Belgaria Sudha Smriti Pathagar
Bari Theke Paliye Ed.2
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
বাড়ী থেকে পালিয়ে
শিবরাম চক্রবর্তী
* মৃত লাইব্রেরী
অ৭ সাল।
২! • বসিরহাট।
मि
এম্পরিজম লিমিটেড
কলিকাতা
দ্বিতীয় সংস্করণ-শ্রাবণ, ১৩৫৩
দাম দুই টাকা
চিত্রশিল্পী—শৈল চক্রবর্তী
প্রয়ােগশিল্পী—প্রশান্তকুমার সিংহ
দি বুক এম্পরিজম লিমিটেডের পক্ষে প্রকাশক কীবেন্দ্রনাপ মে, ২২.১, কনওলিশ স্টটি
দি এিটিং হাউসের পক্ষে মুদ্ৰাকৰ পুলিনবিহারী সামন্ত •, আপার সার্কুলার রোড, কলিকাত
ক্রমান গৌরাঙ্গ প্রসাদ বসু প্রীতিভাজনেষু-
No text on this page.
:.. বিনোদের সঙ্গে কাঞ্চনের কিছুতেই বৰ্ত না। বিনােদ তাদের পুরুতের ছেলে, তাদের ঠাকুর শাল- গ্রামের পূজো সেই করে । বােধ করি দেবতার ভােগের ভাগ নিয়েই তাদের বিরােধের সূত্রপাত হবে। কাঞ্চনের বয়স তের-চোদ্দর বেশী নয়, কিন্তু সেই বয়সেই তার মত দুই দুর্দান্ত ছেলে পাড়ায় দু’টি ছিল না। তার মুহুর্মুহ গিদেও পেত যেমন, তেমনি সেই ক্ষিদেকে কাজে লাগাবার উদ্ভাবনীশক্তিও ছিল তার অসাধারণ। ঘরের বা ঘরের যা কিছু খাবার বৈধ ও অবৈধ উপায়ে সে ত আত্মসাং করতই, ঠাকুর এবং বিনােদের অংশেও ভাগ বসাতে ছাড়ত না। পূজোর আগে ঠাকুর-ঘরে গিয়ে যখন তার রাজভােগ থেকে বাড়ী থেকে পালিয়ে রাজকর সহজেই গ্রহণ কবুত তখন পাথরের দেবতা প্রতিবাদ বা সমালােচনা করতেন না বটে, কিন্তু পূজোর শেষে নিজের অংশ থেকে কিছু ছাড়তে রক্ত-মাংসের মানুষ বিনােদের অত্যন্তই আপত্তি ছিল। সেদিন স্নান করতে গিয়ে কাঞ্চন এর শােধ নিলে। বিনােদকে সাঁতার কাটতে মাঝ-পুকুরে নিয়ে গিয়ে জলের ভিতরে তার মাথা চেপে ধকূল। সাঁতার ভালো জানলেও এবং বয়সে কাঞ্চনের চেয়ে কিছু বড় হলে ও বিনোদ গায়ের জোরে তাকে আঁটতে পাব না। খানিকক্ষণেই হাঁফিয়ে, এক পেট জল খেয়ে বিনােদ যায় আর কি তখন কাঞ্চন তাকে ছেড়ে দিয়ে বললে—‘কেমন হক ! আর আমার সঙ্গে লাগবি ? বিনােদের রাগ ততক্ষণে মাথায় চড়েছে। যতক্ষণ না এক কোমর জলে এল ততক্ষণ সে একটি কথা বলল না। কিন্তু তীরে পৌছেই তার তৈল-জীর্ণ ময়লা পৈতাখানি ছিড়ে কাঞ্চনকে এই বলে শাপ দিল যে ব্ৰহ্মণ্যদেব যদি সত্য হন তবে কখনো তার বিদ্যে হবে না। কি বছরই সে পরীক্ষায় ফেল করবে। এই সুকঠিন অভিশাপে কাঞ্চনের মুখ এতটুকু হয়ে গেল ; ব্যাপারটা এতদূর গড়াবে সে ভাবে নি, তবু জোর করে বঙ্গ, ‘তাের শাপে আমার কচু হবে। এতক্ষণে বিনােদ কেঁদে ফেলে—“দে, আমার পৈতে খুজে দে। ‘এখন কান্না হচ্ছে, ছিড়তে গেলি কেন? আমি যাব খুঁজতে তা-রী দায় আমার !
বাড়ী থেকে পালিয়ে
অনেক খোঁজাখুঁজির পর জলের তলা থেকে উদ্ধার করে বিনােদ
গিট দিয়ে পৈতা পরল ।
‘ছিড়ে গিট দিতে গেলি যে বড় ? ভারী ব্ৰহ্মণ্যদেব !
‘বাঃ, আমি পৈতা না পরে যাই আর বাবা আমাকে ধরে ঠ্যাঙা।
তুমি ত ঐ চাও !
সেই দিনই।
কাঞ্চনের বাড়ী পূজো সেরে আম-বাগানের পথে বিনােদ ফিরছে ।
কাঞ্চন তাকে ধরল, “দাড়াও। এক হাতে ক্ষীরের বাটি, অন্য হাতে
দইয়ের ভাড় নিয়ে ভীতনেত্রে বিনােদ বল, ‘কি আবার?
কাঞ্চন এতক্ষণ তারই প্রতীক্ষায় দাড়িয়ে ছিল, বল, ‘তােমার শাপ
কাটা দাও।
বিনােদ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বল্ল, “দ্যাখ, কাঞ্চন, শাপ আর কাটা
যায় না। ব্ৰহ্ম-বাক্য যা মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে তা রদ করা ব্ৰহ্মরও
সাধ্যি নয়।
‘হ্যা, নয় আবার! আমি এত পড়ে-শুনে ফি বছর ফেল হতে
থাকব আর তুমি ফাকতালে পাশ করে মজা লুটবে, সে হচ্ছে না।
বল আগে-
‘সে হবার নয়, কাঞ্চন, আমি ভেবে দেখলাম। শাপ উটে গেছে
শায়ে এমন কোথাও লেখে নি। তা হলে পরীক্ষিত
‘রেখে দাও তােমার পরীক্ষিত! যদি শাপ না কাটা দাও তবে ঐ
কীরের বাটা আর দইয়ের ভাড় দিয়ে যাও।
বাড়ী থেকে পালিয়ে – বিনােদ এবার গুরুতর সমস্যায় পড়ল। এদিকে শাস্ত্রের নজির, অন্য দিকে ক্ষীরের বাটি। এই উভয় সঙ্কটে সে মাথা খাটিয়ে বল্ল, ‘শাপ ত কাটা যায় না রে ! তবে এই পছি, বিদ্যে তাের না হােক বুদ্ধি তাের খুব হবে। তাতেই তাের পুষিয়ে যাবে। বুঝলি কাঞ্চন ? বামুনের বর, তাও মিথ্যে হবার নয়-- বিদ্যা ও বৃদ্ধির তারতম্য কাঞ্চনের কাছে স্পষ্ট ছিল না। সে এক ঝটকায় দইয়ের ভাড় টেনে সমস্ত দই বিনােদের মাথায় ঢেলে দিল ; অবশেষে ক্ষীরের বাটিটা কেড়ে নিয়ে এক আম-গাছের ডালে উঠে বল্ল। বিনােদের দিকে আর দৃষ্টিপাত না ক'রে পা দোলাতে দোলাতে যে আপাতমধুর বস্তুটি তার হস্তগত হয়েছিল সেই বিষয়ে একান্ত মনঃসংযোেগ করল।
দুই
বননাদ কাদতে কাদতে চলে গেল। খানিক পরেই বাড়ীর চাকর
চঞ্চনের খােজে দেখা দিল-ছােট-বাবু, বাবা তােমায় ডাকছেন।
চাপা গলায় কাঞ্চন জিজ্ঞাসা করল ‘কেন রে ?
‘বিনােদ ঠাকুর'
‘কি বলেছে সে, শুনি?
‘তুমি নাকি পূজোর আগে লুকিয়ে লুকিয়ে ঠাকুরের ভােগ খেয়ে
খাে, তার পরে একদিন নাকি বিনােদ ঠাকুরের সঙ্গে ঝগড়া করে
তাকে ঠাকুর পূজো করতে দাও নি–
‘এই সব বলেছে। পাজি কোথাকার। আচ্ছা, দেখব তাকে
আমি-
‘আবার আজ নাকি তুমি তার পৈতে ছিড়ে দিয়েছ! মাথায়
ই ঢেলে
‘মিথ্যে কথা! আমি পৈতে ছিড়েছি : বলুক দিকি সে ! ওর
ওই ঠাকুরের মাথায় হাত দিয়ে বলুক? ওই ত আমাকে শাপ দিলে।
মার দই ঢেলেছি? বেশ করেছি, কাল ঘােল ঢা।
দেখি কি
চরে ও!'
‘বাবু তােমাকে এখুনি ডাকছেন ! মালখানা থেকে সেই রূপাে
ধানাে চাবুকটাও বের করেছেন।
‘বাঃ রে! সে ত আমার চাৰুক! আমার পিঠেই পড়বে নাকি ?
বাড়ী থেকে পালিয়ে
‘তা কি জানি বাবু ! এখন ত চল, তােমাকে নিয়ে যেতে
পাঠালেন।
‘দেখছিস না, আমি খাচ্ছি। যা তুই আমি যাব এখন।
মা কোথায় রে ?
‘মা কাদছেন। তােমাকে আদর দেন বলে বাবা তাকে খুব
বকেছেন।
যা যা এখন যা। বিরক্ত করিস্ নে । রাগ হয়ে গেলে এই বাটি
তাের মাথায় ছুড়ে ভাঙ,ব
তা বলে দিচ্ছি কিন্তু।
‘আমি ত যাচ্ছি, মাঠাকরুণ আমাকে চুপি চুপি বলে দিলেন কর্তাবাবু
খেয়েদেয়ে ঘুমােবার আগে তুমি যেন বাড়ী ঢুকোন, বুঝলে?
‘যা যা, আর তােকে দাত বের করে হাসতে হবে না’
চাকর চলে গেল, কাঞ্চন ভাবতে লাগল, এখন কি করে।
বিনােদ যে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা কি সে কোনদিন
ভেবেছিল । যাই হােক্। কাঞ্চন আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারল
যে বিনােদ কেমন স্বার্থপর। সামান্য একটি ক্ষীরের জন্য! না,
আর কখনাে সে অমন ছেলের সঙ্গে মিশবে না।
কিন্তু এখন
এখন কি করা?
গাছ থেকে নেমে আম-বাগানের পাশ দিয়ে যে বাঁধা রাস্তা গেছে
তাই দিয়ে সে হাঁটুতে সুরু করল-যেদিকে দু চোখ যায়। কতক্ষণ
সে চলেছে, কিন্তু পথ আর ফুরােয় না। অবশেষে যেখানে পথ শেষ
হ’ল সেটা রেল-ষ্টেশন।
একটু বাদেই একটা ট্রেণ এসে দাড়াল। কাঞ্চন একটুক্ষণ কি
বাড়ী থেকে পালিয়ে
ভাবলে তার পর লােকজন কম এই রকম একটা কাম্রা বেছে নিয়ে
গাড়ীতে উঠে বল।
গাড়ী চলেছে, কোথায় যাচ্ছে কিছুই সে জানে না কয়েকটা ষ্টেশনে
গাড়ী দাঁড়ালাে । কত লােক উঠল, নাল। কিন্তু কেউ তাকে
একটি প্রশ্নও করে না। অবশেষে একটা জায়গায় গাড়ী দাড়াতেই
একটি ভদ্রলােক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পােকা নামবে না ?
‘এটা কি ষ্টেশন ?
‘বর্ধমান। এ গাড়ী এখানেই দাড়াবে, আর যাবে না।
অতএব তাকে নামতে হল। ভদ্রলােক আবার প্রশ্ন করলেন
‘কোথায় যাবে তুমি?
সে একটু ভেবে বলল, ‘কাতায় যাব।
কিন্তু গাড়ী ত সেখানে যাবে না?
কলকাতার গাড়ী পরেই
আসবে ওই ওধারের
প্লাটফর্মে। ওভারব্রিজ, দিয়ে যাবে, লাইন
ভিঙিয়ে যেয়াে না যেন-বুঝলে?” বলে ভদ্রলােক মােট-ঘাট নিয়ে
বার হয়ে গেলেন।
‘কই হে, তােমার টিকেট কই ?
কাঞ্চন দম্বার ছেলে নয়, সহজ ভাবে উত্তর দিল, আমি কি
আপনার গাড়ীতে চেপেছি নাকি? আমি ত বেড়াতে এসেছি।
টিকেট-চেকার বল্লেন, ‘ষ্টেশন হাওয়া খাবার জায়গা নয়। তিনি
অন্যত্র চলে গেলেন, কাঞ্চনও সেই ফাকে বেরিয়ে পড়ল।
তখন বেলা দুটোর বেশী।
বেশী। তার ভয়ঙ্কর ক্ষিদে পেয়েছে। সঙ্গে
একটিও পয়সা নেই যে মুড়ি কিনেও খায়। কি করবে ভাবতে ভাবতে
বাড়ী থেকে পালিয়ে চলেছে। কিছু দূর যেতেই দেখে একটা নাদুস-নুদুস্ ছাগল তাকে গুতােতে তাড়া করে আছে। সে কিছু হটে রাস্তা থেকে পাটকেল কুড়িয়ে তাক করে তাকে মারতে যাবে, এমন সময়ে সামনের চালাঘর থেকে একটি ততােধিক মােটা মেয়ে মানুষ শশব্যন্তে বার হয়ে অৰ্ত্তকণ্ঠে বল্লে, ‘আহা মেরনি, বাবা, মেরনি। বাছা আমার মরে যাবে। ‘মারছি না। কিন্তু বাছাকে সালাও। ছাগলকে নিয়ে যেতেই তার নজর পড়ল সেই ঘরটির দোরের ওপর। একটা সাইনবাের্ড ঝুলছে, তাতে বিচিত্র ছাদে ও বানানে লেখা-- পবীত্র হীন্দু হােটেল হী ভদ্রলােক- দিগের আহারের স্থান সে স্ত্রীলােকটিকে বলে, এখনাে কি তােমার হােটেলে খাবার- টাবার আছে ? ‘খুব আছে, তুমি খাবে?” ‘নিশ্চয়। কাঞ্চন খাওয়া-দাওয়া সেরে বল, কত দাম দিতে হবে ? ‘এমন কি আর খাইছ, যা খুসি দাও। ‘তােমরা নাও কত ? ‘চৌদ্দ পয়সা। ৮
বাড়ী থেকে পালিয়ে
‘আমি তাে তার অর্ধেকও খেতে পারি নি,—অর্ধেক দেব।'
‘তাই দাও।
মশ ল।
নিয়ে গম্ভীর
ভাবে চিবুতে চিবুতে কাঞ্চন
বল্ল, তােমার যা রান্না,
আর আমি যা খেয়েছি
তাতে তোমাকে
পয়সাও দেওয়া উচিত নয়।
আমি কিছুই বে না।
হােটেলওয়ালী
ব, “আচ্ছা, না দিবে ত
নাই দিবে ।
মােটা ছাগলটি এসে
এবার আদর করে তার হাত
চেটে দিল, বিরক্ত হয়ে সে
বলে উঠল, 'দূর ছাই !
ভালাে আপদ দেখছি!
তার পরে হাতটা ছাগলেরই
লােমশ গায়ে মুছে দিয়ে
বেরিয়ে গেল।
ষ্টেশনে ফিরে দেখল
একটা গাড়ী ওপারের
বাড়ী থেকে পালিয়ে প্লাটফর্ম থেকে ছাড়ছে, সে তৎক্ষণাৎ গিয়ে তাতে উঠে কল্ল। পাশের ভদ্রলােককে জিজ্ঞেস করল, “মশাই এ গাড়ী যাবে কোথায় ? তিনি একটু বিস্মিত হয়ে উত্তর দিলেন, কেন কল্কাতায়। কলকাতা তখন আর কয়েকটা ষ্টেশন পরেই। পাশের ভদ্রলােকের সঙ্গে তার বেশ আলাপ জমে উঠেছিল। ককাতা কেমন জায়গা। সেখানে সে এই প্রথম যাচ্ছে কিনা! হ্যা, মামার বাড়ীই ! মামা তাকে নিতে ষ্টেশনে আসবেন। কিন্তু যদি দৈবাৎ ষ্টেশনে না আসতে পারেন? তা, তাতে কি হয়েছে, ভদ্রলােক না হয় তাকে মামার বাড়ী পৌছে দিয়ে আসবেন।-এই রকম নানান কথাবার্তা। 'ভদ্র- লােকের মুখে শুনে শুনে কল্পনায় সে কলকাতার ছবি আঁকছিল। কলকাতায় দিত নাকি এক সমান, রাত্রে চাদের আলাে পথে পড়তে পায় না ! আলে রাস্তায় ! সব ইলেকটিক! রূপকথার রাজপুরীর মত বড় বড় বাড়ী ! আর কত লােজন, গাড়ী ঘােড়া, সিপাই শাস্ত্রী, কত কি! আর দশ মিনিট পরেই তার কত স্বপ্নের, কত সাধের কলকাতা। কিন্তু একটা ভয় ছিল। সেটা প্রকাশ করে বতেই ভদ্রলােকটি বললেন, ‘তাড়াতাড়িতে টিকিট করতে পারেনি, তা আর কি হয়েছে? তুমি তাে আর ইচ্ছে করে ঠকাচ্ছ না, আমি আগে বেরিয়ে গিয়ে একটা টিকেট কিনে এনে দেব, সেইটা দেখালেই তােমাকে ছেড়ে দেবে। হাওড়া স্টেশনে গাড়ী ঢুকল। গােলমাল হৈ চৈ, কুলী চাই? কত লােক! বিদ্যুতের আলােয় কাঞ্চন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। ভদ্রলােকটি তার হাতে ওভার-কোট দিয়ে বল্লেন, এইটা ধর। আমি এক্ষুণি ফিরছি।
৭ বাড়ী থেকে পালিয়ে তিনি চলে গেলেন। কাঞ্চন দেখলে ওভার-কোটের পকেটে সােনার ঘড়ি চেন, কাগজপত্র, আরাে কত কি! দশ মিনিট পরে তিনি ফিরে এসে টিকেটটা কাঞ্চনের হাতে দিলেন। টিকেটখানা নেড়ে চেড়ে কাঞ্চন দেখ ল, তাতে লেখা আছে প্লাটফর্ম টিকেট, চার পয়সা দাম। নিজের পকেটে হাত দূরে দিয়ে কুষ্ঠিত স্বরে বল্ল, দেখুন, আমার কাছে খুচরাে পয়সা ত নেই- ‘আহা থাক। চার পয়সা আর দিতে হবে না। তােমার মামা কই ? 'এসেছেন তিনি? ‘আসবেন নিশ্চয়। তাকে দেখি— ‘আমি তবে চলুম, কেমন? ভদ্রলােক নিজের পথে চলে গেলেন। কাঞ্চন টিকেটখানা গেটে দিয়ে বাইরে এসে দাড়াল, তখন সন্ধ্যা। চারিধারে যেন সমারােহ লেগে রয়েছে। সে শুধু নিস্পলকনেত্রে চারিদিকে চেয়ে রইল। এই স্বপ্নপুরী ! কলকাতা! কাঞ্চন অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে ষ্টেশনের বিরাট কলেবর দেখল। কত গুলাে প্লাটফর্ম। একটাতে গাড়ী লাগে তাে আরেকটাতে ছাড়ে। কত যাত্রী মালপত্র নিয়ে যাচ্ছে আসছে। টিকেট ঘরই বা কত? ইউনিফর্ম-পরা একজন লােক, বােধ হয় রেলের কশ্মচারী, কাঞ্চন সাহস করে তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল ‘মশায় এখানে কটা ষ্টেশন? ভদ্রলােক আশ্চর্য হয়ে গেলেন, ‘কটা ষ্টেশন মানে? ‘এতগুলাে বাড়ী কিনা, তাই জিজ্ঞেস করছি। ‘ষ্টেশন তাে একটাই জানি। ব'লে ভদ্রলােক চলে গেলেন।
বাড়ী থেকে পালিয়ে
একটা ষ্টেশনমার এতগুলো প্লাটফর্ম! কাঞ্চন অবাক হয়ে
ভাবতে লাগল, এও একটা ষ্টেশন, তাদের গায়ে সেও একটা ষ্টেশন।
কত তফাৎ। এই রকম একটা ষ্টেশন তাদের গাঁয়ে হয় না? সে যদি
খুব—খুবই বড়লােক হয় তা হলে এই রকম একটা ষ্টেশন সেখানে
তৈরী করবে। এই রকম একটা ষ্টেশন করতে কত টাকা লাগে কে
জানে !
তার পর ধীরে ধীরে সে ষ্টেশন থেকে বেরিয়ে এল। কি করবে,
কোথায় যাবে, কিছুই তার স্থির নেই। অনেক লোেক যেদিকে চলেছে
তারও গন্তব্য যেন সেই দিক ।
বাইরে গড়িয়ে অনেকক্ষণ সে বিচিত্র যানবাহনের গতিবিধি লক্ষ্য
করতে লাগল।
কতরকমের গাড়ী, কত রঙের কত ঢঙের। ঘােড়র
গাড়ী-ও আবার কি-মানুষ-টানা গাড়ীও আছে আবার ! এত
গুলাের মধ্যে কেবল গরুর গাড়ীই যেন তার চেনা চেনা মনে হল।
গাঁয়ের ষ্টেশন থেকে বাড়ী যেতে লােকে গরুর গাড়ী ভাড়া করে,
এখানে কই গরুর গাড়ীতে কেউ চাপছে না তাে ? গাড়ী গুলাের
ছাপরও নেই—যেন কি রকম।
পাশে একজন ঝকামুটে দাড়িয়ে ছিল, কাঞ্চন তাকে জিজ্ঞেস
করল ওই যে মানুষ টেনে নিয়ে যাচ্ছে ও কোন্ গাড়ী হ্যায় ?
‘উওতে রিকসা হ্যায়। তুম্ কিরায়া করাে গে ?
‘কেয়া বােতা?
‘ভাড়া লেগে ?
হি নেহি। এই রকম জিজ্ঞাসা করতা হ্যায়। আর এই যে
১২
বাড়ী থেকে পালিয়ে সব গাড়ী, ঘােড়া নেই—আপসে আপ সে চা ও তাে মােটর গাড়ী হায়, নেহি ? মুটে গভীর ভাবে উত্তর দিল ‘হাওয়া গাড়ী। ‘ঠিক ঠিক, উসকা কথা হাম্ মার কাছে শুনেছি। কিন্তু মুটের সঙ্গে সদালাপ আর বেশী দূর অগ্রসর হল না। কেননা মুটেটা এর পর তার দিকে এমন অবজ্ঞার দৃষ্টিতে চেয়ে রইল যে কাঞ্চনের তামােটই পছন্দ হল না। সে মুটেটাকে পরিত্যাগ করল। জনতার পিছনে পিছনে অবশেষে সে হাওড়া-পুলের ওপর এসে উঠল। কোথা থেকে হু হু বাতাস এসে চুলের ভেতর দিয়ে সে সে। করে বইতে লাগল। কাঞ্চন আপনা আপনি বলে উঠল—“আরে এ যে একটা নদী। তারি মতাে যে ছেলেটি পাশাপাশি যাচ্ছিল সে বলে, নদী কি থােকা? এ যে গঙ্গা। জান না? গঙ্গা? কাঞ্চনের মনে হ’ল সেই গঙ্গা যার কথা মার গল্পে শুনেছে। তবু সে ঠকবার ছেলে নয়, পাটে প্রশ্ন করল ‘গঙ্গা কি নদী নয় ? তুমি ত’ খুব জান? তারি বয়সী একটা ছেলে তাকে ‘খােকা' বলে ডাকবে এ তার বদান্ত হবার নয়। তার ভারী রাগ হ’ল ছেলেটার ওপর। যদিও দু একটা অত্যাবশ্যক প্রশ্ন করবার কাঞ্চনের অত্যন্ত এয়ােজন বােধ হচ্ছিল কিন্তু এই রকম একটা অসভ্য ছেলেকে না, কিছুতেই না। অত্যাবশ্যক প্রশ্নের একটা হচ্ছে এই যে, বইয়ে সে পড়েছে এই পুলটা নাকি জলে ভাসছে। সত্যিই কি তাই? যদি সত্যিই তাই
বাড়ী থেকে পালিয়ে
হয় তা হলে কি করে সম্ভব? আর যখন ভাসছে তখন ডুতেও ত’
পারে? আর ডােবে যদি হঠাৎ, তখন এই লােকজন গাড়ী ঘােড়া
এ সবের কি দশা হবে ?
কিন্তু, অমন ছেলেকে জিজ্ঞেস করার চেয়ে—না, কাজ নেই।
একটু যদি স্থির হয়ে দাড়াতে পারে তা হলে সে নিজেই পৰ্যবেক্ষণ
করে নেবে। কিন্তু যা লােকের ঠেলা! ক্রমশঃ কেবল এগুতেই
হচ্ছে-অনিচ্ছাসত্ত্বেও।
একটা ষ্টীমার এদিকে আসছিল। বাঁক ঘুরতেই তার ফোকাসের
তীব্র আলাে এসে ব্রীজের গায়ে লাগল। কাঞ্চন বিস্মিত চোখে সেই
দিকে তাকাতে তাকাতে আপন মনে বল, ওটা বােধ হয় একটা
জাহাজ।
‘জাহাজ কি থােকা ও ত ষ্টীমার ।
আবার সেই ছেলেটি, আবার সেই ‘থােক।'! কিন্তু কাঞ্চন এবার
'গুম্ হয়ে রইল, কোন উত্তর দিল না।
ছেলেটি কাঞ্চনের হাত ধরে বললে, ‘জাহাজ দেখতে চাও ? ওই
দেখ সারি সারি দাড়িয়ে রয়েছে। ও সব বিলিতি জাহাজ-বিলেত
থেকে আসে।
ততক্ষণে ফোকাসের আলাে সেই সব অতিকায় জাহাজগুলাের
ওপরে পড়েছে। কাঞ্চনের বিস্ময় আর ধরে না। এই সব কাহাজের
কথা সে গল্পের বইয়ে পড়েছে। তাদের গায়ের জমিদারের ছেলে এই
রকম একটা জাহাজে চেপে বিলেত গেছে নাকি
বিস্ময়ের আতিশয্যে ছেলেটার মুঠোর মধ্যে যে তার হাত আছে
তা সে ভুলেই গিয়েছিল, কিন্তু পুল পেরুতেই তার হুস হ’ল। এক
ঝটকায় সে হাত ছাড়িয়ে নিল—“যাও, আমি জাহাজ দেখতে চাই
। ও আমি অনেক দেখেছি।
বাড়ী থেকে পালিয়ে দেখেছ, কিন্তু চাপাে নি ত ? আমি একদিন লুকিয়ে চেপেছিলাম। খালাসীরা দেখতে পেয়ে নামিয়ে দিল। কাঞ্চন গম্ভীরভাবে বল্ল, “চাপি নি কিন্তু চাপ ব একদিন। সমস্ত পৃথিবী ঘুরে ঘুরে বেড়াব বড় হয়ে। কাঞ্চনের কল্পনা যেন ছেলেটিকে স্পর্শ করল, তারও ত এমনি ইচ্ছা সেও একদিন জাহাজে চেপে পৃথিবী ভ্রমণ করতে চায়—সেই ‘আশীদিনে ভূপ্রদক্ষিণের লােকটার মত। আজ যেমন এই পথে দেখা হয়েছে তেমনি কোনদিন হয় ত কোনাে জাহাজে কি কোনাে বিদেশে ওদের আবার দেখা হবে। ছেলেটি এবার কাঞ্চনকে ভাল করে দেখল, তার পরে জিজ্ঞাসা কল, ‘তুমি কোথায় যাবে থােকা? যাও আমি তােমার সঙ্গে যাব না। বলে রাগ করে কাঞ্চন অন্য দিকে ফিরে দাড়াল। ছেলেটি কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে একটু অপেক্ষা করে অবশেষে চলে গেল। না, আর ছেলেটাকে ভিড়ের মধ্যে দেখা যায় না। তখন কাঞ্চন আবার চলতে সুরু করল। কিন্তু ছেলেটা থাকলেই ভালাে ছিল যেন। বেশ এক সঙ্গে গল্প করতে করতে যাওয়া যেত। যাক গে ! ভারী অসভ্য কিন্তু ! ভদ্রলােকের সঙ্গে কথা কইতে জানে না আদপেই। সে হ’ল গিয়ে কাঞ্চন—তাদের পাড়ার একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি, সব ছেলেই তাকে সন্ত্রম করে চলে আর তাকেই বলে কিনা থােকা! খােকা ত যারা দুধ খায়, হামাগুড়ি দেয়। মন্ট, ন্যাপল-ওরা থােকা।
বাড়ী থেকে পালিয়ে তবু, তার কাছে কলকাতার হাল-চালটা জানা যেত। যাক গে, সে নিজেই দু’দিনে জেনে নেবে। সেই বা কিসে কম ! ও বাবা, এ কি! এ যে কেবলই দোকান। রাস্তার দু'ধারেই। ফলে র, খাবারের, মনােহারী জিনিষের ! কি রকম ইলেটিক আলাে দিয়েছে ! এত দোকান—এত জিনিষ- পত্র—এত সব কেনে কাঞ্চন অবাক হয়ে = দেখতে দেখতে পথ চল । কোনাে দোকানী হয় ত জিজ্ঞাসা করল- ‘কি চাই থােকা? সেখানে কাঞ্চন মুহুর্ত মাত্র দাড়ালাে না। কেউ যদি জিজ্ঞেস ক র ল—কি নেবে বাৰু? কাঞ্চন তাকে অনুগ্রহ করে কিছুক্ষণ - বাড়ী থেকে পালিয়ে সেখানে দাড়িয়ে নেবার যােগ্য কি কি জিনিষ আছে একবার খতিয়ে দেখল, তারপর গম্ভীরভাবে মন্তব্য করল, “বাঃ, বেশ দোকান তােমার! অধিকাংশ দোকানদার তাকে গ্রাহ্যই করল না। না করুক। এই রকম দু-একটা ভারী দোকান তাদের গায়ে করতে হবে। বিশেষত ঐ মনােহারী দোকানটার মত। হঠাং কাঞ্চন দেখে কি, ভিড়ের মধ্যে একজন ও গােছের লােক এক ভদ্রলােকের পকেট থেকে মণিব্যাগ তুলে নিচ্ছে। গুণ্ডাট। বিনা বাক্যব্যয়ে সরে পড়ছে দেখে কাঞ্চন ভদ্রলােককে গিয়ে বল, 'ও মশাই, ওই লােকটা আপনার পকেট থেকে কি নিয়ে পালাচ্ছে। ‘য়। তাই নাকি? তাই ত? পর, পর—চোর, চোর ! ভদ- লােকের আর্তনাদে চারিধার সচকিত হয়ে উঠল—লােকটাও ধরা পড়ল। তার পর মার যা খেল লােকট! অবশেষে পাহারাওয়ালা এসে পড়ল, লােকটার কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে চলল । কাঞ্চনের ভারী মায়া হতে লাগল। সেই ত ধরিয়ে দিলে । ভদ্রলােক বল্লেন, আমার এক শ' টাকা ছিল ব্যাগে। দেখি। তার পরে নােট ও টাকা গুণে এক গাল হেসে বল্লেন, ‘সব আছে, কিছু নিতে পারে নি। একজন বল্লে, “ওই ছেলেটির জন্যই ত পেলেন। ওকে কিছু দিন। আরো কয়েকজন তার কথায় সায় দিল। ভদ্রলােক তৎক্ষণাৎ গভীর হয়ে বলতে লাগলেন, আপনারা যখন বলছেন, তা দেওয়া উচিত, তা • দেওয়া উচিত। এই ট্রাম্, বােপখা রােখা' ব'লে চলন্ত গাড়ীতে তিনি যে লােকটি অনুরােধ করেছিল সে বললে—“বেশ লােক উঠে পড়লেন। ১৮
বাড়ী থেকে পালিয়ে
কিন্তু! না দিয়েই চলে গেল !' যে লােকটি সায় দিয়েছিল সে শুধু
বললে-কলিকাল ! তার পর যে যার কাজে চলে গেল, কাঞ্চন
আবার পথ চলতে লাগল।
এক জায়গায় দেখে, নানা রকম জিনিষের ও পাকার, তার পাশে
একটা প্যাকিং বাক্সে ব'সে তারই বয়সী একটি ছেলে বিচিত্র সুরে ছড়া
কাটছে
‘নীলামওয়ালা এক আনা,
জামাওয়ালা এক আনা !
সস্তাওয়ালা এক আনা,
সুবিস্তাওয়ালা এক আনা !
লে-যাও বাবু এক আনা !
ওই ছেলেটা এই সব এত জিনিষের মালিক নাকি ? কাঞ্চনের
হিংসে হতে লাগল। আঃ, যদি কিছু পয়সা থাকত তার, সব রকম
কিছু কিছু কেনা যেত। এত সস্তায় এত রকমের জিনিষ! তাদের
গাঁয়ে হলে সবার তাক লেকে যেত ।
মনে মনে এক আনার সিরিজের তারিফ করতে করতে কিছু দূর
না এগুতেই দেখে আরেক জন শােক হাত নেড়ে সুর করে হাঁকছে-
‘চুরি কঁচি দু পইসা ! ঘড়ি পেসিল দু পইসা
তালা চাবি দু পইসা ! রম রকম দু পইসা।
সাবান্ ফিতা দু পইসা ! লে-যাও বাবু দু পইসা।
কাঞ্চন একেবারে তাজ্জব হয়ে গেল। তার বিশ্বাস হচ্ছিল না,
এমন সব চমৎকার জিনিষ দু পয়সায় ! ওরই মধ্যে যেটা তার কাছে
১০
বাড়ী থেকে পালিয়ে সব চেয়ে বহুমূল্য মনে হ’ল সেইটা দেখিয়ে পসারীকে জিজ্ঞেস করুন- রে দাম কত? ‘দু পইসা। হরেক চীজ দু পইসা ! কাঞ্চন ভাবতে লাগল, বাড়ী থেকে পালাবার সময় যদি বুদ্ধি করে কিছু পয়সাও সঙ্গে আনত ! বাবা বলেন, রাগের মাথায় কাজ করলে পরে পস্তাতে হয়। কথাটা যে সত্যি এত দিনে তা বােঝা গেল। রাগের মাথায় বাড়ী ছেড়েই ত সে পয়সা আনতে ভুলে গেছে। কত ভাল ভাল জিনিষ অত সস্তায় যাচ্ছে-এ কি আর বেশীক্ষণ পড়ে থাকবে? কাল কি আর পাওয়া যাবে? মন্টর জন্য একটা বাঁশী, ন্যাপলার জন্য একটা রবারের বল্ আর নিজের একটা ফ্যান্সী হাতঘড়ি- অন্ততঃ এগুলাে থাকলেও হয়। ঘুরে ঘুরে সে সেই দ্রব্যসম্ভার পর্যবেক্ষণ করছে এমন সময়ে কে যেন তার নড়া ধরে জোরে এক হ্যাচকা টান দিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার পাশ দিয়ে একটা মােটর হর্ণ দিয়ে বেরিয়ে গেল। লােকটা ব, ‘আর একটু হলেই গেছলে যে ! ফুটপাথ, ছেড়ে রাস্তায় নামে কখনাে ? কাঞ্চন এতক্ষণে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝল, বল—‘আমায় চাপা দিত নাকি ? ‘দিত না আবার! ‘সে কি? গাড়ীতেই ত মানুষ চাপে জানি, গাড়ীও আবার মানুষ চাপে? ‘আকৃছায়! নােজই ত বােজই ত দু'-চারটা দু-চারটা মােট, হলা মরছে।
বাড়ী থেকে পালিয়ে
কলকাতার রাস্তায় খুব সাবধানে চবে, ফুটপাথ ছাড়া চলবেনা—আর
রাস্তা পেরুবার সময় চারিদিক দেখবে। বুঝলে?
কাঞ্চন মােড়ানােহাতটার শুশ্রুষা করতে করতে ঘাড় নাড়ল।
লেগেছে নাকি হাতে ?
‘খু-উব। আপনি যেমন করে টালেন।
‘তােমার ভাগ্যি যে বেঁচে গেছ। আমাকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।
কাঞ্চন চুপ করে রইল। ভাবখানা এই যে ধন্যবাদ সে কিছুর
জন্য কারুকেই দেয় না।
‘তােমার বাড়ী কোথা? কাঞ্চন চুপ।
বুঝতে পেরেছি, তুমি কলকাতার নও। কোথায় দেশ? কাঞ্চন
উত্তর দেয় না।
‘বাড়ী থেকে পালিয়ে এসেছ বুঝি? বােধ হয় বাবা মেরেছিল?
সত্যি করে বল।' কাঞ্চন এবার ঘাড় নাড়ে।
‘কেন ?
‘রােজগার করতে।
এই বয়সে? কার জন্য বােজগার ?
‘মার জন্য। আমার মার বড় দুঃখ।
‘তােমার কে আছে আর ?
‘বাবা আছেন, দু' ভাই আছে। তারা ঘােট।
‘বাবা আছেন। তবে তােমার মার দুঃখ কিসের?
বাবা মাকে একটাও পয়সা দেন না কিনা, তাই মা আমাদের কিছু
কিনে দিতে পারেন না। তাই মা’র দুঃখ। আমি রােজগার করে
মাকে টাকা দেব। তাই বাড়ী থেকে বেরিয়েছি।
চার
খানিক থেমে লােকটি বললে, ‘তা বেশ। তা তুমি কি কাজ পার ?
‘সব কাজ।
বটে ? আমার দোকানে বসে বিক্রী করতে পারবে?
আপনার কিসের, দোকান ?
‘সন্দেশের দোকান।
কাঞ্চন অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে বল্ল-“নিশ্চয় পারব।'
তার উৎসাহে কিঞ্চিৎ বিচলিত হয়ে লােকটা বল্লে, বল কি।
আমার সন্দেশ সব খেয়ে উড়িয়ে দেবে না তাে?
‘না, না। কপ খনো না !
‘তুমি পাবে-দাবে, তা ছাড়া তােমাকে মাসে পাঁচ টাকা দেব।
রাজি আছ? সকালে দু’পয়সা করে পাবে জলখাবারের—তাতে তুমি
যা খুশী খাও; কিন্তু আমার সন্দেশ তুমি খেতে পাবে না, এর দাম
অনেক, চার পয়সার নীচে নেই।
কাঞ্চন ঈষং ম্লান হয়ে বল্পে—‘তা হােক ! আমি পাব ; সন্দেশের
কাছে বসে থাকলেও ভাল লাগে।
দু’জনে কলেজ ষ্ট্ৰীটের মােড় বরাবর এসেছে, তখন অপর দিক
দিয়ে মহা সমারােহে একটা বিয়ের শােভাযাত্রা চলেছে। কাঞ্চন অত্যন্ত
বিয়ে লােকটিকে জিজ্ঞাসা করল, এত লােক আলাে কাধে করে
যাচ্ছে কেন?
বাড়ী থেকে পালিয়ে
‘কোনাে বড়লােকের বিয়ে হচ্ছে, তারই প্রােসেশান্।
‘ওঃ! কী চমৎকার বাজনা-নাচতে ইচ্ছে করে।
‘নেচ না যেন—তা হলে আবার মােটর চাপা পড়বে।
ওটা কি বাজনা? কখনাে শুনি নি ত ?
'ও হচ্ছে ব্যাণ্ড । কেল্লার গােরাদের বাজ না, দেখ দেখ—এই
চতুর্দোলায় বর আসছে। দেখ ছ, দিব্যি বরটি !
কোন উত্তর না পেয়ে লােকটি ফিরে দেখে কাঞ্চন কাছে নেই।
কোথায় গেল? পাশের একজন লােককে জিজ্ঞাসা কবুল—‘মশাই,
এখানে একটি ছেলে ছিল, কোন্ বারে গেল দেখেছেন? সে প্রশ্ন
পাশের লােকটির কানেও গেল না।
কাঞ্চন তখন লােক-লস্কর, ব্যাণ্ড, ব্যাগপাইপ, চতুর্দোলার সঙ্গে
সঙ্গে চলেছে-সন্দেশের দোকানের কথ; তার মনেও নেই।
পাঁচ
শশাভাযাত্রা যেখানে গিয়ে শেষ হ’ল সে এক প্রকাণ্ড বাড়ী। লাল,
নীল, সবুজ নানা রকমের আলােকমালায় তাকে সাজানাে হয়েছে ।
বাড়ীখানিকে কাঞ্চনের আলাদীনের মায়াপুরী বলে মনে হতে লাগল।
এর ভেতরে না জানি কী রহস্যই আছে।
বর অনেকক্ষণ বাড়ীর মধ্যে চলে গেছে। অনেক লােক—তাদের
অধিকাংশই নিমন্ত্রিত অভ্যাগত, ভেতরে যাচ্ছিলেন। কাঞ্চন ভাবতে
লাগ ল সেও যাবে কিনা। অনেক ছােট ছােট ছেলেমেয়েও ত যাওয়া-
আসা করছে। কাঞ্চন একবার নিজের বেশভূষার দিকে তাকাল,
তুলনা করে দেখল তাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পােযাকের সঙ্গে এ যেন
ঠিক খাপ খায় না।
কাঞ্চন মনে মনে ইতস্ততঃ করতে লাগল। কিন্তু অবশেষে যখন
ভেতর থেকে লুচি ভাজার চমংকার গন্ধ তার নাকে এসে লাগল তখন
আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সে সমীচীন মনে করল না। ভিড়ের মধ্যে
মিশে, তাদেরই একজন হয়ে বেশ সপ্রতিভ ভাবে একেবারে ভেতরে
গিয়ে উপস্থিত হ’ল।
ভেতরে গিয়ে দেখে এক বৃহৎ আসর। নানা আকারের নানাবিধ
ভদ্রলােক সেই আসরে নানাভাবে শােভা পাচ্ছেন। কতকগুলি লােক
অত্যন্ত তটস্থভাবে তাদের আদর-আপ্যায়ন করছে।
সে জায়গাটা
তার আদপেই ভাল লাগল না। সেখানে থেকে সরে আসরের আর
২৪
বাড়ী থেকে পালিয়ে এক প্রান্তে গেল, সেখানে তখন গানবাজনার চক্রান্ত চলছে। কৌতূহলের বশে সেও সেখানে গিয়ে বল । খানিক বাদেই গান শুরু হল। খানিকক্ষণ শুনে আর কাঞ্চনের সহ হ’ল না, সে উঠে দাড়াল। পাশের একজন ভদ্রলােক জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি থােকা, উঠলে কেন ? ব’স, বাস। কাঞ্চন তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘মশাই, লােকটা অমন করে চেঁচাচ্ছে কেন?” ভদ্রলােক আশ্চর্য হয়ে বলেন-চেঁচাচ্ছে ! চমৎকার গাইছে ও হচ্ছে পদ, সবাই গাইতে পারে না। উনিই ভূততা বাবু, নমস্ত ব্যক্তি। কাঞ্চন বলে-“হােক গে ভূতত বার। ওকি গান? এ যে মারামারি কাণ্ড! কাঞ্চন সেখান থেকে উঠে গেল। যেন জ্যেঠামশাই' কাঞ্চনের উদ্দেশে এই মন্তব্য করে ভদ্রলােক আবার ‘ভৌতিক' গানে মনােনিবেশ করলেন। কাঞ্চন এ-ঘর ওঘর ঘুরতে ঘুরতে যেখানে বিয়ে হচ্ছিল সেই ঘরে গিয়ে উপস্থিত হল। বর-কনে পাশাপাশি বসে আছে, তাদের সম্মুখে আগুন জ্বলছে এবং শাস্ত্রীয় ক্রিয়াকলাপ চলছে। আগুনের দীপ্তিতে চন্দনচর্চিত কনের আনত মুখখানি কাঞ্চনের ভারী ভাল লাগল। সে দরজার পাশে একধারে দাড়িয়ে এক দৃষ্টিতে প্রায় তারই বাড়ী থেকে পালিয়ে সমস্ত বিবাহ সমবয়সী সেই ছােট্ট মেয়েটির দিকে চেয়ে রইল । ব্যাপারটাই তার হঠাৎ ভারী ভালাে লেগে গেল। এর আগে যদি কেউ তাকে ঠাট্টার ছলেও বলেছে ‘তুই বিয়ে করবি ? তখন সে তাকে কেবল মারতে বাকি রেখেছে; বরং তার চেয়ে কেউ তাকে প্রাণ দিতে বললে তাতে সে তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত ছিল। আজ কিন্তু তার মনে হল মরার তুলনায় বিয়ে করাটা নিতান্ত খারাপ নয়, বরং বিয়ে করতে বেশ মজা আছে। ছেলেবেলায় রাম-সীতার ছবি দেখে সে নাকি মাকে বলেছিল- ‘মা, আমার সীতার মত বউ চাই। মা প্রতিবেশিনীদের কাছে তার এই দুর্বলতার কাহিনী প্রকাশ করে আজও কৌতুক করেন । মার ওপর তার এক-এক সময়ে এমন রাগ হয়। সে নাকি বলেছিল—‘আমি রামের মত রাজা হয়ে বসব, সীতার মত বউ আমার পাশে বসবে, মন্ট আমার মাথায় ছাতা ধরবে, ন্যাপ লা হনুমানের মত হাতজোড় করে থাকবে। মা বলেছিলেন-“কিন্তু ন্যাপ লার যে লেজ নেই। সে জোরের সঙ্গে উত্তর দিয়েছিল—‘লেজ হবে। লেজ হবে, যা। তুমি দেখাে, বড় হ'লে ওর লেজ হবে। তার ছােটবেলার এই গবেষণা নিয়ে প্রায় হাসাহাসি হয়। এই লেজ হবার কথা ভাবলে তার নিজেরও আজ হাসি পায়, যদিও সে হাসে না। ন্যাপলার লেজ না হয় নাই বেরুল, মন্ট, যদি ছাতা ধরার চেয়ে ঘুড়ি ওড়ানােটাই বেশী যুক্তিযুক্ত মনে করে তাতেও তার আপত্তি নেই, কিন্তু সীতার মত বউ পাবার বাসনাটা তার মনে বহু দিন পরে বাড়ী থেকে পালিয়ে হঠাং জেগে উঠল। একটা বউ না পেলে আর চলছে না। সীতা যদি এ যুগে সুলভ নাও হয়, এই মেয়েটির মত একটি হ'লেও তার চলবে। কাঞ্চনের মন যেন উদাস হয়ে গেল। উদাস হবার আর একটা কারণ, সেই লুচি ভাজার গন্ধটা বিয়ের ঘর পর্য্যন্ত হানা দিয়েছিল। অবশ্য সেটা গৌণ কারণ কি ক্রমশঃ সেইটাই মুখ্য হয়ে উঠতে লাগল। যে ঘরে এই বিবাহহংসবের সর্বশ্রেষ্ঠ আকর্ষণ পুঞ্জীভূত হচ্ছে সেই ঘরটি বের করবার জন্য কাঞ্চন ব্যস্ত হয়ে উঠল। কাঞ্চন এখন কলম্বাসের মত আবিষ্কার করতে চায়—কিন্তু আমেরিকাও নয়, সীতাও নয়, সেই লুচি ভাজার ঘরটা। কিন্তু সেই ঘরটি বােধ হয় অন্দরমহলে। অনেক চেষ্টা করেও কাঞ্চন সেখানে যাবার পথ খুঁজে পেল না। বাড়ীটা যেন গােলকধাখার মত অবশেষে বিরক্ত হয়ে বাইরে গিয়ে সে রাস্তার যানবাহনের গতিবিধি নিরীক্ষণ করতে লাগল। কিন্তু তাও বেশীক্ষণ ভাল লাগল না। অত:পর সে ব্যান্ডওয়ালাদের সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করল। তাদের বাশর বহর আগেই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল, সেগুলাের অদ্ভুত আকার-প্রকারের প্রয়ােজনীয়তা সম্বন্ধে পুখানুপু জানুবার তার আকাক্ষা ছিল। কিন্তু ব্যাণ্ডওয়ালারা এতই গভীরপ্রকৃতির যে তাদের সঙ্গে কাঞ্চনের ভাব জমল না। অগত্যা সে আবার বাড়ীর ভেতরে গেল। যেখানে বিবাহপর্ব চলছিল সেই ঘরটির কাছাকাছি যেতেই দেখতে পেল সে-অঞ্চলে এবার একটি নতুন মেয়ের আবির্ভাব হয়েছে। মেয়েটি তার চেয়ে বয়সে
বাড়ী থেকে পালিয়ে
দু-এক বছরের ছােট হলেও অত বড় মেয়েকে কেবল ফ্রক পরে বেড়াতে
এর আগে কখনো দেখে নি। সে মেয়েটি একটি ছােট ছেলেকে হাত
নেড়ে মাথা নেড়ে কি বােঝাচ্ছিল, তার ছােট্ট বেণীটি দুলছিল। সেই
মেয়েটি, তার কথা বলার ভঙ্গী, তার মাথা-নাড়া, তার বেণীর দোলন---
তার সমস্ত কাঞ্চন অবাক হয়ে দেখছিল।
তার বড় কৌতূহল হ’ল মেয়েটির সম্বন্ধে। খানিক বাদে সেই
ছেলেটি যখন তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন সে আর আত্মসম্বরণ করতে
পারল না। তাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করল, ঐ মেয়েটি কে ভাই?
ছেলেটি এক মুহুর্ত তার দিকে একটু আশ্চর্য হয়ে তাকালে ।
তার পর অত্যন্ত বিরূপ হয়ে জিজ্ঞাসা করলে, ‘হােয়াট ইজ ইয়াের নেম?
কাঞ্চন একটু ধাক্কা খেল, কিন্তু দমল
না। সে কি ইংরিজি জানে না ? সেও
ইংরিজিতে জবাব দিল,
কাঞ্চন।
ছেলেটি আবার জিজ্ঞেস করল,
‘হােয়া ক্লাশ ডু ইউ বিড, ইন্?
কাঞ্চনের কেমন ধারণা ছিল যে তার
বয়সের অনুপাতে সে নীচু ক্লাসে পড়ে,
সেইজন্য ক্লাসের পরিচয় দিতে তার
স্বভাবতই অনিচ্ছা হ'ল। সে শুধু বল্পে-
‘আই ডােন্ট সে।
‘ইউ মাষ্ট সে।
ইজ
‘মাই নেম
২৮
বা থেকে পালিয়ে
‘নেভা।
দূর থেকে তাদের এই বিজাতীয় তর্কাতকি শুনে এবার সেই মেয়েটি
এগিয়ে এল ; ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছে রে ভােম্বল ?
মেয়েটির সামনে কাঞ্চনের বুক ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। এ রকম
তার কখনাে করে না, এমন কি দুর্ধর্ষ মাষ্টার মশায়ের সামনেও না।
কাঞ্চনের মনে হ’ল এ রকম বিপদে সে কখনো পড়ে নি।
ভােল বল্লে, ‘মিনিদি, দেখ না এই ছেলেটা। আমি জিজ্ঞাসা
করছি কোন্ ক্লাসে পড়? যেন মারতে আসছে। বলছে
আই ডােন্ট সে কিছুতেই বলবে
।
মিনিদি বল্লে, ‘আচ্ছা, আমি
পরীক্ষা করছি, দাড়া। এই, বানান
করা দেখি মেন্ট। ডােম্বল,
জানিস, এটা ভারী শক্ত বানা
ছােড়দা আমায় ঠকিয়েছিল।
মেটে ন্! ভারী শক্ত।
কাঞ্চনের কাছে এ বানান অতি
তুচ্ছ! ডায়ারিয়া, নিউমােনিয়া,
থাইসিস কিংবা আরকিপিলেগে
হলে বরং কথা ছিল। না,
মেয়েটির কাছে তার বিস্তার পরিচয়
একটু দিতে হ’ল।
বাড়ী থেকে পালিয়ে
‘মেটে? এ-ই-এ-টি-ই-এ-মেটে।
মূখ
টিপে মিনি জিজ্ঞাসা করল, “মানে?
‘মানে? দশ জন মানুষ।
এবার মিনি হেসে ফেল—তােমার মাথা !
কাঞ্চন বলে—“আহ, দশ জন মানুষ না হয়ে হ’ল গিয়ে মানুষ দশ
জন—মেন-টেন ও একই কথা !
মিনি বল্পে –‘তােমার মুণ্ডু! মেটে হচ্ছে এ-এ-আই-এ-টি-
এ-আই-এন্। এর মানে প্রতিপালন করা। এও জান না তুমি ?
এবার কাঞ্চন মােরিয়া হয়ে উঠল। তাকে অপদস্থ করার জন্য
মেয়েটার ওপর ভারী রাগ হল। সে জিজ্ঞাসা করল—“আচ্ছা, তুমি
বানান্ কর দেখিশূর্পনখা ?
মেয়েটি একটু ভুরু কুঁচকে ভাবলে। শূর্পনখা? ভােঙ্গল, কি স
জানিস? দন্ত্য স, না মধ্যণ্য ষ? ডােম্বল ঘাড় নেড়ে জানাল সে
জানে না।
হ্রস্ব উ, না দীর্ঘ উ ? ভােম্বল আবার ঘার
নাড়ল।
মেয়েটি কাঞ্চনকে বল্পে, বলছি, দাড়াও। দ্য স-য়ে হ্রস্ব উ,
পয়ে রেফ সুর্প, ন আর খ-য়ে আকার-সুর্পনখা।
কাঞ্চন বঙে, তােমার মাথা। নিজের নাম বানান জান না,
আবার পরীক্ষা করতে এসেছ।
এবার মেয়েটি রেগে গেল। “কী? আমার নাম শূর্পনখা ?
তুমি তবে ঘটোৎকচ। ঘটোৎকচের বানান জান ত ?
বাড়ী থেকে পালিয়ে
ভােৰূলের এবার ভারী ঘূর্তি। সে “ঘটোৎকচ” বলে হাত তালি
দিতে লাগল।
কাঞ্চন গম্ভীর হয়ে বল্লে’ ‘ঘটোৎকচ হ'তে পারি, কিন্তু সিংহের
মামা ত নই। সিংহের মামা ত একটা জানােয়ার।
মিনি বল্পে, ‘সিংহের মামা আবার কে?
‘কেন, এই যে তােমার পাশে, ভােম্বলদাস !
এ কথায় মিনিকে হাসতে দেখে ভোম্বল অত্যন্ত মুষড়ে গেল। সে
বলল, “আমার নাম বুঝি ভােঙ্গল ? আমার নাম ত সুপ্রকাশ।
ছােড়া, ও ছােড়দা।
একটি বছর কুড়ি বাইশের ছেলে ওপার দিয়ে যাচ্ছিল। সে
থেকেই জবাব দিল, “দাড়া, দাদার বিয়েটা কত দূর দেখে আসি।
ডােম্বল হেঁকে বল্ল, “দেখ না ছােড়দা, এই ছেলেটা আমাদের
অপমান করছে।
অপমানের কথা শুনে ছােড়দা এগিয়ে এল। মিনিকে ডেকে জিজ্ঞেস
করল, ‘তােরা কি করছিস্ এর সঙ্গে?
ভােম্বল জবাব দিল, ‘মিনিদি শুধু ওকে বলেছে মেটেন্ বানান
কর দেখি, তা ও যা বলছে। তুমি ওকে একবার এগজামি কর না,
ছােড়া?
অপরকে পরীক্ষিত হতে দেখলে ভােম্বলের ভারী আমােদ হয়।
তা ছাড়া ছােট ছােট ছেলেমেয়েদের এগজামিন্ করায় ছােড়দার কি
রকম আগ্রহ তা সে জানে।
ছােড়দা বল্লে, “বটে? তােমার নাম কি বাপু?
কাঞ্চনের অপ্রসন্ন মুখে জবাব দিল, ‘কাঞ্চন।
‘কাঞ্চনের ইংরিজি কি ?
কাঞ্চন গুম হয়ে রইল, কোন উত্তর দিল না।
‘কাঞ্চনের ইংরিজি হচ্ছে গােঙ, তাও জান না? সাহসীর ইংরিজি
বােড়। ঠাণ্ডার ইংরিজি-কোড।
-কোড। বলিয়াছিলর 'ইংরিজি-
টোড। পুরাতনের ইংরিজিও। তৈরী করার ইংরিজি-
মােঙ। বিক্রীত-র ইংরিজি—সােম্ভ। ধরে থাকার ইংরিজি
হােঙ। নাঃ, তুমি কিছু জান না? কাঞ্চন নীরব।
‘‘আচ্ছা, ট্রান্সলেট কর, আমার একটা গাধা ছিল। লজ্জা কি ?
বলে ফেল। কাঞ্চন তবু কিছু বলে না।
বাড়ী থেকে পালিয়ে
ভয় ?
-
‘ভয় কিসের? বলে ফেল।
ভয় নেই।
এবার কাঞ্চনের আত্মসম্মানে আঘাত লাগল।
অমন যে
অঙ্কের মাষ্টার মশাই, অমন যে সেকেণ্ড পণ্ডিত মশাই তাকেই সে
ভয় করে না, আর সে ভয় করবে এই
কাঞ্চন গর্বের সঙ্গে বল্ল, ‘ভারি ত' ট্রান্সলেসন্ ! আই ওয়াজ
এ যা।
ছােড়দা ভারী হতে লাগল । কাঞ্চন সংশােধন করে বল্ল, “আই
ওয়াজ, যা য়্যা?
ছোড়দা তনু হাসে। কাঞ্চন অপ্রতিভ হ'য়ে বলল, 'কেন, লট।
হ'ল কোথায় ? পাষ্ট টেস্ তাে দিয়েছি।
ছােড়দা শুধু বন্ধু, ওরে, তাে । কেউ এই গাধাটাকে চিড়িয়াখানায়
দিয়ে আয়।' বলে মিনি ও ভোম্বলকে নিয়ে চলে গেল।
ভােম্বল যেতে যেতে বল্ল, ' কিন্তু ছোড়দা, মিনিদির কথা
জিজ্ঞেস করছিল। বলছিল ও মেয়েটা কে?' তাতেই ৩ গ্রামার
রাগ হয়ে গেল।
ছােড়দা বল্পে, “তাই নাকি?
“তাই নাকি? মিনির কথা জিজ্ঞেস করছিল ?
তবে বােধ হয় মিনিকে আমাদের ওর পছন্দ হয়েছে।
মিনি শুধু বল্পে, ‘দূর!
ছােড়া বল্পে, ‘তা মন্দ কি! মিনি, ওকে যদি তাের বাহন করি
তা হ'লে তুই শীতলা ঠাকরুণ’ হবি।
বুনি দাদার পিঠ একটা কিল বসিয়ে দিল।
বাড়ী থেকে পালিয়ে এদিকে কাঞ্চন অত্যন্ত ম্রিয়মাণ হয়ে এক কোণে বসে রইল। এত উৎসব, আনন্দ, কৰ্ম্ম-কোলাহল কিছুই তার আর ভাল লাগছিল না। মেয়েটির সামনে ? ছি ছি ! নাঃ, ইংরিজিটা তাকে ভাল করে শিখতেই হবে। হয়ত দু'-পাঁচ বছর বাদে ওই ছােড়দা আবার তার সঙ্গে লাগতে আসবে, কিন্তু তখন সে হেড মাষ্টারের মত ইংরিজি জানে ; তখন তার কাছে বিদ্যে ফলানো সােজা নয় ; তখন সে তাকে আচ্ছা জব্দ করে দেবে, ওই মিনির সামনেই। হ্য। কিন্তু বেশীক্ষণ মুখ চূর্ণ করে থাবার ছেলে সে নয়। যেমনি ঘােষণা হ’ল যে বামুনদের পাতা পড়েছে তৎক্ষণাৎ সে অদম্য উৎসাহে চঞ্চল হয়ে উঠল । একবার তার মনে হল সে ত বামুন নয়। কিন্তু তৎক্ষণাৎ তার মন জবাব দিনা হােগে, পা ওয়াটাই আসল, বামুন-টা নয়। সে সটান্ বামুনের পংক্তিতে গিয়ে বসে পড়ল। নানা রকম তরি- তরকারি পাতে পড়তে লাগল। কাঞ্চন এক-একটু চোখে দেখল। তার পরে লুচি এল। ফুকো ছােট ছােট ময়দার লুচি-গুটি ছয়। সে ছ’খানা ত কাঞ্চনের এক নিঃশ্বাসে উড়ে গেল। তার পরে আবার প্রত্যেকের পাতে চারখানা করে পড়ল ;-কাঞ্চনের দ্বিতীয় গ্রাস। তৃতীয় বারে জন প্রতি জিজ্ঞাসা করে লুচি দিচ্ছিল, অনেকেই বল্ল, আর না। কাঞ্চন চুপ করে রইল, ফলে তার পাতে আর দু’খান। পড়ল। সে দু’খানা মরুভূমিতে জলবিন্দুর মত তৎক্ষণাং শুষে গেল । তার পরেই দই সন্দেশ এল। তার পর আর লুচি এল না। কাঞ্চন মনে মনে বল, ‘দুত্তোর ! এই কি না কলকাতার ভােজ! ৩৪ বাড়ী থেকে পালিয়ে পাশের একজন ভদ্রলােক যখন বললেন, ‘না, খাওয়াটা আজ বেজায় হয়ে গেল, অম্বল না হলে বাঁচি। একটা সােড়া খেতে হবে। তখন কাঞ্চন তার ওপর দস্তুর মত রেগে গেল। ঐ নাম মাত্র আহার যেন ঘৃতাহুতি, কাঞ্চনের জঠরানল তার ফলে দ্বিগুণ জ্বলে উঠেছে। কি করে বেচারা! সকলের সঙ্গে উঠে তাকে ও তাঁচাতে হ'ল। অবশেষে আবার ঘােষণা হ'ল, কায়স্থদের জায়গা হয়েছে। কাঞ্চনের আত্মাপুরুষ বলে উঠল, ‘আমি ত কায়স্থ ! এবার আমার ন্যায্য অধিকার, আমার বাথ-রাইট ! কাঞ্চন কায়স্থদের দলে গিয়ে দ্বিতীয়বার খেতে বসে গেল । কাঞ্চন যখন দ্বিতীয়বার আঁচাচ্ছে তখন ডােম্বল মিনির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বল, ‘দেখছি, ছেলেটা কি পেটুক, ভাই! একবার বামুনদের সঙ্গে খেয়ে আবার কায়স্থদের দলে মিনি তাকে থামিয়ে দিল, “যাঃ, বকিস নে' ‘কেন ? আমি দেখেছি যে ‘ওর শরীরখানা দেখেছিস? কি কম মাকিউলার ? পটকা নাকি? তাের মত তিনটেকে পিষে ফেলবে। তাের তিনগুণ খেলে ওর চলবে কেন ? কি রকম চওড়া বুক দেখেছি ? কথাটা কাঞ্চনের কানে গেল। শরীরের প্রশংসায় তার চওড়া বুক যেন আরাে চওড়া হয়ে উঠল। নিরুৎসাহিত ভােম্বলের মলিন মুখের দিকে বিজয়গর্বে সে একবার কটাক্ষপাত করল । তার পর কোনও দিকে দৃকপাত না করে গম্ভীর মুখে তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল- যেন স্বয়ং গামা কি গােবর!
বাড়ী থেকে পালিয়ে তার কানে গেল ভােম্বলের প্রতিবাদ। সে বলছে, 'হ্যা, ভারী ত বুক! অমন ঢের দেখেছি। ওকে এমন বক্সিংএর প্যাচ মারব যে বাছাধন' বলে বক্সিংএর একটা প্যাচ মিনিকে প্যাচ মিনিকে সে দেখিয়ে দিল। মিনি উত্তর দিল, “বাঃ, তােকে আর বাজে বড়াই করতে হবে না। তুই ত তুই ! ছােড়দাও ওর সঙ্গে পারবে কি না— বাকি কথাটা কাঞ্চন শুনতে পেল তার আর শোেনার দরকারও ছিল না। বিদ্যায় না হােক, অন্ততঃ গায়ের জোরে সে যে ছােড়দার সমকক্ষ এ কথা ভাবতে তার ভারী আরাম বােধ হ'ল। এবং এই ধারণা হচ্ছে মিনির—সেই মেয়েটির—যাকে বিয়েবাড়ীর সমস্ত মেয়ের মধ্যে তার পছন্দ হয়েছে। যে ঘরে গানের আসর বসেছিল সেখানে তখনাে তুমুল উদ্যমে গীতবাদ্য চলছে। হাত, পা, ও গলার একটানা করতে ভূততা বাবু তখনাে কাহিল হন নি। কাঞ্চন মনে মনে তাকে ধন্যবাদ দিয়ে বড় দেয়াল-ঘড়িতে দেখলে-বারােটা বেজেছে। ঘড়ির অনুশাসনকে উপেক্ষা করা অনুচিত বলে তার মনে হল। তৎক্ষণাং সে সেই বিস্তীর্ণ আসরের এক প্রান্তে লম্বা হয়ে পড়ল । শুয়ে শুয়ে সে আজ সমস্ত দিনের কথা ভাবতে লাগল। আজ বেলা দুপুরে সে বাড়ীতে ছিল, আজ রাত দুপুরে সে এখন কোথায়। সে যে কোথায়, কার বাড়ীতে সে নিজেই জানে না। সমস্ত দিনে কত কাণ্ডই না ঘটল ! কিন্তু দৈহিক শক্তি কিছু থাকলেও চিন্তাশক্তি কাঞ্চনের আদপেই ছিল না। খানিক বাদেই সে কষ্ট ও যন্ত্রসঙ্গীতের বাড়ী থেকে পালিয়ে 4 মহামারি আস্ফালনকে উপেক্ষা করে ও সমস্ত দুর্ভাবনা ভুলে অকাতরে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখল সে সত্যিই রাস্তা হয়েছে। আমােদর নয়, কলকাতার। সােনার সিংহাসনে সে বসেছে ! মন্ট, ঘুড়ি ওড়ানাে, মার্বেল খেলা, লাট, ঘােরানো ইত্যাদি যাবতীয় জরুরি কাজ পরিত্যাগ করে তার মাথায় ছাতা পরেছে, আর ন্যাপলা—ওমা, তাই ত? সত্যিই যে ওর লেজ গজিয়েছে! সে বেচারা যথাসাধ্য গাল ফুলিয়ে তটস্থ হয়ে যােড়-হাতে দাড়িয়ে আছে। আর তার পাশে যে বসেছে, কাঞ্চন ভাল করে ঠাহর করে দেখলে সে মিনি ছাড়া আর কেউ নয় । কাঞ্চনের ভারী আনন্দ হ'ল । কিন্তু কথায় বলে অত সুখ সয় না। কোথা থেকে সেখানে তার বাবা এসে হাজির। তার হাতে সেই রূপােবাধানাে ছড়ি-মালপানা থেকে সদ্য বহিস্কৃত। না, আর রাজত্ব করা নিরাপদ নয়, এক লাফে সি’হাসন, মিনি, মন্ট, ন্যাপলা সবাইকে ভাগ করে কাঞ্চন দে ছুট— ছুট ছুট—এক ছুটে একেবারে নিরুদ্দেশ। কাঞ্চনের যখন ঘুম ভাঙল তখন বেশ একটু বেলা হয়েছে। বিস্তৃত ফরাস তখন প্রায় জনশূন্য। একজন বড়ো লােক, সেই বাড়ীরই কোন কর্মচারী—এক কোণে বসে একটা মােটা জাব দা খাতা নিয়ে বােধ করি হিসেবপত্র দেখছিলেন, কাঞ্চনকে জাগতে দেখে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাদের বাড়ীর তুমি ? কাঞ্চন গভীর ভাবে উত্তর দিলে, আমাদের বাড়ীর । লােকটি একটু বিরক্ত হয়ে বল্লেন, “তাতে কি বুঝব? যাই হােক
বাড়ী থেকে পালিয়ে
তুমি কি বাড়ী চিনে যেতে পারবে ? তােমার লােকজন বােধ হয়
ভুলে তােমায় ছেড়ে চলে গেছেন। ঠিকানা বল্পে তাদের খবর দিতে
পারতুম।
কাঞ্চন বল্লে, কোন দরকার করে না, আমাকে কি আপনি
পাড়াগেঁয়ে ভেবেছেন ? কলকাতাতেই এত বড় হলুম আর কলকাতার
পথ-ঘাট চিনি নে। আমি ঠিক যাব।'
কাঞ্চন চলে যাচ্ছিল, ভদ্রলােক ডেকে বল্লেন, 'ওহে ছােরা,
তােমার চাদরটা ভুলে যাচ্ছ যে ।
কাঞ্চন দেখলে সে যেখানে শুয়েছিল তার কাছে একটি চমৎকার
সিল্কের চাদর পড়ে আছে। কোন • ভলােক কাল ফেলে গেছেন
কাঞ্চন বল্লে, ‘ন ও চাদর আমার নয়।
এতক্ষণে ভদ্রলোকের মুখে হাসি দেখা গেল। তিনি বল্পে, ‘তােমার
নয়? ভাল । আমিও তাই ভাবছিলাম ।
ভাবছিলুম। তবে এটা আমারই
দাড়াল।
কাঞ্চন ততক্ষণে বার হয়ে গেছে।
সাভ বাড়ীর বাইরে সদর দরজার পারেই এটো-পাতা, গেলাস, খুরিতে স্ত পাকার। সেই শুপীকৃত জঙ্গলের পাশে মানুষ ও কুকুরের কোলাহল বেধে গেছে। চার-পাঁচজন ভিখারী আবৰ্জন ঘেটে তার ভেতর থেকে ছেড়া লুচি, ভাঙা সন্দেশ, ভাজা পাপরের টুকরো, ডাল-তরকারীর অংশ ইত্যাদি সংগ্রহ করে সঞ্চয় করছিল, কুকুরদের তাতে প্রবল আপত্তি। তারা এতক্ষণ দূর থেকে সমবেত প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, কিন্তু তাদের সেই আন্দোলনে কোন ফল না হওয়ায় অবশেষে আক্রমণের উদ্যোগে ছিল, সেই সময়ে ভিখারীদের একজন কুকুরদের অগ্রগামী নেতাটিকে এক লাঠি বসিয়ে দিয়েছে। তার ফলেই কোলাহল। কাঞ্চন আহত কুকুরের পক্ষ নিয়ে বললে, ‘কাহে মাতা ইকো? যাকে সাধু ভাষায় বলে বােসকষায়িত নেত্র, ঠিক সেই চোখে ভিখারীরা কাঞ্চনের দিকে একবার কটাক্ষপাত কবুল। তাদের মধ্যে যে সব চেয়ে ছােট, কাঞ্চনের চেয়ে বয়সে কিছু বড়ই হবে, সে-ই সংক্ষেপে উত্তর দিল, ‘খানে আতা হয়। কাঞ্চন বল্প, ‘খায়ে গা নেহি? কুকুরকা বান্তে তাে ফেক দিয়া। এইবার তাদের মধ্যে যে সব চেয়ে বড় সে কথা বললে ; ‘আমিকো ধানে নেই মিতা, কুত্তা খায়ে গা।' কাঞ্চন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস কবুল, ‘তুমলােক এ লেকে কেয়া করে গা ?
বাড়ী থেঙ্গে পালিয়ে সেই ছােট ছেলেটি বল্লে, ‘খায়ে গা। কাঞ্চন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে ভাবতে লাগল—এত বড় শহর, এখানে এত বড়লােক, লােকের এত টাকা, এমন ভােজ, এমন শােভাযাত্রা, আর এখানে মানুষকে কুকুরের সঙ্গে কাড়াকাড়ি করে খেতে হয়। কাকে দয়া করবেকার পক্ষে সে দাড়াবে ? কুকুরের, না মানুষের ? সেই দৃশ্যের সম্মুখে সে আর একটুক্ষণও দাড়াতে পারল না। কাল রাত্রের সমস্ত পাওয়া যেন তার গলা দিয়ে ঠেলে আসতে লাগল। সেই সঙ্গে কান্নাও। সে ভাবতে ভাবতে চল -কুকুরের মুখের গ্রাস কেড়ে এখানে মানুষকে বাচতে হয়। এ কেন—এ রকমটা কেন ? কেন যে এ রকমটা সে কিছুই ভেবে স্থির করতে পারল না। শেষে এই স্থির করল, সে বড় হলে কলকাতায় সমস্ত ভিখারীদের একটা বড় রকমের ভােজ দেবে। বড় হলে বড়লােক সে হবে নিশ্চয়ই, কেননা বড়লােক হতে দেরী হয় না, বড় হতেই যা দেবী। ভিখারীদের কি কি খাওয়াবে তারও একটা ফর্দ সে মনে মনে ঠিক করে ফেলল । আঃ, কালকে রাত্রের সেই ভােজটা ! কম পাওয়াক, কিন্তু কি চমংকারই খাইয়েছে ! অত সাদা লুচি তাদের পাড়া-গায়ে হয় না। আর কীরটাই বা কি রকম—ক্ষীরের মধ্যে কেবল দুধের সর, সমস্তটার স্বাদই আলাদা! দইটাই বা কেমন মিষ্টি—তাদের গায়ের দইয়ের মত অমন জেদা টক নয়—ওরকম দই সে অনায়াসে এক হাঁড়ি মেরে দিতে পারে। আর সন্দেশ! তাদের গায়ের গাঙ্গুলীর দোকানের মণ্ডা-তা’ দিয়ে আম পাড়া যায় ! দেবী গাঙ্গুলী সাত জন্মেও এমন সন্দেশ করতে পারবে না। আঃ, কী তার দােয়াদ—এখনাে যেন জিভে লেগে আছে। ৪০
বাড়ী থেকে পালিয়ে
হবেই ।
ওর দাম যে অনেক—কোনটাই চার পয়সার নীচে নয়-
বােধ হয় আরাে বেশী ।
ভােজের কথা থেকে তার মিনির কথা মনে পড়ল । তার সঙ্গে
দেখা করে এলে হত আজ। এখন ফিরে যাবে নাকি? সেই বুড়াে
সরকারকে গিয়ে বলবে—‘তােমাদের মিনিকে একবার ডেকে দাও না।
কিন্তু যা মেয়ে বাবা। এখনি এসে হয়তো জিজ্ঞেস করবে, ‘ফিলাডেলফিয়া
কোথায়? সাণ্ডোমিঙ্গো কোথায়? কোথায় মিসিসিপি ? কিংবা হয়তো
বলবে, হিপােপটেমাস বানান কর। তা হলেই তাে সে গেছে।
মেয়েটির সব ভাল, কেবল ওই একটা বড় দোষ।
, এখন মিনির সঙ্গে দেখা করাটা মােটেই যুক্তিযুক্ত নয়। এখন
মিনি কিছুতেই তাকে ‘রেসপেক্ট করবে না। না, সে বড় হয়ে এবং
মিনির চেয়ে অনেক বেশী বিদ্বান হয়ে তার সঙ্গে দেখা করবে। মােটরে
চেপে যাবে সে, গায়ে থাকবে সিল্কের পাঞ্জাবী, হাতে রিষ্ট-ওয়াচ, বুক
পকেটে ফাউনটেন্ পেন্। মিনি তাকে চিনতেই পারবে না। তখন সে
ববে, তােমার বড়দার বিয়ের রাত্রে আমাকে দেখেছিলে।
যদি চিতে না পারে তা হলে সেই লজ্জার কথাটা বলতে হবে, “তুমি
যাকে মেটেন্ বানান্ করতে বলেছিলে গাে! তখন মিনি নিশ্চয়ই
চিবে। সে মিনিকে বলবে, এখন আমাকে বানা জিজ্ঞেস করতে
চাও? আমি এখন এ-এ পড়ি। অনেক মােটা মােটা শক্ত শক্ত
বই আমাকে পড়তে হয়। তার মধ্যে পৃথিবীর সমস্ত খবর, সব বিদ্যা
আছে। তুমি কি জানতে চাও বল? মিনি তখন লজ্জায় মুখ নীচু করে
থাকবে। আর তার ছােড়া? সে তখন সাত বার বি-এ ফেল করে
৪১
বাড়ী থেকে পালিয়ে বাড়ীতে বসে আছে। আর ডােম্বল ? সে তার দাদার দশা দেখে কলেজে ভর্তিই হয় নি। একটা খবর-কাগজের হকার হেঁকে যাচ্ছিল—‘মহাত্মা গান্ধী বলিয়াছেন—১৯২১ সনের মধ্যেই স্বরাজ দিব। কাঞ্চন ভাবলে -স্বরাজ আবার কি? মহাত্মা গান্ধীই বা কে? ডেকে জিজ্ঞেস করবে? ততক্ষণে হকার অনেক দূর চলে গেছে। স্বরাজ কি একটা বড় রকমের ভােজ-টোজ নাকি ? মহাত্মা গান্ধী তাই বুঝি দেবেন ! যদি মাসখানেকের মধ্যে পাকে তাহলে ভােজটা সে খেয়েই বাড়ী ফিরতে পারবে। হকারের কাছে চেয়ে কাগজখানা দেখলে হত, ওতে বােধ হয় সব লেখা আছে । খানিক দূর গিয়ে কাঞ্চন দেখে—বা একটা পুকুর যে ! পুকুরের চার ধারে রাস্তা, রাস্তার ধারে বারে আবার বেঞ্চি পাতা—সমস্ত জায়গাটা রেলিং দিয়ে ঘেরা। কাঞ্চন পুকুর দেখে ভারী খুসী হয়ে উঠল। এতক্ষণ কেবল বাড়ী-ঘর দেখতে দেখতে চোখ যেন ক্ষয়ে যাচ্ছিল, অবশেষে অনেকখানি কালাে জল দেখে যেন চোখ দুটো জুড়ােল , সে পুকুরের পারে সিড়ির বােয়াকে গিয়ে বসল। পুকুরের অন্য পারে কতক গুলাে ছেলে ড্রিল করছিল-কাঞ্চনের চেয়ে তারা বয়সে বড়। কুড়ি-বাইশ বছর করে বয়স, এই রকম কাঞ্চনের মনে হ’ল। একজন মাষ্টার গােছের লােক তাদের ড্রিল শেখাচ্ছে। কাঞ্চনের অদূরে বসে একজন হিন্দুস্থানী সঁাতন করছিল, কাঞ্চন তাকেই জিজ্ঞাসা করল, এত সকালে ওরা ড্রিল করছে কেন? ওরা কারা ?
বাড়ী থেকে পালিয়ে হিন্দুস্থানীটা উত্তর দিল, ‘উ লােক হােটিয়ার হায় ! হােটিয়ার কিরে বাবা! ব্যাপারটা কাঞ্চনের কাছে কিছুমাত্র পরিষ্কার হল না। সে জিজ্ঞাসা করলে, কোন্ ইস্কুলমে পড়তা হায় ও লােক? ‘ইস্কুলমে? উ লােক্ পঢ়াশুনা, ইস্কুল-কালিজ, তামা ছােড় দিয়া। পড়াশুনা, স্কুল-কলেজ সব ছেড়ে দিয়েছে ? ওদের আর বই মুখ করতে হয় না, অঙ্কও কষতে হয় না! বারে! এত ভারী মজা! কাঞ্চন ভাবতে লাগল সেও ড্রিলের খাতায় নাম লেখাবে নাকি। অদূরে জলের মধ্যে হঠাৎ একটা ঘাই মারতে দেখে কাঞ্চন চমকে উঠল--পুকুরের মধ্যে কি আবার! হিন্দুস্থানীটা কাঞ্চনের দিকে কপার চক্ষে তাকিয়ে বল্লে, 'মছলি। ওমা, তাই ত! ইয়া ইয়া প্রকাণ্ড মাছ জলের তিন-চার সিড়ি নীচে অবলীলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। গিয়ে পাজাকোলা করে একটা ধরলেই হয়। এত বড় পুকুরটা কি এমনি মাছে বােঝাই ? কেউ কি এদের ধরে খায় না? মাছগুলাের প্রাণে একটুও ভয় নেই ত ! এ রকম কেন? ইত্যাদি প্রশ্ন কাঞ্চনের মুখে এল, সে হিন্দুস্থানীটাকে জিজ্ঞাসা করতে যাবে, দেখে সে তখন দাতন সমাধা করে চলে যাচ্ছে। কি করে কান ? চুপ করে ভাবতে লাগল। মাছগুলাে পুকুরের জলের মত কানের মনের তলদেশও যেন আলােড়িত করতে লাগল ।
আট
এই খবরের
কাঞ্চন খানিকক্ষণ সেই পুকুর-ধারে বসে, হােলটিয়ার ও মাছদের ড্রিল
দেখ ল। তার পর সে ধীরে ধীরে সেখানে থেকে রাস্তায় বেরিয়ে
পড়ল। কিছু দূরেই একটা চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যেতে চায়ের
গন্ধ এসে কাঞ্চনের নাকে লাগল। বাঃ, চমৎকার ত ! কাঞ্চন মুখ
তুলে দেখে সেই দোকানের টেবিলে একখানা
কাগজ
পড়ে আছে।
কাগজ থেকে তাে মহাত্মা গান্ধীর
স্বরাজের ব্যাপারটা জেনে নেওয়া যায় । কাঞ্চন টেবিলের ধারে গিয়ে
বল ।
বাঃ এ যে “বসুমতী” দেখ ছি। এত ছােট কেন ? তাদের বাড়ী
ফি হপ্তায় সে মুমতী সায় সে তাে এর চার ভবল। তার আধখানায়
শুয়ে আধখানা চাদরের মত গায়ে ঢাকা দেওয়া যায়। সেই বসুমতী
এত ছােট হয়ে গেছে । কাঞ্চন কিঞ্চিৎ দুঃখবােধ করল ।
‘চা দেব আপনাকে ?
কাঞ্চন মুখ তুলে দেপ ল, লেকানের একটি চাকর তাকে সম্ভাষণ
করছে। আপনি সম্ভাষণে সে অত বিগলিত হয়ে গেল ।
বললে,
‘টোষ্ট দেব?
‘টোই? তা দিতে পার।
কাঞ্চন মনে মনে বললে-টোষ্ট, আবার কি? কখনো তাে কানে
৪৪
বাড়ী থেকে পালিয়ে শুনি নি। যাই হােক, খাদ্য নিশ্চয়ই। আর যা কিছু খাদ্য তাতে কাঞ্চনের অরুচি নেই। ‘দু'খানা টোষ্ট দিই তবে। আর মামলে ? ‘মামলে? ‘মালেও হতে পারে, পােচও হতে পারে—যা আপনি চান। এ বলে কি! মালেট, আবার পােচ! এ রকম অদ্ভুত নাম কাঞ্চন কখনাে শশানে নি। বল্ল, একটা মামলেটু আর পােচ। কাঞ্চন কাগজের মধ্যে সেই দরকারী খবরটা খুজছে এ পাতা ও- পাতা ওল্টাচ্ছে, এমন সময়ে সেই লােকটি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার টোষ্টে কি দেব? গােলমরিচ, না চিনি ? কাঞ্চন গভীরভাবে জবাব দিল, “দুই-ই দাও। এতক্ষণে সেই খবরটি পাওয়া গেছে। ভেতরের একটা পাতার মাথাতেই বড় বড় অক্ষরে লেখা, ‘মহাত্মা গান্ধী বলিয়াছেন ১৯২১ সালের মধ্যেই স্বরাজ দিব।' খবরটা আনুপূর্বিক পড়তে যাবে, এমন সময়ে, ‘দেখি ভাই, কাগজখানা, ব'লে পাশের ভদ্রলােক কাঞ্চনের হাত থেকে কাগজখানা কেড়ে নিলেন। কাঞ্চন তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘স্বরাজ হলে কি হবে মশাই ? ‘তখন আমাদের কোন দুঃখ থাকবে না। ‘স্বরাজ হলে সবার সুখ হবে? ‘নিশ্চয়ই। সবাই বেশ ভাল খাবে-দাবে? ভাল পােষাক পরবে ? ৪৫ বাড়ী থেকে পালিয়ে ভলােক একটু অবাক হয়ে কাঞ্চনের দিকে তাকালেন, তার পরে জোরের সঙ্গে বলেন, 'নিশ্চয়ই। ‘আচ্ছা, গরীব মানুষদেরও স্বরাজ হবে ত? স্বরাজ হলে তারা ভাল খেতে পাবে, পরতে পাবে? ‘তার মানে ? ‘গরীবদের আবর্জনা ঘেঁটে আর পথের এটোকাট। কুড়িয়ে খেতে হবে না তো? ভদ্রলােক হঠাং কোন উত্তর দিতে পারলেন না, তিনি ঈষং ভাবিত হয়ে পড়লেন। কাঞ্চন পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘ত।' হ'লে গরীব লােকেরাও তিনতালা-চারতলা বাড়ীতে বেশ আরামে বাস করতে পাবে তাে? ভলােক বল্লেন, ‘স্বরাজে এ সব হবে বলে আমার মনে হয় না। গরীবরা গরীবই থাকবে। কাঞ্চন বললে, মহাত্মা গান্ধী কে? ভদ্রলােক আশ্চর্য্য হয়ে গেলেন। সে কি মহাত্মা গান্ধীর নাম শােন নি? কাঞ্চন লজ্জার সহিত স্বীকার কবুল-নাম শুনেছে বটে, তবে ভদ্রলােকের সম্বন্ধে সে ভালমত কিছু জানে না। যে অজ পাড়াগাঁয়ে তাদের বাড়ী, সেখানে কোন খবরই বড় একটা পৌছায় না। হ্যা, একখানা খবর-কাগজ সাতদিন অন্তর তাদের বাড়ী যায় বটে, কিন্তু তা বাবা নিজে পড়ে ফাইল করে রাখেন। কাঞ্চনকে পড়তেও দে না সে পড়েও না। একবার তাদের স্কুলের ফাষ্ট-সেকেণ্ড, ক্লাসের ছেলেরা গাঁধীর হক না কি নিয়ে মেতে উঠেছিল, তার। বছিল বটে যে স্কুল ৪৬ বাড়ী থেকে পালিয়ে ? বয়কট করবে, কিন্তু সব ক্লাসের সব ছেলে জিনিষটা ভাল করে বুঝবার আগেই হেডমাষ্টার মশাই এক মাসের লম্বা ছুটি দেওয়ায় ব্যাপারটা চাপা পড়ে যায়। কাঞ্চনের সমস্ত কথা শুনে ভদ্রলােক তুখন তাকে গান্ধীজীর জীবন- কাহিনী সংক্ষেপে বােঝাতে লাগলেন। কাঞ্চন অভিভূতের মত শুনতে লাগল । গান্ধীজী বােজ মাত্র ছ’পয়সার খেয়ে থাকেন শুনে কাঞ্চন অত্যন্ত উৎসাহিত হয়ে উঠল, বলেন কি! মােটে ছ’পয়সা ? কি পান্ তিনি? কেবল ছাগলের দুধ। বােজ দেড় সের। ‘তা তো ছ’পয়সায় হবে না। দেড় সের ছাগলের দুধের দাম আমাদের গায়ে দেড় টাকা। ভদ্রলােক অপ্রস্তুত হয়ে বল্লেন, ‘ত।' হ'লে এটা বাজে কথা হবে। আমি ওই রকম শুনেছিলাম। কাঞ্চন ঘাড় নেড়ে বলে, “না, বাজে কথা নয়, ঠিক হয়েছে। ছাগলকে ছ’পয়সার ঘাস খাওয়া। সেই ঘাসে দুধ হয় তো ? ভদ্রলােক বলেন, 'তাই হবে তা হ'লে। চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে, খেয়ে নাও। গান্ধীজীর গল্প শােন্বার অবসরে অজ্ঞাতসারে কাঞ্চন টোষ্ট, পােচ, মামলেট ইত্যাদির সদ্ব্যবহার করছিল। চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে বলে, “আঃ, ভারী গরম। ভদ্রলােক পেয়ালার গায়ে হাত দিয়ে বল্লেন, ‘গরম কোথায়? এ তাে জুড়িয়ে গেছে। ৪৭
বাড়ী থেকে পালিয়ে
‘জুড়ােয় নি এখনাে, মুখ পুড়ে গেল।
‘তা হলে প্লেটে ঢেলে খাও।
‘খাচ্ছি। আমি শুধু ভাবছি গান্ধীজী এত কষ্ট করে যে স্বরাজ
আনবেন তা কেবল বড়লােকের স্বরাজ হবে। গরীবের দুঃখ আর
ঘুচবে না।
‘ক্রমশঃ ঘুচবে ক্রমশঃ।
একটু পরে ভদ্রলোেক বল্লেন, খাওয়া হয়েছে ? চল এবার ঠা
যাক ?
‘হ্যা, চলুন।
ভদ্রলােক ও কাঞ্চন উঠতেই দোকানের লােকটি বল্পে, ‘খােকাবাবু,
আপনার দাম দিলেন না?
কাঞ্চনের এতক্ষণে হুস হ'ল । সে বলে, ‘দাম? এই যা, আমার
কাছে তাে একটি ও পয়সা নেই। এই দেখ বলে শূন্য পকেটে
হাত পুরে দিল। পকেটের শূন্যতা সম্বন্ধে তার মনে কোন সংশয় ছিল না,
কেবল দোকানদারকে নি:সন্দেহ করার জন্যই তার এই প্রয়াস।
কিন্তু নি:সন্দেহ হয়ে দোকানদার নিরস্ত হ’ল না। বরং তার
ব্যস্ততা যেন বেড়ে গেল। সে বল্পে, সে কি! তুমি যে অনেক খেয়েছ ?
‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’! কাঞ্চন ভারী চটে গেল। সে বলে, “তুমি
আমাকে খাওয়ালে কেন? আমি তাে খেতে চাই নি। আমি তো
খবর-কাগজ পড়তে এসেছিলাম।
শুনছেন বাবু, শুনছেন ছোড়ার কথা? উনি খেতে চান নি।
আপনি তত আগাগােড়াই সব দেখছেন
৪৮
বাড়ী থেকে পালিয়ে
করল।
ভদ্রলােকের সাক্ষাতে কাঞ্চন এবার নিজেকে অপমানিত মনে
সে বল্লে, ‘তা খেয়েছি তাে কি হয়েছে? পার থাল তবে !
‘ধার থা! তােমাকে চিনি না, জানি না, তােমাকে ধার দেয়
;
‘তা আর কি হবে, পয়সা নেই যখন ! লিখে রেখে দাও। দেবী
গাঙ্গুলীও লিখে রাখে। ভদ্রলােক এতক্ষণে কথা বল্লেন, ‘কত হয়েছে ?
দোকানদার বক্সে ; ‘দুখানা টোষ্ট, একটা পােচ, একটা মামলেট,
এক কাপ চা-চার পয়সা, আর পাঁচ পয়সা-ন পয়সা, আর চার পয়সা
হ’ল গিয়ে তের পয়সা, চায়ের তিন পয়সা-একুনে চার আনা।
‘এই নাও চার আনা। হ’ল তো? পয়সা চুকিয়ে দিয়ে ভদ্রলােক
কাঞ্চনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। তাকে বল্লেন, ‘কোথায় যাবে তুমি ?
কাঞ্চন বললে, কোথাও না।
‘এস তবে এই পার্কে খানিকক্ষণ বসে গল্প করা যাক।
নয় কাঞ্চন একটু আগে যে পুকুরটা পরিত্যাগ করে এসেছিল তারই ধারে তারা দু'জনে একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বল । কাঞ্চন মনে মনে ভারী বিস্ময় বােধ করছিল। একজন অচেন ছেলের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে এর আগে সে কাউকে দেখে নি। ত্যাগীর আসনে ভদ্রলােককে গান্ধীজীর ঠিক পরেই সে সে স্থান দিল । এক কথায় একেবারে চার আনা ! চার আনা কম পয়সা নয়। যােল দিনে জমে! বাবা রােজ একটি করে পয়সা তাকে দেন, সে তাই মার কাছে জমায়। অনেক গুলো জমলে তাই দিয়ে তখন ঘুড়ি-লাটাই কিংবা ছিপ-হুইল্ ইত্যাদি কেনে। সে এখন বড় হয়েছে, এই অজুহাত দেখিয়ে সে একবার বাবার কাছে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিল যে এক পয়সায় তার আর চলে না, এটা দু’পয়সা করা হােক। বাবা তার বড়ত্বে বিশ্বাস করলেন কিনা ঠিক বােঝা না গেলেও বরাদ্দটা বাড়িয়ে দিতে তার বিশেষ আপত্তি দেখ। গেল। বাবা বল্লেন, এইখানে সাত হাত মাটি খােড় দেখি, পাবি একটা পয়সা? পয়সা অমনি আসে ? পয়সা যে সস্তা নয় এ বিষয়ে সে বাবার সঙ্গে এক মত হতে পারে না, কেননা পয়সার যা কিছু দুর্লভতা সে কেবল তার তরফেই ; তার বাবার বেলায় সেই পয়সাই অজস্র ভাবে অমনি অমনি আসে । সে বাবাকে উত্তর দিয়েছিল, এখানে মাটি খুঁড়লে পয়সা পাব না বাড়ী থেকে পালিয়ে বটে, কিন্তু কূপ খুঁড়লে হাত পিছু ছ’আনা করে পাব। অনাদি পরাণ মণ্ডলের বাড়ী কূপ খােড়ে, সে পায়। ছেলেকে পরাণ মণ্ডলের বাড়ী কূপ খুঁড়তে উৎসাহিত করতে বাবা চান্ না, তাই মাটি খােড়ার উপমাটা আর তিনি দেন না। আজকাল বলেন, ‘পয়সা কি গাছে পরে সে নাড়লেই টুপ টাপ পড়বে ? কাঞ্চন হঠবার ছেলে নয়। সে জবাব দেয়, ‘গাছ নাড়লে ফল তাে পড়বে, সেই ফল বেচলে পয়সা। বাবা বিরক্ত হয়ে বলেন, তবে তাই নাড়াে গে । কাঞ্চন অগত্যা চলে যায়, কিন্তু কোন গাছের কাছে নয়। কাছা- কাছি বিস্তর গাছ থাকলেও তাদের দিকে চেয়ে কোন আশ্বাসই সে পায় । গাছের বদলে সে মাকে গিয়ে নাড়া দেয়। পুকুরের অন্য ধারে তখনো ড্রিল চলছিল। কাঞ্চন জিজ্ঞেস করল, ‘ওরা সব হােটিয়ার,নয় কি ? ‘হােটিয়ার আবার কি ? ওরা সব সি, আর, দশের ভলান্টিয়ার। একটু ইতস্ততঃ ক'রে কাঞ্চন বলে, ‘সি, আর, শ কে ? ‘সি, আর, দাশকেও জান না বুঝি ? কাঞ্চন লজ্জায় চুপ করে রইল । ভদ্রলােক বল্লেন, গান্ধীজী যেমন সমস্ত ভারতবর্ষের, সি, আর, দাশ তেমনি এই গােটা বাংলাদেশের। তাঁর পুরাে নাম হচ্ছে চিত্তরঞ্জন দাশ। খুব বড় ব্যারিষ্টার—মাসে ওঁর পঞ্চাশ হাজার টাকা আয়। দেশের জন্য সমস্ত ছেড়েছেন। গান্ধীজীর চেয়েও ওর ত্যাগ বড়। ওঁর মত বিলাসী লােক বাংলায় ছিল না, বাড়ী থেকে পালিয়ে ‘আমাকে যদি না পাও, তােমার মত কোন ছােট ছেলেকে সাহায্য কয়রা তখন, তা হলেই আমাকে শােধ করা হবে। এই আমার কার্ড, এতে আমার নাম-ঠিকানা আছে। যদি কখনাে অসুবিধায় পড়, লােকের কাছে পথ জেনে আমার কাছে এস। এখান থেকে বেশী দূর নয়। আমি এখন আসি? ভদ্রলােক চলে গেলেন। কাঞ্চন বিস্মিতভাবে তার দিকে তাকিয়ে রইল। একবার মনে হল ভদ্রলােকের সঙ্গে গিয়ে তার বাড়ী দেখে আসে। আবার ভাবল, কি জানি, তা হলে হয়ত রাগ করবেন। ভদ্রলোককে তার ভারী ভাল লেগে গেল। দেশের জন্য সর্বস্ব দেওয়া তাে তার পক্ষে কিছুই না, বােধ হয় ঐ ভদ্রলােকটির জন্যও সে সর্বস্ব দিতে পারে। কাঞ্চন ও পার্ক থেকে বেরিয়ে প্যারেডের দলে গিয়ে ভিড়ে গেল-তাদের সবার শেষে।
ভলান্টিয়ারদের সঙ্গে সমস্ত সহর ঘুরে ঘুরে কাঞ্চনের পা ধরে গেল আর গলা গেল ভেঙে। সকাল বেলার দিকে যখন প্যারেড, সুরু হয় তখন তার এমন ভাল লাগছিল ! লেফট-রাইট-লেফট—তালে তালে পা ফেলে চলতে কী চমংকার ! কিন্তু এখন মাথার ওপরে সূৰ্য্য, বরাদ্দ র ঝাঁক-সহরের রাস্তা এমন তেতে উঠেছে। কাঞ্চনের এখন মনে হচ্ছে ধুত্তোর ! আর কাহাতক ঘাের যায় ? এখন এক থালা ভাতের সম্মুখে গিয়ে বসতে পারলে হয় । খেয়ে-দেয়ে বিকেলে, বরাদ্দ র পড়লে, আবার না হয় একচোট লাগা যাবে । আরাে অনেকক্ষণ টহল দিয়ে অবশেষে তারা একটা পার্কের পাশে এসে দাড়াল। পার্কের ওপরেই চারতলা প্রকাণ্ড বাড়ী—দেখেই কাঞ্চন বুঝতে পারল এই বাড়ীটাই তাদের আস্তানা। তারি সম্মুখে এসে ক্যাপটেন হুকুম দিলেন-‘হট! তারা দাড়াল। ‘নাম্বার ! ‘ওয়ান্টু-থি ফোর-ফাইভ-সিক্স,সেভ—এই ভলান্টিয়াররা নম্বর ব’লে চল। কাঞ্চনের কোন নম্বর ছিল না, সে চুপ করে রইল। ক্যাপটেন্ প্রশ্ন করলেন, ‘এ ছেলেটি কে ? ভলান্টিয়ারদের একজন জবাব দিলে, ও আমাদের নয়।
বাড়ী থেকে পালিয়ে লােহার রেলিং দেওয়া গেট ঝনাৎ করে খুলে গেল। ক্যাপটে তার ভলান্টিয়ারদের নিয়ে মার্চ করে ভেতরে চলে গেলেন। গেট আবার ঝনাৎ করে বন্ধ হয়ে গেল। কাঞ্চন বাইরে দাড়িয়ে গেটের গরাদের ফাক দিয়ে ভেতরের লােকজনদের দেখতে লাগল। ভলান্টিয়াররা জুতাে-জামা খুলে ফেলে প্রকাণ্ড চৌবাচ্চার ধারে দাড়িয়ে স্নান করছিল। অনেকক্ষণ থেকেই কাঞ্চনের গলা শুকিয়ে এসেছে—এক গেলাস জল কেউ দেয় না? সাহস করে চাইবে? ওদের স্নান করা দেখে তার সমস্ত শরীর যেন তৃষিত হয়ে উঠল। খানিক বাদে সারি সারি কলাপাতা পড়ে গেল। ভলান্টিয়াররা খেতে বসল। আঃ, ডালটার কী চমংকার গন্ধ ! ভাত কোনদিনই তার মুখে রােচে না, ভাতের চেয়ে খেজুর-গুড়ের পাটালী দিয়ে চিড়ে ঢের ভাল । কিন্তু সেই ভাতই যে কত আকর্ষণের বস্তু আজ সে প্রথম অনুভব করছিল। আঃ, কেউ যদি তাকে একবারটি খেতে বলে। জিজ্ঞাসা করে, “তুমি কি খেয়েছে ? কিংবা তুমি কি খাবে? কিন্তু সে রকম প্রয়ােজনীয় প্রশ্ন কেউই তাকে করল না। একজন আধ-বয়সী ভদ্রলােক ওপর থেকে নেমে এলেন। তৎক্ষণাৎ ওপারের দরজা খুলে একখানা মােটর বেরিয়ে এল। তিনি সেই মােটরে উঠে বসলেন। ইনি বােধ হয় সি, আর, দাশের দলের একজন হা-চোমরা কেউ হবেন! হয়তাে স্বয়ং তিনিই হতে পারেন! এরও তে পরনে মােটা খদ্দর। লােকটিকে দেখলে কি হয়। কাঞ্চন তার কাছে গিয়ে ডাকল, ‘মশাই, ও মশাই?
বাড়ী থেকে পালিয়ে ০ মােটর থেকে মুখ বাড়িয়ে ভদ্রলােক কাঞ্চনকে দেখলেন। কাঞ্চন বল্পে, ‘আপনি কি—আপনি কি সি, আর, দাশ? ভদ্রলােক একগাল হেসে বল্লেন, ‘না, না। তুমি কি দাশ মশাইকে দেখ নি ? আমি তার দলের একজন। তােমার কি চাই? কাঞ্চন বল্পে, ‘আমি ভলান্টিয়ার হব। ভদ্রলােক কাঞ্চনকে ভাল করে একবার দেখে নিয়ে বল্লেন, “আমরা আঠারাে বছরের নীচে তে; ভলান্টিয়ার করি না।। তুমি যে বড় ছেলেমানুষ! ‘কিন্তু আমি দেশের জন্য সর্বস্ব দিতে পারি। ভদ্রলােক হেসে বল্লেন, বড় হয়ে বরং দিয়ে। তার পরই মােটর ছেড়ে দিলে। কাঞ্চন দেখলে, হৃদয়ের ততটা দাম নেই, যতটা দাম বড় হওয়ার । কোনগতিকে এক নিঃশ্বাসে বড় হওয়া যায় না? কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখে যে সে হঠাং খুব বড় হয়ে গেছে । ছেলেদের ওপর ভগবানের কি অবিচার দেখ তাে! কিছুতেই তাদের তাড়াতাড়ি বড় হতে দেন না। মনে মনে এইরূপ নানা রকম দার্শনিক আলােচনা করতে করতে কাঞ্চন পার্কের ভেতরে একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসল। পার্কের অন্য ধারে টেবিল-চেয়ার সাজানো হচ্ছিল। কাঞ্চন ভাবতে লাগল-মাঠের মধ্যে টেবিল-চেয়ার,ব্যাপার কি? ক্লাস বসবে নাকি? অত্যন্ত ইচ্ছে ব্যাপারখানা গিয়ে জানে, কিন্তু ক্ষুধা-তৃষ্ণায় এবং পরিশ্রমে এতটা অবসন্ন যে উঠবার উৎসাহ তার আদৌ ছিল না। যাই হােক গে—বসে বসেই দেখা যাবে এখন!
বাড়ী থেকে পালিয়ে
খানিক বাদে একটা কনেষ্টবল এসে তার পাশে বসল। একটু
পরেই সে মােটা গলায় গান ছেড়ে দিলে
“নৌতুন গাসে নোতুন নোতুন ফুল ফুটিয়েসে !
আরে—নৌতুন গাসে”
।
.
:
পাহারাওয়ালায় গান গায় ! এই অদ্ভুত দৃশ্যে কাঞ্চনের অত্যন্ত
হাসি পেল। হাসি চেপে সে গম্ভীর ভাবে বল্পে, ‘বাঃ, পাহারাওয়ালা
সাহেব, তুমি তাে বেশ বাংলা গান গাইছ!
৫৮
বাড়ী থেকে পালিয়ে পাহারাওয়ালা গর্বের সহিত বল্লে, ‘হামি আঠ বরেষ বাংলা মুলুকে আসে—বহুৎ বাংলা শিখিয়েসে। হামার হিন্দীমে ভি আচ্ছা গানা আছেন কিন্তু বাংলা গানাই হামি ভালােবাসে। আরে নৌতুন গালে নৌতুন নোতুন— পার্কের দূরবর্তী এক দরজা দিয়ে একদল কনেষ্টবল প্রবেশ করল। তাদের আবির্ভাব দেখে এই পাহারাওয়ালার সঙ্গীতচর্চা অকস্মাৎ থেমে গেল। কাঞ্চনও উঠে পার্ক থেকে বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু না, তার কিছু খাওয়া দরকার। যা খিদে পেয়েছে ! পকেটের সিকিটাকে নাড়তে নাড়তে সে একটা খাবারের দোকানের অন্বেষণে চল। আহা, সেই লােকটার সন্দেশের দোকান যদি কাছাকাছি কোথাও হয়। কিন্তু চার আনায় ক’টাই বা হবে? তার সন্দেশের ভারী দাম-কোনটাই চার পয়সার নীচে নয় ! আহা দেবী গাঙ্গুলীর দোকানে কি সস্তা! চার আনায় আধসের রসগােল্লা। কেমন বড় বড় শক্ত, তা খাওয়াও চলে আবার তা দিয়ে মানুষ মারাও চলে। চার আনার খেলে চার দিন মনে থাকে।
দেবী গাঙ্গুলীর রসগােল্লার কথা মনে হতেই কাঞ্চনের জিভে জল এল। বাবা কিন্তু দেবীকে বড় ঠাট্টা করেন। সেবার কালীপূজোর সময়ে বলেছিলেন, “দেখ দেবী, মাঝে মাঝে একটু রকমফের কোনাে । তােমার যা গােশ্লা, ও গােল-বিশেষ—দুর্ভিক্ষে আর রাষ্ট্রবিপ্লবে কাজে লাগতে পারে কিন্তু ভদ্রলােকের পাতে—' বলে কথাটা শেষ না করেই বাবা যা হেসেছিলেন । এ কথায় হাসবার কি আছে কাঞ্চন ত খুঁজে পায় না। বাবার যেমন ! গাত্রী ভােয়ােল” চলতে চলতে আচমকা ওই কথা গুলাে দেখে কাঞ্চন থমকে দাড়াল। মন দিয়ে সাইন্-বাের্ডটা পড়তে লাগল, “এই যে আম্বন ! এখানে উৎকৃষ্ট ভাত, ডাল, তরকারী, মাছের ঝােল, ঝাল, অম্বল ইত্যাদি দিবারাত্র পাওয়া যায়।” বাঃ, এই ত সে খুজছিল ! কাঞ্চন আর ক্ষণমাত্ৰ ইতস্তত না করে সটান্ ভেতরে ঢুকে গেল । কত ? তােমাদের এখানে খেতে ক’ পয়সা ? ‘তিন আনা। কই, পয়সা দেখি? ‘দেব, আগে খাই। ও সব হবে নাই বাপু' বলে আশ্রমের মালিক বিড় বিড় করে বতে সুরু কবুল ; তার মােদ্দা কথাটা এই যে, ছেলেছােকরাদের এই বাড়ী থেকে পালিয়ে ভাবে খাইয়ে অনেকবার সে ঠকেছে, আগে হাতে পয়সা নিয়ে তবে ধারে সে খাওয়ায় না। কাঞ্চন তাকে সিকিটা দিয়ে একটা আনি ফেরং নিল। লােকটার বক্তৃতায় সে মনে মনে ভারী বিরক্ত হয়েছিল। আগে ত খেয়ে নি, তার পরে দেখাবে লােকটাকে। ঘরের মধ্যে পছন্দমত ভাল একটা জায়গা বেছে নিয়ে সে বসে পড়ল। বসতে না বসতেই একজন মােটাসােটা ভদ্রলােক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন।-ওহে ছােরা, ওখানে বলে যে? ওটা যে আমার জায়গা। কাঞ্চন ভদ্রলােকের দিকে একবার তাকাল মাত্র, কোন বা নিষ্পত্তি করল না। ‘এ যে নড়েও না, রাও কাড়ে না ! ও কিত্তিবাস—কিত্তিবাস ! আশ্রমের মালিক কৃত্তিবাস উপস্থিত হয়ে সমস্যাটা আগে বুঝে নিল, তার পরে কাঞ্চনকে বল্প, ‘তুমি একটু সরে বস বাপু, ইনি আমাদের বাঁধা খদ্দের- ‘বাধা খদ্দের ত অন্য কোথাও বেঁধে রাখ গে। আমি নড়ছি নে। ততক্ষণে কাঞ্চনের সম্মুখে ভাতের থালা এসে পৌছেছে। কৃত্তিবাস চটে বল্পে, ‘তুমি খালাটা নিয়ে ওই ধারে বস না কেন? ‘পয়সার বেলা নগদ, আর বার বেলা ধারে? তা হবে না। এই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে কাঞ্চন আর দ্বিতীয় বাক্যব্যয় না করে থালার প্রতি মনােনিবেশ করল। অগত্যা ভদ্রলােক কানের দিকে কম করে চাইতে চাইতে নিজেই অন্য জায়গায় গিয়ে বলেন। খাওয়া-দাওয়া সেরে কাঞ্চন বেরিয়ে পড়ল। বাবােটা পয়সা
বাড়ী থেকে পালিয়ে
নিয়েছে বটে তবে নেহাং মন্দ খাওয়ায় নি। যাক গে বেটা, কাঞ্চন
ওকে মনে মনে মার্জনা করে দিল।
‘ভােজনামের পাশেই একটা ওষুধের দোকান--বড় বড় হরফে
ইংরেজিতে লেখা Chemist inn
Druggist 1 দোকানের টেবিলে
কাঞ্চন দেখল, সকাল-বেলার সেই
কাগজখানার মত একখানা কাগজ।
আজকের খবরট। তাে তার পড়া হয়
নি। একবার পড়ে দেখ লে হত ।
সে আস্তে আস্তে দোকানে ঢুকল।
টেবিলের ধারে সাহেবী পাষাক পরা
অল্পবয়সী একজন
ভদ্রলােক বসে-
ছিলেন, তিনি খবর-কাগজ থেকে
চোখ তুলে
তাকালেন। কাঞ্চন
জিজ্ঞেস করল, আপনি
কি
ডাক্তার ?
‘হ্যা’ কি চাই?
‘ওই কাগজখানা একবারটি পড়ব ।
‘পড়তে পার।
কাগজখানা পড়তে গেলে ওষুধ কিনতে হবে না ত? আমি
আগেই বলে দিচ্ছি মশাই, আমার কাছে পয়সা-টয়স। নেই, ওষুধ কিতে
আমি পারব না।
বাড়ী থেকে পালিয়ে
ডাক্তার বিস্মিত ভাবে বক্সেন, না না, ওষুধ কিনতে হবে কেন ?
কিছু না কিনেই তুমি পড়তে পার।
ডাক্তার এতক্ষণ একটু অবাক হয়ে কাঞ্চনকে লক্ষ্য করছিলেন,
কাগজখানা তার পড়া শেষ হলে তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন্
স্কুলে পড় তুমি? কোন্ ক্লাসে?
কাঞ্চন গর্বের সহিত বল্ল, ‘আমি পড়ি
টড়ি না।'
বড় ছেলে, স্কুলে পড় না !
কি রকম ?
‘পড়তুম । স্বরাজের জন্য ইস্কুল ছেড়ে
দিয়েছি।
‘বটে ? মুখ হয়ে থাকলে স্বরাজ
হবে ?
* * *
কাঞ্চন প্রশ্নের ধাক্কায় প্রথমটা কাবু
হয়ে পড়ল, কি জবাব দেবে ভেবে পেল
, কিন্তু একটু পরেই দৃঢ়তার সহিত
উত্তর দিল, ‘নিশ্চয় !
মহাত্মা গান্ধী
বলেছেন—বলেছেন-স্বরাজ মে ওয়েট
বাট-বাটু—কথাটা আমার এখন মনে
আসছে না। তার মানেটা এই যে,
পড়াশুনার জন্য অপেক্ষা করা চলবে কিন্তু
স্বরাজের জন্য আর অপেক্ষা করা চলবে না। বুঝেছেন?'
বাড়ী থেকে পালিয়ে ডাক্তার হেসে বল্লেন, ‘মহাত্মা গান্ধী কোথাও এ কথা বলেন নি। ওই ত তােমার সম্মুখে কাগজ পড়ে আছে, কোথায় বলেছেন দেখাও দেখি ? মহাত্মা গান্ধী নিজে কি মুখ ? সি, আর, দাশ কি মুখ ? ওঁদের মত অত বড় বিদ্বান্ দেশে খুব কমই আছে, তা জান? কাঞ্চন এবার নিরস্ত্র হয়ে পড়ল। ডাক্তার বলে চল্লেন, 'মূর্খতার দ্বারা যদি স্বরাজ হত তা হলে দেশের ত্রিশ কোটি লােকের মধ্যে উনত্রিশ কোটিই তাে আকাটু, কোন্ দিন স্বরাজ হয়ে যেত তবে ! মুখ হয়ে থাকলে ভাত আসে না,-স্বরাজ আসে ? কাঞ্চন কি বলতে যাচ্ছিল, বাধা দিয়ে ডাক্তার বল্লেন, ‘তােমার কোন কথা আমি শুনতে চাই না। খবরের কাগজ পড়ে পড়ে তােমার মাথা বিগড়েছে। যাও, এখুনি ইস্কুলে আবার ভর্তি হও গে, ভর্তি হয়ে তবে অন্য কথা। যাও—এক্ষুণি যাও–যাও। ভদ্রলােক যেন কাঞ্চনকে তাড়া করলেন। চমকে উঠে কাঞ্চন চেয়ার ছেড়ে এক লাকে একেবারে ফুটপাথে । কিন্তু ফুটপাথে পড়েই তার মনে হল—ছি !! পালানােটা কাপুরুষের লক্ষণ। কাঞ্চনের কোঠিতে কাপুরুষতা লেখে না। তৎক্ষণাৎ ফিরে দাড়িয়ে বল্প, ‘পড়ব না আমি। আপনি কি করবেন? আমি ভয় করি নাকি আপনাকে ? ডাক্তার হাে হাে করে হাসতে লাগলেন। তাঁর হাসিতে অত্যন্ত বীতশ্রদ্ধ হয়ে কাঞ্চন সে স্থান পরিত্যাগ করল। পরিত্যাগ করুন বটে, কিন্তু ভয় পেয়ে নয় বীরের মত। ৩9 বাড়ী থেকে পালিয়ে কিন্তু বড় ভাবনায় পড়ে গেল কাঞ্চন। মহাত্মা গান্ধী নাই বলুন, হয় অন্য কেউই বলেছে, তা বলেই তাে কথাটা মিথ্যে হতে পারে । কিন্তু এ ভদ্রলােক যা বল্লেন সে কথাগুলােও তত ফেনা নয় ! তবে? উলটো-পাল্টা দু রকম কথার দুইই কি সত্যি হতে পারে কখনাে ? কোষ্টা সত্যি তা হলে? সহসা ফিরিওয়ালার চীংকারে কাঞ্চনের সমস্ত চিন্তাসূত্র ছিন্ন হয়ে গেল। ‘সাবান তরল আতা চাই মাথার কাটা কিলিপ, চাই হেজলিন চাই পমেট চাই- কাঞ্চন তাকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘দেখি কি আছে তােমার ? লােকটা তার বোঁচকা খুলে কাঞ্চনকে দেখাতে লাগল। ‘কি চাই আপনার? সব আছে, সাবান, তরল আলতা, কিলিপ, মাথার কাটা, সেফ টিপি, মাথার চিরুনী, হেজলিন, হিমানী, পাউডার- হঁা, সমস্তই চাই—আমার মার জন্য। ‘তা, কোন বাড়ী বলুন, আমি যাচ্ছি। কাঞ্চন গভীর ভাবে ব, আমাদের বাড়ী? সে আমাদের দেশে। লােকটা হতাশ হয়ে বল্ল, এখানে বাড়ী নয়? কিবেন না যদি তবে কেন আমাকে কষ্ট দিলেন ? কাঞ্চন আশ্বাস দিয়ে বল্ল, ‘কিনব বই কি! মার অন্য কিনতে হবে -আমাকেই কিনতে হবে, বা ত এ সব কিনে দেন্ না কখনাে।
বাড়ী থেকে পালিয়ে
-
বাবা বলেন—এ সব বিলাসিতা। আমি চাই আমার মা একটু
বিলাসিতা করুক। বিলাসিতা করলে মাকে ভাল দেখায়।
লােকটা কাঞ্চনের কথা শুনে হাল ।
বলল, তুমি ত ছেলেমানুষ ! তুমি কি করে
কিনবে?
‘কেন? রােজগার করে? আমি ত
চাকরি করতেই কলকাতায় এসেছি। তা
তুমি তাে এই রাস্তা দিয়েই বােজ যাও
এই সময়ে—কেমন ? প্রথম মাসের মাইনে
পেলেই এ সব আমি কিব। কিনে ডাকে
পাঠিয়ে দেব। ডাকে এ জিনিষ যাবে না?
‘খুব যাবে। ডাকে কি না যায় ! মাশুল
বেশী লাগবে কেবল।
‘তা লাগু।
মাশুলের জন্য আমি
কেয়ার করি না। হঠাৎ এ সব পেলে মা কি
রকম আশ্চৰ্য্য হয়ে যাবে আমি তাই
ভাবছি। সে ভারী মজা হবে।
লােকটা আবার হাতে হাতে চলে
গেল। কাঞ্চন সেই ভারি মজার দৃশ্যটা
একবার মানস-চক্ষে নিরীক্ষণ করে নিল।
পিয়ন বেটা মস্ত এক পার্শ্বেল নিয়ে হাজির
হয়েছে তাদের বাড়ীতে। কিসের পার্শ্বেল ? কার নামে ?
বাড়ী থেকে পালিয়ে
on
বাবা ছুটে বেরিয়েছেন। উহু-বাবার নামে নয়, মার নামে। মার
নামে এত বড় পার্শ্বেল ? বাবার মুখ তখন চূণ । তাদের বাড়ি এত বড়
পার্শ্বেল কখনাে আসে নি। আর যদিবা অবশেষে একদিন এল, তাও
এল কিনা মার নামে। মনে মনে ভারী হিংসে হয়েছে বাবার।
যেমন
হিংসে, তেমনি হয়েছে কৌতুহল !
বাবা পিয়নকে তাড়া
দিচ্ছেন, ‘দাও
আমাকে ! আমারই ত
বৌ—তা র ই মে
এসেছে, আমাকে দিতে
দোষ কি? পিয়ন
বলছে,
হুকুম
নেই। রেজেষ্টরী কিনা,
মার সই চাই।
মা তাে অবাক! বা
কখনাে আসে না, আসার
কল্পনাও তার স্বপ্নে নেই,
তাই কিনা এল তাঁর
নামে! কি আছে না
জানি ওর মধ্যে। কেই
বা পাঠিয়েছে কে জানে।
সই দিয়ে পার্শ্বেল নিয়ে খুলে দেখেন—ওমা, এ যে সাবান, তরল
উহু,
বাড়ী থেকে পালিয়ে
আতা, মাথার কাটা, কিলিপ, সেফটিপিন, হেজলিন, পাউডার,
পমেটম—আরাে কত কি! কেবল বিলাসিতা আর বিলাসিতা।
কে পাঠালে ? মা যখন ভাববেন—কে পাঠালে ! আঃ, তখন কি
মজাই না হবে !
, একটা চাকরির যােগাড় করতে হল তাকে। তা না হলে
কিছু হচ্ছে না।
ও বাবা, এ আবার কি। এত জল হঠাং কোখেকে। এ যে দেখি
পাইপে করে রাস্তায় জল দিচ্ছে,-ভারী চমংকার ত! কিন্তু আর
একটু হলেই সে ভিজে গিয়েছিল ! যদি ঘুরিয়ে না নিত তা হলেই নেয়ে
উঠতে হত আর কি ! একট। লােক রাস্তার মুখে পাইপ এটে দিচ্ছে,
আর একজন কত কায়দায় জল ছড়িয়ে যাচ্ছে। কাঞ্চন জল দেওয়া
দেখতে দেখতে তাদের সঙ্গে সঙ্গে চল।
কাঞ্চনের হঠাৎ মনে হল-এ ত বেশ কাজ ! এ কাজ করলে হয় না?
এ ত কাজ নয়, কাজ-কাজ খেলা।
যদি এ কাজ পায় সে খুব কষে রাস্তায় জল দেয়—দিনরাতই জল
দেয়-সহরের সব রাস্তায়। পাইপে করে জল ছিটানােয় নিশ্চয়ই খুব
আরাম।
যে লােকট। জল দিচ্ছিল কাঞ্চন তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তােমার তাে
বেশ কাজ হে! তুমি কি দিনরাতই রাস্তায় জল দাও?
দু’বার দিতে হয়, খুব ভােরে আর বিকালে।
‘বাঃ, বেশ ত! তা ক’টাকা পাও এ জন্যে ?
বেশী না বাবু, মােটে আঠারাে টাকা।
৬
বাড়ী থেকে পালিয়ে
!
কাঞ্চন অবাক হয়ে বললে, “আ-ঠা-নাে টাকা। সে যে অনেক।
‘অনেক কি বাবু! ওই ক’টা টাকায় আমাদের কি চলে? আমাদের
পােষায় না ওতে।
‘ত’ এ কাজ কোথায় পাওয়া যায় ?
‘মুন্সীপালীতে।
‘সে কোথায় ? আমাকে কাল নিয়ে যাবে?
‘খুব, কাল এইখানে দাড়িয়ে থেক এমন সময়ে, আমরা জল দিতে
আসব, সেইখানে নিয়ে যাব।
‘নিয়ে গেলে হবে না, আমাকেও এই কাজ একটা দিতে হবে।
আমিও জল দেব রাস্তায়।
‘কাজ দেবার মালিক কি আমরা, বাবু? কাজ দেন বড় সাহেব।
বেশ, তুমি আমাকে তার কাছে নিয়ে যেয়ো, কেমন ?
‘আচ্ছা।
লােক দু'টো জল দিতে দিতে চ, কাঞ্চন আর তাদের সঙ্গে গেল
না। সে পরিশ্রান্ত হয়ে রাস্তার একধারে বসে তার আসন্ন এই
চমংকার চাকরীর কথাটা ভাবতে লাগল। আঃ, রাস্তায় জল দিতে
কী ঘূর্তি ! এই বােধ হয় পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট কাজ ! আঠারাে টাকাও
কম টাকা নয়, ওতে বােধ হয় ওই লােকটার বোচকার সমস্ত জিনিষ
কেনা যায় !
• সেখান থেকে সামান্য দূরে বড় রাস্তার মােড়ে একটা পােড় জমিতে
অনেক লােক জমেছিল,-জনতার বৃত্তাকার ক্রমশাই বড় হয়ে উঠছিল।
কাঞ্চনের দৃষ্টি ও পা সেই দিকে আকৃষ্ট হ’ল। অতি কৌশলে এবং কষ্টে
বাড়ী থেকে পালিয়ে সে সেই সঙ্ঘবদ্ধ লােক গুলাের ভেতর দিয়ে গলে গিয়ে একটা ভাল জায়গা দখল করে বল। বৃত্তাকারের মাঝখানে খানিকটা ফাকা জায়গা। সেখানে মড়ার খুলি, হাড়-গােড়, এবং আরাে হরেক রকম জিনিষ। একজন আলখাল্লা পরা লােক আগড়ম-বাগড়ম মন্ত্র আউড়ে ভেলকি দেখাচ্ছিল। কাঞ্চন ভাল হয়ে জমে বল্ল। যে সে ভেলকি নয়—ভানুমতীর ভােজবাজী । আলখাল্লা পরা লােকটা বক্তৃতা দিচ্ছিল যে পেশাদার ম্যাজিক-ওয়ালাদের সাধ্য নেই যে তা মত খেলা দেখায়। এমন খেলা পৃথিবীতে কেবল একজন জানে এবং সেই একজন হচ্ছে সে নিজে। তার কথায় কাঞ্চনের দৃঢ় বিশ্বাস হল। একটা ছােট ছেলেকে বেঁধে-ছেদে একটা বড় চুপড়ির মধ্যে পুরে ডালাটা বন্ধ করা হ’ল, তার পরে চুপড়িটাকে দড়ি দিয়ে ভাল করে বাধা হ’ল। ভেকি-ওয়াল প্রশ্ন করল, ভেতরে আছি তত? ছেলেটা ভেতর থেকে সাড়া দিল। তার পরে ভেলকি-ওয়ালা একটা প্রকাণ্ড ছােরা নিয়ে নির্দয় ভাবে ডালাটার ভেতরে খােচাতে লাগল। কাঞ্চনের সমস্ত আত্মা আঁৎকে উঠল—ছেলেটা মারা যাবে যে! তার পরে চুপড়ি খুলে দেখা গেল ছেলেটা তার মধ্যে নেই, সে জনতার ভেতর থেকেই বেরিয়ে এল কাঞ্চনের পাশ দিয়ে। কাঞ্চন ত অবাক! এ রকম দৃশ্য সে জীবনে দেখে নি। তখন ভূমিকম্প সুরু হলেও সে টের পেত্ন কি না সন্দেহ। লােকটা একটা আমের আঁটি পুতল, দেখতে দেখতে সেটা দাড়াল ৭০
বাড়ী থেকে পালিয়ে
একটা আমের চারা! দেখতে দেখতে তাতে ফল ধরল—একেবারে
একটা আস্ত পাকা আম। ভেলকিওয়ালা আমটা কেটে জনতাকে
পরিবেশন করতে গেল, কিন্তু ভেকির আম খেতে কারু সাহস হল না।
কাঞ্চন এক টুকরাে খেয়ে দেখল -সত্যি একেবারে আসল আম ।
অবাক কাণ্ড!
বারাে
তার পরে তাসের ম্যাজিক,-আরো কত কি ! দেখতে দেখতে
অনেক রাত হয়ে গেল। এইবার লােকটা সবার কাছে একটা করে
পয়সা চাইতে লাগল।
অনেকে দিল, অনেকে দিল না। লােকটা
কাঞ্চনের কাছে কিছু চাইল না, চাইলে বােধ হয় সে আনিটা দিয়ে দিত
খেলা ভেঙে গেলে সবাই চলে গেল। ভেকিওয়ালা তার
জিনিষপত্র গুছােতে লাগল—তার ছেলে তাকে সাহায্য করছিল ।
কাঞ্চন তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, আমাকে নেবে তােমার দলে ?
আমি ম্যাজিক শিখব।
ভেকিওয়ালা বল্পে, ‘বেশ শেখাব তােমাকে । আমার সঙ্গে
যাবে?”
কাঞ্চন উৎসাহিত হয়ে বঙ্কে, এখুনি।
লােকটা বললে, তােমাকে এই পােষাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে আমাকে
পুলিস পাকড়াবে। তােমার জামাকাপড় ছেড়ে লুঙ্গি-পিরাণ পরতে
হবে—পারবে ত?
‘খুব। দাও না একটা লুঙ্গি, আমি এখুনি পরছি।
এখন নয়। এখানে লােকজন তােমাকে পরতে দেখবে।
সকালে আমার আস্তানায় যেময়। এই রাস্তা ধরে সােজা গেলে
সিদুরিয়াপট,-সেখানে ইউসুফ, ভেলকিওয়ালার নাম করলেই লােকে
দেখিয়ে দেবে। কাল সকালে যেয়াে।
বাড়ী থেকে পালিয়ে
লােকটা চলে গেল।
কাঞ্চন তাকে জানাল কাল ভােরে সে নিশ্চয়
যাবে।
সামনের দোকানের ঘড়িতে কাঞ্চন দেখল এগারােটা। ও, অনেক
রাত হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত সে যেন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ছিল। উদরের
মধ্যে একটা তীব্র ক্ষুধার প্রেরণা এতক্ষণ পরে সে অনুভব করল ।
অবিলম্বেই কিছু খাওয়া তার দরকার ।
একটা মিঠাইওয়ালার দোকানে গিয়ে সে বলল, ‘ও গুলো কি
তােমার? লুচি ত? দাও না চার পয়সার।
‘পুরী নেহিউ কচৌরি।
‘দাও কচৌরিই দাও। চার পয়সার।'
মিঠাইওয়ালা তাকে একটা ঠোঙ্গায় করে দু’গানা কচুরি আর
একটুখানি আলুর তরকারী দিল । তার পর আনিটা হাতে নিয়ে
জিজ্ঞাসা করল, ‘তুম হিন্দু।
স্থা।
ঠোঙ্গাটা তার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে আনিটা ফেরৎ দিয়ে বল্ল,
‘ই আনি নেহি চলে গা। সিসা হ্যায়।
‘ব রে ! কাঞ্চনের মুখ দিয়ে আর কথা বেরুল না ।
‘ঠলানো জায়গা নেহি মিলা? বলে মিঠাইওয়ালা তাকে
অনেক গালমন্দ দিল। একমুহুর্তে চারিধারে অনেক লােক জমে গেল ।
একে দারুণ ক্ষুধা, তার ওপরে এত লােকের সামনে অপমান-কাঞ্চনের
চোখ ফেটে জল আসবার মত হ'ল। সে আর সেখানে দাড়ালাে না।
খাওয়া না হয় নাই হ’ল, শােয়া তাে দরকার। কিন্তু কোথায়
বাড়ী থেকে পালিয়ে শােবে? এত রাত্রে কার বাড়ী আশ্রয় পাবে? তা ছাড়া খাদ্যই হােক আর স্থানই হােক—কিছু ভিক্ষা করতে তার ভারী লজ্জা করে। ‘আমাকে কিছু খেতে দেবে ? শােবার জায়গা দেবে? এ কথা মুখ ফুটে বলতে তার মাথা কাটা যায়। সে ভাবলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেই আজ রাতটা কাটাবে। কিন্তু ঘােরেই বা আর কতক্ষণ? আজ সকাল থেকে সমস্ত দিনই তাে ঘুরছে। তা ছাড়া, ঘুমে তার সমস্ত শরীর যেন ঝিঝিম্ করছিল। কাঞ্চন দেখল, দু’পারের ফুটপাথে বিস্ত লােক শুয়ে আছে। দূর সে হাঁটু দেখল কেবল লােক আর লােক। এদের বােধ হয় ঘর বাড়ী নেই—এরা বােধ হয় পথে শুয়েই জীবনটা কাটায় । সেও কেন ফুটপাতে শশাবে? কাঞ্চন একটা জায়গা বেছে নিয়ে শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে সে ভাবতে লাগল, কাল রাত্রে বিয়েবাড়ীতে কি আরামেই না কেটেছে। আর আজ এই ফুটপাথে । ‘এ কে এখানে? একজন ভদ্রলােক সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, কাঞ্চনকে সেখানে শয়ান দেখে বিস্মিত হয়ে এই প্রশ্ন করলেন। কাঞ্চন ক্ষীণস্বরে উত্তর দিল, ‘আমি। তার কথােপকথনে বিশেষ উৎসাহ ছিল না। ‘তুমি ভদ্রলােকের ছেলে, এখানে শুয়ে ? এস, আমার সঙ্গে এস। অগত্যা কাঞ্চন উঠল। বলল, কোথায় পােব? আমার শোবার জায়গা নেই। ৭৪ বাড়ী থেকে পালিয়ে ‘রাস্তায় যত ছােট লােকে শােয়, তাদের সঙ্গে—ছিঃ ! তুমি এস আমার সঙ্গে। কাঞ্চন ভদ্রলােকের সঙ্গে সঙ্গে চল। যাক্, তা হলে সত্যিই ভগবান্ আছেন! একটু আগেই ভগবানের ওপর তার যা অভিমান হচ্ছিল। এই ত তিনি আজ রাত্রের মত খাবার ও শােবার ব্যবস্থা করে দিলেন! আর কত দূর হাঁটতে হবে ? ভদ্রলােকের বাড়ী কত দূর আর ? কাঞ্চনের পা চলে না, তবু গরম ভাত আর উষ্ণ বিছানার লােভে কোন রকমে সে হইছিল। ভদ্রলােক যা তাড়াতাড়ি চলেন। কাঞ্চনকে তার সঙ্গে প্রায় দৌড়াতে হচ্ছিল। অনেকক্ষণ পরে একটা পার্কের কাছাকাছি এসে ভদ্রলােক থামলেন। বললেন, ‘পার্কের গেট যে বন্ধ দেখছি। যাক গে, তুমি টপকে যাও। ‘টপকে ! কেন? কাঞ্চন অবাক হয়ে দাড়িয়ে রইল । ভদ্রলােক আবার বলেন, 'ভেতরে যাবে কি করে ? গেট যে বন্ধ। টপকে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। ওঠ, আমি ধরছি তােমাকে। রেলিংএর উপর দিয়ে কাঞ্চনকে পার্কের ভেতরে নামিয়ে দিয়ে ভদ্রলােক বললেন, “ওই যে সব বেঞ্চি দেখছ? ওই বেঞ্চে গিয়ে শুয়ে থাকে। কোন ভয় নেই, কেউ কিছু বলবে না। ভদ্রলােক চলে গেলেন। কাঞ্চন অনেকক্ষণ স্তম্ভিতের মত গড়িয়ে । তারপর পার্কের ভেতরের পুকুরে গিয়ে এক পেট জল খেল। খেয়ে বেঞ্চিতে এসে শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে সে ভাবতে লাগল-- কালকের ভােজটা কেমন? রইল ।
বাড়ী থেকে পালিয়ে মিনি মেয়েটা বেশ—কিন্তু তার ঘােড়দা সি, আর, দাশ—সিল্কের চাদর-পকেট কাটা- মামূলেট-হাওড়া স্টেশনটিঞ্চার আইডিন- তারপর সে ঘুমিয়ে পড়ল ।
! কিন্তু “ওহে ওঠো ওঠো, এটা ঘুমােবার জায়গা নয় ! আরে, এর ঘুম যে ছাই ভাঙে না, কোথাকার আপ। কাঞ্চন তখন প্রকাণ্ড ভােজ বসে গেছে। লুচি, পােলাও পায়েস, সন্দেশ—নানাবিধ খাদ্য ! পরিবেষণ করছে আবার মিনি খাবারও যেমন ফুরােয় না, তার খাওয়াও তেমনি শেষ হয় না। কিন্তু প্রচণ্ড তাড়নায় তাকে চোখ খুলতে হল। ‘বাবা! কি ঘুম তােমার! কুম্ভকর্ণকেও হার মানায়! কাঞ্চন দেখল সকাল হয়ে গেছে, রােদ উঠেছে এবং তার অব্যবহিত •সামনে একজন বৃদ্ধ লােক অত্যন্ত অপ্রসন্নমুখে দাড়িয়ে বকছেন। চোখ রগড়ে উঠে সে বেঞ্চির এক ধারে বল । ভদ্রলােক বকে চল্লেন, সকালে কি পড়ে পড়ে ঘুমােয় ? ভােরে ধীর হাওয়া বয়, গায়ে লাগালে জোর বাড়ে। আজকালকার ছেলেরা যেন কী? আমার পঁয়ষট্টি বছর বয়স, সেই প্রত্যুষে উঠে বেরিয়েছি, আর এই সব জোয়ান্ ছােরা কোথায় মাঠে ছুটোছুটি করবে, না— কাঞ্চন তার বকুনি থেকে পরিত্রাণ পেতে সেখান থেকে উঠে পুকুরে মুখ ধুতে গেল। হঠাৎ একটা শব্দ শুনে ঘাটের পইঠা থেকে এক দৌড়ে কাঞ্চন একেবারে ফুটপাথে। কাল যাদের সঙ্গে কাঞ্চন প্যারেড, করেছিল সেই দলটাই,—কিন্তু এবার তাদের আগে ও পিছনে অনেক কনেষ্টবল। ৭৭ বাড়ী থেকে পালিয়ে বাঃ, আজকে যে দেখছি পুলিসরাও ওদের সঙ্গে মার্চ করছে। ওরাও গান্ধীর দলে ভিড়ে গেল নাকি? ‘নাহে, না, ওদের ধরে নিয়ে চলেছে থানায়। কাঞ্চনের প্রশ্নের জবাব যে দিল সেও ছেলেমানুষ, তার চেয়ে দু-চার বছরের যদি বড় হয়। কাঞ্চন তাকে জিজ্ঞাসা করল, থানায় নিয়ে চলেছে, তুমি কি করে জানলে? ‘আমি জিজ্ঞাসা করলুম যে। ওর মধ্যে আমার বন্ধু আছে, ওই যে মাঝখানে, গায়ে লাল খদ্দর, ও। আজ খুব ভােরে কংগ্রেস-আফিসে খানাতল্লাসী হয়ে গেছে, ওদের সবাইকে গ্রেপ্তার করেছে। ওদের থানায় নিয়ে গিয়ে কি করবে ? ‘জেলে দেবে। ‘জেলে ? তা হলে তাে ভারী বিপদ! আমি শুনেছি জেল ভারী , খারাপ জায়গা, ভারী ভয়ের। ‘কেন, আমি তাে জেলে ছিলুম, কাল সন্ধ্যায় ছাড়া পেয়েছি। কাঞ্চন বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল,-এ ছেলেটা বলে কি? তারা দু'জনে পার্কের মধ্যে এসে নরম ঘাসে এক জায়গায় বল। ছেলেটা তার কারাবাসের কাহিনী বলে চল্ল, কাঞ্চন হা করে শুতে লাগল। সেই জেলে আগে সব চোর ডাকাত খুনে বদমায়েস থাকত, তাদের খালি করে মফস্বলের জেলে পাঠিয়ে দিয়েছে, এখন কেবল কংগ্রেসের ভলান্টিয়ার-তারাই থাকে। গল্প চলে, কাঞ্চন আর বিস্ময় চেপে রাখতে পারে না, সে বলে উঠল, বল কি? একটা গােটা নিমগাছ সবাই মিলে পতন করে ফে.? ৭ বাড়ী থেকে পালিয়ে ফেবে না? আমরা চার হাজার লােক আছি যে, তার মধ্যে ছেলে ছােকরাই বেশী। সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই সবাই নিমগাছে উঠে বসি, আমাদের দাঁতন করতে হবে তাে? তা বলে একটা গােটা নিমগাছ ? ‘চার হাজার লােক দান করলে একটা নিমগাছ আর ক’দিন টেকে? ‘ভারী আশ্চৰ্যি তাে ! কাঞ্চন মনে মনে ভাবে, কিন্তু ভাব প্রকাশের ঠিক কথাটি খুঁজে পায় । অনেকক্ষণ পরে কথাটা পেয়ে অন্য গল্পের মাঝখানেই বলে উঠে, ‘কিন্তু তার শাখাপ্রশাখা, সব সমেত ? গল্পে বাধা পড়ায় এবার ছেলেটা একটু বিরক্ত হয়। বলে বড় বড় শাখা-প্রশাখা কি আর, ছােট ছােট শাখা-প্রশাখা। গুড়িটাও বাদ। ছেলেটা বলে চলে, সমস্ত দিন আমরা হৈ চৈ ফুর্তি করে ঘুরে বেড়াই অবশ্যি জেলের মধ্যে। বাইরে তাে যেতে দেয় না। আর রাত্রে কেবল ঘরে পুরে রাখে। আমরা থাকি এক ধারে, দাশ-মশাই থাকেন আরেক ধারে। সি, আর, দাশ ! তিনিও জেলে? কাঞ্চনের রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। ছেলেটা চলে গেলে কাঞ্চন নরম ঘাসের উপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ তার কথাগুলাে ভাবতে থাকে। কিন্তু চিন্তা করা কাঞ্চনের পােয় না, বিশেষতঃ পেটের মধ্যে ক্ষিদে নিয়ে ! কাল রাত্রে যে খাওয়া হয়নি এত বড় কথাটা এমন গল্পের মধ্যিখানে এতক্ষণ কাঞ্চনের মনে পড়ে নি, কিন্তু সেই কথাটাই এখন
বাড়ী থেকে পালিয়ে
তার উদরের মধ্যে একমাত্র কথা হয়ে উঠল। আচ্ছা, জেলখানায়
খেতে দেয় ত? খেতে দেয় নিশ্চয়, নইলে লােকগুলো কেবল নিমগাছের
ছােট খাট শাখা-প্রশাখা চিবিয়েই কিছু আর বাঁচে না ।
কিন্তু জেল তাে পরের কথা, কি খেয়ে আপাততঃ বাচে কাঞ্চন?
কি করে কাঞ্চন-কোথায় যায় ? কাল সকালে যে চমৎকার
ভদ্রলােকটি সঙ্গে আলাপ হয়েছিল তার কথা কাঞ্চনের মনে পড়ল।
ভলােক বলেছিলেন—এই আমার কার্ড রাখাে, এতে আমার নাম
ঠিকানা আছে। কখনাে অসুবিধায় পড়লে আমার সন্তে দেখা কোরাে।
কাঞ্চন ভেবে দেখল আজকের এই অবস্থাটাকে অসুবিধাই বিবেচনা
করতে হবে। খালি পেটে থাকার চেয়ে মারাত্মক অসুবিধা আর কি
হতে পারে? এ রকম অসুবিধায় কাঞ্চন এর আগে আর কখনাে পড়ে
নি। বাড়ীতে এতক্ষণ তার তিন বার খাওয়া হয়ে যেত।
কিন্তু সেই কার্ডধানা? পকেটেই তাে ছিল,কিন্তু কই ?, যাঃ,
হারিয়ে গেছে। তা হলে আর যাবে কি করে ? উৎসাহে কাঞ্চন
উঠে দাঁড়িয়েছিল, আবার মুহ্যমান হয়ে বসে পড়ল।
পেটের মধ্যে যেন সূচ ফুটছে।
মিনিদের বাড়ী যাবে? সেখানে হয়ত আজ বৌভাত, আজও খুব
ধাওয়া-দাওয়া। সেখানে গেলেই তাে হয়। সেই বেশ।
সেই বেশ। তাদের
বাড়ী চিনে যাওয়া বােধ হয় খুব শক্ত হবে না।
মিনিদের বাড়ীর দোরগােড়ায় সেই এটোপাতার জঞ্জাল!
ভিখারীরা তার থেকে লুচি, তরকারী, সন্দেশের টুকরাে বেছে জড়
করছে। সেই পীকৃত ভূক্তবশেষ কাঞ্চন মানসচক্ষে দেখতে লাগল।
৮০
বাড়ী থেকে পালিয়ে আর যদি সেখানে আজ বৌভাত না থাকে? নাই থাকল কোন ভােজ, সে মিনিকে ডাকবে। ডেকে বল্বে তাকে। মিনি তার ছােড়দার মত কি ভােম্বলের মত নয়, সে নিশ্চয় তাকে খুব যত্ন করে খাওয়াবে। মিনি তার চওড়া বুকের প্রশংসা করে। মিনিকে সে পাঞ্জা কষতে শিখিয়ে দেবে, ছেলেদের জন্য করার আরাে কত রকম প্যাচ আছে, সব শিখিয়ে দেবে। হ্যা। মিনির কাছে গিয়ে যদি তাকে শেখানাের এই প্রস্তাব করে সে নিশ্চয়ই ভারী খুসী হবে। তাকে নিশ্চয়ই বাড়ীর ভেতরে নিয়ে যাবে, তাদের মার কাছে। তাদের মা না জানি কি রকম! তার মার মত কি ? খেতে সে চাইবে না, কিন্তু না চাইলেও মিনি জোর করে তাকে খাওয়াবে। নিশ্চয়। হ্যা—তাই ত! ঠিক হয়েছে তবে ! আজ সকালেই তাে সে স্বপ্ন দেখেছে মিনি তাকে খাওয়াচ্ছে। মা বলেন, ভােরের স্বপ্ন ভারী সত্যি হয়। কাঞ্চন উঠে দাড়াল। স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করতে তিলমাত্র বিলম্ব তার সইছিল না। সে পাক থেকে বেরিয়ে পড়ল।
काम কিন্তু, কোথায়? এ রাস্তা ও রাস্তা কত রাস্তা ঘুরল, মিনির বাড়ীর মত বাড়ীও দু-চারটা তার চোখে পড়ল, কিন্তু সেগুলাে মিনির বাড়ী নয়। কলকাতার পথের মত বিশ্বাসঘাতক পৃথিবীতে বােধ হয় আর দ্বিতীয় নেই। এমন কি, স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস পর্যন্ত তার টলে গেল। কলকাতা-জায়গাটা বােধ হয় সৃষ্টিছাড়া, এখানে কারু স্বপ্ন বুঝি ফলে না? অনেক ঘুরে অবসন্ন হয়ে অবশেষে একটা জলের কলের কাছে দাঁড়িয়ে কাঞ্চন ধুকতে লাগল। যা তেষ্টা পেয়েছে, এক বাতি জল এক নিঃশ্বাসে উড়িয়ে দিতে পারে। রােদে ঘুরে জল খাওয়া মার বারণ, মা বলেন, জিরিয়ে পাবি। কে যেন কবে ভয়ঙ্কর গরম থেকে এসে ঠাণ্ডা জল খেয়ে হঠাং সর্দি-গৰ্ম্মি হয়ে মরেছিল, তাই থেকে মার ভারী ভয়। পাছে কাঞ্চন কোনদিন তাঁর এই নিষেধ অমান্য করে এইজন্য তিনি তাকে গা-ছুইয়ে দিব্যি করিয়ে নিয়েছেন। কাজেই, কলের সন্নিকটে রােদে দাড়িয়েই কাঞ্চন বিশ্রাম করতে লাগল। দিব্যি না মালে মা মরে যায় যদি। কিছুক্ষণ পরে যখন কাঞ্চনের মনে হ’ল যথেষ্ট জিনােনাে হয়েছে, এইবার জল খাওয়া যেতে পারে তখন কল টিপতে গিয়ে দেখে, এ কি, কল থেকে যে জল পড়েই না। আরাে জোরে, আরাে প্রাণপণ করে টেপনা, এক ফোটাও না। এ কি হল? একজন লােককে ডেকে বলে, ‘ভাই, কলটা একটু টেপাে না। ৮২
বাড়ী থেকে পালিয়ে
কিছু দূর
সে উত্তর দিল, ‘টিপে কি হবে? আর কি জল পড়বে? এগারােটা
বেজে গেছে যে। জল আসবে আবার সেই তিনটেয়।
যা? জলও খেতে পাবে—সেই তিনটেয় ?
সেই পার্কের ভেতরে একটা পুকুর আছে বটে, কিন্তু রাস্তা চিনে
কি সেই পার্কে পৌছুতে পারবে? কলকাতার পথকে তার আর বিশ্বাস
হয় না। কষ্ণেনের মাথা ঝিম্ ঝিম্ করতে থাকে।
দাড়িয়ে থেকে কোন লাভ নেই, হাঁটুতেই হবে। সেই পুকুর
তার আগে ও তিনটার আগে কোথাও জল নেই।
গিয়ে দেখে—আঃ, এই ত জল রয়েছে। রাস্তার ধারে
লোহার চৌবাচ্চায় চমৎকার জল। জল খেতে যাবে, এমন সময়ে
একজন পাহারাওয়ালা এসে তাকে বাধা দিলে। মানুষের জন্য এ জল
নয়, ভাড়াটে গাড়ীর ঘােড়ার জন্য ।
লােকটা বলে কি? ঘােড়ার জন্য জল আছে, মানুষের জন্য জল নেই ?
কাঞ্চন আর দাড়াতে পারে না, মাটিতে বসে পড়ে।
সামনে একটা ছােটখাট মুদীর দোকান, দোকানদার কাঞ্চনকে
ডাল—‘খােকা, এখানে এসে জল খেয়ে যাও।-খুব তেষ্টা পেয়েছে,
? না, না, ঘটি নয়, তােমরা কি? কায়স্থ ? তা হােক, তোমার হাত
ভারী নােংরা। বলছ আলগােছে খাবে? তা কেন, তুমি হাত পাততা,
আমি ঢেলে দিচ্ছি।
যে নােংরা হাত ঘটিতে দেবার পক্ষে অনুপযুক্ত সেই নােংরা হাতে
আকণ্ঠ জল খেয়ে কাঞ্চন অনেকখানি সুস্থ হ’ল ; তার মুখ থেকে কথা
.
বেল।
বাড়ী থেকে পালিয়ে
‘বাঃ, তােমার দোকানে ছাতুও আছে দেখছি যে !
‘তােমার চাই?
হ্যা বল বটে, কিন্তু তৎক্ষণাৎ তার মুখ চুণ হয়ে গেল! তার
অনুৎসাহ দেখে দোকানী প্রশ্ন করল, ‘ক’ পয়সা চাই তােমার ?
‘পয়সাই যে নেই আমার কাছে। শুধু একটা আনি আছে তাও
আবার অচল।
‘দেখি আনিট।। অচলই বটে, তবে আমার কাছে চলে যাবে। এর
বদলে তােমাকে দু পয়সার ছাতু দিতে পারি।
অত্যন্ত উৎসাহিত হয়ে কাঞ্চন বলল, তাই দাও।
একটা শালপাতায় তেল নুন লঙ্কা দিয়ে মাখা সেই ছাতু প্রায় চব্বিশ
ঘণ্টা অনাহারের পর কাঞ্চনের কাছে সে রাত্রের সেই বিয়ে বাড়ীর
ভােজের মতই উপাদেয় মনে হতে লাগল। আহার সমাধা করে আর
এক ঘটি জল খেয়ে কাঞ্চন দোকানীকে জিজ্ঞেস করল, 'কাছাকাছি
কোথাও পার্ক আছে বলতে পারে ?
“হ্যা, এই রাস্তা দিয়ে নাকের সােজ বরাবর চলে যাও মির্জাপুর
পার্ক পাবে। কেন পার্ক কি জন্যে?
‘খাওয়া তাে হ’লএইবার একটি তােফা ঘুম দিতে হবে। কাল
থেকে বড় হাঁটছি, আজ আর তা নয়।
তুমি দেশ-পাড়াগাঁ থেকে এসেছ ? একলা বুঝি
কান দোকানীর অনধিকার চর্চার প্রশ্রয় দেওয়া আদৌ সঙ্গত
৮৪
বাড়ী থেকে পালিয়ে মনে করল না, তার কৌতুহলের কোন জবাব না দিয়ে সে নাকের সােজা চলতে সুরু করে দিল। পার্কে গিয়ে একটা ছাতওয়ালা পরিষ্কার বেঞ্চি দেখে শুয়ে পড়ল সে। যখন তার ঘুম ভাঙল তখন ভারী সােরগােল। সমস্ত পার্ক লাল পাগড়িতে ভর্তি। কি ব্যাপার? মিটিং হচ্ছে নাকি? একধার থেকে সব গেরেপ্তার করছে বুঝি? কাঞ্চন তটস্থ হয়ে উঠে বসল। প্রথমেই তার মনে হ’ল পালাবার কথা। কিন্তু পালাতে হ’ল না, পার্কের ভেতর যে লােকজন ছিল পাহারাওয়ালারা তাদের বার করে দিচ্ছিল। কাঞ্চনকেও বেরিয়ে যেতে হল। পার্কের চার পাশের রাস্তায় বেজায় লােকের ভীড়। চার ধারেই বাড়ী থেকে পালিয়ে লােক জমে গেছে। তাদের কারু বিস্ময়, কারু উন্মাদনা, কারু শুধুই কৌতূহল। একটু পরেই ঘটনাস্থলে ঘােড়ার পিঠে চেপে সার্জেন্টরা এসে পড়ল। এসেই তারা লােক হটাতে আরম্ভ করে দিল। ঘােড়াদের এবং সােয়ারদের দেখেই জনতার মধ্যে চাঞ্চল্য জেগেছিল, সেই চাঞ্চল্য ক্রমে আন্দোলনে পরিণত হ’ল এবং সেই আন্দোলন অকস্মাৎ বেগবান্ হয়ে উঠল। অর্থাৎ, সােজা কথায় জনতা প্রস্থানােত হল । বাবা বলেন, ‘শত হস্তেন বাজিন। চাণক্যঋষি নাকি বলে গেছেন ঘােড়ার থেকে এক শ হাত দূরে থেকো। চাণক্যঋষি বােধ হয় এই সব ঘােড়াদের মানসচক্ষে দেখেই এই ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকবেন—তা হলে ঘােড়ার থেকে একশ হাত কেন এক হাত দূরে থাকাও কাঞ্চন কোনদিন প্রয়ােজন মনে করেনি; এমন কি ঘােড়া দেখলে তার পিঠের ওপরে থাকাই সে বাঞ্চনীয় মনে করেছে। কিন্তু তাদের দেশের ঘােড়া আর এই সব তীর মত উচু ঘােড়া—এ ত ঘােড়া নয়, ঘােটক মা অবশ্য শ্লোকটার অন্য রকম ব্যাখ্যা করতেন, বলতেন, যেখানে বাজি পােড়ানাে হবে সেখান থেকে এক শ’ হাত দূরে থাকবি। কাঞ্চন চিরদিনই ঘােড়ার সম্মুখে মার ব্যাখ্যাটা আর বাজির সম্মুখে বাবার ব্যাখ্যাটা বেশী পছন্দ করেছে, কিন্তু আজকের এই সঙ্কটমুহূর্তে সে বাবার ব্যাখ্যাকেই যুক্তিসঙ্গত মনে করল। কিন্তু পালাবেই বা কোথায়? এক শ' হাত ফাকা জায়গাই কি আছে? গায়ে গায়ে ঠেলাঠেসি। কাঞ্চন হতাশ চোখে চারিদিকে ৮৬ বাড়ী থেকে পালিয়ে চেয়ে দেখল, মহর্ষি চাণক্যকে অনুসরণ করবার কোন উপায়ই নেই। কিন্তু ঘােড়ারা এদিক পানে এসে পড়তেই অকস্মাৎ সেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল, সেই জমাট জনতা সঘবদ্ধ হয়ে ছুটতে লাগল । কাঞ্চন দেখল আর সবার বাবাও ছেলেদের চাণক্যঋষির উপদেশ দিয়ে রেখেছে, অতএব ভরসা আছে। কাঞ্চনকে কষ্ট করে পাও চালাতে হল , আগের এবং পেছনের চাপে মাটিতে পা না ঠেকিয়েও সে অনেকটা পেরিয়ে এল। আকাশে হাটার অভিজ্ঞতা তার এই প্রথম। যখন মাটিতে পা ঠেকল তখন সে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলে ঘােড়ারা ফিরে গেছে এবং জনতা ছত্রভঙ্গ। এত দিনে বাবার একটা কথার মানে বুঝল কাঞ্চন। পূজোর সময় হলেই বাবা পাজি দেখতেন আর মাথা নাড়তেন, ‘দেবীর এবার ঘােড়ায় আগমন ! ফল-ছত্রভঙ্গ! ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে। তখন কাঞ্চন ভাবত, এবার পূজোয় তাকে নতুন ছাতা না দেবার মতলব। তাই এত ছাতা-ভাঙার অজুহাত! দেবী ঘােড়ায় এলে তার ছাতা ভাঙে কি করে এটা কাঞ্চন কিছুতেই বুঝতে পারে নি—কিন্তু এখন সে দেখল যে ঘােড়ার হাতে পড়লে ছাতা কেন মাথা ভাঙ্গাও সম্ভব। আর ঘােড়ার হাতও যা পাও তাই—দু’টোর মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই, কাঞ্চনের মতে। কিন্তু যাই হােক, পালানােটা লজ্জার, আস্তে আস্তে কথাটা কাঞ্চনের মনে হ’ল। একা থাকলে সে হয়ত পালাতাে না, ঘােড়াদের পাশ কাটাতো—বিশেষতঃ হন্তদন্ত হয়ে এত দূর পালিয়ে আসাটা! ঘােড়ারাও ৮৭
বাড়ী থেকে পালিয়ে
তাদের ব্যবহার দেখেই বােধ হয় ললিত হয়ে ফিরে গেছে।
কি করবে, তার ইচ্ছা না থাকলেও না পালিয়ে উপায় ছিল না। যা
গে, সে আবার সেই পার্কের ধারে ফিরে গিয়ে দেখবে কি হচ্ছে সেখানে ;
এবার ঘােড়া কেন হাতী দেখলেও দৌড়াবে না, বড় জোর পাশ কাটাতে
পারে।
সে ফিরতে উদ্যত এমন সময়ে সেই ডাক্তারের সঙ্গে দেখা, যার
ডিসপেন্সারিতে বসে আগের দিন খবরের কাগজ পড়ছিল। তিনি
মােটরকারে বসে ছিলেন, লােকজনের দুটোছুটিতে তার মােটর দাড়িয়ে
গেছল। তিনি কাঞ্চনকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন ‘কি হে ছােরা,
খবর কি, তােমাদের স্বরাজ কর?
কাঞ্চন গম্ভীর হয়ে গেল, কোন উত্তর দিল না।
‘পালাচ্ছিলে যে? তুমি না বলছিলে দেশের জন্য সর্বস্ব দিতে
প'রে ?
এবার কাঞ্চনকে জবাব দিতে হ'ল । সে বিরক্ত হয়ে বল্ল-'দেশের
জন্য পারি, কিন্তু ঘােড়ার জন্য নয়।
ভদ্রলােক হেসে বল্লেন বটে? তা এসে আমার মােটরে।
তোমাকে এই গােলমাল থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছি।
‘চাই না যেতে। ঘােড়াকে আমি ভয় করি নাকি ? অনেক
ঘােড়ার পিঠে চড়েছি।
বলে কাঞ্চন আর একমুহূৰ্ত্ত অপেক্ষা না করে পার্কের দিকে পা
চালাতে শুরু করল।
পার্কের কাছে এসে দেখে আবার চারিধারে ভীড় জমে গেছে।
বাড়ী থেকে পালিয়ে দৌড়াদৌড়ির পরিশ্রমে ঘােড়াদের জিব বেরিয়ে গেছে, তারা নিরুৎসাহ হয়ে হাঁপাচ্ছে। কাঞ্চন বিস্ময় প্রকাশ করে ব, এই মাত্র এত লােক তাড়াল, আবার লােক জমে গেছে ? সােনার চশমাপরা একজন বল্ল-কলকাতা সহর, এখানে লােক কি কম? একজন পিছলে পড়লে দু’শ লােক দাড়িয়ে যায়, মােটর চাপা পড়লে দু' হাজার। এখানে ভিড় তাড়িয়ে রাস্তা পরিষ্কার করা কি সােজা কথা ? কাঞ্চন জবাব দিল- এই লােক কেহ নাহি যেতে পারে তেড়ে। যতই করিবে তাড়া তত যাবে বেড়ে ।
কাঞ্চন তখনো সেই অতিকায় অশ্বগুলাের দিকে তাকিয়ে। ঘােড়া-
গুলােকে তার আন্তরিক পছন্দ হয়েছিল। এদের পিঠে চড়তে না জানি
কি আরাম !
দেশের বেঁটে হেঁটে
টু বিস্তর চাপা গেছে, একটু
ঢ্যাঙা লােকের পক্ষে সে-ঘােড়ায়
চেপে যাওয়ার মানে পায়ে হেঁটে
যাওয়া। দস্তুরমত মাটিতে পা
ঠেকে। কিন্তু এই ঘােড়ায় যদি
চাপা যায়, যতই ঢ্যাঙা হােক না
কেন, মাটিতে পা ঠেকার তার
ভয় নেই। বরং ভয় এই, লােকের
মাথায় না ঠেকে যায় ।
আচ্ছা, সার্জেন্টদের চাকরি
কি পাওয়া যায় না?
ওদের। বেশ আরামের কাজ।
সব চেয়ে ভাল কাজ। সে বিবেচনা
করে দেখল, রাস্তায় জল ছিটানাের
কাজও ভাল বটে, কিন্তু সার্জেন্টের
চাকরি পেলে সে কাজ ছেড়ে দিতে এখুনি সে প্রস্তুত। অবশ্য
বাড়ী থেকে পালিয়ে সায়েন্টদের বেতন কত তার জানা নেই, যারা জল দেয় তারা পায় মানে আ-ঠা-বাে টাকা। সে অনেক টাকা, সার্জেন্টরা কত পায় কে জানে! বেশীও হতে পারে, কমও হতে পারে-বােধ হয় ঘােড়াটাই ওদের বেতন ! কিন্তু ভেবে দেখলে ঘােড়ায় চাপতে পাওয়াটাই কি কম হ’ল ? কাঞ্চন বিনা বেতনেই সার্জেন্ট হতে রাজী। ঘােড়ারা লােলুপ নেত্রে জনতার দিকে কটাক্ষ করছিল। তারা জিরিয়ে নিচ্ছে কিংবা আবার তাড়া করবার মতলবে আছে কাঞ্চন ঠিক বুঝতে পারছিল না। যদি আবার তাড়া করে তা হলে সে ভারী রেগে যাবে। একটু আগেই তাদের তাড়নায় পা না চালিয়ে বেগে চলার অভিজ্ঞতা সে লাভ করেছিল, কিন্তু সেই ইতিহাস পুনরাবৃত্তির অভিলাষ তার আদৌ ছিল না। আকাশ- পথে বেশী চলাচল ভাল নয়, নিরাপদও নয়—বিশে করে স্কুল- চরের পক্ষে। তাতে করে চিড়ে- চ্যাপটা হয়ে যাবার ভয় আছে। ওখান থেকে সরে পড়াটাই কাঞ্চন সমীচীন মনে করল। কিন্তু কোথায়ই বা যাবে? ভিড় ছাড়িয়ে কিছু দূর গিয়ে দেখে একজন ফেরিওয়ালা আলু-কাবলি হেঁকে চলেছে। কলকাতায় পা দিয়ে অবধি এই অপূৰ্ব খাদ্যটি বহুবার তার চোখে পড়েছে, দেখা মাত্র তাকে খাদ্য বলে সনাক্ত করতে তার বিলম্ব হয় নি এবং বাড়ী থেকে পালিয়ে তার অপূৰ্ব্বতা সম্বন্ধেও তার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। কিন্তু টাকে পয়সা না থাকায় জিনিসটা কেবল চোখে দেখাই হয়েছে, চেখে দেখা হয় নি। সে মনে মনে প্রশ্ন করল, সকালে যখন অচল আনিটার বদলে দু’পয়সার ছাতু সে কি তখন এই ফেরিওলা ব্যাটা ছিল কোথায় ? কাছাকাছি থাকে নি কেন? তা হলে ত সে ছাতু না কিনে আলু- কাবলিই কিন্ত—আনিটার বদলে দু’পয়সার না দিক এক পয়সার দিতে কি খুব আপত্তি হত ওর? এই সব দার্শনিক প্রশ্ন-জিজ্ঞাসায় সে যখন ব্যতিব্যস্ত সেই সময়ে সকাল বেলার আলাপী সেই ছেলেটির সঙ্গে তার দেখা হল। ছেলেটা হন্ হন্ করে চলেছে, কাঞ্চন তাকে ডাক দিল, এমন ছুটে চলেছ কোথায় ? ‘মিটিংএ যাচ্ছি। কেন মিটিং হচ্ছে না? —যেয়াে না, যেয়াে না, সেখানে ভারী ঘােড়র উপদ্রব ? —“তাই বুঝি পালিয়ে এসেছ তুমি ? ‘পালিয়ে আসব কেন? আলু-কাবলি কিনতে এলাম আমি। ছেলেটি তাকে ধিক্কার দিল, 'দেশের চেয়ে আলু-কালিই তােমার কাছে বড় হ’ল ! কাফন অপ্রতিভ হবার ছেলে নয়, ‘বাঃ, তােমরা যদি একটা আস্ত নিমগাছ তার সব হােট-খাট শাখা-প্রশাখা সমেত খেয়ে শেষ করতে পার, আমার বেলা আলু-কাবলি খেলেই দোষ ? নিমের চেয়ে আলু- . কালিটা কি খারাপ হ’ল ?”
বাড়ী থেকে পালিয়ে কাঞ্চনের যুক্তির বহরে ছেলেটা ধাক্কা খেল। সে আমতা আমতা করে বল্ল, 'নিমগাছের চেয়ে ভাল হতে পারে স্বীকার করি, কিন্তু তাই বলে কি দেশের চেয়েও? -বারে! দেশ সেখানে কোথায় ? কেবল মানুষ আর ঘােড়, ঘােড়া আর মানুষ ! দেশ-টেশ সেখানে দেখতে পেলুম না তাে! ছেলেটি সবিস্ময়ে বল, বল কি! ‘তাও আবার মানুষগুলাে ঘােড়ার ঠেলায় ছুটোছুটি করে মরছিল, কোথায় পালাবে পথ পাচ্ছিল না। তাই ত আমি বিরক্ত হয়ে চলে এলাম। তাকে যদি তুমি মিটিং বল ত বলতে পার, কিন্তু আমার মতে সেটা মিটিং নয়, রানিং——মানুষ আর ঘােড়র রানিং। ছেলেটি বিরক্তি প্রকাশ করল, ওগুলাে মানুষ নয়, সব গাধা। কাঞ্চন ভারী বিস্মিত হ’ল, ছেলেটা বলে কি, রীতিমত জলজ্যান্ত মানুষ-সেগুলাে সব গাধা হয়ে গেল? গাধা তো তার মধ্যে একটাও তার চোখে পড়ে নি! অনর্থক দ্বিপদ প্রাণীদের চতুষ্পদে প্রামােশন দেওয়া সে সঙ্গত মনে করল না, কিন্তু কথা আর না বাড়িয়ে ছেলেটির মতেই সায় দিল, ‘তা হবে তুমি যখন বলছ। -“তা হবে কি, নিশ্চয় তাই। গাধা থাকতে দেশের কি আশা বল? ‘তা বটে, কিন্তু ঘােড়া থাকতেও দেশের কোন আশা নেই। তা মিটিংএ তুমি কেন যাচ্ছিলে? বক্তৃতা দিতে। -আরে দূর দূর, বক্তৃতা আবার মানুষে দেয়!
বাড়ী থেকে পালিয়ে –কেন? মানুষে দেয় না ত গরুতে দেয় নাকি বক্তৃতা ? –বক্তৃতা দিতে হলে দম আটকে আসে, কথা খুজে পাওয়া যায় না। কাপড়-জামা ঘামে ভিজে যায় । আমাদের ইস্কুলের মিটিংএ আমি একবার বক্তৃতা দিয়েছিলাম, জীবনে আর কখনাে দেব না। বাবা, কি নাকাল । ‘আমার কিন্তু ভালাে লাগে বেশ। —ভারী খারাপ কাজ বক্তৃতা দেওয়া। ওর চেয়ে Essay লেখা ভাল। অন্য বই থেকে টোকা যায়, কিন্তু বক্তৃতার বেলা কি মুস্কিল দেখ, তােমাকে হরদম্ বলে যেতেই হবে, অথচ টোকবার কোন উপায় নেই। তার চেয়ে বক্তৃতার শেষে কসে হাততালি দিতে ভারী মজা! আজকাল আমি বক্তৃতা দিই না, হাততালি দিই।' ছেলেটি গম্ভীর ভাবে বল, আমি খুব ভাল বক্তৃতা দিতে পারি । তােমার মত অমন হাঁপিয়ে উঠি না। অনেক বক্তৃতা দিয়েছি আমি। কাঞ্চন ওকে উৎসাহ দিল, ‘বেশ, তা হলে এখানেই দিয়ে ফেল না কেন একখানা। আমি খুব জোর হাততালি দেব। ‘একজন হাততালি দিলে কি হবে? আর শােনার লােক কই ? ‘আরম্ভ করলেই সব এসে জুটবে। কিন্তু ওই আলু-কাবুলিওয়ালাকে শােনানাে চাই, তােমার বক্তৃতায় দেশের প্রশংসা ত করবেই সেই সঙ্গে ওর আলু-কালির একটু প্রশংসা করে দিয়ে।-ও যদি খুসী হয়ে এক পয়সার আলু-কাবলি আমাদের দিয়ে দেয়। ছেলেটিও এই আইডিয়াটা নেহাং মন্দ লাগল না। সে উৎসাহিত ১৪
বাড়ী থেকে পালিয়ে
হয়ে বলল, “বেশ হয় তা হলে! হাততালি আর আলু-কাবলি-দুটো
লাভ। বেশ আমি রাজী
তার কথা শেষ হতে না হতে’ কাঞ্চন এক ছুটে পাশের সরু গলি
দিয়ে কোথায় যে ভোঁ দৌড় দিল দেখা গেল না। ছেলেটি বিমূঢ় হয়ে
এদিক ওদিক তাকিয়ে দূরে এক অশ্বারােহী সার্জেন্টের আবির্ভাব লক্ষ্য
করল। অভীত কাপুরুষ কাঞ্চনের ওপর তার অত্যন্ত ঘৃণা হ'ল।
ছিঃ, ভারী ভীতু ত ছেলেটা।
কাঞ্চন ফিরতেই সে জিজ্ঞাসা করল, ‘পালালে যে হঠাৎ?
-“বাবার মত একজন লােক এই ফুটপাথ দিয়ে আসছিল যেন
দেখলুম, পরে দেখলুম বাবা নয়, তাই আবার চলে এলুম।
‘বাবাকে বুঝি তােমার বড় ভয়? আমি ভেবেছিলুম তুমি
ঘােড়ার ভয়ে পালালে।'
-“হু। ঘােড়াকে আমি ভয় করি নাকি ? দিক না আমায় ছেড়ে,
আমি চেপে দেখিয়ে দিচ্ছি।
ছেলেটি বড় বড় চোখ করে জিজ্ঞাসা করল, ‘ঘােড়ায় তুমি চাপতে
জান? চেপেছ কখন?
‘আকছার।
-“কিন্তু যদি পিঠে নিয়ে ছুট মারে?
—“ছুটলেই ত মজা! কিন্তু ছােটে কই ? যে-সব বেঁটে বেঁটে
ঘােড় আমাদের দেশের,-দশ ঘা মারলে তবে এক পা নড়ে।
-ওঃ, বেঁটে বেঁটে ঘােড়া! তাই বল। এ ঘোড়ায় আর তােমায়
চড়তে হয় না—কী উচু দেখেছ?
.
বাড়ী থেকে পালিয়ে -“উচু হ’ল ত কী! হাতীতে যেমন করে ওঠে তেমনি করে উঠব। —“কেমন করে? ছেলেটির বিস্ময় উত্তরােত্তর বেড়েই চলে। এই পাড়াগাঁর ছেলেটি কলকাতার ছেলের কাছে নতুন মহিমা নিয়ে দেখা দেয়। ঘােড়াতে ত ও চেপেইছে, হাতীতে চাপতেও ওর বাকী নেই। হাতীতে ওঠা দূরে থাক, চিড়িয়াখানায় অমন যে জনপ্রিয় মানুষ-বংসল হাতী তার কাছে যেতেও তার ভয় করে। যদি দৈবাৎ ভুলে মাড়িয়ে দেয় তা হলেই ত সদ্য ছাতৃত্ব-প্রাপ্তি ! কাঞ্চন অবলীলায় উত্তর দেয়, ‘কেন, লেজ ধরে উঠব। সেই সঙ্গে ছেলেটির দিকে কুপার সঙ্গে তাকায়। ছেলেটি এবার মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করে, কিন্তু তুমি সাইকে চালাতে জান না তাে। ঘােড়ায় চাপা তাে সােজা, সাইকেলে ব্যালান্স রাখতে হয়। —ঢের ঢের সাইকেল চালিয়েছি। সাইকেল চালানাে যে একটা বাহাদুরি কাঞ্চন সে কথা আমলই দিতে চায় না। ‘কখনাে মটর চেপেছ? ছেলেটি রুদ্ধ নিঃশ্বাসে কাঞ্চনের জবাবের প্রতীক্ষা করে। এরই উত্তরের ওপর যেন তার আত্মসম্মান নির্ভর করছে। কাঞ্চন এবার দমে যায়, মটরের ওপর ওর ভীষণ লােভ কিন্তু এখনাে চাপবার সুযােগ হয় নি ওর। সেই ডাক্তার হতভাগা বলছিল বটে তাকে চাপতে, ইচ্ছা হয়েছিল তার, কিন্তু অমন বি লােকের সঙ্গে মটরে যেতে কেন, স্বর্গে যেতেও তার রুচি নেই—অনেক কষ্টে সে তখন আত্মসারণ করেছে। কিন্তু চাপলেই যেন ভাল ছিল, এখন ত সে অনায়াসেই ‘ই’ বলে তার প্রতিশ্রীকে কাবু করে দিতে পারত। নিশ্যে করে ।
বাড়ী থেকে পালিয়ে
বলতে তার নিজের কাছে মাথা কাটা যায়—সে কথা সে কিছুতেই
বলবে না।
ছেলেটির প্রশ্নকে যেন সে গ্রাহই করে না এমনি ভাবে জবাব দেয়,
‘মটর আমরা খাই। পাবা মাত্রই খেয়ে ফেলি।
যথার্থ উত্তর না পেয়ে ছেলেটি মনে মনে চটে যায়। এ রকম ব
বাক্যবাগীশদের সঙ্গে কথায় কে পারবে? বিরক্ত হয়ে সে অদূরে পাশের
বাড়ীর বােয়াকে গিয়ে বসে পড়ে।
কাঞ্চন আলু কাবলিওয়ালার কাছে যায়, তােমার এ সব তাে বহুৎ রােজের বাসি? নইলে কিতাম দু’ আনার। শূন্য পকেটে হাত ভরে দেয় কাঞ্চন। আলু-কাবলিওয়ালা জবাব দেয়, ‘পহলে খাকে তব দাম দিজিয়ে। দু’ আনার আলু-কাবলি এ পর্যন্ত কোন ছেলে কেনেনি তার কাছে—উৎসাহ এবং সন্দেহের চোখে সে কাঞ্চনকে লক্ষ্য করে। কিন্তু পকেটস্থ হাতকে সে অবজ্ঞা করতে পারে । কাঞ্চন বলে, “আরে কিলে ত দাম দেব নিশ্চয়। পহেলা থােড়। চাপনে তাে দাও, দু’ আনার কিনে গা। আলু-কাবলিওয়ালা কিছুটা শাল-পাতায় ক'রে কাঞ্চনকে দেয়। কারুন ঠোঙাটা হাতে নিয়ে বােয়াকে ছেলেটির পাশে গিয়ে বসে। কোন কথা বলে না, শাল-পাতাসমেত সমান অর্ধেক ভাগ করে ছেলেটির হাতে দেয়। ছেলেটি একবার তার দিকে তীক্ষদৃষ্টিতে তাকায়, কিন্তু কিছুমাত্র আপত্তি না করেই আলু-কাবলির অংশ গ্রহণ করে। নীরবে দু’জনের মুখ চলতে থাকে। শাল-পাতাটাকে জিভ দিয়ে সুচারুরূপে মার্জিত করে কাঞ্চন ফেলে দিল, বােধ হয় খুব দুঃখের সঙ্গেই। সত্যিই, ভারী চমংকার খাবার, চেহারা দেখে যেমন সে কল্পনা করেছিল ঠিক তাই। কাঞ্চন বুঝতে পেরেছিল যে ছেলেটি তার উপরে রেগেছে; এবং বাড়ী থেকে পালিয়ে তার ধারণায় খাবারই হচ্ছে রাগ ভাঙানাের শ্রেষ্ঠ উপায়। যে রাগ কথায় পড়তে চায় না, খাদ্যের মধ্যস্থতায় তা সহজেই অনুরাগে পরিণত হয়। কাঞ্চন তার একটা কারণও আবিষ্কার করেছিল, তা হচ্ছে এই খাদ্যের দ্বারা দু'জনের মধ্যে একটা উদরের সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। আবার হৃদয় জিনিষটা উদরের খুব কাছাকাছি আছে কি না, তাই হৃদয়ের সম্বন্ধ হ'তেও বেশী দেরী হয় ন'। ৪ে কাঞ্চন মনে মনে পৰ্যালােচনা করতে লাগল—না, উদরকে ঠিক হৃদয় বলা যায় না, সে কথা সত্যি। মেষশাবক বাঘের উদরে স্থান পায়, কিন্তু হৃদয়ে স্থান পায় কি ? নাঃ, উদর আর হৃদয় এক জিনিষ নয় তবে
বাড়ী থেকে পালিয়ে
উদরকে হৃদয়ের দরজা বলা যেতে পারে। আলু-কাবলির দ্বারা ছেলেটির
হৃদয়ঘরে করাঘাত করতে পেরেছে বলে তার মনে হ’ল। তাই এতক্ষণ
বাদে অত্যন্ত সন্তর্পণে সে কথা কইল, ‘তােমার নামটি কি ভাই?
কনক? কনক ভারী চমৎকার নাম। বল কি, তােমার নাম
কনক? এ রকম নাম তাে এর আগে আমি শুনি নি ! এমন সুন্দর
তােমার নাম!
কাঞ্চনের উচ্ছাস দেখে ছেলেটি বিস্মিত হ’ল ।
নিজ নামের
গুণগানে কে না খুসী হয়? কাঞ্চনকে তার আবার ভাল লাগল ।
মটরে
চাপুক, নামের মর্যাদা সে বােঝে ।
কাঞ্চন বল, ‘এ রকম চমংকার নাম পৃথিবীতে আর একটিও নেই,
কিংবা আর একটিই আছে কেবল।
‘কার নাম? কনক জিজ্ঞাসা করল। তার নামের মত চমৎকার
নাম আর একটা আছে সেজন্য সেই অপরিচিত নামধারীর ওপর মনে
মনে তার ঈর্ষা হ'ল।
কাঞ্চন বলে চল, কনক? গোন্ড মানে কনক, কোভ মানে ঠাণ্ডা,
ও মানে পুরাতন, আর সােন্ড মানে বিক্রয় করিয়াছিল।
ছেলেটার মাথায় ছিট আছে নাকি! কনক ভাবে। কিন্তু আর
একটা নাম আমার মত আছে তুমি বললে যে? কনক আবার
জিজ্ঞাসা করে।
• ইn। সে নামটাও খুব চমৎকার।
কার নাম ?
বাড়ী থেকে পালিয়ে
কাঞ্চন বুক ফুলিয়ে জবাব দেয়, কেন, আমার ! আমার নাম
কাঞ্চন। কনকও যা কাঞ্চনও তাই—একই মানে।
‘তােমার নাম বুঝি কাঞ্চন ? জানতাম না ত।' কনক একটু
ভাবতে থাকে তারপর বলে, যখন এক নাম তখন আমাদের মধ্যে
খুব ভাব হবে, না ?
তে
কাঞ্চন বলল, চল একটু বেড়াই এধারে-ওপারে । বেড়াতে আমার খুব
ভাল লাগে।
কনক বল, আমাদের বাড়ী ত কাছেই, চল না কেন, মা খুব
খাওয়াবেন। বাবার সঙ্গেও তােমার আলাপ করিয়ে দেব।
খাওয়ার কথায় কাঞ্চনের উৎসাহ হ'লেও বাবার কথায় সে দমে
গেল, বল, বাবাদের সঙ্গে আমি আলােপ করি না।
‘কেন বাবারা কি খারাপ লােক।
নিরাসক্ত ভাবে কাঞ্চন জবাব দিল, 'সচরাচর।
বাবাদের ওপর কনকের স্বাভাবিক পক্ষপাত ছিল, কেননা পয়সা-
কড়ি বাগাতে হলে বাবার মত বস্তু পৃথিবীতে নেই। এই ত’ সেদিনই,
তাদের বয়েজ ক্লাব থেকে যা চাদা উঠেছিল তাতে আর ক্রিকেট-সেট
কেনা হ'ত না—কিন্তু কনক তার বাবাকে গিয়ে ধরতেই কাবু এণ্ড
মহলানবিশ থেকে অমন ভাল ক্রিকেটু-সে চলে এল আর চেকটা বাবাই
কেটে দিলেন। কাঞ্চনের কথার প্রতিবাদ করল কনক, ‘বাবাদের কিছু
তুমি জান না।
অভিজ্ঞ ব্যক্তি-সুলভ ওদা-ভরে কাঞ্চন বলল, হাড়ে হাড়ে জানি
বাবা।
‘আমার বাবার তুমি কিছু জান না। আমার বাবা তেমন নন্।
তােমার বাবা তােমাকে ক'দিন অন্তর ঠেঙান ?
বাড়ী থেকে পালিয়ে ‘নে, ঠেঙাবেন কেন? তা না হলে ছেলে মানুষ হয় কখনন? চাণক্য বলে গেছে কিনা ‘লালয়ে পঞ্চবর্ষাণি’—কি সব সংস্কৃত শ্লোক আমার মনে থাকে না ; বাবা আওড়ান। মানে তার মােন্দা এই, পাঁচ বছরের পর থেকেই ছেলে পিটুতে সুরু করবে যােল বছর পর্যন্ত, তবেই সে ছেলে মানুষ হবে। কনক সবিস্ময়ে প্রশ্ন করে, তা না হলে আর মানুষ হবে না? কাঞ্চন মাথা নেড়ে বলে, কি করে হবে? পিটেই ত সব কিছু হয়—লােহা পিটে হাতুড়ি হয়, সােনা পিটে গহনা হয়, তেমনি ছেলে পিটুলেই মানুষ হয় । মানে এটা হচ্ছে গিয়ে বাবার মত, আমি কিন্তু এ কথা বলি না। আমার ছেলের গায়ে আমি মােটেই হাত দেব না, তুমি দেখে নিও। “তােমার বাবা তা হলে তােমাকে মারেন ? ‘তা কি মারতে দিই? ছেলেবেলায় যা মেরে-ধরে নিয়েছেন। তবে এখনাে কয়েক বছর সাবধানে থাকতে হবে আমায়। ‘কেন? এখনাে আমার ঘােল বছর হয় নি কিনা! ‘ও! তারপর আর বাবার ভয় থাকবে না বুঝি? ‘ভয় আমি করি না কাউকেই। তবে একে বাবা, তায় বয়সে বড় কি করি বল? কিন্তু বাবার চেয়ে চাণক্য শ্লোককেই আমার বেশী ভয়, ওই শান্তটা বাবা মানেন কি না! তা, তােমার বাবাও তত তােমাকে মারেন নিশ্চয়ই?
বাড়ী থেকে পালিয়ে ‘মােটই না। আদর করবার সময় ছাড়া গায়ে হাতই দে না। বল কি! তােমার বাবা চাণক্যকে মেেনন না বুঝি? হায় হায়, তুমি আর মানুষ হবে না! ‘আমার বাবা বলেন গাধা পিটে ঘােড়া ত হয় ছাই, বরং অনেক ঘােড় পিটুনির চোটে গাধায় গিয়ে দাঁড়ায়। কাঞ্চন বিজ্ঞতার সঙ্গে বলে, ‘তােমার বাবার দেখছি শাস্তর-টান্তর পড়া নেই। সমসকৃত উচ্চারণ করা শক্ত কিনা, সেই ভয়েই পড়েন নি। কনক গর্বের সঙ্গে বলে, আমার বাবা ইয়া মােটা মােটা ইংরেজি বই বড়েন। হতাশার সহিত কাঞ্চন উত্তর দেয়, ম্লেচ্ছ হয়ে গেছেন ? আর আশা নেই—তােমারও নেই তােমার বাবারও নেই। না থাক গে, আমার বাবা আমায় কত ভালবাসেন। বায়স্কোপে, ফুটবল ম্যাচে নিয়ে যান। আমায় কেমন গল্পের বইয়ের লাইব্রেরী করে দিয়েছেন। সাইকেল আছে, ক্যারম্ বাের্ড আছে আমার। জন্মদিনে কত উপহার দেন—আমার আসছে জন্মদিনে একটা ফাউন্টে পেন দেবেন বলেছেন। পনের-পনের টাকা তার দাম। কাঞ্চনের ভারী বিস্ময় লাগে। এ রকম বাবাও পৃথিবীতে আছে নাকি। মােটেই চাণক্য শ্লোকের ধার ধারেন না, তার ওপরে কত প্রাইজ, দে আবার ! আশ্চৰ্য্য তাে! (তার তত এতদিন মনে হত। যে বাবা নামক মমিতে মা-ই একমাত্র ওয়েসিস অল্পদিন হ’ল বই পড়ে এই উপমাটা কাঞ্চন আয়ত্ত করেছে)। এ ছাড়া অন্তবিধ বাবার অস্তিত্ব কোনদিন তার কল্পনাতেও আ,ে নি। বাবা বলতেই তার ১০৪ বাড়ী থেকে পালিয়ে মনে হয় ওরে বাবা ! আর মা? মা বলতেই যেন গা জুড়িয়ে যায়, মনটা মিষ্টি হয়ে ওঠে, ভাবতে কেমন ভাল লাগে ! কিন্তু কনকের কথা যদি সত্যি হয় তা হলে বলতে হবে পৃধিবীতে মার-মত-বাবাও আছে, যাকে নিঃসন্দেহ মা’র মধ্যেই গণ্য করা যেতে পারে। তবু কনকের বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আর রুচি হ’ল না। একটা বাবার সঙ্গে দেখা করতে যেতে হবে পা ঘামিয়ে ? মা হলেও বরং কথা ছিল। রাস্তা দিয়ে দু’সারি যত লােক যাচ্ছে তাদের মধ্যে ছেলেরা বাদে প্রায় সবাই তাে বাবা-কারুর না কারুর?সব বাবাই প্রায় সমান; এদের যে কোন একজনকে দেখলেই দেখলেই বাবা-দর্শনের প্রয়ােজন মিটে যায়। তাদের গ্রামের সে-ক’টি বাবার সঙ্গে তার পরিচয় আছে প্রত্যেকেই তারা ছেলে মানুষ করতে বদ্ধপরিকর-নিজেদের ছেলের পিঠেই সেই মহৎ প্রয়াসের বিজ্ঞাপন তারা জাহির করেন। কনক যা বলছে তা সত্যি হলে বুঝতে হবে যে ওর বাবাটিই হচ্ছে সৃষ্টি- ছাড়া। সচরাচর বাবারা ও রকম হন না। ‘দেখ দেখ, একটা দড়া নিয়ে ওরা কি করছে'—বলতে বলতে কাঞ্চন লাফিয়ে ওঠে। পাশের খেলার মাঠে কোন য্যাথলেটিক ক্লাবের স্পাের্টস চলছিল, কাঞ্চন সেই দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। একটা দড়ি নিয়ে ও রকম কাড়াকাড়ি করছে কেন? খুব দামী জিনিষ নাকি? ‘ওদের স্পাের্টস হচ্ছে। সে আবার কি ? ‘কেন, তােমাদের গাঁয়ের ইস্কুলে ছেলেরা খেলা ধূলাে করে না?
বাড়ী থেকে পালিয়ে
‘আমরা ডাণ্ডাগুলি খেলি।
‘বাবা! কোন্ অজ পাড়াগেঁয়ে তুমি থাক?'—এতক্ষণে বাহাদুরি
জাহির করবার সুযােগ পেয়ে কনকের মনটা খুসী হয়। স্পাের্টস কাকে
বলে জানে না এ ছেলেটা! অদ্ভুত! ‘ওরা যা করছে ওর নাম
টাগ-অফ-ওয়া--বুঝলে?
বিজ্ঞভাবে মাথা নেড়ে কাঞ্চন বলে, “অনেকক্ষণ আগেই বুঝেছি।
কিন্তু অত টানাটানি করা কেন? দড়ি তত কম নেই, মাঝখান থেকে
কেটে দু'ভাগ করে নিলেই হয়।
লােকগুলাের নির্ধ দ্ধিতা দেখে বিস্ময়ের আতিশয্যে কাঞ্চন এমনই
মুহমান হয়ে পড়েছিল যে কখন অজ্ঞাতসারে সে একজন মেমসাহেবের
ক্ষিপ্রগতির সামনে এসে পড়েছে তা দেখতেই পায় নি। ধাক্কা খেয়ে
কাঞ্চনের হস হল । তার রাগও হয়ে গেল ভয়ানক। চট-মটে সে
বলে উঠল, ‘ডােন্ট, মমম্ ।
মেম সাহেব দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আই অ্যাম সরি।
কনকের ভারী হাসি পেল, সে বল,
‘তুমি দেখছি ইংরিজিও
জান না। “ডােন্ট মেম্ আবার কি হে! মেম-টা কি কোন ভাব,
যে ছােট হবে?
কি! কাঞ্চন ইংরেজি জানে না! এমন কথা বলে—এই পুঁচকে
ছেড়াট। তার মুখের ওপর! কাঞ্চন তখনই মেমটির কাছে দৌড়ে
গেল। পেছন থেকে ডাকতে লাগল, ‘হিয়ার মি, হিয়া মি স্যার!
মেমসাহেব দাড়িয়ে পড়লেন। কনক ভারী হাসতে লাগল
মেয়েছেলেকে বলছে কিনা স্যার! কাঞ্চন জানে কাউকে সম্মান দেখিয়ে
বাড়ী থেকে পালিয়ে
কথা কইতে গেলে স্যার বলতে হয়, ইস্কুলের মাষ্টার মশাইদের তাই
সে বলে-এতে হার কি আছে ? কনকের ব্যবহারে কাঞ্চন অত্যন্ত
মর্মাহত হ’ল। মেমটির কাছে গিয়ে গভীরভাবে সে বল, ‘আই
য্যাম্ নট গ্যাঙ।
মেমসাহেব বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে, ‘হােয়াট?
কাঞ্চন তাকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেয়, ‘ইউ টেল ইউ আর সরি,
বাট আই টেস্ আই য্যাম্ অসাে নটু ম্যাড। ডু ইউ নন?
মেমটি হাসতে হাসতে চলে যায়। কাঞ্চন ভুরু কুঁচকে ফিরে
আসে। কনক তখনাে হাসছে। তার মুখের উপর বলে দেয় ‘ইউ
আর ভেরী ব্যাড বয়, আই ডােন্ট, টক উইথ ইউ। বলে সটান্ সে
রাস্তা পেরিয়ে সামনে যে-গলি পড়ে তার মধ্যে ঢুকে হারিয়ে
কন। মুখে হাসি মিলিয়ে আসে। একটু আগেই যে বন্ধুত্ব
চিরস্থায়ী ; 'র তারা কল্পনা করেছে প্রথম সূত্রপাতেই তা যে এমনি
করে হঠাং ছিড়ে যাবে ভাবতে পারা যায় না। যাক গে—তার বয়েই
গেছে। ভারী গুড বয় উনি—অমন একটা মুখর সঙ্গে বন্ধু পাতাতে
বয়েই গেছে তার। বলে কিনা ডােন্ট মেম্ ।
এ-গলি সে-গলি ঘুরে আবার বড় রাস্তায় পড়ে কাঞ্চন। আনমনে
সে চলতে থাকে। ভারী ছােট লােক ওই কনকটা! আদর দিয়ে
দিয়ে ছেলেটার মাথা খেয়েছেন ওর বাবা! কোনদিন ও মানুষ হবে না।
ইংরেজি ও জানতে পারে—মিনির দাদার মত—কিন্তু মানুষ ও হবে না
কোনদিন, এ কথা কাঞ্চন হলফ করে বলে দেবে।
নিয়মিত
১০৭
বাড়ী থেকে পালিয়ে
এহারকে ওর নিত্যকার খাদ্যতালিকার অন্তভুক্ত না করে ওর
বাবা ভয়ানক ভুল করেছেন। তাতে কষ্ণেনের আর কি এসে যাবে,
কনকেরই ক্ষতি! কাঞ্চনের হাত নিসপিস করতে থাকে-হঠাৎ তার
মনে হয়, একেবারে চলে আসবার আগে কনকের খানিকটা ক্ষতিপূরণ
করে দিয়ে এলে মন্দ হত না।
ভক ভক ভে-
ধূসর রঙের প্রকাণ্ড একখানা মােটর তার পাশে এসে দাড়িয়ে
পড়ল। ভেতর থেকে বিরক্তিপূর্ণ কণ্ঠস্বর শােনা গেল, আর একটু হ'লে
চাপা পড়তে যে! নিজেও মরতে, আমাকেও মজিয়ে যেতে। রাস্তা
চম্বার সময় চোখ-কানগুলাে থাকে কোথায়?
আরােহীর আর্তনাদ কানে না তুলে নিস্পলকনেত্রে সে গাড়ীটার
দিকে তাকিয়ে থাকে তার পরে গম্ভীর ভাবে সার্টিফিকেট দেয়, ‘ভারী
চমৎকার এই গাড়ীটা! কলকাতার সব গাড়ীর চেয়ে ভাল ।
তার কথা শুনে ভদ্রলােক ভারী কৌতুক বােধ করলেন।
‘তােমার পছন্দ হয়েছে গাড়ীখানা? চাপবে একটু ?
কাঞ্চনের লােভ হয়, প্রস্তাবটা গ্রহণ করবে কিনা একবার ভাবে।
সন্দেহের চোখে ভদ্রলােককে একবার দেখে নিয়ে সে জিজ্ঞাসা করে,
‘আপনি ডাক্তারি করেন না তাে?
‘না। কেন?
‘ভাতারদের আমার মােটই ভাল লাগে না। তাদের গাড়ীতে
আমি চাপতে চাই না।
“না না আমার চোদ পুরুষে কেউ ডাক্তার নেই।'
বছেন,
১০৮
বাড়ী থেকে পালিয়ে
আশ্বস্ত হৃদয়ে তখন কাঞ্চন গাড়ীতে উঠে বসে। ভদ্রলােক জিজ্ঞাসা
করেন, ‘তুমি ভাতারদের ভয় কর নাকি?
উহু, ভয় করি না কাউকে আমি। তবে ভাল লােক নয় ওরা
যারা ডাক্তার আর যারা চা বিক্রী কবে।
ভদ্রলােক একটু অবাক হন, তার পরে বলেন, যাক গে ।
ডাক্তারেরা সব জাহামে যাক, ওই সঙ্গে যত চা-ওয়ালার। এমন কি
১)
চা-বাগানগুলাে গেলেও আমার দুঃখ নেই। আমি না হয় কোকো
খেয়েই থাকব। তুমি আমার একটা কাজ করতাে।
ভলােক একখানা খবরের কাগজ মেলে কাঞ্চনের সামনে ধরলেন।
গাড়ী চলতে লাগল।
‘দেখ, এইগুলাে পড়ে দেখ। এগুলাে সব ঘােড়ার নাম। এর
মধ্যে একটা নাম ভূমি পছন্দ কর।
বাড়ী থেকে পালিয়ে কাঞ্চন ভারী অবাক হয়। এতক্ষণ তাে সে ঘােড়ার সঙ্গেই যুদ্ধ করেছে আবার এখানেও সেই ঘােড়! কলকাতার লােকগুলাের কি ঘােড় ঘােড় করে মাথা খারাপ হয়ে গেছে না কি? সে জিজ্ঞাসা করে, কেন ? ‘বছি পরে। এই দেখ, দশটা নাম আছে। এর মধ্যে কোন্টা তােমার পছন্দ? কাঞ্চন মনে মনে ভাবে, এই ঘােড়া গুলাে-যারা তাদের তাড়া করেছিল তারা তা হলে নেহাং কেউকেটা নয়, ছাপার অক্ষরে ওদের সব নাম বেরিয়ে গেছে। মহাত্মা গান্ধী, সি, আর, দাশের সঙ্গে ওদের নাম ছাপা হয় কাগজে-সামান্য কথা নয়! সবিস্ময় কৌতূহলের সঙ্গে নামজাদা ঘােড়াদের মধ্যে একটাকে পছন্দ করার কাজে সে মনােনিবেশ করল। কিন্তু কি অদ্ভুত অদ্ভুত সব নাম। মানে বােয়া দুরে থাক, বানা করাই শক্ত। ভাগ্যিস ভদ্রলােক ওগুলাে রিডিং পড়তে বলেন নি। অনেক ভেবে চিন্তে সে একটা নাম দেখাল। ‘মাই মাদার’? মাই মাদার কি জিতবে? আশা কম। আচ্ছা ধরব আমি কিছু ওতে। যদি জেতে, যা পাব অর্ধেক তােমার। কেমন ? } আঠার কাঞ্চন অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘ঘােড়া আবার কি জিতবে? ‘রেস কাকে বলে জান না বুঝি? রেস্ কয় প্রকার? জানি না ত ! ‘দুই প্রকার। হিউম্যান্ রেস আর হস্ রেস্। আমরা হিউম্যান্ রেসের মধ্যে, কিন্তু হস্’ রেস্ না হলে আমাদের চলে না। বুঝতে পারলে?” কাঞ্চন ঘাড় নেড়ে বল, ‘না। ‘তার মানে হিউম্যান্ রে আমাদের বিশ্বাস ক্রমশঃ কমে আসছে এবং হস্ রে বাড়ছে। মানুষ হলেও ঘােড়াকে ফলাে করতে আমরা ভালবাসি। কাঞ্চন এবার ঘাড় নাড়ে, বুঝতে পেরেছি। অর্থাৎ কিনা আমরা ঘােড়ার রাজত্বে বাস করছি, এই ত? একটু আগেই তা টের পেয়েছি, যা ছুটতে হয়েছিল। কিন্তু তখন ত ঘােড়ারাই ফলাে করছিল আমাদের ? “উহু, তা নয়, ঘৌড়দৌড় কাকে বলে জান না? ঘৌড়দৌড়ে বাজি জেতে শােন নি? ‘ও ঘােড়দৌড়? হ্যা, শুনেছি। বাবা বলেন, ওতে বাজি ধরে মানুষ ফতুর হয়ে যায়। ও খেলা ভারী খারাপ। আমার দাদামশায়রা খুব বড়লােক ছিলেন কিন্তু ঘােড়দৌড়ে ১১১
বাড়ী থেকে পালিয়ে
‘ফতুর হয়ে গেছেন? বরাত খারাপ থাকলে অমন হয়। আমার
কপাল খুব ভাল, আমি ত প্রায়ই জিতি। এই যে এসে পড়েছি।
ওই হচ্ছে রেসকোর্স। দেখছ, কি রকম লোকের ভিড় ! আমি
ভেতরে চল্পম, ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই আসব। তুমি এই গাড়ীতেই
বসে থাক, চলে যেও না যেন। যা দরকার হয় শােফারকে বলল।
চারিদিকে লােক, কেবল লােক। অনেকখানি জায়গা ঘিরে গােল
হয়ে লােকগুলাে যেন অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে ; তখনও কত লােক
আসছে, লােক আসার আর বিরাম নেই।
কাঞ্চনের সম্মুখ দিয়ে
অনেকগুলাে অতিকায় অশ্ব চলে গেল। এইগুলােই বুঝি রেসের
ঘােড়া? শােফারকে তিন-চার বার প্রশ্ন করল কিন্তু সে তার একটা
কথারও জবাব দিল না। তার দিকে তাকাল না পর্যন্ত, যেন তাকে
গ্রাহ্যই করল না। কাঞ্চনের ভারী রাগ হ’লকিন্তু রেগে আর কি
করে? তার ভারী ইচ্ছা হ’ল ভেতরে গিয়ে ঘােড়দৌড় ব্যাপারটা
স্বচক্ষে দেখে কিন্তু কি নিয়ম কানুন কিছুই জানে না ত! তাকে কি
যেতে দেবে ? শােফারব্যাটা যে একেবারে মৌনব্রত নিয়ে বসেছে।
অনেকক্ষণ বাদে ভদ্রলােক ফিরে এলেন। হাতে নােটের তাড়া।
মােটরে উঠে প্রথমেই একচো খুব হেসে নিলেন।
‘আজ একেবারে আপ, সেট।
। ভারি জিতেছি। তােমার টিপ,
ভারী ফুলে গেছে। তুমি মাকে খুব ভালবাস, না? তােমার
মাতৃভক্তির জোরেই জিতে গেলাম। “মাই মাদার” জিতবে কেউ
ভাবে নি। দশ টাকায় চার শ সাতার টাকা—একেবারে রেক
পে-মেট।
১১২
বাড়ী থেকে পালিয়ে ‘আমি বল্লম বলে জিতল ! তা কি হয়? এ ত ভারী আশ্চর্য্য! ‘আশ্চৰ্য্য আবার কি? ছেলেদের মধ্যে ভগবান, থাকেন। তাই ছেলেদের কথা ভারী ফলে যায়। তােমার মধ্যে দেবতা আছেন তা জান? যত দিন ছেলেমানুষ থাকবে তত দিন সেই দেবতা থাকবেন—তারপর যত বড় হবে তত—এই শােফার, বাড়ী-না, বাড়ী নয়, চ্যাগোয়া। ‘চ্যাগোয়া কি ? ‘রেস্তোরাঁ।। মানে, চীনেদের হােটেলভারী চমৎকার সব খাবার- দাবার। চপ-কাটলেট-ফাউ-কারি—ফ্রায়েড রাই—আইসক্রিম তুমি কখনও সে সব খাও নি। ‘মা বলেন চীনেরা সব আসেলা খায়। আর নেংটি ইদুর- ‘ওসব বাজে কথা, কুসংস্কার। চীনেরা আমাদেরই মত সভ্য জাত। সভ্য লােকে কখনও ওসব খেতে পারে ? ‘চ্যাংগােয়া ! নামটা যেন কি রকম। 'হ, ওদের নামগুলােই খারাপ, আর সব ভাল। ‘আচ্ছা চ্যাংদোলা, এটাও চীনের কথা, নয় কি? আমি তখনি জাতাম। আমি পালিয়ে আসতুম ব’লে পড়ুয়ারা আমাকে ছােটবেলায় চ্যাংদোলা করে পাঠশালে নিয়ে যেত। আমার যা খারাপ লাগত। এখন বুঝতে পারছি ওটা চীন দেশের ব্যাপার। ভলােক হাসতে হাসতে বল্পে, ‘ঠিক ধরেছ তুমি। এখন নাম, আমরা এসে পড়েছি। সারি সারি কাঠের কামরা চলে গেছে, পাশ দিয়ে যেতে যেতে পর্দার ফকে কাঞ্চন দেখতে পেলে প্রত্যেক কামরায় লােক খাচ্ছে।
বাড়ী থেকে পালিয়ে কোনটাতে বাঙালী ভদ্রলােক, বাঙালী মেয়েছেলে—আবার কোনটাতে সাহেব-মমম। কাঞ্চনরা একটা কামরায় গিয়ে বসল। ভদ্রলােক ডাকলেন'—বয়। একজন উদ্দী-পরা লােক এল, তাকে খাবারের তালিকায় দাগ দিয়ে দিলেন। কাঞ্চন জিজ্ঞাসা করল, ওই লােকটার নাম কি বয়, ? এ রকম নাম কেন? ও কি চীনে ? ও তাে মনে হল যেন আমাদের? ‘হােটেলে যারা খাবার পরিবেশন করে তাদের বয়, বলে। যে বয়, মানে বালক ও সে বয়, নয়, ও হচ্ছে সে বয়ের বাবা। ছুরি কাটা দিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নানা রকম খাদ্য ও এসে উপস্থিত। ভদ্রলােক ছুরি-কাটা চালাতে লাগলেন। কাঞ্চন হবার ছেলে নয়, সেও ছুরি-কাটা ধরল, কিন্তু খানিক বাদেই দেখল ও দিয়ে শােবার ধরা যায় না কিন্তু প্লেট, ওষ্টাবার পক্ষে ওগুলােই যথেষ্ট। তখন ছুরি-কাটা পরিত্যাগ করে হাতকেই এ বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়া সমীচীন মনে করল। এক একটা খাবারের এক এক রকম স্বাদ ! আর কেমন সব রহস্যময় নাম! আইসক্রিম্ জিনিষটাই কি চমৎকার! কাঞ্চনের যেন জন্ম সার্থক হয়ে গেল। অনেক্ষণ পরে আহারাদি সমাধা হ'লে পর ভদ্রলােক একড়া নােট কাঞ্চনের হাতে দিয়ে বল্লেন, ‘জিতলে তােমাকে অর্ধেক , দেব বলেছিলুম। এগুলাে তােমার। চল্লিশখানা একশ’ টাকার আর একশ’- খানা দশ টাকার নােট আছে-মােট পাঁচ হাজার। নাও, ধর। এই ভাণ্ডব্যাগে রাখব্যাগটাও তােমায় দিলুম। কাঞ্চন বিস্ময়ে হতবাক। ১১০
বাড়ী থেকে পালিয়ে
‘কি ভাবছ?
‘বর্ধমান লাইনের গাড়ী হাওড়া থেকে কখন ছাড়ে ?
‘বাড়ী যাবে? অনেক গাড়ী আছে, তবে শেষ গাড়ী ছাড়ে বাের
হয় রাত এগারােটায়।
‘সেটাতে চাপলে ভাের বেলায় বাড়ী পৌছব। তবে বর্ধমানে গাড়ী
বদলাতে হবে।'
‘টাকাগুলাে দিয়ে কি করবে ?
‘কত কি কিনব। রিষ্টওয়াচ, ফাউন্টেন্ পে, সাইকেল। জামা,
জুতাে, কাপড়, পােষাক। মন্টর জন্য বল, ন্যাপলার জন্য খো, মােটর
গাড়ী এই সব। আর মা'র জন্য যত বিলাসিতার জিনিষ।
‘এ সব কিনেও অনেক টাকা থাকবে। তা দিয়ে কি করবে ?
মাকে দেব।'
‘বেশ বেশ, ভাল কথা । তা তুমি ত দোকানে দোকানে ঘুরে এ
সমস্ত কিতে পারবেন, আমার এক জানা লােক আছে সে অডার
সাপ্লায়ের কাজ করে। চল তোমাকে তার কাছে নিয়ে যাই। সে-ই
সমস্ত কিনে, বেঁধে ছোঁদে ষ্টেশনে গিয়ে বুক করে দেবে-তােমাকে
টিকিট কেটে গাড়ীতেও তুলে দিয়ে আসবে।
সেদিন রাত এগারটার সময় কাঞ্চনকে হাওড়া ষ্টেশনের একটি ফাষ্ট
ক্লাশ কায় দেখা গেল। তখন গাড়ী ছাড়বার সামান্য মাত্র দেরী
অডার সাপ্লায়ার লােকটি মালের রসিদ কাঞ্চনকে দিয়ে বল্ল, ‘সাইকেল
ইত্যাদি সমস্ত জিনিষ এই গাড়ীরই লাগেজ ভ্যানে চলল, ষ্টেশনে নেমে
এই রসিদ দেখিয়ে খালাস করে নেবেন। আর মা'র জন্য কাশ্মীরী শাড়ী
বাড়ী থেকে পালিয়ে
জ্যাকেট, গন্ধ-তেল, এসেন্স, নতুন গুড়ের সন্দেশ—ইত্যাদি সব কিছু ওই
মুটুকোয় দিয়েছি, ওটা তাে আপনি নিজের কাছেই রাখবেন বল্লেন ?
সাইকেলটার পার্টস আর খুলিনি-কাঠের ফ্রেমের মধ্যে সাবধানে
দিয়েছি। ষ্টেশনে নেমে কুলীদের দিয়ে ফ্রেম্ খুলে ফেলে তখনি চালানাে
যাবে—ফুল পাম্প করা আছে। আর কি ?
‘আর কিছু না। তবে একটা কথা – কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ ক'রে
কাঞ্চন দু’খানা একশ’ টাকার নােট বার করল ।
আপনার কাছে কিছু চাই না
আমার কমিশন্ আমি দোকানদারের
কাছে থেকে পাব।'
“না আপনাকে দিচ্ছি না।
আচ্ছা কলকাতা সহরে কত গুলাে
ভিখিরী আছে বলতে পারেন ? দু শ ?
‘পাঁচ শ'?-কাঞ্চন আরাে তিনখানা নাের্ট বার করল।
বাড়ী থেকে পালিয়ে ‘তা হবে কেন বলুন তাে? এই টাকাগুলো রাখুন। আপনি কাল একটা মােটর ভাড়া করে একটু কষ্ট ক’র সমস্ত কলকাতা ঘুরবেন। আপনার চোখে যেখানে যে ভিখিরী পড়বে একটি করে টাকা তাকে দেবেন। ‘টাকা রেখে দিন। এই বাজে খরচ কেন ? ‘বেচারারা পেট ভরে খেতে পায় না, রাস্তার পাত কুড়িয়ে খায় আমার টাকায় তবু একদিন ভাল-মন্দ ইচ্ছামত খাবে। চিরদিনের দুঃখ ত আমি ঘােচাতে পারব না! 'আচ্ছা, দিন তবে। এ অপব্যয় কিন্তু। ছেলেমানুষ আপনি, টাকার মূল্য বােঝেন না। গাড়ী ছেড়ে দিল। নমস্কার। আমার নাম, ঠিকানা ত বলেছি। যখন যা দরকার হয় দয়া করে আমাকে লিখবেন- খুব সযত্বে পাঠিয়ে দেব। ‘আচ্ছা আচ্ছা। নিশ্চয় লিখব। নমস্কার। সুদূর বিস্তৃত প্রান্তরের মধ্য দিয়ে হু হু করে গাড়ী চলেছে- একখানা কামরায় কাঞ্চন একা। জানালায় মাথা রেখে বাইরের অন্ধকারের দিকে চেয়ে কাঞ্চন ভাবছে- মা’র কথা, বাবার কথা, ন্যাপলা ও মন্টর কথা, মিনির কথা, কনকের কথা। কোথায় রইল কনক, কোথায় বা মিনি! তাদের নাম জা শুধু, কিন্তু ঠিকানা, জানে না। কোনদিন কি এ জীবনে আর দেখা হবে তাদের সঙ্গে? ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, টিকিটু-চেকারের ডাকে যখন ঘুম ভাঙল তখন তাের। ১১।
বাড়ী থেকে পালিয়ে এ কি বর্ধমান ? এখানে গাড়ী বদলাতে হবে? ‘বর্ধমান অনেকক্ষণ ছাড়িয়ে এসেছে। টিকিটু দেখি ? এই ষ্টেশনে নামতে হবে। একটু পরেই একখানা ডাউন গাড়ী আসবে সেই গাড়ী বর্ধমান যাবে। গার্ডকে তােমরা আগে বলে রাখা উচিত ছিল, তা হলে বর্ধমানে নামিয়ে দিত, ওভ্যারক্যারেড, হয়ে তা হলে এই অসুবিধা পােহাতে হত না! ‘যা যা হবার হয়ে গেছে। নরম গদি-আঁটা বিছানায় শুয়ে ভারী ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কোথা দিয়ে রাত কেটেছে টের পাই নি। আচ্ছা, এই ডাউন গাড়ীতে চাপলে আমার বাড়ীর ষ্টেশনে কখন পৌছব ? ‘এই দুপুর নাগাদ। বর্ধমানে নিশ্চয়ই করেষ্পণ্ডি ট্রেন্ পাবে, তবে বােধ হয় ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করতে হবে, সেই সময় রেষ্টুরেন্ট কারে খেয়ে-দেয়ে নিতে পার। কাঞ্চন যখন তার বাড়ীর ষ্টেশনে পৌছল তখন দুপুর পেরিয়ে গেছে। সেদিন গাড়ী একটু ‘লেট’ ছিল। রসিদ দেখাতেই ষ্টেশন মাষ্টার বল্লেন, ‘এ সব মাল তাে আজ সকালের গাড়ীতে এসে পড়ে রয়েছে ! তুমি বুঝি গাড়ী বদলাবার সময় গাড়ী ধরতে পার নি ? ‘প্রায় সেই রকম। দেখুন আমি শুধু আমার সাইকেষ্ট। এখন নেব। বাকি জিনিষপত্র পরে লােক এসে নিয়ে যাবে কিংবা আপনি যদি একটা কুলী দিয়ে পাঠিয়ে দেন— ‘তাই দেব। বলে ষ্টেশন মাষ্টার তার টিকিটুখানি নিয়ে চলে গেলেন। ১১৮
বাড়ী থেকে পালিয়ে
কাঞ্চন সাইকেটার প্যাকিং খুলে পিছনের ক্যারিয়ারে সুটকেসটাকে
শক্ত করে বাঁধল। তার পরে সাইকেলে চেপে কাঞ্চন বো বো করে
তার বাড়ীর দিকে পাড়ি দিল।
উনিশ
বাড়ী পৌছে কাঞ্চন একবার ভাল করে চারিদিক চেয়ে দেখল।
কেউ কোথাও নেই। চাকরটাকেও দেখতে পেল না। সাইকেলটাকে
বাইরে রেখে পা টিপে ভেতরে গেল। মন্টু, ন্যাপ লা—এরা গেল
কোথায় ? হয় ত পাড়ায় কোথাও খেলতে গেছে। মা? ঐ যে মা
একটা বই হাতে নিয়ে—ঘুমুচ্ছেন নাকি?-না, জেগেই আছেন যে!
কাঞ্চনকে দেখে মা আনলে চেঁচাতে যাবেন, কাঞ্চন তার মুখ চেপে
ধল। —মা, চুপ, বাবা, কোথায় ?
‘উনি? খেয়ে-দেয়ে ঘুমুচ্ছেন।
‘বেঁচেছি তা হলে।
‘তাের ওপর ওঁর আর রাগ নেই। তুই চলে যাওয়াতে ওঁর মন
১২•
বাড়ী থেকে পালিয়ে খারাপ হয়ে গেছে। এ ক’দিন ভাল করে খেতে পর্যন্ত পারেন নি। আমি ত কেঁদে বাঁচি নে। কোথায় ছিলি তুই? তাের জন্যে আশ- পাশের গাঁ সব তােলপাড় হয়ে গেছে—তাের ক্লাসের সব ছেলের বাড়ী ‘আমি বুঝি এখানে ছিলুম? আমি যে কোলকাতায় গেছলুম। ‘কোলকাতায় ? অবাক কল্পি । পয়সা পেলি কোথায় ? ‘অনি। আমার কি কোথাও যেতে পয়সা লাগে? কত টাকা রােজগার করে আলুম-তােমার জন্য। মা’র যেন বিশ্বাস হয় না। অতটুকু ছেলে কাঞ্চন, সে করবে টাকা রােজগার ? ‘বিশ্বাস হচ্ছে না? এই দেখ সােনার হাত-ঘড়ি। এই দেখ ফাউন্টেন্ পেন্—এইটেরই দামই পনের টাকা। কেমন নতুন ফ্যাসানের জুতাে দেখ। তাই ত! মা একেবারে অবাক। ‘কিন্তু তাের গায়ে একি মণি ! চটের মত জামা-কাপড় পরেছি, এ তােকে মানাচ্ছে না। ‘এ বুঝি চট? তুমি হাসালে মা। তুমি হাসালে মা। এ যে খদ্দর। খার পরলে ভদ্দর হয়। মহাত্মা গান্ধী বলেছেন। গান্ধী কে জান? খুব মহৎ লােক, বয়সে খুব বড় তবু যেন ছেলেদের মত মন ! ‘তা হােক, তবু এ কাপড় তাের গায়ে সাজে না। তাের জন্যে আমি সিঙ্কের জামা, তাঁতের কাপড় আনিয়ে রেখেছি। ‘বা, আমি যে প্রথমে ওই সব কিনেছিলুম-কিন্তু ভেবে দেখলুম ওর চেয়ে খদ্দর ভাল। কনক মােটা খদ্দর পরে, আমিও তাই
বাড়ী থেকে পালিয়ে
পরলুম। আমার সে জামা-কাপড়গুলো ট্রাকে তােলা আছে, বিনােদের
জন্য এনেছি। ওকেই দিয়ে দেব।
‘কনক কে ?
‘আমার বন্ধু। তার কথা তােমায় রাত্রে শুয়ে শুয়ে গল্প করব।
তার কথা, মিনির কথা, কলকাতার ভােজের কথা – হ্যা, তােমার জন্য
আমি চমৎকার সন্দেশ এনেছি, তুমি যে লুচি দিয়ে খেতে ভালবাস ;
ট্রাঙ্কে আছে, খেয়ে দেখ, গাঙ্গুলির সন্দেশ তার কাছে কোথায় লাগে !
‘আমার জন্য তাে সন্দেশ আনলি, তাের বাবার জন্য কি এনেছিস্?
‘বাবার জন্য কি আর আব? কেবল একটা সােনা-
বানাে ছড়ি।
জানি ওটা কোন দিন আমার পিঠেই ভাঙবে, তবু আম।
‘আর মন্টু, ন্যাপলা ?
ওদের জন্য বল, ব্যাট, ট্রাইসিকেল, কত রকম খেলনা, পুতুল,
মােটরগাড়ী-কত কি । তােমার জন্য কত গল্পের বই এনেছি। সে
সব ট্রাক আছে -তিনটে বড় বড় ট্রাক বোঝাই কত জিনিষ ! ষ্টেশন
মাষ্টার কুলী দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
‘এত টাকা পেলি কোথায় ?
‘সে তােমায় সব রাত্রে বলব। ধরে নাও না কেন ভগবান আমায়
দিয়েছেন। এমন কি হয় না?
কলকাতার কোথায় বেড়ালি ? কি দেখলি?
চিড়িয়াখানা, পরেশনাথের মন্দির, শিবপুরের বাগান-এ সব দেখেছি?”
‘না, সময় পাই নি। তা ছাড়া, কোথায় যে ওগুলাে আছে জানতুমও
। এত ত হেটেছি, কোন দিন পথের ধারেও পড়ে নি। পড়লে
कि
১২২
বাড়ী থেকে পালিয়ে
আর না দেখে ছাড়তাম? তবে এমন একটা জায়গা দেখে এসেছি যা
কলকাতা গিয়েও লােক দেখতে পায় না।
‘কি জায়গা রে ?
.
15
‘রে কোস-সেখানে ঘােড়দৌড় হয়। সে রাত্রে বলব। ভারী
মজার গল্প। এখন একটা কথা শুনবে? তােমার পায়ে পড়ি মা।
• বাড়ী থেকে পালিয়ে
ব'লে কাঞ্চন সুটকে খুলে শাড়ী, জ্যাকেট ইত্যাদি বার করে।
এইগুলাে তােমায় পরতে হবে মা।
‘এখন ?
‘হ্যা, এখনই। আমি দেখব।
ছেলের আকার, কি করেন, মাকে পরতে হ’ল। কাঞ্চন বলে-“বাঃ,
তােমাকে কি চমৎকার দেখাচ্ছে মা! সত্যি! এইবার এই জিনিষটা
মুখে মাখো দেখি। এটার নাম হিমানি—এক রকম মে। এইবার
তুমি এই কৌচটায় ব’স।. আমি তােমায় পূজো করব, অঞ্জলি দেব।'
কাঞ্চন নােটের তাড়া নিয়ে মার দিকে ছুড়ে দেয়-বৃষ্টির মত
চারিদিকে নােট্গুলাে ছড়িয়ে পড়ে। মা দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে চেয়ে
থাকেন, তাঁর মুখ থেকে কথা বেরয় না ।
‘কোখেকে এত টাকা পেলুম ভাবছ? সে তােমাকে এক কথায়
বােঝাতে পারব না। আগে বল দেখি রে কয় প্রকার? দুই প্রকার,
-কিন্তু সে বােঝাতে অনেকক্ষণ লাগবে। বিশু কাকা যেমন লটারীতে
অনেক টাকা পেয়েছিল না, আমি এক রকম তাই পেয়েছি। না, না,
ওগুলাে কুড়িয়াে না, অমনি চারিদিকে ছড়িয়ে থাক্। ভুমি মাঝখানে
বসে থাক মা।
মা হতভম্ব হয়ে বসে থাকেন।
‘মা, একটা কথা বলব? তােমার কোলে একটু বসব। আমি বড়
ভারী হয়ে গেছি, তােমার লাগবে কিন্তু।
কখন গিয়ে মার কোলে বসে। মা’র গলা জড়িয়ে ধরে। মা
কাফনের কপালে একটা চুমু খা। কাঞ্চন মা’র বুকে মুখ লুকায়
মার চোখ দিয়ে জল পড়ে।••••••
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.