Bally Sadharan Granthagar

Badhu

Mazumdar, Srijukta Bijayratna · 2009/08/6

PDF Proofread

Front matter

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

বধূ |
উপন্যাস
শ্ৰীযুক্ত বিজয়রত্ন মজুমদার
প্রণীত
বরেন্দ্র লাইব্রেরী
২০৪ কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট,
কলিকাতা।
সন ১৩৩৩ সাল।
মূল্য ১ এক টাকা ।

প্রকাশক
শ্রীবরেন্দ্রনাথ ঘােষ
২০৪, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
আইডিয়াল প্রেস
প্রিন্টার-বি, এন, ঘােষ,
৬৬, মাণিকতলা ফ্রট, কলিকাতা।

উপহার

No text on this page.

শ্রীমতী সুরুচিবালা রায় করকমলেষু।

No text on this page.

নূতন উপন্যাস ২|| २. ১০ আহুতি—সুরুচিবাল রায় নষ্ট ছ—চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মুক্ত পথের যাত্রী—ব্যোমকেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ২১ চোখের কাজল দুনিয়ার দান- মধু যামিনা-সৗরীন্দ্রমোহন মুখােপাধ্যায় কালোর আলাে উপহার-বঙ্কিমচন্দ্র সেনগুপ্ত কালের হাওয়া—চ্চিতেন্দ্রনাথ বসু রায় চৌধুরী ১০ সন্ধ্যামণি-রমেশচন্দ্র চট্টাপাধ্যায় হৃদয়ের জাদ—প্রভাবতী দেবী সরস্বতী ত্রিধারা-যতীন্দ্রনাথ পাল ১|| ১ দুইখানি জীবনী পণ্ডিত রাখালদাস কাব্যানন্দ প্রণীত শঙ্কাগ জীবনী ও তত্ত্ব উপদেশ মহাপুরুষ আশুতােষ (বহু চিত্রে সুশােভিত) ২০ বরেন্দ্র লাইব্রেরী ২০৪নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।

আমাদের প্রকাশিত পুস্তকাবলী। এবিজয়রত্ন মজুমদার প্রণী ও ঐ সত্যচরণ চক্রবর্তী প্রণীত হীরার কন্ঠী ১প্রীতির নিদর্শন২১ হরপাৰ্বতী ১০ কুলদেবী ৷৷ দিশেহারা ২, আলােকে আঁধারে ঐশ্রীপতিমােহন ঘোষ প্রণীত স্বপ্ন-পরিণীতা ১০ হাতের নােয়া ২. স্বয় ধরা ১০ স্নেহাশীষ ২, ঐ অমরেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রণীত শ্রীহরপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত ভাগ্যবতী ১০ পরাধীনা ১৷ অনাদৃতা ১০ শ্ৰীযােগীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রণীত বিসর্জন ১০ কমলিনী ১০ শ্ৰীমতী চারুশীলা মিত্র প্রণীত শ্রীহরিসাধন মুখােপাধ্যায় প্রণীত সতীলক্ষ্মী ২, কমলার অদৃষ্ট | সোণার কমল ১০ স্বর্ণ প্রতিমা ১৩ একালীপ্রসন্ন দাশ গুপ্ত প্রণীত সুরেন্দ্রমােহন ভট্টাচাৰ্য প্রণীত প্রীতি ১,০ স্বর্ণ কুটীর • শ্রীফণীন্দ্রনাথ পাল প্রণীত ধীরেন্দ্রনাথ পাল প্রণীত ফিরে পাওনা ১০ লক্ষ্মীলাভ ১০০ এর খালদাস কাব্যানন্দ প্রণীত এনারায়ণচন্দ্র ভট্টাচার্য প্রণীত শঙ্করাচাৰ্য ২|| বিন্দুর বিয়ে ১া সুখের মিলন || : নবকৃষ্ণ ঘােষ প্রণীত হেমেন্দ্রকুমার রায় প্রণীত মনের দাগ ২১ মেহের দান ২ পসরা ১০ ভােরের আলাে ১||• শান্তি ১০ আশার আলো ১০ যতীন্দ্রনাথ পাল প্রণীত সতীর স্বর্গ ১০ ধৰ্ম্মপত্নী ৩ একাকার মেয়ে ১০ কেরাণীর মাসকাবার ১১ বিয়ের কনে ১০০ নৃপেন্দ্রনাথ বসু প্রণীত সতী-রাণী ১১ মুস্কিল আসান ১৷৷ বিকাশ ও ব্যখা 5110 সঙ্গিনী ১, রংবাহার (নাটক) পরিণয় পারে | মিলন ১১ 4

བཝཱ
এক
“যার বে’ ভার হুস্ নেই, পাড়া পড়শীর ঘুম নেই” বলিয়া হাসি-
মুখে একটি কিশােরী অন্য এক কিশােরীকে ঠেলিয়া তুলিতে ছিল।
প্রভাত সূর্যের স্নিগ্ধ মধুর রৌদ্ররেখাগুলি জানালার ফাকে ফাকে
ঘরে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। ঘরে আর কেহই ছিল না।
কমলা পাশ ফিরিতে ফিরিতে বলিল—কেন ভাই, বেল, জালাতন
করছিস্?
বেল কমলার পাশে বসিয়া মৃদুস্বরে বলিল—জ্বালাতন বৈকি। সকাল
হতেই শুয়ে শুয়ে ভাবছ, কখন সন্ধ্যেটা হয় ।
কমলা বলিল-দাড়া ভাই বেলফুল। মনের ভেতরটা একবার
খুঁজে দেখি ভাবনাটাকে যদি পাই।কমলা চিন্তা করিবার ভাণ করিল।
বেল তাহার চিবুকটি ধরিয়া বলিল-রাত্রে ঘুম হ'য়েছেল ত বেল ?
কমলা ম্লানমুখে বলিল—না ভাই, একটুও হয় নি, সত্যি বলছি !
: আচ্ছা কেন বত ভাই বেল ?

বঙ্গ
বেল পরম বিজ্ঞের মতই বলিল—অমন হয়, অমন হয়। আরাে
কত হবে, দেখিস্ তখন।
কমলা বালিশটি একটু উচু করিয়া বাম হাতের উপর কপােলটি
রাখিয়া উৎসুকের সহিত বলিল—তাের হয়েছিল, বেল, সত্যি কথা
বলিস ভাই ? বলিয়া র্সে ডানহাতটি দিয়া তাহার গলার হারটি
নাড়িতে লাগিল।
বেল গম্ভীরমুখে বলিল-ও-মা ! হয় নি আবার! তিনরাত্রি
ঘুম ছিল না।
কমলার মনে হইল, সে রহস্য করিতেছে। বলিল—কতদিনে
আবার সারল ?
কি সারল ?
ঐ-যে রােগটি।
ও-ই, তাই বল। হা হা ঠিক বটে। কবিরা ওকে বােগই বলে
বটে। । ল ভাই, বেল, তােমার কি রকমটি হয়েছে, বল শুনি। তােমার
বেল্-বাবুকে ঐ নিয়ে একটা গল্প লিখতেও বলতে পারি।
এইখানে বলা আবশ্যক, আমাদের এই বেল, ওরফে মতি
মেঘমালা বস্তু (বাল্যকালে ইনি ‘দাসীই বলিতেন, তাহার স্বামী
বুঝাইয়া দিয়াছেন পৃথিবীতে কেহ কাহার দাস বা দাসী নহে) খাস
কলিকাতার সুকবি যুক্ত সুজয়েন্দ্র নাথ বসুর সহিত দুই বৎসর পূর্বে
পরিণীত হইয়াছিলেন। তাঁহার স্বামীর রচিত পাঁচখানি কবিতার
বই-ও ( ছাপা) আছে।
কমলা হাসিমুখে বলিল—তাই বলিস্ লিখতে।

বেল বলিল-কি-রকম হ’ল, বল-আগে !
কমলা বলিল—এখনি হ’ল কি বল! এই ত মােটে সুরু। সে
যাক, খাবার খেয়েছিস?
আমি খেয়েছি। তা চ’, চা খেয়ে ছাদে বসে, বুঝলি—দুজনে
গল্প হবে।
কমলা বলিল-একটু চা দিবি ভাই ?
বেল বিস্ফারিত নেত্রে চাহিয়া বলিয়া উঠিল—সত্যি ত ভাই বেল,
আজ যে তােমার খেতেই নেই।
দেখ, আমি সব জানি তবু কিন্তু আগে বিয়ে করিনি-বলিতে
বলিতে কমলা খাট হইতে নামিয়া পড়িল । বেলকে টানিতে টানিতে
বলিল—চল, নীচে যাই। সানাই-টা বেশ লাগছে, না-ভাই-বেল ?
বেল বলিল—তাই না-কি রে ! এখনই ?
কমলা বলিল—তাের কি লাগেনি?
লাগেনি! উঃ সে-কি বিষম-ই লেগেছিল ! একেবারে যেন কি
একরকম। শুধু সানাই! সেদিনের সেই খর-জোষ্টির রােদটা কি মিষ্টি
হয়েই উঠেছিল রে—যেন মধু।
এই সময়ে কমলার মা ঘরে ঢুকিয়া বলিলেন—স্নান করবি, কমলা?
ভূদি
বেল বলিয়া উঠিল—না, মামী, বিয়ে বাড়ীতে তুমি ভুদী ভূদি
কর’ না বছি, হঁ্যা। মামী যেন-কি !
কমলা নতমুখে পঁড়াইয়াছিল, বলিল-মা, একটু চাও খেতে
পাব না!

वयु
কমলার মা বলিলেন–না মা, আজ ত খেতে নেই। ও ভূদী,
অ পােড়া কপাল আমার মনের মুখে ! তা ছাই, বলবই-বা কি ?
বেল বলিল—কেন মালা বল্‌বে ; সবাই যা বলে।
তাহার ইচ্ছা নহে যে তাহার শ্বশুর বাড়ীর লােকেরা কদৰ্য্য ভুদী
নামটা দিন রাত্রি না শশানে। অভ্যস্ত হইয়া পড়িতে পারে। ।
আচ্ছা বাবু, মালাই বছি, ও মালা, নে মা ওকে নিয়ে স্নান করে
নে। দেরী করিস নে ; যত সকালে গায়ে হলুদ দিয়ে দিতে পারবি,
বাছা-আমার মুখে একটু জল দিতে পারবে ! বলিয়া তিনি বাহির হইয়া
গেলেন। গলাধরাধরি করিয়া সখী দুইটি একমিনিট দাড়াইল। কেহ
কোন কথা কহিল না। একবার চোখােচাখী হইল। চোখে হাসি
উছুল হইয়া উঠিল ; অথবা দুঃখে ম্লান হইয়া গেল, ঠিক কি হইল
জানি না ; দুজনেই চক্ষু মুদ্রিত করিল।
বলিল—চ, যাই।
বেল্ চলিতে চলিতে দাড়াইল। এদিক ওদিক চাহিয়া বলিল
বেল্ ( আবার সেই চাহনী ) আজই ভাই শেষ•••
, বেল, শেষ নয় ভাই, শেষ নয় ভাই ; তাের এ বেলকে তুই
সারা জীবন পাবি-বলিয়া কমলার হাতটি ধরিয়া বাহির হইয়া গেল।
•
;

দুই এইখানে পরিচয় দেওয়াটা আবশ্যক মনে করি। হুগলীর পুলটা ঠিক যেখানে শেষ হইয়াছে, মহাসনের ইমামবাড়ীটা তার পাশেই বহুকাল হইতে দাড়াইয়া আছে। কত দেশবিদেশ হইতে কত লােক ইংরেজের এই পুলটা আর মুসলমানদের এই ইমামবাড়ীটা দেখিতে আসে। বড় রাস্তার ধারে একটি বৃহৎ বটগাছের নীচেই একটি শ্যাওড়া গাছের মত মােহিনী বাবুর ক্ষুদ্র দ্বিতল গৃহটি অবস্থিত, ইমামবাড়ীর গির্জায় প্রতিফলিত সূৰ্য্যরশ্মি লােকচক্ষুকে এক দৃষ্টিতেই এত বিহ্বল করিয়া দেয় যে এই ভাঙ্গাচোরা, বালি-খসা, ইটকাঠ বেরুণ বাড়ীটা আর কার’ নজরেই পড়ে না। অথচ সুখের পাশে দুঃখের, ধনীর কাছে নিধনের, স্বাস্থ্যবান লােকের পাশেই রােগী থাকিলে দর্শকের চক্ষুকে সন্ত্রস্ত করিয়া তুলে কি-না জানি না, তার একটা করুণ ভাব যে আছে তা অস্বীকার করিবার যাে নেই। মােহিনী বাবু সামান্য গৃহস্থ-কমলা তাহার একমাত্র কন্যা; অন্য পুত্রসন্তানাদি নাই। . বাঙ্গালীর ঘরে তের বছরের মেয়ে থাকিলে পিতামাতার মনের সুস্থতা থাকে কি-না, তা বােধ হয় জানিতে আর কারু বাকী নাই। আবার যদি তাদের ক্যাসবাক্স বেশ ভারী না-হয়, অবস্থাটি কল্পনা করিতেও বাঙ্গালীমাত্রেরই ভয় হয়। কমলার না-হয় বরাত ভাল। মােহিনী বাবুকে বেশী খোঁজাখুঁজি করিতে হয় নাই, একেবারেই মনােমত ঘর-বর আসিয়া জুটিয়াছে- প্রস্থ কিন্তু সে ত আর সকল ঘরেই হয় না। সাথে একটা হয় কি-না তাও সন্দেহ। কলিকাতার এক সুবিখ্যাত ধনীগৃহে কমলার সম্বন্ধ স্থিরীকৃত হইয়াছে। মেয়েটি দেখিয়া তাহারা বিনাপণেই গ্রহণ করিতেছেন। কিন্তু তাহাতেও কি বাপ-মা’র মনে সুখ আছে? সেই যে বলে না, সমানে সমানে কাজ না করলে পস্তাতে হবে—মােহিনী বাবু ভাই ভাবিতেছিলেন। তারা খুব ধনী, তাদের ঘরে গরীবের মেয়ে গিয়া বিপদে পড়িবে না! উঠিতে বসিতে কষ্ট পাইবে না ত। কমলা বাল্যকালে লাল চেলীখানি পরিয়া উঠানের কোণে মাটির শিব গড়িয়া পূজা করিত ; স্নানকালে সেগুলি বাড়ীর নীচেই গঙ্গায় ভাসাইয়া দিত—ইহার কোন ব্যতিক্রম হয় নাই। একবার তাহার খুব অসুখ হইয়াছিল, উঠিবার সামর্থ্য ছিল না। সেই অবস্থাতেও সে বার বার শিবপূজার কথাই বলি। তখন ত তাহার লজ্জা হয় নাই। তখন যে কচি কোমল মনটি ভক্তিতে ভরিয়া ছিল। কত পুণ্যি পুকুর পূজা করিয়াছে, কত বারব্ৰত সেই বয়সেই তাহার আয়ত্ত—কিন্তু তাহাকেই খন সকলে সেদিন বলিল-কলি, ভাল শিবপূজা করিছিলি রে । কমলার মুখখনি জবাকুসুমের মত রাঙাইয়া উঠিল। বাস্তবিক সে- চিরদিন ভক্তিনতচিত্তে শিবপূজা করিয়াছে, কখনও তাহাতে এতটুকু ফাঁকী বা অবহেলা ছিল না ; হয়ত সে তখন শিবপূজার চরম উদ্দেশ্য কি তাহা জানিত ন—কিন্তু সেই পূজার মূলে যে পূর্ণমাত্রায় হার স্বার্থ বিজড়িত হইয়াছিল, তাহাই যখন লােকে তাহাকে বুঝাইয়া দিল, লজ্জায় তাহার মুখটি নত হইয়া পড়িল। বাড়ী শুদ্ধ লােকে যে শঙ্কা করিতেছিল কমলা যে কাণাঘুযায় বঙ- তাহার কিছুই শুনে নাই তাহা নহে । প্রথমটা তাহার বুকের মধ্যে কেমন একটা অজানা আশঙ্কা গু গুর করিয়া উঠেতেছিল, সে খুব ভাল লেখাপড়া জানে না, শুনিয়াছে সহরের মেয়ের নাচ গান করে সে ত এক বিন্দুও জানে না, তাহার বে-ও ইংরেজীতে চিঠি লিখিয়া থাকে, সে ত মাত্ৰ A B C D শিখিয়াই বহিখানিকে পুলের নীচে গঙ্গায় ভাসাইয়া দিয়াছিল। সে ভাবিতেছিল—তাহার যখন কোন গুণই নাই, সে কলকাতায় গিয়া হয় ত কাহাকেও সন্তুষ্ট করিতে পারিবে না। আর তা যদি না পারিল, বােসেদের লতার মত সারাজীবন অশেষ লাঞ্ছনাও ত তাহাকে পাইতে হইবে! কমলার বুক কঁপিয়া উঠিল। মা বাপের একটি মেয়ে, আদর সে যথেষ্টই পাইয়াছে, কটু কথা ত জীবনে একটি বারও শুনে নাই। কেমন করিয়া লাঞ্ছনা অনাদর সে সহিবে । তাহার মনে হইল, কেন বাবা পাড়াগাঁয়েই দেখিলেন না। সেখানে হইলে ত এত বিপদের ভয় থাকিত না। সে অক্লেশে রধি বাড়িয়া, গরুর সেবা করিয়া, শ্বশুর শ্বাশুড়ীকে যত্ন করিয়া জীবন কাটাইয়া দিত। এ কথাটি সে একদিন চুপি চুপি জ্যেঠাইমাকে বলিয়াছিল, একটু সহজ করিয়াই বলিয়াছিল—জ্যেঠাইমা, কাছাকাছি হলে বেশ হত । রােজ রােজ তােমাদের দেখতে পেতুম। জ্যেঠাইমা হাসিয়াছিলেন। কমলা বলিয়াছিল—বেশ আমাদের মত গেরস্থ হলে ভাল হত। জ্যেঠাইমা যে কথাটি বলিয়াছিলেন-একেবারে অপূর্ব। মা! তুমি নিজেই ত একটি ক্ষুদ্র নদী, আর একটা ক্ষুদ্র নদীতে ৭ ব মিলে তােমার কি সুখ হবে মা! নদী সাগরে মিলবে, তবে না তার সার্থকতা। একটু থামিয়া আবার বলিয়াছিলেন-আমি এ বলছি নে মা, যে সব মেয়েরই অমনি বড় বড় ঘরে বে হবে। তাত হতে পারে না মা। তুমি ভাগ্যবতী--সে সৌভাগ্য তোমার হয়েছে-সেত পরম আনন্দের কথা, মা। কমলা বুঝিতে পারে নাই, বলিল—আমি ত জানিনে জ্যেঠাইমা, সেখানে কেমন করে চলতে হয়! কেমন করে শিশুকাল হইতে এই বিধবাটির কাছে তাহার কোন গােপনতা ছিল , আজ কিন্তু কথাটা অধরে ঠেকিয়া বাঁধিয়া গেল। । কিন্তু জ্যেঠাইমা তার মনের কথাটি বুঝিলেন ; বলিলেন-কেমন করে চলতে হয়, কেমন করে সকলকে সন্তুষ্ট করতে হয়? এই-না ! এতে ভাববার কথা কি আছে কমলা! ছেলেবেলায় কি করেছ না করেছ ভুলে যাও, এখন তুমি বাড়ীতে যা করছ, যাতে করে সবাই—মঙ্গলা গাইটি অবধি তোমার বশ—সেখানেও তাই করবে, কমলা। কমলা বলিয়াছিল—তারা যে নতুন লােক জেঠাইমা । জ্যেঠাইমা বলিয়া ছিলেন—হলেই বা নতুন, মানুষ ত! এখানে বােজ সকালে উঠেই তুমি কি কর? ঠাকুর প্রণাম করে আগে তােমার বাবাকে তামাকটি সেজে দাও; সেখানে হয়ত তামাক সাজবার লােক অনেক আছে—তুমি সকালে উঠেই তােমার শ্বাশুড়ীর দরকারটি আগে জেনে নেবে। মা কমলা, আমাদের সংসার ত শ্বশুর শ্বাশুড়ী, দেবর ননদ নিয়েই। তাদের হাসিটি অমূল্য, তাদের সন্তুষ্টি যে প্রাণের

국뽰
আকাঙ্খ। পিপাসা পেলে যেমন জলের চেষ্টা তােমাকে আপনা থেকে
করতেই হইবে, এও যে মা ঠিক তেমনি।
একটু থামিয়া বলিয়াছিলেন-দেখ মা, রামায়ণ মহাভারত শত
গ্রন্থেই দেখবে আমাদের দেশে রমণীই দেশের প্রাণ ! সদাসর্বদা
তুমিও মনে রাখবে, তুমিও রমণী !”
আজবিবাহের দিনে এই সব কথা গুলিই কমলার মনে পড়িতে
লগিল ।

তিন
তবে
কমলার বিবাহ। ভাের বেলায় ঘুমটি ভাঙ্গিয়া যাইতেই তাহার
কাণে সানাইয়ের করুণ সুরটি যেন জাগ্রতেও স্বপ্ন সৃজন করিয়া উঠিল
আজ সানাইয়ের সুরটিতে তাহার সমস্ত মনের ভিতরটা কি একরকম
আবেশময় করিয়া তুলিল। তাই সে চক্ষু মুদ্রিত করিয়া শুইয়াছিল,
ভাবিতেছিল আমারই বিয়ে !
অনেক সখী—চাপা, বেল, কদমের বিবাহে এমনই ত সানাই বাজিয়া
গিয়াছে, তাহাতেও সে আনন্দ পাইয়াছে, কিন্তু আজ সে মনে মনে
যাহা অনুভব করিতেছিল, সে ত কেবল আনন্দ নয় ; তার সঙ্গে যেন
আরো কি মিশাইয়া আছে! ভয়, কি ? কৈ ভয় ত নয়।
এ-কি ?
নীচে নামিতেই, ঠান্‌দি বলিয়া উঠিলেন-ও-মা! কনে যে !
ও ভাই কনে’, স্নান হ’ল? গায়ে হলুদ হবে যে !
কমলা দেখিল, সেখানে দুই একজন দাসী ভিন্ন আর কেহ নাই,
হাসিয়া বলিল—ঠাদি, তােমার গায়ে হলুদ দিয়ে দেব ?
দিবি—দে। শুধু হলুদ কেন, একটু চুণে হলুদ দিয়ে দে। সারা
রাত্তির জেগে কুনাে কুটে, গা গতরে ব্যথা হয়ে গেছে ।
কমলার পিতা মােহিনী বাবু কি একটা কাজে ভিতরে আসিতে
ছিলেন, কন্যার সহাস মুখখানি দেখিয়া প্রসন্নমনে বলিলেন-ও-গাে

বসু
ঠাকমা, এই নাও টেলিগ্রাফ এল। স’ আট-টায় গায়ে হলুদ হবে
লিখেছে তারা।
ঠাদি সবিস্ময়ে বলিলেন-টেলিগ্রাফ কি রে ? লােক আসবে
?
লইল।
কমলার বাবা মেয়ের মুখের পানে চাহিতেই, কমলা দৃষ্টি নামাইয়া
মােহিনী বাবু বলিলেন—লােক ত আসবেই । খবরটা
তার করে আগে থাকতেই দিয়েছেন। বড় লোকের বড় কথা।
কমলার মা-ও আসিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। বেলের নিকটে দাঁড়াইয়া
অবগুণ্ঠনের মধ্য হইতে মৃদুকণ্ঠে কহিলেন-ক’জন্ লােক্ আসবে,
জিজ্ঞেস কর ত ভু-
বেল হাসিয়া কটমট করিয়া চাহিল। জিজ্ঞাসা করিতে হইল না,
মােহিনী বাবু নিজেই বলিলেন—তা কিছু লেখে নি, অনুমান, পঞ্চাশ
ষাট জন আবে।
গৃহিনী আর কিছুই বললেন না। তিনি ভাবিতেছিলেন, বড়
লোক কুটুম বাড়ীর এতগুলি লােক আসিবে, অভ্রম না-হয়।
মােহিনী বাবু যেন তাহা বুঝিয়াই বলিলেন—খাবার দাবার আয়াে-
জন ঠিক করে ফেল। বড় লােকের বাড়ীর চাকর বাকর, অতু না-
হয়। ভারি নিলে হবে। আমি মাছ ধরতে পাঠিয়েছি।তিনি
বাহিরে চলিয়া গেলেন।
ঠাদি—তিনি পাড়ার ঠান্‌দি ;-সুলদেহটি নাড়িয়া, একটু বাঁকা
করিয়া বলিলেন-অত বড় লােক ধরতে গিয়ে ভাল কর নি বৌ।
কমলার জননী কথা কহিলেন না।
১১

বন্ধু। ঠান্‌দি বলিলেন-কলকেতা থেকে হাওয়া গাড়ীতে বর, বরষাত্তর আসবে শুনছি। তারা কি সােজা নােক গা? গৃহিনী তাহা জানিতেন। নৃতন বৈবাহিকদের নিজেরই দুই খানি হাওয়া গাড়ী আছে ; তা ছাড়া, জুড়ি বােড়, কলকাতায় লাটসাহেবের মত বাড়ী আছে এ সবই তিনি শুনিয়াছিলেন। তাহাদের সহিত কাজ করা মধ্যবিত্ত গৃহস্থের যে একেবারেই অসম্ভব ছিল তাহা কি তিনি নিজেই জানিতেন না ! জানিতেন। আসল কথাটি এই, হেমেন্দ্রবাবু হুগলীতে জইন্ট ম্যাজিষ্ট্রেট। তিনিই মহেশ্বরী বালিকাবিদ্যালয়ের পুরস্কার বিতরণের সময় কমলাকে দেখিয়া পসন্দ করিয়াছেন। হেমেন্দ্র বাবুর ছােট ভাই শৈলেন্দ্রের সহিত কমলার সম্বন্ধ তিনিই করেন। না নগদ টাকা, না গহনা তাহারা কিছুই চাহেন নাই; কেবল মাত্র অপূর্ব সুন্দরী কমলাকেই চান। ঠাদির প্রশ্নে কমলার মনে একটুখানি ভয় হইয়াছিল, মা’র কথায় দে ভয় দূর হইয়া গেল। মা বলিলেন--শুনিছি, বড় লােক হলেও তার । লােক খুব ভাল। ওর ভাসুর হবেন যিনি, তিনি ত প্রায়ই আসেন। ঐ-যে কমলার হার বালা সবই তিনি নিজে এসে কমলাকে পরিয়ে দিয়ে গেছেন। দেখা ত মা-কমলা, ঠানদিকে•••• কমলা একবার মুখ তুলিয়াই নামাইয়া লইল, হারটি বালা জোড়াটি দেখাইবার প্রবল ইচ্ছা সত্বেও সে নড়িতে পারিল না। বেল তাহাকে একটু ধাক্কা দিয়া বলিল-লজ্জায় গেলেন আরকি! দেখা না লা। কমলা তীব্র দৃষ্টিতে বেলের পানে চাহিয়াই হাসিয়া ফেলিল। আস্তে আস্তে হারটা খুলিয়া ঠাণদির হাতে দিল।

বহু
ঠাণদি দেখিতে
দেখিতে দেখিতে
দেখিতে বলিলেন—এ যে হীরে জড়ােয়
বসানাে ।
একটু থামিয়া আবার বলিলেন—ভাল হ'লেই ভাল, বৌ ! তবে
আমি ভুগেছি কিনা।
তিনি আরো কি বলিতে যাইতে ছিলেন, গৃহিনী কমলার দিকে
ফিরিয়া বলিলেন-যা-না মা, স্নান করে আয়-না।
কমলা বেলের হাতটি ধরিয়া চলিয়া গেল। এক মিনিট পরে গৃহিনী
বলিলেন—ঠাকুমা, আজকের দিনে ও সব কথা থাক। বলিয়া তিনি
একটি ধামা লইয়া আলু বেগুন গুলি তুলিতে লাগিলেন।
ঠাণদি বলিলেন—কি করতে হবে আমাকেই বলনা বৌ, আমি
কি আর তোমার কাজের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছি ?
কমলার মা বলিলেন—তােমরাই ত আমার ভরসা মা। তােমরা
করবে না ত করবে কে? আমি বলি কি তুমি জপ আহ্নিকটা সেরে
একেবারে কাজে লেগে যাও।
তিনি গৃহিণীর হাত হইতে ধামাটী লইয়া—ধুতে হবে ত?” বলিয়া
কক্ষের বাহির হইতেছিলেন, গৃহিণী বলিলেন –ঠাকুম, পুকুরে আমাদের
ওরা নাইতে গেছে, কোন কথা......
ঠাণদি বাধা দিয়া বলিয়া উঠিলেনসে কথা আর বলতে হবে
না বৌ।
এই পরম সত্যবাদিনী, সংসারাভিজ্ঞা ঠাণদি পুকুরে গিয়া দেখিলেন
-সখি দুইটি আকণ্ঠ নিমজ্জিত হইয়া বসিয়া আছে। ধামাটি সােপানে
নাম ইয়া রাখিয়া বলিলেন—শশুর বাড়ী গিয়ে কি করবি লা? সে যে

ব
সহর, পুকুর পাবি কোথা ? কল টিপলে জল বেরুবে ; ছিড়িক ছিড়িক
করে।
বেল বলিল—কেন চৌবাচ্চা আছে তা
ঠাণদি ঝঙ্কার দিয়া বলিলেন—জানি, লে, জানি। তুই ও যে
সহুরে হয়ে পড়েছিস। সেই যে বলে না যত সব সহুরে বাবু, খায়
কেবল জল সাবু।
বেল জিজ্ঞাসিল---কে বলে ?
কত নােকে বলে, কার নাম করব । আমার এক ভার-শে।
সহরে চাকরী করতে গেছল। ছ' মাস পরে যখন ফিরে এল বাছা
আমার একেবারে অস্থিচমােনার।
বেল বিস্ময়ের ভাণ করিয়া বলিল-বল কি গাে ।
ঠাণদি বলিলেন, বলিলেন--বলিই । সহর জায়গা, তাতে
আবার বড় লােকের বাড়ী।
বেল বমলার মুখের পানে চাহিয়া ঠাণ দিকে বলিল—সব কথাতেই
তােমার টিপনী কাটা আছে, না ঠাণদি।
ঠাণদি এক মুহূর্ত সবিস্ময়ে চাহিয়া রহিলেন, পরে গর্জন করিয়া
উঠিলেন, কি বলি লা ভুদী?
বেল মহা চটিয়া গেল, অন্য দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিল—এখানে ভুদী
কেউ নেই।
ঠাণদি বলিলেন—তুই ভুদী।
বেল কি বলিতে যাইতেছিল, কমলা জলের ভিতরে তাহার হাতটি
টিপিয়া ধরিল। ঠাণদিকে বলিল—কি বলছিলে ঠাণদি? বল না।
১৪

বন্ধু
ঠাণদি কি বলিতে যাইতে ছিলেন, বেল উঠিয়া পড়িল, গামছা খানি
নিংড়াইতে নিংড়াইতে বলিল—আমি চলুম, বেল।
কমলাও উঠিল, বলিল—চল আমিও যাই।
সিক্ত বসনে পথে যাইতে যাইতে কমলা বলিল—ঠাণদি কিন্তু ভারি
রেগে গেছেন ভাই।
তবে আর কি। আমি পিপড়ের গর্ত খুঁজি-বলিয়া হাসিয়া বেল
আলুলায়িত কেশ রাশিতে গামছা জড়াইতে লাগিল।
কমল বলিল-দেখ লিনা, আমরা যখন উঠে এলুম, কি রকম ক'রে
চাইতে লাগলেন।
চাকৃ-গে-বলিয়া বিল কমলার চুল গুলি ঝাড়া দিতে লাগিল।
ঠাণদি তখনও পুকুর ঘাটে ধামার সম্মুখে বসিয়া ভাবিতেছিলেন
ভুদীটা সহর থেকে কি ধিঙ্গী-ই হয়ে এসেছে মা। আজকালকার মেয়ে
গুলাে যেন কি! আমাকে একেবারে থ বানিয়ে দিলে । উঃ কি
আশ্চৰ্য্যি। কি আশ্চৰ্য্যি।
কমলা বলিল—তুই ভাই সত্যি কথাটা বই না কেন?
বেল রাগত ভাবে বলিল-ওর আবার সত্যি মিথ্যে কি।
আমার
মন কেমন করেছিল, আমি ত বলছি।
কমলা তাহাকে ঠেলা দিয়া বলিল—কৈ এতক্ষণ ত ত বলি নি।
আচ্ছা তুই কেঁদেছিলি ?
দূর ! কাদব কেন? হাসতুম। যখন বডড মন কেমন করত, খুব
হাসতুম।
তা কি কেউ পারে ?

বন্ধু
এই সময়ে বাহিরে শঙ্খ ধ্বনি উঠিতেই বেল বলিয়া উঠিল—গায়ে
হলুদ এসেছে—-চ।
কমলা উঠিল না, বলিল—তুই যা।
আহা--
তুইও আয়, বলিয়া বেল সস্নেহে তাহাকে টানিয়া তুলিতেই
কমলা বলিল—যা-লােকে কি মনে করবে তার ঠিক নেই?
মনে আর কি করবে ? তাের জিনিষ তুই দেখবি নে, আয়।
ঘরে করাঘাত শ্রুত হইল, বেল দ্বারটি খুলিয়া দিতেই গৃহিণী হাসি-
মুখে বলিলেন—গায়ে হলুদ এসেছে, ভূ-না, না—মালা! আচ্ছা
তুই-ই বল বাছা, মালা মালা কি করা যায় ! তার চেয়ে বেলই বলব।
বেল হাসিয়া বলিল-তাই বল মামী!
তাহার মুখের কথা শেষ না হইতেই গোলাপী রঙে ছােপান কাপড়
ও চাদর পরা দুইটি লােক প্রবেশ করিতেই গৃহিণী বলিলেন—এই
খেনেই নামাও।
ক্রমে লােকে ঘর ভরিয়া গেল।
কমলা নতমুখে আড়ে আড়ে দেখিতেছিল।
এই যে ঘরভরা জিনিষ এযে তাহাকেই অভ্যর্থনা করিয়া লইবার বিপুল
আয়ােজন মনে পড়িতে সে যে আনন্দে গর্বে স্ফীত হইয়া উঠিতে-
ছিল। হঠাৎ তাহার এই আনন্দ সচেতনের ভাবটা কাটিয়া গেল, কার
এক ভারি গলার আওয়াজে। সে আর একটু জড় সড় হইয়া বসিয়া
একদৃষ্টিতে মুষ্ঠামধ্যের কজ্জল লতার পানেই চাহিয়া হল।
নবাগতা একটি প্রৌঢ়া (গােলাপী কাপড় পরা) তাহার দিকে
চাহিয়া বলিল—-বৌমা, আমাকে আবার লজ্জা কিসের গা ?

বন্ধু
ও-বাড়ীতে গিয়ে দেখবে তখন এই দুই সব। তােল ত’ মা মুখখানি
এরা সবাই দেখবে বলে হাঁ করে দাড়িয়ে রয়েছে।-বলিয়া সে কমলার
নিকটে গিয়া বসিল।
কমলার মা দু’হাতে কমলার চিবুক ধরিয়া তুলিয়া বলিলেন-এই
দেখ বাছা।
সকলে নীরবে প্রশংসা করিতে লাগিল; কেবল হেড-দাসী সদু
চুপ করিয়া থাকিতে পারিল না, বেশ একটু চিবাইয়া চিবাইয়া বলিল—
হা-বৌয়ের মত বৌ বটে! একেবারে নীল পদ্মটি ।
কমলার মাথাটা কোলের উপর ঝুকিয়া পড়িল। সূর্যালােকে
লাল পদ্ম একেবারে রক্তবর্ণ ধারণ করিল। সে-যে সুন্দরী সুরূপা শিশু-
কাল হইতে ত সে শত সহস্র বার শুনিয়াছে ; আনন্দও পাইয়াছে, কিন্তু
আজ একটী পরিচারিকার মুখে সে কথা শুনিয়া সে একেবারে বিহ্বল
হইয়া পড়িল। যেন আরও কি শুনিবে এই আশায় দুল-পরা কাণ দুটি
তাহার দুলিয়া দুলিয়া উঠিতে লাগিল।
অন্য সকলেই বাহির হইয়া গিয়াছিল, তাহা দেখিয়া কোথায় গেল
রে সব’-বলিতে বলিতে সৌদামিনী আর-একবার কমলার মুখের
পানে চাহিয়া, বাহির হইয়া গেল।
বেল সর্বাগ্রে ভেলভেটের বাক্সটি তুলিয়া
ভেলভেটের বাক্সটি তুলিয়া লইয়া গৃহিণীর
সম্মুখে দাড়াইয়া খুলিয়া ফেলিল। তন্মধ্যে একটি জড়ােয় টায়রা
ছিল।
কৈ গাে কমলের মা, গায়ে হলুদ কোথায় নামালে গাে?
বলিতে বলিতে একটি বর্ষিয়সী-রমণী প্রবেশ করিলেন।
১৭

ব
কি-কি গয়ণা দিলে গা—বলিয়া একটি যুবতী শিশু-কক্ষে ঘরে ঢুকিয়া
হুমড়ি খাইয়া টায়রাটি দেখিতে লাগিলেন।
প্রৌঢ়া ৰমণী বলিলেন-বা, জিনিষপত্তর ত বেশ দিয়েছে। সহরের
লােক নইলে দিতে থুতে পারে না, বাপু, যে যাই বল।
যুবতী বলিলেন—কেন দেবে না, বল ? যােগেন দত্ত হল
কলকাতার একটা ডাক-সাইটের উকীল।
এয়েছে ত একশ’ জন, কি জিনিষটা দিলে দেখি-বলিয়া ঠাদি
একেবারে নভােমণ্ডলে চন্দ্রের মতই ফুটিয়া উঠিলেন। তঁাহার পার্শ্বে
অন্য সকলেই মৃদু-জ্যোতি-তারকার মত নিষ্প ভ হইয়া পড়িল ।
ওটা কি টায়রা বুঝি ? দেখিতে দেখিতে নাসিকা কুঞ্চিত হইয়া
উঠিল, আরও কিঞ্চিৎ অনুনাসিক স্বরে উচ্চারিত হইল—নেহাৎ
সেকেলে !
বেল কাপড়ের ট্রে-টা টানিতেছিল, মুখ তুলিয়া বলিল—আজ্ঞে না
মশায়। ওটা লভচাদের নতুন প্যাটার্ণ ।
তুই বল্লেই হবে নতুন ? ঠিক ঐরকমই ত আমার আছে।
কখখন নেই ঐরকম। আচ্ছা নিয়ে এস ত দেখি।
দেখ, ভুদী, ভাল হবে না বলছি। তিনি কয়েক পদ অগ্রসর
হইলেন। বেও দাড়াইয়া উঠিল, ঝঙ্কার দিয়া বলিল—নিয়ে এস-না,
দেখি ।
ঠান্’দি সেই ঘাট হইতেই বিরক্ত হইয়াছিলেন, এখন ধৈৰ্য্য রাখা
তাহার পক্ষে অসম্ভব হইয়া উঠিল। একেবারে তাহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া
হাত নাড়িয়া বলিলেন—তাের বড় বাড় বেড়েছে না।
=

ব বেড়েছেই তবলিয়া বেলও দাড়াইয়া রহিল। ঠান’দি এক মুহূর্ত কি ভাবিয়া লইলেন, তারপর ব্যঙ্গের স্বরে বলিলেন—অত বড় বাড়িসনে লল, ঝড়ে পড়ে যাবি। কমলার মা স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছিলেনএকি ব্যাপার । ঐ অশীতি- বর্ষ বয়স্কা ব্রাহ্মণের বিধবাটি একটি বালিকার সহিত এমন কোমর বাঁধিয়া ঝগড়ায় লাগিয়া গিয়াছেন এই ত সহজে বিশ্বাস হয় না, তার উপর আবার যখন দুম দুম্ করিয়া পা ফেলিতে ফেলিতে বাহির হইয়া যাইতে- ছিলেন, কমলার মা তাহার সম্মুখে আসিয়া বলিলেন—ওকি ঠাকুমা, একরত্তি একটা মেয়ের ওপর রাগ করে তুমি চলে যাচ্ছ? ঠাণ’দি আরক্তমুখে কি একটা বলিতে যাইতেছিলেন, কমলার মা বলিলেন-ঠাকুমা, তােমরা পাঁচজনই আমার বল, বুদ্ধি, ভরসা। তােমরা যদি নিষ্ঠুর হয়ে চলে যাও, আমি এ বিপদ থেকে উদ্ধার হ’ব কি করে-তা বল। শেষের দিকটায় তঁাহার গলা ভিজিয়া ভারী হইয়া গিয়াছিল। তিনি চুপ করিতেই শিশুক্রোড়ে যুবতীটি বলিলেন—বেশ দিয়েছে। কলি, দেখ না রে পছন্দ হয়েছে ত ! কমলা একবার চাহিয়াই চক্ষু ফিরাইয়া লইল। গৃহিণী বলিলেন-- ওর আবার পসন্দ অপসন্দ কি, বীণা? পাঁচজনে তােরা বওর হাতের নােয়া, মাথার সিদুর অক্ষয় হােক। একটি প্রৌঢ়া রমণী দ্রব্যাদি দেখিতেছিলেন, বলিলেন-বলছিনে বৌ। একশ’বার বলছি। দেখে নিও বৌ, তােমার কমলা বৈকুণ্ঠের কমলা হয়ে শ্বশুর ঘর আলাে করবে। , ১৯

বস্তু
গৃহিণী আর কিছুই বলিলেন না। বুঝি বলিতে পারিলেন না।
পাচটা নয়, সাতটা নয়—ঐ একটি। পুত্র বলিতে, কন্যা বলিতে সব।
তার সুখেই তার সুখ। একবার সস্নেহে কন্যার আনন্দোজ্জ্বল মুখের
পানে চাহিয়া বাহির হইয়া গেলেন। তাহার সঙ্গে সঙ্গেই আরও দুই তিন
জন প্রস্থান করিলেন। কেবল ঠাণ’দি সেই যে গোঁজ হইয়া দাঁড়াইয়া-
ছিলেন, এক পাও নড়িলেন না। তাহার মনে হইতেছিল, তিনি চলিয়া
গেলেই ঐ নির্লজ্জা মেয়ে দু’টা তাহার কথা লইয়া হাসি টিটকিরী করিবে,
অথচ এ রকম দাড়াইয়া থাকাটাও যেন কি-রকম লাগিতেছিল।
হঠাৎ কমলার দিকে ফিরিয়া জিজ্ঞাসিলেন—তুই-যে বড় আগেই
নেয়ে কেলি ? গায়ে হলুদ পড়ল না
কমলা সংক্ষেপে জবাব দিল--আর একবার নাইব’-খন।
পাঁচটি যুবতী ঘরে ঢুকিয়া প্রথমে তত্ত্বের দ্রব্যাদি দেখিয়া কমলাকে
তুলিয়া বলিলেন-চ’-হলুদ দিতে হবে।
সকলেই বাহির হইয়া আসিল। বেল সকলের পশ্চাতে আসিয়া
বলিল—ঘরটায় চাবি দিয়ে যাই।
ঠাণ’দি দ্বারের পার্শ্বেই ছিলেন, ঠিকরাইয়া উঠিলেন-একটা কেন,
দে’-না লো, দশটা দে-না। কার কি ? ও-সব আমাদের কাছে নতুন
নয়।—ঢিলটি কোনদিকে পড়িল, তাই তিনি বেশ জানিতেন।
বেল জবাবটিও পাটকেলের মতই স্পষ্টভাবে দিল ; বলিল—সে ঐ
টায়রাতেই জানা গেছে।
ঠাণ’দি জল হইতে সদ্য তােলা কৈমাছের মত ছিট কাইয়া কি জবাব
দিতে যাইতেছিলেন, কমলা আরক্তমুখে বলিল—ঠাণ’দি।
;
২

বসু তাহার সে-সময়ের কণ্ঠস্বর এই আদ্র হইয়া পড়িয়াছিল যে সকলই তাহার দিকে চাহিলেন, ঠাণ’দি-ও চুপ করিয়া গেলেন। কমলা দৃষ্টি নমিত করিল। পরমুহূর্তেই তাহার মনে পড়িয়া গেল যে এই যে কাৰ্য্যটা করিয়া বসিল, করা কোনমতেই তাহার উচিৎ হয়নাই। ইহা লইয়া যে আন্দোলন চলিবে এবং লজ্জা বাড়িয়াই যাইবে মনে করিয়া সে একেবারে নিস্পন্দ হইয়া গেল। অথচ সে-ত জানে, সে নিজের ইচ্ছাতে কিছুই করে নাই। বেলের উপর তাহার রাগ হইয়াছিল—সে কেন তাহার বিবাহের মধু- ময় দিনটা ঝগড়া করিয়া তিক্ত করিয়া তুলিতেছে। বেলকে সে ভাল বাসিত এবং সে সখীত্বের নিগঢ় বন্ধন অতি শৈশবেই হইয়াছি বলিয়া রাগটা বেশী বেলের উপর হইয়া ছিল। তাই সে বেকে কিছু না বলিয়া ঠাণ-দিকে সতর্ক করিয়াদিল । কিন্তু বিয়ের কনের যে-সে অমার্জনীয় অপরাধ তাহা ঠাণ’দি ক্রমে ক্রমে উচ্চকণ্ঠে জাহির করিতে লাগিল। মােহিনী বাবু বিশুষ্কমুখে আসিয়া দাঁড়াইতে গৃহিণী বলিলেন- 'দেখলে, একশ ? হ্যা, তাইত দেখলুম। কিন্তু ওরা ত খাবে না গিন্নী ? গৃহিণী সাশ্চর্য্যে কহিলেন—খাবে না কেন? মােহিনী বাবু বলিলেন—ওরা সব খেয়ে এসেছে বলছে। শুধু জল উল খাইয়ে দাও। একটু থামিয়া আবার বলিলেন—এসব হেমেন্দ্র বাবুর ব্যবস্থা :

चयू বুঝেছ? পাছে বেশী লােককে খাওয়াতে আমরা বিব্রত হয়ে পড়ি তাই এই সতর্কতা। গৃহিণী এক মিনিট পরে বলিলেন—কিন্তু নতুন কুটুম বাড়ী, এটা ত ঠিক নয়। লােকজন কি মনে করবে ? মােহিনী বাবু বলিলেন—মনে করত, যদি কাছাকাছি থেকে আসত। কলকাতা থেকে এসেছে, খেয়েই এসেছে ; এতে মনে করবার কিছু নেই। গৃহিণীর মনটী এবারেও সায় দিল না। তিনি ত ষাট সত্তর জনের আয়ােজন করিয়াইছিলেন? আর ত্রিশ চল্লিসজনের কি করিতে পারি- তেন না? কুটুম বাড়ীর লােক যে তত্ব লইয়া আসিয়া না খাইয়া যাইবে এতে কোন্ গৃহিণী সন্তুষ্ট হইতে পারেন ? তাহার না হয় গরীব, বেয়াই বড়লােক—কিন্তু এটা কি অপমানের মতই নয়। মােহিনীবাবু তাহা বুঝিলেন, বলিলেন—বেশ করে জল খাইয়ে দাও । লুচি, কচুরী, মিষ্টী দিয়ে—তাহলেই হবে। যাইতে যাইতে ফিরিয়া জিজ্ঞাসিলেন—গায়ে হলুদ হয়ে গেছে? হচ্ছে—বলিয়া গৃহিণী ভাড়ার ঘরে ঢুকিলেন। অবৈধ হইলেও ঠাণ’দি সব কথা শুনিবার প্রলােভন ত্যাগ করিতে পারেন নাই। গৃহিণীকে দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন—দেখলে বৌ, বড় লােকের কাণ্ডকারখানাটা। গৃহিণী নিরুত্তরে লুচি কচুরীর ধামা লইয়া নাড়িতে চাড়িতে লাগিলেন। ঠানদি বুঝিলেন—কাৰ্য্য হইতেছে, বলিলেন-আমি বরাবর দেখছি বৌ•••••• গৃহিণী আর্তস্বরে বলিলেন-ঠাক ••• ২২ 국왕 ঠানদি সৎসাহে বলিতে লাগিলেন-ও-সব যে আমার চোখে দেখা বৌ, না হবার যে কি ! গৃহিণীকে নিরুত্তর দেখিয়া পুনরায় কহিলেন--এই যে কাণ্ডটি হল, পাড়ায় একেবারে ঢি ঢি পড়ে যাবে বুঝছ না? আমাদের একবার জিজ্ঞেস করতে হয় বাছা, এমন কাজটি কি করে ? গৃহিণী করজোড়ে বলিলেন—ঠাকমা ও কথা আর তুল না? ঠান্‌দি অপ্রসন্নমুখে বলিলেন—আমি না-হয় নাই তুলুম বাছা ! লােকে ত আর মানা শুবে না। তারা ত বলবেই। তাদের ত আর মুখ বন্ধ করতে পারবে না বৌ। গৃহিণী কিছুই বলিলেন না, আস্তে আস্তে ঘর ছাড়িয়া গেলেন। ঠানদি অস্পষ্ট তীব্র কষ্ঠে বলিলেন-কলির ভাল নেই, বাছা, ভাল নেই। উঠানের এককোণে কদলীবৃক্ষ চতুষ্টয়ের মধ্যে প্রস্তর খণ্ডের উপর কমলা বসিয়াছিল, নাপিতানী হাসিতে হাসিতে কি বলিতেছিল, গৃহিণীকে দেখিয়া চুপ করিয়া গেল। একবারমাত্র সন্দেহ দৃষ্টিতে কন্যাকে দেখিয়া গৃহিণী দ্রুতপদে দ্বিতলে উঠিয়া গেলেন। এক ফোটা চোখের জল ভঁহার অজ্ঞাত সারেই চক্ষু কোণে টলমল করিয়া উঠিল বস্ত্রাঞ্চলে চক্ষু মুছিয়া নিজমনেই বলিলেন--না-না, এ আমি কি করছি। সাধ করে অমঙ্গল টেনে আছি। আমার কমলাকে কি কেউ অযত্ব করতে পারে? কমলা যে আমার রূপে লক্ষী, গুণে সরস্বতী। দয়া- ময় কি তাকে কষ্ট দেবেন? তাহারা মধ্যবিত্ত গৃহস্থ; কুটুম্ব-সাক্ষাৎ খুব বেশী সমাগম হয় 녹원 নাই। তবু, যাহা আসিয়াছে তাহাতেই নাতিবৃহৎ গৃহখানি ভরিয়া গিয়াছে। গৃহিনীকে একা দাড়াইয়া থাকিতে দেখিয়া বিধুর মা বলিলেন—কমলের মা, কুটুম-বাড়ীর লােকজন খাবে না গা? খাবে—বলিয়া গৃহিণী ‘নামিয়া যাইতেছিলেন, মধ্যপথে কমলা কজ্জল লতা হস্তে উঠিতেছিল, দুই হাতে মা’কে জড়াইয়া ধরিয়া বলিল—মা গো, খিদে পেয়েছে। তাহার শুষ্ক মুখের পানে চাহিয়া গৃহিণীর হৃদপিণ্ড ধর ধর করিয়া কঁপিয়া উঠিল। তবে কি সেও ভয় পাইয়াছে না-কি! আবার ভাবিলেন, না-না কচি মেয়ে, এতটা বেলা হইল, একটু জল ও যে মুখে দেয় নাই। তাই মুখ শুকাইয়া গিয়াছে। স্নেহকাতর কণ্ঠে বলিলেন--খাবে বৈ-কি মা। চল, একটু কিছু মুখে দেবে। কমলা মা’র কণ্ঠস্বরে একটু আশ্চর্য হইয়া গেল, কিন্তু কোন কারণ খুজিয়া পাইল না। বলিল-কি খাব মা? মা বলিলেন—আজ ত আর কিছু খেতে নেই মা, একটু দুধ, সন্দেশ খাবে। কমলা পিতামাতার একমাত্র সন্তান। দরিদ্রের গৃহ হইলেও পিতা- মাতার স্নেহের অল্প ছিল না, এবং সেই দুইটি হৃদয় নিঙ্গাড়িয়া সৰটাই সে পাইয়াছিল। ঠোঠ দু’টি ফুলাইয়া অভিমান-ক্ষুদ্ধ-স্বরে বলিল—শুধু দুধ সন্দেশ খেয়ে কি থাকা যায়! মা মেয়েকে বুকের কাছে টানিলেন ; কজ্জললতাটি তাহার কবরী র মধ্যে ও জিয়া দিতে দিতে বলিলেন—আজকের মত দিন যে মেয়ে মাসের জীবনে আর নেই মা। ২৪

বন্ধু
সেই জন্যেই বুঝি উপােস করা?
মা বলিলেন--শাস্ত্রে আছে যে মা ! যারা শাস্ত্র করেছেন তারা
ত আমাদের ভালর জন্যেই বিধি নিয়ম সব গড়েছেন।
কমলা আবদারের স্বরে বলিল-উপােস করে আবার কি ভাল
হয় ?
গৃহিণী বলিলেন—তারা জানেন মা।
সিড়িতে কাহার পদশব্দ শ্রুত হইল। তিনি কমলাকে বাম হস্তে
ধরিয়া নামিয়া গেলেন। ‘এয়ােরা’ তখন লালপাড় শাড়ী পড়িয়া
উঠানে দাড়াইয়া জটলা করিতেছিলেন, তাহাদের সম্মুখীন হইয়া
জিজ্ঞাসিলেন—চাপা, হয়ে গেছে মা সব? একটু জল খেতে দিই ওকে ?
চাপা হাসিয়া বলিল—হয়ে গেছে জেঠাইমা ।
কমলাকে লইয়া গৃহিণী চলিয়া যাইতেছিলেন, চাপা বলিল—
জেঠাইমা, জল খাইয়ে ছেড়ে দাও ওকে, আমরা সাজাব।
গৃহিণী হাসিমুখে বলিলেন-এখনি কি চাপা ?
চাপা বলিল-হা হা, আমাদের দরকার আছে। গৃহিণী হাসি-
লেন। মনের ভিতর যে একটি পাষাণ স্তুপ জমিয়া উঠিতেছিল, এই
হাস্যময়ী যুবতীয়টির হাসি-কথার মধ্যে তাহা শরতের মেঘ-খণ্ডের মত
ভাসিয়া গেল।
কিন্তু ভাড়ার ঘরের সম্মুখে আসিতেই মনটি আবার বিমুখ হইয়া
উঠিল। কমলাকে বাহিরে দাড়াইতে বলিয়া ঘরে ঢুকিলেন।
ঠানদি বলিয়া উঠিলেন, তখন যে বড় আমার উপর রাগ করে
চলে গেলে বৌ। দেখ-দেখি কি কাণ্ডটা।

বন্ধু কমলা ঘরের মধ্যে আসিয়া দাঁড়াইল। গৃহিণ ঈষৎ উচ্চকণ্ঠে বলিলেন—কি আবার কাণ্ড হ’ল ? এই—তােমার বড় লোেক বেয়াই বাড়ীর লােকেদের আক্কেলটার কথা বলছি। পাঁচশ পাণ ত সাজা হয়েছিল, এই দেখ—বলিয়া তিনি সামান্য কয়েকটি পাণ দেখাইলেন। “এ রকম করলে বাছ”••••• গৃহিণী বলিলেন—দু’টো পাণও খাবে না? ঠানদি ধামাটি ঠেলিয়া দিয়া বলিলেন—খাবে না, খাবে না ত করছ ; পাচশ পাণ একঘণ্টায় উঠে গেল। বলি, পারবে ত? এত লােকই-বা কে-আছে তােমার, যে বসে বসে পাণই সাজবে বাছা ? গৃহিণী কি বলিতে যাইতেছিলেন, কমলা মৃদুকণ্ঠে বলিয়া উঠিল— আমরা আসছি ঠাদি। বলিয়া সে আস্তে আস্তে হাত ধুইয়া ফেলিল। এই-যে কথাটা--এযে বিয়ের কনেই বলিল—ইহা যেন তাহার বিশ্বাসই হইল না, তিনি একটা কি বলিবার চেষ্টা করিতেছিলেন, কিন্তু কমলার মা একেবারেই কমলার হাত ধরিয়া বলিলেন—বােস মা। একটা রেকাবীতে কয়েকটি সন্দেশ ও একবাটা দুধ তাহার সম্মুখে রাখিয়া বলিলেন—নে মা, খেয়ে ফেল। কমলা খাইতে লাগিল, গৃহিণী তাহার পাশটিতে চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন। তিন চার মিনিট পরে আমাদের পূর্বোল্লিখিত সর্দার-ঝি শ্ৰীমতী সৌদামিনী তথায় দর্শন দিলেন। এই যে গা বৌ-মা, জল খাওয়া হচ্ছে ?—বলিয়া একটু হাসিয়া ঠান্‌দিকে বলিলেন-কৈ গাে, আর গােটাকতক পাণ দাওনা।

वर्ष ঠান্‌দি একবার জ্বলন্ত দৃষ্টিতে গৃহিণীর দিকে চাহিয়া তীব্ৰস্বরে বলিয়া উঠিলেন—পাণ আর নেই বাছা! সৌদামিনী অবাক হইয়া গেল। তাহার মুখের উপর এমন করিয়া বলিতে কেহ কখন পারে নাই। সে ত শুধু কি নহে, সে-যে হেমেন্দ্র- শৈলেন্দ্রকে মানুষ করিয়াছে--তাহার যে তাহাকে সদু মাসী বলিয়া ডাকে! ও-বাড়ীর গৃহিণী তাহাকে দিদি—বলেন। সৌদামিনীর রসনা লক লক্ করিয়া উঠিল। কোন কথা বলিবার পূর্বেই কমলা মৃদু অথচ পৃষ্ট কণ্ঠে বলিলেন—মা, একটু দাড়াতে বল ওকে। এই কথাটি আর কেহ শুনিতে না পাইলেও মা শুনিয়াছিলেন, ঠাণ দিও যেন একটু একটু বুঝিয়াছিলেন। চোখ দুইটি সােজা তুলিয়া ড্যাব ড্যাব করিয়া চাহিতে লাগিলেন। কমলা কোন মতে দুধের বাটিটা নামাইয়া রাখিয়া জল খাইয়া ফেলিল। ঠাণদির দৃষ্টিটা সে যে দেখিতে পায় নাই তাহা নহে, দেখিয়াছিল—মনে মনে একটা দৃঢ় উপেক্ষার ভাবও জাগিয়া উঠিল ; তাই সে দেখিয়াও দেখিল না, বলিল—আমি পঁাড়াচ্ছি, তুমি খেয়ে নাও, বৌমা। কিন্তু কমলা আর খাইতে পারিল না। হাত ধুইয়া পাণ সাজিতে বসিয়া গেল। নিঃশব্দে পাণ কয়টি একটা কলাপাতায় করিয়া সদুর সম্মুখে ধরিয়া দিল। সদু বলিল-বৌমা আমার একবারে নক্ষ্মী-বলিয়া চলিয়া গেল। গৃহিণী বলিলেন—নতুন কুটুম-বাড়ীর লোেক—তায় বড়লােক, অমন করে বলে ? ২৭ বন্ধু ঠাণদি উষ্ণ হইয়া উঠিলেন-বড় লোক আছে, বড় লােকই আছে আমি কেন ভয় করতে যাব? করতে হয়—তােমরা করগে বাছা। কি—কথায় কি কথা আসিল। গৃহিণী একটা উত্তর দিবার উপক্রম করিতেই, কমলা বলিয়া উঠিল—মা, আমি চাপাদের বউকে নিয়ে আসি-বসে পাণ সাজা হবে। আর একটা কথা বলি, শােন মা। সে জননীর হাত ধরিয়া বাহিরে যাইতেই, ঠাণদি পা টিপিয়া টিপিয়া বারান্দার দিকের জানালাটায় কাণ পাতিয়া দাড়াইয়া রহিলেন—কিছুই শুনিতে না পাইলেও আলােচনা যে তাহাকে লইয়াই হইতেছে—সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল না । এক সময়ে কি--রকমে সুদে-আসলে ফিরা- ইয়া দিবেন, তাই ভাবিতে ভাবিতে খপ করিয়া বাহিরে আসিতেই দেখিলেন,কমলা নাই, গৃহিণী একটা ব্রোচ লইয়া নাড়িতেছেন। মধ্যাহ্নকাল। উঠানে মেছুনীরা মাছ কুটিতে বসিয়া গিয়াছে -কলিকাতা হইতে আনীত পাচক ব্রাহ্মণ দাড়াইয়া মাছ তদারব করিতেছেন, একখানি টুলের উপর বসিয়া কমলার ছােট কাকা তামার খাইতেছেন—তানেক গুলি ছেলে মেয়ে, স্থানটি জুড়িয়া আছে—মাছে পটকাগুলির উপরই তাহাদের লােভ। অদূরে দুইটী অহিংস্র মার্জা উদাসীন ভাবে বসিয়া আছে ; আর ভাবিতেছে—এত চৌকী দেওয় কেন বাপু, আমরা আর মাছ মাংস খাই না, উঠিয়া গেলেই পার !! একটি ছেলে দু চার থানা বড় বড় আঁশ তাহাদের সম্মুখে ফেলিয়া দিতে ছিল, কিন্তু মার্জারগণ এক একবার অবজ্ঞা ভরে মাউ করিয়া একটু পিছাইয়া বসিতেছিল। ভাবটা এই যে, ওসবে আমাদের আর স্পৃহা নাই। কেন দিচ্ছ বাপু, আমরা ওসব ত্যাগ করিয়াছি।

বন্ধু ঠাণদি বােয়াকে বসিয়া অপ্রসন্ন মুখে শ্ৰী গড়িতেছেন, পার্শ্বে ঘােট ছােট খুরিতে বহুবিধ রং রহিয়াছে, তিনি মধ্যে মধ্যে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সমস্ত বাড়ীটা দেখিয়া লইতেছেন। তাহারই নিকটে বসিয়া অন্য একটী মহিলা পিড়িতে আলিপণা দিতেছেন, মধ্যে মধ্যে জিজ্ঞাসা করিতেছেন —হ’চ্ছে ত ঠাণদি ? ঠাণদি মুখ না তুলিয়াই বলিতেছেন—বৈশ হচ্ছে, বাছা, বেশ হচেছ । উঠানের এক পার্শ্বে একটি ছােট চালা বাধা হইয়াছে, হালুইকরের। ডাল, ডালনা চাপাইয়া দিয়া থেলাে হকায় তামাক খাইতেছে। একতল হইতে দিতলে উঠিয়া দেখা গেল, কমলার মা একজন প্রতিবেশিনীর সাহায্যে গায়ে হলুদের তত্বগুলি গুছাইয়া তুলিতেছেন। অন্য একটি কক্ষে কয়েকটি নবীন তাস লইয়া বসিয়া গিয়াছেন। প্রায় সকলের কাছেই একটি করিয়া পাণের ডিবা, কাহারে ছােট কৌটায় কাশীর মূর্তি-গুলি আছে। পুত্রবতী কোন জননী শিশুক্রোড়েই তাস খেলিতেছেন ;-মধ্যে মধ্যে হাস্যতরঙ্গে ক্ষুদ্র কক্ষটি ফাটিবার উপক্রম করিতেছে। কমলাও তাহাদের নিকট বসিয়া খেলা দেখিতেছিল, অন্ততঃ দেখিবার চেষ্টা করিতেছিল। মুখখানি বড় বিষন্ন, হাতে কজললতাটি রহিয়াছে, বাম মনিবন্ধে দূর্বা ও হরিদ্রাবর্ণের কয়েকগুচ্ছ সূত্র বলয়াকারে বাঁধা। তাহার একটু দূরে বেল মাদুরের উপর গাঢ় নিদ্রামগ্ন। দিবানিদ্রাটি তাহার অনেকদিনের অভ্যাস—কিছুতেই ছাড়িতে পারে নাই। কালও মধ্যাহ্নে সে শুইয়াছিল, কমলা জ্বালাতন করিয়া ঘুমাইতে দেয় নাই।

বস্তু ছক্কা হইয়া গেল। চাপা আনাতিশয়ে উঠিয়া গিয়া বেলের পৃষ্ঠে গুডুম করিয়া একটি কিল বসাইয়া দিল। বেলের ঘুম একেবারে চােক করিয়া হুগলী ব্রিজ পার হইয়া গেল। ঘরের জানেলা দিয়া রক্তবর্ণ জুবিলি ব্রিজটি দেখা যায়। বেল ধড়ফড় করিয়া উঠিয়া পড়িল—হার পূর্বেই চাপা নিজের স্থানটিতে বসিয়া গম্ভীরমুখে তাস কুড়াইতেছিল, অন্য সকলেই অতি- কষ্টে হাসি চাপিতেছিলেন, প্রহৃত বেলকে এ-দিক ওদিক চাহিতে দেখিয়া প্রথমে চাপা, পরে সুস্পষ্ট হাে হাে হি হি করিয়া হাসিয়া ফেলিলেন। বেল দাড়াইয়া উঠিয়া শ্লেষ্মপূর্ণ স্বরে বলিল—কার এ কাষ্ঠ রসিকতা! কে মারলে বল ? কেহই কথা কহিল না, মুখ টিপিয়া টিপিয়া হাসিতে লাগিল। বেল কমলার দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসিল-কে মেরেছে বাচ? কমলা নির্ভীক, নিষ্কম্পম্বরে কহিয়া উঠিল—বেল। অন্য দু’তিনটি মহিলা একসঙ্গে তাহার দিকে চাহিয়া উঠিলেন— সে-যে তাহার অর্থ বুঝিল না এমন নহে, কিন্তু আজ সে মিথ্যা বলিবে । কেহ তাহাকে বলিয়াও দেয় নাই, কিছুই নয়, কিন্তু প্রভাতে সেই সানাইয়ের স্বরের সঙ্গেই তাহার মনে হইয়াছিল, আজকের মত দিন জীবনে তাহার কোনদিন আসে নাই, আসিবেও না। সে নির্বিকার ভাবে প্রহারকারিণীকে দেখাইয়া দিল। বেল চাপার পার্শ্বে বসিয়া তাহাকে ভয়ানক শাস্তি দিল। দুটি হাতে জড়াইয়া ধরিয়া প্রথমে তাহাকে একটি চুমা খাইল, পরে পিঠে খুব শব্দ করিয়া একটি কিল মারিল।

বেল বন্ধু চাপা হানিয়া বলিল—কি ঘুমই ঘুমুচ্ছিলি, বাবা! কুম্ভকর্ণকেও হার মানালি। বেল দোক্তাসহ একটি পাণ গালে পুরিয়া দিয়া বলিল—বাসর জাগতে ত হবে—একটু ঘুমিয়ে নিলুম, কি বলি-ভাই বেল ? কমলা কথা কহিল না, নিবিষ্টমনে খেলা দেখিতে লাগিল। তাহার কাছে বসিয়া পড়িতেই কমলা দাড়াইয়া উঠিল। বেল খপ করিয়া তাহার ভূ-লুষ্ঠিত অঞ্চলের প্রান্তটি ধরিয়া ফেলিয়া বলিল— কোথা যাস্ ? কমলা বাম হস্তে অঞ্চল টানিতে টানিতে বলিল—ছাড় ।--সে চলিয়া গেল। এই দু-টিতে যে সকলের চেয়ে বেশী ভাব এবং মাখামাখি তাহা সকলেই জানিত। শিশুকাল হইতে দু’টিতে একসঙ্গে খেলিয়াছে ; ছেলে মেয়ের বিবাহ দিয়া কিছুদিন বেহান সম্পর্কও পাতাইয়াছিল ; বেলের বিবাহ একবৎসর পূর্বেই হইয়াছিল, বেল প্রথমবার শ্বশুর- বাড়ী হইতে সর্বশুদ্ধ সাতাশখানি পত্ৰ দিয়াছিল, তন্মধ্যে পঁচিশখানি তাহার থেকে। এ-কথা সকলেই জানিত ; জাজ যখন কমল। বেলের হাত ছাড়াইয়া অধীর পদক্ষেপে বাহির হইয়া গেল, তখন সকলেরই মিলিত দৃষ্টি পড়িল-বেলের উপর। বে প্রথমটা যেন কিছুই হয় নাই—এই ভাবেই হাসিবার চেষ্টা করিল কিন্তু পারিল না। সেও-তাড়াতাড়ি উঠিয়া গেল। বাহিরে আসিয়া দেখিল-কমলা মায়ের কাছে চুপ করিয়া বসিয়া আছে। মা সস্নেহে তাহার মাথায় মুখে হাত বুলাইয়া দিতেছেন। 242

বন্ধু
বেল-কে দেখিয়াই মা বলিয়া উঠিলেন—এই যে বে, দেনা মা চুল
ক’টা বেঁধে।
কমলা সচকিত হইয়া বলিল—না তুমি দাও।
গৃহিণী আদর করিয়া বলিলেন—বেল কলকাতা থেকে কত-রকমের
চুল বাঁধা শিখে এসেছে।
কমলা বলিল—তুমি দেবে ত দাও, নইলে আমি বাঁধব না।
কাল ত আর তােমার কাছে বাঁধতে আসব না, বাপু। বলিতে বলিতে
তাহার কণ্ঠস্বর যেন সিক্ত হইয়া আসিল।
জননীর স্নেহ-ভারানত হৃদয়টি আলােড়িত হইয়া উঠিল, তিনি
ম্লানমুখে বলিলেন-আয়, দিই । ও বেল্ দড়ি চিরুণীগুলো দে-না, মা,
এনে।
বেল
কমলা তাড়াতাড়ি উঠিয়া বলিল—আমি আছি ।
ফিরিয়া আসিয়া সে মার সম্মুখে নতমুখে বসিয়া পড়িল।
যে জানেলার গরাদে ধরিয়া ম্লানমুখে দাড়াইয়াছিল, দেখিয়াও তাহা
দেখিল না।
গৃহিণী বলিলেন—কাল এতক্ষণ তাদের বাড়ীতে•••
তিনি আরও কি বলিতেছিলেন, কমলা বলিয়া উঠিল—কাছে হ'লে
বেশ হত, না-মা ? বােজ তােমার কাছে অসিতে পারতুম।
গৃহিণী একমূহূর্ত পরে বলিলেন—সেখানেও যে একটি মা পাবি,
কমলা।
পাব মা?—বলিয়া কমলা মুখটি ফিরাইতেই দেখিল, বেল তখনও
তেমনি স্থিরভাবে দাড়াইয়া আছে।

বন্ধু মা বলিলেন—পাৰি বৈ কি কমলা। মা পাবি, বাবা পাবি, ভাসুর পাবি। কত কি পাবি। তাদের সবাই তােকে আমাদের মতই ভালল- বাসবেন। কমলা কি ভাবিল, ক্ষীণকণ্ঠে কহিল—যদি না বাসেন? মা বেণীর উপর করাঘাত করিতে করিতে বলিলেন-বাসবেন বৈ- কি মা। নিশ্চয়ই বাসবেন।-বলিয়া সাদরে কমলার মুখ চুম্বন করিয়া পুনরায় বলিলেন—আমার কমলাকে ভাল না বেসে কি কেউ পারে ? শেষের কথাট। কমলা শুনিতে পাইল না, সে নত হইয়া প্রণাম করিয়া পায়ের ধূল লইয়া মাথায় দিতেই, মা আশীর্বাদ করিলেন— জম্মেস্ত্রী হও-মা। এক ফোটা চোখের জল আপনা হইতেই চোখের কোণে আসিয়া দাড়াইল, পাছে সেটি কমলার মুখের উপর পড়ে, বাম হাতে তাড়া- তাড়ি মুছিয়া ফেলিয়া বাহির হইয়া গেলেন। কমলা তাহার সঙ্গেই প্রস্থান করিল। কমলা বাহিরে গিয়া একবার দাড়াইল, ভাবিল—আর নয়—খুব হইয়াছে। বেল বড়ই কষ্ট পাইতেছে—ডাকিয়া আনি। আবার ভাবিল— তাই-বা কেন? আমি একটু রাগ করিয়াছি-বেল কেন আসিয়া সাধুক না। সেদিন ত সে নিজেই গল্প করিল সে রাগ করিলে তাহার বর কেমন সাধ্য সাধনা করে! কত হাসি, কত গল্প, কত গান, কত কবিতা পড়িয়া তাহাকে ভুলায় এই নূতনত্বের আকাথায় তাহার মনটি ভরিয়া উঠিল। তখনি বেল-কে ডাকিয়া আবার সেই সব গল্প শুনিবার কৌতুহল জন্মিতে লাগিল, কিন্তু একেবারেই ডাকিতে বধু পারিল না। সেই স্থানটিতে চুপ করিয়া দাড়াইল, যদি বেল আসিয়া হাতটি ধরিয়া ফেলে, অন্য হাতে সে-ও তাহার গলাটি জড়াইয়া ধরিবে । চাপা আসিয়া বলিল—কি ভাবচি লা? হাওয়া গাড়ীর ভেঁপু শােনবার জন্যে হাঁ করে আছিস বুঝি ? চাপা সম্পর্কে কমলার দিদি হয়, বয়সও অনেক বেশী; তাহার মুখে একথা শুনিয়া কমলা অকস্মাৎ রাঙা হইয়া উঠিল। চাপা কোন দিন তাহাকে ঠাট্টা করিত না—সে সম্পর্ক তাহাদের নয়—কিন্তু যখন সে করিয়াছে, কমলাও এক মিনিট পরে প্রফুল্ল কণ্ঠে জবাব দিল—তুমি বুঝি তাই কচ্ছ—চাপা দিদি? চাপা-া-লাে--হ্যা, কে করছে তা সবাই জানে—এই রকম একটা কি বলিতে বলিতে—নীচের দিকে যাইতেছিল, কমলার মা সম্মুখে আসিয়া বলিলেন-কনে সাজাবে কে চাপা ? আমি খুড়িমা, আমি-বলিয়া চাপা কমলার অত্যন্ত নিকটে আসিয়া দাড়াইল। পারলেই হল। আমরা সেকেলে লোক, একেলে পসন্দ আমরা জানিনে, বাছা। তােরাই সাজা, দেখিস যেন নিন্দে-বান্দা না হয়। বলিয়া তিনি আর একবার কমলার মুখের পানে চাহিয়া প্রস্থান করিলেন। তিনি চলিয়া যাইতেই কমলা সহাস নেত্ৰদ্বয় তুলিয়া বলিল- শীগগির করে নিতে হবে কিন্তু আমি যে তিন ঘণ্টা ঠায় বসে থাকব তা পারব না। চাপা কি একটা বলিতে যাইতেছিল, বেল সেই সময়ে সামনে দিয়া, == ৩৪ চলিয়া গেল। কমলার হৃদয়টি একবার বেলাঘাতে তরঙ্গের মত উছসিত হইয়া উঠিল, তখনি সে রজ্জ্ব-বদ্ধ অশ্বের মত হৃদয়টিকে ফিরাইয়া লইয়া চাপার পানে চাহিয়া বলিল-চল। চাপা কিন্তু নড়িল না, এক মিনিট চাহিয়া থাকিয়া জিজ্ঞাসিল—তাের বেল কথা কইলে না যে। কমলা বলিল—কি আবার কথা কইবে। সারা দিনই ত কথা হচ্ছে। আজ বুঝি আর কাউকে ভাল লাগছে না, না কমলা? বলিয়া হাসিয়া কমলাকে টানিয়া চাঁপা চলিয়া গেল। কমলা দুই তিন মিনিট সেখানে নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল, তাহার পর ধীরে ধীরে চাপার অন্বেষণে কক্ষ মধ্যে প্রবেশ করিল। তাহার ইচ্ছা হইতে ছিল সেখানে দাড়াইয়া সে একটু কঁদে! বেলেয় এ কি নিষ্ঠুর প্রতিশােধ লওয়া! আর কাহার উপর তাহার কিসের এ প্রতিশােধ। যে বেলের মুখের হাসিটি দেখিবার জন্য সে মরিতে পারে, যাহাকে বাল্য কালে এক দিন না দেখিলে তাহার প্রাণ বাহির হইয়া যাইত !-কমলার গলার ভিতর যেন অশ্রু বাষ্পকারে জমিয়া উঠিতেছিল। সে কঁাদিল না; বেলের ব্যবহার যত কঠিন নিদারুণই হৌক, আজ যে তাহার হৃদয় খানি পুষ্প ভরানত বৃক্ষটির মত বসন্তের বাতাসে, পাখীর কল গানে, বাঁশীর সুতানে হিল্লোলিত হইয়া উঠিতেছিল, তাহা ত সে জানে। বেল যে এক দিন স্বকৃত অপরাধের জন্য অনুশােচনায় মরমে মরিয়া যাইবে এ বিশ্বাস কেমন আপনা হইতেই তাহার হইয়াছিল, তাই সে এ সুখের দিনটিতে আর কোনমতেই অন্তচিন্তার প্রশ্রয় দিল না।

ব সকালে, দুপুরে ও বৈকালেও সানাই বাজিয়াছিল, কিন্তু ভিড়ের মধ্যে সে সুর যেন কাহারও লক্ষ্যই হয় নাই। সন্ধ্যা হইবামাত্র সানাই ওয়ালারা বাছিয়া ইমনে বাঁশী ধরিল। কমলা পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, গান বা সুর চিনিত না। কিন্তু ইমনের অতি মধুর সুরটি তাহাকে যেন বিভাের করিয়া তুলিতেছিল। প্রভাতে যখন নিদ্রা ভঙ্গ হইয়াছিল তখনও এমনই একটু মিষ্ট করুণ সুর তাহার মনকে আবেশময় করিয়া তুলিতেছিল। সে ভাবিতেছিল—বহিতে যে-সে পড়িয়াছে, রাজা রাজড়ারা ভাের বেলায় সানাই শুনতেন—সকাল সন্ধ্যায় নহবৎখানায় নহবৎ বাজত সে এই কারণেই। সে অনেক রকম বাজনা (ব্যাণ্ড) শুনিয়াছে, কিন্তু আজকের বাঁশীর মত মিষ্ট ত কোনটাই কোনদিন তাহার কাণে বাজে নাই। তাহার মনে আছে, যেদিন পাকা দেখা হইয়াছিল, পাশের বাড়ীর জ্যেঠাইমা,-বড় গিন্নি-তাহার কাণে কাণে বলিয়াছিলেন কমলা, এতদিন, মা, খেলা ঘরে খেলেছ! এইবার সত্যিকারের খেলা ঘরে চল্পে। ছেলে বেলায় খেলাঘরে কত ঝগড়া, কত হাসিকান্নার ভেতর দিয়ে কাটিয়েছ, এখন আর তা হবে না মা! এ-যে খেলাঘর, এখানে খেতে ঝগড়া করতে নেই, হাসতে আছে, সেও নিজের গুণে! সকলকে খুসী করে তবে হাসতে হয়, আর কান্না, সংসারে সে-ত জড়িয়েই আছে মা। কমলার মনে পড়িল, সে বড় গিন্নির কথায় ভয় পাইয়াছিল, বড় গিন্নী তাহা বুঝিতে পারিয়াই বলিয়াছিলেন—মা, সেখানে যে শুধুই ভয় আছে তা নয়; সেখানে সুখও অনেক আছে। এখানে তুমি নিজের ; বই ইচ্ছেয় কিছু করতে পাও না, সেখানে তাদের সংসারে তুমিও একজন। তুমি যেমন সেখানে পা দিলে তাদের ছেলেটি ত আর একলা রইল ; তােমাকে নিয়েই হ’ল তখন তাদের ছেলে ! কোন একটা কাজে তারা ছেলের মত চাইলে, ছেলে তােমাকে না জিজ্ঞেস করে কিছু বলতে পারবে না। তােমার কাছে জান্‌তে আসবে, তখন তুমি দেখলে তােমার বাপের বাড়ীতে কোন কাজেই কেউ তােমার মত চাইত না, এখানে চাইছে। তােমার মনে তুমি সুখই পাবে। তাদের ছেলে ধর্ম কর্ম যা করবে সব-তাতেই তুমি তার সঙ্গিনী হবে। তেরাে বছরের বাঙ্গালীর মেয়ের কাছে এ সকল চিন্তা মধুময় । ভাবিতে ভাবিতে কমলার চিত্ত আশায় আবেশে উৎফুল্ল হইয়া উঠিল। বড় গিন্নি বলিয়াছিলেন, আজ থেকে তােমার হাসিটি একজনের চক্ষে বর্ষার-নদীর ঢেউ তুলবে; তােমার কথাগুলি তার কাণে অমৃত বর্ষণ করবে; তােমার সুখ-দুঃখের চিন্তাই তার কাছে সর্বাপেক্ষা প্রিয় ও মধুর হয়ে উঠবে। অন্য দেশের বা অন্য সমাজের এই বয়সের মেয়ের কাছে এ-কথা কেমন ঠেকিত জানি না, আমাদের বাঙ্গালীর মেয়ের মনটি একেবারে কাণায় কানায় ভরিয়া গেল। আকাশে মেঘের সঞ্চার দেখিলে শিখী যেমন উদগ্রীব হইয়া চাহিয়া থাকে, কমলার তরুণ হৃদয়টি সেই রকমই সামনের পানে চাহিয়া রহিল। নানা কাজে কত লােক আসিতেছে যাইতেছে, সকলেই একটা-না- একটা রহস্য করিয়া যাইতেছে, লক্ষ্যভেদের সময় যেমন সব ধনু- ধারীরই শর মাছটার চোখের আশে পাশেই লাগিতেছিল, কমলার ৩৭ বন্ধু মনে হইতে লাগিল, সব রহস্য তাহারও হৃদয়ের আশে পাশেই আসিয়া লাগিতেছে। বড় গিন্নি যেন সব্যসাচী অর্জুন, তঁার শরটি একেবারে মাছের চক্ষু ভেদ করিয়া দিল। এই সময়ে একসঙ্গে অনেকগুলি ভে। বাজিয়া উঠিল এবং সুগম্ভীর হ-র-র-র শব্দ উখিত হইবামাত্র সমস্ত পুরবাসী একসঙ্গেই চীৎকার করিয়া উঠিল—বর এয়েছে, বর এয়েছে। ওরে ও ভুদি, অ চাপ, অ মেনকা, অ শান্তি—ইত্যাদি। এক সঙ্গে দুই তিনটি শখি পোঁ পোঁ করিয়া বাজিয়া উঠিল কমলার বক্ষ দ্রুত স্পন্দিত ইইতে লাগিল। অন্য সকলের দুপ-দাপ পদশব্দের সঙ্গেই কমলার পা দু’টি যেন তাহাকেও টানিতে লাগিল। কেহ তাহাকে বারণ না করিলেও, কিছুতেই সে উঠিতে পারিল না। চাপার ছেলেটি দ্বার সম্মুখে আছাড় খাইয়া পড়িয়া কঁদিতেছিল- আমি বল্ দেব, আমি বল্ দেব। কমলা উঠিয়া গিয়া ছেলেটিকে তুলিয়া লইল। সামনের ছাদের আলিশায় রাজ্যের মেয়েরা জড় হইয়া বর দেখিতেছিল, একবার চকিত দৃষ্টিতে সেদিকে চাহিয়া কমলা খােকাকে লইয়া নিজের স্থানটিতে আসিয়া বসিল। থােক। প্রথমে তাহার মাথার টায়রাটি, গলার হীরার কঠিটি টানিল, তাহার পরই চীৎকার করিতে লাগিল, আমি বল দেব, অ মাথী, বল্ দেখাবে তল না। এইটুকু একটি ছেলের কথাতেও কমলা যেন লজ্জা পাইল। কাচের আলমারীর সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল—কত খেলনা, থােকামণি, কোটা তুমি নেবে বল ত? ত ! ব খােকা ভুলিল না, বলিল—আমি বল দেখব।•••••• অ খােকা! খােকা কোথা গেল রে ?—বলিতে বলিতে চাপা ঘরে ঢুকিতেই কমলা খােকাকে বস্ত্রাঞ্চলে আবৃত করিয়া বলিল— খােকা কোথায়, আমি কি জানি ! দিদি যেন কি । থােকা মায়ের গলা শুনিয়াছিল, কাঁদিয়া উঠিল—মা দাব। চাপা থােকাকে কোলে লইয়া বলিল—তাের বর দেখে এলাম,কমলা! একেবারে রাজপুত্ত রটি। কাপড় পরে এসেছে তাতেই যে কত শােভা কমলা নতমুখে বলিয়া উঠিল—যা-ও ! সে অনেকের কাছেই শুনিয়াছিল যে বর অতি সুপুরুষ ! অনেকে বলিয়াছিল, অত রূপ প্রায়ই দেখা যায় না। তাহাকে দেখিবার আগ্রহ আপনা হইতেই মনের মধ্যে জন্মিয়াছিল, কিন্তু চাপা যখন সেই বরের রূপ বর্ণন করিতে লাগিল, তখন তাহার মুখ দিয়া বাহির হইয়া গেল যাও. অর্থাৎ শুনিব না। চাপা কি একটা বলিতে যাইতেছিল, মা আসিয়া ‘আমার কমলা মা কৈ ? বলিয়া তাহার চন্দনলিপ্ত মুখখানি চুম্বন করিয়া বলিলেন- মা কমলা, নারায়ণ এসেছেন, মা ! চাপা বলিল—ঠিক বলেছ, খুড়িমা । কমলা মুখখানি নত করিয়া রহিল। ঠান্‌দি ঘরে ঢুকিলেন, পিছনে পিছনে বেল-ও ঢুকিল। একটু আড় হইয়া ঠাদির সম্মুখীন হইয়া বলিল—ভুদি কি তােমার খানা-বাড়ীর রেওৎ যে তুমি একগাদা লােকের সামনে ভুদী ভুদি করে হেঁকে মরছিলে? কেন আমার নাম কি তুমি জাননা? ৩৯

শg
ঠাদি কমলার মা’কে কি-একটা কথা বলিতে আসিয়াছিলেন,
ভুলিয়া গেলেন। দপ করিয়া জ্বলিয়া উঠিলেন-দেখ তুদি-
বেল কি একটা কথা বলিতে যাইতেছিল, কমলা প্রদীপ্ত নেত্রে তাহার
দিকে চাহিতেই চুপ করিয়া গেল। হঠাৎ কি যে একটা কাণ্ড হইয়া গেল,
স্পষ্ট ভাবে বুঝিতে না বুঝিতে বেল কমলার মাকে বলিল—আমাকে
এখনি পাঠিয়ে দাও মামী! আমি থাকব না আর এখানে।
আমাকে যাচ্ছেতাই করছে.........
ঠানদি গর্জিয়া উঠিলেন—আমাকে তুই তোকারি !
তোকারি! এত বড়
তাের আম্পর্ধা! তাের বাবা যে বাবা............ইত্যাদি।
কমলা মাকে বলিল--মা গাড়ি আনিয়ে দাও।
মা একবার মেয়ের, একবার বেলের, একবার ঠানদির দিকে
চাহিলেন, কিন্তু কিছুই বলিতে পারিলেন না। দু’মিনিট পরে কি যেন
ভাবিয়া লইয়া বলিলেন—বে, আজ কি মা তাের রাগ করবার
দিন! আর তােমাকেও বলি ঠাকমা, তুমিও ত এক জনের মা
বাছা!
বেল বলিতে গেল—না মামী......
কমলা বলিল—মা গাড়ী আনিয়ে দাও। বলিয়া সে অন্য দিকে মুখ
ফিরাইল। চাঁপা একটি পাশে দাড়াইয়া শিশুকে স্তন্য দিতেছিল, দুই পা
অগ্রসর হইয়া বলিল—তুই চুপ কর না লা ! তাের অত কথায়
কাজ কি!
একতল হইতে মােহিনী বাবু বলিয়া উঠিলেন—ও ঠাকুমা, ঠাকুমা,
লয়ের সময় হচ্ছে যে গো।
৪

বন্ধু ঠান্‌দি একবার সুস্পষ্ট দৃষ্টিতে সকলের পানে চাহিয়া বাহির হইয়া গেলেন। তখনকার ঘরের এবং সকলের মনের অবস্থাটা যে রকম দাড়াইয়াছিল, কেহ আর মুখ তুলিতে পারিতেছিল না। এমন একটা কাণ্ড হইয়া গেছে, যাহা হওয়া কোনমতেই উচিত ছিল না এবং তাহারই জন্য লজ্জায় অনুশােচনায় সকলেরই মন বিস্বাদ হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু লগ্নের সময় উপস্থিত হইয়াছে, কমলার মা আর থাকিতে পারেন না, সবলে চিত্তদমন করিয়া একটুখানি হাসিয়া বলিলেন- মা কমলা ! কমলা মুখখানি তুলিয়া বলিল-কে কঁদছে মা? ও বাড়ীর জ্যেঠাইমা ! খুব চাপা কান্নার একটা করুণ স্বর সানাইয়ের সুরের ফাকে ফাকে ভাসিয়া উঠিতেছিল। তাহা যে কমলার মা’র কাণেও না প্রবেশ করিয়াছিল, তাহা নহে, কিন্তু তিনি শুভদিনে ক্রন্দনধ্বনি শুনিবেন না বলিয়া চিত্ত বশ করিয়াছিলেন। কমলার কথায় তাহার হৃদয়ের বীণার তার যেন ছিড়িয়া গেল। একটু শিহরিয়া উঠিলেন। তখনি অন্যমনস্কর মত বলিয়া উঠিলেন— হামা, তােমার জ্যেঠাই-মাই কাদছেন। কমলা নতমুখে চুপ করিয়া রহিল। এই জ্যেঠাইমা-ই সেদিন তাহাকে কত মিষ্ট কথা বলিয়া গিয়াছিলেন। কমলার মনে পড়িল, তাহার ঠিক পরদিনই খবর আসিয়াছিল—বসন্ত মেসােপােটেমিয়ায় যুদ্ধে প্রাণ ৪১

বg
দিয়াছে। বসন্ত জ্যেঠাইমার একমাত্র সন্তান। কমলার দু'টি চক্ষুতে
জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।
এই সময় কনে কোথায় গাে ! বলিয়া একদল লােক ঘরে ঢুকিয়া
পড়িল।
৪২

সাত “চাও মা, ভাল করে চাও ভাল করে—শুভদৃষ্টি করতে হয় ! লজ্জা কর- -মা। এমন দিন আর হবে না।”—পুরােহিত বৃদ্ধ ভট্টাচাৰ্য মহাশয় কথা কয়টি বলিয়া একখানি রেশমী ওড়নায় বর কনেকে আবৃত করিয়া দিলেন। সে সময় কমলার মনের মধ্যে কি হইতেছিল বলা যায় না। ঠিক মুখের দিকে না চাহিলেও শৈলেন্দ্রের দীর্ঘ উন্নতদেহ তার চক্ষে ঝলমল করিতেছিল, অথচ কোন্ রাজ্যের লজ্জার চাপ আসিয়া চক্ষু- পল্লব নিমীলিত করিয়া দিতেছিল। কমলা শুভদৃষ্টি করিতে পারিল না। পুরােহিত তখনও বলিতেছিলেন—বেশ করে দেখে নাও মা। তুমিও বেশ করে দেখে নাও। এমন করে আর দেখতে পাবে না। সামনে সিংহাসনে নারায়ণ বসে আছেন। তােমাদের আশীর্বাদ করবেন। তার সামনে দু’জন দু’জনকে বেশ করে দেখে নাও। কমলা সবলে চোখের পাতা খুলিয়া যেমন তাকাইল, শৈলেন্দ্রের সহাস্য প্রসন্ন আসন দেখিয়া চোখ নামাইয়া লইল। শৈলেন্দ্র হাতের জাতিটি দিয়া তাহার মুষ্টিমধ্যের কজললতায় টুক করিয়া একটি ঠোকা মারিতেই কমলার সর্বাঙ্গ কঁপিয়া উঠিল। অনূঢ়া পাঠিকা! তুমি জান কি!—কি রকম কঁপিয়া উঠিল! বসন্তের ঝলকা হাওয়ায় ফুল-ভরা ফুলগাছটিকে কখনও কপিতে দেখিয়াছ কি? আকাশের কালাে মেঘের উপর যখন বিদ্যুৎ চমকে, সেই চমকে পৃথিবী চমকে, তুমি দেখিয়াছ কি ? যদি না দেখিয়া থাক—দেখিও, তরুণী-পাঠিকা, আমার!—একদিন দেখিও। তুমি-ও এক-দিন তেমনি কাপিবে, ইহা ৪৩ 지월 আমি নিশ্চিত বলিতে পারি, কিন্তু যদি সেদিনের দেরী থাকে, তবে একদিন ফুলবাগানে গিয়া পরীক্ষা করিতে পার। তারপর ছালনা-তলা! কমলা প্রতিমুহূর্তেই আশ্চর্য হইয়া যাইতে ছিল যে তাহার খুড়ী জ্যেঠাই প্রভৃতি গুরুজনরাও ঠাট্টা করিবে ছাড়িতেছেন না ! একজন—তিনি সম্পর্কে কমলার মাসী, তিনি করিলেন কি!—একগাছি সম্মার্জনী বস্ত্রাবৃত করিয়া রাখিয়া, বরকে কহিলেন—ওগাে বর, এখানে তােমার দিদিশ্বাশুড়ী বসে, ভক্তি করে প্রণাম কর। শৈলেন্দ্র প্রণাম করিতেই মহিলাকুল হাে হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। কমলা নিজেই জানে না, কেন তাহার রাগ হইল! মাসি বস্ত্রটি তুলিয়া লইতেই সম্মার্জনী আত্মপ্রকাশ করিয়া ফেলিল। আবার একটা হাসির লহর উঠিল। এবারে কমলার আরও রাগ হইল, কিন্তু সে আশ্চর্য হইয়া গেল, শৈলেন্দ্র হাসিমুখে উত্তর দিল—আমি ত ঝাটাকে প্রণাম করি নি-আমি করেছি দিদিশ্বাশুড়ীকে। যেমন, আপনারা মন্দিরে গিয়ে যে প্রণাম করেন, সে কি পাথরটাকে? না দেবতাকে ?-মহাদেবকে। হঠাৎ কেহই কোন কথা কহিতে পারিল না, কিন্তু কমলা প্রসন্ন হইয়া উঠিল। কমলার এক খুড়ী-মা একখানি পিড়ি দেখাইয়া বলিলেন—এর ওপর দাঁড়াতে হয়। কমলার মন আবার বিষন্ন হইল। নীচে চার কোণে চারিটি সুপারি দেওয়া আছে—সে তাহা জানিত। যখন পরামর্শ হয় সে-ও শুনিয়াছিল। এখন ভাবিল—এ কি বিশ্রী আমােদ! ৪৪

국월
বর পা বাড়াইয়া বলিল—তা দাড়াচ্ছি। আপনাদের কথা শুনৰ
না, গুরুজনের অসম্মান করব—এমন শিক্ষা আমার হয় নি—বলিয়া
সে যেমন তাহার উপর পা দিবে, একটি মহিলা তাড়াড়ি বলিয়া
উঠিলেন—থাক বাবা, থা—হয়েছে।
তাহার আশ্চর্য স্নেহ-কোমল কণ্ঠস্বরে শৈলেন্দ্র যেন তাহাকে
অত্যন্ত আপনার বলিয়া বুঝিল।
এককোণ হইতে একটি যুবতী রঙ্গকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন—মামীর
জামাই বলে ব্যথা হচ্ছে।শৈলেন্দ্র বুঝিল, যাহার কণ্ঠস্বরে সে মুগ্ধ
হইয়াছিল, তিনি তাহার শ্ব।
দুইটি যুবক আলপণা-দেওয়া পিড়িসুদ্ধ কনেকে বরের চিবুক অবধি
তুলিয়া ধরিয়া হাসিমুখে বলিলবর বড় না কনে গাে বড়?
মহিলারা বলিলেন-ও-মা, এ-যে কনে বড়, কনে বড়।
কমলার ঠিক সন্মুখে তাহার বর! তাহার ইচ্ছা হইতে লাগিল,
একবার—একবার সে চাহিয়া দেখে, কিন্তু সকলের মিলিত দৃষ্টি যে তাহা
কেই কেন্দ্র করিয়া আছে, মনে পড়িতেই সে আর মুখ তুলিতে পারিল
। যাহারা তুলিয়া ধরিয়াছিল, যখন অত্যন্ত ভারবােধ হইল, নামাইয়া
মাটীতে রাখিল।
শশি নাপিত খুব চীৎকার করিয়া ভাঙ্গা গলায় হাকিল.....
কড়ি দিয়ে কিনলাম,
দড়ি দিয়ে বাঁধলাম,
হাতে দিলাম মাকু-
একবার ভ্যা করত বাপু!
৪৫

국월
সঙ্গে সঙ্গেই কতক গুলি ছােট মেয়ে এ উহার গায়ে ঢলিয়া পড়িয়া
বলিল—ভ্যা করত বাপু!
বর বলিয়া উঠিল—একবার ভ্যা।
চাপার কোলের শিশু বড়ই আমােদ বােধ করিল, সে-ও বলিয়া
উঠিল—ভ্যা! ভ্যা—তাহার একটি ছাগল আছে, গাড়ী টানে; মারিলে
সে’ ও ভ্যা ভ্যা করিত। মনে পড়িতেই শিশু আনন্দে মাতার কোলেই
নাচিয়া উঠিয়া বলিল—মা-ভ্যা!
মেয়েরা বলিতে লাগিলেন-ও-মা বর কি-রকম গাে! ভ্যা
করছে যে। ভেড়া নাকি ?
শৈলেন্দ্র সহাস প্রফুল্লকণ্ঠে বলিল-এই দেখুন বিপদ! আপনার
বলতে বল্লেন, আবার আপনারাই ঠাট্টা করছেন।
একটি প্রৌঢ়া বলিলেন—বল ত ভাই বর, কারা ভ্যা ভ্যা করে?
বর অম্লানমুখে জবাব দিল—সে আমিও যেমন জানি, আপনারাও
তেমনি জানেন। আমি কিছু সত্যিই তা নই যে রাগ করব! এটাও
যে আপনারা না জানেন, তা নয়।
একথায় সকলেই লজ্জা পাইল ; কেবল কমলার বক্ষ তাহার
বসনের মধ্যেই গর্বে স্ফীত হইয়া উঠিল। অনেক বিবাহ সে দেখিয়াছে,
এমন স্পষ্ট জবাব দিতে কখনই সে শুনে নাই।
একদল মেয়ে অনুচ্চ মৃদুস্বরে বলিলেন—ওমা, বর কি বেহায়া গােয়
আর একদল একটু স্পষ্ট ভাবেই জবাব দিল—ঠিক বলেছে।
হাজার হাে, চারটে পাশ করা ছেলে ত!
হঠাৎ কে-যে বরের কাণদু’টি মলিয়া লাল করিয়া দিল, বর চারি-
৪৬

বখ দিকে চাহিয়া তাহার সন্ধানই পাইল না। কনের দিকে চাহিতেই কনে অকারণে লাল হইয়া উঠিল। সে-যে এই ব্যাপার প্রসন্ন হয় নাই- তাহা শৈলেন্দ্র বুঝিল। বুঝিয়া মনে মনে আরাম অনুভব করিল। বিবাহ শেষ হইয়া গিয়াছিল। বরের দুইটি বন্ধু আসিয়া বরের হাত ধরিয়া বলিল—খাবে চল। কনের দিকে চাহিয়া বলিল—মুখ তােল ত গা—বৌদি । কমলা মুখ তুলিতে পারিল না, চাপা ডান হাতে তাহার মুখটি তুলিয়া ধরিতেই বর এবং বরের বন্ধু চাহিয়া উঠিল। বন্ধুরা বলিল-চমৎকার ! কমলা ঘামিয়া উঠিতেছিল, আবার শৈলেন্দ্র তাহাকে দেখিতেছিল কেন ? দেখিয়া কি তাহার সাধ মিটিতেছিল না? আবার ভাবিল- তাহারই-কি মিটিয়াছে ? সেও ত বন্ধুদের আহ্বানে যখন মুখ তুলিতে বাধ্য হইল, তখন কি বন্ধুদুটি ছাড়া আর একজনের সুগৌর মুখখানি দেখিবার ইচ্ছা মনের কোণে সে পােষণ করে নাই ? ৪৭ আট কমলা খাইতে বসিয়াছিল, খাইতে পারিল না। আমার অবিবাহিতা পাঠিকারা যেন ভাবিয়া বসিবেন না যে লজ্জায় তাহার গলা বন্ধ হইয়া গিয়াছিল—তাহা নহে। তাহার মন প্রাণ ভরিয়া গিয়াছিল। যতবারই ছালনা-তলার কাণ্ডগুলি তাহার মনে পড়ে—দুই ঘণ্টার দেখা সেই লােকটির সবল-সতেজ ব্যবহার এবং তীক্ষ্ণ-তীব্র অথচ বিনীত মিষ্ট কণ্ঠস্বরটি কোথা হইতে ভাসিয়া আসিয়া তাহার মনটিকে একেবারে নাচাইয়া দেয়। সে শুনিয়াছিল—বাসরে আরও বহুবিধ শরসন্ধান অপেক্ষা করিয়া আছে। সে-সকল পরীক্ষাগুলিতে সে কেমন-করিয়া উত্তীর্ণ হয় জানিতে তাহার কৌতুহল উত্তরােত্তর বর্ধিত হইতেছিল, কিন্তু সেগুলির দ্বারা তাহাকে বিরক্ত না করিলেও যে সে সুখী হইত, ইহাও সে ভাবিতে- ছিল। বর তখনও বাহিরে ! কয়েকটি যুবতী কমলাকে ঘিরিয়া নানা প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিতেছিলেন। কমলার ছােট খাট জবাবগুলিতে তাঁহারা সন্তুষ্ট ত হইতেছিলেনই না, বরং সেগুলা তাহাদের বেশী করিয়া বিরক্ত করিতেছিল। কমলা ইহাও লক্ষ্য করিল যে, বেল একটি কোণে চুপটি করিয়া বসিয়া আছে। তাহার ইচ্ছা হইতেছিল-বেলের গলাটি জড়াইয়া ধরে ; তাহার হাত দুটি ধরিয়া বলে-বেল আমার অন্যায় হয়েছে, তুই আমাকে মাপ কর, ভাই! এ কথার পর যে বেলের রাগ ৮ ব ভাসিয়া যাইত সে তাহা ভালাে রূপই জানে। কিন্তু সমস্ত দিনের অনাহার-অবসাদের পর এই মাত্র যাহা খাইয়াছে, তাহাতেই সে একেবারে অচল হইয়া পড়িয়াছে ; অশক্ত পা দুটিকে তুলিতে যাইবে— বর আসছে, বর আসছে-শুনিয়া সে স্থির হইয়া গেল। শৈলেন্দ্রের বন্ধুদ্বয়ও সঙ্গে আসিয়াছিল, একজন ঘরে পা দিয়াই- বলিয়া উঠিল—আমরাও বাসর জাগব। ঠাণদি মুখ খানি হাসি-হাসি করিয়া বলিলেন—এস, বাবা, এস- ও-রে ও খেদিও পেঁচি, আয়—তােদেরও আজ একটা একটা বর জুটিয়ে দিই—বলিয়া তিনি দুইটি পাঁচ ছ বছরের নিদ্রালু মেয়েকে বিছানা হইতে হিড়হিড় করিয়া টানিয়া টানিয়া তুলিলেন। বন্ধুদয় হাসিয়া পলায়ন করিল। ঠাণদির হাসি-চাপা স্বর যেন তাহ- দের অনুসরণ করিয়াই বলিল-“ও বাছারা, পালাও কেন? বলি শুনেই যাও। বাসর জাগবে—তা বিয়েটা আগে করে নাও। এইবার বরের পরীক্ষা আরম্ভ হইল। একটি পাণের ডিবা দেখাইয়া জনৈক মহিলা বলিলেন-খেয়ে ফেল ত ভাই বর। বর হাসিল; বলিল—দেখুন, পাণ আমি খাইনে বয়েই হয়, কিন্তু আপনারা দিচ্ছেন, আমাকে খেতেই হবে। তবে কথাটা হচ্ছে এই যে পাণ না হয়ে যদি এর মধ্যে আর কিছু থাকে-তা আপনাদের!—বলিয়া সে তিবাটি খুলিয়া সামনের মহিলাটির কাপড়ের উপর উপুড় করিয়া ধরিল। ওরে বাবা রে! গেছি রে।বলিয়া তিনি তড়াক করিয়া লাফাইয়া ব উঠিলেন। কয়েকটি আনুল এদিক ওদিক পলাইয়া গেল, একটি তাহার গায়ে উঠিতেছিল, মহিলাটি তাহা দেখিয়া সভয়ে বলিলেন- ও চাপা, দে মা দে—এটাকে ফেলে দে । অন্যগুলিও সামনে যাহাকে পাইল, তাহার গায়ে উঠিল। একটা বিরাট হাসির ধুমে ঘরটি ভরিয়া গেল ; কমলাও হাসিয়া ফেলিল। অসাবধানতা বশতঃ যেমন হাসিয়া চাহিয়াছে, আর একজনের হাসিমাখা মুখখানি তাহার চোখে পড়িয়া গেল। অল্পক্ষণ পরে দ্বিতীয় পরীক্ষা আরম্ভ হইল। বর-ভাই, শুনেছি নাকি তুমি খুব গান গাইতে জান ? আমাদের একটা শােনাও না-ভাই। বর বলিল--এটা যে আপনারা কোথাও শােনেন নি, সে আমি জানি। কিন্তু বাস্তবিক গান আমি মাঝে মাঝে গাই। একটি মহিলা ব্যঙ্গ করিয়া বলিলেন—কোথায় গাও ভাই ? থিয়েটারে বুঝি ? বর বলিল—হা থিয়েটারও আমি করেছি। “রাজা ও রাণী”তে... বাধা দিয়া একজন বলিলেন—রাণী সেজে গান গেয়েছিলে বুঝি ? এইবার ত পারলেন না! রাণী সাজবার মত চেহারা ত আমার নয়। আমিরাজপুত্র-কুমার সেন সেজেছিলাম। ঠাণদি বলিলেন-বেশ করেছিলে, এখন একটি গান ত গাও। একটা কালী-নাম গাও। বেল এতক্ষণ কোন কথাই কয় নাই, এবার কহিল। কতক রােষ, বগ কতক বিদ্রুপের স্বরে বলিল—সে তােমার গঙ্গাযাত্রার দিন হবে, শৈলেন বাবুকে ডেকে পাঠান যাবে। ঠাণ দি তপ্ততৈল-কটাহে জলের ছিটার মত পট, পট, করিয়া উঠিলেন। কিছু বলিবার পূবেই শৈলেন্দ্র বলিল-“খুব ৰেী গান আমি জানি নে। আর যা জানি, আপনাদের পসন্দ হবে কি-না তাও জানি নে...... অনেকেই বলিয়া উঠিল—তা হােক গাও ভাই। একটি দশ এগারাে বছরের মেয়ে হামোনিয়ামটি শৈলেন্ধের নুর উপর বসাইয়া দিয়া হাসিয়া চলিয়া গেল। ভাবটা যেন এই, সকলেই ঠাট্টা তামাসা করিতেছে, সে-ই বা একটু না করিবে কেন? শৈলেন্দ্র হামোনিয়াম বাজাইতে লাগিল। দু’তিন মিনিট পরে গহিল- “অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া দেখি নাই কভু, শুনি নাই কভু এহেন তরণ বাওয়া !” গান শেষ হইয়া গেল। মেয়েরা দু’দিন মুহূর্ত নির্বাক-বিস্ময়ে বসিয়া রহিল, পরে একটি বর্ষীয়সী মহিলা বলিলেন-একটা গেয়েই থামলে যে ভাই। শৈলেন্দ্র হাসিয়া বলিল—আর আমি গাইতে পারব না। একটু থামিয়া পুনরায় বলিল-বরং এইবার আপনাদের ভেতর কেউ একটা গান্। প্রথমে সকলেই ‘কনে গাইবে, ‘কনে গাইবে বলিয়া গােলমান করিয়া উঠিল, কিন্তু কনের মাথা তখন একেবারে মাটীতে ঠেকিয়াছে

বন্ধু
দেখিয়া এই শান্তি গাইবে। গা-না-লাে শান্তি। দে-না সহরে বরকে
শুনিয়ে যে আমরা পাড়াগাঁর লােক হলেও—গান জানি।
শান্তি সে-কথায় কোন সায় দিল না।
ঠাণদি পুনরায় বলিলেন—গা-না, লজ্জা কিসের! তুই ত কত গানই
জানিস? কলকাতার স্কুলে ত পড়িছিলি...
বাধা দিয়া শান্তি বলিয়া উঠিল-তােমার ইচ্ছে হয়, তুমি গাও,
আমি পারব না।
‘তুই ত ভারি একগুঁয়ে লা?’-বলিয়া ঠাদি শৈলেন্দ্রকে বলিলেন
-কেউ রাজী হল না, তুমিই আর একটা গাও—ভাই।
শৈলেন্দ্র সহজ অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলিলেন—আমি ত বলেছি।
কি বলেছ ?
শৈলেন্দ্র তেমনি সহজভাবে বলিল—যে আর গাইতে পারব
।
তাহার কণ্ঠস্বরের মধ্যে এমন-একটা দৃঢ়তা ছিল, যাহা সকলকেই
বুঝাইয়া দিল যে তাহার কথা হইতে তাহাকে টলানাে সহজ নয়।
আরও দুই তিন বার অনুরােধ করা হইল, কিন্তু শৈলেন্দ্র অবিচলিত স্থির
কঠে বলিল, বার বার কেন বলছেন।
আমি ত বলেছি, আর
পারব না।
ওমা, এ কেমন বর গাে ।
এত অহঙ্কার কি ভাল?
বলি, আমরাই না হয় মূরুধু সুরুকখু নানুষ, এই শান্তি ত রয়েছে,
ও কলেজে পড়া মেমে.০০.০০

নঃ শান্তি রােষদৃপ্ত নয়নে চাহিয়া বলিল—তােমার মাথায় পড়া মেয়ে। জালালে মাগী ! বলিয়া সে দুম দুম কয়িয়া পা ফেলিয়া চলিয়া গেল। এই বাসর জাগা মেয়েদের স্বভাবই হইতেছে, যতক্ষণ বাধা না পান, ততক্ষণ তাহারা ভারি সহজ আর ভারি স্নেহপরায়ণা। একবার বাধা পাইলে আর ধৈৰ্য্য রাখা অসম্ভব হইয়া পড়ে। অনেক বার অনুরােধ করিয়াও যখন ফল ফলিল না, তখন কাহারও শিরঃ পীড়া, কাহারে। শূল বেদনা, কাহারও পুত্র অসুস্থ, কাহারও উদরে দাবানল একই সঙ্গে প্রকাশ হইয়া পড়িল। আমাদের ত আর ভাল লাগবে না ভাই-বলিয়া হাই পতে তুলিতে উঠিয়া পড়িলেন। যাকে লাগবে ভাল সে থাকছে বলিয়া বেশ একটু বক্র হাসি হাসিয়া কটাক্ষ করিয়া প্রস্থান করিলেন। সকলের শেষে বেলও উঠিয়া গেল। দুই তিনটি ছােট মেয়ে এদিকে ওদিকে ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। তাহারাই কেবল পড়িয়া রহিল। কমলাকে নিদ্রালু ভাবিয়া শৈলেন্দ্র বালিশটা তাহার দিকে ঠেলিয়া দিয়া বলিল—তােমার ঘুম পেয়েছে, একটু শুয়ে পড়। কিন্তু কমলা সাড়া দিল না। শৈলেন্দ্র তাহার অঙ্গুলি কয়টির উপর মৃদু আঘাত করিয়া বলিল—শােও, কমলা। হঠাৎ নিদ্রিত মেয়েদের মধ্যে একটি দশ এগারাে বছরের মেয়ে লাফাইয়া উঠিয়া-ওরে, কি বেহায়া বয় রে! এরই মধ্যে কথা কয়েছে রে-বলিয়া নাচিতে নাচিতে বাহির হইয়া গেল; এবং শুভ সংবাদটি জাহির হইতেই বাহিরে একটা মহা হৈ চৈ হইয়া পড়িল ।

ব
শৈলেন্দ্র হাসিয়া কমলাকে বলল-~~মেয়েটি ও জেগে ছিল, মা আমি
ভানতুম কিন্তু ও দূত! কৃত অবধ্য কাজেই কিছু বলি নি! শােও
কমলা। রাত একটা বেজে গেছে।
পাছে কথা বৃদ্ধি পায়, কমল টিপ করিয়া হইয়া পড়িল।
৫৪

বাসি বিয়ের পর শৈলেন্দ্র বাহিরে বৈঠক খানায় গিয়া বসিল। কষ্টে যে সে অব্যাহতি পাইয়াছিল, বলা যায় না। যাহারা রসিকত করিতে পারেন (অর্থাৎ সম্পর্ক হিসাব করিশ্না) এবং যাহারা পারেন না (সম্পৰ্ক হিসাবে কেহই কসুর করেন নাই। কেবল মাত্র তাহার শ্বাশুড়ী বরাবরই তাহার পক্ষ সমর্থন করিয়া আসিয়াছেন। রাত্রে তিনিই বলি। গিয়াছিলেন—শােও বাবা; আর কেউ আসবে না। আমি বরঞ্চ দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে যাই। শৈলেন্দ্রের তখনই মনে হইয়াছিল—ইনিই তাহার মাতৃ-সমা। আজও এই মাত্র তিনিই তাহাকে বাহিরে পাঠাইয়া দিয়াছেন। শৈলেন্দ্র যাইবামাত্র রহস্যসুখবঞ্চিত মহিলাকুল একেবারে সপ্তরর্থী বেষ্টিত অভিমন্যুর মত কমলাকে ঘিরিয়া ফেলিলেন। কমলা ভঁহাদের কথার একটি জবাবও দিলনা, সে আস্তে আস্তে উঠিয়া বেলের হাতটি ধরিয়া বাহির হইয়া গেল। পাশের একটা ঘরে ঢুকিয়া দ্বার বন্ধ করিয়া বলিল—বেল, আমাকে মাপ কর ভাই। বেলের অভিমান বড় কম হয় নাই। কিন্তু বাল্য সখীর এই একটা সম্ভাষণেই তাহার অভিমান কোথায় ভাসিয়া গেল। সে দুই হাতে কমলার গলা জড়াইয়া বলিল—তাের ওপর কি আমি রাগতে পারি বেল!

국왕
অন্যান্য দু একটা কথার পর কমলা বলিল—বে, জেঠাইমাকে ত
একবারও দেখলাম না ভাই।
তাহার বিষন্ন মূখ খানির পানে চাহিয়া বেলের মুখও শুকাইয়া
গেল, বলিল—তিনি আসেননি বেল ।
কমলা এক মিনিট পরে বলিল—আমার সঙ্গে চল না বেল
একবারটি।
বেল সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চাহিতেই কমলা বলিয়া উঠিল।
চ’ জ্যেঠাই মার পায়ের ধুলাে নিয়ে আসি
চল-বলিয়া দ্বারটি খুলিতেই যাহা দেখিল—একেবারে আশ্চৰ্য্য ।
ঠিক দ্বারের সম্মুখেই তাহার জ্যেঠাইমা দাড়াইয়া। বড় গিন্নি কমলার
মা’র সহিত কথা কহিতেছিলেন, কমলা প্রণাম করিয়া পদধুলি লইতেই
জ্যেঠাইমা বলিলেন--আমার মাথায় যত চুল আছে, তত বৎসর হাতের
নােয়া সিথের সিঁদুর নিয়ে বেঁচে থাক মা।
কমলার মা’র দিকে চাহিয়া বলিলেন-দেখছ বৌ! একদিনে
মেয়ে আমার যেন চার বছরের বাড় বেড়েছে।
কমলার মা বলিলেন-সে ত তোমারই আশীবাদে দিদি।
কমলা বলিল-ঘরে এস জ্যেঠাইমা?
কমলার মা বলিলেন—দিদি, বসগে তুমি।
-দিদি, বসগে তুমি। আমি এদিকের
ব্যবস্থাটা দেখিগে। এখনি বরের বাড়ীর লােক সব এসে পড়বে।
যাইতে যাইতে বলিলেন-আজ আবার ঠাকুমাও আসেন নি।
বেল্ বলিল—আসে নি ত ! আমি জানি-আসবে না। কাল
যে তাকে বলে দিয়েছিলাম—কি রকম টায়রা আছে তা’র-আস্তে।

বন্ধু কমল বলিল--ছিঃ-বেল। বেল একবার মাত্র তাহার পানে চাহিয়া চুপ করিয়া গেল। একটিমাত্র—ছিঃ—কথার ভিতর হয়ত কিছুই ছিল না, থাকিলেও তাহা এতই সামান্য যে বেল ও তাহাতে বিন্দুমাত্র লজ্জিত বা অপ- নানিত হইল না। জ্যেঠাইমা কমলার চিবুক ধরিয়া বলিলেন--এই ত চাই, মা। এই ত চাই। কমলা তাহার বুকের উপর মাথা রাখিয়া বলিল—জ্যেঠাইমা ! ! কি-মা ? সেদিন যে-কি বল্‌বে বলেছিলে ? জ্যেঠাইমা বাঞ্চলে নয়ন-মাজ না করিয়া বলিলেন-তােমাকে ত কিছু বলতে হবে না, মা আমার। তুমি যে আমার সুশীলা ময়ে ! ঘরের ভিতর আসিয়া বলিলেন—কমলা, মা-অামার! ছেলেবেলায় উঠানের কোণে শিবপূজা করতে, মনে আছে? কমলা মৃদুস্বরে বলিল—আছে, জেঠাইমা । জ্যেঠাইমা কম্পিতকণ্ঠে কহিলেন—কেন করতে মা ! শিবের মত বামী পেতে। নয় কি? তাই পেয়েছ মা, নারী-জন্মের শ্রেষ্ঠ সম্পং পেয়েছ—অনেক তপস্যা করে লােকে যা পায়—তুমি বেলপাতা দিয়ে জো করেই আশুতােষকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছ ? কমলার মাথায় কোন আবরণ ছিল না, কোনদিনই থাকিত না, আজ এই প্রথম মনে হইল, অবগুণ্ঠণে মুখটি যদি তাহার ঢাকা খাকিত ৩ বস্তু জোঠাইমা বলিলেন-কমলা ।। মি যে জন্ম নিয়ে ভারতে এসেছি, স্বামী দেবতার পূ৯ে; ৰ ল আমাদের জীবনের ব্রত। আজ যাকে পেয়েছ মা, তার :.৮.১ ধড়, তার চেয়ে আপনার তােমার আর কেউ রইল না মা। কমলা আস্তে আস্তে মুখটি তুলিয়া জেঠাইমার মুখের উপর রাখিয়া বাপপূর্ণস্বরে বলিল—কেন জাঠ: 1. তোমরা? বাবা, মা, তুমি = {f ত বলি ন ম : অ মরা তােমার পর। আমি বলেছি-- তার চেয়ে বড় আর কেউ ই । ভােমার বাপ মা তাদের তুমি আজীবন ভক্তি করেছ, : কাছেই আছ, তারা কি তােমার পর হতে পারেন, মা ? জ্যেঠাইমা কমলার মাথার বক্ষপ্ত কেশের গুচ্ছ গুছাইতে গুছাইতে বলিলেন—বল দেখি কমলা, জন্ম অবধি যা’দের খেলি পরলি, যাদের মেহে-কোলে পিঠে মানুষ ...হঠাৎ একদিন একবার এসে যে একটি লােক—যাকে কখনও দেশস নি পর্যন্ত—তােকে নিয়ে চলে যাচ্ছে—তার কি তােৰওয়ে কম জোরের দাবী, কমলা ? কমলা নীরব। তাহার ইচ্ছ। ইতেছিল, জ্যেঠাইমার কোলটিতে মাথা দিয়া শুইয়া পড়ে। জ্যেঠাইমা বলিতে লাগিলে --মহাভারতে রুক্মিণী হরণ পড়েছিস ত। দেখ—তারা রুক্মিণী : উব্ধ। এ করতে যুদ্ধ করতে লাগল—এত তা নয় মা। এ-যে তোর বাপ, মা আত্মীয় স্বজন তাকে সাদরে ডেকে এনেছে, তােকে দেব'রই জন্যে। যেদিন তুই জমেছিস, শৈলেন্দ্র তার আগেই জন্মেছে—বিধান পুরুষ আঁতুড় ঘরে এসে তার নাম-

বন্ধু
টাই তাের কপালে লিখে দিয়ে গেছেন বলিয়া তিনি সস্নেহে কমলার
নাট স্পর্শ করিলেন।
বাহিরে কমলার মাথাটি ক্রমশঃ ঝুঁকিয়া পড়িতেছিল, কিন্তু তাহার
হৃদয়টি একেবারে বৃষ্টির সময়ের চাতকের যতই হাঁ করিয়াছিল।
জ্যেঠাইমা তাহার মাথাটি কোলের উপর তুলিয়া সস্নেহে গায়ে
পিঠে হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিলেন--কমলা, অনেক পুণ্যে অমন
স্বামী পেয়েছিস মা, কায়মনে প্রার্থনা করি সে যেন দীর্ঘায়ু হত্ব !
তাের হাতের নােয়া গাছি যেন হাতেই খয়ে যায় ; তাের সি খির
সিঁদুর যেন মা, চির উজল হয়।
কমল ক্ষীণকণ্ঠে বলিল--সকলে যে বলছে জ্যেঠাইমা••••
কথাটা সে শেষ করিতে পারিল না। জ্যেঠাইমা তাহার থিৰুে
চাহিয়া বলিলেন—সকলে কি বলছে, কমলা?
কমলা বলিল—কাল সকলে গান গাইতে বলেছিল
শৈলেন-কে। সে ত আমি শুনেছি। তিনি গেয়েছিলেন ।
শেষবারে গান নি। তাইতে সবাই বলছে
জ্যেঠাইমা বলিল--বুঝিছি মা। পােড়া কপাল তাদের বলায় ।
তাদের কথা রাতে একটা ত গাইলেন, সমস্ত রাত যদি না পারেন
কমলা বলিয়া উঠিল—তা না জ্যেঠাইমা! সকলে বারবার বলতে
লাগল, তাতে সেই এক উত্তর--আমি ত বলেছি, আর পারব না।
জ্যেঠাইমা হাসিয়া বলিলেন-তাইতেই বুঝি সব রেগে একেবারে
টং হয়ে গেছে। এতে দোষের কোন কথা নেই ত মা ! বরং সুখ্যাতিই
আছে। তিনি মানুষ, লেখাপড়া শিখেছেন, বুদ্ধি হয়েছে।

কথার কি কোন দাম নেই ?--যে লােকে বারবার বই অমনি তার নিজের মতটা উড়ে যাবে ? কমলা আশ্চর্য হইয়া গেল। ঠিক এই কথাটিই ত তাহার বুকের মধ্যে গুরিয়া উঠিতেছিল। লােকে যতই নিন্দা করিতেছিল, ততই কথাটা বদ্ধমূল হইয়া যাইতেছিল, কিন্তু সে আর সেখানে সকলের মাঝে প্রতিবাদ করিতে পারে না! এখন জ্যেঠাইমার মুখে সেই কথা শুনিয়া তাহার অত্যন্ত আনন্দ হইল। জ্যেঠাইমা যে কখনও মিথ্যা বলিবেন না এ ধারণা কমলার খুব বেশী ছিল। নিদারুণ পুত্ৰ-শােক বুকে চাপিয়া তিনি যে তাহাকে সস্নেহে বিদায় দিতে আসিয়াছেন—তাহাও কমলা জানিত। সে চক্ষু মুদিত করিয়া ভাবিল—শুনেছি, মা’র চেয়ে গুরুজন আর কেউ নেই, আমার জ্যেঠাইমা আমার কাছে তার চেয়েও গুরুজন। ইহাতে যদি কোন অপরাধ হয় সে আমি মাথা পাতিয়া লইব। জ্যেঠাইমা তাহাকে নীরব দেখিয়া বলিলেন—কমলা, হিন্দুঘরের মেয়ে-ছেলেবেলা থেকে শিখেছ- “দেব দ্বিজে ভক্তি দিও শ্রদ্ধা গুরুজনে। দুঃখীরে বুকেতে তুল’- ভালবেস পতিধনে।” এর চেয়ে বড় শিক্ষা আর তােমাকে কি দেব মা ? কমলা চক্ষু তুলিয়া দেখিল, জ্যেঠাইমার চক্ষে জল। তাড়াতাড়ি উঠিয়া বসিয়া অঞ্চল দিয়া মুছাইয়া দিল। *, 3월 জ্যেঠাইমা বলিলেন-কমলা, এক ছাঁচে ভেদের দু’টিকে গড়ে তুলছিলাম!—আর বলিতে পারিলেন না। কমলাও কঁদিয়া ফেলিল। পথ চলিতে চলিতে হঠাৎ সামনে একটা বাৰ দেখিলে পথিক যেমন চমকিয়া উঠে, কমলার চক্ষে জল দেখিয়া জ্যেঠাইমাও তেমনি চমকিয়া উঠিলেন, বলিলেন—কমলা, কেঁদনা-মা। আজ তােমার কঁাদবার দিন নয়। এমন দিন আর হবে না মা। তের বছর আগে যে নারীজীবন গ্রহণ করেছিলে, আজ তা ধন্য হল! কমলা বলিল—শুধু একটা কথা বলে দাও জ্যেঠাইমা যে•••• কি মা? সেখানে আমার মন কেমন করে যদি যদি কেন কমলা, করবেই। তুমি ত মা পাষাণ নও, তুমি যে মানুষ—এতকালের ঘরঘর, চিরদিনের বাপ-মা, জ্যেঠি ছেড়ে যাচ্ছ, মন কেমন করবে না আবার! কমলা রুদ্ধশ্বাসে বলিল—তখন কি করব জ্যেঠাবা? তখন শুধু মনে করবে, মা, যে তুমি এখানেই আছ। শ্বাশুড়ী ত নয় -সেহ ত তােমার চিরদিনের মা ! ভাসুর কে ?—সেই ত তােমার বাবা ! একটু থামিয়া তিনি আবার বলিলেন-তুমি ভাবচ মা যে জেঠাই- মা ছাপার কেতাবে লেখা কথাগুলো সব গড় গড় করে বলে যাচ্ছে। নাই না? কমলা মাথা নত করিতেই জ্যোঠাইমা বলিলেন-আমার কাছে ১ বস্থা ধরা পড়তে লজ্জা কি না, আমি যে তাের সেই জ্যোঠাইমা যার কাছে শুয়ে শুয়ে বলসি আমি বসনদাদাকে ছাড়া আর কারুকে বিয়ে করব না। লজ্জায় দুঃখে কমলার মুখ আটী স্পর্শ করিল। লজ্জা কি মা--বলিয়া তিনি সস্নেহে কমলার রক্তা অধরে চুম্বন করিয়া প্রসন্ন মুখে বলিলেন-কমলা একটি কথা তাের জেঠাইমার মনে রাখিস মা যে নত হওয়ার চেয়ে আর গুণ নেই। তার যে কি মােহনী শক্তি তা—কি বশ্ব মা ! একটু খামিয়া কমলার হাতটি তুলিয়া বলিলেন-এই দেখ দুর্বো ঘাসের উপর দিয়ে লোক ত মড় বড় করে চলে যাচ্ছে--তার কি হচ্ছে কমলা সে ঠিকই আছে-তার দ্বারাই দেবতার পূজা হচ্ছে-সে কি অপৰিত্ৰ কমলা তার মুখের কাছে মুখ লইয়া বলিল-বুঝেচি জেঠাইমা বলিয়া সে বাড়াইয়া উঠিল। গলবস্ত্র হইয়া প্রণাম করিয়া পদধুলি মাথায় তুলিয়া লইল।

দশ যে সার্থক নারী জন্মটার কথা কত বারই না জ্যেঠাইমা বলিছিলেন এ বাড়ীতে পা দিয়াই প্রথম সেই কথাটাই তাহার মনে পড়িল । তাহাকে লইয়া কত ক্রিয়াকলাপ, কত রঙ্গ রহস্য, কত নিন্দা সুখ্যাতি হইয়া গিয়াছে কতকগুলি সে শুনিয়াছেও, কিন্তু খানিকপরে কি কি হইয়াছে ভাবিয়া কিছুতেই মনে করিতে পারিল না। আসিবার সমষ গলা ধরিয়া, চীৎকার করিয়া কাণে কাণে কত উপদেশই না লােকে তাহাকে দিয়াছিল, সে তাহার কোনটিতেই মন দিতে পারে নাই—জ্যেঠাইমার মুখের ঐ একটা কথা তাহার মনে বৃদ্ধার ইষ্টনামের মতই কণ্ঠে অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল । তাই, যখন তাহার শ্বাশুড়ী মুখ খানি তুলিয়া ধরিয়া জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন—বল দেখি মা, আমি তােমার কে? কমলা তাহাকে প্রণাম করিয়া বলিয়াছিল—মা ! শাশুড়ী আবার জিজ্ঞাসা করিলেন-কার মা? কমলা তাহার চরণ ধুলি তুলিয়া লইয়া মৃদুস্বরে বলিল—আমার মা, আমাদের মা। শাশুড়ী বধূকে চুম্বন করিয়া বলিয়াছিলেন- মা, আমি তােমা- ক দের মা ! কমলার আশ্চর্য সুন্দর রূপ দেখিয়া সকলেই এক বাক্যে সুখ্যাতি করিয়াছিল—বালিকা বয়সে এই সুখ্যাতিটাই ছিল তাহার ভারী প্রি- 원 আজ কিন্তু সে তাহাতে উৎফুল্ল হইল না। জ্যেঠাইমা ত একথা বলেন নাই। রূপের প্রশংসা যদি তাহার কামনার বস্তু হইত, জ্যেঠাইমা বলিয়া দিতেন। রূপের প্রশংসা সে নিতে চাহে না। সে ভাবিল, সে চাহে নারী জন্ম সার্থক করিতে! কিন্তু কি করিয়া সার্থক করিয়া তুলিতে পারিবে সে তাতো জানিয়া লয় নাই। বুঝি- যাছে ভাবিয়া সে আর প্রশ্নই করে নাই। তখনকার সহজ বুঝা সমস্তটাই এখন তাহার কাছে অবোধ্য হইয়া পড়িল। কমলার ভাসুর হেমেন্দ্র বলিলেন—আমার সঙ্গে কথা কইতে হবে বৌমা ! আমাকে দেখে যে তুমি একটি হাত ঘােমটা টানবে-সে সব কিন্তু চলবে না। কমলা মৃদু কণ্ঠে বলিল—আমি ত আপনার সঙ্গে কথা কই। পাঠিকা সুহাসিনী ! আপনি কি কমলাকে নিলজ্জা বলিবেন ? আমি আপনার উপর মীমাংসার ভার দিলাম, বলুন দেখি সে যাহা করিয়াছে তাহা কি অন্যায় ? আপনি হইলে কি অন্যথা করিতেন? হেমেন্দ্র সন্তুষ্ট হইয়া বলিলেন-কইবে বইকি মা! তুমি যে আমার সেই কমলা! সেই হাকিম কাকাকে দরজার ফাক দিয়ে দেখতে। বলিয়া তিনি হাসিতে লাগিলেন। তাহার পত্নীও দাড়াইয়াছিলেন, হাসিয়া জিজ্ঞাসিলেন—দেখ ত বুঝি? হারে কমলা! তাের বরের দাদাটিও বড়-মিষ্টি-নয়। কমলাকে লজ্জায় সকুচিত দেখিয়া হেমেন্দ্র বলিলেন—আহা, কেন ছেলে মানুষকে লজ্জা দাও। ও কি জানত যে আমার এখানে বিয়ে * আমার সুরূপা পাঠিকাগণের সহিত নিশ্চয়ই কমলায় পার্থক্য আছে। লেখক

হবে, আমার ভায়ের সঙ্গে। ও তখন দেখতও ৰাষা। হানি
জানি-সে কি-হাতী ঘােড়া বস্তু! হাতে মাথা কাটে না কি করে কে
জানে! নয় কমলা ।
কমলা বলিল--আজ্ঞে না।
হেমে বলিলনা ত কি মা?
হেমেরে, পত্নী শকুন্তলা বলিলেন--ও কি ভাবত আমি বলতে
পারি।
হমে সকৌতুকে কহিলেন—কি ?
শকুন্তলা একটু হাসিয়া বলিলেনও ভাবত বরের গাদা-এ, এত
সুন্দর, না জানি এর ভাই কেমন সুন্দর।
হেমেন্দ্র হাসিয়া প্রদান করিতেই কমলা ভাবিল, দিদি নিশ্চয়ই মামী
জন্ম ধষ্ট করিয়া ধন্য হইয়াছিলেন। তাই তিনি এত সুখী। তাই তাঁর
মুখ এত প্রফুল্ল ! তাই ফুৰ্ত্তি তাহার সারাটি অঙ্গ বেড়িয়া বর্ষার নদীর
জলের মত ছল ছল করিতেছে; তাই তাহার হাসিতে ঘাসিয়া
তাই তাহার কথা সুধার ধারা ! কি করিয়া তিনািরী-জীবন
করিয়াছেন, কেমন করিয়া ধন্য করিয়াছেন তাহা কি তিনি তার এই
অনুগত ছােট বােনটিকে শিখাইয়া দিবেন না? এখন ত সে উহারই
শিক্ষা পাইবে বলিয়া আশা করিয়া রহিয়াছে।

এগারো মীসঃবমাজাগিয়া উঠিয়াছে; তাহা পঞ্চদশবর্ষীয়া ননদিনী- বিদ্যুৎ-চপলা জানাইয়া দিল, বৌদি আজ তােমার ফুলশয্যে। অন্য মেয়ে হইলে ( সকলে হইতে পারেন লজ্জায় কাঠ হইয়া যাইত, কমসহজভাবেই হার পানে চাহিয়া:ইহিল । ননদিনী বিদ্যুৎ-চপলা পুনরায়: জলিলগুছাবৌদি তােমার আজ ফুলৰ্যে ঠিকা হাসি উত্তর দিনা, নননিীও একটু হাসিয়া চলিয়া যোনি চুক্তি চক্ষা চােহার্দে। চোখে-চোখে হইল তাহারাই জানে, হয়না যঞ্জিসিটা অতি সহজ:খুৰঞ্জাম; তাই উভয়েই কলিফএফুলশযন্ত কাটায় ভিতত্বে দুইটি ভিন্ন বয়সের বঙ্গবালার কত চুল,কত উল্লাস নিকিতাছিল, ব্রুমলায় মনে কত ভয় ও ছিল কিন্তু একরং মুখের হাসিতে তাহার স্বীয় সাফ হইয়া গেল। সমস্ত আদর যত্ন আনন্দ সমারােহের মধ্যেও একজোড়া জরির জুতার মৃদু শব্দ তাহার কাণের মধ্য দিয়া তাহাকে সচেতন করিয়া তুলিতেছিল। সত্য কথা বলিতে কি তাহার বুকটা ধক ধক করিয়া উঠিল। প্রথম সম্ভাষণের আঘাতটা সে কেমন করিয়া সহ করিবে-একেবারেই সহজ-

ভাবে কথা কহিতে পারিবে কি-না—এই চিন্তাগুলি পুটু পুট করি
তাহার ক্ষুদ্ৰ বুকখানিকে ভরিয়া দিল।
শ্বাশুড়ী, দেখা হইতেই বলিলেন—আজ মা, বৌ-ভাত, পরিবেশ
করতে পারবে?
কমলা বলিল- পারব মা। আমি ত করেছি--
শ্বাশুড়ী বলিলেন—পাগলি কোথাকার! পরিবেশন করেছ বলছ
হুগলীতে ! সেখানে আর এখানে! তাও আবার আজ ! একটু হাসিয়া
বলিলেন—এক হাজার লোেক খাবে। পারবে!
কমলার বুকটি আশঙ্কায় ছাইয়া ফেলিল। কিন্তু অন্ধকারে রি-
স্ফুরণের মত জ্যেঠাইমার সেই নারীজন্মের কথাটাই মনে পড়িয়া গেল
অম্লান মুখে বলিল—আমি পারব, মা !
শকুন্তলা বলিলেন-বেশ ত মা ! কমলাই করবে। সব তরকারি
লুচি, মিষ্টি-বুঝলে কমলা। পারবে?
আবার সেই সঙ্কট অবস্থা, কমলা আত্মজয়
দিদি !
শকুন্তলা শ্বাশুড়ীর পানে চাহিলেন, শ্বাশুড়ী বলিলেন-“যদি না
পার......
কমলা শশার মুখে প্রসন্নতা দেখিয়া বলিল—আপনি আশীর্বাদ
করুন, মা আমি পারব।
কমলার সন্দেহ হইয়াছিল, হয়ত সে অসমর্থ জানিলে তাহার শত্রু
বিরক্ত বা দুঃখিত হইবেন, শধু তাই নয়। পিতৃগৃহে.কতদিন য়ে আত্মীয়
স্বজনকে স্বহন্তে রাধিয়া খাওয়াইয়া সুখ্যাতি অর্জন করিয়াছে, আজ

এত বড় একটা আন বিনা চেষ্টায় সে ত্যাগ রিবে কি করিয়া - একটা বিরাট জনসঘের সম্মুখে পােলাওয়ের থালা লইয়া বৌ মানুষটি চলীফেয়ার ভয়াবহ ছবিটি মনে হইতেই সে-যেন সঙ্কুচিত হইয়া পড়িতে ছিল। কিন্তু তখনই তাহার মনে পড়িল, যাহাকে শিশুকাল হইতে সে দেবতার মত ভক্তি করিয়াছে, এত কম কোলাহল এত আমােদ প্রমে- দৈর মধ্যেও যাঁহার মৃদু গম্ভীর কথাগুলি তাহার বক্ষে সঞ্চরণ করিয়া ফিরিতেছিল, সেই জ্যেঠাইমাই যে একদিন তাহাকে বলিয়াছিলেন- মা, সীতা দ্রৌপদী কি আর কেউ? না, আমাদেরই মত মানুষ তাঁরা। এই দ্রৌপদীরই রান্না খেতে একদিন পতিতপাবন নারায়ণওঁ লালায়িত হয়েছিলেন। এ কি আমাদের কম গবের কথা মা? স্যার পর হইতেই লােক সমাগম হইতে লাগিল। কমলা পােলা পরিবেশন করিল। প্রথমটা হাতের বালতিটা বড়ই ভার লাগিয়াছিল, না। শ একটি রূপার ছােট বালতি দিয়াছিলেন, য়ে বড়টিই লইয়াছিল। uহর উৎপড়িল-বৌ কৈ, বৌকৈ ? কে একজন চেঁচামেচি করিতেছিল—ও-গাে ও বউবাজারের ওরা... বলি ছ ? বাড়ীর একজন গিন্নী বান্নী গােছর লােক ধমক দিয়া বলিল—থাম গাে বউবাজার-ও-লা। বৌ কৈ গাে, নতুন, নতুন বৌ? এইবার যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় নামিতে হইবে, কমলা তাহা বুঝিল। কিছুক্ষণ পূবে বিদ্যুৎ-চপল তাহাকে জানাইয়া দিয়া- ছিল যে এখনি দাদার সব বন্ধুরা আসবে ভাই। তারা সব বড়

বড় বিদ্বান। দেখি ভাই, আমার দাদার বৌ বলে য়েন তুই খনিচ
দিতে পারিষ!মলা কোন উত্তর দেয় নাই।
সে ত জানে না কি হইলে তাহার দাদার বৌ বলিয়া পরি
দিয়ার যােগ্য হইতে পারিবে। যদি বিদ্যুৎ-চপলা তাহাকে কোয়
কথাই না বলিত—তাহার হয়ত শঙ্কা হইত না, কিন্তু তাহার |
নিয়া কমলার মনে ভয়েরই উদয় হইল।
তাই যখন বিদ্যুৎ-চপলার কণ্ঠে তাহারই ডাক শুনিল, সে একেক
স্তব্ধ হইয়া গেল। পরিবেশন শেষ করিয়া সবেমাত্র সে হায়
ধুইয়া আসিতেছে, তখনও বিন্দু বিন্দু ঘাম তাহার ললাটে, কপােল
ফুটিয়াছিল, এখন সর-দেহ একেবারে স্বেদ-স্নাত হইয়া গেল।
বিদ্যুৎ-চপলা তাহারই খােজে প্রথমে ছাদে পরে নীচে যাইতেছি,
মধ্য পথে তাহাকে দেখিয়া বলিয়া উঠিল—এই য়ে বৌদি
কমলা আরও বামিতে লাগিল।
কমলা বড়ি দিয়া উঠিতেছিল, চুপ
বিদ্যুৎ-চপলা তাহার হাত ধরিয়া বলিল—
বন্ধুরা এসেছে।
কমলা দ্বারের নিকটে আসিতেই বিদ্যুৎ-চপলা বুঝি
নমস্কার করিস। আর যা যা জিজ্ঞেস করে—উত্তর ]ি
কমলা বলিল-আচ্ছা।
ঘরে ঢুকিয়া দেখিল, কেহ নাই। বেশ সাজানাে ঘরটি-এর
সে পূর্বে দেখে নাই। চারিদিকে ফুৱে ফুলে ভরিয়া গিয়াছে। দেওয়ায়ে
বিছানায়, আয়নায়, আলনায়, আললাম, সর্বত্র ফুল!

খুঁঝি এ বিশ্বে আজ ফুল আর কোথাও নাই।
এক মিনিট পরেই ধুপ ধাপ, গুপ, গাপ, শব্দ ত হইল। কমলা
জুয়ারটায় বসিয়া মাথা নত করিল।
একটি, দুইটি, তিনটি—সবশুদ্ধ সাতটি যুবক কক্ষে ঢুকিয়াই বলিয়া
ঠল-বা! বা!
সবার্থে ছিল-নরেশ।
প্রথমে কিছুক্ষণ সকলেই প্রশংসমান দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল।
কমলা নতদৃষ্টিটাই একটু আড় করিয়া দেখিল, সকলেই সুবেশ,
সুকেশ, সুন্দর। সকলের চেয়ে যে মলিন, তাহার রূপেরও পারিপাট্য
আছে। পাড়াগাঁয়ের মেয়ে সহরে আসিয়া প্রথমটা আশ্চর্য্য হইয়া
গিয়াছিল। এখানে ছােট ছেলে মেয়েরাও খালি গায়ে ধূলা মাখিয়া
বেড়ায় না, সকলেই বেশ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন, জামা-জোড়া গায়ে দিয়া-
মন ঠেকিলেও এটির সে সুখ্যাতিই করিয়া-
মেয়েদের সাজা-গােজা ভাবটি দেখিয়াছিল,
মন যেন ভয়ই হইয়াছিল, কিন্তু যখন দেখিল, কেবলমাত্র
মশের পরিপাট্য ছাড়া অন্য কোন পার্থক্যই তাহার সঙ্গে তাহাদের
মন্তিবােধ করিয়াছিল।
ৰ্তে স্বামীর বন্ধুদের দেখিয়া প্রথমটা তাহার ভয়ই
কার সহজ সরল ব্যবহারের আভাষ পাইয়া পুলকিত
ইয়া উঠিল।
কে-একজন হাসি-হাসি গলায় বলিল—বৌদি, আমরা এখানে
কিটু বস ?
৭০

১২টা বাজিয়া গিয়াছে। কমলাকে লইয়া শকুন্তলা ও বিদ্যুৎচপল সেই ফুল-সাজানো ঘরটায় আসিয়া-বস, ভাই কমলা-বলিয়া দ্রুতপদ্ধে বাহির হইয়া দ্বারের ছিটকিনি তুলিয়া দিলেন। তাহারা জানিতেন না যে এসবের কোনই দরকার ছিল না। নিলজ্জা বলুন, বেহায়া, বেকুফ কমলাকে পাঠিকা। আমার স্বাহাই বলুন, এই পুষ্পময় গৃহে আসিয়া তাহার কোনই ভাবান্তর হইল না। এই কিছুক্ষণ পূর্বে সে এই ঘরটির ও তৎসঙ্গে গৃহস্বামীর সহিত পরিচিত হইয়া গিয়াছে। তাহার কণ্ঠের যে অপূর্ব মধুর সুর শুনিয়াছে, তাহাতে কমলার নারী-জীবনটা একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ হইয়া ঘরে আসবাব বিশেষ কিছুই ছিল না। একঘামে আর দেওয়ালে একখানি বাঁধানাে ফটোগ্রাফ! #জু, গিয়া দেখি সেই লোকটার! সেই গুরুর! হা, গুরুরই ! ছবিখানার ঠিক উপরেই বৈদ্যুতী আলেকের কল-কাঠিটিতে গাছি মাল লম্বিত ছিল; সেটি লইয়া কমলা সেই ছবির গায়ে টাঙ্গাইয়া দিল। বাহিরে পদশব্দ ত হইল। শব্দ কাহার এবং কোন্ জরি জুতা তাহা কমলা চিনিত। বিছানায় বসিয়া পড়িয়া, একগাছি আর ও প্রায় দলগুলির মধ্যে অঙ্গুলিচালনা করিতে লাগিল।

এক মিনিট পরেই শৈলেন্দ্র ঘরে ঢুকিল। আস্তে আস্তে দরজা
করিয়া, মৃদুকণ্ঠে বলিল-ঘুম পেয়েছে, কমলা!
কমলা বলিল—না।
শৈলেন্দ্র ভাবিয়াছিল, না জানি পল্লীবালিকাকে কথা কইবার
কত সাধ্য সাধনাই তাহাকে করিতে হইবে।
মালা গাঁথছ—বলিয়া শৈলেন্দ্র তাহার পার্শ্বে বসিয়া বলিল-আৱ
হে ? Tাও।
সে মাথা নত করিতেই, কমলা মালাটি তাহার মাথার মধ্য দিয়া
গলায় পরাইয়া দিল। কিন্তু তখনি এক অদৃশ্য শক্তি যেন সবলে আত্মার
ক্ষু দুটিকে মুদিত করিয়া দিল।
কমলাকে তাহার বাহুপাশে বদ্ধ করিয়া-শৈলেন্দ্র তাহার গণ্ডে যুবা-
দয়ের পরিপূর্ণ আনন্দের একটি চিহ্ন অঙ্কিত করিয়া দিল।
সেই ছবিখানা দেখাইয়া বলিল-উনি তােমার গুরু ?
কমলা বালন কি খুব বিদ্বান ?
শৈলেন্দ্রকে এমন ছােট-খাট উত্তর দিতে দেখিয়া কমলা একটু
আশ্চর্য হইয়া গেল। সহজভাবেই বলিল
উনি একদিন আমার রান্না খেতে চেয়েছেন।
বলছিল বটে নীচে গিয়ে।
একটু পরে, শৈলেন্দ্র আবার বলিল—একদিন রেখে তাদের খাও
মাবে কমলা ?
৭)

কমলা নতমুখে ঘরে বলিল—খাওয়াব। শৈলেন্দ্র তাহার হাতটি তুলিয়া লইয়া জিজ্ঞাসিল-তুমি রাখতে ন কমলা? জমি।—বলিয়া কমলা উদগ্রীব হইয়া রহিল। লে বলিল—সব রাঁধতে জান ? জানি। শেলেন্দ্র প্রশংসমান দৃষ্টিতে তাহার মুখের পানে চাহিয়া বলিল- তবে কালই হবে। কি-বল ? কমলা বলিল—আচ্ছা। শৈলেন্দ্র বলিল—শুধু গুরু নন-আরও সব বন্ধুরা খাবে। একটু থামিয়া বলিল—আমার গুরুদেবকে ঐ রকম দেখতে বটে, কমলা, কিন্তু পৃথিবীর বিষ্ঠে গ্রাস করে বসে আছেন। কমলা বলিল-জানি। শৈলেন্দ্র সাশ্চর্য্যে কহিল—কি জান ? কমলা বলিল--তাকে দেখেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম। কি করে কমলা ?-শৈলেন্দ্র জেদাজেদি করিতে লাগিল। কমলা লজ্জারুণ মুখখানা তুলিতেই পারিতেছিল না, তা উত্তর দিবে কি। কিন্তু শৈলেন্দ্র নিষ্কৃতি দিল না ; সস্নেহে, তাহার মুখখানি তুলিয়া ধরিয়া নিৰ্ণিমেষ দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিল—বল, কমলা ! কমলা কিছুতেই লজ্জা দূর করিতে পারিল না, চুপ করিয়া রহিল। ৭৭ শৈলেন্ত্রের স্বরে কাতরতা ফুটিয়া উঠিল, লিগ-বলবে না ত ? বলব। বল। তুমি বিদ্বান, তা ত আমি জানি। তােমার যিনি গুরু, তিনি কি মূখ হতে পারেন। বলিয়াই সে মুখটি নামাইয়া লইল। এ উত্তরে শৈলেন্দ্রের তরুণ হৃদয় কতখানি আনন্দিত, গবোৎফুল্ল হইয়া উঠিল, তাহা আমি বলিতে পারিব না। আপনারা পারেন, অনুমান করিয়া লউন। শৈলেন্দ্র দ্বিতীয়বার কমলার অধর স্পর্শ করিল। একটু পরে জিজ্ঞাসিল—কি ভাবছ কমলা ? কমলা বলিল-একট। কথা। কি কথা? কমলা নীরব। না বল্লে ছাড়ান পাবে ভেবেছ? উহু, তা পাচ্ছ না। বরং আগে ভালেহ ফল। বল।--শৈলেন্দ্র দু’হাতে তাহাকে বেষ্টন করিয়া ধরিল। কমলা লজ্জায় লাল হইয়া বলিল—বলছি, বলছি। শৈলেন্দ্র ছাড়িল না, বলিল-বল। কমলা বলিল—আমার জ্যেঠাইমা বলেন- "দেব দ্বিজে ভক্তি কর এদ্ধা গুরুজনে ; ৭ দুঃখীরে বুকেতে তুল ভালবেস পতিধনে।” -বলিতে বলিতে সে লজ্জারুণ মুখখানি নামাইয়া লইল। শৈলেন্দ্রের চিত্ত ভরিয়া গিয়াছিল, আবার সে কমলার মুখ তুলিয়া রিল, আবার এ সব তােমার ভাল লেগেছে কমলা ? মুখ না-তুলিয়াই কমলা জিজ্ঞাসিল—কি ? শৈলেন্দ্র তাহার মুখের পানে চাহিয়া স্নেহভরা-কণ্ঠে বলিল-এই বন্ধু-বান্ধব, হাসি-তামাসা-- লেগেছে। শৈলেন্দ্র একটু বড় রকমের উত্তর আশা করিয়াছিল, তবে তাহা পাইলেও ক্ষুন্ন হইল না। পূর্ববধিই সে কমলার অবাধ-সহজ ভঙ্গিটিতে সুখ পাইয়াছিল, একটু পরে বলিল—আর একটা কথা বলবে, কমলা ? এব র আর কমলা-কি—সে প্রশ্ন করিতে পারিল না। চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। শৈলেন্দ্র হঠাৎ বলিয়া ফেলিল-আমাকে। কমলা প্রশ্নটা বুঝিতে না পারিয়া মুখ তুলিতেই শৈলেন্দ্র পুনরায় জিজ্ঞাসিল-আমাকে তােমার কেমন লাগল, কমলা ? কমলার মুখ চোখ একেবারে তড়িৎস্পর্শে হাসিয়া উঠিল, আর কর্ণমুল পয্যন্ত লাল হইয়া উঠিল মৃদুস্বরে কহিল--আমি ত ভাল- বাসি! “ভালবেস পতিধনে”-এ কথা কি আমি অমান্য করতে পারি? ৭১

বলিয়া—সে মুখটা নামাইতেই শৈলেন্দ্র দুই হাতে তাহাকে জড়াইয়া
ধরিয়া যেই তাহার অধরে চুম্বন করিতে যাইবে বাহিরে চাপা
হাসির হি হি শব্দ শুনিয়া তাড়াতাড়ি ছাড়িয়া দিল।
কমলও বাহিরের পানে চাহিয়া লজ্জিত হইল। পর মুহূর্তেই
দু’জনে হাসিয়া ফেলিল। শৈলে উঠিয়া সুইচটা টিপিয়া দিল।
'',

শৈলেন্দ্র মধ্যাহ্নে দুই তিনবার উপরে উঠিয়া, অনেকক্ষণ ধরিয়া ঘরে গায়চারি করিল এবং তয় তাহার উপস্থিতির সংবাদটা সশব্দে আলমারী খুলিয়া, বই ঝাড়িয়া, টেবিল নাড়িয়া বাড়ীসুদ্ধ লােককে জানাইয়া দেওয়া সত্ত্বেও কমলা কক্ষে আসিল না। সে যেমন গুরুজনদের কাছে বসিয়া গল্প শুনিতেছিল, তেমনই শুনিতে লাগিল। শকুন্তলা শৈলেন্দ্রের মনােভাব বুঝিতে পারিয়া কহিলেন—কমল। একবার ঘরে যাও দিকিন। বােধ হয় ঠাকুরপো তােমায় খুঁজছে। সেই সময়ে একখানা খুব বড় গােছের বহি শৈলেন্দ্রের হস্ত চ্যুত হইয়া, মাটীতে পড়িয়া, একটা ভীষণ শব্দ তুলিল। সে শব্দ শুনিয়া, বর্ষিয়সীরা গােপনে ও তরুণীর খল খল শব্দে হাস্য করিয়া উঠিলেন। শকুন্তলা বলিলেন-ঘরের জিনিষ পত্তর কিছু আস্ত থাকবে না কমলা, এই বেলা একবার চাদ মুখ খানা দেখিয়ে এস। কমলা লজ্জায় মরিয়া গেল। শকুন্তলার সন্দেহটা মিথ্যা হইল না। একটু পরেই এক trong জিনিষ পড়ার শব্দ হইল। শৈলেন্ধের মাতা-ও সেখানে বসিয়া ছিলেন, তিনি আস্তে আস্তে উঠিয়া, অন্যত্র চলিয়া গেলেন। শকুন্তলা কমলাকে এমটী ছােট খাট ধাক্কা দিয়া বলিলেন- কমলা, শুনছ না কেন ভাই। বিস্তর লােকসান হয়ে যাবে যে !

শখ
কমল বক্ত সাড়া দিল না।
শকুল, খন, তাহাকে ছাড়িয়া দিয়া, শৈলেন্দ্রের ঘরের পানে
চাহিয়া হাস্য-জড়িত কণ্ঠে কহিলেন--আমাদের কোন দোষ নেই
ভাই ঠাকুরপো ! আমরা কমলাকে যেতে বলছি, ও উঠছে না।
শৈলেন্দ্র অবশ্যই সে কথার জবাব দিল না ; শুনিতে পাইয়াছে,
এমন ভাবও জানাইল না; পূর্বের মতই ঘরের দ্রব্যাদি গুছাইতে এ
কোন-কোনটা ফেলিতে লাগিল।
কথাবার্তা সমস্তই বন্ধ হইয়া গিয়াছিল। নারী—বৈঠকে
কেবল একট। চা। হাসি ও মদু গুনের শব্দ উত্থিত হইতেছিল
কমলার মাথাটা তাহাতেই অরে। মাটির সঙ্গে মিশিয়া যাইতেছিল।
মনে-মনে শৈলেন্দ্রের উপর রাগও তাহার কম হইতেছিল না। এত
লোকের মাঝ খানে তাহাকে এমন ভাবে অপ্রস্তুত করা কি তাহার
উচিত হইতেছে।
রুণা হয় বললেন- সে। মানিনি, শ্যাম যে তােমার
কঞ্চের ধারে খুরছে। মন রাখলাে মানিনী : নইলে, শ্যাম যে
তোমার প্রাণে বাঁচে নি ।
তাহাদের কৌতুকোজল দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া কমলা দেখিতে পাইল
শৈলেন্দ্র মুহাব্যতার সহিত বারান্দা দিয়া এঘর
ওঘর করিয়া
বেড়াইতেছে। কমলার সারা দেহ অবশ হইয়া আসিল।
শকুন্তলা বলিলেন---না ভাই কমলা এ তােমার বড় অন্যায় হচ্ছে ।
বোধ হয় বিশেষ কিছু দরকার পড়েছে, তাই ঠাকুরপাে ও-বকম
করে বেড়াচ্ছ।

* * *
৫
বন্ধু
একটি বেরসিকা চকি মেয়ে বলিয়া উঠিল--কেন ? শৈল-মামা কি
বােবা নাকি! ডাকলেই ত পারে ! নামও ত জানে...
একজন যুবতী ধমক দিয়া কহিলেন—তুই থাম ! তাের সকল
কথায় কথা কওয়া কেন লা!--কচি থতমত খাইয়া গেল।
অপরা যুবতী বলিলেন-কচি কিন্তু মিছে বলে নি বাছা ! এই
যদি দরকার, মুখ ফুটে ডাকলেই ত পারে ?
অন্য একটি যুবতী বলিলেন—দরকার না হাতী! মুখচন্দ্র দেখা ছাড়া
কোন দরকারই নেই।
যা বলেছিস! পাঁচদিন কাটে নি, এখুনই দরকার! কি আমার
আয়রণ-চেষ্টের চাৰী রেখে দিয়েছে বৌয়ের জিম্মায় গো!--বলিয়া
একটি অর্ধবয়সী রমণী গম্ভীরভাবে সকলকে লক্ষ্য করিতে লাগিলেন।
তাহারই সমবয়স্কা অনু এক রমণী কহিলেন—যা বলেছ ! বিয়ে
হলে আর ঘর চলে না--যে বলে, এও দেখছি তাই ! কালে
কতই দেখব। আমাদের কালে......
শকুন্তলা একটা অপ্রিয় আলােচনার সুচল কল্পনা
স্বভাবসিদ্ধ প্রফুল্ল কণ্ঠে কহিলেন——যাই তােমরা বন-না কেন ঠামা,
তােমাদের কাল চলে গেছে। সেকালের সঙ্গে একালের কি-ই বা মিল
আছে বাছা! তােমরাই বল ! মিছে সে কথা তােলা !
পূর্বোক্তা রমণী সে-কথায় কর্ণপাত করিলেও, সে কথা ভােলা মিথ্য
ইহা মানিয়া লইতে পারিলেন না, বলিলেন-আমাদের কালে বর ছিল
না ত, চোর ছিল। দিনের বেলা শােবার ঘরে ঢুকতে তাদের পা
কাপত ; গভীর রাত্রে যখন আসতেন, তখনও পা টিপে টিপে, যেন

বাড়ীর লােকে না জানতে পারে। একটি একেলে যুবতী সেকালের প্রতি ‘বন্দুমাত্র সম্মান না দেখাইয়াই কহিলেন—কেন গো ঠাকুমা, চুরী করতে আসত না কি গাে আমাদের ঠাকুর্দা মশাই? পুলিসের ভয়ে বুঝি তার পা কাপাত ? পুলিসের নয় লাে নাতনী, পুলিসের নয়, গুরুজনদের সমীহ। সমীহ। গুরুজনরা তবে বিয়ে দিতেন কেন? অর্ধবয়সী রমণী ক্ষুব্ধ হইয়া বলিলেন-সে তােরা বুঝবি নে লল, বুঝবি নে, তােরা সব একেলে ফচকে ছুড়ী, গুরুজন, সমীহ, এ-সব কথাই তােরা শিখিস্ নি ? যুবতীটি কহিলেন—শিখি-নি? মানে জিজ্ঞেস কর, বলতে না পারি তখনকাণ মলে দিও। এই হাসি-তামাসার মধ্যে রাগের কথা কিছুই ছিল না; ইহাতে রাগিবার কথাও কাহার নয়, কিন্তু ঠাকুমা-নামে অভিহিত সেই infী রমণী ইহাতেই একেবারে টং হইয়া উঠিলেন। এবং মনুষ প্রকৃতির দেবল্য রাগিলে যুক্তি-বিচার হিরােহিত হয়, তাহাই হইল। তিনি রােষযুক্ত স্বরে কহিলে :--"তাদের সঙ্গে কথা কওয়াই ঝকমারী বাছা! তঁা তাকে তুদ্ধ দেখিয়া যুবতটির রঙ্গ-~হা বঞ্ছিত হইতেছিল , তিনি ঠাকমাকে অধিকতর ক্রুদ্ধ করিয়া মজা দেখিবার অভিপ্রায়েই কিছু বলিবার উদ্যোগ কতিতেছিলেন, কিন্তু ব{ হইল না, কারণ এক- জোড়া চটি জুতার শব্দে সকলেই উৎকর্ণ হই। সিড়িটার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন।

국원 শৈলেন্দ্র বৈশাখের অপরাহ্নের মত গম্ভীরমুখে নীচে নামিতেছিল, শকুন্তলা দাঁড়াইয়া উঠিয়া, বলিলেন—আমরা অনেক সাধ্যি সাধন। করলুম, চন্দ্রাননখানি দেখিয়ে আসবার জন্যে ! কত বললুম, ঠাকুরপাে ডাকছে- আমি কাউকে ডাকিনি, বলিয়া শৈলেন্দ্র বাহির হইয়া গেল। শকুন্তলা বৈঠকে ফিরিয়া আসিয়া কমলাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন- আজ মান ভাঙ্গাতে চোখের জল নাকের জলে হতে হবে, কমলা! ভয়ানক রেগেছে। কমলা মুখে কিছু বলিল না বটে, তবে ভয়ে তাহার বুকটি দুরু দুরু কাপিতেছিল। যে যুবতীটি ঠাকমার সঙ্গে রসিকতার যুদ্ধে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন, তিনিই বলিলেন-অধর সুধা কিছু বেশী খরচ হবে, এই যা! তার সন্তে তুমি কিছু ভেব না কমলা! ও এমনই একটা জিনিষ, অজস্র দান করলেও ভড়ার খালি হবার ভয় নেই। ও কুবেরের ভাণ্ডা! তাহার কথায় সকলেই ক্রুদ্ধ ঠাকমা পৰ্যন্ত—হাসিয়া, উঠিলেন। কমল। মাথাটি নীচু করিয়া বসিয়া, ঘামিতে লাগিল। তাহার মনের ভয় এই হাস্যালাপেও ঘুচিল না, যেমন জমাট হইয়াছিল, তেমনি রহিয়া গেল। তাহার ভয় যে অমূলক বা মিথ্যা নহে, তাহা সেই রাত্রে শয়ন কক্ষে ঢুকিয়াই কমলা বুঝিতে পারিল এবং বুঝিতে পারি, তাহব ক্ষুদ্র প্রাণটি ঝড়ের দোলায় দুলিতে লাগিল। কমলা দেখিল, শৈলেন্দ্র দেওয়ালের দিকে মুখ করিয়া ঘুমাইয়া এ বস্থ গেছে। বেশীদিন এখানে না বাস করলেও, এই দৃশ্য তাহার চোখে যেমন অদ্ভুত, তেমনই নূতন ঠেকিল। যে কয়দিন সে এথানে আসি- যাছে, শৈলেন্দ্র একটি রাত্রিও নিজে ঘুমাইয়াছে বা তাহাকে ঘুমাইতে দিয়াছে বলিয়া তাহার মনে হইল না। হয়ত অন্যদিন শৈলেন্দ্রকে নিদ্রিত দেখিলে, কমলার এত চিন্তিত হইবার কারণ ঘটিত না। কিন্তু আজ না-কি মধ্যাহ্ন হইতেই সে এইরূপ একটা কিছু ঘটিবার সম্ভাবনা ভাবিয়া রাখিয়াছিল, তাই এখন তাহার ভ ও ভাবনার সীমা রহিল না। কিন্তু এই ভয়-ভাবনা হইতে মুক্তি পাইবার কোন পন্থাও তাহার জানা ছিল না। অন্যদিন এই স্ময়ে তাহার একবার করিয়া ঘুম আসিত, ঘুমে চক্ষু মুদিয়া আসিত, আবার শৈলেন্দ্রের সঙ্গে কথা কহিতে, গল্প করিতে, ঘুম তাহাকে ছাড়িয়া যাই, সারা-রাত্রি দু’টিতে মুখোমখী করিয়া কত অজানা, অচেনা, অদেখা রাজ্যের যা-তা গল্প করিয়া কহিত। কিন্তু আজ আর ঘুম আসিল না। ভয়ে যাহার চিত্ত অবশ ভাবনায় যাহার হৃদয় ভারাক্রান্ত, নিদ্রার সুখ-শান্তি ও তাহার জন্য সৃজিত হয় নাই; কমলাও সে সুখের আস্বাদ জানিতে পারিল না। কৰ্তব্য ভাবিয়া না পাইয়া, কমলা নিদ্রিত শৈলেন্দ্রের পদতলে বসিয়া, তাহার একখানা পা কোলের উপর তুলিয়া লইয়া, আস্তে আস্তে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল। কতক্ষণ যে এইভাবে কাটিল, তাহা কমলা জানেনা। শৈলেল পাশ ফিরিয়া, পা টানিয়া লইল। কমলা তাহার সুপ্ত-সুন্দর মুখের

বস্তু
।
৩
পানে চাহিয়া নীরবে বসিয়া রহিল।
যদি কোন অরসিকা পাঠিকা ভাবিয়া থাকেন যে শৈলেন্দ্র প্রকৃতই
নিদ্রিত ছিল, তবে তিনি মস্ত ভুল করিয়াছেন; তজ্জন্য তাহার
লজ্জিত হওয়া উচিৎ ! শৈলেন্দ্র ঘুমায় নাই। ঘুম আসেও নাই বটে,
সুমাইতে চাহেও নাই বটে সে শুধু ঘটনা-পরস্পর লক্ষ্য করিবার
জন্য ও তাহার কৃত্রিম-কোপ দর্শনে কমলা কিকরে, তাহা জানিবার
জন্যই ‘মটকা মারিয়া পড়িয়াছিল। তাহার বিশ্বাস ছিল যে নিদ্রি
মানুষ যখন পাশ ফিরে, তখন তাহার নিদ্রার গভীরতা দূর হইয়া যায়,
নিদ্রা তরল হইয়া আসে। তাই সে পাশ করিয়া শুইলে, কমলা
যখন আবার তাহার চরণ স্পর্শ করিল, তখন সে জাগিয়া উঠিবার
"ভান করিল।
কমল। নতমুখে পায়ে হাত বুলাইতেছিল, শৈলেন্দু চক্ষু চাহিয়?
বলল—তুমি এখনাে বসে আছ যে! ঘুমােও নি ?
কমলা সাড়া দিতে পারিল না।
শৈলেন্দ্র পুনশ্চ চক্ষু মুদিয়া, বলিল-শুয়ে পড়, রাত হয়ে গেছে।
কমলা এবারে কথা কহিল, বলিল—অন্যদিন কি এখনই ঘুমােই ?
শৈলেন্দ্র এ কথার কোন উত্তর দিল না।
কমলা বলিল—তুমি আজ এত ঘুমুচ্ছ কেন?
শৈলেন্দ্র বলিল-ঘুম পেয়েছে।
কমলা বলিল--তা নয়, আমার ওর রাগ হয়েছে ।
রাগ ? না !
হয়েছে।

ব
শৈলেন্দ্র চক্ষু চাহিয়া বলিল-“রাগ হবে কেন?
কমলা নতমুখে বলল—দুপুর বেলা আমি আসিনি বলে ?
শৈলেন্দ্র একটু থামিয়া যেন ভাবিয়া লইল, জিজ্ঞাসিল-এলে না
কেন ?
তুমি ত আমায় ডাক-নি ?
কিন্তু বৌদি ত তােমায় আসতে বলেছিলেন।
বলেছিলেন, কিন্তু ঠাট্টা করে। তােমার কিছু দরকার ছিল ?
ছিল।
কিবল না ?
শৈলেন্দ্র চিন্তিত হইয়া পড়িল ; মিথ্যা বলিতে সে অভ্যস্ত ছিল না।
কমলা তাহার হাতটি ধরিয়া বলিল-বল না, কি দরকার ছিল ?
;
সে হয়ে গেছে।
তবুবল?
শৈলেন্দ্র আর গাম্ভীৰ্য্য রক্ষা করিতে পারিল না, হাসিয়া, উঠিয়া
বসিয়া বলিল—বড় খিদে পেয়েছিল ।
কমলাবা। একটু পরে বলিল—তা আমি কি করতুম ?
শৈলেন্দ্র হাসিয়া বলিল—তুমিই খেতে দিতে ?
আমি!
হ্যাগাে! আমার যে খিদে, তার খাবার তুমি ছাড়া আর কেউ
দিতে পারে না।
কমলা অত্যন্ত বিস্ময়ে নির্বাক হইয়া রহিল।
শৈলেন্দ্র বলিল—এখনও :খিদে রয়েছে। দেখবে, খিদে মেটাব ?

지원
বলিয়াই সে কমলাকে দুই হাতে কাছে টানিয়া, তাহার অধরে আননে,
গণ্ডে অজস্র চুম্বন করিল। তার পর মুখ তুলিয়া বলিল—আঃ!
কমলা উচ্ছসিত হাসিতে ফুলিয়া উঠিয়া বলিল—ঐ খিদে ?
শৈলেন্দ্র বলিল—কেন ? ওটা কি খিদে নয় ?
ওরই জন্যে দরকার ছিল ?
হ্যা।
কমলা বলিল—তখন ওঁরাও তাই বলেছিলেন।তাহার মুখখানি
লজ্জায় আরক্ত, করুণ।
একটু পরে বলিল-দুপুরবেলা দরকার পড়িয়ে না ।
শৈলেন্দ্র সহাস্যে জিজ্ঞাসিল--কেন?
কমলা বলিল—আমি ত আসতে পারব না।
কেন পারবে না ?
ম, দিদিমণি, সব থাকেন। তাদের কাছ থেকে আমি আসতে
পারব না।
তাতে কোন দোষ নেই কমলা।
কমলা বলিল—আমি দোষের জন্যে বলছি নে।
শৈলেন্দ্র জিজ্ঞাসিল-তবে?
কমলা বলিল-মা’র কাছে বসি, তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিই :
পায়ে তেল মালিস করে দিই, তখন কি আসা যায় ? আর...
আর কি কমলা? চুপ করলে কেন?—বল।
তুমি রাগ করবে না ত ?
।
বল।

; শg কমলা বলিল আমি ত শুধু তােমারই একলার নই। শৈলেন্দ্র একটা তীব্র রসিকতা করিয়া উঠিল। তাহা শুনিয়া কমলার রক্তিম গণ্ডদ্বয়ে রক্ত যেন ফুটিয়া উঠিল, সে দু’হাতে শৈলেন্দ্রকে ঠেলিয়া দিয়া বলিল—যাও, তুমি বড় দুষ্ট ! আমি দুষ্ট, না তুমি দুষ্ট! আমি ত জানি তুমি আমারই একলার ! আমার সুখের, আমার দুঃখের ; আমার হাসির, আমার কান্নার ; আমার মনের, আমার প্রাণের-আমারই একলার! তুমি বলছ তা নয়, তুমি আমার একলার নও। এতে কি বঝায়, আমি দুষ্ট? না, তুমি দুষ্টু! আমি ত একলা তােমারই, আর কারও নই। কমলার হৃদয়খানি ভাব-তরঙ্গে নাচিয়া নাচিয়া উঠিলেও, কোথায় যেন একটা খােচা উঠিয়া তাহাকে পীড়া দিতেছিল, সে বলিল-মা’র নও, দাদার নও, আর কার নও? শৈলেন্দ্র বলিল—তা কেন... কমলা হাসিয়া বলিল—আমিও তাই। আমার জ্যোঠাইমা বলতেন- *দৈব দ্বিজে ভক্তি কর ; এদ্ধ। গুরুজনে দুঃখীরে বুকেতে তুল ভালবেস পতিধনে।” -তুমি কি বল, একথা মিথ্যে? আমি গুরুজনকে ভক্তি শ্ৰদ্ধ। করব না? তঁাদের সেবা করব না? দুঃখীকে দয়া করব না? বল -তুমি যা বলবে, আমি তাই করব। আমার সেই জ্যেঠাইমাই

আবার বলেছিলেন, কমলা, স্বামীর আদেশ উ কি অনুচিৎ, তা
বিচার করবার অধিকার স্ত্রীর নেই। স্ত্রী করবে, তার আদেশ পালন।
তা হলেই তার নারী-জন্ম সফল হবে।
কমলা শৈলেন্দ্রের মুখের পানে চাহিয়া জিজ্ঞাসিল—বল তােমার
কি আদেশ? উচিৎ অনুচিৎ বিচার না করে আমি তাই পালন
শৈলেন্দ্র হঠাৎ পত্নীকে বক্ষে বাঁধিয়া, তাহার মুখের উপর মুখ
রাখিয়া বলিয়া উঠিল—না কমলা, আমার কোন আদেশ নাই ।
তােমার জ্যোঠাইমা যা বলেছেন, তাই ঠিক, তুমি তার কথাই
পালন কর।
তুমি রাগ করবে না?
, না, না !
শৈলেন্দ্র প্রতিশ্রুতিস্বরূপ তাহার মুখ চুম্বন করিল।
একটু পরে বলিল—কিন্তু কমলা, তােমার সেই জ্যেঠাইমাকে ত
আমি মনে করতে পারছি না।
কমলা মনমুখে বলিল—তাকে তুমি দেখনি?
আমাদের বিয়ের সময় আসেন নি ?
।
কেন ?
কমলা মলিন-মুখে জ্যেঠাইমার উৎসবে যােগ না দিবার কারণটি
সবিস্তারে বলিয়া, অশ্রু ছল ছল নেত্রে কহিল-একবার কেবল কাদতে
কাঁদতে এসে আমায় আশীর্বাদ করে গেছলেন।

সেইদিনের সেই ছবিটা কমলার মানসচক্ষে ফুটিয়া উঠিতেই
তাহার মন প্রাণ হর্ষদীপ্ত হইয়া উঠিল। তাহাকে স্মরণ করিয়া, সে
বেলের হাত ধরিয়া তাহাকেই দেখিতে যাইতেছিল, দ্বার খুলিতেই
দেখে, তাহার কাতর প্রার্থনা শুনিয়া, দেবী তাহার দ্বার সম্মুখেই
আসিয়া গড়াইয়াছেন।
কমলা বলিল—জ্যেঠাইমাকে আমার দেখতে কি রকম জান ?
শৈলেন্দ্র ব্যগ্ৰকয়ে জিজ্ঞাসিল—কিরকম?
জগদ্ধাত্রীর ছবি দেখেছ?
ঠিক সেই রকম।
শৈলেন্দ্র বলিল—এবার যখন যাব তােমাদের ওখানে, দেখাবে
তঁাকে ?
দেখাব!
কমলা সুখাতে ভাসিয়া স্বামীর বুকে মুখ রাখিল।
৯২

সেজ
কয়েকদিন পরে, কমলার পিতা কন্যাকে দেখিতে আসিলেন
শৈলেন্দ্র খবরটা দিয়াই গম্ভীরভাবে চলিয়া যাইতেছিল, কমলা তাহার
হাতটা ধরিয়া জিজ্ঞাসিল—বাবার সঙ্গে দেখা হয়েছে ?
শৈলেন্দ্র গভীরভাবে কহিল-হয়েছে।
কমলা বিস্মিত হইয়া বলিল-বাবা কি বলেন?
এমন কিছু না !
কমলা স্থিরনেত্রে একবার স্বামীর পানে চাহিল কিন্তু সেখানে
চাহিয়াও তাহার এই আকস্মিক গাম্ভীর্যের কোন কারণ খুঁজিয়া না
পাইয়া করুণ-কণ্ঠে কহিল-বল না কি বল্লেন ?
শৈলেন্দ্র অনিচ্ছাটা ঝাড়িয়া ফেলিয়া বলিল—তামাকে নিয়ে যেতে
এসেছেন।
এ সংবাদে কমলার মুখখানি নিমেষের জন্য হর্ষদীপ্ত হইয়া উঠিল
আবার তখনি তখনি ম্লান হইয়া গেল। কমলা কোন কথা না বলিয়া
চুপ করিয়া, দাড়াইয়া রহিল ।
শৈলেন্দ্র বলিল—যাবে ত কমলা?
কমলা বলিল—তুমি বলেই যাব।
তার মানে কি কমলা?

ব
কমলা শৈলেন্দ্রের হাত দুটি মুখের কাছে আনিয়া, মুঠার মধ্যে
চাপিয়া ধরিয়া বলিল—তুমি যেতে বল যদি, যাব। নইলে
নইলে কি ?
নইলে—যাৰ না।
কিন্তু তােমার বাবা যে নিতে এসেছেন কমলা।
কমল। নিরুত্তর।
শৈলেন্দ্র বলিল—না গেলে তােমার দুঃখ হবে না কমলা?
দুঃখ হবে কেন?
তাই জিজ্ঞেস করছি, হবে না?
মন কেমন করবে না ?
এবার কমলা কথা কহিল না।
শৈলেন্দ্র একটুক্ষণ তাহার মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিল—না
কমলা, তুমি যেময়।
কমলা সাগ্ৰাহ কহিল—তুমি বলছ ?
শৈলেন্দ্র বলিল-নইলে তােমার যে মন কেমন করবে কমলা ?--
বলিয়াই শৈলেন্দ্র ঘর ছাড়িয়া বাহিরে গেল।
এক মিনিট কাল কমলা যেন কি করিবে তাহা স্থির করিতে পারিতে
ছিল না। তখনই তাহার জ্ঞানবতী, স্নেহময়ী জ্যাঠাইমার কথাগুলি মনে
পড়িয়া গেল তােমার ওপর তার কি কম জোর কমলা। যাকে
কখনও দেখনি, কোনও দিন যার নামও শােননি সেই লােক একদিন
মাত্র এলে তমাকে তােমার চিরদিনের বাপ মার কাছ থেকে, তােমার

적월 চিরদিনের ঘর সংসার থেকে নিয়ে চলে গেল যে, তােমার পরে তার কত- খানি জোর তা কি আর তােমাকে বলে দিতে হবে মা। সেই এখন তােমার সকলের চেয়ে আপন, সকলের চেয়ে গুরুজন। তঁার তুটিতে তােমার তুষ্টি, তার আনন্দে তােমার আনন্দ। তার আদেশ তােমার কাছে ঈশ্বরের আদেশ! কর্তব্য স্থির করিতে আর কমলার দেরী হইল না। মনঃস্থির করিয়া কমলা নীচে নামিয়া গেল। ঠিক সেই সময়েই তাহার ননদিনী আসিয়া বলিল--বৌ! তােমার বাপ এসেছেন, বড়দা’র সঙ্গে উপুরে আসছেন। সঙ্গে সঙ্গেই সিড়িতে জুতার শব্দ ত হইল। কমলার ভার অগ্নে, পিতা পচাতে উপরে আসিলেন। কমলা প্রথমে তাকে, পরে ভাসুরকে প্রণাম করিয়া মাথা নীচু করিয়া দাঁড়াইল। কমলার পিতা কন্যাকে আশীর্বাদ করিয়া বলিলেন—ভাল আছিল কমলা ? কমলা নতমুখে কহিল-হ্যা বাবা। আপনি ভাল ছিলেন বাবা? আমার মা ? আর সবাই ? হ্যা মা, সবাই ভাল আছে। জ্যেঠাইমা? তাের জ্যেঠাইমা ভাল নেই মা। বর-কণে সেই চলে এলি তােরা, সেই তাের জ্যেঠাই যে শয্যা নিলেন, আজ পর্যন্ত সমান ভাবে ভুগছেন।

“বৰু
কি অসুখ বাবা?
অসুখ বাইরে থেকে কিছু বােঝা যায় না মা। তবে জানিসই ত...
কমলা কাদ কঁাদ হইয়া বলিল-জানি বাবা!
কমলার ভাসুর বলিলেন-বৌমাটীর আমার বুদ্ধি শুদ্ধি যদি কিছু
থাকে।—পাগলী কোথাকার! ঘরে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে কথাবার্তা ক’,
তা নয়
কমলা লজ্জানত মুখে বলিল-আনুন বাবা।
ভাসুর হাসিয়া বলিলেন-এতক্ষণে আসুন বাবা।
ঘরে আসিয়া কমলা একটি একটি করিয়া পিত্রালয়ের সমস্ত খবর
জানিয়া লইল। তাহার মা, সখীরা কে কেমন আছে ও কোথায় আছে
জানিয়া লইয়া বলিল—আচ্ছা বাবা, আমি ত এই ক’দিন নেই, তােমরা
সবাই আমার নাম করতে!
তাহার পিতা কৃত্রিম গাম্ভীর্যের সহিত বলিলেন--না।
করতে না?
।
কমলা মুখখানি ভার করিয়া বলিল—আমি বুঝি তােমাদের পর
হয়ে গেছি ?
গেছিসইত রে! সেই যে আসবার দিন একটা টাকা আর একথালা
চাল দিয়ে-আমাদের সব ঋণ শােধ করে দিয়ে এলি; আর সম্পর্ক
কিসের বল ?
ফমলা বলিল—তবে আবার এলে কেন বাবা?
তােকে দেখতে কমলা।

• ব আমি ত তােমাদের কেউই নই, আমাকে আবার দেখা কেন!- এবার সত্যসত্যই তাহার চক্ষু দু’টি ছল ছল কয়িয়া আসিল; এবং তাহা দেখিয়া কমলার বাবা হাে হাে করিয়া হাসিয়া, কন্যার একটি হাত ধরিয়া তাহাকে কাছে টানিয়া, স্নেহকোমলকণ্ঠে কহিলেন—বদ্ধ পাগল কোথা- কার! প্রাণ ছেড়ে মানুষ কখনও বেঁচে থাকে? জল ছাড়া হলে মাছ বাঁচে কখনও? তুই ক’দিন নেই, আমরা তাের কথা কইছি কি-না জিজ্ঞেস করছিস কমলা? বাড়ীখানা যে অন্ধকার হয়ে আছে মা—আমার ! তাের মা, দিনরাত্রি, আমার কমলা এইখানে বসে খেত ; আজএখন খেয়েছে কিনা; এইখানটিতে শুয়ে ঘুমুত, এখনও ঘুমিয়েছে কি-না, এই করেছে। গাই-গরুটা পর্যন্ত সমস্তক্ষণ ‘মা’ ‘মা’ করছে ; আর তুই জিজ্ঞেস করছিস পাগলী, আমরা তাের নাম করতুম কি না! আচ্ছা পাগলী মেয়ে ত তুই কমলা ! কমলা নতনেত্রে বসিয়া কথাগুলা শুনিতেছিল। কথা শেষ হইয়া গেল কিন্তু তাহার সুখানুভূতিটুকু তাহার অন্তরে সুধাবৃষ্টি করিতেছিল, , সে চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। একটু পরে কমলার পিতা বলিলেন-কাল যাবার দিন হয়েছে কমলা। আমি তােকে নিতে এসেছি। কমলা এ সংবাদে কিছুমাত্র আনন্দ বা আগ্রহ প্রকাশ করিল না ; যেমন নতমুখে বসিয়াছিল, তেমনই বসিয়া রহিল। কথা কচ্ছিস নে যে কমলা। ওঁরা কি বল্লেন বাবা? কারা রে?

আমার শ্বশুড়ী, ভাসুর ? এর আর বলাবলি কি কমলা। সাতদিন পরে যাওয়ার রীতি যে সব যায়গাতেই চলে আসছে রে । আমি যাব না বাবা! কমলার পিতা কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাহার পানে চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন-সে কি কমলা? যাবি নে কিরে? কমলা লজ্জায় আড়ষ্ট হইয়া বসিয়া রহিল, কথা বলিতে পারিল না। তাহার পিতা কিয়ৎক্ষণ মুটের মত বসিয়া থাকিয়া বলিলেন—কি হয়েছে বলত কমলা? কমলা কণ্ঠস্বর যথাসাধ্য সংযত করিয়া কহিল—কিছু হয় নি বাবা। তবে যে যেতে চাচ্ছিসনে বড়। এবার তিনি স্পষ্টই দেখিতে পাইলেন, লজ্জার অরুণরাগে কমলার মুখখানি লাল হইয়া উঠিল। পাছে পিতা সেই লজ্জাকর লালিমাটুকু দেখিতে পান্, কমলা মুখখানাকে একেবারে বুকের মধ্যে লুকাইবার চেষ্টা করিতেছিল; পিতা তাহা বুঝিয়া সেই মুখ খানিকে টানিয়া, কোলের উপর চাপায় ধরিয়া সহাস-আননে কহিলেনআচ্ছ, যাওয়া যাওয়া আমি শৈলেনের সঙ্গে বােঝাপড়া করব। এ কথায়, কমলা যেন অনেক খানি আশ্বস্ত হইল। সে যে তাহার ইচ্ছা নাই জানিয়াই যাইতে আপত্তি করিতেছে, নহিলে তাহার মনটির ভাষা যদি কেহ পড়িতে পারিত, তবে দেখিত সে তাহার সেই পল্লীর বন-সুনিবিড় চির পরিচিত গৃহ খানিতে ফিরিয়া যাইবার জন্য আকুলি- বাকুলি করিতেছে।

রাত্রে শৈলেন্দ্র ঘরে আসিয়া বলিল—যাওয়ার কি হল কমলা ?
কমলা মনে করিল, তবে এখনাে বাবার সঙ্গে কথাবার্তা হয় নাই,
ইনি কিছু জানেন না; সেই ভাবেই বলিল—আমি ত বাবাকে বলেছি
আমি যাব না।
যাবে না ?
।
সত্যি?
সত্যি।
কেন?
কেন আবার! যাব না।
আমি যদি যেতে বলি?
কমলা স্বামীর মুখের উপর স্থির দৃষ্টি ফেলিয়া কি যেন অন্বেষণ
করিল, তারপর বলিল—তা হলেও যাব না।
শৈলেন্দ্র বলিল—দেখাে, ঠিক ত ? কথার নড়চড় হবে না?
।
ঠিক ?
শৈলেন্দ্র বিছানার উপর আড় হইয়া শুইয়া পড়িয়া অন্যদিকে মুখ
করিয়া বলিয়া উঠিল—তবে আর কি হবে! একলাই যাই, দুএকদিন
থেকে চলে এলেই হবে’ খন।
কমলা স্বামীর বুকের উপর লাফাইয়া পড়িয়া বলিয়া উঠিল—তুমি
যাবে ?

49
শৈলে গভীর কণ্ঠে কহিল—কি আর করি, যাই দুদিন ঘুরেই
আসি। বড় ধরেছেন, না গেলে ছাড়বেন কি?
কমলা আবদারের স্বরে কহিল—তৰে আমিও যাব।
শৈলেন্দ্র মৃদু মৃদু হাসিতে হাসিতে বলিল—তা কি করে হয় কমলা !
তােমার যে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হবে। শেযে তােমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করিয়ে,
পাপের ভাগী হব আমি।
কিসের প্রতিজ্ঞা ?
কেন, এই মাত্র তুমি প্রতিজ্ঞা করলে, কিছুতেই যাবে না। সে
প্রতিটি ভাঙ্গা কি তােমার উচিৎ হবে?
তখন ত আর আমি জানতুম না যে তুমি যাবে !—তাই ওকথা
বলেছিলুম।
কিন্তু প্রতিজ্ঞাত। তা সে জেনেই কর, আর না জেনেই কর।
প্রতিজ্ঞা ভরে যা পাপ, তা হবেই।
তা হােক! আমি যাব।
পাপ হবে...
হােক পাপ ! সঙ্গে আমার পূণ্যি স্বয়ং চলেছেন, আমার আবার
পাপ ! আমার সকল পাপ পুণ্য হয়ে যাবে ! বুঝলে কি পুণ্যি-মশাই !
শৈলেৰে বােধ-শক্তির ইঙ্গিতটা বােধকরি ভাষায় ভালরূপ
প্রকাশ পাইবার সম্ভবনা ছিল না, তাই প্রকারান্তরে সেটা সে ভাল
করিয়াই বুঝাইয়া দিল।

পর কিন্তু গ্রাম যতই নিকটবর্তী হইতে লাগিল, কমলার মনখানি ততই যেন ম্লান হইয়া পড়িতেছিল। চির-প্রিয়-জন সম্মেলন, চির- প্রিয় বাসভবন, জননী জ্যেঠাইমার স্নেহ-মধুর সম্ভাষণ কমলার মনটিকে ভিতর হইতে দোল দিতেছিল না, একথা বলিলে সত্য বলা হয় না। কিন্তু তার চেয়ে একটা বড় অস্বস্তিতে তাহার অন্তরখানি নিপীড়িত হইতেছিল। সে ভাবিতেছিল, শৈলৈ সহরের লােক; ইবন তুল্য গৃহ তাহার ; একা তাহারই আদেশ পালন করিবার জন্য চার পাঁচজন পরিচারক, পরিচারিকা আছে ; ইলেট্রিক পাখার বাতাস, খুব গরমের সময়েও গরম জানিতে দেয় না; কত সুপেয় সুমিষ্ট খাদ্য ; কত সুখ, কত সুবিধা। আর এখানে—সবই ত অসুবিধা। পাড়াগায়ের সেই ক্ষুদ্র গৃহখানি, দাস-দাসী নাই, বৈদ্যুতকি আলো নাই ; পাখা নাই। সেখানে কি তিনি থাকিতে পারিবেন ? যদি না মন বসে? যদি গিয়াই চলিয়া আসিতে চাহেন ? কোন্ একটা বড় ষ্টেশনে ট্রেন থামিতেই, কমলার পিতা প্ল্যাটফর্মে নামিয়া গেলেন। কমলা ওধারের বেঞ্চে উপবিষ্ট স্বামীর কাছটিতে গিয়া বসিল। এতক্ষণ পর্যন্ত এই দুইটি একসুরে বাঁধা প্রাণ যে কি বিচ্ছেদ-যাতনা সহিয়াছে, তাহা শুধু তাহারা এবং তাহাদের সৃষ্টি- কর্তারই জানা থাকিতে পারে। কেবলমাত্র চক্ষুলজ্জার খাতিরেই 직원 শৈলেন্দ্র শ্বশুর-মহাশয়কে অন্য গাড়ীতে যাইতে দেয় নাই ; লজ্জার শাস্তিও হাড়ে হাড়ে ভুগিয়াছে। এক্ষণে কপােত-কপােতর মত এই দুইটি প্রাণী কেবল চক্ষু দিয়াই এতক্ষণ বিচ্ছেদের ক্ষতিপূরণ করিয়া লইতেছিল। কার মধ্যে অপর কেহ-না থাকিলেও প্ল্যাটফর্মচারী পথিকগণ যে কামরার মধ্যে খরদৃষ্টি না ফেলিতেছিল এমন নহে। কমলা তাহা দেখিবামাত্র লজ্জা পাইয়া বলিল—না, আমি ওদিকে গিয়ে বসি। শৈলেন্দ্র একালের ছেলে ; শ্বশুরের মর্যাদাটা অতি কষ্টে রাখিতে পারিয়াছিল কিন্তু অপরিচিত কোন লােকের জন্য কোনরূপ সম্মান বােধ তাহার ছিল না। কমলার কথায় সে যেন একটু বেশী করিয়াই কমলার কাছে সরিয়া আসিল ও তাহার একটা হাত ধরিয়া আদর করিতে সুরু করিল। ঠিক সেই সময়েই একটি প্রৌঢ় ভদ্রলােক- “গাড়ীতে যায়গা আছে মশাই” বলিয়া দ্বার ঠেলিয়া একেবারে ভিতরে আসিয়া দাঁড়াইল। কমলা হাতটা ছাড়াইয়া লইয়া দাঁড়াইয়া উঠিল। শৈলেন্দ্র বিরক্তিভরে কহিল-ষায়গা থাকলেও এতে যাবার কারও অধিকার নেই। এ-কামরা আমাদের রিজার্ভ করা। রিজার্ভ ?—ভদ্রলােকটি ব্যস্ত সমস্তভাবে নামিতে যাইবেন, গার্ডের বাঁশী বাজিয়া উঠিল, গাড়ীও একটা বিপুল ঝকানি দিয়া নড়িয়া উঠিল। এবং তন্মুহূর্তেই কমলার বাবা হাতল ধরিয়া ফুটবাের্ডে পা দিয়া বলিয়া উঠিলেন—করেন কি, করেন কি! পড়ে যাবেন যে! সরে পঁড়ান, সরে দাঁড়ান।-বলিয়া ভদ্রলােকটিকে একরকম ভিতরের দিকে ঠেলিয়া দিয়াই, নিজে ভিতরে আসিয়া দাঁড়াইলেন। । ১০২ ভদ্রলােকটি তাহাকেও, তাহারই মত অনধিকার প্রবেশকারী মনে করিয়া, কুদ্ধ-আনন শৈলেন্দ্রের পানে সভয় দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া বলিলেন- আজ্ঞে এগাড়ী ওঁদের রিজার্ভ। তা আছে—পরের ষ্টেশনে নেমে, পারেন, অন্য গাড়ীতে উঠবেন। যাবেনকতদূর? আজ্ঞে একটি ষ্টেশন। ও, বসুন, বসুন।—নিজে বসিয়া, পার্শ্বে স্থান দেখাইয়া দিলেন। আগন্তুক ভদ্রলােক এইবার বুঝিলেন যে ইনি কামরা রিজার্ভকারী- দেরই একজন। সঙ্কুচিত ভাবে এক পার্শ্বে বসিয়া পড়িলেন। এদিকে কমলা সেই যে আড়ষ্ট ভাবে, কোণ ঘেসিয়া দাঁড়াইয়াছিল, ক্রমেই সে যেন দেওয়ালের মধ্যে প্রবিষ্ট হইবার উদ্যোগ করিতেছিল। ঘামে সর্বাঙ্গ ভিজিয়া গিয়াছে ; পা হইতে মাথা-লজ্জায় লাল হইয়া উঠিয়াছে। যেন একটা মস্ত অপরাধ করিয়া, ধরা পড়িয়া গেছে। এখনি কৃত-অপরাধের বিচার হইবে। অবস্থা অনেকটা সেই রকমের। কমলার পি আগে লক্ষ্য করেন নাই ; এক্ষণে সেই দিকে চক্ষু পড়িতেই, শশব্যন্তে কহিয়া উঠিলেন-ওখানে এমন করে দাড়িয়ে কেন কমলা? ও, আমরা বুঝি তাের বেঞ্চিতে বসেছি। তা তুই ঐখানেই বােস না মা। তাতে দোষ নেই কমলা, আমি বলছি, বােস ! কমলা অগত্যা একটি সচল কাপড়ের পুটলীর মত সেই বেঞ্চটারই এক পার্শ্বে বসিয়া পড়িল। শৈলেন্দ্র তথায় উপবিষ্ট ছিল। সে দেখিল, অথবা দেখিল না, বুঝা গেল না।

국원 দুই বৃদ্ধে বেশ গল্প জমাইয়া ফেলিয়াছিলেন। এ বছর কোন্ জেলায় কেমন ধান্য জন্মিয়াছে ; কোন্ কোন্ জেলায় চাষীরা পাটের চাষ কমাইয়াছে ; পাড়াগাঁয়ে গুণ্ডা দুবৃত্তদের অত্যাচার ক্রমশঃই বৃদ্ধি পাইতেছে ; গ্রামে গ্রামে ছেলেরা নিজেরা থানা না বসাইলে আর রক্ষা নাই—এমনই কত দরকারী অদরকারী কথার আলােচনা করিয়া চলিয়াছেন। হায়! একই সুখনীড়ে উপবিষ্ট এই কপােত-কপােতী যুগলও যদি এমনই নিবিচারে দরকারী অদরকারী কথার আলােচনা করিয়া যাইতে পারিত। ; শৈলেন্দ্রের বিরক্তির একটা বিশেষ কারণও ঘটিয়াছিল। যদিও বাড়ী ছাড়িয়া অবধি তাহারা প্রণয়ীযুগল একটি বাক্য বিনিময় ও করিতে পারে নাই, তবুও সমস্তক্ষণই তাহারা দৃষ্টিবিনিময় এবং তারাই হৃদয়ের ভাবের আদান প্রদান করিতে পারিয়াছিল। কমলার পিতা গাড়ীতে ছিলেন রুটে কিন্তু উঠিয়া অবধি তিনি একরকম শুইয়াই আসিতেছেন; অনেক সময়ে তাহাকে নিদ্রামগ্ন বলিয়াই বুঝা গিয়াছে। । সুতরাং তরুণ-তরুণীরনীরব প্রেমালাপে কিছুমাত্র বাধা পড়ে নাই। এক্ষণে দুই বৃদ্ধকে সজাগ বসিয়া থাকিতে দেখিয়া সেই কারণেই শৈলেন্দ্র একটু বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিল। পরের ষ্টেশনে ট্রেণ থামিতেই বৃদ্ধ নামিয়া গেলেন। কিন্তু বাধা প্রাপ্ত তরুণের আলাপ আর জমিতে পায় নাই। আর আধঘণ্টার মধ্যেই টেণ কমলাদের গ্রামের ষ্টেশনে দাড়াইল ষ্টেশনের বাহিরে একখানা গরুর গাড়ী ইহাদের জন্যই অপেক্ষা ১০৪ করিতেছিল। কমলার পিতা কন্যা-জামাতাকে গাড়িতে তুলিয়া নিজে পদব্রজে চলিতে আরম্ভ করিলেন। গরুর গাড়ী হেলিতে দুলিতে, লাফাইতে লাফাইতে-বিচিত্র শব্দ তুলিয়া মন্থর গতিতে অগ্রসর হইল। পিতা দৃষ্টি-বহিভূত হইলে, কমলা বলিলাগা, গরুর গাড়ীতে তােমার কষ্ট হচ্ছে না? কমলার তৃপ্তির সহিত কহিল—সত্যি বল, কষ্ট হচ্ছে না? । কষ্ট হত, যদি সঙ্গে তুমি না থাকতে। বলিয়া প্রিয়ার কোমল হস্তখানি ধৃত করিবার জন্য হাত বাড়াইতেছিল, কমলা গাড়ােয়ানকে দেখাইয়া তাহাকে নিরস্ত করিল। একটু পরে বলিল-না, তােমার কষ্ট হচ্ছে, আমি বুঝতে পারছি। তুমি কেন বাবার সঙ্গে হেঁটে গেলে না? শৈলেন্দ্র ইহার কোন উত্তর দিবার পূর্বেই কমলা পুনশ্চ কহিল- এই হ্যাকচ হ্যাকচ করে গরুর গাড়ীতে যাওয়ার চেয়ে হেটে যাওয়া ঢের ভাল। তাই যাবে, থামাতে বলব? অল্পে অভিমানী শৈলেন্দ্রের মনে হঠাৎ কেমন একটা ধারণা জন্মিল, সে সঙ্গে যায়, কমলা ইহা চাহে না। অভিমান-ক্ষুব্ধ কণ্ঠে কহিল- তােমার অসুবিধা হচ্ছে কমলা ? কমলা কথাটা সহজ ভাবেই লইল এবং সরল ভাবেই উত্তর দিল- আমার অসুবিধে হতে যাবে কেন? তবে.•• শৈলেন্দ্র পূর্ববৎ নীরস-কণ্ঠে কহিল—তবে কি ?

কমলা বলিল-বাবার সঙ্গে গেলে বেশ হােত। বাবা হয়ত কি
ভাবছেন।
শৈলেন্দ্র একথার আর জবাব দিল না। তবে সে-যে এই কথা
সমর্থন করিল, তাহাও নয়। বরঞ্চ সে একটু ক্ষুন্নই হইল। কমলার এই
অতি সারল্য তাহাকে যেন অনেকখানি দমাইয়া দিল, সে পথের দিকে
হিয়া বসিয়া রহিল।
কমলা অন্য কথা পাড়িল। দূরের একটি শ্যামল প্রান্তর দেখাইয়া
বলিল—ওগুলাে কি গাছ বল দেখি?
শৈলেন্দ্র তাহার অঙ্গুলি অনুসরণে চাহিয়া দেখিল বটে কিন্তু কথা
কহিল না।
কমলা হাসিয়া বলিল—বলতে পারলে না ত ? ও মটরশুটীর ক্ষেত।
কি সুন্দর দেখতে-বল ত? যেন সবুজ ভেলভেট। না ?
শৈলেন্দ্র অন্যমনস্কর মত ঘাড় নাড়িল।
কমলা বলিতে লাগিল—তার পাশেই ঐ যে নীল মতন চলে গেছে,
দেখছ, ওটা-বড়াল দীঘি। এত বড় দীঘি আর এ তল্লাটে নেই। দেখতে
পাচ্ছ না? ঐ যে নীল মতন—ঐ একেবারে আকাশের কোল পর্যন্ত
গেছে।
শৈলেন্দ্র ঘাড় নাড়িয়া জানাইল-দেখিয়াছে।
কমলা বলিল—ঐখানে বড়ঠাকুর কতবার হাঁস, বটের, তিতির
শিকার করে গেছেন।
শৈলেন্দ্র নীরব।
হাগা, তুমি বন্দুক আন-নি
১০৬

। কেন আনলে না? বেশ ত শিকার করতে। তুমি বুবি বন্দুক ‘ড়তে পার না? শৈলেন্দ্র বিরক্তভাবে কি উত্তর দিতে যাইতেছিল, একদল ছেলে মেয়ে, পথের ধারে দাড়াইয়া হাত তালি দিয়া বলিয়া উঠিল—-ওরে, কমলা দিদির বর, ঐ দেখরে। পাড়াগাঁয়ে কাহার বাড়ী জামাই আসিলে, শুধু সেই বাড়ীতেই নয় ; সমস্ত গা-টায় একটা সাড়া পড়িয়া যায়। জাতি ভেদ, বর্ণ ভেদ, অবস্থা-ভেদ-কোন ভেদই প্রায় থাকে না, সকলেই সাগ্রহে জামা- দর্শনে আসিয়া থাকেন; যাহারা আসিতে পারেন না,তাহারাও জামাতার প্রসঙ্গ আলােচনা করিয়া তৃপ্তি অনুভব করিয়া থাকেন। কমলাদের বাড়ীতে আজ বহু বর্ষিয়সী, বহু যুবতী, বহু তরুণী, বহু কুমারীর শুভাগমন হইয়াছিল। বহির্বাটীতে পুরুষও দুই দশজন আসিয়াছিলেন সত্য কিন্তু তুলনায় তাহা গােস্পদ-সম। জাতি বর্ণ নির্বিশেষে রমণীরা শুধু যে আসিয়াছিলেন তাহাই নহে; যাহার গৃহে যে ভাল দ্রব্যটি আছে, তাই প্রতিবেশীর জামাতার জন্য সঙ্গে আনিয়া- ছিলেন। অনেকে আবার পূর্বাহ্নে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন। কেহ এক বাটা উত্তম ক্ষীর, কেহ স্বহস্ত-প্রস্তুত বিবিধ মিষ্টায়; কেহ সযত্ন রচিত তাম্বুল ইত্যাদি সঙ্গে আনিয়াছিলেন। কাহার পুষ্করিণী হইতে সদ্য-ধৃত সর্বাপেক্ষা বৃহৎ মৎসটি আগে-ভাগে ইহাদের গৃহে পাঠাইয়া দিয়াছেন; কাহার গাভী প্রসব করিয়াছে, খানিকটা খাটা দুগ্ধ পাঠাইয়া দিয়াছেন। কাহার গাছের ফল আসিয়াছে; কেহ গৃহ-প্ৰস্তুত গব্য : g স্বত পাঠাইয়াছেন, কেহ ক্ষেত্ৰ-উৎপন্ন উত্তম রাজভােগ চাল দিয়াছেন এমনই—কত কি! কত বলিব। আবার যাহার কিছু নাই, কিছু দিতে পারেন নাই—তিনিও আসিয়াছেন। অধরের হাস্য, অন্তরের প্রীতি-প্রতিবেশী কন্যা জামাতার জন্য তিনি তাহাই আনিয়াছেন- তাহাতেও কুণ্ঠা বা দ্বিধা নাই। বঙ্গের সর্বত্র এ ভাবটি আছে কি না জানি না, তবে আমি এ দৃশ্য দেখিয়াছি, এই স্নিগ্ধ-স্নেহ পবিত্র দৃশ্য আমাদের অন্তরে একটা গভীর রেখাপাত করিয়াছে, তাই কোন এক পল্লীগ্রামের চিত্র আঁকিবার কালে ইহাতে সন্নিবেশিত করিলাম। অবস্থাপন্ন গৃহস্থও প্রতিবেশীর দান গ্রহণ করিতে দ্বিধা করিতেন ; বা সেটাকে দান বলিয়াও মনে করিতেন না। বাঙ্গালার পল্লী ছােট বড় মিলিয়া যেন একটা প্রকাণ্ড গৃহস্থের মতই ছিল। আজ বােধ করি দেশের কুত্রাপি এরূপ দৃশ্য দৃষ্ট হইবে না। সভ্যতার যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়তা, সৌহার্দ্য সকলই স্বার্থের তলে আত্মবলি দিয়াছে। অথবা, যদি একেবারে না দিয়া থাকে, দিতেছে। প্রতিবেশিনী—যাহারা কমলাদের গৃহে উপস্থিত ছিলেন, তাঁহার যে নবাগত কন্যা-জামাতাকে মহাসমারােহে অভ্যর্থনা করিয়া লইলেন, তাহা বােধ করি না বলিলেও চলে। জামাতা পরমুহূর্তেই বহির্বাটীতে প্রস্থান করিলে, তাঁহারা এই কয়দিনে কমলা কতখানি বাড়িয়াছে তাহার গায়ের রং কলের জলের সংস্পর্শে কি পরিমাণ শুভ্র হইয়া উঠিয়াছে, তাহার শ্বাশুড়ী প্রদত্ত নুতন অলঙ্কারগুলি তাহাদের স্ব-স্ব স্থানে কিরূপ পরিপাটী মানাইয়াছে, তাহারই আলােচনায় মন দিলেন। এবং ; ১০ অল্পতর্ক ও ততােধিক স্বল্প গবেষণার ফলেই ইহা প্রমাণিত হইল যে মেয়ে মানুষের বাড় কদলীকাণ্ডের বাড়ের সমতুল, বিবাহের জল পড়িলে ত আর কথাই নাই। কলের জলে রং ফর্সা করে সত্য কিন্তু রঙের লালিমাটুকুর অপহব ঘটে, কমলারও যে একটু না ঘটিয়াছে এমন নহে। আর বড় লােকের দেওয়া—নিজ পুত্রবধূকে দেওয়া অলঙ্কার যে ভালই হইবে, তাহাতে আর বৈচিত্র কি আছে। ডিক্রী তিসমিস্ এইরূপে শেষ করিয়া রায়ে বলিলেন যে যাহাই হৌক, ঐ অলঙ্কারগুলি যেন কমলার অঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়া উহাদের জন্ম সার্থক করে। তাহাদের দেখিয়াই সুখ হইবে। তাঁহাদের যে দেখিয়াই সুখ, তাহাতে সন্দেহ নাই। কারণ, জলখাবার দেওয়া হইলে, জামাতার ডাক পড়িবামাত্র এই প্রৌঢ়যুবতী বৃদ্ধা প্রতিবেশিনীগণ যুদ্ধাৰ্থ সজ্জিত হইলেন। প্রথমেই প্রচার করিলেন, জামাই আসিয়া আসনে বসিলে, কমলা স্বহস্তে খাবারের থালা লইয়া যাইবে; তাঁহারা সে দৃশ্য দেখিবেন। তৎপরে, কমলা স্বয়ং তাহার পার্শ্বে বসিবে। একজন বলিলেন-খাইবে। তাহারা শুধু দেখিবেন। প্রৌঢ়ারা তাহাতে আপত্তি উত্থাপন করিলেন। এক সংশােধিত প্রস্তাব এই উঠিল যে কমলা সামনে বসিয়া থাকিবে, বর যদি তাহাকে খাওয়াইয়া দেয়, কমলা যেন লজ্জা করিয়া সেই উপভােগ্য দৃশ্যটি বিনষ্ট না করে। তাহাদের তৃতীয় ইচ্ছা, ঘরটি মুক্ত রাখিতে হইবে। তঁাহারা ইচ্ছা করিলে বন্ধ করিতে পারিবেন কিন্তু অপর পক্ষ তাহার চেষ্টাও ; করিবে না। এক তরুণী জরুরী সমন ধরাইয়া, কমলাকে জুরিদের সম্মুখে উপস্থিত বg করিল। কমলা, অপরাধী আসাম র মত, আদেশগুলা নতমস্তকে নিল। ইহার আশঙ্কা করিতেছিলেন, কমলা সকলগুলায় সম্মতি দিবে না কিন্তু তাহারা আশ্চৰ্য্য হইয়া স্ব-স্ব কর্ণেই শ্রবণ করিলেন, কমলা বলিল,-আচ্ছা গাে, আচ্ছা, তাই হবে। আট হইতে আশী বর্ষ বয়ষ্কার যে বিস্ময়ে হতবাক হইয়া গেলেন, তাহা অমিরা নিশ্চয় করিয়া বলিতে পারি। এবং বিস্ময়ের চেয়ে আর একটা বস্তুতে আঁহার অধিকাংশই—অভিভূত হইয়া পড়িয়াছিলেন, সেটি অতীত ও বর্তমানের একটা তুলনামূলক সমালােচনা করিয়া ! তাহাদের বিস্ময়, পুলকমিখিত দুঃখভােগের অধিক অবসর না দিয়াই, শৈলেন্দ্র শশুর মহাশয়ের সঙ্গে অন্তঃপুরে আসিয়া হাজির হইল। কমলার মাতা, প্রতিবেশিনীগণের সমূহ বিপদ দেখিয়া, স্বামীর উদ্দেশে কহিলেন—তুমি বাইরে যাও গাে ! কমলার পিতা ব্যাপারটা কতক অনুমান করিয়া লইয়া যাই- বলিয়া মৃদু মৃদু হাসিতে হাসিতে চলিয়া গেলেন। এখন- কেহ তাম্বুল রাগ রঞ্জিত অধরখানিতে হাসি-রাশি মাখাইয়া, অগ্রসর হইলেন—কি ভাই বর, চিন্তে পার ? অপরা নয়ন-কোণে বিদ্যুৎ চাপিয়া (?) জিজ্ঞাসিলেন—কি ভাই আমাদের কি মনে পড়ে? আর একজন রসিকাতােমায় আমায় কত ভাব, না ভাই! সেই শৈলেন্দ্র সকলকে সন্তুষ্ট করিতে, সহাস্যে কহিল—আয়ে আপনাদের কি ভােলা যায় ? ১১০ s তরুণী যুবতীদের ভিড় ঠেলিয়া বৃদ্ধারা যুদ্ধ-রেখার কাছেও ঘোঁসিতে না পারিয়া, উভয় পক্ষের যুদ্ধ কৌশল নিরীক্ষণ করিতেছিলেন। শৈলেন্দ্রকে মনােমত উত্তর দিতে দেখিয়া, তাহাদের সমর-স্পৃহা বলবতী হইয়া উঠিল কিন্তু তরুণী ব্যুহ ভেদ করা তাহাদের সাধ্যায়ত্ব ছিল না, কাজেই সেইস্থানে থাকিয়াই এক রসময়ী গাহিয়া উঠিলেন- ......ভােলা কি গাে যায় ? নয়ন ত নয়নে নাহি তার পথে পথে যায় ওরে—ভােলা কিরে যায় ?......” এক ষােড়শী ভিড় ঠেলিয়া, পিছনে আসিয়া রসিকা বৃদ্ধার হাত ধরিয়া, সভা আলােড়িত করিয়া বলিল—তাই ত বলি আমাদের নাগর বরের নাগরী কোথা গেল ? আমরা গরু খোজা করে বেড়াচ্ছি, আর তুমি এখানে ঘাপটি মেরে বসে আছ শৈলেন্দ্র বলিল—আপনারা গরু খোঁজা করেছিলেন। মানুষ খোজাত করেন নি, তাই ওঁকেও পানি। মানুষ খোঁজ করলেন, মিলেও গেল! বরকে বৃদ্ধার পক্ষে ওকালতি করিতে দেখিয়া কৃত্রিম-কোপে তরুণীদের গণ্ড রক্ত হইয়া উঠিল। তাহারা বৃদ্ধাকে টানিতে টানিতে বলিলেন—নাগর ত ঠিক নাগরী চিনে ফেলেছে। বৃদ্ধ পূর্ববৎ সরস কষ্টে গাহিলেন- “নাগরী নাগর চিনেছে ১১১ g বিনি সুতােয় গেঁথে মালা গলায় দিয়েছে।” অজনেই এই সভা বসিয়াছিল—না, না, দাঁড়াইয়াছিল। কমলার মা রান্নাঘরের দ্বারের নিকট দাড়াইয়া, সকলই লক্ষ্য করিতেছিলেন, সভা ক্রমেই জমিয়া উঠিতেছে এবং পথশ্রমে শ্রান্ত শৈলেন্ত্রের জল খাওয়ার বিলম্ব হইতেছে দেখিয়া, তিনি কন্যার হস্তে জল খাবারের রেকাবী দিয়া ঘরের দিকে পাঠাইয়া দিলেন। রান্নাঘর হইতে শয়নকক্ষে যাইতে হইলে, অনটুকু পার হইতে হয়। কমলাকে খাবারের থালা হন্তে অগ্রসর দেখিয়া, রসিকারা বলিলেন- “নাও ভাই, বর পাছে বেদখল হয়ে যায়, ঐ ঘণ্টা পড়েছে। তাহারা কমলাকে দেখাইয়া দিলেন। সেই রসিক বৃদ্ধা কহিলেন—আমাদেরও পা আছে, যেতে জানি। ভাই না, ইচ্ছে হয়, তুমি তােমার আপনার লােকের কাছে যাও, আমরা যাব না; কখন যাব না! শৈলেন্দ্র বলিল—বাবার যাব না বলে ভয় দেখাতেই বােৰা যাচ্ছে, আপনারা যাবেনই। তা আসুন, তবে ভাগ পাবার আশা নেই। , আমরা যাব না, এই দেখ বসলুম! বলিয়া সত্যই কেহ কেহ বসিয়া পড়িলেন। তাহলে বসুন, আমি প্রতিশ্রুত হচ্ছি, ফিরে আসব। বলিয়া শৈলেন্দ্র কাভিমুখে অগ্রসর হইল। এবং যেমন সে ঘরে ঢুকিয়াছে, অমনি বাহির দিক হইতে ঘরটি বিরাট শব্দে বন্ধ হইয়া গেল। ১১২ দম্পতী হাস্য বিনিময় করিল মাত্র। শৈলেন্দ্র আসনে বসিয়া বলিল —তুমি খেয়েছ কমলা? , এবার খাব। শৈলেন্দ্র বলিল—এস একসঙ্গে খাই। কমল বলিল—তুমি খাও। একসঙ্গে-বলিয়া শৈলেন্দ্র নিজে খাইল ও কমলাকে খাওয়াইয়া দিল। বাহিরে-কাহার যেন মূচ্ছা হইয়াছে এইরূপ একটা শব্দ উঠিল। ভিতরে ইহারা দুজনেই হাসিতে লাগিল। গরুর গাড়ীতে যে একটা মেঘ উঠিয়াছিল তাহা এইক্ষণে হাসির সুবাতাসে উড়িয়া গেল। প্রতিবেশিনীগণ যে কক্ষের দ্বার জানালার যাবতীয় ছিদ্র অধিকার করিয়া দাঁড়াইয়া আছেন তাহা ইহারা উভয়েই জানিত ; সে দিকে মন দিবে না সঙ্কল্প করিয়া এই দম্পতী আপন মনে আহার ও গঙ্গ করিয়া যাইতে লাগিল। শৈলেন্দ্র নিজে বলিল—এখন কি করবে কমলা? কমলা বলিল—তুমি বল দিকিন, কি করব? শৈলেন্দ্র বলিল-তাস খেলবে বােধ হয়। কমলা ঘাড় নাড়িয়া অসন্মতি জ্ঞাপন করিল। শৈলেন্দ্র বলিল, গল্প- তাও না। তবে ? “জেঠাইমার কাছে যাব।” শ্রদ্ধায়, ভক্তিতে কমলার কণ্ঠস্বর জমাট বাঁধিয়া গেল। ১১৩

ব
এখন পর্যন্ত স্বচক্ষে না দেখিলেও, কমলার কাছে তাঁহার
সম্বন্ধে যাহা যাহা শুনিয়াছিল, তাহাতেই শৈলেরে মনটি সশ্রদ্ধ
হইয়াছিল। এক্ষণে কমলা তাঁহার কাছেই যাইবে শুনিয়া বলিল—
চল আমিও যাই।
কমলা সাগ্রহে কহিল—যাবে ?
হ্যা !
কমলার আনন্দ আর ধরে না। এই জেঠাইমার সামনে
সঙ্কোচ, লজ্জা কমলার কিছুই ছিল না। কখনও মুখ ফুটিয়া বলিতে
পারে নাই বটে কিন্তু এমনি একটা আশা অতি গােপনে, অতি
অসম্ভব জানিয়াও, তাহার মনের মধ্যে মুকুলিত হইয়া ধীরে ধীরে
বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইতেছিল। তাহার সেই আশাটি সফল হইবার
আভাষে সে আনন্দে অধীর হইয়া উঠিল।
বলিল—তাহলে আর বাইরে যেও না। আমি মাকে বলে
এখনি আসছি-দু’জনে যাব।
কমলা দ্বার টানিতেই দ্বার খুলিয়া গেল। হুড়মুড় করিয়া পাঁচ
সাতটি রমণী ঘরে ঢুকিয়া দস্তুরমত বিস্ময় প্রকাশ করিলেন যে, এ
কোন্ দেশী আষাড়ে খাওয়া ভাই যে শেষ হতেই চায় না।
আর একজন কহিলেন—রেখে ঢেকে খেতে হয় ভাই নইলে
পরে যে আপশােধ করতে হবে।
শৈলেন্দ্র বেশ গুছাইয়া জবাব দিল—সেটা আগে বুঝি নি।
আপনাদের দেখে এখন বুঝছি।
ঘুরাইয়া বলা হইলেও, হুলটা বিধিল এবং রসিক। বৃদ্ধাটি সকলের
১১ঃ

বয়
মুখপাত্রী হইয়া এ কথার এইরূপ জবাব দিলেন যে দৃষ্টান্ত দেখিয়া
গেলেই হয় না, দৃষ্টান্ত হইতে শিক্ষা গ্রহণ করা চাই!
শৈলেন্দ্র বলিল-আজ্ঞে হ্যা, এখন নিঃশেষে খেয়ে পরে হা
ভাত করে না বেড়াতে হয়, দৃষ্টান্ত থেকে সে শিক্ষাটুকু আমার হয়েছে।
রমণীগণ মুখ চাওয়া চাওয়ি করিতে লাগিলেন এবং অসংলগ্ন
ভাবে যিনি য়েরূপে পারিলেন, জোড়া তাড়া জবাব দিবার চেষ্টা
পাইলেন এবং রাত্রি হইয়া যাইতেছে, বাড়ীতে ছেলে এবং পুলে
(বােধকরি ছেলের বাবাদের ‘পুলে বলা হইয়া থাকে) একেলা
আছে মনে পড়তেই চঞ্চল হইয়া উঠিলেন। অর্থাৎ তাঁহারা হারি
মানিলেন। কাল পুনশ্চ আসিবেন এবং জামাই কত কথা জানে,
রসিকতা জানে তাহার পরীক্ষা লইবেন এইরূপ ভীতি প্রদর্শন
করিয়া প্রস্থান করিলেন।
কমলা বলিল—আর দেরী নয়, এস।
জ্যেঠাইমা স্বল্প কথায় কিন্তু অকপট স্নেহে তাহাদের কোলের
কাছে বসাইলেন। অন্যান্য দুই-চারি কথার পর শৈলেন্দ্রকে বলিলেন
-তােমাকে সেই একদিনের একটি কথাতেই আমি চিনতে পেরে-
ছিলুম বাবা! তুমি যে মানুষ, তােমার মধ্যে যে মনুষ্যত্ব আর
তা আমি তখনি জেনেছিলুম। আমার কমলা মা’কে সে কথা
বলেও ছিলুম।-বলিয়া তিনি কমলার মাথাটিকে কোলের পরে
চাপিয়া ধরিয়া বলিলেন, সেই যে রে, বাসরে শৈলে একটা গান গাইলে
তারপরও ঘরসুদ্ধ লােক আবার গাও আবার গাও’ করে ত্যক্ত
করতে লাগল, উনি বলেন, আপনাদের মান আমি রেখেছি,

কিন্তু আর আমি পারব না। সবাই বিরক্ত হােল, কিন্তু ওর মত
ত বদলাল না। অনেকে বলবে, এ বাড়াবাড়ি, জেদ, একগুঁয়েমি
আমি তা বলব না, এই ত ঠিক। ওর কথাটা বুঝি কথা নয়?
ওর বুঝি একটা মত নেই? দুর্বলতা, অস্থিরতা, পুরুষের পক্ষে
ত ভ লক্ষণ নয়।
একথা জ্যেঠাই মা সেই দিনই বলিয়া কমলার সংশয় দূর
করিয়াছিলেন, কমলার তাহা স্মরণ ছিল।
জ্যেঠাইমা জিজ্ঞাসিলেন—কিছুদিন থাকবে ত বাবা?
শৈলেন্দ্র বলিল—যদি ভাল লাগে।
ও কথা ত ঠিক নয় বাবা! ভাল লাগাত তােমার মানসিক
অবস্থার ওপরই নির্ভর করে। তুমি যদি সচ্ছন্দে, সানন্দে নাও
এর শ্যামলতা, কোমলতা সবই পাবে। একে ভালবাস, এর লােক
জনকে পাড়াগেঁয়ে অসভ্য বলে না ভাব, এদের স্নেহ ভালবাসা,
এ সবই তুমি পাবে। আর তুমি যদি নিজেকে সব বিষয়েই
এদের চেয়ে উচ্চ উন্নত মনে করে মিশতে না চাও, দেখতে না চাও,
কিছুতেই ভাল লাগবে না। যখন এসেছে, তখন আমার এই
কথা যে, দেখে যাও, মিশে যাও, চিনে নাও। আপনার করে নাও,
আপনার হয়ে যাও।
শৈলেন্দ্র বলিল—আমারও সেই ইচ্ছে।
জ্যেঠাইমা কিঞ্চিৎ মিষ্টিমুখ করাইবার জন্য উঠিলেন, কমলাকে
ভাকিয়া, ঘরের বাহিরে আসিয়া বলিলেন-কমল, আমার বান
এসেছে দেখিছিস?
১১৬

কমলা স্তম্ভিত হইয়া চাহিয়া রহিল।
জেঠাইমা হাসিমুখে, সস্নেহে, কমলার চিবুকটা ধরিয়া বলিলেন
ঐযে মা, ও ঘরে বসন আমার আলাে করে বসে রয়েছে।
১৭

ষােল চাদার খাতা! তােমায় আমি নমস্কার করি ! তুমি সর্বত্র বিরাজমান ; সর্বশক্তিমান, তােমায় আমি শত শত নমস্কার করি। তুমি না করিতে পার—এমন কাজ নাই, তুমি যাইতে না পার, এমন স্থান নাই; তুমি বধ করিতে অক্ষম, এমন লােক নাই। তােমায় আমি নমস্কার কয়ি। যমরাজের ন্যায় অপ্রতিহত প্রভাব সম্পন্ন চাদার খাতা, ধরার কল্যাণ উদ্দেশ্যেই তােমার উদ্ভব, তােমার পত্র-পদে আমি শত সহস্র নতি করি। তােমার কল্যাণে কত নেতার ঘর হইয়াছে, মােটর হইয়াছে ; নাম হইয়াছে; যশঃ হইয়াছে। তােমার কল্যাণে কত বম্বেটে সাধু হইয়াছে ; দেশে দশে প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হইয়াছে। তুমি না থাকিলে কত লােককে যে দানাপাণিতে বঞ্চিত হইয়া পটল তুলিতে হইত, তাহার আর ইয়ত্ত্বা নাই; তােমাকে না পাইলে ছােকরা-বাবুদের চড়ুইভাতি হইত না ; পাটি জমিত না ; বাইনাচ হইত না। তুমি অগতির গতি, বেকারের পতি, তােমায় আমি ভক্তি নত-চিত্তে প্রণাম করি। আর যে “কলম্বাস তােমায় আবিষ্কার করিয়াছে তাহার উদ্দেশ্যে প্রাণের ভক্তি নিবেদন করিয়া বলি হে অজ্ঞাত মহাপুরুষ, এই এক কীৰ্তি দ্বারাই তুমি অবিনশ্বর, অক্ষয়, অমর! চিত্রগুপ্তের খাতার মত তােমার পাতার সংখ্যা নাই, শেষ নাই, কায়স্থকুলতিলক চিত্রগুপ্তের লেজার খাতার মতই ভীতিপ্রদ তুমি, ভক্তিতে যদি নাও করে—ভয়ে তোমার স্বস্তিবচন উচ্চারণ না করে এমন লােক কে কোথায় ১১৮ আছে? দরিদ্র হইতে ধনবান, পণ্ডিত হইতে মুখতােমাকে দেখিলে, তােমার নাম শুনিলে আৎকাইয়া না উঠে কে ? যদি তেমন লােক কেহ থাকে, তবে সে একূলে ওকূলে নাই, আছে মাত্র গােকুলে। হে চাদার খাতা! তুমিই বেকার-সমস্যা-ভঞ্জনের প্রকৃষ্ট পন্থা। অরক্ষনীয়া কন্যার বিবাহে তুমিই বড় ঘটক ; রাস্তা বাঁধান, পুকুর কাটান, অতিথিশালা নির্মাণ, লাট বেলাটকে ভােজদান, শালা-শালীকে তত্ত্ব প্রেরণ, গৃহিণীর গয়না গড়ান, মােটর ক্রয়, বাড়ী নির্মাণ—সর্ববিধ কল্যাণকর কমের একমাত্র সহজ, সরল ও সাধু প্রয়ােজক, তুমি দিনে দিনে পুষ্টিলাভ কর; তোমার বংশ বৃদ্ধি পাক্ ; তুমি যুগে যুগে অবিনাশী আত্মা লইয়া ধরায় বিচরণ করিতে থাক। আমি তােমাকে প্রণাম করিয়া এবং মমালয়ে দীন-ভবনে তােমার শুভাগমন নিবারণ করিয়া আসল কথা বিবৃত করি । রাত্রির মধ্যেই সংবাদ প্রচারিত হইয়া পড়িল যে কমলার বর শৈলেন্দ্র আসিয়াছে। তাহারা কলিকাতার ডাক সাইটে ধনী; তাহার দাদা হাকিম ; সে-নিজেও একটি হবু-হাকিম। যুবক,উদার, ভদ্র ও মিশুক। যাত্রার আটচালায় “হনু অবতার”-এর আখড়া বসিয়াছিল ; গাঁজায় দম মারিয়া হনু ইটের উপর বসিয়া কারণ পান রত রাবণ রাজাকে ধিক্কার দিতেছিল, বুঝি একটা দখিণা বায়ুই শুভ সংবাদটা তাহাদের কাণে কাণে কহিয়া দিয়া গেল। হনুমান গাঁজার কলিকা ফেলিয়া সােজা দাঁড়াইয়া উঠিল ; রাবণ কারণ-পা ফেলিয়া চণ মন করিতে লাগিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই একখানা পালা-লেখা খাতার সাদা পাতাগুলি ছিড়িয়া লইয়া একটি ক্ষুদ্র চাদার খাতা প্রস্তুত হইল; বুদ্ধিমান ‘রামদাসের ;

बलू পরামর্শ-অনুযায়ী গােটা কতক আজে-বাজে নাম: ও চাদার পরিমাণ লিখিত হইল। ইংরেজী জানা ‘রাম’, নামগুলার পাশে পাশে paid (পাওয়া গিয়াছে) লিখিয়া ইনিসিএল ( সহি) করিল। তারপর কল প্রভাতে অবশ্য প্রাপ্য চাদা হইতে পোষাক কেনা হইবে অথবা দে-পুকুরের মাঠে ‘বিদ্যা’-রূপিনী বাগদিনীর মানসিক-করা পূজাটাই বােড়শােপচারে দিয়া ফেলা যাইবে, তাহার মীমাংসা বৈঠক বসিল। যেসময়ে যাত্রার আখড়ায় ঐ কাণ্ড চলিতেছিল, ঠিক সেই সময়ে ৰাৰা ভােলানাথ মন্দিরের সংস্কার সমিতিতে চৌকী চেটাই সম্মিলনে সভ্যগণ সেই রাত্রেই সহুরে বাবুটিকে গ্রেপ্তার করা যায় কি-না তাহারই পরামর্শ করিতেছিলেন। তাঁহাদের নিকট চাদার খাতা ছিল , তৎপরিবর্তে একটি তালা-আঁটা, ছিদ্রকাটা কাঠের বাক্স ছিল। জন-সমাজে প্রচার, চাবিটি শহরের কোন একজন দেশপ্রসিদ্ধ নেতার জিম্মায় থাকে ; ইহারা মাসান্তে দুই একবার তাহার কাছে গিয়া বাক্সটি কেবলমাত্র খালি করিয়া আসেন। অর্থাৎ তাহারা আদায়ের অধিকারী মা, খরচের নহেন। যেমন কম করাই মানুষের ধর্ম—ফলাফল তা ৰাৰা ভােলানাথের! কিন্তু আসলে ইহা সত্য নহে। কর্মফল হাতে-হাতেই পাওয়া যায়। এই বাক্সটির চাবিও তপ নকুড় কামারের কোমর-লগ্ন যুনসীতে আবদ্ধ থাকে। থিয়েটারের আড্ডায় আয়ােজনটা কিছু জমকালাে রকমের। তত্ৰত্য কলাবিদগণ স্থির করিয়াছেন, ধনাঢ্য ব্যক্তিটিকে রিহার্সালে নিমন্ত্রণ করিয়া আনিয়া, খাতা ধরিতে হইবে; চাই কি, একখানা হত লিখিত অভিনন্দন পত্ৰও দিতে পারা যায়। কিন্তু অধিকাংশের ১২০ বন্ধু ভােটে প্রস্তাবটি অগ্রাহ হইয়া গেল। পূর্বাহ্নেই অভিনন্দনখানি পাইয়া লােকটি যদি পাচসিকা নসিকার উপর দিয়াই চলিয়া যায় তবে বড়ই অপ্রস্তুত হইতে হইবে। তাহার চেয়ে কাল সকালে তাহাকে বিধিমত উপায়ে ধৃত করিয়া আসিয়া, প্রীতিভােজে নিমন্ত্রণ করিয়া মাছের তৈলে মাছ ভর্জিত করিলেই হইবে। এই প্রস্তাবই যুক্তিযুক্ত বিবেচিত হইল। সভ্যগণ স্ব-স্ব আলয়ে নিশা যাপন করিতে গমন করিলেন। এইরূপে রাস্তা বাঁধান, পুকুর কাটান, নৈশবিদ্যালয় গঠন প্রভৃতি সমিতি-অধ্যক্ষগণও রাত্রের মধ্যেই প্রস্তুত হইয়া উঠিলেন। সকালে, প্রত্যেকেই আমরা আগে গিয়া কাৎলা ধৃত করিব এই শুভ সঙ্কল্প লইয়া যাত্রা করিয়া দেখিল, অপর দল তাহাদের পূর্বেই আসিয়া হাজির হইয়াছে। অর্থাৎ কমলাদের বাড়ীর সদর দরজা খুলিবার বহুপূর্ব হইতেই শােক জমায়েত হইয়াছে। কমলার পিতা সকলকেই বসিতে বলিয়া, অন্তঃপুরে জামাতাকে সংবাদ দিতে গেলেন। শৈলেন্দ্র চা খাইতেছিল, শশুর আসিয়া বলিলেন—বাইরে ক’টি ছেলে তােমার সঙ্গে দেখা করবে বলে বসে আছে। শৈলে তখনি যাইতে উদ্যত হইল, শ্বশুর মহাশয় কহিলেন—চা-টা খেয়ে নাও বাবা; আমি তাদের বসিয়ে এসেছি ; একটু দেরী হলেও ক্ষতি হবে না। শৈলেন্দ্র চায়ের বাটী তুলিয়া লইল। শশুর মহাশয় বলিলেন-দেখ বাবা, ওদের দল বেঁধে আসা আর বগলে খাতা দেখেই বুঝেছি, এত সকালেই এখানে হানা দেবার ১২১ বg উদ্দেশ্যটা কি! ওরা কেউ যাত্রাদলের পাণ্ডা, কেউ বায়ােয়ারির চাই; কেউ থিয়েটারের মােড়ল। কিছু কিছু চায় আর কি! বলিয়া তিনি হাসিতে লাগিলেন। শৈলেন্দ্র হাসিয়া বলিল—ও। হা। যা তুমি সন্তুষ্ট হয়ে দেবে, তাই নিয়ে হাসিমুখে চলে যাবে। তবে কিছু দিতেই হবে! বুঝলে না বাবাজী, তােমাদের নাম ডাক শুনেছে, কিছু না নিয়ে যাবে না। যাকে যেমন খুসী, কিছু কিছু দিয়ে দিও। শৈলেন্দ্র বলিল—যে আজ্ঞে। তবে হ্যাঁ, তাও তােমাকে বলে রাখি বাবাজী, ওদের সব টাকাই যে সদ্ব্যয় হয়ত মনে করাে না। ভাল মন্দ লােক সব যায়গাতেই আছে। কতক সত্যিকার ভাল কাজেই লাগে; আর কতক একে- বারেই আজে-বাজে নষ্ট হয়। কিন্তু সে বিচার করে বার-করা বড় শক্ত। আর তাতে বড় মনের অ-সরস-ও হয়। তার চেয়ে আমি বলি কি, ও দুটো একটা করে টাকা দিয়ে দেওয়াই ভাল। শৈলেন্দ্র কথা কহিল না বটে; তবে তাহার মুখের ভাবে ইহা পষ্টই বুঝা গেল যে ইহাই সে সমর্থন করিতেছে। চা-খাওয়া হইয়া গিয়াছিল, শৈলেন্দ্র দাড়াইয়া উঠিল। শশুর মহাশয় কাছে আসিয়া মৃদুকণ্ঠে কহিলেন—তা বলে বেশী কতকগুলাে খরচ করে ফেল না যেন বাবা। আজ্ঞে না—বলিয়া শৈলেন্দ্র মৃদু হাস্য করিয়া, বহিবাটীর দিকে চলিয়া গেল।

বg এবং আমার পাঠক-পাঠিকা বিশ্বাস করিবেন কি-না জানি না, সে বহিবাটার সেই কক্ষটিতে প্রবেশ করিবামাত্র যে সােরগােলটা পড়িয়া গেল, তাহা সাধারণতঃ কোন রাজারাজড়ার আগমনে, রাজসভাতেও দেখা যায় না। যাত্রার দলের লােকেরা কিছু অধিকমাত্রায় বিনয়ী; তাহার একেবারে ভূমি চুম্বন করিয়া, সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিল। রাস্তা বঁাধান ও পুকুর কাটা’ সম্প্রদায় সাষ্টাঙ্গে না হইলেও ভূমিতে লুষ্ঠিত হইল বটে! থিয়েটার আখড়ার ছেলেরা মাঝে মাঝে সহরে-টহরে গিয়াছে ; তদব কায়দা কিছু জানেও ; তাহারা নতমস্তকে হাত তুলিয়া নমস্কার করিল। শৈলেন্দ্র সকলকে বসিতে বলিয়া নিজে বসিল। এবং একটি কথঞ্চিৎ সভ্য-ভব্য সুবেশ যুবকের দিকে চাহিয়া তাহাদের আগমনের কারণ জানিতে চাহিল। যুবকটি থিয়েটার সম্প্রদায়ের ‘এ্যাকট্রেস। অথবা অভিনেত্রী। সে উত্তর দিবার জন্য হা করিয়াছে, যাত্রার দলের চাই প্রবীন চকোত্তী ঠাকুর পাড়াইয়া উঠিয়া বলিতে আরম্ভ করিয়া দিলেন—আজ্ঞে পুষ্প প্রস্ফুটিত হইলে, ভ্রমর যেমন... শৈলেন্দ্র বলিল—আপনাদেরও পরে শুবাে!-বলিয়া সেই যুবকটির উদ্দেশে কহিল—হ্যা বলুন ত, ব্যাপার কি ! যুবক হা করিয়া দলের-বেদলের সকলের দিকে চাহিয়া যেন সানুনয় দৃষ্টিতে ভাষা ভিক্ষা করিতে লাগিল। বাস্তবিক যুবকটি অত্যন্ত মুখ- চোরা, নিরীহ, বেচার-ভাল মানুষ। থিয়েটারে ফিমেল পার্টে সে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না কিন্তু তাহাতে ত নিজের ১২৩ বখ ভাষা ব্যবহার করিতে হয় না। তােতাপাখীর মত মুখস্ত করা পার্টটি ‘বেড়ে বলিয়া যায়। এখানে আসিবার আগে কেহই ত তাহাকে মিহাসাল দিয়া আনে নাই, সেই হইয়াছে তাহার মুস্কিল। রিহাসল দেওয়া থাকিলে তাহার যেরূপ তীক্ষ স্মরণশক্তি, তাহাতে সে কাহারই তােয়াক্কা রাখিত না। যুবাপুরুষটি সকলের, বিশেষ করিয়া তাহাদের রিহাসাল-মাষ্টার তারক হালদারের উপর ক্রোধান্বিত হইয়া উঠিল। রিহাসলি মাষ্টার তারকনাথ বাবু ছাত্রের চেয়ে যে কিছুমাত্র স্বস্তিতে অবস্থান করিতেছিলেন এরূপ মনে করিবার কোনই কারণ নাই। বহুক্ষণ পুবেই তিনি ছাত্রকে বসাইয়া, নিজেই বক্তৃতা দিতে উঠিতে পারিতেন কিন্তু কিয়ৎপূর্ব দৃষ্ট চকোৰ্তী মহাশয়ের অবস্থাটা মনে হইতে, দাড়াইবার শক্তিও তাহার পদদ্বয়ে সঞ্চিত হইতেছিল না। শৈলেন্দ্র যুবকের অবস্থাটা মনে মনে অনুমান করিয়া, প্রসন্ন হান্তে কহিল–কি ব্যাপার বল্লেন না যে ! এবার যুবক গলদঘর্ম হইয়া এক নিঃশ্বসে কহিল—আমাদের থিয়েটারে চাঁদা দিতে হবে। রিহার্সাল মাষ্টার তারকবাবু ও অপেরা মাষ্টার সলিলবাবু আর পারিলেন না, একেবারে চীৎকার করিয়া উঠিলেন—গদভ! গদভ! শৈলেন্দ্র একবার মাত্র তাহাদের পানে ফিরিয়া, যুবককেই জিজ্ঞাসা করিল—কোথায় আপনাদের থিয়েটার ? আপনার জনগণ কর্তৃক জঘন্য সম্ভাষণে অভিহিত হওয়ায় যুবক আর কথা কহিবে না ভাবিয়াছিল; তাই চুপ করিয়াইছিল। এক্ষণে ১২০

ব
মাষ্টারদ্বয়ের প্রতি দৃষ্টি পড়িতেই দেখিল তাহারা চক্ষুরেজিতে তাহাকে
উৎসাহিত করিতেছেন। অগত্যা যুবক কহিল—আজ্ঞে, গরাইদের
চণ্ডীমণ্ডপে থিয়েটার।
শৈলেন্দ্র বলিল--আচ্ছা আমি বিকেলে গিয়ে দেখব ; আপনারা
সব থাকবেন।
যাত্রার দল, নৈশবিদ্যালয়, মন্দিরকমিটি সকলকেই ঐ ভাবে জবাব
দিয়া শৈলেন্দ্র পুষ্করিণী খনন সমিতি ও রাস্তা বাঁধান কমিটির লােকদের
বলিল—চলুন, আপনারা কোথায় কি কাজ করছেন দেখে আসি।
তাহার সােৎসাহে কহিল—চলুন।
থিয়েটার প্রভৃতির সভ্যগণ সাগ্রহে কহিল—আজ্ঞে আমাদের ঐ
দিক দিয়েই ত পথ, একবার পায়ের ধূলাে দেবেন নাকি?
শৈলেন্দ্র বলিল—না। সন্ধ্যেবেলা থাকবেন, সেই সময়েই আমি
যাব।
একজন বলিল—আমরা এসে নিয়ে যাব কি ?
শৈলেন্দ্র হাসিয়া কহিল—বেশ ত, আসবেন।
আবার সকলে নমস্কার আদি করিয়া প্রস্থান করিল ।
শৈলেন্দ্র সারা দুপুর অভুক্ত থাকিয়া সমস্ত গ্রামটা ঘুরিয়া বেড়াইল।
বাস্তবিক ইহাদের কার্যাবলী দেখিয়া সে খুবই সন্তুষ্ট হইয়াছিল। তাই
আহার নিদ্রা বিশ্রামের কথা ভুলিয়া তাহাদের সঙ্গে একটির পর একটি
পথ ঘাট দেখিয়া বেড়াইতে লাগিল। বেলা যখন দুইটা, একজন সঙ্গী-
যুবকের হুস হইল, বলিল—দুটো বেজে গেছে, রদ্র হয়ে গেছে, চলুন
আপনাকে বাড়ী রেখে আসি।
১২৫

ব
শৈলেন্দ্র বলিল—রদ্র বুঝি একলা
আমারই জন্যে হয়েছে।
আপনাদের গায়ে লাগবে না ?
যুবক হাসিয়া বলিল—আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে। আমরা ত
রােজই তিন প্রহর পর্যন্ত বন্দুরে থাকি ; এই সব করি।
শৈলেন্দ্র বলিল—আমারও অভ্যেস করার ইচ্ছে হয়েছে। কাল
থেকে আপনারা আমাকেও আপনাদের সঙ্গী করবেন। আজ যে
সময়ে গেছলেন, সেই সময়ে গেলেই হবে, আমি তৈরী হয়ে থাকব।
আর আপনাদের চাদা আমি যা পারব, তা ত দেবই; উপরন্তু আপনারা
ডিস্ট্রিক্ট বাের্ড থেকে যাতে ভাল রকম সাহায্য বরাবরের জন্যে পান,
আমি দাদাকে দিয়ে তারও ব্যবস্থা করাবার চেষ্টা করব।
বলিয়াই সে বিপরীত দিকে, শ্বশুরালয়ের পানে চলিতে আরম্ভ
করিল। যুবক চতুষ্টয় তাহার অনুগমন করিতেছে দেখিয়া বলিল—
আপনাদের আর আসতে হবে না; আপনার বাড়ী যান।
আপনি পথ চিনে...
তা পারব। যে পথে এসেছি, সেই পথে গেলেই পৌছুতে পার।
যাবে ত! আপনারা অনর্থক কষ্ট পান্ কেন ?
তা হােক। এতে আমাদের কোন কষ্ট নেই...
শৈলেন্দ্র হাসিয়া বলিল—কিন্তু আমার কষ্ট আছে। আপনারা
কি আমাকে এতই সহুরে’ পেলেন যে কেউ সঙ্গে না গেলে আমি পথ
চিনে যেতে পারব না! দোহাই আপনাদের, আপনারা আমাকে
এতটা ভুল বুঝবেন না। নমস্কার। কাল সকালে ।
এ কথার পর আর যুবকগণ তাহার অনুসরণ করিল না। নমস্কার
১২৬
,

• এরূপ বন্ধু করিয়া ও সকালে আসিবে প্রতিশ্রুতি দিয়া, তাহার ভিন্নপথে গমন করিল। একজন কিয়দ্র তাহার সঙ্গে চলিল ; সেই পথেই তাহার বাড়ী। পথে আর কোন কথাবার্তা হইল না। বিস্তর বেলা হইয়া গিয়াছে ; শ্বশুর বাড়ীর লােক উৎকণ্ঠিত হইয়া উঠিয়াছেন; নূতন জামাইয়ের পক্ষে কাৰ্য্য শােভন নহে এই সকল কথা মনে পড়িয়া শৈলেনকে কিঞ্চিৎ বিব্রত করিয়া তুলিতে ছিল। এ যে নিছক লজ্জা, অপর কিছুই নহে—তাহা বুঝিয়াও সে স্বস্তি পাইতেছিল না। তবে ইহাও সত্য যে আজ সে এক অননুভূত- পূর্ব ও অনির্বচনীয় আনন্দ লাভ করিয়াছে ; বাস্তবিক সে অজ্ঞাত অপরিচিত এই পল্লীটির কতকগুলি লােকের সহিতও আত্মীয়তা করিতে পারিয়াছে ; কল্যকার রাত্রে দৃষ্ট শুভবাস, শয্যাশায়িতা দেবী প্রতিমা-সমা মূর্তিটির আদেশ অক্ষরে আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করিয়া ধন্য হইয়াছে। কমলার মনে তাহার সেই বিধবা জ্যেঠাইমার অপ্রতিহত প্রভাবের কথা শৈলেন্দ্রের মনে পড়িতে লাগিল ; কমলা সব সময়ে সর্বকাৰ্য্যে তাহারই আদেশ মানিয়া চলে। শৈলেন্ত্রের তখনি মনে হইল, অতঃপর তাহাকেও তাহাই করিতে হইবে। ক্ষুদ্র কথায়, ক্ষুদ্র জিনিষের দ্বারা তিনি যে কত বড় কাৰ্য্য করাইতে পারেন, নিজ অন্তরে তখনও সদ্য সদ্য ঝঙ্কত হইতেছিল বলিয়া শৈলেন্দ্রের মনে দ্বিধার অবসর এতটুকু ছিল না। গৃহ-সন্নিকটে আসিয়া যুবকটি অভিবাদন করিয়া তাহাকেই কিছু বলিল; কিন্তু তন্ময়-চিত্ত শৈলেন্দ্র তাহা শুনিতে পাইল না। আপন মনেই চলিতে লাগিল। ১২৭

ব
পথ জনশূন্য ; দূরে দূরে গােচারণের মাঠে রৌদ্র ঝলকিত-পৃষ্ঠা
গাভীগুলি চরিতেছে ; বৃক্ষছায়ায় বসিয়া রাখালেরা গান গাহিতেছে ;
বাঁশের বাঁশী বাজাইতেছে-অতি ক্ষীণ অস্পষ্ট সেই ধ্বনি আসিয়া
শৈলেন্দ্রের একাগ্রতা ভঙ্গ করিল।
আপনি বাড়ী গেলেন না ?-বলিতে বলিতে পিছন ফিরিয়া
যাহাকে উদ্দেশ করিয়া, কথাগুলা বলিল, তাহাকে দেখিতে
পাইল না।
তখন আবার একবার পশ্চিম-গগন-আরােহী সূর্যের দিকে চাহিয়া
দ্রুতপদে পা চালাইয়া দিল।
১২৮

সতো দুই দিনের মধ্যেই পাড়াগাঁয়ের বৃদ্ধ, যুবক, বালক, এককথায় সকলের সঙ্গেই এমন ঘনিষ্ঠতা করিয়া ফেলিল যে, সে-যে সেই গ্রামেরই অধিবাসী নহে, আগন্তুকমাত্র এবং পাড়াগাঁয়ের লােক না হইয়া সহরের অধিবাসী—ইহা ভুলিতে কাহারই বিলম্ব হইল না। গায়ে জামা নাই, দিন-রাত্রি নাই, জল কাদা নাই—শৈলেন্দ্র তাহার নবলব্ধ বন্ধু- গণের সহিত টঙ টঙস করিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। সকল কাজে সকল দলে, সকল বৈঠকে, শৈলেন্দ্র ক্রমেই অচ্ছেদ্য হইয়া উঠিতেছে। একদিন বড়ই বাড়াবাড়ি হইয়া গেল। সকালে চা খাইয়া নিত্য যে রকম বাহির হয়, সেদিনও শৈলেন্দ্র সেই রকমই বাহির হইয়াছিল। কিন্তু এক মহাহাঙ্গামায় পড়িয়া, তাহাকে পার্শ্ববর্ত্তী এক ভিন্ন গ্রামে চলিয়া যাইতে হওয়ায় রাত্রি দ্বিপ্রহরের পূর্বে সে গৃহে ফিরিতে পারিল না। হাঙ্গামাটা হইয়াছিল এইরূপ। মােটা রকমের চাদ। প্রাপ্ত বারােয়ারির দল শৈলেন্দ্র গ্রামে থাকিতে থাকিতেই ঘটা করিয়া একটা বারােয়ারি পূজা, যাত্রা গান প্রভৃতি অনুষ্ঠান করিবার সঙ্কল্প করিয়া কলিকাতা হইতে সুবিখ্যাত “হরি রায়ের ‘দল’ বায়না করিয়া আসিয়াছিল। শুক্রবার গান আরম্ভ হইবে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পূবেই ‘দল’ আসিয়া শিবতলায় গােলপাতা নিমিত আট চালায় ছাউনী ফেলিবে এইরূপ স্থির ছিল। বৃহস্পতিবার রাত্রে হঠাৎ সংবাদ 3월 পেীছিল, পাশ্ববর্তী গ্রামের শীতলা পূজা উৎসব উপলক্ষে তথাকার অধিবাসীগণ যাত্রার দলটিকে পথ হইতে ভাঙাইয়া লইয়া গিয়াছে। এই দুই গ্রামের মধ্যে একটা রেষারেষির ভাব অনেক কাল হইতে চলিয়া আসিতেছে। ন্যায় অথবা অন্যায় উপায়ে একটি, অপরটিকে লােকচক্ষুতে বৈধ অথবা অবৈধরূপে খেলাে’ করিবার চেষ্টা বরাবর করিয়া থাকে । কখন কখন সফলকামও হয়। অপর পক্ষের জেদ তাহাতে বাড়িয়াই চলে। গত বৎসর পার্শ্ববর্তী গ্রামে একটা মনসার গানের বৈঠকে গিয়া নানারূপে ইহারা তত্ৰত্য অধিবাসীগণকে অবজ্ঞা দেখাইয়া আসিয়াছিল । এবার সেই অপমান সুদ-সুদ্ধ ফিরাইয়া দিতে বদ্ধ পরিকর হইয়া তাহারা পথ হইতে যাত্রার দলকে দল লােপাট করিয়া দিয়াছে। ওয়ালারাও ( প্রায় সমস্ত ?) এমনই ধর্মপরায়ণ যে একপক্ষের নিকট হইতে পূর্বাহ্নে অগ্রিম বায়না লইলেও অকারণে চুক্তি ভঙ্গ করিতে কোনদিনই দ্বিধা বােধ করেন না। মােট কথা মান অপমান, লজ্জা ঘৃণা মনের মধ্যে বজায় থাকিতে, কেহ যাত্রার দল করে না। কথায় বলে “যাত্রার দল।” তাহারা যত্রতত্র ভােজনে দ্বিধাযুক্ত নহে; হট্টমন্দিরে শয়নে ভীত নহে; এবং বহু কথ্য অকথ্য কৃচ্ছ, সাধনেও পরান্মুখ নহে। সুতরাং তাহারা চুক্তিভঙ্গ করিলেও, আদালতের অথবা অপমানের ভয়ে বিচলিত হইবে এরূপ অপবাদ তাহাদের শত্রুরাই রটনা করিতে সক্ষম। আশা করি মিত্ৰজ্ঞানে তঁাহারা এই নিছক সত্য কথাগুলির ক্রুট গ্রহণ করিবেন না। বৃহস্পতিবার শেষরাত্রে সংবাদ আসিল যে পাশ্ববর্তী গ্রামের ‘দ্য- দুবৃত্তগণ যাত্রার দল ট্রেণ হইতে নামিবামাত্র মােট মাটর সহ দলকে বহু দল কুলপী করিয়া ফেলিয়াছে। বন্দরে নৌকা লাগিলে মুটের। যেমন কাহারও আদেশের অপেক্ষা না করিয়া কোম্পানীর মাল মাথায় মাথায় সাফ করিয়া দেয়, তাহারাও তেমনি দলের মানুষ এবং মােট মাটর। মাথায় মাখায় পাছার করিয়া দিয়াছে। অধিক অর্থ প্রাপ্তির আশা অধিকারী যেমন দমন করা কোন মতেই উচিৎ বােধ করিলেন না মনুষ্য-মন্তকে বাহিত হইয়া যাইবার প্রলােভন তেমনি দলের লােকেরাও সামলাইবার কোন কারণ দেখিলেন না। অধিকারী মহাশয় বড় জোর ভাবিলেন, একটু খেচামেচি হইবে—ফুঃ! আর দলের লােকরা সর্বত্রই ঘাস জল সুনিশ্চিৎ জানিয়া, চিন্তা করিয়া মস্তিষ্ক অপব্যয় করিবার দরকার বুঝিলেন না। সন্দেশৰহ সবিস্তারে সংবাদ দিয়া গেল। শুনিয়া তপ্ততৈলে তরী তরকারীর মত গ্রামশুদ্ধ লােক চড়বড় করিয়া উঠিল। সাধ্যাতীত না হইলে তন্মুহুর্তেই তাহারা মারণ মন্ত্র প্রয়ােগে- পার্শ্ববর্তী গ্রামখানিকে একটা বিরাট ও ভয়াবহ শ্মশানে পরিণত করিয়া ফেলিত। সাধ্যাতীত কমে মননিবেশ না করিয়া, তাই তাহারা কিরূপে চোরের উপর বাটবাড়ী করিয়া পরলােক হইতে দলের অধি- কারী স্বর্গীয় হরিরায় মহাশয় সমেত দলটিকে গ্রামে আনয়ন করিতে পারে—তাহারই যুক্তি নির্ধারণে নিযুক্ত হইল। কিন্তু গােয়ালা প্রধান ( অনেক পল্লীগ্রামে গােপগণ অদ্যাপি লাঠিয়াল বলিয়া প্রসিদ্ধ ) গােপ- গ্রাম হইতে দল আনয়ন করিবার উপযােগী যুক্তি নির্ণয় করিতে পারিল । তখন সকলে পরামর্শ করিয়া পাশ-করা ও হাকিম ভাতা শৈলেন্ধের দ্বারস্থ হইল। শৈলেন্দ্র বলিলেন—আমাদের একবার দলের কর্তার সঙ্গে দেখা করা দরকার। ১৩১ 3월 তাহাতে কোন উপায় হইবার আশা নাই; দাড় করাইয়া গণিয়া সহস্ৰ জুতা উপহার প্রদান করিলেও যাত্রার অধিকারী কথাটি বলিবে না সুতরাং গােপগ্রামে ভিক্ষুকের বেশে যাইয়া, নিরাশাপীড়িত হৃদয়ে প্রত্যাগমন করিতে বড়ই ক্লেশ পাইতে হইবে, এসকল নিষেধ বচন শুনিয়াও, শৈলেন্দ্র বলিল—তবু, বলিল-তবু, এছাড়া আর উপায়ও নাই। শৈলেন্দ্র বলিল—দেখা করলেই কাজ যে হবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই বটে, তবে দেখা না করেও ত কিছু বােঝা যায় না। তােমরা দু'চারজন আমার সঙ্গে চলাে, আমি একবার চেষ্টা করে দেখি। শৈলেন্দ্রের আনুগত্য করাটা ইহাদের অভ্যাস হইয়া গিয়াছিল; তাহারা আর আপত্তি করিল না। আধঘণ্টার মধ্যেই শৈলেন্দ্র সামান্য কিছু জলযােগ করিয়া, চা খাইয়া, ভােরের বেলাতেই বাহির হইয়া গেল। গােপ-গ্রাম যতই নিকট হইতে লাগিল, ইহারা ততই যেন মুষড়িয়া পড়িতেছিল, শৈলেন্দ্র নানা কথায়, নানা গল্পে তাহাদিগকে উৎসাহিত করিতে করিতে চলিল। কিছুক্ষণ মধ্যেই শৈলেন্দ্রকেও স্বীকার করিতে হইল যে ইহাদের কুণ্ঠিত হইবার কারণ ছিল। এরূপ অবস্থায় সভ্যজগতে বিরুদ্ধ দুই যােদ্ধায় কি হয় জানি-না, দেখি নাই, পল্লীগ্রামে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের একপক্ষকে নিরস্ত্র ও সন্ধিপ্রার্থী হইয়া আসিতে দেখিলে প্রতিপক্ষ যে বিধিমত ভাবে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করিতে কার্পণ্য করে না, তাহা ভাল করিয়াই প্রত্যক্ষ করা গেল। শৈলেন্দ্রকে কেহ কিছু বলিল না বটে, কিন্তু যে ভাবে ও যে ভাষায় তাহার সঙ্গীগণকে অভিনন্দিত ১৩২ বন্ধু করিল, তাহাতে শৈলেন্দ্রও উষ্ণ হইয়া উঠিয়াছিল তবে নাকি রাগ দেখাইয়া কাৰ্যাদ্ধার করিবার দুরাশা বহন করিয়া সে আসে নাই, তাই অতি কষ্টে অপমানগুলা হজম করিয়া চলিল। সর্বাঙ্গে প্রজ্ঞ, তাহা হইতে সমবেগে তৈলের কাথ ও রস নির্গত হইতেছে, এক অতি কৃষ্ণকায় প্রৌঢ়ব্যক্তি একখানি নরম-সরম পকমিলের ইষ্টকাসনে বসিয়া তামাকু সেবন করিতেছিল; পাশ্বে বসিয়া এক কাফী- দেশের সুদর্শনবালক সেই স্থূলকায় ব্যক্তিটির অঙ্গে তৈল-সম্ভবতঃ দ বিনাশক তৈলই প্রয়ােগে নিযুক্ত, শৈলেন্দ্রের সঙ্গীরা সেই স্থূলকায় প্রৌঢ় ব্যক্তিটিকে দলের অধিকারী ‘আয় মহাশয়’ বলিয়া সনাক্ত করিল। সেই কদাকব মূর্তি দর্শনে শ্রদ্ধা সম্মানের বিপরীত জ্ঞান জন্মিলেও, ভদ্রতার অনুবােধই শৈলেন্দ্র তাহাকে একটা নমস্কার করিয়া বলি— আপ'ই অধিকার ? এবান ব্যক্তি নিঃশব্দে ও গম্ভীর ভাবে ঘাড় নাড়িলেন। শৈলেন্দ্র বলিল—আমারা কোথাথেকে এসেছি, বুঝতে পারছেন বােধহয়। শৈলেন্দ্রের সঙ্গীগণের পানে পলকের দৃষ্টি ফেলিয়াই, অধিকারী মহাশয় তাহাদিগকে মর্মে মর্মে চিনিতে পারিয়াছিলেন, সদা সত্য কহিবে এই শাস্ত্রানুশাসনেই অধিকারী নির্বিকার ভাবে পুনঃ শির সঞ্চালন করিলেন। শৈলেন্দ্র বলিল—আপনাদের এ কিরূপ আচার মশায় ? আপনারা আজ থেকে তিনদিন আমাদের ওখানে যাত্রা করবেন লেখা পড়া করলেন, টাকা নিলেন, আর দিব্যি এখানে এসে বসে আছেন।

বg
অধিকারী মহাশয় উদাস কণ্ঠে কহিলেন—আমরা ত আসি নি।
শৈলেন্দ্র অবাক! লােকটা পাগল নাকি।
অধিকারী সস্মিত দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন, কথা বলিলেন না।
এই ন্যাকামী অসহ! শৈলেন্দ্র বলিল—এসে বসে তামাক টানছেন
আবার দাত বার করে বলছেন, আসিনি ত!
অধিকারী অতি শীতল প্রকৃতির লােক, ইহা স্বীকার করিতেই
হইবে। পূর্ববৎ ধীর স্থির ও শান্ত স্বরে বলিলেন—আজ্ঞে না, আমরা
আসিনি।
শৈলেন্দ্র কুদ্ধকণ্ঠে কহিল—আসেন নি ত ! বেশ, আদালতে তাই
বলবেন।
আজ্ঞে হ্যা, তা বলব বই কি।
মিথ্যে বলা আমাদের
স্বভাব নয়। নিশ্চয় বলব, আমরা আসিনি। হাজারটা লােক
সাক্ষীও আছে যে আমরা আসিনি। এরা আমাদের মাথায়
করে এনেছে। পাঁচখানা গাঁয়ের লােক দেখেছে, সবাই কিছু মিথ্যে
সাক্ষ্য দেবে না,অবশ্যই বলবে যে যাত্ৰাওলাদের পোটলা পুটলী,
বাক্স পেট থেকে দলের একটা প্রাণীকেও এরা নিজে আসতে দেয়
নি। সব হড় হড় দুড় দুড় করে মাথায় চাপিয়েছে আর এই খেনে
এনে নামিয়ে দিয়েছে।
বলিয়া রায় মহাশয় একটুক্ষণ থামিয়া, ঐ নিঃসৃত কাথের পানে
করুণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া, সহাস কণ্ঠে কহিলেন, আমি দিব্যি করে
বলতে পারি ম’শয়, যদি আপনি তেমন অবস্থায় পড়তেন, আপনাকেও
আসতে হােত! গাড়ী থেকে নেমে, দেখছেনই ত এই মােটা
১৪

বg ৩০ শলীর নিয়ে যেই এলাটফরমটিতে দাড়িয়েছি, কোখেকে যমদূতের মত দু’টো ষণ্ডাগুণ্ডা লােক এসে একেবারে পাঁজা কোলা করে না ধরে মাথায় তুলে ফেল্পে। ব্যাপার কি, বাপু, ব্যাপার কি যতই বলি, আহা বাবু বুড়াে মানুষ আমি, রােগের শলীর আমার, ওকি করতা কথাই কয় না মশাই! না রাম না গঙ্গা! চেয়ে দেখি, আমার দলের সবাইকারই ঐ অবস্থা! মাথার ওপর বসে আমরা যত করি হেই, হেই, এরা ততই করে—হু, হু—আর দৌড়ােয় ; বলি, বাপু, দৌড়ােস নে; নে; আস্তে আস্তে চল, পড়ে যাব, রােগের শলীর, ভেঙ্গে গুড়ো হয়ে যাবে-তা কে কার কথা কাণে তােল বলুন? একদমে, এই খেনে নামিয়ে বল্লে, আয় মশাই, এ গাঁয় গাওনা না করে যেতেটি পাচ্ছ না! আমি বল্লম, বাপু ও গ্রামে পাওনা সেরে’ এগাঁয়ে আসব ; তা বল্লে কি জানেন বাবু, ঘােষ গায়ের লাঠির বহরটা ঠাউরে তবে এখান থেকে নড়বেন, আয় মশাই! এখন আপনিই বলুন বাবু, যাত্রার দল নিয়ে কি লাঠির গুতােয় প্রাণটা দেব ? আপনার লেখা পড়া জানা বিদ্ধান্ পােক আমি আপনারই ওপর বিচারের ভার দিলুম। রায় মহাশয়ের বলিবার ভঙ্গিটা এতই সরল ও হাস্যোদ্দীপক যে শৈলেন্দ্র এতক্ষণ অতিকষ্টে হাস্য সম্বরণ করিতেছিল। কিছুক। পূর্বে এই লােকটার প্রতি যে অশ্রদ্ধা ও বিরক্তির ভাব তাহার মনের মধ্যে সঞ্চিত হইয়া উঠিতেছিল, তাহাও অন্তর্হিত হইয়া গিয়াছিল। সে নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল। রায় মহাশয় বলিলেন—দ্বিজুরায় মহাশয়ের একটি গান আছে বধূ আহা তিনি স্বর্গীয় হয়েছেন, মহাপুরুষ লােক,গানটার ধূয়া হয়েছে “অমন অবস্থায় পড়লে, সবারই মত বদলায়”—মহাকবি লােক তিনি, তুল লেখা কি আর তাঁর কলম থেকে বেরুতে পারে ?—কখনই না। বেড়ে ধুয়ােটি-মমন অবস্থায় পড়লে, সবারই মত বদলায়! ঠিক, বদলায়ই ত! কি বলেন বাবু, বদলায় না ? শৈলেন্দ্র সস্মিতমুখে চাহিয়া রহিল। রায় মহাশয় তাহার মনের ভাবটি অনুমান করিতে করিতে কহিলেন -এদের এখানে তিন রাত্তির গাওনা হবে, এখান থেকে, সােজ। আপনাদের ওখানেই যাব বাবু! কেষ্ট বিষ্ণু মহেশ্বর এলেও এবার আর নড়চড় হবে না, দেখে নেবেন বাবু। শৈলেন্দ্র এইবার কথা কহিল ; বলিল—রায় মশায়, আপনি বােধ করি বুঝতে পারছেন, দু'টো গায়ে একটা জোর রেষারেষি চলছে; এ চায়-ওকে অপমান করবে, ও চায়-ওকে অপমান করবে। এমন অবস্থায় আপনি আমাদের গাঁ’র বায়না আগে নিয়ে, এখানে আগে যাত্রা করে তারপর আমাদের গাঁয়ে গেলে, আমাদের গাঁয়ের বড় অপমান হবে। চাই কি, এই নিয়ে একটা মারামারি, লাঠালাঠি কাটাকাটিও হতে পারে। সেটা কি উচিৎ হবে, আপনিই বলুন। এই তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে যদি রক্তারক্তি হয়—হবেই, নিজের কথা আমি ধরি নে, যদি একটা রক্তারক্তি হয়, সেটাই কি ভাল হবে ? রক্তারক্তির নামে প্রবল প্রতাপ রায় মহাশয়ের পদনখ হইতে কেশাগ্রভাগ পর্যন্ত সন্ত্রস্ত হইয়া উঠিল। তিনি মনশ্চক্ষে সুস্পষ্টই দেখিতে পাইলেন, তাহার মাথাতেও এক ঘা লাঠি পড়িয়াছে এবং সেই • বশ্ব একটি ঘায়েই তিনি কীচক বধ হইয়া গিয়াছেন। রায় মহাশয়ের কণ্ঠতালু শুষ্ক হইয়া আসিল এবং তাহা হইতে একটি শব্দও বাহির হইতে পারিল না। তৈল ব্ৰক্ষণ-নিযুক্ত বালকের হাত দু’টা ঠেলিয়া দিয়া তিনি স্বয়ং সজোরে ও সশব্দে ভ্র ঘর্ষণ করিতে লাগিলেন। শৈলেন্দ্র বলিল—আমি দলাদলি, রেষারেষি পছন্দ করিনে এই একট। অতি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে মারামারি কাটাকাটি হয় - আমি একেবারেই চাই নে। আমি আপােষে বিনাগণ্ডগােলে মিটমাটই চাই। তাই গাঁয়ের লােকের এক রকম অমতেই আমি এসেছি। এরা আমার কথা শোনে, আমার মনে হয় উভয়পক্ষ একটু নরম হলেই মিটমাট করে দিতে পারি। রায় মহাশয় জিজ্ঞ সিলেন—কি রকম, কি করতে চান ? বলছি! তার আগে এখানকার দু'এক জন মাতব্বরকে ডাকুন। তারাও আমার বক্তব্য শুনুন। কোটা তাদের ভাল লাগছে, কোটা লাগছে না, তা সঙ্গে সঙ্গই আমারও জানা দরকার হবে। রায়-মহাশয় নিজেই উঠিলেন এবং অল্পক্ষণ মধ্যে কয়েকজন লোককে সঙ্গে করিয়া ফিরিয়া আসিলেন। শৈলেন্দ্রর সম্ভান্ত রূপ- দর্শনে আকৃষ্ট হইয়াই তাহারা তাহাকে নমস্কার করিয়া ফেলিল। নহিলে সে যাহাদের প্রতিনিধি ও যে উদ্দেশ্যে তাহার আগমন তাহাতে তাহাকে কোনরূপ সম্মানদান ত দূরের কথা, সম্মানরক্ষা করাই তাহা- দের পক্ষে কষ্টকর হইত। শৈলেন্দ্র প্রতি-নমস্কার করিয়া আনুপূর্বিক সকল কথা বলি, বলিল—এখন একটা মীমাংসা যাতে হয়, তাই ১৩৭ আপনাদের করতে হবে। সেইজন্যই আমি আপনাদের কাছে ' এসেছি। একথায় একপক্ষ যেরূপ আত্মপ্রসাদ লাভ করিল; অপরপক্ষ তপ কিম্বা ততােধিক অপ্রসন্ন হইয়া উঠিল, কিন্তু শৈলেন্দ্র কোন পক্ষের দিকেই লক্ষ্য না করিয়া বলিয়া যাইতে লাগিল—আপনাদেরও মান থাকে, ওদেরও অসম্মান না হয়, এমনই একটা মীমাংসা হয় এই আমি চাই। আমি কোন কথা বলব না, আপনারা যা ঠিক করে দেবেন তাতেই রাজী হয়ে আমি চলে যাব। এ কথায় গােপগ্রামের অধিবাসীদের মনগুলি ভিজিয়া গেল। এতখানি বিনয়, সৌজন্য, ভদ্রতায় তাহারা অভ্যস্ত ছিল না ; মনে মনে কেমন সন্ত্রস্ত হইয়া পড়িয়া কহিল—এর আর কথা কি বাবু! আপনি যখন এসেছেন, তখন মীমাংসা ত হয়ে গেছে বল্লেই হয়। শৈলেন্দ্র বলিল-না বাপু, একথাটি ঠিক হ’ল না,-সেরকম ভদ্রতা রক্ষা করা মীমাংসা আমি চাইনে। আমি কি চাই জান, তােমরা এমন একটা মীমাংসা করে দাও, যা দেখে ও গায়ের লােকেরা মুখে বলুক, আর নাই বলুক, মনে ভাববে যে, হ্যা, আমরা বিপন্ন হয়ে পড়েছিলুম, আমাদের কষ্ট দিতে পারি,জেনেও গােপ-গ। আমাদের মান রেখেছে, প্রতিবেশীর যােগ্য কাজ করেছে। শুধু ওরা নয়, যে শুনবে, সেই যেন বলে, গােপ-গাঁয়ে মানুষ আছে বটে; গােপ-গাঁ ভদ্দর গাঁ বটে। এ কথায় গােপ-গ্রাম একেবারে গলিয়া গেল। বলিল, যা ১৩৮

রায় মহাশয় দলের অধি::
বাবু, আপনি যা বলবেন, আমরা তাইতেই রাজী। আপনি ওনা-
দেরও বন্ধু, আমাদের বন্ধু। দু'দলের মর্যাদা থাকে, এমন কাজ
আপনি যা করে দেবেন, আমরা তাতে টু-শব্দটিও করব ।
শৈলেন্দ্র জিজ্ঞাসিল-দেখ ! এর নড়চড় হবে না ত?
সেকি বাবু! আমরা কথা দিচ্ছি, নড়চড় করে কার সাধ্যি।
তাহলে শােন, আমি যা বলি। রায় মশায় ! আপনার দলের
এমন দু'খানা পালা আছে কি, যা একসঙ্গে দু’জায়গায় হতে পারে ?
একসঙ্গে দু’জায়গায় হতে পারে, এমন পলা! দাড়ান ভাবি।
-রায় মহাশয় চিন্তা করিতে লাগিলেন। তঁাহার দলের দুই চারিজন
লােক আসে-পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল ; তাহারাই প্রবল আপত্তির
ধরে বলিয়া উঠিল,-তেমন পালা আমাদের নেই।
শৈলেন্দ্ৰ হতাশ ভাবে রায় মহাশয়ের দিকে চাহিয়া রহিল।
রায় মহাশয় বলিলেন,—আছে। বৃত্রাসুর আর কংসবধ। হা,
তা চলে।
তথায় উপস্থিত ছিলেন, তিনি বলিলেন—চলে ত বলেন,
।
করারও যে আমায় করতে হয়।
কেন, নীলমণি ত রয়েছে।
কস’ কিছু মলিন হইলেন; কিন্তু হাল ছাড়িলেন না, কহি-
লেন—অতাে দৌড় ঝাপ কে করবে মশাই।
সঙ্গে সঙ্গে দলের আরও দুই তিনজন লােক বলিয়া উঠিলেন,-সে
মশায় আমরা পারব না।
ত্রিশকাল ফল

वष्ट्र
চালাইতেছেন। তিনি তাহাদের কথায় কান না দিয়াই শৈলেন্দ্রের পানে
চাহিয়া জিজ্ঞাসিলেন—কখন, কি রকম কি হবে বাবু কিছু ভেবেছেন ?
না, তা ভাবিনি। তবে এক সময়ে দু’জায়গায় গাইতে পারবেন
জানলে সব ঠিক করে ফেলি।
ই বই যখন পেইছি, তখন গাইব বই কি।
শৈলেন্দ্র বলিল—আজই এখানে গাওনা আরম্ভ হবার কথা ত।
নাগাদ সন্ধ্যে হবে বােধ হয় ?
হা, তাই।
তা হলে ওখানেও নাগাদ সন্ধ্যে আরম্ভ করতে হবে। কেবল
কথা এই, ওখানে যখন আরম্ভ হবে, এখানকার দু’পাঁচজনকে সেখানে
গিয়ে আরম্ভ করিয়ে গিয়ে আসতে হবে। আর
আর এখানে
এখানে আমি
নিজে এসে বােমায় আগুন দেব। কি বলেন !—বলিয়া সে গোপ
গ্রামের মাতব্বরগণের পানে চাহিল।
“বােমায় আগুন দোব' কথাটার অর্থ সকলে হয়ত জানেন না।
পল্লীগ্রামে রীতি আছে, যাত্রা আরম্ভ হইবার অব্যবহিত পূর্বে
দু’টি তিনটা বােমা ফাটাইয়া, আওয়াজ করা হয়। প্রথমটি
লােককে জানাইয়া দেয় যে আর দেরী নাই; দ্বিতীয়টির উদ্দেশ্য
ওগাে এস, গাওনা যে আরম্ভ হইয়া গেল।
শৈলে বলিল—কেমন এই রকম বন্দোবস্ত ঠিক নয় ?
কেহই কোন কথা কহিল না।
শৈলেন্দ্র তাহার সঙ্গীদের উদ্দেশ করিয়া বলিল—কি হে তােমাদের
কেন আপত্তি আছে নাকি আমার বন্দোবস্তে ?

ব শৈলেন্দ্রের আনুগত্য করা এবং তাহার কথার বিরুদ্ধে কথা না বলাই তাহাদের অভ্যাস হইয়াছিল। আজিকার কোন বন্দোবস্তই তাহাদের মনঃপূত হয় নাই বটে কিন্তু মুখ ফুটিয়া সে কথা তাহারা বলিতে পারিল না । এবং ইহাও যেন তাহারা মনে মনে বুঝিতেছিল যে শৈলেন্দ্র যাহা করিবে, তাহাতে তাহাদের ভাল ছাড়া মন্দ হইবে না। শৈলেন্দ্র আবার জিজ্ঞাসিলকিগাে তােমরা যে কথা বলছ না? তবে বুঝি তােমাদের মত নেই ? কিন্তু অমতের ত কোন কারণ দেখি না। গােপ গাঁয়ের লােকেরা তােমাদের সঙ্গে যথেষ্ট ভদ্র- ব্যবহার করছে, তারা আজই তােমাদের গায়েও গাওনা হতে দিচ্ছে, তবু যদি তােমাদের অমত হয়, তাহলে দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কি বলব বল ? লােকে চিরদিন তোমাদেরই নিলে করবে, বলবে—দু’টে গায়ে এই যে রেষারেষি, মনকষাকষি গােপ গাঁ। মেটাতে চেয়েছিল, তােমরাই মেটাতে দাও নি। পাশাপাশি দু’খানা গ, প্রতিবেশী, জ্ঞাতি বল্লেই হয়, বহুদিনের ঝগড়া বিবাদের পর মিলনের সুযােগ এল, তাতেও যদি তােমরা উদ্যোগী হয়ে বাধা জন্মাও, মিলন གོ দাও-কলঙ্ক তােমাদেরই। আমরা ত অমত করিনি বাবু। - শৈলেন্দ্র উল্লসিত হইয়া কহিল–করনি ত! তাহলেই হল। গােপ-গাও অমত করবে না, এ আমি জানি। . গােপ-গ্রামের মাতব্বরগণ বলিয়া উঠিল—আমরা ত গােড়াতেই বলে ১৪১ দিইছি বাবু যে আপনি মধ্যস্থ হয়ে যা করে দেবেন, আমরা বুঝব যে আমাদের ভালর জন্যেই আপনি তাই করেছেন। শৈলেন্দ্র বলিল, বেশ কথা। সত্যিই আমি দুখানা গাঁয়েরই ভাল চাই। শুধু দুখানা কেন, যদি পঞ্চাশখানা গ্রাম আর পঞ্চাশখানা গ্রামের বিরুদ্ধে দাড়িয়ে ঝগড়াঝাটি করত, আমি, দু’দলে যাতে মিলন হয়, তাই করতুম। ঝগড়াঝাটি অনেক হয়ে গেছে, পৃথিবীর যেখানেই দেখবে, দেখবে ঝগড়াঝাটিতে যত অনিষ্ট, যত অপকার হয়েছে, এমন আর কিছুতে নয়। সমস্ত পৃথিবীই আজ মিলনের জন্য চেষ্টা করছে, এ-সময়ে ঘরের কোণে আমাদের ঝগড়া রাখা কি উচিত? প্রায় একসঙ্গেই সকলে বলিয়া উঠিল -তা কি আর উচিৎ ? শুনে সন্তুষ্ট হ’লুম। ত’হলে রায় মশাই, গাড়ীটাড়ী আপনার কখানা কি চাই, আপনি আমাদের এখানকার বন্ধুদের বলবেন, এরাই সব বন্দোবস্ত করে দেবেন।—বলিয়া লে গােপ-গায়ের মাতব্বরদের দেখাইয়া দিয়া বলিল—আমাদের অবস্থা ও নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, দু'চার ঘণ্টার মধ্যে আমাদের আসরে কোথায় আলেরে, সতরঞ্চরে—সব যােগাড় করে ফেলতে হবে, আমরা গাড়ীটাড়ি, কোন ব্যবস্থাই করে উঠতে পারব না। কেমন ভাই, আমাদের এ উপকারটিও তােমরা করে দেবে ত! ভ্রাতৃ সম্বােধনে তাহাদের প্রাণের ভিতর আনন্দের তুফান বহিয়া গেল ; বলিল—আজ্ঞে হ্যা, আমরা নিজেরা পৌছে দিয়ে যাব। তাহলে আর দেরী নয়, উwেগ আয়ােজন করতে হবে, ১০২ ; আমরা যাই। এখানকার যা কিছু করতে হবে, তােমরা ও রায় মশায় আমাদের হয়ে করে নিও। বলিয়া তাহার বিদায় লইল। 'গােপগ্রামের মাতব্বরগণ ও রায় মহাশয় বহুদূর পর্যন্ত তাহাদের অনুসরণ করিয়া চলিল। এ গ্রামের তখনকার অবস্থা যথাযথ বর্ণন করিতে পারি সে শক্তি আমাদের নাই। এককথায় বিষাদ ঢাকা গ্রাম' বলিলে আমার পাঠক পাঠিকা যদি কিছু বুঝিয়া লইতে পারেন, তবে তাহাই তাহাদিগকে করিতে হইবে। কারণ আমার বলিবার আর কিছুই নাই। শৈলেন্দ্র ও তাহার সঙ্গীগণ যখন ফিরিয়া আসিল, তখন সন্ধ্যা হইতে আর বড় বেশী দেরী নাই; ইহাদের মুখে সংবাদ জানিয়া সকলেই যে সন্তুষ্ট হইল, তা নয়, তবে অন্য এবং একটু পরেই এখানেও যাত্রাগান হইবে জানিয়া কতকটা আশ্বস্ত হইল মাত্র। বয়ােবৃদ্ধ এবং জট পাকাইতে পরিপক্ক ব্যক্তিগণ আপােষ নিতান্ত অপমানকর হইয়াছে বলিয়াই মনে করিতে লাগিলেন। কিন্তু সন্ধ্যার অব্যবহিত পরে যখন গােপ-গ্রামের মাতব্বরগণ নিজের গরুর গাড়ীর চালক হইয়া রায় মহাশয়ের দলবল ও বাক্স পেটরা হাজির করিয়া দিতে আসিল তখন আর এক প্রাণীর মনেও কোন সঙ্কোচ রহিল না এবং আপােয় সম্মানজনকই হইয়াছে, প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে তাহা প্রচারিত করিতেও কাহারও দ্বিধা রহিল না। শৈলেন্দ্র এতক্ষণ পরে অন্তঃপুরে ঢুকিল। ঢুকিয়াই দেখিল, সেই রুগ্ন, শয্যাশায়িনী জ্যোঠাইমা কমলার হাত ধরিয়া দ্বাৰমুখে দাড়া- ১৪৩

ইয়া, তাহাকেই প্রত্যুদগমন করিতে আসিয়াছেন। শৈলেন্দ্ৰ নতজানু
হইয়া প্রণাম করিতেই, তিনি কমলাকে বলিলেন—মা কয়লা,
ছেলে আমার রাজ্য জয় করে ফিরে এসেছেন। তারা শঙ্খধ্বনি
কর!
কমলং করিল না বটে তবে কে বা কাহারা অলক্ষ্যে ঘনঘন
শঙ্খনিনাদ কৰ্বিতে লাগিল।
কমলা একান্তে স্বামীকে পাইয়া বলিল,-আজ দশখানা গাঁয়ের
লােক তােমার সুখ্যাতি
করছে। আজ আমার মত
সুখী কে ?
শৈলেন্দ্র বলিল—কেন, তােমার মুখে যে সুখী, তােমার দুঃখে যে
দুঃখী, সেই—আমি ।
সম্পূর্ণ।
১৪৪

No text on this page.

No text on this page.

No text on this page.

Badhu

Author
Mazumdar, Srijukta Bijayratna
Title
Badhu
File name
Badhu
Text
OCR done
Citation
1926
Published
2009/08/6
Publisher
Barendranath Ghosh, Kolkata
Language
Sanskrit
Pages
154
Library
Bally Sadharan Granthagar
Classification
Fiction. Prose Narrative
Keywords
Novel
DLI number
512345
Barcode
4990010019431.00
Scanning centre
C-DAK, Kolkata
Digital publisher
Digital Library Of India
Rights
In Public Domain
VMLT id
W98JrngGMf0
Download PDF

Badhu