন পরে আরও কত
ভুল হবে কে জানে ?
সলজ হাস্য সহকারে নলিনী বলিল, “বেশী হবে না; হয় তো
আর দু'একটা ভুল হতে পারে।”
হাসিতে হাসিতে উপেন বলিল, “এখনি তাে দু'চারটে হয়ে গেল ।
যা, তােমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি নলিনী।”
কি কথা উপীনদা
উপে। তুমি কি এখনাে আমাকে ‘উপীনদা’ বলে ডাকবে ?
নলি। তবে কি বলে ডাকবাে ?
নলিনীর মুখের উপর সহাস্য দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া উপেন বলিল,
“আচ্ছা, আর দু’টো দিন পরে কি বলে ডাক, দেখা যাবে।”
নলিনী একটু লজ্জার হাসি হাসিয়া ঘাড় নীচু করিল। উপেন
বলিল, “আচ্ছা নলিনী !”
নলি।
?
“কি ?”
“উপীনদা
বলে না?”
কৃত্রিম কোপে মুখখানাকে গম্ভীর করিয়া নলিনী বলিল, “আমি
বলবাে না, আমার খুসী।”
মৃদু হাসিয়া উপেন বলিল, “উত্তম, তােমার যখন যা খুসী, তাই
ব’লাে । এখন জিজ্ঞাসা করি, এ বিয়েতে তুমি কি সুখী হবে?”
মুখ না তুলিয়াই ভারী গলায় নলিনী উত্তর করিল, “কি জানি।”
উপেন বলিল, “কি জানি নয়, বেশ ভেবে চিন্তে দেখ, তুমি কত

গাঁটছড়া
:
লেখা-পড়া জান, কিন্তু আমি মূখ, কুড়ি টাকা মাইনের চাকরী করি ।
আমি তােমাকে সুখী কত্তে পিরবাে, মনে কর কি ?”
নলিনী আরক্ত মুখখানা তুলিয়া তর্জন সহকারে বলিল, “তােমার
সঙ্গে আমি কথা কইবাে না বলেছি, তবে আবার আমাকে এত
জিজ্ঞাসা কচ্চো কেন ?”
বলিয়াই নলিনী যেন ঝড়ের মত ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।
উপেন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাহার গমনপথের দিকে চাহিয়া-চাহিয়া বিছানার
উপর আড় হইয়া পড়িল । আর দুইটা দিন,—দুই দিন পরেই সে
এই নারীরকে কণ্ঠে ধারণ করিয়া জীবনটাকে সার্থক করিতে পারিবে।
তার পর? তার পর কি হইবে, না হইবে, এত ভবিষ্যৎ ভাবি। সে
এমন সুখময় বর্তমানটাকে কিছুতেই উপেক্ষা করিতে পারে না।
বিছানায় আড় হইয়া পড়িয়া উপেন বর্তমানের সুখ-সমর্শ
চিত্রখানা তন্ময়চিত্তে পৰ্যবেক্ষণ করিতে লাগিল ।
সহসা নলিনী
ব্যস্তভাবে গৃহনধ্যে প্রবেশ করিয়া
বলিল,
“তােমাকে কে ডাকচে উপীনদা!”
উপেন তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কোথায় ?
নলিনী বলিল, “রাস্তায় গাড়ীতে বসে রয়েছে।”
উপেন উঠিয়া দ্রুতপদে কে ডাকিতেছে দেখিতে চলিল,
নলিনী তাহার পশ্চাৎ অনুসরণ করিল ।
দরজার বাহিরে গিয়া গাড়ীর দিকে চাহিয়াই উপেন সহর্ষকণ্ঠে
বলিয়া উঠিল, “এ কি, বড়দি যে !”
উপেন ছুটিয়া গিয়া গাড়ীর দরজা ধরিয়া দাড়াইল। কাদম্বিনী
তাহার হাতখানা চাপিয়া ধরিয়া গম্ভীর অনুজ্ঞার স্বরে বলিল,
“উঠে আয় !”
১৩৯

গাঁটছড়া
উপেন সে আদেশের অন্যথা করিতে পারিল না, কাদম্বিনীর
আকর্ষণে আকৃষ্ট হইয়া যন্ত্রচালিতের ন্যায় ধীরে ধীরে গাড়ীর
ভিতর উঠিয়া বসিল । কাদম্বিনী গাড়ােয়ানকে গাড়ী চালাইতে
আদেশ দিল । আদেশ প্রাপ্তিমাত্র গাড়ী ছুটিয়া চলিল। নলিনী
নিস্পন্দভাবে দরজার উপর দাড়াইয়া দ্রুতগামী গাড়ীখানার দিকে
চাহিয়া রহিল ।
e
হাবড়া ষ্টেশনে পৌছিয়া কাদম্বিনী যখন বলিল, “বেশ্যার
মেয়েকে বিয়ে করে আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করবি, না
আমাদের সঙ্গে যাবি উপেন ?”
বড়দির প্রশ্নে উপেন শিহরিয়া উঠিল! তাহার মাথার ভিতর
যেন ঝিম্ ঝিম্ করিতে লাগিল। কি উত্তর দিবে,
দিবে, স্থির
করিতে না পারিয়া সে নীরবে নতমুখে দাড়াইয়া রহিল। তাহাকে
নীরবে থাকিতে দেখিয়া কাদম্বিনী পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল, “চুপ ক'রে
রইলি যে? কি করবি বল্ ? সঙ্গে যাবি?”
তারপর উত্তর দিবার পূর্বেই নীলমণি অগ্রসর হইয়া বলিল, “তুমি
যেমন পাগল, যাবি কি, যেতেই হবে ওকে। এস হে উপেন!”
বলিয়া সে উপেনের হাত ধরিবামাত্র উপেন বিনাপ্রতিবাদে
ধীরে ধীরে গাড়ীতে উঠিয়া বসিল এবং যতক্ষণ
না গাড়ী
ছাড়িল, ততক্ষণ সে গাড়ীর একটি পাশে যেন চোরের মত
আড়ষ্টভাবে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তার পর গাড়ী চলিতে
আরম্ভ করিলে সে ব্যস্তভাবে জানালা দিয়া মুখ বাড়াইয়া ব্যাকুল
নেত্রে পশ্চাদ্বর্তী সহরের দিকে চাহিল। নলিনী এতক্ষণ কি
১৪০

-
গাঁটছড়া
করিতেছে, কে জানে! হয়
জানে! হয় তাে সে উদগ্রীব হইয়া তাহার
প্রত্যাগমনপথের দিকে চাহিয়া রহিয়াছে, এবং এখনও তাহাকে
ফিরিতে না দেখিয়া ব্যাকুল হইয়া পড়িয়াছে। যতই সময় উত্তীর্ণ
হইবে, ততই তাহার ব্যাকুলতা বৃদ্ধি পাইবে। কিন্তু তাহার সে
ব্যাকুলতা নিবারণের কোন উপায়ই এখন আর উপেনের হাতে
নাই! এখনও নলিনী একবারের জন্য ও মনে করে নাই--তাহার
বিশ্বস্ত উপীনদা একেবারে অবিশ্বাসী হইয়া, ইঙ্গিতেও একটা
কথা না বলিয়া, নিতান্ত পরের
মতই চলিয়া গিয়াছে ! যখন
বুঝিতে পারিবে, তখন সে তাহার উপীনদাকে কতটা নিষ্ঠুর
কতদূর অবিশ্বাসী ভাবিয়া লইবে । শুধু ভাবিয়াই লইবে না,
ইহা ভাবিয়া সে কতটা মৰ্ম্মবেদনা ভােগ করিবে । উপেন কল্পনা-
নেত্রে নলিনীর বেদনাকাতর মুখখানা দেখিতে দেখিতে নিতান্থ
চঞ্চল হইয়া উঠিল। তাহার মনে হইল, না, এমনভাবে চলিয়া
যাওয়া ঠিক নয়, অন্ততঃ নলিনীকে একটা কথাও বলিয়া আসা
দরকার। কথাটা মনে আসিতেই উপেন নিতান্ত
নিতান্ত চঞ্চলভাবে
তাড়াতাড়ি উঠিয়া দাড়াইল ।
তাহার পাশে বসিয়া নীলমণি একটা বিড়ি ধরাইয়া তাহাতে মৃদু
মৃদু টান দিতেছিল, উপেনকে সহসা উঠিয়া দাড়াইতে দেখিয়া সে
জিজ্ঞাসা করিল, “কি হে, উঠে দাড়ালে যে?”
তাহার কথায় উপেনের যেন চমক হইল। গাড়ী তখন ষ্টেশন
ছাড়াইয়া পূর্ণবেগে ছুটিয়া চলিয়াছে। উপেন নিতান্ত হতাশভাবে
পুনরায় যথাস্থানে বসিয়া পড়িল। গাড়ী ষ্টেশনের পর ষ্টেশন অতিক্রম
করিয়া ছুটিয়া চলিল ; উপেন গাড়ীর জানালায় মুখ বাড়াইয়া স্তব্ধ
নিস্পন্দভাবে বসিয়া রহিল। তার পর নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছিবার তিনটা
১৪১

গাঁটছড়া ষ্টেশন আগে গাড়ী থামিলে, সে হঠাৎ গাড়ীর দরজা খুলিয়া নামিয়া পড়িল। গাড়ীর ঝাঁকুনিতে নীলমণির একটু তন্দ্রা আসিয়াছিল ; সুতরাং সে কিছুই জানিতে পারিল না। উপেন হঠাৎ কেন যে নামিয়া পড়িল, কি ভাবিয়া নামিল, তাহা নামিবার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত নিজেই ঠিক করিতে পারিল না ; অথচ সে গাড়ীতে পুনরায় উঠিবার জন্য কোন চেষ্টাও করিল না। যেন কি একটা প্রবল আকাঙ্ক্ষা আসিয়া তাহাকে পশ্চাৎ হইতে টানিয়া রাখিল। তার পর গাড়ী যখন ছাড়িয়া দিল, তখন সে ধীরে ধীরে গিয়া ষ্টেশনের একপাশে একখানা বেঞ্চির উপর বসিয়া পড়িল, এবং বসিয়া বসিয়া অতঃপর কর্তব্য কি, তাহাই ভাবিতে লাগিল । অনেকক্ষণ ভাবিবার পর স্থির করিল, আপাততঃ সে কলিকাতাতেই ফিরিয়া যাইবে, এবং নলিনীকে ও নলিনীর মাকে বুঝাইয়া বলিয়া পুনরায় বাড়ী ফিরিবে । সঙ্কল্প স্থির করিয়া উপেন উঠিয়া দাড়াইল এমন সময় ডাউন ট্রেণ আসিবার ঘণ্টা পড়িল । উপেন তাড়াতাড়ি টিকিট কিনিতে চলিল। কিন্তু পকেটে হাত দিয়াই সে চমকিয়া উঠিল। সৰ্ব্বনাশ, পকেটে যে সাতটি মাত্র পয়সা রহিয়াছে! উপেন জিজ্ঞাসা করিয়া জানিল, এখান হইতে হাবড়ার ভাড়া সাড়ে পাঁচ আনা। শুনিয়া তাহার কলিকাতা যাইবার আশা তিরােহিত হইল । এখন দেশে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নাই। কিন্তু দেশে যাইবারই বা উপায় কি ? এখান হইতে চিলেডাঙ্গা ষ্টেশনের ভাড়াও যে তেরাে পয়সা। ছয় পয়সার অভাব। তুচ্ছ ছয়টা পয়সা হইলেও—এখন সেই ছয়টা পয়সাই বা পায় কোথায় ? উপেন নিতান্ত ব্যাকুলভাবে গায়ের জামাটার দিকে চাহিল । কিন্তু যে সার্টখানায় রূপার বােম লাগান ছিল, এটা তত সে জামা নয়, এ যে মােটা পাঞ্জাবীটা । ১৪২ গাঁটছড়া হাটিয়া গেলেও সাত ক্রোশ রাস্তা হাঁটিতে হইবে। সাত ক্রোশ রাস্তা হাটিয়া যাইবার শক্তি থাকিলেও বেলা তখন বেশী ছিল না; যেটুকু বেলা আছে, তাহাতে ক্রোশ দুই রাস্তা না যাইতেই সন্ধ্যা হইয়া আসিবে । উপেন নিতান্ত হতাশচিত্তে ফিরিয়া গিয়া পুনরায় বেঞ্চিখানার উপর বসিয়া পড়িল, এবং বসিয়া বসিয়া নিজে এরূপে নিজের বিপদ ডাকিয়া আনিবার জন্য আপনার বুদ্ধিকে ধিক্কার দিতে লাগিল। কিন্তু যাহা হইয়া গিয়াছে, তাহার আর চার নাই ; এখন যাহা হয় একটা উপায় করিতেই হইবে, এমন নিরুপায়ভাবে বসিয়া থাকিলে চলিবেনা। ভাল, ষ্টেশন-মাষ্টারের কাছে গিয়া নিজের বিপন্ন অবস্থার কথা খুলিয়া বলিলে তিনি কি একটা উপায় করিয়া দিতে পারিবেন ? ষ্টেশনে যে বাবুরা আছে, প্রত্যেকে একটা করিয়া পয়সা দিলে অনায়াসেই তাহার টিকিটের পয়সা কুলাইয়া যাইবে। উপেনের মনে পড়িল, যাত্রার দলে থাকিবার সময় একবার সে এইরূপ বিপদে পড়িয়াছিল । দলের সঙ্গে ট্রেণে যাইতে যাইতে একটা ষ্টেশনে সে জল ইতে নামিলে গাড়ী ছাড়িয়া দেয় ; তখন সে কাদাকাটা করায় ষ্টেশনের বাবুরা দয়া করিয়া তাহাকে দশ আনার টিকিট কিনিয়া দিয়াছিল। এবারে কি আর ছয়টা পয়সা দিবে না ? ষ্টেশন-মাষ্টারের কাছে যাইবার জন্য উপেন উঠিল বটে, কিন্তু সহসা যাইতে পারিল না ; কেমন যেন একটা লজ্জায় তাহার পা দুইটা জড়াইয়া যাইতে লাগিল। উপেন দেখিল, এখন আর সে সেই যাত্রার দলের উপেন নয় ; সে উপেনের সঙ্গে তাহার এখন অনেক পার্থক্য জন্মিয়াছে। এখন হাজার বিপদে পড়িলেও লােকের কাছে গিয়া পয়সা ভিক্ষা করিবার মত সঙ্কোচহীনতা আর নাই। অথচ ভিক্ষা না ১৪৩ গাঁটছড়া করিলেও উপায় নাই। উপেন নিতান্ত ব্যাকুলভাবে ইতস্ততঃ করিতে লাগিল। এমন সময় বরসহ এক দল বরযাত্রী আসিয়া ষ্টেশনে প্রবেশ করিলে, ষ্টেশনের যাবতীয় লোক গিয়া বরকে ঘেরিয়া দাড়াইল। উপেনও কৌতূহলী হইয়া তথায় উপস্থিত হইল, এবং বর দেখিয়া ক্ষোভে বিস্ময়ে সে নিজের চিন্তা আপাততঃ বিস্মৃত হইল। ষাইট বছরের বুড়া, দাঁতের চিহ্নমাত্র নাই, মাথার চুল সাদা হইয়া গিয়াছে, গাত্ৰচৰ্ম্ম লােল, জরাভারে দেহটি বাঁকিয়া পড়িয়াছে। সেই জরাবঙ্কিম দেহখান পট্টবস্ত্রে আবৃত করিয়া বুড়া কোন্ মুখে কোন্ আশায় বিবাহ করিতে চলিয়াছে, বরের দিকে চাহিয়া চাহিয়া উপেন তাহাই ভাবিতে লাগিল। বরের উপর রাগ হইলেও যখন সে জানিতে পারিল যে, ইহার চিলেডাঙ্গা ষ্টেশনে গিয়া নামিবে, তখন সে আপাতত রাগটাকে দূরে রাখিয়া, বরযাত্রীদের সঙ্গে মিশিয়া গাড়ীতে উঠিয়া পড়িল । কিন্তু গাড়ীতে উঠিয়াই বা নিস্তার কোথায় ! ও লােকটা আবার কোথা হইতে হইতে আসিল—ঐ দারােগা ? মাথার টুপীতে চাপরাশ-আঁটা, সাহেবের পােষাক-পরা রেলের দারােগাবাবু, ‘টিকিট, টিকিট’ শব্দ করিতে করিতে পায়ে-পায়ে ক্ৰমশঃ তাহার দিকেই যে অগ্রসর হইয়া আসিতেছে ! এখন উপায়? দারােগা ত ছাড়িবার পাত্র নহে; এখনই আসিয়া উপেনের নিকট টিকিট চাহিবে, দেখাইতে না পারিলেই এতগুলা ভদ্রলােকের সমক্ষে যথেচ্ছা অপমান করিবে। সে অপমান সহ্য করা তাহার একেবারেই অসাধ্য। উপেনের ইচ্ছা হইল, চলন্ত গাড়ীখানা হইতে তখনই লাফাইয়া পড়ে। কিন্তু ইচ্ছা হইলে কি হইবে, জানালা দিয়া মুখ বাড়াইতেই তাহার হৃৎকম্প হইল। হাওয়া ফাড়িয়া রেল ছুটিতেছে—সে সো সে! অতি ভয়ে জানালা ১৪৪ গাঁটছড়া স্বরে হইতে মুখ ফিরাইতেই কি সর্বনাশ! উপেনের নাসিকাগ্রভাগে ডানহাতখানার তর্জনী রাখিয়া রেল-দারােগাবাবু বজ্রগম্ভীর হকিতেছে, “টিকিট, টিকিট ?” উপেনের মুখখানায় সহসা যেন কালি ঢালিয়া দিল। ভীতিবিহ্বল নেত্রে একবার চেকার সাহেবের মুখের দিকে চাহিয়াই পাঞ্জাবীটার পকেটে হাত দিয়া কি বলিতে যাইবে, এমন সময় গাড়ীর ভিতর একটা সােরগােল উঠিল, “বাতাস কর, বাতাস কর” (খক খ খ) “শুয়ে পড় ঘােষজা মশায়, এখনই সেরে যাবে” (খক খক্ ) “ব্যাগতা করি ঘােষজ মশায়, শুয়ে পড়, শুয়ে পড়"-শুতে ( খক্‌ খক্ ) পাচ্ছি-নি—খ খ)—যে—রেঃ, খক্‌ খক্‌ খক্‌-” পিছনের বেঞ্চি হইতে কে একজন বলিয়া উঠিল, “বাঃ, কাতে কাতে লােকটা বুঝি দম আটকে মরে গেল রে!” এবার উপেন মুখ তুলিয়া চাহিল, তখন রেলের চাকার নিকট আর্তনাদের পরিবর্তে মানুষের কষ্টের ‘নেয়াপাতি ডাবের জল—পান, বিড়ি, সিগারেট’ শব্দের সঙ্গে গাড়ীর ভিতরের বহু কথোচ্চারিত হট্টগােলের ভয়ে সারা গাড়ীখানি একেবারে নিথর দাঁড়াইয়া গিয়াছে, সেই ফাকে টিকিটমাষ্টার-রেলদারােগাবাবুটিও বেমালুম অনুহিত ইয়াছে। ‘কে বলে মা কালী নাই--আঃ' বলিয়া পাঞ্জাবীর পকেট হইতে একটি পয়সা বাহির করিয়া একবার কপালে ঠেকাইয়া উপেন কেঁাচার খুঁটে সেটিকে সযত্নে বাঁধিয়া রাখিল, বুঝি চালকের হাতের কানমলা খাইয়া দণ্ডায়মান রেলগাড়ীখানা নিষ্ফল গজ্জন করিতে করিতে পুনরায় ছুটিল । স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া হাস্য-প্রফুল-কণ্ঠে উপেন যাহাকে জিজ্ঞাসা ১০ ১৪৫ গাঁটছড়া করিল, “এখান থেকে চিলেডাঙ্গা যেতে আর কটা ইষ্টিশান আছে মশায় ?”—সে একজন বরযাত্রী। এ সব কথার জবাব দিবার মত অবসর তখন তাহার না থাকিলেও “চিলেডাঙ্গা” নাম শুনিয়া ব্যককে লােকটি উত্তর করিল, “মাঝে একটা, তার পরেই চিলেডাঙ্গা”। কোথায় যাবে তুমি ? “ঐ চিলেঙ্গা।” “চিলেডাল। কোন্ পাড়া ?” “বােসপাড়া।” “তােমরা ?” “কায়স্থ।” উপেনের জাতি-পরিচয় ও বােসপপাড়া-নিবাসী শুনিয়া সহযাত্রীদিগের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া হর্ষোৎফুল্ল-কণ্ঠে লােকটি বলিয়া উঠিল, “থাম হে, সব চুপ কর, গােল করো না, এই দেখ, বুড়াে শিব কেমন জুটিয়ে দিয়েছেন। সকলই বাবা বুড়ােশিবের ইচ্ছা। বুড়াে শিবের দয়া না থাকলে লােকে এক দণ্ড বাঁচতে! ক’নে রইলাে গায়ে, আর বর এই বেলগাড়ীতে। কে জানতত, বিয়ে কত্তে যাবার পথে ব’রর হাঁপানীর টান এমন বেড়ে উঠবে। আর তাও বলি বাপু, জান যে, রাত নটায় লগ্ন ! তােমরাই বা অমন হাঁপ-কাসির রুগীকে ঘন ঘন তামাক সেজে কোন্ সাহসে দিলে ! যাক্, সকলই বুড়াে শিব বাবা ভােলা মহেশ্বরের খেলা। দেখ না, যেমনি হাঁপের টানটি বেশী হওয়া, অমনি কনের বাড়ী থেকে খবর নিতে কেমন লােকটি এসে হাজির !” সহযাত্রীটির কথায় বরযাত্রীর দল সকলেই উৎসুক নয়নে উপেনের দিকে চাহিল। ১৪৬ গাঁটছড়া উপেন বিস্ময়চমকিত দৃষ্টিতে গাড়ীস্থ সকলের মুখের দিকে চাহিয়া আশ্চর্য্যের সুরে বলিয়া উঠিল, “ক’নের বাড়ী থেকে ? কোথাকার ক’নে!” জভঙ্গী সহকারে পূৰ্বব্যক্তিটি বলিয়া উঠিল, “পরেশ মিত্তিরের মেয়ে গাে মশায়। এক গায়ে বাস, কনের বাপকে চেনে না, কেমন ধারা লােক তুমি ? তবে হ্যা, বলতে পারাে, তিনি বহুদিন পূর্বে গঙ্গালাভ করেছেন। তা যিনি যাবেন, তাকে আর কে ধরে রাখবে বলুন। ভাল কথা, তুমি চিলেডাঙ্গার দয়ারাম ঘােষকে চেনাে? আহা, বড় সজ্জন ব্যক্তি। কেবল তার খাতিরেই অমন বাপ-খেকো কালাে কুচ্ছিত মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া, নইলে মধুসূদন ঘােষের এখনও যা নামডাক আর কড়ি আছে, তাতে আসল ছেড়ে কেবল সুদ, সুদ—সুদের কড়ির অদ্দেক অংশ মাপ করলে কত খাতক মেয়ে মাথায় করে এনে এই ‘কুমীরে-বুড়াের সঙ্গে মালা বদল করিয়ে হাতে হাতে মেয়ে- জামাই ঘরে তুলবে। বুড়ো বয়সে অন সবারই এক আধটু সর্দি-কাসি হয়ে থাকে। তা দেখ, ক’নের দলের লােক, তুমি ভেবাে না, আর তাদেরও ভাবতে বারণ করে দাও গে। ইষ্টিশানে পাল্কীর বন্দোবস্ত করেছ ত? তুমি এগিয়ে দাদা খবরটা দাও গে, আমরা সঙ্গে সঙ্গেই গিয়ে পড়চি। আর দেখ, আমাদের জন্যে ভেবাে না। ও বুড়ো শিবের দয়ায় একটু রাত বেশী হলেও আমাদের ক্ষেতি নাই। বাড়ীর খাওয়া-দাওয়ায় বিলম্ব একটু হয় বৈ কি। আমরা তেমন লােক নই, পরে বুঝবে।” তার পর সহযাত্রীদের দিকে চাহিয়া “ওহে, রংমশালগুলাে নিতে যেন ভুল না হয়, টোপর ফুলমালা সাবধান। আহা-হা, অমন হেঁচকা দিয়ে টেনন না, হাজার হােল্ক বয়েস ত হয়েছে, তার উপর সর্দির ভাবটাও একটু জানান দিয়েছে। গাড়ী একেবারে ১৪৭ গাঁটছড়া পড়িল । না থামলে ‘আঁকুপাকু করে কেউ নামবে না। টিকিগুলো সব আমার হাতে দিয়ে দাও, জয় বুড়াে শিবের জয় !” মন্ত্রমুগ্ধের মত উপেন এতক্ষণ কেবল লােকটির মুখের দিকে হাঁ করিয়া চাহিয়াছিল। তারপর গাড়ী ছাড়িবার ঘণ্টা শুনিয়াই তাড়াতাড়ি গাড়ী হইতে লাফাইয়া পড়িল এবং দু’হাতে মাথাটা টিপিয়া ধরিয়া টিকিট-ঘরের পার্শ্বস্থিত খালি বেঞ্চখানার উপর অবসন্নভাবে শুইয়া এ ক’নেট। তা হলে কে ? বাপ-খেকো মেয়ে, আবার কালো কুচ্ছিত, তার উপর আর না কাহার নাম করিল, হাঁ, সেই নামই ত বটে। দয়ারাম ঘােষ ! উপেন ক্ষিপ্তের মত চীৎকার করিয়া উঠিল । মিথ্যা কথা। তা কখনও হইতে পারে না। ওই ঢকৃঢ়কে বুড়ো, ও ত বৈতরণীর খেয়া-পারের যাত্রী! মেনি! মেনি! তাের কপালে কি বিধাতা বিয়ের রাতেই বিধবা হবার কথা লিখে দিয়েছিল ! ভগবান, মেনীকে বাঁচাও! কথাটা মনে উঠিতেই উপেন চমকিয়া উঠিল। , না, মেনী মরু। গৌরীত লিখিয়াছে, ‘মেনী মরমর, দু’পাঁচ দিনের মধ্যেই বেচারী মরিয়া বাইবে। তা মরুক্‌ সে । কে সে আমার ? মনে মনে এই রূপ তােলাপাড়া হইতে থাকিলেও মেনীকে একেবারে কেউ নয় বলিয়া মন হইতে উপড়িয়া ফেলিতে উপেনের সাহসে কুলাইল না। মেনী কেউ না হইলেও একটা কেউ না-কেউ বটে তার উপর সেই দুই মেয়ে গৌরীটার সেই ছেলেবেলার গাঁটছড়া বাঁধিয়া দেওয়ার কথাটা কেমন ঘুরিয়া ফিরিয়া মনের ভিতর কসিয়া কসিয়া আরও বসিয়া যাইতে লাগিল। হউক মেনী কুরূপ কুৎসিত, তবুও তার সেই ব্যথাভরা সজল চক্ষু দু’টার চাহনি, উপেনের চক্ষুর সম্মুখে আজ সে দিনের মতই ভাসিয়া বেড়াইতে লাগিল। না, সে একবার যাইবে, মেনীর মৃত্যু-মলিন মুখখানা সে একবার জন্মের মত । ১৪৮ গাঁটছড়া শেষ দেখিয়া লইবে, সঙ্গে সঙ্গে মেনীর ডঙ্কা বাজাইয়া চলিয়া যাওয়ার কথাটা গৌরীকে ভাল করিয়া বুঝাইয়া বলিয়া আসিবে. দুষ্ট মেয়ে, দেখলি, তাের উপীন-দা হটবার পাত্র নয়, কেমন জায় মজায় বাজীটা মাৎ হয়ে গেল ! এখন তাের মতন দশটা টুকটুকে গৌরী এলে তাের উপীন-দা তােকে গ্রাহ্য ও করবে না। মেনী চলিয়া যাইতে বসিয়াছে, গোরী ও এখন তাহার মন হইতে অনেক দূরে সরিয়া দাড়াইয়াছে, এখন তাের উপীন-দার জীবনের ধ্রুবতারা কে জানিস ?-নলিনী! আগে নলিনীর সঙ্গে বিবাহটা একবার হইয়া যাক, তার পর তাের রূপের বড়াই ভাঙ্গিয়া দিব। তা ত দিব। কিন্তু ঐ যে ঘাটের মড়াটা বিবাহ করিতে চলিয়াছে, কাহাকে গান কাপড় পরাইবার জন্য উহার শুভাগমন, সেটাও ত একবার জানা দরকার। বরযাত্রীটা যেরূপ পরিচয় দিল, তাহাতে উহাকে মেনীর বর বলিয়াই বিবেচনা হয়। কিন্তু গৌরী কিন্তু গৌরী তবে এরূপ পত্র লিখিল কেন? না, ব্যাপারটা ভাল করিয়া বুঝা দরকার হইয়া পড়িয়াছে। উপেন উঠিয়া বসিল, কৈ, বর, বরযাত্রী কেহই ত ইষ্টিশনে নাই ! শিবরাত্রির সলিতার মত লণ্ঠনের ভিতর যে একটি আলাে মিট মিট করিয়া জ্বলিতেছিল, সেটাও কোন ফাকে নিভিয়া গিয়াছে। উপেন উঠিয়া দাড়াইল, তার পর ষ্টেশনের বাহিরে মেঠো রাস্তা ধরিয়া পায়ে পায়ে বরাবর গ্রামাভিমুখে অগ্রসর হইল । কিছুক্ষণ হাঁটিবার পর আলােক-অন্ধকার-মিশ্রিত রসুলপুরের বাজারের সীমানাটা উপেনের দৃষ্টিপথে আসিতেই বেসুরে বেলয়ে গান হাকিল,- “এলে তাের প্রাণ-বঁধূ এলাে। টেনেছ প্রেমের ভুরী লুকিয়ে কোথা থাকবে বলে।” ১৪৯ : গাঁটছড়া কিন্তু তান রেখাব হইতে মধ্যমে উঠিবার পূৰ্বেই একজন আরও বেতালা বৃদ্ধ লােক আসিয়া গানের প্রথম মওড়ার জুটি ভঙ্গ করিয়া পাইতে হঁপাইতে বলিল, “এখানে কবরেজের ঘর কোথা বলতে পারাে মশাই?” “দ্যুৎ তোর কবরেজ, গানটা মাটী করে দিলেন মশায় ! এই অন্ধকার মাঠে কি কবরেজ বসে থাকে, ঐ সামনে বাজার দেখচেন, ঐখানে একটা কবরেজের গুলীর আড্ডা আছে, গােল গােল গুলী, খেতে না খেতেই দাস্ত পরিষ্কার হয়ে যাবে, যান।” গভীর বিষ্ময়ে আগন্তুক বলিল, “দাস্ত কি মশাই, সর্দি-গৰ্মী। অনেকটা পথ হেঁটে রসুলপুরের বাজারে এসে দাদা মশাই আমার গলদঘর্ম লেগে হাঁপিয়ে পড়েছে, তাই একটু রসসিন্দুরের খোজ- তল্লাস কচ্চি, বলি কাছে-পিঠে যদি কেউ কবরেজ থাকে, যদি একটু জোগাড় কত্তে পারি।” তাহার কথা শুনিয়া উপেন সােল্লাসে হাসিয়া উঠিল। এ বুড়ােটাই কতজনার দাদা মশাই, এর আবার দাদা মশাই, অসুখ আবার তার সর্দি-গৰ্মী। তা ওষুধের ব্যবস্থাটাও হইয়াছে ভাল। তার পর সেই বুদ্ধের দিকে চাহিয়া বিদ্রুপ-তরল কণ্ঠে বলিল, “এমধ আর বােধ হয় দরকার হবে না। কারণ, তিনি নিজেই এখন রসসিন্দুর হয়ে দাড়িয়েছেন। নিদানসময়ে শ্লেষ্ম-ধাত গরম করবার জন্যে লােকে ঐ ওষুধটা খাইয়ে থাকে। তা আপনার দাদা মশাইএর যখন শ্লেষ্মা, গরম দু’টাই একসঙ্গে দেখা দিয়েছে, তখন তিনিই স্বয়ং মকরধ্বজ ; আর আপনাদের মত ছােট ছােট নাতিপুতির দল তার পা-ধােয় জল খেলে বিষে বিষক্ষয় হয়ে তিনিও বেঁচে যাবেন, আর আপনাদেরও বাড়- বাড়ন্ত হবে, অক্ষয় অমর হয়ে আপনারা চারযুগ এই পৃথিবীতে থাকবেন।” ১৫০

গাঁটছড়া
বিরক্তিকুঞ্চিত মুখে বৃদ্ধ বলিল, “তামাসা কচ্ছাে মশাই!
তামাসার কথা নয়, গাঁ সম্পকে তিনি আমাদের দাদা মশাই হন, এ কথা
গা-শুদ্ধ লােক সবাই জানে।” বলিয়া যে পথ হইতে আসিয়াছিল
সেই বাজারের পথেই পুনঃ প্রত্যাবর্তন করিল। আর অপয়া গানটায়
বাধা পাইয়া উপেন তাহার পুরাণে সাধা গান হাকিতে হাকিতে
চলিল,-
“তােরা যাসনে যমুনালে সই লো, ফিরিয়ে আয়।"
ক
দয়ারাম বলিল, “উপেনের ব্যাপার শুনেছ কুসুম?”
গম্ভীর মুখে কুসুম উত্তর করিল, “বেউশের মেয়েটাকে বিয়ে
করেছে তাে ?”
দয়ারাম বলিল, “ই, বিয়ে করে বে নিয়ে সে আসছে, তুমি
বরণডালা সাজিয়ে রাখ।”
ক্রোধসূচক প্রভঙ্গী করিয়া কুসুম বলিল, “বােয়ে গিয়েছে আমার
বরণডালা সাজাত। যার বেশ মাথাব্যথা,
সেই বরণডাল।
সাজাবে।”
ঈষৎ হাসিয়া দয়ারাম বলিল, “তুমি তার দিদি, তােমার চেয়ে কার
মাথাব্যথা বেশী হবে ?”
ভারীমুখে কুসুম বলিল, “আমি তার দিদি বলেই আমাকে এত কথা
শােনাচ্চো, এত টিটকারী দিচ্চো, না?”
অভিমানের আবেগে কুসুমের চোখ দুইটা জলে ভরিয়া আসিল।
তদ্দর্শনে দয়ারাম বলিল, “সৰ্ব্বনাশ, তুমি কেঁদে ফেললে যে ছােট বৌ!”
অশ্রুগদগদ কণ্ঠে কুসুম বলিল, “আমার ভাই সে, তাই আমার কান্না
১৫১

গাঁটছড়া
আসছে। তােমার ভাই যদি এই রকম কত্তো, তবে তােমায়াে কান্না
আসত কি না দেখে নিতাম।”
কুসুমের চোখ দিয়া টপ টপ অশ্রুবিন্দু গড়াইয়া পড়িল। দয়ারাম
তাহার মর্মবেদনা হৃদয়ঙ্গম করিয়া একটু লজ্জিত হইল ; বলিল, “তােমাকে
কাদতে হবে না, বিয়ে হয় নি এখনাে, আমি রহস্য কচ্ছিলাম।”
আঁচলে চোখ মুছিয়া কুসুম বলিল, “তােমার কোষ্টা রহস্য, কোষ্টা
সত্যি, বােঝা দায়।”
দয়ারাম বলিল, “দায় হলেও বিয়ে যে হয়নি, এটা সত্যি কথা।”
কুসু। তুমি খবর পেলে কোথা থেকে ?
দয়া। নীলমণি-দা আর বড় বৌ কলকাতা গিয়েছিল না? তারা
এইমাত্র ফিরে এসেছে।
কুমু। তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে ?
দয়া। দেখা হওয়া ছেড়ে বড় বৌ তাকে সঙ্গে করে নিয়ে
আসছিল, গাড়ীতেও উঠেছিল ; তার পর রাস্তার মাঝে কোথায় গাড়ী
থেকে নেমে পালিয়েছে।
একটু উদ্বেগের সহিত কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “নেমে পালিয়ে
গেল কেন?”
দয়ারাম বলিল, “বােধ হয় লজ্জায়। ঐ যে বেউশের মেয়েকে বিয়ে
কত্তে চেয়েছিল না ?”
কুসু। কিন্তু নেমে গেল কোথায় ?
দয়া। তা তাে ওরা বলতে পারলে না। নেমে কলকাতায় ফিরে
যেতে পারে, দেশেও আসতে পারে।
কুসু। দেশে এলে ওদের সঙ্গেই আসতাে। তা হলে কলকাতাতেই
ফিরে গিয়েছে।
১৫২

গাঁটছড়া
একটু ভাবিয়া দয়ারাম বলিল, “তাই সম্ভব।”
উদ্বিগ্নভাবে কুসুম বলিল, “তা হ'লে রাস্তা থেকে যখন ফিরে গিয়েছে
তখন এবার নিশ্চয়ই বিয়ে করবে।”
দয়ারাম বলিল, “আমারও সেই রকমই মনে হচ্চে। বড়বােয়ের
ধরাবাধায় মুখ এড়াতে না পেরে সঙ্গে এসেছিল। কিন্তু তাদের মায়া
তুলতে না পেরে চুপে চুপে নেমে পালিয়েছে। বেশ্যার মায়া,
বেশ্যার মায়া, ডাকিনীর
মায়া, ওরা যে সাক্ষাৎ ডাকিনী।”
কুসুম বলিল, “এখন ডাকিনীদের হাত থেকে তাকে উদ্ধার করবার
উপায় কি ?”
চিন্তিতভাবে দয়ারাম বলিল, “দেখছি, নিজে একবার না গেলে
উপায় হবে না।”
ব্যস্ততার সহিত কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “যাবে তুমি?”
দয়ারাম বলিল, “যেতে পারি, কিন্তু আজকাল দু’টো দিন তােত
নয়। আজ মেনীর বিয়ে।”
কুসুম বলিল, “মেনীর বিয়ে, তাতে তােমার কি ?”
কুসুমের কথয় বিস্ময় প্রকাশ করিয়া দয়ারাম বলিল, “কও কথা,
আমিই এ বিয়ের ঘটক। শুধু ঘটক কেন, কন্যাকৰ্ত্তা বরকর্তা দুই।
আমি না থাকলে চলে ?”
রাগতভাবে কুসুম বলিল, “তা তাে চলে না, কিন্তু আজ যদি সে
বিয়ে করে ফেলে, তুমি কাল গিয়ে কি করবে ?”
দয়ারাম তাহাকে শান্ত করিবার অভিপ্রায়ে বলিল, “না না, আজই
বিয়ে করবে, এমনই কি কথা আছে? আজ সাড়ে পাঁচটার গাড়ীতে
ফিরে গেলেও কলকাতায় পৌছুতে তার রাত আটটা বেজে যাবে।
আজ কি আর বিয়ে হতে পারে ?”
।

গাঁটছড়া
রাগে ঘাড় দোলাইয়া কুসুম বলিল, “তুমি ঘরে বসে খড়ি পেতে
বলছে হ'তে পারে না, কিন্তু হয়ে গেলে কি করবে?”
চিন্তিতভাবে মাথা নাড়িয়া দয়ারাম বলিল, “কি আর করবাে।
তবে বিয়ে হােক আর নাই হােক, আজ তাে আমি কিছুতেই যেতে
পারি না।”
গম্ভীরমুখে কুসুম বলিল, “যেতে যে পারবে না, তা আমি বেশ
জানি।”
দয়া। কিসে জানলে ?
কুসু। সে তােমার মা’র পেটের ভাই নয় ।
দয়া। মা’র পেটের ভাই হ'লেই কি আজ যেতাম মনে কর?
কুসু। হাজার কাজ ফেলে ছুটে যেতে।
কুসুমের স্বরটা অভিমানে গাঢ় হইয়া আসিল। দেখিয়া দয়ারাম
ঈষৎ হাসিয়া বলিল, “মা’র পেটের ভায়ের ওপর তােমার যে এতটা
দরদ আছে, এটা দেখেও সুখী হলাম ছােটবে। কিন্তু এই দরদটুকু
যদি আগে দেখাতে ? যদি আমার ভাত খাওয়ায় তার অপমান নাই
বুঝে তাকে বাড়ী-ছাড়া না কত্তে ?”
আপনার ভুল বুঝিতে পারিয়া ঈষৎ লজ্জিতভাবে কুসুম বলিল,
“তখন কি জানি, হতভাগা চাকরী কত্তে গিয়ে এই কাণ্ড বাধিয়ে
বসবে ?”
দয়ারাম বলিল, “এটা তাে খুব ছােটখাট কাণ্ড। চেয়েও
গুরুতর কাণ্ড যে বাধিয়ে বসে নাই, তাই যথেষ্ট। কলকাতা
সহর, প্রলােভনের জায়গা ; সেখানে ওর মত ছােকরাদের একা ছেড়ে
দিতে আছে ?”
স্বামীর উক্তির যাথার্থ্য হৃদয়ঙ্গম করিয়া কুসুম বলিল, “যা হবার
১৫৪

পাটছড়া
হয়ে গিয়েছে, এখন ফিরিয়ে এনে তুমি তার বিয়ে দাও, ইচ্ছা কর,
আমি আর কোন কথাই কইবাে না।”
দয়া। কইবে না ?
কুসু। না ।
দয়া। যদি মেনীর মত মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয় ?
কুসু। মেঠো পেত্নীর সঙ্গে বিয়ে হলেও আমার আপত্তি নাই।
দুঃখে নৈরাশ্যে দয়ারামের ভ্রাগল কুঞ্চিত হই। হায়, কুসুম
যদি আগে এতটা বুকিত, তাহা হইলে মেনীর মায়ের প্রতিশ্রত
সাত শশা টাকা কি হাতছাড়া হয় ? অদষ্ট! দয়ারাম তখন পন্নীকে
সান্ত্বনা দিয়া বলিল, “তােমার কোন চিন্তা নাই ছােটবে, বিয়ে না
হতেই আমি তাকে ফিরিয়ে আনবাে। কিন্তু আজ যদি বড়বোয়ের
সঙ্গে হতভাগা এসে পড়তাে।”
কুসুম জিজ্ঞাসা করিল, “এসে পড়লে কি হতাে?
দয়া। তা হলে আজ এই লগ্নেই মেনীর সঙ্গে তার বিয়ে লাগিয়ে
দিতাম।
কুসু। আর যে বর বিয়ে কত্তে আসতাে ?
দয়া।
সে হাতে সূতাে বেঁধে শিশুপালের নত ফিরে যেতো।
দয়ারাম হা হা করিয়া হাসিয়া উঠিল। কুসুম হাসিতে হাসিতে
বলিল, “তা হলে তােমার ঘটকবিদায়টাও সে ভাল রকমে দিয়ে
যেতাে।”
দয়ারাম বলিল, “নন্দ রকম হলেও সে ক্ষতিটা তােমার কাছে
পূরণ করে নিতে পারতাম।”
সহাস্যমুখে কুসুম বলিল, “তা পারতে বৈ কি। তােমার মত ঘটককে
আমি ভাল রকমই বিদায় দিতে জানি।”

গাঁটছড়া দয়ারা বলিল, “তুমি দিতে না জানলেও আমি আদায় করে নিতে জানি।” ঠেট ফুলাইয়া কুসুম বলিল, “আচ্ছা, খুব বাহাদুর তুমি। এখন উপনেকে ফিরিয়ে নিয়ে এল দেখি, তবে তােমার বাহাদুরী বুঝবাে।” বলিয়া কুসুম সবেগে মুখটা নুরাইয়া লইল। দয়ারাম হাসিতে হাসিতে উঠিয়া বিবাহ বাড়ীর দিকে রওনা হইল। “আয় মেনী, তকে সাজিয়ে দিই।” বিবাহবাড়ীতে উৎসবের সাড়াশব্দ ছিল না, কুটুম্বকুটুম্বিনীগণের আনন্দকল্লোলে গৃহ মুখরিত হইতেছিল না, কটাহবিক্ষিপ্ত ঘৃতের মিষ্ট গন্ধে আকৃষ্ট হইয়া প্রতিবেশিগণ মধুগন্ধলুব্ধ মধুকরের ন্যায় ইতস্ততঃ ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল না। কেবল পাড়ার দুই চারিটি মেয়ে--বুড়াে বর দেখিয়া কৌতুকপ্রবৃত্তি চরিতার্থ করিবার আশায় অযাচিতভাবে বিবাহবাটীতে উপস্থিত হইয়াছিল, এবং নিস্তারিণী কর্তৃক অনুরুদ্ধ হইলেও বিবাহের আয়ােজনে ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিল। সঙ্গে সঙ্গে নিস্তারিণী কর্তৃক কষ্টে আহৃত জিনিষপত্র দেখিয়া নাসিকাকুঞ্চনে নিস্তারিণীকে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিয়াছিল। “ও মা, গড়ে-মালা দুছড়া আর পাওয়া গেল না? বরের এ কি জোড় ? আজকাল বাদীদের ঘরেও বরকে এর চেয়ে যে ভাল কাপড় দেয়। পাঁচ আনা দামের টোপর—তা পাকা চুলে পরিবার উপযুক্ত টোপর বটে; বরের জল- খাবার এখানে না পাওয়া যায়, নতুন গঞ্জের বাজার হইতে আনাইলেও ততা চলিত, দন্তহীন বর শুধু মেড়ের জোরে এ চিনির ডেলা ভাঙ্গিতে পারিবে কেন? হাে না কালাে মেয়ে, চার গণ্ডা পয়সার পাউডার গাঁটছড়া আনাইলে আজ রাত্রে কে উহাকে কালাে বলিয়া ধরিতে পারিত ?” প্রতিবেশিনীদিগের এইরূপ উপহাসপূর্ণ তীব্র মন্তব্যগুলা নিস্তারিণীর বুকে শেলের মত বিদ্ধ হইলেও নিস্তারিণী সহাস্যমুখেই যাহাতে কোনরূপে চার হাত এক হয়, তাহারই উপায় করিবার জন্য সকাতরে সকলকে অনুরােধ করিতেছিলেন। মেনী একপাশে চুপ করিয়া বসিয়া মাতার এই লাঞ্ছনা প্রত্যক্ষ করিতে করিতে ক্ষোভে দুঃখে মৰ্ম্মে মৰ্ম্মে দ হইতেছিল। গৌরী পাড়ার মেয়ে। সেও মেনীর বুড়া বর দেখিয়া কৌতু উপভােগ করিবার লােভ সংবরণ করিতে পারে নাই। সুতরাং অন্যান্ট রমণীদের সঙ্গে গৌরী ও উপস্থিত হইয়াছিল। কিন্তু কোনরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিতে পারে নাই, শুধু নিষ্কাভাবে এ দিকে সে দিকে ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। কিন্তু শুধু শুধু এরূপে ঘুরিয়া বেড়াইতে ভাল লাগিল না। খানিক ঘুরিয়া ফিরিয়া সে মেনীর কাছে গিয়া বলিল, “আর মেনি, তােকে সাজিয়ে দিই।” মেনীর কিন্তু তখন সাজিবার প্রবৃত্তি আদৌ ছিল না, মাতার লাঞ্ছনা তাহাকে নিতান্ত কাতর করিয়া তুলিয়াছিল। সুতরাং-গৌরীর সাজাইবার ইচ্ছার উত্তরে সে মুখ বাঁকাইয়া বলিল, “না।” সাজসজ্জায় তাহার আপত্তি কোন দিন না থাকিলেও আজ বিবাহের দিনেও তাহাকে সাজিতে অনিচ্ছুক দেখিয়া গৌরী ঈষৎ হাসিয়া বলিল, “আ মরণ, আজ বিয়ের দিনেও একটু সাজগােজ করবি না?” দৃঢ়স্বরে মেনী উত্তর করিল, “না।” গৌরী বলিল, “তবে এই চেহারাতেই গিয়ে বিয়ের আসরে বসবি ?” নতমুখে গম্ভীরকণ্ঠে মেনী উত্তর দিল, “হ।” ১৫৭ গাঁটছড়া - গৌরী একটু হাসিয়া বলিল, “কেন বল্ দেখি, বুড়া বর হয়েছে এই দুঃখে ?” মেনী নিরুত্তরে মুখ তুলিয়া গৌরীর মুখের উপর সকাতর দৃষ্টি নিক্ষেপ করিল। বালিকা হইলে ও গৌরী সে দৃষ্টির অর্থ কতকটা বুঝিল । আহা, হাজার কুরূপ কুৎসিত হউক, মানুষ তাে বটে, আর সকল মানুষের মতই তাে সে সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়া থাকে। মেনীর উপর গৌরী কোন দিনই প্রসন্ন ছিল না; কিন্তু যে দিন সে শুনিল, একটা স্থবির বুড়ার সঙ্গে নেনীর বিবাহ হইবে, সেই দিন হইতেই তার প্রাণে যেন আপনা হইতেই মেনীর প্রতি কেমন একটা সগনুভূতি জাগিয়া উঠিল। তার মনে হইতে লাগিল, ইহা মেনীর বিবাহ নয়, বলিদান। ছি ছি, মেনীর না কি নিষ্ঠুর ! আজ আবার মেনীর কাতর দৃষ্টিটা তাহার চিত্তকে সম্পূর্ণ আল করিয়াছিল, এবং সে বুড়া বরের উল্লেখ করিয়া যে ভয়ানক অন্যায় করিয়াছে ইহা বুঝিয়া লজ্জিত হইয়া পড়িল ! তাহার মনে হইল, মেনী যেন এই কাতরপূর্ণ দৃষ্টি দ্বারা নীরব ভাষায় আপনার প্রাণের বেদনা ব্যক্ত করিয়া কঁদিতে কাদিতে বলিতেছে, “ওগাে, আমি তাে লবিতেই বসিয়াছি, তােমরা আর মরার উপর খাড়ার ঘা দিও না।” মেনীর বেদনা-বিমলিন মুখের দিকে চাহিতেই গৌরীর চোখ দুইটা সজল হইয়া আসিল। সে আপনার অন্যায়টাকে সংশােধন করিয়া লইবার অভিপ্রায়ে শান্ত কোমলকণ্ঠে বলিল, “তা কি করবি ভাই, এ তো মানুষের হাত নয়, বিধাতার ভবিতব্য। বিধাতার কলম কেউ কি র কতে পারে ?? মেনী ঘাড় নীচু করিয়া নিরুত্তরে বসিয়া রহিল। গৌরী ধীরে ধীরে তাহার পশ্চাতে আসিয়া, পাক দিয়া জড়ান চুলের গােছাটা ১৫৮ গাঁটছড় খুলিয়া দিতে দিতে বলিল, “চুলগুলােকে এ কি করে রেখেছিস্? চি ভাই, আজকার দিনে কি মাথা এমন করে রাখে ?” চুলের গােছা খুলিয়া দিয়া, তেল-চিরুণী লইয়া গৌরী তাহার মাথা বাধিয়া দিতে বসিল। তাহাকে নাছােড়বান্দা দেখিয়া নেী আর কোনরূপ আপত্তি করিল না। নিস্তারিণী কাছে আসিয়া সহঃখে বলিলেন, “দে তো মা, চুলটা বেঁধে, পােড়া মেয়ে কিছুতেই আমাকে নাপায় হাত দিতে দেবে না।” গৌরীও একটু হাসিয়া উত্তর করিল, “তুমি র পছন্দ সই চুল পতে জান না, তাই তাে তােমাকে বাধতে দেয় না নামা না।” “তা তুই পছন্দসই করে বেঁধে দে।" বলিয়া নিস্তারিণী হাসিতে হাসিতে কাৰ্যান্তরে চলিয়া গেলেন । চুলের গোছার উপর চিরুণী চালাইতে চালাইতে গৌরী ডাকিল, “ ভাই মেনী !” কি সুমিষ্ট সম্বোধন! গোৱীর মুখে এমন সুমিষ্ট গােপন মেনী আর কখন শুনে নাই ; আজ শুনিয়া আনন্দের উচ্ছাসে তাহার চোখ দুইটা জলে ভরিয়া আসিল। অশ্রদগদক উত্তর দিল, “কেন ভাই গৌরি ?” “তোর বড় দুঃখু হচ্চে, না?” “কিসের দুঃখ ভাই ?” তিরস্কারের স্বরে গৌরী বলিল, “আ নর, কিসের দুঃখ্য, আমি যেন জানি না। সত্যি, ভাই, আমি হলে তাে কেঁদেই ভাসিয়ে দিতাম।” ম্লান হাসি হাসিয়া মেনী বলিল, “কেঁদে ভাসিয়ে কি করবাে ভাই! তুই ত বললি, যার যেমন কপালের লেখা।” তর্জন সহকারে গৌরী বলিল, “রেখে দে তাের কপালের লেখা। আমি হলে কপালে মুগুর মেরে কপালের লেখা মুছে দিতাম।”

গাঁটছড়া
মেনী মুখ টিপিয়া মৃদু মৃদু হাসিতে লাগিল। তাহাকে হাসিতে
দেখিয়া গৌরীর রাগ হইল ; সে রাগে মেনীর চুলের গােছায় একটা
মৃদু টান দিয়া সকোপ তিরস্কারের স্বরে বলিল, “মুখে আগুন! তুই
হাসচিস মেনী ?”
মৃদু হাস্য সহকারেই মেনী উত্তর করিল, “হাস্বাে না তাে
কাদ্বাে কি ?”
গৌরী বলিল, “কাদিস্ না কঁদি, তাের মুখে যে হাসি আচে
কি করে, তাের হাসি দেখে আমার তাে কান্না পাচ্ছে।”
মেনী বলিল, “কান্না পায়, চুলটা বেঁধে দিয়ে, ঘরে গিয়ে তুই প্রাণ
ভরে কঁা।”
মাথা নাড়িয়া গৌরী বলিল, “শেষ পর্যন্ত না দেখে ঘরে আমি
যাচ্ছি না। বুড়াের পাকা চুলে টোপর কি রকম সাজে, তা আমি
দেখবােই দেখবাে।”
বলিয়া সে ক্ষিপ্রহস্তে চুলের গােছার উপর চিরুণী চালাইতে লাগিল।
চিরুণীর সবেগ সঞ্চালনে কাতর হইয়া মেনী বলিল, “চুলগুলাে আজ
রেখে দিস ভাই!”
ভ্রুকুটি করিয়া গৌরী বলিল, “রেখে কি হবে? বুড়ােকে খোঁপার
বাহার দেখাবি নাকি?”
ঈষৎ হাসিয়া মেনী বলিল, “তাের দেখছি বুড়াের ওপর ভয়ানক
ৰাগ। কেন, বুড়ােরা কি মানুষ নয় ?”
গৌরী বলিল, “মানুষ, কিন্তু বুড়াে মানুষ।”
মেনী বলিল, “মানুষ তাে বটে।”
তর্জন সহকারে গৌরী বলিল, “তাের যে বুড়াের ওপর বড় দরদ
দেখছি।”
১৬০

গাঁটছড়া মেনী বলিল “কপালে যা জোটে, তাই নিয়েই সন্তুষ্ট হওয়া উচিত। অসন্তোষে দুঃখটাকে আরাে বড় করে তােলা হয় মাত্র।” বিরক্তিতে মুখখানাকে বিকৃত করিয়া গৌরী বলিল, “হাগাে পণ্ডিত মশাই তাই হয় বটে, এখন চুপ করে একটু বসে দেখি, আমার কাজটুকু সেরে নিই।” কিন্তু কাজ সারিয়া যাওয়া সহজ হইল না, চুল বাঁধা কিছুতেই পছন্দমত হইয়া উঠিল না। একবার খোঁপা বাঁধিয়া আবার খুলিয়া ফেলিল ; আবার বাঁধিয়া আবার খুলিল। এইরূপে দুই তিনবার খোঁপা বাঁধার পর পরিশেষে বিরক্ত হইয়া বলিল, “দূর হাে ছাই, কি হবে এত পছন্দসই করে খোঁপা বেঁধে ? যা হয়েছে, তাই ঢের।” কোনরূপে চুলবাঁধা শেষ করিয়া, উত্তমরূপে মুখ মুছাইয়া দিয়া গৌরী তাহার কপালে চন্দনের টীপ পরাইতে বসিল । শশীর মা আসিয়া ব্যস্তভাবে বলিল, “আর এত সাজাতে হবে না ; বর আসচে, ঘরে নিয়ে চল।” গৌরী চন্দনের বাটী ফেলিয়া উৰ্দ্ধশ্বাসে বর দেখিতে ছুটিল। কিন্তু বর কোথায় ? দরজার বাহিরে পা দিতেই সম্মুখে উপেনকে দেখিয়া গৌরী থমকিয়া দাড়াইল ; সবিস্ময়ে বলিয়া উঠিল, “উপীনদা যে? তুমি কোথা থেকে এসে পড়লে ?” সহাস্যে উপেন বলিল, “বরের সঙ্গে এসে পড়েছি। ভাল আছিস্ ত গৌরী?” গৌরী বলিল, “হাঁ, ভাল আছি। বর কোথায়?” এখনও মেনীর বর আসে নাই শুনিয়া উপেন বিস্মিত হইল। তা হইলে তাহার অনুমানটাই ঠিক হইয়াছে। সেই টকটকে বুড়ােটাই ১৬১ গাঁটছড়া মেনীর বর হইতে আসিতেছিল। রেলগাড়ীতে সেই যে সেই বরযাত্রীটা বুড়াে বরটার হাঁপানি বাড়িয়া উঠায় ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিল, আর বাজারে যে বুড়াে দাদামশাইএর সর্দি গৰ্ম্মী লাগিয়াছিল, সে আর অপর কেহ নহে, সেই বুড়ােটা নিশ্চয়ই মেনীর উপেন বলিল, “বর এখন অনেক দূরে—রসুলপুরের বাজারে।” গৌরী জিজ্ঞাসা করিল, “কখন্ আসবে ?” উপেন বলিল, “তার ঠিক নাই ; হঠাৎ সর্দি গৰ্মী হয়ে একটা দোকানে পড়ে রয়েছে, কবরেজ এসে ওষুধপত্র দিচ্ছে। বুড়াে যদি বাঁচে, শেষ রাত্রি নাগাদ এসে পৌছাবে। সকলে ভাববে বলে আমি আগে সংবাদ দিতে এসেছি।” এই দুঃসংবাদ শ্রবণে সকলেই চিন্তিত হইয়া পড়িল। সৰ্ব্বনাশ, একে বুড়াে মানুষ, তাহাতে সর্দিগৰ্ম্মি ; বাঁচিলে শেষ রাত্রি নাগাদ আসিতে পারে, কিন্তু বাঁচিবে কি? নিস্তারিণী তত সংবাদ শুনিয়া আছাড় খাইয়া পড়িলেন। হা ভগবা, বুড়া বরের হাতে কন্যাদান, তাহাতেও এই বিভ্রাট! ওগাে, বড় আদরের মেয়ে, বলিয়া মেনীর কপালে কি এত দুঃখ! নিস্তারিণী উঠানের ধূলায় পড়িয়া মাথামুড় খুঁড়িয়া কাঁদিতে লাগিলেন। পদ্মঠাকরুণ আসিয়া তাহাকে ধমক দিয়া বলিলেন, “মর মাগী, চেঁচাবি এর পর। এখন জাতকুল মান ইজ্জৎ যায় যে, তার উপায় কি?” উপায় যে কি আছে, তাহা কেহই ভাবিয়া পাইল না। দয়ারাম ততা মাথায় হাত দিয়া বসিয়া পড়িয়াছিল। পদ্মঠাকরুণ তাহাকে ডাকিয়া বলিলেন, “এখন উপায় কি দয়ারাম দাদা ? বুড়াে বাচবে কি মরবে ১৬২ গাঁটছড়া তার তাে ঠিক নাই। কিন্তু মেয়ের হাতে সূতত বাধা, মেয়েকে পাত্রস্থ না করলে তাে জাতকুল বজায় থাকবে না।” দয়ারাম বলিল, “তা তাে থাকবে না জানি, কিন্তু পাত্র কোথায় যে, মেয়েকে পাত্রস্থ করবে ?” পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, পাত্র একটি আছে। এখন তুমি যদি বল” সাগ্রহে দয়ারাম বলিয়া উঠিল, “এর আর বলাবলি কি, পাত্র যদি পাওয়া যায়- পদ্মঠাকরুণ বলিলেন, “যদি পাওয়া যায় কি, পাওয়া গিয়াছে। আয় না তবে উপেন।” উপেন নিকটেই দাড়াইয়াছিল, দাঁড়াইয়াছিল, পদ্মঠাকরুণ গিয়া তাহার হাত ধরিলেন। দয়ারামের এতক্ষণে চমক হইল। পাত্র উপেন? হউক, ক্ষতি নাই, কিন্তু টাকা? মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে দয়ারাম বলিল, ‘তা মন্দ হবে না দিদি ঠাকরুণ, কিন্তু পদ্মঠাকুরুণ তাহার এই কিন্তু কথার অর্থ বুঝিয়া লইয়া বলিলেন, “টাকার কথা তত ? টাকা নগদ চার শশা পাবে। একটা স্ত্রীহত্যা করে পাচ্ছিলে দু’শশা, এবার না হয় একটা ভদ্রলােকের জাতকুল রক্ষা করে স্ত্রীহত্যার পাপ থেকে মুক্তি পেয়ে পাবে চার শশা। কোন্টা ভাল দয়ারাম দাদা? ভাল থােক, মন্দ হােক, পদ্ম বানী যখন ধরেছে, তখন সে ছাড়বে না। তােমার টাকার জামিন রইলুম আমি। আয় উপেন।” পদ্মঠাকরুণ উপেনকে টানিয়া লইয়া গিয়া বরের আসনে বসাইয়া দিলেন ; পুরােহিতকে ডাকিয়া বলিলেন, “নাও পুরুতমশায়, মন্ত্রগুলাে পড়িয়ে দাও।”

গাঁটছড়া
দয়ারাম নিতান্ত হতবুদ্ধির ন্যায় হাঁ করিয়া পদ্মঠাকরুণের মুখের
দিকে চাহিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। ততক্ষণে পুরােহিত মহাশয় বিবাহের
মন্ত্রপাঠ আরম্ভ করিয়া দিয়াছেন :-
এনাং সালঙ্কৃতাং কন্যাং তুভ্যমহং সম্প্রদদেৎ।
গােরী বরকনের গাঁটছড়া বাধিয়া দিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল,
“কেমন উপীনদা, আমার সেই খেলার গাঁটছড়া বাঁধা সত্যিকার
গাঁটছড়া বাঁধা হয়ে গেল কি না! এইবার তুমি কাকে মারবে ?
মেনীকে, না আমাকে?”
উপেন দাতে ঠোট চাপিয়া তাহার মুখের দিকে সহাস্য কটাক্ষ
নিক্ষেপ করিতেই গৌরী উলুধ্বনি দিয়া পোঁ করিয়া শাঁখ বাজাইয়া
দিল ।
!
শুভ-মিলন

হৃদয়ের সিংহাসনে
প্রেয়সী আমার,
বসায়েছ সঙ্গোপনে
স্বর্ণময় হয়েছে সংসার
অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক
সৌরীন্দ্র মােহন মুখােপাধ্যায় প্রণীত
প্রেয়সী
অভিনব পরিকল্পনা, অসামান্য রচনা-নৈপুণ্য
সুগভীর আন্তরিকতা।
বিচিত্র ঘটনা নব নব বিস্ময়।
নরনারীর শাশ্বত প্রেম-কাহিনী ।
প্রেয়সী
ধরণীর ধূলিকে সােণা করিবে, মাটীর সীমানা
ছাড়াইয়া উৰ্দলােকে মাথা তুলিবে, মরুর
বুকে নিঝরের স্বপ্ন আনিবে ।
কমলিনী-সাহিত্য-গগনের একাদশটি পারিজাত
দেব-সাহিত্য-কুটীরের উদ্যানে ফুটিয়াছে।

মিথ্যা করিস্ ছল্- যুগল-মিলন দেখবি যদি বৃন্দাবনে চল্। সুপ্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক নারায়ণ ভট্টাচার্যের -মুগল-মিলন- উপন্যাসখানি বিস্ময়-রসের আধার। দীন কথাসাহিত্য- প্লাবিত মাতৃভাষায় এমন সুন্দর উপন্যাস হইতে পারে কেহ জানিত না। মুগল-মিলন নিঝরের ন্যায় নির্মল, দর্পণের ন্যায় উজ্জ্বল, এরূপ সুস্থ, স্বচ্ছন্দ-গতি সবল কথাসাহিত্যের বহুল প্রচার বাঞ্ছনীয়। অপূৰ্ব্ব প্রেম-তত্ত্ব-কথা। বিচিত্র আখ্যান। কমলিনী-সাহিত্য-মন্দিরের একাদশটি কোহিনুর দেব-সাহিত্য-কুভীরে জাজ্বল্যমান। ছবি, ছাপা, বাঁধা তুলনাবিহীন।

“উঠিতে শ্ৰীমতী, বসিতে শ্ৰীমতী
শ্ৰীমতী নয়নতারা
সুবিখ্যাত ঔপন্যাসিক
হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘােষের
শ্ৰীমতী
।
বিবাহ-বাসরে মণিমুক্তা অপেক্ষাও বরকন্যাকে উপহার
দিবার শ্রেষ্ঠ সামগ্রী। বিবাহে ইহ শ্রেষ্ঠ উপহার।
হাসি-কান্না-বিরহ-মিলনে অভিষিক্ত
অপূৰ্ব ত্যাগে মহিমান্বিত।
শ্ৰীমতী
অন্ধকার পথের প্রদীপ, সাহারার বুকে গােমুখী নিৰ্ব্বর,
চির তুষারের দেশে দীপ্ত রৌদ্র।
প্রাণময় ভাষা
উপাদেয় সংস্করণ
বিশ্ব-সাহিত্যে অতুলনীয়
কমলিনী-সাহিত্যাকাশের একাদশটি উল্কা
দেব-সাহিত্য-কুটীরের আঙ্গিনায় খসিয়া পড়িয়াছে !

কলস কঁাখে, মােলক নাকে, আন্তা পরা পায়, নূপুর বাজে ঝুমুর ঝুমুর বন্ধুর বৌ যায়। সুপ্রসিদ্ধ প্রবীণ সাহিত্যিক ন্দ্রনাথ পাল ফণী, বি, এ, ণীত বন্ধুর-বে। গভীর রহস্যময়, নূতন ধরণের উপন্যাস। চির সমাদৃত। নবরসের অফুরন্ত নিঝর-ধারা রস-মন্দাকিনী। বন্ধু-বৌ প্রেমলীলা-লহরিত সুললিত সুধা-ঝরা অপূর্ব উপন্যাস। ভাষার লালিত্যে, গল্পের নূতনত্বে, ভাবের বৈচিত্র্যে অতুলনীয়। বাঙ্গালীর ঘরের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম, পূৰ্ব্বরাগ ও প্রেমের চিত্র- কমলিনী-সাহিত্য-জগতের একাদশটি সুরক্ষিত দুর্গ দেব-সাহিত্য-কুটীর অবরােধ করিয়াছে।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Gantchora Ed. 5th

Author
Bhattacharya,narayanchandra
Title
Gantchora Ed. 5th
File name
Gantchora Ed. 5th
Text
OCR done
Citation
1931
Published
2009/08/12
Publisher
Dev Sahitya Kutir,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
186
Library
Makardah Saraswat Library, Howrah
Classification
Fiction, Prose Narrative
Keywords
Gantchora-Story
DLI number
512640
Barcode
4990010019695.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
VB3Suig1vln
Download PDF

Gantchora Ed. 5th