Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Prabhupader Baktritabali Vol.1 Ed.1

2010/04/27

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

ব্ৰহ্ম-মা-গৌড়ীয় সম্প্র
পরমহংস পরিব্রাজক
শ্রীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গােস্বামি-
প্রভুপাদেৱ
বক্ত তাবলী
প্রথম খণ্ড
1
মাখী কৃষ্ণ-পঞ্চমী, গৌরাঙ্গ ৪৪৪]
[ ভিক্ষ-৮ বার আনা

কলিকাতা-বাগবাজার-স্থিত
শ্রীগৌড়ীয় মঠ হইতে
ঐকুঞ্জবিহারি-বিদ্যাভূষণকর্তৃক
প্রকাশিত
প্রথম সংস্করণ
ঢাকা-নবাবপুর-স্থিত
মননামােন প্রেস হইতে
সতীশচন্দ্র দত্তকর্তৃক
মুদ্রিত

---
পরমহংস পরিব্রাজকাচায্য
শ্ৰশ্ৰীমদ্ভক্তিসিদ্ধান্তসরস্বতী গােস্বামী
Em
প্রকাশক-শ্ৰীমাধ্বগৌড়ীয় মঠ, ঢাকা

No text on this page.

“আরাধ্যো ভগবান ব্রজেশ-তনয়স্তদ্ধাম বৃন্দাবনং
রম্যা কাচিদুপাসনা ব্রজবধূবর্গেণ যা কল্পিতা।
শ্রীমদ্ভাগবতং প্রমাণমমলং প্রেমা পুমথো মহান
শ্রীচৈতন্য-মহাপ্রভােতমিদং তত্রাদয়রা নঃ পঃ ॥
“আন্নয়ঃ প্ৰাহ তত্ত্বং হরিমিহ পরমং
সর্বশক্তিং রব্ধিং
তদ্ভিন্নাংশাংশ্চ জীবান্ প্রকৃতি-কবলিতান
তদ্বিমুক্তাংশ্চ ভাবৎ।
ভেদাভেদ-প্রকাশং সকলমপি হরেঃ
সাধনং শুদ্ধভক্তিং
সাধ্যং তৎপ্রতিমেবেত্যুপদিশতি জনান
গৌরচন্দ্রঃ স্বয়ং সঃ ॥”
ঢাকা-নবাবপুরস্থিত মনােমােন-প্রোসের স্বত্বাধিকারী বদান্যবর
যুক্ত বিরাজমােহন কে ভক্তিভূষণ মহােদয়ের
সম্পূর্ণ অর্থানুকূল্যে তদীয় প্রেসে মুদ্রিত।

ঐশ্রীগুরুগৌরাঙ্গেী জয়তঃ শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী ( বঙ্গাব্দ ১৩৩১ সাল পৰ্য্যন্ত) প্রথম খণ্ড সূচীপত্র পত্র te ss s st hts . ২২ rs ২৯ ৪ ০৪ ৪২ ৪ ০ p, । ৬২ বিষয় ১। বৈষ্ণব দর্শন ২) শ্ৰব্যাসপূজায় প্রতি-সম্ভাষণ কলি-ধৰ্ম্ম শ্রীধাম-প্রচারিণী সভার উদ্দেশ্য ৫। নন্দোৎসব ••• ৬। বার্ষভানবী ৭। মধ্বাবির্ভাব ধর্মজগতে বৈষ্ণবদর্শনের স্থান ৯। শ্রীল উদ্ধারণ ঠাকুর... ১০। পাদ ঈশ্বরপুরী ১১। ক্রল জগদীশ পণ্ডিত ১২। বর্তমান যুগধর্ম ১৩। শ্রীল রসিকানদ-প্রসঙ্গ ১৪। ব্যাসপূজায় প্রত্যভিভাষণ ১৫। ঐরূপ-সনাতন-প্রস ১৬। পাঞ্চমাত্রিকী দীক্ষা ও বর্ণ-বিচার ১৭। আত্মধৰ্ম্ম ও মনােধৰ্ম্ম শ্রীচৈতন্যদেব ও তাহার শিক্ষা ১৯ । অ প্রাকৃত সহজ ধর্ম ও প্রকৃত সহজ-ধৰ্ম্ম ২০। পুষ্টিমার্গ ৪ ৪৪০ tes ৪০০ see ১২ . . . ১৪ ৫০ s ৩০০ En re শ্রীগুরুগৌ ওঁ শং শ্রীল প্রভুপাদেৱ বক্ত তাবল প্রথম খণ্ড বৈষ্ণব দর্শন স্থান—টাউনহল, কৃষ্ণনগর সময়-২৯শে বৈশাখ, ১৩২৫ (নদীয়া-সাহিত্য-পরিষদের অধিবেশনেপলক্ষে ) দর্শনের সংজ্ঞা এবং অন্তরিন্দ্রিয় ও বহিরিন্দ্রিয়ের কাৰ্য্য ও বৈশিষ্ট্য-বর্ণন দৃশ্যবস্তুর সহিত দ্রষ্টার সম্বন্ধস্থাপনকে ‘দর্শন’ বলে। সাধারণতঃ যে করণের সাহায্যে বস্তু পরিদৃষ্ট হয়, দ্রষ্টার সেই ইন্দ্রিয়কে ‘চক্ষু” বলে। অদ্বিারা বস্তুর বাহরূপ ও আকারাদির অনুভূতি হয়। বস্তু- সম্বন্ধে বাহ্যজ্ঞান লাভ করিতে হইলে চক্ষু-নামক জ্ঞানেন্দ্রিয় বা করণের সাহায্য আবশ্যক। কেবল চক্ষু থাকিলেই যে দর্শন-কাৰ্য্য সম্পন্ন হয়, এরূপ নহে! কারণরূপে চক্ষুর অভিভাবকের বা চালকরূপে অপর একটী বাহেন্দ্রিয়পতির অবস্থান আমরা বুঝিতে পারি। দর্শনক্রিয়ার কারণ- রূপে চক্ষুর অধিষ্ঠান থাকিলেও তাহার কারণরূপে মুনের প্রতিষ্ঠান অবশ্যই স্বীকার্য। চক্ষুদ্বারা দর্শনে যেস্থলে বাধা নাই, এমত স্থলেও যাহার কর্তৃত্বা- ভাবে চক্ষু কাৰ্য্য করে না, তাহাই মন’ বলিয়া সংজ্ঞিত। মন যে কেবল চক্ষুর নায়ক, তাহাও নহে। মনের অধীনতায় চক্ষুর ন্যায় আরও চা অনেক ২ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী জ্ঞানেন্দ্রিয় আছে। তাহাদের দ্বারা মন বস্তুবিষয়ে ভিন্ন-ভিন্ন অনুভূতি সংগ্রহ করেন। বস্তুর বাহ্য রূপ বা আকারাদি না থাকিলে বা বস্তুর ক্ষুদ্রত্ব, বৃহত্ত্ব বা অবরণ-যােগ্যতা থাকিলে অথবা অভিঘাত ও সুদূরাব- স্থিতি ঘটিলে কসময় চক্ষুর অধিষ্ঠান -সত্ত্বেও বাহ্যবস্তুর প্রতীত হয় না। বাহবস্তুর অধিষ্ঠান অপর চারিটী ইন্দ্রিয়ের সাহায্যেও উপলব্ধ হয়। জ্ঞান- সংগ্রহােপযােগী করণ বা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ইন্দ্রিয়পতি মন বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের স্বতন্ত্রভাবে অননুভূত বস্তুর ও ধারণা করিতে সমর্থ হন। মুখ্যভাবে জ্ঞানেন্দ্রিয় গুলি যে অনুভব সংগ্রহ করিতে অসমর্থ, তাহাও মন করণসমষ্টি-বলে প্রত্যক্ষ-পথ ব্যতীত অনুমান-পথে নিরূপণ করিতে পারেন। প্রত্যক্ষদর্শনাদি যদিও একমাত্র স্বানুভব-পথ, তথাপি দোষদুষ্ট হইলে অনুমিতিও প্রত্যক্ষের সহায়তা করে। কিন্তু প্রত্যক্ষও কোন- কোন সময়ে সত্যের অপলাপ করিয়া মনকৈ বস্তুর সত্যানুভূতি-সংগ্রহে বঞ্চনা করে। মাদকদ্রব্যাদির সহযােগে করণের দ্বারা অনুভূতি অনেক- সময়ে ভ্রান্তির কারণ হয়। দর্শন-শব্দে সাধারণতঃ চক্ষুর কাৰ্য বুঝাইলেও অপরেন্দ্রিয়ের গোচরীভূত বস্তুর প্রতীতিও ‘দর্শন’ নামে আখ্যাত হয়। জড়ীয় বস্তুসত্তার দর্শনকে ‘জড়বিজ্ঞান এবং জড়াতীত চেতনাভাস বস্তুসত্তার দর্শনকে ‘মনাে- বিজ্ঞান’ বলিয়া উক্ত করা হয়। ভারতীয় দর্শনশাস্তুসমূহে, মনের কারণ- রূপে বুদ্ধি, বুদ্ধির কারণরূপে অহঙ্কার, অহঙ্কারের কারণরূপে চিত্ত বা মহত্তত্ব এবং চিত্তের কারণরূপে প্রকৃতি বা অব্যক্ত-তত্ত্বের নির্দেশ দেখিতে পাওয়া যায়। প্রকৃতি, চিত্ত, অহঙ্কার, বুদ্ধি ও মন—অংশশিরূপে ক্রমান্বয়ে অবস্থিত। দ্রব্যে কর্তৃত্তার অভাব থাকিলে তাহাকে দ্রষ্টশক্তি-রহিত ‘জড়’ এবং দ্রব্যে কর্তৃসত্তার বা চেতনের অস্তিত্ব ও দ্রষ্টত্ব পাওয়া গেলে, সেই চেতনুই ক্রমশঃ বিকৃত হইয়া চিত্ত, অহঙ্কার, বুদ্ধি ও মনরূপে কথিত হয় ।

বৈষ্ণব দর্শন ৩ . ষোড়শ দর্শন পুরাকালে ভারতে ছয়টী বিভিন্ন দর্শন প্রসিদ্ধি লাভ করে,- কণাদের বৈশেষিক-দর্শন, গৌতমের ন্যায়-দর্শন, কপিলের সাংখ্য-দর্শন, পতঞ্জলির যােগ দর্শন, জৈমিনির পূৰ্ব্ব-মীমাংসা-দর্শন এবং বেদব্যাসের বেদান্ত-দর্শন। এতদ্ব্যতীত মধ্যযুগে চব্বিাকের নাস্তিক্য-দর্শন, নকুলীশ পাশুপত-দর্শন, রণেশ্বর-দর্শন, অহং-দর্শন, সুগত-দর্শন প্রভৃতি আরও দশ প্রকার দার্শনিক মতসমূহের ন্যূনাধিক পরিচয় সায়নাচার্যের গ্রন্থ হইতে জানা যায়। প্রত্যেক দর্শনের স্থাপ্য বিষয়গুলির তারতম্য-গত গবেষণা অদ্য সমগ্রভাবে আলোচনা করা সম্ভব নহে বলিয়া আমরা তাহা করিতে অগ্রসর হইলাম না। কেবলমাত্র উত্তরমীমাংসা বা বেদব্যাসকৃত বেদান্ত-দর্শনের প্রান্তিক আলােচনা অমািদের আরব্ধ বিষয়ের মূল আকর-জ্ঞানে তৎসম্বন্ধে কিছু বলিবার আবশ্যকতা আছে। বেদান্তের প্রমাণ ও প্রমেয়-বিষয়ে আলােচনা বেদের শিরােভাগ ‘উপনিষৎ' বলিয়া পরিচিত। ঐ উপনিষৎ তাৎপৰ্য্য ধারাবাহিকভাবে প্রকৃত দ্রষ্টার দর্শনে উপলব্ধ হইবে না বলিয়া উপনিষদবলম্বনেই ব্যাসদেব ‘ব্ৰহ্মপুত্র’-নামে একখানি গ্রন্থ রচনা করেন। তাহাই উত্তর-মীমাংসা, শারীরক সূত্র বা বেদান্তদর্শন-নামে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। অন্যান্য দার্শনিকগণের পূৰ্ব্বপক্ষ খণ্ডন করিয়া শব্দ বা শ্রুতির আপ্তবাক্যকে মুল-প্রমাণরূপে গ্রহণপূর্বক প্রত্যক্ষ ও অনুমিতিকে তাহার সোদরজ্ঞানে ব্যাস বেদপ্রতিপাদ্য সিদ্ধান্ত বৰ্ণন করিয়াছেন। ভারতীয় বৈদিক-ধৰ্ম্মপ্রণালীসমূহ সমস্তই ন্যূনাধিক বেদান্তদর্শনাবলম্বনে গঠিত এই শারীরক-মীমাংসার ব্যাখ্যাতৃরূপে আমরা অসংখ্য ভাষ্যকার ও বার্নিককারকে দেখিতে পাই; তন্মধ্যে প্রাচীন ব্যাখ্যাতা বৌধায়ন, টঙ্ক, ৪ শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী ভরুচি, ঐমিড় প্রভৃতি বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। শঙ্করাচাৰ্য- প্রভৃতি অনেকেই শারীরক-ভাষ্য প্রভৃতি নিৰ্মাণ করিয়া বেদান্তাচাৰ্য্য ঘলিয়া আদৃত আছেন। পারমহংসী সংহিতা মদ্ভাগবত ও এই ব্রহ্মসূত্রের অকৃত্রিম ভাষ্য বলিয়া সারগ্রাহি-বিদ্বৎসমাজে উদাহৃত হন। যাদবাচাৰ্য্য, প্রভাকর ও ভাস্কর ভট্ট প্রভৃতি মনীষিগণও বেদান্তের শিক্ষকরূপে কতিপয় গ্রন্থ ও মতভেদ প্রচার করিয়া গিয়াছেন। শঙ্করাচার্যে অনুগামি-সম্প্রদায়ের মধ্যে আমরা আনন্দগিরি ও সায়ন-মাধবপ্রভৃতির লেখনীতে এবং বাচস্পতিমিশের ‘ভামতি’-টীকাদিতে কেবলাদ্বৈত-মতেরই পুষ্টি লক্ষ্য করি । ব্রহ্মসূত্র বা উত্তরমীমাংসাবলম্বনে কয়েক শতাব্দী পূৰ্ব্বে নিবিশেষ-বিশ্বাস-মূলক কেবলাদ্বৈত-মতের বিরুদ্ধে ব্রহ্মের সবিশেষত্ব লক্ষ্য ও বিশ্বাস করিয়াছিলেন—এমন অনেকগুলি শেমুখীসম্পন্ন ভগবৎ- পরায়ণ আচার্যের উদয় হইয়াছিল। তাহারাই সবিশেষ-ব্রহ্মদর্শনের রক্ষক ও প্রচারক। তাহারা কেবলমাত্র খণ্ড দার্শনিক নহেন, পরন্তু সম্বন্ধজ্ঞান-বিশিষ্ট ও সিদ্ধান্তপারঙ্গত, সুতরাং বাস্তবসত্যবস্তু -সম্বন্ধি অভিধেয় ও প্রয়ােজনদর্শনেও বিমুখ ছিলেন না। বিবৰ্তবুদ্ধির দৃষ্টান্ত ও কারণ-বিচার- পুরাকালে জ্যোতির্বিক্ষণ এরূপ ধারণা করিতেন যে, এই বিশ্বের কেন্দ্রেই আমাদের আধার ও অবাসস্থলী ধরণী অবস্থিত এবং তাহাকেই কেন্দ্ৰত্বে বরণ করিয়া সূৰ্য, গ্রহ ও নক্ষত্রাদি জ্যোতিপুঞ্জ আবর্তন করিতেছেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা ও সূক্ষ্মালােচনার ফলে তাহাদের সেই ধারণা পরে পরিবর্তিত হওয়ায় তাহারাই জানিয়াছেন যে, প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদিগকে বক্ষে ধরিয়া যে মহীউল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মূলকেন্দ্র বলিয়া পরিচিত ছিলেন, তাহাকে ও, বুধগ্রহ বা শুক্রহের ন্যায়, শুক্রগ্রহ ও বৈষ্ণব দর্শন কুজগ্রহের মধ্যাকাশে সূর্যদেবকে কেন্দ্র করিয়া প্রত্যেক সৌরবর্ষে একবার পরিভ্রমণ করিতে হয়। পৃথীস্থিত দ্রষ্টা নিজস্থানে বিশ্বের কেন্দ্র স্থাপন করিতে গিয়া যেরূপ ভ্রমপূর্ণ জ্ঞান আশ্রয় করিয়াছিলেন, সেইরূপ ভ্রান্তবিশ্বাস-ভরে জড়-বৈজ্ঞানিকগণ নিজেদের স্থূলশরীরকেই ভোগের কেন্দ্র জ্ঞান করিয়া ভেক্তৃিত্বে বা বিষয়ত্বে বিশ্বাস করিয়াছেন। মনােবিজ্ঞান- বিগণও জড়বিজ্ঞানে মনের প্রভুত্ব দেখিতে পাইয়া সেই জড়শরীরের কেন্দ্রে মনের অবস্থিতি জ্ঞান করিয়া দ্রষ্টরূপে মনশ্চক্ষে জড়কে দৃশ্যস্থানীয় জানিয়া সুষ্ঠুভাবে অবলােকন করিতেছেন। জড়বস্তু কিছু মনকে দেখেন না বা বুঝেন না, পরন্তু মনই ভড়কে দেখেন,-এইরূপ প্রতীতি তাঁহাদের প্রবল। বস্তুতঃ মনন-শক্তির অভাবে জড়চক্ষুতে জুড়েপাদানমাত্র অস্থিত হওয়ায় তাদৃশ দর্শনক্রিয়া-শক্তি-রহিত কেবলমাত্র জড়োপাদান কখনও মনকে বা চক্ষুকে দেখিতে পায় না। মননশক্তির অভাবে অন্যান্য সকল ইন্দ্রিয়ই এইরূপ ক্রিয়া-শক্তিবিহীন হইয়া পড়ে। নানা দেশের বিভিন্ন দার্শনিকগণের মতালােচনা জীবের পরলােকে বিশ্বাসহীন চার্বাক, জড়বসানন্দী এপিকিউরাস, অজ্ঞেয়তাবাদী এগনষ্টিক হাক্সলে, পারলৌকিক বিশ্বাসে সহোদী স্কেপ্টিক্‌গণ, দিব্যজ্ঞানবাদী হেগে, সপেন্হুয়ার ও ক্যান্ট-প্রমুখ মনীষি- বৃন্দ, সক্রেটিস, প্লেটো, এপ্লাটুন্ প্রভৃতি প্রাচীন গ্রীক দার্শনিকগণ এবং, অস্ত্রদেশীয় দার্শনিকগণ অনেকেই মনােবিজ্ঞান বা দর্শনশাস্ত্রের সেবায় জীবন অতিবাহিত করিয়াছেন, এবং নিজ-নিজ অভিজ্ঞতা জগৎকে দেখাইয়া স্ব-স্ব-সাম্প্রদায়িক কৈঙ্কর্যে বস্তু দর্শন করিতে শিখিছেন। তঁাহারা নিজ-নিজ-মনােময় অভিজ্ঞতাকে বহুমানপূর্বক চিন্তাহােতের কেন্দ্রে বসাইয়া, বস্তু দেখাইতে গিয়া বিভিন্নস্থানস্থিত দ্রষ্টবর্গের চক্ষে, শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবনা ৬ ত্তিজনক বিভিন্ন চিত্র প্রদর্শন করিয়াছেন মাত্র। একপ্রকার দর্শন অন্যের দর্শনের সহিত বিরােধ করায় নানা প্রকার বিবদমান দর্শন বা দার্শনিক, মতৃবাদ সমূহ শ্রোতৃবর্গকে স্ব-স্ব-বিপণীতে টানিয়া লইবার প্রযত্ন করিয়া আসিতেছে। যাহা দের চিওরিগা বাসস্থলী যে দার্শনিকের মত- বিপণর সন্নিকট, তাহারা, রাবরে অজ্ঞ জ্যোতিষিণের ন্যায়, একমাত্র তাহাকেই দর্শনরাজ্যের কেন্দ্রে অবস্থিত বলিরা ভ্ৰমময়ী ধারণার পুষ্টি সাধন করিতেছেন। যাহারা দার্শনিকমণ্ডলীর বিন্নি পিণীস্থিত বিভিন্ন পণ্যদ্রব্য দেখিতেছেন, তাহারা স্ব-স্ব-যােগ্যতানুরূপ সেই সেই দ্রব্যে নিজেদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করিতেছেন। ৰিবৰ্ত্তবাদীর ও নির্বিশেষবাদীর চেষ্টা যেরূপ জ্যোতিষিগণ পুরাকালে তামাদের পৃথিবীকেই অন্যান্য সকল জ্যোতিষ্কের কেন্দ্র বলিয়া মনে করিতেন, যেরূপ মানবগণ পুরাকালে আমাদের দেহধারকেই সকল অনুভবের মধ্যবর্তী মনে করিতেন, তদ্রুপ দার্শনিকগণও প্রাথমিক জ্ঞানৰিকাশক্রমে দ্রঃ-মনকেই ‘আত্মা বা যাবতীয় বস্তুবিচারের কেন্দ্র বলিয়া ৬.ন করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। তদশ বিচার-ফলেই বেদান্ত-দর্শনে অহংগ্রহহাপাসনা বা ম য়াবাদ স্থান পাইয়াছে। ‘বেদান্ত’ বলিলেই কিছুকাল পূর্ব হইতে কেবলাদ্বৈতবাদ, জীবেশ্বরৈক্যবাদ জড়চিদৈ ক্যাদ, বিবৰ্ত্তবাদ, নিঃশক্তিকবাদ,সগুণ-নিগুণৈক্যবদ, নির্ভেদ- ব্ৰহ্মবাদ, নিৰ্বিশেষবাদ প্রভৃতি সঙ্কীর্ণ মতবাদসমূহ বিশ্বজনীন উদার বিচারপুষ্ট বলিয়া দর্শনশাস্ত্রার্থিগণের নয়ন আবরণ করিয়া আসিতেছে, এবং সবিশেষ চিবিচিত্রানুভূতি-পর শুদ্ধাদ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত, শুদ্ধদ্বৈত ও দ্বৈতাদ্বৈত প্রভৃতি সিদ্ধান্ত বেদান্তের প্রতিপাদ্য নহে বলিয়া প্রতিপাদন করিবার জন্য অসংখ্য সঙ্কীর্ণ চেষ্টা প্রকৃত উদার বিশ্বজনীন অসাম্প্রদায়িক তাকে বিপন্ন করিয়াছেও করিতেছে।

বৈষ্ণব দর্শন মায়াবাজিগণের কুচেষ্টার কথা শ্ৰীশঙ্করাচার্য্যের অভ্যুদয়-কাল হইতে আরম্ভ করিয়া সায়ন বা বিদ্যারণ্য-ভারতীর শেষদশা পৰ্যন্ত কেবলাতৈবিচারপর বৈদান্তিক- গণের সাম্প্রদায়িক ইতিহাস আলােচনা করিলে অামরা জানিতে পারি যে, জীবাত্মাকে পরমাত্মা ও জগৎকে মিথ্যা বলিয়া প্রতিপাদন, আংশিক দর্শন ব: খণ্ড জ্ঞানের সাহায্যে পুর্ণত্বের কল্পনা, জড়ীয় অখণ্ড দেশ কালাদিকে পূর্ণবস্তুত্বে স্থাপন এবং বিষয়াশ্রয়-বিবেকাভাবে বাস্তব সত্যবস্তুকে নীরবতার আবার বলিয়া স্থাপন করিবার অসংখ্য প্রকার প্রয়াসে জগতের বৃথা কালক্ষেপমাত্র হইয়াছে। বাস্তববস্তুদর্শনের ছলনায় খণ্ড- জ্ঞানকে পূর্ণজ্ঞান, সগুণকে নিগুণ বা গুণাতীতজ্ঞান প্রভৃতি বিবৰ্তমূলক মােধৰ্ম্মে লােকে ব্যাপৃত থাকায় পরমসত্যদর্শন আচ্ছাদিত হইয়াছিল যদিও শঙ্করপ্রমুখ দার্শনিক মনীষিগণ বেদান্তদর্শনে জড়ীয় ভেদ-দর্শনসমূহ নিরাস করিয়াছেন, তাহা হইলে ও দ্র’, ভােক্তৃ বা বিষয় রূপে জীবাত্মাকে এবং দৃশ্য, ভােগ্য বা আশ্রয়রূপে জগৎকে প্রতিষ্ঠা করা। তাহারা পরমসত্যের বি:চত্রবিলাস হইতে দূরে অবস্থিত। এই পরমহত্যের দর্শন প্রদর্শন করিবার জন্যই স্বয়ংরূপ বস্তু স্বয়ং প্রকাশিত হইয়াছিলেন তঁাহাকে অন্য কোন ইতর শক্তির অপেক্ষায় বা সহায়তায় প্রকাশিত হইতে হয় নাই। ; সর্বমত-নিরপেক্ষ শ্রীমদ্ভাগবত ও ভাগবত-দর্শন জড় হইতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ-মূলক পরাপথে বস্তু নির্দেশ করিবার প্রতিপক্ষে অপরােক্ষ প্রত্যকৃপথের মহিমা একমাত্র বৈষ্ণবদর্শনেই নিহিত আছে। ব্রহ্মসূত্র বা বেদান্তদর্শনের অকৃত্রিম্যভাষ্যস্বরূপ শ্রীমদ্ভাগবত-গ্রন্থই সর্বদর্শন-শিয়ােমণি’ বলিয়া বিদ্বৎপরমহংস-সমাজে লপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী অনাদিকাল হইতে সুপ্রসিদ্ধ ; যেহেতু, যাবতীয় দার্শনিক তথ্য এই সৰ্ব্ব-বেদান্তসার গ্রন্থে বিস্তৃতভাবে প্রদর্শিত হইয়াছে। আপেক্ষিক অস্মিতার অভিমানে, আপেক্ষিক কৰ্ম্মকে আশ্রয় করিয়া, আপেক্ষিক করণের দ্বারা, আপেক্ষিক বস্তুকে সম্প্রদান করিয়া, আপেক্ষিক বস্তু- সমূহ হইতে নিরপেক্ষ থাকিয়া, আপেক্ষিক বস্তুর সম্বন্ধে, আপেক্ষিক আধারে দর্শন করিতে গেলে পরমসত্যবস্তুর দর্শন-লাভ যে ঘটে না, ইহা বিস্মৃত হইলে অর্থাৎ বস্তুদর্শনকালে বিশেষরূপে নিরপেক্ষ না হইলে প্রত্যেক দ্ৰষ্টাই বস্তুর সচ্চিদানন্দবিগ্রহ-দর্শনে বিমুখ হইবেন । যাহারা মায়া-দ্বারা বা খণ্ডজ্ঞানপ্রীতির সাহায্যে বস্তুদর্শনে ব্যস্ত, তাহারাই মায়াবাদি-বৈদান্তিক ; আর যাহারা মায়াবাদীর অধীন-বন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া বাস্তব-বস্তুর চিদবিলাসস্বরূপ দর্শন করেন, তাহারাই তত্ত্ববিৎ বা “বৈষ্ণব। সেই তত্ত্ব কেবল ‘মায়া’ নহেন, পরন্তু অখণ্ড পরম-সত্য, পূর্ণ ও অবিমিশ্র চিং এবং অনুপাদেয়তা-রহিত ঘনানন্দ অদ্বয়জ্ঞান। মায়াবাদীর দর্শনবিচার মায়াবাদী বস্তু দর্শন করিতে গিয়া কেবলমাত্র মায়ার আশ্রয়ে দৃশ্য দর্শন করেন। ব্যবহারিক পরিচয়ের মিথ্যাত্ব প্রবল হইয়া তাহাকে বাস্তব-স্তুর স্বরূপ দেখিতে দেয় না। ফলতঃ, খণ্ডজ্ঞানে খণ্ডজ্ঞানী কখনই সত্যবস্তু দেখিতে পান না। সুতরাং তর্ক আসিয়া তাহাকে খণ্ডবস্তুর ভ্রান্ত দ্রষ্টা ও খণ্ডবস্তুপ্রতীতির মিথ্যাত্ব জ্ঞান করাইয়া নিত্যসত্যজ্ঞান হইতে বিপথগামী করায়। তত্ত্ববিৎ জগৎকে ‘মিথ্যা’ মনে বরেন না, বস্তুর বহিঃখগু৪ের্তীতিজন্য ‘ৎকালিক’ বা ‘নশ্বর’ বলিয়া থাকেন। যাহাকে পরিমিত করা যায়, তাহাই মায়া-গঠিত বা সঙ্কোচ-ধৰ্ম্মযুক্ত। দ্রষ্টা যখনই তত্ত্ব ভুলিয়া মায়ার সাহায্যে বাহবস্তুসমূহ নিরীক্ষণ করেন, তখনই জাড্য বৈষ্ণব দর্শন আসিয়া দৃশ্যবস্তুর নানাত্ব দেখাইয়া তাহাকে বিষয় ও দৃশ্যবস্তুসমূহকে আশ্রয়, অবলম্বন বা দর্শনের আধার বলিয়া মনে করায়। মায়া বা পরিমিতি-শক্তি—বস্তুরই শক্তিবিশেষ সেই শক্তি-পরিচালিত হইয়া দ্রষ্টা দৃশ্যবস্তু নানাত্ব ও তাহাদের ভােগােপকরণত্ব দর্শন করে মায়াশক্তির বিকার বস্তুর স্থূলত্ব-প্রসবিনী মায়া-শক্তির ক্রিয়া দ্রষ্টজীবের অস্মিতায় কাৰ্য্য করিবার অবকাশ পাইলেই তাহাকে চিত্ত বা মহত্ত্বরূপে পরিণত করে এবং চিত্ত পরিণত হইয়া অহঙ্কার, অহঙ্কার পরিণত হইয়া বুদ্ধি এবং বুদ্ধি পরিণত হইয়া করণপতি মনরূপে পরিণত হয়। মায়াবাদী ও তত্ত্ববাদীর পরস্পর বিচার-ভেদ মায়াবাদী মারার আশ্রয়ে ভেদজ্ঞানযুক্ত হইয়া বলেন,-দ্রষ্টা, দৃশ্য ও দর্শনে বাস্তব-ভেদ নাই এবং বস্তুতে স্বগত, সজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদ নাই। কিন্তু তত্ত্ববাদী অয়-জ্ঞানাশ্রয়ে বলেন,-তত্ত্ববস্তু ভগবানে সজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদিকা পূর্ণ উপাদেয় শক্তি নিত্যবিরাজমানা। তত্ত্ববাদী অদ্বজ্ঞানশ্রয়ে ব্ৰহ্ম ও পরমাত্মাকে ভগবত্তা হইতে তত্ত্বতঃ পৃথক দর্শন করেন না। তত্ত্ববাদী বাস্তব-বস্তুকে ‘সচ্চিদানন্দ বিষ্ণুতত্ত্ব বলিয়া দর্শন করেন। বিষ্ণুতত্ত্বে স্বগত নিত্যশক্তি-বৈচিত্র্যময়ী লীলা আছে এবং তৎসহ চিজ্জাতীয় জীবশক্তি-পরিণত জৈবজগতে সজাতীয় ও অচিচ্ছক্তি-পরিণত বহির্জগতে বিজাতীয় ভেদ দৃষ্ট হয়। বস্তু ও তচ্ছক্তি পরস্পর ভিন্ন না হইলেও অচিন্ত্যশক্তিবলে সেই বিষ্ণুতেই চিৎপ্রকাশিনী ও অচিৎসর্গ- জননীরূপে উভয় শক্তিই নিত্যবৰ্ত্তমানা। বেদান্তদর্শন কেবল মায়াবাদি গণের কাল্পনিক মায়িক আংশিক দর্শনমাত্র নহেন, পরন্তু বেদান্তদর্শনে A শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী চিদচিদীশ্বর বিষ্ণুতত্ত্বই স্বাভাবিক অচিন্ত্যশক্তি বলে চতুর্বিধ বৈশিষ্ট্যে অবস্থিত বলিয়া দৃষ্ট হন। বিভুচিৎ বিষ্ণ অনুচিৎ জীব ও জড়ের তত্ত্ব এবং তাঁহাদের পরস্পর সম্বন্ধবিচার শ্রুতিতে লিখিত আছে,—ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সুয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্। দিব্যসূরিগণ দৃশ্যবস্তুকে সৰ্ব্বদাই বিষ্ণুর পরম-পদ বলিয়া দেখেন। তাহারা অনুপাদেয় দেশবাল-পরিচ্ছন্ন অচিদ্দর্শনে ষ্ণুিত্ব বা বস্তৃত্বকে আবদ্ধ করেন না। বিষ্ণুর চিচ্ছক্তি বা অচিচ্ছশক্তি পরিণত বস্তুপ্রতীতিকে কখনও “বিষ্ণু বলেন না এবং বিষ্ণু-ব্যতীত তাহার অন্যাধিষ্ঠানও স্বীকার করেন না। বিষ্ণুসন্ধিনী উন্মুখস্তুপ্রতীতিকে বা বসত্তাকে ‘চিৎ এবং বিষ্ণুবিমুখ বস্তু প্রতীতিকে বা বস্তুসত্তাকে ‘অচিৎ পা ‘জড়’-সংজ্ঞায় ভেদ স্বীকার করেন। এই নিত্যভেদ দর্শন করেন বলিয়া তাহার যে বীশ্বরবাদী, তাহা নহে ; বৈষ্ণবগণ একেশ্বর বিষ্ণু- বস্তুই দর্শন করেন ;-বিষ্ণুই তদস্তু এবং বৈষ্ণগণই তৰীয়। বিষ্ণু ও বৈষ্ণব, যথাক্রমে নিত্যশক্তিমান ও শক্তি-পরিণত এবং বিষয় ও আশ্রয়- স্বরূপ হইয়া নিত্যরসের আলম্বন এবং অন্যান্য-সম্বন্ধময়। উভয়ের সেব্য। সেবনবৃত্তি নিত্যা, সুতরাং কালক্ষোভ্য না হওয়ায় নশ্বর বা কৰ্ম্মায়ত্ত নহে,-পরন্তু অনাদি । জড়কাল বিষ্ণু বা বৈষ্ণবের উপর আধিপত্য করিতে অসমর্থ। নিত্যশক্তিমান্ বিষ্ণুর দর্শনরহিত মায়াবাদীর অস্তিত্ব অনিত্য ও কালক্ষোভ্য; কিন্তু বৈষ্ণবের অবস্থান নিত্য, তাহার দর্শনও নিত্য, কোনকালে পরিবর্তন-মােগ্য নহেন চেতনময় ও জড়ময় যাবতীয় বস্তুসর্গে বিষ্ণুর অধিষ্ঠান থাকায় তাহাদের অস্তিত্ব সিদ্ধ, সুতরাং সকলেই বৈষ্ণব। তবে চেতনময় সর্গ—যাহা জড়জগতে বদ্ধাবস্থায় দৃষ্ট হয়, বৈষ্ণব দর্শন '১১ তাহ-প্ৰাকৃত অপেক্ষা যুক্ত বলিয়া বিষ্ণুসেবােম্মুখ না হওয়ায় গুণান্তিৰ্গত। প্রকৃতির অতীতরাজ্যে মুক্তাবস্থায় বিষ্ণুর যে চিৎসর্গ, তাহা মায়ার কোন প্রকার বশ্য বা অধীন নহে। এই জগতে জীবমাত্রেই ‘বৈষ্ণব; কিন্তু জড়বস্তুর প্রতি ভােগাভিনিবেশক্রমে হরিবিমুখ ও জড়ের ডােক্তা বলিয়া নিজ-স্বরূপ নূনাধিক বিস্মৃত। উন্মুখাবস্থায় বৈষ্ণবের ত্রিবিধ অধিকার ও ক্রিয়া হরিসেবেমুখ-চোময় চেতন-সৰ্গ ত্রিবিধ অবস্থায় আপনাকে ‘বৈষ্ণব বলিয়া অবগত হন। সামান্য কনিষ্ঠাধিকারে বৈষ্ণবের ভগবান্ বিষ্ণুই একমাত্র অর্চনীয়। সাত্বত-শাস্ত্র-নির্দিষ্ট বিহিত উপকরণাবলীদ্বারা ভগবদৰ্চ্চার অর্চনই তাহার লক্ষ্য। তিনি উন্নত মধ্যমাধিকারে বিষ্ণু ভক্তিনিরত ব্যক্তির কায়মনােবাক্যে ও ভগবদর্চায়, উভয়ই বিষ্ণুসম্বন্ধ দেখিয়া প্রেমবিশিষ্ট, ভগবদ্ভক্তের প্রতি অকৃত্রিম-বন্ধুতা-সম্পন্ন, ‘সমগ্র জগৎ হরিসেবায় নিযুক্ত হউক',–এরূপ করুণা-বিশিষ্ট এবং বিষ্ণুবিমুখ বিদ্বেষীর প্রতি উপেক্ষা-যুক্ত হইয়া তাহার সঙ্গত্যাগে যত্নবান্। উত্তম- ধিকারে তিনি স্থূলশরীরের দ্বারা ভােগ করিবার বাসনা-রহিত হইয়া জড়বস্তুকে আদৌ নিজতভাগের উপাদান মনে করেন না এবং সফল- বস্তুকেই প্রকৃতপ্রস্তাবে ভগবৎসেবনোন্মুখ হরিসম্বন্ধিবস্তু-জ্ঞানে দর্শন করেন। দৃশ্যবস্তুমাই শক্তিপরিণত বৈষ্ণবস্বরূপে বিষ্ণুর অচিন্ত্যভেদা- ভেদ-প্রকাশ। জগতে সকল-বস্তু বিষ্ণুতেই অবস্থিত এবং বিষ্ণুর সেবার উদ্দেশ্যেই সৰ্ব্বদা নিযুক্ত। কাহারা বৈষ্ণব-শব্দ-বাচ্য নহে? ‘বৈষ্ণব’ বলিলে বর্তমানকালে সমাজের যে সম্প্রদায়বিশেষকে লক্ষ্য করা হয়, প্রকৃতপ্রস্তাবে ‘বৈষ্ণব’-সংজ্ঞা তাদৃশ সামাজিকগণের মধ্যেই শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী আবদ্ধ নহে। যাহার নীতি ও পুণ্য-বজ্জিত, শিক্ষ-মন্দিরের সহিত যাহা দের বৈরিতা, শৌক্রবর্ণভেদ যাহারা কোথাও স্বীকার করেন বা কৱেন না, মৃত ব্যক্তিরষ্ঠ সৎকারােপলক্ষে ভাড়াটিয়া গায়ক, মাৰ্দঙ্গিক, নৰ্ত্তকরূপে নিযুক্ত হইয়া যাহারা জীবিকা অর্জন করেন, বর্ণাশ্রম-ধসমূহ লাঞ্ছনা করায় যাহাদের যথেচ্ছাচার-বৈধ সামাজিকগণের সর্বদা কটাক্ষের বিষয় এবং যাহারা অবৈধ সংঘাের্গী’ বা ‘জাতি-বৈষ্ণব' বলিয়া পরিচিত, তাহাদের মধ্যেই যে বৈষ্ণব-সংজ্ঞা আবদ্ধ, তাহা নহে। আবার, যাঁহারা এই জাতি-বৈষ্ণগণের গুরুগিরি ও পৌরােহিত্য-কার্যে নিরত, মন্ত্ৰদানাদি ব্যবসায়াবলম্বনে স্ব-স্ব-জীবিকা-নিৰ্বাহে তৎপর, ধর্মোপদেশ, শাস্ত্রপাঠ, বিগ্রহ-ব্যবসায়ের দ্বারা অর্থোপার্জনপ্রিয়, যাহারা ইন্দ্রিয়- স্যমের প্রতি লক্ষ্য না করিয়া জড়েয়িতর্পণের চেষ্টাকেও হরিসেবা বলিয়া জানেন, যাহারা প্রভুসন্তান, গােস্বামি-সন্তান, আচাৰ্যসন্তান, অধি- কারী বা গুরু বলি। পরিচয়াকাঙ্ক্ষী, তাঁহারাই যে বৈষ্ণ-সংজ্ঞায় সংজ্ঞিত হইবেন, ভাহা নহে। হিমাঙ্গে ভিন্ন-ভিন্ন-বর্ণের পরিচয় দিয়া যাহারা বংশপরম্পরা বৈষ্ণবধর্মাবলম্বী বা পঞ্চোপাসকগণের অন্যতম উপাস্য বিষ্ণু- মন্ত্রে দীক্ষিত হইয়া বিষ্ণুদেবতার নেতৎপর, যাহারা মুক্তির নিক্কিশেষত্ব বিশ্বাস করেন, তাঁহারাই যে কেবল ‘বৈষ্ণব-সংজ্ঞা লাভ করিবেন, তাহা নহে। যাহারা ভাের-কৌপীনাদি সন্ন্যাসবেযে বিভূষিত, বৈধ- সংসারে বিধিগহনশীল, অক্ষক্রীড়া-স্থান ও দেবালয়াদিতে হরিভজনবিহীন অলস হইয়া অবস্থিতিপরায়ণ, সচ্ছাস্তাদির আলোচনে বিতৃষ্ণ, অথচ প্রাকৃত ভােগবাসনার ফনদী যাহাদের অন্তরে ধীরে-ধীরে বহিতেছে, তাঁহারাই যে কেবল “বৈষ্ণব-সংজ্ঞা লাভ করিবার অধিকারী, তাহা নহে তবে বৈষ্ণব-শব্দ-বাচ্য কে? বৈষ্ণবই সর্বসগুণধার ফলতঃ, কৃষ্ণসেবনােন্মুখতাই বৈষ্ণব-সংজ্ঞার মুখ্য পরিচয়। ভগবৎ- বৈষ্ণব দর্শন সেবায় সর্বাত্মদ্বারা খাঁহার অখিল চেষ্টা অনুক্ষণ নিযুক্ত, যিনি কায়মনাে- বাক্যে হরিসম্বন্ধিবস্তু-স্থানে হরিদেবনােপযােগী বিষয় গ্রহণপূর্বক যে- কোন-অবস্থায় অবস্থিত থাকিয়া হরির নিরন্তর অনুশীলনপর, যাহার হরিসেবা-লাভের প্রয়ােজন ব্যতীত ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম বা মুক্তির অভিলাষ নাই, তিনি উপরিউক্ত যে-কোন-পরিচয়ে পরিচিত থাকুন না কেন, তাহাকেই ‘বৈষ্ণব’ বলিয়া সকলে জানিবেন। যাবতীয় সদ্গুণাবলী নিত্যভাবে বৈষ্ণবেই দেখিতে পাওয়া যায়। অবৈষ্ণবে সদ্গুণসমূহের স্থায়িভাবে অবস্থান করিবার অবকাশ নাই। বৈষ্ণব-পরিচয়াকাক্ষিগণ প্রকৃত প্রস্তাবে বৈষ্ণব-সংজ্ঞা-লাভের যােগ্য না হইলেও আপনাদিগকে তাদৃশ সংজ্ঞায় অভিহিত করেন। বৈষ্ণবের লৌকিক-বৃত্তিগত সদাচারে আমরা দুইটা বিষয় লক্ষ্য করি ;-প্রথমতঃ, তিনি সর্বেশ্বর বিষ্ণুর নিত্য- দাসাভিমানী, এবং দ্বিতীয়ত, তিনি বােষিৎসঙ্গী নহেন। বৈষ্ণব-কৃপালু, অকৃতদ্রোহ, সত্যসার, সম, নির্দোষ, বদান্য, মৃদু, শুচি, অকিঞ্চন, সর্বোপ- কারক, শান্ত, কৃকৈশরণ, অকাম, নিরীহ, স্থির, বিজিতষড়গুণ, মিত- ভুক, অপ্রমত্ত, মানদ, অমানী, গম্ভীর, করুণ, মৈত্র, কবি, দক্ষ ও মৌনী বৈষ্ণব প্রকৃতপ্রস্তাবে এসকল গুণে বিভূষিত হইলেও তাহাকে দর্শন করিতে গিয়া নানা-কারণে বৈষ্ণব-পরিচয়াকাঙ্ক্ষী অবৈষ্ণবগণ তাঁহার গুণসমুহ বুঝিয়া উঠিতে পারেন না। অনেকসময়ে বৈষ্ণবের নিষ্কপট দৈন্য বুঝিতে অসমর্থ হইয়া, নির্বোধ মানব বৈষ্ণবের শিক্ষক- সজ্জায় নিজের অসৎ স্বার্থ পােষণ করিতে গিয়া বৈষ্ণবকেও কপট দৈন্য শিখাইতে অগ্রসর হন এবং অবৈষ্ণববাচিত বিশ্বাসের বশবর্তী হইয়া, নিজের বৈষ্ণববিরােধী ভাবসমূহ বৈষ্ণবেরও ভূষণ হউক,-এরূপ ইচ্ছা করেন। এরূপ চেষ্টা দুর্ভাগ্যের পরিচায়কমাত্র । স্বয়ং বৈষ্ণব না হইলে প্রকৃত শুদ্ধবৈষ্ণবের স্বরূপ বুঝিবার সামর্থ্য-লাভ সাধারণ বিচারহীন শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতালী মনুষ্যের পক্ষে সম্ভব হয় না। প্রকৃত শুদ্ধবৈষ্ণব কোনদিনই সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িকতা পােষণ করেন না। পরমোদার আদর্শচরিত্র বৈষ্ণবকে না বুঝিয়া উদারতার ছলনায়, বিশ্বজনীন ভাবের কপটতায়, সঙ্কীর্ণ সাম্প্র- দায়িক মনে করিলে নিজেরই সঙ্কীর্ণচিত্তের পরিচয় দেওয়া হয় মাত্র । বৈষ্ণবদর্শনে ভগবৎস্বরূপ-বিচার বৈষ্ণব-দর্শনে তত্ববস্তুকে ‘ভগবান্ বলা হইয়াছে। ভগবান্ বলিতে অবৈষ্ণবগণ যেমন মায়ার অন্তর্ভুক্ত নশ্বর-বস্তুর সংজ্ঞা-বিশেষ বলিয়া মনে করেন, সেরূপ নহে। মারার অন্তর্গত বহ্বমাত্রেরই সংজ্ঞা, রূপ, গুণ ও ক্রিয়ার মধ্যে পরস্পর ভেদ আছে, কিন্তু মায়াতীত ভগবানের নাম, রূপ, গুণ ও লীলার মধ্যে সেরূপ জড়ীয় ভেদ নাই। তিনি অজ্ঞানময়। মায়িকজ্ঞানেই ভগবানের সহিত পরমাত্মা ও ব্রহ্মের পার্থক্য কল্পিত হয় ; কিন্তু অপ্রাকৃত-বিচারে সেরূপ মায়ার ক্রিয়া লক্ষিত হতে পারে না বৈষ্ণবদর্শনে কথিত হইয়াছে যে, ভগবান্সৎ এবং অসৎ, উভয় প্রকাশ হইতে শ্রেষ্ঠ এবং স্বতন্ত্র অধিষ্ঠানমুক্ত। তিনি কাল রচিত হইবার পূৰ্বে কালের জনকরূপে ছিলেন ; তাহা হইতেই, সৎ ও অসৎ, উভয়ই উদিত হইয়াছে ; এই দুইসর্গের অপ্রকাশ-কালেও তিনিই থাকিবেন। হাতে ভগবৎসত্তার অধিষ্ঠান নাই এবং ভগবৎসত্তায় যাহার অধিষ্ঠান নাই, তাহাই ভগবানের মায়া। সেই মায়া প্রকাশমানা হইয়া আভাস ও অন্ধকারের ন্যায় বদ্ধজীব ও ত্রিগুণাত্মক জড় বলিয়া কথিত হন। চতুঃসম্প্রদায়ের দার্শনিক সিদ্ধান্ত বিশিষ্টাদ্বৈত-দর্শনে,-ঈশ্বর, চিৎ ও অচিৎ-ত্রিবিধ বিভাগে অদ্বয়ান পরমব্রহ্ম স্বীয় শক্তিদ্বারা নিত্য প্রকাশমান বলিয়া প্রচারিত হইয়াছেন। বস্তুর অদয়তার ব্যাঘাত না করিয়া বস্তুশক্তির বৈচিত্র্যক্রমে ভগবান তিন- বৈষ্ণব দর্শন A6s প্রকারে লীলা-বিশিষ্ট ; ভগবান্‌-চিৎ ও অচিৎ, উভয়েরই ঈশ্বর; তিনি- অনন্ত ও নিত্যশক্তিমান্ সবিশেষ বস্তু এবং স্বগত, সজাতীয় ও বিজাতীয় বিশেষত্ৰয়ে নিত্যবিরাজমান। শুদ্ধদ্বৈত-দর্শনে-সৰ্ব্বশক্তিমান্ ভগবান ও ভক্ত—পরস্পর নিত্য-সেব্য-সেবকরূপে ভেদসম্বন্ধবিশিষ্ট। একমাত্র ভগবান্ বিষ্ণুই স্বতন্ত্র, আর সকলেই পতঙ্ক ; তিনি--ক্ষর ও অক্ষর (লক্ষ্মীদেবী), উভয় হইতেই উত্তম অর্থাৎ পুরুষােত্তম। ভগবানে ও জীবে, ভগবানে ও জড়ে, জীবে ও জড়ে এবং জড়ে ও জড়ের মধ্যে পরস্পর ভেদ নিত্য- বৰ্ত্তমান। এইরূপ পাপ্রেকার নিত্য-ভেদসত্তা ভগবনে নিত্য-বৈচিত্র প্রদর্শন করে। দ্বৈতাদ্বৈত-দর্শনে,—চিন্ময়রসবিগ্রহ ভগবান্ সর্বদা বিষয় ও আশ্রয়গত বস্তুরূপে নিত্য প্রতিষ্ঠিত। যেস্থলে নিৰ্ম্মল আশ্রয়গত চিৎসা, সেস্থলে আশ্রয়ের নিত্যসত্তায় ঘনাননের সম্বেস্তৃরূপে ভগবান্ লীলাময় এবং যেস্থলে নশ্বর সমল আশ্রয়রূপ জড়সত্তা, সেস্থলে ভগবানের লীলা-কুণ্ঠদর্শনে সঙ্কুচিত; তাহা বৈকুণ্ঠ হইলেও পঞ্চিক-বুদ্ধিতে মায়িক অনিত্য বলিয়া প্রতীত হয়। শুদ্ধাদ্বৈত-দর্শনে,-ভগবায় জড়র হেয়ত্ব ও ভেদ আরােপিত হয় না; ভগবহুমুখ হইলেই মুক্তজীবের চিদ্দর্শনে জাড়ের ভেদগত সত্তা তাঁহার সত্যদর্শনে বাধা দেয় না এবং চিবৈচিত্র্যের মিত্য অস্তিত্বের বিনাশকও হয় না' বিভুচৈতন্যের সহিত অণুচৈতন্যের সে-সেবক-ভাবে লীলা অদ্বয়জ্ঞানের ব্যাঘাতকাণিী নহে। অদ্বৈত দর্শনে নশ্বর জড়সত্তা নিত্যসত্তা হইতে ভিন্নরূপে দৃষ্ট হয় বলিয়া চিদ্বৈচিত্র্য অস্বীকৃত বা অস্বীকাৰ্য্য নহে। অবৈষ্ণব দার্শনিকগণের মত ও তন্নিরসন ভগবান্ বিষ্ণুর ব্যক্তিগত সত্তার অর্থাৎ পুরুষােত্তমত্বের বিরােধী দলকেই ‘অবৈষ্ণব দার্শনিক’ বলা যায়। নির্বিশেষ-বাদে ভগবৎ wNW ১৬ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী চিন্ময় বিশেষসমূহকেও বলপূৰ্ব্বক ‘মায়িক’ বলা হইয়াছে। ভগবানের নাম, রূপ, গুণ ও লীলা মায়ার রচিত বলিয়া মনে করিলে ভগবত্তার নিৰ্বিশেষত্বেরই কল্পনা করা হয়। ভগবানের নিত্যবিলাস-বৈচিত্র্যরূপ বিশেষসমুহ মায়া উৎপন্ন হইবার পূর্বেও ছিল, মায়ার ক্রিয়া সমাপ্ত হইলেও থাকিবে। মায়াতে সেই বিশেষত্বের একপাদ-পরিমিত সামান্য প্রতিফলিত ধৰ্ম্মমাত্র প্রদত্ত হইয়াছে, এরূপ বুঝিবার পরিবর্তে ভগবত্তাকে ‘মায়িক মনে কর সূক্ষ্মবুদ্ধির ও তত্ত্ববিমর্শনের অভাব বলিতে হইবে ‘মায়ার রাজ্যেই মায়াতীত বৈকুণ্ঠ-বস্তুকে বাস করিতে হইবে, সর্বশক্তিমান্ ভগবানে শক্তির অভাব আছে, জীব স্বীয় জুড়েন্দ্রিয়ের দ্বারা বাঁহাকে পরিমাণ করিতে অসমর্থতাদৃশ বাস্তব ভগবদহিষ্ঠানের নিত্যস্থিতি নাই, এরূপ আত্মম্ভরিতাময়ী চিত্তবৃত্তি লইয়া পরমার্থতব্দের দর্শন সম্ভব নহে উন্মুখ ও বিমুখ জীবের পরিচয় বিভুচৈতন্য ভগবান্ বিষ্ণু—নিত্যকাল মায়ার অধীশ্বর, আর অণুচৈতন্য বৈষ্ণব জীব--মায়ার বশ্য। বিভুচৈতন্য এক অদ্বিতীয় হইয়াও অনন্ত অসংখ্য নিত্যমুৰ্ত্তিতে নিত্যকাল নিত্যধামে প্রকাশমান আছেন, আর অণুচৈতন্য শুদ্ধ জীবাত্মা অনেক ও ভিন্ন ভিন্ন হইয়া নিত্যকাল তাঁহার নিত্য-সেবায় ব্যাপৃত। অণুচৈতন্য মায়াবাদী জীবগণ দুর্ভাগ্যক্রমে মায়াকে স্বীয় ঈশ্বরী বলিয়া জ্ঞান করিয়া মায়ার অনিত্য-সেবায় মনােনিবেশ করায় তাহারা স্বরূপ বিস্মৃত হইয়া বিভুচৈতন্য হইবার উদ্দেশ্যে মায়াবশই হইয়া পড়েন। অণুচৈতন্য-জীবের স্বরূপে নিত্য বৃহত্বাভাব-বশতঃ তাহাতে সেব্য-ধৰ্ম্ম কোনদিনই নাই,তাহার চিন্ময়ী আত্মস্বরূপ-বৃত্তিতে ভগবদ্দাস্যই নিত্যকাল বিরাজমান। যখন তিনি হরিসেবা-বিমুখ, তখনই তাহাকে মায়ার সেবকরূপে মায়ার ব্রহ্মাণ্ডে অনিত্য-ভােগে ব্যস্ত দেখা যায় বৈষ্ণব দর্শন ১৬(ক) মায়িক ব্রহ্মাণ্ডে ভােগী দেব বা মানবরূপে অণু:ৈতন্য জীবের অধিষ্ঠান নিরতিশয় ক্লেশের কারণ বলিয়া উহা তাহার পক্ষে দণ্ডভােগমাত্র। হরি বিমুখ হইয়া স্বর্গ-ভােগ বা নিয়ে লাভ, উভয়ই তাহার নিত্য সেবা-সুখ- লাভের বিঘ্নকারক এইসকল অনিত্য সুখ-বাসনা বা ক্লেশ-পরিহামেচ্ছা- জীবের অনন্ত উপাদেয় সেবা-প্রাপ্তির অন্তরায়মাত্র : মায়াত-বিচার ও মায়ার ক্রিয়া-বর্ণন ভগবানের নিজাবরণী শক্তির নামই মায়া অর্থাৎ বিমুখ-জীবাত্মাকে মায়া স্কুল ও সূক্ষ্মপাধিদ্বয়ের দ্বারা আবরণ করিয়া ভগবানকে জীবচক্ষুর অদৃশ্য ও অগােচর রাখিতে সমর্থ। ভােগবুদ্ধির প্রাবল্যে ও কৃষ্ণদাস্যর অভাবে জীব মায়িক-সর্গের সেব্যরূপে আপনাকে জ্ঞান করেন; তখন ঐ বৃত্তি তাহাকে অবিদ্যাশিত অভক্তরূপে স্থাপন করায়। আবার হরিসেবাই একমাত্র নিত্যধৰ্ম্ম বলিয়া বুঝিতে পারিলে তাঁহার প্রতি মায়ার বিক্রম শ্লথ হইয়া পড়ে। মায়া এই জড়ব্রহ্মাণ্ডের ‘উপাদান’কারণরূপে কথিত হইলেও ভগবানের উপাদান-শক্তি মায়ায় “আহিত হয় মাত্র। অগ্নিতপ্ত জ্বলন্ত লৌহ, যেরূপ অগ্নির নিকট দাহিকা-শক্তি লাভ করিয়া অপর বস্তুর দহনে সমর্থ হয়, মায়াও সেরূপ ভগবানের নিকট হইতে উপাদান লাভ করিয়া জগতের মাতা বা “উপাদান-কারণ’রূপে বর্ণিত হন অবৈষ্ণব প্রকৃত মায়াবাদীর ও বৈষ্ণবের বিচার-ভদ বাস্তব-বস্তু নিঃশত্তিক এবং যাবতীয় বিচিত্র মায়া হইতে নিঃসৃত --একথা অবৈষ্ণব মায়াবাদীই বলিয়া থাকেন। মায়িক-বৈচিত্রে অপ্রাকৃত-ম-মাহ্মবাদীর পক্ষে অবশ্যম্ভাবী; বৈষ্ণবগণ তাদৃশ বিশ্বাসকে প্রাকৃত বা সহজিয়া বিশ্বাস বলেন। যাহার ত্রিধানুক মৃতক-দেহে ;

১খ) শ্ৰলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী আত্মভ্রান্তি, পুত্ৰকলত্রাদিতে মমত্ব-বুদ্ধি, জড়ে অপ্রাকৃত চিৰদ্ধি এবং সলিলে তীৰ্থৰুদ্ধ, তিনি—প্রাকৃত বা অবৈষ্ণব । অাবার, অনাসক্ত হইয়া কৃষ্ণসুখের অনুকূল যথাযােগ্য বিষয় স্বীকারপূৰ্ব্বক বিষয়সমূহে নিজ-ভােগ- বুদ্ধি পরিত্যাগপূর্বক কৃষ্ণসম্বন্ধে সম্বন্ধবিশিষ্ট প্রণীত হইলে ভক্ত প্রাকৃত- বিশ্বাস হইতে বিমুক্ত হইয়া অপ্রাকৃত হরিসেবনােন্মুখ হন। তখন তিনি মুমুক্ষু মায়াবাদীর ন্যায় হরিসম্বন্ধি বস্তুসমুহকে কৃষ্ণসেবার উপকরণ জানিয়া তাহাদিগকে নিভােগপর অপর প্রাপঞ্চিক বিষয়ের সহিত সমজ্ঞানে ত্যাগ করিবার পরামর্শ করেন না। কৃষ্ণ বিমুখ অভক্ত ও প্রাকৃত রস সংসারে জীবগণ কৃষ্ণবিমুখ হইয়া কৃষ্ণসেবার বিশ্বতিবশতঃ প্রাকৃত অভিমানে মত্ত হইয়া অন্যান্য ভাগ্য জড়বস্তু বা বদ্ধ বগণের সহিত হেয় অনিত্য শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর জডুর- স্থাপনপূৰ্ব্বক জড়রসের রসিক হইয়াছেন । তাহারা বুঝতে পারেন না যে, জড়রলের বিষয় ও আশ্রয়গুলি অল্পকালস্থায়ী ও অনুপাদেয়, সুতরাং কৃষ্ণ ব্যতীত ইতর বিষয়গুলির সহিত আপনাদের সম্বন্ধ নির্দেশ ও স্থাপন করিয়া তাহারা বিবম-ভ্রান্তিতে পড়িয়াছেন। জীবগণ ও ভগবানের মধ্যে বিকৃত রস ও আশ্রয়গুলিই তাহাদের অভীঃনিদ্ধির অন্তরায় বা প্রতিবন্ধকস্বরূপ। ফবৈরাগি-নির্বিশেষবাদীর গতি কখনও বিদ্বেষ-বশে বিষয়-জ্ঞানে মায়িক-বস্তুসমুহের সত্যাগের প্রয়ােজনীয়তা উপলব্ধি করিতে গিয়া কেহ কেহ নিৰ্বিশেষ-বাদকেই আবাহন করিয়া পুনরায় হরিবৈমুখ্য সংগ্রহ করেন; ধৰ্ম্ম, অর্থ ও কাম- বৈষ্ণব দর্শন ১৬(গ) ফলের পরিবর্তে মুক্তি-ফলই তাহাদের আরাধ্য বিষষ হয় এবং চিন্ময়- বস-রাহিত্যকেই শ্রেয়স্কর জানিয়া ভগবানকে রসময় বলিতে শঙ্কিত হন। পরলোকে নিত্য কাল তমিস্রময় বিচিত্ৰতা-হীন অবস্থার নিত্যস্তিত্ব- বিশ্বাসই তাহাকে কংস-শিশুপালাদির আরাধ্য লােকে লইয়া গিয়া তাহার আত্মবিনাশ সাধন করায়। প্রাকৃত-বিশ্বাসবশে কৃষ্ণসেবা বিমুখ বিচারকগণ পুতনাদি কপচারিণীর ন্যায় কৃষ্ণসেবা প্রদর্শন করিয়া মায়াবাদী হন; আবার জীবনান্তে চিবিশেষ-রহিত হইয়া নিৰ্বিশেষত্বে লীন হন। হলে বিপৰ্যয়- ফলে প্রকৃত ভােগময় জগতে বদ্ধজীবগণ যে অনিত্য অসম্পূর্ণ নিরানন্দে লাঞ্ছিত ও বিড়ম্বিত হইয়া পড়িয়াছেন, তাহা হইতে এসকে সুষ্ঠুভাবে গ্রহণ করিতে না পারিয়া নীরস মায়াবাদের অরণী-দ্বারা নিজেদের অশুভ আনয়নপূর্ষক রসময়ের নিত্যরস হইতে নিত্যবিদায় গ্রহণ করাকে বিশেষ- বিচার-পুষ্ট বলিয়া বৈষ্ণব-দার্শনিকগণ মনে করেন না। বৈষ্ণবগণের বিচার তাহারা দেখেন যে, নিত্যরসময় বস্তুর বিকৃত-প্রতি ফলনক্রমেই এই ভােগময় অনিত্য অনুপাদেয় জগতে প্রসের বিকারসমূহ নানাপ্রকার অনথ ও বিশৃঙ্খলতা উৎপাদন করিয়াছে। সেই অনর্থসমুহ অতিক্রম করিয়া শ্রদ্ধাসহকারে অপ্রাকৃত নিত্যরসময় হরিলীলায় অনুপ্রবেশ করিতে পারিলেই শ্রদ্ধা জীবের নিত্যমঙ্গল হইবে। তখন প্রবঞ্চনাময়ী মায়ার অষ্টপাশ হইতে বিমুক্ত হইয়া বৈষ্ণব-দার্শনিকের এই নিরপেক্ষ শ্লোকটা তাহার মনে সর্বদা নৃত্য করিতে থাকিবে (ভাঃ ১৩৩৩৯, “বিক্ৰীড়িতং ব্রজবধূভিরিদ বিষ্ণোঃ শ্রদ্ধান্বিততাংশৃণুয়াথ বৰ্ণয়েদ। ভক্তিং পরাং ভগবতি প্রতিভ্য কামং হৃদরােগমাশ্বপহিনেত্যচিরেণ ধীরঃ॥”

১৬(ঘ)
শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী
তখন বৈষ্ণব-দার্শনিকের এই উক্তিটাও উপরিকথিত বাক্যের সহায়তা
করিবে (ভাঃ ১৭৪-৫ ),
“ভক্তিযােগেন মনসি সম্যক প্রণিহিতেংমলে।
অপৎ পুরুষং পূর্ণং মায়াঞ্চ তদপাশ্রয়া।
যয়া সম্মােহিতত জীব আত্মানং ত্রিগুণাত্মক।
পবােহপি মনুতেহনর্থং তংকৃতঞ্চাভিপদ্যতে
অনর্থোপশমং সাক্ষাদ্ভক্তিযােগথােক্ষজে।”

শ্রীব্যাসপূজায় প্রতি-সম্ভাষণ স্থান-শ্রীগৌড়ীয়মঠ, উল্টাডিঙ্গি, কলিকাতা সমম-সায়ংকাল, ১২ই ফাগুন, ১৩৩০ ( আর্থী কৃষ্ণ-পঞ্চমীতে পঞ্চাশত্তম আবির্ভাব-বাসরে অনুকম্পিতংণের প্রতি শ্রীল প্রভুপাদের আচার্যোচিত বৈপূর্ণ প্রত্যুত্তর) শ্রীগুরু তত্ত্ব বিপদুদ্ধারণ বান্ধবগণ, কিছু বলিবার পূর্বে আমি শ্রৌত-পথাবলম্বনে ঐবিষ্ণু-বৈষ্ণবের- অচিন্ত্যভেদাভেদপ্রকাশ আমার শ্রী গুরুদেবকে সাষ্টাঙ্গ দণ্ডবৎ প্রণতি জানাইতেছি। আমার গুরুদেব আশ্রয়জাতীয় বিষ্ণুবিগ্রহ-লীলার প্ৰকটকারী। তিনি ভগবৎপ্রিয়তম বিষ্ণুবিগ্রহ হইয়াও বৈষ্ণবরূপে মাদৃশ পতিতকে উত্তোলন করিবার জন্য প্রপঞ্চে সৰ্বপ্ৰাণীতে অধিষ্ঠিত। বিষ্ণু ও বৈষ্ণবরূপে মুগপৎ অচিন্ত্যভেদাভেদ সম্বন্ধ তিনি প্রাণিজ নররূপে আমার একমাত্র উপাস্য বস্তু। তিনি নরােত্তম- রূপে বৈষ্ণবগণের পরম বরণীয় বস্তুর সেবকসূত্রে বৈষ্ণব হইলেও গৌর- সুন্দরের সহিত অচিন্ত্যভেদাভেদ-তত্ত্ব। অভেদ-বিচারে তিনি উপিস্থ- পরাকাষ্ঠা-তনু। পরিদৃশ্যমান জগৎ তাহার সেবায় ব্যস্ত, তবে মাদৃশ সেবাবিমুখ নর তাহাকে নবােত্তম বলিয়াই নিরস্ত। সেই নবরাত্তমের ভক্ত নরণি বৈষ্ণব, সুতরাং তাহারাই আমার গুরুরূপে বহুমুত্তিতে প্রকটমান। অন্বয়ভাবে তাহারাই আমার গুরুবর্গ ও শিক্ষকবৃন্দ, ব্যতিরেকভাবে তাহারাই তাঁহাদের জননাপযােগী সময়ে মাদৃশ নরাধমের প্রলপিত-বাক্য-শ্রবণে ব্যস্ত। তাহাদের সহিতই আমি শ্রীগুরুদেবের শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী নিকট হইতে শতবাণী একযােগে কীৰ্ত্তন করিতে সমর্থ বলিয়া মনে করিতেছি। জগৎকে কিছু শিক্ষা দিবার ধৃষ্টতা আমার নাই, কেন না, বিষ্ণু-বৈষ্ণবতত্ত্ব নিত্যবৈশিষ্ট্যময় বা নিত্যভেদযুক্ত হইয়াও অচিন্ত্যভাবে অভিন্ন। উন্মুখ ও বিমুখ শিষরূপি-জীবের স্বরূপ আমি শ্রীগুরুদেবের নিকট শুনিয়াছি যে, অদ্বয়জ্ঞান ব্রজেন্দ্রনন্দনে সমস্ত উপাস্য, সকল-শ্রেণীর উপাসকবৃন্দ ও সকলপ্রকার উপাসনা নিত্য-সংশ্লিষ্ট,নিত্য সংশ্লিষ্ট হইলেও নিত্য প্রাকট্যময় বিচিত্ৰবিলাসযুক্ত। সেই বিচিত্ৰবিলাসযুক্ত নিত্যলীলা আমি ও মাদৃশ হরিগুরুবৈষ্ণব-বিমুখ জীব বিস্মৃত হওয়ায় নিত্য সত্য হইতে ভ্ৰষ্ট হইয়াছি, আবার আমি কি- প্রকারে ভ্ৰষ্ট, তাহাও সুষ্ঠুভাবে বুঝিয়া উঠিতে পারি নাই। আমার নিত্য- বোধে আমি কৃষ্ণদাস। আমি নিত্যদাস্য বিস্মৃত হইয়া নিজের রূপাঃ- ভূতিলাভে বিবৰ্ত্তগর্তে পতিত। তাদৃশ পতনে আমার তটস্থশক্তপলব্ধি সুপ্ত হওয়ায় সর্বশক্তিমান্ অদ্বয়জ্ঞান ব্রজেন্দ্রনন্দনের সেবা-বৈমুখ্যকেই আমার পরম নিবৃতি বলিয়া যে উপলব্ধি করি, তাহা নিত্যচিন্ময়বিলাসবিচিত্রতার বিরোধী হওয়ায় আমি মায়াবাদকে ব্রহ্মজ্ঞান বলিয়া ভ্রান্ত হই। তাদৃশ দর্শন আমাকে বিপথগামী করিয়া শ্রীগুরুদেবের নিত্যদাস্ত হইতে নিত্যকালের জন্য বঞ্চিত করিতেছে। সেইজন্য আমার অস্তিত্বে ভেদাভেদপ্রকাশ বুঝিতে পারিতেছি না –“দা সুপর্ণা” শ্রুতিমন্ত্রয় আমার কীর্তনের বিষয় হইতেছে না। যেখানে আমার স্বরূপবিস্মৃতিতে ভেদাভেদ-প্রকাশ অপ্রকটিত, সেইখানেই আমি ভক্ত্যেকরক্ষক ঐবিষ্ণুস্বামিপাদের অভিন্ন তনু ধরস্বামিপাদের ঐচরণে অপরাধ করিয়া বসিতেছি; শুদ্ধাদ্বৈত বিচারকে কেবলাদ্বৈতবাদের সহিত এম করিয়া আমি আমার প্রাণবল্লভের ;

শ্ৰব্যাসপূজায় প্রতিসম্ভাষণ ১৯ প্রিয় সেবনকার্যে বঞ্চিত হইতেছি,শ্ৰব্যাসের অনুগমনে বঞ্চিত হওয়ায় ভক্তিসিদ্ধান্তরহিত হইয়া অবিদ্যার আবাহনে অহঙ্কাররিমুঢ় প্রাকৃত ভােক্তা বা বিচারকত্রে শ্রোতপথ পরিহার করিতেছি। অবৈদিক হইয়া কৰ্ম্মবিচারকে বহুমান করিতে গিয়া বৈষ্ণবচরণে অপরাধ করিতেছি; শ্রীনারায়ণ-কথিত পঞ্চরাত্ৰপদ্ধতিকে শ্রোতপদ্ধতির বিরােধী জানিতেছি,---উপাস্যবস্তু সঙ্কৰ্ষণ, প্রদ্যুম্ন ও অনিরুদ্ধ বস্তুত্রকে বাসুদেব- তত্ত্ব হইতে ভেদ-দর্শনে নিজের অমঙ্গল সাধন করিতেছি এবং শাণ্ডিল্যের চরণে অপরাধ করায় আমার কেবলাদ্বৈত প্রতীতি প্রবল হইতেছে । ব্যাস-মধ্বানুগ গৌড়ীয়গুরুবর্গের কৃপা-স্মরণ এই দুর্দিনে পাদপূর্ণপ্রজ্ঞ আননতীর্থ মধ্বমুনি স্বীয় ব্যাস- দাস্ত একটিত করিয়া আমার যে উপকার করিতেছেন, তাহা আমি আমার প্ৰাপঞ্চিক ভাষায় বর্ণন করিতে অসমর্থ। মাধবেন্দ্র পুরীপাদ সেই উপাদ্যবস্তুর যে ভজনচেষ্টা শ্ৰঈশ্বরপুরীপাদের হৃদয়ে সংরক্ষণ করিয়া- ছিলেন, তাহাই ঐগৌরসুন্দর তাহার নিজজনগণকে অকাতরে বিতরণ করিয়াছেন। সেই প্রেমবিস্তারকারী শ্রীরূপের আনুগত্যে ভজনরতি- বিগ্রহ দাসগােস্বামিপ্রভুর পাদপদ্মসেবা-বিমুখ হইয়া আমি হরিবিমুখ হইতেছিলাম! শ্রীসনাতন গােস্বামীর অনুগমনে শ্ৰজীবপাদ, আমার কেশ আকর্ষণ করিয়া শ্রীরঘুনাথ-স্বরূপ-পাদপদ্মের নিত্যবাসরূপে আমাকে স্থাপন করিয়াছেন। আমি কবিরাজ গােস্বামীর ঐকরনিঃস্থতা বাণী শুনিবার সুযােগ পাইয়া আমার গুরুদেবকে নরােত্তম- পাদপদ্মরূপে দর্শন করিবার সুবােগ পাই। আমি এই বিশ্বের একটী ক্ষুদ্র জীব । সেই বিশ্বনাথ প্রভু আমাকে বিপথ-গমন হইতে প্রত্যাবৃত্ত করিবার মানসে কতই না ব্যাসপূজার আবাহন শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী করিয়াছেন। বিপৎকালে শ্রীগুরুরূপে প্রাকট্য লাভ করিয়া মধুসূদন দাস ও শ্রীউবদাসের বলসঞ্চারকারী বেদান্তাচার্য আমাকে তর্কপথের সঙ্কট হইতে শ্রৌত-ন্যায় প্রদর্শন করিয়া উদ্ধার করিয়াছেন। পরিদৃশ্যমান জগতের নাথ অভিন্ন-আশয়-মূৰ্ত্তিতে আমার অক্ষজ-চেষ্টায় বাধা দিয়া প্রকটিত হইয়াছিলেন। সেই আশ্রয়জাতীয়-কৃষ্ণবিগ্রহ ভক্তিবিনােদ লেখনী ও অাচরণ প্রভৃতি বিষ্ণুদাস্যদ্বারা আমাকে কৃষ্ণদ্বৈপায়নের মূৰ্ত্তিমদ্বিগ্রহরূপে অভিন্ন-ব্রজভূমি নবদ্বীপে অন্তঃস্থলী শ্ৰীব্রজপত্তনে আশ্রয় দিয়াছেন। - আচাৰ্যবৰ্য্যের গুরুদাস্য ও তৃণাদপি সুনীচতা-শিক্ষা-দান আমি প্রাপঞ্চি ক ভোগভূমিজ্ঞানে সেই ব্রজভূমিশােভা দর্শনে বাহচেষ্টায় ধাবিত হইতে গেলে আমার পতন ঘটিবে জানিয়া যে শ্রীগৌরকিশাের-বিগ্রহ আমাকে তাঁহার পদরেণুতে অভিষিক্ত করিয়াছেন, সেই অপ্রাকৃতবিগ্রহের পদরেণু-ভূদিত হইরা আজ আমি চরিতামৃত- লিখিত ভাষায় আপনাদের নিকট আমার পরিচয় দিবার ধৃষ্টতা করিতেছি, পুরীষের কাট হইতে মুই সে লঘিষ্ঠ । জগাই-মাধাই হইতে মুই সে পাপিষ্ঠ। মাের নাম যেই করে, তার পুণ্যক্ষয়। মাের নাম সেই লয়, তার পাপ হয়। এমন নিঘৃণ্য মোরে কেবা দয়া করে। এক নিত্যানন্দ বিনা জগৎ-মাঝারে । গুরু-বৈষ্ণবগণ বাঞ্ছাকল্পতরু ও কৃপাসিন্ধু সেই পতিতােৰ্দ্ধারণ বাঞ্ছাকল্পতরু মহাবদান্য নিত্যানন্দবিগ্রহ আমাকে সৰ্ব্বতােভাৰে হরিবিমুখতা হইতে রক্ষা করিতেছেন। আপনারা সকলেই শ্ৰব্যাসপূজায় প্রতিসম্ভাষণ AA ory, বৈষ্ণব-আমার সেই প্রভুরই বিলাসবি গ্রহ বৈভব-প্রকাশ। আপনাদের চরণে কোটী কোটী দণ্ডবং প্রণাম। আপনারা আমার প্রিয় বান্ধব- বিপৎকালে একমাত্র উদ্ধার কৰ্ত্তা। আমি ত্রিগুণ-জাত পরিদৃশ্যমান নশ্বর ভগতের প্রাণিবিশেৰ বলিয়া যে কৃবিমুখতা কায়মনোবাক্যে পােষণ করিতেছি, আপনারা আমার সেই দণ্ডনাহ ত্রিদণ্ড গ্রহণ করিয়া আমার কৃষ্ণভােগ প্রবৃত্তি দণ্ডিত করুন। আপনারা বাহ্যজগতে সকলেই বৈষ্ণব পরমহংস, আপনাদের পরিত্যক্ত দণ্ড আমি বহন করিয়া দণ্ডগ্রহণ স্বীকার- পূৰ্ব্বক ভক্তিপ্রতিকূল ‘বচারের হস্ত হইতে পরিত্রাণ লাভ করিয়া যাহাতে হরিভজনে প্রস্তুত হইতে পারি, তদ্রুপ কৃপা করুন । আপনারা অনন্ত- জীবের অনন্ত অভিলাষ পূরণ করিয়া থাকেন। আমি হরিবিমুখ জীব, অামার হরিবিমুখতার দণ্ড বিধান করিয়া কায়মনােবাক্য ব্যাসপূজায় নিযুক্ত করবার সহায়ূ করুন। আমি ক্ষুদ্র প্রাণী, সুতরাং আমার নত্যারাধ্য আনন্দতীর্থের আনুগত্য যেন আমি কোনদিন বিস্মৃত না হই মামাকে প্রাপঞ্চক ভেদবাদী বলিয়া 'ঘৃণা করুন, তথাপি আমি যেন অনন্তকাল সেই বাসুদেবদাস্য পরিহার করিয়া অন্য কোন দুর্বুদ্ধিতে পতিত হই। আমার বড় ভরসা,-শ্রীগৌরসুন্দরের সনাতন-ধৰ্ম্ম-প্রচারক তাহার দ্বিতীয়-স্বরূপ শ্ৰদামােদরের অভিন্নবান্ধব ঐরূপের অনুগ মুর্তিদ্বয় আমাকে রূপানুগ কিঙ্কর-জ্ঞানে তাহাদের পদতলে নিত্যকাল স্থান প্রদান বাঞ্ছাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপাসিন্ধুভ্য এব চ। পতিতানাং পাবনেভ্যো বৈষ্ণবেভ্যো নমাে নমঃ । শ্রীগুরুগৌরাগৈতি- শ্ৰীবাভানবী দন্থিতদাস।

কালধৰ্ম স্থান-চম্পাহট শ্রীগৌরগদাধর-মন্দির-প্রাঙ্গণ সময়-ই চৈত্র, ১৩৩০ সন, গৌরদ্বাদশী (নবদ্বীপ পরিক্রমাকাল ) চম্পাহটে দ্বিজ-বাণীনাথ-সেবিত গৌরগদাধর বিগ্রহের অর্জনেতিহাস-বর্ণন আমরা আজ ঐখাতুদ্বীপে শ্রীগৌরাঙ্গগদাধরের প্রাঙ্গণে উপস্থিত। কয়েক বৎসর পূর্বে আমরা এই স্থানে উপস্থিত হইয়াছিলাম। সে- দিন এই মন্দিরের দ্বারে তালাবদ্ধ দেখিতে পাইয়াছিলাম। এই সেবার প্রাচীনত্ব ঐভক্তিরত্নাকর-গ্রন্থে উল্লিখিত আছে। আমরা আসিয়া দেখি,--এই প্রাচীন স্থানে যে ভগববিগ্রহ আছেন,তাহা দর্শন করিবার উপায় নাই—ঘার বদ্ধ ! শুনিতে পাইলাম, যিনি সেবায়েৎ, তিনি দুই চারি দিন অন্তর কিছু মুড়ি লইয়া আসিয়া আসিয়া ভােগ দেন, কোনদিন বা তাহাও আনেন না। গ্রামের লােকেরা আমাদিগকে মন্দিরের দ্বার খুলিয়া দিলেন। আমরা মন্দিরের জীর্ণ অবস্থা ও বিগ্রহের প্রতি সেবার অনাদর দেখিতে পাইয়া অত্যন্ত ব্যথিতচিত্তে কিছুসময় পরে সে স্থান পরিত্যাগ করি। পরবৎসর আমরা কয়েক মূৰ্ত্তি সজ্জনকে এস্থানে (প্ররণ করি। প্রেরিত ভক্তগণ কলিকাতায় আমাদিগের নিকট আসিয়া সংবাদ দিলেন যে, মন্দিরের পার্শ্বস্থিত গৃহে অমেধ্য মৎস্যাদির ব্যবহার পর্যন্ত চলিতেছে। সেই প্রাচীন সেবার প্রতি পূজকের এরূপ অনাদর এবং গ্রামবাসীর মনােযোগের অভাবশ্যই গ্রামের এইরূপ পারমার্থিক দুর্দশা ঘটিয়াছে। দ্বিজ-বাণীনাথপ্রভু একদিন যে গ্রামের শােভা বর্ধন করিয়াছেন, সেই গ্রামের ভাজ এইরূপ দুরবস্থা ।

কালধৰ্ম্ম ভারতবর্ষের নানাস্থানে ধর্মের প্রতি ঔদাসীন্য হওয়ায় তক্ত স্থানের যে দুর্দশা ঘটিয়াছে, এই স্থানের দশাও তদ্রুপ ঘটিয়াছিল। গ্রামবাসীর তাৎকালিক পারমার্থিক অবস্থা শুনা যায়, এই গ্রামে বিষ্ণুভক্তিহীন ব্রাহ্মণসন্তানেরও বাস আছে। তাহারা অনেকেই মৎস্য-মাংস-ভােজী। আবার জানা গেল, তাহারা অন্যান্য বৃত্তিজীবী, সুতরাং বিষ্ণু-বিরােধি যে-সকল কার্যে ব্রাহ্মণতার হানি হয়, তাহারা সেইসকল কাৰ্য্যও অবাধে করিয়া থাকেন অর্থাৎ কেহ বণিগ,বৃত্তি, কেহ এম্-এ, বি-এ পাশ করিয়া ভৃতকবৃত্তি প্রভৃতি দ্বারা উদর পােষণ করেন। শুধু তাহা নহে, তাহারা শাস্ত্রকথা শুনিয়াও তাহাতে সম্পূর্ণ উদাসীন,জড়ের ক্রিয়াকলাপ, জড়ের ভােগচেষ্টায় মত্ত। হরিভক্তি- বিহীন-শিক্ষাক্রমে মাটিয়াভাবে শিক্ষিত হওয়ায় বৈষ্ণব-বিদ্বেষই ‘ব্রাহ্মণ বলিয়া জানিয়া রাখিয়াছেন। ইহাই কি শাস্ত্রীয় ব্রাহ্মণত্ব, ক্ষত্রিয়, বৈশ্যত্ব বা শূদ্রত্ব ? ইহাই কি শাস্ত্রীয় ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ বা ভৈক্ষ্যাশ্রম ? সন্তান-পরিচয়ে বােগ্যতার অভাবে তঁাহারা নিজের দগ্ধোদর-ভরণের জন্য এমন কুমত নাই, যাহা পােষণ এবং এমন কাৰ্য্য নাই, যাহা অনুষ্ঠান করিতে ব্যস্ত নহেন। মানুষ বলিয়া পরিচয় দিয়া ও মনুষ্যত্বের অভাব, হিন্দুনাম জাহির করিতে চাহিয়াও অহিন্দুর কার্যে ব্যস্ততা দেখিতে পাওয়া গেল। অধার্মিকের কাৰ্য্যে তাহাদের উৎসাহ, অথচ ‘অধাৰ্মিক’ নামটী শুনিতে তঁাহারা কষ্ট বােধ করেন ! অপরাপর স্থানের ন্যায় এ গ্রামের প্রধান ব্যক্তিগণ পরমার্থের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। পারমার্থিক হইবার পূর্বের অনধিকার পরবর্তিসময়ের অধিকার-সহ তুল্যজ্ঞান করিয়া পরমার্থের সহিত তাঁহারা বিদ্বেষ করিতেছিলেন। মুখে সনাতন- ধর্মাবলম্বী বলিয়া পরিচয় দিতেছিলেন, অথচ সনাতন-ধর্মের বিরোধী ২৪ শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী কিন্তু আমরা শুধু এই ক্ষুদ্র পল্লীর কথা বলিতেছি না ; পরমার্থহীন হওয়ায় মানবগণের সর্বত্রই এইরূপ অবস্থা! আমি কুমারিকা হইতে হিমালয় পর্যন্ত সমস্ত ব্যক্তির নিকট এই বৈদিক সত্য নিবেদন করিতেছি। অবশ্য আমরা এখনও সমস্ত স্থানে বৈদিক সনাতন-পৰ্ম্মের কথা বলিবার সুযােগ বা অবকাশ পাই নাই। হায়, কি-প্রকার দুঃখের কথা ! গ্রামস্থিত ঐবিষ্ণু-দেবতার মনিরের দ্বার রুদ্ধ, ভগবানের সেবা হইতেছে না, অথচ গ্রামবাসী সম্পূর্ণ উদাসীন থাকিয়া নিজ-নিজ-জড়-ভোগে মত্ত ! অসুরনীতি-অবলম্বনে সামাজিক বলিয়া পরিচয় দিয়া বিষ্ণুসেবাহীন দুর্গীতির প্রচাররূপ স্ব-স্ব-গৰ্ব্ব-খ্যাপনেই ব্যস্ত । আপনারা সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপরাদি যুগের ঐতিহ্য ও পুরাণাদি শাস্ত্র আলােচনা করিয়া থাকিবেন। কিন্তু আমরা আলােচনা করিয়াওযে তিমিরে সে তিমি রই থাকিতে চাই। দৈবী ও আশুরী সৃষ্টি জগতে দুইপ্রকার সৃষ্টি এবং সৃষ্টিভেদে দুইপ্রকার রুচি। ঐগী বলেন, দ্বৌ ভূতসর্গে লােকেহস্মিন্ দৈব আসুর এব চ। ব্যাসদেব ও পদ্মপুরাণে বলিয়াছেন, দৌ ভূতসর্গে। লােকেস্মিন্ দৈব আসুর এব চ । বিষ্ণুভক্তো ভবেদৈব আসুরশুদ্বিপৰ্যয়ঃ । একপ্রকার সৃষ্টি—দেবসম্বন্ধিনী সৃষ্টি,আর একপ্রকার সৃষ্টি–দেববিরুদ্ধ- সম্বন্ধিনী সৃষ্টি। দেবসম্বন্ধিনী সৃষ্টিতে বর্ণাশ্রমধর্ম আবদ্ধ। সত্যযুগের প্রারম্ভ হইতে এই দুই প্রকার সৃষ্টি বরাবর চলিয়া আসিয়াছে। হিরণ্য- কশিপু ও হিরণ্যাক্ষ বিষ্ণুবৈষ্ণববিদ্বেষী বলিয়া ‘অসুর’-নামে পরিজ্ঞাত। ইহারা কশ্যপঋষির সন্তান। কপঋষি-ব্রাহ্মণ। হিরণ্যকশিপু ব্ৰাহ্মণ- কালধৰ্ম্ম ২৫ কুলে উদ্ভূত হইয়াও বিষ্ণু ও বৈষ্ণবের বিরােধ-হেতু অসুর হইয়াছিলেন । সুতরাং ব্রাহ্মণকুলেও অসুর জন্মিয়া থাকে। আবার অসুরকুলেও বিষ্ণুভক্ত বা ষ্ণৈব জন্মগ্রহণ করিতে পারেন ; যেমন, হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ। ব্রেতাযুগে বিশ্বশ্রবা ব্রাহ্ম । ছিলেন । কিন্তু তাহার পুত্র রাবণ রামচন্দ্রের খিরােধহেতু ‘অসুর বলিয়া পরিচিত সনাতন শাস্ত্রে দৈববর্ণাশ্রম-বিধি- সৰ্ব্বশাস্ত্র সম্রাট শ্রীমদ্ভাগবতে দৈববর্ণাশ্রমধর্মের বিচারে এইরূপ বিধি দৃষ্ট হয় “য যল্লক্ষণং প্রােক্তং পুংসে বর্ণাভিব্যঞ্জকম্ ; যদন্যত্রাপি দৃশ্যেত তৎ তেনৈব বিনিৰ্দিশেৎ। শ্রীধরমিপাদের টীকা-“শমাদিভিরের ব্রাহ্মণাদিব্যবহারে মুখ্যা, ন জাতিমাত্রাদিত্যাহ,-যস্তেতি। যদি অন্যত্র বর্ণান্তরেহপি দৃশ্যেত তদ্বর্ণান্তরং তেনৈব লক্ষণনিমিত্তেনৈব বর্ণেন বিনির্দিশেৎ,নতু জাতি-নিমিত্তেনেত্যৰ্থঃ।” অর্থাৎ লক্ষণ বা বৃত্তদ্বারা বর্ণ নিরূপিত হইবে,—ইহাই দৈববর্ণাশ্রম- বিধি। কেবল জাতির দ্বারা ব্রাহ্মণতা-নিরূপণ—গৌণবিধি। বৃত্ত বা গুণ-দ্বারা ব্রাহ্মণাদি বর্ণ-নিরূপণই বৈদিক মুখ্যবিধি। অন্য-বর্ণোৎপন্ন ব্যক্তিতেও যদি ব্রাহ্মণাদি-বর্ণ-ব্যঞ্জক গুণ দৃষ্ট হয়, তবে তাহাকে অবশ্য সেই সেই গুণানুসারে তত্তবর্ণে বিশেষভাবে নির্দেশ করিবে—অন্যথায় প্রত্যয় ঘটিবে। কলিতে দৈববর্ণাশ্রমবিধি বিপর্যস্ত কালের করাল গতিতে দেতগণের বিচারপ্রণালী বিপন্ন হওয়ায় আসুর বর্ণাশ্রম প্রচলিত হইয়াছে। শাস্ত্রীয় বিচার ও আত্মবিচার শিথিল হইয়া শুক্ৰশােণিতজাত দৈহিকবিচার, অর্থাৎ যােষিৎসঙ্গজ স্থূলদেহগত শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী বিচার প্রাবল্য লাভ করিয়াছে। তথাপি দৈৰবিধিরই পুনঃপ্রবর্তন হওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যাইতে পারে,-হরিদাস নামক কোন বালক মাতৃক্রোড়ে অবস্থানকালে নগ্ন ছিল, তখন লােকে তাহাকে ‘নেংটা হেরে’ বলিয়া ডাকিত। কিছুদিন পরে ডি-এল পাশ করিয়া উকীল হওয়ার পর পাড়ার লােকেরা তাহাকে নেংটা হেরে আবার উকীল !” বলিয়া বিজপ করিল। তাহাতে হরিদাসের ওকালতির বাধা হইল না। প্রাচীনতম বেদ মুখ্যতঃ বিষ্ণুরই গান করিয়াছেন বেদশাস্ত্রের মধ্যে ঋগবেদ সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। যে ব্যক্তি বদবিরােধী, সেই অসুর বলিয়া কথিত। সেই ঋগবেদের একটী প্রধান মন্ত্র, যাহা ব্রাহ্মণমাত্রেরই আচমনীয় মন্ত্র—যে মন্ত্র ব্রাহ্মণের নিত্যপাঠ্য—সর্বাগ্রে পঠনীয় যক্ত- ওঁ তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ দিবীব চক্ষুরাততম্। ওঁ বিষ্ণোৰ্যৎ পরমং পদুম ” সেই বিষ্ণুবস্তুই সবস্তু—নিত্যবস্তু। রিগণ দিবালােকে সূর্যের ন্যায় সেই সদ্বস্তুর পরম বা শ্রেষ্ঠপদই নিত্যকাল ভজন করেন। আপনারা ঋগবেদে অনেক গুলি দেবতার নাম পেয়েছেন, কিন্তু বিষ্ণুর পদই পরম পদ ও নিত্যপদ, সূরিগণের নিত্য ভজনীয় ও দর্শনীয় পদ ; আর আর বাদবাকী সমস্ত পদই বৈষ্ণব পদ বা সুরিপদ। তেত্রিশকোটী দেবতা সকলেই বিষ্ণুর সেব কসম্প্রদায়। সকল দেবতার পরমদেবতা ভগবান্ বিষ্ণু। ভগবান্ বিষ্ণুকে যাঁহারা দর্শন করেন বা জানেন, তাহারাই দেবতা। দেবতা বা বৈষ্ণৰ হইলেই বুঝতে পারা যায়,-কাহার অরাধনা সৰ্ব্বজীবের নিত্য কর্তব্য, কাহার পদই বা পরম পদ এবং কাহার পরমপদ সৰ্ব্বদা দর্শনীয় ও ভজনীয়। যে-সকল লােক বিষ্ণুর কালধৰ্ম্ম ২৭ সহিত অন্যান্য দেবতাকে সমজ্ঞান করিয়াছিলেন, তাহাদিগকে ‘অবৈষ্ণব বলা হইত। ব্রাহ্মণ-নামে পরিচয় দিয়া বৈষ্ণববিদ্বেষ, বিষ্ণুবিদ্বেষ, বিষ্ণুতে প্রাকৃতবুদ্ধি, নারায়ণে শিলা-জ্ঞান, পাদোদকে জলশুদ্ধি, মহাপ্রসাদ ডাল-ভাত-বুদ্ধি, বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি প্রভৃতি কাৰ্য্য প্রাগুদাহৃত উকিল হরিদাসকে ‘নেংট হােরে’ বলার ন্যায় মুখতা বা নাস্তিকতার পরিচয় মাত্র। বর্তমান সাহজিক গৌড়ীয়-সমাজ অবৈষ্ণব ; সুতরাং অবৈদিক পঞ্চোপাসক স্মৰ্ত্তপর সমাজের আনুগত্যে এরূপ মুখতা-প্রযুক্ত বৈষ্ণব- বিদ্বেষ অত্যন্ত ঘৃণাহ। পূৰ্বেই বলিয়াছি, সত্যযুগের প্রারম্ভ হইতে এইরূপ বিষ্ণুবিদ্বেষ ও বৈষ্ণববিদ্বেষ দেখা যায়। হিরণ্যাক্ষ শব্দের ‘হিরণ্য’ শব্দে স্বর্ণ, ‘অক্ষ’ শব্দে ইন্দ্রিয় বুঝায়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ‘টাকা, ‘টাকা করিয়া চোখ দিয়ে টাকা দেখে, সৰ্ব্বদা টাকাই ধ্যান করে ও ভজন করে। শিষ্ণোদরপরায়ণ হওয়ার জন্য টাকার দরকার ; তাই পরমার্থ বিক্রয় করিয়াও টাকা রােজগার করিতে তৎপর। কলিতে আত্মেন্দ্রিয়প্রীতিবাঞ্ছারই প্রাবল্য আমরা যে স্থানে আজ সমবেত হইয়াছি, তাহার অনতিদূরে যখন চৈতন্থদেব আবির্ভূত হইয়াছিলেন,তখনও নাস্তিকতা কিরূপ প্রবল ছিল। ইহার অল্পদিন পরে গৌড়ীয়-সমাজে মহাবিপ্লব উপস্থিত হইয়াছিল। ব্যঘটীয় হরিহর ভট্টাচার্যের পুত্র পরলােকগত মঃ মঃ রঘুনন্দন ভট্টাচাৰ্য্য এক বিষ্ণুবৈষ্ণববিরােধী স্মৃতিপ্রবন্ধ সঙ্কলন করিয়া সমাজে পুনরায় কৰ্ম্ম- জড় নাস্তিক্যবাদের বন্যা আনয়ন করেন। সাধারণ লোক জানে না যে, প্রকৃত শাস্ত্রীয় কথা-বাস্তব সত্যকথা কি, নিত্যধৰ্ম্ম বা আত্মধর্মের কথা কি? তাই তাহারা ঐসকল ভােগবাদ বা অনিত্য কাপট্যযুক্ত ধৰ্ম্মের কথাকে বৈদিক’ বলিতে ব্যস্ত। ঐসকল অশাস্ত্রীয় কথাই তাহাদের শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী প্রতি আকর্ষণ করিয়াছে । অনিত্যধর্মের কথায় মজিয়া ধৰ্ম্ম-অর্থ-কামের কথায় মুগ্ধ হইয়া বা কখনও কৰ্ম্মফলত্যাগী মুফু সাজিয়া তাহারা নিত্যসেবা-ধর্মের কথা ত্যাগ করিয়াছে ! এইস্থানে আমরা উপযুপরি তিনবৎসর যাবৎ আসিতেছি। আমাদের মধ্যে কতকগুলি লােক তাহাদের যথাসর্বস্ব বিসর্জন দিয়াও সত্যকথা বলিতে অগ্রসর হইয়াছেন, তথাপি লোক যে তিমিরে সেই তিমিরে। আমরা আমাদের প্রকৃত পরম উন্নতিতেই সম্পূর্ণ উদাসীন! আনানের সকল কার্যে অবকাশ আছে, সকলবিষয়ে রুচি আছে,--সত্যকথা শুনিবার অবকাশ নাই; কারণ সত্যের সেবায় নিজ ইন্দ্রিয়-তােষণের কথা নাই--ভুক্তি-মুক্তির কথা নাই ; আছে কেবল এ অদ্বিতীয়ের সুখ-কামনা-অজ্ঞানের প্রতিবাঞ্ছ- কৃষ্ণেন্দ্রিয়প্রীতি-বাসনা। ।

শ্ৰীধাম-প্রচারিণী সভার উদ্দেশ্য স্থান-ধাম-মায়াপুর, শ্ৰীযোগপীঠ সময়-১০ই চৈত্র, ১৩৩০ (ধাম প্রচারিণী সভার একত্রিংশৎ বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতি শ্রীল প্রভুপাদের অভিভাষণ) ঠাকুর ভক্তিবিননদের দান ধামপ্রচারিণী সভায় সর্বাগ্রে ঐল ভক্তিবিনােদ ঠাকুরের নাম উল্লেখযােগ্য। তাহার অলৌকিক কৃপা ও অসাধারণ চেষ্টা-বলেই সৰ্ব্বত্র গ্রুধামের প্রচার হইয়াছে ও হইতেছে। অত্যল্প সময়ের মধ্যেই তাহার গ্রন্থরাজির বহু সংস্করণ হইয়াছে ও হইতেছে। বহু কৃতবিদ্যগণের মধ্যে শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর শুদ্ধ সনাতন ধর্ম প্রচারিত হইতেছে। পূৰ্ব্ববঙ্গ হইতে সুদূর আসাম, দক্ষিণে গঞ্জাম প্রদেশ পর্যন্ত ঐসকল কথা সত্যপিপাসু ব্যক্তিগণ গ্রহণ করিতেছেন। কলিকাতা মহানগরীতেও ঐসকল কথার যথেষ্ট প্রচার হইতেছে। বহু সম্ভ্রান্ত,বহু কৃতবিদ্য ব্যক্তি ঐসকল সত্য কথার আদর করিতেছেন। অবশ্য ব্যবসাদার দুষ্কৃত ব্যক্তিগণের মধ্যে ঐ সকল কথার যে অনাদর না হইতেছে, তাহা নহে; কিন্তু সত্যানুসন্ধিৎসু ব্যক্তিমাত্রেই বুঝিতে পারিতেছেন যে, ঐসকল ব্যবসায়ী মৎসর ব্যক্তি- গণের মধ্যে কোনও সত্য নাই। আমরা যখন ঢাকা-নগরীতে প্রাপ্তবয়স্ক কয়েকজন কলেজের অধ্যাপকের নিকট এইসকল সনাতনধৰ্ম্মের কথা বলিলাম, তখন তাহারা বলিলেন,-“আমরা ইতঃপূৰ্ব্বে চৈতন্যদেবের ধর্মের সম্বন্ধে এত উচ্চ দার্শনিক ভাব শ্রবণ করি নাই। ঐল ভক্তি- বিনােদ ঠাকুর বহু ভক্তি-গ্রন্থ রচনা করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু নানা কারণে তিনি সেইসকল কথা সর্বতােভাবে প্রচার করিবার সুযোগ-সুবিধা লাভ করেন নাই।

সুখের বিষয়, শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী বাম-প্রচারিণী সভার উদ্দেশ্য—অসৎসঙ্গত্যাগ অধুনা শ্রীধাম-প্রচারিণী সভার প্রকৃত উদ্দেশ্য কাৰ্য্যে পরিণত হইতে আরম্ভ হইয়াছে। কর্মজড় ভােগ-প্রবণ ব্যক্তিগণ পৰ্যন্ত অসৎসঙ্গ, পরিত্যাগ বা অসৎসঙ্গ হইতে সন্ন্যাস গ্রহণ করিতেছেন। শ্রীগৌরাঙ্গসুন্দরের বাক্য—‘অসৎসঙ্গ-ত্যাগ,—এই বৈষ্ণব-আচার’ সফল হইতেছে। জড়জগতে ভাে-বুদ্ধিতে প্রাকৃত দর্শন বা ভােগ্য-দর্শনই স্ত্রীসঙ্গ বা যােষিৎসঙ্গজ দর্শন; সেইরূপ প্রাকৃত-দর্শন-পরিত্যাগের নামই অসৎসঙ্গ-ত্যাগ বা সন্ন্যাস-গ্রহণ। মদ্ভাগবত বলিতেছেন, ততত দুঃসঙ্গমুৎস্যজ্য সৎ সজ্জেত বুদ্ধিমান্। সন্ত এবাষ্য ছিন্দন্তি মনােব্যাসঙ্গমুক্তিভিঃ । বুদ্ধিমান্ ব্যক্তি দুঃসঙ্গ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক সৎসঙ্গ ভজন করিবেন । কেননা, সাধুগণ দুষ্ট মনের বিশিষ্ট জড়াসক্তিসমূহকে হরিকথা-দ্বারা ছেদন করিয়া থাকেন। সাধুদিগের স্বভাবই অসদ্বিষয়ে বিমুখজীবগণের আসক্তি-ছেদন। সেই ছেদন-কাৰ্য্যের একমাত্র অস্ত্র-শস্ত্র বা হরিকথা- কীৰ্ত্তন। এই ছেদনকৰ্ত্তার বয়স বা স্কুলের অপেক্ষা নাই। কৃষ্ণতত্ববিৎ আচারবান্ ব্যক্তিই বিমুখজীবের অসদাসক্তিরূপগ্রন্থি ছেদনে সমর্থ । প্রদ অসুরকুলে উদ্ভূত এবং বালক হইয়াও অল্পবয়স্ক অসুরবালক- গণের, এমন কি, যণ্ড-অমর্ক-হিরণ্যকশিপু প্রভৃতি গুরুবর্গের বিশিষ্ট আসক্তি ছেদন করিতে যত্নবান্ হইয়াছিলেন। গৃহব্ৰত কৰ্ম্মিম্মাত্তের কুমত-নিরাস কতকগুলি ঘরপাগলা গৃহব্রত লােক বলিয়া থাকে যে, কলিতে সন্ন্যাস নাই-- “অশ্বমেধং গবালম্ভং সন্ন্যাসং পলপৈতৃকম্। দেবরেণ সুতােৎপত্তিঃ কলৌ পঞ্চ বিবর্জয়েৎ।

শ্রীধাম-প্রচারিণী সভার উদ্দেশ্য অর্থাৎ কলিকালে অশ্বমেধ, গােমেধ, সন্ন্যাস, মাংস দ্বারা পিতৃশ্রাদ্ধ, দেবরের দ্বারা সুতোৎপত্তি,-এই পাঁচটী কাৰ্য্য নিষিদ্ধ হইয়াছে। এইসকল কথা কৰ্ম্মজড় ভােগপর কর্মিগণের জন্য শাসন-বাক্য। গৌরাঙ্গসুন্দরের নিজের আচরণ কি? তিনি নিজে সন্ন্যাস গ্রহণ করিয়াছিলেন। ঘরপাগল গৃহব্ৰতগণ স্বরূপােদ্বোধক ব্রহ্মচর্য্যাভাবে তাহার তাৎপর্য বুঝিতে পারে না; তাই শাস্ত্রের কদৰ্থ করিয়া থাকে। • প্রকৃত সন্ন্যাসী বা পরমহংসের স্বরূপ মানুষ গৃহস্থের চেহারায় থাকিয়াও সন্ন্যাসীর উচ্চপদবী পরমহংস- বৈষ্ণব হইতে পারেন; আবার বনচারী, ব্রহ্মচারী ও সন্ন্যাসীর চেহারাতেও পরমহংস বা উচ্চ সন্ন্যাসী হইয়া থাকেন। ইতর চেষ্টা ত্যাগ করিয়া কায়মনােবাক্যে কৃষ্ণার্থে অখিল চেষ্টার নামই ‘সন্ন্যাস। বৈষ্ণবমাত্রেই সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট সন্ন্যাসী ; বৈষ্ণবের অপর নাম-পরমহংস। শ্ৰীঅদ্বৈত প্রভু নিত্যানন্দপ্রভুকে বলিয়াছিলেন,—“পরমহংসের পথে তুমি অধিকারী”; শ্রীমদ্ভাগবতেরও বাক্য-সলঙ্গা আশ্রয়াংস্ত্যক্ত। চরেদবিধিগােচর।” বৈষ্ণবগুরুবর্গের অনুকরণ কর্তব্য নহে, অনুসরণময়ী সেবাই কর্তব্য বৈষ্ণবগুরুগণের বেষ-পরমহংস বেষ ; তাহারা সতত হরি-সেবা- পরায়ণ। গুরুর বেষ গ্রহণ করা আমাদের মত শিষ্যত্ৰুব পাষণ্ডীর উচিত নহে। হরিসেবা-বৃত্তি বাদ দিয়া গুরুর বেষ বা পারমহংস্য-বেষ লইয়া আজ কাল কিরূপ ব্যভিচার চলিতেছে। আমাদের গুরুবর্গের পরমহংস বেষের সম্মান প্রদর্শন করিবার জন্য বর্ণাশ্রমধর্মোপযুক্ত বেষ ধারণ করিয়া হরিসেবায় উন্মুখ হওয়াই কর্তব্য।

শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী সম্বন্ধ জানিয়া অনর্থযুক্ত অবস্থায় অনর্থমুক্ত গুরুবৈষ্ণবের অনুকরণ নিষিদ্ধ, পরমহংস শুরুবৈষ্ণবের শিষ্যাভিমানেই শ্রেয়ঃ শ্রীল ভক্তিবিনােদ ঠাকুর কল্যাণ কল্পতরু’তে লিখিয়াছেন, কৃপা কর বৈষ্ণব ঠাকুর। ভজিতে ভজিতে অভিমান হউক দূর। ‘আমি ত’ বৈষ্ণব এ-বুদ্ধি হইলে ‘অমানী’ না হব আমি। প্রতিষ্ঠাশা আসি হৃদয় দূষিবে হইব নিয়শামী। তােমার কিঙ্কর আপনে জানিব গুরু-অভিমান ত্যজি তােমার উচ্ছিষ্ট পদ-জল-রেণু সদা নিষ্কপটে ভজি । নিজে শ্রেষ্ঠ জানি’ উচ্ছিষ্টাদি-দানে হবে অভিমান ভার । তাই শিষ্য তব থাকিয়া সৰ্ব্বদা লইব পূজা কার । ‘অমানী’ ‘মানদ’ হইলে, কীৰ্ত্তনে অধিকার দিবে তুমি। তোমার চরণে নিষ্কপটে সদা কাদিয়া লুটিব ভূমি।

শ্রীধাম প্রচারিণী সভার উদ্দেশ্য গুরু-বৈষ্ণবাপরাধই-কীৰ্ত্তনদুর্ভিক্ষের মুল গুরুবর্গের অবমাননা-হেতুই আজকাল কীর্তনের দুর্ভিক্ষ হইয়া পড়িয়াছে। আজকালের কীর্তনজড়ের কীৰ্ত্তন, ব্যবসার খাতিরে কীৰ্ত্তন, কনক-কামিনী-প্রতিষ্ঠাসংগ্রহের জন্য কীৰ্ত্তন, জড়েয়িতােষণের জন্য কীৰ্ত্তন ; কৃষ্ণেন্দ্রিয়প্রতি-ইচ্ছা বা হরিতােষণের জন্য নহে। মহাপ্রভু তৌৰ্যত্রিক অর্থাৎ নৃত্য, গীত ও বাদ্য-ইহাদিগকে ‘ব্যসন বলিয়াছেন ; কিন্তু হরিসেবানুকূল হইলে ইহারাই আবার শ্রেষ্ঠ ভজন। আজকালের কীৰ্ত্তন ব্যসনের মধ্যে পরিগণিত হইয়া পড়িয়াছে। ঠাকুর ভক্তিবিনােদের কৃপা কিছুদিবস পূৰ্বে তথাকথিত সভ্যসম্প্রদায় বৈকুণ্ঠ বা গােলােককে লণ্ডন বা প্যারিসের মত কিংবা কাল্পনিক কোনও স্থানের মত মনে করিতেছিলেন, কিন্তু ঐল ভক্তিবিনােদ ঠাকুর কৃষ্ণসেবােম্মুখতায় স্বয়ং উপলব্ধি করিয়া তাহার চিদনুভূতিতে বহুবিধ গ্রন্থ রচনা দ্বারা জগজ্জীবকে ধামের অপ্রাকৃতত্ব জানাইয়া গিয়াছেন। তিনি শ্রীধামের চিন্ময়ত্ব, অপ্রাকৃতত্ব বিষয় বর্ণন করিয়া বহু গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। ধাম—তদ্রুপবৈভব। ; ভক্তিবিনােদামুগ-গণের ব্রত আউল, বাউল, কর্তাভজা, নেড়ানেড়ী, স্মার্ত, প্রাকৃত সহজিয়া, জাতি- গগাস্বামী প্রভৃতি অপসম্প্রদায় শ্রীমন্মহাপ্রভুর নামে কলঙ্ক আনিতেছিলেন শ্রীগৌরসুন্দরের প্রচারিত আত্মধৰ্ম্মকে দেহ ও মননধৰ্ম্মের সহিত সমান করিয়া ফেলিতেছিলেন। শ্রীল ভক্তিবিনােদ ঠাকুর ও তদীয় চরণানুচরগণ শুদ্ধধর্মের সেই গ্লানি দুরীকরণার্থ বন্ধপরিকর হইয়াছিলেন ও হইয়াছেন।

৩৪ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী স্বরূপবিস্মৃতি বা বিরূপাভিমানের দৃষ্টান্ত আপনারা অনেকেই মহাভারতের এই উপাখ্যানটী জানেন,-মানস- সরােবরে শাপগ্রস্ত ইন্দ্র একদা শূকর-যােনি প্রাপ্ত হইয়া বহুশাবকাদি পরিবেষ্টিত হইয়া বাস করিতেছিলেন। ব্রহ্মা আসিয়া শূকররূপী ইন্দ্রকে বলিলেন, “ওহে, তুমি অমরাবতীতে যাইয়া ইন্দ্রের আসনে উপবেশন কর, তথায় বহু দাসদাসী তােমার সেবা করিবার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। এই কথা শুনিয়া শূকররূপী ইন্দ্ৰ ক্রোধে অন্ধ হইয়া ব্রহ্মাকে আক্রমণ করিতে গেল। ব্রহ্মা একে একে ঐ শূকরের শাবক গুলিকে হত্যা করিতে থাকিলে ঐ শূকর চীৎকারে দিদিগন্ত কম্পিত করিয়া তুলিল,-ব্ৰহ্মাকে মহাশত্রুজ্ঞানে ক্রোধে ও শশাকে অধীর হইয়া পড়িল। চতুখ শূকর- রূপী ইন্দ্রের প্রিয়তমা পত্নীকে ও বধ করিলেন । তখন ঐ শূকররূপী ইন্দ্র সমস্ত আত্মীয়-স্বজন-বিহীন হইয়া ব্রহ্মার উপদেশ চিন্তা করিতে লাগিলেন। তখন তাহার নিজের স্বরূপও ধীরে ধীরে স্মরণপথে উদিত হইতে থাকিল। শূকররূপী ইন্দ্ৰ বুঝিলেন—“আমি ত’ ইন্দ্র, আমিত শূকর নহি, শূকররূপী অমির বিরূপ, 'আমি স্বরূপতঃ ইরূপি-ভগবদ্দাস । সাধুমুখে জীব স্বরূপতত্বের কথা-শ্রবণ-ফলে নিজতত্ত্ব অবগত হইতে পারে। বৰ্ত্তমান সময়ে ও যদি মহাপ্রভু-প্ররিত স্বরূপধর্মের কথা ঘরপাগলা লোকদিগের নিকট বলা যায় যে, তােমরা সমস্ত ইতর চেষ্টা পরিত্যাগ করিয়া হরিভজন কর, তখন তাহারাও ঐ শূকররূপী ইন্দ্রের মত বলিয়া উঠে‘বিষয়-ভােগরূপ বিষ্ঠা ভােজন করাই আমাদের সনাতন (?) ধৰ্ম্ম ; তাহাতেই আমাদের সুখ, আমরা চাই না ঐসকল হরিকথা শুনিতে আমাদের অন্যান্য বহু কাৰ্য্য আছে,—বিষ্ঠা-ভােজন-কাৰ্য আছে, শাবক সংখ্যা বর্ধন-কাৰ্য্য আছে। তাহারা সাধুকে শত্রু মনে করে। তাহারা জানে না যে ১ • শ্ৰীধাম প্রচারিণী সভার উদ্দেশ্য “বস্তাহমনুগৃমি হরিষে তদ্ধনং শনৈঃ অর্থাৎ ভগবান্ বলিতেছেন—“যাহার প্রতি আমি অনুগ্রহ প্রকাশ করি, শীঘ্র শীঘ্র তাহার ধন অপহরণ করিয়া থাকি। ত্রিবিধ ঈশ্বর-বৈমুখ্য ঈশ্বরবিমুখতা তিনটী-কনকচেষ্টা, কামিনীচেষ্টা ও প্রতিষ্ঠার চেষ্টা যাবতীয় কায়মনােবাক্য ঈশ্বরের সেবায় নিযুক্ত কর ; তাহা হইলেই ভাে-অভিমান বিদূরিত হইবে। ষ্ণেই যে একমাত্র ভােক্তা এবং আমরা সকলে ও জগতের যাবতীয় বস্তু যে একমাত্র তাহারই ভােগ্য, এইরূপ শুদ্ধ উপলব্ধি হইবে । এইরূপ বিচার উপস্থিত হইলেই আমাদের যােষিৎসঙ্গ- ত্যাগ হইবে। সুষ ধাতুর অর্থ ভজন বা সেবা; যাহা-কিছুদ্বারা অজ্ঞান কৃষ্ণের চিন্ময়-ইন্দ্রিয়সমূহের সেবা না করিয়া আমাদের জড়ভােগগ্রস্ত নিজেন্দ্রিয়ের সেবা করিয়া নিতে চাই, তাহাই লােগ্যা যােষিৎ বা স্ত্রী। তাই স্ত্রীসঙ্গী হইও না, স্ত্রৈণভাব পরিত্যাগ কর। চেতনময় বস্তুর আরাধনার অভাব ঘটিলেই অচেতনের প্রতি আমরা চেতনের আরােপ করিয়া থাকি। দ্বিবিধ চিজ্জভূ-সমন্বয়বাদী দুইপ্রকার ব্যক্তি অচেতনে আরােপ এবং চেনে অচেতনের আরােপ করিয়া থাকেন। তাহারা মায়াবাদী ও কী ? মায়াবাদিগণ ঈশ্বরকেও মায়ার অন্তর্গত জ্ঞান করেন। ‘মীয়তে অনয়া ইতি নয়া' অর্থাৎ যাহা-দ্বারা মাপিয়া লওয়া যায়, তাহারই নাম-‘মায়া। মায়াবাদিগণ ঈশ্বরকে ও মাপিয়া লইতে চান। ঈশ্বর স্বরাষ্ট্র বা স্বাধীন। প্রাকৃত বস্তু যে-প্রকার নাম-রূপ-যুক্ত বলিয়া পরিচ্ছিন্ন, তােপ ঈশ্বরেরও যদি নাম-রূপ-গুণ-লীলা থাকে, ঈশ্বর যদি নিৰ্বিশেষ চেতনের ঐলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী না হইয়া সবিশেষ হন, তাহা হইলে তিনিও পরিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িবেন, মায়াবাদী এইরূপ ভয় করেন। এইরূপ ভয়মুলে ঈশ্বরকে মাপিয়া লইবার চেষ্টা বর্তমান। সাহজিক সম্প্রদায় বা বাউল সম্প্রদায়ের চিত্তবৃত্তিও মায়াবাদীর তুল্য ' যদিও তাহারা দাস্যাভিমান প্রভৃতি প্রদর্শন করিয়া থাকেন, তাহা হইলেও সেস্থলে নিজানন্দ বা নিজ সুবিধার অন্বেষণ করেন মাত্র। তাহারা নিজেরা আনন্দিত হইয়া চোখ দিয়া জল ফেলেন । সকল চেষ্টায় নিজানন্দরূপ কপটতা থাকে বলিয়া উহাও মায়াবাদী ধর্ম । সৰ্ব্বতােভাবে ভগবৎসুখন্বেষণই ভগবদ্ভক্তি বা সেবাধর্ক্স ! আমরা ন্যূনধিক নিত্যকৃষ্ণসেবা-বিমুখ হওয়ায় সকলেই মায়াবাদী হইয়া পড়িয়াছি। জীবে দয়াই একমাত্র হরিকথা-কীৰ্ত্তন। কৃষ্ণসঙ্কীর্তনের ব্যায় জীবে দয়ার প্রকৃষ্ট উপায় বা উচ্চ আদর্শ নাই বা হইতে পারে না!

নন্দোৎসব স্থান-শ্রীগৌড়ীয়মঠে বিরাট বিদ্বৎসভা। সময়-৭ই ভাদ্র, শনিবার ১৩৩১ অপ্রাকৃতচিরসের বিষয়াশ্রয়-তত্ত্ব-বিচার পরিপূর্ণ আনন্দবিগ্রহ ‘রসে। বৈ সঃ”-তিপ্রতিপাদ্য সস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবােপলক্ষে যে সকল ভক্ত আনন্দ প্রকাশ করিয়া থাকেন, তন্মধ্যে নন্দ সর্বপ্রধান। নন্দ’ শব্দের অর্থ “আনন্দ”। শান্তরসের আশ্রয় শ্রীকৃষ্ণ তদীয় নিত্যধামে পঞ্চরসের বিষয়বিগ্রহরূপে সেবিত হন। যখন তিনি শান্তরসের বিষয়, তখন তাহার আশ্রয়—গাে, বেত্র, বিষাণ, বেণু, যমুনা-পুলিন প্রভৃতি ; ইহারা অজ্ঞাতভাবে শ্রীকৃষ্ণের সেবা করিতেছেন। ইহারা জানেন না--“আমরা কাহার সেবা করিতেছি। শ্রীকৃষ্ণ গােচারণ করিতেছেন, গাভী হইতে দুগ্ধ পাইতেছেন, বেদ্বারা গাভীপালকে তাড়ন করিতেছেন, কখনও বা বেণুবাদন করিতেছেন, কখনও যমুনার সৈকত রাশির উপরি পাদবিক্ষেপ করিয়া চলিতেছেন--তাহারা সকলেই শ্রীকৃষ্ণের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির সহায়ক হইয়াছেন, কিন্তু তাহারা তাহা বুঝিতে পারিতেছেন । “কৃষ্ণনিষ্ঠা তৃষ্ণা-ত্যাগ—শান্তের দুইগুণে।” জীবের যখন প্রাকৃত তৃষ্ণা-ত্যাগ হয় এবং ‘কৃষ্ণ আছেন এইরূপমাত্র অনুভূতি হয়, তখন শান্তরস। মুনিগণ শান্তরসের উপাসক,তাহারা উপনিষদাদি পাঠ করিয়া থাকেন, তাঁহারা “ব্ৰহ্মপূতঃ প্রসন্নাত্মা” হন। কিন্তু তাহাদের প্রাকৃত অভিনিবেশ দূর হইয়া চৈতন্যনিষ্ঠা-লাভের প্রাক্কালে শুদ্ধজীবানু ভূতির সময়ে ভগবানের সহিত জীবের সমজাতীয়তার উপলব্ধিতে তাহারা শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী কিয়ৎপরিমাণে ভগবানের সহিত সমৰুদ্ধি হন, কিন্তু তখন ও মমতার উদ্রেক না হওয়ায় অনেক সময় নিত্য আশ্রয়বিগ্রহ বা বিষয়বিগ্রহের সহিত নিজকে একীভূত মনে করিয়া বসেন। যেমন, কোন দ্রষ্টা কোন পুরুষকে দূর হইতে নানাজাতীয়-বৃক্ষাদি-পরিশােভিত পৰ্বতমধ্যে প্রবেশ করিতে দেখিয়া কল্পনা করেন যে, ঐ ব্যক্তি অরণ্যের সহিত একীভূত হইয়া গিয়াছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যেমন ঐ পৰ্বতপ্রবিষ্ট পুরুষ পৰ্বতে প্রবেশ করিয়া বৃক্ষাদির শােভা পরিদর্শন করেন এবং সে সময় ঐ পুরুষের ঐসকল হইতে একটী পৃথক অবস্থানও বিদ্যমান থাকে অর্থাৎ দ্রষ্টা, দৃশ্য ও দর্শন-ব্যাপার অপগত হয় না, তদ্রুপ ব্ৰহ্মলােকের অপােভাগে দেবীধামে স্থিত বহির্দশী তর্কপন্থী লােকসমূহ বৈকুণ্ঠের বিচিত্রতা ধারণা করিতে পারিয়া অদ্বয়জ্ঞানতত্ত্বকে, নিৰ্বিশেষ, নিরাকার প্রভৃতি কল্পনা করিয়া থাকেন। সুতরাং শান্তঃসটা ব্ৰহ্মসম্বন্ধে প্রথম রস অর্থাৎ জীবের সংসারতাপ-নিবৃত্তির পর পরব্রহ্মে অবস্থানমাত্র। ঐ অবস্থায় কিয়ৎ পরিমাণে জড়ব্যতিরেক-সুখ ব্যতীত স্বাধীন ভাব কিছু নাই। তখনও পরব্রহ্মের সহিত সাধকের কোনও সম্বন্ধ স্থাপিত হয় নাই । দাস্যরসের আশ্রয় দ্বিতীয় রস-দাস্যরস ; ইহাতে মমতা বিদ্যমান। আমি দাস ও ভগবান্ আমার নিত্য প্রভু এবং প্রভুর ইন্দ্রিয়প্রীতির জন্য জীবাত্মার স্বাভাবিকী দাস্য-প্রবৃত্তি,-ইহাই দাস্যরসের লক্ষণ। দাস্যরসের আশ্রয়—রক্তক, পত্রক, চিত্রক, বকুল প্রভৃতি সখ্যরসের আশ্রয় তৃতীয় রস—সখ্যরস। সখ্য দুইপ্রকার-গৌরবসখ্য ও বিশন্ত-সখ্য। দাস্যরসে ও গৌরবসখ্যে সমরূপ কটক বর্তমান। সম্ভ্রমের স্বভাব এই শ্রীনন্দোৎসব যে, উহা বিষয়কে আশ্রয় হইতে কিঞ্চিৎ দূরে রাখে। বিশম্ভসখ্য-রসের রসিক গােপবালক সখাগণ কৃষ্ণের ঘাড়ে চড়িতে, কৃষ্ণকে নিজের উচ্ছিষ্ট ফল খাওয়াইতে, তাহার সঙ্গে মারামারি করিতে কোনও দ্বিধা বােধ করেন না। বড়ই আপনার ভাব। বৎসলরসের আশ্রয় আবার দস্যি হইতে সখ্য যেমন শ্রেষ্ঠ-সখ্য হইতে বৎসল রসও তদ্রুপ অর ও শ্রেষ্ঠ। জগতেও দেখা যায়, সমস্ত সখাগণ অপেক্ষা পুত্রই অধিকতর প্রিয় ও আনন্দোৎপাদক। নন্দ-যশােদা-সেই বৎসলরসের রসিক। ঐশ্বৰ্য্য ও মাধুৰ্য-রস ঐশ্বৰ্য্যরসের বিষয়—শ্রীপতি নারায়ণ ; আর মাধুর্য রসের পরম বিষয়-শ্রীকৃষ্ণ। ঐশ্বৰ্য্যদ্বারা শিথিল প্রেমে কৃষ্ণের প্রীতি নাই; কেননা, ঐশ্বৰ্য্যরসের রসিকগণ বিচার করেন যে, বিশ্বম্ভভাব-দ্বারা বুঝি Cহাদের ভগবৎসেবা শ্লথ হইয়া পড়িবে। প্রকৃতপক্ষে তাহা নয়,—বিশ্রম্ভ-সেবায় সেবার গাঢ়তা ও মমতার আস্পদের প্রতি আরও আপনার হইতে আপনার জ্ঞান অধিকতর বর্তমান। ভগবৎপ্রেমার নিকট মুমুক্ষার তুচ্ছত্ব কিন্তু কতকগুলি লােক আত্মরাজ্যের এইসকল অতি উচ্চতত্ব ধারণা করিতে না পারিয়া ত্রিবিধ দুঃখের আত্যন্তিক নিবৃত্তি, জড়মুক্তি বা নিৰ্বিশেষ ব্ৰহ্মানুসন্ধানকেই পরমপ্রাপ্য বস্তু মনে করেন। তাহারা জড়- বৈচিত্রের হেয়তা-দর্শনে চিদ্বৈচিত্র্যের অভাব বা অসম্পূর্ণতা কল্পনা করেন। কেহ কেহ দাস্য-সখ্যাদি ভাবসকলকে নিৰ্বিশেষ অবস্থার পূর্নাঙ্গ বলিয়া কল্পনা করতে ও ত্রুটী করেন না। মন্মহাপ্রভু ঐসকল ৪০ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী লােককে মুগ্ধ’ আখ্যা দিয়াছেন। জড়মুক্তি ত’ অতি নীচের কথা, সামান্য কথা,-রাজাধিরাজের নিকট সামান্য একমুষ্টি অনের প্রার্থনার ন্যায় । প্রকার সহস্র সহস্র মুক্তি ভক্তগণের পদে অবলুষ্ঠিত হইয়া তাহাদের সেবার সময় অপেক্ষা করিতে থাকিলেও ভক্তগণ তাহাতে ভ্রুক্ষেপ করেন না। বুভুক্ষু ও মুমুক্ষুর দশা ও গতি জগৎ বুভুক্ষু ও মুমুক্ষু লােকের সংখ্যায় পরিপূর্ণ। মনেধৰ্ম্মযুক্ত জীবের আদর্শ—হয়, ‘ভােগ’, না হয় ত্যাগ। কিন্তু শ্রীগৌরসুন্দর বলিলেন, “জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্যদাস। কৃষ্ণের তটস্থা শক্তি, ভেদাভেদপ্রকাশ । কৃষ্ণ ভুলি’ সেই জীব অনাদিবহিৰ্ম্ম খ। অতএব মায়া তারে দেয় সংসার-দুঃখ ।” ত্যাগিকুল ভােগিকুলকে ঘৃণা করেন। ভােগিকুল ও ত্যাগিকুলের আদর্শ সম্পূর্ণ বিপরীত বােধ হইলেও উভয়েই সমান। ভােগী আপাতম বিষমিশ্র পুষ্পন্নের লােভ সম্বরণ করিতে না পারিয়া উহা গ্রহণ পূর্বক মৃত্যুর কবলে কবলিত হয় ; আর ত্যাগী ঐ খাদ্য ত্যাগ করিয়া অনাহারে নিজেই নিজের বিনাশ সাধন করে। যেমন দুইটী ব্যক্তির ফোড়া হইয়াছে ; ঐ দুইব্যক্তি দুইজন ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসকের নিকট গেলেন। একজন চিকিৎসক রােগীর ফোড়ায় বাতাস দিয়া (অর্থাৎ তাহাকে আপাতশাস্তি প্রদান করিয়া) বিদায় দিলেন। অপর চিকিৎসক বলিলেন,-অস্ত্রোপচার করিলে তােমার পুনরায় ফোড়া হইতে পারে অতএব যদি তােমার প্রাণ সংহার করা যায়, তাহা হইলে আর ফোড়ার সম্ভাবনা থাকিবে না,-এই বলিয়া রােগীর গলায় ছুরি বসাইয়া দিলেন অর্থাৎ চিরতরে রােগীর জীবন বিনাশ করিলেন। সেইরূপ কর্মীর ;

শ্রীনন্দোৎসব ৪১ লভ্য-ইহকাল ও পরকালে ভােগ, নিৰ্বিশেষ জ্ঞানীর লক্ষ্য—নির্বাণ । সেই নির্বাণ দ্বিবিধ-বোধৱাহিত্য নির্বাণ ও বােধসাহিত্য নিৰ্ব্বাণ । বোধরাহিত! বা অচিৎপরিণতি-শাক্যসিংহের লক্ষ্যবস্তু। বােধ-সাহিত্য বা চিন্মাত্রোপলব্ধি-শাঙ্কর মায়াবাদিগণের লক্ষ্য। শ্রীমদ্ভাগবত বলেন, যেংহেরবিন্দাক্ষ বিমুক্তমানিনস্বয্যস্তভাবাদবিশুদ্ধৰুদ্ধয়ঃ । আরুহ কৃচ্ছে,ণ পরং পদং ততঃ পতন্ত্যধােহনাদৃতযুম্মদ য়ঃ । তথা ন তে মাধব তাবকা কচিশ্যন্তি মার্গাৎ ত্বয়ি বদ্ধসৌহৃদাঃ । ত্বয়াভিগুপ্তা বিচরন্তি নির্ভয়া বিনায়কানীকপমূৰ্দ্ধসু প্রভাে। ‘হে কমললােচন কৃষ্ণ, যাহার সাধন করিতে করিতে ‘আমরা মুক্ত হইয়াছি, অতএব আর ভগবচ্চরণসেবার আবশ্যকতা নাই-সেব্য, সেবক ও সেবার নিত্য পৃথক পৃথক অবস্থানের এয়ােজন নাই,-এইরূপ বুদ্ধি করিয়া তােমার চরণে অনাদর করেন, তাঁহারা যােগাদি নানাপ্রকার কৃচ্ছসাধ্য ধন-দ্বারা অনেক উন্নত পদবী লাভ করিয়া ও ভগচচরণে অপরাধহেতু সেই উচ্চ পদবী হইতে অধঃপতিত হন। কিন্তু হে মাধব, যাহারা তােমার নিত্য সেবা-প্রার্থী ভক্ত, তাহারা তােমাতে পরিনিষ্ঠিতবুদ্ধি হওয়ায় সম্পূর্ণভাবে তােমার সহিত ঘনিষ্ঠ প্রেমযুক্ত, সুতরাং তাহারা সৰ্ব্বদা তােমা-কর্তৃক রক্ষিত হন এবং তজ্জন্য তাহাদের বিঘ্ন হওয়া ত’ দূরের কথা, তাঁহারা বিঘ্নবিনাশকগণের মস্তকে পদার্পণপূর্বক নির্ভয়ে বিচরণ করিয়া থাকেন। ভক্তের বিনাশ নাই,-ভক্ত পরানন্দময়, সুতরাং কোন কালে “ভক্তের বিনাশ নাই”---“ন মে ভক্তঃ প্রণতি"---ইহা গীতার বাক্য। আজ সেই ভক্তরাজ নন্দের আনন্দপ্রকাশের দিন। পরিপূর্ণ সচ্চিদানন্দবিগ্রহ শ্রীভগবান তাঁহার হৃদয়ে সর্বদা বিশ্রাম করেন বলিয়া তিনিও আনন্দময় ; এইজন্য তাহার নাম ‘নন্দ। ;

শ্ৰীবার্ষভানবী স্থান-শ্রীগৌড়ীয় মঠ বিদ্বৎসভা সমর-২০শে ভাদ্র ১৩৩১, রাধাষ্টমী তিথি ( শ্রীরাধজন্মোৎসবোপলক্ষে ) মঙ্গলাচরণ শ্রীকৃষ্ণ-ব্ৰহ্ম-দেবর্ষি-বাদরায়ণ-সংজ্ঞকান্ । মধ্ব-শ্রীপদ্মনাভ-মহরি-মাধবান্ । দেবমীশ্বরশিষ্যং শ্রীচৈতন্যঞ্চ ভজামহে । শ্রীকৃষ্ণপ্রেমদানেন যেন নিস্তারিতং জগৎ। ভগবান্ শ্রীকৃষ্ণের শিষ্য ব্রহ্মা, ব্রহ্মার শিষ্য দেবর্ষি নারদ, নারদের শিষ্য ব্যাসদেব, শ্রীমধ্ব সেই ব্যাসদেবকে গুরুপদে বরণ করিয়াছিলেন। সেই বৃদ্ধ বৈষ্ণবাচাৰ্য মধ্বমুনির অষ্টাদশ অধস্তনপৰ্য্যায়ে কৃষ্ণচৈতন্য- মহাপ্রভু,—যিনি এই জগতে প্রেমরত্ন বিতরণ করিয়া জগৎ উদ্ধার করিয়ানে,—সেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে আমরা ভজন করি। সেই অভিন্ন-ব্রজেন্দ্রনন্দন গৌরসুন্দর মহাপ্রভুই কলিযুগে রাধা-ভাব-দ্যুতি- সুবলিত তনু হইয়া আপনাকে প্রকাশ করিয়াছিলেন। সেই গােবিন্দা- নন্দিনী রাধা গােবিন্দমোহিনী গোবিন্দসর্বস্ব সকান্তা-শিরােমণি শ্ৰীমতী বৃষভানু-নন্দিনীর জন্মােৎসব বর্ষপর্যায়ে গতকল্য অনুষ্ঠিত হইয়াছে। ভাগবতে স্পষ্টভাবে শ্রীরাধার নাম নাই কেন? শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস শ্ৰীমদ্ভাগবত-নামে যে পারমহংসী সংহিতা গ্রন্থ প্রণয়ন করিয়াছেন, তাহাতে তিনি সুষ্ঠুভাবে কৃষ্ণলীলা বর্ণন বার্ষভানবী করিয়াছেন, কিন্তু রহস্যবিচারে বিশেষভাবে শ্ৰীমতী রাধিকার নাম উল্লেখ করেন নাই। যাহার জন্য শ্রীকৃষ্ণলীলা, যিনি শ্রীকৃষ্ণলীলার প্রধান নায়িকা-যিনি আশ্রয়তত্ত্ববিচারে সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়, তাহারই নাম শ্রীমদ্ভাগবত-গ্রন্থে উল্লেখ নাই কেন ?--ইহা অনেকেরই হৃদয়ে প্রশ্ন হইয়া থাকে। শ্ৰীমতী রাধারাণী কৃষ্ণের প্রিয়তমা বলিয়াই লীলার পরমগােপনীয়ত্ব-বিচারে শ্রীব্যাসদেব অনধিকারি-সাধারণ শ্রোতা ও পাঠক দিগের নিকট হইতে গােবিন্দ-প্রেমিকগণের পক্ষে ও পরম-দুর্লভ সৰ্ব্বাপেক্ষা প্রয়ােজনীয় উপাস্য শ্রীরাধাতত্ত্ব গােপন রাখিবার জন্য সেই তত্ত্বের উল্লেখ প্রকাশ্যভাবে করেন নাই। মর্কটের নিকট মুক্তার মালা প্রদান না করিয়া গােপন রাখা কি বুদ্ধিমানের কাৰ্য্য নহে? আবার, পরমহংস ভকুলের জন্য যে তিনি শ্রীমদ্ভাগবত-গ্রন্থে শ্রীরাধার বিষয় কিছুমাত্র উল্লেখ করেন নাই, তাহাও নহে। যেমন শ্রীমদ্ভাগবত-গ্রন্থে শ্রীগৌরাব- তারের কথা ইঙ্গিতে ব্যক্ত হইয়াছে, তদ্রুপ শ্ৰীমতী বৃষভানুনন্দিনীর কথাও অতিগােপ্য রহস্যভাবে উক্ত হইয়াছে ;-১০৩০২৮ (ভাঃ) “অনয়ারাধিতাে নং ভগবান্ হরিরীশ্বর। যন্নো বিহায় গােবিন্দঃ প্রীততা যামনয়দ্রহঃ । শ্ৰীমতী ‘সর্বকান্তা-শিরােমণি কেন ? ঘােড়শসহস্ৰ গােপী কৃষ্ণের রাসস্থলীতে উপস্থিত থাকিয়া শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিযুক্তা। যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ অচিন্ত্যশক্তিবলে দুই-দুইটী গােপীর মধ্যে একএকটী মূর্তি প্রকাশপূৰ্ব্বক গােপীমণ্ডলমণ্ডিত হইর! রাসােৎসবে প্রবৃত্ত। ঐমতীর অভিমান হইল,-তবে কি আমি শ্রীকৃষ্ণের সর্বোত্তমা সেবিকা নহি ? অামাকে না হইলে ও কি কৃষ্ণের চলিতে পারে ? ষােড়শ সহস্র গােপীকাই ত তাহার সেবা সম্পূর্ণভাবে করিতে পারেন? নেই ষােড়শ ৪৪ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী সহস্র সেবিকা, যাহারা ঐগগাবিন্দের জন্য লোকধৰ্ম্ম, বেদধৰ্ম্ম, দেহধৰ্ম্ম, কৰ্ম্ম, লজ্জা, ধৈৰ্য্য, দেহসুখ, আত্মসুখ, আৰ্যপথ, নিজেদের পরিজন-প্রীতি, স্বজন তাড়ন, ভসন, ভয়—সমস্ত পরিত্যাগ করিয়া যথাসৰ্ব্বস্ব-দ্বারা কৃষ্ণেরইন্দ্রিয়-তৰ্পণ করিতেছেন, যদি আমার জন্য শ্রীকৃষ্ণ তাহাদিগকেও ত্যাগ করিতে পারেন, তবেই বুঝিব যে, আমি শ্রীকৃষ্ণের যথার্থ সেবিকা সেইরূপ মনে করিয়া শ্ৰীমতী রাধিকা রাসস্থলী পরিত্যাগপূৰ্ব্বক চলিয়া গেলেন। শ্রীকৃষ্ণের রাস বন্ধ হইল। যাহার জন্য সব যাহার জন্য রাস, যিনি না হইলে রাসােৎসব আরম্ভই হইত না, তাহার অনুপস্থিতিতে রাস বন্ধ হইবে না কেন? গােবিন্দও সেই প্রিয়তমা ও প্রধান নায়িকার অনুসন্ধান করিবার জন্য রাসস্থলী পরিত্যাগ করিলেন। তখন গোপীগণ পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিলেন,-“হে সহচরি, আমাদিগকে ছাড়িয়া শ্রীকৃষ্ণ যাহাকে নিভৃতে লইয়া গেলেন, তিনিই ঈশ্বর হরিকে অবশ্যই অধিক আরাধনা করিয়াছেন। শ্রীরাধিকা বিনা অন্যসমস্ত গােপী একত্র মিলিয়াও কৃষ্ণের সুখের কারণ হইতে পারেন না। রাধার সহিত ঐকৃষ্ণের ক্রীড়ার বুদ্ধি করিবার জন্যই আর সব গােপীগণ রসােপকরণ-স্বরূপ। জয়দেব-গোস্বাশিপন শ্ৰগীতগােবিন্দে এইরূপ বর্ণন করিয়াছেন, কংসারিরপি সংসারবাসনাবদ্ধশৃঙ্খলা। রাধামাদায় হৃদয়ে অত্যাজ ব্রজসুন্দরী! কংসারি কৃষ্ণ সম্পূর্ণসাররূপা রাসলীলা-বাসনাবন্ধা রাধাকে হৃদয়ে লইয়া ব্রজসুন্দরীগণকে পৰ্য্যন্ত ত্যাগ করিয়া গেলেন। গােপীর আনুগত্যময় ভজনের সর্বশ্রেষ্ঠত্ব ঐরাবতারে দণ্ডকারণ্যস্থিত যষ্টিসহস্র ঋষি ভগবান্ শ্রীরামচন্দ্রের কোটিকর্পবিজিত অপ্রাকৃত মনােমােহন রূপ সন্দর্শন করিয়াও গােপীদেহ - শ্ৰবার্যভানবী ৪৫. লাভ করিবার ইচ্ছা করিয়া গােপীর আনুগত্যে বহুবৎসরব্যাপী তপস্যা করিয়াছিলেন। তাঁহারাই শ্ৰীকৃষ্ণলীলায় গােপীদেহ লাভ করেন। গােপীদেহ প্রাকৃত রক্তমাংসের থলি নহে, তাহাদের ও শ্রীকৃষ্ণেরই ন্যায় সচ্চিদানন্দময় তনু। সেই তাপস ঋষিগণের জটাজুটমণ্ডিত মস্তক, সাধনক্লিষ্ট জীর্ণ শীর্ণ প্রাকৃতবিচারযুক্ত দেহ ভগবানের নয়নােৎসৰ বিধান করিতে পারে না এবং তাহারা শান্ত, দাস্য বা গৌরবসখ্যে ভগবানের যে সেবা করিয়াছেন, তাহাতে গােপীভজনের চমৎকারিতা ও মাধুৰ্য্য নাই বলিয়াই তাহার নিত্যচিদানন্দময়ী গােপীতনু লাভ করিবার জন্য ব্যাকুল হইয়াছিলেন। গােপীগণের সচ্চিদানন্দময় দেহের প্রতি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, প্রতি অংশ, প্রতি হাব-ভাব এগােবিন্দের সেবানুকূল। ঐকৃষ্ণপ্রিয়তমা শ্রীরাধিকা দিণ্ডিপাদ শ্রীল প্রবেধানন্দ সরস্বতী বা তুঙ্গবিদ্যাদেবী তাঁহার ‘রাপারসসুধানিধি’ গ্রন্থে শ্ৰীবানবীর স্তবে বলিয়াছেন, বস্থাঃ কদাপি বসনাঞ্চলখেলনােখ- ধন্যাতিধন্থপবনেন কৃতাৰ্থমানী। যােগীন্দ্রদুর্গমগতিমধুসূদনােহপি তস্যা নমােহস্তু বৃষভানুভুবে দিশেহপি। কোন সময়ে যে শ্ৰীমতী রাধিকার বস্ত্ৰাঞ্চল-সঞ্চালন-ফলে পবনদেব ধন্যাতিধন্য হইয়া কৃষ্ণগাত্র স্পর্শ করায় যােগীগণেরও অতি-সুদুর্লভ সেই শ্রীনন্দনন্দন পর্যন্ত আপনাকে কৃতকৃতার্থ মনে করিয়াছিলেন, সেই শ্ৰীমতী বার্ষনবীদেবীর উদ্দেশে আমাদের নমস্কার বিহিত হউক। রাধিকা সর্ববিষয়ে সর্বাধিক দাস্য-রসের রসিক রক্তক, পত্রক, চিত্ৰক যে রসের আস্বাদন ৪৬ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী করিতে পারেন না, সখ্যরসেলাম, সুদাম, দাম, বসুদামাদি গােপবালকগণ যে রসের মধু রিমা আস্বাদন করিতে পারেন না, বৎসল- রসের রসিক-নন্দ-যশে দা যে রসের পরমােৎকর্ষ ধারণা করিতে পারেন না, উদ্ধবাদি শ্রেষ্ঠগণ যে রসের জন্য নিত্য লালায়িত, সেই মধুর- রসের রসিক গােপিকাবর্গ-মধ্যে শ্রীমতী রাধিকা-সৰ্বোত্তমা, রূপে- গুণে-সৌভাগ্যে-প্রেমে সৰ্বাধিকা। কৃষ্ণের পরমশ্রেষ্ঠা কে ?-শ্রীল রূপপাদের বিচার শ্রীল রূপগােস্বামিপদি উপদেশামৃতের শ্লোকে সেই শীমতী রাধকার শ্রেষ্ঠত্ব-বর্ণনে বলিয়াছেন, “কষ্মিভ্যঃ পরিতো হরেঃ প্রিয়তমা ব্যক্তিং যমুনিন- স্তেভ্যো জ্ঞানবিমুক্ত ভক্তিপরঃ (প্রমৈকনিষ্ঠাস্ততঃ । তেভ্যস্তাঃ পশুপালপঙ্কজদশস্তাভ্যাহপি সা রাধিকা প্ৰেষ্ঠা তদ্বদিয়ং তদীরসরসী তাং নায়েৎ কঃ ব্যতী।” কুকৰ্মী, বিকৰ্মী ও অকম্মী হতে সৎকার উৎকর্ষ পরের, অপকার, চৌর্য্য, মিথ, ব্যভিচার, লাম্পট্য প্রভৃতি অসৎকাৰ্য- ব্রত ব্যক্তি হহতে বাঁহারা দেশের উপকার, দান, ধ্যান, তীর্থভ্রমণ প্রভৃতি করেন, যাহার কেবলমাত্র নিজেদের ইন্দ্রিয়ের স্বার্থান্বেষী নহেন সেইরূপ সৎকৰ্ম্মী শ্রেষ্ঠ ; কারণ, অসৎকর্মের গ্রাবল্যে জগভে মনুষ্যজাতির পক্ষে বাস করাই অসম্ভব হয় । কিন্তু এইরূপ সৎকর্মীর আদর্শই চরম নহে। সৎকন্মিগণ কুকৰ্মী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। জীবগণকে উচ্ছ,ঙ্খলতার কবল হইতে রক্ষা করিয়া তাহাদের অসৎকৰ্ম্ম সঙ্কোচ করিবার জন্যই সৎকর্মের ব্যবস্থা। কিন্তু কম্মিগণ বুভুক্ষু, তাহারা ইহকালে অভ্যুদয় ও পরকালে সুখের জন্য ব্যস্ত। যাহারা আপদিগকে নিষ্কাম-কৰ্মী বলিয়া মনে শীবার্ষভানবী ৪৭ করেন, তাহারাও প্রচ্ছন্নভােগী। নিজেদের অন্তঃস্থলের গভীরতম প্রদেশে লুক্কায়িত নিজেন্দ্রিয়-প্রীতিই নানাকারে স্বদেশ-প্রীতি, দরিদ্রকে অন্নদান, বস্তুদান, দাতব্যচিকিৎসালয়-নিৰ্মাণ, পুষ্করিণী-খনন, জলছত্র- স্থাপন, অতিথি-সৎকার দি সৎকাৰ্য্যরূপে প্রকাশিত হয়। জতুনিষ্ঠ কর্মী হইতে চিনুসন্ধিৎসু জ্ঞানীর শ্রেষ্ঠত্ব কম্মিগণ তাহাদের কপটতা নিজেরা ধরিতে পারেন না। সেই বুভুক্ষু কৰ্ম্মী হইতে মুমুক্ষু জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ। তাহারা তাত্ত্বিক, কম্মিদিগের ‘নির্বুদ্ধিতা বুঝিয়াও পাছে তাহাদিগকে সৎকৰ্ম্ম হইতে নিবৃত্ত করিতে গেলে নিজের অসৎকৰ্ম্মাক্ত হইয়া পড়েন, এইজন্য জ্ঞানিগণ গীতার বাক্য স্মরণ করিয়া থাকেন-“ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কৰ্ম্মসঙ্গিনা” অর্থাৎ অজ্ঞতাবশতঃ কর্মে আসক্ত কর্মসঙ্গী মুখব্যক্তিগণের বুদ্ধিভেদ জন্মাইবে না। তাহা করিলে তাহারা অসৎকর্মাসক্ত হইয়া পড়িবে। কর্মিগণ মুখ ; অমুখ জ্ঞানিগণ বিচার করেন--“তে তং ক্তা স্বর্গলােক বিশালং ক্ষীণে পুণ্যে মর্তলোকং বিশন্তি।” কৰ্ম্মিগণ সৎকর্মজনিত পুণ্যফলে দিব্য দেবভােগসকল প্রাপ্ত হন। পরে সেই প্রভূত-সুখ-জক স্বর্গ ভােগ করিয়া পুণ্যক্ষয় হইলে পুনরায় মর্ত্যলােকে আগমন করেন। সুতরাং জ্ঞানীরা কর্মীর মূখতা পরিত্যাগ করিয়া অমুখের বিচারে চির- আনন্দের প্রয়াসী হইয়া মুমুক্ষু হন। তাহাদের বিচার এই যে, অস্তিত্বই যখন ক্লেশায়ক, তখন চিদ্ রাহিত্য, অচিনিৰ্ব্বাণ বা চিৎসাহিত্য ব্রহ্মে বিলীন হওয়াই শ্রেয়ঙ্কর! এই দ্বিতীয় শ্রেণীর লােকই নির্ভেদ-ব্ৰহ্মানুসন্ধান- তৎপর জ্ঞানী, মায়াবাদী বা প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ। ইহাদিগের আশা কত ক্ষুদ্র । ইহারা মূৰ্থ কৰ্মার উপর পাল্লা দিতে গিয়, নিজেরা অমূখ সাজিষ্ট্রে গিয়া **প্রকৃত প্রস্তাবে মূখই হইয়া পড়িলেন, আত্মবিনাশ সাধন করিলেন।

৪৮ লপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী যে নিত্যানন্দ লাভের আশায় জ্ঞানী ত্যাগী সাজিলেন, ভােগীকে ঘৃণা করিলেন, তাহার ভাগ্যে সেই নিত্যানন্দলাভ হইল না। “জ্ঞানী জীবন্মুক্তদশা পাই, করি’ মানে। বস্তুত বৃদ্ধি শুদ্ধ নহে কৃষ্ণভক্তি বিনে।” অখােজ ভগবৎসেবকের সর্বশ্রেষ্ঠত্ব এইজন্য সর্বপ্রকার জ্ঞানী হইতে শুদ্ধভক্ত শ্রেষ্ঠ – ভক্তের পদবী সৰ্ব্ব- শ্রেষ্ঠ পদবী। মুখ ভােগী কর্মিগণ মনে করেন,-ভক্তগণ, বুঝি তঁাহাদের মতই কৰ্ম্ম করেন, তাহাদের মতই বণ্টা নাড়েন, ঈশ্বর পূজা করেন, ‘জীবে দয়া করেন, তীর্থে গমন করেন, সাধুগুরুর সেবা করেন । কিন্তু বস্তুতঃ তাহা নহে। কৰ্মীর ভালমন্দ-বিচার চক্ষু-কণাদি-ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ; কিন্তু ভক্তের সেবা-অপােজসম্বন্ধিনী অর্থাৎ যাহা ইন্দ্রিয়জ জ্ঞান ধারণা করিতে অসমর্থ। ভক্তের নিজেন্দ্রিম-প্রীতি নাই, আছে কেবল কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতি। ফলত্যাগীর বিচারের হেয় জ্ঞানী মনে করেন,-ভক্ত বুঝি তাহারই মত কোন অনিত্য বস্তুর, যে বস্তু পরে আর থাকবে না, যে দৃশ্য, দ্রষ্টা ও দর্শনের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হইবে, যাহার এিপুটী বিনষ্ট হইবে, সেইরূপ বস্তুরই অন্ধবিশ্বাসমূলে ভজন করেন। জ্ঞানিগণ অচিন্ত্যশক্তিসম্পন্ন ভগবানের চিন্ময় হাত, পা, মুখ, চোখ, নাক, ঠোঁট সব কাটিয়া, তঁাহার হাতে হাত কড়ি, পায় বেড়ী দিয়া অবশেষে তাঁহারই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছেদন করিয়া তাহাকে নিরাকার নিৰ্বিশেষ করিতে প্রয়াসী। ভগবান্—যিনি অদ্বিতীয় ভােক্তা, তিনি ভােগ করিতে পারিবেন না, তিনি হাত-পা-ছাড়া বস্তু হইবেন! আর যত নশ্বর জড়ভােগের জন্য হাত-পা, ভােগি কুলের থাকিবে—তাহারা হিমালয়ের মুক্ত বায়ুতে, অরণ্যানীর নির্জন সৌন্দর্য্যে, ভাগীরথীর রমণীয় কূলে বসিয়া বার্যভানবী 8న ত্যাগের নামে প্রচ্ছন্ন ভােগ করিয়া লইবেন! ভক্তগণ সেইরূপ প্রচ্ছন্ন- ভােগী নহেন। যে মুক্তির জন্য জ্ঞানিগণ লালায়িত, তাহা ভক্তগণের নিকট ত্যক্তনিষ্ঠীবনের ন্যায় বস্তু-অগ্রাহ্য পরিত্যাজ্য বস্তু। কৃষ্ণ কণামৃতের লেখক শ্ৰল বিল্বমঙ্গল গােস্বামী বলিয়াছেন। । । মুক্তি-ভক্তির অনুগামিনী দাসী ভক্তিয়ি স্থিরতরা ভগব যদি স্যা- দ্দৈবেন নঃ ফলতি দিব্যকিশােরমূর্তি। মুক্তি স্বয়ং মুকুলিতাঞ্জলিঃ সেবতেহ ধৰ্মার্থকামগতয়ঃ সময়প্রতীক্ষাঃ । যাহার শ্রীকৃষ্ণে শুদ্ধভক্তির উদয় হইয়াছে, তাহার নিকট মুক্তি স্বয়ং মুকুলিতাঞ্জলি হইয়া সেবা করিবার জন্য ব্যস্ত থাকেন, শুদ্ধভক্ত তাহার দিকে একবার ফিরিয়াও চান না, আর ধৰ্ম্ম, অর্থ, কামসকল কোনসময় শুদ্ধভক্তের সেবা করিবার সুযােগ পাইবে এই আশায় সময়ের প্রতীক্ষা করিয়া বসিয়া থাকে। সুতরাং কৰ্মীর প্রার্থনীয় ধৰ্মার্থকাম ও জ্ঞানীর লােভন য় মােক্ষ—ভক্তগণের থুৎকারের বস্তু। - মুমুক্ষার তুচ্ছ শ্ৰল প্ৰবােধানন্দ সরস্বতীপাদ বলেন- কৈবল্যং নরকায়তে ত্রিদশপুরাকাশপুষ্পয়তে দুৰ্দান্তেন্দ্রিয়কালসৰ্পপটলী পােৎখাতদংষ্ট্ৰীয়তে। বিশ্বং পূর্ণসুখায়তে বিধিমহেন্দ্রাদি কীটায়তে যৎকারুণ্যকটাক্ষবৈভববতাং তং গৌরমেব স্তমঃ । জ্ঞানিযােগিগণের মৃগ্য কৈবল্যসুখ-শুদ্ধভক্তের নিকট নরকতুল্য, *- « শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী ~~~~~~~~~ কৰ্মীর লােভনীয় ইন্দ্রপুরীর সুখ—তাহার নিকট আকাশকুসুমের ন্যায় অবাস্তব। যাহার শ্রীগৌরসুন্দরে প্রেম উদিত হইয়াছে, বিশ্বামিত্রপ্রমুখ তাপস-কুলের ন্যায় তাহার পতনাশা নাই; গৌরসুন্দরের কৃপাকটাক্ষের এইরূপই প্রভাব! সুতরাং সর্বপ্রকার জ্ঞানী অপেক্ষা শুদ্ধভক্ত কৃষ্ণের প্রিয়তর। সর্বপ্রকার ভক্তগণ-মধ্যে আবার প্রেমনিষ্ঠ ভক্ত কৃষ্ণের অধিকতর প্রিয়। সর্বপ্রকার প্রেমভক্তের মধ্যে ব্রজগােপীগণ কৃষ্ণের আরও অতিশয় প্রিয়। সৰ্ব্বগোপীগণের মধ্যে শ্রীমতী রাধিকা আবার কৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয়তমা -তাহা হইতে শ্রীকৃষ্ণের আর প্রিয়তম কেহ নাই। যেরূপ শ্রীরাধিকা কৃষ্ণপ্রিয়তমা, সেইরূপ তদীয় কুণ্ড ও শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয়তমা। সেই শ্রীরাধার দাস্যই আমাদের পরম লােভনীয় বিষয় । এমন দিন কবে হইবে,সেদিন আমরা অন্য অভিলাষ, স্মৃত্যুক্ত তুচ্ছ কৰ্ম্ম, অকিঞ্চিৎকর নিধ্বিশেষ জ্ঞান, তপ ও যােগাদি—সমস্ত কাকবিষ্ঠাবৎ পূরিত্যাগ করিয়া রাধার দাস্যে নিযুক্ত হইয়া শ্রীরাধাগােবিন্দের নিত্য পরম-চমৎকার-মাধুৰ্যময়ী সেবার অধিকার পাইব! অনর্থযুক্ত অবস্থায় রাধার দাস্ত-সৌভাগ্য-লাভ ঘটে না। যাহারা অনর্থযুক্ত অনধিকার অবস্থায় পরম-প্রসেবিকা শ্রীরাধার অপ্রাকৃত লীলার আলােচনায় তৎপর হন, তাহারা ইন্দ্রিয়ারামী, প্রচ্ছন্ন ভােগী, প্রাকৃত সহজিয়া . ব্রহ্মসংহিতায় ব্রহ্মা ঐগােবিন্দের এইরূপ স্তব করিয়াছেন, প্রেমাঞ্জনচ্ছুরিতভক্তিবিলােচনেন সন্তঃ সদৈব হৃদয়েহপি বিলােকয়ন্তি। যং শ্যামসুরমচিন্ত্যগুণস্বরূপং গােবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি । প্রেমবিভাবিত সমাধিচক্ষেই সেই অচিন্ত্যগুণস্বরূপ শ্ৰীশ্যামসুন্দরের অপ্রাকৃত শ্ৰীমুর্তির দর্শন-লাভ হয়। অনর্থমুক্ত প্রেমিক ভক্তগণ সেই

শ্ৰবাৰ্ষভানবী
গােবিন্দকে দর্শন করিয়া থাকেন। সুতরাং যে-সকল পরম
সুকৃতিবিশিষ্ট অনর্থমুক্ত পুরুষ শ্রীরাধার দাস্যে থাকিয়া শ্রীকৃষ্ণের ভজন
করেন, তাঁহারাই শ্রীরাধাকুণ্ডে অবগাহন করিতে পারেন,তাহারাই
অষ্টকাল শ্রীরাধাগােবিন্দের সেবা-সৌভাগ লাভ করেন। তাঁহারাই
ধন্য ধন্যাতিধন্থ।

এমধ্বাবির্ভাব স্থান-শ্রীমধ্বগৌড়ীয় মঠ, নবাবপুর, ঢাকা তারিখ-২১শে আশ্বিন, ১৩৩১, শ্রীমাধবন্মােৎসব মঙ্গলাচরণ “আনন্দতীর্থনাম সুখময়ধামা যতির্জয়াৎ। সংসাৱার্ণবতরণিং যমিহ জনাঃ কীৰ্ত্তয়ন্তি বুধাঃ ॥” সেই আনন্দতীর্থ নামক শ্ৰমধ্বমুনিকে আমি সসম্ভ্রমে অভিবাদন করি । তাহার জয় হউক। পণ্ডিতগণ তাহাকে সংসারসাগর পার হইবার নৌকা-সদৃশ বলিয়া কীৰ্ত্তন করেন। সেই যতিরাজ—সুখময়ধাম । আজ তাহার আবির্ভাব দিবস। গৌড়ীয়-আন্নায় ও আচাৰ্যগণের প্রচারেতিহাস বাঙ্গালাদেশে শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর অনুগত গৌড়ীয়-সম্প্রদায়ের সকলেই সেই বৃদ্ধবৈষ্ণবাচার্য্যের অনুগত! তাহার অপর নাম-মধ্বমুনি । তাহার নামানুসারেই এই মঠের নামকরণ হইয়াছে। সেই পাদ আনন্দতীর্থ বা পূর্ণ প্রজ্ঞের অষ্টাদশ অধস্তন শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যদেব, সপ্তদশ অধস্তন—শ্ৰমদ্বৈতপ্রভু ও ঐনিত্যানন্দ প্রভু। এই তিন প্রভু শ্ৰমধ্ব- মুনিকে স্বীয় গুরুপরম্পরা-মধ্যে স্বীকার করিয়াছেন। মধ্বমুনি কেরল দেশের উত্তরাংশে (বর্তমান কেনাড়া জেলায়) আবিভূত হন। এই মহাত্মা ভারতবর্ষে পঞ্চোপাসনার পরিবর্তে একমাত্র বিষ্ণপাসনারই কর্তব্য প্রচার করেন ! তাহার পূর্বে মায়াবাদাচাৰ্য শিবগুরুতনয় শঙ্করপাণ আৰ্য্যধৰ্ম্ম-সংস্থাপনের চেষ্টা করিয়াছিলেন। ক্রম পুনরায় সেই আৰ্য্যধর্মের মধ্যে ভগবদানুগত্য বা ভগবৎসেবাই প্রচার করেন।

শ্ৰীমদ্বাবির্ভাব ক শ্রীমধ্বমুনি অঙ্গুলি নির্দেশপূৰ্ব্বক শ্রদ্ধা জগদ্বাসীকে দেখাইলেন, জীবের অধিষ্ঠানে যে নিত্য ভগবৎসেবাতাৎপৰ্য্য, তন্মলেই আস্তিক্যবাদ প্রতিষ্ঠিত! ভগবানের আনুগত্য ব্যতীত জীবের অন্ত গতি নাই। শিব গুরুতনয় শঙ্করাচাৰ্য মালাবার জেলার কালাডিগ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। শঙ্করের আবির্ভাবের পূর্বে ভারতবর্ষ বৌদ্ধ বা বেদবিরুদ্ধবাদে প্লাবিত ছিল। বেদবিরুদ্ধবাদ খণ্ডন করিয়া শঙ্কর বর্ণাশ্ৰমধৰ্ম্ম প্রবর্তন করেন। পূৰ্বে বৌদ্ধ ও জৈনগণের নানাপ্রকার অবৈদিক বর্ণধৰ্ম্মের দ্বারা ভারতবর্য আচ্ছন্ন ছিল। ভাগবতেও (১২৪) দেখা যায়, ‘ৰুদ্ধো নামঞ্জসুতঃ কীকটেবু ভবিষতি বৌদ্ধ ও জৈনগণ বৈদিক ধর্মের বিরুদ্ধে অনেক বাধা দিয়াছিলেন । শঙ্করাচাৰ্য্য বেদবিহিত ধর্ম প্রবর্তন করেন। বর্তমান হিন্দুসমাজ অনেকটা সঙ্করের অনুগত। ঐশঙ্কর বর্তমান উত্তরভারতে বর্ণাশ্রমের একমাত্র কর্ণধার। তিনি বৌদ্ধধর্মের নিরাসকল্পে বেদের আংশিক উদ্দেশ্য- স্থাপনকর্তা—তিনি একেশ্বরবাদের প্রবর্তক। বেদশাস্ত্রের কর্মশাখিগণ ফলকামী হওয়ায় বহু দেবতার উপাসক। ইন্দ্র, একাদশ রুদ্র, অষ্টবসু, অগ্নি, সূৰ্য, বরুণ, অশ্বিনীকুমার, বিষ্ণু প্রভৃতি বহু বহু দেবতার উপাসনার বিষয় বেদে দেখিতে পাওয়া যায়। এই কৰ্ম্ম বা সকাম উপাসনার মূলে ‘আমি দুর্বল, আমি প্রভুর অনুগত, দেবতাগণের অধীনে থাকিলে আমার সুখলাভ হইবে এই প্রবৃত্তি অবস্থিত। কৰ্ম্মকাণ্ডিগণ এই মতের আশ্রিত। বৌদ্ধগণ ইহাতে বাধা প্রদান করেন এবং জৈনধৰ্ম্মে উহার প্রতিক্রিয়া দৃষ্ট হয়। জিনদিগের মধ্যেও ২৪ জুন অবতার, অষ্টবসু, পরে অনেক গ্রাম্য দেবতা, পৰ্ব্বতের ও বৃক্ষাদির ঈশ্বরত্ব কল্পিত হয়। উত্তরভারতে, নেপালে, ভুটানে, চীনদেশে এই অবৈদিক উপাসনা-দ্বয় প্রচলিত হইয়াছিল। ভিন্ন ভিন্ন গ্রামের ভিন্ন ভিন্ন বিশেষ দেবতা ছিল ৫৪ শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী একগ্রামের দেবতা অন্য গ্রামের দেবতা হইতে শ্রেষ্ঠ, এইরূপ প্রতিপাদন করা যেন একটা বড় বাহাদুরীর কাৰ্য বলিয়া বিবেচিত হইয়াছিল। বেদের প্রতিপাদ্য ধৰ্ম্ম কৰ্মকাণ্ডিগণের হাতে পড়ায় সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি হইতেছিল। চিড় সমন্বয়বাদের জন্মরহস্য বহীশ্বরবাদিগণ পরস্পর বিবাদ করিত—এই পাহাড়ের দেবতা শ্রেষ্ঠ, ঐ পাহাড়ের দেবতা অশ্রেষ্ঠ। পূৰ্ব্বে ধৰ্ম্মের অধীন জাতীয়তা ছিল। বর্তমানে জাতির অধীন ধর্ম। এইসকল সাম্প্রদায়িকতা ও তন্মলে দ্বন্দ্ব ও বিদ্বেষের হাত হইতে নিস্তার পাইবার জন্য সমন্বয় বা ঐক্যের একটা পন্থা কল্পিত হইল। এইরূপ একটী cosmopolitan প্রবৃত্তি তৎকালিক সভ্য মানবজাতি ও পণ্ডিতমণ্ডলীর ভিতর উদিত হইয়াছিল। শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব, গাণপত্য প্রভৃতি ভিন্ন ভিন্ন উপাসকগণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা-নিবারণাৰ্থ মানবের মন থাকথিত সমন্বয় ও মৈত্রীর ছায়াতরুরূপে এমন একটা একত্ববাদ সৃষ্টি করিল, যদ্বারা পঞ্চোপাসনার সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আসিয়া বিরাম লাভ করিতে পারিবে। এই মানব- মনঃকল্পিত সমন্বয়বাদ জনসাধারণের নিকট বড়ই মিষ্ট বলিয়া বােধ হইল। Discordant elementsগুলি একত্র হইয়া কোনও একটা ৪ommon flag এর ভিতরে আসিলে তাহার নাম ‘সমন্বয়। উপাস্য- সৃষ্টির কারখানা হইয়াছিল-মানব-মন। আবার উপাস্যকে ভাঙ্গিয়া চুরিয়া একীভূত করিয়া দেওয়ার কৰ্ত্তাও হইল—মানব-মন। সে সময় বৌদ্ধ ও জৈন বিচারপ্রণালী আসিয়া উপস্থিত হইল। ছােট ঘােট ধৰ্ম্ম বৃহৎ হিন্দুধর্মের মধ্যে প্রবিষ্ট হইয়া তাহার ক্ষুদ্র গণ্ডী হারাইয়া ফেলিল। শঙ্করবিজয়-গ্রন্থপাঠে জানা যায় যে, কাপালিক, যােগী ও নানাপ্রকার ।

বীমধ্বাবির্ভাব দেবদেবীর উপাসকগণ শঙ্করের বেদান্তবিচারের প্রতিপক্ষ হইয়াছিলেন। শঙ্করের বিচারের ফলে তাঁহাদেরও পরে শাঙ্কর-মতে আনুগত্যপ্রাপ্তি ঘটিল। ভগবদাদেশপালনাবতার শ্রীশঙ্করের প্রচারিত মতবাদের তাৎকালিক প্রয়ােজনীয় শাঙ্কর-মত বাস্তবিক বৈদিক-মত কিনা, তদ্বিষয়ে সাত্বতগণ সন্দেহ উত্থাপন করিয়াছেন। তবে ইহা নিঃসন্দেহ যে, বেদবিরুদ্ধ বৌদ্ধমত হইতে ভিন্ন করিয়া শঙ্করাচার্যের প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধবাদ প্রচার করিবার দরকার হইয়া পড়িয়াছিল। ভগবানের নিত্য নাম-রূপ-গুণ-লীলা অস্বীকৃত না হইলে সার্বজনীনতার অভাব হইবে,—এইরূপ বােধমুলেই এই প্রচ্ছন্ন-বৌদ্ধবাদ স্থাপিত। সকল-জাতীয় সাধারণ পঞ্চোপাসনাকে বেদশাস্ত্রের অনুগত বলিয়া ভান করিবার প্রবৃত্তি-মূলে এই মতবাদের সৃষ্টি হইয়াছে। ইহার প্রয়ােজনীতা সৰ্বকালিক নহে-তাৎকালিক মাত্র। বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে বেদের আনুগত্য-প্রচার-মূখদিগকে প্ররােচনা মাত্র ; উহা বুদ্ধিমানের পক্ষে গ্রহণীয় নহে। শঙ্করের বিচার-প্রণালী বিচার করিলে দেখা যায় যে, আচাৰ্য শঙ্কর বোদ্ধানুকূল তাৎকালিক লােকবাদ স্বীকার করিয়া- ছিলেন, কিন্তু শঙ্করের ব্যক্তিগত বিচার তােপ ছিল না। নিগুণ ব্রহ্মে একীভূত হইয়া যাওয়াই তাহার লক্ষ্য। তিনি উপাসনা-প্রণালীর নিত্যত্ব স্বীকার করেন না ;-~হার দশোপনিষদ্ভাষ্যই এতদ্বিষয়ে প্রাণ। বর্তমান হিন্দুসমাজ ও পঞ্চোপাসনা বর্তমান হিন্দুনামধারী ব্যক্তিগণের অধিকাংশই শঙ্কর-শাসিত সমাজে বাস করিতেছেন। হিন্দু বলিতে আজকাল ‘পঞ্চোপাসক’কেই বুঝায়। কিন্তু ঐ পঞ্চোপাসকদিগের উপাসনা-প্রণালী নিত্যা নহে। উপাসকগণের এলপ্রভুপাদের বক্তৃতাল স্ব-স্ব-অভীষ্ট-সিদ্ধি হইয়া গেলে আর উপাসনার প্রয়ােজন থাকে না। সুতরাং উপাসনাটী অনিত্য ব্যাপার মাত্র। । নিৰ্বিশেষবাদ-জনক ও পঞ্চোপাসনা-জননী হইতেই সমন্বয়বাদ-পুত্রের উদ্ভব জগতে ‘ভােগ’ ও ‘ত্যাগ’ নামে—দুইটী কথা বর্তমান। ভােগ ও ত্যাগ’ এই দুইটীকেই বজায় রাখিবার নাম-‘সমন্বয়”। ভােগিকুল পাঁচপ্রকার খাজাঞ্চীর (বিষ্ণু, শিব, শক্তি, গণেশ ও সূর্যের নিকট হইতে ভােগ্যবস্তু লাভ করিয়া ইহ ও পরলােকে দুঃখনিবৃত্তি ও সুখ ইচ্ছা করেন। শাক্যসিংহ ভােগের পরিণাম দেখিয়া ব্যথিত হইয়া কৰ্ম্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হইলেন—ত্যাগ ও তপস্যার বিচার প্রচার করিলেন। তাঁহার মতে, তপস্যা-ত্যাগাদি যে কোনও কৃচ্ছ সাধ্য উপায়েই হউক,অনুভবশক্তির রাহিত্যই প্রয়ােজন। সেই চেতন-রাহিত্যই তাহার মতে ‘নিৰ্ব্বাণ বা এইরূপ ‘অচিৎপরিণতি’রূপ। মুক্তির বিচার চিদচিএর সমন্বয় বিধান-চেষ্টা হইতেই উদ্ভূত। শ্রীপাদ শঙ্করও প্রচ্ছন্নভাবে অনেকটা শাক- সিংহের (সাংখ্যসিংহের ?) মতই স্থাপন করিলেন। ঐশঙ্করের চেষ্টা বহিদৃষ্টিতে শাক্যসিংহের প্রতিকূল হইলেও কার্যতঃ শঙ্করাচাৰ্য শাক্য- সিংহেরই প্রচ্ছন্ন অনুগত বলিয়া স্বীয় মতবাদের পরিচয় দিয়াছেন। সাংখ্যকার কপিলের মতে, প্রকৃতিলীন অবস্থাতেই মুক্তি এবং সত্ত্বাদি গুণত্রয়ের প্রকাশেই মায়ার ক্রিয়া, ভােগ বা কৰ্ম্ম। শ্ৰীশঙ্করাচাৰ্য্য এই সংখ্যবাদের বিপরীত ভাব নিগুণতা গ্রহণপূর্বক চিন্মাত্ৰবাদ প্রচার করিলেন। “অসততা সদজায়ত” অর্থাৎ অব্যক্ত হইতে ব্যক্ত জগৎ প্রকাশিত হইল—এই তিমন্ত্রে যে শক্তিপরিণামবাদ নিহিত রহিয়াছে, তাহ স্বীকার করিলে অধিকারী ঈশ্বরকে ‘বিকারী’ ও শ্রীগুরু-ব্যাস শ্রীমধ্বাবির্ভাব ৫৭ ক দেবকে ‘ভ্রান্ত’ বলিতে হইবে—এই যুক্তি দেখাইয়া মায়াবদাচাৰ্য্য “বিবৰ্ত্তবাদ’ স্থাপন করিয়াছেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে বেদান্তসূত্রে ঈশ্বরের ইচ্ছামাত্র তাঁহার অবিচিন্ত্যশক্তির কাৰ্য-বিকাররূপে যে এই বিশ্ব, এইরূপ শক্তিপরিণামবাদ উদ্দিষ্ট হইয়াছে। বিবৰ্ত্তবাদ ও প্রচ্ছন্ননাস্তিকতামুলক সমন্বয়বাদ “পরাস্ত শক্তিৰ্বিবিধৈব শুয়তে” —এই তিমন্ত্রে ব্রহ্মের একটি অবিচিন্ত্যা পরশক্তি স্বীকৃত হইয়াছে। এক বস্তুতে বস্তুর বুদ্ধির নাম- ‘বিবৰ্ত্ত',-যেমন, রজ্জুতে সর্প, শুক্তিতে রজতভ্রম ইত্যাদি। বদ্ধজীব যখন জড়দেহে আত্মবুদ্ধি করেন,তখনই বিবর্তের উদাহরণ উপস্থিত হয়। সেই বিবৰ্ত্তদোষকে মূলবিশ্বতত্ত্বে ও জীবতত্ত্বে আরােপ-ভগবানের চিচ্ছক্তির অস্বীকার ব্যতীত আর কিছুই নহে;—ইহাই প্রচ্ছন্ন নাস্তিকতা। এই বিবৰ্ত্তবাদের (Idealismএর) মতে বস্তুর অস্তিত্ব ইন্দ্রিয়- জ্ঞানের উপযােগী। এই বিবৰ্ত্তবাদ সমতাপ্রাপ্ত (neutralised) হইলে আর গুণজাত জগৎ থাকিবে না এবং ত্রিপুটী বিনষ্ট হইলে আর বিবর্ত- স্বরূপ (?) জীব ও জগতের পৃথক্‌ অস্তিত্ব নাই। সুতরাং শাক্যসিংহের মতে প্রাপ্যমুক্তি যেমন অচিবিলাসে অবস্থিত, শঙ্করাচার্যের মতে উহা তদ্রুপ চিত্ৰবাদ বা চিবিলাসের অবস্থিতি। নিৰ্বাণ বা দ্রষ্টা, দৃশ্য ও দর্শন --এই ত্রিপুটীর বিনাশরূপ নাস্তিকতাই যখন চরমলক্ষ্য, তখন যিনি যে পথ দিয়াই চলুন না কেন, সকলেই সমান ; ইহারই নাম সমন্বয়-বাদ। এই সমন্বয়-বাদের সুবিধা এই যে, যে কোনও ভ্রান্তমত ইহার ভিতরে প্রবিষ্ট হইয়া একটি স্বতন্ত্র মত বা পথবিশেষ বলিয়া পরিচয় বিয়া আত্মরক্ষা করিতে পারে। এইজন্যই বিষ্ণুবিরােধী মনােধৰ্ম্মি-জগতে চিজ্জড়সমন্বয়বাদের বহুল আর দেখিতে পাওয়া যায় । - ৫৮ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী তথা-কখিত সমন্বয়বাদ মানবের প্রচ্ছন্ননাস্তিকতাময়ী প্রেয়ঃপিপাসার পানীয় সমন্বয়বাদের দ্রষ্টা ভগবানের নিত্য অনুগত্য স্বীকার করেন না। তাহার মিছা বা ব্যবহারিক আনুগত্য-ভান-ভগবানের প্রকৃত আনুগত্য নহে। উহা কৌশলে কাৰ্য্যসাধনরূপ নাস্তিকতারই অপর দিক্‌ । বহ্বীশ্বরবাদ বিশেষতঃ পঞ্চোপাসনা হইতেই সমন্বয়বাদের সৃষ্টি এবং এই সমন্বয়বাদ-মানব-কল্পিত। নির্বিশেষ লক্ষ্য ও গণপ্রিয়তানুসন্ধান সমন্বয়বাদের অন্তর্নিহিত প্রতিজ্ঞা অসাম্প্রদায়িকতা বা উদারতার নামে কাল্পনিক অনিত্য সত্য-ছলনা অর্থাৎ নাস্তিকতা ও অবিসংবাদিত নিত্যসত্য আস্তিকতার সমন্বয় প্রয়াস—কেবল ভক্তিহীন ও ভগবহিৰ্ম্ম খ-লােক-রঞ্জনরূপ ব্যাপার হইতেই উদ্ভূত। এই সকল অসাম্প্রদায়িক নামধারিগণ কাৰ্যতঃ মনঃ- কল্পিত ভগবদবহির্মুখ সম্প্রদায়েরই স্রষ্টা। রামানুজাচাৰ্য্য ও শ্রীমধ্বচাৰ্য্যের আবির্ভাবের কারণ ; সং সম্প্রদায় ও অসৎ সম্প্রদায় এইরূপ বিষ্ণুবিরােধমূলা সমন্বয়চেষ্টার প্রয়াস কেবল আধুনিক নহে, বহুপূৰ্ব্বেও জগতে প্রচলিত ছিল। তাহা দেখিয়া করুণাবশতঃ দুই- জন ভগবৎ-প্রেরিত পরম উদার মহাপুরুষ জগতে আবির্ভূত হইয়া- ছিলেন। ঐসকল ভগববহির্মুখ অসাম্প্রদায়িক-বগণকে প্রকৃত ভগবনুগত ব্যক্তিগণ হইতে পৃথক করিবার বাসনায় ‘অসৎ সাম্প্রদায়িক ও সৎ সাম্প্রদায়িক অখ্যা প্রদান করিলেন। লক্ষ্মণদেশিকই এইবিষয়ে নগ্রণী হইলেন। সৎ সাম্প্রদায়িকগণের মনগড়া সম্প্রদায় নাই।

এমবির্ভাব তাঁহারা কপট উদারতার নামে নাস্তিকতার প্রশ্রয় দেন না। ভগবানই একমাত্র সৎ' অর্থাৎ নিত্যসত্ত্ব-বিশিষ্ট বস্তু। সেই ভগবানের অচিন্ত্য- শক্তিও নিত্যা। সৎ সাম্প্রদায়িকগণ সেই নিত্য-সত্বাবিশিষ্ট অবিচিন্ত্য- শক্তিসমন্বিত শ্রীভগবানের নিত্য উপাসক, সুতরাং তাহারাই একমাত্র পরম উদার। জগতে অবােজ ভগবৎসেবকগণ অপেক্ষা উদার আর কেহ থাকিতে পারে না। জড়ের উদারতা—উদারতা নহে; উহা ইন্দ্রিয়- তর্পণমূলে উদারতার ভান বা কপটতামাত্র। সমন্বয়বাদিগণ উদারতার ছল করিয়া, বিষ্ণু, শিব, শক্তি, গণেশ, সূৰ্য্য, ইহাদের যে কোন একটীর উপাসনা (?) আরম্ভ করিলেন। কিন্তু যাহাকে এতকাল উপাসনা করিলেন, পরে সেই উপাস্তের উপরই খঙ্গ নিপাতিত করিয়া তাহাকে ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন! চুণকাম করা হইল, পলস্তান্না করা হইল, আবার কিছুকাল পরে ঐ পলস্তারাকে ফেলিয়া দেওয়া হইল। যখন এইভাবে ভগবানের নিত্য সবিশেষত্ব ও নিত্য আরাধনা অস্বীকৃত হইতে লাগিল তখনই ভগবানের ইচ্ছায় আন্ধ প্রদেশের অন্তর্গত মহাভূতপুরী নগরীতে লক্ষ্মণ- দেশিক-নামে এক পরম শক্তিশালী মহাপুরুষ আবির্ভূত হইলেন; ইহারই অপর নাম—শ্রীরামানুজাচাৰ্য। রামানুজাচার্য্যের পরবর্ত্তী শ্ৰীমন্মধ্বাচাৰ্য পূর্ণপ্রজ্ঞ। যখনই কোনও ভগবদানুগত্যযুক্ত সত্য- ধৰ্ম্মের কথা জগতে প্রচারিত হয়, তখনই জগতের বিষ্ণুবিরােধী মনুষগণ, এমন কি, দেবতাগণ পৰ্য্যন্ত তাহার পরম শত্রু হইয়া পড়েন। বিষ্ণুভক্তগণের প্রতি অদেবগণের চিরন্তন অবিচার ও অত্যাচার সত্যযুগেও রিভক্ত প্রহলাদের প্রতি বিরােধ-চেষ্টা-দমনের নিমিত শ্রীনৃসিংহদেবের আবির্ভাব হইয়াছিল। পাষণ্ডিগণের আত্মবিনাশ সাধন শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী করাইবার জন্যই ভগবানের ক্রোধের সঞ্চার হয়। পাষণ্ডিগণ হরি ও হরিভক্তের বিরােধ করিতে করিতে অনন্তবিনাশের পথে ধাবিত হয়। যখন রামানুজাচাৰ্য্য আবিভূত হইলেন, তখন তাহার প্রচারে অনেক বিষ্ণুবিরােধী ব্যক্তি বাধা প্রদান করিল; এমন কি, যে গুরুত্ৰুব রামানুজা- চার্যের মত অসীম প্রতিভাশালী ব্যক্তিকে নিজশিষ্য বলিয়া পরিচয় দিতে পারিলে নিজেকে কৃতার্থ মনে করিতেন, রামানুজ যখন সেই গুরু- বসম্প্রদায়ের প্রচারিত কুমতবাদ ভক্তিসিদ্ধান্ত ও শাস্ত্রযুক্তি দ্বারা খণ্ডন করিয়া ভগবানুগত্যময় ধর্ম প্রচার করিলেন, এবং যখন রামানুজের যশঃসৌরভ দিগদিগন্তে বিস্তৃত হইতে থাকিল, তখন সেই মৎসর-সম্প্রদায় রামানুজের শত্রু হইয়া পড়িলেন। শ্রীমদ্ভাগবতে শুক্রাচাৰ্য্য ও বলির চরিত্রেও এইরূপ দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। রামানুজাচাৰ্য্যকে দ্বাদশ বৎসর অজ্ঞাতবাসে থাকিতে হইয়াছিল। আজও ভারতে শ্রীরামানুজাচার্যের অনুগত প্রায় তিন কোটি লােক বাস করিতেছেন। ইহারা যে গ্রামে বাস করেন, সে গ্রামে অসৎ সম্প্রদায়ের জোকের স্থান নাই। ভারতবর্ষে রামানন্দী জমায়েৎ সম্প্রদায়’-নামে একপ্রকার ধর্মসম্প্রদায় দৃষ্ট হয়। এই রামানন্দ—এঁরামানুজের ঘােড়শ অধস্তন। ইনি ঠিক ঐরামানুজা- চার্যের সম্পূর্ণ অনুগত নহেন। ইহার অনুগ-গণ শ্রীরামানুজাচার্যের একনিষ্ঠ সদাচার হইতে কিঞ্চিৎ দূরে সরিয়া পড়িয়াছেন। ইহারা সাধারণ লােকের নিকট উপাসকসম্প্রদায়-নামে পরিচিত হইলে ও চরমে শঙ্করের নিৰ্বিশেষবাদ ও বহু দেবতার উপাসনা ন্যূনাধিক গ্রহণ করিয়াছেন , সম্পূর্ণ গুরুর আনুগত্য ও শাস্ত্রীয় আলােচনার অভাব হইতেই তাহাদের মধ্যে এই বিপত্তি প্রবেশ করিয়াছে। অবােধ্য, পুরী প্রভৃতি স্থানে রামানন্দী জমায়েৎ সম্প্রদায়ের আখড়া আছে। রামানুজীয়গণ-একনিষ্ঠ বা ঐকান্তিক বিষ্ণুসেবক। আমি যখন দক্ষিণদেশে ভ্রমণকালে দক্ষিণমথুরা গ্রীমধ্বাবির্ভাব বা মাদুরাতে মীনাক্ষি দেবীর মন্দিরে প্রবেশ করি, তখন বিষ্ণুবিরােধী শক্তিগণ আমাকে প্রশ্নের উপর প্রশ্ন করিতে লাগিলেন,-“মহাত্মন্ ! আপনার বৈষ্ণব-বেষ দেখিতেছি, আপনি কি প্রকারে দেবীমন্দিরে প্রবেশ করিলেন ?” যখন আমি “বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভুঃ”–শঙ্কুকে বৈষ্ণবশ্রেষ্ঠ জ্ঞানে নমস্কার ও দর্শন করিয়া যাইব, এই ভাবিয়া শিবকাঞ্চিতে প্রবিষ্ট হইলাম, তখনও শৈবগণ আমার নিকট ঐরূপ প্রশ্নের অবতারণা করিতে লাগিলেন ; যেহেতু, দাক্ষিণাত্যে কোন বৈষ্ণব বিষ্ণু-ব্যতীত অন্য দেবতার মন্দিরে প্রবেশ করেন না। পঞ্চোপাসকগণ বিষ্ণুমন্দিরে বিষ্ণুকে অন্য চারি প্রকার দেবের অন্যতম-জ্ঞানে দর্শন করেন। শ্রীমধ্বাগ-গণ অপর দেবগণকে বিষ্ণুভক্ত বলিয়া জানেন। তাহারা বিষ্ণুর পারতম্য এবং বিষ্ণুপ্ৰসাদ-দ্বারা দেবান্তরের পূজা করেন। উড়পীর উত্তরাংশে একস্থানে শিবের উপরিভাগে বিষ্ণুশিলা সংরক্ষিত হইয়া পূজিত হইয়া থাকেন। অনন্তপদ্মনাভের হস্তের নিম্নে ঐশিববিগ্রহ বৰ্তমান। দেবতা ও পিতৃপ্রভৃতি দেবপূজা শ্ৰীমধ্বসম্প্রদায়ে অনাদৃত হয় নাই, তথাপি তাঁহারা পঞ্চোপসিকের নামে জড়সমন্বয়ের পক্ষপাত। মহেন।

ধৰ্ম্মজগতে বৈষ্ণব দর্শনের স্থান স্থান-বারাণসী হিন্দু-বিশ্ববিদ্যালয় সময়—১লা পৌষ, ১৩৩১, সন্ধ্যা ৬ ঘটিকা উপস্থিত—মহামহােপাধ্যায় পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত প্রমথনাথ তর্কভূষণ, কন্যাদ্বয়সহ অধ্যাপক শ্রীযুক্ত ফণিভূষণ অধিকারী এম-এ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য অধ্যাপক ও ছাত্ৰমণ্ডলী, আচার্যাকি শ্রীপাদ কুঞ্জবিহারী বিদ্যাভূষণ, আচাৰ্য শ্রীপাদ পরমানন্দ ব্রহ্মচারী বিদ্যারত্ন, পণ্ডিত প্রবর শ্রীপাদ অনন্ত বাসুদেব বিদ্যাভূষণ বি-এ, পাদ অবােজ ভঙ্গিকোবিদ প্রভৃতি। বস্তুবিজ্ঞানের দ্বিবিধপথ-আরােহ ও অবয়ােহ “ধৰ্ম্ম অর্থে ধারণা—যাহা দ্বারা বস্তুর সম্যক ধারণা হয়, সেই ধারণা’- বিষয়ে চেতন ও অচেতন বস্তুর মধ্যে পার্থক্য বা ভেদ আছে। আমরা চেতনময় জাব-দ্রষ্ট সূত্রে দৃশ্য জগৎ দর্শন করি। আমরা স্বতঃকর্তৃত্ববৰ্ম্মের পরিচালন বা initiative লইতে পারি, কিন্তু অচেতন বস্তু তাহা পারে না। Knowing. ( জ্ঞান ), willing (ইচ্ছা) ও feeling ( অনুভব ),-এই তিনটি চেতনের স্বাভাবিক ধর্ম বা বৃত্তি : অচেতনে এগুলি পরিদৃষ্ট হয় না। বাস্তব বস্তু সত্য, চেতন ও আনন্দময়। তিনিই একমাত্র বেদ্য। তিনিই অজ্ঞান। তাহার অভিজ্ঞান দুইপ্রকারে লভ্য হয়,অন্বয়ভাবে বা শ্রৌতপথে অর্থাৎ অবােক্ষবস্তুর অবতরণ বা অববােহপথের ( Deductive method) দ্বারা এবং ব্যতিরেকভাবে অর্থাৎ empiricism বা ইন্দ্রিয়সমষ্টি-ঘার বর্হিবিষয়ের অভিজ্ঞানমুলে অতন্নিরসনপূৰ্ব্বক আরোহ পথের (Inductive method) দ্বারা। অনাদিকাল হইতে এই দুই উপারেই বেন্ত বাস্তব সত্য-বস্তুর অভিজ্ঞান-চেষ্টা চলিতেছে।

ধৰ্ম্মজগতে বৈষ্ণব দর্শনের স্থান অন্বয় ও ব্যতিরেক পথদ্বয় ব্রহ্মসুত্রের অকৃত্রিম ভাষ্য শ্রীমদ্ভাগবত বলেন (২৯৩৫), “এতাবদেব জিজ্ঞাস্টং তত্ত্বজিজ্ঞাসুনাত্মনঃ। অন্বয়-ব্যতিরেকাভ্যাং যৎ স্যাৎ সৰ্বত্ৰ সৰ্ব্বদা।” এস্থলে অম্বয়ভাবে অর্থাৎ শ্রৌতপথে ধৰ্ম্ম জানা যায় অর্থাৎ সেই তত্ত্ববস্তুবিষয়িণী ধারণা আমায় পরম্পরা কীৰ্ত্তনমুখে অখণ্ডরূপে শ্রবণগােচর হইবার পর কীৰ্ত্তিত হইয়া পুনরায় শ্রুতিপথে অবতীর্ণ হইয়া আসিতেছেন ব্যতিরেকভাবে অর্থাৎ ক্রমশঃ অক্ষ-চেষ্টা-দ্বারা বা ইন্দ্রয়গােচর বাহ্যবস্তুর তদবিপরীতাভিজ্ঞানমূলে কল্পনায় তত্ত্ববস্তুর জিজ্ঞাসা হইতে পারে, কিন্তু বাস্তব সত্য বস্তুকে সম্যক্ জানা যায় না। এইজন্য সৰ্ব্বশাস্ত্রশিরােমণি মদ্ভাগবত বলিয়াছেন (১•১৪৩), জ্ঞানে প্রয়াসমুদপাস্য নমন্ত এব জীবন্তি সন্মুখরিতাং ভবদীয়বার্তা। স্থানে স্থিতাঃ শ্রুতিগতং তনুবাত্মনােভি- যে প্রায়শােহজিত-জিতােহপ্যসি তৈস্ত্রিলােক্যাম্ ॥” অর্থাৎ হে অবাঙমনোগােচর অজিত বিষ্ণো, যার নশ্বর ইন্দ্রিয়দ্বারা বাহ্য অসদবিষয়ের অভিজ্ঞান-সম্বল তর্কপথ দূরে, পরিত্যাগ করিয়া, “আমি শ্রদ্ধাপূৰ্ব্বক শ্রবণ-যােগ্য অবােজ কীৰ্ত্তন শ্রবণ করিব’-এইরূপ বুদ্ধি লইয়া এবং কায়মনােবাক্যে অহঙ্কারবিহীন হইয়া ভ্ৰম, প্রমাণ, বিপ্রণি ও করণাপাটব—এই দোষ-চতুষ্টয়-রহিত, বস্তু-বিচারে সম্যক্‌ অভিজ্ঞ সাধুর শ্রীমুখে তােমার কলি-কলুবনাশিনী কথায় কালযাপন করেন, ত্রিভুবনে তাহারা যে কোন অস্থায় থাকুন না কেন, অধােক্ষজ তােমাকে জ্ঞাত হইয়া তােমাকে প্রেমভক্তি দ্বারা বশীভূত করিতে সমর্থ হন। এই শ্লোকে আমরা দেখিতে পাইলাম যে, নিরস্তকুহক সত্যবৃন্তু তর্কপথে ৬৪ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী লভ্য হইবার নহে—কেবল গুরু-শিষ্য পরম্পরা বা কীৰ্ত্তন-শ্রুতির পথেই লভ্য হয়। শাস্ত্র ও সদাচার এই পথকেই শ্রোত, অববােহ বা অবতার-পথ অথবা সহজ ভাষায় ‘ভক্তিমার্গ’ বলিয়া কীৰ্ত্তন করিয়াছেন তর্কপথ আক্রমণযােগ্য বেদের অপর নাম ‘শ্রুতি। সেই শ্রোতপথ বা বেদানুগত্য পরিত্যাগ করিয়া পরস্পর বিবদমান, পদে পদে প্রতারণাকারী করণসমূহের সাহায্যে জ্ঞান লাভ করিয়া প্রত্যক্ষ, অনুমান বা ঐতিহ্য প্রভৃতি প্রমাণ অর্থাৎ আপ্ত বা শব্দপ্রমাণ ব্যতীত অন্যান্য প্রমাণকে মুখ্য-বােধে গ্রহণ করিয়া আমরা যে বিচার অবলম্বন করি, তা আবার আমাদের অপেক্ষা অধিকতর বিচক্ষণ তার্কিক কর্তৃক আক্রমণযােগ্য। তদ্বারা আমরা কখনও Absolute Knowledge বা অদ্বয়জ্ঞান লাভ করিতে সমর্থ হইব না। প্রতীচ্যদেশে Comte (কোমত )-নামক একজন বিখ্যাত জড়বাস্তববাদী জন্মগ্রহণ করিয়া নিজের জড়ীর অভিজ্ঞতামূলে আবােহ- পথে প্রচুর ব্যতিরেক-বিচার দেখাইয়া গিয়াছেন। তিনি বাস্তববাদী হইলেও জড়বস্তুর অভিজ্ঞানের উপরই তাহার বিচার-প্রণালী, সুতরাং চিবিয়ে তাহার বুদ্ধি আদৌ প্রবেশ বা সান্নিধ্য লাভ করিতে পারে নাই। তাদৃশ বহু দার্শনিক বা ধার্মিক-সম্প্রদায় নিজ-নিজ নশ্বর জড়েন্দ্রিয়প্রসূত অভিজ্ঞতা লইয়া বাস্তব্যসত্য বস্তুকে জড়- বৈচিত্র্যের বিপরীত নিৰ্বিশেষ-তত্ত্ব বলিয়া ধারণা করিয়া তৎসান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করিয়াছেন। ফলে, তর্কায়ে বিবাদ-বিতণ্ডা-দ্বারা তাঁহারা নিজ-নিজ সম্প্রদায়ের মতবাদবিশেষকে নূনাধিক উজ্জ্বলতর করিলেও গণ্ডী, দল বা সাম্প্রদায়িকতাই বর্ধিত বা দৃঢ় করিয়াছেন। এইজন্য সমস্ত ধর্ম ও দার্শনিক মতগুলি এক অদ্বয়জ্ঞানের ভিত্তির উপর ধৰ্ম্মজগতে বৈষ্ণবদর্শনের স্থান প্রতিষ্ঠাপিত হইয়া এক মহাসমন্বয় বা মহান্ ঐক্য সংসাধিত না হওয়ায় অসংখ্য সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক ভাব প্রসার লাভ করিয়াছে। ঐসকল সাম্প্রদায়িক মত গুলি ক্রমশঃ মূল আদর্শ অদ্বয় বাস্তবসত্যবস্তুর জ্ঞান হইতে দূর হইতে দূরতর প্রদেশে নিক্ষিপ্ত হইয়া মহা-চিৎসমন্বয়ের পরিবর্তে সমন্বষের নামে ক্ৰমশঃ অনৈক্যের বিরাট ব্যবধান সৃষ্টি করিতেছে। অসৎ সাম্প্রদায়িকতার জন্মের কারণ ইহার কারণ অনুসন্ধান করিলে আমরা দেখিতে পাই যে, মনােধৰ্ম্মের প্রাবল্য-বশতঃ বিভিন্ন রুচিক্রমেই বিভিন্ন সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি। তাদৃশী বিভিন্ন-রুচি অনাদিবহির্মুখ জীবের পক্ষে নৈসর্গিক, সন্দেহ নাই। বহিরিন্দ্রিয়পরিচালনা-দ্বারা লব্ধ জাগতিক অভিজ্ঞানের তারতম্যক্রমে নানা রুচির অনুকূলে নানা মতবাদের উৎপত্তি, সুতরাং সঙ্কীর্ণতার সৃষ্টি হওয়ায় ক্রমশঃ পরস্পরের প্রতি বৈষম্যভাব ও পরস্পর বাদবিসম্বাদ পুষ্টি লাভ করিয়াছে। এইজন্য বিভিন্ন ধৰ্ম্ম বা দার্শনিক মতগুলিকে সাম্প্রদায়িক ‘বাদ” নামে অভিহিত করা হয়। একটু লক্ষ্য করিলে আমরা দেখিতে পাই যে, ধর্ম, অর্থ, কাম ও মােক্ষ—এই পুরুষার্থচতুষ্টয়ের মধ্যে কোন না কোন একটীই ঐসকল মতবাদের চরম প্রাপ্য বস্তু। চিজ্জতু-সমম্বয়, পঞ্চোপাসনা ও নির্বিশেষবিচার ইন্দ্রিয়ার দৃশ্য বস্তুর বাহ অচিৎপ্রতীতিমূলে ঐসকল পুরুষার্থপ্রাপ্তির চেষ্টা। নিজ-জড়েয়িতৰ্পণ-কামনাই উহাদের সাধন। বস্তুর অচিৎ- প্রতীতিকে চিৎপ্রতীতি বলিয়া ধারণা করিয়া যে বাস্তব-সত্যবর বিচারে অনভিজ্ঞতা, তাহাই চিৎ ও অচিৎএর মধ্যে সমন্বয়-প্রয়াসের কারণ। তাহা হইতেই পুরুষার্থচতুষ্টয়ের সাধনসমূহ বিভিন্ন মতাদ বা ল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী সাম্প্রদায়িকতার সঙ্কীর্ণ ভাবগুলি বৃদ্ধি করিয়াছে। নিৰ্বিশেষবাদাচাৰ্য্য শ্ৰীশঙ্কর পঞ্চোপাসনাকে অবলম্বন করিয়া ধৰ্ম্ম, অর্থ, কাম ও মােক্ষকে সমন্বয় করিয়াছেন। ‘পুষ্করসংহিতা-নামক পঞ্চরাত্ৰগ্রন্থে লিখিত আছে,-মানবগণ ধৰ্ম্মকামী হইয়া সূর্যের, অর্থকামী হইয়া গণেশের, কামকামী হইয়া শক্তির এবং মেক্ষিকামী হইয়া রুদ্রের বা শিবের উপাসনা করেন। ইহাদের মতে,—উপাস্যকে প্রকৃতপক্ষে অনিত্য ও আনন্দবিলাস-বিহীন জ্ঞান করিয়া সাধকের অনিত্য-সাধন বা উপাসনা- দ্বারা সিদ্ধিলাভের পথে উপাস্য ও উপাসকের ভেদ বা বৈশিষ্ট্য ক্রমশঃ লােপ পাইয়া তাহার ‘অদ্বৈতসিদ্ধি’ বা নিৰ্বিশেষ-ব্রহ্মসাযুজ্য-প্রাপ্তিই চরম কাম্য অবস্থা। এজন্য কামনা-মুলক বিদ্ধ বিষ্ণপাসনাও (যেমন, কোথাও কোথাও রােগ, শােক, ভয় দূর করিবার জন্য, ‘দধিবামনের সেবা- ছলনা দেখা যায়, তাহাও) তাদৃশ পঞ্চোপাসনার অন্তর্গত-উহারও চরম প্রাপ্য চিবিলাস-ধ্বংস বা আত্মবিলোপরূপ নিৰ্ব্বিলাস-ব্রহ্মসাযুজ্য- প্রাপ্তি। সুতরাং আমরা দেখিতে পাই যে, এইসমুদয় মতবাদমুলক পঞ্চোপাসনা কখনও জীবের পর শাশ্বত, সনাতন ও নিত্য শুদ্ধধৰ্ম্ম হইতে পারে না শ্রীমদ্ভাগবত ও বলিয়াছেন (১২৬), ‘স বৈ পুংসাং পরে ধৰ্ম্মো যতো ভক্তিরখােক্ষজে। অহৈতুকপ্রতিহতা বয়াত্মা সুপ্রীতি। পরমধর্ম অবােজ-ভক্তির লক্ষণ যাহা হইতে অধক্ষজে ভক্তির উদয় হয়, তাহই মানবগণের পরম ধৰ্ম্ম। সেই ভক্তির দুইটী লক্ষণ,-১) অহৈতুকী, (২) অপ্রতিহত ; তাহাদ্বারাই আত্মা সুপ্রসন্ন হন। এই শ্লোকে ‘অপােজ’ বলিয়া যে শব্দটী ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহার অর্থ-“অধঃকৃতম্ অতিক্রান্ত অক্ষম ধৰ্ম্মজগতে বৈষ্ণবদর্শনের স্থান ইন্দ্রিয়জং জ্ঞানং যেন সঃ”—অর্থাৎ যিনি জীবের সমস্ত ইন্দ্রিয়জ-জ্ঞানকে অতিক্রম করিয়া অবস্থিত, তিনিই শ্রীকৃষ্ণ। তিনি পশ্বাদি স্থাবরান্ত তির্য্য, মানব ও দেবতাদির ইন্দ্রিয়লব্ধজ্ঞানের অতীত হইয়া নিরঙ্কুশ স্বেচ্ছাক্রমে বিলস করিবার অধিকার স্বায়ত্তভূত (right reserved) করিয়াছেন। তাহার ইন্দ্রিয়তর্পণই পরম ধর্ম। সেই পরম-ধর্মের অনুষ্ঠানফলে অপােজবস্তুর যে প্রতি উৎপন্ন হয়, তাহারই নাম ‘ভক্তি বা সেবা ( ‘ভজ সেবায়াম্)। তাহা কোন নিমিত্তমূলা নহে এবং কিছুতেই বাধা প্রাপ্ত হয় না। আর ধৰ্মার্থকামমােক্ষবাঞ্ছা-মূলে উপাস্যের যে উপাসনার অভিনয় দেখা যায়, তাহা শুদ্ধভক্তি নহে এবং দেশকালপাত্রের বৈশিষ্ট্যক্রমে যে ভক্তির সাময়িকী উদ্দীপনা দেখা যায়, তাহা বাধাপ্রাপ্ত, বা কালক্ষোভ্য হইয়া পড়ে সুতরাং তাহাও শুদ্ধভক্তি নহে। তাদৃশী নিত্যারাধ্য অবােজ-বস্তুর প্রতি অহৈতুকী বা কেবলপ্রীতিবা-মূলক এরং বাধাহীন বা ব্যবধানরহিত যে ভক্তি, কেবল তারাই আত্মার প্রসাদ লাভ করা যায়। এস্থলে ‘আত্মা অর্থে দশটী করণবিশিষ্ট পাঞ্চভৌতিক নশ্বর দেহমাত্র নহে বা করণসমষ্টির চালক ও অধিপতি একাদশেন্দ্রিয় “মনকে বুঝায় না। জীবের দেহ বা মনের দ্বারা যে কিছু চেষ্টা, তাহা তাহার ইন্দ্রিয়তপণমাত্র, অধােক্ষজের প্রীতি-প্রযত্ন নহে । অধােক্ষজের সেবা বা ভক্তি প্রকৃতপক্ষে জড়েন্দ্রিয়তপণ নহে। -- ভক্তি—অনাবৃত আত্মার বৃত্তি নারদপঞ্চরাত্র বলেন,-(ভঃ রঃ সিঃ পূঃ লঃ ১১০ সংখ্যা-ধত) “সর্বোপাধিবিনিৰ্ম্মক্তং তৎপরত্বেন নির্মলম্ । হৃষীকেন হৃষীকেশসেবনং ভক্তিচ্যতে।” অর্থাৎ, সমগ্ৰ হৃষীক অর্থাৎ ইন্দ্রিয়দ্বারা যাবতীয় ইন্দ্রিয়ের অধিপতি ৮ শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী যে বিষ্ণু, তাহার প্রতিবাছাই ‘ভক্তি। সেই মুক্তি স্কুল ও সূক্ষ্ম- উপাধিদ্বয়ের দ্বারা আবৃতা নহে এবং কেবল বিষ্ণুসেবা-তাৎপর্য্যে পৰ্যৰসানহেতু শুদ্ধা বা নিৰ্মলা। বিষ্ণুবিমুখ জীবের অক্ষজজ্ঞানের প্রাবল্য ও অধােক্ষজসেবা-বৈমুখ্যহেতু বদ্ধাবস্থায় তাহার স্থূল ও সূক্ষ্ম, এই দুইটা উপাধিদ্বারা আত্মা এবং আত্মবৃত্তি শুদ্ধভক্তি আবৃত হইয়াছে। ভূর্ভুবঃ স্বঃ -এই ব্যাহৃতিয়ে এবং তদূর্ধ্বদেশ মহঃ, জন, তপঃ ও সত্য—এই লােক- চতুষ্টয়ে এবং অতলাদি অবর লােকসপ্তকে ইন্দ্রিয়রা যে অনুশীলন সাধিত হয়, তাহার ভােক্তা আত্মা নহে—আত্মোপাধি বা অনাত্মা,উহা অবােক্ষজের আনুগত্য বা ভক্তি, নহে—নশ্বর ইন্দ্রিয়তপণমাত্র । তাদৃশ মননধৰ্ম্ম- দ্বারাই সঙ্কীর্ণতা বা সাম্প্রদায়িকতা কল্পিত হয়। কিন্তু যদি কেই প্রণিপাত, পরিপ্রশ্ন ও সেবার দ্বারা সেই অবােজ বাস্তব-বস্তুর শরণাগত কইয়া তাহার প্রীতির অনুকূলে নিরন্তর অনুশীলন করেন, তাহা হইলেই তাহার বিজ্ঞান-লাভ বা উপলব্ধি ঘটে। শ্রীগীতার বচন (৪৩৪) এবিষয়ে প্রমাণ তদ্বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেয়া। উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ ॥ নিৰ্বিশেষ ব্রহ্মবাদ—মনােধৰ্মোথ অতএব দেখিতে পাওয়া যায় যে, চিদাভাস-মনও শুদ্ধ-জীবাত্মা বা ‘আমি’-শব্দবাচ্য নহে, সুতরাং তাদৃশ মননধর্মদ্বারা বেদের সুষ্ঠু অর্থ বা তাৎপৰ্য্য অবগত হইতে পারা যায় না; কেননা, মনোধৰ্ম্ম চঞ্চল, পরিবর্তন- শীল ও প্রতিপদেই ব্যবহিত ও প্রতিহত হইবার যােগ্য, অতএব অনাত্মবস্তু বা বৃত্তি-ঘারা আত্মবস্তুর অনুশীলন হয় না। এই অনাত্মবৃত্তি বা মনােধৰ্ম্ম- দ্বারা চালিত হইয়া বিভিন্ন মতবাদের সৃষ্টি হওয়ায় প্রকৃত চিৎসমন্বয়সাধন নিতান্ত দুর্ঘট হইয়া পড়ে। শ্ৰীশঙ্করাচাৰ্য্য সগুণােপাসনা দ্বারা বাহিরে সমন্বয় ;

ধৰ্ম্মজগতে বৈষ্ণবদর্শনের স্থান সাধন করিবার প্রয়াস করিলেও প্রকৃতপক্ষে চরমে জড়-নিগুণ বা নিৰ্বিশেষ-ব্ৰহ্মবাদ স্থাপন করায় তারা প্রকৃত চিৎসমন্বয় সাধিত হয় নাই। ‘অনল হ’ বা অহংগ্ৰহােপাসনা ‘সুফী সম্প্রদায়েও ‘অনল্ হ’ বা ‘অহংগ্রহােপাসনা” দেখা যায় । বস্তুতঃ তাদৃশ বিচার মননধৰ্ম্মমূলে সৃষ্ট। তাদৃশ মননধৰ্ম্ম কালক্ষোভ ও খণ্ডজ্ঞান-সঞ্চয়ণীল বলিয়া ঐসকল জড়াভিজ্ঞানবাদী (empiricists এবং intuitionists) কখন ও অপােজ-বস্তুর সেবা-জ্ঞান সুষ্ঠুভাবে লাভ করিতে পারেন নাই। তঁাহারা জড়েয়িারা—বিশ্বদর্শনােথ অভিজ্ঞান- দ্বারা চালিত এবং বিশ্বান্তৰ্গত খণ্ড প্রাকৃত সহজ-প্রতীতির বাধ্য ; সুতরাং উপাস্য-তত্ত্ববস্তু নিরূপণ করিতে গিয়া আত্মার সহজ প্রতীতিতেও অভিজ্ঞানজাত প্রতীতির আরােপঘারা বিবৰ্ত্তবাদ অবলম্বন করিতে বাধ্য হইয়াছেন। বাস্তবসত্যবস্তুর নিরঙ্কুশ স্বরূপ বা কর্তৃসত্তাগত অধিষ্ঠান নিৰ্বিশেষবাদিগণ তত্ত্ববস্তুকে ব্যতিরেক-বিচারে অচিন্মিশ্ৰাতীত অর্থাৎ জড়-বিপরীতমাত্ৰ জ্ঞান করিলেও সেই অর্ধেক্ষ তত্ত্ববস্তু নিরঙ্কুশ পরমস্বতন্ত্র পরমেশ্বর বলিয়া কেবল চিত্র ও নিৰ্বিশেষমাত্র নাও হইতে পারেন; কেননা, তাহাদের দর্শন অতদ্বস্তু অচিৎএর পরিমাণ ও নিরসন-চেষ্টা-মূলে এবং প্রাকৃত ‘ইদং বিশ্বের সহজপ্রতীতিমূলে উৎপন্ন হওয়ায়, উহার পরিবর্তনশীলতা-হেতু ও বস্তুর প্রকৃত স্বরূপ হইতে বহুদূরে অবস্থিতি-নিবন্ধন তাহা বস্তুর সান্নিধ্য প্রাপ্ত হইতে না পারায়, তৎকৃত বস্তুর স্বরূপনির্ণয় -বিবাদ ও সংশয়ের বােগ্য। তিনি মনঃকল্পনা-প্রভাবে সেই তত্ববস্তুকে ‘নিৰ্বিশেষ’ মাত্র বলিতে পারেন, কিন্তু তাহাতে তত্ত্ববস্তুর স্বরূপের কিছু আসে যায় না—তাহার Subjective Existenceএর ৭০ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী ( কর্তৃসত্তাগত অধিষ্ঠানের) কিছুমাত্র পরিবর্তন হয় না। তিনি জড়- বৈচিত্র্যের বিপরীত কেবল জড়-নিৰ্বিশেষ রূপকে ‘চিন্মাত্র’ বলিয়া আরােপ করায় বিবৰ্ত্তবাদী হইয়া পড়িয়াছেন; যেমন, রজ্জুতে সর্পভ্রান্তি হইলেও অর্থাৎ রঞ্জুকে সর্প বলিয়া ভ্ৰম করিলেও রঙ্গু কিছু সর্পত্ব প্রাপ্ত হয় না, উভয়ের নিত্য পৃথক্‌ অধিষ্ঠান বর্তমান থাকে, তদ্রুপ। অতএব বস্তুর স্বরূপদর্শনের ব্যাঘাতকারক এই বিবৰ্ত্তবাদ দূর করিতে হইলে আদৌ বস্তুবিষয়ক সম্বন্ধজ্ঞান আবশ্যক। তুরীয়অবােজ বিষ্ণুর চিদ্বিলাস ও তদবিরােধী মতবাদিগণ পূৰ্বে বলিয়াছি, অধােক্ষজ বস্তুকে অস্বীকার করিলেও তাহার অধোজত্বহেতু তিনি চিবৈভবময়ই থাকেন। পাশ্চাত্য মনােধৰ্ম্মি- দার্শনিকগণের মধ্যে আমরা দেখিতে পাই যে, অজ্ঞেয়বাদী বা সন্দেহবাদিগণ (যেমন, Huxley ও Spencer প্রভৃতি) নিজেদের রুচিক্রমে বা অভিজ্ঞত-বলে বাস্তববস্তুর অস্তিত্বকে দুজ্ঞেয় বলিয়া বােধ ও সন্দেহ করিলেও বস্তুতঃ তাহার অস্তিত্ব যে নাই, এরূপ নহে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যাইতে পারে,—যেমন, সাহিত্যিক Robert Buchanan ( রবার্ট বুকানন্ সাহেব) যীশুখৃষ্টের ধর্মমতকে মনঃকল্পিত বলিয়া উপহাস করিয়া তাহার আদৌ কোন উপকারিতা ও বাস্তব মহত্ত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করিয়াছেন; অথবা, যেমন তুরীয়-বস্তুবিষয়ক জ্ঞান আমাদের ইন্দ্রিয়দ্বারা লভ্য হয় না—চতুর্থ হইতে অনন্ত মান (Dimension) যে কি বস্তু, তাহা আমরা জড়ীয় অঙ্কশাস্ত্ৰদ্বারা কথঞ্চিৎ কল্পনা করিলেও গৌণী খণ্ডজ্ঞানানুভূতিদ্বারা সম্যক ধারণা করিতে পারি না,পারিবার উপায়ও নাই; কেননা, তুরীয় বস্তু প্রভৃতি অতীন্দ্রিয় বস্তুসমূহ সমস্ত ত্রিগুণ-জাত জড়ীয় অভিজ্ঞানের অতীত ও বহিভূত ব্যাপারবিশেষ।

ধৰ্ম্মজগতে বৈষ্ণবদর্শনের স্থান ৭১ শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথমশ্লোকের প্রতিপাত বস্তু সত্যবর স্বরূপ এজন্য শ্রীমদ্ভাগবত প্রথম শ্লোকেই সেই বাস্তববস্তুকে “ধামা স্বেন সদ নিরন্তকুহকং সত্যং পরং ধীমহি” এই বলিয়া বন করিয়াছেন। ‘স্বেন ধামা’ শবে চিদবিলাসবৈভব-সমন্বিত (with all His para. phernalia) এবং নিরস্তকুহক শব্দে যে বাস্তব-সত্যবস্তু স্বীয় প্রতীতির পার্থক্য বা বৈষম্য উৎপাদন না করিয়া উপাসককে স্বীয় সান্নিধ্য প্রাপ্তি করান,-তাহাকে বঞ্চনা বা ছলনা করেন না সেই বস্তু। বিষ্ণুই সেই অধােক্ষজ বস্তু, তিনিই নিরস্তকুহক সত্য। আধিকারিক দেবতাবিশেষের স্থায় তাঁহাকেও সত্ত্বগুণযুক্ত দেববিশেষ বলিয়া মনে করিলে আমরা স্বীয় মনঃকল্পনা ও কল্পনার স্বৈরাচার পরিতৃপ্ত করিতে পারি বটে, কিন্তু বিষ্ণুর বিষ্ণুত্ব বা বৈকুণ্ঠত্ব উপলদ্ধি করিতে সমর্থ হই না। তিনি বৈকুণ্ঠ‘বিগত কুণ্ঠা যৎ সং' অর্থাৎ তিনি সীমা- বিশিষ্ট বা প্রকৃতির অন্তর্গত কোন পারিচ্ছিন্ন বস্তুবিশেষ নহেন। তিনি সকল-সত্তার একমাত্র আধার এবং অন্বয়-ব্যতিরেকভাবে সমগ্র চিদচি- বস্তুর সত্যপ্রতীতির একমাত্র মূল-কারণ অর্থাৎ তাঁহার অধিষ্ঠানহেতুই নিখিল বস্তু সত্তাবান্। তিনি সকল দেবতার শক্তি-প্ৰদাতা। বিষুব্যতীত অন্য প্রতীতির নিষিদ্ধ যাবতীয় বস্তুর কর্তৃসত্তাগত অধিষ্ঠানের মূল ঈশ্বরই বিষ্ণু। তাহারই পূজা বিহিত ও বিধেয় ; আর বিষ্ণুব্যতীত বহিঃপ্রতীতি নশ্বর বলিয়া অর্থাৎ বিষ্ণুসম্বন্ধহীন বলিয়া শাস্ত্রে তাহার অনাদর দেখা যায় ; যথা শ্রীগীতায় (৯২৩ - “যেংপান্তদেবতা ভক্ত যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ তেহপি মামেব কৌন্তেয় যজ্যবিধি পূৰ্ব্বক।”

৭২ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী অর্থাৎ বহু দেবতাকে বহিৰ্ম্মখী প্রতীতিতে বিভিন্ন দেবতা বা ঈশ্বর বলিয়া যে উপাসনার অভিনয় জগতে দেখা যায়, তাহা বিষ্ণুসম্বন্ধহীন সুতরাং ভক্তিগন্ধশূন্য বলিয়া উহা অবিধি অর্থাৎ অবৈধ বা অভক্তি, সুতরাং তাহা নিষিদ্ধ। চিনিৰ্বিশেষাবস্থাই বিষ্ণব্যতীত অন্যপ্রতীতি মুলক সাধনের চরম ফল বস্তুর বহিঃপ্রতীতিমুলেই প্রকৃতিজাত প্রাকৃত বস্তুর উপাসনা। এই প্রাকৃত বস্তু ও তজ্জননী প্রকৃতির প্রচ্ছন্ন উপাসনাই ‘মায়াবাদ’ নামে খ্যাত। এই প্রকৃতিবাদের বা মায়াবাদের চরম প্রাপ্য যে মােক্ষ, তাহা, প্রকৃতিবাদিগণের মতে, জড়দর্শনের ক্রমশঃ সঙ্কোচ ফলে অব্যক্ত প্রকৃতিতে লয়াবস্থা ব্যতীত আর কিছুই নহে। প্রকৃতির স্বতঃ পরিচালন-বৃত্তি-বেদান্তবিরুদ্ধ কিন্তু আমরা “ঈক্ষতেনশব্দ”—এই ব্রহ্মসূত্র (১১৫) হইতে জানিতে পারি যে, প্রকৃতি স্বয়ং জগৎ সৃষ্টি করিতে সমর্থ নহে, ভগবান্ বিষ্ণুর ঈক্ষণ-প্রভাবেই মায়াদ্বারা জগৎ সৃষ্ট হয় । সাংখ্যস্মৃতিমতে, খঞ্জান্ধায়’-ক্রমে (সাংখ্যকারিকা, ২১) পুরুষ ও প্রকৃতির সংযােগে জগৎ সৃষ্ট। সুতরাং প্রকৃতিবাদী তত বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে, যেন জাতানি জীবন্তি, মৃৎপ্রত্যভিসংবিশন্তি, তবিজিজ্ঞাস, তবে ব্ৰহ্ম” (তৈঃ ভূঃ, ১ অনু) এই বেদবাণী স্বীকার করেন না অর্থাৎ পরব্রহ্ম বিষ্ণুকে জগতের ‘নিমিত্ত ও উপাদান-কারণ বলেন না। প্রপঞ্চে যাবতীয় দর্শনের মুল-আক—তিটী কথা এইরূপে আমরা দেখিতে পাই যে, জগতে এপর্যন্ত যত ‘বাদ’ উখিত হইয়াছে বা ভবিষ্যতে যত ‘বাদ’ উথিত হইবে, সমস্ত দর্শন বা ধর্মমতের ।

ধৰ্ম্মজগতে বৈষ্ণবদর্শনের স্থান ভিত্তি তিনটী কথা—চিদহিত্যবাদ, চিত্রবাদ এবং চিছিলাসবাদ। প্রথমটীতে অনুভূতিরাহিত্যই চরমপ্রাপ্য ;-যেমন, নিরীশ্বর বৌদ্ধ বা কাপিল সাংখ্য মত, দ্বিতীয়তীতে চিদ্বিশেষরাহিত্য অর্থাৎ উপাস্য, উপাসনা ও উপাসকের ভেদরাহিত্য অথবা, দ্রষ্টা, দর্শন ও দৃশ্য—এই তিনের অস্তিত্বলােপাত্মক একীভূত অবস্থানই চরমপ্রাপ্য। তৃতীয়টাতে উপাস্যের নিত্যত্ব, উপাসনার নিত্যত্ব ও বহু উপাসকের নিত্যত্ব বর্তমান। প্রথম দুইটী মতে নিবৃত্তির উপদেশ থাকিলেও উহারা প্রবৃত্তিমিশ্র। জগতের যাবতীয় প্রবৃত্তিমূলক দর্শনই এই দুইটী দর্শনের অনুগত । নিত্যসত্য বাস্তব-স্বার্থ ও অচিৎ অনিত্য স্বার্থের পথ কিন্তু কেবল প্রবৃত্তিবিশিষ্ট হইলে বা ইন্দ্রিয়চেষ্টা-দ্বারা বহির্ভোগ্য- বিষয়-গ্রহণে চালিত হইলে স্বার্থগতি অধােগজ-বস্তু-বিষয়ক অভিজ্ঞান- লাভ হয় না-অসৎ বহিরর্থই, অধিগত হয়। শ্রীমদ্ভাগবতে প্রহলাদ- মহারাজ দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুকে বলিয়াছেন ( ৫৩০-৩১) মতিন কৃষ্ণে পরতঃ স্বলতা বা মিথােহভিপদ্যেত গৃহব্ৰতানা অন্তগোভির্ধিশতাং মিং পুনঃপুনশ্চৰ্বিতচণানাম্ । ন তে বিদুঃ স্বার্থগতিং হি বিষ্ণুং দুরাশয়া যে বহিরমানিনঃ। অন্ধা যথান্ধৈরুপনীয়মানাস্তেহপীশতামুরুদামি বদ্ধাঃ ॥”. এই শ্লোকের মর্মার্থ এই যে, যাহার গৃহব্ৰত অর্থাৎ দ্রষ্টার অভিমানে বহিরিন্দ্রিয়-দ্বারা জড় দর্শন করিতে ব্যস্ত বা নশ্বর জাগতিক বস্তু মূহ ভাে-অভিমানে ভােগ করিতে ব্যস্ত, তাহারা অদাস্তগাে অর্থাৎ তাহাদের ইন্দ্রিয় বশীকৃত হয় নাই, তাহারা নিজেরাই ইন্দ্রিয়ের বশীভূত । সুতরাং সকলজীবের একমাত্র সেব্য, একমাত্র পরম-প্রয়ােজন বিষ্ণু পাদপদ্মে তাহাদের কখনও মতি হয় না,-তাহারা বাহ নশ্বর অর্থলাভের ।

৭৪
শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী
প্রয়াসী—তাহাদের ইন্দ্রিয়বর্গ ভােগ্য জড়বস্তুর অন্বেষণে ব্যস্ত, সুতরাং
সংসারন্ধকারে পুনঃ পুনঃ মায়া-নিগড়-বদ্ধ হইয়া পতিত হয়।
-
ভক্তের লক্ষণ ও ত্রিবিধ অধিকার
কিন্তু ভগবদ্ভক্তগণ স্ব-স্ব-ইন্দ্রিয়বর্গ সৰ্ব্বদা ভগবান্ ঐহরির সেবায়
নিযুক্ত করেন—তাহাদের পক্ষেই “হৃষীকেণ হৃষীকেশসেবনং” সুষ্ঠুভাবে
সাধিত হয়। তাহাদের ত্রিবিধ অধিকার দৃষ্ট হয় ;-
(১) কনিষ্ঠাধিকারে (ভঃ রঃ সিঃ পূঃ বিঃ ২য়লঃ-ধৃত )
“সুরর্ষে বিহিতা শাস্ত্রে হরিমুদ্দিশ্য যা ক্রিয়া,
সৈৰ ভক্তিৱিতি প্ৰােক্তা বয়া ভক্তি পরা ভবেৎ ॥”
কনিষ্ঠাধিকারি ভক্তগণের যাবতীয় ক্রিয়া ভগবাকে উদ্দেশ্য করিয়া
অনুষ্ঠিত, উহাই তাহাদের সাধন। তাহা কৰ্মীর অনুষ্ঠেয় ফলভােগমূলক
কর্ম-শব্দবাচ্য নহে।
(২) মধ্যমাধিকারে (ঐ-ধৃত পঞ্চরাত্র-বাক্য)
“লৌকিকী বৈদিকী বাপি বা ক্রিয়া ক্ৰিয়তে মুনে।
হরিসেবাকুলৈব সা কাৰ্য্যা ভক্তিমিচ্ছ।”
প্রেমভক্তিলাভে ইচ্ছুক মধ্যমাধিকারি-ভক্তগণ লৌকিকী ও বৈদিকী
সমস্ত ক্রিয়াই স্বীয় আরাধ্য শ্রীহরির শুদ্ধ-সেবার অনুকূলে অনুষ্ঠান করিয়া
থাকেন ।
(৩) উত্তমাধিকারে (ভঃরঃ সিঃ--পূঃবঃ ২য়ঃ-ধৃত নারদীয়-বাক্য)
“ইহা যস্য হরেদাস্যে কৰ্ম্মণ। মনসা গিরা ।
নিখিলাস্ব্যবস্থাসু জীবন্মুক্ত স উচ্যতে ॥”
কায়মনােবাক্যে সর্বাবস্থাতেই উত্তমাধিকারী শ্রীহরির সেবায়

ধৰ্ম্মজগতে বৈষ্ণবদর্শনের স্থান অখিলচেষ্টাবিশিষ্ট। পূৰ্ব্ব-কথিত “জ্ঞানে প্রয়াসমুদপাস্য” শ্লোকে “স্থানে স্থিতাঃ” পদে সর্বাবস্থাতেই যে হরিভজন করা যায়, তাহা বুঝা গেল। অভােজ-ভক্তিই অভিধেয়, কর্মজ্ঞানাদি নহে অতএব কৰ্ম্ম, জ্ঞান ও ভক্তি, -এই ত্রিবিধপথের মধ্যে শেষােক্ত কেবল-ভক্তিপথের দ্বারাই তত্ত্ববস্তুর স্বরূপ—অদ্বয়জ্ঞান কৃষ্ণের প্রেমসান্নিধ্য লাভ করা যায়, অপর পথদ্বয়ের দ্বারা তাহা লাভ করা যায় না।

শ্ৰীল উদ্ধারণ ঠাকুর স্থান-মরণ ঠাকুরের শ্রীপাট, সপ্তগ্রাম সময়—দ্বিপ্রহর, ১৮ই মাঘ, ১৪৩১ (গৌড়মণ্ডল-পরিক্রমা-কাল ) শ্ৰীল উদ্ধারণঠাকুরের তত্ত্ব শ্রীল নিত্যানন্দপ্রভু-সমস্ত তদ্রুপবৈভবের মালিক। গােরসুন্দর যখন নিত্যানন্দপ্রভুকে উদার প্রেম-ধৰ্ম্ম প্রচার করিবার জন্য গৌড়সাম্রাজ্যে প্রেরণ করেন, তখন শ্রীল উদ্ধারণঠাকুর শ্রীনিত্যানন্দগণের প্রধনস্ত-স্বরূপ ছিলেন। তিনি অবর ব্রাত্য বৈশ্যকুলাের্ভূত হইলেও অপ্রাকৃত বস্তু বলিয়া সেই কুলের পরিচয়ে পরিচিত হইতে পারেন না, অথবা সেই জাতির অন্তর্গত নহেন ; অর্থাৎ ঠাকুর মহাশয় সুবর্ণবণি নহেন-অপ্রাকৃত বৈষ্ণবে শৌক্রজাতি-বৃদ্ধি করিয়া সুবর্ণবণি জ্ঞান করিলে অনন্তকাল রৌরবে অবস্থান করিতে হইবে। তিনি ব্রজের বলদেবের সখা। তিনি সাধারণ গোয়ালাও নহেন, তিনি শ্রীবলদেবের নিত্যসঙ্গী চিন্ময় দুগ্ধবিক্রেতা গােয়ালা সেই ব্রজসখা প্রপঞ্চে যেস্থানে উদিত হইয়াছিলেন, আজ আমরা বহুভাগ্যফলে সেইস্থানে উপস্থিত হইয়াছি। সেই স্মৃতি আমাদের উদ্দীপনের বস্তু । বিষ্ণু ও বৈষ্ণবের সম্বন্ধ বিষ্ণু ও বৈষ্ণবে কোনও ভেদ নাই ;-কেবল উভয়ে নিত্য সেব্য- সেবকভাবে সম্বন্ধযুক্ত—একজন বিষয়তত্ব আর একজন আশ্রয়তত্ত্ব। “শ্রীবাসাদি ভক্তবৃন্দ’ বলিলে যাহা বুঝায় শ্রীল উদ্ধারণঠাকুরকে ও তাহাই বুঝিতে হইবে। আমরা অনেক সময় ভগবদ্ভক্তগণকে—নিত্যসিদ্ধ ভগবৎ- পরিকর বৈকুণ্ঠবস্তুসমূহকে মায়িকবুদ্ধি-দ্বারা—অক্ষজ-জ্ঞান-দ্বারা মাপিতে jল উদ্ধারণ ঠাকুর ৭৭ গিয়া অপরাধ করিয়া বঞ্চিত হইয়া বলিয়া থাকি,-ভগবদ্ভক্তগণও আমাদের ন্যায় কৰ্ম্মফলবাধ্য জাতির অন্তর্গত; বদ্ধজীব আমরা কোন সময় কৰ্ম্মফলে সুবর্ণ-বণিকুলে জাত হইয়া মনে করিয়া থাকি,-শ্ৰল উদ্ধারণ ঠাকুর আমাদেরই বংশের একজন-আমরাও এক-একজন ছােট খাট উদ্ধারণ ঠাকুর। বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধির দণ্ড ও কুফল সুবৰ্ণবণিকুলােদ্ভূত কোন ব্যক্তি যদি শ্ৰল উদ্ধারণ ঠাকুরের অনুবৰ্তন করিয়া অনন্যচিত্তে হরিভজন করেন, তবে তিনি সুবর্ণ-বণিক- কুলে উদ্ভূত হইলেও উদ্ধারণঠাকুরের অনুগত হইবার ফলে সমগ্র জগতের নিকট হইতে উদ্ধারণঠাকুরের ন্যায় বৈষ্ণবসম্মান পাইবার যােগ্য। কিন্তু সুবৰ্ণবণিকুলে উদ্ভূত হইয়া যদি কোন ব্যক্তি হরিভজন না করেন, তবে তিনি ব্রাহ্মণাদি-কুল-জাত হইলেও কৰ্ম্মফলবাধ্য প্রাকৃত সামাজিক ব্যক্তিমাত্র। তিনি উদ্ধারণঠাকুরের ন্যায় কোনও বৈষ্ণবসম্মান লাভ করিবার যােগ্য নহেন। যদি মবশতঃ তজপ মনে করেন, তাহ হইলে অপ্রাকৃত ভগবদ্ভুক্তে জাতি-বুদ্ধি-ফলে তিনি শাস্ত্র ও সাধুজনকর্তৃক “নারী” সংজ্ঞায় সংজ্ঞিত হন। যাহারা শ্রীগৌরসুন্দরের অনন্ত- সেবক-যাহারা সত্য-সত্যই হরিভজন করেন, তাঁহারাই নিত্যানন্দ- প্রভুর আলিস্তিবিগ্রহ এবং প্রকৃত গৌর-বংশােদ্ভূত। শাস্ত্ৰপ্ৰমাণ-ব্যাসদেবের বাক্য পদ্মপুরাণ বলিয়াছেন, অর্চে বিষ্ণৌ শিলাধীগুরুষু নরমতিবৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি- বিষ্ণোৰ্ব্বা বৈষ্ণবানাং কলিমল-মথনে পাদতীর্থেইস্কুবুদ্ধি।

৭৮ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী বিষ্ণোর্নামি মন্ত্রে সকলকলুষহে শব্দসামান্যবুদ্ধি- বিষ্ণো সৰ্বেশ্বরেশে তদিতর-সমধীর্যস্থ বা নারকী সঃ। শূদ্রং বা ভগবদ্ভক্তং নিষাদং খপচং তথা। ধীক্ষতে জাতিসামান্থাৎ স ঘাতি নরকং বম্ । বৈষ্ণবকে অবৈষ্ণবের সমান বলিয়া জ্ঞানের ন্যায় মহাপরাধ আর নাই। যাহারা আপনাদিগকে উদ্ধারণঠাকুরের কুলোদ্ভূত জ্ঞান করিয়া, শ্ৰল উদ্ধারণঠাকুরকে তাঁহাদের ন্যায় সমজাতি ‘সুবর্ণ-বণিক বুদ্ধি করেন-অৰ্চ্চ শালগ্রামে প্রস্তরখণ্ড শিলা জ্ঞান করেন, তাহারা শাস্ত্র, বিধানানুসারে নিশ্চয়ই নরক লাভ করিবেন। শ্রীগুরুদেবের তত্ত্ব বা স্বরূপ-বিচার ভগবানের সখাগণ ও চতুভুজ নারায়ণে তত্বগত কোনও ভেদ নাই, কেবল লীলাগত ও রসগত বৈচিত্র্য আছে। শ্রীগুরুদেব অভিন্ন-নিত্যানন্দ- স্বরূপ। আমার গুরুদেব-সাক্ষাৎ নিত্যানন্দপ্রভু। আমার গুরুদেব যাহাকে গুরুদেব বলিয়াছেন তিনি আমার গুরুদেবের নিকট নিত্যানন্দাভিন্নস্বরূপ। আমার পরম গুরুদেব যাহাকে গুরুদেব বলিয়াছেন, তিনিও আমার পরমগুরুদেবের নিকট অভিন্ন-নিত্যানন্দস্বরূপ। আপনারা বৈষ্ণবগণ সকলেই নিত্যানন্দপ্রভুর বিচিত্র ভাববিলাস। তাই বলিয়া আমার গুরুদেব নিজমুখে কখনও বলেন নাই যে, আমি নিত্যানন্দ। তিনি সর্বদাই শ্রীগৌরসুন্দরের দাস—গৌরচন্দ্রের মনােহভীষ্টের সেবনকারী বলিয়াই অভিমান করেন। কিন্তু আমি যদি আমার অত্যন্ত দুর্ভাগ্যবশতঃ কোনও দিন কর্ণে শুনিতে পাই যে, আমার গুরুদেব ঐনিত্যানন্দস্বরূপ নহেন, তাহা হইলে সেদিন আমি নিশ্চয়ই জানিব যে, আমার গুরুদেব আমাকে অত্যন্ত অপরাধিজ্ঞানে পরিত্যাগ শীল উদ্ধারণ ঠাকুর ৭৯ করিয়াছেন যে পাষণ্ডী আমার শ্রীগুরুদেবকে নিত্যানন্দাভিন্ন অন্য কিছু বলেন, সেই পাষণ্ডীর সহিত আমার যেন স্বপ্নেও কোনদিন সাক্ষাৎ- কার না হয় । অখােজ বৈষ্ণবঠাকুর অজ্ঞানগম্য নহেন পূৰ্ব্বজন্মের পাপকৰ্ম্মফলে মানুষ অবরকুলে জন্মগ্রহণ করে। किशु তাই বলিয়া শ্রীল উদ্ধারণপ্রভু পাপফলে নীচকুলে উদ্ভূত হন নাই। শ্রীল উদ্ধারণপ্রভু মাটীনির্মিত প্রাকৃত সুবর্ণবণিক মানুষ নহেন,-শ্রীল ঠাকুরমহাশয়কে আমরা অক্ষজানে মাপিতে গেলে বঞ্চিত হইব।

শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরী স্থাশীল ঈশ্বরপুরীর পাট, কুমারহট্ট (হলিসহর) সময়-১৯শে মাঘ, ১৪৩১ (গৌড়মণ্ডল-পরিকা-কাল ) গয়ামে শ্রীমন্মহাপ্রভু ও ঈশ্বরপুরীপাদের মিলন প্রভুর গয়া-গমনের তাৎপর্য আমরা আজ শ্রীপাদ ঈশ্বরপুরীর স্থান দর্শন করিবার জন্য আগমন করিয়াছি। ঐপাদ ঈশ্বরপুরী শ্রীগৌরসুন্দরের পাঞ্চাত্রিক দীগণ-প্রদাতা নহেন। শ্রীগৌরসুন্দরের গৃহস্থলীলার ঐতিহ্য অালােচনা করিলে দেখিতে পাই যে, শ্রীগৌরসুন্দর ঈশ্বরপুরীর পাণ্ডিত্যদোষ প্রদর্শন করিয়াছিলেন। শ্রীগৌরসুন্দর গয়া হইতে আগমন করিবার পূর্বে অমাদিগের নিকট শুদ্ধভক্তিপ্রচারকের লীলা সমুজ্জ্বলভাবে দেখান নাই। গয়াসুর-কাহারও মতে নিরীশ্বর কর্মকাণ্ডের, কাহারও মতে বৈদিক কর্মকাণ্ডের প্রধান বিগ্রহ। বেদশাস্ত্রের অনুকূল কর্মকাণ্ডই ‘কৰ্ম্মবাদ’- নামে পরিচিত ; আর বেদশাস্ত্রের বিরুদ্ধ কৰ্ম্ম বা নৈৰ্ম্ম কাণ্ডই বৌদ্ধবাদ-নামে জগতে প্রসার লাভ করিয়াছে। অজ্ঞান কর্মসঙ্গিগণের ‘বৃদ্ধিভেদ না জন্মাইয়া তাহাদের ক্ষুদ্রাধিকারগত অপেক্ষাকৃত সত্যকর্মে তাহাদিগকে প্রবর্তন করিবার জন্য শ্রীগৌরসুন্দর গয়াবাত্রা করিয়াছিলেন। আবার, তথায় কর্মকাণ্ডের অকর্মণ্যতা, সাধুসঙ্গমের দুল্ল ভত্ব ও চরমপ্রয়ােজনত্ব প্রদর্শন করিবার উদ্দেশে ধন, বিদ্যা, কুল ও রূপ-মদাদি সর্বস্ব পরিত্যাগ করিয়া আমায়পারম্পর্য ও শ্রৌতপথের আদর ও মর্যাদা ব্ৰক্ষা করিবার জন্য শিষ্যলীলার অভিনয় করিয়াছিলেন। যখন সৌভাগ্যবান্ জীব যাবতীয় অভিমান পরিত্যাগ করেন, জড়ীয় পাণ্ডিত্য- । , পাদ ঈশ্বরপুরী প্রতিভা যখন ‘কুকুটপদের ন্যায় দুর্বল ও ঘৃণ্য বােধ করেন, তখনই তিনি গুরুপাদপদ্ম আশ্রয় করিবার যােগ্য হন। ঈশপুরীপাদ ও শ্রীগৌরসুন্দরের জন্ম শ্ৰীমন্মহাপ্রভুকে শ্ৰীঈশ্বরপুরীর শিষ্য বলিলে ইতিহাসের কথা হইতে পারে, কিন্তু তাহাতে তত্ত্ববিরােধ হইয়া পড়ে। অদ্বৈত-তনয় পাঁচবছরের শিশুবালক অচ্যুতানন্দ এই কথা জগজ্জীবকে জানাইয়া দেন; যথা, (চৈঃ চঃ আদি ১২১৬)- “চৌদ্দভুবনের গুরু চৈতন্য গােসাঞি । তার গুরু অন্য,এই কোন শাস্ত্রে নাই।” গৌরসুন্দর অভিনন্দনন্দন। ঈশ্বরপুরীপাদ কৃষ্ণের সেবক, তিনি বহুভাগ্যফলে গুরুরূপে শ্রীগৌরসুন্দরের সেবা লাভ করিয়াছিলেন । যদি ভগবানের গুরু হইলেই জাগতিক ক্রমহিসাবে ‘বড়’ হইতে পারা যায়, তাহা হইলে নদ ও যশোদা কৃষ্ণ হইতে বড় হইতেন, ন হইতে ‘পজ্জন্য” গােপ আরও একটু বড় হইতেন। কুমাৰহট্টে তত্ত্ববিদ্ধ অর্চনাভিনয় আজ এখানে আসিয়া এইরূপ তত্ত্ববিরােধি-ব্যাপার দেখিয়া বড়ই ব্যথিত হইলাম। বৈষ্ণবসিদ্ধান্ত অবগত আছেন বা বৈষ্ণবতা একটুও আছে,-এমন একজন ও কি আধুনিক সময়ে এইস্থানে আসেন নাই? শ্রীচৈতন্যচরণে অপরাধযুক্ত বিচার হইতেই এইরূপ তত্ববিরােধি-কার্যের প্রচার হয়। হায় হায় !! পাঁচবছরের শিশু আমাদিগকে যে উপদেশ দিয়াছেন, তাহা পৰ্য্যন্ত আমাদের গ্রহণ করিবার যােগ্যতা হয় নাই। এগুরু-গৌরাঙ্গ-তত্ত্ব ঈশ্বরপুরীপাদ : ভগবান্ শ্রীচৈতন্যচন্দ্রের অনুগত দাস জাসগােস্বামিপ্রভু মনঃশিক্ষায় আমাদিগকে শিক্ষা দিয়াছেন- শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী “শচীং নন্দীশ্বৰপতিত্বে, গুরুবরং মুকুন্দপ্রেষ্ঠত্বে স্মর পরুমজঃ নয় মনঃ।” শচীনন্দন গৌরহরি সাক্ষাৎ নন, এবং ঐগুরুদেব শ্রীভগবানের অত্যন্ত অনুগত দাস। অতএব ঐপাদ পুরী-গােস্বামী একজন শ্রীচৈতন্যশ্রেষ্ঠদাস-গুরুরূপে শ্ৰচৈতন্যের-প্রিয়তম সেবক। স্থানীয় তত্ত্ববি, ব্যাপারের সমালােচনা দ্বিতীয়তঃ, ঐপাদ ঈশ্বরপরী অধিককাল প্রপঞ্চে প্রকটিত ছিলেন না; সুতরাং তাহার বৃদ্ধাবস্থার শ্রীমূৰ্ত্তি হইতে পারে না। পাদ পুরী-গােস্বামী মাধ্ব-পাৰম্পৰ্যে একজন একদণ্ডি-সন্ন্যাসী! ঈশ্বরপুরীর নিকট হইতে গৌরসুন্দরের দীক্ষালীলাভিনয়-ব্যাপার পুরীপাদের সন্ন্যাসগ্রহণের পরবর্তি-সময়ের কথা,অতএব ঈশ্বরপুরীর গৃহস্থবেশে ধৃতিচাদর-পরিহিত শ্রীমূর্তি ও তৎসম্মুখে ঐগৌরসুন্দরের দীক্ষামন্ত্র-প্রার্থনা--এইরূপ ভাবের মূর্তি (?) তত্ত্বগত বিচার ছাড়িয়া দিলেও ঐতিহাসিক বিচারেরও বিরুদ্ধ। বৈষ্ণবাধ-বশতঃ মায়াবাদ ও কৰ্ম্মস্পৃহা প্রবল হইলেই বদ্ধজব এইসকল তত্ত্ববিরােধি-কাৰ্য্য করিয়া থাকেন। খড়দহে শ্রীরামকৃষ্ণ বটব্যালের সময় শ্রীশ্যামসুন্দরের সমসিংহাসনে ত্রিপুরাসুন্দরীকে স্থাপনও ঐরূপ বৈষ্ণব-বিরােধি-বিচারমূলেই উদিত হইয়াছে। শ্রীগৌরসুন্দরের আদেশ ও আচরণ হইতে আমরা দেখিতে পাই-নিরেপেক্ষ না হৈলে ধৰ্ম্মরক্ষণ না হয়। স্মাৰ্ত্তবাদ, বৰ্ম্মবাদ, নিৰ্বিশেষজ্ঞানবাদ, চিচিৎ- সমন্বয়বাদ, প্রাকৃত-সহজিয়াবাদ প্রভূতি ভগবদবিরােধী কুমতবাদের অপেক্ষাযুক্ত হওয়াতেই বর্তমানকালে শুদ্ধবৈষ্ণবধর্ম আচ্ছাদিত হয়। .:. বৈষ্ণব্রুবসমাজের অজ্ঞতা পড়িয়াছে। ১৮৬৬ সালে যখন ভক্তিবিনােদ ঠাকুর দিনাজপুরে বৈষ্ণব- বেষধারী ব্যক্তিগণের নিকট চৈতন্যদেব-সম্বন্ধে কিছু তথ্য সংগ্রহ পাদ ঈশ্বরপুরী করিতে যত্ন করিয়া ছলেন। তখন কে কেই গৌর ও নিত্যানন্দকে পরুস্পর সহােদর প্রাত, কেই । তাঁহাদের সম্বন্ধে কত অদ্ভুত স্থা বলিতে কুণ্ঠা প্রকাশ করেন নাই । শ্রীকৃষ্ণলীলা ও শ্রীগৌরলীলার পরস্পর বৈশিষ্ট্য বা বৈচিত্র্য ঐনন্দন দ্বাপরযুগে নবনাগরে-লীলার অভিনয় করিয়াছিলেন । মার গৌরসুন্দর এই যুগে বিপ্রলম্ভ-লীলার অভিনয় করিয়াছেন; শ্রীকৃষ্ণ গুরুলীলার অভিনয় করেন নাই, গৌর পরদার হরণ করেন নাই। কিন্তু সৰ্বা এয়াশ্রয় কৃষ্ণের লীলা রক্তমাংসের ব্যভিচার নহে, উহা প্রাকৃত ও ক্ষুদ্র মত্ত যমদন্ত্য নায়ক-নায়িকার প্রাকৃত রস নহে। শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র জগতের নায়ক, সমস্ত অশ্রয়গণের পরমবিষয় ও একমাত্র অদ্বিতীয় ভােজা । ৩ গৌরভক্ত প্রচারকের সহিত সঙ্গ লাভের পুর্বের ও পরের অবস্থা শ্রীগৌরসুন্দরের শিক্ষা শুদ্ধবৈষ্ণবাচার্য্যের আনুগত্যে জগতে প্রচারিত হইলে ভারতবর্ষে বারাণণীর ম'য়াবাদের গৌরব খর্ব হইয়া যাবে চৈতন্যচামৃতে ১৯ সংখ্যায় – তাবব্ৰহ্মকথা বিমুক্তিপদবী তাবন্ন তিকীভবেৎ তাবচ্চাপি বিশৃঙ্খলত্বময়তে নাে লােকবদস্থিতি। তাবচ্ছাস্ত্রবিদাং মিথঃ কলকলাে ন'না-বহিব্বত্ম চৈতন্যপদমুজপ্রিয়জনে যাবন্ন দৃগৃগােচরঃ। যে বলি পৰ্য্যন্ত শ্রীচৈতন্য-পারবিমকরন্দ-ভূঙ্গ অন্তরঙ্গ-ভক্ত জীবের দর্শনের বিষয় না হন সে-কাল পর্যন্তই নিৰ্বিশেষ-ব্ৰহ্ম-বিচার ও ঈশ্বর-

8
শ্রীলপ্রভুপাদের
বক্তৃতাবলী
সাযুজ্যাদি মুক্তিমার্গকে তিক্ত বলিয়া বােধ হয় না, সে-কাল পর্যন্ত
হোমৰ্য্যাদা ও বেদমর্যাদা বিশৃঙ্খলতা প্রাপ্ত হয় না, অর্থাৎ ‘লােকে ও পদে
পরিনিষ্ঠিত-মতি পরিত্যক্ত হয় না, সেকাল পর্যন্তই বিবিধ বহির্মুখয়ার্ল্ডে
বিচরণশীল শাস্ত্রবিৎ অর্থাৎ পণ্ডিস্মন্ত ব্যক্তিগণের স্ব-স্ব-মতবাদ লইয়া পরস্পর
বাদ-বিসম্বাদ অবশ্যম্ভাবী।
য়ুরােপে এইসকল কথা প্রচারিত হইলে যদি তত্রস্থ অধিবাসিগণের
তাহা গ্রহণ করিবার কোনও দিন যােগ্যতা হয়, তবে তাহারা নিশ্চয়ই
আশ্চর্যান্বিত হইয়া যাইবেন বঙ্গদেশের ঘরে ঘরে মহাপ্রভুর
আচরিত ও প্রচারিত নির্মলভক্তির ও প্রীতির কথা প্রচারিত হইলে
বাঙ্গালার তথাকথিত ধার্মিক লােকেরা স্মাৰ্তসমাজের লৌহনিগড়
হইতে ছুটি পাইবেন।
অভিধেয় ও প্রয়ােজনের লক্ষণ
শ্রীগৌরসুন্দর দীক্ষামন্ত্রলাভের পর বলিয়াছেন (চৈঃ চঃ আদি ৭ম পঃ)-
‘কিবা মন্ত্র দিলা গােসাঞি । কিব। তার বল ?
জপিতে জপিতে মন্ত্র করিল পাগল।
হাসায় নাচায় মােরে করায় ক্রন্দন।
এত শুনি গুরু 'মােরে বলিলা বচন ।
‘কৃষ্ণনাম মহামন্ত্রের এই ত’ স্বভাব।
যেই বলে তার কৃষ্ণে উপজয় ভাব।
কৃষ্ণবিষয়ক প্রেমা—পরমপুরুষার্থ।
যার আগে তৃণ-তুল্য চারি-পুরুষার্থ ।
পঞ্চম-পুরুষার্থ প্রেমানলামৃতসিন্ধু।
ৰহ্মাদি-আনন্দ যার নহে এক বিন্দু।

শ্রীল জগদীশ পণ্ডিত
স্থান-ল জগদীশ পণ্ডিতের পাট, যশড়।
সময় অপরা, ২শে মাঘ, ৯৩৩১ (গৌড়মণ্ডল-পরিক্রমা-কাল )
।
‘পণ্ডিত আচাৰ্য্য-লামের সার্থকতা ও পণ্ডিতের
গৌরসেবা
* যে স্থানে আমরা আনিয়াছি, সে স্থান প্রসিদ্ধ এই বলিয়া যে ইহা
জগদীশ পণ্ডিতের স্থান। নিজে আচরণপূর্বক শিক্ষা প্রদান করিয়াছেন
বলিয়াই'তিনি শ্রীল পণ্ডিত আচার্য্য।
শ্ৰমগণীশ আচার্যের নিকট হইতে কিছু শিক্ষা করিবার জন্য
তাঁহার স্থানে উপস্থিত হইয়াছি। জগদীশ পণ্ডিত শ্রীগৌরসুন্দরের
একজন অনুগত ব্যক্তি ও শুদ্ধভক্তির আচাৰ্য। শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর সময়
বহু বহু ব্যক্তি যথা চতুঃষষ্টি মহান্ত, অঃ কবিরাজ, ছয় চক্রবর্তী,
নিত্যানন্দের গণ ও তদ্ব্যতীত বহু ব্যক্তি চৈতন্যচন্দ্রের অভিলাষ পূরণরূপ
সেবা করিবার জন্য আবিভূত হইয়াছিলেন। শ্ৰগীতা (২১) বলেন,
“বদ্যাচরতি শ্রেষ্ঠত্তদেবেরাে জন।
স যৎ প্রমাণং কুরুতে লােস্তদনুবৰ্ত্ততে।”
শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগণ যাহা আচরণ করেন, ইতর লােকসমূহও তাহারই
অনুবর্তন করিয়া থাকেন।
গৃহস্থলীলাভিনয়কারী শ্রীজগদীশ বর্ণাশ্রমাতীত
জগদীশচাৰ্য্য গৃহস্থলীলার অভিনয় করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু তাই
ৰলিয়া তিনি কোন বর্ণ ও আশ্রমের অধীন ছিলেন না, বা ধৰ্ম্মখিকামকামী
কী:বা মােকামী জ্ঞানীও ছিলেন না। ঐল জগদীশ: আচার্যের
৫

শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী তিন চারি শত বৎসর পূর্কে সম্রাট শ্ৰীকুলশেখর (মুকুন্দমালা'-স্তোত্তে ২৫ শ্লোকে) বলিয়াছিলেন- মজ্জন্মনঃ ফলমিদং মধুকৈটভারে মৎপ্রার্থনীয়-মদনুগ্রহ এষ এব। ভৃত্য-ভূত্য-পরিচারক-তৃত্য-ভৃত্য- ভৃত্য ভূত্য ইতি মাং স্মর লােকনাথ । “হে লােকনাথ ভগব, হে মধুকৈটভারে, আমার জন্মের ইহাই ফল, আমার ইহাই প্রার্থনা এবং ইহাই আমার প্রতি আপনার অনুগ্রহ বে,, আপনি আমাকে আপনার ভৃত্য-বৈষ্ণবের দাসানুদাসের দাসানুদালের দাসানুদাস এবং হারও দাসানুদাস বলিয়া স্মরণ করিবেন ? জগদীশ্নচাৰ্যও সেই প্রকার শুদ্ধবৈষ্ণবগণের দাস বলিয়া অভিমান করিয়াছেন। “কৰ্মাবলম্বকা কেচিৎ কেচিজ জ্ঞানাবলম্বকাঃ। বয়ন্তু হরিদাসানাং পদত্ৰাণাবলম্বকাঃ॥” ভগববৈমুখ্য ও পঞ্চোপাসনা-বিচার জীব তাহার নিত্যস্বরূপে শ্রীকৃষ্ণের নিত্যদাস-বৈষ্ণবের নিত্য ‘জুতা-বরদার। কিন্তু অনাদিবহির্মুখতরূপ একটী বৃত্তিও নিত্যকাল আমাদের সহিত বিরাজ করিতেছে। জীব—অণুচৈতন্যস্বরূপ। চেতনতার সদ্ব্যবহারই—ভগবমুখতা বা ভগবৎসেবামুকূল বিষয়ে স্পৃহা, আর চেতনতার অপব্যবহারই--ভগবদবিমুখতা বা ভগবৎ-সেবেতর কাৰ্য্যে আগ্রহ। সেই ভগৰবিমুখতাই আমাদের স্বরূপবিভ্রম ঘটাইয়া থাকে আমরা তখন উজ্জ্বল ও কুকর্মরত হইয়া পড়ি। উচ্ছলতা-প্রণােদিত চিন্তু সুখন প্রাকৃতজগতে শক্তির উপাসনাকেই আদরের বস্তু বলি শ্রীল জগদীশ পণ্ডিত ৭ বরণ করে, অতঃপর জড়জগতে উত্তাপের শ্রেষ্ঠতা-জন্য জ্ঞানােথ সূৰ্য্যো- পাসনা আমাদের নিকট মনােরম বলিয়া বোধ হয় ; তৎপর পশুচৈতন্যের শ্রেষ্ঠত্বেপলব্ধিরূপ গাণপত্যধর্মযাজনে আমরা ধাবিত হই; ইহার পয় নবচৈতন্যের অপেক্ষাকৃত শ্রেষ্ঠত্ব জ্ঞানােথ শিবপাসনা আমাদিগকে প্রমত্ত করিয়া থাকে। আবার কখনও বা বিষ্ণুকে উক্ত চতুবি দেবতার অন্যতম ও সমানজ্ঞানে আরাধনা করিবার জন্য মুমুক্ষা আমাদিগকে চালিত করে। পঞ্চোপাসকগণেরই এইরূপ প্রাকৃত বিচার দৃষ্ট হয়, কিন্তু উহা বৈষ্ণবঠাকুরের পাদুকাবাহী ভগবংসেবকগণের আধােক্ষজৰিচায় পণ্ডিত আচার্যের বিচার জগদীশ পণ্ডিত ঐরূপ প্রাকৃত পঞ্চোপাসকের ক্ষুদ্র বিচারে প্রমত্ত ছিলেন না। তাঁহার বিচার ছিল--অধােক্ষ-বিচার অর্থাৎ যে-বিচারে অবিচিন্ত্যশক্তিসমন্বিত ভগবানের নিত্যসেবা বিরাজমান। তিনি বিষ্ণুকে শক্তি, সূৰ্য্য, গণেশ রা শিবের ন্যায় অন্যতম দেবতা বলিয়া মনে করিতেন না। তিনি জানিতেন-“বিষ্ণো সৰ্বেশ্বরেশে ততির সমধীর্যস্ত বা নারকী সঃ।” তিনি ব্রজেন্দ্রনন্দন শ্রীকৃষ্ণকেই স্বয়ংরূপ ঐভগবান বলিয়া জানিতেন। আমরা আমাদের পুরােবর্তী সেই ব্রজেন্দ্রনন্দনের ঐশ্বৰ্যপ্রকাশ শ্রীজগন্নাথদেবের ঐবিগ্রহকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করি। আপনারা সকলেই তাহার চরণে প্রণত হউন।

বর্তমান যুগধর্ম হাম-বেলিহল’ মেদিনীপুর 'সময়-২৭শে মাঘ, ১৩০১ (গৌডমণ্ডল-পরিক্রমা-কাল ) শুভক্তিই একমাত্র সার্বজনীন, সার্বকালিক ও সার্বভৌমিক ধর্ম ( বর্তমান সময়ে ধর্ম বা দেশসেবা প্রভৃতির নামে যে-সকল কাৰ্য্য জগতের লােকের নিকট বড়ই আদরের ও ধৰ্ম্মের কাৰ্য্য বলিয়া চলি- তেছে, সেইসকল ভগবদবিমুখ কৰ্ম্ম-জ্ঞান-যােগাদির চেষ্টা—নাস্তিক সম্প্রদায়ের অক্ষজ-ভাগময়ী চেষ্টা ( enajpelic activity) মাত্র ; উহাতে ভগবানের সেবাব গন্ধমাত্র নাই-কৃষ্ণে ও কৃষ্ণভক্তে ভোগৰুদ্ধি- মাত্র বিরাজিত। ‘সৰ্ব্বধৰ্ম্মসমম্বয় প্রভৃতি নাম দিয়া অর্ধেক্ষত্রে সেবা-বুদ্ধি-রহিত নাস্তিক-সম্প্রদায় মনোধৰ্ম্ম সৃষ্টি করিয়া নিজেরা বঞ্চিত ও অপরকে বঞ্চিত করিতেছেন। জগতের সমস্ত তোক ও যদি উহাকে সত্য বলিয়া গ্রহণ করে, তথাপি উহা বাস্তব-সতা হইতে বহুদূরে অবস্থিত। অক্ষ জনবাদীর চেষ্টা কথনও পরমধর্ম বা সনাতন ধর্ম নহে। অধােফজে অহৈতুকী ও অপ্রতিহত নির্মল সেবাই—জীবমাত্রের পরমধর্ম ও একমাত্র সাব্বজনীন ধর্ম সেই সেবায় কৰ্ম্ম-জ্ঞানাদি } কৈতব নাই। চিবিলাস-তত্ব জ্ঞানীর দুয়ে মুঢ় অজজ্ঞনবাদি-সম্প্রদায় নিৰ্মলা ভক্তি বা আত্মার স্বভাবজ ধৰ্ম্মের মধুরিমা উপলব্ধি না করিয়া কৈতব-যুক্ত কৰ্ম্ম-জ্ঞানাদিকে ভক্তির সমান বলিয়া মনে করে, কখনও বা ভক্তিকে দুর্বল মনে করিয়া দুগ্ধের বর্তমান যুগধৰ্ম্ম সহিত চূণগােলা মিশাইবার চেষ্টার ন্যায় মনােধৰ্ম্মের হস্তে পড়িয়া মনে করেন যে, ভক্তির সহিত কৰ্ম্ম-জ্ঞানাদি কৈতবযুক্ত বস্তুর সংমিশ্রণ না হইলে ভক্তি কার্যকরী হন না। তাহারা ভাবেন—তাহাদের যাজিত মনােধই সার্বজনীন ধৰ্ম্ম, আর আত্মধর্ম বাজীবের একমাত্র স্বরূপৰ্ম্মই সাম্প্রদায়িকের সঙ্কীর্ণ ধৰ্ম্ম ! এইরূপ বুদ্ধি বিষ্ণুমায়া-বিমােহিত ব্যক্তির দুর্ভাগ্যপরাকাষ্ঠার পরিচয় ব্যতীত আর কিছু নহে। এইসকল ব্যক্তি কখনও চিছিলাস-রাজ্যের কথা বুঝিতে পারিবেন না, বা বিষ্ণু ও বৈষ্ণবের মাহাত্ম্য হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবেন না। বৈষ্ণবের আরাধনার সর্বশ্রেষ্ঠত্ব, পদ্মপুরাণ বলেন- “আরাধনাং সৰ্বেষাং বিষ্ণোরারাধনং পরম্। ভস্মাৎ পরতরং দেবি তদীয়ানাং সমৰ্চ্চন।” বিষ্ণুর আরাধনা অপেক্ষা বৈষ্ণবের আরাধন শ্রেষ্ঠ। কৃষ্ণের আরাধনা অপেক্ষা বৃষভানুনন্দিনীর আরাধন শ্রেষ্ঠ, নদশােদার আরাধনা শ্রেষ্ঠ, শ্ৰদাম, সুদাম, দাম বসুদামের আরাধনা শ্রেষ্ঠ, রক্তক, পত্রক, চিত্রকের আরাধন শ্রেষ্ঠ, গােবেত্র-বেণু-বিষাণের আরাধনা শ্রেষ্ঠ। == ।

। • শ্রীল রসিকানন্দ-প্রসঙ্গ স্থান-পাট গােপীবল্লভপুর সময়-২৯শে মাঘ, ১৩০১ (গৌড়মণ্ডল-পরিক্রমা-কাল ) শ্রীবলদেব বিদ্যাভূষণ-প্রভুর পরিচয় বাম-বৃন্দাবনের সপ্ত সুপ্রসিদ্ধ সেবার মধ্যে গােবিন্দ গোপীনাথ ও শ্রমদনমােহনের পরই চতুর্থ বিখ্যাত সেবা—ঐশ্যাম- সুন্দরজিউর। গৌড়ীয় বেদান্তাচাৰ্য ঐল বলদেব বিদ্যাভূষণপ্রভু তাহার প্ৰকটকালের শেষ অবস্থায় শ্রীরাম-বৃন্দাবনে শ্ৰীশ্যামসুন্দরের সেবায় জীবন অতিবাহিত করেন। পাদ বলদেববিদ্যাভূষণ গোপী- বল্লভপুরের গোস্বামিবংশের চতুর্থ অধস্তন অর্থাৎ রসিকানদাপ্রভুর ও শিষ্য শ্রীরাধানন্দদেব, শ্রীরাধানন্দের পুত্র ও শিষ্য নয়নানন্দদেব, নয়নানন্দের নিকট হইতে শ্রীরাধাদামােদবদাস নামক জনৈক কান্যকুজীয় বৈষ্ণ-ব্রাহ্মণ দীক্ষা গ্রহণ করেন। এই শ্রীরাধাদামােদরই পাদ বলদেব বিদ্যাভূষণ প্রভুর পাঞ্চাত্রিক দীক্ষাগুরু। বিদ্যাভূষণ-প্রভুর উপনিষঙায় একচল্লিশ বৎসর পূর্বে যখন আমি পাদ বলদেবের উপনিষদ- ভাষ্যসমূহ প্রকাশ করিতে ইচ্ছুক হইয়া ঐল বিশ্বম্ভৱানন্দ দেব- গগাস্বামী মহাশয়কে উক্ত ভাষ্যসমূহ সংগ্রহ করিয়া দিবার জন্য লিখিয়াছিলাম, তখন তিনি শ্রী শ্যামসুন্দরের মন্দিরে লিখিনা জানিলেন যে, ঐসকল উপনিষদ-ভাষ্য জীর্ণ হওয়ায় তাহা যমুনাজলে প্রদত্ত হইয়াছে ঈশােপনিষদ-ভাষ্য ব্যতীত বেদান্তাচার্যের আর অন্য ভাষ্য বর্তমানকালে শ্ৰীল রসিকানদ-প্রঙ্গ দৃষ্ট হয় না। শ্রীমদ্ভক্তিবিনােদঠাকুর একটী টীকা রচনা করিয়া শ্রীবলদেব- ভাষ-সহ ঈশােপনিষদ প্রকাশ করিয়াছিলেন। শ্ৰীল নরােত্তমঠাকুর মহাশয়ের চতুর্থ অধস্তনরূপে এল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর গৌড়ীয়াচাৰ্য- রূপে উদিত হইয়া যেমন গৌড়ীয় বৈষ্ণব-ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করিয়াছেন, তদ্রুপ সর্ব প্রথম গৌড়ীয়-বেদান্তাচাৰ্য্য শ্ৰপাৰ বলদেব বিদ্যাভূষণপ্রভুও শ্যামানন্দপ্রভুর পঞ্চম অধস্তনরূপে আবির্ভূত হইয়া গৌড়ীয়-সম্প্রদায় রক্ষা করিছেন। আচাৰ্যত্রয়ের প্রচার-বৈশিষ্ট্য ঐল ঐনিবাসচাৰ্য, শ্ৰল শ্যামানন্দ ও শ্রীল নরােত্তমঠাকুর-এই আচাৰ্যত্রয় স্বল্পশিক্ষিত জনসাধারণের নিকট হরিভক্তির চরমকথাগুলি সঙ্গীতের ভিতর দিয়া প্রচার করিয়াছিলেন। তাঁহাদের বাসস্থানের নামানুসারে এক-একটা সুর প্রচলিত হইয়া এক-একটী বিভিন্ন আখ্যা লাভ করিয়াছে—যেমন ঐশ্যামানন্দসম্প্রদায়ের গুরু শ্রীহৃদয়চৈতন্যের বাসস্থান রেণেটী-পরগণা হইতে ‘রাণীহাটী’ সুর, ঐনিবাসাচাৰ্য্যসম্প্রদায় প্রবর্তিত সুরের নাম—মনােহরসাহী এবং শ্রীল ঠাকুর মহাশয়ের সম্প্রদায় প্রবর্তিত সুর গড়েরহাটী” নামে প্রসিদ্ধ। রসিকানন্দ-তত্ত্ব কাহারও মতে,শ্ৰল রসিকান প্রভু অনিরুদ্ধের অবতার অর্থাৎ তিনি বিষ্ণুবস্তু। নাভাজীর হিন্দি ভক্তমালে শ্যামানন্দ ও রসিকানন্দ প্রভুদয়ের চরিত্র বর্ণিত আছে।

শ্রীব্যাসপূজায় প্রত্যভিভাষণ স্থান-শ্রীগৌড়ীয় মঠ, উল্টাডিঙ্গি, কলিকাতা তারিখ-১লা ফান, ১৩৩১ (ল প্রভুপাদের একপঞ্চাশত্তম প্রকট-বাসরে অনুকশিতগণের উক্তির প্রত্যুক্তি । আচাৰ্যবর্ষের তৃণাদপি-সুনীচতা-শিক্ষা-দান অদ্য অমাির গুরুবর্গ আমার সম্বন্ধে যে-সকল কথা বলিলেন সে-সকল কথার সহিত আমার সংশ্রব অতি অল্পই। তবে একটা কথা অসত্য যে, তাহারা কৃপাপূর্বক আমাকে কৃষ্ণেতর প্রবৃত্তি হইতে উদ্ধার কবিবার জন্য চেষ্টা করিতেছেন। সেজন্য আমি তাহাদের নিকট ঋণী। অামার বড়ই আশাবন্ধ আছে যে, আমি গৌরসুন্দরের নাম অনুক্ষণ কীৰ্ত্তন করিতে পারিব। অামার বহুদিনের সঞ্চিত আশা ও বাসনা এই যে, আমি যেন -ভগবদ্ভক্তের সঙ্গে চব্বিশ-ঘণ্টা কৃষ্ণ-সেবা ও কাঞ্চ“সেবায় নিযুক্ত থাকিতে পারি এবং তাহাদের ভৃত্যৰুদ্ধিতে যেন আমার অন্ত্যকাল যাপিত হয়। এরূপ বহুদিনের আশা আজ পরিপূর্ণ হইতেছে দেখিয়া আমার আনন্দের আর সীমা নাই। তজ্জন্য আমি শ্রীগৌরসুন্দর ও গৌরভক্তবৃন্দের চরণে কোটি কোটি প্রণাম করিতেছি । গুরুবর্গের নিকট আমার প্রার্থনা,-হারা যেন আমাকে নিজ গুণে ক্ষমা করেন। তাহারা সর্বক্ষণ আমাকে হরিকথা শ্রবণ করা এবং তাহাদের আদর্শ চরিত্র আমার নয়নপটে প্রতিফলিত করিয়া আমার দুষ্টহৃদয় শশাধিত করিতেছেন। তাহাদের গৌরকৃষ্ণের পাদপদ্মে যে রতি, তাহা অনন্তাংশের খণ্ডাংশও যেন আমি লাভ করিয়া ধন্য হইতে পারি আমি বিপদে পতিত। তাহারা সর্বক্ষণ আমাকে রক্ষা করিতেছেন।

ব্যাসপূজায় প্রত্যভিভাষণ . সর্বত্র সর্বদা ভগবভক্তের সঙ্গই গ্য গৌরসুন্দরের অমৃতময়ী গাথার সহিত আমার গৌণভাবে সম্বন্ধ আছে, আমার গুরুবর্গ সেই সুধাময়ী গাথা জগতের অনেকের কাছে প্রচার করিয়া আমার অভিলাষ পূর্ণ করিতেছেন। শ্রীগৌরসুন্দরের চরণানুগত্য ব্যতীত অন্য লােভনীয়, আদরণীয় ও প্রার্থনীয় ব্যাপার আমার আর কিছুই নাই। আমি নিতান্ত দুর্বল, কিন্তু ঐগৌরসুর এতই করুণাময়, যে আমাকে সর্বক্ষণ হরিকথা-শ্রবণের অধিকার দিয়াছেন। আমার যৈ-সকল গুরুবর্গ আমাকে সর্বক্ষণ 'হরিকথা শ্রবণ করিবার সুযােগ প্রদান করিয়াছেন, তাহাদের স্মৃতি লইয়াই আমি যেন প্রপঞ্চ হইতে বিদায় গ্রহণ করিতে পারি। ইহাদের পবিত্র চরিত্রের নির্মলতা লােচনা করিলে আমার জন্মে-জন্মে এই ত্ৰিতাপক্লিষ্ট সংসারে আসাই কর্তব্য বলিয়া মনে হয় কারণ, এই প্রপঞ্চেও এইরূপ মই চরিত্র ভগবদ্ভক্তগণ অবস্থান করিতেছেন। এককালে এতগুলি আদর্শচরিত্র ভগবদ্দাসগণের সহিত আমার সাক্ষাৎকার হইবে,—আমি ইহা পূৰ্ব্বে ভাবি নাই। যখন আমি শ্রীগুরুপাদপদ্ম অন্বেষণ করিতেছিলাম আমি মনে করিয়াছিলাম যে, ঐগৌরসুন্দরের প্রকট-কালের স্থায় অত আদর্শ চরিত্র গৌরভক্ত এককালে বুঝি আর প্রকট হইবেন না। কিন্তু এখন দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইতেছি। আজ গৌরভক্তগণের চরণে কোটি কোটি প্রণামপূৰ্ব্বক এখানেই আমার বক্তব্য শেষ করিতেছি : বাঞ্ছাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপাসিন্ধুভ্য এব চ। পতিতানাং পবনেভো বৈষ্ণবেভ্যো নমাে নমঃ। .

শ্রীরূপ-সনাতন-প্রসঙ্গ স্বাম-হালা-নদীর নিকটবর্তী নবনির্মীয়মাণ শাল, আল সময়ই ফাৰু, বুধবার, ১০৩১(গৌড়মল-শমিজমা-কাল। শ্রীরূপ-সনাতন-পদে ঐকান্তিকভক্তির প্রয়ােজনীয়তা শ্রীরূপ-সনাতনের লীলার স্মরণ ও উদ্দীপন দ্বারা জীবের পরম সম্পতি- লাভ হয়। এই স্থানটী আমাদের সাক্ষাৎ গুরুপাদপদ্ম। শ্রুতি বলেন, “যস্ত দেবে পরা ভক্তিৰ্যথা দেবে তথা গুরো। তস্যৈতে কথিত। হর্থাঃ প্রকাশন্তে মহাত্মনঃ ।” ঐরূপ ও ঐসনাতনপ্রভু আমাদের ন্যায় শুক্ৰশােণিতজাত জড়পিণ্ড নহেন, তাহারা যে অপ্রাকৃত পাণ্ডিত্য ও বিশেষত্ব জগতে প্রদর্শন করিয়া- ছেন, তাহা আমরা বাহ্যজ্ঞান লইয়া উপলব্ধি করিতে সমর্থ হইব না। জাগ- তিক উচ্চাবচত্বের দিক দিয়া তাহাদিগকে দেখিতে গেলে আমরা তাহা- দের স্বরূপ-দর্শন-লাভ হইতে বঞ্চিত হইব। হার্ডিঞ্জব্রিজের মত জাগতিক বিচারে মহৎকাৰ্য্য আমরা শ্রীরূপ-সনাতনে দেখিতে পাইব না যাহাদের চিত্ত সেইরূপ কাৰ্য বা চিন্তাস্রোতে অভিনিবিষ্ট, তঁাহারা ঐরূপসনাতন প্রভুদ্বয়ের পদ-নখ-শােভা দর্শন করিতে পারিবেন না শ্রীরূপসনাতন-প্রভুর চৈতন্যের মনােহভীষ্টের প্রচারক। শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর প্রতি যেরূপ ভক্তি কৰ্তব্য,তাহা হইতে একটু নূন পরিমাণ ভক্তি যদি আমরা শ্রীরূপসনাতনে ও জীবের প্রতি প্রদর্শন করি, তাহা হইলে আমাদের শুদ্ধ ভক্তিতে অধিকার হইবে না। ঐচৈতন্য-মহাপ্রভু ও শ্রীরূপসনাতন প্রদ্বয় অভিন্ন। রূপপ্রভুকে গুরুপদে বরণ করিবার পরিবর্তে যদি অন্য কোন ব্যক্তিকে বরণ করি, তবে কখনও সনাতন-রূপকে দর্শন করিতে পারিব না।

শ্রীরূপ-সনাতন-প্রসঙ্গ শ্রীরূপ-পদবিক্ষেপভুমি-ব্ৰহ্মাদিরও বন্দ্য ও দুল্লভ শ্ৰীচৈতন্যে কিরূপ ভক্তি—আত্মার নিশ্বল ভক্তি তাহা শ্রীরূপেই দেখা যায়। ষড়, গােস্বামীর মধ্যে ঐরূপ, সনাতন ও জীব প্রভুত্ৰয় চৈতন্যের সেনাপতি : ষড়গােস্বামীর নামের মধ্যে রূপের নামই সর্বপ্রথম। আমরা কত আশা ও ভরসার সহিত রূপসনাতনের পদাঙ্কপূতরজে বিলুষ্ঠিত হইবার সৌভাগ্য লাভ করিবার জন্য এইস্থানে আসিয়াছি। আপনাদের উৎসাহ দেখিয়া আমাদের হৃদয় পরমানন্দে আপ্লুত হইতেছে। যে-স্থানে ঐরূপের পাদবিক্ষেপ হইয়াছে, সে-স্থান ব্ৰহ্মাদিরও দুর্লভ বস্তু ; আমরা সাধারণ জীব হইয়া সেই চিন্ময় রজঃ আমাদের শিরােভূষণ করিবার জন্য আজ দুরাশা পােষণ করিতেছি। ঐ রূপের পাদপদ্মে আমরা যে ঋণে ঋণী, তাহার শতাংশের একাংশও আমরা অনন্ত-কোটি জীবনে শােধ করিতে পারিব না। শ্রীরূপ- গােস্বামি প্রভুর“ভক্তিরসামৃতসিন্ধু”শুদ্ধ ভক্তির এমাত্র দিও,নিরূপণ যন্ত্র। শ্রীচৈতন্যবাণী প্রচারের ফল প্রবােনন ত্ৰিদণ্ডিপাদ চৈতচন্দ্রাতে ১১৩ শ্লোকে বলিয়াছেন, স্ত্রীপুত্ৰাদিকথাৎ জহুর্বিষয়িণ শাস্ত্রপ্রবাদং বুধ যােগীন্দ্র বিজহুৰ্ম্মরুন্নিয়মজং ক্লেশঃ তপস্তাপলা। জ্ঞানাভ্যাসবিধিং জহুশ্চ যতয়শ্চৈতচন্দ্রে পরা- মাবিষ্ণুৰ্ব্বতি ভক্তিযােগপদবীং নৈৰান্ত আসীদ্রস।” যে সময় চৈতদের জগতে উদিত হইয়াছিলেন, সেই সময়ে বিষয়িগণ স্ত্রীপুত্রাদির কথা পরিত্যাগ করিয়া হরিকথায় কর্ণ প্রদান করিয়াছিলেন। প্রতাপরুদ্রের ন্যায় বিষয়ী রাজাও শ্রীচৈতন্যচরণ আশ্রয় করিয়াছিলেন। ষাটহাজার কাশীবাসী সন্ন্যাসীর গুরু প্ৰকাণানন্দ শাবিদ ও জ্ঞানাভ্যাস তুচ্ছবোধে ত্যাগ করিয়াছিলেন ।

শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী = শ্রীল নরােত্তম ঠাকুরের ঐরূপ-দাস্ত গৌর-নিত্যানন্দাদ্বৈত-গদাধর-শ্রীবাসাদির অপ্ৰকটের পরে নিবাসচাৰ্য, ঐল নরোত্তম-ঠাকুর ও শ্রীশ্যামানন্দ প্রভুত্রয়ের শুদ্ধভক্তিপ্রচার জগতের বহুবহু জীবের মঙ্গল সাধন করিয়াছিল। ঋষ্টিয় গ্রন্থাবলীর ' প্রচার অপেক্ষা শ্রীল নরােত্তম ঠাকুর মহাশয়ের ‘প্রেমভক্তিচন্দ্রিকা ও প্রার্থনার প্রচার নিতান্ত কম নহে। প্রতিবৎসর ৫ লক্ষ হইতে ১০ লক্ষ পৰ্য্যন্ত এই প্রার্থনা’ ও ‘প্রেমভক্তিচন্দ্রিকা গ্রন্থদ্ধর জনসমাজে প্রচারিত হয়। সেই নরােত্তম শ্রীরূপের একান্ত কিঙ্কর ছিলেন বলিয়াই এইরূপ শক্তি লাভ করিয়াছিলেন। তাই তিনি গাহিয়াছেন,- “রূপ-রঘুনাথ-পদে হইবে আকুতি। কবে হাম বুঝব সে যুগল-পিরীতি।” রূপমঞ্জরী-পদ, সেই মাের সম্পদ, সেই মাের ভজন পূজন। সেই মাের প্রাণধন, সেই মোর আভরণ, সেই মাের জীবনের জীবন। সেই মাের রসনিধি, সেই মাের বাঞ্ছাসিদ্ধি, সেই মাের বেদের ধরম। সেই ব্ৰত, সেই তপ, সেই মাের মন্ত্রজপ, সেই মোর ধরম করম।” ইত্যাদি। } ? শ্রীরূপানুগত ব্যতীত যুগলসে-লাভ হয় না আমাদের যতদিন কাদা, জল, মাটী প্রভৃতির ধারণা আছে, ততদিন অপ্রাকৃত রাইকার অপ্রাকৃত রসকেলিবার্তা বুঝা যাইবে না।

রূপ-সনাতন-প্রসঙ্গ ঐশ্বৰ্য্যগন্ধলেশহীন বিশ্বম্ভসেবা-ময়ী কৃষ্ণানুভূতি না হওয়া পর্যন্ত বৃন্দা- বনের দ্বার রুদ্ধ থাকে। আবার, বৃন্দাবনে প্রবিষ্ট হইলে ঐরূপ-রঘুনাথের অনুগত্য ব্যতীত আর কোনও কৃত্য নাই। প্রাণহীন দেহের যেমন কোন মূল্য নাই, তদ্রপ শ্রীরূপের আনুগত্য ব্যতীত জীব-স্বরূপের কোনও সার্থকতা নাই যদি কেহ গৌরকৃষ্ণের ঔদার্য-মাধুৰ্য্য উপলব্ধি করিতে চান, তবে শ্রীরূপাগজনের আনুগত্য করুন। আমরা ঐরূপের আনুগত্য ব্যতীত কিছুতেই যুগলসেবার অধিকার পাইতে পারিব না। বৃন্দাবনে শ্রীগােবিন্দের সেবা-রূপেরই ; যথা- “দীব্যবৃন্দারণ্যকল্পদ্রুমাধঃ শ্ৰীমদ্রাগারসিংহাসনহো। ঐশ্রীরাধা-শ্রীল-গােবিদেবো প্ৰেষ্ঠালীভিঃ সেব্যমানে সুমি।” ( জ্যোতির্ময় শোভাবিশিষ্ট বৃন্দাবনের কল্পবৃক্ষতলে মন্দির সিংহাসনের উপরি অবস্থিত ঐক্রয়াধা-গােবিন্দকে পরম-প্রেষ্ঠ। সখীগণ সেবা করিতেছেন। আমি সেই শ্ৰীযুগলমূর্তিকে পরশ করি ] = সনাতনের কৃপায় সম্বন্ধ-বিগ্রহ ও রূপের আনুগত্যে অভিধেয়-বিগ্রহের সেবা-লাভসম্ভাবনা গৌড়ীয়ের সেব্য তিনটী বিগ্রহ-মদনমােহন, গােবিন্দ ও গােপীনাথ। অষ্টাদশাক্ষর মন্ত্রে এই তিনটী নাম উদ্দিষ্ট হইয়াছে। কৃষ্ণই-মদন- মােহন, গােবিনই—গােবিন্দ এবং গােপী জনবল্লভই-গােপীনাথ। মদনমােহন-কৃষ্ণানুভবই-সম্বন্ধ, গোবিন্দ-সেবাই-অভিধেয় এবং গােপী- জুন-বল্লভ-কর্তৃক আকৃষ্টিই—প্রয়ােজন। শ্রীসনাতনপ্রভু মদনমোহনের সহিত জীবের সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া দিলে ঐরূপ প্রভুর আনুগত্যে জীবের গগাবিন্দ-সেবায় অধিকার উদিত হয়। “মা প্রেক্ষিষ্ঠব যদি সঙ্গে বন্ধুসঙ্গেংস্তি রঙ্গঃ ।

.
শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী
ঐরূপার্ভিাবস্থলীর মহিমা
ঐরূপপাদপদ্ম আশ্রয় করিবার ইচ্ছা হইলে রূপ-পদাঙ্কিত ভূমিতে
অপ্রাকৃতৰুদ্ধিতে গড়াগড়ি দিলেই সৰ্বার্থসিদ্ধি হয় ।
সনাতনপ্রভুর মহিমা
সনাতনপ্রভুর মহিমা কবিকর্ণপূর শ্রীচৈতন্যচন্দ্রোদয়-নাটকে (৪৫।
এইরূপভাবে বর্ণন করিয়াছেন,
গৌড়েশ্য সভা-বিভূষণমণিস্ত্যক্ত। য ঋদ্ধাং শিয়ং
রূপস্যাগ্রজ এষ এব তরুণীং বৈরাগ্যলক্ষ্মীং দধে।
অন্তর্ভক্তিরসেন পূর্ণহৃদয়ো বাহেবধূতকৃতিঃ
শৈবালৈঃ পিহিতং মহাসর ইব প্রীতিপ্রদস্তদ্বিদাম্।
[ গৌড়-রাজ হুসেনুসাহ, বাদসাহার সভার বিভুষণ-মণিম্বরূপ শ্রীরূপাজ এক
সনাতন সমৃদ্ধ রাজশ্রী পরিত্যাগপূৰ্ব্বক নবীন বৈরাগ্যলক্ষ্মীকে ধারণ করিয়াছিলেন।
উহার অন্তঃকরণ ভক্তিরসে পুর্ণ, এবং বাহিরে অবধূতাকার থাকায় তিনি
শৈবালাচ্ছাদিত মহাসমোবরের ন্যায় ভক্তিতত্ত্ববিদগণের প্রীতির পাত্র ছিলেন।
গৌরসুন্দরের মহাবদান্যতা
মহাবদান্যলীলাময় চৈতন্যচন্দ্রকে ঐরূপপ্রভু এই বলিয়া নমস্কার
করিয়াছেন,-
*নমাে মহাবদান্যায় কৃষ্ণপ্রেমপ্রদায় তে
কৃষ্ণায় কৃষ্ণচৈতন্যনাম্নে গৌরত্বিষে নমঃ॥”
কৃষ্ণকীর্তনের তত্ত্ব ও মহিমা
এস্থলে, “কৃষ্ণপ্রেম’ শব্দে কৃষ্ণের সন্তোষ, অর্থাৎ সেবকের নিকট
হইতে কৃষ্ণ যাহা চান, তাহাই। গয়া-ধামে গদাধরের যে পাদপদ্ম আশু-
রিক কর্মকাণ্ড ও বৌদ্ধযুগের জ্ঞানকাণ্ডকে চাপা দিয়াছেন, সেই পাদপীঠ
দর্শন করিবার পর শ্রীগৌরসুন্দর ফিরিয়া আসিয়া কাহাকেও আর অন্য
কোন কথা বলেন নাই। সজীবকে আহ্বান করিয়া কেবল এইকথা
বলিয়াছেন,

রূপ-সনাতন-প্রসঙ্গ ৯৯ ‘যারে দেখ, তারে কহ কৃষ্ণ-উপদেশ। আমার আজ্ঞায় গুরু হঞা তার এই দেশ।” তিনি প্রত্যেককে প্রচারক হইতে বলিয়াছেন। যাহারা স্বার্থপর, তাহারা এইরূপ কথা বলিতে পারেন না। মহাবদান্ত ব্যতীত আর কেহই জীবকে সর্বশ্রেষ্ঠপদে আরােহণ করাইবার অভিলাষী হন না। জগতের লােকসকল স্বার্থপর ; তাহারা অন্যান্য জীবকে সর্বদা নিষ্পেষিত করিয়া তাহাদের অধীন করিয়া রাখিতে প্রয়াসী। তন্মধ্যে কেহ কেহ একটু উদারতার ভান দেখাইয়া নীচ ব্যক্তিকে অপেক্ষাকৃত উচ্চ-পদবীর ছায়াভাসের লােভ দেখাইয়া ব্যক্তিগত স্বার্থ ও প্রতিষ্ঠা সংগ্রহ করিতে যত্নবান্। শ্রীগীতাদি শাস্ত্রে যে সমদর্শিত্বের (৫৯৮) কথা উল্লিখিত হইয়াছে, তাহা অপেক্ষাও গৌরসুন্দরের মহাবদান্যতা কোটি-কোটি-গুণে অধিক। তিনি কাককে গরুড় করিয়াছেন,—বিষয়ী পতিত জীবকুলকে গােলাকের পরমোৎকৃষ্ট নিত্য শোভা-সম্পদ প্রদান করিয়াছেন। তিনি সজীবকে কৃষ্ণকীর্তনে অধিকার প্রদান করিয়াছেন। কৃষ্ণকীর্তনকারীর লক্ষণ কীর্তনকারীর আসন গ্রহণ করিলে আমাদের অভিমান আসিতে পারে, তাই তিনি কীৰ্তন করিবার প্রণালী-বর্ণনে বলিয়াছেন, “তৃণাদপি সুনীচ” না হইলে হরিকথা কীৰ্ত্তন করা যায় না। গুরুর লক্ষণবিচারে তিনি বলিয়াছেন, “তৃণাদপি সুনীচেন তােেরপি সহিষ্ণুনা। অমানিনা মানদেন কীৰ্ত্তনীয়ঃ সদা হরিঃ ॥” যিনি সর্বদা হরিকীৰ্ত্তন করেন, তিনিই ঐগুরুদেব। গুরুর এক মুহুর্তের জন্যও হারকীৰ্ত্তন ব্যতীত অন্য কোনও কৃত্য নাই। হরিকীৰ্ত্তন ও * শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী মায়ার কীৰ্ত্তন’ একসঙ্গে থাকিতে পারে না। যাহারা মায়ার অর্থাৎ ইন্দ্রিয়- তপর্ণার্থ কীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন, আবার সময়ে-সময়ে কৃষ্ণকীর্তনের ছল প্রদর্শন করেন, তাঁহাদের ঐ ‘লােক-দেখান’ কৃষ্ণ-কীৰ্ত্তনও ইন্দ্রিয়তপণ বা মায়ার কীৰ্ত্তন মাত্র। যিনি কনক, কামিনী ও প্রতিষ্ঠা-লাভের জন্য লালায়িত, তিনি তৃণাদপি সুনী' নহেন। যিনি জগৎকে ভােগ্য জ্ঞান করেন, জগতের প্রত্যেক বস্তুকে যিনি কৃষ্ণসেবায় নিযুক্ত করিবার কৌশল জানেন না, তাহার কোন সহিষ্ণুতা নাই, তিনি ধৈৰ্য্যহীন। যিনি জগতের প্রত্যেক জীবকে বৈষ্ণব বা ‘গুরু’ বুদ্ধি করিতে পারেন না, প্রত্যেকবস্তুকে গুরুরূপে দর্শন করিতে শিক্ষা করেন নাই, প্রত্যেকজীবকে কৃষ্ণ-কীৰ্ত্তনে অধিকার প্রদান করিতে অর্থাৎ প্রত্যেককে আচাৰ্যপদের যোগ্যতা প্রদান করিতে কুণ্ঠিত, তিনি ‘অমানী’ ও ‘মানদ’ নহেন। সুতরাং যিনি সর্বদা সৰ্ব্বপ্রকারব্যবধান- রহিত শুদ্ধহৱিকীৰ্ত্তন করিয়া থাকেন, তিনিই শ্রীগুরুদেব । আচাৰ্যবর্গের শিক্ষা শ্রীগৌরসুন্দর, শ্রীঠাকুর হরিদাস, ঐসনাতনপ্র, শ্রীরূপপ্রভু, জীবপ্রভু প্রভৃতি আচাৰ্যবৰ্গ এইরূপ গুরুদেবের আদর্শ প্রদর্শন করিয়াছেন। উচ্চৈঃস্বরে হরিনাম-কীৰ্ত্তনই পরােপকারের পরাকাষ্ঠা। স্বার্থপর ব্যক্তিগণ জপ ধ্যান-যােগাদি প্ৰণালী গ্রহণ করেন। ঐরূপ প্রাকৃত চেষ্ট-দ্বারা জীবের পরম-প্রয়ােজন সিদ্ধ হয় না। নিরন্তর—এক মুহূৰ্ত্ত ও যদি না দিয়া-হরিকথা কীৰ্ত্তন করিলেই জীবের সর্ববিধ মঙ্গল হইতে পারে। হৰিকীৰ্ত্তন ও মায়ার কীর্তনে ভেদ আমরা মায়ার কীৰ্ত্তনকে অনেক সময় ‘হরিকীৰ্ত্তন’ বলিয়া মনে করি। যে কীৰ্ত্তনে কৃষ্ণেন্দ্রিয়ের তর্পণ নাই, যাহার উদ্দেশ্য আত্মেন্দ্রিয়- রূপ-নাতন-প্রসঙ্গ ১০১ তৃপ্তি, তাহাই ‘মায়ার কীৰ্ত্তন’। উহার দ্বারা হরি কীৰ্তিত হন না, কেবলমাত্র আভিধানিক শব্দসমূহ কীৰ্ত্তিত হয় মাত্র। যেমন ‘ঘােড়া বলিলে তৎসঙ্গে আমরা ঘােড়র চেহারা ভাবিয়া থাকি, তপ বিমুখাবস্থায় “হরি” বলিলেও একটী প্রাকৃতরূপই চিন্তা করিয়া থাকি ; উহা প্রাকৃত চেষ্টা বা পৌত্তলিকতা ছাড়া আর কিছুই নহে। যখন নাম-নামীকে অভিন্ন-জ্ঞানে আমরা কৃষ্ণেন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য হরিজনের আনুগত্যে হরিকীর্তন করিব, তখনই শুদ্ধ বৈকুণ্ঠকীর্তন হইবে। হরিনাম জড়েন্দ্রিয় গ্রাহ বিষয় নহেন। ভগবান্ এইটুকু অধিকার স্বায়ত্তভূত ( right reserved ) করিয়া রাখিয়াছেন যে, তিনি যাবতীয় ভােগ্যবস্তুর ন্যায় জড়েন্দ্রিয়গ্রাহ্ন না হওয়ায় জীব তাহাকে কর্ণাদি ও মন প্রভৃতি ইন্দ্রিয়দ্বারা ভােগ করিতে বা মাপিয়া লইতে পারে না। শ্রুতি ‘অপাণিপাদঃ প্রভৃতি মন্ত্রে তাহাই কীৰ্ত্তন করিয়াছেন। জড়েয়িতৰ্পণ ও কৃষ্ণেন্দ্রিয়তর্পণে ভেদ ইন্দ্রিয়তপণ ও ভগবৎপ্রীতি—এই দুইটী বস্তু দুইটী বিপরীতদিকে অবস্থিত। জডেন্দ্রিয়গ্রাহ বিষয়গুলি বদ্ধজীবের ভোগের বস্তু। রাবণের ন্যায় ব্যক্তির পক্ষে ভগচ্ছক্তিকে হরণ করিবার ইচ্ছা হইতে পারে, কিন্তু সীতাদেবী রামচন্দ্রের ভােগ্যা হইলেও কখনও রাক্ষস রাবণের ভােগ্যা নহেন। “সৰ্ব্বং বাসুদেবময়ং জগৎ, ঈশাবামিদং সৰ্ব্ব,-এই বুদ্ধি থাকিলে আমাদের ভগবাকে মাপিয়া লইবার দুৰ্ব্ব দ্ধি হয় না। আমরা অনেক সময় নিৰ্বদ্ধিতা-বশতঃ মনে করি,ভগবান্ আমাদিগকে দুঃখে রাখিলেন কেন? কিন্তু ইহার পরিবর্তে আদিগুরু আমাদিগকে অন্যরূপ শিক্ষা দিয়াছেন (ভাঃ ১০/১৪৮)- “তত্তেং কম্পাং সুসমীক্ষমাণাে ভুঞ্জান এবাত্মকৃতং বিপাক। হৃদ্বাশ্বপভির্বিদধন্নমস্তে জীবেত যাে মুক্তিপদে স দায়ভা” শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী অর্থাৎ হে ভগব, যিনি আপনার অনুকম্পা-লাভের আশায় স্ব-কৃতকর্মের মফল ভােগ করিতে করিতে মন, বাক্য ও শরীরদ্বারা আপনাতে ভক্তি ৰিবান করিয়া জীবন যাপন করেন, তিনি অনায়াসেই মুক্তিপদ লাভ করিয়া থাকেন। দুঃখ না থাকিলে আমাদের ভগবৎ- স্মরণ হইত না। জাগতিক দুঃখ-তাপরাশি তাহারই দয়ার দান। প্রভুয়ের বিষয়ত্যাগ-লীলার তাৎপৰ্য্য খে-দ্বারা পিতামাতা যেমন ছেলেপিলেকে ভুলাইয়া রাখেন, তদ্রুপ মায়াশক্তিও ধন, জন, পাণ্ডিত্য ও জাগতিক বশং-মুখাদিদ্বারা আমা- দিগকে ভগবৎ-পাদপদ্ম হইতে দূরে রাখেন। পৃথিবীর চাচিক্যে ভুলিয়া পার্থিব উন্নতি-বিধানের জন্য অভ্যুদয়বাদী কর্মী হওয়া মনুষ্য- জীবনের উদ্দেশ্য হইতে পারে না। ঐরূপ, সনাতন ও শ্রীজীব প্রভুত্রয় আমাদিগের ন্যায় মুঢ়জীবকে এই সত্য শিক্ষা দিবার জন্যই বিষয়-পরিত্যাগ লীলার অভিনয় করিয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে, তঁাহার সাধনসিদ্ধ ভক্তের স্যায় পূর্বে বিষয়ে আসক্ত বা অদিব্যজ্ঞানযুক্ত এবং পরে বিষয়মুক্ত হইয়া- ছিলেন, এরূপ নহে; তাহার নিত্যবিদ্ধ ব্ৰজপরিকর,-তাহাদের কোনসময়েই দিব্যকৃষ্ণজ্ঞানের অভাব নাই। তঁাহারা সকলেই কৃষ্ণপ্রেষ্ঠ। অদ্য আমরা ঐ প্রভুত্রয়ের লীলাভূমির পূতরজে অভিষিক্ত হইবার জন্য আগমন করিয়াছি। সেই অপ্রাকৃত-ধামবাসিগণ আমাদিগকে কৃপা বিতরণ করুন। “বাঞ্ছাকল্পতরুভ্যশ্চ কৃপাসিন্ধুভ্য এব চ। পতিতানাং পাবনেভ্যো বৈষ্ণবেভ্যো নমাে নমঃ।”

পাঞ্চরাত্রিকী দীক্ষা ও বর্ণ-বিচার ধন-মালদহের পূর্বোক্ত ধৰ্ম্মশালা সময়-৭ই কান, ১৩৩১, রাত্রি ৮ ঘটিকা [ মালদহনিবাসী শ্ৰীযুষ্ণ কৃষ্ণশশী গোস্বামী এ-এ, বি-এ মহাশয়ের “{১} আপনি জাতিভেদ মানেন কি না? (২) ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণের যে-কোন বর্ণ উৎপন্ন ব্যক্তি আপনার নিকট দীক্ষার জন্য আসিলে আপনি কি করেন? (৩) দীক্ষার শয় সকল শিষ্যের একই অবস্থা-লাভ হয় কিনা ? (৪) দীক্ষা-দানের পূর্বে কোন্ criterion' (লক্ষণ)-দ্বারা শিষ্যের যােগ্যতা বিচার করা হয় ?”—এই প্রশ্নচতুষ্টয়ের উত্তরে শ্রীল প্রভুপাদ নিয়লিখিত বক্তৃতা প্রদান করেন। শাস্ত্রানুমােদিত দৈৰ-বর্ণাশ্রমের প্রয়ােজনীয়তা অনর্থযুক্ত জীবের জন্য বর্ণাশ্রমের বিশেষ উপযােগিতা আছে। তবে অবৈধ বর্ণাশ্রম স্বীকাৰ্য্য নহে। বর্তমানকালে বৈধ বর্ণাশ্রমের বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হয়। ব্রাহ্মণের সন্তানকে ‘ব্রাহ্মণ বলিয়া স্বীকার করিয়া লইয়া উপনয়নসংস্কার প্রদান করিলে তিনি যদি ব্ৰহ্মণ্যদেবের উপাসনায় মনােনিবেশ না করিয়া ইতর কাৰ্য্যে ধাবিত হন, তবে তাঁহার উপনয়নসংস্কার-গ্রহণের প্রয়ােজন ছিল কি ? বিবাহের পূর্বে যেরূপ কন্যাকে ‘ভাৰ্য্যা’ বলিয়া নির্দেশ করা হয়, তদ্রুপ অষ্টম-বর্ষে ব্রাহ্মণের সন্তানকে যে ‘ব্রাহ্মণ-নামে নির্দেশ, তাহাও প্রস্তাবিত ব্রাহ্মণতা-মাত্র। শাস্ত্রে এইজন্য বৃত্তব্ৰাহ্মণতার কথা পুনঃ পুনঃ কীৰ্তিত হইয়াছে। যিনি ব্রাহ্মণবৃত্তে অবস্থিত হইতে ইচ্ছা করেন না, তাহাকে বলপূর্বক ব্রাহ্মণ করা যায় না।

১০৪ ঐলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী সরলতা ও সত্যবাদিত অর্থাৎ হরিভজন-স্পৃহাই শিষের দীক্ষা-প্রাপ্তির যােগ্যর লক্ষণ বালকের বৃত্তিদর্শনে আচাৰ্য তাহার বর্ণনির্দেশ করিবেন। সরলতা ও সত্যবাদিতাই ব্রাহ্মণতার পরিচায়ক। সরল ও নিষ্কপট ব্যক্তিই কৈতব-রহিত ভগবদ্ভক্তিকে আশ্রয় করেন। হারিজমত-গৌতম সত্যকাম জাবালের সত্য-সারল্য-বৃত্তি দর্শন করিয়াই তাহার বর্ণ নির্দেশ করিয়া- ছিলেন। সুতরাং বৃত্তব্ৰাহ্মণতাই শ্রোতপথ। শ্রৌতপথ উল্লম্বন করিয়া গুণ-কর্মের অনাদরপূৰ্ব্বক কেবলমাত্র সাধারণ মেয়েলীমতের অনুসরণ কখনও প্রকৃত আচার্যের ধৰ্ম্ম নহে। দীক্ষার পূর্বে সরলতা ও সত্যবাদিতা অর্থাৎ শিষ্যের হরিভজন-স্পৃহা দর্শন করিয়া যে-কোন-কুলাের্ভূত পুরুষের পারমার্থিক-ব্রাহ্মণতায় অধিকার দেখা যায় । কলিতে পঞ্চরাত্ৰিক-দীক্ষা-বিধিই শাস্ত্রসঙ্গত শ্রীহরিভক্তি-বিলাসের পঞ্চম-বিলাসে শ্ৰল গােপালভট্ট-গােস্বামি-প্রভু ঐবিষ্ণুমলের বাক্য উদ্ধার করিয়া বলেন, “কৃতে শ্ৰত্যুত্তমার্গঃ স্যাৎ ত্রেতায়াং স্মৃতিভাবিত। দ্বাপরে তু পুরাণােক্তঃ কলাবাগমসম্ভবঃ । অশুদ্ধাঃ শূদ্রকল্প হি ব্রাহ্মণাঃ কলিসম্ভবাঃ। তেষামাগমমার্গেণ শুদ্ধিন শ্রোতবত্মনা ॥ সাত্বত আগম বা তন্ত্রই—পঞ্চরাত্র। সুতরাং কলিতে যে তন্ত্রবিধানের কথা উল্লিখিত হইয়াছে, তাহা পাঞ্চরাত্রিকী দীক্ষা-প্রণালী বলিয়াই জানিতে হইবে। নারায়ণ স্বয়ং পঞ্চরাত্র-বক্তা ; নারদ, প্রহলাদ প্রভৃতি ভাগবতগণও পঞ্চরাত্রের বক্তা। শ্রীহরির উপাসনা ব্যতীত অন্য নশ্বর ভােগবাদ সাত্বত-তন্ত্রে স্থান পায় নাই।

পারাত্রিকী দীক্ষা ও বর্ণ-বিচার মঃ ভাঃ শাঃ পঃ মােঃধঃ পঃ--৩৮ অঃ ৬৮ শ্লোক, “পঞ্চরাত্রস্ত কৃৎস্য বক্তা নারায়ণঃ স্বয়ম্। যথাগমং যথাধ্যায়ং নিষ্ঠা নারায়ণঃ প্রভু। এবমেকং সংখ্যযােগং বেদারণ্যকমেব চ। পরম্পরাঙ্গাতােনি পঞ্চরাত্ৰস্তু কথ্যতে।” বৈষ্ণবাচাৰ্যই বৈদিক উপনয়ন-সংস্কার-দামে সমর্থ সাত্বতপঞ্চরাত্রের মতে, দীক্ষিত বৈষ্ণবই বাস্তবিক বৈদিক ব্রাহ্মণ। অসাত্বত তন্ত্র বেদবিরুদ্ধ বলিয়া বিষ্ণু-ব্যতীত অন্যান্য দেবতার মন্ত্রে দীক্ষিত কোন ব্যক্তিই বৈদিক ব্রাহ্মণতা লাভ করিতে পারেন না। ব্ৰহ্মসূত্রে পাশুপতাধিকরণই তাহার প্রমাণ। একমাত্র বৈষ্ণবাচাৰ্যই বিষ্ণুদীক্ষা- দ্বারা দীক্ষিতকে ব্রাহ্মণ-জ্ঞানে বৈদিক উপনয়ন-সংস্কার দিতে সমর্থ । দীক্ষার শ্রেণীবিভাগ দীক্ষা দিবিধা-বৈদিকী ও বেদানুগ। বেদানুগ দীক্ষা আবার দ্বিবিধা—পৌরাণিকী ও পাঞ্চরাত্রিকী। যােগ্য-জ্ঞানে সংস্কৃত দ্বিয়ের দীক্ষাই বৈদিকী,অযােগ্যজনে অধিকারি-জ্ঞানেই ‘পৌরাণিকী দীক্ষা এবং অনধিকারি-বিচারে ভাবি-যােগ্যতা লাভের উদ্দেশ্যেই ‘পাঞ্চরাত্রিকী দীক্ষা বিহিত। এইজন্যই শ্ৰহরিভক্তি-বিলাস কলিকালে বৈদিকী দীক্ষার সম্ভাবনা নাই বলিয়াছেন। শ্রীহরিভক্তিবিলাস পৌরাণিকী দীক্ষার বিস্তৃতপদ্ধতির মধ্যে দীক্ষার অঙ্গ-বর্ণনে দশসংস্কার-বিধানের যােগ্যতা আছে বলিয়া উল্লেখ করিয়া ক্ৰমৰীপিকা, সারদা-তিলক, মাৰ্চনচন্দ্ৰিকাদির পদ্ধতি বিস্তৃতভাবে বর্ণন করেন নাই এবং দীক্ষার অনুকুলে তসাগরাদি আগমবিধির কথাই সমর্থন করিয়া লিখিয়াছেন, শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী “যথা কাঞ্চনতাং যাতি কাংস্যং রসবিধানতঃ। তথা দীক্ষা-বিধানেন দ্বিজত্বং জায়তে নৃণা।” দীক্ষা-বিধানের অন্তর্গত প্রণালীর মধ্যেই বৈদিক উপনয়নসংস্কার অন্তর্নিহিত থাকে। দীক্ষা-কালেই অনধিকারি মানবকের দ্বিজত্ব সিদ্ধ হয়। দীক্ষা সমাপ্ত হইলে আর তাহার মধ্যবর্তি-কালীন মৌঞ্জিবন্ধনাদি অনুষ্ঠানসমূহ অবশিষ্ট থাকে না;-তাহা পূৰ্বেই সাধিত হইয়া যায়। পঞ্চোপাসক স্মাৰ্তগণের ‘শু দীক্ষা-বিধান প্রকৃতপ্রস্তাবে নামাপরাধ কেবলমাত্র শৌবিধানের পক্ষপাতী পঞ্চোপাসক আৰ্ত্তগণ শূদ্র- দীক্ষা-বিধান বলিয়া যে বিচার করিয়াছেন, তাহা ‘দীক্ষা-শব্দ বাচ্য নহে। তাহাকে নামাপরাধ বা দীক্ষা-বাব’ বলা যাইতে পারে। এইরূপ দীক্ষা-দান-চাতুৰ্য্যদ্বারা যে কৃত্রিমতা সাধিত হইয়াছে, তাহাতে বৈষ্ণবস্মৰ্ত্ত বা পারমার্থিকগণ বলেন যে, উহা-নব্যম্মত্তের মনগড়া ও কাল্পনিক। পাঞ্চরাত্রিক-দীক্ষা-বিধি নারদপঞ্চরাত্র ( ভরদ্বাজ-সংহিতা-২৩৪) বলেন, “স্বয়ং ব্রহ্মণি নিক্ষিপ্তান্ জাতনেব হি মন্ত্রত। বিনীতানথ পুত্ৰাদী সংস্কৃত্য প্রতিবােধয়েৎ।” আচাৰ্য গুরুদেব স্বয়ং পাঞ্চরাত্রিক মন্ত্র প্রদান করায় সেই মন্ত্র প্রভাবে পুত্র ও শিষ্যাদির পুনর্জন্ম হয়। তখন বিনীত পুত্র ও শিদিগকে বৈদিক দশ-সংস্কারে সংস্কৃত করিয়া আচার্য্য তাহাদিগকে ব্রহ্মচারী করাইয়া মন্ত্রের প্রকৃত অর্থ শিক্ষণ দিবেন,- ইহাই পাঞ্চরাত্রিক-দীক্ষা-বিধি। দীক্ষা-লাভের ফলে সকলেরই শুদ্ধদ্ধিজত্ব-লাভ মহাভারতের (অনু-শাঃ পঃ ১৪৩ অঃ ১৪৬ ) “শূদ্রোহপ্যাগসম্পন্নো দ্বিজো ভবতি সংস্কৃত - পঞ্চরাত্রিী দীক্ষা ও বর্ণ-বিচার -এই বাক্য হইতে জানা যায় যে, পঞ্চরাত্রিকী দীক্ষার মধ্যেই দশ-সংস্কার-পদ্ধতি অনুসৃত আছে। দীক্ষা-লাভের পরে তাহার আর দ্বিজত্বের লক্ষণাভাব থাকে না। দীক্ষিত বৈষ্ণব অব্রাহ্মণ নহেন এক মৎসর ব্যক্তির এক শত্রু লেখা-পড়া শিখিয়া উচ্চ রাজকর্মচারীর পদে আরূঢ় হইয়াছেন শুনিয়া ঐ মৎসর ব্যক্তিটী বলিলেন,-সেই শত্রু কখন ও ঐরূপ উচ্চপদে আরূঢ় হইতে পারে না। যখন শুনিলেন,- সরকার বাহাদুর সেই শত্রুকেই বিচারকের পদ প্রদান করিয়াছেন,তখন ঐ মৎসর ব্যক্তি বলিয়া উঠিলেন,—“একান্তই যদি সে বিচারকই হইয়া থাকে, তাহা হইলেও সে নিশ্চয়ই বেতন পায় না। এইরূপ ‘দীক্ষা-বিধান-দ্বারা বিপ্রত্ব সিদ্ধ হইলেও, দীক্ষিত ব্যক্তি ব্রাহ্মণ-লক্ষণ যজ্ঞসূত্রের দ্বারা লক্ষিত বা বিনির্দিষ্ট হইবেন না--কেহ কেহ এইরূপ মৎসরত-ব্যঞ্জক অশাস্ত্রীয় কথা বলিয়া থাকেন। আবার কেহ কেহ বলিয়া থাকেন যে, দীক্ষিত- ব্যক্তির যজ্ঞসূত্র-গ্রহণ—তাহার ‘তৃণাপি সুনীচতার’ ব্যাঘাতকারক অর্থাৎ তাহা হইলেই ঐসকল মৎসর ব্যক্তির পক্ষে বৈষ্ণবকে ‘পাপী’, ‘শূদ্র’ প্রভৃতি সংজ্ঞায় সংজ্ঞিত করিবার সুযােগ হয়, এবং এমন কি, নিজেরা ‘ব্রাহ্মণব’ হইয়াও যাবতীয় বর্ণাশ্রমিগণের গুরুদেব পরমহংস বৈষ্ণবর্গকেও ‘শূদ্র বলিবার দুর্ভাগ্য-লাভ ঘটিতে পারে। শ্ৰীল রঘুনাথদাস গােস্বামিপ্রভু শাল- গ্রামপূজায় অনধিকারী ছিলেন’, ‘ঠাকুর হরিদাস অপায়ে ছিলেন প্রভৃতি জাতিযুদ্ধ থ বাক্য বলিয়া পাষণ্ডিগণ নরকের পথ সুগম করে। কিন্তু বৈষ্ণবদাসগণ জীবকুলকে এই নরকগমনের দৃঢ়চেষ্টা হইতে রক্ষা করিয়া বলিয়া থাকেন,-“দীক্ষিত বৈষ্ণব কখনও অব্রাহ্মণ নহেন।”

আত্মধর্ম ও মননধৰ্ম স্থান-শ্রীল পুনরানন্দ ঠাকুরের শ্রীপাট, মহেশপুর সময়-১ই ফান,১০৩১(গৌড়মণ্ডল-পরিক্রমা-কাত ) প্রেমধর্ম বা আত্মধর্যের পরিচয় প্রীতির ধর্ম ও অপ্রীতির ধর্মের মধ্যে কিছু ভেদ আছে। যাহারা মনে করেন যে, প্রেমধর্মের মধ্যেও কিছু অপ্রীতিকর কথা আছে, বুঝিতে হইবে,-তাহাদের হৃদয়ের মধ্যেই কিছু অপ্রীতিকর ধর্ম বৰ্তমান। আত্মধৰ্ম্মই প্ৰেমধৰ্ম্ম বা প্রীতির ধর্ম, আর মনোধৰ্মই অপ্রীতির ধৰ্ম্ম। বিয়ের প্রতি আশ্রয়ের নিত্যা শুদ্ধা অহৈতুকী প্রীতি ও আশ্রয়ের প্রতি বিষয়ের শুদ্ধা প্রতিই-প্ৰেমধৰ্ম্ম। প্রেমধর্মের মধ্যে চির-ঐক্যতান (Harmony) বিরাজমান। অদ্বয়জ্ঞানের সেবনজনিত প্রেমধৰ্ম্মের যাজন হইতে বিচ্যুত থাকিলেই আমরা পরস্পরের প্রতি ভােগৰুদ্ধি করিয়া থাকি। কৃষ্ণই একমাত্র মূল বিষয় এবং যাবতীয় কাষ্ণই একমাত্র সেই মূলবিষয়ের আশ্রয়। সাপ-ধৰ্ম্ম-বিশিষ্ট মানবগণ, সকলে—কৃষ্ণেরই সেবক,ইহা জানিতে পারিলে মনুষ্যের আর কোনও অসুবিধা থাকে । তখন মানবগণ স্ব-স্ব-নিত্যসিদ্ধস্বরূপ অর্থাৎ নিজেকে বৈষ্ণব’ বলিয়া উপলব্ধি করিতে পারেন। তখন বৈষ্ণবের সহিত বৈষ্ণবের স্বাভাবিক প্রতিধৰ্ম্ম উদিত হয়। অপ্রীতির ধর্ম বা মননধর্মের পরিচয় ভােগ্য-জগতে প্রীতিধৰ্ম্মের কথা নাই,—সর্বত্রই বিরােধময় সঘর্ষ-ধৰ্ম্ম : এস্থলে একজনের প্রীতিতে অপরের অপ্রীতি উৎপন্ন হয়, একজনের লাভে অপরের ক্ষতি হয়। যেমন,-কেহ ছাগ, কুকুট বা মৎস্যাদির মাংস প্রীতির আত্মধৰ্ম্ম ও মনােধৰ্ম্ম সহিত ভােজন করেন, তাহাতে ভােজনকারীর সাময়িক প্রতি উৎপন্ন হইলেও ছাগ, কুকুট বা মৎস্যের প্রীতির উদয় হয় না । এক মানুষ অঙ্গ মানুষের সহিত প্রতিযােগিতা ও হিংসা করিয়া অর্থ সংগ্রহ করে, কিন্তু তাহাতে অপর মনুষের প্রীতি হয় না। গৌরসুন্দরের জনগণ কখনও অপরকে উদ্বেগ দেন না। কিন্তু প্রাকৃতব্যক্তিগণ অখণ্ড ভগবদস্তুর সহিত বিরােধ করিয়া খণ্ডবস্তুর প্রতি ভােগ্যবুদ্ধি করেন। আমরা অনেকসময় বরং দেহি, ধনং দেহি’, ‘দ্বিষো জহি প্রভৃতি মনের প্রীতিকর কথা বলিয়া নিজকে ও অপরকে বঞ্চনা করি। কৃষ্ণের দ্বিবিধ কৃপাবতার কৃষ্ণই সমস্ত-জীবকে সর্বক্ষণ আকর্ষণ করিতেছেন। তিনি প্রপঞ্চে দুইপ্রকারে আমাদের নিকট আগমন করেন---(১) অর্ফারূপে ও (২) নামরূপে। কপট অবৈষ্ণব ও সরল বৈষ্ণবগণের ব্যবহারভেদ কপটব্যক্তিগণ যােড়শােপচারে পুত্রপৌত্রাদি-লাভের জন্য অর্চার অরাধনা করিতে পারেন, কিন্তু তাহাদের উদ্দেশ্য-ঠাকুর-সেবার বিনিময়ে ঠাকুরের নিকট হইতে কিছু পাওয়া; ইহাকে ‘সেবা’ বলা যায় না। যাহাতে ঠাকুরের সুখ হয়, তাহারই নাম ‘সেবা; আর, যাহাতে নিজের সুখসুবিধা হয়, তাহারই নাম ‘ভােগ। বৈষ্ণবগণের চিত্তবৃত্তি এইরূপ যথা (মুকুন্দমালা-স্তোত্রে), নাস্থা ধৰ্ম্মে ন বসুনিচয়ে নৈব কামােপভােগে যদ্যদ্ভব্যং ভবতু ভগবন্ পূৰ্ব্বকৰ্ম্মানুরূপ। এতৎ প্রার্থং মম বহুমতং জন্মজন্মান্তরেংপি ত্বৎপাদম্ভোরুযুগ-গতা নিশ্চলা ভক্তি ॥

শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী যাহারা জগতের বৈচিত্র্যে মুগ্ধ বা যাহারা মননধৰ্মী, তাহারা এই কথা নিস্কপটে বলিতে পারিবেন না। বিনিময়ে আমি কিছু চাই’-এরূপ কথা অভক্তের বা অবৈষ্ণব-ধৰ্ম্মের কথা; কিন্তু বর্তমানকালে বৈষ্ণবধর্মের নামে এইরূপ অবৈষ্ণব-ধৰ্ম্মই চলিতেছে, ভক্তির নামে অভক্তিরই চেষ্টা সর্বত্র দেখা যাইতেছে। আমরা যদি কপটতা করিয়া কোটি-জন্ম অর্চন করিতে থাকি, কোটি-জন্ম খােল বাজাই, কোটি জন্ম কীৰ্ত্তন করি এবং কপটতাকেই ধৰ্ম্ম বলিয়া প্রতিপাদন করিতে চাই, তাহা হইলে আমরা ঐরূপ অৰ্জ্জন করিতে করিতে, খােল বাজাইতে বাজাইতে, কীৰ্ত্তন করিতে করিতে কৰ্ম্মমার্গের পথিক হইয়া পড়িব, আমাদের ভক্তিলাভ হইবে না। শুদ্ধভগবদ্ভক্তের নিষ্কপট-সেবা ব্যতীত আমাদের কোন মঙ্গলই হইতে পারে না। অর্সার ও হরিনামের আরাধনার নাম করিয়া জগতে কি ভীষণ কপটতাই না চলিতেছে !! ভগবান্ ও ভগবদ্ভক্তকে ঋনা করাকেই কেহ কেহ ভগবদ্ভক্তি বলিয়া বিচার করেন । কপটতাময় সেবাভিনয় ও সরলতাময়ী সেবার ভেদ এই গ্রামের কথাই আমি কিছু বলি। চারিশত বৎসর পূর্বে প্রেমদাতা ঐল নিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গী গ্রুল সুন্দরানন্দপ্রভু এইস্থানে অবতীর্ণ হইয়া যাহা প্রচার করিয়াছিলেন, বৰ্ত্তমান-কালে তাহার একটা বিকৃত প্রতিফলনমাত্ৰ দৃষ্ট হয়। এখন সঙ্কীৰ্ত্তন-পিতা গৌর-নিত্যানন্দের প্রীতির জন্য আর হরিকীৰ্ত্তন হয় না; ওলাউঠা-নিবারণ, গ্রামের শ্রীবৃদ্ধি সাধন প্রভৃতি আত্মেন্দ্রিয়তপণপর ভােগের জন্যই হরিকীৰ্ত্তনের বাহ- আকার মাত্র অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। ভগবানের সেবা ও সেবার অভিনয় দুইটা পৃথক্ বস্তু। ভগবানের শ্রম…ামুৰ্ত্তির সেবা যাহাতে সুষ্ঠুভাবে = আত্মধৰ্ম্ম ও মনােধৰ্ম্ম ১১১ সম্পাদিত হয়, তজ্জন্য আমাদের বিশেষ চেষ্টান্বিত হওয়া আবশ্যক। ভগবানের অক্ষামূৰ্ত্তির সেবক আবার যে-সে ব্যক্তি হইতে পারে না। দশ টাকা বেতন লইয়া দেবল ভগবানের সেবা করিতে পারে না, বিশ টাকা দিয়া নাম-কীৰ্ত্তন হয় না, পঞ্চাশ টাকা ফুরণ করিয়া হরিকথার বক্তৃতা হয় না বা ভাগবত’-পাঠ হয় না,-উহাতে ভাষা-বিন্যাস বা লােকরঞ্জক আমােদ-প্রমোেদ হইতে পারে ; উহা ভক্তি বা বৈষ্ণবধৰ্ম্ম নহে, উহার নাম-ভােগ বা কৰ্ম্মমার্গ। বুভুক্ষা ও মুমুক্ষার স্বার্থপরতা আপনারা জানেন যে, বুভুক্ষা বা মুমুক্ষা-দ্বারা জগৎ চালিত হইতেছে। জীবাত্মার প্রকৃত ধৰ্ম্ম--ভােগময়ী বা ত্যাগময়ী চেষ্টা নহে। আমরা অনেকসময় ত্যাগের খোসা পরিয়া ভােগীর নিকট হইতে কিছু ভােগ করিতে ধাবিত হই । আবার ভােগী ও চান,-ত্যাগীর নিকট হইতে ভােগের জিনিষ কিছু আদায় করিতে পারি কি না। কৃষি, শিল্প ও বিজ্ঞান-জাত দ্রব্য ও ক্রিয়ার বিষ্ণু-বৈষ্ণব- সেবায় নিয়ােগ হইলেই শ্রেয়ঃ ও সার্থকতা আমরা শ্রীআনন্দতীর্থ মধ্বমুনির চরিত্রে একটী আখ্যায়িকা দেখিতে পাই যে, তিনি একদা শিষ্যসঙ্গে বদরিকা-ক্ষেত্রে যাইতেছেন। মহারাষ্ট্র- প্রদেশের মহাদেব-নামক জনৈক রাজা সাধারণের উপকারার্থ একটী পুষ্ক- রিণী খনন করাইতেছিলেন। তিনি শ্রীআনন্দতীর্থকে সেইপথ দিয়া যাইতে দেখিয়া পুষ্করিণী খনন করিতে আদেশ করিলেন। কিন্তু ভগবদ্ভজনচতুর শ্ৰম কৰ্ম্মবীর রাজাকেই ঐ পুষ্করিণী-খননকার্যে প্রবৃত্ত করাইয়া স্বকার্য্যে অগ্রসর হইলেন। কৰ্মী রাজা জানিতেন না যে, সাধারণের উপকারের কাৰ্য্য সাধারণ শ্রমিক লােকের দ্বারাও সম্পাদিত হইতে পারে;

১১২ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী কন্তু যাহারা আত্মবিৎ, তাঁহাদের হাতে যদি কোদাল দেওয়া যায়, তাহা হইলে জগৎকে পরম হিতলাভে কেবল বঞ্চিত করা হয় মাত্র। জগতে শিল্প, বিজ্ঞান, কৃষি প্রভৃতির যত কিছু উন্নতি হইতেছে, তৎসমস্ত বৈষ্ণবসেবায় নিয়ােজিত হইলেই উহাদের সার্থকতা। কিন্তু ঐসকল বস্তু ভােগীয় সেবায় লাগিলে পণ্ডশ্রম ও জগবিনাশের হেতুমাত্র হইয়া থাকে । যেকাল-পৰ্যন্ত বিষ্ণু-বৈষ্ণবের সেবাই সর্বোৎকৃষ্ট বলিয়া দৃঢ়-প্রত্যয় না, হইবে, তাবৎকালপৰ্যন্ত অামাদের কোনই মঙ্গল-লাভ হইবে না। কপটতা-যুক্ত অঞ্চন বা কীর্তনের অভিনয় অর্জন বা কীৰ্ত্তন নহে এইজন্যই সর্বপ্রথমে, অৰ্চ্চার আরাধনা করাই কৰ্ত্তব্য। কিন্তু তাহ। নিজের কোন ইন্দ্রিয়তপণ, উদরভরণ বা অন্য কোন স্বার্থসাধনাে- দ্দেশের জন্য বিধেয় নহে। আমরা সকল জীবের দ্বারেদ্বারে এই বলিয়া ভিক্ষা করিতেছি,আপনারা কৃপা-পূৰ্ব্বক প্রেমধৰ্ম্মের স্বরূপ উপলব্ধি করুন। এখনকার বৈষ্ণব-বেষধারিগণের ব্যবহারকে সামান্য প্রাকৃত স্মাৰ্ত্ত, এমন কি, প্রাকৃত ব্যবহারজ্ঞ পৰ্য্যন্ত সমালোচনা করিবার যােগ্য হইয়াছেন। তাহারা বলেন,ইহাদের আচার বৈষ্ণববাচিত হওয়া দূরে থাকুক, সামান্য মনুষ্যাচিতও নহে এক অপ্রাকৃত হওয়া দূরে থাকুক, প্রাকৃত-ব্যক্তিগণের অপেক্ষাও ঘৃণ্য এবং রাজদ্বারে দণ্ডনীয়। সকলসময়ে মঙ্গলের পথের বাহ চেহারাগুলিই মঙ্গলের পথ নয় ;-কপটতা করিয়া অনেকেই যাত্রার দলের কৃত্রিম নারদমুনি সাজিতেও পারেন। সত্য-সত্য, ভাল লোক অৰ্চন-কাৰ্য্য করুন, সত্য-সত্য নিষ্কপট লোকসকল হরিকীর্তন করুন ; কেবল সুর-মান-লয়-তাল ভাল জানা থাকিলেই মুখে শুদ্ধ- হরিনাম কীৰ্ত্তিত হয় না। যিনি শুদ্ধবৈষ্ণব-গুরুর পদ আশ্রয় করিয়াছেন, তিনিই ঐগুরুদেবের নিকট হইতে হরিকীর্তনে অধিকার পাইতে পারেন।

আত্মধৰ্ম্ম ও মননধৰ্ম্ম মহেশপুর গ্রামের পূর্বকথা ১২৮৪ সালেও এই সুন্দরানন্দ-ঠাকুরের পাটে লােকের বাস ছিল। এই গ্রামটী পূর্বে নদীয়া-জেলার অন্তর্গত ছিল। সৈয়দাবাদের গােস্বামিগণ অদ্যাপিল সুন্দরানন্দ-ঠাকুরের শিষের বংশধর বলিয়াআত্ম- পরিচয় দেন। এই মহেশপুরেই স্বগীয় লালমােহন বিদ্যানিধি মহাশয়ের বাড়ী ছিল।

মে চৈতন্যদেব ও তঁাহার শিক্ষা স্থান-ইংরেজী বিদ্যালয়-গৃহ, পাট উলা সময়—১১ই ফাল্গুন, মঙ্গলবার, ১৪৩১ সৰ নমাে মহা-বদাঙ্গায় কৃষ্ণপ্রেম প্রদায় তে কৃষ্ণায় কৃষ্ণচৈতন্যনামে গৌরত্বিষে নমঃ॥” পূর্বে চৈতন্যের সম্বন্ধে অজ্ঞলোকের ভ্রান্ত ধারণা বাঙ্গ লাদেশের সকলেই ঐচৈতন্যদেবের নাম অবগত আছেন। তিনি যে প্রেমধর্মের প্রচারক ও গৌড়ীয় বৈষ্ণবগণের আরাধ্য একথা অনেকেই সাধারণভাবে জানেন। যাহারা আপনাদিগকে চৈতন্যদেবের অধস্তনসূত্রে চৈতন্যদেবের কথায় অবস্থিত বলিয়া মনে করেন, প্রকৃতপক্ষে তাহার যথার্থ বিষয় অবগত নহেন, কিছু কিছু বিকৃতভাবে জানেন মাত্র, তারা মনে করেন,-চৈতন্যদেবের কথায় দার্শনিক বিষয়ের কিছু অভাব আছে। ১৮৯১ খৃষ্টাব্দে আমি ঘটনাক্রমে দিনাদপুরে ছিলাম। একজন ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী ডেটী-ইন্সপেক্ট-অব-স্কুলকে চৈতদেবের সম্বন্ধে বিরুদ্ধভাব-সম্পন্ন দেখিলাম। তিনি শিক্ষতাভিমানী ছিলেন। তাহার মতে, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ও ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর’ একই শ্রেণীর গ্রন্থ : আমি জিজ্ঞাসা করিলাম,-“বিদ্যাসুন্দরে হরিকথা কি আছে, দার্শনিক চরম মীমাংসাই বাকি আছে ? তিনি বলিলেন,-‘অতিশয়ােক্তি- অলঙ্কারে ভূষিত চৈতন্য-মাহাত্ম্যপূর্ণ পয়ারী পুথি চরিত্রহীন ব্যক্তিগণেরই পাঠ্য। বঙ্গদেশের এমনও একদিন গিয়াছে। আমর শ্রীচৈতন্যদেব- সম্বন্ধে এইরূপ নানা কল্পিত-কথা বহু তথাকথিত শিক্ষিত ব্যক্তির নিকট শ্রবণ করিতে পাই। কিছুদিন পূৰ্ব্বে শুনিতাম,-চৈতন্যদেব অপেক্ষা শ্রীচৈতন্যদেব ও তাহার শিক্ষা ১১৫ আত্ত-ভট্টাচাৰ্যগণের উদারতা ও চরিত্র অধিকতর উন্নত। চৈতন্যদেব সহধর্মিণীকে পরিত্যাগ করিয়াছেন, কিন্তু গৃহমেধী আর্ত-ভট্টাচাৰ্য্যগণ স্ব-স্ব-ভাৰ্যার প্রতি অতিশয় প্রীতিবিশিষ্ট; সুতরাং তাহারা চৈতন্যদেব অপেক্ষাও অধিকতর উদার ও চরিত্ৰবন্ত। পূৰ্বে আরও শুনিতাম যে, চৈতন্যদেব সমাজের একজন প্রধান অহত কারী! বহু ব্যক্তিকে তিনি সংসার ছাড়াইয়াছেন, রাজ ও বিষয় ত্যাগ করাইয়া তাঁর নিকট লইয়া গিয়াছেন, বহুলােকের স্ত্রী, পুত্র ও জননীকে কান্দাইয়াছেন, বিভিন্ন বর্ণে উদ্ভূত, এমন কি, বনকুলে আবিভূ ত ব্যক্তিগণের সহিত ব্যবহারাদি করিয়াছেন, তাহাদিগকে বহু সম্মান ও ভঁহাদিগের দ্বারা গুরুর কাৰ্য্য করিয়াছেন, সুতরাং চৈতন্যদেব সমাজের একজন প্রধান অহিতকারী! মানবজাতির দুর্দশা ও তন্মােচনের উপায় == আবার, ভিন্নপথাবলম্বিগণ চৈতন্যদেবের কথা আলে চনা না করার ফলে প্রকৃত চৈতন্যভক্তের নিকট নিরপেক্ষভাবে চৈতন্যদেবের কথা না শুনার ফলে, নানা-প্রকার মনােবৰ্ম্মের পন্থায় অনুরক্ত আছেন। চৈতন্য- দেবের বাণী কর্ণে না পৌছিবার ফলেই কতকগুলি লোক নানা প্রকার নবীন কল্পিত কুপথে-বিপথে গমন করিয়াছেন ও করিতেছেন। চৈতন্যানুগত ব্যক্তির প্রকৃষ্ট সঙ্গপ্রভাবে যদি চৈতন্যদেবের কথা- চৈতন্যদেবের ভক্তিসিদ্ধান্তবাণী কোনদিন তাহাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করিত, তাহা হইলে এরূপভাবে অন্যপথে গনপূর্বক পরম-দুর্ভাগ্য- বরণ আমরা তাহাদিগের ভাগ্যে দেখিতে পাইতাম না। চৈতন্য- দেবের অপ্রকটের পর বিভিন্নধর্মপন্থীর উদয় হইয়াছে ও হইতেছে। ঐসকল ধর্মপন্থী মনে করেন,-চৈতন্যদেব অপেক্ষাও তাঁহাদের প্রতি জগতের বহিৰ্ম্ম খ লােকের অধিক আদর হইবে; কারণ, তাহারা ১১৬ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী লােকের নােধৰ্ম্মের অনুকূল ইন্দ্রিয়তৃপ্তিকর সিদ্ধান্তদ্বারা লােকের চিত্ত রঞ্জন করিতে সমর্থ। কিন্তু একমাত্র শ্রীচৈতন্যদেবের কথাতেই জগতের বিভিন্নধৰ্ম্মস্রোতের পরস্পর বিবদমান ভাবসমুহ বিদূরিত হইতে পারে, মহাবদান্ত শ্রীচৈতন্যদেবের অমন্দোদয়া দয়াতেই জগতে জীবের সর্ববিধ অশুভ বিনষ্ট হইয়া পরশান্তি-লাভ হইতে পারে। ; চৈতন্যাশ্রিত ভাগবত-ধৰ্ম্ম ও মুমুক্ষ। কেহ কেহ মনে করেন, যে ধৰ্ম্মে মুক্তিবাদ” স্বীকৃত হয় নাই, তাহা ভুক্তিবাদের অপরদি মাত্র। কিন্তু ভুক্তি-মুক্তি জীবের চরম- লক্ষ্য হইতে পারে না। মুক্তি ভুক্তিরই অপর দিক্‌। ভুক্তি ও মুক্তি উভয়ই পিশাচী-সদৃশা ; উ ভসই জীবকে আস্তিকতা হইতে বিচ্যুত করিয়া দেয়। ভগববিশ্বাসিগণ বা আস্তিকগণ কখনও ভুক্তি-মুক্তি পিশাচীর শরণ গ্রহণ করেন না। ভগবদ্ভক্তগণ-মুক্ত ; সুতরাং মুক্ত- পরুষগণ কখন ও মুক্তির জন্য লালায়িত নহেন। আমরা শ্রীচৈতন্যদেবের আচরণে পরম-মুক্তজীবের কৃত্য ও চিন্তা-শােত দেখিতে পাই। আবার, চৈতন্যদেবের উপদেশের মধ্যে বদ্ধজীরে কৃত্যও প্রাপ্ত হই। সূক্ষ্মভাৰে অনুধাবন করিলে জানিতে পারা যাইবে যে, ‘ভােগ’ যে-প্রকার জীবাত্মা- বৈষ্ণবের অপ্রয়ােজনীয় ব্যাপার,মোক্ষ’ও সেইপ্রকার জীবাত্মা-বৈষ্ণবের অপ্রয়োজনীয় বস্তু। “ভােগ ও ত্যাগ উভয়ই বর্জনীয়। শীভাগবত (১১২) তাহাই বলিয়াছেন- “ন নির্বিঘ্নো নাতিসক্তো ভক্তিযােগেহস্ত সিদ্ধিদঃ” অর্থাৎ যিনি অত্যন্ত নির্মিও (অতিরিক্ত অর্থাৎ ফবৈরাগ্যাশিত) নহেন তথচ সংসারে অতিশয় আসক্তিযুক্তও নহেন, তাহার পক্ষেই ‘ভক্তিযোেগ প্রেমফলদ হয় অর্থাৎ প্রেমভক্তি-সিদ্ধি দিয়া থাকেন।

চৈতন্যদেব ও তঁাহার শিক্ষা ১১৭ w ** ; নিত্যানন্দপ্রভুকে আমরা কেহ কেহ দুর্ভাগ্যক্রমে জড়-ভােগের প্রচারক’ বলিয়া মনে করি। আমরা অনেকসময় বলি,-অবধূত নিত্যানন্দ জগতে বংশ রক্ষা অর্থাৎ গৃহব্রতধৰ্ম প্রবর্তন করিবার জন্যই দুই-দুইটা বিবাহ করিয়াছিলেন। কি পাণ্ডিত! সাক্ষাবিষ্ণুবস্তুতে, ভােগবুদ্ধি : অধেক্ষজ বস্তু স্বতন্ত্র ও স্বরাট, জড়চেষ্টা-লভ্য নহেন আমাদের নিকট অনেকসময় আশ্চর্যের বিষয় বলিয়া মনে হয় যে, “আঁহাকে এসংসারে পাওয়া যায় না, সেই ভগবাকে আবার ‘সেবা করিতে হইবে ! আর, যাহাদিগকে দেখা যায়, হস্তদ্বারা স্পর্শ করা যায়, তাহাদের সঙ্গ করিবার অবশ্যকতা নাই।—এ কিরূপ ! কিন্তু মনে দ্বারা, ইন্দ্রিয় গ্রামের দ্বারা আমরা যাহা ভোগ করি, তাহা ত’ অপােক্ষজ ভগবান্ নহেন। তবে কি জাড্যই আমাদের লক্ষ্য ? তাহাও নহে । তাহা হইলে সেই অবােক্ষ বস্তু কিরূপে লভ্য হন?—তাহার সদুত্তর চৈতন্যদেব শ্রীল রূপগােস্বামি-প্রভুকে এই বাক্যে বলিয়াছেন, “অতঃ শ্ৰীকৃষ্ণনামালিন ভবেদগ্রাহমিত্রিয়ৈঃ । সেবােম্মুখে হি জিহ্বাদৌ স্ময়মেব স্ফুরত্যদঃ ॥” দার্শনিক-পণ্ডিতগণ যাহাকে ‘পরমার্থ’ বা ‘তত্ব’-বস্তু বনে, তাহা ‘পরমার্থ নহে,—ইহাই শ্রীচৈতন্যের বাণী। “তাতে ছয় দর্শন হৈতে “তত্ত্ব” নাহি জানি। ‘মহাজন যেই কহে, সেই ‘সত্য মানি।” (চৈঃ চঃ, মধ্য, ২৫শ পঃ)। ভগবৎসেবায় উন্মুখ হইলেই স্বয়ংপ্রকাশ ভগবানের নাম,রূপ, গুণ ও লীলা স্বতঃই আমাদের নিকট প্রকাশিত হন। অধেক্ষজের সেবাই অকৈতব ভাগবত-ধৰ্ম শ্রীমদ্ভাগবতের বাক্য (১২৬) ‘স বৈ পুংসাং পরে ধৰ্ম্মো যততা ভক্তিরখােক্ষজে। মানবজ্ঞানােথ জাগতিক ধর্মসমূহের যদি একটী তালিকা যায় এবং সেই ১১ শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী তালিকা দেখিয়া যদি তাহাদের বিচার প্রণালী ও সিদ্ধান্তের বিচার করা যায়, তাহা হইলে আপনারা বুঝিতে পারিবেন যে, শ্রীমদ্ভাগবত-কথিত ‘সনাতন ধর্ম বা শ্রীচৈতন্যদেব-কথিত ধৰ্ম্ম ব্যতীত মানব জ্ঞানােথ অন্যান্য সমস্ত ধৰ্ম্মে কাল্পনিক চিত্র ও কৈতবই নিহিত আছে। ভাগবত-ধর্ম বা চৈতন্যদেবের প্রচারিত বিমল আত্মধৰ্মই একমাত্র প্রোঙ্ক্ষিত-কৈতব ও পরম-নিৰ্ম্মর পরমহংস সাধুগণের অনুমােদিত, অচরিত, সনাতন শ্রৌত-ধৰ্ম্ম। আজকাল যে-সকল ধর্মের কথা প্রচলিত আছে, তাহা মানব-কল্পিত বা মানব-মনঃ-সৃষ্ট মনােধ মাত্র ; কোনটী-ই আত্ম-ধৰ্ম্ম নহে; (চৈঃ চঃ মধ্য ২৫পঃ)- “চৈতন্য-গগাসাঞি যেই কহে, সেই ত’ সার। আর যত মত, সেইসব ছারখার ॥” অধােক্ষজের চিবিলাস ও পৌত্তলিকতা এক নহে পরমপুরুষ ভগবান্ কিপ্রকার নাম, রূপ, গুণ, লীলা-বিশিষ্ট, তাহা যাহারা কল্পনা করিতে সচেষ্ট হন, তাহাদের চেষ্টা-দাম্ভি তা-মাত্র। তাহাদের কাল্পনিক ব্যাপাসমূহ এবং অবােজ ভগবানের রূপ, গুণ ও শীলা ‘এক’ হইতে পারে না;--ঈশ্বর আমার খানা-বাড়ীর রায়ত’ নহেন যে, আমি আমার মনােপৰ্ম্মের ছাঁচে তাহার বাস্তব স্বরূপ গড়িয়া লইতে পারিব অথবা আমি আমার মনােধৰ্ম্ম-বলে আমার মনের রুচির অনুকূলে আমার জডেন্দ্রিয়-ভােগ্য যে কিছু রূপ সৃষ্টি করিব বা গড়িয়া তুলিব, তাহাকে বাধ্য হইয়া তাহাই কইতে হইবে! যাহারা স্বয়ংপ্রকাশ-ভগবানের বাস্তব-স্বরূপে বিশ্বাস করেন না, তঁাহারাই ঐরূপ মনােধৰ্ম্মের পক্ষপাতী। গণিত-শাস্ত্রের তুরীয়-তত্ত্বের কথা আমরা জানি ল। মানবজ্ঞান যে জড়ীয় ‘সাকার’ ‘নিরাকার কল্পনা করিতেছে, তাহা ভগবানের বাস্তব-স্বরূপের

চৈতন্যদেব ও তাহার শিক্ষা
১১৯
•
সহিত এক নহে। বৈকুণ্ঠের সমতলে কুণ্ঠ-ধৰ্ম্ম নাই; কিন্তু বৈকুণ্ঠের
হেয়-প্রতিফলন-রূপ এই প্রপঞ্চে সৰ্ব্বত্র কুণ্ঠ-বৰ্ম আছে।
ভক্তিবৃত্তির স্থান ও পত্র পরিচয়
ইহ-জগতের চিন্তা-স্রোত নিৰ্বিশেষ-ধারণা-পৰ্য্যন্ত পৌছিয়া শেষ হইয়া
থাকে। কিন্তু মহাপ্রভু রূপ প্রভুকে শিক্ষা দিলেন, (চৈঃ চঃ মধ্য ১৯ শপঃ)-
“ব্রহ্মাণ্ড ভূমিতে কোন ভাগ্যবান জীব ।
গুরু-কৃষ্ণ-প্রসাদে পায় ভক্তি-লতা-বীজ।
মালী হঞা সেই বীজ করে আরােপণ ।
শ্রবণ-কীৰ্ত্তন-জলে করয়ে সেচন।
উপজিয়া বাড়ে লতা ব্ৰহ্মাণ্ড ভেদি’ যায়।
‘বিরজা’, ‘ব্ৰহ্মলােক ভেদি পরব্যোম পায়।
তবে যায় তদুপরি গােলােক-বৃন্দাবন।
কৃষ্ণচরণ-কল্পবৃক্ষে করে আরোহণ ।”
*রণ” ও “তুরীয়”
‘বিরজা-অর্থে যে-স্থানে ত্রিকালের কথা সমন্বিত বা সাম্যাবস্থা প্রাপ্ত
(neutralised) হইয়াছে। পরব্যোমই লক্ষ্মীপতি-নারায়ণের ঐশ্বৰ্য্যধাম ;
বাসুদেবাদি তুরীয়-ব্যুহ-রূপে সেই সেব্য-বস্তুতে বিরাজমান। এই স্থানে
গৌরব-সখ্য পৰ্য্যন্ত রস বর্তমান। জড়ের বাবা-মা'র নিকট হইতে কৃষ্ণ
জন্ম গ্রহণ করেন নাই, কৃষ্ণ হইতে তাহার বাবা-মা প্রকটিত। কৃষ্ণই
সৰ্ব্বকারণ-কারণ মুল-পুরুষ।
গৌরবময়ী বৈধপুঞ্জ ও বিশ্বময়ী রাগ-সেবার
বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য
নারায়ণ-পূজা ও শ্রীকৃষ্ণের সেবা-প্রণালী একজাতীয় নহে।' কৃষ্ণ
গোপ-বালকের বিশম্ভসখ্য-প্রেম আস্বাদন করিবার লােভ সম্বরণ করিতে
---

শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী না পারিয়া পাল্যরূপে কখনও সখাগণকে স্কন্ধে বহন ক্রীড়া করিয়া থাকেন। ভগবানের প্রেম-সেবা কেবলমাত্র পূজা-পূজক-বুদ্ধিতেই আবদ্ধ নহে। বিশ্রম্ভসখ্য ও বৎসল-রসের সেবা-প্রণালী অর্চনমার্গের অর্চকগণের বােধগম্য নহে! কান্তগিণের কথা, কান্তাগণের মধ্যে আবার সর্বকান্তা-শিরােমণি বৃষভানুনন্দিনীর কথা আরও চমৎকারময়ী। কান্তাগণ কৃষ্ণের বংশীধ্বনির আহ্বান-শ্রবণে আত্মবিস্মৃত হইয়া কৃষ্ণসমীপে ছুটিলেন—কোনও দিকে দৃষ্টিপাত নাই,-ঘরের সমস্ত কাজ পড়িয়া থাকিল,—যেমন অবস্থায় ছিলেন, ঠিক তেমন অবস্থায়ই উন্মাদিনী হইয়া কৃষ্ণের অন্বেষণ করিতে ছুটিলেন (ভাঃ ১০২.! ৪-৮) কৃষ্ণবংশীধ্বনি-শ্রবণে গােপীগণের অবস্থা-বর্ণন - “নিশম্য গীতং তদনঙ্গবদ্ধনং ব্রজস্ক্রিয়ঃ কৃষ্ণগৃহীতমানসাঃ । আজন্ম রন্যোংমলক্ষিততাদ্যমাঃ স ত্ৰ কান্তা জবলােলকুণ্ডলাঃ । দুহন্ত্যোহভিযাঃ কাশ্চিদ্দোহঃ হিত্বা সৎসুকা। পয়ােহবিশ্রিত্যসংবমনুদ্বাস্তপর যবুঃ পরিবেষয়ন্ত্যস্তদ্ধিত্ব পায়ন্ত্যঃ শিশূন্ পয়ঃ। শুশ্রুষস্ত্যঃ পতী কাশ্চিদশ্নন্ত্যোংপাস্য ভেজনম্ । লিম্পন্ত্যঃ প্ৰমৃজন্ত্যোহা অঞ্জন্ত্যঃ কাশ্চ লোচনে। ব্যস্তবাভরণাঃ কাশ্চিৎ কৃষ্ণান্তিকং যযুঃ । তা বাৰ্যমাণঃ পতিভঃ পিতৃভি'তৃবন্ধুভিঃ। গোবিন্দাপহৃতাত্মাননা, ন ন্যবৰ্ত্তন্ত মােহিতাঃ ॥” সেই গােপনারীগণের চিত্ত পূৰ্ব্ব হইতেই শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আসক্ত ছিল। সম্প্রতি কৃষ্ণের কামােদ্দীপক-বংশীসঙ্গীত-শ্রবণে, গােপবধূগণ পরস্পরের আঁগােচয়ে প্রিয়তম কৃষ্ণ যেস্থানে আছেন, যত্নপূৰ্ব্বক তথায় শ্রীচৈতন্যদেব ও তাহার শিক্ষা গমন করিলেন। গমনকালে বেগে তাহাদের কর্ণভূষণ কুণ্ডলগুলি দুলিতেছিল, তাহাদের মধ্যে কেহ কেহ দুগ্ধ দোহন করিতেছিলেন, কিন্তু কৃষ্ণগীত-শ্রবণে নিজ-কাৰ্য্য পরিত্যাগপূৰ্ব্বক ঔৎসুক্যভরে যাত্রা করিলেন, কেহ কেহ চুল্লীর উপরিস্থিত দুগ্ধপাত্র বা গােধূম-কণের অন্ন না নামাইয়ই গমন করিতে লাগিলেন; কেহ কেহ পরিবেশন, কেহ । শিশুকে স্তন্য প্রদান, কেহ বা পতির শুশ্রষা, কেই বা ভােজন, কেই বা অঙ্গরাগ সম্পাদন, কেহ শরীর মার্জন এবং কেহ বা লোচনযুগলে অঞ্জন প্রদান করিতেছিলেন। তাহারা তৎকালে নিজ নিজ কাৰ্য্য অসমাপ্ত রাখিয়াই ব্যতিব্যস্ত হইয়া বিপরীতভাবে বসন-ভূষণাদি পরিধানপূর্বক কৃষ্ণের নিকটে উপস্থিত হইয়াছিলেন। তাঁহাদের পতি, পিতা, ভ্রাতা এবং বন্ধুগণ তাহাদিগকে বহু নিষেধ করিতে থাকিলেও তাহারা নিবৃত্ত হইলেন না; কারণ, তাহাদের চিত্ত গােবিন্দে আকৃষ্ট হওয়ায় তাহারা মােহিত হইয়াছিলেন।] সেবা ও ভােগের প্রভেদ আমাদের আত্মবৃত্তি যদি পরিস্ফুট হয়, ত ই আমরা ব্রজের কান্তা, ব্রজের পিতা-মাতা ও ব্রজের সখাগণের আনুগত্যে কৃষ্ণসেবায় অধিকার পাইব। এইসকল বাণী-অধােক্ষজ-বস্তুর সেবার কথা। কৃষ্ণকে সেবা করিতে হইবে, কিন্তু কৃষ্ণে 'ভােগৰুদ্ধি’ করিতে হইবে না। ভােগবুদ্ধি’ কিছু ‘সেবা নহে;-প্রকৃত-সহজিয়ার ‘কৃষ্ণে ভােগৰুদ্ধি’ কিছু অপ্রাকৃত কৃষ্ণসেবা নহে। ইন্দ্রিয়-দ্বারা অধােজ-কৃষ্ণকে ভােগ করা যায় না; এই- জন্যই বলা হইয়াছে যে,জডেন্দ্রিয়দ্বারা তাহাকে সেবা করা যায় না। কৃষ্ণের “সেবা কখনও জীবের ভােগ্য-ব্যাপার নহে। জড়-ভােগী মানব-জাতি শ্রীচৈতন্যদেবের কথা বুঝিতে না পারিয়া ভগবানকে দিয়া নিজেদের ভােগ- ১২২ শ্রীল প্রভুপাদের বক্তৃতাবলী বৃত্তি চরিতার্থ করিবার বুদ্ধি করিতেছে। নিগেন্দ্রিয়-প্রীতি-সাধনের নামই কাম-ভোগ; (চৈঃ চঃ আদি ৪র্থ পঃ)- “আয়েজিয়-প্রতি-বাঞ্ছা তারে বলি কাম। কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রতি-বাঞ্ছা ধরে ‘প্রেম’ নাম। কৰ্মী ও জ্ঞানীর দশা ও ক্রিয়া শ্ৰীল নােত্তম ঠাকুর মহাশয় প্রেমভক্তিচন্দ্রিকায় গাহিয়াছেন, কর্মকাণ্ড, জ্ঞান কাণ্ড, কেবল বিষের ভাণ্ড, ‘অমৃত বলিয়া যেবা খায়। নানা-যোনি সা ফিরে, কদর্য্য ভক্ষণ করে। তার জন্ম অধঃপাতে যায় । রাধাকৃষ্ণে নাহি রতি, অন্য-দেবে বলে পতি', প্রেমভক্তি কিছু নাহি জানে । নাহি ভক্তির সন্ধান, ভরমে করয়ে ধ্যান, বৃথা তার সে ছার জীবনে। জ্ঞান-কৰ্ম্ম করে লােক, নাহি জানে ভক্তিযােগ, নানা মতে হইয়া অজ্ঞান। তার কথা নাহি শুনি, পরমার্থতত্ত্ব জানি, প্রেম-ভক্তি ভক্তগণ-প্রাণ। কর্মকাণ্ড বা জ্ঞানকাণ্ড নিরত ব্যক্তি শ্রীচৈতন্যদেবের কথা বুঝিতে পারিয়া, হয় তাহার নিন্দাবাদ করিবে, নয় তাহাদের মননধৰ্ম্মের কথার সহিত ভক্তিকথার সামান্য-বুদ্ধি করিবে। দ্ভুি চৈঃ চঃ অন্ত্য ৮ম পঃ আমরা জানিতে পারি, *শুষ্ক-প্রহ্মে নাহি থাকে কৃষ্ণের সম্বন্ধ। সৰ্ব-লােক নিন্দা করে, নিন্দাতে নিৰ্বন্ধ।”

চৈতন্যদেব ও তাহার শিক্ষা ------ ------ কৰ্ম্ম-জ্ঞানে অনাবৃতা ভক্তির ফলে প্রেমের পরিচয় কৰ্ম্ম বা জ্ঞানকাণ্ডে আত্মবৃত্তির উন্মেষ হইতে পারে না,—উহাদের মধ্যে মনােধৰ্ম্মেরই প্রাবল্য। কর্মকাণ্ডে প্রাকৃতপ্রবৃত্তিরই তাণ্ডবনৃত্য। আত্ম-প্রতীতিবিশিষ্ট ব্যক্তিই শ্রীহরির সেবা করেন। যখন আমাদের বাহ- জ্ঞান বিলুপ্ত হইব,তখন আমাদের নিৰ্মলা অস্মিতা-দ্বারা আমরা ভগবানের সেবা-বৈচিত্র্য উপলব্ধি ও প্রেমাঞ্জনচ্ছুরিত ভক্তিবিলােচন-দ্বারা অপেক্ষ ঐশ্যামসুন্দরের অপ্রাকৃত রূপ দর্শন করিয়া আর শ্যামসুন্দরের নিত্যসেবা ছাড়িব না,আরও নব-নবায়মান ভাবে সেবা করিতে থাকিব। কন্তু বৈরাগ্যের দুর্গতি অনেক সময় আমাদের মনে হয়,-“দূর ছাই! ভগবানের সুখ হইলে আমার কি হইবে? ‘সেবা-শব্দে যখন কেবল ভগবানের সুখ-সন্ধান মাত্র, তখন ওসব ছাড়িয়া দিয়া ধ্যান-ধারণা-দ্বারা আত্ম-সুখানুসন্ধানই ভাল ; ব্রহ্মের সহিত একীভূত হইয়া গেলেই আমাদের সকল দুঃখ থামিয়া বাইবে। আমরা অনেকসময় এইরূপ আত্মবিনাশকেই নিজের মঙ্গল’ বলিয়া বরণ করিতে গিয়া নির্ভেদ-জ্ঞানী হইয়া পড়ি। যদি কোন ব্যক্তির কোন অঙ্গে স্ফোটক হয় এবং ডাক্তার যদি তার গলায় ছুরি দিয়া বধ সাধনপূর্বক স্ফোটকের যন্ত্রণা হইতে চিরনিস্কৃতি দিবার পরামর্শ দেন, তাহা হইলে এরূপ কাৰ্য পণ্ডিতভিমানী কোনও কোনও অবিবেচক- সম্প্রদায়ে বহুমানিত হইলেও মূখতারই জ্ঞাপক। অসুরমােহনকল্পে বিষ্ণুর অবতার যুদ্ধ বা শঙ্করাবতার আচাৰ্য-শঙ্কর এইরূপ আত্ম- বিনাশের দ্বারা আত্যন্তিকদুঃখ-নিবৃত্তির কথা জগতে প্রচার করিয়াছেন। কিন্তু অমন্দোদয়-দয়া-রিণকারী মহাবদান্য ভগবান্ শ্রীগৌরসুন্দর সেই প্রকার বিচারহীনতার কথা বলেন নাই। • s ১২৪ শ্রীলপ্রভুপাদের বাবলী অসংখ্য কর্মী ও জ্ঞানী অপেক্ষা বিষ্ণুর অক একজন কনিষ্ঠাধিকারীর উৎকর্ষ শ্ৰমূর্তির সেবা, বৈষ্ণবের সেবা, নামের সেবা-দ্বারাই জীবের পরম- মঙ্গল সাধিত হয়। শ্রীচৈতন্যদেব বলিয়াছেন যে, যাহার সেবােম্মুখ জিহ্বায় একবার মাত্র কৃষ্ণনাম কীৰ্ত্তি হন, তিনিই—“শ্রেষ্ঠ সবাকার। দেবীধামের সর্বশ্রেষ্ঠ পুণ্যকর্মী ও জ্ঞানী অপেক্ষাও ঐবিষ্ণুর নামাত্মক :ন্ত্রে বিগ্রহের অéনকারী কনিষ্ট-ভক্ত শ্রেষ্ঠ ; যেহেতু কৰ্মী বা জ্ঞানীর —তিনি যত-বড়ই শ্রেষ্ঠ হউন না কেন-বাস্তব-বস্তু বিষ্ণুর নিত্য- সেব্যত্বে বিশ্বাস নাই, সুতরাং মুখে বেদ মানিলেও তারা প্রকৃতপক্ষে ‘নাস্তিক; আর বিষ্ণুর অর্চ ক—অপ্রাকৃত ভজনরাজ্যে তাহার যতটুকুই মহিমা থাকুক না কেন—অন্ততঃ ঐবিষ্ণুর অর্ডার বাব-সত্য-বিগ্রহত্ব শুরুমুখে শুনিয়া হতে শ্রদ্ধা-বিশিষ্ট। ঐবিগ্রহেব-অৰ্চনকারী একজন কনিষ্ঠ-বৈষ্ণব শ্রীবিগ্রহের কাছে বে ঘণ্টা বাদন করেন,সেই ঘন্টার একটীবার বাদনের সহিত সহস্র-সহ কর্মবীরের অসংখ্য হাসপাতাল, দরিদ্রসেবা, সেবাশ্রম, বিপুল কর্মকাণ্ডের অনুষ্ঠান-ঘটা এবং নির্ভেদজ্ঞান- বীরের বেদ-বেদান্তানুশী নন,ধ্যান,কৃচ্ছ তপাে-যােগ-সাধন-অতীব নগণ্য। ইহা সাম্প্রদায়িকতা-বশে অতিশয়ােক্তি নহে,ইহা বাস্তব-সত্যকথা। বাস্তব- সতত্য বিশ্বাসরহিত নাস্তিকগণ বঞ্চিত হইয়া এইসকল সার কথার মর্মার্থ কিছুতেই হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন না। তাই তাঁহারা কখনও প্রকাশ্য- ভাবে ভক্তিনিক, কখনও বা প্রচ্ছন্ন- নিক সমন্বয়বাদী হইয়া পড়েন। শ্রীভক্তিবিনােদের গৌরমনােহভীষ্ট-প্রচার শ্ৰমভক্তিবিনােদ ঠাকুর শ্রীচৈতন্যদেবের প্রচারিত কৃষ্ণ, কাষ্ণ ও নামের সেবার কথাই বাঙ্গালা, ইংরেজী, সংস্কৃত প্রভৃতি বহু-ভাষায় চৈতন্যদেব ও তাহার শিক্ষা A জগতে জানাইয়াছেন। গত আড়াই শত বা তিন শত বৎসরের গৌড়ীয় বৈষ্ণব-জগতের ইতিহাস-হরিসেবার নামে জড়েন্দ্রিয়-পরায়ণতা। দুই- একটা ভজনানন্দী বৈষ্ণব নিজে-নিজে ভজন করিয়া গিয়াছেন; শ্রীল চক্রবর্ত্তী ঠাকুর বা পাদ বিদ্যাভূষণ-প্রভৃতি বৈষ্ণবাচাৰ্য্যগণ গ্রন্থাশির মধ্যে শুদ্ধভক্তির কথা লিখিয়া রাখিয়া বৈষ্ণব-জগতের প্রভূত কল্যাণ করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু সর্বসাধারণ্যে শুদ্ধভক্তি কথার প্রচার সেরূপ প্রচুরভাবে দেখা যায় নাই। শ্রমভক্তিবিননাদ ঠাকুর শ্রীগৌরসুন্দরের মহাবদান্যতার কথা সৰ্বসাধারণ্যে প্রচার করিবার জন্য বিশেষ উৎ- সাহান্বিত ও যত্নবান্ ছিলেন। আমার গুরুবর্গ—যাহারা এস্থানে এক্ষণে উপস্থিত আছেন তাঁহারা সকলেই কায়মনোবাক্যে শ্রীচৈতন্য, দেবের মনােহভীষ্টের কথা প্রচার করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইয়াছেন , তাহারা গৌরসুন্দরের কৃপা নিশ্চয়ই পাইবেন।

অপ্রাকৃত-সহজ-ধর্ম ও প্রাকৃত-সহজ-ধৰ্ম স্থান-শ্রীচৈতন্যমঠ, ধাম-মায়াপুর সমর-১০ই ফাগুন, ১৩৩১, শুক্রবার, সায়ংকাল কৃষ্ণসেবা-বিরুদ্ধ অভক্তিমুলক প্রয়াস ব্রজেন্দ্রনন্দনই একমাত্র কামদেব। সেই কামদেবের কাম-পরিতৃপ্তির জন্যই অসংখ্য আশ্রয় জাতীয় বিচিত্রতার নিত্যপ্রকাশ আছে। সেবা-বুদ্ধি অপগত হইলেই জীবের অদ্বয়জ্ঞানের বিস্মৃতিক্রমে জড়দ্বৈত-ৰুদ্ধি আসে। তখন জীব “হাম খোদা” বুদ্ধি করিয়া কখনও ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’র ভ্রান্ত ধারণায় নিৰ্বিশেষ নির্ভেদ-ব্ৰহ্মবা দী হন, কখনও বা ভােগি-সম্প্রদায়ের অন্তভুক্ত হইয়া নারায়ণের ন্যায় ঐশ্বৰ্য্য-ভােগের দুরাশা করিয়া থাকেন। সেবা বিস্মৃত বিমুখ বদ্ধজীব কখন ও বাউল’, ‘কর্তাভজা’, ‘নেড়া”, ‘সহজিয়া’, ‘অতিবাড়ী’, ‘চুড়াধী, অভিমান করিয়া নিজকে ‘কৃষ্ণ ও প্রাকৃত স্ত্রীলােকদিগকে ‘গোপী’ কল্পনা অর্থাৎ নিজ-ভােগ্য জ্ঞান করেন । -খনও কৃষ্ণকে সেবা করিবার পরিবর্তে নিজেই সেব্য সাজিয়া সেন ; কখনও ‘গৌরনাগরী’ সাজিয়া গৌরাঙ্গের প্রতি ভােগ-বুদ্ধি করেন। আবার কখনও অদৈব-বর্ণাশ্ৰমধৰ্ম্ম-পালনে নিঃক্ত হন, তখন স্ত্রীর মনো- রঞ্জন করাই তাহার প্রধান ধর্ম হইয়া পড়ে এবং তখন ‘‘আবি সৃষ্টিরক্ষা করলে, কিরূপেই বা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি-রক্ষা হইবে ?”—এইরূপ বিচার আসিয়া তাঁহার হৃদয় অধিকার করে ; কখনও বা পতি-লােক পাইার জন্য গঙ্গাসাগরে স্নান করিতে দৌনি ; কখনও বা গাভী দান, অর্থ দান বা বস্ত্র দান করেন; কখনও বা তীর্থ যাত্রা করেন, নানাবিধ কৃচ্ছ সাধ্য ব্রত আচরণ করেন, আবার কখনও বা পতঞ্জলির আশ্রয় গ্রহণ করেন; কখনও নিজকে ‘অমুক্ত’ অভিমান করিয়া মুক্ত হইবার জন্য ধ্যান-ধারণা করিয়া থাকেন। অপ্রাকৃত কামদেবের কামপুর্তিরূপ অপ্রাকৃত-সহজ-ধৰ্ম্ম ও প্রাকৃত-সহজ-ধৰ্ম্ম ধৰ্ম্ম হইতে বিচ্যুত হইয়া বুভুক্ষু ও মুমুক্ষু-সম্প্রদায়ের খাতায় নাম লেখাইয়া আমরা এইরূপ নানাবিধ অসৎ চেষ্টা করিয়া থাকি। আবার, কখনও বা লােককে বঞ্চনা করিবার জন্য আমি বুভুক্ষু বা মুমুক্ষু-সম্প্রদায়ের কেহ নহি, আমি পরম ভক্ত”—এইরূপ প্রচার করিয়া জগতে কনক- কামিনী বা প্রতিষ্ঠা-বিষ্ঠা আহরণ করিবার জন্য কপটভক্তের পােযাকে ‘ভগবান্ সাজিতে চাই। কৰ্ম্মজ্ঞানাঞ্ছনাবৃতা শুদ্ধা কৃষ্ণসেবার মহিমা মধুর সাধুগণ বলেন,বুভুক্ষা ও মুমুক্ষা-রূপা পিশাচীদ্বয়ের মনােমােনর বেষে লুব্ধ হইয়া উহাদিগকে আলিঙ্গন করিতে যাইও না। অনিত্য ‘পচা-পতি’র জন্য আমাদের গঙ্গাসাগরে স্নান বৃথা! একমাত্র পরমপতি শ্ৰীকৃষ্ণচন্দ্রের নখশােভা যদি আমাদের হৃদয়-দেশ আলোকিত করে—যদি এমনই সৌভাগ্য হয়—তাহা হইলে আমরা কৃষ্ণপ্রেয়সীগণের কিঙ্করী হইয়া ঐকৃষ্ণের বংশীধ্বনি শ্রবণ করিতে করিতে সকল কাৰ্য ফেলিয়া রাস- স্থলীতে দৌড়াইয়া যাইব। তথায় যাইবার সময় আমাদের প্রকৃত পুরুষদেহ বা স্ত্রীদেহ পঞ্চভূতে মিলিত হইবেসখীভেকী যেরূপ কৃষ্ণে ভােগৰুদ্ধিক্রমে প্রাত পুরুষদেহকে ‘সখী সাজাইয়া আত্মবঞ্চনা ও লােকবঞ্চনা করেন, কৃষ্ণচন্দ্রের নখশােভার ছটা হৃদয়ে প্রবিষ্ট হইলে সেরূপ দুর্ব দ্ধি হয় । দণ্ডকারণ্যবাসী যষ্টিসহস্র ঋষি রামচন্দ্রের (শাভায় মুগ্ধ হন; পরে পুরুষদেহত্যাগন্তে তাঁহারা অপ্রাকৃত গােপীগৃহে জন্ম গ্রহণ করেন । গােপীর আনুগত্যে কৃষ্ণভজনার্থ সকলকে উপদেশ হে নিজঙ্গলাকাঙ্কি ভদ্রমহােদয়গণ, আপনারা কৃত্রিমতা পরিত্যাগ করুন,কৃত্রিম ভেকধারণ, কৃত্রিম ভাবুকতা, কৃত্রিম ভক্তি বা মিছাভক্তি, স্ত্রী-পুজা ও স্ত্রৈণভাব পরিত্যাগ করুন। শ্ৰীমতী রাধারাণীর নিত্য-দাস্তে, রূপমঞ্জরীর নিত্য-কৈঙ্কর্য্যে আত্মনিক্ষেপ করুন। বৃষভানুনন্দিনী

১২৮
শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী
বে-প্রকার হরিসেবা করেন, তাহার অনুচরীবৃন্দ সর্বদা সৰ্ব্বতােভাবে যে-
প্রকার কৃষ্ণসেবা করেন, অষ্টসখী-পরিবৃতা বৃষভানু-নন্দিনীর যে-প্রকার
সেবায় মঞ্জরীগণ সতত নিযুক্তা, সেই প্রকার কৃষ্ণসেবায়–কামিনীরূপে
অপ্রাকৃত কামদেবের কাম-তর্পণ-চেষ্টায় নিযুক্ত হউন।
কৃষ্ণই সকলের একমাত্র চিন্ময় নিত্যপতি
রুদ্রাণী, ব্ৰহ্মাণী, ইন্দ্রাণী, বরুণানী, স্বাহা, তারা, উর্বশী, ভারতী
প্রভৃতি প্রকৃতিগণ যখন বাহবিচারে মুগ্ধা, তখন তাহাদের বিচার,
“আমার নশ্বর পতির নাম রুদ্র, ব্রহ্মা, ইন্দ্র বা সমুক দেতা, কি
অমুক মনুষ্য। কিন্তু হরিসেবােম্মুখ হইলে তাহারাও বুঝতে পারেন
যে, “হরিই একমাত্র পতি, শ্ৰীমতী রাধারাণীই কৃষ্ণের প্রিয়তমা, সেই
শ্ৰীমতী ও শ্ৰমতীর অনুচরীবৃন্দের কৈঙ্কৰ্য্যই যথার্থ নিত্যপতি কৃষ্ণসেবা।
সর্বস্বদ্বারা কৃষ্ণসেবাই প্রকৃত মুক্তি বা শ্রেয়ঃ,
তদন্যথা বন্ধন
যাহার যাহা আছে, তিনি যদি তাহার সমস্তই ভগবানে অর্পণ করেন,
তবেই তিনি মুক্ত। সৰ্বস্বার্পণে কার্পণ্যই ‘বদ্ধতা’ বা ‘হরিবিমুখতা'।
তােমার কনক,
ভােগের জনক,
কনকের দ্বারে সেবহ মাধব ।
কামিনীর কাম,
নহে তব ধাম,
তাহার মালিক কেবল যাদব।
বৈষ্ণবী প্রতিষ্ঠা
তাতে কর নিষ্ঠা,
তাহা না ভজিলে লভিবে রৌরব।
কষ্ণের ন্যায় ভােক্তৃপুরুষাভিমানে বােষিদূভােগের
চেষ্টা নিষিদ্ধ
ঝড়ঠাকুর নশ্বরত্নীতে পত্নী-বুদ্ধি না করিয়া তাহাকে দিয়া
হরিভজন করাইয়াছিলেন। বিমঙ্গল ও চিন্তামণির কথা সকলেই

অপ্রাকৃত-সহজ-ধৰ্ম্ম ও প্রাকৃত-ইজ-ধৰ্ম্ম ১২৯ জানেন। চিন্তামণি বিমঙ্গলকে বলিয়াছিলেন,-“তুমি যদি আমার রক্তম ংসের প্রতি এরূপ আসক্ত না হইয়া ভগবানের প্রতি এরূপ আসক্ত হইতে,-প্রাকৃতবস্তুতে আসক্তি পরিত্যাগ করিয়া যদি ঐচেষ্টা অপ্রাকৃত কামদেবে নিহিত করিতে, তাহা হইলে তোমার কতই না মঙ্গল হইত।” বিল্বমঙ্গলের প্রতি চিন্তামণির এই অমূল্য উপদেশের মৰ্ম্ম হৃদয়ঙ্গম করিয়া আমাদের প্রত্যেকেরই পুরুষ বা ভােত্তা এবং স্ত্রী বা প্রাকৃত যাের অভিমান ত্যাগ করা উচিত। বিল্বমঙ্গলের প্রাকৃত চিন্তামণিতে আসক্তি । যােষ বুদ্ধি বিদূরিত হইয়া যখন অপ্রাকৃত চিন্তামণিতে সেবা- বুদ্ধির উদয় হইল, তখনই ভগবান্ অপ্রাকৃত-চিন্তামণিরূপে বিমঙ্গলের নিকট প্রকটিত হইলেন। ‘কৃষ্ণকে ভােগ করিব'--কি দুয়াশা। ভােক্তা বৃষ্ণ ত’ ভােগের বস্তু নন অথবা তিনি ত’ ‘নাগর গৌরাঙ্গ নন যে তাহাকে কেহ ভােগ করিতে সমর্থ হইবে ! জীবের ঐরূপ বুদ্ধি হরিবিমুখতারই পরাকাষ্ঠা। সােমগিরি গুরুরূপে উদিত হইয়া শিফলন- মিশ্রের বাহপ্রবৃত্তি অর্থাৎ কৃষ্ণে ভােগবুদ্ধি দূরীভূত করিয়া দিলেন; মিশ্রের নাম হইল—‘বিমঙ্গল। কনকের দ্বারা—সর্বস্বহারা -কৃষ্ণসেবনই বিধেয় কামিনীকে যেরূপ কৃষ্ণসেবায় নিযুক্ত করিতে হইবে কনকের দ্বারাও তদ্রুপ কৃষ্ণসবাই করিতে হইবে। কনকের দ্বারা সংসার ভােগ করিতে হইবে না বা জড়-প্রতিষ্ঠা অর্জন করিবার বাসনায় ফত্যাগেরও চেষ্টা করিতে হইবে না। কনককে জড় ভােগােপকরণ বােষা বা প্রকৃত বুদ্ধি না করিয়া ‘চিনুবুদ্ধিতে কৃষ্ণসেবােপকরণ করিয়া লও। “সৰ্ব্বং খচ্ছিদং ব্ৰহ্ম”-যে কনকদ্বারা হরিজন সম্পাদিত হয়, তাহা ব্রহ্মজাতীয় অপ্রাকৃত কনক; সেই চিন কনকই হরিজনের সাহায্য করে, হরিজন-সেবার আনুকূল্য বিধান করে। হরিসবার-অনুকূল বস্তু- ~ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী সমুহকে পঞ্চিকজ্ঞানে পরিত্যাগ করা ফবৈরাগ্য বা জড়-প্রতিষ্ঠাকাঙ্ক্ষা ছাড়া আর কি? সকলেরই সৰ্বস্ব কৃষ্ণনেবায় নিযুক্ত কর। সাবধান! হরিসেবার নাম করিয়া কনক-কামিনী-প্রতিষ্ঠার আশা এবং লাভ-পূজা। কুটিনটী নিষিদ্ধাচারের আশ্রয় গ্রহণ করিও না। ঐরূপ চেষ্টা হরিবিমুখতা ছাড়া আর কিছু নহে। রিসেবেমুখ জীবন্মুক্ত পুরুষ যথা-সৰ্বস্ব দিয়া নিরন্তর হরিসেবা করেন। যিনি কৃষ্ণার্থে অখিলচেষ্টা- যুক্ত, তিনিই ‘মুক্ত। সম্পূর্ণ অনর্থমুক্ত হইয়া ঐশ্বৰ্য্যবিধিগন্ধলেশহীন রাগপথে, গােপীর পাল্যরুপে ঐ রাগ-গােবিন্দ-সেবার্থ উপদেশ জয়দেবের রচিত অষ্টাধ্যায়ী বা শ্ৰণীতগােবিন্দ, শ্ৰীল রাম-রায়ের জগন্নাথবল্লভ, শ্রীল রূপের বিদগ্ধমাধব, শ্রীচণ্ডীদাস-বিদ্যাপতির পদালেী, ঐল প্রবােধানন্দপাদের রাধারসসুধানিধি, ল রঘুনাথের বিলাপ- কুসুমাঞ্জলী, ল কবিরাজের গােবিন্দলীলামৃত, শ্ৰল চক্রবর্তীর কৃষ্ণ- ভাবনামৃত, আপনারা তখন পাঠ করিতে পারিবেন-তখন ঐসকল গন্থের অপ্রাকৃত মধুর-রসের কথায় আপনাদের অধিকার জন্মিবে, যখন বাহজগতের ভোগপ্রধান চিন্তা-স্রোতের কবল হইতে আপনারা সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হইতে পারিবেন। ঐ সৌভাগ্য-ভাণ্ডার আপনাদের জন্যই উন্মুক্ত রহিয়াছে -আনারই উহার যথার্থ উত্তরাধিকারী হইবেন। নিপভাবে কৃষ্ণসেবােম্মুখ হইলে, পাঁচপ্রকারের মধ্যে কোন একটা নিত্যসিদ্ধ: স্বরূপগত-রসে আপনাদের স্ব-স্ব-অধিকার উন্মুক্ত হইবে। “মুক্ত’ না হইলে বৃষ্ণসেবায় কাহারও অধিকার হয় না। কৃষ্ণ—একমাত্র রাধারাণীর বস্তু। রাধারাণীর সেবা-ব্যতীত কখনও কৃষ্ণসেবায় অধিকার লাভ হইতে পারে না মধুর সে ঋভাবিক-নিত্যরুচিবিশিষ্ট রাধারাণীর পাল- দীর নিত্যকিঙ্করী হইবার জন্য ব্যাকুল হউন-এই পর্যন্ত আমার কথা f পুষ্টিমাগ স্থান-কলিকাতা ক্লাইভ-টস্থ পুষ্টিমাগীয় বৈষ্ণব-স, যথাসগত রাজাবাবু দামােদরদাস বর্মণের প্রাসাদ সময়-১১ই চৈত্র, ১৩৩১ (পুষ্টিমাগীয় বৈষ্ণব সম্বের বার্ষিক অধিবেশনেপলক্ষে ) পুষ্টিমাগীয় ও গৌড়ীয় বৈষ্ণবের মিলনের প্রাক্তন ইতিহাস পুষ্টমার্গীয়-সভার সভাপতি মহােদয় ও সমাগত বৈষ্ণববৃন্দ! বড়ই আনন্দের সহিত প্রকাশ করিতেছি যে, পুষ্টিমাগীয় বৈষ্ণবস আমাদিগকে কিছু হরিকথা কীৰ্ত্তন করিবার জন্য আহ্বান করিয়াছেন। পুষ্টিমাগীয় বৈষ্ণব ও গৌড়ীয় বৈষ্ণবের সঙ্গে মিলন—বড়ই আনন্দের বিষয়, কিন্তু ইহা নুতন নয়। ঐ কৃষ্ণচৈতন্যমহাপ্রভু যখন প্রয়াগধামে শুভ বিজয় করিয়াছিলেন, তখন শ্রীবল্লভাচাৰ্য আড়াইল-গ্রামে বাস করিতেছিলেন। তিনি গৌরপার্ষদ শ্রীরূপের সহিত শ্ৰীমন্মহাপ্রভুকে নিজ গৃহে লইয়া গিয়া সবংশে মহাপ্রভুর সমাদর করিয়াছিলেন (চৈঃ চঃ মধ্য ১৯শ পঃ)। আজ আবার চারশত বৎসর পরে, আপনারা এইসকল গৗড়ীয় বৈষ্ণবগণকে পুষ্টিমার্গীয় বৈষ্ণবঙ্রে গৃহে আহ্বান করিয়া লইয়া আসিয়াছেন। ঐবল্পভাচার্যের পুত্ৰৰয় গােপীথ ও বিঠঠল-দেব ও রূপ-গােস্বামিপ্রভুর নিকট হরিকথা-শ্রবণ করিয়াছিলেন। শ্রীলােকনাথ, রঘুনাথ দাস, এরপুনথিভট্ট, জীব গােস্বামিগণও মথুরায় বিঠঠল- গৃহে গােপাল বিগ্রহ দর্শন করিতে আসিতেন।জীপুরুষােৰমে শ্ৰীমন্মহা- প্রভুর সহিত বল্লভাচার্যের সাক্ষাৎকার ও প্রকল্পভাচার্যের প্রতি শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলু, শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর উপদেশের কথা আমরা শ্রীচৈতচরিতামৃত গ্রন্থে দেখিতে পাই। বৈধ কা মৰ্যাদ্যা-পথ ও রাগানুগব। পুষ্টিমার্গ গৌড়ীয় বৈষ্ণবাচাৰ্যবৰ্য্য শ্ৰীল রূপ-গোস্বামি প্রভু ঐ ভক্তিরসামৃত- সিন্ধু গ্রন্থ ‘বৈধী’ ও ‘রাগানুগা’-নামে দুইপ্রকার সাধন-ভক্তির উল্লেখ করিয়াছেন। 'শাস্ত্ৰশাসনারি বিধি-বিচার-ভয়ে পূজার নাম~-শ্রীবল্লভা- চার্য্যের ভাষায়--মৰ্য্যাদামা’ অথবা গৌড়ীয়-বৈষ্ণবের ভাষায় ‘বৈধমার্গ এবং গাত্মিক ব্রজবাসিজনের অনুগত হইয়া সেবাই–গাগা ভক্তি শ্রীবল্লভাচার্যের পুষ্টিমার্গ-উক্ত রাগানুগ-পথেরই এক প্রকার বিচার- প্রণালী: বৈধমার্গে শান্ত, দাস্য ও গৌরবসখ্যাৰ্দ্ধ—এই অ ডাই-প্রকার রসের উল্লেখ আছে। অনুরাগ-পথ অবৈধ না হইলেও বিবিমার্গের ঐশ্বৰ্য্য- রসের অন্তর্গত বাপার নহে; উহা সেবীরাজ্যের অত্যুচ্চ তম শিখরে অবস্থিত। অধিকন্তু, তাহাতে বিশ্রম্ভবখ্য, বাৎসল্য ও মধুর—অারও আড়াইপ্রকার রস—অধিক বর্তমান। শ্রীরূপ-গােদামিপ্রভৃতিই বল্লভ- তনয় ঐ বইঠলনাথকে বালগােপাল ও কিশােরগােপালের-সেবায় অধি- কারী করেন। বল্লভবিগ্বিজয়’-গ্রন্থে এ-সকল কথা সুষ্ঠুভাবে বর্ণিত না হইলে ও শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে এ-সকল কথা বর্ণিত আছে শ্রীবল্লভাচাৰ্যকর্তৃক বৈষ্ণবজগতের উপকার শ্রীবল্লভাচাৰ্যজী মহারাজ বৈষ্ণবজগতের যে একটা বিশেষ উপকার সাধন করিয়াছেন, তজ্জন্য বিশ্ববাণী সকল-বৈষ্ণবই তঁহার নিকট ঋণী। তিনি মায়াবাদ-বিচ:রের যুওি সমুহ সম্যক্‌রূপে খণ্ডন করিয়াছেন। ব্ৰহ্মসূত্রের তৎকৃত ‘অনুভাষই উহার সাক্ষ্যস্থল। নিত্য বিষ্ণুপাদনা- পথের পরমবিরােধি-বিচারই—নিভিন্ন-ব্রহ্মবাদ। শ্রীবল্লভাচার্যের পরে - ~~~~~~~ পুষ্টিমার্গ . শ্রীপুরুষােত্তমজী মহারাজ ‘অনুভাষাে’র টীকায় বল্লভাচার্যের মায়াবাদ- খণ্ডনসিদ্ধান্ত আরও সুষ্ঠুরূপে প্রচার করিয়াছেন। বাদাবলী’-নামক সংগ্রহগ্রন্থে উল্লিখিত আছে যে, পুরুষােত্তমজী মহারাজ স্বনামপ্রসিদ্ধ অপ্যয়-দীক্ষিত-নামক মায়াবাদী বৈদান্তিক মহাপণ্ডিতকে ভগবদুপাষনায় নিযুক্ত করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। শ্রীবল্লভাচার্যের অধস্তন সম্প্রদায়ের অনেকেই মায়াব-নিরসনের জন্য যত্ন করিয়াছেন। রাগমার্গের সর্বশ্রেষ্ঠ মহিমা যাহারা ক্ষুদ্ৰবিচারে আবদ্ধ, তাহারা পুষ্টিমার্গের সৌন্দৰ্য্য ও মাধুৰ্য্য উপলব্ধি করিতে পারিবেন না। ভগবানের সহিত সমতা বা তাহা অপেক্ষাও অধিক সামর্থযুক্ত না হইলে প্রেমসেবা হয় না। বিশ্রম্ভ সখ্যরসের রসিকগণ কৃষ্ণকে উচ্ছিষ্ট ফল ভক্ষণ করাইতে পারেন- কৃষ্ণের ঘাড়ে চড়িতে পারেন ; বৎসল-রসের রসিক যশোদা পুজ্ঞানে ও পাল্যবিচারে কৃষ্ণকে বন্ধন ও প্রহারাদি পৰ্যন্ত করিতে পারেন । এবং মধুর রসের রসিকা শ্ৰীবৃষভানুনন্দিনী প্রমুখ গােপীগণ সৰ্ব্বতাে- ভাবে কৃষ্ণকে সেবা করিতে পারেন, আশ্রয় হইয়াও বিষয়ের দ্বারা আনুগত্য করাইতে পারেন। এই সকল কথা প্রাকৃত-বিচার বা অক্ষ- জ্ঞান প্রবল থাকিতে কেহই বুঝিতে পারিবেন না ; অথবা কেহ বুঝিবার চেষ্টা করিলেও অনর্থ উৎপন্ন হইবে মাত্র রামানুজ, মধ্ব ও ঐনিঘর্কের বিচার লক্ষ্মণদেশিকাচার্যের বিচারে কেবলমাত্র বৈকুণ্ঠের শান্ত ও দাস্ত- রসের কথা পাই। কিন্তু প্রতিবন্ধিত বিশ্রম্ভসখ্যাদির কথার নিকট ঐশ্বৰ্য-মার্গের কথা যে নিতান্ত ৰাল-ভাষিত, তাহা রাগানুগ- সম্প্রদায়ের বিচারের দ্বারাই বুঝিতে পারিবেন। পূৰ্ব্বকালে ১৩৪ শ্রীলপ্রভুপাদের বক্তৃতাবলী ~~~~~~~ ভারতবর্ষে যে নাস্তিক্যবাদ বিভিন্ন নাম ধারণ করিয়া বৌদ্ধমত, জৈনমত নিৰ্বিশেষ মায়াবাদ-নামে প্রচারিত হইয়াছিল, তাহার নিরাকরণকল্পে রামানুজাচাৰ্য্য দাস্যভাবে ভগবানের যে নিত্য উপাসনার কথা জগতে প্রচার করিয়াছেন, তজ্জন্য সমগ্র বৈষ্ণবজগৎই তাঁহার নিকট চিরকৃতজ্ঞ থাকিবেন। কিন্তু রাগানুগভজনই সর্বোচ্চ পরবর্তিকালে মধ্বমুনি ও ঐনিম্বার্কাদি আচার্য্যগণও এইবিষয়ে সুষ্ঠু ও সুষ্ঠুতরভাবে কথঞ্চিৎ আলােচনা করিয়াছেন। শ্রীগৌড়ীয় ও শ্রীবল্লভানুগ গণের মিলনাকাঙক্ষা শ্রীল রূপগােস্বামিপাদের সহিত গােপীনাথ ও বিঠঠলের যেরূপ মিলন হইয়াছিল, শ্ৰীমন্মহাপ্রভুর সহিত শ্ৰবল্লভাচার্যের যেরূপ সম্মেলন হইয়াছিল, শ্রীগৌড়ীয়গণ ও বল্লভানুগ গণও যদি সেইরূপ প্রেমনয়নে পরস্পর মিলিত হইতে পারেন, তাহা হইলে উভয়েই এক সেব্যবিগ্রহ রাধা-গােবিন্দের প্রেমসেবা করিয়া জীবন ধণ্ঠ করিতে পারিবেন,-- পরস্পরের সপত্নভাব আর থাকিবে না। প্রথম খণ্ড भार

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Prabhupader Baktritabali Vol.1 Ed.1

Author
Not Available
Title
Prabhupader Baktritabali Vol.1 Ed.1
File name
Prabhupader Baktritabali Vol.1 Ed.1
Text
OCR done
Citation
1330
Published
2010/04/27
Publisher
Gouriyo Math,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
152
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Speeches
Keywords
Bartaman Jugdharma
DLI number
510580
Barcode
4990010016294.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
VjLq9TCkOIE
Download PDF

Prabhupader Baktritabali Vol.1 Ed.1