Bally Sadharan Granthagar
Dakhinapather Jattri
Front matter
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
দক্ষিণাপথের যাত্রী
শ্রীনিধিরাজ হালদার
সাহিত্য-সংসদ
কালীঘাট, কলিকাতা।
প্রকাশক-ঐবিজচাদ হালদার
৪৩সি, সহিম হালদার স্ট্রট,
কালীঘাট, কলিকাতা।
মহালয়া, ১৩৪৫
দাম—এক টাকা
মুদ্রাকর-নীলকণ্ঠ চট্টাচার্য
দি নিউ প্রেস
নং রমেশ মিত্র রােড়,
ভবানীপুর, কালিকাতা।
ভূমিকা অনেকদিন পূর্বে দাক্ষিণাত্যের কয়েকটী স্থান ঘুরে যেটুকু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পেরেছি সেই টুকুই পাঠক- পাঠিকার সামনে ধরে দিলুম। বই আকারে প্রকাশ পাবার আগে লেখাটী ভারতবর্ষে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমানে রচনার কিঞ্চিৎ অদল এক্ষণে পাঠক-পাঠিকাগণ সাদরে গ্রহণ করিলে আমার সকল শ্রম সার্থক মনে করিব। পুস্তিকাখানি প্রকাশ করতে যারা সাহায্য করেছেন তাদের সকলকেই বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বদল হয়েছে। গ্রন্থকার
প্রকাশক-ঐবিষাদ হালদার
৪৩সি, মহিম হালদার স্ট্রট,
কালীঘাট, কলিকাতা।
মহালয়া, ১৩৪৫
দাম—এক টাকা
মুদ্রাকর-শ্ৰীনীলকণ্ঠ ভট্টাচার্য।
দি নিউ প্রেস
১নং রমেশ মিত্র ঘােড়
ভবানীপুর, কালিকা। ;
--ভুমিকা অনেকদিন পূর্বে দাক্ষিণাত্যের কয়েকটী স্থান ঘুরে যেটুকু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে পেরেছি সেই টুকুই পাঠক- পাঠিকার সামনে ধরে দিলুম। বই আকারে প্রকাশ পাবার আগে লেখাটা ভারতবর্ষে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমানে রচনার কিঞ্চিৎ অদল বদল হয়েছে। এক্ষণে পাঠক-পাঠিকাগণ সাদরে গ্রহণ করিলে আমার সকল শ্রম সার্থক মনে করিব। পুস্তিকাখানি প্রকাশ করতে যারা সাহায্য করেছেন তাদের সকলকেই বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি। গ্রন্থকার
পূজ্যপাদ
স্বর্গীয় পিতৃদেবের পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশে
অৰ্পণ করিলাম।
- * * * * আলেক । মা }
No text on this page.
দক্ষিণাপথে যাত্রী . ধৰ্ম্মের বালাই আমার কোনও দিনই ছিল না। তা ছাড়া আমি তীর্থ যাত্রীও নই। সুতরাং দিন পনের ব্যবস্থা না করেই জানুয়ারীর শেষাশেসি হঠাৎ একদিন মান্দ্রাজ মেলে চড়ে বসলুম। সহযাত্রী হলেন এক গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী ও কয়েকজন মাদ্ৰাজী ভদ্রলােক। বাংলা মুলুকের লােক বলতে একা আমি। রাত্রে আর কোন কথাবার্ত। বিশেষ কারুই সঙ্গে হয় নি, তবে তারা ' যে তাদের জন্মভূমি মাদ্রাজে চলেছেন এটা সামান্য একটু আলাপেই বেশ বােঝা গিয়েছিল। রাত দশটার মধ্যেই যে যার বিছানা, কম্বল বিছিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ল। আমি একা জেগে জেগে চিন্তা করতে লাগলুম কি ভাবে এবারের এই ভ্রমণটাকে বেশ আনন্দময় করে তােলা যায়। ঠিক করে ফেলুম পরদিন মধ্যাহ্নে গাড়ী ওয়ালটিয়ার এলে সেইখানেই সমুদ্রের ধারে দু’একদিন উদ্বেলিত তরঙ্গের ঘাত-প্রতিঘাত প্রাণ ভরে উপভােগ আমার চোখে ঘুম ছিল না, কোনও রকমে চোখ দুটো বুজে কয়েক ঘণ্টা পড়ে রইলুম মাত্র। গাড়ীর কিন্তু কর্মের বিরাম নেই, হুহু শব্দে ছুটে চলে যাচ্ছে। কতক্ষণ আর চোখ বুজে চুপ করে শুয়ে থাকা যায়, আস্তে আস্তে বিছানার ওপর
দক্ষিণাপথের যাত্রী
উঠে বসে এট্যাচি কেস থেকে মােপাসার একখান। গল্প গ্রন্থ
বার করে, পড়তে শুরু করে দিলুম। গল্প পড়তে পড়তে এমন
তন্ময় হয়ে গিয়েছিলুম যে কখন ভাের হয়েছে তা আমার খেয়াল
ছিল না।
বেলা তখন আটটা ক’মিনিট আর ঘণ্টা কয়েক বাদে
ওয়ালটিয়ার পৌছব ।
মাদ্ৰাজী ভদ্রলােকটি জিজ্ঞাসা
কবুলেন—“আপনি কি
ওয়ালটিয়ারে নামবেন?”
হ্যা, না করে উত্তর দিলুম-"না, একেবারে মাদ্রাজ -সেখানে
আমার মেলােমশাই আছেন।
পরে সহযাত্রীটির সঙ্গে গল্প সুরু
জন্মের দিন
থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে ভদ্রলেটির সঙ্গে অনেক জটিল প্রশ্নের
তর্ক উঠল। জীবনের রহস্য ভেদ করে মানুষের স্বরূপ বােঝা-
বার চেষ্টা করলুম কিন্তু কোথায় যে এর শেষ তা আলােচনা
করতে করতে গাড়ী ওয়ালটিয়ার এসে থামল । তখন বেলা প্রায়
একটা ক’মিনিট । মাদ্রাজী ভদ্রলোকটি তার ঠিকানা দিয়ে
ঐখানেই নেমে গেলেন।
ওয়ালটিয়ারে গাড়ী আধ ঘণ্টা থামবে সুতরাং প্ল্যাটফর্মে
নেমে, ষ্টেশনের কলে বেশ করে মাথাটা ধুয়ে উদর পূজার
সামগ্রী সংগ্রহের আশায় ট্রেণের একমুড়ো থেকে আর একমুড়াে
পর্যন্ত পায়চারী করে, এমনি বরাত কড়ায়ের ডাল,
২
দক্ষিণাপথের যাত্রী পেঁয়াজের বড়া আর কোকো ছাড়া খাবার মত কিছুই খুঁজে পাওয়া গেল’ না। ক্ষুধা যেন দুনিয়া পৰ্য্যন্ত গ্রাস করতে চাইছিল । এই পােড়া পেটের জন্যইত এত গােল। এমন সময় কলা ও কমলালেবু নিয়ে একজন উপস্থিত হল। এক পয়সার জিনিষ চার পয়সায় কিনে মনে মনে ফিরিওয়ালার চৌদ্দপুরুষের শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা করে গাড়ীতে উঠে বসলুল। গাড়ী ছাড়ার তখন আর মিনিট দুই দেরী। যাত্রা পথেব পথিক আমরা, আমাদের যাত্রা আবার শুরু হল। গাড়ী আপন মনে চলতে লাগল, যেন তার কর্তব্যের বিরাম নেই। গাড়ীর ভেতর বসে বসে মনে হতে লাগল যেন গাড়ীর সঙ্গে আমরাও উদ্ধশ্বাসে ছুটে চলেছি। আর পিছনে পড়ে থাকছে কত ঝােপ ঝাপ, নালা ডােবা, চাষাদের মেটে ছােট ছােট ঘর বাড়ী, গাছপালা, মাঠ আর মাঠ। যতদূর দৃষ্টি যায় চেয়ে দেখলুম মনে হল যেন কোন দিগন্তের পানে ছুটে চলছি। গােদাবরী ষ্টেশনে গাড়ী এসে থামল। প্ল্যাটফর্মে নেমে দেখতে পেলুম সামনে প্রকাণ্ড এক স্থানে স্থানে তার বালুর চর। সহযাত্রীকে জিজ্ঞাসা করে জানলুম এই-ই সেই গােদাবরী নদী। গােদাবরী দৈর্ঘ্যে প্রায় ন'শ মাইল। ইহা ধলেশ্বর থেকে গৌতমী ও বশিষ্ঠা নামে দুই শাখায় বিভক্ত হয়েছে। আবার ঐ দুই শাখার মধ্যে গৌতমী থেকে তুল্যা, আত্রেয়ী ও ভরদ্বাজী আর বশিষ্ঠ। থেকে বৃদ্ধা গৌতমী नौ ।
দক্ষিণাপথের যাত্রী
ও কৌশিকী প্রবাহিত হয়েছে। এই সপ্তস্রোতের সম্মিলন স্থান
সপ্তগগাদাবরী নামে খ্যাত এবং দাক্ষিণাত্যের পরম পুণ্যতীর্থ ব'লে
প্রসিদ্ধ।
নদীর কথা বাদ দিয়ে এখন গ্রামের কথাই বলা যাক।
গ্রামখানিরও নাম গােদাবরী। সম্ভবতঃ নদী থেকেই গ্রামের
নামকরণ হয়েছে। মাদ্রাজ প্রদেশের এটা একটা জেলা। আগে
এটা অন্ধ সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। এখন ইংরাজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত।
এই জেলাতেই মসলিপাট ও কোকোনা অবস্থিত। অনেকেই
হয়ত জানেন যে এই মলিপাটম নস্যর জন্য বিখ্যাত।
কোকোনা একটি বন্দর। যতদূর জানা যায়, এই কোকোনদার
সন্নিকটস্থ সমুদ্রে শ্ৰীমন্ত সওদাগর “কমলেকামিনী” দর্শন করেছিলেন।
গােদাবরী গ্রামের মােটামােটি হিসাব নিকাস জেনে নিয়ে
চুপ করে বসে রইলুম কারণ গ্রামে না ঢুকে রেলগাড়ীর কায়
বসে বসে কত আর জানা যায়।
হঠাৎ গাড়ীর বাঁশী বেজে উঠল, গাড়ী আবার চলতে শুরু করে
দিলে। আমরা গােদাবরী নদীর ওপর এসে উপস্থিত হলুম।
লােহার পুল নীচে বিস্তীর্ণ বালীর চর। মাঝে মাঝে জল যে নেই
তা নয়, যেটুকু জল আছে তারই ওপর দিয়ে ভেলার মত
দু’চারখানা নৌকা পাল তুলে চলেছে। দূরে ঘাটে কেউ
স্নান করছে কেউ বা সানের ওপর কাপড় কাচছে। বহু গ্রাম্য
৪
দক্ষিণাপথের যাত্রী।
মেয়ে মাটির কলসী গােদাবরীর জলে ভর্তি করে কাকে তুলে
পানীয় জল ঘরে নিয়ে যাচ্ছে। নদীর ধারে ক্ষুদ্র গ্রাম মাথা তুলে
দাড়িয়ে আছে, আর আমরা অলস পথিক রূপ-মুগ্ধের মত রূপই
দেখে চলেছি। মনে করি এই বুঝি আমাদের কর্তব্য, এই
কাজ। হঠাং চেয়ে দেখি আর গােদবরী নেই কেবল দু'ধারে
বিস্তীর্ণ মাঠ যেন দানবের মত হাঁ করে চেয়ে আছে। সেদিন ছিল
পূর্ণিমার চাঁদনি রাত। চাঁদের রূপালী আলাের সঙ্গে রাতের কালাে
রং মিশে যেন আমাদের দু'পাশের সীমাহীন ফাঁকা স্থানগুলোকে
জীবন্ত করে তুলছিল। রাত তখন বেশী নয় বােধ হয় দশটা
কি এগারটা হবে। হঠাৎ দেখি আবার পুল। সহযাত্রীর নিকট
জানলুম কৃষ্ণা নদী। নাম তার সার্থক হয়েছে, জল তার ঘন
কালাে। নীচে কালো জল, ওপরে তারার মালায় সাজানাে
নীল আকাশ ।
মনে
হতে লাগল
শুভ্র চন্দ্রমার রূপালী
কিরণের সঙ্গে নক্ষত্রগুলাে কৃষ্ণার কালাে জলকে আলিঙ্গন
করছে। সে মনােহর দৃশ্য লেখনী দিয়ে বর্ণনা করা চলে না।
ইচ্ছে হােল নদীর তীরে গড়িয়ে প্রাণ খুলে সে দৃশ্য উপভােগ
করি। আমার কানে কৃষ্ণার কুলুধ্বনি বীণার ঝঙ্কারের মত বাজতে
লাগল। গাড়ীতে মাদ্ৰাজী ভদ্রলােকটির সঙ্গে একরাত্রের আলাপে
মনে হাে’ল যেন তিনি আমার কত আপনার হয়ে উঠেছেন।
কথায় কথায় ভদ্রলােকটি তাদের দেশের কলার চাষের গল্প শুরু
দক্ষিণাপথের যাত্রী করে দিলেন। তারপর হঠাৎ কিছু না বলেই একটা চুবড়ী থেকে একটা অপৰু কলা আমার হাতে দিয়ে বল্লেন—'যদিও ষ্টেশনে কেনা তা হলেও আপনি খান’, এক রকম জোর করেই কলাটি আমায় খাইয়ে ছাড়লেন। কলাটি এত মিষ্টিও এত উপাদেয়, মনে হল যে সে কলার কাছে আমাদের দেশের ক্ষীর, রাবড়ীও মেনে যায়। রাত ক্রমেই ঘনিয়ে আসতে লাগল কাজেই কথাবার্তার মাঝে আমরা কম্বল বিছিয়ে শুয়ে পড়লুম। রাত্রে আর গাড়ীতে বিশেষ ঘুম হ'ল না। কোন রকমে একটু গড়িয়ে ঘুমের নেশাটাকে কাটিয়ে দেওয়া হল মাত্র। যখন উঠে বসলুম, তখন প্রায় ভাের হয় হয় হয়েছ। মাদ্রাজী ভদ্রলােকটিও আমার সঙ্গে উঠে বসলেন। তিনি আমার কাছে কোলকাতার কত কথাই জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। কথায় কথায় জানতে পারলুম কয়েক বছর আগে তিনি কোলকাতায় খিদিরপুরে একটা বাসা বাড়ী ভাড়া করে থাকতেন, আর কোনও একটা সওদাগরী অফিসে সামান্য কেরাণীর কাজ করতেন। কোনও রকমে কায়ক্লেশে সংসার ধর্ম নিৰ্বাহ হােত। বহু দুঃখের ইতিহাস বসে বসে শুনতে লাগলুম। শেষে একটু হেসে বললুম- “আমরাই ত আমাদের জীবনটাকে এমনি দুব্বিষহ করে তুলেছি, আর অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে চুপ করে চাকরীর আশায় বসে আছি। স্বচ্ছন্দে চাষ বাস করতে পারি তা করব না। ঐ যে বাঁধা ধরা দক্ষিণাপথের যাত্রী দশটা আর পাঁচটা, ওটা যেন আমাদের মজ্জাগত হয়ে দাড়িয়েছে একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বললুম—“আচ্ছা সাত সমুদ্র তের নদীর কথা নাহয় বাদই দিলুম, কিন্তু কোথার সুদূর বিকানির, মাড়ােয়াড় থেকে শুধু লােটা কম্বল সম্বল করে এমন ত দেশ নেই যেখানে তারা বড় বড় ইমারত, হাঁকিয়ে দোরের সামনে ভােজপুরী দরওয়ান খাড়া করে না রেখেছে। সে কি মশাই, কেরাণীগিরি করে ? ভদ্রলােকটি বললেন—সবইত বুঝি কিন্তু পেরে উঠি কই ?” বললুম-“কোথা থেকে পারবাে? জেগে ত নেই ঘুমিয়ে আছি। উপায় আর কেমন করে হবে, চোখ চেয়ে যদি অন্ধ হয়ে থাকি কে আর পথ দেখাবে বলুন? চাকরী করে করে আমরা জড়, স্থবির হয়ে গেছি। জাতের এই পাষাণ স্বপকে সরাতে হলে আমাদের মেরুদণ্ড খাড়া করে দাড়াতে হবে, বুঝলেন?” ভদ্রলােকটি হ্য। না কিছুই বলতে পারলেন না। কাছেই একটা ষ্টেশনে গাড়ী থামতে তিনি আমাকে তার বাড়ীর ঠিকানা দিয়ে যাবার জন্যে অনেক অনুনয় বিনয় জানিয়ে তাের রাত্রে নেমে গেলেন। হাত ঘড়িটায় একবার চোক বুলিয়ে ভাবলুম তাইত আমারও ত নামবার আর বেশী দেরী নেই। বিছানা-পত্ৰ বেধে গাড়ীর বেঞ্চে বসে ভাবতে লাগলুম কোলকাতার লােক আমি কি জানি মাদ্রাজ সহর কেমন লাগবে। মাদ্রাজিদের আচার ব্যবহার সম্বন্ধে তেমন ধারণাও ৭
দক্ষিণাপথের যাত্রী
নেই। তবে এইটুকু চিন্তা করে আশ্বস্ত হয়েছিলুম যে সেই সময়
আমার মেসােমশাই ব্যবসার খাতিরে কিছু দিন আগেই মাদ্রাজে
এসে বাস করছিলেন। কাজেই অসুবিধা ভােগ করবার ভয়
ততটা ছিল না। গাড়ীর জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখতে পেলুম
আকাশের গায়ে তখনও দু'চারটে তারা মিটিমিটি জ্বলছে। আর
দূরে তালবনের ফাকে ফাকে যেন একটু আলাের আভাস পাওয়া
যাচ্ছে। মাঝে মাঝে কাক পাখীরাও উড়তে সুরু করেছে। দেখতে
দেখতে হঠাৎ পূব দিকটা রাঙ্গিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে
যেন কিসেব একটা জাগরণের সাড়া পড়ে গেল।
চেয়ে দেখি
মাতাজ ষ্টেশনে এসে
পৌচেছি। তখন
সাড়ে ছ'ট।।
কিন্তু কলকাতার সময়ের তুলনায় মনে হল যেন বাহিরের সকাল
কিছু বেলায় হয়। ষ্টেশনে আমার প্রতীক্ষায় . মেসােমশাই
তঁার একটি বন্ধুর সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন। দু'রাত ট্রেণ যাপনের
পর কোলাহলপূর্ণ মাদ্রাজ সহরে উপস্থিত হয়ে ক্ষণিকের জন্য
মনটা একটু প্রফুল্ল হয়ে উঠল। ষ্টেশন থেকে বার হয়ে দেখি
সম্মুখে ট্রাম, ট্যাক্সি, ফিটন।
ষ্টেশন থেকে আমাদের বাসা প্রায়
দু’তিন মাইলের পথ, নাম টিপ্লিকেন। বাসায় পৌছতেই
কানে একটা বিরাট
এসে পৌছ’ল।
জিজ্ঞাসা
জানলুম বাসা থেকে সমুদ্র ছ'সাত মিনিটের পথ
সুতরাং বুঝতে আর বাকী রইল না যে সমুদ্রের গর্জন, কারণ
৮
দক্ষিণাপথের যাত্রী পুরীধামেও ওরূপ গর্জন শুনে শুনে এক রকম আগে থেকেই অভ্যন্ত হয়েছিলুম। যাহােক বিশ্রামান্তে বাসার একজনকে সঙ্গে নিয়ে টিপ্লিকেন ছাড়িয়ে আমরা আইস হাউস রােডে এসে পড়লুম। রাস্তার নাম আইস হাউস দেখে জিজ্ঞাসা করলুম এ আবার কি নাম ? আমার সঙ্গী বললেন—“আর একটু গেলেই প্রকাণ্ড একটা সাদা বাড়ী দেখতে পাবে ঐ বাড়ীটার নাম হচ্ছে আইস হাউস। আগে যখন ভারতবর্ষে বরফের কল ছিল না তখন বিলেত থেকে জাহাজে করে ঐ বাড়ীতে বরফ এসে জমা হ'ত বলে ঐ বাড়ীর নাম হয়েছে ‘আইস হাউস’। আর সেই থেকেই রাস্তার নামও আইস হাউস নােড। যখন বাড়ীটার কাছে এসে পৌঁছলুম তখন সামনেই দেখি বিস্তৃত সমুদ্রের ফেনিল জলরাশি বারবার এসে বালুময় বেলাভুমির চরণ তলে আছড়ে পড়ছে। বরফের বাড়ীর কথা ভুলে সমুদ্রের তীরে এসে উপস্থিত হয়। তবে এইখানেই বলে রাখি বাড়ীট। সাধারণ বাড়ীর চেয়ে কিছু বড় ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। এখানে রাস্তার কিছু বর্ণনার দরকার। রাস্তার একধারে ঘােড়ায় চড়ে বেড়াবার জন্যে লম্বা সরু রাস্তা, আর তারই পাশ দিয়ে চলে গেছে মানুষ চলার পথ সেই পথের ধারে দুচারটে ফুল গাছের বাগান। বাগানের নীচে বিস্তীর্ণ বালুকাময় বেলাভূমি, তারপর বিশাল সমুদ্র। যারা দেখেছেন তারাই বুঝতে পারবেন এখানকার দৃশ্য কি রকম। সন্ধ্যা আসন্ন প্রায়। সূৰ্য্যদেব ৯ দক্ষিণাপথের যাত্রী ডুবতে সুরু করেছেন। একদিকে সমুদ্রের উত্তাল তর বালুময় বেলাভূমির পাদদেশে আছড়ে আছড়ে পড়ছে, আর একদিকে সমুদ্রের নীল জলের সঙ্গে নীল আকাশ মিশেছে। সেইখানে অস্তগামী রবি ডুবু ডুবু যেন সমুদ্রের বুক চিরে ফিকি দিয়ে রক্ত ঠিকরে পড়ছে, আর তারই মধ্যে একটা গােলাকার আগুনের থালা লুকোচুরি খেলতে খেলতে লুকিয়ে পড়ছে। এমন প্রাণ মাতান দৃশ্য দেখতে কার না ইচ্ছা করে? সে দৃশ্যের মাধুরী এমনি যে আপনাকে আপনি ভুলিয়ে দেয়। বালির ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মনে হ’ল যেন প্রকৃতি হাসতে হাসতে ধরায় নেমে এসে তাকে আলিঙ্গন করছে। দেখতে দেখতে দূরে লাইট হাউসের আলাে জলে উঠল। মনে মনে ভাবলুম পৃথিবীতে সবই সুন্দর। ফুলের গন্ধে যেমন ভ্রমর আপনা-হারা হয়ে ফুলের মধু খুজে বেড়ায় আমিও তেমনি প্রকৃতির রূপকে নিংড়ে বার করে নেবার জন্যে আপন-হারা হয়ে সমুদ্রের কুলে খানিক ঘুরে ঘুরে বেড়াতে লাগলুম। সবে সন্ধ্যা হয়েছে। রাস্তার দু'ধারে সারি বন্দী বিজলীর আলো জলে উঠেছে। আমার সঙ্গে যিনি গিয়েছিলেন তার নাম হরিদাস বসু আমি তাকে বললুম, “বােসমশাই এত ঘুম পাচ্ছে যে এখানে ঘুমােলেই ভাল হয়, এখান থেকে আর যেতে ইচ্ছে করছে না।” বােসমশাই হাসতে হাসতে বললেন-“প্রথম দিনেই যদি এখান- কার সমস্ত রসটুকু নিংড়ে খেয়ে ফেলতে চাও তাহলে কাল কি দক্ষিণাপথের যাত্রী করবে? আচ্ছা চল বাড়ী ফেরা যাক্, সকাল সকাল পেটটা ঠাণ্ডা করে আজকের রাতটা ভাল করে ঘুমিয়ে নাও, কাল আবার যত পার ঘুরে ফিরে বেড়িও। অগত্যা বাসাবাড়ীর পথে ফিরলুম। আমাদের পশ্চাতে পড়ে রইল বালুচরের ওপর মরা শুক্তি, শামুক, নুলিয়ার জাল, তাদের মাছ ধরা নৌকো, বালি আর বালি। রাস্তায় আসতে আসতে ঠিক করলুম কাল-ই আমরা এ্যাকোয়েরিয়াম দেখতে যাব। শুনেছি তাতে নাকি সমুদ্রের অনেক রকম মাছ আছে—দেখবার জিনিযও বটে। রাত্রে খানিক গল্প গুজব করবার পর নিদ্রাদেবীর ক্রোড়ে সেদিনকার মত আশ্রয় নেওয়া গেল। পরের দিন একটু দেরীতেই ঘুম ভাঙ্গল। বােসমশাইয়ের দেখি সব কাজই সারা হয়ে গেছে। বলুম বা আমাকে ডাকলেন না কেন? উত্তরে তিনি বল্লেন, “দু’রাত্রি গাড়ীতে তােমার ঘুম হয় নি বলেই ডাকি নি।” বােসমশাইকে বহুম, আপনাকে পেয়ে আমার ভারি সুবিধে হয়েছে, কারণ এখানে সঙ্গীর নিতান্ত প্রয়ােজন—তবে আমার থাকার মেয়াদ ত জানেন ? “তুমি কি আজকেই ফিরে যেতে চাও নাকি?” বন্ধুম “না বােসমশাই, আমি যাবে। সেতুবন্ধ রামেশ্বরে।” “ও! তীর্থ করতে ?”
দক্ষিণাপথের যাত্রী
হাসতে হাসতে বলুম,-“তীর্থ নয়—আমি বেরিয়েছি দেশ
পৰ্যটনের বহুদিনের একটা সাধ পূর্ণ করবার জন্যে। যখন বাড়ী
ছেড়ে বেরিয়েছি তখন এমন কিছু নিয়ে ফেরা চাই যা মানুষের
চোখে একটা আকর্ষণের বস্তু হয়ে দাড়ায়।”
বােস মশাই বল্লেল, “ও সব কথা এখন থাক, বেলা হয়েছে
তাড়াতাড়ি কাজ কর্ম সেরে নাও। সত্যিই বেলা হয়ে গিয়েছিল,
তাড়াতাড়ি করেও সেদিন সকালে আর বাহির হওয়া গেল
। বিকেলে বােস মশাইয়ের সঙ্গে যখন সমুদ্রের ধারে এসে
দাড়ালুম, তখন তার উত্তাল ফেনিল জলরাশি দেখে মনে
‘আমি পৃথিবীর শিশু বসে আছি তব উপকূলে,
শুনিতেছি ধ্বনি তব ; ভাবিতেছি, বুঝা যায় যেন
কিছু কিছু মৰ্ম্ম তার—বােবার ইঙ্গিত ভাষা হেন
আত্মীয়ের কাছে।
ঢেউয়ের পর ঢেউ ফুলে ফুলে পৃথিবীর বুকে আছাড় খেয়ে
পড়ছিল। ভাবলুম, আমি সহরে ঘুরবাে কেন? কোথায় এমন
কি বস্তু আছে যা আমাকে এ দৃশ্যের চেয়ে আরও বেশী আনন্দ দান
করতে পারে?
বােসমশাই জিজ্ঞাসা করলেন, “কিহে, তুমি যে একেবারে
যােবার মত চুপ করে রইলে ?”
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বন্ধুম, “আমার আর অন্য কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।
রাস্তায় বেরিয়ে মানুষ, গাড়ী, ঘােড়া ছাড়া আর ত কিছু দেখতে
পাব না; কিন্তু এই মহাসিন্ধুর বেলাভূমির উপর দাঁড়িয়ে আমার
যে আর কিছুই ভাল লাগে না বােসমশাই?”
বােসমশাই জিজ্ঞাসা করলেন, “বৈরাগ্য নাকি?”
বলুম, “আপনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়, সংসারে
আপনার আকর্ষণের বস্তুর হয় ত অভাবও নেই, কিন্তু সত্যি করে
বলুন ত সময়ে সময়ে আপনার কি মনে হয় না যে আপনি কত
অভাবের মধ্যে ডুবে রয়েছেন, কিন্তু তবুও এই সমুদ্রের তীরে
দাড়িয়ে তার রূপ ছাড়া নিশ্চয় আর কিছু হয় ত ভাববার সময়
পান নি, ভগবানের সৃষ্টি এমনি সুন্দর।”
একথা তুমি ঠিক বলেছ, সমুদ্রের ধারে দাড়ালে সব কিছুই
ভুলে যেতে হয়।”
ক্রমেই দিনের আলো নিভে এল, বােসমশাই বল্লেল, “চল এইবার
ড়িী ফেরা যাক।
ফেরার পথে সমুদ্রের পানে বারবার চেয়ে দেখি আর ভাবি,
‘হে জলধি, বুঝিবে কি তুমি
আমার মানব-ভাষা ?
যদিও তুমি সর্বগ্রাসী, তবুও তােমায় দেখলে চক্ষুর পাতা ফিরতে
চায় না, মনে হয় তুমি যেন কত আপনার।
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বাসায় ফিরে বােস মশাইয়ের সঙ্গে গল্প করছি, আমার মেলােমশায়
এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি, মাদ্রাজ সহ তােমার কেমন লাগছে ?”
বন্ধুম-“অত্যন্ত খারাপ।”
“কেন?”
“কারণ আমার মন এখানে মােটেই টিকেতে চাচ্ছে না।
মানুষের মন যেখানে বসে না, সে দেশকে আমি কেমন করে ভাল
বলব বলুন?”
“তাহলে এখানে এত লােক কেমন করে বাস করছে ?”
আমি বলুম, “মানুষের কারাে যদি হঠাৎ একটা পা কাটা যায়,
তখন বাধ্য হয়ে তাকে অন্যের সাহায্য নিয়ে এক পায়েই পথ চলতে
হয় সুতরাং যেটা যার মজ্জাগত, যেখানে মানুষ জন্মেছে সুখ
সুবিধার অধিকারী হয়ে তার ত সেখানে ভাল লাগবেই।”
যাক, খাওয়া-দাওয়ার কোনও কষ্ট হচ্ছে না ত?”
খানিকটা হেসে উত্তর দিলুম, “ভয়ানক।”
আমার মাথাটা একটু নাড়া দিয়ে মেলােমশাই কাজে
বেরিয়ে গেলেন। আমি বােসমশাইকে জিজ্ঞাসা করলুম, “আচ্ছা,
আমাদের ত মাদ্রাজী খাবার-টাবার কিছুই খাওয়া হােল না?”
“বেশ, আর তার কি, কালই হবে, এখানকার উৎকৃষ্ট খাওয়া
হচ্ছে রসম, তারপর তিলের তেল, পেয়াজ, লঙ্কা, ওল, তেঁতুল, এ সব
ত আছেই।”
১৪
দক্ষিণাপথের যাত্রী
“তারপর।”
“তারপর নারকেলের তাড়ি যথেষ্টই পাওয়া যায়। সন্ধ্যার
আগে একদিন আশে-পাশে রাস্তার ধারে একটু লক্ষ্য করে দেখলেই
বুঝতে পারবে ছােট বড় কেউ আর বাদ নেই,
ছােটলােকের দল একসঙ্গে বসে বসে ঐ তাড়ি খাচ্ছে। কি জানি,
হয় ত ওটাই ওদের দিনের শেষে আনন্দ-উৎসব।”
“ঐ কথাই আপনাকে জিজ্ঞাসা করবে মনে করছিলুম। সত্যি,
কি ব্যাপার বলুন ত, অধিকাংশ নারকেল গাছের মাথাই ত কাটা
আর এক একটা ভাড় ঝােলান, তবে কি এদেশে নারকেল
পাওয়া যায় না?”
“পাওয়া যায়, তবে দাম বেশী। বুঝতেই ত পারছ, তাড়ি
হলে ত আর নারকেল হবে না।”
হঠাৎ সেদিন রাত্রে দেখি আমাদের বহু-পরিচিত বিনােদা
বাসায় হাজির। আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “কি রে,
তুই কবে এলি ?”
বন্ধুম, “রামেশ্বর, মাদুরা প্রভৃতি ঘুরবাে বলে বেরিয়েছি।”
বিনােদা বলেন, “আমিও ত যাবে; তবে কাল পরশুর
মধ্যেই কিন্তু যেতে হবে।”
নিতান্ত এই নীরস দেশে আর একজন সঙ্গীলাভ করে অত্যন্ত
আনন্দিত হলুম। বিনােদদা মঠের একজন ব্রহ্মচারী তাছাড়া
দক্ষিণাপথের যাত্রী। তিনি অনেক দেশ ঘুরেছেন। তিনি আমার মেসােমশাইয়ের ছেলেবেলাকার বন্ধু, তাই তিনি মধ্যে মধ্যে না এসে পারেন না। তার মত সঙ্গী পেলে আমার যে কোনও কিছুরই অভাব হবে না জ্ঞ আমি জানতুম, সুতরাং তাকে পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে রইলুম। পরদিন মাদ্রাজ রামকৃষ্ণ মঠে ছিল স্বামী বিবেকানন্দের জমােৎ- সব। বিনােদদার সঙ্গে আমরা সকলেই মঠে হাজির হলুম। প্রসাদ পাওয়ার জন্য অনেকেই দেখি খুব ব্যস্ত। প্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থাও ছিল প্রচুর। আমরা কিছুক্ষণ নামকীর্তন শােনবার পর বিনােদা ও আর একটি মাদ্রাজী সাধু এসে বললেন,-“এইবার কিন্তু তােমাদের এসাদ পেতে হবে।” তখন বেলা প্রায় পাঁচটা। অবেলায় ভাত ডাল খাবার মােটেই ইচ্ছে ছিল না তবু বাঙ্গালীর ছেলে প্রসাদে অভক্তি কোন দিনই নেই, সুতরাং পাতা বিছিয়ে প্রসাদ পেতে, আমরা বসে গেলুম। আশার বহু অতিরিক্ত পােলাও, নানা রকম তরকারী, মিষ্টান্ত খাওয়া হলেও একটা জিনিসের আস্বাদ মােটেই ভুলতে পারছিলুম না, সেটা মাদ্ৰাজীদের উপাদেয় রসম-অন্য কিছুই নয়, তেঁতুল গােলা দিয়ে কলায়ের ডালের পাতলা ঝোল। সাধারণ বাঙ্গালীর যা অরুচির খাওয়া তা এদেশের লােকের উপাদেয় খাদ্য। কারুরই দোষ দেওয়া চলে না, কারণ বিভিন্ন দেশের লােকের বিভিন্ন রুচি। সাধারণতঃ মাদ্ৰাজীরা আমাদের মত আর
• ।
বামেশ্বরের মন্দির
ধনুষ্কাঠী বন্দর
No text on this page.
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সরষের তেল খায় না, তিলের তেলে তাদের রান্না হয়, আমরা যা
মােটই খেতে অভ্যস্ত নই।
সন্ধ্যার পর আমরা বাড়ী ফিরে এলুম। প্রসাদ হলেও খাওয়া
হয়ে গিয়েছিল অতিরিক্ত, সুতরাং সকাল সকাল মজলিস বন্ধ
করে শুয়ে পড়া গেল। ঠিক হ’ল পরেরদিন সকালবেলায় বিনােদা
আর বােসমশাই এখানে দেখবার যা আছে আমাকে সঙ্গে নিয়ে
সব দেখিয়ে দেবেন।
ভাের রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে যেতেই কাণে এসে বাজতে লাগল,
অদূরে সমুদ্রের উদ্বেলিত তরঙ্গাঘাতের আওয়াজ। ঝিঝির
ডাক থেমে গেছে, জোনাকীর আলাে নিভে গেছে, তারপর আস্তে
আস্তে রাত্রির কালাে অন্ধকারও সরে গেল। সবেমাত্র প্রভাতের
আলাে উকি মারতে শুরু করেছে। মনে হতে লাগল যেন
প্রাণের ভেতর একটা নূতন জাগরণের সাড়া উঠেছে, দূর
হ’তে যেন আমার কাণে মহাসাগরের গান ভেসে আসছিল এমন
সময় হঠাৎ রাস্তায় “কু”, “কু”, একট। চীৎকার হতেই জানালা দিয়ে
মুখ বাড়িয়ে দেখি একজন মাদ্রাজী স্ত্রীলােক প্রকাণ্ড একটা
কালাে হাঁড়ি মাথায় চাপিয়ে ঐ রকম বিকট চীৎকার করতে
করতে রাস্তা দিয়ে চলেছে। অবাক হয়ে বােসমশাইকে
জিজ্ঞাসা করলুম, “এ আবার কি ব্যাপার, ঐ স্ত্রীলােকটা মাথায়
কালাে হাঁড়িটা নিয়ে চীৎকার করছে কেন ?”
১৭
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বােসমশাই হাসতে হাসতে বল্লেন, “খাবে, ডাকবাে?”
বললুম, “সে কি, ঐ রকম একটা কেলে হাঁড়ির ভেতর খাবার
জিনিষ বিক্রী হচ্ছে ?”
“ওতে কি বিক্রী হচ্ছে জানাে, টোকো, দই, এদেশে এমনি
করে পাড়ায়-পাড়ায় দই ফিরি করে বেড়ায়।”
প্রথমটা যদিও ঐ রকম একটা বিকট আওয়াজের জন্যে
মনে একটা বিরক্তির ভাব প্রকাশ পেয়েছিল, কিন্তু তখনি অপরের
ভাষায় আমি যে অজ্ঞ এ কথাটা ভেবে পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যের দিক
দিয়ে ঐ রকম ভাবে দই বিক্রীর প্রথার উপর আমি মােটেই সন্তুষ্ট
হতে পারলুম না।
যাই হােক রীতিমত সকালবেলা চা, টোষ্ট খেয়ে আমি,
বিনােদদা আর বােসমশাই এই তিনজনে বেরিয়ে পড়লুম সহরের
দেখবার মত যা আছে তাই দেখতে। রাস্তায় পা বাড়াতেই
দেখলুম প্রত্যেক বাড়ীর সামনের খানিকটা করে জলে ভেজান
জায়গা আলপনা দিয়ে আঁকা। আর তারই ওপর যত রাজ্যের
আবর্জনার আঁস্তাকুড় হয়ে আছে। আমি বুঝে উঠতে পারলুম
এমন করে আলপনা দিয়ে ময়লা ফেলার তাৎপর্য কি, শেষে
বােসমশাইকে জিজ্ঞাসা করে বুঝলুম, এ দেশের অধিকাংশ বাড়ীর
দস্তুরই এই। মানুষের সংস্কার ও অভ্যাসের উপর কোনও কথাই
বলা চলে না, সুতরাং বিশেষ আর কোনও কথা না বলে আমরা
১৮
দক্ষিণাপথের যাত্রী
পার্থসারথির মন্দিরে এসে ঢুকলুম। মন্দিরটি খুব বড় না হলেও
নেহাত ছােট নয়। ওখানে বেশীর ভাগ মন্দিরেই নারকেলের
ভােগ হয়। আমরাও ঝুনাে নারকেল ভেঙে পূজো চড়ালুম।
বােসমশাই বল্লেন, “দেখছি তােমার যে খুব ভক্তি হে।”
বলুম, “বােসমশাই, যদিও আমি আজকালকারই ছেলে, কিন্তু
তাই বলে আমি এখনও আমার সংস্কার হারাইনি, তাই মাটীর প্রতিমা
দেখলে আজও আপনা থেকেই মাথা নত হয়ে আসে। আর
এই মাটীর দেবতাই মানুষকে অমর করতে পারে এ কথাটা ত’ আর
মিথ্যে নয় ?”
বােসমশাই বল্লেন,
“বেশ, দেবতা দরশনের পর এইবার
বাজারটা ঘুরে আসা যাক।” বাজারে ঢুকে দেখি সহরের
বাজার অতি সাধারণ, কোনও জিনিষের বিশেষ কোন পারি-
পাট্য নেই, পেয়াজ, লঙ্কা আর তেঁতুলের আমদানীটা আমার
চোখে পড়ল বেশী। সমুদ্রের মাছও বিক্রী হচ্ছে, সব বালি
মাখানাে। শূদ্র আর অপরাপর ছােট জাতরাই মাছ খায়।
এদেশের ব্রাহ্মণেরা নিরামিষ আহার করে থাকেন এবং যারা মাছ
খায় তাদের তারা ঘৃণা করেন। প্রকাণ্ড একট। ওল কিনে
বােসমশাইকে জিজ্ঞাসা করলুম, “আপনি ত প্রায় দু’টি মাস
এখানে কাটালেন ; এখানকার আচার-বিচার সম্বন্ধে আপনার কি
ধারণা বলতে পারেন ?”
১৯
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বােসমশাই বললেন-“দেখ ভাই, মাদ্রাজে আসা পর্যন্ত
সমুদ্রের কাছে টিপ্লিকেনেই বরাবর বাস করছি। তাছাড়া
এ রাস্তাটা সহরে একটা খুব দরকারী রাস্তা বলেই মনে হয়। স্কুল,
কলেজ, কোর্ট, সমুদ্র সব জায়গায় এই রাস্তার ওপর দিয়ে যাতা-
য়াতের সুবিধে। তার ওপর যতটা আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে
মনে হয় এ জাতটা, ভাড়ী পিটপিটে; ছোয়া নেপা নিয়ে এরা মরে
আর বাঁচে। এদিকে দেখ এদের বেশীর ভাগ লােকই এত
গরীব, তবুও এরা তাড়ি আর জুয়া না হলে একদণ্ডও বাঁচতে পারে
। অবশ্য ছােট জাতের মধ্যেই এর প্রচলনটা বেশী। আমাদের
বাংলাদেশের মেয়েরা যেমন পরদার আড়ালে বাস করে, এ দেশ
কিন্তু তেমন নয়, বেপরােয়া চলাফেরা। মােটের ওপর স্ত্রী-
স্বাধীনতাটা এখানে খুব বেশী। এ দেশে পুরুষের অনুপাতে
মেয়েরাই লেখাপড়ার দিকে বেশী মনােযােগী। এদের মেয়েরা কাছ
দিয়ে কাপড় পরে, আর পুরুষরা ঠিক উলটো, কাছা কিম্বা কোচা
কিছুরই বালাই তাদের নেই। মুসলমানেরা যেমন লুঙ্গি পরে
এদের পুরুষরাও ঠিক তেমনি করে একখানা কাপড় দুপাট করে
লুঙ্গির মত পরে। এমন কি বড় বড় চাকুরে বাবুরাও পায়ে জুতােনা
দিয়ে, কাপড়ের ওপর নেকটাই এটে আফিস কাছারী করে থাকেন।
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, “আচ্ছা, সব চেয়ে এরা খেতে কি
ভালবাসে বলুন ত?”
২০
দক্ষিণাপথের যাত্রী
“আগেই ত বলেছি তেঁতুল, লঙ্কা, পেয়াজ তবে সবচেয়ে
বেশ খায় কলায়ের ডাল কারণ ডালের রসটাই হচ্ছে এদের
একটা উপাদেয় খাদ্য।
হঠাৎ বিনােদদা বল্লেন, “ওহে, তােমার যদি আর কিছু দেখবার
থাকে তাহলে আজই তা সেরে নাও। কারণ ঠিক করেছি আজই
আমরা সন্ধ্যার গাড়ীতে রামেশ্বর রওনা হব, পথে অবশ্য মাদুরায়
নামবাে।”
বলুম, “তবে চলুন, এ্যাকোয়েরীয়ামটা আজকেই দেখে নেওয়া
যাক।”
তিনজনেই আমরা এ্যাকোয়েরীয়াম দেখতে গেলুম। সেটা
একটা সমুদ্রের নানাবিধ মাছের চিড়িয়াখানা। কত রঙ বেরঙের ছােট
বড় লম্বা সৰু মাছ যে তাতে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে,
তা বলা যায় না। সত্যই সেটা দেখবার জিনিষ।
ফেরবার পথে একটা বাঙ্গালী ভদ্রলােকের সঙ্গে আমাদের আলাপ
হােল। এতদিন ধরে কোনও বাঙ্গালীই আমার চোখে পড়েনি।
তার সঙ্গে আলাপ করে জানলুম, বিশ পঁচিশ জন বাঙ্গালী এখানে
বাস করেন, কিন্তু এমনি বিড়ম্বনা কেউ কারাের খোজ-খবর রাখেন
। এই প্রথম আমার ধারণা হল বাংলাদেশের বাইরে সামান্য
ক-ঘর বাঙ্গালীর মধ্যেও দলাদলি। যাই হােক, তঁাকে আমাদের
অভিবাদন জানিয়ে আমরা বাসায় ফিরে এলুম। তখন বেলা হবে
২১
দক্ষিণাপথের যাত্রী। প্রায় বারট।। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে দুটি খেয়ে নেওয়া গেল। তারপর একটু বিশ্রাম করে জিনিষপত্র সব গুছিয়ে নেবার ব্যবস্থা আরম্ভ হল, কারণ আগে থেকেই ঠিক করে ফেলেছিলুম আজই মাদ্রাজ সহর ছেড়ে মাদুরা, রামেশ্বর যাব। তারপর যদি বরাতে জোটে কলম্বাে পৰ্য্যন্ত পাড়ি দেওয়া যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। তার কারণ পাসপাের্ট ও অন্যান্য নানা খুচরাে ইতিহাস। আর কালবিলম্ব না করে বিকেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিয়ে সাতটা ক’মিনিটে বােটমেলে ( এ দেশের লােকেরা চলতি কথায় এই ট্রেনখানাকে বােটমেল বলে, কারণ এই ট্রেনখানা মাদুরা হয়ে সটাং ধনুষ্কোটি পৰ্য্যন্ত গিয়ে কলম্বো যাত্রীদের ষ্টীমার ধরিয়ে দেয় )রামেশ্বরের পথে রওনা হয়ে গেলুম। বােসমশাই আমাদের দুজনকে গাড়ীতে তুলে দিয়ে বাসায় ফিরে গেলেন। আমাদের সহযাত্রী হলেন একজন মাদ্ৰাজী ভদ্রলােক। তার সঙ্গে আলাপ করে জানলুম তিনি কলেজের ছাত্র। আমি কলকাতার লোেক, এই হিসেবে তিনি আমাকে কংগ্রেস সংক্রান্ত অনেক কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। যুবকটিকে জিজ্ঞাসা করে জানলুম, তিনি ত্রিচিনাপল্লীতে নামবেন। গাড়ীতে ছিল খুব ভীড়, কাজে কাজেই কোনও রকমে ঠেলেঠুলে বসতে হ’ল। যতটুকু পারা যায় বসে বসে ঘুমিয়ে নেওয়া গেল। ভাের রাত্রে যুবকটি নেমে গেলেন। সে রাত্রে আমাদের যাত্রার দক্ষিণাপথের যাত্রী শেষ ছিলনা, কারণ রামেশ্বর যেতে হলে পরদিন বেলা একটার সময় মাদুরায় গাড়ী পৌছবে। তারপর বেলা চারটেয় ট্রেন বদলি করে রামেশ্বর। উপায় নেই, পাঁচশ মাইল পথ আমাদের এমনি করে যেতেই হবে। সাউথ ইণ্ডিয়ান রেলওয়ের গাড়ীগুলো যেমন বিশ্রী, ষ্টেশনগুলােও তেমনি জঘন্য। খাবার জিনিষ ত মােটেই পাওয়া যায় না। মধ্যে মধ্যে এক এক জায়গায় গাড়ী থামছিল, আর সঙ্গে সঙ্গে পাল, টি, কফি ও উপমাবড় বিক্রেতার উচ্চ চীৎকারে কাণ যেন একেবারে বধির হয়ে আসছিল। পাল হচ্ছে জোলো দুধ, উপমা বড়া হচ্ছে কলায়ের ভাল আর পিয়াজ দিয়ে তিলের তেলে ভাজা একরকম বড়া। সুতরাং দক্ষিণ-ভারত ভ্রমণ করতে আমাদের যা নাকাল হতে হয়েছিল তা আর বিশেষ করে না বলাই ভাল। যাই হােক, কোন প্রকারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ীর মধ্যে কাটিয়ে পরদিন বেলা একটার সময় আমরা মাদুরায় পৌছুলুম। নেমে কোথায় একটু শান্তি পাব তা নয়, পাণ্ডার ছড়িদার, অর্থাৎ দালাল এসে পেছু নিলে তারা বেশ বাংলা বলতে পারে। কেবলি জিজ্ঞাসা করে, “কোথায় থাকবেন বাবু, কোথায় যাবেন, আপনাদের পাণ্ডা কে” এই রকম আরও কত কথা। আর থাকতে না পেরে বললুম, “বাপু, আমরা তােমাদের দেশে ধৰ্ম্ম করতে আসিনি , আমাদের কোনও মানসিকও নেই, কেন দক্ষিণাপথের যাত্রী। আমাদের বিরক্ত করছ ?” কিন্তু ভবি তােলবার নয়। ছিনে জোকের মত তারা আমাদের পেছনে লেগে রইল। অগত্যা বাধ্য হয়ে একজনকে বললুম “আচ্ছা তােমাদের কিছু দেওয়া যাবে, আমাদের সব দেখিয়ে শুনিয়ে দিও।” তাহাদের নির্দেশ-মত এক ধৰ্মশালায় ওঠা গেল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে, কিছু জলযােগান্তে মাদুরা সহর দেখতে বেরিয়ে পড়া গেল। সঙ্গে ছিলেন বিনােদা আর ছড়িদার। মাদ্রাজ সহরের তুলনায় মাদুরা বেশ ভালই লাগল। ইতিহাস-বর্ণিত দক্ষিণ ভারতের মন্দিরের কারুকার্য দেখে সত্যিই প্রাণে একটা সাড়া পড়ে আমার সঙ্গী বিনোদদাকে বললুম “দেখুন এই চৌরাস্তায় দাড়িয়ে মারার মন্দিরের চূড়াগুলো কি সুন্দর দেখাচ্ছে ! কত পুরােনাে মন্দির, কিন্তু আজও মনে হচ্ছে যেন কত নতুন। মন্দিরের গায়ের কারুকার্য এত চমৎকার যে তা না দেখলে বর্ণনা করা যায় না। এই মাদুরা জেলার ভাষা হচ্ছে তামিল। ইতিহাস পাঠে জানা যায়, এই সহর প্রায় আটশ' বছর আগে পাণ্ডাদের শেষ রাজ। সুন্দর পাণ্ডা তৎকালীন জৈনদের উচ্ছেদসাধন করে নিজ অধিকারে আনেন ; পরে ১৩২৪ খৃষ্টাব্দে মুসলমানগণের দ্বারা মাদুরা অধিকৃত হয়; খৃষ্টাব্দের মধ্যভাগে মাদুরা পুনরায় হিন্দু রাজার অধীনে আসে এবং প্রায় তেত্রিশ বছর রাজত্ব করার পর হঠাৎ রাজার মৃত্যুতে তারপর ১৬০০ ২৪ দক্ষিণাপথের যাত্রী মাদুরা রাজ্য আবার খণ্ডীভূত হয়ে যায় এবং ১৭৪০ খৃষ্টাব্দে রাজ্যটি চাদ সাহেবের অধীনে আসে। পুনরায় ১৭৬২ খৃষ্টাব্দে কাটের নবাবের পক্ষ থেকে ইংরাজেরা এই রাজ্য শাসন করতে আরম্ভ করেন। পরে ১৮০১ খৃষ্টাব্দে নবাব ইংরাজদের রাজ্যের স্বত্ব ছেড়ে দেন। এই হচ্ছে মাদুরার যৎসামান্য ইতিহাস। মাদুরা কাপড়ের জন্য প্রসিদ্ধ। মাদ্রাজি সাড়ী, সবই মাদুরার প্রস্তুত হয়। আমাদের দেশের মেয়েরা সাধারণতঃ এগার হাতের বেশী লম্বা কাপড় পরেন না কিন্তু মাদ্রাজি মেয়েরা ১৩১৪ হাতের কম লম্বা কাপড়ে কুলােতে পারেন না। কাজেই এদেশে ১৩১৪ হাতের কম লম্বা কাপড় পাওয়াও যায় না। মাদুরা জেলার অন্তর্গত ডিণ্ডিগুল সহরে বহুপরিমাণে তামাকের চাষ হয়, আর সেই তামাক ত্রিচিনাপল্লিতে এসে চুরুট আকার ধারণ করে নানা দেশে বিক্রয়ের জন্য প্রেরিত হয়ে থাকে। শােনা যায় ১৬০০ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মাদুরা সহরে রােমান ক্যাথলিক যাজকরা প্রায় দশ লক্ষ লােককে খৃষ্টধর্মে দীক্ষা দেন। যাই হােক এখন ইতিহাসের কথা ছেড়েদিয়ে মারার উপস্থিত কিছু কিছু হিসেব-নিকেশ দেওয়া যাক। ভাগৈ নদীর কূলে মাদুরা সহর অবস্থিত। নগরস্থিত দেবালয় আয়তনে, অলঙ্কার-সম্পদে ও শিল্প-নৈপুণ্যে দক্ষিণ ভারতে অতুলনীয়। দেবালয়ের প্রধান মূর্তি সুন্দর স্বামী বা সুরেশ্বর। প্রধান নগরের ২৫ দক্ষিণাপথের যাত্রী কাছেই মীনাক্ষী দেবীর মন্দির। দেবালয়ের পরিমাণ উত্তর দক্ষিণে আটশ' সাতচল্লিশ ফিট, আর পূর্বে পশ্চিমে সাতশ’ চুয়াল্লিশ ফিট। ন’টি সুউচ্চ ও নানা দেবমূত্তি সমন্বিত গােপুর এর চতুর্দিকে বেষ্টন করে আছে। সহ-স্তম্ভ মণ্ডপ দেবালয়ের প্রধান দর্শনীয় বস্তু। মণ্ডপটি ন’শ সাতানব্বই স্তম্ভযুক্ত। বিশ্বনাথ নায়কের সেনাপতি ও মন্ত্রী আৰ্য্য নায়ক এই সুবৃহৎ দেবালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের মন্দিরের মত সুন্দর কারুকার্যখচিত দেবালয় কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। মন্দিরের কাছেই একটা প্রকাণ্ড সমচতুষ্কোণ জলাশয় আছে। কথিত আছে যে, তৎকালীন তিরুমল নায়ক কর্তৃক টেকুলম নামে এই বৃহৎ জলাশয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই জলাশয়ের প্রত্যেক দিক দু'হাজার চারশ’ হাত পরিমিত। জলাশয়ের মাঝখানে একটা দ্বীপ আছে; তার ওপর একটা উচ্চ মন্দির সংস্থাপিত। বছরে একদিন টেপ্লম ( এক রকম নৌকা বিশেষ) সহযােগে দেবালয়ের মূর্তিগুলি জলাশয়ের চারদিক ঘুরিয়ে আনা হয়, আর সেই উপলক্ষে জলাশয়ের চারি তীরে লক্ষ প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত করা হয়। যদিও আমাদের ভাগ্যে এ দৃশ্য দেখা ঘটে ওঠেনি, তবু বছরের একদিন এই দৃশ্য সত্যিই উপভােগ্য। ছড়িদারের সঙ্গে ঘুরে মন্দিরের ও কাছাকাছি যা কিছু দেখবার ছিল সব দেখে নিলুম। সমস্ত দিন ট্রেনে জেগে শরীর ও মন এত শ্রান্ত হয়ে পড়েছিল যে, আর এক মুহুর্তও দাড়াবার ইচ্ছে হচ্ছিল না। কোন দক্ষিণাপথের যাত্রী রকমে ক্লান্ত দেহটাকে টেনে নিয়ে ধৰ্ম্মশালায় উপস্থিত হলুম। দেখি এর মধ্যে আর একজন বাঙ্গালী ভদ্রলােক সপরিবারে ধর্মশালায় এসে জুটেছেন কথায় কথায় বুঝলুম তিনি কলকাতার কাছাকাছিই থাকেন। সঙ্গে আছেন তার বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও একমাত্র অষ্টাদশ বর্ষীয়া কন্যা। ভদ্রলােকটির সঙ্গে কথা কইছি এমন সময় বৃদ্ধা এসে জিজ্ঞাস করলেন--“তােমরা বুঝি রামেশ্বর যাবে বাবা?” উত্তর দিলুম “হ্যা”। “আজকেই বুঝি এসেছ ?” বললুম, আজকেই দুপুরে এসেছি, আজকেই যাবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ট্রেন না থাকায় কালকে যাব ঠিক করেছি।” এই সময় মেয়েটি এসে ডাকলে—“ঠাকুমা, মা ডাকছে একবার এদিকে এস।” মেয়েটিকে দেখে মনে হল যেন এর ভেতর মােটেই কোনও আড়ষ্ট ভাব নেই, আমাদের দেখে যে কোনও লজ্জা বা সঙ্কোচবােধ সে সব এর আছে বলে মনে হল না তার বাবার সঙ্গে কথা কইছি এমন সময় মেয়েটা এসে আমাদের কথাবার্তা বেশ মন দিয়ে শুনতে লাগল। মাঝে মাঝে দু'এক কথায় যােগ দিতে লাগল। বেশ মনে আছে তার বাবা রামচন্দ্রের সেতুবন্ধ ও রামায়ণ সংক্রান্ত দু' একটি কথা আমাকে বলছিলেন, এমন সময় মেয়েটি বললে, “আজকালকার ছেলেরা জলে পাথর ভাসানাের কথা বল্পেইহেসে উড়িয়ে দেয় কেন বলুনত বাবা?” ২৭
দক্ষিণাপথের যাত্রী
ভদ্রলােকটির নাম ত্রিলােচন রায়। বয়সে বৃদ্ধ না হলেও যুবক
বললুম, “রায় মশাই, আপনার কন্যাটির কি নাম রেখেছেন
বলুন ত ? বেশ চালাক দেখছি ; পড়াশােনা করে ত?”
ত্রিলােচনবাবু বললেন, “এর নাম হচ্ছে সুধীরা, আমরা ‘সুধা,
সুধা' বলেই ডাকি। ওর ঠাকুমার বড় আদুরে। গেল বছর
ম্যাটরিকুলেসন পাশ করে প্রাইভেটে আই, এ দেবার চেষ্টা
করছে।” সমস্ত শােনার পর ব্রিলােচন বাবুর সঙ্গে বেশ একটু
ঘনিষ্ট পরিচয় হয়ে গেল, আর সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হল’ কাল আমরা
এক সঙ্গেই রামেশ্বর রওনা হব।
অনেকক্ষণ বসে বসে ছড়িদার বললে-“বাবু, তাহলে আপনারা
খাওয়া-দাওয়া করে বিশ্রাম করুন, আমি কাল সকালে এসে
আপনাদের মন্দির দর্শন করিয়ে নিয়ে আসব।”
ছড়িদার, চলে গেলে ত্রিলােচন বাবু বললেন--“আপনার
সঙ্গীটির বােধ হয় এতক্ষণ অর্ধেক রাত।”
পিছন ফিরে দেখি বিনােদনা বেশ নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছেন।
তঁাকে ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলুম-“কি, আজ আর খাওয়া-
দাওয়া কিছু করবেন না?”
“এখন আর কোথায় কি পাব যে, খাওয়া-দাওয়া করব? কাল
সকালে যা হয় চেষ্টা করে দু'টো ডালে চালে ফুটিয়ে নিলেই হবে।
২৮
দক্ষিণাপথের যাত্রী
তােমার যদি খুব বেশী ক্ষিদে পেয়ে থাকে একটু দুধ কিনে এনে
খেতে পার?” বলে বিনােদা ফিরে শুলেন।
কে আর দুধ কিনতে যায়, এই ভেবে আমিও কম্বল ও চাদরটা
নিয়ে শােবার উপক্রম করছি, এমন সময় ব্রিলােচন বাবুর কন্যা সুধা
একটা এ্যালুমিনিয়ামের রেকাবে কিছু ফল ও সন্দেশ নিয়ে এসে
বললে-“ঠাকুমা এই সামান্য ফল ও মিষ্টি পাঠিয়ে দিয়ে বলেন,
“রাত-উপােস থাকতে নেই।”
সুধা এসে কথা ক’টা এমন ভাবে বলে গেল যে তার মানে হয়
এখুনি সব না খেয়ে নিলে আর রক্ষে নেই।
বললুম-“ঐখানে রাখ, ডিসটা কাল দিলে চলবে ত?”
বিছানার একধারে ডিসটা নামিয়ে রেখে সুধা তাড়াতাড়ি চাদরটা
আমার হাত থেকে নিয়ে পাততে পাততে বলেলে---“ও এখানকার
নয় ; কাতা থেকে আনা ; তিলের তেলের বালাই নেই ওতে।”
বিনােদাকে ডেকে তুলে দু’জনে ফল আর মিষ্টান্ন খেয়ে নিয়ে
বললুম, “ভাগ্যিস তােমরা এসেছিলে।”
সুধা অমনি হেসে উত্তর দিলে—“আর আপনারা এসেছিলেন,
তাই ত দিতে পেলুম।”
বললুম-“বেশ কাল তা হলে দু’টি ভাতও দিও।”
“সে ত আমাদের সৌভাগ্য, তাহলে আপনাদের কাল আর
হাত পুড়িয়ে চাল ভাল ফোটাবার দরকার নেই বুঝলেন?” বলে
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সুধা ডিস আর গেলাশ নিয়ে চলে গেল। রাত্রে শুয়ে শুয়ে ভাবতে
লাগলুম এই মেয়েটার এত মায়া আমাদের ওপর কেন ?
নিদ্রাদেবী আমাদের উভয়কেই পেয়ে বসেছিল সুতরাং কি
ভাবে যে ওটা ছােট্ট একটা স্বপ্নের ইতিহাস রেখে রাত ভাের
হল আজ সেই কথাই বলব। জীবনের ইতিহাসে অনেক অঘটন
ঘটেছে। বৈচিত্র্যময় পৃথিবীর বুকে মানুষের কলরব যখন দিগন্ত
মুখরিত, এমনি একদিন, সন্ধ্যা হয় হয়, পশ্চিম গগনে অস্তমিত
সূর্যের শেষ রেখাটা তখনও মিশিয়ে যায় নি। লােকালয়ের
বাইরে বিস্তীর্ণ মরুভূমির এক প্রান্তে একাকী শুয়ে শুয়ে ভাবছি,
দিনের আলাে ত নিভে গেল, এখন কেমন করে অন্ধকারে
অজানাপথে বাড়ী ফিরব। দেখতে দেখতে কোথা থেকে যেন
এক অতি পরিচিত সঙ্গীতের মিষ্টি সুর আমার কানে এসে
আধাে-আলো আধাে-অন্ধকারের মাঝে দৃষ্টি প্রসারিত
করে রইলুম। প্রতীক্ষায় সময় অতিবাহিত হয়ে গেল। নির্জন
বালুময় মরুভূমির প্রতি স্তরে স্তরে অন্ধকারের কালাে রঙ অনতিদুরে
ভাসমান সুরের সঙ্গে মিশে নির্জনতাকে আরও গভীর করে
তুলছিল। ভয় হল বুঝি-বা বহু সহস্র বৎসর পূর্বের কোন
মৃত পথহারা পথিকের প্রেত-আত্মা আমাকে ছলনা করছে।
কিছুক্ষণ এইভাবে কেটে গেল। তার পর আকাশের গায়ে
পুঞ্জীভূত তারার আলােয় বুঝতে পারলুম কোনও এক নারীমূর্তি
বাজল।
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সম্মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হল আমারই মত সে-ও
বুঝি পথহারা, শ্রান্ত, আশ্রয় খুঁজছে। শুয়ে শুয়ে জিজ্ঞাসা
করলুম, কে? উত্তর এল, ‘কে’। মনে হল আমার
নিঃস্বর অবগুণ্ঠিত নারীর কর্ণে পৌছয়নি। আবার জিজ্ঞাসা
করলুম, “কে তুমি এমনি করে একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছ?”
প্রতিধ্বনি হল’ বটে কিন্তু উত্তর এল, “আপনার নতুন
যায়গায় কোনও কষ্ট হচ্ছে না ত?”
কষ্ট কেন কিসের কষ্ট, বেশ আরাম করে রাত্রিতে ই,
দিনের বেলায় পথে পথে ঘুরে বেড়াই; কৈ আমার ত কোনও
কষ্ট হয় না। হঠাৎ পেছন অট্টহাসির শব্দে চেয়ে দেখি
রায় মহাশয়ের কন্যা সুধা খিল খিল করে হাসছে। তাের
হয়ে গিয়েছিল, ছড়িদারের ডাকে ঘুম ভেঙ্গে যেতেই দেখি,
ধর্মশালার একটা ঘরে বিনােদ-দা তখনও ঘুমুচ্ছেন। বিনােদাকে
বললুম,—এইবার উঠুন, ভাের হয়েছে।
রাত্রের জলখাবার দেওয়া থেকে বিছানায় চাদর পাতা পর্যন্ত সব
কথাই আবার নুতন করে মনে পড়তে লাগল। উপরন্তু স্বপ্নের
কথা মনটাকে আর এক বােঝ চিন্তার খােরাক জুগিয়ে রেখে
ডেকে
হাত মুখ ধুয়ে বসে আছি, বিনােদ-দা জিজ্ঞাসা করলেন,
“কিহে ওঠ এইবার, সহরটা একটু ঘুরে দেখে আসা যাক।”
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বললুম,—“চলুন না, রায় মশাইকেও সঙ্গে নেওয়া যাক।
ওঁরাও ত রামেশ্বর যাবেন, এক সঙ্গেই যাওয়া যাবে।”
বিনােদ-দা বললেন,—“মেয়েছেলে নিয়ে এত তাড়াতাড়ি
উনি কি আমাদের সঙ্গে গিয়ে উঠতে পারবেন।”
কি একটা বলতে যাচ্ছিলুম, ছড়িদার ঘুরে এসে বললে,
“চলুন বাবু, মন্দির দর্শন করবেন, আজ যদি রামেশ্বর যেতে
হয় তাহলে আর দেরী করবেন না, তাছাড়া ঘুরে ফিরে দেখতে
বেলাও হয়ে যাবে অনেক।”
বললুম, “না-হয় একদিন দেরীই হবে, সকালবেলা এক কাপ
চা না খেলে যে একপাও নড়তে ইচ্ছে করে না ছডিদার।”
এমন সময় রায় মশাই এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “কাল রাত্রে
ঘুম হয়েছিল ত?”
বললুম, “রায় মশাই, নির্ভাবনায় আমরা ঘুমিয়েছি। জানি
যে কদিন এ দেশে থাকা যাবে সে কদিন আমাদের বেশ সুখেই
কাটবে।”
রায় মশাই হাসতে হাসতে বললেন, “কেন, এ দেশটা
আপনাদের বুঝি ভারি ভাল লেগেছে ?”
“দেশ যত ভাল লাগুক আর নাই লাগুক, সবচেয়ে ভাল
লেগেছে এই সুদুর দক্ষিণাপথে আপনাদের সঙ্গ লাভ।”
“সেটা আমার পরম সৌভাগ্য।”
৩২
}}}int1
রামেশ্বর মন্দিরে দেবমূত্তি
রামেশ্বরের শিমুত্তি
No text on this page.
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সেই সময় সুধা দুটো এনামেলের গ্লাসে চা এনে বললে,
এই গ্লাসেই আপনাদের খেতে হবে, কারণ বুঝতেই পারছেন।”
একটু হেসে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি কেমন করে জানলে
আমরা চা খাই, আমরা যে চা খাই না।”
সুধা অবাক হয়ে বললে, “আপনারা কলকাতার লােক,
বাড়ীতে চা আর পান দিয়ে লােক-লৌকিকতা করেন আর আপনি
বলছেন কি না, চা খাই না, এটা আমার কাছে ভারি আশ্চর্য্য বলে
মনে হচ্ছে।”
হাসতে হাসতে উত্তর দিলুম, “আর যদি খাই তাহলে বােধ হয়
আরও আশ্চর্য হবে, কেমন ?”
আর কোনও কথা না বলে একটা গেলাস বিনােদাকে
এগিয়ে দিয়ে বল্লম,
“যখন তুমি এত কষ্ট করে তৈরী করে আনলে,
তখন কি না খেয়ে পারি।”
সুধা বললে, “না না, আপনাদের যদি খাওয়া অভ্যাস না থাকে
তবে খেয়ে আমাকে খুশী করতে গিয়ে অনর্থক শরীর খারাপ করে
লাভ কি বলুন।”
চা খাওয়া শেষ করে বিনােদদা বললেন, “সুধীরা, তােমার
কোনও চিন্তা নেই, চা না খেলে বরঞ্চ আমাদের শরীর খারাপ হবে,
চা’র অপেক্ষায় আমরা ঘরে বসেছিলুম কারণ জানি তােমাদের সঙ্গে
যখন কেটলি এসেছে তখন অন্ততঃ এক ঢােকও আমরা ভাগ পাব।”
দক্ষিণাপথের যাত্রী।
“আচ্ছা আমাকে যেমন ঠকালেন আমি কিন্তু এর প্রতিশােধ
নােব।”
বললুম, “যদি তােমাদের সঙ্গে আমরা রামেশ্বর না যাই?”
“আমাদের সঙ্গে না হয় নাই যাবেন, কিন্তু এতদূর এসে রামেশ্বর
গিয়ে নিশ্চয়ই থাকতে পারবেন না।”
রায়মশাই বললেন, “কি, আজ ত আমাদের যেতে হবে,
তাহলে আরদেরী করে লাভ কি, চলুন বেরুনাে যাক।”
আর বাক্যব্যয় না করে সকলে ছড়িদারের সঙ্গে আর
একবার ভাল করে মারা সহরের যা কিছু দেখা বাকী
আছে দেখতে বেরিয়ে
পড়ল ম। মাদুরা সম্বন্ধে যা
বলবার তাহা আগেই বলেছি। মন্দির দর্শন করে ফেরবরি
পথে রায়মশাই একটি কাপড়ের দোকানে সওদা করার
ঢুকতেই বললুম, “আমি আর যাবােনা, যা নেবার কিনে আনুন,
ততক্ষণ রাস্তায় একটু পায়চারি করি।”
রায়মশাই জিজ্ঞাসা করলেন, “কেন, আপনার বুঝি কিছু
কেনার বরাত নেই ?”
বিনােদদা বললেন, “সুবােধ, মাদুরায় এসেছিস, যাহােক
একটা কিছু কিনে নিয়ে যা, তবুও একটা চিহ্ন থাকবে।”
হাসতে হাসতে বললুম, হ্যা যাবার সময় এক টিন নন্তি
নােব আপনারও হবে আমারও হবে।”
৩৪
দক্ষিণাপথের যাত্রী
রাস্তায় আমি আর বিনােদা কথাবার্তা বলছি, এমন সময়
সুধা এসে তাড়াতাড়ি একখানা প্রকাণ্ড রঙচঙে শাড়ী আমার হাতে
দিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, “সুবােধদা, দেখুন ত কাপড়খানা কেমন,
আপনার পছন্দ হয় ?”
হেসে উত্তর দিলুম, “সুধা, তােমার চেহারা যেমন সুন্দর,
কাপড়খানাওতেমনি সুন্দর, পরলে তােমাকে চমৎকার মানাবে।”
“আমাকে ঠাট্টা করছেন বুঝি সুবােধদা?”
সুধার মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বললুম, “যে সুন্দর তাকে
সুন্দর বলতেও কি দোষ ?”
সুধা মুখটা একটু ভারি করে বললে, “আমাকে দেখতে সুন্দর
কিনা তা ত আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিনি।”
‘সুধা, তাকি কেউ কখনও জিজ্ঞাসা করে, যারা বুদ্ধিমান লোেক
তারা আপনিই তা বুঝতে পারে। কাপড়খানা যে তােমার নিজের
জন্যে পছন্দ করতে চাও একথাটা ত আর মিথ্যে নয়, সুতরাং
তােমার চেহারার অনুপাতে এটা যে মানানসই, আমি তােমাকে সেই
কথাই বলছি এতে কেমন করে তুমি বুঝলে তােমাকে ঠাট্টা করছি ?”
সুধা আর কোনও কথা না বলে দোকানে ফিরে যেতেই রায়-
মশায় জিজ্ঞাসা করলেন, “সুবােধ বাবু কি বললেন ?”
‘সুবােধদার কাপড়টা ভারি পছন্দ হয়েছে বাবা, আমি ত
তােমাকে তখনি বলেছি কাপড়টা ভাল।”
৩৫
দক্ষিণাপথের যাত্রী
কাপড়ের দাম চুকিয়ে দিয়ে সকলে ধৰ্মশালায় ফিরে
আসতেই রায়মশাই জিজ্ঞাসা করলেন, “আমাদের কটায় ট্রেন ?”
টাইম-টেবলখানা ভাল করে উল্টে পাল্টে বললুম, “এখন
অনেক সময় আছে, “বেলা দেড়টার পরে। আমরা ঠিক সন্ধ্যের
আগেই রামেশ্বর পৌছব ।”
ব্রহ্মচারী বিনােদদা সাংসারের কোনও কথায় থাকতেন না,
কিন্তু তিনি তবুও রসিকতা করে জিজ্ঞাসা করলেন, “রায়মশাই,
কাল রাত্রি থেকেই সুধীরা আমাদের কিন্তু ভাতে-ভাতের নিমন্ত্রণ
করে রেখেছে, তার কতদূর বলুন ত।”
রায়মশাই হাসতে
হাসতে বললেন, “তীর্থদর্শনের পর
ব্রাহ্মণ, সাধু ভােজন করান তীর্থ-দর্শনের আর একটা অঙ্গ সেটা যাতে
অসম্পূর্ণ না থাকে মা আমার তাই দেখছি আগে থেকেই আপনাদের
নিমন্ত্রণ করে
রেখেছে। সত্যি কথা বলতে কি এমনি ভাবে
পথের মাঝে আপনাদের পাব তা আমি কোন দিনও ভাবতে
পারিনি। সঙ্গী অবশ্য অনেক পাওয়া যায় কিন্তু আপনাদের মত এত
আপনার হয়ে জোটা, সেটাও পুণ্যফল।”
বললুম, “একা একাই সবটুকু পুণ্য আপনারা ভােগ করবেন,
যদিও আমরা তীর্থযাত্রী নই, তবুও তীর্থ স্থানে মন্দির ত আমরা
দর্শন করেছি কিন্তু এমনি বরাত, কোথায় আমরা ব্রাহ্মণ-ভােজন
করাব, না ভােজন করেই যাচ্ছি।”
৩৬
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সুধা এসে বলে বসল, “ভােজন করবার প্রয়ােজন আছে বলেই
বাধ্য হয়ে করতে হয়।”
বললুম, “সুধা, এ জগতে মানুষের অনেক কিছুই প্রয়ােজন
আছে, সুতরাং তাদের অনেক কিছুই ভেবে কাজ করতে হয়।”
“বেশ আমি দাঁড়িয়ে রইলুম বেশ ভালকরে ভেবেই
আমাকে বলুন।”
বিনােদদা বললেন, “সুধীরা, তােমার সুবােধদার কথা বাদ
দাও, এখন কি বক্তব্য তাই বল শুনি।”
“বেশ ব্রহ্মচারী মশাই, আপনি তবে একাই আসুন সুবোধদাকে
জগতের প্রয়ােজন চিন্তা করতে দিন।”
হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করলুম, “সুধ। এরই মধ্যে
আমাদের ভাতে-ভাত প্রস্তুত, তা বলতে হয়।”
সুধা জবাব দিল, ‘সােজা কথায় আপনাকে জবাব দিলে ত
চলবে না সুবােধদা, একটা কথা বলে বারােবার তার মানে না
করলে আপনার কাছে নিস্তার পাওয়াই দায়।”
“বেশ, এখন থেকে কদিন তােমাদের
আমাদের ঘেরিবার মেয়াদ আছে অন্ততঃ সে কদিন আমি মুখটি বুজে
থাকব এখন চল তােমাদের তীর্থ-দর্শনের শেষ পুণ্যটুকু সঞ্চয়
করিয়ে দিয়ে আসি।”
কম্বল বিছিয়ে ধৰ্মশালার একটা ঘরে রায়মশাই, আমি ও
৩৭
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বিনােদদা খেতে বসেছি সম্মুখে রায়মশায়ের বৃদ্ধা মাতা বসে
আছেন, সুধা কলাপাতা পেতে ভাত, ঘি, মুগের ডাল, আলু-
ভাতে ও একটা নিরামিষ আলুর তরকারী দিয়ে গেল। সেগুলি
খাওয়ার পর, বৃদ্ধা বললেন, “যাও মা এইবার দুধ, কলা আর
চিনি এনে দাও বিদেশে ধর্মশালায় খাবার কত কষ্ট হল।”
বৃদ্ধা আপন মনে কথা কটা বলে যাবার পর বললুম,
“আচ্ছা ঠাকুমা, আপনি কি বলতে চান আমরা বাড়ীতে রোজ
মােণ্ড। মেঠাই খেয়ে থাকি ?
রকম আপনার
আশীর্বাদে খাওয়া হ’ল এরকম যদি বােজ জোটে তাহলে আমি
আপনার সঙ্গে সমস্ত তীর্থদর্শন করতে প্রস্তুত আছি।”
বিনােদদা বললেন, “এও কিন্তু আমাদের জোটেনা মা-
ঠাকরুণ।”
“তা যাই হােক বাবা “তােমাদের তৃপ্তি হলেই হােল” বলে
বৃদ্ধ উঠে গেলেন।
সুধা দুধের বাটা হাতে করে তখনও দাড়িয়ে ছিল, জিজ্ঞাসা
করলুম, কি সুধা দাড়িয়ে আছ যে, আবার কি মুগের ডাল থেকে
খাওয়াতে চাও নাকি?”
সুধা বললে, “আপনি যদি খেতে চান তা আবার খাওয়াতে
পারি বৈকি।”
“না আধপেটাই ভাল শেষে তােমার ভাতে কম পড়লে মনে
৩৮
দক্ষিণাপথের যাত্রী
মনে গালাগালি দেবে ত! দরকার নেই” এই বলে উঠে পড়তেই
বিনােদদা বললেন, “তিলের তেলের চোটে এতদিন আমার
প্রাণ অস্থির হয়ে উঠেছিল, আজ তবু মুখটা বদলান’ গেল,
রান্নাগুলি চমৎকার হয়েছে।”
সুধাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বিনােদাকে বললুম, “সুধার রান্না ভারি
চমৎকার, সব চেয়ে আমার কিন্তু ভাল লেগেছে আলু-ভাতেটা।”
বিনােদদা হাে হাে করে হেসে উঠলেন, সুধা মুখ ভার
করে চলে গেল।
আর ঘণ্টাখানেক বাদেই আমাদের মাদুরার মায়া কাটিয়ে
রামেশ্বর রওনা হতে হবে। ছড়িদার আমাদের সঙ্গেই যাবে,
পূৰ্বেই তা ঠিক হয়ে গিয়েছিল।
সামান্য বিছানা গুছিয়ে নিতে বসলুম।
সুধার ঠাকুমা
আমাদের মুখশুদ্ধি দিয়ে গেলেন। জিজ্ঞাসা করলুম, “আপনাদের
সকলের খাওয়া হয়েছে ত ঠাকুমা ?”
বৃদ্ধা বললেন, “হ্যা বাবা, আজকের মত
গেল, দেড়টায় গাড়ী বুঝি?”
বললুম, “প্রায় দেড়টা, বিছানাপত্র সব গুছিয়ে নিন,
ছড়িদার এলেই আমরা বেরিয়ে পড়ব।”
বৃদ্ধা চলে যাবার সময় বললুম, “ঠাকুমা সুধাকে এক
মাস জল দিয়ে যেতে বলুন না।”
একরকম চুকে
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সুধা জল এনে মাসটা নামিয়ে রেখে চুপ করে দাড়িয়ে রইল।
এক নিঃশ্বাসে এক গ্লাস জল পান করে বললুম, “সুধা আমার
ওপর তুমি রাগ করেছ, না?”
সুধা তত্রাপি নীরব।
বিনােদদা বললেন, “না না, রাগ করবে কেন, যদি রাগই
করবে তা হলে বলবামাত্রই জল এনে দিত না।”
জলের গ্লাসটা হাতে নিয়ে সুধা বললে, “সুবােধা আপনি
মনে করবেন না যে আমি রাঁধতে পারিনা, “আমি যা জানি
আপনার কলকাতার অনেক বড় বড় উড়ে বামুনের চেয়ে তা ভাল।
তা ছাড়া আলু-ভাতের কথা যদি বলেন, তাহলে ঐ রেষ্টুরেন্টের
চপ, ডিমসেদ্ধ আর মাংসেরকারীর চেয়ে আলুভাতে অনেক ভাল তা
আমি একশােবাৰ বলব। মনে করবেন না, যে আলুভাতে রান্না
করা যায় না।”
“বেশ, সে কথা মুখে বলে ত লাভ নেই কাজে দেখিয়ে
দিলেই হয়।
লেখাপড়া শিখেছ, নতুন ধরণের কত রান্না
তুমি ত জানবেই, রান্নার কত বড় বড় ইংরিজী বই তােমাদের
পড়তে হয়েছে।”
সুধা উত্তর দিল, “আচ্ছা এই কিকিন্ধ্যার দেশে আমাকে
যা খুসী বলে নিন, কলকাতায় ফিরে গিয়ে বই-পড়া রান্নারই
কিছু পরিচয় আপনাকে দোব।”
দক্ষিণাপথের যাত্রী এমন সময় ছড়িদার এসে বললে, ‘চলুন, আপনারা সব গুছিয়ে নিয়েছেন ত? আমরা সকলে প্রস্তুত হয়েই ছিলুম বলবামাত্র বেরিয়ে পড়লুম। যাবার পথে পেছন থেকে মন্দিরগুলিকে আর এক- বার প্রণাম করে মাদুরা সহর থেকে বিদায় নিলুম। রামেশ্বরগামী ট্রেণ যাত্রী নেবার জন্যে ষ্টেশনে অপেক্ষা করছিল, আমরা একটা ছােট্ট কামরায় সকলে মিলে উঠে বসলুম। ছড়িদার বললে, “আপনাদের সকলকে রামেশ্বরে নাবিয়ে নােব, আর একবার গাড়ী বদল করতে হবে। আমি পেছনের গাড়ীতেই রইলুম। পথে যদি কেউ এসে কোনও পাণ্ডার কথা বলে, আপনার গােবর্দ্ধন পাণ্ডার নাম করলে কেউ আর কিছু বলবে না।” ছড়িদার চলে গেলে ট্রেন ছেড়ে দিতেই বললুম, ‘যত বেটা এসে জুটেছে কেবল পয়সা মারবার ফিকির।” বৃদ্ধা বললেন, “না বাবা, এ ছড়িদার লােকটা ভাল।” বললুম, “প্রথম প্রথম ওরকম সবাই ভাল থাকে তারপর তীর্থগুরুর প্রণামী নিয়েই গণ্ডগােল বাধে। তা যাই হােক শুনেছি রামেশ্বরের পাণ্ডারা নাকি ভাল লােক, বেশ যত্ন করে।” ৪১
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সুধা জিজ্ঞাসা করলে, “সুবােধদা, এই ত সেই সেতুবন্ধ
রামেশ্বর, এই সমুদ্রইত পাথর দিয়ে বেঁধে রামচন্দ্র রাবণকে বধ
করে সীতা উদ্ধার করেছিলেন?”
বললুম, “যদিও সে রাম নেই, লঙ্কাও নেই তবুও সেই
ত্রেতায় একপাল বাঁদর মিলে সমুদ্রের জলে পাথর ভাসিয়ে কি যে
এক অঘটন ঘটিয়েছিল তার কিছু কিছু নিদর্শন অন্ততঃ আমরা
পাব। ভগবান রামচন্দ্রের পাদস্পর্শে এই রামেশ্বর হিন্দুমাত্রেরই
পরম পবিত্র তীর্থস্থান।”
গাড়ী মেঠো পথ ধরে ছুটে চলেছে, পেছনে পড়ে থাকছে
কত অসংখ্য তাল, নারকেলের বাগান, মাঠ আর মাঠ।
ঘােট ঘােট ষ্টেশনে গাড়ী থামতে থামতে
শেষে একটা ষ্টেশন
এসে গাড়ী প্রায় আধঘণ্টা থেমে রইল, ছড়িদার এসে বল্লে, “যারা
কলম্বে যাবেন ডাক্তার এখানে তাদের পরীক্ষা করবে। বুঝলুম
কোয়ারেণ-টাইন একজামিনেসন। ছড়িদারকে জিজ্ঞাসা করলুম,
“এর পরেই তাহলে আমাদের আবার গাড়ী বদলাতে হবে ত?”
ছড়িদার বলে, “হ্যা বাবু, ছােট লাইন, মাত্র আট ন মাইল
পথ। রামেশ্বরে পৌছাবার আর বেশী দেরী নেই, আপনারা
কলকাতার লােক এতদূরে একটু কষ্ট হবে কিন্তু মন্দির দর্শন
করলে সত্যই আনন্দ পাবেন।”
কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষা শেষ হবার পর গাড়ী ছেড়ে
৪২
দক্ষিণাপথের যাত্রী
পামবন ষ্টেশনে এসে উপস্থিত হতেই আমরা সবাই তাড়াতাড়ি
নেমে পড়লুম। সুধা জিজ্ঞাসা করলে, “এ গাড়ীটা কোথায় যাবে
সুবােধদা?”
বললুম, “এটা এদেশের চলতি কথায় হচ্ছে বােট মেল, একটু
পরেই ধনুষ্কোটি ষ্টেশনে গিয়ে থামলে যারা কলম্বাে যাবেন সমুদ্রের
ধারেই তারা ষ্টিমার পাবেন ওপারে যাবার জন্যে, যাকে চলতি
কথায় এখন আমরা লঙ্কা বলে থাকি।”
আমরা গাড়ী বদল করে পামবন ব্রীজের ওপর এসে উপস্থিত
হলুম। দেড় মাইল লম্বা ব্রীজ, সমুদ্রের উপর যে পুল সম্ভব হতে
পারে, তা এই প্রথম দেখে যতখানি না আশ্চৰ্যন্বিত হ’লুম তার
শতগুণ বেশী আনন্দিত হয়েছিলুম তার কারণ সমুদ্রের ওপর
দিয়ে রেল গাড়ী ছুটে চলেছে, নীচে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথরের
চাই জলে ভেসে রয়েছে আর তারই ওপর সমুদ্রের জল আছড়ে
আছড়ে পড়ছে। এই পাথরের ওপর রেল কোম্পানী প্রকাণ্ড
প্রকাণ্ড বীম বরগার সাহায্যে এমনি ভাবে পুল নির্মাণ করেছেন
যে ইচ্ছে করলে মাঝখান দিয়ে পুলটাকে ষ্টীমার যাবার জন্যে খােলাও
যেতে পারে। সত্যই এখানকার দৃশ্য এতই সুন্দর যে যুগ-যুগান্তর
ধরে বসে বসে দেখলেও যেন আশ মেটেনা। নীচে সমুদ্রের ওপর
পাথরের আশে পাশে কতকটা যায়গা চড়। বলে মনে হ’ল,
সেখানে জলের গভীরতা খুব অল্প, ঢেউয়ের জোর তেমন নেই।
৪৩
দক্ষিণাপথের যাত্রী
কিন্তু একটা কথা এখনও আমার মনে হয় যে, এই বিশাল সমুদ্রের
ধারে এত বড় বড় পাথর কেমন করে এসে হাজির হল। পাথরের
চেহারা দেখে অবশ্য মনে হয় যেন তারা কত যুগ-যুগান্তর ধরে
সমুদ্রের নােনা জলে মিশে ফোপরা হয়ে পড়ে রয়েছে, কত কালাে
কালাে শেওলা তাদের ওপর এসে জমা হয়েছে। তাই আজও
ভাবি পৃথিবীতে কিছুই অসম্ভব নয়।
আমরা পুল পার হয়ে ডাঙায় এসে পড়তেই রেলের জানলা
দিয়ে দুপাশে চেয়ে দেখি কেবলই বালি আর বালি, যেন আমরা
মরুভূমির রাজ্যে এসে পৌঁচেছি। রেলের লাইনের ধারে পনর
বিশ হাত অন্তর অন্তর কুলিরা লাইনের ওপর থেকে কেবলই বালি
পরিষ্কার করে দিচ্ছে।
রামেশ্বরটা একটা দ্বীপ, চারি পাশেই তার সমুদ্র ঘিরে রয়েছে,
তাই তার চারিদিকে বালির আর অভাব নেই। চারি দিকে এত
বালি হলেও পথের মাঝে মাঝে তাল নারকেলের প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড
বাগান দেখতে পাওয়া গেল। আমাদের রেল বালির ওপর
দিয়ে উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটে চলেছে, মাঝে মাঝে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বালির
পাহাড় এমনি ভাবে মাথা চাড়া দিয়ে দাড়িয়ে আছে যে, তাদের
ফাক দিয়ে দূরে সীমাহীন সমুদ্র আমাদের নজরে পড়ছিল।
তখনও চারিদিকে রৌদ্রের বেশ জোর ছিল, তাই দূর থেকে সমুদ্রের
জলগুলােকে মনে হচ্ছিল যেন গলান রূপাে চারিদিকে টলমল করছে।
৪৪
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সন্ধ্যে হবার তখনও কিছু বাকী ছিল, আমরা রামেশ্বরম্
ষ্টেশনে এসে নামলুম। ছড়িদার বলে, “বাবু “এখান থেকে
মন্দির খুব কাছে, আরও কাছে আপনাদের থাকবার নতুন ধৰ্ম্মশালা”
বলুম, “বেশ, চল আগে ধর্মশালায় গিয়ে ওঠা যাক।”
সুধা বল্লে, “এখানে গাড়ী পাওয়া যায় না?”
ছড়িদার বলে, “না, এখানে গরুর গাড়ী ছাড়া অন্য কোন
গাড়ী পাওয়া যায় না।”
সুধাকে বন্ধুম, “তােমরা তাহলে গরুর গাড়ীতেই এস,
সামান্য একটুখানি পথ আমি হেঁটেই চলে যাব।”
সুধা বল্লে, “তবে চলুন আমিও তাহলে আপনাদের সঙ্গে
যাই।”
রায়মশাই তার মার জন্যে একটা গােযান ঠিক করলেন,
কিন্তু কিছুতেই তিনি গরুর গাড়ীতে চড়তে রাজী হলেন না।
বৃদ্ধা বল্লেন, “তীর্থ করতে এসে গরুর গাড়ীতে আমি চড়তে পারব
না।”
অগত্যা সমস্ত মালপত্র গরুর গাড়ীতে তুলে আমরা পদব্রজেই
ধৰ্ম্মশালায় হাজির হলুম। ধৰ্মশালা এমন সুন্দর স্থানে তৈরী
হয়েছে যে, ঘরে বসে বসে সমুদ্রকে প্রাণভরে দেখা চলে। সামনেই
পরিষ্কার রাস্তা, একেবারে মন্দির পর্যন্ত চলে গেছে।
রাস্তায় জলের কলও দেখতে পেলুম আবার ধর্মশালার ভেতরও
৪৫
দক্ষিণাপথের যাত্রী বেশ বাধান পাতকুয়া রয়েছে। কাছেই ছােট্ট বাজার। ছড়িদারকে জিজ্ঞাসা করলুম, “এখানকার লােকেও কি তিলের তেল খায়?” ছড়িদার বল্লে, “না বাবু এখানে আপনি পশ্চিমা হিন্দুস্থানীয় খাবারের দোকান পাবেন, সেখানে ঘিয়ের পুরি, তরকারী, রাবড়ী, পেড়া কিনতে পারেন। রান্না না করলেও আজকের রাত্রে আপনাদের খাওয়ার কোনও কষ্ট হবে না।” ছড়িদারের সঙ্গে কথা কচ্ছি, এক পাল পাণ্ডা এসে খোজ- খবর নিতে লাগল, আমরা কোথা থেকে আসছি আগে এখানে আমাদের পূর্বপুরুষ কেউ এসেছিল কিনা, বড় বড় লম্বা লম্বা জালা খাতা নিয়ে তার হিসেব দেখার মত আমাদের পূর্বপুরুষের নাম ধাম খুজতে লাগল, কারণ যদি কারুর খাতায় আমাদের পূর্বপুরে নাম পায় তাহলে যার খাতায় তা পাওয়া যাবে তাকেই আমাদের পাণ্ডা বলে মেনে নিতে হবে, অন্ততঃ তাই নেওয়াই উচিত। শেষ পর্যন্ত আমাদের ছড়িদারের পাণ্ডাই ঠিক রয়ে গেল। পাণ্ডার গােলমাল মেটবার পর ছড়িদারকে বল্লুম, “আচ্ছা তুমি তাহলে এবার এস, আমরা সন্ধ্যের পর মন্দিরে আরতিটা দেখে আসবাে, তারপর কাল সব কিছু ঘুরে ফিরে সারা যাবে।” ছড়িদার চলে গেল। ৪৬
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সেদিন সত্যই আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলুম তবুও আমি
মুখ হাত ধুয়ে ছড়িদারের অপেক্ষা না কোরে ফাঁকা পথে
বেরিয়ে পড়লুম। খানিকদূরে এসে পেছন ফিরে চেয়ে দেখি সুধা
আমার পেছু নিয়েছে। বন্ধুম, “কি তুমি যে এলে ?”
সুধা হাসতে হাসতে বল্লে, “বা, আপনি ত বেশ মজার লােক,
আমাকে একলাটি ফেলে চলে এলেন।”
বন্ধুম, “তােমাকে একলা ফেলে এলুম কি রকম।”
“তা হক, চলুন না একটু ঘুরে আসি, ওদের সঙ্গে চুপটি
করে বসে থাকতে আমার মােটেই ভাল লাগে না, আপনার মধ্যে
প্রাণ আছে তাই আপনাকে আমার যত ভাল লাগে, অন্য
কাউকে ততটা ভাল লাগে না।”
মুখে সুধাকে কিছু না বললেও মনে মনে বললুম জানি না
এ ভাল লাগার অর্থ কি।
এদিক-সেদিক একটু ঘুরে ধর্মশালায় ফিরে এসে দেখি
ছড়িদার আমাদের দুজনের অপেক্ষা করছে। আমরা সকলে
ছড়িদারের সঙ্গে মন্দির দর্শনে বেরিয়ে পড়লুম।
মন্দিরে ঢুকেই মনে হল বুঝি আমরা আবার মাদুরায়
ফিরে এসেছি। দক্ষিণ ভারতের মন্দির যে এত প্রকাণ্ড
প্রকাণ্ড, তা আমি আগে জানতুম না। অবাক বিস্ময়ে চেয়ে
থাকি আর ভাবি নিশ্চয় এ বােধ হয় মানুষের তৈরী নয়।
৪৭
দক্ষিণপথের যাত্রী
মন্দিরের মধ্যে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পথগুলি বিজলীর আলােয় মনে
হল যেন মধ্যরাত্রে মানবশূন্য কোনও এক নীরব নগরীর রাজপথ ।
রামেশ্বর ও মাদুরার মন্দির যেন অবিকল একই ছাঁচে ঢালা।
তবে কেউ কেউ বলেন, মাদুরার মন্দির রামেশ্বরের মন্দির থেকে
কিছু বড়।
সে যাই হােক দক্ষিণ ভারতের এই মন্দিরগুলি
যদি একবার প্রদক্ষিণ করতে হয় তা হলে কয়েক মাইল হাঁটার
কাজ হয়।
রাত্রে আর কি দেখব, সুধাকে বললুম, “চল এইবার বাড়ী
ফেরা যাক, কাল দিনের আলােয় এখানকার যা কিছু সবই দেখে
নেওয়া যাবে।”
সুধা জিজ্ঞাসা করলে, “আপনারা কালই ফিরে যেতে চান
নাকি?”
বললুম, ‘সুধা, সব কিছু যদি দেখাই হয়ে যায় তাহলে
মিছিমিছি ধর্মশালায় পড়ে থেকে লাভ কি, বরঞ্চ কলকাতায় ফিরে
তােমাদের বাড়ী গিয়ে বােজ তােমার নতুন নতুন রান্না খেয়ে
আসব, তখন হয়ত তুমি চিনতেই পারবে না কি বল ?”
সুধা উত্তর দিলে, “যান আপনি ভারি দুষ্ট, আপনার সঙ্গে
আর কথা কইব না।”
বললুম, “সুধা তুমি রাগ করলে, আমাকে তাহলে দেখতে
পার না বল ?”
৪৮
No text on this page.
No text on this page.
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সুধার গম্ভীর মুখ অমনি হাসিতে ভরে উঠল, পেছনে
চেয়ে দেখি আর সকলে অনেকটা এগিয়ে এসেছে।
পরদিন প্রাতঃকালে
স্নান সেরে রামেশ্বরের যা কিছু
দেখবার সবই দেখে শুনে ধৰ্ম্মশালায় ফিরে এলুম।
তীর্থ করতে না এলেও পাণ্ডাকে দক্ষিণা দিয়ে তীর্থগুরু,
স্বীকার করে তাদের জাবদা খাতায় নাম ও ঠিকানা লিখে দিলুম
সঙ্গে সঙ্গে রায়মশাইও নাম ঠিকানা লিখে দিলেন। রামেশ্বরে
এসে আমার কি ভাল লাগলাে না লাগলে সুধা আমাকে তা
জিজ্ঞাসা করে বসলো।
বললুম, “এই সেতুবন্ধ রামেশ্বর নিয়ে প্রকাণ্ড ইতিহাস লেখ।
আছে, রামায়ণ পড়লে অনেক কিছুই জানতে পারবে, মিছিমিছি
আবার রামায়ণের আদিকাণ্ড থেকে লঙ্কাকাণ্ড পর্যন্ত বলে কোনও
লাভ হবে না। তবে যদি বল অনেকেই আসে, মন্দির দেখে চলে
যায়, আমি কিন্তু আমার বাহিক চোখ দিয়ে মন্দির দর্শন করিনি
সুধা, আমার মনের চোখ দুটো দেখার সবটুকু রস নিঙড়ে বার করে
নিয়েছে। আজ এই বিংশ শতাব্দির যুগে মানব সভ্যতার ইতিহাসের
কথা যতই ভাবি, ততই আমার মনে হয় যারা বিদ্যার বড়াই করেন
তাঁরা বােধহয় পুরাকালের ইতিহাস একবারও পড়ে দেখেন নি!
সুধা জিজ্ঞাসা করলে, “তাহলে আপনি বর্তমান সভ্যতাকে
নিন্দা করেন ?”
৪১
দক্ষিণাপথের যাত্রী
“নিন্দা আমি করি না, তবে এইটুকু বলতে চাই যে আমাদের
দেশে অনেক বড় বড় আর্কিটেক্ট ও ইঞ্জিনিয়ারের মাথা ঘুরে উঠবে
এই সব মন্দিরের নির্মাণ নৈপুণ্য চিন্তা করতে, কারণ তারা
শক্তিশালী বিদেশী ডিগ্রিধারী পণ্ডিত।”
সুধা আর কোনও কথা বলল না কারণ ট্রেণের সময়ের আর
বেশী দেরী ছিলনা। তাছাড়া আমাদের সেই দিনই ফিরতে হবে
সুতরাং আমরা আমাদের যে যার তলপি তলপা গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে
পড়লুম। তারপর প্রায় তিন দিন ট্রেণে কর্মভােগের পর হাওড়ায়
ফিরে এলুম, রায়মশাইকে বিদায় দেবার সময় তার বাড়ীর
ঠিকানা নিয়ে এবং আমার ঠিকানা দিয়ে বাড়ী ফেরবার পথে
ভাবতে লাগলুম সুধার কথা।
এখন আর দক্ষিণাপথের যাত্রী নই। কলকাতায় ফিরে
এসেছি। শীতের আড়ষ্ট ভাবটা নেই বল্লেই চলে। বসন্তের
মলয় বাতাস বইতে শুরু করেছে। গাছের ডালে কোকিলের
কাকলী, নব মজুরিত মুকুলের মধু অন্বেষণে বন বিহগের কলগুঞ্জন
মনটাকে বেশ সৃজীব করে তুলছিল। বসে বসে ভাবছিলুম
সুধার কথা। এক এক করে মাদুর ও রামেশ্বরের সব কথাই
মনে পড়তে লাগল। বাড়ী ফেরার পথে সুধা অনেক করে
৫০
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বলে দিয়েছিল যেন তাদের ভুলে না যাই। এমন সময় বাল্যবন্ধু
অজিত এসে জিজ্ঞাসা করলে, “সুবােধ এখনও যে চুপটি করে বসে
আছিস? আজ না তাের নতুন বান্ধবী সুধীরাদের বাড়ী যাবার
কথা?”
উত্তর দিলুম, “ভাবছি ত তাই, বিদেশে কটাদিনের আলাপ
শেষটায় হয়ত চিনতেই পারবে না সুতরাং ভেবে চিন্তে কাজ
করাটাই কি ভাল নয় ভাই?”
“কিন্তু সুবােধ সেত আর পাড়াগেঁয়ে অশিক্ষিতা পর্দানসীন
মেয়ে নয় সুতরাং সেদিক দিয়ে তােমার ভাবনা করার কোনও
প্রয়ােজন নেই। আর তাছাড়া যখন তার সব কিছুই তােমার
ভাল লাগে তখন এ সুযােগ ছাড়া তােমার কোনও মতেই
উচিত নয়।”
সুধার সম্বন্ধে আমার ওপর অজিতের এ রকম একটা
মনােভাব বুঝতে পেরে বললুম, “অজিত, এ বিদ্রুপ তােমার মুখে
অজিত বললে, “রাগ করিসনি মুবােধ, বিদ্রুপ আমি
মােটই করিনি। তাের কোনও কথাই ত আর আমার অজানা
নেই। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এমনি করেই গড়ে ওঠে।
আজ আমার কথাটা বিদ্রুপ বলে মনে হচ্ছে কিন্তু দুদিন বাদে ঐ
সুধীরাই হয়ত হয়ে উঠবে তােমার পরম আত্মীয়া।”
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বললুম, “অজিত, জানি সংসারে ভবিতব্যের কথা খুবই
সত্যি এও বুঝি যে মানুষ মনে করে এক, হয় আর এক, উপস্থিত
আমার সে চিন্তা নেই, তবে বিদেশে তাদের কাছ থেকে
যে সেবা, যত্ন পেয়েছি তার দেনা যদি এমনি করে শশাধ করতে
হয় তাহলে আমি নাচার।”
অজিত বললে, “সুবােধ, তাের ওসব অন্ধ নাচারের কথা
শুনতে চাই না। আমার মতে তাদের সঙ্গে দেখা কর, তারপর
অনেক কিছুই বিবেচনা করা চলবে।”
অজিতকে বললুম, “তবে তুইও সঙ্গে চল।”
“সে হয় না, তাঁদের সঙ্গে আমার কোনদিন আলাপ পরিচয় নেই
তা ছাড়া তারা হয়ত আমার যাওয়াটা পছন্দ নাও করতে পারেন।
“অজিত, তাদের সঙ্গে জীবনে আমারও কোনদিন পরিচয় ছিল
না। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যে এমনি করে গড়ে ওঠে
একথা একটু আগে তােমার মুখেই শুনেছি তাহলে তােমার এত
ভয় পাবার কারণটা কি?”
অজিতের আর না বলার কোনও উপায় ছিল না সুতরাং
দু’জনে বেরিয়ে পড়লুম। ঠিকানা সঙ্গেই ছিল বাঙ্গী খুঁজে বার
করতে বিশেষ বেগ পেতে হ’ল না। রাস্তার ধারেই হাল ফ্যাসানের
বেশ চমৎকার তিনতলা বাড়ী। রায়মশাইকে ডাকতেই সামনের
বারান্দা থেকে আমাকে দেখেই সুধীরা তাড়াতাড়ি নীচে এসে বললে,
দক্ষিণাপথের যাত্রী
“আসুন, বাবা এইমাত্র বেরুলেন, পথ ভুলে এসেছেন নিশ্চয় ?
একটু হেসে বললুম, “খুব রাগ করেছ না? এখন কিন্তু
পথ আমার খুব ভাল করে জানা হয়ে গেছে তারপর অজিতের
সঙ্গে সুধীরার পরিচয় করিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলুম, সুধীরা তােমার
বাবার সঙ্গে তাহলে আজ আর দেখা হল না, ফিরতে কি খুব
দেরী হবে ? সুধীরা কোনও কিছু বলবার আগেই পুনরায় বললুম,
আচ্ছা থাক, আজ না হয় ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করে যাই আর
একদিন এসে রায়মশাইয়ের সঙ্গে দেখা করে যাব।”
সুধীরা বেশ একটু অভিমান করে বললে, “তাহলে না এলেই ত
পারতেন?
তারপর আমার অপেক্ষা না করেই অজিতকে বললে,-
আপনি সুবােধদার যখন বন্ধু একটু দেরী হলে নিশ্চয় কিছু মনে
করবেন না ?”
অজিত বেশ ভালই জানত সুধীরার সঙ্গে দেখা করা ছাড়া
আমার অন্য কোনও কাজ ছিল না। সুতরাং ভদ্রতার খাতিরে
বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলে, “না, তাতে আর কি, আপনাদের
তীর্থ পথের বন্ধু
অজিতকে বাধা দিয়ে বললুম, “তবে তুই একটু বােস ভাই
আমি চট করে সকলের সঙ্গে একবার দেখা করে আসি।”
সুধা আমাকে ওপরে তার নিজের ঘরে বসিয়ে, ‘আসছি’
বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কয়েক মিনিট পরে ফিরে এসে
দক্ষিণাপথের যাত্রী।
বললে, “আপনাকে এখন কিন্তু ছাড়ছি না, বাবাও বেরিছেন,
ঠাকুমাও ভাগবৎ শুনতে গেছেন।”
মনে মনে ভাবলুম অজিতকে সঙ্গে এনে ভুল
করেছি।
বললুম, “সুধা, অন্য আর একদিন আসব। সেদিন যত পার
আটকে রেখাে। অজিতকে একলাটি বসিয়ে রেখেছি দেরী হলে
মনে মনে হয়ত রাগ করবে।
সুধা বললে, “সে দোষ ত আপনারই, আপনিই ত তাকে
নীচে অপেক্ষা করতে বললেন, বেশ চলুন নীচেই তার সঙ্গে আজ
না হয় আলাপ করা যাক।”
বললুম, “সুধা সে বড় লাজুক, মেয়েদের দেখলে মুখ দিয়ে তার
কথাই বেরােয় না, সুতরাং তাকে আর মিছিমিছি কষ্ট দিয়ে
লাভ কি, চল মাকে গড় করে আজকের মত ফেরা যাক, তারপর
আর একদিন এসে যত খুসী উৎপাত করে যাব তখন কিন্তু বিরক্ত
হলে চলবে না, তা আগে থেকেই বলে রাখছি।”
সুধা উত্তর দিলে, “সুবােধা মাদুরায় যাকে দেখেছিলেন তিনি
আমার পিসিমা, কলকতায় ফিরেই তিনি চলে গেছেন। ছেলেবেলা
মাকে হারিয়েছি, আমাদের সংসারে ভাই বলতেও আমি বােন
বলতেও আমি, থাক নিজেদের দুঃখের ইতিহাস নিয়ে আর লাভ
কি, ঘােড়ায় যখন জিন দিয়ে এসেছেন তখন তার ওপর ত আর
কথাই চলে না।”
৫৪
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বুঝতে পারলুম সুধা খুব অভিমান করেই কথাগুলাে বললে
তাই পরক্ষণেই বেশ মিষ্টি কথায় বললুম, “সুধা তুমি অনর্থক
রাগ কোরনা, তুমি ত জান নীচে অজিত এখনও অপেক্ষা
করছে।”
সুধা মুখ ভার করে উত্তর দিলে, “তাহলে বিদেশের কুটুম্বিতে
রক্ষা না করলেও দোষ আপনার কেউ দিত না।”
বললুম, “না, তুমি রাগই করেছ দেখছি আচ্ছা দেখি অজিতকে
বলে, যদি সে একা কাজটা সেরে যেতে পারে তাহলে অনর্থক
তােমার মনে কষ্ট দোবনা, ঠাকুমা ও রায়মশাই না ফেরা পর্যন্ত
না হয় অপেক্ষা করেই যাবাে।”
সুধা এক গাল হেসে বলে “তাহলে দাড়ান চট করে চাটা
অজিত বাবুকে পাঠিয়ে দি তারপর যা খুসী তাই করবেন।”
বন্ধুম, “চায়ের কোনও প্রয়ােজন নেই কারণ ও রােগের হাত
থেকে অর্জিত নিস্তার পেয়েছে।”
“তা না হয় হল কিন্তু আপনি ত আর নিস্তার পান নি?”
“সে জন্যে তােমায় ব্যস্ত হতে হবে না কারণ একটু আগে খেয়েই
বেরিয়েছি। সুতরাং আর অপেক্ষা না করেই নীচে এসে অজিতকে
সব বলতেই, যাবার সময় সে আমার হাতটা বেশ একটু জোরে
নাড়া দিয়ে বলে, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি তােমাদের
এ রােমানেসর ফলাফল যেন ওভ হয়।"
দক্ষিণাপথের যাত্রী
অজিতকে নিরালায় বসে থাকার দায় থেকে অব্যাহতি দিয়ে
ওপরে এসে দেখি সুধা চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে ব্যস্ত। বল্লম, “সুধা
শেষ পর্যন্ত তােমার জিদই বজায় রইল কিন্তু আবার এ সব চা
ফায়ের হােড়জোড় কেন? না তুমি নিতান্তই অবুঝ।”
সুধা হেসে উত্তর দিলে, “তাহলে শেষ পর্যন্ত অজিত বাবুকে
তাড়িয়ে ছাড়লেন।”
“তার জন্যে দায়ী তুমিই ত সুধা।”
“সে কথা আমি আগেই জানতুম সুবােধদ, অজিত বাবুও
আমার নামে অনেক কথাই বলবেন কারণ আমার জন্যেই যে
তঁাকে এখান থেকে বিদায় নিতে হল তাত আর তঁার জানতে
বাকী রইল না।”
চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে উত্তর দিলুম, সে জন্যে তােমার
দুঃখিত হবার কোন প্রয়ােজন নেই, বাঃ চা-টা ত’ ভারী সুন্দর
হয়েছে। সুধার হাতের চা, নামটা যেমন মিষ্টি চাও তেমনি
না হলে চলবে কেন বল।”
“করার অভ্যাস নেই বলেই হয়ত খারাপ হয়ে থাকবে তাই
বলে নাম নিয়েও ঠাট্টা করবেন তা আমি ভাবি নি। যা হােক
এখন থেকে আমাকে সুধীর বলেই ডাকবেন ও মিষ্টি নামে আর
কাজ নেই।”
! কথায় কথায় তােমার রাগ, আচ্ছা বেশ এখন থেকে
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সুধীরা বলেই ডাকব কিন্তু তােমাকে ঠাট্টা আমি মোটেই করিনি,
সত্যি চা তৈরী চমৎকার হয়েছে, তুমি ভুল বুঝাে না।”
“সে কি আর আমি জানি না সুবােধদা, আলু ভাতে নিয়ে
মাছুরায় আমাকে যা করেছিলেন তা কি আমি এত চট করে
ভুলে যাব।”
বাধা দিয়ে বললুম, “সুধীর। ভালকে ভাল, আর মন্দকে মন্দ
বলাই হচ্ছে মানুষের সাধারণ নিয়ম, কিন্তু তুমি যে মাদুরার সে
কথাটা আজও মনে রেখে অভিমান করে বসে আছ সে জন্যে
তােমার স্মরণ শক্তির তারিফ না করে থাকতে পারছি না।”
এমন সময় নীচে রায়মশাই ডাকলেন, “সুধা একবার নীচে
আয় মা।”
“বাবা এসেছেন, একটু বসুন চট করে খবরটা দিয়ে
আসি তারপর আপনার কথার জবাব আমি দোব।” বলিয়া
সুধীরা নীচে নামিয়া গেল।
বসে বসে ভাবতে লাগলুম এই সুন্দর সরল সুধীরার কথা,
আমার সঙ্গে কিসের এত ঘনিষ্ঠতা যে এমনি করে প্রাণ খুলে তার
এত আলাপ ও অভিযােগ যাই হােক পর মুহূর্তেই সুধীর রায়-
মশাইকে সঙ্গে নিয়ে একেবারে আমার কাছে হাজির হতেই এবং
আমার কিছু বলবার আগেই রায়মশাই বললেন, “সুবােধ তােমার
নামে আমার একটা মস্ত নালিশ আছে।”
দক্ষিণাপথের যাত্রী রায়মশাইয়ের কথা শুনে হঠাৎ মনটা যেন সাত হাত দমে গেল, ভাবতে লাগলুম কি এমন অন্যায় করেছি, জিজ্ঞাসা করলুম, রায়- মশাই, বলুন কি এমন নালিশ, যদি অন্যায় করে থাকি অবশ্যই শান্তি গ্রহণ করব।” রায়মশাই বল্লেন, “দ্যা শাস্তি গ্রহণ তােমাকে করতেই হবে, মন্ত বড় শান্তি। তারপর সুধীরাকে বললেন, চাকরটাকে বল মা একটু তামাক দিয়ে যাক, তাছাড়া সুবােধের মত ফেরারী আসামীকে শাস্তি দিতে হলে বেশ একটু ভেবে চিন্তেই চার্জ ফ্রেম করতে হবে। বললুম, “রায়মশাই অন্যায় একট, হয়েছে।” রায়মশাই বাধা দিয়ে বললেন, “একটু অন্যায় নয় সুবােধ, কদিন ধরে তােমার নেবার জন্যে সুধা কি আমায় কম বলেছে কিন্তু এত বড় সহরে কোথায় তােমায় খুঁজী, ঠিকানাটা যে হারিয়ে ফেলেছিলুম সুধা ত আর জানতাে না। তবে এটুকু জানতুম যে তুমি আসবেই কিন্তু এমনি করে কি বুড়ােটাকে ভুলে যেতে হয় সুবােধ ? ভাবলুম অসুখ বিসুখ হল না কি, দু লাইন লিখেও ত খবর দিতে পারতে।” সত্যই এ কথার উত্তর কি দেব’ কারণ যারা এত ভালবাসে তাহাদের খোঁজ না লওয়া খুবই অন্যায় হয়েছে। যাই হােক রায়মশাইকে বললুম, “আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন। অনেক দিন পরে কলকাতায় ফিরে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে আপনাদের মনােকষ্ট দিলুম।”
দক্ষিণাপথের যাত্রী
রায়মশাই হেসে উঠে বল্লেন, “আরে পাগলা ছেলে, অপরাধ
আবার কি, কথাটা কি জান সুবােধ এক সঙ্গে এতদিন ঘুরে সত্যি
তােমার ওপর কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে। তােমাকে কাছ
ছাড়া করতে কেমন যেন প্রাণে লাগে। আজ এই কটা দিন
অনুপস্থিতির পরে তােমায় দেখে মনে হচ্ছে যেন কত বছর পরে
তােমায় দেখছি।”
সুধীর রায়মশাইকে বাধা দিয়ে বললে, “তাও কি সুবােধা
থাকতে চান, সঙ্গে ওর এক বন্ধু অজিতবাবু এসেছিলেন। জোর
করে সুবােধদাকে আটকে রাখলুম কিন্তু অজিতবাবুর বিশেষ
কাজের জন্যে বসলেন না। তবে তুমি বাড়ী থাকলে হয়ত আরও
কিছুক্ষণ তাকে আটকে রাখা যেত।”
রায়মশাই বললেন, “তা তুমি মা তাকেও আটকে রাখলে
পারতে?”
আমি ত সুবােধদাকে বললুম, অজিত বাবুর সঙ্গে আমার
আলাপ কতটুকু কাজে কাজেই আমার অনুরােধের অরি জোরই
বা কি তাছাড়া তার যখন বিশেষ কাজ তখন তাকে জোর
করে আটকে রাখাও ঠিক নয় এই ভেবে তেমন কিছু বলতে
পারলুম না।"
“তা ঠিক, আচ্ছা সুবােধ তুমি বাবা অজিত বাবুকে আর
একদিন এখানে নিয়ে এস, যেন ভুলােনা, তারপর সুধীরাকে
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বললেন, “ঠাকুরকে বলে দিয়েছিস ত’ মা, যেন বেশ মন দিয়ে রান্না
বান্না করে, সুবােধ যেন না খেয়ে যায় না।”
রায়মশাইয়ের ব্যবস্থা শুনে বললুম, “ওসব হাঙ্গামা আজ
আর করবেন না কারণ আমাকে এখুনি উঠতে হবে বরং আর
একদিন ওসব হবে।”
“সে সব আমি জানি না সুবােধ, সুধাকে জিজ্ঞাসা কর, তাছাড়া
মারও ভাগবৎ শুনে ফেরার সময় হয়েছে। তিনি যদি শােনেন
তুমি এসেছিলে আর তােমাকে না খাইয়ে ছাড়া হয়েছে তাহলে
তিনি খুব রাগ করবেন।”
বললুম “তাহলে ত আপনাদের বাড়ী আসাই দায় দেখছি।”
সুধীরা জবাব দিলে, “দায় কিছু নয় সুবােধদা, বাড়ীতেও
খাবেন, উপােস করে নিশ্চয় থাকবেন না?”
“সে কথা ঠিক কিন্তু বাড়ীর খাবারগুলো যে নষ্ট হবে তার
জন্যে দায়ী হবে কে ?”
“আপনার ও কথার কোনও মানেই হয় না সুবােধদা, এটাও
ঠিক যে পাঁচজনের সংসারে নষ্ট কিছুই হয় না, সংসারের কিছু না
জানলেও এ কথাটা ত আর কিছু মিথ্যে নয় ?”
সুধীরার কথার জবাব দেবার আগেই রায়মশাই বললেন,
“সুবােধ সুধার সঙ্গে যদি বােঝা পড়া করে পার ত’ দেখ আমি
আর তােমাদের ওসব ঝগড়ার ভেতর নেই, যা ভাল বােঝ কর।
৬০
দক্ষিণাপথের যাত্রী আমি বরঞ্চ এই ফাঁকে নিবারণের ছেলেটাকে একবার দেখে আসি, শুনছি ক'দিন থেকে তার জ্বর হয়েছে, আজ নাকি আবার একটু বেড়েছে। তবে আমার ফেরার আগে যেন পালিও না সুবােধ- বাবু বুঝলে?” বললুম, “বেশ ত সুবােধ বলেই ডাকছিলেন, বাবুটাকে আবার ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন কেন?” রায়মশাই, হাসতে হাসতে জবাব দিলেন, “তােমাদের মত বয়েসে আমরাও ওরকম বাবু ছিলুম হে, তা বেশ সুবােধ-ই না হয় হল কিন্তু সুবােধ ছেলেটির মত ততক্ষণ সুধার সঙ্গে গল্প-টল্প কর আমি ছেলেটাকে দেখেই আসছি, নিবারণ অনেক দিনের বাল্যবন্ধু আর তাছাড়া মারও ফেরার সময় হয়েছে।” রায়মশাই বেরিয়ে গেলে, সুধীরাকে বললুম, “তুমি ভারী অবুঝ, এমনি করে যদি জব্দ কর তাহলে আমি এবার থেকে চিঠি লিখেই খালাস কিন্তু।” সুধীরা হাসতে হাসতে উত্তর দিলে, “আচ্ছা সে দেখা যাবে, আমি আপনার চিঠির উত্তরই দেব না। এই বুঝি আপনার ভালবাসা? আমাদের একটা কথা রাখতেই আপনার আপত্তি?” “সুধীরা সত্যি, তােমরা পুরুষের কাজের দিকটা মােটেই ভেবে দেখ না অথচ একটু বল্লেই অমনি মুখ ভােলাে হাঁড়ি করে
দক্ষিণাপথের যাত্রী
একবারে রাগের একটা প্রকাণ্ড দেবী সেজে বসাে, এ কিন্তু
ভারী অন্যায়।”
“পুরুষরা অই রকমই হয় সুবােধ, মেয়েছেলের দুঃখু যদি তারা
বুঝতাে তাহলে সংসারে জঞ্জাল বলে কোনও জিনিষই থাকত না।
বেশ ত আপনি যান না, আমি ত আর আপনাকে ঘরে আটকে
রাখিনি। মনে করব, আপনার সঙ্গে আমাদের কোনও পরিচয়ই
নেই।”
“এ কিন্তু তােমার রাগের কথাই হচ্ছে সুধীরা। তােমাদের
এখামে খেলে আমার জাত যাবে না, সুতরাং আমি তােমায় কথা
দিচ্ছি, এর পর এলে যত পার খাইও আমি কোনও দিনও
তাতে আপত্তি কোরবাে না। আজকের দিনটা আমাকে রেহাই
দাও সুধীরা।”
এতগুলা কথা বলে গেলাম কিন্তু সুধীরার তরফ থেকে হ্যা,
কোন জবাবই পাওয়া গেল না। বুঝতে পারলুম সুধীরা
আমাকে খাওয়াতে পারলে খুবই খুসী হয় তবুও আর একবার
“কি চুপ করে রইলে যে?”
সুধীরা উত্তর দিলে, “যা বােঝেন করুন, বলার যা তা আগেই
বলেছি এখনও তাই বলছি। সত্যিই আপনি আমাদের বাড়ী
খাবেন কেন?”
সুধীরাকে বাধা দিয়ে বললুম, “ইচ্ছে করে সব জিনিষ ভুলে
জিজ্ঞাসা করলুম,
দক্ষিণাপথের যাত্রী
যাও কেন। মাদুরা আর রামেশ্বরে অতদিন ধরে মােজ মােজ
কে খেয়েছিল ?”
সুধীরা উত্তর দিলে, “ওসব কথা ছেড়ে দিন পথে প্রবাসে
নিত্যই ওরকম কত ঘটছে তাই বলে পুরােনাে একটা নজির দেখিয়ে
আজকের দিনের বিচার করা চলে না সুবোধদা।”
বললুম, “বেশ তবে এইখানেই দাড়ি টানলুম, কারণ যে অবুঝ
তাকে বুঝিয়ে কোনও লাভ নেই, এখন তােমার যা খুশী কর আমি
কোনও আপত্তিই কোরব না, সুধীরা।”
সুধীরার গম্ভীর মুখখানা হাসিতে ভরে উঠল, তারপর এক
মিনিট’ বলেই নীচে নেমে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসে বলে,
“সুবােধদা, বেশ ভাল করে ভেবে দেখুন আমার দ্বারা আপনার
কোনও অনিষ্ঠ হবে না ত?”
বললুম, “সুধীরা অনিষ্ঠ হলেও কোনও উপায় নেই কারণ
যখন তুমি আমার সময়ের মূল্যটুকু বুঝলে না তখন তােমার
ইচ্ছামত কাজ না করলে হয়ত তুমি মনে কষ্ট পাবে।”
সুধীরা বাধা দিয়ে বললে, “সুবােধদা, আমার অনুরােধে কিম্বা
চক্ষুলজ্জার খাতিরে আমি আপনাকে কোনও কাজ করতে বলি না,
কারণ নিজের বিবেক বুদ্ধির প্রেরণায় কাজ করে মানুষ যে সুখ পায়
কিন্তু অন্যের অনুরােধে তা পাওয়া সম্ভব নয়।”
“ওকথা তুমি কেন বলছ সুধীরা ? এমনি করে কথায় কথায়
দক্ষিণাপথের যাত্রী
রাগের পাল সুরু করবে জানলে কখনই আমি তােমার ইচ্ছার
বিরুদ্ধে আপত্তি জানাতুম না। সত্যই যদি তুমি আমাকে খাইয়ে
আনন্দ পাও তবে সে আনন্দ থেকে তােমাকে বঞ্চিত করে লাভ কি ?
সুতরাং তােমাকে কথা দিচ্ছি, না খেয়ে এখান থেকে একটা
পাও নড়ব না।”
“তবু ভাল যে এতক্ষণে মতটা বদলালে।” বলেই সুধীরা আমার
দিকে চেয়ে হেসে ফেলতেই বললুম, “শেষ পর্যন্ত জিদ বজায়
রেখে তবে ছাড়লে।” পাশ করা মেয়ের কাছে আমাদের কি আর
পারবার যাে আছে?”
সুধীর বেশ কড়া সুরেই প্রতিবাদ জানাবার সময়েই নীচে
ঠাকুমা “সুধা” বলে ডাকতেই সুধীরা উত্তর দিল, “ঠাকুমা কে এসেছে
দেখবে এস।”
ঠাকুমা একেবারে সটাং ওপরে এসে ঘরে ঢুকে বললেন, “ওমা
এ যে সুবােধ, তবু ভাল এতদিন বাদে তাহলে আমাদের মনে
পড়েছে?”
ঠাকুমাকে একটা প্রণাম ঠুকে “বললুম, বুঝতেই ত পারছেন
কলকাতায় এসে পর্যন্ত মরবারও অবকাশ পাইনি। অনেকক্ষণ
এসেছি, আপনার সঙ্গে দেখা না করে যাব না বলেই ত এতক্ষণ
বসে আছি।”
সুধীরা অমনি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “সুবােধদার কথা শুনােনা
৬৪
দক্ষিণাপথের যাত্রী
ঠাকুমা, জোর করে আটকে রেখেছি, এসেই বল্লেন, “আজ যাই আর
একদিন আসব।”
ঠাকুমা বল্লেন, “কি করবে বল, কতদিন বাদে কলকাতায়
ফিরেছে, কত বন্ধু-বান্ধব, কাজ কর্ম সবই ত’ আছে, তাের বাপের
সঙ্গে দেখা হয়েছে ত’ ?”
সুধীরা জবাব দেবার আগেই উত্তর দিলুম, “রায়মশাইয়ের সঙ্গে
দেখা হয়েছে ঠাকুমা, তিনি এখানে কার অসুখ, তাকে দেখতে
গেছেন।”
ঠাকুমা বললেন, “নিবারণের ছেলেটা আজ কদিন থেকে
জ্বরে ভুগছে তাকেই তবে দেখতে গেছে। আর বল কেন অসুখ
বিসুখ ওদের বাড়ীতে লেগেই আছে। তােমাদের সব খবর
ভাল ত’ সুবােধ ?”
হা “ঠাকুমা আপনার আশীর্বাদে সব ভালই, আপনার শরীর
বেশ ভাল আছে ত’?”
“আর বাবা বুড়াে বয়েসের শরীর, তােমরা সব সুখে
স্বচ্ছন্দে থাকলেই আমার ভাল, তা বেশ যখন এসেছ, খাওয়া দাওয়া
করে যেন চলে যেও না বাবা। ততক্ষণ সুধার সঙ্গে গল্প টর
কর, রাস্তার কাপড় চোপড় গুলাে ছেড়ে আসি, ত্রিলােচনও
আসে এই।”
ঠাকুমা নীচে নেমে গেলেন। ঘরের ভেতর চুপ করে শুধু এই
দক্ষিণাপথের যাত্রী
কথাই ভাবতে লাগলুম, যে সুধীরার মান অভিমানের কথাগুলােই
আমাকে যেন জোর করে এখানে বসিয়ে রেখেছে। নিতান্ত না
খেয়ে যাওয়াটাই হয়ত অভদ্রতা, এমন সময় সুধীরা জিজ্ঞাসা করলে,
“কি চুপ করে বসে রইলেন যে?”
“কি করব বল, আমি ত’ অনেক আগেই যেতে চেয়েছিলুম,
কিন্তু তুমি মুখ ভার করে রইলে সঙ্গে সঙ্গে তােমার মান অভিমানের
পালা সুরু হ’ল সুতরাং চুপ করে বসে থাকা ছাড়া যাবার উপায় ত’
দেখছি না।”
“সত্যি সুবােধা আমি বুঝতে পারছি আপনি আমার ওপর রাগ
করেছেন কিন্তু আপনাকে পেলে মােটেই ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে
, জানি না হয়ত আপনার সরল সহজ মধুর ভালবাসাই এর
জন্যে দায়ী।”
আমার আর উত্তর দেওয়া হল না কারণ সেই সময় রায়মশাই
ঘরে ঢুকে বললেন, “সুবােধ দেরী হয়ে গেল না?”
সঙ্গে সঙ্গে সুধীরাও জিজ্ঞাসা করলে, “বাবা নিবারণ কাকার
ছেলে ভাল আছে ত?”
“হ। মা, আজ একটু ভালই, ডাক্তার বলে গেছে আর কোনও
ভয় নেই’, তুমি মা এইবার সুবােধর খাওয়ার ব্যবস্থাটা করে
ফেল; মা নীচেই রয়েছেন দেখলুম, দেরী করােনা সুবােধকে
আবার অনেকখানি যেতে হবে।”
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সুধীরা একবার আমার মুখের দিকে চেয়ে, “এমন কি রাত
হয়েছে” বলে নীচে নেমে গেল।
সে রাত্রে সকলের অনুরােধে ও যত্নে খাওয়াটা একটু বেশীই
হয়ে গেল। ফেরবার সময় সুধীরা আমাকে দিয়ে একরকম জোর
করেই প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিলে যে কাল তাদের বাড়ী আসতেই
হবে। তাই চলার পথে ভাবতে লাগলুম তবে সত্যই কি সুধীরা
আমার জীবন পথের একটা বােঝা হয়ে দাড়াবে ? জানি না কোথায়
এর শেষ। শােবর উদ্যোগ করছি, কাছেই ক্লাবের ঘড়িটায় ঢং ঢং
করে এগারটা বেজে গেল।
পরের দিন সকাল বেলা বাইরের ঘরে। বসে খবরের
কাগজখানা উলটে পালটে দেখছি হঠাৎ অজিত এসে প্রশ্ন করলে,
“তারপর সুবােধ কালকের রােমান্স কতদূর এগুলাে?”
বললুম, “অজিত যা ভাবছিস তা কিছুই নয়, সংসারে মানুষ
মানুষের সঙ্গে যেমন আলাপ ব্যবহার করে থাকে ঠিক তেমনি।”
অজিত হাসতে হাসতে বললে, “সে কি সম্ভব, যে রকম মতলব
করে আমায় তাড়ালি, এরপরও কি তােমাদের মনােভাব অন্য কিছু
ভাবা যায়?”
“তুমি যদি বিশ্বাস না কর তাহলে আমি নাচার।”
৬৭
দক্ষিণাপথের যাত্রী “কি করে বিশ্বাস করি বল, কারণ তােমার সুধীরাকে যেটুকু দেখবার অবকাশ পেয়েছি তা থেকে শুধু এইটুকুই বুঝেছি যে তার অন্তরাত্মা তােমাকেই পূজা করে।” হেসে উত্তর দিলুম, “তােমার গভীর গবেষণা, মনস্তত্ত্ব- বিদকেও হার মানিয়েছে অজিত, তুমি একজন সমজদার বটে।” “সুবােধ ঠাট্টা কর তাতে দুঃখু কিছু নেই, আমি সত্যি কথাই বলেছি।” বল্প ম, “অজিত একজন শিক্ষিতা নারীর ভালবাসা যাচাই আমার মত একজন অজ্ঞাত কুলশীলকে কেন সে পুজো করবে সেটা বােঝা অত সােজা নয় ভাই।” “খুবই সহজ, খুবই সরলকারণ সে তােমার আত্মীয় নয়, প্রতিবেশীও নয় তবে তার ওপর তােমার কিম্বা তােমার ওপর তার এত আকর্ষণ কিসের আমায় বুঝিয়ে বলতে পার? বন্ধু সব জানি সব বুঝি, কোথায় যে দরদ তা এ শৰ্মার আর জানতে বাকী নেই। শুধু তার চোক দুটো দেখেছি আর অমনি মনে হয়েছে সে চোখ দুটো তােমাকে কি যেন নিবেদন করতে চায়, চট করে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। কারণ সাধারণ মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশী লেখাপড়া সে শিখেছে।" বললুম, “অজিত তুই ভুল বুঝেছিস, সে আমাকে কখনই ভালবাসতে পারে না।” ৬৮ দক্ষিণাপথের যাত্রী “পারে বন্ধু পারে, এমনি করেই নর ও নারীর অন্তরে সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারেই গড়ে ওঠে প্রেম।” “জানি না সুধীরার অন্তরে ফর মত কোনও প্রেম-ধারা প্রবাহিত আছে কিনা কিন্তু আজও আমি তার মনের গােপন কথা কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি।” “ঐ খানেই ত মানুষের দরদ, ঐ খানেই ত তার আকর্ষণ, যাক ওসব কথা, এখন জিজ্ঞাসা করি আজও কি সুধীরাদের বাড়ী যাওয়া হচ্ছে ?” “অজিত মিথ্যে বলে লাভ কি, কাল ফেরার সময় সে জোর করে আমার কাছে কথা নিয়েছে যে আজও তাদের বাড়ী যাবাে।” “সুবােধ আমি জানি তুই না গিয়ে পারিস না, যাই হােক ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি সুধীরার সংস্পর্শে তােমার জীবন সার্থক হয়ে উঠুক।” অজিতের কথা শুনে শুধু তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলুম, কোনও কথাই বলতে পারলুম না। মনে হল যেন আমি বাক- শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। “এতে লজ্জা কিম্বা দোষের কিছু নেই ভাই, এমনি করেই পুরুষ ও নারীর মধ্যে ভালবাসার বীজ অঙ্কুরিত হয়ে ওঠে। যুগ যুগান্তর ধরে এ নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম ঘটেনি তােমার
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বেলায় ও ঘটবে না। আমার মনে হয় পৃথিবীতে এইটেই সব চেয়ে
সত্যি ও আকর্ষণের বস্তু।”
“অজিত তুমি হয়ত ঠিকই বলছ, কিন্তু আমি আজও
বুঝে উঠতে পারছি না এর পরিণতি কোথায়। মনে হচ্ছে কি
জান, যে আমি আমার সব কিছুই হারিয়ে ফেলেছি কাউকে
ভালবাসার মত শক্তিও যেন আমার নেই।”
সুবােধ, মানুষের মনের অজ্ঞাতসারেই প্রেম জেগে ওঠে
এবং তখন তার মাদকতা শক্তির মােহ হয়ে ওঠে প্রখর, তখন
মানুষ হয়ে যায় অন্ধ, ভাল মন্দের বিচার-শক্তি পৰ্যন্ত হারিয়ে
ফেলে। সুতরাং তোমাকে আশ্রয় করে যে জীবন
গড়ে
উঠতে চায় তাকে তুমি বাধা দিওনা।”
অজিতের কথায় হা, না কিছুই বলতে পারলুম না।
মনে হতে লাগল যদি অজিতের কথা সত্যিই হয় তাহলে এ
ভালবাসার ছোঁয়াচ থেকে কেমন করে নিজকে বাঁচাবাে।
অজিত বল্লে, “সুবােধ ভাবনা করে লাভ নেই তবে এইটুকু
মনে রেখে দিও যেন কিছু অন্যায় কিম্বা অশােভন না হয়, আজ
আমি চললুম পরে আবার দেখা হবে।”
অজিতের কথাগুলাে মনটাকে একবারে তােলপাড় করে
দিয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করলুম আজ আর কোনও মতেই
সুধীরাদের বাড়ী যাব না। যথা সময়ে স্নানাহার সেরে বিছানায়
৭০
দক্ষিণাপথের যাত্রী
শুয়ে বর্তমান মাসের ভারতবর্ষটা উলটে পালটে দেখতে দেখতে
কখনও যে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম তার কোনও হুসই ছিল না।
হটাং ঘুম ভাঙ্গতেই ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখি পাঁচটা বাজবার
বিশেষ দেরী নেই। বাইরে পশ্চিম দিকে আকাশের গায়ে কালাে
মেঘের তলায় সূৰ্য্য লুকিয়ে গিয়েছে, কালবােশেখীর ঝড় তুমুল
নৃত্য শুরু করে দিয়েছে, থেকে থেকে বিদ্যুৎ লিক লিক করে জ্বলে
উঠছে, আর সঙ্গে সঙ্গে বজ্রের গুরুগম্ভীর ডাকে দিগন্ত কেঁপে
উঠছে। ভাবলুম যাক ভালই হল, যাওয়ার হাত থেকে নিস্তার
পাওয়া গেল। কিন্তু জানি না কোথা থেকে একরাশ দুর্বলতা
এসে আমাকে আঁকড়ে ধরলে, চুপ করে আর ঘরের ভেতর বসে
থাকতে পারলাম না। বিবেকের সকল যুক্তি তর্ককে দূরে
ঠেলে দিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। সুধীরাদের বাড়ী এসে দরজায় ঘা
দিতেই, চাকর দরজা খুলে দিতে জিজ্ঞাসা করলুম, “জারে বিধু
রায়মশাই বাড়ী আছেন ত’ ?”
বিধু কোনও কিছু বলবার আগেই সুধীরা ওপর থেকে
‘‘আসুন সুবােধদা ওপরে আসুন’ বলতে বলতে নীচে নেমে
আসতেই জিজ্ঞাসা করলুম, “রায়মশাই বাড়ী নেই বুঝি ?”
সুধীরা আমার কথার উত্তর না দিয়ে বললে, “সুবােধা
একি ভিজে যে একেবারে নেয়ে উঠেছেন, তাড়াতাড়ি আগে
কাপড় জামাটা ছেড়ে ফেললুন দেকি।
৭১
দক্ষিণাপথের যাত্রী
“সুধীর রায়মশাই আর ঠাকুমা কাউকেই ত দেখছি না। তবে
তঁারাও কি আমার মত এই দুৰ্যোগ মাথায় নিয়ে বেরিয়েছেন?”
“বাবা অনেক আগেই একটা দরকারে কালীঘাট গেছেন
ফিরতে হয়ত দেরী হতেও পারে, আর ঠাকুমা আপনি ত’ জানেন
একদিনও তার ঠাকুরের আরতি দেখা বাদ যাবার উপায় নেই।”
“সুধীরা, সেকালের মানুষ ঠাকুর দেবতা পেলে আর কিছু
যেন চান না।”
বয়েসের সঙ্গে সজে ও জিনিষট। আপনিই এসে পড়ে
একথা আপনি ভুলে যাচ্ছেন কেন সুবােধা ?”
হাসতে হাসতে বললুম, “ভুল তা হবে তা না হলে এই দুৰ্যোগ
মাথায় করে তােমাদের বাড়ী ছুটে আসি সুধীরা?”
“সেটা আপনার মহানুভবতা,
আমাদের ওপর একটা
ভালবাসার টান।”
“সুধীরা যারা মহৎ তারা সকলকেই এ পৃথিবীতে মহৎ ভাবে
কিন্তু যাই বল না কেন এ দুৰ্যোগ মাথায় নিয়ে বেরুবার কোনও
ইচ্ছেই ছিল না কিন্তু তবুও কেন জানি না হটাৎ তােমার
জন্যে মনটা কেমন করতে লাগল তাই বাড়ী ছেড়ে একটাবার
তােমাকে দেখবার জন্যে এই দুর্যোগেও বেরিয়ে পড়লুম।
সুধীরা উত্তর দিলে, “সে সৌভাগ্যের জন্যে ভগবানের
কাছে কৃতজ্ঞতা জানাবার শক্তি পৰ্যন্ত আজ হারিয়ে ফেলেছি।
৭২
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সুবােধদা। পূর্বজন্মে হয়ত এমন কিছু সুকৃতি ছিল যার ফলে
আপনার মত উদার ও মহৎ ব্যক্তির করুণার পাত্রী হবার
সৌভাগ্য লাভে ধন্য হয়েছি।”
সুধীরাকে বাধা দিয়ে বন্ধুম, “থাক সুধীরা অনেক হয়েছে
আর আমাকে বেশী উচুতে ঠেলে তুলাে না কারণ পড়লে প্রাণে
বাচা হয়ত দায় হয়ে উঠবে।”
“যার যেটুকু প্রাপ্য তাকে সেটুকু দিয়ে দেওয়া কি অন্যায় বলে
মনে করেন সুবােধা ?”
উত্তর দিলুম, “ন্যায় অন্যায়, দেনা-পাওনা কোনও কিছুর
মধ্যে নেই সুধীরা, তােমাকে ভাল লাগে আর তােমরা
ভালবাস বলেই এই দুৰ্যোগ মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ে-
ছিলুম।”
সুধীরা কিছুক্ষণ কি একটা ভেবে বল্পে, ‘আমাকে ভাল লাগে
এটাকি আপনার মনের কথা ?”
সুধীরার প্রশ্নের উত্তর দিতে যেন একরাশ কুঠা গলাটাকে
চেপে ধরলে, উত্তর দিতে পারলুম না। সুধী বল্পে, “কি চুপ করে
রইলেন যে? উত্তর দিন।”
বললুম, ‘সুধা ভাল লাগে কিনা সেটাও কি আমার মুখের
কথায় তােমাকে বুঝিয়ে বলতে হবে ? মানুষের অন্তরটা কি
তার যথেষ্ট প্রমাণ নয় ?”
৭৩
দক্ষিণাপথের যাত্রী
একথার উত্তরে সুধীরা বেশ জোরে একটা নিঃশ্বাস ফেলে
চুপ করে রইল।
চেয়ারের হাতলে হাতের ওপর মাথা রেখে বসে রইলুম।
সুধীরা বেশ একটু ব্যস্ত হয়েই জিজ্ঞাসা করলে, “অমন
চুপ করে বসে রইলেন যে, মাথাটা ধরলো বুঝি ?”
মাথা না তুলেই উত্তর দিলুম, “ও অমন মাঝে মাঝে আমার
হয়, তার জন্যে ভাবনার কিছু নেই আর তাছাড়া আমাদের মত
লােকের সংসারে থাকা না থাকার কোনও মূল্য আছে বলে ত’ আমার
মনে হয় না সুধীরা।”
সুধীরা বেশ একটু রাগত ভাবেই বলে, “দেখুন সুবােদ
আপনি দয়া করে ওসব কথা আর শােনাবেন না ওতে আমার মন
সত্যিই বড় খারাপ হয়ে যায়।”
“সুধীরা আমার ওপর রাগ করে অনর্থক নিজের মনটাকে
খারাপ করে লাভ নেই। দুঃখ পাও এমন কথা নাই বা
বন্ধুম।”
“যান, আমি বুঝি আপনাকে ঐ কথাই বলছি। নিজেই ত’
বড় বড় কথা বলছেন, সংসারে আপনাদের মত লােকের দরকার
আছে কি না আছে। আপনি তার কি বুঝবেন।
“এইবার তুমি ঠিক বলেছ সুধীরা, আমার দরকার আমি
বুঝবাে না, বুঝবে কেবল তুমি, না?”
৭৪
দক্ষিণাপথের যাত্রী
সুধীরা উত্তর দিলে, “হ্যা আমিই শুধু বুঝব অন্য কারুর বাের
প্রয়ােজন আছে বলে অন্ততঃ আমি মনে করি না।”
একটু হেসে উত্তর দিলুম, “থাক আর রাগের প্রয়ােজন নেই
এখন থেকে আর কোনও জিনিষই বােঝবার চেষ্টা করবাে না।”
দিনের পর দিন এমনই আনন্দের ভেতর দিয়ে কেটে চলে।
সুধীরাকে না দেখে একটা দিনও যেন থাকবার উপায় নেই।
দু’মাস পরের কথা, একটা পর্ব উপলক্ষে সেদিন আফিল
কাছারী ছিল সব বন্ধ। দুপুর বেলা খাওয়া দাওয়ার পর অজিতের
সঙ্গে পরামর্শ করছিলুম অন্তত দুচার দিনের জন্যে কোনও
জায়গা থেকে একটু ঘুরে আসা যায় কিনা।
অজিত হাসতে হাসতে উত্তর দিলে, “সুধীরাকে ছেড়ে তুই যে
একটা দিনও কোথাও যেতে পারিস এ ত আমার বিশ্বাস হয় না।”
প্রতিবাদ জানিয়ে অজিতকে কিছু বলার চেষ্টা করতেই
হঠাৎ ঘরের ভেতর রায়মশাই এসে বললেন, “আজ আমার খুব
বরাত জোর, তােমাদের দু'জনকেই একসঙ্গে পাব এ আশা
করিনি যাক ভালই হল একটা কথা বলতে এলুম।”
অজিতের সঙ্গে পূৰ্বেই একদিন রায়মশাইয়ের আলাপ
হয়েছিল সুতরাং অজিত বেশ যত্ন করে রায়মশাইকে বসিয়ে
৭৫
দক্ষিণাপথের যাত্রী।
জিজ্ঞাসা করলে, “এমন কি জরুরী কথা রায়মশাই যে এই দুপুর
রোদে কষ্ট করে বলতে এলেন?”
রায়মশাই বললেন, ‘না এসে কি করি বল, ভেবেছিলুম
সুধা আই, এ পাশ করুক, কিন্তু মার তাগাদার জালায় এই দুপুর
রােদে তােমাদের কাছে দায় জানাতে এলুম। এখন তােমাদের
সাহায্য ছাড়া আমার আর যে কোনও উপায় নেই।”
রায়মশাইয়ের কথা শুনে বুঝতে আর বাকী রইল না যে
সুধীরার বিবাহের জন্যে তিনি বেশ ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
আমি আর কোনও কথা বললুম না। অজিত উত্তর দিলে,
“তা এই দুপুর বেলায় এত ব্যস্ত হবার কি আছে। আমাদের কি
করতে হবে বলুন, আমরা তা অবশ্যই কোরবাে।
রায়মশাই বললেন, “তােমাদেরই সব করতে হবে, পাত্র
যে দু’চার যায়গায় সন্ধান না করেছি তা নয় তবে—”
রায়মশাইকে বাধা দিয়ে অতি জিজ্ঞাসা করলে, “সেগুলি
বুঝি পছন্দ হচ্ছে না?”
“না ঠিক তা নয়, মার বড় ইচ্ছে সুবােধের সঙ্গে হলেই যেন
মনে করেছিলুম সুবােধকে একথা একদিন বলব, কিন্তু
পাছে সুবােধ মনে করে যে তার আলাপের সুযােগ নিয়ে সুবিধা
খুজছি, এই ভেৰে কথাটা এতদিন বলতে পারিনি কিন্তু
সুধীরার মনভাব যখন কিছু কিছু শুনলুম তখন তােমাদের
ভাল হয়।
৭৬
দক্ষিণাপথের যাত্রী।
সে কথা জানানো ছাড়া আমার আর অন্য কোনও উপায়
নেই।”
সমস্ত শুনে অজিত আমার মুখের দিকে তাকাতেই রায়মশাই
অজিতকে আবার বললেন, “অজিত আমার এই কন্যাদায়ে একট,
সাহায্য না করলে চলবে না।
রায়মশাইকে বাধা দিয়ে অজিত বল্লে, “ব্যস্ত হবার কি আছে,
ভবিতব্য থাকলে ভগবানের বিধান নড়চড় কোনও মতেই
হবে না।”
“মেয়ের বাপ বলেই ওটা বুঝেও বুঝে উঠতে পারি না অজিত
সব যেন গােলমাল হয়ে যায় তাই পাঁচজনের সাহায্য হয়ে পড়ে
একান্ত প্রয়ােজন।”
অজিত উত্তর দিলে, “সে জন্যে আপনি চিন্তা করবেন না,
আমার দ্বারা যেটকু হবার তা হবেই।”
অজিতের কথায় রায়মশাই কতকটা আশ্বস্ত হয়ে সেদিনের
মত বিদেয় নিলেন।
রায়মশাই চলে গেলে, অজিত বেশ একট, রসিকতা করে
বল্লে, “সুবোধ একেই বলে লা কোথায় লাগে রেঞ্জার্সের লটারী,
কিন্তু ভাই চালটা যাহােক চাললি বটে ?”
বল্পম, “তার মানে? এর ভেতর চাল টাল কিছুই নেই,
আমাকে অতটা বেহায়া ভাবিসনি অজিত।”
৭৭
দক্ষিণাপথের যাত্রী
অজিত হাসতে হাসতে বললে, “পেটে ক্ষিদে মুখে লাজ কেন
ভাই?”
উত্তর দিলুম, “অজিত সব কথা না হয় মেনেই নিলুম, সুধীরাকে
ভালবাসি এও হয়ত সত্য কিন্তু তাই বলে বিবাহের সম্বন্ধ এট।
একেবারে যেন একটা এ্যাকসিডেন্টের মত নয় কি?
অজিত বলে উঠল, “এই কথাই ত’ আমি জানতে চাই, যাক
তাহলে তুমি এ বিবাহে অরাজী নও? কিন্তু
সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিলুম, “বিয়ে? কি বলছিস অজিৎ ?”
“একেবারে যে গাছ থেকে পড়ছিস, হেয়ালী ছাড় মনের কথাটা
খুলে বলে দাও কারণ শুধু শুধু একজন নিরীহ ভদ্রলােককে হয়রাণ
করে কোনও লাভ হবে না।”
“অজিত অন্যায় করেছি, সুধীরার সঙ্গে পরিচয় না হলেই ভাল
হােত। কিন্তু আজ কেমন করে বলব’ পারবে না, সে যে আমার সব
খানি অন্তর দখল করে বসে আছে।”
অজিত বেশ একটু গম্ভীর হয়ে বললে, “বেশ তাহলে আমি
কালই রায়মশাইকে পাকা কথা দিয়ে আসব’, দেখ শেষট। কিন্তু
কথার নড়চড় না হয়।”
বেশ সংযত হয়েই উত্তর দিলুম, “অজিত তুই ত সব জানিস
ভাই, কিন্তু তবুও কি আমাকে প্রেমের চক্রান্তে পড়ে মিথ্যেবাদী
হতে বলিস?”
৭৮
দক্ষিণাপথের যাত্রী
“সুবােধ আমি জানি তােমার বাবা মারা যাবার পর তুমি
নির্মল বাবুকে কথা দিয়েছিলে তার মেয়ে বীণাকে বে করবে কিন্তু
আজ আর সে কথা তােমার থাকবে না এই ত? কিন্তু সুবােধ সব
সময় এ কথাটা যেন ভুলে যাসনি যে ভালবাসার কাছে কোনও
যুক্তি তর্কই খাটে না আর এ কথাও হয়ত’ মিথ্যে নয় যে সুধীরার
মত একজন শিক্ষিতা কুমারী তােমাকে নিঃস্বার্থে ভালবাসেনি।
সুতরাং তার আজীবনের অত বড় একটা সাধনাকে অপরের চোখে
ক্ষুন্ন করে তুমি পুরুষ হয়ে কেমন করে আর একজন সম্পূর্ণ অজানা
অচেনাকে টেনে আনছ, যা সম্পূর্ণ আমার চিন্তা শক্তির
বাইরে।
মনটা একটা ভীষণ ভাবনায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল, অজিতকে
বললুম “ভাই আমায় একটু ভাববার সময় দাও।”
“বেশ না হয় দু’ একদিন বাদেই তােমার ভাবার ফলাফলটা
জানিও” বলে অজিত তখনকার মত বিদায় নিলে।
অজিত চলে যাওয়ার পর সত্যি সত্যিই মনটা খুবই চঞ্চল হয়ে
উঠল কারণ একদিকে সুধীরার ভালবাসা আর একদিকে কথার
মূল্য, আমাকে বিশেষ ভাবে বিচলিত করে তুললে। সেদিন থেকে
সুধীরাদের বাড়ী যাওয়া বন্ধ করে দিলুম।
এমনি করে পুরাে তিনটে দিন কেটে গেল। অজিতকে আজ
পাকা কথা দেবার দিন। সকাল বেলায় অজিতের অপেক্ষায় বসে
৭১
দক্ষিণাপথের যাত্রী।
বসে শুধু সেই কথাই ভাবছিলুম এমন সময় পিয়ন পত্র দিয়ে গেল
আমারই চিঠি সুধীরা লিখেছে।
পূজনীয়েষু, সুবােধদা,
বাবা না বুঝে একটা ভুলই না হয় করেছেন তাই বলে
আমার ওপর এমনি করে প্রতিশােধ নিতে হয় ? দু’জনের
মাঝখানে কি আছে না আছে তা আমি জানতে চাই না, শুধু
এইটুকু আজ আমি জানিয়ে দিতে চাই যে তােমার অন্তরে ব্যথা
পায় এমন কিছু করতে তােমায় আমি কোনও দিনও অনুরােধ
করবো না। না জেনে অপরাধ করার শাস্তি তুমি আমায়
যথেষ্টই দিয়েছ। ক্ষমা ভিক্ষার জন্যেও অন্ততঃ একটা বার
তােমাকে কাছে পেতে চাই, এই আমার শেষ মিনতি। প্রণাম
নিও। ইতি-
সুধীর।
পত্ৰখানা পড়ে সত্যিই খুব কষ্ট হল, অকপটে ভালবাসাই কি
তার অপরাধ এই কথাই শুধু ভাবতে লাগলুম এমন সময় অজিত
এসে জিজ্ঞাসা করলে, “সুবােধ ভাবার ফলাফলটা কি এইবার
জানতে পারি ?
কোনও কিছু না বলে অজিতকে সুধীর পত্ৰখানা দিয়ে
বললুম, “পড়ে দেখ ।”
পত্ৰখানা পড়ে অজিত বল্লে, “সত্যি তার দুঃখ হবারই কথা,
দক্ষিণাপথের যাত্রী।
শেষ পর্যন্ত যখন তাকে বিয়েই করতে হবে তখন ভালমানুষটার
মত চুপটা করে গা ঢাকা দিয়ে থাকার আমি ত কোনও মানেই
বুঝি না।”
“অজিত তুইও শেষে আমার ওপর চটে যাচ্ছিস?”
“ সুবােধ তােমার এ ব্যবহার আমি মােটেই সমর্থন করতে
পারি না।”
“অজিত তুই বুঝতে পারছিস না, বীণার কথাটা এত চটু করে
কেন ভুলে যাচ্ছিস ভাই।”
“তাই যদি হবে তবে সুধীরাকে মাঝ পথে টেনে আনার কি
প্রয়ােজন ছিল সুবােধ ? অন্ধ বিশ্বাসে একজন যখন তার সমস্ত
ভালবাসা টুকু উজাড় করে তােমায় বিলিয়ে দিলে তখন ভাবনা
হল বীণার জন্যে, যাকে চোখে দেখার সুযােগ আজও তােমার হয়ে
ওঠেনি, সেই বীণার জন্যে আজ তােমার এত দরদ ?”
“অজিত আমিই অপরাধী, যাক বলার আমার কিছুই নেই
আজই আমি পুরী যাব, রথের আগে কলকাতায় ফিরবে না,
সুধীরার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হবে না, তাছাড়া সময়ও নেই, ফিরে
মতামত জানাবো, রায়মশাই এলে এই কথাই তাকে বলে দিও।”
“সুবােধ অদ্ভুত তােমার খেয়াল যা ভাল বােঝ কর, শেষ পর্যন্ত
আমাকে আর নিমিত্তের ভাগী কোরােনা, এই আমার অনুরােধ।”
সেই দিনই পুরী যাত্রা করলুম। প্রায় এক সপ্তাহ পরে
৮১
দক্ষিণাপথের যাত্রী
অজিতের পত্রে জানলুম রায়মশাই আমার খোঁজে এসে পুরীর
ঠিকান। জেনে নিয়ে গেছেন। সুধীরার পত্রের আজও জবাব দেওয়া
হয়নি। সকল সময় সেই জন্যই যেন মনটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে।
সুধীরার পত্ৰখান সঙ্গেই এনেছিলুম। সেখানা বার করে
বার বার পড়ি আর ভাবি তাইত, তার কি অপরাধ। নানা চিন্তায়
মনটা ব্যাকুল হইয়া ওঠে রাত্রে আর ভাল ঘুম হয় না। পরেরদিন
কোথাও বেড়াতে যেতে ভাল লাগলো না। চুপকরে শুয়ে আছি চাকরটা
একখানা পত্র দিয়ে গেল পত্র দেখেই বুঝলুম অজিত লিখেছে, কিন্তু
কাল ত’ তার পত্র পেয়েছি আবার আজ, নানা দুর্ভাবনার মাঝখানে
পত্ৰখানা পড়তেই, ‘সুধীরার আজ কয়দিন খুব অসুখ' এই সংবাদ
মনটাকে অত্যন্ত বিচলিত করে তুললে। বিছানা ছেড়ে উঠে
পাইচারি করতে করতে ঠাকুরকে খবর পাঠালুম আজ আর খাবার
ইচ্ছে নেই শরীরটা তত ভাল নয়।
: কলকাতায় ফিরব কিনা ভাবছি এমন সময় টেলিগ্রাফ পিয়ন
এসে হাজির। তাড়াতাড়ি খামখানা ছিড়ে দেখি রায়মশাই
তার করেছেন, “সুধীরা অত্যন্ত পীড়িত, তােমাকে দেখার জন্য
অত্যন্ত অস্থির, ও সঙ্গে সঙ্গে যাবার জন্য অনুরােধ।
সেইদিনই হােটেলের দেনা শােধ করে জগন্নাথ দেবের কাছে
সুধীরার আরগ্যের জন্য মানত করে কলকাতায় রওনা হলুম
ষ্টেশন থেকে সটাং রায়মশাইয়ের বাড়ী এসে দেখি সকলেই
দক্ষিণাপথের যাত্রী
ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করছেন। আমাকে দেখে রায়মশাই
বললেন, “সুবােধ এসেছ, বড় বিপদ কি হবে জানি না” এবং
কাপড় দিয়ে চোখ মুছতে লাগলেন।
রাইমশাইকে বল্লুম, “ভয় কি, উতলা হবেন না সেরে যাবে।”
সুধীরার পিসিমা রােগীর মাথায় বরফ দিতে ব্যস্ত ছিলেন।
পিসিমাকে বললুম, “ব্যাগটা আমায় দিয়ে আপনি আর খানিকটা
বরফ ভেঙ্গে নিয়ে আসুন।”
সুধীরার মাথায় বরফ দিতে বসে গেলুম। জ্বরের ধমকে ও
বিকারের ঘােরে সুধীরা মাঝে মাঝে “সুবােদ এসেছে” এই
প্রলাপ বকছিল। ঠাকুমা বােগীর পাশেই বসেছিলেন। তিনি
রােগীর গায়ে হাত বুলুতে বুলুতে বললেন, “জা মা, চেয়ে দেখ
তােমার সুবােদ এসেছে।”
জানি না ঠাকুমার কথাগুলি সুধীরার কানে গিয়েছিল কিনা
কিন্তু হঠাৎ সুধীরা আমার দিকে একবার চেয়ে দেখলে। মনে হল
সে চাহনিতে যেন কতদিনের সঞ্চিত রাখা জমাট হয়ে
আছে।
প্রাণহীন পুতুলের মত নির্বাক হয়ে রইলুম যেন মুহূর্তের
মধ্যে আমার সকল শক্তি লােপ পেয়ে গেল। ডাক্তার রােগী দেখে
চলে যাবার পর সকলকেই দেখলুম যেন বেশ একটু চিন্তিত ও
বিমর্ষ। নিতান্ত জোর করে নিজের প্রকৃত অবস্থাকে চেপে রেখে
দক্ষিণাপথের যাত্রী
বললুম, “বিচলিত হবার কিছুই নেই রায়মশাই, আমার মনে হয়
দুচার দিনের মধ্যেই সুধীরা ভাল হয়ে উঠবে।
রায়মশাই একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, “আমি বড় দুর্ভাগা
সুবােধ, “তােমরা তাই বল,মা যেন আমার তাড়াতাড়ি সেরে ওঠে।”
সুধীরার কানের কাছে মুখ রেখে আস্তে আস্তে বললুম,
“সুধীর, এই যে আমি এসেছি।
ঠাকুমা সুধীরার কপালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“ঠাকুর আমার মাকে আর কষ্ট দিও না সারিয়ে দাও।”
বেশ ভাল করে সুধীরার দিকে আর একবার চেয়ে দেখলুম
মনে হল যেন তার সােনার মুখখানা সাদা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে,
স্নান কালো হরিণ চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। খুব
চেষ্টা করেও দীর্ঘ নিঃশ্বাসকে চেপে রাখতে পারলুম না কারণ
স্পষ্টই বুঝলুম সুধীর তিলে তিলে মৃত্যুর পথে এগিয়ে চলেছে।
তিন দিন অক্লান্ত সেবা সুধীরাকে ধরে রাখতে পারলে না।
জানিনা সে যাত্র। পথের সকল পাথেয় চুকিয়ে দিয়ে
আমার ওপর কতবড় একট। অভিমানের
বােঝা
চাপিয়ে
রেখে গেল।
বাড়ী ফিরেছি। কিছুই আর ভাল লাগে না। চুপ করে বসে
থাকি আর ভাবি পরের দিন অজিতকে ডেকে পাঠালুম। কিন্তু সে
এলাে না, খবর এলো সে বীণাকে বিয়ে করেছে। এখন শ্বশুরবাড়ী।
=
—শেষ
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.
No text on this page.