Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Abhishek

Chattopadhyay,abinash Chandra · 2010/01/4

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

অভিষেক
গীতিকাব্য
শ্ৰীঅবিনাশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বিরচিত
কলিকাতা।
মহিলা যন্ত্রে মুদ্রিত
বঙ্গাব্দ ১৩২২।
মূল্য
আট আনা

No text on this page.

{
?
আজি সে কুমার মাতঃ রাজদণ্ডধর,

No text on this page.

শুর পরমাস্পদ আয়ুৰ্বেদাচাৰ্য- পণ্ডিত শ্ৰীযুক্ত অঘােরনাথ শৰ্ম্মা শাস্ত্রি জ্যোতিভূষণ- এফ, টি, এ, মহাশয় শ্রীচরণেষু। িেখয়াছি সাধুজন স্বার্থের সংসারে ধৰ্ম্মে অনুরক্তি অর্থে অনাসক্তি যাঁর, তবু আছে যশােলি প্রাণের মাঝারে ; কিন্তু, দেব, দেখিনাই তুলনা তােমার ! ছদ্মবেশী দেব তুমি পরের কল্যাণে করিয়াছ সমুৎসর্গ হৃদয় দয়ার, দুরারােগ-ব্যাধি-ভীত অশান্ত পরাণে পশে শান্তি একমাত্র পরশে তােমার। ধন্বন্তরী সুধা ভাণ্ড দিলা কি তােমায় ?

তাইকি দুরন্ত ক্রর তক্ষকে দংশিত
ভশ্রশেষ ক্রম সম কালগ্রস্ত কায়,
যাদুমন্ত্রে মুহুর্তেই কর সঞ্জীবিত ?
তব গুণে শুষ্ক তরু মুঞ্জরিল আজি,
দাড়াইল আয়ুৰ্বেদ ফল ফুলে সাজি !
চমৎকৃত দেখি কাৰ্য্য তব সাধনার,
বার বার পদে তব করি নমস্কার ।
নাহি জানি কোন গুণে বড় ভাল বাস
কবিতা আমার !
সেই সে সাহসে আজি
পূরি ‘অভিষেক’ সাজি
নির্গন্ধ কুসুম রাজি
আসিয়াছি শ্রীচরণে
দিতে উপহার!
ধর গুরু ধর দেব,
ভক্তি পুষ্পভার !

অশুদ্ধি পত্র। छा দ্রষ্টব্য পত্র। শীল্পীকুল ৪, ৭, ৩৭, ৬৫ ৭ ইন্দ্রপ্রস্থরানী সরাসন শশঙ্কিত মনিষীগণ ২৫ ২৪ ৩০ ৩০ শিল্পিকুল ভুবন ইন্দ্রপ্রস্থরাণী খসে শরাসন সশক্ষিত মনীষীগণে সান্ত কল্যাণে সুকল্যাণ করুণ তারিণী স্বরূপিণী দুর্গপাশে রাজধানী কুমারিকা মধুবাণী গায়ক মুকুমণ্ডিত জয় ত্বরিতে ক্ষীণ ম্রিয়মাণ ৩১ কল্যানে সুকান করুনা তারিনী স্বরূপিনী দুর্গপাসে রাজধানি কুমারীকা যধুনি গাহক মুকুতামণ্ডিত অয় তরিতে ক্ষীন। ময়মান ৩৩ ৩৯ ৪৪ ৪৭ ৪৯ ৫৭ • পৃষ্ঠা:- ৬১ পিশাচিনী হৰ্ম্ম पछि নৌবরের মলিনী ত্রিভূবন শুনে ছালেক স্বসিল স্বর্গে স্বর্গে ৬৮ ঐ ৭১ १२ १७ ৭৫ পিশাচিনী श्या গ্রন্থি বৌরবের মালিনী ত্রিভুবন খসে লােক খসিল সর্গে মর্গে রূপিণী জননী হাহাম্পাসে উঠিবে হৈমবিভা লক্ষণ। নাশিনী। যন্ত্রণা প্রস্রবণ চীৎকারে শাপ চণ্ডিক। গাণ্ডীবী বাকি দুঃশাসন নিম্বন ৮৫ জনণী হাহাসে উঠিযে হৈমাবিভ লক্ষন নাসিনী যন্ত্রনা প্রবন চীৎকার সাপ চঞ্জীকা গাণ্ডিবী বাকী দুঃশাসণ নিখন ৮৮ ৯৬ - দ্রষ্টব্য। “তুলিকা বসন্ত স্পর্শে সুবর্ণ অনঙ্গ শ্বাসে মানস নিকুঞ্জে যার সৌন্দৰ্য কুসুম হাসে, স্নিগ্ধাজ্জ্বল উষাসম চিত্রাঙ্কনী প্রতিভায় আজি প্রাচ্য শীল্পরাজ্য নয়ন মেলিয়া চায়, দাক্ষিণাত্য অলঙ্কার শীল্পীকুল শিরােমণি ভারত গৌরব আর রবিবৰ্মা নৃপমণি !” উপরি উদ্ধত পংক্তি গুলি ৩৯ পৃষ্ঠায় “মাতৃভক্ত মহাপ্রাজ্ঞ গুণজ্ঞ অসীম” এর পরে বসিবে। ৩৯ পৃষ্ঠায় ৫ম পংক্তিতে “প্রােজ্জ্বল পঞ্চমণি” স্থানে “প্রােজ্জ্বল ছয়মণি” পড়িতে হইবে। ৩৯ পৃষ্ঠায় ১৫শ পংক্তিতে “পঞ্চরত্নরাগে” স্থানে “ষড় রত্নরাগে” পড়িতে হইবে। ৩৯ পৃষ্ঠায় ১৬ পংক্তিতে “পঞ্চ শুক্রতারা” স্থানে ষড় “শুক্র- তারা” পড়িতে হইবে।

No text on this page.

অভিষেক।
বিলাপ।
অধীর গম্ভীর
বিষাদ সিন্ধুর
তরঙ্গে ধরণী টলিতেছিল,
জীমূত নিনাদ
নিন্দিয়া কামান
শশাকের সংবাদ ঘােষিতেছিল,
বিন্ধ্য হিমালয়
ব্যথিত হৃদয়ে
গভীর উচ্ছাসে কাঁপিতেছিল,
জলধি জলদে
অবণী অম্বরে
বিষাদ বিপ্লব টলিতেছিল,
রাজরাজেশ্বরী
বুটনের রাণী
স্নেহ পাশ হায়, কাটিয়া গেল,

অভিষেক। হিন্দু মুসল্মান জৈন খ্রীষ্টিয়ান এক হাহাস্বরে গাহিতেছিল, অধীর অৰ্ব্বদ নর নারী শ্বাসে শশাকের ঝটিকা ছুটিতেছিল, টেমস্ তরঙ্গে জাহ্নবী প্রবাহে বিষাদ বাঁশরী বাজিতেছিল, রবি প্রভান্বিত বৃটীশ ভূবনে বিবাের কুষ্মটী ব্যাপিয়াছিল, # চির- সাম্রাজ্য বিশাল ঘন অভ্র জালে আঁধার ছিল, শণী সমুজ্জ্বল সহসা উঠিল হাসি প্রশান্ত সুনীল সিন্ধু আনন্দ লহরী মালা দুলিল তায়, প্রতিধ্বনি তুলি ঘন কাননে করে দূর বৃটীশের ভীম ভেরী বিজয় গায় । উঠিল হক্কারি হর্ষে গম্ভীর কামান শত, আনন্দ নিনাদে দ্রুত ভরে বিমান, বিলাপ। জয় রাজরাজেশ্বর জয় জয় এডোয়ার্ড- জয় জয় মহিপতি উঠিল গান। উথলে উছলে টেমস্ আনন্দ তুফানে, কিবা অর্ণব তরণী তালে নৰ্ত্তনে চলে, উল্লাসে জগৎবাসী সিন্ধু গিরি মরু তরি রাজেন্দ্র দর্শনে হের সদলে চলে ! কাটিয়া কুজ্জটী ঘন প্রােজ্জ্বল বিভায় পুনঃ বৃটীশ গৌরব রবি উঠিল ভাতি’, ভেদি গাঢ় অভ্রজাল সুধাকর সুধা ধারা বরবিল, ধরাতল উঠিল মাতি। আনন্দ হিল্লোলে টলিল বসুধা, আনন্দ বিদ্যুৎ প্রচণ্ড প্রবাহ স্পর্শিল ভারত, উঠিল নাচিয়া মুগ্ধ হিন্দুস্থান ভুলি অন্তদাহ ! আনন্দে গিরীন্দ্র করিল গর্জন সহস্র শিখর কর উর্দ্ধে তুলি,

অভিষেক।
বিজয় ঝঙ্কারে
মিলাইয়া তান
সহস্র কেশরী গরজিল ফুলি।
বিপুল প্রবাহে
সহস্র নিঝরে
হিমালয় হর্ষ হ’ল উৎসারিত,
উছলি জাহ্নবী
সিন্ধু ব্ৰহ্মপুত্র
ভারত ভূবন করিল প্লাবিত ।
ফুসিয়া সবেগে
লক্ষ দিক হতে
লােকের লহরী ফেনিল উচ্ছল,
মিলিল আসিয়া
গঙ্গোর্শ্বি সৈকতে
আৰ্য্যরঙ্গস্থল করে টলমল ।
রুদ্র নৃত্য সম
আনন্দ বিরাট
উঠিলা উম্ফে ইন্দ্রপ্রস্থ বুকে,
কামান হুঙ্কারে
বিজয় ঝঙ্কারে
উগারি উল্লাস দিগন্ত মুখে।
হারাইয়া শ্যাম ধনে
চির হতাশ্বাস সনে

বিলাপ।
সুনীল গম্ভীর নীরে
যেথায় তাপনী ধীরে
মুহুর্মুহু মৰ্মোচ্ছাসে
উন্মাদিনী মত কাঁপিতেছিলা,
নীরব গাণ্ডীব ধ্বনি
অন্তরে প্রমাদ গণি
আঁধার গহন বনে
চির অন্ধকার মনে
যেথা ইন্দ্রপ্রস্থ দেবী
মহাযােগ মাঝে নিমগ্ন ছিল,
সেথায় পশিল ধ্বনি,
চির তাপিনী তাপনী
জল তল ত্যজি উঠিলা ভাসি,
যােগ ভঙ্গে ত্বরা করি
ইন্দ্রপ্রস্থ পুরীশ্বরী
যমুনা সকাশে মিলিলা আসি

অভিষেক।
.
যমুনা ;-
গিয়াছে যেদিন ফিরিবার নয়,
কিসের এ তবে হয় অভিনয় ?
অসংখ্য কেতন শূন্যোপরে দোলে,
ঝলকে দামিনী গগনের কোলে,
লতিকা প্রসুনে জড়িত সুষমা
হাসে,—মনােলােভা শােভা নিরূপমা ।
ত্রিদিব বৈভব আনন্দ কানন
যেনরে মরতে দিল দরশন,
নানারঙ্গে তালে বাজিছে বাদন,
ফিরিছে রঙ্গিনী করিয়া নৰ্ত্তন
গিয়াছে যেদিন ফিরিবার নয়,
কিসের এ তবে হয় অভিনয় ?
ইন্দ্রপ্রস্থ দেবী ;
ত্রিদিব বিজয়ী
বীরেন্দ্র তনয়
এলাে কি অর্জুন? আইলা কেশব ?

বিলাপ।
গাণ্ডীব টঙ্কার বাজে কি শ্রবণে ?
ওকি শুনা যায় পাঞ্চজন্য রব।
হর্ষ আস্ফালনে
ভুমণ্ডল টলে,
জয় সিংহনাদ করে বৃকোদর ?
হয় হস্তী ধায়
• বিদারি ধরণী,
শুনি যুধিষ্টির রথের ঘর্ঘর ?
বীর পুত্র গণ
ওইকি বঁড়ায়ে ?
ওইকি তাদের প্রফুল্ল বদন ?
বিপক্ষ বিদারি
স্বরাজ্য উদ্ধারি
দুঃখিনী জননী করে অন্বেষণ ?
দুঃখিনী দু বলা
উন্মাদিনী পারা
পরের দাসত্বে রাখিয়া জননী,
জগৎ পূজিত,
কেমনে নিশ্চিন্ত ছিলিরে বাছনি ?
কহিয়া এতেক
ইন্দ্রপ্রস্থরানী
উন্মাদিনী মত চারিদিকে চায়,
বাহু প্রসারিয়া
“আয় বৎস বলি”
হায়রে ক্রোড়েতে লইবারে যায়।
ভূবন বিজয়ী

অভিষেক।
অগ্রসরি ত্বরা নিবারি অমনি
কহিলা বিলাপি তাপিনী পনী,
==
যমুনা ;
দুঃখানলে দহি
কোটী কল্পকাল
বিকৃত মস্তিষ্ক হ’লকি এখন ?
জাগ্রতে স্বপন হেরিতে লাগিলে
হায়রে অভাগী ললাট লিখন ।
আহা--পাগলিনী
হ'লেকি ভগিনী,
কাহারে ডাকিছ ধৰ্ম্মপুত্র বলি ?
কাল বশে হায়,
ইন্দ্র প্রস্থরাণী,
ভুলিলা তনয় আকুল কাকলি ?
“জননী-জননী”—
মরমের ধ্বনি
সে সুরের রেশ কই এ শবদে ?
হৃদয় জুড়ান
ভক্তি আবাহন
কইতাে বাজেনা প্রাণের পরতে ?
উঠিলে সে ধ্বনি
ঝন ঝন উঠিত বাজি,
তন্ত্রী হৃদয়ের

বিলাপ।
প্রতপ্ত শােনিত
প্রবল তরঙ্গে
ধমনী ভিতরে উঠিত নাচি!
বাজিলে সে বাঁশি
তরঙ্গ আমার
বহিত উজান প্রসূনে সাজি,
সৈকতে সৈকতে নিকুঞ্জ কানন
পাপিয়ার তানে গাহিত আজি,
ছুটিত স্বরগে বাঁশরী ঝঙ্কার
ঝরিত সঙ্গীত দেব অঙ্গনার,
বর্ষিত অতুল ত্রিদিব মন্দার,
স্বরগের চারু সুধার ভাণ্ডার
উছলি উঠিত শারদ চন্দ্রিমা,
ভাসিত তরঙ্গে সে হাসি ভঙ্গিমা,
রুদ্ধ হ’ল শ্বাস নীরব যমুনা,
নয়ন নিঝরে ঝরিল করুণা,
দগ্ধ স্মৃতি প্রাণে জলিল যাতনা
কহিতে কেশব হারাল চেতনা।
নিস্পন্দ শরীর কম্পিত অধর,
স্থির উর্ধ দৃষ্টি বক্ষে যুগম কর !

অভিষেক।
কতক্ষণে পুনঃ চেতনা সঞ্চার
উছসি উছসি কহিল আবার,
আমাদের ভাগ্যে
যে বাণী স্বজনী
গিয়াছে ভাঙ্গিয়া দ্বাপরের শেষে,
বাজে কি গাে আর ? সে সুধা বেনুয়া
চিরতরে সখি নীরব এ দেশে!
ভারত বসন্ত
সে শ্যাম কেশব
চির অবসান হয়েছে যখন,
করােনাক আশা
শুনিবে আবার
কোকিল কূজন—গাণ্ডীব নিস্বন !
কি উৎপাত রাহু
হইল উদয়
শান্তি শশধরে গ্রাসিতে আবার!
কি জানি কি নব
উপসর্গ চয়
করিবে ভারত ভীতির আগার!
গিয়াছে যে দিন ফিরিবার নয়।
হায়, এ কিসের হয় অভিনয় !

বিলাপ।
১১
ইন্দ্রপ্রস্থ দেবী
নহে যদি ভগ্নী,
দ্বাপর বিভূতি
ত্রিদিব বৈভব যাহে পরাভব,
কলির আদিত্য
বিক্রম কি তবে
প্রকাশে দ্বাদশ ভাস্কর গৌরব
নবরত্ন মালা
অতুল জগতে
বিলম্বিত গলে, অমল ধবল
কৌস্তুভ রতন
কবি কালিদাস
মধ্য মনি তায় করে ঝলমল ।
শশধরাধিক
বদন সুর
শশধর সুধা হইতে মধুর,
বৰুষে মুছলে
কবিত্ব মাধুরি,
ধরা ধরে শােভা সুবর্ণ বিধুর!
মৃতসঞ্জীবনী
সে সুধা পিয়িয়া
পায় নব প্রাণ ভারত আতুর,
নিরানন্দ ধাম
শােকের আবাস
আবার আনন্দে হয় ভরপূর !

১২ অভিষেক। কি দিল্লীশ্বর- পুত্র পৃথ্বীরাজ দৃষদ্বতী মরু করিয়া বিদার, উদয় অচলে আদিত্য প্রতিম বুঝিবা দিল্লীতে উদয় আবার! নিরখিয়া তায় পঞ্চবিংশ কোটী ভারত নিবাসী নৃত্য করি উঠে, ঝাঁঝরি ঝননে মৃদঙ্গ বাদনে বিজয় রাগিনী চৌদিকে ছুটে ! অথবা প্রতাপ- প্রচণ্ড প্রতাপ হিন্দুসূৰ্য্যছটা করেছে ধারণ, মাণিক্য বিভায় প্রকটিছে ঘূর্তি ঝলসি লােচন ! বীর পুত্রগণ যমুনা; শুনি অর্থ হীন প্রলাপ তােমার হাসি আসে দুঃখে কি কহিব আর, দেখগগা ভগিনী চেয়ে একবার একি সে ভারত আনন্দ আগার।

বিলাপ।
১৩
অন্ন দে অন্ন দে রব হাহাকার
ভরিয়া উঠিছে ভারত চৌধার,
হেথা কি বাজেগাে বসন্ত বিপিনে
প্রেম মাতয়ারা পাপিয়া ঝঙ্কার ।
ভারতে পাপিয়া গাহিবেনা আর।
এযে ক্ষুধাতুর প্রেতের আগার,
মুম্ষু আবাস পূর্ণ হাহাকার,
হেথায় শকুনি করিবে চীৎকার !
স্বার্থ মন্ত্রে নর দীক্ষিত যেথায়,
হিংসা মহাব্রত উদযাপন তরে
যে ভারতে নর লভয় জনম,
আর কি বীরাত্মা সেথায় সঞ্চরে ।
যেথা জয়চন্দ্র মানসিংহ রায়
মহাপাপ বীজ গিয়াছে রােপিয়া,
জনমিয়া সেথা কোটী রক্তবীজ
প্রতি গৃহে স্বসে কালীয় জিনিয়া!
সেই কোটী কোটী রতম কীট
পরস্পরে দংশি বিহরে যেথা,

১৪
অভিষেক।
।
পৃথ্বীশ প্রতাপ হায় সে রৌরবে
বিজয়ের ভেরি আর কি বাজায় !
গিয়াছে যে দিন ফিরিবার নয়
হায়, এ কিসের হয় অভিনয় !
ইন্দ্রপ্রস্থ দেবী ;-
তবে হা, সহসা
কেন গাে বাজিল
নিরানন্দ ধামে আনন্দ বাজনা ?
কেনগাে জাগিল
মরণের দেশে
উৎসাহ আনন্দ স্ফত্তি উত্তেজনা ?
প্রলয় তিমির
মগন গগনে
কেনরে সহসা অরুণােদয় ?
কেনরে আমার
বিঘাের আঁধার
হ’ল আচম্বিতে জোছনাময় ?
কেন এ শ্মশানে
উৎসবের বােল ?
কেন এ নরকে মলয় বয় ?
অশ্রু উচ্ছসিত
তপ্ত বৈতরণী
কেনরে শীতল লহরী ময় ? .

বিলাপ।
শুর সুরমণি
উঠেছে কি কোন
দুর্ভিক্ষ্য দানব দমন তরে?
এসেছে কি কোন
দেবতা দয়াল
মহামারী গ্রাসে রক্ষিতে নরে ?
তাই মাঙ্গলিক
শঙ্খ নিনাদিছে ?
তাই কি ভারতে বাজিছে ডঙ্কা ?
নিহত দানব ?
মরেছে রাক্ষসী ?
তাই স্বনে বাঁশি নাশিয়া শঙ্কা ?
কবি ;
----
দীন দয়াময়ী যেই মাতৃ অনুরাগে
স্বকৃত পাপের মহা প্রায়শ্চিত্ত যাগে,
শিপাহি বিপ্লবানলে, পতঙ্গের রাশি
নিহত নহিল এই ভারত নিবাসী,
মুখরিত গৌর কৃষ্ণ সীতারাম নামে
অবােধ্যায় দ্বারকায় শ্রীচৈতন্য ধামে,
অখণ্ড শান্তির ইন্দু উজ্জ্বল কিরণে
ছিল মা শশাভিত অর্ধ শতাব্দি গগনে,

অভিষেক।
যাহার কৃপায় গয়া পবিত্র প্রয়াগে
বিরাজে নিশ্চিন্তে ভক্ত বিভু অনুরাগে,
ভঙ্গে যাঁহার কাশী হয়নি শঙ্কিত,
হুঙ্কারে সাগর, ক্ষেত্র হয়নি কম্পিত,
ধর্মমতবাদে যেই বৃটন রাণীর
রঞ্জিত নহিল শুভ্র জাহ্নবী শরীর,
রক্ত কলঙ্কিত নাহি হ’ল হিন্দুস্থান,
উড়িলনা শান্তিধামে শােণিত নিশান,
যাঁর সান্তনার সুধা মৃতসঞ্জীবন
সহস্র যােযন পথ করিয়া লঙ্ঘন,
ঝরিত পীড়িত ক্ষুব্ধ ব্যথিত ভবনে
আশায় ভারতবাসী মাতিত নৰ্ত্তনে,
যাঁর বরাভয় কর মাতৃ স্নেহাঙ্কিত
ভারতবাসীর শির সতত স্পর্শিত
সুধাংশু জোছনা মত, রাজেন্দ্র মণ্ডলে
যাঁর সাম্য নীতি গুণ দুর্লভ ভূতলে,
ত্রিংশকোটী হিন্দু বৌদ্ধ জৈন মুসলমান
মুক্তকণ্ঠে মধু ছন্দে গাহে যাঁর গান,

বিলাপ। ১৭ বলিতে বিদরে বুক ঝরে অশ্রুধার, মরম মন্থন করি উঠে হাহাকার, সেই পুণ্যশীলা দেবী বৃটন ঈশ্বরী, আসমুদ্র ধরারাণী রাজরাজেশ্বরী, শাসিয়া সুদীর্ঘকাল সসিন্ধু ধরণী, কীর্তি চন্দ্র করজালে আলােকি অবনী, পরিহরি কর্মভূমি করিলা পয়ান- বৈকুণ্ঠের পথে তার ধায় দিব্য যান । সসাগরা ধরণীর রাজ রাজেশ্বরী, সম্পদে ঐশ্বর্যে বীর্যে জগৎ ঈশ্বরী, কটাক্ষে কাঁপিত খার- স্থাবর জঙ্গম আর, ইঙ্গিতে বিপক্ষ বৃন্দ পাইত বিভ্রম, যাঁহার কিঙ্কর গণ কালান্তের যম- দেব নর দর্পহারী অমিত বিক্রম ধারী, জলধি পর্বত মরু প্রান্তর কানন পদাঙ্কে অঙ্কিত করি করিত ভ্রমণ,

অভিষেক।
সহস্র নরেন্দ্র ঘাঁর সেবিত চরণ,
কৌস্তুভ প্রতিম মণি মুকুট ভূষণ,
মৰ্তে বৈজয়ন্তী যার
অতুল লণ্ডনাগার
খেন-সরসিজ মনােলােভা,
সরসী হৃদয় শােভা,
সস্মিত কমলা ঘাঁর সখী সহচরী,
করেন বন্দনা যার বাণী কবিশ্বরী,
বাসবের বর্জ্য ঘার কামানে হুঙ্কারে,
প্রচেতার পাস সাজে মন্ত্রণা আগারে,
মহিমা-অর্ণব সেই রাজ শেখরের
জগজ্জ্যোতি কোহিনুরে
মুকুট মণ্ডিত শিরে ;
অমােঘ অখণ্ড দণ্ড জগদীশ্বরের,
অবাধে পড়িল আসি মুহূর্তে কালের!
গৃহস্থ বৈরাগী কিম্বা কানন চারীর
ধূলি ধূসরিত শিরে,
যথা অসঙ্কোচে পড়ে,

বিলাপ।
১৯
আঁধার ঢালিয়া দিয়া করালী কালীর।
চির রবি প্রভান্বিত শশী সমুজ্জ্বল,
অৰ্দ্ধ ধরাতল তার
করে পড়ি হাহাকার,
আত্মীয় স্বজন বন্ধু ঢালে অশ্রুজল !
নরেন্দ্র কুল লােভন
মণি মালে অনুপম,
ধুলায় লুটায় পড়ি মুকুট উজ্জ্বল।
কোথায় ঈশ্বরী তার রাজ রাজেশ্বরী ?
সম্পদে ঐশ্বর্যে বীর্যে জগৎ ঈশ্বরী।
হে বিভু করূণাময় সৰ্বময় হরি,
সংসার কি স্বপ্ন শুধু কহ দয়া করি ।
কারণ সমুদ্র নীরে
অনন্ত নিদ্রার ঘােরে
নীলিমায় অনন্তের
আলােকের আঁধারের
অগণ্য বিচিত্র চিত্র আঁকিয়া কেবল
মুছিয়া ফেলিছ তায় থাকিতে তরল !

২
অভিষেক।
==
তবলীলা লীলাময়,
কিছু অনুমেয় নয়।
ধৰ্ম্মাধর্ম কৰ্মকৰ্ম্ম জ্ঞান ও অজ্ঞান,
প্রভুত্ব বৈভৰ বীৰ্য সম্পদ সম্মান,
সংসার সাগরে হায়,
সকলি বুদ্বুদ প্রায়
মুহূর্তে মূরতি ধরি উঠয় ফুলিয়া,
পলকে মিলায় পুনঃ নিমেষে নাচিয়া !
সত্য ত্রেতা দ্বাপরের
দেব কল্প সাধকের
অপূৰ্ব্ব মহিমা ময়
জীবন কম ময়,
সবি তব স্বপ্ন জাল কিছুই কি নয় ।
রাঘবের পরার্থতা,
ভীষ্মের সে উদারতা,
হরিশ্চন্দ্ৰ কীর্তিকথা,
মৈথিলীর কোমলতা-
সকলি কি বাতুলতা ওহে দয়াময়?
-

বিলাপ। ২১ সত্যই কি এ সংসার শুধু মায়াময় ? ভারতের সে মাহাত্ম্য, আরবের সে ঔদ্ধত্য, গীৱীশের জ্ঞানগর্ব, রােমের প্রচণ্ড দর্প- সকলি অসার কিহে অলিক আলয় ? ইতিহাস অর্থহীন প্রলাপ বলয় ? অর্জুনের সরাসন, সীজরের পরাক্রম, কর্ণের প্রতিজ্ঞান, হ্যানিবল বাহুবল, সেকেন্দর সম্রাটের সাহস অতুল, ভীমের সে প্রতিহিংসা ভীষণ বিপুল সবি কি হয়েছে ছাই একই সমান? সবারি কি চিতাভস্ম ভরিয়া বিমান আকাশে উড়ান কাল ঘুচায়ে সব জঞ্জাল ? রাম নীৰৱ সাম্রাজ্যের আনন্দ বেদন,

২২
অভিষেক।
সবি সম অনর্থক নিশার স্বপন ?
প্রতাপ সে দেশব্রত,
পৃথ্বীরাজ বীরব্রত,
জয়চন্দ্র জিঘাংসিত,
লাম্মনেয় শশঙ্কিত,
সবারি সমান মূল্য অসার সবাই ?
সাহস ঐশ্বৰ্য্য বীৰ্য পাপ পুণ্য নাই ?
ওহে প্রভু লীলাময়,
অনন্ত মহিমা ময়,
এহেন মিছার খেলা কেন কর নাথ ।
মিথ্যার বড়াই কেন কর বিশ্বনাথ !
বুঝেছি বুঝেছি দেব স্বরগ সংবাদ,
দয়ার সংসারে কেন হেন বিসম্বাদ !
উদ্ধত উন্নত শির
লুটাতে যদি ধীর,
অবণী হইত পূর্ণ অগন্য কারায়,
দুৰ্বল ধরণী হ’তে লইত বিদায়!

বিলাপ।
অপূৰ্ব্ব কৌশলী, কিন্তু,
সুপবিত্র পুণ্য গাথা
রাখিতে জীবন্ত ভবে দিব্য কণ্ঠ দানে,
মহান চরিত্র ভাবে মুগ্ধ করি প্রাণে,
প্রেরিয়াছ কবিকুলে,
মানবের সুমঙ্গলে
সূর্যে অস্তাচলে দিয়ে
যথা সুধাংশুরে পাঠাইয়ে,
রবি দীপ্ত চন্দ্র করে প্রকাশ ভুবনে।
মৃত সঞ্জীবনী সুধা এ মর্ত্যজীবনে
কবির অমৃত তানে,
পুরাণ মনিষীগণ
অমর-অনন্তকাল এ মহীমণ্ডলে
করেন বিহার, ধরাবাসী কুতুহলে
দেরি পদাঙ্কে ফিরি,
তঁাদেরি আদর্শ ধরি,
সজীব থাকিতে চায় ঝাঁপিয়া অনলে,
পাইবারে মােক্ষ সুধা সংসার গরলে!

১৬ ।
অভিষেক।
জগদীশ নিলা ডাকি কিঙ্করী তাহার
অনন্ত সুকীর্তি তার,
যুগান্তেও সু প্রচার
রাখিবারে প্রেরিবেন বাণীর কুমার,
ছুটিবে অনন্তকাল বীণার ঝঙ্কার !
চলি গেলা ভিক্টোরিয়া কমলা প্রতিমা,
মরতে রহিল তার করুণা মহিমা !
এতদিনে রঙ্গভূমে জন্মের মতন,
অপসৃত অতি পূত দৃশ্য পুরাতন !
রঞ্জিত নবীন রাগে শােভন সুন্দর
সমুদিত অভিনব দৃশ্য মনােহর।
নিত্য নব অনুরাগী অবণী এখন
নবীনে আনন্দে হৃদে করয় ধারণ !
বিচিত্র প্রেমের লীলা! বিধির বিধানে
বিঘাের বিষাদ তম সৃষ্টির কল্যানে,
করেন বিনাশ বিভূ আনন্দ কিরণে ।
সে আনন্দ জ্যোতি যবে জ্বলন্ত হসনে

বিলাপ।
• ২৫
ঝলসে জগতবাসী, মহিমা প্রকাশি
আবার আঁধারে তারে ফেলেন গরাসি !
কেবা শান্ত কে অনন্ত কে করে গণন,
আলােক আঁধার কিম্বা জীবন মরণ !
মঙ্গল কি অমঙ্গল সুখ দুঃখ ভবে,
কে বলিবে এ সংসারে কেবা চির রবে।
ইহাই অনাদি লীলা অখণ্ড নিয়ম
পুরাতনে দলি আসে নবীন বিক্রম।
অশ্রুমুখে পুরাতনে করিয়া বিদায়,
নিভৃত হৃদয় মাঝে চাপিয়া ব্যথায়,
বিধির বিধান বুঝি মুছিয়া নয়ন,
নবীনে বৃটিশরাজ্য করে সম্ভাষণ !
তাই এ উৎসবালােক আনন্দ নিস্বন
উদ্ভাসে অবনীতল বিদারে গগন।
ইন্দ্রপ্রদেবী।
কি বলিলে নাহি আর মহিষী আমার,
ভারতের দুঃখে বুক ফাটিত ঘাঁহার,
ভারতের শােকে যাঁর ঝরিত আসার,

অভিষেক।
!
ভারতের আর্তনাদ উচ্চ হাহাকার
ভেদি বন গিরি নদী লজি পারাবার
বাজিত বজ্রের মত শ্রবণে যাহার,
দীন দয়াময়ী সেই স্নেহময়ী মার
পবিত্র মূরতি হায়, হ’ল শূন্যাকার?
হা ভারত ! হা জননী বুঝি সে দুর্দিন
দিগন্ত আঁধারি পুনঃ হইবে উডডীন
পরপ্রতিপাল্যদীন যদিও অধীন
তথাপি নিশ্চিন্ত ছিলে শান্ত উদাসীন ;
ধর্মান্ধ স্লেজ্জের সেই বিচার বিহীন
রাজশক্তি স্বেচ্ছাচার উন্মত্ত স্বাধীন
নিরন্তর নিদারুণ পীড়িত না আর,
যন্ত্রণায় জ্বলি হিয়া হতনা অঙ্গার।
সেদিন হইল বুঝি এবে অবসান,
আবার বাজিবে তব বিষাদ বিষাণ।
ভারতের ভাগ্য চক্র করিতে চালন,
লৌহ দণ্ডধারী কাল মার্তণ্ড নন্দন
হয়ত উদিবে ভূপ অনুপ অসার,

বিলাপ।
২৭
নীচাশয় স্বার্থপর
জর
করজালে
জ্বলিবে জ্বলন্ত চিতা ভারতের ভালে,
পরিত্রাহি রবে প্রজা বিদারি গগন
আতঙ্কে ডাকিবে কোথা রক্ষ ভগবন।
কবি
বৃথা শঙ্কা কর মাতা, অশিব কল্পনা-
দূর কর হৃদি ভার অলীক জল্পনা !
মহারাণী জননীর
সূৰ্যপ্রভ পুত্ৰধীর,
মহাপ্রাজ্ঞ মহাবীর,
উদার গম্ভীর,
বৃটীশ উদয়াচলে হইলা উদয়,
ওই শুন কোটী কণ্ঠ গায় জয় জয় ।
প্রসস্ত ললাট শুভ্র প্রতিভা দর্পণ,
তেজোদ্দীপ্ত তবু সদা স্নিগ্ধ দ্বিলােচন,
সুবিশাল বজ্রসার,
পাষাণ প্রাকারাকার,
হৃদয়েতে অনিবার

অভিষেক। , বহে দয়াধার ; ওই শুন কুল কুলু স্নিগ্ধ তান তার, হৃদয়ের প্রিয়ধন ভারত আমার !” সামুদ্র সমীরে ভাসি—নীলােৰ্ম্মি কল্লোলে, তটিনী তরঙ্গে নাচি--মলয় হিল্লোলে, ভারত বিষাদ নাশি, ফুটায়ে আনন্দ হাসি, সে বার্তা পশিল আসি, উল্লাস প্রকাশি; গাও দেবী দিব্য কণ্ঠে এডােয়ার্ড জয়! গাহুক সে প্রতিধ্বনি বিন্ধ্য হিমালয় । শুনগাে শুনগাে অয়ি ভারত নন্দিনী । পঞ্চবিংশ বর্ষ পূৰ্ব্বে করুণার খনি, রাণীপুত্র যুবরাজ আইলা ভারত মাঝ, বিস্মৃত হলে কি আজ- করুণার সাজ নিরখি তােমার তার অশ্রু ঝরেছিল ;

বিলাপ।
= ---।
কবীন্দ্র হৃদয় বীণা বেজে উঠেছিল।
বিস্মৃত হলেকি বঙ্গ কবি হেমাদ,
অতুল্য সে “ভারতের বিলাপের” ছাঁদ,
করুণ গম্ভীর স্বরে,
যথা সে গােমুখী ঝরে
পৃথী ব্যোম পূর্ণ করে,
উদ্ভ্রান্ত অন্তরে
সে পুৰ্ব্ব গৌরব স্মৃতি-উচ্ছাসের ভরে,
ঢেলেছিলা যুবরাজ শ্রবণ বিবরে !
জলদ গম্ভীর মন্ত্র সে ৰিলাপ তান
নিশ্চয় অন্তরে তাঁর বিষাণ সমান,
সতত ধ্বনিত হয় ।
ত্যজ চিন্তা ত্যজ ভয়,
বাধহ আশয়,
আজি সেই যুবরাজ রাজ দণ্ডধর,
হইবেন ভারতের রাজরাজেশ্বর ।
ইন্দ্রপ্রস্থদেবী ;
রাজেন্দ্রানী নেত্রনিধি নবীন নরেশ,

অভিষেক। বুঝিলাম আমাদের নাহি ভয় লেশ। করি তঁারে আশীৰ্বাদ, পূর্ণ হ’ক মন সাধ- বৃক্ষ পৰ্ব্বতের আয়ু লভিয়া বিশেষ, প্রজারজি সুকল্যান লভুন অশেষ ! কিন্তু হায়, মাতৃরূপা করুনা রূপিনী ছিলা যিনি ভারতের বিপদে তারিনী, সেই ভিক্টোরিয়া স্মৃতি- কোমল চিত্ত বিবৃতি, রাখিতে মঙ্গলময় পূত নিদর্শন, করে কি ভারতবাসী কোন আয়ােজন ? কবি ;- ছিলা যিনি স্নেহময়ী মাতৃ স্বরূপিনী দীন হীন ভারতের আশ্রয় দায়িনী, তাঁর স্মৃতি অশ্রু স্রোতে পরিখা খনিয়া, হৃদয়ে রাখিবে দেবী দরিদ্র ভারত। কিন্তু যেই বৃটীশের প্রতাপ কিরণ

বিলাপ।
৩১
সপ্ত মহা পারাবার উৰ্ম্মি পরে খেলে,
ভীমকায় মহাষুধ দিগন্ত বিস্তৃত
উত্তাল তরঙ্গ মালা করিয়া নমিত
যাহাদের পদতলে লুটাইয়া পড়ে,
ব্যোমবিহারিনী প্রভা যাদের আদেশে
ভূতলে ভ্ৰমিছে সদা অধম কিঙ্করী,
দর্পে দিনকর কাঁপে--বসুধা বিস্তৃত
বিশাল সাম্রাজ্যে যার মুহূর্তেরা তরে,
সঙ্কোচি কিরণ মালা অস্তাচল বাসে
লভিতে বিরাম নাহি পারেন কখন ;
বিশ্ব বিজয়িনী সেই বৃটীশ ঈশ্বরী
বিষাদিনী ভারতের ভাগ্য বিধায়িনী
রাজচক্রবর্তী রাণী ভিক্টোরিয়া খ্যাতি,
রাখিবারে এ ভারতে লাট মহামতি
করিছেন আয়ােজন;
বিচিত্র গঠন
সুধা ধবলিত সৌধ মৰ্ম্মর স্বপন
রাজধানি দুর্গপাসে জাহ্নবী সৈকতে

অভিষেক।
অচিরে ঝকিবে দেবী মণি মরকতে।
নিকুঞ্জ সুন্দর
করিবে মৰ্ম্মর,
নিয়ত নিঝর
ঝরিবে ঝঝর,
বিহঙ্গ সুস্বরে শাখায় গাবে,
কল কল কল
তরঙ্গে চঞ্চল
জাহ্নবী উচ্ছল,
ধাই অবিরল
চরণ প্রক্ষালি বহিয়া যাবে ।
সহসা গগণে যেন ভাসিল নিবিড় ঘন,
ঢাকিল সহকর মলিন নগর বন ;-
চাহিলা যমুনা উর্ধে ইন্দ্রপ্রস্থরাণী আর,
শিহরিল কলেবর--একি মূৰ্তি করুণার -
লােল গণ্ডে রেখাকার বিশুষ্ক সহস্র ধার,
নিদারুণ করাঘাতে, বক্ষ নীল রক্তাকার।
রুক্ষ্ম কেশ দীনবেশ ঘাের পাণ্ডু গণ্ডদেশ,

খিলগ।
সহিয়া অসন্থ ক্লেশ নেত্রে নাহি অলেশ।
আহত মুমূর্ষ, যেন-স্থির মূর্তি হতাশার,
প্রলয়ান্তে রবি শশী-হীন যেন শূন্যাকার!
সপ্তশত বরষের গভীর বিষাদ ভার
নামিতেছে ধীরে ধীরে, অহহ দৃশ্য করুণার !
পদতলে শােকার পয়ােনিধি উথলিছে,
চতুর্দিকে দুঃখদৈন্ত ঝাবাত উচ্ছসিছে।
অশরীরী ত্রিতন্তীর বাজিছে শশাকের তার,
রাণী ভিক্টোরিয়া স্বনে বহিছে বিষাদ ধার !-
কাঁদ হিমালয় দেবেন্দ্র নিলয়,
কাঁদ ভাগিরথী
কাঁদ বিন্ধ্যগিরি
তপস্বী আয়,
নর্মদা কাবেরী কুমারীকা ;
অমৃত সরােবর
অমৃত আধার,
চারু বৃন্দাবন
পুণ্য বারানী
শঙ্কর আগার,
অযােধ্যা প্রয়াগ দুয়ারিকা ।
কাঁদ গৃহাশ্রমী, কাদ বনচারী,
সৰ্ব্ব পুণ্যালয়,
গ্রহরি বিহার,

অভিষেক।
কাঁদ ধনেশ্বর,
কুটীর বিহারী,
সৰ্ব্ব সমাশ্রয়
রাজরাজেশ্বরী
ভারত মহিষী মরতে নাই।
কঁাদ বিহঙ্গম
বিহরি পবনে,
কাঁদ কাদম্বিনী
গাইয়া গগনে,
কঁাদ সমীরণ
উচ্ছসি সঘনে-
রাণী ভিক্টোরিয়া জীবনে নাই।
পামিল শশাকের গান, বিযাদের তান
ছুটিল দিগন্ত চারি করিয়া ধ্বনিত ;
উতরি ধরণী তলে ভারত জননী
কহিলা বিবর্ণ পাণ্ডু তুলিয়া বদন ;--
কি বলিছ সবে ?—সেই বৃটীশ ঈশ্বরী
ভারতের মহারাণী ভিক্টোরিয়া ভাতি
রাখতে উজ্জ্বল চির ভারত ভিতরে,
হইবে নির্মিত এক প্রাসাদ প্রস্তরে ?
হাসিবার কথা! এক তরঙ্গ গঙ্গার

বিলাপ।
যাহারে গ্রাসিতে পারে, একটী প্লাবন
উন্ম লিয়া লয় যারে করিবারে পারে,
একটী ঝঞ্ঝার শ্বাস তুঙ্গ শৃঙ্গ যার
হেলায় লুটাবে ভূমে, এক ভূকম্পন
সমর্থ মুছিয়া ল’তে চিহ্নমাত্র যার
অবনীর পৃষ্ঠ হতে,—সেই সে ভঙ্গুর
নশ্বর মাটীর কীৰ্ত্তি রাখিবে জাগায়ে
অনশ্বর অপার্থিব কীৰ্ত্তি করুণার !
উদ্যানে বসন্তে পিক নাহি কুহরিলে
লুপ্ত হবে মহীয়সী ভিক্টোরিয়া স্মৃতি
এ ভারত হতে ? মৃদু মলয় হিল্লোলে
নাহি মৰ্ম্মরিলে কুঞ্জ, ভিক্টোরিযা খ্যাতি
খুন্ন হবে আৰ্যস্থানে ? দেখকি অদ্ভুত
রাজকীর্তি রামায়ণ অক্ষয় অতুল !
উন্নত অনন্ত ভেদী হিমাদ্রি প্রতিম
বিরাট সে কীর্তি স্তম্ভ অকাল অধীন !
কোথায় সে রাম রাজ্য ? চিহ্ন কোথা তার ?
কোথা সে অযােধ্যাপুরী ? কোথা প্রতিষ্ঠিত ?

৩৮ অভিষেক। কোথা ধৰ্ম্মরাজ ? কোথা ইন্দ্রপ্রস্থ তঁার ? দানব নির্মিত লক্ষ মণি ঝলসিত কোথা তার মহা সভা মহা যজ্ঞাগার ? নবরত্নে অলঙ্কত বিক্রম ভূপাল কোথায় ? কোথায় তার উজীন সুন্দর! কোথায় কোথায় সেই আকর ধীমান ? মর্তে বৈজয়ন্তী তার সেই দিল্লীপুরী ? কিন্তু আহা পিতৃস্নেহে প্রজাবৃন্দে পালি পূজ্য প্রজাপতি প্রজা বৎসল শ্রীরাম। ভূভারতে রাঘবের খ্যাতি ভগবান ! রামনামে পুলকিত সমস্ত ভারত, প্রতি রেণু, প্রতি পূর্ণ প্রতি নীরকণা উচ্চারে রামের নাম! রামায়ণ গান- দক্ষিণে গাহিছে সিন্ধু হিমাদ্রি উত্তরে, গগনে নীরদ করে সে নাম প্রচার-- অনুকরি বাল্মীকির বীণার ঝঙ্কার ! নিরখি সে পুণ্যজ্যোতিঃ অরুণের রাগে আজিও ভারতবাসী করিছে কীৰ্ত্তন

বিলাপ।
পুণ্যশ্লোক যুধিষ্ঠির নাম ! সীমাহীন
অম্বুধির অবিরাম প্রবাহ হিল্লোলে,
অবিশ্রান্ত উৰ্ম্মিরােলে উচ্ছাসে উল্লোলে,
কৃষ্ণসখ পাণ্ডবের অপূর্ব বারতা,
নাগ নর দেধামে হইছে উদগীত
মহা ভারতের মহা গানে! কীর্তি গাথা
বিক্রমের, কবীন্দ্রের বীণার নিক্কনে—
বেণু বীণা মৃদঙ্গের নিন্দি মধু ধ্বনি,
বিহঙ্গের নিঝরের জিনিয়া ঝঙ্কার,
ধরা স্বৰ্ম মুগ্ধ করি আজিও ঝঙ্কত !
সে নন্দন অবনীর সুচির নন্দন,
কীৰ্ত্তি কল্পতরু দলে, মন্দার-মােহন।
সম্ভব খাবে শূন্যে সুধার আকর
মুখাবেনা এ কীর্তিকুঞ্জ মারের থর !
দর আঘাতে দিল্লী জর্জরিত কায়--
ভাঙ্গিয়া পড়িবে তাও কাল দণ্ডাঘাতে,
ভূবন সুন্দরী তাজ যমুনা জঠরে
বিসজ্জিবে কালে কভু সৌন্দৰ্য্য আপন,

অভিষেক।
লুটাইবে রেণু সাথে কীৰ্ত্তি মােগলের,
কিন্তু সমদর্শী সেই সম্রাটের নাম
জগদ্গুরু আকবর হইবে ধ্বনিত
অনন্ত কালের কণ্ঠে জগদীশ্বৰােবা
দিল্লী-ইশ্বরাে বা”—গাবে ভক্তি উচ্ছসিত
সিন্ধু গিরি মেখলিত বিশাল ভারত !
উঠে যদি উঠিবে সে হৰ্ম মনােহর
কীর্তি ছলে সাম্রাজ্ঞীর,রহি কিছুকাল
দাঁড়াইয়া—কালে কভু হইবে বিলীন ;
কিন্তু মজ্জাভেদি যার ছুটিয়াছে মূল,
রাণীর সে কীৰ্ত্তি তরু সুখাবেনা কভু।
গভীর হৃদয়ে যার ভিত্তি প্রধাবিত,
সেই ভিক্টোরিয়া যশোেমন্দিরের চুড়া
কঁপিবে না, একটীও ইষ্টক তাহার
হবেনা দেউল চ্যুত, রবে তা অক্ষত
অনন্ত অনন্ত কাল ! দুর্ভিক্ষের গ্রাসে
জীয়ে যদি হিন্দুস্থান, অশােক বিক্রম
আকবর কীর্তি সাথে ভিক্টোরিয়া খ্যাতি

বিলাপ।
আচন্দ্র আসূৰ্য্য রবে বিখ্যাত ভারতে !
মহীয়সী মহারাণী-কীৰ্ত্তি নিকেতন,
অপার্থিব মহিমার চির নিদর্শন,
বিধাতা নিৰ্মিত দিব্য সুবর্ণ মণ্ডিত
অমল প্রােজ্জ্বল পঞ্চ মণি ঝলসিত,
হেরিবারে সাধ যদি, তুলিয়া নয়ন
ভারত গগনে ওই কর দরশন ;-
শ্রীরামমােহন রায় ধাৰ্ম্মিক ধীমান,
বিদ্যার সাগর ভবে মমতা-মহান,
বাণীপুত্র মধুবানি শ্রীমধুসূদন,
দীপক আলাপী হেমচন্দ্র বিমােহন,
প্রতিভার অবতার অতুল বঙ্কিম—
মাতৃভক্ত মহাপ্রাজ্ঞ গুণ অসীম,
রাণীর রাজশ্রী কাল কীর্তির শিখর,-
এই পঞ্চ রত্নরাগে দেখ কি সুন্দর !
এই পঞ্চ শুক্রতারা ভারত আকাশে,
উষা সমাগম বার্তা সহাস্যে প্রকাশে !

০৭
অভিষেক।
কবি ;
বিধির বিধানে এই বৃটশ শাসন,
ভারতে সত্যই দেবী মঙ্গল কারণ।
গীতার উদার পথ হারায়ে ভারত,
অহঙ্কার অরথে
অজ্ঞতা পঙ্কীল পথে
আত্মনাশ অন্ধকারে ধাইছে নিয়ত,
ইংরাজ সবিতালােকে
উজ্জ্বল বঙ্কিম চাঁদ
উদিলেন নৈশাকাশে অপূর্ব সুন্দর,
সে পূর্ব পবিত্র পথ করিয়া গােচর !
পিতৃবিত্তে মূঢ়োন্মত্ত পরিখা পতিত
সুরাম, পথিকের পদ বিদলিত,
আত্মদ্রোহী দৈত্যাধম
জঘন্য জগতী তলে,
ভিক্ষুক কুকুর-বৃত্ত অধম ঘৃণিত,
নির্বোধ ভারত বাসী পাপিষ্ঠ পতিত,

বিলাপ।
.
বুঝিয়াছ পূর্ণব্রহ্মে নিজেরা যেমন
কপট কুচক্রী ধূর্ত অনর্থ কারণ ;
আপনার মন মত
আদর্শ গড়িয়া নেছ,
দস্যু যথা খুলি লয়ে কৃপান করাল
সাজায় ডাকাতে কালী দিয়ে লাঠি ঢাল ?
হে ভারত একবার মেল দিলােচন,
শিয়রে দাড়ায়ে দেথ দেবের নন্দন।
শ্রীকৃষ্ণচরিত সুধা
পান পাত্র হাতে লয়ে,
একবার বিন্দুমাত্র ব্যাদানি বদন
সুধা পিয়াে-মােহ ভাঙ্গি হও সচেতন !
আদর্শ মানব রূপে
দেখাইলা জগদীশে,
ভৎসনা করিছ তাই সে মহা পুরুষে ?
হা অদৃষ্ট, তােমরা যে আদর্শ মানুষে
মানব-অধম হ'তে বানরের সাজে
উপস্থিত করিয়াছ মানব সমাজে।

১২ অভিষেক। বিশাল এ ভবতলে ভাগবত জন হয়নি বিকৃত কভু কৃষ্ণের মতন। বানরের হাতে পড়ি শিবের মুরতি হায়রে, পেয়েছে কিবা দারুণ দুর্গতি ! ভুঞ্জিতেছ প্রতিফল অনুরূপ তার, হইয়াছে পদাঘাত হায়রে আহার ! ছিল যারা দেব কল্প ধরা অলঙ্কার, আজি তারা কাপুরুষ নর কুলাঙ্গার ! “প্রচণ্ড উৎসাহে সবে মাত কৰ্ম্মরণে - নিরন্তর বিঘােষিত পাঞ্চজন্য স্বনে ; কুরুক্ষেত্র স্তব্ধভাব, নিৰ্ব্বাক দেবতা সব, বােমাঞ্চিত ধনঞ্জয়-প্রদীপ্ত গগনে, হেরিছেন বিশ্বরূপ মানস নয়নে ! পতিত ভারত। অহহ বধির শ্রবণ- শুনিতে পাওনা আর সে সঙ্খ নিন, বিলাপ। করি তাই ভেরী ধ্বনি সাহিত্যের শূরমণি, ধৰ্ম্মতত্ত্বে দেবাদিষ্ট, বিচারে জগৎ জীত, করেন রােষণা “কৃষ্ণচরিত” মহান দুষ্কৃত দমন সাধু তারণ আখ্যান ! নয়নে অঙ্গুলি দিয়ে করান দর্শন কপট লম্পট নন দৈবকী নন্দন! পাণ্ডিত্যের অভিমান উপাধির অহঙ্কার করি সবে পরিহার করহ ধেয়ান- নিষ্কলঙ্ক নারায়ন কৃষ্ণ ভগবান ! ছিলেহে ভারত বাসী সর্বোচ্চ যেমন, হইয়াছ হায় আজি অধম তেমন ! যেমন ছিলেন কৃষ্ণ কল্পনা অতীত, সকল আদর্শ হতে উচ্চে অবস্থিত, তারি মত অবনতি করিয়াছ তার অতি ;

অভিষেক।
হায়, হিন্দু মূঢ়মতি হীন দুরাচার
আজি তুমি উপস্থিত বিচার আগার !
বাঁচিবারে সাধ যদি করহ সন্ধান
নিষ্কলঙ্ক নারায়ন কৃষ্ণ ভগবান!
দ্রৌপদীর ভয়হারী বন্ধু বিভৎসুর,
গীতার গাহক দেবে ভজরে আতুর !
ভাব সেই বিশ্বরূপ জীবন শঙ্কটে
পাইবিরে শান্তি ধারা ভব নদী তটে ।

উল্লাস।
তপন নন্দিনী তরঙ্গ কম্পনে,
লহরী দলিয়া ত্বরিত গমনে,
আয়গা আয়গােগা, মেলিয়া নয়নে
হের কি উৎসব সৈকত ময় ।
ব্যাপিয়া বিপুল বপু প্রান্তরের,
শােভিছে সুন্দর শ্রেণী শিবিরের,
ফেনিলতরঙ্গ যেন সাগরের
গগনের কোলে গড়ায়ে রয়।
শিবিরের চুড়ে চুড়ে শত শত,
উড়িছে নিশান পত পত পত,
প্রসারিয়া পাখা বিহগ বিনত
উৰ্ম্মি শিরে শিরে উড়িয়া ফিরে,

৪৬
অভিষেক।
জন কোলাহলে পূরিছে বিমান,
বিজয় ঝঙ্কারে ঘন বাদ্য ধ্বন,
যেন সে সাগর তরঙ্গের গান
মহাব্যোমপথ ফেলিছে ঘিরে।
ঘন তােপধ্বনি ধ্রুম ম্ ধ্রুম্
বিদারিয়া ব্যোম দিগন্তে ছুটে,
বিন্ধ্য হিমালয় গহ্বরে গহ্বরে
নাদে প্রতি ধ্বনি,—শিখরে শিখরে
ভৈরব আরাব রবিত, হুঙ্কারে
কেশরী শাৰ্দল লাফায়ে উঠে ।
দ্রুত তরঙ্গিনী ধাইয়া যথা
অম্বুরাশি দেহে প্রবাহ ঢালে,
বেগে বাষ্পরথ ছুটিয়া তথা
নরদলে নর উগারি ফেলে ।
নাবিলা নিজাম কাবুল গান্ধার,
অযুত পদাতি সহস্র সােয়ার
চলিছে দুধারে কাতারে কাতার,
শিবির সাগরে মিলায়ে গেল !

উল্লাস।
৪৭
দপী মহীশুর সেন্ধিয়া ইন্দোর,
জয়পুরপতি ভূপাল বিঠোর,
মহারাষ্ট্র শিখ কাশ্মীর রাঠোর,
বিপুল বাহিনী বহায়ে দেল !
রাজা মহারাজ হাজার হাজার,
আমীর ওমরাহ সংখ্যা করা ভার,
জনসিন্ধু মহা অসীম অপার
নগর প্রান্তরে উছলি চলে ;
চারু পরিচ্ছদ বিবিধ বরণ,
মুকুতামণ্ডিভ নয়ন রঞ্জন,
ঝক ঝক ঝকে দিব্য প্রহরণ,
ক্ষণপ্রভা তায় কেবলি ঝলে !.
অম্বুরাশি গর্ভে কনক রুচির,
যথা বরুণের অপূৰ্ব্ব মন্দির
শােভে রত্নময়, চৌদিকে গম্ভীর ।
মহাষুধ বাহ প্রহত হয়,
তথা সে উৎসব সাগর মাঝারে,
শিল্প প্রদর্শনী বিচিত্র আকারে

s
অভিষেক।
ইদ্রধনু ছটা চৌদিকে বিহারে,
মহাজন স্রোত বেষ্টিয়া বয় ।
অর্ণব-তরণী সুবিপুল কায়--
মহােৎসবাগার শােভিতেছে তায়,
বিশাল বাদাম কেতন উড়ায়,
দাড়ায় সাগরে অচল বলে ।
সুবৰ্ণ মণ্ডিত কক্ষ মনােহর,
স্বর্ণ সিংহাসনে শশাভিত সুন্দর,
পুঞ্জ পুঞ্জ পুষ্প শােভে থরে থর,
স্তম্ভ সারি সারি লতিকা দলে,
চারু চন্দ্রাতপ ব্যাপে নীলাম্বর,
চৌদিকে ঝলকে হীরার ঝালর
কণকে জড়িত-নক্ষত্র নিকর
ছায়াপথে কিবা ফুটিয়া রয় ।
বৃটিশ পদাতি চৌধারে বিহরে,
ভানু প্রভান্বিত প্রহরণ ধরে,
দুরু দুরু ধরা কাঁপে পদ ভরে,
ভীরুর হৃদয়ে সঞ্চরে ভয় ।

উল্লাস।
s
জলিছে জহরে সুবর্ণের তাজ,
বসেছে চৌদিকে ভূপতি সমাজ,
মধ্যস্থলে কিবা করেন বিরাজ
রাজেন্দ্র অনুজ ডিউক বীর !
মহামতি লাট কর্জন ধীমান
সুগম্ভীর স্বরে করি কম্পমান
নরেন্দ্র সমিতি—“এডােয়ার্ড” নাম
করিলা ঘােষণা,-নােয়ায়ে শির
রাজরাজেশ্বরে দানিলা সম্মান,
গম্ভীরে অদূরে গর্জিল কামান,
ঘন বাদ্যে বায় বিজয় তুফান,
কোটী কণ্ঠ গায় অয় এভােয়ার্ড।
ভূলােক দ্যুলােক উঠিল কাপিয়া,
তরিতে ত্রিদিব দুয়ার খুলিয়া
দেখিলা দেবতা-উৎসাহে মাতিয়া,
বিপুল ভারতে উৎসব বিরাট !
ইন্দ্র প্রস্থ দেবী স্মর একবার
সহস্র যুগের বিরাট ব্যাপার,

৫০
অভিষেক।
পাণ্ডবের সেই মহাযজ্ঞাগার
যমুনা সৈকতে ভাতিল যবে,
মানী দুর্যোধন বলী পাবনী,
ত্রিলোেক বিজয়ী বীরেন্দ্র ফাণী,
কর্ণ মহাশূর জলন্ত আগুনি,
শ্রীকৃষ্ণ সহায় পাঞ্চজন্য রবে ;
সাধিলেন যজ্ঞ স্বয়ং ধৰ্ম্মরাজ,
উরিলা মরতে অমর সমাজ,
গন্ধৰ্ব্ব কিন্নর করিলা বিরাজ,
তেজঃ বীৰ্য্যধর অসুর সূর!
বিপুল পুলকে হৃদয় ভরিল,
আসমুদ্র গিরি ভারত কাঁপিল,
জয় ধৰ্ম্মরাজ ক্ষত্রিয় গর্জিল,
জয় নারায়ণ গাহিল সুর।
দেখেছিলা দেবী সেই একদিন,
মহারুদ্ৰোপম ভীষ্ম উদাসীন,
মহারাজয়ে হইয়া আসীন,
কেশব চরণে দানিলা অর্ঘ্য ;

উল্লাস।
ত্রয়স্ত্রিংশকোটী দেবতা সহিত
দেবেন্দ্র বাসব মন্দার সণ্ডিত,
দেবর্ষি ব্রহ্মর্ষি পবিত্র চরিত,
ধৰ্ম্মপদ পূজি লভিলা ত্রিবর্গ
দুৰ্বার দ্বিষত দপী শিশুপাল,
গর্জিয়া উঠিল কালান্তের কাল,
ঘাের দরশন সহস্র ভূপাল
বহ্নি চক্র সম নয়নে চায়।
হায়, সেই সৌৰ্য কোথা ক্ষত্রিযের !
যাহে করিযূথ বিক্রমে সিংহের
মুহূর্তে বিনষ্ট, ধারা রুধিরের
যজ্ঞ বেদীতল প্লাবিয়া ধায়।
ইন্দ্রপ্রস্থ দেবী ! দেখ আরবার
সেই সে দিনের বিরাট ব্যাপার,
নব কলেবরে উদিল আবার,
নব ইন্দ্র প্রস্থ ধামে ;
পূরাও শ্রবণ নব জয় তানে,
ওই শুন দেবী সুগম্ভীর গানে,

৫
অভিষেক।
কোটী কণ্ঠ উঠে অনন্ত বিমানে
জয় এডােয়ার্ড নামে।
প্রজাগণ ;-
রাে-
কিন্তু
জয় জয় জয় রাজরাজেশ্বর।
ভারত ঈশ্বর মহিমা সাগর ।
অখিল আশ্রয় নিখিল পালন।
বিপক্ষ বারণ জগত শাসন।
ভারত নিবাসী ভক্ত প্রজা
এসেছি উৎসবে নাচিতে,
অনশন ক্ষীণ দুৰ্বল দীন
স্খলিত চরণ ছুটিতে ।
পারিনাক প্রভু উদাত্ত স্বরে
গম্ভীর বিজয় রাগেতে,
রাজরাজেশ্বর উৎসব তানে
হৃদয়ের সাধ মিটাতে ।
ছিন্ন ভিন্ন হয় হৃদয় তন্ত্রী
ধমনী রুধির উগারে ;

উল্লাস।
ঘূর্ণিত মস্তিষ্কে মুদিত নেত্রে
ভাসিহে তমােন্ধ পাথারে!
আমরা অধম দুৰ্ব্বল দীন
চাহিনা উচ্চ পদ
বিচার আসনে গর্বিত শিরে
ঢালিতে দম্ভ মদ,
শুধু—নিরন্ন জঠরে অন্ন দাও হে,
শােণিত শােষণ চিন্তা নাশহে,
হৃদয়ে স্ফুর্তি দাও,
তােমার আনন্দ বাদ্য নিনাদে
গাহিতে শক্তি দাও!
আর কিছু নাহি চাই,
শুভ অভিষেক উৎসব দিনে
এসেছি অর্থী স্ফীত আশায়,
বাঞ্ছা কল্পতরু পূরাও বাঞ্ছা,
ভক্তি উচ্ছসিত উচ্চ ভাষায়
আশীষ করিয়া যাই,
আর কিছু নাহি চাই ।

অভিষেক।
হিন্দু প্রজা
}
হে বিধাতা ভারতের বরাভয় দাতা!
রাজরাজেশ্বর প্রভু দুঃখ দৈন্য ত্রাতা।
শােভাময় শান্তিময় আনন্দ নিলীন,
অবসাদ ভ্রান্তি ভেদ স্বেদ শান্তি হীন,
উল্লাসের উৰ্ম্মিধৌত, স্ফৰ্ত্তি বিকম্পিত,
হর্ষ তারে মুখরিত, ঐশ্বর্যে শিঞ্জিত,
প্রােজ্জ্বল হীরকাবাস হ’তে একবার,
কর প্রভু দৃষ্টিপাত জলধির পার।
সহস্র রজতধার—নিঝর ঝরিত
মঞ্জু কুঞ্জ সুশােভিত চঞ্চলালােকিত,
অনিন্দ্য নন্দন হ’তে আননের রাণী
মনি মুক্তা বিমণ্ডিত চির রােননী,
দেখ দেবী দয়াবতী দরিদ্রের ধরা!
অশ্রুশ্রোতে উচ্ছসিত কি আঁধারে ভরা।
অঞ্জলি বাঁধিয়া শিরে করি স্তুতি নতি,
গলল বাসে দোহে করিগাে মিনতি,

উল্লাস।
আমাদের আঁখি লয়ে আমাদের প্রাণে,
দেখ চাহি ভাগ্যহীন ভারতের পানে ;-
ওকি দৃশ্য ভয়ঙ্কর! চিত্র করুণার !
একি মা শ্মশান! একি প্রেতের আগার!
আলােক কি চিনল ! সূৰ্য্য, সুধাধার
জ্বলন্ত অঙ্গার ! হাস্যউচ্চ হাহাকার !
মেঘ-চিতাধূম! মন্দ্র—চিতার হুঙ্কার !
নিকুঞ্জ—ভন্মের স্তুপ! অস্থি কিসলয় ।
সঙ্গীত শিবার কণ্ঠে অবিরাম হয়।
বিগলিত শবরাশি সুবাস বিলায় ।
তটিনীর—অশ্রুনীর ভারত ভাসায় !
মুসলমান প্রজা
দেখিছ কি ওহে প্রভু ভারত ঈশ্বর!
ক্ষুধার্ত সন্তান এক
ক্ষীণ দুটী বাহু তুলি,
জননীরে কূপসম দেখায়ে জঠর
পড়িল ঢলিয়া ভূমে, করি হাহান

অভিষেক।
মৃত শিশু কোলে টানি,
বিশুষ্ক বদন খানি
নিরখি উন্মত্তা মাতা ত্যজিল জীবন।
হােথা পুনঃ আঁখি মেলি রাজেন্দ্র ঘরণী,
স্নেহ মমতার হত্যা-
. হের কি লােমহর্ষণ ;
পিশাচী প্রকৃতি কিবা শশাণিত বরণী
দুঃখ-তপ্ত সংসারের শীত সুধা সম
সুখাইল নিঝরিনী
বুভুক্ষায় উন্মাদিনী
জননী জলন্ত জিহি,
ঘন ঘন লেহি লেহি,
নাগিনী বাঘিনী জিনি নিঠুর নির্মম,
অরিক্ত জ্বলন্ত নেত্র করিয়া ঘূর্ণন
সুরসা সাপিনী সম মেলিয়া বদন
প্রােথিল করাল দংষ্ট্রা সন্তানের বুকে।
চীৎকারিল বৎসলতা
দগ্ধ হ’ল কোমলতা,

উল্লাস।
নাগিনীর বিষ ছুটে
শিশুটী আকুলি উঠে,
চায় আহা মার পানে
ধারা বহে দুনয়ানে,
বাধা দানে মার প্রাণে
জাগাইয়া লুপ্ত জ্ঞানে,
ডুবে ক্ষীন আর্তনাদে দুর্ভিক্ষের মুখে !
ছিন্ন ভিন্ন অর্ধভুক্ত হৃদয়ের ধন
বভুক্ষা প্রেতিনী হেরি
বিকট চীৎকার করি’
বিসর্জি কঠোর অশ্রু ত্যজিল জীবন।
দুর্ভিক্ষ পিশাচী আজি কাল বসে হায়,
নর নারী বক্ষ’পরি
জলৌকা সমান বসি
শুষে লয় ভক্তি শ্রদ্ধা স্নেহ মমতায়।
নথরে কবর খুড়ি তাহ’তে উদ্ধারি,
ক্ষুধানলে ঘৃণাহুতি দিয়া নর নারী
গলিত দুর্গন্ধময় কীটের আবাস,

অভিষেক।
বিভৎস ভীষণ শব করিছে গরাস!
নেহারি মুমূষু এক টানে নাভি শ্বাস,
হের তারে দশ জন
চৌদিকে বেষ্টিয়া বসে,
ক্ষুধায় বিকট দন্ত করিছে বিকাশ,
অমানুষ ভাব মুখে পৈশাচ উল্লাস।
হিন্দু প্রজা
৬০
দীর্ঘকায় কঙ্কালেরা ফিরে হেথা হােথা
মনে হয় ত্রেতা যুগে রণাহত ষত
রাক্ষসের দল সব এসেছে উঠিয়া
প্রতিহিংসানলে অস্থি জ্বলিছে তাদের
বাসনা সে রাঘবের পবিত্র ভারত
বিভৎস উৎসব ময় করিবে শ্মশান!
কোথাও প্রেতিনী সমা সীমন্তিনী কুল,
অনশনে মসী অঙ্গ বিবসনা বেশ
চলে যায় সারি সারি ; আৰ্ত্তকলরবে
পূর্ণ করি ধরাতল শ্মশান উৎসবে !

উল্লাস।
=
দুগ্ধপােষ্য শিশুকুল তপ্ত বালুকায়
উলটি পালটি হায় হয় মৃয়মান!
লতিকা বিচ্যুত যেন কোমল কোরক
নিদাঘের উষ্ণশ্বাসে নীরবে শুকায় !
জীবিত কঙ্কাল কোটী—কি দৃশ্য বিকট!-
চলিতেছে ধীরে ধীরে ভারত আবরি,
কোটর প্রবিষ্ট আঁখি চারিদিকে চায়,
পাড় ভাঙ্গা পরিত্যক্ত কূপ গৰ্ত্ত মাঝে
শুষ্ক প্রায় জল যেন করে চিকি মিকি!
গণ্ড চৰ্ম্মে দশনের প্রতিকৃতি আঁকা,
ললাটের প্রান্তদ্বয় গিয়াছে বসিয়া-
গৃহের গলিত চাল ভগ্ন বংশপরে
যেন হায়, স্থানে স্থানে গিয়াছে নামিয়া !
গােনা যায় পঞ্জরের হাড় সারি সারি
খড়া ওড়া বাকারির যেন ঠাটখান
বক্ষস্থল বসে গেছে শুষ্ক জলা যেন,
কর পদ সরু সরু গ্রন্থি মাঝে মাঝে,
ছিন্ন দড় যােড়া যেন শুষ্ক মােটা গাঠে,

অভিষেক।
কোথা কেহ পড়ে আছে রুগ্ন গলা দেহে
শােভাঞ্জন তরু যেন পচিয়া শুকায়।
ইন্দ্রপ্রস্থ দেবী ;
।
কি লােমহর্ষণ দৃশ্য ! দুর্ভিক্ষ রাক্ষসী
করাল কপাল মুখ করিয়া ব্যদান
কোটী ক্ষুধার্তের রােলে বিদারি অম্বর
দিল করতালি, যেন লক্ষৈক কঙ্কাল
পরস্পর প্রতিঘাতে উঠিল বাজিয়া,
সহস্র প্রেতের যেন পঞ্জরে পঞ্জরে
কি এক ভৌতিক মন্ত্রে বাজিল ঝঞ্চনা।
সে দানবী দন্তে দন্তে করিল ঘর্ষণ
যেন প্রাণী জগতের সব অন্থি গুলি
এক সঙ্গে আঁতযন্ত্রে নিষ্পিষ্ট হইল
সে রাক্ষসী পিষাচিনী নাগিনী সমান
মুহুর্মুহু শুফ জিহি করে সঞ্চালন,
দগ্ধ শেষ হৰ্ম্ম হ’তে ধিকি ধিকি শিখা
উঠি যেন অন্বেষিছে আরেক সংসার!

উল্লাস।
নাড়ীর তাতে শত প্রন্থি দিয়ে গাঁথা !
শত ছিদ্রময় ছিন্ন শুষ্ক নর চৰ্ম্মে
বাধা কটী, অর্ধ নগ্না রুধির অধরা
ধায় রক্ষী, আর্তনাদে কাঁদে বসুন্ধরা
যে দিকে কঠোর নেত্রে করে দৃষ্টিপাত
সরস নিকুঞ্জে হয় শুষ্ক পর্ণ পাত,
বল্কল বিহীন দ্রুম শ্বেত কাণ্ড পরে
শত শুষ্ক শাখা তুলি সারি সারি সারি
বজ্ৰ দগ্ধ দৈত্যব্যুহ সম শশাভা পায় !
প্রচণ্ড নিশ্বাসে তার আষাঢ় অম্বরে
নিবীড় নীরদ শূন্যে জ্বলে উড়ে যায় !
শুকায় সরসী কুল, নিঝরের দ্বার
রুদ্ধ হয়, শুষ্ক মাটী তটিনী হৃদয়ে
উঠে ফাটি, উপবনে জ্বলে তরু লতা,
সুশ্যাম প্রান্তর হয় তাম্রের মতন।

৬২
অভিষেক।
যমুনা;
পাছে ধায় মহামারী সুতীক্ষ্ণ দশনা,
জটায় জ্বলিছে চিতা, আভায় তাহার
হয়েছে আরক্ত বর্ণ ভারত অম্বর!
নিঃশ্বাসে নিকলে ধূম-কাল মেঘ সম
তমসায় সমাচ্ছন্ন করি বসুন্ধরা !
গভীর হুঙ্কারে কাঁপে স্থাবর জঙ্গম।
বাম হস্তে কাষ্ঠভার পৰ্বত প্রমান,
দক্ষ করে তৃণ গুচ্ছ জলে দ দপ,
সহস্র নগর শীর্ষে লক্ষ লক্ষ গ্রামে
লক্ষে লম্ফে ফিরে শিখা প্রভঞ্জনে মাতি ।
ধূধূ ধূধূ স্পর্শি শূন্য উঠে বৈশ্বানর,
অনন্ত অনন্ত ফণা উর্দ্ধে তুলি যেন
লক লকি লােল জিহি দুলিয়া দুলিয়া
সুঘাের উচ্ছাসে খুসি তুফান সমান
মারিছে ছােবল রােষে সুখের সংসারে,
জ্বালাময় হলাহলে নিমেষে অমনি

উল্লাস। ভস্ম হয় সুবাস আনন্দউদ্যান! লােহিত নয়ন প্লেগ বিকারে বিহ্বল ! কাল সর্প বিষে দগ্ধ মঙুকের মত পাণ্ডুর দেহেতে বয় গন্ধকের গন্ধ ! ধায় দৈত্য পদভরে কাঁপায়ে ভারত। সাথে সাথে শিরােপরে লক্ষ গৃধ কঙ্ক কর্কশ চীৎকারে ধায় আবরি অম্বর, নিম্নে বসুন্ধরা ছেয়ে শৃগাল কুকুর ডাকি ডাকি চলেছে ছুটিয়া ! উল্কা সম উড়ে চলে বিকট পিশাচ, : সরােবর নদ নদী হ্রদ পারাবার ফুটিয়া শ্বসিয়া উঠে উথলি উছলি। হাহাকার ইহঙ্কারে কাঁদে দিগঙ্গনা, অনল হলকা তুলি বহে প্রভঞ্জন, বজ গর্জে অগ্নি বৃষ্টি করে কাদম্বিনী। দাবানলে দহে বন,লক্ষ নিঝরের বারিবেগ বিহরিত নিত্য কল্লোলিত- হিমগিরি গড়ে উঠে অনলের খাস !

অভিষেক।
দগ্ধ অঙ্গ ছট ফটি পশু পক্ষীনর
মুহূর্তে লুটায়ে পড়ে অবনী আবরি !
যত দূর চলে যায় রাক্ষস রাক্ষসী,
শবগন্ধে চিতা ধূমে গলিত সংসার
রোববেৰ বিভীষণ বিভৎস ছায়ায়
দেখায় সে প্রণয়ের ভূতনাথ ছবি !
মহাকাল মহাঘাের উন্মত্ত সংহারে,
কপাল মলিনী কালী দলি শবস্থল
ধেই ধেই থেই থেই নেচে নেচে যায় !
প্রজাগণ
;
আর না—আর না-প্রভু, ফেল শীঘ্র ফেল
প্রেতের এ রঙ্গালয়ে চির যবনিকা।
বল বল ভারতেশ ! এ শ্মশানে বসি
কোন প্রাণে বাজাইছ উৎসবের বাসি ।
ইংরাজ রাজ্যের এই কলঙ্ক কালিমা
ধুয়ে ফেল দয়া ধারে প্রকাশ মহিমা।

উল্লাস।
শুধুই হুঙ্কারে প্রভু রাখিবে গরিমা।
হায়রে ইয়ুনানি নীতি বৃটীশ মহিষা।
কবি ;
লক্ষ্মীর অক্ষয় ধনে পূর্ণিত সংসারে
প্রবীনা গৃহিনী ওগগা ভারত জননী,
এই কি ললাটে তাের লিখেছিলা বিধি;
অপরের হাত তােলা শাকান্নের প্রতি
চাহিয়া করুণ নেত্রে ধরিবি জীবন ?
লাঞ্ছনা তাড়না শত তিরষ্কার সহি,
সুক্ষণ বিশুষ্ক দেহে বিবর্ণ বদনে,
কাঙ্গালিনী, দীন নেত্রে ধনীর দুয়ারে,
মুষ্টি ভিক্ষা তরে ওগাে রবি দাঁড়াইয়া ?
কি পাপে বিধাতা তােরে দিলা হেন তাপ ?
জগৎ জননী ছিলে ভূবন পালিকা,
আজি অনাথিনী তুমি ভিখারি বালিকা !
যাহার, সৌন্দর্য্য জ্যোতিঃ মাণিক জুকায়
উজলিত ত্রিভূবন, যাঁহার করুণা

৬৬
অভিষেক।
মরুর উত্তপ্ত বক্ষে প্রবাহিনী বেগে ।
রম্য শ্যাম শস্য রূপে হইত বিকাশ,
বিমল হাসনি যার সহস্র সরসী-~-
কাননে করে কিবা প্রান্তরে নগরে
কুমুদ কহলার দলে হাসিত হিল্লোলে,
স্নেহের কণিকা মাত্র পাইয়া যাহার
সমস্ত জগতবাসী হৃষ্টপুষ্ট হয়ে
সাতিত আনন্দোৎসবে অসীম উৎসাহে,
তঁারি কঙ্কাল ওকি অস্থির মালায়
বিথারে বিকট ভাতি ? তরি অকরুণ।
সীমাহীন মহামরু ওকি ধূ ধূ করে ?
অশ্রুহীন আঁখি ঝলে মরীচিকা শিখা ?
নার হীন হ্রদ বক্ষে শুষ্ক উপবনে
দীর্ঘশ্বাস হুই করে তপ্ত বাত রূপে ?
মাতৃ স্নেহ বিবর্জিত হেরি মার মুখ
চতুর্দিকে কোটী কোটী পুত্র কন্যা তাই
আতঙ্কে শিহরি ওঠে ? বষ্টিয়া তাহারে
সংখ্যাতিত অস্থির সন্তান সন্ততি

উল্লাস।
অন্নদে অন্নদে রবে করিছে চীৎকার!
শতাব্দি ব্যাপিয়া হেথা শুধু হাহাকার
নাই নাই নাই তার কোন প্রতিকার !
শত মহামারী বলে ঘাের বলীয়ান
দুর্ভিক্ষের আস্ফালনে, জিনিয়া বিষাণ
প্রচণ্ড হুঙ্কারে তার-উঠিছে কাঁপিয়া
আসমুদ্র হিমাচল অখণ্ড ভারত ।
ভীষণ সংগ্রামে তারে করিয়া সংহার
উঠেনা রাখিতে কেহ কীৰ্ত্তি করুণার !
প্রমত্ত বারণ সেই দলিয়া সংসার
ধাইছে দুৰ্বার বেগে—বধিতে তাহায়
জাগেনা দুর্জয় সিংহ ঘূর্ণিত নয়নে !
দুরদৃষ্ট ভারতের ! সন্তাপ অপার !
রুদ্ধ এবে দেব ধামে দয়ার দুয়ার !
যে দিকে ফিরাই আঁখি নেহারি কেবল
অগ্নিগিরি অগ্ন্যুচ্ছাসে বুভুক্ষা অনল
প্রলয় অনল সম অলিছে কেবল।
হুহু হুহু ধূধূ ধূধূ শব্দ অহর্নিশ

অভিষেক।
যেন স্বনে চতুর্দিকে লক্ষ আশিবিষ!
অথবা সে দশাস্থের চিতার নিস্বন
উঠে যেন অবিরাম বধিরি শ্রবন !
চতুর্দিক হ’তে অহহা কালীর মুরতি
পতঙ্গ পালের যত অস্থি চৰ্ম্ম সার
পড়িছে সে মহানলে, কি দৃশ্য ভীষণ !
নূতন জনমেজয় এলাে কি আবার ?
ভারত কি হােমকুও হয়েছে তাহার ?
বিশ্বগ্রাসী দুর্ভিক্ষের সৰ্ব্বভুক শিখা
ওই কি সে হুহু শব্দে উড়িছে গগনে ?
রক্ত আভা রঞ্জিয়াছে ভুলােক দ্যুলেক ?
ওকি দৃশ্য !--কাল মেঘ গ্রাসিল গগন ?
ওকি শব্দ!মলি কি প্রলয় জলদ।
একি কম্প!-স্বসিল কি সংহারের ঝড় !
ফুৎকারে নিয়ে দিল চন্দ্র সুৰ্যালােক !
না-ওই ব্যোমব্যাপী ভীষণ দর্শন
প্রলয় পয়ােব্দ নহের ভয়ঙ্কর
নর মেধ মহা যজ্ঞে আহুতি হইতে

উল্লাস।
আসিয়াছে কোটী নর, ওই তাহাদের
অনশন-মসী-দেহ ঘনীভূত নভে!
শ্রবন ভৈরব রব মেঘ ম নয়—
উহাদের আর্তনাদ হাহাকার ঘাের !
নহে ঝড় মহাকাল রুদ্রের ফুৎকার,
বুভুক্ষার ডীমােচ্ছাস কঁপা ভূবন !
নাহি কি আস্তিক কেহ করুণা আধার
হমান জীবে চাহি উৰ্দ্ধ বাহু হয়ে
মাভৈঃ মাভৈঃ হবে অভয় প্রদানে !
ঢালিয়া দয়ার সিন্ধু লােম হর্ষ ওই
নর মেধ যজ্ঞানল করয় নিৰ্বান।
জানিনা জানিনা হায়, কাহার পাপেতে
ভারতের এ দুর্দশা মূর্তিমান আজি,
জানিনা জানিনা কার পৈশাচ উৎসবে
নিমন্ত্রিত হ’ল আজি প্রেতের নগর।
মহা নরমেধ এই ভীষণ যজ্ঞের
কে করিল আয়ােজন জানিনা জানিনা,

, অভিষেক। জানিনা হা কে নির্মম এ হােমকুণ্ডের নিম হ’তে দিতেছেরে ঠেলিয়া ইন্ধন ; জানিনারে উৰ্দ্ধ হতে উৰ্দ্ধ শিখা পরে কে রাক্ষস কে পিশাচ অবিরাম ধারে জীবন্ত প্রাণীরে ধরি দিতেছে আহুতি, অগ্নিগর্ভে দহামান সে লােম হর্ষণ কঠোর করুণ ঘাের জীবের চীৎকারে- জানিনারে কোন দৈত্য অতৃপ্ত আমােদে উৎকট আনন্দ নৃত্যে কঁপায় বসুধা । কিন্তু জানি ভিখারিনী দুঃখিনী ভারত জননীর শিশুমেধ এ যজ্ঞের নাম! এসহে বাল্মীকি ব্যাস এস আরবার- রাজসূয় অশ্বমেধ যে সুরে গাহিলে, ভার চেয়ে উচ্চ তারে বীণাযন্ত্র বাধি বাজাও জলদ মন্দ্রে ভৈরবী রাগিণী । স্বাধীন ভারত যবে গাহিলে তখন স্বাধীন মহােৎসব আনন্দ নৰ্ত্তন, পরাধীন ভারতের গাও এবে কবি,

উল্লাস।
৭১
আর্তনাদ উতরােল বিষাদ ক্রন্দন।
পঞ্চবিংশ কোটী এই বুভুক্ষা প্রেতের
আর্তনাদ উতরােল প্রতি শ্লোক হতে
তব উঠুক গরজি,—সে ঘাের গর্জন
মেঘের নিনাদে ধাই অন্তরীক্ষ পথে
নীলাম্বুধি পারে ওই হেম হৰ্ম্ম চূড়ে
হউক ধ্বনিত সদা! পঞ্চাশত কোট
নয়নের অশ্রুজল-অক্ষরে অক্ষরে
তব উঠুক উছলি, ভাসায়ে ভারত
উঠুক সে অঞ সিন্ধু অভ্র ভেদ করি,
অৰ্ব্বদ তরঙ্গ তার উত্তুঙ্গ প্রাসাদে
হউক প্রচণ্ড বেগে প্রহত সতত,
কপুক গভীর ভিত্তি ; উদ্দাম কল্পনা
স্বর্গে স্বর্গে ক্ষুধার্কের ক্ষুধাগ্নির শিখা
ছুটা বিদ্যুত্ তেজে, সে বিকট দ্যুতি
নৃপেন্দ্র নয়নে নিত্য হউক ঘূর্ণিত,
তাহলে তাহলে কোটী ক্ষুধার্তের জ্বালা
বুঝিবেন ভারতেশ! তাহলে বুঝিবা

২
অভিষেক।
কোটী কোটী শুরু কণ্ঠ তৃষিতের তাপ
পশিবে ভারতের প্রতিনিধি প্রাণে,
দ্রবিবে তুষার স্তুপ পার্লিামেন্টের,
করুণার কল্লোলিনী কবে কল স্বনে
নৃপ কর্ণে-দয়া কর দুঃখিনী নন্দনে।
ভারতের প্রজা-হিন্দু মুসলমান প্রভৃতি
=
অয়ি মা ভারত রাণী করুণা রূপিনী,
ক্ষুধার্তের গ্রাসে তুষ্ট হবে মেহময়ী?
দরিদ্রের ছিন্ন বুলি ঝাড়িয়া জননী,
ঝকিবে যে ব্যোমস্পশী সুবর্ণ শিখর,
তাহে তব পূত আত্মা সন্তোষ পাইবে ?
নিরন্তু অৰ্বদ নর স্মৃতির মন্দির
বেষ্টিয়া—বিদারি কণ্ঠ বিষাদেব গীত
গাহিবে যখন,-অয়ি বৈকুণ্ঠ বাসিনী,
তখন কি ও হৃদয় উৎস মমতার
রহিবে গাে অনাকুল ? যবে কোটী প্রেত,

উল্লাস।
হানিয়া উদরবক্ষে করাঘাত করি
ফিরিবে উৎকট রােলে পার্শ্বে প্রাসাদের,-
প্রফুল্ল উদ্যানে হায়, কুহরিত পিক,
শুনাবে কি সুসঙ্গীত তােমায় তখন ?
অনশন-মৃত-সুত মাতৃ অশ্রুধারে
উষ্ণধার জাহ্নবীর উচ্ছসিত স্রোতঃ
পরশিবে ও মন্দির তখন কি মাতঃ,
উত্তপ্ত সে শ্রোতঃ স্পর্শে দয়া হৃদয়
রবে কি সুস্থির ?-না না-জানিগগা জনণী
আনন্দের সুনন্দন আশার স্বরগ,
ভােগের বৈকুণ্ঠ ধাম ঐশ্বৰ্য্য অলকা,
হাস্যলাস্য নীলাস্থল অপ্সরা আলয়-
অতুল লণ্ডনে তব দয়িতের ছবি,
হাসায়ে রাখিয়া গেছ যে ভাবে জননী,
ভুক্ষিত ভারতের মরুময় বুকে
সে ভাবে হাসিতে মাগাে, পারিবে না তুমি
বিষাদ বিঘাের এই তমসার নাঝে
সুহসিত সুবর্ণের মুরতি তােমার,

৭৪
অভিষেক।
বসাইলে স্নেহময় ও মাতৃ হৃদয়,
নিদারুণ অবসাদে হইবে পীড়িত।
কবি ;-
ভারতেশ! ভারতের ভিক্ষুর সঞ্চয়ে
বুভুক্ষিত ভারতেরে দুটী অন্ন দাও !
ইথে নাহি বর্ণ ভেদ হিন্দু মুসলমান,
সবাই দানব দন্তে চর্বিত সমান।
ইথে নাহি মত ভেদ কাফের যবন,
সবাই রাক্ষস গ্রাসে পরিত্রাহি ডাকে।
হায়গাে স্থাপিবে যায় স্মৃতির মন্দির,
বাজাইবে এ শ্মশানে উৎসবের বাসি,
অনন্ত ভারত দৈন্য তায় ঘুচিবে না-
অসীম ভারত ক্ষুধা জানি নিবিবে না,
কিন্তু হে ভারত প্রভু জানিও নিশ্চয়,
সে অর্থে জঠরানলে পড়ে যদি জল
একটী জনের, উষ্ণ হয় যদি তায়
একটী শীতল অঙ্গ, ফিরে যদি প্রাণ

উল্লাস।
৭৫
একটী মমূযুদেহে, জ্যোতিঃ হীন আঁখি
কাহারাে উজ্জ্বল হয়, হয় পুষ্ট যদি
একটী বিশীর্ণ দেহ, জানিও নিশ্চয়
শত স্মৃতি মন্দিরের ফলিবে হে ফল,
সহস্র উৎসব চেয়ে আনন্দ বিমল,
স্নিগ্ধ জ্যোস্না সুধাধারা ঢালিবে হৃদয়ে ।
ওই গুন চারিধার ভারত ব্যাপিয়া
সহস্র সহস্র প্রজা নিশীথ সন্ধ্যায়,
ডাকিছে কাতর স্বরে জঠর জ্বালায়
“রক্ষা কর নরেশ্বর জীবন যে যায়।”
এদের কাতর স্বরে পাতহে শ্রবন !
ইহাদের হাহাসে আর্দ্র কর হিয়া,
হিমাদ্রি হইতে উর্কে কীৰ্ত্তির শিখর
উঠিযে-গগন ভেদি স্বর্গে সে নিশান
হৈমাবি বিথারিবে, তব কীর্তি গাথা
পুণ্য কথা সাথে সাথে কোটী কঠ উঠি
পূরিবে অনন্ত ব্যোম,-কত কাব্য কোটী
ধন্য হবে তব ভাব ধরিয়া হৃদয়ে ।

।
কঠোর পাষাণ বক্ষে-নিকুঞ্জ মর্মরে,
মরুবক্ষে-কল্লোলিত লহরী উল্লাসে,
শ্মশানেতে--সংসারের হর্ষ কোলাহলে,
শান্ত ক্ষুৎ তৃষিতের আশীষ উচ্ছাসে,
রচিত হইবে তব পর্ণ সিংহাসন,
পাপ তাপ হীন সেই শাস্তির আশ্রমে।

ভারত মাতা।
আইস কুমার! কৰি আশীৰ্বাদ ;-
যুগে যুগে হেন সাম্রাজ্য গৌরব
মণ্ডিত মুকুটে শিরঃ শােভা করি,
অবনী মণ্ডলে বিলাও সৌরভ।
সে পূৰ্ব্ব গৌরব হারায়ে ভারত
অকুলে যাইতে ছিলগাে ভাসিয়া,
হারান সে কুল আঁধারের কোলে
তােমরা ইংরাজ দেখালে আসিয়া!
মুক্ত হস্তে জ্ঞান রত্ন অনুপম
অবিরত হেথা করিছ বর্ষণ,
মনুষ্যত্ব যাছে লভে হিন্দুস্থান
সহস্র উপায় করিছ কীর্তন।

অভিষেক।
উন্নভির পথ দেছ দেখাইয়া,
বিধাতা বিমুখ ভারত বাসীর
উন্নতির পথে ভ্রমিয়া মিয়া
দিন দিন হয় দুর্বল শরীর।
প্লীহা বিদারণ লােমহরষণ
বৃটীশ ভারতে হয়েছে প্রচার,
এ ব্যাধি বিষম-মহামারী হতে
বিভীষিকা প্রাণে করেছে সঞ্চার !
ইহার লক্ষণ বেদে বাইবেলে
কোরাণে পুরাণে নাহিক প্রচার
ইহার চিকীৎসা কর নরেশ্বর,
নহে এ ভারত হ’ল ছারখার।
স্বজাতি বৎসল বিখ্যাত ভূবনে
বৃটন নন্দন অতুল ধরায়,
স্বাধীনতা প্রিয় গর্বিত হৃদয়
ভুবনে এমন নাহিক কোথায়।

উল্লাস।
জাজ্জল্য প্রমান করিতে প্রদান
হায় কি তাহার বৃটীশ কুমার,
ভারতবাসীর প্লী বিদারণ
দুরারােগ্য ব্যাধি কৈলে অবিষ্কার ?
পবিত্র প্রখর ন্যায় ধৰ্মাসনে
ন্যায় দণ্ডধর দিব্য জ্যোতির্মান,
তাহারি আবার করি অভিনয়
করেন প্রচার মহিমা মহান!
বিরাট বিক্রম বুটীশ বীরেশ
ভীম পদাঘাতে বিদলিলে প্লীহা,
বিজয় দিত্র বৃটীশ পত্রিকা
ঘােষয় গর্জিয়া-“যথার্থই ইহা” ।
বিজয় ঝঙ্কারে বৃটীশ হুঙ্কারে
ভারত বাসীর শােণিত উচ্ছাস,
ক্ষীণ আর্তশ্বর কোথায় মিলায়
ঝলসে হৃদয় দারুণ হুতাশ !

.
আভষেক।
বজ বিদ্যুন্ময় মেঘের মতন
আতঙ্ক ভীষণ ভারত অম্বরে,
মুছমুহু ঘাের গরজিয়া উঠে
থর থর প্রজা কাঁপয় অসুরে।
এ হ’তে নিষ্ঠুর ছিল কি সে প্রথা ?
নরবলি দিয়ে নাদিত যখন
নিঠুর হৃদয় ঘাতক নিচয়
রুধিয়ে রঞ্জিয়া বিভৎস বদন ?
দেবতা বাঞ্ছিত স্বজাতি বাৎসল্য—-
এরূপে পরীক্ষা দিতেই কি তার ?
বীর হৃদয়ের এই উদারতা ?
স্বাধীন চিত্তের এই কি প্রসার ?
নিরস্ত্র দুর্বল নিরস্ত্র কাঙ্গাল
ক্ষেপিলে কুকুর নাহি যার ত্রাণ,
মুষ্টাঘাতে তার প্লীহা বিদারিলে
বৃটীশ পৌরুষ হয় কি প্রমাণ।

উলাস।
দুরদৃষ্ট হয়, বুঝিতে না পারি
কোথায় শিখেছ এই বৎসলতা,
প্রচণ্ড রোমের দৃপ্ত গীরীশের
অপূৰ্ব্ব বীরতা কহে কি এ কথা ।
ইহাই মিনতি আরতি আমার
ওহে ভারতের রাজ রাজেশ্বব!
শিখণ্ডীর আড়ে যথা ধনঞ্জয়
বিধিলা বিশিখে ভীষ্ম ধনুর্দ্ধর,-
বিচার আসনে ধৰ্ম্ম অবতার,
স্বজাতি বাৎসল্য শর ভয়ঙ্কর
অসাধ্য যাহার করা প্রত্যাহার,
তীক্ষ্ণ অগ্নিমুখ যেন বিষধর,
জায়ের আড়ালে করিয়া সন্ধান
বধােনা বখােনা ভারত বাসীরে।
তাহ’তে বরঞ্চ দলিয়াে দুপায়ে,
মাতিয়াে তাণ্ডবে ভারত রুধিরে।

অভিষেক।
নাদের দানার তৈমুর প্রেতের
বর্জ্য পদাঘাত সহেছি যে বুকে,
সে বুক পাষাণ অযা অসান
ওতাে পুষ্পঘাত সব হাসি মুখে !
কবি;-
অপূৰ্ব্ব ভারত! অপূৰ্ব প্ৰথায়
হায়রে বিধাতা সৃজিলা তােমায়;
তুলনা তােমার ছিলনা কোথায়-
তিলােত্তমা তুমি চারু প্রকৃতির।
অপূৰ্ব্ব তােমার অনাদি মহান
বেদোপনিষদ অনন্তের জ্ঞান,
ষড়দরশন স্বরগ বিজ্ঞান
অপূৰ্ব্ব ভারত সমাধি ঋষির!
অপূৰ্ব অনুপ কাব্য রামায়ন !
অপূর্ব অদ্ভুত ‘ভারত’ কীর্তন।
ভাগবত সুধা প্রেম প্রস্রবন!
অপূর্ব ভারত নিকুঞ্জ বাণীর
!

উল্লাস। পিককুলপতি কবি কালিদাস- চাঁদের জোছনা পারিজাত বাস বসন্তের হাসি রতির বিলাস যেথায় ঢালিছে আনন্দ মন্দির। অপূৰ্ব্ব রামের প্রজার রঞ্জন! অপূর্ব কৃষ্ণের গীতার কীর্তন! অপূৰ্ব্ব বুদ্ধের জরাদি দর্শন ! অপূৰ্ব্ব ভারত লীলা নিকেতন! অপূৰ্ব্ব প্রহলাদ ধ্রুব মতিমান, জ্ঞানী শুকদেব বৈষ্ণব প্রধান, অপূৰ্ব্ব বানর ভক্ত হনুমান, তুমি মা ভারত ভক্ত বৃন্দাবন ! অপূৰ্ব্ব ভরত পবিত্র লক্ষন, অপূৰ্ব্ব ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা পালন, দুরন্তু কর্ণের কৃতজ্ঞতা ধন, অপূর্ব ভারত মাহাত্ম্য শিখর। ——

৮৪
অভিষেক।
হরিশ্চন্দ্র রাজ শিৰি পুন্যবান,
রাজর্ষি জনক” রঘু খ্যাতিমান,
অপূর্ব কৌন্তেয় ক্ষমা মূর্তিমান,
অপূৰ্ব্ব ভারত পুণ্যের আকর।
অপূৰ্ব্ব সাবিত্রী অন্তক ত্রাসিনী ।
সুধাময়ী সীতা দশাস্য নাসিনী !
দীপ্ত বেদবতী শিখা স্বরূপিনী,
অপূৰ্ব্ব ভারত সতীর নন।
অপূৰ্ব চামুণ্ডা রুদ্ৰ ৰিমর্দিনী,
অপূর্ব দ্রৌপদী কাল কাদম্বিনী,
অপূৰ্ব্ব ঝান্সীর চামুণ্ডা ভাষিনী,---
অপূর্ব ভারতে বীরাঙ্গনাগণ।
অপূৰ্ব আত্রেয়ী মহা বৈদৰতী,
অপুৰ্ব্ব রমনী খুনা লীলাবতী,
মতের চারু প্রতিমা ভারতী,
অপুর্ব ভারতে রমনী বৈভক্ত।

উল্লাস।
দেবী অরুন্ধতী পবিত্র বাদিনী
অপূৰ্ব চিরান্ধ-ব্রত বিলাসিনী
মহাতেজোময়ী গাঙ্কার নন্দিনী,
অপূৰ্ব্ব ভারত মহিমা অর্ণব।
!
অপূৰ্ব্ব তােমার কুরুক্ষেত্র গীত,
জীবন শঙ্কটে গীতার সঙ্গীত,
অতি সে অপূৰ্ব্ব যােগীন্দ্র বাঞ্ছিত
কপট লম্পট কৃষ্ণ ভগবান!
অপূৰ্ব তাহার উদার চরিত—
ভীষ্ম যুধিষ্ঠির বিদুর বন্দিত,
যােগী শুকদেব বেয়াস সেবিত,
বৈরী নিদারুণ কর্ণের পূজিত
অপূৰ্ব্ব সে কৃষ্ণ তস্কর প্রধান।
অপূৰ্ব্ব কুরুর প্রতিজ্ঞা ভীষণ ;-
“সূচ্যগ্র মেদিনী দিবনা কখন!”
অপূৰ্ব্ব আবার মহা পলায়ন
লক্ষ্মণসেনের অশ্বারােহী নামে ।

অভিষেক।
- - - - -
অপূৰ্ব প্ৰতাপ বিধর্মী ঘৃণায় !
অপূৰ্ব আবার মানব হেথায়,
জননী বিলায় বিদেশীর পায়
অপূর্ব ভারত নারকীর নামে।
অপূৰ্ব তােমার লক্ষ্মীর আগার,
অপূৰ্ব তােমার রতন ভাণ্ডার !
অপূৰ্ব্ব আবার চির হাহাকার,
অপূৰ্ব্ব ভারত ক্ষুধার্ত এখন!
অপূর্ব ভারত বিশ্ব বিমােহিনী
রাম কৃষ্ণ বুদ্ধ মুকুট ধারিনী।
বাল্মীকি বেয়াস মাল বিলম্বিনী,
কালিদাস হাস্যে সুমিষ্ট ভাষিনী ;
অপূৰ্ব আবার বিমুক্ত কেশিনী
উন্মাদিনী ওই কঙ্কাল মালিনী;
জুন আরাকে মেদিনী ত্রাসিনী,-
অপূর্ব ভারত মূরতি ভীষণ !

উল্লাস।
আরাে কি অপূৰ্ব দেখসে হােখায়
নন্দকুমারের বিচার প্রথায়,
খােল ইতিহাস-লেখনী লীলায়
পিশাচ কল্পনা শান্ত সিরাজের।
সকলের চেয়ে অপূৰ্ব্ব এখন
ভারতবাসীর প্লীহা বিদারণ,
ন্যায়ের আসনে ন্যায়ের হনন ;
বলিহারি বুদ্ধি বৃটীশ বীরের !
ভারত মাল;-
ভারত যুড়িয়া প্রচণ্ড প্রবাহ
বহে বিজ্ঞানের বিপুল বিরাট,
অদৃষ্ট বিগুন ভারত বাসীর
পিপাশায় কণ্ঠ তবু হয় কাঠ।
পশুত্ব ঘুচিয়া মনুষ্যত্ব লাভ
কিসে হয় সদা পড়িয়া শিখিছে,
হে ইংরাজ তব ভারত প্রজার
ক্ষুধার যন্ত্রণা তবু না নিবিছে।

অভিষেক।
তীক্ষ্ণ দৈন্তকীট অস্থি মজ্জা ভেদি
করিছে প্রবেশ ভারত হৃদয়ে,
যদি তারে বীর দেখিতে না পাও
পার তাহারে নাশিতে নির্ভয়ে,
বিজ্ঞান প্রসূনে ভুষিয়া ভারতে
জ্ঞান মৃণালের শয়নে শােয়ায়ে,
উন্নতি অনিলে করিলে বীজন
ভারতের জ্বালা নিবিবেনা তায় !
এ জ্বালা যন্ত্রনা প্রলয় অনল
নিবাইতে ওহে নৃপ দয়াধার,
বহাও বহাও কোটী প্রস্রবন
হে এ ভারত হ’ল ছারখার।
ভারত’ আশ্রয়! যে জ্ঞান কিরণে
করিছ প্রকাশ কানন কন্দর,
যে নব বিজ্ঞান—আকাশ কুসুমে
মণ্ডত করিছ ভারত সুন্দর,

উল্লাস। ভস্মে হবিধারা সম বৃথা হায়, হইবে ব্যয়িত, যদি নাহি পার নিবাতে ভীষণ বৃটীশ হুঙ্কারে, দুর্ভিক্ষ অনল রাজত্বে তােমার ! অতুলনা খ্যাতি স্মৃতির মন্দির, সহস্ৰ জাতিয় মহা সম্মীলন- অশ্রুত অপূৰ্ব্ব অবণী মণ্ডলে বিরাট বিপুল ভারত শাসন, সবি বৃথা হবে--একই মুদ্রায় বিকাইত যেথা আট মন চাল, সেথায় যদিহে নিত্য অনশনে চীৎকার কেবলি অন্নের কাঙ্গাল ! মহামহােৎসব আজিকে ভারতে,-- ঘােষিছে জগৎ তুলনা ইহার পুরাণে ভারতে মিলিবার নয়-- ভবিষ্য ভারতে দেখিবে না আর!

অভিষেক। হাসি আসে শুনি প্রলাপ বচন। হায়রে উৎসব মরীচিকাময় । ভারতে উৎসব তাহারেই কয় অন্নদা যেথায় মূর্তিমতী হয়! কবি। ; রাজসূয়ােৎসব-- ভারত মাতা ;-। কি শুনালি বাছা! খুলকে রােমাঞ্চ হইল আমার ! কত যুগ গেল শুনিনি সে নাম! সে মধুর নাম শুনারে আবার ! হায়রে সে নামে উথলে আমার বহু শতাব্দির স্মৃতি পারাবার ! সে হতে আমার মহিমা প্রচার- রাজসূয়ােৎসব বল বার বার।

উল্লাস।
as
রাজসূয়ােৎসব বল বার বার !
সে হ’তে আমার মহিমা প্রচার !
শুনেছি শ্রবণে গাণ্ডীব টঙ্কার।
জগতে অতুল্য গীতার ঝঙ্কার!
রাজসূয়ােৎসব বল বার বার।
সে হ’তে আমার মহিমা প্রচার।
বেজেছে ব্যাসের বীণার ঝঙ্কার ।
যে তানে জগৎ আজি চমৎকার।
রাজসূয়ােৎসব বল বার বার--
সে হ’তে আমার মহিমা প্রচার !
ওই বীর শিশু কেশরী কুমার,
কিশাের বয়ষ্ক রূপে যেন মার।
ধায় অভিমন্যু করি মার মার
দর্পে চক্রব্যুহ করিয়া বিদার,
ক্ষত্র গুরু দ্রোণে লাগে চমৎকার!
সপ্ত মহারথী পলায় চৌধার ।

অভিষেক।
রাজসূয়ােৎসব বলিনে আর
সে হতে আমার শশাকের সঞ্চার !
কুরুপাণ্ডবের সহস্র চিতার
জলিছে অনল হৃদয়ে আমার !
রাজসূয়ােৎসব-বলিনে আর--
সে হ’তে দারুণ পতন আমার।
রাজসূয়ােৎসব তুরীর নিনাদ
বাজিতে পবনে কনােজে আবার,
গরজি উঠিল বহ্নি পারাবার !
বাসুকি উচ্ছাসে রসনা লকিয়া
দ্বাপরের সেই বিগ্রহ ভীষণ,
দাড়াল ভীষণ ফণা আস্ফালিয়া!
রাজসূয়ােৎসব বলিনে আর ।
সে হ’তে দারুণ দুর্দশা আমার ।
চরণে শৃঙ্খল বাজে অনিবার।
ঝরিছে নয়নে অশ্রু শতধার!

উল্লাস।
রাজসূয়াের্সৰ বলিসনে আর
নিদারুণ বুকে বাজে ওরে বাজ!
ক্রর জয়াদ অহিকুলরাজ
দংশিল মরমে চৌহানের রাজ ।
আহা ৰংস সম নরকুলমণি
ৰীরচুড়ামণি পুত্র পৃথ্বীরাজ !
গিয়াছ কোথায় জননীর বুকে
হানি উগ্রতর নিদারুণ বাজ ।
পড়িলিরে বাপ দৃশদ্বতী তীরে
যেমনি কালের দশন দংশনে,
ভাঙ্গিয়া পড়িল পঞ্জর আমার !
লুটাই আপন নয়ন কর্দমে।
ওরে প্রাণাধিক জীবন কুমার
যে দিন গুইলি শরশয্যাপরি
সে দিন হইতে করি হাহাকার,
ঘুরিরে ব্রহ্মাণ্ড ভগ্ন দ ধরি ।

অভিষেক।
রাজসূয়ােৎসব !–ওরেরে শ্রবণ
হরে বধির, শুনায়ােনা আর
তনি যা এখনাে~~ঘােরীর গর্জন,
নরকের যেন শিখার হুঙ্কার।
রাজসূয়ােৎসব !-এস মহাকাল
ওরে সঘনে বিষাণে ফুৎকার !
ডুবাও ডুবাও যবন পীড়নে
মহা আর্তনাদ সতী ললনার ।
রাজসূয়ােৎসব-আয়রে প্রলয়-
অগ্নিপুচ্ছ তাের গগণে জলু,
ম্লেচ্ছ পদাঘাতে এ ক্ষত হৃদয়
কর ভষ্ম ত্বরা যাতনা ঘুচুক!
রাজসূয়ােৎসব !-উথল’ জলধি
যমুনা জাহ্নবী মহানদী সােন,
যবন পাকা কর্দমে লেপিত
ভারতের অঙ্গ কর নিমগন ।

উল্লাস।
৯৫
==
=
রাজসূয়ােসব!—ওগাে হিমগিরি,
লক্ষ শৃঙ্গ শিরে পড় আছাড়িয়া !
আজি যে ভারত চণ্ডাল ঘৃণিত
কর চুরমার সে অঙ্গ ভাঙ্গিয়া ।
রাজসূয়ােৎসব--খস সূৰ্য্য শশি-
ভারত ব্যাপিয়া ঢালরে আঁধার!
জলিয়া এ মুখ হয়েছে অঙ্গার
কালা মুখ ওরে লুকাও আমার!
ওরে রাজসূয় !-হায়, কি কুক্ষণে
হয়েছিলি তুই ভারতে উদয় !
তুই কি বিধির নিদারুণ সাপ
বসতি কি তাের ভারত হৃদয় ।
জনমেজয়ের যজ্ঞ হুতাশন--
তুই কি নিঠুর ঘাের দরশন ?
এলন্ত রসনা করি প্রসারণ
পুগণে মাের করিস্ ভক্ষণ

অভিষেক।
রাজসূয়ােৎসব” কেন বল আর !
আতঙ্কে শরীর শিহরে আমার !
আজি শুভদিন-সর্বনাশী নাম
করােনা করােনা উচ্চারণ আর ।
যবন কৃপাণে শােকের দশনে,
স্থবির শরীর হল জর জর !
আছে তবু শান্তি বৃটীশ শাসনে
তাহার মঙ্গল কর মহেশ্বর!
কবি ;
ত্যজচিন্তা মাত!-বুটীশের নামে
কাপে অমঙ্গল অন্ধকার ধামে।
মঙ্গল চঞ্জীকা বৃটনের ডুমে
ছুটেগাে তাণ্ডবে বিপদ খণ্ডিয়া !
কি কথা নরের-দেব দানবের
কে খণ্ডে অদৃষ্ট বীর বৃটাশের ।
নেহার চণ্ডীর চরণে কালের
পাষাণের বক্ষ যেতেছে ভাঙ্গিয়া !

উল্লাস।
৯৭
হের মা নয়নে সামান্য উৎসব
নহে এ জননী,রাজসূয়ােৎসব।
রাজসূয়ােৎসব—আজিকে ভারতে।
হয়নি হবেনা এমন মরতে!
কেন মা এমন চাহিছ বিষ্ময়ে ?
এ কথা বিশ্বাস হয় না হৃদয়ে ।
রাজসূয়ােৎসব—ভারত পতির!
শােন মা হুঙ্কার বুটীশ ভেরীর !--
ভারত মাতা ;-
কি বলিলে? একি—রাজ সূয়ােৎসব ?
ভারতের মাঝে—রাজ সূয়ােৎসব ?
বিকৃত মস্তিষ্ক হ’লকি আমারাে ?
ভারতে আজিকে রাজসূয়ােৎসব ?
কোথা সে উৎসব রােমহর্ষকর ?
কোথা রাজগণ জ্যোতিষ্ক নিকর ?
৭

অভিষেক।
কোথা হতদর্প নরেন্দ্র বদন,
আরক্ত যেমন সান্ধ্য দিবাকর ?
কোথায় তাদের অঙ্গার নয়নে
স্বচ্ছ শিখা সম অশ্রুর আভাস,
নিৰ্বাপিত প্রায় অঙ্গারের গায়ে
ভস্ম আবরণে অঙ্গারকাস।
ভরাশি লয়ে করিতেছ ক্রীড়,,
খুলেছ ভারতে রাজসূয় মেলা,
মুমূষুরে টানি করিতেছ খাড়া,
অপূৰ্ব্ব ভারতে অপূৰ্ব্ব এ খেলা!
ভারতে এখন আছে নাকি রাজা ?
অপূৰ্ব্ব বারতা রাজসূয় হেথা !
অপূৰ্ব্ব ভারতে অপূৰ্ব্ব সকলি—
রাজা নাই যেথা রাজসূয় সেথা ।
a 222

উল্লাস।
কবি ;
“রাজসূয়ােৎসব” উচ্চারিতে হায়,
হৃদয় উচ্ছাসে মুচ্ছিলা জননী,
পড়িতে ধরায় ইন্দ্রপ্রস্থদেবী
তপন নন্দিনী ধরিলা অমনি।
“হ’ত রাজসূয়”--উচ্চারি উচ্ছাসে
উঠিলা আবার ভারত জননী,
ছুটিল তড়িৎ শীতল শােণিতে
লােচন যুগলে জ্বলিল দামিনী।-
ভারতমাতা ;-
হ’ত রাজসূয় ভারতে যখন
ছিলা দানবেন্দ্র সে ময় দানব,
রাজসূয় হত ভারতে যখন
ছিল মহাসভা রতন আসব !
রাজসূয় হত ভারতে যখন
রুদ্র প্রতিদ্বন্দী ছিল সে গাণ্ডিবী,

অভিষেক।
প্রেরিলা যজ্ঞেতে নাগেন্দ্র বাসুকী
ধরিয়া গাণ্ডীবে সসিন্ধু পৃথিবী!
ছিল রাজসূয় ভারতে যখন
উরিলা দেবতা ধৰ্ম্মের সভায়
আপনি মহেশ লুটিয়া পড়িল
কৃষ্ণ বাসুদেব ভগবান পায় !
হ’ত রাজসূয় ভারতে যখন
ছিল জরাসন্ধ পৰ্বত প্রতিম,
ছিল সে যখন পৰ্বত পাতন
পবন নন্দন ভয়ঙ্কর ভীম !
রাজসূয় হ’ত ছিল সে যখন
দর্পী শিশুপাল দীপ্ত হুতাশন,
ছিল যবে হায়, কৌস্তুভ বিদ্যুতে
নব ঘন শ্যাম নরক মর্দন !
ছিল রাজসূয় গাহিল যখন
কবিকুল গুরু কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন,

উল্লাস।
কবিত্ব পয়ােধি ভাবের তরঙ্গে
কল্পনা পবনে টলিল যখন।
মন্থল বীণায় কুরুকুল সিন্ধু,
হইল ঘূর্ণিত বসন মন্দর,
উদিল সুধাংশু ধৰ্ম্ম সহিষ্ণুতা-
অগ্রজে ভকতি অমৃত সুন্দর !
-
উদিলা কমলাপতি নারায়ণ
দুঃশাসণ রাহু হইল দলন,
জ্বলিল গরল দুর্যোধন জ্বালা
এসিল তাহায় রুদ্র বৃকোদর !
বাজিল বীণায় মহারণ বাদ্য
গজের গর্জন কোদও টঙ্কার,
ধ্বনিল বীণায় শঙ্খের নিশ্বন
রথের ঘর্ঘর বীর হুহুঙ্কার !
হত রাজসূয় ভারতে তখন
দুস্কৃত দুলন লজ্জা নিবারণ,

১২
অভিষেক।
ভীষ্ম ইষ্টদেব বিপদ বারণ
ছিলা যােগেশ্বর কেশব যখন !
গিয়াছে সে দিন উদিবে না আর।
বাজিবে না আর সে বীণা ঝঙ্কার।
কৃষ্ণ ধনঞ্জয় নহে আসিবার
রাজসূয়ােৎসব কেন তবে আর!
হায়, গাে বিধাতঃ-অপূর্ব ভারতে
সবি কি অপূৰ্ব্ব হবে সংঘটন,
একি পণ্ডশ্রম—একি আড়ম্বর।
একি এ ভারতে অপূৰ্ব্ব ক্রীড়ন।
বুঝেছি বুঝেছি হায়রে এখন!
বিড়ালের বিভা-হইল যেথায়,
তারি বৃহত্তর খেয়ালের খেলা
বিনা এ ভারত কোথা শােভা পায় !

উল্লাস।
কবি ;
হৈলা অন্তর্হিত ভারত জননী,
যেন বাতােচ্ছাস দূরে মিলাইল,
বিদারি তরঙ্গ ডুবিলা তাপনী
ইন্দ্রপ্রস্থদেবী আঁধারে পশিল !
ফুরাল উৎসব ঝলসি লােচন,
হইল ভারত আবার তেমন,
অনল-কৌতুক-তরঙ্গিনী দল
উচ্ছসি ক্ষণেক নিভিলে যেমন ।
জয় জয় এডােয়াড সপ্তম ভূপতি জয়!
অনন্ত মঙ্গল র করহে মঙ্গলময় !
বিশল্য বিপুল আয়ু দেহ ভঁরে ভগবতী !
বীণযন্ত্রে জয় তাঁর গাওগাে ভারতী সতী !
ধন্য হে কৰ্জ্জন লাট ভারতের প্রতিনিধি।
রাজসূয় স্মৃতিস্তম্ভ ভারতে রাখিলে কীর্তি।
সম্পূর্ণ।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Abhishek

Author
Chattopadhyay,abinash Chandra
Title
Gitikabya
File name
Abhishek
Text
OCR done
Citation
1915
Published
2010/01/4
Publisher
N.a.
Language
Sanskrit
Pages
122
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Lyrics
Keywords
Chattopadhyay,Abinash Chandra
DLI number
510827
Barcode
4990010018031.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
VqdCgK8HaND
Download PDF

Abhishek