Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata

Kumkum Ed.3rd

Das,govindachandra · 2009/12/13

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

কু
ম।
( কাব্য)
কিমপ্যন্তি স্বভাবেন সুন্দরং বাপ্যসুন্দর।
যদেব রােচতে যস্মৈ ভবেত্তত্ত সুন্দরং।
(হিতােপদেশ)
শ্রীগােবিন্দচন্দ্র দাস প্রণীত।
তৃতীয় সংস্করণ।
কলিকাতা,
২১০৫ কর্ণওয়ালি-স্ট্রীট, নব্যভারত-প্রেসে,
এভূতনাথ পালিত দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
আশ্বিন, ১৩১৬।
All rights reserved.

No text on this page.

উপহার।
কারে দিব উপহার ?
যাহারে বাসনা দিতে, সে কিগাে চাহিবে নিতে ?
সে যে করে অবহেলা-ঘৃণা-তিরস্কার।
থাক্ তার কাছে গেলে, দূরে থেকে থুথু ফেলে,
সে করে আমার নামে ‘নেকার-নেকার !
সহস্র যােজনে থাকি, যদি মনে মনে ডাকি,
সে নাকি ‘বিষম যায় স্মরণে আমার ।
আমারি স্মরণে হায়, সে নাকি ‘উছটু খায়,
ডরায় স্বপন দেখে বিকট আকার !
আমি নীচ-সে যে উচ্চ, সে মহৎ—আমি তুচ্ছ,
আমি তারে ভালবাসি-কলঙ্ক তাহার।
তারি নিন্দা-তারি গালি, এ পুস্তক ভরা খালি,--
কলঙ্কের ইতিহাস শুধু দেবতার !
২৯শে চৈত্র, ১২৯৬ সাল
জয়দেবপুর-ঢাকা।

সূচী বিষয়। পৃষ্ঠা। ১ রমণীর মন ৬৮ মালা গাঁথা ৬৯ : ৭৪ ১ - । ৮৭ কই ? / ৮৯ পৃষ্ঠা। বিষয়। কোথায় যাই? ২। শজারু ২-সখী - ৪ | নারি-হৃদয় /... চেন কি ? সােণার মেয়ে... ১৮ | শরতের মা ২২ বিবাহহপহার ২৭ পাপ ও পুণ্য ৩৩ কুসুম / ৩৫ ভুল হয়েছিল এও কি স্বপন ? · ৪০ দেখিবে কি আর ? ৪৪ পরীক্ষা ৪৫ 'নববর্ষ সাগরের উক্তি • ৯৪ ১০৩ T | গােলাপ কি হলো আমার ? দেখিলাম প্রেমােন্মীলন .. কলঙ্কী শশাঙ্ক••• বহুদিনের পর দেখা জোনাকী /... তােমার আমার পত্র লিখিও মশা ছবি ঘােমট। আইভি লতা .. পূর্ণ বিকশিত ... কি দিবে? •• ক্ষুদ্রতরী ••• ১১০ ১২০ ১২৭ কৃষ্ণদাস পাল ••• ১৩১ ৫৭ ••• ১৩৫ দেব-নিবাস ৫৯ ৬২ পরিমল দত্ত ১৩৯

কুম।
d
কুম।
কুকুমপঙ্ক-কলঙ্কিত দেহ।”
কে আর তােমারে ভালবাসিবে কুঙ্কুম ?
আশা, চিন্তা, সুখ-সব, যতকিছু অভিনব,
দেশময় মূতনের জবর-জুলুম!
যাহারা পুরাণা দল,
সকলেই বেদখল,
নাহি আর আগেকার সে ভারত ভূম।
তােমারাে সে দিন নাই, কপালে পড়েছে ছাই,
কামিনী কৌতুকে পরে ক্যানেজা’ কুসুম
লেভেণ্ডার ম্যাকেসার, সুইট ব্রায়া ওয়াটার,
পাউডার এসেন্সের মহা মরসুম!
কে আর তােমারে খােজে । প্রমত্ত অট-ডি-বােজ,
পারফিউমের দেশে পড়িয়াছে ধুম!
সর্বথা বিলাতী গন্ধ, ভারত করেছে অন্ধ,
কে আর তােমারে ভালবাসিবে কুঙ্কুম।
১১ সাল।

৪
কুম।
মাহি প্রেম নাহি প্রাণ দেখ শূ-হিয়া,
শূন্য মনে বসি, মলা গাথি ফুল দিয়া ?
ই বৈশাখ,১২৯৩ সাল,
কলিকাতা।
চন্দ্র
তুমি কিহে সেই চন্দ্র বুঝিতে না পারি,
তােমারি-তােমারি কাছে, কত দিন-মনে আছে ?
বেড়াতে আসিত এক উপবনে নারী।
তুলিয়া গােলাপ যুই, হইল বছর দুই,
কি বলিৰ দুই জনে আজি ছাড়াছাড়ি।
গোলাপেতে প্রেম থুয়ে, ঢাকিয়া দিত সে যুয়ে,
মনে করিতাম তারে সে বুঝি আমারি !
দেখা হলে তার সনে, চখে চখে দুই জনে,
প্রাণ নিয়া করিয়াছি কত কাড়াকাড়ি।
যখন পেয়েছি বুকে, চুম্বিয়াছি চখে মুখে,
কে যেন কাহারে আগে চুষে নিতে পারি।
তােমারে দেখিয়ে আজ, মনে হ’ল দ্বিজরাজ
আসিয়াছি শুধাইতে দুটী কথা তারি ।
তুমি কিহে সেই চন্দ্র বুঝিতে না পারি।
f
T
«

চন্দ্র।
সে দিন তুমি কি শশি দেখিয়াছ তারে ?
তরণী বাহিয়া যাই, কোন্ দিকে ঠিক নাই,
সন্ধ্যার সবুজ শােভা হাসে চারি ধারে ।
সনাল কুমুদ ফুলে, মালা গাঁথে তুলে তুলে
একটী বালিকা মেয়ে—দিবে জানি কারে,
কোন্ দেবপুরবাসী কোন্ দেবতারে !
দুইটী রমণী আসে, একটী লুকায়ে হাসে,
তীরে তীরে ধীরে ধীরে ফিরে বারে বারে !
বালিকা ডাকিল “মা, ধর মালা।” “না না।”
লুকাইল শরমে সে সখীটীর আড়ে,
সে দিন তুমি কি শশি দেখিয়াছ তারে ?
তুমি কিহে সেই চন্দ্র-সে দিন কি ছিলে ?
আমতলে চুমাে খেতে তুমি কি দেখিলে ?
এলােমেলাে চুল সেই এলােমেলাে বায়,
সুনীল মেঘের মত খেলা করে গায় ।
পশ্চাতে অচিল তা’তে মৃদু কম্পমান,
প্রেমের ধ্বজার যেন ধবল নিশান।
টানিয়া লইল মােরে,-তবু লাগে দূরে,
পরাণে ভরিতে যেন চাহে ভেঙ্গে চুরে
এত তৃষ্ণা এত আশা আকাঙ্ক্ষা প্রখর,
শিহরে শিহরে উঠে কম-কলেবর ।

চাহে সে আমারে যেন করিবারে পান,
উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা তার করিতে নির্বাণ ।
মর্দিয়া মথিয়া মােরে লুঠিয়া সে নিলে,
আমতলে চুমাে খেতে তুমি দেখেছিলে?
৪
সে দিন তুমি কি শশি ছিলেহে সেখানে ?
লুকাইয়া চুপি দিয়া, দেখেছিলে ঘরে গিয়া,
পায় ধরে সাধাসাধি, কঁাদাকাদি মানে ?
সে স্নান-বিষ-বেশ, লাবণ্যের একশেষ,
সরলা-সরােজ-মূর্তি দেখেছ পাষাণে ?
দেখেছ কি স্থির ধীর, কি গম্ভীর রূপসীর
মহান্ মহিমা মুখে,—চেয়ে সাবধানে ?
সে পদ্ম-নয়ন নত, সরল পবিত্র কত,
চাহিতে পরাণ কাপে ভয়ে তার পানে !
তরাসে মরিয়া রই, সেধে অপরাধী হই,
আমি যেন আমি নই,-কি জানি সে জানে।
সে দিন কি দেখেছিলে কাদাকাদি মানে ?
৫
তুমি কিহে সে দিনের সেই শশধর?
যে দিন ছাড়িয়া যাই, অভিমানে চাহি নাই
গেল বুঝি গত হয়ে আজি দু’বছর।
বিনয় করিল কত, অনুতাপে অবিরত,
ঘৃণায় দেইনি তার কথার উত্তর।
কে জানে কেমন নারী, প্রেম করে দিন চারি,

৭
চিনিয়া চিনে না শেষে কত যেন পর।
লিখিয়াছি কত পত্র, লিখে নাই এক ছত্র
কত যেন কাযে ব্যস্ত, নাহি অবসর।
ঠোঁটে রেখে রাঙ্গা হাসি, ভাঙ্গা ভালবাসাবাসি
বড় তীক্ষ্ণ-বড় তীব্র-বড় খরতর।
ম’রে থাকি কাছাকাছি, মরিলে দু’জনে বাঁচি
তাই সে ছাড়িয়া অাছি অজি দু’বছর!
ও যে সাধা মন রাখা, ছলনা চাতুরী মাখা,
লােকেরে দেখান শুধু উহার অন্তর।
তুমি কি বােঝনি তাহা ওহে শশধর?
বুঝিয়াছি তাই আছি দূর পরবাসে,
এ দেশে তাহার গন্ধ বহে না বাতাসে ।
কত যে গােলাপ যুই, বুকে নিয়া সদা শুই,
আকুল করেনা প্রাণ তেমন উদাসে।
এ দেশে তেমন নারী, নাহি দেখি করে বাড়ী,
ফুল দিয়া প্রেম ঢেকে দিতে নাহি আসে!
বসে থাকি অমিতলা, ধরে না আসিয়া গলা,
এ দেশে নারী কি চুমা ভাল নাহি বাসে?
হাসি কাদি একা একা, পাইনা, কাহারাে দেখা,
রেখেছি পাগল প্রাণ বেঁধে নাগ-পাশে।
এ দেশে খােলেনা বাঁধ নারীর নিশ্বাসে!

কুঙ্কুম।
৭
সুবিশাল গারাে-গিরি অই যে উত্তরে,
শৃঙ্গে শৃঙ্গে ভর দিয়া, উঠিয়াছে দাঁড়াইয়া,
উন্নত ললাট গিয়া ঠেকেছে অম্বরে,
উহার পাষাণ বুকে, চাহি যবে উৰ্দ্ধমুখে,
কতই সান্ত্বনা পাই, প্রাণ যেন ভরে!
প্রতি রেণু বালুকায়, মরিয়া রয়েছে হায়,
রমণীর কত অশ্রু হাসি থরে থরে।
কত প্রেম অনুরাগ, পাষাণে নাহি সে দাগ,
কত চুম্ব আলিঙ্গন কঙ্করে কঙ্করে?
কত মান আছে পড়ি, অযতনে, হরি হরি।
চরণে কত যে পশু বিদলিত করে ।
কতই সান্ত্বনা পাই পৰ্বত প্রস্তরে।
পৰ্বত পার্থিব প্রেম দিয়া বিসর্জন,
অনন্ত প্রেমের যেন করিছে সাধন।
এসেছে ছাড়িয়া নারী, প্রেম তারি-দেশ তারি,
রেখেছে পাষাণে প্রাণ করি আচ্ছাদন।
নয়ন করিয়া অন্ধ, নিশ্বাস করিয়া বন্ধ,
রমণীর রূপ গন্ধ করে না গ্রহণ !
কি গম্ভীর স্থির ভাব, অচল করেছে লাভ,
কি মহান্ প্রেমযােগে আছে নিমগন,
ও ক্ষুদ্র সামান্য নারী, অতি ক্ষুদ্র প্রেম তারি,
সাধ্য কি সে এ পিপাসা করে নিবারণ ।

চন্তা।
অই পর্বতের মত, প্রেম-তৃষ্ণা অবিরত
শশাঙ্ক। আমার প্রাণে জাগিছে এখন,
চন্দ্র সূৰ্য্য কৰি তুচ্ছ,আরাে উর্ধ-আরাে উচ্চ,
আমার প্রাণের সেই প্রেম-সিংহাসন।
যদি দেখ সরলারে, দেখিলে বলিও তারে,
শত পদাঘাতে যার ভেঙ্গে দিছ মন,
পর্বত দিয়াছে শিক্ষা, পেয়েছে সে প্রেমভিক্ষা,
পাষাণ তােমার মত নহে গাে কৃপণ।
দেখিলে বলিও শশি সেই রমণীরে,
সে দিন করিয়ে ভুল, নিয়েছি যে যুই ফুল,
ভাসা’য়ে এসেছি তাহা ‘চিলাইর’ নীরে।
তার কওয়া যত কথা, হাসি, অশ্রু, ব্যাকুলতা,
নিয়ে যাও নিয়ে যাও, দিও তারে ফিরে ।
ভালবাসা যত তার, কিছুই নাহি সে আর,
আপনি সে ফিরে নি’ছে ক’যাে রমণীরে।
যা আছেবিরহ আছে, দিতেছি তােমারি কাছে,
বাঁচা’য়ে রেখেছি তাহা আখি নীরে নীরে !
নিয়ে যাও নিয়ে যাও, দিয়াে তারে ফিরে।
যখন হইবে শ্যাম-সায়াহ সময়,
রমণী বসিয়া আছে, কেহ আর নাই কাছে,
যা দিলাম একে একে দিয়াে সমুদয়।
প্রেম-ভাঙ্গা উপহার, যদি সে না চিনে তার

কুঙ্কুম।
I
চাহে যদি বিধুমুখী পুনঃ পরিচয়,
বলিও সে সরলারে, একটী সন্ন্যাসী তারে,
ফিরে দিছে নিশিশেষে-প্রভাত সময়!
সে মেখেছে ভস্ম ছাই, তার আর কায নাই,
সে হয়েছে বনবাসী, গারাে-দেশে রয় ।
তারি কাছে সেধে পাওয়া, কে আর করিবে দাওয়া,
সে বলেছে তােমারি এ, আর কারাে নয়।
গােলাপী সুবাসমাখা, যুথিকা কুসুমে ঢাকা,
হইবে তােমারি বুঝি হেন মনে লয়!
তােমারি-তােমারি দাগ, ভাঙ্গা প্রেম অনুরাগ,
তােমারি গায়ের গন্ধে ভরা সমুদয় !
এই নেও ধর ধর, যাহা খুসি তাহা কর,
চরণে দলিয়া ফেল যদি মনে লয় ।
ধর ধর—যা দিয়েছে, নেও সমুদয়।
এই কার্তিক-১২৯৫ সাল ;
শীতলপুর বাগানবাটী, শেরপুর-ময়মনসিংহ।
গােলাপ।
১
চাহিনা গােলাপ! তােরে চাহিনারে আর,
বড়ই বিধেছে প্রাণে কন্টক তােমার ।
আজো সে মরম গত, আজো সে প্রাণের ক্ষত

গােলাপ।
১১
শুকায়নি, ঝরিতেছে সদ্য রক্ত তার,
হৃদয় শতধা ছিন্ন কণ্টকে তােমার।
२
চাহিনা গােলাপ তােরে চাহিনারে আর,
ভুলেও যাবনা আর নিকটে তােমার।
হৃদয়ের স্তরগত, প্রাণের লুকান ক্ষত
প্রাণেই লুকায়ে রাখি বেদনা তাহার।
বলিনা কাহারাে কাছে হৃদয়ে যে ব্যথা আছে,
কে চিনে এ হৃদরােগ-এত জ্বালা যার,
কে জানে গােলাপ কাটা ফুটেছে আমার।
গােলাপ! তােমারে ভালবাসিব না আর,
থাকু মধুর হাসি, থাক্‌ শত রূপরাশি,
চাহিনা ও মধুময় সুবাস তোমার!
থাকে। ফুটে কাটা গাছে, যার ফুল তার কাছে
প্রাণের অধিক ভাল বাসু সে তার।
তব রূপ অদ্বিতীয়, হৌক জগতের প্রিয়,
উড়িয়ে পড়,
অলি হাজার হাজার!
অনিল তােমারে নিয়ে, সােহাগ করুক গিয়ে,
আমি ত যাবনা কাছে-কি বেদনা তার,
সে কি জানে প্রাণে কাটা ফোটে নাই যার
ক
----
:
গােলাপ! তোমারে ভাল বাসিবনা আর,
আমার সে বন-যুই, হৃদয়ে লুকায়ে খুই,
কিছুই বিধেনা প্রাণে-
কাটা নাই তার।

কুম।
সে ক্ষুদ্র হৃদয় তলে, বিন্দুমাত্র পরিমলে
এমন শীতল করে পরাণ আমার ।
শীতল মধুর হাসি, শীতল সে রূপরাশি,
ননয়-শীতল-আলাে বন-যূথিকার !
অই ক্ষুদ্র বুক টুকে, মধুভরা মুখে মুখে,
হইলে একটু উনা দুনা বাড়ে তার,
গােলাপ! তােমারে ভাল বাসিবনা আর।
৫
গােলাপ! তােমারে ভালবাসিব না আর,
শতগুণে ভাল অই যুথিকা আমার।
যেমনি পরাণ নেয়, তেমনি ফিরায়ে দেয়,
ভাঙ্গেনা চোরেনা প্রাণ হাতে গেলে তার।
তুমিরে গােলাপ ফুল, যত যন্ত্রণার মূল,
দেওনা অক্ষত প্রাণ পেলে একবার।
হৃদয় শতধা ছিন্ন কণ্টকে তােমার।
গােলাপ! তােমারে ভালবাসিব না আর,
শতগুণে ভাল অই যুথিকা আমার।
রূপে আলাে করি তুমি, উজল বাগান ভূমি,
উন্নত প্রাচীর আঁটা বেড়া চারি ধার,
লুকায়ে ছাপিয়ে যাই, তবু না দেখিতে পাই,
বিমুখ হইয়ে আমি গিয়ে কত বার!
কিন্তু অই যুই ফুল, প্রেম-প্রস্রবণ মূল,
উছলে হৃদয়কেন্দ্রে বেগে অনিবার,

গোলাপ।
১
দিবানিশি নাহি ভেদ ভালবাসা অবিচ্ছেদ
হৃদয়ে লাগিয়ে থাকে সন্তত আমার ।
গােলাপ! তোমারে ভালবাসি না আর।
৭
*
গােলাপ! তােমারে ভালবাসিবনা আর,
আছে তাে কামিনী ফুল, মালতী বেলী বকুল,
বাগান করিছে আলাে রূপে সবাকার !
আরাে আছে শত শত, সুন্দর কুসুম কত,
সকলের চেয়ে বেশী ঠমক তােমার
তারা ত এমন নয়, সবে কোমলতাময়
সকলে খসিয়া পড়ে লাজে আপনার।
যখন তখন যাই, অমনি দেখিতে পাই,
ছলনা চাতুরী নাই হৃদয়ে কাহার।
এমন সরল তারা, তুমিরে গরল ধারা,
গড়ায়ে পড়িছে গায় গরিমা তােমার।
আমার ও যুই ফুল মাহি তার সমতুল,
সকলের চেয়ে বেশি সরল তার,
সুখে দুখে সদা হাসি, তাই তারে ভালবাসি
দেখিলে চুটিয়ে আসে হৃদয়ে আমার ।
গােলাপ! তােমারে ভালবাসিনা আর।
৮
নানা-না!
পারিনা ভাল না বেসে, পারিনাৱে আৰ,
গােলাপ, তোমারে ভালবাসিব আবার।
।

১৪
-
কুম।
যদি নাহি ভালবাসি, পােড়ে প্রাণ দিবানিশি,
হৃদয়ে অলিতে থাকে চিতার অঙ্গার।
এ অনল নিবাইতে, এ প্রাণে প্রবােধ দিতে,
গােলাপ! তােমারে ভালবাসিব আবার।
গােলাপ! তােমারে ভালবাসিব আবার।
কণ্টকে কণ্টকে যদি, চিরে প্রাণ নিরবধি,
এ হতে তবুও ভাল যন্ত্রণা তাহার।
দিয়েছি পাতিয়ে বুক,
সে কণ্টক বিষমুখ,
আমূল হৃদয় তলে বিঁধুক আমার?
ভাল না বাসিলে তােরে, মরি যে যাতনা ঘােরে,
কে বুঝে সে হৃদয়ের যাতনা অপার ?
গােলাপ! তােমারে ভালবাসিব আবার।
গােলাপ। তােমারে ভালবাসিব আবার।
চাহিনা কামিনী ফুল, চাহিনা বেলী বকুল,
ছার সেই বন-যুই নিছনি তােমার।
কে লাগেরে তাের কাছে, তাের কি তুলনা আছে?
ভূতলে অতুল তুই পারিজাত হার।
হাজার সুন্দর হৌক, হাজার সুবাস রে,
তবুও কামিনী ভাল লাগেনা আমার,
গােলাপ! তােমারে ভালবাসিব আবার।
১২৮৫৬ সাল ;
দেবপুর।
Neurer

কি হলাে আমার ?
আহা, কি হলাে আমার ।
ছিল যে হৃদয় মম, নির্মল দর্পণ সম,
অকলঙ্ক-অতি স্বচ্ছ—অতি পরিষ্কার।
কোন চিন্তা কোন দিন, করে নাই ৰিমলিন
এমন গভীর ধন গাঢ় অন্ধকার।
কোন দিন এত বেগে, গর্জে নাই মেঘে মেঘে,
এত বজে ভাঙ্গে গাই এ হৃদয় আর,
আহা, কি হলাে আমার।
আহা, কি হলাে আমার?
বুঝিয়া বুঝিনা যেন, কি হলে কি হলাে কেন,
পরাণে পড়িল এসে ছায়া খানি কার।
কার এ বিশাল ছায়া, কার এ বিরাট কামা,
দেব কি দানব মায়া বুঝিনা তাহার।
সমস্ত হৃদয় মােড়া, বুকত জাগা গােড়া,
চাকিয়া ফেলেছে বিশ্ব জগৎ সংসার।
আহা কি হলাে আমার ?
কি হলো আমার ? আমি দেখিনা আমারে
সমস্ত হৃদয় রাজ্য ভরা দেখি তারে।
নাহি প্রাণ নাহি মন, কত করি অন্বেষণ,
ডুবিয়া গিয়াছি তার ছায়া অন্ধকারে।
।

কুঙ্কুম।
যে দিকে যে দিকে চাই, চন্দ্র নাই সুৰ্য নাই,
তাহারি প্রতিমা মাখা যারে দেখি তারে।
কার এ বিশাল ছায়া গ্রাসিল' অঞ্চমারে ?
৪
}
৫
কার ও মধুর মুখ বিধুর শােভায়,
পূর্ণিমার রে’তে ফোটে আকাশের গায় ।
করি ও নয়ন বাঁকা, কমলে রয়েছে আঁকা,
অমর অমৃত মাখা স্নেহ মমতায় ?
জ্বলন্ত হৃদয়ে মম, শীতল চন্দন সম
সরস পরশ কার হে মলয়ায়
কে গাে এ আকুল প্রাণে, শ্যামা কোকিলার গানে,
মধুর মদিরা ঢালে সংগীত সুধায় ?
সায়াহ্ন মধ্যাহ্ন কিবা, কিবা নিশি কিবা দিবা,
পৰ্বতে পাষাণে বনে তরু লতিকায়,
ক্ষুদ্র শিশিরের বিন্দু, অকুল সমুদ্র সিন্ধু,
বিশাল ব্ৰহ্মাণ্ড ভরা কাহার ছায়ায় ।
কার এ বিশাল ছায়া গ্রাসিল আমায় ?
কার এ বিশাল ছায়া গ্রাসিয়াছে প্রাণ।
সশঙ্কে সভয়ে হায়, এত যত্নে কার পায়
আপনি সাধিয়া দিছি আত্মবলিদান ?
মনের মহত্ত্ব যত, দিয়াছি জন্মের মত,
ভুলিয়া গিয়াছি হায় মান অপমান!
কার এ বিশাল ছায়া গ্রাসিয়াছে প্রাণ?

কি হলাে আমার।
কেগাে দেবি। হৃদয়ের রাজ রাজেশ্বরী,
পাতিয়াছ সিংহাসন, আচ্ছাদিয়া প্রাণমন,
মৃত এ আশারে হায় শবাসন করি?
এ দগ্ধ শ্মশান-দেশে, এই ভস্ম-অবশেষে
কেগাে এ অনল মাখা আনন্দ লহরী।
কি আছে কি দিব আর, দেবযােগ্য উপহার,
যাও এ শ্মশানরাজ্য যাও পরিহরি।
যাও এ সরল বুকে সর্বনাশ করি ।
৭
যাও সৰ্ব্বনাশ করি, নাহি পারি আর
এমন আগ্নেয়ীমূর্তি পূজিতে তােমার?
সশঙ্কে আতঙ্কে ত্রাসে, এত উষ্ণ দীর্ঘশ্বাসে,
এত অশ্রুজল আর এত হাহাকার,
পারিনা পারিনা হায়, নিত্য এত লাঞ্জনাম,
অর্পিতে চরণে হেন পূজা-উপহার!
পারিনা আগ্নেয়ীমুর্তি পূজিতে তােমার!
৮
}
A
আনন্দ উল্লাসময় সরল হৃদয়,
নাহি ছিল কোন চিন্তা, নাহি ছিল ভয়!
আপনি আপন মনে, সমস্ত হৃদয় সনে,
আপনি বেসেছি ভাল আপন হৃদয়।
পরাণে লাগেনি দাগ, করি নাই আত্মত্যাগ,
করিনি শান্তির সনে অশ্রু বিনিময়।

কুঙ্কুম।
কিন্তু আজি কার ছায়া, কার এ বিরাট কায়া,
কার এ বিশাল মূর্তি জ্যোতি-মণিময় ।
এত দয়া এত স্নেহ, করি এই দেব দেহ,
লইল হৃদয় রাজ্য করি পরাজয়।
কার এ বিশাল ছায়া গ্রাসিল হৃদয় ?
২০শে ভাদ্র-১২৯৩ সাল ;
জয়দেবপুর-ঢাকা।
দেখিলাম কই ?
দেবি! দেখিলাম কই ?
কপােল কুন্তল চূর্ণ, অধর অমৃত পূর্ণ,
নয়নে করুণা মাখা সুন্দর বড়ই।
ললাটে লাবণ্য-সিন্ধু, উজলি উঠিছে ইন্দু,
দেখেছি কি না দেখেছি এক দিন বই
এলান কুন্তল ভার, ঘন ঘোর অন্ধকার,
ছড়া’য়ে রয়েছে যেন জলধর অই!
স্নেহে যেন ছানা মাখা, কবি কল্পনায় আঁকা,
মমতার মন্দাকিনী সুন্দর বড়ই।
দেবি, দেখিলাম কই ।
এ দগ্ধ হৃদয়ে দেবি ! তুমিই আমার
অমৃতের অবলেপ, আনন্দ তাড়িত-ক্ষেপ,

দেখিলাম কই ?
স্বর্গীয় শান্তির শত সঙ্গীতের খায়।
ও রক্ত অধরে হাসি, ওঠে প্রাণ পরকাশি,
সরল শরত-শােভা শত চন্দ্রমার।
যতক্ষণ দগ্ধ আঁখি,ও নয়নে মেখে রাখি,
ভুলে থাকি এ সংসার জ্বালা যন্ত্রণার।
এ দগ্ধ হৃদয়ে শান্তি তুমিই আমার ।
প্রিয়তমে।
এক দিন হৃদয়ের রত্ন-সিংহাসনে,
যদিও দিবস কত, ঢাকিয়াছে অবিরত
পরতে পরতে তারে শত আবরণে,
এক দিন হৃদয়ের রত্ন-সিংহাসনে,
বসায়েছি যে প্রতিমা, কি লাবণ্য ! কি মহিমা।
পবিত্র করিলে প্রাণ পরশি চরণে।
হৃদয় অজ্ঞাত ভাবে, কি জানি কি সুখ লাভে
আপনা ঢালিয়া দিল অঞ্জলি অর্পণে ।
কি জানি চরণ তব পূত পরশনে!
s
t
দেখিনি মানব চক্ষে সেরূপ অতুল,
দেখিনি কখনাে প্রিয়ে, মানবের আঁখি দিয়ে,
সে দিন দেখেছি যদি তবু হয় ভুল!
শুধু কল্পনায় আনি, দেখাল প্রতিমা খানি,
বিনােদ বদন ভরা এলােমেলাে চুল।
ফুটিয়া উঠিয়া হায়, পুঠিয়া পড়িছে পায়,

२०
কুঙ্কুম।
অনাদরে অযতনে-নীচে তরুমূল,
স্বর্গের সুরভি মাখা বিনােদ বকুল!
মােহিল সে প্রাণমন সুরভি উচ্ছাসে,
নয়ন সতর্ক রাখি, চারি দিকে চেয়ে থাকি,
দেখি না হৃদয়ে জানি কোন্ পথে আসে।
সেই এলােমেলাে চুল,
বিনােদ
বকুল ফুল,
প্রাণের ভিতর জানি কোথা হতে হাসে !
মােহিল সে প্রাণমন সুরভি উচ্ছাসে ।
মােহিল সে প্রাণমন স্বর্গীয় স্বপন,
আজি ক’বছর পরে, একটী মুহুৰ্ত্ত তরে,
নহে নিদ্রা, নহে তন্দ্রা, নহে জাগরণ!
একটা মুহূৰ্ত্ত তরে, কত যত্নে মনে পড়ে
কত আদরের সেই আকুল স্মরণ !
কত অশ্রুজলে ভাসি, কত কঁাদি, কত হাসি,
আকুল প্রাণের সেই কত আকিঞ্চন!
কত পুণ্যে হায় হায়, কত যুগ তপস্যায়,
হেরিব তােমার প্রিয়ে চারু-চানন !
কই দেখিলাম দেবি, জাগ্রত স্বপন।
৭
কই দেখিলাম আজি হৃদয়ের রাণী,
হৃদয় নন্দনে দেবি, যে চরণ নিত্য সেবি,
কই দেখিলাম সেই চরণ দুখানি।

দেখিলাম কই?
২১
একমাত্র অদ্বিতীয়, প্রাণের অধিক প্রিয়,
জগতে তােমারে বই আর নাহি জানি।
কই এলােমেলাে
চুল,
কই সে বকুল ফুল,
কই সে আকুল ভাষা—আধ আধ বাণী ।
আধ ঘোমটায় ঢাকা,আধ আধ লাজ মাখা,
কই গাে সে দয়াময়ী দেবী বীণাপাণি।
কই দেখিলাম আজ হৃদয়ের রাণি !
দেবি, দেখিলাম কই ?
কপােল কুন্তল চূর্ণ, অধর অমৃত পূর্ণ,
নয়নে করুণা মাখা সুন্দর বড়ই ।
ললাটে লাবণ্য সিন্ধু, উজলি উঠিছে ইন্দু,
দেখেছি কি না দেখেছি এক দিন বই।
এলান কুন্তল ভার, ঘন ঘাের অন্ধকার,
ছড়ায়ে রয়েছে যেন জলধর অই!
স্নেহে যেন ছানা মাখা, কবি কল্পনায় আঁকা,
মমতার মন্দাকিনী সুন্দর বড়ই।
দেবি। দেখিলাম কই ?
১০ই ভাদ্র, ১২৯৩ সাল।
জয়দেবপুর-ঢাকা ।

প্রেমােন্মীলন।
“বুঝিলাম মন।” প্রিয়ে কি বুঝিলি বল,
নাচিল হৃদয়ে রক্ত তরল তরল !
হৃদয়ের গ্রন্থিগুলি,
একে একে গেছে খুলি,
আপনার বশে নাই পরাণ পাগল,
জানিতে বাসনা মনে কি বুঝিলি বল।”
হৃদয়ের কোন্ খানে,
আবার ছুইল জানি,
সঞ্জীবনী সুরাশক্তি পূর্ণ পরিমল।
আবার করিল প্রাণ পাগল পাগল !
২
কি বুঝিলি প্রিয়তমে! কি বুঝিলি বল,
জানিতে বাসনা বড় পরাণ পাগল।
সােণার মৃণাল দিয়ে,
প্রিয়তমে কি দেখায়ে,
কি বলিলি শশিমুখি ঝাঁপিয়ে অঞ্চল।
“বুঝিলাম মন।* প্রিয়ে, কি বুঝিলি, বল ?
বসন্ত কোকিল কঠে,
সুধাকর গায় যেন,
অজানা ছুইল গিয়ে হৃদয়ের তল ।
আবার করিল প্রাণ পাগল পাগল।

প্রেমােন্মীলন।
२०
কি দিয়ে বুঝিলি মন ? মন দিয়ে মন !”
কবে দিলি ? ক্রোধে রক্ত সুনীল নয়ন!
আরাে কত ক্রোধে জানি,
ফুল্ল-রক্ত-সরােজিনী,
করিয়ে বঙ্কিম গ্রীবা কাপিল কেমন ;
কত সে সৌন্দর্যময় মন আন্দোলন।
আবার সরােজল,
যুগ কুঞ্চিত করি,
হৃদয়ে করিল তপ্ত সুরা সংক্রমণ,
কিবা সেই অভিমান প্রাণ উন্মাদন।
৪
কিবা সেই অভিমান-স্ফীত-বক্ষস্থল,
অপাঙ্গে উগারে আরাে উগ্র হলাহল।
কোমল দক্ষিণ পাণি,
টানিল ঘােমটা খানি,
অষ্টমীর অর্ধশশী পবিত্ৰ নিৰ্ম্মল,
উজলিল চা অৰ্দ্ধ ঘােমটার তল।
আবার সে অভিমানে,
কবে যে দিয়াছে প্রাণ,
কহিল অমর বালা, বিচুর্ণ কুন্তল
চুম্বিল গােলাপ- কপােলর তুল।

কি কহিলি অভিমানে সরলা আবার,
পশেনি হৃদয়ে হেন তপ্ত সুরাসার।
আজিই প্রথম তার,
এ হৃদয় ছুঁইবার,
কাপিয়া উঠিল বুকে ধমনীর তার,
করেনি হৃদয় হেন উন্মাদ ঝঙ্কার !
এমন উন্মও প্রাণ,
হয় নাই কোন দিন,
একত্রে উছলে যেন সপ্ত পারাবার !
কি কহিলি শশিমুখি সরলা আমার ?
সে অনন্ত মােয়,
উদাস করিল প্রাণ
কি কহিলি মানময়ি ? শুনিনু আবার,
“বুঝিতে তােমার মন বাকী নাই আর!”
“বাকী নাই—যা করেছি-এই শেষ তার,
বল কি করিব আর ?
পাইতে তােমার মন,
কি না করিয়াছি বল,”-
মধুর এজে প্রাণে বাজিল আবার,
“বল দেখি প্রিয়তম । কি করিব আয়?”
পুলকে পাগল প্রাণে,
চাহিগগন পানে,

।
প্রেমােন্মীলন ।
দেখিলাম সত্য শশী সুধার আধার,
বুঝিলাম এত দিনে, বুঝি নাই আর
৭
4
কুসুমে সৌন্দয্য আছে সুধা পরিমল,
আছে মাদকতা তায় পরাণ পাগল ।
বুঝি নাই এত দিন,
বুঝিলাম আজি আছে,
জগতে পরশমণি মাণিক উজ্জ্বল,
অন্তরের ভালবাসা-অমিয় সরল ।
বুঝিলাম এত দিনে,
সত্যই মানস হ্রদে,
ফুটে সুধাসিক্ত কম কনক-কমল,
ভূতলে অতুল যার উপমার স্থল !
৮
বুঝিলাম এত দিনে, বুঝি নাই আর,
সত্যই ত্রিদিব আছে অমর সংসার।
মৃত-সঞ্জীবনী সুধা,
সত্যই সেখানে আছে,
মরেনা অমর লােক আস্বাদনে যার,
বুঝিলাম এতদিনে—বুঝি নাই আর।
সত্যই নন্দন বনে,
স্বর্ণ-পারিজাত ফুটে,
সত্যই অধরে সুধা সুর অঙ্গনার,
বুঝিলাম এতদিনে-বুঝি নাই আর

কুম
#
আবার গাইল বীণা তাল মান লয়,
কহিলাম কথাগুলি প্রগল্‌ভতাময়,
কহিলাম কথাগুলি,
মনের কপাট খুলি,
আবার কোমল কণ্ঠ মন্দীভূত হয় ।
কি সুন্দর সরলার সলজ্জ বিনয় ।
অতি আস্তে ধীরে ধীরে,
আবার কহিল ফিরে,
“মনে না করিও কিছু!” ভুলিবার নয়,
কি সুন্দর সরলার সলজ্জ বিনয় ।
আবার গাইল বীণা তানু মান লয়,
“স্মরণে রাখিও সখা যদি মনে লয়,
অনেক বিশ্বাসে প্রাণ,
তােমাকে করেছি দান,
কি বলিব প্রিয়তম বলিবার নয়,
স্মরণে রাখিও সখা যদি মনে লয়।
করিয়া অনেক আশা,
দিয়াছি এ ভালবাসা,
সরলা নারীর নাকি সদা ভুল হয়।
স্মরণে রাখিও সখা যদি মনে লয়।”

কলঙ্কী শশাঙ্ক।
২
.
।
।
*
=
এই কি সরলা তাের হৃদয় সরল ?
কেমনে ঢলিলি প্রাণে প্রতপ্ত গরল ?
দেখাব চিনিয়ে বুক,
আছে কিনা একটুক,
অনাদর-অবিশ্বাস,“হৃদয়ের তল,
আয় দেখাইব শিরা ছিড়িয় সকল!
শুনিয়া হাসিল প্রিয়া,
বদনে অঞ্চল দিয়া,
অর্ধ-নিমীলিত চারু-নব-নীলােৎপল,
লাজে অবনত মুখে নিরখে ভুতল!
২৯শে মাঘ, ১২৮৫ সাল।
জয়দেবপুর।
L
কলঙ্কী শশাঙ্ক।
১
আজি এ শারদ নিশি—হাস শশধর ।
নিৰ্ম্মেঘ-নবীন-নীল অমল অম্বর।
নিরমল হাসি রাশি, মনে প্রাণে ভালবাসি,
আরাে ভালবাসি অই কলঙ্ক সুন্দর,
আজি এ শারদ নিশি-হাস শশধর ।
ভুলিয়ে গিয়েছে প্রাণ, তুমি প্রেম মূর্তিমান,
প্রেমেতে মাখান তব কম কলেবর,
‘কলঙ্কী-শশাঙ্ক প্রেম-উপাধি সুন্দর।

কুম।
উছলিয়া প্রেম পড়ে,
কে বলে সুধাংশু ঝরে,
হৃদয়ে প্রেমের স্রোত বহে নিরন্তর,
ও নহে কলঙ্ক অই প্রেমের মােহর।
২
‘শশাঙ্ক কি মিষ্ট নাম, কে কলঙ্ক কয়?
প্রেমের মিলন—এ যে নামে পরিচয়।
কে দিল বাছিয়া নাম, নামেতেই বুঝিলাম
বুঝিলাম মাের মত তাহারাে হৃদয়,
সেও ভালবাসে শশি তোমারে নিশ্চয়।
প্রাণের সহিত শশি, তােমারে হে ভালবাসি,
তুমি যত প্রিয়তম এত কেহ নয় !
‘শশাঙ্ক’ কি মিষ্ট নাম! কে কলঙ্ক কয়?
ওঠে নাই কোলে যার সােণার হরিণ,
বলুক ‘কলঙ্কী সেই মূখে চিরদিন।
এক দৃষ্টি—অর্ধ পায়, অর্ধেক সম্মুখে চায়,
প্রাণ নেয় প্রাণ দেয় প্রাণে হয় লীন,
চকিত সরল অই সােণার হরিণ।
কি জানি অাবার কম, মুখে হাসি বুকে ভয়,
আধ তার মনে রয়,
এত পরাধীন।
চকিত সরল অই সােণার হরিণ।
৪
শারদ সায়াহ্ন, হাসে প্রকৃতি শ্যামল,
হাসিছে গগন নব-নীল-নিরমল ।

কলঙ্কী শশাঙ্ক।
২৯
ফোটেনি এখনাে তারা,
ফোটো ফোটো করে তারা,
কুটীরে ফুটিল কিবা কিরণ-কোমল,
নহে চন্দ্র, নহে তারা, নহে শতদল !
জনক কুরঙ্গ ওটী,
সুনীল নয়ন দু'টী,
মরি কি লাবণ্যময় চকিত-চঞ্চল ।
শারদ সায়াহ্নে অই নীল উতপল।
দেখেনি যে জন এর নবীন মাধুরী,
চোকের উপরে কিসে প্রাণ করে চুরি!
অথবা সাধিয়ে দেই, তার কিছু দোষ নেই,
সরল হরিণ অই জানে না চাতুরী!
‘এস না, ডাকিছে ওই, এ অনিন্দ কোথা থুই,
পরাণ ভাসিয়া যায়, আহা কি মাধুরী!
সরল হরিণ অই জানে না চাতুরী।
স্বর্গের অমৃতময় সেই এক দিন
চকিত সরল অই সােণার হরিণ।
এ দিকে ও দিকে দোলে, আছে সরসীর কোলে,
মৃণাল কণ্টকে যেন সােণার নলিন।
ছুটিয়া আসিতে চায়, মৃণালে আটকে হায়,
বিষাদ সলিলে অই ভাসে চিরদিন,
মৃণাল কণ্টকে যেন সােণার নলিন।

কুঙ্কুম।
৭
অই যে বিগত দিন পূরব অম্বর,
উজলি উঠিল যবে নব বিভাকর,
অাশার একটী রেখা, ওরি সনে দিয়ে দেখা,
মুহূর্তে ফুটিল শত কিরণ সুন্দর,
উজলি উঠিল যবে নব বিভাকর ।
চেয়ে দেখিলাম ফিরে, হেমময়ী হরিণীরে,
দাঁড়ায়ে ঘরের ছেচে হাসে মনােহর,
প্রাণের হরিণ অই সরল সুন্দর ।
৮
‘পথের মানুষ’—প্রিয়ে! কেন অভিমান ।
মানুষে জানে না দেব পূজার বিধান !
দেবতার যােগ্য যাহা, ভূতলে মিলে না তাহা,
কি দিয়ে তুষিব বল দেবতার প্রাণ,
মরুতে মিলিবে কোথা নন্দন উদ্যান ?
হৃদয়ের মরুভূমি, দেখেছ প্রেয়সি! তুমি,
যা ছিল সম্বল দিছি—শুষ্ক এক প্রাণ!
কোথা পাব পারিজাত কুসুম প্রধান ?
শুনিলাম পুনরায়--কপিল হৃদয়,
“হইবে জীবন যদি একদিন লয়।”
এত প্রেম ভালবাসা, আগে ত জানিনে আহা,
সােণার শরীরে ও যে এত জ্বালা সয়,
শুনিলাম সবিস্ময়ে—কপিল হৃদয়!

কলঙ্কী শশাঙ্ক।
৩১
প্রাণের জীবন্ত যন্ত্র, সাধে যার মহামন্ত্র,
চিনিলাম আজি তারে, নহে সে নিদয়,
প্রেম তার দয়া তার অনন্ত অক্ষয়।
বুঝিলাম আজি অই দেবতার প্রাণ,
প্রেমের অনন্ত উৎস, নহে ও পাষাণ ।
প্রত্যেক আঘাতে বুকে, এক গঙ্গা শত মুখে
ছুটিছে অনন্ত বেগে—বহেনা উজান।
বুঝিলাম আজি অই দেবতার প্রাণ ।
আজি বুঝিয়াছি হায়,
অই ফন্তু গঙ্গা ধায়,
হৃদয়ে অনন্ত স্রোত সদা বেগবান,
প্রেমের অনন্ত উৎস, নহে ও পাষাণ!
আবার বিকালে কালি কি কহিব আর,
সম্মুখে সে হেমময়ী হরিণী আমার ।
এই আসে এই যায়, এই পুনঃ ফিরে চায়,
এই দেখি পুনরায় বুকে অভাগার,
কনক-কলঙ্ক অই কুরঙ্গ আমার !
কি কহিব এক মুখে,
সে মাহেন্দ্ৰ ক্ষণ টুকে
দীনের গলায় আহা মণিময় হার,
কনক-কলঙ্ক অই কুরঙ্গ আমার ।
১২
কি চাহনি চেয়েছিল সলাজ নয়নে,
কি কথা যে কয়েছিল তাও আছে মনে।

৩২
কুঙ্কুম।
বলেছিল বার বার,
জানিনা, জানি না অরি!
লুকা’য়ে রেখেছি তাহা পরাণের কোণে,
যতদিন বেঁচে থাকি রহিবেক মনে!
সে সলাজ হাসিমুখ, কিবা লাল টু টু !
খেয়েছি স্বর্গের সুধা প্রত্যেক চুম্বনে,
যতদিন বেঁচে থাকি রহিবেক মনে!
উন্মত্ত ঝটিকা দিয়া, আস্ফালিয়া—আন্দোলিয়া,
ঢেলে দিল পদ্মবন প্রতি আলিঙ্গনে।
যত দিন বেঁচে থাকি রহিবেক মনে।
কত পুণ্য শশধর জানিনা তােমার,
ও কলঙ্ক অঙ্ক-ফল কত তপস্যার ?
বল যদি প্রাণ দিলে, শশাঙ্ক, কলঙ্ক, মিলে
পাই কিনা দেখি তবে দিয়ে একবার,
কনক-কলঙ্ক অই কুরঙ্গ আমার ।
আরেক মুহূর্ত সুখে,
ও কলঙ্ক ধরি বুকে,
এ জীবন স্বর্গসুখ বেশি নহে আর।
কনক-কলঙ্ক অই কুরঙ্গ আমার ।
১৪
কত পুণ্য শশধর জানিনা তােমার,
একটী রাহুর বল কত ভয় আর ?
এ পাপ অবনী তলে, শত রাহু ভ্রমে ছলে,
তবুও কিছুই ভয় করি না যে তার,
শশাঙ্ক, সশঙ্ক নয় হৃদয় আমার।

বহুদিনেব পর দেখা ।
তুমি ত অনন্ত সুখে, ও কলঙ্ক ধরি বুকে,
স্বর্গের গগন রাজ্যে ভ্রম অনিবার,
চুইতে পারে না তােমা পাপের সংসার।
ওঠে নাই কোলে যার সােণার হরিণ,
বলুক ‘কলঙ্কী সেই মূখে চিরদিন।
সেই সরসীর তীরে, দেখেনি যে হরিণীরে
প্রেমপূর্ণ দু’নয়ন—লাজ ভয় হীন।
সেই লতা-গুল্মবনে,
যা রাখিল সংগােপনে,
চকিত সরল অই সােণার হরিণ।
দেখিয়া-না শুনিয়া, হাসিয়া-না কাদিয়া,
বলুক ‘কলঙ্কী’ সেই মূর্থে চিরদিন,
ওঠে নাই কোলে যার সােণার হরিণ।
১২৮৬ সাল ;
জয়দেবপুর, ঢাকা।
বহুদিনের পর দেখা।
বহুদিন হ’ল—ভাল নাহি পড়ে মনে,
খেলেছি শৈশবে এক বালিকার সনে !
বাগানে লইয়া তারে পরায়েছি ফুল,
থােপায় গুজিয়া দিছি মঞ্জরী মুকুল।
বকুলে গাঁথিয়া দিছি, চারু চন্দ্রহার,
গলায় দিয়েছি মালা নব মল্লিকার।

৩৪
কুঙ্কুম।
সপত্র গােলাপ ফুল অর্ধ বিকশিত,
শ্রবণ যুগলে তার বড় শােভা দিত।
এক দিন দেখিতে সে শােভা মনােহর,
চাহিয়া হয়েছি সেই মুখের উপর,
অকস্মাৎ জিজ্ঞাসিল বালিকা সরলা,
স্থির অবিচল যেন চঞ্চলা চপলা,
“কি দেখেছ একদৃষ্টে চাহিয়া অমন ?”
কহিলাম দেখি তব চারু চন্দ্রানন।
লাজের আবেশে মৃদু মধুর হাসিল,
ছুটিয়া আসিয়া বুকে মুখ লুকাইল!
কিন্তু সে সুখের দিন বেশী দিন নয়,
অপরের সনে তার হ’ল পরিণয় !
আর সে বাগানে নাহি এল এক দিন,
কত ফুল কত মালা হইল মলিন ।
কি বলিব শুধু সেই শুষ্ক ফুল দলে,
ভাসায়েছি একা বসি নয়নের জলে।
দিন গেল মাস গেল,—ফিরিল না আর,
সেই-দেখা শেষ-দেখা হইল তাহার ।
বহু দিন হ’ল,ভাল মনে নাহি জাগে,
কে তুমি সরলে ! যেন চিনি চিনি লাগে ?
৮ই আষাঢ়, ১২৯৫ সাল।
কলিকাতা।

জোনাকী
জোনাকি। আলােক নিয়া নিশীথে নির্জনে,
খুজিয়া বেড়াস্ কি রে এখানে ওখানে?
এক দিন-দুই দিন-তিন দিন নয়,
নিতি নিতি দেখি তােরে এমনি সময় ।
পথে ঘাটে মাঠে বনে তরু গুল্ম মূলে,
তটিনীর শ্যাম শুটে সরসীর কূলে।
ঝোপে ঝাঁপে দুৰ্বাদলে শ্যাম তৃণ ঘাসে,
যেখানে ফুটিয়া ফুল লতা:বউ হাসে।
কি খুজিস্ একাকী সে নিশীথে নির্জনে,
হারালি এমন কিরে লতা গুল্ম বনে?
রত্ন কি সে? ধন কি সে ? কহিমুর মণি ?
সামান্য পতঙ্গ তার সম্পদ এমনি ?
অসম্ভব-মিছে কথা! উহা কিছু নয়,
অথচ কারণ গুরু দেখে বােধ হয়।
নতুবা দিবসে নাহি করি অন্বেষণ,
চুরি করি রে’তে কেন খুজি এমন?
বুঝেছিরে, প্রাণটীরে-কপাল আমার !
হাসিতে হারালি জানি কোন্ লতিকার !
জাগন্ত জগতে দিনে কলঙ্কে লজ্জায়,
পারিয়া অন্বেষিতে মৰ্ম্ম বেদনায়,
নিশীথে নির্জনে তাই তাহাদের কাছে,

৩৬
কুঙ্কম।
খুজিস্ প্রাণটা কার পায় পড়ে আছে !
কিন্তু মানবের নামে ধিক্‌ শতবার,
এমন সৌভাগ্য কভু ঘটে না তাহার।
কি দিবসে কি নিশিতে প্রভাতে সন্ধ্যায়,
সাধ্য কি কাহারাে কাছে প্রাণ চে’তে যায় ?
নিশিতে তারকা দেখি দিনে দিবাকর,
মাসান্তে দেখিতে পাই পূর্ণ শশধর!
বসন্ত পূর্ণিমা দেখি বর্ষে একদিন,
তাহার অধিক তারে দেখিতে কঠিন?
সেই শ্যাম সন্ধ্যাবেলা-শ্যামল পুকুর,
শ্যামার সুবর্ণ-মূৰ্ত্তি, হাসি সুমধুর !
কষিয়া হৃদয়ে তার রাখিলাম রেখা,
লুকাইয়া সাবধানে দেখিলাম একা ।
কিন্তু আর এ জীবনে হলনা কখন,
পরখি দেখি যে সেই কষিত কাঞ্চন।
জলের কলসী কক্ষে না দেখিনু ফিরা,
লইয়া অমৃত-কুম্ভ গেল যে ইন্দিরা !
সেই দিন বসন্তের পূর্ণ চন্দ্র চাপ,
পরাণে ফুটিয়াছিল সােণার গােলাপ।
আজিও দেখিতে তারে হইয়ে অস্থির,
সেই ঘাটে চেয়ে থাকি সেই সরসীর
তাহার চরণ-স্পৃষ্ট তীরের সে ধূলি,
দুই হাতে বুকে মাখি আকুলি বেকুলি

তােমার আমার।
কিন্তু তার সনে দেখা হইল না আর,
কারে জিজ্ঞাসিব পাণ পেয়েছে আমার ।
মাথা খা, পায় পড়ি, বা জোনাকি,
কে করিল প্রাণ চুরি দেখেছিস নাকি?
১৫ই আষাঢ়-১২৯১ সাল ;
ময়মনসিংহ।
তোমার আমার ।
১
দেবি? তােমার আমার,
কুমুদ সলিলে ভাসে, শশধর নীলাকাশে
বিষাদে মলিন মুখ চির অন্ধকার।
বঞ্চিত মিলন সুখে, সঞ্চিত বিরহ বুকে,
অপূর্ণ আশার পূর্ণ ছবি দু’জনার,
প্রিয়ে, তােমার আমার ।
২
দেবি, তােমার আমার,
অই যে পাষাণময়, শশাতে গারাে-গিরিচয়,
গগন ভেদিয়া শির উঠিয়াছে যার,
আমরা উহারি সম, দুজনেই নিরমম,
কঠিন কর্কশ প্রাণ দেখ দু’জনায়,
প্রিয়ে, তােমার আমার।

দেবি, তোমার আমার ।
ভীষণ সাহারা যথা, নাহি তরু তৃণ লতা,
ধূ ধূ করে বালুরাশি অনন্ত অপার, -
নাহি বারি-বিন্দু লেশ, সৰ্ব্বনেশে মরুদেশ,
মরীচিকা মাখা সেই প্রাণে দুজনার,
প্রিয়ে, তােমার আমার!
৪
দেবি, তােমার আমার !
স্রোত প্রতিকূল বাতে, ভীষণ তরঙ্গাঘাতে,
আছাড়ে আছড়ে যথা ভাঙ্গে পারার,
আপনি আপন বুকে, লুঠিয়া পড়ে গাে দুখে,
আকুল উন্মত্ত সেই চিত্ত দু’জনার,
প্রিয়ে, তেমার আমার।
দেবি, তােমার আমার।
সুন্দর সােণার ছবি, উঠিলে ও রাঙ্গা রকি,
গ্রাসে গাে জগত যথা ঘাের অন্ধকার,
হারায়ে গিয়েছি পথ, নাহি ভূত ভবিষ্যৎ
তেমনি জীবন আজি দেখ দু’জনার,
প্রিয়ে, তােমার আমার ।
দেবি, তােমার আমার।
যে ভূজব্দ চয়, ফণ। বিস্তারিয়া রয়,

তোমার আমার।
একটু দংশিলে প্রাণ বাঁচেনা কাহার,
গুর চেয়ে হলাহলে, সতত হৃদয় জলে,
তবুও মরণ নাই দেখ দু’জনার,
প্রিয়ে, তােমার আমার !
৭
দেৰি, তােমার আমার।
অই যে ক্ষিপ্তের মত, জলন্ত জ্যোতিষ্ক কত,
অনন্ত গগন রাজ্যে ভ্রমে অনিবার,
আমরাও হরি । হরি! তেমনি সংসার করি,
হৃৎপিণ্ড উল্কাপিণ্ড জ্বলে দু’জনার,
প্রিয়ে, তােমার আমার ।
দেবি, তােমার আমার ।
অই যে জলদচয়, ব্যাপিয়া গগনময়,
কাঁদিয়া বরষে কত আখি-নীর-ধার,
আমরা তেমনি দুখে, নিত্য কঁদি অশ্রুমুখে,
লুকায়ে অশনি বুকে রেখে দু’জনার,
প্রিয়ে, তােমার আমার
দেবি, তােমার আমার ।
এত গাে প্রণয় নহে, প্রণয়ে কি প্রাণ দহে,
হৃদয় পুড়িয়া এযে হ’ল ছারখার,
বুঝিতে পারিনা হায়, কিসে এ যাতনা যায়,
লিছে পত সম প্রাণ দুজনার,
প্রিয়ে, তােমার আমার!
.

৪৫
ফুঙ্কন
দেবি, তােমার আমার।
আশা ভালকস ষত, সকলি জন্মের মত,
অপূর্ণ রহিল, পূর্ণ হইল না আর,
শুধু হাহাকার করি, অলি পুড়িয়া মরি,
আর ত হবেন আহা দেখা দু’জনার,
প্রিয়ে, তােমার আমার ।
৮ই চৈত্র--১২৯৩ সাল
শীতলপুর বাগানবাটী, শেরপুর, ময়মনসিংহ।
“পত্র লিখিও।”
প্রিয় দেবি। কি লিখিব ? দুইটী কথায়,
প্রাণের এ ছঃখ রাশি লিখা নাকি যায় ?
তুমি ত অসূৰ্যম্পশ্যা,
গৃহকোণে অমাবস্যা ।
দেখিলে দেখেছ রবি আপনার পায়।
দর্পণে চাহিয়া যদি,
দেখে থাক সুধানিধি,
আপনার সুধাময় আনন আভায় !
চাহিয়া গগনক্ষে,
দেখ নাই লক্ষে লক্ষে,
জ্বলে কত উল্কাপিণ্ড, হায় হায় হায়,
কি লিখিব প্রিয়তমে, দুইটী কথায় ?
প্রাণের এ দুখ রাশি কি লিখিব হায়,
দেখনি পৰ্বত রূপ,
প্রকাণ্ড পাষাণ স্তুপ,

পত্র লিখিও। ৪১ বিরাট বিশাল বপু, গগন মাথায়। তবে এই দুঃখ ভার, কি দিয়ে বুঝাব আর, কি লিখিৰ প্রিয়দেধি ! দুইটা কথায়, প্রাণের যন্ত্রণা এত বুঝান কি যায় ? বলনা কেমনে তবে লিখিব তােমায় ? যে অপার দুঃখরাশি, জীবন ফেলেছে গ্রাসি, যে গভীর শােকসিন্ধু উছলে হিয়ায়, দেখনি সরলা যদি, সীমান্ত সে জলধি, কেমন সে মহাশূন্যে মিলিয়াছে হায়, ভীষণ তরঙ্গ ভঙ্গে, কেমনে সে মহারঙ্গে গগনের চন্দ্র সূর্য গ্রাসিবারে চায় । দেখিলে প্রিয়তমে, তাকি লিখা যায় ? ৪ বলনা কেমনে তবে লিখিব তােমায় ? দেখিলে মরুভূমি, কেমনে বুঝিবে তুমি, কেমনে জ্বলিছে ধুধু চিত্ত নিরাশায়। কেমন সে মরীচিকা, বিষমাখা বহ্নিশিখা, বিনােদ বাসন্তী বেশে মােহে বঞ্চনায়। না দেখিলে মরুভূমি, কি লিখা যায় ? বলনা কেমনে দেৰি লিখিব তােমায় ? দেখনি আগ্নেয়গিরি পবািণের বক্ষ চিৰি, কেমনে আনল তােত উছলিয়া যায়।

৪২ কুঙ্কুম। প্রাণের সে ভস্ম ছাই বাহিরিতে দেখ নাই, আবরিয়া রবি শশী গগনের গায় । যে গম্ভীর পরিতাপে, বিশাল ব্ৰহ্মাণ্ড কাপে, আহা সে পাষাণ-ভেদী বিলাপ তােমায়, বলনা কেমনে লিখি—ঐকি লিখা যায় ? বলনা কেমনে দেবি। লিখিব তােমায় ? এ দূর পর্বত দেশে, এ বিজন বনবাসে, এই যে একাকী বসি গভীর নিশায়, নিমগ্ন তোমার ধ্যানে, জ্বলন্ত আকাঙ্ক্ষা প্রাণে, আকুল হৃদয়ে দেখি শশী অস্ত যায় ! বাগানের চারি পাশে, দৌড়িয়া আঁধার আসে, ভীষণ রাক্ষস যেন গ্রাসিতে আমায় ! এ আকাঙ্ক্ষা—এই ধ্যান, ও দগ্ধ জ্বলন্ত প্রাণ, অস্তমান শশিকরে মাখা হায় হায়, ওই নিশি অবসানে,একি লিখা যায় ? এই নিশি অবসানে প্রেয়সি ! তােমায়, ছাড়িয়া এসেছি কবে, লেখা দেখি নীল নভে, অস্তমান শশিকরে, স্তব্ধ তারকায়! প্রভাতের এ বাতাসে, সে দীর্ঘ নিশ্বাস আসে, উদাস করিয়া আহা চিত্ত নিরাশায় । দেখি সেই অশ্রুজলে, মাখা এই দুৰ্বাদলে, জনমের মত সেই অন্তিম বিদায়। এই যেন সেই নিশি যায় যায় যায় ।

পত্র লিখিও। ৪৩ ৮ অন্তিম বিদায় সেই, নিশি যায় যায় । কতবার কোলে রাখি, কতবার বুকে মাথি, পাইনা কিছুতে শান্তি রাখিয়া কোথায় ? পারিনা থাকিতে আর, তবু ফিরে শতবার, চুম্বিয়াছি চখে মুখে আকুলে তােমায়! আছে কি এমন কথা, লিখিতে এ ব্যাকুলতা প্রাণের জ্বলন্ত ব্যথা-হায় হায় হায় ! বলনা কেমনে তবে লিখিব তােমায় ? ৯ অন্তিম বিদায় সেই--নিশি যায় যায়। প্রতিদিন নিশি শেষে, দেখি সে মােহিনী বেশে, অপূৰ্ব অমর জ্যোতি আসন্ন-উষায়। অন্য মনে অকস্মাৎ, অমনি বাড়াই হাত, আদরে লইতে দেবি, হৃদয়ে তােমায়। কিন্তু ও আকাশ ধরি, বৃথা আলিঙ্গন করি, হৃদয় ভরিয়া যায় মহাশূন্যতায় । জানিনা এমন ভাষা, এ বিফল শূন্য আশা, বুকভরা এ পিপাসা কিসে লিখা যায়। বলনা কেমনে তবে লিখিব তােমায় ? বলনা কেমনে দেবি! লিখিব তােমায় ? দুই জনে দুই পারে, কেহ নাহি দেখি কারে, ণি বারিধি রাখে দুরে দু’জনায় । ।

৪৪
কুম।
যায় না পাখীটী উড়ে,
তােমার ও দেবপুরে,
ভগবান বাম হলে কি করি উপায় ?
শুধু স্বপনের মত,
জীবন করিব গত,
তােমারি—তােমারি ধ্যানে, তােমারি পূজায় !
বিসর্জন নাহি অার ·
হৌক্‌ মৃত্যু শতবার,
এ অপূর্ণ মহাপূজা অমর আত্মায়,
এ অনন্ত মহাব্রত,একি লিখা যায় ?
১০ই আশ্বিন, ১২৯৪ সাল ;
শীতলপুর বাগানবাটী, শেরপুর ।
মশা।
বাগানে বাগানে ঘুরে, এ ফুলে ও ফুলে উড়ে,
মধুর পিপাসী অলি মধুপান করিয়া,
নিশিতে ফুলের বুকে, লাগাইয়া মুখে মুখে,
বিবশে সে থাকে বটে মাতােয়ারা পড়িয়া।
শরতে যামিনী কালে, বেষ্টিত তারকা জালে,
উঠিলে সােণার শশী মৃদু মৃদু হাসিয়া,
অনন্ত গগন তলে, সুধা পিয়ে কুতুহলে,
চঞ্চল চকোর ছােটে সে অনন্তে ভাসিয়া।
বরষার নব ঘন, করি মৃদু গরজন,
নীল রঙে নীলাকাশ ফেলে যবে ছাইয়া,
নব জল পিপাসায়, আদে চাতক ধায়,
‘দে জল দে জল’ বলি মন সুখে গাইয়া !

ছবি।
৪
কিন্তু হে রসিক মশা, কুসুমের কোলে বসা,
সামান্য সুধাংশু অই অবহেলা করিয়া,
জক্ষেপে চাহনা ফিরে, চাহনা নীরদ নীরে,
বর্ষে যে জ্যোৎস্না জল, ফুল পড়ে ঝরিয়া ।
তুমি করি প্রাণপণ, (লােকে বলে পণ পণ)
বাড়ী বাড়ী কোণে কোণে সদা ফির ঘুরিয়া,
ফুলের অধিক শােভা, চাদ চেয়ে মনােলােভা,
দেখিলে যুবতী মুখ চুমাে খাও উড়িয়া !
কিন্তু দুর্বিপাকে বটে, কখনাে মরণ ঘটে-
সুধা কে ছাড়িয়া থাকে সুদর্শনে ডরিয়া ?
সুরেন্দ্র ইন্দ্রও চায়, সে আননে যদি পায়,
একটা চুম্বন তার শতবার মরিয়া ।
২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১২৯০ সাল ,
কলিকা।
ছবি ।
১
কি চিত্র একেছ তুমি ধন্য চিত্রকর,
কত ভাব কত ভাষা, কত স্নেহ ভালবাসা,
মথিয়া তুলিলে তুমি এরূপ সুন্দর।
প্রতি রেখা প্রতি টানে, ভাসা’য়ে বাহিরে আনে,
কি সুখ উহার প্রাণে খেলে নিরন্তর।

কুঙ্কুম।
ওরি বুকে মেখে তুলি, দিয়েছিলে টান গুলি ?
নহে কি অমন ছবি ওঠে মনােহর ?
জানিনা এমন ভাষা, অই ভঙ্গী—অই হাস,
চম্পক-আঙ্গুলে
টিপে পদ্ম-পয়ােধর ।
কোলে নিয়ে শিশু ছেলে, দেয় তার মুখে ঠেলে,
খাইয়া কমল সুধা হাসে শশধর!
জানিনা এমন ভাষা লিখিতে সুন্দর ?
পশ্চিমে কোমল রবি হেসে অস্ত যায়,
লাবণ্য সােণার থালা, প্রেমের পুণ্যের ডালা,
ডুবিল জীবনে কার সােণালী-সন্ধ্যায় ।
সে রূপ—সে জ্যোতিকণা, কারাে মুখে দেখি না,
ভুলেছে জগৎ তারে হায় হায় হায় !
না না, ও সােণা-মেঘে, সে হাসি রয়েছে লেগে,
অই যে কোমল নীল আকাশের গায় ।
মেঘ কি ভুলিতে পারে, এত প্রেম একেবারে,
জড়িত জীবনে যাহা কণায় কণায় ?
যদিও
প্রেমের পবিত্র ছবি,
নিষ্ঠুর জগৎ যদি ভুলেছে তাহায়,
এত প্রেম একেবারে, সে ত না ভুলিতে পারে,
অই যে সে বুক ভরা হাসি দেখা যায়।
মরিলেও হাসে প্রেম সােণালীসন্ধ্যায়।
ডুবেছে রবি,

ছবি।
সােণাসন্ধ্যা সাের্ণামেঘে সুনীল আকাশে,
শরতের সােণাশশী চুপি দিয়া হাসে।
ক্ষুদ্র ও কুটীর দ্বারে ক্ষুদ্র আঙ্গিনায়,
সােণার সমুদ্র দেখে উছলিয়া যায়।
সােণার যৌবনে ফোটা সােণার কমল,
কোলে সে সােণার শিও হাসে খল খল।
সােণামুখে চুঙ্গে শিশু এক পয়াের,
সােণা হাতে চুচুকাগ্ৰ খুটিছে অপর !
দেখিয়া সােণার শশী ভাবিছে আকাশে,
কতই আনন্দে যেন আশা অভিলাষে।
কত পুণ্য কত ধর্ম কত তপস্যায়,
অমন সােণার পদ্মে মধু খাওয়া যায় ?
৪
বেলী যুই ফোটে নাই কুটীরের পাশে,
কেবল সােণার হাসি ঝিঙ্গা ফুল হাসে।
ছায়াময় ঝােপ ঝাপ চারি দিকে তার,
ফুটিছে সােণার কণা জোনাকীর স্বার।
মাঝে তার ফুটে আছে সােণার কমল,
কোলে সে সােণার শিশু হাসে খল খল!
বিফলে বহিয়া যায় সােণার জোয়ার,
কে দেখিবে ? ঘরে নাই সােণা তার।

কুম।
পূরবে দু’পেয়ে পথ আমতল দিয়া,
বাগানের অন্ধকারে রয়েছে ঢাকিয়া
এই পথে ধীরে ধীরে আসিছে পথিক,
মাথার উপরে তার ডাকিতেছে পিক,
“উহু। উহু! কি কঠিন পুরুষের প্রাণ,
গেলেনা আসিতে জানে কেমন পাষাণ
উপর আকাশে এক পাখী যায় গেয়ে,
“চো গেল পথিকের পথ চেয়ে চেয়ে !”
দয়েল বলিছে ঠারে শিশু দিয়া তায়,
“কিছুই বলল না, শেষে পলাবে লজ্জায় !
শশধর হেসে বলে “সাধ্য আছে কার,
দেখিলে এ রূপরাশি যাইবে আবার ?”
পথিক আসিতে চায় চলেনা চরণ,
কি যেন আনন্দে তার ভুলে গেছে মন।
পথিক আসিতে চায় পথ নাহি পায়,
নয়ন ভুলিয়ে যেন রয়েছে কোথায় ?
কোথা গেছে চোক্ তার কোথা গেছে মন,
কে কোথা ইন্দ্রিয়গণ করেছে গমন।
কুড়ায়ে আনিতে যেন মাহি পারে আর,
জীবনে হয়েছে হেন মৃতের আকার !
নিৰ্বাক্‌ নিষ্প স্তব্ধ স্থির অবিচল,
দাঁড়ায়ে একটী যেন পাষাণ পুত্তল।

ছবি
৪৯
আবার মাথায় পরে আমের পল্লব,
নাড়িল একটী পাখী করি কলরব
গাইল একটী মেয়ে দূরে তার সনে,
“আম গাছে বৈয়া লাে,
সােণা পাখী ডাকিল।
নিল একটী চন্দ্র থাকিয়া গগনে।
একটী রমণী ভুলে, চাহিল নয়ন তুলে,
একটী নিশ্বাস দীর্ঘ পড়িল কেমনে!
বুঝিনা পাখীর ভাষা, বুঝিনা নারীর আশা,
কি বলিল কি বুঝিল তারা দুই জনে।
সামান্য বালিকা মেয়ে, সেও যে বুঝিল গেয়ে,
পুরুষ এত কি বােকা? হাসিল গগনে,
বেড়িয়া একটী চন্দ্র তারা শত জনে।
ফিরে না নারীর আর নয়ন যুগল,
পড়ে না আঁখির পাতা স্থির অবিচল।
প্রেমের অনন্ত সিন্ধু, সে নয়নে এক বিন্দু,
গড়ায়ে পড়িল যেন শিশিরের জল,
পড়িল সুন্দর বুকে, শিশুর সুন্দর মুখে,
একত্রে ভিজিল দুই শশী শতদল ।
অশ্রুসিক্ত স্তনভার, শিশু না চুম্বিল আর,
দুহিল মায়ের মুখ চাহিয়া কেবল।
আবার পড়িল বিন্দু, দুইটী বদন ইচ্ছ

কুঙ্কুম।
হাসিল, ভাসিল দুই শিশু হিমাচল,
যমুনা জাহ্নবী স্রোতে-পবিত্ৰ নিৰ্ম্মল ।
ফিরে না নারীর তবু নয়ন যুগল,
চেয়ে আছে অনিমিখে, আঁধার পথের দিকে,
জাগ্ৰত স্বপনে নাকি এত কুতূহল ?
এত আশা জাগে মনে, এত আশঙ্কার সনে,
জ্বলিছে নিবিছে যেন জোনাকীর দল।
ছায়ায় আঁকিছে বুক, ছায়ায় আঁকিছে মুখ,
ছায়ায় আঁকিছে তার শরীর সকল !
কিন্তু সে পাষাণময়, প্রাণ কি ছায়ায় হয় ?
ছায়ায় মিশিছে ছায়া—তন বিফল ।
জাগ্রত স্বপনে নাকি এত কুতুহল ?
এই দৃশ্য মহাশােভা—মহা মহােৎসক,
তিনটী বছরে আজ প্রাণে অনুভব!
প্রকৃতি দেখেনি আর যুগান্তে কখন,
এত দূরে এত গাঢ় দৃঢ় আলিঙ্গন !
ভেঙ্গে যায় বুক যেন ভেঙ্গে যায় হাড়,
রেণু রেণু হয়ে যায় প্রাণ দুজনার।
চুম্বিতে দোহারে দোহে করিতেছে পান,
কি আকাঙ্ক্ষা অগ্নিময় শিখা লেলিহান্।
দেখিতে দোহারে দোহে করে ভস্মময়,
কি ভস্মলােচন প্রেম, কাম ভন্ম হয়।

ঘােমটা।
৫১
ধন্ঠ চিত্রকর, তুমি কি একেছ ছবি,
কল্পনা করিতে এত নাহি জানে কবি
২৪শে বৈশাখ, ১২৯৫ সাল,
কলিকাতা।
ঘােমটা।
রমণীর চারুচন্দ্র পবিত্র আনন,
কেন তুমি আবরিয়ে রয়েছ ঘােমটা,
দেখিতে না দেও তার লাবণ্য কেমন,
ভুবনমােহন সেই নব রূপ ছটা !
দিবা নিশি একাকী সে দেখ চাদ মুখ,
তথাপি আকাঙ্ক্ষা নাহি পূরে একটুক।
১
তুমি হিংসুকের শেষ বড়ই নিষ্ঠুর,
পরে যে দেখিবে তব নাহি সয় প্রাণে,
তুমি হে রাহুর চেয়ে ভয়ানক কুর,
রাহু ত গিলিয়া পুনঃ উগারিতে জানে।
গিলিলে নারীর মুখ তুমি দুরাচার,
যৌবন থাকিতে তাহা নাহি ছাড় আর!
২
দেও হে দেখিব আজ বড় সাধ মনে,
ও নলিন রূপরাশি— অমলিন কাচ।

কুঙ্কুম।
ভয় কর কি জানি কি যদি দরশনে,
নয়নে তুলিয়ে তার নিয়ে যাই ছাঁচ।
নিব না, দেখিব শুধু আমার এ দাগে,
তােমার ও মুখ খানি লাগে কি না লাগে ?
হারায়ে গিয়েছি তারে বহু দিন গত,
পরাণ আকুল বড় দেখিতে তাহারে,
টলমল সে কমল নয়ন আনত,
সুইয়ে পড়েছে যেন স্নেহ লাজ ভারে?
দেখিলেই ঢাকামুখ মনে করি সেই,
লুকায়ে রয়েছে বুঝি এই—এই—এই।
সন্দেহ ভাঙ্গিয়া দেওভেঙ্গে দেও ভুল,
অপবিত্র হইবে না দেখিলে কখন,
পৃথিবীর পাপী তাপী কত দেখে ফুল,
দেখে রবি, দেখে শশী, গ্রহ তারাগণ।
সেই জ্যোতি সেই কান্তি নব পরিমল,
সকলি তেমনি থাকে পবিত্র উজ্জ্বল।
একটু সরনা তুমি আমি দেখে যাই,
এত দেখ নিশি দিন পূরে না কি আশা ?
অথবা তােমারে মিছে দোষ দেই ভাই,
রমণীর মুখে জাগে ভীক্ষের পিপাসা ?

আইভি লতা।
রাহু যে চাঁদেরে ছাড়ে শুধু চাঁদ বলে,
সেও না ছাড়িত কভু চাদ মুখ হ'লে!
২৩শে বৈশাখ, ১২৯৫ সাল ;
কলিকাতা।
আইভি লতা।
আইভি লতা।
কত স্নেহ মমতায়, হৃদয় ছাইয়া যায়,
রাখেনা একটু ফাক, একটু ব্যথা।
মনে করে দেয় তার স্নেহ মমতা !
আইভি লতা!
স্বর্গীয় সরল প্রাণে, শুধু ভালবাসা জানে,
ফুল ফুটে নাহি হাসে দেমা’কে কথা !
মনে করে দেয় তার স্নেহ মমতা !
আইভি লতা !
পােড়া মাটী নাহি বাছে, বেয়ে উঠে মরা গাছে,
এমন উদার প্রাণ দেখেছ কোথা ?
শ্যামরূপে মাখা যেন কত মমল !
৪
আইভি লতা!
অলি না ছলিয়া যায়, ফুলে মধু নাহি খায়,
পবিত্র সরল শুদ্ধ দেবতা যথা!
মনে করে দেয় তার স্নেহ মমতা !

৫৪
কুঙ্কন।
আইভি লতা।
নাহি জানে অভিমান, সতত প্রসন্ন প্রাণ,
আছে বিষন্ন ভাব নাহি ছলতা!
ভুলিতে পারিনা সেই পুরানাে কথা !
আইভি লতা।
সাদা সিদে সােজা সাজ, সাদা সিদে বােঝা কাষ,
বসন্তে বিলাস নাই, শীতে জড়তা ।
মনে পড়ে কবে তারে দেখেছি কোথা!
৭
আইভি লতা।
যখনি দেখিতে পাই, ভাবে ভাের সর্বদাই,
বয়ান ভুলিয়া গেছে বলিতে কথা !
নয়নে গলিয়া পড়ে স্নেহ মমতা !
আইভি লতা!
বুকে টেকে বুকে থেকে, চমকে স্বপন দেখে,
তরাসে শিহরে উঠে হরিণী যথা ।
কোথা সেই দেবপুর, কোথা দেবতা।
১৯শে বৈশাখ, ১২৯৫ সাল ;
কলিকাতা।

পূর্ণ
বিকশিত।
১
“সুনীল গগনে আজি পূর্ণ বিকশিত,
হাসি হাসি মুখে শশী কেন প্রকাশিত ?
কেন এই জ্যোৎস্না রাশি,
কি হেতু পুলকে ভাসি,
নীরব প্রকৃতি রাণী এত উদ্ভাসিত ?”
সুন্দর শরত চন্দ্র নির্মল আকাশে,
পূবে—পুকুরের পারে,
অন্ধকার বাঁশ ঝাড়ে,
বুক চিরে হাসি তার চুরি করে আসে।
মড় মড়, ডাঙ্গে হাড়,
তবু থে’ নাহি তার,
তবু দোলে বাঁশ ঝাড় আনন্দে বাতাসে !
এ হাসি মরম-ছেদী,
এ হাসি পরাণ-ভেদী,
আহাহা! এমন হাসি কে না ভালবাসে?
সুন্দর শরত চন্দ্র নির্মল আকাশে।
আমি কলা নারিকেল কটাল সুপারী,
চারি দিকে আছে সব সারি সারি সারি ।
আরাে আছে যথা তথা,
কত তরু কত লতা,
স্বর্গের একটী যেন গৃহস্থের বাড়ী।
কোণায় দাড়িম গাছে,
শ্যামা লতা উঠিয়াছে,
লইয়া ডােগাটী হাতে দাঁড়ায়ে সুন্দরী।

। কুম। সম্মুখে বাঁশের ঝাড়, বুক ভাঙ্গে হাসি তার, চাতক চমকি উঠে হাহাকার করি দেখেনা শশানেনা তারা বােঝেনা সুন্দরী। ৪ ‘ভুবন উজলা লইয়া ডােগাটী হাতে ভাবিহে সরলা, ভাবিছে চাহিয়া পূবে, জ্যোৎস্নায় আকাশ ডুবে, বােঝেনি সে হতভাগী নিজে ষোলকলা । বােঝেনি তাহার কাছে শিখিতে যে আসিয়াছে, কলঙ্কী শশাঙ্ক হাসি-ভুবন ভুলিয়াছে শশীর সে হাসি ভরা মলা! ৫ সমীর তাহার স্পর্শ এসেছে শিখিতে, যে গিয়াছে গারো-দেশে উদাসী বিদেশী বেশে, তারে গিয়া নিশাকালে শিহরিয়া দিতে। মােহময় স্পর্শ তার, কে শিখিবে সাধ্য কার, আপনি মােহিত বায়ু নিকটে অসিতে। আঁচলে লুটায় পায়, অলস অবশ কায়, বােঝেনি সে ‘হাবী তারে শিখাইয়া দিতে। সমীর তাহার স্পর্শ এসেছে শিখিতে । তার মধু, তার শােভা, তাহার সৌরভ, শিখিতে তাহার কাছে, কত ফুল ফুটিয়াছে, ফুটেছে বাগানে বনে শােভা অভিনব । করুণা মমতা হে, কোমল শিখে কেহ, শিখে যেন ভালবাসা নিশীথ নীরব।

পূর্ণ বিকশিত।
কারে যেন কোথা থেকে, ফুলে ফুলে বলে ডেকে,
কে যেন স্বপনে আজ করে অনুভব,
তার মধু তার শােভা তাহার সৌরভ!
বােঝেনি প্রকৃতি আজ শিখে তার কাছে,
উদার মহান্ মন,
বিশ্বব্যাপী আলিঙ্গন,
বিশাল গগন বক্ষ প্রসারিয়া আছে !
তরল কোমল হৃদি,
দয়া শিখে জলনিধি,
সৌন্দৰ্য প্ৰভাত সন্ধ্যা শিখে পাছে পাছে ।
দেবতা মানবে আশা,
স্বর্গে মর্ত্যে ভালবাস
না দেখে কেমনে শুধু আঁখি জলে বাঁচে,
কে যেন স্বপনে অজি শিখে তার কাছে।
বােঝেনা জানেনা ‘হাবী’ এত রূপ তার,
জানেনা বােঝেনা হাবী, চোক্‌ তুলে যারে চাবি,
জনমের মত তার হইবে অাঁধার !
যারে দিবি পা ছুইতে, প্রাণ ঢেলে পূজা দিতে,
সেত না আসিবে আহা ফিরে ঘরে আর ।
যাহারে লিখিবি পত্র,
কবিতায় পাঁচ ছত্ত,
লিখিবে সে মহাকাব্য আঁখি জলে তার ।
বল্ দেখি হারে হাবি!
তুই কি বুঝিতে চাৰি,
বারাে-গিরি ভরা তার এত হাহাকার ?
জানেনা বােঝেনা হাবী এত রূপ তার

কুম।
গ
চাহিয়া আকুল মনে আকাশের পানে,
ভাবিছে চাঁদের হাসি,
চাদের এ রূপরাশি
কতই আনন্দে প্রাণ ভাসাইতে জানে।
হাবী ত জানেনা হায়,
নিজ রূপে খাবি খায়,
হেসে বলে মধুকর কুসুমের কাণে।
শুনে সে অলির ভাষা,
দেখে সে ফুলের হাস,
প্রবাসী চাহিয়া আছে পৰ্বত পাষাণে,
জাগ্রত স্বপনে আজ শত সাবধানে।
শুনিছে সে দেবকণ্ঠে স্বর্গীয় সঙ্গীত,
আনন্দে পড়িছে পত্র,
সুধা-মাখা প্রতি ছত্র
“সুনীল গগনে আজি পূর্ণ বিকশিত,
হাসি হাসি মুখে শশী কেন প্রকাশিত ?
কেন এই জ্যোৎস্না রাশি,
কি হেতু পুলকে ভাসি,
নীরব প্রকৃতি রাণী এত উদ্ভাসিত ?”
শুনিয়া অলির ভাষা,
দেখিয়া ফুলের হাসা,
আনন্দে ভুলিয়া গেছে প্রবাসীর চিত,
প্রাণে জাগে প্রেমমূর্তিপূর্ণ বিকশিত।
১ই জ্যৈষ্ঠ-১২৯৫ সাল ;
কলিকাতা।

কি দিবে ?
১
শারদ পূর্ণিমা নিশি নিৰ্ম্মল সুন্দর।
কি যেন আনন্দ ভরা, হাস্যময়ী বসুন্ধরা,
রজত জ্যোৎস্না ঢালা দিক্‌ দিগন্তর ।
নিৰ্ম্মল সুনীলাকাশে, তারা হাসে চন্দ্র হাসে,
কাননে কুসুমে হাসে লতা মনােহর ?
কি যেন কি সরলতা, পরিপূর্ণ যথা তথা,
খুলেছে প্রকৃতি রাণী পুণ্যের নিঝর ।
“পবিত্র পূর্ণিমা নিশি সুন্দর কেমন,
কি আজ তােমারে দিয়া সুখী হবে মন।”
কি যেন স্বর্গীয় তানে, কি যেন পশিল কাণে,
কি যেন ফুটিল প্রাণে সুধা প্রস্রবণ।
“কি আছে তােমারে দিতে, মাটীর এ পৃথিবীতে,”
এ মৃত জগতে আহা অমৃত স্বপন।
সত্যই স্বপন একি আশার ছলনা ?
স্বর্গীয় সুধার নামে শুধু বিড়ম্বনা ?
কি দিবে জাননা দেবি। জাননি কি হয়,
সত্যই জীবন গেল বৃথা তপস্যায় ?

কুম।
সত্যই বােঝনি প্রিয়ে, দেবের হৃদয় দিয়ে,
মর্ত্তের মানুষ আহা কি পাইতে চায়।
এমন অপূর্ণ বুকে, এত অশ্রু-পূর্ণ মুখে,
বােঝনা মানুষ কাঁদে কি যে পিপাসায় ?
বােঝনা সত্যই তবে, ছাই হবে-ভস্ম হবে,
আর যে বাঁচে না প্রাণ এত নিরাশায়।
সত্যই কি এত দিনে বুঝিলেনা হায় ?
৪
কি দিবে জাননা দেবি, ভাবিয়া কাতর ?
ছি ছি ছি। শুনিয়া দেখ হাসে শশধর!
যেখানে আছগাে তুমি, হৌক্‌ না সে মত্তভূমি,
হৌক্‌ না সে বালুভরা মরু ভয়ঙ্কর।
পাহাড় পর্বত রূপে, উন্নত পাষাণ স্তুপে,
নিৰ্ম্মমত কঠিনতা থাকুক বিস্তর।
তথাপি তােমার কাছে, সেখানে সকলি আছে,
যা কিছু সরল সত্য পবিত্র সুন্দর!
সকলি সেখানে আছে যাহা মনােহর।
যেখানে তুমি গাে আছ, আছে.তথা সৰ,
তুমি ফুল, তুমি মধু, তুমিই সৌরভ।
তােমারি সুরক্ত ঠোটে, স্বর্ণ পারিজাত ফোটে,
তােমারি বদনে দেবি, অমৃত উদ্ভব।
লাবণ্যে শশাঙ্ক হাসে মলয়া বহিছে শ্বাসে,
নন নলিন শােড়া করে পরাভব।

কি দিবে ?
৬
তুমি শান্তি সরলতা তুমি পুণ্য পবিত্রতা,
প্রীতির কলপ-লতা--আনন্দ উৎসব।
তুমিই সে অমরের অতুল বিভব !
কি দিবে তুমি গো দেবি প্রিয় প্রাণেশ্বরি।
কি আছে তােমার আর,-হরি। হরি। হরি।
কিবা তুমি চাহ দিতে, কি নাই এ পৃথিবীতে?
ভাবিয়া তােমার কথা হেসে কেঁদে মরি ।
তুমি রত্ন—তুমি খনি, তুমিই আপনি মণি,
কি দিবে আমারে তুমি আপনা পাসরি ?
?
৭
পবিত্ৰ পূর্ণিমা নিশি কেমন সুন্দর,
চকোরেরে সুধা দিয়া,কুমুদেরে ফুটাইয়া,
কি দিবে আমারে শুনে হাসে শশধর।
তরু কোলে লতা হাসে, নীরব অফুট ভাষে,
কুসুম হাসিয়া মরে কোলে মধুকর।
কি তুমি গাে চাহ দিতে, কি নাই এ পৃথিবীতে?
তােমারি চরণে স্বর্গ সেবিছে অমর।
৮
কি দিবে আমারে দেবি। ফিরে পুনরায়,
আর না বলিও হেন কঠিন ভাষায়।
পাষাণ বিদীর্ণ হবে, সাগর শুকায়ে যাবে,
অনল জ্বলিবে শত অনল শিখায়।
বিষে বিষ যাবে ছেয়ে, শশাকের সন্তাপ পেয়ে,
}

৬২
‘কুঙ্কম।
অশনি মূছা যাবে কুসুমের প্রায় !
আর না বলিও দেৰি। কি দিবে আমায়।
অথবা ভাগ্যের দোষে,
নিতান্ত যদ্যপি আহা বুঝিলে না হায়!
এস তবে এস প্রিয়ে, দেই আজি শিখাইয়ে,
ধরার মানুষ মরে কি যে পিপাসায়।
দেও হৃদয়ের রাণি ! কালকূট বিষ আনি,
জ্বলিছে হৃদয় খনি শত যাতনায়।
অঞ্জলি অঞ্জলি ভরি, দেও মুখে পান করি,
আদরে অমৃত সম আকুল তৃষায়!
নিকটে দাঁড়াও এসে দেখে যাই জন্মশেষে,
মরণে রাখিও,-
২৭শে আশ্বিন, ১২৯৩ সাল ;
জয়দেবপুর-ঢাকা।
ক্ষুদ্র তরী।
অই ক্ষুদ্র তরী খানি ধীরে ধীরে যায়,
দুটি পাগল প্রাণ ওরি পিছে ধায়।

ক্ষুদ্র তরী।
নন্ত লহরী সঙ্গে,
তরঙ্গিনী কত রঙ্গে,
ভরল রজত স্রোত পুলকে গড়ায়।
অই ক্ষুদ্র তরী খানি বুকে ভেসে যায় ।
কঠিন কাঠের তরী,
নদী বক্ষ ভেদ করি,
প্রতি দাড় বিক্ষেপণে ছুটিয়া পলায়,
পশ্চাতে রাখিয়া দাগ,যতদুর যায় ?
২
অই ক্ষুদ্র তরী খানি ধীরে ধীরে যায়,
পাগল প্রাণের প্রাণ ওরি পিছে ধায় !
জীবন-প্রবাহে নদী,
দাগ রেখে যায় যদি,
তবুও জলের দাগ জলেই মিশায়,
আবার লহরী রঙ্গে নাচিয়া বেড়ায়।
কঠিনা কাষ্ঠের তরী,
এই বক্ষ ভেদ করি,
তােরললা হৃদয় সনে ভেসে ভেসে যায়,
বিদীর্ণ হৃদ নাহি মিশে পুনরায় ।
অই ক্ষুদ্র তরী খানি ধীরে ধীরে যায়,
পাগল করিল প্রাণ-কেগাে অই নায় ।
প্রতি দাড় বিক্ষেপণে,
যে আঘাত লাগে মনে,

কুফু। যে তরঙ্গ ওঠে মনে বলা নাহি যায়, নদীর নির্জীব জল সম্ভবে কি ? জলময় নদীবক্ষ, এ আঘাত লক্ষ লক্ষ- মুহূর্তে কঁপায়ে জল মুহূর্তে মিশায়, বিদ্যুত আঘাতে বুক ৰিলােড়িয়া যায় । 1 S অই ক্ষুদ্র তরী খানি ধীরে ধীরে যায়, পাগল করিল প্রাণকেগাে অই নায়? তরল সলিল রাশি, সরল রজত হাসি, আঘাতে কাপিয়া নদী হাসে পুনরায়, সন্ধ্যার সৌন্দর্য্য মালা পরিমা গলায়। কিন্তু ও আঘাতগুলি, যে তরঙ্গ দিছে তুলি, প্রতপ্ত শণিত স্রোতে, সহন না যায়, সমস্ত হৃদয় কাপে আগায় গােড়ায় । মনের যে সুখ আশা, প্রাণের যে ভালবাসা, অন্তরের সে পিপাসা ভাঙ্গা ভাঙ্গা প্রায়, কম্পিত জীবনস্রোতে ভাসিয়া বেড়ায়। ৫ অই ক্ষুদ্র তরী খানি ধীরে ধীরে যায়, পশ্চাতে রাখিয়া দাগ-কেগো অই নায় ।

ক্ষুদ্র তরী।
স্বর্ণভানু অস্তাচলে,
কি শােভা জলদ দল,
সােণার আঁচলখানি গগনের গায়,
শীতল মৃদুল সান্ধ্য অনিলে উড়ায় ।
ও তরীর আগে ভাগে,
আকাশে ও শোভা জাগে,
মাের মত পিছে থেকে দেখ পুনরায়,
ধ্ব ধ্বক্ জ্বলে বহ্নি গগনের গায় ।
অই ক্ষুদ্র তরী খানি ধীরে ধীরে যায়,
ফিরে না নয়ন দুটী-কেগাে অই নায় ।
কঠিন মাঝীর প্রাণ,
ঘন দেয় দাড়ে টান,
মনে করি, করি মানা, সরেনা জিহ্বায় ।
কাতর নয়ন দুটী এই দিকে চায় ।
বাসনা সতত প্রাণে,
থাকে তরী অই খানে,
নয়নের পথে পথে ভাসিয়া বেড়ায়,
সায়াহ্ন পবনে অই নদী-নীলিমায় !
৭
অই ক্ষুদ্র তরী খানি ধীরে ধীরে যায়,
ফিরে না নয়ন দুটী,—কেগো অই না ?
দেখিব বলিয়া যারে,
চাহিতেছি বারে বারে,

৬৬
কুম।
এখন তাহারে আর দেখা নাহি যায়,
নয়ন তরণী মাঝে গ্রাম অন্তরায়।
দেখিয়াছি শেষ বার,
লও প্রিয়ে উপহার,
শেষ অশ্রুবিন্দু এই,—কি দিব তােমায় ?
সকলি দিয়াছি অাগে,—বিদায়! বিদায়।
যাই তবে প্রিয়তমে,
ভাবি নাই এজনমে,
সকলি দিয়াছি আগে,-দিব যে তােমায়,
এতদিনে শেষ-অশ্রু–অন্তিম বিদায়।
৭
ই
অই ক্ষুদ্র তরী খানি ধীরে ধীরে যায়,
পুণ্যময় সেই দেশ লাগিবে যুথায়।
ত্রিদিব সৌন্দৰ্য রাশি,
যাইতেছে ভাসি ভাসি,
সায়াহ্ন সমীরে অই নদী-নীলিমায়,
পুণ্যময় সেই দেশ লাগিবে যথায় ।
পুড়ে হ’লল ভস্ম ছাই,
হৃদয়ের কিছু নাই,
নয়নের শেষ-অশ্রু-অন্তিম বিদায় ।
এ জনমে দেখা নাহি হবে পুনরায় ।
১২৮৫ সাল,
জয়দেবপুর-ঢাকা।

কোথায় যাই!
আর ত পারি না আমি নিতে।
করুণার মমতার,
এত বােঝ—এত ভার,
আর আমি পারিনা বহিতে ।
এত দয়া অনুগ্রহ,
কেমনে সহিব কহ,
আর না কুলায় শকতিতে ।
হৃদয় গিয়েছে ভরে,
নয়নে উছলে পড়ে,
ধরেনা ধরেনা অঞ্জলিতে ।
ভাসিয়া যেতেছি হায়,
করুণায় মমতায়,
অলস অবশ সাতারিতে।
২
আমারে দিও না কেহ, আর এ মমতা স্নেহ,
আর অশ্রু পারিনা মুছিতে।
এত স্নেহ মমতায়,
কত যে যাতনা হায়,
যে না পায়, পারেনা বুঝিতে।
জীবনে করেছি শিক্ষা, শুধু ভিক্ষা—শুধু ভিক্ষা,
একটু শিখিনি কারে দিতে।
কত ভাবি দিব যেয়ে, দিতে যেয়ে বসি চেয়ে,
সেত গাে জানেনা ফিরাইতে।
সে জানেনা কণা-বিন্দু, সে দেয় ঢালিয়া সিন্ধু,
বুকে পারিনা রাখিতে।
ছােট

কুঙ্কুম।
!
আরাে বলে দিবে কত, জন্ম জন্ম অবিরত,
রয়েছে অনন্ত আরাে দিতে
শুনিয়া লেগেছে ত্রাস, সর্বনাশ! সর্বনাশ!
এত দিলে পারি কি বাঁচিতে ?
চাহিনা তাহার প্রেম,
হোক হীরা—হৌক হেম,
হউক অমৃত পৃথিবীতে।
কিন্তু গাে তুমিও যদি, ভালবাস নিরবধি,
তবেই ত হইবে ঠেকিতে।
সে’ত আছে দেবভূমি, জগৎ যুড়িয়া তুমি,
কোথা আমি যাব পলাইতে ?
১৭ই বৈশাখ,--১২৯৫ সাল
কলিকাতা।
জারু।
দীন বাঙ্গালীর হায়,
চাকরিই ব্যবসায়,
তাহাও এ অভাগার ভাগ্যে নাহি জুটিল।
ঘরে বঙ্গবালা প্রিয়া, তারেও গহনা দিয়া,
তুষিবারে দুরদৃষ্টে ঘটে নাহি উঠিল ।
প্রেমের প্রতিমা খান, দীনতায় নহে স্নান,
সরল হরিণী সম নাচে কাছে ছুটিয়া !
তরল কৌমুদীরাণী, গােলাপী মাখন খানি,
চায়নি গহনা প্রিয়া কতু মুখ ফুটিয়া !
প্রেয়সীর মুখ খানা,
পাকা দাড়িমের দানা,

সখী।
টল মল করে বসে আছে কোণে বসিয়া।
সরল ফুলের প্রাণে,
সরল ফুলের ঘ্রাণে,
সরল সুধার ধরা পড়ে যেন খসিয়া ।
প্রতিবেশী আছে যারা, সকলেই ধনী তারা,
মেয়ে ছেলে রাখে গায় সােণা রূপা জড়িয়া !
বসায়ে রূপের হাট, উজলে দীঘির ঘাট,
বড় মানুষের মেয়ে কত ভূষা পরিয়া!
রাঙ্গা মুখে রাঙ্গা হাসি, প্রেয়সী কহিল আসি,
“বিধুর গহনাগুলি মরি কিবা সুচারু !”
দিবার যােগ্যতা নাই, আর কি কহিব ছাই,
হাসিয়া কহিনু “প্রিয়ে! সাজিবে কি শজারু ?
১২৮৫ সাল ;
জয়দেবপুর-ঢাকা।
সখী।
সখিরে! আমারে কি বুঝাইবি বল?
আমি কি বুঝিনা হায়,
তাহারে না পাওয়া যায়,
যে ধন কাটিয়া যায় আপনি অঞ্চল।
বুঝিনা কি তার তরে,
যে মরে সে মিছা মরে,
যে ফেরে সে মিছা ফেলে নয়নের জল ?

কুঙ্কুম।
গলায় মারিয়া ছুরি
যে যায় আপনি চুরি,
তার লেগে ভেবে মরে কে হেন পাগল?
সখিরে আমারে কি বুঝাইবি বল?
২
সখিরে! আমারে কি বুঝাইবি বল ?
আমিত আপনি বুঝি,
আমি তারে নাহি খুজি,
যে পাখী কাটিয়া গেছে আপনি শিকল ।
কঠিনা পাষাণী শারী,
কঠিনা পাষাণী নারী,
মরমে মমতা নাই, চখে নাই জল।
এতদিন ভাঙ্গা বুকে,
এতই কি ছিল দুখে,
রয়েছে প্রাণের কণা বিধে পদতল ?
ঘৃণা লজ্জা আশেপাশে,
সে বুঝি না ভালবাসে,
নিশ্বাসে পুড়িয়া গেছে হৃদয় কোমল !
যাক সে চলিয়া যাক,
চিরকাল সুখে থাক,
ভুলেও ভাবিনা তারে, ভাবিয়া কি ফল?
সে যথা ভুলেছে, তথা ভুলেছি সকল!

সখী।
৭১
সখিরে! তবু কেন ফেলি আঁখি জল।
নিশ্বাসে নিশ্বাসে হেন,
পরাণ কাপিছে কেন,
ভাঙ্গিছে চুরিছে যেন পাঁজর সকল!
তবু হেন হাহাকারে,
কেন কঁাদি বারে বারে,
প্রাণের ভিতরে কেন জ্বলে দাবানল?
শুনিবি ? শুনিবি সই ?
আয় তবে আয় কই,
কই সে প্রাণের কথা ব্যথা অবিরল।
সে গেছে যদিও হায়,
প্রেম তার নাহি যায়,
পরাণে বাঁধিয়া আছে পাষাণ শৃঙ্খল!
৪
সখিরে। প্রেম নাকি নিতান্ত কোমল।
তুইও ত বলিতি আগে,
প্রেমে ভর নাহি লাগে,
না চুইতে ছিড়ে যায় কুসুমের দল!
যারা প্রেম করিয়াছে,
তারাও ত বলিয়াছে,
ভাঙ্গে সে আঁখির ঠারে ঠুনকো কেৰল!
কত জনে হেসে খেলে
পথে ঘাটে ভেঙ্গে ফেলে,

কুঙ্কুম ।
প্রেম কি প্রাণের ব্যথা ?—কথার কৌশল!
সখিরে! এমনি নাকি বুঝাইতি বল ?
কিন্তু
সখিরে। আমার কি কপালের ফল,
মেহ তার, প্রেম তার,
নহেরে কুসুম হার,
লৌহময় বজ্রময় পাষাণ শৃঙ্খল!
ছিড়িতে নাহিক পারি,
কি কঠিন প্রেম তারি,
মিছা টানাটানি করি বুকে নাই বল!
যতন করি যে এত,
কিছুতে গলেনা সেত,
দিন রাত এত ঢালি নয়নের জল!
বৃথাই এ জল ঢালা,
নিবে না প্রাণের জ্বালা,
নিবে না সে পােড়া প্রেম-অশনি অনল ।
এ দীর্ঘ নিশ্বাস ঝড়ে,
একটু নাহিক নড়ে,
চাপিয়া বসেছে বুকে যথা হিমাচল।
বৃথা করি তােলপাড়,
বৃথা করি হাহাকার,
বেঁধেছে সাগর বুক পাষাণ শৃঙ্খল!

সখী।
৭৩
হায় কি কঠিনা নারী,
কি কঠিন প্রেম তারি,
ছড়িতে নাহিক পারি বুকে নাই বল,
হায়রে নারীর প্রেম লােহার শিকল
সখিরে । কেন ফেলি নয়নের জল ।
বুঝিলি কি এতক্ষণে,
তারে না করিয়া মনে,
ছিড়িতে তাহার শুধু প্রেমের শৃঙ্খল!
ভাঙ্গিতে সে বেড়ী হায়,
পরাণ ভাঙ্গিয়া যায়,
এত করাঘাত করি ফাটে হৃদিতল ।
এ দীর্ঘ নিশ্বাস ভার,
এ বিলাপ হাহাকার,
প্রাণ করে ছটফটু পাগল পাগল,
ছিড়িতে তাহার শুধু প্রেমের শৃঙ্খল ।
সখিরে! বুঝিলি কিনা বল ?
সখিয়ে! বুঝিলি কিনা বল !
প্রেম যার ঘৃণা করি,
ছি ছি ছি। লজ্জায় মরি,
তারে কি বাসিব ভাল, হয়েছি পাগল ?

৭৪
কুঙ্কুম।
তাহারে করিতে মনে,
ঘৃণা লজ্জা অভিমানে,
নয়ন ঢাকিয়া ফেলি চাপি করতল।
শুনিতে তাহার কথা,
প্রাণে বড় লাগে ব্যথা,
হৃদয় ভরিয়া যেন উঠে হলাহল।
সে যদি থাকিত কাছে,
তবে কিরে প্রাণ বাঁচে,
কবে যে জ্বলিত বুকে চিতার অনল!
সে যে রে এ দেশে নাই
ভালই হয়েছে তাই,
সে আমার মহাশত্রু মহা অমঙ্গল।
তারে কি বাসিব ভাল, হয়েছি পাগল ?
১৭ই বৈশাখ,১২৯৫ সাল,
কলিকাতা।
নারি-হৃদয়।
কেমন বুঝিব নারি হৃদয় তােমার?
এখানের শশী রবি, সেখানে মলিন সবি,
কে জানে কেমন তথা কি জানি কি আর ।

নারি-হৃদয়।
সেখানে চলেনা দৃষ্টি, কে জানে কেমন
কে জানে কেমন সেই অদ্ভুত ব্যাপার!
হাত দিয়া কি বুঝিব আলাে অন্ধকার ?
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তোমার ?
উন্নত কি অবনত,
গভীর প্রসর কত,
কত বড় কত ক্ষুদ্র কত অনুদার !
কোমল কি নিরমম,
সরল পবিত্রতম
এত দিন বুঝি নাই ঢালি অশ্রুধার !
হাত দিয়ে কি বুঝিব স্নেহ দয়া তার।
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার ?
কাছে কি নরক স্বর্গ, ধৰ্ম্ম অর্থ চতুৰ্বর্গ,
জানিনা তাহার সেই গৃঢ় সমাচার।
নারীর হৃদয় তত্ত্ব,
নারীর প্রেমের অর্থ,
কে কবে বুঝেছে, কোথা হেন ভাষ্যকার ?
হাত দিয়ে কি বুঝিব হৃদয় তােমার?
৪
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার ?
সুধা নাকি হলাহলে,
কিসে যে পরাণ জ্বলে,
দিবানিশি করে দেহ দাহ অনিবার,

৭৬
কুঙ্কুম।
ক্ষিপ্ত কুকুরের বিয়ে, পাগল করিছে কি স
জলাতঙ্কে করে প্রণে আতঙ্ক সঞ্চার
হাত দিয়ে কি বুঝিব হৃদয় তােমার ?
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার?
একটু চাপিয়া বুকে,
শশাণিত উঠিল মুখে,
একটুকু আলিঙ্গনে ভেঙ্গে দিলে হাড়!
কে জানে রাক্ষসি তাের, শুধু ঠোটে এত জোর,
চুম্বনে করিলে চূর্ণ পরাণ আমার ।
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার ?
}
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার ?
আমার সে আলিঙ্গনে,
প্রাণপূর্ণ সে চুম্বনে,
একটু তােমার বুকে দাগ নাই তার ।
নারীর এমন হিয়া, কে গড়িল কি যে দিয়া,
কুসুম পাষাণ নহে কি জানি কি আর!
হাত দিয়ে কি বুঝিব হৃদয় তােমার ?
৭।
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার ?
আজিও তােমার লাগি, সারা নিশি কেঁদে জাগি,
এক দিন না শুকায় আঁখি-নীর-ধার!

নারি-হৃদয়।
৭৭
তােমার আঁখির ঠারে, হায় হায় সরলারে,
নয়ন কলসী গেছে ভাঙ্গিয়া আমার ।
হাত দিয়ে কি বুঝিব হৃদয় তােমার ?
৮
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তোমার?
কতকাল চক্ষু খেয়ে,
দেখিলাম চেয়ে চেয়ে,
পাইনি তােমার বুকে প্রবেশের দ্বার!
কতকাল দিনে রে’তে, রহিয়াছি কাণ পেতে
পারিনি প্রাণের কথা কভু শুনিবার !
হাত দিয়া কি বুঝিব হৃদয় তােমার ?
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তোমার ?
আসিতে পায়ের ভাজে, থাকিলেও শত কাষে,
এখন চিন না তার এত হাহাকার।
শত জনমেরও যেন দেখা নাই তার ।
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার ?
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার ?
বিশ্বাসে তােমার কথা, নিশ্বাসে নিশ্বাসে ব্যথা,
নড়িতে চড়িতে বুকে বিঁধে শতবার !

৭৮
কুঙ্কুম।
বিষাক্ত স্বপন সম,
জলন্ত জীবনে মম,
জাগিয়া রয়েছে তব ফুল-উপহার!
হাত দিয়ে কি বুঝিব হৃদয় তােমার ?
১১
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার ?
বসন্ত গিয়েছে ঘুচে,
শশী গেছে শীতে মু’ছে,
উড়িয়ে গিয়েছে মেঘ কোথা বরষার।
কৃত ঋতু বার মাসে, এক যায় আর আসে,
রমণী তেমনি লীলা আশা আকাঙ্ক্ষার !
হাত দিয়ে কি বুঝিব হৃদয় তােমার ?
১২
কেমনে বুঝিব নারি হৃদয় তােমার ?
সে দিনের কঁাদা হাসা, “রীপু-করা” ভালবাসা,
সেই দেখা শেষ দেখা-ঘৃণা—তিরস্কার ।
আপনার সব দোষ,
তবু মান, তবু রােষ,
রমণী এমন করে কাজীর বিচার।
হাত দিয়ে কি বুঝিব হৃদয় তােমার ?
২রা ফান,-১২৯৫ সাল ;
জয়দেবপুর-ঢাকা ।

চেন কি ?
সময়ের শতন্তুর রেখেছে ঢাকিয়া,
সে দিনের প্রেমচিহ্ন,
হৃদয়ের অবিচ্ছিন্ন
প্রাণের পরশ মণি বজ্রলেপ দিয়া ।
তেমন পবিত্র স্থানে,
তেমন সরল প্রাণে,
তরল হৃদয়ে দিছে গরল মাখিয়া ।
কোন প্রাণে নাহি জানি, বদন সরােজ খানি,
রাখিলি প্রেয়সি আজি অর্ধ আবরিয়া
এত জানে অবহেলা অবলার হিয়া ?
প্রীতিময়ী প্রাণেশ্বরি !
হয়েছি অপরিচিত, চেননা নিশ্চিত,
হয়েছে কতই যেন যুগ অতীত।
চিনিবার চিহ্ন যাহা, এখন আর নাই তাহা,
বিস্মৃতি সলিলে তব প্রাণ প্রক্ষালিত।
অচেনা চাহনি চেয়ে,
কেনলো হৃদয় ছেয়ে,
অনন্ত অনল রাশি কর প্রজ্জ্বলিত ?
সরে যাও কাছ থেকে,
কায নাই আর দেখে,
ঘােমটার কর মুখ পূর্ণ আবরিত ;
ছুয়ােনা হৃদয়, প্রাণ হবে জাগরিত ।

কুম।
কি কাজ জাগায়ে প্রাণ,
কেন তার মােহ মূৰ্ছা ভাঙ্গিবে আবার?
এমন যন্ত্রণা যার
মােহেতেই সুখ তার,
থাকে উদ্বেগ চিন্তা আলােক আঁধার ।
শুকায় না ক্ষত স্থান,
কেবল বঁচিায় প্রাণ,
তেমন ঔষধে আরাে যন্ত্রণা অপার ।
কেন তার মােহ মূৰ্ছা ভাঙ্গিবে আবার ?
সরে যাও;
সম্মুখে দাঁড়ায়ে আর নাহি প্রয়ােজন,
এখনি টানিয়ে নেই ফিরায়ে নয়ন।
দিলে যার নাম নাই, কেন যে দিয়েছি তাই,
ছেড়ে দেও নয়নের নয়ন বন্ধন।
সেই দৃষ্টি প্রেমপূর্ণ,
এই দৃষ্টি প্রাণচূর্ণ,
পারি না সহিতে আর এত জ্বালাতন!
যা দিয়েছ সবি নেও,
আঁখি পালটিতে দেও,
ছিড়ে দিয়ে হৃৎপিণ্ড করি পলায়ন।
সম্মুখে দাড়ায়ে আর নাহি প্রয়ােজন!
পারিনা,
এমন উদাস মুর্তি আর নিরখিতে,
এমন উদাস প্রাণ পারিনা রাখিতে ।

চেন কি?
৮১
এমন নিরাশা মাখা, প্রাণের প্রতিমা আঁকা,
পারিনা পারিনা আর পারিনা দেখিতে,
সহেনা সহেনা চক্ষে,
এমন অভিন্ন বক্ষে,
নীরব পাষাণ মূৰ্ত্তি হৃদয়ে আঁকিতে।
এ মূর্তি দেখিতে নাই, সরে যাও—চলে যাই,
হৃদয় শশাণিত উষ্ণ থাকিতে থাকিতে।
পারিনা উদাস মূর্তি আর নিরখিতে।
?
কোন্ প্রাণে,
কোন্ প্রাণে প্রেয়সিরে দেখিব আবার,
হৃদয়ের রন্ধে রন্থে?
যে বদন পূর্ণচন্দ্রে,
একত্রে ঢালিত সপ্ত সুধা পিরবার,
সরল শিশুর মত,
হাসিত খেলিত কত,
ছুটিয়ে আসিত পুনঃ হৃদয়ে আমার!
সে চঞ্চলা সে চপলা,
শরতের চন্দ্রকলা,
গভীর বিষাদময়ী মুরতি তাহার,
কোন্ প্রাণে প্রেয়সিরে দেখিব আবার?
কথা শুনে যে চিনিত, তাহারি অপরিচিত,
যে প্রণয়, সে প্রণয় জ্বলন্ত অঙ্গার !
পারিনা অচেনা ভাব নিরখিতে তার!
আজিকার এই মূর্তি হেমন্ত সন্ধ্যায়,
নিবিড় বিষাদ মাখা ম্লান কালিমায় ।

২
কুঙ্কম ।
উড়িছে পশ্চাতে নীল বসন অঞ্চল,
উড়ে যেন পদ্মবনে মধুকর দল!
দক্ষিণ কনুই সন্ধিকটির উপর,
রেখেছে বমি করি কম কলেবর ।
সে স্বর্ণ মৃণালহন্ত
কমকরতল-ন্যস্ত
জিনিয়ে প্রভাত-পদ্ম কােল সুন্দর!
হেলান মৃণাল শিরে,
মলিন নলিনটীরে,
বসা’য়ে রেখেছে কেরে মুখের উপর ?
মকর বাঁকাইয়া,
দক্ষিণ বগলে দিয়া,
চাপিয়া রেখেছে বক্ষ স্ফীত মনােহর।
অৰ্দ্ধোৰ্ধ বঙ্কিম দৃষ্টি, করিতেছে বিষ বৃষ্টি,
হৃদয়ের গুপ্ত কক্ষে প্রাণের উপর ।
কোমল কমল নয়,
নহে সরলতাময়,
কঠিন পাষাণ পদ্ম গঠিত মৰ্ম্মর ।
পারিনা দেখিতে আর কপিছে অন্তর।
সেদিনের সেই মূর্তি,
সে প্রতিমা কপাটের অন্ধ অন্তরালে,
শারদ চন্দ্রাদ্ধ সেই নবঘন জালে।
নব পরিমলময়,
কনকের কুবলয়,
আবৃত অর্ধেক সেই শ্যামূল শৈবালে।
সে অৰ্দ্ধ কমল শশী, সেই অৰ্দ্ধ রূপরাশি,
সে দিন প্রভাতে আর সেই সন্ধ্যাকালে ।

চেন কি ?
৮9
দেখিয়াছি যেই চক্ষে,
আঁকিয়াছি যেই বঙ্গে,
সােণার সরােজ রাণী জীবন মৃণালে।
সে নয়নে সেই প্রাণে, মরদের সেই খানে,
পূজিব পাষাণমূৰ্ত্তি প্রেমপুষ্প জালে
সেই আমি? পারিবনা, মরিব অকা
৯
পারিবনা সে প্রতিমা দিতে বিসর্জন,
প্রেম-বিশ্বমূলে মাত্র করিয়ে বােধন।
মিটেনি প্রাণের আশা, মিটেনাই ভালবাসা,
আজিও হয়নি তার পূর্ণ জাগরণ !
আজিও লইয়ে বক্ষে,
চাহি যদি চক্ষে চক্ষে,
লাজের আবেশে ঢাকে অমনি নয়ন।
আজিও বিদ্যুৎ বেশে,
আপনি ছুটিয়ে এসে,
ধরেনা জড়ায়ে গলা করে না চুম্বন,
লাজের আবেশে মাখা আজিও নয়ন।
সেইদিন,
দাঁড়াইয়া সন্ধ্যাকালে,
সে প্রতিমা স্বর্ণ-শ্যামা সরসীর তীরে,
ভাসিল একটী ছায়া নিরমল নীরে।
হৃদয়ের কক্ষগত,
প্রত্যেক বিন্দুতে শত,
ভাসিল ও দেবমূর্তি অনন্ত রুধিরে,

৮৪
কুঙ্কম
সেই মূর্তি সেই হাসি, অঙ্কিত হইল আসি,
অমনি অচলভাবে স্নায়ুকেন্দ্র শিরে!
কেমনে ভুলিব তারে, প্রাণে মাখা একেবারে,
মুছিলে ওঠেনা দাগ দেখ বুক চিরে !
কিসে করি বিসর্জন ও প্রতিমাটীরে ?
প্রেয়সিরে দেখিয়াছ,
সামান্য তরুর অঙ্গে লতার বেষ্টন,
হৃদয়ে বিঁধিয়ে করে প্রাণ আলিঙ্গন।
হাড় মাংস কেটে প্রাণে, মরমের মর্মস্থানে,
বসিয়ে গিয়েছে সেই প্রতিমা তেমন,
তুলিয়া ফেলিতে তায়, হৃদি উপাড়িয়া যায়,
ধমনী স্নায়ুর ছিড়ে অনন্ত বন্ধন!
এমন কিছুই নাই,
ধুইতে মরম ঠাঁই,
কি দিয়ে করিব তবে প্রাণ প্রক্ষালন ?
পারিব না সে প্রতিমা দিতে বিসর্জন।
১২
যত না গরল আছে শত, বিষধরে,
মানব রসনা তাই উদগীরণ করে।
লইতে হৃদয়ে তুলি,
ঝাপিয়াছি কুতুহলে-
সােণার সরােজ,—সেই বিষের সাগরে।
দেখেছি কমল-নৃত্য,
হই নাই ভীত চিত্ত,
মানুষের তীব্ৰবিষ-কলঙ্কের ভরে।

চেন কি ?
স চাহনি সেই হাসি, সেই অর্ধ রূপ রাশি,
করিত কুসুম বৃষ্টি প্রাণের উপরে,
সােণার সরােজ সেই বিষের সাগরে ।
এ হৃদয় নিত্য নিত্য,
কমল শশীর সেই প্রেম আলাপনে,
জাগিত নবীন বলে নবীন জীবনে।
ধমনী শৈরিক রন্ধে,
গরজিয়া মেঘ মন্দ্রে,
ছুটিত শােণিত উষ্ণ তাড়িত ক্ষেপণে!
সেই স্বপ্ন—সে নিদ্রায়, সেই প্রেম তপস্যায়,
অনন্ত অচল সেই সমাধি আসনে,
অন্তরে বাহিরে আসি, সে প্রতিমা হাসি হাসি,
বর্ষিত অমৃত ধারা কমল নয়নে,
পুণ্যময় সেই দিন—প্রীতির পার্বণে ।
১৪
পুণ্যময় সেই দিন,
যদিও কালের স্রোতে গিয়াছে ভাসিয়া
আবদ্ধ শােণিত স্রোত,
হৃদয়ের কক্ষগত,
ধমনী শিরায় চলে ঘুরিয়া ফিরিয়া!
সে প্রবাহে সে শােণিতে, হৃৎ-কক্ষ ধমনীতে,
দেখ সেই পুণ্যদিন দেখ নিরখিয়া,
সােণার সরােজরাণী, লুপ্ত অর্ধ দেহখানি,
কপাটের অন্তরালে আছে দাঁড়াইয়া !

কুম।
কি জানি হাসিতে দেয় পরাণে মাখিয়া ?
কি দেয় মাখিয়া প্রাণে,
শুধু মাত্র প্রাণ জানে,
নয়ন বিস্মিত হয় তন্ময় দেখিয়া ?
হৃদয় শােণিত স্রোতে দেখ নিরখিয়া!
যদিও, নিরখিয়া আজি এই
অনন্ত উদাস মূর্তি বিষাদ মণ্ডিত,
আপনি হইতে চায় নেত্র নিমীলিত,
যদিও রে প্রাণেশ্বরি,
রসনা দংশন করি,
‘চেনকি বলিতে চিত্ত হতেছে কুষ্টিত,
তবুও ত প্রাণ ফাটি, বাহিরায় সে কথাটা,
বিদ্যুত আঘাতে বক্ষ করি বিদারিত।
কি জানি আগ্নেয় মন্ত্রে,
সমস্ত শােণিত যন্ত্রে,
প্রলয়ের মহাবহ্নি করে প্রধুমিত,
নিরখি উদাস মূর্তি বিষাদ মণ্ডিত।
পারিব না ও প্রতিমা দূরে সরাইয়া,
নিতে এ পাষাণ মুর্তি হৃদয়ে টানিয়া!
সরে যাও কাছে থেকে, কায নাই আর দেখে,
সবিষ নয়নে তব নয়ন রাখিয়া ।
যা দেখেছি ভাল তাই, আর না দেখিতে চাই,
যােমটায় রাখ মুখ পূর্ণ আবরিয়া!
লিখেছি যে প্রাণ খুলি ,
প্রণয়ের পত্রগুলি ,
কর তাহা ছিন্ন ভিন্ন চরণে দলিয়া!

সাের্ণার মেয়ে।
৮৭
ভুলিবে প্রেয়সি তবে, আর নাহি মনে হবে,
পুরানাে প্রেমের কথা কে দিবে বলিয়া ?
ফেল.অই স্মৃতিচিহ্ন চরণে দলিয়া ?
১৭
ভুলিবে যে দিন, প্রিয়ে ভুলিবে যে দিন,
পাষাণ হইতে তব হৃদয় কঠিন,
সে দিন কালের বশে হ'লে দেখাদেখি,
জিজ্ঞাসিব দুইজনে “চেন কি? চেন কি ?”
ক্ষুদ্রতম সে কুটীরে,
সেই সরসীর তীরে,
হইয়ে কৌতুকী,
জিজ্ঞাসিবে প্রতিধ্বনি “চেন কি? চেন কি ?
?
১২৮৬ সাল ;
জয়দেবপুর, ঢাকা।
সােণার মেয়ে।
কেরে পাগলিনী মেয়ে, তোর পানে চেয়ে চেয়ে,
এমন পাগল করে পরাণ আমার ।
আবেশে আঁবশ হই, কেন তুলে কোলে লই,
কি জানি কি মনে পড়ে শশিমুখ কার !
কি জানি কি মনে পড়ে, পরাণ পাগল করে ,
তােরি নয়নের মত নয়ন তাহার ।
সেই আঁধারের আগে,
উষার আলােক জাগে,
সুন্দর সীমন্তে শােভে কাল কেশ ভার!

৮
কুঙ্কুম।
চুল সেই,
এলােমেলাে
দু’হাতে সরা’য়ে দেই
তেমনি যতনে মনে লয় কতবার,
আরাে যে কি মনে পড়ে, . পরাণ কেমন করে,
তােরি কপােলর মত কপােল তাহার।
৪
তারি মত ঠোট যােড়া, সােণার তবক মােড়া,
অমল অধর তার সুধার আধার ।
তারি মত তাের কথা,
গলিয়ে পড়ে মমতা,
এত মধু পবিত্রতা প্রিয় সরলার।
হাসিতে মাণিক পড়ে, কাদিতে মুকুতা ঝরে,
তােরি মত মানময়ী মূরতি তাহার।
তুই সে চাদের আলাে, প্রাণে তাই লাগে ভালাে,
পবিত্রতা পরিপূর্ণ প্রেম পূর্ণিমার !
শৈশব সঙ্গীতে তাের, কি এক নেশার ঘোর,
কি এক অন্বত ঢালে হৃদয়ে আমার ।
তুই সে “সােণার পাখী, আয় ততরে বুকে রাখি,
তুই সে সােণার মেয়ে প্রিয় সরলার।
৭
দয়া মায়া স্নেহ যত,
সকলি তাহার মত,
শৈশবের শান্তিময়ী ছায়া তুই তার,
আসি জ্বলন্ত চিতে,
স্বর্গীয় সান্ত্বনা দিতে,
দ্বিতীয় প্রতিমা খানি প্রিয় সরলার।

শরতের মা ।
৯
৮
আয় তােরে রেখে বুকে, চুমা খাই চাদ মুখে,
দর্পণে উঠান তুই ছায়া খানি তার।
তাের অই রাঙ্গা ঠোঁটে, তারি মত মধু ওঠে,
আয়রে সােণার মেয়ে প্রিয় সরলার।
২৫শে ভা-১২৯৩ সাল
;
জয়দেবপুর-ঢাকা।
-
শরতের মা ।
১
কই মা শরৎ! কোলে আয় মা আমার,
আয় দুখিনীর ধন,
শত দুঃখ নিবারণ,
জ্বলিয়া পুড়িয়া প্রাণ হতেছে অঙ্গার ।
আয় কোলে একটুক, জুড়া মা মায়ের বুক,
দেখি তাের চন্দ্র মুখ সুধার আধার !
তুই বিনে কেহ নাই, এ সংসার ভস্ম ছাই,
ধূ ধূ করে মরুভূমি সম্মুখে আমার ।
তুইরে শরত-ইন্দু,
শত অমৃতের সিন্ধু,
প্রাণময়ী প্রিয় কন্যা পতি দেবতার ।
কই মা শরৎ। কোলে আয় মা আমার।
কই মা আমার কোলে আয় মা শরৎ!
ধরাতে বিধবা আমি, ত্রিদিবে অমর স্বামী,
স্বর্গ মর্ত্য ছুয়ে তুই দীপ্ত ছায়াপথ ।

৯০
কুঙ্কম।
ভয় আশা কণা গুলি, একত্রে রেখেছি তুলি,
জীবনের জ্যোতির্ময় তােরে ভবিষ্যৎ।
আয় মা মায়ের বুকে,
সুধাভরা হাসি মুখে
আয় বিধবার মেয়ে-মণি মরকত।
কই মা আমার ? কোলে অয়ি মা শরৎ।
৩
.
তুই কে আসিলি কাছে, তুই মেয়ে কার ?
কইরে সে প্রাণময়ী শরৎ আমার ?
মুখে মাখা এলাে চুল,
নব শিশু মেঘ কুল,
ঢাকিয়া রয়েছে দিনে শশী দ্বিতীয়ার।
ভূষণ বিহীন গায়,
ধবল বসন হায়,
কমল নয়ন বহি পড়িছে নীহার ।
সুদীর্ঘ নিশ্বাস ভরে, বুক যেন ভেঙ্গে পড়ে,
আকুল ব্যাকুল প্রাণ, মুখে হাহাকার,
তুই কে আসিলি কাছে ? তুই মেয়ে কার ?
৪
তুই মেয়ে অমঙ্গল,“দূর-দূর-দূর!
শরৎ মঙ্গলময়ী মূরতি মধুর।
তুই কি শরৎ সেই, তাের কিরে বেশ এই,
কোথা তাের শাখা শাড়ী সুন্দর সিন্দুর?
কোথা তাের বাজু বালা, গলায় সোণার মালা,
কে নিল খুলিয়া আহা কে হেন নিষ্ঠুর ?
কে দিল খুলিয়া বেণী, অজগর শিশু শ্রেণী,
দংশিতে মায়ের প্রাণে, কে এমন ক্রুর ?

শরতের মা।
উপবাসে শীর্ণ কায়,
শুষ্ক কণ্ঠ পিপাসায়,
বধিছে বালিকা মেয়ে, কে হেন অসুর ?
কে দানবকে ডাকাতে, নিদারুণ পদাঘাতে,
করিল মঙ্গল ঘট ভেঙ্গে চুর চুর!
কোথা তাের শখা শাড়ী, সুন্দর সিন্দুর?
৫
কে দিল যােগিনী বেশ পরাইয়া হায়,
কনকের কচি মেয়ে শরতের গায় ।
কে দিল পাষাণ মনে, সুন্দর সমােজ বনে,
শীতের শিশির মেখে সোণালী ঊষায় ?
সৌন্দৰ্য্য করিয়া কালী, কে দিলরে ধোয়া ঢালি,
রমণীয় মণিময় প্রদীপ শিখায় ?
সেও কি মানুষ কেহ, তারে কি এমনি দেহ,
এই রক্ত এই মাংস আছে কলিজায় ?
মানুষের রীতি নীতি, আছে কি মমতা প্রীতি,
সরলা বালিকা পেলে নাহি গিলে খায় ?
তারাে কিরে আছে মেয়ে, সে কি তার মাথা খেয়ে,
দিয়েছে বিধবা বেশ পরাইয়া তায়,
পােড়েনি একটু প্রাণ স্নেহ মমতায় ?
দুখিনীর একমাত্র জীবন সম্বল,
কে দিল তাহারে আজ মেখে হলাহল ?
নব দুর্গা রূপ খানি, সােণার শরৎ রাণী,
একটু চাহিতে প্রাণ হইত শীতল।

কুঙ্কুম।.
শােক তাপ জ্বালা যত, দুঃখ কষ্ট শত শত,
জুড়াইত শান্তিময়ী নব গঙ্গা জল।
আজিরে দেখিতে তায়, সে আনন্দ কোথা হায়,
অসহ সেরূপ চক্ষে,চাপি করতল,
কিছুতে নাহিক পারি, নিবারিতে অশ্রুবারি,
অজানা কেমনে জানি ঝরে আঁখি জল ।
কি জানি কি শেল, বাণ, ছেচে, কুটে, ছিড়ে প্রাণ,
মরমে মরমে জ্বলে কিযে দাবানল ।
বালিকা বিধবা মেয়ে মাখা হলাহল !
৭
বালিকা বিধবা মেয়ে কত অমঙ্গল,
কত যে আশঙ্কা ত্রাস, কত যেন সৰ্ব্বনাশ,
কত জনমের যেন কত পাপফল!
কত যে সংকোচ ভয়,
কত লজ্জা ঘৃণাময়,
কত যেন অধঃপাত কত রসাতল!
কত কলঙ্কের কালী, কত “ছি ছি কত গালি,
ভবিষ্যত ভরা যেন লাঞ্ছনা কেবল !
ছাই ফেলা ভাঙ্গা কুলা,
ছিটালে পাতিল—ঠোলা,
অনুতাপ অভিশাপ ভরা অশ্রুজল !
প্রাণের শরৎ আজ এত অমঙ্গল।
৮
বােঝেনা অবােধ মেয়ে বালিকা অজ্ঞান,
রাঁধে বাড়ে ধূলা দিয়ে,
পুতুলের দেয় বিয়ে,
দেবকণ্ঠে করে সেই বিবাহের গান ।

শরতের মা।
মিলে কত মেয়েছেলে, “চাপিলা চুপিল” খেলে,
আজো খেলে “গঙ্গি-গঙ্গি”—হেসে আটখান
কত বলে উপকথা, কি বিশ্বাস, সরলতা!
রাজারাণীদের টুনি কাটে নাক কাণ!
প্রাণের শরত আজো বালিকা অজ্ঞান !
বােঝেনা অবােধ মেয়ে শরৎ আমার,
কি বিষম সৰ্ব্বনাশ হইয়াছে তার ।
পৃথিবী হয়েছে ছাই,
তার তরে কিছু নাই,
হইয়াছে সুখশান্তি পুড়ে ছারখার !
বিলুপ্ত সিন্দুর বিন্দু,
হয়েছে গরল সিন্ধু,
শত বজ্রে ভবিষ্যৎ শতধা বিদার।
ববাঝে না কি সর্বনাশ হইয়াছে তার।
১০
অবােধ বালিকা মেয়ে শরৎ আমার,
মুটি মুটি দু’টী দু’টী খায় কতবার !
নাহি বােঝে কিবা ধৰ্ম্ম, নাহি বােঝে কিবা কৰ্ম্ম,
কেবল সরল সত্য প্রাণে আপনার !
হায় রে তাহারি জন্য,
একাহার হবিষ্যান্ন,
একাদশী ব্রহ্মচর্য ব্রত বিধাতার ।
যােগিনী তাপসী বেশ,
কর্কশ চাচর কেশ,
হায় কি ধর্মের শেষ এই অবলার ?
ধিক্‌, ধিক্‌, নাহি লাজ, হা ভারত! হা সমাজ।
কি পাপে এ অধঃপাত হয়েছে তােমার?

৪ কুঙ্কুম । কোথা প্রভু! কোথা স্বামি! দেবতা আমার। দেখ নাথ দেখ চেয়ে, তব আদরের মেয়ে, কি দশা হয়েছে আজ দেখ একবার ! শরৎ জীবন্ত চিতা, হইয়াছে প্রজ্জ্বলিত, এ জনমে এ জীবনে নিবিবে না আর। এই চিতা ল’য়ে বুকে, জ্বলিব পুড়িব দুখে, এরি লাগি রেখে গেছ অভাগী তােমার ? ২রা মাঘ, ১২৯৬ সাল জয়দেবপুর-ঢাকা। বিবাহােপহার। ১ যে পবিত্র প্রেমপুষ্প পরিণয় হার, আজি পরিয়াছ গলে, দুইজনে কুতুহলে, মানব জন্মের ইহা পুণ্য-পুরস্কার। জগতে ইহার কাছে,. আর কি অমৃত আছে, এ সুধা পায়নি দেব মথি পারাবার। ওঠেনি সাগর জলে, এ কৌস্তুভ কোন কালে, হেন পরিমলম পারিজাত হার, পরিলে ‘অমর’ আজি যে মণি-মন্দার । ২ অমৃত ঔষধ হেন জীবনের আর, স্বর্গ মর্ত্য ত্রিভুবনে, নাহি কিছু কোন স্থানে, বিশল্য করণ হেন জ্বালা যন্ত্রণার।

বিবাহোপহার।
রােগ শােক দুঃখ ভরা, এত যে বিষাক্ত ধরা,
ইহার(ই) পরশে বাঁচে সৃষ্টি বিধাতার!
যে প্রাণে এ পুণ্যস্রোত, হয় নাই প্রবাহিত,
পবিত্র করেনি প্রাণ প্রণয়ে যাহার,
সে ত সাহারার মত, হা হা করে অবিরত,
এ জীবনে সে পিপাসা নহে পূরিবার,
ঢাল যদি স্বর্গ মর্ত্ত পরণে তাহার!
সে জীবন শময়, শূন্য সে হৃদয়,
উদ্যম উৎসাহ হীন,
আশাশূন্য চিরদিন,
অন্তরে অনল জ্বলে সকল সময়।
তার নয়নের কাছে, সংসার পুড়িয়া আছে,
ছাই হয়ে ভস্ম হয়ে গেছে সমুদয় ।
সে জানেনা সুখ শান্তি, সে বােঝে সকলি ভ্রান্তি,
সে জানেনা দয়া মায়া স্নেহ কারে কয়
জগতের নারীর,
সে ভাবে সকলি পর,
তাহারো কেহই নয়, সেও কারাে নয়।
সে যেন আকাশ ছাড়া, জ্বলন্ত একটী তারা,
পরের অশুভ করে, নিজে ভস্ম হয়।
৪
-
অপ্রেম এমনি সখা মহা অকল্যাণ,
প্রেম মঙ্গলের মূল, উন্নতি উত্থান।
প্রেম করে পরিপূর্ণ অপূর্ণ জীবন,

৯১
কুঙ্কুম।
জগতের নরনারী,
যমুনা জাহুবী বারি,
মিলাইয়া করে এক মহা প্রস্রবণ।
উদ্যম উৎসাহ আশা, দয়া মায়া ভালবাসা,
বহে শতমুখে গঙ্গা সাগরে যেমন!
হাসে তার তীরদেশে, সংসার সুন্দর বেশে,
বিনােদ বসন্তে যথা বন উপবন
প্রেম নহে ভােগবাঞ্ছা, বাসনা বিলাস,
প্রেমের প্রতিমা নারী, শত স্বর্গ পায় তারি,
পবিত্র হৃদয়ে ধৰ্ম্ম সদা করে বাস!
সংসার করিয়া শূন্য,
তারি কাছে যত পুণ্য,
প্রীতির পবিত্র তীর্থ পাপ করে নাশ!
কোমল পবিত্র দৃষ্টি, প্রাণে করে সুধাবৃষ্টি,
জাগায় হৃদয়ে সত্য আশা অভিলাষ,
প্রেম নহে ভােগ-বাঞ্ছা বাসনা বিলাস ।
ধৰ্ম্মের সহায় নারী তপস্যার প্রাণ,
সিদ্ধির সাধনা নারী, যাগ যজ্ঞ সব তারি,
তাহার সাহায্য বিনা মিলেনা নিৰ্বাণ ।
হইয়ে সংসার ত্যাগ, তাই সে সতীর লাগি,
তাই সে নারীর প্রেমে উন্মাদ ঈশান!
ধৰ্ম্মের সহায় নারী তপস্যার প্রাণ।
৭
জননী ভগিনী, নারী, নারী সমুদয়,
বিপদে বন্ধুর মৃত,
উপদেশ দেয় কত,

বিবাহহপহার।
৯৭
শীতল ছায়াটী যেন বুক ঢেকে রয়!
যেন সে পরের তরে, জন্মিয়াছে এ সংসারে,
আপনার প্রাণ তার আপনার নয় !
জননী ভগিনী নারী নারী সমুদয় !
আজ সে মহিমাময়ী রমণীর সনে,
মিলিত হইলে সখা, পবিত্র বন্ধনে।
শিখিও তাহার রীতি, সেই প্রেম সেই প্রীতি,
সেই দৃঢ় ধর্মভাব শিখিও জীবনে।
শিখিও সে সরলতা,
শ্রদ্ধা ভক্তি পবিত্র,
শিখিও সে স্নেহ দয়া দীন হীন জনে।
শিখিও শিবের মত,
পবিত্ৰ সন্ন্যাস ব্রত,
পবিত্র সতীর সেই পূত আচরণে!
এমন রমণী লয়ে, ভােগ অভিলাষী হয়ে,
ভুলনা পরম ধৰ্ম্ম সদা রেখ মনে।
ভুলনা ভুলনা দোহে, সংসারের মায়া মােহে,
থাকে যেন স্থির মন বিভুর চরণে,
রাখিবে মঙ্গলময় সুখে দুই জনে ।
এই ফান—১২৯৪ সাল ;
কলিকাতা!

পাপ পুণ্য।
আমি কেন পাপ পুণ্য বুঝিতে না পারি ?
বুঝয়ে দিবে কি কেহ, ঘুচাইবে এ সন্দেহ,
শুনিবে কি দয়া করে কথা দুই চারি ?
আমি কেন পাপ পুণ্য বুঝিতে না পারি ?
২
আমি কেন পাপ পুণ্য বুঝিতে না পারি ?
পাপী বলে পায় ঠেলে, ঘৃণায় দিওনা ফেলে,
সত্যই এ প্রাণ ভরা সংশয় আমারি !
আমি কেন পাপ পুণ্য বুঝিতে না পারি ?
আমি কেন পাপ পুণ্য বুঝিতে না পারি ?
কি চেতন কিবা জড়,
এই বিশ্ব চরাচর,
ক্ষুদ্র কি বৃহৎ অংশ সকলি তাহারি ।
আমি কেন ভিন্নভাব বুঝিতে না পারি ?
৪
তারে ছাড়া কিছু নাই সকলি তন্ময়,
যদি কিছু থাকে আর,
অবশ্য থাকিবে তার
দ্বিতীয় জন কর্তা, কেন মনে লয় ?
তারে ছাড়া কিছু নাই সকলি তন্ময় ।

পাপ পুণ্য।
ని
তারে ছাড়া কিছু নাই সকলি তন্ময়,
মান-জ্ঞেয়-জ্ঞা-তিন, সৃজন পালন লীন,
বর্তমান অনাগত অতীত সময়।
তারে ছাড়া কিছু নাই সকলি তন্ময়!
তারে ছাড়া কিছু নাই সকলি তন্ময়,
কারণে থাকে সে ভয়ে, কার্যে জাগরণ থুয়ে,
জমাট শক্তির বিশ্ব মহা পরিচয় !
তারে ছাড়া কিছু নাই সকলি তন্ময়!
৭
ইচ্ছায় গড়িল বিশ্ব নিজে ইচ্ছাময়,
অন্য উপাদান তার, আগে ত ছিল না আর,
কাযেই অখিল বিশ্ব সেও ইচ্ছাময় ।
যাহাতে রচিত বিশ্ব সে কি বিশ্ব নয় ?
৪
সে আমি অভেদ যদি একই উভয়,
তার কাযে কেন তবে, অমঙ্গল নাহি কবে,
অনন্ত মঙ্গল তার অপাপ প্রলয়!
পিপীলিকা বধে মম কেন পাপ হয় ?
সে আমি অভেদ যদি একই উভয়,
সে করিলে আমি করি, সেই করে হাতে ধরি,

কুম।
তাহার আমার কাযে ভেদ কিসে হয় ?
সে আমি অভেদ যদি একই উভয় !
সে আমি অভেদ যদি একই উভয়,
আমার তৃপ্তিতে তবে, সে কি তৃপ্ত নাহি হবে ?
পূরিলে আমার ইচ্ছা তারি পূর্ণ হয়,
সে আমি অভেদ যদি একই উভয় ।
।
সে আমি অভেদ যদি একই উভয়,
কারে তবে বল ধৰ্ম্ম, কারে বল পাপ কৰ্ম্ম,
অধৰ্ম্ম জগতে সে কি অশ্ব-ডিম্ব নয় ?
সে করিলে আমি করি—কিসে পাপ হয় ?
১২
সে আমি অভেদ যদি একই উভয়,
কিসে বা উন্নত হই, কিসে অবনত রই,
যা হই তা হই যদি তারে ছাড়া নয়!
আত্মার উন্নতি তবে লােকে কারে কয়?
অনন্ত উন্নতি তবে লােকে কারে কয়?
তাহারে করিয়ে তুচ্ছ, আছে নাকি আরাে উচ্চ,
বুঝিনা কেমন কথা প্রহেলিকাময় ।
সে আমি অভেদ যদি একই উভয় !

পাপ পুণ্য।
১৪
সে আমি অভেদ যদি একই উভয়,
হি থাকে পুণ্য পাপ, নাহি থাকে পরিতাপ,
তবে ও নরক স্বৰ্গ মিছে কেন কয় ?
সে আমি অভেদ যদি একই উভয় ।
সে আমি অভেদ যদি একই উভয়,
আত্মায় আত্মীয় তবে, পূর্ণ আত্মীয়তা সবে,
কিসে থাকে পুত্র কন্যা ভেদ সমুদয়,
সে আমি অভেদ যদি একই উভয় !
সে আমি অভেদ যদি একই উভয়,
থাকে অাপন পর,
শত্রু মিত্র পরস্পর,
যদি এ প্রেমের রাজ্য অনাদি অব্যয়।
কেন কঁাদি তার শোকে, যে গিয়াছে পরলােকে,
সে কি গো আমার তরে পথ চেয়ে রয় ?
অন্যে কি সেখানে যেয়ে, তেমন থাকে না চেয়ে,
অাত্মায় আত্মায় ত গো কেহ পর নয়।
সে আমি অভেদ যদি একই উভয় !
কেহ যদি নাহি থাকে কারাে অপেক্ষায়,
তবে কেন তার তরে, নিশি দিশি আখি ঝরে,
উদাসী বিদেশী বেশে সদা ফিরি হায়,
কেহ যদি নাহি থাকে কারাে অপেক্ষায়।

১০২
কুঙ্কুম।
১৮
কেহ যদি নাহি থাকে কারাে অপেক্ষায়,
বুক ভেঙ্গে নিরবধি, হাজার ডাকিলে যদি,
সে পাষাণী একটুকু ফিরে নাহি চায়!
একটু শােনেনা কথা, নিদারুণ নির্দয়তা
জনমের মত যদি একেবারে যায়।
কেহ যদি নাহি থাকে কারাে অপেক্ষায়।
১৯
কেহ যদি নাহি থাকে কারাে অপেক্ষায়,
অনন্ত কালের স্রোতে, চলে অনন্তের পথে,
অনন্ত আত্মীয় মিলে সে যেখানে যায় ।
চির আত্মীয়তা যদি আত্মায় আত্মায়।
२०
অামি কেন কাদি তবে তাহার আশায় ?
এ জগতে তার মত, কেহ কি মিলেনা তত,
একজন গেলে নাকি পৃথিবী ফুরায় ?
সায়াহ্নে শ্মশান ভূমে,
দেখিয়াছি যে কুসুমে,
ফুলবনে পরী যেন খেলিয়া বেড়ায়।
কি যেন সে আসে নিতে, কি যেন সে হাসে দিতে,
কি যে রীতি নিতি নিতি ফিরে ফিরে যায়।
তরল নয়নে তার,
সেধে যায় শত বার,
পাৰ্বতী পৰ্বতে যেন প্রীতির পূজায় !
সে তপস্থা সে সাধনা, ঠেলে ফেলে কয় জনা ?
যােগে ভাঙ্গিয়া যোগ আঁখি মেলে চায়!

কুসুম।
ভোলে পুরাতন স্মৃতি, বিধির নিয়তি-নীতি,
একি পুণ্য—একি পাপ, কহনা আমায় ?
২১
কেহ যদি নাহি থাকে কারাে অপেক্ষায়।
সহস্র শােকাশ্রু জলে, তৃণটুকু নাহি টলে,
এমনি নিয়ম যদি নিখিল ধরায়।
কেহ না কাহারে খােজ, সবাই আপনা বােঝে,
সৃষ্টির নিগূঢ় অর্থ এই যদি হায়,
তবে ও শ্মশানে এসে, সন্ধ্যার কিরণে ভেসে,
যে নব লাবণ্য জ্যোতি জমিয়া দাঁড়ায়,
লাজুক নয়নে তার,
নিমন্ত্রণ শতবার,
অজানা হৃদয় যদি হাত পেতে চায়,
একি পুণ্য—একি পাপ, কহ না আমায় ?
১লা শ্রাবণ, ১২৯৭ সাল ;
জয়দেবপুর-ঢাকা ।
কুসুম।
১
নয়নে নয়নে,
সেই যে করেছি খেলা, বসন্তে বিকাল বেলা,
দেবপুরবাসী এক বালিকার সনে।
চিলাইর শ্যামতটে, সেই যে মন্দিরে-মঠে,
মনােহর শ্মশানের শ্যাম তপােবনে,
সেই যে করেছি খেলা বালিকার সনে।

কুঙ্কুম।
সেই যে করেছি খেলা বালিকার সনে,
কলসী লইয়া কাকে, আসে আর চেয়ে থাকে,
হাসে আর চলে যায় দুই তিন জনে।
এক পা--দুই পা,
আর পা চলে না,
বকুলের ফুলে লাগে উচ্ছট চরণে।
সে পথ দীঘল কত,
যােজন যােজন শত,
অবিরত বেড়ে যায় তাহার গমনে।
আর যত বালিকাৱা, বকুল বিঁধেনা তারা,
সবারি ফুরায় পথ যায় যত জনে!
সকলেরি আখি আগে, তাহারি পশ্চাদ ভাগে,
চলে যেতে সন্ধ্যা চাহে ফিরে পিছ পানে ।
সেই যে করেছি খেলা বালিকার সনে ।
সেই যে করেছি খেলা নয়নে নয়নে
দেবপুরবাসী এক বালিকার সনে !
মৃদুল মলয় রায়,
অঞ্চল উড়িয়া যায়,
উলটি পালটি যেন চাপা ফুল বনে!
খুলিয়া গিয়াছে থােপা, অপরাজিতার থােপা,
মদন বিধুরে দেয় অঞ্জলি বদনে।
সংকোচে লজ্জায় হায়,
ঠেকেছে বিষম দায়,
বেহায়া বেল্লিক সেই বাতাসের সনে।
কোকিল বকুল শাখে, সেও যেন তারে ডাকে,
আপদ লেগেছে যত পিছনে পিছনে।

কুম।
১৫
এ বিষম গণ্ডগােলে, কার নাহি পথ ভােলে ?
ধমকি দাড়ায় বালা চমকি চৰণে,
বসন্তে বিকাল বেলা বকুলের বনে !
৪
সকলে কলসী ভরি আনিয়াছে জল,
সে নিছে কলসী ভরি, প্রাণ হরি মন হরি,
হেসে মরি কেঁদে মরি হইয়ে পাগল ।
ফিরিয়ে চলেছে ঘরে, আধা পথে গিয়ে পরে,
হাসিয়া উঠেছে সব বালিকার দল।
দেখিয়া কলসী খালি, কেহ দেয় করতালি,
কেহ বলে “ও কুসুমি। কোথা তাের জল,
বােঝনি সে বালিকারা, অামি যে আপনা-হারা,
কুসুমেরি জলে মাের আঁখি ছল ছল ।
তারা পড়ে হেসে গলে,
এ উহার গায় ঢ'লে,
কেহ বলে “মাকে বলি বাড়ী চল চল!”
কুসু’ ত ঠেকেছে দায়, তা কি আর যাওয়া যায় ?
পিছনেও আছে সেই পথে ফুলদল !
উভয় সংকট মাঝে, কি শােভা সংকোচে লাজে,
কমলে শেহালা মাখা আননে আঁচিল ।
সেই যে করিছি খেলা আখিভরাজল !
আননে আঁচল ‘কুসু’ মহা ভাবনায়।
অর্ধেক কপােল রাগে,
পশ্চিমের অর্ধভাগে,
লেগেছে গােলাপী আভা আকাশের গায় ।

১০৬
কুঙ্কুম।
বালিকারা আশে পাশে, তেমনি আনন্দে হাসে,
ঢেউয়াইয়া তপােবন সােণালী সন্ধ্যায় !
গরি যেন লেগে ছিটা, তারা জ্বলে মিঠা মিঠা,
পূরবের অর্ধাকাশে অর্ধ-নীলিমায়!
মন্দিরে আরতি করে,
দীপ জ্বলে ঘরে ঘরে,
দীদী ডাকে “ও কুসুম, বাড়ী আয় আয়।”
বুলবুল ভাবে.মনে,
বুড়ী বুঝি এ জনমে,
কখনাে বকুল ফুল বিঁধে নাই পায় ।
বুড়ী যে হয়েছে বুড়ী, কাছাকাছি তিন কুড়ি,
তবুও দাদার হাওয়া লাগে নাই গায় ।
শ্যামা ভাবে ঘরে গিয়া, এ শূন্য কলসী নিয়া,
কি করিয়া কি বলিবে শুধাইলে মায় ?
দীদী ডাকে ও কুসুম, বাড়ী আয় আয়।”
প্রসন্ন বসন্ত সন্ধ্যা প্রসন্ন গগন,
জয় জয় দেবপুরে পুণ্য পােবন !
প্রসন্ন-প্রসন্নতম,
সুপ্রসন্ন ভাগ্য মম,
তততধিক সুপ্রসন্ন কুসুমের মন!
স্নেহে মাখালাজে ঢাকা, প্রাণে রাখা—দূরে থাকা,
আপনারে ঢেলে দেওয়া দয়াদ্র নয়ন,
আবার তুলিয়া বালা, শত জন্ম করি আলা,
সরাইয়া হৃদয়ের ভস্ম আচ্ছাদন,
চাহিলা মধুরে হাসি, প্রথম সুধাংশু রাশি,
সীমা শুন্য নীলসিন্ধু করিয়া চুম্বন।

কুসুম।
সে ভুলিল আমি ছাড়া, তারে ছাড়া আমি হারা,
কি যেন আবেশময় বিবশ স্বপন,
নয়নে নয়নে সেই আত্মসমর্পণ ।
৭
জ্বলিছে অমৃত দীপ চন্দ্র তারকায়,
নীল চন্দ্রাতপ তলে গগনের গায়।
কোকিলা দিতেছে হুলু,
‘চিলাইর’ কুলু কুলু,
ললিত পঞ্চমে গায় শ্যামা পাপিয়ায়!
সে পবিত্র মহােৎসবে, জগতবাসীরে সবে,
আতর গােলাপ বায়ু আপনি বিলায় ।
কামিনী চামেলী বেলী, এয়াে তারা সবে মেলি,
মন্দিরে মঙ্গল শংখ বাজে উভরায়,
প্রেমের দেবতা হর,
মহাদেব মহেশ্বর,
বিশ্বরূপে বিরাজিত প্রেমের সভায়।
জানিনা বুঝিনা ঠিক, কি আনন্দে দশদিক,
জগৎ ভাসিয়া গেল প্রেমের সুধায় !
হয় সে মাহেন্দ্ৰ ক্ষণ,
এজীবনে
অতুলন,
সে অমৃতযােগ দৈবযােগে পাওয়া যায়।
নয়নে নয়ন নিয়া,
দু’জনে করিনু বিয়া,
সেই সন্ধ্যাকালে সেই কদম্ব তলায়,
দীদী ঢাকে ও কুসুম, বাড়ী আয় আয়।”
সেই
কুসুমের বনে পাওয়া কুসুম আমার,
শত জনমের যেন কত পুরস্কার।

কুঙ্কম।
কেরে তারে কেড়ে নিয়া, কারে দিল পরাইয়া,
সেকি গাে রাক্ষস এত দয়া নাই তার ?
প্রেমের নন্দনবন,
ভাঙ্গিয়া চূরিয়া মন,
শ্মশান করিয়া দিল শ্মশান আবার!
কার পাকা ধানে মই, কবে আমি দিছি কই ?
আমি ত আগুন বুকে দেই নাই কার !
তবে জোরে বলে ছিড়ে, সে পুণ্য কুসুমটীরে,
লুঠে নিয়া দিল কারে পাপী দুরাচার ?
আমি ত আগুন বুকে দেই নাই তার।
হায় হায় একি স্বপ্ন—একি জাগরণ ?
আমার কুসুম হার,
সে নাকি হইল কার,
কল্পনা করিতে যেন পুড়ে যায় মন।
একি লজ্জা একি লাজ, আমারি কুসুম আজ,
সে নাকি হইল কার কণ্ঠের ভূষণ।
ভাবিতে পারিনা আর, অসহ্য যন্ত্রণা তার,
হিংসায় জ্বলিয়া যায় ভূতলে গগন!
দংশে যেন বিষধরে, হৃদয়ের স্তরে স্তরে,
কি যেন গরল প্রাণে করে উদগীরণ।
অসাধ্য সে ঘৃণা লজ্জা ক্রোধ নিবারণ ।
T
ভুলিৰে বালিকা সেই ভুলিবে কুসুম,
ভুলিবে সে ছেলেখেলা, বসন্তে বিকাল বেলা,
দু’দিনে হইবে তার স্মৃতি সমভূম !

কুসুম।
অনা’সে ভুলিবে সেই, নারীর স্বভাব এই,
অবলার আখিভরা বারমেসে ঘুম!
আরে যে দেখেছি নারী, সব আমি চিনি রি,
রমণীর যত কিছু দিন চারি ধূম্ ।
ভুলিবে বালিকা সেই ভুলিবে কুসুম !
বালিকা কুসুম বটে ভুলিবে সকল,
শত জাগরণ দিয়া, আমারি জ্বলিবে হিয়া,
বিধিয়া রহিবে বুকে পথে ফুলদল !
স্বপনে শুনিব খালি, বালিকার করতালি,
চমকি দেখিব সেই আননে আঁচল।
সে রক্ত কপােলছবি,
অর্ধ অস্তগত রবি,
হৃদয়ে ঢালিবে সদা রাঙা হলাহল ।
জ্বলিবে জীবন ব্যাপি শ্মশান কেবল।
১২
ছাড়িয়া সুরভি ফুল বায়ু যদি যায়,,
যদিও বিরহী বেশে, কেঁদে ফিরে দেশে দেশে,
আতর অমৃত গন্ধ তবু থাকে গায়।
তেমনি তাহারে ত্যজি, যদিও এসেছি আজি,
তবু সে অমর জ্যোতি উছলে হিয়ায়।
দেখি সে কামিনী গাছে, তারি হাসি ফুটে আছে,
চাঁদের জোছনা মাখা ঝরে মলয়ায় !
দেখি সেই দেবপুরে,
দাড়াইয়া দূরে দূরে,
নয়নে নয়নে ‘কুসু’ আজো চুমাে খায়!

১১০
কুঙ্কম।
মৃদুল মলয়ানিলে,
আলিঙ্গন ঢেলে দিলে,
কঁকাল ভাঙ্গিয়া পড়ে কদম্ব তলায়!
নাতিনীর পথে ফের,
কেমনে পাইবে টের ?
বুড়ী ত বােঝেনা ছুড়ী সেধে চুরি যায়।
দীদী ডাকে “ও কুসুম, বাড়ী আয় আয় !”
২০শে ফান-১২৯৭ সাল ;
শেরপুর-ময়মনসিংহ।
ভুল হয়েছিল
১
ভুল হয়েছিল একি ফুল পানে চেয়ে,
দেবপুরে শ্মশানের তপােবনে যেয়ে।
সরসীর শ্যামকূলে,
দাড়া’য়ে বকুল মূলে
মালা গাঁথে ও পাড়ার রাঙ্গা রাঙ্গা মেয়ে!
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে।
২
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে,
বসন্তে বিকাল বেলা তপােবনে যেয়ে !
কোকিলের কুহু রবে,
হাসিয়া ভেঙ্গায় সবে
কিবা সে বদন ভঙ্গি-গান গেয়ে গেছে।
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে।

ভুল হয়েছিল।
১১১
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে,
শ্মশানের তপােৰনে বেড়াইতে যেয়ে ।
আমারে দেখিয়া লাজে, পলাইল বন মাঝে,
ফুলের ঢেউয়ের মত সবে ধেয়ে ধেয়ে ।
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে।
ভুল
হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে !
পূর্বপাড়া সন্ধ্যাকালে বেড়াইতে যেয়ে ।
মায়ে ঝিয়ে এক কাঠে, দাঁড়ায়ে পুকুর ঘাটে,
মায়ের আঁচল টানে চঁদােনা মেয়ে।
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে।
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে,
পূর্বপাড়া সন্ধ্যাকালে বেড়াইতে যেয়ে !
রাণী’ ডাকে মেও মেও, আরো দেও, আরাে দেও,
আদরে বিড়াল ছানা চুমাে খেয়ে খেয়ে।
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে।
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে,
বসন্তে বিকাল বেলা পূর্বপাড়া যেয়ে,
গলাগলি দুই বােনে, কেহ যেন নাহি শােনে,
জিব কাটে আধা কথা কয়ে লাজ পেয়ে।
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে।

১১২
কুঙ্কুম।
৭
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে।
পূর্বপাড়া সন্ধ্যাকালে বেড়াইতে যেয়ে ।
কাণে করঞ্জার ফুল,
গালভরা এলাে চুল
মেঘ উড়ে শরতের চাঁদ মুখ ছেয়ে।
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে !
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে,
শরতের সন্ধ্যাকালে বেড়াইতে যেয়ে ।
কার নাম শুনিয়া সে, কিল ওছাইয়া হাসে
দাতে কেটে লাল ঠোঁট-পাণ খেয়ে খেয়ে !
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে !
থ
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে,
শরতের সন্ধ্যাকালে পূর্বপাড়া যেয়ে !
তারা ওঠে, চঁাদ ওঠে, ঝিঙ্গা ফুল চালে ফোটে,
সুধা ঝরে শুধু তার চঁাদ মুখ বেয়ে!
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে।
ভুল হয়েছিল এক ফুল পানে চেয়ে,
সন্ধ্যাকালে পূর্বপাড়া বেড়াইতে যেয়ে !

এও কি স্বপন।
১১৩
দেখিয়ে পলায় ঘরে,
দেখিতেও সাধ করে,
থাকে সে বেড়ার ফঁাকে চুপে চুপে চেয়ে।
কাল শুনিয়াছি তার হয়ে গেছে বিয়ে।
৭ই চৈত্র-১২৯৭ সাল,
শেরপুর-ময়মনসিংহ।
এও কি স্বপন ?
এও কি স্বপন ?
বৈশাখে বিকাল বেলা, মেঘে মেঘে করে খেলা,
বহিতেছে মৃদু মৃদু শীত সমীরণ।
দয়েল বসিয়া আছে,
পশ্চিমে ‘কাফিলা’ গাছে,
ঝুলিছে বাঁশের আগে মুমূর্য কিরণ।
‘উলুছন’ ফুলগুলা,
কাঠীর আগায় তুলা,
কে যেন করিয়ে গেছে দীপ আয়ােজন।
সবুজ ‘নিলজী বনে,
উড়িছে ফড়িঙ গণে,
যােড় যােড়া পিঠে পিঠে করি আরােহণ ?
আমতলে ডাকে গাই,
নিকটে বাছুর নাই,
বুড়ী করে “দু” করি বৎস অন্বেষণ ।

১১৪
কুঙ্কুম।
#
একাকী রূপসী বালা,
কুটীর করিয়া আলা,
“ওশোরায় মাছ কুটে—সুন্দর কেমন।
বঁটির উপরে বসা,
বাতাসে আঁচল খসা,
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে হয়
উদঘাটন
অর্ধ নিশি অর্ধ দিবা,
একত্রে সে দেশে কিবা,
একত্রে উদয় অস্ত-লাবণ্য মূতন !
সে শােভা দেখিয়া হায়,
কে না ভােলে মােহ যায় ।
উদাসী বিদেশী গেছে হারাইয়া মন !
কি সুন্দর গাল পেতে,
‘কুসু’ দিছে চুমাে খেতে,
হেলা’য়ে ঈষৎ বামে কমল-আনন।
দুই হাত দুই পাশে,
মাখা সে মাছের আঁসে,
ধরে না ছোঁয় না বালা করে না বারণ !
রাঙ্গা হাতে মাখা ছাই,
তাহার তুলনা নাই,
আবেশে অবশে আছে মুদিয়া নয়ন।
আবার ডাকিছে গাই,
বাছুর ত আসে নাই,
“ডড” করি করে বুড়ী বাড়ী আগমন,

দেখিবে কি আর ?
১১৫
চমকি ভাঙ্গিল ঘুম,
হা কুসুম! হা কুসুম !
একটু যে দিলি দেখা, এও কি স্বপন?
৫ই জ্যৈষ্ঠ-১২৯৮ সাল,
শেরপুর-ময়মনসিংহ।
দেখিবে
কি আর ?
দেবি। দেথিবে কি আর ?
ত্রিদিবে তােমারে দেবে, আনন্দে নন্দনে সেবে,
অপিয়া চরণে শত সােণার মন্দার,
কেন সে ফেলিয়া পূজা, প্রাণময়ি শ্বেতভুজা,
মর্ত্যের মানবে দয়া আবার তােমার ?
দেবি! দেখিবে কি আর ?
দেবি! দেখিবে কি আর ?
অনলে শিখার মত, তব প্রেম অবিরত,
জ্বালা’য়ে পােড়ায়ে প্রাণ করি ছারখার,
নিবিয়া গিয়াছে কবে, বলনা প্রেয়সি তবে,
সেই ভস্ম-সেই ছাই—সে দগ্ধ অঙ্গার,
দেখিতে বাসনা কেন,—কি দেখিবে আর ?

কুঙ্কম।
দেবি? দেখিবে কি আর ?
দেখিতে আছে কি বাকি, এতদিন বুকে রাখি,
দেখিয়া দেখার আশা মিটেনি তােমার ?
উলটি পালটি কত, দেখিয়াছ অবিরত,
পেযিয়া ঘষিয়া বুকে ভেঙ্গে চুরে হাড়,
দেখিয়াছ রেণুকণা,-কি দেখিবে আর ?
৪
দেবি। দেখিবে কি আর ?
লাগাইয়া জিবে জিবে, অমৃত দ্রাবকে কিবে,
গলা’য়ে চুষিয়ে নিলে হৃদয় আমার!
আশ্বাসে দিছিনু এনে, নিশ্বাসে নিয়েছ টেনে,
হায় হায় বিশ্বাসের এই পুরস্কার।
দেবি? কি দেখিবে আর ?
দেবি? দেখিবে কি আর ?
বিচূর্ণ বালুকা সম, যে চূর্ণ হৃদয়ে মম,
আলিঙ্গনে পড়েছিল যে দাগ তােমার,
সুদীর্ঘ নিশ্বাস ঝড়ে, তাই নিয়ে খেলা করে,
ব্যাপিয়ে মরম-মরু ঘাের অন্ধকার।
দেবি। দেখিবে কি আর ?
দেবি। দেখিবে কি আর ?
কোন যুগে নিয়েছিলে, কোন যুগে দিয়েছিলে,

দৈখিবে কি আর
আঐ অলক্তক-চিহ্ন চুম্বনে তােমার।
রমণী ছুইলে ঠোটে, ধুইলে কি নাহি ওঠে?
দেখিবে কি ধু'য়েছে কি আঁখি জলধার,
সে বীরত্ব জয়চিহ্ন গৌরব তােমার ?
৭
দেবি ! কি দেখিবে অার ?
শুনেছি বাঘিনী বনে, খেলে হরিণের সনে,
ভাঙ্গিয়ে কোমল গ্রীবা করিয়ে সংহার,
বুঝিতে নাহি যে পারি, তেমনি তুমি কি নারী,
খেলিতে এসেছ সেই খেলা অবলার।
দেবি ! দেখিবে কি আর ?
৪
দেবি। দেখিবে কি আর?
একি সে মেহের দেখা, আঁখি জলে চিঠী লেখা ?
এ শুধু মুখের কথা মুখে বলিবার ?
এ নহে ধরিয়া গলে, এ নহে সে আমতলে,
এত শুধু দূরে দূরে ঘৃণা উপেক্ষার !
দেবি! দেখিবে কি আর ?
৯
দেবি। দেখিবে কি আর?
যে দেখা নয়ন কোণে, কেহ নাহি দেখে শােনে,
এ দেখা কি দেখা সেই প্রীতি মমতার ?
একি সে প্রাণের টান ? একি নহে অপমান ?
একি নহে উপহাস শুধু হাসিবার ?
দেবি। দেখিবে কি আর ?

কুঙ্কুম।
১০
দেবি। দেখিবে কি আর ।
যদিগগা আগের মত, দেখিতে বাসনা তত,
সত্যই সরলা প্রিয়ে থাকিত তােমার,
তবে কি “ভেরণ” গাছে, অত পাতা উঠিয়াছে ?
দেখিতাম পথে আগে পাতা ভাঙ্গা তার!
দেবি। দেখিবে কি আর ?
দেবি। দেখিবে কি আর ?
সেদিন গিয়েছে কবে, আর কি সেদিন হবে,
দু’জনে দুপুর বেলা বুকে দু’জনার !
আঙ্গিনা ভাঙ্গিয়া মেয়ে, না আসিতে ঘরে ধেয়ে,
আগে গিয়ে কোলে নিয়ে চুমাে খেতে তার,
বুঝিনা সে বালিকা চাতুরী তােমার !
১২
দেবি। দেখিবে কি আর ?
তােমার বিরহানলে, কেমনে হৃদয় জ্বলে,
কেমনে নয়নে আজ বহে শত ধরি,
তাই কি দেখিয়া সুখী হতে চাও বিধুমুখি ?
কাটা ঘায়ে নুন দিয়ে তামাসা তােমার।
দেবি? দেখিবে কি আর ?

দেখিবে
কি আর ?
দেবি? দেখিবে কি আর ?
ময়ন করিয়ে খালি, সকলি দিয়েছি ঢালি,
দিয়েছি সে শ্যামালতা ভিজায়ে তােমার।
দেখ গিয়ে পাতে পাতে, শুকায়ে রয়েছে তাতে,
আঁখি জলে মাখা আহা কত হাহাকার।
দেবি! দেখিবে কি আর ?
১৪
দেবি। দেখিবে কি আর ?
কোণায় দাড়িম গাছে, দেখ গিয়ে রহিয়াছে,
আলিঙ্গন ফিরে দিছি সকলি তােমার।
রাখিয়াছি ফুলে ফুলে, তােমারি চুম্বন তুলে,
ভাঙ্গা বুকে রাঙ্গা চুমা নহে রাখিবার।
দেবি ! দেখিবে কি আর ?
দেবি ! দেখিবে কি আর ?
আমি যে পাপিষ্ঠ অতি, তুমি অতি পুণ্যবতী,
চাহিলে লাগিবে পাপ নয়নে তােমার।
শত গঙ্গাজল দিয়া, দেও যদি ধােওয়াইয়া,
তবু এ পাপের দাগ নহে যাইবার ।
দেবি? দেখিবে কি আর!

কুঙ্কম।
দেবি। দেখিবে কি আর ?
কেন সে নিষ্ঠুর খেলা, ভাঙ্গাবুক ভেঙ্গে ফেলা,
কেন দে স্বপন পুনঃ দেখাও আবার ?
লইয়া শ্মশান বুকে, মহা নিদ্রা যাই সুখে,
দয়া করে ক্ষমা কর জাগায়ােনা আর।
রমণি, তােমার নামে শত নমস্কার ।
১৩ই ভাদ্র-১২৯৮ সাল ;
শেরপুর-ময়মনসিংহ।
পরীক্ষা ।
সরলা! সমােজ-আখি সুধা নাকি ভরা,
অথবা কি কালকূট বিষমাখা বাণ?
তুমিললা চাহিলে নাকি বেঁচে উঠে মরা,
অথবা আখির ঠারে বাহিরায় প্রাণ ?
দু’জনে দু’কথা বলে, ঠিক কথা কার,
চাওনা সরলা ! চেয়ে দেখি একবার ?
২
সরলা ! কি রাখিয়াছ সুন্দর অধরে,
ফুলের পুটলী বেঁধে আদরে এমন?
কেহ বলে বিষ উহা খেলে লােক মরে,
কেহ বলে মরা বাঁচে-সুধা অতুলন!

নববর্ষ ।
১২১
দু’জনে দু’কথা বলে, ঠিক কথা কার,
দেওনা সরলা ! খেয়ে দেখি একবার ?
শােক তাপ ভরা এই দরিদ্র জীবন,
যদি গাে সৌভাগ্য বশে সুধা পাওয়া যায়,
জনমের মত ক্লেশ হবে নিবারণ,
কিংবা যদি থাকে বিষ ক্ষতি কি তাহায় ?
দুই তুল্য মহামূল্য নিকটে আমার,
দেওনা সরলা ! বুঝে দেখি একবার ?
কবি কহে সুধা বিষ দুই আছে ভরা,
জীবিত মরিয়া যায়, বেঁচে উঠে মরা।
১ই জ্যৈষ্ঠ-১২৯৫ সাল।
কলিকাতা।
নববর্ষ।
; ২৯১)
এস বর্ষ! অনিবাৰ্য বিধির আদেশে,
অবনত শিরে লই তােমার শাসন,
এত দুঃখ-এত কষ্ট—আছি এত ক্লেশে,
তথাপিও অ-মুখে করি সম্ভাষণ !
১১

১২২
কুঙ্কুম।
२
এত বর্ষ! আমি ক্ষুদ্র—আমি নরাধম,
ফিরিবে না গতি তব আমার ইচ্ছায়,
ভীষণ জলধি স্রোত ভীম পরাক্রম,
রােধিতে চাহে কি তারে ক্ষুদ্র বালুকায় ?
এস বর্ষ ! দেখ এসে হৃদয় আমার
বুক ভরা মরুভূমি, কভু কি দেখেছ তুমি,
মরমের মর্মভরা হেন মৃদঙ্গার ?
নিবিড় নিভৃত স্থলে,
শিরায় শ্মশান জ্বলে,
শােণিতে তরঙ্গশিখা উছলে তাহার ?
মরা প্রাণ, বাঁচা দেহ, কভু কি দেখেছ কেহ,
আছে কি জগতে বল প্রাণী এ প্রকার ?
দেখেছ কি প্রাণভরা হেন অন্ধকার ?
৪
এ হৃদয় মরুভূমি দেখহ চাহিয়া,
ছােট বড় কত আশা, কত স্নেহ ভালবাসা,
যৌবনে অঙ্কুরে বীজে গিয়াছে পুড়িয়া !
উদ্যম উৎসাহ শূন্য,
নাহি পাপ নাহি পুণ্য,
কেবল অনন্ত শূন্য হৃদয় যুড়িয়া।
এ হৃদয় মরুভূমি দেখহ চাহিয়া।

নববর্ষ ।
১২৩
দেখ চেয়ে এ হৃদয়,
সুখ নাই, শান্তি নাই, শুধু ছাই! শুধু ছা
নিরাশ। সে ছাইগুলি, মুঠা মুঠা করি,
প্রাণে উড়াইয়া দেয় দিবস শৰ্বরী ।
প্রাণের নির⇒ সেই নিত্য অশ্রুপাত,
সে নীরব হাহাকার, সে রাক্ষস ব্যবহার,
আত্মার করুণ কণ্ঠে ছুরিকা আঘাত।
তৰ পূৰ্ব্ব বর্ষ কত, করিয়াছে অবিরত,
অন্তরে অনন্ত হেন আগ্নেয় উৎপাত,
ভস্মৃশেষ দগ্ধবক্ষ দেখহ সাক্ষাৎ।
৭
এস বর্ষ !
আমি হে ভারতবর্ষ অধিবাসী নয়,
বলহে ভবিষ্য ভাগ্য বজে আমার,
বল মাস বর্ষ ফল, বল কত অশ্রুজল,
কত পদাঘাত বক্ষে, তত হাহাকার,
প্লীহাফাটা
কত বন্য পশু হত,
নিরস্ত্র দুর্বল প্রজা সােদর আমার,
লইয়া আসিলে কত হেন অত্যাচার ?
কত শালগ্রাম শিলা, হারাইবে দেবলীলা,
কত সুরেন্দ্রের ভােগ হবে কারাগার।
মৃত্যু কত,

১২৪
কুঙ্কুম।
ভারতের কত ছাত্র, বেত্রাঘাতে ছিন্নগাত্র,
সহিবে শৈশব প্রাণে কত অবিচার ?
বল ইবার্ট বিলে, ‘এ’ ‘পে সবে মিলে,
করিবে দায়াদ সুত্রে কত অত্যাচার ?
আত্মশাসনের ছলে,
শুষ্ক প্রাণে মরুস্থলে,
কত ভ্ৰমাইবে রূপে মৃগতৃষ্ণিকার ?
কাতরে কঁদিবে কত জননী আমার ?
৮
এস বর্ষ! দুর্ভাগ্যের বল ভাগ্যফল,
কত আর অসহায়, জননী ভগিনী জায়া,
কলঙ্কিত করিবেক সেনানী ধবল ?
কত আর চক্ষু খেয়ে, সে দৃশ্য দেখিব চেয়ে,
কুকুরে চিবাতে দিয়ে হৃন্মৰ্ম্মস্থল ?
হা কি লজ্জা! হা কি ঘৃণা, বাচিনা মরণ বিনা,
বরাহের ভােগচিহ্নে অঙ্কিত কমল।
৯
বল বর্ষ ।
কত কহিনুর আর হবে অপহৃত ?
বল কত বরদার, দুর্ভাগ্য গাইকবাড়,
চাতুরী -“হীরক চুর্ণ” হবে নির্বাসিত ?

নববর্ষ।
১২৫
অযােধ্যা সেরা কত,
অনুতাপে অবিরত
কঁদিবেক মিত্রতায় হইয়া বঞ্চিত ?
কত বা নিজাম খেদে, সুস্থ অঙ্গ ব্যবচ্ছেদে,
বেরার বিয়ােগ শােকে হবে জর্জরিত ?
কত রাজ্য রক্ত চিহ্নে হইবে রঞ্জিত ?
ক
নববর্ষ।
তব আগমন ফল বলহ বিশেষ,
সে দিন নাহিক আর, তেজবীৰ্য্য গরিমার,
আগেছিনু সিংহ রাশি, আজি মােরা মেষ।
হায়রে ত্রিদিব দেবে, নির্মুলা নক্ষত্র এবে,
কলঙ্কিত শশধর, পতিত দিনেশ !
কারে সিংহাসন দিয়া, কহিনুর পরাইয়া,
কোন্ চণ্ডালেরে তুমি করিলে নরেশ ?
কারে বা করিলে মন্ত্রী, কোন্ শনি ষড়যন্ত্রী,
আরাে কি
নূতন
ট্যাক্সে প্ৰজা হবে শেষ?
কোন্ অমঙ্গল গ্রহ,
শস্যাধিপ হ’ল কহ,
আরো কি দুর্ভিক্ষে তুমি পােড়াইবে দেশ ?
বলহে বৈদ্যের ফল,
কপিতেছে বক্ষস্থল,
‘বােমান্ট’ ‘বোঁটন বেশে হ’ল কি প্রবেশ ?
আরো কি চাষার প্রাণ, নিত্য করি বলিদান,
তুষিবে হে জমিদার রাক্ষস বিশেষ ?
আরাে কি ভারতবর্ষ হবে ভস্মৃশেষ ?

১২৬
কুঙ্কুম।
বল বর্ষ।
পিশাচী রাক্ষসী সুরা ব্যাদিত বদনে,
শোণ্ডিকের মুক্ত গৃহে,
পল্লীতে পল্লীতে কিহে,
গ্রাসিবে গৃহস্থ দীন বালবৃদ্ধগণে ?
অস্থি চৰ্ম্ম করি শেষ,
আফিঙ্গে নাশিবে দেশ,
কাঁদিবে জননী জায়া-ধারা দু’নয়নে ?
আরাে কি গঞ্জিকা সিদ্ধি, পশুত্ব করিয়া বৃদ্ধি
সাহায্য করিবে বল নিরয় পতনে ?
করে দিলে আবকারী দয়াহীন মনে ?
১২
এস বর্ষ ।
দুৰ্বল বাঙ্গালী আমি, দুৰ্বল হৃদয়,
তােমার এ আগমনে, সুখ না হইল মনে,
সতত শঙ্কিত আছি কিসে যে কি হয়।
বঞ্চনার নিত্য নিত্য, বিশ্বাস করেনা চিত্ত,
চুণে গেছে মুখ তে’তে দধি দেখে ভয় ।
যদিহে কুশলে রাখ,
যদি শুভ এনে থাক,
দিব ধন্যবাদ তােমা যাবার সময় !
১৭ই চৈত্র, ১২৯০ সাল।
দেবনিবাস-ময়মনসিংহ।

সাগরের উক্তি।
যারে যা কুটিলা নদি, কেন আর নিরবধি,
মিছে কু কু স্বরে আলাস্ আমায় ?
ও কপট প্রেম গানে,
পরাণে সাঁড়াশী টানে,
কলিজা ধমনী শিরা ছিড়ে যায় যায় ।
পারি না সহিতে আর,
এ পাষাণ ব্যবহার,
বাড়ব অনলে বুক জ্বলিছে সদায়,
মিছে তাের ও সােহাগে,
নিদারুণ মহারাগে,
ঝটিকা তুফানে বুক ভেঙ্গে চুরে যায়,
অবিরাম অবিশ্রাম আছাড়ি বেলায় ।
২
জন্ম তাের উচ্চ কুলে, বৃথাই গিয়েছি ভুলে,
তাের মত নীচগামী দেখি নাই আর,
শুধু তোর সঙ্গদোষে,
জগতে এ নিন্দা ঘােষে-
নীচতর নীচতম নীচ পারাবার !
ভাঙ্গিয়া পাষাণ কারা,
হয়েছিস্ দেশ ছাড়া,

১২৮
কুম।
কত দেশে বেড়াইলি সংখ্যা নাহি তার ।
কোথাও পালি কুল,
খেয়েছিস দুই কুল,
তােরে ফুল দিয়ে শেষে অকুল আমার!
বড় আশা ছিল মনে, তাের সনে সম্মিলনে,
নিৰ্ম্মল জীবনে প্রাণ হইবে নিৰ্ম্মল,
এনে দিবি স্বর্ণকণা,
কিন্তু একি বিড়ম্বনা,
ঢেলে দিলি হা পাষাণি কাদামাখা জল ।
বিধাতা হয়েছে বাম,
গেল রত্নাকর নাম,
কর্দমে মর্দিলি মণি মাণিক্য সকল !
আরাে দেখ বুক ভরা,
কত যে জন্মেছে চরা,
অপার বালুকা রাশি ব্যাপি নীল জল !
৪
কত দুঃখ কত ক্লেশ,
ভীম ভয়ঙ্কর বেশ,
মকর হাঙ্গর ন কত জলচর,
অতল জীবন মম,
মথিতেছে অবিরাম,
মুহূর্ত বিশ্রাম নাই—তিল অবসর !

সাগরের
উক্তি।
১২১
যদি কেহ সেঁচে জল,
দেখিত এ বক্ষস্থল,
দেখিত সে কি যে কাণ্ড—কি যে ভয়ঙ্কর
হৃদয়ে লুকান মাের,
কি যে সে বিপ্লব ঘাের,
প্রলয়ের ধ্বংসমুৰ্ত্তি গ্রাসে চরাচর।
এ হৃদয়ে একদিন ছিল শশধর,
দেবেরে দিয়েছি যাহা,
এ হৃদয়ে ছিল তাহা,
আমারি অমৃত দিয়া দেবতা অমর।
দিছি পারিজাত ফুল,
কৌস্তুভ-মণি অতুল,
দিছি সৰ্ব্ব ফলপ্রদ কল্প তরুবর,
দিছি সৰ্ব্ব অবশেষে,
ঐশ্বৰ্য্য ঈশ্বরী বেশে,
রাজশক্তি রাজলক্ষ্মী চাহিলে অমর।
কিন্তু আজি হায় হায়,
কে বিশ্বাস করে তায়,
সহস্র মন্দরে যদি মথে নিরন্তর,
সে সকল রত্ন আর,
উঠিবে পুনৰ্ব্বার,
অতল কর্দমরাশি বালুকার স্তর,
গ্রাসিয়াছে পারিজাত, শশী-সুধাকর ।
ক

কুম।
এখনাে চাহিলে আহা শশধর পানে,
হৃদয় উছলে উঠে,
বিশাল তরঙ্গ ছুটে,
কি যেন ভাবের উৎস খুলে যায় প্রাণে !
পারিনা থাকিতে স্থির,
ভাসাইয়া যায় তীর,
সজোরে জোয়ারে তােরে ঠেলিয়া উজানে ।
কিন্তুরে বেহায়া এত,
তাের মত দেখিনে ত,
আবার আসি ফিরে কু কুল্ গানে,
দিনে রেতে ঠেলে দেই যানা উজানে!
আহা !
এ বিষাক্ত চিন্তা প্রাণে সহে না যে আর,
নিত্য অশ্রুজলে সিক্ত,
জীবন হইল তিক্ত,
রটিল ক্ষীরােদ নামে কলঙ্ক আমার!
শরীর হইল কালা,
প্রাণ করে ঝালাপালা,
আগুন লাগায় জলে নারী এ প্রকার।
কোথাহে অগস্ত আজ,
কর বান্ধবের কার্য,

কৃষ্ণদাস পাল।
১৩১
বিশাল গঙুষে আসি শেষ পারাবার,
নিবে যা জীবনের যন্ত্রণা অপার !
১৮ই শ্রাবণ -১২৯৪ সাল।
শীতলপুর বাগানবাটী, শেরপুর ।
কৃষ্ণদাস পাল।
কোথা আজি কৃষ্ণদাস গেলে অকস্মাৎ ?
না বলিয়া না কহিয়া, পাষাণে বঁধিয়া হিয়া,
মারিয়া মায়ের বুকে অশনি নির্ঘাত।
হায় কি নিষ্ঠুর তুমি, জননী ভারত ভূমি,
কোটি নেত্রে করে আজি কত অশ্রুপাত,
করিয়া ললাটে বক্ষে ভীম করাঘাত।
তুমি বিনে কৃষ্ণদাস সব অন্ধকার,
জ্বলন্ত প্রতিভা বলে, আলােকিয়া ধূমণ্ডলে,
জ্যোতির্ময় গ্রহ তুমি খসিলে তাহার !
উদ্যম উৎসাহ ধন্য,
একাগ্রতা অগ্রগণ্য,
প্রাণপণ যত্ন চেষ্টা উগ্র আকাঙ্ক্ষার
করুণা মমতা স্নেহ,
দয়া ধৰ্ম্মে দ্রব দেহ,
সত্যের সহায় চিত্ত আছিল তােমার।
তুমি বিনে কুষ্ণদাস ভারত আঁধার।

১৩২
কুঙ্কুম।
রাজনীতি শাস্ত্রে ছিলে পণ্ডিত এধন,
স্বদেশের হিত-রত, স্বজাতি-বাংলা ব্ৰত,
আছিলে ধৰ্ম্মের সখ কৃষ্ণ মতিমান্ ।
আজি কুরুক্ষেত্র রণে,
তােমার আশ্রিত জনে,
অকূলে ফেলিয়া কোথা করিলে প্রস্থান ?
তােমারে সারথি করি, কোদণ্ড গাণ্ডীব ধরি,
পুনরায় বৰ্ম্ম চৰ্ম্ম করি পরিধান,
লভিতে সে হৃতস্বত্ব,
দেবতার সে দেবত্ব,
সে আত্ম-শাসন-শক্তি-রাজত্ব মহান,
ত্যজিয়া অজ্ঞাত বাস, করি এত অভিলাষ,
জালিনু সমর অগ্নি-শিখা লেলিহান্!
না হতে সফল কাম, হা কৃষ্ণ হইয়ে বাম,
সপিয়া শত্রুর হাতে করিলে প্রস্থান ।
অকূলে যায় যে ভাই ভারতের প্রাণ ।
৪
দুর্দান্ত কৌরবগণ সদা অত্যাচারী,
ধৃতরাষ্ট্র রাজা অন্ধ, নাহি দেখে ভাল মন্দ,
দিল রাজ্য রসাতলে তনয় গান্ধারী।
লুঠে নিল ইন্দ্রপ্রস্থ,
ধন রত্ন যে সমস্ত,
হায়রে ভারত আজ কড়ার ভিখারী।
ওয়েব, ফ্রান্সি হায়, দুষ্ট দুঃশাসন প্রায়,
হরে দ্রৌপদীর বস্তু পাপী দুরাচারী।

কৃষ্ণদাম পাল। তােমারি সে ভ্রাতৃজায়া, দানবে লুঠিল কায়া, নাহি দিয়া প্রতিশােধ দৈত্যদর্পহরি, কি বলিব হায় হায়, কুকুরে কলিজা খায়, শত বজে ভাঙ্গে বুক বলিতে না পারি । কোথা গেলে ধৰ্ম্মসখা কাঙ্গাল-কাণ্ডারি ? ৫ কোথা গেলে প্রিয় সখা ভারত-বান্ধব ? জান সবিশেষ তুমি, দিলনা সূচ্যগ্র ভূমি, অযােধ্যা সেতারা সিন্ধু করে হাহা রব। নিজাম-হায়দরাবাদ, বরদার আর্তনাদ, কাশ্মীর কুষ্ঠিত-কণ্ঠে সশঙ্কে নীরব ! ত্রিবাঙ্কোর মহীশূর, সকলেরি দর্পচূর ; আরাে আছে যে সমস্ত ব্যতিব্যস্ত সব! সদা কুমন্ত্রণা দেয়, ছলে বলে রাজ্য নেয়, শকুনি ‘ইংলিশম্যান’ তুলিয়া গুজব ! তুমি ভিন্ন কেবা অন্য, ভারতের রক্ষা জন্য, করিবে হে আন্দোলন—বিশাল ভৈরব ? কোথা গেলে প্রিয় সখা ভারত-বান্ধব ? t শকুনি ইংলিশম্যান কুমন্ত্রণা দিয়া, সামান্য ইলবার্ট বিলে, যে টুকু ক্ষমতা দিলে, ছলে বলে কৌশলে তা লইল হরিয়া! কে আর তােমার মত, কুরুসভা-সমাগত, পাপিষ্ঠ কোরবগণে ধীরে সম্বোধিয়া জলদ গম্ভীর স্বরে, উভয়ের হিত তরে, দিবে ন্যয্য উপদেশ ধীরে বুঝাইয়া?

৩৪ কুঙ্কুম। ৭ তুমি বিনে কৃষ্ণদাস আর কোন্ জন, ত্যজিয়া বিপুল অর্থ, হইবেক সুসমর্থ, করিতে দেশের হিত চিন্তা অনুক্ষণ ? জনক জননী জ্ঞানে, স্নেহ ভক্তি মাখা প্রাণে, কে আর ভারতে ভালবাসিবে তেমন ? কে আর প্রতিজ্ঞা করি, সজোরে লেখনী ধরি, ভারতের হিতে প্রাণ করিবে অর্পণ ? ৮ কৃষ্ণদাস ! তব এ দানের কিহে আছে বিনিময় ? পৃথিবীর দ্রব্যগুলা, কেবলই মাটী ধূলা, নাহি কোন ভাল বন্ধু চির সুখময় । নয়নের জলটুকু, হৃদয়ের রক্তটুকু, নিঃশেষ করিয়ে বদি দেই সমুদয়, ধরার মানব ছার, সাধ্য কিহে দিবে আর ? তব এ দানের নহে যােগ্য বিনিময় । তবে- যাও সেই দিব্য ধামে, যেখানে ত্রিদিব নামে, বিরাজে বিনােদ বেশে চারু ইন্দ্রালয় । বসগে’ দেবের সঙ্গে। সে সুর সভার রঙ্গে, আছে সিংহাসন পাতা রত্ন মণিময় । উদ্যম উৎসাহে দেবে, জাতীয় সম্মানে সেবে, নাহি জানে দ্বেষ হিংদা দেবের হৃদয়।

দেদ-নিবাস। ১৩৫ অমরের উপভােগ্য, আছে তথা তব যােগ্য, নিত্য সুখপূর্ণ সুর সম্পদ নিচয় ! কলপ পাদপ আছে, চতুৰ্বর্গ ফলে গাছে, আছে মৃত সঞ্জীবনী সুধা সুধাময়। নন্দনে মন্দার ফুলে, শােভে মন্দাকিনী কূলে, অমৃত প্রবাহে মন্দাকিনী মন্দ বয়। মায়ের সুপুত্র-ধন্য, এ স্বপ্ন তাদের জন্য, এখানে বাসের যােগ্য আর কেহ নয় যাও সখা পাবে তথ। যােগ্য বিনিময় । ১৬ই শ্রাবণ, ১২৯১ সাল, ময়মনসিংহ। দেব-নিবাস । বন্ধুবর! কত কষ্ট কত ক্লেশ, যন্ত্রণার একশেষ, সহিয়াছ এ জীবনে কত যে বৎসর, রাক্ষস মানব নামে, রাখিয়া দক্ষিণে বামে, করিয়াছ আত্মরক্ষা যুঝি নিরন্তর। না ছিল সহায় আর, আপনিই আপনার ;- একাকী করিলে ঘাের সংসার-সমর, যথা অভিমন্যু বীর, অটল প্রতিজ্ঞা স্থির, সপ্ত সারথীর যুদ্ধে শিশু অকাতর। তেমনি তুমিও হায়, অবিচল প্রতিজ্ঞায়, তততাধিক বীর বীর্যে পূর্ণিত অন্তর, করিয়াছ ব্যুহ ভেদ প্রিয় বন্ধুবর ! ; সল বাবর কাম-রন।

১৬
কুঙ্কম
প্রিয়তম!
প্রকাণ্ড ব্ৰহ্মাণ্ড এই অনন্ত মহান
তথাপি তােমার তরে,
স্বর্গ মর্ত্য ত্রিসংসারে,
নাহি ছিল এতদিন তিল-অর্ধ স্থান।
সমীরণে বালুকণা,
সমুদ্রে সলিল ফেণা,
কোথায় ভাসিয়া যেতে কে নিত সন্ধান।
কে ভাবিত হায় হায়,
জলবিষ কোথা যায়,
কোথায় পতন তার কোথা অবসান!
এখন সম্ভাষে যারা, ক্ষেপে চাহেনি তারা,
পাপময়ী পৃথিবীর এই ত বিধান !
দেখিয়া সম্মুখে সিন্ধু, ভাব নাই এক বিন্দু,
বজ্রনাদ বারিধির বিকট তুফান।
আজ সে অকুল সিন্ধু, দিছে এই মৃদ্বিন্দু,
এই সেই তক পুরী নব বাসস্থান!
সংসার যুদ্ধের হায়,
অই দ্বারে শােভা পায়,
অই প্রিয়বর তব বিজয় নিশান ।
বীরত্বে বারিধি দিছে বুকে বাসস্থান ।
প্রিয়তম!
ভাবিওনা সুখ স্বপ্ন—গ কথা আর,
কোথায় আছিলে তুমি, কোথা তব জন্মভূমি,
কোথায় কিরূপে হ’ল কি নাম তোমার ?
কোথা বা সে উচ্চ আশা, অগস্ত্যের সে পিপাসা,
কোথা ক্ষুদ্র হিম বিন্দু কোথা পারাবার ?
s: 3 ।

'। দেব-নিবাস। ১৩৭ কি- হৌক মা সাবিত্রী সীতা, যুধিষ্ঠির হৌক পিতা, প্রাণের লক্ষ্মণ ভাই হৌক আগেকার । তথাপি নিষ্ঠুর কর্ম, জননী জনক ধৰ্ম্ম, ভুলিয়া কোলের শিশু করা পরিহার ! তারাই তােমারে হায়, তপ্ত মরু বালুকায়, নিক্ষেপিয়া করিয়াছে—এ দশা তােমার, মরীচিকা দেখাইয়া, পিপাসা বাড়ায়ে দিয়া, যা সে ঘৃণিত কথা নহে বলিবার। গৃহস্থের ক্ষুদ্র ঘরে, যে আনন্দ শােভা করে, যে নিত্য উৎসবপূর্ণ ক্ষুদ্র সে সংসার, থাকিলে সে ক্ষুদ্র ঘরে, শত যুগ যুগান্তরে, স্বপনেও জানিতে না এ কষ্ট তােমার ! দুর হউক- কেন তুলি গতকথা, বিস্মৃত প্রাণের ব্যথা, শুষ্ক ক্ষতে কেন করি ক্ষত পুনৰ্ব্বার ? ভােল সে নিশীথ স্বপ্ন, স্মরিও না আর। ৪ দেখ দূরে ভােল সে কুহকী স্বপ্ন দেখ বৰ্ত্তমান, দেখ সে গন্তব্য পথ, ভবিষ্যত, দেখ কি সংকীর্ণ সেতু করিছে নির্মাণ। বন্ধুর বেশ ধরি, সম্মুখে সাজিছে অরি, ভূত হ'তে ভবিষ্যত পরীক্ষা মহান্। সে উদ্যম সে উৎসাহ, সে প্রতাপ বিশ্বদাহ, এখনাে হইতে চাই সেই সাবধান। ত্যজিও না যুদ্ধ বেশ, হয়নি সমর শেষ, আবার জ্বলিবে সেই শিক্ষা লেলিহান। বাধ কটি, পর বর্ম, কর জীবনের কর্ম, মনের মহত্ত্ব রাখ, আত্মার সম্মান।

১৩ কুঙ্কম ।. যতাে ধৰ্ম্ম শুতে জয়ঃ, তােমার কাহারে ভয় ? দূর হতে পলাইবে পাপ মূৰ্ত্তিমান। আবার উড়িবে তব ধৰ্ম্মের নিশান। আবার উড়িবে তব ধৰ্ম্মের নিশান, আবাব এমনি সুখে, প্রণয় প্রসন্ন মুখে, আকাশ ভেদিয়া গা’ব তব যশোগান। এমনি আমরা সবে, মাতি হেন মহােৎসবে, চাহিব বিভুর কাছে তােমার কল্যাণ। পুণ্যময় সেই দিন, সুখময় সৰ্ব্বাঙ্গীন, কল্পনার কল্পনেত্রে দেখি বিদ্যমান। তোমারি নিকটে হায়, মৃত শত্ৰু সমুদায়, চাহিবে ভিক্ষুক বেশে কৃপাকণা দান! খুজিলে অনন্ত বিশ্ব, না মিলে এমন দৃশ্য, দেখিবে ভূতলে স্বর্গ তুমি ভাগ্যবান। আবার উড়িবে তব ধৰ্ম্মের নিশান! সমাগত ভ্রাতৃগণ ! দয়াবান জগদীশে দেও ধন্যবাদ, তারি স্নেহ করুণায়, অনাথে আশ্রয় পায়, তঁাহারি কৃপায় ভুঞ্জি সকলে আহলাদ! ভুলি মুহূর্তের তরে, দ্বেষ হিংসা পরস্পরে, এস হে সকলে চাই তঁার আশীর্বাদ, আর যেন পুনরায়, সুজন সুহৃদে হায়, ঘেরে এ পৃথিবীর বিষাক্ত বিষাদ । সুখ যেন শান্তি সনে, নিত্য তার রহে মনে, দুরাকাঙ্ক্ষা দূরে যেন করে আর্তনাদ! এস হে সকলে চাই তার আশীর্বাদ। ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১২৯০ সাল ; ময়মনসিংহ।

পরিমল দত্ত।
১
কোথা হতে এলি তুই নব পরিমল ?
কোথা হতে এলি ছুটে, স্বর্গীয় প্রভাতে উঠে,
ধরে যেন ধীরে ধীরে উষার আঁচল।
অমৃত পরশ দিয়া, মৃত ধরা বাঁচাইয়া,
খুলিয়া উদয়াচলে সােণার অর্গল !
কোথা হতে এলি তুই নব পরিমল ?
কোথা হতে এলি তুই নব পরিমল ?
কোমল নয়নে তাের, এখনো সে ঘুম ঘাের,
স্বর্গীয় স্বপনে ভাের নীল উতপল ।
আবেশে অবশ কায়, ভাঙ্গিয়া পড়িয়া যায়,
চলিতে থাকে না থির চরণ কমল !
কোথা হতে এলি তুই নব পরিমল ?
কোথা হতে এলি তুই নব পরিমল ?
বাতাসে হেলা’য়ে গা, ফুলে ফুলে দিয়ে পা,
মাখিয়া কৌমুদী গায়কিরণ কোমল।
অধরে লইয়ে হাসি, অজানা আনন্দ রাশি,
লইয়া নয়নকোণে শিশিরের জল,
কোথা হতে এলি তুই শিশু পরিমল ?
s
কোথা হতে এলি তুই শিশু পরিমল ?
আসিলি অতিথি হয়ে, কার অনুরােধ লয়ে,
অজানা করিলি প্রাণ পাগল পাগল ।
কচি হাতে জড়াইয়া, কাড়িয়া লইলি হিয়া,
সমস্ত পৃথিবী দিয়া ক্ষুদ্র করতল,
ভরিতে পারিনা তাের শিশু পরিমল।
* নামকরণাপলক্ষে।

কুঙ্কুম।
কোথা হতে এলি তুই নব পরিমল ?
কি জানি আনন্দ ভরা, কি জানি কি যাদু করা,
কি জানি কি পথে পথে ঢেলে কুতুহল,
কোন্ পথে কোন খানে, কেমনে পশিলি প্রাণে,
কোন্ কুসুমের তুই সুরভি পাগল!
কোথা হতে এলি তুই প্রিয় পরিমল ?
কোথা হতে এলি তুই প্রিয় পরিমল ?
এদেশে যে ফুল ফোটে, সমীরে সুরভি ছােটে,
সে ত রে করে না এত বেহুস বিভল।
কোন্ কুসুমের বুকে, ঘুমায়ে আছিলি সুখে,
কাররে প্রেমের গন্ধ তুই পরিমল,
আত্মার অমৃত অংশ-পবিত্র উজ্জ্বল ?
৭
কোথা হতে এলি তুই নব পরিমল ?
পাপের পঙ্কিল ধরা গলিত দুর্গন্ধ ভরা,
নারী নহে, নর নহে, নরক কেবল !
একটী এ ম্লান হিয়া, স্বর্গীয় সুবাস দিয়া,
করিতে পারি যদি পবিত্ৰ নিৰ্ম্মল,
পরিমল নাম তাের হইবে সফল ।
২২শে আশ্বিন, ১২৯৮ সাল ;
ময়মনসিংহ।
সমাপ্ত।

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Kumkum Ed.3rd

Author
Das,govindachandra
Title
Kumkum Ed.3rd
File name
Kumkum Ed.3rd
Text
OCR done
Citation
1909
Published
2009/12/13
Publisher
Bhutnath Palit,kolkata
Language
Sanskrit
Pages
149
Library
Bangiya Sahitya Parishad, Kolkata
Classification
Bengali Poetry
Keywords
Das,Govindachandra
DLI number
512839
Barcode
4990010019874.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
W4bogf9nQKh
Download PDF

Kumkum Ed.3rd